৫১০৪

পরিচ্ছেদঃ ২০. প্রথম অনুচ্ছেদ - রাগ ও অহংকার

৫১০৪-[১] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। জনৈক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জিজ্ঞেস করল, আমাকে কিছু উপদেশ দিন। তিনি বললেনঃ তুমি রাগ করবে না। লোকটি কয়েকবার একই কথা পুনরাবৃত্তি করল। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও প্রত্যেক বারই বললেনঃ তুমি রাগ করো না। (বুখারী)[1]

بَابُ الْغَضَبِ وَالْكِبَرِ

عَن أبي هريرةَ أَنَّ رَجُلًا قَالَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: أوصني. قَالَ: «لَا تغضبْ» . فردَّ ذَلِكَ مِرَارًا قَالَ: «لَا تَغْضَبْ» . رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ

عن أبي هريرة أن رجلا قال للنبي صلى الله عليه وسلم: أوصني. قال: «لا تغضب» . فرد ذلك مرارا قال: «لا تغضب» . رواه البخاري

ব্যাখ্যাঃ (أَنَّ رَجُلًا) ইমাম আহমাদ, ইবনু হিব্বান এবং ‘ত্ববারানী’র বর্ণনা মতে লোকটির নাম হারিসাহ্ ইবনু কুদামাহ্। এছাড়াও মুহাদ্দিসগণের নিকটে তিনজন সাহাবীর যে কেউ হতে পারেন : ১. ইবনু ‘উমার ২. হারিসাহ্ ইবনু কুদামাহ্ ৩. সুফ্ইয়ান ইবনু ‘আবদুল্লাহ। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬১১৬; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)

(أوصني) ‘‘আমাকে এমন একটি বিশেষ ‘আমলের ব্যাপারে অবহিত করুন যা ব্যাপকভাবে দুনিয়া এবং আখিরাতে আমার কল্যাণ বয়ে আনবে এবং আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে দেবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)

(لَا تغضبْ) ইমাম খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ‘‘তুমি রাগ করবে না’’ এ কথার সারমর্ম হলো আপনি রাগ আনয়নকারী সব ধরনের উপকরণ থেকে দূরে থাকুন। যে সকল কথা বা কাজ মানুষকে রেগে যেতে সহায়তা করে সেগুলো থেকে নিজেকে নিরাপদে রাখুন। কারণ রাগ থেকে শত চেষ্টার পরও সম্পূর্ণ মুক্ত থাকা সম্ভব নয়, তাই পারতপক্ষ যতটুকু সম্ভব দূরে থাকাই উত্তম।

কারো মতে, (لَا تغضبْ) বলার কারণ হল- অধিকাংশ সময় রাগের সাথে অহংকার প্রকাশ পায়। কোন বিষয় যদি মতের অমিল হয় তখন মনের রাগ প্রকাশের সময় এক রকমের আত্ম-অহংকার চলে আসে। এর ফলে বিনয়ী ভাব এবং আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়।

কেউ কেউ বলেছেনঃ প্রশ্নকারী লোকটি রাগচটা প্রকৃতির ছিলেন। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সকল বিষয় খেয়াল করেই প্রত্যেককে উপযুক্ত নাসীহাত প্রদান করতেন।

ইবনু তীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ (لَا تغضبْ) কথাটির ভেতরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ একত্রিত করেছেন। কেননা রাগের ফলে মানবজীবনে আত্মীয়তার সম্পর্ক ও বন্ধত্ব নষ্টসহ নানাবিধ অকল্যাণ ও ক্ষতির সম্ভাবনা দেখা দেয়। অবশেষে সামাজিক সম্মান আর ধার্মিকতার চরম অভাব পরিলক্ষিত হয়।

