পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - সালাম
প্রশংসনীয় কাজ ও কথাকে আদাব (আদব) বলা হয়। ইমাম সুয়ূত্বী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ চারিত্রিক মহৎ গুণাবলী লাভ করাকে আদব বলা হয়। আবার কেউ কেউ বলেন, সৎকর্মের সাথে থাকা ও অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকার নাম আদাব। কেউ কেউ বলেন, বড়দের সম্মান করা ও ছোটদের সাথে সদয় আচরণ করাকে আদব বলে।
এটাও বলা হয় যে, أدب শব্দটি مأدبة থেকে গৃহীত। আর তা হলো খাবারের প্রতি আহবান করা, এটা এজন্য নাম হয়েছে যে, সাধারণত খাদ্যের প্রতি ডাকাই হয়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
৪৬২৮-[১] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা আদম (আ.)-কে তাঁর আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন। তাঁর উচ্চতা ছিল ষাট হাত। আল্লাহ তা’আলা তাঁকে সৃষ্টি করে বলেন, যাও এবং অবস্থানরত মালায়িকাহ্’র (ফেরেশতাদের) ঐ দলটিকে সালাম করো। আর তাঁরা তোমার সালামের উত্তরে কি বলে তা শ্রবণ করো। তাঁরা যে উত্তর দেবে তা তোমার এবং তোমার সন্তানদের সালামের উত্তর। অতঃপর আদম (আ.) গিয়ে তাঁদের উদ্দেশে বললেনঃ ’’আসসালা-মু ’আলায়কুম’’। অতঃপর মালায়িকাহ্ উত্তর দিলেন, ’’আসসালা-মু ’আলায়কা ওয়া রহমাতুল্ল-হ’’। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তাঁরা (ফেরেশতাগণ) ’’ওয়া রহমাতুল্ল-হ’’ অংশটি বৃদ্ধি করেছেন। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ যে ব্যক্তিই জান্নাতে প্রবেশ করবে সে আদম (আ.)-এর আকৃতিতেই জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং সে উচ্চতায় হবে ষাট হাত। তখন হতে আজ পর্যন্ত সৃষ্টিকুলের উচ্চতা ক্রমাগত হ্রাস পেয়ে আসছে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ السَّلَامِ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: خَلَقَ اللَّهُ آدَمَ على صورته طوله ذِرَاعًا فَلَمَّا خَلَقَهُ قَالَ اذْهَبْ فَسَلِّمْ عَلَى أُولَئِكَ النَّفَرِ وَهُمْ نَفَرٌ مِنَ الْمَلَائِكَةِ جُلُوسٌ فَاسْتَمِعْ مَا يُحَيُّونَكَ فَإِنَّهَا تَحِيَّتُكَ وَتَحِيَّةُ ذُرِّيَّتِكَ فَذَهَبَ فَقَالَ: السَّلَامُ عَلَيْكُمْ فَقَالُوا: السَّلَامُ عَلَيْكَ وَرَحْمَةُ اللَّهِ قَالَ: «فَزَادُوهُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ» . قَالَ: «فَكُلُّ مَنْ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ عَلَى صُورَةِ آدَمَ وَطُولُهُ سِتُّونَ ذِرَاعًا فَلَمْ يَزَلِ الْخَلْقُ يَنْقُصُ بعدَه حَتَّى الْآن»
ব্যাখ্যাঃ হাদীসে উল্লেখিত ‘তাঁর’ সর্বনাম এর প্রত্যাবর্তনস্থল কোন্ দিকে? এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন, এর প্রত্যাবর্তনস্থল হলো ‘‘আদম’’ অর্থাৎ আল্লাহ আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেছেন যে আকৃতিতে যা ছিল পৃথিবীতে অবতরণ অথবা মৃত্যু পর্যন্ত। এটা তাদের সংশয়কে দূর করার জন্য যারা মনে করে যে, আদম (আ.) জান্নাতে অন্যরূপে ছিলেন অথবা তিনি বরাবর প্রথম সৃষ্টির মতো ছিলেন। তার বেড়ে উঠায় কোন পরিবর্তন হয়নি যেটা তাঁর সন্তান এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় পরিবর্তিত হয়।
কেউ বলেন, দাহরিয়্যাহ্ (যুগবাদীদের) খন্ডন করার জন্য। আর তা হলো মানুষ শুক্র থেকে সৃষ্টি হয়, আর মানব শুক্র মানুষ থেকে উৎপন্ন হয় এর কোন প্রথম নেই। অতএব প্রমাণিত হয় যে, তিনি প্রথম থেকে এভাবে সৃষ্টি।
কেউ বলেন, এটা প্রকৃতিবাদীদের খন্ডন করার জন্য যারা বিশ্বাস করে যে, অবশ্যই মানুষ প্রকৃতির প্রভাবে জন্মে থাকে।
কেউ বলেন, এটা কদারিয়্যাহদেরকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য যারা ‘আক্বীদাহ্ পোষণ করে যে, মানুষ নিজেই সৃষ্টি হয়েছে।
কেউ বলেছেন, হাদীসটির পটভূমির আলোকে এর প্রত্যাবর্তনস্থল হবে আদম । কারণ এর পূর্বে এক ঘটনা উহ্য আছে যা হলো জনৈক লোক তার গোলামকে মুখমন্ডলের উপর প্রহার করলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিষেধ করলেন এবং এ হাদীসটি বললেন।
কেউ কেউ বলেছেন, এর সর্বনাম প্রত্যাবর্তন করবে আল্লাহর দিকে। তারা দলীল হিসেবে অন্য একটি হাদীস عَلٰى صُورَةِ الرَّحْمٰنِ উল্লেখ করেন যা মুনকার ও য‘ঈফ। আর এখানে صُورَةِ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো الصِّفَةُ তথা গুণাবলী। তখন তার অর্থ হবে, নিশ্চয় আল্লাহ আদমকে তাঁর জ্ঞান, জীবন, শ্রবণ, দর্শন ও অন্যান্য গুণাবলী দিয়ে সৃষ্টি করেছেন।
ইবনু ‘আবদুল বার ইজমার দাবী করে বলেন, সালামের সূচনা করা সুন্নাত ও সালামের জবাব দেয়া ওয়াজিব। এটা আমাদের প্রসিদ্ধ মত। কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর থেকে বর্ণনা করে বলেন, সালাম দেয়া সুন্নাত অথবা ফরযে কিফায়াহ্। যদি দলের পক্ষে কেউ একজন সালাম প্রদান করেন তাহলে যথেষ্ট হবে। তিনি ইজমার উদ্ধৃতি দিয়ে আরো বলেনঃ তাঁর ফরযে কিফায়াহ্ বলার অর্থ হলো এটা সুন্নাত। আর সুন্নাত প্রতিষ্ঠা করা বা পুনর্জীবিত করা হচ্ছে ফরযে কিফায়াহ্।
‘আলিমগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, সালামের জবাব দেয়া ফরযে কিফায়াহ্।
নিঃসন্দেহে বলা যায়, সালামের মাধ্যমে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করা আমাদের উম্মাতে মুহাম্মাদীর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। যা অন্যান্য উম্মাতের সময় ছিল না। যার ইঙ্গিত আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অমীয় বাণী থেকে প্রাপ্ত হই। যেমন প্রখ্যাত হাদীসবিশারদ ইমাম বুখারী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর রচিত প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘আদাবুল মুফরাদে’ ও ইবনু মাজাহতে রয়েছে। যাকে ইমাম ইবনু খুযায়মাহ্ সহীহ বলেছেন, আমাদের মা ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে মারফূ‘ সূত্রে বর্ণিত, ইয়াহূদীরা তোমাদের ‘সালাম’ ও ‘আমীন’-এর ব্যাপারে যত হিংসা করে আর কোন কিছুতেই এরূপ তোমাদের ওপর হিংসা করে না।
আবূ যার (রাঃ) তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘটনায় বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে বললেনঃ আমি হলাম প্রথম ব্যক্তি যাকে ইসলামী শুভেচ্ছায় অভিবাদন জানানো হয়েছে। এরপর বললেন, وَعَلَيْكَ وَرَحْمَةُ اللّٰهِ অর্থাৎ তোমার ওপরেও আল্লাহর শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক। (মুসলিম)
ইমাম ত্ববারানী ও বায়হাক্বী আবূ উমামাহ্ কর্তৃক মারফূ‘ হাদীস উল্লেখ করে বলেনঃ আল্লাহ সালামকে আমাদের শুভেচ্ছা জ্ঞাপনের মাধ্যম ও আমাদের যিম্মীদের নিরাপত্তা প্রদান স্বরূপ নির্ধারণ করেছেন।
আবূ দাঊদে ‘ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, আমরা জাহিলী যুগে অভিবাদন জানানোর সময় বলতাম أَنْعِمْ بِكَ عَيْنًا তোমার চক্ষু শীতল হোক। أَنْعِمْ صَبَاحًا সকাল শুভ হোক। অতঃপর যখন ইসলামের আবির্ভাব ঘটল তখন আমরা এসব বলাতে নিষিদ্ধ হলাম।
ইবনু আবূ হাতিম বলেনঃ তারা জাহিলী যুগে حُيِّيتَ مَسَاءً আমি সন্ধ্যায় তোমার দীর্ঘজীবন কামনা করলাম। حُيِّيتَ صَبَاحًا সকালে দীর্ঘজীবন কামনা করলাম। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা এটাকে পরিবর্তন করে সালামের প্রবর্তন করলেন।
এ হাদীসে সালামের জবাবে প্রদানকারীর চাইতে কিছু বৃদ্ধিসহ বলার ইঙ্গিত রয়েছে। এটা সর্বসম্মতিক্রমে মুস্তাহাব। কারণ এ ব্যাপারে এর সাক্ষ্য কুরআনে পাওয়া যায়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, فَحَيُّوا بِأَحْسَنَ مِنْهَا أَوْ رَدُّوْهَا ‘‘তখন তোমরা এর চাইতে উত্তমভাবে অভিবাদন বা সালাম জানাও অথবা তার মতো ফিরিয়ে দাও’’- (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪ : ৮৬)। অতএব সালাম প্রদানকারী যদি وَرَحْمَةُ اللهِ পর্যন্ত বলে তবে জবাব দানকারীর وَبَرَكَاتُهٗ বৃদ্ধি করা মুস্তাহাব। আবার কেউ যদি وَبَرَكَاتُهٗ পর্যন্ত বলে তাহলে তার জবাবে কিছু বৃদ্ধি করা যাবে কিনা? অথবা প্রদানকারীর وَبَرَكَاتُهٗ-এর চাইতে কিছু বেশি বলতে পারে কিনা? এর উত্তরে ইমাম মালিক তাঁর মুওয়াত্ত্বা গ্রন্থে ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর সূত্রে বলেন, وَبَرَكَاتُهٗ পর্যন্তই সালামের শেষ। ইমাম বায়হাক্বী তাঁর ‘‘শু‘আবুল ঈমান’’ গ্রন্থে বলেনঃ জনৈক ব্যক্তি ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ)-এর কাছে বলল, السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهٗ وَمَغْفِرَتُهٗ। তখন তিনি বললেন, وَبَرَكَاتُهٗ পর্যন্ত বললে তোমার জন্য যথেষ্ট হতো, এর শেষ وَبَرَكَاتُهٗ পর্যন্ত। ‘উমার (রাঃ) বলেন, সালাম হলো وَبَرَكَاتُهٗ পর্যন্ত। এর বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য। তবে ইবনু ‘উমার-এর মতে বৃদ্ধি করা জায়িয। যেমন ইমাম মালিক তাঁর মুওয়াত্ত্বা গ্রন্থে বলেন, ইবনু ‘উমার (রাঃ) সালামের জবাবে বৃদ্ধি করে وَالْغَادِيَاتُ وَالرَّائِحَاتُ বলেন।
ইমাম বুখারী আদাবুল মুফরাদে বলেন, সালিম বলেনঃ ইবনু ‘উমার (রাঃ) জবাবে বৃদ্ধি করতেন। আমি একদিন এসে বললাম السَّلَامُ عَلَيْكُمْ , এর উত্তরে তিনি বললেন السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللهِ। পরে আরেকদিন এসে وَبَرَكَاتُهٗ পর্যন্ত বললাম, তখন এর উত্তরে তিনি বৃদ্ধি করে وَطِيبُ صَلَوَاتِه বলেন। যায়দ ইবনু সাবিত এক বর্ণনায় বলেন, ইবনু ‘উমার (রাঃ) মু‘আবিয়াহ্ (রাঃ)-এর নিকট চিঠি লিখতে গিয়ে বললেন, السَّلَامُ عَلَيْكُمْ يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهٗ وَمَغْفِرَتُهٗ وَطِيبُ صلواته।
ইবনু দাক্বীক্বিল ‘ঈদ বলেনঃ এ রীতি আল্লাহর বাণী فَحَيُّوا بِأَحْسَنَ مِنْهَا থেকে গৃহীত। অতএব যখন প্রথমে সালাম দানকারী ব্যক্তি وَبَرَكَاتُهٗ পর্যন্ত বলবে তখন এর উত্তরে বৃদ্ধি করা জায়িয।
وَبَرَكَاتُهٗ এরপর বর্ধিত শব্দাবলীর ফাযীলাত সংক্রান্ত যে সব হাদীস আছে এবং যেসব হাদীস রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে পাওয়া যায় তার প্রায় সবই য‘ঈফ। এসব য‘ঈফ হাদীসের ক্ষেত্রে হাফিয ইবনু হাজার বলেনঃ যখন এ দুর্বল হাদীসগুলো একত্রিত হয় তখন তা শক্তিশালী হয়। যার ফলে وَبَرَكَاتُهٗ এর পরে বর্ধিত শব্দগুলো ব্যবহারের বৈধতা পাওয়া যায়। (ফাতহুল বারী ১১শ খন্ড, হাঃ ৬২২৭)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬২৯-[২] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জিজ্ঞেস করল, ইসলামে কোন্ ’আমলটি উত্তম? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ অপরকে খাবার খাওয়াবে এবং পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম দেবে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ السَّلَامِ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو: أَنَّ رَجُلًا سَأَلَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَيُّ الْإِسْلَامِ خَيْرٌ؟ قَالَ: «تُطْعِمُ الطَّعَامَ وَتَقْرَأُ السَّلَامَ عَلَى مَنْ عَرَفْتَ وَمَنْ لم تعرف»
ব্যাখ্যাঃ ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ পরিচিত অপরিচিত সবাইকে সালাম দেয়াতে আল্লাহর জন্য ‘আমলকে খালেস করা হয় এবং বিনয় ব্যবহার করা হয়। তিনি আরো বলেন, সালামের বিস্তার সাধন এ উম্মাতের একটি বৈশিষ্ট্য।
ইবনু হাজার (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এর উপকারিতা হলো যদি কেউ অপরিচিত ব্যক্তিকে সালাম না দেয় তাহলে তার ধারণা হবে যে, সে তার অপরিচিত ব্যক্তি। এতে সে একাকীত্ব অনুভব করবে। তিনি বলেন, কাউকে কাফির বলে চিনতে না পারা পর্যন্ত সতর্কতার স্বার্থে সালাম দেয়া বৈধ।
ইবনু বাত্ত্বল (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ অপরিচিত ব্যক্তিকে সম্বোধন পূর্বক সালাম প্রদান করার মাধ্যমে কোমল আচরণ করা হয়। যাতে সকল মুসলিম ভাই ভাই হয়ে যায়। কেউ কারো নিকট থেকে একাকীত্ববোধ না করে। তিনি বলেন, সালামকে শুধুমাত্র পরিচিত মুসলিমের সাথে খাস করে অপরিচিত ব্যক্তিকে সালাম না দেয়াটা পরস্পরের বিচ্ছিন্নতার মতো। (ফাতহুল বারী ১১শ খন্ড, হাঃ ৬২৩৬)
‘আওনুল মা‘বূদ-এর রচয়িতা আবূ দাঊদ-এর ভাষ্যকার বলেনঃ সালামকে পরিচিত ব্যক্তির সাথে খাস করা কিয়ামতের আলামাতসমূহের একটি। যেমন ত্বহাবীসহ অন্যরা ইবনু মাস্‘ঊদ থেকে হাদীস বর্ণনা করেন। ত্বহাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, إِنَّ مِنْ أَشْرَاطِ السَّاعَةِ السَّلَامَ لِلْمَعْرِفَةِ ‘‘শুধুমাত্র পরিচিত ব্যক্তিকে সালাম দেয়া কিয়ামতের নিদর্শনাবলীর অন্যতম’’। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫১৮৫)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৩০-[৩] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একজন মু’মিনের ওপর অপর মু’মিনের ছয়টি অধিকার রয়েছে। যথা- ১. যখন কোন মু’মিনের রোগ-ব্যাধি হয়, তখন তার সেবা-শুশ্রূষা করা, ২. কেউ মৃত্যুবরণ করলে, তার জানাযাহ্ ও দাফন-কাফনে উপস্থিত হওয়া, ৩. কেউ দা’ওয়াত করলে তা গ্রহণ করা অথবা কারো ডাকে সাড়া দেয়া, ৪. সাক্ষাতে সালাম প্রদান করা, ৫. হাঁচি দিলে জবাব দেয়া এবং ৬. উপস্থিত-অনুপস্থিত সকল অবস্থায় মু’মিনের কল্যাণ কামনা করা।
মাসাবীহ গ্রন্থকার বলেনঃ আমি এ হাদীসটি সহীহুল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে পাইনি এবং হুমায়দীর কিতাবেও পাইনি। তবে জামি’উল উসূলের গ্রন্থকার নাসায়ী’র বর্ণনা সূত্রে এটা বর্ণনা করেছেন।[1]
بَابُ السَّلَامِ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لِلْمُؤْمِنِ عَلَى الْمُؤْمِنِ سِتُّ خِصَالٍ: يَعُودُهُ إِذَا مَرِضَ وَيَشْهَدُهُ إِذَا مَاتَ وَيُجِيبُهُ إِذَا دَعَاهُ وَيُسَلِّمُ عَلَيْهِ إِذَا لَقِيَهُ وَيُشَمِّتُهُ إِذَا عَطَسَ وَيَنْصَحُ لَهُ إِذَا غَابَ أَوْ شَهِدَ «لَمْ أَجِدْهُ» فِي الصَّحِيحَيْنِ «وَلَا فِي كِتَابِ الْحُمَيْدِيِّ وَلَكِنْ
ذَكَرَهُ صَاحِبُ» الْجَامِع بِرِوَايَة النَّسَائِيّ
ব্যাখ্যাঃ (يَنْصَحُ لَهٗ) এর অর্থ সে মু’মিনের কল্যাণ কামনা করবে বা তাকে সুপথ প্রদর্শন করবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
সহীহ মুসলিম-এর ভাষ্যকার বলেনঃ তাকে সদুপদেশ দান করবে, সৎ পরামর্শ দিবে। তাকে প্রতারিত করবে না। তাকে অবিরত সদুপদেশ দান করবে। (শারহুন নাবাবী হাঃ ২১৬২)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৩১-[৪] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা ঈমান গ্রহণ করবে। আর ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মু’মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদেরকে এমন কথা বলে দেব, যার উপর ’আমল করলে তোমাদের পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে। (তা হলো) তোমরা পরস্পরের মধ্যে সালামের প্রচলন করবে। (মুসলিম)[1]
بَابُ السَّلَامِ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا وَلَا تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا أَو لَا أدلكم على شَيْء إِذا فعلمتموه تحاببتم؟ أفشوا السَّلَام بَيْنكُم» رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ (وَلَا تُؤْمِنُوا حَتّٰى تَحَابُّوا) এর মর্মার্থ, পারস্পরিক ভালোবাসা ছাড়া তোমাদের ঈমান পরিপূর্ণতা লাভ করবে না এবং মু’মিন হিসেবে তোমাদের অবস্থান সঠিক হবে না।
হাদীসের বাহ্যিক অর্থ হলো, ঈমান থাকা অবস্থায় কেউ মারা গেলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। যদিও তার ঈমান পরিপূর্ণ না হয়। তবে শায়খ আবূ ‘আমর (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, পারস্পরিক ভালোবাসা ছাড়া ঈমান পূর্ণ হয় না। পরিপূর্ণ মু’মিন ব্যতীত জান্নাতে প্রবেশ করবে না। ইমাম বুখারী তাঁর সহীহ গ্রন্থে ‘আম্মার ইবনু ইয়াসির (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি তিনটি বস্তু সঞ্চয় করে, সে যেন ঈমান সঞ্চয় করল। ১. নিজে ন্যায় বিচার করা, ২. পৃথিবীবাসীকে সালাম প্রদান করা। ৩. মাল খরচ করা।
সালাম প্রদান ঐক্য সংহতির প্রধান উপায় ও ভালোবাসা অর্জনের মূল। সালামের বিস্তারের মাধ্যমে মুসলিমদের একে অপরের সাথে হৃদ্যতা গড়ে উঠে। আর অন্য ধর্মাবলম্বী থেকে তাদেরকে পার্থক্যকারী চিহ্নের প্রকাশ সাধন হয়। এর দ্বারা আত্মচর্চা, ইসলামের বাণীকে উন্নীতকরণ, মুসলিমদের ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। আবার এর মাধ্যমে মুসলিমদেরকে সম্মান প্রদান ও তাদের প্রতি বিনয়ী হওয়া নিশ্চিত হয়। উপরন্তু মুসলিমগণ রসূলের সুন্নাত জীবিত রাখে। আবার এর আরেকটি সূক্ষ্ম রহস্য হলো সালাম বিস্তারের ফলে মুসলিমদের মাঝে পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা, হিংসা-বিদ্বেষ বিদ্যমান ঝগড়া-ফাসাদ বিদূরিত হয়। কেননা তার সালাম একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে হয়ে থাকে। এখানে সে প্রবৃত্তির অনুসরণ করে না। ফলে সে তার সাথী ও বন্ধু-বান্ধবদের খাস করে না।
মুওয়াত্ত্বায় সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে, একদিন তুফায়ল ইবনু উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ) সকালে ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ)-এর সাথে বাজারে গেলেন। তিনি বলেন, ‘আবদুল্লাহ বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতা, মিসকীন, এমনকি প্রত্যেককে সালাম দিচ্ছেন। আমি বললাম, আপনি বাজারে কি করছেন? আপনি তো বাজারে কিছু কেনা-বেচার জন্য আগত হচ্ছেন না, কোন পণ্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছেন না? আসুন আমাদের সাথে বসুন আমরা কথা বলি। তখন তিনি আমাকে বললেন, আমরা সালাম দেয়ার জন্য সকালে এসেছি। আমাদের সাথে যাদের সাক্ষাত হচ্ছে তাদেরকে সালাম দিচ্ছি। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫১৮৪; শারহুন নাবাবী ২য় খন্ড, হাঃ ৯৩)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৩২-[৫] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আরোহী ব্যক্তি পায়ে হেঁটে চলা ব্যক্তিকে সালাম দেবে এবং পদব্রজে গমনকারী উপবিষ্টমান ব্যক্তিকে সালাম দেবে এবং অল্পসংখ্যক লোক বেশি সংখ্যক লোককে সালাম দেবে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ السَّلَامِ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يُسَلِّمُ الرَّاكِبُ عَلَى الْمَاشِي وَالْمَاشِي عَلَى الْقَاعِدِ وَالْقَلِيلُ عَلَى الْكَثِيرِ»
ব্যাখ্যাঃ ন্যূনতম সালাম হলো ‘‘আসসালা-মু ‘আলায়কুম’’। যদি মুসলিম ব্যক্তি একজন হয় তাহলে এর স্বল্পতর সালাম হলো ‘‘আসসালা-মু ‘আলায়কা’’। তবে ‘‘আসসালা-মু ‘আলায়কুম’’ বলা উত্তম। কারণ সালাম যেন তাকে ও দু’ মালাক (ফেরেশতা)-কে শামিল করে। এর চাইতে অধিকপূর্ণ সালাম হলো এর সাথে ‘‘ওয়া রহমাতুল্ল-হি ওয়া বারাকা-তুহ’’ বৃদ্ধি করা।
ছোটরা বড়দেরকে, গমনকারী উপবিষ্টদেরকে, আরোহী হেঁটে চলা ব্যক্তিকে, কম সংখ্যক লোক বেশি সংখ্যক লোককে সালাম দেয়া মুস্তাহাব। তবে এর বিপরীত করলেও জায়িয আছে। রবং যে আগে সালাম দিবে সে অহঙ্কারমুক্ত বলে গণ্য হবে।
হাফিয ইবনু হাজার ‘আসকালানী (রহিমাহুল্লাহ) ফাতহুল বারীতে বলেনঃ ‘আলিমগণ শারী‘আতে সালাম প্রদানকারীদের ব্যাপারে হিকমাত নিয়ে আলোচনা করেন। যেমন- ইবনু বাত্ত্বল মুহাল্লাব থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেনঃ বড়দের হক থাকার দরুন ছোটরা তাদেরকে সালাম প্রদান করবে। কারণ সে বড়কে সম্মান করবে ও নমনীয় হবে। কম সংখ্যক লোক বেশি সংখ্যক লোকেকেদেকে সালাম প্রদান করবে। কারণ তাদের হক অধিক বড়। বাড়িওয়ালাদের নিকট প্রবেশকারী অনুমতি চাওয়ার জন্য সালাম প্রদান করবে। আরোহী সালাম প্রদান করবে যাতে সে আরোহণ করার কারণে গর্ববোধ না করে। ফলে সে বিনয়তা প্রদর্শন করতে পারে। ইবনুল ‘আরাবী বলেনঃ হাদীসের মর্মার্থ হলো, অবশ্যই যার ওপরে শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে, সে এমন শ্রেণীর যে, সে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির ওপরে প্রাধান্য পায়।
মাযূরী বলেনঃ আরোহী ব্যক্তি সালাম প্রদান করবে। কারণ পায়ে হেঁটে চলা ব্যক্তির ওপরে তার শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। সেজন্য পদাচারী ব্যক্তির পরিবর্তে আরোহী ব্যক্তি গর্ব থেকে সতর্ক থাকার উদ্দেশে সালাম প্রদান করবে। যাতে সে দু’টি ফাযীলাতের অধিকারী হতে পারে। আর পদব্রজে গমনকারী সালাম প্রদান করবে। এতে উপবিষ্ট ব্যক্তি তার অনিষ্টতার আশংকা করে না। বিশেষতঃ আরোহী ব্যক্তি সালাম দিলে সে নিরাপদ হয়ে যায় এবং সে তাকে ভালোবাসে। উপরন্তু গমনকারীদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় তাদেরকে সালাম দেয়া বসে থাকা ব্যক্তিদের নিকট কঠিন। সেহেতু তাদের ওপর থেকে সালাম প্রদানের হুকুম রহিত হয়ে যায়। কিন্তু গমনকারীদের নিকট তা কঠিন নয়। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৭০৩)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৩৩-[৬] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ছোট বা কম বয়সী বয়োজ্যেষ্ঠকে, পদব্রজে অতিক্রমকারী বসা ব্যক্তিকে ও কম সংখ্যক লোক বেশি সংখ্যক লোককে সালাম দেবে। (বুখারী)[1]
بَابُ السَّلَامِ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يُسَلِّمُ الصَّغِيرُ عَلَى الْكَبِيرِ وَالْمَارُّ عَلَى الْقَاعِدِ وَالْقَلِيلُ عَلَى الْكَثِيرِ»
ব্যাখ্যাঃ মাওয়ারদী বলেনঃ যদি কোন ব্যক্তি কোন মাজলিসে প্রবেশ করে। আর যদি দলটি ছোট হয় যা এক সালামে শামিল করে তাহলে তাই যথেষ্ট হবে। আর যদি সালাম বৃদ্ধি করে কাউকে বিশেষভাবে সালাম দেয়, তাহলে কোন দোষ নেই। আর তাদের পক্ষ থেকে একজন উত্তর দিলে যথেষ্ট হবে। আর যদি বেশি লোকে উত্তর দেয় তবে এতেও কোন দোষ নেই।
আর যখন মাজলিস বড় হবে ও লোক সংখ্যা বেশি হয় ফলে সবার নিকটে সালাম পৌঁছবে না, এক্ষেত্রে তাদের সাথে সাক্ষাৎ হলে প্রবেশের পূর্বে প্রথমে সালাম দিলে যারা শুনেছে তাদের নিকটে সালামের সুন্নাত আদায় হয়ে যাবে। শ্রবণকারীরা সালামের জবাব দিলে সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে। তবে যারা সালাম শুনতে পায়নি তাদেরকে পুনরায় সালাম দেয়ায় কোন ক্ষতি নেই। (ফাতহুল বারী ১১শ খন্ড, হাঃ ৬২৩১)
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ ভদ্রতা বজায় থাকবে রাস্তায় পরস্পরে দু’জনের সাক্ষাৎকালে। অতএব যখন সে কোন বসা ব্যক্তির নিকটে আগমন করবে তখন সে সালাম প্রদান করবে। চাই সেই আগমনকারী ছোট হোক বা বড়, কম সংখ্যক হোক বা বেশি সংখ্যক। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৭০৪)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৩৪-[৭] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদল বালকের নিকট দিয়ে অতিক্রম করলেন এবং তাদের সালাম দিলেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ السَّلَامِ
وَعَن أَنَسٍ قَالَ: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مر على غلْمَان فَسلم عَلَيْهِم
ব্যাখ্যাঃ ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসে বালেগ তরুণদেরকে সালাম দেয়া যে মুস্তাহাব তা সাব্যস্ত হয়েছে। পরস্পরের নমনীয়তা জাগ্রত, সব মানুষকে সালাম প্রদান এবং বিশ্ববাসীর প্রতি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মহানুভবতা ও স্নেহপরায়ণতার ইঙ্গিত এতে বিদ্যমান। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৬৯৬)
হুসায়মী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ পাপমুক্ত হতে হলে ফিৎনামুক্ত হতে হবে। অতএব যে নিরাপদ থাকার ব্যাপারে আস্থাবান হয় সে সালাম প্রদান করবে। নতুবা চুপ থাকায় অধিক নিরাপদ।
ইবনু বাত্ত্বল (রহিমাহুল্লাহ) মুহাল্লাব থেকে বর্ণনা করে বলেনঃ পুরুষ কর্তৃক মহিলাদের সালাম দেয়া ও মহিলা কর্তৃক পুরুষদের সালাম দেয়া জায়িয, যখন ফিৎনা থেকে মুক্ত হয়।
মালিকী মাযহাবীরা অজুহাতের পথ বন্ধ করার স্বার্থে যুবতী ও বৃদ্ধাদের মাঝে পার্থক্য করেছেন। তবে রবী‘আহ্ একেবারে নিষেধ করেছেন।
কুফাবাসীগণ বলেনঃ মহিলা কর্তৃক পুরুষদের সালাম দেয়া শারী‘আতে ঠিক নয়। কারণ তাদেরকে আযান, ইকামাত, উচ্চৈঃস্বরে কুরআন তিলাওয়াত করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। তবে তারা মাহরামদের মাঝে সালাম লেন-দেনকে জায়িয বলেছেন। ফাতহুল বারীতে এমনিভাবে এসেছে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫১৯৫)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৩৫-[৮] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ইয়াহূদী ও খ্রিষ্টানকে প্রথমে সালাম দেবে না। তোমাদের কেউ যদি পথে কোন ইয়াহূদী বা খ্রিষ্টানের সাক্ষাৎ পাও, তবে রাস্তাকে এতটা সংকীর্ণ করে রাখবে, যাতে সে রাস্তার একপাশ দিয়ে অতিক্রম করতে বাধ্য হয়। (মুসলিম)[1]
بَابُ السَّلَامِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم: «لَا تبدؤوا الْيَهُودَ وَلَا النَّصَارَى بِالسَّلَامِ وَإِذَا لَقِيتُمْ أَحَدَهُمْ فِي طريقٍ فَاضْطَرُّوهُ إِلَى أضيَقِه»
ব্যাখ্যাঃ মুসলিম কর্তৃক ইয়াহূদী ও নাসারাদের সালাম প্রদান করা তাদেরকে সম্মান করার শামিল। অথচ এটা মুসলিমদের জন্য জায়িয নয়।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ তাদেরকে সালাম দেয়া হারাম।
ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ পছন্দনীয় মত হলো বিদ্‘আতীরা সালাম পাওয়ার হকদার নয়। যদি অপরিচিত কোন ব্যক্তিকে সালাম দেয়ার পর জানা যায় যে, সে যিম্মী অথবা বিদ্‘আতী, তাহলে তার প্রতি অবজ্ঞাবশতঃ বলবে, আমি সালাম ফিরিয়ে নিলাম। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫১৯৬)
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আমার সাথীরা বলেন, যিম্মীদেরকে রাস্তার মধ্যভাগ ছাড়া যাবে না। বরং যখন মুসলিমনগণ পথ চলবে তখন তারা যিম্মীদেরকে সংকীর্ণের দিকে যেতে বাধ্য করবে। তবে রাস্তা যানজটমুক্ত হলে এতে কোন দোষ নেই। তারা এ কথাও বলেন যে, সংকোচন এমন হওয়া উচিত যাতে সে গর্তে পড়ে না যায় এবং কোন দেয়ালে বাধাপ্রাপ্ত না হয়। (শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ৫১৬৭)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৩৬-[৯] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন ইয়াহূদীরা তোমাদেরকে সালাম দেয়, তখন তারা ’’আসসামু ’আলায়কা’’ (অর্থাৎ- শীঘ্রই তোমার মৃত্যু ঘটুক) বলে, তখন তোমরাও জবাবে বলবে ’’ওয়া ’আলায়কা’’ (অর্থাৎ- তোমারও মৃত্যু হোক)। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ السَّلَامِ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِذَا سَلَّمَ عَلَيْكُمُ الْيَهُودُ فَإِنَّمَا يَقُولُ أَحَدُهُمْ: السَّامُ عَلَيْك. فَقل: وَعَلَيْك
ব্যাখ্যাঃ আহলে কিতাবের সালামের জবাবে কি বলা যায়, এ নিয়ে ‘আলিমদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। এ নানা মতের কারণ হলো বিভিন্ন রকম রিওয়ায়াত। এসব রিওয়ায়াতের কোনটি অগ্রাধিকারযোগ্য?
ইবনু ‘আবদুল বার واو বিহীন বলেছেন। কেননা এটা অংশীদার করার ফায়েদা দেয়।
ইমাম খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) রচিত معالم السنن গ্রন্থে বলা হয়েছে, যে রিওয়ায়াতে عليكم রয়েছে অর্থাৎ واو নেই সেটা উত্তম যাতে واو আছে সেই রিওয়ায়াত থেকে। ইবনু ‘উয়াইনাহ্ বলেনঃ وعليكم বর্ণনাটি عليكم বর্ণনার চাইতে অধিক সঠিক। আর এভাবে তাদের কথাকে হুবহু তাদের নিকটে ফিরিয়ে দেয়া হয়। তখন এর অর্থ হবে তোমরা যা বলেছ সেটাই তোমাদের ওপর ফিরিয়ে দিলাম।
আবার ইমাম খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর গ্রন্থে সাধারণ ‘আলিমদের এমন বর্ণনা উল্লেখ করেন যাতে واو যোগে عليكم রয়েছে। তিনি এ ব্যাপারে বলেন, অবশ্য واو হরফটি حرف عطف যা দু’টি বস্তুকে একত্রিত করে। এরূপ বাক্যে واو টি পূর্বের বাক্যকে আরো সুদৃঢ়ভাবে সাব্যস্ত করে ও অন্য আরো কিছু যুক্ত হয়ে থাকে। যেমন তুমি যখন বলবে زيد كاتب যায়দ লেখক। তখন সম্বোধিত ব্যক্তি বলবে وشاعر وفقيه। এ ধরনের বাক্যের অর্থের চাহিদা হলো যায়দ তো লেখক আবার কবি ও ফকীহও বটে।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ عليكم এর সাথে واو যুক্ত করা বা না করা উভয়ই সঠিক ও জায়িয। واو যোগে وعليكم অধিক উৎকৃষ্ট। এতে কোন সমস্যা নেই। অসংখ্য বর্ণনা এ ব্যাপারে অধিকাংশ ‘আলিম থেকে পাওয়া যায়। এর অর্থে দু’টি তাৎপর্য রয়েছে।
১. তারা বলে, عليكم الموت তোমাদের মৃত্যু হোক। এর উত্তরে বলবে وعليكم ايضا অর্থাৎ তোমরা ও আমরা সবাই সমান। আমরা সবাই মরব।
২. واو টি استئناف পুনরারম্ভ এর অর্থে ব্যবহার হবে। এটা عطف সংযুক্ত বা تشريك অংশীদার করা এর অর্থে নয়। এটা মূলত এ রকম ছিল وعليكم ما تسحقون من الذم তোমরা যেই তিরস্কারের হকদার তা তোমাদের ওপর আপতিত হোক। (ফাতহুল বারী ১১শ খন্ড, হাঃ ৬২৫৭)
‘আওনুল মা‘বূদ গ্রন্থকার বলেনঃ এর অর্থ হলো أَنَّا لَسْنَا نَمُوت دُونكُمْ بَلْ نَحْنُ نَمُوت وَأَنْتُمْ أَيْضًا تَمُوتُونَ আমরা তোমরা ব্যতীত মরব না বরং আমরাও মরব তোমরাও মরবে, এতে শরীক করার অর্থ স্পষ্ট। সুতরাং واو যুক্ত করাতে কোন অসিদ্ধতা নেই। যেমন পূর্বে বলা হয়েছে যে, অনেক ইমাম واو সহ বর্ণনা করেছেন। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫১৯৭)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৩৭-[১০] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন তোমাদেরকে আহলে কিতাব (অর্থাৎ- ইয়াহূদী ও নাসারাগণ) সালাম দেয়, তখন তোমরাও বলবে ’’ওয়া আলায়কুম’’ (অর্থাৎ- তোমাদের ওপরও)। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ السَّلَامِ
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِذَا سَلَّمَ عَلَيْكُمْ أَهْلُ الكتابِ فَقولُوا: وَعَلَيْكُم
ব্যাখ্যাঃ ইয়াহূদী নাসারাদের প্রথমে সালাম দেয়া হারাম।
কাযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ‘আলকামাহ্ ও নাখ‘ঈ (রহিমাহুমাল্লাহ) জায়িয বলেছেন। আওযা‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এটা এজন্য যে, যদি তুমি তাদেরকে সালাম দাও তবে সৎ ব্যক্তিরা সালাম দিবে। আর যদি তাদেরকে পরিহার কর তবে ভালো ব্যক্তিরা পরিহার করবে।
মুসলিম ও অমুসলিম কাফির মিশ্রিত মাজলিসে সালাম দেয়া জায়িয। তবে এক্ষেত্রে শুধু মুসলিমদের উদ্দেশে সালাম প্রদান করবে। যেমন পরবর্তী হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম ও মুশরিক মিশ্রিত মাজলিসে সালাম দিয়েছেন। (শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২১৬৪)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৩৮-[১১] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইয়াহূদীদের একটি দল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে উপস্থিত হওয়ার জন্য অনুমতি চাইল এবং বলল : ’’আসসামু ’আলায়কুম’’ অর্থাৎ- ’’তোমাদের মৃত্যু হোক’’। আমি তাদের উত্তরে বললামঃ ’’বরং তোমাদের মৃত্যু হোক’’ এবং ’’অভিসম্পাতও হোক’’। (এ কথা শুনে) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ হে ’আয়িশাহ্! আল্লাহ তা’আলা স্বয়ং কোমল, তিনি সকল কাজে কোমলতাকে পছন্দ করেন।
তখন আমি (’আয়িশাহ্) বললামঃ আপনি কি শুনেননি, তারা কি বলেছে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আমি তো তাদের জবাবে ’’ওয়া ’আলায়কুম’’ বলে দিয়েছি। অপর এক রিওয়ায়াতে শুধু عَلَيْكُمْ রয়েছে, وَاوْ অক্ষরটি উল্লেখ করা হয়নি। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
বুখারী’র আরেক বর্ণনায় আছে, ’আয়িশাহ্ সিদ্দিকা (রাঃ) বলেনঃ একদল ইয়াহূদী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বলল : ’’আসসামু ’আলায়কা’’ (তোমার মৃত্যু হোক)। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ ’’ওয়া ’আলায়কুম’’ (তোমাদেরও মৃত্যু হোক)। ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বললেনঃ ’’তোমাদের মৃত্যু হোক, আল্লাহর অভিসম্পাত হোক, আল্লাহর গযব তোমাদের ওপর পতিত হোক।’’ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে ’আয়িশাহ্! থামো, তোমার কোমল হওয়া উচিত, কঠোরতা পরিহার করো, অশ্লীল ভাষা হতে বেঁচে থাকো। ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বললেনঃ আপনি কি শুনেননি, তারা কি বলল? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তুমি কি শুননি, আমি কি জবাব দিয়েছি? আমি তাদের কথাকে তাদের দিকেই ফিরিয়ে দিয়েছি। তাদের ব্যাপারে আমার দু’আ কবুল হবে, আমার জন্য তাদের দু’আ কবুল হবে না। মুসলিম-এর অপর বর্ণনায় রয়েছে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ হে ’আয়িশাহ্! তুমি অযথা অশ্লীল কথা বলো না। কেননা আল্লাহ তা’আলা অশালীনতা ও অশ্লীলতা পছন্দ করেন না।
بَابُ السَّلَامِ
وَعَن عائشةَ قَالَتْ: اسْتَأْذَنَ رَهْطٌ مِنَ الْيَهُودِ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالُوا السَّامُ عَلَيْكُمْ. فَقُلْتُ: بَلْ عَلَيْكُمُ السَّامُ وَاللَّعْنَةُ. فَقَالَ: «يَا عَائِشَةُ إِنَّ اللَّهَ رَفِيقٌ يُحِبُّ الرِّفْقَ فِي الْأَمْرِ كُلِّهِ» قُلْتُ: أَوَلَمْ تَسْمَعْ مَا قَالُوا؟ قَالَ: «قَدْ قُلْتُ وَعَلَيْكُمْ» . وَفِي رِوَايَةٍ: «عَلَيْكُمْ» وَلم يذكر الْوَاو
وَفِي رِوَايَةٍ لِلْبُخَارِيِّ. قَالَتْ: إِنَّ الْيَهُودَ أَتَوُا النَّبِي صلى الله عَلَيْهِ وَسلم فَقَالُوا: السَّام عَلَيْكَ. قَالَ: «وَعَلَيْكُمْ» فَقَالَتْ عَائِشَةُ: السَّامُ عَلَيْكُمْ وَلَعَنَكُمُ اللَّهُ وَغَضِبَ عَلَيْكُمْ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَهْلًا يَا عَائِشَةُ عليكِ بالرِّفق وإِياك والعنفَ والفُحْشَ» . قَالَت: أَو لم تسمع مَا قَالُوا؟ قَالَ: «أَو لم تَسْمَعِي مَا قُلْتُ رَدَدْتُ عَلَيْهِمْ فَيُسْتَجَابُ لِي فِيهِمْ وَلَا يُسْتَجَابُ لَهُمْ فِيَّ»
وَفِي رِوَايَةٍ لِمُسْلِمٍ. قَالَ: «لَا تَكُونِي فَاحِشَةً فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُحبُّ الفُحْشَ والتفحُّش»
ব্যাখ্যাঃ (الرِّفْقَ) শব্দের অর্থ لين الجانب তথা কোমল বা সদয় আচরণ করা। এটা العنف তথা কঠোর আচরণ এর বিপরীত। الفحش এর অর্থ মন্দ কথা বা কাজ। কেউ সীমালঙ্ঘনকে الفحش বলেছেন।
এ হাদীসটি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মহৎ চরিত্র ও পূর্ণ ধৈর্যশীলতার এক উজ্জ্বল প্রমাণ। এতে মহানুভবতা, সদয় আচরণ, সহিষ্ণুতা, কঠোরতা অবলম্বনের প্রয়োজন ব্যতিরেকে মানুষের সাথে কোমল আচরণের প্রতি উৎসাহ প্রদানের ইঙ্গিত সুস্পষ্ট বিদ্যমান। (শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২১৬৫)
এ হাদীস থেকে আরো বুঝা যায় যে, যখন কোন যালিম কারো প্রতি বদ্দু‘আ করে, তখন তার প্রার্থনা কবুল করা হয় না। যেহেতু আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَمَا دُعَاءُ الْكَافِرِينَ إِلَّا فِي ضَلَالٍ ‘‘কাফিরদের আহবান ভ্রষ্টতা ছাড়া কিছুই নয়’’- (সূরাহ্ আর্ রা‘দ ১৩ : ১৪)। (ফাতহুল বারী ১১শ খন্ড, হাঃ ৬৪০১)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৩৯-[১২] উসামাহ্ ইবনু যায়দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সমবেত জনতার নিকট দিয়ে গমন করলেন, যাদের মধ্যে রয়েছে মুসলিম, মুশরিক তথা পৌত্তলিক ও ইয়াহূদী। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদেরকে সালাম দিলেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ السَّلَامِ
وَعَن أُسامة بن زيد: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرَّ بِمَجْلِسٍ فِيهِ أَخْلَاطٌ مِنَ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُشْرِكِينَ عَبَدَةِ الْأَوْثَانِ وَالْيَهُودِ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ
ব্যাখ্যাঃ ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ মুসলিম ও কাফির মিশ্রিত মাজলিসের পাশ দিয়ে গমন করার সুন্নাত হলো ব্যাপকার্থক শব্দের দ্বারা সালাম প্রদান করে মুসলিমদেরকে উদ্দেশ্য করা।
ইবনুল ‘আরাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ অনুরূপভাবে সুন্নাতের অনুসারী ও বিদ্‘আতী, ন্যায়পরায়ণ ও পাপী এবং বন্ধু ও শত্রু মিশ্রিত মাজলিসে সালাম দেয়া বৈধ।
কতিপয় লোক ইয়াহূদী নাসারাদের সালাম প্রদান করা যাবে বলে মত পেশ করেন। তারা এর দলীল হিসেবে কুরআনে বর্ণিত ইব্রাহীম (আ.)-এর পিতা সম্পর্কে উক্তিটি এবং ইমাম ত্বীবী কর্তৃক ইবনু ‘উয়াইনাহ্-এর হাদীসটি উল্লেখ করেন। যেহেতু ইব্রাহীম (আ.) তার পিতাকে বলেন, ‘‘সালা-মুন ‘আলায়কা’’। অন্য জায়গায় আল্লাহ বলেন, لَا يَنْهَاكُمُ اللهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ ‘‘দীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেনি, আর তোমাদেরকে তোমাদের ঘর-বাড়ী থেকে বের ক’রে দেয়নি...’’- (সূরাহ্ আল মুমতাহিনাহ্ ৬০ : ৮)।
কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) এ ধরনের আয়াতের এবং ইবরাহীম (আ.)-এর উক্তির জবাব দিয়ে বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো তার সাথে সন্ধি করা বা তার থেকে দূরে থাকতে চাওয়া। আসলে এটা সম্ভাষণের জন্য ছিল না। কোন সালাফে সলিহীন এক্ষেত্রে স্পষ্টরূপে বলেছেন যে, وقل سلام فسوف تعلمون আয়াতটি যুদ্ধের আয়াত দ্বারা মানসূখ হয়ে গেছে।
ইমাম ত্ববারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ) ও উসামাহ্ ইবনু যায়দ (রাঃ)-এর হাদীসের মাঝে বৈপরীত্য নেই। কারণ, আবূ হুরায়রা (রাঃ)-এর হাদীসটি ‘আম এবং উসামার হাদীসটি খাস। এটি বন্ধুত্ব, প্রতিবেশী ও প্রতিদান দেয়ার মতো প্রয়োজন ছাড়া সালাম দেয়ার বিষয়টির কারণে আবূ হুরায়রা (রাঃ)-এর হাদীস থেকে খাস হয়েছে। এখানে সালাম দেয়া নিষেধ বলতে শারী‘আতসম্মত সালাম দেয়া নিষেধ উদ্দেশ্য। অতএব যদি কেউ এমন শব্দ প্রয়োগ করে সালাম দেয় যাতে অমুসলিমরা বের হয়ে যায়, তাহলে সেটা জায়িয। যেমন কেউ বলল, اَلسَّلَامُ عَلَيْنَا وَعَلٰى عِبَادِ اللهِ الصَّالِحِينَ ‘‘আমাদের ও আল্লাহর সকল পুণ্যবান বান্দার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক’’ এ ধরনের বাক্য ব্যবহার করা জায়িয। যেমনিভাবে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিরাক্বিল ও তার মতো অন্যদেরকে যখন চিঠি লিখতেন তখন বলতেন, السَّلَامُ عَلٰى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدٰى অর্থাৎ- যে হিদায়াতের (ইসলামের) অনুসারী তার ওপরে সালাম।
‘আবদুর রাযযাক থেকে কতাদাহ্ বলেনঃ যখন তুমি আহলে কিতাবদের বাড়ীতে প্রবেশ করবে তখন السَّلَامُ عَلٰى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدٰى বলে সালাম দিবে।
আবূ মালিক-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, যখন তুমি মুশরিকদের সালাম দিবে তখন বলবে, اَلسَّلَامُ عَلَيْنَا وَعَلٰى عِبَادِ اللهِ الصَّالِحِينَ তাহলে তারা ভাববে তুমি তাদেরকে সালাম দিয়েছ অথচ তুমি তাদের নিকট থেকে সালাম ফিরিয়ে নিয়েছ। (ফাতহুল বারী ১১শ খন্ড, হাঃ ৬২৫৪)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৪০-[১৩] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা রাস্তার উপর বসা হতে বিরত থাকো। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমাদের রাস্তায় বসা ছাড়া গত্যন্তর নেই। কারণ, আমরা তথায় বসে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা সমাধা করি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ যদি তোমরা তথায় বসতে বাধ্যই হও, তবে রাস্তার হক আদায় করবে। সাহাবীগণ (পুনঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রসূল! রাস্তার হক কি? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ চক্ষু বন্ধ রাখা, কাউকে কষ্ট না দেয়া, সালামের জবাব দেয়া, ভালো কাজের আদেশ করা এবং মন্দ কাজের নিষেধ করা। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ السَّلَامِ
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِيَّاكُمْ وَالْجُلُوسَ بِالطُّرُقَاتِ» . فَقَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا لَنَا مِنْ مَجَالِسِنَا بُدٌّ نَتَحَدَّثُ فِيهَا. قَالَ: «فَإِذَا أَبَيْتُمْ إِلَّا الْمَجْلِسَ فَأَعْطُوا الطَّرِيقَ حَقَّهُ» . قَالُوا: وَمَا حَقُّ الطَّرِيقِ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ: «غَضُّ الْبَصَرِ وَكَفُّ الْأَذَى وَرَدُّ السَّلَام والأمرُ بِالْمَعْرُوفِ وَالنَّهْي عَن الْمُنكر»
ব্যাখ্যাঃ কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসে সাহাবীদের প্রতি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ ওয়াজিব ছিল না। মূলতঃ এটা ছিল উৎসাহ প্রদানমূলক বা উত্তমতার নিরিখে। যদি সাহাবীগণ এটাকে ওয়াজিব মনে করতেন তাহলে তারা পুনর্বার এটাকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে পেশ করতেন না।
যারা মনে করেন এটা ওয়াজিব নির্দেশ ছিল না তারা এ হাদীসকে কখনো দলীল হিসেবে পেশ করে থাকেন।
রাস্তার হক সম্পর্কে একাধিক রিওয়ায়াত বর্ণিত হয়েছে, এসব হাদীস থেকে হাফিয ইবনু হাজার ‘আসকালানী (রহিমাহুল্লাহ) চিন্তা ভাবনা করে ১৪টি আদবের ইঙ্গিত প্রদান করেন। সম্মানিত ভাষ্যকার এ চৌদ্দটি আদবকে একত্রিত করে তিনটি চরণে উল্লেখ করেন যা নিম্নে প্রদত্ত হলো,
আমি রাস্তায় বসতে চাওয়া ব্যক্তির জন্য সৃষ্টির সেরা মানুষের (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর) নিকট থেকে আদাবসমূহ একত্রিত করেছি :
১. সালাম বিস্তার কর, সুন্দর কথা বল, হাঁচিদাতা ও সালাম প্রদানকারীর উপযুক্ত জবাব দাও,
২. বোঝা বহনকারী ও মাযলূমকে সাহায্য কর, দুঃখির সাহায্যে পাশে দাঁড়াও, পথিক ও দিশেহারাকে পথের দিশা দাও,
৩. সৎকাজের আদেশ কর, মন্দ কাজ থেকে বাধা দান কর, কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দাও, দৃষ্টি অবনমিত রাখ, আমাদের প্রভু (আল্লাহর) বেশি বেশি জিকর কর।
রাস্তায় বসা নিষেধ হওয়ার কতগুলো তাৎপর্য রয়েছে। যেমন যুবতী মহিলার ফিৎনার আশংকা, তাদের প্রতি নযর পড়ার ভয়। কারণ প্রয়োজনে রাস্তায় মহিলার গমন করা নিষেধ নয়। আল্লাহ ও মুসলিমদের অধিকার সম্পর্কিত বিষয়াদি এসে পড়া যা বাড়ীতে থাকা অবস্থায় আবশ্যক নয়। যা একাই করা দরকার তা রাস্তায় একাই সম্পাদন করার সুযোগ পায় না। মন্দ কোন কিছু চোখে পড়া ও সৎকর্ম বাধাগ্রস্ত হওয়া। এসব ক্ষেত্রে আদেশ করা ও নিষেধ করা মুসলিমের ওয়াজিব দায়িত্ব। যদি সে এগুলো পরিহার করে তাহলে সে অপরাধী হবে। অনুরূপভাবে সে তার নিকটে গমনকারী ও সালাম প্রদানকারীর মুখোমুখি হয়। কখনো এদের সংখ্যা এত বেশি হয় যে, তাদের জবাব দিতে অক্ষম হয়ে পড়ে। অথচ তার জবাব দেয়া ওয়াজিব। ফলে সে পাপী হয়ে যায়। আর মানুষকে ফিৎনা ও সাধ্যাতিরিক্ত কোন কিছুর সম্মুখীন না হতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সে কারণ ঐসব বিষয়ের নিষ্পত্তিকল্পে শারী‘আত প্রণেতা মানুষদেরকে রাস্তায় না বসতে সচেতন করেছেন। এর পরেও সাহাবীরা যখন তাদের প্রয়োজন, যেমন- তাদের পারস্পারিক খোঁজ-খবর নেয়া, দীন সম্পর্কে আলোচনা, বৈষয়িক কল্যাণকর কর্মকাণ্ড, ভালো জিনিসের ব্যাপারে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আত্মিক প্রশান্তির কথা রসূলের সামনে তুলে ধরলেন তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে উপরোক্ত সমস্যা দূরীকরণে সুনির্দেশনা দান করলেন।
কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হাদীসে মুসলিমদের পারস্পরিক সদাচরণের জাগরণ ফুটে উঠেছে। অবশ্য রাস্তায় উপবিষ্ট ব্যক্তির পাশ দিয়ে অসংখ্য মানুষ গমনাগমন করে। আবার কখনো তারা তাদের প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহ ও পথঘাট সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে থাকে। এ সময় তাদের সাথে হাসিমুখে কথা বলা আবশ্যক। সে যেন তাদের সাথে রূঢ় আচরণ না করে, সামগ্রিকভাবে এটাই হচ্ছে রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস সরানো।
ইবনু হাজার ‘আসকালানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ গমনকারী থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানোর অর্থ হলো এমনভাবে না বসা যাতে রাস্তা সংকুচিত হয়ে যায়। অথবা বাড়ীর দরজায় না বসা যাতে লোক কষ্ট পায় অথবা তার পরিবার-পরিজন বা যেটা গোপনীয় কিছু যা এর দ্বারা উন্মোচিত হয়ে যায়।
(ফাতহুল বারী ১১শ খন্ড, হাঃ ৬২২৯)
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানোর মধ্যে গীবত, কুধারণা, গমনকারীরদের হেয় মনে করা থেকে বিরত থাকা এর অন্তর্ভুক্ত। তেমনিভাবে যখন রাস্তায় এমন লোক বসে থাকে যাদেরকে পথিক ভয় পায় এবং বিকল্প পথ না পেয়ে নিজেদের প্রয়োজনীয় কাজে যেতে বাধাপ্রাপ্ত হয়। (শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২১২১)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৪১-[১৪] আবূ হুরায়রা (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে উপরিউক্ত ঘটনায় আরো বর্ণনা করেন যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ (পথহারাকে) পথপ্রদর্শন করা। [ইমাম আবূ দাঊদ (রহিমাহুল্লাহ) আবূ সা’ঈদ আল খুদরী(রাঃ) বর্ণিত হাদীসের শেষাংশে এ অংশটুকু উল্লেখ করেছেন।][1]
بَابُ السَّلَامِ
وَعَنْ أَبِي
هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي هَذِهِ الْقِصَّةِ قَالَ: «وَإِرْشَادُ السَّبِيلِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ عَقِيبَ حَدِيثِ الْخُدْرِيِّ هَكَذَا
ব্যাখ্যাঃ (وَإِرْشَادُ السَّبِيلِ) ‘‘আর পথিককে পথ দেখানো’’। এটা هداية الضال ‘‘বিভ্রান্ত বা বিপথগামীকে পথের দিশা দেয়া’’ থেকে অধিকতর ব্যাপক অর্থসম্পন্ন। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৮০৮)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৪২-[১৫] ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি উপরিউক্ত ঘটনায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি এটাও বলেছেন- ’’এবং মাযলূমের ফরিয়াদে সাড়া দান করবে এবং পথহারাকে পথপ্রদর্শন করবে’’।
ইমাম আবূ দাঊদ (রহিমাহুল্লাহ) এ হাদীসটি আবূ হুরায়রা (রাঃ)-এর হাদীসের পর এভাবেই বর্ণনা করেন। গ্রন্থকার বলেনঃ আমি এ দু’টি হাদীস বুখারী ও মুসলিমে পাইনি।[1]
بَابُ السَّلَامِ
وَعَنْ عُمَرَ
عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي هَذِهِ الْقِصَّةِ قَالَ: «وَتُغِيثُوا الْمَلْهُوفَ وَتَهْدُوا الضالَّ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد عقيب حَدِيث أبي هُرَيْرَة هَكَذَا وَلم أجدهما فِي «الصَّحِيحَيْنِ»
ব্যাখ্যাঃ تُغِيثُوا শব্দটি الاغاثة মাসদার থেকে গৃহীত। এর অর্থ الاغاثة সাহায্য বা সহায়তা দান করা। ملهوف অর্থ নিরুপায় মাযলূম, যে দুঃখ করে ফরিয়াদ করে।
(تَهْدُوا الضالَّ) এর অর্থ ترشدوه الى الطريق ‘তোমরা তাকে পথ নির্দেশ করবে’। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৮০৯)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৪৩-[১৬] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একজন মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের ছয়টি কল্যাণকর অধিকার রয়েছে। ১. কোন মুসলিমের সাথে সাক্ষাৎ হলে সালাম দেবে, ২. তাকে কোন মুসলিম ডাকলে (দা’ওয়াত করলে) তার ডাকে সাড়া দেবে, ৩. কোন মুসলিমের হাঁচি এলে হাঁচির জবাব দেবে, ৪. কোন মুসলিম অসুস্থ হলে তার সেবা-শুশ্রূষা করবে। ৫. কোন মুসলিম মৃত্যুবরণ করলে তাঁর জানাযায় অনুগমন করবে এবং ৬. প্রত্যেক মুসলিমের জন্য সে জিনিসই পছন্দ করবে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে। (তিরমিযী ও দারিমী)[1]
وَعَنْ عَلِيٍّ
قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لِلْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ سِتٌّ بِالْمَعْرُوفِ: يُسَلِّمُ عَلَيْهِ إِذَا لَقِيَهُ وَيُجِيبُهُ إِذَا دَعَاهُ وَيُشَمِّتُهُ إِذَا عَطَسَ وَيَعُودُهُ إِذَا مَرِضَ وَيَتْبَعُ جِنَازَتَهُ إِذَا مَاتَ وَيُحِبُّ لَهُ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ والدارمي
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, সনদে ‘‘হারিস আল আ‘ওয়ার’’ নামের বর্ণনাকারী য‘ঈফ। হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৩১৩ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ (لِلْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ سِتٌّ بِالْمَعْرُوفِ) অর্থাৎ এক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের ছয়টি কল্যাণকর অধিকার রয়েছে। আর তা হলো যে কথা বা কাজ যাতে আল্লাহ তা‘আলা সন্তুষ্ট হন। (يُجِيبُهٗ إِذَا دَعَاهُ) অর্থাৎ যে কেউ আমন্ত্রণ করলে অথবা প্রয়োজনে ডাকলে সাড়া দিবে। يُشَمِّتُهٗ এর অর্থ (আলহামদুলিল্লা-হ বললে) সে তার জন্য يرحمك الله বলে দু‘আ করবে। হাঁচির জবাব দেয়ার হুকুমের ক্ষেত্রে ‘আলিমদের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। যেমন হাফিয ইবনু হাজার ‘আসকালানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হাঁচির জবাব দেয়া ওয়াজিব। কারণ, আবূ হুরায়রা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস রয়েছে, فَحَقٌّ عَلٰى كُلِّ مُسْلِمٍ سَمِعَهٗ أَنْ يُشَمِّتَهُ।
ইবনু আবূ জামরাহ্ বলেনঃ একদল ‘আলিম এটাকে ফরযে ‘আইন বলে অভিহিত করেছেন। ইমাম ইবনুল কইয়িম (রহিমাহুল্লাহ) এ মতটিকে তাঁর সুনানের মধ্যে জোর দিয়ে বলেছেন। আরেকদল বিদ্বান এটাকে ফরযে কিফায়াহ্ বলেছেন। অতএব যখন কেউ এর জবাব দেয় তখন তা সবার পক্ষ থেকে যথেষ্ট হয়ে যাবে। জামহূর হাম্বালী, হানাফী ও আবুল ওয়ালীদ ইবনু রুশদ প্রমুখ এরূপ মত পেশ করেন। মালিকীদের একদল ও ‘আবদুল ওয়াহ্ব মুস্তাহাব বলেছেন। এ ধরনের মত শাফি‘ঈ মতাবলম্বীদেরও। হাফিয (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ সহীহ হাদীস দ্বারা জবাব দেয়া কিফায়াহ্। ওয়াজিব প্রমাণিত হলেও দ্বিতীয় মতটি দলীলের দিক থেকে অগ্রাধিকারযোগ্য। কারণ হাঁচির জবাবদান যদিও ‘আমভাবে বর্ণিত হয়েছে তবুও এর দ্বারা সবাইকে সম্বোধন করা হয়েছে।
ইবনুল কইয়িম (রহিমাহুল্লাহ) ‘‘যাদুল মা‘আদ’’ গ্রন্থে হাঁচির জবাব সম্পর্কে একাধিক হাদীস নিয়ে এসেছেন তন্মধ্যে প্রথমে বুখারী কর্তৃক বর্ণিত আবূ হুরায়রা (রাঃ)-এর إِنَّ اللهَ يُحِبُّ الْعُطَاسَ وَيَكْرَهُ التَّثَاؤُبَ فَإِذَا عَطَسَ فَحَمِدَ اللهَ فَحَقٌّ عَلٰى كُلِّ مُسْلِمٍ سَمِعَهٗ أَنْ يُشَمِّتَهٗ হাদীসটি উল্লেখ করে বলেন, হাঁচিদাতা ব্যক্তির আলহাম্দুলিল্লা-হ শ্রবণকারী প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির হাঁচির জবাব দেয়া ফরযে ‘আইন। সবার তরফ থেকে একজনের হাঁচির জবাব দেয়া যথেষ্ট হবে না। তিনি আরো বলেন, এটা ‘আলিমদের একটি মত, যাকে ইবনু যায়দ ও ইবনুল ‘আরাবী মালিকী পছন্দ করেন। তুহফাতুল আহ্ওয়াযীর ভাষ্যকার ইবনুল কইয়িম (রহিমাহুল্লাহ)-এর মতটিকে গ্রহণ করেন। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৭৩৬)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৪৪-[১৭] ’ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে উপস্থিত হয়ে বলল : ’’আসসালা-মু ’আলায়কুম’’। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সালামের জবাব দিলেন। অতঃপর লোকটি বসল। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ লোকটির জন্য দশ নেকি লেখা হলো। অতঃপর আরেক ব্যক্তি এসে বলল : ’’আসসালা-মু ’আলায়কুম ওয়া রহমাতুল্ল-হ’’। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালামের জবাব দিলেন। লোকটি বসল। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ লোকটির জন্য বিশ নেকি লেখা হলো। অতঃপর আরো এক ব্যক্তি এসে বলল : ’’আসসালা-মু ’আলায়কুম ওয়া রহমাতুল্ল-হি ওয়া বারাকা-তুহ’’। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সালামের জবাব দিলেন। লোকটি বসার পর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ লোকটির জন্য ত্রিশ নেকি লেখা হলো। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
وعنِ
عمرَان بن حُصَيْن أَنَّ رَجُلًا جَاءَ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: السَّلَامُ عَلَيْكُمْ فَرَدَّ عَلَيْهِ ثُمَّ جَلَسَ. فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «عشر» . ثمَّ جَاءَ لآخر فَقَالَ: السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ فَرَدَّ عَلَيْهِ فَقَالَ: «ثَلَاثُونَ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ প্রতিটি শব্দে দশটি করে নেকী রয়েছে। সালামের জবাব সালাম প্রদানকারীর চাইতে উত্তমভাবে দিতে হয়। হাফিয ইবনু হাজার ‘আসকালানী স্বীয় ‘ফাতহুল বারী’ গ্রন্থে বলেনঃ যদি সালামদাতা ‘‘ওয়া রহমাতুল্ল-হ’’ পর্যন্ত বলে তবে উত্তরদাতা বৃদ্ধি করে ‘‘ওয়া বারাকা-তুহ’’ পর্যন্ত বলা মুস্তাহাব।
এক্ষণে সালাম প্রদানকারী যদি ‘‘ওয়া বারাকা-তুহ’’ পর্যন্ত বলে তাহলে সালামের জবাবদাতা কিছু বৃদ্ধি করতে পারবে কিনা? অথবা সালামদাতা যদি ‘‘ওয়া বারাকা-তুহ’’ থেকে বৃদ্ধি করে বলে তাহলে সেটা শারী‘আতসম্মত হবে কিনা? ইমাম মালিক স্বীয় মুওয়াত্ত্বা গ্রন্থে বলেনঃ সালামের শেষ হলো ‘‘ওয়া বারাকা-তুহ’’ পর্যন্ত। ইমাম বায়হাক্বী তাঁর ‘‘শু‘আবুল ঈমান’’ গ্রন্থে একটি রিওয়ায়াত নিয়ে এসেছেন, যেখানে তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি ইবনু ‘উমার (রাঃ)-এর নিকটে এসে বলেনঃ السلام عليكم ورحمة الله وبركاته ومغفرته। তখন ইবনু ‘উমার (রাঃ) বললেনঃ ‘‘ওয়া বারাকা-তুহ’’ পর্যন্তই যথেষ্ট। কারণ এর শেষ হলো ‘‘ওয়া বারাকা-তুহ’’। অন্য এক বর্ণনায় ‘উমার বলেন সালামের শেষ হলো ‘‘ওয়া বারাকা-তুহ’’ পর্যন্ত। এর বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য এবং উত্তম রাবীর অন্তর্ভুক্ত। (ফাতহুল বারী ১১/৬)
তবে মুওয়াত্ত্বায় বর্ণিত আরেকটি বর্ণনা থেকে বুঝা যায় যে, ইবনু ‘উমার (রাঃ)-এর সালামের জবাবে والغاديات والرائحات বৃদ্ধি করাতে, কিছু বেশি করার বৈধতার প্রমাণ মিলে। অনুরূপভাবে ইমাম বুখারী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আদাবুল মুফরাদে একটি রিওয়ায়াত উল্লেখ করেন, তাতে ইবনু ‘উমার সালামের জবাবে বৃদ্ধি করতেন যেমন ইবনু ‘উমার -এর মুক্ত দাস বলেন, আমি তার নিকটে একদিন এসে সালাম দিলে এর জবাবে তিনি বৃদ্ধি করে وطيب صلواته বলেন।
ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘‘শু‘আবুল ঈমান’’ গ্রন্থে একটি হাদীস য‘ঈফ সনদে বর্ণনা করেন। সেখানে যায়দ ইবনু আরকাম (রাঃ) বলেন, যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে সালাম দিতেন তখন আমরা বলতাম, وعليك السلام ورحمة الله وبركاته ومغفرته। উল্লেখ্য ‘‘ওয়া বারাকা-তুহ’’ এর পরে বৃদ্ধি করার হাদীসগুলো সবই য‘ঈফ।
ইমাম ‘আসকালানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এসব দুর্বল হাদীসগুলো যখন একত্রিত করা হয় তখন তা শক্তিশালী হয়। ফলে ‘‘ওয়া বারাকা-তুহ’’-এর পরে বৃদ্ধি করার বৈধতা পাওয়া যায়।
(ফাতহুল বারী ১১শ খন্ড, হাঃ ৬; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৬৮৯)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৪৫-[১৮] মু’আয ইবনু আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে উপরিউক্ত হাদীসের সমার্থক হাদীস বর্ণনা করেন। তিনি নিম্নোক্ত বাক্যগুলো বর্ধিত করেন, অতঃপর আরো এক ব্যক্তি এসে বলল : ’’আসসালা-মু ’আলায়কুম ওয়া রহমাতুল্লা-হি ওয়া বারাকা-তুহু ওয়া মাগফিরাতুহ’’। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ এ ব্যক্তির জন্য চল্লিশ নেকি লেখা হলো। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরো বললেনঃ এভাবে সাওয়াব বৃদ্ধি পায়। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن معَاذ
بْنِ أَنَسٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِمَعْنَاهُ وَزَاد ثُمَّ أَتَى آخَرُ فَقَالَ: السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ وَمَغْفِرَتُهُ فَقَالَ: «أَرْبَعُونَ» وَقَالَ: «هَكَذَا تكون الْفَضَائِل» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘আব্দ মারহুম ‘আবদুর রহমান ইবনু মায়মূন’’ এবং ‘‘সাহল ইবনু মু‘আয’’ নামের দু’জন বর্ণনাকারীর দ্বারা দলীল গ্রহণ করা যায় না। দেখুন- ‘আওনুল মা‘বূদ ১৪/৭০ পৃঃ, হাঃ ৫১৯৬।
ব্যাখ্যাঃ فَقَالَ:أَرْبَعُونَ অর্থাৎ তার জন্য চল্লিশ নেকী রয়েছে। প্রত্যেক শব্দে দশ নেকী।هَكَذَا تكون الْفَضَائِل এর অর্থ হলো সালামদাতা যতই শব্দ বৃদ্ধি করে ততই নেকী বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হবে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫১৮৭)
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ জেনে রাখা উচিত যে, শ্রেষ্ঠ সালাম হলো السلام عليكم ورحمة الله وبركاته বলা। একজন লোক হলেও এভাবে সালাম দিতে হবে। আর জবাবদাতা বলবে وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته। ন্যূনতম সালাম হলো السلام عليكم যদি বলে السلام عليك অথবা سلام عليك তবুও হয়ে যাবে। আর ন্যূনতম সালামের জবাব হলো وعليك السلام অথবা وعليكم السلام। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৪৬-[১৯] আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলার নিকট অগ্রগণ্য সে ব্যক্তি, যে প্রথমে সালাম দেয়। (আহমাদ, তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي أُمَامَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ أَوْلَى النَّاسِ بِاللَّهِ مَنْ بَدَأَ السَّلَام» . رَوَاهُ أَحْمد وَالتِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ إِنَّ أَوْلَى النَّاسِ بِاللهِ مَنْ بَدَأَ السَّلَام এর মর্মার্থ প্রসঙ্গে ইমাম ত্বীবী বলেন, পরস্পরে সাক্ষাতকারী দুই ব্যক্তির মধ্যে যে ব্যক্তি প্রথমে সালাম দিবে সেই আল্লাহর রহমতের সর্বাধিক নিকটতম ব্যক্তি হিসেবে পরিগণিত হবেন। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫১৮৮; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৬৯৪)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৪৭-[২০] জারীর (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদল মহিলার নিকট দিয়ে গেলেন এবং তাদেরকে সালাম দিলেন। (আহমাদ)[1]
وَعَن
جَرِيرٍ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرَّ عَلَى نِسْوَةٍ فَسَلَّمَ عَلَيْهِنَّ. رَوَاهُ أَحْمَدُ
ব্যাখ্যাঃ (فَسَلَّمَ عَلَيْهِنَّ) এ হাদীসের ব্যাখ্যায় মাওলানা সাইয়্যিদ মুহাম্মাদ ‘আবদুল আওয়াল গজনবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীস থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, অপরিচিত নারীকে সালাম দেয়া অথবা সালামের জবাব দেয়া বৈধ। যে কাজ শারী‘আতের অনুকূলে হয় তাতে কোন ফিতনার আশংকা নেই। সাহাবীগণ সর্বদা উম্মুল মু’মিনীনদের সালাম দিতেন। আর তারাও সালামের জবাব দিতেন। এমনকি জিবরীল (আ.) স্বয়ং উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে সালাম পাঠিয়েছেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ- বোম্বায় ছাপা, ৪র্থ খন্ড, ১৩ পৃষ্ঠা)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৪৮-[২১] ’আলী ইবনু আবূ ত্বালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন একদল লোক যেতে থাকে এবং তাদের মধ্য থেকে কোন ব্যক্তি অপর কোন ব্যক্তিকে বা দলকে সালাম দেয়, তবে এ সালাম গোটা দলের পক্ষ হতে যথেষ্ট হবে। এমনিভাবে কোন মাজলিস হতে কোন এক ব্যক্তি যদি সালামের জবাব দেয়, তবে তার এ জবাবই গোটা মাজলিসের পক্ষ হতে যথেষ্ট। (ইমাম বায়হাক্বী এ বর্ণনাকে ’’শু’আবুল ঈমান’’ গ্রন্থে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উক্তি বলে বর্ণনা করেছেন। আর ইমাম আবূ দাঊদ বলেনঃ হাসান ইবনু ’আলী এ হাদীসটিকে মারফূ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং হাসান ইবনু ’আলী ইমাম আবূ দাঊদ-এর উস্তায।)[1]
وَعَنْ
عَلِيَّ بْنَ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: يُجْزِئُ عَنِ الْجَمَاعَةِ إِذَا مَرُّوا أَنْ يُسَلِّمَ أَحَدُهُمْ وَيُجْزِئُ عَنِ الْجُلُوسِ أَنْ يَرُدَّ أَحَدُهُمْ. رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ» مَرْفُوعا. وروى أَبُو دَاوُد وَقَالَ: وَرَفعه الْحَسَنُ بْنُ عَلِيٍّ وَهُوَ شَيْخُ أَبِي دَاوُدَ
ব্যাখ্যাঃ কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ সালাম দেয়া সুন্নাত ও মুস্তাহাব ওয়াজিব নয়। এটা সুন্নাতে কিফায়াহ্। সে কারণে একটা দলের তরফ থেকে একজন সালাম দিলে যথেষ্ট হবে। আর যদি প্রত্যেকেই সালাম দেয় তাহলে সেটা হবে সর্বোত্তম। তেমনিভাবে সালামের জবাব দেয়া সর্বসম্মতিক্রমে ফরযে কিফায়াহ্। তবে সবাই যদি সালামের জবাব দেয় তাহলে সেটা হবে সর্বাধিক উত্তম।
(عَنِ الْجُلُوسِ) এখানে উপবিষ্ট বলতে যাদেরকে সালাম দেয়া হয় তাদেরকে বুঝানো হয়েছে। তারা যে অবস্থায় থাক না কেন। এখানে অধিকাংশ অবস্থার দিকে লক্ষ্য করে جلوس শব্দের সাথে খাস করা হয়েছে। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষ একত্রিত হলে বসে থাকে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫২০১)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৪৯-[২২] ’আমর ইবনু শু’আয়ব তাঁর পিতার মাধ্যমে তাঁর পিতামহ হতে বর্ণনা করেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আমাদের ছাড়া অন্য জাতির সাথে সাদৃশ্য করে সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। তোমরা ইয়াহূদী ও খ্রিষ্টানদের সাথে সাদৃশ্য করো না। কেননা ইয়াহূদীরা অঙ্গুলির ইশারায় সালাম দেয়, আর খ্রিষ্টানরা হাতের তালু দ্বারা সালাম করে। [ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং তিনি বলেন, এ হাদীসের সানাদ দুর্বল।][1]
وَعَنْ
عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَشَبَّهَ بِغَيْرِنَا لَا تَشَبَّهُوا بِالْيَهُودِ وَلَا بِالنَّصَارَى فَإِنَّ تَسْلِيمَ الْيَهُودِ الْإِشَارَةُ بِالْأَصَابِعِ وَتَسْلِيمَ النَّصَارَى الْإِشَارَةُ بِالْأَكُفِّ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: إِسْنَاده ضَعِيف
ব্যাখ্যাঃ (لَيْسَ مِنَّا) এর অর্থ আমাদের তরীকার অনুসারী নয় এবং আমাদের অনুসরণের প্রতি যত্নবান নয়। কাজেই তোমরা তাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ড- কোনরূপ সাদৃশ্যতা অবলম্বন করো না। বিশেষভাবে এ দুই ক্ষেত্রে। কারণ হয়ত তারা সালাম দেয়ার সময় অথবা সালামের জবাবে অথবা উভয় ক্ষেত্রে হাত মুড়িয়ে বেঁধে ইশারা করে থাকত সালাম উচ্চারণ না করেই।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আসমা বিনতু ইয়াযীদ (রাঃ)-এর হাদীস থাকতে জাবির -এর হাদীসকে একেবারে প্রত্যাখ্যান করা যায় না। আসমা (রাঃ)-এর হাদীসে রয়েছে, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদের ভিতর দিয়ে গমন করছিলেন, তখন একদল নারী সেথায় বসে ছিল। অতঃপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাত নাড়িয়ে সালাম প্রদান করলেন। (তিরমিযী হাঃ ২৬৯৭)
এ হাদীসে এটা সম্ভাবনা রয়েছে যে, তিনি হাতের ইশারা ও সালাম উচ্চারণ উভয়টি করেছেন। আবার আবূ দাঊদ-এর বর্ণনায় আসমা (রাঃ)-এর হাদীসে রয়েছে, فسلم علينا অর্থাৎ তিনি আমাদেরকে সালাম দিলেন। অতএব এটা আরো স্পষ্ট হয়ে গেল। বস্তুত যে ব্যক্তি শার‘ঈ পদ্ধতিতে ভালোভাবে সালাম প্রদান করতে সক্ষম তার জন্য ইশারায় সালাম দেয়া নিষিদ্ধ। এছাড়া যে ব্যক্তি ব্যস্ততার কারণে সালামের জবাব উচ্চারণ করতে বাধাপ্রাপ্ত হয় যেমন সালাতরত ব্যক্তি দূরবর্তী ব্যক্তি এবং বোবা ব্যক্তির সালামের জবাব দেয়া অনুরূপভাবে বধির ব্যক্তিকে ইশারায় সালাম দেয়াও জায়িয। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৬৯৫)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৫০-[২৩] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যখন তোমাদের কেউ নিজের কোন মুসলিম ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করে, সে যেন প্রথমে সালাম দেয়। আর যদি তাদের উভয়ের মধ্যখানে বৃক্ষ, দেয়াল বা পাথরের আড়াল পড়ে যায়, অতঃপর পুনরায় সাক্ষাৎ হয়, তবে যেন দ্বিতীয়বার সালাম দেয়। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ اتا: «إِذَا لَقِيَ أَحَدُكُمْ أَخَاهُ فَلْيُسَلِّمْ عَلَيْهِ فَإِنْ حَالَتْ بَيْنَهُمَا شَجَرَةٌ أَوْ جِدَارٌ أَوْ حَجَرٌ ثُمَّ لَقِيَهُ فَلْيُسَلِّمْ عَلَيْهِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যাঃ (أَوْ حَجَرٌ) অর্থাৎ বড় পাথর। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসে সালাম বিস্তারের প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। আর অবস্থান বা ক্ষেত্র পরিবর্তন হলেও প্রত্যেক গমন ও প্রস্থানকারীদেরকে বারবার সালাম প্রদানের প্রতি উদ্ধুদ্ব করা হয়েছে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫১৯১)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৫১-[২৪] কতাদাহ্ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন তোমরা গৃহে প্রবেশ করবে, তখন গৃহবাসীকে সালাম দেবে। আর যখন ঘর থেকে বের হবে, তখন গৃহবাসীকে সালাম দিয়ে বিদায় গ্রহণ করবে। (ইমাম বায়হাক্বী ’’শু’আবুল ঈমানে’’ মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন)[1]
وَعَن
قَتَادَة قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا دَخَلْتُمْ بَيْتًا فَسَلِّمُوا عَلَى أَهْلِهِ وَإِذَا خَرَجْتُمْ فَأَوْدِعُوا أَهْلَهُ بِسَلَامٍ» رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ» مُرْسَلًا
ব্যাখ্যাঃ ‘আলী কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ যদি বাড়ীতে কেউ না থাকে, তাহলে اَلسَّلَامُ عَلَيْنَا وَعَلٰى عِبَادِ اللهِ الصَّالِحِينَ বলে সালাম দেয়া মুস্তাহাব। যাতে সেখানে যে মালাকের (ফেরেশতার) গোপন সংবাদ রয়েছে তাদের প্রতি সালাম পৌঁছে যায়। উল্লেখ্য যে, এখানে إيداع এর অর্থ হলো توديع যা وداع থেকে গৃহীত। অর্থাৎ সালাম দিয়ে যাত্রা করা। কোন কোন হানাফীর মতে বিদায়ী সালামের জবাব দেয়া মুস্তাহাব। কারণ এটা দু‘আ এবং বিদায়, যেমনটি ‘আলী কারী বলেন।
শায়খ ‘‘লাম্‘আত’’ গ্রন্থে বলেনঃ اودعوا শব্দটি ايداع থেকে নির্গত হয়েছে। এর অর্থ তোমরা গৃহবাসীদের নিকটে সালামকে গচ্ছিত সম্পদ হিসেবে রাখ। অর্থাৎ তোমরা যখন বের হওয়ার সময় গৃহবাসীদেরকে সালাম দিবে তখন যেন তা তাদের নিকটে সালামের কল্যাণ ও বারাকাতকে গচ্ছিত সম্পদ হিসেবে রাখে। আর সেটাকে ভবিষ্যতে মানুষ যেমন কোন সম্পদ নিজ লোকের নিকট রেখে পুনরায় নিয়ে নেয়, তোমরা তাদের নিকট থেকে গচ্ছিত সম্পদরূপে গ্রহণ করবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ- বোম্বায় ছাপা, ৪র্থ খন্ড, ১৪ পৃষ্ঠা)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৫২-[২৫] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হে বৎস! যখন তুমি তোমার ঘরে প্রবেশ করো, তখন সালাম দেবে। তোমার সালাম তোমার ও তোমার ঘরের বাসিন্দাদের জন্য বারাকাতের কারণ হবে। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ
أَنَسٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «يَا بُنَيِّ إِذَا دَخَلْتَ عَلَى أَهْلِكَ فَسَلِّمْ يَكُونُ بَرَكَةً عَلَيْكَ وَعَلَى أَهْلِ بَيْتك» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
হাদীসটিকে আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) প্রথমে য‘ঈফ বলেন, য‘ঈফুল জামি‘ ৬৩৮৯। অতঃপর তিনি পরবর্তীতে সহীহ আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ১৬০৮ নং হাদীসে অত্র হাদীসকে হাসান বলেছেন। দেখুন- তারাজু‘আতুল আলবানী ২৫৯ নং।
ব্যাখ্যাঃ (يَكُونُ بَرَكَةً) এটা جملة مستأنفة অর্থাৎ কারণযুক্ত শুরু বাক্য। এটা আসলে ছিল فانه يكون অর্থাৎ সালাম হলো বারাকাত বৃদ্ধি এবং অধিক কল্যাণ ও দয়া বৃদ্ধির কারণ। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৬৯৮)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৫৩-[২৬] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কথাবার্তা বলার পূর্বেই সালাম দিতে হবে। [তিরমিযী; আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এ হাদীসটি মুনকার।][1]
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «السَّلَامُ قَبْلَ الْكَلَامِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيث مُنكر
ব্যাখ্যাঃ সুন্নাত হলো কথা বলার পূর্বে সালাম দিয়ে শুরু করা। কারণ সালাম দ্বারা আরম্ভ করা নিরাপত্তা ও সুলক্ষণের ইঙ্গিত বাহক। এর দ্বারা সম্বোধিত ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ হওয়া যায়। আবার আল্লাহর জিকর দ্বারা আরম্ভ হওয়ার বারাকাত হাসিল করা হয়।
কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এটা শুভেচ্ছা। যা শুরুতে করা হয়। সুতরাং কথা দ্বারা আরম্ভ করলে তা বাদ পড়ে যায়। যেমন তাহিয়্যাতুল মসজিদ যাকে বসার পূর্বে আদায় করতে হয়। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৬৯৯)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৫৪-[২৭] ’ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা জাহিলিয়্যাতের যুগে সাক্ষাতের সময় বলতাম : أَنْعَمَ اللهُ بِكَ عَيْنًا (আল্লাহ তোমার চক্ষু শীতল করুন), أَنْعَمَ صَبَاحًا (প্রত্যুষেই তুমি কল্যাণের অধিকারী হও)। অতঃপর যখন ইসলামের আগমন ঘটলো, তখন আমাদেরকে এটা বলতে নিষেধ করা হলো। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عِمْرَانَ
بْنِ حُصَيْنٍ قَالَ: كُنَّا فِي الْجَاهِلِيَّةِ نَقُولُ: أَنْعَمَ اللَّهُ بِكَ عَيْنًا وَأَنْعَمَ صَبَاحًا. فَلَمَّا كَانَ الْإِسْلَامُ نُهِينَا عَنْ ذَلِكَ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ইনক্বিতা‘ (বিচ্ছিন্নতা) রয়েছে। তাহলে কতাদাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) ‘ইমরান ইবনু হুসায়ন থেকে শুনেননি। দেখুন- ‘আওনুল মা‘বূদ ১৪/৯৪ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ আবূ দাঊদ-এর ভাষ্যকার ফাতহুল ওয়াদূদে বলেনঃ এটা নিষিদ্ধ হওয়ার ভিত্তি হলো সেটা জাহিলী যুগের অভিবাদন বা শুভেচ্ছা। তবে জাহিলিয়্যাতের যুগে انعم الله بك عينا বাক্যটি প্রসিদ্ধ ছিল। অতঃপর জাহিলী অবস্থার যখন পরিবর্তন হলো তখন জাহিলী শুভেচ্ছার বিধানও অবশিষ্ট থাকল না। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫২১৮)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৫৫-[২৮] গালিব (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমরা হাসান বাসরী-এর দরজায় বসেছিলাম। তখন জনৈক ব্যক্তি এসে বলল : আমার পিতা আমার পিতামহ হতে হাদীস বর্ণনা করেন যে, (আমার পিতামহ বললেনঃ) আমার পিতা একবার আমাকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পাঠালেন এবং বললেনঃ তুমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে উপস্থিত হয়ে আমার সালাম পৌঁছাবে। আমার পিতামহ বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আমার পিতা আপনাকে সালাম জানিয়েছেন। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জবাবে বললেনঃ عَلَيْكَ وَعَلٰى أَبِيْكَ السَّلَامُ. ’’তোমার এবং তোমার পিতার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক’’। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن غَالب قَالَ:
إِنَّا لَجُلُوسٌ بِبَابِ الْحَسَنِ الْبَصْرِيِّ إِذْ جَاءَ رَجُلٌ فَقَالَ: حَدَّثَنِي أَبِي عَنْ جَدِّي
قَالَ: بَعَثَنِي أَبِي إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: ائتيه فَأَقْرِئْهُ السَّلَامَ. قَالَ: فَأَتَيْتُهُ
فَقُلْتُ: أَبِي يُقْرِئُكَ السَّلَامَ. فَقَالَ: عَلَيْكَ وَعَلَى أَبِيكَ السَّلَامُ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ আবূ দাঊদ-এর ভাষ্যকার ফাতহুল ওয়াদূদে বলেন, এ হাদীস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সালামের বাহককেও জবাব দেয়া যায়। আবার ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর একটি বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, শুধুমাত্র সালাম প্রেরণকারীকে সালামের জবাব দিয়েছেন। যেমন হাদীসে এসেছে, ان النبي صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قال لها ان جبريل يقرأ عليك السلام فقالت وعليه السلام ورحمة الله নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আয়িশাহ্-কে বললেন, জিবরীল (আ.) তোমাকে সালাম দিয়েছেন। তখন তিনি বললেন, وعليه السلام ورحمة الله। (আবূ দাঊদ হাঃ ৫২২৩)
এক্ষণে দুই হাদীসের সমাধানে বলা যায়, সালামের বাহক ও প্রেরণকারীকে উত্তর দেয়া মুস্তাহাব। আর শুধুমাত্র প্রেরণককে সালামের উত্তর দেয়া জায়িয। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫২২২)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৫৬-[২৯] আবুল ’আলা ইবনুল হাযরামী হতে বর্ণিত। ’আলা ইবনুল হাযরামী (রাঃ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কর্মচারী ছিলেন। যখন তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে চিঠি লিখতেন, তখন নিজের নাম দিয়ে আরম্ভ করতেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن أبي
الْعَلَاء بن الْحَضْرَمِيّ أَنَّ الْعَلَاءَ الْحَضْرَمِيَّ كَانَ عَامِلَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَكَانَ إِذَا كَتَبَ إِليه بدأَ بنفسِه. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘ইবনুল ‘আলা’’ যার অজ্ঞতার কারণে হাদীসটি য‘ঈফ। দেখুন- হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৩১৭ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ ‘আলা ইবনুল হাযরামী (রাঃ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাহরায়নে নিযুক্ত কর্মচারী ছিলেন। প্রথম ও দ্বিতীয় খলীফা আবূ বকর ও ‘উমার (রাঃ) তাকে আমৃত্যু উক্ত পদে ১৪ বছর যাবৎ বহাল রাখেন।
এ হাদীস থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, লেখকের নিজের নাম দ্বারা কোন চিঠি লেখা আরম্ভ করা সুন্নাত। যার প্রমাণ সরাসরি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক হিরাক্বিল বাদশাহর নিকটে প্রদত্ত চিঠি থেকে পাওয়া যায়। তাতে লিখা ছিল بسم الله الرحمن الرحيم من محمد عبد الله ورسوله الى هرقل .....الخ।
হাফিয ইবনু হাজার ‘আসকালানী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ফাতহুল বারীতে’ এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেনঃ এতে প্রমাণ হয় যে, নিজের পক্ষ থেকে চিঠি লেখা আরম্ভ করা সুন্নাত। এটা জামহূর মুহাদ্দিসের মত, এমনকি নুহাস (রহিমাহুল্লাহ) এ ব্যাপারে সাহাবীদের ইজমার দাবী করেন। তবে সঠিক হলো এর বিপরীত। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫১২৫)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৫৭-[৩০] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন তোমাদের কেউ অন্য কাউকে চিঠি লেখে, তখন তাতে যেন (লেখা শেষে) মাটি লাগিয়ে দেয়। কেননা এটা উদ্দেশ্য পূরণে অধিকতর সফলকারী। [তিরমিযী; আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এ হাদীসটি মুনকার][1]
وَعَنْ جَابِرٌ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِذا كتب أحدكُم كتابا فليتر بِهِ فَإِنَّهُ أَنْجَحُ لِلْحَاجَةِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيث مُنكر
হাদীসটির য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘হামযা নাসিবী’’ নামের বর্ণনাকারী য‘ঈফ। আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) তাকে মাতরূক ও হাদীস জাল করার অভিযোগ অভিযুক্ত করে করেছেন। দেখুন- য‘ঈফাহ্ ১৭৩৮, হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৩১৮ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ মাজমা' গ্রন্থে বলা হয়েছে, উদ্দেশ্য সাধনে আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা রাখার জন্য চিঠিকে মাটিতে ফেলা হয়। অথবা মাটি লাগানো হয়।
ইমাম মুযহির (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ লেখক যেন অধিক নমনীয়তার সাথে সম্বোধন করে। আর মাটিময় করার অর্থ হলো সম্বোধনে অধিক নমনীয়তা প্রদর্শন করা।
কেউ কেউ বলেনঃ মাটি লাগানোর উদ্দেশ্য হলো লিখনী মুছে যাওয়া থেকে রক্ষার জন্য। ভেজা কালিকে শুকিয়ে নেয়া। নিঃসন্দেহে লিখনী স্বঅবস্থায় বিদ্যমান থাকা প্রয়োজন পূরণে অব্যর্থ ব্যবস্থা। আর সেটা মিটে যাওয়া উদ্দেশ্য সাধনের প্রতিবন্ধক স্বরূপ। তিরমিযীর ভাষ্যকার বলেনঃ মাটিযুক্ত করার নির্ভরযোগ্য অর্থ হলো সেটাকে শুকিয়ে নেয়া।
(فَإِنَّهٗ أَنْجَحُ لِلْحَاجَةِ) অর্থাৎ এটা উদ্দেশ্য পূরণে সর্বাধিক নিকটতম ও সহজ উপায়।
(তুহফাতুল আহওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৭১৩)
তবে যেহেতু হাদীসটি য‘ঈফ তথা মুনকার, সেহেতু এর উপর ‘আমল করা বৈধ নয়। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৫৮-[৩১] যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে উপস্থিত হলাম। তখন তাঁর সম্মুখে একজন কাতিব (লেখক) ছিল। আমি তাঁকে লেখকের উদ্দেশে বলতে শুনেছি, ’’কলমটি কানের উপর রাখো। কেননা এরূপ করলে প্রয়োজনীয় কথা বা উদ্দেশ্য স্মরণ হয়’’। [তিরমিযী; আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ এ হাদীসটি গরীব ও সানাদ দুর্বল।][1]
عَن زيدٍ بن ثابتٍ
قَالَ: دَخَلْتُ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَبَيْنَ يَدَيْهِ كَاتِبٌ فَسَمِعْتُهُ يَقُولُ: ضَعِ الْقَلَمَ عَلَى أُذُنِكَ فَإِنَّهُ أَذْكَرُ لِلْمَآلِ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ وَفِي إِسْنَادِهِ ضعفٌ
হাদীসটি মাওযূ‘ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘আমবাসাহ্ ইবনু ‘আবদুর রাহমান আল উমাবী’’ নামের বর্ণনাকারী, যে হাদীস জাল করত এবং ‘‘মুহাম্মাদ’’ নামের বর্ণনাকারীও য‘ঈফ। দেখুন- য‘ঈফাহ্ ৮৬১।
ব্যাখ্যাঃ এখানে ‘লেখক’ বলতে রূপক লেখক উদ্দেশ্য। যিনি তার কথাকে রচনা করতে বিলম্ব হলে তখন তিনি তার কলমকে কানে রাখবেন। কারণ এটা লেখকের উদ্দিষ্ট কথা স্মরণ করতে অধিক দ্রুত মাধ্যম। হাতে কলম থাকলে লেখক অল্প চিন্তা করেই তার কথাকে লিখতে উৎসাহী হবে। ফলে তার কথাগুলো সুন্দর গোছালো হবে না। আবার কলমকে মাটিতে রেখে দিলে এটা যেন লেখা থেকে অবসর গ্রহণের মতো। এতে তার এ চিন্তা না করে বসে থাকবে। কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এর অর্থ হলো প্রয়োজনে কানের উপরে কলম রাখা স্মরণের অধিক নিকটবর্তী এবং তা অর্জনের জন্য সর্বাধিক সহজ স্থান। যেটা অন্য স্থানে রাখলে এরূপ হয় না। কারণ কখনো কখনো তার নিকটে সেটা বিনা কষ্টে দ্রুত লাভ করা কঠিন হয়ে পড়ে। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৭১৪)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৫৯-[৩২] উক্ত রাবী [যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে আদেশ করলেন যেন আমি সুরইয়ানিয়্যাহ্ ভাষা শিক্ষা করি। অন্য এক বর্ণনায় আছে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে আদেশ করলেন, যেন আমি ইয়াহূদীদের পত্রলিখন পদ্ধতি শিক্ষা করি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরো বলেন যে, পত্রালাপ সংক্রান্ত ব্যাপারে ইয়াহূদীদের দিক থেকে আমার সন্তুষ্টি আসে না। যায়দ ইবনু সাবিত(রাঃ) বলেনঃ অর্ধ মাসের মধ্যে আমি (সুরইয়ানিয়্যাহ্ ভাষা) শিখে ফেললাম। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখনই কোন ইয়াহূদীকে চিঠি লিখতেন, তা আমি লিখতাম। আর কোন ইয়াহূদী যখন তাঁর কাছে চিঠি পাঠাত, তাদের চিঠি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সমীপে আমিই পাঠ করতাম। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْهُ
قَالَ: أَمَرَنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ أَتَعَلَّمَ السُّرْيَانِيَّةَ. وَفِي رِوَايَةٍ: إِنَّهُ أَمَرَنِي أَنْ أَتَعَلَّمَ كِتَابَ يَهُودَ وَقَالَ: «إِنِّي مَا آمَنُ يَهُودَ عَلَى كِتَابٍ» . قَالَ: فَمَا مَرَّ بِيَ نِصْفُ شَهْرٍ حَتَّى تَعَلَّمْتُ فَكَانَ إِذَا كَتَبَ إِلَى يَهُودَ كَتَبْتُ وَإِذَا كَتَبُوا إِلَيْهِ قَرَأْتُ لَهُ كِتَابَهُمْ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ
ব্যাখ্যাঃ কারী (রহিমাহুমাল্লাহ) বলেনঃ সতর্কতার স্বার্থে ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ইসলামী শারী‘আতে যা হারাম তা শিক্ষা গ্রহণ করার বৈধতার দলীল এ হাদীসে বিদ্যমান।
অনুরূপভাবে ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুমাল্লাহ) উক্ত মত পেশ করেন। কারণ শারী‘আয় ভাষা শিক্ষা করা হারাম বলে কোন ইঙ্গিত পাওয়া যায় না। যেমন সুরইয়ানিয়্যাহ্, হিব্রু, হিন্দী, তুর্কী, ফার্সী প্রভৃতি ভাষা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَمِنْ آيَاتِه خَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافُ أَلْسِنَتِكُمْ অর্থাৎ ‘‘তার নিদর্শনাবলীর অন্যতম হলো আকাশমণ্ডলী ও জমিন সৃষ্টি এবং বিভিন্ন ভাষা।’’ (সূরাহ্ আর্ রূম ৩০ : ২২)
বরং সমস্ত ভাষাই বৈধ। তবে হ্যাঁ যেগুলো অনর্থক-বেকার সেগুলো পূর্ণ জ্ঞানী লোকেদের নিকটে নিন্দনীয়, কিন্তু যেগুলোর উপকার রয়েছে সেগুলো শিক্ষা করা মুস্তাহাব। যেমনটি আলোচ্য হাদীস থেকে বুঝা যায়।
‘আবদুর রহমান ইবনু আবূ যিনাদ-এর বর্ণনায় আছে, أَنْ أَتَعَلَّمَ لَهٗ كَلِمَاتٍ مِنْ كِتَابِ يَهُود, আর আ‘মাশ-এর বর্ণনায় রয়েছে أَنْ أَتَعَلَّمَ السُّرْيَانِيَّةَ। হাফিয ইবনু হাজার ‘আসকালানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ সম্ভবত সাবিত-এর ঘটনাটি খারিজার ঘটনার সাথে যুক্ত। কারণ, যে ব্যক্তি ইয়াহূদী লেখ্যরীতি সম্পর্কে অবগত হতে চাইবে তাকে তাদের ভাষা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা জরুরী। আর তাদের ভাষা সুর্ইয়ানিয়্যাহ্ কিন্তু প্রসিদ্ধ আছে তাদের ভাষা হলো হিব্রু। সুতরাং এক্ষেত্রে বলা যায়, হয়ত বর্ণনাকারী যায়দ প্রয়োজনের তাকীদে উভয় ভাষা শিক্ষা লাভ করেছিলেন। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৭১৫)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৬০-[৩৩] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যখন কোন মাজলিসে পৌঁছে, সে যেন সালাম করে। অতঃপর যদি বসার প্রয়োজন হয়, তবে বসে পড়বে। অতঃপর যখন প্রস্থানের উদ্দেশে দাঁড়াবে সালাম দেবে। কেননা প্রথমবারের সালাম দ্বিতীয়বারের সালামের চেয়ে উত্তম নয় (অর্থাৎ- উভয় সালামই মর্যাদার দিক দিয়ে সমান)। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ
أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِذَا انْتَهَى أَحَدُكُمْ إِلَى مَجْلِسٍ فَلْيُسَلِّمْ فَإِنْ بَدَا لَهُ أَنْ يَجْلِسَ فَلْيَجْلِسْ ثُمَّ إِذَا قَامَ فَلْيُسَلِّمْ فَلَيْسَتِ الْأُولَى بِأَحَقَّ مِنَ الْآخِرَةِ» رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ উপস্থিত হওয়ার সময়ে প্রথম সালাম যেন তার অনিষ্ট হতে নিরাপত্তার ঘোষণাস্বরূপ এবং বিদায়কালীন সালাম হলো অনুপস্থিত থেকে তার কোন ক্ষতি থেকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান করা। তিনি আরো বলেন, অনুপস্থিতির নিরাপত্তার চাইতে উপস্থিতির সময় যে সালাম দেয়া হয় তা অধিক উপযুক্ত নয়। বরং পরেরটি বেশি উপযুক্ত। ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীস প্রমাণ করে যে, প্রস্থানের সময় যখন কোন দলকে সালাম দিবে তখন তার সালামের জবাব দেয়া দলের ওপর ওয়াজিব।
কাযী হুসায়ন ও আবূ সা‘ঈদ মুতাওয়াল্লী (রহিমাহুমাল্লাহ) বলেনঃ প্রস্থানের সময়ে কোন মানুষের সালাম দেয়ার যে প্রথাটি চালু রয়েছে, সেটা হচ্ছে দু‘আ। এর জবাব দেয়া মুস্তাহাব, ওয়াজিব নয়। কারণ অভিবাদন সাক্ষাতের সময় হয়ে থাকে। প্রস্থানের সময় হয় না। তবে এ মতের বিরোধিতা করেন ইমাম শাশী। তিনি বলেন, সাক্ষাতের সময় যেমন সালাম দেয়া সুন্নাত, প্রস্থানের সময়েও সালাম দেয়া তেমনি সুন্নাত। সাক্ষাতের সময় যেমন সালামের জবাব দেয়া ওয়াজিব তেমনিভাবে প্রস্থানের সময় জবাব দেয়াও ওয়াজিব। এটাই হলো বিশুদ্ধ মত। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৭০৬)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৬১-[৩৪] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রাস্তার উপর বসা ভালো নয়। তবে হ্যাঁ, সে ব্যক্তির জন্য ভালো, যে রাস্তা দেখিয়ে দেয়, সালামের জবাব দেয়, চক্ষু অবনত রাখে এবং বোঝা বহনকারীকে সাহায্য করে। (শারহুস্ সুন্নাহ্, এ বিষয়ে আবূ জুরাই-এর বর্ণিত হাদীস সদাকার মাহাত্ম্য অধ্যায়ে বর্ণনা করা হয়েছে।)[1]
وَعَنْهُ أَنَّ
رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا خَيْرَ فِي جُلُوسٍ فِي الطُّرَقَاتِ إِلَّا لِمَنْ هَدَى السَّبِيلَ وَرَدَّ التَّحِيَّةَ وَغَضَّ الْبَصَرَ وَأَعَانَ عَلَى الْحُمُولَةِ» رَوَاهُ فِي «شَرْحِ السُّنَّةِ»
وَذَكَرَ حَدِيثَ أَبِي جُرَيٍّ فِي «بَاب فضل الصَّدَقَة»
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘ইয়াহ্ইয়া ইবনু ‘উবায়দুল্লাহ আল কুরাশী’’ নামের বর্ণনাকারী মাতরূকুল হাদীস। তাহযীবুল কামাল, রাবী নং ৪৮৪৪২।
ব্যাখ্যাঃ প্রথমত রাস্তায় বসা ঠিক নয়। যদি কোন প্রয়োজনে বসতে হয় তবে রাস্তার হক আদায় করতে হয়। যেমন- কাটা, বিষযুক্ত প্রাণী ইত্যাদি রাস্তা থেকে সরানো। রাস্তায় কোন গর্ত থাকলে তা পূর্ণ করা অথবা আশেপাশে কোন বাধা বিপত্তি থাকা যাতে কোন মুসলিম অন্ধকারে পড়ে যায় এমন কিছুকে দূরীভূত করা। অন্য হাদীসে রাস্তায় না বসতে অস্বীকার করলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণকে রাস্তার হক দিতে বললেন। তারা বলল, রাস্তার হক কী? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, সালামের জবাব দিবে, নিষিদ্ধ বস্তু ও মহিলাদের থেকে দৃষ্টি অবনমিত রাখবে, পিঠে, প্রাণীর উপরে অথবা মাথায় বা অনুরূপভাবে বোঝা বহনকারীকে বোঝার কিছু অংশ বহন করে অথবা পুরো বোঝাকে বহন করে সাহায্য করবে। এটা তার প্রতি সহানুভূতি বা অনুগ্রহ করার শামিল। ভালো কাজের আদেশ দেয়া ও মন্দ কাজ থেকে বাধা দেয়াও রাস্তার হক। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৬২-[৩৫] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন আল্লাহ তা’আলা আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করলেন এবং তাঁর মধ্যে প্রাণ দান করলেন, তখন আদম (আ.) হাঁচি দিলেন এবং আল্লাহ তা’আলার অনুমতিক্রমে তাঁর প্রশংসা করে ’’আলহামদুলিল্লা-হ’’ বললেন। আল্লাহ তা’আলা তাঁকে বললেনঃ হে আদম! আল্লাহ তোমাকে রহম করুন। এখন তুমি ঐ উপবেশনকারী মালায়িকাহ্’র (ফেরেশতাদের) কাছে যাও, যাঁরা বসে আছে। আর তাঁদেরকে বলো ’’আসসালা-মু ’আলায়কুম’’ (তোমাদের প্রতি আল্লাহ শান্তি বর্ষণ করুন)। তিনি গিয়ে বললেনঃ ’’আসসালা-মু ’আলায়কুম’’। মালায়িকাহ্ জবাবে বললেনঃ ’’আলায়কাস্ সালা-মু ওয়া রহমাতুল্ল-হ’’ (তোমার প্রতি আল্লাহর শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক)। অতঃপর তিনি তাঁর প্রতিপালকের নিকট ফিরে আসলেন। আল্লাহ তা’আলা বললেনঃ এটাই তোমার এবং তোমার সন্তানদের পারস্পরিক অভিবাদন। তখন আল্লাহ তা’আলা তাঁকে নিজের দু’হাত দেখিয়ে বললেনঃ তুমি এ দু’টির যে কোন একটি পছন্দ করো। তখন তাঁর উভয় হাত মুষ্টিবদ্ধ ছিল। আদম (আ.) বললেনঃ হে প্রভু! আমি তোমার ডান হাতকে পছন্দ করলাম। আল্লাহ তা’আলার উভয় হাতই ডান হাত এবং কল্যাণকর। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা তাঁর হাত খুলতেই দেখা গেল, তাতে আদম (আ.)-এর সন্তানগণ রয়েছে।
তখন আদম (আ.) বললেনঃ হে আমার প্রতিপালক! এরা কারা? আল্লাহ তা’আলা বললেনঃ এরা তোমার সন্তান। তখন দেখা গেল, প্রত্যেক ব্যক্তির আয়ুষ্কাল তাঁর দু’চোখের মাঝে অর্থাৎ- কপালে লিপিবদ্ধ আছে। তন্মধ্যে উজ্জ্বলতর এক ব্যক্তি রয়েছে। আদম (আ.) জিজ্ঞেস করলেনঃ হে প্রভু! এ ব্যক্তি কে? আল্লাহ তা’আলা বললেনঃ এ ব্যক্তি তোমার অন্যতম সন্তান ’’দাঊদ’’। তাঁর আয়ু আমি চল্লিশ বছর লিখেছি। আদম (আ.) বললেনঃ ’’হে প্রভু! তাঁর আয়ু বাড়িয়ে দিন’’। আল্লাহ তা’আলা বললেনঃ আমি তো তাঁর এতটুকু আয়ুষ্কাল লিখে রেখেছি। আদম (আ.) জিজ্ঞেস করলেনঃ হে রব্! আমি আমার আয়ু হতে ষাট বছর দান করলাম। আল্লাহ তা’আলা বললেনঃ ’’ঠিক আছে, তুমি আর তোমার সন্তান দাঊদ জানে’’ অর্থাৎ- এটা তোমার ব্যাপার। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ অতঃপর আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছানুযায়ী আদম (আ.) জান্নাতে বসবাস করেন। অতঃপর তাঁকে জান্নাত হতে বের করে দেয়া হলো। আদম (আ.) নিজের বয়সের বছরগুলো গণনা করতে লাগলেন, (যখন তাঁর আয়ুষ্কাল নয়শ’ চল্লিশ বছর শেষ হয়ে গেল) তখন তাঁর কাছে মৃত্যুর মালাক (ফেরেশতা) আসলেন। আদম (আ.) তাঁকে বললেনঃ তুমি তো আগে এসেছ, আমার জন্য এক হাজার বছর আয়ুষ্কাল লেখা রয়েছে। মৃত্যুর মালাক বললেন, জ্বি-হ্যাঁ, কিন্তু আপনি আপনার সন্তান দাঊদ (আ.)-কে ষাট বছর আয়ু দান করেছেন। তখন আদম (আ.) অস্বীকার করলেন। এ কারণে তাঁর সন্তানগণও অস্বীকার করে থাকেন এবং আদম (আ.) ভুলে গেছেন, তাই তাঁর সন্তানগণও ভুলে যায়। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সেদিন হতে লিখে রাখতে এবং সাক্ষী রাখতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। (তিরমিযী)[1]
عَنْ
أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَمَّا خَلَقَ اللَّهُ آدَمَ وَنَفَخَ فِيهِ الرُّوحَ عَطَسَ فَقَالَ: الْحَمْدُ لِلَّهِ فَحَمِدَ اللَّهَ بِإِذْنِهِ فَقَالَ لَهُ رَبُّهُ: يَرْحَمُكَ اللَّهُ يَا آدَمَ اذْهَبْ إِلَى أُولَئِكَ الْمَلَائِكَةِ إِلَى مَلَأٍ مِنْهُمْ جُلُوسٍ فَقُلِ: السَّلَامُ عَلَيْكُمْ. فَقَالَ: السَّلَامُ عَلَيْكُمْ. قَالُوا: عَلَيْكَ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ. ثُمَّ رَجَعَ إِلَى رَبِّهِ فَقَالَ: إِنَّ هَذِهِ تَحِيَّتُكَ وَتَحِيَّةُ بَنِيكَ بَيْنَهُمْ. فَقَالَ لَهُ اللَّهُ وَيَدَاهُ مَقْبُوضَتَانِ: اخْتَرْ أَيَّتَهُمَا شِئْتَ؟ فَقَالَ: اخْتَرْتُ يَمِينَ رَبِّي وَكِلْتَا يَدَيْ رَبِّي يَمِينٌ مُبَارَكَةٌ ثُمَّ بَسَطَهَا فَإِذَا فِيهَا آدَمُ وَذُرِّيَّتُهُ فَقَالَ: أَيْ رَبِّ مَا هَؤُلَاءِ؟ قَالَ: هَؤُلَاءِ ذُرِّيَّتُكَ فَإِذَا كُلُّ إِنْسَانٍ مَكْتُوبٌ عُمْرُهُ بَين عَيْنَيْهِ فَإِذا فيهم رجلٌ أضوؤهُم - أَوْ مِنْ أَضْوَئِهِمْ - قَالَ: يَا رَبِّ مَنْ هَذَا؟ قَالَ: هَذَا ابْنُكَ دَاوُدُ وَقَدْ كَتَبْتُ لَهُ عُمْرَهُ أَرْبَعِينَ سَنَةً. قَالَ: يَا رَبِّ زِدْ فِي عُمْرِهِ. قَالَ: ذَلِكَ الَّذِي كَتَبْتُ لَهُ. قَالَ: أَيْ رَبِّ فَإِنِّي قَدْ جَعَلْتُ لَهُ مِنْ عُمْرِي سِتِّينَ سَنَةً. قَالَ: أَنْتَ وَذَاكَ. قَالَ: ثُمَّ سَكَنَ الْجَنَّةَ مَا شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ أُهْبِطَ مِنْهَا وَكَانَ آدَمُ يَعُدُّ لِنَفْسِهِ فَأَتَاهُ مَلَكُ الْمَوْتِ فَقَالَ لَهُ آدَمُ: قَدْ عَجَّلْتَ قَدْ كَتَبَ لِي أَلْفَ سَنَةٍ. قَالَ: بَلَى وَلَكِنَّكَ جَعَلْتَ لِابْنِكَ دَاوُدَ سِتِّينَ سَنَةً فَجَحَدَ فَجَحَدَتْ ذُرِّيَّتُهُ وَنَسِيَ فَنَسِيَتْ ذُرِّيَّتُهُ قَالَ: «فَمن يؤمئذ أَمر بِالْكتاب وَالشُّهُود» رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ এ হাদীস থেকে প্রমাণ হয় যে, আল্লাহ তা‘আলার দু’টো হাত রয়েছে। আর এ দু’টি সিফাত হলো আল্লাহ তা‘আলার সত্তার সিফাত বা গুণাবলীর অন্যতম। আল্লাহর সিফাতকে অস্বীকারকারী জাহামিয়া ও মু‘আত্তিলাহ্ এবং মুশাব্বিহগণ বলেন, এ দু’টো অঙ্গ নয়। যারা বলে দুই হাতের অর্থ হলো কুদরত তাদের মত খন্ডন হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, ‘আলিমগণ এ মর্মে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, কুদরত একটি হয়। এর দ্বিবচন হওয়া সঠিক নয়। যাদের নিকটে আল্লাহর সিফাতের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়, তাদের নিকটে তার সিফাত বিদ্যমান থাকে। আর যারা তার সিফাতকে অস্বীকার করে তাদের নিকটে তার কুদরতও থাকে না। দুই হাত থেকে উদ্দেশ্য যে, কুদরত নয় এটার প্রমাণ আরেকটি ঘটনা থেকে পাওয়া যায়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা ইবলীসকে বললেন, আমি যাকে নিজ দুই হাত দ্বারা তৈরি করেছি তাকে সিজদা্ করতে তোমাকে কিসে বাধা দিল? এখান থেকে যেমন একটি বিষয়ের স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় যা সাজদাকে ওয়াজিব করে। আর তা হলো নিজ হাতে বানানো। অতএব যদি এখানে দুই হাত থেকে উদ্দেশ্য কুদরত হতো তাহলে শয়তান বলত যে, আমার ওপরে আদামের কিসের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে? আমি এবং সে (আদম) দু’জনই তো কুদরত দ্বারা তৈরি হয়েছি। (মিশকাতুল মাসাবীহ- বোম্বায় ছাপা, উর্দূ তরজমা, ৪র্থ খন্ড, ১৮ পৃষ্ঠা)
কারী (রহিমাহুমাল্লাহ) বলেনঃ সালাফদের আল্লাহর গুণাবলীর উপমা দানকে অস্বীকার করা ও তা মেনে নিয়ে পবিত্রতা সাব্যস্ত করা তাওহীদের জন্য অধিকতর নিরাপদ।
‘‘তুহফা’’ গ্রন্থকার বলেনঃ এটাই বিশুদ্ধতম পন্থা। এ হাদীস দ্বারা প্রমাণ হয় যে, সব মানুষের নূর থাকবে। তবে তাদের নূর হবে ভিন্ন ভিন্ন।
(وَقَدْ كَتَبْتُ لَهٗ عُمْرَهٗ) অর্থাৎ আমি তাকে আমার বয়স থেকে দিলাম। এর আসল অর্থ হলো বয়স বৃদ্ধির জন্য আল্লাহর নিকটে আবেদন করা। কারণ আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত এটা কেউ করতে পারে না। এ হাদীসে ষাট বছর প্রদানের কথা উল্লেখ থাকলেও অন্য বর্ণনায় চল্লিশ বছর দেয়ার কথা উল্লেখ হয়েছে। ভিন্ন এ হাদীসের সমাধানে কোন হাদীস বিশারদ বলেন যে, প্রথমে তিনি চল্লিশ বছর দিতে চেয়েছিলেন। পরে আরো বিশ বছর দিয়ে ষাট বছর হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আ.)-কে প্রথমে ত্রিশ দিনের ওয়া‘দা দিয়ে আবার চল্লিশ দিন পর্যন্ত বৃদ্ধি করেন। (সূরাহ্ আল আ‘রাফ ৭ : ১৪২)
অথবা এটা বর্ণনাকারীর পক্ষ থেকে সন্দেহ হয়ে গেছে। তাই তিনি একবার চল্লিশ বছর বলেছেন এবং অন্যবার ষাট বছর বলেছেন। অথবা কখনো চল্লিশ বছরকে আসল বয়স এবং ষাট বছরকে দান বলেছেন। অথবা কখনো ষাট বছরকে আসল বয়স এবং চল্লিশ বছরকে দান বলেছেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
এর উত্তরে আল্লাহর হ্যাঁ-সূচক জবাব দানের দু’টি অর্থ হতে পারে। এক. البراءة অর্থাৎ তার আবেদনকে খারিজ করে দেয়া। দুই. الاجابة অর্থাৎ তার আবেদনকে গ্রহণ করা। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৮ম খন্ড, হাঃ ৩৩৬৮)
পরিচ্ছেদঃ ১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৬৩-[৩৬] আসমা বিনতু ইয়াযীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মহিলাদের এক সমাবেশের নিকট দিয়ে অতিক্রম করলেন এবং আমাদেরকে সালাম করলেন। (আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ ও দারিমী)[1]
وَعَن أسماءَ
بنت يزيدَ قَالَتْ: مَرَّ عَلَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي نِسْوَةٍ فَسَلَّمَ عَلَيْنَا. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَابْن مَاجَه والدارمي
ব্যাখ্যাঃ হুসায়মী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ দূরে থাকায় ফিতনামুক্তি, অতএব যে নিজের ওপরে নিরাপত্তার আস্থা রাখবে সে সালাম দিবে। অন্যথায় চুপ থাকায় নিরাপদ। ইবনু বাত্ত্বল বলেনঃ যখন ফিতনাহ্ থেকে নিরাপদ থাকবে তখন পুরুষকে মহিলাদের এবং মহিলাদেরকে পুরুষদের সালাম দেয়া জায়িয।
মালিকীরা এর পথকে বন্ধ করার জন্য যুবতী ও বৃদ্ধাদের মাঝে পার্থক্য করেছেন।
কুফীরা বলেনঃ মহিলাদের জন্য পুরুষদের সালাম দেয়া নিষেধ। কারণ তারা আযান, ইকামাত ও উচ্চৈঃস্বরে কুরআন তিলাওয়াত করতে নিষিদ্ধ। তবে মাহরামগণ-মাহরামদেরকে সালাম দিতে পারবে। যেমনটি ফাতহুল বারীতে উল্লেখ হয়েছে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫১৯৫)
পরিচ্ছেদঃ ১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৬৪-[৩৭] তুফায়ল ইবনু উবাই ইবনু কা’ব (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি (তুফায়ল) ইবনু ’উমার (রাঃ)-এর কাছে যাতায়াত করতেন এবং তাঁর সাথে সকাল বেলা বাজারে যেতেন। তিনি বললেনঃ যখন আমরা সকাল বেলা বাজারে যেতাম, তখন ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ)-এর নিয়ম ছিল, তিনি যখনই কোন সাধারণ দোকানদার, বিক্রেতা, মিসকীন এবং অন্য কোন মানুষের নিকট দিয়ে গমন করতেন, তখন তাদেরকে সালাম করতেন। বর্ণনাকারী তুফায়ল বলেন, আমার পূর্বের নিয়ম অনুযায়ী একদিন আমি ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ)-এর নিকট গেলাম, তখন তিনি আমাকে সাথে করে বাজারের দিকে যেতে শুরু করলেন। আমি তাঁকে বললামঃ আপনি কেনা-বেচার জন্য কোথাও দাঁড়ান না, কোন জিনিসের দাম জিজ্ঞেস করেন না, কোন সওদা করেন না, আর বাজারের কোন মাজলিসেও বসেন না। সুতরাং আপনি আমার সাথে এখানে বসুন, আমরা হাদীস আলোচনা করি। তিনি (তুফায়ল) বলেন, ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) আমাকে বললেনঃ হে প্রকাণ্ড পেটওয়ালা! [তুফায়লের পেট তুলনামূলক কিছুটা বড় ছিল] আমরা সকালবেলা শুধু সালাম করতে যাই। আমরা যাকেই সাক্ষাতে পাই, তাকেই সালাম করি। (মালিক ও বায়হাক্বী শু’আবুল ঈমানে)[1]
وَعَن الطفيلِ
بن أُبي بن كعبٍ: أَنَّهُ كَانَ يَأْتِي ابْنَ عُمَرَ فَيَغْدُو مَعَهُ إِلَى السُّوقِ. قَالَ فَإِذَا غَدَوْنَا إِلَى السُّوقِ لَمْ يَمُرَّ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ عَلَى سَقَّاطٍ وَلَا عَلَى صَاحِبِ بَيْعَةٍ وَلَا مِسْكِينٍ وَلَا أَحَدٍ إِلَّا سَلَّمَ عَلَيْهِ. قَالَ الطُّفَيْلُ: فَجِئْتُ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عُمَرَ يَوْمًا فَاسْتَتْبَعَنِي إِلَى السُّوقِ فَقُلْتُ لَهُ: وَمَا تَصْنَعُ فِي السُّوقِ وَأَنْتَ لَا تَقِفُ عَلَى الْبَيْعِ وَلَا تَسْأَلُ عَن السّلع وتسوم بِهَا وَلَا تَجْلِسُ فِي مَجَالِسِ السُّوقِ فَاجْلِسْ بِنَا هَهُنَا نتحدث. قَالَ: فَقَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ: يَا أَبَا بَطْنٍ - قَالَ وَكَانَ الطُّفَيْلُ ذَا بَطْنٍ - إِنَّمَا نَغْدُو مِنْ أَجْلِ السَّلَامِ نُسَلِّمُ عَلَى مَنْ لَقِينَاهُ. رَوَاهُ مَالك وَالْبَيْهَقِيّ فِي «شعب الْإِيمَان»
ব্যাখ্যাঃ (لَا تَجْلِسْ فِي مَجَالِسِ السُّوقِ) অর্থাৎ আপনি পবিত্র থাকার জন্য এবং বাজারে আগত ব্যক্তিদেরকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য বাজারে বসেন না।
(فَاجْلِسْ بِنَا هَهُنَا نَتَحَدَّثُ) এর মর্মার্থ হলো আমরা তোমার নিকট থেকে হাদীস শুনব। অথবা আমাদের কেউ কারো সাথে দীনী আলোচনা করবে বা দুনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে কথা বলবে।
(نُسَلِّمُ عَلٰى مَنْ لَقِينَاهُ) সাক্ষাত হয়ে থাকে দুই পক্ষের মাধ্যমে, এখানে সালাম হলো ‘আম, অর্থাৎ সালাম দেয়া ও জবাব দেয়া। কারণ উভয় পক্ষের জন্য পূর্ণ সাওয়াব রয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৬৫-[৩৮] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করেন : (হে আল্লাহর রসূল!) আমার বাগানে অমুক ব্যক্তির একটি খেজুর গাছ আছে। তার এ খেজুর গাছ আমাকে কষ্ট দেয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ ব্যক্তিকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেনঃ তুমি তোমার খেজুর গাছটি আমার কাছে বিক্রয় করো। লোকটি বলল : না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তবে আমাকে দান করো। লোকটি বলল : না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আবারো বললেনঃ জান্নাতের একটি খেজুর গাছের বিনিময়ে ওটা আমার নিকট বিক্রয় করো। লোকটি এবারও বলল : না। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমি তোমার তুলনায় অধিক কৃপণ আর কাউকে দেখিনি। কিন্তু হ্যাঁ, যে ব্যক্তি সালাম করতে কৃপণতা করে। (আহমাদ ও বায়হাক্বী’র ’’শু’আবুল ঈমানে’’)[1]
وَعَن جَابر
قَالَ: أَتَى رَجُلٌ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: لِفُلَانٍ فِي حَائِطِي عَذْقٌ وَأَنَّهُ آذَانِي مَكَانُ عَذْقِهِ فَأَرْسَلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَنْ بِعْنِي عَذْقَكَ» قَالَ: لَا. قَالَ: «فَهَبْ لِي» . قَالَ: لَا. قَالَ: «فَبِعْنِيهِ بِعَذْقٍ فِي الْجَنَّةِ» ؟ فَقَالَ: لَا فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا رَأَيْتُ الَّذِي هُوَ أَبْخَلُ مِنْكَ إِلَّا الَّذِي يَبْخَلُ بِالسَّلَامِ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ»
ব্যাখ্যাঃ (أَنَّه آذَانِىْ) অর্থাৎ- সে সময়ে অসময়ে আসে, এর কারণে আমাদের কষ্ট দেয়। فَهَبْ لِي অর্থাৎ যদি তুমি আমার নিকট বিক্রি করতে লজ্জাবোধ কর, তাহলে এভাবে দান করে দাও যাতে আমি বাগানওয়ালাকে দান করে দেই।
(مَا رَأَيْتُ الَّذِىْ هُوَ أَبْخَلُ مِنْكَ) এর অর্থ হলো যে ব্যক্তি সালামের জবাব দেয় না সে তোমার চাইতে অধিক কৃপণ। কারণ সে অল্প কাজের দ্বারা অধিক সাওয়াব অর্জন করে না। বিদ্বানগণ বলেন, এখানে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকটিকে সুপারিশ হিসেবে আবেদন করেছেন, নির্দেশ হিসেবে নয়। এ ছাড়া সে কিভাবে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশকে উপেক্ষা করল? ঐ ব্যক্তি মুসলিম ছিল বলে বুঝা যায়। এর প্রমাণ এই যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি জান্নাতী গাছের বিনিময়ে গাছটি দিয়ে দাও। অবশ্য লোকটি খুব শক্ত মনের ছিল। (মিশকাতুল মাসাবীহ- বোম্বায় ছাপা, উর্দূ অনুবাদ ও ব্যাখ্যা ৪র্থ খন্ড, ২০ পৃষ্ঠা)
পরিচ্ছেদঃ ১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সালাম
৪৬৬৬-[৩৯] ’আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ প্রথমে সালাম প্রদানকারী অহংকার হতে মুক্ত। [ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) হাদীসটি ’’শু’আবুল ঈমানে’’ বর্ণনা করেছেন।][1]
وَعَن عَبْدِ
اللَّهِ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الْبَادِئُ بِالسَّلَامِ بَرِيءٌ مِنَ الْكِبْرِ» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي «شعب الْإِيمَان»
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘আবূ ইসহাক’’ নামক বর্ণনাকারীর নাম ‘‘আস্ সাবীয়ী’’, যিনি একজন মুদাল্লিস রাবী। এখানে তিনি ‘‘আন’’ দ্বারা হাদীস বর্ণনা করেছেন। বিস্তারিত দেখুন- য‘ঈফাহ্ ১৭৫১।
ব্যাখ্যাঃ (بَرِيءٌ مِنَ الْكِبْرِ) সালাম প্রদানকারী ব্যক্তি অহংকারমূলক কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত ও পবিত্র। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - অনুমতি প্রার্থনা
৪৬৬৭-[১] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমাদের কাছে আবূ মূসা আল আশ্’আরী(রাঃ) এসে বললেনঃ ’উমার(রাঃ) আমার কাছে জনৈক ব্যক্তিকে পাঠিয়ে আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি যথারীতি তাঁর দরজায় উপস্থিত হলাম এবং তিনবার সালাম দিলাম; কিন্তু আমার সালামের উত্তর দেয়া হলো না বিধায় আমি ফিরে গেলাম। অতঃপর (অন্যত্র) ’উমার(রাঃ) আমাকে বললেনঃ আমাদের কাছে আসতে তোমাকে কিসে বারণ করল? আমি বললাম, আমি এসেছিলাম এবং আপনার দরজায় তিনবার সালাম করেছিলাম, কিন্তু আপনাদের কেউই আমার সালামের জবাব দেননি। তখন আমি ফিরে গেলাম। কেননা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছেনঃ যখন তোমাদের কেউ তিনবার অনুমতি প্রার্থনা করে, আর অনুমতি না মেলে, তবে সে যেন ফিরে আসে। ’উমার(রাঃ) এটা শুনে বললেনঃ এ ব্যাপারে তোমাকে অবশ্যই প্রমাণ পেশ করতে হবে। আবূ সা’ঈদ আল খুদরী(রাঃ) বলেনঃ তখন আমি আবূ মূসা আল আশ্’আরী-এর সাথে ’উমার (রাঃ)-এর নিকট গেলাম এবং সাক্ষ্য দিলাম। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْإِسْتِئْذَانِ
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: أَتَانَا أَبُو مُوسَى قَالَ: إِنَّ عُمَرَ أَرْسَلَ إِلَيَّ أَنْ آتِيَهُ فَأَتَيْتُ بَابَهُ فَسَلَّمْتُ ثَلَاثًا فَلَمْ يَرُدَّ عَلَيَّ فَرَجَعْتُ. فَقَالَ: مَا مَنَعَكَ أَنْ تَأْتِيَنَا؟ فَقُلْتُ: إِنِّي أَتَيْتُ فَسَلَّمْتُ عَلَى بَابِكَ ثَلَاثًا فَلم تردَّ عليَّ فَرَجَعْتُ وَقَدْ قَالَ لِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا اسْتَأْذَنَ أَحَدُكُمْ ثَلَاثًا فَلَمْ يُؤْذَنْ لَهُ فَلْيَرْجِعْ» . فَقَالَ عُمَرُ: أَقِمْ عَلَيْهِ الْبَيِّنَةَ. قَالَ أَبُو سَعِيدٍ: فَقُمْتُ مَعَهُ فذهبتُ إِلى عمرَ فشهِدتُ
ব্যাখ্যাঃ ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমায়ে উম্মাতের দলীলের আলোকে বিদ্বানগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, অনুমতি নেয়া শারী‘আতসিদ্ধ। সুন্নাত হলো সালাম দেয়া। অনুমতি চাইবে তিনবার। অতএব সালাম ও অনুমতি। উভয়টি করার কুরআনে স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে।
সালাম আগে দিবে না অনুমতি আগে চাইবে- এ নিয়ে ‘আলিমগণ মতভেদ করেছেন। তবে হাদীসে যা রয়েছে সেটা সঠিক। যার দরুন বিদ পন্ডিতগণ বলেছেন, আগে সালাম দিবে। তারপর অনুমতি চাইবে। যেমন সে বলবে, ‘‘আস্সালা-মু ‘আলায়কুম’’ আমি কি প্রবেশ করতে পারি? কারণ প্রথমে সালাম দেয়ার ব্যাপারে দু’টি সহীহ হাদীস রয়েছে।
২য় মতে আগে অনুমতি চাইবে। অতঃপর সালাম দিবে।
৩য় মতে, মাওয়ারদী বলেনঃ যদি অনুমতি প্রার্থনাকারীর চোখ প্রবেশ করার পূর্বে বাড়ীর লোকের ওপর পড়ে যায় সেক্ষেত্রে আগে সালাম দিবে। নতুবা আগে অনুমতি চাইবে। তিনবারের বেশি অনুমতি চাওয়া যাবে কিনা? এ নিয়ে কয়েকটি মত পাওয়া যায়। এক মতে, তিনবারের অধিক অনুমতি চাওয়া যাবে না। এরপরে ফিরে আসতে হবে। যেমনটি হাদীসের দাবী। আরেক মতে, যদি সে মনে করে যে, অনুমতিদাতা শুনছে কিন্তু অনুমতি দেয় না তখন সে প্রয়োজনে এর সংখ্যা বাড়াতে পারে। (শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২১৩৫)
তিনবার সালাম দেয়া বা অনুমতি চাওয়ার তত্ত্ব সম্পর্কে ইবনু আবী শায়বাহ্, ‘আলী ইবনু আবূ ত্বালিব থেকে বর্ণনা করে বলেন, প্রথমটি হচ্ছে জানানোর জন্য এবং দ্বিতীয়টি হলো চিন্তা করার জন্য আর ৩য়টি হলো সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য। হয় সে অনুমতি দিবে অথবা প্রত্যাখ্যান করবে। (ফাতহুল বারী ১১শ খন্ড, হাঃ ৬২৪৫)
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ যারা দাবী করে যে, খবরে ওয়াহিদ দ্বারা দলীল গ্রহণ করা যায় না তারা এ হাদীসকে প্রমাণ হিসেবে পেশ করে এবং দাবী করে যে, ‘উমার আবূ মূসার হাদীসকে খবরে ওয়াহিদ হওয়ার কারণে গ্রহণ করেননি। এটা বাতিল মত। অথচ যারা এ হাদীসকে দলীলের উপযুক্ত মনে করে এবং তার প্রতি ‘আমল করে তারা ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। আর এর দলীল স্বয়ং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, খুলাফায়ে রাশিদীন, সমস্ত সাহাবী ও পরবর্তী অসংখ্য ব্যক্তিদের নিকট থেকে পাওয়া যায়। ‘উমার আবূ মূসাকে প্রমাণ পেশ করতে বললেন এটা তার কথাকে রদ করার জন্য নয়। বরং ‘উমার বিদ্‘আতী, মিথ্যুক ও মুনাফিকদের মতো লোকেদের রসূলের ব্যাপারে এমন কথা যা তিনি বলেননি এবং কারো স্বার্থে রসূলের নামে মিথ্যা হাদীস বানানোর অপচেষ্টাকে শংকাবোধ করেছেন। এহেন শংকাবোধের রাস্তাকে বন্ধ করার জন্য আবূ মূসা ব্যতীত অন্যদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন। কারণ ‘উমার আবূ মূসা (রাঃ)-এর ব্যাপারে এরূপ ধারণার ঊর্ধ্বে রয়েছেন যে, তিনি রসূলের নামে এমন কথা বলবেন যা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেননি আসলে তিনি এভাবে অন্যদেরকে এ থেকে নিষেধ করেছেন। কারণ যখন অন্যরা আবূ মূসার এ ব্যাপারটি দেখবে অথবা জানতে পারবে তখন যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে এবং হাদীস বানিয়ে বলে তারা আবূ মূসার মতো ভয় করবে। ফলে তারা হাদীস তৈরি করা এবং নিশ্চিত বিশ্বাস ছাড়াই হাদীসের প্রতি ঝুকে পড়া থেকে বিরত থাকবে।
এখান থেকে এ কথাও বুঝা যায় যে, খবরে ওয়াহিদ হওয়ার কারণে ‘উমার (রাঃ) আবূ মূসাকে প্রত্যাখ্যান করেননি। আসলে তিনি এ হাদীসের উপর ‘আমল করার জন্য অন্য ব্যক্তির সমর্থন কামনা করেছেন। আর এটা স্বতঃসিদ্ধ যে, দু’জনের খবরকেও খবরে ওয়াহিদ ধরা হয় যতক্ষণ পর্যন্ত মুতাওয়াতিরের পর্যায়ে না পৌঁছে। আবূ মূসা -এর ব্যাপারে উমার -এর যে দুর্বল ধারণা ছিল না- এ ব্যাপারে একাধিক দলীল রয়েছে। যেমন ইমাম মুসলিম আবূ মূসা (রাঃ)-এর বিষয়ে বর্ণনা করেন। উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ) বলেন, হে ইবনুল খত্ত্বাব! আপনি রসূলের কোন সাহাবীকে শাস্তি দিবেন না। তখন ‘উমার বললেন, সুব্হা-নাল্ল-হ! আমি কিছু শুনেছি যেটার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়াকে ভালো মনে করেছি। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৬৯০)
মুওয়াত্ত্বায় রয়েছে, ‘উমার আবূ মূসা -কে বললেন, মনে রেখ হে আবূ মূসা! আমি তোমাকে অভিযুক্ত করছি না। বরং আমি শংকা করছি যে, মানুষ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামে বানোয়াট কথা বলবে। (ফাতহুল বারী ১১শ খন্ড, হাঃ ৬২৪৫)
আবূ মূসা (রাঃ)-এর নিকট থেকে ‘উমার -এর প্রমাণ চাওয়া সম্পর্কে বুখারীর ভাষ্যকার ইমাম কিরমানী বলেনঃ এতে বেখেয়াল বা ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় ‘উমার (রাঃ) তার নিকট থেকে নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন। খবরে ওয়াহিদ হওয়ার কারণে গ্রহণ করেননি, এটা ঠিক নয়। এর দলীল এই যে, ‘উমার (রাঃ) শুধু হাম্বাল ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে ভ্রূণ হত্যার জরিমানা দাসমুক্ত করা সংক্রান্ত খবরে ওয়াহিদকে গ্রহণ করেছেন। এরূপ আরো প্রমাণ আছে যে, ‘উমার খবরে ওয়াহিদকে গ্রহণ করেছেন, যেমন- ‘আবদুর রহমান ইবনু ‘আওফ (রাঃ)-এর নিকট থেকে জিয্ইয়াহ্ সংক্রান্ত খবরে ওয়াহিদও গ্রহণ করেছেন। কিরমানী আরো বলেনঃ এ হাদীসে এটাও স্পষ্ট বুঝা গেল যে, জ্ঞানী ব্যক্তির নিকটে এমন কোন জ্ঞান অজানা থেকে যায় যা তার চাইতে কম জ্ঞানী লোকের নিকট জানা থাকে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫১৭১)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - অনুমতি প্রার্থনা
৪৬৬৮-[২] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেনঃ তোমাকে অনুমতি দেয়া হলো, তুমি আমার দরজার পর্দা উঠিয়ে চলে আসবে এবং আমার গোপন কথাবার্তা শুনতে থাকবে, যে পর্যন্ত না আমি তোমাকে নিষেধ করি। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْإِسْتِئْذَانِ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ لِي النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذْنُكَ عَلَيَّ أَنْ تَرْفَعَ الْحِجَابَ وَأَنْ تَسْمَعَ سِوَادِي حَتَّى أَنهَاك»
ব্যাখ্যাঃ এ হাদীসে প্রবেশের সময় অনুমতির জন্য কোন সংকেত ব্যবহার করার প্রমাণ রয়েছে। অতএব যখন আমীর বিচারক বা অনুরূপ ব্যক্তিবর্গ সাধারণ মানুষের জন্য কিংবা বিশেষ কোন ব্যক্তি বা দলের জন্য প্রবেশের লক্ষ্যে অনুমতি হিসেবে দরজা থেকে পর্দা উঠানো বা অনুরূপ অন্য কোন আলামাত বা সংকেতকে নির্ধারণ করে তখন অনুমতি না নিয়েই সংকেত দেখে প্রবেশ করা জায়িয। তদ্রূপ যখন কোন ব্যক্তি তার কোন চাকর, আমলা, বড় সন্তান-সন্ততি বা অন্যান্য সদস্যদের জন্য দরজায় পর্দা ঝুলানো বা অনুরূপ কোন সংকেত নির্ধারণ করে তখন অনুমতি না নিয়ে প্রবেশ করা নিষেধ। আবার যখন পর্দা উঠিয়ে নিবে তখন প্রবেশ করা সিদ্ধ হবে। (শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২১৬৯)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - অনুমতি প্রার্থনা
৪৬৬৯-[৩] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার পিতার গৃহীত ঋণের লেনদেনের ব্যাপারে একদিন আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলাম এবং দরজায় করাঘাত করলাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেনঃ কে? আমি বললামঃ আমি। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আমি, আমি (তথা পরিচয় কি?)। সম্ভবতঃ তিনি এরূপ বলাকে অপছন্দ করেছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْإِسْتِئْذَانِ
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: أَتَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي دَيْنٍ كَانَ عَلَى أَبِي فَدَقَقْتُ الْبَابَ فَقَالَ: «مَنْ ذَا؟» فَقُلْتُ: أَنَا. فَقَالَ: «أَنَا أَنا» . كَأَنَّهُ كرهها
ব্যাখ্যাঃ মুহাল্লাব (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ انا ‘আমি’ এখানে অপছন্দ হওয়ার কারণ হলো, এতে স্পষ্ট পরিচয় ফুটে উঠে না। তবে যদি অনুমতিদাতা অনুমতি প্রার্থীকে চিনতে পারে এবং অন্য কারো সাথে তালগোল পাকিয়ে না যায় তাহলে ভিন্ন কথা। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংশয় সৃষ্টি হয়েই থাকে।
মাওয়ারদী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এটা অপছন্দ করার কারণ হলো, সে প্রশ্নের দাবী অনুযায়ী জবাব দেয়নি। কারণ যখন সে দরজায় নক করল তখন তো বুঝা গেল যে, এখানে একজন করাঘাতকারী আছে। অতঃপর যখন সে ‘‘আমি’’ বলে জানান দিতে চাইল যে দরজায় নককারী এখানে, এতে কিন্তু দরজায় আওয়াজ করাতে যতটুকু জানা গিয়েছিল তার চাইতে বেশি কিছু জানতে পারা যায়নি। সঙ্গত কারণে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপছন্দ করেছেন।
খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ انا আমি কথাটি উপযুক্ত জবাব নয় এবং যে উদ্দেশে এটার ব্যবহার হয়েছে তা অর্জন হয়নি। এভাবে বলা উপযুক্ত জবাব ছিল যে, انا جابر ‘‘আমি জাবির’’। যাতে প্রত্যাশিত দাবী অনুযায়ী স্পষ্ট পরিচয় প্রকাশ পেত। যেমন ইমাম বুখারী ‘‘আদাবুল মুফরাদ’’ বুরয়দাহ্-এর হাদীসে বর্ণনা করেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে এসেছেন আর আবূ মূসা (রাঃ) (কুরআন) পড়ছিলেন, তখন আমি আসলাম। অতঃপর তিনি বললেন, এটা কে? আমি বললাম যে, আমি বুরয়দাহ্। অনুরূপ উম্মু হানী একদিন রসূলের দরবারে এসে বললেন, আমি উম্মু হানী। ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ যখন কেউ তার উপনাম ছাড়া পরিচয় বলতে পারে না তখন এভাবে স্বীয় নাম বলা অপছন্দের কিছু নয়। অতএব যখন কারো ‘‘আমি শায়খ অমুক’’ ‘‘আমি অমুক কারী’’ বা ‘‘আমি কাযী অমুক’’ বলা ছাড়া পার্থক্য করতে না পারে তখন এরূপ বলাতে কোন দোষ নেই।
ইবনু জাওযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ انا ‘আমি’ বলা অপছন্দ হওয়ার কারণ হলো ‘আমি’ বলাতে গর্বের গন্ধ পাওয়া যায়। যেন ‘আমি’ বলা ব্যক্তি বুঝাতে চাচ্ছে যে, আমি এমন ব্যক্তি যার নাম ও বংশ উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। এর বিপরীত মত পোষণ করেন মুগলাত্বয় (مغلطاي)। তিনি বলেন, এ ধরনের মন্তব্য জাবির-এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। যদি জাবির এরূপই হতেন তাহলে তিনি এটা ছেড়ে দেয়ার জন্য শিক্ষা না দিয়ে এতে অভ্যস্ত থাকতেন।
ইবনুল ‘আরাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ জাবির হাদীসে দরজায় করাঘাত করার প্রমাণ রয়েছে। আদাবুল মুফরাদে রয়েছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরজায় নখ দ্বারা আঘাত করা হতো। তবে এটা বলা যায় যে, নখ দ্বারা দরজায় আঘাত করা হলো উন্নত আদব। দরজার নিকটে থাকা ব্যক্তির ক্ষেত্রে এরূপ নখ দ্বারা করাঘাত করা ভালো। আর যদি সে দরজা থেকে এমন দূরে অবস্থান করে যে, নখ দ্বারা আওয়াজ দিলে তার কাছে আওয়াজ পৌঁছে না তখন প্রয়োজনমত অন্য কিছু দ্বারা আঘাত করা মুস্তাহাব। সুহায়লী বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরজায় কড়া না থাকায় সাহাবীগণ নখ দ্বারা আঘাত করতেন। তারা এভাবে করাঘাত করতেন তার সম্মান, মর্যাদা ও আদবের প্রেক্ষিতে। (ফাতহুল বারী ১১শ খন্ড, হাঃ ২৬৫০)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - অনুমতি প্রার্থনা
৪৬৭০-[৪] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে তাঁর ঘরে প্রবেশ করলাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ঘরে এক পেয়ালা দুধ পেলেন। তখন আমাকে বললেনঃ হে আবূ হুরায়রা! আহলে সুফফার নিকটে যাও এবং আমার কাছে তাঁদেরকে ডেকে আনো। আমি তখন তাঁদের নিকট এসে তাঁদেরকে ডাকলাম। তাঁরা তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে এলেন এবং অনুমতি প্রার্থনা করলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদেরকে অনুমতি দিলেন, অতঃপর তাঁরা প্রবেশ করলেন। (বুখারী)[1]
بَابُ الْإِسْتِئْذَانِ
وَعَن أبي هريرةَ قَالَ: دَخَلْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَوَجَدَ لَبَنًا فِي قَدَحٍ. فَقَالَ: «أَبَا هِرٍّ الْحَقْ بِأَهْلِ الصُّفَّةِ فَادْعُهُمْ إِلَيَّ» فَأَتَيْتُهُمْ فَدَعَوْتُهُمْ فَأَقْبَلُوا فَاسْتَأْذَنُوا فَأَذِنَ لَهُمْ فَدَخَلُوا
ব্যাখ্যাঃ এখান থেকে বুঝা গেল, যাকে খাওয়ার জন্য আহবান করা হয় তার জন্য সেই ডাক অনুমতির জন্য যথেষ্ট নয়। বরং নতুনভাবে অনুমতি চাইবে। তবে এটা আরেকটি হাদীসের বিপরীত। যেমন অপর হাদীসে রয়েছে رَسُولُ الرَّجُلِ إِلَى الرَّجُلِ إِذْنُهٗ। আরেক রিওয়ায়াতে আছে, إِذَا دُعِيَ الرَّجُلُ فَهُوَ إِذْنُهٗ অর্থাৎ কোন ব্যক্তিকে দূত মারফত ডাকা হলে সেটা তার জন্য অনুমতি। সে কারণ এর দ্বারা নিশ্চিত হুকুম সাব্যস্ত হয় না। এ দুই বিপরীতমুখী হাদীসের সমাধানে মুহাদ্দিসগণ ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। যেমন মুহাল্লাব বলেনঃ যদি ডাকা এবং আসার মধ্যে সময় দীর্ঘ হয়ে যায় সেক্ষেত্রে নতুনভাবে অনুমতির দরকার। অনুরূপভাবে যদি কারো নিকটে স্বাভাবিকভাবে অনুমতির প্রয়োজনের মতো হয় তবে তখন আবার অনুমতি নিতে হবে। এছাড়া পুনরায় অনুমতির দরকার নেই।
ইবনু তীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হয়তো প্রথম হাদীসটি এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যার নিকটে অনুমতি নেয়ার মতো কেউ নেই। আর ২য়টি এর বিপরীত। তিনি আরো বলেন, সর্বদা অনুমতি নেয়াই সর্বোচ্চ সাবধানতা অবলম্বন। এ দু’ হাদীসের সমন্বয়ে ইমাম ত্বহাবী বলেনঃ যদি আহুত ব্যক্তির সাথে দূত থাকে তার অনুমতি নিতে হবে না। শুধু সাক্ষাতের সালাম যথেষ্ট হবে। আর যদি দূত বিলম্ব করে অর্থাৎ সাথে না থাকে তাহলে অনুমতির প্রয়োজন আছে। কারণ আলোচ্য হাদীসে فَأَقْبَلُوا فَاسْتَأْذَنُوا শব্দ ব্যবহার করা তো প্রমাণ হয় যে, আবূ হুরায়রা তাদের সাথে ছিলেন না। অন্যথায় তিনি অবশ্যই فَأَقْبَلْنَا এভাবে বলতেন। বিধায় তারা পুনরায় অনুমতি চেয়েছেন। (ফাতহুল বারী ১১শ খন্ড, হাঃ ৬২৪৬)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - অনুমতি প্রার্থনা
৪৬৭১-[৫] কালাদাহ্ ইবনু হাম্বাল (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সফ্ওয়ান ইবনু উমাইয়াহ্ (রাঃ) আমার মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে দুধ অথবা হরিণের একটি বাচ্চা এবং একটি শসা পাঠালেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার উঁচু উপত্যকায় অবস্থান করছিলেন। কালাদাহ্ বলেন, আমি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এমনিতেই ঢুকে পড়লাম, সালাম প্রদান করলাম না এবং অনুমতিও নিলাম না। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেনঃ তুমি ফিরে যাও (প্রবেশের জন্য অনুমতি প্রার্থনা করো)। অতঃপর বলো : ’’আসসালা-মু ’আলায়কুম’’, আমি কি ভিতরে আসতে পারি? (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
عَنْ كَلَدَةَ بْنِ حَنْبَلٍ: أَنَّ صَفْوَانَ بْنَ أُميةَ بعث بِلَبن أَو جدابة وَضَغَابِيسَ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالنَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِأَعْلَى الْوَادِي قَالَ: فَدَخَلْتُ عَلَيْهِ وَلَمْ أُسَلِّمْ وَلَمْ أَسْتَأْذِنْ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ارْجِعْ فَقُلِ: السَّلَامُ عَلَيْكُمْ أَأَدْخُلُ . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ এতে স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয় যে, সালামের সাথে অনুমতি প্রার্থনা যোগ করা এবং প্রথমে সালাম দেয়া সুন্নাত। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫১৬৮)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - অনুমতি প্রার্থনা
৪৬৭২-[৬] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের মধ্যে যদি কাউকে ডাকা হয়, আর সে ব্যক্তি সংবাদ বাহকের সাথে চলে আসে, তবে তার সাথে আসাই তার জন্য অনুমতি। (আবূ দাঊদ)[1]
আবূ দাঊদ-এর অপর বর্ণনায় আছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন লোকের কাছে লোক পাঠানোই তার অনুমতি।
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِذَا دُعِيَ أَحَدُكُمْ فجاءَ مَعَ الرسولِ فَإِن ذَلِك إِذْنٌ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ. وَفِي رِوَايَةٍ لَهُ قَالَ: «رَسُول الرجل إِلَى الرجل إِذْنه»
ব্যাখ্যাঃ ফাতহুল ওয়াদূদে বলা হয়েছে, যখন দূতের সাথে আসবে তখন অনুমতি চাওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে হ্যাঁ যদি সাবধানতাবশতঃ অনুমতি চায় তাহলে সেটা উত্তম। বিশেষ করে যখন বাড়ি শুধু পুরুষদের না হয়। সঙ্গত কারণে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহলে সুফফাদেরকে আবূ হুরায়রা (রাঃ)-কে দিয়ে ডাকতে পাঠালেন। তারা এসে অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করলেন। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫১৮০)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - অনুমতি প্রার্থনা
৪৬৭৩-[৭] ’আবদুল্লাহ ইবনু বুসর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোন বাড়িতে যেতেন, তখন ঘরের দরজার দিকে মুখ করে দাঁড়াতেন না; বরং দরজার ডানদিকে বা বামদিকে দাঁড়াতেন এবং অনুমতি গ্রহণের উদ্দেশে ’’আসসালা-মু ’আলায়কুম’’, ’’আসসালা-মু ’আলায়কুম’’ বলতেন। আর এটা সে সময়ের কথা যখন দরজার সামনে পর্দা ঝুলানো থাকত না। (আবূ দাঊদ)[1]
আর নিমন্ত্রণ অধ্যায়ে আনাস(রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসে আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ’’আসসালা-মু ’আলায়কুম ওয়া রহমাতুল্ল-হ’’।
وَعَن عبد الله بن بُسرٍ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا أَتَى بَابَ قَوْمٍ لَمْ يَسْتَقْبِلِ الْبَاب تِلْقَاءِ وَجْهِهِ وَلَكِنْ مِنْ رُكْنِهِ الْأَيْمَنِ أَوِ الْأَيْسَرِ فَيَقُولُ: «السَّلَامُ عَلَيْكُمْ السَّلَامُ عَلَيْكُمْ» وَذَلِكَ أَنَّ الدُّورَ لَمْ يَكُنْ يَوْمَئِذٍ عَلَيْهَا سُتُورٌ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
وَذَكَرَ حَدِيثَ أَنَسٍ قَالَ: «السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ» فِي «بَابِ الضِّيَافَةِ»
ব্যাখ্যাঃ বাড়িতে দৃষ্টি পড়ে যাওয়ার কারণে দরজা বরাবর সামনে দাঁড়ানো নিষিদ্ধ। তাই দরজার ডান বা বাম পাশে সরে দাঁড়াতে হবে। তিনি দু’বার সালাম দিয়েছেন বাড়িওয়ালাকে শুনানোর জন্য এবং অনুমতি নিশ্চিত করার জন্য। তিনি সালাম ডাবল দেয়ার দ্বারা অধিক সংখ্যক উদ্দেশ্য নিয়েছেন। দুই বারে সীমাবদ্ধ করেননি। কারণ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোন গুরুত্বপূর্ণ কথা তিনবার বলার অভ্যাস ছিল। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫১৭৭)
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - অনুমতি প্রার্থনা
৪৬৭৪-[৮] ’আত্বা ইবনু ইয়াসার (রহঃ) হতে বর্ণিত। একদিন জনৈক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করল, আমি নিজের মায়ের কাছে যেতে কি অনুমতি চাইব? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ হ্যাঁ। লোকটি জিজ্ঞেস করল, আমি এবং আমার মা একসাথে একই ঘরে বসবাস করি। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যখন তাঁর কাছে যাবে, তখন অনুমতি নিয়ে যাবে। তখন লোকটি বলল, আমি মায়ের পরিচর্যাকারী (খিদমাতে থাকি)। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ অনুমতি নিয়ে তাঁর কাছে যাবে। তুমি কি তোমার মাকে উলঙ্গ অবস্থায় দেখতে পছন্দ করো? লোকটি বলল : না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ অতএব অনুমতি নিয়ে তাঁর কাছে যাও। [ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ) হাদীসটি মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন।)[1]
عَنْ عَطَاءٍ أَنَّ رَجُلًا سَأَلَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: أَسْتَأْذِنُ عَلَى أُمِّي؟ فَقَالَ: «نَعَمْ» فَقَالَ الرَّجُلُ: إِنِّي مَعَهَا فِي الْبَيْتِ. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اسْتَأْذِنْ عَلَيْهَا» فَقَالَ الرَّجُلُ: إِنِّي خَادِمُهَا. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اسْتَأْذِنْ عَلَيْهَا أَتُحِبُّ أَنْ تَرَاهَا عُرْيَانَةً؟» قَالَ: لَا. قَالَ: «فَاسْتَأْذِنْ عَلَيْهَا» . رَوَاهُ مَالِكٌ مُرسلاً
ব্যাখ্যাঃ কাযী আবূ মুহাম্মাদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ অনুমতি নেয়া ওয়াজিব। তিনবার অনুমতি না নেয়া পর্যন্ত প্রবেশ নিষেধ। এর দলীল সূরাহ্ আন্ নূর-এর ২৭ নং আয়াত। ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ তিনবার অনুমতি নেয়ার হুকুম সাব্যস্ত হয় আল্লাহর বাণী حَتّٰى تَسْتَأْنِسُوا ‘‘তোমরা অনুমতি ব্যতীত (প্রবেশ করো না)’’ শব্দ থেকে।
শায়খ আবুল কাসিম (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ তিনের বেশি অনুমতি চাওয়া উচিত নয়। তবে এতেও যদি শুনতে পেয়েছে বলে বুঝা না যায় তখন তিনবারের বেশি অনুমতি নিতে কোন দোষ নেই।
পুরুষেরা তার মায়ের নিকটে, মাহরাম ও যাদের লজ্জাস্থানের উপর নযর দেয়া দৃষ্টি সর্বদা হারাম তাদের নিকটে অনুমতি চাইতে হবে। সে কারণে মায়ের নিকট অনুমতি চাওয়া সম্পর্কে প্রশ্নকারী ব্যক্তি নিজেকে মায়ের খাদেম বললেও তাকে মায়ের নিকটে অনুমতি নিতে বলেই ক্ষান্ত হননি। বরং তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, তুমি কি তোমার মাকে উলঙ্গ অবস্থায় দেখতে চাও? কারণ সে যখন বিনা অনুমতিতে হঠাৎ এসে পড়বে তখন সে তার মাকে উলঙ্গ অবস্থায় দেখতে পারে, যা তার জন্য হালাল নয়। কিন্তু হ্যাঁ, স্ত্রীর নিকটে এবং দাসী যাদের লজ্জাস্থানের উপর নযর দেয়া হালাল তাদের নিকটে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করতে পারবে। (মুওয়াত্ত্বা ৯ম খন্ড, হাঃ ১৭৩৯)
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - অনুমতি প্রার্থনা
৪৬৭৫-[৯] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার জন্য রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট রাত ও দিনের বেলা সর্বদাই যাওয়ার অনুমতি ছিল। আমি তাঁর নিকট রাতের বেলা গমন করলে তিনি আমাকে অনুমতি দেয়ার জন্য গলা খেকড় দিতেন। (নাসায়ী)[1]
وَعَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: كَانَ لِي مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَدْخَلٌ بِاللَّيْلِ وَمَدْخَلٌ بِالنَّهَارِ فَكُنْتُ إِذَا دخلتُ بِاللَّيْلِ تنحنح لي. رَوَاهُ النَّسَائِيّ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘মুগীরাহ্’’ নামের বর্ণনাকারী বিশ্বস্ত কিন্তু মুদাল্লিস এবং সে ‘‘আন’’ দ্বারা হাদীসটি বর্ণনা করেছে।
ব্যাখ্যাঃ অপর বর্ণনায় রয়েছে, আমি যখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে আসতাম, তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সালাত আদায় করতেন। আর এমতাবস্থায় তিনি গলা খেকড় দিতেন। এখান থেকে বুঝা যায়, প্রয়োজনে সালাতের মধ্যে গলা খেকড় দেয়া যায়। যারা বলেন যে, গলা খেকড় দিলে সালাত নষ্ট হয়ে যায় তারা এ হাদীস সম্পর্কে বেখবর। (মিশকাতুল মাসাবীহ- বোম্বায় ছাপা, ৪র্থ খন্ড, ২৪ পৃষ্ঠা)
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - অনুমতি প্রার্থনা
৪৬৭৬-[১০] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি প্রথমে সালাম না করবে, তাকে তোমরা অনুমতি দেবে না। [ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) হাদীসটি শু’আবুল ঈমানে বর্ণনা করেন।][1]
وَعَنْ
جَابِرٌ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا تَأْذَنُوا لِمَنْ لَمْ يَبْدَأْ بالسلامِ» رَوَاهُ الْبَيْهَقِيّ فِي «شعب الْإِيمَان»
ব্যাখ্যাঃ এ হাদীস থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, অনুমতি নেয়ার পূর্বে সালাম দেয়া আবশ্যক। এ অধ্যায় থেকে এটাও জানা গেল যে কারো বাড়িতে অনুমতি ব্যতীত প্রবেশ করা নিষেধ এবং এটা জরুরী বিষয়। এ রীতি মত, আদর্শ, জ্ঞানী ও সভ্য মু’মিনের। কিন্তু জাহিল, মূর্খ ও অসভ্য লোকেরা অন্য ডাক দিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করে এবং অপমান লাঞ্ছনা-গঞ্ছনার স্বীকার হয়। যারা বাড়িতে সবসময় যাওয়া আসা করে তাদেরও তিন সময়ে অনুমতি নেয়া উচিত। একবার ফজরের সালাতের পূর্বে, একবার দুপুরের পরে যখন মানুষেরা বিশ্রাম নিবে। আর একবার ‘ইশা সালাতের পরে যেমন কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। এ বিধান এজন্য যে, মানুষ কখনো নিজের স্থানে ব্বিস্ত্র হয়ে থাকতে পারে অথবা স্ত্রী কিংবা দাসীদের সাথে যৌন কর্মে লিপ্ত থাকতে পারে। (মিশকাতুল মাসাবীহ- বোম্বায় ছাপা, ৪র্থ খন্ড, ২৫ পৃষ্ঠা)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - করমর্দন ও আলিঙ্গন
৪৬৭৭-[১] কতাদাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আনাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীদের মধ্যে কি করমর্দনের রীতি প্রচলিত ছিল? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। (বুখারী)[1]
بَابُ الْمُصَافَحَةِ وَالْمُعَانَقَةِ
عَن قتادةَ قَالَ: قُلْتُ لِأَنَسٍ: أَكَانَتِ الْمُصَافَحَةُ فِي أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ قَالَ: نعم. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ মুসাফাহ্ বলা হয়, بِهَا الْإِفْضَاءُ بِصَفْحَةِ الْيَدِ إِلَى صَفْحَةِ الْيَدِ হাতের তালুর সাথে হাতের তালু মিলানো। এ সংজ্ঞা প্রথম ব্যক্ত করেছেন ইয়ামানবাসীরা।
ইমাম সুয়ূত্বী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর সংক্ষিপ্ত নিহায়াহ্ গ্রন্থে বলেন, التصفح বলা হয়, تصفيق কে। আর তা হলো হাতের তালুর সাথে হাতের তালু মারা। এ থেকে مصافحة এর উৎপত্তি। তিনি মুসাফাহার সংজ্ঞায় বলেন, هِيَ إِلْصَاقِ صفحة صَفْحِ الْكَفِّ بِالْكَفِّ এটি মুফাতালাহ্ বাবের শব্দ, অর্থাৎ হাতের তালুর সাথে হাতের তালু মিলানো। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ সাক্ষাতের সময় মুসাফাহ্ করা মুস্তাহাব। তবে ‘আসরের পর এবং ফজরের পর মানুষের যে মুসাফাহ্ প্রচলন আছে শারী‘আতে এমন কোন নিয়ম-নীতি নেই। তবে এভাবে মুসাফাহ্ দোষ নেই। কারণ মুসাফাহার মূল হলো সুন্নাত। তবে কোন সময় বেশি মুসাফাহ্ করা বা সব সময়ে অধিক মুসাফাহ্ করা শারী‘আহ্ বহির্ভূত কাজ নয়।
হাফিয ইবনু হাজার ‘আসকালানী (রহিমাহুল্লাহ) ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ)-এর বিপরীত মত পোষণ করেন। তিনি বলেনঃ কোন বিদ্বান ব্যক্তির জন্য কোন সময়কে নির্দিষ্ট করাকে মাকরূহ বলেছেন। আবার কেউ বলেন, এমন দলীল শারী‘আতে নেই। ‘আল্লামা কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ সে কারণে আমাদের কোন ‘আলিম এ ধরনের ‘আমলকে মাকরূহ এবং নিন্দনীয় বিদ্‘আত বলেন।
তুহফাতুল আহ্ওয়াযী গ্রন্থকার হাফিয ও কারীর মতকে সমর্থন করেন। ‘আবদুস্ সালাম তাঁর القواعد গ্রন্থে বলেন, মুসাফাহার জন্য কোন সময়কে নির্দিষ্ট করা মুবাহ-বিদ্‘আত। অনুরূপভাবে কারী ‘আল্লামা বাশীরুদ্দীন কান্নুজী দুই ঈদের পরে মুসাফাহ্ ও মু‘আনাকা করাকে بدعة مذمومة বা নিন্দনীয় বিদ্‘আত বলেছেন। তবে ‘আল্লামা শাওকানী (রহিমাহুল্লাহ) বিদ্‘আতের ভাগকরণকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করেছেন। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৭২৯)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - করমর্দন ও আলিঙ্গন
৪৬৭৮-[২] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (নিজ দৌহিত্র) হাসান ইবনু ’আলী (রাঃ)-কে চুম্বন করলেন, তখন তাঁর কাছে আকরা’ ইবনু হাবিস (রাঃ) উপস্থিত ছিলেন। আকরা’ (রাঃ) বললেনঃ আমার দশ দশটি সন্তান আছে, আমি তাদের কাউকে চুম্বন করিনি। এতদশ্রবণে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দিকে তাকালেন। অতঃপর বললেনঃ ’’যে ব্যক্তি অনুগ্রহ করে না, তার ওপর অনুগ্রহ করা হয় না’’। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
গ্রন্থকার বলেনঃ আবূ হুরায়রা বর্ণিত أَثَمَّ لُكَعُ বাক্য বিশিষ্ট হাদীসটি ইনশা-আল্লাহ مَنَاقِبِ أَهْلِ بَيْتِ النَّبِىِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ অধ্যায়ে অতি সত্বর উল্লেখ করব এবং উক্ত বিষয়বস্তুর উপর উম্মু হানী (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীসটি اَلْأَمَانُ অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
بَابُ الْمُصَافَحَةِ وَالْمُعَانَقَةِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَبْلَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْحَسَنَ بْنَ عَلِيٍّ وَعِنْدَهُ الْأَقْرَعُ بْنُ حَابِسٍ. فَقَالَ الْأَقْرَعُ: إِنَّ لِي عَشَرَةً مِنَ الْوَلَدِ مَا قَبَّلْتُ مِنْهُمْ أَحَدًا فَنَظَرَ إِلَيْهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثُمَّ قَالَ: «مَنْ لَا يَرْحَمْ لَا يُرْحَمْ» مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
وَسَنَذْكُرُ حَدِيثَ أَبِي هُرَيْرَةَ: «أَثَمَّ لُكَعُ» فِي «بَابِ مَنَاقِبِ أَهْلِ بَيْتِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَعَلَيْهِمْ أَجْمَعِينَ» إِنْ شَاءَ تَعَالَى
وَذَكَرَ حَدِيثَ أمِّ هَانِئ فِي «بَاب الْأمان»
ব্যাখ্যাঃ (مَا قَبَّلْتُ مِنْهُمْ أَحَدًا) হয়ত বা তিনি নিজেকে বড় মনে করে অথবা তুচ্ছতাহেতু কাউকে চুম্বন করতেন না। আকরা‘ (রাঃ)-এর কথার প্রেক্ষিতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীতে যা বুঝা যায় তা হলো সন্তান, স্ত্রী মাহরাম বা অন্যান্য ব্যক্তিকে চুম্বন দেয়া যায়। তবে হ্যাঁ যেন এটা দয়া স্নেহবশতঃ হয়। কিন্তু উত্তেজনা এবং উপভোগবশতঃ না হয়। অনুরূপ বিধান আলিঙ্গন বা কোলাকুলি ও ঘ্রাণ নেয়ার ক্ষেত্রে। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৯৯৭)
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) কোন ব্যক্তির তার ছোট সন্তানকে চুম্বন করাকে ওয়াজিব বলেছেন। অনুরূপভাবে অন্যদেরকে স্নেহ, দয়া ও আত্মীয়তার মুহাববাত স্বরূপ চুম্বন করা সুন্নাত। কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ চুম্বন ওয়াজিব হওয়ার জন্য স্পষ্ট হাদীসের স্মরণাপন্ন হতে হবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - করমর্দন ও আলিঙ্গন
৪৬৭৯-[৩] বারা’ ইবনু ’আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন দু’জন মুসলিম একত্র হয়, অতঃপর পরস্পর করমর্দন করে, তখন তারা পৃথক হওয়ার পূর্বেই তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া হয়। (আহমাদ, তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ)[1]
আবূ দাঊদ-এর বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যখন দু’জন মুসলিম মিলিত হয়ে পরস্পর করমর্দন করে, আল্লাহ তা’আলার প্রশংসা করে এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, তখন তাদের উভয়কেই ক্ষমা করে দেয়া হয়।
عَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا مِنْ مُسْلِمَيْنِ يَلْتَقِيَانِ فَيَتَصَافَحَانِ إِلَّا غُفِرَ لَهُمَا قَبْلَ أَنْ يَتَفَرَّقَا» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ
وَفِي رِوَايَةِ أَبِي دَاوُدَ قَالَ: «إِذَا الْتَقَى الْمُسْلِمَانِ فَتَصَافَحَا وَحَمِدَا اللَّهَ وَاسْتَغْفَرَاهُ غفر لَهما»
ব্যাখ্যাঃ (قَبْلَ أَنْ يَتَفَرَّقَا) অর্থাৎ মুসাফাহার পর স্বশরীরে পৃথক হওয়ার পূর্বে গুনাহ ক্ষমা হয়ে যায়। অপর বর্ণনায় রয়েছে, তাদের গুনাহ গাছের পাতার ন্যায় ঝরে যায়।
উল্লেখ্য এক হাতে মুসাফাহ্ করা সুন্নাত। অর্থাৎ সাক্ষাতের সময় হোক বা কেনা-বেচার সময় হোক দুই জনের দুই হাত দ্বারা মুসাফাহ্ করা সুন্নাত। হানাফী, শাফি‘ঈ ও হাম্বালী ‘আলিমগণ এ ব্যাখ্যা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন। ফকীহ শায়খ মুহাম্মাদ আমীন ওরফে ইবনু আবিদীন স্বীয় رد المختار على الله المختار নামক গ্রন্থে বলেনঃ উত্তম হলো ডান হাতে মুসাফাহ্ করা। কারণ ভালো কাজে ডান পক্ষই অবলম্বন করা শ্রেয়। সে কারণ ‘‘বাহরুল আমীন’’ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, হাজরে আসওয়াদ হলো আল্লাহর ডান পক্ষ। এর দ্বারা আল্লাহ তার বান্দার সাথে মুসাফাহ্ করেন। আর মুসাফাহ্ ডানই হয়। শায়খ জিয়াউদ্দীন হানাফী নকশবন্দী তাঁর শারাহ لوامع العقول নামক গ্রন্থে বলেন, শারী‘আতে সুন্নাত পালনের আদাব হলো, উভয় পক্ষের ডান হাতকে নিযুক্ত করা। সুতরাং সেটা বাম হাতের দ্বারা বাম হাতের অথবা ডান হাতে বাম হাতে সমাধা করলে হবে না। ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) ডান হাতে মুসাফাহ্ করাকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলেছেন।
শায়খুল আলম রববানী সায়্যিদ ‘আবদুল কাদির জিলানী তাঁর ‘‘গুনিয়াতুত্ তালিবীন’’ গ্রন্থে বলেনঃ যে সব কাজ ডান হাত দ্বারা করতে হয় এবং যা বাম হাত দ্বারা সম্পাদিত করতে হয় তা পৃথক। ডান হাত দ্বারা কতক কাজ করা মুস্তাহাব। যেমন- খাওয়া, পান করা, মুসাফাহ্ করা এবং উযূ করা, জুতা ও কাপড় ডান দিক থেকে শুরু করা। সাক্ষাতের সময় বা বায়‘আতের সময় হোক মুসাফাহ্ উভয়ের ডান হাত দ্বারা করা সুন্নাত।
১ম দলীল : ইমাম আহমাদ (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর মুসনাদে বর্ণনা করেন, হাসসান ইবনু নূহ বলেনঃ আমি ‘আবদুল্লাহ ইবনু বুসরকে বলতে দেখেছি, তিনি বলেন, তোমরা আমার এ হাতকে দেখছ, আর আমিও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি আমার হাতের তালুকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতের তালুর উপর রেখেছি- (সানাদ সহীহ)। অন্য বর্ণনায় আছে, তোমরা আমার এ হাতকে দেখছ যে, আমি এর দ্বারা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে মুসাফাহ্ করেছি- (সানাদ মুত্তাসিল)।
আর উমামাহ্-এর হাদীসে রয়েছে, تَمَامُ التَّحِيَّةِ الْأَخْذُ بِالْيَدِ وَالْمُصَافَحَةُ بِالْيُمْنٰى ডান হাতে মুসাফাহ্ করার মাধ্যমে সালাম পরিপূর্ণতা লাভ করে।
২য় দলীল : ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহ মুসলিমে ‘আমর ইবনুল ‘আস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললাম, আপনি ডান হাত বাড়িয়ে দিন, আমি আপনার নিকটে বায়‘আত করব।
মুসনাদে আহমাদে সহীহ সনদে বর্ণিত। আবূ গাদিয়া বলেনঃ আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটে বায়‘আত করেছি। আবূ সা‘ঈদ বলেনঃ আমি তাকে বললাম, ডান হাত দ্বারা? উত্তরে তিনি বললেন, হ্যাঁ। মুসনাদে আহমাদে আনাস ইবনু মালিক-এর হাদীসে রয়েছে, আনাস বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটে সাধ্যমত শুনার ও পালন করার জন্য আমার এ হাত অর্থাৎ ডান হাত দিয়ে বায়‘আত করেছি।
তুহফাতুল আহ্ওয়াযী গ্রন্থকার বলেনঃ যদি তুমি বল ‘আমর ইবনুল ‘আস, আবূ গাদিয়া, আনাস ইবনু মালিক ও জারীর-এর হাদীস থেকে প্রমাণ হলো, বায়‘আতের সময় ডান হাত দ্বারা মুসাফাহ্ করা সুন্নাত, সাক্ষাতের সময় নয়। তবে এর উত্তরে আমি বলব, এসব হাদীস দ্বারা যেমন বায়‘আতের সময় ডান হাত দ্বারা মুসাফাহ্ সুন্নাত প্রমাণ হয় তেমনিভাবে সাক্ষাতের সময় ডান হাতে মুসাফাহ্ সুন্নাতও প্রমাণ হয়। কারণ বায়‘আতের মুসাফাহ্ ও সাক্ষাতের মুসাফাহ্ বাস্তবে এক ও অভিন্ন। এ দুয়ের মাঝে বাস্তবিক পার্থক্যের কোন দলীল নেই।
৩য় দলীল : মুসাফাহ্ হলো, هِيَ إِلْصَاقُ صَفْحِ الْكَفِّ بِصَفْحِ الْكَفِّ অর্থাৎ হাতের তালুর সাথে হাতের তালু মিলানো। অতএব মাসনূন মুসাফাহ্ হয়, উভয় পক্ষের এক হাতের দ্বারা হবে অথবা উভয়ের দুই হাত দ্বারা হবে। উভয় অবস্থা ধরে নেয়া যাক, এবার প্রথম অবস্থা তো হাদীসে স্পষ্ট। আর দ্বিতীয় অবস্থাতে ডান হাতের তালুর সাথে ডান হাতের তালু মিলানো এবং বাম হাতের তালুর সাথে বাম হাতের তালু মিলানো। অথচ আমাদেরকে শারী‘আত একটি মুসাফাহ্ করার নির্দেশ দিয়েছে দুই মুসাফাহ্ করার জন্য নয়। আর যদি উভয়ের ডান হাতের তালুর সাথে ডান হাতের তালু মিলানো এবং বাম হাতের তালুর সাথে ডান হাতের পিঠ মিলানো হয়, তাহলে ডান হাতের তালুর সাথে ডান হাতের তালু মিলানোকে মুসাফাহ্ বলা গেল। কিন্তু বাম হাতের তালুর সাথে ডান হাতের পিঠ মিলানোর কোন অর্থই হয় না। কারণ এ অবস্থাটি মুসাফাহার বাস্তবতার বাহিরে।
এক্ষণে ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাস্‘ঊদ-এর হাদীস, عَلَّمَنِى النَّبِىُّ وَكَفِّىْ بَيْنَ كَفَّيْهِ التَّشَهُّدَ كَمَا يُعَلِّمُنِى السُّورَةَ مِنَ الْقُرْآنِ - (বুখারী ও মুসলিম)। এখানে এটা মুসাফাহার সাথে কোন সম্পর্ক নেই। বরং এটা শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে অধিক গুরুত্ব ও মনোনিবেশ করার জন্য হাত ধরেছেন। যেমন এ ব্যাপারে ‘আল্লামা ফাযিল লাক্ষনবী তাঁর এক ফাতাওয়ার হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন,
لَيْسَ ظَاهِرٌ أَنَّ است كه مُصَافَحَةٌ مُتَوَارَثَةٌ كه بِوَقْتِ تَلَاقِي مَسْنُونٍ است نبوده بدكه طريقه تعليميه بوده كه أكابر بِوَقْتِ اهتمام تعليم جيزي ازهردودست يايكدست دست اصاغر كرفته تعليم ميسازند
যার মর্মার্থ হলো, সহীহুল বুখারীতে ইবনু মাস্‘ঊদ-এর যে হাদীসটা রয়েছে তা সাক্ষাতের সময়ে মাসনূন মুসাফাহ্ সম্পর্কে নয়। বরং এটা শিক্ষা দানের সময়ে গুরুত্ব দেয়ার জন্য হাত ধরা সম্পর্কে। যেমন বড়রা ছোটদের শিক্ষা দানের সময়ে করে থাকে। তারা ছোটদের এক অথবা দুই হাত ধরেন। আবার হানাফী ফকীহ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন যে, আল্লাহর নবীর দুই হাতের মাঝে ইবনু মাস্‘ঊদ-এর হাত ছিল তাশাহ্হুদ শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব ও মনোযোগ আকর্ষণের জন্য। শিক্ষাদানের সময় হাত ধরা সম্পর্কে অনেক হাদীস রয়েছে। যেমন মুসনাদে আহমাদে আছে, আবূ কতাদাহ্ ও আবূ দাহ্মাহ্ বলেনঃ আমরা এক বেদুঈন লোকের নিকটে আসলাম। বেদুঈন লোকটি বলল, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাত ধরে এমন কিছু শিক্ষা দিলেন যা আল্লাহ তাকে শিক্ষা দিয়েছেন।
তিরমিযীতে রয়েছে, শিকল ইবনু হামীদ (রাঃ) বলেনঃ আমি রসূলের খেদমতে এসে বললাম, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমাকে আশ্রয় প্রার্থনার উপায় অর্থাৎ تعوذ শিক্ষা দিন, যাতে আমি আশ্রয় চাইতে পারি। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাতের তালু ধরলেন এবং বললেন, তুমি বল اللّٰهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ سَمْعِي... الْحَدِيثَ ‘‘হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই শুনার অনিষ্ট হতে...’’হাদীস। তিরমিযীর অপর বর্ণনায় রয়েছে, আবূ হুরায়রা বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ কে এমন আছ, যে এ বাক্যগুলো শিখবে এবং ‘আমল করবে? আমি বললাম, আমি, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! অতঃপর তিনি আমার হাত ধরলেন। তারপর পাঁচটি গুণে দিলেন এবং বললেন, اتَّقِ الْمَحَارِمَ تَكُنْ أَعْبَدَ النَّاسِ তুমি হারাম থেকে বেঁচে থাক তাহলে তুমি সর্বোত্তম বান্দায় পরিণত হবে। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৭২৭)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - করমর্দন ও আলিঙ্গন
৪৬৮০-[৪] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল : হে আল্লাহর রসূল! আমাদের মধ্য হতে কেউ যদি তাঁর কোন মুসলিম ভাইয়ের কিংবা কোন বন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করে, তবে কি সে (তাঁর সম্মানার্থে) মাথা নত করবে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ না। লোকটি বলল : তবে কি সে আলিঙ্গন করবে এবং তাকে চুম্বন করবে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ না। লোকটি আবার জিজ্ঞেস করল, তাহলে কি তার হাত ধরবে এবং পরস্পর করমর্দন করবে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ হ্যাঁ। (তিরমিযী)[1]
وَعَن أنس قَالَ: قَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللَّهِ الرَّجُلُ مِنَّا يَلْقَى أَخَاهُ أَوْ صَدِيقَهُ أَيَنْحَنِي لَهُ؟ قَالَ: «لَا» . قَالَ: أَفَيَلْتَزِمُهُ وَيُقَبِّلُهُ؟ قَالَ: «لَا» . قَالَ: أَفَيَأْخُذُ بِيَدِهِ وَيُصَافِحُهُ؟ قَالَ: «نَعَمْ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ (قَالَ: أَفَيَأْخُذُ بِيَدِه وَيُصَافِحُهٗ؟) হলো عطف تفسير অথবা যেটা নির্দিষ্টতা বা অধিক পূর্ণাঙ্গ।
‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ দ্বিতীয়টি নির্দিষ্ট কারণ হাত ধরা ও মুসাফাহ্ করাকে ‘আরবী কায়দার ভাষায় عام خاص مطلق বলে। অর্থাৎ ব্যাপকভাবে বলার পর নির্দিষ্টভাবে বলা। অর্থাৎ হাত ধরা বলতে মুসাফাহ্ করা। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৭২৮)
এ হাদীস থেকে বুঝা গেল, আলিঙ্গন করা অনুরূপ সালাম দেয়ার সময় নত হওয়া মাকরূহ এবং সুন্নাত পরিপন্থী। কিন্তু সফর থেকে আগমনের সময় কোলাকুলি করা সুন্নাত। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়দ ইবনু হারিসাহ্ এবং জা‘ফার ইবনু আবূ ত্বালিব যখন হাবাশাহ্ থেকে ফিরে আসলেন তখন তাদের সাথে আলিঙ্গন করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, সফর ছাড়াও কোলাকুলি করা যায়। যদি ফিতনার আশংকা না থাকে এবং দু’টি কাপড় পরিধান করে থাকে। কিন্তু যদি শুধু লুঙ্গি পরে থাকে তাহলে কোলাকুলি করা মাকরূহ স্ত্রী ব্যতীত। (মিশকাতুল মাসাবীহ- বোম্বায় ছাপা, ৪র্থ খন্ড, ২৬-২৭ পৃষ্ঠা)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - করমর্দন ও আলিঙ্গন
৪৬৮১-[৫] আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রোগগ্রস্ত ব্যক্তিকে দেখাশুনা পূর্ণতা হয় যখন তোমাদের কেউ রোগীর কপালে বা হাতে নিজের হাত রাখে এবং তার কুশল সংবাদ জিজ্ঞেস করে। তোমাদের সালামের পরিপূর্ণতা হলো, সালামের পর পরস্পর করমর্দন করা। [আহমাদ ও তিরমিযী; আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) হাদীসটিকে দুর্বল বলেছেন।][1]
وَعَنْ أَبِي أُمَامَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم قَالَ: تَمَامُ عِيَادَةِ الْمَرِيضِ أَنْ يَضَعَ أَحَدُكُمْ يَدَهُ عَلَى جَبْهَتِهِ أَوْ عَلَى يَدِهِ فَيَسْأَلَهُ: كَيْفَ هُوَ؟ وَتَمَامُ تَحِيَّاتِكُمْ بَيْنَكُمُ الْمُصَافَحَةُ . رَوَاهُ أَحْمد وَالتِّرْمِذِيّ وَضَعفه
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘আলী ইবনু ইয়াযীদ’’ একজন য‘ঈফ রাবী। দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ১২৮৮।
ব্যাখ্যাঃ ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ দুইয়ের অতিরিক্ত নেই। যদি বেশি করা হয় তবে তা কষ্টকর হবে। আসলে তিনি এর দ্বারা মধ্যমপন্থার কথা বলেছেন। এর অর্থ এ নয় যে, এর চাইতে কম বেশি করা যাবে না।
কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এর অতিরিক্ত হলে কঠিন হয়। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো নিম্নমানের পূর্ণতা। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৭৩২)
অন্য হাদীসে রয়েছে, যখন তোমরা রোগীকে দেখতে যাবে তখন তাকে বেঁচে থাকায় খুশি রাখ। অর্থাৎ এরূপ বল যে, এখনো তুমি অনেক দিন বেঁচে থাকবে, রোগ খুব কঠিন নয় ভালো হয়ে যাবে ইনশা-আল্লাহ। এরূপ বলাতে তাকদীর পরিবর্তন হয় না কিন্তু রোগীর এমন খুশি হয়। রোগীর এ খুশি থাকলে সুস্থ হয়ে যাওয়ার আশা করা যায়। (মিশকাতুল মাসাবীহ- বোম্বায় ছাপা, ৪র্থ খন্ড, ২৭ পৃষ্ঠা)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - করমর্দন ও আলিঙ্গন
৪৬৮২-[৬] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যায়দ ইবনু হারিসাহ্ মদীনায় আগমন করলেন। এ সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে ছিলেন। যায়দ ইবনু হারিসাহ্(রাঃ) এসে ঘরের দরজায় আওয়াজ করলেন, তখনই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খালি গায়ে চাদর টানতে টানতে তাঁর কাছে গেলেন। (’আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেনঃ) আল্লাহর কসম! আমি তাঁকে এর পূর্বে বা পরে কখনো খালি গায়ে দেখিনি। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাথে আলিঙ্গন করলেন এবং তাঁকে চুম্বন করলেন। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: قَدِمَ زَيْدُ بْنُ حَارِثَةَ الْمَدِينَةَ وَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي بَيْتِي فَأَتَاهُ فَقَرَعَ البابَ فقامَ إِلَيْهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عُرْيَانًا يَجُرُّ ثَوْبَهُ وَاللَّهِ مَا رَأَيْتُهُ عُرْيَانًا قَبْلَهُ وَلَا بَعْدَهُ فَاعْتَنَقَهُ وَقَبَّلَهُ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘মুহাম্মাদ ইবনু ইসপদকব’’ নামের বর্ণনাকারী একজন প্রসিদ্ধ মুদাল্লিস রাবী। যে ‘‘আন’’ দ্বারা হাদীস বর্ণনা করেছেন। দেখুন- রিয়াযুস্ সলিহীন হাঃ ৮৯৬।
ব্যাখ্যাঃ মিরক্বাতুল মাফাতীহে বলা হয়েছে, এর দ্বারা ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) এ কথা বুঝাতে চেয়েছেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাভী থেকে চাদর পড়ে যাওয়ায় নাভীর উপরের দিক অনাবৃত ছিল। যদি প্রশ্ন করা হয় কিভাবে ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) কসম খেয়ে বললেন যে, আমি এর পূর্বে ও পরে কখনো বিবস্ত্র দেখিনি? অথচ তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দীর্ঘদিন তার সাথে এক চাদরে মিলিত হয়েছেন এবং সাহচর্যে থেকেছেন তবে এর উত্তরে বলা যায় যে, হয়ত বা তিনি এর দ্বারা উদ্দেশ্য নিয়েছেন যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আর কোন লোকের সাথে এভাবে অনাবৃত হয়ে মুখোমুখি হননি এবং কোলাকুলি করেননি। আসলে তিনি অবস্থার চাহিদা মোতাবেক কথাকে সংক্ষেপ করেছেন। হাদীসে সফর থেকে আগমনকারী ব্যক্তির সাথে কোলাকুলি করা সঠিকভাবে প্রমাণিত। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৭৩২)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - করমর্দন ও আলিঙ্গন
