পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
مناسك শব্দটি বহুবচন, এর একবচন منسك। ইবনু জারীর বলেনঃ ’আরাবী منسك ঐ স্থানকে বলা হয় যেখানে লোকজন কল্যাণের উদ্দেশে একত্রিত হয়। হজের কার্যসমূহকে مناسك এজন্যই বলা হয়ে থাকে যে, হজ্জের কাজ সম্পাদনের জন্য লোকজন একই জায়গায় বারবার একত্রিত হয়।
الحج-এর শাব্দিক অর্থ হলো ’কোন কিছুকে উদ্দেশ্য করা’। ইসলামী শারী’আতের পরিভাষায় নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে, নির্দিষ্ট কাজের মাধ্যমে, কাবা ঘরের সম্মানের উদ্দেশে তা যিয়ারত করাকে হজ্জ/হজ বলে।
কুরআন-সুন্নাহ ও ইজমা দ্বারা হজ্জ/হজ ফরয হওয়া প্রমাণিত। এর অস্বীকারকারী কাফির এতে কোন দ্বিমত নেই। জীবনে তা শর্তসাপেক্ষে মাত্র একবারই ফরয।
হজ্জ/হজ ফরয হওয়ামাত্রই তা সম্পাদন করা ওয়াজিব না-কি তা বিলম্বে পালন করার অবকাশ রয়েছে- এ বিষয়ে ’উলামাগণের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। ইমাম মালিক, আহমাদ, আবূ ইউসুফ এবং মুযানী-এর মতে তা ফরয হওয়ামাত্রই আদায় করা ওয়াজিব, বিলম্ব করার অবকাশ নেই। পক্ষান্তরে ইমাম শাফি’ঈ, সাওরী, আওযা’ঈ ও মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান এর মতে তা বিলম্বে আদায় করার অবকাশ রয়েছে। ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ)-এর মতে ওজর ব্যতীত বিলম্বকারী গুনাহগার হবে।
উত্তম কথা হলো এই যে, যথাসম্ভব দ্রুত হজ্জ/হজ সম্পাদন করা উচিত। কেননা মৃত্যু কখন আসবে তা কেউ জানে না, তাই ফরয হওয়ার পরে তা বিলম্বে আদায় করতে গিয়ে তা আদায় করার পূর্বেই মৃত্যু উপস্থিত হলে, আর তার পক্ষ থেকে তা আদায় করা না হলে নিশ্চিত গুনাহের মধ্যে নিপতিত হতে হবে। আর তা দ্রুত আদায় করা মধ্যেই তা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার একমাত্র উপায়। হজ্জ কখন ফরয হয়েছে তা নিয়েও ’আলিমদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। তবে প্রসিদ্ধ অভিমত হলো নবম হিজরী সালে হজ্জ ফরয করা হয়েছে।
২৫০৫-[১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের উদ্দেশে ভাষণ দানকালে বললেন, হে মানবমণ্ডলী! আল্লাহ তা’আলা তোমাদের ওপর হজ্জ/হজ ফরয করেছেন, সুতরাং তোমরা হজ্জ/হজ পালন করবে। তখন এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রসূল! এটা (হজ্জ পালন) কি প্রত্যেক বছরই? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) চুপ থাকলেন। লোকটি এভাবে তিনবার জিজ্ঞেস করলো। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আমি যদি হ্যাঁ বলতাম, তবে তা (হজ্জ প্রতি বছর) ফরয হয়ে যেতো, যা তোমরা (প্রতি বছর হজ্জ পালন করতে) পারতে না। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, যে ব্যাপারে আমি তোমাদেরকে কিছু বলিনি সে ব্যাপারটি সেভাবে থাকতে দাও। কেননা তোমাদের পূর্বের লোকেরা বেশি বেশি প্রশ্ন করে ও তাদের নবীদের সাথে মতবিরোধ করার কারণে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। তাই আমি যখন তোমাদেরকে কোন বিষয়ে নির্দেশ করবো তা যথাসাধ্য পালন করবে এবং যে বিষয়ে নিষেধ করবো তা পরিত্যাগ করবে। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ:: خَطَبَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ فُرِضَ عَلَيْكُمُ الْحَجُّ فَحُجُّوا» فَقَالَ رَجُلٌ: أَكُلَّ عَامٍ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ فَسَكَتَ حَتَّى قَالَهَا ثَلَاثًا فَقَالَ: لَوْ قُلْتُ: نَعَمْ لَوَجَبَتْ وَلَمَا اسْتَطَعْتُمْ ثُمَّ قَالَ: ذَرُونِي مَا تَرَكْتُكُمْ فَإِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِكَثْرَةِ سُؤَالِهِمْ وَاخْتِلَافِهِمْ عَلَى أَنْبِيَائِهِمْ فَإِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ وَإِذَا نَهَيْتُكُمْ عَنْ شَيْء فدَعُوه . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: (فُرِضَ عَلَيْكُمُ الْحَجُّ فَحُجُّوْا) ‘‘তোমাদের ওপর হজ্জ/হজ ফরয করা হয়েছে। অতএব তোমরা হজ্জ সম্পাদন করো।’’ এ কথা শ্রবণ করে একব্যক্তি প্রশ্ন করল- (أَكُلَّ عَامٍ) প্রত্যেক বৎসরই কি?
অর্থাৎ- আপনি কি আমাদেরকে প্রত্যেক বৎসরই হজ্জ/হজ সম্পাদন করতে আদেশ দিচ্ছেন?
(لَوْ قُلْتُ: نَعَمْ لَوَجَبَتْ) ‘‘আমি হ্যাঁ বললেই তা প্রতি বৎসরের জন্যই ওয়াজিব হয়ে যেত।
ইমাম সিন্দী বলেনঃ এটা অসম্ভব নয় যে, হজ্জ/হজ প্রতি বৎসর ওয়াজিব করা বা না করার বিষয় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর ন্যাস্ত ছিল। তাই তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হ্যাঁ বললেই তা প্রতি বৎসরের জন্যই ওয়াজিব হয়ে যেত। কেননা আল্লাহর পক্ষে তাঁর নাবীকে কোন ব্যাপারে সাধারণভাবে নির্দেশ দেয়ার পর তার ব্যাখ্যার বিষয়টি তার ওপর ন্যাস্ত করা বৈধ।
(ذَرُوْنِىْ مَا تَرَكْتُكُمْ) ‘‘যে বিষয়ের উপর আমি তোমাদেরকে ছেড়ে দিয়েছি তোমরাও সে বিষয়ে আমাকে ছেড়ে দাও।’’ অর্থাৎ- আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে হয়েছে শারী‘আতের নিয়মাবলী বর্ণনা করা এবং তা লোকদের নিকট পৌঁছানোর জন্য। অতএব শারী‘আতের বিধান আমি তোমাদের নিকট অবশ্যই বর্ণনা করব, সে বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করার কোন প্রয়োজন নেই।
(فَإِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِكَثْرَةِ سُؤَالِهِمْ) ‘‘তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মাতগণ অধিক প্রশ্ন করার কারণে ধ্বংস হয়েছে।’’
ইমাম বাগাবী শারহে সুন্নাতে উল্লেখ করেছেন যে, প্রশ্ন দু’ ধরনের। যথা-
(১) ধর্মীয় কোন বিষয়ে প্রয়োজনের খাতিরে শিখার উদ্দেশে প্রশ্ন করা, আর এ ধরনের প্রশ্ন করা বৈধ। যেমন- আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ ‘‘যারা জানে তোমরা তাদের নিকট জিজ্ঞেস করো’’- (সূরা আন্ নাহল ১৬ : ৪৫ আয়াত, সূরা আল আম্বিয়া ২১ : ৬ আয়াত)। সাহাবীগণের প্রশ্নাবলী এ ধরনেরই ছিল।
(২) হতবুদ্ধি ও বিহ্বল করার জন্য অনর্থক প্রশ্ন করা। আর এ ধরনের প্রশ্ন করতে হাদীসে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ অধিক ভাল জানেন।
(إِذَا نَهَيْتُكُمْ عَنْ شَىْءٍ فَدَعُوْهُ) ‘‘যখন আমি তোমাদেরকে কোন বিষয়ে নিষেধ করি তা পরিত্যাগ করো।’’
যেহেতু নিষিদ্ধ বস্ত্ত পরিত্যাগ করতে সকলেই সক্ষম তাই বলা হয়নি যে, সক্ষম হলে তা পরিত্যাগ করো। পক্ষান্তরে আদিষ্ট কোন বিষয় কার্যকর করতে সক্ষমতার প্রয়োজন রয়েছে। তাই সেক্ষেত্রে বলা হয়েছে ‘‘আমি যে বিষয়ে আদেশ করি সাধ্যমত তা পালন করো।’’
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
২৫০৬-[২] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো, কোন্ ’আমল সর্বোত্তম? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের ওপর বিশ্বাস স্থাপন। আবার জিজ্ঞেস করা হলো, তারপরে কোন্ ’আমল? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ করা। আবারও জিজ্ঞেস করা হলো, এরপর কোনটি? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ’হজ্জে মাবরুর’ অর্থাৎ- কবূলযোগ্য হজ্জ। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْهُ قَالَ: سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَيُّ الْعَمَلِ أَفْضَلُ؟ قَالَ: «إِيمَانٌ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ» قِيلَ: ثُمَّ مَاذَا؟ قَالَ: «الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ» . قِيلَ: ثُمَّ مَاذَا؟ قَالَ: «حَجٌّ مبرورٌ»
ব্যাখ্যা: (ثُمَّ مَاذَا؟) ‘‘অতঃপর কোন ‘আমল উত্তম।’’ অর্থাৎ- আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করার পর কোন কাজ উত্তম?’’ (الْجِهَادُ فِىْ سَبِيلِ اللّٰهِ) ‘‘আল্লাহর পথে জিহাদ করা’’। অর্থাৎ- আল্লাহর বিধানকে বিজয়ী করার জন্য কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা সর্বোত্তম ‘আমল।
(حَجٌّ مَبْرُوْرٌ) ‘‘কবূলযোগ্য হজ্জ/হজ’’। অর্থাৎ- আল্লাহর নিকট গৃহীত হজ্জ। হজ্জ কবূল হওয়ার আলামাত হলোঃ হজ্জ থেকে ফিরে আসার পর তার অবস্থা পূর্বের চাইতে ভাল হওয়া এবং গুনাহের কাজে পুনরায় লিপ্ত না হওয়া। ইমাম কুরতুবী বলেনঃ মাকবূল-এর বিভিন্ন অর্থ করা হয়ে থাকে যার সারমর্ম প্রায় একই, অতএব মাকবূল হজ্জ বলতে তাই বুঝায় যে হজে তার সকল নিয়মাবলী যথার্থ পালিত হয়েছে এবং হজ্জ সম্পাদনকারী ব্যক্তি তার ওপর করণীয় কার্যসমূহ পূর্ণাঙ্গভাবে সম্পাদন করেছে তাই হজ্জে মাবরূর তথা মাকবূল হজ্জ।
অত্র হাদীসে জিহাদকে হজ্জের পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে অথচ জিহাদ হলো ফারযে কিফায়াহ্ আর হজ্জ হলো ফারযে ‘আইন। এর কারণ এই যে, জিহাদের উপকারিতা ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে সমস্ত মুসলিম সমাজে প্রভাব ফেলে, পক্ষান্তরে হজের উপকারিতা শুধুমাত্র ব্যক্তির জন্যই প্রযোজ্য। তাছাড়া জিহাদের মধ্যে প্রাণ বিসর্জন দেয়ার বিষয়টি সংযুক্ত যা হজের মধ্যে নেই। তাই জিহাদের গুরুত্ব হজের তুলনায় অধিক। এজন্যই অত্র হাদীসে জিহাদকে আগে উল্লেখ করা হয়েছে লোকদেরকে ঐ কাজে উদ্বুদ্ধ করার জন্য।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
২৫০৭-[৩] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে লোক আল্লাহরই (সন্তুষ্টির) জন্য হজ্জ/হজ করেছে এবং অশ্লীল কথাবার্তা বলেনি বা অশ্লীল কাজকর্ম করেনি। সে লোক হজ্জ/হজ হতে এমনভাবে বাড়ী (নিস্পাপ হয়ে) ফিরবে যেন সেদিনই তার মা তাকে প্রসব করেছে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «مِنْ حَجَّ فَلَمْ يَرْفُثْ وَلَمْ يَفْسُقْ رَجَعَ كَيَوْمِ وَلَدَتْهُ أمه»
ব্যাখ্যা: (فَلَمْ يَرْفُثْ) ‘‘আর সে অশ্লীল কথা বলেনি’’। হাফিয ইবনু হাজার বলেনঃ الرفث শব্দের অর্থ সহবাস করা। সহবাসের প্রতি ইঙ্গিত করা এবং অশ্লীল কথাকেও الرفث বলা হয়। وَلَمْ يَرْفُثْ আর ফাসিক্বী না করে। কামূসের লেখক বলেনঃ الرفث শব্দের অর্থ- আল্লাহর নির্দেশ পরিত্যাগ করা, তার অবাধ্য হওয়া এবং সঠিক ও সত্য পথ থেকে বেরিয়ে যাওয়া। رَجَعَ প্রত্যাবর্তন করল। অর্থাৎ- সে পরিণত হলো, অথবা গুনাহ থেকে ফিরে এলো অথবা হজ্জ/হজ সম্পাদন করে সে ফিরে এলো।
(كَيَوْمِ وَلَدَتْهُ أُمُّه) ‘‘সেদিনের ন্যায় যেদিন তার মা তাকে প্রসব করেছিল’’। অর্থাৎ- হজ্জ/হজ সম্পাদনকারী ব্যক্তি হজ্জের কার্য সম্পাদন করে জন্মদিনের ন্যায় নিষ্পাপ হয়ে গেল। এ হাদীস থেকে বুঝা যায় হজ্জ সম্পাদনকারীর কাবীরাহ্ ও সগীরাহ্ সকল প্রকার গুনাহ মাফ হয়ে যায়।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
২৫০৮-[৪] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এক ’উমরা হতে অপর ’উমরা পর্যন্ত সময়ের জন্য (গুনাহের) কাফফারাহ স্বরূপ আর কবূলযোগ্য হজের প্রতিদান জান্নাত ব্যতীত আর কিছু নয়। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْعُمْرَةُ إِلَى الْعُمْرَةِ كَفَّارَةٌ لِمَا بَيْنَهُمَا وَالْحَجُّ الْمَبْرُورُ لَيْسَ لَهُ جَزاءٌ إِلا الجنَّةُ»
ব্যাখ্যা: (كَفَّارَةٌ لِمَا بَيْنَهُمَا) ‘‘দু’ উমরা-এর মাঝের গুনাহ মোচনকারী’’। হাদীসের এ অংশটুকুতে ‘উমরা-এর ফাযীলাত বুঝানো হয়েছে। আর তা হলো এক ‘উমরা থেকে অপর ‘উমরা-এর মাঝখানে কোন গুনাহের কাজ হয়ে থাকলে ‘উমরা-এর কারণে তা মোচন হয়ে যাবে। ইবনু ‘আবদুল বার বলেনঃ এখানে গুনাহ দ্বারা সগীরাহ্ গুনাহ উদ্দেশ্য। হাফিয ইবনু হাজার বলেনঃ এ হাদীসটি বেশী বেশী ‘উমরা করা মুস্তাহাব হওয়ার দলীল।
(الْحَجُّ الْمَبْرُوْرُ) ‘মাকবূল হজ্জ/হজ’’। ইবনুল ‘আরাবী বলেনঃ যে হজ্জের পরে গুনাহের কাজ করা হয়নি তাই হজে মাবরুর তথা মাকবূল হজ্জ/হজ।
‘আলিমগণ বলেনঃ হজ্জে মাবরুর-এর শর্ত হলো হজ্জে ব্যয়কৃত মাল হালাল পন্থায় অর্জিত হতে হবে। হারাম পন্থায় অর্জিত মাল দ্বারা সম্পাদিত হজ্জ হজ্জে মাবরুর নয়। যদিও এ হজ্জ দ্বারা তার ওপর নির্ধারিত ফরয হজ্জ সম্পাদন হয়েছে বলে গণ্য কিন্তু এ হজ্জ/হজ দ্বারা তার কোন সাওয়াব অর্জিত হবে না। এটাই ইমাম আবূ হানীফা, মালিক ও শাফি‘ঈর অভিমত। পক্ষান্তরে ইমাম আহমাদ বলেনঃ হারাম মাল দ্বারা সম্পাদিত হজ্জের মাধ্যমে তার ওপর নির্ধারিত ফরয হজ্জ/হজ সম্পাদন হবে না।
(لَيْسَ لَه جَزَاءٌ إِلَّا الْجَنَّةُ) ‘‘জান্নাতই তার একমাত্র প্রতিদান’’। ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেনঃ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো তার শুধুমাত্র আংশিক গুনাহ ক্ষমা হবে না বরং অবশ্য সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
২৫০৯-[৫] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রমাযান মাসে ’উমরা পালন (সাওয়াবের দিক দিয়ে) হজের সমতুল্য। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «إِن عمْرَة فِي رَمَضَان تعدل حجَّة»
ব্যাখ্যা: (إِنَّ عُمْرَةً فِىْ رَمَضَانَ تَعْدِلُ حَجَّةً) ‘‘রমাযান মাসে ‘উমরা হজ্জের সমতুল্য’’। অর্থাৎ- রমাযান মাসে সম্পাদিত ‘উমরা-এর সাওয়াব হজ্জের সাওয়াবের সমতুল্য। এর অর্থ এ নয় যে, রমাযান মাসে ‘উমরা পালন করলে তার ওপর ফরয হজ্জ/হজ পালন হয়ে যাবে। কেননা বস্ত্তকে কোন বস্ত্তর সাথে তুলনা করার অর্থ এ নয় যে, এ বস্ত্তটি সর্বাংশে তুল্য বস্ত্তর সমান বরং এক বস্ত্তর সাথে অন্য বস্ত্তর কোন দিক দিয়ে মিল থাকলেই তাকে ঐ বস্ত্তর সাথে তুলনা করা যায়। যদিও সব দিক দিয়ে তার সমতুল্য নয়। এ হাদীস বর্ণনার কারণ এই যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বিদায় হজ্জ/হজ থেকে ফিরে এলেন তখন তিনি উম্মু সিনান আল আনসারী এক মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের সাথে হজ্জ/হজ সম্পাদন করতে তোমাকে কিসে বাধা প্রদান করল? জবাবে উক্ত মহিলা বলল যে, আমাদের মাত্র দু’টি উট আছে। একটির বাহনে তার স্বামী ও তার ছেলে হজ্জ/হজ গমন করেছিলেন। আরেকটি উট তিনি রেখে গেলেন যার দ্বারা আমরা পানি সরবরাহ করেছি। আর অন্য কোন বাহন না থাকায় আমি আপনাদের সাথে হজে যেতে পারিনি। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যখন রমাযান মাস আসবে তখন তুমি ‘উমরা করবে। কেননা রমাযান মাসে ‘উমরা সম্পাদন করা হজ্জ/হজ সম্পাদনের সমান সাওয়াব। বুখারীর বর্ণনায় রয়েছে, রমাযান মাসে ‘উমরা সমপাদন করা আমার সাথে হজ্জ/হজ সম্পাদন করার সমান সাওয়াব।
বিভিন্ন বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায়, উক্ত মহিলা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে হজ্জ/হজ সম্পাদন করতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু তিনি যখন তা করতে পারলেন না তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ রমাযান মাসে ‘উমরা সম্পাদন করলে আমার সাথে হজ্জ/হজ সম্পাদন করার মতো সাওয়াব অর্জিত হবে।
ইবনুল জাওযী বলেনঃ অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, সময়ের মর্যাদার কারণে কার্যের মর্যাদা বৃদ্ধি পায় যেমন মনোযোগ সহকারে ও ইখলাসের সাথে ‘আমল করার কারণে কাজের মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।
যেহেতু নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল ‘উমরা সম্পাদন করেছেন যিলকদ মাসে, তাই ‘আলিমগণ এ বিষয়ে সন্দেহে পতিত হয়েছেন যে, রমাযান মাসে ‘উমরা পালন উত্তম না-কি হজের মাসসমূহে ‘উমরা পালন করা উত্তম? অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, রমাযান মাসে ‘উমরা পালন করা উত্তম। হাফিয ইবনু হাজার বলেনঃ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত অন্য যে কোন লোকের জন্য রমাযান মাসে ‘উমরা পালন করা উত্তম। পক্ষান্তরে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং যা করেছেন তার জন্য তাই উত্তম। কেননা জাহিলী যুগের লোকেরা মনে করত যে, হজের মাসসমূহে ‘উমরা করা বৈধ নয়। তাই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ্জের মাসে ‘উমরা পালন করে দেখিয়ে দিলেন যে, হজ্জের মাসে ‘উমরা পালন করা বৈধ।
অত্র হাদীসে রমাযান মাসে ‘উমরা পালন করতে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। এতে এটাও প্রতীয়মান হয় যে, একাধিকবার ‘উমরা করা বৈধ তথা মুস্তাহাব, আর এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন ইমাম আবূ হানীফা এবং ইমাম শাফি‘ঈ।
ইমাম মালিক বৎসরে একাধিক ‘উমরা করা মাকরূহ মনে করেন। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল দশদিনের কমে ‘উমরা করা মাকরূহ্ মনে করেন।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
২৫১০-[৬] উক্ত রাবী [’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (হজের সফরে) ’রওহা’ নামক জায়গায় এক আরোহী দলের সাক্ষাৎ পেলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, এরা কারা? তারা বললো, ’আমরা মুসলিম’। অতঃপর তারা জিজ্ঞেস করলো, ’আপনি কে?’ তিনি বললেন, (আমি) আল্লাহর রসূল! তখন একজন মহিলা একটি শিশুকে উঠিয়ে ধরলেন এবং বললেন, (হে আল্লাহর রসূল!) এর কি হজ্জ/হজ হবে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, হ্যাঁ, তবে সাওয়াব হবে তোমার। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْهُ قَالَ: إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَقِيَ رَكْبًا بِالرَّوْحَاءِ فَقَالَ: «مَنِ الْقَوْمُ؟» قَالُوا: الْمُسْلِمُونَ. فَقَالُوا: مَنْ أَنْتَ؟ قَالَ: «رَسُولُ اللَّهِ» فَرَفَعَتْ إِلَيْهِ امْرَأَةٌ صَبِيًّا فَقَالَتْ: أَلِهَذَا حَجٌّ؟ قَالَ: «نَعَمْ وَلَكِ أَجَرٌ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যা: (أَلِهٰذَا حَجٌّ) ‘‘এ শিশুটির হজ্জ হবে কি?’’ অর্থাৎ- এ শিশুটি যদি হজ্জ/হজ পালন করে তাহলে সে হজের সাওয়াব পাবে কি? (قَالَ: نَعَمْ) ‘‘তিনি বললেনঃ হ্যাঁ (وَلَكِ أَجَرٌ) ‘‘তোমারও সাওয়াব হবে’’। ইমাম নাবাবী বলেনঃ এর অর্থ হলো ঐ শিশুকে বহন করার জন্য এবং তাকে ঐ সমস্ত কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য তিনি সাওয়াব পাবেন যে সমস্ত কাজ থেকে ইহরামধারী ব্যক্তি বিরত থাকেন।
অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, শিশুকে সাথে নিয়ে হজ্জ/হজ করা বিধিসম্মত। এতে ‘উলামাগণের মাঝে কোন বিরোধ নেই। এতে এটাও জানা গেল যে, শিশু ছোট হোক বা বড় হোক তার হজ্জ/হজ বিশুদ্ধ। তবে শিশুর পক্ষ থেকে এ হজ্জটি নফল হজ্জ বলে গণ্য হবে। বালেগ হওয়ার পর হজ্জ ফরয হওয়ার শর্তসমূহ পাওয়া গেলে তাকে পুনরায় হজ্জ করতে হবে।
কোন শিশু হজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধার পর ‘আরাফাতে অবস্থান করার পূর্বে বালেগ হলে তার বিধান কি? এ নিয়ে ‘উলামাগণের মাঝে মতভেদ রয়েছে।
ইমাম মালিক-এর মতে ইহরাম বাঁধার পর ‘আরাফাতে অবস্থানের পূর্বে শিশু বালেগ হলে অনুরূপভাবে গোলামকে আযাদ করা হলে তারা ঐ অবস্থায় হজের কাজ সম্পাদন করবে। তবে তাদের উভয়কে পুনরায় ফরয হজ্জ/হজ সম্পাদন করতে হবে।
ইমাম আবূ হানীফার মতে তারা যদি নতুন করে ইহরাম বেঁধে হজের বাকী কাজ সম্পন্ন করে তাহলে এটিই তাদের জন্য ফরয হজ্জ/হজ বলে গণ্য হবে।
ইমাম শাফি‘ঈর মতে শিশু ইহরাম বাঁধার পর ‘আরাফাতে অবস্থানের পূর্বে বালেগ হলে অনুরূপভাবে গোলাম ইহরাম বাঁধার পর তাকে আযাদ করা হলে ঐ ইহরামেই তারা ‘আরাফাতে অবস্থানসহ হজ্জের বাকী কাজ সম্পাদন করলে এ হজ্জই তাদের জন্য যথেষ্ট হবে। তাদের পুনরায় ফরয হজ্জ/হজ করতে হবে না।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
২৫১১-[৭] উক্ত রাবী [’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার খাস্’আম গোত্রের এক মহিলা জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রসূল! বান্দাদের ওপর আল্লাহ তা’আলার ফরয করা হজ্জ/হজ আমার পিতার ওপরও বর্তেছে, কিন্তু আমার পিতা অতিশয় বৃদ্ধ, যিনি সওয়ারীর উপরে বসে থাকতে পারে না। তাই আমি কি তার পক্ষ হতে হজ্জ/হজ আদায় করতে পারি? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, হ্যাঁ, পারো। এটা বিদায় হজের ঘটনা। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْهُ قَالَ: إِنَّ امْرَأَةً مِنْ خَثْعَمَ قَالَتْ: يَا رَسُول الله إِن فَرِيضَة الله عِبَادِهِ فِي الْحَجِّ أَدْرَكَتْ أَبِي شَيْخًا كَبِيرًا لَا يَثْبُتُ عَلَى الرَّاحِلَةِ أَفَأَحُجُّ عَنْهُ؟ قَالَ: «نعم» ذَلِك حجَّة الْوَدَاع
ব্যাখ্যা: (أَفَأَحُجُّ عَنْهُ) ‘‘আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ্জ/হজ সম্পাদন করব?’’ অর্থাৎ- আমার জন্য কি এটা বৈধ হবে যে, ঐ বৃদ্ধের পক্ষ হতে তার পরিবর্তে আমি তার হজ্জের কাজ সম্পাদন করব। (قَالَ: نَعَمْ) ‘‘তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ হ্যাঁ।’’ অর্থাৎ- তুমি তার পক্ষ থেকে হজ্জ সম্পাদন করলে তা তার জন্য যথেষ্ট হবে।
অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, পুরুষের পক্ষ হতে কোন মহিলা অনুরূপভাবে মহিলার পক্ষ থেকে কোন পুরুষ হজ্জ/হজ করলে তা বৈধ ও বিশুদ্ধ। ইবনু বাত্ত্বাল বলেনঃ এতে কোন মতভেদ নেই যে, পুরুষের পক্ষ থেকে মহিলার এবং মহিলার পক্ষ থেকে পুরুষের হজ্জ/হজ করা বৈধ। তবে হাসান বাসরীর মতে পুরুষের পক্ষ থেকে মহিলার হজ্জ/হজ সম্পাদন করা বৈধ নয়। কেননা হজ্জে মহিলার জন্য এমন পোষাক পরিধান করা বৈধ যা পুরুষের জন্য বৈধ নয়। অতএব পুরুষের পক্ষ থেকে পুরুষকেই হজ্জ করতে হবে। অত্র হাদীস তার এ মত প্রত্যাখ্যান করে। অত্র হাদীস আরো প্রমাণ করে যে, অপারগ ব্যক্তির ওপর হজ্জের অন্যান্য শর্ত পাওয়া গেলে এবং তার পক্ষ থেকে হজ্জ/হজ সম্পাদন করার লোক পাওয়া গেলে তাকে হজ্জ/হজ পালন করতে অর্থাৎ- অন্য লোক দিয়ে তার পক্ষ থেকে হজ্জ/হজ করাতে হবে। ইমাম আবূ হানীফা ও ইমাম শাফি‘ঈর অভিমত এটাই।
পক্ষান্তরে ইমাম মালিক-এর মতে স্বয়ং হজ্জ/হজ সম্পাদনে সক্ষম না হলে তার পক্ষ থেকে অন্যকে দিয়ে হজ্জ/হজ করানো ফরয নয়। কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيْلًا ‘‘যে ব্যক্তি তাতে পৌঁছতে সক্ষম’’- (সূরা আ-লি ‘ইমরান ৩ : ৯৭)। আর অপারগ ব্যক্তি সক্ষম নয়। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বর্ণিত খাস্‘আমিয়াহ্ মহিলার হাদীসটি ইমাম মালিক-এর এ মতকে প্রত্যাখ্যান করে।
তবে এ বিষয়ে কোন মতভেদ নেই যে, কোন ব্যক্তির ওপর সুস্থ অবস্থায় হজ্জ/হজ ফরয হওয়ার পর যদি তিনি অসুস্থ হন যার ফলে তিনি স্বয়ং হজ্জ/হজ সম্পাদন করতে অক্ষম হন তাহলে তার পক্ষ থেকে অবশ্যই হজ্জ/হজ সম্পাদন করতে হবে।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
২৫১২-[৮] উক্ত রাবী [’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)] হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, এক লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রসূল! আমার বোন হজ্জ/হজ পালন করার জন্য মানৎ করেছিলেন; কিন্তু (তা আদায় করার আগেই) তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার বোনের কোন ঋণ থাকলে তুমি তা পরিশোধ করতে কিনা? সে বললো, হ্যাঁ আদায় করতাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তবে তুমি আল্লাহর ঋণ পরিশোধ করো; কেননা তা আদায় করা অধিক উপযোগী। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْهُ قَالَ: أَتَى رَجُلٌ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: إِنَّ أُخْتِي نَذَرَتْ أَنْ تَحُجَّ وَإِنَّهَا مَاتَتْ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَوْ كَانَ عَلَيْهَا دَيْنٌ أَكَنْتَ قَاضِيَهُ؟» قَالَ: نَعَمْ قَالَ: «فَاقْضِ دَيْنَ اللَّهِ فَهُوَ أَحَقُّ بِالْقَضَاءِ»
ব্যাখ্যা: (لَوْ كَانَ عَلَيْهَا دَيْنٌ أَكَنْتَ قَاضِيَه) ‘‘তার ওপর কারো পাওনা থাকলে তা কি তুমি আদায় করতে?’’ (قَالَ: نَعَمْ) ‘‘লোকটি বললঃ হ্যাঁ।’’ (قَالَ: فَاقْضِ دَيْنَ اللّٰهِ فَهُوَ أَحَقُّ بِالْقَضَاء) ‘‘নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি (তার পক্ষ থেকে) আল্লাহর পাওনা পরিশোধ করো। কেননা তা পরিশোধ করার ক্ষেত্রে অধিক হাক্বদার।’’ অত্র হাদীসে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, কোন ব্যক্তির যিম্মাতে আল্লাহর কোন হাক্ব থাকাবস্থায় সে মারা গেলে যেমন হজ্জ/হজ, কাফফারাহ অথবা মানৎ তার পক্ষ থেকে তা আদায় করা ওয়াজিব। এতে এ প্রমাণও পাওয়া যায় হজ্জের মানৎ করে তা আদায় না করে কেউ মারা গেলে তার পক্ষ থেকে ওয়ারিস বা অন্য কেউ হজ্জ/হজ সম্পাদন করলে তা যথেষ্ট হবে। এতে এটাও জানা যায় যে, মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে ঋণ পরিশোধ করার বিষয়টি সমাজে প্রচলিত ছিল। এজন্যই মানুষের প্রাপ্যের সাথে আল্লাহর প্রাপ্যকে তুলনা করা হয়েছে। মৃত ব্যক্তি ওয়াসিয়্যাত না করা সত্ত্বেও তার পক্ষ থেকে হজ্জ/হজ করা বিধিসম্মত, অত্র হাদীসে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। অনুরূপভাবে সকল প্রকার আর্থিক পাওনা মৃতের পক্ষ থেকে পরিশোধ করা বৈধ। হাফিয ইবনু হাজার বলেনঃ কোন ব্যক্তির ওপর হজ্জ/হজ ফরয হওয়ার পর হজ্জ/হজ সম্পাদন করার পূর্বে মারা গেলে তার রেখে যাওয়া সম্পদ বণ্টনের পূর্বেই তার মাল দ্বারা হজ্জ/হজ করানো ওয়াজিব যেমনটি ঋণগ্রস্থ ব্যক্তির সম্পদ বণ্টনের পূর্বে তার মাল থেকে ঋণ পরিশোধ করা ওয়াজিব।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
২৫১৩-[৯] উক্ত রাবী [’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন পুরুষ যেন কক্ষনো কোন স্ত্রীলোকের সাথে এক জায়গায় নির্জনে একত্র না হয়, আর কোন স্ত্রীলোক যেন কক্ষনো আপন কোন মাহরাম ব্যতীত একাকিনী সফর না করে। তখন এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রসূল! অমুক অমুক যুদ্ধে আমার নাম লেখানো হয়েছে। আর আমার স্ত্রী একাকিনী হজের উদ্দেশে বের হয়েছে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, যাও তুমি তোমার স্ত্রীর সাথে হজ্জ/হজ করো। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ وَلَا تُسَافِرَنَّ امْرَأَةٌ إِلَّا وَمَعَهَا مَحْرَمٌ» . فَقَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللَّهِ اكْتُتِبْتُ فِي غَزْوَةِ كَذَا وَكَذَا وَخَرَجَتِ امْرَأَتِي حَاجَّةً قَالَ: «اذهبْ فاحجُجْ مَعَ امرأتِكَ»
ব্যাখ্যা: ‘‘মাহরাম ব্যক্তি ছাড়া কোন মহিলা পর-পুরুষের সাথে মিলিত হবে না এবং সফরও করবে না’’। অত্র হাদীসে স্বামীর কথা উল্লেখ নেই। আবূ সা‘ঈদ আল খুদরী (রাঃ)-এর বরাতে বুখারী, মুসলিমে স্বামীর কথা উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ- স্বামী অথবা মাহরাম ছাড়া কোন মহিলা পর-পুরুষের সাথে মিলিত হবে না এবং সফর করবে না। মাহরাম বলা হয় এমন পুরুষকে উক্ত মহিলার জন্য যাকে বিবাহ করা চিরস্থায়ীভাবে হারাম, যেমন- ছেলে, বাবা, ভাই, চাচা, মামা, দাদা, নানা ইত্যাদি। অত্র হাদীসটি প্রমাণ করে যে, স্বামী অথবা মাহরাম ছাড়া কোন মহিলার জন্য সফর করা হারাম। এ হাদীসে কোন দূরত্ব অথবা সময়ের কথা উল্লেখ নেই। কোন হাদীসে তিনদিন, কোন হাদীসে দু’দিন, কোন হাদীসে একদিন, কোন হাদীসে তিন মাইলের অধিক সফর না করার উল্লেখ রয়েছে। উল্লিখিত সকল বর্ণনার দিকে লক্ষ্য করলে প্রতীয়মান হয় যে, কোন মহিলার পক্ষে স্বামী অথবা মাহরাম ব্যতীত তিন মাইলের অধিক ভ্রমণ করা বৈধ নয়।
(اِذْهَبْ فَاحْجُجْ مَعَ اِمْرَأَتِكَ) ‘‘তুমি গিয়ে তোমার স্ত্রীর সাথে হজ্জ/হজ সম্পাদন করো’’। হাদীসের এ অংশ প্রমাণ করে যে, স্বামী অথবা মাহরাম ব্যতীত কোন মহিলার জন্য হজের সফর বৈধ নয় যদি এর দূরত্ব তিন মাইলের বেশী হয়। দারাকুত্বনী ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন মহিলা মাহরাম ব্যতীত কখনো হজ্জ/হজ করবে না। অতএব যারা বলেন যে, হজ্জের সফরের জন্য মাহরাম শর্ত নয়- এটা তাদের মনগড়া উক্তি। যা গ্রহণযোগ্য নয়।
অত্র হাদীস এও প্রমাণ করে যে, কোন মহিলার ওপর হজ্জ/হজ ফরয হলে তাকে হজ্জ/হজ করতে বাধা দেয়া স্বামীর জন্য বৈধ নয় যদি তার সাথে মাহরাম ব্যক্তি সফর করে।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
২৫১৪-[১০] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট জিহাদে যাবার জন্য অনুমতি চাইলাম, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমাদের জিহাদ হলো হজ্জ/হজ। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: اسْتَأْذَنْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الْجِهَادِ. فَقَالَ: «جهادكن الْحَج»
ব্যাখ্যা: (جِهَادُكُنَّ الْحَجُّ) ‘‘তোমাদের জিহাদ হলো হজ্জ/হজ’’। অর্থাৎ- তোমাদের ওপর জিহাদ করা ফরয নয়। সক্ষম হলে, অর্থাৎ- হজ্জের শর্তসমূহ পূর্ণ হলে তোমার ওপর হজ্জ/হজ করা ফরয। অত্র হাদীসে হজ্জকে জিহাদ বলা হয়েছে। এজন্য যে, হজ্জ সম্পাদন করার জন্য নাফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে হয়। তাছাড়া জিহাদে, যেমন- সফরের কষ্ট স্বীকার করতে হয় অনুরূপভাবে হজ্জের জন্য সফরের কষ্ট এবং শারীরিক কষ্ট স্বীকার করতে, আর পরিবার-পরিজন ও স্বীয় মাতৃভূমি ত্যাগ করে কষ্ট সহ্য করতে হয়। আর এ কাজগুলো জিহাদের মধ্যেও করতে হয়।
ইবনু বাত্ত্বাল বলেনঃ ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বর্ণিত হাদীস প্রমাণ করে যে, মহিলাদের ওপর জিহাদ ফরয নয় বরং তারা আল্লাহ তা‘আলার বাণীঃ انْفِرُواْ خِفَافاً وَثِقَالًا (সূরা আত্ তাওবাহ্ ৯ : ৪১ আয়াত)-এর অন্তর্ভুক্ত নয়। এটি সর্বসম্মত বিষয়। তবে (جِهَادُكُنَّ الْحَجُّ) এর অর্থ এ নয় যে, তারা নফল জিহাদও করতে পারবে না। বরং হাদীসের মর্ম হলো মহিলাদের জন্য জিহাদের চাইতে হজ্জ/হজ উত্তম। তাদের উপর জিহাদ এ জন্য ফরয নয় যে, মহিলাদের পুরুষদের থেকে পৃথক থাকা এবং তাদের থেকে পর্দা করা জরুরী। অথচ জিহাদ এর বিপরীত। তাই তাদের উপর জিহাদ ফরয নয়।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
২৫১৫-[১১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন মহিলা কোন মাহরাম ব্যতীত একদিন ও এক রাতের পথও সফর করবে না। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تُسَافِرُ امْرَأَةٌ مَسِيرَةَ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ إِلَّا وَمَعَهَا ذُو محرم»
ব্যাখ্যা: (لَا تُسَافِرُ امْرَأَةٌ) ‘‘কোন মহিলা সফর করবে না’’। চাই সে সফর হজ্জের জন্য হোক অথবা অন্য কোন কারণে হোক। আর সফর মটর গাড়ীতে হোক, উড়োজাহাজে হোক অথবা রেলগাড়ীতেই হোক, যে কোন পন্থায়ই হোক। মাহরাম ব্যতীত মহিলার জন্য সকল প্রকার সফরই হারাম। আর মহিলা যুবতীই হোক আর বৃদ্ধাই হোক সবার ক্ষেত্রে একই হুকুম প্রযোজ্য।
‘উলামাগণের মধ্যে এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে যে, কোন মহিলা যখন সম্পদশালী হয় এবং তার যদি মাহরাম বা স্বামী না থাকে তাহলে তার ওপর কি হজ্জ/হজ ফরয? সঠিক কথা এই যে, কোন মহিলার পক্ষেই কোন সফরের জন্য মাহরাম অথবা স্বামী ব্যতীত সফর করা বৈধ নয়। অতএব যে মহিলার স্বামী বা মাহরাম নেই এ ওজর থাকার কারণে তার উওপর হজ্জ/হজ ফরয নয়।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
২৫১৬-[১২] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাবাসীদের জন্যে ’যুলহুলায়ফাহ্’-কে, শাম বা সিরিয়াবাসীদের জন্য ’জুহফাহ্’-কে আর নাজদবাসীদের জন্য ’ক্বরনুল মানাযিল’-কে এবং ইয়ামানবাসীদের জন্য ’ইয়ালাম্লাম্’-কে মীকাত নির্দিষ্ট করেছেন। এসব স্থানগুলো এ সকল স্থানের লোকজনের জন্য আর অন্য স্থানের লোকেরা যখন এ স্থান দিয়ে আসবে তাদের জন্য, যারা হজ্জ/হজ বা ’উমরার ইচ্ছা করে। আর যারা এ সীমার ভিতরে অবস্থান করবে, তাদের ইহরামের স্থান হবে তাদের ঘর- এভাবে ক্রমান্বয়ে কাছাকাছি লোকেরা স্বীয় বাড়ি হতে এমনকি মক্কাবাসীরা ইহরাম বাঁধবে মক্কা হতেই। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: وَقَّتَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِأَهْلِ الْمَدِينَةِ: ذَا الْحُلَيْفَةِ وَلِأَهْلِ الشَّامِ: الْجُحْفَةَ وَلِأَهْلِ نَجْدٍ: قَرْنَ الْمَنَازِلِ وَلِأَهْلِ الْيَمَنِ: يَلَمْلَمَ فَهُنَّ لَهُنَّ وَلِمَنْ أَتَى عَلَيْهِنَّ مِنْ غَيْرِ أَهْلِهِنَّ لِمَنْ كَانَ يُرِيدُ الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ فَمَنْ كَانَ دُونَهُنَّ فَمُهَلُّهُ مِنْ أَهْلِهِ وَكَذَاكَ وَكَذَاكَ حَتَّى أهل مَكَّة يهلون مِنْهَا
ব্যাখ্যা: যুলহুলায়ফাহ্ঃ মদীনার নিকটবর্তী একটি প্রসিদ্ধ স্থান। ইমাম নাবাবীর মতে মসজিদে নাবাবী হতে এর দূরত্ব ছয় মাইল। ইবনু হাযম-এর মতে এর দূরত্ব মদীনাহ্ হতে চার মাইল। এখানে ‘‘বী’রে ‘আলী’’ নামক একটি কূপ রয়েছে। বর্তমানে এ স্থানটি আব্ ইয়ারে ‘আলী নামে পরিচিত। এটিই মদীনাহবাসীদের মীকাত।
জুহফাহ্ঃ মক্কা হতে উত্তর-পশ্চিম দিকে ১২০ মাইল দূরে অবস্থিত একটি স্থান। মরক্কো, মিসর ও সিরিয়ার অধিবাসীগণের এটি মীকাত। বর্তমানে উক্ত স্থানটি চেনার বিশেষ কোন নিদর্শন না থাকার কারণে লোকজন রাবেগ নামক স্থান থেকে ইহরাম বেঁধে থাকেন।
ক্বরনুল মানাযিলঃ মক্কা হতে ৪২ মাইল পূর্বে একটি পাহাড়ী এলাকার নাম। এটি নাজদবাসীদের মীকাত।
ইয়ালামলাম্ঃ মক্কা থেকে ৩০ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত একটি পাহাড়। এটি ইয়ামানবাসীদের মীকাত। পাকভারত উপমহাদেশের সমুদ্রপথে গমনকারী যাত্রীগণও ইয়ামানে উপনীত হয়ে এ ইয়ালামলাম পাহাড়ের দক্ষিণে অবস্থানকালে ইহরাম বাঁধেন।
(هُنَّ لَهُنَّ وَلِمَنْ أَتٰى عَلَيْهِنَّ مِنْ غَيْرِ أَهْلِهِنَّ) উক্ত বর্ণিত মীকাত তাদের জন্য যাদের জন্য তা উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাদেরও জন্য এগুলো মীকাত যারা এর অধিবাসী নয় অথচ এ পথেই তারা অতিক্রম করে। যেমন- একজন বাংলাদেশী যিনি মদীনাতে অবস্থান করছেন তিনি যদি হজ্জ/হজ করতে চান তাহলে তার মীকাত যুলহুলায়ফাহ্। অথচ তার প্রকৃত মীকাত উড়োজাহাজে ক্বরনুল মানাযিল আর সমুদ্র পথে ইয়ালামলাম্।
(لِمَنْ كَانَ يُرِيدُ الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ) ‘‘যে ব্যক্তি হজ্জ/হজ অথবা ‘উমরা করতে চায়’’। এতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, হজ্জ/হজ অথবা ‘উমরাতে গমনেচ্ছু ব্যক্তির জন্য ইহরাম না বেঁধে মীকাত অতিক্রম করা বৈধ নয়। তবে কোন ব্যক্তি যদি হজ্জ/হজ অথবা ‘উমরা করার ইচ্ছা ব্যতিরেকে সফরে গমন করে তার জন্য ইহরাম ছাড়াই এ মীকাতগুলো অতিক্রম করা বৈধ। তবে এ বিষয়ে ‘উলামাগণের মাঝে মতভেদ রয়েছে।
(১) ইমাম যুহরী, হাসান বাসরী, ইমাম শাফি‘ঈ-এর একটি ক্বওল, ইবনু ওয়াহ্ব-এর বর্ণনা অনুযায়ী ইমাম মালিক এবং দাঊদ ইবনু ‘আলী ও তাদের অনুসারীদের মতে ইহরাম ব্যতীত মক্কাতে প্রবেশে কোন ক্ষতি নেই।
(২) ‘আত্বা ইবনু আবী রবাহ, লায়স ইবনু সা‘দ, সাওরী, আবূ হানীফা এবং তার অনুসারীবৃন্দ, বিশুদ্ধ বর্ণনানুযায়ী ইমাম মালিক, শাফি‘ঈ-এর প্রসিদ্ধ মত, আহমাদ, আবূ সাওর প্রমুখদের মতে মীকাতের বাইরে অবস্থানকারীদের জন্য ইহরাম ব্যতিরেকে মক্কাতে প্রবেশ করা বৈধ নয়।
কেউ যদি ইহরাম ছাড়াই প্রবেশ করে তবে খারাপ কাজ করল তবে এজন্য ইমাম শাফি‘ঈর মতে কোন প্রকার কাফফারা নেই। আর ইমাম আবূ হানীফার মতে কাফফারাহ স্বরূপ হজ্জ/হজ অথবা ‘উমরা করতে হবে।
(فَمَنْ كَانَ دُونَهُنَّ فَمُهَلُّه مِنْ أَهْلِه) আর যে ব্যক্তি মীকাতের অভ্যন্তরের অধিবাসী স্বীয় আবাসই তার ইহরাম বাঁধার স্থান। অর্থাৎ- তাকে মীকাতের বাইরে যেয়ে ইহরাম বাঁধতে হবে না বরং স্বীয় আবাসস্থল থেকেই ইহরাম বাঁধবে।
(وَأَهْلُ مَكَّةَ مِنْ مَكَّةَ) আর মক্কাবাসীগণ মক্কা থেকেই ইহরাম বাঁধবে। এ বিধান হজের জন্য খাস।
মক্কাহ্বাসী যদি ‘উমরা করতে চায় তবে হারাম এলাকার বাইরে গিয়ে ইহরাম বাঁধতে হবে। যেমনটি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে তান্‘ঈমে প্রেরণ করেছিলেন ‘উমরা-এর ইহরাম বাঁধার জন্য।
মীকাতে যাওয়াব পূর্বেই ইহরাম বাঁধা যাবে কি-না? এ বিষয়ে ‘উলামাগণের মাঝে ভিন্নমত রয়েছে।
ইবনু হাযম বলেনঃ কারো জন্য বৈধ নয় যে, মীকাতে পৌঁছার পূর্বেই হজ্জ/হজ অথবা ‘উমরার জন্য ইহরাম বাঁধবে। কেউ যদি মীকাতে পৌঁছার পূর্বেই ইহরাম বাঁধে। অতঃপর মীকাত অতিক্রম করে তবে তার হজ্জ/হজ বা ‘উমরা কোনটাই হবে না। তবে মীকাতে পৌঁছার পর যদি নতুন করে ইহরামের নিয়্যাত করে তাহলে তার ইহরাম বিশুদ্ধ হবে।
জমহূর ‘উলামাগণের মতে মীকাতে পৌঁছাবার পূর্বেই ইহরাম বাঁধলে তা বৈধ হবে বরং হানাফী এবং শাফি‘ঈ উলামাগণের মতে, মীকাতে পৌঁছার পূর্বে ইহরাম বাঁধা উত্তম। ইমাম মালিক-এর মতে মীকাতে পৌঁছাবার পূর্বে ইহরাম বাঁধা মাকরূহ। আর এ অভিমতটিই অধিক সঠিক। আল্লাহই ভাল জানেন।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
২৫১৭-[১৩] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ মদীনাবাসীদের মীকাত হলো ’যুলহুলায়ফাহ্’। অন্য পথে (সিরিয়ার পথে) প্রবেশ করলে ’জুহফাহ্’, ইরাকবাসীদের মীকাত হলো ’যা-তু ’ইরক্ব’ এবং নাজদবাসীদের মীকাত হলো ’ক্বরনুল মানাযিল’ এবং ইয়ামানবাসীদের মীকাত হলো ’ইয়ালাম্লাম্। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ جَابِرٍ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مُهَلُّ أَهْلِ الْمَدِينَةِ مِنْ ذِي الْحُلَيْفَةِ وَالطَّرِيقُ الْآخَرُ الْجُحْفَةُ وَمُهَلُّ أَهْلِ الْعِرَاقِ مِنْ ذَاتِ عِرْقٍ وَمُهَلُّ أَهْلِ نَجْدٍ قَرْنٌ وَمُهَلُّ أَهْلِ الْيَمَنِ يَلَمْلَمُ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যা: (وَمُهَلُّ أَهْلِ الْعِرَاقِ مِنْ ذَاتِ عِرْقٍ) ‘ইরাকবাসীদের ইহরাম বাঁধার স্থান যাতু ‘ইরক্ব। যাতু ‘ইরক্ব মক্কা হতে ৪৮ মাইল দূরে অবস্থিত যা তিহামা ও নাজদের মধ্যবর্তী জায়গায় অবস্থিত। এটা ‘ইরক্ব ও ইরানবাসীদের মীকাত। অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, ‘ইরাকবাসীদের মীকাত যাতু ‘ইরক্ব। এর স্বপক্ষে ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে আহমাদ, আবূ দাঊদ, নাসায়ী, ত্বহাবী ও দারাকুত্বনীতে সহীহ সনদে হাদীস বর্ণিত রয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
২৫১৮-[১৪] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মোট চারবার ’উমরা পালন করেছেন। হজের সাথে ’উমরা ছাড়া প্রত্যেকটি ’উমরা পালন করেছেন যিলকদ মাসে। এক ’উমরা করেছেন হুদায়বিয়াহ্ নামক স্থান হতে যিলকদ মাসে (আগমনকারী বৎসরে), আর এক ’উমরা করেছেন জি’রানাহ্ নামক স্থান থেকে, যেখানে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হুনায়ন যুদ্ধেলব্ধ গনীমাতের মাল বণ্টন করেছিলেন যিলকদ মাসে। আর এক ’উমরা তিনি পালন করেছেন (দশম হিজরীতে তাঁর বিদায়) হজের মাসে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: اعْتَمَرَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَرْبَعٌ عُمَرٍ كُلُّهُنَّ فِي ذِي الْقَعْدَةِ إِلَّا الَّتِي كَانَتْ مَعَ حَجَّتِهِ: عُمْرَةً مِنَ الْحُدَيْبِيَةِ فِي ذِي الْقَعْدَةِ وَعُمْرَةً مِنَ الْعَامِ الْمُقْبِلِ فِي ذِي الْقَعْدَةِ وَعُمْرَةً مِنَ الْجِعْرَانَةِ حَيْثُ قَسَّمَ غَنَائِمَ حُنَيْنٍ فِي ذِي الْقَعْدَةِ وَعُمْرَةً مَعَ حَجَّتِهِ
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরতের পর চারটি ‘উমরা করেছেন। এর সবগুলোই যিলকদ মাসে করেছেন। বিদায় হজের ‘উমরাটি যদিও যিলহজ্জ মাসে করেছেন তথাপি তার জন্য ইহরাম বাঁধা হয় যিলকদ মাসেই। তাই বলা হয়ে থাকে যে, এ চারটি ‘উমরাই তিনি যিলকদ মাসে করেছেন। এর কারণ এই যে, জাহিলী যুগের লোকেরা মনে করত যে, হজ্জের মাসসমূহে (শা‘বান, যিলকদ, যিলহাজ্জ) ‘উমরা করা সবচাইতে গর্হিত কাজ। তাই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চারটি ‘উমরা হজ্জের মাসে সম্পাদন করেছেন যাতে বুঝতে পারা যায় যে, জাহিলী যুগের লোকেরা যা বলত তা বাতিল।
বারা ও ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’বার ‘উমরা করেছেন। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’টি ‘উমরা করেছেন যিলকদ মাসে এবং একটি ‘উমরা করেছেন শাও্ওয়াল মাসে।
‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ্জের পূর্বে যিলকদ মাসে তিনটি ‘উমরা করেছেন।
আনাস (রাঃ) বর্ণিত অত্র হাদীস এবং যে সমস্ত হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি দু’বার ‘উমরা করেছেন এর সমন্বয় এই যে, তারা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হজ্জের সাথে ‘উমরা গণ্য করেননি। আর তা ছিল যিলহজ্জ মাসে। অনুরূপভাবে হুদায়বিয়ার ‘উমরাকেও তারা গণ্য করেননি। এজন্য যে, তা পূর্ণতা পায়নি মুশরিকদের বাধা দেয়ার কারণে। আর যারা বলেছেন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার ‘উমরা করেছেন তারা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হজ্জের সাথে ‘উমরাটি গণ্য করেননি তা যিলহজ্জ মাসে হজ্জের সাথে হওয়ার কারণে, যেমনটি ‘উমার (রাঃ)-এর বর্ণনায় এসেছে। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত শাও্ওয়াল মাসের ‘উমরার সমন্বয় এই যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা শুরু করেছিলেন শাও্ওয়াল মাসের শেষের দিকে আর তা সমাপ্তি ঘটেছে যিলকদ মাসে।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
২৫১৯-[১৫] বারা ইবনু ’আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (দশম হিজরীতে তাঁর বিদায়) হজ্জ/হজ পালন করার আগে যিলকদ মাসে দু’বার ’উমরা করেছিলেন। (বুখারী)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ قَالَ: اعْتَمَرَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي ذِي الْقَعْدَةِ قَبْلَ أَنْ يَحُجَّ مَرَّتَيْنِ . رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা কুসতুলানী বলেনঃ বারা ইবনু ‘আযিব (রাঃ)-এর বক্তব্য প্রমাণ করে না যে, অন্য ‘উমরা পালন করেননি। অথবা বারা (রাঃ) হুদায়বিয়ার ‘উমরাহকে গণ্য করেননি এজন্য যে, তা পূর্ণতা পায়নি। তেমনিভাবে হজ্জের সাথের ‘উমরাটিও গণ্য করেননি এজন্য যে, তা হজ্জের কার্যসমূহের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) এবং ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর বক্তব্য নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিলকদ মাস ছাড়া ‘উমরা করেননি। এটি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হজ্জের সাথের ‘উমরা-এর বিরোধী নয়। কেননা এ ‘উমরাটি শুরু হয়েছিল যিলকদ মাসে শেষ হয়েছে যিলহজ্জ মাসে।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
২৫২০-[১৬] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হে মানবজাতি! আল্লাহ তা’আলা তোমাদের ওপর হজ্জ/হজ ফরয করেছেন। এটা শুনে আক্বরা’ ইবনু হাবিস দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! এটা (হজ্জ/হজ) কি প্রতি বছর? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, যদি আমি বলতাম হ্যাঁ, তবে তা (প্রত্যেক বছর) ফরয হয়ে যেতো। আর যদি ফরয হয়ে যেতো, তোমরা তা সম্পাদন করতে না এবং করতে সমর্থও হতে না। হজ্জ/হজ (জীবনে ফরয) একবারই। যে বেশী করলো সে নফল করলো। (আহমাদ, নাসায়ী, ও দারিমী)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ عَلَيْكُمُ الْحَجَّ» . فَقَامَ الْأَقْرَعُ بْنُ حَابِسٍ فَقَالَ: أَفِي كُلِّ عَامٍ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: لَوْ قُلْتُهَا: نَعَمْ لَوَجَبَتْ وَلَوْ وَجَبَتْ لَمْ تَعْمَلُوا بِهَا وَلَمْ تَسْتَطِيعُوا وَالْحَجُّ مَرَّةٌ فَمَنْ زَادَ فَتَطَوُّعٌ . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالنَّسَائِيّ والدارمي
ব্যাখ্যা: (أَفِىْ كُلِّ عَامٍ) প্রতি বৎসরই হজ্জ/হজ করা কি ফরয? যেমন সওম এবং যাকাত প্রতি বৎসরই ফরয।
(لَوْ قُلْتُهَا: نَعَمْ لَوَجَبَتْ) আমি যদি বলতাম, হ্যাঁ, তবে তা প্রতি বৎসরের জন্যই ফরয হয়ে যেত। উল্লেখ্য যে, হাদীসটি মুসনাদ আহমাদে আট জায়গায় বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু কোন স্থানেই (لَوْ قُلْتُهَا: نَعَمْ) এ শব্দে বর্ণিত হয়নি। বরং প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানে (১ম খণ্ড, ২৫৫ ও ২৯০-২৯১ পৃঃ) (لَوْ قُلْتُهَا: لَوَجَبَتْ) শব্দে বর্ণিত হয়েছে। সপ্তম স্থানে (১ম খণ্ড, ৩৭১ পৃঃ) ও অষ্টম স্থানে (১ম খণ্ড, ৩৭২ পৃঃ) (لَوْ قُلْتُ: نَعَمْ) শব্দে, তৃতীয় স্থানে (১ম খণ্ড, ২৯২ পৃঃ) পঞ্চম স্থানে (১ম খণ্ড, ৩২৩ পৃঃ) ও ৬ষ্ঠ স্থানে (১ম খণ্ড, ৩০১ পৃঃ) (لو قلت: كل عام لكان) শব্দে বর্ণিত হয়েছে। অতএব এটি স্পষ্ট যে, মিশকাতের বর্ণনা (لَوْ قُلْتُ: نَعَمْ) শব্দটি সংকলক কর্তৃক ভুল হয়েছে। আল্লাহই ভাল জানেন।
(وَالْحَجُّ مَرَّةٌ) ‘‘হজ্জ/হজ মাত্র একবার’’, অর্থাৎ- হজ্জ/হজ জীবনে মাত্র একবারই ফরয। যে ব্যক্তি এর বেশী করবে তা নফল।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
২৫২১-[১৭] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ’বায়তুল্লাহ’ পৌঁছার পথের খরচের মালিক হয়েছে অথচ হজ্জ/হজ পালন করেনি সে ইয়াহূদী বা খ্রীস্টান হয়ে মৃত্যুবরণ করুক এতে কিছু যায় আসে না। আর এটা এ কারণে যে, আল্লাহ তা’আলা বলেন, ’’মানুষের জন্য বায়তুল্লাহর হজ্জ/হজ পালন করা ফরয, যে ব্যক্তি ওখানে পৌঁছার সামর্থ্য লাভ করেছে।’’
(তিরমিযী; তিনি বলেছেন, এটি গরীব। এর সনদে কথা আছে। এর এক রাবী হিলাল ইবনু ’আব্দুল্লাহ মাজহূল বা অপরিচিত এবং অপর রাবী হারিস য’ঈফ বা দুর্বল।)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ مَلَكَ زَادًا وَرَاحِلَةً تُبَلِّغُهُ إِلَى بَيْتِ اللَّهِ وَلَمْ يَحُجَّ فَلَا عَلَيْهِ أَنْ يَمُوتَ يَهُودِيًّا أَوْ نَصْرَانِيًّا وَذَلِكَ أَنَّ اللَّهَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى يَقُولُ: (وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حَجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِليهِ سَبِيلا)
رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ. وَفِي إِسْنَادِهِ مَقَالٌ وَهِلَالُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ مَجْهُولٌ والْحَارث يضعف فِي الحَدِيث
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসে হজ্জ/হজ সম্পাদনে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও যে ব্যক্তি হজ্জ/হজ পালন করে না তাকে ইয়াহূদী ও নাসারার সাথে তুলনা করার কারণ এই যে, ইয়াহূদী এবং নাসারাগণ আহলে কিতাব। কিন্তু তারা আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাব তাওরাত, ইঞ্জীলের বিধান মেনে চলে না। অনুরূপ যে ব্যক্তি হজ্জ/হজ করল না সে আল্লাহর কিতাব কুরআনের বিধান অমান্য করল। আল্লাহর কিতাব অমান্য করার ক্ষেত্রে সে ইয়াহূদী ও নাসারাদের সাথে সাদৃশ্য হলো। তাই হজ্জ/হজ পরিত্যাগকারীকে ইয়াহূদী ও নাসারাদের সাথে তুলনা করা হয়েছে। অতএব হাদীসের অর্থ এই যে, হজ্জের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ্জ/হজ পালন না করে মৃত্যুবরণ করা আর ইয়াহূদী ও নাসারা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা উভয়ই সমান। কারণ উভয়েই আল্লাহর নি‘আমাত অস্বীকারকারী এবং তাঁর নির্দেশ অমান্যকারী।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
২৫২২-[১৮] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও) হজ্জ/হজ পালন না করে থাকা ইসলামে নেই। (আবূ দাঊদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ:
لَا صَرُورَةَ فِي الإِسلامِ . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (صَرُوْرَةٌ) শব্দের অর্থ আবদ্ধ রাখা বা বিরত থাকা। হাদীসে (صَرُوْرَةٌ) শব্দের তিনটি ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে।
(১) যে ব্যক্তি হজ্জ/হজ সম্পাদন করা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। অর্থাৎ- কোন মুসলিমের জন্য সামর্থ থাকা সত্ত্বেও হজ্জ/হজ সম্পাদন করা থেকে বিরত থাকবেন। সামর্থ থাকা সত্ত্বেও যে হজ্জ/হজ করল না সে নিজের উপর থেকে কল্যাণকে বিরত রাখল।
(২) যে ব্যক্তি বিবাহ করা থেকে বিরত থেকে নিঃসঙ্গ জীবন-যাপন করল। অর্থাৎ- ইসলামে বিবাহ থেকে বিরত থাকার বিধান নেই।
(৩) হারামে (মক্কার সম্মানিত এলকা) যে ব্যক্তি হত্যা করবে তাকেও হত্যা করা হবে। জাহিলী যুগে কেউ অপরাধ করলে সে অপরাধের দায় থেকে বাঁচার জন্য হারামে আশ্রয় নিত। ইসলাম এ ধরনের কৌশল গ্রহণ করা বাতিল করে দিয়েছে। অতএব কেউ যদি হারাম শরীফে হত্যা করে অথবা হত্যা করার পর হারাম শরীফে আশ্রয় গ্রহণ করে তাকে রেহাই দেয়া হবে না।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
২৫২৩-[১৯] উক্ত রাবী [’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি হজ্জ/হজ পালনের ইচ্ছা পোষণ করেছে সে যেন তাড়াতাড়ি হজ্জ/হজ পালন করে। (আবূ দাঊদ ও দারিমী)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ أَرَادَ الْحَجَّ فَلْيُعَجِّلْ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد والدارمي
ব্যাখ্যা: (فَلْيُعَجِّلْ) ‘‘সে যেন তা দ্রুত আদায় করে’’।
ইমাম ত্বীবী বলেনঃ (تفعيل) শব্দটি (استفعال) এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ- (تعجل) শব্দটি (استعجال) এর অর্থে এসেছে। যারা বলেনঃ হজ্জ/হজ ফরয হওয়া মাত্রই তা দ্রুত আদায় করতে হবে, বিলম্ব করার অবকাশ নেই, অত্র হাদীসটি তাদের পক্ষে দলীল।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
২৫২৪-[২০] ’আব্দুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হজ্জ/হজ ও ’উমরা সাথে সাথে করো। কারণ এ দু’টি দারিদ্র্য ও গুনাহ এমনভাবে দূর করে, যেমনভাবে হাঁপর লোহা ও সোনা-রূপার ময়লা দূর করে। কবূলযোগ্য হজের সাওয়াব জান্নাত ব্যতীত আর কিছু নয়। (তিরমিযী ও নাসায়ী)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «تَابِعُوا بَيْنَ الْحَجِّ وَالْعُمْرَةِ فَإِنَّهُمَا يَنْفِيَانِ الْفَقْرَ وَالذُّنُوبَ كَمَا يَنْفِي الْكِيرُ خَبَثَ الْحَدِيدِ وَالذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَلَيْسَ لِلْحَجَّةِ الْمَبْرُورَةِ ثَوَابٌ إِلَّا الْجَنَّةَ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَالنَّسَائِيُّ
ব্যাখ্যা: (تَابِعُوْا بَيْنَ الْحَجِّ وَالْعُمْرَةِ) ‘‘হজের সাথে ‘উমরা আদায় করো’’।
(متابعة) অর্থাৎ- ধারাবাহিকভাবে একটির পরে আরেকটি কাজ করাকে (متابعة) বলা হয়। অতএব হাদীসের অর্থ দাঁড়ায় তোমরা হজ্জ/হজ সম্পাদনের সাথে সাথে ‘উমরা করো। অথবা ‘উমরা করার সাথে সাথে হজ্জ/হজও সম্পাদন করো।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
২৫২৫-[২১] কিন্তু আহমাদ ও ইবনু মাজাহ ’উমার (রাঃ) হতে ’’লোহার ময়লা’’ পর্যন্ত বর্ণনা করেছেন।[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَرَوَاهُ أَحْمَدُ وَابْنُ مَاجَهْ عَنْ عُمَرَ إِلَى قَوْله: «خبث الْحَدِيد»
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
২৫২৬-[২২] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রসূল! কিসে (কোন বস্তুতে) হজ্জ/হজ ফরয করে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, পথ খরচ ও বাহনে। (তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا يُوجِبُ الْحَجَّ؟ قَالَ: «الزَّادُ وَالرَّاحِلَة» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: (مَا يُوجِبُ الْحَجَّ) ‘‘কিসে হজ্জ/হজ ওয়াজিব করে?’’ অর্থাৎ- হজ্জ/হজ ওয়াজিব হওয়ার জন্য শর্ত কি? উত্তরে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ (الزَّادُ وَالرَّاحِلَةُ) ‘‘পাথেয় ও বাহন’’। অর্থাৎ- যে ব্যক্তি বায়তুল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছবার এবং সেখান থেকে ফিরে আসার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী ও যাতায়াতের খরচের মালিক হবে তার ওপর হজ্জ/হজ ফরয।
উল্লেখ্য যে, এখানে অন্যান্য শর্তসমূহের মধ্য থেকে মাত্র দু’টি উল্লেখ করার কারণ এই যে, এ দু’টি শর্ত অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তবে জেনে রাখা দরকার যে, হজ্জ/হজ ফরয হওয়ার শর্ত পাঁচটি। যথা-
(১) মুসলিম হওয়া, (২) বোধশক্তি সম্পন্ন হওয়া, (৩) বালেগ হওয়া, (৪) আযাদ হওয়া, (৫) মক্কায় যাতায়াতে সক্ষম হওয়া। এ বিষয়ে ‘আলিমদের মাঝে কোন দ্বিমত নেই।
ইবনু কুদামাহ্ বলেনঃ উপর্যুক্ত শর্তসমূহ তিনভাগে বিভক্ত। যথা-
(১) ওয়াজিব ও বিশুদ্ধ হওয়ার শর্ত, আর তা হলো মুসলিম ও বোধশক্তি সম্পনণ হওয়া। অতএব কাফির এবং পাগলের ওপর হজ্জ/হজ ফরয নয়। তারা হজ্জ/হজ করলে তা বিশুদ্ধ হবে না।
(২) ওয়াজিবও যথেষ্ট হওয়ার শর্ত। আর তা হচ্ছে বালেগ ও আযাদ হওয়া। তা বিশুদ্ধ হওয়ার শর্ত নয়। অতএব শিশু অথবা গোলাম যদি হজ্জ/হজ করে তাহলে তাদের হজ্জ/হজ বিশুদ্ধ হবে কিন্তু তাদের হজ্জ/হজ ফরয হিসেবে যথেষ্ট নয়। বরং শিশু বালেগ হলে এবং গোলাম আযাদ হলে তাকে পুনরায় ইসলামের ফরয হজ্জ/হজ সম্পাদন করতে হবে অন্যান্য শর্ত পাওয়া গেলে।
(৩) শুধুমাত্র ওয়াজিব হওয়ার শর্ত। আর তা হলো সক্ষম হওয়া। অতএব সক্ষম নয় এমন ব্যক্তি যদি পাথেয় ও বাহন ব্যতীতই কষ্ট করে হজ্জ/হজ পালন করে তাহলে তার হজ্জ/হজ বিশুদ্ধ এবং তা ফরয হিসেবে যথেষ্ট। অর্থাৎ- উক্ত ব্যক্তি যদি পরবর্তীতে সক্ষমতা অর্জন করে তাকে আর পুনরায় হজ্জ/হজ করতে হবে না।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
২৫২৭-[২৩] উক্ত রাবী [’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক লোক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলেন, হাজী কে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, যে লোকের (ইহরাম বাঁধার জন্য) অগোছালো চুল এবং সুগন্ধিহীন শরীর। এরপর অপর ব্যক্তি দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রসূল! কোন্ হজ্জ/হজ উত্তম? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ’লাব্বায়কা’ বলার সাথে আওয়াজ সুউচ্চ করা এবং (কুরবানীর) রক্ত প্রবাহিত করা। তারপর অপর (তৃতীয়) ব্যক্তি দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রসূল! কুরআনে বর্ণিত ’সাবীল’ (সামর্থ্য রাখে)-এর অর্থ কি? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, পথের খরচ ও বাহন। [ইমাম বাগাবী (রহঃ) শারহুস্ সুন্নাহ-তে এবং ইবনু মাজাহ তাঁর সুনানে বর্ণনা করেছেন, তবে তিনি শেষের অংশ বর্ণনা করেননি।][1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْهُ قَالَ: سَأَلَ رَجُلٌ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: مَا الْحَاج؟ فَقَالَ: «الشعث النَّفْل» . فَقَامَ آخَرُ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيُّ الْحَجِّ أَفْضَلُ؟ قَالَ: «الْعَجُّ وَالثَّجُّ» . فَقَامَ آخَرُ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا السَّبِيلُ؟ قَالَ: «زَادٌ وَرَاحِلَةٌ» رَوَاهُ فِي شَرْحِ السُّنَّةِ. وَرَوَى ابْنُ مَاجَهْ فِي سُنَنِهِ إِلَّا أَنَّهُ لَمْ يذكر الْفَصْل الْأَخير