ইমাম বায়যাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দৃষ্টিতে মনে হয়েছে যে, সকল বিপদ আর ফিতনাহ্-ফাসাদের কেন্দ্রস্থল হচ্ছে মানুষের রাগ। যেহেতু প্রশ্নকারী সাহাবী অন্তরের কোমলতা আর সৎ ইচ্ছা নিয়ে নাসীহাত চেয়েছিলেন, তাই আল্লাহর নবী তাকে অযথা রাগ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিলেন। আর সকল নিকৃষ্ট আচরণের মধ্যে রাগ হলো শীর্ষে। তাই রাগ থেকে নিজেকে হিফাযাত করার অর্থ হলো সবচেয়ে বড় শত্রুকে দমন করা।

ইবনু হিব্বান (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ (لَا تغضبْ) বলার উদ্দেশ্য হলো রাগের অবস্থায় যে কোন ধরনের অন্যায় কাজ না করা। রাগ থেকে বিরত থাকা নয়। যেহেতু রাগ এমন একটি স্বভাব যা দূর করা কারো পক্ষ সম্ভব নয়, তাই এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো রাগের সময় কোন ধরনের অন্যায় অপরাধ না করা। আবার কারো মতে, আল্লাহ তা‘আলা রাগকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষের সৃষ্টিগত স্বভাবের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ফলে মানুষ যখন কোন উদ্দেশে সফলতার জন্য চরম আগ্রহী হয়ে উঠে তখন সেই আকাঙক্ষা থেকে এক ধরনের রাগ জেদ আকারে প্রকাশ পায়। তার তীব্রতা চোখে মুখে ফুটে উঠে। চেহারা রক্তিম বর্ণ হয়ে যায়। এ ধরনের রাগ সাধ্যের ভেতরে কোন বস্তুকে পাওয়ার আশায় তৈরি হয়। আর যদি সেটা সাধ্যের বাহিরে হয় তখন দুশ্চিন্তায় চেহারার রং ফ্যাকাশে হয়ে যায়। কখনো লাল বা হলুদ বর্ণ ধারণ করে। এটা হলো মানুষের বাহ্যিক অবস্থা। পক্ষান্তরে অভ্যন্তরীণ অবস্থা এর চাইতেও মারাত্মক। করণ রাগের অবস্থায় অন্তর নামক পবিত্র বস্তুটি হিংসা-বিদ্বেষ আর অসৎ উদ্দেশ্যের জন্ম দেয়। বিভিন্ন উপায়ে মানুষের ক্ষতি করার নীল-নকশা তৈরি করে। তাই রাগের বাহ্যিক অবস্থার চাইতে ভিতরগত অবস্থা নেহায়াত কুৎসিত। কাজেই এদিক থেকে (لَا تغضبْ) উপদেশটি অত্যন্ত জরুরী হিসেবে গণ্য হয়েছে।

একজন গবেষক উল্লেখ করেছেন যে, রাগ হচ্ছে শয়তানের কুমন্ত্রণা। এর মাধ্যমে মানুষ প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে অন্যায়ে জড়িয়ে পড়ে এবং মিথ্যাকে প্রশ্রয় দেয়। অবশেষে অসৎকাজে চরম আগ্রহে আত্মনিয়োগ করে, হিংসা আর কপটতায় অন্তর ভারী হয়ে উঠে। এরপর কুফরী করতে উদ্যত হয় এবং তা করে ফেলে। এজন্যই আল্লাহর নবী তাকে বারবার রাগ থেকে সতর্ক করছিলেন।

‘আল্লামা তূরিবিশতী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের চারিত্রিক বিষয়গুলো খেয়াল করতেন। তাঁর কাছে চরিত্রের যে দিকটি অসুস্থ বলে মনে হত সেই স্থানে উপযুক্ত ঔষধ প্রয়োগের চেষ্টা করতেন। ফলে সাহাবীদের জন্য যে বিষয়টি অত্যন্ত জরুরী বলে মনে করতেন সেই বিষয়েই তাদেরকে নাসীহাত প্রদান করতেন। প্রশ্নকারী সাহাবীর ব্যাপারটিও এমন ছিল। তিনি হয়তবা রাগী প্রকৃতির ছিলেন, তাই তাকে রাগ থেকে সতর্ক করলেন।

(ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬১১৬; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ২০২০; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
পুনঃনিরীক্ষণঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-২৫: শিষ্টাচার (كتاب الآداب)