৪৬৮৩-[৭] আইয়ূব ইবনু বুশায়র (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি ’আনাযাহ্ গোত্রের এক ব্যক্তি হতে বর্ণনা করেন আমি একদিন আবূ যার গিফারী (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা যখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে, তখন কি তিনি তোমাদের সাথে করমর্দন করতেন? আবূ যার বললেনঃ আমি যখনই তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেছি, তখনই তিনি আমার সাথে করমর্দন করেছেন। একদিন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে ডেকে পাঠালেন, তখন আমি বাড়িতে ছিলাম না। যখনই বাড়িতে এলাম, আমাকে সংবাদ দেয়া হলো। আমি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে উপস্থিত হলাম, তখন তিনি একটি খাটের উপর বসা ছিলেন। তিনি আমার সাথে আলিঙ্গন করলেন। আর এ আলিঙ্গন ছিল অতি উত্তম, অতি উত্তম। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَيُّوبَ بْنِ بُشَيْرٍ عَنْ رَجُلٍ مِنْ عَنَزةَ أنَّه قَالَ: قُلْتُ لِأَبِي ذَرٍّ: هَلْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُصَافِحُكُمْ إِذَا لَقِيتُمُوهُ؟ قَالَ: مَا لَقِيتُهُ قَطُّ إِلَّا صَافَحَنِي وَبَعَثَ إِلَيَّ ذَاتَ يَوْمٍ وَلَمْ أَكُنْ فِي أَهْلِي فَلَمَّا جِئْتُ أُخْبِرْتُ فَأَتَيْتُهُ وَهُوَ عَلَى سَرِيرٍ فَالْتَزَمَنِي فَكَانَتْ تِلْكَ أَجْوَدَ وَأَجْوَدَ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘আনাযাহ্’’ গোত্রের একজন অপরিচিত লোক আছে যার পরিচয় জানা যায় না। তুহফাতুল আহওয়াযী ৭/৪৩৪ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ (عَلٰى سَرِيرٍ) ইবনুল মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ কখনো খাট سرير বলতে রাজত্ব ও নি‘আমাতকে বুঝানো হয়। এখানে سرير বা খাট বলতে নুবুওয়াতের রাজত্ব ও এর নি‘আমাত উদ্দেশ্য। কেউ বলেন, এ খাট ছিল খেজুর কাঠের যা মদীনাবাসী এবং মিসরের লোকেরা ঘুমানোর জন্য এবং পোকা-মাকড় থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তৈরি করে থাকে। (فَكَانَتْ تِلْكَ أَجْوَدَ) অর্থাৎ এ আলিঙ্গন ছিল মুসাফাহার চাইতে মনোতৃপ্তি এবং হাতের জন্য অধিক আরামদায়ক। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫২০৫)
ফিতনার ভয় না থাকলে সফর ছাড়াও কোলাকুলি বৈধতার জন্য কেউ এ হাদীসকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তবে এর উত্তরে বলা যায় যে, আবূ যার সফর থেকে এসেছিলেন, তার স্পষ্ট প্রমাণ হলো যে, তিনি বলেছেন لم اكن في اهلي অর্থাৎ আমি আমার পরিবারের নিকট ছিলাম না।
(মিশকাতুল মাসাবীহ- বোম্বায় ছাপা, ৪থ খন্ড, ২৮ পৃষ্ঠা)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - করমর্দন ও আলিঙ্গন
৪৬৮৪-[৮] ’ইকরিমাহ্ ইবনু আবূ জাহল (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যেদিন আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে উপস্থিত হই, তিনি আমাকে দেখেই বললেনঃ হিজরতকারী আরোহীর প্রতি মুবারকবাদ। (তিরমিযী)[1]
وَعَن عكرمةَ بن أبي جهلٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ جِئْتُهُ: «مَرْحَبًا بِالرَّاكِبِ الْمُهَاجِرِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘মূসা ইবনু মাস্‘ঊদ’’ নামের বর্ণনাকারী য‘ঈফ। দেখুন- তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৮/৫ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ ‘আসকারী বর্ণনা করেন সায়ফ ইবনু যীইয়াযান সর্বপ্রথম (مَرْحَبًا) শব্দটি ব্যবহার করেন। এ হাদীসে আগমনকারী ব্যক্তির প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করার দলীল রয়েছে। রসূলের নিকট থেকে এরূপ ঘটনার নযীর বারবার হয়েছে। (بِالرَّاكِبِ الْمُهَاجِرِ) এখানে মুহাজির বলতে আল্লাহ ও তার রসূলের পথে হিজরতকারী অথবা দারুল হারব থেকে দারুল ইসলামের দিকে হিজরত করা বুঝানো হয়েছে। এখানে আরেকটি বিষয় জানা গেল যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী لا هجرة بعد الفتح মক্কা বিজয়ের পর থেকে কোন হিজরত নেই, কারণ এটা এখন দারুল ইসলাম। এর বিধান মক্কা বিজয়ের পূর্বের হিজরতের বিধানের বিপরীত। কারণ তখন হিজরত ওয়াজিব, বরং শর্ত ছিল। আর দারুল কুফর থেকে দারুল ইসলামে হিজরত করার আবশ্যকতা কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৭৩৫)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - করমর্দন ও আলিঙ্গন
৪৬৮৫-[৯] উসায়দ ইবনু হুযায়র (রাঃ) নামক আনসার গোত্রীয় ব্যক্তি থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, একদিন তিনি নিজের সম্প্রদায়ের সাথে কথাবার্তা বলছিলেন এবং এর মধ্যে হাসি-তামাশা হচ্ছিল। তিনি নিজের কথাবার্তায় জনতাকে হাসাচ্ছিলেন। এমন সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি লাকড়ি দ্বারা তাঁর পাঁজরে খোঁচা দিলেন। তখন উসায়দ(রাঃ) বললেনঃ আপনি আমাকে খোঁচা দিয়েছেন, এখন আমাকে এর প্রতিশোধ গ্রহণ করার সুযোগ দিন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ প্রতিশোধ গ্রহণ করো। উসায়দ(রাঃ) বললেনঃ আপনার শরীর জামা দ্বারা আবৃত, অথচ আমার গায়ে জামা ছিল না। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জামা তুলে ধরলেন। তখন উসায়দ(রাঃ) রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জড়িয়ে ধরলেন এবং তাঁর পাঁজরে চুমু দিতে লাগলেন। আর বলতে লাগলেন : হে আল্লাহর রসূল! এটাই আমি চেয়েছিলাম। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن أُسَيدِ بن حُضَيرٍ - رَجُلٌ مِنَ الْأَنْصَارِ - قَالَ: بَيْنَمَا هُوَ يُحَدِّثُ الْقَوْمَ - وَكَانَ فِيهِ مُزَاحٌ - بَيْنَا يُضْحِكُهُمْ فَطَعَنَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي خَاصِرَتِهِ بِعُودٍ فَقَالَ: أَصْبِرْنِي. قَالَ: «أَصْطَبِرُ» . قَالَ: إِنَّ عَلَيْكَ قَمِيصًا وَلَيْسَ عَلَيَّ قَمِيصٌ فَرَفَعَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ قَمِيصِهِ فَاحْتَضَنَهُ وَجَعَلَ يُقَبِّلُ كَشْحَهُ قَالَ: إِنَّمَا أَرَدْتُ هَذَا يَا رسولَ الله. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ رجل মাসাবীহ গ্রন্থে رجل যের যোগে বলা হয়েছে। তখন এর অর্থ হলো রসিক ব্যক্তি ও প্রতিশোধ গ্রহণকারী ব্যক্তি হচ্ছে একজনই সেটা হলো বর্ণনাকারী উসায়দ ইবনু হুযায়র। আর "جامع الاصول" গ্রন্থে বর্ণিত হাদীসের মাতান ভিন্নভাবে এসেছে। যেমন, عن ابن حضير قال ان رجلا من الانصار كان فيه مزاح فبينما هو يحدث القوم لضحكهم এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট বুঝা গেল যে, রসিক ব্যক্তি অন্যজন ছিল। তার ঘটনা উসায়দ বর্ণনা করেছে এভাবে যে, সে রসিক লোক ছিল এবং মানুষকে হাসাত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও তার সাথে রসিকতা করতেন। খত্ত্বাবী নিহায়াহ্ গ্রন্থে বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে গাছের ভাঙ্গা ডাল দ্বারা খোঁচা দিয়ে রসিকতা করেন। তখন সে ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললেন, আমাকে প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ দিন। অতঃপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গায়ের কাপড় উঠালে সে তার কোমরের পাশে কটিদেশে চুম্বন করে। এ থেকে বুঝা গেল, শারী‘আহ্ পরিপন্থী যদি না হয় তাহলে রসিকতা করা বা শোনা যায়।
(‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫২১৫; মিশকাতুল মাসাবীহ- বোম্বায় ছাপা, ৪র্থ খন্ড, ২৮ পৃষ্ঠা)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - করমর্দন ও আলিঙ্গন
৪৬৮৬-[১০] শা’বী (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন জা’ফার ইবনু আবূ ত্বালিব (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করলেন, তখন তাঁর সাথে আলিঙ্গন করলেন এবং তাঁর দু’ চোখের মধ্যখানে (কপালে) চুম্বন করলেন। (আবূ দাঊদ)
আর ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর "شُعَبُ الْإِيْمَانِ" গ্রন্থে হাদীসটি مُرْسَلْ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আর مَصَابِيْحِ গ্রন্থের কোন কোন কপিতে এবং شَرْحُ السُّنَّةِ গ্রন্থে ইমাম বায়াযী হতে مُتَّصِلْ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।)[1]
وَعَنِ
الشَّعْبِيِّ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَلَقَّى جَعْفَرَ بْنَ أَبِي طَالِبٍ فَالْتَزَمَهُ وقبَّلَ مابين عَيْنَيْهِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ» مُرْسَلًا
وَفِي بَعْضِ نُسَخِ «الْمَصَابِيحِ» وَفِي «شرح السّنة» عَن البياضي مُتَّصِلا
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘আজলাহ্’’ নামক বর্ণনাকারী, যিনি য‘ঈফ। তাহযীবুল কামাল, রাবী নং ২৭৮৯।
ব্যাখ্যাঃ এ হাদীস এবং পরের হাদীস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সফর থেকে ফেরার সময় কোলাকুলি করা বৈধ। ‘আলিমগণ এসব হাদীসকে সামনে রেখে জ্ঞানী ও সম্মানী ব্যক্তিদের হাতে চুম্বন করাকে সঠিক বলেছেন। কিন্তু "در المختار" গ্রন্থে সাক্ষাতের সময় স্বীয় সাথীদের হাত চুম্বন করাকে সর্বসম্মতিক্রমে মাকরূহ বলেছেন। অনুরূপভাবে ‘আলিম বা নেতাদের সামনে ভূমি চুম্বন করাকে হারাম আখ্যা দিয়েছেন। যে এরূপ করবে এবং এতে সন্তুষ্ট হবে উভয়ে পাপী হবে। এটা তো মূর্তিপূজা সদৃশ। আর যদি ‘ইবাদাত বা সম্মানের উদ্দেশে করে তাহলে সে কাফির হবে। কিন্তু অভিবাদনের উদ্দেশে করলে সে কাফির হবে না তবে কাবীরাহ্ গুনাহ হবে।
"ملتقط" গ্রন্থে বলা হয়েছে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশে নত হওয়া হারাম। "مبانية" গ্রন্থে রয়েছে, যখন কোন সম্মানী ব্যক্তি আসবে তখন তার সম্মানের উদ্দেশে দাঁড়ানো জায়িয বরং মানদূব। (মিশকাতুল মাসাবীহ- বোম্বায় ছাপা, ৪র্থ খন্ড, ২৯ পৃষ্ঠা)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - করমর্দন ও আলিঙ্গন
৪৬৮৭-[১১] জা’ফার ইবনু আবূ ত্বালিব (রাঃ) হাবাশাহ্ হতে প্রত্যাবর্তনের ঘটনা প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন যে, আমরা হাবাশাহ্ হতে রওয়ানা করে মদীনায় এসে পৌঁছলাম। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার সাথে সাক্ষাৎ করলেন এবং আমার সাথে আলিঙ্গন করলেন। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আমি বলতে পারছি না খায়বার বিজয় আমার কাছে বেশি আনন্দের, না জা’ফার-এর ফিরে আসাটা বেশি আনন্দের! জা’ফার (রাঃ) ঘটনাক্রমে সেদিনই এসেছিলেন, যেদিন খায়বার বিজয় হয়েছিল। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
وَعَنْ
جَعْفَرِ بْنِ أَبِي طَالِبٍ فِي قِصَّةِ رُجُوعِهِ مِنْ أَرْضِ الْحَبَشَةِ قَالَ: فَخَرَجْنَا حَتَّى أَتَيْنَا الْمَدِينَةَ فَتَلَقَّانِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاعْتَنَقَنِي ثُمَّ قَالَ: مَا أَدْرِي: أَنَا بِفَتْحِ خَيْبَرَ أَفْرَحُ أَمْ بِقُدُومِ جَعْفَرٍ؟ «. وَوَافَقَ ذَلِكَ فَتْحَ خَيْبَرَ. رَوَاهُ فِي» شَرْحِ السّنة
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘মুজালিদ ইবনু সা‘ঈদ’’ নামের বর্ণনাকারী শক্তিশালী নয়। অন্য একটি বর্ণনায় শা‘বী (রহিমাহুল্লাহ) থেকে দু’জন বিশ্বস্ত বর্ণনাকারী ‘‘মুজালিদ ইবনু সা‘ঈদ’’-এর বিপরীত বর্ণনা করেছেন। দেখুন- আর্ রওযুন্ নাযীর ৯৩৪, হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪৩৩১ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ (قَالَ: "مَا أَدْرِي: أَنَا بِفَتْحِ خَيْبَرَ أَفْرَحُ أَمْ بِقُدُومِ جَعْفَرٍ؟") এর অর্থ হলো, আমার খুশির কারণ একাধিক। সুতরাং আমি বুঝতে পারছি না, এ দিকে লক্ষ্য করব না ঐ দিকে লক্ষ্য করব। কারণ প্রত্যেকটিই খুশির জন্য স্বনির্ভর কারণ ছিল। খুশির কারণগুলো একটির সাথে আরেকটি যুক্ত হয় না। ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এটা আসলে পূর্ণতার সাথে অপূর্ণতাকে মিলিত করার উপযুক্ত সাদৃশ্যদানের একটি রীতিমাত্র। সে কারণে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) খায়বার বিজয়ের তুলনায় জা‘ফার-এর আগমনকে অপূর্ণরূপে প্রকাশ করেছেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - করমর্দন ও আলিঙ্গন
৪৬৮৮-[১২] যারি’ (রাঃ) হতে বর্ণিত। যিনি ’আবদুল কায়স প্রতিনিধি দলের সদস্য ছিলেন। তিনি বলেন, যখন আমরা মদীনায় আগমন করলাম তখন আমরা তাড়াহুড়া করে সওয়ারী হতে অবতরণ করলাম এবং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাত ও পা চুম্বন করলাম। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن زارع
وَكَانَ فِي وَفْدِ عَبْدِ الْقَيْسِ قَالَ: لَمَّا قَدِمْنَا الْمَدِينَةَ فَجَعَلْنَا نَتَبَادَرُ مِنْ رَوَاحِلِنَا فَنُقَبِّلُ يَدُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَرجله. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ হাফিয আবূ বকর ইস্পাহানী মাকরী (রহিমাহুল্লাহ) হাতে চুম্বন করা জায়িযের ব্যাপারে একটি খন্ড রচনা করেন। সেখানে তিনি ইবনু ‘উমার, ইবনু ‘আব্বাস, জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ, বুরয়দাহ্ ইবনু হাসিব, সফওয়ান ইবনু ‘আসসাল, বুরয়দাহ্ আল ‘আবদী, যারি‘ ইবনু ‘আমির ‘আবদী প্রমুখদের হাদীস উল্লেখ করেন। তিনি সেখানে আরো সাহাবী ও তাবি‘ঈদের সহীহ আসার তুলে ধরেছেন।
কেউ কেউ বলেন, মালিক (রহিমাহুল্লাহ) উপরোক্ত মতকে এবং এ বিষয়ের হাদীস মানেননি। তবে অন্যরা এটাকে জায়িয বলেছেন।
আবহুরী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ মূলত ইমাম মালিক তাকে অপছন্দ করেছেন যখন চুম্বন অহংকারবশতঃ ও সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্য হয়। অতএব যখন তা গোপনাঙ্গ ব্যতীত কারো হাত, মুখমণ্ডলে বা শরীরের অন্য কোন অঙ্গ চুম্বন করা, তার ‘ইলম, দীন, মর্যাদার কারণে আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য হয়ে থাকে তখন জায়িয। আল্লাহর রসূলের হাতে চুম্বন করা আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের সহায়ক। আর যা কোন পার্থিব উদ্দেশে অথবা কোন নেতার উদ্দেশে বা অনুরূপ কোন অহংকারবশতঃ হয়ে থাকে তবে তা নাজায়িয। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫২১৪)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - করমর্দন ও আলিঙ্গন
৪৬৮৯-[১৩] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আকৃতি-প্রকৃতি, স্বভাব-চরিত্র ও কাঠামো-অবয়বে; (অপর এক রিওয়ায়াতে আছে) আলাপ-আলোচনায় ফাতিমা (রাঃ) ছাড়া অন্য কাউকে আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সদৃশ পাইনি। ফাতিমা (রাঃ) যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসতেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দাঁড়িয়ে যেতেন এবং ফাতিমার হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে চুম্বন করতেন এবং নিজের আসনে বসাতেন। অনুরূপভাবে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন ফাতিমা (রাঃ)-এর কাছে যেতেন, ফাতিমা (রাঃ) উঠে দাঁড়াতেন, তাঁর হাত ধরতেন, হাতে চুম্বন করতেন এবং নিজের বসার স্থানে তাঁকে বসাতেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ
عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: مَا رَأَيْتُ أَحَدًا كَانَ أَشْبَهَ سَمْتًا وَهَدْيًا وَدَلًّا. وَفِي رِوَايَةٍ حَدِيثًا وَكَلَامًا بِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ فَاطِمَةَ كَانَتْ إِذَا دَخَلَتْ عَلَيْهِ قَامَ إِلَيْهَا فَأَخَذَ بِيَدِهَا فَقَبَّلَهَا وَأَجْلَسَهَا فِي مَجْلِسِهِ وَكَانَ إِذَا دَخَلَ عَلَيْهَا قَامَتْ إِلَيْهِ فَأَخَذَتْ بِيَدِهِ فَقَبَّلَتْهُ وَأَجْلَسَتْهُ فِي مجلسِها. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) অন্যের উদ্দেশে বিতর্কিত দাঁড়ানোর বৈধতার জন্য এ হাদীসকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এর উত্তরে ইবনুল হজ্জ বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতিমার সম্মানার্থে তাকে স্বীয় স্থানে বসানোর জন্য দাঁড়িয়েছিলেন। এটা সেই বিতর্কিত ক্বিয়াম ছিল না। অবশ্য যতটুকু জানা যায় সেটা হলো তাদের বাড়ী সংকীর্ণ হওয়ায় এবং পর্যাপ্ত বিছানা না থাকার কারণে তাকে বসাতে গিয়ে দাঁড়ানো এবং এদিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা দরকার ছিল।
অন্যের উদ্দেশে দাঁড়ানোর অপর হাদীস হলো সা‘দ ইবনু মু‘আয-এর হাদীস যা সম্মানের উদ্দেশে ছিল না। বরং তা তাকে গাধার পিঠ থেকে নামতে সাহায্য করার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদেরকে দাঁড়াতে বলেছিলেন।
আর এর প্রমাণ হলো মুসনাদে আহমাদে ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর সূত্রে বর্ণিত হাদীস তথা قُومُوا إِلٰى سَيِّدِكُمْ فَأَنْزِلُوهُ তোমরা তোমাদের নেতার জন্য দাঁড়িয়ে তাকে নামিয়ে দাও। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫২০৮)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - করমর্দন ও আলিঙ্গন
৪৬৯০-[১৪] বারা’ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ বকর সিদ্দীক(রাঃ) যখন (কোন যুদ্ধ হতে) প্রথম মদীনায় আসেন, তখন আমি তাঁর সাথে তাঁর ঘরে প্রবেশ করলাম। আমি দেখলাম, তাঁর কন্যা ’আয়িশাহ্ (রাঃ) শুয়ে আছেন। তিনি জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন। আবূ বকর সিদ্দীক(রাঃ) তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেনঃ হে বৎস! তুমি কেমন আছ? এবং তাঁর গালে চুম্বন করলেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن البراءِ
قَالَ: دَخَلْتُ مَعَ أَبِي بَكْرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا أولَ مَا قدمَ المدينةَ فَإِذا عَائِشَة مُضْطَجِعَة قد أصابتها حُمَّى فَأَتَاهَا أَبُو بَكْرٍ فَقَالَ: كَيْفَ أَنْتِ يَا بُنَيَّةُ؟ وَقَبَّلَ خَدَّهَا. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যাঃ কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ অনুগ্রহ, ভালোবাসা, অথবা সুন্নাত রক্ষার লক্ষ্যে তিনি তাকে গালে চুম্বন করেছেন। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫২১৩)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - করমর্দন ও আলিঙ্গন
৪৬৯১-[১৫] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে একটি শিশুকে আনা হলো, তিনি তাকে চুম্বন করে বললেনঃ এরাই কার্পণ্যের হেতু, ভীরুতার কারণ। আর এরাই আল্লাহর সুগন্ধিতুল্য একটি অন্যতম নি’আমাত। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ
رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أُتِيَ بِصَبِيٍّ فَقَبَّلَهُ فَقَالَ: «أَمَا إِنَّهُمْ مَبْخَلَةٌ مَجْبَنَةٌ وَإِنَّهُمْ لَمِنْ ريحَان الله» . رَوَاهُ فِي «شرح السّنة»
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘ইবনু লাহী‘আহ্’’ নামের বর্ণনাকারী সায়্যিউল হিফয বা খারাপ স্মৃতিশক্তির অধিকারী।
ব্যাখ্যাঃ সন্তান-সন্ততি কৃপণতা ও ভীরুতার কারণ। কেননা তারা পিতা-মাতাকে কৃপণ বানিয়ে দেয়। ফলে তারা তাদের জন্য ধন-সম্পদে কৃপণ হয়ে পড়ে। ফলে সে কিছু দেয় না। ভীরুতার কারণ, তারা এজন্যে যুদ্ধে যেতে ভয় পায় যে, যুদ্ধে সে মারা গেলে তার সন্তানরা মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াবে। এ হাদীস থেকে সন্তানের প্রতি পিতামাতার পূর্ণ ভালোবাসা ও অত্যধিক হৃদ্যতার প্রমাণ পাওয়া যায়। এমনকি অধিকাংশ মানুষ ধর্মীয় ও বৈষয়িক জীবনে তাদের জন্য উপকারী একনিষ্ঠ শারী‘আতের নির্দেশিত বিষয়সমূহ ও সন্তোষজনক প্রশংসনীয় যাবতীয় কর্মকাণ্ড-র উপরে সন্তানদের প্রতি ভালোবাসাকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে।
(لَمِنْ ريحَان الله) অর্থাৎ আল্লাহর রিজিক। কারণ রিযক্বের মাধ্যমে তার উন্নতি ঘটে। অথবা ريحان দ্বারা এমন কিছু হতে পারে যার ঘ্রাণ নেয়া হয়। কারণ ঘ্রাণ নেয়া হয় এমন বস্তুকে ريحان বলা হয়। তখন এর অর্থ হবে আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে এর দ্বারা সম্মানিত করেছেন এবং তাদেরকে দান করেছেন। কারণ তাদের ঘ্রাণ নেয়া হয় এবং চুম্বন করা হয়। সুতরাং যেন তারা আল্লাহ সৃষ্ট ঘ্রাণ সমষ্টির অংশ। ভাষ্যকার বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো রিজিক অথবা সুঘ্রাণ। এর দ্বারা আল্লাহ মানুষের অন্তরকে আনন্দিত করেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - করমর্দন ও আলিঙ্গন
৪৬৯২-[১৬] ইয়া’লা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন হাসান ও হুসায়ন (রাঃ) দৌড়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলেন। আর তিনি দু’জনকেই নিজের সাথে জড়িয়ে ধরে বললেনঃ ’’সন্তানই কৃপণতা ও ভীরুতার কারণ’’। (আহমাদ)[1]
عَن يعلى
قَالَ: إِنَّ حسنا وحُسيناً رَضِي الله عَنْهُم اسْتَبَقَا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَضَمَّهُمَا إِلَيْهِ وَقَالَ: «إِنَّ الْوَلَدَ مَبْخَلَةٌ مجبنَةٌ» . رَوَاهُ أَحْمد
ব্যাখ্যাঃ ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ বাক্যের বাচনভঙ্গি মোতাবেক এখানে مَبْخَلَةٌ ও مَبْخَلَةٌ উল্লেখ করার অর্থ হলো ভালোবাসা যা প্রশংসনীয়। কিন্তু এর পূর্বের হাদীসের বাচনভঙ্গি ছিল এর বিপরীত। ‘ইবাদাত বন্দেগীর ক্ষেত্রে যাদের নিকটে আল্লাহর ভালোবাসার ঊর্ধ্বে পূর্ণতা নেই তাদের জন্য এ দু’টো এখানে উল্লেখ করাতে পূর্ণ স্বভাবজাত ভালোবাসা ও স্বাভাবিক আন্তরিকতা স্পষ্ট বুঝা যায়।
কেননা আল্লাহ হলেন আসল প্রিয়জন। তিনি ব্যতীত অন্যগুলো বাড়তি। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - করমর্দন ও আলিঙ্গন
৪৬৯৩-[১৭] ’আত্বা আল খুরাসানী (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা পরস্পর করমর্দন করো, এতে অন্তরের হিংসা ও বিদ্বেষ অন্তর্হিত হয় এবং পরস্পরের মধ্যে উপঢৌকন বিনিময় করো, এতে ভালোবাসা ও আন্তরিকতা বৃদ্ধি পায় এবং শত্রুতা দূরীভূত হয়। [ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ) এ হাদীসটি মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন][1]
وَعَنْ عَطَاءٍ
الْخُرَاسَانِيِّ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «تَصَافَحُوا يَذْهَبِ الْغِلُّ وَتَهَادَوْا تَحَابُّوا وَتَذْهَبِ الشَّحْنَاءُ» رَوَاهُ مَالِكٌ مُرْسَلًا
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ হলো, এর সনদে ‘‘আত্বা’’ নামের এক বর্ণনাকারী আছে। হাফিয ইবনু হাজার (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ সে বিশ্বস্ত, তবে অনেক ভুল করত, মুরসাল করত এবং তাদলীস করত (মুদাল্লিস)। দেখুন- হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৩৩৪ পৃঃ, ইরওয়াউল গালীল ৬/৪৪, সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ১৭৬৬, য‘ঈফুল জামি‘ ৬১৮৭।
ব্যাখ্যাঃ (الشَّحْنَاءُ) شين বর্ণে ‘যবর’ যোগে। এর অর্থ অন্তরভর্তি শত্রুতা। তিরমিযীতে রয়েছে, তোমরা পরস্পরে হাদিয়া (উপঢৌকন) আদান-প্রদান কর। তাহলে অন্তরের বিদ্বেষ দূরীভূত হবে। কোন প্রতিবেশী যেন তার প্রতিবেশীর বকরীর খুর প্রদান করাকে তুচ্ছজ্ঞান না করে।
অন্য এক বর্ণনায় আছে, তোমরা পরস্পরের খাদ্য হাদিয়া লেন-দেন করো। কারণ এতে তোমাদের রিজিক প্রশস্ত হয়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - করমর্দন ও আলিঙ্গন
৪৬৯৪-[১৮] বারা’ ইবনু ’আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি দ্বিপ্রহরের পূর্বে চার রাক্’আত সালাত আদায় করল, সে যেন এ চার রাক্’আত কদরের রাতে আদায় করল। আর দু’জন মুসলিম যখন করমর্দন করে, তখন তাদের মধ্যে কোন গুনাহ অবশিষ্ট থাকে না, মাফ করে দেয়া হয়। (বায়হাক্বী’র ’’শু’আবুল ইমানে’’ বর্ণনা করেছেন)[1]
وَعَنِ الْبَرَاءِ
بْنِ عَازِبٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ صَلَّى أَرْبَعًا قَبْلَ الْهَاجِرَةِ فَكَأَنَّمَا صَلَّاهُنَّ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ وَالْمُسْلِمَانِ إِذَا تَصَافَحَا لَمْ يَبْقَ بَيْنَهُمَا ذَنْبٌ إِلَّا سَقَطَ» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ»
হাদীসটি সম্পর্কে আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আমি হাদীসটির সানাদ সম্পর্কে অবহিত হতে পারিনি, তবে বাহ্যিকভাবে মনে হচ্ছে হাদীসটি জাল। হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৩৩৪। আমরা হাদীসটির তাহক্বীক পেয়েছি ‘‘জাওয়ামি‘উল কালিম’’ নামক সফ্টওয়্যার থেকে।
ব্যাখ্যাঃ এখানে গুনাহ বলতে সাধারণ গুনাহ উদ্দেশ্য। কিন্তু ত্বীবী বলেনঃ এখানে গুনাহ থেকে উদ্দেশ্য হলো বিদ্বেষ ও শত্রুতা যার আলোচনা পূর্বে করা হয়েছে। (মিশকাতুল মাসাবীহ- বোম্বায় ছাপা, ৪র্থ খন্ড ৩১ পৃষ্ঠা)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - দণ্ডায়মান হওয়া
الْقيام এর পরিচিতি : الْقيام শব্দটি বাবে نَصَرَ এর মাসদার শাব্দিক অর্থ : দণ্ডায়মান হওয়া, দাঁড়ানো।
পারিভাষিক অর্থ : কারো সম্মানার্থে দাঁড়ানো তথা ঐ সম্মানিত ব্যক্তি যতক্ষণ বসে থাকবে, ততক্ষণ ঐ স্থানে দাঁড়িয়ে থাকাকে ক্বিয়াম বলা হয়।
৪৬৯৫-[১] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বানূ ক্বুরায়যাহ্ সম্প্রদায় যখন সা’দ (রাঃ)-এর ঘোষিত রায় মেনে নেয়ার শর্তে দূর্গ হতে অবতরণ করল, তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সা’দকে ডেকে পাঠালেন। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটবর্তী ছিলেন। সা’দ (রাঃ) যখন গাধার পিঠে আরোহণ করে মসজিদে নাবাবীর নিকটবর্তী হলেন, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারগণকে বললেনঃ তোমরা তোমাদের নেতার সাহায্যের জন্য দাঁড়িয়ে যাও। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
এ হাদীসের বিস্তারিত বর্ণনা بَابِ حِكَمِ الْإِسْرَاءِ ’’মি’রাজের ঘটনাবলী অধ্যায়ে’’ হয়েছে।
بَابُ الْقِيَامِ
عَن أبي سعيد الْخُدْرِيّ قَالَ: لَمَّا نَزَلَتْ بَنُو قُرَيْظَةَ عَلَى حُكْمِ سَعْدٍ بَعَثَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَيْهِ وَكَانَ قَرِيبًا مِنْهُ فَجَاءَ عَلَى حِمَارٍ فَلَمَّا دَنَا مِنَ الْمَسْجِدِ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِلْأَنْصَارِ: «قُومُوا إِلَى سيِّدكم» . مُتَّفق عَلَيْهِ. وَمَضَى الْحَدِيثُ بِطُولِهِ فِي «بَابِ حِكَمِ الْإِسْرَاءِ»
ব্যাখ্যাঃ (عَلٰى حُكْمِ سَعْدٍ) যে ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে তা হলো এই যে, মদীনার ইয়াহূদী গোত্র বানূ ‘‘কুরায়যার সাথে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। শর্ত ছিল তারা মুসলিমদের স্বার্থের পরিপন্থী কাজ করবে না। অথচ ৫ম হিজরীতে সংঘটিত খন্দাক যুদ্ধে প্রায় প্রকাশ্যেই তারা মক্কার কাফিরদেরকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহযোগিতা করে, ফলে যুদ্ধের পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ব-সৈন্যে বানূ কুরায়যাকে অবরোধ করেন। উপায়ন্তর না দেখে বানূ কুরায়যার লোকেরা আবূ লুবাবাকে ডাকল। আবূ লুবাবাহ্ তাদের শাস্তি স্বরূপ হত্যার ইঙ্গিত দিলেন। পরিশেষে তারা তাদের গোত্রীয় মুসলিম সাহাবী সা‘দ -এর ফায়সালা মেনে নিতে রাজি হয়।
ফলে সা‘দ নারী ও শিশুকে ব্যতীত সকলকে হত্যার নির্দেশ দেন। এ নির্দেশ শুনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সা‘দ তাঁর রবের ইচ্ছামত নির্দেশ প্রদান করেছে।
(فَلَمَّا دَنَا مِنَ الْمَسْجِدِ) দ্বারা উদ্দেশ্য : বলা হয় মসজিদ দ্বারা বুঝানো হয়েছে ঐ স্থানকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বানূ কুরায়যার অবস্থানকালে যে স্থানটিকে সালাত আদায় করার জন্য নির্ধারণ করেছিলেন। পরবর্তীতে মানুষেরা সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। এটা দ্বারা মদীনার মসজিদে নাবাবী উদ্দেশ্য নয়।
কিন্তু ইবনু ইসহক (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ এটা দ্বারা উদ্দেশ্য মসজিদে মদীনাহ্। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সা‘দ (রাঃ)-কে বানূ কুরায়যায় নিকট পাঠিয়ে ছিলেন তাদের বিচার-ফায়সালা করার জন্য। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সা‘দ (রাঃ)-এর জন্য মসজিদে নাবাবীতে তাবু তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে একজন মহিলা তাঁর আঘাতপ্রাপ্ত স্থানের সেবা করতেন।
فلما خرج إلى بني قريظة এটা দ্বারা উদ্দেশ্য নিশ্চয় সা‘দ মসজিদে মদীনায় ছিলেন। (ফাতহুল বারী ৭ম খন্ড, হাঃ ৪১২১)
ক্বিয়ামের প্রকারভেদ ও হুকুমসমূহ :
* কারো সম্মানার্থে দাঁড়ানো। যেমন : পিতামাতা, নেতৃস্থানীয় লোকেদের সম্মানার্থে দাঁড়ানো- এটা জায়িয।
* শুভেচ্ছা জ্ঞাপন বা অভ্যর্থনা জ্ঞাপনার্থে দাঁড়ানো জায়িয।
* কাউকে সহযোগিতা করার জন্য দাঁড়ানো- এটা জায়িয ও পুণ্যের কাজ।
* অহংকারী ব্যক্তির জন্য দাঁড়ানো- এটা হারাম।
* কবর যিয়ারতের জন্য দাঁড়ানো- এটা জায়িয।
* মৃতের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য দাঁড়ানো- এটা বিদ্‘আত।
(قُومُوا إِلٰى سيِّدكم) বলা হয় : কারো সম্মানার্থে দাঁড়ানো, এটা দ্বারা প্রমাণিত হয় দাঁড়ানো অপছন্দনীয় নয়। কারো জন্য দাঁড়ানো মুস্তাহাব।
বলা হয় : তোমাদের নেতাকে গাধা হতে নামানোর জন্য দাঁড়াও। কেননা যখন খন্দাক যুদ্ধে সা‘দ আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে তাঁর হাতের রগ কাটা গিয়েছিল। তাই তার গাধা থেকে নামার জন্য যেন কষ্ট না হয় সে জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন তোমরা নেতার জন্য দাঁড়াও।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ সম্মানিত ব্যক্তিদের জন্য দাঁড়ানো মুস্তাহাব। এ ব্যাপারে সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তবে নিষেধ সম্পর্কে স্পষ্ট হাদীস নেই। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
الْقيام শব্দের صلة যখন إلى আসে তখন সাহায্য-সহযোগিতা অর্থ হয়।
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - দণ্ডায়মান হওয়া
৪৬৯৬-[২] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কেউ কোন ব্যক্তিকে তার বসার স্থান হতে উঠিয়ে অতঃপর নিজেই সে স্থানে বসে পড়ে, এরূপ করবে না; বরং তোমরা স্থানটিকে প্রশস্ত করে নেবে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْقِيَامِ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا يُقِيمُ الرَّجُلُ الرَّجُلَ مِنْ مَجْلِسِهِ ثُمَّ يَجْلِسُ فِيهِ وَلَكِنْ تَفَسَّحُوا وَتَوَسَّعُوا» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ উল্লেখিত হাদীসের মাধ্যমে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসার আদব শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়েছেন। ইবনু বাত্ত্বলসহ আরো অনেকে বলেছেন, এটা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাজলিসের জন্য নির্দিষ্ট। জামহূর ‘উলামা বলেছেনঃ আলোচ্য বাক্যে "مجلس" দ্বারা সবার জন্য উন্মুক্ত বসার স্থানকে বুঝানো হয়েছে। যেমন মসজিদ আলোচনা সভা পাঠকক্ষ। সুতরাং জুমু‘আর দিন হলেও সালাত কিংবা অন্য অবস্থায় বসা থাকলেও তাকে উঠে নিজে বসা নাজায়িয। কেউ নিজের ইচ্ছায় উঠে পড়লে জায়িয হবে। তবে বিশেষ কোন ব্যক্তির জন্য নির্দিষ্ট জায়গা থাকলে সেখানে বসবে না। যদি কেউ সে স্থানে বসে তাহলে তাকে উঠিয়ে দেয়া বৈধ হবে। মানুষদেরকে বসার সুযোগ করে দেয়ার মর্মে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন : ‘‘হে মু’মিনগণ! যখন তোমাদের বলা হয়, মাজলিসের স্থান প্রশস্ত করে দাও, তখন তোমরা স্থান প্রশস্ত করে দিও। আল্লাহ তোমাদের জন্য প্রশস্ত করে দিবেন। যখন বলা হয় উঠে যাও, তখন উঠে যেয়ো’’- (সূরাহ্ আল মুজা-দালাহ্ ৫৮ : ১১)। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৭৪৯; ফাতহুল বারী ১১শ খন্ড, হাঃ ৬২৬৯; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - দণ্ডায়মান হওয়া
৪৬৯৭-[৩] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যদি কেউ নিজের স্থান হতে উঠে অন্যত্র চলে যায়, অতঃপর পুনরায় ফিরে আসে, তবে সে-ই ঐ স্থানের অগ্রাধিকারী। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْقِيَامِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ قَامَ مِنْ مَجْلِسِهِ ثُمَّ رَجَعَ إِلَيْهِ فَهُوَ أَحَقُّ بِهِ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ কোন স্থানে বসার পর সে স্থান হতে উঠলে পুনরায় সে স্থানে বসার বিধান : ইবনু মালিক বলেন, যে ব্যক্তি বসার স্থান ত্যাগ করে উযূ, থুথু ফেলা বা অন্য কোন সাধারণ প্রয়োজনে উঠে বাইরে যায় এবং পুনরায় ফিরে আসার ইচ্ছা রাখে, এমতাবস্থায় সে যদি সেখানে কিছু রেখে যায় অথবা না রেখে যায় সেই স্থানে বসতে পারবে এবং সে ব্যক্তি তার পূর্বের স্থানে বসার অধিক হকদার। তার স্থানে কোন লোকের বসা উচিত নয়। কেউ বসলে পূর্বের ব্যক্তি ফিরে আসলে তার জন্য আসন ছেড়ে দিতে হবে। ছেড়ে দেয়ার বিধান হলো মুস্তাহাব, ওয়াজিব নয়।
কেউ কেউ বলেছেন, যদি সে বসার স্থানে কোন কিছু না রেখে যায় তাহলে তার পূর্বের বসার হুকুম বাতিল হয়ে যায়। তবে দারস প্রদান, শিক্ষক বা উচ্চমর্যাদা বা কোন ব্যক্তি যদি তার স্থান হতে উঠে যায়। তিনি ফিরে আসলে তাকে তার স্থান ফেরত দিতে হবে।
(তুহফাতুল আহওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৭৫১; শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২১৭৯)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - দণ্ডায়মান হওয়া
৪৬৯৮-[৪] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাহাবায়ে কিরামের নিকট রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেয়ে অধিক প্রিয় ব্যক্তি আর কেউ ছিল না। কিন্তু তবুও তাদের অবস্থা এই ছিল যে, যখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আগমন করতে দেখতেন তার সম্মানার্থে তাঁরা দাঁড়াতেন না। কেননা তারা জানতেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা পছন্দ করেন না। [তিরমিযী; আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।][1]
عَن أنس بن مَالك قَالَ: لَمْ يَكُنْ شَخْصٌ أَحَبَّ إِلَيْهِمْ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَكَانُوا إِذَا رَأَوْهُ لَمْ يَقُومُوا لِمَا يَعْلَمُونَ مِنْ كَرَاهِيَتِهِ لِذَلِكَ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ
ব্যাখ্যাঃ উল্লেখিত হাদীসের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, সাহাবীগণের নিকট রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহজগতে অধিক, মর্যাদাবান, প্রিয় ব্যক্তি ছিলেন। সাহাবীগণ তাদের পিতা-মাতা, ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোন সকলের চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে। তারপরও তারা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মানের জন্য দাঁড়াতেন না। কেননা শারী‘আতে এটা নিষেধ। দু’টি হাদীসের মাঝে تعارض বা দ্বন্দ্ব হয়েছে। নিম্নে দ্বন্দ্বের বর্ণনা করা হলো :
আনাস (রাঃ)-এর হাদীসের মাধ্যমে বুঝা যায় যে, সহাবায়ি কিরামগণ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগমনে তাঁর প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য দাঁড়াতেন না। পক্ষান্তরে আবূ সা‘ঈদ আল খুদরী (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারদেরকে সা‘দ (রাঃ)-এর জন্য দাঁড়াতে নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং প্রকাশ্যভাবে হাদীসদ্বয়ে দ্বন্দ্ব পরিলক্ষিত হয়। নিম্নে তার সমাধান প্রদান করা হলো :
যদিও হাদীস দু’টিতে দ্বন্দ্ব পরিলক্ষিত হয়েছে, প্রকৃতপক্ষ উভয় হাদীসের মাঝে কোন দ্বন্দ্ব নেই। আবূ সা‘ঈদ আল খুদরী (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে বানূ কুরায়যাকে উদ্দেশ্য করে সা‘দ ইবনু মু‘আয (রাঃ)-এর জন্য যে দাঁড়ানোর আদেশ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিয়েছিলেন তাঁর কারণ ছিল সা‘দ ইবনু মু‘আয (রাঃ) তখন আহত অবস্থায় গাধার পিঠে আরোহিত অবস্থায় পৌঁছেছিলেন তখন তাকে সাহায্য করার জন্য এ নির্দেশ দিয়েছিলেন। তা সম্মান প্রদর্শনার্থে দাঁড়ানোর আদেশ ছিল না, সেজন্য রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম قُومُوا إِلَى سيِّدكم বলেছেন। আর আনাস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে সাহাবীগণ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সম্মান প্রদর্শনার্থে দাঁড়ানো হতে নিষেধ করেছেন। এর অর্থ হলো সাহাবীগণ ‘আরবের রেওয়াজ ও নিয়ম অনুযায়ী অবনত মস্তকে অত্যন্ত অনুনয়-বিনয়ের সাথে মূর্তির মতো দাঁড়াতে অভ্যস্ত ছিলেন, তাই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ নিয়মে দাঁড়াতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। ফলে সাহাবীগণ সে নিয়মে দাঁড়ানো বর্জন করেছেন। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৭৫৪)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - দণ্ডায়মান হওয়া
৪৬৯৯-[৫] মু’আবিয়াহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যার মনের অভিলাষ এই যে, মানুষ তার সম্মুখে মূর্তির মতো দণ্ডায়মান থাকুক, সে যেন জাহান্নামকে নিজের বাসস্থান বানিয়ে নেয়। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن مُعَاوِيَة قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ سَرَّهُ أَنْ يَتَمَثَّلَ لَهُ الرِّجَالُ قِيَامًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ» رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ উল্লেখিত হাদীস সম্পর্কে মুহাদ্দিসগণের বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে। মিরক্বাতুল মাফাতীহ প্রণেতা (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ যদি কোন ব্যক্তি কারো সেবা করার জন্য দাঁড়ায়, সম্মান করার জন্য নয়। তাহলে তা জায়িয তাতে কোন সমস্যা হবে না। যেমনিভাবে প্রমাণিত হয়েছে সা‘দ ইবনু মু‘আয (রাঃ)-এর হাদীসের মাধ্যমে। হাদীসের মাঝে তার স্থান জাহান্নাম হবে তা ধমকস্বরূপ বলা হয়েছে অহংকারী ব্যক্তিদের জন্য। বলা হয় : সা‘দ ইবনু মু‘আয (রাঃ) হাদীসের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, গভর্নর, ন্যায়বিচারক, শিক্ষকের জন্য দাঁড়ানো মুস্তাহাব তা মাকরূহ নয়। ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ এই দাঁড়ানো হবে ভালো কাজে, সম্মানিত ব্যক্তিকে সম্মান প্রদান করার জন্য। যেমনিভাবে দাঁড়ানো হয়েছিল সা‘দ ইবনু মু‘আয এবং কা‘ব ইবনু মালিক-এর ক্ষেত্রে। শারহুস্ সুন্নাহয় বর্ণিত রয়েছে : আবূ মিজলায বর্ণনা করেন যে, মু‘আবিয়াহ্ (রাঃ) বের হলেন ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমির ও ‘আবদুল্লাহ ইবনু জুবায়র (রাঃ) বসা ছিল। ইবনু ‘আমির দাঁড়ালেন এবং ইবনু জুবায়র বসা ছিল। অতঃপর মু‘আবিয়াহ্ (রাঃ) বলেনঃ নিশ্চয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি তার সম্মানার্থে লোকেদেরকে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আনন্দ পায় সে যেন জাহান্নামে নিজের বাসস্থান বানিয়ে নেয়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - দণ্ডায়মান হওয়া
৪৭০০-[৬] আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লাঠিতে ভর দিয়ে আমাদের নিকট আগমন করলেন। আমরা তাঁর সম্মানার্থে দণ্ডায়মান হলাম। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ অনারব লোকেরা একে অপরের সম্মানার্থে যেভাবে দাঁড়ায়, তোমরা সেভাবে দাঁড়াবে না। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن أَبِي أُمَامَةَ قَالَ: خَرَجَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُتَّكِئًا عَلَى عَصًا فَقُمْنَا فَقَالَ: «لَا تَقُومُوا كَمَا يَقُومُ الْأَعَاجِمُ يُعَظِّمُ بَعْضهَا بَعْضًا» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ হলো, এর সনদে ‘‘আবূ মারযূক’’ নামের বর্ণনাকারী দুর্বল রাবী। দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ৩৪৬ নং হাদীসের আলোচনা। য‘ঈফুল জামি‘ ৬২৫২, মুসান্নাফ ইবনু আবূ শায়বাহ্ ২৫৫৮১, মুসনাদে আহমাদ ২২১৮১, শু‘আবুল ঈমান ৮৯৩৭, য‘ঈফ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ১৬২২।
ব্যাখ্যাঃ আলোচ্য হাদীসের সম্পর্কে মুহাদ্দিসগণ ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। প্রথমত হাদীসটি দুর্বল। সুতরাং এ হাদীস দ্বারা কারো জন্য দাঁড়ানো যাবে তা প্রমাণিত হয় না। মুল্লা ‘আলী কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ কারো সম্মান প্রদর্শনার্থে দাঁড়ানো নিষেধ। ইমাম মুসলিম (রহিমাহুল্লাহ) হাদীস বর্ণনা করেছেন, জাবির (রাঃ) বর্ণনা করেন, যখন তারা সালাত আদায় করে তার পিছনে বসেছিল। অতঃপর তিনি সালাম ফিরিয়ে বললেন, কিছুক্ষণ পূর্বে তোমরা তা করেছিলে যা পারস্য ও রোমের লোকেরা করে থাকে তারা দাঁড়িয়ে থাকে এবং তাদের নেতাগণ বসে থাকে তোমরা এরূপ করো না। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
অনারবরা একে অপরের সম্মানার্থে দাঁড়ায় তোমরা এমনভাবে দাঁড়াবে না। এভাবে সেবাদাসের ভঙ্গিতে দাঁড়ানোকে নিষেধ করা হয়েছে। এর কারণ হলো : ১. প্রচলিত প্রথা দূরীকরণ : সেবাদাসের মতো দাঁড়িয়ে থাকা ইসলামের শিক্ষা বিরোধী। মানুষ কেবল আল্লাহর সামনে মাথা নত করতে পারে আর কোথাও নয়। ২. আত্ম-অহংকারের মূলোৎপাটন : অহংকারের অধিকার একমাত্র আল্লাহর। কিন্তু তৎকালে ক্ষমতাশীল লোকেরা অন্যদের নিকট থেকে সেবাদাসের ভূমিকা আশা করত। তাদের এ অহংকার দূর করার জন্য এ বিধান জারী করা হয়েছে। এ মর্মে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘‘নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা কোন দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না’’- (সূরাহ্ আন্ নাহল ১৬ : ২৩)। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - দণ্ডায়মান হওয়া
৪৭০১-[৭] সা’ঈদ ইবনু আবুল হাসান (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ বকরাহ্ (রাঃ) এক মামলায় সাক্ষ্য প্রদানের জন্য আগমন করলেন। তখন জনৈক ব্যক্তি তাঁকে স্থান দেয়ার জন্য বৈঠক হতে উঠে দাঁড়াল। তিনি তার স্থানে বসতে অস্বীকার করলেন এবং বললেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা নিষেধ করেছেন। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে অপর ব্যক্তির কাপড় দ্বারা হাত মুছতে নিষেধ করেছেন, যাকে সে কাপড় পরিধান করায়নি। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن سعيد بن أبي الْحسن قَالَ: جَاءَنَا أَبُو بكرَة فِي شَهَادَةٍ فَقَامَ لَهُ رَجُلٌ مِنْ مَجْلِسِهِ فَأَبَى أَنْ يَجْلِسَ فِيهِ وَقَالَ: أَنَّ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ ذَا وَنَهَى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَمْسَحَ الرَّجُلُ يَدَهُ بِثَوْبِ مَنْ لَمْ يَكْسُهُ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ হলো, এর সনদে ‘‘মাওলা ‘আলী বুরদাহ্’’ নামে একজন বর্ণনাকারী আছে। যার উপনাম হলো আবূ ‘আবদুল্লাহ সে একজন মাজহূল বা অপরিচিত রাবী। দেখুন- হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৩৩৭ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ হাদীসের অংশ (قَالَ: أَنَّ النَّبِىِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهٰى عَنْ ذَا) দ্বারা উদ্দেশ্য : ذَا শব্দটি ব্যবহার করে যা বুঝতে চেয়েছেন তা কয়েকটি অর্থে ব্যবহার হতে পারে। নিম্নে তা আলোচনা করা হলো :
১. ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) উল্লেখ করেছেন, কোন ব্যক্তি নিজ বসার স্থান ত্যাগ করার পর অন্য লোককে সেখানে বসাবে। ২. মুল্লা ‘আলী কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ নিজে বসার উদ্দেশে কোন ব্যক্তিকে বসার স্থান হতে উঠিয়ে দেয়া। স্বেচ্ছায় যে কোন ব্যক্তি নিজের স্থান ছেড়ে অন্যকে বসতে দিলে শারী‘আত তা জায়িয বলেছে।
অন্যের কাপড়ে হাত মোছার বিধান : ক. ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ যখন হাতে খাদ্য লেগে যাবে তখন বিনা অনুমতিতে অন্যের কাপড় রুমাল, লুঙ্গি কোনটি ব্যবহার করা জায়িয নেই। খ. মুযহির (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ অপরিচিত বা অন্যের কাপড়ে হাত মোছা নিষেধ। তবে দাস-দাসী, ছেলে বা যাকে কাপড় পরিধান করাচ্ছে তাঁর কাপড়ে হাত মোছা জায়িয। কাপড়ওয়ালা সন্তুষ্ট থাকলে যে কোন ব্যক্তির কাপড়ে হাত মোছা জায়িয। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হা ৪৮১৯)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - দণ্ডায়মান হওয়া
৪৭০২-[৮] আবুদ্ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বসতেন, আমরাও তাঁর চতুষ্পার্শ্বে বসে যেতাম। তাঁর অভ্যাস ছিল, যখন তিনি উঠে যেতেন এবং পুনরায় ফিরে আসতে ইচ্ছা করতেন, তখন নিজের জুতা বা পরিধেয় কোন বস্ত্র রেখে যেতেন। এতে তাঁর সাহাবীগণ তাঁর প্রত্যাগমনের কথা বুঝতেন এবং নিজ নিজ স্থানে বসে থাকতেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن أبي الدرداءِ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا جلس - جلسنا حوله - فَأَرَادَ الرُّجُوعَ نَزَعَ نَعْلَهُ أَوْ بَعْضَ مَا يَكُونُ عَلَيْهِ فَيَعْرِفُ ذَلِكَ أَصْحَابُهُ فَيَثْبُتُونَ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ হলো, এর সনদে ‘‘কা‘ব’’ নামের বর্ণনাকারী মাজহূল বা অপরিচিত। আর তাম্মাম ইবনু নুজায়র নামের বর্ণনাকারী (وَاهٍ) একেবারেই দুর্বল। বিস্তারিত দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ৫৭৬৭, হিদায়াতুর রওয়াত ৪৩৩৭ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ সাহাবীগণ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে, ডানে এবং বামে বসতেন। এতে প্রমাণিত হয় যে, মাজলিসে বসা নিষিদ্ধ।
(حوله - فَأَرَادَ الرُّجُوعَ نَزَعَ نَعْلَهٗ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি হালকা, ছোট কোন প্রয়োজনে মাজলিস ত্যাগ করতেন এবং আবার ফিরে আসার ইচ্ছা করতেন তাহলে মাজলিসে জুতা পাগড়ী বা অন্য কিছু নিজ স্থানে রেখে যেতেন।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ সম্ভবত রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খালি পায়ে হেঁটে ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর ঘরে যেতেন। দূরবর্তী কোথাও গেলে খালি পায়ে হেঁটে যেতেন না। জুতা পরে যেতেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - দণ্ডায়মান হওয়া
৪৭০৩-[৯] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন ব্যক্তির জন্য অপর দু’ ব্যক্তির মাঝে ব্যবধান সৃষ্টি করা (মাঝখানে বসে) বৈধ নয়। তবে হ্যাঁ, যদি উভয়ের অনুমতি থাকে, তবে বসতে পারে। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن عبد الله بن عَمْرو عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا يَحِلُّ لِرَجُلٍ أَنْ يُفَرِّقَ بَيْنَ اثْنَيْنِ إِلَّا بِإِذْنِهِمَا» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যাঃ উক্ত হাদীস এবং পরবর্তী হাদীসের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, দু’জন ব্যক্তির মাঝে ব্যবধান সৃষ্টি করা ও তাদের মাঝে বসা কোন ব্যক্তির জন্য জায়িয নয়। কেননা তাদের মাঝে গভীরতম বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা থাকতে পারে। এমতাবস্থায় ভিন্ন তাহলে তাদের কষ্ট হতে পারে। তবে তারা অনুমতি দিলে বসা জায়িয হবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - দণ্ডায়মান হওয়া
৪৭০৪-[১০] ’আমর ইবনু শু’আয়ব (রহঃ) তাঁর পিতার মাধ্যমে তাঁর পিতামহ হতে বর্ণনা করেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দু’ ব্যক্তির মাঝখানে বসো না, যতক্ষণ না তাদের অনুমতি লাভ করো। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَمْرِو
بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا تَجْلِسْ بَيْنَ رَجُلَيْنِ إِلَّا بإِذنهما» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
পরিচ্ছেদঃ ৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - দণ্ডায়মান হওয়া
৪৭০৫-[১১] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে বসে আমাদের সাথে কথাবার্তা বলতেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন দাঁড়াতেন, আমরাও দণ্ডায়মান হতাম। যতক্ষণ পর্যন্ত না তাঁকে নিজের কোন স্ত্রীর ঘরে প্রবেশ করতে দেখতাম, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা দণ্ডায়মান থাকতাম।[1]
عَنْ
أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَجْلِسُ مَعَنَا فِي الْمَسْجِدِ يُحَدِّثُنَا فَإِذَا قَامَ قُمْنَا قِيَامًا حَتَّى نَرَاهُ قد دخل بعض بيُوت أَزوَاجه
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ হলো, এর সনদে ‘‘মুহাম্মাদ ইবনু হিলাল’’ নামের এক বর্ণনাকারী আছে, যে তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছে। তার পিতার ব্যাপারে ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ আমি তাকে চিনি না। হিলাল নামের বর্ণনাকারী অপরিচিত। দেখুন- ‘আওনুল মা‘বূদ ১৩/৯৩ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ (فَإِذَا قَامَ قُمْنَا قِيَامًا) এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো : প্রায়ই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সাথে মসজিদে বসে আলোচনা করতেন। আলোচনার শেষে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন গৃহে ফেরার উদ্দেশে উঠে দাঁড়াতেন তখন আমরাও উঠে দাঁড়িয়ে থাকতাম। এ জন্য যে, আমাদের কারো প্রতি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রয়োজন পড়তে পারে। সুতরাং আমরা ও অতি তাড়াতাড়ি যেন তার আদেশ পালন করতে পারি। অথবা তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পুনরায় মাজলিসে ফিরে আসতে পারেন এজন্যই আমরা মাজলিস ত্যাগ করতাম না। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগমনে বা ফিরে যাওয়ার সম্মানের জন্য আমরা তা করতাম না। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - দণ্ডায়মান হওয়া
৪৭০৬-[১২] ওয়াসিলাহ্ ইবনুল খত্ত্বাব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে উপবিষ্ট ছিলেন। জনৈক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে উপস্থিত হলো। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটু সরে আগন্তুকের জন্য জায়গা করে দিলেন। লোকটি বলল : হে আল্লাহর রসূল! বেশ প্রশস্ত জায়গা রয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ একজন মুসলিমের অবশ্য কর্তব্য যে, যখন সে তার কোন মুসলিম ভাইকে আসতে দেখবে, তখন কিছুটা নড়াচড়া করে তার জন্য জায়গা করে দেবে। [উল্লেখিত হাদীসদ্বয় ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) ’’শু’আবুল ঈমানে’’ বর্ণনা করেছেন।][1]
وَعَن
وَاثِلَة بن الخطابِ قَالَ: دَخَلَ رَجُلٌ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ فِي الْمَسْجِدِ قَاعِدٌ فَتَزَحْزَحَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. فَقَالَ الرَّجُلُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ فِي الْمَكَانِ سَعَةً. فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ لِلْمُسْلِمِ لَحَقًّا إِذَا رَآهُ أَخُوهُ أَنْ يَتَزَحْزَحَ لَهُ» . رَوَاهُمَا الْبَيْهَقِيُّ فِي «شعب الْإِيمَان»
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ হলো, এর সনদে আছে ‘‘মুজালিদ ইবনু ফারকদ’’ নামের একজন বর্ণনাকারী, তার ব্যাপারে ইমাম যাহাবী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘‘আল মুগনী’’ কিতাবে বলেনঃ আল ফিরয়াবী নামের বর্ণনাকারী তার থেকে অনেক মুনকার হাদীস বর্ণনা করেছে। আরেকজন বর্ণনাকারীর নাম ‘আবদুল ওয়াহ্ব ইবনু আয্ যহ্হাক আল হিমসী। তার সম্পর্কে ইমাম যাহাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ সে মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত। মুহাদ্দিসগণ তাকে ত্যাগ করেছেন। বিস্তারিত দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ১৪/১২১৬ পৃঃ, হাঃ ৭১১৭।
ব্যাখ্যাঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভাষ্য (أَنْ يَتَزَحْزَحَ لَهٗ) বর্ণটির অর্থ হলো সে যেন তার ভাইয়ের বসার সুবিধার্থে নড়ে চড়ে বসে। অর্থাৎ কোন মাজলিসে কিংবা কোন আলোচনা সভায় জায়গা সংকীর্ণ হলে চেপে বসে অন্যদেরকে বসার সুযোগ করে দেয়া। কারণ দীনী আলোচনা শোনার অধিকার সকলের সমান। কাজেই অপর মু’মিন ভাইকে বসার সুযোগ ঈমানের দাবী রাখে।
ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ মুস্তাহাব হলো প্রবেশকারীকে সম্মান করা এবং তার বসার সুযোগ করে দেয়া। সহীহ মুসলিমে ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তোমরা মানুষদেরকে বসাও তাদের মর্যাদা অনুযায়ী। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - বসা, ঘুমানো ও চলাফেরা করা
৪৭০৭-[১] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে পবিত্র কা’বাহ্ গৃহের চত্বরে দেখলাম যে, তিনি নিজের দু’ হাত উভয় পায়ের গোছা (হাঁটু খাড়া করে) পরিবেষ্টন করেছিলেন। (বুখারী)[1]
بَابُ الْجُلُوْسِ وَالنَّوْمِ وَالْمَشْىِ
عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِفنَاء الْكَعْبَة مُحْتَبِيًا بيدَيْهِ. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ আলোচ্য হাদীসে (فنَاء الْكَعْبَة) দ্বারা কি উদ্দেশ্য করা হয়েছে তা নিয়ে মুহাদ্দিসগণের নিকট মতবিরোধ রয়েছে। তা নিম্নে বর্ণনা করা হলো :
১. ফাতহুল বারীর প্রণেতা ইবনু হাজার ‘আসকালানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ কা‘বার সামনে দিককে বুঝানো হয়েছে। ২. মুল্লা ‘আলী কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, কা‘বার সম্মুখস্থ প্রশস্ত স্থান। ৩. মিরক্বাতুল মাফাতীহ প্রণেতার মতে, কা‘বার সামনে প্রশস্ত আঙ্গিনাকে বুঝানো হয়েছে। ৪. কারো কারো মতে কা‘বার চারদিকে প্রশস্ত স্থানকে বুঝানো হয়েছে।
(مُحْتَبِيًا بيدَيْهِ) দ্বারা উদ্দেশ্য : ইহতিবা বলা হয়, দু’ হাঁটু উপরে তুলে, উরুকে পেটের সাথে মিলিয়ে দু’ হাত দিয়ে নলা জড়িয়ে ধরে নিতম্বের ওপর বসা। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা এভাবে বসতেন না। এ হাদীস দ্বারা ইহতিবা বৈধতা প্রমাণিত হয়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - বসা, ঘুমানো ও চলাফেরা করা
৪৭০৮-[২] ’আব্বাদ ইবনু তামীম (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর চাচা হতে বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মসজিদের মধ্যে চিৎ হয়ে এক পা অপর পায়ের উপর রেখে শায়িত অবস্থায় দেখেছি। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْجُلُوْسِ وَالنَّوْمِ وَالْمَشْىِ
وَعَن عبَّادِ بن تَمِيم عَنْ عَمِّهِ قَالَ: رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الْمَسْجِدِ مُسْتَلْقِيًا وَاضِعًا إِحْدَى قدمَيه على الْأُخْرَى. مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিৎ হয়ে শুয়ে এক পা অপর পায়ের উপর রেখে শায়িত ছিলেন। এর অর্থ হলো পা লম্বা করে এক পা অপর পায়ের মধ্যে প্রবেশ করা অবস্থায় অথবা একটির উপর অপরটি সোজাসুজিভাবে স্থাপন করে শুয়েছেন। এভাবে শয়ন করলে সতর খুলে যায় না। সুতরাং এরূপ শয়ন করা নিষিদ্ধ নয়। কিন্তু পা খাড়া করে একটিকে অপরটির উপরে রাখা দ্বারা যেহেতু সতর খুলে যাওয়ার আশংকা রয়েছে, তাই তা নিষিদ্ধ। এভাবে শয়ন করা হলে :
১. পায়ের উপর পা রেখে চিৎ হয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লে সতর খুলে যেতে পারে।
২. এতে বুকে পিঠে ব্যথা হতে পারে। ৩. এরূপ শয়ন দেখতে ভদ্রতার পরিপন্থী। এ সমস্ত কারণে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিৎ হয়ে পায়ের ওপর পা রেখে শয়ন করতে নিষেধ করেছেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - বসা, ঘুমানো ও চলাফেরা করা
৪৭০৯-[৩] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন ব্যক্তিকে চিৎ হয়ে শুয়ে এক পা খাড়া করে অপর পা তার উপরে রাখতে নিষেধ করেছেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْجُلُوْسِ وَالنَّوْمِ وَالْمَشْىِ
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَرْفَعَ الرَّجُلُ إِحْدَى رِجْلَيْهِ عَلَى الْأُخْرَى وَهُوَ مُسْتَلْقٍ عَلَى ظَهْرِهِ. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ দু’টি হাদীসের মাঝে দ্বন্দ্ব ও সমাধান: জাবির (রাঃ)-এর হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, চিৎ হয়ে এক পায়ের উপর অপর পা তুলে শয়ন করা নিষিদ্ধ। পক্ষান্তরে ‘আব্বাদ ইবনু তামীম (রাঃ) হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, স্বয়ং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে এরূপ শয়ন করেছেন। সুতরাং বাহ্যিকভাবে উভয় হাদীসে দ্বন্দ্ব পরিলক্ষিত হয়। মুহাদ্দিসগণ যেভাবে সমাধান দিয়েছেন তা নিম্নে বর্ণনা করা হলো :
ক. ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ সম্ভাবনা রয়েছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে চিৎ হয়ে শয়ন করা পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন, যা হারাম বুঝায় না। বরং সাবধানতার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন।
খ. কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ সম্ভবত রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রয়োজনে এভাবে শয়ন করেছিলেন, তার ক্লান্তি দূর করা ক্ষণিকের জন্য ‘আব্বাদ ইবনু তামীম (রাঃ) যেভাবে দেখেছিলেন, সেভাবে শুয়েছিলেন।
গ. ইমাম খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, জাবির (রাঃ)-এর হাদীস ‘আব্বাদ ইবনু তামীম (রাঃ)-এর হাদীস দ্বারা রহিত হয়ে গেছে।
ঘ. তাছাড়া আব্বাদ (রাঃ)-এর হাদীসটি ফে‘লী ও জাবির (রাঃ)-এর হাদীসটি কওলী- এ ধরনের হাদীসদ্বয়ের দ্বন্দ্ব দেখা দিলে কওলী হাদীসকে প্রাধান্য দেয়া হয়।
ঙ. ‘আব্বাদ (রাঃ)-এর হাদীসটি হা-বোধক, আর জাবির (রাঃ)-এর হাদীসটি না-বোধক, এরূপ ক্ষেত্রে না-বোধক হাদীস প্রাধান্য লাভ করে থাকে।
চ. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক পা খাড়া করে তার উপর অপর পা রেখে শয়ন করেননি। হয়তো বা শয়ন করে থাকলেও সাথে সাথে উভয় পা সোজা করেছেন। বর্ণনাকারী যে অবস্থায় দেখেছেন তাই বর্ণনা করেছেন।
মন্তব্য: কাজেই বুঝা গেল চিৎ হয়ে শয়ন করলে সাবধান থাকা চাই। এটা হারাম নয় বরং অনুত্তম। সুতরাং হাদীস দু’টিতে কোন দ্বন্দ্ব নেই। (শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ৪০৯৯; মিরক্বাতুল মাফাতীহ ৪৭০৮ ও ৪৭০৯)
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - বসা, ঘুমানো ও চলাফেরা করা
৪৭১০-[৪] উক্ত রাবী [জাবির (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ কখনো এমনভাবে চিৎ হয়ে শয়ন করবে না যে, এক পা খাড়া করে অপর পা তার উপর থাকে। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْجُلُوْسِ وَالنَّوْمِ وَالْمَشْىِ
وَعَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا يستلقين أحدكُم ثمَّ يضع رجلَيْهِ على الْأُخْرَى» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ চিৎ হয়ে শোয়া বলতে বুঝায় পিঠ নিচে রেখে বুক উপরের দিকে দিয়ে শয়ন করাকে চিৎ হয়ে শয়ন করা বুঝায়। এটা আবার দু’ ধরনের হতে পারে। ক. দুই পা সোজাভাবে বিছিয়ে এক পায়ের উপর অপর পা রাখা। এ অবস্থায় সতর খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই বিধায় এভাবে শয়ন করা জায়িয। খ. চিৎ হয়ে শয়ন করে এক পায়ের হাঁটু খাড়া করে অপর পা তার উপর রাখা এভাবে শয়ন করা সতর খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি বিধায় এরূপ শয়ন করা নিষিদ্ধ। (মিনহাতুল মুসলিম ৭০/২০৯৯)
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - বসা, ঘুমানো ও চলাফেরা করা
৪৭১১-[৫] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একদিন জনৈক ব্যক্তি নকশা করা দু’টি চাদর গায়ে দিয়ে প্রবল অহমিকার সাথে চলছিল এবং এ অবস্থায় তার মধ্যে অহংকার সৃষ্টি করছিল। ফলে এ ব্যক্তিকে জমিনে ধসিয়ে দেয়া হলো, আর এ অবস্থায় সে কিয়ামত পর্যন্ত মাটির গভীরে বিলীন হতে থাকবে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْجُلُوْسِ وَالنَّوْمِ وَالْمَشْىِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «بَيْنَمَا رَجُلٌ يَتَبَخْتَرُ فِي بُرْدَيْنِ وَقد أعجبتْه نَفسه خسف بِهِ لأرض فَهُوَ بتجلجل فِيهَا إِلَى يَوْم الْقِيَامَة» . مُتَّفق عَلَيْهِ. لفصل الثَّانِي
ব্যাখ্যাঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী (بَيْنَمَا رَجُلٌ) শব্দের অর্থ জনৈক ব্যক্তি। এ জনৈক ব্যক্তি দ্বারা কাকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, তা নিয়ে ‘আলিমদের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ উল্লেখিত ব্যক্তি দ্বারা উম্মাতে মুহাম্মাদীর কোন এক ব্যক্তি উদ্দেশ্য হওয়া অসম্ভব নয়। কেউ কেউ বলেন, এ ব্যক্তি ছিল মূসা (আ.)-এর সময়কালের কারূন। সে প্রবল অহংকার করে চলত। আল্লাহ তা‘আলা তার অহংকার চূর্ণ করেছিলেন, কারূন-এর ধ্বংস হওয়া সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘অতঃপর আমি কারূনকে ও তার প্রাসাদকে ভূগর্ভে বিলীন করে দিলাম।’’ (সূরাহ্ আল কাসাস ২৮ : ৮১)
হাদীসের শিক্ষা : এ হাদীস ও কুরআনের আয়াত হতে প্রমাণিত হয় যে, অহংকার অহমিকা ও আত্মগৌরব ইত্যাদির পরিণাম ধ্বংস। সুতরাং সকলকে এটা হতে বাঁচতে হবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বসা, ঘুমানো ও চলাফেরা করা
৪৭১২-[৬] জাবির ইবনু সামুরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাঁর বামপার্শ্বে বালিশে ভর দিয়ে বসতে দেখেছি। (তিরমিযী)[1]
عَن جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ: رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُتَّكِئًا عَلَى وِسَادَةٍ عَلَى يَسَارِهِ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো বামপার্শ্বে ভর দিয়ে বসতেন। এভাবে বসা জায়িয করার জন্য রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বামপার্শ্বে বালিশে ভর দিয়ে দেখিয়েছেন। ইবনু মুলক বলেছেনঃ বামপার্শ্বে ভর দিয়ে বসা মানদূব। ফাতহুল বারীর প্রণেতা ইবনু হাজার (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ বাম-ডান পার্শ্বে এভাবে হেলান দিয়ে বসা মুস্তাহাব। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বসা, ঘুমানো ও চলাফেরা করা
৪৭১৩-[৭] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মসজিদে বসতেন, তখন ইহতিবা করে (হাঁটুদ্বয় খাড়া করে নিতম্ব জমিনে ঠেকিয়ে দু’ হাত দ্বারা দু’ পায়ের গোড়ালিকে জড়িয়ে ধরে) বসতেন। (রযীন)[1]
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا جَلَسَ فِي الْمَسْجِد احتبى بيدَيْهِ. رَوَاهُ رزين
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বসা, ঘুমানো ও চলাফেরা করা
৪৭১৪-[৮] কয়লাহ্ বিনতু মাখরামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মসজিদে কুরফুসা অবস্থায় বসে থাকতে দেখেছি। তিনি আরো বললেনঃ আমি যখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অনুনয়-বিনয়ের চরম অবস্থায় দেখলাম, তখন ভয়-ভীতিতে আমার সমস্ত শরীর কেঁপে উঠল। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن قيلة بنت مخرمَة أَنَّهَا رَأَتْ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الْمَسْجِدِ وَهُوَ قَاعِدٌ الْقُرْفُصَاءَ. قَالَتْ: فَلَمَّا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمُتَخَشِّعَ أُرْعِدْتُ مِنَ الْفَرَقِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ আলোচ্য হাদীস থেকে শিক্ষণীয় বিষয় হলো সালাত শেষ করে হোক বা অন্য কোন প্রয়োজনে হোক মসজিদে বসার পদ্ধতি সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। ১. কুরফুসা পদ্ধতিতে বসা অর্থাৎ দু’ হাঁটু খাড়া করে পেটের সাথে মিলিয়ে দু’ হাত দ্বারা দু’ পায়ের নলা জড়িয়ে ধরে নিতম্ব মাটিতে রেখে বসা। ২. ইহতিবা অবস্থায় বসা ৩. তারাববু তথা হাঁটু খাড়া রেখে মাথা হাঁটুর মধ্যে ঝুকিয়ে নিতম্বের উপর বসা, ৪. সালাতের তাশাহহুদের মতো বসা। মসজিদে বসার বিভিন্ন পদ্ধতি থাকলেও রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিকাংশ সময় তাশাহ্হুদে বসার মতো বসতেন। কেননা এতে বিনয়ী হওয়ার ভাব প্রকাশ পায়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বসা, ঘুমানো ও চলাফেরা করা
৪৭১৫-[৯] জাবির ইবনু সামুরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের সালাত আদায় করে সূর্য ভালোভাবে উদয় না হওয়া পর্যন্ত নিজের স্থানেই চারজানু হয়ে বসে থাকতেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ: كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا صَلَّى الْفَجْرَ تَرَبَّعَ فِي مَجْلِسِهِ حَتَّى تطلع الشَّمْس حسناء. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ উল্লেখিত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের সালাত আদায় করে সালাতের স্থানেই বসে থাকতেন, কতটুকু পরিমাণ সময় বসে থাকতেন- এ নিয়ে ‘উলামার মাঝে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। কেউ কেউ বলেছেন, প্রকাশ্যভাবে সূর্য উদিত হওয়া পর্যন্ত। আবার কেউ বলেছেন, পরিপূর্ণভাবে সূর্য উদিত হওয়া পর্যন্ত। ‘আল্লামা তূরিবিশতী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ প্রথমটি সঠিক। তখন এ বাক্যটির মর্মার্থ হলো, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের সালাত আদায় করার পর সালাতের স্থানেই বসে দু‘আ, তিলাওয়াত ও সাহাবীদের সাথে দীনের কথা বলতে থাকতেন। ভালোভাবে সূর্য উদয় না হওয়া পর্যন্ত। অতঃপর ইশরাকের সালাত আদায় করে মসজিদ হতে বের হতেন। ‘আল্লামা কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তারাববু বসার মতো বসেছিলেন সূর্য পরিষ্কারভাবে না উঠা পর্যন্ত সূর্য উদিত হওয়ার পর সূর্য হতে হলুদ রং দূর হয়ে গেলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জায়গা হতে উঠে যেতেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বসা, ঘুমানো ও চলাফেরা করা
৪৭১৬-[১০] আবূ কতাদাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে কোথাও যখন আরাম করতেন, তখন ডান পাঁজরে ভর দিয়ে ঘুমাতেন। আর যখন ভোর সংলগ্ন সময়ে কোথাও অবস্থান করতেন, তখন বাহু খাড়া করে হাতের তালুর উপর মাথা রেখে বিশ্রাম করতেন। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
وَعَنْ
أَبِي قَتَادَةَ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ إِذَا عَرَّسَ بِلَيْلٍ اضْطَجَعَ عَلَى شِقِّهِ الْأَيْمَنِ وَإِذَا عَرَّسَ قُبَيْلَ الصُّبْحِ نَصَبَ ذِرَاعَهُ وَوَضَعَ رَأْسَهُ عَلَى كَفِّهِ. رَوَاهُ فِي «شَرْحِ السُّنَّةِ»
ব্যাখ্যাঃ বিশ্রাম ও নিদ্রার জন্য মুসাফিরের শেষ রাতে অবস্থান করা, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিয়মনীতি ছিল। সফরের সময় কোথাও বিশ্রাম কিংবা ঘুমানোর জন্য অবস্থান করলে তখন দেখতেন রাত কি পরিমাণ আছে। যদি ভোর হতে দেরী থাকত, তখন তিনি ডান পাজরে কাত হয়ে ঘুমাতেন। মূলত এ পাজরে ঘুমানো ছিল সবসময়ের অভ্যাস। আর যদি ভোর হতে দেরী না থাকত, তখন হাতের কনুইকে মাটিতে ঠেস দিয়ে হাতের তালুর উপর মাথা রেখে ঘুমাতেন। মূলত এ অবস্থায় ঘুমালে যথাসময়ে জাগ্রত হওয়া যায়। ফলে ফজরের সালাত কাযা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। কেননা পাজরে ঘুমালে গভীর নিদ্রায় ডুবে থাকার আশংকা কম থাকে। এজন্য ডান পাজরে শোয়াই সুন্নাহ্। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বসা, ঘুমানো ও চলাফেরা করা
৪৭১৭-[১১] উম্মু সালামাহ্ (রাঃ)-এর বংশধরদের কতিপয় ব্যক্তি হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিছানা এরূপ কাপড়ের ছিল, যেরূপ কাপড়ে তাঁকে কবরে রাখা হয়েছিল, আর মসজিদ তাঁর শিয়রের কাছেই ছিল। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ بَعْضِ
آلِ أُمِّ سَلَمَةَ قَالَ: كَانَ فِرَاشُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَحْوًا مِمَّا يُوضَعُ فِي قَبْرِهِ وَكَانَ الْمَسْجِدُ عِنْد رَأسه. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হাদীসটির বর্ণনাকারীগণ বিশ্বস্ত, তবে ত্রুটিযুক্ত। এটা আমার নিকট ত্রুটিযুক্ত। হাদীসটি উম্মু সালামাহ্ (রাঃ)-এর পরিবারের কতিপয় ব্যক্তি থেকে আবূ ক্বিলাবাহ্ বর্ণনা করেছেন। এই কতিপয় ব্যক্তি যদি সাহাবী হয় তবে তার থেকে তার শ্রবণ তিনি উল্লেখ করেননি। তাদেরকে তার তাদলীস সুপরিচিত। আর যদি সে তাদের থেকে না শুনে তবে সে একজন মুরসাল বর্ণনাকারী। আর এটাই আমার নিকট স্পষ্ট হয়েছে। দেখুন- হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৩৪২ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীসের মাধ্যমে বুঝা যায় যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবন যাপন ছিল সাধারণ। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কখনো বিলাসীভাবে জীবন যাপন করা পছন্দ করতেন না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কখনো এমন পোশাক পরিধান করতেন না যার মাধ্যমে মনের মাঝে অহংকার সৃষ্টি হয়। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাধারণ পোশাক-পরিচ্ছেদ পরিধান করে জীবন যাপন করতেন। যেরূপ সাধারণ পোশাকে তাঁকে দাফন করা হয়েছিল। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বসা, ঘুমানো ও চলাফেরা করা
৪৭১৮-[১২] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে দেখে বললেন, এভাবে শয়ন করা আল্লাহ তা’আলা পছন্দ করেন না। (তিরমিযী)[1]
وَعَن
أبي هريرةَ قَالَ: رَأَى رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَجُلًا مُضْطَجِعًا عَلَى بَطْنِهِ فَقَالَ: «إِنَّ هَذِهِ ضِجْعَةٌ لَا يُحِبُّهَا اللَّهُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ
ব্যাখ্যাঃ এ হাদীসের অর্থ হলো পেটের উপর ভর দিয়ে উপুড় হয়ে শয়ন করা। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে উপুড় হয়ে শয়ন করে ও গভীর ঘুমে মগ্ন থাকার কারণে তাকে সম্বোধন করে বললেন, এ ধরনের শয়ন আল্লাহ তা‘আলা পছন্দ করেন না। ইসলামী শারী‘আতে উপড় হয়ে শয়ন করা নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ। ১. উপুড় হয়ে শয়ন করা আল্লাহ তা‘আলা পছন্দ করেন না। যেমন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীস বলেছেন, এভাবে উপুড় হয়ে শয়ন করাতে আল্লাহ রাগান্বিত হন। ২. উপুড় হয়ে শোয়া জাহান্নামীদের বৈশিষ্ট্য। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নিশ্চয় জাহান্নামীরা এভাবে শয়ন করে। ৩. উপুড় হয়ে শয়ন করলে নাকে-মুখে রক্ত এসে মৃত্যু হতে পারে। ৪. এটা শয়তান ও তার অনুসরীদের শোয়া। ৫. বুক ও মুখমণ্ডলে শরীরের মধ্যে মর্যাদাসম্পন্ন অঙ্গ। তাই সিজদা্ ব্যতীত অন্য কোন অবস্থায় তা নিম্নমুখী করা উচিত নয়। এজন্য রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপুড় হয়ে শয়ন করতে নিষেধ করেছেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বসা, ঘুমানো ও চলাফেরা করা
৪৭১৯-[১৩] ইয়া’ঈশ ইবনু ত্বিখফাহ্ ইবনু কায়স আল-গিফারী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন, তিনি (ত্বিখফাহ্ ইবনু কায়স আল-গিফারী) আসহাবে সুফফাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। তিনি বলেন, আমি একদিন বুকের ব্যথার কারণে উপুড় হয়ে শুয়ে ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি তাঁর পা দ্বারা নাড়া দিয়ে আমাকে বললেনঃ এরূপ শয়নে আল্লাহ তা’আলা অসন্তুষ্ট হন। তখন আমি তাকিয়ে দেখলাম, তিনি স্বয়ং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। (আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ يَعِيشَ
بْنِ طِخْفَةَ بْنِ قَيْسٍ الْغِفَارِيِّ عَن أبيهِ - وَكَانَ مِنْ أَصْحَابِ الصُّفَّةِ - قَالَ: بَيْنَمَا أَنَا مُضْطَجِعٌ مِنَ السَّحَرِ عَلَى بَطْنِي إِذَا رَجُلٌ يحركني بِرجلِهِ فَقَالَ: «هَذِهِ ضِجْعَةٌ يَبْغَضُهَا اللَّهُ» فَنَظَرْتُ فَإِذَا هُوَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যাঃ আহলে সুফফার পরিচয়, বলা হয় যে সকল গরিব সাহাবী মসজিদে নাবাবীর বারান্দায় অবস্থান করতেন তাদেরকে আহলে সুফফাহ্ বলে। তারা জ্ঞান অর্জনের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছিল। দুনিয়ার প্রতি তাদের আসক্তি ছিল না। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট হাদিয়া স্বরূপ যা আসতো তারা তাই আহার করত। এরা সংখ্যায় ৭০ বা তার কিছু বেশি।
(يحركني بِرجلِه) ইসলামী শারী‘আতের সংস্কৃতির প্রবর্তক রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেন শায়িত লোকটিকে পা দিয়ে নাড়াচাড়া করলেন। এরূপ করার রহস্য হলো :
ক. ত্বিখফাহ্ ছিলেন অসুস্থ। একদিন তার ভীষণ বুক ব্যথা হয়। ফলে তিনি মসজিদে নাবাবীতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েন। কারণ উপুড় হয়ে শয়ন করলে বুকে পেটে চাপ পড়লে কিছুটা আরামবোধ হয়। কিন্তু এরূপ শয়ন আল্লাহ তা‘আলা পছন্দ করেন না, তাই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে পা দিয়ে নাড়া দিলেন এবং উপুড় হয়ে না শোয়ার জন্য সতর্ক করলেন। এ মতটি অধিক গ্রহণযোগ্য।
খ. জাহিলী যুগে ‘আরবদের ধারণা ছিল কোন ব্যক্তিকে জীন-ভূত আসর করলে অথবা মৃগী রোগে আক্রান্ত হলে তাকে পা দিয়ে নাড়া দিলে সে ভালো হয়ে যেত। সম্ভবত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কারণেই তাকে পা দিয়ে নাড়া দিয়েছিলেন।
গ. হয়তো বা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাঁটতে গিয়ে তার শরীরে পা লেগে গিয়েছিল।(মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বসা, ঘুমানো ও চলাফেরা করা
৪৭২০-[১৪] ’আলী ইবনু শায়বান (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি রাতে ঘরের ছাদে ঘুমাবে, আর তার উপর কোন আড়াল থাকবে না। অন্য এক বর্ণনায় আছে, যার উপর কোন পাথর অর্থাৎ- পাথরের প্রাচীর থাকবে না, তার উপর আল্লাহ তা’আলার কোন দায়-দায়িত্ব থাকে না। কেননা সে নিজেই নিজেকে বিপদে নিক্ষেপ করেছে। (আবূ দাঊদ)[1]
ইমাম খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ)-এর مَعَالِمُ السُّنَنِ গ্রন্থে حِجَابٌ বা حِجَارٌ-এর স্থলে حِجًىْ উল্লেখিত হয়েছে।
وَعَن
عليِّ بن شَيبَان قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ بَاتَ عَلَى ظَهْرِ بَيْتٍ لَيْسَ عَلَيْهِ حِجَابٌ - وَفِي رِوَايَةٍ: حِجَارٌ - فَقَدْ بَرِئَتْ مِنْهُ الذِّمَّةُ «. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ. وَفِي» مَعَالِمِ السّنَن «للخطابي» حجى
ব্যাখ্যাঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী : (فَقَدْ بَرِئَتْ مِنْهُ الذِّمَّةُ) আল্লাহ তা‘আলা বান্দাদের নিরাপত্তা ও হিফাযাতের দায়িত্ব নিয়েছেন। কিন্তু বান্দা যদি নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয় তখন আল্লাহ তা‘আলা দায়িত্বমুক্ত হয়ে যান। এ উক্তির মাধ্যমে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝিয়েছেন যে, যে স্থানে অসুবিধা বা মৃত্যু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এমন স্থানে তোমরা শয়ন করা থেকে বিরত থাকবে। কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি এরূপ ঘরের ছাদে ঘুমাবে আর তার উপর কোন আড়াল থাকবে না, সে যেন নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিল নিজের জানের নিরাপত্তাকে দূরে নিক্ষেপ করল। এ অবস্থায় নিচে পড়ে মৃত্যুবরণ করলে তা আত্মহত্যারই নামান্তর। অথচ এটা হারাম। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বসা, ঘুমানো ও চলাফেরা করা
৪৭২১-[১৫] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন ব্যক্তিকে এমন ছাদের উপর শয়ন করতে নিষেধ করেছেন, যেখানে পর্দার অন্তরাল না থাকে। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ جَابِرٍ
قَالَ: نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَنَامَ الرَّجُلُ عَلَى سطحٍ لَيْسَ بمحجورٍ عَلَيْهِ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীসের মাধ্যমে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাদের উপর শয়ন করতে নিষেধ করেছেন। চাই তা রাতে হোক বা দিনে হোক যে সমস্ত ছাদের বেষ্টন বা দেয়াল নেই। ছাদ হতে নিচে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সতর্কতার জন্য সে সকল ছাদে ঘুমাতে নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ সর্বদা মুসলিমগণ নিজের জানের ব্যাপারে সতর্ক থাকবে। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ৪৭২১; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বসা, ঘুমানো ও চলাফেরা করা
৪৭২২-[১৬] হুযায়ফাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সে ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুখেই অভিশপ্ত হয়েছে, যে ব্যক্তি হালকার (পরিধির) মাঝখানে গিয়ে বসে। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن
حذيفةَ قَالَ: مَلْعُونٌ عَلَى لِسَانِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ قَعَدَ وَسْطَ الْحَلْقَةِ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এর সানাদটি য‘ঈফ, তার দু’টি কারণ, এক- শরীক। তিনি হলেন ‘‘ইবনু ‘আবদুল্লাহ আল কাযী’’, ইনি য‘ঈফ রাবী। দুই- আবূ মিজলায ও হুযায়ফাহ্ (রাঃ)-এর মাঝে ইনক্বিতা‘ বা বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ২/৯৭ পৃঃ, হাঃ ৬৩৮।
ব্যাখ্যাঃ উল্লেখিত হাদীসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী : (وَسْطَ الْحَلْقَةِ) দ্বারা উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইমাম খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ এর দ্বারা দু’টির মধ্যে যে কোন একটি হতে পারে।
ক. মানুষ যে স্থানে বৃত্তাকারে বসে আলোচনা করতে থাকে এমন মাজলিসের মধ্যস্থলে বসা, মাজলিসের ফাঁকা স্থানে না বসা।
খ. উক্ত পরিধির মাঝে এমনভাবে বসা যে, তার কারণে একে অপরের মুখ দেখতে পায় না। উভয় প্রকার বসাই দূষণীয় এবং আদাবে মাজলিসের পরিপন্থী। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বসা, ঘুমানো ও চলাফেরা করা
৪৭২৩-[১৭] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ উত্তম মাজলিস তাই যা প্রশস্ত জায়গায় অনুষ্ঠিত হয়। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ
أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «خَيْرُ الْمَجَالِسِ أَوْسَعُهَا» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বসা, ঘুমানো ও চলাফেরা করা
৪৭২৪-[১৮] জাবির ইবনু সামুরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন সাহাবায়ে কিরাম বসেছিলেন। (এ সময়) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে বললেনঃ কি হলো? তোমাদেরকে বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত অবস্থায় দেখছি! (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن
جَابر بن سَمُرَة قَالَ: جَاءَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَصْحَابُهُ جُلُوسٌ فَقَالَ: «مَا لِي أَرَاكُمْ عِزينَ؟» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী (مَا لِي أَرَاكُمْ عِزينَ؟) কি হলো তোমাদেরকে বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত অবস্থায় বসে থাকতে দেখছি। এর দ্বারা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদ্দেশ্য করেছেন তোমরা এভাবে পৃথক পৃথক হয়ে বিচ্ছিন্নভাবে বসবে না। বরং তোমরা সুন্দরভাবে সারিবদ্ধ হয়ে বসবে। অথবা গোলাকার হয়ে বসবে। ঐক্যবদ্ধ হয়ে সুশৃঙ্খল বৈঠক হবে সর্বোত্তম বৈঠক। দলবদ্ধ হওয়ার জন্য আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘‘তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ করো পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’’ (সূরাহ্ আ-লি ‘ইমরান ৩ : ১০৩)
বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে বসা কাফিরদের বসার সাথে সাদৃশ্য রাখে। এই মর্মে মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন : ‘‘অতএব, কাফিরদের কি হলো যে, তারা আপনার দিকে ছুটে আসছে ডান ও বাম দিক থেকে দলে দলে।’’ (সূরাহ্ আল মা‘আরিজ ৭০ : ৩৬-৩৭)
সুফ্ইয়ান (রহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেছেন, গোলাকার হয়ে বসা উত্তম। এলোমেলোভাবে বসার কারণে পরস্পরে মনোমালিন্য হতে পারে। যা ইসলামে অত্যন্ত ঘৃণিত। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বসা, ঘুমানো ও চলাফেরা করা
৪৭২৫-[১৯] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যখন ছায়ায় বসে, পরে তার উপর হতে ছায়া চলে যায় এবং এ অবস্থায় তার শরীরের কিছু অংশ রোদে এবং কিছু অংশ ছায়ায় থাকে, তবে সে যেন সেখান থেকে উঠে চলে যায়। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ
أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِذَا كَانَ أَحَدُكُمْ فِي الْفَيْء فقلص الظِّلُّ فَصَارَ بَعْضُهُ فِي الشَّمْسِ وَبَعْضُهُ فِي الظل فَليقمْ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীসের ব্যাখ্যায় ডাক্তারগণ গবেষণা করে বের করেছেন, শরীরে কিছু অংশ রোদে আর কিছু অংশ ছায়ায় থাকলে, মানুষের দেহে ও মেজাজে যথেষ্ট ক্ষতি হতে পারে। এতে কুষ্ঠরোগ, চর্মরোগ দেখা দিতে পারে। এছাড়া মানসিক দিক দিয়ে মেজাজ খিটখিটে ও চঞ্চল হয়ে পড়ে, ফলে কোন ভালো কাজের উদ্যম থাকে না তাই এরূপ স্থানে বসতে নিষেধ করা হয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বসা, ঘুমানো ও চলাফেরা করা
৪৭২৬-[২০] শারহুস্ সুন্নাহ্ গ্রন্থে উক্ত আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যখন ছায়ায় বসে অতঃপর তার উপর হতে ছায়া চলে যায়, তবে সে যেন উঠে চলে যায়। কেননা এটা (কিছু অংশ ছায়ায় আর কিছু অংশ রোদে) শয়তানের বসার স্থান। মা’মার এ হাদীসটি মাওকূফ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।[1]
وَفِي «
شرح السّنة» عَنهُ. قَالَ: «وَإِذا كَانَ أَحَدُكُمْ فِي الْفَيْءِ فَقَلَصَ عَنْهُ فَلْيَقُمْ فَإِنَّهُ مَجْلِسُ الشَّيْطَانِ» . هَكَذَا رَوَاهُ مَعْمَرٌ مَوْقُوفًا
ব্যাখ্যাঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উক্তি (فَلْيَقُمْ فَإِنَّهٗ مَجْلِسُ الشَّيْطَانِ) রৌদ্র ছায়ায় বসা থেকে সে যেন উঠে যায়। কেননা এটা শয়তানের মাজলিস, এর ব্যাখ্যা হলো :
ক. মূলত এরূপ রৌদ্র ছায়ায় মিলন মোহনায় শয়তান আসর জমায়। তাই এখানে বসতে নিষেধ করা হয়েছে। খ. এরূপ স্থানে বসতে শয়তান মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে। কারণ শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। গ. রৌদ্র ছায়ায় বসলে মানুষের শরীরে প্রাকৃতিক প্রভাব পড়বে যাতে তার মারাত্মক ব্যাধি হতে পারে। ঘ. এরূপ স্থানে বসলে দেহে দু’টি রং বা বর্ণের প্রতিফলন ঘটে যা কেবল শয়তানের স্বভাব। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বসা, ঘুমানো ও চলাফেরা করা
৪৭২৭-[২১] আবূ উসায়দ আল আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদ হতে বের হচ্ছিলেন, এ সময় রাস্তায় পুরুষগণ মহিলাদের সাথে মিশে চলছিল। এমতাবস্থায় তিনি শুনেছেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাদের উদ্দেশে বললেনঃ তোমরা পুরুষদের পেছনে চলো। রাস্তার মধ্যখান দিয়ে চলা তোমাদের জন্য সমীচীন নয়। এ কথা শুনে মহিলারা প্রাচীর ঘেঁষে চলতে লাগল। এতে কখনো কখনো তাদের কাপড় প্রাচীরের সাথে আটকে যাচ্ছিল। (আবূ দাঊদ ও বায়হাক্বী শু’আবুল ঈমানে)[1]
وَعَن أبي
أُسيد الأنصاريِّ أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ وَهُوَ خَارِجٌ مِنَ الْمَسْجِدِ فَاخْتَلَطَ الرجالُ مَعَ النِّسَاء فِي الطَّرِيق فَقَالَ النِّسَاء: «اسْتَأْخِرْنَ فَإِنَّهُ لَيْسَ لَكُنَّ أَنْ تُحْقِقْنَ الطَّرِيقَ عَلَيْكُنَّ بِحَافَاتِ الطَّرِيقِ» . فَكَانَتِ الْمَرْأَةُ تَلْصَقُ بِالْجِدَارِ حَتَّى إِنَّ ثَوْبَهَا لَيَتَعَلَّقُ بِالْجِدَارِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ»
ব্যাখ্যাঃ আলোচ্য হাদীসের মাধ্যমে বুঝা যায় যে, ইসলামী শারী‘আত অনুমতি দিয়েছে যে, মহিলারাও মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করতে পারবে। সর্বাবস্থায়ই নারী-পুরুষ মিলেমিশে রাস্তায় চলাফেরা করা হতে নিষেধ করা হয়েছে। মহিলাগণ পর্দা করে চলাফেরা করবে। পুরুষগণ আগে যাবে মহিলারা তাদের পিছনে, রাস্তার একপাশ দিয়ে যাবে। এতে তাদের মান-সম্মান রক্ষা পাবে, কখনো রাস্তার মাঝখান দিয়ে চলবে না। এ হাদীস থেকে বুঝা যায় নারীগণ রাস্তার একপাশ দিয়ে হিজাবসহ শালীনতার সাথে চলবে। তাহলে সমাজে তাদের সম্মান বৃদ্ধি পাবে। অন্যথায় তারা হবে ঘৃণিত। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বসা, ঘুমানো ও চলাফেরা করা
৪৭২৮-[২২] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন ব্যক্তিকে দু’জন মহিলার মাঝখানে হাঁটতে নিষেধ করেছেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنِ
ابْنِ عُمَرَ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم نهى أنْ يمشيَ - يَعْنِي الرجلٌ - بَين المرأتينِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি মাওযূ‘ হওয়ার কারণ হলো, এর সনদে আছে ‘‘দাঊদ ইবনু আবূ সালিহ আল মাদানী’’ নামের বর্ণনাকারী। ইবনু হিব্বান বলেনঃ সে হাদীস জাল করত। বিস্তারিত দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ৩৭৫, শু‘আবুল ঈমান ৫৪৪৬, য‘ঈফুল জামি‘ ১৪১৯২।
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বসা, ঘুমানো ও চলাফেরা করা
৪৭২৯-[২৩] জাবির ইবনু সামুরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে উপস্থিত হতাম, তখন শেষের দিকের খালি জায়গায় বসে পড়তাম। (আবূ দাঊদ)[1]
(গ্রন্থকার বলেন, ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ)-এর হাদীসদ্বয় بَابِ الْقِيَامِ-এ বর্ণিত হয়েছে এবং أَسْمَاءِ النَّبِىِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَصِفَاتِه অধ্যায়ে ’আলী (রাঃ) ও আবূ হুরায়রা (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীস ইনশা-আল্লাহ বর্ণনা করব।)
وَعَن جابرِ
بن سمرةَ قَالَ: كُنَّا إِذَا أَتَيْنَا النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جَلَسَ أَحَدُنَا حَيْثُ يَنْتَهِي. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
وَذكر حَدِيثا عبد الله بن عَمْرٍو فِي «بَابِ الْقِيَامِ»
وَسَنَذْكُرُ حَدِيثَ عَلِيٍّ وَأَبِي هُرَيْرَةَ فِي «بَابِ أَسْمَاءِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَصِفَاتِهِ» إِنْ شَاءَ اللَّهُ تَعَالَى
ব্যাখ্যাঃ এ হাদীস থেকে বসার আদব, শিষ্টাচার প্রমাণিত হয় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী (جَلَسَ أَحَدُنَا حَيْثُ يَنْتَهِي) এ বাক্যটির দু’টি অর্থ হতে পারে।
১. আমরা মাজলিসের সে স্থানে বসতাম, যেখানে সম্মুখ হতে লোকেদের বসা শেষ হয়েছে। ২. আমরা মাজলিসের প্রান্তসীমায় বসতাম। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - বসা, ঘুমানো ও চলাফেরা করা
৪৭৩০-[২৪] ’আমর ইবনু শারীদ (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট দিয়ে গমন করলেন। তখন আমি এভাবে বসেছিলাম যে, আমার বাম হাত আমার পিঠের উপর ছিল এবং ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলির গোড়ার মাংসের উপরে আমি ভর করেছিলাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে এ অবস্থায় দেখে বললেনঃ তুমি কি এমনভাবে বসছ যেভাবে আল্লাহর অভিশপ্ত ব্যক্তিরা বসে? (আবূ দাঊদ)[1]
عَن عمْرِو
بن الشَّريدِ عَن أبيهِ قَالَ: مَرَّ بِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَنَا جَالِسٌ هَكَذَا وَقَدْ وَضَعْتُ يَدِي الْيُسْرَى خَلْفَ ظَهْرِي وَاتَّكَأْتُ عَلَى أَلْيَةِ يَدِي. قَالَ: «أَتَقْعُدُ قِعْدَةَ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ আলোচ্য হাদীসের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, এক হাতকে পিছনে রেখে অপর হাতের উপর ভর করে বসা অপছন্দনীয়। তেমনিভাবে উভয় হাত পিছনে রেখে তার উপর ভর করে বসাও অপছন্দ। কেননা এভাবে অহংকারীরা বসে। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ হাদীসে (الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ) দ্বারা ইয়াহূদীদেরকে বুঝানো হয়েছে। এ সম্পর্কে হাদীস বর্ণিত রয়েছে। ‘আদী ইবনু হাতিম বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ইয়াহূদীরা অভিশপ্ত নাসারাগণ পথভ্রষ্ট। (তিরমিযী হাঃ ২৯৫৪)
ইয়াহূদীদের কথা উল্লেখ করার জন্য দু’টি হিকমাত রয়েছে। যথা :
ক. আল্লাহ তা‘আলা যেমনিভাবে ইয়াহূদীদের অবাধ্যতার কারণে তাদের ওপর অসন্তুষ্ট তেমনিভাবে উল্লেখিত নিয়মে বসার প্রতিও অসন্তুষ্ট। খ. এটার মাধ্যমে এ কথার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, মুসলিম জাতি এমন এক জাতি যাদের প্রতি আল্লাহ তা‘আলা অসংখ্য নি‘আমাত নাযিল করেছেন। সুতরাং তাদের পক্ষ এমন এক জাতির অনুকরণ করা উচিত নয় যাদের ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত বর্ষিত হয়েছে। আর মুসলিমগণের উচিত এভাবে বসা থেকে বিরত থাকা। কেননা আল্লাহ তা‘আলা মুসলিমদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং ইয়াহূদীদের অনুকরণ করা হতে নিষেধ করেছেন। তাদের অনুসরণ করলে তাদের মতো গজব নাযিল হবে মুসলিমদের প্রতি। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - বসা, ঘুমানো ও চলাফেরা করা
৪৭৩১-[২৫] আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উপুড় হয়ে শুয়েছিলাম। এ সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তিনি স্বীয় পা দ্বারা আমাকে ঠোকা দিয়ে বললেনঃ হে জুনদূব! (আবূ যার (রাঃ)-এর নাম) শোয়ার এ পদ্ধতি জাহান্নামবাসীদের পদ্ধতি। (ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَن أبي
ذرِّ قَالَ: مرَّ بِي النبيُّ وَأَنَا مُضْطَجِعٌ عَلَى بَطْنِي فَرَكَضَنِي بِرِجْلِهِ وَقَالَ: «يَا جُنْدُبُ إِنَّمَا هِيَ ضِجْعَةُ أَهْلِ النَّارِ» . رَوَاهُ ابنُ مَاجَه
ব্যাখ্যাঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (إِنَّمَا هِيَ ضِجْعَةُ أَهْلِ النَّارِ) উপুড় হয়ে শোয়া জাহান্নামবাসীদের শোয়ার পদ্ধতি। তিনি এ বক্তব্যের মাধ্যমে এ কথার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন যে, কাফির ও পাপাচারী লোকেরা এভাবে শয়ন করে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - হাঁচি দেয়া এবং হাই তোলা
৪৭৩২-[১] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা হাঁচিকে পছন্দ করেন এবং হাই তোলাকে অপছন্দ করেন। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যখন কোন ব্যক্তি হাঁচি দেয় এবং ’’আলহামদুলিল্লা-হ’’ বলে আল্লাহর প্রশংসা করে, তখন এমন প্রত্যেক মুসলিমের প্রতি ’’ইয়ারহামুকাল্ল-হ’’ বলা অপরিহার্য হয়ে পড়ে, যে হাঁচিদাতার ’’আলহামদুলিল্লা-হ’’ শুনতে পায়। আর হাই তোলা শয়তানের কাজ। অতএব তোমাদের কারো যখন হাই আসে, তখন যথাসম্ভব তা প্রতিরোধ করা উচিত। কারণ যখন কোন ব্যক্তি হাই তোলে, তখন শয়তান তা দেখে হাসতে থাকে। (বুখারী)[1]
মুসলিম-এর এক বর্ণনায় রয়েছে যে, তোমাদের কেউ যখন হাই তোলার সময় ’হা’ করে, তখন শয়তান তা দেখে হাসতে থাকে।
بَابُ الْعُطَاسِ وَالتَّثَاؤُبِ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْعُطَاسَ وَيَكْرَهُ التَّثَاؤُبَ فَإِذَا عَطَسَ أَحَدُكُمْ وَحَمِدَ اللَّهَ كَانَ حَقًّا عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ سَمِعَهُ أَنْ يَقُولَ: يَرْحَمُكَ اللَّهُ. فَأَمَّا التَّثَاؤُبُ فَإِنَّمَا هُوَ مِنَ الشَّيْطَان فَإِذا تثاءب أحدكُم فليرده مااستطاع فَإِنَّ أَحَدَكُمْ إِذَا تَثَاءَبَ ضَحِكَ مِنْهُ الشَّيْطَانُ . رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ
وَفِي رِوَايَةٍ لِمُسْلِمٍ: فَإِنَّ أَحَدَكُمْ إِذا قَالَ: هَا ضحك الشَّيْطَان مِنْهُ
ব্যাখ্যাঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উক্তি (إِنَّ اللهَ يُحِبُّ الْعُطَاسَ وَيَكْرَهُ التَّثَاؤُبَ) অর্থাৎ- আল্লাহ তা‘আলা হাঁচিকে ভালোবাসেন আর হাই তোলাকে অপছন্দ করেন। এর কারণ হচ্ছে : হাঁচির দ্বারা অনেক উপকার রয়েছে। যথা : ১. হাঁচি দ্বারা মস্তিষ্কের নিষ্ক্রিয়তা ও ক্লেশ দূর হয়। ২. মন সতেজ ও তরতাজা হয়। ৩. মস্তিষ্ক হতে ময়লা বের হয়ে আসে। ৪. অনুভূতি শক্তি প্রখর হয়। ৫. মানুষের মনের অলসতা কেটে প্রফুল্লতা ফিরে আসে। ৬. এটা আল্লাহর বিশেষ এক নি‘আমাত। ৭. এর ফলে ‘ইবাদাতে, কাজে-কর্মে, উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার সৃষ্টি হয়। কাজে হাঁচি আসাতে আল্লাহর প্রশংসা করা উচিত। এজন্য আল্লাহ তা‘আলা হাঁচিকে ভালোবাসেন। আল্লাহ তাআলা হাই তোলাকে অপছন্দ করেন। এরূপ অপছন্দের কিছু কারণ রয়েছে নিম্নে তা বর্ণনা করা হলো :
১. হাই তোলা শয়তানের কাজ। ২. হাই সাধারণত চরম ক্লান্তি ও অলস্যের নিদর্শন। ৩. এটা ‘ইবাদাতে ও কাজ-কর্মে সর্বদা বিঘ্ন ঘটায়। ৪. হাই মস্তিষ্কে জড়তা সৃষ্টি করে এবং অনুভূতি ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে ব্যক্তি অকর্মণ্য হয়ে পড়ে। ৫. হাই তোলার সাথে সাথে শরীর নিস্তেজ হয়ে আসে। ফলে প্রয়োজনীয় কর্তব্য ও আবশ্যকীয় কাজ রেখেই মানুষ কখনো কখনো ঘুমিয়ে পড়ে এবং তা দেখে শয়তান খুশি হয়। এ সকল কারণেই আল্লাহ তা‘আলা হাই তোলাকে অপছন্দ করেন।
হাঁচির জবাব : কেউ কেউ বলেছেন, হাঁচির জবাবে ‘আলহাম্দুলিল্লা-হ’ বললে তার জবাবে ‘ইয়ারহামুকাল্ল-হ’ বলা ফরযে ‘আইন। আবার কেউ কেউ বলেছেন, ফরযে কিফায়াহ্ এই মত অধিকাংশ ‘আলিমগণ পোষণ করেছেন। ইমাম শাফি‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ হাঁচির জবাব দেয়া সুন্নাত।
হাদীসের অংশ (ضَحِكَ مِنْهُ الشَّيْطَانُ) এর বিশ্লেষণ : রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হাই তোলার কারণে শয়তান হাসে। কেননা, উদরপূর্তিজনিত শারীরিক ক্লান্তি হতেই হাইয়ের উৎপত্তি। আর হাই ‘ইবাদাত ও আনুগত্যের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। যা শয়তানের একান্ত কামনা। সুতরাং কেউ হাই তুললে শয়তান অত্যন্ত খুশি হয়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
আবূ সা‘ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, যখন তোমাদের কারো হাই আসে সে তার হাত মুখে রাখবে কেননা শয়তান তার মুখের ভিতর প্রবেশ করে। (আল জামি‘উস্ সগীর ১/৩৮, হাঃ ৫১৬)
আবূ হুরায়রা হতে বর্ণিত, যখন তোমাদের কেউ হাঁচি দেয় সে যেন হাতের তালু চেহারায় রাখে এবং আওয়াজ হালকা, আস্তে করে। (হাকিম ৪/২৬৪, বায়হাক্বী)
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - হাঁচি দেয়া এবং হাই তোলা
৪৭৩৩-[২] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন তোমাদের কারো হাঁচি আসে, তখন সে যেন ’’আলহামদুলিল্লা-হ’’ বলে এবং তার কোন মুসলিম ভাই অথবা বন্ধু তার উত্তরে ’’ইয়ারহামুকাল্ল-হ’’ বলে। আর যখন হাঁচিদাতার উত্তরে শ্রোতা ব্যক্তি ’’ইয়ারহামুকাল্ল-হ’’ বলে, তখন হাঁচিদাতা ঐ ব্যক্তির উত্তরের উত্তরে ’’ইয়াহদীকুমুল্ল-হু ওয়া ইউসলিহু বা-লাকুম’’ অর্থাৎ- ’’আল্লাহ তা’আলা তোমাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন এবং তোমাদের আধ্যাত্মিক অবস্থা কল্যাণময় করুন’’ বলবে। (বুখারী)[1]
بَابُ الْعُطَاسِ وَالتَّثَاؤُبِ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: إِذا عطسَ أحدُكم فلْيقلِ: الحمدُ لِلَّهِ وَلْيَقُلْ لَهُ أَخُوهُ - أَوْ صَاحِبُهُ - يَرْحَمُكَ اللَّهُ. فإِذا قَالَ لَهُ يَرْحَمك الله قليقل: يهديكم الله وَيصْلح بالكم رَوَاهُ البُخَارِيّ
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - হাঁচি দেয়া এবং হাই তোলা
৪৭৩৪-[৩] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, দু’ ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে হাঁচি দিলো। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এক ব্যক্তির হাঁচির জবাব দিলেন, অপর ব্যক্তির জবাব দিলেন না। লোকটি বলল : হে আল্লাহর রসূল! আপনি এ ব্যক্তির জবাব দিলেন; কিন্তু আমার জবাব দিলেন না। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ ব্যক্তি ’’আলহামদুলিল্লা-হ’’ বলেছিল, আর তুমি ’’আলহামদুলিল্লা-হ’’ বলনি। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْعُطَاسِ وَالتَّثَاؤُبِ
وَعَن أنسٍ قَالَ: عَطَسَ رَجُلَانِ عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَشَمَّتَ أَحَدَهُمَا وَلَمْ يُشَمِّتِ الْآخَرَ. فَقَالَ الرَّجُلُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ شَمَّتَّ هَذَا وَلَمْ تُشَمِّتْنِي قَالَ: «إِنَّ هَذَا حَمِدَ اللَّهَ وَلم تحمَدِ الله» . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ আলোচ্য হাদীস হতে জানা যায় যে, হাঁচি আসলে হাঁচিদাতার ‘‘আলহামদুলিল্লা-হ’’ বলতে হবে। এর হিকমাত হলো, হাঁচি আল্লাহ তা‘আলার এক বিশেষ নি‘আমাত। কেননা হাঁচি দ্বারা মস্তিষ্কের নিস্ক্রিয়তা দূরীভূত হয় এবং শারীরিক জড়তা কেটে যায়। ফলে কাজ কর্মে ও ‘ইবাদাতে উৎসাহ, আগ্রহ সৃষ্টি হয় এবং মনে প্রফুল্লতা আসে। তাই আল্লাহর নি‘আমাতের কৃতজ্ঞাতাস্বরূপ হাঁচিদাতাকে ‘‘আলহামদুলিল্লা-হ’’ বলতে হয়।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী : ‘‘ইয়াহদীকুমুল্ল-হু ওয়া ইউসলিহু বা-লাকুম’’ বলার গুরুত্ব : হাঁচিদাতা ‘আলহামদুলিল্লা-হ’ বলার পর শ্রোতা যখন ‘‘ইয়ারহামুকাল্ল-হ’’ বলে দু‘আ করল তখন হাঁচি প্রদানকারীর কর্তব্য হলো তার চেয়ে আরো উত্তম দু‘আর মাধ্যমে শ্রোতার কল্যাণ কামনা করবে আর মানুষের সবচেয়ে বড় কল্যাণ হলো হিদায়াতপ্রাপ্ত হওয়া। কেননা হিদায়াতই পরকালীন মুক্তির একমাত্র পথ। হাঁচিদাতার জবাব দেয়া প্রসঙ্গে ‘উলামাদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, ‘‘ইয়াহদীকুমুল্ল-হু ওয়া ইউস্লিহু বা-লাকুম’’। আবার কেউ বলেছেন, ‘‘ইয়াগফিরুল্ল-হু লানা- ওয়ালাকুম’’।
ইমাম শাফি‘ঈ ও ইমাম মালিক (রহিমাহুমাল্লাহ) বলেছেনঃ হাঁচির জবাব দেয়া ফরযে কিফায়াহ্। কেউ কেউ বলেছেন সুন্নাহ, ওয়াজিব নয়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - হাঁচি দেয়া এবং হাই তোলা
৪৭৩৫-[৪] আবূ মূসা আল আশ্’আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে, তোমাদের কেউ যদি হাঁচি দেয় এবং আল্লাহর প্রশংসা করে, তবে তোমরা তার জবাবে ’’ইয়ারহামুকাল্ল-হ’’ বলবে। আর যদি সে আল্লাহর প্রশংসা না করে, তবে তোমরা ’’ইয়ারহামুকাল্ল-হ’’ বলে জবাব দেবে না। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْعُطَاسِ وَالتَّثَاؤُبِ
وَعَنْ أَبِي مُوسَى قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «إِذَا عَطَسَ أَحَدُكُمْ فَحَمِدَ اللَّهَ فَشَمِّتُوهُ وَإِنْ لَمْ يَحْمَدِ اللَّهَ فَلَا تُشَمِّتُوهُ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ উল্লেখিত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কোন ব্যক্তি যদি হাঁচি প্রদান করে আলহাম্দুলিল্লা-হ বলে তা যদি কেউ শ্রবণ করে তাহলে তার জবাবে ইয়ারহামুকাল্ল-হ বলবে, অন্যথায় যদি সে আলহামদুলিল্লা-হ না বলে তাহলে তাকে ইয়ারহামুকাল্ল-হ বলতে হবে না। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - হাঁচি দেয়া এবং হাই তোলা
৪৭৩৬-[৫] সালামাহ্ ইবনুল আকওয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত। জনৈক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটে হাঁচি দিলো, তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার জবাবে ’’ইয়ারহামুকাল্ল-হ’’ বললেন। অতঃপর লোকটি দ্বিতীয়বার হাঁচি দিলো। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ লোকটি কফ-সর্দিতে আক্রান্ত হয়েছে। (মুসলিম)[1]
তিরমিযী’র এক বর্ণনায় আছে, লোকটির তৃতীয়বার হাঁচির সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ লোকটি কফ-সর্দিতে আক্রান্ত হয়েছে।
بَابُ الْعُطَاسِ وَالتَّثَاؤُبِ
وَعَن سلمةَ بن الْأَكْوَع أَنَّهُ سَمِعَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَعَطَسَ رَجُلٌ عِنْدَهُ فَقَالَ لَهُ: «يَرْحَمُكَ اللَّهُ» ثُمَّ عَطَسَ أُخْرَى فَقَالَ: «الرَّجُلُ مَزْكُومٌ» . رَوَاهُ مُسلم وَفِي رِوَايَة التِّرْمِذِيّ أَنَّهُ قَالَ لَهُ فِي الثَّالِثَةِ: «إِنَّهُ مَزْكُومٌ»
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীস সম্পর্কে বিভিন্ন মনীষীগণের উক্তি রয়েছে। কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হাঁচিদাতা যদি ‘‘আলহামদুলিল্লা-হ’’ বলে তবুও সে দু‘আ পাওয়ার দাবিদার। মাকহূল (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ একদিন আমি আমীরুল মু’মিনীন ‘উমার ইবনুল খত্ত্বাব (রাঃ)-এর নিকটে ছিলাম। এ সময়ে মসজিদের এক পাশে কোন এক ব্যক্তি হাঁচি দিল। তখন ‘উমার (রাঃ) বলেন, ‘‘ইয়ারহামুকাল্ল-হ’’ আল্লাহ তা‘আলা তোমার প্রতি অনুগ্রহ দান করুক। কেননা তুমি আল্লাহর প্রশংসা করেছ। ইমাম শা‘বী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, যদি কোন ব্যক্তি দেয়ালের পিছন থেকে হাঁচি দিয়ে ‘‘আলহামদুলিল্লা-হ’’ বলে আর তুমি তা শুনতে পাও তবে তুমি ‘‘ইয়ারহামুকাল্ল-হ’’ বলবে। ইবরাহীম নাখ‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ তুমি যদি হাঁচি দিয়ে ‘‘আলহামদুলিল্লা-হ’’ বল। কিন্তু তোমার কাছে অন্য কেউ না থাকে তখন তুমি বলবে ‘‘ইয়াগফিরুল্ল-হু লানা- ওয়ালাকুম’’। তোমার হাঁচির জবাবে মালাক (ফেরেশতা) ‘‘ইয়ারহামুকাল্ল-হ’’ বলেছেন, কারণ মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) সব সময় মানুষের সাথে আছেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - হাঁচি দেয়া এবং হাই তোলা
৪৭৩৭-[৬] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন তোমাদের কারো হাই আসে, সে যেন নিজের হাত মুখের উপর রাখে। কেননা শয়তান মুখে প্রবেশ করে। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْعُطَاسِ وَالتَّثَاؤُبِ
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيُّ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ
: «إِذَا تَثَاءَبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَمْسِكْ بِيَدِهِ عَلَى فَمه فإِنَّ الشيطانَ يدخلُ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীসে উল্লেখিত একটি বাক্য (فإِنَّ الشيطانَ يدخلُ) এর উদ্দেশ্য এটাও হতে পারে যে, শয়তান প্রকৃতভাবেই মানুষের মুখে প্রবেশ করে। কেননা শয়তান আল্লাহ তা‘আলার নিকট অনুমিত নিয়েছে যে, আদম সন্তানের শিরা উপশিরায় চলাচলের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হাঁচি দেয়া এবং হাই তোলা
৪৭৩৮-[৭] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যখন হাঁচি আসত, তখন তিনি নিজের হাত বা কাপড় দ্বারা মুখ ঢেকে ফেলতেন এবং হাঁচির শব্দকে নিচু রাখতেন। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান ও সহীহ।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ إِذَا عَطَسَ غَطَّى وَجْهَهُ بِيَدِهِ أَوْ ثَوْبِهِ وَغَضَّ بِهَا صَوْتَهُ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ. وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيح
ব্যাখ্যাঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী : (غَطَّى وَجْهَهٗ بِيَدِه أَوْ ثَوْبِه) এর মর্মার্থ হলো, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হাঁচি দিতেন তখন স্বীয় হাত কিংবা কাপড় দ্বারা চেহারা আবৃত করে রাখতেন। এটা এজন্য যে, একদিকে মাজলিসের আদব রক্ষেত হয় এবং অন্যদিকে হাঁচি দেয়ার সময় মানুষের চেহারা এমন অস্বাভাবিক হয়ে যায় যা অপরের কাছে খারাপ লাগতে পারে। তাই মানুষের দৃষ্টি আড়াল করার জন্য চেহারা ঢেকে নেয়া হয়। আবার মুখে যদি হাত বা কাপড় না দেয়া হয়, তবে মুখের থুথু, কফ, নাকের ভিতরের ময়লা অন্যের শরীরে কিংবা নিজের শরীরে পড়েও জামা-কাপড় অপরিষ্কার হতে পারে। আবার হাঁচির আওয়াজ বড় হলেও অপরের বিরক্তির কারণ হতে পারে, তাই মুখে হাত বা কাপড় দিতে হয়।
(غَضَّ بِهَا صَوْتَهٗ) এর মর্মার্থ হলো : রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হাঁচি দিতেন, তখন তিনি হাঁচির আওয়াজকে যদি সংযত না করা হয় তবে এটা মাজলিসের লোকের মধ্যে আতঙ্কের কারণ হতে পারে। বলা বাহুল্য যে, উক্ত কারণেই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাঁচির সময় আওয়াজকে সংযত রাখতেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হাঁচি দেয়া এবং হাই তোলা
৪৭৩৯-[৮] আবূ আইয়ূব (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন তোমাদের কারো হাঁচি আসে, সে যেন বলে, ’’আল-হামদু লিল্লাহি ’আলা- কুল্লি হা-ল’’ অর্থাৎ- সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহর প্রশংসা। আর যে ব্যক্তি তার উত্তর দেবে সে যেন বলে, ’’ইয়ারহামুকাল্ল-হ’’ অর্থাৎ- আল্লাহ তোমাকে দয়া করুন! এরপর তার উত্তরে পুনরায় হাঁচিদাতা বলবে, ’’ইয়াহ্ দীকুমুল্ল-হু ওয়া ইউসলিহু বা-লাকুম’’ অর্থাৎ- আল্লাহ তোমাকে সঠিক পথপ্রদর্শন করুন এবং তোমার অবস্থা ভালো করুন! (তিরমিযী ও দারিমী)[1]
وَعَن أبي أَيُّوب أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِذا عطسَ أحدكُم فلْيقلْ: الحمدُ لله عَلَى كُلِّ حَالٍ وَلْيَقُلِ الَّذِي يَرُدُّ عَلَيْهِ: يَرْحَمك الله وَليقل هُوَ: يهديكم وَيصْلح بالكم رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ والدارمي
ব্যাখ্যাঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উক্তি (وَيصْلح بالكم) উল্লেখিত বাক্যোংশ بال শব্দটি ৩টি অর্থে ব্যবহার হতে পারে।
১. কলব বা অন্তর অর্থে হতে পারে। ২. স্বচ্ছল জীবন যাপন হতে পারে। ৩. স্থান বা অবস্থা, অত্র হাদীসে তৃতীয় অর্থে ব্যবহার হওয়া অধিক প্রযোজ্য। ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ হাঁচিদাতা ‘‘আলহামদুলিল্লা-হ’’ এর চেয়ে বেশি করে শব্দ যোগ করে বলতে পারে। যেমন- (اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ عَلٰى كُلِّ حَالٍ) ‘‘আল-হামদু লিল্লাহি ‘আলা- কুল্লি হা-ল’’। শ্রোতাগণ বলবেন يرحمك الله ‘‘ইয়ারহামুকাল্ল-হ’’ অথবা يرحكم الله ‘‘ইয়ারহাকুমুল্ল-হ’’। এগুলো সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত রয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হাঁচি দেয়া এবং হাই তোলা
৪৭৪০-[৯] আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইয়াহূদীগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটে ইচ্ছা করে এ উদ্দেশে হাঁচি দিত, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের হাঁচির জবাবে ’’ইয়াহদীকুমুল্ল-হু ওয়া ইউসলিহু বা-লাকুম’’ অর্থাৎ- ’’আল্লাহ তা’আলা তোমাদেরকে হিদায়াত করুন’’ এবং তোমাদের অবস্থা ভালো করুন’’ বলেন। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي مُوسَى قَالَ: كَانَ الْيَهُودُ يَتَعَاطَسُونَ عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَرْجُونَ أَنْ يَقُولَ لَهُمْ: يَرْحَمُكُمُ اللَّهُ فَيَقُولُ: «يَهْدِيكُمُ اللَّهُ وَيُصْلِحُ بَالَكُمْ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীস দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট কিছু সংখ্যক ইয়াহূদী উপস্থিত হয়ে তারা ইচ্ছা করে হাঁচি দিত। এজন্য যে, তারা আশা করত যেন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জন্য রহমাতের দু‘আ করেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের হাঁচির জবাবে দু‘আ করেছেন ‘‘ইয়াহদীকুমুল্ল-হু ওয়া ইউসলিহু বা-লাকুম’’ (আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে হিদায়াত দান করুক ও তোমাদের অবস্থা ভালো করুক)। তাদের জন্য এরূপ দু‘আ এজন্য করেছেন যাতে তারা কুফরী ধ্যান-ধারণা ও মতাদর্শ হতে ইসলামের দিকে প্রত্যাবর্তন করে। তাদের জন্য (يَرْحَمُكُمُ اللهُ) ‘‘ইয়ারহামুকুমুল্ল-হ’’ বলেননি, কেননা রহমত শুধু মু’মিনদের জন্য নির্দিষ্ট। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ সম্ভবত তারা সত্য জেনে ছিল কিন্তু তাদেরকে ইসলাম গ্রহণ করা হতে বাধা প্রদান করেছিল তাদের অন্ধ অনুসরণ এবং তাদের নেতৃত্বের ভালোবাসা। সম্ভবত তাঁরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আশা করেছিল যেন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জন্য রহমত রহম করার জন্য দু‘আ করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জন্য রহম করার জন্য দু‘আ করেনি বরং হিদায়াতের জন্যই দু‘আ করেছেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হাঁচি দেয়া এবং হাই তোলা
৪৭৪১-[১০] হিলাল ইবনু ইয়াসাফ (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমরা সালিম ইবনু ’উবায়দ (রাঃ)-এর সঙ্গে ছিলাম। জনতার মধ্য হতে জনৈক ব্যক্তি হাঁচি দিলো এবং (’আলহামদুলিল্লা-হ’র পরিবর্তে) ’’আসসালা-মু ’আলাইকুম’’ বলল (এ ধারণায় যে, হয়তো বা এটাও জায়িয আছে)। তখন সালিম(রাঃ) তার জবাবে বললেনঃ ’’তোমার ওপর এবং তোমার মায়ের ওপর সালাম।’’ লোকটি এতে মনে ব্যথা পেল। তখন সালিম(রাঃ) বললেনঃ আমি তো এটা আমার পক্ষ হতে বলিনি; বরং এটা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বলেছিলেন, যখন এক ব্যক্তি তাঁর সম্মুখে হাঁচি দিলো এবং বলল : ’’আসসালা-মু ’আলাইকুম’’, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ’’তোমার ওপর এবং তোমার মায়ের উপর সালাম।’’ যখন তোমাদের কারো হাঁচি আসে, সে যেন ’’আলহামদু লিল্লা-হি রব্বিল ’আ-লামীন’’ বলে এবং যে তার জবাব দেয়, সে যেন ’’ইয়ারহামুকাল্ল-হ’’ বলে এবং হাঁচিদাতা যেন তার জবাবে ’’ইয়াগফিরুল্ল-হু লী ওয়া লাকুম’’ (অর্থাৎ- আল্লাহ তা’আলা তোমাকে ও আমাকে ক্ষমা করুন) বলে। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن
هلالِ بن يسَاف قَالَ: كُنَّا مَعَ سَالِمِ بْنِ عُبَيْدٍ فَعَطَسَ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ فَقَالَ: السَّلَامُ عَلَيْكُمْ. فَقَالَ لَهُ سَالِمٌ: وَعَلَيْكَ وَعَلَى أُمِّكَ. فَكَأَنَّ الرَّجُلَ وَجَدَ فِي نَفْسِهِ فَقَالَ: أَمَا إِنِّي لَمْ أَقُلْ إِلَّا مَا قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذْ عَطَسَ رَجُلٌ عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: السَّلَامُ عَلَيْكُمْ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: عَلَيْكَ وَعَلَى أُمِّكَ إِذَا عَطَسَ أَحَدُكُمْ فَلْيَقُلْ: الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ وَلْيَقُلْ لَهُ مَنْ يَرُدُّ عَلَيْهِ: يرحمكَ اللَّهُ وَليقل: يغْفر لي وَلكم رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد
এ হাদীসটি য‘ঈফ হওয়া সম্পর্কে আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এর সনদে ইনক্বিত্বা‘ বা বিচ্ছিন্নতা আছে। আর তা হলো, হাকিম (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হিলাল ইবনু ইয়াসাফ এবং সালিম-কে পাননি। এ কারণেই হাদীসটি য‘ঈফ অথবা হিলাল ইবনু ইয়াসাফ এবং সালিম-এর মাঝে দু’জন বর্ণনাকারীর নাম উল্লেখ নেই। তাদের দু’ জনের অপরিচিতির কারণে হাদীসটি য‘ঈফ। বিস্তারিত দেখুন- ইরওয়াউল গালীল ৩/২৪৬-২৪৭ পৃঃ। সহীহ ইবনু হিব্বান ৫৯৯, শু‘আবুল ঈমান ৯৩৪২, সুনানুন্ নাসায়ী আল কুবরা ১০০৫৩, আল মুসতাদরাক ৭৬৯৮।
ব্যাখ্যাঃ (وَعَلَيْكَ وَعَلٰى أُمِّكَ) এর মর্মার্থ : কোন এক ব্যক্তি হাঁচির সময় ‘‘আসসালা-মু ‘আলাইকুম’’ বললে সালিম ইবনু ‘উবায়দ তার জবাবে বললেন, ‘‘ওয়া ‘আলায়কা ওয়া ‘আলা- উম্মিকা’’ অর্থাৎ তোমার ওপর ও তোমার মায়ের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। এ কথাটি আপাতদৃষ্টিতে তিরস্কারমূলক হলেও তা প্রকৃতপক্ষ সালিম এর উক্তি ছিল না। ইবনু মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ সম্ভাবনা রয়েছে সালিম ‘আলহামদুলিল্লা-হ’-এর পরিবর্তে ‘‘আসসালা-মু ‘আলাইকুম’’ বলেছেন। আরো সম্ভাবনা রয়েছে যে, সে ভুল করে ‘আলহামদুলিল্লা-হ’-এর পরিবর্তে ‘‘আসসালা-মু ‘আলাইকুম’’ বলেছেন।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ হাঁচিদাতা যখন ‘আলহামদুলিল্লা-হ’ ছাড়া অন্য কোন শব্দ দিয়ে বলবে তখন সে তার জবাব পাওয়ার উপযুক্ত নয়। কোন ব্যক্তি যদি হাঁচির সময় ‘আলহামদুলিল্লা-হ’ বা ‘‘আলহামদুলিল্লা-হি রব্বিল ‘আ-লামীন’’ বলে। তখন তার উত্তরে ‘‘ইয়ারহামুকাল্ল-হ’’ বলবে।
অতঃপর হাঁচিদাতা তার উত্তরে পুনরায় ‘‘ইয়াহদীকুমুল্ল-হু ওয়া ইউসলিহু বা-লাকুম’’ বা ‘‘ইয়াগফিরুল্ল-হু লী ওয়া লাকুম’’ বলবে। এছাড়া ‘‘আসসালা-মু ‘আলাইকুম’’ অথবা অন্য কোন বাক্য ব্যবহার করা উচিত নয়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হাঁচি দেয়া এবং হাই তোলা
৪৭৪২-[১১] ’উবায়দ ইবনু রিফা’আহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হাঁচিদাতার হাঁচির জবাব তিনবার (পর্যন্ত) দাও। তারপরে যদি আরো হাঁচি দেয়, তবে তোমার ইচ্ছা; জবাব দেবে অথবা দেবে না। [আবূ দাঊদ ও তিরমিযী। আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসটি গরীব।][1]
وَعَن عبيد
بن رِفَاعَة عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «شَمِّتِ الْعَاطِسَ ثَلَاثًا فَإِنْ زَادَ فَشَمِّتْهُ وَإِنْ شِئْتَ فَلَا» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالتِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيب
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘ইয়াযীদ ইবনু ‘আবদুর রাহমান’’ যিনি আবূ ইয়াযীদ আদ্ দালানী নামে পরিচিত। ইনি একজন য‘ঈফ বর্ণনাকারী। দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ৪৮৩০, য‘ঈফুল জামি‘ ৬৪২৯।
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীসের মাধ্যমে মুসলিমদের শিক্ষা দেয়া হয়েছে এক বৈঠকে যদি কোন ব্যক্তি একাধিকবার হাঁচি দেয় তাহলে শ্রোতার করণীয় সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে হাঁচির জবাব দেয়া ওয়াজিব যা প্রত্যেক মুসলিমের পালন করা আবশ্যক। কিন্তু এ ব্যাপারে সংখ্যা নির্ধারিত হয়েছে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা মুসলিম ভাইয়ের তিনবার হাঁচির জবাব দাও। তবে একই ব্যক্তি একই বৈঠকে যদি তিনবারের বেশি হাঁচি দেয়, তখন জবাব দেয়া শ্রোতার ইচ্ছাধীন হয়ে যায়। শ্রোতা ইচ্ছা করলে জবাব দিতেও পারে আবার জবাব নাও দিতে পারে। তবে তিনবারের বেশি হাঁচি হলে জবাব দেয়া মুস্তাহাব। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হাঁচি দেয়া এবং হাই তোলা
৪৭৪৩-[১২] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তুমি তোমার মুসলিম ভাইয়ের হাঁচির জবাব তিনবার পর্যন্ত দাও। এর চেয়ে যদি বেশি হাঁচি দেয়, তবে মনে করতে হবে যে, এটা তার সর্দি-কফের ব্যাধি। (আবূ দাঊদ)[1]
রাবী বলেনঃ আমি যতটুকু জানি যে, আবূ হুরায়রা(রাঃ) এ হাদীসটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে মারফূ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
وَعَن أبي
هريرةَ قَالَ: «شَمِّتْ أَخَاكَ ثَلَاثًا فَإِنْ زَادَ فَهُوَ زُكَامٌ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَقَالَ: لَا أَعْلَمُهُ إِلَّا أَنَّهُ رَفَعَ الْحَدِيثَ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
পরিচ্ছেদঃ ৬. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - হাঁচি দেয়া এবং হাই তোলা
৪৭৪৪-[১৩] নাফি’ (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ)-এর পাশে হাঁচি দিলো এবং বলল, ’’আলহামদুলিল্লা-হ ওয়াসসালা-মু ’আলা রসূলিল্লা-হ’’ (অর্থাৎ- সকল প্রশংসা আল্লাহ তা’আলার এবং সালাম রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর)। ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) বললেনঃ আমি বলছি- ’’আলহামদুলিল্লা-হ ওয়াস্সালা-মু ’আলা রসূলিল্লা-হ’’; পদ্ধতি নয়। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে শিখিয়েছেন যে, (যদি আমাদের কারো হাঁচি আসে) যেন আমরা বলি, ’’আলহামদুলিল্লা-হি ’আলা কুল্লি হাল’’ অর্থাৎ- সর্বাবস্থায় প্রশংসা আল্লাহরই জন্য। (ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং তিনি বলেন, এ হাদীসটি গরীব।)[1]
عَنْ نَافِعٍ: أَنَّ رَجُلًا عَطَسَ إِلَى جَنْبِ ابْن عمَرَ فَقَالَ: الْحَمْدُ لِلَّهِ وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ ابْنُ عُمَرَ: وَأَنَا أَقُولُ: الْحَمْدُ لِلَّهِ وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ وَلَيْسَ هَكَذَا. عَلَّمَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ نَقُولَ: الْحَمْدُ لِلَّهِ عَلَى كُلِّ حَالٍ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ
ব্যাখ্যাঃ উল্লেখিত হাদীসে বর্ণিত রয়েছে যে, ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ)-এর পাশে জনৈক ব্যক্তি হাঁচি দিয়ে বলল, ‘‘আলহামদুলিল্লা-হ ওয়াসসালা-মু ‘আলা রসূলিল্লা-হ’’। মিরক্বাতুল মাফাতীহ গ্রন্থের প্রণেতা বলেছেনঃ সম্ভাবনা রয়েছে যে, জনৈক ব্যক্তিটি এই শারী‘আতের বিধান সম্পর্কে মুস্তাহাব মনে করে ছিল। ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) বলেছেন, আমি হাঁচি দিয়ে ‘‘আলহামদুলিল্লা-হ ওয়াসসালা-মু ‘আলা রসূলিল্লা-হ’’ বলি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষ এটা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শিক্ষার পরিপন্থী। কেননা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে যেমন বর্ণিত হয়েছে তার থেকে কম-বেশি, যোজন-বিয়োজন না করে হুবহু সেভাবে বলা উত্তম। হাঁচি দেয়ার সময় হাঁচিদাতার আরাম অনুভব হোক কিংবা দুঃখ-বেদনা অনুভব হোক সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রশংসা আদায় করতে হবে। এজন্য আল্লাহ তা‘আলা হাঁচিকে পছন্দ করেন যে, বান্দা সুখে থাক বা দুঃখের মাঝে থাক সর্বদা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - হাসি
৪৭৪৫-[১] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এমনভাবে অট্টহাসি দিতে দেখিনি যে, তাঁর জিহবামূল দেখা গেছে; বরং তিনি কেবল মুচকি হাসতেন। (বুখারী)[1]
بَابُ الضِّحْكِ
عَن عائشةرضي اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: مَا رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُسْتَجْمِعًا ضَاحِكًا حَتَّى أَرَى مِنْهُ لَهَوَاتِهِ إِنَّمَا كَانَ يتبسم. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ উচ্চশব্দে, স্বশব্দে হাসা ও কাউকে উপহাস করা ঠিক না। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ অভ্যাস ছিল না। এ অভ্যাস কাফিরদের ছিল। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হাসি ছাড়া স্বশব্দে হাসতেন না। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - হাসি
৪৭৪৬-[২] জারীর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন হতে আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে কোন অবস্থাতেই তাঁর কাছে আসতে নিষেধ করেননি। যখনই তিনি আমাকে দেখতেন, মুচকি হাসতেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الضِّحْكِ
وَعَن جرير قَالَ: مَا حَجَبَنِي النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُنْذُ أَسْلَمْتُ وَلَا رَآنِي إِلَّا تَبَسَّمَ. مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ (ضحك) শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মুচকি হাসা, এ কথাটুকু রয়েছে তিরমিযী হাদীস গ্রন্থে, আর এটা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরিপূর্ণ উত্তম চরিত্র। ইমাম বুখারী তাঁর সহীহ গ্রন্থে এ হাদীস উল্লেখ করেন এবং সহীহ মুসলিম ও মুসনাদে আহমাদে রয়েছে। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - হাসি
৪৭৪৭-[৩] জাবির ইবনু সামুরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে স্থানে ফজরের সালাত আদায় করতেন সূর্য পূর্ণরূপে উদয় না হওয়া পর্যন্ত ঐ স্থান হতে উঠতেন না। সূর্য উদয় হলে উঠে দাঁড়াতেন। আর ইত্যবসরে কথাবার্তা বলতেন এবং জাহিলিয়্যাত যুগের কাজ-কারবারের আলোচনা করে সাহাবায়ে কিরাম হাসতেন এবং রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও মুচকি হাসতেন। (মুসলিম)[1]তিরমিযী’র এক বর্ণনায় আছে যে, সাহাবায়ে কিরাম কবিতা আবৃত্তিও করতেন।
بَابُ الضِّحْكِ
وَعَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يَقُومُ مِنْ مُصَلَّاهُ الَّذِي يُصَلِّي فِيهِ الصُّبْحَ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ فَإِذَا طَلَعَتِ الشَّمْسُ قَامَ وَكَانُوا يَتَحَدَّثُونَ فَيَأْخُذُونَ فِي أَمْرِ الْجَاهِلِيَّة فيضحكون ويبتسم صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. رَوَاهُ مُسْلِمٌ. وَفِي رِوَايَة لِلتِّرْمِذِي: يتناشدون الشِّعْرَ
ব্যাখ্যাঃ ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ সময় ফজরের সালাতের পর জিকর করা মুস্তাহাব। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতের বসার স্থানে সার্বক্ষণিক থাকতেন যতক্ষণ পর্যন্ত কোন সমস্যা না হত।
কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ সালাফগণ এই সুন্নাতের উপর সর্বদা ‘আমল করতেন। তারা সংক্ষিপ্ত করতেন এ ব্যাপারে জিকর ও দু‘আর উপর। এমনকি সূর্য উদয় হত।
ইমাম মুসলিম (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর গ্রন্থে এবং ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর সুনানে তুহফাতুল আহ্ওয়াযীতে রয়েছে, জাবির ইবনু সামুরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে এক শতকের অধিকবার বসেছি, অতঃপর সাহাবীরা কবিতা পাঠ করতেন এবং তারা উল্লেখ করতেন, জাহিলিয়্যাতের অনেক বিষয় এবং তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তখন চুপ থাকতেন এবং অনেক সময় তাদের সঙ্গে মুচকি হাসতেন।
শিক্ষণীয় : আমরা ফজরের সালাত আদায় করার পর হতে সূর্য উদিত হওয়া পর্যন্ত যিকরে ও দু‘আতে লিপ্ত থাকব এবং পরে সম্ভব হলে সূর্য উঠার পর দুই রাক্‘আত ইশরাকের সালাত আদায় করব। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হাসি
৪৭৪৮-[৪] ’আবদুল্লাহ ইবনু হারিস ইবনু জাযআ (রাঃ) বলেনঃ আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেয়ে বেশি মুচকি হাসতে আর কাউকে দেখিনি। (তিরমিযী)[1]
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ الْحَارِثِ بْنِ جَزْءٍ قَالَ: مَا رَأَيْتُ أَحَدًا أَكْثَرَ تَبَسُّمًا مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ
পরিচ্ছেদঃ ৭. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - হাসি
৪৭৪৯-[৫] কতাদাহ্ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবনু ’উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলো রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণ কি হাসতেন? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, তবে তাঁদের অন্তরে পাহাড়ের চেয়েও অধিক বড় ঈমান ছিল। বিলাল ইবনু সা’দ বলেনঃ আমি সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ)-কে তীরের লক্ষ্যস্থলের মধ্যে দৌড়াতে দেখেছি, এমতাবস্থায়ও তাঁরা একে অপরকে দেখে হাসতে থাকতেন। আর যখন রাত হত, তখন তাঁরা আল্লাহর প্রতি অধিক ভীত হতেন। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
عَن قتادةَ قَالَ: سُئِلَ ابْنُ عُمَرَ: هَلْ كَانَ أَصْحَابُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَضْحَكُونَ؟ قَالَ: نَعَمْ وَالْإِيمَانُ فِي قُلُوبِهِمْ أَعْظَمُ مِنَ الْجَبَلِ. وَقَالَ بِلَالُ بْنُ سَعْدٍ: أَدْرَكْتُهُمْ يَشْتَدُّونَ بَيْنَ الْأَغْرَاضِ وَيَضْحَكُ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ فَإِذَا كَانَ اللَّيْلُ كَانُوا رُهْبَانًا. رَوَاهُ فِي «شَرْحِ السّنة»
ব্যাখ্যাঃ তারা হাসতে সীমালঙ্ঘন করত না এবং অন্য কিছুর মাঝেও দীনের গন্ডির মাঝে থাকতেন। বেশি হাসার কারণে অন্তর মরে যাবে এমন হাসতেন না। বেশি হাসার জন্য তাদের অন্তর প্রকম্পিত হত। যেমন এসেছে অধিক হাসা অন্তরকে মেরে ফেলে। হাসার অর্থ উপহাস আর কাউকেও উপহাস করা বৈধ নয়।
ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ তারা হাসতেন কিন্তু সীমালঙ্ঘন করতেন না। যার ফলে তাদের অন্তরসমূহকে মেরে ফেলবে বেশি হাসার ফলে, তাদের ঈমান কেঁপে উঠতো। যেমন হাদীসে এসেছে, নিশ্চয় বেশি হাসা অন্তরসমূহকে মেরে ফেলে, মৃত করে দেয়। তাই আল্লাহ সূরাহ্ মুতাফফিফীনের আয়াত উল্লেখ করে এটাই জানাতে চান যে, ‘‘নিশ্চয় পাপীরা মু’মিনদেরকে উদ্দেশ্য করে হাসত’’- (সূরাহ্ আল মুতাফফিফীন ৮৩ : ২৯) আর এটা ঠিক নয়, অনুচিত কাজ। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ) [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৫০-[১] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাজারে গেলেন। এক ব্যক্তি ’’হে আবুল কাসিম!’’ বলে ডাক দিলো। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে দৃষ্টিপাত করলেন। লোকটি বলল, আমি ঐ ব্যক্তিকে ডেকেছি। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা আমার নামে নাম রাখতে পার; কিন্তু আমার উপনামে উপনাম রেখ না। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْأَسَامِىْ
عَنْ أَنَسٍ قَالَ: كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي السُّوقِ فَقَالَ رَجُلٌ: يَا أَبَا الْقَاسِمِ فَالْتَفَتَ إِلَيْهِ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: إِنَّمَا دَعَوْتُ هَذَا. فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسلم: «سموا باسمي وَلَا تكنوا بكنيتي» . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ ত্ববারানীর বর্ণনায় রয়েছে, ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত (وَلَا تَكْنُوْا بِكُنِيَّتِىْ) অর্থাৎ আমার উপনামে নামকরণ করো না। কেননা উপনাম সম্মানার্থে হয়ে থাকে। শুধু নাম সম্মানের বিপরীত, অতঃপর তিনি তাদেরকে এটা হতে নিষেধ করেন। যাতে করে সন্দেহে পতিত না হয় যখন কতিপয় মানুষকে আহবান করা হয়। অতঃপর ঘোষণা দেয়া হয়, নিশ্চয় ‘আরবদের ‘আলিমগণ বলেন, নাম হয়ত প্রশংসার ঘোষণা দিবে অথবা বদনামের তার নাম মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপনাম আবুল কাসিম ও তার لقب উপাধি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপনামে বা মূল নামে কখন রাখা যাবে বা যাবে না- এ প্রসঙ্গে নিম্নে ইমামদের মতভেদ উল্লেখ করা হলো।
১. ইমাম শাফি‘ঈ ও আহলে যাহির-এর অভিমত হলো : নিশ্চয় আবুল কাসিম নামে কারও নামকরণ করা কখনও বৈধ হবে না। চাই সেই নাম মুহাম্মাদ বা আহমাদ হোক বা না হোক। আনাস (রাঃ) বর্ণিত মুসলিমের বাহ্যিক হাদীস থেকে উপলব্ধি করা যায়- এ মতটি।
২. এই নিষেধ রহিত হয়ে গেছে। এ আদেশ প্রথম দিকে ছিল। এ অর্থই হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। অতঃপর রহিত হয়েছে। জামহূর ‘উলামা বলেছেন, অতঃপর প্রত্যেকের জন্য আবুল কাসিম নামে নামকরণ করা বর্তমানে বৈধ। সেটা তার নাম মুহাম্মাদ এবং আহমাদ বা অন্য কিছু হোক এতে অসুবিধা নেই। এ মতটি ইমাম মালিক-এর। কাযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ মতটি অধিকাংশ সালাফ ও মিসরের ফকীহগণেরও অধিকাংশ ‘আলিমগণের এবং প্রসিদ্ধ রয়েছে এক জামা‘আত আবুল কাসিম উপনামে নাম রেখেছে। এর পরেও বর্তমান পর্যন্ত।
৩. ইবনু জারীর-এর মত নিশ্চয় এটা রহিত হয়নি। শুধু নিষেধ ছিল পবিত্রকরণে ও আদাবের (শিষ্টাচারিতার) জন্য, হারাম করার জন্য নয়।
৪. নিশ্চয় নিষেধ আবুল কাসিম উপনামে ডাকা থেকে। নির্দিষ্ট ঐ ব্যক্তির জন্য যার নাম মুহাম্মাদ অথবা আহমাদ এবং ক্ষতি নেই অসুবিধা নেই শুধু উপনামে ঐ ব্যক্তির জন্য যে এই দুই নামের মধ্যে থেকে কোন একটি নামে নাম রাখে না। এটা সালাফের এক জামা‘আতের উক্তি। এ প্রসঙ্গে মারফূ‘ হাদীস জাবির হতে বর্ণিত হয়েছে।
৫. নিশ্চয় সাধারণভাবে আবুল কাসিম উপনামে ডাকা থেকে নিষেধ করা হয় এবং কাসিম নাম রাখা থেকে নিষেধ করা হয়। যাতে উপনামে ডাকা হবে না তার আববাকে আবুল কাসিম নামে অথচ মারওয়ান ইবনু হাকাম তার ছেলের নাম পরিবর্তন করে ‘আবদুল মালিক রাখলেন। যখন তার কাছে পৌঁছল এ হাদীস তখন তার ছেলের নাম রাখলেন ‘আবদুল মালিক। তার ছেলের নাম প্রথমে রেখেছিলেন কাসিম এবং কতিপয় আনসার সাহাবীরা এরূপ করেছেন।
৬. সাধারণত মুহাম্মাদ নাম রাখা নিষেধ করা হয়। চাই তার উপনাম হোক বা আসল নাম হোক- এ প্রসঙ্গে হাদীস এসেছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে تُسَمُّونَ أَوْلَادَكُمْ مُحَمَّدًا ثُمَّ تَلْعَنُونَهُمْ অর্থাৎ তোমরা তোমাদের সন্তানদের নাম রাখ মুহাম্মাদ, অতঃপর তোমরা তাদের প্রতি অভিসম্পাত কর লা‘নাত কর। ‘উমার চিঠি লিখেন কুফাবাসীর প্রতি, তোমরা নবীর নামে কারও নাম রাখিও না। মাদানীহ্-এর এক জামা‘আতকে আদেশ করেন তাদের সন্তানদের মুহাম্মাদ নাম পরিবর্তন করার জন্য। এক জামা‘আত উল্লেখ করেন তার জন্য নিশ্চয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে অনুমতি দিয়েছেন এ ব্যাপারে এবং এর মাধ্যমে তিনি নাম রাখেন, অতঃপর তিনি তাদেরকে ত্যাগ করেন। কাযী বলেনঃ অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ নিশ্চয় ‘উমার এ কাজটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামের সম্মান করার জন্য করেন।
শিক্ষা : কুরআন ও সহীহ হাদীস বিরোধী কোন নাম হলে সেই নাম পরিবর্তন করা উচিত। যেরূপ সহাবা (রাঃ) করেছেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশায় কোন অবস্থায় ঠিক না। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামে বা উপনামে বা উপাধিতে নাম রাখা। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২১৩১/১) [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৫১-[২] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার নামে নাম রাখতে পার; কিন্তু আমার নামে নাম রেখ না। কেননা আমাকে বণ্টনকারী নিয়োগ করা হয়েছে। আমি তোমাদের মধ্যে বণ্টন করে থাকি। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْأَسَامِىْ
وَعَنْ جَابِرٌ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «سموا باسمي وَلَا تكنوا بِكُنْيَتِي فَإِنِّي إِنَّمَا جُعِلْتُ قَاسِمًا أَقْسِمُ بَيْنَكُمْ» مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ জাবির (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামে নাম রাখা আদেশ পাওয়া যায় উপনামে নাম রাখা নিষেধাজ্ঞা পাওয়া যায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সম্মান করার জন্য। যাকে আহবান করা হয়, উপনামের কারণে সে কষ্ট পায়। এটা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অধিকারে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ইযযত করা। এর মধ্যে কাউকেও অংশীদার না করা। অথচ আল্লাহ তা‘আলা বলেছেনঃ لَا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُمْ بَعْضًا ৭৩ ‘‘রসূলের ডাককে তোমরা তোমাদের একের প্রতি অন্যের ডাকের মতো গণ্য করো না’’- (সূরাহ্ আন্ নূর ২৪ : ৬৩)। আল্লাহ তাদেরকে জানেন যারা তোমাদের মধ্যে চুপিসারে সরে পড়ে। আল্লাহ তা‘আলা ‘কাসিম’ অর্থাৎ বণ্টনকারী বানিয়েছেন সবার মাঝে। جامع (জামি‘)-এর বর্ণনায় রয়েছে, আমি প্রেরিত হয়েছি, কাসিম হিসেবে আমি বণ্টনকারী ‘ইলম’ গনীমাত এরূপ আরো অনেক কিছু। শুভ সংবাদ নেক বান্দার জন্য। মানতের বস্তু খারাপ ব্যক্তির জন্য। মূলকথা হলো রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু তার সন্তানদের জন্য ‘আবুল কবাসিম’ নন বরং তিনি দুনিয়া ও আখিরাতের বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে সর্বকালের জন্য ‘কাসিম’।
‘আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! যদি আপনার মৃত্যুর পর আমার সন্তান হয় আমি কি তার নাম মুহাম্মাদ এবং আপনার উপনামে নাম রাখতে পারব? তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হ্যাঁ। এ মত ইমাম মালিক-এর। কাযী ‘ইয়ায বলেনঃ এ মত অধিকাংশ সালাফের ও মিসরের ফকীহগণের।
আবূ হুরায়রা (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে রয়েছে, أن النبي صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نهى أن يجمع بين اسمه وكنيته অর্থাৎ নিশ্চয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন তার নাম ও উপনামে একত্র করা হতে। একই ব্যক্তির মাঝে । (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৮৪২)
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রসূলুল্লাহ উপাধি কোন অবস্থায় কারো জন্য বৈধ নয়। মালায়িকাহ্’র (ফেরেশতাদের) নামে কারো নাম রাখা নিষেধ।
‘আবদুল্লাহ ইবনু জাবির হতে বর্ণিত বুখারী ও মুসলিমে নিষেধ রয়েছে, হাদীসটি নিম্নে বর্ণিত হলো,
عن عبد الله بن جرار "سموا بأسماء الانبياء ولاتسموا بأسماء الملائكة". (متفق عليه)
নামের প্রসঙ্গে শাফি‘ঈ ও আহলুয্ যাহির সতর্কতা অবলম্বনে যা বলেছেন আবুল কাসিম উপনামে কারো নাম রাখা কখনও বৈধ নয়, সঠিক কথা হলো তার নামে রাখা বৈধ, তাঁর উপনামে ডাকা তার থেকে নিষেধ। তার বেঁচে থাকা অবস্থায় কঠিনভাবে নিষেধ। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ) [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৫২-[৩] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলার নিকট তোমাদের নামসমূহের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম নাম ’আবদুল্লাহ এবং ’আবদুর রহমান। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْأَسَامِىْ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ أَحَبَّ أَسْمَائِكُمْ إِلَى اللَّهِ: عَبْدُ اللَّهِ وَعَبْدُ الرَّحْمَنِ رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ ব্যাখ্যায় বলা হয়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-গণের নামের পরে, ইসফাতের দালীলের মাধ্যমে জানা যায়। ‘আবদুল্লাহ ও ‘আবদুর রহমান অতি প্রিয় আল্লাহ তা‘আলার নিকট। অতঃপর প্রমাণ করে এই দুই নামের উপরে যে, এ দুই নাম মুহাম্মাদের নাম হতে অধিক প্রিয় নয়, অতঃপর উভয় নামই সমান মর্যাদার অবস্থানে। অথবা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাম। উক্ত দুই নাম হতে অতি প্রিয় সাধারণভাবে অথবা কোন দিক থেকে। মিরক্বাত লেখক বলেনঃ এ বিষয়ে আল্লাহ অধিক ভালো অবগত রয়েছেন। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৮৩৩)
عن عبد الله بن عمر عن النبي قال أحب الاسماء عبد الله وعبد الرحمن
অর্থাৎ ইবনু ‘উমার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, আল্লাহর কাছে ‘আবদুল্লাহ ও ‘আবদুর রহমান নাম অতি প্রিয়।
শিক্ষা : আল্লাহ তা‘আলার নামের সঙ্গে কারো নাম রাখতে হলে আল্লাহর নামের পূর্বে عبد শব্দ যুক্ত করে اضافت এর পদ্ধতিতে ব্যবহার করতে হবে তা না করলে বৈধ হবে না। বরং শির্ক হবে। যেমন- ‘আবদুল মালিক ও ‘আবদুর রহীম ইত্যাদি।
অন্যথায় বৈধ হবে না। যেমন ‘আবদুন্ নবী ও ‘আবদুল হারিস ইত্যাদি এ জাতীয় নাম রাখা শারী‘আতে বৈধ নয়। আর ‘আবদুল্লাহ ও ‘আবদুর রহমান নাম আমরা বেশী রাখব। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৫৩-[৪] সামুরাহ্ ইবনু জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তুমি কখনো তোমাদের ’’গোলাম’’ (সন্তান)-এর নাম ’ইয়াসার’, ’রবাহ’, ’নাজীহ’ ও ’আফলাহ’ রেখ না। কেননা যখন তুমি তার নাম ধরে ডাকবে, আর সে উপস্থিত থাকবে না, তখন কেউ বলবে ’’নেই’’। (মুসলিম)[1]
মুসলিম-এর অপর বর্ণনায় রয়েছে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ তুমি তোমার গোলামের নাম ’রবাহ’, ’ইয়াসার’, ’আফলাহ’ কিংবা নাফি’ নাম রেখ না।
بَابُ الْأَسَامِىْ
وَعَن سَمُرَةَ بْنِ جُنْدُبٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: لَا تسمين غُلَاما يسارا وَلَا رباحا ولانجيحا وَلَا أَفْلَحَ فَإِنَّكَ تَقُولُ: أَثَمَّ هُوَ؟ فَلَا يَكُونُ فَيَقُولُ لَا رَوَاهُ مُسْلِمٌ. وَفِي رِوَايَةٍ لَهُ قَالَ: «لَا تسم غُلَاما رَبَاحًا وَلَا يَسَارًا وَلَا أَفْلَحَ وَلَا نَافِعًا»
ব্যাখ্যাঃ আমাদের সন্তানের নাম نجيح ، افلح، نافع، يسار، رباح (নাজীহ, আফলাহ, নাফি‘, ইয়াসার, রবাহ) ইত্যাদি ও এ জাতীয় অর্থবোধক নাম রাখা থেকে বিরত থাকব। ইমাম নাবাবী মুসলিমের শারহাতে বলেছেন, আমাদের সঙ্গীরা এ জাতীয় নাম রাখা অপছন্দ করেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ) [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৫৪-[৫] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইচ্ছা করলেন যে, তিনি লোকেদেরকে ইয়া’লা, বারাকাহ্, আফলাহ, ইয়াসার, নাফি’ এবং অনুরূপ নাম রাখতে নিষেধ করবেন। তারপর দেখলাম, তিনি ইচ্ছা পোষণ করার পর নিশ্চুপ থাকলেন। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তিকাল হলো, অথচ তিনি এরূপ নাম রাখতে নিষেধ করেননি। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْأَسَامِىْ
وَعَن جَابر قَالَ أَرَادَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَنْهَى عَنْ أَنْ يُسَمَّى بِيَعْلَى وَبِبَرَكَةَ وَبِأَفْلَحَ وَبِيَسَارٍ وَبِنَافِعٍ وَبِنَحْوِ ذَلِكَ. ثُمَّ سَكَتَ بَعْدُ عَنْهَا ثُمَّ قُبِضَ وَلَمْ يَنْهَ عَنْ ذَلِك. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ জাবির (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে نافع، يسار، افلح، بركة، يعلى (নাফি‘, ইয়াসার, আফলাহ, বারাকাহ্, ইয়া‘লা-) এ জাতীয় আরো নাম এবং সামুরাহ্ (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ বর্ণনা করেন চারটি নাম رباح، نافع، يسار، افلح (রবাহ, নাফি‘, ইয়াসার, আফলাহ) এবং ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাস্‘ঊদ বর্ণিত হাদীসে ইমাম ত্ববারানী হাসান সনদে বর্ণনা করেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম وليذ، حرب، يسار، نجيح، افلح، ابوالحكم، الحكم، امرأة (ওয়ালীয, হারব, ইয়াসার, নাজীহ, আফলাহ, আবুল হাকাম, আল হাকাম, আমরিআহ্/আমরাআহ্) এবং ইমাম ত্ববারানী (রহিমাহুল্লাহ) বুরয়দাহ্ হতে বর্ণিত كلب ، كليب কাল্ব ও কুলায়ব নাম রাখতে নিষেধ করেছেন।
শিক্ষা : আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে উল্লেখিত নিষেধকৃত নাম রাখা থেকে পুরোপুরি বিরত থাকার তাওফীক দান করুন এবং বিরত থাকা আমাদের সকলের উচিত যেহেতু হাদীসে নিষেধ রয়েছে।
(শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ১৩-[২১৩৮]; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৮৩৫) [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৫৫-[৬] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলার সমীপে সবচেয়ে খারাপ নাম ঐ ব্যক্তির হবে, যাকে مَلِكَ الْأَمْلَاكِ অর্থাৎ- ’’রাজাধিরাজ’’ বলা হবে। (বুখারী)[1]
মুসলিমের অপর বর্ণনায় রয়েছে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলার নিকট সবচেয়ে অভিশপ্ত ও কলুষিত সে-ই হবে, যার নাম ’’শাহানশাহ’’ বা ’’রাজাধিরাজ’’ রাখা হয়েছিল। আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত কেউ ’’রাজাধিরাজ’’ নন।
بَابُ الْأَسَامِىْ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَخْنَى الْأَسْمَاءِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عِنْدَ اللَّهِ رَجُلٌ يُسَمَّى مَلِكَ الْأَمْلَاكِ» . رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ. وَفِي رِوَايَةٍ لِمُسْلِمٍ قَالَ: «أَغْيَظُ رَجُلٍ عَلَى اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَأَخْبَثُهُ رَجُلٌ كَانَ يُسَمَّى مَلِكَ الْأَمْلَاكِ لَا مَلِكَ إِلَّا لله»
ব্যাখ্যাঃ বিখ্যাত সাহাবী আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, বুখারীতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন নিকটতম নাম হবে ঐ ব্যক্তির যে নাম রাখে مالك الأملاك ‘‘রাজাধিরাজ’’। ফাতহুল বারীতে কিছু শব্দের পরিবর্তে একই রূপ বর্ণনা করা হয়। সুফ্ইয়ান বলেন, এ শব্দের ব্যাখ্যা شاهان شاه। মুসলিম, আবূ দাঊদ ও ইমাম তিরমিযী একই রূপ উল্লেখ করেন। قاضي القضاة অথবা حاكم الحكام ‘‘বিচারকদের বিচারক নাম রাখার ব্যাপারে ‘আলিমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।’’ (শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ [২১৪৩]-২০)
ملك الأملاك অনেক ঘৃণিত নাম আল্লাহ তা‘আলার নিকট। ইবনু আবী শায়বাহ্ তার রিওয়ায়াতে কিছু বৃদ্ধি করেছেন, যেমন বলেন لا مالك الا الله عزوجل আর باب تحريم التسمي بملك الأملاك وبملك الملوك" এই শিরোনাম থেকে আমরা বুঝতে পারি এ জাতীয় নাম হারাম পর্যায়ের।
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আমি জিজ্ঞেস করেছি, আবূ ‘আমর-কে ঘৃণিত নামের প্রসঙ্গে তিনি বলেন এগুলো নাম অনেক নিকৃষ্ট। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, اغيظ رجل على الله يوم القيامة واخبته واغيظه عليه رجل كان يسمى ملك الأملاك অর্থাৎ কিয়ামত দিবসে আল্লাহর নিকট অধিক অপছন্দনীয় ও লাঞ্ছিত হবে ঐ ব্যক্তি যার নাম যে ‘‘মালিকুল আমলাক’’ ও ‘‘মালিকুল মুলুক’’ নামে শিরোনাম যুক্ত হবে। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৮৩৭; ‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৯৫৩)
শিক্ষা : এ উল্লেখিত এসব নামে শিরোনাম যুক্ত হওয়া হারাম, এগুলো আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট। যেমন আর রহমান ও আল কুদ্দূস ইত্যাদি। আরো রয়েছে জাহাঙ্গীর, আলমগীর, শাহজাহান, শাহানশাহ ইত্যাদি।
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৫৬-[৭] যায়নাব বিনতু আবূ সালামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার নাম ’’বাররাহ্’’ রাখা হয়েছে। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা নিজেদের পবিত্রতা নিজেরাই প্রকাশ করো না। তোমাদের মধ্যে কে পুণ্যবান, তা আল্লাহ তা’আলাই বেশি জানেন। তাঁর নাম যায়নাব রাখো। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْأَسَامِىْ
وَعَن زينبَ بنتِ أبي سلَمةَ قَالَتْ: سُمِّيتُ بَرَّةَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ «لَا تُزَكُّوا أَنْفُسَكُمْ اللَّهُ أَعْلَمُ بِأَهْلِ الْبِرِّ مِنْكُمْ سَمُّوهَا زَيْنَبَ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ যায়নাব (রাঃ) বলেন, আমার নাম ছিল বাররাহ্ (পুণ্যবতীর কাছ থেকে উত্থিত হয়েছে)। অতঃপর আমার নাম রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়নাব রাখলেন। (শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ১৯-[২১৪২])
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৫৭-[৮] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিবি ’’জুওয়াইরিয়াহ্’’-এর নাম ছিল ’’বাররাহ্’’। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর নাম পরিবর্তন করে ’’জুওয়াইরিয়াহ্’’ রেখেছিলেন। এজন্য যে, কেউ বলবে, আপনি ’’বাররাহ্’’ কথাটি তিনি খারাপ মনে করতেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْأَسَامِىْ
وَعَن ابنِ عبَّاسٍ قَالَ: كَانَتْ جُوَيْرِيَةُ اسْمُهَا بَرَّةُ فَحَوَّلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اسْمَهَا جُوَيْرِيَةَ وَكَانَ يَكْرَهُ أَنْ يُقَالَ: خَرَجَ مِنْ عِنْدِ برة. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ এ হাদীসের মধ্যে برة নাম পরিবর্তন করে زينب (যায়নাব) রাখতে বলেন, কেননা কে ভালো বা মন্দ আল্লাহ অধিক ভালো অবগত রয়েছেন। মুসলিমের অন্য বর্ণনায় برة নামকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম جويرية (জুওয়াইরিয়াহ্) নামে পরিবর্তন করেন। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬১৯২; শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২১৪২/১৯)
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৫৮-[৯] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’উমার (রাঃ)-এর কন্যাকে ’আসিয়াহ্ বলা হত। অতঃপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নাম পরিবর্তন করে রাখলেন ’’জামীলাহ্’’। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْأَسَامِىْ
وَعَن ابْن عمر أَنَّ بِنْتًا كَانَتْ لِعُمَرَ يُقَالُ لَهَا: عَاصِيَةُ فَسَمَّاهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جميلَة. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ ‘উমার -এর মেয়ের নাম ছিল عاصية (‘আসিয়াহ্) অর্থাৎ অমান্যকারী। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নাম পরিবর্তন করে রাখলেন جميلة (জামীলাহ্) অর্থাৎ সুন্দরী। শারহু মুসলিমে রয়েছে, ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ অপছন্দনীয় কুশ্রী নাম পরিবর্তন করা মুস্তাহাব, যে রকম اسامى مكروهة অপছন্দ নামসমূহ পরিবর্তন করে ভালো নাম রাখা শারী‘আতসম্মত মত।
(শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২১৩৯/১৫; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৮৩৮; ‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৯৪৪)
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৫৯-[১০] সাহল ইবনু সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুনযির ইবনু আবূ উসায়দ যখন ভূমিষ্ঠ হলো, তখন তাঁকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আনা হলো। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে নিজের রানের উপর রাখলেন এবং জিজ্ঞেস করলেনঃ তাঁর নাম কী? উত্তরদাতা বলল : ’’অমুক’’। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ ’’না’’; বরং তাঁর নাম ’’মুনযির’’। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْأَسَامِىْ
وَعَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ قَالَ أُتِيَ بِالْمُنْذِرِ بْنِ أَبِي أُسَيْدٍ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حِينَ وُلِدَ فَوَضعه على فَخذه فَقَالَ: «وَمَا اسْمه؟» قَالَ: فلَان: «لاولكن اسْمه الْمُنْذر» . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ সাহল ইবনু সা‘দ (রাঃ) অর্থাৎ সা‘দ আস্ সা‘ইদী আল আনসারী, সাহল-এর নাম ছিল حزن (হুয্ন), অর্থাৎ- দুঃখিত, ব্যথিত, বিষণ্ণ হওয়া। অতঃপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নাম রাখলেন سهل (সাহল), তার থেকে তার ছেলে عباس (‘আব্বাস) ও الزهرى (যুহরী)। আর ابو حازم (আবূ হাযিম) বর্ণনা করেন আল মুনযির ইবনু আবূ উসায়দ (রাঃ) তাকে الساعدى (সা‘দী)-ও বলা হয়। তাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আনা হলে তার জন্মের পর তাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রানের উপর রাখা হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে শিশুকে যে উপস্থিত করেছেন তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তার নাম কি? তিনি বললেন, উমুক। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, না। ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ)-এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেনঃ তোমরা যে নাম এ শিশুটির রেখেছ তাতে আমি সন্তুষ্ট নই। বরং আমি সন্তুষ্ট হব তার নাম হবে المنذر (মুনযির)। সম্ভবত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভালো মনে করে এরূপ করেছেন। ফাতহুল বারী ও শারহুন নাবাবীসহ সব শারহাতে শাব্দিক কিছু পার্থক্যসহ সব হাদীসগুলো একইরূপ উল্লেখ করা হয়েছে। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬১৯১; শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২১৪৯/২৯)
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৬০-[১১] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ নিজের দাস-দাসীকে ’’আমার বান্দা’’, ’’আমার বাঁদী’’ ইত্যাদি যেন না বলে। কেননা তোমরা সকল পুরুষই আল্লাহ তা’আলার বান্দা, আর সকল মহিলাই আল্লাহ তা’আলার বাঁদি; বরং সে যেন বলে, ’’আমার চাকর’’, ’’আমার চাকরাণী’’, ’’আমার ছেলে’’, ’’আমার মেয়ে’’। আর গোলামও নিজের মুনীবকে প্রভু বলবে না; বরং সে বলবে, ’’আমার সর্দার’’।অপর এক বর্ণনায় আছে, সে যেন ’’আমার সর্দার’’ ও ’’আমার মনিব’’ বলে। আরেক বর্ণনায় আছে যে, দাস তার মালিককে যেন ’’আমার প্রভু’’ না বলে। কারণ তোমাদের সকলের প্রভুই আল্লাহ রব্বুল ’আলামীন। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْأَسَامِىْ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَا يَقُولَنَّ أَحَدُكُمْ عَبدِي وَأمتِي كلكُمْ عباد اللَّهِ وَكُلُّ نِسَائِكُمْ إِمَاءُ اللَّهِ. وَلَكِنْ لِيَقُلْ: غُلَامِي وَجَارِيَتِي وَفَتَايَ وَفَتَاتِي. وَلَا يَقُلِ الْعَبْدُ: رَبِّي ولكنْ ليقلْ: سَيِّدِي وَفِي رِوَايَةٍ: لِيَقُلْ: سَيِّدِي وَمَوْلَايَ . وَفِي رِوَايَةٍ: لَا يَقُلِ الْعَبْدُ لِسَيِّدِهِ: مَوْلَايَ فَإِنَّ مولاكم اللَّهُ . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ) বর্ণিত সহীহ মুসলিমের হাদীসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন : কতিপয় শব্দের মাধ্যমে মুনীব বা দাস কেউ কাউকে ডাকতে পারবে না- এ প্রসঙ্গে নিম্নে আলোচনা উল্লেখ করা হলো-