ব্যাখ্যা: (مَا الْحَاجُّ) ‘‘হজ্জ/হজ আদায়কারী কে?’’ অর্থাৎ- পরিপূর্ণ হজ্জ/হজ সম্পাদনকারীর গুণাবলী কি? (اَلشَّعِثُ التَّفْلُ) ‘‘সৌন্দর্য ও সুগন্ধি বর্জনকারী। অর্থাৎ- হজ্জ/হজ সম্পাদনকারী সফরের কারণে ধূলিমলিন হবে এবং সুগন্ধি বর্জন করার কারণে তার থেকে অপছন্দনীয় দুর্গন্ধ বের হবে।
(أَىُّ الْحَجِّ أَفْضَلُ) ‘‘কোন্ হজ্জ/হজ উত্তম’’। অর্থাৎ- কোন প্রকারের হজে অধিক সাওয়াব অর্জন হয়। (الْعَجُّ وَالثَّجُّ) ‘‘উচ্চস্বরে তালবিয়াহ্ পাঠ এবং রক্ত প্রবাহিত করা’’। সুতরাং যে হজ্জে তালবিয়াহ্ বেশী পরিমাণে পাঠ করা হয় এবং কুরবানী করা হয় সে হজ্জই অধিক সাওয়াবের অধিকারী। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যে হজ্জের যাবতীয় কাজ, এর রুকনসমূহ, মুস্তাহাবসমূহ পরিপূর্ণভাবে আদায় করা হয় সে হজ্জই উত্তম হজ্জ।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
২৫২৮-[২৪] আবূ রযীন আল ’উক্বায়লী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমার পিতা অতিশয় বৃদ্ধ, হজ্জ/হজ ও ’উমরা করার সামর্থ্য রাখে, না বাহনে বসতে পারেন না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তুমি তোমার পিতার পক্ষ হতে হজ্জ/হজ ও ’উমরা করে দাও। [তিরমিযী, আবূ দাঊদ ও নাসায়ী; ইমাম তিরমিযী (রহঃ) বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ][1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْ أَبِي رَزِينٍ الْعُقَيْلِيِّ أَنَّهُ أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ أَبِي شَيْخٌ كَبِيرٌ لَا يَسْتَطِيعُ الْحَجَّ وَلَا الْعُمْرَةَ وَلَا الظَّعْنَ قَالَ: «حُجَّ عَنْ أَبِيكَ وَاعْتَمِرْ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ
ব্যাখ্যা: (حُجَّ عَنْ أَبِيكَ) ‘‘তোমার বাবার পক্ষ থেকে হজ্জ/হজ সম্পাদন করো’’ হাদীসের এ অংশটুকু প্রমাণ করে যে, অপারগ পিতার পক্ষ থেকে পুত্রের জন্য হজ্জ/হজ করা বৈধ।
ইমাম ত্ববারী বলেনঃ এ হাদীসটি সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, যিনি স্বয়ং হজ্জ/হজ করতে সক্ষম নন এমন জীবিত ব্যক্তির পক্ষ হতে অন্য ব্যক্তির হজ্জ/হজ করা বৈধ। আর তা অন্যান্য শারীরিক ‘ইবাদাত তথা সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) ও সিয়ামের মতো নয়। وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعٰى আল্লাহ তা‘আলার এ বাণী দ্বারা সকল ‘ইবাদাত উদ্দেশ্য নয়।
(وَاعْتَمِرْ) ‘‘আর (তার পক্ষ থেকে) ‘উমরা করো’’। যারা বলেন ‘উমরা করা ওয়াজিব হাদীসের এ অংশটুকু তাদের পক্ষে দলীল। এ মতের স্বপক্ষে একদল আহলুল হাদীস এবং ইমাম শাফি‘ঈ ও ইমাম আহমাদ-এর প্রসিদ্ধ মত এটাই। ইমাম ইসহাক, সাওরী এবং মুযানী এ মতের প্রবক্তা। ‘আল্লামা সিনদী বলেনঃ অন্যের পক্ষ থেকে হজ্জ/হজ ও ‘উমরা করা তা সম্পাদনকারীর ওপর ওয়াজিব নয়। অত্র হাদীসে (اعْتَمِرْ) আদেশসূচক শব্দটি ওয়াজিব বুঝায় না বরং তা মুস্তাহাব বুঝায়। অতএব অত্র হাদীস দ্বারা ‘উমরা ওয়াজিব সাব্যস্ত হয় না।
‘আল্লামা শানক্বীত্বী বলেনঃ অত্র হাদীসে (اعْتَمِرْ) নির্দেশসূচক শব্দটি আবূ রযীন-এর প্রশ্নের জওয়াবে বলা হয়েছে। আর উসূলবিদদের নিকট এটি সাব্যস্ত যে, প্রশ্নের জওয়াবে নির্দেশসূচক শব্দ দ্বারা ওয়াজিব বুঝায় না বরং তা দ্বারা বৈধতা বুঝায়। ইমাম আবূ হানীফা এবং ইমাম মালিক-এর মতে ‘উমরা করা ওয়াজিব নয়।
এদের স্বপক্ষে দলীলঃ ইমাম তিরমিযী, বায়হাক্বী ও আহমাদে জাবির কর্তৃক বর্ণিত হাদীস যাতে রয়েছে (أخبرني عن العمرة أواجبة هي؟ فقال: لا وأن تعتمر خير لك) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলা হলো আমাকে অবহিত করুন যে, ‘উমরা কি ওয়াজিব? উত্তরে তিনি বললেনঃ না। তবে ‘উমরা করা তোমার জন্য কল্যাণকর। কিন্তু হাদীসটি য‘ঈফ। কেননা এর সনদে হাজ্জাজ ইবনু আরতাহ্ নামক রাবী রয়েছে যিনি য‘ঈফ। এ হাদীসের সমর্থনে আরো হাদীস রয়েছে। তাই ইমাম শাওকানী বলেনঃ হাদীসটি হাসান লিগয়রিহী এর পর্যায়ভুক্ত যা জমহূর ‘উলামাগণের নিকট দলীল হিসেবে গণ্য। ‘উমরা ওয়াজিব কি-না? এ বিষয়ে উভয় ধরনের দলীল থাকার কারণে সকল যুগের ‘আলিমগণের মাঝে দ্বিমত রয়েছে।
(১) ‘উমরা ওয়াজিবঃ এ মতের পক্ষে রয়েছেন ‘উমার, ইবনু ‘আব্বাস, যায়দ ইবনু সাবিত ও ইবনু ‘উমার (রাঃ), সা‘ঈদ ইবনু মুসাইয়্যিব, সা‘ঈদ ইবনু জুবায়র, ‘আত্বা, তাউস, মুজাহিদ, হাসান বাসরী, ইবনু সীরীন ও শা‘বী প্রমুখ। সাওরী, ইসহাক, শাফি‘ঈ ও আহমাদ এ মতের প্রবক্তা
(২) ‘উমরা ওয়াজিব নয়ঃ ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) থেকে তা বর্ণিত আছে। এ মতের পক্ষে রয়েছেন- ইমাম মালিক, আবূ সাওর ও আবূ হানীফা। ইমাম শাফি‘ঈ ও আহমাদ থেকেও একটি বর্ণনা এরূপ পাওয়া যায়। ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ্ এ মত গ্রহণ করেছেন।
‘আল্লামা শানক্বীত্বী তিনটি কারণে ওয়াজিব হওয়ার মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
(১) অধিকাংশ উসূলবিদগণ ঐ হাদীসকে প্রাধান্য দিয়েছেন যে হাদীস বারায়াতে আসলিয়াহ্ (মূল হুকুম) থেকে অন্য হুকুমের দিকে ধাবিত করে।
(২) একদল উসূলবিদ ঐ হাদীসকে প্রাধান্য দিয়েছেন যা ওয়াজিব বুঝায় ঐ হাদীসের উপর যা ওয়াজিব বুঝায় না।
(৩) যারা ওয়াজিব বলেছেন তাদের মতানুসারে যদি তা ওয়াজিব হিসেবে পালন করা হয় তাহলে জিম্মা থেকে তা নেমে গেল। পক্ষান্তরে যারা ওয়াজিব বলেনি তাদের মতানুসারে যদি তা আদায় না করা হয় আর যদি তা ওয়াজিব হয়ে থাকে তাহলে তা জিম্মাতেই থেকে গেল। অতএব ওয়াজিব হিসেবে তা আদায় করাই শ্রেয়। আল্লাহই অধিক অবগত আছেন।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
২৫২৯-[২৫] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে বলতে শুনলেন, আমি শুব্রম্নমাহ্’র পক্ষ হতে (হজ্জ/হজ পালনের উদ্দেশে) উপস্থিত হয়েছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, শুব্রম্নমাহ্ কে? সে বললো, আমার ভাই অথবা বললো, আমার নিকটাত্মীয়। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, তুমি নিজের হজ্জ/হজ করেছো কি? সে বললো, জি না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তবে (প্রথমে) নিজের হজ্জ/হজ করো। পরে শুবরুমাহ্’র পক্ষ হতে হজ্জ/হজ করবে। (শাফি’ঈ, আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
مَرْفُوع وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَمِعَ رَجُلًا يَقُولُ لَبَّيْكَ عَنْ شُبْرُمَةَ قَالَ: «مَنْ شُبْرُمَةُ» قَالَ: أَخٌ لِي أَوْ قَرِيبٌ لِي قَالَ: «أَحَجَجْتَ عَنْ نَفْسِكَ؟» قَالَ: لَا قَالَ: «حُجَّ عَنْ نَفْسِكَ ثُمَّ حُجَّ عَنْ شُبْرُمَةَ» . رَوَاهُ الشَّافِعِيُّ وَأَبُو دَاوُد وابنُ مَاجَه
ব্যাখ্যা: (حُجَّ عَنْ نَفْسِكَ ثُمَّ حُجَّ عَنْ شُبْرُمَةَ) ‘‘আগে তোমার নিজের হজ্জ/হজ করো এরপর শুবরুমার পক্ষ থেকে হজ্জ/হজ করো’’। দারাকুত্বনী, ইবনু হিব্বান এবং ইবনু মাজাহতে আছে, (فاجعل هذه عن نفسك) ‘‘এটি তোমার নিজের পক্ষ থেকে আদায় করো, এরপর শুব্রুমার পক্ষ থেকে হজ্জ/হজ করো’’। সিন্দী বলেনঃ অত্র হাদীস থেকে জানা গেল যে, যিনি নিজে হজ্জ/হজ করেননি তিনি যদি অন্যের পক্ষ থেকে হজের ইহরাম বাঁধেন তাহলে তা অব্যাহত রাখা জরুরী নয় বরং সে ইহরামকে নিজের হজ্জের জন্য পরিবর্তন করা ওয়াজিব।
এ হাদীস থেকে স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় যে, যিনি নিজের হজ্জ/হজ সম্পাদন করেননি তার জন্য অন্যের পক্ষ থেকে হজ্জ/হজ করা জায়িয নয়। তিনি নিজের হজ্জ/হজ পালন করতে সক্ষম হোন অথবা না হোন।
ইমাম শাফি‘ঈর অভমত এটাই। ইমাম আওযা‘ঈ এবং ইসহাক এ মতের প্রবক্তা। ইমাম আহমাদ থেকেও এ মতের পক্ষে একটি বর্ণনা রয়েছে।
পক্ষান্তরে ইমাম মালিক ও আবূ হানীফার মতে নিজের হজ্জ/হজ না করেও অন্যের পক্ষ থেকে হজ্জ/হজ করা বৈধ। হাসান বাসরী, ‘আত্বা ও সাওরী- এ মতের প্রবক্তা।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
২৫৩০-[২৬] উক্ত রাবী [’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্বদিকের অধীবাসীদের (’ইরাকীদের) জন্যে ’আক্বীক্ব নামক স্থানকে (ইহরাম বাঁধার জন্য) মীকাত নির্ধারণ করেছেন। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْهُ قَالَ: وَقَّتَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِأَهْلِ الْمَشْرِقِ الْعَقِيقَ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা ত্ববারী বলেনঃ ‘আক্বীক্ব যাতু ‘ইরক্ব-এর নিকটবর্তী একটি উপত্যকার নাম। ‘আরব দেশে অনেক জায়গা যা ‘আক্বীক্ব নামে পরিচিত। মূলত পানি প্রবাহের কারণে সে সমস্ত স্থান নালার মতো প্রশস্ত হয়ে যায় ঐ স্থানকে ‘আক্বীক্ব বলা হয়। আযহারী বলেনঃ ‘আরব দেশে এরূপ চারটি ‘আক্বীক্ব রয়েছে। ‘আল্লামা আলকারী বলেনঃ হাদীসে উল্লেখিত ‘আক্বীক্ব যাতু ‘ইরক্ব বরাবর পূর্ব প্রান্তে একটি জায়গার নাম। এটাও বলা হয়ে থাকে যে, তা যাতু ‘ইরক্ব এর সীমানার মধ্যে অবস্থিত।
(أَهْلِ الْمَشْرِقِ) দ্বারা উদ্দেশ্য যাদের আবাস মক্কার হারাম শরীফের বাইরে পূর্ব দিকে অবস্থিত। আর তারা হলো ‘ইরাকবাসী। হাদীসের মর্মার্থ এই যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্ব এলাকার বাসিন্দাদের জন্য ‘আক্বীক্ব নামক জায়গাকে মীকাত সাব্যস্ত করেছেন।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
২৫৩১-[২৭] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’ইরাকবাসীদের জন্য ’’যাতু ’ইরক্ব’’-কে মীকাত নির্ধারণ করেছেন। (আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْ عَائِشَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَّتَ لِأَهْلِ الْعِرَاقِ ذَاتَ عِرْقٍ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: যাতু ‘ইরক্ব এর পরিচয় পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে। এটি মক্কা থেকে পূর্ব দিকে অবস্থিত একটি স্থান। যাতু ‘ইর্ক্ব এবং ‘আক্বীক্ব দু’টি কাছাকাছি স্থান। তবে ‘আক্বীক্বের অবস্থান যাতু ‘ইরক্ব-এর পূর্বে।
ইবনুল মালিক বলেনঃ মনে হয় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্ব এলাকাবাসীর জন্য নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’টি মীকাত নির্ধারণ করেছেন।
একটি ‘আক্বীক্ব আরেকটি যাতু ‘ইরক্ব। অতএব যে ব্যক্তি যাতু ‘ইরক্ব-এ পৌঁছবার আগেই ‘আক্বীক্ব থেকে ইহরাম পরিধান করে এটি তার জন্য উত্তম। আর যে ব্যক্তি ‘আক্বীক্ব অতিক্রম করে যাতু ‘ইরক্ব-এ ইহরাম পরিধান করে এটি তার জন্য বৈধ। ইমাম শাফি‘ঈ বলেনঃ ‘আক্বীক্ব থেকেই ইহরাম বাঁধা উচিত।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
২৫৩২-[২৮] উম্মু সালামাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি মসজিদে আক্বসা থেকে মসজিদে হারামের দিকে হজ্জ/হজ বা ’উমরার ইহরাম বাঁধবে তার পূর্বের ও পরের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। অথবা তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, তার জন্যে জান্নাত অবধারিত হবে। (আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْ أُمِّ سَلَمَةَ قَالَتْ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: مَنْ أَهَلَّ بِحَجَّةٍ أَوْ عُمْرَةٍ مِنَ الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى إِلَى الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَا تَأَخَّرَ أَوْ وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ
ব্যাখ্যা: এ হাদীসে ঐ ইঙ্গিত রয়েছে যে, ইহরাম যতদূর থেকে বাঁধা হয় সাওয়াব তত বেশী। ‘আল্লামা ত্ববারী বলেনঃ এ হাদীস দ্বারা তারা দলীল পেশ করে থাকেন যারা বলেন যে, মীকাতের পূর্বে ইহরাম বাঁধাতে ফাযীলাত বেশী। তবে এখানে এ কথা বলার অবকাশ রয়েছে যে, এটা বায়তুল মাক্বদিসের জন্য বিশেষ বৈশিষ্ট্য যা অন্য স্থানের জন্য নেই। কেননা দূরত্বের কারণেই যদি সাওয়াব বেশী হত তাহলে বায়তুল মাকদিসের চাইতেও আরো কোন দূরবর্তী স্থানের উল্লেখ করাই উত্তম ছিল।
ইমাম খাত্ত্বাবী বলেনঃ এ হাদীস প্রমাণ করে মীকাতের পূর্বে ইহরাম বাঁধা বৈধ। আর একাধিক সাহাবী মীকাতে পৌঁছবার আগেই ইহরাম বেঁধেছেন। তবে একদল ‘আলিম তা মাকরূহ বলেছেন। এমনকি ‘উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) ‘ইমরান ইবনুল হুসায়ন (রাঃ) কে বাসরাহ্ থেকে ইহরাম বাঁধার বিষয়ের প্রতি অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। হাসান বাসরী, ‘আত্বা ইবনু আবী রবাহ এবং মালিক ইবনু আনাস তা মাকরূহ মনে করতেন।
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
২৫৩৩-[২৯] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইয়ামানবাসীরা হজ্জ/হজ পালন করতো অথচ পথের খরচ সঙ্গে নিত না। আর বলতো, আমরা আল্লাহর ওপর ভরসাকারী। কিন্তু মক্কায় পৌঁছে মানুষের কাছে ভিক্ষা চাইতো, তখন আল্লাহ তা’আলা এ আয়াত নাযিল করেন, ’’ওয়াতাযাও ওয়াদূ ফাইন্না খয়রায্ যা-দিত্ তাক্বওয়া-’’ অর্থাৎ- তোমরা পথের খরচ সাথে নাও, উত্তম পাথেয় তো তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতি (অর্থাৎ- অন্যের নিকট ভিক্ষা না করা)। (বুখারী)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: كَانَ أَهْلُ الْيَمَنِ يَحُجُّونَ فَلَا يَتَزَوَّدُونَ وَيَقُولُونَ: نَحْنُ الْمُتَوَكِّلُونَ فَإِذَا قَدِمُوا مَكَّةَ سَأَلُوا النَّاسَ فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى: (وتزَوَّدُوا فإِنَّ خيرَ الزَّادِ التَّقوى)
رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: (تَزَوَّدُوْا) ‘‘তোমরা পাথেয় গ্রহণ করো’’। অর্থাৎ- পাথেয় হিসেবে তোমরা খাদ্য সামগ্রী সাথে নিয়ে নাও এবং অন্যের নিকট খাবার চাওয়া হতে বিরত থাকো। (فإِنَّ خَيْرَ الزَّادِ التَّقْوٰى) ‘‘কেননা উত্তম পাথেয় হলো তাক্বওয়া’’। অর্থাৎ- সওয়াল (চাওয়া) করা থেকে বিরত থাকা। ইমাম শাওকানী বলেনঃ এ আয়াতে এ সংবাদ প্রদান করা হয়েছে যে, উত্তম পাথেয় হলো নিষিদ্ধ কাজ হতে বেঁচে থাকা। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেনঃ আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে পাথেয় সহ বের হওয়ার জন্য যে নির্দেশ দিয়েছেন তোমরা সে নির্দেশ পালনে আল্লাহকে ভয় করো। কেননা আল্লাহকে ভয় করাই হচ্ছে উত্তম পাথেয়। এও বলা হয়ে থাকে যে, আয়াতের মর্মার্থ হলোঃ উত্তম পাথেয় তাই যা দ্বারা মুসাফির নিজেকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করে এবং মানুষের নিকট হাত পাতা ও তাদের নিকট সওয়াল করার প্রয়োজন থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে।
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
২৫৩৪-[৩০] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল! মহিলাদের ওপর কি জিহাদ ফরয? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, হ্যাঁ, তাদের ওপর এমন জিহাদ ফরয যাতে সশস্ত্র যুদ্ধ নেই- আর তা হলো হজ্জ/হজ ও ’উমরা। (ইবনু মাজাহ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ عَلَى النِّسَاءِ جِهَادٌ؟ قَالَ: نَعَمْ عَلَيْهِنَّ جِهَادٌ لَا قِتَالَ فِيهِ: الْحَجُّ وَالْعُمْرَةُ . رَوَاهُ ابْنُ مَاجَه
ব্যাখ্যা: (عَلَيْهِنَّ جِهَادٌ لَا قِتَالَ فِيهِ) ‘‘মহিলাদের ওপর এমন জিহাদ ফরয যাতে মারামারি নেই। বরং তাতে রয়েছে পরিশ্রম এবং খাদ্য বহন, দেশ ও পরিবার-পরিজন ত্যাগ ও সফরের কষ্ট।’’
আর তা হলো (الْحَجُّ وَالْعُمْرَةُ) ‘‘হজ্জ/হজ এবং ‘উমরা’’। ‘আল্লামা সিন্দী বলেনঃ হজ্জ/হজ এবং ‘উমরা পালনে জিহাদের মতই সফর ও দেশ ত্যাগের কষ্ট বিদ্যমান রয়েছে। তবে শত্রুর সাথে লড়াই করার ক্ষমতা মহিলাদের নেই। অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, মহিলাদের ওপর জিহাদ ফরয নয়, এতে ‘উমরা ওয়াজিব হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
২৫৩৫-[৩১] আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি সুস্পষ্ট অভাব অথবা অত্যাচারী শাসকের বাধা, অথবা সাংঘাতিক রোগে আক্রান্ত হওয়া ছাড়া হজ্জ/হজ পালন না করে মৃত্যুপথে যাত্রা করেছে, সে যেন মৃত্যুবরণ করে ইয়াহূদী হয়ে অথবা নাসারা হয়ে। (দারিমী)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ أَبِي أُمَامَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ لَمْ يَمْنَعْهُ مِنَ الْحَجِّ حَاجَةٌ ظَاهِرَةٌ أَوْ سُلْطَانٌ جَائِرٌ أَوْ مَرَضٌ حَابِسٌ فَمَاتَ وَلَمْ يَحُجَّ فَلْيَمُتْ إِنْ شَاءَ يَهُودِيًّا وَإِنْ شَاءَ نَصْرَانِيًّا» . رَوَاهُ الدَّارمِيّ
ব্যাখ্যা: (حَاجَةٌ ظَاهِرَةٌ) ‘‘প্রকাশ্য প্রয়োজন’’। অর্থাৎ- পাথেয় ও বাহন না থাকে। কেননা সক্ষমতা হজ্জ/হজ ওয়াজিব হওয়ার জন্য শর্ত এতে কোন দ্বিমত নেই।
(أَوْ سُلْطَانٌ جَائِرٌ) ‘‘অথবা যালিম শাসক বাধা না দেয়’’। এতে এ ইঙ্গিত রয়েছে যে, রাস্তা যদি নিরাপদ না থাকে বরং যালিম শাসক বাধা প্রদান করে তাহলে হজ্জ/হজ ফরয নয়। তবে কোন শাসক যদি কারো প্রতি মহববত বা ভালবাসার কারণে সাময়িকভাবে বাধা প্রদান করে তা হজ্জ/হজ ফরয হওয়ার পথে বাধা নয়।
রাস্তায় হত্যা অথবা অন্যায়ভাবে সম্পদ ছিনিয়ে নেয়ার আশঙ্কাও হজ্জ/হজ ফরয না হওয়ার কারণ।
(مَرَضٌ حَابِسٌ) ‘‘সফরে বাধাপ্রদানকারী রোগ’’। অর্থাৎ- অধিক অসুস্থতার কারণে সফর করার সামর্থ্য না থাকা। অতএব সকল প্রকার রোগ ও শারীরিক ত্রুটি থেকে মুক্ত থাকা হজ্জ/হজ ফরয হওয়ার জন্য শর্ত।
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
২৫৩৬-[৩২] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ হজ্জ/হজ ও ’উমরাহকারী হলো আল্লাহর দা’ওয়াতী কাফেলা বা মেহমানী দল। অতএব তারা যদি আল্লাহর কাছে দু’আ করেন, তিনি তা কবূল করেন। আর যদি তারা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান, তিনি তাদেরকে ক্ষমা করে দেন। (ইবনু মাজাহ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: «الْحَاجُّ وَالْعُمَّارُ وَفْدُ اللَّهِ إِنْ دَعَوْهُ أجابَهمْ وإِنِ استَغفروهُ غَفرَ لهمْ» . رَوَاهُ ابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: (الْحَاجُّ) ‘‘হজ্জ/হজ সম্পাদনকারী’’। ইমাম ত্বীবী বলেনঃ (الحاج) শব্দটি (الحجاج)-এর এক বচন। এখানে একবচন শব্দকে বহুবচনের অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। (الْعُمَّارُ) শব্দটি (عامر)-এর বহুবচন ‘উমরা পালনকারী। (وَفْدُ اللّٰهِ) ‘‘আল্লাহর মেহমান’’। এখানে (وَفْدُ) শব্দটিকে (اللّٰهِ) শব্দের দিকে ‘ইযাফাহ্ তথা সম্বন্ধ পদ। হজ্জ/হজ ও ‘উমরা সম্পাদনকারীদের সম্মানার্থে এ সম্বন্ধ পদ ব্যবহৃত হয়েছে।
(إِنْ دَعَوْهُ أَجَابَهُمْ وَإِنِ اسْتَغْفَرُوْهُ غَفرَ لَهُمْ) তারা যদি দু‘আ করে তিনি তা কবূল করেন। তারা ক্ষমা চাইলে তিনি তাদেরকে ক্ষমা করেন। এ দু‘আ কবূল ও ক্ষমা তাদের জন্য প্রযোজ্য যাদের হজ্জ/হজ হজ্জে মাবরূর বলে গণ্য হবে। অনুরূপভাবে ‘উমরা-এর ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য।
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
২৫৩৭-[৩৩] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ আল্লাহর প্রতিনিধি বা মেহমান হলো তিন ব্যক্তি। গাযী (ইসলামের জন্যে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী), হাজী ও ’উমরা পালনকারী। (নাসায়ী ও বায়হাক্বী- শু’আবুল ঈমান-এ রয়েছে)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْهُ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «وَفْدُ اللَّهِ ثَلَاثَةٌ الْغَازِي وَالْحَاجُّ وَالْمُعْتَمِرُ» . رَوَاهُ النَّسَائِيُّ وَالْبَيْهَقِيُّ فِي شُعَبِ الْإِيمَان
ব্যাখ্যা: (وَفْدُ اللّٰهِ ثَلَاثَةٌ) ‘‘আল্লাহর মেহমান তিনজন’’। অর্থাৎ- তিন প্রকারের লোক আল্লাহর মেহমান যারা তার নিকট আগমন করে এবং তার রাস্তায় সফর করে।
অন্যান্য ‘ইবাদাতকারীদের মধ্য থেকে এ তিন শ্রেণীর লোককে আল্লাহর মেহমান বলার কারণ এই যে, সাধারণত এ তিন প্রকার ‘ইবাদাতের জন্য সফরের প্রয়োজন হয়। আর যারা সফর করে কারো নিকট গমন করে তারাই তার মেহমান বলে গণ্য। এরাও যেহেতু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সফর করে তাই এদেরকে আল্লাহর মেহমান বলা হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
২৫৩৮-[৩৪] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন তুমি কোন হাজীর সাক্ষাৎ পাবে তাকে সালাম দিবে, মুসাফাহা করবে আর তাকে অনুরোধ জানাবে, তিনি যেন তোমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান তার ঘরে প্রবেশের পূর্বেই। কারণ তিনি (হাজী) ক্ষমাপ্রাপ্ত ব্যক্তি। (আহমাদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا لَقِيتَ الْحَاجَّ فَسَلِّمْ عَلَيْهِ وَصَافِحْهُ وَمُرْهُ أَنْ يَسْتَغْفِرَ لَكَ قَبْلَ أَنْ يَدْخُلَ بَيْتَهُ فَإِنَّهُ مَغْفُورٌ لَهُ» . رَوَاهُ أَحْمد
ব্যাখ্যা: (مُرْهُ أَنْ يَسْتَغْفِرَ لَكَ قَبْلَ أَنْ يَدْخُلَ بَيْتَه) ‘‘তার স্বীয় আবাসে প্রবেশের পূর্বেই তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনার আবেদন করো’’। কেননা সে বাড়ীতে প্রবেশের পরে হয়ত বিভিন্ন বিষয়ে জড়িয়ে পড়বে। ‘আল্লামা মানাবী বলেনঃ হাজীর সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে সালাম করা, তার সাথে মুসাফাহ করা এবং তার নিকট দু‘আর আবেদন করা মুস্তাহাব। হাদীসের প্রকাশমান অর্থ এই যে, তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনার আবেদন তার স্বীয় আবাসে প্রবেশের পূর্বের সময়ের সাথে সম্পৃক্ত। অতএব সে স্বীয় আবাসে প্রবেশ করার পর তা বাতিল হয়ে যাবে। তিনি এও বলেন যে, বাড়ীতে প্রবেশের পূর্বে দু‘আর আবেদন করা উত্তম।
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
২৫৩৯-[৩৫] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি হজ্জ/হজ, ’উমরা অথবা আল্লাহর পথে জিহাদের উদ্দেশে বের হবে আর পথেই মৃত্যুবরণ করবে; আল্লাহ তা’আলা তার জন্য গাযী, হাজী বা ’উমরা পালনকারীর সাওয়াব ধার্য করবেন। (বায়হাক্বী ’’শু’আবুল ঈমান’’ গ্রন্থে অত্র হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ خَرَجَ حَاجًّا أَوْ مُعْتَمِرًا أَوْ غَازِيًا ثُمَّ مَاتَ فِي طَرِيقِهِ كَتَبَ اللَّهُ لَهُ أَجْرَ الْغَازِي وَالْحَاجِّ والمعتمِرِ» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي شُعَبِ الْإِيمَانِ
ব্যাখ্যা: (ثُمَّ مَاتَ فِىْ طَرِيقِه كَتَبَ اللّٰهُ لَه أَجْرَ الْغَازِىْ) যে ব্যক্তি হজ্জ/হজ-‘উমরা অথবা জিহাদের উদ্দেশে বাড়ী থেকে বের হয়ে রাস্তায় মারা যাবে আল্লাহ তার জন্য হজ্জ/হজ, ‘উমরা ও জিহাদের সাওয়াব লিপিবদ্ধ করবেন। কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ ‘‘যে ব্যক্তি হিজরতের উদ্দেশে স্বীয় বাড়ী থেকে বের হয়ে রাস্তায় মারা যাবে আল্লাহর নিকট তার সাওয়াব নির্ধারিত হয়ে যাবে’’- (সূরা আন্ নিসা ৪ : ১০০)। যদি বলা হয় যে, যার উপর হজ্জ/হজ ওয়াজিব হওয়ার পর বিলম্বে হজের জন্য বের হয়ে মারা যায় সে তো গুনাহগার হবে যা এ আয়াতের বিরোধী।
‘আল্লামা আলক্বারী বলেনঃ হাদীসের অর্থ এই যে, যিনি হজ্জ/হজ ওয়াজিব হওয়ার অব্যবহিত পরেই হজের জন্য বের হয়ে যায় অথবা অসুস্থতা বা রাস্তার নিরাপত্তার অভাবের কারণে বিলম্বে বের হয়। অতঃপর তার মৃত্যু ঘটে তাহলে তিনি গুনাহগার হবেন না। তবে যদি বিনা উযরে বিলম্ব করে তাহলে অবশ্যই গুনাহগার হবে। এ সত্ত্বেও বলব যে, তিনি হজের সাওয়াব অবশ্যই পাবেন। কেননা আল্লাহ তা‘আলা কারোরই ভাল ‘আমল বিনষ্ট করেন না।
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - ইহরাম ও তালবিয়াহ্
’আল্লামা আলক্বারী বলেনঃ ইহরামের প্রকৃত অর্থ হলো সম্মানিত স্থানে বা কাজে প্রবেশ করা। এর দ্বারা উদ্দেশ্য বিশেষ সম্মানিত কাজ। শারী’আতে হজের জন্য এ ধরনের ইহরাম শর্ত। তবে তা নিয়্যাত ও তালবিয়াহ্ ব্যতীত বাস্তবায়ন হয় না। অতএব ইহরামের উপর তালবিয়ার ’আত্ফটি ’আম-এর উপর খাসে ’আত্ফ।
গুনিয়্যাতুন্ নাসিক-এর লেখক বলেনঃ ইহরামের শাব্দিক অর্থ হলো- হুরসাত তথা সম্মানিত কাজে প্রবেশ করা।
শারী’আতের পরিভাষায় নির্দিষ্ট সম্মানিত কাজে প্রবেশ করা এবং তার ওপর অটল থাকাকে ইহরাম বলে। তবে এ অটল থাকা নিয়্যাত এবং নির্দিষ্ট যিকির ব্যতীত বাস্তবায়িত হয় না। সুস্পষ্ট মুতাওয়াতির বর্ণনা দ্বারা সাব্যস্ত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুলহুলায়ফাহ্ নামক স্থানে পৌঁছে ইহরাম বেঁধেছেন এবং ইহরামের সময় নির্দিষ্ট, ইফরাদ, কিরান বা তামাত্তু’ হজের উল্লেখ করেছেন।
এটাও সাব্যস্ত আছে যে, ইহরাম বাঁধার সময় প্রথম তালবিয়াহ্ হতেই তিনি তা নির্দিষ্ট করেছেন এবং এ সময় তিনি তালবিয়াহ্ পাঠ করেছেন। অতএব যিনি হজ্জ/হজ অথবা ’উমরা এর উদ্দেশে মীকাতে পৌঁছাবেন, তিনি ইহরামের নিয়্যাতে বলবেন (যদি ’উমরার ইচ্ছা করেন) ’’লাব্বায়কা ’উমরাতান’’ অথবা ’’আল্লা-হুম্মা লাব্বায়কা ’উমরাতান’’। হজের নিয়্যাত থাকলে বলবেন ’’লাব্বায়কা হাজ্জান’’ অথবা বলবেন ’’আল্লা-হুম্মা লাব্বায়কা হাজ্জান’’। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাই করেছেন।
২৫৪০-[১] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাঁর ইহরামের জন্য ইহরাম বাঁধার পূর্বে এবং ইহরাম খোলার জন্যে (দশ তারিখে) বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করার পূর্বে সুগন্ধি লাগাতাম, এমন সুগন্ধি যাতে মিস্ক থাকতো। আমি যেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সিঁথিতে এখনো সুগন্ধি দ্রব্যের উজ্জ্বলতা দেখতে পাচ্ছি অথচ তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইহরাম অবস্থায় ছিলেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْإِحْرَامِ وَالتَّلْبِيَةِ
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: كُنْتُ أُطَيِّبُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِإِحْرَامِهِ قَبْلَ أَنْ يُحْرِمَ وَلِحِلِّهِ قَبْلَ أَنْ يَطُوفَ بِالْبَيْتِ بِطِيبٍ فِيهِ مِسْكٌ كَأَنِّي أَنْظُرُ إِلَى وَبِيصِ الطِّيبِ فِي مَفَارِقِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ مُحْرِمٌ
ব্যাখ্যা: كُنْتُ أُطَيِّبُ رَسُوْلَ اللّٰهِ ﷺ لِإِحْرَامِه قَبْلَ أَنْ يُحْرِمَ ‘‘ইহরাম বাঁধার পূর্বে ইহরামের উদ্দেশে আমি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সুগন্ধি লাগিয়ে দিতাম’’। হাদীসের এ অংশ প্রমাণ করে যে, ইহরাম বাঁধার উদ্দেশে ইহরাম বাঁধার পূর্বে সুগন্ধি লাগানো মুস্তাহাব। ইহরাম বাঁধার পরও ঐ সুগন্ধি ক্ষতির কোন কারণ নয়। সুগন্ধির ঘ্রাণ ও তার রং শরীরে লেগে থাকাও কোন ক্ষতির কারণ নয়। তবে ইহরাম পরে নতুন করে সুগন্ধি লাগানো হারাম। এ মতের প্রবক্তা হলেন ইমাম শাফি‘ঈ, আবূ হানীফা, আবূ ইউসুফ, আহমাদ ইবনু হাম্বল। সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস, ইবনুয্ যুবায়র, ইবনু ‘আব্বাস, ইসহাক ও আবূ সাওর থেকে ইবনুল মুনযির এ অভিমত বর্ণনা করেছেন। ইবনু ‘আব্বাস আবূ সা‘ঈদ খুদরী, ‘আব্দুল্লাহ ইবনু জা‘ফার, ‘আয়িশাহ্, উম্মু হাবীবাহ্ (রাঃ), ‘উরওয়াহ্ ইবনুয্ যুবায়র, কাসিম ইবনু মুহাম্মাদ, শা‘বী, নাসায়ী, খারিজাহ্ ইবনু যায়দ প্রমুখ মনিষীগণ হতেও এ অভিমত বর্ণনা করেছেন।
পক্ষান্তরে একদল ‘উলামা বলেনঃ ইহরামের উদ্দেশে ইহরাম বাঁধার পূর্বে সুগন্ধি ব্যবহার করা বৈধ নয়। যদি কেউ তা লাগিয়ে থাকে অবশ্যই তা ধুয়ে ফেলতে হবে যাতে তার রং ও ঘ্রাণ কিছুই না থাকে। ইমাম মালিক-এর এটিই অভিমত। ইমাম যুহরী ও মুহাম্মাদ ইবনুল হাসানও এ মতের প্রবক্তা।
যারা তা বৈধ মনে করেন ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বর্ণিত অত্র হাদীস তাদের দলীল।
পক্ষান্তরে যারা তা বৈধ নয় বলেন তাদের দলীল ইয়া‘লা ইবনু ‘উমাইয়্যাহ্ বর্ণিত হাদীস তাতে আছে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রশ্নকারীকে সুগন্ধি ধুয়ে ফেলার নির্দেশ দিলেন। এতে সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় যে, যিনি ইহরামের পূর্বে সুগন্ধি লাগাবেন তা অব্যাহতভাবে রাখার সুযোগ নেই বরং ইহরাম বাঁধার পূর্বেই তা ধুয়ে পরিষ্কার করতে হবে। জমহূর ইয়া‘লা বর্ণিত হাদীসের জওয়াবে বলেনঃ
(১) ইয়া‘লা বর্ণিত ঘটনা ঘটেছিল অষ্টম হিজরীতে জি‘রানাতে। আর ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বর্ণিত হাদীসের ঘটনা ১০ম হিজরীতে বিদায় হজের ঘটনা। আর সর্বশেষ বিষয়টি দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
(২) ইয়া‘লা বর্ণিত হাদীসে নির্দিষ্ট সুগন্ধি ধোয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে আর তা হলো খালূক। যে কোন সুগন্ধি ধোয়ার নির্দেশ দেয়া হয়নি। সম্ভবতঃ খালূক জা‘ফরান মিশ্রিত থাকার কারণে এ নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যা সুগন্ধির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কেননা পুরুষের জন্য কোন অবস্থাতেই জা‘ফরান ব্যবহার করা বৈধ নয়।
‘আল্লামা শানক্বীত্বী বলেনঃ আমার দৃষ্টিতে জমহূরের অভিমত তথা ইহরাম বাঁধার পূর্বে সুগন্ধি ব্যবহার বৈধ অধিক স্পষ্ট বলে প্রতীয়মান হয়।
(وَلِحِلِّه قَبْلَ أَنْ يَطُوفَ بِالْبَيْتِ) অর্থাৎ- তাওয়াফে ইফাযার পূর্বে রামী জামারাহ্ এবং মাথা মুন্ডানোর পরে তাকে সুগন্ধি লাগিয়েছি। হাদীসের এ অংশ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, রমী জামারার পর ইহরাম অবস্থায় হারামকৃত সবকিছুই হালাল হয়ে যায়। শুধুমাত্র স্ত্রীর সাথে মিলন এবং এর সাথে সম্পৃক্ত কার্যাবলী তাওয়াফ ইফাযাহ্ পর্যন্ত হারাম থাকে।
এ হাদীসটি এও প্রমাণ করে যে, হাজীর জন্য দু’টি হালাল অবস্থা রয়েছে। একটি জামরাতে পাথর নিক্ষেপ ও মাথা মুন্ডানোর পর। আরেকটি তাওয়াফে ইফাযার পর।
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - ইহরাম ও তালবিয়াহ্
২৫৪১-[২] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মাথার চুল জড়ানো অবস্থায় তালবিয়াহ্ বলতে শুনেছি,
’’লাব্বায়ক আল্লা-হুম্মা লাব্বায়ক, লাব্বায়কা লা- শারীকা লাকা লাব্বায়ক, ইন্নাল হাম্দা ওয়ান্ নি’মাতা লাকা ওয়াল মুল্ক, লা- শারীকা লাকা’’
অর্থাৎ- ’’হে আল্লাহ! আমি তোমার দরবারে উপস্থিত হয়েছি! আমি তোমার খিদমাতে উপস্থিত হয়েছি। তোমার কোন শারীক নেই। আমি তোমার দরবারে উপস্থিত। সব প্রশংসা, অনুগ্রহের দান তোমারই এবং সমগ্র রাজত্বও তোমারই, তোমার কোন শারীক নেই।’’
এ কয়টি কথার বেশি কিছু তিনি বলেননি। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْإِحْرَامِ وَالتَّلْبِيَةِ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُهِلُّ مُلَبِّدًا يَقُولُ: «لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ» . لَا يَزِيدُ عَلَى هَؤُلَاءِ الْكَلِمَاتِ
ব্যাখ্যা: (يُهِلُّ مُلَبِّدًا) তিনি তালবীদ অবস্থায় তালবিয়াহ্ পাঠ করতেন। ‘উলামাহগণ বলেন আঠা বা খাতমী জাতীয় বস্ত্ত দ্বারা মাথার চুল লাগিয়ে রাখাকে তালবীদ বলা হয়। যাতে মাথার চুল পরস্পর মিলিত হয়ে থাকে তা এলোমেলো না হয়ে যায়।
এ থেকে বুঝা যায় যে, ইহরাম অবস্থায় তালবীদ করা মুস্তাহাব।
(لَا يَزِيدُ عَلٰى هَؤُلَاءِ الْكَلِمَاتِ) ‘‘নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তালবিয়াতে হাদীসে বর্ণিত শব্দের চাইতে বেশী কিছু বলতেন না’’। এ বর্ণনাটি নাসায়ীতে আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তালবিয়াতে ছিল ‘‘লাব্বায়কা ইলাহাল হাক্কি’’-এর বিরোধী নয়। কেননা এ সম্ভাবনা রয়েছে এটি আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) শুনেছেন কিন্তু ইবনু ‘উমার (রাঃ) তা শুনেননি, তবে এটা প্রকাশমান যে, আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) বর্ণিত বাক্যটি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব কমই বলেছেন। যেহেতু ইবনু ‘উমারের বর্ণিত বাক্যটি অধিক বর্ণিত হয়েছে। ইমাম আহমাদ, মালিক ও মুসলিম নাফি' সূত্রে ইবনু ‘উমার থেকে মারফূ' সূত্রে অত্র হাদীসে বর্ণিত তালবিয়ার শব্দ বর্ণনা করার পর অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন যে, নাফি' বলেনঃ ইবনু ‘উমার তার তালবিয়াতে এ দু‘আর সাথে আরো বাড়িয়ে বলতেন, ‘‘লাব্বায়কা, লাব্বায়কা, লাব্বায়কা, ওয়া সা‘দায়কা, ওয়াল খাইরু বিইয়াদায়কা, লাব্বায়কা, ওয়ার রাগবাউ ইলায়কা ওয়াল ‘আমল’’।
যদি প্রশ্ন করা হয় যে, ইবনু ‘উমার তালবিয়াতে তা কিভাবে বাড়ালেন যা সেটার অন্তর্ভুক্ত নয়। অথচ তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতের অনুসরণে খুবই কঠোর ছিলেন? এর জওয়াব এই যে, তিনি মনে করতেন যে, বর্ণিত শব্দমালার সাথে কিছু বাড়ানো হলে তা উক্ত শব্দমালাকে রহিত করে না। কোন বস্ত্তর একাকী থাকা যে পর্যায়ের, অন্যের সাথে সে একই পর্যায়ভুক্ত। অতএব নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পঠিত তালবিয়ার সাথে উক্ত শব্দমালাকে বাড়ালে তা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তালবিয়াতে কোন ব্যাঘাত ঘটাবে না। অথবা তিনি বুঝেছেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পঠিত শব্দমালার উপর সংক্ষেপ্ত রাখা জরুরী নয়। কেননা কাজ বেশীর মধ্যেই সাওয়াব বেশী। ‘আল্লামা ‘ইরাকী বলেনঃ যিকিরের ক্ষেত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেছেন তার মধ্যে কোন পরিবর্তন না করে যদি অতিরিক্ত শব্দমালা যোগ করা হয় তবে তা দোষণীয় নয়।
জেনে রাখা ভাল যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তালবিয়াতে যে শব্দমালা পাঠ করেছেন তার চাইতে বাড়ানো যাবে কি-না- এ ব্যাপারে ‘উলামাগণের মাঝে দ্বিমত রয়েছে।
কেউ তা মাকরূহ বলেছেন। ইবনু ‘আবদুল বার ইমাম মালিক থেকে তা বর্ণনা করেছেন। ইমাম শাফি‘ঈর একটি অভিমতও এ রকম।
পক্ষান্তরে সাওরী, আওযা‘ঈ ও মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান বলেনঃ তালবিয়াহ্ পাঠকারী তাতে তার পছন্দমত শব্দ বাড়াতে পার। আবূ হানীফা, আহমাদ ও আবূ সাওর বলেনঃ বাড়ানোতে কোন দোষ নেই।
হাফিয ইবনু হাজার বলেনঃ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পঠিত শব্দমালার উপর ‘আমল করা উত্তম। তবে তাতে বাড়ালে কোন দোষ নেই। এটিই জমহূর ‘উলামাগণের অভিমত।
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - ইহরাম ও তালবিয়াহ্
২৫৪২-[৩] উক্ত রাবী [’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (বিদায় হজের সময়) যখন যুলহুলায়ফাহ্ মসজিদের নিকট নিজের পা রিকাবে রাখার পর উটনী তাঁকে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তালবিয়াহ্ পাঠ করেছিলেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْإِحْرَامِ وَالتَّلْبِيَةِ
وَعَنْهُ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا أَدْخَلَ رِجْلَهُ فِي الْغَرْزِ وَاسْتَوَتْ بِهِ نَاقَتُهُ قَائِمَةً أَهَلَّ منَ عندِ مسجدِ ذِي الحليفة
ব্যাখ্যা: নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখন তালবিয়াহ্ পাঠ শুরু করেছেন এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়-
(১) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুলহুলায়ফার মসজিদে সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করার পর তালবিয়াহ্ পাঠ করেছেন। যেমনটি আহমাদ, নাসায়ী, তিরমিযী ও বায়হাক্বী ইবনু ‘আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন।
(২) যুলহুলায়ফার মসজিদের বাইরে বৃক্ষের নিকট যখন তার বাহন তাকে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে তখন তিনি তালবিয়াহ্ পাঠ করেছেন। বুখারী, মুসলিম ও আহমাদ ইবনু ‘উমার থেকে তা বর্ণনা করেছেন।
(৩) ‘বায়দা’ নামক স্থানে যখন তার বাহন তাকে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে তখন তিনি তালবিয়াহ্ পাঠ করেছেন। এ বর্ণনাগুলোর মধ্যে সমন্বয় এই যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণিত সকল স্থানেই তালবিয়াহ্ পাঠ করেছেন। যারা তাঁকে যেখানে তা পাঠ করেছেন তারা তাই বর্ণনা করতে দেখেছেন। অতএব অত্র বর্ণনাগুলোর মধ্যে কোন বৈপরীত্য নেই।
ইবনুল ক্বইয়্যিম বলেনঃ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুলহুলায়ফার মসজিদে যুহরের দু’ রাক্‘আত সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করার পর মুসল্লাতেই হজ্জ/হজ ও ‘উমরা-এর নিয়্যাত করে তালবিয়াহ্ পাঠ করেন। এরপর বাহনে আরোহণ করে আবার তালবিয়াহ্ পাঠ করেছেন। অতঃপর বায়দা নামক স্থানে যখন তার বাহন তাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে যায় তখনো তিনি তালবিয়াহ্ পাঠ করেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - ইহরাম ও তালবিয়াহ্
২৫৪৩-[৪] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে (হজের উদ্দেশে) বের হলাম এবং উচ্চস্বরে তালবিয়াহ্ বলতে থাকলাম। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْإِحْرَامِ وَالتَّلْبِيَةِ
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: خَرَجْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَصْرُخُ بِالْحَجِّ صراخا. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: (نَصْرُخُ بِالْحَجِّ صُرَاخًا) আমরা হজের জন্য উচ্চঃশব্দে তালবিয়াহ্ পাঠ করতাম। ইমাম নাবাবী বলেনঃ অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, উচ্চঃশব্দে তালবিয়াহ্ পাঠ করা মুস্তাহাব।
তবে আওয়াজ মধ্যম ধরনের হতে হবে। আর মহিলাগণ শুধু নিজে শুনতে পায় এমনভাবে তালবিয়াহ্ পাঠ করবে তারা আওয়াজ উঁচু করবে না। কেননা উঁচু আওয়াজ তাদের জন্য ফিতনার কারণ হতে পারে।
সকল ‘উলামাগণের মতে পুরুষদের উঁচু আওয়াজে তালবিয়াহ্ পাঠ করা মুস্তাহাব। আহলুয্ যাহিরদের মতে তা ওয়াজিব। এ হাদীস এও প্রমাণ করে যে, ইহরামের শুরুতে তালবিয়াহ্ পাঠ বা ইহরামের নিয়্যাতের প্রাক্কালে স্বশব্দে হজ্জ/হজ বা ‘উমরা-এর নিয়্যাত করা মুস্তাহাব।
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - ইহরাম ও তালবিয়াহ্
২৫৪৪-[৫] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একই সওয়ারীতে আবূ ত্বলহাহর সাথে পিছনে বসেছিলাম, তখন সাহাবীগণ সম্মিলিতভাবে হজ্জ/হজ ও ’উমরার জন্যে উচ্চস্বরে তালবিয়াহ্ পাঠ করছিলেন। (বুখারী)[1]
بَابُ الْإِحْرَامِ وَالتَّلْبِيَةِ
وَعَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: كُنْتُ رَدِيفَ أَبِي طَلْحَةَ وَإِنَّهُمْ لَيَصْرُخُونَ بهِما جَمِيعًا: الْحَج وَالْعمْرَة. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: (إِنَّهُمْ لَيَصْرُخُونَ بهِما جَمِيعًا: اَلْحَجِّ وَالْعُمْرَةِ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ সমস্বরে একত্রে হজ্জ/হজ ও ‘উমরা-এর তালবিয়াহ্ পাঠ করতেন। অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিরান হজ্জ/হজ করেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - ইহরাম ও তালবিয়াহ্
২৫৪৫-[৬] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বিদায় হজের বছর আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে (হজের উদ্দেশে) রওয়ানা হলাম। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ শুধু ’উমরার জন্য ইহরাম বেঁধেছিলেন, আবার কেউ কেউ হজ্জ/হজ ও ’উমরা উভয়ের জন্যে ইহরাম বেঁধেছিলেন, আবার কেউ কেউ শুধু হজের জন্য ইহরাম বেঁধেছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু হজের জন্য ইহরাম বেঁধেছিলেন। অতঃপর যারা শুধু ’উমরার ইহরাম বেঁধেছিলেন তারা (তাওয়াফ ও সা’ঈর পর) হালাল হয়ে গেলেন (অর্থাৎ- ইহরাম খুলে ফেললেন)। আর যারা শুধু হজ্জ/হজ অথবা হজ্জ/হজ ও ’উমরা উভয়ের জন্য ’ইহরাম’ বেঁধেছিলেন তারা কুরবানীর দিন আসা পর্যন্ত হালাল হননি। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْإِحْرَامِ وَالتَّلْبِيَةِ
وَعَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: خَرَجْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَامَ حَجَّةِ الْوَدَاعِ فَمِنَّا مَنْ أَهَلَّ بِعُمْرَةٍ وَمِنَّا مَنْ أَهَلَّ بِحَجٍّ وَعُمْرَةٍ وَمِنَّا مَنْ أَهَلَّ بِالْحَجِّ وَأَهَلَّ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالْحَجِّ فَأَمَّا مَنْ أَهَلَّ بِعُمْرَةٍ فَحَلَّ وَأَمَّا مَنْ أَهَلَّ بِالْحَجِّ أَوْ جَمَعَ الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ فَلَمْ يَحِلُّوا حَتَّى كَانَ يَوْمُ النَّحْرِ
ব্যাখ্যা: (خَرَجْنَا) ‘‘আমরা বের হলাম’’। অর্থাৎ- আমরা মদীনাহ্ থেকে বের হলাম। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে যারা বিদায় হজের বৎসর বের হয়েছিলেন তাদের সংখ্যা কত ছিল- এ নিয়ে ‘আলিমদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। বলা হয়ে থাকে যে, তাদের সংখ্যা ছিল নব্বই হাজার।
আবার এটাও বলা হয় যে, তাদের সংখ্যা ছিল এক লাখ দশ হাজার। কেউ বলেন তাদের সংখ্যা আরো বেশী ছিল।
তাবূকের যুদ্ধের সময় তাদের সংখ্যা ছিল এক লাখ। বিদায় হজ্জ/হজ তারও এক বৎসর পরে অনুষ্ঠিত হয়। অতএব তাদের সংখ্যা এক লাখের বেশীই ছিল।
নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাহ্ থেকে কোন দিন বের হয়েছিলেন- এ নিয়ে ও মতভেদ রয়েছে। সঠিক কথা হলো তিনি যিলকদ মাসের চার দিন বাকী থাকতে শনিবার মদীনাহ্ থেকে বের হয়ে যুলহুলায়ফাতে যেয়ে যুহর অথবা ‘আসর-এর সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করেন।
(عَامَ حَجَّةِ الْوَدَاعِ) ‘‘বিদায় হজের বৎসর’’। এ হজ্জ/হজকে বিদায় হজ্জ/হজ এজন্যই বলা হয় যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাতে লোকজনদেরকে বিদায় জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেনঃ সম্ভবত এরপর আমি আর হজ্জ/হজ করব না। প্রকৃতপক্ষে ঘটেও ছিল তাই। তিনি পুনরায় আর হজ্জ/হজ করার সুযোগ পাননি।
জেনে রাখা ভাল যে, হজ্জ/হজ তিন প্রকারঃ ইফরাদ, তামাত্তু' ও কিরান। ‘উলামাহগণ সকলে একমত যে, তিন প্রকারের যে কোন এক প্রকার হজ্জ/হজ করা বৈধ।
(১) ইফরাদঃ হজ্জের মাসে শুধুমাত্র হজ্জের নিয়্যাতে ইহরাম বেঁধে হজের কার্য সম্পাদন করাকে ইফরাদ হজ্জ/হজ বলে। হজ্জের কাজ সম্পাদন করে কেউ ইচ্ছা করলে ‘উমরা করতে পারে।
(২) তামাত্তুঃ হজের মাসে মীকাত থেকে শুধুমাত্র ‘উমরা এর নিয়্যাতে ইহরাম বেঁধে ‘উমরা এর কাজ সম্পাদন করে হালাল হয়ে যাবে। এরপর ঐ বৎসরই পুনরায় ইহরাম বেঁধে হজের কার্যাবলী সম্পাদন করবে।
(৩) কিরানঃ মীকাত থেকে একই সাথে হজ্জ/হজ ও ‘উমরা-এর জন্য নিয়্যাত করে ইহরাম বেঁধে একই ইহরামে ‘উমরা ও হজ্জের কার্য সম্পাদন করাকে কিরান হজ্জ/হজ বলে।
এ তিন প্রকারের হজের মধ্যে কোন প্রকারের হজ্জ/হজ উত্তম- এ বিষয়ে ‘উলামাগণের মাঝে মতভেদ রয়েছে।
[১] উত্তম হলো ইফরাদ হজ্জঃ ইমাম মালিক ও ইমাম শাফি‘ঈর মত এটিই। এরপর তামাত্তু' এরপর কিরান।
[২] উত্তম হলো তামাত্তু' হজ্জঃ ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বালের অভিমত এটিই। ইমাম শাফি‘ঈর একটি মতও এরূপ পাওয়া যায়।
[৩] উত্তম হলো কিরান হজ্জঃ এটি ইমাম আবূ হানীফার অভিমত। হানাফীদের প্রসিদ্ধ মতানুযায়ী, অতঃপর তামাত্তু', অতঃপর ইফরাদ। ইমাম আবূ হানীফা থেকে একটি মত এরূপ পাওয়া যায় যে, তামাত্তু'-এর চাইতে ইফরাদ উত্তম।
[৪] কুরবানীর পশু সাথে নিলে কিরান উত্তম নচেৎ তামাত্তু' উত্তম। ইমাম আহমাদ থেকে এ মত বর্ণনা করেছেন ‘আল্লামা মারূয।
[৫] ফাযীলাতের দিক থেকে তিন প্রকার হজ্জই সমান। হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী ফাতহুল বারীতে দাবী করেছেন যে, এটি ইমাম ইবনু খুযায়মার অভিমত।
[৬] তামাত্তু' ও কিরান ফাযীলাতের ক্ষেত্রে সমান। আর এ দু’টো ইফরাদের চাইতে উত্তম। আবূ ইউসুফ থেকে এ অভিমত বর্ণিত হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - ইহরাম ও তালবিয়াহ্
২৫৪৬-[৭] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজের সাথে ’উমরারও উপকারিতা লাভ করেছিলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এভাবে শুরু করেছিলেন যে, প্রথমে ’উমরার তালবিয়াহ্ পাঠ করেছিলেন, এরপর হজের তালবিয়াহ্। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْإِحْرَامِ وَالتَّلْبِيَةِ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: تَمَتَّعَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي حَجَّةِ الْوَدَاعِ بِالْعُمْرَةِ إِلَى الْحَجِّ بدأَ فأهلَّ بالعمْرةِ ثمَّ أهلَّ بالحجّ
ব্যাখ্যা: (تَمَتَّعَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ) ‘‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তামাত্তু' হজ্জ/হজ করেছেন’’। (بَدَأَ فَأهَلَّ بِالْعُمْرَةِ ثُمَّ أَهَلَّ بِالْحَجِّ) এ বাক্যটি (تمتع)-এর ব্যাখ্যা। অর্থাৎ- তিনি প্রথমে ‘উমরার জন্য ইহরাম বেঁধেছেন, পরে ‘উমরা-এর সাথে হজ্জের নিয়্যাত করেছেন। সিন্দী বলেনঃ এখানে (تمتع) ‘‘তামাত্তু’’ বলতে কিরান বুঝানো হয়েছে। কেননা সাহাবীগণ কিরানকেও (تمتع) বলে থাকেন। আর অবধারিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হজ্জ/হজ কিরান ছিল।
(بَدَأَ بِالْعُمْرَةِ) অর্থাৎ- তিনি ইহরাম বাঁধার সময়ে প্রথমে ‘‘উমরা’’ শব্দ উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন (لبيك عمرة) ‘‘লাব্বায়কা ‘উমরাতান্’’।
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ইহরাম ও তালবিয়াহ্
২৫৪৭-[৮] যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ইহরাম বাঁধার উদ্দেশে কাপড় খুলতে ও গোসল করতে দেখেছেন। (তিরমিযী ও দারিমী)[1]
عَنْ زَيْدِ بْنِ ثَابِتٍ أَنَّهُ رَأَى النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَجَرَّدَ لِإِهْلَالِهِ وَاغْتَسَلَ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ والدارمي
ব্যাখ্যা: (تَجَرَّدَ لِإِهْلَالِه) ‘‘তিনি ইহরাম বাঁধার জন্য কাপড় খুললেন’’। অর্থাৎ- ইহরাম বাঁধার উদ্দেশে সেলাই করা কাপড় খুলে চাদর পরিধান করলেন। (وَاغْتَسَلَ) ‘‘এবং গোসল করলেন’’। অর্থাৎ- ইহরামের জন্য গোসল করলেন।
ইমাম শাওকানী বলেনঃ অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, ইহরাম বাঁধার জন্য গোসল করা মুস্তাহাব। অধিকাংশ ‘উলামাগণের অভিমত এটিই।
নাসির বলেনঃ ইহরামের জন্য গোসল করা ওয়াজিব। ইহরামের জন্য গোসল করার উদ্দেশ্য, শরীর পরিষ্কার করা এবং শরীর থেকে দুর্গন্ধ দূর করা যাতে মানুষ কষ্ট না পায়।
ইবনুল মুনযির বলেনঃ ‘উলামাহগণ এ বিষয়ে একমত যে, ইহরামের উদ্দেশে গোসল করা বৈধ, তবে তা ওয়াজিব নয়। কিন্তু হাসান বাসরী বলেনঃ কেউ যদি গোসল করতে ভুলে যায় তাহলে যখন স্মরণ হবে তখন গোসল করে নিবে।
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ইহরাম ও তালবিয়াহ্
২৫৪৮-[৯] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আঠালো বস্তু দিয়ে মাথার চুল জড়ো করেছিলেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَبَّدَ رَأْسَهُ بِالْغِسْلِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (لَبَّدَ رَأْسَه بِالْغِسْلِ) গোসলের উপকরণ (খিতমী বা অন্য কিছু) দিয়ে স্বীয় মাথাকে তালবীদ করেছেন।
পূর্বে বর্ণিত ইবনু ‘উমার (রাঃ)-এর হাদীসে (سمعت رسول الله - ﷺ- يهل ملبدًا) তালবীদ সম্পর্কে আলোচনা গত হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ইহরাম ও তালবিয়াহ্
২৫৪৯-[১০] খল্লাদ ইবনুস্ সায়িব তার পিতা (সায়িব) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জিবরীল (আঃ) আমার কাছে এসে আমাকে নির্দেশ দিলেন যে, আমি যেন আমার সাহাবীগণকে উচ্চস্বরে তালবিয়াহ্ পাঠ করতে আদেশ করি। (মালিক, তিরমিযী, আবূ দাঊদ, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ ও দারিমী)[1]
وَعَنْ خَلَّادِ بْنِ السَّائِبِ عَنْ أَبِيهِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ «أَتَانِي جِبْرِيلُ فَأَمَرَنِي أَنْ آمُرَ أَصْحَابِي أَنْ يرفَعوا أصواتَهم بالإِهْلالِ أَو التَّلبيَةِ» . رَوَاهُ مَالِكٌ وَالتِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ وَالدَّارِمِيُّ
ব্যাখ্যা: (أَمَرَنِىْ أَنْ اٰمُرَ أَصْحَابِىْ) ‘‘তিনি আদেশ করেছেন’’। অর্থাৎ- আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাকে অবহিত করেছেন) আমি যেন আমার সঙ্গীদের আদেশ করি। জমহূরের মতে এ আদেশ মুস্তাহাব। আহলুয্ যাহিরদের মতে তা ওয়াজিব।
(أَنْ يَرْفَعُوْا أَصْوَاتَهُمْ بِالْإِهْلَالِ) তারা যেন ইহরাম বাঁধার সময় উচ্চস্বরে তালবিয়াহ্ পাঠ করে। যাতে ইহরামের নিদর্শন প্রকাশ পায় এবং অজ্ঞরা তা শিখতে পারে।
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ইহরাম ও তালবিয়াহ্
২৫৫০-[১১] সাহল ইবনু সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন মুসলিম যখন তালবিয়াহ্ পাঠ করে, তখন তার সাথে সাথে তার ডান বামে যা কিছু আছে- পাথর, গাছ-গাছড়া কিংবা মাটির ঢেলা তালবিয়াহ্ পাঠ করে থাকে। এমনকি এখান থেকে এদিক ও ওদিকে (পূর্ব ও পশ্চিমের) ভূখগুের শেষ সীমা পর্যন্ত। (তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَا مِنْ مُسْلِمٍ يُلَبِّي إِلَّا لَبَّى مَنْ عَنْ يَمِينِهِ وَشِمَالِهِ: مِنْ حَجَرٍ أَوْ شَجَرٍ أَوْ مَدَرٍ حَتَّى تنقطِعَ الأرضُ منْ ههُنا وههُنا . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: (حَتّٰى تَنْقَطِعَ الْأَرْضُ مِنْ هٰهُنَا وَهٰهُنَا) এমনকি তা পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে পৌঁছে যায়। পাথর, বৃক্ষ ও ইট এসবগুলোর তালবিয়াহ্ পাঠের দ্বারা মুসলিমদের বুঝানো হচ্ছে যে, এ যিকিরের মর্যাদা অনেক বেশী। আল্লাহর নিকট এর অনেক ফাযীলাত ও মর্যাদা রয়েছে। এটাও অসম্ভব নয় যে, তালবিয়াহ্ পাঠকারীর ‘আমলনামায় তাদের তালবিয়াহ্ পাঠের সাওয়াবও লিখা হবে। কেননা তিনি অন্যদের তালবিয়াহ্ পাঠের কারণ।
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ইহরাম ও তালবিয়াহ্
২৫৫১-[১২] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুলহুলায়ফায় ইহরাম বাঁধার সময় দুই রাক্’আত সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করেছেন। অতঃপর যুলহুলায়ফার মসজিদের কাছে তাঁর উষ্ট্রী তাঁকে নিয়ে দাঁড়ালে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ সব শব্দের দ্বারা তালবিয়াহ্ পাঠ করলেন, ’’লাব্বায়কা আল্লা-হুম্মা লাব্বায়কা লাব্বায়কা ওয়া সা’দায়কা, ওয়াল খয়রু ফী ইয়াদায়কা লাব্বায়কা, ওয়ার্ রগবা-উ ইলায়কা ওয়াল ’আমলু’’ (অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমি তোমার দরবারে উপস্থিত, আমি তোমার দরবারে উপস্থিত। আমি উপস্থিত আছি ও তোমার দরবারের সৌভাগ্য লাভ করেছি, সব কল্যাণ তোমার হাতে নিহীত। আমি উপস্থিত, সকল কামনা-বাসনা তোমারই হাতে, সকল ’আমল তোমারই জন্যে।)। (বুখারী ও মুসলিম; তবে শব্দগুলো মুসলিমের)[1]
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَرْكَعُ بِذِي الْحُلَيْفَةِ رَكْعَتَيْنِ ثُمَّ إِذَا اسْتَوَتْ بِهِ النَّاقَةُ قَائِمَةً عِنْدَ مَسْجِدِ ذِي الْحُلَيْفَةِ أَهَلَّ بِهَؤُلَاءِ الْكَلِمَاتِ وَيَقُولُ: «لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ وَالْخَيْرُ فِي يَدَيْكَ لَبَّيْكَ وَالرَّغْبَاءُ إِلَيْكَ وَالْعَمَل» . مُتَّفق عَلَيْهِ وَلَفظه لمُسلم
ব্যাখ্যা: (يَرْكَعُ بِذِى الْحُلَيْفَةِ رَكْعَتَيْنِ) ‘‘নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুলহুলায়ফাতে (ইহরামের পূর্বে) দু’ রাক্‘আত সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করতেন।’’ ‘আল্লামা যুরক্বানী বলেনঃ এ দু’ রাক্‘আত সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) সুন্নাতুল ইহরাম তথা ইহরামের সুন্নাত। আর তা ছিল নফল সালাত (সালাত/নামাজ/নামায)। জমহূর ‘উলামাগণের অভিমত এটাই।
হাসান বাসরী ফরয সালাতের পর ইহরাম বাঁধা মুস্তাহাব মনে করতেন। ‘আল্লামা ইবনু কুদামাহ্ বলেনঃ সালাতের পর ইহরাম বাঁধা মুস্তাহাব। ফরয সালাতের সময় হলে ফরয সালাতের পর ইহরাম বাঁধবে। তা না হলে দু’ রাক্‘আত নফল সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করে ইহরাম বাঁধবে। ‘আত্বা, ত্বাউস, মালিক, শাফি‘ঈ, সাওরী, আবূ হানীফা, ইসহাক, আবূ সাওর ও ইবনুল মুনযির তা মুস্তাহাব মনে করতেন। ইবনু ‘উমার ও ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকেও এমনটি বর্ণিত হয়েছে। মোটকথা হলো সালাতের পর ইহরাম বাঁধা সুন্নাত। যদি ফরয সালাতের পর তা বাঁধা হয় তাহলে শুধুমাত্র সুন্নাতের উপর ‘আমল হলো। আর যদি নফল সালাতের পর বাঁধা হয় তাহলে সুন্নাত ও মুস্তাহাব দু’টিই পাওয়া গেল।
(أَهَلَّ بِهَؤُلَاءِ الْكَلِمَاتِ) ‘‘তালবিয়ার শব্দগুলো উচ্চস্বরে পাঠ করতেন’’। হাদীসের এ অংশ প্রমাণ করে যে, উচ্চস্বরে তালবিয়াহ্ পাঠ করা মুস্তাহাব।
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ইহরাম ও তালবিয়াহ্
২৫৫২-[১৩] ’উমারাহ্ ইবনু খুযায়মাহ্ ইবনু সাবিত (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি তার পিতা হতে এবং তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন তালবিয়াহ্ শেষ করলেন, তখন আল্লাহর নিকট তাঁর সন্তুষ্টি ও জান্নাত কামনা করলেন এবং তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর রহমতের দ্বারা জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি চাইলেন। (শাফি’ঈ)[1]
وَعَنْ عِمَارَةَ بْنِ خُزَيْمَةَ بْنِ ثَابِتٍ عَنْ أَبِيهِ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ كَانَ إِذَا فَرَغَ مِنْ تَلْبِيَتِهِ سَأَلَ اللَّهَ رِضْوَانَهُ وَالْجَنَّةَ وَاسْتَعْفَاهُ بِرَحْمَتِهِ مِنَ النَّارِ. رَوَاهُ الشَّافِعِي
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, মুহরিম ব্যক্তি যখনই তালবিয়াহ্ পাঠ করা শেষ করবে তখন অত্র দু‘আটি পাঠ করবেঃ
اَللّٰهُمَّ إِنِّىْ أَسْأَلُكَ مَغْفِرَتَكَ وَرِضَاكَ وَالْجَنَّةَ فِى الْاٰخِرَةِ، وَأَنْ تَعْفُوْ عَنِّىْ وَتُعِيْذَنِىْ وَتُعْتِقَنِىْ بِرَحْمَتِكَ مِنَ النَّارِ.