১. আবূ হুরায়রা (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ তোমাদের কেউ বলবে না তুমি খাওয়াও তোমার রবকে। উযূ করিয়ে দাও তোমার রবকে এবং তার বলা উচিত আমার নেতা, আমার বন্ধু। আর তোমাদের কেউ বলবে না আমার দাস আমার দাসী এবং তার বলা উচিত আমার যুবক এবং আমার যুবতী এবং আমার ছেলে। আরবী হাদীস নিম্নে প্রদত্ত হলো,
عن ابى هريرة يحدث عن النبي صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ انه قال لا يقل احدكم اطعم ربك وضيئ ربك وليقل سيدى مولاى ولا احدكم عبدى امتى وليقل فتاى وفتاتى غلامى
২. আবূ দাঊদ, নাসায়ী, আহমাদ এবং মুসান্নিফ (রহিমাহুমুল্লাহ) ‘আল আদাবুল মুফরাদ’-এর মধ্যে বর্ণনা করেন ‘আবদুল্লাহ ইবনু আশ্ শিখখীর-এর বর্ণিত হাদীস উল্লেখ করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন السيد শব্দ দ্বারা আল্লাহ তা‘আলাকে বুঝানো হয়েছে। ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেন হারফে নিদার দ্বারা নির্দিষ্ট করে আহবান করাকে অপছন্দ করা হয়েছে। অতঃপর তিনি বলেনঃ কোন ব্যক্তির বলা يا سيدى এরূপ বলা অপছন্দ অর্থাৎ ঠিক হবে না।
৩. মুসান্নিফ (রহিমাহুল্লাহ) আল আদাবুল মুফরাদে বৃদ্ধি করেছেন এবং ইমাম মুসলিম (রহিমাহুল্লাহ) ‘আলা ইবনু ‘আবদুর রহমান তিনি তার আববা থেকে তার আববা আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন, "كلكم عبيد الله وكل نسائكم اماء الله অর্থাৎ- তোমরা সবাই আল্লাহর বান্দাসমূহ বা দাসসমূহ এবং তোমাদের সকল মহিলারা আল্লাহর বান্দীসমূহ বা দাসীসমূহ।
৪. ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ নিষেধাজ্ঞার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো বড়ত্ব ও অহংকার প্রকাশ করার জন্য বৈধ হবে না। আর যদি শুধু পরিস্থিতির জন্য রাখে তা হলো শিথিলতা রয়েছে। والله أعلم
৫. শারহু মুসলিমে শাব্দিক কিছু একই রূপ হাদীস উল্লেখ করেছেন।
৬. ‘আওনুল মা‘বূদে আবূ হুরায়রা হতে বর্ণিত হাদীস উল্লেখ করা হলো :
لَا يَقُولَنَّ أَحَدُكُمْ عَبْدِىْ وَلَا أَمَتِىْ وَلَا يَقُلِ الْمَمْلُوكُ رَبِّىْ وَرَبَّتِىْ وَلٰكِنْ لِيَقُلِ الْمَالِكُ فَتَاىَ وَفَتَاتِىْ وَالْمَمْلُوكُ سَيِّدِىْ وَسَيِّدَتِىْ فَإِنَّكُمُ الْمَمْلُوكُونَ وَالرَّبُّ اللهُ تَعَالٰى
অর্থাৎ আবূ হুরায়রা হতে বর্ণিত, নিশ্চয় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ বলবে না আমার বান্দা, আমার দাসী এবং দাস; তার মুনীবকে বলবে না আমার রব (প্রভু)। আর ‘রব্’ শব্দকে তা দ্বারা স্ত্রী লিঙ্গ বানিয়ে বলবে না আমার রববাতী স্ত্রী প্রভু নামে সম্বোধন করবে না। কর্তার বলা উচিত আমার যুবক এবং যুবতী এবং দাসের বলা উচিত আমার নেতা ও আমার নেত্রী। অতঃপর অবশ্যই তোমরা সবাই আল্লাহর দাসসমূহ আর প্রকৃত প্রভু আল্লাহ তা‘আলা। অতএব ‘রব্’ শব্দ আল্লাহ তা‘আলার জন্যই প্রযোজ্য অন্য কারোর জন্য নয়। আর ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ) দু‘আ করার সময় سيد শব্দের মাধ্যমে দু‘আ করা তিনি অপছন্দ করেন। سيد শব্দ আল্লাহর নাম হিসেবে কুরআন এবং মুতাওয়াতির হাদীসে প্রমাণ পাওয়া যায় না। আর ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ‘রব্’ শব্দ দ্বারা আল্লাহ তা‘আলাকে বুঝানো হয়েছে। মুনযিরী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ ইমাম নাসায়ী এটা সংকলন করেন।
শিক্ষা : হাদীসসমূহ পর্যালোচনা করে বুঝা যায়, যে সমস্ত নাম আল্লাহ তা‘আলার জন্য প্রযোজ্য, তা অন্য কারোর জন্য প্রয়োগ না করা। আর যে সমস্ত শব্দ বা নাম এর ব্যাপারে সন্দেহ রয়েছে ঐ নাম বা শব্দ অন্যের নামের (সৃষ্টি জীবের) জন্য ব্যবহার ও সম্বোধন না করা। যেমন ربة، رب، سيد، امة، عبد، مولى ইত্যাদি। যা আল্লাহর জন্য ব্যবহার করা দরকার তা আল্লাহ তা‘আলার জন্য আর যা অন্যের জন্য ব্যবহার করা যায় তা অন্যের জন্য এটা ছাড়া বিপরীত থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে তা না হলে পাপী হতে হবে এবং শির্ক হয়ে যাবে।
(ফাতহুল বারী ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫৫২; শারহুন নাবাবী ১৫শ খন্ড, হাঃ ২২৪৯/১৫; ‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৯৬৭)
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৬১-[১২] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (আঙ্গুর গাছকে) তোমরা ’’কার্ম’’ বলো না। কারণ كَرْم (কারম) বলা হয় মু’মিনের অন্তঃকরণকে। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْأَسَامِىْ
وَعَنْهُ
عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لَا تَقُولُوا: الْكَرْمُ فَإِنَّ الْكَرْمَ قَلْبُ الْمُؤمن . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ ফাতহুল বারীতে আবূ হুরায়রাহ হতে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ
عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ ؓ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَيَقُولُونَ الْكَرْمُ إِنَّمَا الْكَرْمُ قَلْبُ الْمُؤْمِنِ
অর্থাৎ- রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তারা বলেন, الْكَرْمُ (আল কার্ম) আর ‘‘আল কার্ম’’ অর্থ মু’মিনের অন্তর। যুহরী বর্ণনা করেন, আবূ সালামাহ্ হতে এই শব্দের মাধ্যমে لا تسموا العنب كرما অর্থ তোমরা আঙ্গুরকে كرم নামকরণ করো না।
আর ইমাম মুসলিম (রহিমাহুল্লাহ) همام এর পদ্ধতি থেকে আবূ হুরায়রা -এর বর্ণনা করা হাদীস উল্লেখ করেন, لا يقل احدكم للعنب الكرم অর্থাৎ তোমাদের কেহ আঙ্গুরকে الكرم বলবে না। কেননা الكرم শব্দ দ্বারা একজন মুসলিম ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে। سفيان এর বর্ণিত হাদীস,
قال رسول الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لا تقولوا كرم فإن الكرم قلب المؤمن
অর্থাৎ- রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা كرم বলো না, কেননা কার্ম হলো মু’মিনের অন্তর। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উক্তি ويقولون الكرم এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো তারা বলে কার্ম আঙ্গুরের গাছ। আর ত্ববারানী ও বাযযার (রহিমাহুমাল্লাহ) সামুরাহ বর্ণিত হাদীস মারফূ‘ হিসেবে সংকলন করেন,
إن اسم الرجل المؤمن في الكتب الكرم من أجل ما أكرمه الله على الخليقة، وإنكم تدعون الحائط من العنب الكرمد
অর্থাৎ- নিশ্চয় মু’মিনের নাম গ্রন্থসমূহে রয়েছে كرم এ কারণে যে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে সৃষ্টিজীবের উপর সম্মানিত করেছেন। নিশ্চয় তোমরা আঙ্গুরের বাগানকে كرم কার্ম বলে আহবান করো।
খত্ত্বাবী এ আলোচনার সারাংশ বর্ণনা করেছেন যে, নিশ্চয় নিষেধের দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মদের হারামের গুরুত্ব দেয়া তার নাম মিটিয়ে ফেলার দ্বারা এবং কেননা এ নাম অবশিষ্ট রাখার মাধ্যমে তাকে প্রতিষ্ঠা করার শামিল। কারণ জাহিলী যুগে একে যে পান করত সে সম্মানী হয়ে যায় এটা মনে ও ধারণা করত, অতঃপর এর নামকরণ كرم কারাম করা হতে নিষেধ করা হয়েছে এবং বলেছেন,
(إِنَّمَا الْكَرْمُ قَلْبُ الْمُؤْمِنِ) অর্থাৎ নিশ্চয় কার্ম মু’মিনের হৃদয়, অন্তর। কারণ এর ভিতর রয়েছে ঈমানের আলো ইসলামের হিদায়াত সৎপথ প্রদর্শন।
ইবনুল বাত্ত্বল ইবনুল ‘আরাবী হতে বর্ণনা করেছেন, নিশ্চয় তারা আঙ্গুর কারম كرم নামে নামকরণ করত, কেননা মদ আঙ্গুর থেকে তৈরি করা হত আর তাদের ভ্রান্ত ধারণা মদ দানশীল হওয়ার, উদার হওয়ার উপর উৎসাহ প্রদান করে এবং উত্তম চরিত্রের আদেশ দেয়। (আসলে এ কথাগুলো ঠিক নয়, ভ্রান্ত।) শারহু মুসলিমে আবূ হুরায়রা ও ‘আওনুল মা‘বূদে নিষেধ রয়েছে।
শিক্ষা : আমরা কখনও কোন ব্যক্তির নাম كرم (কারম) রাখব না এবং এ নামে আহবান করব না। বরং كرم কোন ব্যক্তির নাম রাখা যায়।
(ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬১৮৩; শারহুন নাবাবী ১৫শ খন্ড, হাঃ ২২৪৭/৭; ‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৯৬৬)
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৬২-[১৩] মুসলিম-এর উপর বর্ণনায় ওয়ায়িল ইবনু হুজর হতে বর্ণিত। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ তোমরা আঙ্গুরকে কার্ম বলো না; বরং عِنَبْ (’ইনাব) ও حَبَلَهْ (হাবালাহ্) বলো।[1]
بَابُ الْأَسَامِىْ
وَفِي
رِوَايَةٍ لَهُ عَنْ وَائِلِ بْنِ حُجْرٍ قَالَ: لَا تَقُولُوا: الْكَرْمُ وَلَكِنْ قُولُوا: الْعِنَبُ والحبلة
ব্যাখ্যাঃ ‘আলকামাহ্ ইবনু ওয়ায়িল তার পিতা থেকে বর্ণিত হাদীস নিষেধ রয়েছে।
لَا تَقُولُوا الْكَرْمُ وَلَكِنْ قُولُوا الْعِنَبُ وَالْحَبَلَةُ
অর্থাৎ নিশ্চয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা ‘কার্ম’ বলো না। বরং তোমরা আঙ্গুর বা আঙ্গুরের গাছ বলো। আর এটাই আসল কথা। (শারহুন নাবাবী ১৫শ খন্ড, হাঃ ২২৪৮/১২)
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৬৩-[১৪] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা আঙ্গুরের নাম ’’কারম’’ (كَرْم) রাখবে না এবং যুগের হতাশা ও নৈরাজ্যজনক শব্দ উচ্চারণ করো না। কেননা আল্লাহই যুগ। অর্থাৎ- যুগ আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছাধীন। (বুখারী)[1]
بَابُ الْأَسَامِىْ
وَعَنْ
أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَا تُسَمُّوا الْعِنَبَ الْكَرْمَ وَلَا تَقُولُوا: يَا خَيْبَةَ الدَّهْرِ فَإِنَّ اللَّهَ هُوَ الدهرُ . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ বুখারীতে আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসের প্রথম দিকে আঙ্গুরকে كرم বলতে নিষেধ করা হয়েছে। এর পরে (يَا خَيْبَةَ الدَّهْرِ) অর্থাৎ যুগের নিরাশ বলে সম্বোধন করতে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ যুগের কোন দোষ নেই। যুগ পরিবর্তন করেন স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা নিজেই। এজন্যে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (فَإِنَّ اللهَ هُوَ الدهرُ) অর্থাৎ অতঃপর নিশ্চয় আল্লাহ নিজেই যুগ। যুগের ভালো ও মন্দ কোন কিছু করার ক্ষমতা নেই যদি আল্লাহ তা‘আলা না করেন। কেননা আল্লাহ তা‘আলা যুগের সৃষ্টিকর্তা। তিনি যুগকে পরিবর্তন, রূপান্তর, পরিবর্ধন করেন। যুগের মধ্যে কারও পরিবর্তন করার ক্ষমতা নেই আল্লাহ ছাড়া। আর যুগ আল্লাহ তা‘আলার হুকুমে নিয়ন্ত্রণে নিয়ন্ত্রিত ও বশীভূত, অনুগত। জামি‘উস্ সগীরে বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেন।
শারহু মুসলিমে আবূ হুরায়রা বর্ণিত হাদীসে রয়েছে,
يسب بن آدَمَ الدَّهْرَ وَأَنَا الدَّهْرُ بِيَدَيَّ اللَّيْلُ وَالنَّهَارُ
অর্থাৎ- আবূ হুরায়রা বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেনঃ ইবনু আদম (আদম সন্তান) যুগকে গালি দেয়, অথচ আমিই যুগ আমারই হাতে রাত ও দিন অর্থাৎ আমার হুকুমের অধীনে রাত-দিন।
আবূ হুরায়রা বর্ণিত অন্য হাদীসে রয়েছে শাব্দিক কিছু পরিবর্তন সহকারে,
يؤذيني بن آدَمَ يَسُبُّ الدَّهْرَ وَأَنَا الدَّهْرُ أُقَلِّبُ اللَّيْلَ والنهار
অর্থাৎ আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ আদম সন্তান আমাকে কষ্ট দেয়, সে যুগকে গালি দেয়। আর অথচ আমিই যুগ, আমি রাত ও দিবসকে পরিবর্তন করি। শারহু মুসলিমে আরো রয়েছে শাব্দিক কিছু পরিবর্তন সহকারে, تَسُبُّوا الدَّهْرَ فَإِنَّ اللهَ هُوَ الدَّهْرُ
অর্থাৎ তোমরা যুগকে গালি দিও না, কেননা আল্লাহ তা‘আলা তিনিই যুগ।
অন্য বর্ণনায় রয়েছে, আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে, ولا تقولوا يا خيبة الدهر، فإن الله هو الدهر
অর্থাৎ তোমাদের কেউ বলবে না ‘হে যুগের নিরাশ!’ কেননা আল্লাহ তা‘আলাই যুগ। এটা ছাড়া ফাতহুল বারীতেও একই রূপ নিষেধ রয়েছে।
(শারহুন নাবাবী ১৫শ খন্ড, হাঃ ২২৬৪/৪; ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬১৮২)
শিক্ষা : বিভিন্ন হাদীসের পর্যালোচনা থেকে বুঝা গেল যে, হে যুগের নিরাশ! যুগের বঞ্চিত বলা যাবে না এবং যুগ ও কালকে গালি দেয়া যাবে না। সম্পূর্ণ নিষেধ।
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৬৪-[১৫] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যেন যুগকে গালি না দেয় (দোষারোপ না করে)। কারণ যুগের ব্বির্তন আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছাধীন। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْأَسَامِىْ
وَعَنْهُ
قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَسُبَّ أَحَدُكُمُ الدَّهْرَ فَإِنَّ اللَّهَ هوَ الدَّهْر» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে রয়েছে,
عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ:لَا يَسُبُّ أَحَدُكُمُ الدَّهْرَ، فَإِنَّ اللهَ هُوَ الدَّهْرُ وَلَا يَقُولَنَّ أَحَدُكُمْ لِلْعِنَبِ الْكَرْمَ، فَإِنَّ الْكَرْمَ الرَّجُلُ الْمُسْلِمُ
অর্থাৎ- রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অবশ্যই তোমাদের কেউ যুগকে গালি দিবে না, কেননা আল্লাহ তিনিই যুগ এবং তোমাদের কেউ অঙ্গুরকে কার্ম বলবে না, কেননা الكرم দ্বারা উদ্দেশ্য হলো একজন মুসলিম ব্যক্তি। এটা ছাড়া বিভিন্ন হাদীসে যুগকে গালি দেয়া এবং আঙ্গুরকে الكرم বলা নিষেধ করা হয়েছে, অতঃপর আমরা এরূপ করব না এবং বলব না। (শারহুন নাবাবী ১৫শ খন্ড, হাঃ ২২৪৭/৬)
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৬৫-[১৬] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যেন কখনো এ কথা না বলে যে, আমার আত্মা কলুষিত হয়েছে; বরং বলবে, আমার আত্মা কষ্ট বা ব্যথা পাচ্ছে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
এ প্রসঙ্গে আবূ হুরায়রা(রাঃ) বর্ণিত হাদীস ’’ঈমান’’ অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে।
بَابُ الْأَسَامِىْ
وَعَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَا يَقُولَنَّ أَحَدُكُمْ: خَبُثَتْ نَفْسِي وَلَكِنْ لِيَقُلْ: لَقِسَتْ نَفْسِي . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
وَذُكِرَ حديثُ أبي هريرةَ: «يُؤذيني ابنُ آدمَ» فِي «بَاب الْإِيمَان»
ব্যাখ্যাঃ ফাতহুল বারীতে রয়েছে ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে এবং আবূ উমামাহ্ ইবনু সাহল তিনি তার পিতা হতে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে,
عَنْ الزُّهْرِيِّ عَنْ أَبِىْ أُمَامَةَ بْنِ سَهْلٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ النَّبِىِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَا يَقُولَنَّ أَحَدُكُمْ خَبُثَتْ نَفْسِي وَلَكِنْ لِيَقُلْ لَقِسَتْ نَفْسِي تَابَعَهُ عُقَيْلٌ
অর্থাৎ আবূ উমামাহ্ ইবনু সাহল তার পিতা হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, তোমাদের কেউ অবশ্যই বলবে না আমার আত্মা-মন দুষ্ট, অনিষ্টকর, মন্দ হয়েছে এবং কিন্তু তার বলা উচিত আমার মন-আত্মা আকৃষ্ট, আকর্ষিত হয়েছে। এ হাদীসের অনুসরণ করেছে ‘উকায়ল।
শিক্ষা : আত্মা-মন অনিষ্টকর বা মন্দ হয়েছে না বলে, আকৃষ্ট বা আকর্ষিত, ঝুঁকে পড়েছে বলা উচিত।
(ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬১৭৯)
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৬৬-[১৭] শুরাইহ ইবনু হানী (রহঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন, যখন তিনি তাঁর গোত্রের প্রতিনিধি দলের সাথে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে উপস্থিত হলেন, তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শুনলেন যে, তাঁর গোত্র তাঁকে ’’আবুল হাকাম’’ (اَبُوْ الْحَكَمِ) উপনামে ডাকছে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে নিজের কাছে ডাকলেন এবং বললেনঃ আল্লাহ তা’আলাই ’’হাকাম’’ এবং হুকুম তো তাঁরই ইখতিয়ারাধীন। তুমি কেন ’’আবুল হাকাম’’ উপনাম গ্রহণ করেছ। তিনি জবাবে বললেনঃ আমাদের সম্প্রদায়ের লোকেদের যখন কোন ব্যাপারে মতানৈক্য হয়, তখন তারা নিঃসন্দেহে আমার কাছে আসে এবং আমি তাদের মাঝে এমনভাবে ফায়সালা করি যে, তারা উভয় দলই সন্তুষ্ট হয়ে যায় এবং আমার আদেশকে শিরোধার্য করে মেনে নেয়। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ কাজ খুব ভালো কাজ। তোমার কয়টি সন্তান আছে? জবাবে তিনি (হানী) বললেনঃ আমার তিনটি ছেলে আছে- ১. শুরাইহ, ২. মুসলিম, ৩. ’আবদুল্লাহ। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ এদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ কে? তিনি বললেনঃ ’’শুরাইহ’’। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ ঠিক আছে, তোমার উপনাম আবূ শুরাইহ। (আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
عَن شُرَيْح بن هَانِئ عَن أبيهِ أَنَّهُ لَمَّا وَفَدَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَعَ قَوْمِهِ سَمِعَهُمْ يُكَنُّونَهُ بِأَبِي الْحَكَمِ فَدَعَاهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَكَمُ فَلِمَ تُكَنَّى أَبَا الْحَكَمِ؟» قَالَ: إِنَّ قَوْمِي إِذَا اخْتَلَفُوا فِي شَيْءٍ أَتَوْنِي فَحَكَمْتُ بَيْنَهُمْ فَرَضِيَ كِلَا الْفَرِيقَيْنِ بِحُكْمِي. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا أَحْسَنَ هَذَا فَمَا لَكَ مِنَ الْوَلَدِ؟» قَالَ: لِي شُرَيْحٌ وَمُسْلِمٌ وَعَبْدُ اللَّهِ
قَالَ: «فَمَنْ أَكْبَرُهُمْ؟» قَالَ قُلْتُ: شُرَيْحٌ. قَالَ فَأَنْتَ أَبُو شُرَيْحٍ . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যাঃ ‘আওনুল মা‘বূদে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে,
عن ابيه عن ابيه هانئ انه لما وفد إلى رسول الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مع قومه سمعهم يكنونه بابى الحكم فدعاه رسول الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فقال " ان الله هو الحكم واليه الحكم فلم تكنى ابا الحكم" فقال ان قومى اذا اختلفوا فى شيئ اتونى فحكمت بينهم فرضى كلا الفريقين فقال رسول الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ "مااحسن هذا فمالك من الولد" قا لي شريح ومسلم وعبد الله قال ومن اكبرهم قلت شريح قال فأنت ابو شريح"
অর্থাৎ- তার পিতা হানি হতে বর্ণিত, তিনি যখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট তার সম্প্রদায়ের লোকেদের সঙ্গে আসলেন, তিনি তাদেরকে তাকে ‘আবুল হাকাম’ উপনামে আহবান করতে শ্রবণ করলেন। অতঃপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ডাকলেন, আর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলাই হলেন الحكم (হাকাম) আর তার নিকটেই ফায়সালা الحكم (হাকাম), অতঃপর কেন? তোমাকে ابو الحكم (আবুল হাকাম) উপনামে ডাকা হয়। অতঃপর তিনি বললেন, নিশ্চয় আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা যখন কোন বিষয়ে মতভেদ করেন। তখন তারা আমার কাছে আগমন করেন। অতঃপর আমি তাদের মাঝে সমাধান ও ফায়সালা প্রদান করি। অতঃপর উভয় দলের লোকেরা সন্তুষ্ট হয়ে যায়। তারপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটা কতই না সুন্দর! তোমার কি সন্তান রয়েছে? তখন তিনি বললেন আমার সন্তান রয়েছে শুরাইহ, মুসলিম ও ‘আবদুল্লাহ নামে (তিনজন)। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তাহলে তাদের মধ্যে বড় কে? আমি বললাম, শুরাইহ। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, অতএব তুমি আবূ শুরাইহ। নাসায়ীতেও কিছু শাব্দিক পরিবর্তনসহ হাদীস রয়েছে।
শিক্ষা : ‘আবুল হাকাম’ কারো নাম রাখা যাবে না এবং বড় সন্তানের নামের সঙ্গে উপনাম হওয়াটা উচিত। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৯৪৭; শারহুন নাসায়ী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ৫৪০২)
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৬৭-[১৮] মাসরূক (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি ’উমার (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ’তুমি কে’? আমি বললাম, আমি আজদা’-এর পুত্র মাসরূক। ’উমার(রাঃ) বললেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ শয়তানের এক নাম আজদা’। (আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَن
مسروقٍ قَالَ: لَقِيتُ عُمَرَ فَقَالَ: مَنْ أَنْتَ؟ قُلْتُ: مَسْرُوقُ بْنُ الْأَجْدَعِ. قَالَ عُمَرُ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «الْأَجْدَعُ شيطانٌ» رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وابنُ مَاجَه
হাদীস য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘মুজালিদ ইবনু সা‘ঈদ’’ নামের একজন য‘ঈফ বর্ণনাকারী আছে। তার ব্যাপারে ইমাম বুখারী বলেনঃ আমি তার হাদীস লিখি না, আমি তার হাদীস লিখি না, আমি তার হাদীসে সময় ব্যয় করি না। অন্যবার বলেন, সে মিথ্যুক। ইমাম যাহাবী বলেনঃ সে একজন য‘ঈফ বর্ণনাকারী। ইয়াহইয়া ইবনু মা‘ঈন সহ অনেকে তাকে য‘ঈফ বলেছেন। বিস্তারিত দেখুন- তাহযীবুল কামাল, রাবী নং ৫৭৮০।
ব্যাখ্যাঃ ‘আওনুল মা‘বূদের মধ্যে মাসরূক বর্ণিত হাদীসে রয়েছে,
عَنْ مَسْرُوقٍ، قَالَ: لَقِيتُ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ ؓ، فَقَالَ: مَنْ أَنْتَ؟ قُلْتُ مَسْرُوقُ بْنُ الْأَجْدَعِ، فَقَالَ عُمَرُ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: "الْأَجْدُعُ: شَيْطَانٌ
অর্থাৎ- মাসরূক (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘উমার ইবনুল খত্ত্বাব -এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। অতঃপর তিনি বলেছেন। তুমি কে? আমি বললামঃ مسروق بن الاجدع (মাসরূক ইবনুল আজদা‘)। অতঃপর ‘উমার বললেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, الاجدع (আল আজদা‘) : শয়তান, অর্থাৎ শয়তানসমূহের একটি শয়তানের নাম।
শিক্ষা : الاجدع (আল আজদা‘) কারও নাম না রাখা, যেহেতু শয়তানের নামের সঙ্গে সাদৃশ্য হয়।
(‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৯৪৯)
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৬৮-[১৯] আবুদ্ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে তোমাদের পিতার নাম ধরে ডাকা হবে। সুতরাং তোমরা তোমাদের উত্তম নাম রাখবে। (আহমাদ ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ
أَبِي الدَّرْدَاءِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «تُدْعَوْنَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِأَسْمَائِكُمْ وَأَسْمَاءِ آبَائِكُمْ فَأَحْسِنُوا أسمائكم» رَوَاهُ أَحْمد وَأَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে উল্লেখিত ‘‘আবদুল্লাহ ইবনু আবূ যাকারিয়্যা আবুদ্ দারদা ’’ থেকে হাদীসটি শোনেননি, কাজেই সনদে বিচ্ছিন্নতা হওয়ার কারণে হাদীসটি য‘ঈফ। দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ৫৪৬০।
ব্যাখ্যাঃ ‘আওনুল মা‘বূদের মধ্যে ‘আবদুল্লাহ ইবনু আবূ যাকারিয়্যা তিনি আবুদ্ দারদা হতে বর্ণনা করেন, আবুদ্ দারদা (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে রয়েছে, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন তোমাদের আহবান করা হবে তোমাদের নামে এবং তোমাদের পিতাদের নামে। অতএব তোমরা তোমাদের সুন্দর ও উত্তম নাম রাখ।
ত্ববারানীর বর্ণনায় রয়েছে,
فِىْ غَيْرِه أَوْ يُقَالُ تُدْعٰى طَائِفَةٌ بِأَسْمَاءِ الْآبَاءِ وَطَائِفَةٌ بِأَسْمَاءِ الْأُمَّهَاتِ (فَأَحْسِنُوا أَسْمَاءَكُمْ) أَىْ أَسْمَاءَ أَوْلَادِكُمْ وَأَقَارِبِكُمْ وَخَدَمِكُمْ
অর্থাৎ একদলকে আহবান করা হবে পিতাদের নামে এক দলকে মাতাদের নামে। অতএব তোমরা তোমাদের (সন্তানদের, আত্মীয়দের, চাকর-চাকরাণীদের) সুন্দর ও উত্তম নাম রাখ।
শিক্ষা : আমাদের সবার উচিত কুরআন ও সহীহ হাদীসের সমর্থিত উত্তম ও সুন্দর নামগুলো রাখা। যে নামগুলো রাখতে নিষেধ করা হয়েছে সেগুলো নাম না রাখা। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৯৪০) [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৬৯-[২০] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নাম ও উপনাম একই ব্যক্তির মধ্যে একত্র করতে নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ- ’’মুহাম্মাদ’’ নাম রেখে তাঁরই উপনাম ’’আবুল কাসিম’’ রাখতে নিষেধ করেছেন। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ أَبِي
هُرَيْرَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ نَهَى أَنْ يَجْمَعَ أَحَدٌ بَيْنَ اسْمه وكُنيتِه وَيُسمى أَبَا الْقَاسِم. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাম এবং উপনাম একত্রে রাখতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন। কারও জন্য একত্র রাখা বৈধ নয়। আর জাবির হতে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন তোমরা আমার নাম রাখবে তখন তোমরা আমার উপনাম রাখবে না। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৮৪১)
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৭০-[২১] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন তোমরা আমার নামে নাম রাখবে, তখন আমার উপনামে উপনাম রাখবে না। (তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ)[1]
ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসটি গরীব। আবূ দাঊদ-এর অপর বর্ণনায় রয়েছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আমার নামে নাম রাখবে, সে আমার উপনামে উপনাম রাখবে না। আর যে ব্যক্তি আমার উপনামে উপনাম রাখবে, সে আমার নামে নাম রাখবে না।
وَعَنْ
جَابِرٌ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ قَالَ: «إِذَا سَمَّيْتُمْ بِاسْمِي فَلَا تَكْتَنُوا بِكُنْيَتِي» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ. وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ. وَفِي رِوَايَةِ أَبِي دَاوُدَ قَالَ: «مَن تسمَّى باسمي فَلَا يَكْتَنِ بِكُنْيَتِي وَمَنْ تَكَنَّى بِكُنْيَتِي فَلَا يَتَسَمَّ باسمي»
ব্যাখ্যাঃ ‘আওনুল মা‘বূদের মধ্যে আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে,
عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَسَمَّوْا بِاسْمِي وَلَا تَكَنَّوْا بِكُنْيَتِي
অর্থাৎ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা আমার নামে নামকরণ করতে পার এবং আমার উপনামে ডাকিও না। এ প্রসঙ্গে পূর্বেও আলোচনা করা হয়েছে। এ ব্যাপারে ইমাম আবূ দাঊদ, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, বুখারী ও মুসলিম ইত্যাদি গ্রন্থে শাব্দিক কিছু পরিবর্তন সহকারে নিষেধ করা হয়েছে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৯৫৭)
তুহফাতুল আহ্ওয়াযীতে রয়েছে, জাবির বর্ণিত হাদীসে এরূপ, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
إذا سميتم بِي فَلَا تَكَنَّوْا بِي
অর্থাৎ- যখন তোমরা আমার নামে নামকরণ করবে বা নাম রাখবে তখন তোমরা আমার উপনামে নামকরণ করবে না বা উপনামে ডাকবে না।
* উপনাম ও মূল নাম একত্রকরণ বৈধ হওয়ার দলীল এবং এটা কোন সময় বৈধ- এ ব্যাপারে আলোচনা উল্লেখ করা হলো,
عن محمد بن الحنفية قال قال علي ؓ الله قلت يا رسول الله ان ولد لى من بعدك ولد اسميه باسمك وأكنيه بكنيتك؟ قال نعم
অর্থাৎ মুহাম্মাদ ইবনু হানাফিয়্যাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আলী বললেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! যদি আমার সন্তান হয় আপনার (মৃত্যুর পর) আমি কি তার নাম রাখতে পারি আপনার নামে এবং আমি কি আপনার উপনামে তার নাম রাখতে পারি বা তাকে আপনার উপনামে ডাকতে পারি? তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, হ্যাঁ, (উপনামে নাম রাখতে পার বা ডাকতে পার)। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৮৪২)
শিক্ষা : নিষেধাজ্ঞা সীমাবদ্ধ তার বেঁচে থাকা অবস্থায়, অতঃপর বৈধ হবে উভয়ের মাঝে একত্র করা তার মৃত্যুর পর- এ মত ব্যক্ত করেন ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ)। অধিকাংশ ‘উলামার মত যেমন নাবাবীর আলোচনায় রয়েছে এবং ইমাম শাফি‘ঈ ও আহলুয্ যাহির বলেন, এ প্রসঙ্গে আবুল কাসিম কারো জন্য কখনও জায়িয নেই চাই তার নাম মুহাম্মাদ অথবা আহমাদ অথবা না হোক। আনাস -এর বাহ্যিক হাদীসের দৃষ্টিতে যা অধ্যায়ের মধ্যে রয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৭১-[২২] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন জনৈকা মহিলা বলল : হে আল্লাহর রসূল! আমার একটি পুত্র সন্তান হয়েছে। আমি তার নাম ’’মুহাম্মাদ’’ এবং তার কুনিয়াত ’’আবুল কাসিম’’ রেখেছি। অতঃপর আমার কাছে এ কথা ব্যক্ত করা হলো যে, আপনি এ নাম রাখা পছন্দ করেন না। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ কিসে আমার নাম হালাল করল, আর আমার কুনিয়াত হারাম করল? অথবা কিসে আমার উপনাম হারাম করল, আর নাম হালাল করল? [আবূ দাঊদ; আর ইমাম মুহয়িউইস্ সুন্নাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এ হাদীসটি গরীব[[1]
وَعَنْ
عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا أَنَّ امْرَأَةً قَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي وَلَدْتُ غُلَامًا فَسَمَّيْتُهُ مُحَمَّدًا وَكَنَّيْتُهُ أَبَا الْقَاسِمِ فَذُكِرَ لِي أَنَّكَ تَكْرَهُ ذَلِكَ. فَقَالَ: «مَا الَّذِي أَحَلَّ اسْمِي وَحرم كنيتي؟ أَو ماالذي حَرَّمَ كُنْيَتِي وَأَحَلَّ اسْمِي؟» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ. وَقَالَ محيي السّنة: غَرِيب
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘মুহাম্মাদ ইবনু ‘ইমরান আল হাজাবী’’ নামের বর্ণনাকারী মুনকারুল হাদীস। এজন্য হাদীসটি য‘ঈফ। বিস্তারিত দেখুন- আর্ রওযুন্ নাযীর ৮০৮ নং হিদায়াতুর্ রুওয়াতি ইলা তাখরীজি আহাদীসিল মাসাবীহি ওয়াল মিশকাত ৪/৩৬২ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে এবং আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার নামে নাম রাখো আমার উপনামে নাম রেখ না।
عن عائشة رضي الله عنها قالت جاءت امرأة الى رسول الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فقالت يا رسول الله انى قد ولدت غلاما فسميته محمدا و كنيته ابا القاسم فذكرلى انك تكره ذلك فقال "ما الذى احل اسمى وحرم كنيتى" أو " ما الذى حرم كنيتى واحل اسمى"
অর্থাৎ- ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। জনৈকা মহিলা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসলেন, অতঃপর তিনি বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি একজন ছেলে জন্ম দিয়েছি, অতঃপর তার নাম রেখেছি মুহাম্মাদ এবং তার উপনাম রেখেছি আবুল কাসিম। অতঃপর আমার কাছে উল্লেখ করা হয়েছে আপনি তা অপছন্দ করেন। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, কিসে আমার নাম হালাল করেছে এবং কিসে আমার উপনাম হারাম করেছে অথবা কিসে আমার উপনাম হারাম করেছে এবং কিসে আমার নাম হালাল করেছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৯৬০)
তুহফাতুল আহ্ওয়াযীতে রয়েছে ‘আলী ইবনু আবী ত্বালিব হতে বর্ণিত হাদীস,
عن علي ابن أَبِىْ طالب انه قال يا رسول الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ارأيت ان ولدلى بعدك ولد اسمه محمد أو اكنيه بكنيتك؟ قال نعم قال فكانت رخصة لي
অর্থাৎ ‘আলী ইবনু আবী ত্বালিব (রাঃ) বর্ণিত। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনার অভিমত কি? যদি আপনার (মৃত্যুর) পর আমার একটি ছেলে সন্তান হয় তাহলে কি তার নাম মুহাম্মাদ রাখতে পারব? আর আপনার উপনামে তাকে ডাকতে পারব বা আপনার উপনাম রাখতে পারব? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, হ্যাঁ (পারবে)। রাবী বলেন, আমার জন্য অনুমতি পাওয়া গেল। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৮৪৩)
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৭২-[২৩] মুহাম্মাদ ইবনু হানাফিয়্যাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রসূল! যদি আপনার ইন্তিকালের পর আমার কোন পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে, তবে কি আমি আপনার নামে নাম ও আপনার উপনামে উপনাম রাখব? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ হ্যাঁ। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن مُحَمَّد
بن الحنفيَّةِ عَنْ أَبِيهِ قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَرَأَيْتَ إِنْ وُلِدَ لِي بَعْدَكَ وَلَدٌ أُسَمِّيهِ بِاسْمِكَ وَأُكَنِّيهِ بِكُنْيَتِكَ؟ قَالَ: «نَعَمْ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ তুহফাতুল আহ্ওয়াযীতে রয়েছে ‘আলী ইবনু আবী ত্বালিব (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে ‘আলী ইবনু আবী ত্বালিব (রাঃ)-এর জন্য অনুমতি ছিল। অতঃপর জায়িয রয়েছে। একত্র করা সন্দেহ দূর হয়ে গেল। এ আলোচনা বহুবার হয়েছে। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৮৪৩)
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৭৩-[২৪] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এক প্রকার শাক তুলতাম, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ শাকের নামানুসারে আমার উপনাম রাখলেন। (তিরমিযী)[1]
ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসটি এ বর্ণনা সূত্র ছাড়া অন্য কোন বর্ণনা সূত্রে বর্ণিত হয়নি। আর মাসাবীহ গ্রন্থকার এ হাদীসটিকে সহীহ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
وَعَن أنس
قَالَ: كَنَّانِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ بِبَقْلَةٍ كُنْتُ أَجْتَنِيهَا. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ لَا نَعْرِفُهُ إِلَّا مِنْ هَذَا الْوَجْه. وَفِي «المصابيح» صَححهُ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘জাবির আল জু‘ফী’’ নামের বর্ণনাকারী; এ বর্ণনাকারী মাতরূক। এ হাদীসটির অন্য একটি সানাদ আছে যেটি এর চেয়ে ভালো। আর সেই সনদে একজন বর্ণনাকারী আছে যার নাম ‘‘শরীক ইবনু ‘আবদুল্লাহ আল কাযী’’। সে একজন য‘ঈফ রাবী। দেখুন- আলবানী (রহিমাহুল্লাহ)-এর তাহক্বীককৃত হিদায়াতুর্ রুওয়াত ইলা তাখরীজি আহাদীসিল মাসাবীহি ওয়াল মিশকাত ৪/৩৬০ পৃঃ।
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৭৪-[২৫] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুৎসিত নাম পরিবর্তন করে রাখতেন। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ
رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ كَانَ يُغَيِّرُ الِاسْم الْقَبِيح. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৭৫-[২৬] বাশীর ইবনু মায়মূন (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর চাচা উসামাহ্ ইবনু আখদারী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট একদল লোক এলো। তাদের মধ্যে এক ব্যক্তি ছিল, তাকে ’’আসরাম’’ (গাছ কর্তনকারী বা কাঠুরিয়া) বলা হত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম কি? লোকটি বলল : ’’আসরাম’’। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ না; বরং তুমি ’’যুর’আহ্’’। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن بشير بن مَيْمُون عَن أُسَامَةَ بْنِ أَخْدَرِيٍّ أَنَّ رَجُلًا يُقَالُ لَهُ أصْرمُ كانَ فِي النَّفرِ الَّذِينَ أَتَوْا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا اسْمك؟» قَالَ: «بَلْ أَنْتَ زُرْعَةُ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৭৬-[২৭] ইমাম আবূ দাঊদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’আস, ’আযীয, ’আতালাহ্, শয়তান, হাকাম, গুরাব, হাবাব ও শিহাব ইত্যাদি নামগুলো পরিবর্তন করে রেখেছেন। তিনি আরো বলেন, আমি সংক্ষিপ্ত করার জন্য এর বর্ণনাসূত্র পরিত্যাগ করেছি।[1]
وَقَالَ:
وَغَيَّرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اسْم الْعَاصِ وعزير وَعَتَلَةَ وَشَيْطَانٍ وَالْحَكَمِ وَغُرَابٍ وَحُبَابٍ وَشِهَابٍ وَقَالَ: تركت أسانيدها للاختصار
ব্যাখ্যাঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপছন্দনীয় নাম পরিবর্তন করেছেন যেমন এক বর্ণনায় রয়েছে, এক ব্যক্তির নাম ছিল اسود (আসওয়াদ) অর্থ কালো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নাম রাখলেন ابيض (আব্ইয়ায) যার অর্থ সাদা। যা বর্ণনা করেন ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ)।
এছাড়া আবূ দাঊদ-এর বর্ণনায় রয়েছে, এক ব্যক্তির নাম ছিল اصرم (আসরম), রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নাম পরিবর্তন করে রাখলেন زرعة (যুর্‘আহ্) আর صرم অর্থ কর্তন করা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম العاص (‘আস) এর নাম عزيز (‘আযীয) ও شهاب، حباب، غراب، الحكم، شيطان، عتلة (শিহাব, হিবাব, গরাব, আল হাকাম, শয়তান, ‘আতালাহ্) নামগুলো পরিবর্তন করেন, এটা ছাড়া অনেক নাম পরিবর্তন করেছেন যা বিভিন্ন বর্ণনায় রয়েছে।
আর তুহফাতুল আহ্ওয়াযীতে বর্ণিত হাদীসেও পরিবর্তনের কথা রয়েছে।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপছন্দনীয় নাম পরিবর্তন করতেন। ‘আওনুল মা‘বূদে পরিবর্তনের কথা উল্লেখ রয়েছে।
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৭৭-[২৮] আবূ মাস্’ঊদ আল আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি আবূ ’আবদুল্লাহ (রাঃ)-কে অথবা আবূ ’আবদুল্লাহ(রাঃ) আবূ মাস্’ঊদ আল আনসারী (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন যে, তুমি زَعَمُوْا শব্দটি সম্পর্কে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কী বলতে শুনেছ? তিনি বললেনঃ আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, زَعَمُوْا শব্দটি মানুষের নিকৃষ্ট বাহন (অর্থাৎ- এ শব্দটির ব্যবহার খারাপ)। (আবূ দাঊদ)[1]
ইমাম আবূ দাঊদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আবূ ’আবদুল্লাহ হুযায়ফাহ্ -এর উপনাম।
وَعَن أبي
مسعودٍ الأنصاريِّ قَالَ لِأَبِي عَبْدِ اللَّهِ أَوْ قَالَ أَبُو عَبْدِ اللَّهِ لِأَبِي مَسْعُودٍ: مَا سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ فِي (زَعَمُوا)
قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «بِئْسَ مَطِيَّةُ الرَّجُلِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَقَالَ: إِنَّ أَبَا عَبْدِ اللَّهِ حُذَيْفَة
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৭৮-[২৯] হুযায়ফাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা এরূপ বলো না, ’’যা কিছু আল্লাহ চান এবং অমুক ব্যক্তি চায়’’; বরং তোমরা বলবে, ’’যা কিছু আল্লাহ চান’’ অতঃপর ’’অমুক ব্যক্তি চায়’’। (আহমাদ ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ
حُذَيْفَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لَا تَقُولُوا: مَا شَاءَ اللَّهُ وَشَاءَ فُلَانٌ وَلَكِنْ قُولُوا: مَا شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ شَاءَ فلَان . رَوَاهُ أَحْمد وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ অপছন্দনীয় নাম পরিবর্তন করা উচিত। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(مَا شَاءَ اللهُ وَشَاءَ فُلَانٌ) ‘‘যা কিছু আল্লাহ চান এবং অমুক ব্যক্তি চায়’’ বলা যাবে না, এটাতে আল্লাহ তা‘আলার ক্ষমতা ও ব্যক্তির ক্ষমতা একই রূপ হয়ে যায়। আর এটা শির্কের পর্যায়ে পড়ে যায়। তাই এরূপ বলা যাবে না বরং ماشاء الله এর পরে واو হরফে আত্বফ রয়েছে তার পরিবর্তে ثم হরফে আত্বফ ব্যবহার করতে হবে। এটার ফলে মাখলূক ও খালিক-এর মাঝে দূরত্ব ও পার্থক্য উপলব্ধি করা যায়, এটার মাধ্যমে বিলম্ব বুঝা যায়। আল্লাহ তা‘আলা ও অন্যের মাঝে সাদৃশ্যপূর্ণ শির্ক হতে মুক্ত থাকা যায়। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (مَا شَاءَ اللهُ وَشَاءَ فُلَانٌ) বলার পরিবর্তে (مَا شَاءَ اللهُ وَشَاءَ فُلَانٌ) বলতে নির্দেশ দিয়েছেন। আর এটাই সঠিক অন্যথায় শির্ক হবে। ইমাম আহমাদ, আবূ দাঊদ অনুরূপ বর্ণনা করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, সূরাহ্ আত্ তাকভীর-এ وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللهُ অর্থাৎ তোমরা চাইলে হবে না কোন কিছু, যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলা না চাইবেন’’- (সূরাহ্ আদ্ দাহর/ইনসান ৭৬ : ৩০)। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৭৯-[৩০] অপর এক বর্ণনায় مُنْقَطِعْ হিসেবে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ’’যা কিছু আল্লাহ তা’আলা ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চান’’ বলবে না; বরং শুধু এতটুকু বলবে, ’’যা কিছু একমাত্র আল্লাহ তা’আলা চান’’। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
وَفِي رِوَايَةٍ
مُنْقَطِعًا قَالَ: لَا تَقُولُوا: مَا شَاءَ اللَّهُ وَشَاءَ مُحَمَّدٌ وَقُولُوا مَا شَاءَ اللَّهُ وحْدَه «. رَوَاهُ فِي» شرح السّنة
ব্যাখ্যাঃ (مَا شَاءَ اللهُ وَشَاءَ مُحَمَّدٌ) আল্লাহ তা‘আলার সঙ্গে واو আত্বফ দ্বারা বর্ণনা করা যাবে না বরং ثم হরফে আত্বফ ‘আল্লাহ’ শব্দের পরে উল্লেখ করতে হবে তাহলে শির্ক হবে না অথবা ‘আল্লাহ’ শব্দের পরে وحده শব্দ উল্লেখ করতে হবে তাহলেও শির্ক হতে মুক্ত থাকা যাবে। যেমন (مَا شَاءَ اللهُ وَشَاءَ مُحَمَّدٌ) বলা যাবে না বরং বলতে হবে مَا شَاءَ اللهُ وحْدَهٗ অথবা বলা যাবে (مَا شَاءَ اللهُ ثُمَّ شَاءَ مُحَمَّدٌ)। যদি কেউ বলে (مَا شَاءَ اللهُ وَشَاءَ مُحَمَّدٌ) তা শির্কে জালী হবে অর্থাৎ স্পষ্ট শির্ক হবে। এ বর্ণনাটি শারহুস্ সুন্নাহ্-এর মধ্যে রয়েছে। অন্য রিওয়ায়াত অনুযায়ী ماشاء الله ثم شاء فلان বলা যাবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ) [সম্পাদক]
শিক্ষা : ماشاء الله وشاء فلان এবং مَا شَاءَ اللهُ وَشَاءَ مُحَمَّدٌ বললে শির্ক হবে এবং ماشاء الله ثم شاء فلان أو محمد বললে শির্ক হবে না।
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৮০-[৩১] উক্ত রাবী [হুযায়ফাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা কোন মুনাফিককে নেতা বলবে না। কেননা সে যখনই তোমাদের নেতা হয় বা তোমরা তাকে নেতা বলবে, তখন তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে অসন্তুষ্ট করলে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْهُ
عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا تَقُولُوا لِلْمُنَافِقِ سَيِّدٌ فَإِنَّهُ إِنْ يَكُ سَيِّدًا فَقَدْ أَسْخَطْتُمْ رَبَّكُمْ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ হুযায়ফাহ্ (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে মুনাফিককে سيد (সাইয়িদ) বলতে নিষেধ করা হয়েছে যে হাদীসটি হাদীস গ্রন্থ আবূ দাঊদে রয়েছে। এ হাদীসে মুনাফিককে سيد বলা যাবে না তাহলে বুঝা যায় مؤمن (মু’মিন)-কে সাইয়িদ বলা যাবে। আর এটা বিরোধী নয় যা বর্ণনা করেছে আহমাদ ও হাকিম ‘আবদুল্লাহ ইবনু শিখখীর হতে মারফু‘ হিসেবে। السيد দ্বারা আল্লাহ তা‘আলাকেই বুঝানো হয়েছে। যা মুসনাদ আহমাদে রয়েছে। আর যদি কেউ মুনাফিককে سيد বলে তাহলে সে যেন আল্লাহ তা‘আলাকে রাগান্বিত করল আর যে আল্লাহ তা‘আলাকে রাগান্বিত করল সে যেন বড় পাপ করল। আর এ হাদীসের ভাষ্য দ্বারা মুনাফিককে سيد বলা যাবে না। বললে আল্লাহ তা‘আলাকে রাগান্বিত করা হয়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ) [সম্পাদক]
শিক্ষা ও মূলকথা : المولى ও السيد (আল মাওলা ও আস্ সাইয়িদ) উভয় শব্দটি আল্লাহ তা‘আলার জন্য প্রকৃত পক্ষ প্রযোজ্য, অন্যের জন্য রূপক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। না করাটাই অনেক ভালো ও সঠিক। আল্লাহ আমাদেরকে তাওফীক দান করুন। পরিচিতির জন্য অনেকে ব্যবহার করে থাকে জায়িয মনে করে। والله أعلم (আল্লাহ অধিক ভালো জানেন।)
পরিচ্ছেদঃ ৮. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৮১-[৩২] ’আবদুল হামীদ ইবনু জুবায়র ইবনু শায়বাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি সা’ঈদ ইবনু মুসাইয়াব (রহিমাহুল্লাহ)-এর কাছে বসেছিলাম। তিনি আমাকে এ হাদীস বর্ণনা করলেন যে, তাঁর দাদা ’’হাযন’’ (حَزْن) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে উপস্থিত হলেন। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার নাম কী? তিনি জবাবে বললেনঃ আমার নাম ’’হাযন’’। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আমি তোমার নাম ’’সাহল’’ (سَهْل) রাখলাম। তিনি বললেনঃ আমি আমার নাম পরিবর্তন করতে চাই না। কেননা এ নাম আমার পিতা রেখেছেন। ইবনু মুসাইয়াব (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, তারপর হতে (এ নামের দরুন) আমাদের পরিবার দুঃখন্ডকষ্টে দিনাতিপাত করছে। (বুখারী)[1]
عَنْ
عَبْدِ الْحَمِيدِ بْنِ جُبَيْرِ بْنِ شَيْبَةَ قَالَ: جَلَسْتُ إِلَى سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيَّبِ فَحَدَّثَنِي أَنَّ جَدَّهُ حَزْنًا قَدِمَ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «مَا اسْمُكَ؟» قَالَ: اسْمِي حَزْنٌ قَالَ: «بَلْ أَنْتَ سَهْلٌ» قَالَ: مَا أَنَا بِمُغَيِّرٍ اسْمًا سَمَّانِيهِ أَبِي. قَالَ ابْنُ الْمُسَيَّبِ: فَمَا زَالَتْ فِينَا الْحُزُونَةُ بَعْدُ. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ ফাতহুল বারীতে রয়েছে, ‘আবদুল হামিদ ইবনু জুবায়র ইবনু শায়বাহ্ বলেছেন, আমি বসেছিলাম সা‘ঈদ ইবনু আল মুসাইয়্যাব-এর নিকটে, অতঃপর তিনি আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, তার দাদা হাযন (حزن) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আগমন করেন, তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমার নাম কি? তিনি বললেন, আমার নাম হাযন حزن (দুঃখ, কষ্ট, বেদনা...)। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তখন বললেন, বরং তুমি سهل (সাহল)। রাবী বলেন, আমি আমার নাম পরিবর্তন করতে সক্ষম নই, যে নাম রেখেছেন আমার আববা। তখন ইবনুল মুসাইয়্যাব বলেন, এরপর থেকে আমাদের মাঝে আল হাযূনাহ্ الحزونة চিন্তা ঝামেলা অবস্থান করে, চলতে থাকে। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬১৯৩)
শিক্ষা : এ হাদীস থেকে বুঝা যায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদেশ ও সুন্নাতকে অনুসরণ করার জন্য অপছন্দনীয় নাম পরিবর্তন করা ও তার আদেশের আনুগত্য করা। এটাতে কল্যাণ অবশ্যই রয়েছে। কারণ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা অবগত আছেন আমরা তা অবগত নই। অতএব আমরা জানতে পারলাম। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাত ও আদেশ না পালন করলে অশান্তি আসতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে হিফাযাত করেন। যা সুয়ূত্বী (রহিমাহুল্লাহ) উল্লেখ করেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশে অবশ্যই নাম পরিবর্তন করব যা বিভিন্ন রিওয়ায়াতে উল্লেখ রয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৮. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - নাম রাখা
৪৭৮২-[৩৩] আবূ ওয়াহ্ব আল জুশামী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা নবীদের নামে নিজেদের নাম রাখবে। আল্লাহ তা’আলার নিকট নামসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম হলো ’আবদুল্লাহ এবং ’আবদুর রহমান। আর (অর্থ ও প্রকৃতির দিক দিয়ে) বেশি সত্য নাম হলো- ’’হারিস’’ (কর্ষণকারী) ও ’’হাম্মাম’’ (ইচ্ছা পোষণকারী) ও এবং সবচেয়ে মন্দ নাম হলো, ’’হারব’’ (লড়াই) ও ’’মুররাহ্’’ (তিক্ততা ও দুঃখ)। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ
أَبِي وَهَبٍ الْجُشَمِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «تَسَمُّوا أَسْمَاءَ الْأَنْبِيَاءِ وَأَحَبُّ الْأَسْمَاءِ إِلَى اللَّهِ عَبْدُ اللَّهِ وَعَبْدُ الرَّحْمَنِ وَأَصْدَقُهَا حَارِثٌ وهمامٌ أقبحها حربٌ ومُرَّة» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
বিঃ দ্রঃ এ হাদীসটিকে আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) প্রথমে য‘ঈফ বলেছিলেন, য‘ঈফুল জামি‘ ২৪৩৫, ইরওয়া ১১৭৪, আল কালিমুত্ব ত্বইয়িব ২১৭ নং। অতঃপর তিনি তার (য‘ঈফ) মতটি থেকে ফিরে এসে সহীহ বলে ঘোষণা দিয়েছেন, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৯০৪, ১০৪০; আল কালিমুত্ব ত্বইয়িব ২১৮ নং, দারুল মা‘আরিফ ও তার ভূমিকায় ৫ নং পৃষ্ঠা দ্রঃ। দেখুন- তারাজু‘আতুল ‘আল্লামা আল আলবানী ফিত্ তাসহীহ ১/৬ পৃঃ, হাঃ ৪৩।
ব্যাখ্যাঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-গণের নামে নাম রাখার অনুমোদন দিয়েছেন এবং বলেছেন, সবচেয়ে উত্তম ও প্রিয় নাম আল্লাহর নিকট ‘আবদুল্লাহ ও ‘আবদুর রহমান এবং অধিক সত্য নাম হারিস ও হাম্মান, আর নিকৃষ্ট নাম হারব ও মুররাহ্।
নাসায়ীর এক বর্ণনায় রয়েছে, মুনযিরী বলেনঃ "وَكَانَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُحِبُّ الْفَأْلَ الْحَسَنَ وَالِاسْمَ الْحَسَنَ" নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুন্দর (فأل) (ফাল)-কে সুন্দর ও উত্তম নামকে ভালোবাসেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
শিক্ষা : রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবীগণের নাম রাখার অনুমতি দিয়েছেন এবং বলেছেন, ‘আবদুল্লাহ ও ‘আবদুর রহমান অতি প্রিয় নাম। আর উত্তম ও সুন্দর নাম হলে ভালো এবং নিকৃষ্ট নাম অপছন্দ করেন। আর পরিবর্তন করেন এবং পরিবর্তন করতে অনুপ্রেরণা প্রদান করেন। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি
৪৭৮৩-[১] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, দু’জন লোক পূর্বদিক থেকে এসে (বিশুদ্ধ ও সুচারুরূপে) বক্তৃতা উপস্থাপন করল। লোকেরা তাদের বক্তৃতা শুনে মুগ্ধ হয়ে গেল। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ নিশ্চয় কোন কোন বক্তৃতা যাদুকরী হয়। (বুখারী)[1]
بَابُ الْبَيَانِ وَالشِّعْرِ
عَن ابْن عمر قَالَ: قَدِمَ رَجُلَانِ مِنَ الْمَشْرِقِ فَخَطَبَا فَعَجِبَ النَّاسُ لِبَيَانِهِمَا فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ مِنَ الْبَيَانِ لَسِحْرًا» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ (رَجُلَانِ) দু’জন বক্তির নামা হলো যিবরিকান ইবনু বাদ্র এবং ‘আমর ইবনু আহতাম। তারা উভয়ে তামীম গোত্রের ছিলেন। নবম হিজরীতে বানী তামীম প্রতিনিধি দলের সাথে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে মদীনাতে আগমন করেছিলেন।
(الْمَشْرِقِ) বানী তামীম গোত্রের বসবাস ছিল ইরাকের দিকে। আর ইরাক মদীনার পূর্বে অবস্থিত। তাই বলা হয়েছে পূর্ব দিক থেকে আগমন করেন। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৭৬৭)
(إِنَّ مِنَ الْبَيَانِ لَسِحْرًا) ‘‘নিশ্চয় বক্তব্যে যাদু আছে’’ এটা বলার উদ্দেশ্য নিয়ে মুহাদ্দিসগণ মতানৈক্য করেছেন। ‘শারহুস্ সুন্নাহ্’ গ্রন্থকার বলেনঃ কতিপয় মুহাদ্দিস মনে করেন, এটা নিন্দা করে বলা হয়েছে। কেননা বক্তব্যে বানোয়াট, মনগড়া কথা কিছু বক্তা এমনভাবে উপস্থাপন করে যে মানুষ তা বিশ্বাস করে ফেলে। তাছাড়া যাদু বৈধ কোন বিষয় নয়। সাধারণত নিন্দার জন্যই অবৈধ বিষয়ের সাথে তুলনা করা হয়, কেউ কেউ মনে করেন, এ বক্তব্য সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার জন্য উৎসাহ দেয়া হয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
উভয়ের মাঝে সমন্বয়, সত্য বিষয়কে সুন্দরভাবে উপস্থাপন প্রশংসনীয় আর বাতিল বিষয়কে বক্তব্যে আকর্ষণীয় করে বর্ণনা করা নিন্দনীয়। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৭৬৭)
(البيان বিশুদ্ধ ও সুন্দর শব্দ দ্বারা মনের ভাব প্রকাশকে البيان বলে। الشعر অন্তর্মিলযুক্ত কথা যাতে সূক্ষ্ম জ্ঞান নিহিত থাকে তাকে الشعر বলে।)
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি
৪৭৮৪-[২] উবাই ইবনু কা’ব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন কোন কবিতা কৌশল কেবলই। (বুখারী)[1]
بَابُ الْبَيَانِ وَالشِّعْرِ
وَعَنْ أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ مِنَ الشِّعْرِ حِكْمَةً» . رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ
ব্যাখ্যাঃ কবিতায় (حِكْمَةً) আছে এর অর্থ হলো কবিতায় বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সুন্দর কথাগুলো প্রজ্ঞাময় হিকমাহ্-এর একটি দিক হলো এটা মানুষকে মূর্খতা থেকে মুক্ত করে। আর কবিতায় যদি হিকমাহপূর্ণ কথা থাকে তাহলে তা কবির জ্ঞানের বহিঃপ্রকাশ ঘটে এবং মানুষ উপকৃত হয়। যেমন : উপদেশ সম্বলিত কবিতাসমূহ। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬১৪৫; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৮৪৪)
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি
৪৭৮৫-[৩] ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কথায় অতিরঞ্জনকারীরা ধ্বংস হয়েছে। তিনি এ বাক্যটি তিনবার বলেছেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْبَيَانِ وَالشِّعْرِ
وَعَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «هَلَكَ الْمُتَنَطِّعُونَ» . قَالَهَا ثَلَاثًا. رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যাঃ (الْمُتَنَطِّعُونَ) চরমপন্থী অর্থাৎ দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়িকারী এবং কথায় ও কাজে সীমালঙ্ঘনকারী।
* কথার সীমালঙ্ঘন হলো অনর্থক কথাকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা।
* কাজের সীমালঙ্ঘন হলো দীন গর্হিত কোন কাজকে সুন্দরভাবে উদযাপন করা।
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ; শারহুন নাবাবী ১৬শ খন্ড, হাঃ ২৬৭০/৭)
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি
৪৭৮৬-[৪] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সবচেয়ে সত্য কথা যা কোন একজন কবি বলেছেন, তা হচ্ছে লাবীদ-এর উক্তি- أَلَا كُلُّ شَيْءٍ مَا خَلَا اللهَ بَاطِلُ অর্থাৎ- ’’জেনে রাখ! আল্লাহ তা’আলা ছাড়া সবকিছুই বাতিল ও ধ্বংস হবে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْبَيَانِ وَالشِّعْرِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أُصَدِّقُ كَلِمَةٍ قَالَهَا الشَّاعِرُ كَلِمَةُ لَبِيدٍ: أَلَا كُلُّ شَيْءٍ مَا خَلَا اللَّهَ بَاطِلُ . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ ‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এটা সর্বাধিক বিশুদ্ধ কথা এ কারণে যে, তা নীচের আয়াতের কথার সাথে মিলে গেছে,
كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ وَيَبْقٰى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ
‘‘পৃথিবী পৃষ্ঠে যা আছে সবই ধ্বংসশীল, কিন্তু চিরস্থায়ী তোমার প্রতিপালকের চেহারা (সত্তা)- যিনি মহীয়ান, গরীয়ান’’- (সূরাহ্ আর্ রহমা-ন ৫৫ : ২৬-২৭)। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
এ ধরনের কবিতা অর্থাৎ যেগুলোর অর্থ কুরআনের আয়াতের সাথে মিলে যায় সেগুলো প্রশংসনীয়।
কবি লাবীদ যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন কবিতা রচনা ছেড়ে দেন এবং বলতেন, আমার জন্য কুরআনই যথেষ্ঠ। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৮৪৯)
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি
৪৭৮৭-[৫] ’আমর ইবনু আশ্ শারীদ (রহঃ) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন। একদিন আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিছনে আরোহণ করলাম। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, উমাইয়াহ্ ইবনু আবী সালত-এর কোন কবিতা কি তোমার মুখস্থ আছে? আমি বললামঃ জ্বী হ্যাঁ। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ সেটা শুনাও! তখন আমি সেটার একটি পংক্তি আবৃত্তি করলাম। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আরো শুনাও। অতঃপর আমি আরো একটি পংক্তি আবৃত্তি করলাম। এবারও তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আরো শুনাও। এভাবে আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে (উমাইয়াহ্ ইবনু আবী সালত-এর) একশ’ পংক্তি আবৃত্তি করে শুনালাম। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْبَيَانِ وَالشِّعْرِ
وَعَنْ عَمْرِو بْنِ الشَّرِيدِ عَنْ أَبِيهِ قَالَ: رَدِفْتُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمًا فَقَالَ: «هَلْ مَعَكَ مِنْ شِعْرِ أُمَيَّةَ بْنِ أَبِي الصَّلْتِ شَيْءٌ؟» قُلْتُ: نَعَمْ. قَالَ: «هِيهِ» فَأَنْشَدْتُهُ بَيْتًا. فَقَالَ: «هيهِ» ثمَّ أنشدته بَيْتا فَقَالَ: «هيه» ثمَّ أنشدته مائَة بَيت. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমাইয়াহ্-এর কবিতা পছন্দ করতেন এবং এমন কবিতা রচনায় উৎসাহিত করতেন। কেননা তাতে আল্লাহর একত্ববাদ ও পরকাল নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। অতএব যে সমস্ত কবিতার বিষয়বস্তু ভালো সেগুলো আবৃত্তি ও শ্রবণ করা বৈধ। (শারহুন নাবাবী ১৫শ খন্ড, হাঃ ২২৫৬/২)
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি
৪৭৮৮-[৬] জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক যুদ্ধে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত ছিলেন। তাঁর একটি আঙ্গুল রক্তাক্ত হয়েছিল। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে অঙ্গুলিকে লক্ষ্য করে কবিতা আবৃত্তি করলেনঃ هَلْ أَنْتِ إِلَّا أُصْبُعٌ دَمِيْتِ وَفِيْ سَبِيْلِ الله مَا لقِيْتِ। অর্থাৎ- হে অঙ্গুলি! তুমি একটি অঙ্গুলি ছাড়া আর কিছুই নও। তুমি রক্তাক্ত হয়েছ ঠিকই, তবে যা কিছু হয়েছে আল্লাহর পথে হয়েছে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْبَيَانِ وَالشِّعْرِ
وَعَن جُنْدُبٍ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ فِي بَعْضِ الْمَشَاهِدِ وَقَدْ دَمِيَتْ أُصْبُعُهُ فَقَالَ:
هَلْ أَنْتِ إِلَّا أُصْبُعٌ دَمِيتِ وَفِي سَبِيلِ الله مَا لقِيت
مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ ‘আল্লামা কিরমানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ঘটনাটি উহুদ যুদ্ধের।
* সহীহ মুসলিম-এর এক বর্ণনায় আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক গর্তে ছিলেন তখন ঘটনাটি ঘটে।
* আর বুখারী-এর এক বর্ণনা আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাঁটছিলেন তখন পাথর লেগে আঙ্গুল কেটে যায়।
* মতগুলোর সমন্বয়ে মিরক্বাতুল মাফাতীহ গ্রন্থকার বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধে ছিলেন এবং সালাতের জন্য হেঁটে যাচ্ছিলেন পথিমধ্যে ঘটনাটি ঘটে। আর মুসলিম-এর বর্ণনা নিয়ে ‘আল্লামা কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এটার পড়তে ভুল আছে। غاز এর স্থানে বারী غار পড়েছেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি
৪৭৮৯-[৭] বারা’ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্বুরায়যার দিন (যেদিন ইয়াহূদী কুরায়যাহ্ গোত্রকে অবরোধ করেছিলেন) হাসসান ইবনু সাবিত (রাঃ)-কে বললেনঃ তুমি মুশরিকদের বিরুদ্ধে ব্যঙ্গ বা বিদ্রূপাত্মক কবিতা আবৃত্তি করো! জিবরীল (আ.) তোমার সাথে আছেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসসান (রাঃ)-কে বলতেন : তুমি আমার পক্ষ হতে কাফিরদেরকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের জবাব দাও। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসসান (রাঃ)-এর জন্য দু’আ করতেন : হে আল্লাহ! তুমি رُوْحُ الْقُدُسِ তথা জিবরীল-এর দ্বারা হাসসানকে সাহায্য করো। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْبَيَانِ وَالشِّعْرِ
وَعَن البَراءِ قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ قُرَيْظَةَ لِحَسَّانَ بْنِ ثَابِتٍ: «اهْجُ الْمُشْرِكِينَ فَإِنَّ جِبْرِيلَ مَعَكَ» وَكَانَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ لِحَسَّانَ: «أَجِبْ عَنِّي اللَّهمَّ أيِّدْه بروحِ الْقُدس» . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ (يَوْمَ قُرَيْظَةَ) বানী কুরায়যাহ্ মদীনার এক পার্শ্বে অবস্থানকারী ইয়াহূদী সম্প্রদায় ছিল। তাদেরকে অবরুদ্ধ করে রাখার সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাস্সান -কে এ কথা বলেছিলেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি
৪৭৯০-[৮] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধ চলাকালে নিজের পক্ষর কবিদেরকে বলেছেনঃ তোমরা কুরায়শদের প্রতি ব্যঙ্গ ও বিদ্রূপমূলক কবিতা আবৃত্তি করো। কেননা এটা তাদের জন্য তীরের আঘাতের তুলনায় কঠোরতর। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْبَيَانِ وَالشِّعْرِ
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «اهْجُوا قُرَيْشًا فَإِنَّهُ أَشَدُّ عَلَيْهِمْ مِنْ رَشْقِ النَّبْلِ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ উক্ত হাদীসে কাফিরদের নিয়ে ব্যঙ্গ-কবিতা রচনার বৈধতা পাওয়া যায়। তবে প্রথমেই কাফিরদের ব্যঙ্গ করা এবং গালাগালি করা উচিত নয়। কারণ তারাও প্রত্যুত্তরে ইসলামকে ও মুসলিমদের গালিগালাজ করবে। এজন্যই আল্লাহ বলেনঃ
وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللهِ فَيَسُبُّوا اللهَ عَدْوًا بِغَيْرِ عِلْمٍ
‘‘(হে মু’মিনগণ!) আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে তারা ডাকে তোমরা তাদেরকে গালি দিও না, কেননা তারা তাদের অজ্ঞতাপ্রসূত শত্রুতার বশবর্তী হয়ে আল্লাহকে গালি দেবে.....’’- (সূরাহ্ আল আন্‘আম ৬ : ১০৮)।
(শারহুন নাবাবী ১৬শ খন্ড, হাঃ ২৪৯০/১৫৭)
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি
৪৭৯১-[৯] উক্ত রাবী [’আয়িশাহ্ সিদ্দিকা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কবি হাসসান (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি আল্লাহ ও আল্লাহর রসূল-এর পক্ষ থেকে মুশরিকদের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের মোকাবিলা করতে থাকবে, ততক্ষণ রূহুল কুদস [জিবরীল (আ.)] তোমাকে সাহায্য করতে থাকবেন। ’আয়িশাহ্ সিদ্দিকা (রাঃ) বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এটাও বলতে শুনেছি, হাসসান কাফিরদের প্রতি ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের কবিতা পাঠ করেছে। এতে সে মুসলিমদেরকে শান্তি ও পরিতৃপ্তি দান করেছে এবং নিজেও পরিতৃপ্তি লাভ করেছে। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْبَيَانِ وَالشِّعْرِ
وَعَنْهَا قَالَتْ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ لِحَسَّانَ: «إِنَّ رُوحَ الْقُدُسِ لَا يَزَالُ يُؤَيِّدُكَ مَا نَافَحْتَ عَنِ اللَّهِ وَرَسُوله» . سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «هَجَاهُمْ حَسَّانُ فَشَفَى وَاشْتَفَى» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি
৪৭৯২-[১০] বারা’ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খন্দাকের যুদ্ধে নিজেও মাটি কেটে সরাচ্ছিলেন। এমনকি তাঁর পেট মুবারাক ধূলোয় মলিন হয়েছিল। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলছিলেন : আল্লাহর কসম, যদি আল্লাহ তা’আলার হিদায়াত না হত, তবে আমরা নিশ্চয় হিদায়াত পেতাম না, আমরা সাদাকা দিতাম না এবং সালাতও আদায় কতাম না। সুতরাং হে আল্লাহ! তুমি আমাদের ওপর প্রশান্তি অবতীর্ণ করো। আমরা যখন শত্রুর মুখোমুখি হই, আমাদের অবস্থানে আমাদেরকে সুদৃঢ় রাখো।
অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ কবিতার চরণটি আবৃত্তি করলেনঃ إِنَّ الْأولى قَدْ بَغَوْا عَلَيْنَا إِذَا أَرَادُوْا فِتْنَةً أَبَيْنَا। অর্থাৎ- ’’প্রথমোক্ত দল (কাফিররা) আমাদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছে। যখন তারা আমাদেরকে বিপর্যয়ে নিক্ষেপ করার ইচ্ছা করে, তখন আমরা একে অস্বীকার করি।’’ তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উচ্চস্বরে পংক্তিগুলো আবৃত্তি করতেন এবং اَبَيْنَا (আমরা অস্বীকার করি) اَبَيْنَا (আমরা অস্বীকার করি) কথাটি বেশি জোরে উচ্চারণ করতেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْبَيَانِ وَالشِّعْرِ
وَعَنِ الْبَرَّاءِ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَنْقُلُ التُّرَابَ يَوْمَ الْخَنْدَقِ حَتَّى اغْبَرَّ بَطْنُهُ يَقُولُ:
وَاللَّهِ لَوْلَا اللَّهُ مَا اهْتَدَيْنَا وَلَا تَصَدَّقْنَا وَلَا صلَّينا
فأنزلنْ سكينَة علينا وثبِّتِ الْأَقْدَام إِن لاقينا
إِنَّ الأولى قَدْ بَغَوْا عَلَيْنَا إِذَا أَرَادُوا فِتْنَةً أَبَيْنَا
يَرْفَعُ بِهَا صَوْتَهُ: «أَبَيْنَا أَبَيْنَا» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি
৪৭৯৩-[১১] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আহযাবের যুদ্ধে মুহাজির ও আনসারগণ পরিখা খনন ও মাটি সরাতে লাগল, আর বলতে লাগল- আমরা ঐ লোক, যারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে জিহাদের জন্য বায়’আত করেছি, যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা জীবিত থাকি।’’ তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁদের জবাবে বললেনঃ ’’হে আল্লাহ! পরকালের জীবন ছাড়া আর কোন জীবন নেই। তুমি আনসার ও মুহাজিরদেরকে ক্ষমা করো।’’ (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْبَيَانِ وَالشِّعْرِ
وَعَن أنسٍ قَالَ: جَعَلَ الْمُهَاجِرُونَ وَالْأَنْصَارُ يَحْفِرُونَ الْخَنْدَقَ وَيَنْقُلُونَ الترابَ وهم يَقُولُونَ:
نَحن الذينَ بَايعُوا محمَّداً عَلَى الْجِهَادِ مَا بَقِينَا أَبَدَا
يَقُولُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ يُجِيبُهُمْ:
اللَّهُمَّ لَا عَيْشَ إِلَّا عَيْشُ الْآخِرَهْ فَاغْفِرْ لِلْأَنْصَارِ والمهاجرة
مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ (اَللّٰهُمَّ لَا عَيْشَ إِلَّا عَيْشُ الْآخِرَهْ) এর মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আখিরাতী জীবনের স্থায়িত্ব বুঝিয়েছেন। যে ব্যাপারে একাধিক কুরআনের আয়াত পাওয়া যায়।
আল্লাহ বলেনঃ (وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَّأَبْقٰى) ‘‘অথচ আখিরাতই অধিক উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী।’’ (সূরাহ্ আল আ‘লা- ৮৭ : ১৭)
وَقَالَ النَّوَوِيُّ: هُوَ مَا يَسُدُّ الرَّمَقَ. وَقَالَ الْقُرْطُبِيُّ أَيْ: مَا يَقْرِيهِمْ وَيَكْفِيهِمْ بِحَيْثُ لَا يُشْعِرُهُمُ بِالْجَهْدِ وَلَا يُرْهِقُهُمُ الْفَاقَةُ وَلَا تُذِلُّهُمُ الْمَسْأَلَةُ وَالْحَاجَةُ، وَلَا يَكُونُ فِي ذَلِكَ أَيْضًا فُضُولٌ يُخْرِجُ إِلَى التَّرَفُّهِ وَالتَّبَسُّطِ فِي الدُّنْيَا وَالرُّكُونِ إِلَيْهَا
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আখিরাত (দুনিয়াবী) আকাঙক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করে। আর কুরতুবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আখিরাতমুখী তাদেরকে সীমিত করে দেয় যাতে তাদের কষ্টানুভব হয় না। আর হারিয়ে যাওয়ার ভয় থাকে না এবং কোন প্রয়োজন বা চাওয়া তাদেরকে লাঞ্ছিত করে না। আর এটা তাদের জন্য অতিরিক্ত হবে না। এটা দুনিয়াতে তাদেরকে প্রশস্ততা দিবে এবং পরকালমুখী করবে।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ কথা বলার মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝাতে চেয়েছেন যে, সাহাবীরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে যে ওয়া‘দা করেছেন তা যদি পূর্ণ করেন তাহলে তাদেরকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রতিদান দান করবেন যা একমাত্র আখিরাতে পাবে। কেননা আখিরাত হলো চিরস্থায়ী। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি
৪৭৯৪-[১২] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন ব্যক্তির পেটকে পুঁজ দ্বারা পরিপূর্ণ করা, যা পেটকে নষ্ট করে দেয়, তা কবিতা দ্বারা ভর্তি করা অপেক্ষা উত্তম। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْبَيَانِ وَالشِّعْرِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لِأَنَّ يمتلىءَ جَوْفُ رَجُلٍ قَيْحًا يَرِيهِ خَيْرٌ مِنْ أَنْ يمتلئ شعرًا» مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ হাদীসটির উদ্দেশ্য হলো কাব্য চর্চায় বেশি মনোনিবেশ করাটা কুরআন শিক্ষা ও শারী‘আতের জ্ঞান শিক্ষা থেকে বিরত রাখে। এ জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেশি কাব্য চর্চার নিন্দা করেছেন।
‘আল্লামা সুয়ূত্বী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এর দ্বারা শুধু ঐ সমস্ত কবিতা উদ্দেশ্য যেগুলোতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিন্দা করা হয়েছে। তবে অনেকেই এ মতকে গ্রহণ করেননি বরং বলেছেন, এর দ্বারা সকল কবিতা চর্চায় বেশি মনোনিবেশ করার বিষয়টি নিষেধ করা হয়েছে।
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬১৫৫; শারহুন নাবাবী ১৫শ খন্ড, হাঃ ২২৫৭/৭)
পরিচ্ছেদঃ ৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি
৪৭৯৫-[১৩] কা’ব ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করেন, আল্লাহ তা’আলা কবিতা সম্পর্কে যা অবতীর্ণ করার অবতীর্ণ করেছেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ মু’মিন ব্যক্তি তাঁর তরবারি ও রসনা দ্বারা জিহাদ করে। সেই সত্তার কসম! যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তোমরা কবিতা দ্বারা কাফিরদেরকে এমনভাবে আঘাত করছ, যেভাবে তীর দ্বারা আঘাত করা হয়। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
كِتَابُ الْاِسْتِيْعَابِ (ইসতী’আব কিতাব)-এ ইবনু ’আবদুল বার (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রসূল! কবিতা রচনা ও আবৃত্তি সম্পর্কে আপনি কী আদেশ করেন? তখন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ মু’মিন তাঁর তরবারি এবং মুখের বাক্য উভয় দ্বারা যুদ্ধ করে।
عَن كعبِ بنِ مالكٍ أَنَّهُ قَالَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى قد أنزلَ فِي الشعرِ مَا أَنْزَلَ. فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ الْمُؤْمِنَ يُجَاهِدُ بِسَيْفِهِ وَلِسَانِهِ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَكَأَنَّمَا تَرْمُونَهُمْ بِهِ نَضْحَ النَّبْلِ» رَوَاهُ فِي شَرْحِ السُّنَّةِ
وَفِي «الِاسْتِيعَابِ» لِابْنِ عَبْدِ الْبَرِّ أَنَّهُ قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَاذَا تَرَى فِي الشِّعْرِ؟ فَقَالَ: «إِنَّ الْمُؤْمِنَ يُجَاهد بِسَيْفِهِ وَلسَانه»
ব্যাখ্যাঃ (إِنَّ اللهَ تَعَالٰى قد أنزلَ فِي الشعرِ) এ কথার দ্বারা কা‘ব (রাঃ) কবিতার নিন্দা করেছেন। কেননা আল্লাহ তা‘আলা কবিদের নিন্দা করে আয়াত অবতীর্ণ করেছেন,
وَالشُّعَرَاءُ يَتَّبِعُهُمُ الْغَاوُونَ অর্থাৎ ‘‘পথভ্রষ্টরাই কবিদের অনুরণ করে।’’ (সূরাহ্ আশ্ শু‘আরা ২৬ : ২২৪)
‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উত্তরের মূল কথা হলো সাধারণত কাব্য চর্চা নিন্দার নয় কিন্তু যদি কাব্য চর্চাটা পথভ্রষ্ট করে দেয় তাহলে তা নিন্দনীয়। আর মু’মিন কাফিরদের পরাজিত করার জন্যই কাব্য চর্চা করে থাকে। এটাও এক ধরনের জিহাদ। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি
৪৭৯৬-[১৪] আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেনঃ লজ্জা ও রসনা সংযত রাখা ঈমানের দু’টো শাখা। পক্ষান্তরে অশ্লীল ও অপ্রয়োজনীয় কথা বলা মুনাফিক্বীর দু’টো শাখা। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ أَبِي
أُمَامَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الْحَيَاءُ وَالْعِيُّ شُعْبَتَانِ مِنَ الْإِيمَانِ وَالْبَذَاءُ وَالْبَيَانُ شُعْبَتَانِ مِنَ النِّفَاقِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ (الْعِيُّ) অল্প কথা বলা। এখানে উদ্দেশ্য হলো অশ্লীল গদ্য-পদ্য থেকে দূরে থাকা।
ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) (الْعِيُّ)-এর ব্যাখ্যায় বলেন, অনর্থক বিষয় বা পাপে পতিত হওয়ার আশংকায় কম কথা বলা।
(الْبَذَاءُ) অশ্লীল কথা যা শালীনতার বিপরীত।
(الْبَيَانُ) বেশি বাগ্মিতা দিয়ে কথা বলা যেটা মানুষ সাধারণভাবে বুঝতে পারে না এবং যার একাধিক উদ্দেশ্য হয়। যেমনটা মুনাফিকরা করত।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يُعْجِبُكَ قَوْلُه فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا
‘‘মানুষের মধ্যে এমন আছে, পার্থিব জীবন সম্পর্কিত যার কথাবার্তা তোমাকে চমৎকৃত করে...’’- (সূরাহ্ আল বাকবারাহ্ ২ : ২০৪)। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ২০২৭)
পরিচ্ছেদঃ ৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি
৪৭৯৭-[১৫] আবূ সা’লাবাহ্ আল খুশানী (রাঃ)হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন তোমাদের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়তম ও আমার সবচেয়ে নিকটতম সেই ব্যক্তি হবে, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে চরিত্রবান। আর আমার কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত ও সবচেয়ে দূরতম সে ব্যক্তি হবে, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে চরিত্রহীন, বেশি কথা বলে, অসতর্কভাবে যা-তা বলে এবং কথাবার্তায় নিজেকে বড় বলে প্রকাশ করে। (বায়হাক্বী’র ’’শু’আবুল ঈমান’’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)[1]
وَعَن أبي
ثَعلبةَ الخُشنيِّ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّ أَحَبَّكُمْ إِلَيَّ وَأَقْرَبَكُمْ مِنِّي يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَحَاسِنُكُمْ أَخْلَاقًا وَإِنَّ أَبْغَضَكُمْ إِلَيَّ وَأَبْعَدَكُمْ مني مساويكم أَخْلَاقًا الثرثارون المتشدقون المتفيقهون» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيّ فِي «شعب الْإِيمَان»
পরিচ্ছেদঃ ৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি
৪৭৯৮-[১৬] ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) জাবির (রাঃ) হতে অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেন। অপর এক বর্ণনায় রয়েছে যে, লোকেরা জিজ্ঞেস করল : হে আল্লাহর রসূল! আমরা তো اَلثَّرْثَارُوْنَ এবং اَلْمُتَشَدِّقُوْنَ-এর অর্থ বুঝলাম; কিন্তু اَلْمُتَفَيْهِقُوْنَ কারা? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ অহংকারীরা।[1]
وَرَوَى التِّرْمِذِيُّ
نَحْوَهُ عَنْ جَابِرٍ وَفِي رِوَايَتِهِ قَالُوا: يَا رَسُول الله قد علمنَا الثرثارونَ والمتشدقون فَمَا المتفيقهون؟ قَالَ: «المتكبرون»
ব্যাখ্যাঃ (الثَّرْثَارُوْنَ) অনর্থক ও অন্যায়মূলক বিষয়ে বেশি কথা যারা বলে তাদের ثرثارون বলা হয়।
(الْمتَشَدِّقُوْنَ) সংযত ও সতর্ক না হয়ে যারা কথা বলে।
(الْمُتَفَيْهِقُوْنَ) অহংকারবশত যারা কথা বলে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ২০১৮)
পরিচ্ছেদঃ ৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি
৪৭৯৯-[১৭] সা’দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামত ঐ সময় পর্যন্ত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না এমন একদল লোকের আবির্ভাব হবে, যারা নিজেদের রসনার সাহায্যে এমনভাবে ভক্ষণ করবে, যেভাবে গাভী তার রসনার সাহায্যে ভক্ষণ করে থাকে। (আহমাদ)[1]
وَعَنْ
سَعْدِ بْنِ أَبِي وَقَّاصٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تُقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى يَخْرُجَ قَوْمٌ يَأْكُلُونَ بِأَلْسِنَتِهِمْ كَمَا تَأْكُلُ الْبَقَرَةُ بألسنتها» رَوَاهُ أَحْمد
ব্যাখ্যাঃ তারা তাদের জিহবাকে খাবারের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করবে অর্থাৎ তারা হালাল হারাম বাছাই করবে না যেমন গাভী তার জিহবাকে হালাল হারাম বাছাই করা ছাড়া খাবারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি
৪৮০০-[১৮] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা মানুষের মাঝে ভাষা-অলঙ্কারবিদকে ঘৃণা করেন, যে বাকশৈলী ও বাক-নিপুণতা প্রদর্শন করতে গিয়ে নিজের জিহবাকে এমনভাবে নাড়াচাড়া করে, যেভাবে গাভী নিজের জিহবা নাড়াচাড়া করে। [তিরমিযী ও আবূ দাঊদ; আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ এ হাদীসটির গরীব।][1]
وَعَنْ عَبْدِ
اللَّهِ بْنِ عُمَرَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّ اللَّهَ يُبْغِضُ الْبَلِيغَ مِنَ الرِّجَالِ الَّذِي يَتَخَلَّلُ بِلِسَانِهِ كَمَا يَتَخَلَّلُ الْبَاقِرَةُ بِلِسَانِهَا» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ: هَذَا حَدِيث غَرِيب
ব্যাখ্যাঃ ঐ সমস্ত বাগ্মী যারা অসংযতভাবে কথা বলে এবং কথাকে প্যাঁচায় যেমনভাবে গাভী জিহবা দ্বারা তার খাবার প্যাঁচায়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ, তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৮৫৩)
পরিচ্ছেদঃ ৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি
৪৮০১-[১৯] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মি’রাজের রাতে আমার গমন এমন একদল লোকের নিকট দিয়ে হলো, যাদের জিহবা আগুনের কাঁচি দিয়ে কাটা হচ্ছিল। আমি জিবরীল (আ.)-কে জিজ্ঞেস করলামঃ হে জিবরীল! এরা কারা? জিবরীল (আ.) বললেনঃ এরা আপনার উম্মাতের মধ্যে ধর্মোপদেশদাতাগণ, যারা এমন কথা বলত, যার উপর তারা নিজেরা ’আমল করত না। [তিরমিযী; আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসটি গরীব।][1]
وَعَنْ
أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَرَرْتُ لَيْلَةَ أُسْرِيَ بِي بقومٍ تُقْرَضُ شفاهُهم بمقاريض النَّارِ فَقُلْتُ: يَا جِبْرِيلُ مَنْ هَؤُلَاءِ؟ قَالَ: هَؤُلَاءِ خُطَبَاءُ أُمَّتِكَ الَّذِينَ يَقُولُونَ مَا لَا يَفْعَلُونَ . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ
পরিচ্ছেদঃ ৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি
৪৮০২-[২০] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি এমন কিছু কথা শিক্ষা করে, যাতে পুরুষদের বা লোকেদের অন্তরকে আকৃষ্ট এবং সম্মোহিত করা যায়, আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন তার নফল ও ফরয (’ইবাদাত) কোনটাই কবুল করবেন না। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ
أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ تَعَلَّمَ صَرْفَ الْكَلَامِ لِيَسْبِيَ بِهِ قُلُوبَ الرِّجَالِ أَوِ النَّاسِ لَمْ يَقْبَلِ اللَّهُ مِنْهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ صَرْفًا وَلَا عدلا» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘যহ্হাক ইবনু শুরাহবীল’’ নামের একজন বর্ণনাকারী। ইনি একজন মিসরী। ইবনু ইউনুস তাকে মিসরীয়দের ইতিহাস নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। ইমাম বুখারী ও ইবনু আবী হাকিম (রহিমাহুল্লাহ)-ও তার আলোচনা করেছেন কিন্তু তারা কোন সাহাবী থেকে তার হাদীস বর্ণনার কথা উল্লেখ করেননি। তার বর্ণনা কেবলামাত্র তাবি‘ঈদের থেকে আর অত্র হাদীসটি তিনি আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণনা করেছেন, এ কারণেই হাদীসটি মুনকত্বি‘ হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থেকে গেছে। দেখুন- ‘আওনুল মা‘বূদ ১৩/২৩৮ পৃঃ, হাঃ ৫০০৬।
ব্যাখ্যাঃ صرفا তাওবাহ্ অথবা নফল ‘ইবাদাত। عدلا মুক্তিপণ অথবা ফরয ‘ইবাদাত। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ, ‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৯৯৮)
পরিচ্ছেদঃ ৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি
৪৮০৩-[২১] ’আমর ইবনুল ’আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন জনৈক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে খুব দীর্ঘ বক্তব্য দিলেন। তখন ’আমর বললেনঃ যদি সে তার বক্তৃতা সংক্ষেপ করত, তবে খুব ভালো হত। আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেনঃ আমি দেখেছি অথবা আমাকে আদেশ করা হয়েছে যে, যেন আমি বক্তব্য সংক্ষেপ করি। কেননা সংক্ষেপ করাই উত্তম। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن عمْرِو
بن العاصِ أَنَّهُ قَالَ يَوْمًا وَقَامَ رَجُلٌ فَأَكْثَرَ الْقَوْلَ. فَقَالَ عَمْرٌو: لَوْ قَصَدَ فِي قَوْلِهِ لَكَانَ خَيْرًا لَهُ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «لَقَدْ رَأَيْتُ - أَوْ أُمِرْتُ - أَنْ أَتَجَوَّزَ فِي الْقَوْلِ فَإِنَّ الْجَوَازَ هُوَ خير» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ বক্তব্যের নিয়ম খুব বেশিও না আবার কমও না বরং প্রয়োজন অনুপাতে মধ্যম ধরনের বক্তব্য দিতে হবে। এটা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিয়ম। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ, ‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫০০০)
পরিচ্ছেদঃ ৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি
৪৮০৪-[২২] সখর ইবনু ’আবদুল্লাহ ইবনু বুরয়দাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর পিতার মাধ্যমে তাঁর পিতামহ হতে বর্ণনা করেন, তিনি (বুরয়দাহ্) বলেনঃ আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ কোন কোন বক্তৃতা যাদুবিশেষ (অর্থাৎ- যাদুর মতো সম্মোহনী শক্তি থাকে), কোন কোন বিদ্যা মূর্খতার নামান্তর, কোন কোন বাক্য কৌশলের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত এবং কোন কোন কথা জীবনের জন্য দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ
صَخْرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ بُرَيْدَةَ عَن أَبِيه عَن جدِّه قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «إِنَّ مِنَ الْبَيَانِ سِحْرًا وَإِنَّ مِنَ الْعِلْمِ جَهْلًا وَإِنَّ مِنَ الشِّعْرِ حُكْمًا وَإِنَّ مِنَ الْقَوْلِ عِيَالًا» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘আবূ জা‘ফার আন্ নাহবী ‘আবদুল্লাহ ইবনু সাবিত’’ নামের বর্ণনাকারী মাজহূল। ইবনু হাজার আল ‘আসকালানী এবং ইমাম যাহাবী (রহিমাহুল্লাহ) তাকে মাজহূল বলেছেন। জাওয়ামিউল কালিম। দেখুন- হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/২৭১ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ (إِنَّ مِنَ الْعِلْمِ جَهْلًا) এর উদ্দেশ্য :
* অনর্থক কোন বিষয়ের জ্ঞান অর্জন করা যাতে কোন উপকার নেই। এ বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের চেয়ে অজ্ঞতা উত্তম। যেমন : জ্যোতিষশাস্ত্র ইত্যাদি।
* আল্লামা আযহারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ‘ইলম অনুপাতে ‘আমল না করা। আর ‘আমল পরিত্যাগ করাটা জ্ঞানের অজ্ঞতা।
* কতিপয় বিদ্বান না জানা বিষয়ে জানার ভান করবে। এটাই জ্ঞানের অজ্ঞতা।
(إِنَّ مِنَ الْقَوْلِ عِيَالًا) এর উদ্দেশ্য :
* বক্তার কিছু কথা কখনো কখনো তার বিপদের কারণ হয়।
* অস্থানে ও অপাত্রে কোন কথা বলা। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ, ‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫০০৪)
পরিচ্ছেদঃ ৯. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি
৪৮০৫-[২৩] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসসান ইবনু সাবিত (রাঃ)-এর জন্য মসজিদে মিম্বার স্থাপন করতেন। হাসসান(রাঃ) তার উপর দণ্ডায়মান হতেন এবং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে গর্বের কবিতা আবৃত্তি করতেন অথবা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ হতে বিদ্রূপাত্মক কবিতা পাঠ করতেন। আর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন : আল্লাহ তা’আলা ’’রূহুল কুদস’’ অর্থাৎ- জিব্রীল (আ.)-এর দ্বারা হাসসানকে সাহায্য করছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ থেকে ভৎর্সনার প্রতিউত্তর দিতে থাকে বা সত্য গৌরব প্রকাশ করতে থাকে। (বুখারী)[1]
عَنْ
عَائِشَةَ قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَضَعُ لِحَسَّانَ مِنْبَرًا فِي الْمَسْجِدِ يَقُومُ عَلَيْهِ قَائِمًا يُفَاخِرُ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أوينافح. وَيَقُولُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ اللَّهَ يُؤَيِّدُ حَسَّانَ بِرُوحِ الْقُدُسِ مَا نَافَحَ أَوْ فَاخَرَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
পরিচ্ছেদঃ ৯. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি
৪৮০৬-[২৪] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একজন উষ্ট্র চালক গায়ক ছিল। তাঁকে ’’আনজাশাহ্’’ বলা হত। তাঁর স্বর ছিল খুবই মধুর। একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেনঃ হে আনজাশাহ্! উটকে ধীরে ধীরে চালাও, কাঁচের পাত্রগুলোকে ভেঙ্গো না। কতাদাহ্ (রহঃ) বলেনঃ ’’আয়না’’ বলতে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দুর্বল-নাজুক মহিলাদের বুঝিয়েছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
وَعَن أنسٍ قَالَ: كَانَ لِلنَّبِيِّ حَادٍ يُقَالُ لَهُ: أَنْجَشَةُ وَكَانَ حَسَنَ الصَّوْتِ. فَقَالَ لَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «رُوَيْدَكَ يَا أَنْجَشَةُ لَا تَكْسِرِ الْقَوَارِيرَ» . قَالَ قَتَادَةُ: يَعْنِي ضَعْفَةَ النِّسَاءِ. مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ (لَا تَكْسِرِ الْقَوَارِيرَ) তোমার সুমধুর কণ্ঠ দিয়ে দুর্বল হৃদয়ের মেয়েদের আকৃষ্ট করো না।
যখন উট তার আওয়াজ শুনে দ্রুত আসতে চাইবে এমতাবস্থায় উটের পিঠে কোন মহিলা থাকলে তার কষ্ট হবে। তাই একটু নিচু আওয়াজে ডাকতে বলেছেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
শেষের মতটিকে মিরক্বাতুল মাফাতীহ প্রণেতা পছন্দনীয় মত হিসেবে গণ্য করেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ৯. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি
৪৮০৭-[২৫] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে কবিতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ কবিতাও এক প্রকার কথা। ভালো কবিতা ভালো কথা এবং খারাপ কবিতা খারাপ কথা। (দারাকুত্বনী)[1]
وَعَنْ
عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: ذُكِرَ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الشِّعْرُ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «هُوَ كَلَامٌ فَحَسَنُهُ حَسَنٌ وَقَبِيحُهُ قَبِيحٌ» . رَوَاهُ الدَّارَقُطْنِيّ
পরিচ্ছেদঃ ৯. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি
৪৮০৮-[২৬] ইমাম শাফি’ঈ (রহিমাহুল্লাহ) হাদীসটি ’উরওয়াহ্ হতে মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
وروى الشَّافِعِي
عَن عُرْوَة مُرْسلا
পরিচ্ছেদঃ ৯. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি
৪৮০৯-[২৭] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ’আরয নামক এক গ্রামের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করছিলাম। এমন সময় একজন কবি কবিতা আবৃত্তি করতে করতে সামনে এসে উপস্থিত হলো। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ শয়তানকে ধরে ফেলো অথবা বলেছেনঃ এ শয়তানকে থামিয়ে দাও। কোন ব্যক্তির উদর কবিতা দ্বারা পরিপূর্ণ করার চেয়ে পুঁজ দ্বারা ভর্তি করা অনেক উত্তম। (মুসলিম)[1]
وَعَن
أبي سعيدٍ الخدريِّ قَالَ: بَيْنَا نَحْنُ نَسِيرُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بالعرج إِذْ عَرَضَ شَاعِرٌ يُنْشِدُ. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «خُذُوا الشَّيْطَانَ أَوْ أَمْسِكُوا الشَّيْطَانَ لِأَنْ يَمْتَلِئَ جَوْفُ رَجُلٍ قَيْحًا خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَمْتَلِئَ شِعْرًا» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যাঃ (عَرَضَ) এটা ইয়ামানের একটি শহর। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
লোকটিকে শয়তান বলার কারণ : হয়ত সে কাফির ছিল। তার কবিতাটা মন্দ ছিল।
(শারহুন নাবাবী ১৫শ খন্ড, হাঃ ২২৫৯)
পরিচ্ছেদঃ ৯. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি
৪৮১০-[২৮] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ গান-বাজনা মানুষের অন্তরে কপটতা উৎপাদন করে, যেভাবে পানি শস্য উৎপাদন করে। [ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) ’’শু’আবুল ঈমান’’-এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।][1]
وَعَنْ
جَابِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْغِنَاءُ يُنْبِتُ النِّفَاقَ فِي الْقَلْبِ كَمَا يُنْبِتُ الْمَاءُ الزَّرْعَ» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي «شعب الْإِيمَان»
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে, ‘‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আবদুল ‘আযীয ইবনু আবী রওয়াদ’’ নামের বর্ণনাকারীর ব্যাপারে। আবূ হাতিম ও অন্যান্যরা বলেছেন, তার বর্ণিত হাদীসগুলো মুনকার। য‘ঈফাহ্ ৫/৪৫১, হাঃ ২৪৩০, আবূ দাঊদ ৪৯২৭, এর সকল বর্ণনাকারী বিশ্বস্ত কেবল ‘সাল্লাম’ নামের বর্ণনাকারীর শায়খ ছাড়া, কারণ তিনি তার শায়খের নাম উল্লেখ করেননি। কাজেই সে একজন মাজহূল। দেখুন- য‘ঈফাহ্ ২৪৩, য‘ঈফুল জামি‘ ৩৯৩৭, আস্ সুনানুস্ সুগরা ৪৬৬৯, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২১৫৩৬।
ব্যাখ্যাঃ গানের ব্যাপারে ইমামদের মতামত :
ইমাম শাফি‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ যে ব্যক্তি সর্বদা গান শুনে এবং প্রকাশ্যে গান গায় তার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয় আর যে ব্যক্তি কম শুনে তার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ বাজনা ছাড়া খালি গলায় গান গাওয়া ও শুনা মাকরূহ (অপছন্দনীয়)। আর গীটার তবলা এবং ঢোল ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র দ্বারা গান গাওয়া ও শুনা হারাম। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৯. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি
৪৮১১-[২৯] নাফি’ (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ)-এর সাথে পথ অতিক্রম করেছিলাম। তখন তিনি বাঁশির সুর শুনতে পেলেন এবং নিজের দু’ অঙ্গুলি দু’ কানের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দিলেন এবং রাস্তা থেকে সরে অপরদিকে চলে গেলেন। অতঃপর যখন অনেক দূরে চলে গেলেন, তিনি আমাকে বললেনঃ হে নাফি’! তুমি কি কোনকিছু শুনতে পাও। আমি বললামঃ জ্বী না। তখন তিনি তাঁর দু’ অঙ্গুলি দু’ কান থেকে বের করলেন এবং বললেনঃ একবার আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বাঁশির শব্দ শুনতে পেলেন এবং আমি যেরূপ করেছি তিনিও সেরূপ করেছেন। নাফি’ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আমি সে সময় অনেক ছোট ছিলাম। (আহমাদ ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ
نَافِعٍ قَالَ: كُنْتُ مَعَ ابْنِ عُمَرَ فِي طَرِيقٍ فَسَمِعَ مِزْمَارًا فَوَضَعَ أُصْبُعَيْهِ فِي أُذُنَيْهِ وَنَاءَ عَنِ الطَّرِيقِ إِلَى الْجَانِبِ الْآخَرِ ثُمَّ قَالَ لِي بَعْدَ أَنْ بَعُدَ: يَا نَافِعُ هَلْ تسمعُ شَيْئا؟ قلتُ: لَا فرفعَ أصبعيهِ عَن أُذُنَيْهِ قَالَ: كُنْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَسَمِعَ صَوْتَ يَرَاعٍ فَصَنَعَ مِثْلَ مَا صَنَعْتُ. قَالَ نَافِعٌ: فَكُنْتُ إِذْ ذَاكَ صَغِيرًا. رَوَاهُ أَحْمَدُ وَأَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যাঃ আর নাফি‘ (রহিমাহুল্লাহ) শুনেছিলেন কেন? কারণ তিনি তখনও ছোট ছিলেন বালেগ হননি। হাদীসের শেষাংশে সেদিকে ইঙ্গিত রয়েছে, (كُنْتُ إِذْ ذَاكَ صَغِيرًا) ‘‘আমি সে সময় অনেক ছোট ছিলাম।’’
ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে অপর একটি বর্ণনায় আছে, তিনিও কানে আঙ্গুল দিয়েছিলেন, কারণ সে সময় তিনিও ছোট ছিলেন। আর এখান থেকেই তিনি মাসআলাটি গ্রহণ করেছেন। আল্লাহ তার অবস্থা সম্পর্কে ভালো জানেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
জিহ্বার হিফাযাত বলতে অশ্লীল-অবাঞ্ছিত কথা-বার্তা ইত্যাদি থেকে জিহ্বাকে রক্ষা করা। গীবত বলা হয় তোমার মুসলিম ভাইয়ের মধ্যে বিদ্যমান কোন দোষ তার অসাক্ষাতে আলোচনা করা যা সে শুনলে তা অপছন্দ করবে। তার মধ্যে যদি দোষটি না থাকে তবে সেটা হবে বুহতান বা অপবাদ।
আরবীতে اَلشَّتَمُ বলা হয় গালি প্রদান করা, অভিসম্পাত করা। এতে জীবিত-মৃত, উপস্থিত-অনুপস্থিত সকলেই এর অন্তর্ভুক্ত।
৪৮১২-[১] সাহল ইবনু সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আমার কাছে তার দু’ চোয়ালের মধ্যস্থিত বস্তুর এবং তার দু’ পায়ের মধ্যস্থিত বস্তুর জামিন হবে, আমি তার জন্য জান্নাতের জামিন হব। (বুখারী)[1]
بَابُ حِفْظِ اللِّسَانِ وَالْغِيبَةِ وَالشَّتَمِ
عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ يَضْمَنْ لِي مَا بَيْنَ لَحْيَيْهِ وَمَا بَيْنَ رِجْلَيْهِ أضمنْ لَهُ الجنَّةَ» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ مَنْ অব্যয়টি শরতিয়া হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। لَحْيَةٌ হলো দাঁতের উদগত স্থল, অর্থাৎ চোয়াল। দুই চোয়ালের মাঝের বস্তু দ্বারা উদ্দেশ্য হলো জিহ্বা বা মুখের ভাষা। অর্থাৎ জিহ্বা এবং মুখকে যে অশ্লীল কথা-বার্তা এবং হারাম খাদ্য থেকে হিফাযাতের যিম্মাদারী নিবে, আর নিজের যৌনাঙ্গকে যিনা বা অনুরূপ কার্যক্রম থেকে হিফাযাতের গ্যারান্টি দিবে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য প্রথম পর্বেই জান্নাতের উচ্চস্তরে প্রবেশের যিম্মাদারী গ্রহণ করবেন।
‘আল্লামা ইবনু হাজার ‘আসকালানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এর অর্থ হলো যে, যে কথা বলা আবশ্যক সে কথা বলার মাধ্যমে এবং যে কথা বলা উচিত নয়, সে কথা থেকে বিরত বা চুপ থাকার মাধ্যমে মুখের হক আদায় করবে। অনুরূপ যৌনাঙ্গকে হালাল পন্থায় ব্যবহারের মাধ্যমে তার হক আদায় করা এবং হারাম পন্থা থেকে বিরত রাখা বা দূরে থাকা।
‘আল্লামা দাঊদী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হাদীসের ভাষা ‘দুই চোয়ালের মাঝের বস্তু’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মুখ। আর মুখের দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- মুখের কথা, খানা-পিনা এবং মুখ দ্বারা সম্পাদিত যাবতীয় বিষয়।
দুই রানের মাঝের বস্তু দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যৌনাঙ্গ। যারা এ দু’টিকে হিফাযাত করতে পারবে তারা সকল খারাপ কাজ থেকে নিজকে হিফাযাত করতে পারবে।
‘কথা’ হলো যিনা বা ব্যভিচারের উপক্রমিকা, কেউ যদি কথা থেকে নিজকে রক্ষা করতে পারে তাহলে সে শুরুতেই রক্ষা পেয়ে গেল।
ইবনুল বাত্ত্বল (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ সুতরাং মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তার মুখের ভাষা, অতঃপর যৌনাঙ্গ।
যে ব্যক্তি এ দুয়ের অনিষ্টতা থেকে রক্ষা পেল সে সবচেয়ে বড় অনিষ্টতা ও বিপদ থেকে রক্ষা পেল। আবূ হুরায়রা প্রমুখাৎ বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ যাকে দুই চোয়ালের মাঝের বস্তু অর্থাৎ জিহ্বার অনিষ্টতা এবং দুই পায়ের মাঝের বস্তু অর্থাৎ যৌনাঙ্গের অনিষ্টতা থেকে রক্ষা করবেন তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; মুসনাদে আহমাদ ৪র্থ খন্ড, ৩৯৮ পৃঃ; ফাতহুল বারী ১২শ খন্ড, হাঃ ৬৪৭৪; ইবনু হিব্বান হাঃ ৫০৮১, তিরমিযী হাঃ ২৪০৮)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮১৩-[২] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বান্দা কোন কোন সময় এমন কথা মুখ দিয়ে বলে, যাতে আল্লাহ তা’আলা সন্তুষ্ট হয়ে যান এবং এজন্যই তার পদমর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন, অথচ বান্দা এ বিষয়ে ওয়াকিফহাল থাকে না। পক্ষান্তরে বান্দা কোন কোন সময় এমন কথা বলে, যাতে আল্লাহ তা’আলা অসন্তুষ্ট হন। এ কথা তাকে জাহান্নামের দিকে নিক্ষেপ করে, অথচ বান্দা এ বিষয়ে ওয়াকিফহাল থাকে না। (বুখারী)[1]
বুখারী ও মুসলিম-এর এক বর্ণনায় আছে যে, এ কথা তাকে জাহান্নামের মধ্যে এতটা দূরত্বে নিক্ষেপ করে যতটা দূরত্ব পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝে রয়েছে।
بَابُ حِفْظِ اللِّسَانِ وَالْغِيبَةِ وَالشَّتَمِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ الْعَبْدَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ رِضْوَانِ اللَّهِ لَا يُلْقِي لَهَا بَالًا يَرْفَعُ اللَّهُ بِهَا دَرَجَاتٍ وَإِنَّ الْعَبْدَ لِيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ سَخَطِ اللَّهِ لَا يُلْقِي لَهَا بَالًا يَهْوِي بِهَا فِي جَهَنَّمَ» . رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ. وَفِي رِوَايَةٍ لَهُمَا: «يَهْوِي بِهَا فِي النَّارِ أَبْعَدَ مَا بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ»
ব্যাখ্যাঃ হাদীসের শব্দ (لَيَتَكَلَّمُ) আবূ যার-এর এক বর্ণনায় ‘লাম’ অক্ষরটি বিলোপ করে (يَتَكَلَّمُ) ব্যবহার হয়েছে।
মানুষ অনেক সময় মুখ দিয়ে এমন কথা বলে থাকে যা সে মনোযোগ দিয়ে কিংবা গুরুত্ব দিয়ে বলে না এবং সে জানে না আল্লাহর নিকট ঐ কথার কত দাম ও মর্যাদা। আল্লাহ তা‘আলার কাছে ঐ কথার যেহেতু অনেক দাম ও মর্যাদা, অতএব তিনি তাকে ঐ অনিচ্ছাজনিত কথারই যথাযথ মূল্যায়ন করে তার সম্মান ও মর্যাদা এমনভাবে বৃদ্ধি করে দেন যে সম্মান বা মর্যাদার কথা সে ভাবতেও পারেনি।
পক্ষান্তরে অনেক কথাই রয়েছে যা মানুষের দৃষ্টিতে খুব দোষণীয় বা বড় ধরনের পাপের নয়, কিন্তু আল্লাহর নিকট তা খুবই অপছন্দনীয় এবং অসন্তষ্টির কারণ। মানুষ এমন কথা গুরুত্ব না দিয়ে বা পরিণাম ও ভবিষ্যৎ চিন্তা না করেই বলে ফেলে, ফলে আল্লাহ তার প্রতি খুব অসন্তুষ্ট হন। পরিণামে সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়। মুল্লা ‘আলী কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীস দ্বারা মানুষকে চিন্তা-ভাবনা করে কথা বলার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮১৪-[৩] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মুসলিমদের গালাগালি করা ফাসিক্বী এবং খুনাখুনি করা কুফরী। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ حِفْظِ اللِّسَانِ وَالْغِيبَةِ وَالشَّتَمِ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ وَقِتَالُهُ كُفْرٌ» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ (سِبَابُ الْمُسْلِمِ) ক্রিয়া বিশেষ্য বা মাসদার তার مفعول বা কর্মের দিকে ইফাযত হয়েছে। سِبَابُ শব্দের আভিধানিক অর্থ গালি দেয়া, মন্দ বলা।
ইবরাহীম আল হার্বী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ السباب أشد من السب অর্থাৎ السباب শব্দটি سَبٌّ গালি দেয়া থেকে আধিক্যতার ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়ে থাকে। সেটা হলো কোন ব্যক্তির যা দোষ আছে তা সম্পর্কে এবং যা নেই তা সম্পর্কেও তাকে গালি দেয়া। এতে উদ্দেশ্য তাকে হেয় করা। কেউ কেউ বলেছেন, এখানে السباب শব্দটি القتال এর মত, অর্থ পরস্পর গালি-গালাজে অংশ নেয়া।
কোন মুসলিম অপর কোন মুসলিমকে গালি দিতে পারে না, নাহক গালি দেয়া হারাম।
الفسوق শব্দের আভিধানিক অর্থ الخروج বের হয়ে যাওয়া। আকমাল বলেনঃ الخروج زنة (সম্মানের) ওজন বা পরিমাপ থেকে বের হয়ে যাওয়া।
শারী‘আতের পরিভাষায় الخروج عن الطاعة আনুগত্য থেকে বের হয়ে যাওয়া। ‘আল্লামা ইবনু হাজার ‘আসকালানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ الخروج عن طاعة الله ورسوله আল্লাহ ও তার রসূলের আনুগত্য থেকে বের হয়ে যাওয়া। এটা চরম অবাধ্যচারিতা ও পাপাচারিতার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
قِتَالُهٗ এর অর্থ محاربته لأجل الإسلام প্রত্যেকেই একে অপরের (নিজ নিজ ধারণায়) ইসলামের জন্য যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে একজন তার অপর মুসলিম ভাইকে হত্যা করা। বাতিল চিন্তা ও উদ্দেশ্য নিয়ে এ কাজ তো সুস্পষ্ট কুফরী কর্ম। অবশ্য কেউ কেউ বলেছেন, এই কুফরী তাকীদান ও তামহীদান বা ধমকীস্বরূপ বলা হয়েছে। তবে এ কথা সত্য যে, কেউ যদি তার মুসলিম ভাইকে হত্যা বৈধ মনে করে করে তবে তা নিঃসন্দেহে কুফরী।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ অত্র হাদীসের অর্থ ঐ (হাদীসের) দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়েছে, الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِه وَيَدِه মুসলিম ঐ ব্যক্তি যার জিহ্বা এবং হাত থেকে অপর মুসলিম নিরাপদ থাকে। এ কথা সুসাব্যস্ত যে, এখানে মুসলিম দ্বারা মুসলিমে কামিল। ঈমানের দাবী অনুপাতে ইসলামের হকসমূহ আদায় করা তার ওপর কর্তব্য, কিন্তু তার কতিপয়ের ঘাটতি বা কমতির দ্বারা সে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে খাঁটি কাফির হয়ে যায় না বরং তার ঈমান কমে যায়।
শারহুস্ সুন্নাহ্ গ্রন্থে রয়েছে, এতে মুরজিয়াদে যুক্তি খন্ডনের দলীল রয়েছে। তারা ‘ইবাদাত ও ‘আমলকে ঈমান বলে মনে করে না। তারা বলেন, ‘আমলের মাধ্যমে ঈমান বাড়ে না এবং পাপের কারণে ঈমান কমে না অর্থাৎ নেককার-গুনাহগার সকল মুসলিমের ঈমান সমান। আহলুস্ সুন্নাহ্ ওয়াল জামা‘আতের ‘আক্বীদাহ্ এর বিপরীত অর্থাৎ নেক ‘আমলের কারণে ঈমানের বৃদ্ধি ঘটে এবং পাপ কাজের কারণে ঈমান হ্রাসপ্রাপ্ত হয়। (ফাতহুল বারী ১ম খন্ড, হাঃ ৬১০৩)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮১৫-[৪] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইকে কাফির বলবে, তাদের দু’জনের একজন এর উপযুক্ত সাব্যস্ত হবে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ حِفْظِ اللِّسَانِ وَالْغِيبَةِ وَالشَّتَمِ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَيُّمَا رَجُلٍ قَالَ لِأَخِيهِ كَافِرُ فَقَدْ بَاءَ بِهَا أَحدهمَا» . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ কোন মুসলিম অপর কোন মুসলিমকে কাফির বলে সম্বোধন করতে পারে না। কেউ কাউকে কাফির বলে সম্বোধন করলেই (তো সত্য-মিথ্যা যাই হোক না কেন) কার্যকরীরূপে প্রতিফলিত হবে। যাকে এ সম্বোধন করা হলো সে যদি সত্যই কুফরী কর্ম করে থাকে তবে তার ওপর ঐ কথার হুকুম প্রযোজ্য হবে এবং সে সত্য সত্যই কাফির বলে বিবেচিত হবে। আর যদি সে সত্যিকার কোন কুফরী কর্ম না করে, তাকে অহেতুক কাফির বলে সম্বোধন করা হয় তাহলে তার ঐ কথাটি নিজের দিকেই প্রত্যাবর্তিত হবে, অর্থাৎ সেই কাফির বলে বিবেচিত হবে।
ইবনুল মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ অহেতুক কাউকে কাফির বলে সম্বোধন করলে সে নিজে কুফরীর গুনাহ নিয়ে ফিরবে।
‘আল্লামা নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ যে হাদীসগুলো ‘উলামাগণের নিকট খুব মুশকিল, এটি তার একটি। এর প্রকাশ্য বা বাহ্যিক অর্থ উদ্দেশ্য নয়। এটা এজন্য যে, একজন মুসলিমকে দীনের উপর অটুট বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও হত্যা কিংবা যিনার মতো কাবীরাহ্ গুনাহের কারণে কাফির বলা যায় না। এ কথা যখন সাব্যস্ত হলো যে, কাউকে কাফির বলা ঠিক নয় তখন অত্র হাদীসের আমরা কয়েকটি ব্যাখ্যা বা তাবীল করব। আর সেটি হলো এই যে,
প্রথমতঃ কেউ যখন কাউকে কাফির বলা হালাল বা বৈধ মনে করবে তখন তার ওপর (এই কাফির বলার অনভিপ্রেত বিরূপ প্রতিক্রিয়া হিসেবে) কুফরীর হুকুম বর্তাবে।
দ্বিতীয়টি হলো : তার ওপর গুনাহের বোঝা চেপে বসবে এবং ঈমানের ঘাটতি সংঘটিত হবে।
তৃতীয়টি হলো : এটা খারিজীদের ব্যাপারে প্রযোজ্য, কেননা তারা মু’মিনদের কাফির বলে থাকে, তাই সেটা ফিরে গিয়ে তাদের ওপর পতিত হয়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮১৬-[৫] আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে ফাসিক বা পাপী বলে অপবাদ দেবে না এবং কাফির বলেও দুর্নাম করবে না। যদি উদ্দিষ্ট ব্যক্তি এরূপ না হয়, তবে তার প্রদত্ত অপবাদ তার দিকেই প্রত্যাবর্তন করবে। (বুখারী)[1]
بَابُ حِفْظِ اللِّسَانِ وَالْغِيبَةِ وَالشَّتَمِ
وَعَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَرْمِي رَجُلٌ رَجُلًا بِالْفُسُوقِ وَلَا يَرْمِيهِ بِالْكُفْرِ إِلَّا ارْتَدَّتْ عَلَيْهِ إِنْ لَمْ يَكُنْ صَاحِبُهُ كَذَلِكَ» رَوَاهُ البُخَارِيّ
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮১৭-[৬] উক্ত রাবী [আবূ যার (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কাউকে কাফির বলে ডাকে অথবা আল্লাহর দুশমন বলে, অথচ সে ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষ এরূপ না হয়, তবে এ বাক্য তার দিকে প্রত্যাবর্তন করবে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ حِفْظِ اللِّسَانِ وَالْغِيبَةِ وَالشَّتَمِ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ دَعَا رَجُلًا بِالْكُفْرِ أَوْ قَالَ: عَدُوَّ اللَّهِ وَلَيْسَ كَذَلِكَ إِلاَّ حارَ عليهِ . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ এ দু’টি (৪৮১৬ ও ৪৮১৭) হাদীসের ব্যাখ্যা ৪৮১৫ নং হাদীসের ব্যাখ্যানুরূপ।
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮১৮-[৭] আনাস ও আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যদি দু’ ব্যক্তি পরস্পরকে গালি দেয়, তবে গালমন্দের পাপ সে ব্যক্তির হবে যে ব্যক্তি প্রথম গালি দিয়েছে, যতক্ষণ পর্যন্ত না অত্যাচারিত ব্যক্তি সীমা অতিরিক্ত করবে। (মুসলিম)[1]
بَابُ حِفْظِ اللِّسَانِ وَالْغِيبَةِ وَالشَّتَمِ
وَعَن أنس وَأَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الْمُسْتَبَّانِ مَا قَالَا فَعَلَى الْبَادِئِ مالم يعْتد الْمَظْلُوم» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ (الْمُسْتَبَّانِ) শব্দটি কর্তৃবাচ্য দ্বিবচন হিসেবে باب افتعال থেকে এসে باب تفاعل এর خاصيت রূপে ব্যবহার হয়ে المتشائمان শব্দের অর্থ প্রদান করেছে। المتشائمان এর অর্থ হলো :
هُمَا اللَّذَانِ سَبَّ كُلٌّ مِنْهُمَا الْآخَرَ দু’জন পরস্পর একজন আরেকজনকে গালি দেয়া এবং পরস্পরের মধ্যে বিদ্যমান লুকায়িত গোপন দোষ-ত্রুটি তুলে ধরা।
পরস্পর গালিদানকারী দু’জনের একজন সূচনাকারী হয়, যে প্রথমে গালি দেয়ার সূচনা করে সে বেশী অপরাধী। তবে প্রথম গালিদানকারী গালি দেয়া শুরু করলে আরেকজন যদি ধৈর্যধারণ করে থাকতে পারে এবং গালিদানের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন না করে তাহলে গাল-মন্দের যাবতীয় পাপ প্রথমজনই বহন করবে। কেননা ঝগড়ার সূত্রপাত সেই ঘটিয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, গালি-গালাজের সম্পূর্ণ গুনাহ সে বহন করবে না বটে, তবে অধিকাংশ গুনাহ সে বহন করবে। কিন্তু দ্বিতীয় ব্যক্তিও যদি ধৈর্যধারণ না করে গালি শুরু করে দেয় এবং সীমালঙ্ঘন করে ফেলে তবে উভয়ের সমান গুনাহ হবে। প্রথমজনের গুনাহের কারণ তো সর্বজনবিদিত, দ্বিতীয়জন গালি দেয়ার কারণে সেও গুনাহগার হবে।
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ; শারহুন নাবাবী ১৬শ খন্ড, হাঃ [২৫৮৭]-৬৮; ‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৮৮৬; লুম্‘আত)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮১৯-[৮] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একজন সিদ্দীকের পক্ষ অধিক অভিসম্পাতকারী হওয়া সমীচীন নয়। (মুসলিম)[1]
بَابُ حِفْظِ اللِّسَانِ وَالْغِيبَةِ وَالشَّتَمِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا يَنْبَغِي لِصِدِّيقٍ أنْ يكونَ لعَّاناً» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ (صِدِّيقٍ) শব্দ صادق এর মুবালাগাহ্, এর অর্থ অধিক সত্যবাদী। উদ্দেশ্য মু’মিন ব্যক্তি, কারণ প্রকৃত মু’মিন সর্বদাই সত্যবাদী হয়ে থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ وَالَّذِينَ آمَنُوا بِاللهِ وَرُسُلِه# أُولٰئِكَ هُمُ الصِّدِّيقُونَ ‘‘যারা আল্লাহ ও তদীয় রসূলের প্রতি ঈমান এনেছে তারাই প্রকৃত সত্যবাদী’’- (সূরাহ্ আল হাদীদ ৫৭ : ১৯)। প্রকৃত মু’মিনের জন্য বৈধ নয় যে, সে অধিক লা‘নাতকারী বা অভিসম্পাতকারী হবে।
লা‘নাতের দ্বারা এখানে উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর রহমত থেকে দূর থাকার দু‘আ করা, যা বদ্দু‘আর অর্থে ব্যবহার হয়ে থাকে। মু’মিনের ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ মাত্রা কম হওয়ার কারণে বাক্যটিতে মুবালাগার সীগাহ্ ব্যবহার করা হয়েছে। ইবনু মালিক বলেনঃ মুবালাগার সীগাহ্ ব্যবহারের উদ্দেশ্য হলো অধিক লা‘নাত বুঝানো, কারো থেকে দু’একবার লা‘নাত প্রকাশিত হলে এই নিন্দা তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ সিদ্দীকের জন্য এ নিন্দনীয় গুনটি যথার্থ নয়, কেননা সিদ্দীক হলো নুবুওয়াতের পরবর্তী স্তর। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ ‘‘যারা আল্লাহ এবং তার রসূলের আনুগত্য করে তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে নি‘আমাতপ্রাপ্ত নবী, সিদ্দীক্বীন, শুহাদা এবং সলিহীনদের সাথেই থাকবেন’’- (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪ : ৬৯)। নবীগণ সৃষ্টির প্রতি রহমতস্বরূপ এবং আল্লাহর দয়া থেকে বিতাড়িত ও দূরে অবস্থানকারী বান্দাদের জন্য নৈকট্য সৃষ্টিকারীরূপে প্রেরিত হয়েছেন। আর অধিক অভিসম্পাতকারী নবীদের নৈকট্য থেকে দূরে অবস্থানকারী। অতএব এই অভিসম্পাত সিদ্দীক হওয়ায় জন্য অন্তরায়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮২০-[৯] আবুদ্ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেনঃ নিশ্চয় অধিক অভিসম্পাতকারীরা কিয়ামতের দিন সাক্ষ্যদাতা হবে না এবং সুপারিশকারীও হবে না। (মুসলিম)[1]
بَابُ حِفْظِ اللِّسَانِ وَالْغِيبَةِ وَالشَّتَمِ
وَعَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «إِنَّ اللَّعَّانِينَ لَا يَكُونُونَ شُهَدَاءَ وَلَا شُفَعَاء يَوْم الْقِيَامَة» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ পূর্বের হাদীসে আলোচিত হয়েছে মু’মিন ব্যক্তি অভিসম্পাতকারী হবে না। একজন মু’মিন আরেক মু’মিনকে অভিসম্পাত করা নীচ ও হীন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। এতে ব্যক্তির শরাফত-ভদ্রতা ও ন্যায়পরায়ণতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। তাই কিয়ামতের দিন সে মু’মিন হিসেবে পূর্ব জাতির জন্য সাক্ষ্যদানকারী। অথবা সুপারিশকারী হতে পারবে না।
স্মর্তব্য যে, কিয়ামতের দিন পূর্ববর্তীর নবীর উম্মাতেরা তাদের নবীদের রিসালাত ও দা‘ওয়াতকে অস্বীকার করে বলবে, ‘‘আমাদের কাছে কোন আহবানকারী আসেনি এবং তাওহীদের দা‘ওয়াতও পেশ করেনি’’। আল্লাহ তা‘আলা তখন ঐ সময়ের নবীদের ডেকে তাদের নিকট সাক্ষী তলব করবেন। তখন নবীগণ উম্মাতে মুহাম্মাদীকে সাক্ষী হিসেবে পেশ করবেন। উম্মাতে মুহাম্মাদী আল কুরআনে বর্ণিত পূর্ব জাতির ইতিহাস পাঠ করে তাদের কৃতকর্ম জানার কারণে নবীদের দা‘ওয়াতের সত্যতার সাক্ষী প্রদান করবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ
(وَكَذٰلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ) ‘‘আমি এভাবেই তোমাদেরকে মধ্যমপন্থী জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছি, যাতে তোমরা মানবজাতির জন্য সাক্ষী হও’’- (সূরাহ্ আল বাকারাহ্ ২ : ১৪৩)।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ অত্র আয়াতে উল্লেখিত الْوَسَط শব্দের অর্থ হলো الْعَدْل ন্যায়পরায়ণতা। অভিসম্পাত عَدَالَةِ বা ন্যায়পরায়ণতাকে বিলোপ করে, আর আদিল বা ন্যায়পরায়ণ নয় এমন ব্যক্তির সাক্ষী গ্রহণযোগ্য নয়।
ব্যাখ্যাকারগণ বলেছেনঃ তারা (লা‘নাত করার কারণে) ফাসিকে পরিণত হয়েছে। সুতরাং ফাসিকের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। তাই কিয়ামতের দিন তারা কোন সাক্ষী হতে পারবেন না এবং সুপারিশের মর্যাদাও পাবে না। কিয়ামতের দিন সুপারিশের অধিকার বা মর্যাদা হলো নবীদের এবং শাহীদদের জন্য খাস, এই মর্যাদা আল্লাহ মু’মিনদেরও দিনে। মু’মিনদের যে মর্যাদা দিবেন লা‘নাত বা অভিসম্পাতের কারণে সেই মর্যাদা বিলোপ হয়ে যাওয়ায় কিন্তু (কিয়ামতের দিন) তাদের কোন সুপারিশ গ্রহণ করা হবে না। এটা অবশ্য তাদের বেলায় যারা এ কাজে অভ্যস্ত, ঘটনাক্রমে দু‘এক বারের দ্বারা এই মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে না।
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ; শারহুন নাবাবী ১৬শ খন্ড, হাঃ [২৫৯৮]-৮৫)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮২১-[১০] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন কোন ব্যক্তি বলে যে, মানুষ ধ্বংস হোক, তখন সে নিজেই সবচেয়ে বেশি ধ্বংসপ্রাপ্ত। (মুসলিম)[1]
بَابُ حِفْظِ اللِّسَانِ وَالْغِيبَةِ وَالشَّتَمِ
وَعَنْ
أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِذَا قَالَ الرَّجُلُ: هَلَكَ النَّاسُ فَهُوَ أَهْلَكُهُمْ . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যাঃ কোন ব্যক্তির এই কথা বলা যে ‘মানুষের ধ্বংস হোক’ এর অর্থ হলো : অন্যদের খারাপ ‘আমলের কারণে জাহান্নামে যাওয়াকে আবশ্যক বলে মনে করা, এটিও একটি অভিসম্পাত। সুতরাং কারো জন্য বা কোন জাতির জন্য এরূপ অভিসম্পাত করা আদৌ বৈধ নয়।
হাদীসের শব্দ فَهُوَ أَهْلَكُهُمْ ‘সেই সর্বাধিক ধ্বংসপ্রাপ্ত, এর "كُ" বর্ণে পেশ এবং যবর উভয় চিহ্ন যোগে পাঠ সিদ্ধ। যবরযোগে পাঠ করলে তা فِعْلٌ مَاضٍ অতীতকালের ‘সীগাহ্’ বা শব্দ হিসেবে অর্থ প্রদান করবে। তখন এর অর্থ হয় সীমালঙ্ঘনকারী তারাই যারা মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করে থাকে এবং বলে থাকে, ‘মানুষ ধ্বংস হোক’। মানুষ যখন এ কথা বলেই ফেলে তখন আল্লাহ নয় বরং সে নিজে তার জন্য ধ্বংস আবশ্যক করে নেয়। "ك" বর্ণে পেশ যোগে পাঠ করলে এর অর্থ হয়, যে এ কথা বলবে সেই হবে অধিক ধ্বংসশীল। কেননা সে নিজেকে অপরের চেয়ে অধিক ভালো মনে করেছে আর আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে অন্যকে বঞ্চিত মনে করে নিজের জন্য কেবল নির্ধারণ করে নিয়েছে।
ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত আছে, যদি কেউ অন্যকে হেয় এবং তুচ্ছ মনে করে নিজেকে বেশী ভালো মনে করে এ কথা বলে থাকে, তবে নিঃসন্দেহে তা অপছন্দনীয় এবং নিষিদ্ধ। আর যদি অন্যকে তুচ্ছ জ্ঞান করে নয়, বরং অন্যের মধ্যে দীনের ত্রুটি লক্ষ্য করে তাদের শাসন হিসেবে এ কথা বলা হয়ে থাকে তাহলে তা দোষণীয় নয়, এটা জামহূরেরও মত।
কেউ কেউ বলেছেন, এটা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো বিদ্‘আতী দল, যারা মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করে থাকে এবং (গুনাহের কারণে) চিরজাহান্নামী বলে মনে করে থাকে।
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ; শারহুন নাবাবী ১৬শ খন্ড, হাঃ [২৬২৩]-১৩৯; ‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৯৭৫)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮২২-[১১] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা কিয়ামতের দিন সবচেয়ে খারাপ লোক তাকে পাবে, যে দ্বিমুখী (কপট)। সে এক মুখ নিয়ে এদের কাছে যায় এবং অপর মুখ নিয়ে ওদের কাছে যায়। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ حِفْظِ اللِّسَانِ وَالْغِيبَةِ وَالشَّتَمِ
وَعَنْهُ: قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «تَجِدُونَ شَرَّ النَّاسِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ذَا الْوَجْهَيْنِ الَّذِي يَأْتِي هَؤُلَاءِ بوجهٍ وَهَؤُلَاء بوجهٍ» . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ দুই চেহারা বিশিষ্ট লোক হলো মুনাফিক। তারা একদলের কাছে বলে, আমরা তোমাদের সাথে; অন্যদের কাছে গিয়ে বলে, আমরা মূলত তোমাদের সাথে।
মুল্লা ‘আলী কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ফাসাদ সৃষ্টি। এরা হলো মুনাফিক সদৃশ লোক। ‘আল্লামা নাবাবী বলেনঃ এরা প্রত্যেক দলের কাছে গিয়ে নিজেদেরকে তাদের দলের লোক বলে পরিচয় দেয় এবং তাদের হিতাকাঙ্ক্ষী হিসেবে প্রচার করে থাকে। মূলত তাদের এ সকল কার্যক্রম হলো নিরেট প্রতারণা এবং ধোঁকা, যা দুই দলের গোপন তথ্যাদি প্রকাশে উৎসাহিত করে এবং ঝগড়া বাধিয়ে দেয়। এটা সম্পূর্ণ হারাম। কিন্তু কেউ যদি ব্বিদমান দু’টি দলের মধ্যে সন্ধি স্থাপন কিংবা মীমাংসার নিয়্যাতে এরূপ কাজ করে থাকে তবে তা নিন্দনীয় এবং হারাম নয় বরং প্রশংসনীয়। মুনাফিকের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে, আল্লাহ বলেনঃ ‘‘নিশ্চয় মুনাফিকেরা জাহান্নামের নিম্নস্তরে থাকবে’’- (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪ : ১৪৫)। হাদীসে এসেছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে থাকবে দ্বিমুখী লোক অর্থাৎ মুনাফিকগণ। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; শারহুন নাবাবী ১৬শ খন্ড, হাঃ [২৫২৬]-১৯৯; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ২০২৫)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮২৩-[১২] হুযায়ফাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ চোগলখোর বা নিন্দাকারী জান্নাতে যাবে না। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
মুসলিম-এর অপর বর্ণনায় قَتَّاتٌ-এর স্থলে نَمَّامٌ (একই অর্থ- চোগলখোর) শব্দ রয়েছে।
بَابُ حِفْظِ اللِّسَانِ وَالْغِيبَةِ وَالشَّتَمِ
وَعَنْ حُذَيْفَةَ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَتَّاتٌ» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ. وَفِي رِوَايَةِ مُسْلِمٍ: «نَمَّامٌ»
ব্যাখ্যাঃ (قَتَّاتٌ) বলা হয় ঐ ব্যক্তিকে যে কারো গোপন বা সিক্রেট কথা অন্যমনস্কভাব নিয়ে বা আড়ালে থেকে সতর্কতার সাথে এবং অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে (কান লাগিয়ে) শোনে এবং সেটা অন্যের কাছে কিংবা ঐ লোকের প্রতিপক্ষর নিকট তা পৌঁছে দেয়। (نَمَّامٌ) বলা হয় ঐ ব্যক্তিকে যে প্রকাশ্যে থেকেই কারো কথা শুনে এবং তা অপরের কাছে পৌঁছে দেয়। এ উভয় কর্মই হারাম ও নিন্দনীয়, কেননা এতে উদ্দেশ্য থাকে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-কলহ সৃষ্টি করা অথবা অনিবার্য কারণেই এতে পরস্পরের মধ্যে ঝগড়া কলহ সৃষ্টি হয়ে যায়। এরূপ কর্ম সম্পূর্ণরূপে হারাম। ইবনুল মালিক বলেনঃ যদি পরস্পরের দ্বন্দ্ব-কলহ নিরসনের জন্য এরূপ কার্য সম্পাদন করা হয় তবে তা নিন্দনীয় এবং হারাম হতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ ‘‘অধিকাংশ গুপ্ত পরামর্শে কোন কল্যাণ নিহিত থাকে না, হ্যাঁ তবে যে ব্যক্তি দান অথবা কোন নেক কাজ কিংবা জনগণের মধ্যে পরস্পর সন্ধি স্থাপনে উৎসাহিত করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এরূপ কাজ করবে আমি সত্বরই তাকে মহান পুরস্কার প্রদান করব।’’ (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪ : ১১৪)
এ বিষয়ে ‘আল্লামা গাযালী (রহিমাহুল্লাহ)-এর বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য, যার সংক্ষিপ্ত সার হলো : যার কাছে গীবত বা পরের কথা নিয়ে কেউ উপস্থিত হবে তার উচিত হলো তাকে সত্য বলে না জানা এবং তার কথা বিশ্বাস না করা। আর যার সম্পর্কে যা কিছু বলেছে তা নিয়ে তত্ত্ব অনুসন্ধানে লিপ্ত না হওয়া এবং কথা বহনকারীকে এরূপ কর্মকাণ্ড থেকে বারণ করা। এরূপ কাজকে সে খারাপ জানবে এবং ঘৃণাও করবে, কখনও এরূপ কাজের প্রতি সন্তুষ্ট হবে না। ‘আল্লামা নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ একজনের (গোপন) কথা অপরকে বলার মধ্যে যদি দীনের কোন কল্যাণ নিহিত থাকে তাহলে তা নিষেধ বা হারাম তো নয়ই বরং প্রকাশ করাটাই মুস্তাহাব, এমনকি কখনো তা ওয়াজিবও হয়ে যেতে পারে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬০৫৬; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ২০২৬; ‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৮৬৩)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮২৪-[১৩] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের সত্যানুসারী হওয়া উচিত। কেননা সত্যবাদিতা পুণ্যের দিকে পথপ্রদর্শন করে, আর পুণ্য জানণাতের দিকে পথপ্রদর্শন করে। যে ব্যক্তি সর্বদা সত্য কথা বলে এবং সত্য বলতে চেষ্টা করে, আল্লাহ তা’আলার দরবারে তাকে সত্যবাদী বলে লেখা হয়। তোমরা মিথ্যাচার থেকে বেঁচে থাকো। মিথ্যা পাপাচারের পথ দেখায়, আর পাপ জাহান্নামের দিকে পথ দেখায়। যে ব্যক্তি সর্বদা মিথ্যা কথা বলে এবং মিথ্যা বলতে সচেষ্ট থাকে, আল্লাহ তা’আলার দরবারে তাকে বড় মিথ্যুক বলে লেখা হয়। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
মুসলিম-এর অপর বর্ণনায় রয়েছে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ সত্য বলা পুণ্যের কাজ, আর পুণ্য মানুষকে জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়। মিথ্যা বলা পাপের কাজ, আর পাপ মানুষকে জাহান্নামে নিয়ে যায়।
بَابُ حِفْظِ اللِّسَانِ وَالْغِيبَةِ وَالشَّتَمِ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «عَلَيْكُمْ بِالصِّدْقِ فَإِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَصْدُقُ وَيَتَحَرَّى الصِّدْقَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللَّهِ صِدِّيقًا. وَإِيَّاكُمْ وَالْكَذِبَ فَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَكْذِبُ وَيَتَحَرَّى الْكَذِبَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللَّهِ كَذَّابًا» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ. وَفِي رِوَايَة مُسلم قَالَ: «إِنَّ الصِّدْقَ بِرٌّ وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ. وَإِنَّ الْكَذِبَ فُجُورٌ وَإِنَّ الْفُجُورَ يهدي إِلَى النَّار»
ব্যাখ্যাঃ সত্যবাদিতা মানব চরিত্রের শ্রেষ্ঠ গুণ এবং মিথ্যাচারিতা নিকৃষ্ট মানবীয় দোষ। সত্য কথা বলা, সত্য বলার চেষ্টা এবং এর উপর অবিচল থাকার প্রত্যয় মু’মিন জীবনের জন্য একান্তই কাম্য। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী, (عَلَيْكُمْ بِالصِّدْقِ) এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মুল্লা ‘আলী কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ الْزَمُوا الصِّدْقَ অর্থাৎ তোমরা সত্যবাদিতাকে নিজের জন্য ওয়াজিব করে নাও। সত্যবাদিতা মানুষকে পুণ্যের পথ ধরিয়ে জান্নাতে পৌঁছিয়ে থাকে। মানুষ যখন সত্যাশ্রয়ী হয়, সত্যই হয় জীবনের একমাত্র অবলম্বন, তখন আল্লাহ তা‘আলা তাকে সিদ্দীক বা চরম সত্যবাদীরূপে লিখে নেন। আল্লাহর নিকট নবীগণের মর্যাদার পরই ‘সিদ্দীক্বীনদের’ মর্যাদা। সত্যবাদী সিদ্দীকানের মর্যাদা নিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। পক্ষান্তরে মিথ্যা বলা বা মিথ্যাচারিতা স্খলিত চরিত্রের বিভৎসরূপ। মিথ্যাবাদী আল্লাহর নিকট ভীষণ অপছন্দনীয় ব্যক্তি। মিথ্যা মানুষকে পাপাচারিতার পথ ধরে জাহান্নামে নিক্ষেপ করে। কোন মানুষ যখন মিথ্যা বলে, মিথ্যা বলার চিন্তা ফিকর নিয়েই সর্বদা থাকে, তখন আল্লাহ তা‘আলার নিকট তাকে মিথ্যুক হিসেবে লিখে নেয়া হয়।
‘আল্লামা নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী- يُكْتَبُ তাকে লিখা হয়, এখানে তার অর্থ হলো : তার ওপর ঐ গুণের হুকুম লাগানো হয়, ফলে সে ঐ গুণের অধিকারী হয়ে হয়তো সিদ্দীক্বীনদের পুরস্কার লাভ করে না হয় মিথ্যাবাদী হয়ে তার শাস্তি ভোগ করে।
..... মাখলূক বা সৃষ্টির কাছে এটা প্রকাশের উদ্দেশ্য হলো : হয় সে ভালো-মন্দ লেখক মালায়িকাহ্’র (ফেরেশতাগণের) হাতে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হিসেবে লিপিবদ্ধ হবে আর না হয় আল্লাহর অপ্রিয় হিসেবে লিপিবদ্ধ হবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; শারহুন নাবাবী ১৬ খন্ড, হাঃ ২৬০৭/১০৩)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮২৫-[১৪] উম্মু কুলসূম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সে ব্যক্তি মিথ্যুক নয়, যে লোকেদের মধ্যে মীমাংসা করে, ভালো কথা বলে এবং ভালো কথা আদান-প্রদান করে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ حِفْظِ اللِّسَانِ وَالْغِيبَةِ وَالشَّتَمِ
وَعَنْ أُمِّ كُلْثُومٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «لَيْسَ الْكَذَّابُ الَّذِي يُصْلِحُ بَيْنَ النَّاسِ وَيَقُولُ خيرا وينمي خيرا» . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ মিথ্যা সর্বদাই নিন্দনীয় এবং মিথ্যুক ব্যক্তি আল্লাহর অপ্রিয় বান্দা। তবে মিথ্যা যদি মানুষের মধ্যকার পারস্পারিক দ্বন্দ্ব-কলহ নিরসনের নিমিত্তে হয় তখন তা নিন্দনীয় নয় এবং ঐ মিথ্যুক ব্যক্তি প্রকৃত মিথ্যাবাদী নয়। সে যদি বাহ্যিক দৃষ্টিতে মিথ্যা কথা বলেও থাকে। কিন্তু তার কথার অন্তর্নিহিত অর্থ হবে সত্য অথবা তার উদ্দেশ্য হবে মহৎ। যেমন যায়দ এবং ‘আমর-এর মধ্যকার দ্বন্দ্ব-কলহ নিরসনে কোন ব্যক্তি ‘আমরকে গিয়ে (মিথ্যাভাবে) বলল, ওহে ‘আমর! যায়দ তোমাকে সালাম জানিয়েছে। সে তোমার প্রশংসা করে বলল, আমি ‘আমরকে ভালোবাসি। অনুরূপ যায়দ-এর কাছে গিয়েও ‘আমর সম্পর্কে অনুরূপ কথা বলল, ফলে উভয় উভয়ের প্রতি শত্রুভাব এবং আত্মকলহ দূর হয়ে বন্ধুত্বের মানসিকতা সৃষ্টি হয়ে গেল। (মিরকাত; ফাতহুল বারী ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬৯২; শারহুন নাবাবী ১৬শ খন্ড, হাঃ ২৬০৫/১০১)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮২৬-[১৫] মিকদাদ ইবনু আসওয়াদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন তোমরা প্রশংসায় বাড়াবাড়িকারীদের দেখবে, তখন তাদের মুখে মাটি নিক্ষেপ করবে। (মুসলিম)[1]
بَابُ حِفْظِ اللِّسَانِ وَالْغِيبَةِ وَالشَّتَمِ
وَعَنِ
الْمِقْدَادِ بْنِ الْأَسْوَدِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا رَأَيْتُمُ الْمَدَّاحِينَ فَاحْثُوا فِي وُجُوهِهِمُ التُّرَاب» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ কারো প্রশংসায় যখন অতিরঞ্জন হবে অথবা অহেতুক হবে অথবা প্রশংসা হবে নিজেকে চাটুকারিতামূলক কিংবা কিছু খাওয়া পাওয়ার জন্য তখন এ হুকুম।
এ হাদীসে রয়েছে তার চেহারায় মাটি নিক্ষেপ কর। কোন কোন সংকলনে রয়েছে তার মুখে মাটি পুরে দাও। মুখে মাটি পুরে দেয়া অথবা ধূলা নিক্ষেপ করা হলো হাদীসের প্রকাশ্য বা বাহ্যিক অর্থ। কিন্তু কেউ কেউ বলেছেন, এর অর্থ হলো তার চাহিদার মাল-সম্পদ তাকে দিয়ে দাও। কেননা দুনিয়ার মাল-সম্পদ ইযযত সম্মানের তুলনায় ধূলাবালির মতই তুচ্ছ বস্তু, সুতরাং সেই বস্তু তাকে দিয়ে তার মুখ বন্ধ করে ফেলো।
আবার কেউ কেউ বলেছেন, তাকে সামান্য কিছু দিয়ে দাও, এই সামান্য কিছুকেই ধূলার সাথে সাদৃশ্য দিয়েছেন। (এছাড়াও আরো অনেকে অনেক ব্যাখ্যা করেছেন, বিস্তারিত মূল মিরক্বাতুল মাফাতীহ দ্রঃ)
মুল্লা ‘আলী কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সামনে প্রশংসাকারীকে তিরস্কার করা এবং এ কাজ থেকে বিরত থাকার প্রতি উৎসাহিত করা। কেননা কারো সামনে তার প্রশংসা তাকে দাম্ভিক-অহংকারী বানিয়ে ফেলে।
‘আল্লামা খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ কিছু মানুষ আছে যারা স্বভাবগতভাবে মানুষের প্রশংসা করে তার নিকট থেকে কিছু খেতে বা পেতে চায়, নিশ্চয় এদের জন্য অত্র হাদীসের বিধান যথার্থ। কিন্তু যে ব্যক্তি সমাজের কল্যাণে প্রশংসনীয় কোন ভালো কাজ করল, অন্যদেরকেও এমন ভালো কাজে উৎসাহ দানের লক্ষ্যে এবং কল্যাণকর কাজে অনুপ্রাণিত করতে কারো প্রশংসা করল, সে ঐ হুকুমের অন্তর্ভুক্ত নয়।
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৮৯৬)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮২৭-[১৬] আবূ বকরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মুখে এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তির খুব প্রশংসা করল। এটা শুনে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ ’’হায় দুর্ভাগা! তুমি তোমার ভাইয়ের গলা কাটলে’’। এ বাক্য তিনবার বললেন। অতঃপর বললেনঃ যদি তোমরা কারো প্রশংসা করা প্রয়োজন মনে করো, তবে এরূপ বলবে, ’’আমি অমুক ব্যক্তি সম্পর্কে এ ধারণা পোষণ করি, প্রকৃত অবস্থার সঠিক হিসাব আল্লাহ তা’আলাই জানেন’’। আর এটা ঐ সময় বলবে, যখন সে ব্যক্তি সম্পর্কে সত্যি সত্যিই তুমি এ ধারণা পোষণ করবে। কাউকে পূত-পবিত্র আখ্যায়িত করতে আল্লাহ তা’আলার ওপর বাড়াবাড়ি করবে না। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ حِفْظِ اللِّسَانِ وَالْغِيبَةِ وَالشَّتَمِ
وَعَن أبي بكرَة قَالَ: أَثْنَى رَجُلٌ عَلَى رَجُلٌ عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «وَيْلَكَ قَطَعْتَ عُنُقَ أَخِيكَ» ثَلَاثًا مَنْ كَانَ مِنْكُمْ مَادِحًا لَا محَالة فَلْيقل: أَحسب فلَانا وَالله حسيبه إِنْ كَانَ يُرَى أَنَّهُ كَذَلِكَ وَلَا يُزَكِّي على الله أحدا . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে যে লোকটি অন্য আরেকজন লোকের প্রশংসা করছিল এই প্রশংসা ছিল মাত্রাতিরিক্ত এবং প্রশংসার ক্ষেত্রে অতি বাড়াবাড়ি, ফলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ব্যাপারে বলেন (وَيْلَكَ) তোমার ধ্বংস হোক। (وَيْلَكَ) শব্দটি ‘আরবদের বর্ণনা বাগধারায় সতর্ক করণার্থে ব্যবহার হয়ে থাকে। এর অর্থ (هَلَكْتَ هَلَاكًا) তুমি একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছ অথবা ধ্বংস করে ফেলেছ। অর্থাৎ প্রশংসার ক্ষেত্রে তুমি অতিরঞ্জন করে নিজেকে মারাত্মক ক্ষতির মধ্যে ফেলেছ, অথবা যার অতিরিক্ত প্রশংসা করছ তাকে ভীষণ ক্ষতির মধ্যে ফেলেছ। এ শব্দটি নিখাদ বদ্দু‘আ অর্থে নয় বরং ধমকী কিংবা আফসোস ও পরিতাপ প্রকাশার্থে ব্যবহার হয়ে থাকে। সুতরাং (وَيْلَكَ) অর্থ তোমার জন্য আফসোস ও পরিতাপ। কোন কোন সংকলনে (وَيْحَكَ) শব্দ ব্যবহার হয়েছে। এটাও ধমকী অর্থে ব্যবহার হয়, তবে এতে থাকে মুহববাত ও দয়াশীলতা।
প্রশংসাকারীকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা (قَطَعْتَ عُنُقَ أَخِيكَ) ‘‘তুমি তোমার ভাইয়ের গর্দান কেটে দিলে’’ এটা রূপকার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে ধ্বংস দ্বারা দীনের ক্ষতি বা ধ্বংস উদ্দেশ্য। কারো প্রশংসা করতে হলে, নিজের ধারণার কথাটুকু ব্যক্ত করবে মাত্র। সে এভাবে বলবে আমার ধারণা মতে অমুকে ভালো বা এমন। অথবা আমি তো তাকে ভালো বলেই মনে করি বা ধারণা করি। প্রকৃত ভালো কে সে তো আল্লাহ জানেন। অতএব আল্লাহর জ্ঞানের ও জানার উপর অতি প্রশংসাই আল্লাহর ওপর বাড়াবাড়ি করা, যা নিষিদ্ধ।
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬১৬২; ‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৭৯৭; শারহুন নাবাবী ১৮শ খন্ড, হাঃ ৩০০০/৬৫)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮২৮-[১৭] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমরা কি জান গীবত কাকে বলে? সাহাবীগণ বললেনঃ আল্লাহ ও তাঁর রসূলই ভালো জানেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তোমার মুসলিম ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা তার কাছে খারাপ লাগবে। জিজ্ঞেস করা হলো, যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে সে ত্রুটি বিদ্যমান থাকে, তুমি যে দোষ-ত্রুটির কথা বললে, তার মধ্যে সে দোষ-ত্রুটি থাকলেই তো তুমি গীবত করলে। আর যদি দোষ-ত্রুটি বর্তমান না থাকে, তবে তুমি ’’বুহতান’’ (মিথ্যারোপ) করলে। (মুসলিম)[1]
অপর এক বর্ণনায় রয়েছে যে, যদি তুমি তোমার ভাইয়ের এমন দোষের কথা বলো, যা তার মধ্যে রয়েছে, তবে তুমি তার গীবত করলে। আর যদি তার সম্পর্কে এমন দোষের কথা বলো, যা তার মধ্যে নেই, তবে তুমি তার প্রতি ’’বুহতান’’ (মিথ্যা অপবাদ) দিলে।
بَابُ حِفْظِ اللِّسَانِ وَالْغِيبَةِ وَالشَّتَمِ
وَعَنْ
أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «أَتُدْرُونَ مَا الْغِيبَةُ؟» قَالُوا: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ: ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ . قِيلَ أَفَرَأَيْتَ إِنْ كَانَ فِي أَخِي مَا أَقُولُ؟ قَالَ: «إِنْ كَانَ فِيهِ مَا تَقُولُ فَقَدِ اغْتَبْتَهُ وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِيهِ مَا تَقُولُ فَقَدْ بَهَتَّهُ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ. وَفِي رِوَايَةٍ: «إِذَا قُلْتَ لِأَخِيكَ مَا فِيهِ فَقَدِ اغْتَبْتَهُ وَإِذَا قُلْتَ مَا لَيْسَ فِيهِ فقد بَهته»
ব্যাখ্যাঃ হাদীসটি আল কুরআনের এ আয়াতের ব্যাখ্যাঃ وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا ‘‘তোমাদের কেউ একে অপরের গীবত করবে না।’’ (সূরাহ্ আল হুজুরাত ৪৯ : ১২)
এ আয়াত নাযিল হলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণকে জিজ্ঞেস করলেন, (أَتَدْرُونَ مَا الْغِيبَةُ؟) তোমরা কি জান গীবত কি? তারা তখন জওয়াব দিলেন আল্লাহ ও তার রসূলই ভালো জানেন। এভাবে প্রশ্ন-উত্তর পরম্পরায় বিষয়টির বিস্তারিত ব্যাখ্যা অত্র হাদীসে বিধৃত হয়েছে।
ইমাম নাবাবী বলেনঃ গীবত হলো জঘন্য অপরাধসমূহের একটি অপরাধ। এটা যখন মানব সমাজে ব্যাপকভাবে বিস্তার ঘটে তখন তা থেকে অল্প মানুষই ফিরে আসতে সক্ষম হয়।
গীবতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ (ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهٗ) তোমার (দীনী) ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা যা সে অপছন্দ করে তাই গীবত।
এ বাক্যের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ‘আল্লামা নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ তোমার ভাই সম্পর্কে তার অসাক্ষাতে কিছু বলার বিষয়টি ব্যাপক। তার শারীরিক কোন বিষয়েও হতে পারে, তার জান-মাল, চরিত্র এমনকি আর্থিক, পারিবারিক, সন্তান-সন্ততি কিংবা পোশাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি সংক্রান্ত বিষয়েও হতে পারে। আর কারো সম্পর্কে গীবত যে শুধু মুখের ভাষায় হবে এমনটি নয়, কারো লিখনির মাধ্যমে, ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমে, চোখ টিপের মাধ্যমে, হাত-মাথা বা অন্য কোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমেও হতে পারে। মোটকথা যা দ্বারা অন্যের কাছে তোমার মুসলিম ভাইয়ের ত্রুটি বা তুচ্ছতা তুলে ধরবে এবং সে তা বুঝতে পেরে অপছন্দ করবে সেটাই গীবত, যা সম্পূর্ণরূপে হারাম। অনুরূপ খুড়িয়ে চলা, লাঠি, ভর দিয়ে চলা ইত্যাদি দ্বারা যদি কারো ত্রুটি বুঝানো উদ্দেশ্য হয় তবে সেটাও গীবতের অন্তর্ভুক্ত হবে। কারো মধ্যে কোন দোষ বিদ্যমান থাকলে সেটা অন্যের কাছে বর্ণনা করায় তা গীবত হয়। কিন্তু তার মধ্যে যদি ঐ দোষ না থাকে আর তা অন্যের কাছে প্রকাশ করা হয় তবে সেটা হয় ‘বুহতান’ বা অপবাদ তথা (কারো সম্পর্কে) মহা মিথ্যাচার।
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ; শারহুন নাবাবী ১৬শ খন্ড, হাঃ ২৫৮৯/৭০; ‘আওনুল মাবূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৮৬৬; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৯৩৪)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮২৯-[১৮] ’আয়িশাহ্ সিদ্দিকা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সাক্ষাতের অনুমতি প্রার্থনা করল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ)
-কে) বললেনঃ তাকে আসার অনুমতি দাও। সে নিজের গোত্রের খারাপ ব্যক্তি। যখন লোকটি তাঁর দরবারে এসে বসল, তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রশস্ত ললাটে তার দিকে তাকালেন এবং মৃদু-হাস্যে তার সাথে কথা বললেন। যখন লোকটি চলে গেল, তখন ’আয়িশাহ্ সিদ্দিকা (রাঃ) বললেনঃ হে আল্লাহর রসূল! আপনি লোকটি সম্পর্কে এমন এমন বলেছেন, অতঃপর আপনিই তার সাথে প্রশস্ত ললাটে সাক্ষাৎ করলেন এবং মৃদু হেসে কথা বললেন। এটা শুনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি কি আমাকে কখনো অশ্লীলভাষী পেয়েছ? কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে মানুষের মধ্যে মর্যাদার দিক দিয়ে সে-ই নিকৃষ্ট হবে, যাকে মানুষ তার অনিষ্টের ভয়ে ত্যাগ করে।
অপর এক বর্ণনায় আছে, যাকে মানুষ তার অশ্লীলতার ভয়ে পরিত্যাগ করবে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ حِفْظِ اللِّسَانِ وَالْغِيبَةِ وَالشَّتَمِ
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا أَنَّ رَجُلًا اسْتَأْذَنَ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. فَقَالَ: «ائْذَنُوا لَهُ فَبِئْسَ أَخُو الْعَشِيرَةِ» فَلَمَّا جَلَسَ تَطَلَّقَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي وَجْهِهِ وَانْبَسَطَ إِلَيْهِ. فَلَمَّا انْطَلَقَ الرَّجُلُ قَالَتْ عَائِشَةُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ قُلْتَ لَهُ: كَذَا وَكَذَا ثُمَّ تَطَلَّقْتَ فِي وَجْهِهِ وَانْبَسَطْتَ إِلَيْهِ. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَتى عهدتني فحاشا؟ ؟ إِن شَرّ النَّاس مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَنْ تَرَكَهُ النَّاسُ اتِّقَاءَ شَرِّهِ» وَفِي رِوَايَةٍ: «اتِّقَاءَ فُحْشِهِ» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ যে লোকটি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করেছিল তার নাম এখানে উল্লেখ নেই। কেউ বলেছেন, তার নাম ছিল ‘উয়াইনাহ্ আল ফাযারী। আবার কেউ বলেছেন, মাখরামাহ্ ইবনু নাওফাল। লোকটি প্রবেশের সময় তার সম্পর্কে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মন্তব্য করলেন- সে গোত্রের কতই না নিকৃষ্ট লোক। সহীহুল বুখারীর অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, সে গোত্রের কতই না নিকৃষ্ট লোক এবং কতই না নিকৃষ্ট লোকের সন্তান। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সম্পর্কে এমন কথা বলার কারণ হলো- সে তখনও ইসলাম গ্রহণ করেনি, কিন্তু জনসম্মুখে ভূয়াভাবে ইসলাম প্রকাশ করেছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার অবস্থা প্রকাশের জন্য এমন কথা বলেছেন যাতে কেউ তার কথায় ধোঁকায় না পরে এবং প্রতারিত না হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথে হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় দেখা করেন এবং মিষ্টি ও নরম কথা বলেন। এটা ছিল রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্বভাবজাত অভ্যাস, তিনি শত্রুর সাথেও নরম ও মিষ্টি কথা বলতেন। তাছাড়া ঐ লোকটির অন্তর জয় করাও ছিল একটি উদ্দেশ্য।
শারহুস্ সুন্নাহ্ গ্রন্থকার এ হাদীসের ভিত্তিতে বলেন, ফাসিক ব্যক্তির ভিতরের অসৎ রূপ প্রকাশ করা বৈধ, যাতে জনগণ তার অনিষ্টতা থেকে আত্মরক্ষা করতে পারে। এরূপ বলা বা করা গীবতের অন্তর্ভুক্ত হবে না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার অন্তরের লুকায়িত কুফরী প্রকাশ করে স্বীয় নুবুওয়াতী মু‘জিযা প্রকাশ করেছেন, এটা গীবত হবে না।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ যে নিজের পাপাচারী এবং বিদ্‘আত প্রকাশ করে বেড়ায় তার গীবত দোষণীয় নয়। এরূপ আটস্থলে গীবত করা বৈধ, বিস্তারিত দেখুন- রিয়াযুস্ সলিহীন, গীবত অধ্যায়।
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬০৩২; ‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৭৮৩; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৯৯৬)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৩০-[১৯] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার সকল উম্মাত ক্ষমাপ্রাপ্তদের মধ্যে আছে; কিন্তু যে ব্যক্তি নিজের অপরাধ প্রকাশকারী, সে ক্ষমাপ্রাপ্তদের মধ্যে নয়। এটা কতই না লজ্জাহীনতার কাজ যে, লোক রাতে খারাপ কাজ করে, আর আল্লাহ তা’আলা তার কুকর্ম গোপন করে রাখেন। অতঃপর সকাল হতেই লোকেদেরকে বলে ফেলে, হে অমুক! আমি রাতে এরূপ কাজ করেছি। আল্লাহ তা’আলা রাতে তার দোষ ঢেকে ছিলেন, কিন্তু সকাল হতেই সে আল্লাহ তা’আলার পর্দা উন্মুক্ত করে দিলো। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
এ প্রসঙ্গে আবূ হুরায়রা কর্তৃক বর্ণিত হাদীস مَنْ كَانَ يُؤمِنُ بِاللهِ الخ যিয়াফাত অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে।
بَابُ حِفْظِ اللِّسَانِ وَالْغِيبَةِ وَالشَّتَمِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: كُلُّ أُمَّتِي مُعَافًى إِلَّا الْمُجَاهِرُونَ وَإِنَّ مِنَ الْمَجَانَةِ أَنْ يَعْمَلَ الرَّجُلُ عَمَلًا بِاللَّيْلِ ثُمَّ يُصْبِحَ وَقَدْ سَتَرَهُ اللَّهُ. فَيَقُولَ: يَا فُلَانُ عَمِلْتُ الْبَارِحَةَ كَذَا وَكَذَا وَقَدْ بَاتَ يَسْتُرُهُ رَبُّهُ وَيُصْبِحُ يَكْشِفُ سِتْرَ اللَّهِ عَنْهُ . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
وَذكر فِي حَدِيث أبي هُرَيْرَة: «من كَانَ يُؤمن بِاللَّه» فِي «بَاب الضِّيَافَة»
ব্যাখ্যাঃ অনেক মানুষ এমন রয়েছে, যে রাতের অন্ধকারে গোপনে পাপ করে, তার এ পাপের কথা কেউ জানে না, আল্লাহ তা‘আলা তার পাপকে গোপন করে রাখেন, কিন্তু সে আল্লাহর সেই গোপনীয়তার পর্দা উন্মোচন করে দিয়ে দিনের বেলা নিজের গোপন পাপের কথা মানুষের কাছে প্রকাশ করে দেয়। আল্লাহ এ কাজে ভীষণ অসন্তুষ্ট হন এবং তিনি আর তাকে ক্ষমা করেন না। গোপনীয় পাপ প্রকাশ না করলে কোন না কোনভাবে তা মাফ হয়ে যায়। হয়তো সে নিজেই অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে তাওবাহ্ করে ক্ষমা প্রার্থনা করে, ফলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন, অথবা তিনি অন্য কোন নেক ‘আমল করেন যার কারণে তার ঐ গোপন পাপ মাফ হয়ে যায়। কিন্তু যখন সে তা মানুষের কাছে প্রকাশ করে দেয়ার ধৃষ্টতা দেখান তখন আল্লাহ তার ক্ষমার পথ বন্ধ করে দেন। কারণ এটা এক প্রকার অহংকার ও সীমালঙ্ঘন, আল্লাহ অহংকারী এবং সীমালঙ্ঘনকারীকে ভালোবাসেন না।
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬০৬৯; শারহুন নাবাবী ১৮শ খন্ড, হাঃ ২৯৯০/৫২)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৩১-[২০] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা পরিত্যাগ করবে, অথচ মিথ্যা হলো প্রকৃতই বাতিল, তার জন্য জান্নাতের এক প্রান্তে একটি প্রাসাদ তৈরি করা হবে। যে ব্যক্তি ঝগড়াঝাটি পরিত্যাগ করবে অথচ ন্যায়ত সে ঝগড়ার হকদার, তার জন্য জান্নাতের মাঝখানে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করা হবে। আর যে ব্যক্তি নিজের চরিত্রকে উত্তম করবে, তার জন্য জান্নাতের উঁচু এলাকায় একটি প্রাসাদ বানানো হবে। (তিরমিযী। ইমাম তিরমিযী বলেন, এ হাদীসটি হাসান। শারহুস্ সুন্নাহ্য়ও হাসান বলা হয়েছে; কিন্তু মাসাবীহ গ্রন্থকার বলেনঃ হাদীসটি গরীব।)[1]
عَنْ أَنَسٍ
رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم: «من تَرَكَ الْكَذِبَ وَهُوَ بَاطِلٌ بُنِيَ لَهُ فِي ربض الْجنَّة وَمن ترك المراء وَهُوَ مُحِقٌّ بُنِيَ لَهُ فِي وَسَطِ الْجَنَّةِ وَمَنْ حَسَّنَ خُلُقَهُ بُنِيَ لَهُ فِي أَعْلَاهَا» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ. وَكَذَا فِي شَرْحِ السُّنَّةِ وَفِي الْمَصَابِيحِ قَالَ غَرِيبٌ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘সালামাহ্ ইবনু ওয়ারদান’’ নামের বর্ণনাকারী, সে য‘ঈফ। সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ১০৫৬।
ব্যাখ্যাঃ মিথ্যা সর্বদাই পরিহারযোগ্য। সুতরাং এটাকে সাধারণভাবে নেয়াই উচিত। তবে ক্ষেত্রবিশেষ তার বৈধতা সার্বজনীন আলোচনার বিষয় নয়। হাদীসের বাণী, (وَهُوَ بَاطِلٌ) বাক্যটি শর্ত এবং জাযার মাঝে জুমলায়ে মু‘তারাযা বা বিছিন্ন বাক্য। এর মূল প্রতিপাদ্য কথা হলো তা (মিথ্যা) বাতিল। অথবা বাক্যটি জুমলায়ে হালিয়া হয়েছে অর্থাৎ হাল বা অবস্থা হলো এই যে, মিথ্যা বাতিল এতে কোন কল্যাণ নেই (মাত্র তিনটি ক্ষেত্র ব্যতীত)। এই হাল কর্তা এবং কর্ম বা فاعل কিংবা مَفْعُولٍ যে কোন বাক্যটি থেকে হতে পারে।
(ربض الْجنَّة) হলো জান্নাতের অভ্যন্তরের পার্শ্বস্থল। মিথ্যা পরিহারকারীর জন্য জান্নাতের পার্শদেশে বিশেষ একটি মহল তৈরি করা হবে। ‘আরবীতে المراء শব্দের অর্থ الجدال, ঝগড়ায় সর্বদা যে ন্যায় কথা বলা সত্ত্বেও ঝগড়া পরিহার করে চলে তার জন্য জান্নাতের মধ্যস্থলে একটি বিশেষ প্রাসাদ বা মহল তৈরি করে দেয়া হবে। চরিত্র সুন্দর করার অর্থ হলো মিথ্যা বলা থেকে, ঝগড়া থেকে এবং যাবতীয় খারাপ চারিত্রিক অসৎ গুণাবলী থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে সৎকর্ম দ্বারা স্বীয় চরিত্রকে সুন্দর করে সাজিয়ে তোলা, এর জন্য জান্নাতের উচ্চশৃঙ্গে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করা হবে। এই উচ্চশৃঙ্গ ইন্দ্রীয়গ্রাহ্য কিংবা অর্থগত দিক থেকেও হতে পারে। এ হাদীস থেকে প্রমাণিত যে, চরিত্র মানুষের উপার্জিত তথা নিজ হাতে গড়া বস্তু, যদিও তাতে প্রকৃতি বা স্বভাবজাত প্রভাব রয়েছে। সহীহ হাদীসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা দু‘আ করেছেন, اَللّٰهُمَّ حَسِّنْ خُلُقِي كَمَا حَسَّنْتَ خَلْقِي ‘‘হে আল্লাহ! তুমি আমার দেহ অবয়বকে যেভাবে সুন্দর করেছ অনুরূপভাবে আমার চরিত্রকেও সুন্দর করে দাও।’’
সহীহ মুসলিম-এর এক বর্ণনায় এভাবে দু‘আ এসেছে : اَللّٰهُمَّ اهْدِنِي لِأَحْسَنِ الْأَخْلَاقِ لَا يَهْدِي لِأَحْسَنِهَا إِلَّا أَنْتَ ‘‘হে আল্লাহ! আমাকে চরিত্র সুন্দর করার পথ দেখাও, চরিত্র সুন্দর করার পথ তুমি ছাড়া আর কেউই দেখাতে পারে না।’’
হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযালী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ المراء হলো মানুষের কথা এড়িয়ে চলা, এতে প্রকাশ্যে ত্রুটি থাক বা আভ্যন্তরীণ ত্রুটি থাক, শাব্দিক ত্রুটি থাক বা আত্মিক ত্রুটি থাক অথবা বক্তার ইচ্ছাগত ত্রুটিই থাক না কেন। তুমি যে কথাই শুনবে তা হয় হক হবে আর না হয় নাহক বা বাতিল। যদি হক হয় তাহলে তুমি তার সত্যায়ন কর আর যদি বাতিল হয় আর সেটা যদি দীন সংক্রান্ত না হয় তাহলে তা থেকে তুমি নিরবতা অবলম্বন কর। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৯৯৩)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৩২-[২১] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা কি জানো, মানুষকে কোন্ জিনিস সবচেয়ে বেশি জান্নাতের প্রবেশ করাবে? সেটা হলো, আল্লাহভীতি ও উত্তম চরিত্র। তোমরা কি জানো, মানুষকে কোন্ জিনিস সবচেয়ে বেশি জাহান্নামে প্রবেশ করাবে? সেটা হলো, দু’টো গহ্বর; একটি মুখ, অপরটি জননেন্দ্রিয়। (তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ)[1]
وعنن أَبِي
هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَتُدْرُونَ مَا أَكْثَرُ مَا يُدْخِلُ النَّاسَ الْجَنَّةَ؟ تَقْوَى اللَّهِ وَحُسْنُ الْخُلُقِ. أَتُدْرُونَ مَا أَكْثَرُ مَا يُدْخِلُ النَّاسَ النَّارَ؟ الْأَجْوَفَانِ: الْفَمُ وَالْفَرْجُ رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ
ব্যাখ্যাঃ কোন্ জিনিস মানুষকে অধিক হারে জান্নাতে প্রবেশ করাবে? এর অর্থ হলো কোন্ বৈশিষ্ট্যগুলো মানুষকে সফলকামী মানুষের সাথে জান্নাতের অধিকারী করবে? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই তার উত্তর দেন। জান্নাতে প্রবেশের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো : আল্লাহভীতি। আল্লাহভীতির ন্যূনতম পন্থা হলো উত্তম চিন্তা। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো উত্তম চরিত্র বা উত্তম আচরণ। প্রতিটি সৃষ্টিজীবের সাথে উত্তম আচরণ করা। সৎ চরিত্র এবং উত্তম আচরণের ন্যূনতম পন্থা হলো তাদের কষ্ট দান থেকে বিরত থাকা, আর সর্বোচ্চ পর্যায় হলো যে কষ্ট দেয় তার সাথে ভালো আচরণ করা এবং তার প্রতি ইহসান করা।
এখানে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রশ্নাকারে কথা উপস্থাপনা করার উদ্দেশ্য হলো এ কথার প্রভাব যেন ভালোভাবে মানুষের হৃদয়ে বসে যায়।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুরূপভাবেই প্রশ্নাকারে উত্থাপন করেছেন যে, কোন বস্তু মানুষকে অধিকহারে জাহান্নামে প্রবেশ করাবে। এখানেও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই তার উত্তরে বলে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দু’টি গহ্বর অর্থাৎ মানব দেহের দু‘টি গহবর যা মানুষকে অধিকারে জাহান্নামে প্রবেশ করাবে।
মানবদেহের এ গহ্বর দু’টি হলো মুখ এবং যৌনাঙ্গ। কেননা মানুষ অধিকাংশ সময় এ দু’টির কারণে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর নাফরমানীতে লিপ্ত হয়ে থাকে এবং তার পরিণামে সে জাহান্নামের অধিকারী হয়ে যায়।
‘আল্লামা ত্বীবী (تَقْوَى اللهِ) ‘আল্লাহভীতি’ এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেনঃ এ বাক্যটি আল্লাহর আদেশ পালনের মাধ্যমে এবং নিষিদ্ধ বস্তুসমূহ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে উত্তম মুআমলাহর দিকে ইশারা করছে। অনুরূপ (حُسْنُ الْخُلُقِ) ‘হুসনু খুলুক’ দ্বারা সকল সৃষ্টিজীবের প্রতি উত্তম আচরণের দিকে ইশারা করছে। এ দু’টি উত্তম বৈশিষ্ট্যই মানুষকে জান্নাতের অধিকারী করে থাকে। এর বিপরীতে জাহান্নাম। আল্লাহ তা‘আলা মুখ এবং যৌনাঙ্গকে তার মোকাবেলায় তৈরি করেছেন। জিহ্বাকে মুখের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। শারী‘আতের সকল নির্দেশিত কাজে তার হিফাযাত যেমন জরুরী তেমনি সকল হালাল খাদ্য খাওয়াও তাকওয়ার শীর্ষস্তর।