‘‘হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট ক্ষমা ও আপনার সন্তুষ্টি প্রার্থনা করি এবং পরকালে জান্নাত কামনা করি। আপনি আমাকে মাফ করুন। স্বীয় দয়ায় জাহান্নামের আগুন থেকে আমাকে পরিত্রাণ ও আশ্রয় দান করুন।’’
পরিচ্ছেদঃ ১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ইহরাম ও তালবিয়াহ্
২৫৫৩-[১৪] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হজ্জ/হজ পালনের ইচ্ছা পোষণ করলেন, তখন মানুষের মধ্যে ঘোষণা করে দিলেন। তাই লোকেরা দলে দলে সমবেত হলো। তিনি ’বায়দা’ নামক জায়গায় পৌঁছলে (হজের জন্য) ’ইহরাম’ বাঁধলেন। (বুখারী)[1]
عَنْ جَابِرٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمَّا أَرَادَ الْحَجَّ أَذَّنَ فِي النَّاسِ فَاجْتَمَعُوا فَلَمَّا أَتَى الْبَيْدَاءَ أَحْرَمَ. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: (أَذَّنَ فِى النَّاسِ) ‘‘তিনি লোকদের মাঝে ঘোষণা দিলেন।’’ ইবনু মালিক বলেনঃ তিনি এ ঘোষণা নিজেই দিয়েছিলেন এই বলে যে, ‘‘আমি হজ্জ/হজ করতে ইচ্ছা করছি।’’ ‘আল্লামা আল কারী বলেনঃ প্রকাশমান অর্থ এই যে, তিনি কোন ঘোষককে এ মর্মে ঘোষণা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ্জ/হজ করবেন।
(فَلَمَّا أَتَى الْبَيْدَاءَ أَحْرَمَ) ‘‘তিনি যখন বায়দাতে পৌঁছালেন ইহরাম বাঁধলেন’’। অর্থাৎ- তিনি ইহরামের শব্দাবলী পুনরায় উচ্চারণ করলেন অথবা জনসম্মুখে তাঁর ইহরামের বিষয় প্রকাশ করলেন।
পরিচ্ছেদঃ ১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ইহরাম ও তালবিয়াহ্
২৫৫৪-[১৫] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুশরিকরা তালবিয়াহ্ পাঠে বলতো, ’’লাব্বায়কা লা- শারীকা লাকা’’ (অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমরা উপস্থিত। তোমার কোন শারীক নেই।)। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, ’’তোমাদের সর্বনাশ হোক, থামো থামো (আর অগ্রসর হয়ো না, কিন্তু তারা দ্রুত বেগে চলতো) অবশ্য যে শারীক তোমার আছে, যার মালিক তুমি এবং তারা যে জিনিসের মালিক তারও তুমি মালিক। তারা (মুশরিকরা) এ কথা বলতো আর বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করতো। (মুসলিম)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: كَانَ الْمُشْرِكُونَ يَقُولُونَ: لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ فَيَقُولُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «وَيْلَكُمْ قَدْ قَدْ» إِلَّا شَرِيكًا هُوَ لَكَ تَمْلِكُهُ وَمَا مَلَكَ. يَقُولُونَ هَذَا وَهُمْ يَطُوفُونَ بِالْبَيْتِ. رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যা: (قَدْ قَدْ) ‘‘যথেষ্ট হয়েছে’’। অর্থাৎ- তোমাদের বাক্য (لَبَّيْكَ لَا شَرِيْكَ لَكَ) এটুকু বলাই যথেষ্ট। অতএব তোমরা এখানেই থামো এর অধিক কিছু বলো না।
ইমাম ত্বীবী বলেনঃ মুশরিকগণ বলত- (لبيك لا شريك لك إلا شريكًا هو لك تملكه وما ملك)।
তাদের ঐ বাক্যের যখন এ অংশটুকু বলা হত (لَا شَرِيْكَ لَكَ)। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেনঃ (قَدْ قَدْ) অর্থাৎ- তোমরা এখানেই থামো, তোমরা তা অতিক্রম করে পরবর্তী অংশ বলো না।
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিদায় হজের বৃত্তান্তের বিবরণ
২৫৫৫-[১] জাবির ইবনু ’আব্দুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় নয় বছর অবস্থানকালে হজ্জ/হজ পালন করেননি। অতঃপর দশম বছরে মানুষের মধ্যে ঘোষণা করলেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বছর হজে যাবেন। তাই মদীনায় বহু লোক আগমন করলো। অতঃপর আমরা তাঁর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাথে হজ্জ/হজ করতে রওয়ানা হলাম এবং যখন যুলহুলায়ফাহ্ নামক স্থানে পৌঁছলাম (আবূ বকর-এর স্ত্রী) আসমা বিনতু ’উমায়স মুহাম্মাদ ইবনু আবূ বকর-কে প্রসব করলেন। তাই আসমা (রাঃ) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করে পাঠালেন, ’’আমি এখন কি করবো?’’ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে পাঠালেন, ’’তুমি গোসল করবে এবং কাপড়ের টুকরা দিয়ে টাইট করে লেঙ্গুট (প্যান্ট) পরবে। এরপর ইহরাম বাঁধবে। তখন (বর্ণনাকারী জাবির) বলেন, এ সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে দু’ রাক্’আত সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করলেন। এরপর ক্বাস্ওয়া নামক উটনীর উপর আরোহণ করলেন।
অতঃপর যখন ’বায়দা’ নামক স্থানে তাঁকে নিয়ে উটনী সোজা হয়ে দাঁড়াল তিনি আল্লাহর তাওহীদ সম্বলিত এ তালবিয়াহ্ পাঠ করলেন, ’’লাব্বায়কা আল্লা-হুম্মা লাব্বায়কা, লাব্বায়কা লা- শারীকা লাকা লাব্বায়কা, ইন্নাল হাম্দা ওয়ান্নি’মাতা লাকা ওয়াল মুল্ক, লা শারীকা লাকা।’’ জাবির (রাঃ) বলেন, আমরা হজ্জ/হজ ব্যতীত আর অন্য কিছুর নিয়্যাত করিনি। আমরা ’উমরা বিষয়ে কিছু জানতাম না। অবশেষে আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বায়তুল্লাহয় আসলাম তখন তিনি ’হাজরে আসওয়াদ’ (কালো পাথর)-এ হাত লাগিয়ে চুমু খেলেন এবং সাতবার কা’বার (বায়তুল্লাহ) তাওয়াফ করলেন। তাতে তিনবার জোরে জোরে (রমল) ও চারবার স্বাভাবিকভাবে হেঁটে হেঁটে তাওয়াফ করলেন। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মাকামে ইব্রাহীমের দিকে অগ্রসর হলেন এবং কুরআনের এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন, وَاتَّخِذُوْا مِنْ مَقَامِ إِبرَاهِيْمَ مُصَلّٰى ’’এবং মাকামে ইব্রাহীমকে সালাতের স্থানে রূপান্তরিত করো’’- (সূরা আল বাক্বারাহ্ ২ : ১২৫) (অর্থাৎ- এর কাছে সালাত আদায় করো)। এ সময় তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মাকামে ইব্রাহীমকে তার ও বায়তুল্লাহর মাঝখানে রেখে দু’ রাক্’আত সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করলেন।
অপর এক বর্ণনায় আছে, এ দু’ রাক্’আত সালাতে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ’কুল হুওয়াল্লা-হু আহাদ’ ও ’কুল ইয়া- আইয়্যুহাল কা-ফিরূন’ পড়েছিলেন। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হাজারে আস্ওয়াদের দিকে ফিরে গেলেন, একে স্পর্শ করে চুমু খেলেন। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দরজা দিয়ে সাফা পর্বতের দিকে বের হয়ে গেলেন। যখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাফার নিকটে পৌঁছলেন তখন কুরআনের এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন, إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللّٰهِ অর্থাৎ- ’’নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়াহ্ আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত’’- (সূরা আল বাক্বারাহ্ ২ : ১৫৮)। আর বললেন, আল্লাহ তা’আলা যেখান হতে শুরু করেছেন আমিও তা ধরে শুরু করবো। তাই তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাফা হতে শুরু করলেন এবং এর উপরে চড়লেন। এখান থেকে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর ঘর দেখতে পেলেন।
অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা দিলেন এবং তাঁর মহিমা বর্ণনা করলেন। আর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ’’আল্লাহ ছাড়া প্রকৃতপক্ষে কোন ইলাহ নেই, তিনি অদ্বিতীয়, তাঁর কোন শারীক নেই, তাঁরই সার্বভৌমত্ব ও তাঁরই সব প্রশংসা, তিনি সব কিছুতেই ক্ষমতাবান।’ আল্লাহ ছাড়া কোন মা’বূদ নেই, তিনি অদ্বিতীয়, তিনি তাঁর ওয়া’দা পূর্ণ করেছেন, তিনি তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন, একাই তিনি সম্মিলিত কুফরী শক্তিকে পরাভূত করেছেন- এ কথা তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তিনবার বললেন। এর মাঝে কিছু দু’আ করলেন। অতঃপর সাফা হতে নামলেন এবং মারওয়াহ্ অভিমুখে হেঁটে চললেন, যে পর্যন্ত তাঁর পবিত্র পা উপত্যকার মধ্যমর্তী সমতলে গিয়ে ঠেকলো।
তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দ্রুতবেগে হেঁটে চললেন, মারওয়ায় না পৌঁছা পর্যন্ত। এখানেও তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাফায় যা করেছেন, মারওয়ার শেষ চলা পর্যন্ত তাই করলেন। এমনকি যখন মারওয়াতে শেষ তাওয়াফ শেষ হলো, তখন তিনি মারওয়ার উপর দাঁড়িয়ে লোকদেরকে সম্বোধন করলেন এবং লোকেরা তখন তাঁর নীচে (অপেক্ষমাণ) ছিল। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, যদি আমি আমার ব্যাপারে আগে জানতে পারতাম যা পরে আমি জেনেছি, তবে আমি কখনো কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে আনতাম না এবং একে ’উমরার রূপ দান করতাম। তাই তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে আসেনি সে যেন ’ইহরাম’ খুলে ফেলে। একে ’উমরার রূপ দান করে। এ সময় সুরাক্বাহ্ বিন মালিক ইবনু জু’শুম দাঁড়িয়ে বললো, হে আল্লাহর রসূল! এটা কি আমাদের জন্য এ বছর, নাকি চিরকালের জন্য? তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতের আঙুলগুলো পরস্পরের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে দু’বার বললেন, ’উমরা হজের মধ্যে প্রবেশ করলো না। বরং চিরকালের জন্যে।
এ সময় ’আলী (রাঃ) ইয়ামান হতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কুরবানীর পশু নিয়ে আসলেন (তিনি সেখানে বিচারক পদে নিযুক্ত ছিলেন)। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি (ইহরাম বাঁধার সময় নিয়্যাতে) কি বলেছিলে? ’আলী(রাঃ) বললেন, আমি বলেছি- হে আল্লাহ! আমি ইহরাম বাঁধছি যেভাবে তোমার রসূল ইহরাম বেঁধেছেন!’’ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার সাথে কুরবানীর পশু রয়েছে, তাই তুমি ইহরাম খুলো না। রাবী জাবির (রাঃ) বলেন, যেসব কুরবানীর পশুগুলো ’আলী(রাঃ) ইয়ামান হতে নিয়ে এসেছিলেন এবং যেগুলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের সাথে নিয়ে এসেছিলেন তাতে মোট একশ’ হয়ে গেলো। রাবী জাবির বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাথে যারা নবীর মতো পশু নিয়ে এসেছিলেন, তারা ছাড়া সকলে ইহরাম খুলে হালাল হয়ে গেলেন এবং চুল কাটলেন। অতঃপর (৮ যিলহাজ্জ) তারবিয়ার দিন তাঁরা সকলেই নতুন করে ইহরাম বাঁধলেন এবং মিনা অভিমুখে রওয়ানা হলেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও সওয়ার হয়ে গেলেন এবং সেখানে যুহর, ’আসর, মাগরিব, ’ইশা ও ফজরের সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করলেন। অতঃপর সূর্যোদয় পর্যন্ত স্বল্প সময় অবস্থান করলেন।
এ সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশ করলেন যেন তাঁর জন্যে নামিরাহ্’য় একটি পশমের তাঁবু খাটানো হয়। এ কথা বলে তিনিও সেদিকে রওয়ানা হয়ে গেলেন। তখন কুরায়শগণের এ বিষয়ে সন্দেহ ছিল না যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিশ্চয়ই মাশ্’আরুল হারাম-এর নিকটে অবস্থান করবেন, যেভাবে তারা জাহিলিয়্যাতের যুগে করতো (নিজের মর্যাদাহানির আশঙ্কায় সাধারণের সাথে ’আরাফাতে সহবস্থান করবেন না)। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’আরাফাতে না পৌঁছা পর্যন্ত সামনে অগ্রসর হলেন। সেখানে গিয়ে দেখলেন, নামিরাহ্’য় তাঁর জন্য তাঁবু খাটানো হয়েছে। তাই তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সেখানে নামলেন (অবস্থান নিলেন) সূর্য ঢলা পর্যন্ত। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর ক্বাস্ওয়া উষ্ট্রীর জন্য আদেশ করলেন।
ক্বাস্ওয়া সাজানো হলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ’বাত্বনি ওয়াদী’ বা ’আরানা’ উপত্যকায় পৌঁছলেন এবং লোকদের উদ্দেশে ভাষণ দিলেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন- ’’তোমাদের একজনের জীবন ও সম্পদ অপরের প্রতি (সকল দিন, কাল ও স্থানভেদে) হারাম যেভাবে এ দিনে, এ মাসে, এ শহরে হারাম। সাবধান! জাহিলিয়্যাতের যুগের সকল অপকর্ম আমার পদতলে প্রোথিত হলো, জাহিলিয়্যাত (মূর্খতার) যুগের রক্তের দাবীগুলো রহিত হলো। আর আমাদের রক্তের দাবীসমূহের যে দাবী আমি প্রথমে রহিত করলাম, তা হলো (আমার নিজ বংশের ’আয়াশ) ইবনু রবী’আহ্ ইবনু হারিস-এর রক্তের দাবী। যে বানী সা’দ গোত্রের দুধপানরত অবস্থায় ছিল তখন হুযায়ল গোত্রের লোকেরা তাকে হত্যা করে। এভাবে জাহিলিয়্যাত যুগের সূদ মাওকূফ (রহিত) হয়ে গেল। আর আমাদের (বংশের) যে সূদ আমি প্রথমে মাওকূফ করলাম তা (আমার চাচা) ’আব্বাস ইবনু ’আবদুল মুত্ত্বালিব-এর (পাওনা) সূদ, তা সবই মাওকূফ করা হলো।’’
’’তোমরা তোমাদের নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করবে। কেননা তোমরা তাদেরকে গ্রহণ করেছো আল্লাহর আমানাত হিসেবে এবং আল্লাহর নামে তাদের গুপ্তাঙ্গকে হালাল করেছো। তাদের ওপর তোমাদের হাক্ব হলো তারা যেন তোমাদের বিছানায় এমন কাউকেও আসতে না দেয়, যাকে তোমরা অপছন্দ কর। যদি তারা তা করে, তবে তাদেরকে মৃদু প্রহার করবে। আর তোমাদের ওপর তাদের হাক্ব হলো, তোমরা ন্যায়সঙ্গতভাবে তাদের খাদ্য ও পোশাকের ব্যবস্থা করবে।’’
’’আমি তোমাদের মাঝে এমন একটি জিনিস রেখে যাচ্ছি যদি তোমরা তা আকড়ে ধরো, তবে তোমরা আমার মৃত্যুর পর কখনো বিপথগামী হবে না- তা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব।’’
’’হে লোক সকল! তোমরা আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে, তখন তোমরা কি বলবে? লোকেরা উত্তরে বললো, আমরা সাক্ষ্য দিবো যে, আপনি নিশ্চয়ই আল্লাহর বাণী আমাদের কাছে পৌঁছিয়েছেন। নিজের কর্তব্য সম্পূর্ণরূপে পালন করেছেন এবং আমাদের কল্যাণ কামনা করেছেন। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজের শাহাদাত অঙ্গুলি আকাশের দিকে উঠিয়ে এবং মানুষের দিকে তা ইঙ্গিত করে তিনবার বললেন, ’’হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থেকো, হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থেকো।’’
অতঃপর বিলাল(রাঃ) আযান ও ইক্বামাত(ইকামত/একামত) দিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুহরের সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করলেন। বিলাল আবার ইক্বামাত(ইকামত/একামত) দিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’আসরের সালাত আদায় করলেন। এর মাঝে কোন নফল সালাত আদায় করলেন না। এরপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ক্বাস্ওয়া উষ্ট্রীতে আরোহণ করে (’আরাফাতে) নিজের অবস্থানস্থলে পৌঁছলেন। এখানে এর পিছন দিক (জাবালে রহমতের নীচে) পাথরসমূহের দিকে এবং হাবলুল মুশাত-কে নিজের সম্মুখে করে কিবলার দিকে ফিরলেন। সূর্য না ডুবা ও পিত রং কিছুটা না চলে যাওয়া পর্যন্ত এভাবে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এখানে দাঁড়িয়ে রইলেন।
এরপর সূর্যের গোলক পরিপূর্ণ নীচের দিকে অদৃশ্য হয়ে গেলো। এরপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উসামাকে নিজের সওয়ারীর পেছনে বসালেন এবং মুযদালিফায় পৌঁছা পর্যন্ত সওয়ারী চালাতে থাকলেন। এখানে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এক আযান ও দুই ইক্বামাত(ইকামত/একামত)ের সাথে মাগরিব ও ’ইশার সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করলেন। এর মধ্যে কোন নফল সালাত আদায় করলেন না। তারপর ভোর না হওয়া পর্যন্ত শুয়ে রইলেন। ভোর হয়ে গেলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আযান ও ইক্বামাত(ইকামত/একামত) দিয়ে ফজরের সালাত আদায় করলেন। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ক্বাস্ওয়া নামক উষ্ট্রীতে আরোহণ করে চলতে লাগলেন যতক্ষণ না মাশ্’আরাল হারামে এসে পৌঁছলেন। সেখানে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর কাছে দু’আ করলেন। তাঁর মহিমা ঘোষণা করলেন, কালিমায়ে তাওহীদ (লা- ইলা-হা ইল্লালস্ন-হ) পড়লেন এবং তাঁর একত্ব ঘোষণা করলেন। এভাবে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সেখানে আকাশ পরিষ্কার হওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকলেন।
অতঃপর তিনি সূর্যোদয়ের পূর্বেই সওয়ারী চালিয়ে দিলেন এবং আপন (চাচাতো ভাই) ফযল ইবনু ’আব্বাস-কে সওয়ারীর পেছনে বসালেন। এভাবে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ’বাত্বনি মুহাস্সির’ নামক স্থানে পৌঁছলেন এবং সওয়ারীকে কিছুটা দৌড়ালেন। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মধ্যম পথে চললেন যা বড় জামারার দিকে গিয়েছে। সুতরাং তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ওই জামারায় পৌঁছলেন যা গাছের নিকট অবস্থিত (অর্থাৎ- বড় জামারাহ্) এবং বাত্বনি ওয়াদী (অর্থাৎ- নীচের খালি জায়গা) হতে এর উপর বুটের মতো সাতটি কংকর মারলেন। আর প্রত্যেক কংকর মারার সময় ’’আল্লা-হু আকবার’’ বললেন। এরপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সেখান থেকে কুরবানীর জায়গায় ফিরে আসলেন এবং তেষট্টিটি উট নিজ হাতে কুরবানী করলেন। অতঃপর যা বাকী রইলো তা ’আলীকে বাকী পশুগুলো দিলেন, তিনি তা কুরবানী করলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজের পশুতে ’আলীকেও শারীক করলেন। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রত্যেক পশু হতে এক টুকরা নিয়ে একই হাড়িতে পাকানোর নির্দেশ দেন। সুতরাং নির্দেশ অনুযায়ী একটি ডেকচিতে তা পাকানো হয়।
তারা উভয়ে এর মাংস (গোসত/মাংস) খেলেন ও ঝোল পান করলেন। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সওয়ারীতে আরোহণ করলেন এবং বায়তুল্লাহর দিকে রওয়ানা হলেন। মক্কায় পৌঁছে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যুহরের সালাত আদায় করলেন। এরপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) (নিজ বংশ) বানী ’আবদুল মুত্ত্বালিব-এর নিকট পৌঁছলেন। তারা তখন যমযমের পাড়ে দাঁড়িয়ে লোকজনকে পানি পান করাচ্ছিলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদেরকে বললেন, হে বানী আবদুল মুত্ত্বালিব! তোমরা টানো (দ্রুত কর), আমি যদি আশংকা না করতাম যে, পানি পান করানোর ব্যাপারে লোকেরা তোমাদের উপরে জয়লাভ করবে, তবে আমিও তোমাদের সাথে পানি টানতাম। তখন তারা তাঁকে এক বালতি পানি এনে দিলেন, তা হতে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পানি পান করলেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ قِصَّةِ حَجَّةِ الْوَدَاعِ
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَكَثَ بِالْمَدِينَةِ تِسْعَ سِنِينَ لَمْ يَحُجَّ ثُمَّ أَذَّنَ فِي النَّاسِ بالحجِّ فِي الْعَاشِرَةِ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَاجٌّ فَقَدِمَ الْمَدِينَةَ بَشَرٌ كَثِيرٌ فَخَرَجْنَا مَعَهُ حَتَّى إِذَا أَتَيْنَا ذَا الْحُلَيْفَةِ فَوَلَدَتْ أَسْمَاءُ بِنْتُ عُمَيْسٍ مُحَمَّدَ بْنَ أَبِي بَكْرٍ فَأَرْسَلَتْ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: كَيْفَ أصنعُ؟ قَالَ: «اغتسِلي واستثقري بِثَوْبٍ وَأَحْرِمِي» فَصَلَّى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الْمَسْجِدِ ثُمَّ رَكِبَ الْقَصْوَاءَ حَتَّى إِذَا اسْتَوَتْ بِهِ نَاقَتُهُ عَلَى الْبَيْدَاءِ أَهَلَّ بِالتَّوْحِيدِ «لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ» . قَالَ جَابِرٌ: لَسْنَا نَنْوِي إِلَّا الْحَجَّ لَسْنَا نَعْرِفُ الْعُمْرَةَ حَتَّى إِذَا أَتَيْنَا الْبَيْتَ مَعَهُ اسْتَلَمَ الرُّكْنَ فَطَافَ سَبْعًا فَرَمَلَ ثَلَاثًا وَمَشَى أَرْبَعًا ثُمَّ تَقَدَّمَ إِلَى مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ فَقَرَأَ: (وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبراهيمَ مُصَلَّى)
فَصَلَّى رَكْعَتَيْنِ فَجَعَلَ الْمَقَامَ بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْبَيْتِ وَفِي رِوَايَةٍ: أَنَّهُ قَرَأَ فِي الرَّكْعَتَيْنِ: (قُلْ هوَ اللَّهُ أَحَدٌ و (قُلْ يَا أيُّها الكافِرونَ)
ثُمَّ رَجَعَ إِلَى الرُّكْنِ فَاسْتَلَمَهُ ثُمَّ خَرَجَ مِنَ الْبَابِ إِلَى الصَّفَا فَلَمَّا دَنَا مِنَ الصَّفَا قَرَأَ: (إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شعائِرِ اللَّهِ)
أَبْدَأُ بِمَا بَدَأَ اللَّهُ بِهِ فَبَدَأَ بِالصَّفَا فَرَقِيَ عَلَيْهِ حَتَّى رَأَى الْبَيْتَ فَاسْتَقْبَلَ الْقِبْلَةَ فَوَحَّدَ اللَّهَ وَكَبَّرَهُ وَقَالَ: «لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ أَنْجَزَ وَعْدَهُ وَنَصَرَ عَبْدَهُ وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحْدَهُ» . ثُمَّ دَعَا بَيْنَ ذَلِكَ قَالَ مِثْلَ هَذَا ثَلَاثَ مَرَّاتٍ ثُمَّ نَزَلَ وَمَشَى إِلَى الْمَرْوَةِ حَتَّى انْصَبَّتْ قَدَمَاهُ فِي بَطْنِ الْوَادِي ثُمَّ سَعَى حَتَّى إِذَا صَعِدْنَا مَشَى حَتَّى أَتَى الْمَرْوَةَ فَفَعَلَ عَلَى الْمَرْوَةِ كَمَا فَعَلَ عَلَى الصَّفَا حَتَّى إِذَا كَانَ آخِرُ طَوَافٍ عَلَى الْمَرْوَةِ نَادَى وَهُوَ عَلَى الْمَرْوَةِ وَالنَّاسُ تَحْتَهُ فَقَالَ: «لَوْ أَنِّي اسْتَقْبَلْتُ مِنْ أَمْرِي مَا اسْتَدْبَرْتُ لَمْ أسق الهَدْيَ وجعلتُها عُمْرةً فمنْ كانَ مِنْكُم لَيْسَ مَعَهُ هَدْيٌ فَلْيَحِلَّ وَلْيَجْعَلْهَا عُمْرَةً» . فَقَامَ سُرَاقَةُ بْنُ مَالِكِ بْنِ جُعْشُمٍ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَلِعَامِنَا هَذَا أَمْ لِأَبَدٍ؟ فَشَبَّكَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَصَابِعَهُ وَاحِدَةً فِي الْأُخْرَى وَقَالَ: «دَخَلَتِ الْعُمْرَةُ فِي الْحَجِّ مَرَّتَيْنِ لَا بَلْ لِأَبَدِ أَبَدٍ» . وَقَدِمَ عَلِيٌّ مِنَ الْيَمَنِ بِبُدْنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ لَهُ: «مَاذَا قُلْتَ حِينَ فَرَضْتَ الْحَجَّ؟» قَالَ: قُلْتُ: اللهُمَّ إِنِّي أُهِلُّ بِمَا أهلَّ بهِ رسولُكَ قَالَ: «فَإِنَّ مَعِي الْهَدْيَ فَلَا تَحِلَّ» . قَالَ: فَكَانَ جَمَاعَةُ الْهَدْيِ الَّذِي قَدِمَ بِهِ عَلِيٌّ مِنَ الْيَمَنِ وَالَّذِي أَتَى بِهِ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِائَةً قَالَ: فَحَلَّ النَّاسُ كُلُّهُمْ وَقَصَّرُوا إِلَّا النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم وَمن كَانَ مَعَه من هدي فَمَا كَانَ يَوْمُ التَّرْوِيَةِ تَوَجَّهُوا إِلَى مِنًى فَأَهَلُّوا بِالْحَجِّ وَرَكِبَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَصَلَّى بِهَا الظُّهْرَ وَالْعَصْرَ وَالْمَغْرِبَ وَالْعِشَاءَ وَالْفَجْرَ ثُمَّ مَكَثَ قَلِيلًا حَتَّى طَلَعَتِ الشَّمْسُ وَأَمَرَ بِقُبَّةٍ مِنْ شَعَرٍ تُضْرَبُ لَهُ بِنَمِرَةَ فَسَارَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَا تَشُكُّ قُرَيْشٌ إِلَّا أَنَّهُ وَاقِفٌ عِنْدَ الْمَشْعَرِ الْحَرَامِ كَمَا كَانَتْ قُرَيْشٌ تَصْنَعُ فِي الْجَاهِلِيَّةِ فَأجَاز رَسُول الله صلى حَتَّى أَتَى عَرَفَةَ فَوَجَدَ الْقُبَّةَ قَدْ ضُرِبَتْ لَهُ بِنَمِرَةَ فَنَزَلَ بِهَا حَتَّى إِذَا زَاغَتِ الشَّمْسُ أَمَرَ بِالْقَصْوَاءِ فَرُحِلَتْ لَهُ فَأَتَى بَطْنَ الْوَادِي فَخَطَبَ النَّاسَ وَقَالَ: «إِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ حَرَامٌ عَلَيْكُمْ كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا فِي شَهْرِكُمْ هَذَا فِي بَلَدِكُمْ هَذَا أَلَا كُلُّ شَيْءٍ مِنْ أَمْرِ الْجَاهِلِيَّةِ تَحْتَ قَدَمَيَّ مَوْضُوعٌ وَدِمَاءُ الْجَاهِلِيَّةِ مَوْضُوعَةٌ وَإِنَّ أَوَّلَ دَمٍ أَضَعُ مِنْ دِمَائِنَا دَمُ ابْنِ رَبِيعَةَ بْنِ الْحَارِثِ وَكَانَ مُسْتَرْضَعًا فِي بَنِي سَعْدٍ فَقَتَلَهُ هُذَيْلٌ وَرِبَا الْجَاهِلِيَّةِ مَوْضُوعٌ وَأَوَّلُ رِبًا أَضَعُ مِنْ رِبَانَا رِبَا عَبَّاسِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَإِنَّهُ مَوْضُوعٌ كُلُّهُ فَاتَّقُوا اللَّهَ فِي النِّسَاءِ فَإِنَّكُمْ أَخَذْتُمُوهُنَّ بِأَمَانِ اللَّهِ وَاسْتَحْلَلْتُمْ فُرُوجَهُنَّ بِكَلِمَةِ اللَّهِ وَلَكُمْ عَلَيْهِنَّ أَنْ لَا يُوطِئْنَ فُرُشَكُمْ أَحَدًا تَكْرَهُونَهُ فَإِنْ فَعَلْنَ ذَلِكَ فَاضْرِبُوهُنَّ ضَرْبًا غَيْرَ مُبَرِّحٍ وَلَهُنَّ عَلَيْكُمْ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَقَدْ تَرَكْتُ فِيكُمْ مَا لَنْ تَضِلُّوا بَعْدَهُ إِنِ اعْتَصَمْتُمْ بِهِ كِتَابَ اللَّهِ وَأَنْتُمْ [ص:786] تُسْأَلُونَ عَنِّي فَمَا أَنْتُمْ قَائِلُونَ؟» قَالُوا: نَشْهَدُ أَنَّكَ قَدْ بَلَّغْتَ وَأَدَّيْتَ وَنَصَحْتَ. فَقَالَ بِإِصْبَعِهِ السَّبَّابَةِ يَرْفَعُهَا إِلَى السَّمَاءِ وَيَنْكُتُهَا إِلَى النَّاسِ: «اللَّهُمَّ اشْهَدْ اللَّهُمَّ اشْهَدْ» ثَلَاثَ مَرَّاتٍ ثُمَّ أَذَّنَ بِلَالٌ ثُمَّ أَقَامَ فَصَلَّى الظُّهْرَ ثُمَّ أَقَامَ فَصَلَّى الْعَصْرَ وَلَمْ يُصَلِّ بَيْنَهُمَا شَيْئًا ثُمَّ رَكِبَ حَتَّى أَتَى الْمَوْقِفَ فَجَعَلَ بَطْنَ نَاقَتِهِ الْقَصْوَاءِ إِلَى الصَّخَرَاتِ وَجَعَلَ حَبْلَ الْمُشَاةِ بَيْنَ يَدَيْهِ وَاسْتَقْبَلَ الْقِبْلَةَ فَلَمْ يَزَلْ وَاقِفًا حَتَّى غَرَبَتِ الشَّمْسُ وَذَهَبَتِ الصُّفْرَةُ قَلِيلًا حَتَّى غَابَ الْقُرْصُ وَأَرْدَفَ أُسَامَةَ وَدَفَعَ حَتَّى أَتَى الْمُزْدَلِفَةَ فَصَلَّى بِهَا الْمَغْرِبَ وَالْعَشَاءَ بِأَذَانٍ وَاحِدٍ وَإِقَامَتَيْنِ وَلَمْ يُسَبِّحْ بَيْنَهُمَا شَيْئًا ثُمَّ اضْطَجَعَ حَتَّى طَلَعَ الْفَجْرُ فَصَلَّى الْفَجْرَ حِينَ تَبَيَّنَ لَهُ الصُّبْحُ بِأَذَانٍ وَإِقَامَةٍ ثُمَّ رَكِبَ الْقَصْوَاءَ حَتَّى أَتَى الْمَشْعَرَ الْحَرَامَ فَاسْتَقْبَلَ الْقِبْلَةَ فَدَعَاهُ وَكَبَّرَهُ وَهَلَّلَهُ وَوَحَّدَهُ فَلَمْ يَزَلْ وَاقِفًا حَتَّى أَسْفَرَ جِدًّا فَدَفَعَ قَبْلَ أَنْ تَطْلُعَ الشَّمْسُ وَأَرْدَفَ الْفَضْلَ بْنَ عَبَّاسٍ حَتَّى أَتَى بَطْنَ مُحَسِّرٍ فَحَرَّكَ قَلِيلًا ثُمَّ سَلَكَ الطَّرِيقَ الْوُسْطَى الَّتِي
تَخْرُجُ
عَلَى الْجَمْرَةِ الْكُبْرَى حَتَّى أَتَى الْجَمْرَةَ الَّتِي عِنْدَ الشَّجَرَةِ فَرَمَاهَا بِسَبْعِ حَصَيَاتٍ يُكَبِّرُ مَعَ كُلِّ حَصَاةٍ مِنْهَا مِثْلَ حَصَى الْخَذْفِ رَمَى مِنْ بَطْنِ الْوَادِي ثُمَّ انْصَرَفَ إِلَى الْمَنْحَرِ فَنَحَرَ ثَلَاثًا وَسِتِّينَ بَدَنَةً بِيَدِهِ ثُمَّ أَعْطَى عَلِيًّا فَنَحَرَ مَا غَبَرَ وَأَشْرَكَهُ فِي هَدْيِهِ ثُمَّ أَمَرَ مِنْ كُلِّ بَدَنَةٍ بِبَضْعَةٍ فَجُعِلَتْ فِي قِدْرٍ فَطُبِخَتْ فَأَكَلَا مِنْ لَحْمِهَا وَشَرِبَا مِنْ مَرَقِهَا ثُمَّ رَكِبَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَفَاضَ إِلَى الْبَيْتِ فَصَلَّى بِمَكَّةَ الظُّهْرَ فَأَتَى عَلَى بَنِي عَبْدِ الْمُطَّلِبِ يَسْقُونَ عَلَى زَمْزَمَ فَقَالَ: «انْزِعُوا بَنِي عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَلَوْلَا أَنْ يَغْلِبَكُمُ النَّاسُ عَلَى سِقَايَتِكُمْ لَنَزَعْتُ مَعَكُمْ» . فَنَاوَلُوهُ دَلْوًا فَشَرِبَ مِنْهُ. رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যা: (اغْتَسِلِىْ) ‘‘তুমি গোসল করো’’। অত্র হাদীসের এ অংশটি প্রমাণ করে নিফাস অবস্থায় ইহরাম বাঁধার জন্য গোসল করা প্রয়োজন। যদিও সে তখনো নিফাস হতে পবিত্র হয়নি। ঋতুবতী মহিলার ক্ষেত্রেও এ বিধান প্রযোজ্য। আর এ গোসল পবিত্রতার গোসল নয় বরং তা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও দুর্গন্ধ দূর করার নিমিত্তে। যাতে সমবেত লোকজন দুর্গন্ধজনিত কষ্ট হতে মুক্ত থাকতে পারে।
(اسْتَلَمَ الرُّكْنَ) ‘‘হাজারে আস্ওয়াদ স্পর্শ করলেন।’’ কোন প্রকার গুণ বর্ণনা করে শুধুমাত্র (الرُّكْنَ) শব্দটি উল্লেখ করলে তা দ্বারা হাজারে আস্ওয়াদই বুঝায়। অর্থাৎ- তিনি উক্ত পাথরটির উপর হাত রাখলেন এবং তাতে চুমু দিলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) রুকনে ইয়ামানীকেও স্পর্শ করেন তবে তাতে চুমু দেননি। সম্ভব হলে হাজারে আস্ওয়াদ স্পর্শ করে তাতে চুমু দেয়া সুন্নাত। যদি তা কষ্টকর হয় তবে শুধুমাত্র হাত দ্বারা স্পর্শ করে হাতে চুমু দিবে। তাও সম্ভব না হলে লাঠি দ্বারা পাথর স্পর্শ করে তাতে চুমু দিবে। তাও যদি সম্ভব না হয় তাহলে হাজারে আসওয়াদের দিকে কোন কিছু দিয়ে ইশারা করবে। তবে ইশারাকৃত বস্ত্ততে চুমু দিবে না। আর রুকনে ইয়ামানীতে শুধুমাত্র স্পর্শ করাই সুন্নাত। তাতে চুমু দেয়া সুন্নাত নয়। আর তা স্পর্শ করতে না পারলে অন্য কিছু করবে না। তাওয়াফের প্রতি চক্করেই হাজারে আসওয়াদের এসে তার দিকে ইশারা করা এবং ‘আল্লা-হু আকবার’ বলা মুস্তাহাব।
(فَرَمَلَ) ‘‘অতঃপর তিনি রমল করলেন।’’ অর্থাৎ- কাঁধ দুলিয়ে ছোট পদক্ষেপে দ্রুতগতিতে অগ্রসর হলেন। (ثَلَاثًا) ‘‘তিনবার’’ অর্থাৎ- সাত চক্করের তিন চক্করে তিনি রমল করে বাকী চার চক্কর স্বাভাবিক গতিতে হাঁটলেন। আর এ তাওয়াফের সকল চক্করেই তিনি ইযতিবা' করেন। ডান কাঁধ খালি চাদরের দু’প্রান্ত বাম কাঁধের উপর তুলে দিয়ে গায়ে চাদর জড়ানোকে ইযতিবা' বলা হয়। ইমাম নাববী বলেনঃ মুহরিম যদি ‘আরাফাতে অবস্থানের পূর্বে মক্কাতে প্রবেশ করে তার জন্য তাওয়াফ কুদূম করা সুন্নাত। আর তাওয়াফে কুদূমের প্রথম তিন চক্করে রমল করাও সুন্নাত।
(فَصَلّٰى رَكْعَتَيْنِ) ‘‘অতঃপর তিনি দু’ রাক্‘আত সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করলেন।’’ অত্র হাদীস প্রমাণ করে তাওয়াফ শেষে মাকামে ইব্রাহীমের পিছনে দু’ রাক্‘আত সালাত আদায় করা বিধিসম্মত। এ বিষয়ে সকলেই একমত। তবে এ সালাত সুন্নাত, না-কি ওয়াজিব এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে।
(ثُمَّ رَجَعَ إِلَى الرُّكْنِ فَاسْتَلَمَه) ‘‘এরপর তিনি হাজারে আস্ওয়াদের নিকটে ফিরে এসে তা স্পর্শ করলেন।’’ এতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, তাওয়াফ কুদূম সম্পাদনকারী তাওয়াফের পর সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) শেষে পুনরায় হাজারে আসওয়াদ স্পর্শ করার পর সাফা পাহাড়ের দিকের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাবে। তবে সকলেই একমত যে, এ স্পর্শ করা সুন্নাত, তা ওয়াজিব নয়। আর তা পরিত্যাগকারীর জন্য কোন কাফফারাহ দিতে হবে না।
(أَبْدَأُ بِمَا بَدَأَ اللّٰهُ بِه) ‘‘আমি সেখান থেকে (সা‘ঈ) শুরু করব যা দিয়ে আল্লাহ আয়াত শুরু করেছেন’’। অর্থাৎ- আমি সাফা পাহাড় থেকে সা‘ঈর কাজ শুরু করব। কেননা আল্লাহ বলেছেনঃ إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللّٰهِ।
‘আল্লামা সিন্দী বলেনঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বক্তব্য থেকে এ কথা বুঝায় যে, আল্লাহ তা‘আলা যে বিষয় প্রথমে উল্লেখ করেছেন কর্মক্ষেত্রেও তা প্রথমে হওয়া বাঞ্ছনীয়। তবে এ শুরুটা মুস্তাহাব, ওয়াজিব নয়।
(فَبَدَأَ بِالصَّفَا فَرَقِىَ عَلَيْهِ) ‘‘তিনি সা‘ঈ শুরু করার উদ্দেশে সাফা পাহাড়ে আরোহণ করলেন।’’
(ثُمَّ دَعَا بَيْنَ ذٰلِكَ قَالَ مِثْلَ هٰذَا ثَلَاثَ مَرَّاتٍ) অতঃপর তিনি এর মাঝে দু‘আ করলেন। আর উল্লিখিত যিকির তিনবার পাঠ করলেন। ‘আল্লামা সিন্দী বলেনঃ উল্লিখিত যিকির তিনবার পাঠ করবে এবং প্রত্যেকবার অত্র যিকির পাঠ শেষে দু‘আ করবে।
ইমাম নাবাবী বলেনঃ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী- (أَبْدَأُ بِمَا بَدَأَ اللّٰهُ بِه)। অত্র হাদীসে হজ্জের বিভিন্ন বিষয় বর্ণিত হয়েছে।
(১) সা‘ঈর জন্য শর্ত হলো তা সাফা থেকে শুরু করতে হবে। এটা ইমাম শাফি‘ঈ, ইমাম মালিক ও জমহূর ‘উলামাগণের অভিমত। নাসায়ীতে বর্ণিত আছে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (أَبْدَوْوا بِمَا بَدَأَ اللّٰهُ بِه) অর্থাৎ- ‘‘তোমরা সেখান থেকে শুরু করো যা দ্বারা আল্লাহ শুরু করেছেন।’’ এখানে (أَبْدَأوا) শব্দটি বহুবচন এবং তা আদেশসূচক।
(২) সা‘ঈর শুরুতে সাফা পাহাড়ে আরোহণ করা উচিত। তবে এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। জমহূর ‘উলামাগণের মতে তা সুন্নাত, ওয়াজিব নয়। তা পরিত্যাগ করলে সা‘ঈ বিশুদ্ধ হবে। কিন্তু ফাযীলাত থেকে বঞ্চিত হবে। আমাদের সাথীরা বলেন, তা মুস্তাহাব।
(৩) সাফা পাহাড়ে আরোহণ করে কিবলামুখী হয়ে উল্লেখিত যিকির পাঠ এবং দু‘আ করা সুন্নাত। আর তা তিনবার পাঠ করবে।
(حَتَّى انْصَبَّتْ قَدَمَاهُ فِىْ بَطْنِ الْوَادِىْ ثُمَّ سَعٰى) ‘‘তার পদদ্বয় নিম্নভূমিতে অবতরণের পর তিনি দৌড়ালেন।’’ অর্থাৎ- ছোট পদক্ষেপে দ্রুত পদচারণা করলেন।
(حَتّٰى اِذَا صَعِدَتَا) ‘‘এমনভাবে তার পদদ্বয় নিম্নভূমি হতে উঁচু ভূমিতে আরোহণের পর তিনি হেঁটে চললেন।’’ ইমাম নাবাবী বলেনঃ এতে এ প্রমাণ পাওয়া যায় যে, সা‘ঈ করাকালে নিম্নভূমিতে দ্রুত পদক্ষেপে দৌড়াতে হবে। অতঃপর উঁচু ভূমিতে আসার পর সাধারণ গতিতে মারওয়া পর্যন্ত হেঁটে চলবে। এ স্থানে সাত চক্করের প্রতি চক্করেই দ্রুত দৌড়িয়ে চলা মুস্তাহাব। আর নিম্নভূমির পূর্বে উঁচু ভূমিতে হেঁটে চলা মুস্তাহাব। যদি কোন ব্যক্তি সাফা ও মারওয়ার মাঝখানে সম্পূর্ণ স্থান হেঁটে চলে অথবা দৌড়িয়ে চলে তবে তার সা‘ঈ বিশুদ্ধ হবে। কিন্তু ফাযীলাত থেকে বঞ্চিত হবে।
(فَفَعَلَ عَلَى الْمَرْوَةِ كَمَا فَعَلَ عَلَى الصَّفَا) ‘‘মারওয়াতে তাই করলেন তিনি সাফাতে যা করেছিলেন। অর্থাৎ- মারওয়াতে আরোহণ করে কিবলামুখী হয়ে পূর্বোল্লিখিত যিকির পাঠ ও দু‘আ করলেন। এটিও পূর্বের মতই সুন্নাত।
(حَتّٰى اِذَا كَانَ اٰخِرُ طَوَافٍ عَلَى الْمَرْوَةِ) ‘‘তাওয়াফের শেষ চক্করে যখন তিনি মারওয়াতে এলেন।’’ হাদীসের এ অংশ প্রমাণ করে যে, সাফা হতে মারওয়াতে যাওয়া এক চক্কর গণনা করা হবে। আবার মারওয়াহ্ থেকে সাফাতে যাওয়া আরেক চক্কর। এভাবে সাফা থেকে সা‘ঈ শুরু করে মারওয়াতে যেয়ে সা‘ঈর সপ্তম চক্কর শেষ হবে। এটাই ইমাম শাফি‘ঈ ও জমহূর ‘উলামাগণের অভিমত। পক্ষান্তরে আবূ বাকর সায়রাফী-এর মতে সাফা থেকে মারওয়াতে গিয়ে পুনরায় সাফাতে ফিরে আসলে এক চক্কর হবে। এ মতানুযায়ী সাফা হতে সা‘ঈ শুরু হয়ে সাফাতেই তা শেষ হবে। কিন্তু এ সহীহ হাদীসটি তাদের এ অভিমত প্রত্যাখ্যান করে।
(لَوْ أَنِّى اسْتَقْبَلْتُ مِنْ أَمْرِىْ مَا اسْتَدْبَرْتُ) ‘‘যা আমি এখন বুঝতে পেরেছি তা যদি আমি আগে বুঝতে পারতাম।’’ অর্থাৎ- যখন আমি হজ্জের কাজ শুরু করেছি তখন যদি বুঝতে পারতাম।
(لَمْ أَسُقِ الْهَدْىَ) ‘‘তাহলে আমি কুরবানীর পশু নিয়ে আসতাম না’’। কেননা কোন ব্যক্তি যখন ইহরাম বাঁধার সময় থেকে কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে আসে তাহলে তা যাবাহ করার আগে তার জন্য হালাল হওয়া বৈধ নয়। আর ইয়াওমুন্ নাহরের পূর্বে অর্থাৎ- ১০ই যিলহজ্জের পূর্বে কুরবানীর পশু যাবাহ করা বৈধ নয়। আর এমন ব্যক্তির জন্য হজ্জের উদ্দেশে বাঁধা ইহরামকে ‘উমরাতে রূপান্তর করতে পারে না। আর যে ব্যক্তি কুরবানীর পশু না নিয়ে আসবে তার জন্য হজ্জের ইহরামকে ‘উমরার ইহরামে রূপান্তর করা বৈধ।
হাদীসের এ অংশ প্রমাণ করে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তামাত্তু' হজ্জ/হজ করেননি, বরং তাঁর হজ্জ/হজ ছিল হজ্জে কিরান।
(وَجَعَلْتُهَا عُمْرَةً) ‘‘আমি তা ‘উমরাতে রূপান্তর করতাম।’’ অর্থাৎ- আমি আমার হজ্জের ইহরামকে ‘উমরাতে রূপান্তর করে ‘উমরার কাজ সমাপনান্তে হালাল হয়ে পুনরায় হজ্জ/হজ সম্পাদন করে তামাত্তু' হজ্জ/হজ সম্পাদন করতাম।
(أَلِعَامِنَا هٰذَا أَمْ لِأَبَدٍ؟) ‘‘এ বিধান কি শুধু এ বৎসরের জন্য না-কি চিরদিনের জন্য?’’ অর্থাৎ- হজ্জের নিয়্যাত পরিবর্তন করে তা ‘উমরাতে পরিণত করা কি শুধু এ বৎসরের জন্য? হাদীসের প্রকাশমান অর্থ এটিই, অথবা এর অর্থ হলো হজ্জের মাসসমূহে ‘উমরা পালন করা অথবা হজ্জের সাথে ‘উমরা পালন করার বিধান কি শুধু এ বৎসরের জন্য?
(دَخَلَتِ الْعُمْرَةُ فِى الْحَجِّ مَرَّتَيْنِ لَا بَلْ لِأَبَدِ أَبَدٍ) ‘‘হজ্জের সাথে ‘উমরা পালনের বিধান চিরদিনের জন্য। তা কোন বৎসরের জন্য খাস নয়।" সুরাকার প্রশ্নের উদ্দেশ্য কি? তা নিয়ে ‘উলামাগণের মাঝে মতভেদ রয়েছে।
(১) এর উদ্দেশ্য হজ্জের মাসসমূহে ‘উমরা পালন করা।
(২) এর দ্বারা উদ্দেশ্য হজে কিবরান করা।
(৩) হজ্জের নিয়্যাত পরিবর্তন করে তা ‘উমরাতে পরিণত করা।
১ম মতানুযায়ী- (دَخَلَتِ الْعُمْرَةُ فِى الْحَجِّ)-এর অর্থ হলো হজ্জের মাসসমূহে ‘উমরা করা বৈধ। এর দ্বারা জাহিলী যুগের এ ধারণাকে বাতিল ঘোষণা করা যে, হজ্জের মাসসমূহে ‘উমরা বৈধ নয়।
২য় মতানুযায়ী- এর অর্থ হলো যে ব্যক্তি একই সাথে হজ্জ/হজ ও ‘উমরার নিয়্যাত করেছে তার ‘উমরা হজ্জের সাথে মিশে গেছে এবং ‘উমরার কাজসমূহ হজ্জের কাজের মধ্যে প্রবেশ করেছে, ফলে উভয় কাজ হতে একবারে হালাল হবে।
৩য় মতানুযায়ী- এর অর্থ হলো হজ্জের নিয়্যাতের মধ্যে ‘উমরা-এর নিয়্যাত প্রবেশ করেছে। অর্থাৎ- যে ব্যক্তি হজ্জের নিয়্যাত করেছে তার পক্ষে ‘উমরা-এর কাজ সম্পাদন করে হালাল হওয়া বৈধ। হজ্জের নিয়্যাত পরিবর্তন করে তা ‘উমরাতে পরিণত করার অর্থ হলো যে ব্যক্তি হজ্জে ইফরাদ বা হজ্জে কিরানের নিয়্যাত করেছে এবং সাথে কুরবানীর পশু নিয়ে যায়নি এবং সে ‘আরাফাতে অবস্থান করার পূর্বে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করার পর সাফা মারওয়াতে সা‘ঈ করেছে তার জন্য হজ্জের নিয়্যাত পরিবর্তন করে উপর্যুক্ত কাজসমূহকে শুধুমাত্র ‘উমরাতে পরিণত করার নিয়্যাত করা এবং উক্ত কাজসমূহ সমাপনান্তে মাথা মুণ্ডন করে ইহরাম থেকে হালাল হবে। পরবর্তীতে হজ্জের নিয়্যাত করে পৃথকভাবে হজ্জের কাজ সম্পাদন করে হজে তামাত্তু' সম্পাদনকারী হবে। আর পরিবর্তন করা কি শুধু সাহাবীগণের পক্ষে ঐ বৎসরের জন্য খাস ছিল না-কি তা চিরদিনের জন্য বৈধ- এ বিষয়ে ‘উলামাগণের মাঝে মতভেদ রয়েছে।
(১) ইমাম আহমাদ, আহলুয্ যাহির ও আহলুল হাদীসদের মতে তা সাহাবীগণের জন্য খাস নয় বরং এ বিধান ক্বিয়ামাত পর্যন্ত বহাল আছে। অতএব যে কোন ব্যক্তি যদি হজ্জ/হজ ইফরাদ বা হজ্জ/হজ কিরানের জন্য ইহরাম বাঁধে এবং সাথে কুরবানীর পশু না থাকে তাহলে তার ঐ ইহরামকে ‘উমরাতে পরিণত করতে পারবে এবং ‘উমরা-এর কাজ সমাপনান্তে ইহরাম থেকে হালাল হয়ে যাবে।
(২) ইমাম মালিক, শাফি‘ঈ, আবূ হানীফা ও জমহূর ‘উলামাগণের মতে এটা শুধু সাহাবীগণের পক্ষে ঐ বৎসরের জন্য খাস। পরবর্তীতে কারো জন্য তা বৈধ নয়।
যারা বলেন তা সাহাবীগণের জন্য খাস তাদের দলীল নিম্নরূপঃ
(১) মুসলিমে আবূ যার হতে বর্ণিত হাদীস। তিনি বলেনঃ হজ্জের মুত্‘আহ্, অর্থাৎ- হজ্জ/হজ্জকে ‘উমরাতে রূপান্তর করা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণের জন্য খাস।
(২) আহমাদ, আবূ দাঊদ, নাসায়ী ও ইবনু মাজাহতে বিলাল ইবনুল হারিস বর্ণিত হাদীস। তিনি বলেনঃ আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! হজ্জ/হজ্জকে ‘উমরাতে রূপান্তর করা এটা কি আমাদের জন্য খাস, না-কি তা সবার জন্যই? নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ বরং তা তোমাদের জন্য খাস।
বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হয় যে, জাবির (রাঃ) বর্ণিত হাদীস ও আবূ যার এবং বিলাল ইবনুল হারিস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসের মধ্যে বৈপরীত্য রয়েছে আসলে তা নয় বরং হাদীস দু’টোর মধ্যে সমন্বয় করা সম্ভব। তা এভাবে যে, বিলাল ইবনুল হারিস (রাঃ) এবং আবূ যার (রাঃ) বর্ণিত হাদীস সাহাবীগণের জন্য খাস এ অর্থে যে, এ সফরে যারা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে হজ্জের নিয়্যাত করেছিলেন। কিন্তু যাদের সাথে কুরবানীর পশু ছিল না রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশের কারণে তাদের জন্য ওয়াজিব ছিল হজ্জ/হজকে ‘উমরাতে রূপান্তর করা। আর তা সাহাবীগণের জন্যই খাস।
আর জাবির (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে তা চিরদিনের জন্য, অর্থাৎ- হজ্জকে ‘উমরাতে রূপান্তর করা চিরদিনের জন্য বৈধ। তবে তা ওয়াজিব নয়। হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী এবং ‘আল্লামা শানক্বীত্বী উভয় প্রকারের হাদীসের মধ্যে এভাবে সমন্বয় করেছেন। আর এটাই সঠিক। আল্লাহই ভাল জানেন।
(اَللّٰهُمَّ إِنِّىْ أُهِلُّ بِمَا أهلَّ به رَسُوْلُكَ) ‘‘হে আল্লাহ! আমি সে ইহরাম বাঁধলাম যে ধরনের ইহরাম বেঁধেছে আপনার রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।’’
এতে এ প্রমাণ পাওয়া যায় যে, কোন ব্যক্তি যদি বলে অমুক ব্যক্তি যে ধরনের ইহরাম বেঁধেছে আমিও সে ধরনের ইহরাম বাঁধলাম, তাহলে তা সহীহ ও সঠিক। এ ব্যক্তির ইহরাম ঐ ব্যক্তির ইহরামের মতই যার নাম তিনি উল্লেখ করেছেন। ইমাম শাফি‘ঈ এবং তার অনুসারীদের অভিমত এটিই।
ইমাম আবূ হানীফার মতে তার ইহরাম সঠিক। কিন্তু যার নাম তিনি উল্লেখ করেছেন এর ইহরাম উল্লিখিত ব্যক্তির ইহরামের মতো হওয়া আবশ্যক নয়।
(فَحَلَّ النَّاسُ كُلُّهُمْ) ‘‘অতঃপর সবাই হালাল হয়ে গেল।’’ অর্থাৎ- অধিকাংশ লোকই ‘উমরা সম্পাদন করে হালাল হয়ে গেল।
(وَقَصَّرُوْا) ‘‘এবং তারা তাদের মাথার চুল ছেঁটে খাটো করল।’’ ‘আল্লামা ত্বীবী বলেনঃ মাথা মুন্ডানো উত্তম হওয়া সত্ত্বেও তারা এজন্য খাটো করেছিল যাতে মাথাতে কিছু চুল অবশিষ্ট থাকে এবং হজ্জ/হজ সম্পাদনের পর মাথা মুন্ডাতে পারে যাতে তারা চুল খাটো করা এবং মাথা মুন্ডানোর উভয় প্রকারের সাওয়াবই অর্জনে সক্ষম হয়।
(يَوْمُ التَّرْوِيَةِ) ‘‘তারবিয়ার দিন’’। এটি যিলহজ্জ মাসের অষ্টম দিন। এ দিনকে (التَّرْوِيَةِ) এজন্য বলা হয় যে, হাজীগণ এ দিনে নিজেরা পানি পান করে যেমন তৃপ্ত হয় তেমনি তাদের বাহন উটকে পানি পান করিয়ে তৃপ্ত করায় এবং পরবর্তী দিনগুলোর জন্য পানির ব্যবস্থা করতো ‘আরাফাতে অবস্থানের প্রস্ত্ততি স্বরূপ। কেননা তৎকালীন সময়ে বর্তমানের ন্যায় ‘আরাফাতে পানির কোন ব্যবস্থা ছিল না।
এটাও বলা হয়ে থাকে যে, কুরায়শগণ হাজীদেরকে পান করানোর উদ্দেশে মক্কা থেকে পানি নিয়ে যেত ফলে হাজীগণ তা পান করে তৃপ্ত হত। অথবা ইব্রাহীম (আঃ) এ দিনে চিন্তা-ভাবনা করেছিলেন যে, তার পুত্র ইসমা‘ঈলকে কিভাবে কুরবানী করবেন। আর (التَّرْوِيَةِ) শব্দটি চিন্তা-ভাবনার অর্থেও ব্যবহার হয়, তাই এ দিনের নাম (يَوْمُ التَّرْوِيَةِ) ‘‘তারবিয়ার দিন’’ নামকরণ করা হয়েছে। আল্লাহ ভাল জানেন।
প্রকাশ থাকে যে, যিলহজ্জ মাসের পরস্পর ছয়টি দিনের পৃথক পৃথক নাম রয়েছে।
(১) অষ্টম দিন- ইয়াওমুত্ তারবিয়াহ্, (২) নবম দিন- ‘আরাফাহ্, (৩) দশম দিন- আন্ নাহর, (৪) একাদশ দিন- আল ক্বার। কেননা এ দিন তারা মিনাতে অবস্থান করে, (৫) দ্বাদশ দিন- আন্ নাফরুল আওয়াল, (৬) ত্রয়োদশ দিন- আন্ নাফরুস্ সানী।
(فَأَهَلُّوْا بِالْحَجِّ) ‘‘তারা হজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধল।’’
আলমুহিববুত্ তাবারী বলেনঃ এতে এ ইঙ্গিত রয়েছে যে, মক্কাহ্বাসীগণ এবং তামাত্তু হজ্জ/হজ সম্পাদনকারীগণ এ দিনই হজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধবেন। এতে এ ইঙ্গিতও পাওয়া যায় যে, মক্কাতে যারা ইহরাম বাঁধবে এ দিন তারা তাওয়াফ ও সাঈ' করবে না।
(ثُمَّ مَكَثَ قَلِيلًا حَتّٰى طَلَعَتِ الشَّمْسُ) ‘‘তিনি সূর্যোদয় পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন।’’ এতে প্রমাণিত হয় যে, সূর্যোদয়ের পর মিনা থেকে ‘আরাফার উদ্দেশে রওয়ানা হওয়া সুন্নাত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মিনাতে অবস্থান এবং তথায় সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায়, রাত যাপন করা প্রমাণ করে যে, এসবগুলোই মুস্তাহাব। অষ্টম দিনের দিবাগত রাতে মিনাতে অবস্থান করা আর মিনার দিবসগুলোতে, অর্থাৎ- ইয়াওমুন্ নাহর থেকে পরবর্তী দিনগুলোতে মিনাতে রাত যাপনের বিধানের মধে পার্থক্য রয়েছে। এতে সবাই একমত।
ইমাম নাবাবী বলেনঃ এ রাতে (অষ্টম দিন দিবাগত রাতে) মিনাতে যাতায়াত করা সুন্নাত। তা হজ্জের রুকনও নয় এবং তা ওয়াজিবও নয়। এ রাতে কেউ মিনাতে রাত যাপন না করলে তার জন্য দম ওয়াজিব নয় এতে ঐকমত্য রয়েছে।
(وَأَمَرَ بِقُبَّةٍ مِنْ شَعَرٍ تُضْرَبُ لَه بِنَمِرَةَ) ‘‘নামিরাতে তার জন্য একটি তাঁবু খাটানোর নির্দেশ দিলেন।’’ ইমাম ত্বীবী বলেন, নামিরাহ্ ‘আরাফাহ্ পার্শ্বস্থ একটি জায়গার নাম, তা ‘আরাফাহ্ নয়। ইমাম নাবাবী বলেনঃ এ হাদীস প্রমাণ করে ইহরামধারী ব্যক্তি তাঁবু বা অন্য কিছুর দ্বারা ছায়া গ্রহণ করতে পারে। অবস্থানকারীর পক্ষে ছায়া গ্রহণ করার বিষয়ে কারো দ্বিমত নেই। আরোহী ব্যক্তির পক্ষে তা বৈধ কি-না এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। অধিকাংশ ‘আলিমদের মতে তা বৈধ। ইমাম মালিক ও আহমাদের মতে মাকরূহ। ইমাম নাবাবী আরো বলেনঃ এতে এ প্রমাণ পাওয়া যায় যে, মিনা থেকে রওয়ানা হয়ে গিয়ে নামিরাতে অবস্থান করা মুস্তাহাব। কেননা সুন্নাত হলো যুহর ও ‘আসরের সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) যুহরের ওয়াক্তে একত্রে আদায় করার পর ‘আরাফাতে গিয়ে অবস্থান করা। অতএব সূর্য ঢলে পড়ার পূর্ব পর্যন্ত নামিরাতে অবস্থান করা সুন্নাত। সূর্য ঢলার পর ইমাম মুসল্লীদের নিয়ে মসজিদে ইব্রাহীমে (নামিরাতে অবস্থিত মাসজিদ) যেয়ে খুতবাহ্ দিবেন। অতঃপর তাদের নিয়ে যুহর ও ‘আসরের সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায়ান্তে ‘আরাফাতে যেয়ে অবস্থান করবেন।
(حَتّٰى اَتٰى عَرَفَةَ) ‘‘তিনি ‘আরাফাতে আগমন করলেন।’’ অর্থাৎ- ‘আরাফার নিকটবর্তী হলেন। ‘আরাফার নাম ‘আরাফাহ্ হওয়ার কারণ এই যে, জিবরীল (আঃ) এখানে ইব্রাহিম (আঃ)-কে হজ্জের নিয়মাবলী শিখিয়েছিলেন অথবা আদম (আঃ) ও হাওয়া (আঃ) দুনিয়াতে আগমনের পর এখানেই তাদের পুনর্মিলন ও পরিচয় ঘটে অথবা লোকজন পরস্পরের সাথে এখানে পরিচয় ঘটে, তাই এ স্থানের নাম ‘আরাফাহ্।
(فَخَطَبَ النَّاسَ) ‘‘অতঃপর লোকদের উদ্দেশে খুতবাহ্ দিলেন।’’ যুরক্বানী বলেনঃ অত্র হাদীসে প্রমাণ মিলে যে, ‘আরাফার দিনে অত্র স্থানে ইমামের জন্য খুতবাহ্ দেয়া মুস্তাহাব। জমহূর ‘উলামাগণের এটাই অভিমত। ইমাম শাফি‘ঈ-এর মতে হজ্জ/হজ মাওকূফে চার স্থানে খুতবাহ্ দেয়া ইমামের জন্য সুন্নাত।
(১) যিলহজ্জ মাসের সপ্তম দিনে মক্কাতে যুহরের সালাতের পর।
(২) নামিরাতে ‘আরাফার দিনে।
(৩) মিনাতে ইয়াও্মুন্ নাহরের দিন।
(৪) আইয়্যামে তাশরীক্বের দ্বিতীয় দিন, অর্থাৎ- ইয়াওমুন্ নাফরিল আওয়াল।
ইমাম আবূ হানীফার মতে হজ্জে তিনটি খুতবাহ্ সুন্নাত।
প্রথম দু’টি ইমাম শাফি‘ঈ-এর মতই।
তৃতীয়টি মিনাতে যিলহজ্জের একাদশ দিনে। অর্থাৎ- ইয়াওমুল ক্বার।
(حَرَامٌ عَلَيْكُمْ كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هٰذَا فِىْ شَهْرِكُمْ هٰذَا) ‘‘তোমাদের পরস্পরের রক্ত প্রবাহিত করা হারাম। যেমন- আজকের দিনে তা হারাম।’’
অর্থাৎ- যিলহজ্জ মাসে ‘আরাফার দিনে মক্কাতে তা যে রকম হারাম তেমনি অন্যায়ভাবে তার রক্ত প্রবাহিত করা তথা হত্যা করা সম্পদ অন্যায়ভাবে জবর-দখল করা, তোমাদের কারো সম্মানহানি করা হারাম। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমদের জান, মাল ও সম্মানের মর্যাদাকে, মক্কা, ‘আরাফাহ্ ও যিলহজ্জ মাসের মর্যাদার সাথে তুলনা করার কারণ এই যে, ঐ মাসে ঐ স্থানে এগুলো করা কারো নিকটই বৈধ নয়। তাই জান-মাল ও সম্মানের মর্যাদার গুরুত্ব বুঝানোর জন্য ঐ বস্ত্তগুলোর সাথে তুলনা করা হয়েছে।
(كُلُّ شَىْءٍ مِنْ أَمْرِ الْجَاهِلِيَّةِ تَحْتَ قَدَمَىَّ مَوْضُوعٌ) ‘‘জাহিলী যুগের সকল রীতিনীতি আমার পদতলে রাখা হলো।’’ অর্থাৎ- প্রত্যাখ্যাত ও বাতিল।
(وَدِمَاءُ الْجَاهِلِيَّةِ مَوْضُوعَةٌ) ‘‘জাহিলী যুগের রক্তের দাবী প্রত্যাখ্যাত’’। অর্থাৎ- তার ক্বিসাস, দিয়াত ও কাফফারাহ সব কিছুই বাতিল ও পরিত্যক্ত। কেউ তার দাবী করতে পারবে না। দাবী করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। ক্বিসাসের বিধান তো জাহিলী যুগের লোকেরা উদ্ভাবন করেনি। তা সত্ত্বেও নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাতিল করার মাধ্যমে জাহিলী যুগের ঝগড়ার ধারাবাহিকতাকে বন্ধ করার উদ্দেশে এ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
(وَإِنَّ أَوَّلَ دَمٍ أَضَعُ مِنْ دِمَائِنَا دَمُ ابْنِ رَبِيعَةَ بْنِ الْحَارِثِ) ‘‘আমাদের বংশের রক্তের দাবী যা আমি পরিত্যক্ত ঘোষণা করছি তা হলো রবী‘আর ছেলের রক্তের দাবী’’। ইমাম নাবাবী বলেনঃ যিনি মানুষকে ভাল কাজের আদেশ দান করেন এবং মন্দ কাজের নিষেধ করেন তার কর্তব্য হলো প্রথমে নিজের মধ্যে নিজ পরিবারের মধ্যে তা বাস্তবায়ন করা। তা করলেই বিষয়টি লোকজনের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা পাবে। এজন্যই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রথমে নিজ বংশীয় রক্তের দাবী ছেড়ে দেন। উক্ত রবী‘আহ্ ছিলেন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চাচাতো ভাই। ঐ ভাইয়ের ছেলের নাম ছিল (إياس) ইয়াস্।
(فَاتَّقُوا اللّٰهَ فِى النِّسَاءِ) ‘‘মহিলাদের ব্যাপারে তোমরা আল্লাহকে ভয় করো।’’ যেহেতু জাহিলী যুগের সকল রীতিনীতি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে তন্মধ্যে মহিলাদের অধিকার না দেয়া এবং তাদের প্রতি সুবিচার না করা জাহিলী যুগের একটি রীতি। তাই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ব্যাপারে উম্মাতকে নির্দেশ দিয়েছেন ইসলামী শারী‘আতের নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে এবং এ বিষয়ে আল্লাহকে ভয় করতে।
অত্র হাদীসে নারীদের অধিকার রক্ষা করা এবং তাদের সাথে সদাচরণের আদেশ দিয়েছেন।
(فَإِنَّكُمْ أَخَذْتُمُوهُنَّ بِأَمَانِ اللّٰهِ) ‘‘তোমরা তাদেরকে আল্লাহর আমানাত হিসেবে গ্রহণ করেছো।’’ যুরক্বানী বলেনঃ আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের নিকট আমানাত রেখেছেন। অতএব সে আমানাত সংরক্ষণ করা এবং ইহকালীন ও পরকালীন সকল অধিকার ও তাদের কল্যাণের প্রতি খেয়াল রাখা তোমাদের একান্ত কর্তব্য।
(وَلَكُمْ عَلَيْهِنَّ أَنْ لَا يُوطِئْنَ فُرُشَكُمْ أَحَدًا تَكْرَهُونَه) ‘‘তাদের ওপর তোমাদের অধিকার হলো তারা এমন কাউকে তোমার বিছানায় আসতে দিবে না যাদেরকে তোমরা অপছন্দ করো।’’
ইমাম খাত্ত্বাবী বলেনঃ এর অর্থ হলো তারা কোন পর-পুরুষকে তাদের নিকট প্রবেশের অনুমতি দিবে না তাদের সাথে গল্প করার জন্য। ইসলাম পূর্বযুগে ‘আরব দেশে নারী-পুরুষদের মধ্যে পরস্পর গল্প করার প্রচলন ছিল। এটাকে তারা কোন প্রকার দোষণীয় মনে করত না। পর্দার আয়াত নাযিল হওয়ার পর নারীদেরকে সীমাবদ্ধ করে দেয়া হলো এবং পর-পুরুষের সাথে বসে গল্প করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়া হলো।
(فَاضْرِبُوهُنَّ ضَرْبًا غَيْرَ مُبَرِّحٍ) ‘‘তাদেরকে কঠিন মার মারবে না।’’ অর্থাৎ- তারা যদি তোমাদের অনুমতি ব্যতীত কোন পুরুষকে বাড়ীতে প্রবেশের অনুমতি দিয়ে ফেলে তাহলে তোমরা তাদের হালকা প্রহার করতে পারো। কিন্তু এমন প্রহার করা যাবে না যাতে তা কষ্টদায়ক হয়। অত্র হাদীসে পুরুষদেরকে তার অধীনস্থ কোন নারী অপরাধে জড়িত হওয়ার কারণে তাদেরকে প্রহার করার অনুমতি দেয়া হয়েছে যাতে তারা সাবধান হয়ে যায়।
(وَلَهُنَّ عَلَيْكُمْ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ) ‘‘তারা তোমাদের নিকট ন্যায়সঙ্গত ভরণ-পোষণ পাওয়ার অধিকারী।’’ অর্থাৎ- তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্য-পানীয়, বাসস্থান এবং পরিধেয় পোষাকাদি যথারীতি পাবে। এ ক্ষেত্রে যেমন অপব্যয় করা যাবে না তেমনিভাবে কৃপণতাও করা যাবে না। ধনী ব্যক্তি তার অবস্থানুযায়ী তা প্রদান করবে। আর দরিদ্র ব্যক্তি তার অবস্থানুযায়ী। আর তা কুরআন, হাদীস ও ইজমা দ্বারা সাব্যস্ত।
(كِتَابَ اللّٰهِ) ‘‘আল্লাহর কিতাব’’। অর্থাৎ- আমি তোমাদের নিকট কুরআন রেখে গেলাম তা আকড়িয়ে ধরে থাকলে তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। এখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআনের কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু হাদীসের কথা উল্লেখ করেননি। অথচ কিছু কিছু বিধান হাদীস থেকেই জানা যায়। এর কারণ এই যে, কুরআনের উপর ‘আমল হাদীসের উপর ‘আমলও আবশ্যক করে। কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেছেনঃ أَطِيْعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُوْلَ ‘‘তোমরা আল্লাহর ও রসূল-এর আনুগত্য করো’’। অতএব কিতাব তথা কুরআনের উপর ‘আমলই হাদীসের উপর ‘আমল করা অপরিহার্য করে। এতে এ ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, কুরআনই আসল।
(اَللّٰهُمَّ اشْهَدْ) ‘‘হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাকো।’’ অর্থাৎ- তোমার বান্দাগণের স্বীকৃতি (نَشْهَدُ أَنَّكَ قَدْ بَلَّغْتَ) ‘‘আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি রিসালাতের দায়িত্ব উম্মাতের নিকট পৌঁছিয়েছেন।’’ তাদের এ স্বীকৃতির প্রতি তুমি সাক্ষী থাকো।
(ثُمَّ أَذَّنَ بِلَالٌ ثُمَّ أَقَامَ فَصَلَّى الظُّهْرَ ثُمَّ أَقَامَ فَصَلَّى الْعَصْرَ) ‘‘অতঃপর বিলাল আযান দেয়ার পর ইক্বামাত দিলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যুহরের সালাত আদায় করলেন, অতঃপর ইক্বামাত দিলে তিনি ‘আসরের সালাত আদায় করলেন।’’ অর্থাৎ- নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুহরের ওয়াক্তে এক আযানে ও দু’ ইক্বামাতে যুহরের ও ‘আসরের সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) জমা করে আদায় করলেন।
অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, ‘আরাফাতে এক আযান ও দু’ ইক্বামাতে যুহর ও ‘আসরের সালাত জমা করে আদায় করতে হয়।
এ বিষয়ে ‘উলামাগণের মাঝে তিনটি মত পরিলক্ষিত হয়।
(১) এক আযান ও দু’ ইক্বামাতে তা আদায় করতে হবে। এ অভিমত পোষণ করেন ইমাম আবূ হানীফা, সাওরী, শাফি‘ঈ, আবূ সাওর, আহমাদ ও ইমাম মালিক থেকে এক বর্ণনা অনুযায়ী। মালিকী মাযহাবের ইবনুল কাসিম, ইবনু মাজিশূন এবং ইবনু মাওয়াযির অভিমতও তাই।
(২) আযান ব্যতীত দু’ ইক্বামাতে তা আদায় করতে হবে। ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে এমন একটি বর্ণনা পাওয়া যায়।
(৩) দু’ আযান ও দু’টি ইক্বামাত দিতে হবে। মালিকী মাযহাবের এটিই প্রসিদ্ধ মত। ইবনু কুদামাহ্ বলেনঃ হাদীসে যা বর্ণিত হয়েছে, তাই উত্তম।
জেনে রাখা ভাল যে, ‘আরাফাতে যুহর ও ‘আসরের সালাত একত্রে আদায় করার জন্য ইমাম আবূ হানীফার মতানুযায়ী তা জামা‘আত সহকারে বড় ইমাম তথা খলীফাহ্ অথবা তার প্রতিনিধির নেতৃত্বে আদায় করা শর্ত। মুযদালিফাতে মাগরিব ও ‘ইশার সালাত একত্রে আদায় করার ক্ষেত্রে এ শর্ত প্রযোজ্য নয়। সাওরী ও ইব্রাহীম নাখ্‘ঈর অভিমতও তাই।
ইমাম মালিক, শাফি‘ঈ ও আহমাদের মতানুযায়ী তা শর্ত নয়। আর এ মতটি প্রবল।
(ثُمَّ رَكِبَ حَتّٰى اَتَى الْمَوْقِفَ) ‘‘অতঃপর বাহনে আরোহণ করে মাওক্বিফে আসলেন।’’ অর্থাৎ- ‘আরাফার ময়দানে আসলেন। ‘আরাফার ময়দান পুরোটাই অবস্থানস্থল। আর এখানে অবস্থানের সময়সীমা ‘আরাফার দিনে সূর্য ঢলে যাওয়ার পর থেকে ইয়াওমুন্ নাহরের ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত। যে ব্যক্তি এ সময়ের মধ্যে এর কোন অংশে ‘আরাফায় অবস্থান করে তার হজ্জ/হজ বিশুদ্ধ। আর যে ব্যক্তি তা করতে ব্যর্থ তার হজ্জ/হজ হবে না। এটাই ইমাম শাফি‘ঈ ও জমহূর ‘উলামাগণের অভিমত। ইমাম মালিক-এর মতে শুধুমাত্র দিনের কোন এক ভাগে ‘আরাফায় অবস্থান করলে হজ্জ/হজ বিশুদ্ধ হবে না বরং দিনের সাথে রাতের কিছু অংশও ‘আরাফায় অবস্থান করতে হবে।
(وَاسْتَقْبَلَ الْقِبْلَةَ) ‘‘তিনি কিবলামুখী হলেন।’’ এতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, ‘আরাফায় অবস্থান কিবলামুখী হওয়া মুস্তাহাব।
(حَتّٰى اَتَى الْمُزْدَلِفَةَ فَصَلّٰى بِهَا الْمَغْرِبَ وَالْعَشَاءَ بِأَذَانٍ وَاحِدٍ وَإِقَامَتَيْنِ) ‘‘তিনি মুযদালিফাতে এসে এক আযান ও দু’ ইক্বামাতে (‘ইশার ওয়াক্তে) মাগরিব ও ‘ইশার সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করলেন।’’ ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেনঃ এ হাদীসে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, ‘আরাফাহ্ থেকে মুযদালিফাতে গমনকারী ব্যক্তির জন্য মাগরিবের সালাত বিলম্ব করে ‘ইশার সালাতের সাথে একত্রে আদায় করা সুন্নাত। তবে কেউ যদি মাগরিবের সময়ে ‘আরাফাতে অথবা রাস্তায় অথবা অন্য কোন স্থানে এ দু’ সালাত একত্রে আদায় করে অথবা পৃথক পৃথকভাবে নিজ নিজ ওয়াক্তে আদায় করে, তবে তা ইমাম শাফি‘ঈ, আওযা‘ঈ, আবূ ইউসুফ আশহাব এবং আহলুল হাদীসদের কূফাহাদের মতে বৈধ। কিন্তু তা উত্তমের বিপরীত। ইমাম আবূ হানীফা এবং ফুকাবাসীদের মতে তা মুযদালিফাতেই আদায় করতে হবে। ইমাম মালিক-এর মতানুযায়ী মুযদালিফাতে আগমনের পূর্বে তা আদায় করা বৈধ নয় তবে উযর থাকলে ভিন্ন কথা।
(وَلَمْ يُسَبِّحْ بَيْنَهُمَا شَيْئًا) ‘‘এ দু’ সালাতের মাঝে তিনি কোন নফল সালাত আদায় করেননি।’’ অর্থাৎ- মাগরিব ও ‘ইশার সালাতের মাঝখানে কোন নফল সালাত আদায় করেননি।
(فَصَلَّى الْفَجْرَ حِينَ تَبَيَّنَ لَهُ الصُّبْحُ) ‘‘ফজর সালাতের ওয়াক্ত হলে তিনি ফজরের সালাত আদায় করলেন।’’ ইমাম নাবাবী বলেনঃ মুযদালিফাতে ফজর সালাতের ওয়াক্ত শুরু হওয়া মাত্রই তা আদায় করা সুন্নাত। কেননা এ দিনে অনেক কাজ রয়েছে। এজন্য এ দিন ওয়াক্ত হওয়া মাত্রই এ সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করা জরুরী যাতে অন্যান্য কাজের জন্য সময় পাওয়া যায়।
(ثُمَّ اَتَى الْمَشْعَرَ الْحَرَامَ) ‘‘অতঃপর তিনি মাশ্‘আরে হারামে আসলেন।’’ মাশ্‘আরে হারাম মুযদালিফার একটি নির্দিষ্ট স্থানের নাম। (الْمَشْعَرَ) নামকরণের কারণ এই যে, তা ‘ইবাদাতের জন্য চিহ্নিত স্থান। হারাম এজন্য বলা হয় যে, তা হেরেম এলাকায় অবস্থিত অথবা এ স্থানের মর্যাদা অন্যান্য স্থানের তুলনায় বেশী। আর এর দ্বারা উদ্দেশ্য মুযদালিফাতে অবস্থিত কুবাহ নামক পাহাড়। তবে জমহূর মুফাসসিরীনদের মতে সমস্ত মুযদালিফা অঞ্চলই মাশ্‘আরে হারাম। ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম জাবির (রাঃ) থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি এখানে অবস্থান করলাম তবে সমগ্র মুযাদালিফাহ্ অবস্থান স্থল। ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সমগ্র মুযদালিফা মাশ্‘আরুল হারাম।
(فَاسْتَقْبَلَ الْقِبْلَةَ فَدَعَاهُ) ‘‘অতঃপর তিনি কিবলামুখী হয়ে দু‘আ করলেন।’’ মুহিববু ত্ববারী বলেনঃ হাজীদের জন্য মুস্তাহাব হলো তারা এখানে ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত দু‘আ পাঠ করবে। তা নিম্নরূপ-
اللهم اعصمني بدينك وطاعتك وطواعية رسولك، اللهم جنبني حدودك، اللهم اجعلني ممن يحبك، ويحب ملائكتك، ويحب رسلك، ويحب عبادك الصالحين. اللهم حببني إليك وإلى ملائكتك وإلى رسلك وإلى عبادك الصالحين. اللهم يسرني لليسرى، وجنبني العسرى، واغفر لي في الآخرة والأولى. اللهم اجعلني أوف بعهدك الذي عاهدت عليه واجعلني من أئمة المتقين ومن ورثة جنة النعيم، واغفر لي خطيئتي يوم الدين.
(فَلَمْ يَزَلْ وَاقِفًا) ‘‘তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে থাকেন।’’ এ হাদীস প্রমাণ করে কুবাহ পাহাড়ে অবস্থান করা হজ্জের কার্য্যাবলীর অন্তর্গত এ বিষয়ে বিরোধ নেই।
(حَتّٰى اَسْفَرَ جِدًّا) ‘‘দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে খুব বেশী ফর্সা হয়ে গেল।’’ অর্থাৎ- ফজরের পর ভোরের আলো পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ পেল। ত্ববারী বলেন, মুযদালিফাতে রাত যাপনের পরিপূর্ণ সুন্নাত হলো ভোরের আলো পূর্ণভাবে প্রকাশ পাওয়া পর্যন্ত তথায় অবস্থান করা। ইমাম আবূ হানীফার মতে কেউ যদি মুযদালিফাতে ফজরের পর অবস্থান না করে তার জন্য দম ওয়াজিব। তবে ওজর থাকে তাহলে ভিন্ন কথা। ইবনু আবিদীন বলেনঃ মাশ্‘আরে হারামে অবস্থান করা ওয়াজিব তা সুন্নাত নয়। আর মুযদালিফাতে ফজর পর্যন্ত রাত যাপন করা সুন্নাত তা ওয়াজিব নয়।
(فَدَفَعَ قَبْلَ أَنْ تَطْلُعَ الشَّمْسُ) ‘‘সূর্যোদয় হওয়ার পূর্বেই তিনি মাশ্‘আরে হারাম ত্যাগ করেন।’’ এতে সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্যোদয়ের পূর্বে মিনার দিকে রওয়ানা হয়েছেন। জমহূর ‘উলামাগণের নিকট এটাই সুন্নাত। ইমাম মালিক-এর মতে পূর্বাকাশে লালিমা প্রকাশের আগেই মিনার দিকে রওয়ানা হবে।
(حَتّٰى اَتَى الْجَمْرَةَ الَّتِىْ عِنْدَ الشَّجَرَةِ فَرَمَاهَا) ‘‘অতঃপর তিনি বৃক্ষের নিকট জামারাতে এসে পাথর নিক্ষেপ করলেন।’’ এ হাদীসে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, তৎকালীন সময়ে জামারায়ে ‘আক্বাবার নিকট বৃক্ষ ছিল। শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী বলেনঃ জামারাতে পাথর নিক্ষেপের উদ্দেশ্য আল্লাহর যিকির প্রতিষ্ঠা করা।
আল্লাহর যিকির দু’ ধরনেরঃ
(১) এক প্রকার যিকির দ্বারা আল্লাহর দীনের প্রতি আনুগত্যের ঘোষণা করা। এর জন্য লোকজনের সমাবেসস্থলকে বাছাই করা হয় (সেখানে আধিক্য উদ্দেশ্য নয়)। জামারাতে পাথর নিক্ষেপ তারই অন্তর্ভুক্ত।
(২) এ প্রকার যিকির দ্বারা মহান আল্লাহর মর্যাদাকে অন্তরে প্রতিষ্ঠা করা আর এজন্য তাতে অধিক্য প্রয়োজন।
(يُكَبِّرُ مَعَ كُلِّ حَصَاةٍ مِنْهَا) ‘‘প্রতিটি পাথর নিক্ষেপকালে তাকবীর (আল্লাহু আকবার) বলতেন। ইমাম নাবাবী বলেনঃ এতে প্রমাণ পাওয়া যায়, প্রতিটি পাথর নিক্ষেপের সময় তাকবীর বলা সুন্নাত এবং প্রতিটি পাথর পৃথকভাবে নিক্ষেপ করতে হবে। যদি সাতটি পাথর একসাথে নিক্ষেপ করে তাহলে তা এক নিক্ষেপ বলে গণ্য করা হবে।
(فَنَحَرَ ثَلَاثًا وَسِتِّينَ بَدَنَةً بِيَدِه) ‘‘অতঃপর তিনি স্বীয় হস্তে তেষট্টিটি উট যাবাহ করলেন।’’ এতে জানা যায় যে, কুরবানীর পশু স্বীয় হস্তে যাবাহ করা মুস্তাহাব।
(ثُمَّ أَعْطٰى عَلِيًّا فَنَحَرَ مَا غَبَرَ) ‘‘অতঃপর বাকী পশু যাবাহ করার জন্য ‘আলী -কে দায়িত্ব দিলেন।’’ এতে জানা গেল যে, কুরবানীর পশু স্বয়ং যাবাহ না করে কাউকে যাবাহ করার দায়িত্ব দেয়া বৈধ। এতে এ প্রমাণও পাওয়া যায় যে, কুরবানীর পশুর সংখ্যা যদি বেশীও হয় তবুও তা ১০ই যিলহজ্জ তারিখে যাবাহ করাই উত্তম বিলম্ব না করে। যদিও এর পরবর্তী তিনদিনও কুরবানী করা বৈধ।
(ثُمَّ رَكِبَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ فَأَفَاضَ إِلَى الْبَيْتِ) ‘‘অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহনে আরোহণ করেন এবং দ্রুত বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করতে যান।’’
এ তাওয়াফকে তাওয়াফে ইফাযাহ্ ও তাওয়াফে যিয়ারহ্ বলা হয়। এটি হজ্জের রুকন। আর এ তাওয়াফ ‘আরাফাতে অবস্থানের পর মিনাতে এসে অবস্থান করে মক্কাতে গিয়ে তাওয়াফ করতে হয়। এ তাওয়াফের ওয়াক্ত শুরু হয় ইয়াওমুন্ নাহরের অর্ধরাত্রি অতিক্রান্ত হওয়ার পর। তবে উত্তম হলো ইয়াওমুন্ নাহরে অপরাহ্নে জামারায়ে ‘আক্বাবাতে পাথর নিক্ষেপের পর মিনাতে কুরবানীর পশু যাবাহ করে মাথা মুন্ডানোর পরে তাওয়াফ করা। তবে ইয়াওমুন্ নাহরের যে কোন সময়ে এ তাওয়াফ করা সমানভাবে বৈধ। কোন ওজর ব্যতীত তা ইয়াওমুন্ নাহরের পরে পিছিয়ে নেয়া মাকরূহ। আর আইয়্যামে তাশরীক্বের পর পর্যন্ত বিলম্ব আরো অধিক মাকরূহ। এ তাওয়াফ অবশ্যই ‘আরাফাতে অবস্থানের পর করতে হবে। কেউ যদি ইয়াওমুন্ নাহরের অর্ধ রাত্রির পরে তাওয়াফ করার পর ঐ রাতেই ফজরের পূর্বে ‘আরাফায় গিয়ে অবস্থান করে তাহলে এ তাওয়াফ বিশুদ্ধ হবে না। এ তাওয়াফ বিলম্বে করলে দম ওয়াজিব হবে কিনা তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ইমাম শাফি‘ঈ ও আহমাদ-এর মতানুসারে তা আইয়্যামে তাশরীক্বের পর পর্যন্ত বিলম্ব করলে দম ওয়াজিব নয়। ইমাম মালিক-এর মতে খুব বেশী বিলম্ব করলে দম ওয়াজিব। ইমাম আবূ হানীফার মতে আইয়্যামে তাশরীক্বের তৃতীয় দিন পর্যন্ত বিলম্ব করলে দম ওয়াজিব হবে।
(فَصَلّٰى بِمَكَّةَ الظُّهْرَ) ‘‘অতঃপর তিনি মক্কাতে যুহরের সালাত আদায় করেন।’’ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াওমুন্ নাহরে যুহরের সালাত কোথায় আদায় করেছেন তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। জাবির (রাঃ)-এর অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, তিনি যুহরের সালাত মক্কাতেই আদায় করেছেন।
অনুরূপ আবূ দাঊদে বর্ণিত হয়েছে, ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেনঃ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াওমুন নাহরে যুহরের সালাত আদায় করেন ও তাওয়াফ ইফাযাহ্ করেন। অতঃপর মিনাতে ফিরে এসে আইয়্যামে তাশরীক্বের রাতগুলোতে তিনি মিনাতেই অবস্থান করেন। তবে মুসলিমে ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফে ইফাযাহ্ সমাপনান্তে মিনাতে ফিরে যুহরের সালাত আদায় করেন।
ইবনু হাযম (রহঃ) ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) ও জাবির (রাঃ) বর্ণিত হাদীসকে প্রাধান্য দিয়ে বলেনঃ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এদিনে মক্কাতেই যুহরের সালাত আদায় করেছেন।
ইমাম নাবাবী ইবনু ‘উমারের এ হাদীস ও জাবির (রাঃ) এবং ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বর্ণিত হাদীসের মধ্যে এভাবে সমন্বয় করেছেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য ঢলার পূর্বেই তাওয়াফে ইফাযাহ্ সম্পাদন করার পর মক্কাতে যুহরের সালাত আদায় করেন। অতঃপর মিনাতে এসে সাহাবীগণের অনুরোধক্রমে তিনি তাদের নিয়ে পুনরায় যুহরের সালাত আদায় করেন যা ছিল নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য নফল।
(فَنَاوَلُوهُ دَلْوًا فَشَرِبَ مِنْهُ) ‘‘তারা তাঁকে (যমযমের) পানির বালতি দিলে তিনি তা থেকে পান করলেন।’’ এতে প্রমাণ মিলে যে, হজ্জ/হজ সম্পাদনকারীর জন্য যমযমের পানি পান করা মুস্তাহাব।
বলা হয়ে থাকে যে, যমযমের পানি দাঁড়িয়ে পান করা মুস্তাহাব। এর স্বপক্ষে বুখারীতে ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসটিকে দলীল হিসেবে উপস্থাপন করা হয় যাতে আছে- ‘‘আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে যমযমের পানি পান করিয়েছি। তিনি তা দাঁড়িয়ে পান করেছেন।
‘আসিম (রহঃ) বলেনঃ ‘ইকরিমাহ্ শপথ করে বলেছেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে সময় উটের উপর ছিলেন। অতএব অত্র হাদীস দ্বারা যমযমের পানি দাঁড়িয়ে পান করার দলীল গ্রহণ করা সমালোচনামুক্ত নয়। কেননা বিষয়টি এমনই যা ‘ইকরিমাহ্ শপথ করে বলেছেন তা হলো যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তখন বাহনের উপর ছিলেন। আর এ অবস্থাকে قائم তথা দাঁড়ানোই বলা হয়। ইবনু ‘আব্বাস-এর বক্তব্য দ্বারা উদ্দেশ্য তাই। অতএব নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ অবস্থা এবং দাঁড়িয়ে পান করা হাদীসের মধ্যে কোন বৈপরীত্য নেই। অথবা ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বর্ণিত হাদীস থেকে তার প্রকাশমান অর্থ গ্রহণ করলেও এ প্রমাণ পাওয়া যায় যে, দাঁড়িয়ে পান করা বৈধ। অর্থাৎ- নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে পান করেছিলেন তা বৈধতা বুঝানোর জন্য। এটাও বলা হয়ে থাকে যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ওজর থাকার কারণে দাঁড়িয়ে পান করেছিলেন। অতএব বসে পান করা মুস্তাহাব, দাঁড়িয়ে পান করা মাকরূহ তবে প্রয়োজনে দাঁড়িয়ে পান করা বৈধ।
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিদায় হজের বৃত্তান্তের বিবরণ
২৫৫৬-[২] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বিদায় হজে বের হলাম। আমাদের কেউ কেউ ’উমরার ইহরাম বেঁধেছিল আর কেউ কেউ হজের ইহরাম। আমরা যখন মক্কায় পৌঁছলাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে ব্যক্তি ’উমরার ইহরাম বেঁধেছে এবং কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে আসেনি সে যেন ’উমরার কাজ শেষ করে (ইহরাম খুলে) হালাল হয়ে যায়। আর যে ব্যক্তি ’উমরার ইহরাম বেঁধেছে, সাথে করে কুরবানীর পশুও এনেছে, সে যেন হজের তালবিয়াহ্ পাঠ করে ’উমরার সাথে এবং ইহরাম না খুলে, যে পর্যন্ত হজ্জ/হজ ও ’উমরা উভয় হতে অবসর গ্রহণ না করে। অপর এক বর্ণনায় আছে, সে যেন ইহরাম না খুলে যে পর্যন্ত পশু কুরবানী করে অবসর গ্রহণ না করে। আর যে শুধু হজের ইহরাম বেঁধেছে সে যেন হজের কাজ পূর্ণ করে। তিনি [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] বলেন, আমি ঋতুমতী হয়ে গেলাম, (’উমরার জন্য) বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করতে পারলাম না এবং সাফা-মারওয়ার সা’ঈও করতে পারলাম না। আমার অবস্থা ’আরাফার দিন উপস্থিত হওয়া পর্যন্ত এরূপই থাকলো। অথচ আমি ’উমরা ছাড়া অন্য কিছুর ইহরাম বাঁধিনি।
তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে আদেশ করলেন, আমি যেন আমার মাথার চুল খুলে ফেলি ও চিরুনী করি। সুতরাং হজের ইহরাম বাঁধি, আর ’উমরা ত্যাগ করি। আমি তা-ই করলাম এবং আমার হজ্জ/হজ আদায় করলাম। এরপর আমার ভাই ’আবদুর রহমান ইবনু আবূ বকর-কে আমার সাথে পাঠালেন এবং আমাকে নির্দেশ দিলেন, আমি যেন আমার সেই ’উমরার পরিবর্তে তান্’ঈম হতে ’উমরা করি। তিনি [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] বলেন, যারা শুধু ’উমরার ইহরাম বেঁধেছিল, তারা বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করলো এবং সাফা-মারওয়ার মাঝে সা’ঈ করলো। অতঃপর তারা হালাল হয়ে গেলো। তারপর যখন মিনা হতে (১০ তারিখে) ফিরে এসে তখন (হজের জন্যে) তাওয়াফ করল, আর যারা হজ্জ/হজ ও ’উমরা একসাথে (ইহরাম বেঁধেছিল) করেছিল তারা শুধু (১০ তারিখে) একটি মাত্র তাওয়াফ করলো। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ قِصَّةِ حَجَّةِ الْوَدَاعِ
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: خَرَجْنَا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي حَجَّةِ الْوَدَاعِ فَمِنَّا مَنْ أَهَلَّ بِعُمْرَةٍ وَمِنَّا مَنْ أَهَلَّ بِحَجٍّ فَلَمَّا قَدِمْنَا مَكَّةَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ أَهَلَّ بِعُمْرَةٍ وَلَمْ يُهْدِ فَلْيَحْلِلْ وَمَنْ أَحْرَمَ بِعُمْرَةٍ وَأَهْدَى فَلْيُهِلَّ بِالْحَجِّ مَعَ العُمرةِ ثمَّ لَا يحل حَتَّى يحل مِنْهَا» . وَفِي رِوَايَةٍ: «فَلَا يَحِلُّ حَتَّى يَحِلَّ بِنَحْرِ هَدْيِهِ وَمَنْ أَهَلَّ بِحَجٍّ فَلْيُتِمَّ حَجَّهُ» . قَالَتْ: فَحِضْتُ وَلَمْ أَطُفْ بِالْبَيْتِ وَلَا بَيْنَ الصَّفَا وَالْمَرْوَةِ فَلَمْ أَزَلْ حَائِضًا حَتَّى كَانَ يَوْمُ عَرَفَةَ وَلَمْ أُهْلِلْ إِلَّا بِعُمْرَةٍ فَأَمَرَنِي النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ أَنْقُضَ رَأْسِي وَأَمْتَشِطَ وَأُهِلَّ بِالْحَجِّ وَأَتْرُكَ الْعُمْرَةَ فَفَعَلْتُ حَتَّى قَضَيْتُ حَجِّي بَعَثَ مَعِي عَبْدَ الرَّحْمَنِ بْنَ أَبِي بَكْرٍ وَأَمَرَنِي أَنْ أَعْتَمِرَ مَكَانَ عُمْرَتِي مِنَ التَّنْعِيمِ قَالَتْ: فَطَافَ الَّذِينَ كَانُوا أَهَلُّوا بِالْعُمْرَةِ بِالْبَيْتِ وَبَيْنَ الصَّفَا وَالْمَرْوَةِ ثُمَّ حَلُّوا ثمَّ طافوا بَعْدَ أَنْ رَجَعُوا مِنْ مِنًى وَأَمَّا الَّذِينَ جَمَعُوا الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ فَإِنَّمَا طَافُوا طَوَافًا وَاحِدًا
ব্যাখ্যা: (وَمَنْ أَحْرَمَ بِعُمْرَةٍ وَأَهْدٰى فَلْيُهِلَّ بِالْحَجِّ مَعَ العُمْرَةِ ثُمَّ لَا يَحِلُّ حَتّٰى يَحِلَّ مِنْهَا) অর্থাৎ- ‘‘যে ব্যক্তি ‘উমরার ইহরাম বেঁধেছে এবং সাথে কুরবানীর পশু নিয়ে এসেছে সে যেন ‘উমরার সাথে হজ্জের ইহরামও বেঁধে নেয়।’’ অতঃপর সে হজ্জ/হজ ও ‘উমরা সম্পন্ন করার পূর্বে হালাল হতে পারবে না। অর্থাৎ- সে ইহরাম থেকে বের হতে পারবে না এবং ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কোন কাজ তার জন্য হালাল হবে না যতক্ষণ না সে ‘উমরা ও হজ্জ/হজ উভয়টির কাজ সম্পন্ন না করবে। উভয় কাজ সম্পন্ন করার পর সে ইহরাম থেকে হালাল হবে।
(فَحِضْتُ وَلَمْ أَطُفْ بِالْبَيْتِ وَلَا بَيْنَ الصَّفَا وَالْمَرْوَةِ) ‘‘অতঃপর আমি ঋতুবতী হয়ে গেলাম তাই বায়তুল্লাহতে তাওয়াফ করিনি এবং সাফা-মারওয়াতে সা‘ঈ করিনি। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বায়তুল্লাহতে তাওয়াফ করেননি এজন্য যে, তিনি অপবিত্র হয়ে পড়েছিলেন। আর বায়তুল্লাহতে তাওয়াফ করার জন্য পবিত্রতা শর্ত। আর সা‘ঈ এজন্য করেননি যে, সা‘ঈ তো তাওয়াফের পর করতে হয় তাওয়াফ ব্যতীত সা‘ঈ বিশুদ্ধ নয়। তবে ঋতুবতীর বিধান এর ব্যতিক্রম। ঋতুবতীর জন্য সা‘ঈ করা বৈধ এজন্য পবিত্রতা শর্ত নয়। কেননা ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) ঋতুবতী হওয়ায় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বলেছিলেনঃ বায়তুল্লাহর তাওয়াফ ব্যতীত হজ্জের সকল কাজ সম্পন্ন করো।
ইবনু কুদামাহ্ বলেনঃ সা‘ঈ তাওয়াফের অনুগামী। তাওয়াফের পূর্বে সা‘ঈ করা বৈধ নয়। অতএব তাওয়াফের পূর্বে কেউ সা‘ঈ করলে তা যথেষ্ট হবে না। ইমাম মালিক, শাফি‘ঈ এবং আহলুল বায়তগণের অভিমত এটিই। ‘আত্বা বলেনঃ তাওয়াফের পূর্বে সা‘ঈ করলেও যথেষ্ট হবে। কতক আহলুল হাদীসের অভিমতও তাই।
(وَأُهِلَّ بِالْحَجِّ وَأَتْرُكَ الْعُمْرَةَ) ‘‘(আমাকে নির্দেশ দিলেন) আমি যেন ‘উমরাহ পরিত্যাগ করে হজ্জের ইহরাম বাঁধি।’’ হানাফীদের নিকট এর অর্থ হলো, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে নির্দেশ দিলেন যে, আমি যেন ‘উমরা-এর ইহরাম থেকে বেরিয়ে যাই এবং ইহরাম অবস্থায় যা হারাম ছিল তা পালন করি যেমন মাথার বেণী খুলে ফেলি, চুল আচড়াই ইত্যাদি। কেননা ঋতুর কারণে ‘উমরা-এর কার্যাবলী সম্পাদন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। অতঃপর হজ্জের ইহরাম বাঁধি। তাঁরা এ হাদীসটিকে তাদের দলীল হিসেবে পেশ করেন এবং বলেন, কোন মহিলা যদি তামাত্তু' হজ্জের নিয়্যাতে ইহরাম বাঁধার পর কাবা ঘরের তাওয়াফ করার আগেই ঋতুবতী হয়ে যায় এবং ‘আরাফার দিন আসা পর্যন্ত তার ঋতু অব্যাহত থাকে তাহলে সে মহিলা ‘উমরা পরিত্যাগ করে শুধুমাত্র ইফরাদ হজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধবে। হজ্জের কাজ সম্পন্ন করার পর পুনরায় পরিত্যক্ত ‘উমরার জন্য কাযা ‘উমরা করবে। আর ইতোপূর্বে ‘উমরা পরিত্যাগ করার জন্য দম দিবে।
জমহূর ‘উলামাহগণ বলেনঃ এ হাদীসের অর্থ হলো- নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে নির্দেশ দিলেন আমি যেন ‘উমরা-এর যাবতীয় কাজ তথা কাবা ঘরের তাওয়াফ, সাফা-মারওয়ার সা‘ঈ, মাথার চুল খাটো করা এসব কিছু বাদ রেখে ‘উমরার ইহরামের সাথেই হজ্জের ইহরাম বাঁধি। ফলে আমি হজ্জে কিরানকারী হয়ে যাই। এখানে ‘উমরা-এর কাজ পরিত্যাগ করার অর্থ ‘উমরার ইহরাম বাতিল করা নয় বরং ‘উমরার কাজ বাদ রেখে তার সাথে হজ্জের কাজ সংযুক্ত করা। এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন ইমাম মালিক, আওযা‘ঈ শাফি‘ঈ এবং অনেক ‘উলামাহবৃন্দ। তারা দলীল হিসেবে জাবির (রাঃ)-এর হাদীস উল্লেখ করেন যাতে রয়েছে- ‘‘নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে বললেনঃ তুমি গোসল করে হজ্জের ইহরাম বাঁধো, অতঃপর তিনি তাই করলেন। অতঃপর তিনি হজ্জের সকল কাজ সম্পাদন করার পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এবার তুমি হজ্জ/হজ ও ‘উমরা থেকে হালাল হলে। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে অন্য বর্ণনায় রয়েছে- নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ইয়াওমুন্ নাফরে (ফিরার দিন) বললেনঃ তোমার এ তাওয়াফ তোমার হজ্জ/হজ ও ‘উমরা-এর জন্য যথেষ্ট হবে’’ হাদীসটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন।
(فَفَعَلْتُ) ‘‘আর আমি তাই করলাম।’’ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে যে নির্দেশ দিলেন। অর্থাৎ- ‘উমরার বাদ রেখে রেখে আমি হজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধলাম।
(ثُمَّ حَلُّوْا) ‘‘এরপর তারা হালাল হয়ে গেল।’’ অর্থাৎ- ‘উমরা-এর কাজ সম্পাদন করে হলক অথবা তাক্বসীরের মাধ্যমে তারা হালাল হয়ে গেল। অতঃপর মক্কা থেকে পুনরায় হজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধল।
(ثُمَّ طَافُوْا بَعْدَ أَنْ رَجَعُوْا مِنْ مِنًى) ‘‘এরপর মিনা থেকে মক্কায় ফিরে এসে তারা তাওয়াফ করল’’। তার ওপর থেকে, অর্থাৎ- তামাত্তু' হজ্জ/হজ সম্পাদনকারীর ওপর থেকে তাওয়াফে কুদূম রহিত হয়ে গেল। কেননা সে এখন মক্কাহবাসীদের মতই। আর মক্কাহ্বাসীদের জন্য তাওয়াফে কুদূম নেই।
(وَأَمَّا الَّذِينَ جَمَعُوا الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ فَإِنَّمَا طَافُوا طَوَافًا وَاحِدًا) ‘‘যারা হজ্জে কিরান করল, তারা মাত্র একবার তাওয়াফ করল।’’ অর্থাৎ- হজ্জে কিরানকারী ‘আরাফাতে অবস্থান করার পর কুরবানীর দিন মক্কায় ফিরে এসে হজ্জ/হজ ও ‘উমরার জন্য একবার তাওয়াফ করল। ইমাম যুরক্বানী বলেনঃ কেননা কিরান হজ্জ/হজ সম্পাদনকারীর জন্য এক তাওয়াফ, একবার সা‘ঈ করাই যথেষ্ট। কারণ ‘উমরার কার্যাবলী হজ্জের কাজের মধ্যেই প্রবেশ করেছে।
এ অভিমত ইমাম মালিক, শাফি‘ঈ, আহমাদ ও জমহূর ‘উলামাগণের। পক্ষান্তরে ইমাম আবূ হানীফা-এর মতে কিরানকারীর জন্যও দু’টি তাওয়াফ ও দু’টি সা‘ঈ আবশ্যক।
জেনে রাখা ভাল যে, কিরান সম্পাদনকারীর জন্য তিনটি তাওয়াফ রয়েছে- (১) তাওয়াফে কুদূম (আগমনী তাওয়াফ) তাওয়াফে ইফাযাহ্ বা যিয়ারহ্ (এটি হজ্জের রুকন) তাওয়াফুল বিদা' (বিদায়ী তাওয়াফ) এটি ওয়াজিব। ওজর ব্যতীত তা পরিত্যাগ করলে দম দিতে হবে। তবে ঋতুবতীর জন্য তা ওয়াজিব নয়। তবে ইমাম আবূ হানীফার মতে কিরান হজ্জ/হজ সম্পাদনকারীর আরেকটি তাওয়াফ আবশ্যক যা ‘উমরা-এর তাওয়াফ।
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিদায় হজের বৃত্তান্তের বিবরণ
২৫৫৭-[৩] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজে হজের সাথে ’উমরা মিলিয়ে হজে তামাত্তু’ আদায় করেছেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ’যুলহুলায়ফাহ্’ হতে কুরবানীর পশু সাথে নিয়েছিলেন এবং কাজের শুরুতে ’উমরার তালবিয়াহ্ পাঠ করলেন, তারপর হজের তালবিয়াহ্ পাঠ করলেন। তাই লোকেরাও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে হজের সাথে ’উমরা মিলিয়ে হজে তামাত্তু’ করলেন। তাদের কেউ কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে এসেছে, আর কেউ সাথে আনেনি। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় পৌঁছে লোকদেরকে বললেন, তোমাদের মধ্যে যারা কুরবানীর পশু সাথে করে এনেছে সে যেন এমন কোন বিষয়কে হালাল মনে না করে যা ইহরামের কারণে তার ওপর হারাম হয়ে গিয়েছে যে পর্যন্ত সে নিজের হজ্জ/হজ সম্পন্ন না করে। আর তোমাদের মধ্যে যারা কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে আসেনি, সে যেন বায়তুল্লাহর তাওয়াফ ও সাফা-মারওয়ার সা’ঈ করে এবং মাথার চুল ছেটে হালাল হয়ে যায়। এরপর হজের জন্যে পুনরায় ইহরাম বাঁধে ও কুরবানীর পশু নেয়। আর যে কুরবানীর পশু সাথে নিতে পারলো না, তাহলে সে যেন তিনদিন হজের সময়েই সওম পালন করে এবং বাড়ীতে ফিরে আসার পর সাতদিন সওম রাখে।
অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মক্কায় পৌঁছে প্রথমে (’উমরার জন্য বায়তুল্লাহর) তাওয়াফ করলেন ও হাজারে আসওয়াদে চুম্বন করলেন। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সজোরে তিনবার তাওয়াফ করলেন আর চারবার স্বাভাবিক হাঁটলেন। বায়তুল্লাহর তাওয়াফ শেষে মাকামে ইব্রাহীমের নিকট দাঁড়িয়ে দু’ রাক্’আত সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করলেন, তারপর সালাম ফিরালেন। তারপর সেখান থেকে সাফা মারওয়ায় ফিরে গেলেন। তারপর সাফা ও মারওয়ায় গিয়ে সাতবার সা’ঈ করলেন। এরপরও তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) (ইহরামের কারণে) যা তার ওপর হারাম ছিল তা নিজের হজ্জ/হজ সম্পন্ন না করা পর্যন্ত হালাল করলেন না। কুরবানীর তারিখে কুরবানীর পশু যাবাহ করলেন এবং (মিনা হতে) মক্কায় গিয়ে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করলেন। তারপর ইহরামের কারণে যা তার প্রতি হারাম ছিল তা হতে তিনি পূর্ণ হালাল হয়ে গেলেন। আর লোকেদের মধ্যে যারা কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে এসেছিল তারাও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেরূপ করেছিলেন সেরূপ করেছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ قِصَّةِ حَجَّةِ الْوَدَاعِ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: تَمَتَّعَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي حَجَّةِ الْوَدَاعِ بِالْعُمْرَةِ إِلَى الْحَجِّ فَسَاقَ مَعَهُ الْهَدْيَ مِنْ ذِي الْحُلَيْفَةِ وَبَدَأَ فَأَهَلَّ بِالْعُمْرَةِ ثُمَّ أَهَلَّ بِالْحَجِّ فَتَمَتَّعَ النَّاسُ مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالْعُمْرَةِ إِلَى الْحَجِّ فَكَانَ مِنَ النَّاسِ مَنْ أَهْدَى وَمِنْهُمْ مَنْ لَمْ يُهْدِ فَلَمَّا قَدِمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَكَّةَ قَالَ لِلنَّاسِ: «مَنْ كَانَ مِنْكُمْ أَهْدَى فَإِنَّهُ لَا يَحِلُّ مِنْ شَيْءٍ حَرُمَ مِنْهُ حَتَّى يَقْضِيَ حَجَّهُ وَمَنْ لَمْ يَكُنْ مِنْكُمْ أَهْدَى فَلْيَطُفْ بِالْبَيْتِ وَبِالصَّفَا وَالْمَرْوَةِ وَلْيُقَصِّرْ وَلْيَحْلِلْ ثُمَّ لِيُهِلَّ بِالْحَجِّ وليُهد فمنْ لم يجدْ هَديا فيلصم ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ فِي الْحَجِّ وَسَبْعَةً إِذَا رَجَعَ إِلَى أَهْلِهِ» فَطَافَ حِينَ قَدِمَ مَكَّةَ وَاسْتَلَمَ الرُّكْنَ أَوَّلَ شَيْءٍ ثُمَّ خَبَّ ثَلَاثَةَ أَطْوَافٍ وَمَشَى أَرْبَعًا فَرَكَعَ حِينَ قَضَى طَوَافَهُ بِالْبَيْتِ عِنْدَ الْمَقَامِ رَكْعَتَيْنِ ثُمَّ سَلَّمَ فَانْصَرَفَ فَأَتَى الصَّفَا فَطَافَ بِالصَّفَا وَالْمَرْوَةِ سَبْعَةَ أَطْوَافٍ ثُمَّ لَمْ يَحِلَّ مِنْ شَيْءٍ حَرُمَ مِنْهُ حَتَّى قَضَى حَجَّهُ وَنَحَرَ هَدْيَهُ يَوْمَ النَّحْرِ وَأَفَاضَ فَطَافَ بِالْبَيْتِ ثُمَّ حَلَّ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ حَرُمَ مِنْهُ وَفَعَلَ مِثْلَ مَا فَعَلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ سَاقَ الْهَدْي من النَّاس
ব্যাখ্যা: (تَمَتَّعَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ فِىْ حَجَّةِ الْوَدَاعِ بِالْعُمْرَةِ إِلَى الْحَجِّ) ‘‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজ্জ ‘উমরা ও হজ্জে একত্রে সম্পাদন করে তামাত্তু' করেছেন।’’ এখানে তামাত্তু' শব্দটি আভিধানিক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ- তিনি হজে কিরানের মধ্যে ‘উমরা-এর উপকারিতা অর্জন করেছেন। কেননা তিনি হজ্জের কাজসমূহ একবার সম্পাদন করেই দু’টি ‘ইবাদাতের তথা হজ্জ/হজ ও ‘উমরা-এর সাওয়াব অর্জন করেছেন। আর নিঃসন্দেহে এ কাজ দ্বারা বড় ধরনের একটি উপকারিতা লাভ করেছেন।
(فَسَاقَ مَعَهُ الْهَدْىَ مِنْ ذِى الْحُلَيْفَةِ) ‘‘তিনি যুলহুলায়ফাহ্ থেকে কুরবানীর পশু সঙ্গে নিয়েছেন।’’ এতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, মীকাত থেকে কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে যাওয়া মুস্তাহাব।
(مَنْ كَانَ مِنْكُمْ أَهْدٰى فَإِنَّه لَا يَحِلُّ مِنْ شَىْءٍ حَرُمَ مِنْهُ حَتّٰى يَقْضِىَ حَجَّه) ‘‘যে ব্যক্তি কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে এসেছে সে হজ্জ/হজ সম্পাদন না করা পর্যন্ত তার জন্য কোন কিছুই হালাল হবে না যা তার জন্য হারাম হয়েছে।’’ এতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে আসাই হালাল না হওয়ার কারণ।
(وَلْيُهْدِ) ‘‘সে যেন কুরবানী করে।’’ অর্থাৎ- তামাত্তু' হজ্জ/হজ সম্পাদনকারী কুরবানীর দিন জামারাতে ‘আক্বাবাতে পাথর নিক্ষেপের পর কুরবানী করবে।
(فَمَنْ لَمْ يَجِدْ هَدْيًا فَلْيَصُمْ ثَلَاثَةَ) যে ব্যক্তি কুরবানী করতে সামর্থ্য না রাখে সে যেন হজ্জের সময় তিনদিন সিয়াম পালন করে এবং বাড়ীতে ফিরে এসে আরো সাতটি সওম পালন করে। হজ্জের দিনসমূহ বলতে হজ্জের মাসে ইয়াওমুন্ নাহরের পূর্বে তিনটি সিয়াম পালন করবে ইহরাম অবস্থায়। তবে উত্তম হলো এর সর্বশেষ সিয়াম ‘আরাফার দিনে সম্পাদন করা। আর সাতটি সওম আইয়্যামে তাশরীক্ব বাদে যে কোন সময় পালন করতে পারে। তবে উত্তম হলো নিজ পরিবারে ফিরে এসে তা পালন করা।
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিদায় হজের বৃত্তান্তের বিবরণ
২৫৫৮-[৪] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এটা ’উমরা, যা দিয়ে আমরা তামাত্তু’ করলাম। অতএব যার কাছে কুরবানীর পশু সাথে নেই, সে যেন (’উমরা শেষ করে) পূর্ণভাবে হালাল হয়ে যায়। তবে এটা মনে রাখবে যে, ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) পর্যন্ত ’উমরা হজের মাসে প্রবেশ করলো। (মুসলিম)[1]
بَابُ قِصَّةِ حَجَّةِ الْوَدَاعِ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ «هَذِهِ عُمْرَةٌ اسْتَمْتَعْنَا بِهَا فَمَنْ لَمْ يَكُنْ عِنْدَهُ الْهَدْيُ فَلْيَحِلَّ الْحِلَّ كُلَّهُ فَإِنَّ الْعُمْرَةَ قَدْ دَخَلَتْ فِي الْحَجِّ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
وَهَذَا الْبَابُ خَالٍ عَنِ الْفَصْلِ الثَّانِي
ব্যাখ্যা: (فَلْيَحِلَّ الْحِلَّ كُلَّه) ‘‘সে পূর্ণভাবে হালাল হয়ে যাবে।’’ অর্থাৎ- ইহরাম অবস্থায় তার জন্য যা হারাম ছিল তার কিছুই আর তার জন্য হারাম থাকবে না। সে ইহরামের পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে যাবে।
(إِلٰى يَوْمِ الْقِيَامَةِ) ‘‘ক্বিয়ামাত পর্যন্ত’’। ইবনু মালিক বলেনঃ অর্থাৎ- হজ্জের মাসে ‘উমরা পালন করার বৈধতা এ বৎসরের জন্য নির্দিষ্ট নয় বরং তা ক্বিয়ামাত পর্যন্ত বৈধ।
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - বিদায় হজের বৃত্তান্তের বিবরণ
২৫৫৯-[৫] ’আত্বা ইবনু আবূ রবাহ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এবং আমার সাথে কতিপয় লোকের মধ্যে জাবির (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি, ’’আমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণ কেবলমাত্র হজের ইহরাম বেঁধেছিলাম।’’ ’আত্বা বলেন, জাবির (রাঃ) বলেছেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিলহজের চার তারিখ পার হবার পর সকালে মক্কায় আসলেন এবং আমাদেরকে ইহরাম ছেড়ে হালাল হতে নির্দেশ দিলেন। ’আত্বা জাবিরের মাধ্যমে বলেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) (এ কথাও) বলেছেন, ’’তোমরা হালাল হও এবং স্বীয় স্ত্রীর সাথে মেলামেশা করো’’। ’আত্বা আরো বলেন, এতে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদেরকে বাধ্য করলেন না; বরং স্ত্রীদেরকে তাদের জন্য হালাল করে দিলেন। (জাবির বলেন,) তখন আমরা পরস্পর বলাবলি করতে লাগলাম, আমাদের ও ’আরাফাতে উপস্থিত হবার মধ্যে যখন মাত্র পাঁচদিন বাকী, এমন সময় তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদেরকে স্ত্রীর সাথে মিলতে অনুমতি দিলেন, তবে কি আমরা ’আরাফাতে উপস্থিত হবো আর আমাদের লিঙ্গ থেকে শুক্র ঝরতে থাকবে? ’আত্বা বলেন, তখন জাবির (রাঃ) নিজের হাত নেড়ে ইশারা করলেন, আমি যেন তাঁর হাত নাড়ার ইঙ্গিত এখনো দেখছি।
জাবির (রাঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন (ভাষণ দানের উদ্দেশে) আমাদের মাঝে দাঁড়ালেন এবং বললেন, ’’তোমরা জানো যে, আমি তোমাদের অপেক্ষা আল্লাহকে বেশি ভয় করি, তোমাদের অপেক্ষা অধিক সত্যবাদী এবং তোমাদের অপেক্ষা অধিক পুণ্যবান। আমি যদি কুরবানীর পশু সাথে না আনতাম, আমিও তোমাদের ন্যায় ইহরাম ভেঙ্গে হালাল হয়ে যেতাম। আর আমি যদি আমার ব্যাপারে পূর্বে বুঝতে পারতাম, যা আমি পরে বুঝেছি, তাহলে আমি কক্ষনো কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে আসতাম না। সুতরাং তোমরা (ইহরাম ভেঙ্গে) হালাল হয়ে যাও।’’ তাই আমরা হালাল হয়ে গেলাম এবং তাঁর কথা শুনলাম ও তাঁর কথামোতো কাজ করলাম।
’আত্বা (রহঃ) বলেন, জাবির (রাঃ) বলেছেন, এ সময় ’আলী (রাঃ) তাঁর কর্মস্থল হতে আসলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কিসের ইহরাম বেঁধেছো। ’আলী(রাঃ) বললেন, ’’আমি ইহরাম বেঁধেছি, যার জন্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম বেঁধেছেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, তবে তুমি কুরবানী কর এবং ইহরাম অবস্থায় থাক। জাবির (রাঃ) বলেন, ’আলী (রাঃ) তার সাথে কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে এসেছিলেন। (জাবির (রাঃ) বলেন) এ সময় সুরাক্বাহ্ ইবনু মালিক ইবনু জু’শুম দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! (হজের সাথে ’উমরা করা কি) আমাদের শুধু এ বছরের জন্য, নাকি চিরকালের জন্যে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, চিরকালের জন্য। (মুসলিম)[1]
عَنْ عَطَاءٍ قَالَ: سَمِعْتُ جَابِرَ بْنَ عَبْدِ اللَّهِ فِي نَاسٍ مَعِي قَالَ: أَهْلَلْنَا أَصْحَابَ مُحَمَّد بِالْحَجِّ خَالِصًا وَحْدَهُ قَالَ عَطَاءٌ: قَالَ جَابِرٌ: فَقَدِمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صُبْحَ رَابِعَةٍ مَضَتْ مِنْ ذِي الْحِجَّةِ فَأَمَرَنَا أَنْ نَحِلَّ قَالَ عَطَاءٌ: قَالَ: «حِلُّوا وَأَصِيبُوا النِّسَاءَ» . قَالَ عَطَاءٌ: وَلَمْ يَعْزِمْ عَلَيْهِمْ وَلَكِنْ أَحَلَّهُنَّ لَهُمْ فَقُلْنَا لَمَّا لَمْ يَكُنْ بَيْنَنَا وَبَيْنَ عَرَفَةَ إِلَّا خَمْسٌ أَمَرَنَا أَنْ نُفْضِيَ إِلَى نِسَائِنَا فَنَأْتِيَ عرَفَةَ تَقْطُرُ مَذَاكِيرُنَا الْمَنِيَّ. قَالَ: «قَدْ عَلِمْتُمْ أَنِّي أَتْقَاكُمْ لِلَّهِ وَأَصْدَقُكُمْ وَأَبَرُّكُمْ وَلَوْلَا هَدْيِي لَحَلَلْتُ كَمَا تَحِلُّونَ وَلَوِ اسْتَقْبَلْتُ مِنْ أَمْرِي مَا اسْتَدْبَرْتُ لَمْ أَسُقِ الْهَدْيَ فَحِلُّوا» فَحَلَلْنَا وَسَمِعْنَا وَأَطَعْنَا قَالَ عَطَاءٌ: قَالَ جَابِرٌ: فَقَدِمَ عَلِيٌّ مِنْ سِعَايَتِهِ فَقَالَ: بِمَ أَهْلَلْتَ؟ قَالَ بِمَا أَهَلَّ بِهِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «فَأَهْدِ وَامْكُثْ حَرَامًا» قَالَ: وَأَهْدَى لَهُ عَلِيٌّ هَدْيًا فَقَالَ سُرَاقَةُ بْنُ مَالِكِ بْنِ جُعْشُمٍ: يَا رَسُولَ اللَّهِ ألعامنا هَذَا أم لأبد؟ قَالَ: «لأبد» . رَوَاهُ مُسلم
[বিঃ দ্রঃ এ অধ্যায়ে দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ নেই (وَهٰذَا الْبَابُ خَالٍ عَنِ الْفَصْلِ الثَّانِىْ)]
ব্যাখ্যা: (بِالْحَجِّ خَالِصًا وَحْدَه) ‘‘শুধুমাত্র হজ্জের জন্য ইহরাম বেঁধেছিলাম।’’ অর্থাৎ- সবাই শুধুমাত্র হজ্জের ইহরামই বেঁধেছিলাম। এর সাথে ‘উমরা ছিল না। জাবির (রাঃ)-এর এ বক্তব্য তার বুঝ অনুসারে দিয়েছেন। অর্থাৎ- তিনি যা বুঝেছেন তাই বলেছেন। কেননা ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীস যা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে তাতে রয়েছে- ‘‘আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বের হলাম, আমাদের মধ্যে কেউ শুধুমাত্র ‘উমরার ইহরাম বেঁধেছিল। আবার কেউ হজ্জ/হজ ও ‘উমরার ইহরাম একত্রে বেঁধে ছিল। আবার কেউ শুধুমাত্র হজ্জের ইহরাম বেঁধেছিল। অথবা জাবির (রাঃ) ‘আসহাব’ শব্দ দ্বারা অধিকাংশ সাহাবী বুঝিয়েছেন।
(فَأَمَرَنَا أَنْ نَحِلَّ) ‘‘তিনি আমাদেরকে হালাল হওয়ার নির্দেশ দিলেন।’’ অর্থাৎ- হজ্জকে ‘উমরাতে রূপান্তর করে ‘উমরার কাজ সম্পাদন করে হালাল হতে বললেন।
(وَلَكِنْ أَحَلَّهُنَّ لَهُمْ) ‘‘তবে তিনি তাদেরকে তাদের জন্য হালাল করে দিলেন।’’ অর্থাৎ- হজ্জকে ‘উমরাতে রূপান্তর করা যে রকম বাধ্যতামূলক করেছিলেন কিন্তু স্ত্রীদের সাথে মিলিত হওয়া তেমন বাধ্যতামূলক করেননি। বরং ‘উমরা সম্পাদনের পর তাদের স্ত্রীগণের সাথে মিলিত হওয়া তাদের জন্য হালাল ছিল।
(تَقْطُرُ مَذَاكِيرُنَا الْمَنِىَّ) ‘‘আমাদের পুরুষাঙ্গ থেকে মনি নির্গত হতে থাকবে।’’ এর দ্বারা উদ্দেশ্য স্ত্রী সহবাসের অব্যাহতি পরেই আমরা হজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধব। আর এ বিষয়টি জাহিলী যুগে দোষণীয় ছিল এবং তা হজ্জের ত্রুটি হিসেবে গণ্য করা হত।
(وَلَوْلَا هَدْيِيْ لَحَلَلْتُ كَمَا تَحِلُّونَ) ‘‘যদি আমার সাথে কুরবানীর পশু না থাকত তবে আমিও হালাল হয়ে যেতাম যেভাবে তোমরা হালাল হলে।’’ অর্থাৎ- আমি তোমাদেরকে যে কাজের নির্দেশ দিয়েছি আমিও তাই করতাম যদি আমার সাথে কুরবানীর পশু না থাকত। হাদীসটি প্রমাণ করে কুরবানীর পশু সাথে থাকাটাই হালাল হওয়ার জন্য বাধা। অতএব কুরবানীর পশু সাথে থাকলে সে হালাল হতে পারবে না তার ইহরাম যে ধরনেরই হোক না কেন।
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - বিদায় হজের বৃত্তান্তের বিবরণ
২৫৬০-[৬] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিলহজ্জ মাসের চার বা পাঁচ তারিখে আমার কাছে রাগান্বিত অবস্থায় আসলেন। এ সময় আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লার রসূল! কে আপনাকে রাগান্বিত করলো? আল্লাহ তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করুন। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তুমি কি জানো না, আমি (কিছু) লোকদেরকে একটা বিষয়ে আদেশ করেছি? আর তারা এ ব্যাপারে দ্বিধাবোধ করছে। যদি আমি আমার ব্যাপারে প্রথমে বুঝতে পারতাম যা পরে বুঝেছি, তাহলে কক্ষনো আমি কুরবানীর পশু সাথে করে নিয়ে আসতাম না; বরং পরে তা কিনে নিতাম। অতঃপর আমিও তাদের ন্যায় হালাল হয়ে যেতাম। (মুসলিম)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا أَنَّهَا قَالَتْ: قَدِمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِأَرْبَعٍ مَضَيْنَ مِنْ ذِي الْحِجَّةِ أَوْ خَمْسٍ فَدَخَلَ عَلَيَّ وَهُوَ غَضْبَانُ فَقُلْتُ: مَنْ أَغْضَبَكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَدْخَلَهُ اللَّهُ النَّارَ. قَالَ: «أَو مَا شَعَرْتِ أَنِّي أَمَرْتُ النَّاسَ بِأَمْرٍ فَإِذَا هُمْ يَتَرَدَّدُونَ وَلَوْ أَنِّي اسْتَقْبَلْتُ مِنْ أَمْرِي مَا اسْتَدْبَرْتُ مَا سُقْتُ الْهَدْيَ مَعِي حَتَّى أَشْتَرِيَهُ ثمَّ أُحلُّ كَمَا حلُّوا» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: (لأربع أو خمس) ‘‘যিলহজ্জ মাসের চারদিন অথবা পাঁচদিন অতিবাহিত হওয়ার পর।’’ এ সন্দেহ হয়তো ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) নিজেরই। এজন্য যে তারিখ সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত ছিলেন না। অথবা ‘আয়িশাহ্ থেকে বর্ণনাকারী সন্দেহে পতিত হয়েছেন তিনি কি বলেছিলেন? চার তারিখ না পাঁচ তারিখ?
(فَدَخَلَ عَلَىَّ وَهُوَ غَضْبَانُ) ‘‘তিনি রাগান্বিত অবস্থায় আমার নিকট আসলেন।’’ এ রাগের কারণ ছিল হজ্জের ইহরামকে ‘উমরাতে রূপান্তর করতে সাহাবীগণের বিলম্বের কারণে এবং তার নির্দেশ পালনে সংশয়ের মধ্যে নিপতিত হওয়ার জন্যে।
(فَإِذَا هُمْ يَتَرَدَّدُونَ) ‘‘আর তারা সংশয়ে নিপতিত হয়।’’ অর্থাৎ- আদেশ পালন করে আনুগত্য করতে তারা সংশয় করে অথবা তারা মনে করলো এমন করলে তা তাদের হজ্জের জন্য ক্ষতিকর হবে।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৬১-[১] নাফি’ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) যখনই মক্কায় আসতেন ’যী তুওয়া’ নামক স্থানে সকাল না হওয়া পর্যন্ত রাত যাপন করতেন। এরপর তিনি গোসল করতেন এবং (নফল) সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করতেন। তারপর দিনের বেলায় মক্কায় প্রবেশ করতেন যখন তিনি মক্কা হতে প্রত্যাবর্তন করতেন আর তখন ’যী তুওয়া’র পথেই ফিরতেন এবং সেখানে রাত কাটাতেন যতক্ষণ না সকাল হতো এবং তিনি আরো বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপই করতেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ دُخُوْلِ مَكَّةَ وَالطَّوَافِ
عَنْ نَافِعٍ قَالَ: إِنَّ ابْنَ عُمَرَ كَانَ لَا يَقْدَمُ مَكَّةَ إِلَّا بَاتَ بِذِي طُوًى حَتَّى يُصْبِحَ وَيَغْتَسِلَ وَيُصَلِّيَ فَيَدْخُلَ مَكَّةَ نَهَارًا وَإِذَا نَفَرَ مِنْهَا مَرَّ بِذِي طُوًى وَبَاتَ بِهَا حَتَّى يُصْبِحَ وَيَذْكُرُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَفْعَلُ ذَلِكَ
ব্যাখ্যা: (إِلَّا بَاتَ بِذِىْ طُوًى) ‘‘তিনি ‘যী তুওয়া’-এ রাত যাপন করতেন।’’ অর্থাৎ- ইবনু ‘উমার (রাঃ) যখনই মক্কাতে আগমন করতেন তখন ‘যী তুওয়া’ নামক স্থানে অবতরণ করে সেখানে রাত যাপন করতেন।
ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেনঃ তা মক্কার নিকটবর্তী অতি পরিচিত একটি স্থানের নাম। হাফিয ইবনু হাজার বলেনঃ বর্তমানে ঐ স্থানটি ‘‘বি’রি যা-হির’’ (বাহির কূপ) নামে পরিচিত।
(حَتّٰى يُصْبِحَ) ‘‘সকাল পর্যন্ত’’। অর্থাৎ- তিনি ‘যী তুওয়া’ নামক স্থানে অবতরণ করে বিশ্রাম নেয়া এবং গোসল করে পরিষ্কার হওয়ার নিমিত্তে রাত যাপন করতেন। অতঃপর ভোর হলে গোসল করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হতেন।
ইমাম নাবাবী বলেনঃ অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, মক্কায় প্রবেশ করার জন্য গোসল করা বিধিসম্মত। আর ‘যী তুওয়া’ দিয়ে আগমনকারীর জন্য ঐ স্থানে গোসল করা মুস্তাহাব।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৬২-[২] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কায় আসতেন, উঁচু দিক হতে প্রবেশ করতেন এবং নিচু দিক দিয়ে বের হতেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ دُخُوْلِ مَكَّةَ وَالطَّوَافِ
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمَّا جَاءَ إِلَى مَكَّةَ دَخَلَهَا مِنْ أَعْلَاهَا وخرجَ منْ أسفلِها
ব্যখ্যা: জমহূর ‘উলামায়ে কিরামের নিকট মক্কায় উঁচু পথ- সানিয়াতুল ‘উল্ইয়াহ্ দিয়ে প্রবেশ করা এবং নিচু পথ সানিয়াতুস্ সুফলা দিয়ে বের হওয়া মুস্তাহাব।
মক্কায় আগমনকারী প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যই কি সানিয়্যাতু ক্বযা দিয়ে প্রবেশ করা সুন্নাত? যদিও তার প্রবেশের পথ ভিন্ন হয়। এ ব্যাপারে ‘উলামায়ে কিরামের মতানৈক্য রয়েছে।
আবূ বাকর সায়দালানী ও শাফি‘ঈ মাযহাবের কিছু ‘উলামায়ে কিরামের অভিমত এবং সে অভিমতের উপর ইমাম রাফি‘ঈও নির্ভর করেছেন। তারা বলেন, যে ব্যক্তির মক্কায় প্রবেশ পথ সানিয়্যাতু কাদা এর দিক দিয়ে হবে তার জন্য সানিয়াতুল ‘উল্ইয়াহ্ দিয়ে প্রবেশ করা মুস্তাহাব। কিন্তু যার রাস্তা এই দিক দিয়ে নয়, তার নিজের পথ পরিবর্তন করে সানিয়্যাতু ক্বযা দিয়ে প্রবেশ করা তার জন্য মুস্তাহাব নয়।
ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেন, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যই সানিয়াতুল ‘উল্ইয়াহ্ দিয়ে মক্কায় প্রবেশ করা সুন্নাত। চাই তার পথ এ দিক দিয়ে হোক অথবা না হোক। তিনি আরো বলেন, আমাদের মুহাক্কিক আসহাবদের মতে গ্রহণযোগ্য মত হচ্ছে, প্রত্যেক মুহরিমের জন্যই সানিয়াতুল ‘উল্ইয়াহ্ দিয়ে মক্কায় প্রবেশ করা মুস্তাহাব।
আবূ মুহাম্মাদ এর কারণ বর্ণনা করেছেন যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পথ সানিয়াতুল ‘উল্ইয়াহ্ দিকে ছিল না। তার পরেও রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুরে এসে মক্কায় সানিয়াতুল ‘উল্ইয়াহ্ দিয়ে প্রবেশ করেছেন।
ইবনু জাসির (রহঃ) বলেন, আমি আমাদের হাম্বালী মাযহাবের আসহাবদের আলোচনায় এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোন মতামত পাইনি। কিন্তু তাদের বাহ্যিক কথা থেকে বুঝা যায় যে, মক্কায় প্রবেশকারী ব্যক্তির জন্য সাধারণভাবে সানিয়্যাতুল ‘উল্ইয়াহ্ দিয়েই প্রবেশ করা সুন্নাত। হ্যাঁ- যদি তার পথ সানিয়্যাতুল ‘উল্ইয়াহ্ থেকে ভিন্ন হয় তখন সে পথ থেকে ফিরে এসে সানিয়্যাতুল ‘উল্ইয়াহ্ দিয়ে প্রবেশ করাটা তার জন্য মুস্তাহাব নয়।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৬৩-[৩] ’উরওয়াহ্ ইবনুয্ যুবায়র (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ্জ/হজ করলেন, (আমার খালা) ’আয়িশাহ্ (রাঃ) আমাকে বলেছেন যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মক্কায় প্রবেশ করে প্রথমে উযূ করলেন। অতঃপর বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করলেন। তবে তা ’উমরায় পরিণত করলেন না (অর্থাৎ- ইহরাম খুললেন না)। তারপর আবূ বকর (রাঃ) হজ্জ/হজ করেছেন, তিনিও প্রথমে যে কাজ করেছেন তা হলো বায়তুল্লাহর তাওয়াফ। তিনি এ তাওয়াফকে ’উমরায় পরিণত করেননি। অতঃপর ’উমার, তারপর ’উসমান (রাঃ) এই একইভাবে হজ্জ/হজ সম্পাদন করেছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ دُخُوْلِ مَكَّةَ وَالطَّوَافِ
وَعَن عُروةَ بنِ الزُّبيرِ قَالَ: قَدْ حَجَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَخْبَرَتْنِي عَائِشَةُ أَنَّ أَوَّلَ شَيْءٍ بَدَأَ بِهِ حِينَ قَدِمَ مَكَّةَ أَنَّهُ تَوَضَّأَ ثُمَّ طَافَ بِالْبَيْتِ ثُمَّ لَمْ تَكُنْ عُمْرَةً ثُمَّ حجَّ أَبُو بكرٍ فكانَ أوَّلَ شيءٍ بدَأَ بِهِ الطوَّافَ بالبيتِ ثمَّ لَمْ تَكُنْ عُمْرَةً ثُمَّ عُمَرُ ثُمَّ عُثْمَانُ مثلُ ذَلِك
ব্যাখ্যা: কোন ব্যক্তি যদি হাদী না চালিয়ে হজ্জের ইহরাম বাঁধে সে কি বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করলেই হালাল হতে পারবে? এ ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে।
ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, হাদী চালিয়ে হজ্জের ইহরাম ধারণকারী ব্যক্তি শুধু বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেই হালাল হয়ে যাবে। আর যদি সে হজ্জের ইহরাম বাকী রাখতে চায় তাহলে তার উকুফে ‘আরাফার পর এসে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করতে হবে। এর বিপরীতে জমহূর ‘উলামায়ে কিরাম বলেন, না- বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করলেই তার হালাল হতে হবে না। বরং হজ্জের যাবতীয় কাজ শেষ করে তারপর হাদী না চালানো ব্যক্তি হালাল হবে। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর দলীল হলো, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহাবায়ে কিরামদের মাঝে যারা হাদী আনেননি তাদেরকে তাওয়াফ করে হালাল হয়ে যাওয়ার আদেশ করেছিলেন।
জমহূর ‘উলামায়ে কিরাম তার জবাবে বলেন, এই হুকুম সহাবায়ে কিরামদের জন্য খাস ছিল। সকল ‘উলামায়ে কিরাম এ ব্যাপারে একমত যে, যে শুধু হজ্জের ইহরাম বেঁধেছে সে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করতে পারে, কোন সমস্যা নেই। এ ব্যাপারে ‘উরওয়াহ্ (রহঃ) উল্লেখিত হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করেছেন। তিনি বলেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ্জের ইহরাম বেঁধেছেন এবং বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেছেন। কিন্তু তিনি হজ্জ/হজ থেকে হালাল হননি। আর সেটা ‘উমরাও ছিল না।
তাওয়াফের পূর্বে উযূ করাঃ
সকল ‘উলামায়ে কিরামের নিকট তাওয়াফের জন্য উযূ শর্ত। কতক কুফাবাসী ‘উলামায়ে কিরামের নিকট তাওয়াফের জন্য উযূ শর্ত নয়। ইমাম আবূ হানীফা-এর নিকট তাওয়াফের জন্য উযূ শর্ত নয়। তবে তাঁর সাথীবর্গ এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেন। কিন্তু বিশুদ্ধ মত তাঁর মতেও তাওয়াফের জন্য উযূ শর্ত। যেমন ইবনু হুমাম শারহে হিদায়ার মধ্যে বলেছেন, হায়িযা মহিলার জন্য তাওয়াফ হারাম হওয়ার দু’টি কারণ। (ক) তার মসজিদে প্রবেশের কারণে। (খ) ওয়াজিব ছাড়ার কারণে আর সেটা হচ্ছে পবিত্রতা।
* বর্ণিত হাদীস তাওয়াফে কুদূম শারী‘আতসিদ্ধ হওয়ার উপর দালালাত করে।
* হাফিয ইবনু হাজার (রহঃ) বলেন, এই হাদীস দ্বারা বুঝা যায় মাসজিদুল হারামে আগমনকারী ব্যক্তির জন্য তাওয়াফের মাধ্যমে কাজ শুরু করা মুস্তাহাব।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয় বিষয়ঃ
১. ‘উরওয়াহ্ (রহঃ)-এর এই বর্ণনা থেকে বুঝা যায়, সহাবায়ে কিরাম ও তাদের পরবর্তী তাবি‘ঈনগণ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীসের সাথে সাথে খুলাফায়ে রাশিদীনদের ‘আমলকেও শারী‘আতের জন্য দলীল মনে করতেন। সুতরাং শুধু হাদীসের উপর সীমাবদ্ধ না থেকে হাদীসের ব্যাখ্যার জন্য সহাবায়ে কিরামের ‘আমলকেও আমাদের সামনে রাখতে হবে।
২. এ হাদীস দ্বারা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত-এর মাযহাব অনুসারে খুলায়ায়ে রাশিদীনের মধ্যে মর্যাদার যে স্থান সাব্যস্ত করা হয় তা হলো সর্বশ্রেষ্ঠ আবূ বাকর (রাঃ), তারপর ‘উমার (রাঃ), তারপর ‘উসমান (রাঃ) এবং তারপর ‘আলী (রাঃ) এ বিষয়টিও প্রমাণিত হয়।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৬৪-[৪] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ্জ/হজ বা ’উমরা করতে এসে প্রথমে যখন তাওয়াফ করতেন তিন পাক জোরে পদক্ষেপ করতেন, আর চার পাক স্বাভাবিকভাবে চলতেন। তারপর (মাকামে ইবরাহীমের কাছে) দু’ রাক্’আত (তাওয়াফের) সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করতেন এবং সাফা মারওয়ার মাঝে সা’ঈ করতেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ دُخُوْلِ مَكَّةَ وَالطَّوَافِ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا طَافَ فِي الْحَجِّ أَوِ الْعمرَة مَا يَقْدَمُ سَعَى ثَلَاثَةَ أَطْوَافٍ وَمَشَى أَرْبَعَةً ثُمَّ سَجَدَ سَجْدَتَيْنِ ثُمَّ يَطُوفُ بَيْنَ الصَّفَا والمروة
ব্যাখ্যা: ১. বর্ণিত হাদীসটি তাওয়াফের প্রথম তিন চক্করে রমল সুন্নাত হওয়ার দলীল। অধিকাংশ ‘উলামায়ে কিরামের অভিমত এটিই।
২. শাফি‘ঈ মাযহাবে কিছু ‘উলামায়ে কিরাম বলেন, হজ্জ/হজ এবং ‘উমরার শুধু একটি তাওয়াফের প্রথম তিন চক্করে রমল করা মুস্তাহাব, হজ্জ/হজ ‘উমরা ব্যতীত সাধারণ তাওয়াফে রমল নেই।
ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেন, এ ব্যাপারে কোন মতবিরোধ নেই যে, হজ্জ/হজ এবং ‘উমরার শুধু একটি তাওয়াফে রমল করা শারী‘আত সম্মত। এ মাসআলায় ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ)-এর দু’টি অভিমত রয়েছে। প্রসিদ্ধ অভিমতটি হচ্ছে, যে তাওয়াফের পরে সা‘ঈ রয়েছে সে তাওয়াফে রমল করবে। আর পরে সা‘ঈ রয়েছে এমন তাওয়াফ হচ্ছে তাওয়াফে কুদূম ও তাওয়াফে ইফাদাহ্। বিদায়ী তাওয়াফের পরে সা‘ঈ নেই, সুতরাং সে তাওয়াফে রমলও হবেনা।
দ্বিতীয় অভিমত হচ্ছে, রমল শুধুমাত্র তাওয়াফে কুদূমেই শারী‘আতসম্মত অন্য তাওয়াকে নয়। চাই তাওয়াফকারী তাওয়াফের পরে সা‘ঈর ইচ্ছা করুক বা না করুক। আর ‘উমরার তাওয়াফে রমল শারী‘আতসিদ্ধ। কেননা ‘উমরার মাঝে তাওয়াফ একটিই হয়ে থাকে।
৩. বর্ণিত হাদীস থেকে আরো প্রমাণিত হয় যে, রমল শুধু প্রথম তিন তাওয়াফে করবে বাকীগুলোতে করবে না। কেউ যদি প্রথম তিন তাওয়াফে রমল ছেড়ে দেয় তাহলে বাকী তাওয়াফগুলোতে কাযা করাও লাগবে না এবং তাঁর উপর দমও (কুরবানী) আবশ্যক হবে না।
৪. তাওয়াফের প্রথম তিন চক্করে রমল করার বিধান শুধু পুরুষদের জন্য। মহিলাগণ রমল করবে না।
৫. বর্ণিত হাদীস দ্বারা তাওয়াফের পরে মাকামে ইব্রাহীমের নিকট দু’ রাক্‘আত সালাতের বিধানটি প্রমাণিত হয়। হানাফীদের নিকট এই দু’ রাক্‘আত সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করা ওয়াজিব তাদের দলীল হচ্ছে, (وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى) ।
শাফি‘ঈদের নিকট তাওয়াফের পর মাকামে ইব্রাহীমের নিকট দু’ রাক্‘আত সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করা সুন্নাত।
৬. বর্ণিত হাদীস দ্বারা হজ্জের কার্যক্রমের মাঝে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা আবশ্যক হওয়ার বিষয়টিও প্রমাণিত হয়। তাওয়াফের পরে সা‘ঈ করতে হবে। কেউ যদি তাওয়াফের পূর্বে সা‘ঈ করে নেয় তাহলে তার সা‘ঈ শুদ্ধ হবে না।
তাওয়াফের প্রথম তিন চক্কর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমল করেছিলেন মুশরিকদের সামনে মুসলিমদের বীরত্ব প্রকাশের জন্য। কেননা ‘উমরাতুল কাযার সময় মুশরিকরা মুসলিমদের দেখে বলেছিল, ইয়াস্রিবের জ্বর মুসলিমদের কাবু করে ফেলেছে। তাদের এ কথার প্রতিবাদস্বরূপ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমদের তাওয়াফের প্রথম তিনি চক্করে রমলের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু বিজয়ের পর রমলের এই কারণ শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও রমলের হুকুম রয়ে গিয়েছিল। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজ্জের সময়ও রমল করেছিলেন। রমলের হুকুমের কারণ শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও পূর্বের মতো ঠিক থাকার কারণ বর্ণনায় ‘উলামায়ে কিরাম বলেছেন, রমলের হুকুম পূর্বের অবস্থায় রাখা হযেছে যাতে করে মুসলিমগণ তাদের পূর্বের অবস্থা স্মরণ রাখতে পারে। তাদের উপর আল্লাহ রববুল ‘আলামীনের অনুগ্রহসমূহ স্মরণ রাখতে পারে যে, তারা এক সময় এমন দুর্বল ছিল মুশরিকরা তাদেরকে হাসি-ঠাট্টা করত। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে শাক্তিশালী করেছেন স্বল্পসংখ্যা বৃহৎ সংখ্যায় পরিণত করেছেন। এ সকল নি‘আমাত স্মরণ করানোর জন্যই রমলের হুকুম এখনো বাকি রয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৬৫-[৫] উক্ত রাবী [’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাজারে আসওয়াদ থেকে শুরু করে আবার হাজারে আসওয়াদ পর্যন্ত তিন পাক রমল (দ্রুতবেগে) তাওয়াফ করেছেন এবং চার পাক স্বাভাবিকভাবে করেছেন। এভাবে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন সাফা মারওয়ার মাঝেও সা’ঈ করতেন তখন বাত্বনিল মাসীলে মাঝখানে (নিচু জায়গায়) দ্রুতবেগে চলতেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ دُخُوْلِ مَكَّةَ وَالطَّوَافِ
وَعَنْهُ قَالَ: رَمَلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ الْحَجَرِ ثَلَاثًا وَمَشَى أَرْبَعًا وَكَانَ يَسْعَى بِبَطْنِ الْمَسِيلِ إِذَا طَافَ بَيْنَ الصَّفَا وَالْمَرْوَةِ. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: বর্ণিত হাদীসটি তাওয়াফের প্রথম তিন চক্করে হাজারে আসওয়াদ থেকে শুরু করে আবার ফিরে হাজারে আসওয়াদ আসা পর্যন্ত পরিপূর্ণ চক্করে রমল সুন্নাত হওয়ার দলীল। ‘আল্লামা ইবনু হাযম ও কিছু সংখ্যক ‘উলামায়ে কিরাম বলেন, পূর্ণ চক্করে সুন্নাত নয় বরং শুধুমাত্র হাজারে আসওয়াদ থেকে রুকনে ইয়ামানী পর্যন্ত রমল করা ওয়াজিব।
বর্ণিত হাদীসটি সাফা এবং মারওয়ার মাঝে বাত্বনিল মাসীল তথা নিচু জায়গা, বর্তমানে সবুজ বাতি চিহ্নিত জায়গা দ্রুতবেগে চলা সুন্নাত হওয়ার উপর দলীল।
হাজীদের ওপর সাফা-মারওয়ার মাঝে সা‘ঈ করা আবশ্যক করার মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা ইসমা‘ঈল (আঃ)-এর মাতা হাজিরা (আঃ)-এর স্মৃতিকে ধরে রেখেছেন। ইব্রাহীম (আঃ) যখন আল্লাহর নির্দেশে শিশু পুত্র ইসমা‘ঈল ও স্ত্রী হাজিরাকে মক্কার বিরাণ মরুভূমিতে রেখে গেলেন। তার কিছু দিন পর খাদ্য পানীয় সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ায় শিশু পুত্র ইসমা‘ঈল পানির পিপাসায় কাতরাচ্ছিলেন। তখন মা হাজিরা পানির খোঁজে সাফা থেকে মারওয়া আবার মারওয়া থেকে সাফা পেরেশান হয়ে দৌড়াচ্ছিলেন। এভাবে এক দুই বার নয় সাত বার তিনি এ পাহাড় থেকে ও পাহাড় গিয়েছেন। সপ্তমবার পুত্র ইসমা‘ঈল (আঃ)-এর নিকট এসে দেখলেন, আল্লাহ তা‘আলা ইসমা‘ঈল (আঃ)-এর পায়ের নিকট পানির ফোয়ারা সৃষ্টি করে দিয়েছেন।
আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে এক অবলা নারীর এ মহান কুরবানী অনেক পছন্দনীয়। তাই আল্লাহ তা‘আলা এ ঘটনা থেকে উম্মাতকে শিক্ষা দেয়ার জন্য হাজীদের সাফা-মারওয়ার মাঝে সা‘ঈ করাকে আবশ্যক করলেন। সাথে সাথে ক্বিয়ামাত পর্যন্ত আগমনকারী সকল মানুষের নিকট হাজিরা (আঃ)-এর কুরবানীর এক দৃষ্টান্ত হিসেবে বাকী থাকল।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৬৬-[৬] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় এলেন, হাজারে আসওয়াদের নিকট গেলেন এবং একে স্পর্শ করলেন। তারপর এর ডানদিকে ঘুরে তিন চক্কর রমল (কা’বাকে বামে রেখে) করলেন আর চার চক্কর স্বাভাবিকভাবে হেঁটে তাওয়াফ করলেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ دُخُوْلِ مَكَّةَ وَالطَّوَافِ
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمَّا قَدِمَ مَكَّةَ أَتَى الْحَجَرَ فَاسْتَلَمَهُ ثُمَّ مَشَى عَلَى يَمِينِهِ فَرَمَلَ ثَلَاثًا وَمَشى أَرْبعا. رَوَاهُ مُسلم
ব্যখ্যা: বর্ণিত হাদীসটি হাজারে আসওয়াদকে চুম্বন করার পর তাওয়াফ শুরু করা মুস্তাহাব হওয়ার উপর দলীল। (الْحَجَرَ) ‘আল বাহর’ নামক কিতাবে শাফি‘ঈ (রহঃ) থেকে বর্ণনা করা হয়েছে, তাওয়াফ হাজারে আসওয়াদ থেকে শুরু করা ফরয।
আলোচ্য হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, তাওয়াফকারী হাজারে আসওয়াদ বাম পাশে রেখে তাওয়াফকারীর ডান দিকে বায়তুল্লাহর দরজার দিকে অগ্রসর হবে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় হাজারে আসওয়াদ থেকেই তাওয়াফ শুরু করতে হবে। সকল ‘উলামায়ে কিরাম তাওয়াফের জন্য বর্ণিত অবস্থাকে শর্ত সাব্যস্ত করেছেন। সুতরাং বর্ণিত অবস্থা ব্যতীত অন্য কোন ভাবে তাওয়াফ করলে তা শুদ্ধ হবে না।
হাজারে আসওয়াদ ছোট একটি পাথর। কোন এক দুর্ঘটনায় তা পাঁচ টুকরো হয়ে যায়। এ টুকরাগুলো পরে মূল্যবান ধাতুর সাহায্যে জোড়া দিয়ে একত্র করা হয়েছে। একটি রৌপ্যের পাত্রে বায়তুল্লাহর পূর্ব দক্ষিণ কোণে তা স্থাপন করা হয়েছে। এ টুকরাগুলোর কোন একটিতে চুমু দেয়া বা স্পর্শ করা সুন্নাত। টুকরাগুলো ব্যতীত উক্ত ধাতুতে বা রৌপ্য পাত্রে চুমু দিবে না এবং স্পর্শ করবে না।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৬৭-[৭] যুবায়র ইবনু ’আরাবী (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার এক ব্যক্তি ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) কে হাজারে আসওয়াদে ’চুমু দেয়া’ প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলো। ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) জবাবে বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তা স্পর্শ করতে ও চুমু দিতে দেখেছি। (বুখারী)[1]
بَابُ دُخُوْلِ مَكَّةَ وَالطَّوَافِ
وَعَنِ الزُّبَيْرِ بْنِ عَرَبِيٍّ قَالَ: سَأَلَ رَجُلٌ ابنَ عمرَ عَنِ اسْتِلَامِ الْحَجَرِ فَقَالَ: رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَسْتَلِمُهُ وَيُقَبِّلُهُ. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যখ্যা: লোকটি ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) কে হাজারে আসওয়াদ স্পর্শ করা ও চুম্বন করা সম্পর্কে প্রশ্ন করেছে। তার মনে প্রশ্ন ছিল পাথরকে স্পর্শ করা ও চুম্বন করা কীভাবে সুন্নাত হতে পারে? উত্তরে ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) এ হাদীস বর্ণনা করেছেন যার দ্বারা হাজারে আসওয়াদ স্পর্শ করা ও চুম্বন করার বিষয়টি সুন্নাত বলে প্রমাণিত হয়।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৬৮-[৮] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বায়তু্ল্লাহর ইয়ামানী দিকের দুই কোণ ছাড়া অন্য কোন কোণকে স্পর্শ করতে দেখিনি। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ دُخُوْلِ مَكَّةَ وَالطَّوَافِ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: لَمْ أَرَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَسْتَلِمُ من الْبَيْت إِلَّا الرُّكْنَيْنِ اليمانيين
ব্যাখ্যা: রুকনে ইয়ামানী ব্যতীত নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য কোন অংশ স্পর্শ করতেন না। রুকনে ইয়ামানীকে এ নামে নামকরণ করার কারণ হলো- এটি ইয়ামানের দিকে অবস্থিত, যেভাবে শামের দিকে অবস্থিত কোণকে রুকনে শামী বলে, আবার ইরাক্বের দিকে অবস্থিত কোণকে ইরাকী বলা হয়ে থাকে।
রুকনে ইয়ামানীকে স্পর্শ করার কারণ হলো- এর মধ্যে হাজারে আসওয়াদ অবস্থিত রয়েছে। কতক উলামায়ে কিরামের বক্তব্য হলো, কেবলমাত্র রুকনে ইয়ামানী ছাড়া অন্য কোন রুকনে স্পর্শ করা সুন্নাত নয়। আর রুকন স্পর্শ দ্বারা হাজারে আসওয়াদ স্পর্শ করাকে বুঝানো হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৬৯-[৯] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজে উটের উপর থেকে তাওয়াফ করেছেন, মাথা বাঁকা লাঠি দিয়ে হাজারে আসওয়াদ স্পর্শ করেছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ دُخُوْلِ مَكَّةَ وَالطَّوَافِ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: طَافَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي حَجَّةِ الْوَدَاعِ عَلَى بعير يسْتَلم الرُّكْن بمحجن
ব্যাখ্যা: হাদীসে বলা হচ্ছে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজে উটের পিঠে বসে তাওয়াফ করেছেন। মূলত এ তাওয়াফ ছিল কুরবানীর দিনের তাওয়াফে ইফাযাহ্ অথবা বিদায়ী তাওয়াফ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে হেঁটে হেঁটে তাওয়াফ করেছেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় জাবির (রাঃ) বর্ণিত হাদীস দ্বারা। শায়খ দেহলবী (রহঃ) বলেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক উটের পিঠে বসে তাওয়াফ করার অন্যতম কারণ ছিল যে, তখন প্রচন্ড ভীড় ছিল। আরো একটি কারণ ছিল তা হলো- যাতে লোকেরা তাঁর কাছ থেকে বিভিন্ন বিধি-বিধান সম্পর্কে প্রশ্ন করতে পারে সেদিকে খেয়াল রেখে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটের পিঠে তাওয়াফ করেছেন। এছাড়াও আরো একটি কারণ হলো যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-সহ অন্যরাও উটের পিঠে তাওয়াফ করতে পারবে তা বৈধ করণার্থে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটের পিঠে বসে তাওয়াফ করেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৭০-[১০] উক্ত রাবী [ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)] হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটের উপর সওয়ার অবস্থায় বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেছেন। হাজারে আসওয়াদের কাছে পৌঁছেই নিজের হাতের কোন জিনিস (লাঠি) দিয়ে ইশারা করতেন এবং (আল্লা-হু আকবার) তাকবীর দিয়েছেন। (বুখারী)[1]
بَابُ دُخُوْلِ مَكَّةَ وَالطَّوَافِ
وَعَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ طَافَ بِالْبَيْتِ عَلَى بَعِيرٍ كُلَّمَا أَتَى عَلَى الرُّكْنِ أَشَارَ إِلَيْهِ بِشَيْءٍ فِي يدِه وكبَّرَ. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসটি আরোহী অবস্থায় তাওয়াফ জায়িয হওয়ার দলীল। ইমাম মালিক (রহঃ) প্রয়োজনের সময় যখন কোন ব্যক্তি বাহন ব্যতীত তাওয়াফ করতে না পারে তার জন্য আরোহী অবস্থায় তাওয়াফ করা বৈধ বলেছেন। ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ) স্বাভাবিক অবস্থায় সওয়ার হয়ে তাওয়াফ করা মাকরূহ বলেছেন। ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) বিনা ওজরে তাওয়াফ ও সা‘ঈ আরোহী অবস্থায় করা মাকরূহ বলেছেন।
বর্ণিত হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, হাজারে আসওয়াদকে স্পর্শ করতে না পারলে ইশারা করবে। কিন্তু রুকনে ইয়ামানীর হুকুম এর বিপরীত। কেননা রুকনে ইয়ামানী স্পর্শ করতে না পারলে তার দিকে ইশারা করার ব্যাপারে কোন দলীল নেই। আর এটাই ‘উলামায়ে কিরামদের সঠিক অভিমত।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরোহী অবস্থায় তাওয়াফ করার বিভিন্ন কারণ ছিলঃ
১. রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্বাস্থ্য তখন খুব খারাপ ছিল। এক বর্ণনায় এ কথার সমর্থন পাওয়া যায়। তিনি বলেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কায় পৌঁছলেন তখন তিনি অসুস্থ ছিলেন। তাই তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আপন বাহনে থেকেই তাওয়াফ করেছেন। (আবূ দাঊদ)
২. অথবা কারণ এই ছিল যে, তখন ভিড় ছিল অত্যধিক অথচ সব লোকই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হজ্জের কার্যাবলী দেখা ও শেখার জন্য আগ্রহী ছিল। এজন্য রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটের উপর সওয়ার হয়ে তাওয়াফ করেছেন। যাতে সকল লোক অথবা বেশী সংখ্যক লোক স্বচক্ষে দেখে শিখতে পারে। এ ব্যাখ্যার সমর্থনে জাবির (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীস রয়েছে। তিনি বলেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদেরকে হজ্জের কার্যাবলী দেখানোর জন্য এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করার জন্য সওয়ার হয়ে তাওয়াফ করেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৭১-[১১] আবুত্ব তুফায়ল (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করার সময় তাঁর হাতের বাঁকা লাঠি দিয়ে হাজারে আসওয়াদ স্পর্শ করতে এবং বাঁকা লাঠিকে চুমু দিতে দেখেছি। (মুসলিম)[1]
بَابُ دُخُوْلِ مَكَّةَ وَالطَّوَافِ
وَعَنْ أَبِي الطُّفَيْلِ قَالَ: رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَطُوفُ بِالْبَيْتِ وَيَسْتَلِمُ الرُّكْنَ بِمِحْجَنٍ مَعَهُ ويقبِّلُ المحجن. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: যদি কেউ হাজারে আসওয়াদে চুমু দিতে না পারে অপর কোন বস্ত্ত দিয়ে হাজারে আসওয়াদ স্পর্শ করে সে বস্ত্ততে চুম্বন করলে তার সুন্নাত আদায় হয়ে যাবে।