অনুরূপ যৌনাঙ্গের হিফাযাতও দ্বীনের সবচেয়ে বড় মর্যাদাপূর্ণ একটি স্তর। আল্লাহ মু’মিনদের নিদর্শন ও গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ ‘‘আর যারা তাদের যৌনাঙ্গের হিফাযাতকারী’’- (সূরাহ্ আল মু’মিন ৪০ : ০৫)। শাহ্ওয়াত বা প্রবৃত্তির তাড়নার প্রাধান্যকালে যিনার সকল উপকরণ ও সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নিজেকে বিরত রাখা সিদ্দীক্বীনদের দরজায় পৌঁছার শামিল। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ২০০৪)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৩৩-[২২] বিলাল ইবনু হারিস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মানুষ মুখ দিয়ে ভালো কথা বলে; কিন্তু সে এর মর্যাদা জানে না। আল্লাহ তা’আলা তার জন্য তাঁর সন্তুষ্টি লিপিবদ্ধ করেন, যাবৎ না সে আল্লাহ তা’আলার সাথে সাক্ষাৎ করে। অপরদিকে মানুষ মুখ দিয়ে মন্দ কথা বলে; কিন্তু সে জানে না তার পরিণাম কী। আল্লাহ তা’আলা এ কারণে তার ওপর নিজের ক্রোধ ও অসন্তুষ্টি লিপিবদ্ধ করতে থাকেন, যতক্ষণ না সে আল্লাহ তা’আলার সাথে সাক্ষাৎ করে। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
ইমাম মালিক, তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ (রহিমাহুল্লাহ) অনুরূপ অর্থে বর্ণনা করেছেন।
وَعَن بلالِ
بن الحارثِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ الرَّجُلَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنَ الْخَيْرِ مَا يَعْلَمُ مَبْلَغَهَا يَكْتُبُ اللَّهُ لَهُ بِهَا رِضْوَانَهُ إِلَى يَوْمِ يَلْقَاهُ. وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنَ الشَّرِّ مَا يَعْلَمُ مَبْلَغَهَا يَكْتُبُ اللَّهُ بِهَا عَلَيْهِ سَخَطَهُ إِلَى يَوْمِ يَلْقَاهُ» . رَوَاهُ فِي شَرْحِ السُّنَّةِ
وَرَوَى مَالِكٌ وَالتِّرْمِذِيُّ وَابْن مَاجَه نَحوه
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীসের ব্যাখ্যা অনেকাংশে ৪৮১৩ নং হাদীসের ব্যাখ্যানুরূপ। মানুষ অনেক সময় মুখে এমন কথা উচ্চারণ করে যা খুবই কল্যাণকর কথা এবং আল্লাহর কাছে অতীব পছন্দনীয় বাক্য। কিন্তু সে জানে না আল্লাহ তার ঐ কথার কি মূল্য ও মর্যাদা। উচ্চারণকারী তাকে ক্ষীণ বা ছোট করেই দেখেছে, কিন্তু আল্লাহর নিকট ঐ কথার সাওয়াব তার জন্য দীর্ঘায়িত করে দেন এবং আল্লাহর সাথে তার সাক্ষাত পর্যন্ত স্বীয় সন্তষ্টি তার জন্য অবধারিত করে নেন।
পক্ষান্তরে আল্লাহর অতীব অপছন্দনীয় এবং অসন্তুষ্টির কিছু কথা রয়েছে, যা তার বান্দা উচ্চারণ করে থাকে। উচ্চারণকারী সে নিজেও জানে না যে ঐ কথা আল্লাহর কত অপ্রিয় এবং অনিষ্টকর, ফলে কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহ তার ওপর অসন্তুষ্টির সিদ্ধান্ত লিখে নেন।
আল্লাহর সাথে সাক্ষাত পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলা তার প্রতি সন্তষ্টি লিখে নেন, এর অর্থ হলো আল্লাহ তা‘আলা তাকে নেক কাজের তাওফীক দান করেন, আর কল্যাণকর কাজে তিনি অগ্রণী হয়ে যান, ফলে তিনি জীবদ্দশায় প্রশংসনীয় জীবন পান এবং মৃত্যুর পর বারযাখী জীবনে কবরের ‘আযাব থেকে নিষ্কৃতি লাভ করে থাকেন। তার কবর হয়ে যায় প্রশস্ত এবং আরামদায়ক। তাকে বলা হয় তুমি নব দুলহার ন্যায় ঘুমাও, যাকে পরিবারের সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি ছাড়া কেউ জাগাতে সাহস করে না। কিয়ামতের দিন সে নেককার সৌভাগ্যশীলদের সাথে উঠবে ফলে আল্লাহ তাকে তার ছায়ায় আশ্রয় দান করবেন। এরপর তাকে চিরস্থায়ী নি‘আমাতের ঘর জান্নাতে স্থান দিবেন, অতঃপর মহান আল্লাহর দীদারে তাকে ধন্য করবেন। এর বিপরীতটাও অনুরূপ, অর্থাৎ খারাপ কথার খারাপ প্রতিদান সে পাবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৩১৯)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৩৪-[২৩] বাহয ইবনু হাকীম (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর পিতার মাধ্যমে তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন, তিনি (দাদা) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ধ্বংস তাদের জন্য, যারা কথা বলে আর জনতাকে হাসানোর জন্য মিথ্যা বলে। তার ওপর ধ্বংস, তার ওপর ধ্বংস। (আহমাদ, তিরমিযী, আবূ দাঊদ ও দারিমী)[1]
وَعَنْ بَهْزِ
بْنِ حَكِيمٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جده قا ل: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «وَيْلٌ لِمَنْ يُحَدِّثُ فَيَكْذِبُ لِيُضْحِكَ بِهِ الْقَوْمَ وَيْلٌ لَهُ وَيْلٌ لَهُ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُد والدارمي
ব্যাখ্যাঃ আরবীতে (وَيْلٌ) শব্দের অর্থ হলো هَلَاكٌ عَظِيمٌ মহাধ্বংস অথবা (وَيْلٌ) হলো وَادٍ عَمِيقٌ فِي جَهَنَّمَ জাহান্নামের ভিতরের গভীর একটি গর্ত।
মিথ্যা বলা সর্বাস্থায় নিষিদ্ধ, তা হাস্য রসিকতারচ্ছলে হলেও নিষিদ্ধ এবং পাপ। কেউ কাউকে হাসানোর জন্য মিথ্যা কথা বললেও তার পরিণতি কি? তাই অত্র হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। অবশ্য কথা সত্য হলে তা দ্বারা মানুষ হাসানো এই নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত নয় এবং সে এ ধ্বংসের অন্তর্ভুক্ত হবে না। যেমন আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন সময় তার স্ত্রীদের কারো ওপর রাগ করলে ‘উমার (রাঃ) তখন কোন হাসানো (সত্য কথা) বলে তাকে হাসাতেন। এ অবস্থা ঘটনাক্রমে হলে অথবা কখনো কখনো হলে তবে তা নিষিদ্ধ নয় কিন্তু হাস্যরসিকতা কেউ যদি পেশা বানিয়ে নেয় এবং সর্বদাই এতে লিপ্ত থাকে তাহলে তার জন্য হাদীসে বর্ণিত ধ্বংস অবধারিত।
(وَيْلٌ) শব্দটি একাধিকবার উল্লেখ করা হয়েছে তাকীদ হিসেবে অথবা প্রথমটি বারযাখ বা কবরের জীবনে, দ্বিতীয়টি হাশরে এবং তৃতীয়টি জাহান্নামে।
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৩১৫; ‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৯৮২)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৩৫-[২৪] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বান্দা একটি কথা বলে এজন্য যে, সে এটা দ্বারা লোক হাসাবে। সে এ কথার দরুন জাহান্নামের মধ্যে এত দূরে নিক্ষিপ্ত হবে যা আকাশমণ্ডলী ও জমিনের দূরত্বের সমান। বান্দার পা পিছলানোর তুলনায় মুখ পিছলানো ভয়ানক ক্ষতিকর। (বায়হাক্বী’র ’’শু’আবুল ঈমানে’’ বর্ণনা করেছেন।)[1]
وَعَنْ أَبِي
هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ الْعَبْدَ لَيَقُولُ الْكَلِمَةَ لَا يَقُولُهَا إِلَّا لِيُضْحِكَ بِهِ النَّاسَ يَهْوِي بِهَا أَبْعَدَ مَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَإِنَّهُ لَيَزِلُّ عَنْ لِسَانِهِ أَشَدَّ مِمَّا يَزِلُّ عَنْ قَدَمِهِ» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي شُعَبِ الْإِيمَانِ
(لم تتمّ دراسته)
ব্যাখ্যাঃ ‘‘বান্দা একটি কথা বলে’’ এ বাক্যে ‘কথা’ বলতে মিথ্যা কথা উদ্দেশ্য, অর্থাৎ মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা অথবা অশ্লীল কিংবা অনর্থক কথা বলে থাকে। এ কারণে সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে এবং সে জাহান্নামের এত গভীর পতিত হবে যে, তার গভীরতা আকাশ পাতালের দূরত্বের সমান হবে। কেউ কেউ বলেছেন, এর অর্থ হলো ঐ মিথ্যা অথবা অনর্থক অশ্লীল হাসানো কথার কারণে সে আল্লাহর রহমত ও কল্যাণ থেকে আকাশমণ্ডলী এবং জমিনের দূরত্ব সমান দূরে সরে পড়বে।
মিথ্যা কথা বলা অথবা অন্য কোন গীবত পরনিন্দা ইত্যাদির ক্ষতি দৈহিক ক্ষতির চেয়ে অধিক ভয়ানক। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; জামি‘উস সগীর হাঃ ২০৬১)
কবি বলেন, ‘‘তীর দ্বারা আঘাতের ক্ষত এক সময় শুকে যায় কিন্তু জিহ্বার ক্ষত কখনো শুকায় না।’’
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৩৬-[২৫] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি নিশ্চুপ রইল, সে মুক্তি পেলো। (আহমাদ, তিরমিযী, দারিমী ও বায়হাক্বী’র ’’শু’আবুল ঈমানে’’ বর্ণনা করেছেন)[1]
وَعَنْ عَبْدِ
اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «من صَمَتَ نَجَا» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَالدَّارِمِيُّ وَالْبَيْهَقِيُّ فِي شعب الْإِيمَان
ব্যাখ্যাঃ ‘‘যে বিরত থাকলো সে মুক্তি পেল’’ এর অর্থ হলো, যে অশ্লীল ও মিথ্যা কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকলো সে তার পাপ ও শাস্তি থেকে মুক্তি পেল।
ইমাম রাগিব ইস্পাহানী (রহিমাহুল্লাহ) [শব্দ বিজ্ঞানী] বলেনঃ الصَّمْتُ ‘চুপ থাকা’ শব্দটি السُّكُوتِ ‘চুপ থাকা’ বা নীরব থাকা শব্দ হতে অধিক পূর্ণতা প্রকাশকারী শব্দ। কেননা الصَّمْتُ শব্দটি বাকশক্তিসম্পন্ন সত্তা এবং বাকশক্তিহীন সত্ত্বা উভয়ের ক্ষেত্রেই ব্যবহার হয়ে থাকে, পক্ষান্তরে السُّكُوتِ শব্দটি কেবলমাত্র বাকশক্তি সম্পন্ন সত্তার ক্ষেত্রেই ব্যবহার হয়ে থাকে।
ইমাম গাযালী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ কথাটি مِنْ فَصْلِ الْخِطَابِ وَجَوَامِعِ الْكَلِمِ وَجَوَاهِرِ الْحِكَمِ এর অন্তর্ভুক্ত, কোন ব্যক্তিই এর অর্থ করে শেষ করতে পারবে না। বহুবিধ অর্থ সমৃদ্ধ বাক্যটির অর্থ অনুসন্ধানে সর্বকালের ‘আলিমগণই শ্রম সাধনা ব্যয় করে চলছেন।
মানুষের জিহ্বার স্খলনজনিত বিপদ অত্যন্ত বড় এবং তার অনিষ্টতা খুব বেশী। কেননা মিথ্যা, গীবত, অপবাদ, অশ্লীল কথা ইত্যাদি মুখ থেকে অবলীলাক্রমে অনায়াসেই বেড়িয়ে পড়ে এবং অন্তরও এতে অগ্রণী হয়, না এগুলোতে কোন বেগ পোহাতে হয় না। আর অন্তর তার একটি মিষ্টতাও অনুভব করে থাকে, অপরদিকে প্রবৃত্তি এবং শয়তানের সহযোগিতা থাকে পুরোদমে। সুতরাং কথা বলাই ঝুঁকিপূর্ণ এবং চুপ থাকাই নিরাপদ।
মানুষের প্রতিটি কথাই রেকর্ড করা হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ
‘‘মানুষ যে কোন কথাই বলুক না কেন, তা লিপিবদ্ধ করার জন্যে তৎপর প্রহরী (ফেরেশতা) তার নিকটই রয়েছে।’’ (সূরাহ্ কাফ ৫০ : ১৮)
এ আয়াত দ্বারা চুপ থাকার নির্দেশ পাওয়া যায়। মানুষের কথা চার প্রকার, তন্মধ্যে এক প্রকার কথায় শুধু ক্ষতিই বিদ্যমান। দ্বিতীয় এক প্রকারের মধ্যে রয়েছে উপকার, তৃতীয় প্রকার লাভ ক্ষতি মিলে আর চতুর্থ প্রকার যার মধ্যে কোন লাভও নেই কোন ক্ষতিও নেই। যে কথায় শুধু ক্ষতিই তা থেকে নীরব থাক আবশ্যক। অনুরূপ লাভন্ডক্ষতি উভয়টি যেখানে বিদ্যমান, সে কথা থেকেও নীরব থাকা আবশ্যক। আর যে কথায় কোন লাভন্ডক্ষতি কিছুই নেই, নিঃসন্দেহে তা অহেতুক বা বেহুদা কথা, তা বলা সময় অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়, সুতরাং তাও ক্ষতিকর। চতুর্থ আরেকটি প্রকার যাতেও রয়েছে ক্ষতির আশংকা। অতএব চুপ থাকা নিঃসন্দেহে নিরাপদ ও বাঁচার পথ।
মানুষের জিহ্বার অনিষ্টতা সীমাহীন, নিরবতাই তা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ।
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৫০১)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৩৭-[২৬] ’উকবাহ্ ইবনু ’আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সাক্ষাৎ করে জিজ্ঞেস করলামঃ (হে আল্লাহর রসূল!) মুক্তির উপায় কি? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তুমি নিজের জিহ্বাকে আয়ত্তে রাখো, নিজের ঘরে পড়ে থাকো এবং নিজের পাপের জন্য ক্রন্দন করো। (আহমাদ ও তিরমিযী)[1]
وَعَن عُقْبةَ
بن عامرٍ قَالَ: لَقِيتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقُلْتُ: مَا النَّجَاةُ؟ فَقَالَ: «أَمْلِكْ عَلَيْكَ لِسَانَكَ وَلْيَسَعْكَ بَيْتُكَ وَابْكِ عَلَى خَطِيئَتِكَ» . رَوَاهُ أَحْمد وَالتِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ ‘‘লোকটি প্রশ্ন করেছিল, মুক্তি কিসে বা মুক্তির উপায় কি?’’ অর্থাৎ কোন কাজ করলে আল্লাহর ‘আযাব এবং অসন্তুষ্টি থেকে মুক্তির পাওয়া যাবে? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তোমার জন্য যে কথায় কোন কল্যাণ নেই সে কথা থেকে বিরত থাক। তোমার জিহ্বার উপর তোমার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা কর।’
‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জওয়াবটি ছিল একটি বিজ্ঞচিত রীতিতে। লোকটি প্রশ্ন করেছিল মুক্তির হাকীকাত সম্পর্কে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে মুক্তির কারণ বলে দিলেন। কেননা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এটাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আরো বললেন, তোমার ঘরকে তোমার জন্য প্রশস্ত কর। এর অর্থ হলো তুমি তোমার ঘরেই অবস্থান কর। প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হয়ো না এবং সর্বদা ঘরে অবস্থানে বিরক্ত হয়ো না, বরং এটাকে নিজের জন্য গনীমাত মনে কর। কেননা সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক নানা অনিষ্টতা এবং ফিৎনাহ্ থেকে মুক্তি বা বেঁচে থাকার এটাই প্রকৃষ্ট পন্থা। বলা হয়ে থাকে ‘‘নীরব থাকার জন্য ঘরের প্রকোষ্ঠে অবস্থান আবশ্যক।’’
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকটিকে অতীতের গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে কান্না-কাটি করে ক্ষমা প্রার্থনার পরামর্শ দিলেন। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ‘কান্না’ শব্দের মধ্যে রয়েছে লজ্জিত হওয়া এবং অনুশোচনা প্রকাশ করা। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৪০৬)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৩৮-[২৭] আবূ সাঈদ (রাঃ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উক্তি বলে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আদম সন্তান সকালে ঘুম থেকে উঠলে, তার সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জিহ্বার কাছে অনুনয়-বিনয় করে বলে, আমাদের ব্যাপারে তুমি আল্লাহকে ভয় করো। কেননা আমরা তোমার সাথে জড়িত। তুমি ঠিক থাকলে আমরাও ঠিক থাকব, আর তুমি বাঁকা পথ অনুসরণ করলে আমরাও বাঁকা পথ অনুসরণ করব। (তিরমিযী)[1]
وَعَن أبي
سعيدٍ رَفَعَهُ قَالَ: إِذَا أَصْبَحَ ابْنُ آدَمَ فَإِنَّ الْأَعْضَاءَكُلَّهَا تُكَفِّرُ اللِّسَانَ فَتَقُولُ: اتَّقِ اللَّهَ فِينَا فَإنَّا نَحْنُ بِكَ فَإِنِ اسْتَقَمْتَ اسْتَقَمْنَا وَإِنِ اعْوَجَجْتَ اعوَججْنا . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ সকাল বা প্রভাতকাল হলো সফলতার দরজার চাবি। মানুষের জিহ্বার (ভাষার) আপদ হলো সমাজের সাথে মেলামেশা, লেনদেন সংক্রান্ত কথাবার্তা, আর এই কার্যক্রম শুরু হয় সকাল তথা প্রভাতকাল থেকেই কাজের মধ্যে ইচ্ছা-অনিচ্ছা নানাভাবেই তা থেকে অনুষ্ঠিত হয় মিথ্যা, প্রতারণা, গীবত, অশ্লীল কথা-বার্তা ইত্যাদি। যা তাকে প্রকৃত মুত্তাক্বী হওয়াতে বাধা প্রদান করে থাকে।
মানুষের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিনয়ের সাথে অনুগত হয়ে জিহ্বার কাছে জিজ্ঞেস করে (বলে), ওহে জিহ্বা! আমাদের হক বিষয়ে তুমি আল্লাহকে ভয় কর, আমরা তো তোমার অনুগত-অনুগামী এবং তোমার সাথে সংশ্লিষ্ট। তুমি যদি সঠিক পথে চল তাহলে আমরা সঠিক পথে চলতে পারব, আর তুমি যদি হাকের উপর অটল-অবিচল থাকতে না পার এবং বক্রপথে চল তাহলে আমরাও হাকের উপর থাকতে সক্ষম হব না বরং বক্র পথে পরিচালিত হব।
অত্র হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, মানুষের মুখ নিয়ন্ত্রণ থাকলেই সকল পাপ থেকে বাঁচা যায়। কিন্তু অন্য আরেকটি প্রসিদ্ধ হাদীসে রয়েছে, ‘মানব দেহে’ একটি গোশত টুকরা আছে যদি সেটি ভালো থাকে তাহলে সারা দেহই ভালো থাকে আর যদি সেটি নষ্ট হয়ে যায় তাহলে সারা দেহই নষ্ট হয়ে যায়, সেটি হলো কাল্ব (অন্তর)।’
এ দুই হাদীসের বাহ্যিক বিরোধের প্রেক্ষিতে ‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ জিহ্বা হলো কাল্ব বা অন্তরের মুখপত্র এবং বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রতিনিধি।
অর্থাৎ মানুষের কাল্বই তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ভালো-মন্দের মূল উৎস। জিহ্বা বা ভাষা হলো তার ঘোষক বা প্রকাশক মাত্র। তার দিকে এ সম্পর্ক রূপকার্থে করা হয়েছে।
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৪০৭)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৩৯-[২৮] ’আলী ইবনু হুসায়ন (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্য এই যে, সে অনর্থক কথা ও কাজ পরিত্যাগ করবে। (মালিক ও আহমাদ)[1]
وَعَنْ
عَلِيِّ بْنِ الْحُسَيْنِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ» . رَوَاهُ مَالك وَأحمد
ব্যাখ্যাঃ একজন মুসলিমের ঈমান এবং ইসলামের পরিপূর্ণ সৌন্দর্যের সামগ্রিক রূপ হলো- সকল প্রকার অনর্থক অহেতুক কথাবার্তা এবং কর্ম বর্জন করা। সে আল্লাহর সকল নির্দেশের কাছে আত্মসমর্পণ করবে এবং তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। অনুরূপ সে সকল নিষেধাজ্ঞা থেকে সর্বদার জন্য দূরে থাকবে। হাদীসে উল্লেখিত تَرْكُهٗ مَا لَا يَعْنِيهِ এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ‘আল্লামা গাযালী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ যেক্ষেত্রে তুমি নীরব থাকলে তোমার জীবন এবং সম্পদের কোন ক্ষতি হয় না, সেগুলোও বর্জন করে চলা। যেমন তুমি কোন বৈঠকে তোমার কোন সফরের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে তোমার দেখা নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, খানা-পিনা এবং দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিদ্বানদের নানা ঘটনা প্রবাহ বর্ণনা করছ। তুমি যখন এগুলো বর্ণনা করবে তখন তাতে থাকবে অতিরঞ্জন, বাড়াবাড়ী, গীবত-নিন্দা ইত্যাদি।
সর্বোপরি ঐ সময়টুকু তুমি তো আল্লাহর জিকর থেকে বিরত থাকলে, যা ছিল তোমার জন্য কল্যাণকর।
হাদীসে উল্লেখ আছে, জান্নাতীগণ দুনিয়ায় আল্লাহর জিকরবিহীন যে সময় কাটিয়েছে তার জন্য যেরূপ আফসোস করবে এরূপ আফসোস আর অন্য কিছুর জন্যই করবে না। সুতরাং কোন কথা না বলে চুপ থাকাই নিরাপদ। এটা ঈমানের হিফাযাত এবং তাকওয়া। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৩১৭)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৪০-[২৯] ইমাম ইবনু মাজাহ (রহিমাহুল্লাহ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন।
وَرَوَاهُ
ابْن مَاجَه عَن أبي هُرَيْرَة
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৪১-[৩০] আর তিরমিযী ও ’বায়হাক্বী’র শু’আবুল ঈমানে ’আলী (রাঃ) ও আবূ হুরায়রা (রাঃ) উভয় হতে বর্ণনা করেন। (মালিক ও আহমাদ)
وَالتِّرْمِذِيّ
وَالْبَيْهَقِيّ فِي «شعب الْإِيمَان» عَنْهُمَا
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৪২-[৩১] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) এর মধ্য থেকে একজন ইন্তিকাল করেন। তখন জনৈক ব্যক্তি বলল : ’’তুমি জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো’’। এটা শুনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি এ কথা বলছ, অথচ তুমি প্রকৃত ঘটনা জানো না। এমনও হতে পারে যে, সে (মৃত ব্যক্তি) নিরর্থক কথাবার্তা বলেছে অথবা এমন বিষয়ে কার্পণ্য করেছে, যাতে তাঁর কিছু কমে যেত না। (তিরমিযী)[1]
وَعَن أنسٍ
قَالَ: تُوُفِّيَ رَجُلٌ مِنَ الصَّحَابَةِ. فَقَالَ رَجُلٌ: أَبْشِرْ بِالْجَنَّةِ. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أوَ لَا تَدْرِي فَلَعَلَّهُ تَكَلَّمَ فِيمَا لَا يَعْنِيهِ أَوْ بخل بِمَا لَا ينقصهُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ (تُوُفِّىَ رَجُلٌ مِنَ الصَّحَابَةِ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীদের মধ্য থেকে জনৈক ব্যক্তি মারা গেলেন। (فَقَالَ رَجُلٌ) তখন এক ব্যক্তি মৃত ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে বললেন। (أَبْشِرْ بِالْجَنَّةِ) তুমি জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ কর। এ মর্মে আল্লাহ বলেনঃ وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنْتُمْ تُوعَدُونَ ‘‘...তোমরা ঐ জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ কর যার প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেয়া হয়েছিল’’- (সূরাহ্ ফুস্সিলাত ৪১ : ৩০)।
(তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৩১৬)
(فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أوَ لَا تَدْرِي) ‘‘তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি তাকে সুসংবাদ দিচ্ছ কিন্তু তুমি জান না অথবা তুমি এ বিষয়ে কি বলছ তা জান না।’’ এ কথা বলার অর্থ হচ্ছে : তুমি কিভাবে তা জানতে পারলে? অথবা তুমি কিভাবে তা জানলে যা অন্য কেউ জানে না? (فَلَعَلَّهٗ تَكَلَّمَ فِيمَا لَا يَعْنِيهِ) সম্ভবত সে অনর্থক কথা বলেছে, যা তার উপকারে আসবে না, বরং ক্ষতি করবে।
(أَوْ بَخِلَ بِمَا لَا يَنْقُصُه) অথবা সে আর্থিক ‘ইবাদাতের ক্ষেত্রে যা ব্যয় করার দরকার ছিল তাতে কৃপণতা করেছে অথবা ‘ইলমী মাসআলার ক্ষেত্রে অথবা নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস ধার কর্জ দেয়ার ক্ষেত্রে কৃপণতা করেছে যা করা তার জন্য উচিত ছিল না। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৪৩-[৩২] সুফ্ইয়ান ইবনু ’আবদুল্লাহ আস্ সাকাফী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রসূল! যে জিনিসগুলো আপনি আমার জন্য ভয়ের বস্তু বলে মনে করেন, তন্মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর কোন্ জিনিসটি? রাবী বলেন, এ কথা শুনে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজের জিহবা ধরে বললেনঃ ’’এটা’’! [তিরমিযী; আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) হাদীসটি সহীহ বলে উল্লেখ করেছেন।][1]
وَعَن
سُفْيَان بن عبد الله الثَّقَفِيّ قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا أَخْوَفُ مَا تَخَافُ عَلَيَّ؟ قَالَ: فَأَخَذَ بِلِسَانِ نَفْسِهِ وَقَالَ: «هَذَا» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَصَححهُ
ব্যাখ্যাঃ (مَا أَخْوَفُ مَا تَخَافُ عَلَيَّ؟) ‘‘আপনি কোন্ বিষয়ে আমার ওপর সবচেয়ে বেশি আশঙ্কা করেন?’’ সুফ্ইয়ান বলেনঃ তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জিহ্বা ধরে বললেন, এটা। অর্থাৎ এটা তোমার জন্য আমি বেশী আশঙ্কা করি। কারণ এ অঙ্গটাই শরীরের সবচেয়ে বেশী কাজ সংঘটিত করে তথা পাপ-পুণ্য সকল ক্ষেত্রেই তার অবদান রয়েছে। যে তার জিহ্বার লাগাম টেনে না ধরে ঢিল দিয়ে রাখে তখন শয়তান তাকে নিয়ে সকল ক্ষেত্রে বিচরণ করে এবং তাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়। আর এর অনিষ্টতা থেকে সেই রক্ষা পাবে যে শারী‘আতের লাগাম শক্ত করে ধারণ করবে।
মোটকথা জিহ্বার ভালো মন্দ তার কর্মের উপর নির্ভর করে। ঠিক করে কোন একটির উপর বেশী গুরুত্বারোপ করা কঠিন তবে আল্লাহ যার ভালো কাজ করার তাওফীক দেন তার জন্য ভালো কাজ করা সহজ। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৪৪-[৩৩] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন বান্দা মিথ্যা বলে, তখন মালাক (ফেরেশতা) মিথ্যার দুর্গন্ধে এক ক্রোশ দূরে চলে যান। (তিরমিযী)[1]
وَعَنِ ابْنِ
عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا كَذَبَ الْعَبْدُ تَبَاعَدَ عَنْهُ الْمَلَكُ مِيلًا مِنْ نَتْنِ مَا جاءَ بِهِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘আবদুর রহীম ইবনু হারূন আল গস্সানী’’ নামের বর্ণনাকারী খুবই য‘ঈফ। আর ‘আবদুল ‘আযীয ইবনু আবী রও্ওয়াদ (رواد) নামের বর্ণনাকারীও মুনকার, হাদীস বর্ণনাকারী য‘ঈফ। দেখুন- য‘ঈফাহ্ ১৮২৮। আল মু‘জামুল আওসাত্ব ৭৩৯৮, আল মু‘জামুল সগীর ৮৫৩, ‘ত্ববারানী’র আল মু‘জামুল কাবীর ৫৭৮, য‘ঈফুল জামি‘ ৬৮০, য‘ঈফ আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ১৭৫৮।
ব্যাখ্যাঃ (إِذَا كَذَبَ الْعَبْدُ تَبَاعَدَ عَنْهُ الْمَلَكُ) যখন বান্দা মিথ্যা কথা বলে তখন তার সঙ্গে থাকা সংরক্ষণকারী মালাক ১ মাইল দূরে চলে যায়। (مِيلًا) মাইল হলো, এক ফারসাখের তৃতীয়াংশ অথবা জমিনের নির্ধারিত কিছু অংশ অথবা দৃষ্টিসীমা পরিমাণ অংশ।
(مِنْ نَتْنِ مَا جاءَ بِه) সে মিথ্যা নিয়ে এসেছে তার দুর্গন্ধের কারণে। نَتْنِ হলো فوح এর বিপরীত যার অর্থ সুগন্ধির বিপরীত। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৪৫-[৩৪] সুফ্ইয়ান ইবনু উসায়দ আল হাযরামী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেনঃ সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা হলো তুমি তোমার কোন মুসলিম ভাইকে কোন কথা বললে এবং সে ওটাকে সত্য বলে জানল। অথচ প্রকৃতপক্ষ তুমি তার সাথে মিথ্যা বলেছ। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن سُفيان
بن أسدٍ الحضرميِّ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «كَبُرَتْ خِيَانَةً أَنْ تُحَدِّثَ أَخَاكَ حَدِيثًا هُوَ لَكَ بِهِ مُصَدِّقٌ وَأَنْتَ بِهِ كاذبٌ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, ‘‘যবারাহ্ (ضبارة) ইবনু মালিক আল হাযরামী’’ নামের বর্ণনাকারী মাজহূল। আর বাক্বিয়্যাহ্ ইবনু ওয়ালীদ একজন মুদাল্লিস রাবী। সে ‘আন দ্বারা হাদীস বর্ণনা করেছে। বিস্তারিত দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ১২৫১।
ব্যাখ্যাঃ (كَبُرَتْ خِيَانَةً أَنْ تُحَدِّثَ أَخَاكَ) বড় খিয়ানাত বা বিশ্বাসঘাতকতা হলো তুমি তোমার কোন মুসলিম ভাইকে এমন কথা বলবে। (هُوَ لَكَ بِه مُصَدِّقٌ وَأَنْتَ بِه كاذبٌ) যে কথায় সে তোমার প্রতি নির্ভর করবে এবং তোমার কথাকে বিশ্বাস করবে এবং ধারণা করবে, তুমি মুসলিম হিসেবে মিথ্যা বলতে পার না, ফলে সে তোমার কথায় বিশ্বাস করে অথচ তুমি সে বিষয়ে মিথ্যাবাদী। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৪৬-[৩৫] ’আম্মার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি দুনিয়ায় দ্বিমুখী হবে, কিয়ামতের দিন তার মুখে আগুনের জিহ্বা হবে। (দারিমী)[1]
وَعَن عمار
قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ كَانَ ذَا وَجْهَيْنِ فِي الدُّنْيَا كَانَ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لِسَانَانِ مِنْ نَارٍ» . رَوَاهُ الدَّارمِيّ
ব্যাখ্যাঃ (مَنْ كَانَ ذَا وَجْهَيْنِ فِي الدُّنْيَا كَانَ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لِسَانَانِ مِنْ نَارٍ) যারা দুনিয়াতে ফিতনার উদ্দেশে দ্বিমুখী আচরণ করে। একদলের কাছে গিয়ে এক কথা বলে এবং অন্যদলের কাছে গিয়ে অন্য কথা বলে। কিয়ামতের দিন তার আগুনের দু’টি জিহ্বা থাকবে, কেননা সে দুনিয়াতে প্রত্যেক দলের কাছে আলাদা জিহ্বা ব্যবহার করত। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৮৬৫)
মিরক্বাতুল মাফাতীহ গ্রন্থকার বলেনঃ হাদীসটির মর্মার্থ এরূপ, যে নিজেকে কোন ব্যক্তির সামনে তার শুভাকাঙক্ষী এবং ভালোবাসার দাবীদার হবে অথচ তার পশ্চাতে তার দোষ-ত্রুটি বলে বেড়াবে।
অথবা, যার দু’জন শত্রু রয়েছে এবং প্রত্যেকের নিকট বন্ধু সাজে ফলে প্রত্যেকে মনে করে সে তাদের বন্ধু অথচ সে একজনের দোষ অন্যের কাছে গিয়ে লাগায়। কিয়ামতের দিন তার আগুনের দু’টি জিহ্বা হবে।
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ ‘কিতাবুল আদাব’)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৪৭-[৩৬] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একজন পূর্ণ মু’মিন তিরস্কার ও অভিসম্পাতকারী এবং অশ্লীল গালমন্দকারী ও অহঙ্কারী হতে পারে না। (তিরমিযী ও বায়হাক্বী’র ’’শু’আবুল ঈমানে’’ বর্ণনা করেছেন।)[1]
وَعَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَّانِ وَلَا بِاللَّعَّانِ وَلَا الْفَاحِشِ وَلَا الْبَذِيءِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَالْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ» . وَفِي أُخْرَى لَهُ «وَلَا الْفَاحِشِ الْبَذِيءِ» . وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ: هَذَا حَدِيث غَرِيب
ব্যাখ্যাঃ (لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَّانِ) কোন পরিপূর্ণ মু’মিন মানুষের দোষ-ত্রুটি উল্লেখ করে কাউকে আঘাত করতে পারে না। (وَلَا بِاللَّعَّانِ) এবং লা‘নাত বা অভিসম্পাতকারী হতে পারে না। (وَلَا الْفَاحِشِ) এবং অশ্লীলভাষী। (وَلَا الْبَذِيءِ) এবং অহঙ্কারী হতে পারে না। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৪৮-[৩৭] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একজন পরিপূর্ণ মু’মিন অধিক অভিসম্পাতকারী হতে পারে না। অপর এক বর্ণনায় আছে, একজন মু’মিনের পক্ষ খুব অভিসম্পাতকারী হওয়া সমীচীন নয়। (তিরমিযী)[1]
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَكُونُ الْمُؤْمِنُ لعانا» . وَفِي رِوَايَة: «لاينبغي لِلْمُؤمنِ أَن يكون لعانا» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ (لَا يَكُونُ الْمُؤْمِنُ لعانا) কোন মু’মিন তথা পরিপূর্ণ ঈমানদার ব্যক্তি অধিক অভিসম্পাতকারী হতে পারে না যদিও সে কখনো অভিসম্পাত করে থাকে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, কোন ঈমানদার ব্যক্তির অধিক অভিসম্পাতকারী হওয়া উচিত নয়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
তুহফাতুল আহ্ওয়াযী গ্রন্থকার বলেনঃ لعانا অর্থ হচ্ছে অধিক অভিসম্পাতকারী আর লা‘নাত অর্থ হচ্ছে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরে যাওয়ার জন্য দু‘আ করা। শব্দটিকে মুবালাগার শব্দ দ্বারা ব্যবহার করা হয়েছে। কেননা মু’মিন ব্যক্তি কদাচিৎ কাউকে লা‘নাত করে ফেলতে পারে।
(তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ২০১৯)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৪৯-[৩৮] সামুরাহ্ ইবনু জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা একে অপরকে ’’তোমার ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত হোক’’, ’’আল্লাহর গজব হোক’’ বলে অভিশাপ দেবে না এবং জাহান্নামে প্রবেশের বদ্দু’আও করবে না।
অপর এক বর্ণনায় جَهَنَّمَ-এর শব্দের স্থলে اَلنَّارْ (তথা ’জাহান্নাম’ শব্দটি) উল্লেখ রয়েছে। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن سَمُرَةَ بْنِ جُنْدُبٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تَلَاعَنُوا بِلَعْنَةِ اللَّهِ وَلَا بِغَضَبِ اللَّهِ وَلَا بِجَهَنَّمَ» . وَفِي رِوَايَةٍ «وَلَا بِالنَّارِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ (لَا تَلَاعَنُوا بِلَعْنَةِ اللهِ) কেউ যেন কাউকে লা‘নাত বা অভিশাপ না দেয়। নির্দিষ্ট করে কোন মুসলিম ব্যক্তিকে এ কথা না বলে عَلَيْكَ لَعْنَةُ اللهِ তোমার ওপর আল্লাহর লা‘নাত বা অভিশাপ বর্ষিত হোক।
(وَلَا بِغَضَبِ اللهِ) এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে গজবের দু‘আ না করে। যেমন এ কথা বলে غَضِبَ اللهُ عَلَيْكَ তোমার প্রতি আল্লাহর ক্রোধ নেমে আসুক।
(وَلَا بِالنَّارِ) এবং কাউকে জাহান্নামের আগুনের জন্য দু‘আ করবে না। যেমন- এ কথা বলা : أَدْخَلَكَ اللهُ النَّارَ আল্লাহ তোমাকে জাহান্নামে প্রবেশ করান। এ বিধান নির্দিষ্ট করে কোন ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য, কেননা অনির্দিষ্ট করে কোন সম্প্রদায়ের জন্য লা‘নাত জায়িয, যেমন এ কথা বলা যে, لَعْنَةُ اللهِ عَلَى الْكَافِرِينَ ‘‘কাফিরদের ওপর আল্লাহর লা‘নাত’’ অথবা নির্দিষ্ট করে, যেমন- لَعْنَةُ اللهِ عَلَى الْيَهُودِ ইয়াহূদীকে প্রতি আল্লাহর লা‘নাত অথবা কুফরী অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী কোন কাফিরের প্রতি লা‘নাত যেমন- আবূ জাহল। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৮৯৮)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৫০-[৩৯] আবুদ্ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যখন বান্দা কোন বস্তুকে অভিসম্পাত করে, তখন এ অভিসম্পাত আকাশের দিকে উঠে যায়। আর এ অভিসম্পাতের জন্য আকাশের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। অতঃপর ঐ অভিসম্পাত জমিনের দিকে প্রত্যাবর্তন করে। তার জন্য জমিনের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। অতঃপর ডানদিক-বামদিকে যায় এবং যখন সেখানেও কোন রাস্তা না পায়, শেষ পর্যন্ত সে ব্যক্তি বা বস্তুর দিকে প্রত্যাবর্তন করে, যাকে অভিসম্পাত করা হয়েছে। যদি সে অভিসম্পাতের উপযুক্ত হয়, তবে তার ওপর আপতিত হয়। তা না হলে অভিসম্পাতকারীর দিকেই ফিরে আসে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «إِنَّ الْعَبْدَ إِذَا لَعَنَ شَيْئًا صَعِدَتِ اللَّعْنَةُ إِلَى السَّمَاءِ فَتُغْلَقُ أَبْوَابُ السَّمَاءِ دُونَهَا ثُمَّ تَهْبِطُ إِلَى الْأَرْضِ فَتُغْلَقُ أَبْوَابُهَا دُونَهَا ثُمَّ تَأْخُذُ يَمِينًا وَشِمَالًا فَإِذَا لَمْ تَجِدْ مَسَاغًا رَجَعَتْ إِلَى الَّذِي لُعِنَ فَإِنْ كَانَت لِذَلِكَ أَهْلًا وَإِلَّا رَجَعَتْ إِلَى قَائِلِهَا» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ (إِنَّ الْعَبْدَ إِذَا لَعَنَ شَيْئًا صَعِدَتِ اللَّعْنَةُ إِلَى السَّمَاءِ) বান্দা যখন কাউকে লা‘নাত করে তখন উক্ত লা‘নাত শরীরের আকৃতি ধারণ করে ঊর্ধ্বাকাশে আরোহণ করে তখন তার সামনের দিকের আকাশের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। অতঃপর সে নীচের দিকে নেমে আসে, তখন লা‘নাত প্রকাশের স্থান থেকে পৃথিবীর সমস্ত স্তরের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়, ফলে সে আসমান ও জমিনের মাঝখানে ডানে বামে ঘুরতে থাকে। যখন সে যাওয়ার কোন রাস্তা খুঁজে না পায় তখন তার দিকে ফিরে আসে যাকে লা‘নাত করেছিল। যদি সে উক্ত লা‘নাতের উপযুক্ত হয় তাহলে তা তার সাথে যুক্ত হয় এবং বাস্তবায়িত হয়। অন্যথায় তার বক্তার দিকে ফিরে যায়, কেননা সেই তার উপযুক্ত এবং তার অধিকারী। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৫১-[৪০] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তির চাদর বাতাসে উড়ছিল। তখন লোকটি বাতাসকে অভিসম্পাত করল। এটা শুনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ বাতাসকে অভিসম্পাত করো না। কেননা তা তো আদিষ্ট। প্রকৃত ঘটনা এই যে, যে ব্যক্তি কোন বস্তুকে অভিসম্পাত করে, যদি সে বস্তুটি অভিসম্পাতযোগ্য না হয়, তবে তা অভিসম্পাতকারীর দিকেই ফিরে আসে। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن ابنِ عبَّاسٍ أَنَّ رَجُلًا نَازَعَتْهُ الرِّيحُ رِدَاءَهُ فَلَعَنَهَا. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تَلْعَنْهَا فَإِنَّهَا مَأْمُورَةٌ وَأَنَّهُ مَنْ لَعَنَ شَيْئًا لَيْسَ لَهُ بِأَهْلٍ رَجَعَتِ اللَّعْنَةُ عَلَيْهِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ (أَنَّ رَجُلًا نَازَعَتْهُ الرِّيحُ) বাতাস এক ব্যক্তির চাদর উড়িয়ে নিলে সে তাকে লা‘নাত বা অভিশাপ দেয়। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে লক্ষ্য করে বললেনঃ তুমি তাকে লা‘নাত করো না, কেননা সে আদিষ্ট তথা সে যে কোন ব্যাপারে আদিষ্ট, উড়িয়ে নেয়া তার বৈশিষ্ট্য, তার মধ্যে এটা থাকাই স্বাভাবিক। অথবা বান্দাকে যে ব্যাপারে পরীক্ষা করার জন্য সে আদিষ্ট তার মধ্যে উড়ানোও একটি।
(وَأَنَّهٗ مَنْ لَعَنَ شَيْئًا لَيْسَ لَهٗ بِأَهْلٍ) আর যে ব্যক্তি এমন ব্যাপারে লা‘নাত করে যার সে উপযুক্ত নয়, তাহলে লা‘নাতকারীর দিকে উক্ত লা‘নাত ফিরে আসে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৯০০)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৫২-[৪১] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার সাথীদের মধ্যে কেউ আমাকে কোন ব্যক্তির ব্যাপারে কোন খারাপ কথা শুনাবে না। কেননা আমি এটা ভালোবাসি যে, যখন আমি তোমাদের কাছে আসি, তখন আমার বক্ষ পরিষ্কার থাকুক। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنِ ابْنِ
مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يُبَلِّغُنِي أَحَدٌ مِنْ أَصْحَابِي عَنْ أَحَدٍ شَيْئًا فَإِنِّي أُحِبُّ أَنْ أَخْرُجَ إِلَيْكُمْ وَأَنَا سَلِيمُ الصَّدْرِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে যায়দ ইবনু যায়িদ (ذيد بن ذائد) নামের একজন বর্ণনাকারী আছে, সে মাজহূল। দেখুন- হিদায়াতুর্ রুওয়াত ইলা তাখরীজি আহাদীসিল মসাবীহি ওয়াল মিশকাত ৪/৩৮৬ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ (لَا يُبَلِّغُنِي أَحَدٌ مِنْ أَصْحَابِي عَنْ أَحَدٍ شَيْئًا) আমার সঙ্গীদের মধ্য থেকে কেউ যেন অন্যের সম্পর্কে আমার কাছে এমন কিছু না পৌঁছায় যাতে আমি তা অপছন্দ করি এবং তার প্রতি রাগান্বিত হই। এটা কথা ও কাজ উভয় ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যেমন- কেউ কাউকে গালি দিল, তাকে কষ্ট দিল অথবা তার ব্যাপারে মন্দ কথা বল।
(فَإِنِّي أُحِبُّ أَنْ أَخْرُجَ إِلَيْكُمْ وَأَنَا سَلِيمُ الصَّدْرِ) কেননা আমি চাই বাড়ি থেকে বের হয়ে তোমাদের সাথে সাক্ষাৎ করব। এমতাবস্থায় যে, আমার অন্তর তোমাদের কারো দোষ-ত্রুটি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। ইবনু মালিক বলেনঃ হাদীসটির মূলকথা হলো- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কামনা করতেন যে, তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নিবেন আর তার অন্তর সাহাবীদের কারো প্রতি সকল প্রকার অসন্তুষ্টি থেকে মুক্ত থাকবে। আর এটা হবে উম্মাতের জন্য একটি শিক্ষা অথবা মানবতার দাবী। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৫৩-[৪২] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললামঃ সফিয়্যাহ্-এর সম্পর্কে আপনাকে এতটুকু বলাই যথেষ্ট যে, সে এরূপ এরূপ। অর্থাৎ- সে বেঁটে। এতদশ্রবণে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তুমি এমন একটা কথা বললে, যদি এর সাথে সমুদ্রকে মিশিয়ে দেয়া হয়, তবে তা সমুদ্রকে পরিবর্তন করে দেবে। (আহমাদ, তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن عَائِشَة
قَالَتْ: قُلْتُ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: حَسبك صَفِيَّةَ كَذَا وَكَذَا - تَعْنِي قَصِيرَةً - فَقَالَ: «لَقَدْ قُلْتِ كَلِمَةً لَوْ مُزِجَ بِهَا الْبَحْرُ لَمَزَجَتْهُ» . رَوَاهُ أَحْمد وَالتِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ (حَسبك صَفِيَّةَ كَذَا وَكَذَا) ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে লক্ষ্য করে বলেন, সফিয়্যাহ্-এর ব্যাপারে আপনার কাছে এতটুকু বলাই যথেষ্ট যে, সে এমন এমন। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) তার এ কথা দ্বারা বুঝাতে চেয়েছেন যে, তিনি খুব বেঁটে।
মিরকাত ভাষ্যকার বলেনঃ كَذَا এতটুকু বলে তিনি এক বিঘতের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বলেনঃ আমার মতে (كَذَا وَكَذَا) ‘‘এরূপ এরূপ’’ দু’বার বলে দু’টি ভিন্ন ধরনের গুণ বুঝাতে চেয়েছেন। সম্ভবত তিনি মুখ দিয়ে বুঝাতে চেয়েছেন বেঁটে এবং হাতের ইশারায় এক বিঘত দেখিয়ে বুঝিয়েছেন তিনি খুবই বেঁটে। তিনি কথা ও কাজের মাঝে সমন্বয় করে বিষয়টির প্রতি তাকিদ দিয়েছেন। এ ব্যাপারে আল্লাহই ভালো জানেন।
(فَقَالَ: لَقَدْ قُلْتِ كَلِمَةً) অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি এমন একটি বিশাল ও বিষাক্ত কথা বলেছ যদি তার তিক্ততা সমুদ্রের পানির সাথেও মিশানো হতো তাহলে তাকে পরিবর্তন করে দিত।
‘আল্লামা কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এই গীবত এতই বিষাক্ত ছিল যে, সমুদ্রের পানির আধিক্য এবং ঘনত্ব সত্ত্বেও যদি তার সাথে মিশানো হতো তাহলে তাকে পরিবর্তন করে দিত। সুতরাং তোমার ‘আমলের অবস্থা কেমন হবে যার সাথে নাপাকী কথা মিশ্রিত হয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৫৪-[৪৩] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নির্লজ্জতা বা অশ্লীলতা ত্রুটিপূর্ণ করে। আর কোন কিছুকে লজ্জাশীলতা বা শালীনতা সেটাকে সৌন্দর্যমন্ডিত করে তোলে। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ أَنَسٍ
قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا كَانَ الْفُحْشُ فِي شَيْءٍ إِلَّا شَانَهُ وَمَا كَانَ الْحَيَاءُ فِي شيءٍ إِلا زانَهُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ (مَا كَانَ الْفُحْشُ فِي شَيْءٍ إِلَّا شَانَهٗ) কোন ব্যাপারে অশ্লীল কথার মাত্রা বেশী হলে তা তাকে দোষণীয় করে তোলে। অথবা এখানে الْفُحْشُ (অশ্লীল) দ্বারা কঠোরতা উদ্দেশ্য। যেমন অন্য বর্ণনায় এসেছে, مَا كَانَ الرِّفْقُ فِي شَيْءٍ إِلَّا زَانَهٗ وَلَا نُزِعَ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا شَانَهٗ কোন কিছুতে কোমলতা তার সৌন্দর্যতাকে বৃদ্ধি করে এবং কোন কিছু তা উঠিয়ে নিলে তাকে দোষণীয় করে।
(وَمَا كَانَ الْحَيَاءُ فِي شيءٍ إِلا زانَهٗ) এবং কোন কিছুতে লজ্জাশীলতা তার সৌন্দর্যতাকে বৃদ্ধি করে। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হাদীসের বাণীفِي شيءٍ কোন কিছুর বলার মধ্যে আধিক্যতা রয়েছে। অর্থাৎ যদি অশ্লীলতা অথবা লজ্জাশীলতা কোন জড় পদার্থের থাকে তাহলে সৌন্দর্যমন্ডিত অথবা দোষণীয় করে তোলে। তাহলে উক্ত গুণ দু’টি মানুষের ক্ষেত্রে হলে কেমন হবে? (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৯৭৪)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৫৫-[৪৪] খালিদ ইবনু মা’দান (রহিমাহুল্লাহ) মু’আয (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি তার কোন মুসলিম ভাইকে লজ্জা দেয়, সে লজ্জাদাতা ঐ অপরাধ না করা পর্যন্ত মরবে না। রাবী বলেন, অর্থাৎ- যে অপরাধ হতে সে প্রত্যাবর্তন করেছে। (তিরমিযী)[1]
وَعَن خالدِ
بن معدانَ عَنْ مُعَاذٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ عَيَّرَ أَخَاهُ بِذَنْبٍ لَمْ يَمُتْ حَتَّى يَعْمَلَهُ» يَعْنِي مِنْ ذَنْبٍ قَدْ تَابَ مِنْهُ -. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ وَلَيْسَ إِسْنَادُهُ بِمُتَّصِلٍ لِأَنَّ خَالِدًا لَمْ يُدْرِكْ معَاذ بن جبل
হাদীসটি মাওযূ‘ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান ইবনু আবী ইয়াযীদ আল হামদানী’’ নামের বর্ণনাকারী মিথ্যুক। আর খালিদ ইবনু মা‘দান হাদীস বর্ণনা করেছেন মু‘আয ইবনু জাবাল (রাঃ) থেকে, অথবা খালিদ ইবনু মা‘দান রাবী মু‘আয ইবনু জাবাল (রাঃ)-কে দেখেননি। দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ১৭৮।
ব্যাখ্যাঃ (مَنْ عَيَّرَ) যে দোষ বর্ণনা করে, তিরস্কার করে। (أَخَاهُ) তার কোন মুসলিম (দীনী) ভাইয়ের।
(بِذَنْبٍ) অতীতে কৃত পাপের কারণে যা থেকে সে এখন তাওবাহ্ করে নিয়েছে অথবা গালির উদ্দেশে।
(لَمْ يَمُتْ حَتّٰى يَعْمَلَهٗ) সে যে দোষে তার ভাইকে তিরস্কার করেছিল সেই কাজ না করা পর্যন্ত মারা যাবে না।
(يَعْنِي مِنْ ذَنْبٍ قَدْ تَابَ مِنْهُ) অর্থাৎ এমন গুনাহ যা থেকে তার মুসলিম ভাই তাওবাহ্ করেছিল। (সেই গুনাহের কাজটি না করা পর্যন্ত তার মৃত্যু হবে না)। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
এ হাদীসের শিক্ষা হলোঃ শুধু দোষ বর্ণনা করার জন্য কারো গুনাহের কাজ প্রকাশ করে দেয়া খুবই মন্দ কাজ যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ছয়টি কারণ ছাড়া ভালো উদ্দেশ্য সত্ত্বেও অন্যের দোষ বর্ণনা করা বৈধ নয়। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫০৫)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৫৬-[৪৫] ওয়াসিলাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তুমি তোমার কোন মুসলিম ভাইকে বিপদগ্রস্ত দেখে আনন্দ প্রকাশ করো না। হতে পারে আল্লাহ তা’আলা তাকে অনুগ্রহ করবেন, আর তোমাকে অধঃপতিত করে দেবেন। [তিরমিযী; আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান, গরীব।][1]
وَعَن وَاثِلَة
قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «لَا تظهر الشماتة لأخيك فِي وَيَبْتَلِيَكَ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, ‘‘মাকহূল’’ নামের বর্ণনাকারী ওয়াসিলাহ্ ইবনুল আস্ক্ব‘ হতে হাদীস শোনেননি। সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ৫৪২।
ব্যাখ্যাঃ (لَا تظهر الشماتة) শক্রর বিপদে আনন্দ প্রকাশ করো না। (لأخيك) তোমার মুসলিম ভাইয়ের কোন দুনিয়াবী অথবা দীনী বিপদের কারণে অথবা শারীরিক ও আর্থিক বিপদে। فَيَرْحَمَهُ اللهُ তাহলে আল্লাহ তোমার মুখ মলিন করে তাকে অনুগ্রহ করবেন। (وَيَبْتَلِيَكَ) আর তোমাকে পরীক্ষায় ফেলবেন যেহেতু তুমি তার ওপর তোমার প্রশংসা প্রকাশ করলে এবং মর্যাদাকে বাড়ালে। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৫০৬)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৫৭-[৪৬] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি কারো সম্পর্কে গল্প বলা পছন্দ করি না, যদিও আমার জন্য এরূপ এরূপ হয়। (ইমাম তিরমিযী এ হাদীসটিকে সহীহ বলে উল্লেখ করেছেন।)[1]
وَعَن
عَائِشَةَ قَالَتْ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا أُحِبُّ أَنِّي حَكَيْتُ أَحَدًا وَأَنَّ لي كَذَا وَكَذَا» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَصَححهُ
ব্যাখ্যাঃ (مَا أُحِبُّ أَنِّي حَكَيْتُ أَحَدًا) আমি কারো কিছু কাজের বর্ণনা করতে পছন্দ করি না। এ কথার অর্থ হচ্ছে : আমি কারো কথা বা কাজের দোষ-ত্রুটি বর্ণনা করতে পছন্দ করি না। (وَأَنَّ لي كَذَا وَكَذَا) যদিও আমাকে উক্ত কথা বলার জন্য এত এত পরিমাণ কিছু দেয়া হয়।
অথবা حَكَيْتُ এর অর্থ حَاكَيْتُ অর্থাৎ আমি তার অনুরূপ কাজ করেছি। আর এ حَاكَيْتُ শব্দটি মন্দ কাজের বর্ণনার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। তখন হাদীসের অর্থ দাড়াবে। আমি মন্দ কিছু বর্ণনা করা এবং এর বিনিময়ে পৃথিবীর এত এত পরিমাণ একত্র করতে পছন্দ করি না।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ الْمُحَاكَاة তথা অন্যের মন্দ কিছু বর্ণনা করা নিষিদ্ধ গীবতের অন্তর্ভূক্ত। যেমন- কেউ খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটে অথবা মাথা নীচু করে হাঁটে ইত্যাদি অঙ্গ-ভঙ্গিমা প্রদর্শন করা। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৫৮-[৪৭] জুনদুব ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক মরুচারী বেদুঈন এলো, নিজের উটকে বসাল এবং পা বাঁধল। অতঃপর মসজিদে প্রবেশ করে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিছনে সালাত আদায় করল। সালাতের সালাম ফেরানোর পর সে নিজের উটের কাছে এসে সেটার পা খুলল এবং উটটির পিঠে আরোহণ করে সশব্দে এ কথা বলে চলে গেল, (আল্ল-হুম্মার্ হামনী ওয়া মুহাম্মাদান ওয়ালা- তুশরিক ফী রহমতিনা- আহাদা-) ’’হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অনুগ্রহ করো। আমাদের অনুগ্রহে অন্যকে অংশীদার করো না। এটা শুনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমাদের কি ধারণা! এ বেদুঈন লোকটি বেশি মূর্খ, না তার উটটি? তোমরা কি শুননি, লোকটি কি বলল? তাঁরা বললেনঃ জ্বী হ্যাঁ। (আবূ দাঊদ)[1]
আবূ হুরায়রা -এর كَفٰى بِالْمَرْءِ كَذِبًا হাদীসটি (বাবুল ই’তিসা-ম) ’’দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা’’-এর প্রথম অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে।
وَعَن جُنْدُبٍ
قَالَ: جَاءَ أَعْرَابِيٌّ فَأَنَاخَ رَاحِلَتَهُ ثُمَّ عَقَلَهَا ثُمَّ دَخَلَ الْمَسْجِدَ فَصَلَّى خَلْفَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَمَّا سَلَّمَ أَتَى رَاحِلَتَهُ فَأَطْلَقَهَا ثُمَّ رَكِبَ ثُمَّ نَادَى: اللَّهُمَّ ارْحَمْنِي وَمُحَمَّدًا وَلَا تُشْرِكْ فِي رَحْمَتِنَا أَحَدًا. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَتَقُولُونَ هُوَ أَضَلُّ أَمْ بَعِيرُهُ؟ أَلَمْ تَسْمَعُوا إِلَى مَا قَالَ؟» قَالُوا: بَلَى؟ . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
وَذَكَرَ حَدِيثَ أَبِي هُرَيْرَةَ: «كَفَى بِالْمَرْءِ كَذِبًا» فِي «بَاب الِاعْتِصَام» فِي الْفَصْل الأول
ব্যাখ্যাঃ (جَاءَ أَعْرَابِىٌّ فَأَنَاخَ رَاحِلَتَهٗ) ‘আরবের গ্রামাঞ্চল থেকে এক ব্যক্তি মদীনায় এলেন এবং তার বাহনকে বসালেন এবং তাকে বেঁধে মসজিদে প্রবেশ করলেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিছনে সালাত আদায় করলেন। যখন তিনি সালাম ফিরালেন তখন ঐ লোকটি তার বাহনের নিকট গেলেন এবং তার বাঁধনমুক্ত করে পিঠে আরোহণ করে উচ্চৈঃস্বরে এ দু‘আ করলেন। (اَللّٰهُمَّ ارْحَمْنِىْ وَمُحَمَّدًا وَلَا تُشْرِكْ فِىْ رَحْمَتِنَا أَحَدًا) হে আল্লাহ! আপনি আমাকে এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অনুগ্রহ করুন। আমাদের সাথে আর কাউকে অনুগ্রহ করবেন না। (فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَتَقُولُونَ) তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা কি ধারণা করছ। (هُوَ أَضَلُّ أَمْ بَعِيرُهٗ؟) সে মূর্খ, না তার উটটি? কেননা সে আল্লাহর প্রশস্ত নি‘আমাতকে সংকীর্ণ করে ফেলেছে। (أَلَمْ تَسْمَعُوا إِلٰى مَا قَالَ؟) তোমরা কি শুননি, সে কি বলে ফেলেছে- এ কথার মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝিয়েছেন, তিনি যা বলেছেন আসলেই সেই বেদুঈন লোকটি তার উপযুক্ত। (قَالُوا: بَلٰى؟) তারা বললেনঃ হ্যাঁ, অবশ্যই (সে মূর্খ)। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৮৭৭)
পরিচ্ছেদঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৫৯-[৪৮] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন কোন পাপী লোকের প্রশংসা করা হয়, আল্লাহ তা’আলা ক্রুদ্ধ হন এবং তার প্রশংসার কারণে আল্লাহ তা’আলার ’আরশ কেঁপে ওঠে। (’বায়হাক্বী’র ’’শু’আবুল ঈমানে’’ বর্ণনা করেছেন।)[1]
عَنْ
أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا مُدِحَ الْفَاسِقُ غَضِبَ الرَّبُّ تَعَالَى وَاهْتَزَّ لَهُ الْعَرْشُ» رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي «شعب الْإِيمَان»
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘আবূ খল্ফ’’ নামের একজন বর্ণনাকারী, ইনি একজন য‘ঈফ রাবী। ‘‘আল মীযানে’’ ইমাম যাহাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এই বর্ণনাকারীকে ইবনু মা‘ঈন মিথ্যুক বলেছেন। বিস্তারিত দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ১৩৯৯।
ব্যাখ্যাঃ (إِذَا مُدِحَ الْفَاسِقُ) যখন কোন ফাসিক বা পাপাচারী ব্যক্তির প্রশংসা করা হয়। যেমন তাকে সাইয়্যিদ বা সর্দার বলে সম্বোধন করা হয়।
(غَضِبَ الرَّبُّ تَعَالٰى) তখন আল্লাহ তা‘আলা প্রশংসাকারীর ওপর রাগান্বিত হন। (وَاهْتَزَّ لَهُ الْعَرْشُ) এবং তার উক্ত প্রশংসা করার কারণে ‘আরশ প্রকম্পিত হয়।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ‘আরশ প্রকম্পিত হওয়ার অর্থই হলো বিরাট কোন কাজ সংঘটিত হওয়া। কেননা তাতে সন্তুষ্ট প্রকাশ করা হয় যাতে আল্লাহ অসন্তুষ্ট এবং রাগান্বিত হন। বরং সে কুফরীর একদম কাছে পৌঁছে যায়। কেননা সে যেন আল্লাহ যা হারাম করেছে তা হালাল বানিয়ে ফেলে; আর এটা বর্তমানে ব্যাপক মহামারীর আকার ধারণ করেছে। অধিকাংশ ‘আলিম, কবি-সাহিত্যিক এবং লোক দেখানো কুরআনের কারীদের মধ্যে। আর এটা যদি ফাসিকের প্রশংসা করার বিধান হয় তাহলে যারা যালিমের প্রশংসা করে এবং তাদের শরণাপন্ন হয় তাদের কি অবস্থা কি হবে? অথচ আল্লাহ বলেছেন- وَلَا تَرْكَنُوا إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ ‘‘তোমরা যালিমদের প্রতি ঝুঁকে পড়ো না, তাহলে আগুন তোমাদেরকে স্পর্শ করবে...’’- (সূরাহ্ হূদ ১১ : ১১৩)। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৬০-[৪৯] আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মু’মিনকে বিশ্বাস ভঙ্গ ও মিথ্যা ব্যতীত অন্য যে কোন স্বভাবে তৈরি করা হয়। (আহমাদ)[1]
وَعَنْ أَبِي
أُمَامَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يُطْبَعُ الْمُؤْمِنُ عَلَى الْخِلَالِ كلِّها إِلا الخيانةَ وَالْكذب» . رَوَاهُ أَحْمد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ইনক্বিত্বা‘ বা বিচ্ছিন্নতা আছে। হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৩৮৯ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ (يُطْبَعُ الْمُؤْمِنُ عَلَى الْخِلَالِ كلِّها) মু’মিন বান্দাকে সৃষ্টি করা হয়েছে সর্বপ্রকার সুন্দর গুণ দিয়ে। (إِلا الخيانةَ وَالْكذب) আমানাতের খিয়ানাত এবং মিথ্যা- এই দু’টি মন্দ গুণ (দোষ) ব্যতীত। কেননা মু’মিন বান্দাকে সত্যবাদিতা ও আমানাতদারিতার উপর সৃষ্টি করা হয়েছে। আর ইমাম ও সত্যবাদীর দাবী এটিই। এজন্যই আল্লাহ তা‘আলা صِيغَةِ الْحَصْر তথা সীমাবদ্ধকারণের শব্দ ব্যবহার করে বলেন- إِنَّمَا يَفْتَرِي الْكَذِبَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِآيَاتِ اللهِ وَأُولٰئِكَ هُمُ الْكَاذِبُونَ ‘‘শুধুমাত্র তারাই মিথ্যারোপ করে, যারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহে বিশ্বাস করে না এবং তারাই মিথ্যাবাদী’’- (সূরাহ্ আন্ নাহল ১৬ : ১০৫)। এমনিভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- لَا إِيمَانَ لِمَنْ لَا أَمَانَةَ لَهٗ ‘‘যার তার আমানাতদারী নেই তার ঈমান নেই।’’ (আহমাদ)
অতএব মু’মিন বান্দার পক্ষ থেকে যদি কখনো মিথ্যা এবং খিয়ানাত প্রকাশ পায় তাহলে সেটা হবে তার স্বভাব বহির্ভূত বিষয়। তার আসল সৃষ্টিগত স্বভাব থেকে নয়।
অথবা মু’মিন ব্যক্তি এ দু’টি মন্দ গুণ থেকে মুক্ত থাকবে, এটি মুবালাগা বা আধিক্য অর্থে প্রযোজ্য। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৬১-[৫০] আর ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) ’’শু’আবুল ঈমান’’ গ্রন্থে সা’দ ইবনু আবী ওয়াককাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন।
وَالْبَيْهَقِيّ فِي
شُعَبِ الْإِيمَانِ
عَنْ سَعْدِ بْنِ أَبِي وَقاص
পরিচ্ছেদঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৬২-[৫১] সাফওয়ান ইবনু সালীম (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো, ঈমানদার কি ভীরু হতে পারে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ ’’হ্যাঁ’’। জিজ্ঞেস করা হলো, ঈমানদার কি কৃপণ হতে পারে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ ’’হ্যাঁ’’। আবার জিজ্ঞেস করা হলো, ঈমানদার কি মিথ্যাবাদী হতে পারে? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ’’না’’।
[মালিক; আর ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) ’’শু’আবুল ঈমানে’’ মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন][1]
وَعَنْ صَفْوَانَ
بْنِ سَلِيمٍ أَنَّهُ قِيلَ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَيَكُونُ الْمُؤْمِنُ جَبَانًا؟ قَالَ: «نعم» . فَقيل: أَيَكُونُ الْمُؤْمِنُ بَخِيلًا؟ قَالَ: «نَعَمْ» . فَقِيلَ: أَيَكُونُ الْمُؤْمِنُ كَذَّابًا؟ قَالَ: «لَا» . رَوَاهُ مَالِكٌ وَالْبَيْهَقِيُّ فِي «شعب الْإِيمَان» مُرْسلا
ব্যাখ্যাঃ (أَيَكُونُ الْمُؤْمِنُ جَبَانًا؟) মু’মিন বান্দা কি সাধারণত ভীরু হতে পারে? (قَالَ: نعم) তিনি বললেন, হ্যাঁ হতে পারে যা ঈমানের পরিপন্থী নয়। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আবার জিজ্ঞেস করা হলো, মু’মিন বান্দা কি স্বভাবত কৃপণ হতে পারে? যেমনটি আল্লাহ্ তা‘আলা বলেছেনঃوَكَانَ الْإِنْسَانُ قَتُورًا ‘‘...বাস্তবিকই মানুষ বড়ই সংকীর্ণচিত্ত’’- (সূরাহ্ বানী ইসরাঈল ১৭ : ১০০)। তিনি বললেন, হ্যাঁ, হতে পারে তবে সাধারণ ঈমান বা পরিপূর্ণ ঈমানের পরিপন্থী নয়। তাকে আবার জিজ্ঞেস করা হলো। (أَيَكُونُ الْمُؤْمِنُ كَذَّابًا؟) মু’মিন বান্দা কি মিথ্যাবাদী হতে পারে? অর্থাৎ অধিক মিথ্যা কথা বলতে পারে অথবা স্বভাব ও চরিত্র অনুযায়ী মিথ্যাবাদী হতে পারে? তিনি উত্তর দিলেন না, হতে পারে না। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৬৩-[৫২] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, শয়তান কোন কোন সময় মানুষের আকৃতি ধারণ করে কোন সম্প্রদায়ের কাছে আসে এবং তাদের সাথে মিথ্যা কথা বলে। অতঃপর দলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে চলে যায়। এরপর তাদের মধ্য থেকে কোন একজন বলে, আমি এক ব্যক্তির কাছ থেকে এ কথা বলতে শুনেছি, তাকে দেখলে চিনি; কিন্তু নাম জানি না। (মুসলিম)[1]
وَعَن
ابْن مسعودٍ قَالَ: إِنَّ الشَّيْطَانَ لَيَتَمَثَّلُ فِي صُورَةِ الرَّجُلِ فَيَأْتِي الْقَوْمَ فَيُحَدِّثُهُمْ بِالْحَدِيثِ مِنَ الْكَذِبِ فَيَتَفَرَّقُونَ فَيَقُولُ الرَّجُلُ مِنْهُمْ: سَمِعْتُ رَجُلًا أَعْرِفُ وَجْهَهُ وَلَا أَدْرِي مَا اسْمُهُ يُحَدِّثُ . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যাঃ (إِنَّ الشَّيْطَانَ لَيَتَمَثَّلُ فِي صُورَةِ الرَّجُلِ) শয়তান কখনো কখনো মানুষের রূপ ধারণ করে এবং কোন সম্প্রদায়ের জনসমাজে এসে তাদের নিকট মিথ্যা হাদীস বর্ণনা করে, ফলে তারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। তখন তাদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি এ কথা বলে- আমি একজন লোককে এ কথা বলতে শুনেছিলাম আমি চেহারা দেখলে চিনব কিন্তু তার নাম জানি না। সে লোকটি এরূপ এরূপ কথা বলে। সম্ভবত এটা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীসই হবে। আর এটাই মিথ্যার মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্টতম। ফলে সে কাফিরের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। আর এজন্য শয়তানের নেতা এর উপর গুরুত্বারোপ করে এবং মানুষের আকৃতি ধারণ করে, অভ্যন্তরীণ কুমন্ত্রণাকে শক্তিশালী করার জন্য। অথবা তা থেকে ঝগড়া-ফাসাদের শাখা প্রশাখা বের করার জন্য। যেমন- মিথ্যা অপবাদ এবং অনুরূপ অন্যান্য কিছু।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসের শিক্ষা হলো- কারো কাছ থেকে কোন কথা শুনলে খুব সতর্ক হওয়া উচিত এবং যদি বক্তা সম্পর্কে জানা যায় যে, সে সত্যবাদী তাহলে তার কাছ থেকে হাদীস বর্ণনা করা জায়িয আর যদি সে মিথ্যুক হয় তাহলে তার কথা বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। আর এ মর্মে সহীহ মুসলিমে হাদীস রয়েছে- كَفٰى بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ একজন মানুষ মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সেযা শুনবে, যাচাই না করে তাই বর্ণনা করবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৬৪-[৫৩] ’ইমরান ইবনু হিত্ত্বান (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি আবূ যার (রাঃ)-এর কাছে এলে তাঁকে কালো চাদর জড়ানো অবস্থায় একাকী মসজিদে অবস্থানরত পেলাম। আমি বললামঃ হে আবূ যার! এ একাকিত্ব কিরূপ? তখন আবূ যার(রাঃ) বললেনঃ আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেনঃ একাকী থাকা খারাপ সহ-উপবেশনকারীর চেয়ে উত্তম এবং ভালো সহ-উপবেশনকারী একাকী থাকার চেয়ে ভালো। ভালো কথা শিক্ষা দেয়া চুপ থাকার চেয়ে উত্তম, আর চুপ থাকা খারাপ শিক্ষা দেয়ার চেয়ে উত্তম।[1]
وَعَنْ عِمْرَانَ
بْنِ حِطَّانَ قَالَ: أَتَيْتُ أَبَا ذَرٍّ فَوَجَدْتُهُ فِي الْمَسْجِدِ مُحْتَبِيًا بِكِسَاءٍ أَسْوَدَ وَحده. فَقلت: يَا أَبَا ذَر ماهذه الْوَحْدَةُ؟ فَقَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «الْوَحْدَةُ خَيْرٌ مِنْ جَلِيسِ السُّوءِ وَالْجَلِيسُ الصَّالِحُ خَيْرٌ مِنَ الْوَحْدَةِ وَإِمْلَاءُ الْخَيْر خيرٌ من السكوتِ والسكوتُ خيرٌ من إِملاءِ الشَّرّ»
‘আত্ তালখীস’ গ্রন্থে ইমাম যাহাবী বলেনঃ সহীহ নয়। হাদীসটি য‘ঈফ কারণ সনদে আছে শরীক ইবনু ‘আবদুল্লাহ আল কাযী, তার স্মৃতিশক্তি খারাপ। ‘আত তাকবীর’ গ্রন্থে হাফিয ইবনু হাজার আল ‘আসকালানী (রহ) বলেনঃ সে সত্যবাদী তবে অনেক ভুল করে। কুফার বিচারক পদে আসীন হওয়ার পর থেকে তার মুখস্থশক্তি পরিবর্তন হয়ে যায়। বিস্তারিত সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ১৮৫৩।
ব্যাখ্যাঃ (أَتَيْتُ أَبَا ذَرٍّ فَوَجَدْتُهٗ فِي الْمَسْجِدِ...) আমি আবূ যার (রাঃ)-এর নিকট আসলাম, মসজিদে একাকী কালো চাদর পরিহিত অবস্থায় দেখে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, (يَا أَبَا ذَر ماهذه الْوَحْدَةُ؟) হে আবূ যার! তুমি কেন একাকী বসে আছ? তখন তিনি বললেনঃ আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট শুনেছি, তিনি বলেন- (مِنْ جَلِيسِ السُّوءِ) খারাপ সঙ্গীর সাহচর্যের চেয়ে একাকী থাকাই উত্তম। অর্থাৎ বর্তমান সময়ে ভালো সঙ্গী নিতান্তই কম।
(وَإِمْلَاءُ الْخَيْر خيرٌ من السكوتِ والسكوتُ خيرٌ من إِملاءِ الشَّرّ) এবং চুপ থাকার চেয়ে ভালো কিছু করা উত্তম আর অন্যায় কিছু করার চেয়ে চুপ থাকাই ভালো। কেননা নিঃসঙ্গ ও একাকী চুপচাপ থাকাই ভলো। অর্থাৎ নিঃসঙ্গ ও একাকী চুপচাপ থাকা অন্যায় থেকে দূরে রাখতে সহায়তা করে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৬৫-[৫৪] ’ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন ব্যক্তির নীরব থাকায় যে মর্যাদা লাভ হয়, তা ষাট বছরের নফল ’ইবাদাতের চেয়েও উত্তম।[1]
وَعَن عِمْرَانَ
بْنِ حُصَيْنٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَقَامُ الرَّجُلِ بِالصَّمْتِ أَفْضَلُ مِنْ عِبَادَةِ سِتِّينَ سنة»
ব্যাখ্যাঃ (مَقَامُ الرَّجُلِ بِالصَّمْتِ) কোন ব্যক্তির জন্য অনর্থক কাজের চেয়ে চুপচাপ থাকা তথা নিরবতা অবলম্বন করা। (أَفْضَلُ مِنْ عِبَادَةِ سِتِّينَ سنة) ষাট বছর ‘ইবাদাতের চেয়ে উত্তম তথা ‘ইবাদাতের পাশাপাশি অধিক কথা বলা এবং সৎকাজে সুপ্রতিষ্ঠিত না থাকার চেয়ে চুপ থাকাই উত্তম।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ‘ইবাদাত করতে গিয়ে অনেক সমস্যায় পড়তে হয় আর নিরবতা অবলম্বন করলেই তা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। যেমন- হাদীসে এসেছে, مَنْ صَمَتَ نَجَا যে চুপ থাকল সে পরিত্রাণ পেল। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৬৬-[৫৫] আবূ যার গিফারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হলাম। অতঃপর আবূ যার(রাঃ) দীর্ঘ হাদীস বর্ণনা করলেন। তিনি এতটুকু পর্যন্ত বললেন যে, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রসূল! আপনি আমাকে উপদেশ দিন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আমি তোমাকে আল্লাহভীতির উপদেশ দিচ্ছি। কেননা এটা তোমার সকল কাজের অধিক সৌন্দর্যের কারণ হবে। আমি বললামঃ আরো কিছু উপদেশ দিন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ কুরআন পাঠ ও আল্লাহর স্মরণকে তোমার জন্য আবশ্যিক করে নাও। কেননা এটা তোমার জন্য আকাশে স্মরণযোগ্য এবং জমিনে আলোকস্বরূপ। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আরো কিছু উপদেশ দিন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ দীর্ঘ সময় নীরব থাকো। কেননা নিরবতা শয়তানকে দূরীভূত করে এবং তোমার দীনী কাজে তোমার জন্য সহায়ক হয়। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ আরো কিছু উপদেশ দিন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ অধিক হাসি থেকে নিরাপদে থাকো। কেননা এটা অন্তরকে মৃত করে ফেলে এবং মুখমণ্ডল ের জ্যোতিকে দূর করে দেয়। আমি বললামঃ আরো কিছু বলুন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তিক্ত হলেও ন্যায় কথা বলবে। আমি অনুরোধ করলামঃ আরো উপদেশ দিন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আল্লাহর রাস্তায় কাজ করতে গিয়ে কোন নিন্দুকের তিরস্কারকে ভয় করো না। আমি বললামঃ আমাকে আরো কিছু বলুন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ যখন তোমার অন্তরে অপরের কুৎসা রটানোর ইচ্ছা হয়, তখন এই ভেবে তোমার ইচ্ছাকে থামিয়ে দেবে যে, তোমার মধ্যে ত্রুটি রয়েছে।[1]
وَعَن أبي
ذرٍّ قَالَ: دَخَلْتُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَذَكَرَ الْحَدِيثَ بِطُولِهِ إِلَى أَنْ قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَوْصِنِي قَالَ: «أُوصِيكَ بِتَقْوَى اللَّهِ فَإِنَّهُ أَزْيَنُ لِأَمْرِكَ كُلِّهِ» قُلْتُ: زِدْنِي قَالَ: «عَلَيْكَ بِتِلَاوَةِ الْقُرْآنِ وَذِكْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ فَإِنَّهُ ذِكْرٌ لَكَ فِي السَّمَاءِ وَنُورٌ لَكَ فِي الْأَرْضِ» . قُلْتُ: زِدْنِي. قَالَ: «عَلَيْكَ بِطُولِ الصَّمْتِ فَإِنَّهُ مَطْرَدَةٌ لِلشَّيْطَانِ وَعَوْنٌ لَكَ عَلَى أَمْرِ دِينِكَ» قُلْتُ: زِدْنِي. قَالَ: «إِيَّاكَ والضحك فَإِنَّهُ يُمِيتُ الْقَلْبَ وَيَذْهَبُ بِنُورِ الْوَجْهِ» قُلْتُ: زِدْنِي. قَالَ: قُلِ الْحَقَّ وَإِنْ كَانَ مُرًّا . قُلْتُ: زِدْنِي. قَالَ: «لَا تَخَفْ فِي اللَّهِ لومة لائم» . قلت: زِدْنِي. لِيَحْجُزْكَ عَنِ النَّاسِ مَا تَعْلَمُ مِنْ نَفْسِكَ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘ইয়াহ্ইয়া ইবনু সা‘ঈদ’’ নামের রাবীর জীবনীতে বলা হয়েছে, সে ‘আবদুল মালিক ইবনু জুরায়জ থেকে অনেক উল্টাপাল্টা বর্ণনা করত। আর ‘উকায়লী তাঁর ‘‘আয্ যু‘আফাহ্’’ নামক কিতাবে ৪/৪০৪ পৃঃ উল্লেখ করেছেন, তার হাদীসের অনুসরণ করা যায়নি, আর হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে সে প্রসিদ্ধ নয়। বিস্তারিত দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ১২/৩১৭ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ (قُلْتُ : يَا رَسُولَ اللهِ أَوْصِنِي قَالَ : أُوصِيكَ بِتَقْوَى اللهِ) আবূ যার (রাঃ) বলেনঃ আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমাকে উপদেশ দিন। তিনি বললেনঃ আমি তোমাকে তাকওয়া তথা আল্লাহকে ভয় করার উপদেশ দিচ্ছি। এটা পৃথিবীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকলের জন্য উপদেশ। যেমন- আল্লাহ বলেনঃ
وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَإِيَّاكُمْ أَنِ اتَّقُوا اللهَ
‘‘এবং অবশ্যই আমি তোমাদের আগে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল তাদেরকে আর তোমাদেরকেও আদেশ দিয়েছি যে, আল্লাহকে ভয় কর।’’ (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪ : ১৩১)
(فَإِنَّهٗ أَزْيَنُ لِأَمْرِكَ) কেননা তা (তাকওয়া) তোমার দীনের সমস্ত বিষয় বিশ্বাস-কথা-কাজ সবকিছুকে সুসজ্জিত করে তোলে। যেহেতু তাকওয়া প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সর্বপ্রকার শির্ক বর্জন করা, কাবীরাহ্ ও সগীরাহ্ গুনাহ থেকে বিরত থাকা, সন্দেহমূলক বিষয় পরিহার, কুপ্রবৃত্তি থেকে দূরে থাকা, যাবতীয় অন্যায় পরিহার করতে সহায়তা করে।
(قُلْتُ: زِدْنِي) ‘‘আমি বললামঃ সৎকাজ বেশী করে সম্পাদন করতে আমাকে আরো উপদেশ দিন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, (عَلَيْكَ بِتِلَاوَةِ الْقُرْآنِ) তুমি বেশী করে কুরআন তিলাওয়াত করবে, কেননা তা তাকওয়া অবলম্বনের সহায়ক ‘আমল এবং উচ্চ মর্যাদা লাভের উপায় এবং বেশী করে আল্লাহর জিকর করবে। কেননা কুরআন তিলাওয়াত এবং জিকর- এ দু’টি ‘আমল আসমানে তোমাকে নাম স্মরণ করবে এবং পৃথিবীতে তোমার জন্য আলো হবে।
(قُلْتُ: زِدْنِي) আমি বললাম, আরো উপদেশ দিন যাতে আপনার উল্লেখিত ‘আমলগুলো সম্পাদন করতে সহায়ক হয়। তিনি বললেন- (عَلَيْكَ بِطُولِ الصَّمْتِ) তোমাকে নিরবতা অবলম্বন করতে হবে। কেননা তা শয়তানকে তাড়াতে সহায়তা করবে এবং তোমার দীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে সহায়তা করবে। (قُلْتُ: زِدْنِي) আমি বললাম, আমাকে আরো কিছু উপদেশ দিন। তিনি বললেন, إِيَّاكَ وَكَثْرَةَ الضَّحِكِ তুমি অধিক হাসি থেকে দূরে থাকবে। কেননা অধিক হাস্য অন্তরকে মেরে ফেলে তথা অন্তরে কঠোরতা আনয়ন করে যার দরুন উদাসীনতা সৃষ্টি করে। ফলে আল্লাহর স্মরণ থেকে অন্তর উদাসীন হলে অন্তর মরে যায়।
(وَيَذْهَبُ بِنُورِ الْوَجْهِ) এবং মুখের জ্যোতি চলে যায়। তথা মুখের উজ্জ্বলতা ও সৌন্দর্য দূর হয়ে যায়।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ (سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِمْ مِنْ أَثَرِ السُّجُودِ) ‘‘...তাদেরকে তুমি দেখবে রুকূ‘ ও সাজদায় অবনত অবস্থায়...’’- (সূরাহ্ আল ফাতহ ৪৮ : ২৯)।
(قُلْتُ: زِدْنِي) আমি বললাম, আমাকে আরো উপদেশ দিন। তিনি বললেন, (قُلِ الْحَقَّ) তুমি সত্য কথা বলবে যদিও সত্য কথা অন্তরে অথবা বাতিলপন্থীদের নিকট তিক্ত মনে হয় তথা বিস্বাদ সৃষ্টি করে।
(قُلْتُ: زِدْنِي) আমি বললাম, আমাকে আরো কিছু উপদেশ দিন। তিনি বললেন, (لَا تَخَفْ فِي اللهِ لومة لائم) তুমি আল্লাহর জন্য এবং তার ‘ইবাদাতের ক্ষেত্রে কারো তিরস্কারকে ভয় করবে না। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে সকলের থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে- আল্লাহর পথে অটুট থাকা এবং মানুষের প্রশংসা অথবা তিরস্কারকে উপেক্ষা করে চলা।
যেমনটি আল্লাহ বলেছেনঃ
(وَتَبَتَّلْ إِلَيْهِ تَبْتِيلًا) ‘‘...এবং একাগ্রচিত্তে তাঁর প্রতি মগ্ন হও’’- (সূরাহ্ আল মুয্যাম্মিল ৭৩ : ৮)।
(قُلْتُ: زِدْنِي) আমি বললাম, আমাকে আরো কিছু বলুন। তিনি বললেন, তুমি তোমাকে মানুষের দোষত্রুটি অন্বেষণ থেকে দূরে রাখবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৬৭-[৫৬] আনাস (রাঃ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ হে আবূ যার! তোমাকে কি এমন দু’টো স্বভাবের কথা বলব, যে স্বভাব দু’টি পিঠে খুব হাল্কা; কিন্তু পাপ-পুণ্যের পাল্লায় খুব ভারী? আমি বললামঃ জ্বী বলুন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ দীর্ঘ নিরবতা ও উত্তম ব্যবহার। যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম! বান্দা এ দু’টো কাজের মতো উত্তম আর কোন কাজ করে না।[1]
وَعَنْ أَنَسٍ
عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «يَا أَبَا ذَرٍّ أَلَا أَدُلُّكَ عَلَى خَصْلَتَيْنِ هُمَا أَخَفُّ عَلَى الظَّهْرِ وَأَثْقَلُ فِي الْمِيزَانِ؟» قَالَ: قُلْتُ: بَلَى. قَالَ: «طُولُ الصَّمْتِ وَحُسْنُ الْخُلُقِ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا عَمِلَ الْخَلَائق بمثلهما»
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়া কারণ, এর সনদে ‘‘আবূ বকর’’ নামের একজন বর্ণনাকারী আছে, তার আসল নাম বাশ্শার ইবনুল হাকাম ইবনু ‘আদী তাঁর ‘‘আল কামিল’’ নামক কিতাবে ২/২৩ পৃষ্ঠাতে বলেন, সে একজন বাসরার অধিবাসী। সে সাবিত আল বুনানী ও অন্যান্যদের থেকে হাদীস মুনকার করত। দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ২৯৯৯।
ব্যাখ্যাঃ (يَا أَبَا ذَرٍّ أَلَا أَدُلُّكَ عَلٰى خَصْلَتَيْنِ هُمَا أَخَفُّ عَلَى الظَّهْرِ) হে আবূ যার! আমি কি তোমাকে এমন দু’টি স্বভাবগত ‘আমলের সন্ধান দিব যা পালনকারীর পক্ষ শরীরে বা মুখে বহন করা খুবই সহজ এবং ওজনের পাল্লায় খুবই ভারী হবে।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ বোধগম্য বিষয়কে বাস্তবতার সাথে উপমা দিয়ে বলেছেন যাতে গ্রহণ করা খুবই সহজ হয়। যেমনটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যত্র বলেছেন- كَلِمَتَانِ خَفِيفَتَانِ عَلَى اللِّسَانِ ثَقِيلَتَانِ فِي الْمِيزَانِ দু’টি বাক্য মুখে উচ্চারণ করা খুবই সহজ এবং ওজনের পাল্লায় খুবই ভারী। (বুখারী ও মুসলিম)
(قَالَ: قُلْتُ: بَلٰى) তিনি বলেন- আমি বললাম, (হে আল্লাহর রসূল!) অবশ্যই আমাকে বলুন। তিনি বললেন- (طُولُ الصَّمْتِ وَحُسْنُ الْخُلُقِ) নিরবতা পালন করা এবং উত্তম চরিত্রে চরিত্রবান হওয়া। এরপর তিনি বললেন, সেই সত্ত্বার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ সৃষ্টিকুলের মাঝে এটি ‘আমলের মতো ‘আমল আর নেই।
ইবনু আবুদ্ দুন্ইয়া (রহিমাহুল্লাহ) সফওয়ান ইবনু সালিম থেকে মুরসাল সূত্রে বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ أَلَا أُنْبِئُكَ بِأَمْرَيْنِ خَفِيفٌ أَمْرُهُمَا عَظِيمٌ أَجْرُهُمَا لَمْ تَلْقَ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ بِمِثْلِهِمَا: طُولُ الصَّمْتِ وَحُسْنُ الْخُلُقِ আমি কি তোমাদেরকে অতি সহজ দু’টি ‘ইবাদাতের সন্ধান দিব না? যা শরীরের পক্ষ বহন করা খুবই সহজ এবং তাদের সাওয়াব অনেক বেশী। আল্লাহর নিকট তার মতো আর কিছু পাবে না, তা হলো নিরবতা এবং উত্তম চরিত্র। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৬৮-[৫৭] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর নিকট দিয়ে গমন করছিলেন, তখন তিনি (আবূ বকর সিদ্দীক) তাঁর কোন এক দাসকে ভৎর্সনা করছিলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেনঃ ভৎর্সনাকারী ও সিদ্দীক- কখনো একই ব্যক্তি হতে পারে না। পবিত্র কা’বার রবে্র কসম! এটা শুনে আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) ঐ দিনই কিছু দাস মুক্ত করে দিলেন। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বললেনঃ ভবিষ্যতে আমি কখনো এ কাজের পুনরাবৃত্তি করব না। (বায়হাক্বী উপরিউক্ত পাঁচটি হাদীস ’’শু’আবুল ঈমানে’’ বর্ণনা করেছেন।)[1]
وَعَن عَائِشَة
قَالَتْ: مَرَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِأَبِي بَكْرٍ وَهُوَ يَلْعَنُ بَعْضَ رَقِيقِهِ فَالْتَفَتَ إِلَيْهِ فَقَالَ: «لَعَّانِينَ وَصِدِّيقِينَ؟ كَلَّا وَرَبِّ الْكَعْبَةِ» فَأَعْتَقَ أَبُو بَكْرٍ يَوْمَئِذٍ بَعْضَ رَقِيقِهِ ثُمَّ جَاءَ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَالَ: لَا أَعُودُ. رَوَى الْبَيْهَقِيُّ الْأَحَادِيثَ الْخَمْسَةَ فِي «شعب الْإِيمَان»
ব্যাখ্যাঃ (مَرَّ النَّبِىُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِأَبِي بَكْرٍ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, এমতাবস্থায় যে, তিনি তার কতক চাকরকে অভিসম্পাত করছিলেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে লক্ষ্য করলেন অথবা আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) তার দিকে লক্ষ্য করলেন। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, (لَعَّانِينَ وَصِدِّيقِينَ؟) সিদ্দীক লা‘নাতকারীও হতে পারে? অথবা তুমি কি লা‘নাতকারী এবং সিদ্দীক তথা এ দু’টি গুণের সমাবেশ ঘটতে দেখেছ?
(كَلَّا وَرَبِّ الْكَعْبَةِ) কখনই নয়, কা‘বার রবের শপথ।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এর অর্থ হচ্ছে- তোমরা কি সিদ্দীক কে অভিসম্পাতকারীরূপে দেখেছ? কখনই নয়, আল্লাহর কসম! তোমরা এ দু’টি গুণকে একত্রে কোন দিন দেখতে পাবে না। এ বাক্যে আশ্চর্যতা প্রকাশ পেয়েছে।
(فَأَعْتَقَ أَبُو بَكْرٍ يَوْمَئِذٍ بَعْضَ رَقِيقِه) অতঃপর আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) অনিচ্ছাকৃত ভুলের কাফফারাহ্ হিসেবে তার কতক দাসকে মুক্ত করে দিলেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ওযর পেশ করতে এলেন। অতঃপর বললেনঃ আমি এমন কাজ আর কখনো করবো না। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৬৯-[৫৮] আসলাম (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন ’উমার (রাঃ) আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর নিকট আসলেন, তখন আবূ বকর সিদ্দীক(রাঃ) নিজের জিহবা টানছিলেন। তখন ’উমার(রাঃ) বললেনঃ থামুন, দেখি! আপনি কি করছেন? আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন। তখন আবূ বকর সিদ্দীক(রাঃ) বললেনঃ এ জিহবাই আমাকে ধ্বংসের স্থানসমূহে নিক্ষেপ করেছে। (মালিক)[1]
وَعَنْ أَسْلَمَ قَالَ: إِنَّ عُمَرَ دَخَلَ يَوْمًا على أبي بكر الصِّدّيق رَضِي الله عَنْهُم وَهُوَ يَجْبِذُ لِسَانَهُ. فَقَالَ عُمَرُ: مَهْ غَفَرَ الله لَك. فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ: إِنَّ هَذَا أَوْرَدَنِي الْمَوَارِدَ. رَوَاهُ مَالك
ব্যাখ্যাঃ (إِنَّ عُمَرَ دَخَلَ يَوْمًا على أَبِىْ بكر الصِّدّيق) একদিন ‘উমার আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর গৃহে প্রবেশ করলেন। এমতাবস্থায় যে, তিনি তার জিহ্বাকে টেনে ধরে আছেন। তখন ‘উমার (রাঃ) বললেন, (مَهْ) এ কাজ থেকে বিরত হোন। আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন। তিনি দু‘আ অর্থে এটা বলেছেন অথবা তার ব্যাপারে যা শুনেছেন সে ব্যাপারে সংবাদমূলক। তখন আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) তাকে বললেন- নিশ্চয় এই জিহ্বাই জিহ্বার প্রতি ইঙ্গিত করে বলার উদ্দেশ্য হলো এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন অথবা তাকে তুচ্ছকরণ।
(أَوْرَدَنِي الْمَوَارِدَ) আমাকে ধ্বংসের মধ্যে প্রবেশ করিয়েছে বা আমাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছিয়ে দিয়েছে।
বায়হাক্বীর বর্ণনায় এসেছে- তিনি বলেন, নিশ্চয় এটি আমাকে ধ্বংসের অনিষ্টতায় প্রবেশ করিয়েছে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে কেবল জিহ্বাই তার কৃতকর্ম সম্পর্কে আল্লাহর নিকট অভিযোগ করবে।
ইমাম গাযালী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি নিজেকে অহেতুক কথা বলা থেকে বিরত রাখার জন্য মুখে পাথরকুচি রাখতেন এবং তিনি তার জিহ্বার দিকে ইঙ্গিত করে বলতেন- এটাই আমাকে ধ্বংসের মধ্যে প্রবেশ করিয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৭০-[৫৯] ’উবাদাহ্ ইবনুস্ সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা তোমাদের পক্ষ থেকে আমাকে ছয়টি জামানাত দাও, আমি তোমাদের জন্য জান্নাতের জামিন হব- ১. যখন তোমরা কথা বলবে, সত্য বলবে, ২. যখন প্রতিশ্রুতি দেবে, প্রতিশ্রুতি পালন করবে, ৩. যখন তোমাদের কাছে গচ্ছিত রাখা হবে, তা পরিশোধ করবে, ৪. নিজের লজ্জাস্থানসমূহকে হিফাযাত করবে, ৫. নিজ দৃষ্টি অবনমিত রাখবে, ৬. নিজের হস্তদ্বয়কে আয়ত্তে রাখবে।[1]
وَعَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: اضْمَنُوا لِي سِتًّا مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَضْمَنُ لَكُمُ الْجَنَّةَ: اصْدُقُوا إِذَا حَدَّثْتُمْ وَأَوْفُوا إِذَا وَعَدْتُمْ وأدوا إِذا ائتمتنم واحفظوا فروجكم وغضوا أبصاركم وَكفوا أَيْدِيكُم
ব্যাখ্যাঃ (أَنَّ النَّبِىَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: "اضْمَنُوا لِي سِتًّا) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা আমার জন্য তোমাদের ৬টি অভ্যাসের জামিনদার হও তাহলে আমি তোমাদের জন্য জান্নাতের জামিনদার হব। অর্থাৎ কৃতকার্যতার সাথে জান্নাতে প্রবেশের অথবা নৈকট্যপ্রাপ্ত উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন জান্নাতীদের স্তরে পৌঁছানোর জামিনদার হব।
(اصْدُقُوا إِذَا حَدَّثْتُمْ) যখন তোমরা কথা বলবে, সত্য বলবে।
(أَوْفُوا إِذَا وَعَدْتُمْ) যখন অঙ্গীকার করবে তখন তা পূর্ণ করবে।
(وأدوا إِذا ائتمتنم) যখন তোমাদের নিকট আমানাত রাখা হবে, তখন তোমরা আমানাত আদায় করবে এবং সাক্ষ্য প্রদান করবে।
(وغضوا أبصاركم) যার প্রতি দৃষ্টি দেয়া হারাম তা হতে দৃষ্টিকে অবনমিত রাখবে।
(وَكفوا أَيْدِيكُم) তোমরা তোমাদের হাতকে জুলুম করা হতে বিরত রাখবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৭১-[৬০], ৪৮৭২-[৬১] ’আবদুর রহমান ইবনু গানম ও আসমা বিনতু ইয়াযীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর প্রিয় বান্দা তারা, যাদেরকে দেখলে আল্লাহকে স্মরণ হয়। আর আল্লাহ তা’আলার নিকৃষ্ট বান্দা তারা, যারা মানুষের পরোক্ষ নিন্দা করে বেড়ায়, বন্ধুদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে এবং পূত-পবিত্র লোকেদের পদস্খলন প্রত্যাশা করে। (বর্ণিত হাদীসদ্বয় আহমাদ ও বায়হাক্বী শু’আবুল ঈমানে বর্ণনা করেছেন।)[1]
وَعَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ غَنْمٍ وَأَسْمَاءَ بِنْتِ يَزِيدَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «خِيَارُ عِبَادِ اللَّهِ الَّذِينَ إِذَا رُؤُوا ذُكِرَ اللَّهُ. وَشِرَارُ عِبَادِ اللَّهِ الْمَشَّاؤُونَ بِالنَّمِيمَةِ وَالْمُفَرِّقُونَ بَيْنَ الْأَحِبَّةِ الْبَاغُونَ الْبُرَآءَ الْعَنَتَ» . رَوَاهُمَا أَحْمَدُ وَالْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَان»
ব্যাখ্যাঃ (خِيَارُ عِبَادِ اللهِ الَّذِينَ إِذَا رُؤُوا ذُكِرَ اللهُ) আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে তারাই উত্তম যাদেরকে দেখলে আল্লাহর স্মরণ হয়। এখানে এ হাদীসের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে- الْمُؤْمِنُ مِرْآةُ الْمُؤْمِنِ মু’মিন হচ্ছে অন্তরের আয়না স্বরূপ।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হাদীসটির দু’টি মর্মার্থ থাকতে পারে।
১। তারা আল্লাহর সাথে এমন গভীর সম্পর্ক বজায় রাখে যে, তাদেরকে যারাই দেখবে তাদের অন্তরে আল্লাহর স্মরণ জেগে উঠবে, কেননা তাদের চেহারায় ‘ইবাদাতের ছায়া ভেসে রয়েছে।
২। যারাই তাদেরকে দেখবে তারাই আল্লাহকে স্মরণ করবে। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, النَّظَرُ إِلٰى وَجْهِ عَلِيٍّ عِبَادَةٌ এ হাদীসের মর্ম হলো, ‘আলী (রাঃ) যখন জনসম্মুখে বের হতেন তখন মানুষেরা বলত লা- ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ, কেমন সম্মানিত এ বালকটি, কেমন বীরপুরুষ ছেলেটি, এ ছেলেটি কত জ্ঞানী, কত সহিষ্ণু। তাকে দেখলেই তারা তাওহীদের বাণী বলতে উদ্বুদ্ধ হয়।
(وَشِرَارُ عِبَادِ اللهِ الْمَشَّاؤُونَ بِالنَّمِيمَةِ) এবং আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে নিকৃষ্টতম হচ্ছে যারা ফিতনাহ্-ফাসাদ সৃষ্টির উদ্দেশে একজনের কথা অন্যজনের নিকট নিয়ে বেড়ায়।
(الْمُفَرِّقُونَ بَيْنَ الْأَحِبَّةِ) প্রিয়জনের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে।
(الْبَاغُونَ الْبُرَآءَ الْعَنَتَ) পুত-পবিত্র লোকেদের ধ্বংস, বিপর্যয় ও পদস্খলন কামনা করে।
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৭২-[৬১] দেখুন পূর্বের হাদিস।
وَعَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ غَنْمٍ وَأَسْمَاءَ بِنْتِ يَزِيدَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «خِيَارُ عِبَادِ اللَّهِ الَّذِينَ إِذَا رُؤُوا ذُكِرَ اللَّهُ. وَشِرَارُ عِبَادِ اللَّهِ الْمَشَّاؤُونَ بِالنَّمِيمَةِ وَالْمُفَرِّقُونَ بَيْنَ الْأَحِبَّةِ الْبَاغُونَ الْبُرَآءَ الْعَنَتَ» . رَوَاهُمَا أَحْمَدُ وَالْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَان»
পরিচ্ছেদঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৭৩-[৬২] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, দু’জন সায়িম (রোযাদার) ব্যক্তি যুহর কিংবা ’আসর সালাত আদায় করল। যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাত সমাপন করে বললেনঃ তোমরা যাও পুনরায় উযূ করো এবং সালাত আদায় করো, আর তোমাদের সওম (রোযা) পূর্ণ করে অন্য কোনদিন সেটা কাযা করো। তারা জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রসূল! কেন কাযা করব? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ কেননা তোমরা অমুক ব্যক্তির পরোক্ষ নিন্দা-রটনা করেছ।[1]
وَعَن ابنِ
عبَّاسٍ أَنَّ رَجُلَيْنِ صَلَّيَا صَلَاةَ الظُّهْرِ أَوِ الْعَصْرِ وَكَانَا صَائِمَيْنِ فَلَمَّا قَضَى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الصَّلَاةَ قَالَ: «أَعِيدَا وُضُوءَكُمَا وَصَلَاتَكُمَا وامْضِيا فِي صومكما واقضيا يَوْمًا آخَرَ» . قَالَا: لِمَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: «اغتبتم فلَانا»
হাদীসটির ব্যাপারে আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আমি হাদীসটির সানাদ সম্পর্কে এখনও অবহিত হতে পারিনি। আর আমি একে সহীহ মনে করি না। য‘ঈফাহ্ ৮৩৫ নং হাদীসের শেষে। ‘‘জাওয়ামিউল কালিম’’ সফ্টওয়্যার হাদীসটিকে মাওযূ‘ হিসেবে উল্লেখ করেছে। কারণ, এর সনদে ‘‘আল মুসান্না ইবনু বকর’’ নামের রাবী মাতরূকুল হাদীস এবং ‘‘আববাদ ইবনু মানসূর’’ নামের বর্ণনাকারী য‘ঈফ।
ব্যাখ্যাঃ (أَنَّ رَجُلَيْنِ صَلَّيَا صَلَاةَ الظُّهْرِ أَوِ الْعَصْرِ) দুই ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে যুহর অথবা ‘আসরের সালাত আদায় করল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাত শেষ করে বললেনঃ তোমরা দু’জন পুনরায় তোমাদের উযূ করা এবং সালাত আদায় কর, আর ইফত্বারের মাধ্যমে সওম ভঙ্গ করো না এবং অন্য আরেকদিন সওমকে পুনরায় আদায় করে নিও।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ সিয়ামের ক্ষেত্রে পুনরায় আদায় করার নির্দেশ আল্লাহ তা‘আলার এ বাণীর আলোকে أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا ‘‘...তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে?...’’- (সূরাহ্ আল হুজুরাত ৪৯ : ১২)। আর সালাতের ক্ষেত্রে কারণ হলো যেহেতু সে তার ভাইয়ে রক্ত ও গোশত ভক্ষণের মাধ্যমে অপবিত্র হয়ে গেছে।
মূল কথা হলো- ভালো কাজ করার পূর্বে মন্দ কাজ সম্পাদন করলে তার পূর্ণতা হ্রাস পায়। যেমনভাবে অন্যায়ের পর ভালো কাজ করলে তা দূরীভূত হয়। যেহেতু আল্লাহ তা‘আলা বলেছেনঃ إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ ‘‘...পুণ্যরাজি অবশ্যই পাপরাশিকে দূর করে দেয়...’’- (সূরাহ্ হূদ ১১ : ১৪)।
সম্ভবত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে বান্দার হক নষ্ট করে গীবত করার কঠোরতা উল্লেখ করেছেন। কখনো সম্পূর্ণ ‘ইবাদাত নষ্ট হয়ে যায়, যেহেতু গীবতকারীর ‘আমল থেকে গীবতকৃত ব্যক্তিকে সাওয়াবে দিয়ে দেয়া হয়, ফলে অপরাধী ব্যক্তি সালাত ও সওম শূন্য হয়ে যায়। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে সালাত ও সিয়াম পুনরায় আদায় করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। এটা ছিল ঐ ব্যক্তিদ্বয়ের জন্য খাস ফাতাওয়া অন্যের জন্য এ বিধানটি ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য নয়।
(قَالَا) তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, (اغتبتم فلَانا) ‘‘তোমরা অমুক বান্দার গীবত করেছ।’’ অর্থাৎ সালাত আদায়ের পূর্বে এবং উযূর পরে ও সওম শুরুর পূর্বে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৭৪-[৬৩], ৪৮৭৫-[৬৪] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী ও জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তাঁরা বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ’’গীবত’’ ব্যভিচারের চেয়েও ভয়ঙ্কর। সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রসূল! গীবত ব্যভিচার হতে ভয়ঙ্কর কিভাবে হতে পারে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ মানুষ ব্যভিচার করে, অতঃপর তওবা্ করে এবং আল্লাহ তা’আলা অনুগ্রহ করে তওবা্ কবুল করেন। অপর এক বর্ণনায় আছে যে, অতঃপর ব্যভিচারী তওবা্ করে, আল্লাহ তা’আলা তাকে ক্ষমা করেন; কিন্তু পরোক্ষ নিন্দাকারীকে আল্লাহ তা’আলা ক্ষমা করেন না, যতক্ষণ না যার নিন্দা করা হলো সে ক্ষমা করে।[1]
وَعَن أبي سعيدٍ وجابرٍ قَالَا: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْغِيبَةُ أَشَدُّ مِنَ الزِّنَا» . قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَكَيْفَ الْغِيبَةُ أَشَدُّ مِنَ الزِّنَا؟ قَالَ: «إِنَّ الرَّجُلَ لَيَزْنِي فَيَتُوبُ فَيَتُوبُ اللَّهُ عَلَيْهِ» - وَفِي رِوَايَةٍ: «فَيَتُوبُ فَيَغْفِرُ اللَّهُ لَهُ وَإِنَّ صَاحِبَ الْغِيبَةِ لَا يُغْفَرُ لَهُ حَتَّى يغفِرَها لَهُ صَاحبه»
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘আববাদ ইবনু কাসীর’’ নামের রাবী মাতরূক। ইমাম আহমাদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ সে অনেক মিথ্যা হাদীস বর্ণনা করেছে। য‘ঈফাহ্ ১৮৪৬।
ব্যাখ্যাঃ (الْغِيبَةُ أَشَدُّ مِنَ الزِّنَا) গীবত, যিনা-ব্যভিচারের চেয়েও আরো মারাত্মক ভয়ংকর কাজ তথা বান্দার অধিকার সংশ্লিষ্ট কাজের বিপরীত একটি কঠিন অপরাধমূলক কাজ।
(قَالُوا: يَا رَسُولَ اللهِ وَكَيْفَ الْغِيبَةُ أَشَدُّ مِنَ الزِّنَا؟) সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! কিভাবে গীবত, যিনা-ব্যভিচারের চেয়েও কঠিন? অথচ যিনাও তো একটি বড় গুনাহ- এ ব্যাপারে কঠিন ভীতি প্রদর্শন ও হত্যা, বেত্রাঘাত ইত্যাদি শাস্তির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
(قَالَ: إِنَّ الرَّجُلَ لَيَزْنِي فَيَتُوبُ فَيَتُوبُ) তিনি উত্তরে বললেনঃ কোন ব্যক্তি যিনা করে আল্লাহ তা‘আলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে আর আল্লাহও তাকে ক্ষমা করে দেন, ফলে সে সত্য ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে, সে তাওবাহ্ করলে তাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়। কিন্তু গীবতকারী যদিও আল্লাহর নিকট ক্ষমা চায় তথাপি গীবতকৃত ব্যক্তি ক্ষমা করে না দেয়া পর্যন্ত তাকে ক্ষমা করা হয় না। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৭৫-[৬৪] দেখুন পূর্বের হাদীস।
وَعَن أبي سعيدٍ وجابرٍ قَالَا: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْغِيبَةُ أَشَدُّ مِنَ الزِّنَا» . قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَكَيْفَ الْغِيبَةُ أَشَدُّ مِنَ الزِّنَا؟ قَالَ: «إِنَّ الرَّجُلَ لَيَزْنِي فَيَتُوبُ فَيَتُوبُ اللَّهُ عَلَيْهِ» - وَفِي رِوَايَةٍ: «فَيَتُوبُ فَيَغْفِرُ اللَّهُ لَهُ وَإِنَّ صَاحِبَ الْغِيبَةِ لَا يُغْفَرُ لَهُ حَتَّى يغفِرَها لَهُ صَاحبه»
পরিচ্ছেদঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৭৬-[৬৫] আনাস (রাঃ)-এর বর্ণনায় আছে যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যিনাকারী বা ব্যভিচারী তওবা্ করে; কিন্তু পরোক্ষ নিন্দাকারীর জন্য তওবা্ নেই। [উপরিউক্ত তিনটি হাদীস ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) ’’শু’আবুল ঈমানে’’ বর্ণনা করেছেন।][1]
وَفِي رِوَايَةِ
أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: «صَاحِبُ الزِّنَا يَتُوبُ وَصَاحِبُ الْغِيبَةِ لَيْسَ لَهُ تَوْبَةٌ» . رَوَى الْبَيْهَقِيُّ الْأَحَادِيثَ الثَّلَاثَةَ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ»
হাদীসটি মাওযূ‘ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘আহমাদ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু জামীল ইবনু মিহরান’’ নামের বর্ণনাকারী মাজহূলুল হাল এবং অজ্ঞাত। আরো এক ব্যক্তি আছে যার পরিচয় জানা যায়নি (عن رجل)। জাওয়ামিউল কালিম সফটওয়্যার।
ব্যাখ্যাঃ (صَاحِبُ الزِّنَا يَتُوبُ) যিনাকারীর পক্ষ থেকে তাওবার আশা করা যায় অথবা তার নিকট বড় অপরাধ হওয়ায় অধিকাংশ সময় নিজেই তাওবাহ্ করে থাকে।
(وَصَاحِبُ الْغِيبَةِ لَيْسَ لَهٗ تَوْبَةٌ) কিন্তু গীবতকারীর জন্য তাওবার সুযোগ নেই। অর্থাৎ গীবতকারী অধিকাংশ সময় বিষয়টিকে সহজ ভেবে তাওবাহ্ করে না অথচ এটা আল্লাহর নিকট বিরাট অপরাধ অথবা গীবতকারী এ ব্যাপারে সন্তুষ্টচিত্তে থাকায় তার স্বতন্ত্র কোন তাওবার সুযোগ হয় না। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জিহ্বার হিফাযাত, গীবত এবং গালমন্দ প্রসঙ্গে
৪৮৭৭-[৬৬] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ গীবতের কাফফারাহ্ হলো, গীবতকারী যার গীবত করেছে, তার জন্য মাগফিরাত প্রার্থনা করবে এবং এভাবে বলবে, হে আল্লাহ! আমাকে এবং তাকে ক্ষমা করো। [ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) ’’দা’ওয়াতুল কাবীর’’-এ বর্ণনা করেছেন এবং তিনি বলেন, এ হাদীসটির বর্ণনা সূত্র দুর্বল।][1]
وَعَنْ أَنَسٍ
قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ مِنْ كَفَّارَةِ الْغِيبَةِ أَنْ تَسْتَغْفِرَ لِمَنِ اغْتَبْتَهُ تَقُولُ: اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَنَا وَلَهُ «. رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي» الدَّعَوَاتِ الْكَبِيرِ وَقَالَ: فِي هَذَا الْإِسْنَاد ضعف
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘আমবাসাহ্’’ নামের বর্ণনাকারীর ব্যাপারে ইমাম বুখারী বলেনঃ যাহিবুল হাদীস। আবূ হাতিম বলেন, সে হাদীস তৈরি করত। ইবনু হিব্বান বলেনঃ সে অনেক মিথ্যা হাদীস তৈরি করেছে, সুতরাং তার দ্বারা দলীল গ্রহণ করা বৈধ নয়। ‘‘আত্ তাকরীব’’ গ্রন্থে বলা হয়েছে মাতরূক। আবূ হাতিম তাকে হাদীস তৈরিকারী বলেছেন। এছাড়াও আশ্‘আস ইবনু শাবীব নামের বর্ণনাকারী মাজহূলুল হাল, য‘ঈফাহ্ ১৫১৯। ‘‘জাওয়ামিউল কালিম’’ সফ্টওয়্যার হাদীসটিকে মাওযূ‘ বলে উল্লেখ করেছে।
ব্যাখ্যাঃ (إِنَّ مِنْ كَفَّارَةِ الْغِيبَةِ) গীবতের কাফফারার মধ্য হতে এটি একটি। অর্থাৎ যথাযথভাবে তাওবাহ্ করার পর গীবতের কাফফারার মধ্যে একটি হচ্ছে :
(أَنْ تَسْتَغْفِرَ لِمَنِ اغْتَبْتَهٗ) তুমি যার গীবত করেছ তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে।
(تَقُولُ: اَللّٰهُمَّ اغْفِرْ لَنَا وَلَهٗ) এ কথা বলে, হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে ও তাকে ক্ষমা করে দাও। (এখানে বহুবচন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যদি গীবতকারী দলবদ্ধ জামা‘আত হয়, সেদিকে লক্ষ্য করে অথবা মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি লক্ষ্য করে)
হাদীসের আলোকে প্রতীয়মান হয় যে, এ ধরনের ক্ষমা প্রার্থনা তখন হবে যখন গীবত তার নিকট না পৌঁছে। যদি গীবত তার কাছে পৌঁছে থাকে তাহলে অবশ্যই তার নিকট থেকে ক্ষমা চেয়ে মুক্তি নিতে হবে এভাবে : তার নিকট গিয়ে উক্ত কথা উল্লেখ করে ক্ষমা চাইবে। যদি তা করা সম্ভব না হয়, তাহলে প্রতিজ্ঞা করবে যে, যখনই তাকে পাবে তার নিকট গিয়ে ক্ষমা চাইবে। যদি সে ক্ষমা করে দেয় তাহলেই তার ওপর থেকে দায়িত্বমুক্ত হবে। আর যদি এ সমস্ত কাজ করতে অপারগ হয় গীবতকৃত ব্যক্তির মারা যাওয়ার কারণে বা তার অনুপস্থিতির কারণে সেক্ষেত্রে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে এবং তার অনুগ্রহ ও দয়া কামনা করবে এবং প্রতিপক্ষকে নিজ দয়ায় যেন সন্তুষ্ট করে দেন সেই প্রার্থনা করবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১১. প্রথম অনুচ্ছেদ - ওয়া‘দা বা প্রতিশ্রুতি
৪৮৭৮-[১] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকাল করলেন এবং আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর কাছে বাহরাইনের গভর্নর ’আলা ইবনু আল-হাযরামীর তরফ থেকে মালামাল এলো, তখন আবূ বকর সিদ্দীক(রাঃ) বললেনঃ ’’নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর কার দেনা আছে, অথবা কারো সাথে তিনি ওয়া’দা করেছিলেন, তারা যেন আমার কাছে আসে।’’ জাবির(রাঃ) বলেন, আমি বললামঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার সাথে ওয়া’দা করেছিলেন যে, আমাকে এত এত এত দেবেন। তিনি (রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজের দু’হাত প্রসারিত করে তিনবার ইশারা করেছিলেন। জাবির(রাঃ) বলেন, আবূ বকর সিদ্দীক(রাঃ) আমাকে আঁজলা ভরে এক আঁজলা মাল দিলেন। আমি গণনা করে দেখলাম, এতে পাঁচশ’ দিরহাম আছে এবং তিনি (আবূ বকর সিদ্দীক) বললেনঃ পাঁচশ’ পাঁচশ’ করে আরো দু’বার গুণে নাও। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْوَعْدِ
عَن جابرٍ قَالَ: لَمَّا مَاتَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَجَاء أَبُو بَكْرٍ مَالٌ مِنْ قِبَلِ الْعَلَاءِ بْنِ الْحَضْرَمِيِّ. فَقَالَ أَبُو بكر: من كَانَ لَهُ عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دَيْنٌ أَوْ كَانَتْ لَهُ قِبَلَهُ عِدَةٌ فَلْيَأْتِنَا. قَالَ جَابِرٌ: فَقُلْتُ: وَعَدَنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يُعْطِيَنِي هَكَذَا وَهَكَذَا وَهَكَذَا. فَبَسَطَ يَدَيْهِ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ. قَالَ جَابِرٌ: فَحَثَا لِي حَثْيَةً فَعَدَدْتُهَا فَإِذَا هِيَ خَمْسُمِائَةٍ وَقَالَ: خُذْ مثلَيها. مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ (لَمَّا مَاتَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَجَاء أَبُو بَكْرٍ مَالٌ) যখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মারা গেলেন এবং আবূ বকর (রাঃ) খলীফা হলেন। তার খিলাফাতকালে ‘আলা ইবনুল হাযরামী-এর পক্ষ থেকে মাল এলে তিনি বলেন, (من كَانَ لَهٗ عِنْدَ النَّبِىِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دَيْنٌ أَوْ كَانَتْ لَهٗ قِبَلَهٗ عِدَةٌ) যার ঋণ আদায়ের ভার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর ছিল অথবা যার জন্য তার পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি ছিল সে যেন আমাদের কাছে আসে।
উক্ত হাদীসের শিক্ষা হলো- মৃত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ করে দেয়া মুস্তাহাব এবং সে মারা গেলে যে তার প্রতিনিধিত্ব করবে সে তা বাস্তাবায়িত করবে। এক্ষেত্রে উত্তরাধিকারী ও অপরিচিত ব্যক্তি সবাই সমান।
হাদীস থেকে আরো জানা যায় যে, ওয়া‘দা বা প্রতিশ্রুতি হলো ঋণের অন্তর্ভুক্ত। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে الْعِدَةُ دَيْنٌ ওয়া‘দা ঋণের অন্তর্ভুক্ত।
(قَالَ جَابِرٌ: فَقُلْتُ: وَعَدَنِي رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ...) জাবির (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার সাথে ওয়া‘দা করেছিলেন তিনি আমাকে এত এত পরিমাণ সম্পদ দান করবেন। অতঃপর তিনি তার দুই হাতকে তিনবার প্রশস্ত করলেন এত এত এর পরিমাণ বুঝিয়ে দেয়ার জন্য। জাবির (রাঃ) বলেন, এরপর আবূ বকর (রাঃ) তার দুই চৌলে দিরহাম ভর্তি করে আমার চাদরে ঢেলে দিলেন। অতঃপর আমি গণনা করে দেখি সেখানে কি পরিমাণ আছে। (فَإِذَا هِيَ خَمْسُمِائَةٍ وَقَالَ: خُذْ مثلَيها) আমি দেখলাম সেখানে ৫০০ দিরহাম আছে এবং তিনি বললেন, তুমি আরো এর দ্বিগুণ গ্রহণ কর। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
এ হাদীসের আরো শিক্ষা হলো- ওয়া‘দা বাস্তবায়নকরণ। ইমাম শাফি‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ) ও জামহূর ‘আলিমের মতে তা বাস্তবায়ন করা ও তা পালন করা মুস্তাহাব ওয়াজিব নয়। তবে হাসান বাসরী ও কতিপয় মালিকী মাযহাবের ‘আলিমের নিকট তা ওয়াজিব। (শারহুন নাবাবী ১৫/২৩১৪)
পরিচ্ছেদঃ ১১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ওয়া‘দা বা প্রতিশ্রুতি
৪৮৭৯-[২] আবূ জুহায়ফাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখেছি যে, তাঁর শুভ্রতা প্রকাশ পেয়েছিল। ’আলী (রাঃ)-এর পুত্র হাসান(রাঃ) রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুরূপ ছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে তেরোটি সবল উট দিতে আদেশ করেছিলেন। আমরা সে উটগুলো আনতে গেলাম। আমাদের কাছে তাঁর ইন্তিকালের সংবাদ পৌঁছল, তখন আমাদেরকে কোনকিছু দেয়া হলো না। অতঃপর যখন আবূ বকর সিদ্দীক(রাঃ) খলীফাহ্ নির্বাচিত হলেন, তখন তিনি ঘোষণা করলেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি কারো সাথে কোন ওয়া’দা করে থাকেন, তবে সে যেন আমার কাছে আসে। তখন আমি তাঁর কাছে উপস্থিত হলাম এবং এ ঘটনা তাঁকে জানালাম। তিনি আমাদেরকে তা (তেরোটি উট) দিয়ে দিতে আদেশ করলেন। (তিরমিযী)[1]
عَنْ أَبِي جُحَيْفَةَ قَالَ: رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَبْيَضَ قَدْ شَابَ وَكَانَ الْحَسَنُ بْنُ عَلِيٍّ يُشْبِهُهُ وَأَمَرَ لَنَا بِثَلَاثَةَ عَشَرَ قَلُوصًا فَذَهَبْنَا نَقْبِضُهَا فَأَتَانَا مَوْتُهُ فَلَمْ يُعْطُونَا شَيْئًا. فَلَمَّا قَامَ أَبُو بَكْرٍ قَالَ: مَنْ كَانَتْ لَهُ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عِدَةٌ فَلْيَجِئْ فَقُمْتُ إِلَيْهِ فَأَخْبَرْتُهُ فَأَمَرَ لَنَا بِهَا. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ
ব্যাখ্যাঃ (رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَبْيَضَ) আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখেছি তিনি ছিলেন সাদা রঙের লালচে আর তার কোন কোন দাড়ি পেকে গিয়েছিল অথবা তার ভিতর বার্ধক্যে ছাপ ছিল।
(وَكَانَ الْحَسَنُ بْنُ عَلِيٍّ يُشْبِهُهٗ) ‘আলী (রাঃ)-এর ছেলে হাসান (রাঃ) ছিলেন, দেখতে তার মতই। আর তিনি আমাদেরকে তিন উষ্ট্রি ভর্তি করে দিতে বলেছেন। তাই আমরা তার দায়িত্বশীলের নিকট তা গ্রহণ করতে যাচ্ছিলাম তখন আমাদের কাছে তার মৃত্যুর খবর পৌঁছে। ফলে আমাদেরকে কিছুই দেয়া হলো না। এ দ্বারা বুঝা যায় দান, সাদাকা গ্রহণ না করা পর্যন্ত মালিক হওয়া যায় না।
(فَلَمَّا قَامَ أَبُو بَكْرٍ) আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) খিলাফাতের দায়িত্ব নিলেন। তিনি বললেন, যার জন্য রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ থেকে কোন ওয়া‘দা করা ছিল সে যেন আমার কাছে আসে তথা আমাদের কাছে আসলে আমরা তা পূর্ণ করে দিব। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ওয়া‘দা বা প্রতিশ্রুতি
৪৮৮০-[৩] ’আবদুল্লাহ ইবনু আবুল হাসমা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নুবুওয়াত লাভের পূর্বে একদিন আমি তাঁর কাছ থেকে কিছু কেনাকাটা করি, যার কিছু মূল্য পরিশোধ করতে বাকি রয়ে গিয়েছিল। আমি তাঁর সাথে ওয়া’দা করেছিলাম যে, আমি অবশিষ্ট দাম নিয়ে তাঁর নির্ধারিত স্থানে এসে উপস্থিত হব। আমি এ প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে গেলাম। তিনদিন পরে আমার স্মরণ হলো। এসে দেখলাম, তিনি সে নির্দিষ্ট স্থানেই আছেন। আমাকে দেখে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তুমি আমাকে খুব বিপদে ফেলেছিলে। আমি তিনদিন যাবৎ তোমার অপেক্ষা করছি। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن عبدِ الله بن أبي الحَسْماءِ قَالَ: بَايَعْتُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَبْلَ أَنْ يُبْعَثَ وَبَقِيَتْ لَهُ بَقِيَّةٌ فَوَعَدْتُهُ أَنْ آتِيَهُ بِهَا فِي مَكَانِهِ فَنَسِيتُ فَذَكَرْتُ بَعْدَ ثَلَاثٍ فَإِذَا هُوَ فِي مَكَانِهِ فَقَالَ: «لَقَدْ شَقَقْتَ عَلَيَّ أَنَا هَهُنَا مُنْذُ ثَلَاثٍ أنتظرك» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘আবদুল কারীম’’ নামের বর্ণনাকারী মাজহূল বা অপরিচিত।
ব্যাখ্যাঃ (بَايَعْتُ النَّبِىُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ) আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট থেকে কিছু কিনেছি নুবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে এবং উক্ত ক্রয়কৃত বস্তুর কিছু মূল্য বাকী ছিল। আমি তাকে ওয়া‘দা দিয়েছিলাম যে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট স্থানে তার নিকট আসব এবং তা পরিশোধ করে দিব। কিন্তু আমি সেই ওয়া‘দার কথা ভুলে গিয়েছিলাম। তিনদিন পর আমার স্মরণ হলে আমি সঙ্গে সঙ্গে উক্ত স্থানে এসে দেখি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত স্থানে অবস্থান করছেন। এখানে থেকে বুঝা যায় ওয়া‘দা বাস্তবায়ন এবং তা পূর্ণ করা মুস্তাহাব।
(فَقَالَ:لَقَدْ شَقَقْتَ) অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি আমাকে কষ্টে ফেলে দিয়েছ। আমি এখানে তিনদিন থেকে অপেক্ষা করছি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ থেকে উক্ত স্থানে উপস্থিত থাকা মূল্য প্রাপ্তির জন্য ছিল না, সেটা ছিল প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ জেনে রাখা ভালো যে, ওয়া‘দা রক্ষা করার ব্যাপারে প্রত্যেক ধর্মেই নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পূর্ববর্তী সকল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা হিফাযাত করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ وَإِبْرَاهِيمَ الَّذِي وَفّٰى ‘‘আর ইব্রাহীমের (কিতাবের খবর) যে (ইব্রাহীম) ছিল পুরোপুরি দায়িত্ব পালনকারী’’- (সূরাহ্ আন্ নাজম ৫৩ : ৩৭)। তার ছেলে ইসমা‘ঈল (আ.) -এর প্রশংসা করে বলেন- إِنَّه كَانَ صَادِقَ الْوَعْدِ ‘‘...সে ছিল ওয়া‘দা রক্ষায় (দৃঢ়) সত্যবাদী...’’- (সূরাহ্ মারইয়াম ১৯ : ৫৪)। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ সকল ‘আলিম এ ব্যাপারে একমত যে, যদি কেউ কারো সাথে এমন বিষয়ের ওয়া‘দা করে যা হারাম নয় তা পালন করা উচিত। এটা কি ওয়াজিব না মুস্তাহাব- এ ব্যাপারে মতবিরোধ রয়েছে, ইমাম শাফি‘ঈ এবং আবূ হানীফাহ্ (রহিমাহুমাল্লাহ) এবং জামহূর ‘আলিমের মতে এটা মুস্তাহাব। যদি ছেড়ে দেয় তাহলে তার ফাযীলাত ছুটে যাবে এবং সে কঠিন মাকরূহ কাজ করবে তবে গুনাহগার হবে না।
আবার একদল ‘আলিমের মতে এটা ওয়াজিব। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৯৮৮)
পরিচ্ছেদঃ ১১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ওয়া‘দা বা প্রতিশ্রুতি
৪৮৮১-[৪] যায়দ ইবনু আরকাম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যখন কোন ব্যক্তি তার কোন ভাইয়ের সাথে কোন বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেয়, আর তার এ অভিপ্রায় থাকে যে, সে প্রতিশ্রুতি পালন করবে। অতঃপর কোন কারণবশতঃ প্রতিশ্রুতি পালন করতে পারল না এবং সময় মতো এলো না, তবে তার পাপ হবে না। (আবূ দাঊদ ও তিরমিযী)[1]
وَعَن زيد بن أَرقم عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِذَا وَعَدَ الرَّجُلُ أَخَاهُ وَمِنْ نِيَّتِهِ أَنْ يَفِيَ لَهُ فَلَمْ يَفِ وَلِمَ يَجِئْ لِلْمِيعَادِ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالتِّرْمِذِيُّ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘আবুল নু‘মান ও আবূ ওয়াক্কাস’’ নামে দু’জন মাজহূল বা অপরিচিত বর্ণনাকারী আছে। দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ১৪৪৭ নং হাদীসের আলোচনা দ্রঃ। আল মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ৪৯৪০, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২১৩৫৯।
ব্যাখ্যাঃ (إِذَا وَعَدَ الرَّجُلُ أَخَاهُ وَمِنْ نِيَّتِه أَنْ يَفِيَ) যদি কোন ব্যক্তি তার ভাইয়ের সাথে কোন ব্যাপারে ওয়া‘দা করে থাকে আর তা পালন করার নিয়্যাতও রাখে কিন্তু কোন কারণবশতঃ তা পালন করতে না পারে এবং উক্ত ওয়া‘দার স্থানে পৌঁছতে না পারে তাহলে তার কোন গুনাহ হবে না।
এ হাদীসের শিক্ষা হলো, কেউ যদি খাঁটিভাবে নিয়্যাত করে তাহলে উক্ত ওয়া‘দা কোন কারণে পালন করতে না পারে তাহলেও সে সাওয়াব পাবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ওয়া‘দা বা প্রতিশ্রুতি
৪৮৮২-[৫] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমার মা আমাকে ডাকলেন, তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের ঘরে বসা ছিলেন। মা বললেনঃ এদিকে এসো, তোমাকে কিছু দেব। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাকে বললেনঃ তুমি তাকে কি দিতে ইচ্ছা করেছ? তিনি বললেনঃ আমি তাকে একটি খেজুর দিতে ইচ্ছা করেছি। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেনঃ সাবধান! যদি তুমি তাকে কিছু না দিতে, তবে তোমার ’আমলনামায় একটি মিথ্যা কথা লেখা হত। (ইমাম আবূ দাঊদ এবং বায়হাক্বী’ ’’শু’আবুল ঈমানে’’ বর্ণনা করেছেন।)[1]
وَعَن عبدِ الله بن عامرٍ قَالَ: دَعَتْنِي أُمِّي يَوْمًا وَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَاعِدٌ فِي بَيْتِنَا فَقَالَتْ: هَا تَعَالَ أُعْطِيكَ. فَقَالَ لَهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا أَرَدْتِ أَنْ تُعْطِيهِ؟» قَالَتْ: أَرَدْتُ أَنْ أُعْطِيَهُ تَمْرًا. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَمَا إِنَّكِ لَوْ لَمْ تُعْطِيهِ شَيْئًا كُتِبَتْ عَلَيْكِ كَذِبَةٌ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ»
ব্যাখ্যাঃ (دَعَتْنِي) আমাকে ডাকলেন। (وَرَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَاعِدٌ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন আমাদের ঘরে বলছিলেন। সে বাক্যটি অবস্থামূলক ব্যাখ্যা করছে। (فَقَالَتْ: هَا) অতঃপর বললেন, নাও গ্রহণ কর। هَا শব্দটি সতর্কমূলক হিসেবে ব্যবহৃত।
(تَعَالَ) ‘আসো’ শব্দটি কথাকে আরো জোড়ালো করেছে। (أُعْطِيكَ) আমি তোমাকে কিছু দিব। (مَا أَرَدْتِ أَنْ تُعْطِيهِ؟) তুমি তাকে কি জিনিস দিতে চাচ্ছ? (أَمَا إِنَّكِ لَوْ لَمْ تُعْطِيهِ شَيْئًا) সাবধান! তুমি যদি তাকে কিছুই না দাও। এ বাক্যে أَمَا শব্দটি সতর্কমূল হিসেবে ব্যবহৃত। (كُتِبَتْ عَلَيْكِ كَذِبَةٌ) তাহলে তোমাকে মিথ্যাবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করা হবে অথবা এক প্রকার মিথ্যার আশ্রয় নিবে।
এ হাদীসের শিক্ষা হলো : সন্তান কান্নাকাটি করার সময় মানুষ মুখে যা বলে, যেমন কোন কিছু দেয়া মিথ্যা আশ্বাস অথবা ভয়-ভীতি দেখানো ইত্যাদি হারাম মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৯৮৩)
পরিচ্ছেদঃ ১১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ওয়া‘দা বা প্রতিশ্রুতি
৪৮৮৩-[৬] যায়দ ইবনু আরকাম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যদি কোন ব্যক্তি কারো সাথে ওয়াদা করে, তন্মধ্যে একজন সালাতের সময় পর্যন্ত না আসে, তখন যে ব্যক্তি যথাসময়ে এসেছে, সে যদি যথাসময়ে সালাতে চলে যায়, তবে তার কোন পাপ হবে না। (রযীন)[1]
عَنْ زَيْدِ بْنِ أَرْقَمَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ وَعَدَ رَجُلًا فَلَمْ يَأْتِ أَحَدُهُمَا إِلَى وَقْتِ الصَّلَاةِ وَذَهَبَ الَّذِي جَاءَ لِيُصَلِّيَ فَلَا إِثمَ عليهِ» . رَوَاهُ رزين
পরিচ্ছেদঃ ১২. প্রথম অনুচ্ছেদ - ঠাট্টা ও কৌতুক প্রসঙ্গে
শার’ঈ ঠাট্টা ও কৌতুকের কতিপয় শর্ত আছে :
১। ঠাট্টা ও কৌতুক করার সময় সামান্য পরিমাণেও দীনকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা যাবে না। কারণ এটি হলো ইসলাম ভঙ্গের কারণ। মহান আল্লাহ বলেনঃ
وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ قُلْ أَبِاللهِ وَآيَاتِه وَرَسُولِه كُنْتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ ৬৫ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ
’’তাদেরকে জিজ্ঞেস করলে তারা জোর দিয়েই বলবে, ’আমরা হাস্য রস আর খেল-তামাশা করছিলাম।’ বল, ’আল্লাহ, তাঁর আয়াত ও তাঁর রসূলকে নিয়ে তোমরা বিদ্রূপ করছিলে?’ ওযর পেশের চেষ্টা করো না, ঈমান আনার পর তোমরা কুফরী করেছ...।’’ (সূরাহ্ আত্ তওবা্ ৯ : ৬৫-৬৬)
ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ্ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ’’মহান আল্লাহ, তাঁর আয়াত ও তাঁর রসূলকে নিয়ে ঠাট্টাকারী ব্যক্তি ঈমান আনার পরে কাফির হয়ে যায়।’’
অনুরূপভাবে কতিপয় সুন্নাতকে নিয়েও ঠাট্টা করার ব্যাপারটি, যা খুবই বিস্তার লাভ করেছে। যেমন- দাড়ি, পর্দা ও টাকনুর উপর কাপড় পরিধান করা ইত্যাদি।
(المجموع الثمين) ’’আল মাজমূ’উস্ সামীন’’ কিতাবের ১/৬৩ পৃষ্ঠায় শায়খ মুহাম্মাদ ইবনু উসায়মীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ রব, রিসালাত, ওয়াহী ও দীনের কোন বিষয় নিয়ে ঠাট্টা ও কৌতুক করা হারাম। ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা বা কাউকে হাসানোর জন্য এরূপ কাজ করা কারো জন্যে বৈধ নয়। যদি কেউ এরূপ করে তবে সে কাফির। কারণ সে মূলত আল্লাহ, তাঁর রসূল, তাঁর কিতাব ও তার শারী’আত নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করল। উপরোক্ত কেউ এরূপ কাজ করে ফেললে, তার কর্মের কারণে তাকে মহান আল্লাহর নিকট তওবা্ করতে হবে। কারণ এটি এক প্রকারের নিফাক (মুনাফিক্বী)। তার উচিত হলো মহান আল্লাহর কাছে তওবা্ করা, ইসতিগফার করা, তার কাজকে শুধরে নেয়া, তার অন্তরে মহান আল্লাহর ভয় রাখা, তাকে সম্মান করা, ভয় করা ও তাকে ভালোবাসা।
২। ঠাট্টা ও কৌতুক সত্য হতে হবে : রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ وَيْلٌ لِلَّذِي يُحَدِّثُ فَيَكْذِبُ لِيُضْحِكَ بِهِ الْقَوْمَ، وَيْلٌ لَهٗ وَيْلٌ لَهٗ ঐ ব্যক্তির জন্য দুর্ভোগ! যে জাতিকে হাসানোর জন্য মিথ্যা কথা বলে। তার জন্য দুর্ভোগ। সুতরাং এ মারাত্মক অপরাধ থেকে বিরত রাখাই হলো রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উদ্দেশ্য। (আবূ দাঊদ হাঃ ৪৯৯০ : হাসান)
৩। ভয় দেখানো যাবে না : বিশেষ করে শক্তিশালী ব্যক্তি দুর্বলকে অথবা হাতে অস্ত্র নিয়ে অথবা লোহার টুকরা নিয়ে অথবা লাঠি নিয়ে কোন ব্যক্তিকে ঠাট্টা ও কৌতুক করা যাবে না। কারণ এতে করে তারা ভীত হয়ে পড়ে। আবূ লায়লা (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথীরা (সাহাবীরা) আমাদেরকে হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, তারা একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সফর করেছিলেন। এমন সময় তাদের মধ্যকার এক লোক ঘুমিয়ে পড়লে তাদের কেউ কেউ গিয়ে একটা রশি এনে ঐ লোকের সামনে ধরলে সে ভয় পেয়ে যায়। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
لَا يَحِلُّ لِمُسْلِمٍ أَنْ يُرَوِّعَ مُسْلِمًا কোন মুসলিমকে ভয় দেখানো কোন মুসলিমের জন্য বৈধ নয়। (আবূ দাঊদ হাঃ ৫০০৪ : সহীহ)
৪। ঠাট্টা-বিদ্রূপ কটাক্ষ ও দুর্নাম না করা : মানুষের স্তর বহু রকমের হয়। এটা হয় তার জ্ঞানের দিক থেকে ব্যক্তিত্বের দিক থেকে। কতক মানুষ মনের দিক থেকে দুর্বল হয়। নিজের চেয়ে কম বুদ্ধিসম্পন্ন ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লোকের সাথে মানুষ ঠাট্টা-বিদ্রূপ ও কটাক্ষ করে। অথচ এ থেকে মহান আল্লাহ সতর্ক ও সাবধান করেছেন- দেখুন, সূরাহ্ আল হুজুরাত ১১নং আয়াত।
يٰاَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِنْ قَوْمٍ عَسٰى أَنْ يَكُونُوا خَيْرًا مِنْهُمْ وَلَا نِسَاءٌ مِنْ نِسَاءٍ عَسٰى أَنْ يَكُنَّ خَيْرًا مِنْهُنَّ وَلَا تَلْمِزُوا أَنْفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ بِئْسَ الِاسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الْإِيمَانِ
’’হে মু’মিনগণ! কোন সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে ঠাট্টা-বিদ্রূপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রূপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর নারীরা যেন অন্য নারীদেরক ঠাট্টা-বিদ্রূপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রূপকারিণীদের চেয়ে উত্তম। তোমরা একে অন্যের নিন্দা করো না, একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। ঈমান গ্রহণের পর (ঈমানের আগে কৃত অপরাধকে যা মনে করিয়ে দেয় সেই) মন্দ নাম কতই না মন্দ!...’’ (সূরাহ্ আল হুজুরাত ৪৯ : ১১)
এ আয়াতের তাফসীরে ইমাম ইবনু কাসীর (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ আয়াত থেকে উদ্দেশ্য হলো তাদেরকে তুচ্ছ মনে করা, হেয় পতিপন্ন করা ও ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা। আর এগুলো হারাম যা মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে গণ্য হবে।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঠাট্টা-বিদ্রূপ তথা উপহাস ও কষ্ট দেয়া থেকে সাবধান করেছেন, কারণ তা শত্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেষের রাস্তা, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
...الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ، لَا يَظْلِمُهٗ وَلَا يَخْذُلُهٗ، وَلَا يَحْقِرُهُ التَّقْوٰى هَاهُنَا وَيُشِيرُ إِلٰى صَدْرِهِ ثَلَاثَ مَرَّاتٍبِحَسْبِ امْرِئٍ مِنَ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ، كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ، دَمُهٗ، وَمَالُهٗ، وَعِرْضُهٗ
...এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে তাকে জুলুম করবে না। তাকে লাঞ্ছিত ও তুচ্ছ মনে করবে না। তাকওয়া এখানে থাকে। এ বলে তিনি তার বুকের দিকে তিনবার ইশারা করলেন। কোন লোকের খারাপ হওয়ার জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, সে তার মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ মনে করবে। প্রত্যেক মুসলিম একে অন্যের উপর হারাম, তার রক্ত, তার সম্পদ ও তার সম্মান হরণ করা। (মুসলিম হাঃ ৩২-[২৫৬৪])
৫। ঠাট্টা ও কৌতুক বেশি পরিমাণে না করা : কিছু মানুষ অতিরিক্ত ঠাট্টা ও কৌতুক করে। এর ফলে সে মানুষের নিকট মূল্যহীন হয়ে পড়ে। অথচ এটি একজন মু’মিনের বৈশিষ্ট্য নয়। আত্মার প্রশান্তির জন্য ও সুস্থ বিনোদনের জন্য এর অনুমোদন আছে। ’উমার ইবনু ’আবদুল ’আযীয (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ "اتقوا المزاح، فإنه حمقة تورث الضعينة" ’তোমরা ঠাট্টা ও কৌতুক থেকে সাবধান থাক, কেননা তা হলো নির্বুদ্ধিতা, যা বিদ্বেষ ও শত্রুতা ছড়িয়ে দেয়।
৬। মানুষের পরিমাপ জানা : কতক মানুষ বাছ-বিচার না করেই সবার সাথে ঠাট্টা ও কৌতুক করে। অথচ জ্ঞানী ব্যক্তির (’আলিমের) হক আছে, বড় মানুষের হক আছে, মুরুববী মানুষেরও হক আছে। এজন্য মানুষের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আগে জানা উচিত। বোকা, নির্বোধ ও পাগলের সাথে ঠাট্টা করা উচিত নয়। অনুরূপভাবে অপরিচিত ব্যক্তির সাথেও। এ বিষয়ে ’উমার ইবনু ’আবদুল ’আযীয (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ
"اتقوا المزاح، فإنه يذهب المروءة" ’’তোমরা ঠাট্টা ও কৌতুক থেকে সাবধান থাক, কেননা তা ব্যক্তিত্বকে নিয়ে যায়।’’
সা’দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস বলেন,
"إقتصر فى مزاحك، فإن الإفراط فيه يذهب البهاء، ويجرىّ عليك السفهاء"
’তুমি ঠাট্টা ও কৌতুক কম কর, কেননা তা বেশি করা সৌন্দর্য ও জ্যোতিকে নিয়ে যায়। আর তোমাকে নির্বুদ্ধিতার উপর ছেড়ে যায়।’
৭। ঠাট্টা ও কৌতুকের পরিমাণ তরকারীতে লবণের পরিমাণের মত হবে : এ বিষয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ لا تكثر الضحك فإن كثرة الضحك تميت القلب ’তোমরা বেশি বেশি হাসিও না, কারণ অতিরিক্ত হাসি অন্তরকে মেরে ফেলে।’ (সহীহুল জামি’ ৭৪৩৫)
৮। ঠাট্টা ও কৌতুকের মাঝে গীবত না থাকা : এটা একটা অপবিত্র রোগ। কিছু মানুষ এটা ঠাট্টা-বিদ্রূপের ছলে করে বসে। তবুও এটা গীবত হবে। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهٗ ’তোমার ভাইয়ের এমন বিষয় উল্লেখ করা যা সে অপছন্দ করে।’ (মুসলিম হাঃ ৭০-[২৫৮৯])
৯। ঠাট্টা ও কৌতুক করার জন্য একটি উপযোগী সময় নির্বাচন করা : সেটা হতে পারে শীতকালীন ছুটি অথবা গ্রীষ্মকালীন ছুটি অথবা বন্ধুর সাথে সাক্ষাতের সময়। তার সাথে বুদ্ধি খাটিয়ে, আশ্চর্যজনক বিষয়ে যাতে চিন্তার খোরাক থাকে এমন সামান্য পরিমাণে ঠাট্টা ও কৌতুক করবে। যাতে করে অন্তরে ভালোবাসা বৃদ্ধি হয় এবং মনে আনন্দ হয়।
(বিস্তারিত দেখুন : ’আবদুল মালিক আল কাসিম-এর ’’মা হিয়া শুরুত্বুল মিযাহিশ্ শার’ঈ’’ নামক প্রবন্ধটি, অনলাইন থেকে সংগৃহীত, সম্পাদক)
৪৮৮৪-[১] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সাথে উৎফুল্ল মেজাজ ও সম্প্রীতি প্রদর্শন করতেন। এমনকি আমার ছোট ভাইকেও জিজ্ঞেস করতেন : হে আবূ ’উমায়র! তোমার ছোট্ট বুলবুলি কি করল? ’উমায়র-এর একটি ছোট্ট বুলবুল পাখি ছিল। সে সেটা নিয়ে খেলা করত। পাখিটি মরে গিয়েছিল। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْمُزَاحِ
عَن أنس قَالَ: إِنْ كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَيُخَالِطُنَا حَتَّى يَقُولَ لِأَخٍ لِي صَغِيرٍ: «يَا أَبَا عُمَيْرٍ مَا فَعَلَ النُّغَيْرُ؟» كَانَ لَهُ نُغَيْرٌ يَلْعَبُ بِهِ فَمَاتَ. مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ (كَانَ النَّبِىُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَيُخَالِطُنَا) অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সাথে উঠাবসা করতেন এবং আমাদের সাথে সামাজিক আচার-আচরণ করতেন। আর আমাদের সাথে বসে হাস্য-কৌতুক করতেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(لِأَخٍ لِي صَغِيرٍ) এখানে আবূ ‘উমায়র (রাঃ) হলেন আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)-এর বৈপিত্রেয় ভাই। অর্থাৎ মা এক, আর পিতা দু‘জন। মুসনাদে আহমাদের এক বর্ণনায় আছে, وكان لها من أبي طلحة ابن يكنى أبا عمير অর্থাৎ আনাস (রাঃ)-এর মা উম্মু সুলায়ম (রাঃ)-এর স্বামী তথা আনাস (রাঃ)-এর পিতা মারা গেলে তিনি দ্বিতীয়বার আবূ ত্বলহাহ্ (রাঃ)-এর সাথে বিয়ে করলে আবূ ‘উমায়র উপনামে এক সন্তান হয়।
(ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬২০৩)
(مَا فَعَلَ النُّغَيْرُ؟) نُغَيْرُ (নুগায়র) শব্দটি نغر-এর তাসগীর বা ক্ষুদ্রকরণ। এটা একটা পাখির নাম যা চড়ুই পাখির সাথে সাদৃশ্য রাখে। তবে তার ঠোট লাল রংয়ের। বলা হয়েছে যে, এটা চড়ুই পাখির নাম। এও বলা হয়েছে যে, এটা চড়ুই পাখি যার ঠোট ছোট আর মাথা লাল। বলা হয়েছে যে, মদীনাবাসী একে বুলবুল নামে ডাকে। বাক্যটির অর্থ হলো নুগায়র কোথায় চলে গেল যে, আমি তাকে তোমার সাথে দেখছি না।
বুখারী মুসলিমের বর্ণনায় আছে যে, নুগায়র নামের পাখিটির সাথে সে খেলত। তবে পাখিটি মারা গিয়েছিল। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ কথাটি ছিল তার জন্য সান্তবনাস্বরূপ, কারণ সে পাখিটিকে হারিয়ে ব্যথিত ছিল। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনাস -এর পরিবারের সাথে এমনভাবে মিশেছিলেন যে, তাদের পরিবারের সকলের খোঁজ-খবর রাখতেন। একটা ছোট ছেলে কি নিয়ে খেলে তিনি তারও খোঁজ রাখতেন। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৯৮৯)
হাদীসটির বাস্তবিক শিক্ষা : হাদীসের মধ্যে অনেক শিক্ষা রয়েছে, তন্মধ্যে-
১। সন্তান না থাকলেও উপনাম ব্যবহার করা জায়িয। ২। শিশু সন্তানের উপনাম রাখলে মিথ্যা হবে না- (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৯৬১)। ৩। খাদেমের/কর্মচারীর পরিবারের খোঁজ-খবর রাখার শিক্ষা পাওয়া যায়। ৪। ছোটদের আনন্দিত করার জন্য ন্যায়সঙ্গত ঠাট্টা ও কৌতুক করা দোষণীয় নয়, বরং সম্পূর্ণভাবে বৈধ। ৫। কথা বলার সময় ছন্দ মিলিয়ে কথা বলাতে দোষের কিছু নেই। (সম্পাদক)
পরিচ্ছেদঃ ১২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ঠাট্টা ও কৌতুক প্রসঙ্গে
৪৮৮৫-[২] আবূ হুরায়রা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রসূল! আপনি আমাদের সাথে কৌতুকপূর্ণ কথাবার্তা বলছেন? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হ্যাঁ, (এ কৌতুকপূর্ণ কথাবার্তার মধ্যেও) আমি সত্য কথাই বলছি। (তিরমিযী)[1]
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّكَ تُدَاعِبُنَا. قَالَ: «إِنِّي لَا أَقُولُ إِلَّا حَقًا» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ (إِنَّكَ تُدَاعِبُنَا) الدعابة মাসদার থেকে تُدَاعِبُنَا শব্দটি গঠিত। অর্থাৎ আপনি আমাদের সাথে কৌতুকপূর্ণ কথাবার্তা বলছেন? এ প্রসঙ্গে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এক বৃদ্ধা মহিলাকে বলেছিলেন, لَا تَدْخُلُ الْجَنَّةَ عَجُوزٌ অর্থাৎ ‘জান্নাতে কোন বৃদ্ধা মহিলা প্রবেশ করবে না।’ (হাদীসটি হাসান, গয়াতুল মারাম ৩৭৫নং)
হাদীসটির অর্থ হলো জান্নাতে প্রবেশ করার সময় কোন ব্যক্তি বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা থাকবে না। বাহ্যিকভাবে মনে হচ্ছে যেন বৃদ্ধা জান্নাতে যেতে পারবে না। এটাই ছিল রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কৌতুক। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৯৯০)
(إِنِّي لَا أَقُولُ إِلَّا حَقًا) অর্থাৎ আমি ন্যায় ও সত্য কথা বলি। কথা ও কাজে পদস্খলন থেকে আমাকে রক্ষা করার কারণে। আর তোমাদেরকে রক্ষা না করার কারণে তোমাদের কেউ এই সীমাবদ্ধতার উপর ক্ষমতাবান নও। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৯৯০)
হাদীসটির বাস্তবিক প্রয়োগ : ন্যায়ের উপর অটল অবিচল থেকে কৌতুক করা যায়। কিন্তু কোনটা ন্যায় যার উপর অটল থেকে কৌতুক করা বৈধ হবে, এরূপ বাছ-বিচার করার মতো জ্ঞানী ব্যক্তি খুবই কম আছে। তাই ঢালাওভাবে কোন বাছ-বিচার না করে শারী‘আতকে অবমূল্যায়ন করে যারা ঠাট্টা ও কৌতুক করেন, তারা নিঃসন্দেহে অপরাধ করেন। এ অপরাধ কখনো কুফরীর পর্যায়ে পৌঁছে। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ১২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ঠাট্টা ও কৌতুক প্রসঙ্গে
৪৮৮৬-[৩] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে সওয়ারী চাইল। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আমি তোমার সওয়ারীর জন্য উষ্ট্রীর বাচ্চা দান করব। তখন লোকটি বলল, আমি উষ্ট্রীর বাচ্চা দিয়ে কি করব? অতঃপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ উট তো উষ্ট্রী-ই প্রসব করে। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن أنسٍ أَنَّ رَجُلًا اسْتَحْمَلَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «إِنِّي حَامِلُكَ عَلَى وَلَدِ نَاقَةٍ؟» فَقَالَ: مَا أَصْنَعُ بِوَلَدِ النَّاقَةِ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «وَهَلْ تَلِدُ الْإِبِلُ إِلَّا النُّوقُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ (مَا أَصْنَعُ بِوَلَدِ النَّاقَةِ؟) মোটা বুদ্ধির সাধারণ মানুষ উটের বাচ্চা বলতে ছোট উট বুঝে, যার উপর আরোহণ করা যায় না। মূলত রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেটা বোঝাননি। তিনি একটি আরোহণযোগ্য পরিণত উটের কথা বুঝিয়েছেন। তবে লোকটি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অর্থ বুঝতে ভুল করেছে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৯৯০)
(هَلْ تَلِدُ الْإِبِلُ إِلَّا النُّوقُ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি তোমাকে সওয়ারীর জন্য একটি উটের বাচ্চা দিব। তখন লোকটি একটু অসন্তুষ্ট হলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বুঝিয়ে দিলেন যে, উট বড় হয়ে গেলেও তো উটেরই বাচ্চা। বাচ্চা বলতে যে ছোট উটই উদ্দেশ্য হবে এমন নয়। বড় উটও হতে পারে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথে সে সত্য কথাই বলেছেন, সেটা তিনি বড় উট ও ছোট উট দ্বারা বুঝিয়ে ছিলেন।
‘আল্লামা বায়জূরী (রহিমাহুল্লাহ) ‘শারহুশ শামায়িল’ গ্রন্থে বলেনঃ এর অর্থ হলো যদি তুমি আমার কথার অর্থ চিন্তা-ভাবনা করে কথা বলতে, তবে এরূপ কথা বলতে পারতে না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ কথায় ইঙ্গিত আছে যে, যে ব্যক্তি কোন কথা শুনবে তার উচিত হলো ভালোভাবে চিন্তা-ভাবনা করে উত্তর দেয়া। শুনেই তাড়াহুড়া না করে উত্তর দেয়া উচিত। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৯৯০)
হাদীসটির বাস্তবিক শিক্ষা : আজকে ইন্টারনেটের যুগে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, কিছু বক্তার বক্তব্যকে ছোট করে অংশ বিশেষ জাতির সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আর সাধারণ জনগণ না বুঝেই, আগে-পিছে, না শুনেই এক-একটা মন্তব্য করে বসে। কেউ কাফির পর্যন্ত বলে গালি-গালাজ করে বসে। আবার কেউ ‘আলিমদের ব্যঙ্গ চিত্র তৈরি করে মন্তব্য করছে। যেগুলো কাবীরাহ্ গুনাহের শামিল। অথচ যদি মন্তব্যকারী বক্তার কথা সম্পূর্ণ শুনে চিন্তা-ভাবনা করত তবে এরূপ মন্তব্য করা সম্ভব ছিল না। (সম্পাদক)
পরিচ্ছেদঃ ১২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ঠাট্টা ও কৌতুক প্রসঙ্গে
৪৮৮৭-[৪] উক্ত রাবী [আনাস (রাঃ)] হতে বর্ণিত। একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেনঃ হে দু’ কর্ণধারী! (আবূ দাঊদ ও তিরমিযী)[1]
وَعَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَهُ: «يَا ذَا الْأُذُنَيْنِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالتِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ (يَا ذَا الْأُذُنَيْنِ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনাস (রাঃ)-কে সুন্দরভাবে মনোযোগ সহকারে শোনার জন্য উৎসাহিত ও সতর্ক সাবধান করেছেন। কারণ কানের কাজ হলো মনোযোগ দিয়ে শোনা। আল্লাহ যাকে দু’টি কান দিয়েছেন, আর সে মনোযোগ দিয়ে না শুনে অন্যমনষ্ক থাকে তার কোন ওযর-আপত্তি নেই। এটাও বলা হয়েছে যে, এ বাক্যটির অর্থ হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কৌতুক করে আনাস (রাঃ)-কে কথাটি বলেছিলেন। এটা ছিল তার কোমল চরিত্রের নমুনা। নিহায়াহ্ গ্রন্থকার এরূপ বলেছেন।
(তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৯৯১, ‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৯৯৪)
পরিচ্ছেদঃ ১২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ঠাট্টা ও কৌতুক প্রসঙ্গে
৪৮৮৮-[৫] উক্ত রাবী [আনাস (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক বৃদ্ধা মহিলাকে বললেনঃ কোন বৃদ্ধা জান্নাতে যাবে না। বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করল, কি কারণে বৃদ্ধারা জান্নাতে যাবে না? অথচ এ বৃদ্ধা মহিলা কুরআন পাঠ করেছিল। তখন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ তুমি কি কুরআনের এ আয়াত পাঠ করনি- إِنَّا أَنْشَأْنَاهُنَّ إِنشاءً فَجَعَلْنَاهُنَّ أَبْكَارًا অর্থাৎ- ’’তাদেরকে (অর্থাৎ ঐ হূরদেরকে) আমি সৃষ্টি করেছি এক অভিনব সৃষ্টিতে’’- (সূরাহ্ আল ওয়াক্বি’আহ্ ৫৬ : ৩৫)। (রযীন; আর শারহুস্ সুন্নাহ্ গ্রন্থে মাসাবীহের উদ্ধৃতিতে বর্ণিত)[1]
وَعَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لِامْرَأَةٍ عَجُوزٍ: «إِنَّهُ لَا تَدْخُلُ الْجَنَّةَ عَجُوزٌ» فَقَالَتْ: وَمَا لَهُنَّ؟ وَكَانَتْ تَقْرَأُ الْقُرْآنَ. فَقَالَ لَهَا: «أَمَا تَقْرَئِينَ الْقُرْآنَ؟ (إِنَّا أَنْشَأْنَاهُنَّ إِنشاءً فجعلناهُنَّ أَبْكَارًا)
رَوَاهُ رَزِينٌ. وَفِي
شَرْحِ السُّنَّةِ» بِلَفْظِ «الْمَصَابِيحِ»
ব্যাখ্যাঃ (قَالَ لِامْرَأَةٍ عَجُوزٍ) বলা হয়েছে যে, এই বৃদ্ধা মহিলার নাম সফিয়্যাহ্ বিনতু ‘আবদুল মুত্ত্বালিব। যিনি যুবায়র ইবনু ‘আও্ওয়াম (রাঃ)-এর মা এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ফুফু। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(لَا تَدْخُلُ الْجَنَّةَ عَجُوزٌ. فَقَالَتْ: وَمَا لَهُنَّ؟) অর্থাৎ বৃদ্ধা মহিলাগণ কোন কারণে জান্নাতে যেতে পারবে না অথচ তারা মু’মিনাদের অন্তর্ভুক্ত? অর্থাৎ তাদেরও তা সাধারণ যুবতী মু’মিনা নারীদের সাথে জান্নাতের যাওয়ার কথা। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(فَقَالَ لَهَا:أَمَا تَقْرَئِينَ الْقُرْآنَ؟) অর্থাৎ বৃদ্ধা মহিলার প্রশ্নের উত্তরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে প্রশ্ন করেন। তুমি কি কুরআন পড় না? পবিত্র কুরআন মাজীদেই তো তোমার প্রশ্নের উত্তর আছে। তা হলো মহান আল্লাহ বলেন, إِنَّا أَنْشَأْنَاهُنَّ إِنْشَاءً فَجَعَلْنَاهُنَّ أَبْكَارًا ‘‘তাদেরকে (অর্থাৎ ঐ হূরদেরকে) আমি সৃষ্টি করেছি এক অভিনব সৃষ্টিতে’’- (সূরাহ্ আল ওয়াক্বি‘আহ্ ৫৬ : ৩৫)।
মহিলাদেরকে কিভাবে কুমারী করা হবে তার ২টি ব্যাখ্যা আছে। ১. যখনই তাদের স্বামীরা তাদের কাছে সহবাসের জন্য আসবে তখনই তাদেরকে কুমারী পাবে। আর ২. আল্লাহ পরকালে তাদেরকে নব যৌবন দান করবেন। যাতে তারা হূরদের চেয়ে সুন্দরী হয়ে যাবে। আর সে সকল মহিলার কয়েকজন স্বামী থাকবে তাদেরকে সবচেয়ে উত্তম চরিত্রবান স্বামীকে বেছে নেয়ার জন্য স্বাধীনতা দেয়া হবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ঠাট্টা ও কৌতুক প্রসঙ্গে
৪৮৮৯-[৬] উক্ত রাবী [আনাস (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’’যাহির ইবনু হারাম’’ নামক এক বনভূমির বাসিন্দা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য বনভূমি থেকে উপঢৌকন হিসেবে কিছু নিয়ে আসত। সে যখন চলে যাওয়ার মনস্থ করত, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পথের সম্বল গোছগাছ করে দিতেন। একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সম্পর্কে বললেনঃ যাহির আমাদের জন্য বনভূমির গোমস্তা, আর আমরা তার শহরের গোমস্তা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ভালোবাসতেন। সে ছিল দেখতে কুৎসিত। একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাজারে এলেন, তখন যাহির তার পণ্য সামগ্রী বিক্রি করছিল। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পিছন থেকে তাকে বুকে চেপে ধরলেন, ফলে সে তাঁকে দেখতে পেল না। যাহির বলল : কে? আমাকে ছেড়ে দাও। সে আড়চোখে লক্ষ্য করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে চিনতে পারল। তখন সে তার পিঠকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বুকের সাথে বারাকাতের জন্য মিলাতে চেষ্টা করে সফল হলো। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতে লাগলেন, ’’গোলাম কিনবে কে?’’ যাহির এটা শুনে বলল : হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহর কসম, আপনি আমাকে অকেজো পাবেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কিন্তু আল্লাহ তা’আলার নিকট তুমি অকেজো নও। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
وَعَنْهُ أَنَّ رَجُلًا مِنْ أَهْلِ الْبَادِيَةِ كَانَ اسْمه زَاهِر بن حرَام وَكَانَ يهدي النَّبِي صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ الْبَادِيَةِ فَيُجَهِّزُهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا أَرَادَ أَنْ يَخْرُجَ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ زَاهِرًا بَادِيَتُنَا وَنَحْنُ حَاضِرُوهُ» . وَكَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُحِبُّهُ وَكَانَ دَمِيمًا فَأَتَى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمًا وَهُوَ يَبِيعُ مَتَاعَهُ فَاحْتَضَنَهُ مِنْ خلفِه وَهُوَ لَا يُبصره. فَقَالَ: أَرْسِلْنِي مَنْ هَذَا؟ فَالْتَفَتَ فَعَرَفَ النَّبِيَّ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسلم فَجعل لَا يألوا مَا أَلْزَقَ ظَهْرَهُ بِصَدْرِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حِينَ عَرَفَهُ وَجَعَلَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَنْ يَشْتَرِي الْعَبْدَ؟» فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِذًا وَاللَّهِ تَجِدُنِي كَاسِدًا فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَكِنْ عِنْدَ اللَّهِ لَسْتَ بِكَاسِدٍ» رَوَاهُ فِي «شرح السّنة»
ব্যাখ্যাঃ (أَنَّ رَجُلًا مِنْ أَهْلِ الْبَادِيَةِ) ‘‘আল ইস্তী‘আব’’ গ্রন্থে আছে যে, লোকটি হিজাযের অধিবাসী ছিল, তবে তিনি বনভূমিতে বাস করতেন। ইবনু হাজার ‘আসকালানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আমার মনে হয় তিনি বাদর যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(مِنَ الْبَادِيَةِ) অর্থাৎ বনভূমিতে যে সকল ফল-মূল, শাক-সবজি, সুগন্ধি ও অন্যান্য জিনিসপত্র পাওয়া যায় তা তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে উপঢৌকন বা হাদিয়া দিতেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(لَكِنْ عِنْدَ اللهِ لَسْتَ بِكَاسِدٍ) একজন মানুষ নিজেকে ছোট বা নগণ্য মনে করবে এটাই স্বাভাবিক। এই দৃষ্টিভঙ্গিতেই সাহাবী নিজেকে কম দামের মানুষ মনে করেছিলেন, কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সুসংবাদ ছিলেন যে, তুমি নিজেকে ছোট বা নগণ্য মনে করলেও আল্লাহর নিকট ঈমানদার হওয়ার কারণে তোমার মূল্য অনেক। তুমি তার নিকট অনেক সম্মানিত এক লোক। হাদীসটি আল্লাহর সৎ বান্দাদের মূল্য যে আল্লাহর নিকট কত দামী তার প্রমাণ বহন করে। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ১২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ঠাট্টা ও কৌতুক প্রসঙ্গে
৪৮৯০-[৭] ’আওফ ইবনু মালিক আল আশজা’ঈ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি তাবূকের যুদ্ধের সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে উপস্থিত হলাম। তিনি একটি চামড়ার তাঁবুর মধ্যে অবস্থান করছিলেন। আমি সালাম প্রদান করলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমার সালামের জবাব দিলেন এবং বললেন, ভিতরে চলে এসো। আমি বললামঃ হে আল্লাহর রসূল! আমার সম্পূর্ণ শরীরটি নিয়েই ভিতরে আসব? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ হ্যাঁ, সম্পূর্ণটা নিয়েই। তখন আমি ভিতরে প্রবেশ করলাম। ’উসমান ইবনু আবূ ’আতিকাহ্ বলেনঃ ’আওফ ইবনু মালিক-এর ’’আমি সম্পূর্ণ প্রবেশ করব?’’ বলে কৌতুক করার কারণ ছিল, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তাঁবুটি ছোট ছিল। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَوْفِ بْنِ مَالِكٍ الْأَشْجَعِيِّ قَالَ: أَتَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي غَزْوَةِ تَبُوكَ وَهُوَ فِي قُبَّةٍ مِنْ أَدَمٍ فَسَلَّمْتُ فَرَدَّ عَلَيَّ وَقَالَ: «ادْخُلْ» فَقُلْتُ: أَكُلِّي يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: «كُلُّكَ» فَدَخَلْتُ. قَالَ عُثْمَان بن أبي عَاتِكَة: إِنَّمَا قَالَ أَدْخُلُ كُلِّي مِنْ صِغَرِ الْقُبَّةِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ (أَكُلِّي يَا رَسُولَ اللهِ؟) সাহাবী (রাঃ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ কথা বলার কারণ হলো যে তাবুর মধ্যে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন, সে তাবুটি ছোট ছিল। যেমনটি সামনে বর্ণনা আসছে। আর অত্র হাদীসটি হতে বুঝা যাচ্ছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেরূপ সাহাবীদের সাথে ঠাট্টা-কৌতুক করতেন, ঠিক তেমনি সাহাবীরাও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ঠাট্টা-কৌতুক করতেন। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৯৯২)
তাবূক যুদ্ধ : ৯ম হিজরীর রজব মাসে তাবূক যুদ্ধ সংগঠিত হয়। মুতার যুদ্ধে রোমকদের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযানের ১৩ মাস পর এটি ছিল তাদের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় অভিযান। আর এটিই ছিল রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অংশগ্রহণে তার জীবনের শেষ যুদ্ধ।
এ অভিযানে মুসলিম বাহিনীতে সৈন্যসংখ্যা ছিল ৩০,০০০ (ত্রিশ হাজার) এবং রোমকদের সৈন্য সংখ্যা ছিল ৪০,০০০ (চল্লিশ হাজার)-এর বেশী। যাদের মধ্যে লাখাম ও জুযামসহ অন্যান্য ‘আরব খ্রিষ্টান গোত্রসমূহ ছিল। যারা ইতিমধ্যে শামের (بلقاء) ‘বালকা’ পর্যন্ত এসে গিয়েছিল। গত বছরে মুতার যুদ্ধের শোচনীয় পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবার জন্য তারা সরাসরি মদীনায় হামলার এই গোপন প্রস্তুতি নেয়। তাতে মদীনার সর্বত্র রোমক ভীতির (خَوْفُ غَسَّانَ) সঞ্চার হয়। কিন্তু এতদসত্ত্বেও রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের প্রতিরোধে রোমান সীমান্ত অভিমুখে যাত্রা করলে তারা সংবাদ পেয়ে ভীত হয়ে পালিয়ে যায়। রমাযান মাসে মুসলিম বাহিনী বিনা যুদ্ধে জয়ী হয়ে মদীনায় ফিরে আসে। এ অভিযানকালে সূরাহ্ তাওবার অনেকগুলো আয়াত নাযিল হয়। পঞ্চাশ দিনের এ দীর্ঘ সফরে ৩০ দিন যাতায়াতে এবং ২০ দিন তাবূকে অবস্থানে ব্যয়িত হয়।ৎ
(ইবনু হিশাম ২/৫১৫-১৬, যাদুল মা‘আদ ৩/৪৬১, আর্ রা্হীক ৪২০, সীরাতুর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৫৮৩ পৃঃ)
এ যুদ্ধে সাহাবীগণ প্রচুর পরিমাণে দান করেন। এ যুদ্ধের জন্য আবূ বকর (রাঃ) তার সমস্ত সম্পদ এনে পেশ করেন এবং ‘উমার ফারূক (রাঃ) তার অর্ধেক সম্পদ পেশ করেন। এ যুদ্ধ থেকে ফিরে (مسجد الضرار) ‘মসজিদে যিরার’ বা অনিষ্টকারী মসজিদকে ভেঙ্গে ফেলা হয়।
পরিচ্ছেদঃ ১২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ঠাট্টা ও কৌতুক প্রসঙ্গে
৪৮৯১-[৮] নু’মান ইবনু বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আবূ বকর(রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন, তখনই তিনি ’আয়িশাহ (রাঃ)-এর সুউচ্চ কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন। যখন তিনি ঘরে প্রবেশ করলেন, ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে চড় মারার অভিপ্রায়ে তাঁর হাত ধরে ফেললেন এবং বললেনঃ সাবধান! ভবিষ্যতে যেন তোমাকে কখনো রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্বরের চেয়ে উচ্চস্বরে কথা বলতে না শুনি। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ বকর (রাঃ)-কে থামাতে এবং শান্ত করতে চেষ্টা করতে লাগলেন। অতঃপর রাগান্বিতভাবেই আবূ বকর(রাঃ) বের হয়ে চলে গেলেন। যখন আবূ বকর চলে গেলেন তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ লোকটার হাত থেকে তোমাকে কিভাবে বাঁচালাম দেখলে? রাবী বর্ণনা করেন যে, এ ঘটনার পর কয়েকদিন আবূ বকর(রাঃ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসেননি। অতঃপর একদিন তিনি উপস্থিত হয়ে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন এবং ঘরে প্রবেশ করে দেখলেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও ’আয়িশাহ্ (রাঃ) উভয়েই পারস্পরিক সমঝোতার পরিবেশে রয়েছেন। তখন আবূ বকর(রাঃ) উভয়কে লক্ষ্য করে বললেনঃ যেভাবে তোমরা আমাকে তোমাদের যুদ্ধের অংশীদার করেছিলে, সেভাবে তোমাদের সন্ধি ও সমঝোতায়ও অংশীদার করো। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমরা তা-ই করলাম। আমরা তা-ই করলাম। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن النعمانِ بن بشيرٍ قَالَ: اسْتَأْذَنَ أَبُو بَكْرٍ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَسَمِعَ صَوْتَ عَائِشَةَ عَالِيًا فَلَمَّا دَخَلَ تَنَاوَلَهَا لِيَلْطِمَهَا وَقَالَ: لَا أَرَاكِ تَرْفَعِينَ صَوْتَكِ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَجَعَلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم يحجزه وَأَبُو بَكْرٍ مُغْضَبًا. فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حِينَ خَرَجَ أَبُو بَكْرٍ: «كَيْفَ رَأَيْتِنِي أَنْقَذْتُكِ مِنَ الرَّجُلِ؟» . قَالَتْ: فَمَكَثَ أَبُو بَكْرٍ أَيَّامًا ثُمَّ اسْتَأْذَنَ فَوَجَدَهُمَا قَدِ اصْطَلَحَا فَقَالَ لَهُمَا: أَدْخِلَانِي فِي سِلْمِكُمَا كَمَا أَدْخَلْتُمَانِي فِي حَرْبِكُمَا فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «قَدْ فَعَلْنَا قَدْ فَعَلْنَا» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যাঃ (كَيْفَ رَأَيْتِنِي أَنْقَذْتُكِ مِنَ الرَّجُلِ؟) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বাড়ীর ভিতর মা ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) উচ্চৈঃস্বরে কথা বলতে শুনে তার পিতা ও রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শ্বশুর আবূ বকর (রাঃ) অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে তার মেয়েকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বেয়াদবির জন্য মারতে উদ্যত হলেন। তবে মা ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর প্রতি অত্যন্ত ভালোবাসা থাকার কারণে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তার পিতার হাত থেকে রক্ষা করলেন তথা মারতে দিলেন না। মা ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর আচরণে ব্যথিত হয়ে আবূ বকর অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মা ‘আয়িশাকে কৌতুক করার ছলে উল্লেখিত উক্তিটি করেন। যার অর্থ হলো দেখলে তো লোকটার হাত থেকে তোমাকে কিভাবে বাঁচালাম।’
(مِنَ الرَّجُلِ) বলার কারণ : নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মা ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললেন, ‘তোমাকে লোকটির হাত থেকে রক্ষা করেছি, কিন্তু তোমাকে তোমার পিতার হাত থেকে রক্ষা করেছি বললেন না কেন? এর জবাবে বলা যায়, যদি আবূ বকর (রাঃ) পিতা হিসেবে তোমাকে মারতে চাইতেন, তাহলে পিতৃস্নেহে মারা সম্ভব হতো না। কেননা পিতৃস্নেহ ও সন্তানকে মারধর করা পরস্পর বিরোধী। বস্তুত তিনি একজন পূর্ণ ঈমানদার ব্যক্তি হিসেবে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে অন্যায় হচ্ছে দেখে সত্যি সত্যিই মারতে উদ্যত হয়েছিলেন। সুতরাং তোমার ওপর ক্রোধ ‘বাপ’ হিসেবে ছিল না, বরং ‘‘মর্দে মু’মিন’’ হিসেবে ছিল। তাই তিনি মারতে না পারায় রাগ করে চলে গেলেন। সেজন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম مِنَ الرَّجُلِ ‘‘লোকটি থেকে’’ বলেছেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
হাদীসটির শিক্ষা ও বাস্তবিক প্রয়োগ : অত্র হাদীসটিতে সহীহ মুসলিম এর ৫২নং হাদীসের প্রয়োগ লক্ষণীয়। তা হলো مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِه، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِه، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِه، وَذٰلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ তোমাদের মধ্যে যখন কেউ কোন খারাপ কাজ (শারী‘আতবিরোধী কাজ) দেখবে তখন সে যেন হাত দ্বারা তা প্রতিরোধ করে, ‘সম্ভব না হলে মুখ দিয়ে.....। পৃথিবীর ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ একজন মহিলাকে তার স্বামীর সামনে যিনি শ্রেষ্ঠ রসূল তার পিতা যিনি নবী-রসূলদের পরে শ্রেষ্ঠ মানুষ, তিনি মারার জন্য উদ্দ্যত হচ্ছেন। আমার সামাজিকতায় কি এটা ভাবা যায়? আমাদের সমাজে অনেক মেয়েই তার স্বামী বা স্বামীর পরিবারস্থ লোকেদের সাথে মন্দ আচরণ করে,’ ফলে পরস্পর আত্মীয়দের মধ্যে নানা প্রকার বিবাদের সৃষ্টি হয়। অনেক সময় আত্মীয়তার সম্পর্কচ্ছেদ হয়ে যায়। কিন্তু যদি মেয়ের পক্ষপাতিত্ব না করে যথোপযুক্ত শাসন করে, তাহলে সেই বিবাদ বা বিপদ থেকে সহজেই রক্ষা পাওয়া সম্ভব। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ১২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ঠাট্টা ও কৌতুক প্রসঙ্গে
৪৮৯২-[৯] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ তুমি তোমার কোন মুসলিম ভাইয়ের সাথে ঝগড়া করো না, কৌতুক করো না এবং এমন ওয়া’দা করো না, যা রক্ষা করতে পারবে না। [তিরমিযী; আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এ হাদীসটি গরীব।][1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا تُمَارِ أَخَاكَ وَلَا تُمَازِحْهُ وَلَا تَعِدْهُ مَوْعِدًا فَتُخْلِفَهُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حديثٌ غَرِيب
وَهَذَا الْبَابُ خَالٍ عَنِ الْفَصْلِ الثَّالِثِ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘লায়স ইবনু আবূ সুলায়ম’’ নামের বর্ণনাকারী য‘ঈফ। দেখুন- হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৪০১ পৃঃ।
-
[এ অধ্যায়ে তৃতীয় অনুচ্ছেদ নেই।]
ব্যাখ্যাঃ (وَلَا تُمَازِحْهُ) এখানে কৌতুক দ্বারা নাজায়িয ও মনে কষ্টদায়ক কৌতুক করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে, যে কৌতুকে মানুষের মান-সম্মান নষ্ট হয়। জায়িয ও সত্য কৌতুক করা নিষেধ করা হয়নি। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৯৯৫; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
এ অধ্যায়ের শুরুতে যে শর্তগুলো উল্লেখ করা হয়েছে, সে অনুযায়ী কৌতুক করা যাবে। অন্য কোন কৌতুক করা যাবে না।
পরিচ্ছেদঃ ১৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - বংশগৌরব ও পক্ষপাতিত্ব
الْمُفَاخَرَةِ শব্দটি বাবে مفاعلة এর মাসদার। মূল অক্ষর فخر অর্থ গর্ব করা, গৌরব করা। এটা দু’ প্রকার : ১. নিন্দনীয়। যেমন- প্রতারণার উদ্দেশে বা পার্থিব কোন ব্যক্তির স্বার্থ চরিতার্থের জন্য মিথ্যা বংশ গৌরব করা। এটা অবৈধ। ২. প্রশংসনীয়। যেমন, কাফির মুশরিকদের সাথে যুদ্ধের সময় বীরত্ব প্রকাশের উদ্দেশে গৌরবের কথা প্রকাশ করা। এটা জায়িয। মহান আল্লাহ বলেন, وَأَمَّا بِنِعْمَةِ رَبِّكَ فَحَدِّثْ ’’তুমি তোমার রবের নি’আমাতের কথা বর্ণনা কর।’’ (সূরাহ্ আয্ যুহা- ৯৩ : ১১)
নিন্দনীয় গর্ব করা থেকে সাবধান করতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ،إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ قَدْ أَذْهَبَ عَنْكُمْ عُبِّيَّةَ الْجَاهِلِيَّةِ، وَفَخْرَهَا بِالْآبَاءِ مُؤْمِنٌ تَقِيٌّ، وَفَاجِرٌ شَقِيٌّ، أَنْتُمْ بَنُو آدَمَ وَآدَمُ مِنْ تُرَابٍ، لَيَدَعَنَّ رِجَالٌ فَخْرَهُمْ بِأَقْوَامٍ، إِنَّمَا هُمْ فَحْمٌ مِنْ فَحْمِ جَهَنَّمَ، أَوْ لَيَكُونُنَّ أَهْوَنَ عَلَى اللهِ مِنَ الْجِعْلَانِ الَّتِي تَدْفَعُ بِأَنْفِهَا النَّتِنَ
আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মহান আল্লাহ তোমাদের জাহিলী যুগের মিথ্যা অহংকার ও পূর্বপুরুষদেরকে নিয়ে গর্ব করার প্রথাকে বিলুপ্ত করেছেন। মু’মিন হলো আল্লাহভীরু আর পাপী হলো দুর্ভাগা। তোমরা সকলে আদম সন্তান আর আদম (আ.) মাটির তৈরি। লোকেদের উচিত বিশেষ গোত্রেরভুক্ত হওয়াকে কেন্দ্র করে অহংকার না করা। এখন তো তারা জাহান্নামের কয়লায় পরিণত হয়েছে। অন্যথায় তোমরা মহান আল্লাহর নিকট ময়লার সেই কীটের চেয়ে জঘন্য হবে যে তার নাক দিয়ে ময়লা ঠেলে নিয়ে যায়। (আবূ দাঊদ ৫১১৬, তিরমিযী ৪২৩৩ : হাসান)
মির্’আতুল মাফাতীহ-এর মধ্যে ’আল্লামা মুবারকপূরী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ বংশীয় বা গোত্রীয় অহংকার বলা হয়, বাপ দাদার অথবা বংশের নাম উল্লেখ করে গর্ব করাকে। এ কাজ অন্যকে ছোট করে নিজের মর্তবাকে উঁচু করে তোলার জন্য করা হয়। সেজন্য এ কাজ জায়িয নেই। অন্যের গোত্রকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এ কাজে অন্যকে ছোট করা হয় বা লজ্জায় ফেলা হয়।
আর العصبية শব্দের অর্থ হলো-স্বজনপ্রীতি বা পক্ষপাতিত্ব করা। পরিভাষায় রক্তের বন্ধনে আবদ্ধতার অনুভূতি এবং সেই অনুভূতির কারণে অন্যের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করাকে العصبية বলা হয়। আধুনিক পরিভাষায় একে গোত্রবাদ বা সাম্প্রদায়িকতাও বলা যেতে পারে। এটি একটি জাহিলী প্রথা। এ ব্যাপারে হাদীসে রয়েছে, আল হাবিস আল আশ্’আরী হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
وَمَنْ ادَّعٰى دَعْوَى الجَاهِلِيَّةِ فَإِنَّهٗ مِنْ جُثَا جَهَنَّمَ، فَقَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللهِ وَإِنْ صَلّٰى وَصَامَ؟ قَالَ: وَإِنْ صَلّٰى وَصَامَ، فَادْعُوا بِدَعْوَى اللهِ الَّذِي سَمَّاكُمُ المُسْلِمِينَ المُؤْمِنِينَ، عِبَادَ اللهِ
আর যে লোক জাহিলিয়্যাতের ’আমলের রীতি-নীতির দিকে আহবান করে সে জাহান্নামীদের দলভুক্ত। জনৈক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! সে সালাত আদায় করলেও, সিয়াম পালন করলেও? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ হ্যাঁ। সে সালাত আদায় করলেও, সিয়াম পালন করলেও। সুতরাং তোমরা সেই আল্লাহ তা’আলার ডাকেই নিজেদেরকে ডাকবে যিনি তোমাদেরকে মুসলিম, মু’মিন ও আল্লাহ তা’আলার বান্দা নাম রেখেছেন।
(তিরমিযী ২৮৬৩, মিশকাত ৩৬৯৪)
অন্য হাদীসে এসেছে-
عَنْ جَابِرٍ، قَالَ: اقْتَتَلَ غُلَامَانِ غُلَامٌ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ، وَغُلَامٌ مِنَ الْأَنْصَارِ، فَنَادَى الْمُهَاجِرُ أَوِ الْمُهَاجِرُونَ، يَا لَلْمُهَاجِرِينَ وَنَادَى الْأَنْصَارِيُّ يَا لَلْأَنْصَارِ، فَخَرَجَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: مَا هٰذَا دَعْوٰى أَهْلِ الْجَاهِلِيَّةِ.