হাজারে আসওয়াদের দিকে ইশারা করে হাতে চুম্বন করা যাবে না, বরং তাতে চুম্বন করতে হবে অথবা তাতে হাত অথবা কোন বস্ত্ত স্পর্শ করিয়ে সে বস্ত্ততে চুম্বন করতে হবে। যদি সহজ ও শান্তভাবে অপরকে কষ্ট দেয়া ব্যতীত হাজারে আসওয়াদ স্পর্শ করে চুম্বন করা না যায়, তাহলে পাথরটিকে সামনে রেখে সেদিকে ফিরে দাঁড়াবে ও হাত পাথরের দিক করে বিসমিল্লাহ, তাকবীর বলবে।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৭২-[১২] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে (হজের উদ্দেশে) রওনা হলাম। তখন আমরা হজ্জ/হজ ছাড়া অন্য কিছুর (’উমরার) তালবিয়াহ্ পড়তাম না। আমরা ’সারিফ’ নামক স্থানে পৌঁছলে আমার ঋতুস্রাব শুরু হয়ে গেলো। এমন সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে আসলেন। আমি হজ্জ/হজ করতে পারবো না বিধায় কাঁদছিলাম। (কাঁদতে দেখে) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, মনে হয় তোমার ঋতুস্রাব শুরু হয়েছে। আমি বললাম, হ্যাঁ! তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এটা এমন বিষয় যা আল্লাহ তা’আলা আদম-কন্যাদের জন্য নির্ধারণ করেছেন। তাই হাজীগণ যা করে তুমিও তা করতে থাকো, তবে পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তুমি বায়তুল্লাহর তাওয়াফ থেকে বিরত থাকো। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ دُخُوْلِ مَكَّةَ وَالطَّوَافِ
وَعَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: خَرَجْنَا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا نَذْكُرُ إِلَّا الْحَجَّ فَلَمَّا كُنَّا بِسَرِفَ طَمِثْتُ فَدَخَلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَنَا أَبْكِي فَقَالَ: «لَعَلَّكِ نَفِسْتِ؟» قُلْتُ: نَعَمْ قَالَ: «فَإِنَّ ذَلِكِ شَيْءٌ كَتَبَهُ اللَّهُ عَلَى بَنَاتِ آدَمَ فَافْعَلِي مَا يَفْعَلُ الْحَاجُّ غَيْرَ أَنْ لَا تَطُوفِي بِالْبَيْتِ حَتَّى تَطْهُرِي»
ব্যাখ্যা: সারিফ মক্কা হতে দশ মাইল দূরে একটি প্রসিদ্ধ জায়গার নাম। ষষ্ঠ হিজরীর অনাদায়ী ‘উমরা কাযা করার উদ্দেশে সপ্তম হিজরীতে মক্কা যাওয়ার পথে এ সারিফ নামক স্থানেই মায়মূনাহ্’র সাথে ইহরাম অবস্থায় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিবাহ হয় এবং ফিরার পথে এ স্থানেই হালাল অবস্থায় তার বাসর রাত্রি যাপন হয় এবং পরের দিন ওয়ালীমা অনুষ্ঠান হয়। হিজরী ৬১ মতান্তরে ৫১ সনে এ স্থানেই মায়মূনাহ্ (রাঃ) ইন্তিকাল করেন এবং সেখানেই তিনি সমাধিত হন। বর্তমানে স্থানটি যিয়ারতগাহ হিসেবে প্রসিদ্ধ।
বর্ণিত হাদীসটি থেকে বুঝা যায় যে, হায়িয ও নিফাসগ্রস্থ মহিলা এবং জুনুবী ব্যক্তি হজ্জের তাওয়াফ ব্যতীত যাবতীয় সব কাজ করতে পারবে। হ্যাঁ- তাওয়াফের অনুগামী হিসেবে তাওয়াফের দু’ রাক্‘আত সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) ও সা‘ঈও করতে পারবে না।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৭৩-[১৩] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বিদায় হজের (এক বছর) আগে যে হজে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ বকর (রাঃ)-কে হজের আমির বানিয়ে পাঠিয়েছিলেন, সে হজ্জে আবূ বকর কুরবানীর দিনে আরো কিছু লোকসহ আমাকে লোকদের মাঝে ঘোষণা দিতে আদেশ করে পাঠালেন- সাবধান! এ বছরের পর আর কোন মুশরিক বায়তুল্লাহর হজ্জ/হজ করতে পারবে না এবং কেউ কক্ষনো উলঙ্গ হয়ে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করতে পারবে না। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ دُخُوْلِ مَكَّةَ وَالطَّوَافِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: بَعَثَنِي أَبُو بَكْرٍ فِي الْحَجَّةِ الَّتِي أَمَّرَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَيْهَا قَبْلَ حَجَّةِ الْوَدَاعِ يَوْمَ النَّحْرِ فِي رَهْطٍ أَمَرَهُ أَنْ يُؤَذِّنَ فِي النَّاسِ: «أَلَا لَا يَحُجُّ بَعْدَ العامِ مشرِكٌ وَلَا يطوفَنَّ بِالْبَيْتِ عُرْيَان»
ব্যাখ্যা: এ হাদীসটি আল্লাহর বাণী- فَلَا يَقْرَبُوا الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ بَعْدَ عَامِهِمْ هٰذَا। অর্থাৎ- ‘‘এ বছরের পর কোন কাফির মসজিদে হারামের নিকটবর্তী হতে পারবে না’’- (সূরা আত্ তাওবাহ্ ৯ : ২৮)।
এ আয়াত দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, কোন কাফির মসজিদে হারামে প্রবেশ করতে পারবে না। যদিও তারা হজ্জের নিয়্যাত করে। এখানে হারাম দ্বারা শুধু বায়তুল্লাহকে বুঝানো হয়নি বরং সমস্ত হারাম এলাকা উদ্দেশ্য। ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেনঃ যদি কোন কাফির গুরুত্বপূর্ণ কোন চিঠি বা কোন বিষয় নিয়ে আসে যা তার সাথে আছে তবুও সে হারাম এলাকায় প্রবেশ করতে পারবে না। বরং যার কাছে সে এসেছে সে হারাম এলাকা থেকে বের হয়ে তার কাছে তথা কাফিরের কাছে যাবে এবং প্রয়োজন মিটাবে। এমনভাবে কোন জিম্মিও হারামে অবস্থান করতে পারবে না। কেননা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- তোমরা ইয়াহূদী ও নাসারাদেরকে ‘আরব উপত্যকা থেকে বের করে দাও।
এ হাদীসের অপর একটি অংশে বলা হয়েছে যে, কোন ব্যক্তি এখন থেকে আর কক্ষনো উলঙ্গ হয়ে কাবা তাওয়াফ করতে পারবে না। শুধু এ দিনটিতেই নয় বরং কোন দিনই কেউ উলঙ্গ হতে পারবে না। এ কথার সমর্থনে কুরআন মাজীদে এসেছে- ‘‘হে আদাম সন্তানেরা! তোমরা সালাতের সময় তোমাদের সাজ-সজ্জা গ্রহণ করো’’- (সূরা আল আ‘রাফ ৭ : ৩১)।
ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ এ আয়াতটি জাহিলী যুগের উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করার নিয়মকে প্রতিহত করতে নাযিল করা হয়েছে। কেননা জাহিলী যুগে তারা উলঙ্গ হয়ে কাবা প্রদক্ষেণ করত।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৭৪-[১৪] মুহাজির আল মাক্কী (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার জাবির কে এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, যে ব্যক্তি বায়তুল্লাহকে দেখে (দু’আ পাঠের সময়) নিজের দুই হাত উঠাবে। জবাবে জাবির (রাঃ) বললেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে হজ্জ/হজ করেছি, কিন্তু কক্ষনো আমরা এরূপ করিনি। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
عَنِ الْمُهَاجِرِ الْمَكِّيِّ قَالَ: سُئِلَ جَابِرٌ عَنِ الرَّجُلِ يَرَى الْبَيْتَ يَرْفَعُ يَدَيْهِ فَقَالَ قَدْ حَجَجْنَا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَمْ نَكُنْ نَفْعَلُهُ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যা: কাবা দর্শনে হাত উত্তোলন করার হুকুমঃ বায়তুল্লাহ দেখার সাথে সাথে হাত উত্তোলন করে দু‘আ করা জায়িয আছে কিনা- এ বিষয়ে ইমামদের মাঝে মতবিরোধ রযেছে, যা নিম্নে উল্লেখ করা হলো।
ইমাম আবূ হানীফা, শাফি‘ঈ, আহমাদ, সুফিয়ান সাওরী (রহঃ) প্রমুখ ইমামদের নিকট বায়তুল্লাহ নজরে পরার সময় উভয় হাত উত্তোলন করে দু‘আ পড়া সুন্নাত। তাদের দলীল হলো ইবনু জুরায়জ-এর একটি হাদীস এবং ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত এই হাদীসে রয়েছে যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাত স্থানে হস্তদ্বয় উত্তোলন করতেন- সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আরম্ভকালে, বায়তুল্লাহর নিকট, বায়তুল্লাহ দর্শনে, সাফা-মারওয়ায়, ‘আরাফাতে, মুযদালিফায় এবং দু’ জামারায়।
আর ইমাম মালিক (রহঃ)-এর মতে বায়তুল্লাহ দর্শনকালে দু‘আ পাঠের সময় হাত উত্তোলন করা বৈধ নয়। তিনি উপরোক্ত মুহাজিরে মাক্কী বর্ণিত হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করেন। বর্ণিত হাদীসটি ইমাম তিরমিযী, আবূ দাঊদ, নাসায়ী, বায়হাক্বী বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী বলেন, হাদীসটি হাসান।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৭৫-[১৫] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাহ্ হতে (হজ্জ/হজ ও ’উমরা পালনের জন্য) মক্কায় প্রবেশ করে হাজারে আসওয়াদের দিকে অগ্রসর হলেন, একে চুমু খেলেন। তারপর বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করলেন, এরপর সাফা পাহাড়ের দিকে এলেন এবং এর উপর উঠলেন যাতে বায়তুল্লাহ দেখতে পান। তারপর দু’ হাত উঠালেন এবং উদারমনে আল্লাহর যিকির ও দু’আ করতে লাগলেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: أَقْبَلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَدَخَلَ مَكَّةَ فَأَقْبَلَ إِلَى الْحَجَرِ فَاسْتَلَمَهُ ثُمَّ طَافَ بِالْبَيْتِ ثُمَّ أَتَى الصَّفَا فَعَلَاهُ حَتَّى يَنْظُرَ إِلَى الْبَيْتِ فَرَفَعَ يَدَيْهِ فَجَعَلَ يَذْكُرُ اللَّهَ مَا شَاءَ وَيَدْعُو. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, প্রত্যেক মক্কায় প্রবেশকারী ব্যক্তিই তাওয়াফ করবে। চাই সে মুহরিম হোক অথবা না হোক।
বর্ণিত হাদীসটি এর উপরও দলীল যে, বায়তুল্লাহ দেখার পর নির্ধারিত কোন দু‘আ পাঠ করার বিধান নেই। বরং যে কোন দু‘আই করতে পারে। তবে দু‘আয়ে মাসুরা বা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত দু‘আ পড়া উত্তম।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৭৬-[১৬] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বায়তুল্লাহর চারদিকে তাওয়াফ করা সালাতেরই মতো, তবে এতে তোমরা কথা বলতে পারো। তাই তাওয়াফের সময় ভালো কথা ব্যতীত আর কিছু বলবে না। (তিরমিযী, নাসায়ী ও দারিমী)[1]
ইমাম তিরমিযী (রহঃ) একদল মুহাদ্দিসের নাম উল্লেখ করেছেন যারা এ হাদীসকে ইবনু ’আব্বাস-এর উক্তি (মাওকূফ) বলে উল্লেখ করেছেন।
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الطَّوَافُ حَوْلَ الْبَيْتِ مِثْلُ الصَّلَاةِ إِلَّا أَنَّكُمْ تَتَكَلَّمُونَ فِيهِ فَمَنْ تَكَلَّمَ فِيهِ فَلَا يَتَكَلَّمَنَّ إِلَّا بِخَيْرٍ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَالنَّسَائِيُّ وَالدَّارِمِيُّ وَذَكَرَ التِّرْمِذِيُّ جَمَاعَةً وَقَفُوهُ عَلَى ابْنِ عباسٍ
ব্যাখ্যা: ইমাম তিরমিযী (রহঃ) একদল মুহাদ্দিসের নাম উল্লেখ করেছেন, যারা এ হাদীসটিকে ইবনু ‘আব্বাস-এর উক্তি (মাওকূফ) হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন।
‘বায়তুল্লাহর চারদিকে তাওয়াফ করা সালাতের মতো’ এর অর্থ এই নয় যে, সালাতে যেমন কিরাআত, রুকূ‘, সিজদা্ ইত্যাদি আছে তেমনিভাবে তাওয়াফের মধ্যেও এগুলো আছে। তবে শরীর পাক, কাপড় পাক ও সতর ঢাকা যেমনিভাবে সালাতের জন্য অপরিহার্য, তেমনিভাবে তাওয়াফের জন্যও অপরিহার্য। এদিক দিয়ে তাওয়াফ সালাতের সাদৃশ্য। এ হাদীসের ভিত্তিতে ইমামগণ বলেছেন পবিত্রতা তাওয়াফের জন্য শর্ত। কিন্তু হানাফীদের নিকট শর্ত নয় বরং উত্তম।
আলোচ্য হাদীসে তাওয়াফের মধ্যে উত্তম কথা বলা বৈধ হওয়ার ব্যাপারে দলীল। উত্তম কথা হলো যিকির, তিলাওয়াত, দীনী ‘ইলম শিক্ষা করা বা শিক্ষা দেয়া ইত্যাদি। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে তার এ সকল কাজে যেন অপরের কষ্ট না হয়। যদি কারো তাওয়াফ চলাকালীন সময় হাদাস (অপবিত্র) হয়ে যায়, তাহলে নতুন করে উযূ করে পুনরায় তাওয়াফ শুরু করতে হবে।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৭৭-[১৭] উক্ত রাবী [ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)] হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হাজারে আসাওয়াদ যখন জান্নাত হতে নাযিল হয়, তখন তা দুধের চেয়েও বেশি সাদা ছিল। অতঃপর আদম সন্তানের গুনাহ একে কালো করে দেয়। [আহমাদ ও তিরমিযী; ইমাম তিরমিযী (রহঃ) বলেছেন, হাদীসটি হাসান সহীহ।][1]
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «نَزَلَ الْحَجَرُ الْأَسْوَدُ مِنَ الْجَنَّةِ وَهُوَ أَشَدُّ بَيَاضًا مِنَ اللَّبَنِ فَسَوَّدَتْهُ خَطَايَا بَنِي آدَمَ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيح
ব্যাখ্যা: অনেক ‘উলামায়ে কিরাম বলেছেন হাদীসটি তার প্রকাশ্য অর্থেই গ্রহণ করতে হবে। প্রকৃতপক্ষেই তা জান্নাতী পাথর জান্নাত হতে তা অবতীর্ণ করা হয়েছে।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যখন হাজারে আসওয়াদ পৃথিবীতে আসে তখন সেটা দুধের চেয়ে সাদা ছিল। অতঃপর আদাম সন্তানদের পাপের দ্বারা সেটা কালো হয়ে গেল। অর্থাৎ- বানী আদামের যে সকল লোক হাজারে আসওয়াদ স্পর্শ করে তাদের গুনাহের দ্বারা এ পাথর সাদা থেকে কালো হয়েছে। এ কথাগুলো সুনানে আত্ তিরমিযী’র বর্ণনায় এসেছে। মুসনাদে আহমাদের বর্ণনা হলো- হাজারে আসওয়াদ জান্নাত থেকে এসেছে। আর সেটা ছিল বরফের চেয়েও সাদা। অতঃপর মুশরিকদের পাপের দরুন সেটা কালো রং ধারণ করেছে। ত্ববারানী’র এক বর্ণনায় এসেছে- হাজারে আসওয়াদ জান্নাতের পাথরসমূহের মধ্যে একটি পাথর। এটা ছাড়া দুনিয়াতে জান্নাতের আর কিছুই নেই। আর এটা পানির মতো সাদা ছিল।
কাযী বায়যাবী (রহঃ) বলেন-এ হাদীস দ্বারা হাজারে আসওয়াদের ফাযীলাতের কথা বুঝানো হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৭৮-[১৮] উক্ত রাবী [ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)] হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাজারে আসওয়াদ সম্পর্কে বলেছেন, আল্লাহর কসম! কিয়ামতের দিন আল্লাহ এটিকে উঠাবেন, তখন এর দু’টি চোখ থাকবে যা দিয়ে সে দেখতে পাবে। তার একটি জিহ্বা থাকবে ও এই জিহবা দিয়ে সে কথা বলবে এবং যে তাকে ঈমানের সাথে চুমু দিয়েছে তার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে। (তিরমিযী, ইনু মাজাহ ও দারিমী)[1]
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الْحَجَرِ: «وَاللَّهِ لَيَبْعَثَنَّهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لَهُ عَيْنَانِ يُبْصِرُ بِهِمَا وَلِسَانٌ يَنْطِقُ بِهِ يَشْهَدُ عَلَى مَنِ اسْتَلَمَهُ بِحَقٍّ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَابْن مَاجَه والدارمي
ব্যাখ্যা: (وَلِسَانٌ يَنْطِقُ بِه) তুরবিশতী (রহঃ) বলেনঃ মৃত্যুর পরে পুনরুত্থান, যা মানুষের জন্য নির্দিষ্ট। এমনিভাবে পাথরকেও তিনি জীবন দিতে সক্ষম যাতে সে কথা বলতে পারে। আর তাকে বাকশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি দিবেন যাতে সে পার্থক্য করতে পারে- কে প্রকৃত স্পর্শকারী আর কে নয়? আর এই দু’টি যন্ত্র হল- চক্ষু ও জিহবা।
(يَشْهَدُ عَلٰى مَنِ اسْتَلَمَه بِحَقٍّ) স্পর্শকারী শুধু স্পর্শ করবে তার নিজের জন্য এমনটি যেন না হয়, বরং আল্লাহর নির্দেশ ও সুন্নাতের অনুসরণ যেন ‘আমল করা উদ্দেশ্য হয়। ইমাম ‘ইরাকী বলেনঃ এখানে عَلٰى শব্দটি لام এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে স্পর্শ করার সাক্ষ্য হিসেবে, যাতে সংরক্ষণ করা বুঝায়।
(بِحَقٍّ) প্রকৃতপক্ষেই তা হবে ঈমান ও সাওয়াবের আশায়। এ হাদীসকে বাহ্যিক অর্থের উপরই বুঝানো হয়। কেননা আল্লাহ তা‘আলা বস্ত্তর ক্ষেত্রে বাকশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিতে সক্ষম যেমনটি তিনি মানুষের ক্ষেত্রে করবেন। আর যাদের অন্তরে বক্রতা আছে তারা এর অপব্যাখ্যা করে। তারা বলে, مستلم (স্পর্শকারী) ব্যক্তির প্রতিদান দেয়ার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৭৯-[১৯] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, হাজারে আসওয়াদ ও মাকামে ইব্রাহীম জান্নাতের ইয়াকূতসমূহের মধ্যে দু’টি ইয়াকূত। আল্লাহ এদের নূর (আলো) দূর করে দিয়েছেন। যদিও এ দু’টির নূর (আলো) আল্লাহ তা’আলা দূর করে না দিতেন। তবে এরা পূর্ব ও পশ্চিম দিগন্তের মধ্যে যা আছে তাকে আলোকময় করে দিতো। (তিরমিযী)[1]
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «إِنَّ الرُّكْنَ وَالْمَقَامَ يَاقُوتَتَانِ مِنْ يَاقُوتِ الْجَنَّةِ طَمَسَ اللَّهُ نورَهما وَلَو لم يطمِسْ نورَهما لأضاءا مَا بينَ المشرقِ والمغربِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: মাকামে ইব্রাহীমকে সালাতের স্থান বানানোর জন্য কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ এসেছে, وَاتَّخِذُوْا مِنْ مِّقَامِ إِبْرَاهِيْمَ مُصَلًّى সুতরাং তাওয়াফের পর মাকামে ইব্রাহীমের নিকট দু’ রাক্‘আত সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করবে। যদি ভীড়ের কারণে তৎক্ষণিকভাবে তার নিকট পড়তে না পারে তাহলে যেখানে সম্ভব সেখানে আদায় করবে।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৮০-[২০] ’উবায়দ ইবনু উমায়র (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) দু’ রুকনের (হাজারে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানীর) কাছে যেভাবে ভীড় করতেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীদের আর কাউকে এমনভাবে (প্রতিযোগিতামূলকভাবে) ভীড় করতে দেখিনি। ইবনু ’উমার(রাঃ) বলেন, আমি যদি এরূপ করি (তাতে দোষের কোন বিষয় নয়), কেননা আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, নিশ্চয়ই এদের স্পর্শ করা গুনাহের কাফফারাহ্। আমি তাঁকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে) আরো বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি বায়তুল্লাহর চারদিকে সাতবার তাওয়াফ করবে ও তা যথাযথভাবে সম্পন্ন করবে, তবে তা তার জন্য গোলাম মুক্ত করে দেবার সমতুল্য হবে। এটা ছাড়াও তাঁকে (ইবনু ’উমার (রাঃ)-কে) বলতে শুনেছি, কোন লোক এতে এক পা ফেলে অপর পা উঠানোর আগেই বরং আল্লাহ তা’আলা তার একটি গুনাহ মাফ করে দেন ও তার জন্যে একটি সাওয়াব নির্ধারণ করেন। (তিরমিযী)[1]
وَعَن عُبيدِ بنِ عُمَيرٍ: أَنَّ ابْنَ عُمَرَ كَانَ يُزَاحِمُ عَلَى الرُّكْنَيْنِ زِحَامًا مَا رَأَيْتُ أَحَدًا مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُزَاحِمُ عَلَيْهِ قَالَ: إِنْ أَفْعَلْ فَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «إِنَّ مَسْحَهُمَا كَفَّارَةٌ لِلْخَطَايَا» وَسَمِعْتُهُ يَقُولُ: «مَنْ طَافَ بِهَذَا الْبَيْتِ أُسْبُوعًا فَأَحْصَاهُ كَانَ كَعِتْقِ رَقَبَةٍ» . وَسَمِعْتُهُ يَقُولُ: «لَا يَضَعُ قَدَمًا وَلَا يَرْفَعُ أُخْرَى إِلا حطَّ اللَّهُ عنهُ بهَا خَطِيئَة وكتبَ لهُ بهَا حَسَنَة» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: অন্যান্য সহাবায়ে কিরাম অধিক ভীড়ের সময় হাজারে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানীকে স্পর্শ করা ছেড়ে দিতেন। কেননা তাতে নিজের এবং অপর লোকদের কষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) সহাবায়ে কিরামের মাঝে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। তিনি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছোট থেকে ছোট সকল কাজকেও পরিপূর্ণরূপে মুহাব্বাতের সাথে আদায় করতেন। বর্তমান যুগে ভীড় বেশি হওয়ার কারণে অন্যান্য সহাবায়ে কিরামের আমলের অনুসরণ করাই আমাদের জন্য উত্তম।
শায়খ ‘আবদুল হাক্ব মুহাম্মাদ দেহলবী (রহঃ) লুম্‘আত নামক কিতাবে বলেন, ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ)-এর কথা اِنْ اَفْعَلُ যদি আমি করি এর ব্যাখ্যা হলো যদি আমি হাজারে আসওয়াদ এবং রুকনে ইয়ামানীকে স্পর্শ করার জন্য ভীড় করি তোমরা আমাকে নিষেধ করো না। কেননা আমি এ দু’টি স্পর্শ করার ব্যাপারে যে ফাযীলাত শুনেছি তার উপর আমি নিজেকে স্থির রাখতে পারি না।
বায়তুল্লাহকে সাতবার তাওয়াফ করাকে গোলাম আজাদের সমতুল্য ধরা হয়েছে। এর ব্যাখ্যায় অধিকাংশ ‘উলামায়ে কিরাম সাতবার প্রদক্ষিণ করার অর্থ উদ্দেশ্য নিয়েছেন। আর কিছু ‘উলামায়ে কিরাম সাতদিন তাওয়াফ করার অর্থ নিয়েছেন। কিন্তু প্রথমটিই অধিক গ্রহণযোগ্য। কেননা অন্যান্য হাদীস দ্বারা এর প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে বর্ণিত সাওয়াব সে পাবে যদি তাওয়াফের ওয়াজিব, সুন্নাত এবং শর্তসমূহ সবকিছু ঠিকভাবে আদায় করে।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৮১-[২১] ’আব্দুল্লাহ ইবনুস্ সায়িব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দু’ রুকনের (হাজারে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানী) মধ্যবর্তী স্থানে এ দু’আ পড়তে শুনেছি- ’’রব্বানা- আ-তিনা ফিদ্দুন্ইয়া- হাসানাতাওঁ ওয়াফিল আ-খিরাতি হাসানাতাওঁ ওয়াক্বিনা- ’আযা-বান্না-র’’ (অর্থাৎ- হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ দান কর এবং জাহান্নামের আগুন হতে রক্ষা কর।)। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن عبد الله بن السَّائِب قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ مَا بَيْنَ الرُّكْنَيْنِ: (رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَاب النَّار)
رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: বর্ণিত হাদীসটি তাওয়াফের মাঝে এবং হাজারে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানের মাঝে দু‘আ করা সুন্নাত হওয়ার উপর দলীল। হাদীসটি ইমাম আবূ দাঊদ, ইবনু হিব্বান, হাকিম এবং বায়হাক্বীও বর্ণনা করেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৮২-[২২] সফিয়্যাহ্ বিনতু শায়বাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ তুজরাহ্-এর মেয়ে আমাকে বলেছেন, আমি কুরায়শ গোত্রের কিছু মহিলার সাথে আবূ হুসায়ন পরিবারের একটি ঘরে প্রবেশ করলাম যাতে আমরা সাফা মারওয়ার সা’ঈর সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখতে পাই। তখন আমি তাঁকে সা’ঈ করতে দেখলাম, জোরে জোরে পা ফেলার কারণে তাঁর চাঁদর এদিকে-সেদিকে দুলছিল। আর তখন আমি তাঁকে এ কথাও বলতে শুনেছি, ’’তোমরা সা’ঈ করো’’। কেননা সা’ঈ করা আল্লাহ তোমাদের জন্য লিপিবদ্ধ (নির্ধারণ) করেছেন। (বাগাবীর শারহুস্ সুন্নাহ এবং আহমাদ কিছু ভিন্নতার সাথে)[1]
وَعَن صفيةَ بنتِ شيبةَ قَالَتْ: أَخْبَرَتْنِي بِنْتُ أَبِي تُجْرَاةَ قَالَتْ: دَخَلْتُ مَعَ نِسْوَةٍ مِنْ قُرَيْشٍ دَارَ آلِ أَبِي حُسَيْنٍ نَنْظُرُ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ يَسْعَى بَيْنَ الصَّفَا وَالْمَرْوَةِ فَرَأَيْتُهُ يَسْعَى وَإِنَّ مِئْزَرَهُ لَيَدُورُ مِنْ شِدَّةِ السَّعْيِ وَسَمِعْتُهُ يَقُولُ: «اسْعَوْا فَإِنَّ اللَّهَ كَتَبَ عَلَيْكُمُ السَّعْيَ» . رَوَاهُ فِي شَرْحِ السُّنَّةِ وَرَوَاهُ أَحْمد مَعَ اخْتِلَاف
ব্যাখ্যা: বর্ণিত হাদীসটি দ্বারা বুঝা যায়, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফা-মারওয়ার মাঝে পায়ে হেঁটে সা‘ঈ করেছিলেন। অনেক ‘আলিমগণ বলেছেন, এটা ‘উমরার সা‘ঈ ছিল। কেননা অন্য হাদীস দ্বারা বুঝা যায় বিদায় হজে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরোহী অবস্থায় সা‘ঈ করেছেন।
সা‘ঈর বিধান সম্পর্কে ইমামগণের মতবিরোধঃ
হজ্জ/হজ আদায়ের ক্ষেত্রে সা‘ঈ করা কী? ইমাম শাফি‘ঈ, মালিক ও আহমাদ (রহঃ) প্রমুখের মতে সাফা-মারওয়ার মাঝে সা‘ঈ করা রুকন তথা ফরয। তাদের নিকট সা‘ঈ ব্যতীত হজ্জ/হজ হবে না। তাদের কথার দলীল হলো আলোচ্য হাদীসের এই অংশ قال عليه السلام اِسْعَوْا فَإِنَّ اللّٰهَ كَتَبَ عَلَيْكُمُ السَّعْىَ অর্থাৎ- রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা সা‘ঈ করো। কেননা আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের ওপর সা‘ঈকে নির্ধারণ করেছেন।
ইমাম আবূ হানীফা ও সুফিয়ান সাওরী (রহঃ) প্রমুখ ‘উলামায়ে কিরাম বলেন, সা‘ঈ ওয়াজিব। তাদের দলীল আল্লাহ তা‘আলার মহান বাণী لَا جُنَاحَ عَلَيْهِ اَنْ يَّطَّوَّفَ بِهِمَا উল্লেখিত আয়াতে لَا جُنَاحَ বৈধতার প্রতি ইঙ্গিত করেছে। তাছাড়া আরো দলীল রয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৮৩-[২৩] কুদামাহ্ ইবনু ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আম্মার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে উটের পিঠে চড়ে সাফা মারওয়ার মাঝে সা’ঈ করতে দেখেছি। কিন্তু কাউকেও মারতে বা হাঁকাতে দেখিনি এবং এমনকি আশেপাশে ’সরো’ ’সরো’ বলতেও শুনিনি। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
وَعَنْ قُدَامَةَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمَّارٍ قَالَ: رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَسْعَى بَيْنَ الصَّفَا وَالْمَرْوَةِ عَلَى بَعِيرٍ لَا ضرب وَلَا طرد وَلَا إِلَيْك. رَوَاهُ فِي شرح السّنة
ব্যাখ্যা: এ হাদীসের রাবী কুদামাহ্ ইবনু ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আম্মার, যিনি প্রথমদিকে ইসলাম গ্রহণ করেন। কিন্তু তিনি মক্কায় বসবাস করতেন।
এ প্রখ্যাত সাহাবী রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বিদায় হজ্জের সময় সাক্ষাত করেন। কুদামাহ্ থেকে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা খুবই সীমিত।
এ হাদীসের আলোকে এ কথা প্রমাণিত হয়েছে যে, সময় ক্ষেত্রে বাহনে করে ও সাফা-মারওয়ার মাঝে সা‘ঈ করা যাবে। অথবা সাধারণভাবে সাফা-মারওয়ার মাঝে বাহনে চড়ে সা‘ঈ করার বৈধতা প্রদান করা হয়েছে আলোচ্য হাদীসের মাধ্যমে।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৮৪-[২৪] ইয়া’লা ইবনু উমাইয়্যাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি সবুজ চাদর ইযত্বিবা হিসেবে গায়ে দিয়ে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করেছেন। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ ও দারিমী)[1]
وَعَنْ يَعْلَى بْنِ أُمَيَّةَ قَالَ: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ طَافَ بِالْبَيْتِ مُضْطَجعا بِبُرْدٍ أَخْضَرَ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ وَالدَّارِمِيُّ
ব্যাখ্যা: (اَلْاِضْطِبَاعَ) ইযত্বিবা' বলা হয় ডান কাঁধকে বিবস্ত্র রেখে সমস্ত চাদরকে বাম কাঁধের উপর রাখা। কেননা চাদরের মধ্যভাগকে বগলের দিকে রাখা হয় এবং ডান বাহু উন্মুক্ত থাকে।
ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেন, (اَلْاِضْطِبَاعَ) হলো ইযার বা লুঙ্গিকে ডান বগলের নিচে প্রবেশ করানো এবং তার অপর প্রান্তকে বাম কাঁধে রাখা আর ডান কাঁধ খোলা থাকবে।
ইমাম ত্বীবী (রহঃ) বলেন, (اَلْاِضْطِبَاعَ) ইযত্বিবা‘ হলো ইযার (লুঙ্গি) অথবা চাদর নিয়ে এটার মধ্যভাগকে ডান বগলের নিচে রাখা। আর অবশিষ্ট দুই পার্শকে বাম কাঁধের উপর বক্ষ ও পিঠের দিক হতে রাখা।
কেউ কেউ বলেন, এটা (اَلْاِضْطِبَاعَ) করা হয় সাহসিকতা প্রকাশের জন্য। যেমন তাওয়াফের সময় দুই হাত ঝুকিয়ে হাঁটা। আর সর্বপ্রথম (اَلْاِضْطِبَاعَ) করা হয় ‘উমরাতুল কাযাতে। যেন এটা দুই হাত ঝুকিয়ে হাঁটার সময় সহায়ক হয়। আর মুশরিকরা যেন তাদের শক্তি লক্ষ্য করে। অতঃপর তা সুন্নাতে পরিণত হয়। সাত চক্করেই (اَلْاِضْطِبَاعَ) করতে হয়। তাওয়াফ শেষ হলে তখন কাপড় ঠিক করে নেয়। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফের দুই রাক্‘আতের সময় (اَلْاِضْطِبَاعَ) করেননি। অতএব তাওয়াফ শেষ হলে দু’ রাক্‘আত সালাতে অথবা তাওয়াফ চলাকালীন সালাতে দাঁড়ালে অবশ্যই দু’ কাঁধ ঢেকে নিবে।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৮৫-[২৫] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ জি’রানাহ্ হতে ’উমরা করেছেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বায়তুল্লাহর তাওয়াফে তিনবার জোরে জোরে চলেছেন এবং তাঁদের চাদরসমূহ ডান বগলের নিচ দিয়ে বাম কাঁধের উপর রেখেছেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسلم وأصحابَه اعتمروا من الجعْرانة فَرَمَلُوا بِالْبَيْتِ ثَلَاثًا وَجَعَلُوا أَرْدِيَتَهُمْ تَحْتَ آبَاطِهِمْ ثُمَّ قَذَفُوهَا عَلَى عَوَاتِقِهِمُ الْيُسْرَى. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: সাহাবীগণ চাদরকে তাদের ডান কাঁধের নীচ দিয়ে বাম কাঁধের উপর ফেলে দিতেন।
এ হাদীস হতে প্রমাণিত হয় যে, তাওয়াফে রমল ও ইযত্বিবা' করতে হয়।
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৮৬-[২৬] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা এ দু’টি কোণ তথা রুকনে ইয়ামানী ও হাজারে আসওয়াদ কষ্টে ও আরামে কোন অবস্থাতেই স্পর্শ করতে ছাড়িনি যখন থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ দু’ কোণ (রুকন) স্পর্শ করতে দেখেছি। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: مَا تَرَكْنَا اسْتِلَامَ هَذَيْنِ الرُّكْنَيْنِ: الْيَمَانِي وَالْحَجَرِ فِي شِدَّةٍ وَلَا رخاء مُنْذُ رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يستلمهما
ব্যাখ্যা: এ হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনু হাজার (রহঃ) বলেন, বাহ্যিক কথা হচ্ছে, ইবনু ‘উমার (রাঃ) ভীড়ের সময় চুম্বন করা ছেড়ে দেয়াকে ওযর হিসেবে গ্রহণ করতেন না।
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৮৭-[২৭] বুখারী ও মুসলিমের অপর বর্ণনায় রয়েছে, নাফি’ (রহঃ) বলেছেনঃ আমি ইবনু ’উমার (রাঃ)-কে হাজারে আসওয়াদ নিজ হাতে স্পর্শ করে হাত চুমু খেতে দেখেছি। আর তাঁকে এটা বলতে শুনেছি, যখন থেকে আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এটা করতে দেখেছি, তখন থেকে এটা কক্ষনো পরিত্যাগ করিনি। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
وَفِي رِوَايَةٍ لَهُمَا: قَالَ نَافِعٌ: رَأَيْتُ ابْنَ عُمَرَ يَسْتَلِمُ الْحَجَرَ بِيَدِهِ ثُمَّ قَبَّلَ يَدَهُ وَقَالَ: مَا تَرَكْتُهُ مُنْذُ رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَفْعَله
ব্যাখ্যা: মুসলিমের শব্দে রয়েছে, (يَسْتَلِمُ الْحَجَرَ بِيَدَيْهِ ثُمَّ قَبَّلَ يَدَه) অর্থাৎ- তিনি তার হাত দিয়ে পাথর স্পর্শ করলেন। অতঃপর হাত চুম্বন করলেন। সম্ভবত এটা (অর্থাৎ- হাত দিয়ে চুম্বন করা) ভীড়ের সময় করেছিলেন। যখন তিনি পাথর চুম্বন করতে সক্ষম হননি। কেননা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সরাসরি মুখ দিয়ে পাথর চুম্বন করেছিলেন।
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৮৮-[২৮] উম্মু সালামাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে অভিযোগ করলাম যে, আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তাহলে তুমি সওয়ার হয়ে মানুষের পেছনে পেছনে তাওয়াফ করো। তিনি [উম্মু সালামাহ (রাঃ)] বলেন, আমি তাওয়াফ করলাম। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বায়তুল্লাহর পাশে দাঁড়িয়ে সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করছিলেন এবং সালাতে সূরা ’’ওয়াত্ তূর ওয়া কিতা-বিম্ মাসতূর’’ পড়ছিলেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
وَعَنْ أُمِّ سَلَمَةَ قَالَتْ: شَكَوْتُ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنِّي أَشْتَكِي. فَقَالَ: «طُوفِي مِنْ وَرَاءِ النَّاسِ وَأَنْتِ رَاكِبَةٌ» فَطُفْتُ وَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُصَلِّي إِلَى جَنْبِ الْبَيْتِ يَقْرَأُ ب (الطُّورِ وكِتَابٍ مسطور)
ব্যাখ্যা: উম্মুল মু’মিনীন উম্মু সালামাহ্ যায়নাব বিনতু আবূ সালামাহ (রাঃ)-এ মা, মক্কা হতে মদীনাহ্ যাওয়ার সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট অসুস্থতার অভিযোগ করলেন যে, তিনি অসুস্থতাজনিত দুর্বলতার কারণে পায়ে হেঁটে তাওয়াফ করতে সক্ষম নন। তখন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে মানুষের পেছনে পেছনে তাওয়াফ করার আদেশ দেন, যেন তিনি পুরুষদের হতে আড়ালে থাকতে পারেন এবং তার বাহন তাওয়াফকারী মানুষদের কষ্ট না দেয়, তিনি তাকে তাদের কাতার হতে বিচ্ছিন্ন হতে নিষেধ করেন।
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৮৯-[২৯] ’আবিস ইবনু রবী’আহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ’উমার (রাঃ)-কে হাজারে আসওয়াদ চুমু দিতে দেখেছি এবং তাঁকে বলতে শুনেছি- আমি অবশ্যই জানি যে, তুমি একটি পাথর মাত্র, যা কারো উপকার বা ক্ষতি করতে পারো না। আমি যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তোমাকে চুমু দিতে না দেখতাম তবে আমি কক্ষনো তোমাকে চুমু দিতাম না। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
وَعَنْ عَابِسِ بْنِ رَبِيعَةَ قَالَ: رَأَيْت عمر يقبل الْحجر وَيَقُول: وَإِنِّي لَأَعْلَمُ أَنَّكَ حَجَرٌ مَا تَنْفَعُ وَلَا تَضُرُّ وَلَوْلَا أَنِّي رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يقبل مَا قبلتك
ব্যাখ্যা: এ হাদীসে ‘উমার (রাঃ)-এর উক্তি, ‘‘আমি অধিক জানি যে, তুমি একটি পাথর। উপকার করতে পারো না এবং ক্ষতিও করতে পারো না। যদি আমি না দেখতাম যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুম্বন করেছেন, তবে আমি তোমাকে চুম্বন করতাম না।’’ এর দ্বারা উদ্দেশ্য কি?
এ প্রসঙ্গে ইমাম ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ ‘উমার (রাঃ) এজন্য বলেছেন যে, যেন ইসলামে নবদিক্ষিত কিছু মুসলিমরা বিভ্রান্ত না হয় যারা পাথর পূজা, তার সম্মান করা, তার পরকালের আশা করা এবং তার সম্মানের ত্রুটির কারণে ক্ষতি হয়- এ আশঙ্কার সাথে সুপরিচিত। তিনি আশংকা করলেন যে, তাদের কেউ তাকে চুম্বন করতে দেখে ফিতনায় পড়বে। ফলে তিনি স্পষ্টভাবে বর্ণনা করলেন যে, এই পাথর কোন উপকার করতে পারে না এবং ক্ষতিও করতে পারে না। এটা কেবল বিধান পালন করে প্রতিদানের আশায় করা হয়।
এ হাদীসে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণ করার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে পাথর চুম্বন করার মাধ্যমে। যদি অনুসরণ করা উদ্দেশ্য না হত, তবে চুম্বন করতেন না।
সারকথা হচ্ছে, আমরা যা করব, বলব এবং বিশ্বাস করব তা হবে সহীহ সুন্নাহভিত্তিক। আর আমরা বিদ্‘আতী কাজ, ‘আক্বীদাহ্ ও ‘আমল নষ্ট হয়ে যায় এমন শৈথিল্য করা হতে সতর্ক থাকব।
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৯০-[৩০] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রুকনে ইয়ামানীর সাথে সত্তরজন মালাক (ফেরেশতা) নিয়োজিত রয়েছেন। যখন কোন ব্যক্তি বলে, হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের ক্ষমা ও কুশল প্রার্থনা করছি। হে রব! আমাদেরকে দুনিয়ায় কল্যাণ দান কর, আখিরাতেও কল্যাণ দান করো এবং জাহান্নামের ’আযাব হতে রক্ষা করো। তখন সেসব মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) বলে ওঠেন, ’আমীন’ (আল্লাহ কবূল কর)। (ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «وُكِّلَ بِهِ سَبْعُونَ مَلَكًا» يَعْنِي الرُّكْنَ الْيَمَانِيَ فَمَنْ قَالَ: اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ قَالُوا: آمين . رَوَاهُ ابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: উল্লেখিত হাদীসে রুকনে ইয়ামানীর ফাযীলাত বর্ণিত হয়েছে। যদি রুকনে ইয়ামানীর মর্যাদা এমন হয় তাহলে রুকনে আসওয়াদের মর্যাদা এর চেয়ে অধিক এবং উচ্চ। কিন্তু মর্যাদা এর জন্যই নির্দিষ্ট। আর হাজারে আসওয়াদের অনেক ফাযীলাত ও অন্যান্য পরিপূর্ণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
সুতরাং যে রুকনে ইয়ামানীতে পৌঁছে অতিক্রম করতে করতে উক্ত দু‘আ তথা
اللهم انى اسئلك.........وقنا عذاب النار
এ দু‘আটি পড়ে তার দু‘আ কবূলের জন্য মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) ‘আমীন’ বলেন।
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - মক্কায় প্রবেশ করা ও তাওয়াফ প্রসঙ্গে
২৫৯১-[৩১] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি বায়তুল্লাহ সাতবার তাওয়াফ করে এবং ’’সুবহা-নাল্ল-হি ওয়াল হামদুলিল্লা-হি ওয়ালা- ইলা-হা ইল্লাল্ল-হু ওয়াল্ল-হু আকবার, ওয়ালা- হাওলা ওয়ালা- ক্যুওয়াতা ইল্লা- বিল্লা-হ’’ (অর্থাৎ- আল্লাহ পবিত্র, সকল প্রশংসা আল্লাহরই, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃতপক্ষে কোন উপাস্য নেই, আল্লাহ মহান, আল্লাহ ছাড়া কারো উপায় বা শক্তি নেই।) দু’আটি পড়া ব্যতীত আর কোন কথা না বলে তার দশটি গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়, তার (’আমলনামায়) দশটি নেকী লিপিবদ্ধ করা হয় এবং তার দশটি মর্যাদাও বৃদ্ধি করা হয়। আর যে ব্যক্তি তাওয়াফ করা অবস্থায় কথাবার্তা বলবে সে আল্লাহ তা’আলার রহমতে তার পা দিয়ে ঢেউ উঠিয়েছে যেমন কোন ব্যক্তি নিজের পা দিয়ে পানিতে ঢেউ উঠিয়ে থাকে। (ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: مَنْ طَافَ بِالْبَيْتِ سَبْعًا وَلَا يَتَكَلَّمُ إِلَّا بِ: سُبْحَانَ اللَّهِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ مُحِيَتْ عَنْهُ عَشْرُ سَيِّئَاتٍ وَكُتِبَ لَهُ عَشْرُ حَسَنَاتٍ وَرُفِعَ لَهُ عَشْرُ دَرَجَاتٍ. وَمَنْ طَافَ فَتَكَلَّمَ وَهُوَ فِي تِلْكَ الْحَالِ خَاضَ فِي الرَّحْمَةِ بِرِجْلَيْهِ كَخَائِضِ الماءِ برجليه . رَوَاهُ ابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: যদি কেউ তাসবীহ, তাহলীল, তাহমীদ এবং তাকবীর বলা ব্যতীত মানুষের সাথে কথা বলে তবুও সে সাওয়াব ও শরীরের নিম্নাংশ নিবিষ্টকারী। কেননা সে অশোভনীয় কাজ করেছে। আর সে অনেক রহমাত পাবে না আল্লাহর যিকির না করার কারণে। আর যখন সে আল্লাহরই যিকির করে অন্য কারো সাথে কথা বলে না তখন সে রহমাতের সাগরে ডুবে যায় পা থেকে মাথা এবং নিচ থেকে উঁচু পর্যন্ত।
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - ‘আরাফায় অবস্থান প্রসঙ্গে
২৫৯২-[১] মুহাম্মাদ ইবনু আবূ বকর আস্ সাক্বাফী (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি একবার আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, তখন তারা উভয়ে মিনা হতে সকালে ’আরাফাতের দিকে যাচ্ছিলেন। আপনারা এ ’আরাফার দিনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কি করতেন? তখন তিনি বললেন, আমাদের মধ্যে যারা তালবিয়াহ্ পাঠ করার পাঠ করতো, এজন্যে তাদের তা হতে নিষেধ করা হতো না এবং যারা তাকবীর ধ্বনি দিতো এতেও নিষেধ করা হতো না। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْوُقُوْفِ بِعَرَفَةَ
عَن محمدِ بن أبي بكرٍ الثَقَفيُّ أَنَّهُ سَأَلَ أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ وَهُمَا غَادِيَانِ مِنْ مِنًى إِلَى عَرَفَةَ: كَيْفَ كُنْتُمْ تَصْنَعُونَ فِي هَذَا الْيَوْمِ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ فَقَالَ: كَانَ يُهِلُّ مِنَّا الْمُهِلُّ فَلَا يُنْكَرُ عَلَيْهِ وَيُكَبِّرُ الْمُكَبِّرُ مِنَّا فَلَا يُنكَرُ عَلَيْهِ
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসটিতে মীনা হতে ‘আরাফাহ্ গমনের পথে তালবিয়াহ্ ও তাকবীর পাঠ করা বৈধ হওয়ার দলীল। যদি কেউ ‘আরাফাহ্ গমনের পথে তালবিয়াহ্ অথবা তাকবীর পাঠ করে তবে তার বৈধতা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগেও সাহাবীগণ পাঠ করেছিলেন। তিনি অস্বীকৃতি জানাননি। তাঁর চুপ থাকা স্বীকৃতির পরিচায়ক। আর সাহাবীগণও পরস্পর পরস্পরকে এ ব্যাপারে দোষারোপ করেননি। ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেন, মীনা হতে ‘আরাফাহ্ গমনের পথে তালবিয়াহ্ এবং তাকবীর পাঠ করা মুস্তাহাব হওয়ার ব্যাপারে হাদীসটি দলীল।
ইমাম ত্বীবী (রহঃ) বলেন, অন্যান্য যিকিরের ন্যায় তাকবীর পড়ার অনুমতি রয়েছে। কিন্তু ‘আরাফার দিন তাকবীর পাঠ করা হাজীদের সুন্নাত নয়, বরং সুন্নাত হচ্ছে কুরবানীর দিন জামারাতুল ‘আক্বাবায় কঙ্কর নিক্ষেপ পর্যন্তও সময় তালবিয়াহ্ পাঠ করা।
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - ‘আরাফায় অবস্থান প্রসঙ্গে
২৫৯৩-[২] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি এ স্থানে কুরবানী করেছি, মিনা সম্পূর্ণটাই কুরবানীর স্থান। তাই তোমরা তোমাদের বাসায় কুরবানী কর। আমি এ স্থানে (’আরাফায়) অবস্থান করেছি, আর ’আরাফাহ্ সম্পূর্ণটাই অবস্থানের স্থান এবং আমি এ জায়গায় অবস্থান করেছি, আর মুযদালিফা সম্পূর্ণটাই অবস্থানের স্থান। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْوُقُوْفِ بِعَرَفَةَ
وَعَنْ جَابِرٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «نحرتُ هَهُنَا وَمِنًى كُلُّهَا مَنْحَرٌ فَانْحَرُوا فِي رِحَالِكُمْ. وَوَقَفْتُ هَهُنَا وعرفةُ كلُّها موقفٌ. ووقفتُ هَهُنَا وجَمْعٌ كلُّها موقفٌ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: হাদীসটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কুরবানী করার স্থানকে এবং ‘আরাফায় অবস্থান করার স্থানকে নির্দিষ্ট না করার দলীল। বরং মিনার সকল স্থানে কুরবানী করা বৈধ। কিন্তু উত্তম হলো রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেখানে কুরবানী করেছেন সেখানে কুরবানী করা ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ) বলেছেন। সারকথা হচ্ছে মিনার সকল স্থানে কুরবানী করা বৈধ। এজন্য রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা তোমাদের বাড়ীতে কুরবানী করো। আর তোমরা কুরবানী আমার কুরবানী করার স্থানে কুরবানী করা ধার্য করে নিয়ো না, বরং মিনায় অবস্থিত তোমাদের বাড়িগুলোতেও কুরবানী করতে পার। আর ‘উরানাহ্ নামক স্থান ব্যতীত ‘আরাফার সকল স্থানেই অবস্থান করার জায়গা। সকল ‘উলামা ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, ‘আরাফার যে কোন স্থানে অবস্থান করলে তা শুদ্ধ হবে। এর চারটি সীমারেখা আছে,
১. পূর্ব দিকের রাস্তার সীমানা।
২. পাহাড় সংলগ্ন সীমানা, যা তার পেছনে আছে।
৩. কাবার সামনের বাম পাশের দুই পাশ সংলগ্ন বাগানের সীমানা পর্যন্ত।
৪. ‘উরানাহ্ উপত্যকা।
‘উরানাহ্ উপত্যকা ও নামিরাহ্ ‘আরাফাহ্ ও হারামের অন্তর্ভুক্ত নয়।
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - ‘আরাফায় অবস্থান প্রসঙ্গে
২৫৯৪-[৩] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এমন কোন দিন নেই, যেদিন আল্লাহ তা’আলা তাঁর বান্দাদেরকে ’আরাফার দিনের চেয়ে জাহান্নাম থেকে বেশি মুক্তি দিয়ে থাকেন। তিনি সেদিন বান্দাদের খুব নিকটবর্তী হন, তাদেরকে নিয়ে মালায়িকার (ফেরেশতাগণের) কাছে গর্ববোধ করে বলেন, এরা কি চায়? (অর্থাৎ- যা চায় আমি তাদেরকে তাই দেবো)। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْوُقُوْفِ بِعَرَفَةَ
وَعَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: مَا مِنْ يَوْمٍ أَكْثَرَ مِنْ أَنْ يُعْتِقَ اللَّهُ فِيهِ عَبْدًا مِنَ النَّارِ مِنْ يَوْمِ عَرَفَةَ وَإِنَّهُ لَيَدْنُو ثُمَّ يُبَاهِي بِهِمُ الْمَلَائِكَةَ فَيَقُولُ: مَا أَرَادَ هَؤُلَاءِ . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: হাদীসটি ‘আরাফার দিন ফাযীলাতপূর্ণ হওয়ার ব্যাপারে দলীল। যদি কেউ বলেন, আমার স্ত্রী সর্বোত্তম দিনে ত্বলাক্ব। এ উত্তম দিনটির ব্যাপারে দু’টি মত রয়েছে।
১. জুমু‘আর দিন উদ্দেশ্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ হাদীসের কারণে,
خَيْرُ يَوْمٍ طَلَعَتْ فِيْهِ الشَّمْسُ يَوْمَ الْجُمُعَةِ.