জাবির হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আনসার ও মুহাজিরদের দু’জন বালক মারামারি করলে মুহাজিরগণ তাদের মুহাজির ভাইদের এবং আনসারগণ তাদের আনসার ভাইদের ডাকলেন। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হয়ে এসে বললেন, এটা কি জাহিলী যুগের সেই (মারামারির) ডাকার মতো? (মুসলিম ৬২-[২৫৮৪]) [সম্পাদক]
৪৮৯৩-[১] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো, কে সবচেয়ে সম্মানিত? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আল্লাহ তা’আলার নিকট সবচেয়ে সম্মানিত সে ব্যক্তি, যে সবচেয়ে আল্লাহভীরু। সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ)জিজ্ঞেস করলেনঃ আমরা এ দৃষ্টিকোণ থেকে জিজ্ঞেস করিনি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ সকল মানুষের মধ্যে সম্মানিত ব্যক্তি ইউসুফ (আ.), যিনি আল্লাহর নবী এবং আল্লাহর নবীর পুত্র এবং আল্লাহর নবীর পৌত্র এবং আল্লাহর বন্ধু ইব্রাহীম (আ.)-এর প্রপৌত্র ছিলেন। সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ)বললেনঃ আমরা এ দৃষ্টিকোণ থেকেও জিজ্ঞেস করিনি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ ’আরবদের বংশ ও গোত্র সম্পর্কে কি জিজ্ঞেস করছ? সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ)বললেনঃ জ্বী হ্যাঁ। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি অন্ধকার যুগে ভালো ছিল, সে ইসলামী যুগেও ভালো, যখন সে দীন ইসলামের সম্যক অবহিত। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْمُفَاخَرَةِ وَالْعَصَبِيَّةِ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَي النَّاس أكْرم؟ فَقَالَ: «أَكْرَمُهُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاهُمْ» . قَالُوا: لَيْسَ عَنْ هَذَا نَسْأَلُكَ. قَالَ: «فَأَكْرَمُ النَّاسِ يُوسُفُ نَبِيُّ اللَّهِ ابْنُ نَبِيِّ اللَّهِ ابْنِ خَلِيلِ اللَّهِ» . قَالُوا: لَيْسَ عَن هَذَا نَسْأَلك. قَالَ: «فَمِمَّنْ مَعَادِنِ الْعَرَبِ تَسْأَلُونِي؟» قَالُوا: نَعَمْ. قَالَ: فَخِيَارُكُمْ فِي الْجَاهِلِيَّةِ خِيَارُكُمْ فِي الْإِسْلَامِ إِذَا فَقُهُوا . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ (أَي النَّاس أكْرم؟) মানুষের মধ্যে কোন্ মানুষ বেশি মর্যাদার ও সম্মানের অধিকারী? ‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ বাক্যটি দ্বারা বংশের দিকে লক্ষ্য না করে সাধারণভাবে কোন্ মানুষ আল্লাহর নিকট সম্মানের অধিকারী তা বুঝার সম্ভাবনা আছে। একজন কালো-কুৎসিত দাসও আল্লাহর নিকট সম্মানের অধিকারী হতে পারে। আবার বংশ মর্যাদাও বুঝাতে পারে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(أَكْرَمُهُمْ عِنْدَ اللهِ أَتْقَاهُمْ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ উত্তর প্রদান করেন মহান আল্লাহর বাণী থেকেই। তা হলো :
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثٰى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللهِ أَتْقَاكُمْ
‘‘হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে এক নারী ও পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদের পরিচিতির জন্য বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মার্যাদাবান যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াসম্পন্ন।’’ (সূরাহ্ আল হুজুরাত ৪৯ : ১৩)
এখানে গোত্র ও জাতিকে মহান আল্লাহ শুধুমাত্র পরিচিতির মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করলেন। আর মর্যাদা তাকওয়া ব্যতীত হবে না। কারণ শেষ পরিণাম মুত্তাক্বীদের জন্যই। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(إِذَا فَقُهُوا) অর্থাৎ যখন কোন ব্যক্তি শারী‘আতের আদব ও ইসলামের বিধি-বিধান আয়ত্ব করে পালন করবে, দীনে প্রবেশ করার পরে। তথা দীন শিখে তা পালন করবে। এ বাক্যটি দ্বারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেন মুনাফিক ও যাদের অন্তর আকৃষ্ট হয়ে আছে।
ইসলামে (المؤلفة قلوبهم) তাদেরকে বাদ দিয়েছেন। তথা বংশ-মর্যাদার কারণে ইসলামে কেউ মর্যাদাশীল বলে গণ্য হয় না, বরং তাকে ইসলামে প্রবেশ করে জ্ঞান অর্জন করে মর্যাদা অর্জন করতে হয়। যে যত জ্ঞানী হতে পারবে তার মর্যাদা তত বেশি হবে। আর যে জ্ঞান অর্জন করতে পারবে না, তার মর্যাদা কমে যাবে, তথা স্তর নিচে নেমে যাবে। আর এই ‘ইলম ‘আমলের সাথে সম্পর্কিত তথা ‘ইলম অনুযায়ী ‘আমল করতে হবে। যার মূল কথা হলো তাকওয়া অর্জন। আল্লাহ বলেন, فَلَا تُزَكُّوا أَنْفُسَكُمْ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اتَّقٰى ‘‘কে তাকওয়া অবলম্বন করে তা তিনি ভালোভাবেই জানেন’’- (সূরাহ্ আন্ নাজ্ম ৫৩ : ৩২)। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - বংশগৌরব ও পক্ষপাতিত্ব
৪৮৯৪-[২] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সম্মানিত ব্যক্তি সম্মানিত ব্যক্তির পুত্র, সম্মানিত ব্যক্তির পৌত্র এবং সম্মানিত ব্যক্তির প্রপৌত্র হলেন ইবরাহীম (আ.)-এর প্রপৌত্র, ইসহক (আ.)-এর পৌত্র ও ইয়াকুব (আ.)-এর পুত্র ইউসুফ (আ.)। (বুখারী)[1]
بَابُ الْمُفَاخَرَةِ وَالْعَصَبِيَّةِ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْكَرِيمُ ابْنُ الْكَرِيمِ ابْنِ الْكَرِيمِ ابْنِ الْكَرِيمِ يُوسُفُ بْنُ يَعْقُوبَ بنِ إِسحاقَ بن إِبراهيمَ» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ ইউসুফ (আ.)-এর সম্মানের কারণ : ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, সম্মানিত হওয়ার মূল হলো অনেক কল্যানের মালিক হওয়া। আর নুবুওয়াতের পাশাপাশি ইউসুফ (আ.)-এর মধ্যে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ গুণ একত্রিত হয়েছিল। যেমন- সচ্চরিত্র, ভদ্রচিত আচরণ, জ্ঞান, সৌন্দর্য, মর্যাদাসম্পন্ন পিতৃকুল, পরিশেষে বংশ পরম্পরায় চারজন নবীর মধ্যে চতুর্থ নবী। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধৈর্যশীল নবী যেমনটি সূরাহ্ ইউসুফ-এর ৮০ নং আয়াত থেকে জানা যায়। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৮ম খন্ড, হাঃ ৩১১৬)
পরিচ্ছেদঃ ১৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - বংশগৌরব ও পক্ষপাতিত্ব
৪৮৯৫-[৩] বারা’ ইবনু ’আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুনায়নের যুদ্ধের দিন আবূ সুফ্ইয়ান ইবনু হারিস নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খচ্চরে লাগাম ধরে রেখেছিলেন। যখন মুশরিকরা তাঁকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলল, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খচ্চরের পৃষ্ঠ থেকে অবতরণ করলেন এবং বলতে লাগলেন, ’’আমি নবী, না মিথ্যার কোন সূত্র- আমি যে ’আবদুল মুত্ত্বালিব-এর পুত্র।’’ রাবী বলেন, সেদিন তাঁর চেয়ে অধিক বিক্রমপূর্ণ আর কাউকেও দেখা যায়নি। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْمُفَاخَرَةِ وَالْعَصَبِيَّةِ
وَعَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ قَالَ: فِي يَوْمِ حُنَيْنٍ كَانَ أَبُو سُفْيَانَ بْنُ الْحَارِثِ آخِذًا بِعِنَانِ بَغْلَتِهِ يَعْنِي بَغْلَةَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَمَّا غَشِيَهُ الْمُشْرِكُونَ نَزَلَ فَجَعَلَ يَقُولُ «أَنَا النَّبِيُّ لَا كَذِبَ أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبْ»
قَالَ: فَمَا رُئِيَ مِنَ النَّاسِ يَوْمَئِذٍ أَشَدُّ مِنْهُ. مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ
হুনায়ন যুদ্ধ : হুনায়ন যুদ্ধ ৮ম হিজরীর শাও্ওয়াল মাসে অনুষ্ঠিত হয়। হাওয়াযিন ও সাক্বীফ গোত্রের আত্মগর্বী নেতারা মক্কা হতে ‘আরাফাতের দিকে ১০ মাইলের কিছু বেশি দক্ষিণ-পূর্বে হুনায়ন উপত্যকায় মালিক ইবনু ‘আওফ-এর নেতৃত্বে ৪০০০ দুর্ধর্ষ সেনার সমাবেশ ঘটায়। ফলে মক্কা বিজয়ের ১৯তম দিনে ৬ই শাও্ওয়াল শনিবার আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার ২০০০ নওমুসলিমসহ মোট ১২,০০০ সাথী নিয়ে হুনায়ন উদ্দেশে রওয়ানা হন এবং ১০ই শাও্ওয়াল বুধবার রাতে গিয়ে উপস্থিত হন।
(আর্ রাহীক ৪১৩-১৪ পৃঃ, ইবনু হিশাম ২/৪৩৭, যাদুল মা‘আদ ৩/৪০৮-১৮ পৃঃ, সীরাতুর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৫৫৫পৃঃ)
হুনায়ন যুদ্ধে মুসলিম পক্ষ শাহীদের সংখ্যা ছিল ৪ জন এবং কাফির পক্ষ নিহতের সংখ্যা ছিল ৭২ জন- (সীরাহ্ সহীহাহ্ ২/৫০৩-০৪)। মানসূরপুরী কাফির পক্ষ ৭১ জন নিহত ও মুসলিম পক্ষ ৬ জন শহীদ বলেছেন- (রহমাতুল্লিল ‘আলামীন ২/২০১)। হুনায়ন যুদ্ধে বিপুল গনীমাত লাভ হয়। বন্দী : ৬০০০ (নারী-শিশুসহ)। উট : ২৪,০০০। দুম্বা-বকরী : ৪০,০০০-এর অধিক। রৌপ্য : ৪০০০ উক্বিয়া। এতদ্ব্যতীত ঘোড়া, গরু, গাধা ইত্যাদির কোন হিসাব পাওয়া যায়নি। (ইবনু সা‘দ ২/১১৬ পৃঃ, সীরাতুর্ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৫৬৪ পৃঃ)
এ যুদ্ধে বিজয় সম্পর্কে আল্লাহ বলেনঃ ‘‘আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেছেন অনেক স্থানে, বিশেষ করে হুনায়নের দিন। যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদের গর্বিত করেছিল। কিন্তু তা তোমাদের কোনই কাজে আসেনি। বরং প্রশস্ত জমিন তোমাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। ফলে তোমরা পিঠ ফিরে পালিয়ে গিয়েছিলে। আল্লাহ স্বীয় প্রশান্তি নাযিল করেন তার রসূল ও মু’মিনদের ওপর এবং নাযিল করেন এমন সেনাদল, যাদের তোমরা দেখেননি এবং কাফিরদের তিনি শাস্তি প্রদান করেন। আর এটি ছিল তাদের কর্মফল। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন, তাওবার তাওফীক দেন। বস্তুত আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল ও দয়াবান।’’(সূরাহ্ আত্ তাওবাহ্ ৯ : ২৫-২৭)
(أَنَا النَّبِىُّ لَا كَذِبَ أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبْ) যদি প্রশ্ন করা হয় : নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিভাবে বললেন, আমি ‘আবদুল মুত্ত্বালিব-এর ছেলে? তিনি নিজের পিতার নাম না বলে নিজের বংশের দিকে সম্পর্কিত করলেন যেটা জাহিলী যুগের অধিকাংশ মানুষের গর্বের প্রতি ইঙ্গিত করে? এর উত্তর হল- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দাদার নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। কারণ তার পিতা ‘আবদুল্লাহ যুবক বয়সেই মারা যান। সে কারণে তিনি বেশি প্রসিদ্ধ ছিলেন না। পক্ষান্তরে ‘আবদুল মুত্ত্বালিব মক্কাবাসীর নেতা হওয়ার কারণে অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ছিলেন। সকলের নিকট তিনি ছিলেন পরিচিত মুখ। বহু মানুষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তার দাদার সাথে যুক্ত করে ডাকত। আর তারা এ কাজ করত দাদার প্রসিদ্ধতার কারণে। যেমন হুমাম ইবনু সা‘লাবাহ্-এর বর্ণিত হাদীসে আছে, أيكم ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبْ؟ তোমাদের মধ্যে ‘আবদুল মুত্ত্বালিব-এর ছেলে কে? ‘আরবদের নিকট এটা প্রসিদ্ধ ছিল যে, ‘আবদুল মুত্ত্বালিব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সংবাদ দিয়েছিলেন। তিনি এও বলেছিলেন যে, অচিরেই তার মান-মর্যাদা বিরাট হবে। এও কথিত আছে যে, ‘আবদুল মুত্ত্বালিব রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগমনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। আর এটা ‘আরবদের নিকট সুপ্রসিদ্ধ ছিল। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উল্লেখিত কথাটি বলে তাদেরকে সেটা স্মরণ করিয়ে দেয়ার ইচ্ছা করলেন যে, আমিই সেই সত্য নবী। আমিই সেই ‘আবদুল মুত্ত্বালিব-এর স্বপ্নের সুসংবাদপ্রাপ্ত সত্য নবী, এতে মিথ্যার কিছু নেই। (শারহুন নাবাবী ১২শ খন্ড, হাঃ ৭৮-[১৭৭৬])
পরিচ্ছেদঃ ১৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - বংশগৌরব ও পক্ষপাতিত্ব
৪৮৯৬-[৪] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সমীপে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, হে সৃষ্টির সেরা! রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সৃষ্টির সেরা ব্যক্তি ছিলেন ইবরাহীম (আ.)। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْمُفَاخَرَةِ وَالْعَصَبِيَّةِ
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا خَيْرَ الْبَرِيَّةِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «ذَاكَ إِبْرَاهِيم» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ ইবরাহীম (আ.)-কে (خَيْرَ الْبَرِيَّةِ) বলার কারণ : নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবরাহীম (আ.)-কে সৃষ্টির সেরা বলে আখ্যায়িত করার কারণ কি? এ বিষয়ে ‘উলামাগণ বলেনঃ
১. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতিশয় বিনয় ও শিষ্টাচার প্রদর্শনার্থে এরূপ বলেছেন। মহান ব্যক্তিবর্গ অন্য কোন মহান ব্যক্তির উচ্ছ্বাসিত প্রশংসা করে থাকেন। এতদ্ব্যতীত ইবরাহীম (আ.) ছিলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদি পিতা ও ঊর্ধ্বতন পুরুষ। অতএব, পিতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে এরূপ বলা হয়েছে।
২. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ উক্তির মর্মার্থ এটাও হতে পারে যে, ইব্রাহীম (আ.) সমসাময়িক যুগের (خَيْرَ الْبَرِيَّةِ) বা সেরা ও উত্তম মানুষ ছিলেন।
৩. এও বলা হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম سَيِّدُ وَلَدِ آدَمَ তথা ‘আদম সন্তানদের নেতা’ এ কথা জানার পূর্বে ইবরাহীম (আ.) (خَيْرَ الْبَرِيَّةِ) বা সৃষ্টির সেরা মানুষ ছিলেন। (শারহুন নাবাবী ১৫শ খন্ড, হাঃ ১৫০-[২৩৬৯])
পরিচ্ছেদঃ ১৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - বংশগৌরব ও পক্ষপাতিত্ব
৪৮৯৭-[৫] ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ খ্রিষ্টানরা মারইয়াম-এর পুত্র ’ঈসা (আ.)-এর প্রশংসায় যেভাবে বাড়াবাড়ি করেছে, তোমরা সেভাবে আমার প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করো না। আমি তো আল্লাহর বান্দা। তোমরা আমাকে আল্লাহর বান্দা এবং আল্লাহর রসূল বলো। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْمُفَاخَرَةِ وَالْعَصَبِيَّةِ
وَعَنْ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَا تُطْرُونِي كَمَا أَطْرَتِ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ فَقُولُوا: عبدُ الله ورسولُه . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ (كَمَا أَطْرَتِ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ) নাসারাগণ তথা খ্রিষ্টানগণ ‘ঈসা (আ.)-কে আল্লাহর বান্দা ও রসূল হিসেবে না মেনে আল্লাহ বা আল্লাহর পুত্র হিসেবে মান্য করত। এটা তারা করত সম্মান ও ভক্তির ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করার কারণে। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু’মিনদেরকেও সতর্ক ও সাবধান করে বলেন, নাসারাগণ যেভাবে মারইয়াম-এর পুত্র ‘ঈসা (আ.)-কে নিয়ে প্রশংসার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করেছে, তোমরাও এভাবে আমার প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করো না। বরং তোমরা আমাকে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসূল বল। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৪৪৫)
পরিচ্ছেদঃ ১৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - বংশগৌরব ও পক্ষপাতিত্ব
৪৮৯৮-[৬] ’ইয়ায ইবনু হিমার আল মুজাশি’ঈ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা আমাকে ওয়াহীর মাধ্যমে জানিয়েছেন যেন তোমরা পরস্পর বিনয়ী হও। এমনকি এক ব্যক্তি যেন অন্য ব্যক্তির ওপর গৌরব না করে এবং এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তির ওপর অত্যাচার না করে। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْمُفَاخَرَةِ وَالْعَصَبِيَّةِ
وَعَن عياضِ بن حمارٍ المجاشعيِّ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِنَّ اللَّهَ أَوْحَى إِلَيَّ: أَنْ تَوَاضَعُوا حَتَّى لَا يَفْخَرَ أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ وَلَا يبغيَ أحدٌ على أحد . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ (وَلَا يَبْغِىَ أَحَدٌ عَلٰى أَحَدٍ) অহংকারী ব্যক্তি বলা হয় ঐ ব্যক্তিকে, যে নিজেকে সকলের চেয়ে বড় ভাবে। সকলের চেয়ে তার মান-সম্মান উপরে মনে করে। আর সে কারো আনুগত্য করে না। কাউকে পরোয়া করে না। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বংশগৌরব ও পক্ষপাতিত্ব
৪৮৯৯-[৭] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ ঐসব লোকেরা যেন তাদের সেসব বাপ-দাদার গৌরব করা থেকে বিরত থাকে, যারা মরে জাহান্নামের অঙ্গারে পরিণত হয়েছে; অথবা আল্লাহ তা’আলার নিকট আবর্জনার কীট অপেক্ষা লাঞ্ছিত হবে, যে কীট আবর্জনাকে নিজের নাক দ্বারা দোলা দেয়। আল্লাহ তা’আলা তোমাদের থেকে জাহিলিয়্যাতের গর্ব-অহংকার ও বাপ-দাদার গৌরবের ব্যাধি দূর করেছেন। এখন চাই ধর্মভীরু মু’মিন হোক বা ধর্মহীন পাপী হোক, সমস্ত মানুষ আদম (আ.)-এর সন্তান, আর আদম (আ.) মাটি দ্বারা তৈরি। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَيَنْتَهِيَنَّ أَقْوَامٌ يَفْتَخِرُونَ بِآبَائِهِمُ الَّذِينَ مَاتُوا إِنَّمَا هُمْ فَحْمٌ مِنْ جَهَنَّمَ أَوْ لَيَكُونُنَّ أَهْوَنَ عَلَى اللَّهِ مِنَ الْجُعَلِ الَّذِي يُدَهْدِهُ الْخِرَاءَ بِأَنْفِهِ إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَذْهَبَ عَنْكُمْ عُبِّيَّةَ الْجَاهِلِيَّةِ وَفَخْرَهَا بِالْآبَاءِ إِنَّمَا هُوَ مُؤْمِنٌ تَقِيٌّ أَوْ فَاجِرٌ شَقِيٌّ النَّاسُ كُلُّهُمْ بَنُو آدَمَ وَآدَمُ مِنْ تُرَابٍ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ (النَّاسُ كُلُّهُمْ بَنُو آدَمَ وَآدَمُ مِنْ تُرَابٍ) কোন মানুষের পক্ষ গর্ব-অহংকার করা যে ঠিক নয়, তার প্রমাণস্বরূপ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ উক্তিটি করেন। যার মর্মার্থ হলো, সমস্ত মানুষ আদম (আ.)-এর সন্তান আর আদম (আ.) মাটি থেকে তৈরি। অত্র হাদীস হতে আমরা গর্ব না করার দু’টি সঙ্গত কারণ খুঁজে পাই। প্রথমত সমস্ত মানুষ যেহেতু আদম (আ.)-এর সন্তান, অতএব তারা সকলে পরস্পর ভাই ভাই। কাজেই এক ভাইয়ের ওপর অপর ভাইয়ের গর্ব করা বোকামি। দ্বিতীয়ত সমস্ত মানুষ মাটির তৈরি। অতএব মাটির তৈরি মানুষ মাটি নিয়ে কিভাবে গর্ব করতে পারে। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ১৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বংশগৌরব ও পক্ষপাতিত্ব
৪৯০০-[৮] মুত্বাররিফ ইবনু ’আবদুল্লাহ আশ্ শিখখীর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বানূ ’আমির-এর প্রতিনিধিদলের সাথে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গেলাম। আমরা তাঁকে বললামঃ আপনি আমাদের নেতা। তিনি বললেনঃ নেতা হলেন আল্লাহ। আমরা বললামঃ আপনি মর্যাদার দিক দিয়ে আমাদের তুলনায় অধিক মর্যাদাবান এবং দানের দিক দিয়ে আপনি সর্বাধিক সম্মানিত। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ এ কথা বলো অথবা তার চেয়ে কম বলো শয়তান যাতে তোমাদেরকে উকিল না বানাতে পারে। (আহমাদ ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن مطرف بن عبد الله الشِّخّيرِ قَالَ: قَالَ أَبِي: انْطَلَقْتُ فِي وَفْدِ بَنِي عَامِرٍ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقُلْنَا: أَنْتَ سَيِّدُنَا. فَقَالَ: «السَّيِّدُ اللَّهُ» فَقُلْنَا وَأَفْضَلُنَا فَضْلًا وَأَعْظَمُنَا طَوْلًا. فَقَالَ: «قُولُوا قَوْلَكُمْ أَوْ بَعْضَ قَوْلِكُمْ وَلَا يَسْتَجْرِيَنَّكُمُ الشَّيْطَانُ» . رَوَاهُ أَحْمد وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ (فَقَالَ: السَّيِّدُ اللهُ) অর্থাৎ এই নামের তিনিই প্রকৃত উপযুক্ত। মুল্লা ‘আলী কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ যিনি সৃষ্টিকুলের তাকদীরের মালিক এবং তাদের সার্বিক দায়িত্বশীল তিনি হলেন, আল্লাহ। তবে এটা মাজাযী বা রূপক সম্বন্ধনীয় নেতা হওয়াকে নিষেধ করে না। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, أَنَا سَيِّد وَلَد آدَم وَلَا فَخَرَ আমি আদম সন্তানদের শ্রেষ্ঠ (নেতা) তাতে কোন গর্ব নেই। অর্থাৎ আমি গর্ব করার জন্য বলছি না, বরং আমি আল্লাহর নি‘আমাতের কথা স্মরণ করছি। ইমাম বুখারী (রহিমাহুল্লাহ) জাবির (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, ‘উমার (রাঃ) বলতেন, আবূ বকর (রাঃ) আমাদের নেতা আর তিনি আমাদের নেতাকে মুক্ত করেছেন তথা বিলাল (রাঃ)-কে। এখানে বিলাল (রাঃ)-এর কথা উল্লেখ করার কারণ হলো তার প্রতি বিনয় প্রকাশ করা। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৭৯৮)
(قُولُوا قَوْلَكُمْ) অর্থাৎ তোমরা তোমাদের শারী‘আত ও দীনের অনুসারীদের কথার মতো কথা বলো। তোমরা আমাকে নবী ও রসূল বলে ডাক যে নামে মহান আল্লাহ তার কিতাবে আমাকে ডেকেছেন। তোমরা আমাকে সাইয়েদ বা নেতা বলে ডাকবে না। যেমন তোমরা তোমাদের মাতব্বর-মোড়লকে সম্বোধন করে থাক। আর তোমরা আমাকে তোমাদের মতো মনে করবে না। কারণ আমি তোমাদের কারো মতো নয়। আমি তোমাদেরকে নুবুওয়াত দ্বারা ও রিসালাত দ্বারা পরিচালিত করি, অতএব তোমরা আমাকে নবী ও রসূল বলে সম্বোধন করবে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৭৯৮)
পরিচ্ছেদঃ ১৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বংশগৌরব ও পক্ষপাতিত্ব
৪৯০১-[৯] হাসান বাসরী (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি সামুরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ধন-সম্পদ হলো মান-মর্যাদা এবং আল্লাহভীরুতা দয়া-দাক্ষিণ্য। (তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَن الْحسن عَن سَمُرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْحَسَبُ الْمَالُ وَالْكَرَمُ التَّقْوَى» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وابنُ مَاجَه
ব্যাখ্যাঃ (الْحَسَبُ الْمَالُ) অর্থাৎ অধিকাংশ ক্ষেত্রে পার্থিব সম্পদ দুনিয়ায় মানুষের মর্যাদা-সম্মান বৃদ্ধির একটি উপায়। (وَالْكَرَمُ التَّقْوٰى) আখিরাতের মর্যাদা একান্তই তাকওয়া বা আল্লাহভীতির মধ্যে নিহিত। মহান আল্লাহ বলেন,
إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ ‘‘তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই লোকই অধিক সম্মানীয় যে লোক অধিক মুত্তাক্বী’’- (সূরাহ্ আল হুজুরাত ৪৯ : ১৩; আয়াত)। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৮ম খন্ড, হাঃ ৩২৭১)
হাদীসটির বাস্তবিক প্রয়োগ : প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আবশ্যক হলো, দুনিয়ার সম্মানের পাশাপাশি আখিরাতের জীবনও যেন সুখের হয়, মুক্তি লাভ হয় তা ভাবা উচিত। সে অনুপাতে ‘আমল করা উচিত। যেমনটি আল্লাহ আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন-
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَّفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَّقِنَا عَذَابَ النَّارِ ‘‘হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন এবং পরকালেও আমাদেরকে কল্যাণ দান করবেন আর আমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচান’’- (সূরাহ্ আল বাকারাহ্ ২ : ২০১)। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ১৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বংশগৌরব ও পক্ষপাতিত্ব
৪৯০২-[১০] উবাই ইবনু কা’ব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি নিজেকে জাহিলিয়্যাতের গৌরবে গৌরবান্বিত করে, তার দ্বারা তার পিতৃ-পুরুষের লজ্জাস্থানকে কর্তন করাও। আর এ কথাগুলো তাকে ইঙ্গিতে নয়; বরং পরিষ্কার ভাষায় বলে দাও। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
وَعَن أُبيِّ
بن كعبٍ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَنْ تَعَزَّى بِعَزَاءِ الْجَاهِلِيَّةِ فَأَعِضُّوهُ بِهَنِ أَبِيهِ وَلَا تُكَنُّوا» . رَوَاهُ فِي «شَرْحِ السّنة»
ব্যাখ্যাঃ (فَأَعِضُّوهُ بِهَنِ أَبِيهِ) যে ব্যক্তি তাঁর সেসব পিতৃপুরুষদেরকে নিয়ে গর্ব করে। যারা জাহিলিয়্যাতের যুগে মারা গেছে, তাকে বল যে, তুমি তোমার মৃত পিতৃপুরুষদের লজ্জাস্থানকে কর্তন করে মুখে তুলে নাও। অর্থাৎ তাদের ব্যাপারে গর্ব করা, আর তাদের লজ্জাস্থান কর্তন করে মুখে তুলে চিবানো একই কথা। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(وَلَا تُكَنُّوا) অর্থাৎ এ কথাগুলো অস্পষ্ট বা ইঙ্গিত দিয়ে নয়, বরং স্পষ্টভাবে তাদেরকে জানিয়ে দাও। যাতে করে তাদের শিক্ষা হয় যে, এটা কত জঘন্য কাজ। যাতে তারা বিরত থাকে। এও বলা হয়েছে যে, এর অর্থ হলো, যে ব্যক্তি জাহিলী যুগের নিয়ম-নীতি, কৃষ্টি-কালচার যেমন গালি দেয়া, অভিসম্পাত করা ও মানুষের মান-সম্মান নষ্ট করার মতো কাজ চালু করতে চায়। এছাড়াও নির্লজ্জতা, বেহায়াপনা, অহংকার ছড়িয়ে দিতে চায় তাকে স্মরণ করিয়ে দাও যে, তার পিতা মূর্তি পূজা করত, যিনা করত, মদ পান করত। এছাড়াও অনেক খারাপ কাজ করত। আর তাকে এ কথাগুলো স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিবে। কোন প্রকারের ইঙ্গিত করে নয়। যাতে সে মানুষের সামনে লজ্জিত হয়ে ফিরে আসে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বংশগৌরব ও পক্ষপাতিত্ব
৪৯০৩-[১১] ’আবদুর রহমান ইবনু আবূ ’উকবাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি আবূ ’উকবাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন। আবূ ’উকবাহ্(রাঃ) মুক্ত দাস ছিলেন এবং পারস্যের অধিবাসী ছিলেন। তিনি বলেন, আমি উহুদের যুদ্ধে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে উপস্থিত ছিলাম। মুশরিকদের মধ্য হতে এক ব্যক্তিকে তরবারি বা বর্শা দ্বারা আঘাত করলাম এবং বললামঃ আমার তরফ থেকে আঘাত গ্রহণ করো, আমি পারস্যের দাস। এটা শুনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার দিকে দৃষ্টিপাত করলেন এবং বললেনঃ তুমি কেন এ কথা বললে না যে, আমার তরফ থেকে আঘাত গ্রহণ করো, আমি আনসারীদের দাস? (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ
عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِي عُقْبَةَ عَنْ أبي عُقبةَ وَكَانَ مَوْلًى مِنْ أَهْلِ فَارِسَ قَالَ: شَهِدْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أُحُدًا فَضَرَبْتُ رَجُلًا مِنَ الْمُشْرِكِينَ فَقُلْتُ خُذْهَا مِنِّي وَأَنَا الْغُلَامُ الْفَارِسِيُّ فَالْتَفَتَ إِلَيَّ فَقَالَ: هَلَّا قُلْتَ: خُذْهَا مِنِّي وَأَنَا الْغُلَامُ الْأَنْصَارِيُّ؟ . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘মুহাম্মাদ ইবনু ইসপদকব’’ নামক বর্ণনাকারী ‘‘আন’’ শব্দ দ্বারা বর্ণনা করেছে। আর তিনি একজন মুদাল্লিস রাবী। হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৪০৪ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ (خُذْهَا مِنِّي وَأَنَا الْغُلَامُ الْفَارِسِيُّ) এর কারণ হলো, কোন সম্প্রদায়ের মুক্ত দাস সেই সম্প্রদায়েরই অন্তর্ভুক্ত। মুল্লা ‘আলী কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ যখন তুমি কাউকে আঘাত করে গর্ব করবে তখন তুমি নিজেকে আনসারদের সাথে সম্পৃক্ত করবে। যাদের নিকট আমি হিজরত করেছি এবং যারা আমাকে সাহায্য করেছে। আর তৎকালীন সময়ে পারস্য কাফির রাষ্ট্র ছিল। তাই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীকে তাদের দিকে সম্পৃক্ত করাকে অপছন্দ করেছেন। আর তাকে আনসারদের সাথে সম্পৃক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন যাতে করে সে মুসলিমদের সাথে সম্পৃক্ত হয়। বুঝা যায় যে, সে একজন মুসলিম বীর পুরুষ। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫১১৪)
উহুদ যুদ্ধ : ৩য় হিজরীর ৭ই শাও্ওয়াল শনিবার সকালে উহুদ যুদ্ধ সংগঠিত হয়। কুরায়শরা আবূ সুফ্ইয়ান-এর নেতৃত্বে ৩০০০ সৈন্যের সুসজ্জিত বাহিনী নিয়ে মদীনার তিন মাইল উত্তরে উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে শিবির সন্নিবেশ করে। এই বাহিনীর সাথে আবূ সুফ্ইয়ান-এর স্ত্রী হিন্দ বিনতু ‘উতবাহ্-এর নেতৃত্বে ১৫ জনের একটি মহিলা দল ছিল, যারা নেচে-গেয়ে ও উত্তেজক কবিতা পাঠ করে তাদের সৈন্যদের উত্তেজিত করে। এ যুদ্ধে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নেতৃত্বে প্রায় ৭০০ সৈন্য ছিল। প্রচণ্ড যুদ্ধ শেষে একটি ভুলের জন্য মুসলিমদের সাক্ষ্য বিজয় অবশেষে বিপর্যয়ে পরিণত হয়। মুসলিম পক্ষ ৭০ জন শাহীদ ৩৮০ জন আহত হয়। তার মধ্যে মুহাজির ৪ জন, আনসার ৬৫ জন। কুরায়শ পক্ষ ৩৭ জন নিহত হয়। তবে এই হিসাব চূড়ান্ত নয়। বরং কুরায়শ পক্ষ হতাহতের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি, এই যুদ্ধে মুসলিমরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কুরায়শরা বিজয়ী হয়নি। বরং তারা ভীত হয়ে ফিরে যায়। এ যুদ্ধ প্রসঙ্গে সূরাহ্ আ-লি ‘ইমরান-এর ১২১-১৭৯ পর্যন্ত ৬০টি আয়াত নাযিল হয়। (সীরাতুর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৩৩৯ পৃঃ)
পরিচ্ছেদঃ ১৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বংশগৌরব ও পক্ষপাতিত্ব
৪৯০৪-[১২] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে নিজের সম্প্রদায়ের সাহায্য করে, তার তুলনা সে উটের মতো, যা কূপে পতিত হয়েছে, অতঃপর সেটার লেজ ধরে উদ্ধারের জন্য টানা হচ্ছে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنِ
ابْنِ مَسْعُودٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ نَصَرَ قَوْمَهُ عَلَى غَيْرِ الْحَقِّ فَهُوَ كَالْبَعِيرِ الَّذِي رَدَى فَهُوَ يُنزَعُ بذنَبِه» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ (يُنزَعُ بذنَبِه) অর্থাৎ সেটার পিছন ধরে টানা হচ্ছে। ইমাম খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এর অর্থ হলো নিশ্চয় সে পাপে লিপ্ত হলো এবং ধ্বংস হলো। ঐ উটের মতো যে কুয়ায় পড়ে গেলে তাকে উদ্ধারের জন্য তার পিছন দিক থেকে তথা লেজ ধরে উদ্ধারের চেষ্টা করা হচ্ছে তবে তাকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করা সম্ভবপর হচ্ছে না। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫১০৮)
পরিচ্ছেদঃ ১৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বংশগৌরব ও পক্ষপাতিত্ব
৪৯০৫-[১৩] ওয়াসিলাহ্ ইবনুল আসক্বা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রসূল! ’’আসাবিয়্যাহ্’’ কি? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ ’আসাবিয়্যাহ্ হলো তোমার গোত্রকে অন্যায়ের কাজে সাহায্য করা। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن
واثلةَ بن الأسقَعِ قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا الْعَصَبِيَّةُ؟ قَالَ: «أَنْ تُعِينَ قَوْمَكَ عَلَى الظُّلْمِ» رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘ওয়াসিলাহ্-এর কন্যাকে’’ চেনা যায় না। কেউ কেউ তার নাম দিয়েছে ফাসীলাহ্ আর সালামাহ্ ইবনু বিশ্র আদ্ দিমাশ্ক্বী মাজহূলুল হাল। ইবনু হিব্বান ব্যতীত কেউ তাকে বিশ্বস্ত বলেননি। এ হাদীসে ইমাম যাহাবী (রহিমাহুল্লাহ) তাকে মুদাল্লিস বলেছেন। বিস্তারিত দেখুন- গয়াতুল মারাম ১৮৭ পৃঃ, হাঃ ৩০৫।
ব্যাখ্যাঃ (أَنْ تُعِينَ قَوْمَكَ عَلٰى الظُّلْمِ) অর্থাৎ তোমার কর্তব্য হলো হাকের প্রতিনিধিত্ব করা। যার মাঝে হক আছে কোন চিন্তা-ভাবনা না করেই তাকে সমর্থন করা। এ বিষয়ে জাবির হতে মারফূ‘ সূত্রে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে-
انْصُرْ أَخَاكَ ظَالِمًا أَوْ مَظْلُومًا إِنْ يَكُ ظَالِمًا فَارْدُدْهُ عَنْ ظُلْمِهِ، وَإِنْ يَكُ مَظْلُومًا، فَانْصُرْهُ
‘‘তুমি তোমার ভাইকে সাহায্য কর সে যালিম হোক বা মাযলূম হোক। যদি সে যালিম হয় তবে তাকে জুলুম করা থেকে বিরত রাখ। আর যদি সে মাযলূম হয় তবে তুমি তাকে সাহায্য কর’’- (আবূ দাঊদ)। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বংশগৌরব ও পক্ষপাতিত্ব
৪৯০৬-[১৪] সুরাকাহ্ ইবনু মালিক ইবনু জু’শুম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের উদ্দেশে ভাষণ দিলেন এবং বললেনঃ তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই ব্যক্তি, যে নিজে অপরাধ না করা পর্যন্ত নিজের গোত্রের অন্যায়-অত্যাচার দমন করে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن
سُراقَة بن مالكِ بن جُعْشُم قَالَ: خَطَبَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «خير كم الْمُدَافِعُ عَنْ عَشِيرَتِهِ مَا لَمْ يَأْثَمْ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, আবূ দাঊদ (রহিমাহুল্লাহ) নিজেই বলেছেন ‘‘আইয়ূব ইবনু সুওয়াইদ’’ নামের বর্ণনাকারী য‘ঈফ। য‘ঈফুল জামি‘ ২৯১৫, সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ১৮২, শু‘আবুল ঈমান ৭৯৮৪, আল মু‘জামুল আওসাত্ব ৬৯৯৩, আল মু‘জামুস্ সগীর লিত্ব ত্ববারানী ১০২০।
ব্যাখ্যাঃ (مَا لَمْ يَأْثَمْ) যে ব্যক্তি গোত্রীয় অন্যায়-অত্যাচার দমন করতে গিয়ে নিজেই যদি কোন অপরাধ করে বসে, তবে সে ব্যক্তি উত্তম নয়। অতএব জুলুম অন্যায় দমন করতে গিয়ে যতক্ষণ পর্যন্ত সে এ দমন কার্যে অপরাধ না করবে, ততক্ষণ সে উত্তম ব্যক্তি বলে বিবেচিত হবে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫১১১)
পরিচ্ছেদঃ ১৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বংশগৌরব ও পক্ষপাতিত্ব
৪৯০৭-[১৫] জুবায়র ইবনু মুত্ব’ইম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ’’আসাবিয়্যাহ্’’-এর দিকে লোকেদেরকে আহবান করে, নিজে ’’আসাবিয়্যাহ্’’-এর উপর যুদ্ধ করে এবং ’’আসাবিয়্যাহ্’’-এর উপর মৃত্যুবরণ করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن
جُبَيْرُ بْنُ مُطْعِمٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَيْسَ مِنَّا مَنْ دَعَا إِلَى عَصَبِيَّةٍ وَلَيْسَ مِنَّا مَنْ قَاتَلَ عَصَبِيَّةً وَلَيْسَ مِنَّا من مَاتَ علىعصبية» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার দু’টি কারণ, ১. ইনক্বিত্ব‘ বা বিচ্ছিন্নতা, তা হলো ‘আবদুল্লাহ ইবনু আবূ সুলায়মান জুবায়র ইবনু মুত্ব‘ইম থেকে শোনেননি। আর ২. ইবনু আবূ লাবীবাহ্ নামের বর্ণনাকারী য‘ঈফ। বিস্তারিত দেখুন- গয়াতুল মারাম হাঃ ৩০৪, ১৮৬ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ (إِلٰى عَصَبِيَّةٍ) ‘আল্লামা মানবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এর অর্থ হলো, যে ব্যক্তি ‘আসাবিয়্যাতের জন্য লোকেদেরকে সুসংগঠিত করল। আর তা হলো যালিমকে সাহায্য-সহযোগিতা করার জন্য। মুল্লা ‘আলী কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, অর্থাৎ যালিমকে সাহায্য সহযোগিতা করার জন্য ‘আসাবিয়্যাতের দিকে একত্রিত হলো। ‘আসাবিয়্যাহ্ সম্পর্কে ‘আন্ নিহায়াহ্’ গ্রন্থকার বলেনঃ এটা তাদের কথা ছিল যে, হে অমুকের বংশধর। তারা কোন নতুন বিষয় নিয়ে একজন অন্যকে আহবান করত।
হাদীসটির বাস্তবিক প্রয়োগ : বর্তমানে আমাদের দেশে যে রাজনৈতিক অবস্থা বিরাজমান, ‘আসাবিয়্যাহ্ বুঝতে আমাদের বেশি বেগ পেতে হবে না। কারণ দলের লোক যতই অন্যায় করুক, বিভিন্ন দিক থেকে অন্যায়ভাবে তাকে সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে মুক্ত করা হয়। পক্ষান্তরে শুধু নিজের দলকে ঠিক রাখার জন্য অন্যের ওপর জুলুম-নির্যাতন এমনকি হত্যা পর্যন্ত করা হয়। নিজের দলকে ঠিক রাখার জন্য বা নিজের ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য অন্যের ওপর যে জুলুম-অন্যায় করা হয় একেই বলে ‘আসাবিয়্যাহ্। জাহিলী যুগে এ ‘আসারিয়্যাতের শিকার হয়ে ন্যায়-অন্যায় বিচার-বিবেচনা না করে শুধু নিজ গোত্রীয় পক্ষপাতিত্বের মনোভাব নিয়ে ‘আরবগণ বছরের পর বছর ধরে এক গোত্র অন্য গোত্রের সাথে মারামারি-কাটাকাটিতে লিপ্ত থাকত। যা বর্তমানে বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছে। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ১৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বংশগৌরব ও পক্ষপাতিত্ব
৪৯০৮-[১৬] আবুদ্ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ কোন কিছুর ভালোবাসা যেন তোমাকে অন্ধ ও বধির না করে ফেলে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي
الدَّرْدَاءَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «حُبُّكَ الشَّيْءَ يُعْمِي وَيُصِمُّ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীরটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘আবূ বকর’’ নামের বর্ণনাকারী সে য‘ঈফ। কারণ, তার মুখস্থশক্তি খারাপ হওয়ার কারণে উল্টাপাল্টা হয়ে যায়। এছাড়াও এর সানাদ নিয়েও মতভেদ আছে তা হলো কেউ একে মারফূ‘ বলেছেন, কেউ একে মাওকূফ বলেছেন। বিস্তারিত দিখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ১৮৬৮।
ব্যাখ্যাঃ (حُبُّكَ الشَّيْءَ يُعْمِي وَيُصِمُّ) যখন কোন ব্যক্তি অপর কোন ব্যক্তি বা বস্তুকে ভালোবাসে, তখন ভাবাবেগে সে ঐ ব্যক্তি বা বস্তুর কোন দোষকেই দোষ বলে মনে করে না, যেন এ ব্যাপারে সে অন্ধ। অনুরূপভাবে সে উক্ত ব্যক্তি বা বস্তুর দোষ-ত্রুটির কথা শুনেও শোনে না, যেন এ ব্যাপারে সে বধির। এর কারণ হলো তার মনের মণিকোঠায় ভালোবাসার মানুষটিকে উঁচু স্থান দিয়েছে। (‘আওনুল মা‘বুদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫১২১)
পরিচ্ছেদঃ ১৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - বংশগৌরব ও পক্ষপাতিত্ব
৪৯০৯-[১৭] (ফিলিস্তিনী অধিবাসী) ’উবাদাহ্ ইবনু কাসীর আশ্ শামী (রহিমাহুল্লাহ) বর্ণিত। তিনি স্বীয় গোত্রের ’’ফাসীলাহ্’’ নামণী এক মহিলার নিকট থেকে বর্ণনা করেন। ফাসীলাহ্ বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সমীপে জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রসূল! কোন ব্যক্তির নিজের গোত্রকে ভালোবাসা কি ’আসাবিয়্যাতের অন্তর্ভুক্ত? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ না; বরং ’আসাবিয়্যাত হলো কোন ব্যক্তির নিজের গোত্রকে যুলমে সাহায্য করা। (আহমাদ ও ইবনু মাজাহ)[1]
عَن عُبَادَةَ
بْنِ كَثِيرٍ الشَّامِيِّ مِنْ أَهْلِ فِلَسْطِينَ عَن امْرَأَةٍ مِنْهُمْ يُقَالُ لَهَا فَسِيلَةُ أَنَّهَا قَالَتْ: سَمِعْتُ أَبِي يَقُولُ: سَأَلَتْ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَمِنَ الْعَصَبِيَّةِ أَنْ يُحِبَّ الرَّجُلُ قَوْمَهُ؟ قَالَ: «لَا وَلَكِنْ مِنَ الْعَصَبِيَّةِ أَنْ يَنْصُرَ الرَّجُلُ قَوْمَهُ عَلَى الظُّلْمِ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَابْنُ مَاجَهْ
হাদীরটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘ফাসীলাহ্’’ নামের বর্ণনাকারীকে চেনা যায় না । দেখুন- গয়াতুল মারাম হাঃ ৩০৫, পৃঃ ১৮৭।
ব্যাখ্যাঃ (أَنْ يَنْصُرَ الرَّجُلُ قَوْمَهُ عَلَى الظُّلْمِ) মানুষকে অন্যায় কাজে সহযোগিতা করা আর নিজে অন্যায় করা সমান কথা। বরং এটা আরো মারাত্মক। ঠিক ‘আসাবিয়্যাতের বিষয়টিও এরূপ। নিজে পাপী জাতির নিকট ভালো হওয়ার জন্য তাদেরকে অন্যায় কাজে সহযোগিতা করাই হলো ‘আসাবিয়্যাহ্। যিনি সমাজে ‘আসাবিয়্যাতকে জিইয়ে রাখেন তিনি মূলত সমাজে ইবলীসের ভূমিকা পালন করেন। কাজেই জাতিকে জুলুম-অন্যায়ের উপর সাহায্য-সহযোগিতা থেকে সাবধান থাকুন। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ১৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - বংশগৌরব ও পক্ষপাতিত্ব
৪৯১০-[১৮] ’উকবাহ্ ইবনু ’আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের বংশ পরিচয় এমন জিনিস নয় যে, তোমরা এর কারণে অন্যকে মন্দ বলবে। তোমরা সবাই এক আদমের সন্তান। পাল্লার সমান পাল্লা। কোন একদিক পূর্ণ করে নিতে পারো না। দীন ও আল্লাহভীতি ছাড়া তোমাদের কারো ওপর কারো মর্যাদা নেই। এক ব্যক্তি মন্দ ব্যক্তিতে পরিণত হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে প্রগল্ভ, অশ্লীলভাষী ও কৃপণ। [আহমাদ; আর ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) ’’শু’আবুল ঈমানে’’ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।][1]
وَعَنْ
عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَنْسَابُكُمْ هَذِهِ لَيْسَتْ بِمَسَبَّةٍ عَلَى أَحَدٍ كُلُّكُمْ بَنُو آدَمَ طَفُّ الصَّاعِ بِالصَّاعِ لَمْ تملؤوه لَيْسَ لِأَحَدٍ عَلَى أَحَدٍ فَضْلٌ إِلَّا بِدِينٍ وَتَقْوًى كَفَى بِالرَّجُلِ أَنْ يَكُونَ بَذِيًّا فَاحِشًا بَخِيلًا» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ»
ব্যাখ্যাঃ হাদীসটির সারকথা হলো : যে ব্যক্তি প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য শির্ক থেকে দূরে থাকে এবং কাবীরাহ্ ও সগীরাহ্ গুনাহ থেকে দূরে থাকে সেই প্রকৃত মর্যাদাবান। মোটকথা সকল আদম সন্তানের মাঝে কমতি রয়েছে। আর সকলে ক্ষতিগ্রস্ত তবে মুক্তাক্বী ও পূর্ণ দীনদার ব্যক্তি ব্যতীত।
মহান আল্লাহ বলেন,
وَالْعَصْرِ * إِنَّ الْإِنْسَانَ لَفِي خُسْرٍ * إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ
‘‘সময়ের কসম, নিশ্চয় সকল মানুষ ক্ষতিগ্রস্ততায় নিপতিত। তবে তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে...’’- (সূরাহ্ আল ‘আসর ১-৩)। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯১১-[১] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রসূল! আমার সাহচর্যে আমার সদাচার পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারী কে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ ’’তোমার মা’’। লোকটি বলল, তারপর কে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ ’’তোমার মা’’। লোকটি পুনরায় জিজ্ঞেস করল, তারপর কে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ ’’তোমার মা’’। লোকটি আবারো জিজ্ঞেস করল, তারপর কে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ ’’তোমার বাবা’’। অপর এক বর্ণনায় আছে যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ তোমার মা, অতঃপর তোমার মা, অতঃপর তোমার মা, অতঃপর তোমার বাবা, তারপর তোমার নিকট আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধব। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْبِرِّ وَالصِّلَةِ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَنْ أَحَقُّ بِحُسْنِ صَحَابَتِي؟ قَالَ: «أُمَّكَ» . قَالَ: ثُمَّ مَنْ؟ قَالَ: «أُمَّكَ» . قَالَ: ثُمَّ مَنْ؟ قَالَ «أُمَّكَ» . قَالَ: ثُمَّ مَنْ؟ قَالَ: «أَبُوكَ» . وَفِي رِوَايَةٍ قَالَ: «أُمَّكَ ثُمَّ أُمَّكَ ثُمَّ أُمَّكَ ثُمَّ أَبَاكَ ثمَّ أدناك أدناك» . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ (جاء رَجُلٌ) প্রশ্নকারী সাহাবীর নাম সম্ভবত মু‘আবিয়াহ্ ইবনু হায়দাহ্। তিনি বাহয ইবনু হাকীম এর দাদা ছিলেন। ইমাম বুখারী তাঁর ‘‘আল আদাবুল মুফরাদ’’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, মু‘আবিয়াহ্ ইবনু হায়দাহ্ বলেন, قلت : يا رسول الله من أبر ؟ قال : أمك আমি বললামঃ হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! সদ্ব্যবহার পেতে কে অগ্রগণ্য? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমার মা ....’’- (আল আদাবুল মুফরাদ হাঃ ৩)। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৯৭১)
(ثُمَّ أَدْنَاكَ أَدْنَاكَ) সর্বপ্রথম সদ্ব্যবহার পাওয়ার হকদার মা, তারপর পিতা, তারপর ছেলে-মেয়ে, তারপর দাদাগণ-নানাগণ, রক্তসম্পর্কীয় মাহরাম আত্মীয়গণ। যেমন : চাচা ও ফুফুগণ, মামা ও খালাগণ। এরপর পর্যায়ক্রমের নিকট আত্মীয়গণ। এরপর রক্তসম্পর্কীয় গায়রে মাহরাম (যাদের সাথে বিবাহ হালাল বা বৈধ) যেমন- চাচতো ভাই, চাচাতো বোন, মামাতো ভাই, মামাতো বোন ইত্যাদি। এরপর শ্বশুর বাড়ীর আত্মীয়দের সাথে সদাচরণ করতে হবে। এরপর খাদেম বা কর্মচারীদের সাথে স্তর অনুযায়ী। এরপর প্রতিবেশীদের সাথে। এর মধ্যে যার বাড়ীর কাছে সে বেশি হকদার, এভাবে পর্যায়ক্রমে দূরের। (শারহুন নাবাবী ১৬শ খন্ড, হাঃ ১-[২৫৪৮])
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯১২-[২] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তার নাক ধুলোয় মলিন হোক, তার নাক ধূলোয় মলিন হোক, তার নাক ধূলোয় মলিন হোক (তথা অপদস্থ হোক)। তিনি জনৈক সাহাবী কর্তৃক জিজ্ঞাসিত হলেন, হে আল্লাহর রসূল! কে সে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ যে ব্যক্তি নিজের পিতা-মাতার কোন একজনকে বা উভয়কে বার্ধক্য অবস্থায় পেল, অথচ (তাদের খিদমাত করে) সে জান্নাতে প্রবেশ করল না। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْبِرِّ وَالصِّلَةِ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «رَغِمَ أَنْفُهُ رَغِمَ أَنْفُهُ رَغِمَ أَنْفُهُ» . قِيلَ: مَنْ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: «مَنْ أَدْرَكَ وَالِدَيْهِ عِنْدَ الْكِبَرِ أَحَدَهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا ثمَّ لم يدْخل الْجنَّة» . وَرَاه مُسلم
ব্যাখ্যাঃ (رَغِمَ أَنْفُهٗ) অর্থাৎ তার নাক ধূলোয় মলিন হোন। এটা দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে, সে ব্যক্তি অপদস্থ হোক। নিহায়াহ্ গ্রন্থে বলা হয়েছে, তাঁর নাক মাটিতে মিলিয়ে দিক। আলোচ্য হাদীসে মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান ধ্বংস হোক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ সে নিতান্তই হতভাগা ও কপাল পোড়া। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৯ম খন্ড, হাঃ ৩৫৪৫)
(لَمْ يَدْخُلِ الْجَنَّةَ) পিতামাতার অবাধ্য হওয়ার কারণে এবং তাদের অধিকার যথাযথ পালন না করার কারণে সে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এর অর্থ হলো পিতামাতার বৃদ্ধ বয়সে ও তাদের দুর্বল অবস্থায় তাদের প্রতি খরচ করা ও তাদের খিদমাতের মাধ্যমে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করা জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম। সুতরাং কোন ব্যক্তি এই কাজে কমতি করলে জান্নাতে প্রবেশের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ‘সে জান্নাতে প্রবেশ করল না’; এর অর্থ হলো সে অপমানিত ও লজ্জিত হবেন এবং ধ্বংস হবে। যে ব্যক্তি ঐ সুযোগ পেল যা তাকে সফলতা ও জান্নাত দানে ধন্য করবে এরূপ সুযোগ যে কাজে লাগাতে পারল না। সে মহান আল্লাহর বাণীকে কাজে লাগাতে পারেনি। মহান আল্লাহ বলেন, وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا ‘‘...আর পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। তাদের একজন বা তাদের উভয়ে যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে বিরক্তি বা অবজ্ঞাসূচক কথা বলো না...’’- (সূরাহ্ বানী ইসরাঈল ১৭ : ২৩)। তিনি আরো বলেন, وَقُلْ رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا ‘‘...বল, হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া কর যেমনভাবে তারা আমাকে শৈশবে লালন পালন করেছেন’’- (সূরাহ্ বানী ইসরাঈল ১৭ : ২৪)। এ আয়াতগুলো যাবতীয় হারাম কথা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ করে এবং যাবতীয় ভালো কথা ও কাজ করার প্রতি আদেশ করে। দুনিয়াতে তাদের প্রতি সদয় হও। তাদের খিদমাত করতে ও মৃত্যুর পর তাদের জন্য জান্নাত লাভের দু‘আ করার জন্য নির্দেশ করে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯১৩-[৩] আসমা বিনতু আবূ বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার মা আমার কাছে আসলেন। তিনি ছিলেন মুশরিকা। এ ঘটনা ঐ সময়ের, যখন কুরায়শদের সাথে হুদায়বিয়ার সন্ধি সংঘটিত হয়েছিল। আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রসূল! আমার মা আমার কাছে এসেছেন, তিনি ইসলামের প্রতি অসন্তুষ্ট। সুতরাং আমি কি তার সাথে সদ্ব্যবহার করব? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ হ্যাঁ, তার সাথে উত্তম আচরণ করো। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْبِرِّ وَالصِّلَةِ
وَعَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِي بَكْرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنهُ قَالَتْ: قَدِمَتْ عَلَيَّ أُمِّي وَهِيَ مُشْرِكَةٌ فِي عَهْدِ قُرَيْشٍ فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ أُمِّي قَدِمَتْ عَلَيَّ وَهِيَ رَاغِبَةٌ أَفَأَصِلُهَا؟ قَالَ: «نعم صِليها» . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ আসমা (রাঃ)-এর মা আবূ বকর (রাঃ)-এর স্ত্রী মুশরিকা অবস্থায় মক্কা থেকে মদীনায় গিয়ে স্বীয় কন্যা আসমার গৃহে পৌঁছেন। তার আগমনের এ সময়টি ছিল কুরায়শদের সাথে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুদ্ধ বিগ্রহ বন্ধ এবং একে অপরের নিরাপত্তার সন্ধি চুক্তির মেয়াদকালে। এ সময়ও সে ইসলামের বিমুখ ও বীতশ্রদ্ধ ছিল। কিন্তু স্বামী ও সন্তানাদির বিরহ-বিদ্রোহের লাঞ্ছনাময় জীবনের দুর্বিসহ যন্ত্রণায় ছিল কাতর। আসমা (রাঃ) বলেন, এজন্য সে আমার কাছ থেকে কিছু পাওয়ার আশাবাদী ছিল। সে কমপক্ষ এতটুক আশা করে এসেছিল যাতে আমি তার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করি।
মুশরিকা মায়ের এ অবস্থা দেখে আসমা বিনতু আবূ বকর (রাঃ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি কি আমার এই মায়ের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখব এবং তার সাথে সদাচরণ করব? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ! তুমি তার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখ। অর্থাৎ সে যা পেলে খুশী হয়, তুমি তাকে তা দাও। ইমাম ইবনু হাজার ‘আসকালানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এ হাদীস দ্বারা মুশরিক নিকটতম আত্মীয়ের সাথেও সদাচরণ করার বৈধতা প্রমাণিত হয়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯১৪-[৪] ’আমর ইবনুল ’আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ অমুকের বাপের সন্তানরা আমার বন্ধু নয়; বরং আমার বন্ধু আল্লাহ তা’আলা এবং পুণ্যবান মু’মিনগণ। তবে হ্যাঁ, তাদের সাথে আমার আত্মীয়তা আছে, আমি তাদের সিক্ততার সাথে সিক্ত করি। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْبِرِّ وَالصِّلَةِ
وَعَنْ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: إِنَّ آل فُلَانٍ لَيْسُوا لِي بِأَوْلِيَاءَ إِنَّمَا وَلِيِّيَ اللَّهُ وَصَالِحُ الْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنْ لَهُمْ رَحِمٌ أَبُلُّهَا بِبَلَالِهَا. مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ لَيْسُوْا لِىْ بِأَوْلِيَاءَ এ কথাটির অর্থ হলো তারা আমার বন্ধুদের দলভুক্ত নয়। ইবনু ত্বীন (রহিমাহুল্লাহ) দাওয়ারদী থেকে বর্ণনা করেছেন, এ কথাটি দ্বারা উদ্দেশ্য হলো তারা যারা তাদের মধ্য থেকে ইসলাম গ্রহণ করেননি। অর্থাৎ এখানে সম্পূর্ণ বলে আংশিককে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। খত্ত্বাবী বলেনঃ হাদীসের এ অংশে বন্ধুত্বের যে অংশটিকে নিষেধ করা হয়েছে সেটি হলো নিকটাত্মীয় এবং বিশেষ বন্ধুত্বের অংশ। এখানে দীনের বন্ধুত্বকে নিষেধ করা হয়নি। উপরোক্ত দুই মতের প্রথম মতকে ইবনু ত্বীন প্রাধান্য দিয়েছে।
إِنَّمَا وَلِيِّىَ اللهُ وَصَالِحُ الْمُؤْمِنِينَ ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ যারা সৎ তারাই নবীর বন্ধু যদিও বংশের দিক দিয়ে নবীর সাথে তাদের কোন সম্পর্ক না থাকে। তারা নবীর কোন বন্ধু নয় যারা সৎ নয় যদিও তারা বংশের দিক দিয়ে নবীর নিকটাত্মীয়। ইমাম কুরতুবী বলেনঃ হাদীস থেকে বুঝা যায় বন্ধুত্বের মাপকাঠি কেবল দীন। সুতরাং মুসলিমই আমাদের বন্ধু কোন কাফির নয়, যদিও সে নিকটতম আত্মীয় হয় তথাপি সে বন্ধু হতে পারে না কারণ সে কাফির। ইবনু বাত্ত্বল বলেনঃ এ হাদীসে মুসলিমদের সাথে বন্ধুত্ব করাকে ওয়াজিব করা হয়েছে আর কাফিরদের বন্ধুত্ব ছিন্ন করতে বলা হয়েছে যদিও সে রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় হয়ে থাকে, কারণ তারা কাফির। তাই বংশসূত্র দাবী করে নিকটাত্মীয়রা যদি একই দীনের অন্তর্ভুক্ত না হয় তাহলে তারা পরস্পর পরস্পরের উত্তরাধিকারী সাব্যস্ত হবে না এবং কোন বন্ধুত্ব অটুট থাকবে না। ইবনু বাত্ত্বল আরো বলেনঃ হাদীসটি থেকে বুঝা যায়, আত্মীয়তার যে সম্পর্ক ছিন্ন করতে নিষেধ করা হয়েছে, তা হলো শার‘ঈ আত্মীয়তার সম্পর্ক। অপরদিকে দীনের খাতিরে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করতে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। তাই অমুসলিম আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে অবৈধ হবে না এবং সে গুনাহগার হবে না। আত্মীয় যদি অমুসলিম হয়ে থাকে তার সাথে দ্বীনের কোন সম্পর্ক না রেখে দুনিয়াবী সম্পর্ক ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া বৈধ।
হাফিয ইবনু হাজার ‘আস্ক্বালানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হাদীসের বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝা যায় যারা দীনী কর্মকাণ্ড-র ব্যাপারে সৎ নয় তাদের সাথেও বন্ধুত্ব করা যাবে না। কারণ হলো মু’মিন হওয়ায় পাশাপাশি সৎ ‘আমলকারী হতে হবে। কাফির আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক রাখার বিষয়টি শর্তযুক্ত, যদি এমন ধারণা হয় যে সে আর কুফরী থেকে ফিরে আসবে না ঠিক কিন্তু তার ঔরসজাত সন্তানের মধ্য থেকে কেউ না কেউ মুসলিম হতে পারে, তাহলে তার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করা যাবে।
তাফসীর বিশারদগণ صَالِحُ الْمُؤْمِنِينَ তথা সৎ মু’মিনের ব্যাখ্যায় মতবিরোধ করেছেন।
কেউ বলেছেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো নবীগণ; কেউ বলেছেন, হলো সাহাবীগণ; কেউ বলেছেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য মু’মিনগণ; কেউ কেউ বলেন, আবূ বকর, ‘উমার ও ‘উসমান ; কেউ বলেছেন শুধু আবূ বকর এবং ‘উমার । কেউ বলেছেন, এর দ্বারা শুধুমাত্র আবূ বকরই উদ্দেশ্য। কেউ বলেছেন, এর দ্বারা ‘উমার। কেউ ‘আলী -এর কথা বলেছেন। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৯৯০)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯১৫-[৫] মুগীরাহ্ ইবনু শু’বাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা তোমাদের জন্য মায়ের অবাধ্যতা, কন্যাদের জীবন্ত প্রোথিতকরণ, কৃপণতা ও ভিক্ষাবৃত্তি হারাম করেছেন। আর তোমাদের জন্য বৃথা তর্কবিতর্ক, অধিক সওয়াল করা ও সম্পদ বিনষ্ট অপছন্দ করেছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْبِرِّ وَالصِّلَةِ
وَعَن الْمُغِيرَةِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ اللَّهَ حَرَّمَ عَلَيْكُمْ عُقُوقَ الْأُمَّهَاتِ وَوَأْدَ الْبَنَاتِ وَمَنَعَ وَهَاتِ. وَكَرِهَ لَكُمْ قِيلَ وَقَالَ وَكَثْرَةَ السُّؤَالِ وَإِضَاعَةَ الْمَالِ» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ (وَوَأْدَ الْبَنَاتِ) এর অর্থ হচ্ছে কন্যা সন্তানদেরকে জীবিত দাফন করা। জাহিলী যুগের মানুষ নারীদের প্রতি অবজ্ঞাবশতঃ এ কাজ করত। সর্বপ্রথম যে এ কাজটি করে তার নাম কায়স ইবনু ‘আসিম আত্ তামিমী। ঘটনাটি হলো : কায়স ইবনু ‘আসিম-এর কোন শত্রু একদিন তার ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে তার কন্যাকে বন্দী করে নিজের স্ত্রী বানিয়েছেন। অতঃপর কোন এক সময় তাদের মাঝে সন্ধি স্থাপিত হয় এবং শত্রুটি তার মেয়েকে স্বাধীনতা দেয়, মেয়েটি তার স্বামীর কাছে থাকতেই পছন্দ করে। এ কারণে কায়স শপথ করে যে, এর পরবর্তীতে যত মেয়ে সন্তান তার জন্ম নিবে সবাইকে সে মাটিতে জিবন্ত পুঁতে ফেলবে। ‘আরব সমাজ তার এ নীতি অনুসরণ করে কন্যা সন্তানদের জীবিত মাটিতে পুঁতে ফেলা শুরু করে দেয়। দ্বিতীয় আরেকটি দল ছিল, যারা যে কোন সন্তানকেই (ছেলে হোক মেয়ে হোক) হত্যা করত। এর একটি কারণ ছিল যে সন্তান তার সাথে খেলে তার সম্পদ কমে যাবে। তাদের এ ঘৃণ্য স্বভাবকে আল্লাহ রববুল ‘আলামীন কুরআনে কয়েকটি জায়গায় উল্লেখ করেছেন।
পরবর্তীতে কায়স ইবনু ‘আসিম আত্ তামিমী ইসলাম গ্রহণ করেন এবং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীর মর্যাদা লাভ করেন। উল্লেখিত হাদীসে কন্যা সন্তান বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ হলো সাধারণত কন্যা সন্তানদেরকেই জীবিত কবর দেয়া হত।
(كَثْرَةُ السُّؤَالِ) হাদীসের এ অংশটুকুর ব্যাখ্যায় যথেষ্ট মতবিরোধ রয়েছে। এটা কি কোন মাল সম্পদ চাওয়া নাকি কোন সমস্যার সমাধান চাওয়া, নাকি এর চেয়ে ব্যাপক কোন বিষয়? এক্ষেত্রে সঠিক কথা হলো বিষয়টিকে ব্যাপক রাখাই শ্রেয়। কেউ কেউ বলেছেন, এ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মানুষের খুঁটিনাটি বিষয়ে বেশি বেশি জিজ্ঞেস করা, অথবা কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত জিজ্ঞাসা। অসম্ভব, অহেতুক বা বিরল কোন বিষয়ে প্রশ্ন করা অপছন্দনীয়। আল্লাহ রববুল ‘আলামীন বলেনঃ ‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা এমন কোন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না যা প্রকাশ হলে তোমাদের ক্ষতি হবে।’’ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তি সর্বাধিক পাপিষ্ট যে এমন কোন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল যে বিষয়টি হারাম ছিল না, কিন্তু তার প্রশ্ন করার কারণে হারাম করে দেয়া হয়েছে।
ভিক্ষা করা নিন্দনীয় এবং ভিক্ষা থেকে বিরত থাকা প্রশংসনীয় কাজ। আল্লাহ রব্বুল ‘আলামীন তাদের প্রসংশা করেছেন যারা দরিদ্র হওয়া স্বত্ত্বেও মানুষের কাছে হাত পাতে না। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে বান্দা ভিক্ষাবৃত্তি করে বেড়ায় কিয়ামতের মাঠে সে এমন অবস্থায় উঠবে যে, তার মুখে কোন গোশত থাকবে না। সহীহ মুসলিমে এসেছে, তিন শ্রেণীর মানুষ ছাড়া কারও জন্য ভিক্ষা করা বৈধ নয়।
১। প্রচণ্ড দারিদ্রে্য জর্জরিত ব্যক্তি; ২। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, যে ঋণ প্রতিশোধ করার সাধ্য রাখে না; ৩। যার সম্পদ দুর্ভিক্ষে নষ্ট হয়ে গেছে।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ‘উলামায়ে কিরাম এক মত যে, বিনা প্রয়োজনে ভিক্ষা করা নিষেধ। আমাদের সাথীরা মতবিরোধ করেছেন উপার্জনক্ষম ব্যক্তির ভিক্ষাবৃত্তির বিষয়ে। কেউ কেউ বলেছেন, এটা সম্পূর্ণ হারাম। কেউ বলেছেন, তিনটি শর্তে এটা অপছন্দনীয়তার সাথে জায়িয। শর্ত তিনটি হলো : ১) চাইতে গিয়ে পিড়াপিড়ি করবে না, ২) চাইতে গিয়ে নিজেকে অপদস্থ করবে না, ৩) দানকারীকে কষ্ট দিবে না। উল্লেখিত তিন শর্তের কোন একটি শর্ত যদি না পাওয়া যায় তাহলে ভিক্ষা করা অবৈধ হারাম হবে।
ফাকিহানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আমি আশ্চর্যান্বিত হয়ে যাই তাদের কথায়, যারা বলে, মানুষের কাছে চাওয়া কোন অবস্থাতেই বৈধ নয়; অথচ মানুষের কাছে চাওয়ার ব্যাপরটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগ থেকে প্রমাণিত। পূর্ববর্তী সালাফে সলিহীনদের নিকট থেকেও প্রমাণিত, তাই ইসলামী শারী‘আহ্ এটাকে অপছন্দনীয় বলেনি।
(إِضَاعَةَ الْمَالِ) ধন-সম্পদ নষ্ট করার ব্যাপারে ইসলাম কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। কেননা সম্পত্তি হলো মানব কল্যাণের জন্য, তাই তা নষ্ট করা মানবতা বিরোধী কর্মকাণ্ড-র শামিল। তবে আখিরাতের সাওয়াবের আশায় জনকল্যাণমূলক কাজে তা অত্যধিক ব্যয় করা খারাপ কিছু নয়। অধিক ব্যয়ের তিনটি দিক হতে পারে। ১) অন্যায় পথে খরচ করা, এটা বিনা সন্দেহে নিষিদ্ধ। ২) ন্যায়ের পথে খরচ করা, যার প্রতি শারী‘আত উৎসাহিত করেছে। ৩) শারী‘আত কর্তৃক বৈধ বিষয়ে খরচ করা। যেমন একটু চাকচিক্যময় জীবন যাপন করা। ইমাম সুবকী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ সম্পদ নষ্টের ব্যাপারে মূলনীতি হলো তা খরচের ব্যাপারে দীনী ও পার্থিব কোন উদ্দেশ্য না থাকা, সম্পদ খরচের ক্ষেত্রে দীনী ও পার্থিব কোন উদ্দেশ্য না থাকলে তা অকাট্য হারাম হবে। ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ উত্তম চরিত্রের মূলনীতি হিসেবে হাদীসটি অনেকগুলো ভালো স্বভাবকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৯৭৫)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯১৬-[৬] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিজের মাতা-পিতাকে গালি দেয়া কাবীরাহ্ গুনাহসমূহের মধ্যে অন্যতম। সাহাবায়ি কিরাম জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রসূল! মানুষ কি তার পিতা-মাতাকে গালি দেয়? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ হ্যাঁ, সে কোন ব্যক্তির বাবা ও মাকে গালি দিল, সেই ব্যক্তিও তার বাবা ও মাকে গালি দিল। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْبِرِّ وَالصِّلَةِ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مِنَ الْكَبَائِرِ شَتْمُ الرَّجُلِ وَالِدَيْهِ» . قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَهَلْ يَشْتُمُ الرَّجُلُ وَالِدَيْهِ؟ قَالَ: «نَعَمْ يَسُبُّ أَبَا الرَّجُلِ فَيَسُبُّ أَبَاهُ ويسبُّ أمه فيسب أمه» . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীসে পিতামাতার অবাধ্য হওয়ার একটি দিক নিয়ে কথা বলা হয়েছে। মনে রাখার বিষয় হলো পিতা মাতাকে গালি দেয়ার কারণ সৃষ্টি করাই যদি সবচেয়ে বড় গুনাহ হয়ে থাকে তা হলো গালি দেয়া আরও বেশি বড় গুনাহ। ‘আদাবুল মুফরাদ’ নামক কিতাবে ‘উরওয়াহ্ ইবনু ইয়াস তিনি ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর থেকে শুনে বর্ণনা করেছেন। কোন ব্যক্তি তার পিতাকে গালি দিবে এটা কাবীরাহ্ গুনাহের অন্তর্গত। ইমাম মুসলিম ইয়াযীদ ইবনু আল-হাদ এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, পিতামাকে গালি দেয়া কাবীরাহ্ গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।
(قَالُوا: يَا رَسُولَ اللهِ وَهَلْ يَشْتُمُ الرَّجُلُ وَالِدَيْهِ؟) হাদীসের এ অংশটিতে পিতা-মাতাকে গালি দেয়ার বিষয়টি সাহাবীদের নিকট আশ্চর্যজনক ছিল। কিন্তু সুস্থ বিবেক এটা মানতে নারাজ, তাই তারা প্রশ্ন করেছিল- মানুষ কি তার পিতামাতাকে গালি দেয়? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়টি পরিষ্কার করে বর্ণনা করেছেন যে, গালি যদিও দেয় না গালির কারণ সৃষ্টি করতে পারে। ইবনু বাত্ত্বল বলেনঃ এ হাদীসটি পাপের মাধ্যমকে বন্ধ করার ক্ষেত্রে মূলনীতি হিসেবে গৃহীত। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৯৭৩)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯১৭-[৭] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মানুষের সর্বোত্তম অনুগ্রহের কাজ হলো, পিতার মৃত্যুর পর পিতার বন্ধুদের সাথে সদাচরণ করা। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْبِرِّ وَالصِّلَةِ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ مِنْ أَبَرِّ الْبِرِّ صِلَةَ الرَّجُلِ أَهْلَ وُدِّ أَبِيهِ بَعْدَ أَن يولي» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের আর একটি উত্তম পন্থা হলো তারা মৃত্যুর পর তাদের প্রিয় মানুষদের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখা। ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীস পিতা-মাতার মরণের পর তাদের আত্মীয়-স্বজন বা প্রিয় মানুষদের প্রতি সদাচরণকে সর্বোত্তম নেকীর কাজ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। আর এসব লোকের প্রতি সদাচরণের কারণ হলো তারা পিতা-মাতার বন্ধু-বান্ধব বা প্রিয় মানুষ। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে এমন সব আত্মীয়কে বুঝায় যাদের মাঝে বংশীয় সম্পর্ক বিদ্যমান, চাই তারা একে অপরের ওয়ারিস হোক বা না হোক। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৯০৩)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯১৮-[৮] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি নিজ জীবিকার প্রশস্ততা ও মরণে বিলম্ব কামনা করে, সে যেন আত্মীয়-স্বজনের সাথে উত্তম ব্যবহার করে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْبِرِّ وَالصِّلَةِ
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ أَحَبَّ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ وَيُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَره فَليصل رَحمَه» . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ (مَنْ أَحَبَّ أَنْ يُبْسَطَ لَهٗ فِي رِزْقِه) অন্য বর্ণনায় এসেছে, إن صلة الرحم محبة في الأهل، مثراة في المال، منسأة في الأثر নিশ্চয় আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার মধ্যে রয়েছে পরিবারের ভালোবাসা। সম্পদের বারাকাত এবং হায়াতে বারাকাত। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রহিমাহুল্লাহ) ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে মারফূ‘ সনদে বর্ণনা করেছেন :
صلة الرحم وحسن الجوار وحسن الخلق يعمران الديار ويزيدان في الإعمار আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহার, উত্তম চরিত্র, সংসার জীবনকে আনন্দঘন করে তোলে এবং জীবনে বারাকাত বয়ে আনে। ‘আবদুল্লাহ ইবনু আহমাদ ‘‘যাওয়ায়িদুল মুসনাদ’’ নামক কিতাবে বর্ণনা করেছেন। ويدفع عنه ميتة السوء মৃতকালীন খারাপ অবস্থা তার থেকে দূর করা হয়। অর্থাৎ যারা আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখবে তাদের ভালো মৃত্যু প্রদান করা হবে। ইমাম আবী ইয়া‘লা আনাস থেকে মারফূ‘ সূত্রে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন, হাদীসটি হলো্র
إن الصدقة وصلة الرحم يزيد الله بهما في العمر، ويدفع بهما ميتة السوء অর্থাৎ দান খয়রাত করা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা- এ দু’টি কাজের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা তার হায়াত বৃদ্ধি করে দেয়, অর্থাৎ জীবনে বারাকাত দান করেন। আর খারাপ মৃত্যু দূর করে দেন, অর্থাৎ ভালো মৃত্যু দেন।
ইবনু ত্বীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ‘‘হায়াত বৃদ্ধি করে দেয়া হয়’’ কথাটির বাহ্যিক দিক কুরআনে কারীমের আয়াতের সাথে সাংঘর্ষিক মনে হয়, কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেছেনঃ
فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ لَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ অর্থাৎ ‘‘...কারো নির্ধারিত সময় এসে গেলে সে সময়েই তার মৃত্যু হবে এর একটুও আগপিছ হবে না।’’ (সূরাহ্ আল আ‘রাফ ৭ : ৩৪)
আর হাদীসে বলা হলো, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখলে হায়াত বৃদ্ধি করে দেয়া হয়।
উপরোক্ত আয়াত ও হাদীসের মাঝে সামঞ্জস্য বিধানের দু’টি পদ্ধতি হতে পারে। (১) বয়স বৃদ্ধির অর্থ সময় বৃদ্ধি নয় বরং বয়সে বারাকাত দান করা, বেশী বেশী সৎ ‘আমল করার তাওফীক দেয়া এবং জীবনকে আখিরাতে কল্যাণ লাভ হয় এমন পথে পরিচালনা করা। আর সময়ের অপচয় থেকে হিফাযাত করা। যেমন- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস থেকে প্রমাণ হয়, এ উম্মাতের বয়স পূর্বের উম্মাতদের চেয়ে কম, তবে এ উম্মাতের জীবনে বারাকাত দেয়া হয়েছে। যেমন- লায়লাতুল কদর, যা এক হাজার রাত্রির চেয়ে উত্তম। মোটকথা হলো আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখলে এর কারণে আল্লাহ ভালো কাজ করার তাওফীক দিবেন আর অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকার তাওফীক দিবেন। মৃত্যুর পরেও পৃথিবীতে তার ভালো গুনাগুণের আলোচনা অব্যাহত থাকবে, মনে হবে যেন সে মরেনি। ২) দ্বিতীয়টি হলো আসলেই বয়স বৃদ্ধি করা হয়, এটা আল্লাহ তা‘আলার আদেশ। মালাককে আল্লাহ এভাবে আদেশ দেন যে, অমুক ব্যক্তি যদি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে তাহলে তার হায়াত ১০০ বছর আর ছিন্ন করলে ৬০ বছর করে দাও (কিন্তু এ কম বেশীর জ্ঞান কোন সৃষ্টির কাছেই নেই)। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৯৮৫)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯১৯-[৯] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা সকল মাখলূক সৃষ্টি করলেন। আর যখন তা থেকে অবসর হলেন, তখন রহিম তথা ’’আত্মীয়তা’’ উঠে দাঁড়াল এবং আল্লাহ রহমানুর্ রহীম-এর কোমর ধরল। তখন আল্লাহ তা’আলা বললেনঃ থামো, কি চাও বলো? ’’আত্মীয়তা’’ জিজ্ঞেস করল, এ স্থান তার, যে তোমার কাছে আত্মীয়তার সম্পর্কচ্ছেদ থেকে রেহাই চায়। আল্লাহ তা’আলা বললেনঃ তুমি কি এ কথায় সম্মত আছ, যে ব্যক্তি তোমাকে বহাল ও সমুন্নত রাখবে, তার সাথে আমিও সম্পর্ক বহাল রাখব; আর যে তোমাকে ছিন্ন করবে, আমিও তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করব? রহিম তথা আত্মীয়তা উত্তর দিল, হ্যাঁ, রাযি আছি, হে আমার প্রভু! আল্লাহ তা’আলা বললেনঃ তাহলে তোমার সাথে আমার এ ওয়া’দাই রইল। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْبِرِّ وَالصِّلَةِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: خُلِقَ اللَّهُ الْخَلْقَ فَلَمَّا فَرَغَ مِنْهُ قَامَتِ الرَّحِمُ فَأَخَذَتْ بِحَقْوَيِ الرَّحْمَنِ فَقَالَ: مَهْ؟ قَالَتْ: هَذَا مقَام العائذ بك من القطيعةِ. قَالَ: أَلَا تَرْضَيْنَ أَنْ أَصِلَ مَنْ وَصَلَكِ وَأَقْطَعَ مَنْ قَطَعَكِ؟ قَالَتْ: بَلَى يَا رَبِّ قَالَ: فَذَاك . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ ইবনু আবূ জামরাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এখানে সৃষ্টি দ্বারা সকল মানবকে উদ্দেশ্য হতে পারে। কিংবা শুধুমাত্র মুকাল্লাফিন বা দায়িত্বপ্রাপ্ত বান্দাগণ উদ্দেশ্য হতে পারে। উক্ত হাদীসের কথাটি আকাশ জমিন সৃষ্টি করার পরও হতে পারে অথবা আকাশ জমিন সৃষ্টির বিষয়টি লাওহে মাহফূযে সংরক্ষেত হওয়ার পরও হতে পারে, অথবা বানী আদামের সকল রূহ সৃষ্টির পরও হতে পারে। হাদীসে বলা হয়েছে ‘‘রহিম তথা আত্মীয়তা বলবে’’- এ কথার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইবনু আবী জামরাহ্ বলেনঃ সম্ভাবনা আছে রহিম অবস্থা অনুযায়ী কথা বলেছিল, অথবা জবান দ্বারাই কথা বলেছিল। এখানে প্রশ্ন হলো জবান দিয়ে যদি রহিম কথাই বলে তাহলে রহিম-এর রূপ বর্তমানে যে রকম আছে সে রকমই ছিল নাকি আল্লাহ রব্বুল ‘আলামীন কথা বলার সময় তাকে জবান এবং বিবেক দিয়েছিলেন? এর উত্তরে সহীহ কথা হলো যে রকম আছে সে রকমই ছিল কিন্তু আল্লাহ তাকে বলার শক্তি দিয়েছিলেন। কেউ কেউ বলেছেন যে, একজন ফেরেশতাই রহিম-এর জবানে কথা বলেছিল।
(أَصِلَ مَنْ وَصَلَكِ وَأَقْطَعَ مَنْ قَطَعَكِ) হাদীসের এ অংশটিকে বলা হয়েছে আল্লাহ রহিম তথা আত্মীয়তা-কে বললেন, ‘‘তোমার সম্পর্ক যে বজায় রাখবে আমি তার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখব, যে তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে আমিও তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করব।’’ ইবনু আবী জামরাহ্ বলেনঃ এখানে সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টি আল্লাহর পক্ষ থেকে ইহসানের ইঙ্গিত বহন করছে তাদের জন্য যারা আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখবে। অনুরূপ সম্পর্ক ছিন্ন অর্থ ইহসান থেকে মাহরুম করে দেয়া। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৯৮৭)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯২০-[১০] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ’’রহিম’’ (আত্মীয়তা) শব্দটি আল্লাহ তা’আলার গুণবাচক নাম ’’রহমান’’ থেকে উদ্ভূত। আল্লাহ তা’আলা ’’রহম’’ (আত্মীয়তা)-কে বলেছেনঃ যে ব্যক্তি তোমাকে সংযোজন করে, আমি তার সাথে সংযোজিত হবো; আর যে ব্যক্তি তোমাকে ছিন্ন করবে আমি তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করব। (বুখারী)[1]
بَابُ الْبِرِّ وَالصِّلَةِ
وَعَنْهُ
قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: الرَّحِمُ شِجْنَةٌ مِنَ الرَّحْمَنِ. فَقَالَ اللَّهُ: مَنْ وَصَلَكِ وَصَلْتُهُ وَمَنْ قَطَعَكِ قَطَعْتُهُ . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ (شِجْنَةٌ) শব্দের অর্থ বিভিন্ন গাছের শিকড়, যা একটি আরেকটির মধ্যে প্রবেশ করে থাকে। বলা হয়ে থাকে الحديث ذو شجون অর্থাৎ এমন কথা যার এক বাক্য অন্য বাক্যের মাঝে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। হাদীসে উল্লেখিত শব্দ (مِنَ الرَّحْمٰنِ) অর্থাৎ رحم এর উৎপত্তি মহান আল্লাহর الرَّحْمٰنِ নাম থেকেই। বস্তুতঃ এ ‘রহিম’ হলো আল্লাহ রব্বুল ‘আলামীনের দয়ার একটি অংশ, তাই যারা রহিম তথা আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখবে তারা আল্লাহর দয়া লাভে ধন্য হবে। আর যারা রহিম তথা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে তারা আল্লাহর রহম বা দয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
ইমাম কুরতুবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আত্মীয়তার যে সম্পর্কের কথা বজায় রাখতে বলা হয়েছে তা মোটামোটি দু’ শ্রেণীর- ১। عامة তথা ব্যাপক। ২। خاصة বিশেষ কোন সম্পর্ক।
عامة তথা ব্যাপক আত্মীয়তার সম্পর্ক হলো দীনের দিক দিয়ে সকল মুসলিম একে অপরের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখবে, পরস্পর পরস্পরকে ভালোবাসবে, শ্রদ্ধা করবে, একে অন্যের প্রতি ইনসাফ করবে, একে অন্যের আবশ্যিক হক ও প্রয়োজনীয় হক আদায়ে সচেষ্ট থাকবে। অপরদিকে خاصة তথা বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার অর্থ হলো আত্মীয়-স্বজনদের কল্যাণে অর্থ ব্যয় করা, তাদের খোঁজ-খবর নেয়া, ভুল-ভ্রান্তি ক্ষমা দৃষ্টিতে দেখা।
ইবনু আবূ জামরাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার কয়েকটি মাধ্যম হতে পারে, যেমন- একে অন্যের কল্যাণে অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে, বিপদে সাহায্য করার মাধ্যমে, তার অকল্যাণ দূর করার মাধ্যমে, তার সাথে হাসোজ্জ্বল চেহারা নিয়ে সাক্ষাতের মাধ্যমে এবং তার জন্য দু‘আ করার মাধ্যমে।
(ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৯৮৮)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯২১-[১১] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ’’রহিম’’ তথা আত্মীয়তা আল্লাহ তা’আলার ’আরশের সাথে ঝুলন্ত আছে এবং বলছে, যে ব্যক্তি আমাকে সংযোজন করবে তথা আত্মীয়তার সম্পর্ক বহাল রাখবে, আল্লাহ তা’আলা তার সাথে সম্পর্ক রক্ষা করবেন এবং যে ব্যক্তি আমাকে ছিন্ন করবে আল্লাহ তা’আলা তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْبِرِّ وَالصِّلَةِ
وَعَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: الرَّحِمُ مُعَلَّقَةٌ بِالْعَرْشِ تَقُولُ: مَنْ وَصَلَنِي وَصَلَهُ اللَّهُ وَمَنْ قَطَعَنِي قَطَعَهُ الله . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ রহিম বা আত্মীয়তার সম্পর্ক কিয়ামতের দিন আল্লাহ রহমানের ‘আরশ চেপে ধরে বলবে যে, আমার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখবে আল্লাহ তার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখবেন, আর যে আমার সম্পর্ক ছিন্ন করবে আল্লাহ তার সম্পর্ক ছিন্ন করবেন।
পূর্বে ৪৯২০ নং হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ রহিম তথা আত্মীয়তা-কে লক্ষ্য করে বলেছেন, ‘‘যে তোমার সাথে সম্পর্ক রক্ষা করবে আমি তার সাথে (আমার রহমাতের) সম্পর্ক রক্ষা করব। যে তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে আমি তার সাথে (আমার রহমাতের) সম্পর্ক ছিন্ন করব।’’
‘রহিম’ এ কথা শুনে উৎসাহিত এবং উদ্বৃদ্ধ হয়েই আল্লাহর ‘আরশ ধারণ করে বলেবেন, ‘যে আমার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখবে আল্লাহ তার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখবেন....।’
‘রহিম’-এর এ কথাটি দু‘আ অর্থেও হতে পারে, অর্থাৎ হে আল্লাহ! যে আমার সাথে সম্পর্ক রক্ষা করবে তুমি তার সাথে (তোমার রহমাতের) সম্পর্ক রক্ষা কর।
আল্লাহর সম্পর্ক রক্ষার অর্থ যেমন তার রহমত দ্বারা আবৃত্ত করে নেয়া, ঠিক তেমনি তার প্রতি উত্তম সাহায্যের ব্যবস্থা করা। এমনকি তার গুনাহখাতা ক্ষমা করা।
পক্ষান্তরে আত্মীয়তার সম্পর্ক বিচ্ছিন্নকারীর সাথে আল্লাহর সম্পর্ক ছিন্ন করার অর্থ হলো তাকে আল্লাহর খাস রহমত থেকে দূরে রাখা, তার প্রতি দয়াপ্রদর্শন না করা, তাকে সাহায্য না করা, এমনকি ক্ষমা না করা। আল্লাহ তা‘আলার বান্দার সাথে সম্পর্ক রক্ষার আরেক অর্থ হলো তার দিকে এগিয়ে আসা এবং তাকে কবুল বা গ্রহণ করা। আর সম্পর্ক ছিন্নের অর্থ হলো তার থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখা এবং তার প্রতি অসন্তুষ্ট হওয়া।
ইমাম ইবনু হাজার ‘আসকালানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ‘রহিম’ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক যা রক্ষা করা ওয়াজিব, তার সীমা নিয়ে মতপার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।
কেউ কেউ বলেন, রহিম-এর সম্পর্ক তাদের মধ্যে বিদ্যমান যাদের দু’জনের মধ্যে যে কোন একজনকে পুরুষ ধরলে তাদের একে অপরের সাথে বিবাহ হারাম হয়ে যায়। এই সূত্রের ভিত্তিতে চাচার এবং মামার সন্তানেরা রহিম বা আত্মীয় সম্পর্ক সীমার আওতাভুক্ত নয়। তবে কোন নারী তার চাচা এবং মামাকে বিবাহ করতে পারবে না, কিন্তু এদের সন্তানদের সাথে বিবাহ বৈধ।
কেউ কেউ বলেছেন, রহিম বা আত্মীয়তার সম্পর্ক মীরাসের ক্ষেত্রে যারা যবীলে আরহাম (মায়ের আত্মীয়তার সম্পর্কীয়) তাদের বেলায় প্রযোজ্য, চাই সে মুহরিম হোক, চাই গাইরি মুহরিম। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯২২-[১২] জুবায়র ইবনু মুত্ব’ইম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْبِرِّ وَالصِّلَةِ
وَعَنْ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَاطِعٌ» . مُتَّفِقٌ عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না। অপরদিকে আবূ মূসা আল আশ্‘আরী (রাঃ) কর্তৃক মারফূ‘ সনদে আছে, لا يدخل الجنة مدمن خمر، ولا مصدق بسحر، ولا قاطع رحم অর্থাৎ মদখোর, যাদু সত্যায়নকারী ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।
আল আদাবুল মুফরাদে আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে মারফূ‘ হাদীস এসেছে,
إن أعمال بني آدم تعرض كل عشية خميس ليلة جمعة، فلا يقبل عمل قاطع رحم বানী আদামের ‘আমলসমূহ প্রতি সপ্তাহে বৃহস্পতিবার রাতে আল্লাহর নিকট উপস্থাপন করা হয় সবার ‘আমলে কবুল করা হয় শুধু قاطع رحم তথা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যতীত। ইবনু আবী আওফা (রাঃ) থেকে আর একটি হাদীস এসেছে মারফূ‘ সনদে।
إن الرحمة لا تنزل على قوم فيهم قاطع الرحم অর্থাৎ যে সমাজে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী বিদ্যমান সে সমাজের ওপর রহমত অবতীর্ণ হয় না।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) অত্র হাদীসের বিশ্লেষণে বলেছেন, এখানে ‘রহমত’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো বৃষ্টি অর্থাৎ যে সমাজে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী থাকবে ঐ সমাজে আল্লাহর রহমত তথা বৃষ্টি অবতীর্ণ হবে না। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৯৮)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯২৩-[১৩] ইবনু ’আমর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী সে নয়, যার সাথে সম্পর্ক রক্ষা করা হচ্ছে; বরং আত্মীয়তা রক্ষাকারী সে, যার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়েছে, আর সে সেই সম্পর্ককে যোজন করে আত্মীয়তার বন্ধন বহাল রেখেছে। (বুখারী)[1]
بَابُ الْبِرِّ وَالصِّلَةِ
وَعَنِ
ابْنِ عَمْرٍو قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «لَيْسَ الواصِلُ بالمكافىء
وَلَكِنَّ الْوَاصِلَ الَّذِي إِذَا قُطِعَتْ رَحِمُهُ وَصَلَهَا» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ ভঙ্গুর এবং ক্ষয়িষ্ণু আত্মীয় সম্পর্ক পুনঃস্থাপন ও সংস্কারের ক্ষেত্রে হাদীসটি চরম গুরুত্বারোপ করেছে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ কোন লোকের আত্মীয় যদি তার প্রতি সম্পর্ক বজায় রাখে বিনিময় স্বরূপ সেও যদি সম্পর্ক বজায় রাখে এর নাম সিলাহ রাহেমী তথা আত্মীয়তার সম্পর্ক বহাল নয়, বরং কেউ আত্মীয় সম্পর্ক ছিন্ন করলে তার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা বা বজায় রাখতে চেষ্টা করার নামই হলো সিলাহ রহিমী বা আত্মীয়তার সম্পর্ক বহাল রাখা।
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষকারীর তিনটি স্তর হতে পারে-
১) পূর্ণ সম্পর্ককারী তিনি; যিনি বেশি দেন, নেন কম।
২) বিনিময় প্রদানকারী তিনি, যিনি যা নেন তার চেয়ে বেশি দেন না।
৩) সম্পর্ক ছিন্নকারী তিনি, যিনি নেনও না, দেনও না।
সম্পর্ক রাখা না রাখার বিষয়টি দু’ পক্ষর মধ্যে হয়ে থাকে, সম্পর্ক ছিন্ন বিষয়টিও দু’ পক্ষর মধ্যে হয়ে থাকে। যিনি সম্পর্ক বজায় রাখা শুরু করে তার নাম ওয়াসিল বা সম্পর্ক স্থাপনকারী, যদি অপর কেউ তার বিনিময় দেয় তাকে বলা হয় বিনিময় প্রদানকারী। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৯৯১)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯২৪-[১৪] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রসূল! আমার এমন কিছু আত্মীয় আছে, আমি তাদের সাথে সদাচরণ করি; কিন্তু তারা সম্পর্ক ছিন্ন করে। আমি তাদের প্রতি অনুগ্রহ করি, তারা আমার ক্ষতিসাধন করে। আমি তাদের প্রতি ধৈর্য ও ক্ষমা প্রদর্শন করি অথচ তারা আমার সাথে বর্বরতা প্রদর্শন করে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তুমি যেরূপ বলছ, যদি তুমি সেরূপ আচরণই করে থাকো, তবে তুমি যেন তাদের প্রতি গরম ছাই নিক্ষেপ করছ। যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি এ গুণের উপর বহাল থাকবে, আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে সর্বদা তোমার সাথে একজন সাহায্যকারী থাকবেন, তিনি তাদের ক্ষতিকে প্রতিরোধ করবেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْبِرِّ وَالصِّلَةِ
وَعَنْ
أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَجُلًا قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ لي قَرَابةَ أصلهم ويقطعوني وَأحسن إِلَيْهِم ويسيؤون إِلَيّ وأحلم عَلَيْهِم وَيَجْهَلُونَ عَلَيَّ. فَقَالَ: «لَئِنْ كُنْتَ كَمَا قُلْتَ فَكَأَنَّمَا تُسِفُّهُمُ الْمَلَّ وَلَا يَزَالُ مَعَكَ مِنَ اللَّهِ ظَهِيرٌ عَلَيْهِمْ مَا دُمْتَ عَلَى ذَلِكَ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীসে বলা হয়েছে, এক সাহাবীর প্রতিবেশী ও নিকটাত্মীয়ের অসৎ ব্যবহারের কথা। তিনি তাদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখেন, সৎ ব্যবহার করেন কিন্তু তারা তার এ সৎ ব্যবহারের পরও তার সাথে অসৎ আচরণ করে। তার ওপর জুলুম নির্যাতন করে। মূর্খ আচরণ করে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বিষয়টি নিয়ে তিনি আলোচনা করলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি এত ভালো ও উত্তম আচরণ করার পরও তারা তোমার সাথে অসদাচরণ করছে বিষয়টি যেন এমন যে, তুমি তাদের চেহারায় ছাই নিক্ষেপ করছো। আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার জন্য সাহায্যকারী মালাক (ফেরেশতা) থাকবেন। যিনি তোমাকে তাদের বিপরীতে সাহায্য করবেন। যতদিন তুমি তাদের সাথে সৎ ব্যবহার করে যাবে।
‘আল্লামা তূরিবিশতী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ তাদের প্রতি তোমার ইহসানকে যেহেতু তারা অনিষ্ট দ্বারা মোকাবিলা করছে এটা তাদের অনেক ক্ষতি ডেকে আনবে, এমনকি তুমি যেন তাদেরকে আগুন খাওয়াচ্ছ, বিষয়টি এত ভয়াবহ।
কেউ কেউ বলেছেন, এমন সব লোক যারা ইহসানের শুকরিয়া আদায় করে না উপরন্তু আরো কষ্ট দেয়, এদের প্রতি ইহসান চালিয়ে যাওয়া অর্থ হলো তাদেরকে লাঞ্ছনা ও গঞ্জনার দিকে ঠেলে দেয়া। কেউ কেউ বলেন, তাদের চেহারা গরম বালুর রূপ ধারণ করবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯২৫-[১৫] সাওবান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দু’আ ব্যতীত আর কিছুই ভাগ্যকে পরিবর্তন করে না, পুণ্য ব্যতীত আর কিছুই আয়ু বাড়ায় না এবং কৃত পাপ ব্যতীত আর কিছুই মানুষকে জীবিকা থেকে বঞ্চিত করে না। (ইবনু মাজাহ)[1]
عَنْ ثَوْبَانَ
قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَرُدُّ الْقَدَرَ إِلَّا الدُّعَاءُ وَلَا يَزِيدُ فِي الْعُمْرِ إِلَّا الْبِرُّ وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيُحْرَمُ الرِّزْقَ بِالذَّنْبِ يُصِيبُهُ» . رَوَاهُ ابْنُ مَاجَهْ
ব্যাখ্যাঃ সাওবান (রাঃ) তিনি ছিলেন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আযাদকৃত গোলাম। তার বর্ণিত এ হাদীসটি একটি বহুল আলোচিত হাদীস। হাদীসটিতে বলা হয়েছে তাকদীর পরিবর্তনের কথা। তাকদীর দুই প্রকার- (১) তাকদীরে মু‘আল্লাক যা পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। (২) তাকদীরে মুবরাম যা কখনো পরিবর্তন হয় না। অত্র হাদীসে দু‘আর মাধ্যমে যে তাকদীর পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে, সেটি হলো তাক্বীদীরে মু‘আল্লাক এবং দু‘আও এমন দু‘আ যা নিশ্চিতভাবে কবুল করা হয়।
‘আল্লামা তূরিবিশ্তী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এখানে তাকদীর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর আদেশ। হাদীসের দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে, ভালো কাজ মানুষের হায়াত বৃদ্ধি করে, তাই যদি দু‘আ না করে তাহলে তাকদীরে মু‘আল্লাক যেভাবে ছিল ঠিক সেভাবে অপরিবর্তিত থেকে যায়। যদি কল্যাণকর কাজ না করা হয় তাহলে হায়াত খাটো হয়ে যায়। তাকদীরে মু‘আল্লাক যেটা লাওহে মাহফূযে সংরক্ষেত কতিপয় মালাক (ফেরেশতা) এবং নবীগণ ও আল্লাহর কিছু বান্দার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। অন্যদিকে তাকদীরে মুবরাম যা আল্লাহর ‘ইল্মের সাথে সংশ্লিষ্ট, যা রয়েছে উম্মুল কিতাবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘‘আল্লাহ যা ইচ্ছা মুছে ফেলেন, আর যা ইচ্ছা দৃঢ় রাখেন। তার কাছে রয়েছে উম্মুল কিতাব।’’ (সূরাহ্ আর্ রা‘দ ১৩ : ৩৯)
অতএব দু‘আ এবং সৎকর্ম খুবই জরুরী দু’টি বিষয়। যেগুলো তাকদীরের পরিবর্তন সাধন করতে পারে আর হায়াত বৃদ্ধি করতে পারে।
তবে এ দু’টি বিষয়ও তাকদীরে লিপিবদ্ধ থাকে, যেমন সৎকর্ম করা অসৎকর্ম করা যা সৌভাগ্য এবং দুর্ভাগ্য হওয়ার কারণ, এ দু’টিই তাকদীরে লিপিবদ্ধ থাকে। অত্র হাদীসের তাকদীর পরিবর্তনের দ্বারা উদ্দেশ্য হলো তাকদীরে নির্ধারিত বিষয় সম্পাদন করতে সহজ করে দেয়া, এমন সহজ মনে হবে যেন তাকদীর পরিবর্তন হয়ে গেছে। হায়াত বৃদ্ধি দ্বারা উদ্দেশ্য হলো হায়াতে বারাকাত দান করা।
শারহুস্ সুন্নাহতে আবূ হাতিম সিজিস্তানী (রহিমাহুল্লাহ) অত্র হাদীসের অর্থ বিশ্লেষণে বলেনঃ মানুষ সর্বদা দু‘আ করতে থাকবে, এটা তাকে তাকদীরের সঠিক পথে পরিচালনা করবে। যেন মনে হবে তার তাকদীরের খারাপ বিষয়গুলো পরিবর্তিত হয়ে ভালো হয়ে গেছে। কল্যাণকর কাজ তার জীবনকে সুন্দর করে তুলবে, মনে হবে যেন তার হায়াত বৃদ্ধি করে দেয়া হয়েছে। অপরদিকে পাপ সুন্দর, উত্তম রিয্ক্বের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। আর তার শেষ পরিণাম খুবই জঘন্য হয়। মুযহির (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হাদীসের শব্দ রিজিক দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আখিরাতের কল্যাণ। কেউ কেউ বলেছেন, এর দ্বারা দুনিয়ার সম্পদ ও সুস্থতাও উদ্দেশ্য হতে পারে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯২৬-[১৬] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি জান্নাতে প্রবেশ করলাম এবং এতে কুরআন পাঠ করতে শুনলাম। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ এ ব্যক্তি কে? মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) বললেনঃ হারিসাহ্ ইবনু নু’মান (রাঃ)। এটা শুনে সাহাবায়ি কিরামের মনে প্রশ্ন জাগল, হারিসাহ্ কিভাবে এত মর্যাদা লাভ করল? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ পুণ্যের প্রতিফল এরূপই, পুণ্যের প্রতিফল এরূপই। সে তার মায়ের সাথে সকল মানুষের তুলনায় সর্বোত্তম সদাচরণ করত। (শারহুস্ সুন্নাহ্ ও বায়হাক্বী’র ’’শু’আবুল ঈমানে’’ বর্ণনা করেছেন)[1]
অপর এক বর্ণনায় আছে, ’’আমি জান্নাতে প্রবেশ করলাম’’-এর স্থলে ’’আমি ঘুমালাম এবং নিজেকে জান্নাতে দেখলাম’’। এখানে فَرَأَيْتُنِيْ فِي الْجَنَّةِ বাক্যটি دَخَلْتُ الْجَنَّةَ-এর পরিবর্তে নেয়া হয়েছে।
وَعَنْ عَائِشَةَ
قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: دَخَلْتُ الْجَنَّةَ فَسَمِعْتُ فِيهَا قِرَاءَةً فَقُلْتُ: مَنْ هَذَا؟ قَالُوا: حَارِثَةُ بْنُ النُّعْمَانِ كَذَلِكُمُ الْبِرُّ كَذَلِكُمُ الْبِرُّ «. وَكَانَ أَبَرَّ النَّاسِ بِأُمِّهِ. رَوَاهُ فِي» شَرْحِ السُّنَّةِ «. وَالْبَيْهَقِيُّ فِي» شعب الْإِيمَان
وَفِي رِوَايَة: قَالَ: «نِمْتُ فرأيتني فِي الْجنَّة» بدل «دخلت الْجنَّة»
ব্যাখ্যাঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা, ‘‘আমি জান্নাতে প্রবেশ করলাম’’। এটা তার স্বপ্নযোগে জান্নাতে প্রবেশের কথা, যা অত্র হাদীসের শেষাংশে উদ্ধৃত হয়েছে।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে কারো কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াতের আওয়াজ শুনলেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, এই তিলাওয়াত কার? উত্তরে মালায়িকাহ্ বললেন, হারিসাহ্ ইবনু নু‘মান-এর।
হারিসাহ্ ইবনু নু‘মান (রাঃ) ছিলেন জালীলুল কদর (অতীব মর্যাদাসম্পন্ন) সাহাবীগণের একজন, তিনি বাদ্র, উহুদসহ সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। তার এই উন্নত মর্যাদার কথা শুনে সাহাবীগণ প্রশ্ন করলেন, কেন তার এ মর্যাদা? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বললেনঃ সে তার মায়ের সাথে সর্বোত্তম আচরণ করত, সেজন্যই তার এ মর্যাদা।
(كَذَلِكُمُ الْبِرُّ) ‘পুণ্যের প্রতিফল এরূপই’ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথাটি দু’বার উচ্চারণ করেছেন তাক্বীদ হিসেবে এবং কথাটির অধিক গুরুত্ব বুঝানোর জন্য। অর্থাৎ মায়ের খিদমাতের কারণে আল্লাহ তা‘আলা তাকে এভাবে কবুল করেছেন যে, জান্নাতের মধ্যে তার কুরআন তিলাওয়াতের আওয়াজ তার নবীকে শুনিয়েছেন। এখানে একবচনের স্থলে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে সম্মানের জন্য।
হাদীসটি সামান্য শব্দের পরিবর্তনে শারহুস্ সুন্নাহ্, বায়হাক্বী, হাকিম প্রভৃতি গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। ইমাম হাক্বীম এটা বুখারী, মুসলিমের শর্তে বর্ণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯২৭-[১৭] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রতিপালক আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টিতে এবং প্রতিপালকের অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টিতে। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ عَبْدِ
اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «رَضِيَ الربِّ فِي رضى الْوَالِدِ وَسُخْطُ الرَّبِّ فِي سُخْطِ الْوَالِدِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীসে বলা হয়েছে রবের সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টিতে, অনুরূপভাবে রবের অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টিতে। ‘উলামায়ে কিরাম বলেন, ঠিক এরূপ কথাই মাতার সম্পর্কে প্রযোজ্য, বরং তার অধিকার আরো বেশি। অত্র হাদীসটির বিভিন্ন সানাদ রয়েছে, এক এক সনদে এক এক ধরনের শব্দ বিদ্যমান।
ইমাম ত্ববারানী (রহিমাহুল্লাহ)-এর এক বর্ণনায় এমন রয়েছে, رِضَا الرَّبِّ فِي رِضَا الْوَالِدَيْنِ وَسُخْطُهٗ فِي سُخْطِهِمَا অর্থাৎ পিতামাতার সন্তুষ্টিতে রবের সন্তুষ্টি, পিতা-মাতার অসন্তুষ্টিতে রবের অসন্তুষ্টি। কেননা আল্লাহ তা‘আলা আদেশ করেছেন পিতামাতার সেবা করতে, তাদের আনুগত্য করতে, তাই তাদের আনুগত্য আল্লাহর আনুগত্যেরই নামান্তর।
অত্র হাদীসে পিতা-মাতার অবাধ্যতার জন্য চরম হুশিয়ারী দেয়া হয়েছে, পিতা-মাতার অবাধ্যতা কাবীরাহ্ গুনাহর অন্তর্ভুক্ত। (মিরকাতুল মাফাতীহ, তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৯০০)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯২৮-[১৮] আবুদ্ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন জনৈক ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে বলল : আমার স্ত্রী আছে। আমার মা চান যে, আমি আমার স্ত্রীকে ত্বলাক (তালাক) দেই। তখন আবুদ্ দারদা(রাঃ) বললেনঃ আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ পিতা হলেন জান্নাতের দরজাসমূহের মধ্যবর্তী দরজা। যদি তুমি ভালো মনে করো, তবে এ দরজাকে রক্ষণাবেক্ষণ করো; আর যদি ইচ্ছে করো, তবে বিনষ্ট করো। (তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَن أبي
الدَّرْدَاء أَنَّ رَجُلًا أَتَاهُ فَقَالَ: إِنَّ لِي امْرَأَةً وَإِن لي أُمِّي تَأْمُرُنِي بِطَلَاقِهَا؟ فَقَالَ لَهُ أَبُو الدَّرْدَاءِ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْوَالِدُ أَوْسَطُ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ فَإِنْ شِئْتَ فَحَافِظْ عَلَى الْبَابِ أَوْ ضَيِّعْ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَابْنُ مَاجَه
ব্যাখ্যাঃ মা যদি স্ত্রীকে ত্বলাক দিতে বলে তখন তার কারণ অনুসন্ধান করে দেখবে, যদি আল্লাহ ও তার রসূলের নাফরমানীমূলক না হয় তবে তার নির্দেশ মান্য করবে, তা না হলে তাকে বুঝিয়ে সমন্বয় করতে হবে। অত্র হাদীসে বলা হচ্ছে পিতার সেবা হলো জান্নাতে প্রবেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। ‘আল্লামা কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ জান্নাতে যাওয়ার উত্তম ‘আমল হলো পিতার সেবা, এর মাধ্যমে জান্নাতের উত্তম সিঁড়িতে আরোহণ সম্ভব। অনেকে বলেন, জান্নাতের অনেকগুলো দরজা আছে, প্রবেশের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত দরজা হলো মাঝখানের দরজা, আর পিতার সেবা করার মাধ্যমে এ দরজা দিয়ে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এখানে পিতা দ্বারা উদ্দেশ্য শুধু পিতাই নন, মাতাও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৮৯৯)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯২৯-[১৯] বাহয ইবনু হাকীম (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর পিতার মাধ্যমে তাঁর পিতামহ হতে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁর পিতামহ বলেছেনঃ আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল! আমি কার সাথে উত্তম আচরণ করব? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তোমার মায়ের সাথে। আমি বললামঃ অতঃপর কার সাথে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তোমার মায়ের সাথে। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ তারপর কার সাথে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তোমার মায়ের সাথে। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ তারপর কার সাথে? এবার তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তোমার বাবার সাথে, তারপর তোমার নিকটতম আত্মীয়-স্বজনের সাথে, তারপর তাদের নিকটতম আত্মীয়দের সাথে। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ
بَهْزِ بْنِ حَكِيمٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جدَّه قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَنْ أَبَرُّ؟ قَالَ: «أُمَّكَ» قُلْتُ: ثُمَّ مَنْ؟ قَالَ: «أُمَّكَ» قُلْتُ: ثُمَّ مَنْ؟ قَالَ: «أُمَّكَ» قُلْتُ: ثُمَّ مَنْ؟ قَالَ: «أَبَاكَ ثُمَّ الْأَقْرَبَ فَالْأَقْرَبَ» رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীস থেকে প্রমাণিত, মায়ের প্রতি সদয় হওয়া, সৎ ব্যবহার করা- এটা সন্তানের কাছ থেকে মায়ের অধিকার। অধুনা সমাজে নারী অধিকার নিয়ে চলছে নানা দাবী, কিন্তু সত্যিকার অর্থে সেগুলো নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে অধিকার ক্ষুণ্ণ করার পায়তারা। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় অত্র হাদীসটি এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫১৩০)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯৩০-[২০] ’আবদুর রহমান ইবনু ’আওফ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, কল্যাণময় মহান আল্লাহ বলেছেনঃ ’’আমি আল্লাহ’’, ’’আমিই রহমান’’, আমি ’’রহিম’’-কে সৃষ্টি করেছি। ’’রহিম’’ নামটি আমি আমার ’’রহমান’’ নাম থেকে অনুসৃত। সুতরাং যে ব্যক্তি আত্মীয়তাকে সংযোজিত করবে অর্থাৎ- আত্মীয়তার সম্পর্ক বহাল রাখবে, আমি তাকে আমার রহমতের সাথে সংযুক্ত করব। আর যে ব্যক্তি আত্মীয়তাকে ছিন্ন করবে, আমি তাকে আমার রহমত থেকে ছিন্ন করব। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَوْفٍ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم يَقُول: قَالَ الله تبَارك: أَنَا اللَّهُ وَأَنَا الرَّحْمَنُ خَلَقْتُ الرَّحِمَ وَشَقَقْتُ لَهَا مِنِ اسْمِي فَمَنْ وَصَلَهَا وَصَلْتُهُ وَمَنْ قطعهَا بتته . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ (رَحِمٌ) ‘রহিম’ শব্দটি (رَحْمٰنُ) ‘রহমা-ন’ শব্দ থেকে উৎপত্তি হয়েছে। রহমান আল্লাহর একটি সিফাতি বা গুণবাচক নাম, অর্থ দয়ালু। আল্লাহর দয়ার ক্ষেত্রে এটি মৌলিক নাম। আল্লাহ বলেন, আমি আল্লাহ্, আমিই রহমান, ‘রহিম’ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক শব্দটি আমি আমার রহমান বা দয়ালু নামক উত্তম গুণবিশিষ্ট নাম শব্দ থেকে চয়ন করেছি। সুতরাং এর সাথে দয়া, মুহাববাত ও ভালবাসার মূল উপাদান বিদ্যমান রয়েছে। যে ব্যক্তি এই সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখবে আমি তার সাথে আমার রহমত বা দয়ার সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখব। আর যে এ সম্পর্ক ছিন্ন করবে আমিও তার সাথে আমার দয়ার সম্পর্ক ছিন্ন করব।
‘রহিম’ নামের উৎসগত ভিত্তি যেহেতু ‘রহমান’, যা দয়ায় পরিপূর্ণ, সুতরাং রহিম-এর সম্পর্কেও এই দয়া আবশ্যক।
রহমান যেহেতু আল্লাহর অতি উত্তম একটি গুণ, মু’মিনের জন্য আল্লাহর এই উত্তম গুণ অর্জন নির্ধারণ করা হয়েছে এবং আল্লাহর নাম ও সিফাতসমূহের সাথে সম্পর্ক তৈরি আবশ্যক করা হয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯৩১-[২১] ’আবদুল্লাহ ইবনু আবূ আওফা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, সে সম্প্রদায়ের ওপর আল্লাহ তা’আলার রহমত নাযিল হবে না, যারা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী। [ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) ’’শু’আবুল ঈমানে’’ বর্ণনা করেছেন।][1]
وَعَنْ عَبْدُ
اللَّهِ بْنِ أَبِي أَوْفَى قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «لَا تَنْزِلُ الرَّحْمَةُ عَلَى قَوْمٍ فِيهِمْ قَاطِعُ الرَّحِمِ» رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَان»
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘সুলায়মান’’ নামক একজন বর্ণনাকারী আছে, ইবনু মা‘ঈন যাকে বিশ্বস্ত নয়, বাযযার বা মিথ্যুক বলে উল্লেখ করেছেন। দেখুন- সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ১৪৫৬।
ব্যাখ্যাঃ ‘আল্লামা তূরিবিশতী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ যে কওম বা সম্প্রদায়ের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী থাকবে তাদের ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষণ হয় না। এ হাদীসে ঐ কত্তম বা সম্প্রদায়ের এ শান্তির কারণ হলো যারা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নের কাজে বাধা না দিয়ে বরং সাহায্য করবে। তিনি আরো বলেন, এখানে রহমত দ্বারা উদ্দেশ্য দুর্ভাগ্যজনক অনাবৃষ্টির ক্ষরদাহ বিদীর্ণ করে প্রাণ সঞ্চয়ী বৃষ্টিপাত না হওয়া। অর্থাৎ তাদের ওপর কল্যাণের বৃষ্টিপাত বন্ধ হয়ে যাওয়া। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯৩২-[২২] আবূ বকরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন পাপই এতটা যোগ্য নয় যে, পাপীকে আল্লাহ তা’আলা খুব শীঘ্র এ দুনিয়াতেই তার বিনিময় দেবেন এবং আখিরাতেও তার জন্য শাস্তি জমা করে রাখবেন। তবে হ্যাঁ, এরূপ দু’টো পাপ রয়েছে- ১. সমসাময়িক নেতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা এবং ২. আত্মীয়তার বন্ধনকে ছিন্ন করা। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ
أَبِي بَكْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا مِنْ ذَنْبٍ أَحْرَى أَنْ يُعَجِّلَ اللَّهُ لصَاحبه الْعقُوبَة فِي الدُّنْيَا مَعَ مايدخر لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْبَغْيِ وَقَطِيعَةِ الرَّحِمِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ হাদীসের বাক্য (مَا مِنْ ذَنْبٍ أَحْرٰى) এর মধ্যে مَا নাফী বা নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।مِنْ অব্যয়টি অতিরিক্তি হিসেবে ইস্তিগফার বা সামগ্রিক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। أَحْرٰى শব্দটি أَحَقُّ وَأَوْلٰى অধিক হকদার উত্তম অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ, দু’টো পাপ ছাড়া আর অন্য কোন পাপই এত অধিক যোগ্য নয় যার অধিকারীকে দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহর ‘আযাবে নিপতিত করতে পারে। হ্যাঁ! যে দু’টি পাপ বান্দাকে দুনিয়া এবং আখিরাত উভয় জগতে আল্লাহর শাস্তিতে অধিকভাবে নিপতিত করতে পারে তার প্রথমটি হলো : বিদ্রোহী হওয়া, এটি একটি জুলুম। সমকালের স্থিতিশীল সুলতান শাসক বা সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করে তোলা এবং সরকারকে বিব্রত করে তোলা ভয়াবহ অপরাধ। আল্লাহ তা‘আলা এ অপরাধের শাস্তি তাকে দুনিয়াতেও দিবেন এবং তাওবাহ্ না করে মৃত্যুবরণ করলে আখিরাতেও তার জন্য তৈরি করে রেখেছেন ভয়াবহ যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। দ্বিতীয় অপরাধ বা পাপটি হলো আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিস্তারিত বিবরণ পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯৩৩-[২৩] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ উপকার করে খোঁটাদাতা, পিতা-মাতার অবাধ্য ও সর্বদা মদ পানকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (নাসায়ী ও দারিমী)[1]
وَعَنْ عَبْدِ
اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنَّانٌ وَلَا عَاقٌّ وَلَا مُدْمِنُ خمر» . رَوَاهُ النَّسَائِيّ والدارمي
ব্যাখ্যাঃ ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রাঃ)-এর বর্ণিত এ হাদীসটিতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনটি জঘন্য কাজ থেকে নিষেধ করেছেন। ১। দান করে খোঁটা দেয়া। ২। পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া। ৩। মদ পান করা।
দান করে খোটা দেয়া প্রসঙ্গে কুরআনে মাজীদে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেনঃ لَا تُبْطِلُوا صَدَقَاتِكُمْ بِالْمَنِّ وَالْأَذٰى ‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের দানকে খোঁটা ও কষ্টদানের মাধ্যমে বিনষ্ট করো না’’- (সূরাহ্ আল বাকারাহ্ ২ : ২৬৪)। দান করে খোঁটা দেয়া আরবী শব্দ হলো من এ শব্দের বিশেস্নষণ করতে গিয়ে ব্যাখ্যাকারীগণ বলেন, শব্দ অনুপাতে হাদীসের অর্থ এ রকম হওয়ারও সম্ভাবনা আছে, তা হলো তোমরা নিরবচ্ছিন্নভাবে দান করে যাও, দান করা কখনো বন্ধ করো না।
অত্র হাদীসে মদ পান হারাম করা হয়েছে। কম হোক বেশী হোক, কিছু সময়ের জন্য হোক আর স্থায়ীভাবে পান করা হোক, সবই হারাম। যারা বলেন, মদ হারাম শুধু স্থায়ীভাবে পান করা হলে, কিছু সময়ের জন্য পান করলে তা হারাম হবে না বরং জায়িয, তাদের এ কথা ভুল।
‘আল্লামা তূরিবিশতী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ‘‘যারা এ ধরনের পাপের সাথে জড়িত থাকবে তারা জান্নাতে যাবে না- এর অর্থ হলো প্রথম সারীর সফলকামদের সাথে জান্নাতে যাবে না অথবা জান্নাতে যাবে না যতক্ষণ পর্যন্ত এ জঘন্য পাপের শাস্তি ভোগ না করবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯৩৪-[২৪] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা তোমাদের বংশ পরিচয় শিক্ষা করো, তাহলে আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করতে পারবে। কেননা আত্মীয়তার সম্পর্ক আপনজনের মধ্যে সম্প্রীতি, ধন-সম্পদের প্রবৃদ্ধি এবং আয়ুতে দীর্ঘজীবী হওয়ার উপলক্ষ হয়। [তিরমিযী; আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসটি গরীব।][1]
وَعَنْ أَبِي
هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «تَعَلَّمُوا مِنْ أَنْسَابِكُمْ مَا تَصِلُونَ بِهِ أَرْحَامَكُمْ فَإِنَّ صِلَةَ الرَّحِمِ مَحَبَّةٌ فِي الْأَهْلِ مَثْرَاةٌ فِي الْمَالِ مَنْسَأَةٌ فِي الْأَثَرِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيب
ব্যাখ্যাঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী ‘‘তোমরা বংশ পরিচয় শিক্ষা কর’’-এর অর্থ হলো তোমার বংশের পূর্বপুরুষ, যেমন- বাপ, দাদা, চাচা, মামা ইত্যাদি এবং তাদের শাখা-প্রশাখার নামগুলো শিক্ষা কর। এতে পরস্পরের চেনা জানার ভিত্তিতে মুহাব্বাত ও দয়ার্দ্রতা সৃষ্টি হবে এবং দু’জনের মাঝের ঝগড়ার সম্ভাবনা দূর হবে। এ হাদীস এটাও করে যে, আত্মীয়তার সম্পর্ক সকল যবীলে আরহামের (মায়ের আত্মীয়তার সম্পর্কীয়দের) সাথে সম্পৃক্ত শুধুমাত্র পিতা-মাতার সাথে সম্পৃক্ত নয়, যেমন কতিপয় ‘আলিম ও বিজ্ঞজনের ধারণা। আরো ব্যাখ্যা হলো নিম্নের হাদীস, تَعَرَّفُوا أَقَارِبَكُمْ مِنْ ذَوِي الْأَرْحَامِ
অর্থাৎ তোমরা যবীলে আরহাম বা নিকটাত্মীয়দের পরিচয় শিক্ষা কর, যাতে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব হয় এবং তাদের প্রতি মুহাববাত সৃষ্টি হয় ফলে ইহসান করা সম্ভব হয়।
বংশ-পরিচয় লাভ করা এবং তাদের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক সুরক্ষার যতগুলো সুফল রয়েছে তন্মধ্যে সম্পদের প্রবৃদ্ধি ও দীর্ঘায়ু লাভ অন্যতম সুফল। সম্পদের প্রবৃদ্ধি হলো আয় উপার্জন বেড়ে যাওয়া এবং তাতে বারাকাত লাভ করা। আর আয়ু বৃদ্ধির অর্থ হলো অল্প জীবনেই দীর্ঘ জীবনের ‘ইবাদাতের তাওফীক লাভ করা এবং বেশী বেশী ‘ইবাদাতের সুযোগ লাভ করা। সর্বোপরি স্বাস্থ্য ও মানাসিকভাবে ‘ইবাদাতের যোগ্যতার লাভ করা এবং শির্ক ও বিদ্‘আতমুক্ত সঠিক ‘আমলের রাস্তা পাওয়া।
কেউ কেউ বলেছেন, মৃত্যু দেরিতে হওয়া বা হায়াত বৃদ্ধি পাওয়ার অর্থ হলো বাস্তবেই বৃদ্ধি পাওয়া, যা আল্লাহর একক ‘ইল্মের মধ্যেই রয়েছে। কেউ বলেন, এর অর্থ হলো তার বংশ ও ভালো প্রজন্মের মধ্যে তার সুনাম সুখ্যাতি চিরদিন অবশিষ্ট থাকা। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯৩৫-[২৫] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে উপস্থিত হয়ে বললঃ হে আল্লাহর রসূল! আমি এক বড় পাপ করেছি। আমার তওবা্ কি কবুল হতে পারে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তোমার কি মা আছে? সে বলল : জ্বী না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তোমার কি কোন খালা আছে? লোকটি বলল : জ্বী হ্যাঁ। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তবে তার সাথে উত্তম আচরণ করো। (তিরমিযী)[1]
وَعَن ابْن
عمر أَنَّ رَجُلًا أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي أَصَبْتُ ذَنْبًا عَظِيمًا فَهَلْ لِي مِنْ تَوْبَةٍ؟ قَالَ: «هَلْ لَكَ مِنْ أُمٍّ؟» قَالَ: لَا. قَالَ: «وَهَلْ لَكَ مِنْ خَالَةٍ؟» . قَالَ: نَعَمْ. قَالَ: «فبرها» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীসে খালাকে মায়ের মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। হাদীসের শব্দ الْخَالَةُ بِمَنْزِلَةِ الْأُمِّ অর্থাৎ ‘‘খালা মায়ের সমতুল্য’’ এর অর্থ মায়ের অবর্তমানে ছেলে মেয়ে লালন পালনে তাদের খালাই উপযুক্ত। অতএব খালা মায়ের স্থলাভিষিক্ত। তাই মায়ের অবর্তমানে খালাকে মায়ের মতো সেবা করবে।
অত্র হাদীসকে কেন্দ্র করে একটি লম্বা ঘটনা আছে। ইমাম বুখারী এবং ইমাম মুসলিম (রহিমাহুল্লাহ) ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন : রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুদায়বিয়ার দিন তিনটি বিষয়ে কাফিরদের সাথে সন্ধি করেন।
১। যে সমস্ত মুশরিক মদীনায় চলে আসবে তাদেরকে মক্কায় ফেরত পাঠাতে হবে।
২। আর কাফিরদের কাছে যদি কোন মুসলিম যায় তাহলে তারা ফেরত পাঠাবে না।
৩। আগামী বছর তারা মক্কায় যাবেন এবং সেখানে তিনদিন অবস্থান করবেন।
পরবর্তী বছর শর্তানুসারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় প্রবেশ করলেন। তিনদিন পর সেখান থেকে বের হয়ে চলে আসার সময় হামযাহ্ -এর কন্যা, তাঁকে পিছন থেকে হে চাচা! হে চাচা! বলে ডাক শুরু করলেন। ইতোমধ্যে তাকে ‘আলী ধরে ফেলেন; তাকে নিয়ে ‘আলী, যায়দ ও জা‘ফার (রাঃ) বাক-বিতিন্ডা শুরু করেন। ‘আলী (রাঃ) বলেন, আমি তাকে ধরেছি যেহেতু সে আমার চাচাতো বোন। জা‘ফার (রাঃ) বলেন, যেহেতু সে আমার চাচাতো বোন এবং তার খালা আমার স্ত্রী। যায়দ (রাঃ) বলেন, আমি তাকে ধরেছি যে আমার ভাতিজী। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জা‘ফার (রাঃ)-এর কাছে দিলেন কারণ সেখানে তার সাথে তার খালা আছেন, তাই সেখানে তার লালন পালন ভালো হবে। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, الْخَالَةُ بِمَنْزِلَةِ الْأُمِّ খালা মায়ের স্থলাভিষিক্ত।
এদিকে ‘আলী (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তো আমার বংশের। জা‘ফারকে বললেনঃ তুমি আকৃতি ও চরিত্রে আমার মতই। যায়দকে বললেন, তুমি আমাদের ভাই ও আযাদকৃত গোলাম। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৯০৪)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯৩৬-[২৬] আবূ উসায়দ আস্ সা’ইদী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে বসেছিলাম। বানী সালামাহ্ গোত্রের এক ব্যক্তি এসে বলল : হে আল্লাহর রসূল! আমার পিতা-মাতার মৃত্যুর পরও কি তাদের প্রতি সদাচরণ করার মতো কোনকিছু অবশিষ্ট থাকে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ হ্যাঁ আছে। তা হলো, তাঁদের জন্য দু’আ করা, তাঁদের ওয়া’দা পূরণ করা, তাঁদের আত্মীয়দের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা এবং তাঁদের বন্ধু-বান্ধবদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। (আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَن
أبي أسيد السَّاعِدِيّ قَالَ: بَيْنَا نَحْنُ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذْ جَاءَ رَجُلٌ مِنْ بَنِي سَلَمَةَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ هَلْ بَقِي من برِّ أبويِّ شيءٌ أَبَرُّهُمَا بِهِ بَعْدَ مَوْتِهِمَا؟ قَالَ: «نَعَمْ الصَّلَاةُ عَلَيْهِمَا وَالِاسْتِغْفَارُ لَهُمَا وَإِنْفَاذُ عَهْدِهِمَا مِنْ بَعْدِهِمَا وَصِلَةُ الرَّحِمِ الَّتِي لَا تُوصَلُ إِلَّا بِهِمَا وَإِكْرَامُ صَدِيقِهِمَا» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘আবূ আসীদ’’-এর মুক্ত দাস ‘আলী নামক একজন বর্ণনাকারী আছে, যে ব্যক্তি বিশ্বাসী নয়। এছাড়া বাকী সকল বর্ণনাকারী বিশ্বস্ত। দেখুন- য‘ঈফাহ্ ৫৯৭, য‘ঈফ আত্ তারগীব ১৪৮২।
ব্যাখ্যাঃ পিতা-মাতার মৃত্যুর পরও তাদের প্রতি সদাচরণের কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে। পিতা-মাতার মৃত্যুর পর করণীয় হলো তাদের জানাযার সালাত আদায় করা, তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা, তাদের মৃত্যুর পর তাদের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা, তাদের মাধ্যমে সৃষ্ট আত্মীয় সম্পর্ক বজায় রাখা এবং তাদের প্রিয় মানুষদের শ্রদ্ধা করা। ‘সালাত’ দ্বারা উদ্দেশ্য জানাযার সালাত অথবা দু‘আ করা।
‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী হানাফী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘সালাত’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো তাদের জন্য আল্লাহর রহমাতের দু‘আ করা। ইসতিগফার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। তাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করা অর্থ হলো তাদের ওয়াসিয়্যাত বাস্তবায়ন করা। তাদের কারণে সৃষ্ট আত্মীয়ের বন্ধন অটুট রাখার অর্থ হলো নিকটাত্মীয়ের প্রতি ইহসান করা।
‘মিরকাতুস্ সউদ’ গ্রন্থে ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ)-এর এক বর্ণনার শব্দগুলো নিম্নরূপ :
وَصِلَةُ رَحِمِهِمَا الَّتِي لَا رَحِمَ لَكَ إِلَّا مِنْ قِبَلِهِمَا
অর্থাৎ তুমি তাদের সাথে বন্ধন অটুট রাখ যাদের সাথে তোমার পিতা-মাতার বন্ধন রয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা শুনে লোকটি বললেন, হে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি অনেক ভালো ‘আমলের কথা বললেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে এখন থেকে এগুলো ‘আমল কর তাহলে এর মাধ্যমে মৃত্যুর পরও তোমার পিতামাতার সেবা করতে পারবে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ২৫১৩৩)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯৩৭-[২৭] আবুত্ব তুফায়ল (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’’জি’রানাহ্’’ নামক স্থানে আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মাংস বণ্টন করতে দেখলাম। এমন সময় এক মহিলা আগমন করলেন, যখন তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটবর্তী হলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জন্য নিজের চাদর বিছিয়ে দিলেন। তখন তিনি (মহিলা) সেই চাদরের উপর বসলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এ মহিলা কে? তাঁরা বলল, ইনি সেই মহিলা, যিনি তাঁকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শৈশবে স্তন্য পান করিয়েছিলেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن
أبي الطُّفَيْل قَالَ: رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقْسِمُ لَحْمًا بِالْجِعْرَانَةِ إِذْ أَقْبَلَتِ امْرَأَةٌ حَتَّى دَنَتْ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَبَسَطَ لَهَا رِدَاءَهُ فَجَلَسَتْ عَلَيْهِ. فَقُلْتُ: مَنْ هِيَ؟ فَقَالُوا: هِيَ أُمُّهُ الَّتِي أَرْضَعَتْهُ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘জা‘ফার ইবনু ইয়াহ্ইয়া’’-কে ‘আলী ইবনুল মাদানী ও ইমাম যাহাবী মাজহূল বলেছেন।
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মায়ের প্রতি যে সম্মান দেখালেন তা পৃথিবীবাসীর জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যেখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দুধ মায়ের শ্রদ্ধায় নিজের চাদর বিছিয়ে দিলেন। গর্ভধারিণী আপন মায়ের সম্মান আরো কমবেশী হতে পারে।
হাফিয ইবনু হাজার ‘আসক্বালানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হালিমাতুস্ সা‘দিয়াহ্ (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দুধ মা ছিলেন। তিনি ছিলেন আবূ যু‘আয়ব-এর কন্যা, আবূ যু‘আয়ব-এর প্রকৃত নাম হলো ‘আবদুল্লাহ ইবনু আল-হারিস ইবনু সা‘দ ইবনু বকর ইবনু হাওয়াযিন। ইবনু ‘আবদুল বার বলেনঃ তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে শিশুকালে বুকের দুধ পান করানো অবস্থায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভবিষ্যত নুবুওয়াত প্রাপ্তির অনেক নিদর্শন অবলোকন করেছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই দুধ মা একবার তার সাথে দেখা করতে আসলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সম্মানে দাঁড়িয়ে গেলেন আর নিজের চাদর বিছিয়ে দিলেন। বিবি হালিমা ঐ চাদরের উপর বসলেন। এ হাদীস নারীর সম্মানে ইসলামের শাশ্বত বিধানের উজ্জ্বল নমুনা। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫১৩৫)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯৩৮-[২৮] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ তিন ব্যক্তি পথ চলছিলেন। হঠাৎ তাঁদেরকে বৃষ্টিতে পেলে তাঁরা এক পর্বতের গুহায় আশ্রয় নিলেন। এ সময় হঠাৎ পর্বত থেকে একটি প্রকাণ্ড পাথর এসে গুহার মুখে পতিত হলো এবং তাঁদের বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেল। তাঁদের মধ্য থেকে একজন অপরজনকে বললেন, তোমরা তোমাদের কোন নেক কাজ দেখো, যা একমাত্র আল্লাহ তা’আলার উদ্দেশেই করেছ। আর সে কাজকে উপলক্ষ করে আল্লাহ তা’আলার কাছে এ বিপদ থেকে মুক্তির প্রার্থনা করো। এমনও হতে পারে যে, আল্লাহ তা’আলা হয়তো এ পাথর দূর করে দেবেন।
তখন তাঁদের একজন বললেনঃ হে আল্লাহ! আমার অতি বৃদ্ধ মাতা-পিতা ছিলেন এবং কয়েকটি ছোট বাচ্চা ছিল। আমি ছাগল চরাতাম। যখন সন্ধ্যায় তাদের নিকট ফিরে আসতাম, তখন দুধ দোহন করতাম। আমার সন্তানদের পান করানোর আগেই আমার পিতা-মাতাকে দুধ পান করাতাম। ঘটনাক্রমে একদিন চারণ-ক্ষেত্র আমাকে দূরে নিয়ে গেল। অর্থাৎ- ছাগল চরাতে চরাতে এতটা দূরে চলে গেলাম যে, বাড়িতে পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। দেখলাম, আমার মা-বাবা উভয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। আমি প্রতিদিনের মতো আজও দুধ দোহন করলাম এবং দুধের পাত্র নিয়ে মা-বাবার কাছে এসে তাঁদের শিয়রের কাছে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমি তাঁদেরকে ঘুম থেকে জাগানো ভালো মনে করলাম না এবং অপছন্দ করলাম বাচ্চাগুলোকে দুধ পান করাতে তাঁদের পূর্বে, অথচ বাচ্চাগুলো আমার পায়ের কাছে ক্ষুধায় কাঁদছিল। সকাল হওয়া পর্যন্ত আমার ও তাদের এ অবস্থা ছিল। হে আল্লাহ! যদি তুমি জেনে থাকো যে, আমি এ কাজ একমাত্র তোমার সন্তুষ্টির জন্য করেছি, তবে আমাদের জন্য এতটুকু পথ খুলে দাও, যেন আকাশ দেখতে পাই। তখন আল্লাহ তা’আলা পাথরকে এতটুকু সরিয়ে দিলেন যে, আকাশ দেখা যেতে লাগল।
দ্বিতীয় ব্যক্তি বললেনঃ হে আল্লাহ! আমার এক চাচাতো বোন ছিল। আমি তাকে অত্যধিক ভালোবাসতাম, যতটা কোন পুরুষ কোন মহিলাকে ভালোবাসতে পারে। আমি তাকে উপভোগ করতে চাইলাম। সে এটা অস্বীকার করল, যতক্ষণ না আমি তাকে একশ’ দীনার দেই। তখন আমি জোর প্রচেষ্টা চালালাম এবং একশ’ দীনার যোগাড় করে তার সাথে সাক্ষাৎ করলাম। যখন তার দু’পায়ের মধ্যখানে হাঁটু গেড়ে বসলাম, সে বলল : হে আল্লাহর বান্দা! আল্লাহকে ভয় করো, মোহর অর্থাৎ- কুমারিত্ব নষ্ট করো না। তৎক্ষণাৎ আমি দাঁড়ালাম। হে আল্লাহ! যদি তুমি জেনে থাকো যে, আমি এ কাজ একমাত্র তোমার সন্তুষ্টির জন্য করেছি, তবে আমাদের জন্য পথ খুলে দাও। তখন আল্লাহ তা’আলা পাথর আরো কিঞ্চিৎ সরিয়ে দিলেন।
তৃতীয় ব্যক্তি বললেনঃ হে আল্লাহ! আমি এক ব্যক্তিকে এক ’’ফারক’’ পরিমাণ খাদ্যের বিনিময়ে মজুর নিয়োগ করলাম। যখন সে ব্যক্তি নিজ কাজ সমাধা করে বলল : আমার পাওনা আমাকে দিয়ে দাও। আমি তাকে প্রাপ্য দিলাম। সে তা ফেলে চলে গেল, তার প্রতি ভ্রূক্ষেপ করল না। আমি তার পাওনা দ্বারা চাষাবাদ আরম্ভ করলাম। সেটার আয় দ্বারা অনেকগুলো গরু ও রাখাল যোগাড় করলাম। তখন একদিন লোকটি আমার কাছে এসে বলল : আল্লাহকে ভয় করো, আমার প্রতি অবিচার করো না। আমাকে আমার পাওনা দিয়ে দাও। আমি বললামঃ এ গরুগুলো এবং তার রাখালসমূহ নিয়ে যাও। সে বলল : আল্লাহকে ভয় করো, আমার সাথে ঠাট্টা করো না। তখন আমি বললামঃ তোমার সাথে ঠাট্টা করছি না। ঐ গরু ও রাখালগুলো নিয়ে যাও। সুতরাং সে ওগুলো নিয়ে চলে গেল। হে আল্লাহ! যদি তুমি জানো যে, এ কাজ আমি শুধু তোমার সন্তুষ্টির উদ্দেশেই করেছি, তবে এখনো যতটুকু বাকি, সে রাস্তা খুলে দাও। তখন আল্লাহ তা’আলা পাথর সরিয়ে রাস্তা খুলে দিলেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
عَنِ ابْنِ عُمَرَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: بَيْنَمَا ثَلَاثَة نفر يماشون أَخَذَهُمُ الْمَطَرُ فَمَالُوا إِلَى غَارٍ فِي الْجَبَلِ فَانْحَطَّتْ عَلَى فَمِ غَارِهِمْ صَخْرَةٌ مِنَ الْجَبَلِ فَأَطْبَقَتْ عَلَيْهِمْ فَقَالَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ: انْظُرُوا أَعْمَالًا عَمِلْتُمُوهَا لِلَّهِ صَالِحَةً فَادْعُوا اللَّهَ بِهَا لَعَلَّهُ يُفَرِّجُهَا. فَقَالَ أَحَدُهُمْ: اللَّهُمَّ إِنَّهُ كَانَ لِي وَالِدَانِ شَيْخَانِ كَبِيرَانِ وَلِي صِبْيَةٌ صِغَارٌ كُنْتُ أَرْعَى عَلَيْهِمْ فَإِذَا رُحْتُ عَلَيْهِمْ فَحَلَبْتُ بَدَأْتُ بِوَالِدَيَّ أَسْقِيهِمَا قَبْلَ وَلَدِي وَإِنَّهُ قَدْ نَأَى بِي الشَّجَرُ فَمَا أَتَيْتُ حَتَّى أَمْسَيْتُ فَوَجَدْتُهُمَا قَدْ نَامَا فَحَلَبْتُ كَمَا كُنْتُ أَحْلُبُ فَجِئْتُ بِالْحِلَابِ فَقُمْتُ عِنْدَ رُؤُوسِهِمَا أَكْرَهُ أَنْ أُوقِظَهُمَا وَأَكْرَهُ أَنْ أَبْدَأَ بِالصِّبْيَةِ قَبْلَهُمَا وَالصِّبْيَةُ يَتَضَاغَوْنَ عِنْدَ قَدَمَيَّ فَلَمْ يَزَلْ ذَلِكَ دَأْبِي وَدَأْبَهُمْ حَتَّى طَلَعَ الْفَجْرُ فَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنِّي فَعَلْتُ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ وَجْهِكَ فَافْرُجْ لَنَا فُرْجَةً نَرَى مِنْهَا السَّمَاءَ فَفَرَجَ اللَّهُ لَهُمْ حَتَّى يرَوْنَ السماءَ
قَالَ الثَّانِي: اللَّهُمَّ إِنَّه كَانَ لِي بِنْتُ عَمٍّ أُحِبُّهَا كَأَشَدِّ مَا يُحِبُّ الرِّجَالُ النِّسَاءَ فَطَلَبْتُ إِلَيْهَا نَفْسَهَا فَأَبَتْ حَتَّى آتيها بِمِائَة دِينَار فلقيتها بِهَا فَلَمَّا قَعَدْتُ بَيْنَ رِجْلَيْهَا. قَالَتْ: يَا عَبْدَ اللَّهِ اتَّقِ اللَّهَ وَلَا تَفْتَحِ الْخَاتَمَ فَقُمْتُ عَنْهَا. اللَّهُمَّ فَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنِّي فَعَلْتُ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ وَجْهِكَ فَافْرُجْ لَنَا مِنْهَا فَفَرَجَ لَهُمْ فُرْجَةً
وَقَالَ الْآخَرُ: اللَّهُمَّ إِنِّي كُنْتُ اسْتَأْجَرْتُ أَجِيرًا بِفَرْقِ أَرُزٍّ فَلَمَّا قَضَى عَمَلَهُ قَالَ: أَعْطِنِي حَقِّي. فَعَرَضْتُ عَلَيْهِ حَقَّهُ فَتَرَكَهُ وَرَغِبَ عَنْهُ فَلَمْ أَزَلْ أَزْرَعُهُ حَتَّى جَمَعْتُ مِنْهُ بَقَرًا وَرَاعِيَهَا فَجَاءَنِي فَقَالَ: اتَّقِ اللَّهَ وَلَا تَظْلِمْنِي وَأَعْطِنِي حَقِّي. فَقُلْتُ: اذْهَبْ إِلَى ذَلِكَ الْبَقْرِ وَرَاعِيهَا فَقَالَ: اتَّقِ اللَّهَ وَلَا تَهْزَأْ بِي. فَقُلْتُ: إِنِّي لَا أَهْزَأُ بكَ فخذْ ذلكَ البقرَ وراعيها فَأخذ فَانْطَلَقَ بِهَا. فَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنِّي فَعَلْتُ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ وَجْهِكَ فَافْرُجْ مَا بَقِيَ فَفَرَجَ الله عَنْهُم . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীসটি সৎ ‘আমলের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাওয়ার এক উজ্জ্বল নমুনা। মানুষ বিপদে পড়লে আল্লাহর নিকট দু‘আ করবে। বৃষ্টি প্রার্থনাসহ সব দু‘আর ক্ষেত্রেই। নিজ নিজ সৎ ‘আমলের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট দু‘আ করবে। উক্ত তিন ব্যক্তি নিজ নিজ সৎ ‘আমলের মাধ্যমে দু‘আ করলে আল্লাহ তা‘আলা তাদের দু‘আ কবুল করলেন।
অত্র হাদীস থেকে পিতা-মাতার সেবার বিষয়টি পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে, তাদের সেবা করলে আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহ পাওয়া যায়। আর পিতা-মাতাকে সন্তানাদির চেয়ে বেশী অগ্রাধিকার দিতে হবে এমনকি স্ত্রীর চেয়েও বেশী।
অত্র হাদীস থেকে আরো বুঝা যায় যে, আমাদের সব সময় হারাম কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে, যদিও কেউ তা না দেখে। কেউ না দেখলেও আল্লাহ দেখেন। হারাম কাজ ছাড়তে হবে কেবল আল্লাহর উদ্দেশে এবং তাকে খুশি করার লক্ষ্যে।
অত্র হাদীস থেকে আরো বুঝা যায় নিজ কাজের জন্য কেউ কর্মচারী নিয়োগ দিলে কর্মচারীর সাথে সৎ ব্যবহার করতে হবে, তার সাথে কৃত অঙ্গীকার রক্ষা করতে হবে। আমানাতদারিতার প্রমাণ দিতে হবে এবং কর্ম ক্ষেত্রে উদারতা সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে।
অত্র হাদীসের মৌলিক শিক্ষা হলো তাওয়াস্সুল হলো সৎ আমলের মাধ্যমে দু‘আ করা, এই দু‘আ আল্লাহ কবুল করেন। (শারহে মুসলিম ১৭ খন্ড, হাঃ ২৭৪৩)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯৩৯-[২৯] মু’আবিয়াহ্ ইবনু জাহিমাহ্ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তাঁর পিতা জাহিমাহ্ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রসূল! আমি জিহাদে অংশগ্রহণের ইচ্ছা করি, এজন্য আপনার সাথে পরামর্শ করতে এসেছি। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার মা জীবিত আছেন কী? তিনি বললেনঃ জ্বী হ্যাঁ। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ মায়ের সেবাকেই অবলম্বন করো। কেননা জান্নাত তাঁর পায়ের কাছে। (আহমাদ, নাসায়ী ও বায়হাক্বী শু’আবুল ঈমানে বর্ণনা করেছেন।)[1]
وَعَن معاويةَ بن جاهِمةُ أَنَّ جَاهِمَةَ جَاءَ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَرَدْتُ أَنْ أَغْزُوَ وَقَدْ جِئْتُ أَسْتَشِيرُكَ. فَقَالَ: «هَلْ لَكَ مِنْ أُمٍّ؟» قَالَ: نَعَمْ. قَالَ: «فَالْزَمْهَا فَإِنَّ الْجَنَّةَ عِنْدَ رِجْلِهَا» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالنَّسَائِيُّ وَالْبَيْهَقِيّ فِي «شعب الْإِيمَان»
পরিচ্ছেদঃ ১৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯৪০-[৩০] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈকা মহিলা আমার বিবাহ বন্ধনে ছিল, আমি তাকে ভালোবাসতাম। অথচ আমার পিতা ’উমার তাকে ঘৃণা করতেন। তিনি আমাকে বললেনঃ তুমি এ মহিলাকে ত্বলাক (তালাক) দিয়ে দাও। আমি অস্বীকার করলাম। তখন আমার পিতা ’উমার (রাঃ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলেন এবং তাঁকে ঘটনা বললেন। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেনঃ তুমি তাকে ত্বলাক (তালাক) দিয়ে দাও। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن ابنِ
عمَرَ قَالَ: كَانَتْ تَحْتِي امْرَأَةٌ أُحِبُّهَا وَكَانَ عُمَرُ يَكْرَهُهَا. فَقَالَ لِي: طَلِّقْهَا فَأَبَيْتُ. فَأَتَى عُمَرُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَذَكَرَ ذَلِكَ لَهُ فَقَالَ لِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «طَلِّقْهَا» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ এ বিষয়ে ইতোপূর্বে ৪৯২৮ নং হাদীসের ব্যাখ্যায় আলোচনা করা হয়েছে।
অত্র হাদীস থেকেও বুঝা গেল যে, যদি পিতা স্ত্রীকে ত্বলাক দিতে বলেন তাহলে ঐ স্ত্রীকে ত্বলাক দিয়ে দিবে। আমাদের উচিত পিতা-মাতাকেই অগ্রাধিকার দেয়া যতক্ষণ না তারা আমাদেরকে আল্লাহ এবং তার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাফরমানী হয় এমন বিষয়ে আদেশ দেন। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১১৮৯)
পিতা-মাতার অন্যায় অবৈধ নির্দেশ হলে আলোচনার মাধ্যমে তাদের বুঝিয়ে সমন্বয় করে নিতে হবে।
পরিচ্ছেদঃ ১৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯৪১-[৩১] আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করল : হে আল্লাহর রসূল! সন্তানের ওপর মা-বাবার কি দাবি আছে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তাঁরা দু’জন তোমার জান্নাত ও জাহান্নাম। (ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَن أبي
أُمامةَ أَنَّ رَجُلًا قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا حَقُّ الْوَالِدَيْنِ عَلَى وَلَدِهِمَا؟ قَالَ: «هُمَا جَنَّتُكَ ونارُكَ» . رَوَاهُ ابنُ مَاجَه
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘আলী ইবনু ইয়াযীদ’’ নামের বর্ণনাকারী য‘ঈফ। দেখুন- হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৪১৮ পৃঃ, য‘ঈফ আত্ তারগীব ১৪৭৬।
ব্যাখ্যাঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট জনৈক সাহাবী এসে প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর নবী! পিতা-মাতার হক কি? নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তারা তোমার জান্নাত তারা তোমার জাহান্নাম, অর্থাৎ তাদের সেবা কর তারা যদি রাজি থাকেন তাহলে আল্লাহ তোমাকে তার জান্নাত দান করবেন। পক্ষান্তরে তাদের কষ্ট দিলে আল্লাহ তোমার জন্য তার জাহান্নাম প্রস্তুত করে রেখেছেন। (ইবনু মাজাহ ৩য় খন্ড, হাঃ ৩৬৬২)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯৪২-[৩২] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন কোন বান্দার মাতা-পিতা অথবা তাদের যে কোন একজন মৃত্যুবরণ করে এমন অবস্থায় যে, সে তাঁদের অবাধ্য। অতঃপর তাঁদের মৃত্যুর পর সে অবাধ্য পুত্র তাঁদের জন্য দু’আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে, তখন আল্লাহ তা’আলা তাকে পুণ্যবানদের সাথে লিপিবদ্ধ করেন।[1]
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ الْعَبْدَ لَيَمُوتُ وَالِدَاهُ أَوْ أَحَدُهُمَا وَإِنَّهُ لَهُمَا لَعَاقٌّ فَلَا يَزَالُ يَدْعُو لَهُمَا وَيَسْتَغْفِرُ لَهُمَا حَتَّى يَكْتُبَهُ اللَّهُ بارا»
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘ইয়াহ্ইয়া ইবনু উকবাহ্’’ নামের বর্ণনাকারী য‘ঈফ। এছাড়াও আবূ ‘আবদুর রাহমান ‘আস্ সুলামী’’ নামের বর্ণনাকারী হাদীস তৈরি করার অভিযোগে অভিযুক্ত। বিস্তারিত দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ৯১৫।
ব্যাখ্যাঃ পিতা-মাতার অবাধ্যচারী বড় ধরনের পাপী। মানুষ অজ্ঞতার কারণেই পিতা-মাতার অবাধ্যচারী হয়ে পাপী হয়। অনেক পাপাচারীকে পরবর্তী জীবনে তাওবাহ্ করে পাপ থেকে ফিরে আসতে এবং নেককার হতে দেখা যায়। অনুরূপ মাতা-পিতার অবাধ্যাচারীর পিতা-মাতার মৃত্যুর পর তার তাওবাহ্ ও ক্ষমার পথ একে করেই রুদ্ধ হয়ে যায় না। সন্তান যদি পরবর্তী জীবনে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে তাওবাহ্ ও ইস্তিগফার করে, অতঃপর নিরন্তর মৃত্যু মাতা-পিতার জন্য দু‘আ ইস্তিগফার করতে থাকে তাহলে আল্লাহ খুশী হয়ে তাকে ক্ষমা করে দেন এবং একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ‘ইবাদাত করায় এই পাপী বান্দাহকেই নেককার বান্দাহদের অন্তর্ভূক্ত করে নেন। অত্র হাদীসে সেদিকে ইশারা করা হয়েছে। সুতরাং নেককার গুনাহগার সকল সন্তানেরই উচিত নিয়মিত মৃত মাতা-পিতার জন্য দু‘আ ইস্তিগফার করা। হাদীসটি সানাদ দুর্বল হলেও অর্থগত বিষয়ে সঠিক। কেননা সহীহ হাদীসে রয়েছে, মাতা-পিতার মৃত্যুর পর তাদের সাথে সদাচরণের পথ হলো তাদের জন্য দু‘আ করা। এ দু‘আর ক্ষেত্রে নেককার গুনাহগারের কোন পার্থক্য করা হয়নি। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯৪৩-[৩৩] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় সকাল করল যে, সে তার মাতা-পিতার ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলার আদেশের অনুগত রয়েছে, তখন তার সে সকাল এমন অবস্থায় হয় যে, তার জন্য জান্নাতের দু’টো দরজা খোলা থাকে। যদি একজন হয়, তখন জান্নাতের একটি দরজা খোলা থাকে। আর যে ব্যক্তি মাতা-পিতার ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলার কাছে অপরাধী হিসেবে সকাল করে, তবে সে যেন এমনভাবে ভোর করল যে, জাহান্নামের দু’টো দরজা তার জন্য খোলা থাকে। আর যদি তাঁদের একজন থাকে, তবে একটি দরজা খোলা থাকে। এ সময় জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, যদি তাঁরা পুত্রের ওপর অবিচার করে? জবাবে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ যদি তারা পুত্রের প্রতি অবিচার করে, যদিও তাঁরা পুত্রের প্রতি অবিচার করে, যদিও তাঁরা পুত্রের প্রতি অবিচার করে।[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ أَصْبَحَ مُطِيعًا لِلَّهِ فِي وَالِدَيْهِ أَصْبَحَ لَهُ بَابَانِ مَفْتُوحَانِ مِنَ الْجَنَّةِ وَإِنْ كَانَ وَاحِدًا فَوَاحِدًا. وَمَنْ أَمْسَى عَاصِيًا لِلَّهِ فِي وَالِدَيْهِ أَصْبَحَ لَهُ بَابَانِ مَفْتُوحَانِ مِنَ النَّارِ وَإِنْ كَانَ وَاحِدًا فَوَاحِدًا» قَالَ رَجُلٌ: وَإِنْ ظَلَمَاهُ؟ قَالَ: «وَإِنْ ظلماهُ وإِن ظلماهُ وإِنْ ظلماهُ»
হাদীসটি জাল হওয়ার কারণ, سىرخسى (সারখাসা) নামের বর্ণনাকারী মিথ্যা হাদীস তৈরি করত। বিস্তারিত দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ৬২৭১, য‘ঈফ আল আদাবুল মুফরাদ ১।
ব্যাখ্যাঃ মাতা-পিতার অনুগত্য আল্লাহর আনুগত্যের অংশবিশেষ, যা স্বয়ং আল্লাহ নিজে তার বান্দার প্রতি আবশ্যক করে দিয়েছেন। অনুরূপ মাতা-পিতার অবাধ্যচারিতা বা নাফরমানী এবং তাদের কষ্ট দেয়া আল্লাহর নাফরমানী এবং তাকে কষ্ট দেয়ারই নামান্তর, যা আল্লাহ হারাম বা নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন।
‘আল্লামা ‘আলী কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ মাতা-পিতার নাফরমানী করা এবং তাদের কষ্ট দেয়া আল-কুরআনের বাণী : إِنَّ الَّذِينَ يُؤْذُونَ اللهَ وَرَسُولَه ‘‘নিশ্চয় যারা আল্লাহ এবং তার রসূলকে কষ্ট দেয়’’- (সূরাহ্ আল আহযা-ব ৩৩ : ৫৭)-এর অন্তর্ভুক্ত। কোন কোন সংকলণে ‘পিতা-মাতার আনুগত্যের’ শব্দের পরিবর্তে শুধু ‘পিতার আনুগত্যের’ কথা উল্লেখ হয়েছে, সেখানে পরিহার করার বিধান প্রযোজ্য।
মাতা-পিতা জুলুম করলেও তাদের কষ্ট দেয়া যাবে না এবং তাদর নাফরমানীও করা যাবে না।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এই জুলুম দ্বারা দীনী কিংবা পরকালীন জুলুম উদ্দেশ্য নয়, বরং দুনিয়াবী জুলুম। আরেকটি কথা স্মরণযোগ্য যে, আল্লাহর নাফরমানী করে মাতা-পিতার আনুগত্য করা যাবে না। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯৪৪-[৩৪] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন কোন মাতা-পিতার ভক্ত সন্তান নিজের মাতা-পিতাকে অনুগ্রহের দৃষ্টিতে দেখে, আল্লাহ তা’আলা তার প্রতিটি দৃষ্টির বিনিময়ে তার ’আমলনামায় একটি নফল হজ্জ-এর সাওয়াব লিখে দেন। সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রসূল! যদি দৈনিক একশ’বার দৃষ্টিপাত করে? রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হ্যাঁ, তাও। আল্লাহ মহান ও পবিত্র।[1]
وَعَنْهُ
أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مامن وَلَدٍ بَارٍّ يَنْظُرُ إِلَى وَالِدَيْهِ نَظْرَةَ رَحْمَةٍ إِلَّا كَتَبَ اللَّهُ لَهُ بِكُلِّ نَظْرَةٍ حَجَّةً مَبْرُورَةً» . قَالُوا: وَإِنْ نَظَرَ كُلَّ يَوْمٍ مِائَةَ مرّة؟ قَالَ: «نعم الله أكبر وَأطيب»
হাদীসটি জাল হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘নাহশাল (نهشل) ইবনু সা‘ঈদ’’ নামের একজন বর্ণনাকারী প্রসিদ্ধ মিথ্যুক। বিস্তারিত দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ৬২৭৩।
ব্যাখ্যাঃ নেককার সন্তান মাতা-পিতার প্রতি দয়াশীল, সুতরাং সে তার মাতা-পিতার প্রতি দয়া ও রহমাতের দৃষ্টিতে তাকাবে। সন্তানের এই ভালোবাসার দৃষ্টি আল্লাহর কাছে পছন্দনীয়, এমনকি প্রতিটি দৃষ্টিই আল্লাহর প্রিয় এবং আল্লাহ তার মূল্যায়ন করেন। এ মূল্যায়ন হলো প্রতিটি দৃষ্টির বিনিময়ে একটি নফল হাজ্জের সাওয়াব প্রদান করেন। লোকেরা প্রশ্ন করল, কেউ যদি দিনে একশতবার মাতা-পিতার দিকে রহমাতের দৃষ্টিতে তাকায়? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, আল্লাহ তা‘আলা তাকে একশতটিই হাজ্জের সাওয়াবই দান করবেন। কেননা মানুষ যা ধারণা করে এবং মানুষের যে দৃষ্টিভঙ্গি আল্লাহ তার চেয়ে মহান এবং সকল প্রকার অক্ষমতা, দুর্বলতা এবং সংকীর্ণ থেকে মুক্ত।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ মানুষের এই সংকীর্ণ ধারণাও ই‘তিকাদ (বিশ্বাসসমূহ) থেকে আল্লাহ পুত-পবিত্র এবং মুক্ত। তার দান ভাণ্ডার থেকে কোন কিছু দান করলে সে ভান্ডারের ঘাটতি হয় না, এসব ত্রুটি থেকেও তিনি মুক্ত এবং পবিত্র। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯৪৫-[৩৫] আবূ বকরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রত্যেক পাপ আল্লাহ তা’আলা যতটুকু ইচ্ছে ক্ষমা করে দেন; কিন্তু মাতা-পিতার অবাধ্যতা ক্ষমা করেন না; বরং আল্লাহ তা’আলা এটার শাস্তি দুনিয়াতেই তার মৃত্যুর পূর্বে তাকে প্রদান করেন।[1]
وَعَنْ أَبِي
بَكْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «كلُّ الذنوبِ يغفرُ اللَّهُ مِنْهَا مَا شاءَ إِلَّا عُقُوقَ الْوَالِدَيْنِ فَإِنَّهُ يُعَجَّلُ لِصَاحِبِهِ فِي الحياةِ قبلَ المماتِ»
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘বকর ইবনু ‘আবদুল ‘আযীয ইবনু আবূ বাকরাহ্’’ নামের বর্ণনাকারী য‘ঈফ। দেখুন- গয়াতুল মারাম হাঃ ২৭৯, ১৭০ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ সকল পাপ বা গুনাহকেই আল্লাহ যতটুকু ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন। এটা শির্কের গুনাহ ব্যতীত। কেননা শির্কের গুনাহ শির্ক বর্জনপূর্বক তাওবাহ্ না করা পর্যন্ত তা ক্ষমা করা হয় না। মাতা-পিতার সাথে নাফরমান করার গুনাহকেও আল্লাহ ক্ষমা করেন না। আল্লাহর সাথে শরীক বা অংশীদার স্থাপনের গুনাহ যেমন ভয়াবহ এবং ক্ষমার অযোগ্য, ঠিক তেমনি মাতা-পিতার সাথে নাফরমানীর গুনাহ্ও ভয়াবহ এবং ক্ষমার অযোগ্য। যেহেতু এ বিষয়টি হাক্কুল্লাহ এবং হাক্কুল ‘ইবাদ উভয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট। অতএব মাতা-পিতার নিকট ক্ষমা না নেয়া পর্যন্ত আল্লাহ এককভাবে তাকে ক্ষমা করবেন না। তার এ অপরাধের জন্য আল্লাহ দুনিয়ায় থাকতেই তার শাস্তি শুরু করবেন। অর্থাৎ মৃত্যুর আগেই সে শান্তি ভোগ শুরু করবে, কিয়ামত পর্যন্ত তাকে প্রতিক্ষা করতে হবে না।
কেউ কেউ বলেছেন, এর এও অর্থ হতে পারে যে, তার মাতা-পিতা মৃত্যুর আগেই শাস্তি শুরু হয়ে যাবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - অনুগ্রহ ও স্বজনে সদাচার
৪৯৪৬-[৩৬] সা’ঈদ ইবনুল ’আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বড় ভাইয়ের অধিকার ছোট ভাইয়ের ওপর, যেমন- পিতার অধিকার তার পুত্রের উপর।
(উপরের পাঁচটি হাদীস বায়হাক্বী’র ’’শু’আবুল ঈমানে’’ বর্ণনা করেছেন।)[1]
وَعَن
سعيدِ بْنِ الْعَاصِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «حقُّ كبيرِ الإِخوَةِ على صَغِيرِهِمْ حَقُّ الْوَالِدِ عَلَى وَلَدِهِ» . رَوَى الْبَيْهَقِيُّ الأحاديثَ الخمسةَ فِي «شعب الْإِيمَان»
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, ‘‘মুহাম্মাদ ইবনু আস্ সায়িব আন্ নুকরা’’ নামের বর্ণনাকারী য‘ঈফ। দেখুন- য‘ঈফাহ্ ১৮৭৮।
ব্যাখ্যাঃ পিতার অবর্তমানে বড় ভাই ছোট ভাই-বোনের অভিভাবক হয়ে থাকে। এছাড়া পিতার বর্তমানেও বড় ভাই ছোট ভাই-বোনদের লালন-পালন ও পরিচর্যা করে থাকে, এমনকি অনেক সময় বড় ভাইয়ের উপার্জনেই ছোট ভাই-বোনের জীবিকা নির্বাহ হয়ে থাকে।
অতএব ছোট ভাইয়ের ওপর বড় ভাইয়ের অধিকার পুত্রের প্রতি পিতার অধিকারের মতই।
মুল্লা ‘আলী কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এই সাদৃশ্য মুবালাগাহ্ হিসেবে পেশ করা হয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৪৭-[১] জারীর ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করে না, আল্লাহ তার প্রতি অনুগ্রহ করেন না। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الشَّفَقَةِ وَالرَّحْمَةِ عَلَى الْخَلْقِ
عَن جَرِيرِ بْنِ عَبْدُ اللَّهِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَرْحَمُ اللَّهُ مَنْ لَا يَرْحَمُ النَّاسَ» . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ দয়া বা রহমত আল্লাহ তা‘আলাই তার বান্দাদের অন্তকরণে দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা তার বান্দাদের মধ্যে দয়াশীলদেরকেই দয়া করেন। ইবনু বাত্ত্বল (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ অধ্যায়ের উদ্দেশ্য হলো রহমত দয়ার বিষয়টিকে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা, এটা আল্লাহ তা‘আলার সত্ত্বাগত গুণাবলীর অন্তর্গত। সুতরাং রহমান হচ্ছে আল্লাহর একটি গুণ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ যাকে দয়া করবেন তাকে তিনি সেই গুণটি দান করবেন এবং তাকে তার দয়ার ছায়ায় আশ্রয় দিবেন। তিনি আরো বলেনঃ আল্লাহ তা‘আলার সব নামের মূলকথা একটা নামকে কেন্দ্র করেই, আর সে নামটি হলো ‘‘আল্লাহ’’, যদিও প্রতিটি নামে ভিন্ন ভিন্ন গুণ রয়েছে। ইবনু ত্বীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ‘‘রহমান এবং রহীম’’ এ দু’টি শব্দ রহমত মূল ধাতু থেকে গৃহীত। কেউ কেউ বলেন, এ দু’টি শব্দ স্বতন্ত্রভাবেই দু’টি নাম।
ইমাম খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ জামহূর ‘উলামায়ে কিরাম বলেন, ‘‘রহমান’’ নামটি ‘রহমত’ থেকে গৃহীত আরবী ব্যকরণ অনুপাতে মুবালাগাহ্ বা আধিক্যতার অর্থবাচক শব্দ। এর অর্থ এমন দয়া প্রদর্শনকারী যার কোন জুড়ি নেই। এজন্য আরবী ব্যকরণ অনুপাতে এ শব্দের কোন দ্বিবচন ও বহুবচন নেই। ইমাম খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) আরো বলেনঃ অতএব ‘রহমান’ হলেন এমন নাম যার মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা সমগ্র সৃষ্টিজীবকে রহমত করে থাকেন। অপরদিকে ‘‘রহীম’’ অর্থ যে নামের মাধ্যমে আল্লাহ কেবলমাত্র মু’মিনদের দয়া করে থাকেন, যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَكَانَ بِالْمُؤْمِنِينَ رَحِيمًا অর্থাৎ ‘‘আল্লাহ মু’মিনদের প্রতি সর্বদাই দয়াশীল’’- (সূরাহ্ আল আহযাব ৩৩ : ৪৩)। ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, ‘রহমান’ ও ‘রহীম’ এ দু’টি নাম অত্যন্ত দয়ার্দ্র নাম, এর একটির চাইতে আরেকটি দ্বারা বেশী দয়ার কথা বুঝায়। (ফাতহুল বারী ১৩শ খন্ড, হাঃ ৭৩৭৬)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৪৮-[২] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন এক বেদুঈন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সমীপে উপস্থিত হয়ে বলল, তোমরা কি শিশুদের চুম্বন করো? আমরা তো শিশুদের চুম্বন করি না। এটা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যদি আল্লাহ তা’আলা তোমার অন্তর থেকে স্নেহ-মমতা বের করে নেন, তবে আমি কি পারব তা তোমার অন্তরে পুনঃপ্রবেশ করাতে? (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الشَّفَقَةِ وَالرَّحْمَةِ عَلَى الْخَلْقِ
وَعَن عائشةَ قَالَتْ: جَاءَ أَعْرَابِيٌّ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: أَتُقَبِّلُونَ الصِّبْيَانَ؟ فَمَا نُقَبِّلُهُمْ. فَقَالَ النَّبِي صلى الله عَلَيْهِ وَسلم: «أوَ أملكُ لَكَ أَنْ نَزَعَ اللَّهُ مِنْ قَلْبِكَ الرَّحْمَةَ» . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীসে গ্রাম্য লোকটি হলো আকরা; কেউ বলেছেন, ‘কায়স ইবনু ‘আসিম আত্ তামিমী। এ মর্মে আবুল ফারাজ আল-আসবাহানী একটি হাদীস রিওয়ায়াত করেছেন। যার শব্দ এরূপ :
عن أَبِىْ هريرة أن قيس بن عاصم دخل على النبي صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, কায়স ইবনু ‘আসিম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসলেন..... এভাবে তৎপরবর্তী ঘটনার বিবরণ দিলেন।
এখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শিশুদের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রমাণ মেলে, সে যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রসূল! আপনি শিশুদের পেলে আদর করেন আর আমার এতগুলো সন্তান আমার একটুও আদর করতে ইচ্ছে হয় না। তার এহেন অদ্ভূত কথায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার অন্তর থেকে আল্লাহ দয়া ভালোবাসা ছিনিয়ে নিলে আমি তা কিভাবে ফিরিয়ে দিব? ঠিক এমনই একটি ঘটনার কথা জানা যায় ‘উয়াইনার ঘটনায়। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৯৯৮)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৪৯-[৩] উক্ত রাবী [’আয়িশাহ্ সিদ্দিকা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন জনৈকা মহিলা আমার কাছে এলো। তার সাথে তার দু’ কন্যা ছিল। সে আমার কাছে কিছু ভিক্ষা চাইল। তখন আমার কাছে একটি মাত্র খেজুর ছাড়া কিছুই ছিল না। আমি সেটাই তাকে দিয়ে দিলাম। সে খেজুরটিকে তার দু’ কন্যার মধ্যে ভাগ করে দিলো, তা থেকে নিজে তিনি কিছুই খেলো না। অতঃপর সে উঠে চলে গেল। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে প্রবেশ করলেন, আমি ঘটনাটি তাঁর কাছে বললাম। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ যে ব্যক্তি এ কন্যাদের দ্বারা পরীক্ষিত হবে এবং সে কন্যাদের সাথে উত্তম আচরণ করবে, তবে এ কন্যারাই তার জন্য জাহান্নামের আগুনের মাঝে অন্তরায় হবে (অর্থাৎ- তাকে জাহান্নামের প্রতিবন্ধক হবে)। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الشَّفَقَةِ وَالرَّحْمَةِ عَلَى الْخَلْقِ
وَعَنْهَا قَالَتْ: جَاءَتْنِي امْرَأَةٌ وَمَعَهَا ابْنَتَانِ لَهَا تَسْأَلُنِي فَلَمْ تَجِدْ عِنْدِي غَيْرَ تَمْرَةٍ وَاحِدَةٍ فَأَعْطَيْتُهَا إِيَّاهَا فَقَسَمَتْهَا بَيْنَ ابْنَتَيْهَا وَلَمْ تَأْكُلْ مِنْهَا ثُمَّ قَامَتْ فَخَرَجَتْ. فَدَخَلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَحَدَّثْتُهُ فَقَالَ: «مَنِ ابْتُلِيَ مِنْ هَذِهِ الْبَنَاتِ بِشَيْءٍ فَأَحْسَنَ إِلَيْهِنَّ كُنَّ لَهُ سِتْرًا مِنَ النَّارِ» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ অপর এক বর্ণনায় এসেছে, তিনি তাকে তিনটি খেজুর দিলেন। তিনটির ভিতরে তার দুই কন্যাকে একটি একটি করে দিয়ে দিলেন। তৃতীয় খেজুরটি মুখে নিলেন তিনি খাওয়ার জন্য, কিন্তু তার দুই কন্যা ঐ খেজুরটিও খেতে চাইলে তিনি সে ঐ খেজুরটিও ভাগ করে তাদেরকে দিয়ে দিলেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, ব্যক্তিকে দু’টি কন্যা দ্বারা পরীক্ষা করা হবে। এখানে পরীক্ষা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো তাদের লালন পালনের ব্যয়ভার ইত্যাদি বিষয়গুলো। এখানে অনেকগুলো হাদীসের বর্ণনা এসেছে, যে কন্যা সন্তানের প্রতি ইহসান করবে ভালো ব্যবহার করবে। অপর বর্ণনায় এসেছে, যে দু’টি কন্যা সন্তানকে লালন পালন করবে। উম্মু সালামাহ্-এর হাদীসে, যে ব্যক্তি দু’টি কন্যা অথবা দু’টি বোন অথবা দু’জন নিকটাত্মীয় মেয়ের প্রতি খরচ করবে।
ইবনু ‘আব্বাস-এর হাদীস এসেছে, তাদেরকে সুন্দরভাবে আদব শিখাবে। জাবির -এর হাদীস এসেছে, তাদেরকে আশ্রয় দিবে, তাদের প্রতি রহম করবে, তাদেরকে লালন পালন করবে। ত্ববারী একটু বেশি বর্ণনা করে বলেছেন, তাদেরকে বিবাহ দিবে। ‘আদাবুল মুফরাদ’-এর একটি বর্ণনা আবূ সা‘ঈদ আল খুদরী থেকে এভাবে এসেছে যে, তাদের ভালো সাথী দিয়ে দিবে এবং তাদের বিষয়ে আল্লাহকে ভয় করবে। এগুলো সব হচ্ছে ‘ইহসান’ শব্দের অন্তর্ভুক্ত। হাদীসে এসেছে, এ সাওয়াব সেও পাবে যে একজন মেয়ের প্রতিও এ রকম ইহসান করবে।
ইবনু বাত্ত্বল (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ অত্র হাদীসে গরীব মানুষ কারো কাছে চাইতে পারবে এটার প্রমাণ পাওয়া যায় এবং চাইলে দিতে হবে এটারও প্রমাণ পাওয়া যায়, যেহেতু ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) একটি খেজুর পেয়েছিলেন সে একটি খেজুরই তাকে দান করেছিলেন। আর শিক্ষণীয় যে কম বলে তাকে তুচ্ছ মনে করে দান করা থেকে বিরত থাকা উচিত নয় বরং কম থাকলে কম দিবে বেশি থাকলে বেশি দিবে। এ হাদীস থেকে আরো বুঝা যায় যে, কল্যাণকর কাজ উল্লেখ করা জায়িয যদি সেটা অহংকার বা খোঁটা দেয়া উদ্দেশ্য না হয়ে থাকে। ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) ইবনু বাত্ত্বল-এর অনুসারী হয়ে বলেনঃ এখানে কন্যা সন্তানদের লালন পালনের বিষয়টিকে পরীক্ষা শব্দ দ্বারা উল্লেখ্য করার কারণ হলো মানুষ কন্যা সন্তানদের অপছন্দ করেন, তাই এটাকে পরীক্ষা শব্দ দ্বারা উল্লেখ্য করা হয়েছে। কন্যা সন্তানদের অধিকার আদায়ের ব্যাপারে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বাত্মক গুরুত্বারোপ করেছেন এবং তাদের ক্ষেত্রে দায়িত্বকে অবহেলা করা কোনভাবেই উচিত নয়, এটা ইসলামী আইন দ্বারা সাব্যস্ত। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৯৯৫)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৫০-[৪] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি দু’টো কন্যাকে বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করবে, সে ব্যক্তি ও আমি কিয়ামতের দিন এভাবে একত্রিত হব, যেমন এ দু’টো অঙ্গুলি। এ বলে তিনি নিজের দু’টো আঙ্গুল একত্রে মিলালেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ الشَّفَقَةِ وَالرَّحْمَةِ عَلَى الْخَلْقِ
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ عَالَ جَارِيَتَيْنِ حَتَّى تَبْلُغَا جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَنَا وَهُوَ هَكَذَا» وضمَّ أصابعَه. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ হাদীসটি নারী এবং কন্যা শিশুদের রক্ষণাবেক্ষণ, তাদেরকে লালন পালনের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে। হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ রক্ষণাবেক্ষণের মানে হচ্ছে তাদের ভরণ-পোষণ, তাদের লালন-পালন ইত্যাদি ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন। "عال" ‘আল’-এর ব্যাখ্যায় ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘আল’ এটা ‘আওন’ থেকে গৃহীত, যার অর্থ হচ্ছে নিকট। কন্যা সন্তানদের লালন পালনের ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তারা এবং আমি জান্নাতে খুব কাছাকাছি থাকব। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কনিষ্ঠা এবং মধ্যমা অঙ্গুলিকে এক সাথে করে দেখালেন, এ দু’টি আঙ্গুল যেমন পাশাপাশি এ রকম অবস্থানে আমরা থাকব। (শারহুন নাবাবী ১৬শ খন্ড, হাঃ ২৬৩১)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৫১-[৫] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বিধবা ও নিঃস্বদের জন্য উপার্জনকারী আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গকারীর মতো। বর্ণনাকারী বলেন, আমার ধারণা, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এটাও বলেছেন যে, বিধবা ও নিঃস্বদের জন্য উপার্জনকারী রাতজাগা ’ইবাদাতকারীর মতো, যে অলসতা করে না এবং ঐ সায়িমের (রোযাদারের) মতো যে কক্ষনো সওম ভঙ্গ করে না। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الشَّفَقَةِ وَالرَّحْمَةِ عَلَى الْخَلْقِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «السَّاعِي عَلَى الْأَرْمَلَةِ وَالْمِسْكِينِ كَالسَّاعِي فِي سَبِيلِ اللَّهِ» وَأَحْسَبُهُ قَالَ: «كَالْقَائِمِ لَا يَفْتُرُ وَكَالصَّائِمِ لَا يفْطر» . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ বিধবা এবং মিসকীনদের লালন পালনের বিষয়ে অত্র হাদীসে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। হাদীসের শব্দ ‘সাঈ’ এর অর্থ হলো উপার্জন, বিধবা মিসকীন এবং ইয়াতীমের ভরণ-পোষণের জন্য উপার্জন। বিধবা হলো যার স্বামী মারা গিয়েছেন। ব্যাখ্যাকারীগণ বলেছেন, স্বামী মারা যাওয়া শর্ত নয়, যে নারীর স্বামী নেই সেই হচ্ছে বিধবা। কেউ বলেছেন, যার স্বামীর সাথে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে সেও বিধবা।
ইবনু কুতায়বাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ ধরনের মহিলাকে হাদীসের ভাষায় বা ‘আরবী ভাষায় আরবেলা বলা হয়। ‘আরবেলা’ শব্দের অর্থ আরমেলা অর্থ হলো দারিদ্র্যতা এবং স্বামী হারানোর কারণে নিজে ভরণ পোষণে সক্ষমতা হারিয়ে কষ্টে জীবন যাপন কর। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬০০৭)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৫২-[৬] সাহল ইবনু সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি এবং ইয়াতীমের লালন-পালনকারী, সে ইয়াতীম নিজের হোক বা অন্য কারো হোক জান্নাতে এরূপ হবো, এ কথা বলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজের তর্জনী ও মধ্যমা অঙ্গুলি দ্বারা ইঙ্গিত করলেন। তখন দু’ অঙ্গুলির মধ্যে সামান্য ব্যবধান ছিল। (বুখারী)[1]
بَابُ الشَّفَقَةِ وَالرَّحْمَةِ عَلَى الْخَلْقِ
وَعَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَنَا وَكَافِلُ الْيَتِيمِ لَهُ وَلِغَيْرِهِ فِي الْجَنَّةِ هَكَذَا» وَأَشَارَ بِالسَّبَّابَةِ وَالْوُسْطَى وفرَّجَ بَينهمَا شَيْئا. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীসে ইয়াতীমদের প্রতি সদাচারণের কথা বলা হয়েছে। ‘কাফিলুল ইয়াতীম’ শব্দের অর্থ হলো ইয়াতীমের দায়ভার গ্রহণকারী ও তার কল্যাণকারী। নিজের অধীনে থাকা ইয়াতীম হোক বা অপর কারো অধীনে থাকা ইয়াতীম হোক। অধীনে থাকা ইয়াতীম কথাটির অর্থ হলো সে ঐ ইয়াতীমের দাদা অথবা চাচা অথবা বড় ভাই অথবা নিকটাত্মীয়। অথবা এমন হতে পারে যে, সন্তানের পিতা মারা গেলেন আর তার মাতা তার লালন পালনের পুরা দায়িত্ব নিলেন, এগুলো সবই ইয়াতীম পালনের অন্তর্ভুক্ত। ইমাম বাযযার আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন,
من كفل يتيما ذا قرابة أو لا قرابة له যে কেউ কোন ইয়াতীম লালন পালন করবে, সে তার নিকটাত্মীয় হোক বা না হোক সে উক্ত হাদীসে বর্ণিত সাওয়াব পাবে।
ইবনু বাত্ত্বল (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ইয়াতীমের লালন-পালনের অফুরন্ত সাওয়াবের এ হাদীসটি যার কানে পৌঁছবে সে যেন এর উপর ‘আমল করে যাতে করে সে জান্নাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বন্ধু হতে পারে। আর আখিরাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বন্ধু হওয়া বড়ই সৌভাগ্যের বিষয়। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬০০৫)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৫৩-[৭] নু’মান ইবনু বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তুমি ঈমানদারদেরকে তাদের পারস্পরিক সহানুভূতি, বন্ধুত্ব ও দয়ার ক্ষেত্রে একটি দেহের মতো দেখবে। দেহের কোন একটি অঙ্গ যদি ব্যথা পায়, তবে শরীরের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এর কারণে জাগরণ ও জ্বরের মাধ্যমে ঐ ব্যথার অংশীদার হয়। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الشَّفَقَةِ وَالرَّحْمَةِ عَلَى الْخَلْقِ
وَعَنِ النُّعْمَانِ بْنِ بَشِيرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «تَرَى الْمُؤْمِنِينَ فِي تراحُمِهم وتوادِّهم وتعاطفِهم كمثلِ الجسدِ إِذا اشْتَكَى عضوا تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ الْجَسَدِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীসে মু’মিনদেরকে পরস্পর পরস্পরের সহমর্মিতা প্রদর্শন করতে বলা হয়েছে। এ হাদীস এবং তার পূর্ববর্তী কিছু হাদীস মু’মিন মুসলিমদের পরস্পর পরস্পরের উপর দয়াশীল এবং ভালো ও জনকল্যাণমূলক কাজে একে অপরের সহযোগী হতে বলেছে। এ হাদীস থেকে আরো বুঝা যায় কাউকে কোন বিষয় বুঝাতে নিকট অর্থবোধক কোন শব্দ দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন ভালো এতে খুব তাড়াতাড়ি বিষয়টি বুঝে আসে। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬০১১)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৫৪-[৮] উক্ত রাবী [নু’মান ইবনু বাশীর (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সকল মু’মিন এক অখন্ড ব্যক্তির মতো। যদি এদের কোন একজনের চক্ষু ব্যথা হয়, তবে তাদের সর্বাঙ্গ ব্যথিত হয়, আর যদি তার মাথা ব্যথা হয়, তখন তাদের সারা শরীর ব্যথিত হয়। (মুসলিম)[1]
بَابُ الشَّفَقَةِ وَالرَّحْمَةِ عَلَى الْخَلْقِ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْمُؤْمِنُونَ كَرَجُلٍ وَاحِدٍ إِنِ اشْتَكَى عَيْنُهُ اشْتَكَى كُلُّهُ وَإِنِ اشْتَكَى رَأْسُهُ اشْتَكَى كُله» . رَوَاهُ مُسلم
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৫৫-[৯] আবূ মূসা (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, এক মু’মিন অপর মু’মিনের জন্য প্রাচীর বা ইমারতের মতো, যার একাংশ অপরাংশকে সুদৃঢ় করে। এটা বলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এক হাতের অঙ্গুলি অপর হাতের অঙ্গুলির মধ্যে প্রবেশ করালেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الشَّفَقَةِ وَالرَّحْمَةِ عَلَى الْخَلْقِ
وَعَنْ أَبِي مُوسَى عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الْمُؤْمِنُ لِلْمُؤْمِنِ كَالْبُنْيَانِ يَشُدُّ بَعْضُهُ بَعْضًا» ثُمَّ شَبكَ بَين أَصَابِعه. مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীসে বলা হয়েছে যে, মু’মিনরা একে অপরের সহযোগী। একে অপরের জন্য তারা নিবেদিত প্রাণ। ইবনু বাত্ত্বল (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ মু’মিনরা যে একে অপরের সহযোগী এটা হচ্ছে আখিরাতের কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে। তদ্রূপভাবে দুনিয়ার বৈধ কর্মকাণ্ডেও মু’মিনরা একে অপরের সহযোগী হবে। ‘‘আল্ল-হু ফী আওনিল ‘আবদী মাদামাল ‘আব্দু ফী আওনী আখী’’ অর্থাৎ বান্দার সাহায্যে আল্লাহ রব্বুল ‘আলামীন ততক্ষণ থাকে যতক্ষণ সে অপর ভাইয়ের সহযোগিতা করে। কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে, ‘‘তোমরা একে অপরের সহযোগী হও সৎ কর্মে আর কল্যাণকর কাজে অপরদিকে অকল্যাণকর কাজ এবং অসৎ কাজে একে অপরের সহযোগিতা কর না।’’ (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬০২৬)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৫৬-[১০] উক্ত [আবূ মূসা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, যখন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে কোন ভিক্ষুক বা অভাবী লোক আসত, তখন তিনি সাহাবায়ি কিরামকে বলতেন, তোমরা সুপারিশ করো, তাহলে তোমাদের সুপারিশের সাওয়াব দেয়া হবে। আল্লাহ তা’আলা যে আদেশ জারি করতে চান, তা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জবানিতে জারি করেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الشَّفَقَةِ وَالرَّحْمَةِ عَلَى الْخَلْقِ
وَعَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ كَانَ إِذَا أَتَاهُ السَّائِلُ أَوْ صَاحِبُ الْحَاجَةِ قَالَ: «اشْفَعُوا فَلْتُؤْجَرُوا وَيَقْضِي اللَّهُ عَلَى لِسَان رَسُوله مَا شَاءَ» . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীস থেকে বুঝা যায় কোন মুসলিম ভাই যদি বিভিন্ন বৈধ কর্মকাণ্ডের তার সাথীদের সুপারিশের প্রয়োজনবোধ করে থাকেন তাহলে তার জন্য সুপারিশ করা মুস্তাহাব। সে সুপারিশটা বাদশাহর নিকটে হোক অথবা মন্ত্রী অথবা সচিবের কাছে হোক। কোন ভাই যদি কোন প্রকার সুপারিশের দাবি করে, আর যার কাছে দাবি করবে সে যদি ঐ সুপারিশ করার অধিকার বা সক্ষমতা রাখে তাহলে সে সুপারিশ করবে। চাই বাদশাহর জুলুম থেকে পরিত্রাণ পাওয়া অথবা শাস্তি মার্জনা করা অথবা নিঃস্ব মানুষের দান-দখিনা ইত্যাদি বিষয় হোক। কিন্তু যদি কোন ব্যক্তি তার উপরে হাদ্দ ফরয হয়েছে, আর সে সুপারিশ চাচ্ছে যে, আপনি রাষ্ট্রপতির কাছে আমার জন্য একটু সুপারিশ করুন যেন আমার ওপরে তিনি হাদ্দ প্রতিষ্ঠা না করেন। অনুরূপ কোন বাতিল, অবান্তর বিষয়কে লাভ করার জন্য সুপারিশ কামনা করা অথবা অন্যের কোন প্রাপ্যকে বাতিলের জন্য সুপারিশ করা বা চাওয়া সম্পূর্ণভাবে হারাম; এ থেকে বেঁচে থাকা খুবই জরুরী। (শারহুন নাবাবী ১৬শ খন্ড, হাঃ ২৬২৭)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৫৭-[১১] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অত্যাচারী হোক বা অত্যাচারিত হোক তোমার মুসলিম ভাইকে সাহায্য করো। জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল : হে আল্লাহর রসূল! আমি তো অত্যাচারিতকে সাহায্য করব, অত্যাচারীকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তাকে অত্যাচার থেকে নিবৃত্ত করো, এটাই অত্যাচারীর প্রতি তোমার সাহায্য। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الشَّفَقَةِ وَالرَّحْمَةِ عَلَى الْخَلْقِ
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «انْصُرْ أَخَاكَ ظَالِمًا أَوْ مَظْلُومًا» . فَقَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَنْصُرُهُ مَظْلُومًا فَكَيْفَ أَنْصُرُهُ ظَالِمًا؟ قَالَ: «تَمنعهُ من الظُّلم فَذَاك نصرك إِيَّاه» . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ কেউ যদি জুলুম করে তাহলে যালিমকে কখনো সহযোগিতা করা ঠিক নয়। অন্যভাবে এর অর্থ হলো তাকে বাধা দাও, অর্থাৎ যালিমকে তার জুলুম থেকে নিবৃত্ত কর। অতএব যালিম যেন নিজেও জুলুম থেকে বিরত এবং মাযলূমও তার জুলুম থেকে বাঁচতে পারে। (ফাতহুল বারী ১২শ খন্ড, হাঃ ৬৯৫২)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৫৮-[১২] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মুসলিম মুসলিমের ভাই। কোন মুসলিম না কোন মুসলিমের ওপর জুলুম করবে, না তাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিবে। যে ব্যক্তি কোন মুসলিম ভাইয়ের অভাব মোচনে সাহায্য করবে, আল্লাহ তা’আলা তার অভাব মোচন করবেন। যে ব্যক্তি কোন মুসলিম ভাইয়ের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করবে, আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন তার দুঃখ-কষ্ট লাঘব করবেন। যে ব্যক্তি তার কোন মুসলিম ভাইয়ের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবে, আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الشَّفَقَةِ وَالرَّحْمَةِ عَلَى الْخَلْقِ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ لَا يَظْلِمُهُ وَلَا يُسْلِمُهُ وَمَنْ كَانَ فِي حَاجَةِ أَخِيهِ كَانَ اللَّهُ فِي حَاجَتِهِ وَمَنْ فَرَّجَ عَنْ مُسْلِمٍ كُرْبَةً فَرَّجَ اللَّهُ عَنْهُ كُرْبَةً مِنْ كُرُبَاتِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَمَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ হাদীসটি মানবাধিকার রক্ষায় একটি মাইলফলক। হাদীসের প্রথম অংশে যে এক মুসলিমকে আরেক মুসলিম ভাই হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে এটা হলো উখুওয়াতুল ইসলাম বা ইসলামী ভ্রাতৃত্ব। অর্থাৎ এক মুসলিম আরেক মুসলিমের ভাই। এখানে উল্লেখ্য যে, ভাই কখনো ভাই-এর ওপরে জুলুম করবে না, অর্থাৎ মুসলিম ভাই মুসলিম ভাই-এর উপরে জুলুম করা হারাম।
তাকে কষ্টও দিবে না বরং তাকে সহযোগিতা করবে, সাহায্য করবে এবং তার পক্ষ হয়ে সব ধরনের বিপদাপদে তার সহযোগী হবে। এই সহযোগী হওয়াটা মাঝে মাঝে বাধ্যতামূলক হয়ে যায় মাঝে মাঝে তা কাঙিক্ষত হয়ে থাকে। ইমাম ত্ববারানী সালিম থেকে বর্ণনা করেছেন যে, একজন মুসলিম আরেকজন মুসলিমকে বিপদগ্রস্ত দেখে চলে যাবে না, বরং তার সহযোগী হবে। ইমাম মুসলিম আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, একজন মুসলিম আরেকজন মুসলিমকে ক্ষুদ্র জ্ঞান করবে না। হাদীসের আরেক অংশ হলো, আল্লাহ রববুল ‘আলামীন তখন বান্দাকে সাহায্য করেন যখন সে তার ভাইকে সাহায্য করে। আর যে কোন মুসলিম ভাই-এর দুনিয়া ও আখিরাতের কোন বিপদে সাহায্য করবে আল্লাহ রববুল ‘আলামীন তাকে সাহায্য করবেন।
অত্র হাদীসে মুসলিম ভাইয়ের দোষ গোপন করতে বলা হয়েছে, এটি একটি শর্তসাপেক্ষ বিষয়; তা যদি প্রকাশ করার চাইতে গোপন করা উত্তম হয়ে থাকে তাহলে গোপন, আর যদি প্রকাশ করা উত্তম হয় তাহলে প্রকাশ করবে। এক্ষেত্রে আমরা দেখি ইমামগণ যে রাবীদের সমালোচনা করেছেন এটা হারাম গীবতের মধ্যে শামিল নয়, কারণ এখানে তার দোষ না বললে সমস্ত মুসলিম এক চরম ক্ষতির মধ্যে পড়ে যাবে। (ফাতহুল বারী ৫ম খন্ড, হাঃ ৪৯৫৮)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৫৯-[১৩] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এক মুসলিম অপর মুসলিমের (দীনী) ভাই। মুসলিম ব্যক্তি অপর মুসলিমের ওপর অবিচার করবে না, তাকে অপদস্থ করবে না এবং অবজ্ঞা করবে না। আল্লাহভীতি এখানে! এ কথা বলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজের বক্ষের দিকে তিনবার ইঙ্গিত করে বললেনঃ একজন মানুষের জন্য এতটুকু অন্যায়ই যথেষ্ট যে, সে নিজের মুসলিম ভাইকে হেয় জ্ঞান করবে। মুসলিমের জন্য অপর মুসলিমের রক্ত, ধন-সম্পদ ও মান-সম্মান হারাম। (মুসলিম)[1]
بَابُ الشَّفَقَةِ وَالرَّحْمَةِ عَلَى الْخَلْقِ
وَعَنْ
أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ لَا يَظْلِمُهُ وَلَا يَخْذُلُهُ وَلَا يَحْقِرُهُ التَّقْوَى هَهُنَا» . وَيُشِير إِلَى صَدره ثَلَاث مرار بِحَسْبِ امْرِئٍ مِنَ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ: دَمُهُ ومالهُ وَعرضه . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ হাদীসটি মুসলিমদের পরস্পর পরস্পরের প্রতি আচরণ কেমন হবে তার বিবরণ পেশ করেছে। হাদীসের শব্দ (لَا يَخْذُلُهٗ) এর অর্থ তাকে বর্জন করবে না, তুচ্ছ মনে করবে না, লাঞ্ছিত করবে না, অবজ্ঞা করবে না। আরো একটু বিস্তারিত বললে হবে ‘‘কোন মুসলিম কোন যালিমের জুলুম থেকে বাঁচার জন্য অপর কোন মুসলিমের নিকট সহযোগিতার আবেদন জানালে তাকে ঐ অবস্থায় ফেলে রাখবে না বরং যথাসাধ্য তাকে জুলুমের হাত থেকে বাঁচানো এবং তার সহযোগিতায় হাত প্রসারিত করা দায়িত্ব।’’ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে বুকের দিকে ইশারা করে বললেন, তাকওয়া এখানে, তাকওয়া এখানে, তাকওয়া এখানে।
অন্য হাদীসে এসেছে, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের শরীরের দিকে দেখেন না, দেখেন তোমাদের অন্তরের দিকে। প্রথমটির অর্থ হলো বাহ্যিক ‘আমল দ্বারা তাকওয়া অর্জন হয় না। যতক্ষণ পর্যন্ত অন্তরে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি না হয়। এ হাদীসটির মৌলিক অর্থ হলো অন্তরের অবস্থায় আল্লাহর নিকট বেশী গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কেউ এ হাদীস দ্বারা দলীল দিয়ে বলেছেন, ‘আক্ল জ্ঞান কলবে থাকে মাথায় নয়। (শারহে মুসলিম ১৬শ খন্ড, হাঃ ২৫৬৪)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৬০-[১৪] ’ইয়ায ইবনু হিমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তিন প্রকার লোক জান্নাতবাসী। যথা- ১. দেশের শাসক- যিনি সুবিচারক ও দাতা, যাকে ভালো ও সৎ কাজ করার যোগ্যতা দান করা হয়েছে, ২. যিনি সকলের প্রতি অনুগ্রহকারী- নিকটাত্মীয় ও মুসলিমদের প্রতি কোমলপ্রাণ এবং ৩. যিনি নিষিদ্ধ বস্তু এবং ভিক্ষাবৃত্তি থেকে আত্মরক্ষাকারী- সন্তান-সন্ততি সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলার ওপর ভরসাকারী।
পাঁচ প্রকার লোক জাহান্নামবাসী। যথা- ১. দুর্বল জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি,- যে নিজের স্থুল বুদ্ধির কারণে নিজেকে কুকর্ম থেকে ফেরাতে পারে না। আর এ ব্যক্তি তোমাদের অধীনস্থ চাকর-বকরদেরই একজন। সে স্ত্রীও চায় না, হালাল মালেরও পরোয়া করে না। অর্থাৎ- নিজে ব্যভিচারে লিপ্ত থাকার কারণে স্ত্রীর প্রয়োজনবোধ করে না। হারাম মাল উপার্জনেই সন্তুষ্ট। হারাম হোক আর হালাল হোক, তার পেট ভরলেই সে যথেষ্ট মনে করে। ২. এমন খিয়ানাতকারী- যার লালসা গোপন ব্যাপার নয়, তুচ্ছ ব্যাপার হলেও সে অসাধুতা অবলম্বন করে। ৩. সে ব্যক্তি- যে তোমাকে তোমার পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদের মধ্যে ধোঁকায় ফেলার জন্য সকাল-সন্ধ্যা চিন্তামগ্ন থাকে। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম), ৪. কৃপণ ও মিথ্যাবাদী এবং ৫. দুশ্চরিত্র ও অশ্লীল বাক্যালাপকারীর কথা বর্ণনা করেছেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ الشَّفَقَةِ وَالرَّحْمَةِ عَلَى الْخَلْقِ
وَعَنْ
عِيَاضِ بْنِ حِمَارٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَهْلُ الْجَنَّةِ ثَلَاثَةٌ: ذُو سُلْطَانٍ مُقْسِطٌ متصدِّقٌ موفق وَرجل رَحِيم رَفِيق الْقلب لكلَّ ذِي قربى وَمُسْلِمٍ وَعَفِيفٌ مُتَعَفِّفٌ ذُو عِيَالٍ. وَأَهْلُ النَّارِ خَمْسَةٌ: الضَّعِيفُ الَّذِي لَا زَبْرَ لَهُ الَّذِينَ هم فِيكُمْ تَبَعٌ لَا يَبْغُونَ أَهْلًا وَلَا مَالًا وَالْخَائِنُ الَّذِي لَا يَخْفَى لَهُ طَمَعٌ وَإِنْ دَقَّ إِلَّا خَانَهُ وَرَجُلٌ لَا يُصْبِحُ وَلَا يُمْسِي إِلَّا وَهُوَ يُخَادِعُكَ عَنْ أَهْلِكَ وَمَالِكَ وَذَكَرَ الْبُخْلَ أَوِ الْكَذِبَ وَالشِّنْظِيرُ الْفَحَّاشُ . رَوَاهُ مُسلم
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৬১-[১৫] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সে মহান সত্তার শপথ! যাঁর হাতে আমার প্রাণ, বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত (পরিপূর্ণ) ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না সে নিজের (মুসলিম) ভাইয়ের জন্য সে জিনিস পছন্দ করবে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الشَّفَقَةِ وَالرَّحْمَةِ عَلَى الْخَلْقِ
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا يُؤمن أحد حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ لا يؤمن ‘তারা ঈমানদার হতে পারবে না’ যারা ঈমানের দাবী করে অর্থাৎ নিজেদেরকে মু’মিন বলে পরিচয় দেয়। হাফিয ইবনু হাজার ‘আসকালানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ‘তারা ঈমানদার হতে পারবে না।’ এ কথার অর্থ হলো পূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না।
لا يبلغ عبد حقيقة الإيمان অর্থাৎ ‘‘কোন মু’মিন ঈমানের হাকীকাতে পৌঁছতে পারবে না’’, এখানে হাকীকাতে ঈমান অর্থ পূর্ণ ঈমান। এর দ্বারা প্রমাণিত যে, ঈমানের অনেক স্তর রয়েছে। হাদীসটিতে বলা হয়েছে মুসলিমের জন্য তাই ভালোবাসতে হবে যা নিজের জন্য ভালোবাসী, সেটা যত প্রকার কল্যাণ আছে সবই, তা পার্থিব হোক অথবা পারলৌকিক হোক। এর মধ্যে থেকে হারাম বিষয়গুলো বাদ যাবে। (ফাতহুল বারী ১ম খন্ড, হাঃ ১৩)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৬২-[১৬] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর কসম! সে ঈমানদার হবে না, আল্লাহর কসম! সে ঈমানদার হবে না, আল্লাহর কসম! সে ঈমানদার হবে না। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রসূল! কে সে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ যার প্রতিবেশী তার অনিষ্টতা থেকে নিরাপদ নয়। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الشَّفَقَةِ وَالرَّحْمَةِ عَلَى الْخَلْقِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ» . قِيلَ: مَنْ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: «الَّذِي لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ বর্ণিত হাদীসটিতে প্রতিবেশীর হাকের ব্যাপারে চরম গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন (وَاللهِ لَا يُؤْمِنُ وَاللهِ لَا يُؤْمِنُ) আল্লাহর শপথ সে ঈমানদার হতে পারে না। আল্লাহর শপথ সে ঈমানদার হতে পারে না। যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদে থাকে না, কেননা ঈমানের শর্ত হলো কুরআন মেনে চলা অথচ কুরআনে বলা হয়েছে, وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبٰى وَالْجَارِ الْجُنُبِ অর্থাৎ- ‘‘আত্মীয় ও অনাত্মীয় সকল প্রতিবেশীর প্রতি সদাচারণ কর।’’ (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪ : ৩৬)
তাই যারা প্রতিবেশীর প্রতি সদাচারণে ব্যর্থ তারা প্রকৃত ঈমানদার হতে পারবে না। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৬৩-[১৭] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার প্রতিবেশী তার অনিষ্টতা থেকে নিরাপদ নয়। (মুসলিম)[1]
بَابُ الشَّفَقَةِ وَالرَّحْمَةِ عَلَى الْخَلْقِ
وَعَنْ
أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীসের لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ لَا يَأْمَنُ جَارُهٗ بَوَائِقَهٗ এখানে بَوَائِقَ শব্দটি بائقة এর বহুবচন, যার অর্থ غائلة অর্থ কষ্টকর কোন জিনিস। (لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ) ‘জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না’, এর অর্থ দু’টি হতে পারে।
১। যারা মুসলিমদের কষ্ট দেয়া হালাল মনে করে তারা কাফির হয়ে যাবে, আর কাফির মূলতই জান্নাতে যেতে পারবে না।
২। মুসলিমদের কষ্ট দেয় এমন ব্যক্তির শাস্তি হলো সে সফলকাম মুসলিমদের সাথে প্রথম সারিতে জান্নাতে যেতে পারবে না, বরং তাকে অনেক অপেক্ষা করতে হবে। তারপর আল্লাহ তাকে শাস্তি দিলে দিতে পারেন আর মাফ করলে তার ইচ্ছা।
আহলুস্ সুন্নাহ্ ওয়াল জামা‘আতের মতামত যে, যারা কাবীরাহ্ গুনাহ করে অথচ তাওহীদের উপর মারা যায় তারা আল্লাহর ইচ্ছায় থাকবে যদি আল্লাহ চান তাদের শাস্তি দিবেন, আর চাইলে তিনি তাদের মাফ করে জান্নাতে দিবেন, অথবা কিছু শাস্তি দিয়ে জান্নাতে দিবেন। (শারহুন নাবাবী ২য় খন্ড, হাঃ ৪৬)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৬৪-[১৮] ’আয়িশাহ্ ও ইবনু ’উমার (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ জিবরীল (আ.) সর্বদা আমাকে প্রতিবেশীর অধিকার পূর্ণ করার উপদেশ দিতে থাকতেন। এমনকি আমার ধারণা হয়েছিল যে, তিনি প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী ঠিক করে দেবেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الشَّفَقَةِ وَالرَّحْمَةِ عَلَى الْخَلْقِ
وَعَنْ عَائِشَةَ وَابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَا زَالَ جِبْرِيلُ يُوصِينِي بِالْجَارِ حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ سَيُوَرِّثُهُ» . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ প্রতিবেশীর হক ইসলামে একটি বিরাট স্থান করে নিয়েছে, জিবরীল আমীন (আ.) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বার বার প্রতিবেশীর হাকের ব্যাপারে উপদেশ দিচ্ছিলেন। এমনকি নবীজি
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মনে করলেন জিবরীল এ কথাও বলবেন প্রতিবেশীকেও যেন উত্তরাধিকারী করা হয়। এখানে উত্তরাধিকারী দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে সম্পত্তির ভাগ দেয়া, যেমনটা নিকটাত্মীয়ের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। আর প্রতিবেশী বলতে সব ধরনের প্রতিবেশী অন্তর্ভুক্ত তারা মুসলিম হতে পারে কাফির হতে পারে। আল্লাহর বান্দা হতে পারে, ফাসিক হতে পারে, নিকটাত্মীয় হতে পারে, দূর সম্পর্কের আত্মীয় হতে পারে, ঘরের নিকটবর্তী হতে পারে এবং দূরেও হতে পারে, প্রতিবেশীর কয়েকটি স্তর রয়েছে একেকটি স্তর অন্য স্তর হতে বেশী উন্নত।
সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হলো মুসলিম প্রতিবেশী, তার পরে যিনি বেশী ইসলামের বিধি বিধান মানেন, তারপরে যারা যতটুকু ইসলামের বিধান মানেন সেই অনুপাতে তাদের স্তর বিন্যাস করা হবে। ইয়াহূদীদের সাথেও প্রতিবেশীর সম্পর্ক স্থাপন হতে পারে। ত্ববারানী বর্ণনা করেছেন প্রতিবেশী তিন শ্রেণীর। একজন হলো যার হক রয়েছে অথচ সে মুশরিক, তার শুধু প্রতিবেশীর হক রয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রতিবেশী হলো যার দু’টি হক রয়েছে, তিনি হলেন মুসলিম, তার দু’টি হক হলো একটি প্রতিবেশীর হক আরেকটি ইসলামের হক। আরেক ধরনের প্রতিবেশী হলো, যার তিনটি হক রয়েছে একটি হলো ইসলামের হক, আরেকটি প্রতিবেশীর হক, আরেকটি আত্মীয়ের হক।
ইমাম কুরতুবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ‘প্রতিবেশী’ শব্দটি ব্যবহার করা হয় যারা আশেপাশে রয়েছে, আর বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে বাড়ির বা ঘরের লোককেই প্রতিবেশী বলা হয়ে থাকে। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬১০৪)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৬৫-[১৯] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন তোমরা তিন ব্যক্তি একত্রে থাকবে, তোমাদের দু’জনে পরস্পর অপরজনকে বাদ দিয়ে কানে কানে কথা বলবে না যতক্ষণ না তোমরা জনতার সাথে মিশে যাও। এটা এজন্য যে, এতে অপর ব্যক্তি মনঃক্ষুণ্ণ হবে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الشَّفَقَةِ وَالرَّحْمَةِ عَلَى الْخَلْقِ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا كُنْتُمْ ثَلَاثَةً فَلَا يَتَنَاجَى اثْنَانِ دُونَ الْآخَرِ حَتَّى تَخْتَلِطُوا بِالنَّاسِ مِنْ أَجْلِ أَن يحزنهُ» . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ তিনজন ব্যক্তি এক সাথে থাকলে তার ভিতর থেকে দু’জন একজনকে বাদ দিয়ে কোন গোপন পরামর্শ করবে না। إِذَا كَانُوا أَرْبَعَة যদি তারা চারজন থাকেন। তাহলে কোন অসুবিধা নেই। ইবনু উমার (রাঃ)-এর একটি ‘আমল এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। যখন তিনি কোন ব্যক্তির সাথে গোপন পরামর্শ করতে চাইতেন আর তারা যদি তিনজন থাকত তখন চতুর্থ আরেকজনকে ডেকে নিয়ে আসতেন। তারপর দু’জনকে লক্ষ্য করে বলতেন, তোমরা দু’জন বিশ্রাম নাও, আমি একটু কথা বলি। তাহলে এখানে দেখা যাচ্ছে যে, চারজন হলে অসুবিধা নেই। ইবনু বাত্ত্বল (রহিমাহুল্লাহ) মালিক থেকে বর্ণনা করেছেন, এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে কোন একজনকে বাদ দিয়ে আলাপ করবে এটা নিষিদ্ধ, তাতে সে জামা‘আতের সংখ্যা তিন হোক চার হোক বা ততোধিক হোক। এতে তাদের ভিতরে বিদ্বেষ সৃষ্টি বা সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার কারণ ঘটে যেতে পারে। ইবনু বাত্ত্বল (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ কোন জামা‘আত থেকে একজনকে বাদ দিয়ে আলাপচারিতা করবে না।
ইমাম কুরতুবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এক জামা‘আত যদি আরেক জামা‘আতকে বাদ দিয়ে কথাবার্তা বলে সেটা জায়িয হবে কিনা- এ ব্যাপারে মতবিরোধ রয়েছে। ইবনু তীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর হাদীস ফাতিমার ঘটনায় প্রমাণ করে এটা জায়িয আছে। আল্লাহই ভালো জানেন। (ফাতহুল বারী ১১শ খন্ড, হাঃ ৬২৯০)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৬৬-[২০] তামীম আদ্ দারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার বললেনঃ দীন হলো সহমর্মিতা বা কল্যাণ কামনা। আমরা জিজ্ঞেস করলামঃ কার জন্য সহমর্মিতা? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আল্লাহ তা’আলার জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, তাঁর রসূল-এর জন্য, মুসলিমদের নেতার জন্য এবং সর্বসাধারণ মুসলিমের জন্য। (মুসলিম)[1]
بَابُ الشَّفَقَةِ وَالرَّحْمَةِ عَلَى الْخَلْقِ
وَعَن
تَمِيم الدَّارِيّ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الدِّينُ النَّصِيحَةُ» ثَلَاثًا. قُلْنَا: لِمَنْ؟ قَالَ: «لِلَّهِ وَلِكِتَابِهِ وَلِرَسُولِهِ وَلِأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ وَعَامَّتِهِمْ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যাঃ ইমাম আবূ সুলায়মান আল খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) অত্র হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেনঃ ‘নাসীহাত’ শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক আরবী শব্দ, এর অর্থ হচ্ছে যার জন্য উপদেশ দেয়া হবে তার জন্য সর্বময় কল্যাণ কামনা করা। আরবী ভাষাতে এমন কোন শব্দ নেই যে, শব্দটি একক শব্দ হওয়া সত্ত্বেও এত বেশী অর্থবোধক হয়ে থাকে। আল্লাহর জন্য নাসীহাতের অর্থ হলো তার প্রতি ঈমান নিয়ে আসা। তার সাথে অংশীদার স্থাপন না করা এবং তার গুণাগুণে বিকৃত সাধন না করা। আর আল্লাহ রববুল ‘আলামীনকে সকল প্রকার অসম্পূর্ণতা থেকে মুক্ত ঘোষণা করা। তার অনুগত হওয়া, অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা। তার কারণেই কাউকে ভালোবাসা, তার কারণে কারও সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক ছিন্ন করা। (শারহুন নাবাবী ২য় খন্ড, হাঃ ৫৫)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৬৭-[২১] জারীর ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে নিম্নোক্ত কথাগুলোর বায়’আত বা আজ্ঞানুবর্তী হওয়ার শপথ করলাম- ১. সালাত প্রতিষ্ঠা করা, ২. যাকাত আদায় করা এবং ৩. প্রত্যেক মুসলিমের কল্যাণ কামনা করা। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الشَّفَقَةِ وَالرَّحْمَةِ عَلَى الْخَلْقِ
عَن جرير بن عبد الله قَالَ: بَايَعْتُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى إِقَامِ الصَّلَاةِ وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ وَالنُّصْحِ لكل مُسلم. مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ জারীর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, অত্র হাদীসে সালাত প্রতিষ্ঠা, যাকাত আদায় এবং সমস্ত মুসলিমদের কল্যাণের ব্যাপারে আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে বায়‘আত করেছি। এখানে প্রশ্ন হলো শুধু সালাত ও যাকাতের কথা বলা হলো কেন? উত্তরে ‘উলামায়ে কিরাম বলেনঃ এ সালাত ও যাকাত যেহেতু কুরআন হাদীসে সব স্থানে এক সাথে এসেছে, তাই এখানেও এক সাথে আনা হয়েছে, আর সালাত এবং যাকাত হলো শাহাদাতের পরে ইসলামের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ রুকন। সওম ও হাজ্জের কথা উল্লেখ করা হয়নি এ কারণে যে, এগুলো السمع কথা শুনা ও الطاعة তথা মানার মধ্যেই শামিল। (শারহে মুসরিম ২য় খন্ড, হাঃ ৫৬)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৬৮-[২২] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবুল কাসিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, যিনি ’’সত্যবাদী সত্যায়িত’’ তাঁকে বলতে শুনেছি, দুর্ভাগ্যবান ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কারো অন্তর হতে অনুগ্রহ ও দয়া বের করে দেয়া হয় না। (আহমাদ ও তিরমিযী)[1]
عَن أبي
هُرَيْرَة قَالَ: سَمِعْتُ أَبَا الْقَاسِمِ الصَّادِقَ الْمَصْدُوقَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «لَا تُنْزَعُ الرَّحْمَةُ إِلاَّ مَن شقي» . رَوَاهُ أَحْمد وَالتِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সমাজবিজ্ঞানী বুঝতে হবে এ হাদীসটিই তা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। যেখানে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ আল্লাহর সৃষ্টির উপর দয়া করতে যে না পারবে সে চরম হতভাগা। সর্বাগ্রে সে দয়া করবে নিজের প্রতি। কারণ যে নিজেকেই দয়া করতে পারে না সে অন্যকে কিভাবে দয়া করবে? মহান আল্লাহ বলেন, إِنْ أَحْسَنْتُمْ أَحْسَنْتُمْ لِأَنْفُسِكُمْ ‘‘তোমরা অপর কাউকে ইহসান করার অর্থ তোমাদের নিজেদের ইহসান করা।’’ (সূরাহ্ ইসরা ১৭ : ৭)
‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ মানুষের প্রতি দয়া না করাকে হতভাগ্য বলে চিত্রায়িত করার কারণ হলো সৃষ্টির প্রতি দয়াপরবশ হতে উৎসাহিত করা যা ঈমানের পরিচায়ক। যার ভিতর নম্রতা নেই তার ঈমান নেই আর যার ঈমান নেই, সে নিঃসন্দেহে হতভাগ্য। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৯২৩)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৬৯-[২৩] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি অনুগ্রহ ও অনুকম্পা প্রদর্শনকারীদের প্রতি আল্লাহ রহমানুর রহীম অনুগ্রহ ও দয়া বর্ষণ করেন। সুতরাং তোমরা জমিনের অধিবাসীদের প্রতি দয়া করো, তাহলে আকাশের মালিক তোমাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করবেন। (আবূ দাঊদ ও তিরমিযী)[1]
وَعَنْ عَبْدِ
اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: الرَّاحِمُونَ يَرْحَمُهُمُ الرَّحْمَنُ ارْحَمُوا مَنْ فِي الْأَرْضِ يَرْحَمْكُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالتِّرْمِذِيُّ
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীসে দয়াশীলতার যে কথা বলা হয়েছে তা জমিনের মানব, জীব জানোয়ারের প্রতি অনুগ্রহ করা ও বিপদাপদে সমবেদনা জানানোর কথাটি ব্যাপক রাখা হয়েছে যাতে করে জমিনের সকলকে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। এর ভিতরে ভালো, মন্দ, কথা বলতে পারে এমন, পক্ষীকুল, কীটপতঙ্গ সবাই অন্তর্ভুক্ত হবে।
(يَرْحَمْكُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ) যিনি আকাশে আছেন তিনি তোমাদের দয়া করবেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ সুবহানাহূ ওয়াতা‘আলা। কেউ কেউ বলেছেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলেন আসমানে বসবাসকারী মালায়িকাহ্ (ফেরেশতামণ্ডলী), কেননা তারা মু’মিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। যেমন, মহান আল্লাহ বলেনঃ
الَّذِينَ يَحْمِلُونَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَه يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيُؤْمِنُونَ بِه# وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَيْءٍ رَحْمَةً وَعِلْمًا فَاغْفِرْ لِلَّذِينَ تَابُوا وَاتَّبَعُوا سَبِيلَكَ وَقِهِمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ
অর্থাৎ যারা ‘আরশ বহন করে এবং তাদের আশেপাশে যারা আছে তারা তাদের রবের প্রশংসা তাসবীহ পাঠ করে এবং তার প্রতি ঈমান এনেছে এবং মু’মিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে, হে আমাদের রব্! তুমি সব জিনিসকে দয়া ও ‘ইলমের মাধ্যমে বেষ্টন করে আছ। সুতরাং তুমি তাওবাহকারী ও তোমার পথ অনুসারীদের ক্ষমা কর এবং তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি হতে রক্ষা কর। (সূরাহ্ আল মু’মিন/গাফির ৪০ : ৭)
সিরাজুল মুনীর গ্রন্থে এসেছে, اهل السماء তথা আসমানবাসী। এ শব্দ দ্বারা মালায়িকাহ্ উদ্দেশ্য।
(তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৯২৪)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৭০-[২৪] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদেরকে অনুগ্রহ করে না, আমাদের বড়দের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে না, ভালো কাজের আদেশ করে না এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করে না, সে আমাদের দলের নয়। [তিরমিযী; আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এ হাদীসটি গরীব।][1]
وَعَنِ
ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ:
لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيرَنَا وَلَمْ يُوَقِّرْ كَبِيرَنَا وَيَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَ عَنِ الْمُنْكَرِ
رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘লায়স ইবনু আবী সুলায়ম’’ নামের একজন য‘ঈফ রাবী। এছাড়াও শরীকও য‘ঈফ। দেখুন- য‘ঈফাহ্ ২১০৮।
ব্যাখ্যাঃ ইমাম আবূ ‘ঈসা তিরমিযী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। কোন কোন ‘আলিম বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা (لَيْسَ مِنَّا) অর্থ আমাদের শিষ্টাচারের মধ্যে নয়। ‘আলী ইবনুল মাদীনী বলেছেনঃ ইয়াহইয়া ইবনু সা‘ঈদ বলেন, সুফ্ইয়ান সাওরী উক্ত ব্যাখ্যাকে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের মধ্যে নয়’ অর্থ আমাদের ধর্মের নয়। অর্থাৎ যদি কেউ ছোটদের স্নেহ না করে, বড়দের শ্রদ্ধা না করে তাহলে সে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত নয়। সুতরাং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরাই আমাদের ঈমানের পরিচয়। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৯২০)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৭১-[২৫] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে যুবক কোন বৃদ্ধকে বার্ধক্যের কারণে ইজ্জত-সম্মান করবে, আল্লাহ তা’আলা তার বৃদ্ধাবস্থার জন্য এমন লোককে নিয়োগ করবেন, যে তাকে ইজ্জত-সম্মান করবে। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ
أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا أَكْرَمَ شَابٌّ شَيْخًا مِنْ أَجْلِ سِنِّهِ إِلَّا قَيَّضَ اللَّهُ لَهُ عِنْد سنه من يُكرمهُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘ইয়াযীদ ইবনু বায়ান’’ নামের বর্ননাকারী য‘ঈফ। দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ৩০৪।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৭২-[২৬] আবূ মূসা আল আশ্’আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বৃদ্ধ মুসলিমকে ইজ্জত-সম্মান করা, কুরআন পাঠককে সম্মান করা- যতক্ষণ সে কুরআনের বাক্যের বা অর্থে বাড়াবাড়ি ও বিকৃতিসাধন না করে এবং ন্যায়বিচারক শাসককে সম্মান করা, এ সবকিছুই আল্লাহকে সম্মান করার অংশবিশেষ। (আবূ দাঊদ ও বায়হাক্বী’র ’’শু’আবুল ঈমান’’)[1]
وَعَنْ
أَبِي مُوسَى قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ مِنْ إِجْلَالِ الله إكْرامَ ذِي الشَّيبةِ المسلمِ وَحَامِلُ الْقُرْآنِ غَيْرَ الْغَالِي فِيهِ وَلَا الْجَافِي عَنْهُ وَإِكْرَامُ السُّلْطَانِ الْمُقْسِطِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ»
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৭৩-[২৭] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মুসলিমদের ঘরের মধ্যে উত্তম ঘর সেটাই, যাতে ইয়াতীম আছে, আর তার সাথে উত্তম আচরণ করা হয় এবং মুসলিমের ঘরের মধ্যে খারাপ ঘর সেটা, যাতে ইয়াতীম আছে, কিন্তু তার সাথে অসদাচরণ করা হয়। (ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ أَبِي
هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «خَيْرُ بَيْتٍ فِي الْمُسْلِمِينَ بَيْتٌ فِيهِ يَتِيمٌ يُحْسَنُ إِلَيْهِ وَشَرُّ بَيت فِي المسلمينَ بيتٌ فِي يَتِيم يساء إِلَيْهِ» . رَوَاهُ ابْن مَاجَه
হাদীসটি ‘‘ইয়াহ্ইয়া ইবনু সুলায়মান’’ নামের বর্ণনাকারী য‘ঈফ। য‘ঈফাহ্ ১৬৩৭।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৭৪-[২৮] আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টির জন্য কোন ইয়াতীমের মাথায় হাত বুলাবে, যে চুলের উপর দিয়ে তার হাত বুলাবে, তার প্রতিটি চুলের জন্য একটি করে সাওয়াব লেখা হবে। যে ব্যক্তি কোন বালিকা অথবা ইয়াতীম বালকের সাথে ভালো ব্যবহার করবে, যে তার তত্ত্বাবধানে আছে, আমি এবং সে জান্নাতে এ দু’টোর মতো হবো, যেমনিভাবে এ দু’টো অঙ্গুলি মিলিত হয়ে আছে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজের দু’ অঙ্গুলি একত্রে মিলালেন। [আহমাদ ও তিরমিযী; আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসটি গরীব।][1]
بِي أُمَامَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ مَسَحَ رَأْسَ يَتِيمٍ لَمْ يمسحه إلالله كَانَ لَهُ بِكُلِّ شَعْرَةٍ تَمُرُّ عَلَيْهَا يَدُهُ حَسَنَاتٌ وَمَنْ أَحْسَنَ إِلَى يَتِيمَةٍ أَوْ يَتِيمٍ عِنْدَهُ كُنْتُ أَنَا وَهُوَ فِي الْجَنَّةِ كَهَاتَيْنِ» وَقرن بِي أُصْبُعَيْهِ. رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘আলী ইবনু ইয়াযীদ’’ নামের বর্ণনাকারী য‘ঈফ। দেখুন- তাহক্বীক মুসনাদে আহমাদ ২২৩৩৮।
ব্যাখ্যাঃ (مَنْ مَسَحَ رَأْسَ يَتِيمٍ) ‘যে কোন ইয়াতীমের মাথায় হাত বুলাবে’; ইয়াতীম হলো পুঃ লিঙ্গ, ইয়াতীমাহ্ হলো স্ত্রী লিঙ্গ। অত্র হাদীসে শুধু ইয়াতীম বলা হয়েছে এর অর্থ এই নয় যে, ইয়াতীমার দিকটি বাদ দেয়া হয়েছে। ইয়াতীমার বিষয়টি আরো বেশী গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত। কারণ মেয়েরা এমনিতেই অবহেলিত জাতি, তারা ইয়াতীম হলে আরো অসহায় হয়ে পরে।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ইয়াতীমের মাথায় হাত বুলানোর অর্থ হলো তার প্রতি স্নেহশীল হওয়া, তাকে আদর-সোহাগ এবং সমবেদনা জানানো, যাতে সে তার পিতার অভাব খানিকটা হলেও ভুলে যায়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৭৫-[২৯] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন ইয়াতীমকে নিজের খাদ্য-পানীয়তে ঠাঁই দেবে, তার জন্য আল্লাহ তা’আলা নিশ্চয় জান্নাত অবধারিত করে দেবেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সে এমন কোন পাপ না করে, যা মার্জনা করা হয় না। যে ব্যক্তি তিনটি কন্যা বা তিনটি বোনকে প্রতিপালন করবে, তাদের শিষ্টাচার শেখাবে এবং অনুগ্রহ ও অনুকম্পা প্রদর্শন করবে, যতক্ষণ না আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে পরমুখাপেক্ষিতা হতে মুক্ত করেন, তার জন্য আল্লাহ তা’আলা জান্নাত অবধারিত করেছেন। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল : হে আল্লাহর রসূল! দু’ কন্যা বা দু’ বোনের লালন-পালনে কি সাওয়াব হবে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ দু’জনের ব্যাপারে একই সাওয়াব মিলবে। যদি কেউ (সাহাবায়ে কিরাম) এক বোন বা কন্যার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেন, তবে তার সম্পর্কেও রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটাই বলতেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরো বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা যে ব্যক্তির দু’টো প্রিয় বস্তু নিয়ে গিয়েছেন, তার জন্য জান্নাত অবধারিত রয়েছে। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রসূল! তার প্রিয় বস্তুদ্বয় কি? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তার চক্ষুদ্বয়। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
وَعَنِ ابْنِ
عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ آوَى يَتِيمًا إِلَى طَعَامِهِ وَشَرَابِهِ أَوْجَبَ اللَّهُ لَهُ الْجَنَّةَ أَلْبَتَّةَ إِلَّا أَنْ يَعْمَلَ ذَنْبًا لَا يُغْفَرُ. وَمَنْ عَالَ ثَلَاثَ بَنَاتٍ أَوْ مِثْلَهُنَّ مِنَ الْأَخَوَاتِ فَأَدَّبَهُنَّ وَرَحِمَهُنَّ حَتَّى يُغْنِيَهُنَّ اللَّهُ أَوْجَبَ اللَّهُ لَهُ الْجَنَّةَ» . فَقَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ الله واثنتين؟ قَالَ: «واثنتين» حَتَّى قَالُوا: أَوْ وَاحِدَةً؟ لَقَالَ: وَاحِدَةً «وَمَنْ أَذْهَبَ اللَّهُ بِكَرِيمَتَيْهِ وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ» قِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا كَرِيمَتَاهُ؟ قَالَ: «عَيْنَاهُ» . رَوَاهُ فِي «شرح السّنة»
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘হুসায়ন ইবনু কায়স আবূ আলী আর্ রুহাবী’’ নামের বর্ণনাকারীর উপাধি হান্শ। হাদীস বিশারদগণ তাকে য‘ঈফ বলেছেন। দেখুন- হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৪২৭ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ যে মুসলিম কোন ইয়াতীমকে নিজের খাওয়ার সাথী বানাবে আল্লাহ তাকে জান্নাত দিবেন। হ্যাঁ, তবে যদি সে এমন গুনাহ করে থাকে যা ক্ষমার অযোগ্য তাহলে ভিন্ন কথা। এখানে ক্ষমার অযোগ্য পাপ হলো শির্ক। ইবনুল মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এটা হলো সৃষ্টির প্রতি জুলুম নির্যাতন চালানো। মিরক্বাত গ্রন্থকার ‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী হানাফী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ইয়াতীম পালনের দ্বারা মানুষের হক নষ্ট করার পাপ ক্ষমা হবে না। বান্দাদের হক নষ্টের মধ্যে এটাও শামিল যে, কেউ ইয়াতীমের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করবে। মোটকথা হলো যারা ইয়াতীম লালন করবে তাদের আল্লাহর ইচ্ছায় ক্ষমা করে দেয় হবে। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ৪৯৭৫)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৭৬-[৩০] জাবির ইবনু সামুরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন ব্যক্তি কর্তৃক তার সন্তানকে শিষ্টাচারের একটি কথা শিখানো এক সা’ পরিমাণ খাদ্য দান করার চেয়েও উত্তম। (তিরমিযী)[1]
ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসটি গরীব। এর রাবী ’’নাসিহ’’ হাদীসবিদদের মতে সবল নয়।
وَعَنْ جَابِرِ
بْنِ سَمُرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَأَنْ يُؤَدِّبَ الرَّجُلُ وَلَدَهُ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَتَصَدَّقَ بِصَاعٍ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ وَنَاصِحٌ الرَّاوِي لَيْسَ عِنْدَ أصحابِ الحَدِيث بِالْقَوِيّ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘নাসিহ’’ (ناصح) নামের একজন ব্যক্তি, যে হাদীস বর্ণনায় য‘ঈফ। দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ১৮৮৭।
ব্যাখ্যাঃ لَأَنْ يُؤَدِّبَ الرَّجُلُ وَلَدَهُ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَتَصَدَّقَ بِصَاعٍ ‘কোন ব্যক্তি এক সা' পরিমাণ সাদাকা করবে এর চেয়ে সে তার সন্তানকে আদব শিক্ষা দিবে, এটা উত্তম। ‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী হানাফী (রহিমাহুল্লাহ) এর ব্যাখ্যায় বলেছেনঃ এখানে একটি আদব বলার কারণ হলো আদব শিক্ষা দেয়ার গুরুত্ব মাহাত্ম্যকে ফুটিয়ে তোলা, সর্বোপরি এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া। কেননা সম্পদ দান এটা ক্ষয় হয়ে গেলেও আদব শিক্ষা দেয়ার বিষয়টি কিয়ামত পর্যন্ত জারি থাকবে।
‘আল্লামা আল মানবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ সন্তানকে আদব শিক্ষা দেয়া সদাকায়ে জারিয়াহ্ তথা চলমান সাওয়াব সংশ্লিষ্ট কাজের অন্তর্ভুক্ত। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৯৫১)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৭৭-[৩১] আইয়ূব ইবনু মূসা (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি তাঁর পিতার মাধ্যমে তাঁর পিতামহ থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন পিতা তার সন্তানকে শিষ্টাচারের চেয়ে শ্রেয় কোন বস্তু দান করে না। [তিরমিযী, বায়হাক্বী’র ’’শু’আবুল ঈমানে’’ বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমার মতে এটা মুরসাল হাদীস।][1]
وَعَنْ أَيُّوبَ
بْنِ مُوسَى عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَا نَحَلَ وَالِدٌ وَلَدَهُ مِنْ نُحْلٍ أَفْضَلَ مِنْ أَدَبٍ حَسَنٍ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَالْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ» وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ: هَذَا عِنْدِي حَدِيث مُرْسل
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ দু’টি : ১. ‘আমির ইবনু সলিহ আল খয্যায (الخزاز) য‘ঈফ। ২. মুরসাল- বিস্তারিত দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ১১২১।
ব্যাখ্যাঃ مَا نَحَلَ وَالِدٌ وَلَدَهُ مِنْ نُحْلٍ أَفْضَلَ مِنْ أَدَبٍ حَسَنٍ : পিতা কর্তৃক সন্তানকে দেয়া সবচেয়ে বড় উপঢৌকন হলো আদব শিক্ষা দেয়া। নিহায়াহ্ গ্রন্থে এসেছে, النحل অর্থ العطية তথা দান الهبة তথা কোন বিনিময় না চেয়ে নিঃশর্ত ও নিঃস্বার্থ দান, অকৃত্রিম ভালোবাসা।
(أَفْضَلَ مِنْ أَدَبٍ حَسَنٍ) শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়াই উত্তম। আদব শিক্ষা দিতে গিয়ে পিতা তার সন্তানকে ধমক দিতে বা প্রহারও করতে পারে, এগুলোই হচ্ছে আদব শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়ার নিয়ম, কেননা শিষ্টাচার বান্দাকে পূর্ণ বান্দা হতে সহায়তা করে। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৯৫২)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৭৮-[৩২] ’আওফ ইবনু মালিক আশজা’ঈ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি ও বিবর্ণ গন্ডদ্বয়বিশিষ্টা মহিলা কিয়ামতের দিন এরূপ হব। ইয়াযীদ ইবনু যুরাই (রহিমাহুল্লাহ) নিজের মধ্যমা ও তর্জনী অঙ্গুলির প্রতি ইঙ্গিত করলেন। আর বিবর্ণ গালবিশিষ্ট মহিলার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, যে মহিলা নিজের স্বামী হারিয়েছে (মৃত্যু বা ত্বলাকের (তালাক) কারণে), যার জাঁকজমক ও রূপ রয়েছে; কিন্তু ইয়াতীম সন্তানদের লালন-পালনের উদ্দেশে নিজেকে বন্দি করে রেখেছে, তার ইয়াতীম সন্তানের বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে পৃথক হওয়া বা মৃত্যুবরণ পর্যন্ত। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن عَوْف
بن مَالك الْأَشْجَعِيّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَنَا وَامْرَأَةٌ سَفْعَاءُ الْخَدَّيْنِ كَهَاتَيْنِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» . وَأَوْمَأَ يَزِيدُ بْنُ ذُرَيْعٍ إِلَى الْوُسْطَى وَالسَّبَّابَةِ «امْرَأَةٌ آمَتْ مِنْ زَوْجِهَا ذَاتُ مَنْصِبٍ وجمالٍ حبَستْ نفسهاعلى يتاماها حَتَّى بانوا أوماتوا» رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘আন্ নুহাস (النهاس) ইবনু কহাম (قهم)’’ নামের বর্ণনাকারী য‘ঈফ। দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ১১২২।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৭৯-[৩৩] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যার একটি কন্যা আছে অথচ সে তাকে জিবন্ত প্রোথিত করেনি, তাকে হেয় প্রতিপন্ন করেনি, তার উপর তার পুত্রদের অগ্রাধিকার দেয়নি, তাকে আল্লাহ তা’আলা জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنِ
ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ كَانَتْ لَهُ أُنْثَى فَلَمْ يَئِدْهَا وَلَمْ يُهِنْهَا وَلَمْ يُؤْثِرْ وَلَدَهُ عَلَيْهَا - يَعْنِي الذُّكُورَ - أَدْخَلَهُ اللَّهُ الْجَنَّةَ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ এর সনদে ‘‘ইবনু জারির’’ নামের একজন বর্ণনাকারী আছে। ইমাম যাহাবী (রহিমাহুল্লাহ) তার ব্যাপারে বলেন, তাকে চেনা যায় না। দেখুন- হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৪২৯ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ (مَنْ كَانَتْ لَهٗ أُنْثٰى) যার নারী সন্তান আছে, নারী সন্তান বলতে নিজের মেয়ে অথবা বোন বুঝানো হয়েছে। (لَمْ يَئِدْهَا) সে তাকে প্রোথিত করল না, প্রোথিত অর্থ (কন্যা সন্তানদেরকে) জিবন্ত কবরস্থ করা। সেকালে ‘আরবরা কন্যাদেরকে জীবিত কবর দেয়ার মতো জঘন্য কর্মে লিপ্ত ছিল। এটাকে ইসলাম চরমভাবে হারাম করেছে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫১৩৭)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৮০-[৩৪] আনাস (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যে ব্যক্তির সম্মুখে তার কোন মুসলিম ভাইয়ের পরোক্ষ নিন্দা করা হয়, আর সে তার সাহায্য করার ক্ষমতা রাখে, অতঃপর সে তার সাহায্য করল, আল্লাহ তা’আলা তাকে ইহকাল ও পরকালে সাহায্য করবেন। আর যদি সাহায্য না করে, অথচ সে সাহায্য করার ক্ষমতা রাখে, আল্লাহ তা’আলা এজন্য তাকে ইহকাল ও পরকালে পাকড়াও করবেন। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
وَعَنْ أَنَسٍ
عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنِ اغْتِيبَ عِنْدَهُ أَخُوهُ الْمُسْلِمُ وَهُوَ يَقْدِرُ على نصرِه فنصرَه نصرَه اللَّهُ فِي الدِّينَا وَالْآخِرَةِ. فَإِنْ لَمْ يَنْصُرْهُ وَهُوَ يَقْدِرُ عَلَى نَصْرِهِ أَدْرَكَهُ اللَّهُ بِهِ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ» . رَوَاهُ فِي «شرح السّنة»
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘আবান’’ নামের বর্ণনাকারী মাতরূক। দেখুন- হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৪২৯, সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ১৮৮৮।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৮১-[৩৫] আসমা বিনতু ইয়াযীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন মুসলিম ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তার মাংস খাওয়া থেকে অন্যকে প্রতিহত করবে, আল্লাহ তা’আলার ওপর হক এই যে, তিনি তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেবেন। (বায়হাক্বী’র ’’শু’আবুল ঈমানে’’ বর্ণনা করেছেন।)[1]
وَعَن أسماءَ
بنت يزِيد قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ ذَبَّ عَنْ لَحْمِ أَخِيهِ بِالْمَغِيبَةِ كَانَ حَقًّا عَلَى اللَّهِ أَنْ يُعْتِقَهُ مِنَ النَّارِ» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيّ فِي «شعب الْإِيمَان»
ব্যাখ্যাঃ (مَنْ ذَبَّ عَنْ لَحْمِ أَخِيهِ) যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের গীবত প্রতিহত করবে সকলের জানা আছে গীবত একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে তার মৃত ভাই-এর গোশত ভক্ষণকারী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। অত্র হাদীসে গীবত থেকে পূর্ণভাবে বিরত থাকার প্রতি নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
(كَانَ حَقًّا عَلَى اللهِ) অর্থাৎ আল্লাহর জন্য দায়িত্ব হয়ে যায় তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করা। হতে পারে প্রথম পর্যায়েই তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিবেন অথবা অন্যান্য অপরাধের শাস্তি ভোগ করার পর। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৮২-[৩৬] আবুদ্ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে, যে মুসলিম তার অপর মুসলিম ভাইয়ের মান-সম্মান বিনষ্ট করা থেকে অন্যকে বিরত রাখে, আল্লাহ তা’আলার ওপর তার হক এই যে, তিনি কিয়ামতের দিন তার ওপর থেকে জাহান্নামের আগুন বিদূরিত করবেন। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কুরআনের এ আয়াত পাঠ করলেনঃ ...وَكَانَ حَقًّا عَلَيْنَا نَصْرُ الْمُؤْمِنِيْنَ ’’...আর আমাদের ওপর বিশ্বাসীদের সাহায্য করা কর্তব্য’’- (সূরাহ্ আর্ রূম ৩০ : ৪৭)। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
وَعَنْ أَبِي
الدَّرْدَاءِ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَرُدُّ عَنْ عِرْضِ أَخِيهِ إِلَّا كَانَ حَقًّا عَلَى اللَّهِ أَنْ يَرُدَّ عَنْهُ نَارَ جَهَنَّمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» . ثُمَّ تَلَا هَذِهِ الْآيَةَ: (وَكَانَ حَقًّا عَلَيْنَا نصر الْمُؤمنِينَ)
رَوَاهُ فِي «شرح السّنة»
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ এর সনদে আছে ‘‘লায়স ও শাহ্র ইবনু হাওশাব’’ নামে দু’জন য‘ঈফ রাবী। দেখুন- হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৪৩০ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ আবূ বকর নাহশালী তিনি কুফার বাসিন্দা ছিলেন, রাবী হিসেবে সত্যবাদী, তবে কেউ কেউ তাকে মুরজিয়া হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
مَنْ رَدَّ عَنْ عِرْضِ أَخِيهِ যে তার ভাইয়ের ইয্যত রক্ষা করে, অর্থাৎ তার ভাইয়ের কোন দোষত্রুটি গোপন রাখে। অথবা তাকে কেউ অসম্মানিত করতে চাইলে তা প্রতিহত করে।
رَدَّ اللهُ عَنْ وَجْهِهِ النَّارَ আল্লাহ তার চেহারাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন। আল মানবী বলেনঃ এখানে চেহারা বলে শুধু চেহারাই উদ্দেশ্য নয় চেহারাকে বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ হলো চেহারায় ‘আযাবের তীব্রতা অনেক বেশী টের পাওয়া যায় এবং তা লাঞ্ছনা-গঞ্জনার জন্য সর্বাধিক কার্যকরী।
(তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৯৩১)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৮৩-[৩৭] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে মুসলিম তার কোন মুসলিম ভাইকে এমন সাহায্যস্থল হতে পরিত্যাগ করবে, যেখানে সে অসম্মানিত হচ্ছে অথবা তার ইজ্জতহানি করা হচ্ছে, আল্লাহ তা’আলা এমন জায়গায় তার সাহায্য পরিত্যাগ করবেন, যেখানে সে নিজেকে সাহায্য করা পছন্দ করবে। আর যে মুসলিম তার কোন মুসলিম ভাইকে এমন স্থানে সাহায্য করবে, যেখানে সে অসম্মানিত হচ্ছে বা তার মানহানি করা হচ্ছে, আল্লাহ তা’আলা এমন স্থানে তাকে সাহায্য করবেন, যেখানে সে নিজেকে সাহায্য করা পছন্দ বা প্রত্যাশা করবে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ جَابِرٌ
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَا مِنِ امْرِئٍ مُسْلِمٍ يَخْذُلُ امْرَأً مُسْلِمًا فِي مَوْضِعٍ يُنْتَهَكُ فِيهِ حُرْمَتُهُ وَيُنْتَقَصُ فِيهِ مِنْ عِرْضِهِ إِلَّا خَذَلَهُ اللَّهُ تَعَالَى فِي مَوْطِنٍ يُحِبُّ فِيهِ نُصْرَتَهُ وَمَا مِنِ امْرِئٍ مُسْلِمٍ يَنْصُرُ مُسْلِمًا فِي مَوْضِعٍ يُنْتَقَصُ فِيهِ عرضه وينتهك فِيهِ حُرْمَتِهِ إِلَّا نَصَرَهُ اللَّهُ فِي مَوْطِنٍ يُحِبُّ فِيهِ نصرته» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, ‘‘ইয়াহ্ইয়া ইবনু সুলায়মান ইবনু যায়দ ও ইসমা‘ঈল ইবনু বাশীর’’ নামের দু’ ব্যক্তিই মাজহূল। দেখুন- য‘ঈফাহ্ ৬৮৭১, হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৪৩১ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ (مَا مِنِ امْرِئٍ مُسْلِمٍ يَخْذُلُ) কোন মুসলিম যদি অপর কোন মুসলিমকে লাঞ্ছিত করে তাহলে আল্লাহ তাকে লাঞ্ছিত করবেন। হাদীসটির অর্থ হলো যে ব্যক্তি অন্য কোন মুসলিম ভাইয়ের অপমানজনক কিছু করবে আল্লাহও তাকে অপমান করবেন। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৮৪-[৩৮] ’উকবাহ্ ইবনু ’আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের ত্রুটি দেখে, অতঃপর সেটা গোপন করে, তার সাওয়াব তার সমান হবে, যে জীবন্ত প্রোথিত কোন কন্যাকে বাঁচালো। [আহমাদ ও তিরমিযী; আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) একে সহীহ হাদীস বলেছেন।][1]
وَعَنْ
عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ رَأَى عَوْرَةً فَسَتَرَهَا كَانَ كَمَنْ أَحْيَا مؤودة» . رَوَاهُ أَحْمد وَالتِّرْمِذِيّ وَصَححهُ
হাদীসটির সানাদ য‘ঈফ হওয়ার কারণে হাদীসটি য‘ঈফ। এর সনদে ‘উকবার মুক্তদাস ‘‘আবুল হায়সাম’’ নামের বর্ণনাকারীকে চেনা যায় না। যেমনটি ইমাম যাহাবী বর্ণনা করেছেন। হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৪৩০ পৃঃ, য‘ঈফাহ্ ১২৬৫।
ব্যাখ্যাঃ ‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের কোন ত্রুটি দেখবে অথবা অসম্মানজনক কোন কাজ দেখবে আর সেটা সে গোপন করে রাখবে যেন সে তাকে জীবিত করল। অর্থাৎ এ গোপন করে রাখার সাওয়াবটা এত বেশী যেন কাউকে সে জীবিত করার সওয়াব পেয়ে গেল। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তা‘আলা রব্বুল ‘আলামীন বলেছেন, ‘‘যে ব্যক্তি একটি আত্মাকে জীবিত করল যেন সে সারা পৃথিবীর মানুষকে জীবিত করল’’- (সূরাহ্ আল মায়িদাহ্ ৫ : ৩২)। তবে যদি প্রকাশ করে দেয়াটা উত্তম হয় সেক্ষেত্রে প্রকাশ করে দেয়াটাও জরুরী হয়ে বসতে পারে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৮৫-[৩৯] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা প্রত্যেকেই তোমাদের মুসলিম ভাইয়ের আয়না স্বরূপ। যদি কেউ খারাপ কিছু তার মধ্যে দেখে, সে যেন সেটা তার থেকে দূর করে। (তিরমিযী)[1]
আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) এ হাদীসটি য’ঈফ বলেছেন। তিরমিযী ও আবূ দাঊদ-এর অপর বর্ণনায় আছে যে, মুসলিম মুসলিমের আয়না স্বরূপ। মুসলিম মুসলিমের ভাই। যা তাকে ধ্বংস করবে, এমন বস্তু সে তার থেকে সরিয়ে দেয় এবং তার অনুপস্থিতিতে তার অধিকার সংরক্ষণ করে।)
وَعَنْ أَبِي
هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ أَحَدَكُمْ مِرْآةُ أَخِيهِ فَإِنْ رَأَى بِهِ أَذًى فَلْيُمِطْ عَنْهُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَضَعَّفَهُ. وَفِي رِوَايَةٍ لَهُ وَلِأَبِي دَاوُدَ: «الْمُؤْمِنُ مِرْآةُ الْمُؤْمِنِ وَالْمُؤْمِنُ أَخُو الْمُؤْمِنِ يَكُفُّ عَنْهُ ضَيْعَتَهُ وَيَحُوطُهُ مِنْ وَرَائِهِ»
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘ইয়াহ্ইয়া’’ নামের বর্ণনাকারী মাতরূক। দেখুন- য‘ঈফাহ্ ১৮৮৯, হাদীসটির বাকী অংশটুকু তথা আবূ দাঊদের বর্ণনাটি হাসান। আবূ দাঊদ ৪৯১৮, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৯২৬, সহীহুল জামি‘উস্ সগীর ৬৬৫৬, শু‘আবুল ঈমান ৭৬৪৪, আল মু‘জামুল আওসাত্ব ২১১৪।
ব্যাখ্যাঃ (الْمُؤْمِنُ مِرْآةُ الْمُؤْمِنِ) ‘‘এক মু’মিন আর এক মু’মিনের জন্য আয়না স্বরূপ’’, কথাটির অর্থ হলো মু’মিন তার অপর ভাইয়ের ভালো-মন্দ উভয় দিকই স্বচক্ষে অবলোকন করে থাকেন। তিনি তার মন্দ বিষয়গুলো লোক সমাজে প্রকাশ না করে শুধরিয়ে দিবেন যেমন আয়নাতে আমরা আমাদের চেহারায় ময়লা লাগলে তা পরিষ্কার করে থাকি। অনেক সময় নিজের দোষ নিজে অনুধাবন করা যায় না; কেউ ধরিয়ে দিলে ঠিকই বুঝতে পারা যায়।
(يَكُفُّ عَنْهُ ضَيْعَتَهٗ) তার পণ্য নষ্ট হয়ে যাওয়া থেকে তাকে রক্ষা করবে। অর্থাৎ তার সম্পত্তি নষ্ট হয়ে যাওয়া থেকে তাকে সাবধান করবে, হতে পারে মান-সম্ভ্রম ইত্যাদি অর্থাৎ তার মু’মিন ভাই কোন দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কিনা এটা তিনি লক্ষ্য করবেন।
(يَحُوطُهٗ مِنْ وَرَائِه) তার চোখের আড়ালে থেকে তাকে সুরক্ষা দিতে স্বচেষ্ট হবে। অর্থাৎ তাকে হিফাযাতের আপ্রাণ চেষ্টায় লিপ্ত থাকবে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৯১০)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৮৬-[৪০] মু’আয ইবনু আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন মুসলিমকে মুনাফিকের অনিষ্টতা থেকে রক্ষা করবে, আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন তার জন্য এমন একজন মালাক (ফেরেশতা) পাঠাবেন, যে তার দেহ জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবে। যে ব্যক্তি কোন মুসলিমকে এমন বিষয়ে অপবাদ দেবে, যার দ্বারা সে তাকে কলঙ্কিত করতে চায়, আল্লাহ তা’আলা তাকে জাহান্নামের সেতুর উপর বন্দি করবেন, যতক্ষণ না সে কথিত অপবাদ থেকে বের হয়ে আসে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن معَاذ بن
أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ حَمَى مُؤْمِنًا مِنْ مُنَافِقٍ بَعَثَ اللَّهُ مَلَكًا يَحْمِي لَحْمَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ نَارِ جَهَنَّمَ وَمَنْ رَمَى مُسْلِمًا بِشَيْءٍ يُرِيدُ بِهِ شَيْنَهُ حَبْسَهُ اللَّهُ عَلَى جِسْرِ جَهَنَّمَ حَتَّى يَخْرُجَ مِمَّا قَالَ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ (مَنْ حَمٰى) যে হিফাযাত করবে।
অত্র হাদীসে মুনাফিকের কথা উল্লেখ হওয়ার কারণ হলো, তারা কারো দোষ-ত্রুটি সামনে বলে না, বরং যার দোষ-ত্রুটি আছে তার কাছে তার ভালো গুণ বলে, আর অপরের কাছে দোষ-ত্রুটি বলে বেড়ায়, অথচ উচিত ছিল যার দোষ তার সামনে বলে দেয়া যাতে সে সংশোধিত হতে পারে।
অত্র হাদীসের শিক্ষা হলো আমরা কারো দোষ দেখলে যার দোষ তাকেই বলবো, আর মুসলিম ভাইকে অপরের অনিষ্টতা হতে রক্ষা করব, এতে পরস্পর সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির সাথে জীবন যাপন করতে পারব। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৮৭৫)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৮৭-[৪১] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলার নিকট সে ব্যক্তি উত্তম বন্ধু, যে তার নিজের বন্ধুর কাছে উত্তম এবং আল্লাহ তা’আলার নিকট উত্তম প্রতিবেশী সে ব্যক্তি, যে তার নিজের প্রতিবেশীর কাছে উত্তম। [তিরমিযী ও দারিমী; আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এ হাদীসটি হাসান গরীব।][1]
وَعَنْ
عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «خَيْرُ الْأَصْحَابِ عِنْدَ اللَّهِ خَيْرُهُمْ لِصَاحِبِهِ وَخَيْرُ الْجِيرَانِ عِنْدَ اللَّهِ خَيْرُهُمْ لِجَارِهِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَالدَّارِمِيُّ وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৮৮-[৪২] ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করল : হে আল্লাহর রসূল! আমি কিভাবে জানব যে, আমি ভালো কাজ করলাম কিংবা খারাপ কাজ করলাম? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যখন তুমি তোমার প্রতিবেশীকে বলতে শুনবে যে, তুমি ভালো করেছ, তবে তুমি ভালো কাজ করলে। আর যখন তুমি তোমার প্রতিবেশীকে বলতে শুনবে যে, তুমি খারাপ কাজ করেছ, তবে তুমি খারাপ কাজ করলে। (ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَن
ابْن مَسْعُود قَالَ: قَالَ رجل للنَّبِي اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ كَيْفَ لِي أَنْ أَعْلَمَ إِذَا أَحْسَنْتُ أَوْ إِذَا أَسَأْتُ؟ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِذَا سَمِعْتَ جِيرَانَكَ يَقُولُونَ: قَدْ أَحْسَنْتَ فَقَدْ أَحْسَنْتَ. وَإِذَا سَمِعْتَهُمْ يَقُولُونَ: قَدْ أَسَأْتَ فقد أَسَأْت . رَوَاهُ ابْن مَاجَه
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৮৯-[৪৩] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মানুষকে তার পদমর্যাদা অনুযায়ী সম্মান করো। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «أنزِلوا النَّاس منازَلهم» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ইনক্বিত্বা‘ বা বিছিন্নতা রয়েছে। তা হলো মায়মূন ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে পাননি। দেখুল- আবূ দাঊদ ৪৮৪২, য‘ঈফাহ্ ১৮৯৪।
ব্যাখ্যাঃ أَنْزِلُوا النَّاسَ مَنَازَلَهُمْ মানুষকে তার মর্যাদা অনুযায়ী সম্মান দাও। এ কথাটির অর্থ হলো মানুষ সমাজে প্রত্যেক ধর্ম, জ্ঞানে, বিজ্ঞানে, সম্মানে যে যে শ্রেণী ও পর্যায়ের তার সাথে সেরূপ মর্যাদা বজায় রেখে আচার ব্যবহার কর। ‘আল্লামা ‘আযীযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ
الْمُرَادُ بِالْحَدِيثِ الْحَضُّ عَلٰى مُرَاعَاةِ مَقَادِيرِ النَّاسِ وَمَرَاتِبِهِمْ وَمَنَاصِبِهِمْ وَتَفْضِيلِ بَعْضِهِمْ عَلٰى بَعْضٍ فِي الْمَجَالِسِ وَفِي الْقِيَامِ وَغَيْرِ ذٰلِكَ مِنَ الْحُقُوقِ
অর্থাৎ অত্র হাদীসের উদ্দেশ্য হলো মানুষকে উৎসাহিত করে তোলা যে, তারা যেন প্রত্যেককে তাদের নিজ নিজ পদ মর্যাদা সামাজিক অবস্থান ও মান-মর্যাদা বজায় রেখে আচার আচরণ করে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৮৩৪)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৯০-[৪৪] ’আবদুর রহমান ইবনু আবূ কুরাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উযূ করলেন। সাহাবায়ে কিরাম তাঁর উযূর পানি স্বীয় শরীরে মর্দন করতে লাগলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদেরকে বললেনঃ কিসে তোমাদেরকে এ কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করল? সাহাবায়ে কিরাম বললেনঃ আল্লাহ ও তাঁর রসূল-এর ভালোবাসা। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যার আন্তরিক বাসনা যে, সে আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে ভালোবাসবে অথবা আল্লাহ ও তাঁর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ভালোবাসবেন, সে যেন যখন কথা বলে সত্য বলে, যখন তার কাছে গচ্ছিত রাখা হয় সে তা যথারীতি ফেরত দেয় এবং যার প্রতিবেশী আছে, সে প্রতিবেশীর সাথে প্রতিবেশীসুলভ উত্তম আচরণ করে।[1]
عَنْ
عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِي قُرَادٍ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَوَضَّأَ يَوْمًا فَجَعَلَ أَصْحَابُهُ يَتَمَسَّحُونَ بِوَضُوئِهِ فَقَالَ لَهُمُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا يَحْمِلُكُمْ عَلَى هَذَا؟» قَالُوا: حَبُّ اللَّهِ وَرَسُولِهِ. فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ سَرَّهُ أَنْ يحب الله وَرَسُوله أويحبه اللَّهُ وَرَسُولُهُ فَلْيُصَدِّقْ حَدِيثَهُ إِذَا حَدَّثَ وَلْيُؤَدِّ أَمَانَتَهُ إِذَا أُؤْتُمِنَ وَلِيُحْسِنَ جِوَارَ مَنْ جَاوَرَهُ»
পরিচ্ছেদঃ ১৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৯১-[৪৫] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে, সে ব্যক্তি পূর্ণ মু’মিন নয়, যে উদরপূর্তি করে খায় অথচ তার পাশেই তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে। [উপরের হাদীস দু’টি ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) ’’শু’আবুল ঈমানে’’ বর্ণনা করেছেন।][1]
وَعَنِ
ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالَّذِي يَشْبَعُ وَجَارُهُ جَائِع إِلَى جنبه» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيّ فِي «شعب الْإِيمَان»
পরিচ্ছেদঃ ১৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৯২-[৪৬] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলল : হে আল্লাহর রসূল! অমুক মহিলা সম্পর্কে জনশ্রুতি আছে যে, সে বেশি বেশি সালাত আদায় করে, সওম পালন করে এবং দান-দক্ষিণায় খুব প্রসিদ্ধি লাভ করেছে; কিন্তু নিজের মুখ দ্বারা প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সে জাহান্নামে যাবে। লোকটি জিজ্ঞেস করল : হে আল্লাহর রসূল! অমুক মহিলা, যার সম্পর্কে জনশ্রুতি আছে যে, সে কম সওম পালন করে, কম দান-দক্ষিণা করে এবং কম সালাত আদায় করে। সে শুধু কয়েক টুকরো পনির আল্লাহর রাস্তায় দান করে; কিন্তু নিজের কথার দ্বারা প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় না। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সে জান্নাতে যাবে। (আহমাদ ও বায়হাক্বী’র ’’শু’আবুল ঈমানে’’)[1]
وَعَنْ أَبِي
هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ فُلَانَةً تُذْكَرُ مِنْ كَثْرَةِ صَلَاتِهَا وَصِيَامِهَا وَصَدَقَتِهَا غَيْرَ أَنَّهَا تُؤْذِي جِيرَانَهَا بِلِسَانِهَا. قَالَ: «هِيَ فِي النَّارِ» . قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ فَإِنَّ فُلَانَةً تُذْكَرُ قِلَّةَ صِيَامِهَا وَصَدَقَتِهَا وَصَلَاتِهَا وَإِنَّهَا تَصَدَّقُ بِالْأَثْوَارِ مِنَ الْأَقِطِ وَلَا تؤذي جِيرَانَهَا. قَالَ: «هِيَ فِي الْجَنَّةِ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالْبَيْهَقِيّ فِي «شعب الْإِيمَان»
পরিচ্ছেদঃ ১৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৯৩-[৪৭] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপবিষ্ট কতিপয় সাহাবীর নিকট এসে দাঁড়িয়ে বললেনঃ আমি কি তোমাদেরকে অবহিত করব না তোমাদের মধ্যে কে ভালো লোক এবং কে খারাপ লোক? রাবী বলেনঃ এটা শুনে সাহাবায়ে কিরাম চুপ রইলেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথাটি তিনবার বললেন। তখন এক ব্যক্তি বলল : জ্বী হ্যাঁ, হে আল্লাহর রসূল! আমাদের ভালো লোকেদেরকে খারাপ লোক থেকে পৃথক করে দেখিয়ে দিন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তোমাদের মধ্যে ভালো সে ব্যক্তি, যার ভালো কাজের আশা করা যায় এবং যার মন্দ থেকে নিরাপত্তা আশা করা যায়। আর তোমাদের মধ্যে খারাপ সে ব্যক্তি, যার ভালো কাজের আশা করা যায় না, যার অনিষ্টতা থেকে নিরাপত্তার আশা করা যায় না।[তিরমিযী ও বায়হাক্বী’র ’’শু’আবুল ঈমানে’’; আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান সহীহ।][1]
وَعَنْهُ
قَالَ: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَفَ عَلَى نَاسٍ جُلُوسٍ فَقَالَ: «أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِخَيْرِكُمْ مِنْ شَرِّكُمْ؟» . قَالَ: فَسَكَتُوا فَقَالَ ذَلِكَ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ. فَقَالَ رَجُلٌ: بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ أَخْبِرْنَا بِخَيْرِنَا مِنْ شَرِّنَا. فَقَالَ: «خَيْرُكُمْ مَنْ يُرْجَى خَيْرُهُ وَيُؤْمَنُ شَرُّهُ وَشَرُّكُمْ مَنْ لَا يُرْجَى خَيْرُهُ وَلَا يُؤْمَنُ شَرُّهُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَالْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ» وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ: هَذَا حَدِيث حسن صَحِيح
ব্যাখ্যাঃ (قَالَ: خَيْرُكُمْ مَنْ يُرْجٰى خَيْرُهٗ) তোমাদের মধ্যে উত্তম সে যার কাছ থেকে ভালো আশা করা যায়। সামাজিক জীবনে আমরা সমাজে এমন কিছু মানুষ পাই যাদেরকে সবাই ভালো মানুষ হিসেবে জানেন এবং সর্বদা তাদের নিকট থেকে আমরা ভালো এবং কল্যাণমূলক কাজ পেয়ে থাকি, হাদীসটিতে তাদের কথাই বলা হয়েছে।
(وَيُؤْمَنُ شَرُّهٗ) অন্য এক শ্রেণীর মানুষ রয়েছে, যাদের অনিষ্ট থেকে জনসাধারণ নিরাপদে থাকতে চায়। ‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী হানাফী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ সমাজের সর্বনিকৃষ্ট মানুষের কথা হলো, যাদের কাছ থেকে কোন কল্যাণ আশা করা যায় না। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২২৬৩)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৯৪-[৪৮] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা তোমাদের মধ্যে তোমাদের চরিত্র বণ্টন করেছেন, যেভাবে তোমাদের রিজিক বণ্টন করেছেন। আল্লাহ তা’আলা ঐ ব্যক্তিকে দুনিয়া দান করেন, যাকে প্রিয়জন মনে করেন এবং ঐ ব্যক্তিকেও দান করেন, যাকে প্রিয়জন মনে করেন না। কিন্তু আল্লাহ তা’আলা যাকে ভালোবেসেছেন, তাকে ছাড়া অন্য কাউকে দীন দান করেন না। অতএব যাকে আল্লাহ তা’আলা দীন দান করেন, তাকে তিনি ভালোবেসেছেন। যার হাতে আমার প্রাণ, সে সত্তার কসম, বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত মুসলিম হতে পারে না, যতক্ষণ না তার অন্তর ও মুখ (রসনা) মুসলিম হবে এবং কোন ব্যক্তি ঐ সময় পর্যন্ত মু’মিন হতে পারে না, যতক্ষণ না তার প্রতিবেশী তার অনিষ্টতা থেকে নিরাপদ হবে।[1]
وَعَنِ ابْنِ
مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى قَسَمَ بَيْنَكُمْ أَخْلَاقَكُمْ كَمَا قَسَمَ بَيْنَكُمْ أَرْزَاقَكُمْ إِن الله يُعْطِي الدُّنْيَا مَنْ يُحِبُّ وَمَنْ لَا يُحِبُّ وَلَا يُعْطِي الدِّينَ إِلَّا مَنْ أَحَبَّ فَمَنْ أَعْطَاهُ اللَّهُ الدِّينَ فَقَدْ أَحَبَّهُ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا يُسْلِمُ عَبْدٌ حَتَّى يُسْلِمَ قَلْبُهُ وَلِسَانُهُ وَلَا يُؤْمِنُ حَتَّى يَأْمَنَ جَارُهُ بَوَائِقَهُ»
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘আস্ সববাহ ইবনু মুহাম্মাদ’’ নামে একজন য‘ঈফ রাবী আছে। তাহক্বীক মুসনাদে ৩৬৭২।
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীসে মানুষের তাকদীরে যা নির্ধারিত সে বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ ‘‘আমি তাদের জীবন উপকরণকে তাদের মাঝে বণ্টন করে দিয়েছি।’’ (সূরাহ্ আয্ যুখরুফ ৪৩ : ৩২)
আল্লাহ রব্বুল ‘আলামীন দুনিয়াবী রিজিক দান করেন যাকে তিনি ভালোবাসেন, যেমন- নবীগণ, ওলী আউলিয়াগণ; যেমন- সুলায়মান (আ.) এবং ‘উসমান (রাঃ)-এর দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা যেতে পারে। আর যাকে তিনি ভালো না বাসেন তাকেও তিনি দুনিয়া দান করেন, যেমন- ফির‘আওন, হামান। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ বলেছেনঃ ‘‘তোমার প্রতিপালকের দান থেকে আমি এদেরকে আর ওদেরকে সকলকেই সাহায্য করে থাকি, তোমার প্রতিপালকের দান তো বন্ধ হওয়ার নয়’’- (সূরাহ্ ইসরা ১৭ : ২০)। তবে আল্লাহ রব্বুল ‘আলামীন যাকে ভালোবাসেন না তাকে কখনো দীনের জ্ঞানের দেন না। আর যাকে আল্লাহ রববুল ‘আলামীন দীন দিয়েছেন তাকে ভালোবেসেছেন। দীনের বিষয়গুলো নিঃসন্দেহে দুনিয়ার চেয়ে উত্তম। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৯৫-[৪৯] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মুসলিম প্রেম-প্রীতি ও ভালোবাসার কেন্দ্রস্থল। তার মধ্যে কোন কল্যাণ নেই, যে ব্যক্তি অন্যকে ভালোবাসে না এবং অন্য মুসলিমও তার প্রতি ভালোবাসার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে না। [হাদীসদ্বয় ইমাম আহমাদ ও বায়হাক্বী’র (রহিমাহুল্লাহ) ’’শু’আবুল ঈমানে’’ বর্ণনা করেছেন।][1]
وَعَنْ أَبِي
هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الْمُؤْمِنُ مَأْلَفٌ وَلَا خَيْرَ فِيمَنْ لَا يَأْلَفُ وَلَا يُؤْلَفُ» رَوَاهُمَا أَحْمد وَالْبَيْهَقِيّ فِي «شعب الْإِيمَان»
ব্যাখ্যাঃ মু’মিন ভালোবাসার কেন্দ্র, সুতরাং তারা পরস্পর পরস্পরকে ভালোবাসবে, এটা কল্যাণের নিদর্শন। যার মধ্যে কল্যাণ নেই, সেই ভালোবাসা পরিহার করে থাকে। এটাই হচ্ছে কুরআন এবং হাদীসের দা‘ওয়াত এবং আহবান। আল্লাহ রব্বুল ‘আলামীন বলেছেনঃ ‘‘তোমরা সকলে শক্তভাবে সম্মিলিতভাবে আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধর এবং বিচ্ছিন্ন হয়ো না আর আল্লাহর পক্ষ থেকে নি‘আমাতের শুকরিয়া আদায় কর। যখন তোমরা পরস্পর পরস্পরের শত্রু ছিলে, অতঃপর আল্লাহ রববুল ‘আলামীন তোমাদের ভিতরে তোমাদের অন্তরে ভালোবাসা স্থাপন করেছেন। পরক্ষণে তোমরা একে অপরের ভাই হয়ে গেছ আল্লাহর নি‘আমাতের কারণে’’- (সূরাহ্ আ-লি ‘ইমরান ৩ : ১০২)। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৯৬-[৫০] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আমার উম্মাতের কারো অভাব পূরণ করল এবং তাকে সন্তুষ্ট করল, তাহলে সে আমাকে সন্তুষ্ট করল। যে ব্যক্তি আমাকে সন্তুষ্ট করল, সে আল্লাহ তা’আলাকে সন্তুষ্ট করল। যে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করল, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।[1]
وَعَنْ
أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ قَضَى لِأَحَدٍ مِنْ أُمَّتِي حَاجَةً يُرِيدُ أَنْ يَسُرَّهُ بِهَا فَقَدْ سَرَّنِي وَمَنْ سَرَّنِي فَقَدْ سَرَّ اللَّهَ وَمَنْ سرَّ الله أدخلهُ الله الْجنَّة»
হাদীসটি জাল হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘ইয়াহইয়া ইবনু যাহদাম’’ অর্থাৎ ইবনু হারিস একজন মিথ্যুক। বিস্তারিত- য‘ঈফাহ্ ৬৮৫৭।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৯৭-[৫১] উক্ত রাবী [আনাস (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন অত্যাচারিত ব্যক্তির ফরিয়াদ শুনে সাহায্য করবে, আল্লাহ তা’আলা তার জন্য তিহাত্তরটি মাগফিরাত অবধারিত করবেন। তন্মধ্যে একটি এই যে, এতে তার পার্থিব সকল কাজের সংশোধনের দায়-দায়িত্ব গ্রহণ। আর বাহাত্তরটি হলো, কিয়ামতের দিন তার মর্যাদা বৃদ্ধির উপকরণ দান করা।[1]
وَعَنْهُ
قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ أَغَاثَ مَلْهُوفًا كَتَبَ اللَّهُ لَهُ ثَلَاثًا وَسَبْعِينَ مَغْفِرَةً وَاحِدَةٌ فِيهَا صَلَاحُ أَمْرِهِ كُلِّهِ وَثِنْتَانِ وَسَبْعُونَ لَهُ دَرَجَاتٌ يَوْمَ الْقِيَامَة»
হাদীসটি জাল হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘যিয়াদ ইবনু আবী হাস্সান’’ নামে একজন বর্ণনাকারী আছে। যে আনাস থেকে জাল হাদীস তৈরি করত। বিস্তারিত- য‘ঈফাহ্ ৬২১, য‘ঈফুল জামি‘ ৫৪৫৬।
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীসের তিহাত্তর সংখ্যা নিয়ে ‘উলামায়ে কিরাম বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছেন। কেউ বলেছেন, এখানে তিহাত্তর উদ্দেশ্য নয়, উদ্দেশ্য হলো বেশী বেশী সাওয়াব দান। এ তিহাত্তরটির প্রথমটি হলো তার দুনিয়ার সব কিছু সুখের হওয়া, আর বাহাত্তরটি ক্বিয়ামাতে দেয়া হবে। এখানে বুঝা যায় যে, একটি রহমতই দুনিয়ার সব পাপ ক্ষমার ও কল্যাণের জন্য যথেষ্ট আর বাকিগুলো সব কিয়ামতের জন্য অবশিষ্ট থাকবে। ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ গুনাহ মোচনকারী যত ‘আমল রয়েছে সব যখন একত্রিত হবে তখন একটি ‘আমলের মাধ্যমে সমস্ত সগীরাহ্ গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে, আর পরেরগুলো দিয়ে কাবীরাহ্ গুনাহকে হালকা করা হবে। এরপর যতগুলো আসবে সবগুলো অর্থ হবে তার মর্যাদা বৃদ্ধি। ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ)-ও এ কথা বলেছেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৯৮-[৫২], ৪৯৯৯-[৫৩] উক্ত রাবী [আনাস (রাঃ)] ও ’আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তাঁরা বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সকল সৃষ্টি আল্লাহ তা’আলার পরিবারের সদস্যবিশেষ। সৃষ্টজীবের মধ্যে আল্লাহ তা’আলার কাছে সবচেয়ে প্রিয় সেই, যে তার পরিবার-পরিজনের প্রতি অনুগ্রহ করে। [ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) উপরিউক্ত তিনটি হাদীস শু’আবুল ঈমানে বর্ণনা করেছেন।][1]
وَعنهُ وَعَن عبد الله قَالَا: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْخَلْقُ عِيَالُ اللَّهِ فَأَحَبُّ الْخَلْقِ إِلَى اللَّهِ مَنْ أَحْسَنَ إِلَى عِيَالِهِ» . رَوَى الْبَيْهَقِيُّ الْأَحَادِيثَ الثَّلَاثَةَ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ»
হাদীস জাল হওয়ার কারণ, এর সনদে বর্ণিত ‘‘ইউসুফ’’ নামের বর্ণনাকারী মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত। বিস্তারিত- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ১৯০০।
ব্যাখ্যাঃ (الْخَلْقُ عِيَالُ اللهِ) ‘‘সমগ্র সৃষ্টি আল্লাহ তা‘আলার পরিবারের সদস্যবিশেষ’’ সমগ্র সৃষ্টির রিজিক ও পরিচালনা আল্লাহই করেন। আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত عيال ‘ইয়াল’ শব্দটি অন্য কারো জন্য ব্যবহৃত হলে তা হবে রূপক অর্থজ্ঞাপক। মহান আল্লাহ বলেন, وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَمُسْتَوْدَعَهَا অর্থাৎ ‘‘সমগ্র সৃষ্টিজীবের রিজিক আল্লাহর নিকট যিনি জানেন কোথায় তারা বসবাস করবে আর কোথায় মৃত্যুবরণ করবে...।’’ (সূরাহ্ হূদ ১১ : ৬)
(فَأَحَبُّ الْخَلْقِ إِلَى اللهِ مَنْ أَحْسَنَ إِلٰى عِيَالِه) ‘‘আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তি সবচেয়ে প্রিয় যে তার পরিবারের প্রতি বেশী দয়াশীল’’। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, خَيْرُ النَّاسِ أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ অর্থাৎ মানুষের মধ্যে সেই সর্বোত্তম যে মানুষের বেশী উপকার করে থাকেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৪৯৯৯-[৫৩] দেখুন পূর্বের হাদীস।
وَعنهُ وَعَن عبد الله قَالَا: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْخَلْقُ عِيَالُ اللَّهِ فَأَحَبُّ الْخَلْقِ إِلَى اللَّهِ مَنْ أَحْسَنَ إِلَى عِيَالِهِ» . رَوَى الْبَيْهَقِيُّ الْأَحَادِيثَ الثَّلَاثَةَ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ»
পরিচ্ছেদঃ ১৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৫০০০-[৫৪] ’উকবাহ্ ইবনু ’আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম আল্লাহ তা’আলার আদালতে যে মামলার বিচার হবে, তা হলো দুই প্রতিবেশীর ঝগড়ার মামলা। (আহমাদ)[1]
وَعَنْ عُقْبَةَ
بْنِ عَامِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَوَّلُ خَصْمَيْنِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ جَارَانِ» . رَوَاهُ أَحْمد
ব্যাখ্যাঃ أَوَّلُ خَصْمَيْنِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ جَارَانِ ‘‘কিয়ামত দিবসে সর্বপ্রথম প্রতিবেশীদের মধ্যেকার বিবাদের বিচার হবে।’’ ইমাম সুয়ূত্বী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ কোন বর্ণনায় এসেছে, أَوَّلُ مَا يُحَاسَبُ بِهِ الْعَبْدُ صِلَاتُهٗ অর্থাৎ সর্বপ্রথম বান্দার সালাতের হিসাব হবে। অন্য বর্ণনায় এসেছে, أَوَّلُ مَا بَيْنَ النَّاسِ الدَّمُ অর্থাৎ সর্বপ্রথম মানুষের মাঝে রক্ত তথা হত্যাযজ্ঞের বিচার হবে। উক্ত বর্ণনাগুলো পরস্পর বিপরীতমুখী মনে হলেও আসলে তা নয়, কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম হুক্কুল্লাহ তথা বান্দা ও আল্লাহর সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের মধ্যে সালাতের হিসাব নেয়া হবে। যেহেতু সালাত হচ্ছে হুক্কুল্লাহর মধ্যে সর্বোত্তম ‘ইবাদাত। হুক্কুল ইবাদের ক্ষেত্রে প্রতিবেশীর হক অগ্রণী, তাই সে বিচার আগে হবে। আর বান্দার হকসমূহের মধ্যে সর্বপ্রথম হত্যাকা--র বিচার হবে, কেননা এটা হচ্ছে সর্ববৃহৎ পাপ। অতএব উক্ত বর্ণনাগুলোর মাঝে কোন বৈপরীত্য নেই। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৫০০১-[৫৫] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বললেনঃ জনৈক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে নিজের কঠিন হৃদয় সম্পর্কে অভিযোগ করল। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে প্রতিকার হিসেবে বললেন যে, ইয়াতীমের মাথায় হাত বুলাও এবং নিঃস্বদেরকে খাদ্য খাওয়াও। (আহমাদ)[1]
وَعَن أبي
هُرَيْرَة أَنَّ رَجُلًا شَكَا إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَسْوَةَ قَلْبِهِ فَقَالَ: «امْسَحْ رَأْسَ الْيَتِيم وَأطْعم الْمِسْكِين» . رَوَاهُ أَحْمد
ব্যাখ্যাঃ মানুষের অন্তর কোন কারণবশতঃ কঠিন হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়, তাই সেই অন্তরকে নরম করতে হলে কিছু কর্মসূচী হাতে নিতে হয়। এ পরিস্থিতিতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াতীমের মাথায় হাত বুলানোর কথা এবং মিসকীনকে খাদ্যদানের কথা বলেছেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ أَوْ إِطْعَامٌ فِي يَوْمٍ ذِي مَسْغَبَةٍ يَتِيمًا ذَا مَقْرَبَةٍ أَوْ مِسْكِينًا ذَا مَتْرَبَةٍ ‘‘দুর্ভিক্ষর দিনে ইয়াতীমকে খাদ্য খাওয়ানো এবং নিকটাত্মীয়কে ও মিসকীনকে খাদ্য খাওয়ানোতে জাহান্নাম থেকে মুক্তি মেলে।’’ (সূরাহ্ আল বালাদ ৯০ : ১৪-১৬)
অহংকার থেকে বাঁচতে হলে বিনয়ী হতে হবে, কৃপণতা থেকে বাঁচতে হলে উদার হতে হবে, আর অন্তরকে নরম করতে হলে ইয়াতীমের মাথায় হাত বুলাতে হবে এবং তাদের আদর-স্নেহ দিতে হবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
৫০০২-[৫৬] সুরাকাহ্ ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি কি তোমাদেরকে উত্তম সাদাকা সম্পর্কে অবহিত করব না? এটা তোমার ঐ কন্যার প্রতি সাদাকা করা, যাকে তোমার দিকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে, আর তুমি ছাড়া তার উপার্জনশীল অন্য কেউ নেই। (ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَن
سراقَة بْنِ مَالِكٍ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «أَلَا أَدُلُّكُمْ عَلَى أَفْضَلِ الصَّدَقَةِ؟ ابْنَتُكَ مَرْدُودَةً إِلَيْكَ لَيْسَ لَهَا كَاسِبٌ غَيْرُكَ» . رَوَاهُ ابْنُ مَاجَهْ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদের বর্ণনাকারীগণ বিশ্বস্ত তবে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে আর তা হল- সুরাকাহ্ ও তার আগের বর্ণনাকারী মূসা তার পিতা থেকে। দেখুন- য‘ঈফাহ্ ৪৮২২।
পরিচ্ছেদঃ ১৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ তা‘আলার জন্য বান্দার প্রতি ভালোবাসা
৫০০৩-[১] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সকল রূহ্ শরীরে প্রবেশ করার পূর্বে একদল পতাকাধারী সৈন্যের মতো ছিল। যে সব রূহ্ শরীরে প্রবেশ করানোর পূর্বে পরস্পর পরিচিত ছিল, এখনো তারা পরস্পর পরিচিত এবং একে অপরের সাথে বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ। আর যে সব রূহ্ ঐ সময় পরস্পর অপরিচিত ছিল, তাদের এখনো পরস্পর মতানৈক্য রয়েছে। (বুখারী)[1]
بَابُ الْحُبِّ فِى اللهِ وَمِنَ اللهِ
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْأَرْوَاحُ جُنُودٌ مُجَنَّدَةٌ فَمَا تَعَارَفَ مِنْهَا ائْتَلَفَ وَمَا تَنَاكَرَ مِنْهَا اخْتَلَفَ» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ (الْأَرْوَاحُ جُنُودٌ مُجَنَّدَةٌ) ইমাম খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এর সম্ভাব্য অর্থ এটা হতে পারে যে, এ সমস্ত মানুষের রূহগুলো কল্যাণ অকল্যাণের দিক বিবেচনায় সাদৃশ্যপূর্ণ। মানুষের অবয়ব অনুপাতে তাদের দিকে কল্যাণ প্রসারিত হতে পারে। ঠিক তার মতই অকল্যাণের বিষয়টি। অতএব ঐগুলোর পরস্পরের পরিচিতি তাদেরকে যে বৈশিষ্ট্যের উপর সৃষ্টি করা হয়েছে সে বৈশিষ্ট্যের উপরই হয়ে থাকে। সুতরাং তারা যখন একই বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হয় তখন তারা পরস্পর পরস্পরের সাথে পরিচিতি লাভ করে। পক্ষান্তরে তাদের বৈশিষ্ট্য যদি ভিন্ন ভিন্ন হয় তখন তারা পরস্পর অপরিচিত থেকে যায়। এর অর্থ এটা হওয়ারও সম্ভাবনা আছে যে, অদৃশ্যে আল্লাহ রব্বুল ‘আলামীন সৃষ্টিকুলের যে সৃষ্টি শুরু করেছিলেন সে কথাই এখানে বলা হয়েছে। রূহগুলো সৃষ্টি করা হয়েছে শরীরের আগে। যখন রূহগুলো শরীরে প্রবেশ করলো তখন তারা পরিচিতি লাভ করলো। কেউ কেউ বলেছেন, রূহ যখন প্রথম সৃষ্টি করা হয় তখন দু’ প্রকার করে সৃষ্টি করা হয়েছে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৮২)
পরিচ্ছেদঃ ১৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ তা‘আলার জন্য বান্দার প্রতি ভালোবাসা
৫০০৪-[২] ইমাম মুসলিম (রহিমাহুল্লাহ) এ হাদীসটি আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন।
بَابُ الْحُبِّ فِى اللهِ وَمِنَ اللهِ
وَرَوَاهُ مُسلم عَن أبي هُرَيْرَة
পরিচ্ছেদঃ ১৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ তা‘আলার জন্য বান্দার প্রতি ভালোবাসা
৫০০৫-[৩] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন আল্লাহ তা’আলা কোন বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন জিবরীল (আ.)-কে ডেকে বলেন যে, আমি অমুক ব্যক্তিকে ভালোবাসী, তুমিও তাকে ভালোবাসো। রাবী বলেন, অতঃপর জিবরীল (আ.)-ও তাকে ভালোবাসতে থাকেন এবং আকাশে ঘোষণা করে দেন যে, আল্লাহ তা’আলা অমুক ব্যক্তিকে ভালোবাসেন, তোমরাও তাকে ভালোবাসো। তখন আকাশমণ্ডলীর অধিবাসীরাও তাকে ভালোবাসতে শুরু করে। অতঃপর সে বান্দার জন্য জমিনেও স্বীকৃতি স্থাপন করা হয়। আর যখন আল্লাহ তা’আলা কোন বান্দাকে ঘৃণা করেন, তখন জিবরীল (আ.)-কে ডেকে বলেন যে, আমি অমুক বান্দাকে ঘৃণা করি, তুমিও তাকে ঘৃণা করো। রাবী বলেন, অতঃপর জিবরীল (আ.)-ও তাকে ঘৃণা করেন এবং আকাশে ঘোষণা করে দেন যে, আল্লাহ তা’আলা অমুক ব্যক্তিকে ঘৃণা করেন, তোমরাও তাকে ঘৃণা করো এবং আকাশবাসীরাও তার প্রতি ঘৃণা পোষণ করে। অতঃপর তার জন্য জমিনেও ঘৃণা স্থাপন করা হয়। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْحُبِّ فِى اللهِ وَمِنَ اللهِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ اللَّهَ إِذَا أَحَبَّ عَبْدًا دَعَا جِبْرِيلَ فَقَالَ: إِنِّي أُحِبُّ فُلَانًا فَأَحِبَّهُ قَالَ: فَيُحِبُّهُ جِبْرِيلُ ثُمَّ يُنَادِي فِي السَّمَاءِ فَيَقُولُ: إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ فُلَانًا فَأَحِبُّوهُ فَيُحِبُّهُ أَهْلُ السَّمَاءِ ثُمَّ يُوضَعُ لَهُ الْقَبُولُ فِي الْأَرْضِ. وَإِذَا أَبْغَضَ عَبْدًا دَعَا جِبْرِيلَ فَيَقُولُ: إِنِّي أُبْغِضُ فُلَانًا فَأَبْغِضْهُ. فَيُبْغِضُهُ جِبْرِيلُ ثُمَّ يُنَادِي فِي أَهْلِ السَّمَاءِ: إِنَّ اللَّهَ يُبْغِضُ فَلَانَا فَأَبْغِضُوهُ. قَالَ: فَيُبْغِضُونَهُ. ثُمَّ يُوضَعُ لَهُ الْبَغْضَاءُ فِي الْأَرْضِ . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ (إِذَا أَحَبَّ عَبْدًا) ‘‘আল্লাহ যখন কোন বান্দাকে ভালোবাসেন’’ কোন কোন সনদে এ ভালোবাসার কারণসহ বিবরণ এসেছে এবং এর দ্বারা কি উদ্দেশ্য তাও এসেছে, যেমন সাওবান থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, إن العبد ليلتمس مرضاة الله تعالى فلا يزال كذلك অর্থাৎ বান্দা সর্বদা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে ব্যস্ত থাকলে আল্লাহ তা‘আলা জিবরীল (আ.)-কে ডাক দিয়ে বলেন, ওহে জিবরীল! আমার অমুক বান্দা আমার সন্তুষ্টি অর্জনে ব্যস্ত তুমি জানিও দাও আমার রহমত আমার বান্দার অতি নিকটে অবস্থান করছে। ইমাম আহমাদ ও ইমাম ত্ববারানী অত্র হাদীসটিকে বর্ণনা করেছেন। গোলাম সংক্রান্ত অধ্যায়ে আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসটিও অনুরূপ।
ولا يزال عبدي يتقرب إلي بالنوافل حتى أحبه অর্থাৎ আমার বান্দা নফল ‘ইবাদাতসমূহের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জনে ব্যস্ত থাকলে আমি বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যাই।
فينادي جبريل في أهل السماء الخ ‘‘অতঃপর জিবরীলও আসমানবাসীকে ডাক দিয়ে বলেন যে, অমুক ব্যক্তিকে আল্লাহ ভালোবাসেন।’’ সাওবান (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে اهل السموات السبع তথা সাত আসমানবাসীর কথা আছে।
ثُمَّ يُوضَعُ لَهُ الْقَبُولُ فِي أَهْلِ الْأَرْضِ ‘‘অতঃপর জমিনে তার গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারিত হয়ে যায়’’ এ প্রসঙ্গে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনুল কারীমে এসেছে, إن الذين آمنوا وعملوا الصالحات سيجعل لهم الرحمن ودا অর্থাৎ নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎ ‘আমল করে রহমান তাদের জন্য ভালোবাসা সৃষ্টি করেন। অত্র হাদীসে কবুল দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সকলে তাকে মুহাববাতের চাদরে আঁকড়ে ধরবে, তার দিকে এগিয়ে আসবে, তার প্রতি সন্তুষ্ট হবে। এজন্য বলা হয়ে থাকে যে, মানুষের আন্তরিক ভালোবাসায় সিক্ত হলে এ বিষয়টিই প্রমাণ করে যে আল্লাহ তা‘আলা তাকে ভালোবাসেন। আল্লাহর ভালোবাসার অর্থ হলো আল্লাহ বান্দার কল্যাণ সাধন করেন, আর মালায়িকাহ্’র (ফেরেশতাদের) ভালোবাসার অর্থ হলো তারা এ বান্দার জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেন। বান্দাদের ভালোবাসার অর্থ হলো তার প্রতি তাদের এ বিশ্বাস জন্মে যে, তার কাছ থেকে অনেক কল্যাণ পাওয়া যাবে, তার কাছ থেকে কোন অকল্যাণ আসবে না। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬০১৪)
পরিচ্ছেদঃ ১৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ তা‘আলার জন্য বান্দার প্রতি ভালোবাসা
৫০০৬-[৪] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, সে লোকেরা কোথায়? যারা আমার ইয্যতের খাতিরে একে অপরকে ভালোবাসত। আজ আমি তাদেরকে আমার ছায়ায় জায়গা দেব। আজ আমার ছায়া ব্যতীত আর কোন ছায়া নেই। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْحُبِّ فِى اللهِ وَمِنَ اللهِ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ اللَّهَ يَقُولُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ: أَيْنَ الْمُتَحَابُّونَ بِجَلَالِي؟ الْيَوْمَ أُظِلُّهُمْ فِي ظِلِّي يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلِّي . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যাঃ في جلالي ‘‘আমার সম্মানে’’ অত্র হাদীসটি হাদীসে কুদসী। এখানে আল্লাহ তা‘আলা বললেন, আমার সম্মানে যারা ভালোবাসে এর অর্থ হলো শুধুমাত্র আল্লাহর সত্ত্বা ও সম্মানের খাতিরে যারা পরস্পর পরস্পরকে ভালোবাসে, এ ভালোবাসায় থাকে না কোন লৌকিকতা ও প্রবৃত্তি অনুসরণের ছাপ। যেমন অন্যত্রে মহান আল্লাহ বলেনঃ وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَاঅর্থাৎ ‘‘যারা আমার পথে সংগ্রাম করে তাদেরকে আমি আমার সঠিক পথ দেখিয়ে দিব...।’’ (সূরাহ্ আল ‘আনকাবূত ২৯ : ৬৯)
নবী ও শাহীদগণ মর্যাদার উচ্চ আসনে থাকার পরেও পরস্পর পরস্পরকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসা স্থাপনকারীদের মর্যাদা অবলোকনে এর প্রতি আশা করবে। অপরদিকে শাহীদগণ মর্যাদার উচ্চাসন লাভ করার পরও আশা করবেন যে, পরস্পর পরস্পরকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসা স্থাপন কারীদের এ গুণ তারাও যদি অর্জন করতেন তাহলে তারা দু’ দিক দিয়ে মর্যাদা পেতেন। হাদীসের এ অংশটি দ্বারা নবী ও শাহীদগণের গিবতাহ্ উদ্দেশ্য, ঈর্ষা নয়। আর আল্লাহর জন্য পরস্পর পরস্পরকে ভালোবাসার গুণে গুনান্বিত ব্যক্তিদের মর্যাদার বিবরণ পেশ করা। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৩৯০)
পরিচ্ছেদঃ ১৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ তা‘আলার জন্য বান্দার প্রতি ভালোবাসা
৫০০৭-[৫] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এক ব্যক্তি তার কোন মুসলিম ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করার ইচ্ছায় রওয়ানা করল। সে আরেক গ্রামে থাকে। আল্লাহ তা’আলা রাস্তায় তার অপেক্ষায় একজন মালাক (ফেরেশতা) বসিয়ে দিলেন। সে যখন সেখানে পৌঁছল, মালাক জিজ্ঞেস করল, কোথায় যেতে ইচ্ছে করেছ? সে বলল, ঐ গ্রামে আমার ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করতে। মালাক বলল, তার কাছে তোমার কোন পাওনা আছে যে, তুমি তা আনবে? সে বলল, না, আমি শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাকে ভালোবাসী। তখন মালাক বলল : আমি আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে তোমার কাছে প্রেরিত হয়েছি। আল্লাহ তোমাকে এ সুসংবাদ দিয়েছেন যে, আল্লাহ তা’আলাও তোমাকে অনুরূপ ভালোবাসেন, যেরূপ তুমি তাকে আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টির জন্য ভালোবেসেছ। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْحُبِّ فِى اللهِ وَمِنَ اللهِ
وَعَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَنَّ رَجُلًا زَارَ أَخًا لَهُ فِي قَرْيَةٍ أُخْرَى فَأَرْصَدَ اللَّهُ لَهُ عَلَى مَدْرَجَتِهِ مَلَكًا قَالَ: أَيْنَ تُرِيدُ؟ قَالَ: أُرِيدُ أَخًا لِي فِي هَذِهِ الْقَرْيَةِ. قَالَ: هَلْ لَكَ عَلَيْهِ مِنْ نِعْمَةٍ تَرُّبُّهَا؟ قَالَ: لَا غَيْرَ أَنِّي أَحْبَبْتُهُ فِي اللَّهِ. قَالَ: فَإِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكَ بِأَنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَبَّكَ كَمَا أَحْبَبْتَهُ فِيهِ . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ (فَأَرْصَدَ اللهُ لَهٗ عَلٰى مَدْرَجَتِهِ مَلَكًا) তার চলাচলের রাস্তায় আল্লাহ তা‘আলা একজন মালাক নিযুক্ত করে দিলেন’’ এখানে চলাচলের পথকে المدرجة বলার কারণ হলো মানুষের এর উপর দিয়ে আস্তে আস্তে ক্রমান্বয়ে অগ্রসর হয়।
(بِأَنَّ اللهَ قَدْ أَحَبَّكَ كَمَا أَحْبَبْتَهُ فِيهِ) তুমি যেহেতু আল্লাহর উদ্দেশে তাকে ভালোবেসেছ, তাই আল্লাহ তা‘আলাও তোমাকে ভালোবেসেছেন। ‘আলিমগণ বলেন, ‘আল্লাহ বান্দাকে ভালোবাসেন’ এর অর্থ হলো আল্লাহ বান্দাকে দয়া করেন, তাকে কল্যাণ দান করেন। সুতরাং আল্লাহর ভালোবাসা অর্থ হলো আল্লাহর দয়া। আর বান্দাগণ পরস্পর পরস্পরকে ভালোবাসার অর্থ হলো একে অন্যের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া আল্লাহ এ থেকে মুক্ত। (শারহুন নাবাবী ১৬শ খন্ড, হাঃ ২৫৬৭)
পরিচ্ছেদঃ ১৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ তা‘আলার জন্য বান্দার প্রতি ভালোবাসা
৫০০৮-[৬] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রসূল! ঐ ব্যক্তির ব্যাপারে আপনার কি অভিমত? যে কোন কওম বা দলকে ভালোবাসে; কিন্তু তাদের সাথে (কখনো) সাক্ষাৎ হয়নি। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ সে ব্যক্তি তার সাথেই আছে, যাকে সে ভালোবাসে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْحُبِّ فِى اللهِ وَمِنَ اللهِ
وَعَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ كَيْفَ تَقُولُ فِي رَجُلٍ أَحَبَّ قَوْمًا وَلَمْ يَلْحَقْ بِهِمْ؟ فَقَالَ: «المرءُ معَ من أحب» . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ (أَحَبَّ قَوْمًا) অর্থাৎ কোন ব্যক্তি যদি কোন কওম বা সম্প্রদায়কে ভালোবাসে, এ ভালোবাসা আল্লাহর ওয়াস্তে হওয়া চাই এবং যাকে ভালোবাসবে তার সৎ হওয়া চাই।
(وَلَمْ يَلْحَقْ بِهِمْ) কিন্তু তাদের সাথে তার কখনো সাক্ষাৎ হয়নি। ‘‘মিরকাত’’ গ্রন্থকার এর কয়েকটি অর্থ করেছেন- ১. তাদের সাহচর্য লাভ করেনি, ২. ‘ইলম বা বিদ্যায় তাদের সমপর্যায় পৌঁছেনি। ৩. ‘আমলে তাদের সমকক্ষ হয়নি। ৪. তাদের সাথে মিলিত হয়নি তথা তাদের দেখা পায়নি। তাদের কাজের মতো কাজও করেনি, শুধু তাদেরকে ভালোবাসে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(اَلْمَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبَّ) সে ব্যক্তি তার সাথেই আছে, যাকে সে ভালোবাসে, অর্থাৎ সে ব্যক্তি কিয়ামতের মাঠে তার ভালোবাসার ব্যক্তির সাথে সমবেত হবে। তার কাঙিক্ষত ব্যক্তির সে বন্ধুত্ব লাভ করবে। এ মর্মে মহান আল্লাহ বলেনঃ وَمَنْ يُّطِعِ اللهَ وَالرَّسُولَ فَأُولٰئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللهُ عَلَيْهِمْ ‘‘আর যে কেউ আল্লাহর হুকুম এবং তার রসূলের হুকুম মান্য করবে, তাহলে যাদের প্রতি আল্লাহর নি‘আমাত দান করেছেন, সে তাদের সঙ্গী হবে’’- (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪ : ৬৯)। হাদীসটির এ অংশটুকু দ্বারা সৎ সঙ্গী খুঁজে তাদের সাথে চলার ইঙ্গিত বহন করে। যেমনটি অন্য হাদীসেও বলা হয়েছে- الْمَرْءُ عَلٰى دِينِ خَلِيلِه ‘‘ব্যক্তি তার বন্ধুর দীনের উপর থাকে’’। সুতরাং তোমাদের কোন ব্যক্তি কাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করছে সেটা যেন লক্ষ্য করে। (আবূ দাঊদ হাঃ ৪৮৩৩; আলবানী : হাসান)
আল জামি‘উস্ সগীরে আরেকটি হাদীস এসেছে, (اَلْمَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبَّ) কোন ব্যক্তি যাকে ভালোবাসে তার সাথে সে থাকবে (কিয়ামতের দিন)।
(আল জামি‘উস্ সগীর ৯১৯০, বুখারী ৬১৬৭, মুসলিম ৪/২০৩২, দারিমী ২৭৮৭, আহমাদ ৩/১৬৮)
হাদীস দ্বারা পরোক্ষভাবে বুঝা যায় যে, ‘আলিম-‘উলামা ও সৎ লোকেদেরকে ভালোবাসা জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম। পক্ষান্তরে জাহিল ও অসৎ এবং অমুসলিমদেরকে ভালোবাসা জাহান্নামে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
পরিচ্ছেদঃ ১৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ তা‘আলার জন্য বান্দার প্রতি ভালোবাসা
৫০০৯-[৭] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল : হে আল্লাহর রসূল! কিয়ামত কখন হবে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তোমার জন্য পরিতাপ। কিয়ামতের জন্য তুমি কী প্রস্তুত করেছ? সে জবাবে বলল, আমি কিছুই করিনি, তবে আমি আল্লাহ ও তাঁর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ভালোবাসী। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তুমি তার সাথেই হবে যাকে তুমি ভালোবাসো। (রাবী) আনাস (রাঃ) বলেনঃ ইসলাম আবির্ভাবের পর মুসলিমদেরকে আমি কোন কথায় এতটা খুশি হতে দেখিনি, যতটা তারা খুশি হয়েছিল রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ বাণীতে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْحُبِّ فِى اللهِ وَمِنَ اللهِ
وَعَنْ أَنَسٍ أَنَّ رَجُلًا قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَتَى السَّاعَةُ؟ قَالَ: «وَيْلَكَ وَمَا أَعْدَدْتَ لَهَا؟» قَالَ: مَا أَعْدَدْتُ لَهَا إِلَّا أَنِّي أُحِبُّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ. قَالَ: «أَنْتَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ» . قَالَ أَنَسٌ: فَمَا رَأَيْتُ الْمُسْلِمِينَ فَرِحُوا بِشَيْءٍ بَعْدَ الْإِسْلَامِ فَرَحَهُمْ بِهَا. مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ (مَتَى السَّاعَةُ) অর্থাৎ কিয়ামত কোন্ সময়ে সংগঠিত হবে? এ বাক্য দ্বারা কিয়ামতকে অস্বীকার করা বুঝাচ্ছে না বরং কিয়ামতের প্রতি অগাধ বিশ্বাস বুঝাচ্ছে। কিয়ামতের প্রতি দৃঢ় ঈমান থাকার কারণে ও তার ভয়ের কারণে সাহাবী রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ প্রশ্নটি করলেন।
(قَالَ: وَيْلَكَ) ‘তুমি ধ্বংস হও’, ‘তোমার জন্য পরিতাপ’ এ শব্দটি কখনো বদ্দু‘আ অর্থে ব্যবহার হয়ে থাকে। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুখে সাহাবীর জন্য এ কথা বদ্দু‘আ ছিল না। এরপর তাকে পরীক্ষা করার জন্য বললেন, (مَا أَعْدَدْتَ لَهَا) ‘তুমি তার জন্য কি প্রস্তুত করেছ? উত্তরে সাহাবী বললেন, আমি কোন কিছু তৈরি করিনি। (إِلَّا أَنِّي أُحِبُّ اللهَ وَرَسُولَهٗ) তবে আমি আল্লাহ ও তার রসূলকে ভালোবাসী। এখানে সাহাবী কোন অন্য ‘আমলের কথা উল্লেখ করেননি। তিনি কোন অন্তরের ‘ইবাদাত, শারীরিক ‘ইবাদাত, কোন আর্থিক ‘ইবাদাতের কথা উল্লেখ করেননি। কেননা এসবগুলোই হলো ভালোবাসার (مَحَبَّةِ এর) শাখা। আর মুহাব্বাত বা ভালোবাসা হলো সবকিছুর চেয়ে উঁচু স্তরের ‘ইবাদাত। মহান আল্লাহ বলেন, يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَه ‘‘তিনি তাদেরকে ভালোবাসেন আর তারাও তাকে ভালোবাসে’’- (সূরাহ্ আল মায়িদাহ্ ৫ : ৫৪)। তিনি আরো বলেন, إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللّٰهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللهُ ‘‘তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসতে চাইলে আমার অনুসরণ কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন’’- (সূরাহ্ আ-লি ‘ইমরা-ন ৩ : ৩১)। আর সাহাবীদের এটা ভালোভাবেই জানা ছিল যে, ভালোবাসা অনুসরণ করা ছাড়া অর্জিত হয় না, আর যে ‘ইবাদাত তাঁর অনুসরণ করা ব্যতীত করা হবে তাতে লাভ হবে না। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
أَنْتَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ ‘তার সাথে থাকবে যাকে তুমি ভালোবাস’ এ কথার অর্থ হলো কিয়ামতের দিন তুমি তার সাথে মিলিত হয়ে তাদের দলে থাকবে। এখানে একটা প্রশ্ন থাকে তা হলো মানুষের স্তর তো বিভিন্ন ধরনের, তবে সাথে থাকার বিষয়টি কেমন? এর উত্তরে বলা হয়েছে, সাথে থাকার অর্থ এক জায়গায় তথা কোন জিনিসের মধ্যে একত্রিত হওয়াকে বুঝায়নি। আর সাথে থাকার অর্থ এক জিনিসের মধ্যে একত্রিত হওয়া এটা ওয়াজিব করে না। বরং সকলে যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন সাথে থাকার অর্থ সত্যায়িত হবে। যদিও সেখানে অনেক স্তর আছে। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬১৬৭)
এখানে আল্লাহ তা‘আলা, তাঁর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সৎলোকেদেরকে ভালোবাসার ফাযীলাত বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ ও তাঁর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ভালোবাসা বলতে বুঝায় তাদের আদেশসমূহ পালন করা। তাদের নিষেধসমূহ হতে দূরে থাকা এবং ইসলামী শারী‘আতের শিষ্টাচার অনুযায়ী শিষ্টাচার শিক্ষা করা। (শারহুন নাবাবী ১৬শ খন্ড, হাঃ ২৬৩৯; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ তা‘আলার জন্য বান্দার প্রতি ভালোবাসা
৫০১০-[৮] আবূ মূসা আল আশ্’আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সৎলোকের সাহচর্য ও অসৎলোকের সাহচর্য যথাক্রমে কস্তুরী বিক্রেতা (আতরওয়ালা) ও কর্মকারের হাপরে ফুঁক দেয়ার মতো। কস্তুরী বিক্রেতা হয়তো তোমাকে এমনিতেই কিছু দান করবে অথবা তুমি তার নিকট থেকে কিছু কস্তুরী ক্রয় করবে। আর অন্ততপক্ষ কিছু না হলেও তার সুঘ্রাণ তোমার অন্তর ও মস্তিষ্ককে সঞ্জীবিত করবে। পক্ষান্তরে হাপরে ফুঁকদানকারী তোমার কাপড় জ্বালিয়ে দেবে। আর কিছু না হলেও তার দুর্গন্ধ তুমি পাবে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْحُبِّ فِى اللهِ وَمِنَ اللهِ
وَعَنْ أَبِي مُوسَى قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَثَلُ الْجَلِيسِ الصَّالِحِ وَالسَّوْءِ كَحَامِلِ الْمِسْكِ وَنَافِخِ الْكِيرِ فَحَامِلُ الْمِسْكِ إِمَّا أَنْ يُحْذِيَكَ وَإِمَّا أَنْ تبتاعَ مِنْهُ وإِمَّا أَن تجدَ مِنْهُ رِيحًا طَيِّبَةً وَنَافِخُ الْكِيرِ إِمَّا أَنْ يَحْرِقَ ثيابَكَ وإِمَّا أنْ تجدَ مِنْهُ ريحًا خبيثةً» . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ এখানে সৎ বন্ধুর দৃষ্টান্ত দেয়া হয়েছে আতরওয়ালার সাথে। আতরওয়ালা নিজে আতরের ঘ্রাণ পায়। তার আশপাশের মানুষকেও সে ঘ্রাণে ভরিয়ে তোলে। সৎ সঙ্গ, ‘উলামাগণের সাথে চলার প্রতি দিক নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। কারণ এটি দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ করবে। পক্ষান্তরে অসৎ সঙ্গী ও ফাসিকদের সঙ্গী হতে দূরে থাকতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে, কারণ তারা দীন ও দুনিয়া উভয় ধ্বংস করে। সৎ সঙ্গী কল্যাণকর কিছু দেয়, আর অসৎ সঙ্গী অকল্যাণকর কিছু দেয়, যেমন বাতাস। যখন সে সুঘ্রাণের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয় তখন সে সুঘ্রাণপ্রাপ্ত হয় ও সুঘ্রাণ বিতরণ করে। আর যখন সে খারাপ দুর্গন্ধময় কোন কিছুর উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন সে দুর্গন্ধ লাভ করে এবং দুর্গন্ধ ছড়িয়ে দেয়। তাই তো মহান আল্লাহ সৎ মুক্তাক্বী সঙ্গী নির্বাচন করার নির্দেশ দিয়ে বলেন- يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ ‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গী হও’’- (সূরাহ্ আত্ তাওবাহ্ ৯ : ১৮৯)। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
كَمَثَلِ صَاحِبِ الْكِيرِ ‘‘হাপরওয়ালার মতো’’। হাদীসের এ অংশটিতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসৎ বন্ধুর দৃষ্টান্ত দিয়েছেন হাপরওয়ালার সাথে, যার কাছ থেকে সর্বদা কিছু না কিছু অপকার হওয়া স্বাভাবিক হয় তার হাফর থেকে আগুনের স্ফুলিঙ্গ এসে তোমার কাপড়ে বা শরীরে পরবে আর না হয় কমপক্ষ ধুয়া এবং দুর্গন্ধ তো পাবেই। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৮২১)
পরিচ্ছেদঃ ১৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ তা‘আলার জন্য বান্দার প্রতি ভালোবাসা
৫০১১-[৯] মু’আয ইবনু জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তা’আলা বলেছেনঃ যারা আমার সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশে পরস্পরকে ভালোবাসে, আমার উদ্দেশে সভা-সমাবেশে উপস্থিত হয়ে আমার গুণগান করে, আমার উদ্দেশে পরস্পর দেখা-সাক্ষাৎ করে এবং আমারই ভালোবাসা অর্জনের জন্য নিজেদের সম্পদ পরস্পরের মধ্যে ব্যয় করে, তাদেরকে ভালোবাসা আমার জন্য ওয়াজিব হয়। (মালিক)[1]
আর তিরমিযীর এক বর্ণনায় আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা বলেন, ’’আমার মহত্ব ও সম্মানের খাতিরে যারা পরস্পর মহববত করে, তাদের জন্য পরকালে বিরাট নূরের মিনার হবে, যা দেখে নবী ও শাহীদগণ ঈর্ষা করবেন’’।
وَعَن مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: وَجَبَتْ مَحَبَّتِي لِلْمُتَحَابِّينَ فِيَّ وَالْمُتَجَالِسِينَ فِيَّ وَالْمُتَزَاوِرِينَ فِيَّ وَالْمُتَبَاذِلِينَ فِيَّ . رَوَاهُ مَالِكٌ. وَفِي رِوَايَةِ التِّرْمِذِيَّ قَالَ: يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى: الْمُتَحَابُّونَ فِي جَلَالِي لَهُمْ مَنَابِرُ مِنْ نُورٍ يَغْبِطُهُمُ النَّبِيُّونَ وَالشُّهَدَاء
ব্যাখ্যাঃ (لِلْمُتَحَابِّينَ فِيَّ) যারা একমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য পরস্পর ভালোবাসার সেতু বন্ধনে আবদ্ধ হবে, তাদের এ পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ভালোবাসার মাঝে কোন স্বার্থসিদ্ধির ফন্দি আসবে না, থাকবে না কোন কু-মতলব, তাহলে এ নিঃস্বার্থ ভালোবাসার বিনিময়ে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে জান্নাতে অনুপ্রবেশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
(الْمُتَجَالِسِينَ فِيَّ) যারা আল্লাহর দীনকে দুনিয়ায় প্রচার-প্রসার করার জন্য পরস্পর একত্রিত হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে এবং মহান আল্লাহর একত্ববাদ, তার শ্রেষ্ঠত্ব, মহত্ব ও গুণাবলী নিয়ে আলোচনা করে পরস্পর দীনী শিক্ষা করে তাদের জন্যও আল্লাহ তা‘আলা জান্নাত প্রদানের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।
(الْمُتَزَاوِرِينَ فِيَّ) হাদীসে কুদসীতে মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘‘যারা আমার সন্তুষ্টির জন্য পরস্পর সাক্ষাৎ করল, তাদের জন্য আমার ভালোবাসা ওয়াজিব হয়ে গেছে, অর্থাৎ আমি তাদেরকে আমার জান্নাতে প্রবেশ করাব’’। এখানে সাক্ষাৎ করা অর্থ হলো মুসলিম ভাইয়ের খোঁজ-খবর নেয়া, তাঁর বিপদে-আপদে সাহায্য করা, সর্বদা তার কল্যাণ কামনা করা ইত্যাদি।
(الْمُتَبَاذِلِينَ فِيَّ) যারা নিজেদের ধন-সম্পদকে পরস্পরের মধ্যে ব্যয় করে, একজন অন্যজনের আর্থিক অসুবিধা সমাধান করে, ঋণ পরিশোধ করে, আর এসব সহযোগিতার পিছনে যদি কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন উদ্দেশ্য থাকে তবে আল্লাহ তাদেরকে জান্নাতে থাকতে দিবেন তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে।
(الْمُتَحَابُّونَ فِي جَلَالِي) মহান আল্লাহ বলেনঃ আমার বড়ত্ব ও মহত্ব প্রকাশ ও আমার প্রতি সম্মান প্রদর্শনকল্পে যারা পরস্পর ভালোবাসা স্থাপন করে অর্থাৎ আমার দীনের স্বার্থে এবং আমার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে নিজেদের মধ্যে এ সম্পর্ক গড়ে তোলে, তাদেরকে ভালোবাসা আমার জন্য আবশ্যক হয়ে যায়।
[সম্পাদক]
(يَغْبِطُهُمُ النَّبِىُّونَ وَالشُّهَدَاء) মুল্লা ‘আলী কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ গিবত্বাহ্ বলা হয়, নি‘আমাতের অধিকারী ব্যক্তির নি‘আমাতের ধ্বংস কামনা না করে নিজেও তদ্রূপ নি‘আমাত লাভের আশা করাকে। এটা হিংসার বিপরীত কারণ হিংসা জন্যের নি‘আমাত চলে যাওয়া কামনা করা হয়।
কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ প্রতিটি মানুষ তার ‘ইলম ও ‘আমল অনুযায়ী সম্মান ও মর্যাদা লাভ করবে, যার মধ্যে গুণ নেই সে তার মর্যাদা লাভ করবে না। কারও মধ্যে যদি একটা গুণ না থাকে তবে সে অন্যের মধ্যে সেই গুণ থাকার কারণে তার পুরস্কার দেখে ঈর্ষা করবে। সে কামনা করবে যদি তার মধ্যেও এ মর্যাদা থাকত তবে ভালো হত। সেও এ সম্মানের অধিকারী হত। আর এ কারণেই বলা হয়েছে- (يَغْبِطُهُمُ النَّبِىُّونَ وَالشُّهَدَاء) কেননা নবী ও শাহীদগণ সবচেয়ে উঁচু স্তরের মর্যাদাবান, কারণ তারা সৃষ্টিকুলকে দা‘ওয়াত দিয়েছেন সত্য/হক প্রকাশ করেছেন, দীনকে সমুন্নত করেছেন, সাধারণ ও বিশেষ লোকেদেরকে সঠিক পথের রাস্তা দেখিয়েছেন। এছাড়াও তারা মহাসফলতা লাভ করেছেন। সাধারণ মানুষগুলো নবীদের মতো এরূপ গুরু দায়িত্বপ্রাপ্ত হয় না ও দায়িত্ব পালনে সক্ষমও হয় না। এ সত্ত্বেও যখন তারা তাদেরকে কিয়ামতের দিনে তাদের স্থানে, তাদের নিকটবর্তী ও মহান আল্লাহর নিকট তাদের মর্যাদা লক্ষ্য করবে, তারা বলবে তারাও যদি এদের মতো গুণে গুণান্বিত হত তবে তারা দ্বিগুণ কল্যাণ লাভ করতে পারত। তারা দু‘টি সফলতা লাভ করতে পারত। এও বলা হয়েছে যে, নবী-রসূলগণ ও শাহীদগণ এসব মর্যাদার জন্য খুশি হবেন। মনে হবে যেন তারাও এরূপ মর্যাদা ও মতবার প্রত্যাশা করেন। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৩৯০)
পরিচ্ছেদঃ ১৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ তা‘আলার জন্য বান্দার প্রতি ভালোবাসা
৫০১২-[১০] ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলার বান্দাদের মধ্যে কিছু লোক এমন আছে যে, তাঁরা নবীও নন, শাহীদও নন; কিন্তু কিয়ামতের দিন নবীগণ ও শাহীদগণ আল্লাহ তা’আলার কাছে তাঁদের মর্যাদা দেখে ঈর্ষা করবেন। সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রসূল! তাঁরা কারা? আমাদেরকে বলুন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তাঁরা সেসব লোক, যারা শুধু আল্লাহ তা’আলার ক্বুরআনের খাতিরে একে অপরকে ভালোবাসে, তাদের মধ্যে কোন নিকট আত্মীয়তার সম্পর্কও নেই, তাঁদের পরস্পরের মধ্যে ধন-সম্পদের লেনদেনের সম্পর্কও নেই। আল্লাহর কসম! তাদের মুখমণ্ডলে উজ্জ্বল হবে অথবা তাঁরা স্বয়ং আলোকবর্তিকা হবে। তারা সে সময় ভীত-সন্ত্রস্ত হবে না, যখন সকল মানুষ ভীত-সন্ত্রস্ত হবে; তাঁরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবে না, যখন সকল মানুষ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকবে। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ আয়াত পাঠ করলেনঃ অর্থাৎ- ’’সাবধান! নিশ্চয় আল্লাহর বন্ধুগণের কোন ভয় নেই। তারা দুশ্চিন্তাগ্রস্তও হবে না’’- (সূরাহ্ ইউনুস ১০ : ৬২)। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عُمَرَ
قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ مِنْ عِبَادِ اللَّهِ لَأُنَاسًا مَا هُمْ بِأَنْبِيَاءٍ وَلَا شُهَدَاءَ يَغْبِطُهُمُ الأنبياءُ والشهداءُ يومَ القيامةِ بِمَكَانِهِمْ مِنَ اللَّهِ» . قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ تُخْبِرُنَا مَنْ هُمْ؟ قَالَ: «هُمْ قَوْمٌ تَحَابُّوا بِرُوحِ اللَّهِ عَلَى غَيْرِ أَرْحَامٍ بَيْنَهُمْ وَلَا أَمْوَالٍ يَتَعَاطَوْنَهَا فَوَاللَّهِ إِنَّ وُجُوهَهُمْ لَنُورٌ وَإِنَّهُمْ لَعَلَى نُورٍ لَا يَخَافُونَ إِذَا خَافَ النَّاسُ وَلَا يَحْزَنُونَ إِذَا حَزَنَ النَّاسُ» وَقَرَأَ الْآيَةَ: (أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُم يحزنونَ)
رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ (إِنَّ مِنْ عِبَادِ اللهِ) অর্থাৎ যাদের পূর্ণ ঈমান আছে এবং যারা ইখলাসের সাথে সৎকাজ করে।
(تَحَابُّوا بِرُوحِ اللهِ) অর্থাৎ যারা মহান আল্লাহর ‘‘রূহ’’-এর জন্য একে অপরকে ভালোবাসবে। আর এ সমস্ত লোকেদের মর্যাদা হাশরের মাঠে এত উঁচু হবে যে, নবী ও রসূলগণ পর্যন্ত তা দেখে ঈর্ষান্বিত হবেন। এখানে رُوحِ শব্দের ব্যাখ্যায় নিম্নরূপ অভিমত।
رُوحِ শব্দের ব্যাখ্যায় নিম্নরূপ অভিমত পাওয়া যায়। رُوحِ এর (ر) অক্ষরকে পেশ এবং যবর উভয় ক্বিরাআতে পড়া যায়। পেশযোগে এর অর্থ- এমন বস্তু, যা দ্বারা সৃষ্টবস্তু জীবিত থাকে। অর্থাৎ রূহ বা আত্মা। আর এটা দ্বারা পবিত্র কুরআন উদ্দেশ্য। যেমন মহান আল্লাহ বলেন, وَكَذٰلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا مِنْ أَمْرِنَا ‘‘এভাবে (উল্লেখিত ৩টি উপায়েই) আমার নির্দেশের মূল শিক্ষাকে তোমার কাছে আমি ওয়াহীযোগে প্রেরণ করেছি...’’- (সূরাহ্ আশ্ শূরা ৪২ : ৫২)। এখানে رُوحِ শব্দ দ্বারা মহাগ্রন্থ আল কুরআনকে বুঝানো হয়েছে। এ নামকরণের কারণ হলো, কুরআন যেমন আত্মাকে সজীব রাখে, অনুরূপভাবে রূহ ও শরীরকে উজ্জীবিত রাখে। এ অবস্থায় হাদীসাংশের অর্থ হবে, তারা কুরআনের অনুসরণে, ইসলামের বৃহত্তর স্বার্থে এবং মুসলিম বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখার জন্য পরস্পর ভালোবাসার সূত্রে আবদ্ধ হয়। অথবা رُوحِ শব্দের অর্থ- মুহববাত বা ভালোবাসা। যেমন প্রিয়জনকে বলা হয় أنت روح ‘‘তুমি আমার প্রাণ’’। অর্থাৎ আমার প্রাণের ন্যায়। তখন এর অর্থ হবে, মহান আল্লাহর উদ্দেশেই পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসার একই সূত্রে প্রথিত হয়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(وَإِنَّهُمْ لَعَلَى نُورٍ) অর্থাৎ কিয়ামতের দিন তারা নূরের বা আলোকসজ্জাবিশিষ্ট মিম্বারের উপর থাকবে। যেমনটি অন্য একটি হাদীসেও বর্ণিত হয়েছে। কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এখানে তাদের মর্যাদা তাদেরকে সম্মান্বিত করা হবে যেমনিভাবে দুনিয়াতে তাদেরকে সম্মান করে উঁচুস্থানে বসার ব্যবস্থা করা হতো ঠিক সেভাবে। তাদের সেদিন আনন্দের উপর আনন্দ হবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ তা‘আলার জন্য বান্দার প্রতি ভালোবাসা
৫০১৩-[১১] আর [ইমাম বাগাবী (রহিমাহুল্লাহ)] ’’শারহুস্ সুন্নাহ্’’ গ্রন্থে আবূ মালিক (রহিমাহুল্লাহ) থেকে মাসাবীহর শব্দে কিছু অতিরিক্ত শব্দযোগে বর্ণনা করেছেন। অনুরূপভাবে শু’আবুল ঈমানেও।
وَرَوَاهُ فِي
شَرْحِ السُّنَّةِ
عَنْ أَبِي مَالِكٍ بِلَفْظِ «الْمَصَابِيحِ» مَعَ زَوَائِدَ وَكَذَا فِي «شُعَبِ الْإِيمَان»
পরিচ্ছেদঃ ১৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ তা‘আলার জন্য বান্দার প্রতি ভালোবাসা
৫০১৪-[১২] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ যার (রাঃ)-কে বললেনঃ হে আবূ যার! ঈমানের কোন্ শাখাটি অধিক মজবুত? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রসূলই অধিক অবগত। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে পরস্পর সখ্যতা স্থাপন করা এবং শুধুমাত্র আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টির জন্য কাউকে ভালোবাসা ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কাউকে ঘৃণা করা। (বায়হাক্বী’র ’’শু’আবুল ঈমান’’)[1]
وَعَنِ ابْنِ
عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِأَبِي ذَرٍّ: «يَا أَبَا ذَرٍّ أَيُّ عُرَى الْإِيمَانِ أَوْثَقُ؟» قَالَ: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ: «الْمُوَالَاةُ فِي اللَّهِ وَالْحُبُّ فِي اللَّهِ وَالْبُغْضُ فِي اللَّهِ» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيّ فِي «شعب الْإِيمَان»
ব্যাখ্যাঃ (أَيُّ عُرَى الْإِيمَانِ أَوْثَقُ؟) এখানে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক আবূ যার -কে প্রশ্ন করার হিকমাত সম্ভবত প্রশ্নের উত্তরের প্রতি তার খেয়াল বা মনোযোগ বৃদ্ধি করা। এর সঠিক উত্তর কি হবে সে যেন সেটা ভালোভাবে মনে রাখতে পারে সেজন্য তাকে সজাগ ও সচেতন করার। আর এ প্রশ্ন করাটা তার উত্তরের গুরুত্ব বুঝানের জন্যেও হয়ে থাকে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(وَالْحُبُّ فِي اللهِ) অর্থাৎ আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসা। যদিও সে ভালোবাসা একজনের পক্ষ থেকে হোক না কেন। যেমন আমরা কোন আল্লাহর এক বান্দাকে ভালোবাসি যদিও তিনি আমাদেরকে না দেখেন বা আমরাও তাকে না দেখি।
(وَالْبُغْضُ فِي اللهِ) অর্থাৎ আল্লাহর পথে চলতে গিয়ে যারা তার দীনের বিরোধিতা করে তাদের সাথে শত্রুতা রাখা। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেনঃ
لَا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللهَ وَرَسُولَه وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ أُولٰئِكَ كَتَبَ فِي قُلُوبِهِمُ الْإِيمَانَ وَأَيَّدَهُمْ بِرُوحٍ مِنْهُ
‘‘আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী এমন কোন দল তুমি পাবে না যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরোধিতাকারীদেরকে ভালোবাসে- হোক না এই বিরোধীরা তাদের পিতা অথবা পুত্র অথবা তাদের ভাই অথবা তাদের জ্ঞাতি গোষ্ঠী। আল্লাহ এদের অন্তরে ঈমান বদ্ধমূল করে দিয়েছেন, আর নিজের পক্ষ থেকে রূহ দিয়ে তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন...।’’ (সূরাহ্ আল মুজাদালাহ্ ৫৮ : ২২)
ত্ববারানীতে ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে একটি হাদীস এ রকম (মারফূ‘ সূত্রে) বর্ণনা করেছেন,
أَوْثَقُ عُرَى الْإِيمَانِ الْمُوَالَاةُ فِي اللهِ، وَالْمُعَادَاةُ فِي اللهِ، وَالْحُبُّ فِي اللّٰهِ، وَالْبُغْضُ فِي اللّٰهِ عَزَّ وَجَلَّ
ঈমানের অধিক মজবুত শাখাটি হলো, একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে পরস্পর শত্রুতা স্থাপন করা এবং শুধুমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাউকে ভালোবাসা ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কাউকে ঘৃণা করা। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ তা‘আলার জন্য বান্দার প্রতি ভালোবাসা
৫০১৫-[১৩] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন কোন মুসলিম তার কোন ভাইয়ের রোগ দেখতে যায় অথবা সাক্ষাৎ করতে যায়, তখন আল্লাহ তা’আলা বলেন, তোমার জীবন সুখের হলো, তোমার চলন উত্তম হলো এবং তুমি জান্নাতে একটি ইমারত বানিয়ে নিলে। [তিরমিযী; আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসটি গরীব][1]
وَعَنْ أَبِي
هُرَيْرَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِذَا عَادَ الْمُسْلِمُ أَخَاهُ أَوْ زَارَهُ قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: طِبْتَ وَطَابَ مَمْشَاكَ وَتَبَوَّأْتَ مِنَ الْجَنَّةِ مَنْزِلًا . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيث غَرِيب
ব্যাখ্যাঃ (إِذَا عَادَ الْمُسْلِمُ أَخَاهُ) অর্থাৎ যখন কোন মুসলিম তার অপর কোন মুসলিম ভাইকে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে গেল। তার সেবা করল, তার খোঁজ-খবর নিল।