অর্থাৎ- এক সপ্তাহের বা সাত দিনের মধ্যে উত্তম দিন হচ্ছে জুমু‘আর দিন। আর এভাবেই এ হাদীসের ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
২. ‘আরাফার দিন উদ্দেশ্য, সরাসরি হাদীসে বর্ণিত হওয়ার কারণে। ‘আরাফার দিন ফাযীলাতপূর্ণ হওয়ার হাদীসটি বাহ্যিকভাবে ইঙ্গিত বহন করে যে, সালফে সলিহীনদের মতানুসারে তিনি সুবহানাহূ তা‘আলা মাখলূকের সাথে কোন প্রকার তা’বীল, তাক্‘ঈফ ও তাসবীহ ব্যতীত ‘আরাফার দিন দুপুরের পরে বান্দাদের নিকটবর্তী হন। অতঃপর বান্দাকে নিয়ে মালায়িকাহ্’র সাথে ফখর করেন।
মুল্লা ‘আলী কারী বলেন, তারা কি চায়? যার কারণে তারা পরিবার ও দেশ ত্যাগ করেছে, মাল ব্যয় করেছে। মূলত তারা ক্ষমা, সন্তুষ্টি, নৈকট্য ও সাক্ষাৎ লাভ করতে চায়।
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ‘আরাফায় অবস্থান প্রসঙ্গে
২৫৯৫-[৪] ’আমর ইবনু ’আব্দুল্লাহ ইবনু সফ্ওয়ান (রহঃ) তাঁর এক মামা হতে বর্ণনা করেন, যাকে ইয়াযীদ ইবনু শায়বান বলা হতো। ইয়াযীদ (রাঃ) বলেন, আমরা ’আরাফাতে আমাদের (পূর্ব পুরুষদের) নির্দিষ্ট স্থানে ছিলাম। ’আমর বলেন, এ স্থানটি ছিল ইমামের (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর) স্থান হতে অনেক দূরে। ইয়াযীদ(রাঃ) বলেন, এমন সময় আমাদের কাছে ইবনু মিরবা’ আল আনসারী এসে বললেন, আমি তোমাদের কাছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ হতে প্রেরিত প্রতিনিধি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তোমাদেরকে তোমাদের অবস্থানেই (’ইবাদাতগাহেই) থাকার জন্য বলেছেন। কারণ তোমরা তোমাদের পিতা ইবরাহীমের সুন্নাতের উপরেই রয়েছ। (তিরমিযী, নাসায়ী ও ইবনু মাজাহ)[1]
عَنْ عَمْرِو بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ صَفْوَانَ عَنْ خَالٍ لَهُ يُقَالُ لَهُ يَزِيدُ بْنُ شَيْبَانَ قَالَ: كُنَّا فِي مَوْقِفٍ لَنَا بِعَرَفَةَ يُبَاعِدُهُ عَمْرٌو مِنْ مَوْقِفِ الْإِمَامِ جِدًّا فَأَتَانَا ابْنُ مِرْبَعٍ الْأَنْصَارِيُّ فَقَالَ: إِنِّي رَسُولُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَيْكُمْ يَقُولُ لَكُمْ: «قِفُوا عَلَى مَشَاعِرِكُمْ فَإِنَّكُمْ عَلَى إِرْثِ من إِرْثِ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ
ব্যাখ্যা: ইয়াযীদ বলেন, জাহিলিয়্যাতের যুগে আমরা আমাদের বাপ-দাদা ও পূর্ববর্তীদের প্রথানুসারে ইমামের অবস্থান করার স্থান হতে অনেক দূরে থাকতাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দূতের মাধ্যমে তাদেরকে তাদের মাশ্‘আর তথা কুরবানী করার স্থানে অবস্থান করতে বললেন। কেননা তাদের অবস্থান ছিল ইব্রাহীম (আঃ)-এর অবস্থান করার জায়গায়। তারা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাত অনুযায়ী অবস্থান করেছিলেন। তারা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে দূরে অবস্থান করাকে হজ্জের ত্রুটি মনে করতেন অথবা তারা ধারণা করতেন যে, তারা যেখানে অবস্থান করে সেটি অবস্থানের স্থান নয়। তাদের অন্তরের প্রশান্তির জন্য রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দূত পাঠিয়ে সেখানেই অবস্থান করতে বলেন।
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ‘আরাফায় অবস্থান প্রসঙ্গে
২৫৯৬-[৫] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ’আরাফার সম্পূর্ণ স্থানই অবস্থানস্থল এবং মিনার সম্পূর্ণ স্থানই কুরবানীর স্থান, মুযদালিফার সম্পূর্ণটাই অবস্থানস্থল এবং মক্কার সকল পথই রাস্তা ও কুরবানীর স্থান। (আবূ দাঊদ ও দারিমী)[1]
وَعَنْ جَابِرٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «كُلُّ عَرَفَةَ مَوْقِفٌ وَكُلُّ مِنًى مَنْحَرٌ وَكُلُّ الْمُزْدَلِفَةِ مَوْقِفٌ وَكُلُّ فِجَاجِ مَكَّةَ طَرِيقٌ وَمَنْحَرٌ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالدَّارِمِيُّ
ব্যাখ্যা: বর্ণিত হাদীসটিতে হজ্জের কয়েকটি কার্যাবলীতে বিশেষ প্রশস্ততা প্রদান করা হয়েছে তা হচ্ছে, বাত্বনি ‘উরানাহ্ ব্যতীত ‘আরাফার সকল স্থানই হজ্জের জন্য অবস্থানের স্থান। মিনার সকল স্থানই কুরবানী করার এবং হজ্জের জন্তু যবেহের স্থান। মিনা ও ‘আরাফার মতো মুযদালিফার সকল স্থানই অবস্থানের স্থান। কিন্তু বাত্বনি মুহাসসার ব্যতীত। আর মক্কায় সকল রাস্তা দিয়ে প্রবেশ করা জায়িয আছে, যদিও সানিয়্যাহ্ দিয়ে প্রবেশ করা উত্তম। যেখান দিয়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রবেশ করেছিলেন। অনুরূপ মক্কার সকল স্থানে কুরবানী করা বৈধ। কেননা তা হারাম সীমানার অন্তর্ভুক্ত। মূলত এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রশস্ততা দান ও সংকীর্ণতা দূর করা। এভাবেই ইমাম ত্বীবী (রহঃ) উল্লেখ করেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ‘আরাফায় অবস্থান প্রসঙ্গে
২৫৯৭-[৬] খালিদ ইবনু হাওযাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে উটের উপর চড়ে ’আরাফার দিনে দু’ পাদানীতে পা রেখে সওয়ার অবস্থায় ভাষণ দিতে দেখেছি। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن خالدِ بنَ هَوْذَةَ قَالَ: رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَخْطُبُ النَّاسَ يَوْمَ عَرَفَةَ عَلَى بَعِيرٍ قَائِمًا فِي الركابين. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: আবূ ‘আমর ইবনু ‘আলী হতে আল আসমা‘ঈ বর্ণনা করেন ‘আদা তার ভাই হারমালাহ্ ও তাদের দু’জনের পিতা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তারা দু’জন তাদের সম্প্রদায়ের নেতা ছিলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুযা‘আহ্-এর নিকট দু’জনের ইসলাম গ্রহণের সুসংবাদ পাঠালেন। ‘আরাফার দিন দ্বিপ্রহরের পরে উটে চড়ে থেকে তাদের হজ্জের কার্যাবলী শিক্ষা দিতেন।
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ‘আরাফায় অবস্থান প্রসঙ্গে
২৫৯৮-[৭] ’আমর ইবনু শু’আয়ব তাঁর পিতা শু’আয়ব হতে, তিনি তাঁর দাদা [’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ)] হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সকল দু’আর শ্রেষ্ঠ দু’আ হলো ’আরাফার দিনের দু’আ আর শ্রেষ্ঠ কালিমাহ্ (যিকির) যা আমি পাঠ করেছি ও আমার পূর্ববর্তী নবীগণ পাঠ করেছেন তা হলো, ’’লা- ইলা-হা ইল্লাল্ল-হু ওয়াহদাহূ লা- শারীকা লাহূ লাহুল মুলকু, ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুওয়া ’আলা- কুল্লি শাইয়িন ক্বদীর’’ (অর্থাৎ- আল্লাহ ছাড়া কোন মা’বূদ নেই। তিনি অদ্বিতীয়, তাঁর কোন শারীক নেই। তাঁরই রাজত্ব। তার জন্যই সকল প্রশংসা। তিনি সকল শক্তির আঁধার।)। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: خَيْرُ الدُّعَاءِ دُعَاءُ يَوْمِ عَرَفَةَ وَخَيْرُ مَا قُلْتُ أَنَا وَالنَّبِيُّونَ مِنْ قَبْلِي: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْء قدير . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: ‘আরাফার দিনের দু‘আ সর্বোত্তম দু‘আ বলতে, অধিক সাওয়াব পাওয়ার এবং অধিক দু‘আ গ্রহণ হওয়ার কথা বুঝানো হয়েছে এবং অন্যান্য দিনের চেয়ে ‘আরাফার দিনের মর্যাদা প্রমাণিত হয় বর্ণিত হাদীস দ্বারা। এ দিনে উত্তম দু‘আ হচ্ছে, হাদীসে বর্ণিত দু‘আটি। এরপর তিনি اَللّٰهُمَّ اجَّعَلْ فِىْ قَلْبِىْ نُوْرًا এ দু‘আটি পড়তেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা ‘‘আর সর্বোত্তম দু‘আ হচ্ছে, যা আমি বলি’’ এর ব্যাখ্যায় শায়খ দেহলবী (রহঃ) বলেন, অর্থাৎ- আমি দু‘আ করতাম, দু‘আটি হচ্ছে, لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ পূর্ণাঙ্গ দু‘আটি। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর পূর্ববর্তী নাবীগণও ‘আরাফার দিন সন্ধ্যায় এ দু‘আটি পড়তেন।
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ‘আরাফায় অবস্থান প্রসঙ্গে
২৫৯৯-[৮] ইমাম মালিক এ হাদীসটি তলহা ইবনু ’উবায়দুল্লাহ (রাঃ) হতে ’’লা- শারীকা লাহূ’’ বাক্য পর্যন্ত বর্ণনা করেছেন।)[1]
وروى مالكٌ عَنْ طَلْحَةَ بْنِ عُبَيْدِ اللَّهِ إِلَى قَوْلِهِ: «لَا شريك لَهُ»
ব্যাখ্যা: এ হাদীসে পূর্বের হাদীসে বর্ণিত দু‘আ সম্পর্কে বলা হয়েছে। পূর্বের হাদীসে বর্ণিত দু‘আ- لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ وَحْدَهٗ لَا شَرِيْكَ لَهٗ، لَهُ المُلْكُ، وَلَهُ الحَمْدُ، وَهُوَ عَلٰى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ এর পরিবর্তে لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ وَحْدَه لَا شَرِيْكَ لَهُ পর্যন্ত হবে বলে এ হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে। এর সমর্থনে ইমাম বাইহাক্বী ও তার কিতাবে হাদীস সংকলন করেছেন। কিন্তু ইমাম ‘আবদুল বার (রহঃ) বলেনঃ এ হাদীসের ব্যাপারে সকলে একমত যে, এটা মুরসাল হাদীস।
ইমাম বুখারী (রহঃ) এটাকে মুনকার হাদীস বলেছেন। সুতরাং এ কথা বলা যায় যে, ‘আরাফার দিনের দু‘আটি হবে- لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ وَحْدَهٗ لَا شَرِيْكَ لَهٗ، لَهُ المُلْكُ، وَلَهُ الحَمْدُ، وَهُوَ عَلٰى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ আর এটাই শুদ্ধ।
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ‘আরাফায় অবস্থান প্রসঙ্গে
২৬০০-[৯] তলহা ইবনু উবায়দুল্লাহ ইবনু কারীয (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শয়তানকে ’আরাফার দিন ব্যতীত অন্য কোন দিন এত অপমানিত, এত লাঞ্ছিত, এত বেশি ঘৃণিত ও এত বেশী রাগান্বিত হতে দেখা যায় না। কেননা শয়তান এদিন দেখতে থাকে বান্দাদের প্রতি আল্লাহর রহমত নাযিল হচ্ছে, তাদের বড় বড় গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হচ্ছে। তবে এটা বদরের দিন দেখে গিয়েছিল। কেউ জিজ্ঞেস করলো, বদরের দিন কি দেখা গিয়েছিল (হে আল্লাহ রসূল!)। উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, সেদিন সে নিশ্চিতভাবে শয়তান দেখেছিল, জিবরীল (আঃ) মালায়িকাকে (ফেরেশতাগণকে) কাতারবন্দী করতে দেখেছিল। (মালিক মুরসাল হিসেবে; ইমাম বাগাবী শারহুস্ সুন্নাহয় তবে শব্দবিন্যাস মাসাবীহ-এর)[1]
لإرساله وَعَنْ طَلْحَةَ بْنِ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ كَرِيزٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَا رُئِيَ الشَّيْطَانُ يَوْمًا هُوَ فِيهِ أَصْغَرُ وَلَا أَدْحَرُ وَلَا أَحْقَرُ وَلَا أَغْيَظُ مِنْهُ فِي يَوْمِ عَرَفَةَ وَمَا ذَاكَ إِلَّا لِمَا يَرَى مِنْ تَنَزُّلِ الرَّحْمَةِ وَتَجَاوُزِ اللَّهِ عَنِ الذُّنُوبِ الْعِظَامِ إِلَّا مَا رُئِيَ يَوْمَ بَدْرٍ» . فَقِيلَ: مَا رُئِيَ يَوْمَ بَدْرٍ؟ قَالَ: «فَإِنَّهُ قَدْ رَأَى جِبْرِيلَ يَزَعُ الْمَلَائِكَةَ» . رَوَاهُ مَالِكٌ مُرْسَلًا وَفِي شَرْحِ السُّنَّةِ بِلَفْظِ الْمَصَابِيحِ
ব্যাখ্যা: বর্ণিত হাদীসটিতে ‘আরাফার দিনে শয়তানের তুচ্ছ, অপমানিত এবং খারাপ অবস্থানের অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। শয়তান ‘আরাফার সারাদিন সেখান হতে দূরে থাকে। তার (শয়তানের) অপমানিত, লাঞ্চিত এবং খারাপ অবস্থায় থাকার ও ‘আরাফার ময়দান হতে দূরে থাকার অন্যতম কারণ হচ্ছে, সে আল্লাহ তা‘আলা ‘আরাফায় অবস্থানকারী বান্দাদের কাবীরাহ্ গুনাহগুলো ক্ষমা করেন। আর রহমাতে মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) ‘আরাফায় অবস্থানকারীদের নিকট অবতরণ করেন। তার আরেকটি কারণ হতে পারে যে, সে (শয়তান) মালায়িকাহ্-কে হাজীদের দু‘আর জন্য ডানা বিছাতে দেখেছে। আর এটাও সম্ভাবনা থাকতে পারে যে, সে অর্থাৎ- শয়তান মালায়িকাহ্-কে বলতে শুনেছে যে, তাদের (হাজী তথা ‘আরাফায় অবস্থানকারীদেরকে) আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। আর আল্লাহ শয়তানের এমন অনুভূতি শক্তি সৃষ্টি করেছেন, যার কারণে সে মালায়িকাহ্-কে আনিত খবরের সংবাদ শুনেছে যে, আল্লাহ ‘আরাফায় অবস্থানকারীদের কাবীরাসহ সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন।
অনুরূপ খারাপ অবস্থায় শয়তান ছিল দ্বিতীয় হিজরীতে অনুষ্ঠিত বদর যুদ্ধে। যখন শয়তান দেখেছিল মালায়িকাহ্ মুজাহিদদের যুদ্ধের জন্য সাজিয়ে দিচ্ছিলেন এবং তাদেরকে কাতার হতে বের হতে নিষেধ করেছিলেন। আর হাদীসটিতে হজ্জের ফাযীলাত, ‘আরাফায় উপস্থিত বাদরের দিনের এবং পাপীদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ করার ফাযীলাত বর্ণিত হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ‘আরাফায় অবস্থান প্রসঙ্গে
২৬০১-[১০] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ’আরাফার দিন আল্লাহ তা’আলা দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং হাজীদের ব্যাপারে মালায়িকাহ্’র (ফেরেশতাদের) সম্মুখে গর্ববোধ করেন এবং বলেন, তোমরা আমার বান্দাদের দিকে তাকাও, তারা আমার কাছে আসছে এলোমেলো চুলে, ধূলাবালি গায়ে, আহাজারী করতে করতে দূর-দূরান্ত হতে উপস্থিত হয়েছে। আমি তোমাদের সাক্ষী করে বলছি, আমি তাদেরকে মাফ করে দিলাম। তখন মালায়িকাহ্ বলেন, হে রব! অমুক বান্দাকে তো বড় গুনাহগার বলে অভিহিত করা হয় এবং অমুক পুরুষ ও নারীকেও। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, আল্লাহ তখন বলেন, আমি তাদেরকেও ক্ষমা করে দিলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ’আরাফার দিনের চেয়ে এত বেশি জাহান্নাম হতে মুক্তি দেবার মতো আর কোন দিন নেই। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
وَعَنْ جَابِرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِذَا كَانَ يَوْمُ عَرَفَةَ إِنَّ اللَّهَ يَنْزِلُ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا فَيُبَاهِي بِهِمُ الْمَلَائِكَةَ فَيَقُولُ: انْظُرُوا إِلَى عِبَادِي أَتَوْنِي شُعْثًا غُبْرًا ضَاجِّينَ مِنْ كُلِّ فَجٍّ عَمِيقٍ أُشْهِدُكُمْ أَنِّي قَدْ غَفَرْتُ لَهُمْ فَيَقُولُ الْمَلَائِكَةُ: يَا رَبِّ فُلَانٌ كَانَ يُرَهَّقُ وَفُلَانٌ وَفُلَانَةُ قَالَ: يَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ: قَدْ غَفَرْتُ لَهُمْ . قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «فَمَا مِنْ يَوْمٍ أَكْثَرَ عَتِيقًا مِنَ النَّارِ مِنْ يَوْمِ عَرَفَةَ» . رَوَاهُ فِي شرح السّنة
ব্যাখ্যা: আল্লাহ তা‘আলা ‘আরাফার দিন, দুনিয়ার আসমানে নেমে এসে ‘আরাফায় অবস্থানকারী বান্দাদের নিয়ে দুনিয়ার মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) অথবা নিকটবর্তী মালাক (ফেরেশতা) অথবা সকল মালায়িকাহ্’র সাথে ফখর করেন। অতঃপর আল্লাহ বলেন, মালায়িকাহ্’র তোমরা লক্ষ্য করো, তারা বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল ও দেশ হতে এসেছে এবং উচ্চস্বরে তালবিয়াহ্ পাঠ করছে। তোমরা সাক্ষ্য থাক! আমি তাদের সকলকে ক্ষমা করে দিলাম। তখন মালায়িকাহ্ আশ্চর্যান্বিত হয়ে বলেন, তাদের মধ্যে তো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী এবং নাফরমানী ও ফাসিক্বী নারী-পুরুষ আছে। আল্লাহ বলেন, তবুও আমি ক্ষমা করে দিলাম। কেননা হজ্জ/হজ তার পূর্ববর্তী পাপসমূহকে বিনষ্ট করে দেয়। আর সেদিন আল্লাহ অনেক সংখ্যক লোককে জাহান্নাম হতে মুক্তি দিবেন।
পরিচ্ছেদঃ ৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ‘আরাফায় অবস্থান প্রসঙ্গে
২৬০২-[১১] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কুরায়শ গোত্র ও তাদের অনুসারীরা (’আরাফার দিন) মুযদালিফায় অবস্থান করতো এবং নিজেদেরকে তারা বাহাদুর ও অভিজাত বলে অভিহিত করতো। আর সমস্ত ’আরব গোত্র ’আরাফার ময়দানে অবস্থান গ্রহণ করতো। অতঃপর ইসলাম আসার পর আল্লাহ তা’আলা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আদেশ করলেন, ’আরাফার ময়দানে গিয়ে সাধারণ মানুষদের সাথে অবস্থান নিতে, তারপর সেখান থেকে ফিরে আসতে। আল্লাহ তা’আলা কুরআনে এ ব্যাপারটিকে এভাবেই বলেছেন, ’’সুম্মা আফীযূ মিন হায়সু আফা-যান্না-সু’’ (অর্থাৎ- অতঃপর তোমরা ফিরে আসো, যেখান থেকে সাধারণ মানুষ ফিরে আসে।’’)। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
عَن عَائِشَة قَالَتْ: كَانَ قُرَيْشٌ وَمَنْ دَانَ دِينَهَا يَقِفُونَ بالمزْدَلفَةِ وَكَانُوا يُسمَّوْنَ الحُمْسَ فكانَ سَائِرَ الْعَرَبِ يَقِفُونَ بِعَرَفَةَ فَلَمَّا جَاءَ الْإِسْلَامُ أَمَرَ اللَّهُ تَعَالَى نَبِيَّهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَأْتِيَ عَرَفَاتٍ فَيَقِفُ بِهَا ثُمَّ يَفِيضُ مِنْهَا فَذَلِكَ قَوْلُهُ عَزَّ وَجَلَّ: (ثُمَّ أفِيضُوا من حَيْثُ أَفَاضَ النَّاس)
ব্যাখ্যা: এ হাদীসে হজ্জের কার্যাবলী সম্পাদনের নিয়ম-কানুন শিক্ষা দেয়া হয়েছে। জাহেলী যুগে কুরায়শগণ মুযদালিফা থেকে সরাসরি তাওয়াফে চলে আসত। বাকী সব ‘আরবগণ ‘আরাফার ময়দানে অবস্থান করত। অতঃপর ইসলাম যখন আসলো তখন আল্লাহ তা‘আলা এ নির্দেশ দিলেন যে, সকলকে ‘আরাফায় অবস্থান করতে হবে। আর এ অবস্থান হজ্জের অন্যতম ফরয কাজ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন- ‘‘তোমরা সেখান থেকে তাওয়াফের জন্য ফিরে আসো যেখান থেকে লোকেরা আসে’’- (সূরা আল বাক্বারাহ্ ২ : ১৯৯)। এ আয়াতে যে স্থানের কথা বলা হয়েছে তা হলো ‘আরাফার ময়দান।
ইমাম আত্ তিরমিযী (রহঃ) বলেনঃ মক্কাহ্বাসী হজ্জের সময় হারাম এলাকা থেকে বের হত না, আর ‘আরাফাহ্ হারামের বাহিরে। তারা মুযদালিফায় অবস্থান করত, আর বলত যে, আমরা আল্লাহর ঘরের অধিবাসী। মক্কাহবাসীদের ‘আরাফায় অবস্থান না করার কারণে আল্লাহ নির্দেশ দিলেন যে, সকলকে ‘আরাফায় অবস্থান করতে হবে।
ইমাম সিন্দী বলেনঃ এ হাদীস দ্বারা ‘আরাফার ময়দানে অবস্থান করাকে আবশ্যক করে দিয়েছে।
হাফিয ‘ইরাকী বলেনঃ এ হাদীসে বর্ণিত আয়াতে যে স্থানের কথা বলা হয়েছে তা হলো- ‘আরাফার মাঠ। অর্থাৎ- যেখানে সকল হজ্জ/হজকারীকে অবস্থান করতে হবে।
পরিচ্ছেদঃ ৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ‘আরাফায় অবস্থান প্রসঙ্গে
২৬০৩-[১২] ’আব্বাস ইবনু মিরদাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’আরাফার দিন বিকালে নিজের উম্মাতের (হাজীদের) জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইলেন। উত্তর দেয়া হলো, অত্যাচারী ছাড়া সকলকে ক্ষমা করে দিলাম। কেননা আমি মাযলূমের পক্ষ হয়ে যালিমকে পাকড়াও করে হাক্ব আদায় করব। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, হে আমার রব! আপনি ইচ্ছা করলে মাযলূমকে জান্নাত দিতে পারেন এবং যালিমকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। কিন্তু সেদিন বিকালে তাঁর দু’আ কবূল হলো না। বর্ণনাকারী বলেন, তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন মুযদালিফায় ভোরে উঠলেন, তখন আবার সেই দু’আ করলেন। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যা চেয়েছিলেন তা তাঁকে দেয়া হলো। রাবী ’আব্বাস বলেন, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে ফেললেন অথবা তিনি বলেছেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মুচকী হাসলেন। এ সময় আবূ বকর ও ’উমার (রাঃ) বললেন, আমাদের পিতা-মাতা আপনার প্রতি কুরবান হোক! এটা তো এমন একটা সময় যে, আপনি কোন সময়ই হাসতেন না। কিসে আপনাকে হাসালো? আল্লাহ তা’আলা আপনাকে আরও হাসিখুশি রাখুন। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আল্লাহর শত্রু ইবলীস যখন জানতে পারলো যে, আল্লাহ আমার দু’আ কবূল করেছেন এবং উম্মাত (হাজীদেরকে) ক্ষমা করে দিয়েছেন তখন সে মাটি উঠিয়ে নিজের মাথায় ছিটাতে লাগলো আর বলতে লাগলো, হায় আমার কপাল! হায় আমার দুর্ভাগ্য! ইবলীসের এ অস্থিরতা দেখেই আমায় হাসি এসেছে। [ইবনু মাজাহ; বায়হাক্বী (রহঃ) তাঁর ’’কিতাবুল বা’সি ওয়ান্ নুশূর’’-এ অনুরূপ বর্ণনা করেছেন][1]
وَعَن عبَّاسِ بنِ مِرْداسٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دَعَا لِأُمَّتِهِ عَشِيَّةَ عَرَفَةَ بِالْمَغْفِرَةِ فَأُجِيبَ: «إِنِّي قَدْ غَفَرْتُ لَهُمْ مَا خَلَا الْمَظَالِمَ فَإِنِّي آخُذُ لِلْمَظْلُومِ مِنْهُ» . قَالَ: «أَيْ رَبِّ إِنْ شِئْتَ أَعْطَيْتَ الْمَظْلُومَ مِنَ الْجَنَّةِ وَغَفَرْتَ لِلظَّالِمِ» فَلَمْ يُجَبْ عَشِيَّتَهُ فَلَمَّا أَصْبَحَ بِالْمُزْدَلِفَةِ أَعَادَ الدُّعَاءَ فَأُجِيبَ إِلَى مَا سَأَلَ. قَالَ: فَضَحِكَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَوِ قَالَ تبسَّمَ فَقَالَ لَهُ أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ: بِأَبِي أَنْتَ وَأُمِّي إِنَّ هَذِهِ لَسَاعَةٌ مَا كُنْتَ تَضْحَكُ فِيهَا فَمَا الَّذِي أَضْحَكَكَ أَضْحَكَ اللَّهُ سِنَّكَ؟ قَالَ: «إِنَّ عَدُوَّ اللَّهِ إِبْلِيسَ لَمَّا عَلِمَ أَنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ قَدِ اسْتَجَابَ دُعَائِي وَغَفَرَ لأمَّتي أخذَ الترابَ فَجعل يحشوه عَلَى رَأْسِهِ وَيَدْعُو بِالْوَيْلِ وَالثُّبُورِ فَأَضْحَكَنِي مَا رَأَيْتُ مِنْ جَزَعِهِ» . رَوَاهُ ابْنُ مَاجَهْ وَرَوَى البيهقيُّ فِي كتاب الْبَعْث والنشور نحوَه
ব্যাখ্যা: এ হাদীসে বিভিন্ন বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। হাদীসের প্রারম্ভে দেখা যাচ্ছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় উম্মাতের জন্য হজ্জের সময় আল্লাহর কাছে দু‘আ করেছেন যাতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর উম্মাতকে মাফ করে দেয়। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু‘আর ব্যাখ্যায় মুল্লা ‘আলী কারী (রহঃ) বলেন, বাহ্যিকভাবে বুঝা যায় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জন্য করেছেন যারা তাঁর সাথে হজ্জ/হজ করেছিলেন।
‘আল্লামা সিনদী (রহঃ) বলেনঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল উম্মাতের জন্য দু‘আ করেছিলেন যারা তখন তার সাথে হজ্জ/হজ করেছিলেন এবং যারা ক্বিয়ামাত পর্যন্ত হজ্জ/হজ করবেন সকলের জন্য রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু‘আ করেছেন। অথবা তিনি সকল উম্মাতের জন্য দু‘আ করেছেন চাই সে হজ্জ করুক বা না করুক।
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - ‘আরাফাহ্ ও মুযদালিফা হতে ফিরে আসা
২৬০৪-[১] হিশাম ইবনু ’উরওয়াহ্ তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, একবার উসামাহ্ ইবনু যায়দকে জিজ্ঞেস করা হলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজে ’আরাফার ময়দান হতে ফিরে আসার সময় কিভাবে চলেছিলেন? জবাবে তিনি (’উরওয়াহ্) বললেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) স্বাভাবিক গতিতে চলতেন এবং যখনই খোলা পথ পেতেন দ্রুতবেগে চলতেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابٌ الدَّفْعُ مِنْ عَرَفَةَ وَالْمُزْدَلِفَةِ
عَنْ هِشَامِ بْنِ عُرْوَةَ عَنْ أَبِيهِ قَالَ: سُئِلَ أُسَامَةُ بْنُ زَيْدٍ: كَيْفَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَسِيرُ فِي حَجَّةِ الْوَدَاعِ حِينَ دَفَعَ؟ قَالَ: كَانَ يَسِيرُ الْعُنُق فَإِذا وجد فجوة نَص
ব্যাখ্যা: এ হাদীসে বিশেষভাবে উসামাহ্ বিন যায়দকে জিজ্ঞেস করার কারণ হচ্ছে তিনি ছিলেন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ‘আরাফাহ্ হতে মুযদালিফা গমন পথের সহগামী। আর তিনি ‘‘গ্রীবা নাড়িয়ে চলতেন’’ বলতে বুঝানো হয়েছে, দ্রুতও না এবং ধীরেও না; বরং এর মাঝামাঝি চলতেন। মানুষের কোমলতা তথা কষ্ট না দেয়ার জন্য তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এরূপ হাঁটতেন। অতঃপর যখন কোন ভীড় থাকত না তখন দ্রুত চলতেন। সালাফগণ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পূর্ণ অনুসরণ করার জন্য তাঁর চলা ও অবস্থান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন।
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - ‘আরাফাহ্ ও মুযদালিফা হতে ফিরে আসা
২৬০৫-[২] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি একবার ’আরাফার দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ’আরাফার ময়দান হতে ফিরে এসেছেন। এমন সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পেছন হতে জোরে জোরে উট তাড়ানোর হাঁক ও উটকে পিটানোর শব্দ শুনতে পেলেন। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজের হাতের চাবুক দিয়ে পেছনে তাদের দিকে ইশারা করে বললেন, হে লোকেরা! তোমরা প্রশান্তির সাথে ধীরে সুস্থে চলো, কারণ উট হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়াই শুধু নেক কাজ নয়। (বুখারী)[1]
بَابٌ الدَّفْعُ مِنْ عَرَفَةَ وَالْمُزْدَلِفَةِ
وَعَن ابنِ عبَّاسٍ أَنَّهُ دَفَعَ مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ عَرَفَةَ فَسَمِعَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَرَاءَهُ زَجْرًا شَدِيدًا وَضَرْبًا لِلْإِبِلِ فَأَشَارَ بِسَوْطِهِ إِلَيْهِمْ وَقَالَ: «يَا أَيُّهَا النَّاسُ عَلَيْكُمْ بِالسَّكِينَةِ فَإِنَّ الْبِرَّ لَيْسَ بِالْإِيضَاعِ» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: এ হাদীসে (زَجْرًا) (ধমক দেয়া) বলতে উদ্দেশ্য উটকে দ্রুত চলার উৎসাহের জন্য চিৎকার করা। আর (عَلَيْكُمْ بِالسَّكِيْنَةِ) অর্থাৎ- ‘তোমরা ধীরে চলো’ বলতে উদ্দেশ্য কোমল আচরণ এবং ভীড় না করা। ‘‘দ্রুত চলার মধ্যে কোন কল্যাণ নেই’’ বলার উদ্দেশ্য মানুষ যখন রাস্তায় দীর্ঘক্ষণ থাকবে এবং দ্রুত চলায় তাদের কষ্ট হবে, তখন এই দ্রুত চলায় কোন কল্যাণ নেই। এ অবস্থায় আসতে চলা উত্তম। পূর্বের হাদীসে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দ্রুত চলা প্রমাণিত আছে, অথচ তিনি এ হাদীসে আসতে চলতে বলছেন, উভয় হাদীসের মধ্যে বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয়। এর সমাধান হচ্ছে ভীড়ের সময় আস্তে চলা এবং ফাঁকা পাওয়া অবস্থায় দ্রুত চলা।
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - ‘আরাফাহ্ ও মুযদালিফা হতে ফিরে আসা
২৬০৬-[৩] উক্ত রাবী [ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)] হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, উসামাহ্ ইবনু যায়দ (রাঃ) ’আরাফার ময়দান হতে মুযদালিফা পর্যন্ত ফিরে আসার সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পেছনে বসেছিলেন। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মুযদালিফা হতে মিনায় আসা পর্যন্ত (আমার বড় ভাই) ফযল ইবনু ’আব্বাসকেও তাঁর পেছনে বসিয়েছিলেন। তাঁরা উভয়ে বলেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামারাতুল ’আক্বাবায় কংকর মারা পর্যন্ত তালবিয়াহ্ পাঠ করেছিলেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابٌ الدَّفْعُ مِنْ عَرَفَةَ وَالْمُزْدَلِفَةِ
وَعَنْهُ أَنَّ أُسَامَةَ بْنَ زِيدٍ كَانَ رِدْفَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ عَرَفَةَ إِلَى الْمُزْدَلِفَةِ ثُمَّ أَرْدَفَ الْفَضْلَ مِنَ الْمُزْدَلِفَةِ إِلَى مِنًى فَكِلَاهُمَا قَالَ: لَمْ يَزَلِ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُلَبِّي حَتَّى رَمَى جَمْرَة الْعقبَة
ব্যাখ্যা: এ হাদীসে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তালবিয়াহ্ পাঠ কখন শেষ হয়েছে, এ নিয়ে অনেক মতভেদ রয়েছেঃ
১. রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামারাতুল ‘আক্বাবায় পাথর নিক্ষেপ করা পর্যন্ত তালবিয়াহ্ পাঠ করেছেন। এখানে কেউ কেউ উদ্দেশ্য নিয়েছেন প্রথম পাথর নিক্ষেপ করার পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তালবিয়াহ্ পাঠ শেষ করেছেন। এর সমর্থনে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, যা বায়হাক্বী বর্ণনা করেছেন, (لَمْ يَزَلَ حَتّٰى رَمٰى جَمْرَةَ الْعَقَبَةَ بِأَوْلِ حُطَاةٍ)
অর্থাৎ- তিনি জামারাতুল ‘আক্বাবায় প্রথম পাথর নিক্ষেপ করা পর্যন্ত তালবিয়াহ্ পাঠ করতেন।
২. আর কেউ কেউ উদ্দেশ্য নিয়েছেন শেষ পাথর নিক্ষেপ করার পর পর্যন্ত (অর্থাৎ- জামারাতুল ‘আক্বাবায়) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তালবিয়াহ্ পাঠ করা শেষ করেছেন। এর সমর্থনে ইবনু খুযায়মার রিওয়ায়াতে বর্ণিত আছে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জামারাতুল ‘আক্বাবায় পাথর নিক্ষেপ করা পর্যন্ত তালবিয়াহ্ পাঠ করতেন এবং প্রত্যেক পাথর নিক্ষেপের সাথে তাকবীর পাঠ করতেন। অতঃপর শেষ পাথর নিক্ষেপের সাথে তালবিয়াহ্ পাঠ করা শেষ করতেন। দ্বিতীয় মতটিকে হাফিয ইবনু হাজার (রহঃ) ইবনু ‘আবদুল বার, ইমাম নাবাবী, ইমাম ‘আয়নী ও ইমাম আহমাদ (রহঃ) প্রাধান্য দিয়েছেন।
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - ‘আরাফাহ্ ও মুযদালিফা হতে ফিরে আসা
২৬০৭-[৪] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাগরিব ও ’ইশার সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) মুযদালিফায় একত্রে আদায় করেছেন। প্রত্যেক সালাতের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ইক্বামাত(ইকামত/একামত) দিয়েছেন এবং এ দুই সালাতের মাঝে কোন নফল সালাত আদায় করেননি এবং পরেও আদায় করাননি। (বুখারী)[1]
بَابٌ الدَّفْعُ مِنْ عَرَفَةَ وَالْمُزْدَلِفَةِ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: جَمَعَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَغْرِبَ وَالْعِشَاءَ بِجَمْعٍ كُلَّ وَاحِدَةٍ مِنْهُمَا بِإِقَامَةٍ وَلَمْ يُسَبِّحْ بَيْنَهُمَا وَلَا عَلَى إِثْرِ كُلِّ وَاحِدَةٍ مِنْهُمَا. رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ
ব্যাখ্যা: হাদীসে বলা হচ্ছে যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাগরিব ও ‘ইশার সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) এক সাথে আদায় করেছেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোথায় মাগরিব ও ‘ইশার সালাত আদায় করেছেন? এ প্রশ্নের উত্তরে এক বাক্যে বলা যায় যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফায় ‘ইশার ওয়াক্তে মাগরিব ও ‘ইশার সালাত আদায় করেছেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলাদা আলাদা ইক্বামাতে এ সালাত আদায় করেছেন। আর এ দু’ সালাতের মাঝে কোন তাসবীহ পাঠ করেননি। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্থান পরিবর্তন না করে একই স্থানে বসে এ দু’ সালাত আদায় করেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - ‘আরাফাহ্ ও মুযদালিফা হতে ফিরে আসা
২৬০৮-[৫] ’আব্দুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কক্ষনো মুযদালিফায় মাগরিব ও ’ইশার সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) একত্রে আদায় করা ছাড়া আর অন্য কোন সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) একত্রে আদায় করতে দেখিনি। আর সেদিনই তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ফজরের সালাতও (কিছু) সময়ের আগে আদায় করেছিলেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابٌ الدَّفْعُ مِنْ عَرَفَةَ وَالْمُزْدَلِفَةِ
وَعَنْ عَبْدُ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: مَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَلَّى صَلَاةً إِلَّا لِمِيقَاتِهَا إِلَّا صَلَاتَيْنِ: صَلَاةَ الْمَغْرِبِ وَالْعِشَاءِ بِجَمْعٍ وَصَلَّى الْفَجْرَ يومئِذٍ قبلَ ميقاتها
ব্যাখ্যা: এ হাদীসে এ বিধান সাব্যস্ত হয়েছে যে, হজ্জের সময় এক ওয়াক্তের সালাত অন্য ওয়াক্তে এসে বা আগত ওয়াক্তের সালাত বর্তমান ওয়াক্তের সাথে আদায় বৈধ। যেমন- রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফায় মাগরিব ও ‘ইশার সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) ‘ইশার ওয়াক্তে আদায় করেছেন এবং যুহর ও ‘আসরের সালাত যুহরের ওয়াক্তে আদায় করেছেন। হাদীসে বলা হচ্ছে যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের সালাত ওয়াক্তের পূর্বে আদায় করেছেন। আসলে ব্যাপারটা এ রকম নয় বরং সাধারণতঃ যে সময়ে ফজরের সালাত আদায় করেন তার পূর্বে আদায় করেছেন। ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেনঃ ওয়াক্তের শুরুতে আদায় করেছে পূর্বে নয়।
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - ‘আরাফাহ্ ও মুযদালিফা হতে ফিরে আসা
২৬০৯-[৬] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের পরিবারের যেসব দুর্বল (শিশু ও মহিলা)-দেরকে মুযদালিফার রাতে সময়ের আগেই (মিনায়) পাঠিয়েছিলেন আমিও তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলাম। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابٌ الدَّفْعُ مِنْ عَرَفَةَ وَالْمُزْدَلِفَةِ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: أَنَا مِمَّنْ قَدَّمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَيْلَة الْمزْدَلِفَة فِي ضعفة أَهله
ব্যাখ্যা: এ হাদীস হতে প্রমাণিত হয় যে, মহিলা, শিশু এবং দুর্বল পুরুষরা মুযদালিফা হতে মিনায় ফজর উদিত হওয়ার পূর্বে এবং মাশ্‘আরে হারামে অবস্থান করার পূর্বে যেতে পারবে। এ হাদীসের সমর্থনে ইবনু ‘আব্বাস-এর হাদীস বর্ণিত আছে যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফার রাতে ‘আব্বাস (রাঃ)-কে বললেন, তুমি আমাদের দুর্বল লোক এবং মহিলাদের নিয়ে যাও, যেন তারা মিনায় গিয়ে ফজর সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করে এবং মানুষের পূর্বে জামারাতুল ‘আকাবায় কঙ্কর নিক্ষেপ করে। সর্বসম্মতিক্রমে অর্ধরাত্রির পরে যেতে পারবে, রাতের প্রথম ভাগে নয়।
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - ‘আরাফাহ্ ও মুযদালিফা হতে ফিরে আসা
২৬১০-[৭] ফযল ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উটের পেছনে বসাছিলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ’আরাফার সন্ধ্যায় ও মুযদালিফায় ভোরে লোকেদের উদ্দেশে বলেছেন, তোমরা (অবশ্যই) প্রশান্তির সাথে ধীরে সুস্থে চলবে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজেও নিজের উষ্ট্রীকে মিনার অন্তর্গত মুহাস্সির নামক স্থানে না পৌঁছা পর্যন্ত সংযত রেখেছিলেন। এখানে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ’তোমরা আঙ্গুল দিয়ে ধরা যায় এমন ছোট পাথর জামারাতে মারার জন্য লও’। ফযল বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামারায় পাথর মারা পর্যন্ত সব সময় তালবিয়াহ্ পড়ছিলেন। (মুসলিম)[1]
بَابٌ الدَّفْعُ مِنْ عَرَفَةَ وَالْمُزْدَلِفَةِ
وَعَن الفضلِ بن عبَّاسٍ وَكَانَ رَدِيفَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ فِي عَشِيَّةِ عَرَفَةَ وَغَدَاةِ جَمْعٍ لِلنَّاسِ حِينَ دَفَعُوا: «عَلَيْكُمْ بِالسَّكِينَةِ» وَهُوَ كَافٌّ نَاقَتَهُ حَتَّى دَخَلَ مُحَسِّرًا وَهُوَ مِنْ مِنًى قَالَ: «عَلَيْكُمْ بِحَصَى الْخَذْفِ الَّذِي يُرْمَى بِهِ الْجَمْرَةَ» . وَقَالَ: لَمْ يَزَلْ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُلَبِّي حَتَّى رَمَى الْجَمْرَةَ. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: যে ব্যক্তি ওয়াদীয়ে মুহাসসার-এ পৌঁছতে চায় তার জন্য মুস্তাহাব হলো যদি সে সওয়ারী হয় তাহলে সে আস্তে চলবে আর যদি পায়ে হেঁটে চলে তাহলে দ্রুত চলবে। ‘আরাফাহ্, মুযদালিফা এমনকি ভীড়ের জায়গাগুলোতে আস্তে চলা এটা রাস্তার আদব। আর (وَهُوَ مِنِّيْ) বলতে বুঝানো হয়েছে ওয়াদীয়ে মুহাসসার মিনার অন্তর্ভুক্ত এবং কেউ মুযদালিফা উদ্দেশ্য নিয়েছেন। মূলত মুযদালিফা এবং মিনার মধ্যবর্তী ওয়াদীয়ে মুহাসসার নামক স্থানটি কবরের ন্যায়। এজন্য আস্তে চলতে বলা হয়েছে। (عَلَيْكُمْ بِحَصَي الْخَذَفِ) বলতে বৃদ্ধা ও তর্জনী আঙ্গুলদ্বয়ের দুই পাশ দিয়ে ছোট কঙ্কর নিক্ষেপ করা উদ্দেশ্য।
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - ‘আরাফাহ্ ও মুযদালিফা হতে ফিরে আসা
২৬১১-[৮] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফা হতে প্রশান্তির সাথে ধীরস্থিরভাবে রওয়ানা হলেন, লোকজনকেও শান্তশিষ্টভাবে রওয়ানা হওয়ার জন্য আদেশ করলেন। তবে মুহাস্সির উপত্যকায় পৌঁছার পর উটকে কিছুটা দৌড়ালেন এবং তাদেরকে জামারায় আঙুল দিয়ে নিক্ষেপ করার মতো পাথর মারতে নির্দেশ দিলেন। এমন সময় তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, সম্ভবত এ বছরের পর আমি আর তোমাদেরকে দেখতে পাবো না। (গ্রন্থকার লিখেছেন, বুখারী ও মুসলিমে এ হাদীসটি পাইনি, তবে তিরমিযী কিছু আগ-পিছ করে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)[1]
بَابٌ الدَّفْعُ مِنْ عَرَفَةَ وَالْمُزْدَلِفَةِ
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: أَفَاضَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ جَمْعٍ وَعَلَيْهِ السَّكِينَةُ وَأَمَرَهُمْ بِالسَّكِينَةِ وَأَوْضَعَ فِي وَادِي مُحَسِّرٍ وَأَمَرَهُمْ أَنْ يَرْمُوا بِمِثْلِ حَصَى الْخَذْفِ وَقَالَ: «لَعَلِّي لَا أَرَاكُمْ بَعْدَ عَامِي هَذَا» . لَمْ أَجِدْ هَذَا الْحَدِيثَ فِي الصَّحِيحَيْنِ إِلَّا فِي جَامِعِ التِّرْمِذِيِّ مَعَ تقديمٍ وَتَأْخِير
ব্যাখ্যা: এ হাদীস হতে প্রমাণিত হয় ওয়াদীয়ে মুহাসসার দ্রুত অতিক্রম করা বৈধ। সে স্থানটির সীমা ছিল ৫৪৫ গজ। দ্রুত অতিক্রম বৈধ হওয়ার কারণ হলো সেখানে ‘আরববাসীরা অবস্থান করতো এবং তাদের গর্বকারী পূর্বপুরুষদের আলোচনা করতো।
(حَصَي الْخَذْفِ) কঙ্কর নিক্ষেপ বলতে ছোট কঙ্কর নিক্ষেপ উদ্দেশ্য। আর (لَعَلِّىْ لَا أَرَاكُمْ بَعْدَ عَامِىْ هٰذَا) তথা সম্ভবত আমি এ বছর পর তোমাদের দেখতে পাব না। সম্ভবত তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উদ্বেগ কণ্ঠে বলেছেন যেন তারা হজ্জের কার্যাবলী শিখে নিয়ে মানুষের নিকট পৌঁছিয়ে দেন।
অন্য বর্ণনায় আছে- لَتَأخُذُوْا مَنَاسِكَكُمْ فَاِنِّيْ لَا اَدْرِىْ لَعَلِّيْ لَا اَحُّجَ بَعْدَ حَجَّتِىْ هٰذِه তথা তোমরা হজ্জের কার্যাবলী শিখে নাও। কেননা আমি জানি না হয়তবা এ হজ্জের পর আর হজ্জ/হজ করতে পারব না।
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ‘আরাফাহ্ ও মুযদালিফা হতে ফিরে আসা
২৬১২-[৯] মুহাম্মাদ ইবনু ক্বায়স ইবনু মাখরামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভাষণ দানকালে বললেন, জাহিলী যুগের লোকেরা যখন সূর্যাস্তের পূর্বে মানুষের চেহারায় মানুষের পাগড়ীর মতো দেখা যেত তখন ’আরাফার ময়দান হতে রওয়ানা হতো। আর সূর্যোদয়ের পর মানুষের চেহারায় ওইভাবে মানুষের পাগড়ীর মতো যখন দেখাতো তখন মুযদালিফা হতে রওয়ানা হতো। আর আমরা সূর্যাস্ত না হওয়া পর্যন্ত ’আরাফার ময়দান হতে রওয়ানা হবো না এবং সূর্যোদয়ের আগে মুযদালিফা হতে রওয়ানা হবো। আমাদের নিয়ম-নীতি মূর্তিপূজক ও শির্কপন্থীদের নিয়ম-নীতির বিপরীত। (বায়হাক্বী)[1]
وَعَن محمّدِ بنِ قيسِ بن مَخْرمةَ قَالَ: خَطَبَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «إِنَّ أَهْلَ الْجَاهِلِيَّةِ كَانُوا يَدْفَعُونَ مِنْ عَرَفَةَ حِينَ تَكُونُ الشَّمْسُ كَأَنَّهَا عَمَائِمُ الرِّجَالِ فِي وُجُوهِهِمْ قَبْلَ أَنْ تَغْرُبَ وَمِنَ الْمُزْدَلِفَةِ بَعْدَ أَنْ تَطْلُعَ الشَّمْسُ حِينَ تَكُونُ كَأَنَّهَا عَمَائِمُ الرِّجَالِ فِي وُجُوهِهِمْ. وَإِنَّا لَا نَدْفَعُ مِنْ عَرَفَةَ حَتَّى تَغْرُبَ الشَّمْسُ وَنَدْفَعُ مِنَ الْمُزْدَلِفَةِ قَبْلَ أَنْ تَطْلُعَ الشَّمْسُ هَدْيُنَا مُخَالِفٌ لِهَدْيِ عَبَدَةِ الْأَوْثَانِ وَالشِّرْكِ» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي شعب الْإِيمَان وَقَالَ فِيهِ: خَطَبنَا وَسَاقه بِنَحْوِهِ
ব্যাখ্যা: কুরায়শগণ ব্যতীত জাহিলী যুগের লোকেরা ‘আরাফাহ্ হতে সূর্য ডুবার পূর্বে আসতো এবং মুযদালিফা হতে সূর্যাস্তের পর আসতো। কিন্তু সঠিক নিয়ম হচ্ছে ‘আরাফাহ্ হতে সূর্যাস্তের পর আসা এবং মুযদালিফা হতে সূর্য উদিত হওয়ার পূর্বে আসা। সূর্যকে মানুষের পাগড়ীর সাথে সাদৃশ্য দেয়ার কারণ হচ্ছে দিনের দুই প্রান্তে সূর্য যখন আকাশের কিনারার নিকটবর্তী হয় তখন পাগড়ীর মতো দেখা যায় আর এটা মানুষের চেহারায় চকচক করে পাগড়ীর শুভ্রতার উজ্জ্বলতার কারণে হয়।
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ‘আরাফাহ্ ও মুযদালিফা হতে ফিরে আসা
২৬১৩-[১০] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফার রাতে আমাদেরকে ’আবদুল মুত্ত্বালিব বংশীয় বালকদেরকে গাধার উপর চড়িয়ে দিয়ে তাঁর আগেই মিনার দিকে রওয়ানা দিলেন। তখন আমাদের উরু চাপড়িয়ে বললেন, আমার প্রিয় সন্তানেরা! তোমরা সূর্যোদয়ের পূর্বে জামারায় পাথর নিক্ষেপ করো না। (আবূ দাঊদ, নাসায়ী ও ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَدَّمَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَيْلَةً الْمُزْدَلِفَةِ أُغَيْلِمَةَ بَنِي عَبْدِ الْمُطَّلِبِ عَلَى حُمُرَاتٍ فَجَعَلَ يَلْطَحُ أَفْخَاذَنَا وَيَقُولُ: «أُبَيْنِيَّ لَا تَرْمُوا الْجَمْرَةَ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ وَابْنُ مَاجَه
ব্যাখ্যা: এ হাদীসে জামারায় ‘আক্বাবায় পাথর নিক্ষেপের বিধান সম্পর্কে বলা হয়েছে। এ হাদীস এ দিকে ইঙ্গিত করছে যে, কুরবানীর দিন জামারায় ‘আক্বাবায় পাথর নিক্ষেপের সময় হলো- সূর্য উদয়ের পর। অর্থাৎ- কুরবানীর দিন সূর্য উদয়ের পর পাথর মারতে হবে।
‘আল্লামা শাওকানী (রহঃ) বলেনঃ এ হাদীস দ্বারা এ কথা প্রমাণিত যে, পাথর সূর্যোদয়ের পর মারতে হবে। যাদের কোন সমস্যা নেই তাদের এ ব্যাপারে কোন সুযোগ নেই। আর নারী বা দুর্বল ব্যক্তিদের জন্য সুযোগ আছে। অর্থাৎ- তারা এর পূর্বেও পাথর মারতে পারবে। এ কথার সমর্থনে সহীহ সনদে ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ‘আরাফাহ্ ও মুযদালিফা হতে ফিরে আসা
২৬১৪-[১১] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর (আগের) রাতে উম্মু সালামাহ (রাঃ)-কে (মিনায়) পাঠালেন। তিনি [উম্মু সালামাহ (রাঃ)] ভোর হবার আগেই পাথর মারলেন। তারপর মক্কায় পৌঁছে তাওয়াফে যিয়ারা (তাওয়াফে ইফাযাহ্) করলেন। আর সেদিনটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তাঁর ঘরে থাকারই দিন ছিল। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن عَائِشَة قَالَتْ: أَرْسَلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بأُمِّ سَلَمَةَ ليلةَ النَّحْر فرمت الجمرةَ قبلَ الْفَجْرِ ثُمَّ مَضَتْ فَأَفَاضَتْ وَكَانَ ذَلِكَ الْيَوْمُ الْيَوْمَ الَّذِي يَكُونَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عِنْدهَا. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যা: বর্ণিত হাদীসটিতে মহিলাদের জন্য ফজরের পূর্বে কঙ্কর নিক্ষেপ করা বৈধ প্রমাণিত হয়। কেননা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে প্রকাশ্য ছিলেন। আর তিনি স্বীকৃতিও দিয়েছেন। আল আমীর আল ইয়ামানী (রহঃ) বলেনঃ এ হাদীসটি ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) এর পূর্বের হাদীসের সাথে বৈপরীত্য সৃষ্টি হয়। আর তার সমাধান হলোঃ যে ব্যক্তির ওযর (কোন কারণ) থাকে তাহলে তার জন্য ফজরের পূর্বে কঙ্কর নিক্ষেপ করা বৈধ। আর ছোট বাচ্চাদের কোন ওযর-আপত্তি ছিল না।
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ‘আরাফাহ্ ও মুযদালিফা হতে ফিরে আসা
২৬১৫-[১২] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুক্বীম (মক্কাবাসী) অথবা ’উমরাহকারী (মক্কার বাইরে থেকে আগন্তুক) হাজারে আসওয়াদ স্পর্শ না করা পর্যন্ত তালবিয়াহ্ (লাব্বায়কা) পাঠ করতে থাকবে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن ابنِ عبَّاسٍ، قَالَ: يُلَبِّي المقيمُ أَوِ المعتَمِرُ حَتَّى يستلمَ الْحَجَرَ) . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَقَالَ: وَرُوِيَ مَوْقُوفًا على ابنِ عبَّاس.
ব্যাখ্যা: যে ব্যক্তি ‘উমরা’র ইহরাম বেঁধেছে সে ইহরাম বাঁধা থেকে শুরু করে তাওয়াফ শুরু করা পর্যন্ত তালবিয়াহ্ পাঠ করবে। অতঃপর তালবিয়াহ্ পাঠ করা ছাড়বে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তালবিয়াহ্ পাঠ বন্ধ করতেন যখন পাথর চুম্বন করতেন।
পরিচ্ছেদঃ ৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ‘আরাফাহ্ ও মুযদালিফা হতে ফিরে আসা
২৬১৬-[১৩] ইয়া’কূব ইবনু ’আসিম ইবনু ’উরওয়াহ্ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি শারীদ (ইবনু সুওয়াইদ)-কে বলতে শুনেছেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে (’আরাফাহ্ হতে) রওয়ানা হয়েছি। মুযদালিফায় না পৌঁছা পর্যন্ত তাঁর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর) পা কোথাও মাটি স্পর্শ করেনি। (আবূ দাঊদ)[1]
عَنْ يَعْقُوبَ بْنِ عَاصِمِ بْنِ عُرْوَةَ أَنَّهُ سمع الشَّريدَ يَقُولُ: أَفَضْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَمَا مَسَّتْ قَدَمَاهُ الْأَرْضَ حَتَّى أَتَى جمْعاً. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: বর্ণিত হাদীসের সাথে বৈপরীত্য সৃষ্টি হয় যে হাদীসটি শায়খাইন, ইমাম আবূ দাঊদ ও ইমাম নাসায়ী (রহঃ) উসামাহ্ হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেনঃ ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আরাফাহ্ হতে ফিরে এসে শা‘ব নামক স্থানে প্রসাব করলেন।
অন্য বর্ণনায় আছে যখন শা‘ব নামক স্থানে আসলেন তখন সওয়ারীকে বসালেন। অতঃপর প্রসাব-পায়খানা করার পর উযূ করলেন কিন্তু পূর্ণাঙ্গ উযূ করলেন না। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, হালকাভাবে উযূ করলেন। আমি বললাম, সালাত? তিনি বললেন, সামনে। তারপর সওয়ার হলেন। যখন মুযদালিফায় আসলেন, নেমে উযূ করলেন এবং পরিপূর্ণ উযূ করলেন। অতঃপর সালাতের ইক্বামাত দেয়া হলো তারপর মাগরিবের সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করলেন।
সমাধানঃ শারীদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ‘আরাফাহ্ হতে মুযদালিফা পর্যন্ত ভ্রমণের বর্ণনা দিয়েছে যে, তিনি ঐ দূরত্ব পর্যন্ত সওয়ারী হয়েছেন কিন্তু দুই পা দিয়ে দ্রুত হাঁটেননি। এর অর্থ এই নয় যে, তিনি উট থেকে নামেননি। সুতরাং কোন বৈপরীত্য নেই।
শারীদের ওপর উসামার হাদীস প্রাধান্য পাবে, কেননা উট থেকে নামার প্রমাণ রয়েছে। আর হ্যাঁ-বোধক, না-বোধকের উপর প্রাধান্য পায়। আর উসামাহ্ (রাঃ) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সওয়ারী হয়েছেন তিনি তাঁর সম্পর্কে বেশি ভাল জানেন কিন্তু শারীদ তাঁর উট থেকে নামা দেখেননি। এজন্য তিনি নাকচ করেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ‘আরাফাহ্ ও মুযদালিফা হতে ফিরে আসা
২৬১৭-[১৪] ইবনু শিহাব (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাকে সালিম (রহঃ) (’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ)-এর পুত্র) বলেছেন, যে বছর হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ ’আব্দুল্লাহ ইবনুয্ যুবায়র-এর বিরুদ্ধে সৈন্য-সামন্ত নিয়ে মক্কায় পৌঁছেন, (আমার পিতা) ’আব্দুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলেন, ’আরাফার দিনে ’আরাফার ময়দানে আমরা হজের কাজ কিভাবে সম্পন্ন করবো? সালিমই (তাৎক্ষণিক) বলেন, আপনি যদি সুন্নাতের অনুসারী হয়ে করতে চান, তাহলে ’আরাফার দিন সকালে শীঘ্র সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করবেন (যুহর ও ’আসর এক সাথে তথা যুহরের প্রথম সময়ে)। তখন (আমার পিতা) ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) বললেন, সে (সালিম) সঠিক বলেছে, কেননা সাহাবীগণ সুন্নাত অনুসারে যুহর ও ’আসর একত্রে সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করতেন।
রাবী ইবনু শিহাব বলেন, আমি সালিমকে জিজ্ঞেস করলাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি এটা করেছেন (অর্থাৎ- যুহর ও ’আসর একত্রে আদায় করেছেন)? তখন সালিম (রহঃ) বললেন, তাঁরা কি রসূলের সুন্নাত ব্যতীত অন্য কিছুর অনুসরণ করতেন? অর্থাৎ- করতেন না। (বুখারী)[1]
وَعَن ابنِ شهابٍ قَالَ: أَخْبَرَنِي سَالِمٌ أَنَّ الْحَجَّاجَ بْنَ يُوسُفَ عَامَ نَزَلَ بِابْنِ الزُّبَيْرِ سَأَلَ عَبْدَ اللَّهِ: كَيْفَ نَصْنَعُ فِي الْمَوْقِفِ يَوْمَ عَرَفَةَ؟ فَقَالَ سَالِمٌ إِنْ كُنْتَ تُرِيدُ السُّنَّةَ فَهَجِّرْ بِالصَّلَاةِ يَوْمَ عَرَفَةَ فَقَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ: صَدَقَ إِنَّهُمْ كَانُوا يَجْمَعُونَ بَيْنَ الظُّهْرِ وَالْعَصْرِ فِي السُّنَّةِ فَقُلْتُ لِسَالِمٍ: أَفَعَلَ ذَلِكَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ فَقَالَ سَالِمٌ: وَهل يتَّبعونَ فِي ذلكَ إِلا سنَّتَه؟ رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: হাদীসটি ‘আরাফার ময়দানে অবস্থান করার সময় করণীয় ‘আমলের প্রতি আলোকপাত করা হয়েছে। আর তা হচ্ছে; যুহর ও ‘আসরের সালাতকে একত্রিত করে যুহরের আওয়াল (প্রথম) ওয়াক্তে পড়া। এভাবে সাহাবীগণ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ অনুযায়ী যুহর ও ‘আসরের সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) একত্রিত করে আদায় করতেন।
খাম্বায় কংকর নিক্ষেপ করাঃ অর্থাৎ- খাম্বাতে কংকর নিক্ষেপ করার সময় অথবা তার হুকুম। খাম্বা তিনটিঃ প্রথম খাম্বা, দ্বিতীয় খাম্বা এবং শেষের খাম্বা। বলা হয়েছে যে, আদম (আঃ) ও ইব্রাহীম (আঃ) যখন ইবলীসের সম্মুখীন হন তখন তাকে কংকর নিক্ষেপ করেন।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - পাথর মারা
২৬১৮-[১] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কুরবানীর দিন নিজ সওয়ারীর উপর থেকে পাথর মারতে দেখেছি। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, তোমরা আমার নিকট হতে হজের হুকুম-আহকাম শিখে নাও। কারণ এ হজের পর আর আমি হজ্জ/হজ করতে পারব কিনা তা জানি না। (মুসলিম)[1]
بَابُ رَمْىِ الْجِمَارِ
عَن جَابر قَالَ: رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَرْمِي عَلَى رَاحِلَتِهِ يَوْمَ النَّحْرِ وَيَقُولُ: «لِتَأْخُذُوا مَنَاسِكَكُمْ فَإِنِّي لَا أَدْرِي لَعَلِّي لَا أَحُجُّ بعد حجتي هَذِه» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: উক্ত হাদীস প্রমাণ করে যে, বড় খাম্বায় কংকর নিক্ষেপ করা কুরবানীর দিন পায়ে হেঁটে কংকর নিক্ষেপ করা অপেক্ষা সওয়ারীতে বসে উত্তম। ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ)-এর নিকট মুস্তাহাব হলো সওয়ারীতে যে পৌঁছাবে তার সওয়ারীতে নিক্ষেপ করা আর পায়ে হেঁটে নিক্ষেপ করলেও জায়িয হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি পায়ে হেঁটে পৌঁছবে সে দাঁড়িয়ে নিক্ষেপ করবে। আর এ হুকুম কুরবানীর দিবসের। পক্ষান্তরে আইয়্যামে তাশরীক্বের প্রথম দুই দিন সুন্নাত হলো তিন খাম্বাকে দাঁড়ানো অবস্থায় কংকর নিক্ষেপ করা। আর তৃতীয় দিন সওয়ারীতে আরোহিত অবস্থায় করে কংকর নিক্ষেপ করা।
শায়খ কামালুদ্দীন ইবনুল হুমাম-এর মতে উত্তম হলো পায়ে হেঁটে কংকর নিক্ষেপ করা বিনয়ের নিকটতম। বিশেষ করে বর্তমানে। কারণ সাধারণ লোক পায়ে হেঁটে কংকর নিক্ষেপ করে থাকে। তাই ভীড়ের কারণে সওয়ারীতে কংকর মারলে অন্যদের কষ্ট হবে। আর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সওয়ারীতে বসে কংকর নিক্ষেপ করার লক্ষ্য হলো যে, লোকদেরকে দেখানো যাতে তারা তাকে একতেদা করে। বায়হাক্বীতে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আইয়্যামে তাশরীকে পায়ে হেঁটে কংকর নিক্ষেপ করেছেন। আর এটা বিশুদ্ধ হলে এটাই অনুসরণ করা উচিত। আর এটাকে ইমাম তিরমিযী ও অন্যান্যরা বিশুদ্ধ বলেছেন। ইবনু ‘আব্দুল বার অতিরিক্ত উল্লেখ করেছেন যে, খলীফাদের এক জামা‘আত তাঁর পরে এর উপর ‘আমল করেছেন।
উক্ত হাদীসের এ অংশ, অর্থাৎ- ‘‘তোমরা আমার থেকে হজ্জের নিয়ম শিখে নাও’’ হজ্জের বিষয়ে বড় একটা মূলনীতি। অনুরূপ রিওয়ায়াত মুসলিম ছাড়া অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। যেমনিভাবে সালাতের ক্ষেত্রেও বর্ণিত হয়েছে, তোমরা সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় কর যেমনি আমাকে সালাত আদায় করতে দেখ।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - পাথর মারা
২৬১৯-[২] উক্ত রাবী [জাবির (রাঃ)] হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জামারায় খযফ-এর পাথরের মতো পাথর মারতে দেখেছি। (মুসলিম)[1]
بَابُ رَمْىِ الْجِمَارِ
وَعَنْهُ قَالَ: رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَمَى الْجَمْرَةَ بِمِثْلِ حَصَى الْخَذْفِ. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: খাম্বাতে যে কংকর নিক্ষেপ করতে হয় তার পরিমাপ হলঃ খেজুরের আটির মতো। অথবা পাথরের ঐ কুচি যা দুই আঙ্গুলের মধ্য করে দূরে নিক্ষেপ করা যায়।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - পাথর মারা
২৬২০-[৩] উক্ত রাবী (জাবির) হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিন সকাল বেলায় পাথর মেরেছেন, কিন্তু এর পরের দিনগুলোতে সূর্যাস্তের পর মেরেছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ رَمْىِ الْجِمَارِ
وَعَنْهُ قَالَ: رَمَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْجَمْرَةَ يَوْمَ النَّحْرِ ضُحًى وَأَمَّا بَعْدَ ذَلِكَ فَإِذَا زَالَتِ الشَّمْسُ
ব্যাখ্যা: কংকর নিক্ষেপ করার সময়ঃ কুরবানীর দিন বড় খাম্বায় সাতটি কংকর নিক্ষেপ করবে। সময় হলো সূর্য উদয় হওয়ার পর থেকে সূর্য ঢলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত। কুরবানীর দিনের পর আইয়্যামে তাশরীকে সূর্য ঢলে যাওয়ার পর তিনটি খাম্বায় সাতটি করে কংকর নিক্ষেপ করবে। এই মাসআলায় ইমামগণ ঐকমত্য পেশ করেছেন। ইবনু ‘উমার থেকে ইমাম বুখারী বর্ণনা করেন যে, আমরা সময়ের জন্য অপেক্ষা করতাম। অতঃপর যখন সূর্য ঢলে যেত তখন আমরা কংকর নিক্ষেপ করতাম।
হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, এ হাদীসটি প্রমাণ করে যে, সুন্নাত হলো কুরবানীর দিন ছাড়া সূর্য ঢলে যাওয়ার পর খাম্বাগুলোতে কংকর নিক্ষেপ করবে।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - পাথর মারা
২৬২১-[৪] ’আব্দুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি জামারাতুল কুবরার (বড় জামারার) নিকট পৌঁছে বায়তুল্লাহকে বামে আর মিনাকে ডানে রেখে এর উপর সাতটি পাথর মারলেন, এতে প্রত্যেকবার ’আল্লা-হু আকবার’ বলেছেন। অতঃপর তিনি বললেন, যাঁর ওপর সূরা আল বাক্বারাহ্ নাযিল হয়েছে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-ও এভাবে পাথর মেরেছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ رَمْىِ الْجِمَارِ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ: أَنَّهُ انْتَهَى إِلَى الْجَمْرَةِ الْكُبْرَى فَجَعَلَ الْبَيْتَ عَنْ يَسَارِهِ وَمِنًى عَنْ يَمِينِهِ وَرَمَى بِسَبْعِ حَصَيَاتٍ يُكَبِّرُ مَعَ كُلِّ حَصَاةٍ ثُمَّ قَالَ: هَكَذَا رَمَى الَّذِي أُنْزِلَتْ عَلَيْهِ سُورَةُ الْبَقَرَةِ
ব্যাখ্যা: ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাস্‘ঊদ (রাঃ) এর উক্তি ‘‘যখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বড় খাম্বার কাছে পৌছাতেন, তখন বায়তুল্লাহকে বামে ও মিনাকে ডানে করতেন।’’ হাফিয ইবনু হাজার (রহঃ) বলেন, বড় খাম্বাতে চারটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে।
১. কুরবানীর দিন কেবলমাত্র বড় খাম্বাতে পাথর মারতে হয়।
২. তার নিকট বিলম্ব করা যায় না।
৩. চাশতের সময় কংকর নিক্ষেপ করা।
৪. তার নিচ থেকে কংকর নিক্ষেপ করা মুস্তাহাব?