(طِبْتَ وَطَابَ مَمْشَاكَ) যখন কোন মুসলিম তার কোন মুসলিম ভাইয়ের পরিচর্যা করতে যায় অথবা কোন সুস্থ ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ করতে যায়, তখন মহান আল্লাহ বলেন, তোমার জন্য ইহকাল ও পরকালে অফুরন্ত কল্যাণ রয়েছে। ইহকালীল জীবনের সে ব্যক্তি যেমন আত্মতৃপ্তি ও শান্তি লাভ করবে ঠিক তেমনিভাবে সে পরকলের জীবনেও জান্নাত লাভে ধন্য হবে। তার মনের সকল কামনা-বাসনা সেখানে পূর্ণ হবে। طِبْتَ দ্বারা সেদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। আর তার পার্থিব জীবনের প্রত্যেকটি পদচিহ্ন হবে পরকালীন সাফল্যময় জীবনের কারণস্বরূপ অর্থাৎ তার হাঁটা-চলা উত্তম কাজের জন্যই হবে, যার ফলে সে পরকালে দীর্ঘস্থায়ী সুখসময় জীবনের অধিকারী হবে।
(وَتَبَوَّأْتَ مِنَ الْجَنَّةِ مَنْزِلًا) অর্থাৎ তুমি জান্নাতের মধ্যে অনেক বড় মর্তবা বা সম্মান লাভ করলে। কেননা কোন মু’মিনের অন্তরে প্রশান্তি সৃষ্টি করা মানুষ ও জিনের যত রকমের ‘ইবাদাত রয়েছে তন্মধ্যে শ্রেষ্ঠ ‘ইবাদাত। বিশেষ করে রোগীর দেখাশুনা করা ফার্য়ে কিফায়াহ্ আর এর মধ্যে অনেক উপদেশ ও সতর্কতা, শিক্ষণীয় বিষয় আছে সুস্থ ব্যক্তিদের জন্য, তা হলো সুস্থ ব্যক্তি তার সুস্থতার ও জীবনের নি‘আমাত ভালোভাবে বুঝতে পারে। আর বেশি বেশি আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে পারে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ তা‘আলার জন্য বান্দার প্রতি ভালোবাসা
৫০১৬-[১৪] মিকদাম ইবনু মা’দীকারিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যখন কোন ব্যক্তি তার কোন মুসলিম ভাইকে ভালোবাসে, সে যেন তাকে খবর দিয়ে দেয় যে, সে তাকে ভালোবাসে। (আবূ দাঊদ ও তিরমিযী)[1]
وَعَن
الْمِقْدَام بن معديكرب عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِذا أحب الرجل أَخَاهُ فليخبره أَنه أحبه» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالتِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ (فَلْيُخْبِرْهُ أَنَّه يُحِبُّه) যদি কোন মুসলিম অন্য কোন মুসলিমকে অন্তর দিয়ে ভালোবাসে, অত্যন্ত আপন মনে করে, তবে তাকে তা জানিয়ে দিবে। হয়ত বা সে জানার পর তার হৃদয়ের মণিকোঠায় এ ব্যক্তির প্রতি ভালোবাসার সৃষ্টি হবে। সেও তাকে ভালোবাসবে। এতে একে অপরের সহযোগিতায় তারা এগিয়ে আসবে, এ দুনিয়া হতে বিশৃঙ্খলা, অন্যায়-অত্যাচার কমে যাবে। সমাজে বন্ধুত্ব-ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে। মুসলিম সমাজ থেকে জুলুম-নির্যাতন, হিংসা-বিদ্বেষ দূর হবে। পরস্পরের মাঝে লেনদেন, আদান-প্রদান ও দা‘ওয়াত বৃদ্ধি পাবে। সমাজে তৈরি হবে এক জান্নাতী সেতুবন্ধন। এতে সমাজ থেকে মু’মিনদের মধ্য থেকে ইখতিলাফ দূর হবে। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৩৯১; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
এ হাদীসটি অন্য একটি বর্ণনায় এভাবে এসেছে যে, আবূ যার হতে বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ إِذَا أَحَبَّ أَحَدُكُمْ صَاحِبَهُ فَلْيَأْتِه فِي مَنْزِلِهِ فَلْيُخْبِرْهُ أَنَّهٗ يُحِبُّهُ لِلّٰهِ ‘‘যখন তোমাদের কেউ তার সাথীকে ভালোবাসে তখন সে যেন তার বাড়ীতে আসে এবং তাকে সে কথা জানিয়ে দেয়।’’ (আল জামিউস্ সগীর হাঃ ৩৫৮)
হাদীসটির শিক্ষণীয় : অত্র হাদীসে তার বাড়ীতে যেতে বলা হয়েছে, তার বাড়ীতে গেলে তার জন্য বাড়ীওয়ালার অন্তরেও ভালোবাসা জন্মাবে এটাই স্বাভাবিক। তাই এ হাদীস থেকে আমরা জানতে পারলাম কাউকে ভালোবাসলে তাকে কিভাবে জানাতে হবে। রাস্তা-ঘাটে যেখানে-সেখানে জানিয়ে দেয়া সুন্নাত বিরোধী। বরং সুন্নাত হলো তার বাড়িতে গিয়ে বসে সুন্দরভাবে তাকে জানিয়ে দেয়া। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ১৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ তা‘আলার জন্য বান্দার প্রতি ভালোবাসা
৫০১৭-[১৫] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট দিয়ে গমন করল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে তখন লোকজন ছিল। তাঁর কাছে উপস্থিত লোকেদের মধ্য থেকে একজন বলল, আমি এ ব্যক্তিকে আল্লাহরই উদ্দেশে ভালোবাসি। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি কি তাকে এ কথা জানিয়েছ? লোকটি বলল : না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ উঠো এবং তাকে জানিয়ে দাও। তখন লোকটি উঠে তার নিকট গেল এবং তাকে জানিয়ে দিলো। তখন লোকটি জবাবে বলল, তোমাকে সে সত্তা ভালোবাসবেন, যাঁর সন্তুষ্টির জন্য তুমি আমাকে ভালোবেসেছ।
রাবী [আনাস (রাঃ)] বলেনঃ অতঃপর লোকটি ফিরে এলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন। তখন লোকটি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাই জানাল, যা গমনকারী বলেছে। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি কিয়ামতের দিন ঐ ব্যক্তির সাথে থাকবে, যাকে তুমি ভালোবাসো। আর তুমি তোমার নিয়্যাতের বিনিময় পাবে। [ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) এ হাদীসটি ’’শু’আবুল ঈমানে’’ বর্ণনা করেছেন।][1]
وَعَنْ
أَنَسٍ قَالَ: مَرَّ رَجُلٌ بِالنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَعِنْدَهُ نَاسٌ. فَقَالَ رَجُلٌ ممَّنْ عِنْده: إِني لأحب هَذَا فِي اللَّهِ. فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَعْلَمْتَهُ؟» قَالَ: لَا. قَالَ: «قُمْ إِلَيْهِ فَأَعْلِمْهُ» . فَقَامَ إِلَيْهِ فَأَعْلَمَهُ فَقَالَ: أَحَبَّكَ الَّذِي أَحْبَبْتَنِي لَهُ. قَالَ: ثُمَّ رَجَعَ. فَسَأَلَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَخْبَرَهُ بِمَا قَالَ. فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَنْتَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكَ مَا احْتَسَبْتَ» رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ» . وَفِي رِوَايَةِ التِّرْمِذِيِّ: «الْمَرْءُ مَعَ من أحبَّ ولَه مَا اكْتسب»
ব্যাখ্যাঃ (الْمَرْءُ مَعَ من أحبَّ) অর্থাৎ হাশরের মাঠে তুমি তার সাথে থাকবে যাকে তুমি ভালোবাস। এর কারণ হলো মানব জাতি অনুকরণপ্রিয়। যে যাকে ভালোবাসে তার নীতি, আদর্শ অনুসরণ করে ও তা জীবনে বাস্তবায়ন করে। সে জন্য কিয়ামতের দিনেও সে তার বন্ধু হবে। মহান আল্লাহ বলেন, وَمَنْ يُطِعِ اللهَ وَالرَّسُولَ فَأُولٰئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللهُ عَلَيْهِمْ ‘‘আর যারা রসূলের অনুসরণ করেন তারা (কিয়ামতের দিন) তাদের সাথে থাকবে যাদেরকে আল্লাহ অনুগ্রহ (নি‘আমাত) দান করেছেন’’- (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪ : ৬৯)।
অত্র হাদীসটি দ্বারা বাহ্যিকভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, তোমরা নেক ও সৎ বন্ধুদের সাথে বন্ধুত্ব কর, তাহলে তোমরা কিয়ামতের দিন তাদের সাথে থাকতে পারবে। যেমনটি অন্য একটি হাদীসে এসেছে- الْمَرْءُ عَلٰى دِينِ خَلِيلِه ‘‘ব্যক্তি (মানুষ) তার বন্ধুর ধর্মের উপর থাকে’’- (আবূ দাঊদ হাঃ ৪৮৩৩)। বাহ্যিকভাবে হাদীসটির মধ্যে উৎসাহ ও ভীতি এবং সতর্ক ও সাবধনতা রয়েছে।
(وَلَكَ مَا احْتَسَبْتَ) মুল্লা ‘আলী কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ অর্থাৎ সৎ নিয়্যাত দ্বারা যা অর্জন করেছ তার প্রতিদান। আর الاحتساب (আল ইহতিসাব) বলা হয় সাওয়াব বা প্রতিদান কামনা করাকে। احتساب শব্দের অর্থ হলো কোন বস্তুকে হিসাব বা গণনার মধ্যে রাখা। আর পরিভাষায় মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোন কাজ করাকে إحْتِسَابُ بِالْعَمَل বলে। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৩৮৬)
পরিচ্ছেদঃ ১৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ তা‘আলার জন্য বান্দার প্রতি ভালোবাসা
৫০১৮-[১৬] আবূ সা’ঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন, তিনি বলেন, মু’মিন ব্যতীত অন্য কাউকে বন্ধু বানাবে না এবং তোমার খাদ্য আল্লাহভীরু লোক ছাড়া যেন অন্য কেউ না খায়। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ ও দারিমী)[1]
وَعَن
أبي سعيد أَنَّهُ سَمِعَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «لَا تُصَاحِبْ إِلَّا مُؤْمِنًا وَلَا يَأْكُلْ طَعَامَكَ إِلَّا تَقِيٌّ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ والدارمي
ব্যাখ্যাঃ (لَا تُصَاحِبْ إِلَّا مُؤْمِنًا) অর্থাৎ পূর্ণ ঈমানদার ছাড়া তুমি কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে না। কারো সাথে চলবে না। এ কথার উদ্দেশ্য হলো তুমি কোন কাফির বা মুনাফিকের সাথে বন্ধুত্ব রাখবে না। কেননা তাদের সাথে বন্ধুত্ব রাখলে দীনের ক্ষতি হয়। তারা মুসলিমের দীনের ক্ষতি করে, বিশেষ করে মুনাফিক ব্যক্তি দীনের ক্ষতি সাধনে মারাত্মক ভূমিকা রাখে। অত্র হাদীসে মু’মিন দ্বারা মুসলিম জাতি উদ্দেশ্য।
(وَلَا يَأْكُلْ طَعَامَكَ إِلَّا تَقِيٌّ) অর্থাৎ আল্লাহভীরু তাকওয়াবান লোক ব্যতীত তোমার খাবার যেন কেউ না খায়। আল্লাহভীরুকে ছাড়া তুমি কাউকে খেতে দিবে না। যাতে সে তোমার খাবার খেয়ে যে শক্তি যোগায় তা যেন আল্লাহর ‘ইবাদাতে ব্যয় করতে পারে। পক্ষান্তরে কোন কাফির বা মুনাফিক তোমার দেয়া খাবার খেয়ে যেন শক্তি যুগিয়ে তা আল্লাহর অবাধ্যতার কাজে ব্যয় না করতে পারে। অত্র হাদীসে মুত্তাক্বীকে খাবার খাওয়ানোর কথা বললেও বাহ্যিকভাবে বুঝা যায় যে, যিনি খাবার খাওয়াবেন তাকেও মুত্তাক্বী হওয়ার নির্দেশ প্রদান করছে। কারণ মুত্তাক্বী ব্যক্তির বন্ধুত্ব মুত্তাক্বী ছাড়া অন্য কারো সাথে হতে পারে না। আরো একটি বিষয় হাদীসটি হতে বুঝা যায় তা হলো, মুত্তাক্বী ছাড়া কাউকে খাবার খাওয়াবে না। এটা দা‘ওয়াত খাওয়ানো ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। প্রয়োজনের খাবারের জন্য প্রযোজ্য নয়। এ দিকে ইঙ্গিত করে মহান আল্লাহ বলেন, وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلٰى حُبِّه# مِسْكِينًا وَّيَتِيمًا وَّأَسِيرًا ‘‘তারা আল্লাহ ভালোবাসায় অভাবগ্রস্ত, ইয়াতীম ও বন্দীকে আহার্য দান করে’’- (সূরাহ্ ইনসান ৭৬ : ৮)। এ আয়াতটি প্রমাণ করে যে, বন্দী হয়ে যারা আসত তারা সবাই ছিল কাফির, মু’মিন নয়। অথচ প্রয়োজনের কারণে তাদের খাবার খাওয়ানোকে আল্লাহ প্রশংসা করেছেন। এখান থেকে বুঝা গেল, অমুসলিমরা অভাবী হলে তাদেরকে খাওয়ানো দোষের কিছু নয়। কিন্তু অমুসলিমদের সাথে বন্ধুত্ব হারাম।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ অত্র হাদীসটিতে মুত্তাক্বী ব্যক্তি ছাড়া অন্যকে খাবার খাওয়াতে নিষেধ করা হয়নি বরং হাদীস দ্বারা উদ্দেশ্য হলো তুমি সেই খাবার থেকে দূরে থাকবে যা মুক্তাক্বী ব্যক্তি হারাম হওয়ার ভয়ে না খায়। অর্থাৎ তুমি হারাম খাবার খাওয়াবে না যা মুত্তাক্বীরা খায় না। আর মুত্তাক্বীরা যাদের থেকে দূরে থাকে তাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে না। এর অর্থ হলো- لَا تُصَاحِبْ إِلَّا مُطِيْعًا وَلَا تُخَالِلْ إِلَّا تَقِيًّا তুমি অনুগত বান্দা ব্যতীত কারো সাথে বন্ধত্ব করো না, আর তুমি মুত্তাক্বী ব্যতীত কারো সাথে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব করো না।
(তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৩৯৫; ‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৮২৪; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ তা‘আলার জন্য বান্দার প্রতি ভালোবাসা
৫০১৯-[১৭] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মানুষ তার বন্ধুর আদর্শে গড়ে উঠে। সুতরাং তার বন্ধু নির্বাচনের সময় এ বিষয়ে খেয়াল রাখা উচিত, সে কাকে বন্ধু নির্বাচন করছে। (তিরমিযী, আহমাদ ও বায়হাক্বী)[1]
ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান গরীব। আর ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এর বর্ণনাসূত্র সহীহ।
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْمَرْءُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلْ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَالْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ» وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ. وَقَالَ النَّوَوِيُّ: إِسْنَادُهُ صَحِيحٌ
ব্যাখ্যাঃ (الْمَرْءُ عَلٰى دِينِ خَلِيلِه) অর্থাৎ বেশির ভাগ সময়ে মানুষ তার বন্ধুর আদর্শে গড়ে ওঠে। আদর্শের মিল ছাড়া কখনও প্রকৃত বন্ধুত্ব হতে পারে না। বন্ধুত্ব করার সময় লোকটিকে দেখে নিতে হবে। যদি সে ফাসিক, পাপী এবং দুনিয়াদার হয়, তবে তার সাথে বন্ধুত্ব করবে না। কারণ তার মধ্যেও সেই স্বভাব প্রসারিত হতে পারে।
(فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلْ) এর অর্থ হল। কারো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করার পূর্বে লক্ষ্য করতে হবে, কার সাথে বন্ধুত্ব করা হচ্ছে। সে কিরূপ লোক। তার চরিত্র কিরূপ, সে কি ‘আক্বীদাহ্ বিশ্বাস করে। অর্থাৎ এসব দিক বিবেচনা করে ও দেখেশুনে বন্ধুত্ব করা উচিত। কারণ মহান আল্লাহ বলেন, يٰاَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ ‘‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যপন্থীদের অন্তর্ভুক্ত হও’’- (সূরাহ্ আত্ তাওবাহ্ ৯ : ১১৯)। ইমাম গাযালী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ লোভী ব্যক্তির সাথে উঠাবসা করলে নিজের লোভও বৃদ্ধি পায়। আর দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তির সাথে চলাফেরা করলে দুনিয়ার প্রতি নিজের আকর্ষণ কমে আখিরাতের কথা বেশি মনে হয়। এর কারণ হলো কারো অনুসরণ করাটা নিজের জ্ঞানকে সেদিকেই নিয়ে যায়। অনুসরণকারী তার অনুসরণীয় ব্যক্তির প্রতি ভক্তির কারণে নিজের চিন্তাশক্তিকে হারিয়ে ফেলে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ তা‘আলার জন্য বান্দার প্রতি ভালোবাসা
৫০২০-[১৮] ইয়াযীদ ইবনু না’আমাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন কোন মানুষ কোন মানুষের সাথে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করে, সে যেন তার নাম, তার পিতার নাম এবং কোন্ গোত্রে জন্মলাভ করেছে তা জিজ্ঞেস করে নেয়। কেননা এটা বন্ধুত্বকে সুদৃঢ় করে। (তিরমিযী)[1]
وَعَن
يزِيد بن نَعامة قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا آخَى الرَّجُلُ الرَّجُلَ فَلْيَسْأَلْهُ عَنِ اسْمِهِ وَاسْمِ أَبِيهِ وَمِمَّنْ هُوَ؟ فَإِنَّهُ أَوْصَلُ للمودَّة» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ (إِذَا آخَى الرَّجُلُ الرَّجُلَ) অর্থাৎ যখন কোন ব্যক্তি কোন মু’মিন ব্যক্তিকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বন্ধু হিসেবে ভ্রাতৃত্ব গড়ে তুলবে। এ ভ্রাতৃত্ব হবে দীনের ভ্রাতৃত্ব, যা রক্তের সম্পর্কের চেয়ে মজবুত। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(فَإِنَّهٗ أَوْصَلُ للمودَّة) যখন কোন ব্যক্তি কারো সাথে বন্ধুত্ব সূত্রে আবদ্ধ হতে চায় অথবা কাউকে হৃদয়ের অতি আপন বানাতে চায়, তাহলে তার উচিত হবে সেই ব্যক্তির জীবনবৃত্তান্ত অবহিত হওয়া এবং তার পূর্ণ পরিচয় অবগত থাকা। এতে একে অপরের সুখে দুঃখে পাশে দাঁড়াতে পারবে এবং পরস্পরের ভ্রাতৃত্ব আরো মজবুত ও দৃঢ় হবে। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ১৬. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ তা‘আলার জন্য বান্দার প্রতি ভালোবাসা
৫০২১-[১৯] আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে এসে বললেনঃ তোমরা কি জানো, আল্লাহ তা’আলার কাছে কোন্ কাজ সবচেয়ে বেশি প্রিয়? কেউ কেউ বলল: সালাত ও যাকাত, আর কেউ কেউ বলল: জিহাদ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলার কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয় কাজ হলো, একমাত্র আল্লাহরই উদ্দেশে কাউকে ভালোবাসা এবং একমাত্র আল্লাহ তা’আলার উদ্দেশে কাউকে ঘৃণা করা। [আহমাদ ও আবূ দাঊদ;[1] আর ইমাম আবূ দাঊদ (রহিমাহুল্লাহ) শুধু শেষ বাক্যটি বর্ণনা করেন।]
عَنْ أَبِي
ذَرٍّ قَالَ: خَرَجَ عَلَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «أَتَدْرُونَ أَيُّ الْأَعْمَالِ أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ تَعَالَى؟» قَالَ قَائِلٌ: الصَّلَاةُ وَالزَّكَاةُ. وَقَالَ قَائِلٌ: الْجِهَادُ. قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ أَحَبَّ الْأَعْمَالِ إِلَى اللَّهِ تَعَالَى الْحُبُّ فِي اللَّهِ وَالْبُغْضُ فِي اللَّهِ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَرَوَى أَبُو دَاوُد الْفَصْل الْأَخير
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে এক ব্যক্তি আছে যার নাম জানা যায় না, ‘‘ইয়াযীদ ইবনু আবূ যিয়াদ’’ ইনি হাশিমী য‘ঈফ। দেখুন- য‘ঈফাহ্ ১৮৩৩।
ব্যাখ্যাঃ أَتَدْرُونَ أَيُّ الْأَعْمَالِ أَحَبُّ إِلَى اللهِ تَعَالٰى؟ অর্থাৎ কোন প্রকারের ‘ইবাদাত আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় তা কি তোমরা জান। এও বলা হয়েছে যে, প্রিয় বস্তু বা ভালোবাসার বস্তু আফযাল বা সর্বোত্তম হওয়াকে আবশ্যক করে না। যেমনটি বলা যায়, মানুষের নিকট তাদের সন্তানাদি অধিক প্রিয় তবে তা সর্বোত্তম জিনিস নয়। আবার অনেকের নিকট ‘ইলম মুত্বালা‘আহ্ বা অধ্যয়ন অধিক প্রিয় কিন্তু তা আফজাল বা সর্বোত্তম জিনিস নয়।
(الْحُبُّ فِي اللهِ وَالْبُغْضُ فِي اللهِ) অত্র হাদীসটিকে শক্তিশালী করে নবী ও রসূলদের ঈর্ষান্বিত হওয়ার হাদীসটি। এ হাদীসটি ফরয কার্যাবলী সম্পাদন করার পর অতিরিক্ত ‘আমলের মধ্যে সর্বোত্তম কাজ। ইসলামী শারী‘আতে যে সকল কাজ সম্পাদন করতে বলা হয়েছে তা পালন করা ও যে সকল কাজ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে তা থেকে বিরত থাকার পরে নফল ‘আমলের মধ্যে সর্বোত্তম ‘আমল হলো একমাত্র আল্লাহরই উদ্দেশে কাউকে ভালোবাসা এবং একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার উদ্দেশে কাউকে ঘৃণা করা। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
হাদীসের শিক্ষা ও বাস্তব প্রয়োগ : অত্র হাদীসটি হতে আমরা জানতে পারলাম যে, কাউকে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালোবাসা ও কাউকে মহান আল্লাহকে খুশী করার জন্য ঘৃণা করা উত্তম কাজ। এ হাদীসের শিক্ষা যদি সমাজে প্রয়োগ করা হয়, বিশেষ করে নেতৃত্ব স্থানীয় ব্যক্তিগণ যদি এ হাদীসের প্রয়োগ সমাজে চালু রাখেন তবে আমাদের সমাজটা সুখে-শান্তিতে ভরে যেত। মহান আল্লাহ আমাদেরকে সুমতি দান করুন। আমীন। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ১৬. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ তা‘আলার জন্য বান্দার প্রতি ভালোবাসা
৫০২২-[২০] আবূ উমামাহ্ আল বাহিলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে বান্দা কোন বান্দাকে একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশেই ভালোবাসল, সে যেন প্রতিপালক মহীয়ান-গরীয়ানকেই সম্মান করল। (আহমাদ)[1]
وَعَنْ أَبِي
أُمَامَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا أَحَبَّ عَبْدٌ عَبْدًا لِلَّهِ إِلَّا أَكْرَمَ رَبَّهُ عَزَّ وَجَلَّ» . رَوَاهُ أَحْمد
ব্যাখ্যাঃ হাদীসটিতে বলা হয়েছে, যে বান্দা কোন বান্দাকে একমাত্র আল্লাহরই উদ্দেশেই ভালোবাসল, সে যেন প্রতিপালক মহীয়ান গরীয়ানকেই ভালোবাসল। সুতরাং মুসলিমদের পরস্পরের মাঝে ভালোবাসা সৃষ্টি করাই এ হাদীসটির দাবী। বিশেষ করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীদেরকে ভালোবাসা ঈমানের দাবী। যে নেককার বান্দা আল্লাহকৃত ফরয কাজগুলোকে ফরয জানল আর হারাম কাজগুলোকে হারাম জানল তাকে ভালোবাসাও একজন মুসলিমের ঈমানের দাবী। আমাদের সকলের উচিত অত্র হাদীসের শিক্ষাকে জীবনে বাস্তবায়িত করার আপ্রাণ চেষ্টা করা। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ১৬. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ তা‘আলার জন্য বান্দার প্রতি ভালোবাসা
৫০২৩-[২১] আসমা বিনতু ইয়াযীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন যে, আমি কি তোমাদেরকে বলে দেব না যে, তোমাদের মধ্যে ভালো লোক কে? সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞেস করলেনঃ জ্বী হ্যাঁ, হে আল্লাহর রসূল! তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তোমাদের মধ্যে ভালো লোক সে ব্যক্তি, যাকে দেখলে আল্লাহ তা’আলার কথা স্মরণে আসে। (ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَن أَسمَاء
بنت يزِيد أَنَّهَا سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «أَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِخِيَارِكُمْ؟» قَالُوا: بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ: «خِيَارُكُمُ الَّذِينَ إِذَا رُؤوا ذُكِر الله» رَوَاهُ ابْن مَاجَه
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে বর্ণনাকারী ‘‘শাহ্র ইবনু হাওশাব’’, সে খুব বেশি ভুল করত। দেখুন- হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৪৪৪ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ কোন লোক যখন পরিপূর্ণ সুন্নতী তরীকায় তার জীবন পরিচালনা করে তখন তাকে দেখলে পরকালের কথা, আল্লাহর সামনে একদিন দাঁড়াতে হবে, আল্লাহ সবকিছু দেখছেন- এসব কথা স্মরণ হয়। কেননা, কোন লোক যখন আল্লাহর ভয়ে ভীত তথা মুত্তাক্বী হয় তখন সে আল্লাহকে ভয় করে হারাম কাজ থেকে বিরত থাকে আর হালাল বা নির্দেশিত কাজগুলো পালন করার আপ্রাণ চেষ্টা করে। ফলে আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়, আল্লাহর কথা তাদেরও স্মরণ হয়ে যায়। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ১৬. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ তা‘আলার জন্য বান্দার প্রতি ভালোবাসা
৫০২৪-[২২] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যদি দু’জন ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহ মহীয়ান-গরীয়ানের উদ্দেশে একে অপরকে ভালোবাসে, তন্মধ্যে একজন পূর্বদেশীয় বাস করে এবং অপরজন পাশ্চাত্যে বাস করে, আল্লাহ তা’আলা উভয়কে কিয়ামতের দিন একত্র করে বলবেন, এ সেই ব্যক্তি, যাকে তুমি আমার জন্য ভালোবাসতে।[1]
وَعَنْ أَبِي
هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَوْ أَنَّ عَبْدَيْنِ تَحَابَّا فِي اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ وَاحِدٌ فِي الْمَشْرِقِ وَآخَرُ فِي الْمَغْرِبِ لَجَمَعَ اللَّهُ بَيْنَهُمَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ. يَقُولُ: هَذَا الَّذِي كُنْتَ تُحِبُّهُ فِي
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘হাকীম ইবনু নাফি‘’’। যাহাবী বলেছেনঃ আযদী বলেন, হাকীম ইবনু নাফি‘ মাতরূক বা পরিত্যক্ত। দেখুন- হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৪৪৪ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীসটিতে বলা হলো কেউ যদি কাউকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালোবাসে, যদিও তারা অনেক দূরে অবস্থান করে আল্লাহ তাদেরকে কিয়ামতের দিনে পরিচয় করিয়ে দিবেন। আল্লাহ নিজে পরিচয় করিয়ে দেয়ার ঘোষণা দিলেন, যদি তারা পরস্পরে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একে অন্যকে ভালোবাসে। হাদীসটি হতে বুঝা গেল- ভালোবাসা হতে হবে আল্লাহকে রাজি-খুশি করার জন্য। এও বুঝা যাচ্ছে যে, না দেখেও দূর থেকে ভালোবাসা হয়। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ১৬. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ তা‘আলার জন্য বান্দার প্রতি ভালোবাসা
৫০২৫-[২৩] আবূ রযীন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ হে আবূ রযীন! আমি কি তোমাকে ঐ দীনী কাজের শেকড় সম্পর্কে বলে দেব, যা দ্বারা তুমি দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ লাভ করতে পারবে? তুমি আল্লাহকে জিকরকারীদের বৈঠকে অবশ্যই বসবে। আর যখন একা থাক, তখন যতটা সম্ভব আল্লাহর যিকরে নিজের রসনাকে নাড়াতে থাক। একমাত্র আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টির জন্যই কাউকে ভালোবাসবে এবং আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টির জন্যই কাউকে ঘৃণা করবে। হে আবূ রযীন! তুমি কি জানো, যখন কোন ব্যক্তি তার কোন মুসলিম ভাইয়ের সাথে দেখা-সাক্ষাতের উদ্দেশে ঘর থেকে বের হয়, তখন সত্তর হাজার মালাক (ফেরেশতা) তার জন্য দু’আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং বলে, হে রব্! এ ব্যক্তি একমাত্র তোমারই সন্তুষ্টির জন্য সাক্ষাৎ করল, তুমি তাকে তোমার রহমত ও কল্যাণ দ্বারা পরিপূর্ণ করে দাও। সুতরাং তোমার পক্ষ যদি সম্ভব হয় তোমার কোন মুসলিম ভাইয়ের সাক্ষাতে যাওয়া, তবে এরূপ করবে। অর্থাৎ- মুসলিম ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করবে।[1]
وَعَن أبي
رَزِينٍ أَنَّهُ قَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَلَا أَدُلُّكَ عَلَى مِلَاكِ هَذَا الْأَمْرِ الَّذِي تُصِيبُ بِهِ خَيْرَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ؟ عَلَيْكَ بِمَجَالِسِ أَهْلِ الذِّكْرِ وَإِذَا خَلَوْتَ فَحَرِّكْ لِسَانَكَ مَا اسْتَطَعْتَ بِذِكْرِ اللَّهِ وَأَحِبَّ فِي اللَّهِ وَأَبْغِضْ فِي اللَّهِ يَا أَبَا رَزِينٍ هَلْ شَعَرْتَ أَنَّ الرَّجُلَ إِذَا خَرَجَ مَنْ بَيْتِهِ زَائِرًا أَخَاهُ شَيَّعَهُ سَبْعُونَ أَلْفَ مَلَكٍ كُلُّهُمْ يُصَلُّونَ عَلَيْهِ وَيَقُولُونَ: رَبَّنَا إِنَّهُ وَصَلَ فِيكَ فَصِلْهُ؟ فَإِنِ اسْتَطَعْتَ أَنْ تُعْمِلَ جَسَدَكَ فِي ذَلِك فافعل
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘আমর ইবনু হাসান’’ নামের একজন বর্ণনাকারী আছেন যিনি মাতরূক। দেখুন- হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৪৪৫ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ (عَلَيْكَ بِمَجَالِسِ أَهْلِ الذِّكْرِ) অর্থাৎ যে সকল লোক আল্লাহকে স্মরণকারী তাদেরকে আঁকড়ে থাক। কেননা তারা জান্নাতের বাগান। যেমনি ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) আনাস (রাঃ) হতে মারফূ‘ সূত্রে বর্ণনা করেছেন, إِذَا مَرَرْتُمْ بِرِيَاضِ الْجَنَّةِ فَارْتَعُوا قَالُوا: يَا رَسُولَ اللهِ! وَمَا رِيَاضُ الْجَنَّةِ؟ قَالَ: الذِّكْرُ
হাদীসটির অর্থ হলো, ‘‘যখন তোমরা দেখবে কোন জামা‘আত আল্লাহর জিকর-আযকার করছে তখন তোমরাও জিকর-আযকারে লিপ্ত হবে। যাতে তোমরা তাদের মতো হতে পার। কারণ তারা জান্নাতের বাগানে রয়েছে।’’ আবূ হুরায়রা হতে মারফূ‘ভাবে অন্য আরেকটি হাদীসে এসেছে-
ِإِذَا مَرَرْتُمْ بِرِيَاضِ الْجَنَّةِ فَارْتَعُوا قُلْتُ: وَمَا رِيَاضُ الْجَنَّةِ؟ قَالَ: "الْمَسَاجِدُ" قُلْتُ: وَمَا الرَّتْعُ يَا رَسُولَ اللهِ: سُبْحَانَ اللهِ وَالْحَمْدُ لِلّٰهِ وَلَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ وَاللهُ أَكْبَرُ
অর্থ : যখন তোমরা কোন জান্নাতের বাগান দিয়ে অতিক্রম করবে তখন তোমরা তাতে অংশগ্রহণ করবে। আমি বললাম, জান্নাতের বাগান কি? তিনি বললেন, মসজিদসমূহ। আমি বললামঃ তাহলে الرْتَعُوا (রত্‘উ) কি? তিনি বললেনঃ সুবহা-নাল্ল-হ, আল হামদুলিল্লা-হ, লা- ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ আল্ল-হু আকবার। (তিরমিযী ৩৫০৯)
হাদীসের ভাষ্যকার বলেনঃ হাদীসটি স্থান ও যিকরের জন্য মুতলাক বা অনির্দিষ্ট। তবে অনির্দিষ্টকে নির্দিষ্টের উপর প্রয়োগ করেছেন। এটা মীরাক উল্লেখ করেছেন।
সঠিক কথা হলো উল্লেখিত, ‘মসজিদ’ ও ‘জিকর’ শব্দটা তিনি উল্লেখ করেছেন দৃষ্টান্ত দেয়ার জন্য। উত্তম মসজিদ হলো যাতে উত্তম মাজলিস হয়। সম্ভাবনা আছে যে, তিনি মসজিদকে নির্দিষ্ট করেছেন তা উত্তম হওয়ার কারণে। হাদীসে আযকার বলতে যাবতীয় সৎকাজ উদ্দেশ্য। তা কুরআনে বর্ণিত যাবতীয় সৎকাজ উদ্দেশ্য। তা কুরআনে বর্ণিত যাবতীয় ভালো কাজকে শামিল করে। বিশেষ করে যেসব মসজিদ উত্তম যাতে ‘আলিম-‘উলামা সহীহ ‘আক্বীদাহ্, সঠিক শারী‘আত, আর্থিক ও দৈহিক ‘ইবাদাত শিক্ষা দেয় এবং যা হালাল হারাম ও সৎকাজে উৎসাহিত করে এবং অসৎ কাজে নিরুৎসাহিত করে সেই মাজলিস উত্তম। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(وَإِذَا خَلَوْتَ فَحَرِّكْ لِسَانَكَ مَا اسْتَطَعْتَ بِذِكْرِ اللهِ) এর সারকথা হলো : তুমি আল্লাহর জিকর থেকে গাফিল থাকবে না, চাই তুমি জনতার মাঝে থাক বা একাকী থাক।
বাযযার সহীহ সনদে ইবনু ‘আব্বাস থেকে মারফূ‘ সূত্রে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন, তা হলো-
قَالَ: قَالَ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالٰى: يَا ابْنَ آدَمَ إِذَا ذَكَرْتَنِي خَالِيًا ذَكَرْتُكَ خَالِيًا، وَإِذَا ذَكَرْتَنِي فِي مَلَأٍ ذَكَرْتُكَ فِي مَلَأٍ خَيْرٍ مِنَ الَّذِىْ ذَكَرْتَنِي فِيهِمْ
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মহান আল্লাহ বলেনঃ হে আদম সন্তান! যখন তুমি আমাকে নির্জনে স্মরণ করবে তখন আমিও তোমাকে নির্জনে স্মরণ করব। আর যখন তুমি আমাকে স্মরণ করবে কোন মাজলিসে তখন আমি তোমাকে তোমার চেয়ে উত্তম মাজলিসে স্মরণ করব। (কাশফুল আসতার ৪/৬, হাদ/৩০৬৫)
অন্য একটি হাদীসে কুদসীতে মহান আল্লাহ বলেনঃ
أَنَا عِنْدَ ظَنِّ عَبْدِي بِي وَأَنَا مَعَهٗ إِذَا ذَكَرَنِي فَإِنْ ذَكَرَنِي فِي نَفْسِه ذَكَرْتُهٗ فِي نَفْسِي وَإِنْ ذَكَرَنِي فِي مَلَإٍ ذَكَرْتُهٗ فِي مَلَإٍ خَيْرٍ
‘‘আমার বান্দা আমার সম্পর্কে যেরূপ ধারণা করে আমি তেমন আর আমি তার সাথে থাকি যখন সে আমাকে স্মরণ করে, যদি সে আমাকে মনে মনে স্মরণ করে তবে আমিও মনে মনে তাকে স্মরণ করি, যদি সে আমাদের কোন মাজলিসে আমাকে স্মরণ করে তবে আমি তাকে তার চেয়ে উত্তম মাজলিসে স্মরণ করি’’- (বুখারী ৭৪০৫, মুসলিম ৪/২০৬৭)। মনে মনে জিকর করাই হলো উত্তম। এটাকে গোপন জিকর বলা হয়। হাদীসটিতে জিহ্বা নাড়ানোর কথা দ্বারা মন ও ঠোট এক সাথে নাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৬. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ তা‘আলার জন্য বান্দার প্রতি ভালোবাসা
৫০২৬-[২৪] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলাম। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জান্নাতে ইয়াকূতের স্তম্ভ রয়েছে, এর উপর পান্নার নির্মিত অট্টালিকা রয়েছে। ঐ অট্টালিকার দরজাসমূহ সদা উন্মুক্ত। এমন উজ্জ্বল ও চকচক করছে যেন উজ্জ্বল তারকা। সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! এতে কারা বাস করবে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ সেসব লোক, যারা একমাত্র আল্লাহ তা’আলার উদ্দেশে পরস্পরকে ভালোবাসে, একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশে পরস্পর বসে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টির জন্য পরস্পর দেখা-সাক্ষাৎ করে। [উপরিউক্ত হাদীস তিনটি ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) ’’শু’আবুল ঈমানে’’ বর্ণনা করেছে।][1]
وَعَنْ أَبِي
هُرَيْرَةَ قَالَ: كُنْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ فِي الْجَنَّةِ لَعُمُدًا مِنْ يَاقُوتٍ عَلَيْهَا غُرَفٌ مِنْ زَبَرْجَدٍ لَهَا أَبْوَابٌ مُفَتَّحَةٌ تُضِيءُ كَمَا يُضِيءُ الْكَوْكَبُ الدُّرِّيُّ» . فَقَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَنْ يَسْكُنُهَا؟ قَالَ: «الْمُتَحَابُّونَ فِي اللَّهِ وَالْمُتَجَالِسُونَ فِي اللَّهِ وَالْمُتَلَاقُونَ فِي اللَّهِ» . رَوَى الْبَيْهَقِيُّ الْأَحَادِيثَ الثَّلَاثَةَ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ»
য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘মুহাম্মাদ ইবনু আবূ হুমায়দ’’ নামের একজন বর্ণনাকারী য‘ঈফ। দেখুন- য‘ঈফাহ্ ১৮৯৭, হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৪৪৫ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ (أَبْوَابٌ مُفَتَّحَةٌ) এর দু’টি অর্থ : তা হলো জান্নাত সম্পূর্ণভাবে ক্ষতি সাধন থেকে নিরাপদ, এটা সম্পূর্ণমুক্ত বিধায় এর দ্বার সর্বদা উন্মুক্ত। অথবা (أَبْوَابٌ مُفَتَّحَةٌ) এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে, জান্নাত স্বীয় দ্বার খোলা রেখে তার অধিবাসীর আগমন অপেক্ষায় আকুল হয়ে রয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(كَمَا يُضِيءُ الْكَوْكَبُ الدُّرِّيُّ) তাফসীরকারক ইমাম বায়যাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, মহান আল্লাহ বলেছেনঃ كَأَنَّهَا كَوْكَبٌ دُرِّيٌّ ‘‘...কাঁচটি যেন একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র...’’- (সূরাহ্ আন্ নূর ২৪ : ৩৫)। অর্থাৎ উজ্জ্বল আলোকরশ্মি দ্বারা সজ্জিত যেন মতিতুল্য। এটাকে পরিস্ফূটিত হওয়ার কারণে মতির সাথে সাদৃশ্য দেয়া হয়েছে। কারণ আলোর কারণে সে অন্ধকারকে দূরীভূত করে দেয়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - সাক্ষাৎ ত্যাগ, সম্পর্কচ্ছেদ ও দোষান্বেষণে নিষেধাজ্ঞা
৫০২৭-[১] আবূ আইয়ূব আল আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন মুসলিম ব্যক্তির জন্য এটা বৈধ নয় যে, সে তিনদিনের বেশি সময় অপর কোন মুসলিম ভাইকে ত্যাগ করে। তারা কোথাও একে অপরের মুখোমুখি হলে একজন এদিকে মুখ ফিরিয়ে নেবে এবং অপরজন ওদিকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। তাদের দু’জনের মধ্যে উত্তম সে ব্যক্তি, যে প্রথমে সালাম করে কথাবার্তা আরম্ভ করে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يُنْهٰى عَنْهُ مِنَ التَّهَاجِرُ وَالتَّقَاطُعِ وَاتِّبَاعِ الْعَوْرَاتِ
عَنْ أَبِي أَيُّوبَ الْأَنْصَارِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَحِلُّ لِلرَّجُلِ أَنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ فَوْقَ ثَلَاثِ لَيَالٍ يَلْتَقِيَانِ فَيعرض هَذَا ويعرض هذاوخيرهما الَّذِي يبْدَأ بِالسَّلَامِ» . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ (أَنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ) এই ভাই দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মুসলিম ভাই। আর এ ভাইয়ের সম্পর্ক আত্মীয়তার সূত্রে ভাই বা রক্ত সম্পর্কের ভাই বা সঙ্গী-সাথী যা ভাই এর চেয়ে ব্যাপক।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ ভাই দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ইসলামী ভাই তথা মুসলিম ভাই। আর এখান থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, যদি কেউ এ ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ছিন্ন করে তবে তার সাথে তিনদিনের বেশি সময় কথা না বলা জায়িয। তখন তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা ওয়াজিব। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(فَوْقَ ثَلَاثِ) এখান থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, তিনদিনের কম সময় ত্যাগ করা (কথা বন্ধ করা) বৈধ আছে। আর এ সময়ে যেন সে নমনীয় হতে পারে। কারণ মানুষের স্বভাব হলো রেগে যাওয়া এবং মন্দ চরিত্রের হওয়া ইত্যাদি। তবে রাগ যতই হোক না কেন তাকে তিনদিনের মধ্যে তা দূর করতে হবে। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬০৭৭)
(وخيرهما الَّذِىْ يبْدَأ بِالسَّلَامِ) বেশির ভাগ ‘উলামা বলেছেনঃ কেউ যদি তার ভাইকে সালাম দেয় ও সালামের জওয়াব নেয় তবে পরিত্যাগ করা দূর হয়ে যাবে।
ইমাম আহমাদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ পরিত্যাগ করা হতে সে অত সময় মুক্ত হবে না যতক্ষণ না সে পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে আসে। তিনি আরো বলেনঃ তার মুসলিম ভাইয়ের সাথে কথা বন্ধ করা যদি তাকে (সে ভাইকে) কষ্ট দেয় তবে শুধু সালাম দিলে পরিত্যাগকারী الهجرة দূর হবে না। ইবনুল কাসিমও এরূপ বলেছেন।
কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ যখন সে কথা বলা থেকে দূরে থাকবে তখন আমাদের নিকট তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা যাবে না। যদিও সে তাকে সালাম দিক না কেন। অর্থাৎ তার কথাটি ইবনুল কাসিম (রহিমাহুল্লাহ)-এর কথাকে শক্তিশালী করেছে।
ইবনু হাজার ‘আসকালানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আমি বলছি, তার সাক্ষ্য গ্রহণের ব্যাপারে মতপার্থক্য আছে। আর তার সাথে কথা বলা ছেড়ে দেয়াটা বুঝা যায় যে, তার মনে তার প্রতি কোন রাগ আছে। সুতরাং তার সাক্ষ্য কবুল হবে না। যদি সে তিনদিনের ভিতরে তার সাথে সালাম বিনিময় করে তবে পরিত্যাগ করাটা চলে যাবে। আর জামহূর ‘উলামা দলীল পেশ করেন, ‘ত্ববারানী’র যায়দ ইবনু ওয়াহ্ব-এর সূত্রে ইবনু মাস্‘ঊদ হতে একটি মাওকূফ হাদীস। আর তাতে আছে, ورجوعه أن يأتي فيسلم عليه আর তার ফিরে আসা হলো সে এসে তাকে সালাম করবে। (ফাতহুল রাবী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬০৭৭)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - সাক্ষাৎ ত্যাগ, সম্পর্কচ্ছেদ ও দোষান্বেষণে নিষেধাজ্ঞা
৫০২৮-[২] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা কোন বস্তু বা ব্যক্তি সম্পর্কে কুচিন্তা থেকে বেঁচে থাকো। কেননা কুচিন্তা সবচেয়ে মিথ্যা। কারো খারাপ বা দোষের খবর জানার চেষ্টা করো না, গোয়েন্দাগিরি করো না, আর একজনের দরের উপর দিয়ে মাল দর করো না। পরস্পরের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা রেখ না, আর পরোক্ষ নিন্দাবাদে একে অপরের পিছনে লেগো না; বরং তোমরা সকলেই আল্লাহর বান্দা, ভাই ভাই হয়ে থাকবে। অপর এক রিওয়ায়াতে আছে, পরস্পরে লোভ-লালসা করো না। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يُنْهٰى عَنْهُ مِنَ التَّهَاجِرُ وَالتَّقَاطُعِ وَاتِّبَاعِ الْعَوْرَاتِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِيَّاكُمْ وَالظَّنَّ فَإِنَّ الظَّنَّ أَكْذَبُ الْحَدِيثِ وَلَا تَحَسَّسُوا وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا تَنَاجَشُوا وَلَا تَحَاسَدُوا وَلَا تَبَاغَضُوا وَلَا تَدَابَرُوا وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا» . وَفِي رِوَايَة: «وَلَا تنافسوا» . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ (إِيَّاكُمْ وَالظَّنَّ فَإِنَّ الظَّنَّ) অর্থাৎ তোমরা ধারণার অনুসরণ করা থেকে সাবধান থাক অথবা তোমরা কুচিন্তা থেকে সাবধান থাক। আর কুচিন্তা হলো একটি অপবাদ যা অন্তরে পতিত হয়, যার কোন দলীল থাকে না। এর দ্বারা উদ্দেশ্য এটা নয় যে, ধারণা করে সেই ‘আমল ছেড়ে দিবে যার দ্বারা বেশির ভাগেই হুকুম-আহকাম সাব্যস্ত হয়। বরং উদ্দেশ্য হলো সেই অবাস্তব কুচিন্তাকে ত্যাগ করবে, যা কুচিন্তাকারীর ক্ষতি করে।
(أَكْذَبُ الْحَدِيثِ) অর্থাৎ- এ মিথ্যা কথা হলো অন্তরের মিথ্যা কথা, কারণ এটা মানুষের অন্তরে শয়তানের জাগ্রত করার মাধ্যমে হয়ে থাকে। এখানে কুধারণাকে কথার সাথে সাদৃশ্য করা হয়েছে মাজায বা রূপকথা অর্থে, কারণ কুধারণা থেকেই তা উৎপত্তি হয়।
(وَلَا تَحَسَّسُوا) ইমাম মানবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ অর্থাৎ কারো দোষ-ত্রুটি অনুসন্ধান করো না। যেমন : কান পেতে কারো গোপন কথা শোনা, গোপনে কোন জিনিস দেখা। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৯০৯)
(وَلَا تَنَاجَشُوا) বলা হয়ে থাকে : কোন পণ্য ক্রয় করার আগ্রহ ছাড়াই তার দাম বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্য থাকে, যাতে ক্রেতা ধোকায় পড়ে যায়। দালালী করার কারণে ক্রেতা চড়া দামে পণ্য কেনায় আগ্রহী হয়। এ অর্থটিই জামহূর ফুকাহাদের নিকট প্রসিদ্ধ। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(وَلَا تَحَاسَدُوا) অর্থাৎ তোমাদের কেউ যেন কারো নি‘আমাত বা অনুগ্রহ দূর হয়ে যাওয়ার আকাঙক্ষা না করে। যেন মনে মনেও তা না করে আবার প্রকাশ্যভাবেও না করে। মহান আল্লাহ বলেন,
وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللهُ بِه بَعْضَكُمْ عَلٰى بَعْضٍ لِلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِمَّا اكْتَسَبُوا وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِمَّا اكْتَسَبْنَ وَاسْأَلُوا اللهَ مِنْ فَضْلِه
‘‘তোমরা তা কামনা করো না যদ্দ্বারা আল্লাহ তোমাদের কাউকে কারো ওপর মর্যাদা প্রদান করেছেন। পুরুষেরা তাদের কৃতকার্যের অংশ পাবে, নারীরাও তাদের কৃতকর্মের অংশ পাবে...’’- (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪ : ৩২)। অর্থাৎ আল্লাহ যে নি‘আমাত দিয়েছেন তা বা তার অনুরূপ নি‘আমাত যেন কামনা করে। আর এ প্রকার হিংসাকে বলা হয় গিবত্বাহ্। অর্থাৎ অন্যের নি‘আমাত দূর না হওয়ার আকাঙক্ষা করে তার অনুরূপ নি‘আমাত কামনা করা যেমন অন্য একটি হাদীস বলা হয়েছে - لَا حَسَدَ إِلَّا فِي اثْنَتَيْنِ ‘‘দু’টি জিনিস ব্যতীত কোন বিষয়ে হিংসা নেই।’’
(وَلَا تَبَاغَضُوا) অর্থাৎ প্রবৃত্তির ও বিভিন্ন মাযহাবের কারণে তোমরা দলে দলে ভাগ হবে না। কারণ দীনের মধ্যে বিদ্‘আত ও সরল সঠিক পথ থেকে ভ্রষ্টতা শত্রুতাকে ওয়াজিব বা আবশ্যক করে। অনুরূপ বলা হয়েছে, বাহ্যিক দিকল হলো পরস্পর শত্রুতা করতে নিষেধ করা হয়েছে। কেবল দীনের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ককে ঠিক রাখার জন্য। যদি দীনের সম্পর্ক ঠিক না থাকে তবে তার সাথে শত্রুতা রাখা জায়িয। কারণ আল্লাহর উদ্দেশ্য হলো জাতিকে এক করে রাখা। যেমন আল্লাহ বলেন, وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللهِ جَمِيعًا وَّلَا تَفَرَّقُوا ‘‘আল্লাহর রজ্জুকে সমবেতভাবে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না’’- (সূরাহ্ আ-লি ‘ইমরা-ন ৩ : ১০৩)। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, পরস্পরকে ভালোবাসা একতার কারণ, আর পরস্পরকে শত্রু মনে করা বিচ্ছিন্নতাকে আবশ্যক করে। এর অর্থ হলো তোমরা একে অন্যের সাথে শত্রুতা রাখবে না।
(وَلَا تَدَابَرُوا) অর্থাৎ একে অপরের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করো না। কেউ কেউ বলেন, এর অর্থ- তোমরা একে অপরের গীবত বা পরোক্ষ নিন্দাবাদ করো না।
(وَكُونُوا عِبَادَ اللهِ إِخْوَانًا) এর অর্থ হলো : তোমরা আল্লাহর বান্দা হওয়ার দিক দিয়ে সবাই সমান। আর তোমাদের ধর্মও এক। পরস্পর পরস্পরের প্রতি হিংসা, শত্রুতা ও সম্পর্কছেদ করতে তোমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে। অতএব তোমাদের কর্তব্য হলো ভ্রাতৃত্বসুলভ আচরণ করা। ভালোবাসার সম্পর্ক স্থাপন করা, সৎ কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করা এবং প্রত্যেক ভালো কাজে কল্যাণ কামনা করা। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - সাক্ষাৎ ত্যাগ, সম্পর্কচ্ছেদ ও দোষান্বেষণে নিষেধাজ্ঞা
৫০২৯-[৩] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সোমবার ও বৃহস্পতিবার জান্নাতের দরজা খোলা হয় এবং প্রত্যেক বান্দাকে ক্ষমা করা হয় এ শর্তে যে, সে আল্লাহ তা’আলার সাথে কোন কিছুকে অংশীদার করবে না। আর সে ব্যক্তি এ ক্ষমা থেকে বঞ্চিত থেকে যায়, যে কোন মুসলিমের সাথে হিংসা ও শত্রুতা পোষণ করে। মালায়িকাহ্’কে (ফেরেশতাদেরকে) বলা হয় যে, এদের অবকাশ দাও, যেন তারা পরস্পর মীমাংসা করে নিতে পারে। (মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يُنْهٰى عَنْهُ مِنَ التَّهَاجِرُ وَالتَّقَاطُعِ وَاتِّبَاعِ الْعَوْرَاتِ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: تُفْتَحُ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ يَوْمَ الِاثْنَيْنِ وَيَوْمَ الْخَمِيسِ فَيُغْفَرُ لِكُلِّ عَبْدٍ لَا يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا إِلَّا رجلا كَانَتْ بَيْنَهُ وَبَيْنَ أَخِيهِ شَحْنَاءٌ فَيُقَالُ: انْظُرُوا هذَيْن حَتَّى يصطلحا . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ (تُفْتَحُ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ) কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এর অর্থ হলো, সোমবার ও বৃহস্পতিবার মহান আল্লাহ অধিক পরিমাণে ক্ষমা করে দেন এবং রহমত নাযিল করেন, মর্যাদা সমুন্নত করেন আর উত্তম প্রতিদান দেন। এ বাক্যটি স্বীয় প্রকাশ্য অর্থের উপরও প্রযোজ্য হতে পারে। আর জান্নাতের দরজা খোলা হলো তার আলামাত। (শারহুন নাবাবী ১৬শ খন্ড, হাঃ ২৫৬৫)
(حَتّٰى يَصْطَلِحَا) অর্থাৎ দু’জনে সংশোধন করে নেয় আর তাদের মধ্যকার হিংসা-বিদ্বেষকে দূর করে নেয়। যদি তারা সুনাম ও লোকদেখানোর জন্য মীমাংসা করে তবে তা কোন উপকারে আসবে না। মূল কথা হলো খাটি অন্তরে প্রত্যেককে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। যাতে তার অন্তর থেকে হিংসা শত্রুতা দূর হয়, তার সাথী সংশোধন হোক বা না হোক সেটা দেখার বিষয় না। মহান আল্লাহ ভালো জানেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - সাক্ষাৎ ত্যাগ, সম্পর্কচ্ছেদ ও দোষান্বেষণে নিষেধাজ্ঞা
৫০৩০-[৪] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রত্যেক সপ্তাহে দু’বার (অর্থাৎ- সোমবার ও বৃহস্পতিবার) বান্দার কার্যাবলী আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয় এবং প্রত্যেক মু’মিন বান্দাকে ক্ষমা করা হয়; কিন্তু ঐ বান্দাকে ক্ষমা করা হয় না, যে নিজে কোন মুসলিম ভাইয়ের সাথে শত্রুতা পোষণ করে। তার সম্পর্কে বলে দেয়া হয় যে, তাদেরকে সময় দাও, যাতে তারা পরস্পর আপোষ হতে পারে। (মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يُنْهٰى عَنْهُ مِنَ التَّهَاجِرُ وَالتَّقَاطُعِ وَاتِّبَاعِ الْعَوْرَاتِ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: تُعْرَضُ أَعْمَالُ النَّاسِ فِي كُلِّ جُمُعَةٍ مَرَّتَيْنِ يَوْمَ الِاثْنَيْنِ وَيَوْمَ الْخَمِيسِ فَيُغْفَرُ لِكُلِّ مُؤْمِنٍ إِلَّا عبدا بَينه بَين أَخِيهِ شَحْنَاءُ فَيُقَالُ: اتْرُكُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَفِيئَا . رَوَاهُ مُسلم
পরিচ্ছেদঃ ১৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - সাক্ষাৎ ত্যাগ, সম্পর্কচ্ছেদ ও দোষান্বেষণে নিষেধাজ্ঞা
৫০৩১-[৫] উম্মু কুলসূম বিনতু ’উকবাহ্ ইবনু আবূ মু’আয়ত (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, ঐ ব্যক্তি মিথ্যুক নয়, যে ব্যক্তি মিথ্যা বলে হলেও লোকেদের মধ্যে মীমাংসা করে, উভয় পক্ষকে ভালো কথা বলে, একের পক্ষ থেকে অপরকে ভালো কথা পৌঁছায়। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
ইমাম মুসলিম (রহিমাহুল্লাহ) এক বর্ণনায় এ কথাগুলো বৃদ্ধি করেছেন, উম্মু কুলসূম (রাঃ) বলেনঃ আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তিনটি কাজ ব্যতীত কোন কাজে কখনো মিথ্যা বলার অনুমতি দিতে শুনিনি- ১. শত্রুর বিরুদ্ধে মুসলিমের যুদ্ধের সময়, ২. ব্বিদমান দু’ পক্ষর মীমাংসা করানোর সময় এবং ৩. স্বামী স্ত্রীর সাথে এবং স্ত্রী স্বামীর সাথে কথা বলার সময়।
بَابُ مَا يُنْهٰى عَنْهُ مِنَ التَّهَاجِرُ وَالتَّقَاطُعِ وَاتِّبَاعِ الْعَوْرَاتِ
وَعَنْ أُمُّ كُلْثُومٍ بِنْتُ عُقْبَةَ بْنِ أَبِي مَعِيطٍ قَالَتْ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «لَيْسَ الْكَذَّابُ الَّذِي يُصْلِحُ بَيْنَ النَّاسِ وَيَقُولُ خَيْرًا وَيَنْمِي خَيْرًا» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ. وَزَادَ مُسْلِمٌ قَالَتْ: وَلَمْ أَسْمَعْهُ - تَعْنِي النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - يُرَخِّصُ فِي شَيْءٍ مِمَّا يَقُولُ النَّاسُ كَذِبٌ إِلَّا فِي ثَلَاثٍ: الْحَرْبُ وَالْإِصْلَاحُ بَيْنَ النَّاسِ وَحَدِيثُ الرَّجُلِ امْرَأَتَهُ وَحَدِيثُ الْمَرْأَةِ زَوْجَهَا
ব্যাখ্যাঃ (لَيْسَ الْكَذَّابُ الَّذِىْ يُصْلِحُ بَيْنَ النَّاسِ) ‘‘ঐ ব্যক্তি মিথ্যাবাদী নয়, যে মিথ্যা বলেও লোকেদের মধ্যে মীমাংসা করে।’’ এর অর্থ হলো ঐ ব্যক্তি নিন্দিত মিথ্যুক নয়, যে মানুষের মাঝে মীমাংসা করে। বরং সে ব্যক্তি একজন সৎলোক। (শারহুন নাবাবী ১৬শ খন্ড, হাঃ ২৬০৫)
(وَيَنْمِي خَيْرًا) অর্থাৎ উভয়পক্ষকে ভালো কথা বলে, একপক্ষ থেকে অপরপক্ষকে ভালো কথা পৌঁছায়। অর্থাৎ যে ভালো কথা তাদের থেকে শোনেনি, তা অপরপক্ষর নিকট পৌঁছে দেয়। যেমন- সে বলে, অমুক ব্যক্তি আপনাকে সালাম প্রেরণ করেছেন, সে আপনাকে ভালোবাসে, সে আপনার ব্যাপারে ভালো বলেছে। অনুরূপ আরো অনেক কথা তার নিজের থেকে বলে। এর দ্বারা তার উদ্দেশ্য হলো উভয়ের মাঝে সৃষ্ট বিবাদ মীমাংসা করা। কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ সে ভালো কথা যা শুনেছে তা বলবে আর খারাপ কথা পরিহার করবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - সাক্ষাৎ ত্যাগ, সম্পর্কচ্ছেদ ও দোষান্বেষণে নিষেধাজ্ঞা
৫০৩২-[৬] এ প্রসঙ্গে জাবির বর্ণিত হাদীস إِنَّ الشَّيْطَانَ قَدْ أَيِسَ ’’প্রতারণা’’ অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে।
بَابُ مَا يُنْهٰى عَنْهُ مِنَ التَّهَاجِرُ وَالتَّقَاطُعِ وَاتِّبَاعِ الْعَوْرَاتِ
وَذكر حَدِيث جَابر: «إِن الشَّيْطَان قد أيس» فِي «بَاب الوسوسة»
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সাক্ষাৎ ত্যাগ, সম্পর্কচ্ছেদ ও দোষান্বেষণে নিষেধাজ্ঞা
৫০৩৩-[৭] আসমা বিনতু ইয়াযীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মিথ্যা বলা শুধু তিন জায়গায় জায়িয আছে- ১. নিজের স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করার জন্য স্বামীর মিথ্যা কথা বলা, ২. যুদ্ধের সময় মিথ্যা বলা এবং ৩. মানুষের মধ্যে আপোষ-মীমাংসার উদ্দেশে মিথ্যা বলা। (আহমাদ ও তিরমিযী)[1]
عَن أَسمَاء بنت يزِيد قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَا يَحِلُّ الْكَذِبُ إِلَّا فِي ثَلَاثٍ: كَذِبُ الرَّجُلِ امْرَأَتَهُ لِيُرْضِيَهَا وَالْكَذِبُ فِي الْحَرْبِ وَالْكَذِبُ لِيُصْلِحَ بَيْنَ النَّاسِ . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ
ব্যাখ্যাঃ (امْرَأَتَهُ لِيُرْضِيَهَا) অর্থাৎ স্বামী তার স্ত্রীকে এবং স্ত্রী তার স্বামীকে এমন কিছু আবেগময় কথা প্রকাশ করা যাতে তাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি হয়ে যায়। যে ভালোবাসায় তারা পরস্পরে সুখে শান্তিতে জীবন-যাপন করতে পারে। তাদের মধ্যে প্রেম জন্মে। অন্যথা এমনও হতে পারে যে, তাদের পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা না জন্মে সেটা অন্যের প্রতি জন্মাতে পারে, ফলে তাদের মধ্যে অশান্তি বিরাজ করবে, এমনকি তাদের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটে যেতে পারে। [সম্পাদক]
(وَالْكَذِبُ فِى الْحَرْبِ) অর্থাৎ যুদ্ধের ময়দানে কাফিরদের ভয় ধরিয়ে দেয়ার জন্য বলা হয় যে, মুসলিম সৈন্য অনেক আছে এবং তাদের অনেক সাহায্যকারী লোক আছে। অথবা মুসলিম সৈন্যদেরকে বলা কাফিরদের সংখ্যা কম। তোমরা যুদ্ধ কর তোমাদের সাহায্যকারী আছে। অথবা কোন কাফিরকে বলা যে, দেখ তোমার পিছে কে তোমাকে হত্যা করার জন্য আসছে অথবা তুমি সাহায্যের জন্য তোমার সাথে কাকে নিয়ে এসেছ? ইত্যাদি মিথ্যা কথা বলা। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সাক্ষাৎ ত্যাগ, সম্পর্কচ্ছেদ ও দোষান্বেষণে নিষেধাজ্ঞা
৫০৩৪-[৮] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন মুসলিমের পক্ষ এটা উচিত নয় যে, তিনদিনের বেশি সময় নিজের কোন মুসলিম ভাইয়ের ওপর রাগ হয়ে কথা বলা বন্ধ রাখবে। যখন তার সাথে সাক্ষাৎ হবে, তাকে তিনবার সালাম করবে। প্রত্যেকবারেই যদি জবাব না দেয়, তবে সে তার গুনাহ নিয়েই ফিরবে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا يَحِلُّ لِمُسْلِمٍ أَنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ فَوْقَ ثَلَاثٍ فَمِنْ هَجَرَ فَوْقَ ثَلَاثٍ مَرَّاتٍ كُلُّ ذَلِكَ لَا يَرُدُّ عَلَيْهِ فَقَدْ بَاء بإثمه» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ (فَقَدْ بَاء بإثمه) ‘আল্লামা ত্বীযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ যাদের মধ্যে তিনদিন পর্যন্ত কথাবার্তা বন্ধ, এ সময়ের পর পরস্পর দেখা-সাক্ষাৎ হলে রাগান্বিত ব্যক্তিকে পরস্পর তিনবার সালাম দিলে যদি সে একবারও সালামের উত্তর না দেয় তবে সে তার পাপ নিয়ে ফিরে যাবে। এখানে তার পাপ বলতে সম্ভবত যে সালামের উত্তর দেয় না তাকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি আগে সালাম দিয়েছে সে মুসলিম তিনদিনের বেশি কথাবার্তা বর্জন রাখার পাপ থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। আর যে মুসলিম সালামের উত্তর দেয়নি তার উপর পাপটা পতিত হবে। অর্থাৎ সে তিনদিনের বেশি কথাবার্তা বর্জন রাখার গুনাহ নিয়ে ফিরবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
হাদীসটির বাস্তবিক শিক্ষা : আমাদের সমাজে অনেক লোককে দেখা যায় একজন অন্যজনের সাথে কোন কারণবশতঃ বহুদিন কথা বন্ধ রাখে। একজন যদি একটু নমনীয় হয়ে অন্যজনকে সালাম দেয় তবে যাকে সালাম দিয়েছে তার দামটা সে বাড়িয়ে ফেলে। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। যেন শুনতেই পায়নি। অথচ সে স্পষ্টভাবে হাদীসটির বিরোধিতা করল।
হাদীসটির ভাষ্য অনুযায়ী সালামের উত্তর না দেয়ার কারণে সে পাপী থেকে গেল। একদিন হয়ত এমন সময় আসে যে, সালামের উত্তর নেয়নি তার আর সালাম দেয়ার সুযোগ হয়ে ওঠে না তার আগেই তাকে পরকালে পাড়ি জমাতে হয়। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সাক্ষাৎ ত্যাগ, সম্পর্কচ্ছেদ ও দোষান্বেষণে নিষেধাজ্ঞা
৫০৩৫-[৯] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন মুসলিমের জন্য এটা বৈধ নয় যে, সে তিনদিনের বেশি সময় অপর কোন মুসলিম ভাইয়ের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে সাক্ষাৎ পরিত্যাগ করে। যে ব্যক্তি তিনদিনের বেশি সময় অপর ভাইকে ত্যাগ করল, আর এ সময় তার মৃত্যু হলো, তবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। (আহমাদ ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا يَحِلُّ لِمُسْلِمٍ أَنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ فَوْقَ ثَلَاثٍ فَمِنْ هَجَرَ فَوْقَ ثَلَاثٍ فَمَاتَ دَخَلَ النَّارَ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ (فَمَاتَ) অর্থাৎ ঐ অবস্থায় তাওবাহ্ না করেই মারা যায়।
(دَخَلَ النَّارَ) ‘আল্লামা তূরিবিশতী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ অর্থাৎ তার জন্যে জাহান্নামে যাওয়া ওয়াজিব হয়ে যায়, এটা এভাবে যে, পাপে পতিত হওয়া যেন শাস্তিতে পতিত হওয়া। যদি আল্লাহ চান তবে তাকে শাস্তি দিতে পারেন। আর যদি তিনি চান তবে তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
আসলে এ হুকুমটি কঠোরতা প্রকাশার্থে বর্ণনা করা হয়েছে, যেন এ ধরনের কাজ করতে কেউ সাহস না করে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৯০৬)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সাক্ষাৎ ত্যাগ, সম্পর্কচ্ছেদ ও দোষান্বেষণে নিষেধাজ্ঞা
৫০৩৬-[১০] আবূ খিরাশ আস্ সুলামী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন : যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের সাথে এক বছর যাবৎ সম্পর্ক ছিন্ন রাখল, সে যেন তার রক্তপাত করল। (অর্থাৎ- তাকে হত্যার করল)। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن أبي خرَاش السُّلَميَّ أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَنْ هَجَرَ أَخَاهُ سَنَةً فَهُوَ كسفك دَمه» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ (فَهُوَ كَسَفْكِ دَمِه) অর্থাৎ কোন মুসলিম ভাইয়ের সাথে একবছর সম্পর্কচ্ছেদ করা তাকে বর্জন করার শাস্তিকে আবশ্যক করে। যেমনিভাবে কাউকে হত্যা করলে শাস্তি আবশ্যক হয়ে যায়। হত্যা এবং কথা বর্জন এক পর্যায়ের নয়। গুনাহের দিক দিয়ে বাক্যটি তাকিদের জন্য নেয়া হয়েছে যেন কেউ এ পাপ কাজে জড়িয়ে না পড়ে। আবার কোন কোন সিফাত বা গুণ তাশবীহ বা সাদৃশ্যের ক্ষেত্রে সমান হয়। কতক হাদীসের ব্যাখ্যাকার হাদীসটির এরূপ ব্যাখ্যা করেছেন।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এখানে তাশবীহ বা সাদৃশ্যটা মুবালাগাহ্ বা আধিক্যতা বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে : زِيدٌ كَالْأَسَدِ তথা যায়দ বাঘের মতো। এখানে সাদৃশ্য দেয়া হয়েছে শক্তির দিক দিয়ে ও বীরত্বের দিক দিয়ে, আকৃতির দিক দিয়ে নয়। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ لَا يَحِلُّ لِمُؤْمِنٍ أَنْ يَهْجُرَ مُؤْمِنًا فَوْقَ ثَلَاثٍ কোন মু’মিনের জন্য কোন মু’মিনকে তিনদিনের বেশি পরিহার করা বৈধ নয়। এখান থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, তিনদিনের বেশি পরিত্যাগ করা হারাম। এ পাপে জড়িত ব্যক্তি শাস্তিযোগ্য। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সাক্ষাৎ ত্যাগ, সম্পর্কচ্ছেদ ও দোষান্বেষণে নিষেধাজ্ঞা
৫০৩৭-[১১] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একজন মুসলিমের এটা বৈধ নয় যে, সে কোন মুসলিম ভাইয়ের সাথে তিনদিনের বেশি সময় সম্পর্ক ছিন্ন করে থাকবে। তিনদিন উত্তীর্ণ হতেই সে যেন তার প্রতিপক্ষর সাথে সাক্ষাৎ করে এবং তাকে সালাম করে। যদি সে তার সালামের জবাব দেয়, তবে উভয়েই সাওয়াবের অংশীদার হবে। আর যদি সালামের জবাব না দেয়, তবে সে পাপী হবে এবং সালাম দানকারী মুসলিম সম্পর্কচ্ছেদজনিত পাপ থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ
أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَحِلُّ لِمُؤْمِنٍ أَنْ يَهْجُرَ مُؤْمِنًا فَوْقَ ثَلَاثٍ فَإِنْ مَرَّتْ بِهِ ثلاثُ فَلْيلقَهُ فليسلم عَلَيْهِ فَإِن ردَّ عَلَيْهِ السَّلَامَ فَقَدِ اشْتَرَكَا فِي الْأَجْرِ وَإِنْ لَمْ يَرُدَّ عَلَيْهِ فَقَدْ بَاءَ بِالْإِثْمِ وَخَرَجَ المُسلِّمُ من الْهِجْرَة» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘হিলাল আল মাদানী’’ নামের বর্ণনাকারীর ব্যাপারে ইমাম যাহাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ তাকে চেনা যায় না। রিয়াযুস্ সলিহীন ১৬০৫, ইরওয়া ২০২৯, হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৪৪৯ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ (فَقَدِ اشْتَرَكَا فِي الْأَجْرِ) অর্থাৎ যদি সে তার সালামের উত্তর দেয়, তবে উভয়েই সাওয়াবের অংশীদার হবে দু’ভাবে : ১. সালামের উত্তর দেয়ার কারণে ২. তিনদিনের বেশি কথাবার্তা বন্ধ না রেখে কথাবার্তা বলার কারণে।
(فَقَدْ بَاءَ بِالْإِثْمِ) যদি সে সালামের উত্তর না দেয়, তবে সে দু’ভাবে গুনাহগার হবে ১. সালামের উত্তর না দেয়ায় ২. তিনদিনের বেশি কথাবার্তা বর্জন রাখায়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সাক্ষাৎ ত্যাগ, সম্পর্কচ্ছেদ ও দোষান্বেষণে নিষেধাজ্ঞা
৫০৩৮-[১২] আবুদ্ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি কি তোমাদের এমন কাজ সম্পর্কে বলব না, যার সাওয়াবের মর্যাদা সিয়াম (রোযা), সাদাকা ও সালাতের চেয়েও বেশি? আবুদ্ দারদা(রাঃ) বলেন, তখন আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রসূল! তিনি বললেনঃ সে কাজ হলো, দু’জন মুসলিমের মধ্যে আপোষ করানো। যে ব্যক্তি ঝগড়া ও বিপর্যয় সৃষ্টি করে, সে যেন মস্তক মুণ্ডনকারী। [আবূ দাঊদ ও তিরমিযী; আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসটি সহীহ।][1]
وَعَنْ أَبِي
الدَّرْدَاءِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَفْضَلَ من درجةِ الصِّيامِ والصدقةِ وَالصَّلَاة؟» قُلْنَا: بَلَى. قَالَ: «إِصْلَاحُ ذَاتِ الْبَيْنِ وَفَسَادُ ذَاتِ الْبَيْنِ هِيَ الْحَالِقَةُ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالتِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ صَحِيح
ব্যাখ্যাঃ (مِنْ دَرَجَةِ الصِّيَامِ وَالصَّدَقَةِ) আশরাফ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এ ‘আমল দ্বারা উদ্দেশ্য নফল, ফরয না। অর্থাৎ দু‘জন মুসলিমের মাঝে আপোষ করানো নফল সিয়াম, সালাত ও সাদাকা হতে উত্তম। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(إِصْلَاحُ ذَاتِ الْبَيْنِ) অর্থাৎ ঐ সৎ গুণের অবতারণা, যা দ্বারা জাতির মধ্যে সম্প্রীতি, ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়। যেমন- মহান আল্লাহ বলেনঃ وَاللهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ ‘‘আর আল্লাহ অন্তরের সকল বিষয় সম্যক অবগত’’- (সূরাহ্ আ-লি ‘ইমরা-ন ৩ : ১৫৪)। এটাও বলা হয়ে যাকে যে, (ذَاتِ الْبَيْنِ) (দু’জন মুসলিমের মধ্যে আপোষ-মীমাংসা করানো )-এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো দু’জনের মধ্যকার ঝগড়া বিবাদ এবং সম্পর্ক বিচ্ছেদের অবসান ঘটানো। (الْبَيْنِ) বলা হয় বিচ্ছিন্নতা ও দলাদলিকে।
(وَفَسَادُ ذَاتِ الْبَيْنِ هِيَ الْحَالِقَةُ) অর্থাৎ এটা এমন একটা গুণাবলী যা দীনকে মুণ্ডন করে এবং সমূলে উৎপাটন করে। যেমন খুর বা ব্লেড চুলকে মুণ্ডন করে। অত্র হাদীসে উৎসাহ-উদ্দীপনা আছে দু’জনের মাঝে মীমাংসা করার ব্যাপারে আর উভয়ের মাঝে দ্বন্দ্ব লাগানোকে নিষেধ করা হয়েছে কারণ সংশোধন এর মাঝে আল্লাহর রজ্জুকে মজবুত করে ধরার উপায় আছে। এ কাজে মুসলিমের মাঝে বিচ্ছেদ হবে না। আর দু’জনের মাঝে বিশৃঙ্খলা লাগানো দীনের জন্য বিষফোড়া। অতএব যে ব্যক্তি উভয়ের মধ্যে সংশোধনের চেষ্টা করবে এবং বিশৃঙ্খলা দূর করবে, সে ঐ ব্যক্তির চেয়ে বেশি মর্যাদাবান হবে। যে কেবলমাত্র সিয়াম পালন করে ও গোপনে তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৯১১; তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৫০৬)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সাক্ষাৎ ত্যাগ, সম্পর্কচ্ছেদ ও দোষান্বেষণে নিষেধাজ্ঞা
৫০৩৯-[১৩] যুবায়র (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বিগত উম্মাতের ব্যাধি তোমাদের মধ্যে বিস্তার লাভ করেছে। বিগত উম্মাতের ব্যাধি ছিল হিংসা ও ঘৃণা। এটা হলো মুণ্ডনকারী। আমি এ মুণ্ডন দ্বারা মাথা মুণ্ডনকে বুঝাইনি; বরং সেটা দ্বারা দীনের মুণ্ডন বা মূলোচ্ছেদ বুঝিয়েছি। (আহমাদ ও তিরমিযী)[1]
وَعَنِ الزُّبَيْرِ
قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «دَبَّ إِلَيْكُمْ دَاءُ الْأُمَمِ قَبْلَكُمُ الْحَسَدُ وَالْبَغْضَاءُ هِيَ الْحَالِقَةُ لَا أَقُولُ تَحْلِقُ الشَّعْرَ ولكنْ تحلق الدّين» . رَوَاهُ أَحْمد وَالتِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ (الْحَسَدُ) এটি এমন একটি দুরারোগ্য ব্যাধি যা ইসলামী সমাজকে ভিতর থেকে ধ্বংস করে দেয়। হাসাদ অর্থ হিংসা। হিংসা অর্থ أن يحسد على ما انعم الله عليه به، وإن يتمتى زوال نعمته আল্লাহ অন্যকে যে নি‘আমাত দান করেছেন তাকে হিংসা করা এবং উক্ত নি‘আমাতের ধ্বংস কামনা করা। হিংসা হয়ে থাকে গোপনে।।
(وَالْبَغْضَاءُ) বিদ্বেষ বা শত্রুতা এটা হয়ে থাকে প্রকাশ্যে। এটিও অন্তরের রোগ।
(لَا أَقُولُ تَحْلِقُ الشَّعْرَ) অর্থাৎ আমি বলি না শরীরের বাহ্যিক কোনকিছু কাটে, কেননা এটা একটা সহন বিষয়।
(ولكنْ تحلق الدّين) এর ফলাফল বড় ভয়াবহ দুনিয়াতে এবং আখিরাতেও ।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ শত্রুতা দীনকে এমনভাবে ধ্বংস করে যেমন বেস্নড চুলকে ধ্বংস করে। ‘তাহলিক্বু’-এর যমীর আল বাগযা এর দিকে ফিরেছে। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫১০)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সাক্ষাৎ ত্যাগ, সম্পর্কচ্ছেদ ও দোষান্বেষণে নিষেধাজ্ঞা
৫০৪০-[১৪] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ তোমরা হিংসা হতে বেঁচে থাকো। কেননা হিংসা সৎকর্মসমূহকে খেয়ে ফেলে, যেমনিভাবে কাষ্ঠখন্ডকে আগুন খায়। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي
هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِيَّاكُمْ وَالْحَسَدَ فَإِنَّ الْحَسَدَ يَأْكُلُ الْحَسَنَاتِ كَمَا تَأْكُلُ النَّارُ الْحَطَبَ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদের বর্ণনাকারীগণ বিশ্বস্ত তবে ইব্রাহীমের দাদা/নানা (جد ابراهيم) ব্যতীত। তিনি মাজহূল বা অপরিচিত। কারণ, তার নাম উল্লেখ করা হয়নি। দেখুন- য‘ঈফাহ্ ১৯০২।
ব্যাখ্যাঃ (إِيَّاكُمْ وَالْحَسَدَ) অর্থাৎ তোমরা ধন-সম্পদ ও পার্থিব সম্মান-মর্যাদার বিষয়ে অন্যের প্রতি হিংসা করা থেকে বেঁচে থাক। কেননা এটা নিন্দনীয়। অবশ্য পরকালীন বিষয়ে গিবতাহ্ বা অন্যের মধ্যে যে বিশেষত্ব রয়েছে তা নিজের মধ্যে অর্জিত হওয়ার আগ্রহ করা দূষণীয় নয়।
(فَإِنَّ الْحَسَدَ يَأْكُلُ الْحَسَنَاتِ) অর্থাৎ হিংসা-বিদ্বেষ হিংসুকের সৎকর্মগুলো বিনষ্ট করে দেয়।
(كَمَا تَأْكُلُ النَّارُ الْحَطَبَ) কারণ হিংসা হিংসুককে গীবত করার দিকে নিয়ে যায়। সুতরাং যার প্রতি হিংসা করা হয়েছে সে হিংসুকের সৎকর্মগুলো নিয়ে যাবে তার গীবত করার কারণে। সুতরাং যার প্রতি হিংসা করা হয়েছে তার নি‘আমাতের উপর নি‘আমাত বৃদ্ধি পায়। আর হিংসুক ব্যক্তির ক্ষতির উপর ক্ষতি। তার অবস্থার ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, خَسِرَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ ‘‘তার দুনিয়া ও আখিরাত ধ্বংস হলো’’- (সূরাহ্ আল হজ্জ ২২ : ১১)। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৮৯৫)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সাক্ষাৎ ত্যাগ, সম্পর্কচ্ছেদ ও দোষান্বেষণে নিষেধাজ্ঞা
৫০৪১-[১৫] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ দু’ ব্যক্তির মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টি করা থেকে তোমরা নিজেকে রক্ষা করো। কেননা এ কাজ দীনকে ধ্বংসকারী। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْهُ
عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِيَّاكُمْ وَسُوءَ ذَاتِ الْبَيْنِ فَإِنَّهَا الْحَالِقَةُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ (إِيَّاكُمْ وَسُوءَ ذَاتِ الْبَيْنِ) অর্থাৎ দু’ ব্যক্তির মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টি করা থেকে, তাদের মাঝে পারস্পরিক সম্প্রীতি নষ্ট করা এবং পারস্পারিক ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টির চেষ্টা করা থেকে বেঁচে থাকার জন্য বিশ্বনবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাবধান করেছেন। এর কারণ হলো, এটি অত্যন্ত গর্হিত একটি কাজ। এটি একটি মারাত্মক অপরাধ। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সাক্ষাৎ ত্যাগ, সম্পর্কচ্ছেদ ও দোষান্বেষণে নিষেধাজ্ঞা
৫০৪২-[১৬] আবূ সিরমাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি (কোন মুসলিমকে) কষ্ট দেবে, আল্লাহ তা’আলা তাকে কষ্ট দেবেন এবং যে ব্যক্তি (কোন মুসলিমকে) বিপদে ফেলবে, আল্লাহ তা’আলা তাকে বিপদে ফেলবেন। [ইবনু মাজাহ ও তিরমিযী; আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এ হাদীসটি গরীব।][1]
وَعَن أبي
صرمة أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ ضَارَّ ضَارَّ اللَّهُ بِهِ وَمَنْ شَاقَّ شَاقَّ اللَّهُ عَلَيْهِ» . رَوَاهُ ابْنُ مَاجَهْ وَالتِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيب
ব্যাখ্যাঃ (شَاقَّ اللهُ عَلَيْهِ) অর্থাৎ আল্লাহ তাকে শাস্তি দিবেন। মহান আল্লাহ বলেন, وَمَنْ يُّشَاقِّ اللهَ فَإِنَّ اللهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ ‘‘আর যে আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করেন তার জানা উচিত যে, আল্লাহ কঠিন শাস্তিদাতা।’’ (সূরাহ্ আল হাশ্র ৫৯ : ৪)
شَاقَّ ও ضَارَّ এর মধ্যে পার্থক্য : অর্থের দিক দিয়ে شَاقَّ ও ضَارَّ শব্দ দু’টো প্রায় সমপর্যায়ের। অবশ্য এর মধ্যে কিছুটা পার্থক্য বিদ্যমান। ধন-সম্পদের বিনষ্ট সাধনকে ضرر বলে, আর শারীরিক ক্ষতি বা কষ্ট দেয়াকে مشقة বলে। অথবা ضَارَّ দ্বারা শারীরিক বুঝায়। আর مشقة এমন বিরুদ্ধারণ, যা কলহ-বিবাদ এবং যুদ্ধ ডেকে আনে। তবে প্রথম মতটাই গ্রহণযোগ্য। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৯৪০)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সাক্ষাৎ ত্যাগ, সম্পর্কচ্ছেদ ও দোষান্বেষণে নিষেধাজ্ঞা
৫০৪৩-[১৭] আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সেই ব্যক্তি অভিশপ্ত, যে কোন মুসলিমকে কষ্ট দেয় অথবা কোন মুসলিমের সাথে প্রবঞ্চনা করে। [তিরমিযী; আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এ হাদীসটি গরীব।][1]
وَعَنْ أَبِي
بَكْرٍ الصِّدِّيقِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَلْعُونٌ مَنْ ضَارَّ مُؤْمِنًا أَوْ مَكَرَ بِهِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘ফারকদ’’ নামের বর্ণনাকারী য‘ঈফ। বিস্তারিত দেখুন- য‘ঈফাহ্ ১৯০৩, বাযযার ৪৩, মুসনাদে আবূ ইয়া‘লা ৯৬, শু‘আবুল ঈমান ৮৫৭৭, আল মু‘জামুল আওসাত্ব ৯৩১২।
ব্যাখ্যাঃ (مَنْ ضَارَّ مُؤْمِنًا) যে কোন মু’মিনকে কষ্ট দেয়, অর্থাৎ বাহ্যিকভাবে বা প্রকাশ্যভাবে কোন মু’মিনকে ক্ষতি করে অথবা ক্ষতি করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যায়।
(أَوْ مَكَرَ بِه) সে তার সাথে প্রতারণা বা ধোঁকাবাজি করে। অর্থাৎ গোপনে তার ক্ষতি করে অথবা ক্ষতি করার জন্য নিরলস চেষ্টা করে যায়, তার ব্যাপারে বিশ্বনবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সেই ব্যক্তি মহান আল্লাহর রহমত থেকে বিতাড়িত হবে। (তুহফাতুল আহ্ওযায়ী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৯৪১)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সাক্ষাৎ ত্যাগ, সম্পর্কচ্ছেদ ও দোষান্বেষণে নিষেধাজ্ঞা
৫০৪৪-[১৮] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বারের উপর উঠলেন এবং উচ্চস্বরে ডেকে বললেনঃ ’’হে মুসলিমগণ! যারা মুখে ইসলাম গ্রহণ করেছ এবং অন্তরে ইসলামের প্রভাব রাখোনি, তোমরা মুসলিমদেরকে কষ্ট দিয়ো না, তাদেরকে লজ্জা দিয়ো না এবং তাদের দোষ অন্বেষণ করো না। কেননা যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের দোষ অন্বেষণ করে, আল্লাহ তা’আলা তার দোষ অন্বেষণ করেন। আল্লাহ তা’আলা যার দোষ খুঁজবেন, তাকে অপমান করবেন, যদি সে নিজের ঘরের মধ্যেও থাকে। (তিরমিযী)[1]
وَعَن ابنِ
عمَرَ قَالَ: صَعِدَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمِنْبَرَ فَنَادَى بِصَوْتٍ رَفِيعٍ فَقَالَ: «يَا مَعْشَرَ مَنْ أَسْلَمَ بِلِسَانِهِ وَلَمْ يُفْضِ الْإِيمَانُ إِلَى قَلْبِهِ لَا تُؤْذُوا الْمُسْلِمِينَ وَلَا تُعَيِّرُوهُمْ وَلَا تَتَّبِعُوا عَوْرَاتِهِمْ فَإِنَّهُ مَنْ يَتَّبِعْ عَوْرَةَ أَخِيهِ الْمُسْلِمِ يَتَّبِعِ اللَّهُ عَوْرَتَهُ وَمَنْ يَتَّبِعِ اللَّهُ عَوْرَتَهُ يَفْضَحْهُ وَلَوْ فِي جَوْفِ رَحْلِهِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ (مَنْ أَسْلَمَ بِلِسَانِه) অর্থ যারা মুখে ইসলাম গ্রহণ করেছ দ্বারা মু’মিন এবং মুনাফিকরা উভয় প্রকার লোককে বুঝানো হয়েছে। আর (وَلَمْ يُفْضِ الْإِيمَانُ إِلٰى قَلْبِه) অর্থ আর অন্তরে ঈমানের/ইসলামের প্রভাব রাখনি’ দ্বারা ফাসিককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সুতরাং বাক্যটির অর্থ হবে- একদিন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু’মিন, মুনাফিক এবং ফাসিক সকলে সম্বোধন করে উপদেশ দিয়েছেন। (لَا تُؤْذُوا الْمُسْلِمِينَ) অর্থাৎ যারা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করেছে, আর তারা মুখে ইসলাম গ্রহণ করেছে আর তাদের অন্তর দ্বারা ঈমান এনেছে।
(وَلَا تُعَيِّرُوهُمْ) অর্থ ‘আর তোমরা তাদেরকে লজ্জা দিয়ো না’। যদি লজ্জা দেয় তবে এটা তাদের জন্য ধমক ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে। কেউ কাউলে লজ্জা দিলে তাকে এ কাজ হতে তাওবাহ্ করতে হবে। আবার কখনও লজ্জা দেয়ার জন্য তাকে হাদ্দ বা শাস্তি অথবা তা‘বীর বা শিক্ষা দেয়ার জন্য শাস্তি দেয়া ওয়াজিব হবে। এটা হবে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের দিক থেকে। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২০৩২)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সাক্ষাৎ ত্যাগ, সম্পর্কচ্ছেদ ও দোষান্বেষণে নিষেধাজ্ঞা
৫০৪৫-[১৯] সা’ঈদ ইবনু যায়দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ সবচেয়ে বড় সুদ হলো অন্যায়ভাবে কোন মুসলিমের মানহানি করা। (আবূ দাঊদ ও বায়হাক্বী ’’শু’আবুল ঈমানে’’ বর্ণনা করেছেন।)[1]
وَعَن سعيد
بْنِ زَيْدٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّ مِنْ أَرْبَى الرِّبَا الِاسْتِطَالَةُ فِي عِرْضِ الْمُسْلِمِ بِغَيْرِ حَقٍّ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ»
ব্যাখ্যাঃ (إِنَّ مِنْ أَرْبَى الرِّبَا) অর্থ সবচেয়ে বড় সুদ অর্থাৎ ক্ষতির দিক দিয়ে মারাত্মক এবং হারামের দিক দিয়েও জঘন্যতম।
(الِاسْتِطَالَةُ فِي عِرْضِ الْمُسْلِمِ) এখানে الِاسْتِطَالَةُ শব্দের অর্থ- দীর্ঘায়িত করা, অতিরিক্ত করা ও বাড়াবাড়ি করা। এখানে অর্থ হচ্ছে, কোন মুসলিমের ইয্যত নষ্ট করার উদ্দেশে অহংকার ও গর্ব করে গালি দেয়া, গীবত ও মিথ্যা অপবাদ দেয়া। এটি সুদের চেয়েও মারাত্মক হারাম হওয়ার কারণ হলো, মুসলিমের মান-সম্মান ধন-সম্পদের চেয়ে অধিক মূল্যবান। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৮৬৮)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সাক্ষাৎ ত্যাগ, সম্পর্কচ্ছেদ ও দোষান্বেষণে নিষেধাজ্ঞা
৫০৪৬-[২০] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন আল্লাহ তা’আলা আমাকে উপরে নিয়ে গেলেন, আমি সেখানে এমন লোকেদের কাছ দিয়ে অতিক্রম করলাম, যাদের নখ তামার তৈরি। সেসব নখ দ্বারা তারা তাদের মুখমণ্ডলে ও বক্ষ খোঁচাচ্ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ হে জিবরীল! এরা কারা? জিবরীল (আ.) বললেনঃ এরা সেসব লোক, যারা মানুষের মাংস খায় (পরোক্ষ নিন্দা করে) এবং মানুষের পিছনে লেগে থাকে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَنَسٍ
قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسلم: لما عرجَ بِي ربِّي مَرَرْتُ بِقَوْمٍ لَهُمْ أَظْفَارٌ مِنْ نُحَاسٍ يَخْمِشُونَ وجوهَهم وصدورهم فَقُلْتُ: مَنْ هَؤُلَاءِ يَا جِبْرِيلُ؟ قَالَ: هَؤُلَاءِ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ لُحُومَ النَّاسِ وَيَقَعُونَ فِي أَعْرَاضِهِمْ . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ (الَّذِينَ يَأْكُلُونَ لُحُومَ النَّاسِ) অর্থাৎ তারা মুসলিমদের গীবতে লিপ্ত থাকত।
(وَيَقَعُونَ فِي أَعْرَاضِهِمْ) ‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মি‘রাজে গিয়ে দেখলেন জাহান্নামে কিছু লোক মুখ ও বক্ষ আঁচড়াতে রত। প্রকৃতপক্ষ মুখ ও বক্ষ আঁচড়ানো স্বভাবটা বিলাপ করে ক্রন্দনকারী মহিলাদের স্বভাব। অথচ যারা দুনিয়াতে গীবত করেছে এবং মুসলিমদের মান-সম্মান ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করেছে, এরা প্রকৃতপক্ষ পুরুষের গুনাগুণ সম্বলিত না। বরং তারা মহিলাদের মন্দ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হওয়ায় তাদেরকে মহিলাদের মতো সাজা দেয়া হচ্ছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সাক্ষাৎ ত্যাগ, সম্পর্কচ্ছেদ ও দোষান্বেষণে নিষেধাজ্ঞা
৫০৪৭-[২১] মুসতাওরিদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের পরোক্ষ নিন্দা করে বা মন্দ বলে এক গ্লাস খেলো, আল্লাহ তা’আলা তাকে সে পরিমাণ জাহান্নামের আগুন খাওয়াবেন। যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের অপদস্থ ও অপমানের বিনিময়ে কাপড় পরিধান করল, আল্লাহ তা’আলা সেটার বিনিময়ে তাকে সমপরিমাণ জাহান্নামের আগুনের পোশাক পরিধান করাবেন। আর যে ব্যক্তি কাউকে দাঁড় করায় বা নিজে দণ্ডায়মান হয়ে লোকেদেরকে নিজের বুজুর্গি শোনায় বা নিজের শ্রেষ্ঠত্ব দেখায়, কিয়ামতের দিন স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা তার ত্রুটি-বিচ্যুতি ও দুর্বলতা শোনানোর জন্য এবং দেখানোর জন্য তাকে দাঁড় করাবেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن الْمُسْتَوْرد
عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ أَكَلَ بِرَجُلٍ مُسْلِمٍ أُكْلَةً فَإِنَّ اللَّهَ يُطعِمُه مثلَها منْ جهنَّمَ ومَن كَسا ثَوْبًا بِرَجُلٍ مُسْلِمٍ فَإِنَّ اللَّهَ يَكْسُوهُ مِثْلَهُ مِنْ جَهَنَّمَ وَمَنْ قَامَ بِرَجُلٍ مَقَامَ سُمْعَةٍ وَرِيَاءٍ فَإِنَّ اللَّهَ يَقُومُ لَهُ مَقَامَ سُمْعَةٍ ورياءِ يَوْم الْقِيَامَة» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ (مَنْ أَكَلَ بِرَجُلٍ مُسْلِمٍ) অর্থাৎ কোন মুসলিমের গীবত করার কারণে যে তার সাথে শত্রুতা রাখে তার কাছে এ মুসলিমের মান-সম্মান খাটো করার কারণে অথবা তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়ে এক গ্লাস বা এক বেলা খাদ্য গ্রহণ করল, মহান আল্লাহ তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে এ পরিমাণ খাওয়াবেন।
(بِرَجُلٍ مُسْلِمٍ) এর ب (বা) টি তা‘দিয়্যাহ্ বা পৌঁছে দেয়া অর্থে অথবা কারণ দর্শাণোর অর্থে আসতে পারে। যদি সেটা তা‘দিয়্যাহ্ এর জন্য আসে তবে তার অর্থ হবে مَنْ أَقَامَ رَجُلًا مَقَامَ سُمْعَةٍ وَرِيَاءٍ অর্থাৎ যে ব্যক্তি কোন ব্যক্তিকে দিয়ে তাকওয়া ও বুজুর্গ প্রকাশ করল যাতে করে মানুষ তার ব্যাপারে সুধারণা বা উত্তম বিশ্বাস রাখে যে, সে একজন মুত্তাক্বী ব্যক্তি, তাকে সম্মানী করুক বা তাকে লোকেরা খিদমাত করুক, যেন সে এর কারণে টাকা-পয়সা বা সম্মান-মর্যাদা লাভ করতে পারে। তখন আল্লাহ তা‘আলা তার সুনাম ও লোক দেখানোর বিপরীতে একজন মালাক (ফেরেশতা) দাঁড় করিয়ে দেন যাতে সে প্রকাশ করতে পারে যে এ ব্যক্তি মিথ্যুক।
আর যদি সাবাবিয়্যাহ্ বা কারণ দর্শানোর জন্য আসে তবে এর অর্থ হবে : সে নিজে দন্ডায়মান হয়ে লোকেদেরকে নিজের বুজুর্গি শোনায় বা নিজের শ্রেষ্ঠত্ব দেখায় যাতে লোকেরা বিশ্বাস করে যে, লোকটি বিরাট মর্যাদার অধিকারী। অনেক সম্পদশালী, এটা দ্বারা তার উদ্দেশ্য হলো লোকেরা তাকে বেশি টাকা প্রদান করুক, তাকে সম্মান করুক তবে কিয়ামতের দিন স্বয়ং আল্লাহ তার ত্রুটি-বিচ্যুতি ও দুর্বলতা শোনানোর জন্য এবং দেখানোর জন্য দাঁড় করাবেন (একজন ফেরেশতাকে)। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ‘আওনূল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৮৭৩)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সাক্ষাৎ ত্যাগ, সম্পর্কচ্ছেদ ও দোষান্বেষণে নিষেধাজ্ঞা
৫০৪৮-[২২] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ভালো চিন্তা ও উত্তম ধারণা করাও ’ইবাদাত। (আহমাদ ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي
هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «حُسْنُ الظَّنِّ مِنْ حسْنِ العِبادةِ» . رَوَاهُ أَحْمد وَأَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ এর সনদে ‘‘শুতায়র (شتير) বা সুমায়র (سمير) ইবনু নাহার (نهار)’’ নামে একজন বর্ণনাকারী আছে। ইমাম যাহাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ নুকরাহ্ (نكرة) বা তার মধ্যে অপছন্দ বিষয় আছে। দেখুন- হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৪৫৩ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ (حُسْنُ الظَّنِّ) অর্থাৎ মহান আল্লাহ ও মুসলিমদের ব্যাপারে উত্তম ধারণা পোষণ করা।
(مِنْ حسْنِ العِبادةِ) অর্থাৎ এটা এক প্রকারের ‘ইবাদাত, যা মহান আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়।
হাদীসটির বাস্তবিক শিক্ষা : সুধারণা পোষণ করা এক প্রকার উত্তম ‘ইবাদাত। যেমনিভাবে মন্দ ধারণা পোষণ করা এক প্রকার পাপ।
এক ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ ‘‘নিশ্চয় কতক ধারণা পোষণ করলে পাপ হয়’’- (সূরাহ্ আল হুজুরা-ত ৪৯ : ১২)। অর্থাৎ কতক ধারণা ভালো, যা ‘ইবাদাতের অন্তর্ভুক্ত। ‘আস সিরাজুম মুনীর’ কিতাবে অনুরূপ বলা হয়েছে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৯৮৫)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সাক্ষাৎ ত্যাগ, সম্পর্কচ্ছেদ ও দোষান্বেষণে নিষেধাজ্ঞা
৫০৪৯-[২৩] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী সফিয়্যাহ্ (রাঃ)-এর উটটি পীড়াগ্রস্ত হয়ে পড়ল। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অপর স্ত্রী যায়নাব (রাঃ)-এর কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটি সওয়ারী ছিল। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবি যায়নাবকে বললেনঃ তাঁকে একটি উট দাও। তখন তিনি বললেনঃ আমি ঐ ইয়াহূদীনীকে উট দেবো? এতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মনোক্ষুণ্ণ হলেন এবং যিলহজ্জ, মুহাররম ও সফর মাসের কিছুদিন তাঁর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেছিলেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن عائشةَ
قَالَتْ: اعْتَلَّ بَعِيرٌ لِصَفِيَّةَ وَعِنْدَ زَيْنَبَ فَضْلُ ظَهْرٍ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِزَيْنَبَ: «أَعْطِيهَا بَعِيرًا» . فَقَالَتْ: أَنَا أُعْطِي تِلْكَ الْيَهُودِيَّةَ؟ فَغَضِبَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَهَجَرَهَا ذَا الْحُجَّةِ وَالْمُحَرَّمَ وَبَعْضَ صَفَرٍ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
وَذُكِرَ حَدِيثُ مُعَاذِ بْنِ أَنَسٍ: «مَنْ حَمَى مُؤْمِنًا» فِي «بَابِ الشَّفَقَة وَالرَّحْمَة»
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘সুমাইয়া’’ নামের বর্ণনাকারীকে চেনা যায় না। দেখুন- গয়াতুল মারাম ২৩৪ পৃঃ, হাঃ ৪১০।
ব্যাখ্যাঃ لِصَفِيَّةَ بِنْتِ حُيَيٍّ সফিয়্যাহ্ বিনতু হুয়াইয়ি (রাঃ) ছিলেন আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী।
(وَعِنْدَ زَيْنَبَ) ইনি যায়নাব বিনতু জাহশ (রাঃ)-ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী ছিলেন।
(أَنَا أُعْطِي تِلْكَ الْيَهُودِيَّةَ؟) এর ব্যাখ্যাঃ সফিয়্যাহ্ (রাঃ) ছিলেন খায়বার এলাকার ইয়াহূদী সর্দার হুয়াই ইবনু আখতার-এর কন্যা। বংশ পরম্পরায় তিনি ছিলেন মূসা (আ.)-এর বড় ভাই হারূন (আ.)-এর বংশের মহিলা। সপ্তম হিজরীতে খায়বার বিজয়ের সময় সফিয়্যাহ্ (রাঃ) দাসী হিসেবে বন্দি হয়ে মুসলিমদের হাতে আসলে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে মুক্ত করে দিয়ে নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন। এ হিসেবে যায়নাব (রাঃ) তাকে ইয়াহূদিনী হিসেবে তিরস্কার করেছিলেন।
(فَهَجَرَهَا ذَا الْحُجَّةِ وَالْمُحَرَّمَ وَبَعْضَ صَفَرٍ) ‘‘যিলহজ্জ মুহার্রম ও সফর মাসের কিছুদিন তার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেছিলেন’’।
ইবনুল মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হাদীসের এ অংশ দ্বারা বুঝা গেল যে, মন্দ কাজের জন্য তিনদিনের বেশি সময় কথাবার্তা বন্ধ রাখা বৈধ আছে। অর্থাৎ ধমক দেয়া ও আদব শিক্ষা দেয়ার ইচ্ছায়; শত্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টির ইচ্ছায় না। এখান থেকে আমরা পূর্ববর্তী হাদীস তথা তিনদিনের বেশি কথাবার্তা বন্ধ রাখা জায়িয না হাদীসটি ও অত্র হাদীসটির মধ্যে সমন্বয় বুঝতে পারলাম। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৫৯১)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সাক্ষাৎ ত্যাগ, সম্পর্কচ্ছেদ ও দোষান্বেষণে নিষেধাজ্ঞা
৫০৫০-[২৪] আবূ হুরায়রা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মারইয়াম-এর পুত্র ’ঈসা (আ.) এক ব্যক্তিকে চুরি করতে দেখলেন। ’ঈসা (আ.) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তুমি চুরি করেছ? সে বলল : কখনো না। ঐ সত্তার কসম! যিনি ছাড়া কোন ’ইবাদাতের যোগ্য কোন ইলাহ নেই। ’ঈসা (আ.) বললেনঃ আমি আল্লাহ তা’আলার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করলাম এবং নিজেকে নিজে মিথ্যাবাদী আখ্যায়িত করলাম। (মুসলিম)[1]
عَنْ
أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسلم: رأى عِيسَى بن مَرْيَمَ رَجُلًا يَسْرِقُ فَقَالَ لَهُ عِيسَى: سَرَقْتَ؟ قَالَ: كَلَّا وَالَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ. فَقَالَ عِيسَى: آمَنْتُ بِاللَّهِ وَكَذَّبْتُ نَفْسِي . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ (آمَنْتُ بِاللهِ) অর্থাৎ তোমার কসমের বাক্য থেকে মহান আল্লাহর যে একত্ববাদের কথা বুঝা যায় তার প্রতি আমি ঈমান এনেছি।
(وَكَذَّبْتُ نَفْسِي) অর্থাৎ তোমার শপথের উপর ভিত্তি করে গোপনে মাল নেয়ার সময় চুরির যে সম্ভাবনা ছিল সেটা আসলে চুরি হবে না। কারণ চুরির ক্ষেত্রে শারী‘আতের যে নির্ধারিত শর্ত আছে, তার একটি এখনও পাওয়া যায়নি।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আমি তোমার এ শপথ ‘‘আল্লাযী লা- ইলা-হা ইল্লা হুওয়া’’-এর ভিত্তিতে তোমাকে বিশ্বাস করলাম। আর তোমাকে দোষমুক্ত মনে করলাম, আর আমি তোমার ব্যাপারে যে ধারণা করেছিলাম তা থেকে ফিরে আসলাম আর আমি নিজেকে মিথ্যাবাদী আখ্যায়িত করলাম। মহান আল্লাহ বলেন, يٰاَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ ‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা বেশি ধারণা করা থেকে বেঁচে থাক, নিশ্চয় কতক ধারণা পাপ বা গুনাহের কাজ’’- (সূরাহ্ আল হুজুরাত ৪৯ : ১২)। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সাক্ষাৎ ত্যাগ, সম্পর্কচ্ছেদ ও দোষান্বেষণে নিষেধাজ্ঞা
৫০৫১-[২৫] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দারিদ্র্যতা যেন প্রায়ই কুফরীর সীমানা পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেবে, আর হিংসা বা উচ্চাশা যেন তাকদীরের উপর জয়লাভ করবে।[1]
وَعَنْ
أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «كَادَ الْفَقْرُ أَنْ يَكُونَ كفرا وكادَ الحسدُ أَن يغلب الْقدر»
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘ইয়াযীদ আর্ রুকাশী’’ নামের বর্ণনাকারী য‘ঈফ। দেখুন- য‘ঈফাহ্ ৪০৮০।
ব্যাখ্যাঃ (كَادَ الْفَقْرُ أَنْ يَكُونَ كُفْرًا) মূলত ধনী হলো সেই ব্যক্তি, যার হৃদয়টা ধনী তথা অভাবমুক্ত। আর গরীব হলো সেই, যার হৃদয়টা অভাবে পরিপূর্ণ; এ গরীব হৃদয়ই হলো কুফরীর কারণ। তা কখনো আল্লাহর সর্বক্ষমতার উপর প্রশ্ন উত্থাপন করে, আবার কখনো তাঁর সিদ্ধান্তের উপর অনীহা সৃষ্টি করে অথবা কখনো এ দরিদ্রতাই সরাসরি কুফরীর মধ্যে লিপ্ত করে ফেলে। আর এটা এভাবে যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, কাফির-মুশরিক-আল্লাহদ্রোহীরা পার্থিব ধন-ঐশ্বর্যের প্রাচুর্যতার মাঝে ডুবে আছে। পক্ষান্তরে বেশিরভাগ ইসলাম দরিদ্রতার নিচে বাস করে। স্বভাবত এটা দেখে অনেক মুসলিমই কুফরী করতে পারে। অথবা এমন মন্তব্য করে বসে যাতে সে কুফরী করে বসে। এজন্যই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘দরিদ্রতা যেন কুফরীর সীমা পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেয়।
(وَكَادَ الْحَسَدُ أَنْ يَّغْلِبَ الْقَدْرَ) আর হিংসা বা উচ্চাশা যেন তাকদীরের উপর জয়লাভ করবে। অর্থাৎ হিংসুক ব্যক্তি অন্যের নি‘আমাত দেখে তার ভিতরের সুপ্ত লালসাকে আরো বাড়িতে তোলে। সে অন্যের নি‘আমাত দূর হয়ে যাক এমন কামনা করে। আর নিজে সব নি‘আমাতের একক মালিক হোক- এমন কামনা করে। মহান আল্লাহ যে তাকদীর লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন এটা সে মনেই করে না। হিংসার প্রভাবে সকল নীতি-নৈতিকতা ভুলে যায়। সে মহান আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত তাকদীরকে যথাযথ সম্মান দেখাতে পারে না। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ১৭. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সাক্ষাৎ ত্যাগ, সম্পর্কচ্ছেদ ও দোষান্বেষণে নিষেধাজ্ঞা
৫০৫২-[২৬] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি নিজের কোন মুসলিম ভাইয়ের কাছে ওযর-আপত্তি করে এবং সে মুসলিম যদি তাকে অপারগ বা ওযরযোগ্য মনে না করে অথবা যদি তাকে ক্ষমা না করে, তবে যালীম তহসীলদারের মতো পাপী হবে। [বায়হাক্বী’র ’’শু’আবুল ঈমান’’;[1] আর ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ مَكَّاسٌ অর্থ- ওশর আদায়কারী বা তহসীলদার]
وَعَنْ
جَابِرٍ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنِ اعْتَذَرَ إِلَى أَخِيهِ فَلَمْ يَعْذِرْهُ أَوْ لَمْ يَقْبَلْ عُذْرَهُ كَانَ عَلَيْهِ مثلُ خَطِيئَة صَاحب المكس» . رَوَاهُمَا الْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ» وَقَالَ: الْمَكَّاسُ: الْعَشَّارُ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘ইবনু জুরায়জ’’ নামে একজন মুদাল্লিস রাবী আছে যে, ‘‘আন’’ দ্বারা হাদীস বর্ণনা করেছে। বিস্তারিত দেখুন- য‘ঈফাহ্ ১৯০৭।
ব্যাখ্যাঃ (كَانَ عَلَيْهِ مِثْلُ خَطِيئَةِ صَاحِبِ الْمَكْسٍ) বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ কোন ব্যক্তি যদি ওযর ও অক্ষমতা বা ক্ষমা প্রার্থনা করার পর যে ব্যক্তি তার ওযর গ্রহণ করল না বা তাকে ক্ষমা করল না, সে ব্যক্তি অত্যাচারী তহসীলদারের ন্যায় অপরাধী, এটা একটা মারাত্মক অপরাধ। অন্য একটি হাদীসে আবূ হুরায়রা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
عِفُّوا عَنْ نِسَاءِ النَّاسِ تَعِفَّ نِسَاؤُكُمْ، وَبِرُّوا آبَاءَكُمْ يَبِرُّكُمْ أَبْنَاؤُكُمْ، وَمَنْ أَتَاهُ أَخُوهُ مُتَنَصِّلًا فَلْيَقْبَلْ ذٰلِكَ مُحِقًّا كَانَ أَوْ مُبْطِلًا، فَإِنْ لَمْ يَفْعَلْ لَمْ يَرِدْ عَلَى الْحَوْضِ
‘তোমরা মানুষের মহিলাদের সতীত্ব বজায় রাখ, তবে তোমাদের মহিলাদেরও সতীত্ব বজায় রাখবে। তোমরা তোমাদের বাপ-দাদাদের সাথে সদাচরণ কর, তবে তোমাদের সন্তানরাও তোমাদের সাথে সদাচরণ করবে। আর তোমাদের কারো কাছে যদি কোন ভাই কোন ওযর অক্ষমতা নিয়ে আসে আর যদি সে সত্য বলে বা মিথ্যা বলে তবুও সে যেন তার ওযর গ্রহণ করে। আর যদি সে সেটা না করে তবে সে যেন আমার হাওযের নিকট না যায়। ইমাম হাকিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন, এর সানাদ সহীহ। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
অত্র হাদীসটি প্রমাণ করে ওযর-আপত্তি গ্রহণ না করলে সে যুলুমকারী তথা অত্যাচারির মতো। এর কারণ হলো, বিদ্‘আতকারী যেমন বিদ্‘আত করে নিজের প্রতি অত্যাচারের করার কারণে হাওযের কাছে আসতে পারবে না, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে তাড়িয়ে দিবেন, ঠিক তেমনি মানুষের ওযর অক্ষমতা অগ্রহণকারী বা প্রত্যাখ্যানকারী ব্যক্তিরও অবস্থা হবে। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ১৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - আত্মসংযম ও কাজে ধীরস্থিরতা
الْحَذَرِ শব্দের অর্থ : বিরত থাকা, সতর্ক থাকা বা সকল প্রকার ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকা। এ শব্দটি অত্যন্ত ব্যাপক অর্থবোধক।
الْحَذَرِ এমন কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকাকে বলে, যে কথা ও কাজে ইহকালীন ও পরকালীন চিরস্থায়ী সুখ থেকে বঞ্চিত করে এবং আত্মার উন্নতির পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
التَّأَنِّي শব্দের অর্থ : ধীরস্থিরভাবে কোন কাজ করা, তাড়াহুড়া করে কোন কাজ না করা। ধীরস্থিরতার মধ্যে আল্লাহর রহমত ও সাহায্য এসে থাকে। কোন কাজে তাড়াহুড়া পরিহার করে শলা-পরামর্শভিত্তিক ধীরস্থিরতার সাথে কাজ করা নবী-রসূলদের ও সাহাবীদের কর্ম ছিল। আলোচ্য অধ্যায়ে এ বিষয়ের হাদীসগুলো আলোচনা করা হয়েছে।
৫০৫৩-[১] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এক গর্ত থেকে মু’মিনকে দু’বার দংশন করা যায় না। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْحَذَرِ وَالتَّأَنِّىْ فِى الْأُمُورِ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يلْدغ الْمُؤمن من جُحر مرَّتَيْنِ» . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) থেকে কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন, তিনি বলেন, এ হাদীসটির পটভূমি হলো একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা, তা হলো : أَبُو غُرَّةَ ‘‘আবূ গুররাহ্’’ নামক এক ব্যক্তি কুরায়শ কাফিরদের মধ্যে একজন বিখ্যাত কবি ছিল। সে কবিতার ছন্দে মুসলিমদের কুৎসা রচনা করে জনসাধারণের মধ্যে প্রচার করত। অপরদিকে স্বীয় দলের দুরাচার লোকেদেরকে কবিতার মাধ্যমে মুসলিমদের বিরুদ্ধে অত্যাচার করার জন্য উদ্বুদ্ধ করত। বাদ্র যুদ্ধের দিন মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য ময়দানে নামলে তাকে বন্দি করে মদীনায় আনা হলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এ অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, সে ভবিষ্যতে এরূপ আর করবে না। এ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করেছিলেন। কিন্তু দেখা গেল যে, এ পাপিষ্ঠ তার সেই মন্দ চরিত্র থেকে ফেরেনি। এমনকি পরবর্তী বছর উহুদের যুদ্ধেও সে মুসলিমদের বিরুদ্ধে কবিতা আবৃত্তি করে ময়দানে উপস্থিত হয়েছে। এবারও সে মুসলিমদের হাতে বন্দি হয়ে মদীনায় আনীত হলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিলেন। এবারও সে মুসলিমদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটাবে না বলে শক্তভাবে প্রতিশ্রুতি দিলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, لَا يلْدغ الْمُؤمن من جُحر مرَّتَيْنِ ‘‘এক গর্ত থেকে মু’মিনকে দু’বার দংশন করা যায় না।’’ এরপর তাকে হত্যা করা হয়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬১৩৩)
(لَا يلْدغ) অর্থাৎ মু’মিন ব্যক্তির এমন গাফিল বা অমনোযোগী হওয়া উচিত নয় যে, একবার অসচেতনতাবশতঃ ধোঁকা খেয়ে পুনরায় ধোঁকা খাওয়া। এটা দুনিয়ার ক্ষেত্রে যেমন আখিরাতের ক্ষেত্রে ঠিক তেমনি। বলা হয়ে থাকে, এর অর্থ হলো মু’মিন কোন কাজের জন্য দুনিয়াতে শাস্তি পেলে পরকালে তাকে আর শাস্তি দেয়া হবে না। কথিত আছে : এ হাদীসটিতে অসাবধানতা থেকে সতর্ক করা হয়েছে। আর বিবেক-বুদ্ধিকে কাজে লাগানোর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
আবূ ‘উবায়দ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হাদীসটির অর্থ হলো, মু’মিন ব্যক্তির জন্য উচিত নয়, কোন কাজে বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার পর পুনরায় সে কাজে ফিরে যাওয়া।
হাফিয ইবনু হাজার আল ‘আসক্বালানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ বেশিরভাগ মুহাদ্দিস এটিই বুঝিয়েছেন। তাদের মধ্য থেকে এ হাদীসটির বর্ণনাকারী ইমাম যুহরী (রহিমাহুল্লাহ)-ও। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬১৩৩)
পরিচ্ছেদঃ ১৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আত্মসংযম ও কাজে ধীরস্থিরতা
৫০৫৪-[২] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’’আবদুল কায়স’’ গোত্রের গোত্রপতিকে বললেনঃ তোমার মধ্যে দু’টো চরিত্র এমন আছে যে, আল্লাহ তা’আলা সেটা পছন্দ করেন- ১. সহনশীলতা ও ২. ধীরস্থিরতা বা চিন্তা-ভাবনা করে কাজ করা। (মুসলিম)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لِأَشَجِّ عَبْدِ الْقَيْسِ: إِنَّ فِيكَ لَخَصْلَتَيْنِ يُحِبُّهُمَا الله: الْحلم والأناة . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ (لِأَشَجِّ عَبْدِ الْقَيْسِ) বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে : ‘আবদুল কায়স’ গোত্রের গোত্রপতি বলতে তাদের প্রতিনিধি দলের নেতা মুনযির ইবনু ‘আয়িয-কে বোঝানো হয়েছে। সহীহ মুসলিমের বর্ণনা দ্বারা এটাই বোঝা যায়- (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; শারহুন নাবাবী ১ম খন্ড, ১৭/২৫)। তবে তার নাম নিয়ে মতপার্থক্য আছে। ইবনুল কালবী বলেনঃ তার নাম মুনযির ইবনুল হারিস ইবনু যিয়াদ ইবনু ‘আসর ইবনু ‘আওফ। কথিত আছে, তার নাম : মুনযির ইবনু ‘আমির। কথিত আছে, মুনযির ইবনু ‘উবায়দ’। কথিত আছে, তার নাম : ‘আয়িয ইবনুল মুনযির। কথিত আছে, ‘আবদুল্লাহ্ ইবনু ‘আওফ। তবে সঠিক ও প্রসিদ্ধ হলো ইবনু ‘আবদুল বার ও অধিকাংশ মুহাদ্দিস যা বলেছেন, তা হলো তার নাম মুনযির ইবনু ‘আয়িয।
(শারহুন নাবাবী ১ম খন্ড, হাঃ ২৫-[১৭])
‘আবদুল কায়স’ গোত্রের প্রতিনিধি দলটি যখন মদীনায় পৌঁছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সাক্ষাতের জন্য উদ্যত হলো। তখন তাদের গোত্রপতি মুনযির ইবনু ‘আয়িয যাকে ‘আশাজ্জ’ নামে ডাকা হত। তিনি তাদের ঘরের কাছে এসে সবাইকে সুসংগঠিত করলেন। আর তার উটকে বেঁধে তার সুন্দর পোশাকটি পরিধান করলেন, এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আগমন করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কাছে ডেকে তার পাশে বসালেন। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন, তোমরা কি নিজেদের ও গোত্রের সকলের পক্ষ থেকে বায়‘আত করবে? জবাবে সম্প্রদায়ের সবাই বলল, হ্যাঁ। তখন আশাজ্জ তথা মুনযির ইবনু ‘আয়িয বললেন, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি একজন লোকের জন্যেও কোন বিষয়ে এমন নির্দেশ প্রদান করেননি, যেটা দীন পালনের ক্ষেত্রে তার জন্য কঠিন। এখন আমরা নিজেদের জন্য আপনার কাছে বায়‘আত করছি। আর গোত্রের লোকেদের নিকট আমরা লোক পাঠাব, যারা তাদেরকে ডাকবে। যারা আমাদের অনুসরণ করবে তারা আমাদের অন্তর্ভুক্ত হবে। আর যে অস্বীকার করবে আমরা তার সাথে লড়াই করব। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি সত্য কথা বলেছ, নিশ্চয় তোমার মধ্যে দু’টো চরিত্র এমন আছে যে, মহান আল্লাহ সেটা পছন্দ করেন - ১. সহনশীলতা ও ২. ধীরস্থিরতা বা চিন্তাভাবনা করে কাজ করা। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ২০১১; শারহুন নাবাবী ১ম খন্ড, হাঃ ২৫-[১৭])
(الْحِلْمُ وَالْأَنَاةُ) কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ أناة বলা হয়, সংশোধনের জন্য কাউকে অবকাশ দেয়া আর এ ব্যাপারে তাড়াহুড়া না করা। আর আলোচ্য হাদীসটিতে حلم বলতে বুঝানো হয়েছে, তার সঠিক জ্ঞান ও শাস্তি দেয়ার জন্য অবকাশ প্রদান করাকে। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ২০১১)
পরিচ্ছেদঃ ১৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আত্মসংযম ও কাজে ধীরস্থিরতা
৫০৫৫-[৩] সাহল ইবনু সা’দ আস্ সা’ইদী (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ধীরস্থিরভাবে কাজ করা আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে আসে, আর তাড়াহুড়া করে কাজ করা শয়তানের পক্ষ থেকে আসে।[তিরমিযী;[1]
আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসটি গরীব। কোন কোন হাদীসবিদ এর অন্যতম রাবী ’আবদুল মুহায়মিন ইবনু ’আব্বাস এর স্মরণশক্তি সম্পর্কে মতভেদ করেছেন।]
عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ السَّاعِدِيِّ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الْأَنَاةُ مِنَ اللَّهِ وَالْعَجَلَةُ مِنَ الشَّيْطَانِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ. وَقَدْ تَكَلَّمَ بَعْضُ أَهْلِ الْحَدِيثِ فِي عَبْدِ الْمُهَيْمِنِ بْنِ عَبَّاس الرَّاوِي من قبل حفظه
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘আবদুল মুহায়মিন ইবনু ‘আব্বাস ইবনু সাহল’’ নামের বর্ণনাকারী য‘ঈফ। দেখুন- হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৪৫৬ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ الْأَنَاةُ مِنَ اللهِ وَالْعَجَلَةُ مِنَ الشَّيْطَانِ ‘‘ধীরস্থিরভাবে কাজ করা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে আর তাড়াহুড়া করে কাজ করা শয়তানের পক্ষ থেকে আসে’’। ইমাম মানবী (রহিমাহুল্লাহ) শারহুল জামি‘উস্ সগীরে বলেনঃ ব্যক্তি শয়তানের ধোঁকায় পড়ে কোন কাজে তাড়াহুড়া করে। কারণ তাড়াহুড়া করা কোন কাজে সুপ্রতিষ্ঠিত হতে ও শাস্তির প্রদানের ক্ষেত্রে কাউকে অবকাশ দিতে বাধা দেয়। যার ফলে কাজের শেষে আফসোস অনুশোচনা করতে হয়। আর এটাই হলো শয়তানের চক্রান্ত ও তার কুমন্ত্রণা।
‘আমর ইবনুল ‘আস (রাঃ) বলেন, মানুষ যতদিন তাড়াহুড়ার ফল ছিঁড়বে ততদিন সে আফসোস করবে। অর্থাৎ যতদিন তাড়াহুড়া করে কাজ করবে ততদিন তার আফসোস শেষ হবে না। অতঃপর নিন্দিত তাড়াহুড়া বলা হয়, যাতে আনুগত্য থাকে না। যাতে সুপ্রতিষ্ঠিত করা বা প্রমাণ করা পাওয়া যায় না এবং যাতে কোন কিছু ছুটে যাওয়ার ভয় থাকে না। কারণ তাড়াহুড়া করা শয়তানের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে। অতঃপর তিনি বলেছিলেন, যদি সেটা মূসা (আ.)-এর কথার মতো হয়, وَعَجِلْتُ إِلَيْكَ رَبِّ لِتَرْضٰى ‘‘হে আমার রব্! আমি আপনার নিকট তাড়াতাড়ি এসেছি যাতে আপনি সন্তুষ্ট হন’’- (সূরাহ্ ত্ব-হা- ২০ : ৮৪)। বলা হয়ে থাকে, যেটা কল্যাণ কাজে তাড়াহুড়া করা হয় তাকে এ থেকে আলাদা করা হয়েছে। অর্থাৎ কল্যাণ কাজে তাড়াহুড়া করা যাবে। মহান আল্লাহ বলেন, إِنَّهُمْ كَانُوا يُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ ‘‘তারা কল্যাণ কাজে ছিল অগ্রগামী’’- (সূরাহ্ আল আম্বিয়া ২১ : ৯০)।
কারী বূন (بون) বলেনঃ আনুগত্যের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ও তাড়াহুড়া করা প্রশংসনীয়। আর ‘ইবাদাতের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করে ফেলা দোষণীয়। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ২০১২)
পরিচ্ছেদঃ ১৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আত্মসংযম ও কাজে ধীরস্থিরতা
৫০৫৬-[৪] আবূ সা’ঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব অতিক্রম করেছে, সে ব্যতীত কেউ সহনশীল হয় না এবং যে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে, সে ব্যতীত কেউ বিচারক হয় না। [আহমাদ ও তিরমিযী; আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান ও গরীব।][1]
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا حَلِيمَ إِلَّا ذُو تَجْرُبَةٍ» رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيب
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘দার্রাজ’’ নামের বর্ণনাকারী আছে, যার উপাধি আবুস্ সাম্হ, সে য‘ঈফ। বিস্তারিত দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ৫৬৪৬।
ব্যাখ্যাঃ لَا حَلِيمَ إِلَّا ذُو تَجْرُبَةٍ পা পিছলে যাওয়া ব্যক্তি বা হোঁচট খাওয়া ব্যক্তি। অথবা যে ব্যক্তি লেখা-লেখিতে বার বার ভুল করে লজ্জিত হয়। বলা হয়ে থাকে : সে ব্যক্তি ব্যতীত কেউ পূর্ণ সহনশীল হতে পারে না যে, অপদস্ততায় পতিত হয়েছে অথবা যার ভুল হয়ে গেছে, অতঃপর তার ভুলকে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। তারপর সে বুঝতে পেরেছে ক্ষমা কি জিনিস। সে তখন অন্যের ভুলের সময় সহনশীল হতে পারে। কারণ সে সেই সময় প্রতিষ্ঠিত ছিল। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ২০৩৩)
وَلَا حَكِيمَ إِلَّا ذُو تَجْرِبَةٍ অর্থাৎ নিজের বা অন্যের ক্ষেত্রে পরীক্ষিত ব্যক্তি ছাড়া কেউ বিচারক হতে পারে না।
মুল্লা ‘আলী কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ব্যাখ্যাকার বলেছেন, সকল বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা ছাড়া ও সংশোধনমূলক জ্ঞান ও ধ্বংসাত্মক জ্ঞান অর্জন না করে কেউ পূর্ণ বিচারক হতে পারে না।
কারণ হলো জ্ঞান অর্জন না করে কেউ পূর্ণ বিচারক হতে পারে না, কারণ বিচারক কোন বিষয়ের হিকমাত ছাড়া কোন কাজ করতে পারেন না। আর হিকমাতই কোন বিষয় নষ্ট হওয়া থেকে সঠিকতায় পৌঁছে দেয়। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ২০৩৩)
পরিচ্ছেদঃ ১৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আত্মসংযম ও কাজে ধীরস্থিরতা
৫০৫৭-[৫] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। জনৈক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জিজ্ঞেস করল, আপনি আমাকে উপদেশ দিন। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তুমি পরিণাম ভেবে তোমার কাজ সম্পাদন করো। যদি তার শেষ ফল ভালো দেখো, তবে করে ফেলো। আর যদি শেষ ফল ভ্রান্ত ও খারাপ বলে ধারণা করো, তবে তা পরিত্যাগ করো। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
وَعَنْ أَنَسٍ أَنَّ رَجُلًا قَالَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَوْصِنِي. فَقَالَ: «خُذِ الْأَمْرَ بِالتَّدْبِيرِ فَإِنْ رَأَيْتَ فِي عَاقِبَتِهِ خَيْرًا فَأَمْضِهِ وَإِنْ خِفْتَ غَيًّا فَأَمْسِكْ» . رَوَاهُ فِي «شَرْحِ السّنة»
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘আববান’’ নামের বর্ণনাকারী মাতরূক বা পরিত্যক্ত। দেখুন- হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৪৫৭ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ (خُذِ الْأَمْرَ بِالتَّدْبِيرِ) ‘‘তুমি পরিণাম ভেবে করবে’’ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট জনৈক ব্যক্তি এসে কিছু উপদেশ প্রদানের আবদার করলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে পরিণাম ভেবে কাজ করার পরামর্শ দিলেন। কাজটি কল্যাণকর, না ক্ষতিকর- সে সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করা এবং কাজটি করার পর তার পরিণাম কি হবে সে বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করাই হলো হাদীসটির সারকথা।
(وَإِنْ خِفْتَ) ‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এখানে الخوف (ভয়কর) শব্দটি الظن (ধারণা করা) অর্থে। যেমন মহান আল্লাহর বাণী- إِلَّا أَنْ يَخَافَا أَلَّا يُقِيمَا حُدُودَ اللهِ ‘তবে যদি তুমি মনে করো যে, তুমি আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না’’- (সূরাহ্ আল বাকারাহ্ ২ : ২২৯)। আবার علم (জ্ঞান) ও اليقين (দৃঢ় বিশ্বাস) অর্থেও ব্যবহৃত হয়। কারণ যে ব্যক্তি কোন জিনিসকে ভয় পায়, সে তার থেকে দূরে থাকে এবং তার বাস্তবতা বা সঠিক সমাধান খুঁজে বের করে। এখানে সঠিক জিনিস খুঁজে বের করার শিক্ষা রয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
শিক্ষণীয় : অনেক লোক এমন রয়েছে যারা পরিণাম ভেবে কথা বলে না বা কাজ করে না। ফলে দেখা যায়, কথা বলার পরে বা কাজ করে ফেলার পরে হতাশা বা দুশ্চিন্তায় ভোগে। এ কারণেই বাংলায় একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে, ‘ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না’। আর আমাদের বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথাটিই বহুদিন পূর্বে বলে গেছেন, যাতে মুসলিম জাতির উন্নতির পথে হতাশা বা আফসোস অন্তরায় না হতে পারে। কারণ পরিণাম ভেবে কাজ না করলে হতাশা বা আফসোস করা স্বাভাবিক বিষয়। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ১৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আত্মসংযম ও কাজে ধীরস্থিরতা
৫০৫৮-[৬] মুস্’আব ইবনু সা’দ তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন। আ’মাশ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমি এ বাণী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বলেই জানি যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ সব কাজেই দেরি করা ও ধীরে-সুস্থে করা উত্তম; কিন্তু আখিরাতের কাজ ব্যতীত। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ مُصْعَبِ بْنِ سَعْدٍ عَنْ أَبِيهِ قَالَ الْأَعْمَشُ: لَا أَعْلَمُهُ إِلَّا عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «التُّؤَدَةُ فِي كُلِّ شَيْء إِلَّا فِي عَمَلِ الْآخِرَةِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যাঃ (قَالَ الْأَعْمَشُ) অর্থাৎ একজন বর্ণনাকারী। তিনি একজন প্রসিদ্ধ সম্মানিত তাবি‘ঈ। তার প্রকৃত নাম ছিল সুলায়মান ইবনু মিহরান আল কাহলী আল আসাদী। তিনি বানূ কাহিল-এর আযাদকৃত গোলাম ছিলেন। তিনি ৬০ হিজরীতে الري ‘রায়’ নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। অতঃপর তাকে কূফায় আনা হলে বানূ কাহিল-এর এক ব্যক্তি তাকে ক্রয় করেন এবং তাঁকে আযাদ করে দেন। তিনি হাদীস ও ‘ইলমে ক্বিরাআত সম্পর্কে একজন প্রসিদ্ধ পন্ডিত ছিলেন। অধিকাংশ কূফাবাসী তার ওপর নির্ভর করত। তাঁর নিকট থেকে অনেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি ১৪৮ হিজরী সনে মৃত্যুবরণ করেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(إِلَّا فِي عَمَلِ الْآخِرَةِ) অর্থাৎ কারণ আখিরাতের কাজে দেরী করা হলো বিপদ। আর বর্ণিত আছে যে, জাহান্নামবাসীদের অধিকাংশের চিৎকার শোনা যাবে কাজের গতিক্রিয়া থেকেই।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ পার্থিব কাজ চিন্তা-গবেষণার প্রথমেই উপলব্ধি করা মানুষের পক্ষ সম্ভব নয়। পক্ষান্তরে পরকালের অবশ্যম্ভাবী মুক্তির উত্তম কাজ যথাশীঘ্র করাই বাঞ্ছনীয়। মহান আল্লাহ বলেনঃ فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرَاتِ ‘‘...তোমরা কল্যাণকর কাজে প্রতিযোগিতা কর...’’- (সূরাহ্ আল বাকারাহ্ ২ : ১৪৮; সূরাহ্ আল মায়িদাহ্ ৫ : ৪৮)। وَسَارِعُوا إِلٰى مَغْفِرَةٍ مِّنْ رَبِّكُمْ ‘‘তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমার দিকে ছুটে যাও...’’- (সূরাহ্ আ-লি ‘ইমরা-ন ৩ : ১৩৩)।
الشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ ‘‘শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্র্যতার প্রতিশ্রুতি দেয়...’’- (সূরাহ্ আল বাকারাহ্ ২ : ২৬৮)। এ আয়াত সম্পর্কে ইমাম গাযালী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ মু’মিনের কর্তব্য হলো যখন তার সামর্থ্য থাকে দান করার সে যেন দান করে দেয়। দান করা থেকে বিরত না থাকে। কারণ শয়তান তাকে দারিদ্র্যতার প্রতিশ্রুতি দেয়, তাকে দারিদ্র্যতার ভয় দেখায় ও দান করা থেকে তাকে বিরত রাখে। আবুল হাসান ফারশাখী একবার টয়লেটে প্রবেশ করে তার এক ছাত্রকে ডেকে বললেন, তুমি আমার শরীর থেকে জামাটা খুলে অমুক লোককে দিয়ে দাও। জবাবে ছাত্রটি বলল, যদি আপনি বের হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধারণ করতেন। তখন তিনি বললেন, তাকে দান করতে আমি ভুলে যেতে পারি। আর আমি আমার মনের ব্যাপারে নিরাপদ নই, সে হয়ত পরিবর্তনও হয়ে যেতে পারে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আত্মসংযম ও কাজে ধীরস্থিরতা
৫০৫৯-[৭] ’আবদুল্লাহ ইবনু সারজিস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ উত্তম চাল-চলন, ধীরস্থির পদক্ষেপ এবং মধ্যম পন্থা অবলম্বন নুবুওয়াতের চব্বিশ ভাগের এক ভাগ। (তিরমিযী)[1]
وَعَن عبد الله بن جرجس أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «السَّمْتُ الْحَسَنُ وَالتُّؤَدَةُ وَالِاقْتِصَادُ جُزْءٌ مِنْ أَرْبَعٍ وَعشْرين جُزْءا من النُّبُوَّة» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ (السَّمْتُ الْحَسَنُ) অর্থাৎ পছন্দনীয় বা সন্তোষজনক চাল-চলন ও উত্তম পথ-পদ্ধতি। এ ছাড়াও السَّمْتُ শব্দের অর্থ রাস্তা, পথ। এখানে السَّمْتُ দ্বারা সৎলোকদের পদাঙ্কের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। এছাড়াও السَّمْتُ শব্দ দ্বারা কোন রীতিনীতিকে আঁকড়ে ধরা বুঝায়।
(وَالتُّؤَدَةُ وَالِاقْتِصَادُ) বলা হয় সকল কাজে ধীরস্থিরতা অবলম্বন করাকে। আর التُّؤَدَةُ অর্থ- সর্বাবস্থায় মধ্যম পন্থা অবম্বন করা। আর সংকোচন ও অতিরঞ্জন বা সীমালঙ্ঘন থেকে বিরত থাকা।
ইমাম তূরিবিশতী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ মধ্যপন্থা দুই প্রকারের : প্রথমটি হল- যেটি প্রশংসনীয় ও নিন্দনীয় এর মাঝামাঝি হয়। যেমন- অত্যাচার ও ন্যায় এবং কৃপণতা ও দানের মাঝামাঝি। আর আমি এই প্রকারটি নিয়েছি মহান আল্লাহর কথা দ্বারা- وَمِنْهُمْ مُقْتَصِدٌ ‘‘...আর তাদের মধ্যে আছে মধ্যমপন্থী...’’- (সূরাহ্ ফাত্বির ৩৫ : ৩২)।
আর দ্বিতীয় প্রকারটি হলো : সাধারণভাবে প্রশংসনীয় হওয়া বুঝায়। এর দু’টি দিক আছে- সংকোচন ও অতিরঞ্জন জ্ঞান বা সীমালঙ্ঘন। যেমন দান করা। নিশ্চয় এটা অপব্যয় ও কৃপণতার মাঝামাঝি। বীরত্ব এটাও ভীতু ও কাপুরুষতার মাঝামাঝি। আর হাদীসটিতে মধ্যপন্থা বলতে সাধারণভাবে প্রশংসনীয় এই প্রকারটিকে বুঝানো হয়েছে।
(من النُّبُوَّة) অর্থাৎ নুবুওয়াতের অনেক অংশের মধ্য থেকে এটাও একটা অংশ।
ইমাম খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ السَّمْتُ হলো চলার পথ। আর الِاقْتِصَادُ হলো যাবতীয় কাজ-কর্মে মধ্যম পন্থায় সমাধানের চেষ্টায় রত থাকা, যাতে করে কাজটির উপর স্থির থাকা সম্ভব হয়। ‘নুবুওয়াতের অংশ’ এ কথাটি দ্বারা তিনি ইচ্ছা করেছেন বা বুঝতে চেয়েছেন, এসব উত্তম চরিত্র বৈশিষ্ট্য আম্বিয়া কিরামের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যের অন্তর্ভুক্ত। আর এটা তাদের মর্যাদার অংশবিশেষ। সুতরাং তোমরা এর অনুসরণ কর এবং এসব উত্তম চরিত্র অর্জনে নবীগণের অনুসরণ কর। এর অর্থ এই নয় যে, নুবুওয়াত একটি বিভাজ্য বস্তু, আর যার মধ্যে এসব চরিত্র পাওয়া যাবে, সেই ব্যক্তি নবী হয়ে যাবে; বরং নুবুওয়াত একটি ঐশী দান, মহান আল্লাহ যাকে ইচ্ছা এ পদমর্যাদা দান করেন। কেউ নিজ ইচ্ছায় বা নিজ চেষ্টা-সাধনা দ্বারা নবী হতে পারে না। কিংবা এর অর্থ এসব চরিত্র বৈশিষ্ট্য সেই মহৎ গুণের অন্তর্ভুক্ত, যা শিক্ষাদানের জন্য নবী-রসূলগণ এ দুনিয়ায় প্রেরিত হয়েছিলেন। অথবা এর অর্থ যে ব্যক্তির মাঝে এর গুণাবলীসমূহ একত্রিত হয়েছে মানুষ তাকে সম্মান-মর্যাদা প্রদান করে। আর মহান আল্লাহ তাকে এমন তাকওয়ার পোশাক পরিধান করান যা তিনি তার নবীদেরকে পরিধান করিয়েছিলেন, আর এটা যেন নুবুওয়াতেরই অংশবিশেষ। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ২০১০; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আত্মসংযম ও কাজে ধীরস্থিরতা
৫০৬০-[৮] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ উত্তম অভ্যাস, উত্তম চাল-চলন এবং মধ্যম পন্থা অবলম্বন নুবুওয়াতের পঁচিশ ভাগের এক ভাগ। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ نَبِيَّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّ الْهَدْيَ الصَّالِحَ وَالِاقْتِصَادَ جُزْءٌ مِنْ خَمْسٍ وَعِشْرِينَ جُزْءًا مِنَ النُّبُوَّة» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ (الْهَدْيَ الصَّالِحَ) বলা হয়, সঠিক পথ বা রাস্তাকে।
(السَّمْتُ) হলো চাল-চলন, বেশ-ভূষণ সুন্দর হওয়া। আর এর মূল (الهدى ও المت একই জিনিস) হলো অনুসরণীয় পথ। আর ‘নিহায়াহ্’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, الصَّالِحُ অর্থ তার অবস্থা বেশ-ভূষণ দীনের ক্ষেত্রে সুন্দর হয়েছে। এটা কেবল চেহারা বা গায়ের রং এর দিক থেকে নয়।
(جُزْءًا مِنَ النُّبُوَّة) পূর্বোক্ত হাদীসের, এর مِنَ النُّبُوَّة এর আলোচনা দ্রঃ। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৭৬৮)
পরিচ্ছেদঃ ১৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আত্মসংযম ও কাজে ধীরস্থিরতা
৫০৬১-[৯] জাবির ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যখন কোন ব্যক্তি কোন কথা বলে, অতঃপর এদিক-ওদিক দৃষ্টিপাত করে, তবে তা (শ্রোতার জন্য) আমানাত তথা গচ্ছিত বস্তু। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِذَا حَدَّثَ الرَّجُلُ الْحَدِيثَ ثُمَّ الْتَفَتَ فَهِيَ أَمَانَةٌ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ ‘আলকামাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ তোমার নিকট কেউ কোন কথা বলার পর চলে গেলে সে কথাটি তোমার জন্য আমানাত হয়ে যায়। সে আমানাত নষ্ট করা তোমার জন্য জায়িয নয়। তিনি এদিক-সেদিক তাকানো (الْتَفَتَ) এর অর্থ করেছেন, চলে যাওয়া غاب; তবে প্রথম মতটিই অধিক বিশুদ্ধ।
ইবনু রসলান (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ কেননা তার এদিক-সেদিক তাকানো এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, যার কাছে সে কথাটি বলেছে সে ছাড়া অন্য কেউ কথাটি না শুনুক। আর সে এ কথাকে গোপন রাখার চেষ্টা করছে। তার এদিক-সেদিক চাওয়া প্রমাণ করে যে, তুমি এ কথা আমার থেকে নাও আর গোপন রাখ। এ কথাটি তোমার জন্য আমানাত, অর্থাৎ তুমি কথাটি কারো কাছে বলবে না।
(فَهِيَ أَمَانَةٌ) অর্থাৎ যখন কোন ব্যক্তি কারো নিকট কোন কথা বলে গোপন রাখার ইচ্ছায় এদিক সেদিক তাকায়, যাতে কেউ না শুনতে পায় তবে যার কাছে সে কথাটি বলছে, তার জন্য আমানাত স্বরূপ হবে। এ কথাটির হুকুম তখন আমানাতের হুকুমে হবে। তখন যার কাছে কথা বলা হয়েছে তার জন্য এ কথা প্রচার করে আমানাতকে নষ্ট করা বৈধ নয়। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৮৬০; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৯৫৯)
পরিচ্ছেদঃ ১৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আত্মসংযম ও কাজে ধীরস্থিরতা
৫০৬২-[১০] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবুল হায়সাম ইবনু তাইয়িহান (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার কোন খাদিম আছে? তিনি বললেনঃ না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ যখন আমার কাছে গোলাম আসে, তুমি আসবে। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে দু’জন গোলাম আনা হলে আবুল হায়সাম(রাঃ) উপস্থিত হলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ দু’জনের মধ্য থেকে একজনকে নিয়ে যাও। তিনি বললেনঃ হে আল্লাহর নবী! আপনি আমার জন্য বেছে দিন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যার কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণ করা হয়, তাকে বিশ্বস্ত হওয়া উচিত। তুমি এ গোলামটিকে নিয়ে যাও। আমি তাকে সালাত আদায় করতে দেখেছি। আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি যে, তুমি তার সাথে সদাচরণ করবে। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ أَبِي
هُرَيْرَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لأبي الهيثمِ بن التَّيِّهان: «هَلْ لَكَ خَادِمٌ؟» فَقَالَ: لَا. قَالَ: فَإِذَا أَتَانَا سَبْيٌ فَأْتِنَا فَأُتِيَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِرَأْسَيْنِ فَأَتَاهُ أَبُو الْهَيْثَمِ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اخْتَرْ مِنْهُمَا» . فَقَالَ: يَا نَبِيَّ اللَّهِ اخْتَرْ لِي فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ الْمُسْتَشَارَ مُؤْتَمَنٌ. خُذْ هَذَا فَإِنِّي رَأَيْتُهُ يُصَلِّي وَاسْتَوْصِ بِهِ مَعْرُوفًا» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ (الْمُسْتَشَارَ مُؤْتَمَنٌ) এখানে الْمُسْتَشَارَ অর্থ যার নিকট পরামর্শ বা মতামত চাওয়া হয়, আর مُؤْتَمَنٌ অর্থ আমানাতদার বা বিশ্বস্ত। অর্থাৎ কোন ব্যক্তির নিকট যে কোন বিষয়ের পরামর্শ চাওয়া হলে সে সেটার ব্যাপারে আমানাতদার।
অতএব যে পরামর্শ চাইবে তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা (খিয়ানাত) করা উচিত নয়। পরামর্শদাতার উচিত হলো কল্যাণকর বিষয়টি নির্বাচন করে দেয়া। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫১১৯)
(وَاسْتَوْصِ بِه مَعْرُوفًا) অর্থাৎ তাকে কল্যাণকর কাজ ছাড়া অন্য কোন কাজের নির্দেশ দিবে না। আর তার জন্য সব সময় কল্যাণ কামনা করবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আত্মসংযম ও কাজে ধীরস্থিরতা
৫০৬৩-[১১] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সকল বৈঠকের ব্যাপারই আমানাতের মতো। তবে তিনটি বৈঠকের ব্যাপারে আমানাতস্বরূপ নয়, যথা- ১. অন্যায়ভাবে হত্যার ষড়যন্ত্র বৈঠকের কথাবার্তা, ২. গোপনে ব্যভিচারের ষড়যন্ত্রের কথাবার্তা এবং ৩. অন্যায়ভাবে কারো সম্পদ ছিনিয়ে নেয়ার ষড়যন্ত্র বৈঠকের কথাবার্তা। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ جَابِرٍ
قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: المجالسُ بالأمانةِ إِلَّا ثلاثَةَ مَجَالِسَ: سَفْكُ دَمٍ حَرَامٍ أَوْ فَرْجٌ حَرَامٌ واقتطاع مَالٍ بِغَيْرِ حَقٍّ . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
وَذَكَرَ حَدِيثَ أَبِي سَعِيدٍ: «إِنَّ أَعْظَمَ الْأَمَانَةِ» فِي «بَاب المباشرةِ» فِي «الْفَصْل الأول»
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘ইবনু আবূ জাবির’’ নামক বর্ণনাকারীর অজ্ঞতার কারণে হাদীসটি য‘ঈফ, কারণ তার পরিচয় পাওয়া যায়নি। বিস্তারিত দেখুন- য‘ঈফাহ্ ১৯০৯।
ব্যাখ্যাঃ (المجالسُ بالأمانةِ) ইবনু রসলান (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ بالأمانةِ শব্দের ‘বা’ বর্ণটি দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, এখানে কিছু শব্দ গোপন আছে তা হলো تَحَسُّنُ الْمَجَالِسِ অথবা حُسْنُ الْمَجَالِسِ وَشَرَفُهَا উত্তম মাজলিস ও সম্মানিত মাজলিস যেটি যার উপস্থিতিগণ সকল কথা ও কাজকে গোপন রাখে। এর অর্থ হলো- মাজলিসের উপস্থিতিগণ যা শুনেছে ও দেখেছে সে ব্যাপারে যেন আমানাতদার হয়।
(بِغَيْرِ حَقٍّ) অর্থাৎ কোন মাজলিসে কেউ যদি বলে যে, আমি অমুক ব্যক্তিকে হত্যা করতে চাই, অথবা অমুকের সাথে (মেয়ের) ব্যভিচার করতে চাই।
অথবা অমুকের সম্পদ কেড়ে নিতে চাই তখন যে ব্যক্তি এটা শুনল তার কর্তব্য হলো তা প্রচার করে দেয়া, যাতে তার ক্ষতিকে বন্ধ করে দেয়া সম্ভব হয়। তার জন্য শোনার পর চুপ থাকা জায়িয নেই। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৮৬১)
পরিচ্ছেদঃ ১৮. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - আত্মসংযম ও কাজে ধীরস্থিরতা
৫০৬৪-[১২] আবূ হুরায়রা (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা যখন ’’জ্ঞান’’ সৃষ্টি করলেন, তখন ’’জ্ঞান’’-কে বললেনঃ তুমি দাঁড়াও, তখন জ্ঞান দাঁড়াল। অতঃপর তাকে বললেনঃ পিছনে ফিরো। সে পিছনে ফিরল। অতঃপর তাকে বললেনঃ সামনের দিকে ফিরো। সে ফিরল। অতঃপর বললেনঃ বসো। সে বসল। অতঃপর তাকে বললেনঃ আমি তোমার চেয়ে উত্তম, শ্রেষ্ঠ ও সুন্দর কোন বস্তু সৃষ্টি করিনি। আমি তোমার সাহায্যেই বান্দার নিকট থেকে বন্দেগী গ্রহণ করি, তোমারই দ্বারা বান্দাকে দান করি, তোমারই দ্বারা আমি পরিচিত হই, তোমার দ্বারা অসন্তুষ্টি দেখাই, তোমারই দ্বারা পুণ্য দান করি, আর তোমারই ওপর শাস্তি দেই। কতিপয় ’আলিম এর মধ্যে সমালোচনা করেছেন।[1]
عَنْ
أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لَمَّا خَلَقَ اللَّهُ الْعَقْلَ قَالَ لَهُ: قُمْ فَقَامَ ثُمَّ قَالَ لَهُ: أدبر ثُمَّ قَالَ لَهُ: أَقْبِلْ فَأَقْبَلَ ثُمَّ قَالَ لَهُ: اقْعُدْ فَقَعَدَ ثُمَّ قَالَ: مَا خَلَقْتُ خَلْقًا هُوَ خَيْرٌ مِنْكَ وَلَا أَفْضَلُ مِنْكَ وَلَا أَحْسَنُ مِنْكَ بِكَ آخُذُ وَبِكَ أُعْطِي وَبِكَ أُعْرَفُ وَبِكَ أُعَاتِبُ وَبِكَ الثَّوَابُ وَعَلَيْكَ العقابُ . وَقد تكلم فِيهِ بعض الْعلمَاء
হাদীসটিকে ইবনুল জাওযী ও ইবনু তায়মিয়াহ্ (রহিমাহুল্লাহ) মাওযূ‘/জাল বলেছেন, আর ‘আকল (জ্ঞান) সম্পর্কে যত হাদীস বর্ণিত হয়েছে তার কোনটিই সহীহ নয়, বরং ইবনু তায়মিয়াহ্ সবগুলোকেই জাল বলেছেন। আর এ ব্যাপারে ইবনু কইয়িম তাঁর ‘আল মানারুল মুনীফ’ কিতাবের ২৫ পৃঃ তার অনুসরণ করেছেন। দেখুন- হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৪৫৯ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ (لَمَّا خَلَقَ اللهُ الْعَقْلَ) প্রকাশ্য হাদীস দ্বারা বোঝা যায় যে, عَقْلَ-এরও দেহাবয়ব আছে। যেমন, মহান আল্লাহ জীবন এবং মৃত্যুকে দুম্বার আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন। আগে-পিছে যাওয়া, উঠা-বসা মানুষের জ্ঞানের তারতম্য অনুসারে। এসব গোপন কার্যসমূহ ‘আকল বা জ্ঞান থেকে সৃষ্টি হয়। সম্ভবত ‘ক্বিয়াম ও ক্বুউদ দ্বারা প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্যের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
‘ইকবাল’ দ্বারা কোন বস্তুর প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধের অর্থ করা হয়েছে। ইদবার দ্বারা আল্লাহর ইচ্ছার সাথে জড়িত বিষয় থেকে বিমুখ থাকার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ সম্পূর্ণ বাক্যটির দ্বারা এ কথার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, عَقْلَ হলো শারী‘আতের বিধান পালনের হেতু। এ কারণে আদেশ-নিষেধ আছে। এটা দ্বারাই সৃষ্টির ‘ইবাদাতের পরিসমাপ্তি হয়। কারণ মহান আল্লাহ ‘ইবাদাতের জন্যই আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(مَا خَلَقْتُ خَلْقًا هُوَ خَيْرٌ مِنْكَ) অর্থাৎ মানুষের বিবেক-বুদ্ধি এমন এক মূল্যবান রত্ন, যার ভিত্তিতে সম্মানিত ব্যক্তি সম্মানিত হয় আর অসম্মানিত ব্যক্তি অসম্মানিত হয়।
এজন্যই মহান আল্লাহ উল্লেখিত হাদীসে বলেন- ‘‘আমি তোমার চেয়ে উত্তম, শ্রেষ্ঠ ও সুন্দর কোন বস্তু সৃষ্টি করিনি’’। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৮. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - আত্মসংযম ও কাজে ধীরস্থিরতা
৫০৬৫-[১৩] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এক ব্যক্তি সালাত আদায়কারী, সায়িম (রোযাদার), যাকাতদাতা, হজ্জ ও ’উমরাহ্ পালনকারী হয়, এমনকি তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলতে বলতে সকল ভালো কাজের নামই বললেন; কিন্তু কিয়ামতের দিন তাকে তার জ্ঞান পরিমাণই প্রতিফল দেয়া হবে।[1]
وَعَنِ ابْنِ
عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ الرَّجُلَ لِيَكُونُ مِنْ أَهْلِ الصَّلَاةِ وَالصَّوْمِ وَالزَّكَاةِ وَالْحَجِّ وَالْعُمْرَةِ» . حَتَّى ذَكَرَ سِهَامَ الْخَيْرِ كُلَّهَا: «وَمَا يُجْزَى يَوْم الْقِيَامَة إِلا بقدرِ عقله»
হাদীসটি বাত্বিল হওয়ার কারণ, এর সনদে মানসূর ইবনু সক্বীর আর জাযায়ী য‘ঈফ। বিস্তারিত দেখুন- য‘ঈফাহ্ ৫৫৫৭।
ব্যাখ্যাঃ (يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِلَّا بِقَدْرِ عَقْلِه) অর্থাৎ সকল ‘ইবাদাতের ক্ষেত্রে সে কিভাবে তার জ্ঞান-বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়েছে কিয়ামতের দিন সে অনুপাতে ফল পাবে। সম্ভবত এখানে ‘আকল দ্বারা উদ্দেশ্য সে তার ‘আকল তথা জ্ঞান বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে তা দ্বারা উপকৃত হওয়া এবং যাবতীয় ‘ইবাদাতে সাওয়াব লাভের মাধ্যমে উঁচু মর্যাদা লাভ করা। মূল কথা হলো, যখন কোন ব্যক্তি তার বিবেক-বুদ্ধিকে খাটিয়ে ইখলাসের সাথে ‘ইবাদাত করবে তখন তার সেই কর্মের প্রতিফল সে কিয়ামতের ময়দানে প্রাপ্ত হবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৮. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - আত্মসংযম ও কাজে ধীরস্থিরতা
৫০৬৬-[১৪] আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেনঃ হে আবূ যার! তদবীর বা পরিণাম ভেবে কাজ করার মতো কোন জ্ঞান নেই, নিবৃত্ত থাকার মতো কোন আল্লাহভীতি নেই এবং উত্তম চরিত্রের মতো কোন আভিজাত্য নেই।[1]
وَعَنْ أَبِي
ذَرٍّ قَالَ: قَالَ لِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَا أَبَا ذَرٍّ لَا عَقْلَ كَالتَّدْبِيرِ وَلَا ورع كالكفِّ ولاحسب كحسن الْخلق»
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘আল মাযী ইবনু মুহাম্মাদ আল গফিক্বী আল মিসরী’’ থাকার কারণে সানাদটি য‘ঈফ। দেখুন- য‘ঈফাহ্ ১৯১০।
ব্যাখ্যাঃ (لَا عَقْلَ كَالتَّدْبِيرِ) অর্থাৎ সকল কাজের পরিণাম চিন্তা-ভাবনা করার জ্ঞান-বুদ্ধির মতো কোন জ্ঞান-বুদ্ধি নেই। (كالكفِّ) অর্থাৎ নিষিদ্ধ কর্মসমূহ থেকে বিরত থাকা আদেশকৃত বা নির্দেশিত কর্মসমূহ পালন করার মতো আর এটাকেই الورع বা আল্লাহভীতি বলে। (ইবনু মাজাহ ৩য় খন্ড, হাঃ ৪২১৮)
পরিচ্ছেদঃ ১৮. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - আত্মসংযম ও কাজে ধীরস্থিরতা
৫০৬৭-[১৫] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ব্যয় নির্বাহের ব্যাপারে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা জীবন-যাপনের অর্ধেক, মানুষের প্রতি ভালোবাসা জ্ঞানের অর্ধেক এবং জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশে সুন্দরভাবে প্রশ্ন করা বিদ্যার অর্ধেক।
[উপরোক্ত চারটি হাদীস ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) ’’শু’আবুল ঈমানে’’ বর্ণনা করেছেন।][1]
وَعَنِ ابْنِ
عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الِاقْتِصَادُ فِي النَّفَقَةِ نِصْفُ الْمَعِيشَةِ وَالتَّوَدُّدُ إِلَى النَّاسِ نِصْفُ الْعَقْلِ وَحُسْنُ السُّؤَالِ نِصْفُ الْعِلْمِ» رَوَى الْبَيْهَقِيُّ الْأَحَادِيثَ الْأَرْبَعَةَ فِي شُعَبِ الْإِيمَانِ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘মুখয়স (مخيس) ও হাফস্’’ নামের দু’ বর্ণনাকারীই মাজহূল বা অপরিচিত। ইমাম যাহাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হিশাম ইবনু ‘আম্মার মুখয়স থেকে মুনকার হাদীস বর্ণনা করত। দেখুন- য‘ঈফাহ্ ১৫৭।
ব্যাখ্যাঃ (الِاقْتِصَادُ فِي النَّفَقَةِ نِصْفُ الْمَعِيشَةِ) অর্থাৎ ব্যয় করার ক্ষেত্রে বা দান করার ক্ষেত্রে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা জীবন যাপনের অর্ধেক। এটা গ্রহণ করা হয়েছে মহান আল্লাহর বাণী থেকে। তিনি বলেন,
وَالَّذِينَ إِذَا أَنْفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذٰلِكَ قَوَامًا
‘‘আর তারা যখন ব্যয় করে তখন অপব্যয় করে না, কৃপণতাও করেন না, আর তাদের পন্থা হয় এতদুভয়ের মধ্যবর্তী।’’ (সূরাহ্ আল ফুরকান ২৫ : ৬৭)
(نِصْفُ الْعَقْلِ) অর্থাৎ তার অর্ধেক জ্ঞান ব্যবহার করার কারণে, অথবা অর্ধেক জ্ঞান অর্জন করার কারণে। কারণ সৎ মুসলিম ব্যক্তির সাথে সাথী হওয়ার কারণে তার জ্ঞান অর্জিত হল। ব্যক্তি একা থাকার কারণে তার ‘আকল অর্ধেক ছিল। আর তার সাথীর ‘আকলের দ্বারা তার ‘আকল পূর্ণ হলো। এ কারণেই বলা হয়, عِلْمَانِ خَيْرٌ مِنْ عِلْمٍ وَاحِدٍ একজনের ‘ইলম থেকে দু’জনের ‘ইলম উত্তম। কতক জ্ঞানী ব্যক্তি তাদের কতিপয় ছাত্রকে বলতেন, ‘‘আমি ও তুমি পূর্ণ মানুষ। কারণ তুমি ক্বুরআনের হাফিয আর আমি ক্বুরআনের মুফাস্সির’’। সুতরাং বুঝা গেল যে, সৎ ব্যক্তির সান্নিধ্যে থাকলে ‘আকল বা জ্ঞান-বুদ্ধি বৃদ্ধি পায়।
(حُسْنُ السُّؤَالِ نِصْفُ الْعِلْمِ) অর্থাৎ সঠিক সুন্দর প্রশ্ন করাটাও গভীর জ্ঞান-প্রজ্ঞার নিদর্শন। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা বর্ণিত আছে, একদিন ইমাম আবূ ইউসুফ (রহিমাহুল্লাহ)-এর মাজলিসে এক ছাত্র চুপ করে বসে ছিল। ফলে তিনি তাকে বললেন, তোমার কাছে কোন বিষয় বুঝতে কঠিন হলে তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করো। লজ্জা করো না। কারণ লজ্জা করা ‘ইলম অর্জন করতে বাধা দেয়। ইমাম সিয়ামের সংজ্ঞা প্রসঙ্গের কথা বলছিলেন। সিয়ামের সময় হলো সুবহে সাদিক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। তখন ছাত্র বলল, যদি সূর্যাস্তই না হয়। তখন ইফতার করবে কখন? তখন ইমাম বললেন, তুমি চুপ কর। কারণ তোমার কথা বলার চেয়ে চুপ থাকাই কল্যাণকর।
কতিপয় জ্ঞানী বলেন, জাহিল ব্যক্তি যখন কথা বলে তখন সে গাধার মতো। আর যখন সে চুপ থাকে তখন দেয়ালের মতো। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৬৮-[১] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা নিজে নম্র, তিনি নম্রতাকেই ভালোবাসেন। তিনি কঠোরতার উপর যা দান করেন না, তা নম্রতার জন্য দান করেন। নম্রতা ছাড়া অন্যকিছুতেই তা দান করেন না। (মুসলিম)[1]
মুসলিম-এর অপর বর্ণনায় আছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে বললেনঃ নম্রতাকে নিজের জন্য বাধ্যতামূলক করে নাও এবং কঠোরতা ও নির্লজ্জতা থেকে নিজেকে রক্ষা করো। কেননা যে জিনিসের মধ্যে নম্রতা আছে, সে নম্রতাই তার সৌন্দর্য বৃদ্ধির কারণ হয়। আর যে জিনিস থেকে নম্রতাকে প্রত্যাহার করা হয়, সেটা ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যায়।
بَابُ الرِّفْقِ وَالْحَيَاءِ وَحُسْنِ الْخُلُقِ
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى رَفِيقٌ يُحِبُّ الرِّفْقَ وَيُعْطِي عَلَى الرِّفْقِ مَا لَا يُعْطِي عَلَى الْعُنْفِ وَمَا لَا يُعْطِي عَلَى مَا سِوَاهُ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ. وَفِي رِوَايَةٍ لَهُ: قَالَ لِعَائِشَةَ: «عَلَيْكِ بِالرِّفْقِ وَإِيَّاكِ وَالْعُنْفَ وَالْفُحْشَ إِنَّ الرِّفْقَ لَا يَكُونُ فِي شَيْءٍ إِلَّا زَانَهُ وَلَا يُنْزَعُ مِنْ شَيْء إِلَّا شانه»
ব্যাখ্যাঃ (إِنَّ اللهَ تَعَالٰى رَفِيقٌ) অর্থাৎ নিশ্চয় মহান আল্লাহ তার বান্দার প্রতি দয়াশীল, তিনি তাদের প্রতি সহজ চান। কোন কাজ তাদের ওপর কঠিন হোক, এটা তিনি চান না। তিনি তাদের শক্তির চেয়ে কঠিন কোন দায়িত্ব অর্পণ করেন না।
(وَيُعْطِي عَلَى الرِّفْقِ) অর্থাৎ দুনিয়াতে কোমল ব্যবহার করার দরুন তিনি বান্দাকে সুন্দর জীবন-যাপন, কাজ-কর্ম সহজ করে দেন। আর পরকালে তিনি এর প্রতিদান স্বরূপ অফুরন্ত প্রতিদান প্রদান করবেন।
(مَا لَا يُعْطِي عَلَى الْعُنْفِ) এখানে الْعُنْفِ শব্দের অর্থ নির্দয়, নিষ্ঠুর ও কঠোরমনা হওয়া। এটা (الرِّفْقِ) তথা দয়া, অনুগ্রহ ও সহনশীল হওয়ার বিপরীত। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৭৯৯)
পরিচ্ছেদঃ ১৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৬৯-[২] জারীর (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যাকে নম্রতা থেকে বঞ্চিত করা হয়, যেন তাকে পুণ্য থেকে বঞ্চিত করা হয়। (মুসলিম)[1]
بَابُ الرِّفْقِ وَالْحَيَاءِ وَحُسْنِ الْخُلُقِ
وَعَنْ جَرِيرٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مِنْ يُحْرَمِ الرِّفْقَ يُحْرَمِ الْخَيْرَ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যাঃ (مِنْ يُحْرَمِ الرِّفْقَ) অর্থাৎ আল্লাহ যাকে নম্রতা থেকে বঞ্চিত করেন, যার থেকে তা কেড়ে নেন। মূলত সে ব্যক্তি যাবতীয় কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। কারণ কোমলতা, নম্রতা, ধীরস্থিরতা ও যাবতীয় কাজে তাড়াহুড়া পরিহার না করলে কল্যাণ সাধিত হয় না। (ইবনে মাজাহ্ ৩য় খন্ড, হাঃ ৩৬৮৭)
হাদীসটির বাস্তবিক শিক্ষা : নম্রতা মহান আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত একটি মহৎ গুণ যা যাবতীয় কল্যাণের উৎস। তিনি যাকে যাবতীয় মেহেরবানীতে আবদ্ধ করতে চান, তাকে সেটা দান করেন। পক্ষান্তরে যাকে যাবতীয় কল্যাণ থেকে বঞ্চিত করতে চান, তাকে এ গুনটি থেকেও বঞ্চিত করা হয়, যেন তাকে সকল প্রকার পুণ্য থেকে বঞ্চিত করা হয়। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ১৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৭০-[৩] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারদের এক ব্যক্তির নিকট দিয়ে গমন করছিলেন। সে আনসারী তখন তাঁর ভাইকে লজ্জা সম্পর্কে উপদেশ দিচ্ছিল। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাকে ছেড়ে দাও। কেননা লজ্জা ঈমানের অংশ। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الرِّفْقِ وَالْحَيَاءِ وَحُسْنِ الْخُلُقِ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرَّ عَلَى رَجُلٍ مِنَ الْأَنْصَارِ وَهُوَ يَعِظُ أَخَاهُ فِي الْحَيَاءِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «دَعْهُ فَإِنَّ الْحَيَاءَ مِنَ الْإِيمَانِ» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ (فَإِنَّ الْحَيَاءَ مِنَ الْإِيمَانِ) ইবনু কুতায়বাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ নিশ্চয় লজ্জা তার অধিকারী ব্যক্তিকে অর্থাৎ লজ্জাশীল ব্যক্তিকে অবাধ্য বা পাপের কাজ থেকে বিরত রাখে যেমন ঈমান বিরত রাখে। এজন্যই হাদীসে লজ্জাকে ঈমান বলা হয়েছে। যেভাবে কোন জিনিস অন্য জিনিসের স্থলাভিষিক্ত হলে তাকে সে জিনিসের নামেই নামকরণ করা হয়।
‘আল্লামা রাগিব (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ লজ্জা আত্মাকে মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। মানুষের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তার মনে যা চায় সে সব কাজ করে পশুর মতো হবে না। যে পাপ থেকে নিজেকে বিরত থাকার চেষ্টা করবে, আর এ কারণেই লজ্জাশীল ব্যক্তি ফাসিক হয় না। এ কারণেই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয় লজ্জা করা ঈমানের অঙ্গ। (ফাতহুল বারী ১ম খন্ড, হাঃ ৫০৭০)
হাদীসটির বাস্তবিক শিক্ষা : লজ্জাই মানুষকে নিষিদ্ধ ও পাপের কাজ থেকে বিরত রাখতে পারে। ঈমান যেমন মহান আল্লাহকে না দেখে বিশ্বাস করার নাম, ঠিক তেমনিভাবে আল্লাহকে না দেখে তাকে লজ্জা করে হারাম ও অপছন্দনীয় কাজ থেকে বিরত থাকার নাম হায়া বা লজ্জা। মূলত লজ্জাই ঈমানের বহিঃপ্রকাশ। কাজেই যাবতীয় নিষিদ্ধ কাজ থেকে আল্লাহকে লজ্জা করে বিরত থাকাই হলো ঈমানের দাবী। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ১৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৭১-[৪] ’ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ লজ্জাশীলতা পুণ্য বৈ কিছুই আনয়ন করে না। অপর এক বর্ণনায় আছে যে, লজ্জাশীলতার সব প্রকারই উত্তম। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الرِّفْقِ وَالْحَيَاءِ وَحُسْنِ الْخُلُقِ
وَعَنْ عِمْرَانَ بْنِ حُصَيْنٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْحَيَاءُ لَا يَأْتِي إِلَّا بِخَيْرٍ» . وَفِي رِوَايَةٍ: «الْحيَاء خير كُله» مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ الْحَيَاءُ لَا يَأْتِي إِلَّا بِخَيْرٍ লজ্জা মানুষের কল্যাণই করে। লজ্জা মানুষকে ভয় প্রদর্শন করে, আর সেই কারণে সে তিরষ্কারমূলক কোন কাজে ও পাপের কাজে জড়িত হয় না। ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ কতক লোক এ হাদীসটির উপর ইশকাল বা প্রশ্ন উত্থাপন করে যে, লজ্জাশীল ব্যক্তি তো এমন মহান কাজে শরম করে, যে কাজে লোক তাকে বেশি মর্যাদা দিবে। আবার সে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বাধা দিতেও ভয় পায়। এ কাজ করতে পারে না লজ্জার কারণে। অনেক সময় সে লজ্জার কারণে তার ওপর যাদের হক আছে তাও যথাযথভাবে পালন করতে পারে না, তাহলে লজ্জা কিভাবে সকল কাজে কল্যাণ নিয়ে আসে?
উত্তর : এ প্রশ্নের উত্তরে ‘উলামার একটি দল উত্তর দিয়েছেন, তাদের মধ্য থেকে শায়খ আবূ ‘আমর ইবনুস্ সলাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এখানে আমরা যে লজ্জার কথা বলেছি তা প্রকৃত লজ্জা নয়। বরং এটি হলো অপারগতা ও সীমালঙ্ঘন। এটাকে শাব্দিক দিক থেকে লজ্জা বলা হয়েছে। শারী‘আতের পরিভাষায় লজ্জার সংজ্ঞা হলো এটা এমন একটা চরিত্রকে বলা হয়, যা মন্দকে পরিহার করার কারণে গড়ে উঠে। আর যাকে যে হক দেয়া দরকার তাকে সে হক প্রদান করতে শেখায়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৭২-[৫] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অতীতের নবীদের বাণী থেকে মানুষ যা পেয়েছে তা এই যে, যখন তুমি লজ্জাকে তুলে রাখবে, তখন তোমার মনে যা চায় তা-ই করবে। (বুখারী)[1]
بَابُ الرِّفْقِ وَالْحَيَاءِ وَحُسْنِ الْخُلُقِ
وَعَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ مِمَّا أَدْرَكَ النَّاسُ مِنْ كَلَامِ النُّبُوَّةِ الْأُولَى: إِذَا لَمْ تَسْتَحى فاصنعْ مَا شئْتَ رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ (مِنْ كَلَامِ النُّبُوَّةِ الْأُولٰى) ইমাম খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এর অর্থ হলো, লজ্জার বিধান সর্বযুগে প্রতিষ্ঠিত ছিল। আর এর ব্যবহার নুবুওয়াতের প্রথম যুগ থেকেই ওয়াজিব হিসেবে চালু ছিল। কেননা প্রত্যেক নবীই লজ্জার দিকে আহবান করেছেন এবং এরই উপর তাদেরকে প্রেরণ করা হয়েছিল। তাদের শারী‘আতের অন্যান্য বিধানের ন্যায় এ বিধানটি ব্যাহত হয়ে যায়নি। এর কারণ হলো, এটা এমন একটি বিষয় যার প্রতিদান তারা জানতেন। কাজেই সকলেই তার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন।
(فاصنعْ مَا شئْتَ) শারহুস্ সুন্নাহ্তে বলা হয়েছে, এ ব্যাপারে কয়েকটি উক্তি আছে : প্রথমটি হলো, এখানে فاصنعْ শব্দটি খবর এর অর্থে ব্যবহার হয়েছে, যদিও তা ‘আমর-এর শব্দ। যেন তিনি বলেছেন, যখন তোমার লজ্জা তোমাকে নিষেধ না করবে তখন তুমি তোমার অন্তর যে খারাপের দিকে ডাকে তা তুমি করতে পারবে। আর এই অর্থটি করেছেন আবূ ‘উবায়দাহ্। দ্বিতীয়টি হলো, এটি ধমক দেয়ার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন, ﴿اعْمَلُوا مَا شِئْتُمْ﴾ অর্থাৎ ‘‘তোমার মন যা চায় তুমি তাই কর’’- (সূরাহ্ ফুস্সিলাত ৪১ : ৪০)। কেননা মহান আল্লাহ তোমাকে ছেড়ে দিয়েছেন; এ অর্থ করেছেন আবুল ‘আব্বাস। আবূ তৃতীয়টি হলো, ইসহক আল মাওয়ারদী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ তুমি যে কাজটি করবে তা করার পূর্বে তোমাকে অপেক্ষা করা উচিত যদি তুমি সে কাজটি করতে লজ্জা না পাও তবে তা করে ফেল। আর যদি তুমি তা করতে লজ্জা পাও তবে তা করা থেকে বিরত থাক। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৭৮৯; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৭৩-[৬] নাও্ওয়াস ইবনু সাম্’আন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে পুণ্য ও পাপ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ পুণ্য হলো উত্তম স্বভাব, আর পাপ হলো যা তোমার অন্তরে যাতনা সৃষ্টি করে এবং তুমি ঐ কাজ জনসমাজে প্রকাশ হওয়াকে খারাপ মনে করো। (মুসলিম)[1]
بَابُ الرِّفْقِ وَالْحَيَاءِ وَحُسْنِ الْخُلُقِ
وَعَن النَّواس بن سمْعَان قَالَ: سَأَلَتْ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الْبِرِّ وَالْإِثْمِ فَقَالَ: «الْبِرُّ حُسْنُ الْخُلُقِ وَالْإِثْمُ مَا حَاكَ فِي صَدْرِكَ وَكَرِهْتَ أَن يطلع عَلَيْهِ النَّاس» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ (الْبِرُّ حُسْنُ الْخُلُقِ) এখানে الْبِرُّ শব্দের বিভিন্ন তাফসীর করা হয়েছে। এক স্থানে তাফসীর করা হয়েছে যে, যেখানে আত্মা ও অন্তর প্রশান্তি লাভ করে। অন্যস্থানে ঈমানের স্থানে তাফসীর করা হয়েছে। অন্যস্থানে যেটা আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয় আর এই দু’টিই হলো (حُسْنُ الْخُلُقِ) বা উত্তম চরিত্র। উত্তম চরিত্রের আরেকটি ব্যাখ্যা আছে তা হলো কষ্টদায়ক বস্তু দূর করা, রাগ কমিয়ে ফেলা, হাসি-খুশি থাকা, ভালো কথা বলা, আর এ সবগুলো চরিত্রের মধ্যে শামিল।
ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ এখানে الْبِرُّ হলো সদাচরণ, দান করা, আনুগত্য করা যার সমষ্টি হয় (حُسْنُ الْخُلُقِ) বা উত্তম চরিত্র। কোন কোন মুহাক্কিক ‘আলিম বলেছেন, الْبِرُّ বলা হয়, এমন সমষ্টিগত নামকে যা সকল প্রকার আনুগত্য ও সকল প্রকার নৈকট্যমূলক কর্মকাণ্ডকে শামিল করে নেয়। আর এখান থেকেই বলা হয় بِرُّ الْوَالِدَيْنِ বা পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করা। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(حَاكَ فِي صَدْرِكَ) অর্থাৎ বুকে নাড়া দেয় ও সন্দিহান হয়। আর তার বক্ষ তাকে কাজটি করার অনুমোদন দেয় না, বরং তার অন্তরে সন্দেহের সৃষ্টি হয়, সে মনে মনে ভয় পায় যে, এ কাজটি করলে হয়ত তার পাপ হবে। (শারহুন নাবাবী ১৬শ খন্ড, হাঃ ১৪/২৫৫৩)
(وَكَرِهْتَ أَن يطلع عَلَيْهِ النَّاس) অর্থাৎ তারা নিজেদের চোখ দিয়ে দেখুক বা অন্য কোন কিছু দিয়ে দেখুক (হয়ত বা সিসি ক্যামেরা)। এখানে النَّاس এর ‘আলিফ’ ‘লাম’ جنس (জিনস্) এর জন্য এসেছে। আর জিনস্ বা জাতি পরিপূর্ণতার দিকেই ফিরে। এর কারণ, মানুষের স্বভাব হলো তার মন চায় মানুষ তার ভালোটা লক্ষ্য করুক। আর যখন সে তার কোন কোন কাজ অন্য কেউ দেখুক এটা অপছন্দ করে তখন বুঝতে হবে এ কাজটি তাকে আল্লাহর নিকটবর্তী করাবে না। অথবা এ কাজটি করার জন্য শারী‘আত তাকে অনুমোদন দেয়নি। বুঝতে হবে যে, এ কাজে তার কোন কল্যাণ নেই। এটা ভালো কাজ নয়। সুতরাং এ কাজটি পাপ ও অকল্যাণকর। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৩৮৯)
পরিচ্ছেদঃ ১৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৭৪-[৭] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি আমার কাছে খুব প্রিয়, যার চরিত্র ভালো। (বুখারী)[1]
بَابُ الرِّفْقِ وَالْحَيَاءِ وَحُسْنِ الْخُلُقِ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «إِن مِنْ أَحَبِّكُمْ إِلَيَّ أَحْسَنَكُمْ أَخْلَاقًا» . رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ
ব্যাখ্যাঃ (أَحْسَنَكُمْ أَخْلَاقًا) অর্থাৎ যার মধ্যে যাবতীয় ভালো-মন্দ শামিল থাকে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর হক ও বান্দার হক যথাযথভাবে আদায় করে চলে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
হাদীসটির বাস্তবিক শিক্ষা : মুসলিম সমাজে অনেককে দেখা যায় যারা সত্য কথা বলে, দান-সাদাকা করে, বড়দের সম্মান ও ছোটদের স্নেহ করে। সকল মানুষ বিনয়ীর কারণে তাকে ভালোবাসে, ভালো বলে। কিন্তু সে সালাত আদায় করে না, গোপনে পাপ কাজে লিপ্ত হয়। এরূপ সকল ব্যক্তি সমাজের চোখে ভালো হলেও কিন্তু মহান আল্লাহর কাছে ভালো না, অপরাধী। কাজেই ভালো হতে হলে মানুষের হক ও আল্লাহর হক উভয়টিই আদায় করতে হবে। তাহলে উত্তম চরিত্রবান হওয়া যাবে। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ১৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৭৫-[৮] উক্ত [’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ঐ ব্যক্তি, যে চরিত্রের দিক দিয়ে উত্তম। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الرِّفْقِ وَالْحَيَاءِ وَحُسْنِ الْخُلُقِ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ مِنْ خِيَارِكُمْ أحسنَكم أَخْلَاقًا» . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ إِنَّ مِنْ خِيَارِكُمْ أحسنَكم أَخْلَاقًا অত্র হাদীসটিতে সৎচরিত্রের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে এবং সৎচরিত্রবানের ফাযীলাত বর্ণনা করা হয়েছে। এটা আল্লাহর নবীগণের ও বন্ধুগণের গুণাবলী। হাসান বাসরী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ উত্তম চরিত্রের স্বরূপ হলো ভালো কাজ করা, মন্দ প্রতিহত করা, হাসি মুখ রাখা। কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ উত্তম চরিত্র হলো মানুষের সাথে সুন্দর ও হাসি-খুশি চেহারা নিয়ে মিলিত হওয়া, তাদের সাথে বন্ধুত্ব রাখা, তাদের প্রতি সদয় হওয়া, তাদের কষ্ট দূর করার চেষ্টা করা, তাদের প্রতি সহনশীল হওয়া, তাদের অপছন্দনীয় কাজের উপর ধৈর্য ধারণ করা, তাদের ওপর জোর-জবরদস্তি ও অহংকার পরিহার করা, তাদের ওপর ভুল ও রাগা-রাগি থেকে দূরে থাকা, তাদেরকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখা। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৭৬-[৯] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যাকে নম্রতার অংশ প্রদান করা হয়েছে, তাকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ প্রদান করা হয়েছে। আর যাকে নম্রতা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তাকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ أُعْطِيَ حَظَّهُ مِنَ الرِّفْقِ أُعْطِي حَظَّهُ مِنْ خَيْرِ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَمَنْ حُرِمَ حَظَّهُ مِنَ الرِّفْقِ حُرِمَ حَظَّهُ مِنْ خَيْرِ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ» . رَوَاهُ فِي «شرح السّنة»
ব্যাখ্যাঃ الرِّفْقِ : مِنَ الرِّفْقِ শব্দের অর্থ- নম্রতা, কোমলতা। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ)-এর পারিভাষিক অর্থ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, কোন কাজকে সুন্দর-সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য সহকর্মী বন্ধু-বান্ধবদের সাথে নরম, কোমল ও ভদ্রতাসুলভ আচরণ করার নামই হলো-‘‘রিফ্ক্ব’’, এটা মানুষের মানবিক একটা বিশেষ গুণ। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৭৭-[১০] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ লজ্জা ঈমানের একটি অংশ, আর ঈমানদার জান্নাতে যাবে। লজ্জাহীনতা অত্যন্ত মন্দ কাজ, আর মন্দ লোক জাহান্নামে যাবে। (আহমাদ ও তিরমিযী)[1]
وَعَنْ أَبِي
هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْحَيَاءُ مِنَ الْإِيمَانِ وَالْإِيمَانُ فِي الْجَنَّةِ. وَالْبَذَاءُ مِنَ الْجَفَاءِ وَالْجَفَاءُ فِي النَّار» . رَوَاهُ أَحْمد وَالتِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ (الْإِيمَانُ فِي الْجَنَّةِ) অর্থাৎ ঈমানদার ব্যক্তি জান্নাতে যাবে।
আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ঈমানদার ব্যক্তিকে ‘ঈমান’ বলে সম্বোধন করার কারণ হলো, তার মাঝে কিছু বৈশিষ্ট্য এমনভাবে স্থান পেয়েছে যা তাকে অন্যদের ওপর প্রাধান্য দিয়েছে।
(وَالْجَفَاءُ) অর্থাৎ ওয়া‘দা পূরণ না করে ভঙ্গকারীগণ যারা সবসময় কঠোর স্বভাব ও কঠোর অন্তরের উপর অটল থাকে।
(فِي النَّار) বলতে হতে পারে সামরিক অথবা চিরস্থায়ী। কারণ তা পূর্ণ ঈমানের বিপরীত অথবা কঠোর হৃদয়ের মানুষ কুফরীর মধ্যে লিপ্ত হয়ে পড়ে। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ২০০৯; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৭৮-[১১] মুযায়নাহ্ গোত্রের জনৈক ব্যক্তি হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রসূল! উত্তম কোন্ জিনিসটি যা মানব জাতিকে দেয়া হয়েছে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ ’’উত্তম স্বভাব’’। [ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) ’’শু’আবুল ঈমানে’’ বর্ণনা করেছেন][1]
وَعَنْ رَجُلٍ
مِنْ مُزَيْنَةَ قَالَ: قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا خَيْرُ مَا أُعْطِيَ الْإِنْسَانُ؟ قَالَ: «الْخُلُقُ الْحَسَنُ» رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَان»
ব্যাখ্যাঃ الْخُلُقُ الْحَسَنُ বা উত্তম স্বভাব, যা মানুষকে সমাজের মানুষের কাছে সম্মানিত ও গ্রহণীয় করে তোলে। কেউ যতই শিক্ষেত বা সম্পদশালী হোক না কেন তার স্বভাব-চরিত্র যদি ভালো না হয় তবে সে সমাজের কাছে একজন ঘৃণিত ব্যক্তি। পক্ষান্তরে পরকালে আল্লাহ তাকে জাহান্নামে দিবেন। এজন্য দুনিয়াতে চরিত্রকে ঠিক রাখার জন্য মহান আল্লাহর নিকট সাহায্য কামনা করে ভালো চরিত্র গঠনে মনোযোগী হওয়া ও আপ্রাণ চেষ্টা করা সকলের জন্য আবশ্যক। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ১৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৭৯-[১২] আর উসামাহ্ ইবনু শরীক (রাঃ) হতে শারহুস্ সুন্নাহ্-তে বর্ণিত হয়েছে।[1]
وَفِي
شَرْحِ السُّنَّةِ
عَنْ أُسَامَةَ بْنِ شَرِيكٍ
পরিচ্ছেদঃ ১৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৮০-[১৩] হারিসাহ্ ইবনু ওয়াহ্ব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দুশ্চরিত্র, মন্দ স্বভাব ও কঠোর ভাষা ব্যবহারকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।
রাবী বলেন, الْجَوَّاظُ অর্থ- দুশ্চরিত্র, মন্দ স্বভাব। এ হাদীসটি আবূ দাঊদ (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর ’’সুনান’’ গ্রন্থে বর্ণনা করেন। আর বায়হাক্বী ’’শু’আবুল ঈমান’’-এ বর্ণনা করেন এবং জামি’উল উসূল প্রণেতা এতে হারিসাহ্ হতে বর্ণনা করেন। অনুরূপ শারহুস্ সুন্নাহ্ গ্রন্থে হারিসাহ্ হতে বর্ণিত ভাষ্যটি নিম্নরূপ- لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ الْجَوَّاظُ الْجَعْظَرِيُّ. يُقَالُ : الْجَعْظَرِيُّ : الْفَظُّ الْغَلِيْظُ. আর মাসাবীহ গ্রন্থে এ হাদীসটি ’ইকরিমাহ্ ইবনু ওয়াহ্ব হতে বর্ণিত হয়েছে। সেখানে এগুলো উল্লেখ করা হয়েছে যে, الْجَوَّاظُ সে ব্যক্তিকে বলা হয়, যে লোক ধন-সম্পদ সঞ্চয় করে; কিন্তু সেটা থেকে কাউকে দান করে না এবং الْجَعْظَرِيُّ শব্দের অর্থ হচ্ছে কঠোর ও রুক্ষ ভাষা ব্যবহারকারী।[1]
وَعَنْ حَارِثَةَ
بْنِ وَهْبٌ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ الْجَوَّاظُ وَلَا الْجَعْظَرِيُّ» قَالَ: وَالْجَوَّاظُ: الْغَلِيظُ الْفَظُّ رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ فِي «سُنَنِهِ» . وَالْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ وَصَاحِبُ» جَامِعِ الْأُصُولِ «فِيهِ عَنْ حَارِثَةَ. وَكَذَا فِي» شَرْحِ السُّنَّةِ عَنْهُ وَلَفْظُهُ قَالَ: «لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ الْجَوَّاظُ الْجَعْظَرِيُّ» . يُقَالُ: الْجَعْظَرِيُّ: الْفَظُّ الْغَلِيظُ
وَفِي نُسَخِ «الْمَصَابِيحِ» عَنْ عِكْرِمَةَ بْنِ وَهْبٍ وَلَفْظُهُ قَالَ: وَالْجَوَّاظُ: الَّذِي جَمَعَ وَمَنَعَ. وَالْجَعْظَرِيُّ: الغليظ الْفظ
ব্যাখ্যাঃ (الْجَوَّاظُ وَلَا الْجَعْظَرِيُّ) الْجَوَّاظُ শব্দের অর্থ سيء الْخُلُقِ বা দুশ্চরিত্র, মন্দ স্বভাব।
(الْجَعْظَرِيُّ) ঐ ব্যক্তিকে বলা হয়, যে ধন-সম্পদ জমা করে এবং সেটা কাউকে দান করে না। অর্থাৎ চরম কৃপণ। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(الْجَوَّاظُ) অর্থ রুক্ষ বা কঠোরভাষী ও অহংকারী বলা হয়, যে তার মাথাকে কারো নিকট নত করে না। এও বলা হয় যে, কোন ব্যক্তির মাঝে যে গুণাবলী নেই সেই গুণের প্রশংসা ও সুনাম-সুখ্যাতি অন্যের নিকট থেকে যে শুনতে চায় তাকে جَعْظَرِيُّ বলে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৭৯৩)
পরিচ্ছেদঃ ১৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৮১-[১৪] আবুদ্ দারদা (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন মু’মিনদের পাল্লায় ভারী যে বস্তুটি রাখা হবে, তা হলো উত্তম চরিত্র। আল্লাহ তা’আলা অশ্লীলভাষী ও বাচালকে ঘৃণা করেন। (তিরমিযী;[1] আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হাদীসটি হাসান সহীহ। ইমাম আবূ দাঊদ (রহিমাহুল্লাহ)-এর প্রথমাংশ বর্ণনা করেন।
وَعَنْ أَبِي
الدَّرْدَاءَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّ أَثْقَلَ شَيْءٍ يُوضَعُ فِي ميزانِ الْمُؤمن يومَ الْقِيَامَة خُلُقٌ حسنٌ وَإِنَّ اللَّهَ يُبْغِضُ الْفَاحِشَ الْبَذِيءَ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: حَدِيث حسن صَحِيح. وروى أَبُو دَاوُد الفصلَ الأول
ব্যাখ্যাঃ (من خلق حسن) এর কারণ হলো, নিশ্চয় মহান আল্লাহ সৎকর্মশীল ব্যক্তিকে ভালোবাসেন এবং তিনি তার প্রতি সন্তুষ্ট।
(الْفَاحِشَ) যে ব্যক্তি কটু কথা বলে, অথবা যে ব্যক্তির জিহ্বা অনুচিত কথা বলে তাকে الْفَاحِشَ বলে।
(الْبَذِيءَ) ‘আল্লামা মুনযিরী (রহিমাহুল্লাহ) ‘আত্ তারগীব’ এর মধ্যে বলেন, الْبَذِيءَ বলা হয়, যে ব্যক্তি কথা-বার্তা বলার সময় ফাহিশা কথা বলে।
‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ যে কথা ও কাজ মহান আল্লাহকে রাগান্বিত করে তার কোন ওযন ও পরিমাণ নেই। যেমন যে কাজ তিনি ভালোবাসেন তার জন্য তার নিকট বিরাট মর্যাদা আছে। মহান আল্লাহ কাফিরদের ব্যাপারে বলেন, فَلَا نُقِيمُ لَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَزْنًا ‘‘আর আমি কিয়ামতের দিন তাদের জন্য দাঁড়িপাল্লা (ওজন) কায়িম করব না’’- (সূরাহ্ আল কাহ্ফ ১৮ : ১০৫)। প্রসিদ্ধ হাদীসে আছে,
كَلِمَتَانِ خَفِيفَتَانِ عَلَى اللِّسَانِ ثَقِيلَتَانِ فِي الْمِيزَانِ حَبِيبَتَانِ إِلَى الرَّحْمٰنِ سُبْحَانَ الله وبحمده سبحان الله العظيم
অর্থ : দু’টি কালিমাহ্ আছে, যেগুলো দয়াময়ের কাছে অতি প্রিয়, মুখে উচ্চারণ করা খুবই সহজ, দাঁড়িপাল্লায় অত্যন্ত ভারী। (বাণী দু‘টো হল) ‘‘সুব্হা-নাল্ল-হি ওয়া বিহামদিহী সুবহা-নাল্ল-হিল ‘আযীম’’ (আমরা আল্লাহর প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করছি, মহান আল্লাহ [যাবতীয় ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে] অতি পবিত্র)- (সহীহুল বুখারী ৬৪০৬, মুসলিম ২৬৯৪)। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ২০০২)
পরিচ্ছেদঃ ১৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৮২-[১৫] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে, মু’মিনগণ তাদের উত্তম চরিত্র দ্বারা রাতে ’ইবাদাতকারীর ও দিনে সায়িমের (রোযাদারের) মর্যাদা লাভ করে থাকবে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ
عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «إِنَّ الْمُؤْمِنَ لَيُدْرِكُ بِحُسْنِ خُلُقِهِ دَرَجَةَ قَائِمِ اللَّيْل وصائم النَّهَار» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ دَرَجَةَ الصَّائِمِ الْقَائِمِ অর্থাৎ আনুগত্যের সাথে রাতে তাহাজ্জুদের সালাত আদায়কারীর মতো মর্যাদা দেয়া হবে। এই মর্যাদা কেবল উত্তম চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তিকে দেয়া হবে। কারণ সিয়াম পালনকারী ব্যক্তি ও মুসল্লী ব্যক্তি তাহাজ্জুদের সালাত আদায়কালে উভয়ে নিজের নাফসের সাথে সংগ্রাম করে উভয়ের অংশের ক্ষেত্রে। আর যে ব্যক্তি বিভিন্ন স্বভাব চরিত্রের বিপরীতে মানুষের সাথে উত্তম চরিত্রের কারণে সদাচরণ করে, সে ব্যক্তিও পরোক্ষভাবে বহু আত্মার সাথে সংগ্রাম করে। তাই সে ব্যক্তির মর্যাদা সিয়াম পালনকারীর ও রাতে তাহাজ্জুদ আদায়কারীর সমান; কখনো তাদের চেয়েও বেশি। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৭৯০)
পরিচ্ছেদঃ ১৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৮৩-[১৬] আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেনঃ তুমি যখন যেভাবে থাকবে, আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করবে। মন্দ কাজ হয়ে গেলে সাথে সাথেই ভালো কাজ করবে। কারণ ভালো কাজ মন্দকে মুছে ফেলে। আর মানুষের সাথে সদাচরণ করবে। (আহমাদ, তিরমিযী ও দারিমী)[1]
وَعَنْ
أَبِي ذَرٍّ قَالَ: قَالَ لِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اتَّقِ اللَّهَ حَيْثُمَا كُنْتَ وَأَتْبِعِ السَّيِّئَةَ الْحَسَنَةَ تَمْحُهَا وَخَالِقِ النَّاسَ بِخُلُقٍ حَسَنٍ» . رَوَاهُ أَحْمد وَالتِّرْمِذِيّ والدارمي
* এই হাদীস হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১। তাকওয়া (অর্থাৎ: আল্লাহকে ভক্তিসহকারে ভয় করে তাঁর সঠিক ভক্ত হওয়ার বিষয়টি), বাস্তবায়িত হয়: প্রকৃত ইসলামের শিক্ষা মোতাবেক আল্লাহর আদেশ পালনে রত থেকে এবং তাঁর নিষিদ্ধ বা বারণকৃত জিনিস থেকে বিরত থেকে নিজের আত্মাকে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা ও যত্ন করার মাধ্যমে।
২। যে আচরণকে প্রকৃত ইসলাম এবং সঠিক বুদ্ধি ভালো বলে স্বীকৃতি দেয়, তাকেই বলে সচ্চরিত্র বা সৎস্বভাব। এবং সচ্চরিত্র বা সৎস্বভাবের প্রভাব হলো: কাউকে কষ্ট না দেওয়া, লোকের উপকার করা এবং বিপদে ধৈর্যধারণ করা।
৩। অধিকতর সৎকর্ম করলে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পাপের ক্ষমা পাওয়া যায়। মানুষের জন্য মহান আল্লাহর এটি একটি বড় অনুগ্রহ।
৪। প্রকৃত ইসলাম হলো সচ্চরিত্রের একটি ধর্ম। তাই প্রকৃত ইসলাম ধর্ম মানুষকে তার জীবনের সকল ক্ষেত্রে সচ্চরিত্র এবং সৎস্বভাব বজায় রাখার উপদেশ প্রদান করে। সুতরাং ইসলামের প্রতি দাওয়াত প্রদান, শিক্ষাদান, প্রশিক্ষণ, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবনের সকল বিষয়ে সচ্চরিত্র বজায় রাখা অপরিহার্য।
ব্যাখ্যাঃ (اتَّقِ اللهَ) অর্থাৎ যাবতীয় ওয়াজিব কাজ (আল্লাহ যা করার নির্দেশ দিয়েছেন তা) পালন করা এবং যাবতীয় নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকাকে তাকওয়া বলা হয়। কেননা তাকওয়া হলো দীনের মূল ভিত্তি। আর এরই দ্বারা বিশ্বাসের স্তর উন্নীত হয়।
(حَيْثُ مَا كُنْتَ) অর্থাৎ তুমি নির্জনে থাক বা নি‘আমাতের মাঝে থাক অথবা বিপদাপদে থাক সর্বদা তাকওয়া অবলম্বন করবে। কেননা মহান আল্লাহ তোমার গোপন বিষয় সম্পর্কে অবহিত যেরূপ তোমার প্রকাশ্য বিষয় তিনি অবহিত। সুতরাং তার আদেশ ও যে সব কাজ তাকে সন্তুষ্ট করে তা সংরক্ষণ করা তোমার একান্ত দায়িত্ব। পাশাপাশি তার রাগের ও অসন্তুষ্টির বিষয় হতেও বিরত থাকা কর্তব্য।
মহান আল্লাহ বলেনঃ وَاتَّقُوا اللهَ الَّذِىْ تَسَاءَلُونَ بِه وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا
‘‘তোমরা সেই আল্লাহকে ভয় করো যার নামে তোমরা পরস্পর পরস্পরের কাছে চাও ও আত্মীয়তার বন্ধন গড়ে তোলো, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের সকল বিষয় পর্যবেক্ষণ করেন।’’ (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪ : ১)
(أَتْبِعِ السَّيِّئَةَ) অর্থাৎ তোমার থেকে সগীরাহ্ গুনাহ হয়ে যায়, অনুরূপভাবে কাবীরাহ্ গুনাহও। ‘আম বা সাধারণভাবে এটা বুঝা যায়। আর এ মতটি সাধারণ কতিপয় ‘উলামা বলেছেন। তবে জামহূর ‘উলামার মত হলো, কেবলমাত্র সগীরাহ্ বা ছোট গুনাহগুলো ক্ষমা হয়ে যাবে।
(الْحَسَنَةَ) হাদীসে হাসানাহ্ বলতে সালাত, সাদাকা অথবা ইস্তিগফার ইত্যাদির কথা বলা হয়েছে।
(وَخَالِقِ النَّاسَ بِخُلُقٍ حَسَنٍ) এখানে خُلُقْ শব্দটি المخالقة মাসদার থেকে আমর এর সীগাহ। اسم فاعل নয়। যার অর্থ হলো মানুষের সাথে মিলিত হও বা তাদের সাথে সদাচরণ কর। আর (خُلُقٍ حَسَنٍ) হলো সহাস্যমুখে মানুষের সাথে মিলিত হওয়া। লজ্জার ক্ষেত্রে লজ্জাশীলতা প্রদর্শন করা। দানক্ষেত্রে দান করা ও দুঃখ-কষ্ট সহ্য করা। কারণ এ সকল কাজ যে করে সে দুনিয়াতে সফলতা লাভ করতে পারে এবং পরকালে মুক্তি লাভ করে। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৯৮৭)
পরিচ্ছেদঃ ১৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৮৪-[১৭] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি কি তোমাদেরকে সে লোকের কথা বলে দেব না? যার উপর জাহান্নামের আগুন হারাম হবে, যাকে জাহান্নামের আগুন পরিত্যাগ করবে। সে ঐ লোক, যার মেজাজ নরম, স্বভাব কোমল ও আচরণ নম্র। [আহমাদ ও তিরমিযী; আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসটি গরীব।)[1]
وَعَنْ عَبْدِ
اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِلَّا أُخْبِرُكُمْ بِمَنْ يَحْرُمُ عَلَى النَّارِ وَبِمَنْ تَحْرُمُ النَّارُ عَلَيْهِ؟ عَلَى كُلِّ هَيِّنٍ لَيِّنٍ قَرِيبٍ سَهْلٍ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيب
ব্যাখ্যাঃ (عَلٰى كُلِّ هَيِّنٍ لَيِّنٍ) অর্থাৎ জাহান্নাম ঐ ব্যক্তির জন্য হারাম যার আচরণ নম্র, হাসি মুখে মানুষের সাথে কথা বলে, সহনশীল ও যার স্বভাব কোমল। (قَرِيبٍ) অর্থাৎ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মানুষের সাথে একত্রিত হওয়া ও অত্যন্ত হৃদ্যতার সাথে মানুষের সাথে মেলামেশা করা। (سَهْلٍ) অর্থাৎ শক্তি ও সাধ্যানুযায়ী অন্যের প্রয়োজন মেটাতে সচেষ্ট হওয়া, ক্রয়বিক্রয় ইত্যাদির মধ্যে উদারতা ও সহনশীলতা প্রদর্শন করা। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৮৫-[১৮] আবূ হুরায়রা (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ পুণ্যবান লোকেরা আত্মভোলো ও দয়ালু হয়ে থাকেন। পক্ষান্তরে পাপী লোকেরা ধূর্ত, দুশ্চরিত্র ও কৃপণ হয়ে থাকে। (আহমাদ, তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي
هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الْمُؤْمِنُ غِرٌّ كَرِيمٌ وَالْفَاجِرُ خَبٌّ لَئِيمٌ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যাঃ (الْمُؤْمِنُ غِرٌّ كَرِيمٌ) অর্থাৎ এখানে মু’মিনকে দু’টি গুণে গুণান্বিত করা হয়েছে। তারা কখনো অসৎকাজের শিকার হয়ে পড়লেও এটা তাদের মূর্খতার কারণে হয় না; বরং তাদের সভ্যতা, নম্রতা ও সৎচরিত্রের জন্য হয়ে থাকে। এটা তাদের সরল আত্মঃকরণ ও মানুষের প্রতি সৎ ধারণার কারণে হয়ে থাকে।
(الْفَاجِرُ خَبٌّ لَئِيمٌ) অর্থাৎ কৃপণ তার মাঝে অসৎ চরিত্রের প্রভাব থাকার কারণে। একজন মু’মিন ব্যক্তি কোন চক্রান্তমূলক কাজে জড়িত হয় না। সে তার কোমলতা ও সরলতার জন্য এ ফিতনা ছড়ানোর ভয়াবহতা সম্পর্কে তার জ্ঞান থাকার কারণে সে এরূপ কাজ থেকে বিরত থাকে। সে যে অজ্ঞতার কারণে বিষয়টি এমন নয়। কিন্তু এরূপ কাজ থেকে বিরত থাকল, সে বিরত থাকল তার উত্তম চরিত্রের কারণে। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৯৬৪; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৮৬-[১৯] মাকহূল (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মু’মিন লোক ঐ উটের মতো ধীরস্থির ও নরম স্বভাবের হয়ে থাকে, যার নাকের মধ্যে রশি লাগানো হয়েছে। যখন সেটাকে টেনে নেয়া হয়, সে টেনে চলে এবং পাথরের উপর বসতে চাইলে সে পাথরের উপরেই বসে পড়ে। [ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) এ হাদীসটি ’’মুরসাল’’ হিসেবে বর্ণনা করেন।][1]
وَعَنْ مَكْحُولٍ
قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْمُؤْمِنُونَ هَيِّنُونَ لَيِّنُونَ كَالْجَمَلِ الْآنِفِ إِنْ قِيدَ انْقَادَ وَإِنْ أُنِيخَ عَلَى صخرةٍ استَناخَ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ مُرْسلا
আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আমি মনে করি হাদীসটি তিরমিযীর সাথে সম্পৃক্ত করায় ভুল হয়েছে। আমি হাদীসটি তিরমিযীতে পায়নি। হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৪৬৭, সহীহুল জামি‘ ৬৬৬৯, হিলইয়াতুল আওলিয়া ৫/১৮০ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ (الْمُؤْمِنُونَ هَيِّنُونَ لَيِّنُونَ كَالْجَمَلِ...) হাদীসটি সম্পর্কে ‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ প্রত্যেক মু’মিন ব্যক্তি আল্লাহর পূর্ণ আনুগত্যের সাথে জীবন-যাপন করে। আর তারা সকলে চেষ্টা করে তাদের রবের সন্তুষ্টি অর্জন করার। যেমনিভাবে একটা উট যখন তার নাকে রশি বাধা থাকে তখন তার মালিককে খুশি করার জন্য যেখানে যা করা দরকার সেখানে তাই করে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৮৭-[২০] ইবনু ’উমার (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যে মুসলিম মানুষের সাথে মিলেমিশে বাস করে এবং মুসলিমের জ্বালা-যন্ত্রণায় ধৈর্যধারণ করে, সে ঐ মুসলিমের চেয়ে উত্তম, যে মানুষের সাথে মিশে না এবং তাদের জ্বালা-যন্ত্রণা সহ্য করে না। (তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنِ
ابْنِ عُمَرَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الْمُسْلِمُ الَّذِي يُخَالِطُ النَّاسَ وَيَصْبِرُ عَلَى أَذَاهُمْ أَفْضَلُ مِنَ الَّذِي لَا يُخَالِطُهُمْ وَلَا يَصْبِرُ عَلَى أَذَاهُمْ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وابنُ مَاجَه
ব্যাখ্যাঃ الَّذِي يُخَالِطُ النَّاسَ অত্র হাদীসের বর্ণনায় ‘সুবুলুস্ সালাম’ গ্রন্থে বলা হয়েছে : বলা হয়েছে, যে মু’মিন ব্যক্তি সমাজের মানুষের সাথে মিলিত হয় সে উত্তম ব্যক্তি। তার ফাযীলাতের কথা এ হাদীসে বলা হয়েছে। এর কারণ হলো সে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে বাধা দেয়ার মতো দু’টি ফরয কাজ সম্পাদন করতে পারে। এর পাশাপাশি সে তাদের সাথে সদাচরণের সুযোগ পায়। যে ব্যক্তি সমাজ জীবনে মানুষের সাথে লেনদেন এবং আচার অনুষ্ঠানে মেলামেশা করেনি তথা পার্থিব জীবনে দুঃখকষ্ট ও জ্বালা-যন্ত্রণায় পতিত হয়নি, এমন ব্যক্তির চেয়ে যে ব্যক্তি-এসব কিছুতে পতিত হয়ে ধৈর্যের সাথে সেটাকে অতিক্রম করে, সে অনেক উত্তম মু’মিন। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৫০৭)
পরিচ্ছেদঃ ১৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৮৮-[২১] সাহল ইবনু মু’আয (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি তার নিজের রাগকে সংযত করে রাখে এমন অবস্থায় যে, সে নিজের রাগ দ্বারা নিজের মনোবৃত্তিকে চরিতার্থ করতে পারে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা তাকে সৃষ্টিকুলের সম্মুখে ডাকবেন এবং যে হূরকে সে পছন্দ করে, তাকে সে হূরকেই বেছে নেয়ার জন্য অনুমতি দেয়া হবে। [তিরমিযী ও আবূ দাঊদ; আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসটি গরীব।][1]
وَعَن سهلِ
بن معاذٍ عَنْ أَبِيهِ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ كَظَمَ غَيْظًا وَهُوَ يَقْدِرُ عَلَى أَنْ يُنفِّذَه دعاهُ اللَّهُ على رؤوسِ الْخَلَائِقِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُخَيِّرَهُ فِي أَيِّ الْحُورِ شَاءَ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ: هَذَا حَدِيث غَرِيب
ব্যাখ্যাঃ (فِي أَيِّ الْحُورِ شَاءَ) অর্থাৎ সে যে হূরকে গ্রহণ করতে চায় তাকে সেটা গ্রহণ করার ক্ষমতা দেয়া হবে। এটা মূলত জান্নাতে প্রবেশের প্রতি ইঙ্গিত করেছে। অর্থাৎ এ কাজটি করলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তার মর্যাদাও অনেক উঁচু হবে।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ মহান আল্লাহ এখানে নিয়ন্ত্রণ করার গুণকে প্রশংসা করেছেন। কেননা তা নাফ্সে আম্মারা-কে মন্দের দিকে ধাবিত করে। এ কারণে আল্লাহ তাদের প্রশংসায় বলেন, وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ ‘‘...এবং রাগ দমন করে ও মানুষকে ক্ষমা করে...’’- (সূরাহ্ আ-লি ‘ইমরা-ন ৩ : ১৩৪)। আর যার আত্মাকে সে স্বীয় প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত করতে সক্ষম হলো জান্নাত হবে তার থাকার জায়গা। আর চক্ষু শীতলকারী হূর হবে তার পুরস্কার। (তুহফাতুল আহওযায়ী ৫ম খন্ড, হাঃ ২০২১)
পরিচ্ছেদঃ ১৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৮৯-[২২] ইমাম আবূ দাঊদ (রহিমাহুল্লাহ)-এর এক রিওয়ায়াতে আছে, যা সুওয়াইদ ইবনু ওয়াহ্ব (রহিমাহুল্লাহ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীর সন্তান হতে বর্ণনা করেছেন। উক্ত ব্যক্তি তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা ঐ ব্যক্তির অন্তরকে ঈমান ও শান্তি দ্বারা ভরে দেবেন। আর সুওয়াইদ (রহিমাহুল্লাহ)-এর مَنْ تَرَكَ لِبْسَ ثَوْبِ جَمَالٍ হাদীসটি كِتَابُ اللِّبَاسِ-এ বর্ণিত হয়েছে।[1]
وَفِي رِوَايَةٍ
لِأَبِي دَاوُدَ عَنْ سُوَيْدِ بْنِ وَهْبٍ عَنْ رَجُلٍ مِنْ أَبْنَاءِ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ أَبِيهِ قَالَ: «مَلأ اللَّهُ قلبَه أمْناً وإِيماناً»
وَذُكِرَ حَدِيثُ سُوْيَدٍ: «مَنْ تَرَكَ لِبْسَ ثَوْبِ جما ل» فِي «كتاب اللبَاس»
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে একজন অপরিচিত ব্যক্তি আছে। দেখুন- য‘ঈফাহ্ ১৯১২।
পরিচ্ছেদঃ ১৯. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৯০-[২৩] যায়দ ইবনু ত্বলহাহ্ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রতিটি দীন (ধর্ম) বা জীবন বিধানের একটি উত্তম সিফাত আছে। ইসলামি জীবন বিধানে ঐ সিফাত বা গুণটি হলো লজ্জাশীলতা। [ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ) ’’মুরসাল’’ হিসেবে বর্ণনা করেন।[1]
عَنْ زَيْدِ
بْنِ طَلْحَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ لِكُلِّ دِينٍ خُلُقًا وَخُلُقُ الْإِسْلَامِ الْحَيَاءُ» . رَوَاهُ مَالِكٌ مُرْسلا
পরিচ্ছেদঃ ১৯. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৯১-[২৪], ৫০৯২-[২৫] আর ইমাম ইবনু মাজাহ ও ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) শু’আবুল ঈমানে আনাস ও ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন।
وَرَوَاهُ ابْنُ مَاجَهْ وَالْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ» عَن أنس وَابْن عَبَّاس
পরিচ্ছেদঃ ১৯. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৯২-[২৫] দেখুন পূর্বের হাদীস।
وَرَوَاهُ ابْنُ مَاجَهْ وَالْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ» عَن أنس وَابْن عَبَّاس
পরিচ্ছেদঃ ১৯. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৯৩-[২৬] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ লজ্জা ও ঈমানকে এক স্থানে রাখা হয়েছে (অর্থাৎ- এরা পরস্পর অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত)। যখন তাদের মধ্য থেকে একটিকে উঠিয়ে নেয়া হয়, তখন অপরটিকেও উঠিয়ে নেয়া হয়।[1]
وَعَنِ ابْنِ
عُمَرَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّ الْحَيَاءَ وَالْإِيمَانَ قُرَنَاءُ جَمِيعًا فإِذا رفع أَحدهمَا رفع الآخر»
পরিচ্ছেদঃ ১৯. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৯৪-[২৭] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)-এর বর্ণনায় এ মর্মে উল্লেখ আছে যে, যখন লজ্জা ও ঈমানের মধ্য থেকে যে কোন একটি দূর করা হয়, তখন অপরটিও চলে যায়। (বায়হাক্বী শু’আবুল ঈমানে)
وَفِي رِوَايَةِ
ابْنِ عَبَّاسٍ: «فَإِذَا سُلِبَ أَحَدُهُمَا تَبِعَهُ الْآخَرُ» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ»
পরিচ্ছেদঃ ১৯. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৯৫-[২৮] মু’আয (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি যখন রিকাবে পা রাখলাম, তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে শেষ উপদেশ দিলেন, হে মু’আয! মানুষের তালিম ও তরবিয়তের জন্য নিজের চরিত্রকে ভালো করো। (মালিক)[1]
وَعَن مُعاذٍ
قَالَ: كانَ آخرُ مَا وصَّاني بِهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حِينَ وَضَعْتُ رِجْلِي فِي الْغَرْزِ أَنْ قَالَ: «يَا مُعَاذُ أحسُنْ خُلُقكَ للنَّاس» . رَوَاهُ مَالك
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, হিদায়াতুর্ রুওয়াতে আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ মুওয়াত্ত্বা মালিকের সানাদ ছাড়া চারটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। আর এ ব্যাপারে ‘উলামাগণ বলেছেন, কোন কিতাবে তার সানাদ পাওয়া যায় না। হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৪৬৯ পৃঃ। তবে আলবানী য‘ঈফ আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ১৬০৩ নম্বরে য‘ঈফ হিসেবে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ১৯. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৯৬-[২৯] মালিক (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি এ হাদীস সম্বন্ধে জানতে পেরেছেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ উত্তম চরিত্রকে পূর্ণতা দান করার জন্য আমি আদিষ্ট হয়েছি। (’’মুওয়াত্ত্বা’’ গ্রন্থে এ হাদীসটিকে মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে)[1]
وَعَن مَالك
بَلَغَهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ حُسْنَ الْأَخْلَاقِ» رَوَاهُ الْمُوَطَّأ
পরিচ্ছেদঃ ১৯. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৯৭-[৩০] ইমাম আহমাদ (রহিমাহুল্লাহ) এ হাদীসটিকে আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন।[1]
وَرَوَاهُ
أَحْمد عَن أبي هُرَيْرَة
হাদীসটি জাল হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘আমর ইবনু হুসায়ন ও ইয়াহইয়া ইবনু আল ‘আলা’’ উভয়েই মিথ্যুক। ইরওয়া ১/১১৪ হাঃ ৭৪ মুসনাদে আবূ ইয়া‘লা ২৬১১, ‘ত্ববারানী’র আল মু‘জামুল কাবীর ১০৬১৪।
পরিচ্ছেদঃ ১৯. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৯৮-[৩১] জা’ফার ইবনু মুহাম্মাদ (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর পিতার নিকট থেকে বর্ণনা করেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আয়না দেখতেন, তখন বলতেন, সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তা’আলার জন্য, যিনি আমার গঠন-আকৃতিকে সুন্দর করেছেন এবং আমার স্বভাবকেও উত্তম করেছেন। আর যেসব গঠন আকৃতি এবং স্বভাব ত্রুটিযুক্ত, আমাকে সেগুলো থেকে মুক্ত করেছেন। (বায়হাক্বী’র ’’শু’আবুল ঈমানে’’ মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন।)
وَعَنْ جَعْفَرِ
بْنِ مُحَمَّدٍ عَنْ أَبِيهِ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا نَظَرَ فِي الْمِرْآةِ قَالَ: «الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي حَسَّنَ خُلُقِي وَخَلْقِي وَزَانَ مِنِّي مَا شَانَ مِنْ غَيْرِي» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَان» مُرْسلا
পরিচ্ছেদঃ ১৯. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫০৯৯-[৩২] আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায়ই বলতেন : হে আল্লাহ! তুমি আমাকে উত্তমরূপে সৃষ্টি করেছ এবং আমার চরিত্রকেও তুমি উত্তম করো। (আহমাদ)[1]
وَعَنْ
عَائِشَةَ قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «اللَّهُمَّ حسَّنَت خَلقي فأحسِنْ خُلقي» . رَوَاهُ أَحْمد
পরিচ্ছেদঃ ১৯. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫১০০-[৩৩] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি কি বলে দেব না যে, তোমাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি কে? সাহাবায়ে কিরাম বললেনঃ জ্বী হ্যাঁ, হে আল্লাহর রসূল! তিনি বললেনঃ তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি সর্বোত্তম, যার বয়স বেশি এবং যার চরিত্র ভালো। (আহমাদ)[1]
وَعَنْ أَبِي
هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَلَا أُنْبِئُكُمْ بِخِيَارِكُمْ؟» قَالُوا: بَلَى. قَالَ: «خِيَارُكُمْ أَطْوَلُكُمْ أَعْمَارًا وَأَحْسَنُكُمْ أَخْلَاقًا» رَوَاهُ أَحْمد
পরিচ্ছেদঃ ১৯. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫১০১-[৩৪] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যাদের চরিত্র উত্তম, তারাই পূর্ণ ঈমানদার। (আবূ দাঊদ ও দারিমী)[1]
وَعَنْهُ
قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد والدارمي
ব্যাখ্যাঃ (أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا) ‘‘পরিপূর্ণ ঈমানদার সেই ব্যক্তি যে ব্যক্তি সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী।’’ এ প্রসঙ্গে ইবনু রাসলান (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ‘‘এখানে মানবজাতির ঐ সকল আচরণের কথা বলা হয়েছে যেই আচরণগুলো দৈনন্দিন জীবনে একজন অপরজনের সাথে প্রকাশ করে থাকে।’’ এ আচরণগুলো দু’ প্রকার : প্রশংসনীয় এবং নিন্দনীয়। প্রশংসনীয় আচরণ, যেমন : মানুষের সাথে সদাচরণ করা, নম্র ও ভদ্র সুরে কথা বলা, বিপদে ধৈর্যধারণ করা, কষ্ট ও অত্যাচার সহ্য করা, সকল পাপ ও অনিষ্ট থেকে দূরে থাকা ইত্যাদি।
প্রখ্যাত ফকীহ হাসান বাসরী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ উত্তম চরিত্রের হাক্বীকাত হলো সৎ কাজ করা, কাউকে কষ্ট না দেয়া এবং হাসিমুখে কথা বলা। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৬৭০)
পরিচ্ছেদঃ ১৯. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫১০২-[৩৫] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসেছিলেন, এমতাবস্থায় জনৈক ব্যক্তি আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ)-কে গালিগালাজ করতে লাগল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা শুনে আশ্চর্যান্বিত হলেন এবং মৃদু হাসতে লাগলেন। লোকটি যখন খুব বেশি মন্দ বকল, তখন আবূ বকর সিদ্দীক(রাঃ) তার কোন কথার প্রতি-উত্তর দিলেন। এতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব রাগান্বিত হলেন এবং উঠে গেলেন। আবূ বকর সিদ্দীক(রাঃ) তাঁর পিছন পিছন গেলেন এবং বললেনঃ হে আল্লাহর রসূল! লোকটি আমাকে মন্দ বলছিল আর আপনি বসেছিলেন। যখন আমি তার কোন কথার প্রতি-উত্তর করলাম, আপনি রাগ করে উঠে এলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তোমার সাথে একজন মালাক (ফেরেশতা) ছিলেন, যিনি ঐ লোকটির জবাব দিচ্ছিলেন। যখন তুমি নিজেই তার জবাব দিলে, তখন তোমাদের মাঝে শয়তান উপস্থিত হলো। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ হে আবূ বকর! তিনটি কথা আছে, সেগুলোর প্রত্যেকটি হক।
প্রথমতঃ যদি কোন বান্দার ওপর জুলুম করা হয় এবং ঐ ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জুলুমের বিরুদ্ধে কোন প্রকার প্রতিবাদ না করে চুপ করে থাকে, তাহলে আল্লাহ তা’আলা খুব সাহায্য করেন।
দ্বিতীয়তঃ যে ব্যক্তি তার দানের দরজা খুলে দেয় এবং ঐ দানের সাহায্যে তার স্বজন-প্রতিবেশীর সাথে অনুগ্রহের ইচ্ছা পোষণ করে, আল্লাহ তা’আলা তার ধন-সম্পদ আরো বৃদ্ধি করে দেন।
তৃতীয়তঃ যে ব্যক্তি ভিক্ষার দরজা খুলে দিয়ে নিজের ধন-সম্পদ বৃদ্ধি করতে চায়। এতে আল্লাহ তা’আলা তার ধন-সম্পদ আরো কমিয়ে দেন। (আহমাদ)[1]
وَعَنْهُ
أَنَّ رَجُلًا شَتَمَ أَبَا بَكْرٍ وَالنَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جَالِسٌ يَتَعَجَّبُ وَيَتَبَسَّمُ فَلَمَّا أَكْثَرَ رَدَّ عَلَيْهِ بَعْضَ قَوْلِهِ فَغَضِبَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَامَ فَلَحِقَهُ أَبُو بَكْرٍ وَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ كَانَ يَشْتُمُنِي وَأَنْتَ جَالِسٌ فَلَمَّا رَدَدْتُ عَلَيْهِ بَعْضَ قَوْلِهِ غَضِبْتَ وَقُمْتَ. قَالَ: «كَانَ مَعَكَ مَلَكٌ يَرُدُّ عَلَيْهِ فَلَمَّا رَدَدْتَ عَلَيْهِ وَقَعَ الشَّيْطَانُ» . ثُمَّ قَالَ: يَا أَبَا بَكْرٍ ثَلَاثٌ كُلُّهُنَّ حقٌّ: مَا منْ عبدٍ ظلم بمظلمة فِي غضي عَنْهَا لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ إِلَّا أَعَزَّ اللَّهُ بِهَا نَصْرَهُ وَمَا فَتَحَ رَجُلٌ بَابَ عَطِيَّةٍ يُرِيدُ بِهَا صِلَةً إِلَّا زَادَ اللَّهُ بِهَا كَثْرَةً وَمَا فَتَحَ رَجُلٌ بَابَ مَسْأَلَةٍ يُرِيدُ بِهَا كَثْرَةً إِلَّا زَادَ اللَّهُ بِهَا قِلَّةً . رَوَاهُ أَحْمد
পরিচ্ছেদঃ ১৯. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - নম্রতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম স্বভাব
৫১০৩-[৩৬] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা যে ঘরের বাসিন্দাদের জন্য কোমলতা পছন্দ করেন, ঐ কোমলতার সাহায্যে তাদের অনেক উপকার করেন। আর যে ঘরের বাসিন্দাদেরকে কোমলতা থেকে বঞ্চিত রাখেন, তাদেরকে সেটা দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত করেন। (বায়হাক্বী’’র ’’শু’আবুল ঈমান’’)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ
قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَا يُرِيدُ اللَّهُ بِأَهْلِ بَيْتٍ رِفْقًا إِلَّا نَفَعَهُمْ وَلَا يَحْرِمُهُمْ إِيَّاهُ إِلَّا ضَرَّهُمْ «. رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي» شُعَبِ الْإِيمَانِ
পরিচ্ছেদঃ ২০. প্রথম অনুচ্ছেদ - রাগ ও অহংকার
৫১০৪-[১] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। জনৈক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জিজ্ঞেস করল, আমাকে কিছু উপদেশ দিন। তিনি বললেনঃ তুমি রাগ করবে না। লোকটি কয়েকবার একই কথা পুনরাবৃত্তি করল। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও প্রত্যেক বারই বললেনঃ তুমি রাগ করো না। (বুখারী)[1]
بَابُ الْغَضَبِ وَالْكِبَرِ
عَن أبي هريرةَ أَنَّ رَجُلًا قَالَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: أوصني. قَالَ: «لَا تغضبْ» . فردَّ ذَلِكَ مِرَارًا قَالَ: «لَا تَغْضَبْ» . رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ
ব্যাখ্যাঃ (أَنَّ رَجُلًا) ইমাম আহমাদ, ইবনু হিব্বান এবং ‘ত্ববারানী’র বর্ণনা মতে লোকটির নাম হারিসাহ্ ইবনু কুদামাহ্। এছাড়াও মুহাদ্দিসগণের নিকটে তিনজন সাহাবীর যে কেউ হতে পারেন : ১. ইবনু ‘উমার ২. হারিসাহ্ ইবনু কুদামাহ্ ৩. সুফ্ইয়ান ইবনু ‘আবদুল্লাহ। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬১১৬; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(أوصني) ‘‘আমাকে এমন একটি বিশেষ ‘আমলের ব্যাপারে অবহিত করুন যা ব্যাপকভাবে দুনিয়া এবং আখিরাতে আমার কল্যাণ বয়ে আনবে এবং আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে দেবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(لَا تغضبْ) ইমাম খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ‘‘তুমি রাগ করবে না’’ এ কথার সারমর্ম হলো আপনি রাগ আনয়নকারী সব ধরনের উপকরণ থেকে দূরে থাকুন। যে সকল কথা বা কাজ মানুষকে রেগে যেতে সহায়তা করে সেগুলো থেকে নিজেকে নিরাপদে রাখুন। কারণ রাগ থেকে শত চেষ্টার পরও সম্পূর্ণ মুক্ত থাকা সম্ভব নয়, তাই পারতপক্ষ যতটুকু সম্ভব দূরে থাকাই উত্তম।
কারো মতে, (لَا تغضبْ) বলার কারণ হল- অধিকাংশ সময় রাগের সাথে অহংকার প্রকাশ পায়। কোন বিষয় যদি মতের অমিল হয় তখন মনের রাগ প্রকাশের সময় এক রকমের আত্ম-অহংকার চলে আসে। এর ফলে বিনয়ী ভাব এবং আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়।
কেউ কেউ বলেছেনঃ প্রশ্নকারী লোকটি রাগচটা প্রকৃতির ছিলেন। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সকল বিষয় খেয়াল করেই প্রত্যেককে উপযুক্ত নাসীহাত প্রদান করতেন।
ইবনু তীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ (لَا تغضبْ) কথাটির ভেতরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ একত্রিত করেছেন। কেননা রাগের ফলে মানবজীবনে আত্মীয়তার সম্পর্ক ও বন্ধত্ব নষ্টসহ নানাবিধ অকল্যাণ ও ক্ষতির সম্ভাবনা দেখা দেয়। অবশেষে সামাজিক সম্মান আর ধার্মিকতার চরম অভাব পরিলক্ষিত হয়।
ইমাম বায়যাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দৃষ্টিতে মনে হয়েছে যে, সকল বিপদ আর ফিতনাহ্-ফাসাদের কেন্দ্রস্থল হচ্ছে মানুষের রাগ। যেহেতু প্রশ্নকারী সাহাবী অন্তরের কোমলতা আর সৎ ইচ্ছা নিয়ে নাসীহাত চেয়েছিলেন, তাই আল্লাহর নবী তাকে অযথা রাগ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিলেন। আর সকল নিকৃষ্ট আচরণের মধ্যে রাগ হলো শীর্ষে। তাই রাগ থেকে নিজেকে হিফাযাত করার অর্থ হলো সবচেয়ে বড় শত্রুকে দমন করা।
ইবনু হিব্বান (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ (لَا تغضبْ) বলার উদ্দেশ্য হলো রাগের অবস্থায় যে কোন ধরনের অন্যায় কাজ না করা। রাগ থেকে বিরত থাকা নয়। যেহেতু রাগ এমন একটি স্বভাব যা দূর করা কারো পক্ষ সম্ভব নয়, তাই এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো রাগের সময় কোন ধরনের অন্যায় অপরাধ না করা। আবার কারো মতে, আল্লাহ তা‘আলা রাগকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষের সৃষ্টিগত স্বভাবের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ফলে মানুষ যখন কোন উদ্দেশে সফলতার জন্য চরম আগ্রহী হয়ে উঠে তখন সেই আকাঙক্ষা থেকে এক ধরনের রাগ জেদ আকারে প্রকাশ পায়। তার তীব্রতা চোখে মুখে ফুটে উঠে। চেহারা রক্তিম বর্ণ হয়ে যায়। এ ধরনের রাগ সাধ্যের ভেতরে কোন বস্তুকে পাওয়ার আশায় তৈরি হয়। আর যদি সেটা সাধ্যের বাহিরে হয় তখন দুশ্চিন্তায় চেহারার রং ফ্যাকাশে হয়ে যায়। কখনো লাল বা হলুদ বর্ণ ধারণ করে। এটা হলো মানুষের বাহ্যিক অবস্থা। পক্ষান্তরে অভ্যন্তরীণ অবস্থা এর চাইতেও মারাত্মক। করণ রাগের অবস্থায় অন্তর নামক পবিত্র বস্তুটি হিংসা-বিদ্বেষ আর অসৎ উদ্দেশ্যের জন্ম দেয়। বিভিন্ন উপায়ে মানুষের ক্ষতি করার নীল-নকশা তৈরি করে। তাই রাগের বাহ্যিক অবস্থার চাইতে ভিতরগত অবস্থা নেহায়াত কুৎসিত। কাজেই এদিক থেকে (لَا تغضبْ) উপদেশটি অত্যন্ত জরুরী হিসেবে গণ্য হয়েছে।
একজন গবেষক উল্লেখ করেছেন যে, রাগ হচ্ছে শয়তানের কুমন্ত্রণা। এর মাধ্যমে মানুষ প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে অন্যায়ে জড়িয়ে পড়ে এবং মিথ্যাকে প্রশ্রয় দেয়। অবশেষে অসৎকাজে চরম আগ্রহে আত্মনিয়োগ করে, হিংসা আর কপটতায় অন্তর ভারী হয়ে উঠে। এরপর কুফরী করতে উদ্যত হয় এবং তা করে ফেলে। এজন্যই আল্লাহর নবী তাকে বারবার রাগ থেকে সতর্ক করছিলেন।
‘আল্লামা তূরিবিশতী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের চারিত্রিক বিষয়গুলো খেয়াল করতেন। তাঁর কাছে চরিত্রের যে দিকটি অসুস্থ বলে মনে হত সেই স্থানে উপযুক্ত ঔষধ প্রয়োগের চেষ্টা করতেন। ফলে সাহাবীদের জন্য যে বিষয়টি অত্যন্ত জরুরী বলে মনে করতেন সেই বিষয়েই তাদেরকে নাসীহাত প্রদান করতেন। প্রশ্নকারী সাহাবীর ব্যাপারটিও এমন ছিল। তিনি হয়তবা রাগী প্রকৃতির ছিলেন, তাই তাকে রাগ থেকে সতর্ক করলেন।
(ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬১১৬; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ২০২০; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২০. প্রথম অনুচ্ছেদ - রাগ ও অহংকার
৫১০৫-[২] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সে ব্যক্তি শক্তিশালী বীর নয়, যে মানুষকে আছাড় দেয় (পরাস্ত করে); বরং সে ব্যক্তিই প্রকৃত শক্তিশালী বীর, যে রাগের সময় নিজেকে সংবরণ করতে সক্ষম। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْغَضَبِ وَالْكِبَرِ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ» . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ (لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ) এখানে প্রকৃত শক্তিশালী হওয়ার ব্যাপারে যে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে তা হলো আধ্যাত্মিক বা মনোস্তাত্ত্বিক শক্তি। এ ধরনের শক্তি স্বয়ং আল্লাহ প্রদত্ত। এটি চিরস্থায়ী আর শারীরিক শক্তি হলো ক্ষণস্থায়ী। উক্ত হাদীসে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দৈহিক শক্তিকে আধ্যাত্মিক শক্তির দিকে স্থানান্তরিত করেছেন। এভাবেই তিনি জাগতিক বিষয়ের উপর ধর্মীয় বিষয়কে (আধ্যাত্মিক শক্তিকে) প্রাধান্য দিয়েছেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২০. প্রথম অনুচ্ছেদ - রাগ ও অহংকার
৫১০৬-[৩] হারিসাহ্ ইবনু ওয়াহ্ব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি তোমাদেরকে জান্নাতবাসী লোকেদের কথা বলে দেব কি? তারা হলেন বৃদ্ধ ও দুর্বল লোক। তারা যদি আল্লাহর দরবারে কসম করে, তখন আল্লাহ তাদের সে শপথকে সত্যে পরিণত করে দেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরো বলেছেনঃ আমি কি তোমাদেরকে জাহান্নামবাসী লোকেদের কথা বলে দেব? তারা হলো, মিথ্যা ও তুচ্ছ বস্তু নিয়ে খুব বিবাদকারী, শান্ত মস্তিষ্কে ধন-সম্পদ সঞ্চয়কারী ও অহংকারী। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
মুসলিম-এর এক বর্ণনায় রয়েছে, প্রত্যেক সম্পদ সঞ্চয়কারী কৃপণ, জারজ ও অহংকারী।
بَابُ الْغَضَبِ وَالْكِبَرِ
وَعَنْ حَارِثَةَ بْنِ وَهْبٌ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ الْجَنَّةِ؟ كُلُّ ضَعِيفٍ مُتَضَعِّفٍ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لَأَبَرَّهُ. أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ النَّارِ؟ كُلُّ عُتُلٍّ جَوَّاظٍ مُسْتَكْبِرٍ» . مُتَّفق عَلَيْهِ. وَفِي رِوَايَة مُسلم: «كل جواظ زنيم متكبر»
ব্যাখ্যাঃ (كُلُّ ضَعِيفٍ مُتَضَعِّفٍ) উক্ত হাদীসাংশে ضَعِيفٍ শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সেই ব্যক্তি যে নিজেকে বিনয়ের চাদরে আবৃত করে নম্র হয়ে চলে। বিনয়ীর বেশে চলাফেরার কারণে তার পারিপার্শ্বিক সকল অবস্থাদি দুর্বল বা হালকা মনে হয়। এ অবস্থায় নম্র হয়ে চলার কারণে তাকে বহু স্থানে লাঞ্ছিতও হতে হয়।
আবার কেউ বলেছেন, ضَعِيفٍ দ্বারা নিরহংকার ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যে কোন মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করে না।
(مُتَضَعِّفٍ) ঐ লোককে বলা হয় যে মানুষের সাথে স্বাভাবিক অবস্থায় অত্যন্ত বিনয়ী মহানুভব আর শত্রুর সামনে তেজী ও সাহসী। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেনঃ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ
‘‘...মু’মিনরা শত্রুদের ওপর অত্যন্ত কঠোর আর তারা পরস্পর দয়ালু...।’’ (সূরাহ্ আল ফাত্হ ৪৮ : ২৯)
অনুরূপভাবে আল্লাহ বলেনঃ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ
‘‘মু’মিনরা একে অন্যের ওপর বিনয়ী আর কাফিরদের ওপর অত্যন্ত কঠোর।’’ (সূরাহ্ আল মায়িদাহ্ ৫ : ৫৪)
অতএব এখানে ঐ ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, যে শক্তি ও সাহস থাকার পরও মানুষের সাথে সদয় এবং বিনয়ী। ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এখানে উদ্দেশ্য ঐ ব্যক্তি যাকে লোকেরা দুর্বলভাবে এবং নিচু চোখে দেখে। সামাজিক জীবনে আর্থিক বা শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে তাকে নিচু শ্রেণীর মানুষ হিসেবে গণ্য করে।
(عُتُلٍّ) উক্ত শব্দের ব্যাখ্যায় ‘আলিমদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। ইমাম ফাররা (রহিমাহুল্লাহ)-এর মতে (عُتُلٍّ) অর্থ হলো অত্যন্ত ঝগড়াটে লোক।
আবূ ‘উবায়দাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ অত্যধিক কঠোর প্রকৃতির লোক; এখানে কাফির উদ্দেশ্য। ইমাম খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ দয়ামায়াহীন ব্যক্তি। ইমাম ‘আবদুর রাযযাক (রহিমাহুল্লাহ)-এর মতে অশ্লীল কাজে অভ্যস্ত নোংরা ব্যক্তি। ইমাম দাউদিয়্যু (الدَّاوُدِيُّ) (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ বিশাল আকৃতির পেট ও ঘাড়ওয়ালা লোক।
ইমাম হারবী (রহিমাহুল্লাহ)-এর মতে, যে ব্যক্তি নিজে পাপ কাজ করে এবং অপরকে সৎকাজ করতে বাধা দেয়। কারো মতে, পেটুক প্রকৃতির লোক। আবার কারো মতে নাসীহাত শুনার পরও তা মানতে যার অন্তর কঠোর বা বাঁকা।
(جَوَّاظٍ) খত্ত্বাবীর মতে, جَوَّاظٍ বলা হয় সেই ব্যক্তিকে যার দৈহিক আকৃতি ও শক্তি অন্যের তুলনায় বেশী হওয়ার কারণে অহংকার করে চলে। ইবনু ফারিস (রহিমাহুল্লাহ)-এর মতে, অধিক ভক্ষণকারী পেটুক লোক। কারো মতে, এমন লোক যার কখনো অসুখ হয় না। কেউ বলেন, ঐ ব্যক্তিকে جَوَّاظٍ বলা হয় যে নিজেকে এমন সব বস্তু বা গুণাবলীর অধিকারী হিসেবে গর্ব করে যা তার কাছে আদৌ নেই।
(لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللهِ لَأَبَرَّهٗ) ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ এখানে এর অর্থ হলো সে যদি (আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের আশায়) আল্লাহর ওপর শপথ বা কসম করে থাকে তবে আল্লাহ তা অবশ্যই পূরণ করেন। ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ)-ও একই অর্থ নিয়েছেন।
(ফাতহুল বারী ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৯১৮; শারহুন নাবাবী ১৭শ খন্ড, হাঃ ২৮৫৩/৪৬; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২০. প্রথম অনুচ্ছেদ - রাগ ও অহংকার
৫১০৭-[৪] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তির অন্তরে একটি সরিষা পরিমাণ ঈমান থাকবে, সে কখনো জাহান্নামে প্রবেশ করবে না এবং যে ব্যক্তির অন্তরে একটি সরিষা পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْغَضَبِ وَالْكِبَرِ
وَعَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَدْخُلُ النَّارَ أحد فِي قلبه مِثْقَال حَبَّة خَرْدَلٍ مِنْ إِيمَانٍ. وَلَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ أَحَدٌ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ مِنْ كبر» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ (لَا يَدْخُلُ النَّارَ أحد فِي قلبه مِثْقَال حَبَّة) উক্ত হাদীসাংশে مِثْقَال حَبَّة এর অর্থ হলো কোন শস্যদানার ওজনের পরিমাণ। তুহফাতুল আহ্ওয়াযীর লেখক মাজমা‘ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, مِثْقَال শব্দটি মূলত ওজনের পরিমাণ বুঝায়। কম হোক বা বেশী হোক। কিন্তু লোকেরা শুধুমাত্র দীনারের হিসাব সংখ্যায় শব্দটিকে রূপান্তরিত করে ব্যবহার করছে। যা মোটেও উচিত নয়।
(শারহুন নাবাবী ২য় খন্ড, হাঃ ৯১/১৪৭; ‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪০৮৭; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৯৯৮)
(مِنْ خَرْدَلٍ) বলা হয়েছে, خَرْدَلٍ হলো কালো বর্ণের শস্যদানা যা দেখতে ক্ষুদ্র অণুর মতো। অর্থাৎ একেবারে ছোট। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪০৮৭; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৯৯৮)
(مِنْ كبر) ইমাম খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ অহংকারের ব্যাখ্যা দু’টি পদ্ধতিতে করা যেতে পারে। ১. হতে পারে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শির্ক এবং কুফরীমূলক অহংকারের উদ্দেশ্য করেছেন। কেননা হাদীসের শেষাংশে তিনি বিপরীত প্রতিদান হিসেবে জান্নাতের জন্য ঈমানকে দাঁড় করিয়েছেন আর ঈমানের বিপরীত হচ্ছে শির্ক ও কুফরী। কাজেই এখানে এমন অহংকার উদ্দেশ্য যা শির্ক বা কুফরীর সমতুল্য। এ অবস্থায় কেউ জান্নাতে যাবে না। ২. আল্লাহ সুবহানাহূ যখন কাউকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে ইচ্ছা পোষণ করেন তখন তার অন্তর থেকে অহংকার দূর করে দেন। এভাবে সে অহংকার ও হিংসামুক্ত হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করে। যেমনটি আল্লাহ বলেছেন, وَنَزَعْنَا مَا فِي صُدُورِهِمْ مِنْ غِلٍّ
‘‘এবং তাদের অন্তরে যে হিংসা বিদ্বেষ ছিল আমি তা দূর করে দেই...।’’ (সূরাহ্ আল আ‘রাফ ৭ : ৪৩)
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) উক্ত ব্যাখ্যা দু’টি সম্পর্কে বলেছেনঃ হাদীসের শেষাংশে যে অহংকারের কথা বলা হয়েছে তা আমাদের কাছে সুপরিচিত। তা হলো মানুষের সামনে নিজেকে বড় মনে করা এবং তাদেরকে অবহেলার চোখে দেখা, এমনকি সৎ বা সঠিক বিষয় সামনে আসলেও তা প্রত্যাখ্যান করে মিথ্যা বা ভুলের উপর অবিচল থাকা। কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) এ কথাটি পছন্দ করেছেন। কোন কোন মুহাক্কিক বলেছেন যে, কেউ যদি অহংকার করা বৈধ মনে করে তাহলে জাহান্নামে যাওয়াই হবে তার প্রতিদান। তবে যারা আল্লহকে এক বলে স্বীকৃতি প্রদান করেছে তার শাস্তি ভোগ করার পর একবার না একবার জান্নাতে যাবেই। কেউ বলেছেন, (لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ) এর অর্থ হলো প্রথমবারেই মুত্তাক্বীদের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করবে না, বরং শাস্তি ভোগের পর জান্নাতে প্রবেশ করবে।
ইমাম খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ (لَا يَدْخُلُ النَّارَ) এর অর্থ হলো জাহান্নামে প্রবেশ করবে না এমনটি নয় বরং আল্লাহ চাইলে সে জাহান্নামে যেতে পারে।
তুহফাতুল আহওয়াযীর লেখক বলেনঃ مِثْقَال حَبَّة مِنْ إِيمَانٍ এ কথাটিই প্রমাণ করে যে, ঈমান কমে এবং বাড়ে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪০৮৭; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৯৯৮; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২০. প্রথম অনুচ্ছেদ - রাগ ও অহংকার
৫১০৮-[৫] উক্ত রাবী [’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যার অন্তরে এক বিন্দু অহংকার আছে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল : হে আল্লাহর রসূল! সকলেই তো এটা পছন্দ করে যে, তার পোশাক ভালো হোক, জুতো জোড়া ভালো হোক, এসব কি অহংকারের মধ্যে শামিল? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আল্লাহ তা’আলা নিজেও সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দও করেন। আর অহংকার হলো হককে বাতিল করা এবং মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করা। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْغَضَبِ وَالْكِبَرِ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنَ كِبْرٍ» . فَقَالَ رَجُلٌ: إِنَّ الرَّجُلَ يُحِبُّ أَنْ يَكُونَ ثَوْبُهُ حَسَنًا وَنَعْلُهُ حَسَنًا. قَالَ: «إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ. الْكِبَرُ بَطَرُ الْحَقِّ وَغَمْطُ النَّاس» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ (لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِه مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنَ كِبْرٍ) অত্র হাদীসের ব্যাখ্যায় কোন একজন হাদীস বিশারদ উল্লেখ করেছেন যে, এ ধরনের ব্যক্তি চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। আবূ সা‘ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতেও এ মর্মে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
يخرج من النار من كان فى قلبه مثقال ذرة من إيمان
অর্থাৎ ‘‘যার অন্তরে অণু পরিমাণ ঈমান রয়েছে তাকেও জাহান্নাম থেকে বের করা হবে।’’
অনুরূপভাবে একাধিক তাবি‘ঈ নিমেণাক্ত আয়াতটিকে তাফসীর করে বলেছেন,
رَبَّنَا إِنَّكَ مَنْ تُدْخِلِ النَّارَ فَقَدْ أَخْزَيْتَه
‘‘আল্লাহ আপনি যাকে জাহান্নামে চিরস্থায়ী বাসিন্দা বানিয়েছেন আপনি তাকে অতি লাঞ্ছিত করেছেন...’’- (সূরাহ্ আ-লি ‘ইমরা-ন ৩ : ১৯২)। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৯৯৯)
(فَقَالَ رَجُلٌ) ইমাম নাবাবী শারহু মুসলিমে উল্লেখ করেছেন লোকটির নাম হলো মালিক ইবনু মুযারা আর্ রহওয়াই।
মিরক্বাতুল মাফাতীহ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে কয়েকজন হতে পারে, তারা হলেন- ১. মু‘আয ইবনু জাবাল ২. ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর ইবনুল ‘আস এবং ৩. রবী‘আহ্ ইবনু ‘আমির।
إِنَّهٗ يُعْجِبُنِي أَنْ يَكُونَ ثَوْبِي حَسَنًا ونعلي حسنا অর্থাৎ মানুষের নজরকাড়া বা দৃষ্টি আকর্ষণ করার মানসিকতাও আমার নেই অহংকার বা দম্ভভরে চলাফেরা করা এবং মানুষের প্রশংসা বা বাহবা শুনার কোনরূপ ইচ্ছাও আমার নেই।
(إِنَّ اللهَ تَعَالٰى جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ) অর্থাৎ- আল্লাহ সুবহানাহূ ওয়াতা‘আলা পরিপূর্ণ গুণাবলীর অধিকারী এবং উত্তম কার্য সম্পাদনকারী। ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ আলো এবং সৌন্দর্য উদ্দেশ্য। আবার বলা হয়েছে, তোমাদের সাথে উত্তম আচরণকারী এবং তোমাদের ওপর সুদৃষ্টিদানকারী।
ইমাম মানবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ (إِنَّ اللهَ جَمِيلٌ) দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার সত্ত্বাগত সৌন্দর্য, গুণগত এবং কর্মগত সৌন্দর্য বুঝায়। আর يُحِبُّ الْجَمَالَ দ্বারা তোমাদের অবস্থাগত সৌন্দর্য (পরিষ্কার-পরিছন্নমূলক) এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে মুখাপেক্ষী হওয়া থেকে নিজেকে পবিত্র রাখাকে বুঝায়।
(الْكِبَرُ بَطَرُ الْحَقِّ) অর্থাৎ অহংকার হলো সত্যের সৌন্দর্যকে নষ্ট করে কলংকিত করা। আর (وَغَمْطُ النَّاس) এর অর্থ হলো সৃষ্টিজীবকে হেয় প্রতিপন্ন করে ঘৃণার চোখে দেখা। (بَطَرُ) শব্দের মূল অর্থ হলো অত্যধিক পরিমাণে হাসি তামাশায় দিন যাপন করা। এখানে উদ্দেশ্য হলো অর্থের প্রাচুর্যে নোংরা হয়ে যাওয়া। আবার বলা হয়েছে, নি‘আমাতে ডুবে থেকে আল্লাহর সীমালঙ্ঘন করা। উল্লেখিত অর্থ দু’টি পরস্পর সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মোটকথা (بَطَرُ الْحَقِّ) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ তা‘আলার তাওহীদ, রিসালাহ্, ‘ইবাদাত ইত্যাদি বিষয়সমূহের মধ্যে যা হক হিসেবে গণ্য করেছেন সেগুলোকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা।
তূরিবিশতী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ উক্ত হাদীসাংশের ব্যাখ্যা হলো সত্যকে মিথ্যা মনে করে বা অবহেলা করে তা থেকে পিছুটান থাকা। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৯৯৯; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২০. প্রথম অনুচ্ছেদ - রাগ ও অহংকার
৫১০৯-[৬] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তিন প্রকার মানুষ আছে, কিয়ামতের দিন যাদের সাথে আল্লাহ তা’আলা কথা বলবেন না এবং তাদেরকে পাপ-পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র করবেন না। অন্য এক বর্ণনায় আছে, আল্লাহ তা’আলা তাদের প্রতি রহমতের দৃষ্টি নিক্ষেপ করবেন না। আর তাদেরকে কঠিন শাস্তি দেবেন। তারা হচ্ছে- বৃদ্ধ ব্যভিচারী, মিথ্যাবাদী বাদশাহ ও অহংকারী গরীব। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْغَضَبِ وَالْكِبَرِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «ثَلَاثَةٌ لَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ» . وَفِي رِوَايَةٍ: وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ: شَيْخٌ زَانٍ وَمَلِكٌ كَذَّابٌ وَعَائِلٌ مُسْتَكْبِرٌ . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ (لَا يُكَلِّمُهُمُ اللهُ) অর্থাৎ স্বাভাবিকভাবে সন্তুষ্ট মনে কথা বলবেন না বা মোটেই কথা বলবেন না।
(وَلَا يُزَكِّيهِمْ) অর্থাৎ তাদেরকে তাদের কৃত পাপ থেকে পবিত্রও করবেন না এবং অন্যান্য মু’মিনদের সামনে তাদের গুণগানও গাইবেন না।
(شَيْخٌ زَانٍ) এ পর্যায়ের ব্যক্তির ওপর অভিসম্পাতের কারণ হলো ব্যভিচার করা এমনিতেই অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ। উপরন্তু কোন যুবক দ্বারা সংগঠিত হলে স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে যুবক হওয়ার কারণে ওযর বা কৈফিয়ত থাকে কিন্তু যদি এটা কোন বৃদ্ধের দ্বারা সংগঠিত হয় তখন এটা মেনে নেয়ার ক্ষেত্রে কোন ওযর থাকে না। কারণ ইতিপূর্বে যৌবনে তার চাহিদা পূরণ হয়েছে। এ অবস্থায় তার দ্বারা এমন কাজ হওয়ার বিকৃত রুচি এবং নেহায়াত কুৎসিত চরিত্রের অধিকারী হিসেবেই প্রমাণ করে। যেহেতু এটা সমাজ সংসারে এবং সভ্য বিবেকে মনুষ্যত্বের পরিপন্থী কাজ, তাই এটা আল্লাহর কাছেও অতি ঘৃণিত অপরাধ।
(وَمَلِكٌ كَذَّابٌ) অর্থাৎ অত্যধিক পরিমাণে মিথ্যার আশ্রয়গ্রহণকারী বাদশা (শাসক)। (وَعَائِلٌ مُسْتَكْبِرٌ) অর্থাৎ- দরিদ্র হয়েও অহংকার পোষণকারী ব্যক্তি। এ ধরনের লোক অভিশপ্ত হওয়ার কারণ হলো অহংকার করার যোগ্যতা তার মধ্যে নেই। যে সমস্ত উপকরণ হাতে থাকলে অহংকার চলে আসে, যেমন- অর্থ-সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি, শিক্ষা-দীক্ষা, মান-সম্মান ইত্যাদি এগুলোর কোন কিছুই তার কাছে নেই যা তাকে অহংকারী হতে সহায়তা করে, তারপরও সে অহংকার করে। এটা স্বয়ং আল্লাহর কাছে অত্যন্ত নিন্দনীয়। তাই এটাও জঘন্য অপরাধ। বলা হয়েছে (عَائِلٌ) অর্থ হলো ذو العيال তথা সংসারী লোক। তার অহংকার হলো এ রকম যে, হাতে অর্থ নেই, আবার কেউ সাদাকা করলে তা নিবেও না, অন্তরে এক রকম হিংসাও কাজ করে, ফলে পরিবার অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ যিনা হলো স্বাভাবিক অবস্থায় জঘন্য অপরাধ কিন্তু এটা যদি কোন বৃদ্ধ লোকের কাজ হয় তবে এটা অত্যন্ত জঘন্য হয়। অনুরূপ মিথ্যা কুৎসিত তবে এটা বাদশার কাছ থেকে হলে অত্যন্ত কুৎসিত হয়। অনুরূপভাবে অহংকার ঘৃণিত কাজ আর যদি এটা ফাকীরের কাছ থেকে হয় তবে তার জঘন্যের পরিমাণ আরো বেড়ে যায়।
মোটকথা, আমরা এভাবে বলতে পারি যে, الشَيْخٌ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো বিবাহিত লোক, চাই সে যুবক হোক বা বৃদ্ধ হোক। শারী‘আতের দৃষ্টিতে এটা অত্যন্ত জঘন্য, তাই তার জন্য রজমের শাস্তি আবশ্যক।
আর المَلِكٌ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ধনী-সম্পদশালী লোক। কেননা ফাকীর দুনিয়াবী প্রয়োজনের উপকার লাভের আশায় মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ফায়দা লাভ করে, পক্ষান্তরে ধনী লোকের দ্বারা এমনটির প্রয়োজন হয় না। এজন্য ধনী লোকের দ্বারা এমনটি হলে সেটা অত্যন্ত জঘন্য হিসেবে গণ্য হয়।
আর (عَائِلٌ مُسْتَكْبِرٌ) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ঐ ফাকীর লোক, যে অন্যান্য ফাকীরদের ওপর অহংকার করে, সে শক্তি সামর্থ্য থাকার পরও পরিশ্রম করেও অর্থ উপার্জন করতে চায় না। আত্মঅহংকারে ঘরে বসে থাকে। কোন সন্দেহ নেই যে, এ অবস্থায় সে নিজে এবং পরিবারের সবাই ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ, শারহুন নাবাবী ২য় খন্ড, হাঃ ১০৭/১৭২; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৫৯৫)
পরিচ্ছেদঃ ২০. প্রথম অনুচ্ছেদ - রাগ ও অহংকার
৫১১০-[৭] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা বলেন, ’’অহংকার আমার চাদর ও শ্রেষ্ঠত্ব আমার লুঙ্গিস্বরূপ’’। অতএব, যে ব্যক্তি এ দু’টোর কোন একটি আমার কাছ থেকে কেড়ে নেবে, আমি তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করব। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْغَضَبِ وَالْكِبَرِ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى: الْكِبْرِيَاءُ رِدَائِي وَالْعَظَمَةُ إِزَارِي فَمَنْ نَازَعَنِي وَاحِدًا مِنْهُمَا أَدْخَلْتُهُ النَّارَ . وَفِي رِوَايَةٍ: «قَذَفْتُهُ فِي النَّارِ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ (الْكِبْرِيَاءُ رِدَائِي وَالْعَظَمَةُ إِزَارِي) উল্লেখিত হাদীসাংশে الْكِبْرِيَاءُ শব্দটি আল্লাহর জাত বা সত্তাগত আর الْعَظَمَةُ শব্দটি আল্লাহর সিফাত বা গুণগত।
رِدَائِي এবং إِزَارِي শব্দ দু’টি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। إِزَارِ এবং رِدَاء তথা লুঙ্গি ও চাদর- এ দু’টি কাপড় মানুষের শরীরে জড়ানো থাকে। এ দু’টি কাপড় হলো কোন মানুষের সৌন্দর্য। অনুরূপভাবে الْكِبْرِيَاءُ ও الْعَظَمَةُ তথা অহংকার ও মহত্ব- এ দু’টি বৈশিষ্ট্য আল্লাহর সাথেই জড়ানো এবং তিনিই এ দু’টোর একমাত্র দাবিদার আর এ দু’টি দ্বারাই তাঁর মর্যাদা এবং সৌন্দর্য প্রকাশ পায়। কাজেই উল্লেখিত হাদীসে উপমা স্বার্থকরূপেই ফুটে উঠেছে।
(শারহুন নাবাবী ১৬শ খন্ড, হাঃ ২৬২০/১৩৬; মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ইবনু মাজাহ ৩য় খন্ড, হাঃ ৪১৭৪)
(فَمَنْ نَازَعَنِي وَاحِدًا مِنْهُمَا) অর্থাৎ কেউ যদি উক্ত দু’টি বৈশিষ্ট্য নিজের ভেতরে প্রকাশ করে এবং আল্লাহর সাথে অংশ সাব্যস্ত করতে চায় তাহলে আল্লাহ তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। কেননা অহংকার হলো আল্লাহর সত্ত্বাগত বৈশিষ্ট্য (যা আল্লাহর দেহে মনে সম্পৃক্ত) আর মহত্ব ও বড়ত্ব আল্লাহর গুণগত বৈশিষ্ট্য, যে দু’টোর অধিকারী একমাত্র আল্লাহই। এখন কেউ যদি নিজের ভেতরে এ দু’টির চর্চা করে, তাহলে সে আল্লাহর সাথে অংশ সাব্যস্ত করে বিধায় আল্লাহ তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - রাগ ও অহংকার
৫১১১-[৮] সালামাহ্ ইবনু আকওয়া’ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এমন এক ব্যক্তি আছে, যে সর্বদা নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করে, মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে থাকে, এমনকি তার নাম উদ্ধত-অহংকারীদের মধ্যে লিখে দেয়া হয়। আর উদ্ধত-অহংকারীদের ওপর যে বিপদ অবতীর্ণ হয়, তার ওপরও সে বিপদই অবতীর্ণ হয়। (তিরমিযী)[1]
عَن سَلَمَةَ بْنِ الْأَكْوَعِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَذْهَبُ بِنَفْسِهِ حَتَّى يُكْتَبَ فِي الْجَبَّارِينَ فَيُصِيبَهُ مَا أَصَابَهُمْ» رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘উমার ইবনু রশীদ’’ নামের বর্ণনাকারী য‘ঈফ। দেখুন- য‘ঈফাহ্ ১৯১৪।
ব্যাখ্যাঃ (لَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَذْهَبُ بِنَفْسِه) অর্থাৎ- যে ব্যক্তি সদা সর্বদা নিজেকে অন্যদের চাইতে উঁচু পর্যায়ের মনে করবে এবং মানুষের সাথে স্বাভাবিক জীবনে উঠাবসা বা লেনদেন না করে নিজেকে দূরে সরিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের দাবী করবে, আত্মঅহংকারে আর দাম্ভিকতার জোরে নিজেকে অনেক সম্মানী ভাবতে থাকবে এমন ব্যক্তিকে এক পর্যায়ে আল্লাহর দরবারে অত্যাচারী অহংকারী এবং স্বৈরশাসকদের কাতারে গণ্য করা হবে। যেমন- ফির্‘আওন, হামান, কারূন- তাদেরকে যে বিপদাপদ গ্রাস করেছিল এক সময় তাকেও এগুলো আক্রমণ করবে। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ২০০০; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - রাগ ও অহংকার
৫১১২-[৯] ’আমর ইবনু শু’আয়ব (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর পিতার মাধ্যমে তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন। তাঁর দাদা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন অহংকারীদেরকে ছোট পিপীলিকার মতো একত্রিত করা হবে; কিন্তু আকৃতি-অবয়ব হবে মানুষের। চতুর্দিক থেকে অপমান তাদেরকে ঘিরে থাকবে। তাদেরকে ’’বূলাস’’ নামক জাহান্নামের এক কারাগারের দিকে হাঁকিয়ে নেয়া হবে। তাদের ওপর আগুনের কুণ্ডলী হবে এবং তাদেরকে জাহান্নামীদের নিংড়ানো পঁচা রক্ত ও পুঁজ পান করানো হবে, যার নাম ’’ত্বীনাতুল খবাল’’। (তিরমিযী)[1]
عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: يُحْشُرُ الْمُتَكَبِّرُونَ أَمْثَالَ الذَّرِّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِي صُوَرِ الرِّجَالِ يَغْشَاهُمُ الذُّلُّ مِنْ كُلِّ مَكَانٍ يُسَاقُونَ إِلَى سِجْنٍ فِي جَهَنَّمَ يُسَمَّى: بُولَسُ تَعْلُوهُمْ نَارُ الْأَنْيَارِ يُسْقَوْنَ مِنْ عُصَارَةِ أَهْلِ النَّارِ طِينَةَ الْخَبَالِ . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ
পরিচ্ছেদঃ ২০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - রাগ ও অহংকার
৫১১৩-[১০] ’আতিয়্যাহ্ ইবনু ’উরওয়াহ্ আস্ সা’দী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রাগ শয়তানের পক্ষ থেকে আসে এবং শয়তানকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে। আগুন পানি দ্বারা নেভানো যায়। যখন তোমাদের মধ্যে কারো রাগ আসে, তবে সে যেন উযূ করে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن
عَطِيَّة بن عُرْوَة السعديّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ الْغَضَبَ مِنَ الشَّيْطَانِ وَإِنَّ الشَّيْطَانَ خُلِقَ مِنَ النَّارِ وَإِنَّمَا يُطْفَأُ النَّارُ بِالْمَاءِ فَإِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَتَوَضَّأْ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) প্রথমে আল কালিমুত্ব ত্বইয়িব ২২৭ নং হাদীসে সহীহ বলেছিলেন। পরবর্তীতে ৫৮২৯ নং হাদীসে য‘ঈফাতে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, আমি তার কোন শাহিদ হাদীস পাইনি। فليغسل এর পরিবর্তে فَلْيَتَوَضَّأْ শব্দ পেয়েছি। তবে তার সানাদ মাজহূল, য‘ঈফ। দেখুন- তারাজু‘আতে আলবানী ১/২১ পৃঃ, হাঃ ১৪।
ব্যাখ্যাঃ (إِنَّ الْغَضَبَ مِنَ الشَّيْطَانِ) অর্থাৎ- রাগ হলো শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং কুপ্রভাব। তাই শয়তানের কুপ্রভাবেই মানুষ রাগান্বিত হয়। সুতরাং রাগের অবস্থায় উযূ করলে রাগ দূর হয়ে যায়। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৭৭৬)
(وَإِنَّ الشَّيْطَانَ خُلِقَ مِنَ النَّارِ) উক্ত হাদীসাংশ থেকে প্রমাণিত হয় যে, শয়তান মালায়িকাহ্’র (ফেরেশতাদের) অন্তর্ভুক্ত ছিল না। কারণ মালায়িকাহ্ হলো নূরের বা আলো থেকে তৈরি আর শয়তান হলো আগুন থেকে তৈরি।
(فَإِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَتَوَضَّأْ) এখানে রাগের সময় উযূ করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। কারণ রাগ আসে শয়তান থেকে আর শয়তানকে তৈরি করা হয়েছে আগুন থেকে। যেহেতু পানি আগুনকে নিভিয়ে দিতে পারে, তাই উযূর মাধ্যমে রাগকেও দমন করা যেতে পারে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - রাগ ও অহংকার
৫১১৪-[১১] আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন তোমাদের কারো রাগ বা ক্রোধ হয়, সে যেন বসে পড়ে, তাও রাগ না কমলে সে যেন চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে। (আহমাদ ও তিরমিযী)[1]
وَعَنْ
أَبِي ذَرٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسلم قَالَ: «إِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ وَهُوَ قَائِمٌ فَلْيَجْلِسْ فَإِنْ ذَهَبَ عَنْهُ الْغَضَبُ وَإِلَّا فَلْيَضْطَجِعْ» رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ (وَهُوَ قَائِمٌ فَلْيَجْلِسْ) হাদীসের এ অংশে বিপরীত অবস্থার দ্বারা চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে। কারণ রাগ হলো শয়তানের কুমন্ত্রণা দ্বারা সৃষ্ট ক্রমান্বয়ে বর্ধনশীল এক প্রকার শক্তি যা আগুনের মতো বৃদ্ধি পেতে থাকে। আগুন যে রকম উপরের দিকে বাড়তে থাকে রাগের মাত্রাও অনুরূপ বাড়তে থাকে। অনুরূপভাবে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য মানুষ বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ে, প্রচণ্ড রেগে গেলে বসা থেকে দাঁড়িয়ে যায়। মানুষ যেহেতু আগুনকে উপরে বাড়তে দেয় না তাকে ধরাশায়ী করতে চায় অনুরূপ কোন রাগান্বিত ব্যক্তিকে দাঁড়ানো অবস্থা থেকে বসিয়ে দিলেও তারও রাগ কমে যায়। এতেও না কমলে তাকে শুইয়ে দিতে হয়, অবশেষে তার রাগ দূর হয়।
শারহুস্ সুন্নাহতে বলা হয়েছে, রাগের অবস্থা বসে যেতে এবং শুয়ে যেতে আদেশের কারণ হলো রাগের অবস্থায় কোন গর্হিত কাজ যেন সংগঠিত না হয়। কেননা শুয়ে থাকা ব্যক্তি বসে থাকা ব্যক্তির চাইতে নড়াচড়া এবং শক্তি প্রয়োগের দিক থেকে দুর্বল হয়।
ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ সম্ভবত আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিনয় এবং নম্রতাকে ইচ্ছা করেছেন। কেননা রাগ অহংকার ও দম্ভ তৈরি করে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ, ‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৭৭৪)
পরিচ্ছেদঃ ২০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - রাগ ও অহংকার
৫১১৫-[১২] আসমা বিনতু ’উমায়স (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ ঐ বান্দা মন্দ, যে নিজেকে অপরের চেয়ে ভালো মনে করে, অহংকার করে এবং আল্লাহ তা’আলাকে ভুলে যায়। ঐ বান্দা মন্দ, যে মানুষের ওপর জুলুম-অত্যাচার করে, সীমালঙ্ঘন করে এবং সর্বশ্রেষ্ঠ পরাক্রমশালী আল্লাহকে ভুলে যায়। ঐ বান্দা মন্দ, যে দীনের কাজ ভুলে যায়, দুনিয়ার কাজে মত্ত হয়ে থাকে এবং কবরস্থানের কথা ও শরীর পঁচে যাওয়ার কথা ভুলে যায়। ঐ বান্দা মন্দ, যে ঝগড়া-বিবাদ বাধিয়ে বিপর্যয় সৃষ্টি করে, অবাধ্য হয় এবং নিজের প্রথম ও শেষ ভুলে যায়। ঐ বান্দা মন্দ, যে দুনিয়াবাসীকে ’’দীন’’ দ্বারা ধোঁকা দেয়। ঐ বান্দা মন্দ, যে সন্দেহ করে ধর্মকে খারাপ করে দেয়। ঐ বান্দা মন্দ, যাকে দুনিয়ার লোভ-লালসার দিকে এবং দুনিয়ার পূজারীদের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া যায়। ঐ বান্দা মন্দ, যাকে দুনিয়ার লোভ-লালসা ও দুনিয়ার প্রতি আসক্তি, অসম্মানিত ও হেয় করে।[তিরমিযী ও বায়হাক্বী’র ’’শু’আবুল ঈমানে’’ বর্ণনা করেছেন; আর ইমাম বায়হাক্বী ও তিরমিযী (রহিমাহুমাল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসের বর্ণনাসূত্র সবল নয় এবং ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) আরো বলেনঃ এ হাদীসটি গরীব।][1]
وَعَنْ أَسْمَاءَ
بِنْتِ عُمَيْسٍ قَالَتْ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «بِئْسَ الْعَبْدُ عَبْدٌ تَخَيَّلَ وَاخْتَالَ وَنَسِيَ الْكَبِيرَ الْمُتَعَالِ بِئْسَ الْعَبْدُ عَبْدٌ تَجَبَّرَ وَاعْتَدَى وَنَسِيَ الْجَبَّارَ الْأَعْلَى بِئْسَ الْعَبْدُ عَبْدٌ سَهَى وَلَهَى وَنَسِيَ الْمَقَابِرَ وَالْبِلَى بِئْسَ الْعَبْدُ عَبْدٌ عَتَى وَطَغَى وَنَسِيَ الْمُبْتَدَأَ وَالْمُنْتَهَى بِئْسَ الْعَبْدُ عَبْدٌ يَخْتِلُ الدُّنْيَا بِالدِّينِ بِئْسَ الْعَبْدُ عَبْدٌ يَخْتِلُ الدِّينَ بِالشُّبَهَاتِ بِئْسَ الْعَبْدُ عَبْدٌ طَمَعٌ يَقُودُهُ بِئْسَ الْعَبْدُ عَبْدٌ هَوًى يُضِلُّهُ بِئْسَ الْعَبْدُ عَبْدٌ رَغَبٌ يُذِلُّهُ» رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَالْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ» . وَقَالَا: لَيْسَ إِسْنَادُهُ بِالْقَوِيِّ وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ أَيْضًا: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘হাশিম ইবনু সা‘ঈদ আল কুফী’’ য‘ঈফ। আবূ যায়দ আল খস্‘আমী (الخسعمى) নামের বর্ণনাকারী মাজহূল। হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৪৭৬, য‘ঈফাহ্ ২০২৬।
ব্যাখ্যাঃ بِئْسَ الْعَبْدُ এখানে الرجل লোক অথবা المرأ (ব্যক্তি) শব্দ ব্যবহার করা হয়নি। বরং الْعَبْدُ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যেহেতু হাদীসে উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যসমূহ কোন عَبْدٌ তথা আল্লাহর ‘ইবাদাতকারী বান্দার জন্য শোভনীয় নয়, তাই الْعَبْدُ শব্দ ব্যবহার করে তাকে তিরস্কার জানানো হয়েছে।
(عَبْدٌ تَخَيَّلَ وَاخْتَالَ) মুনবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এখানে ঐ বান্দার কথা বলা হয়েছে, যে মনে মনে নিজেকে অন্যের তুলনায় শ্রেষ্ঠভাবে এবং অহংকার করে চলে।
(بِئْسَ الْعَبْدُ عَبْدٌ تَخَيَّلَ) মুনবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ঐ বান্দার কথা বলা হয়েছে, যে মানুষকে নিজের ইচ্ছানুযায়ী চলতে বাধ্য করে। এখানেও ক্ষমতার অপব্যবহারে অহংকার প্রকাশ পায়।
(عَبْدٌ سَهٰى) ঐ ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, যে দুনিয়াবী লোভ লালসায় মত্ত থাকে কিন্তু সঠিক বিষয় তার সামনে আসলে সেটা গ্রহণও করে না আবার ‘ইবাদাত-বন্দেগীর তোয়াক্কাও করে না।
(وَلَهٰى) খেল-তামাশায় মত্ত থাকে।
(وَنَسِيَ الْمَقَابِرَ) এখানে উদ্দেশ্য হলো মৃত্যুকে ভুলে থাকে। উদাসীন জীবন যাপন করে মৃত্যু, কবর, পরকাল ইত্যাদি সবকিছু থেকে নিজেকে উদাসীন করে রাখে।
(وَنَسِيَ الْمُبْتَدَأَ وَالْمُنْتَهٰى) এখানেالْمُبْتَدَأَ শব্দ দ্বারা তার সৃষ্টির সূচনা তথা মাতা-পিতার দেহে তাদের বীর্যে তার অবস্থানকে সে ভুলে যায় এবং পুনরায় আল্লাহর কাছে তার ফিরে যাওয়ার কথাও সে ভুলে যায়।
(তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৪৪৮; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - রাগ ও অহংকার
৫১১৬-[১৩] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ মহীয়ান ও গরীয়ানের দৃষ্টিতে কোন বান্দা রাগের ঢোকের চেয়ে উত্তম ঢোক গিলে না, যা সে আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টির জন্য গিলে থাকে। (আহমাদ)[1]
عَنِ ابْنِ
عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا تَجَرَّعَ عَبْدٌ أَفْضَلَ عِنْدَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ مِنْ جُرْعَةِ غَيْظٍ يكظمها اتبغاء وَجه الله تَعَالَى» . رَوَاهُ أَحْمد
ব্যাখ্যাঃ উল্লেখিত হাদীসে মানুষের রাগ এবং তার তীব্রতাকে নিয়ন্ত্রণ করার ফাযীলাত বর্ণনা করা হয়েছে। কোন বান্দা যদি রাগকে মনের সাথে চেপে রাখে এবং তা প্রকাশ না করে, ফলে মানুষ এতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তাহলে মনে মনে রাগ হজম করার কারণে আল্লাহর পক্ষ হতে তার জন্য অনেক বড় পুরস্কার বরাদ্দ থাকে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - রাগ ও অহংকার
৫১১৭-[১৪] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। আল্লাহ তা’আলার বাণী- اِدْفَعْ بِالَّتِيْ هِيَ أَحْسَنُ (অর্থাৎ- ’’তুমি খারাপকে ভালো দ্বারা দমন করো...’’- (সূরাহ্ আল মু’মিনূন ২৩ : ৯৬)-এর ব্যাখ্যায় বলেনঃ রাগের সময় ধৈর্যধারণ করা এবং বিপদের সময় ক্ষমা করাই এর তাৎপর্য। যখন মানুষ এরূপ করে, তখন আল্লাহ তা’আলা তাকে বিপদাপদ হতে রক্ষা করেন এবং শত্রুদেরকে তাদের জন্য নত ও অনুগত করে দেন, যেন তারা ঘনিষ্ঠ বন্ধু। (ইমাম বুখারী হাদীসটি বিনা সনদে বর্ণনা করেন।)[1]
وَعَنِ
ابْنِ عَبَّاسٍ فِي قَوْلِهِ تَعَالَى: (ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أحسن)
قَالَ: الصَّبْرُ عِنْدَ الْغَضَبِ وَالْعَفْوُ عِنْدَ الْإِسَاءَةِ فَإِذَا فَعَلُوا عَصَمَهُمُ اللَّهُ وَخَضَعَ لَهُمْ عَدُوُّهُمْ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ قَرِيبٌ. رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ تَعْلِيقًا
পরিচ্ছেদঃ ২০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - রাগ ও অহংকার
৫১১৮-[১৫] বাহয ইবনু হাকীম (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর পিতার মাধ্যমে তাঁর পিতামহ হতে বর্ণনা করেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রাগ ঈমানকে বিনষ্ট করে দেয়, যেমন সাবির (গাছের তিক্ত আঠা) মধুকে বিনষ্ট করে দেয়।[1]
وَعَنْ بَهْزِ
بْنِ حَكِيمٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ الْغَضَبَ لَيُفْسِدُ الْإِيمَانَ كَمَا يُفْسِدُ الصبرُ الْعَسَل»
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘মুখয়য়িস (مخيس)’’ নামের বর্ণনাকারী মাজহূল বা অপরিচিত। আর হিশাম ইবনু ‘আম্মার-এর মধ্যে দুর্বলতা আছে। দেখুন- য‘ঈফাহ্ ১৯১৮।
পরিচ্ছেদঃ ২০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - রাগ ও অহংকার
৫১১৯-[১৬] ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন তিনি মিম্বারের উপর দাঁড়িয়ে বললেনঃ হে লোক সকল! তোমরা বিনয়ী হও। আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি লাভের জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ তা’আলা তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। সে নিজেকে নিজে ছোট মনে করে কিন্তু মানুষের চোখে খুবই মহান ও সম্মানিত হয়। যে ব্যক্তি অহংকার করে, আল্লাহ তা’আলা তাকে হেয় করে দেন। সে মানুষের দৃষ্টিতে ছোট- অপাংক্তেয় এবং সে নিজেকে নিজে খুব বড় মনে করে। এমনকি সে শেষ পর্যন্ত মানুষের চোখে কুকুর ও শূকরের চেয়েও অধিক ঘৃণিত বলে বিবেচিত হয়।[1]
وَعَن عمر
قَالَ وَهُوَ عَلَى الْمِنْبَرِ: يَا أَيُّهَا النَّاسُ تَوَاضَعُوا فَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَنْ تَوَاضَعَ لِلَّهِ رَفَعَهُ اللَّهُ فَهُوَ فِي نَفْسِهِ صَغِيرٌ وَفِي أَعْيُنِ النَّاسِ عَظِيمٌ وَمَنْ تَكَبَّرَ وَضَعَهُ اللَّهُ فَهُوَ فِي أَعْيُنِ النَّاسِ صَغِيرٌ وَفِي نَفْسِهِ كَبِيرٌ حَتَّى لَهُوَ أَهْوَنُ عَلَيْهِمْ مِنْ كَلْبٍ أَوْ خنزيرٍ»
হাদীসটি জাল হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘সা‘ঈদ ইবনু সাল্লাম’’ নামের বর্ণনাকারী মিথ্যুক। দেখুন- য‘ঈফাহ্ ১২৯৫, হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৪৭৭।
পরিচ্ছেদঃ ২০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - রাগ ও অহংকার
৫১২০-[১৭] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মূসা ইবনু ’ইমরান (আ.)আল্লাহ তা’আলার কাছে জিজ্ঞেস করলেন, হে রব্! তোমার বান্দাদের মধ্যে তোমার কাছে প্রিয়তম কে? আল্লাহ তা’আলা বললেনঃ প্রতিশোধ গ্রহণের ক্ষমতা থাকতেও যে ক্ষমা করে দেয়।[1]
وَعَنْ أَبِي
هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: قَالَ مُوسَى بْنُ عِمْرَانَ عَلَيْهِ السَّلَامُ: يَا رَبِّ مَنْ أَعَزُّ عِبَادِكَ عِنْدَكَ؟ قَالَ: مَنْ إِذَا قَدَرَ غَفَرَ
পরিচ্ছেদঃ ২০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - রাগ ও অহংকার
৫১২১-[১৮] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি নিজের রসনাকে সংযত রাখে, আল্লাহ তা’আলা তার দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখেন। যে ব্যক্তি নিজের রাগকে দমন করে, আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন তার ওপর থেকে শাস্তি থামিয়ে দেন। যে নিজের কৃত পাপের জন্য আল্লাহ তা’আলার দরবারে অজুহাত দেখায়, আল্লাহ তা’আলা তার অজুহাত কবুল করেন।[1]
وَعَنْ أَنَسٍ
أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ خَزَنَ لِسَانَهُ سَتَرَ اللَّهُ عَوْرَتَهُ وَمَنْ كَفَّ غَضَبَهُ كَفَّ اللَّهُ عَنْهُ عَذَابَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَمَنِ اعْتَذَرَ إِلَى الله قَبِلَ الله عذره»
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘রবী‘ ইবনু সুলায়মান আল আযদী’’ নামের বর্ণনাকারী য‘ঈফ। দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ১৯১৬।
পরিচ্ছেদঃ ২০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - রাগ ও অহংকার
৫১২২-[১৯] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তিনটি জিনিস পরিত্রাণকারী এবং তিনটি জিনিস ধ্বংসকারী। পরিত্রাণকারী জিনিসগুলো হল- ১. প্রকাশ্যে ও গোপনে আল্লাহকে ভয় করা, ২. সন্তুষ্ট ও অসন্তুষ্ট উভয় অবস্থায় উচিত কথা বলা, ৩. ধনী ও দরিদ্র উভয় অবস্থায় মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা। আর ধ্বংসকারী জিনিসগুলো হল- ১. প্রবৃত্তির অনুসারী হওয়া, ২. লোভ-লালসা করা, ৩. কোন ব্যক্তি নিজেকে নিজে সম্মানিত মনে করা। আর এ স্বভাবটিই সবচেয়ে খারাপ স্বভাব। (উপরিউক্ত পাঁচটি হাদীস বায়হাক্বী’র ’’শু’আবুল ঈমানে’’ বর্ণনা করেছেন।)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: ثَلَاثٌ مُنْجِيَاتٌ وَثَلَاثٌ مُهْلِكَاتٌ فَأَمَّا الْمُنْجِيَاتُ: فَتَقْوَى اللَّهِ فِي السِّرِّ والعلانيةِ والقولُ بالحقِّ فِي الرضى وَالسُّخْطِ وَالْقَصْدُ فِي الْغِنَى وَالْفَقْرِ. وَأَمَّا الْمُهْلِكَاتُ: فَهَوًى مُتَّبَعٌ وَشُحٌّ مُطَاعٌ وَإِعْجَابُ الْمَرْءِ بِنَفْسِهِ وَهِيَ أَشَدُّهُنَّ «. رَوَى الْبَيْهَقِيُّ الْأَحَادِيثَ الْخَمْسَةَ فِي» شعب الْإِيمَان
পরিচ্ছেদঃ ২১. প্রথম অনুচ্ছেদ - অত্যাচার
৫১২৩-[১] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জুলুম বা অত্যাচার কিয়ামতের দিন অন্ধকারের কারণ হবে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الظُّلْمِ
عَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الظُّلْمُ ظُلْمَاتٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ (الظُّلْمُ ظُلْمَاتٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ) ইবনুল জাওযী (রহিমাহুল্লাহ) উল্লেখিত হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেনঃ জুলুম বা অত্যাচার প্রধানতঃ দু’টো পাপের সাথে সম্পৃক্ত থাকে। একটি হলো অন্যায়ভাবে কারো সম্পদ আত্মসাৎ করা। আর অপরটি হলো আল্লাহ সুবহানাহূ ওয়াতা‘লার সাথে বিরুদ্ধাচরণ করা শারী‘আত বহির্ভূত কোন বিষয় নিয়ে। জুলুমের এ পাপটি অন্যান্য পাপের চাইতে মারাত্মক। কারণ অধিকাংশ সময় জুলুম নামক অন্যায় দুর্বল ব্যক্তিদের সাথেই সংগঠিত হয়ে থাকে। যারা এতে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে না অক্ষম হওয়ার কারণে তারা পরাজিত হয়। জুলুম অন্তরের অন্ধকার তথা বক্রতা থেকে তৈরি হয়। তবে যদি সেই অন্তর হিদায়াতের আলো দ্বারা আলোকিত হয় তখন তার মর্যাদা অনেক গুণে বেড়ে যায়। সুতরাং আখিরাতে যেদিন মুত্তাক্বীরা তাকওয়ার প্রতিদান হিসেবে আল্লাহর নূর লাভে ধন্য হবে সেদিন যালিমকে তার জুলুমের অন্ধকার আচ্ছন্ন করবে কিন্তু কোনই সাহায্যকারী থাকবে না। (ফাতহুল বারী ৫ম খন্ড, হাঃ ২৪৪৭; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ২০৩০)
কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন যালিমের জন্য বাস্তবিকই অন্ধকার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ অন্ধকারগুলো বিভিন্ন বিপদাপদ, দুঃখ-দুর্দশার আকৃতিরূপে প্রকাশ পাবে। মানুষ যখন বিপদে পতিত হয় তখন সে এক রকম অন্ধকারেই পতিত হয়, এদিক থেকে ظُلْمَاتٌ বলা হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন-
قُلْ مَنْ يُنْجِيكُمْ مِنْ ظُلُمَاتِ الْبَرِّ والبحر ‘‘হে নবী! বলুন, কে তোমাদেরকে জলের এবং স্থলের বিপদাপদ থেকে রক্ষা করে।’’ আবার ظُلْمَاتٌ শব্দ দ্বারা বিভিন্ন প্রকার শাস্তিও উদ্দেশ্য হতে পারে। (শারহুন নাবাবী ১৬শ খন্ড, হাঃ ২৫৭৯/৫৭)
পরিচ্ছেদঃ ২১. প্রথম অনুচ্ছেদ - অত্যাচার
৫১২৪-[২] আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা অত্যাচারীকে অবকাশ দিয়ে থাকেন। অতঃপর তাকে এমনভাবে পাকড়াও করেন যে, সে আর ছুটে যেতে পারে না। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ আয়াত পাঠ করলেন- وَكَذٰلِكَ أَخْذُ رَبِّكَ إِذَا أَخَذَ الْقُرَىْ وَهِىَ ظَالِمَةٌ। অর্থাৎ- এরূপ তোমার প্রভুর পাকড়াও যে, যখন তিনি অত্যাচারী গ্রামবাসীদের পাকড়াও করেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الظُّلْمِ
وَعَنْ أَبِي مُوسَى قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «إِن اللَّهَ لَيُمْلِي لِلظَّالِمِ حَتَّى إِذَا أَخَذَهُ لَمْ يفلته» ثمَّ يقْرَأ (وَكَذَلِكَ أَخْذُ رَبِّكَ إِذَا أَخَذَ الْقُرَى وَهِيَ ظالمة)
الْآيَة. مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ (إِن اللهَ لَيُمْلِي لِلظَّالِمِ) অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা অত্যাচারীকে ভালো হওয়ার জন্য বারবার সুযোগ দেন। প্রথমবারেই তাকে পাকড়াও করেন না।
(حَتّٰى إِذَا أَخَذَهٗ لَمْ يفلته) কিন্তু যখন তাকে পাকড়াও করার ইচ্ছা করেন তখন আর তাকে সুযোগ দেন না। তাকে ধ্বংস করে দেন। (ফাতহুল বারী ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৬৮৬; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২১. প্রথম অনুচ্ছেদ - অত্যাচার
৫১২৫-[৩] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ’’হিজর’’ নামক স্থানের উপর দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন লোকেদেরকে বললেনঃ সেসব বাড়ি-ঘরে যাবে না, যারা নিজেদের আত্মার প্রতি অত্যাচার করেছে। তোমরা যখন অতিক্রম করবে ক্রন্দনরত অবস্থায় অতিক্রম করবে, যাতে তোমাদের ওপরও ঐ বিপদ না পৌঁছে, যা তাদের উপর পৌঁছেছে। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজ মাথা চাদর দ্বারা ঢেকে ফেললেন এবং চলার গতি দ্রুত করলেন, যতক্ষণ না উপত্যকাটি অতিক্রম করে গেলেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الظُّلْمِ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمَّا مَرَّ بِالْحِجْرِ قَالَ: «لَا تَدْخُلُوا مَسَاكِنَ الَّذِينَ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ إِلَّا أَنْ تَكُونُوا بَاكِينَ أَنْ يُصِيبَكُمْ مَا أَصَابَهُمْ» ثُمَّ قَنَّعَ رَأْسَهُ وَأَسْرَعَ السَّيْرَ حَتَّى اجتاز الْوَادي. مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ (لَمَّا مَرَّ بِالْحِجْرِ) উক্ত হাদীসে الْحِجْرِ শব্দটি একটি স্থানের নাম। এখানে ‘আদ এবং সামূদ সম্প্রদায়ের বসতি ছিল। এ প্রসঙ্গে তূরিবিশতী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ الْحِجْرِ হলো সামূদ সম্প্রদায়ের আবাসিক এলাকা। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ৫ম খন্ড, হাঃ ৪৪১৯)
(الَّذِينَ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ) অর্থাৎ-‘‘যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছিল’’ এরা শির্ক ও কুফরীর মাধ্যমে নিজেদের ওপর জুলুম করেছিল। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(قَنَّعَ رَأْسَهٗ وَأَسْرَعَ السَّيْرَ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত পথ দিয়ে তাবুক যাওয়ার পথে এ স্থানে মাথা নিচু করে ডানে বামে কোন দিকে না তাকিয়ে খুব দ্রুত সামনে আগালেন। তিনি এমনটি করেছিলেন তাঁর উম্মাতকে শিখানোর জন্য যেন তারা পরবর্তীতে এখান দিয়ে যাওয়ার সময় খুব দ্রুত চলে যায়। যেহেতু আল্লাহ তা‘আলা এ সকল জায়গা থেকে সতর্ক সাবধান থাকার আদেশ প্রদান করেছেন, তাই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব দ্রুত এখান থেকে চলে যান যেন কোন বিপদ গ্রাস করতে না পারে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(لَا تَدْخُلُوا مَسَاكِنَ) এ প্রসঙ্গে ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এখানে উদ্দেশ্য হলো কোন অবস্থাতেই যেন তাদের বসতিতে কেউ প্রবেশ না করে। শুধু কান্নার অবস্থায় প্রবেশ করতে পারবে এমনটি নয়। বরং সর্বাবস্থায় সেখানে প্রবেশ করা থেকে সাবধান থাকতে হবে।
ইমাম খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ঐ বসতিতে প্রবেশ করতে নিষেধের কারণ হলো যদি কেউ আল্লাহর ‘আযাবকে স্মরণ করে কান্না বা ভয়ের অবস্থায় সেখানে প্রবেশ না করে তবে ভূমিকম্প বা আসমানী বালা-মুসীবাত চলে আসতে পারে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২১. প্রথম অনুচ্ছেদ - অত্যাচার
৫১২৬-[৪] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তির কোন মুসলিম ভাইয়ের প্রতি অত্যাচারঘটিত; যেমন- মানহানি বা অন্য কোন বিষয়ের কোন হক থাকে, তবে সে যেন সেদিনের পূর্বেই তার কাছ থেকে ক্ষমা করিয়ে নেয়, যেদিন তার কাছে কোন দীনার বা দিরহাম থাকবে না। যদি তার নেক ’আমল থাকে, তাহলে অত্যাচারিতের হক অনুসারে তার কাছ থেকে নেক ’আমল নিয়ে নেয়া হবে। আর যদি তার নেক না থাকে, তবে অত্যাচারিত ব্যক্তির পাপকে তার ওপর চাপানো হবে। (বুখারী)[1]
بَابُ الظُّلْمِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلِمَةٌ لِأَخِيهِ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ مِنْهُ الْيَوْمَ قَبْلَ أَنْ لَا يَكُونَ دِينَارٌ وَلَا دِرْهَمٌ إِنْ كَانَ لَهُ عَمَلٌ صَالِحٌ أُخِذَ مِنْهُ بِقَدْرِ مَظْلِمَتِهِ وَإِنْ لَمْ يَكُنْ لَهُ حَسَنَاتٌ أُخِذَ مِنْ سَيِّئَاتِ صَاحِبِهِ فَحُمِلَ عَلَيْهِ» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ (إِنْ كَانَ لَهُ عَمَلٌ صَالِحٌ أُخِذَ مِنْهُ) হাদীসের এ অংশে ইবনুল মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ কিয়ামতের দিন যালিমের সৎ ‘আমল থেকে পরিমাণ মতো সাওয়াব কেটে নেয়ার ধরণটা হতে পারে এ রকম যে, সে ‘আমলগুলোকে কোন কিছুর আকৃতি দেয়া, যেমন- স্বর্ণ-রূপা বা মণি-মুক্তা ইত্যাদি। অতঃপর সেটা মাযলূমকে দেয়া অথবা এমনও হতে পারে যে, যালিমের সুখ মাযলূমকে দিয়ে বা মাযলূমের শাস্তি যালিমকে দিয়ে ফায়সালা করা। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২১. প্রথম অনুচ্ছেদ - অত্যাচার
৫১২৭-[৫] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা কি জানো, (প্রকৃত) গরীব কে? সাহাবায়ে কিরাম বললেনঃ আমরা তো মনে করি, আমাদের মধ্যে যার টাকা-পয়সা, ধনদৌলত নেই, সে-ই গরীব। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ কিয়ামতের দিন আমার উম্মাতের মধ্যে ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি গরীব হবে, যে ব্যক্তি দুনিয়া থেকে সালাত, সিয়াম ও যাকাত আদায় করে আসবে; কিন্তু সাথে সাথে সেসব লোকেদেরকেও নিয়ে আসবে যে, সে কাউকে গালি দিয়েছে, কারো অপবাদ রটিয়েছে, কারো সম্পদ খেয়েছে, কাউকে হত্যা করেছে এবং কাউকে প্রহার করেছে; এমন ব্যক্তিদেরকে তার নেকীগুলো দিয়ে দেয়া হবে। অতঃপর যখন তার পুণ্য শেষ হয়ে যাবে অথচ পাওনাদারদের পাওনা তখনো বাকি, তখন পাওনাদারদের গুনাহ তথা পাপ তার ওপর ঢেলে দেয়া হবে, আর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (মুসলিম)[1]
بَابُ الظُّلْمِ
وَعَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «أَتَدْرُونَ مَا الْمُفْلِسُ؟» . قَالُوا: الْمُفْلِسُ فِينَا مَنْ لَا دِرْهَمَ لَهُ وَلَا مَتَاعَ. فَقَالَ: «إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي مَنْ يَأْتِي يَوْم الْقِيَامَة بِصَلَاة وَصِيَام وَزَكَاة وَيَأْتِي وَقَدْ شَتَمَ هَذَا وَقَذَفَ هَذَا. وَأَكَلَ مَالَ هَذَا. وَسَفَكَ دَمَ هَذَا وَضَرَبَ هَذَا فَيُعْطَى هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يَقْضِيَ مَا عَلَيْهِ أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ فَطُرِحَتْ عَلَيْهِ ثُمَّ طُرح فِي النَّار» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ (إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي) উল্লেখিত হাদীসে যে নিঃস্ব বা দেউলিয়া ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে সে হলো প্রকৃত নিঃস্ব বা দেউলিয়া। পক্ষান্তরে যার সম্পদ নেই বা থাকলেও খুব কম লোকেরা তাকে নিঃস্ব বলে কিন্তু প্রকৃত পক্ষ সে নিঃস্ব নয়। কারণ তার এ অবস্থা ক্ষণস্থায়ী। সে কোন সময় ধনবানও হতে পারে যদি তা নাও হতে পারে তবে মৃত্যুর মাধ্যমে তার এ অবস্থা দূর হয়ে যাবে। কিন্তু স্থায়িত্বের দিক থেকে হাদীসে উল্লেখিত ব্যক্তিই হলো প্রকৃত নিঃস্ব। এ প্রসঙ্গে ইমাম মাযিয়ী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ কোন কোন বিদ্‘আতী মনে করে যে, উক্ত হাদীসটি কুরআনের এ আয়াতের সাথে সাংঘর্ষিক। আল্লাহ বলেন,
وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرٰى
অর্থাৎ- ‘‘একজনের পাপ অন্যজন বহন করবে না।’’ (সূরাহ্ আল ফা-ত্বির ৩৫ : ১৮)
কিন্তু এ ধরনের আপত্তি তার অজ্ঞতাপূর্ণ এবং তা প্রত্যাখ্যাত। কারণ হাদীসে উল্লেখিত ব্যবস্থাই হলো যালিমের একমাত্র শাস্তি যা তার জন্য ন্যায্য পাওনা।
(শারহুন নাবাবী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৫৮১/৫৯; তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৪১৮)
পরিচ্ছেদঃ ২১. প্রথম অনুচ্ছেদ - অত্যাচার
৫১২৮-[৬] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন হকদারদের হক আদায় করা হবে, এমনকি যে বকরীর শিং নেই, তার জন্য শিংওয়ালা বকরী থেকে বিনিময় আদায় করে দেয়া হবে। (মুসলিম)[1]
এ প্রসঙ্গে জাবির -এর হাদীস اِتَّقَوُا الظُّلْمَ ’’বাবুল ইনফাক’’-এর (দানের অধ্যায়ে) বর্ণনা করা হয়েছে।
بَابُ الظُّلْمِ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَتُؤَدَّنَّ الْحُقُوقُ إِلَى أَهْلِهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُقَادَ لِلشَّاةِ الْجَلْحَاءِ مِنَ الشَّاةِ الْقَرْنَاءِ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
وَذَكَرَ حَدِيثَ جَابِرٍ: «اتَّقَوُا الظُّلم» . فِي «بَاب الإِنفاق»
ব্যাখ্যাঃ (لَتُؤَدَّنَّ الْحُقُوقُ إِلٰى أَهْلِهَا) এ হাদীস থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, কিয়ামতের দিন চতুষ্পদ জন্তুকেও হাশরের ময়দানে উপস্থিত করা হবে। এ মর্মে কুরআন ও সহীহ হাদীসের আরো দলীল রয়েছে। যেমন- وَإِذَا الْوُحُوشُ حشرت তবে তাদেরকে মানুষ এবং জীন জাতির মতো হিসাবের জন্য বা জবাবদিহিতার জন্য উপস্থিত করা হবে না, বরং বদলা নেয়ার জন্য উপস্থিত করা হবে। তাদের কেউ কাউকে দুনিয়ার জীবনে শিং দ্বারা একটি আঘাত করে থাকলেও সেই আঘাত ফিরিয়ে দেয়ার জন্যই তাদের উঠানো হবে। প্রত্যেকটি প্রাণীর হক সঠিকভাবে আদায় হয়ে যাবে। (শারহুন নাবাবী ১৬শ খন্ড, হাঃ ২৫৮২/৬০; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৪২০)
পরিচ্ছেদঃ ২১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - অত্যাচার
৫১২৯-[৭] হুযায়ফাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা অচৈতন্য হয়ো না যে, তোমরা বলবে, যদি লোকেরা আমাদের সাথে ভালো ব্যবহার করে, আমরাও ভালো ব্যবহার করব; আর জুলুম করলে আমরাও জুলুম করব; বরং তোমরা নিজেদের জন্য এ আদেশ ঠিক করে দেবে যে, যদি লোকেরা তোমাদের সাথে ভালো ব্যবহার করে, তোমরাও ভালো ব্যবহার করবে। আর যদি খারাপ ব্যবহার করে, তবে তোমরা জুলুম করবে না (বদলা নিবে না)। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ حُذَيْفَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَا تَكُونُوا إِمَّعَةً تَقُولُونَ: إِنْ أَحْسَنَ النَّاسُ أَحْسَنَّا وَإِنْ ظَلَمُوا ظَلَمْنَا وَلَكِنْ وَطِّنُوا أَنْفُسَكُمْ إِنْ أَحْسَنَ النَّاسُ أَنْ تُحْسِنُوا وإِن أساؤوا فَلَا تظلموا . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ. وَيصِح وَقفه على ابْن مَسْعُود
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘আবূ হিশাম আর্ রিফাঈ মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াযীদ’’ নামের বর্ণনাকারী য‘ঈফ। জাওয়ামিউল কালিম সফটওয়্যার।
পরিচ্ছেদঃ ২১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - অত্যাচার
৫১৩০-[৮] মু’আবিয়াহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন তিনি ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর নিকট পত্র লেখলেন। ঐ পত্রে লেখা ছিল, আপনি আমাকে উপদেশ দান করে নাতিদীর্ঘ পত্র লেখবেন। ’আয়িশাহ্ (রাঃ) সেটার জবাবে লেখলেন, সালা-মুন ’আলায়কা। পর সমাচার, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে, যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি চায় মানুষের অসন্তুষ্টি সত্ত্বেও, তার সাহায্যের জন্য আল্লাহ তা’আলাই যথেষ্ট। তিনি তাকে মানুষের অত্যাচার থেকে বাঁচান। আর যে ব্যক্তি মানুষের সন্তুষ্টি চায় আল্লাহর অসন্তুষ্টি সত্ত্বেও, আল্লাহ তা’আলা তাকে মানুষের হাতে ছেড়ে দেন, আসসালা-মু ’আলায়কা। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ مُعَاوِيَةَ أَنَّهُ كَتَبَ إِلَى عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا أَنِ اكْتُبِي إِلَيَّ كِتَابًا تُوصِينِي فِيهِ وَلَا تُكْثِرِي. فَكَتَبَتْ: سَلَامٌ عَلَيْكَ أَمَّا بَعْدُ: فَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُول: «من التمَس رضى الله بسخط النَّاس كفاهُ اللَّهُ مؤونة النَّاس وَمن التمس رضى النَّاسِ بِسَخَطِ اللَّهِ وَكَلَهُ اللَّهُ إِلَى النَّاسِ» وَالسَّلَام عَلَيْك. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ (وَكَلَهُ اللهُ إِلَى النَّاسِ) অর্থাৎ- আল্লাহ রববুল ‘আলামীন তাকে মানুষের দিকে মুখাপেক্ষী করে দিবেন। ফলে মানুষ তার ওপর প্রাধান্য বিস্তার করবে এবং তাকে কষ্ট দিবে তার ওপর নির্যাতন চালাবে। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৪১৪)
ইমাম মুযহির (রহিমাহুল্লাহ) এ প্রসঙ্গে বলেছেনঃ কোন ব্যক্তির সামনে যখন এমন কাজ উপস্থিত হয় যা করতে গেলে আল্লাহ খুশি হবেন কিন্তু মানুষ অসন্তুষ্ট হবে অথবা মানুষ সন্তুষ্ট হবে কিন্তু আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন, এ সময় যদি সে প্রথমটা করে তাহলে তার ওপর আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন এবং মানুষের অনিষ্ট হতে তাকে হিফাযাত করবেন। পক্ষান্তরে সে যদি দ্বিতীয়টা করে তাহলে আল্লাহ তার ওপর অসন্তুষ্ট হবেন এবং মানুষের অনিষ্ট হতে তাকে হিফাযাত করবেন না এবং তাকে বিভিন্ন কাজে মানুষের দ্বারে ঘুরাবেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - অত্যাচার
৫১৩১-[৯] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন এ আয়াতটি নাযিল হলো- (الَّذِيْنَ آمَنُوْا وَلَمْ يَلْبِسُوْا إِيْمَانَهُمْ بِظُلْمٍ) অর্থাৎ- ’’সেসব লোক যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের ঈমানে তারা জুলুমকে শামিল করেনি’’- (সূরাহ্ আল আন্’আম ৬ : ৮২)। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীদের কাছে বিষয়টি কঠিন ঠেকল। তাঁরা জিজ্ঞেস করল : হে আল্লাহর রসূল! আমাদের মধ্যে এমন কে আছে, যে নিজের ওপর অত্যাচার করেনি? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ অত্যাচার দ্বারা এ কথা বুঝানো হয়নি; বরং শির্ককে বুঝানো হয়েছে। তোমরা লুকমান (আ.)-এর উপদেশ কি শুনোনি, যা তিনি তাঁর পুত্রকে দান করেছেন? সেটা এই যে, ’’হে বৎস! আল্লাহ তা’আলার সাথে কাউকে শরীক করো না, যেহেতু আল্লাহর সাথে শরীক করা ভয়ঙ্কর অত্যাচার।’’ অপর এক বর্ণনায় আছে, তিনি বলেছেনঃ তোমরা যা মনে করছ প্রকৃতপক্ষ তা নয়। অত্যাচার (জুলুম) দ্বারা এ কথাই বুঝানো হয়েছে, যা লুকমান (আ.) তার পুত্রকে বলেছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
عَن ابْن مَسْعُود قَالَ: لَمَّا نَزَلَتْ: (الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمانهم بظُلْم)
شَقَّ ذَلِكَ عَلَى أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَالُوا: يَا رَسُول اله: أَيُّنَا لَمْ يَظْلِمْ نَفْسِهِ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَيْسَ ذَاكَ إِنَّمَا هُوَ الشِّرْكُ أَلَمْ تَسْمَعُوا قَوْلَ لُقْمَانَ لِابْنِهِ: (يَا بني لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ؟)
فِي رِوَايَةٍ: «لَيْسَ هُوَ كَمَا تَظُنُّونَ إِنَّمَا هُوَ كَمَا قَالَ لُقْمَان لِابْنِهِ» . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ لَمَّا نَزَلَتْ: الَّذِيْنَ آمَنُوْا وَلَمْ يَلْبِسُوْا إِيْمَانَهُمْ بِظُلْمٍ উল্লেখিত হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ সাহাবীগণ সন্দেহে পতিত হওয়ার কারণ হলো সাধারণত জুলুমের বাহ্যিক অবস্থা হচ্ছে এ রকম যে, কারো হক নষ্ট করা বা কারো সাথে কোনরূপ অন্যায় আচরণ করা। সাহাবীরা তো কেউ কাবীরাহ্ গুনাহ করে নিজের প্রতি অবিচার করতেন না তাহলে ঈমানের সাথে জুলুমের মিশ্রণের অর্থটা কি? তারা ধারণা করলেন উদ্দেশ্য হতে পারে জুলুমের বাহ্যিক অবস্থা। কারণ দৈনন্দিন জীবনে উঠতে বসতে কত রকমই না ছোট-খাট জুলুম হয়ে থাকে। যেহেতু জুলুমের সংজ্ঞাই হলো কোন জিনিসকে তার সঠিক স্থানে না রেখে অন্য স্থানে রাখা। সেহেতু এই সংজ্ঞা অনুযায়ী প্রতিদিনই কোন না কোন জুলুম হয়। তাই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের এ সন্দেহ দূর করে দিয়ে বললেন, এ জুলুম হচ্ছে আল্লাহর সাথে কাউকে শির্ক করা। আর এটিই হলো সবচেয়ে বড় জুলুম। (শারহুন নাবাবী ২য় খন্ড, হাঃ ১২৭/১৯৭)
পরিচ্ছেদঃ ২১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - অত্যাচার
৫১৩২-[১০] আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন মর্যাদার দিক থেকে সে ব্যক্তি নিকৃষ্ট হবে, যে নিজের পরকালকে পার্থিব স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশে ধ্বংস করেছে। (ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ أَبِي
أُمَامَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم قَالَ: «مِنْ شَرِّ النَّاسِ مَنْزِلَةً عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَبْدٌ أَذْهَبَ آخِرَتَهُ بِدُنْيَا غَيْرِهِ» . رَوَاهُ ابْن مَاجَه
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘শাহর ইবনু হাওশাব’’ নামের বর্ণনাকারী য‘ঈফ। আর ‘আবদুল হাকাম আস্ সাদূসী নামের বর্ণনাকারী অপরিচিত। দেখুন- য‘ঈফাহ্ ১৯১৫ ।
ব্যাখ্যাঃ (أَذْهَبَ آخِرَتَهٗ بِدُنْيَا غَيْرِه) উক্ত হাদীসাংশের ব্যাখ্যায় ‘আবদুল বাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এখানে দু’টো অর্থের সম্ভাবনা রয়েছে। ১. তুচ্ছ জিনিসের লোভে কাউকে হত্যা করে আখিরাত বরবাদ করা। ২. অথবা অত্যাচারীকে নগণ্য বস্তু ছিনিয়ে নিতে সাহায্য করে আখিরাত নষ্ট করা। (ইবনু মাজাহ ৩য় খন্ড, হাঃ ৩৯৬৬)
পরিচ্ছেদঃ ২১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - অত্যাচার
৫১৩৩-[১১] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ’আমলনামা তিন প্রকার- ১. ঐ ’আমলনামা, যাকে আল্লাহ তা’আলা ক্ষমা করবেন না। আর তা হলো, আল্লাহ তা’আলার সাথে শরীক করা। আল্লাহ মহীয়ান-গরীয়ান বলেন- (إِنَّ اللهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِه) অর্থাৎ- ’’অংশীবাদীদেরকে আল্লাহ তা’আলা ক্ষমা করবেন না’’, ২. ঐ ’আমলনামা, যাতে মানুষের পারস্পরিক জুলুম-অত্যাচার লিপিবদ্ধ আছে। সে ’আমলনামাকে আল্লাহ তা’আলা এমনিতেই ছাড়বেন না। এমনকি একজনের কাছ থেকে অপরজনের প্রতিশোধ নেবেন এবং ৩. ঐ ’আমলনামা, যার প্রতি আল্লাহ তা’আলা ভ্রূক্ষেপ করবেন না। এ ’আমলনামা হলো বান্দা ও আল্লাহ তা’আলার মধ্যকার জুলুম সংক্রান্ত বিষয়। এটা আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। যদি তিনি ইচ্ছে করেন, তাকে শাস্তি দেবেন। আর যদি ইচ্ছে করেন, তাকে ক্ষমা করে দেবেন।[1]
وَعَنْ
عَائِشَةَ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: الدَّوَاوِينُ ثَلَاثَةٌ: دِيوَانٌ لَا يَغْفِرُهُ اللَّهُ: الْإِشْرَاكُ بِاللَّهِ. يَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ (إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ)
وَدِيوَانٌ لَا يَتْرُكُهُ اللَّهُ: ظُلْمُ الْعِبَادِ فِيمَا بَيْنَهُمْ حَتَّى يَقْتَصَّ بَعْضُهُمْ مِنْ بَعْضٍ وَدِيوَانٌ لَا يَعْبَأُ اللَّهُ بِهِ ظُلْمُ الْعِبَادِ فِيمَا بينَهم وبينَ الله فَذَاك إِلَى اللَّهِ فَذَاكَ إِلَى اللَّهِ: إِنْ شَاءَ عَذَّبَهُ وَإِن شَاءَ تجَاوز عَنهُ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘সাদাকা’’ নামের বর্ণনাকারী য‘ঈফ। আর ইয়াযীদ ইবনু বাবানুস (يَزِيدَ بْنِ بَابَنُوسَ) নামের বর্ণনাকারীর মাঝে অপরিচিত আছে। দেখুন- আল মুসতাদরাক ৮৭১৭।
পরিচ্ছেদঃ ২১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - অত্যাচার
৫১৩৪-[১২] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তুমি অত্যাচারিতের বদদু’আ থেকে নিজেকে রক্ষা করো। কেননা সে আল্লাহ তা’আলার কাছে নিজের অধিকার প্রার্থনা করে। আল্লাহ তা’আলা কোন হকদারকে নিজের পাওনা থেকে বঞ্চিত করেন না।[1]
وَعَنْ عَلِيٍّ
قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِيَّاكَ وَدَعْوَةَ الْمَظْلُومِ فَإِنَّمَا يَسْأَلُ اللَّهَ تَعَالَى حَقَّهُ وَإِنَّ اللَّهَ لَا يَمْنَعُ ذَا حق حَقه»
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘সলিহ ইবনু হাসান’’ নামের বর্ণনাকারী মাতরূক। দেখুন- য‘ঈফাহ্ ১৬৯৭।
পরিচ্ছেদঃ ২১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - অত্যাচার
৫১৩৫-[১৩] আওস ইবনু শুরাহবীল (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি অত্যাচারীর সাথে এ উদ্দেশে চলে যে, সে তার শক্তি বৃদ্ধি করবে; আর সে এটা জানে যে, সে জুলুমকারী, তবে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে গেল।[1]
وَعَن أوْسِ
بن شَرحبيل أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَنْ مَشَى مَعَ ظَالِمٍ لِيُقَوِّيَهُ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ ظَالِمٌ فَقَدْ خَرَجَ مِنَ الْإِسْلَام»
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘আমর ইবনু ইসপদক’’ নামের বর্ণনাকারী অপরিচিত। আর আবূ ইসপদক ইবনু ইবরাহীম ইবনু যাবরীক নামের বর্ণনাকারী খুবই দুর্বল। দেখুন- য‘ঈফাহ্ ৭৫৮।
পরিচ্ছেদঃ ২১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - অত্যাচার
৫১৩৬-[১৪] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি জনৈক ব্যক্তিকে বলতে শুনেছেন, অত্যাচারী মূলত কারো কোন ক্ষতি সাধন করতে পারে না; বরং নিজেই নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আবূ হুরায়রা(রাঃ) এটা শুনে বললেনঃ হ্যাঁ, আল্লাহর কসম! এরূপই। এমনকি ’’সবারা’’ (সারস পাখি)-ও অত্যাচারীর অত্যাচারের কারণে নিজের বাসায় থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে, পরিশেষে মৃত্যুবরণ করে।
[ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) ’’শু’আবুল ঈমানে’’ উপরিউক্ত চারটি হাদীস বর্ণনা করেছেন।][1]
وَعَنْ أَبِي
هُرَيْرَةَ أَنَّهُ سَمِعَ رَجُلًا يَقُولُ: إِنَّ الظَّالِمَ لَا يَضُرُّ إِلَّا نَفْسَهُ فَقَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ: بَلَى وَاللَّهِ حَتَّى الْحُبَارَى لَتَمُوتُ فِي وَكْرِهَا هُزْلًا لِظُلْمِ الظَّالِمِ. رَوَى الْبَيْهَقِيُّ الْأَحَادِيثَ الْأَرْبَعَةَ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ»
আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আমি এর সানাদ পাইনি তবে ইন্টারনেটের মাধ্যমে আমরা জেনেছি যে, হাদীসটি য‘ঈফ। ইবনু হাজার (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ তার সনদে মুহাম্মাদ ইবনু জাবির আল ইয়ামানী নামের বর্ণনাকারী মাতরূক। দেখুন- তাফসীর ত্ববারী ১৪/৮৫ পৃঃ।
পরিচ্ছেদঃ ২২. প্রথম অনুচ্ছেদ - ভালো কাজের আদেশ
৫১৩৭-[১] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোন শারী’আত বিরোধী কার্যকলাপ হতে দেখে, সেটাকে যেন নিজ হাতে পরিবর্তন করে দেয়। যদি নিজ হাতে সেগুলো পরিবর্তন করার ক্ষমতা না থাকে, তাহলে মুখে নিষেধ করবে। আর যদি মুখে নিষেধ করারও সাধ্য না থাকে, তাহলে অন্তরে সেটা ঘৃণা করবে। এটা সবচেয়ে দুর্বল ঈমানের পরিচায়ক। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْأَمْرِ بِالْمَعْرُوْفِ
عَن أبي سعيدٍ الخدريِّ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فبقلبه وَذَلِكَ أَضْعَف الْإِيمَان» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ أَوَّلُ مَنْ بَدَأَ بِالْخُطْبَةِ يَوْمَ الْعِيد কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ ব্যাপারে মতানৈক্য আছে। তবে হাদীসে যার নাম আছে আমিও সেটাই মনে করি। কেউ বলেছেন, ‘উসমান (রাঃ), আবার বলা হয়েছে, ‘উমার ইবনুল খত্ত্বাব (রাঃ) শুরু করেছিলেন। তিনি যখন খেয়াল করলেন সালাতের পরে মুসল্লীরা অপেক্ষা করে না তাড়াহুড়া করে চলে যান তখন তিনি সালাতের আগে খুত্ববার ব্যবস্থা করলেন। কেউ বলেছেন, মু‘আবিয়াহ্ (রাঃ); আরাব কেউ বলেছেন, ইবনুয্ যুবায়র (রাঃ)।
কিন্তু রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চার খলীফা এবং সকল আনসারী ফকীহ সাহাবী, তাবি‘ঈ তারা সবাই আগে সালাত আদায় করেছেন ও পরে খুত্ববাহ্ দিয়েছেন, এটাই সাব্যস্ত হয়েছে।
মারওয়ান-এর আগে কেউ করেছেন, এ মর্মে কোন দলীল সাব্যস্ত হয়নি। কাজেই ‘উমার, ‘উসমান এবং মু‘আবিয়াহ্ সম্পর্কে ধারণা সঠিক নয়। (শারহুন নাবাবী ২য় খন্ড, হাঃ ৪৯/৭৮)
(وَذٰلِكَ أَضْعَف الْإِيمَان) ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ মর্যাদা এবং সাওয়াবের দিক থেকে এর পরিমাণ কম। ইমাম মানবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ أَضْعَف الْإِيمَان অর্থ হলো أَضْعَف خصال الْإِيمَان তথা দুর্বল বৈশিষ্ট্যের ঈমান। ঈমান দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ইসলাম বা তার প্রভাব অথবা তার ফলাফল।
কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ ধরনের লোক হলো দুর্বল ঈমানদার, কেননা যদি সে শক্তিশালী (তেজোদীপ্ত) ঈমানের লোক হত তাহলে এটুকুতেই থেমে যেত না। কারণ হাদীসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, أَفْضَلُ الْجِهَادِ كَلِمَةُ حَقٍّ عِنْدَ سُلْطَانٍ جَائِرٍ ‘‘সর্বোত্তম জিহাদ হলো অত্যাচারী শাসকের নিকট সত্য কথা বলা।’’
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) শারহু মুসলিমে বলেনঃ ভালো কাজের আদেশ করা আর মন্দ কাজের নিষেধ করার হুকুম হলো ফরযে কিফায়াহ্। কেউ করলে বাকীদের পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যায়। আর কেউ না করলে সবাই গুনাহগার হয়। পক্ষান্তরে ‘উলামাগণ বলেছেন, ঐ ব্যক্তির ওপর থেকে সৎকাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধের দায়িত্ব রহিত হবে না যার ওপর শারী‘আতের বিধান অর্পিত হয়েছে। এটা তার জন্য অত্যাবশ্যক। অন্যথায় সে গুনাহগার হবে। (‘আওনূল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪৩৩২; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২১৭২)
(فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِه...) এ প্রসঙ্গে কতিপয় ‘উলামা মতামত ব্যক্ত করেছেন যে, উল্লেখিত হাদীসের তিনটি আদেশ তিন শ্রেণীর ব্যক্তিদের জন্য। প্রথম আদেশ আমীরের জন্য। দ্বিতীয় আদেশ ‘আলিমদের জন্য এবং তৃতীয় আদেশ সাধারণ সকল মুসলিমদের জন্য। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২২. প্রথম অনুচ্ছেদ - ভালো কাজের আদেশ
৫১৩৮-[২] নু’মান ইবনু বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তি প্রদানের বিষয়ে অলসতা করাকে ঐ সম্প্রদায়ের সাথে তুলনা করা যায়, যারা নৌকায় স্থান পাওয়ার জন্য লটারি করেছে এবং লটারি অনুসারে তাদের কেউ নৌকার নিচে এবং কেউ উপরে বসেছে। নৌকার নিচের লোকেরা উপরের লোকেদের পাশ দিয়ে পানির জন্য গমনাগমন করত, ফলে উপরের লোকেদের কষ্ট হত। একদিন নিচের লোকেদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি কুঠার হাতে নিয়ে নৌকার তলায় কাঠ কোপাতে আরম্ভ করল। তখন উপরের লোকেরা তার কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, সর্বনাশ! তুমি কি করছ? লোকটি বলল, তোমরা আমাদের কারণে কষ্ট পাচ্ছ। আর আমাদেরও পানি একান্ত প্রয়োজন। এমতাবস্থায় যদি তারা তার হস্তদ্বয় ধরে ফেলে, তাহলে তাকেও রক্ষা করবে, নিজেরাও রক্ষা পাবে। আর যদি তাকে তার কাজের উপরই ছেড়ে দেয়, তাহলে তাকেও ধ্বংস করবে, নিজেদেরকেও ধ্বংস করবে। (বুখারী)[1]
بَابُ الْأَمْرِ بِالْمَعْرُوْفِ
وَعَنِ النُّعْمَانِ بْنِ بَشِيرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: مثلُ المدهنِ فِي حُدُودِ اللَّهِ وَالْوَاقِعِ فِيهَا مَثَلُ قَوْمٍ استهمواسفينة فَصَارَ بَعْضُهُمْ فِي أَسْفَلِهَا وَصَارَ بَعْضُهُمْ فِي أَعْلَاهَا فَكَانَ الَّذِي فِي أَسْفَلِهَا يَمُرُّ بِالْمَاءِ عَلَى الَّذِينَ فِي أَعْلَاهَا فَتَأَذَّوْا بِهِ فَأَخَذَ فَأْسًا فَجَعَلَ يَنْقُرُ أَسْفَلَ السَّفِينَةِ فَأَتَوْهُ فَقَالُوا: مَالك؟ قَالَ: تَأَذَّيْتُمْ بِي وَلَا بُدَّ لِي مِنَ الْمَاءِ. فَإِنْ أَخَذُوا عَلَى يَدَيْهِ أَنْجَوْهُ وَنَجَّوْا أَنْفُسَهُمْ وَإِنْ تَرَكُوهُ أَهْلَكُوهُ وَأَهْلَكُوا أَنْفُسَهُمْ . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ (الْمُدْهِنِ) শব্দের ব্যাখ্যা হলো ঐ ব্যক্তি যার সামনে অন্যায় কাজ করা হয় কিন্তু সে তা প্রতিহত করে না। বরং দর্শকের ভূমিকা পালন করে নিশ্চুপ থাকে।
(ফাতহুল বারী ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬৮৬; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২১৭৩)
হাদীসে الْمُدْهِنِ শব্দটিকে উল্লেখ করা হয়েছে এ কারণে যে, সে প্রতিবাদ করার শক্তি ও ক্ষমতা থাকার পরও নীরব মনোভাব এবং দর্শক ভূমিকা পালন করে, ফলে সমাজে বড় ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনা রাখে। তাই বিশেষ গুরুত্ব প্রদানের জন্য উক্ত শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।
(حُدُودِ اللهِ) এখানে حُدُودِ দ্বারা বিভিন্ন অশ্লীল ও গর্হিত কাজ উদ্দেশ্য হতে পারে। তাই حُدُودِ শব্দটিকে অধিক গুরুত্ব বুঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে। অথবা প্রত্যেকটি পাপের একটি নির্দিষ্ট ও জ্ঞাত সীমা রয়েছে এটা বুঝানোর জন্য। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২২. প্রথম অনুচ্ছেদ - ভালো কাজের আদেশ
৫১৩৯-[৩] উসামাহ্ ইবনু যায়দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন একজন লোককে উপস্থিত করা হবে এবং তাকে আগুনে নিক্ষেপ করা হবে, সাথে সাথেই তার পেট থেকে নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে পড়বে। সে নাড়িভুঁড়িকে কেন্দ্র করে এমনভাবে ঘুরতে থাকবে, যেভাবে আটার চাক্কিকে কেন্দ্র করে গাধা ঘুরতে থাকে। এটা দেখে জাহান্নামবাসীরা তার পাশে জমায়েত হয়ে তাকে বলবে : হে অমুক! তোমার ব্যাপার কি? তুমি না আমাদেরকে সৎ কাজের আদেশ করতে এবং অসৎ কাজে নিষেধ করতে? লোকটি বলবে, আমি তোমাদেরকে সৎ কাজের জন্য আদেশ করতাম; কিন্তু নিজে সেটা করতাম না। আর তোমাদেরকে অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করতাম; কিন্তু নিজে সেটা থেকে বিরত থাকতাম না। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْأَمْرِ بِالْمَعْرُوْفِ
وَعَنْ أُسَامَةَ بْنِ زَيْدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يُجَاءُ بِالرَّجُلِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيُلْقَى فِي النَّارِ فَتَنْدَلِقُ أَقْتَابُهُ فِي النَّارِ فَيَطْحَنُ فِيهَا كَطَحْنِ الْحِمَارِ بِرَحَاهُ فَيَجْتَمِعُ أَهْلُ النَّارِ عَلَيْهِ فَيَقُولُونَ: أَيْ فُلَانُ مَا شَأْنُكَ؟ أَلَيْسَ كُنْتَ تَأْمُرُنَا بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَانَا عَنِ الْمُنْكَرِ؟ قَالَ: كُنْتُ آمُرُكُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَلَا آتِيهِ وَأَنْهَاكُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَآتِيهِ . مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ (فَتَنْدَلِقُ أَقْتَابُ بَطْنِه) আবূ ‘উবায়দ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ أَقْتَابُ অর্থ হলো পেটের নাড়িভুঁড়ি।
ইবনু ‘উওয়াইনাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, أَقْتَابُ হলো ঐ জিনিস যা পেটের মধ্যে বৃত্তাকার হয়ে পেঁচানো রয়েছে। (শারহুন নাবাবী ১৮শ খন্ড, হাঃ ২৯৮৯/৫১)
(فَيَطْحَنُ فِيهَا كَطَحْنِ الْحِمَارِ بِرَحَاهُ) এ প্রসঙ্গে ইমাম মুযহির (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ঐ লোক তার নাড়িভুঁড়ির চারপাশে বৃত্তাকারে হয়ে ঘুরতে থাকবে এবং পা দিয়ে তাতে আঘাত করতে থাকবে। তবে এখানে অর্থ নেয়া যেতে পারে যে, সে জাহান্নামে ভুঁড়ি নিয়ে সর্বত্র ঘুরতে থাকবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ভালো কাজের আদেশ
৫১৪০-[৪] হুযায়ফাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ঐ পবিত্র সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ, নিম্নোক্ত দু’টো বিষয়ের মধ্যে একটি অবশ্যই হবে। হয় অবশ্যই তুমি সৎকাজের আদেশ দান করবে এবং মন্দকাজ হতে নিষেধ করবে; নতুবা অনতিবিলম্বে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের ওপর ’আযাব নাযিল করবেন। অতঃপর তোমরা তাঁর কাছে প্রার্থনা করবে; কিন্তু তোমাদের প্রার্থনা গ্রহণ করা হবে না। (তিরমিযী)[1]
عَنْ حُذَيْفَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَتَأْمُرُنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلَتَنْهَوُنَّ عَنِ الْمُنْكَرِ أَوْ لَيُوشِكَنَّ اللَّهُ أَنْ يَبْعَثَ عَلَيْكُمْ عَذَابًا مِنْ عِنْدِهِ ثُمَّ لَتَدْعُنَّهُ وَلَا يُسْتَجَاب لكم» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ (لَتَأْمُرُنَّ بِالْمَعْرُوفِ) এখানে ইমাম আল জাযারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ الْمَعْرُوفِ হলো এমন এক পরিপূর্ণ অর্থ প্রদানকারী ইস্ম বা নাম যার দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্য এবং নৈকট্য লাভের উপায় মানুষের সাথে সদাচরণসহ শারী‘আতের প্রত্যেকটি হালাল-হারাম বিধান যথাযথভাবে উপলব্ধি করা যায়। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২১৬৯)
(وَلَا يُسْتَجَاب لكم) হাদীসের এ অংশের উদ্দেশ্যমূলক অর্থ হচ্ছে, আমাদের পক্ষ থেকে সৎকাজের আদেশ বা মন্দ কাজের নিষেধ উভয়টি একত্রে বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় আল্লাহর পক্ষ হতে ‘আযাব নেমে আসবে। তখন ঐ ‘আযাব থেকে বাঁচার জন্য দু‘আ করা হলে তা তখন আর কবুল করা হবে না।
অন্য আরেকটি হাদীসে এসেছে, قبل أن يدعوا এখানে ‘আবদুল বাক্বী‘ (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ এর অর্থ হলো মানুষকে সৎ কাজের আদেশ আর মন্দ কাজের নিষেধের মাধ্যমে হিদায়াতের দিকে আহবান করা হলে তারা এই আহবান মোটেই সাড়া দেবে না। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২১৬৯; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ভালো কাজের আদেশ
৫১৪১-[৫] ’উরস ইবনু ’আমীরাহ্ (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ পৃথিবীর বুকে যখন কোন গুনাহ করা হয়, তখন যে ব্যক্তি সেটাকে মনে মনে খারাপ জানবে, সে ঐ স্থানে উপস্থিত থাকলে, তাকে ঐ ব্যক্তির ন্যায় মনে করা হবে, যে ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত নেই। আর যে ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত নেই কিন্তু সেসব খারাপ কাজকে মনে মনে ভালোবাসে, সে ঐ ব্যক্তির মতোই হবে, যে সেখানে উপস্থিত আছে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن الْعرس بن عَمِيرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِذَا عُمِلَتِ الْخَطِيئَةُ فِي الْأَرْضِ مَنْ شَهِدَهَا فَكَرِهَهَا كَانَ كَمَنْ غَابَ عَنْهَا وَمَنْ غَابَ عَنْهَا فَرَضِيَهَا كَانَ كَمَنْ شَهِدَهَا» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
পরিচ্ছেদঃ ২২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ভালো কাজের আদেশ
৫১৪২-[৬] আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি সমবেত লোকেদের উদ্দেশে বলেন, হে জনগণ! তোমরা নিশ্চয় এ আয়াতটি পাঠ করেছ, (অর্থাৎ-) ’’হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ওপর এ কথা আবশ্যিক করে নাও, যে পথভ্রষ্ট হয়েছে, সে তোমাদের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা হিদায়াতের উপর স্থির থাকবে’’। এ সম্পর্কে আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, মানুষ যখন কোন খারাপ কাজ হতে দেখে, সেটাকে পরিবর্তন করে না, অনতিবিলম্বেই আল্লাহ তা’আলা তাদের ওপর তাঁর ’আযাব নাযিল করবেন। [ইবনু মাজাহ ও তিরমিযী;[1] আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) হাদীসটি সহীহ বলে বর্ণনা করেছেন।]
আর আবূ দাঊদ (রহিমাহুল্লাহ)-এর এক বর্ণনায় আছে যে, মানুষ যখন কোন অত্যাচারীকে অত্যাচার করতে দেখেও তার হাত ধরে না ফেলে, অনতিবিলম্বেই আল্লাহ তা’আলা তাকে শাস্তি প্রদান করবেন। ইমাম আবূ দাঊদ-এর অপর এক বর্ণনায় আছে যে, যে জাতির মধ্যে পাপাচার হয়, আর সে জাতির পরিবর্তন ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সেটার পরিবর্তন না করে, তাহলে অনতিবিলম্বে আল্লাহ তা’আলা তাকে শাস্তি প্রদান করবেন। তাঁর অপর এক বর্ণনায় আছে যে, যে জাতি পাপাচারে লিপ্ত হয়, আর পাপে লিপ্তদের তুলনায় সাধারণ লোক সংখ্যায় বেশি হয়।
وَعَنْ أَبِي بَكْرٍ الصِّدِّيقِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنكم تقرؤونَ هذهِ الْآيَة: (يَا أيُّها الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُمْ مَنْ ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ)
فَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «إِنَّ النَّاسَ إِذَا رَأَوْا مُنْكَرًا فَلَمْ يُغَيِّرُوهُ يُوشِكُ أَنْ يَعُمَّهُمُ اللَّهُ بِعِقَابِهِ» . رَوَاهُ ابْنُ مَاجَهْ وَالتِّرْمِذِيُّ وَصَحَّحَهُ. وَفِي رِوَايَةِ أبي دَاوُد: «إِذا رَأَوْا الظَّالِم فَم يَأْخُذُوا عَلَى يَدَيْهِ أَوْشَكَ أَنْ يَعُمَّهُمُ اللَّهُ بِعِقَابٍ» . وَفِي أُخْرَى لَهُ: «مَا مِنْ قَوْمٍ يُعْمَلُ فِيهِمْ بِالْمَعَاصِي ثُمَّ يَقْدِرُونَ عَلَى أَنْ يُغَيِّرُوا ثُمَّ لَا يُغَيِّرُونَ إِلَّا يُوشِكُ أَنْ يَعُمَّهُمُ اللَّهُ بِعِقَابٍ» . وَفِي أُخْرَى لَهُ: «مَا مِنْ قَوْمٍ يُعْمَلُ فِيهِمْ بِالْمَعَاصِي هُمْ أَكْثَرُ مِمَّن يعمله»
ব্যাখ্যাঃ يٰاَيُّها الَّذِينَ اٰمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُمْ مَنْ ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ হাদীসে উল্লেখিত এই আয়াত (সূরাহ্ আল মায়িদাহ্ ৫ : ১০৫) কাদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে তা নিয়ে অনেক মতানৈক্য রয়েছে। প্রখ্যাত তাবি‘ঈ মুজাহিদ এবং সা‘ঈদ ইবনু জুবায়র (রহিমাহুমাল্লাহ) বলেন, এ আয়াতটি ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। এর অর্থ হলো:
عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُمْ مَنْ ضَلَّ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ، فَخُذُوا مِنْهُمُ الْجِزْيَةَ وَاتْرُكُوهُمْ
অর্থাৎ- তোমাদের ওপর আবশ্যক হলো তোমরা নিজেদেরকে অন্যায় থেকে সংরক্ষণ করবে তাহলে কিতাবধারীদের মধ্যে যারা গুমরাহ হয়েছে তারা তোমাদের কোনরূপ ক্ষতি করতে পারবে না। আর তোমরা তাদের থেকে খাজনা গ্রহণ করে তাদের থেকে দূরে থাক।
উল্লেখিত হাদীসের ব্যাখ্যায় আবূ ‘উবায়দ (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) এ কথা ভেবে ভয় পেয়ে গেলেন যে, লোকেরা হয়তবা আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করতে পারে। তারপর মানুষদেরকে সৎকাজের আদেশ দেয়া থেকে নিষেধ করতে পারে। তাই তিনি তাদেরকে জানিয়ে দিলেন যে, বিষয়টি প্রকৃতপক্ষ এমন নয় বরং এখানে উদ্দেশ্য হলো বিধর্মীদের মধ্যে যারা মুসলিম অঞ্চলের মুয়াহাদ তথা চুক্তিবদ্ধ তাদেরকে তাদের শির্কী কর্মকাণ্ড থেকে বাধা প্রদান না করার ব্যাপারে অনুমতি দেয়া হয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২১৬৮)
পরিচ্ছেদঃ ২২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ভালো কাজের আদেশ
৫১৪৩-[৭] জারীর ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে জাতিতে কোন লোক পাপে লিপ্ত থাকে, আর ঐ ব্যক্তিকে পাপ থেকে ফেরাতে জাতির লোকেদের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও না ফেরায়, তাহলে তাদের মৃত্যুর পূর্বেই আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করবেন। (আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَن جَرِير بن عبد الله قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَا مِنْ رَجُلٍ يَكُونُ فِي قَوْمٍ يَعْمَلُ فِيهِمْ بِالْمَعَاصِي يَقْدِرُونَ عَلَى أَنْ يُغَيِّروا عَلَيْهِ وَلَا يُغَيِّرُونَ إِلَّا أَصَابَهُمُ اللَّهُ مِنْهُ بِعِقَابٍ قبل أَن يموتو» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যাঃ (عَلٰى أَنْ يُغَيِّروا عَلَيْهِ وَلَا يُغَيِّرُونَ) এখানে হাত বা মুখ দ্বারা বাধা প্রদানের কথা বলা হয়েছে। এ কাজ করার জন্য তার ওপর একটি শর্ত রয়েছে তা হলো সে নিজে এমন গর্হিত কাজ থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত থাকবে। এক্ষেত্রে তার ওপর দু’টো বিষয় করণীয় : ১. সে নিজেকে সৎকাজের আদেশ দিবে এবং মন্দ থেকে বারণ করবে। ২. অন্যকে সৎ কাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজ থেকে বারণ করবে। তাকে আরো একটি বিষয় মেনে চলতে হবে সেটা হলো সে সকলের সাথে কোমল ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করবে। তবেই তার দা‘ওয়াতী কাজে সফল আসবে।
এ প্রসঙ্গে ইমাম শাফি‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ যে ব্যক্তি গোপনে তার কোন ভাইকে নাসীহাত করল সে যেন তাকে দোষমুক্ত আর পরিপাটি করল, আর যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে তার কোন ভাইকে নাসীহাত করল সে যেন তাকে অসম্মান আর দোষী সাব্যস্ত করল। সুতরাং প্রকাশ্যে কোন ভাইকে নাসীহাত করার চাইতে লোক আড়ালে একান্তে নাসীহাত করাই ভালো। তবে বৃহৎ উপকার লাভে জনসম্মুখে নাসীহাত করা বৈধ আছে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪৩৩১)
পরিচ্ছেদঃ ২২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ভালো কাজের আদেশ
৫১৪৪-[৮] আবূ সা’লাবাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি আল্লাহ তা’আলার এ বাণী- عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُمْ مَنْ ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ সম্পর্কে বলেনঃ আল্লাহর কসম! আমি এ আয়াত সম্বন্ধে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করেছি (অর্থাৎ- এ আয়াত অনুযায়ী সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ করা থেকে বিরত থাকব কি-না)। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ’’না’’; বরং ঐ পর্যন্ত চালু রাখো, যখন তোমরা দেখবে, কৃপণের অনুসরণ করা হয়, প্রবৃত্তির পূজা করা হয়, ইহকালকে পরকালের উপর প্রাধান্য দেয়া হয় এবং প্রত্যেক জ্ঞানী ব্যক্তি নিজের মতকে পছন্দনীয় বলে মনে করে। তুমি এমন কাজ দেখবে, যা থেকে তুমি এড়িয়ে চলতে পারবে না। তখন তুমি নিজেকেই নিজে রক্ষা করো এবং জনগণকে তাদের অবস্থার উপর ছেড়ে দাও। কারণ তোমাদের ভবিষ্যৎযুগ এমন হবে, তোমাকে শুধু ধৈর্যধারণ করতে হবে এবং এমতাবস্থায় যে ব্যক্তি ধৈর্যধারণ করবে, তার অবস্থা এরূপ হবে, যেন সে নিজের হাতে নিজে অঙ্গার উঠিয়ে নিয়েছে। সে সময় যে ব্যক্তি ধর্মের কাজে ’আমল করবে, সে পঞ্চাশজন লোকের ’আমল করার সাওয়াব পাবে। জনৈক সাহাবী জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রসূল! সে যামানারই পঞ্চাশজন লোকের ’আমলে সাওয়াবের সমান হবে? রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ না, তোমাদের যামানার পঞ্চাশজনের ’আমলের সাওয়াবের সমান হবে। (তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ)[1]
ولبعض فقره شَوَاهِد)
وَعَن أبي ثعلبةَ فِي قَوْلُهُ تَعَالَى: (عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُمْ مَنْ ضل إِذا اهْتَدَيْتُمْ)
فَقَالَ: أَمَا وَاللَّهِ لَقَدْ سَأَلْتُ عَنْهَا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: بَلِ ائْتَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَتَنَاهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ حَتَّى إِذَا رأيتَ شُحّاً مُطاعاً وَهوى مُتَّبَعاً ودينا مُؤْثَرَةً وَإِعْجَابَ كُلِّ ذِي رَأْيٍ بِرَأْيِهِ وَرَأَيْتَ أَمْرًا لَا بُدَّ لَكَ مِنْهُ فَعَلَيْكَ نَفْسَكَ وَدَعْ أَمْرَ الْعَوَامِّ فَإِنَّ وَرَاءَكُمْ أَيَّامَ الصَّبْرِ فَمَنْ صَبَرَ فِيهِنَّ قَبَضَ عَلَى الْجَمْرِ لِلْعَامِلِ فِيهِنَّ أَجْرُ خَمْسِينَ مِنْهُمْ؟ قَالَ: «أَجْرُ خَمْسِينَ مِنْكُمْ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যাঃ (عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ) উল্লেখিত আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় ইমাম বায়যাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আয়াতাংশের অর্থ হলো তোমরা নিজেরদেরকে বিপদাপদ ও অন্যায় অশ্লীলতা থেকে হিফাযাত কর এবং কৃত অন্যায় অপরাধ থেকে সংশোধন কর।
(بَلِ ائْتَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَتَنَاهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ) বর্ণিত হাদীসাংশের অর্থ হলো তোমরা একে অন্যকে সৎকাজের আদেশ কর আর এক দল অন্যদলকে মন্দ কাজে থেকে নিষেধ কর।
ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ তোমরা এ দু’টো বিষয়কে (সৎকাজের আদেশ আর মন্দ কাজের নিষেধ) পরিপূর্ণরূপে উত্তম পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন কর। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ভালো কাজের আদেশ
৫১৪৫-[৯] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’আসরের সালাতের পর আমাদের মাঝে দাঁড়ালেন। কিয়ামত পর্যন্ত যেসব ঘটনা ঘটবে, সেগুলো বর্ণনা করলেন। সেসব কথা যে স্মরণ রাখল তো রাখল, আর যে ভুলে গেল তো ভুলে গেল। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যা কিছু বললেন, এতে এ কথাও ছিল যে, দুনিয়াটা একটা মিষ্টি ও সুস্বাদু বস্তু। আল্লাহ তা’আলা এতে তোমাদেরকে তাঁর প্রতিনিধি বানিয়ে দিলেন। তারপর দেখবেন, তোমরা কিভাবে ’আমল করো। সাবধান! দুনিয়ার মোহ থেকে বাঁচো এবং বাঁচো রমণীদের থেকে। অতঃপর বললেনঃ নিশ্চয় কিয়ামতের দিন প্রতিটি ওয়া’দা ভঙ্গকারীর জন্য একটি ঝাণ্ডা হবে, যা দুনিয়ার ওয়া’দা অনুসারে উঁচু-নিচু হবে। কোন ওয়া’দা ভঙ্গকারী জনপ্রতিনিধি বা জনসাধারণের শাসকদের ওয়া’দা ভঙ্গের চেয়ে বড় হবে না। তার ঝাণ্ডা তার বসার স্থানের কাছে দণ্ডায়মান করা হবে। তারপর তিনি বললেনঃ মানুষের ভীতি যেন তোমাদের কাউকে ন্যায় কথা বলা থেকে বিরত না রাখে, যখন সে সেটাকে ন্যায় বলে জানে।
অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কোন অন্যায় কাজ করতে দেখে, লোকভীতি যেন সেটাকে উৎপাটন করা থেকে তাকে বিরত না করে। এ বলে আবূ সা’ঈদ আল খুদরী(রাঃ) কেঁদে ফেললেন এবং বললেনঃ আমি অবশ্য অন্যায় কাজ সংঘটিত হতে দেখেছি; কিন্তু মানুষের ভয়ে আমি সেটা নিষেধ করতে পারিনি। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ স্মরণ রেখ, আদম সন্তানকে বিভিন্ন স্তরে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন আছে, মু’মিন হিসেবে জন্মগ্রহণ করে, মু’মিন হিসেবে জীবন-যাপন করে এবং মু’মিন হিসেবে মৃত্যুবরণ করে এবং তাদের কেউ কেউ এমনও রয়েছে যে, জন্মগ্রহণ করে কাফির হিসেবে, জীবন-যাপন করে কাফির হিসেবে এবং মৃত্যুবরণ করে কাফির হিসেবে। আর তাদের থেকে কেউ কেউ এমন রয়েছে যে, জন্মগ্রহণ করে মু’মিন হিসেবে, জীবন-যাপন করে মু’মিন হিসেবে; কিন্তু মৃত্যুবরণ করে কাফির হিসেবে। আবার কেউ কেউ এমন আছে যে, কাফির হিসেবে জন্মগ্রহণ করে, কাফির হিসেবে জীবন-যাপন করে; কিন্তু মৃত্যুবরণ করে মু’মিন হিসেবে।
আবূ সা’ঈদ আল খুদরী(রাঃ) বলেন, তারপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাগ সম্পর্কে বললেনঃ কেউ কেউ এমন আছে, যারা খুব তাড়াতাড়ি রাগে এবং তাড়াতাড়ি ঠাণ্ডা হয়। একটি অপরটির ক্ষতিপূরণকারী। আবার কেউ কেউ এমন আছে, যারা খুব দেরিতে রাগে এবং তাদের রাগ নিবারিত হতেও দেরি হয়। এ দু’টো অবস্থাও একটি অপরটির ক্ষতিপূরক। তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যার রাগ দেরিতে আসে এবং তাড়াতাড়ি রাগ প্রশমিত হয়ে যায় এবং সে ব্যক্তি নিকৃষ্ট, যে তাড়াতাড়ি রাগে এবং দেরিতে ঠাণ্ডা হয়। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তোমরা রাগ থেকে বাঁচো। কেননা সেটা আদম সন্তানের হৃদয়ে একটি জ্বলন্ত অঙ্গার। তোমরা কি দেখনি, মানুষ যখন রাগে, তখন শাহ-রগ ফুলে ওঠে এবং চক্ষুদ্বয় লাল হয়ে যায়। অতএব, তোমাদের কেউ যখন রাগ উপলব্ধি করবে, সে যেন চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে এবং ভূমির সাথে মিশে থাকে।
আবূ সা’ঈদ আল খুদরী(রাঃ) বলেনঃ অতঃপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঋণ সম্পর্কে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন আছে, যে ঋণ পরিশোধ যথাসময়ে করে; কিন্তু সে যদি কাউকে ঋণ দিয়ে থাকে, তাহলে সেটা আদায়ের ব্যাপারে খুব কঠিন হয়ে পড়ে এবং খুব খারাপ ব্যবহার করে। এগুলোর মধ্যে একটি অভ্যাস অপর অভ্যাসটির ক্ষতিপূরক। আবার কোন লোক এমন আছে, যে ঋণ পরিশোধ করার ব্যাপারে খুবই খারাপ; কিন্তু সে যদি কাউকে ঋণ দিয়ে থাকে, তাহলে নরম কথা বলে ঋণ আদায় করে। এসব অভ্যাস একটি অপরটির ক্ষতিপূরক। তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে কারো নিকট থেকে ঋণ গ্রহণ করলে ঠিক সময় মতো পরিশোধ করে; আর সে যদি কারো নিকট পাওনা থাকে, তাহলে নরম কথা বলে তার ঐ পাওনা আদায় করে। তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি সর্বনিকৃষ্ট, যে ঋণ পরিশোধ করার ব্যাপারে খারাপ এবং নিজের পাওনা আদায়ের ব্যাপারে কঠিন ও কটুভাষী হয়। ততক্ষণে সূর্য খেজুরের ডাল এবং দেয়ালের কিনারায় পৌঁছল। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ সাবধান! সময় চলে গিয়েছে। তার মোকাবিলায় এতটুকু পরিমাণ দুনিয়াবী জীবন বাকি আছে, যতটুকু এ দিনের ক্ষুদ্রাংশ বাকি আছে। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: قَامَ فِينَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَطِيبًا بَعْدَ الْعَصْرِ فَلَمْ يَدَعْ شَيْئًا يَكُونُ إِلَى قِيَامِ السَّاعَةِ إِلَّا ذَكَرَهُ حَفِظَهُ مَنْ حَفِظَهُ وَنَسِيَهُ مَنْ نَسِيَهُ وَكَانَ فِيمَا قَالَ: «إِنَّ الدُّنْيَا حُلْوَةٌ خَضِرَةٌ وَإِنَّ اللَّهَ مُسْتَخْلِفُكُمْ فِيهَا فَنَاظِرٌ كَيْفَ تَعْمَلُونَ أَلَا فَاتَّقُوا الدُّنْيَا وَاتَّقُوا النِّسَاءَ» وَذَكَرَ: «إِنَّ لِكُلِّ غَادِرٍ لِوَاءً يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِقَدْرِ غَدْرَتِهِ فِي الدُّنْيَا وَلَا غَدْرَ أَكْبَرُ مِنْ غَدْرِ أَمِيرِ الْعَامَّةِ يُغْرَزُ لِوَاؤُهُ عِنْدَ اسْتِهِ» . قَالَ: «وَلَا يَمْنَعْنَّ أَحَدًا مِنْكُمْ هَيْبَةُ النَّاسِ أَنْ يَقُولَ بِحَقٍّ إِذَا عَلِمَهُ» وَفِي رِوَايَةٍ: «إِنْ رَأَى مُنْكَرًا أَنْ يُغَيِّرَهُ» فَبَكَى أَبُو سَعِيدٍ وَقَالَ: قَدْ رَأَيْنَاهُ فَمَنَعَتْنَا هَيْبَةُ النَّاسِ أَنْ نَتَكَلَّمَ فِيهِ. ثُمَّ قَالَ: «أَلَا إِنَّ بَنِي آدَمَ خُلِقُوا عَلَى طَبَقَاتٍ شَتَّى فَمنهمْ مَن يولَدُ مُؤمنا وَيحيى مُؤْمِنًا وَيَمُوتُ مُؤْمِنًا وَمِنْهُمْ مَنْ يُولَدُ كَافِرًا وَيحيى كَافِرًا وَيَمُوتُ كَافِرًا وَمِنْهُمْ مَنْ يُولَدُ مُؤْمِنًا وَيحيى مُؤْمِنًا وَيَمُوتُ كَافِرًا وَمِنْهُمْ مَنْ يُولَدُ كَافِرًا وَيحيى كَافِرًا وَيَمُوتُ مُؤْمِنًا» قَالَ: وَذَكَرَ الْغَضَبَ «فَمِنْهُمْ مَنْ يَكُونُ سَرِيعَ الْغَضَبِ سَرِيعَ الْفَيْءِ فَإِحْدَاهُمَا بِالْأُخْرَى وَمِنْهُمْ مَنْ يَكُونُ بَطِيءَ الْغَضَبِ بَطِيءَ الْفَيْءِ فَإِحْدَاهُمَا بِالْأُخْرَى وَخِيَارُكُمْ مَنْ يَكُونُ بَطِيءَ الْغَضَبِ سَرِيعَ الْفَيْءِ وَشِرَارُكُمْ مَنْ يَكُونُ سَرِيعَ الْغَضَبِ بَطِيءَ الْفَيْءِ» . قَالَ: «اتَّقُوا الْغَضَبَ فَإِنَّهُ جَمْرَةٌ عَلَى قَلْبِ ابْنِ آدَمَ أَلَا تَرَوْنَ إِلَى انْتِفَاخِ أَوْدَاجِهِ؟ وَحُمْرَةِ عَيْنَيْهِ؟ فَمَنْ أَحَسَّ بِشَيْءٍ مِنْ ذَلِكَ فَلْيَضْطَجِعْ وَلْيَتَلَبَّدْ بِالْأَرْضِ» قَالَ: وَذَكَرَ الدَّيْنَ فَقَالَ: «مِنْكُمْ مَنْ يَكُونُ حَسَنَ الْقَضَاءِ وَإِذَا كَانَ لَهُ أَفْحَشَ فِي الطَّلَبِ فإحداهُما بِالْأُخْرَى وَمِنْهُم مَن يكونُ سيِّءَ الْقَضَاءِ وَإِنْ كَانَ لَهُ أَجْمَلَ فِي الطَّلَبِ فَإِحْدَاهُمَا بِالْأُخْرَى وَخِيَارُكُمْ مَنْ إِذَا كَانَ عَلَيْهِ الدَّيْنُ أَحْسَنَ الْقَضَاءِ وَإِنْ كَانَ لَهُ أَجْمَلَ فِي الطَّلَبِ وَشِرَارُكُمْ مَنْ إِذَا كَانَ عَلَيْهِ الدَّيْنُ أَسَاءَ الْقَضَاءَ وَإِنْ كَانَ لَهُ أَفْحَشَ فِي الطَّلَبِ» . حَتَّى إِذَا كَانَتِ الشَّمْسُ عَلَى رؤوسِ النَّخْلِ وَأَطْرَافِ الْحِيطَانِ فَقَالَ: «أَمَا إِنَّهُ لَمْ يَبْقَ مِنَ الدُّنْيَا فِيمَا مَضَى مِنْهَا إِلَّا كَمَا بَقِيَ مِنْ يَوْمِكُمْ هَذَا فِيمَا مَضَى مِنْهُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ (إِنَّ الدُّنْيَا خَضِرَةٌ) অর্থাৎ- দুনিয়া অনেক চাকচিক্যময় আর প্রমোদের জায়গা। এর ভোগ্য বস্তুগুলো অত্যন্ত মজাদার ও চমৎকার।
হাদীসে الدُّنْيَا শব্দের বিশেষণ হিসেবে خَضِرَةٌ আর حُلْوَةٌ ব্যবহার করার কারণ হলো ‘আরবের লোকেরা সুখকর ও পছন্দনীয় বস্তুর ক্ষেত্রে উক্ত শব্দদ্বয় ব্যবহার করে তার মাধুর্যতা প্রকাশ করে থাকেন। সে দিক থেকে এখানেও তার প্রয়োগ ঘটেছে।
(فَاتَّقُوا الدُّنْيَا) অর্থাৎ- জীবন ধারণের তাগিদে আর ধর্মীয় কারণে যতটুকু প্রয়োজন তাতেই সীমাবদ্ধ থাকা। অতিরিক্ততা বর্জনই হলো আসল উদ্দেশ্য।
(وَاتَّقُوا النِّسَاءَ) অর্থাৎ- নারীদের চক্রান্ত, ছলনা আর কুটবুদ্ধি থেকে সতর্ক থাক।
وَلَا غَدْرَةَ أَعْظَمَ مِنْ غَدْرَةِ إِمَامٍ عَامَّةٍ ‘আল্লামা তূরিবিশতী (রহিমাহুল্লাহ) এ ধরনের ইমামের ব্যাপারে বলেনঃ এখানে উদ্দেশ্য হলো ঐ ব্যক্তি যিনি কোনরূপ চক্রান্ত বা ছলচাতুরীর মদদ ছাড়াই মুসলিম অধ্যূষিত এলাকায় জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন এবং জনগণের একান্ত আন্তরিকতায় বিভিন্ন সময়ে সাহায্যপ্রাপ্ত হন। এমন ব্যক্তি যখন জনগণের সাথে প্রতারণা করেন তখন এর চাইতে জঘন্যতম ও ক্ষতিকর প্রতারণা আর কিছুই হতে পারে না। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২১৯১; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ভালো কাজের আদেশ
৫১৪৬-[১০] আবুল বাখতারী (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীদের মধ্যে একজনের থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মানুষ ধ্বংস হবে না তার মধ্যে পাপের পরিমাণ বেশি না হওয়া পর্যন্ত। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي
الْبَخْتَرِيِّ عَنْ رَجُلٍ مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «لن يهْلك النَّاس حَتَّى يعذروا فِي أنفسهم» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ (لَنْ يَّهْلِكَ النَّاسُ حَتّٰى يَعْذِرُوْا فِىْ أَنْفُسِهِمْ) উল্লেখিত হাদীসের তাফসীরে ইমাম খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আবূ ‘উবায়দ তাঁর কিতাবে উল্লেখ করেছেন,يعذروا শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যতক্ষণ না তাদের দোষ-ত্রুটি ও পাপাচার বৃদ্ধি পাবে। আবার বলা হয়েছে, হাদীসের অর্থ হলো ‘‘যতক্ষণ না তাদের কাছে সত্য প্রকাশ না করা এবং তার ওপর ‘আমল করতে না পারার কোন ওযর থাকবে।’’ তাই বিনা ওযরে সত্য প্রত্যাখ্যাত হলে আল্লাহর শাস্তি অবধারিত হবে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪৩৩৯; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ভালো কাজের আদেশ
৫১৪৭-[১১] ’আদী ইবনু ’আদী আল কিন্দী (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক মুক্ত গোলাম আমাদের নিকট বর্ণনা করেন যে, আমার দাদাকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেনঃ আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহ তা’আলা কোন জাতিকে তাদের বিশেষ কোন লোকের পাপের কারণে শাস্তি প্রদান করবেন না, যতক্ষণ না ঐ জাতির অধিকাংশ লোক ঐ পাপের কথা জানতে পারবে যে, তাদের মধ্যে খারাপ কাজ করা হচ্ছে এবং তারা সেটা প্রতিরোধ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিরোধ না করে। যখন তারা এরূপ করে, তখন আল্লাহ তা’আলা ঐ জাতির সকলকে ব্যাপকভাবে শাস্তি প্রদান করেন। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
وَعَنْ عَدِيِّ
بْنِ عَدِيٍّ الْكِنْدِيِّ قَالَ: حَدَّثَنَا مَوْلًى لَنَا أَنَّهُ سَمِعَ جَدِّي رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ يَقُولُ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى لَا يُعَذِّبُ الْعَامَّةَ بِعَمَلِ الْخَاصَّةِ حَتَّى يَرَوُا الْمُنْكَرَ بَيْنَ ظَهْرَانِيهِمْ وَهُمْ قَادِرُونَ عَلَى أَنْ يُنْكِرُوهُ فَلَا يُنْكِرُوا فَإِذَا فَعَلُوا ذَلِكَ عَذَّبَ اللَّهُ العامَّةَ والخاصَّةَ» . رَوَاهُ فِي «شرح السّنة»
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ এর সনদে ‘‘মাওলা’’র অজ্ঞতা থাকার কারণে য‘ঈফ। দেখুন- হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৪৮৮। য‘ঈফুল জামি‘ ১৬৭৫, আহমাদ ১৭৭২০, আল মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ১৩৭৮৮।
পরিচ্ছেদঃ ২২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ভালো কাজের আদেশ
৫১৪৮-[১২] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বনী ইসরাঈল গোত্র যেখন পাপাচারে লিপ্ত হয়ে গেল, তখন তাদের ’আলিমগণ প্রথমত তাদেরকে সেটা থেকে নিষেধ করলেন। যখন তারা বিরত হলো না, তখন তারাও তাদের মাজলিসে বসতে লাগল এবং তাদের সাথে একত্রে খাদ্য খেতে ও মদ পান করতে লাগল। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা তাদের কারো কারো অন্তর কারো কারো অন্তর দ্বারা কলুষিত করে দিলেন। তখন আল্লাহ তা’আলা দাঊদ (আ.) ও ’ঈসা ইবনু মারইয়াম (আ.)-এর যবানিতে তাদের ওপর অভিসম্পাত করলেন। এ অভিসম্পাত তাদের পাপের কারণে ও সীমালঙ্ঘন করার কারণে হয়েছে।
রাবী বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বালিশে হেলান দিয়ে শুয়েছিলেন। এ কথা বলে তিনি উঠে বসলেন এবং বললেনঃ ঐ পবিত্র সত্তার কসম! যাঁর হাতে আমার জীবন, তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর শাস্তি থেকে রেহাই পাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা অত্যাচারী ও পাপীদের পাপকার্য থেকে নিষেধ করবে। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
অন্য বর্ণনায় আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর কসম! তোমরা তাদেরকে অবশ্যই সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। অত্যাচারীদের হস্তদ্বয় ধরে ফেলবে, তাদেরকে সৎকাজের প্রতি অনুপ্রাণিত করবে এবং সৎকাজের উপর স্থিতিশীল রাখবে। নতুবা আল্লাহ তা’আলা তোমাদের কারো কারো অন্তরকে কারো কারো অন্তরের সাথে মিলিয়ে দেবেন। তারপর বনী ইসরাঈলকে যেভাবে অভিসম্পাত করেছিলেন, সেভাবে তোমাদেরকেও অভিসম্পাত করবেন।
وَعَنْ
عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَمَّا وَقَعَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ فِي الْمَعَاصِي نَهَتْهُمْ عُلَمَاؤُهُمْ فَلَمْ يَنْتَهُوا فَجَالَسُوهُمْ فِي مَجَالِسِهِمْ وَآكَلُوهُمْ وَشَارَبُوهُمْ فَضَرَبَ اللَّهُ قُلُوبَ بَعْضِهِمْ بِبَعْضٍ فَلَعَنَهُمْ عَلَى لسانِ دَاوُد وَعِيسَى ابْن مَرْيَمَ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ» . قَالَ: فَجَلَسَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَكَانَ مُتَّكِئًا فَقَالَ: «لَا وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ حَتَّى تَأْطِرُوهُمْ أَطْرًا» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَفِي رِوَايَتِهِ قَالَ: «كَلَّا وَاللَّهِ لَتَأْمُرُنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلَتَنْهَوُنَّ عَنِ الْمُنْكَرِ وَلَتَأْخُذُنَّ عَلَى يَدَيِ الظَّالِمِ ولنأطرنه على الْحق أطرا ولنقصرنه عَلَى الْحَقِّ قَصْرًا أَوْ لَيَضْرِبَنَّ اللَّهُ بِقُلُوبِ بَعْضِكُمْ عَلَى بَعْضٍ ثُمَّ لَيَلْعَنَنَّكُمْ كَمَا لَعَنَهُمْ»
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, ‘‘ইবনু মাস্‘ঊদ’’-এর মাঝে তার বিচ্ছিন্নতার কারণে, আর তার ছেলের নাম আবূ ‘উবায়দাহ্। দেখুন- য‘ঈফাহ্ ১১০৫, হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৪৮৯, আহমাদ ৩৭১৩।
ব্যাখ্যাঃ (فَضَرَبَ اللهُ قُلُوبَ بَعْضِهِمْ بِبَعْضٍ) ‘আল্লামা ইবনুল মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এখানে بِبَعْضٍ শব্দের শুরুর "ب" হরফটি কারণ বর্ণনা করার অর্থে ব্যবহার হয়েছে। কাজেই এর অর্থ হলো, অন্যায়কারী ব্যক্তির সহচার্যে থাকার কারণে তা দুষ্কৃতির দ্বারা একজন সৎ ব্যক্তির অন্তরকে আল্লাহ মলিন করে দিয়েছেন। এক কথায় পাপী ব্যাক্তির সহচার্যে সৎলোকের অন্তর কলুষিত হয়। এভাবে তাদের সকলের অন্তর সঠিক ও কল্যাণকর বিষয় গ্রহণ করার ব্যাপারে কঠোর ও নির্দয় হয়েছিল। এটি ছিল বানী ইসরাঈলের ওপর আল্লাহর বিশেষ ধরনের অভিসম্পাত। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪৩২৮; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ৩০৪৭; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ভালো কাজের আদেশ
৫১৪৯-[১৩] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মি’রাজের রাতে আমি বহু লোককে দেখেছি যে, তাদের ঠোঁট আগুনের কাঁচি দ্বারা কাটা হচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ হে জিবরীল! এরা কারা? জিবরীল (আ.) বললেনঃ এরা আপনার উম্মাতের মধ্যে বক্তাগণ, যারা লোকেদেরকে ভালো কাজের আদেশ করত; কিন্তু নিজেদেরকে ভুলে যেত। অর্থাৎ- নিজেরা সৎকাজ করত না। (শারহুস্ সুন্নাহ্ ও বায়হাক্বী’র ’’শু’আবুল ঈমান’’)[1]
ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ)-এর অপর এক বর্ণনায় আছে যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ আমার উম্মাতের মধ্যে এমন সব খত্বীব বা বক্তা হবে, যারা এমন সব কথা বলবে, যা তারা নিজেরা কার্যকর করবে না। তারা আল্লাহ তা’আলার কুরআন পাঠ করবে; কিন্তু সে মতো ’আমল করত না।
وَعَنْ
أَنَسٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: رَأَيْتُ لَيْلَةَ أُسْرِيَ بِي رِجَالًا تُقْرَضُ شِفَاهُهُمْ بِمَقَارِيضَ مِنْ نَارٍ قُلْتُ: مَنْ هؤلاءِ يَا جبريلُ؟ قَالَ: هؤلاءِ خُطباءُ أُمَّتِكَ يَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبَرِّ وَيَنْسَوْنَ أَنْفُسَهُمْ «. رَوَاهُ فِي» شرح السّنة «وَالْبَيْهَقِيّ فِي» شعب الإِيمان وَفِي رِوَايَتِهِ قَالَ: «خُطَبَاءُ مِنْ أُمَّتِكَ الَّذِينَ يقولونَ مَا لَا يفعلونَ ويقرؤونَ كتابَ اللَّهِ وَلَا يعملونَ»
পরিচ্ছেদঃ ২২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ভালো কাজের আদেশ
৫১৫০-[১৪] ’আম্মার ইবনু ইয়াসির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মূসা (আ.)-এর কওমের ওপর আকাশ থেকে রুটি ও মাংসের থালা অবতীর্ণ করা হয়েছিল এবং তাদেরকে আদেশ করা হয়েছিল আমানাতে খিয়ানাত না করার। অর্থাৎ- প্রয়োজনের অধিক নেবে না ও অন্যের অংশেও হাত দেবে না এবং আগামীকালের জন্য সঞ্চয় করে রাখবে না। কিন্তু তারা খিয়ানাত করল ও সঞ্চয়ও করল এবং অন্য দিনের জন্য কিছু খাবার রেখেও দিলো। এজন্য আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক তাদের আকৃতি-অবয়ব পরিবর্তন করে বানর ও শূকর বানিয়ে দেয়া হলো। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ عَمَّارِ
بْنِ يَاسِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أُنْزِلَتِ الْمَائِدَةُ مِنَ السَّمَاءِ خُبْزًا وَلَحْمًا وَأُمِرُوا أَنْ لَا يَخُونُوا وَلَا يَدَّخِرُوا لِغَدٍ فَخَانُوا وَادَّخَرُوا وَرَفَعُوا لغَدٍ فمُسِخوا قَردةً وخَنازيرَ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ এর সনদে ‘‘কতাদাহ্’’ নামক বর্ণনাকারীগণ একজন প্রসিদ্ধ মুদাল্লিস ব্যক্তি। আর সে ‘‘আন’’ দ্বারা হাদীস বর্ণনা করেছেন। মুসনাদে আবূ ইয়া‘লা ১৬৫১।
ব্যাখ্যাঃ (أُنْزِلَتِ الْمَائِدَةُ مِنَ السَّمَاءِ) ‘আল্লামা রাগিব আল আসবাহানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ الْمَائِدَةُ হলো এক ধরনের প্রশস্ত প্লেট যাতে বিভিন্ন প্রকারের খাবার থাকে।
ইমাম ইবনু কাসীর (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর তাফসীর গ্রন্থ ‘তাফসীর ইবনু কাসীর’-এ উল্লেখ করেছেন যে, ‘ঈসা ইবনু মারইয়াম (আ.)-এর যুগে বানী ইসরাঈলের কাছে আল্লাহর পক্ষ হতে এ খাবার অবতীর্ণ হত। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ৩০৬১; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ভালো কাজের আদেশ
৫১৫১-[১৫] ’উমার ইবনুল খত্ত্বাব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শেষ যামানায় আমার উম্মাতের ওপর তাদের শাসকদের পক্ষ থেকে কঠিন বিপদ আপতিত হবে। ঐ বিপদ থেকে শুধু সেসব লোকই রেহাই পাবে, যারা আল্লাহ তা’আলার দীন সম্পর্কে জ্ঞাত থাকবে। সে তার নিজের মুখ, হাত ও অন্তর দ্বারা সত্যকে প্রকাশ করার জন্য জিহাদ করবে। এ ব্যক্তির সৌভাগ্য তার জন্য অগ্রগামী হয়েছে। অন্য আরেক ব্যক্তি হবে, যে আল্লাহ তা’আলার দীন সম্পর্কে জানবে, এতে বিশ্বাস স্থাপন করবে। অন্য এক ব্যক্তি হবে, যে আল্লাহর দীন সম্পর্কে জানবে; কিন্তু চুপচাপ থাকবে। যখন কাউকে কোন নেক কাজ করতে দেখবে, তখন তাকে ভালোবাসবে। আর যখন কাউকে অসৎকাজ করতে দেখবে, তখন তাকে ঘৃণা করবে। এ ব্যক্তিও অন্তরে ভালোবাসা ও বিদ্বেষভাব লুকায়িত রাখার কারণে পরিত্রাণ পাবে।[1]
عَنْ عُمَرَ
بْنِ الْخَطَّابِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّهُ تُصِيبُ أُمَّتِي فِي آخِرِ الزَّمَانِ مِنْ سُلْطَانِهِمْ شَدَائِدُ لَا يَنْجُو مِنْهُ إِلَّا رَجُلٌ عَرَفَ دِينَ اللَّهِ فَجَاهَدَ عَلَيْهِ بِلِسَانِهِ وَيَدِهِ وَقَلْبِهِ فَذَلِكَ الَّذِي سَبَقَتْ لَهُ السَّوَابِقُ وَرَجُلٌ عَرَفَ دِينَ اللَّهِ فَصَدَّقَ بِهِ وَرَجُلٌ عَرَفَ دِينَ اللَّهِ فَسَكَتَ عَلَيْهِ فَإِنْ رَأَى مَنْ يَعْمَلُ الْخَيْرَ أَحَبَّهُ عَلَيْهِ وَإِنْ رَأَى مَنْ يَعْمَلُ بِبَاطِلٍ أَبْغَضَهُ عَلَيْهِ فَذَلِكَ يَنْجُو على إبطانه كُله»
হাদীসটি দু’টি কারণে য‘ঈফ : ১ম- ইনক্বিতা‘ জাবির ইবনু যায়দ-এর মাঝে। আর ২য়টি- য‘ঈফ সালিম আল মুরাদী। আর সে হলো ইবনু ‘আবদুল ওয়াহিদ, অথবা ইবনুল আ‘লা অথবা ‘আবদুল ‘আলা; তাকে ইমাম নাসায়ী ও ইবনু মা‘ঈন য‘ঈফ বলেছেন। দেখুন- য‘ঈফাহ্ ৬৭২৫।
পরিচ্ছেদঃ ২২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ভালো কাজের আদেশ
৫১৫২-[১৬] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ মহীয়ান-গরীয়ান জিবরীল (আ.)-কে আদেশ করেন যে, অমুক শহর বা জনপদটিকে সেটার বাসিন্দাসহ উল্টিয়ে দাও। তখন জিবরীল (আ.)বললেনঃ হে প্রভু! ঐ জনপদে তোমার অমুক বান্দা রয়েছে, যে এক মুহূর্ত তোমার নাফরমানি করেনি। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল্লাহ তা’আলা বলেন, তার ও তাদের সকলের ওপর শহরটিকে উল্টিয়ে দাও। কারণ ঐ ব্যক্তির মুখমণ্ডলে পাপীদের পাপাচার দেখে আমার সন্তুষ্টির জন্য এক মুহূর্তের জন্যও পরিবর্তন হয়নি। অর্থাৎ- সে পাপীদের পাপ এক মুহূর্তের জন্যও খারাপ মনে করেনি।[1]
وَعَنْ جَابِرٍ
قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَوْحَى اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ إِلى جبريلَ عَلَيْهِ السَّلَامُ: أَنِ اقْلِبْ مَدِينَةَ كَذَا وَكَذَا بِأَهْلِهَا قَالَ: يارب إِنَّ فِيهِمْ عَبْدَكَ فُلَانًا لَمْ يَعْصِكَ طَرْفَةَ عَيْنٍ . قَالَ: فَقَالَ: اقْلِبْهَا عَلَيْهِ وَعَلَيْهِمْ فَإِنَّ وَجهه لم يتمعر فِي سَاعَة قطّ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘আম্মার ইবনু সায়ফ’’ নামের বর্ণনাকারী য‘ঈফ। ইমাম যাহাবী তাকে য‘ঈফ বলেছেন, আর ইমাম দারাকুত্বনী তাকে মাতরূক বলেছেন। আর ‘উবায়দুল্লাহ ইবনু ইসহাকব আল আত্বার নামের বর্ণনাকারী সম্পর্কেও ইমাম যাহাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ তারা তাকে য‘ঈফ বলেছেন। দেখুন- য‘ঈফাহ্ ১৯০৪, হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৪৯১।
পরিচ্ছেদঃ ২২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ভালো কাজের আদেশ
৫১৫৩-[১৭] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ মহীয়ান-গরীয়ান কিয়ামতের দিন বান্দাকে জিজ্ঞেস করবেন এবং বলবেন, যখন শারী’আত বিরোধী কাজ সংঘটিত হতে দেখছিলে, তখন তোমার কি হয়েছিল যে, তুমি এতে নিষেধ করতে পারোনি? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ঐ বান্দাকে আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে প্রমাণ শিখিয়ে দেয়া হবে। যখন আল্লাহ তা’আলা তাকে ক্ষমা করার মর্জি করবেন, তখন সে বলবে, হে আল্লাহ! আমি মানুষের জুলুম-অত্যাচারের ভয়ে ভীত ছিলাম এবং তোমারই ক্ষমার আশা পোষণ করেছিলাম। [ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) উল্লেখিত হাদীস তিনটি শু’আবুল ঈমানে বর্ণনা করেছেন।][1]
وَعَنْ أَبِي
سَعِيدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَسْأَلُ الْعَبْدَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيَقُولُ: مَا لَكَ إِذَا رَأَيْتَ الْمُنْكَرَ فَلَمْ تُنْكِرْهُ؟ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: فَيُلَقَّى حُجَّتَهُ فَيَقُولُ: يَا رَبِّ خِفْتُ النَّاسَ وَرَجَوْتُكَ «. رَوَى الْبَيْهَقِيُّ الْأَحَادِيثَ الثَّلَاثَةَ فِي» شُعَبِ الْإِيمَانِ
ব্যাখ্যাঃ (فَيَقُولُ: يَا رَبِّ خِفْتُ النَّاسَ وَرَجَوْتُكَ) লোকটির এই উত্তরের মধ্যে আল্লাহর অনুগ্রহের উপর নির্ভরশীল থাকা, অপারগতা প্রকাশ এবং অন্যায়ের স্বীকৃতি পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এমনও হতে পারে যে, দুষ্ট লোকেদের দাপটের কারণে ভয়ে সে প্রতিবাদ করতে পারেনি, ফলে সে অক্ষম ছিল। ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ ধরনের ব্যক্তি শারী‘আত সমর্থিত অবস্থার সম্মুখীন, তাই তার কোন অপরাধ নেই। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ভালো কাজের আদেশ
৫১৫৪-[১৮] আবূ মূসা আল আশ্’আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সেই পবিত্র সত্তার কসম! যাঁর হাতে মুহাম্মাদ-এর প্রাণ, কিয়ামতের দিন সৎ ও অসৎ কাজগুলোকে বিশেষ আকৃতিতে তৈরি করা হবে এবং তাদের সম্মুখে উপস্থাপন করা হবে। ভালো কাজগুলো তার ’আমলকারীকে সুসংবাদ দেবে এবং ভালো ফলাফলের অঙ্গীকার করবে। আর মন্দ কাজগুলো তার ’আমলকারীকে বলবে, দূর হয়ে যাও, দূর হয়ে যাও। প্রকৃতপক্ষ তারা দূর হয়ে যাওয়ার শক্তি পাবে না; বরং তার সাথেই জড়িয়ে থাকবে। (আহমাদ ও বায়হাক্বী’র ’’শু’আবুল ঈমানে’’ বর্ণনা করেছেন।)[1]
وَعَنْ أَبِي
مُوسَى الْأَشْعَرِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ إِنَّ الْمَعْرُوفَ وَالْمُنْكَرَ خَلِيقَتَانِ تُنْصَبَانِ لِلنَّاسِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَأَمَّا الْمَعْرُوفُ فَيُبَشِّرُ أَصْحَابَهُ وَيُوعِدُهُمُ الْخَيْرَ وَأَمَّا الْمُنْكَرُ فَيَقُولُ: إِلَيْكُمْ إِلَيْكُمْ وَمَا يَسْتَطِيعُونَ لَهُ إِلَّا لُزُومًا «. رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالْبَيْهَقِيّ فِي» شعب الإِيمان
হাদীসিট য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর বর্ণনাকারীগুলো বিশ্বস্ত তবে ‘‘কতাদাহ্ ও হাসান বাসরী’’ মুদাল্লিস রাবী। আর তারা দু’ জনের ‘আন দ্বারা হাদীস বর্ণনা করেছে। দেখুন- হিদায়াতুর্ রুওয়াত ৪/৪৯১ পৃঃ।