জামারাতুল ‘আকাবাহ্ বড় খাম্বাকে বলা হয়। আর মিনাতে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারদের নিকট হতে হিজরতের উপর বায়‘আত নিয়েছিলেন। মুস্তাহাব হলো, যে ব্যক্তি বড় খাম্বার নিকট দাঁড়াবে সে মক্কাহকে বাম দিকে ও মিনাকে ডান দিকে করবে আর তার চেহারাকে খাম্বার দিকে করবে।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - পাথর মারা
২৬২২-[৫] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ইস্তিঞ্জার ঢেলা নিতে হয় বেজোড়, জামারায় পাথর মারা বেজোড়, সাফা মারওয়ায় সা’ঈ বেজোড় এবং তাওয়াফ করতে হয় বেজোড়। সুতরাং তোমাদের কেউ যদি সুগন্ধি ধোঁয়া গ্রহণ করে সেও যেন বেজোড় লাগায়। (মুসলিম)[1]
بَابُ رَمْىِ الْجِمَارِ
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الِاسْتِجْمَارُ تَوٌّ وَرَمْيُ الْجِمَارِ توٌّ وَالسَّعْيُ بَيْنَ الصَّفَا وَالْمَرْوَةِ تَوٌّ وَالطَّوَافُ تَوٌّ وَإِذَا اسْتَجْمَرَ أَحَدُكُمْ فَلْيَسْتَجْمِرْ بِتَوٍّ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যা: উক্ত হাদীস হতে প্রমাণিত হয় যে, ইস্তিঞ্জার মধ্যে ঢেলা বেজোড় নিবে। খাম্বাতে বেজোড় কংকর নিক্ষেপ করবে। সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে সাঈ বেজোড় করবে। তাওয়াফও বেজোড় করবে।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - পাথর মারা
২৬২৩-[৬] কুদামাহ্ ইবনু ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আম্মার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কুরবানীর দিন একটি লাল-সাদা মিশ্রিত রংয়ের উষ্ট্রীর উপর চড়ে জামারায় পাথর মারতে দেখেছি। সেখানে কাউকে আঘাত করা ব্যতীত, হাঁকানো ব্যতীত এবং ’সরে যাও সরে যাও’ শব্দ ব্যতীত (পাথর মেরেছেন)। (শাফি’ঈ, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ ও দারিমী)[1]
عَنْ قُدَامَةَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمَّارٍ قَالَ: رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَرْمِي الْجَمْرَةَ يَوْمَ النَّحْرِ عَلَى نَاقَةٍ صَهْبَاءَ لَيْسَ ضَرْبٌ وَلَا طَرْدٌ وَلَيْسَ قِيلُ: إِلَيْكَ إِليك. رَوَاهُ الشَّافِعِيُّ وَالتِّرْمِذِيُّ وَالنَّسَائِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ وَالدَّارِمِيُّ
ব্যাখ্যা: উক্ত হাদীস প্রমাণ করে যে, সওয়ারীতে আরোহণ করে কংকর নিক্ষেপ করা জায়িয এবং কংকর নিক্ষেপের সময় কাউকে দূরে সরানো বা কষ্ট দেয়া জায়িয নয়। আর হাদীসটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রত্যেক কাজে বিনয়ী হওয়া প্রমাণ করে। আরো প্রমাণ করে, কুরবানীর দিন সওয়ারীতে আরোহণ করে কংকর নিক্ষেপ করা জায়িয।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - পাথর মারা
২৬২৪-[৭] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ (জামারায়) পাথর মারা ও সাফা মারওয়ার মধ্যে সা’ঈ করা আল্লাহ যিকির কায়িম করার জন্যই প্রবর্তিত হয়েছে। (তিরমিযী ও দারিমী; ইমাম তিরমিযী বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّمَا جُعِلَ رَمْيُ الْجِمَارِ وَالسَّعْيُ بَيْنَ الصَّفَا وَالْمَرْوَةِ لِإِقَامَةِ ذِكْرِ اللَّهِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَالدَّارِمِيُّ وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ
ব্যাখ্যা: কংকর নিক্ষেপ করা এবং সাফা ও মারওয়া সা‘ঈ করা নির্ধারণ করা হয়েছে আল্লাহর যিকির কায়িম করার জন্য। মুল্লা ‘আলী কারী হানাফী (রহঃ) বলেনঃ এ সকল বারাকাতময় স্থানে আল্লাহর স্মরণ করা আর গাফেল হওয়ার থেকে বেঁচে থাকার জন্য যিকিরকে খাস করা হয়েছে। কারণ সকল ‘ইবাদাতের লক্ষ্য হলো, আল্লাহকে স্মরণ করা। খাম্বায় কংকর নিক্ষেপ করা আর সাফা মারওয়ার মধ্যে সা‘ঈ করা সুন্নাত হয়েছে আল্লাহর স্মরণের জন্য, অর্থাৎ- ‘আল্লা-হু আকবার’ বলা প্রত্যেক উচ্চস্থানে আরোহণের জন্য। উল্লেখিত দু‘আ সা‘ঈর মধ্যে সুন্নাত। উক্ত হাদীস উৎসাহিত করছে হজ্জের সুন্নাতসমূহ হিফাযাত করতে। যেমনঃ তাওয়াফে আল্লাহকে স্মরণ করা। আল্লাহ তা‘আলা সূরা বাক্বারায় ২০৩ নং আয়াতে ইরশাদ করেন, ‘‘তোমরা আল্লাহকে স্মরণ করো নির্ধারিত দিনগুলোতে’’।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - পাথর মারা
২৬২৫-[৮] উক্ত রাবী [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা (সাহাবীগণ) অনুনয় করলাম, হে আল্লাহর রসূল! আমরা কি আপনার জন্য মিনায় একটি বাড়ী তৈরি করে দেবো, যা সবসময় আপনাকে ছায়াদান করবে? জবাবে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, না। মিনায় সে ব্যক্তিই তাঁবু খাটাবে যে প্রথমে সেখানে আসবে। (তিরমিযী, ইবনু মাজাহ ও দারিমী)[1]
وَعَنْهَا قَالَتْ: قُلْنَا: يَا رَسُولَ اللَّهِ ألَا نَبْنِي لَكَ بِنَاءً يُظِلُّكَ بِمِنًى؟ قَالَ: «لَا مِنًى مُنَاخُ مَنْ سَبَقَ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَابْنُ مَاجَه والدارمي
ব্যাখ্যা: উক্ত হাদীস থেকে প্রমাণ হয় যে, মিনায় কোন খাস ঘর বানানো ঠিক নয়। সেটি একটা ‘ইবাদাতের স্থান। কংকর নিক্ষেপ করার কুরবানী ও মাথা কামানোর স্থান। যদি সেখানে ঘর বানাতে অনুমতি দেয়া হত, তবে সেখানে জায়গা সংকীর্ণ হয়ে যেত।
পরিচ্ছেদঃ ৬. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - পাথর মারা
২৬২৬-[৯] নাফি’ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) প্রথম দুই জামারায় দীর্ঘ সময় অবস্থান করতেন এবং আল্লা-হু আকবার, সুবহা-নাল্ল-হ ও আল হাম্দুলিল্লা-হ (অর্থাৎ- আল্লাহর মহিমা, পবিত্রতা ও প্রশংসা বর্ণনা করতেন) বলতেন এবং দু’আ করতেন। কিন্তু জামারাতুল ’আক্বাবার নিকট অবস্থান করতেন না। (মালিক)[1]
عَنْ نَافِعٍ قَالَ: إِنَّ ابْنَ عُمَرَ كَانَ يَقِفُ عِنْدَ الْجَمْرَتَيْنِ الْأُولَيَيْنِ وُقُوفًا طَوِيلًا يُكَبِّرُ اللَّهَ وَيُسَبِّحُهُ وَيَحْمَدُهُ وَيَدْعُو اللَّهَ وَلَا يَقِفُ عنْدَ جمرَةِ العقبةِ. رَوَاهُ مَالك
ব্যাখ্যা: ইবনু ‘উমার কংকর নিক্ষেপ করে প্রথমে দু’টি খাম্বার নিকটে সূরা আল বাক্বারাহ্ পড়ার সমান লম্বা সময় দাঁড়িয়ে থাকতেন। আল্লা-হু আকবার বলতেন, সুবহা-নাল্লা-হ বলতেন, আলহাম্দুলিল্লা-হ বলতেন ও দু‘আ করতেন।
আর কংকর নিক্ষেপ করে বড় খাম্বার কাছে দাঁড়াতেন না।
‘আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিনার শেষ দিনে তাওয়াফে ইফাযাহ্ করেন, সেই সময় যখন যুহর সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করেন। অতঃপর আবার মিনায় ফিরে যান। ইবনু ‘উমার ও ইবনু মাস্‘ঊদ হতে জানা যায় যে, তারা কংকর নিক্ষেপ করার সময় এ দু‘আ পড়তেন, হে আল্লাহ! তুমি এটা হজে মাবরূর বানাও এবং গোনাহ ক্ষমা করে দাও।
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - কুরবানীর পশুর বর্ণনা
২৬২৭-[১] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুলহুলায়ফায় যুহরের সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করলেন। এরপর তাঁর কুরবানীর পশু আনালেন এবং এর কুঁজের ডান দিকে ফেঁড়ে দিলেন ও এর রক্ত মুছে ফেলে গলায় দু’টি জুতার মালা পরিয়ে দিলেন। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর সওয়ারীতে উঠে বসলেন। তারপর (সামনে গিয়ে) বায়দাতে বাহন সোজা হয়ে দাঁড়ালে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হজ্জের তালবিয়াহ্ (লাব্বায়কা) পাঠ করলেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْهَدْىِ
عَن ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: صَلَّى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِذِي الْحُلَيْفَةِ ثُمَّ دَعَا بِنَاقَتِهِ فَأَشْعَرَهَا فِي صَفْحَةِ سَنَامِهَا الْأَيْمَنِ وَسَلَّتَ الدَّمَ عَنْهَا وَقَلَّدَهَا نَعْلَيْنِ ثُمَّ رَكِبَ رَاحِلَتَهُ فَلَمَّا اسْتَوَتْ بِهِ على الْبَيْدَاء أهل بِالْحَجِّ. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা : বিদায় হজ্জে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুহরের সালাত ২ রাক্‘আত যুল হুলায়ফায় আদায় করেন। অতঃপর উটনীর চিহ্ন দিলেন যাতে মানুষেরা বুঝতে পারে যে, এটা কুবরানীর পশু। সূরা আল মায়িদাহ্’য় আল্লাহ তা‘আলা বলেন, لَا تُحِلُّوْا شَعَائِرَ اللَّهِ অর্থাৎ- ‘‘আল্লাহর ঘরের দিকে পাঠানো পশুকে হালাল মনে করো না।’’ (সূরা আল মায়িদাহ্ ৫ : ২)
(إشعار) ইশ্‘আর শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো অবহিত করা। আর শারী‘আতের ভাষায় উটের কুঁজের এক পাশে ছুরি বা অস্ত্র দ্বারা আহত করে রক্ত প্রবাহিত করা। যাতে লোকেরা কুরবানীর উট ও অন্য উটের মাঝে পার্থক্য করতে পারে। যাতে অন্য উটের সাথে মিশে বা হারিয়ে না যায়। আর চোরেরা এর থেকে দূরে থাকে। আর গরীবরা খেতে পারে যখন রাস্তায় যাবাহ করা হয় মৃত্যুর ভয়ে। হাদীসও প্রমাণ করে যে, ইশ্‘আর করা সুন্নাত। আর এটি অধিকাংশ ‘আলিমদের মত। তাদের মধ্য হতে তিন ইমাম। আর ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) হতে বর্ণিত যে, ইশ্‘আর বিদ্‘আত ও মাকরূহ। আর মুসলা তথা পশুকে শাস্তি দেয়া হলে এটি হারাম। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটি করেছিলেন মুশরিকদের উট নিতে বিরত রাখার জন্য আর তারা বিরত থাকতো না ইশ্‘আর করা ছাড়া। এখানে ইমাম আবূ হানীফার মতটি সহীহ হাদীসের বিরোধী।
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - কুরবানীর পশুর বর্ণনা
২৬২৮-[২] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বায়তুল্লাহর কুরবানীর পশু হিসেবে একপাল ছাগল (ভেড়া) পাঠালেন এবং এগুলোর গলায় (জুতার) মালা পরিয়ে দিলেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْهَدْىِ
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: أَهْدَى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مرّة إِلَى الْبَيْت غنما فقلدها
ব্যাখ্যা: একদা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বায়তুল্লাহর দিকে কুরবানীর জন্য ছাগলের একটি পাল প্রেরণ করেন। আর এটি ছিল বিদায়ী হজ্জের পূর্বে। তাদের সাথে যারা মদীনাহ্ থেকে হজ্জে গিয়েছিল। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হজ্জে যাননি। এখানে হাদীসে ‘‘একবার ছাগল প্রেরণ করেছিলেন’’- এ কথা প্রমাণ করে যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অন্য সময় উট প্রেরণ করতেন। কারণ এটিই উত্তম। আর ছাগল দেয়া জায়িয আছে। আর উক্ত ছাগলের গলায় হার লটকিয়ে দেন। এটিই অধিকাংশ ‘উলামাগণের মত। এ বিষয়ে বিরোধিতা করেন হানাফী ও মালিকী মাযহাবগণ তারা বলেন ছাগলের হার পরিধান করা ঠিক না। কিন্তু তাদের মত হাদীসের পরিপন্থী।
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - কুরবানীর পশুর বর্ণনা
২৬২৯-[৩] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিন (মিনায়) ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর পক্ষ হতে একটি গরু কুরবানী করেছিলেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْهَدْىِ
وَعَن جَابر قَالَ: ذَبَحَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ عَائِشَةَ بَقَرَةً يَوْمَ النَّحْرِ. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাবাহ করেছেন। অন্য হাদীসে নাহর (উট নাহর করেছেন) আছে। আসলে নাহর বলেঃ গর্দান ও সিনায় ছুরি নিক্ষেপ করা। আর যাবাহ বলে, হলকে বা গলায় ছুরি নিক্ষেপ করা। সুতরাং যাবাহ হলো গর্দানের রগ কেটে ফেলা। তাকমিলাতুয্ যুহর-এ আছেঃ যাবাহ করতে গিয়ে সম্পূর্ণ গলা কেটে ফেললে কোন অসুবিধা নেই বা তার নিচে, তার মধ্যে ও উপরে হওয়াতে কোন অসুবিধা নেই। এ হাদীসটি অধিকাংশ ‘উলামাগণের দলীল। অর্থাৎ- গরু নাহর বা কুরবানী করা জায়িয গরু যাবাহ করাটা উত্তম। কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
অর্থাৎ- নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা আদেশ করেন যে, ‘‘কাজেই তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশে সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় কর এবং কুরবানী কর।’’ (সূরা আল কাওসার ১০৮ : ২)
আর হাসান বিন সালিহ ও মুজাহিদ নাহর মুস্তাহাব বলেছেন। ইমাম মালিক বলেন, জরুরী ছাড়া উট যাবাহ করা অথবা বিনা প্রয়োজনে ছাগল নাহর করা হলে তার গোশ্ত (গোসত/গোশত) খাওয়া জায়িয হবে না।
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - কুরবানীর পশুর বর্ণনা
২৬৩০-[৪] জাবির (রাঃ) হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে তাঁর স্ত্রীদের পক্ষ হতে একটি গরু কুরবানী দিয়েছিলেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْهَدْىِ
وَعنهُ قَالَ: نَحَرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ نِسَائِهِ بَقَرَةً فِي حَجَّتِهِ. رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যা: বিদায়ী হজ্জে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গরু নাহর বা কুরবানী করেন তার স্ত্রীদের পক্ষ হতে। অন্য বর্ণনায় আছে, একটি বকরী দিয়েছিলেন। আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে, ‘উমরা আদায়কারী স্ত্রীদের পক্ষ হতে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গরু কুরবানী করেন। জাবির, ‘আয়িশাহ্ ও আবূ হুরায়রার হাদীসে প্রমাণিত কুরবানী যদি উট বা গরু হয় তবে তাতে শারীক হতে পারে। এ বিষয় ‘উলামাগণের ইখতেলাফ আছে। ইমাম শাফি‘ঈ, ইমাম আহমাদ এবং অধিকাংশ ‘আলিমদের মত হলো কুরবানীর মধ্যে শারীক হওয়া জায়িয। চাই কুরবানী ওয়াজিব হোক বা নফল হোক। আর দাঊদ, যাহিরী ও কিছু মালিকীদের মতে নফল কুরবানীতে শারীক হওয়া জায়িয আছে, ওয়াজিব কুরবানীতে জায়িয নেই। এ মত ঠিক নয় কারণ জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ফায়েদা উঠাতাম ফলে আমরা গরু যাবাহ করতাম সাতজনের পক্ষ হতে। আমরা তাতে শারীক হতাম। আর ইমাম মালিক (রহঃ)-এর মতে কোন অবস্থাতেই কুরবানীতে শারীক হওয়া জায়িয নয়। তবে তার এ মত এখানে আলোচিত অধ্যায়ের খিলাফ। তবে তার থেকে আহমাদ বর্ণনা করেছেন যে, তিনি এ মত হতে ফিরে এসেছেন। আর অধিকাংশদের সাথে মত ব্যক্ত করেছেন। আর সম্ভবত ইমাম মালিক-এর নিকট এ হাদীস পৌছায়নি। ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ)-এর মত হলো সব অবস্থায় শারীক কুরবানী জায়িয। চাই ওয়াজিব হোক আর নফল হোক।
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - কুরবানীর পশুর বর্ণনা
২৬৩১-[৫] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আমার নিজ হাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কুরবানীর পশু উটের মালা তৈরি করেছি। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তা পশুদের গলায় পরিয়েছেন এবং এগুলোর কুঁজ ফেঁড়ে দিয়েছেন। তারপর এগুলোকে কুরবানীর পশু হিসেবে (বায়তুল্লাহয়) পাঠিয়েছেন। এতে তাঁর উপরে কোন জিনিস হারাম হয়নি, যা তাঁর জন্যে আগে হালাল করা হয়েছিল। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْهَدْىِ
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: فَتَلْتُ قَلَائِدَ بُدْنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِيَدَيَّ ثُمَّ قَلَّدَهَا وَأَشْعَرَهَا وَأَهْدَاهَا فَمَا حَرُم عَلَيْهِ كانَ أُحِلَّ لَهُ
ব্যাখ্যা: ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর এ হাদীস প্রমাণ করে যে, কুরবানীর পশুর গলায় হার লটকানো জায়িয এবং ইশ্‘আর করা (কুঁজের উপর রক্ত বের করে দেয়া) জায়িয। আর কুরবানীর জানোয়ার তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নবম হিজরীতে আবূ বাকর সিদ্দীক্ব-এর কাছে মক্কায় প্রেরণ করেন। এতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর কিছু হারাম প্রমাণিত হয়নি। আর এ হাদীস প্রমাণ করে যে, হারামে কুরবানীর জানোয়ার প্রেরণ করা জায়িয। যদিও সে নিজে সফর না করে বা নিজে ইহরাম না পরিধান করে। আর এ হাদীস এটাও প্রমাণ করে যে, একজনের পশু অন্যজন কুরবানী দিতে পারে। আর এ হাদীস হতে ইমাম মালিক দলীল গ্রহণ করেন যে, গরু কুরবানী করা উত্তম। তবে তার এ মাযহাব অন্যদের নিকট অগ্রহণীয়।
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - কুরবানীর পশুর বর্ণনা
২৬৩২-[৬] উক্ত রাবী [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার কাছে যে পশম ছিল তা দিয়ে আমি (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর) কুরবানীর পশুর মালা তৈরি করেছি। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে আমার পিতার সাথে (মক্কায়) পাঠিয়েছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْهَدْىِ
وَعَنْهَا قَالَتْ: فَتَلْتُ قَلَائِدَهَا مِنْ عِهْنٍ كَانَ عِنْدِي ثُمَّ بَعَثَ بِهَا مَعَ أَبِي
ব্যাখ্যা: এ হাদীসটি ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উটের রশি আমি নিজেই পাকিয়েছিলাম যা কুসুম রংয়ের পশমের ছিল। কেউ বলেছেন, লাল ছিল। আর প্রেরণের সাল ছিল নবম হিজরী, সে সনে আবূ বাকর (রাঃ) মানুষকে নিয়ে হজ্জে যান। ইবনুত্ তীন বলেন, ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) ইচ্ছা করেন এর থেকে পুরা ঘটনা অথবা তিনি অনুমান করছেন এটা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শেষ কর্ম।
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - কুরবানীর পশুর বর্ণনা
২৬৩৩-[৭] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে একটি কুরবানীর উট চালিয়ে নিয়ে যেতে দেখলেন। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এর উপর উঠে যাও। তখন লোকটি বললো, হে আল্লাহর রসূল! এটা তো কুরবানীর উট। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, চড়ে যাও! সে পুনরায় বললো, এটা যে কুরবানীর উট! তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দ্বিতীয় বা তৃতীয়বারে বললেন, আরে হতভাগা এর উপর চড়ে যাও। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْهَدْىِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأَى رَجُلًا يَسُوقُ بَدَنَةً فَقَالَ: «ارْكَبْهَا» . فَقَالَ: إِنَّهَا بَدَنَةٌ. قَالَ: «ارْكَبْهَا» . فَقَالَ: إِنَّهَا بَدَنَةٌ. قَالَ: «ارْكَبْهَا وَيلك» فِي الثَّانِيَة أَو الثَّالِثَة
ব্যাখ্যা: এ হাদীসের মধ্যে بُدْنَةٌ (বুদনাতুন) শব্দটি উট নর-নারী উভয়ের পর ব্যবহার হয়। পরবর্তীতে এর ব্যবহার هَدْيٌ (হাদয়ুন) শব্দে বেশি হয়ে থাকে।
‘আল্লামা কুসতুলানী বলেন, بُدْنَةٌ (বুদনাতুন) শব্দটি উটের নর-নারী ও গাভীর নর ও নারীকে বুঝানো হয়েছে। এ হাদীস হতে প্রমাণ হল যে, কুরবানীর জানোয়ারের উপর সওয়ার হওয়া জায়িয। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকটিকে আদব শিক্ষা দেয়ার জন্য বলেছিলেন, ‘‘তোমার ধ্বংস হোক’’। আসমা‘ঈ বলেন, وَيْلٌ শব্দটি ধমক এবং রহমাতের জন্যও ব্যবহার হয়। সীবুওয়াইহ বলেন, وَيْحٌ শব্দটি ‘আযাব ঐ ব্যক্তির জন্য জন্য যে ধ্বংসের কাছে উপনীত হয়েছে। হাদীসে আছে যে, وَيْلٌ এটি জাহান্নামের একটি উপত্যকার নাম। এখানে এ শব্দ দ্বারা ধমক বুঝানো হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - কুরবানীর পশুর বর্ণনা
২৬৩৪-[৮] আবুয্ যুবায়র (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জাবির ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ)-কে কুরবানীর উটের উপর বসে যাওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে শুনেছি। জবাবে তিনি বলেছেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, কষ্ট না দিয়ে সুন্দরভাবে এর উপর আরোহণ কর যখন তুমি এর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ো যতক্ষণ না অন্য একটি সওয়ারী পাও। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْهَدْىِ
وَعَنْ أَبِي الزُّبَيْرِ قَالَ: سَمِعْتُ جَابِرَ بْنَ عبدِ اللَّه سُئِلَ عَنْ رُكُوبِ الْهَدْيِ فَقَالَ: سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «ارْكَبْهَا بِالْمَعْرُوفِ إِذَا أُلْجِئْتَ إِلَيْهَا حَتَّى تَجِدَ ظَهْرًا» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: জাবির (রাঃ)-এর এ হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, কুরবানীর পশুর উপর প্রয়োজনের সময় সওয়ার হওয়া জায়িয। অর্থাৎ- পশুর যাতে কোন রকম সমস্যা না হয়। আর অন্য পশু পেলে কুরবানীর পশুর উপর সওয়ার হবে না।
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - কুরবানীর পশুর বর্ণনা
২৬৩৫-[৯] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার (মক্কায়) এক ব্যক্তির সাথে কুরবানী করার জন্য ১৬টি উটনী পাঠালেন এবং তাকে কুরবানী করার জন্য দায়িত্ব বুঝে দিলেন। লোকটি জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রসূল! যদি পথিমধ্যে উটগুলোর কোনটি অচল হয়ে পড়ে তখন আমার করণীয় কি? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, যাবাহ করে দেবে। অতঃপর এর মালার জুতা দু’টি এর রক্তে রঞ্জিত করে তার কুঁজের পাশে রাখবে। তবে তুমি ও তোমার সাথীদের কেউ তা (মাংস) খাবে না। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْهَدْىِ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: بَعَثَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سِتَّةٌ عَشَرَ بَدَنَةً مَعَ رَجُلٍ وَأَمَّرَهُ فِيهَا. فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ كَيْفَ أَصْنَعُ بِمَا أُبْدِعَ عَلَيَّ مِنْهَا؟ قَالَ: «انْحَرْهَا ثُمَّ اصْبُغْ نَعْلَيْهَا فِي دَمِهَا ثُمَّ اجْعَلْهَا عَلَى صَفْحَتِهَا وَلَا تَأْكُلْ مِنْهَا أَنْتَ وَلَا أَحَدٌ مِنْ أهل رفقتك» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর হাদীসটি মিশকাতের সকল নুসখায় এবং সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১৬টি উট একটি লোকের মাধ্যমে প্রেরণ করেন। লোকটি বলল, আমি তার কোনটি দুর্বল বা অসুস্থ হলে কি করবো হে আল্লাহর রসূল! তিনি বললেন, তুমি তা নাহর করো এবং তার জুতায় (মালাদ্বয়ে) রক্ত লাগাও। অতঃপর তা তার কাঁধে লাগিয়ে দাও। আর তুমি এবং তোমার সাথীগণ যেন তা হতে খাবে না। সুতরাং হাদীসটি প্রমাণ করে, যে ব্যক্তি কুরবানীর জানোয়ার হারামে প্রেরণ করবে, অতঃপর রাস্তায় যদি অসুস্থ হয়ে যায়, হালাল হওয়ার স্থানে পৌছানোর আগেই তবে তা নাহর বা কুরবানী করে দিবে। অতঃপর তার দুই জুতায় রক্ত লাগাবে আর রক্ত মাখানো জুতা কুঁজে ঝুলিয়ে দিবে- এ ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত হলো যে, কুরবানীর পশুর মালিক এবং তার বন্ধু-বান্ধব খেতে পারবে না, কিন্তু ফকীর-মিসকীনদের খাওয়া জায়িয আছে।
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - কুরবানীর পশুর বর্ণনা
২৬৩৬-[১০] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে হুদায়বিয়ার সন্ধির বছর সাতজনের পক্ষ হতে একটি উট এবং সাতজনের পক্ষ হতে একটি গরু কুরবানী করেছি। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْهَدْىِ
وَعَن جابرٍ قَالَ: نحَرْنا مَعَ رَسولِ اللَّهِ عَامَ الْحُدَيْبِيَةِ الْبَدَنَةَ عَنْ سَبْعَةٍ وَالْبَقَرَةَ عَنْ سَبْعَة. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: জাবির (রাঃ)-এর এ হাদীস থেকে প্রমাণ হয় যে, উটে ও গুরুতে কুরবানীতে সাতজন শারীক হতে পারে। আর এটা জমহূর (অধিকাংশ) এর মত। দাঊদ যাহিরী ও কিছু মালিকীদের মতে নাফলের ক্ষেত্রে জায়িয, ওয়াজিবের ক্ষেত্রে নয়। আর ইমাম মালিক-এর মত কোন অবস্থায় জায়িয নয়। মালিকী মাযহাবের লোকেরা এ হাদীসকে অনেক রকমের তা’বীল করেন, যা অনর্থক ঠাট্টা তাবিল। যে ব্যক্তি চায় সে যেন মুয়াত্ত্বার শরাহ যুরক্বানীর অধ্যয়ন করে। জাবির থেকে সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, হজ্জে ও ‘উমরার মধ্যে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে উটে আমরা সাতজন শারীক হয়েছিলাম। এক ব্যক্তি বললো, গরু ও উটে একই রকম শারীক হবো? তিনি বললেন, গরু তো উটের দলভুক্ত। মুসলিমের মধ্যে তার থেকে বর্ণিত হয়েছে, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে হজ্জ/হজ করতে বের হয়েছিলাম, ফলে তিনি আমাদেরকে উট ও গরুতে সাতজন শারীক হতে আদেশ করলেন।
এ সকল হাদীস প্রমাণ করে যে, কুরবানীতে শারীক হওয়া জায়িয আছে। অন্য হাদীসে এসেছে যে, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ফায়েদা উঠাতাম। আমরা গরু যাবাহ করতাম সাতজনের পক্ষ থেকে এবং আমরা তাতে শারীক হতাম। সুতরাং বহু সহীহ রিওয়ায়াত প্রমাণ করছে যে, উট ও গরুতে সাতজন শারীক হতে পারবে।
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - কুরবানীর পশুর বর্ণনা
২৬৩৭-[১১] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। একবার তিনি এক ব্যক্তির কাছে আসলেন। দেখলেন যে, সে তার উটকে কুরবানী করার জন্য বসিয়েছে। (এ দৃশ্য দেখে) তখন তিনি তাকে বললেন, উটকে দাঁড় করাও এবং পা বেঁধে যাবাহ করো। এটাই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাত। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْهَدْىِ
وَعَن ابنِ عمَرَ: أَنَّهُ أَتَى عَلَى رَجُلٍ قَدْ أَنَاخَ بِدَنَتَهُ يَنْحَرُهَا قَالَ: ابْعَثْهَا قِيَامًا مُقَيَّدَةً سُنَّةَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
ব্যাখ্যা: ইবনু ‘উমার (রাঃ) মিনাতে এক লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করেন। সে তার উটকে বসিয়ে কুরবানী করতে উদ্ধত হয়েছে। ইবনু ‘উমার তাকে বললেন যে, তা ছেড়ে দাও দাঁড় করিয়ে নাহর বা কুরবানী কর। এটিই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাত। সুনানে আবূ দাঊদে জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবীগণ উট নাহর বা কুরবানী করতেন তিন পায়ে দাঁড়ানো অবস্থায় ও বাম পা বাঁধা অবস্থায়। আর এ বিষয়টি প্রমাণ করে হারবী-এর বর্ণনায়। সেখানে আছে যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছিলেন, তা নাহর বা কুরবানী কর দাঁড়নো অবস্থায়, কেননা এটা সুন্নাত। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ হাদীসটি প্রমাণ করে যে, উট দাঁড়ানো অবস্থায় নাহর বা কুরবানী করা সুন্নাত। ইমাম বাজী বলেন, এটাই হলো ইমাম মালিক ও জমহূর (অধিকংশের) মত, হাসান বাসরী ব্যতীত।
এ বিষয়ে সহীহুল বুখারীতে আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হস্তে দাঁড়িয়ে সাতটি উট নাহর করেছিলেন। ইমাম মালিক, ইমাম শাফি‘ঈ, ইসহাক ও ইবনু মুনযীর এটাকে মুস্তাহাব বলেছেন। পক্ষান্তরে ইমাম খাত্ত্বাবী এবং রায় পন্থীগণ উভয় পন্থাকে জায়িয বলেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - কুরবানীর পশুর বর্ণনা
২৬৩৮-[১২] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে (বিদায় হজে) কুরবানীর উটগুলো দেখাশুনা করতে, তার মাংস (গোসত/মাংস), চামড়া ও ঝুল (গরীবদের মাঝে) বণ্টন করে দিতে এবং কসাইকে কিছু না দিতে আদেশ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমরা আমাদের নিজের কাছ থেকে তার (কসাইয়ের) পারিশ্রমিক দিবো। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْهَدْىِ
وَعَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: أَمَرَنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ أَقُومَ عَلَى بُدْنِهِ وَأَنْ أَتَصَدَّقَ بِلَحْمِهَا وَجُلُودِهَا وَأَجِلَّتِهَا وَأَنْ لَا أُعْطِيَ الْجَزَّارَ مِنْهَا قَالَ: «نَحْنُ نُعْطِيهِ مِنْ عِنْدِنَا»
ব্যাখ্যা: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আলী (রাঃ)-কে আদেশ করেছেন যে, তার উট যা মক্কায় প্রেরণ করেছিলেন, যার সংখ্যা ছিল একশতটি। সেগুলোকে দেখাশুনা করা ও কুরবানী করে গোশ্ত (গোসত/গোশত) ও চামড়াগুলো সাদাকা করতে। আর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উটের গোশ্ত কসাইকে দিতে নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ- কুরবানীর গোশত কাজের বিনিময়ে কসাইদেরকে দিতে নিষেধ করেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - কুরবানীর পশুর বর্ণনা
২৬৩৯-[১৩] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা কুরবানীর উটের মাংস (গোসত/মাংস) তিন দিনের বেশি খেতাম না। তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের অনুমতি দিয়ে বললেন, তিন দিনের বেশি সময় ধরে খেতে এবং ভবিষ্যতের জন্য রেখে দিতে পারো। তাই আমরা খেলাম ও (ভবিষ্যতের জন্য) রেখে দিলাম। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْهَدْىِ
وَعَن جابرٍ قَالَ: كُنَّا لَا نَأْكُلُ مِنْ لُحُومِ بُدْنِنَا فَوْقَ ثَلَاثٍ فَرَخَّصَ لَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «كُلُوا وَتَزَوَّدُوا» . فَأَكَلْنَا وتزودنا
ব্যাখ্যা: জাবির (রাঃ)-এর হাদীসের ভাষ্য হলো, প্রথম পর্যায়ে তিন দিনের বেশি কুরবানীর গোশ্ত (গোসত/গোশত) খাওয়া নিষেধ ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে ছাড় দিয়ে বলেন, তোমরা খাও এবং পরবর্তীর জন্য জমা করে রাখ। এ বিষয়ে জাবির (রাঃ) ছাড়াও আরো অন্য সাহাবী থেকে হাদীস রয়েছে যা এ বিষয় প্রমাণ করে যে, তিন দিনের পরেও গোশ্ত (গোসত/গোশত) গচ্ছিত রাখা যায়। কাযী ‘ইয়ায (রহঃ) বলেন, এ হাদীসগুলো গ্রহণের ব্যাপারে ‘উলামাগণের মাঝে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়েছে। একদলের বক্তব্য হলঃ কুরবানীর গোশ্ত (গোসত/গোশত) জমা করে রাখা বা তিন দিনের পরে খাওয়া হারাম। আর এ হারামের বিধান এখন পর্যন্ত অবশিষ্ট রয়েছে। যেমনটি ‘আলী এবং ইবনু ‘উমার (রাঃ) বলেছেন। জমহূরের মতে, তিন দিনের পরে খাওয়া এবং পরবর্তীর জন্য জমা করে রাখা বৈধ। আর এ বিষয়ে বর্ণিত নিষেধাজ্ঞাটি জাবির, বুরায়দাহ্, ইবনু মাস্‘ঊদ, কাতাদা বিন নু‘মানসহ আরো অন্যান্য সাহাবীদের থেকে বর্ণিত হাদীসের মাধ্যমে মানসূখ হয়ে গেছে।
(কাযী বলেন) আর এটি হলো হাদীসের দ্বারা হাদীস মানসূখের পর্যায়ভুক্ত। আবার কারো কারো মতে, এটি মূলত মানসূখ নয় বরং হারামটি ছিল একটি বিশেষ কারণে। তাই যখন সে কারণ দূরীভূত হয়ে গেছে তখন হারামের বিধানও উঠে গেছে। সে কারণটি হল, (মদীনায়) ইসলামের প্রাথমিক সময়ে অভাব দেখা দেয়ায় এ বিষয়ে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল। অতঃপর যখন সে অবস্থার অবসান ঘটল তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদের তিন দিনের পরেও তা খাওয়ার এবং পরবর্তীর জন্য জমা করে রাখার নির্দেশ দিলেন। যেমনটি এ বিষয়ে মুসলিমে বর্ণিত ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর হাদীসটি সুস্পষ্ট বর্ণনা। তবে সঠিক কথা হলো জমহূরের বক্তব্য, অর্থাৎ- নিষেধাজ্ঞাটি মুত্বলাক্বভাবে (সাধারণভাবে) মানসূখ। হারাম বা কারাহাত কোনটিই অবশিষ্ট আর নেই। ফলে তিন দিনের পরেও খাওয়া এবং জমা করে রাখা বৈধ।
ইবনু কুদামাহ্ (রহঃ) বলেন, প্রায় সকল আহলে ‘ইলমদের ভাষ্যমতে তিন দিনের অধিক জমা করে রাখা বৈধ। তবে ‘আলী এবং ইবনু ‘উমার (রাঃ)-এর বৈধতা দেননি। যেহেতু নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর থেকে নিষেধ করেছেন। আর আমাদের পক্ষে দলীল মুসলিমে বর্ণিত নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উক্তি আমি তোমাদেরকে তিনদিনের অধিক কুরবানীর গোশ্ত (গোসত/গোশত) জমা রাখতে নিষেধ করেছিলাম। তবে এখন তোমরা যতদিন খুশি জমা করে রাখতে পারো। ইমাম আহমাদ (রহঃ) বলেন, এ বিষয়ে সহীহ সনদে বর্ণিত অনেক হাদীস রয়েছে। আর ‘আলী এবং ইবনু ‘উমার (রাঃ)-এর বিষয়টি হলো তাদের নিকট রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছাড়ের বিষয়টি পৌঁছেনি। তারা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিষেধ করতে শুনেছিলেন ফলে তারা যা শ্রবণ করেছেন তাই বর্ণনা করেছেন।
হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) ফাতহুল বারীতে বলেন, ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ) বলেছেন, সম্ভবত ‘আলী (রাঃ)-এর নিকট মানসূখের বিষয়টি পৌঁছেনি। আবার অন্যরা বলেছেন, এ সম্ভবনাও রয়েছে যে, ‘আলী (রাঃ) যে সময়ে এ কথাটি বলেছেন সে সময়ে মানুষের প্রয়োজন ছিল যেমনটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে ঘটেছিল। ইমাম ইবনু হাযম এ বিষয়টিকে অকাট্য বলে বর্ণনা করেছেন। এটি কোন বছরে নিষেধ করা হয়েছিল এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন, পঞ্চম হিজরীতে। আবার কেউ বলেন, নবম হিজরীতে নিষেধ করা হয়েছিল আর দশম হিজরীতে রুখসাত (ছাড়) দেয়া হয়েছিল। তবে শেষের বক্তব্যটিই সঠিক যা বিভিন্ন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - কুরবানীর পশুর বর্ণনা
২৬৪০-[১৪] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুদায়বিয়ার সন্ধির বছর নিজের কুরবানীর পশুগুলোর মধ্যে আবূ জাহল-এর একটি উটকেও কুরবানীর পশু হিসেবে মক্কায় পাঠিয়েছিলেন। এর নাকে ছিল একটি রূপার নথ বা বলয়। অপর বর্ণনায় আছে, সোনার বলয় ছিল। এটি দ্বারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুশরিকদের মনে ক্ষোভের সঞ্চার করতে চেয়েছিলেন। (আবূ দাঊদ)[1]
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَهْدَى عَامَ الْحُدَيْبِيَةِ فِي هَدَايَا رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جَمَلًا كَانَ لِأَبِي جَهْلٍ فِي رَأْسِهِ بُرَةٌ مِنْ فِضَّةٍ وَفِي رِوَايَةٍ مِنْ ذَهَبٍ يَغِيظُ بِذَلِكَ الْمُشْركين. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর হাদীসের ভাষ্য হলো, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুদায়বিয়ার বছরে যে সব জন্তু হাদী হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন তার অন্তর্ভুক্ত ছিল বদর যুদ্ধে নিহত আবূ জাহলের যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে প্রাপ্ত তার পুরুষ উটটি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ জন্তুটি এজন্য প্রেরণ করেছিলেন যাতে মুশরিকরা এটা দেখে ক্রোধান্বিত হয় বা রাগান্বিত হয়। এ হাদীস থেকে হাদীর ক্ষেত্রে পুরুষ উটও যে বৈধ এর দলীল পাওয়া যায় যার বৈধতার বিষয়ে অধিকাংশ আহলে ‘ইলমগণ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। ভাষ্যকার ‘আল্লামা উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী (রহঃ) বলেন, এ বিষয়ে ইমাম বায়হাক্বী (রহঃ) অধ্যায় বেঁধেছেন, (بَابُ جَوَازِ الذَّكَرِ وَالْأُنْثٰى فِى الْهَدَايَا) অর্থাৎ- হাদীর ক্ষেত্রে পুরুষ এবং নারী উভয় প্রাণীই বৈধ। আর ইবনু মাজাহ (রহঃ) অধ্যায় বেঁধেছেন, (بَابُ الْهَدْىِ مِنَ الْإِنَاثِ وَالذُّكُوْرِ) অর্থাৎ- নর এবং মাদী প্রাণীর হাদীর অধ্যায়।
ইবনু কুদামাহ্ (রহঃ) বলেছেন, হাদীর ক্ষেত্রে নর এবং মাদী প্রাণী উভয়টিই সমান। ইবনুল মুসাইয়্যিব, ‘উমার বিন ‘আবদুল আযীয, মালিক, ‘আত্বা, এবং শামী প্রমুখ ব্যক্তিগণ নর উট হাদী প্রেরণের বিষয়ে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। আর ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি কাউকে এরূপ করতে দেখিনি। আমার নিকট পছন্দনীয় হল মাদী উট নাহর করা। তবে প্রথম মতটিই ভালো/উত্তম। কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, (بدن) বুদন তথা হাদীর জন্তুসমূহকে আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর নিদর্শন বানিয়েছি। তিনি এখানে নর বা মাদীর উল্লেখ করেননি। আর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকেও প্রমাণিত যে, তিনি আবূ জাহল-এর নর উটকে হাদী হিসেবে প্রেরণ করেছেন। কেননা, এ ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য হলো গোশ্ত (গোসত/গোশত)। আর নর উটের গোশত বেশি এবং মাদীর গোশত তাজা। ফলে দু’টি সমান।
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - কুরবানীর পশুর বর্ণনা
২৬৪১-[১৫] নাজিয়াহ্ আল খুযা’ঈ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল! যে কুরবানীর পশু পথে অচল ও অপারগ হয়ে পড়বে, তার ক্ষেত্রে আমি কি করবো? জবাবে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, একে কুরবানী করে ফেলবে। তবে তার মালার জুতা এর রক্তে ডুবিয়ে (কুঁজের পাশে রেখে) দিবে। অতঃপর এ কুরবানী করা পশুকে মানুষের মাঝে রেখে যাবে। (গরীবেরা) লোকেরা তা খাবে। (মালিক, তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ نَاجِيَةَ الْخُزَاعِيِّ قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ كَيْفَ أَصْنَعُ بِمَا عَطِبَ مِنَ الْبُدْنِ؟ قَالَ: «انْحَرْهَا ثُمَّ اغْمِسْ نَعْلَهَا فِي دَمِهَا ثُمَّ خَلِّ بَيْنَ النَّاسِ وَبَيْنَهَا فَيَأْكُلُونَهَا» . رَوَاهُ مَالك وَالتِّرْمِذِيّ وَابْن مَاجَه
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - কুরবানীর পশুর বর্ণনা
২৬৪২-[১৬] আবূ দাঊদ ও দারিমী (রহঃ) নাজিয়াহ্ আল আসলামী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন।[1]
وَرَوَاهُ أَبُو دَاوُد والدارمي عَن نَاجِية الْأَسْلَمِيّ
ব্যাখ্যা: হাদীসের ভাষ্য হলো সাহাবী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রশ্ন করলেন হাদীর যে প্রাণী ধ্বংসের উপক্রম হয়েছে সেটি আমি কি করব? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তুমি তাকে নাহর কর, অতঃপর তার গলায় ঝুলানো জুতাটা রক্তে ডুবিয়ে তা মানুষের মাঝে রেখে দাও, তারা তা খেয়ে ফেলুক।
ভাষ্যকার ‘উবায়দুল্লাহ (রহঃ) বলেন, অত্র হাদীসের (الذين يتبعون القافلة) দ্বারা উদ্দেশ্য কি তা নিয়ে মতভেদ আছে। ইমাম মালিক-এর মতে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য বন্ধুশ্রেণী ও অন্যান্যদের মধ্য হতে যারা ধনী এবং গরীব। হানাফীদের মতে, এর দ্বারা শুধু দরিদ্ররা উদ্দেশ্য চাই তারা ঘনিষ্ঠ বন্ধু হোক বা অন্যদের থেকে হোক। আর শাফি‘ঈ ও হাম্বালীদের মতে, এর দ্বারা দরিদ্ররাই উদ্দেশ্য, তবে তারা হাদীর মালিকের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে না আর এ মতটিই আমাদের নিকট প্রণিধানযোগ্য। যেহেতু ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর হাদীসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তার থেকে তুমি এবং তোমার বন্ধুরা খাবে না।
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - কুরবানীর পশুর বর্ণনা
২৬৪৩-[১৭] ’আব্দুল্লাহ ইবনু কুরত্ব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অবশ্যই কুরবানীর দিন আল্লাহর নিকট সবচেয়ে মহান দিন। অতঃপর ’ক্বার্’-এর দিন। সাওর বলেন, তা কুরবানীর দ্বিতীয় দিন। রাবী (’আব্দুল্লাহ) বলেন, (ঐ দিনে) পাঁচ বা ছয়টি উট রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট পেশ করা হলো। আর উটগুলো নিজেদেরকে তাঁর নিকট এজন্য পেশ করতে লাগল যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আগে কোনটি কুরবানী করবেন। রাবী (’আবদুল্লাহ) বলেন, উটগুলো যখন মাটিতে শুইয়ে গেলো, তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিম্নস্বরে একটা কথা বললেন যা আমরা বুঝতে পারলাম না। আমি নিকটস্থ একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কি বললেন? সে ব্যক্তি বললো, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, যার ইচ্ছা হয় তা কেটে নিতে পারে। [আবূ দাঊদ; এ ব্যাপারে ইবনু ’আব্বাস ও জাবির (রাঃ) বর্ণিত দু’টি হাদীস বাবুল উযহিয়্যাহ্ বা কুরবানীর অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে][1]
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ قُرْطٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّ أَعْظَمَ الْأَيَّامِ عِنْدَ اللَّهِ يَوْمُ النَّحْرِ ثُمَّ يَوْمُ الْقَرِّ» . قَالَ ثَوْرٌ: وَهُوَ الْيَوْمُ الثَّانِي. قَالَ: وَقُرِّبَ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَدَنَاتٌ خَمْسٌ أَوْ سِتٌّ فطفِقْن يَزْدَلفْنَ إِليهِ بأيتهِنَّ يبدأُ قَالَ: فَلَمَّا وَجَبَتْ جُنُوبُهَا. قَالَ فَتَكَلَّمَ بِكَلِمَةٍ خَفِيَّةٍ لَمْ أَفْهَمْهَا فَقُلْتُ: مَا قَالَ؟ قَالَ: «مَنْ شَاءَ اقْتَطَعَ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَذَكَرَ حَدِيثَا ابنِ عبَّاسٍ وجابرٍ فِي بَاب الْأُضْحِية
ব্যাখ্যা: হাদীসের ভাষ্য হলো, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলছেনঃ আল্লাহ তা‘আলার নিকট সবচেয়ে মহান দিন হল কুরবানীর দিন। তবে এ হাদীসটি অন্যান্য সহীহ হাদীসে বর্ণিত ‘আরাফার দিনের শ্রেষ্ঠত্বের যে বিষয়টি এসেছে তার বিপরীত নয়, ফলে (إِنَّ أَعْظَمَ الْأَيَّامِ) দ্বারা উদ্দেশ্য হবে কুরবানী এবং তাশরীকের দিনসমূহ। কেননা দিনের শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়টি আপেক্ষিক এবং বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে হয়। তাছাড়া সবচেয়ে শ্রেষ্ঠতম দিন রমাযানের শেষ দশক। কুরবানীর প্রথম দিন শ্রেষ্ঠ হওয়ার কারণ হলো সেটি সবচেয়ে বড় ঈদের দিন এবং এ দিনে হজ্জের সবচেয়ে বড় কর্মগুলো সম্পাদিত হয়। এমনকি আল্লাহ তা‘আলা এটি সবচেয়ে বড় হজ্জের দিন বলে অবহিত করেছেন।
হাদীসের শেষাংশে উটগুলোর নাহর হওয়ার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটবর্তী হওয়ার যে বর্ণনা এসেছে তা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুস্পষ্ট মু‘জিযার অন্তর্ভুক্ত। খাত্ত্বাবী (রহঃ) বলেছেন, এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, জনসাধারণকে হিবা করা বৈধ।
পরিচ্ছেদঃ ৭. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - কুরবানীর পশুর বর্ণনা
২৬৪৪-[১৮] সালামাহ্ ইবনুল আক্ওয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের মাঝে যে ব্যক্তি কুরবানী করে, তৃতীয় দিনের পর সকালেও যেন তার ঘরে কুরবানীর মাংসের কিয়দংশও অবশিষ্ট না থাকে। রাবী (সালামাহ্) বলেন, পরবর্তী বছর আসলে সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমরা গত বছর যা করেছি এ বছরও কি সেভাবে করবো? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, না; তোমরা খাও, অন্যদরকেও খাওয়াও এবং (যদি ইচ্ছা কর তবে) জমা করে রেখো। কারণ গত বছর তো মানুষ অভাব-অনটনের মধ্যে ছিল। আর তাই আমি চেয়েছিলাম, তোমরা তাদের সাহায্য করো। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
عَنْ سَلَمَةَ بْنِ الْأَكْوَعِ قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ «مَنْ ضَحَّى مِنْكُمْ فَلَا يُصْبِحَنَّ بَعْدَ ثَالِثَةٍ وَفِي بَيْتِهِ مِنْهُ شَيْءٌ» . فَلَمَّا كَانَ الْعَامُ الْمُقْبِلُ قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ نَفْعَلُ كَمَا فَعَلْنَا الْعَامَ الْمَاضِي؟ قَالَ: «كُلُوا وَأَطْعِمُوا وَادَّخِرُوا فَإِنَّ ذَلِكَ الْعَامَ كَانَ بِالنَّاسِ جَهْدٌ فَأَرَدْتُ أَنْ تُعِينُوا فِيهِمْ»
ব্যাখ্যা: নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষদের তিন দিনের বেশি কুরবানীর গোশ্ত (গোসত/গোশত) জমা করে রাখতে নিষেধ করেছেন, কারণ সে বছর দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়ায় মদীনার আশেপাশের গ্রাম্য লোকেরা মদীনায় এসে আশ্রয় নিলে তিনি তাদেরকে সহযোগিতার উদ্দেশে এ আদেশ দিলেন। পরবর্তী বছর মানুষেরা এ বিষয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উত্তরে বললেন, সে হুকুম দুর্ভিক্ষের কারণে ছিল বরং তোমরা নিজেরা খাও, অপরকে খাওয়াও এবং পরবর্তীর জন্য জমা করে রাখ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উক্তি (كُلُوْا) (তোমরা খাও) টি আমরের (আদেশসূচক) বাক্য। হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, যারা বলেন যে কুরবানীর গোশ্ত (গোসত/গোশত) থেকে খাওয়া আবশ্যক তারা এটিকে নিজেদের দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছে। তবে এতে তাদের পক্ষের দলীল নেই। কারণ যখন আমরের সীগাহ্ হাযর বা নিষেধসূচক বাক্যের পরে আসবে তখন তা মুবাহের অর্থ দিবে। ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেন, কুরবানীর গোশত (গোসত/গোশত) থেকে খাওয়া মুস্তাহাব। আর জমহূর ‘আলিমগণ এ ‘আমলটিকে মানদূব বা মুবাহের অর্থে গ্রহণ করেছেন।
খাত্ত্বাবী (রহঃ) বলেন, মুত্বলাক্ব হাদীসসমূহ প্রমাণ করে যে, কুরবানীর গোশত খাওয়ার পরিমাণের ক্ষেত্রে কোন সীমাবদ্ধতা নেই। আর কুরবানী দাতার জন্য কুরবানীর গোশতের কিছু অংশ খাওয়া আর বাকীটুকু সাদাকা এবং হাদিয়্যাহ্ করা মুস্তাহাব।
ইমাম শাফি‘ঈর বর্ণনা হলো কুরবানীর গোশতকে তিন ভাগে বিভক্ত করা মুস্তাহাব। যেহেতু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা নিজেরা খাও, অপরকে খাওয়াও আর সাদাকা কর। ইবনু ‘আবদুল বার (রহঃ) বলেছেন, ইমাম শাফি‘ঈ ছাড়া অন্যরা বলতেন অর্ধেক নিজে খাওয়া আর বাকী অর্ধেক অপরকে খাওয়ানো মুস্তাহাব। ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেন, জমহূরের মত হলো কুরবানীর গোশত থেকে খাওয়া আবশ্যক নয়। এ ক্ষেত্রে আদেশটি অনুমতির জন্য। আর তার থেকে সাদাকা করার বিষয়ে সঠিক বক্তব্য হলো যতটুকু করলে সাদাকা বুঝাবে ততটুকু করা আবশ্যক। তবে বেশি অংশ সাদাকা করাই উত্তম। ইবনু হাযম (রহঃ) তার ‘মুহাল্লা’ নামক গ্রন্থে বলেন, প্রত্যেক কুরবানীদাতার ওপর আবশ্যক হলো, সে তার কুরবানীর গোশত হতে এক লোকমা হলেও খাবে এবং কম হোক বা বেশি হোক সাদাকা করবে। তবে তার থেকে ধনী, কাফিরদের খাওয়ানো এবং উপঢৌকন দেয়া মুবাহ।
ইবনু কুদামাহ্ (রহঃ) তাঁর ‘‘আল মুগনী’’ নামক গ্রন্থে বলেন, ইমাম আহমাদ (রহঃ) বলেছেন, আমরা ‘আব্দুল্লাহ বিন মাস্‘ঊদ (রাঃ)-এর হাদীসকে গ্রহণ করব। যেখানে বর্ণিত আছে কুরবানীদাতা এক তৃতীয়াংশ খাবে। এক তৃতীয়াংশ যাকে খুশি খাওয়াবে, আর এক তৃতীয়াংশ মিসকীনদের সাদাকা করবে। ‘আলক্বমাহ্ (রহঃ) বলেন, ‘আব্দুল্লাহ বিন মাস্‘ঊদ (রাঃ) আমাকে একটি হাদীয়াহ দিয়ে প্রেরণ করে বললেন, যেন আমি এক তৃতীয়াংশ খাই, এক তৃতীয়াংশ তার ভাই ‘উতবাহ্’র পরিবারে প্রেরণ করি আর বাকী এক-তৃতীয়াংশ সাদাকা করি। ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ কুরবানী এবং হাদীর গোশতের এক তৃতীয়াংশ তোমার, এক তৃতীয়াংশ তোমার পরিবারের আর এক তৃতীয়াংশ মিসকীনদের। আদ্ দুররুল মুখতারের লেখক বলেন, কুরবানীর গোশত থেকে খাবে, ধনীদের খাওয়াবে এবং জমা করে রাখবে তবে সাদাকা এক-তৃতীয়াংশের কম না হওয়ায় ভাল।
ভাষ্যকার ‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী (রহঃ) বলেন, ‘উলামাহগণ فَكُلُوْا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسَ الْفَقِيْرَ (সূরা আল হজ্জ/হজ ২২ : ২৮) আয়াতে খাওয়ার যে আদেশ দেয়া হয়েছে তার হুকুম নিয়ে মতবিরোধ করেছেন যে, তা ওয়াজিব না মুস্তাহাব। জমহূরের মতে, আয়াতদ্বয়ে ‘আমর বা খাওয়ার আদেশ দ্বারা উদ্দেশ্য মুস্তাহাব, ওয়াজিব নয়। ইবনু কাসীর, ইবনু জারীর এবং কুরতুবী (রহঃ) সকলেই তাদের তাফসীরে আয়াতদ্বয়ের আমরের দ্বারা মুস্তাহাব উদ্দেশ্য এই তাফসীর করেছেন। ইবনু কাসীর (রহঃ) বলেন, খাওয়া আবশ্যক এ বক্তব্যটি বিরল।
পরিচ্ছেদঃ ৭. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - কুরবানীর পশুর বর্ণনা
২৬৪৫-[১৯] নুবায়শাহ্ আল হুযালী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (বিগত বছর) আমি তোমাদেরকে তিন দিনের বেশি কুরবানীর মাংস (গোসত/মাংস) রেখে খেতে নিষেধ করেছিলাম যাতে তোমাদের সকলকে শামিল করে। এ বছর আল্লাহ তা’আলা স্বচ্ছলতা দান করেছেন। সুতরাং এ বছর তোমরা খাও ও জমা রাখো এবং (দান করে) সাওয়াব হাসিল করো। তবে জেনে রাখো, (ঈদের) এ দিনগুলো হলো খাবার দাবার ও আল্লাহর যিকিরের দিন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ نُبَيْشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم: «إِن كُنَّا نهينَا عَنْ لُحُومِهَا أَنْ تَأْكُلُوهَا فَوْقَ ثَلَاثٍ لِكَيْ تسَعْكم. جاءَ اللَّهُ بالسَّعَةِ فكُلوا وادَّخِرُوا وأْتَجِروا. أَلَا وَإِنَّ هَذِهِ الْأَيَّامَ أَيَّامُ أَكْلٍ وَشُرْبٍ وذِكْرِ اللَّهِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: হাদীসের বক্তব্য হলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমাদেরকে কুরবানী গোশ্ত (গোসত/গোশত) তিন দিনের অধিক খেতে নিষেধ করা হয়েছিল যাতে যারা কুরবানী দিয়েছে আর যারা দিতে পারেনি সকলেই এর গোশ্ত (গোসত/গোশত) পায়। আল্লাহ তা‘আলা এখন প্রশস্ততা দিয়েছেন তাই তোমরা তা খাও, জমা করে রাখ এবং সাদাকা করার মাধ্যমে সাওয়াব অন্বেষণ কর, অর্থাৎ- সাদাকা কর। জেনে রাখ, তাশরীক্বের দিনসমূহ (যিলহজ্জ মাসের ১১, ১২ ও ১৩) খাওয়া, পান করা এবং আল্লাহর স্মরণের দিন। তাই এ দিনসমূহে সিয়াম পালন করা বৈধ নয়। এর কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে ‘আলী (রাঃ) বলেছেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষেরা আল্লাহর সাক্ষাতের জন্য আগমন করে এবং তারা এ দিনসমূহে তার আতিথেয়তায় থাকে। আর কোন মেহমানের জন্য মেজবানের অনুমতি ব্যতীত সিয়াম পালন করা ঠিক নয়। ইমাম বায়হাক্বী আসারটি মাক্ববুল সনদে বর্ণনা করেছেন।
অন্য একদল লোকেরা বলেছেন, এর রহস্য হলো আল্লাহ তা‘আলা তার বান্দাদেরকে তার গৃহ পরিদর্শনের আহবান জানালেন, তারা তার ডাকে সাড়া দিল এবং প্রত্যেকে তার সাধ্যানুপাতে হাদী নিয়ে এসে সেগুলো কুরবানী করলে তিনি তাদের সে কুরবানী কবূল করে তাদের জন্য তিন দিনের আতিথেয়তা বরাদ্দ করলেন যে দিনগুলোতে তারা খাবে এবং পান করবে। আর রাজা বাদশাদের নিয়ম হলো তারা যখন অতিথিয়তা করে তখন গৃহের অভ্যন্তরের লোকদের যেমন খাওয়ায় তেমনভাবে দ্বারে দন্ডায়মান লোকদেরও ভক্ষণ করায়। কাবা হল গৃহ আর সমগ্র বিশ্বের প্রান্তগুলো গৃহের দ্বার। ফলে আল্লাহ তা‘আলা তার আতিথেয়তায় সকলকে অন্তর্ভুক্ত করে এ দিনগুলোর সিয়াম পালনে বারণ করেছেন। ‘আল্লামা যুরক্বানী বলেন, এখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদ্য পানীয়ের পরে আল্লাহর যিকিরের বিষয়টি নিয়ে এসেছেন এজন্য যে, যাতে বান্দারা নিজেদের অংশ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে আল্লাহর হাক্ব ভুলে না যায়।
ইমাম খাত্ত্বাবী (রহঃ) বলেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উক্তি (أَيَّامُ أَكْلٍ وَشُرْبٍ) প্রমাণ করে যে, তাশরীকের দিনসমূহে সিয়াম পালন করা ঠিক নয়। কারণ তিনি এ দিনসমূহকে চিহ্নিত করেছেন খাওয়া এবং পান করার দ্বারা যেমনিভাবে ঈদের দিনকে সিয়াম ভঙ্গের দ্বারা চিহ্নিত করেছেন এবং সেদিন সিয়াম পালন বৈধতা দেননি। ঠিক অনুরূপ তাশরীকের দিনসমূহ সিয়াম পালন বৈধ নয়। চাই তা নফল সিয়াম হোক বা মানতের সিয়াম হোক বা তামাত্তু' হজ্জ/হজকারীর সিয়াম হোক।
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - মাথার চুল মুণ্ডন করার প্রসঙ্গে
এ অধ্যায়ে ছয়টি বিষয়ের আলোচনা রয়েছে ইমাম বাজী মুয়াত্ত্বার ব্যাখ্যায় যার বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
প্রথমত حَلْقُ (হলক) বা মাথা মুন্ডানোর হুকুম। দ্বিতীয়ত এর নিয়মাবলী। তৃতীয়ত এর স্থান। চতুর্থত এর সময়। পঞ্চমত এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিধানাবলী। ষষ্ঠত এটি কি নুসুক্ব (বিধানাবলী) না ইহরাম থেকে মুক্ত হওয়া।
’আয়নী (রহঃ) বলেন, আমাদের শায়খ যায়নুদ্দীন আল ’ইরাকী তিরমিযীর ব্যাখ্যায় বলেছেন, হলক বা মাথা মুন্ডানো হলো হজের একটি অন্যতম কাজ। ইমাম নাবাবী (রহঃ) এটিই বলেছেন। এটিই অধিকাংশ আহলে ’ইলমের মত এবং ইমাম শাফি’ঈর সঠিক অভিমত। তবে এ বিষয়ে পাঁচ ধরনের বক্তব্য রয়েছে যার মধ্যে সবচেয়ে সঠিক বক্তব্য হলো এটি হজ্জ/হজ এবং ’উমরার একটি রুকন যা ব্যতীত হজ্জ/হজ এবং ’উমরা বিশুদ্ধ হবে না।
সহীহ মুসলিমের ভাষ্যকার ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেন, আমাদের প্রসিদ্ধ অভিমত হলো হলক (মাথা মুন্ডানো) বা ক্বসর (চুল খাটো করা) হজের এবং ’উমরার কাজ এবং উভয়ের রুকনসমূহের মাঝে একটি অন্যতম রুকন যা ব্যতীত হজ্জ/হজ এবং ’উমরা সম্পূর্ণ হবে না। সকল ’উলামা এ অভিমতই ব্যক্ত করেছেন।
ইমাম বুখারী (রহঃ) সহীহুল বুখারীতে অধ্যায় রচনা করেছেন,(بَابُ الْحَلْقِ وَالتَّقْصِيْرِ عِنْدَ الْإِحْلَالِ) (ইহরাম থেকে মুক্ত হওয়ার সময় মাথা মুন্ডানো এবং মাথার চুল খাটো করা) ইবনু মুনযীর তার হাশিয়াতে বলেছেন, ইমাম বুখারী এ অধ্যায় রচনার দ্বারা বুঝিয়েছেন যে, মাথা মুন্ডানো নুসুক্ব বা হজের এবং ’উমরার কাজ। যেমন ইমাম বুখারী (রহঃ) এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথা মুণ্ডনকারীর জন্য যে দু’আ করেছেন তার দ্বারা দলীল পেশ করেছেন। দু’আ তো সাওয়াবের ইঙ্গিতবাহী। আর ’ইবাদাতের জন্য সাওয়াব পাওয়া যায় মুবাহ কাজের জন্য নয়। অনুরূপ তার হলককে তাক্বসীরের উপর প্রাধান্য দানটি এ বিষয়ের ইঙ্গিতবাহী। কেননা মুবাহ কর্মের একটির উপর অপরটিকে প্রাধান্য দেয়া হয় না।
হলক তথা মাথা মুন্ডানো যে নুসুক্ব তথা হজ্জ/হজ এবং ’উমরার একটি অত্যাবশ্যকীয় কর্ম এটি জমহূরের বক্তব্য। এ বিষয়ে তারা কুরআন এবং সুন্নাহ থেকে বেশ কিছু দলীল প্রদান করে এর প্রমাণ করেছেন যে, তা নুসুক্ব।
২৬৪৬-[১] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর কিছু সাহাবী বিদায় হজে মাথা মুণ্ডন করেছিলেন। আবার (সাহাবীগণের) কেউ কেউ মাথার চুল ছেটে (ছোট করে) ছিলেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْحَلْقِ
عَنِ ابْنِ عُمَرَ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَلَقَ رَأْسَهُ فِي حَجَّةِ الْوَدَاعِ وَأُنَاسٌ مِنْ أَصْحَابِهِ وَقَصَّرَ بَعْضُهُمْ
ব্যাখ্যা: হাদীসের ভাষ্য হলো বিদায় হজ্জে তার মাথা মুন্ডিয়েছেন এবং তার কিছু সাহাবীও প্রথমত তার অনুসরণ করণার্থে, দ্বিতীয়ত তিনি মাথা মুণ্ডনকারীদের জন্য দুইবার বা তিনবার যে দু‘আ করেছেন সে দু‘আর বারাকাত লাভের উদ্দেশে মাথা মুণ্ডন করেছেন। আর কতিপয় সাহাবী তিনি মাথার চুল খাটো করার যে ছাড় দিয়েছেন তা গ্রহণার্থে মাথার চুল ছোট করেছেন। যেহেতু তিনি শেষের বার যারা মাথার চুল ছোট করে তাদের জন্যও দু‘আ করেছেন। যে সাহাবী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাথা মুন্ডিয়ে দিয়েছিলেন সঠিক মতানুসারে তিনি হলেন মা‘মার বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন নাযলাহ্। আর যিনি হুদায়বিয়ার সময় তার মাথা মুন্ডিয়ে ছিলেন তিনি হলেন খারাশ বিন উমাইয়্যাহ্ আল খুযা‘ঈ।
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - মাথার চুল মুণ্ডন করার প্রসঙ্গে
২৬৪৭-[২] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মু’আবিয়াহ্(রাঃ) আমাকে বলেছেন, আমি মারওয়ার কাছে কাঁচি দিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাথার চুল ছেঁটেছি। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْحَلْقِ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ لِي مُعَاوِيَةُ: إِنِّي قَصَّرْتُ مِنْ رَأْسِ النَّبِيِّ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم عِنْد الْمَرْوَة بمشقص
ব্যাখ্যা: হাদীসের ভাষ্য হলো মু‘আবিয়াহ্ (রাঃ) ইবুন ‘আব্বাস (রাঃ) কে বললেন যে, তিনি মারওয়াতে কাঁচি দ্বারা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চুল ছোট করে দিয়েছেন। এ হাদীস দ্বারা ঐ সকল ব্যক্তিগণ দলীল পেশ করেছেন যারা মাথা মুন্ডানোর ন্যায় মাথার কিছু চুল ছোট করাকে যথেষ্ট মনে করেন। কেননা, (قَصَّرْتُ مِنْ رَأْسِ) বাহ্যিকভাবে কিছু অর্থ বোঝাচ্ছে। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো চুল ছোট করার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি না করা এমনভাবে যাতে চুলের গোড়া পর্যন্ত কেটে নেয়া হয়। এটি উদ্দেশ্য নয় যে, মাথার কিছু অংশ কেটে এবং কিছু অংশ ছেড়ে দিলেই যথেষ্ট হবে।
ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেন, এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, চুল শুধুমাত্র ছোট করাও বৈধ যদিও মাথা মুন্ডানো উত্তম। আর এ ক্ষেত্রে হজ্জ/হজ এবং ‘উমরা পালনকারী উভয়েই সমান। তবে তামাত্তু' হজ্জ/হজ পালনকারীর জন্য মুস্তাহাব হল ‘উমরাতে মাথার চুল ছোট করা আর হজ্জে মাথা মুন্ডানো যাতে হজ্জ/হজ মাথা মুন্ডানোটা দু’টি ‘ইবাদাতের মধ্যে যেটি পূর্ণাঙ্গ সেটির ক্ষেত্রে সংঘটিত হয়। ‘উমরা পালনকারী মারওয়াতে তার মাথার চুল ছোট করবে বা মাথা মুন্ডাবে যেহেতু সেটি তার হালাল হওয়ার স্থান। আর হজ্জ/হজ পালনকারী মিনা প্রান্তরে তার মাথা মুন্ডাবে বা মাথার চুল ছোট করবে। যেহেতু সেটি তার হালাল হওয়ার স্থান। অতঃপর এ হাদীসে একটি জটিলতা রয়েছে যে, মু‘আবিয়াহ্ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চুল ছোট করেছেন মর্মে যে সংবাদ দিয়েছেন তা হজ্জে ছিল, না ‘উমরায় ছিল। কারণ হজ্জে মাথা মুন্ডানো বা মাথার চুল ছোট করা হয়, মিনায় মারওয়ায় নয়। তাহলে তা ছিল ‘উমরায়। তবে তা কোন্ ‘উমরায় ছিল এ নিয়ে মুহাদ্দিসগণ মতবিরোধ করেছেন এবং প্রত্যেকে তার বক্তব্যের পিছনে দলীল দিয়েছেন। তবে সঠিক বক্তব্য হলো তা ছিল ‘উমরাতুল জি‘রানাহ্-তে যেমনটি ইমাম নাবাবী, ইমাম ত্ববারী ও ইমাম ইবনুল ক্বইয়্যিম (রহঃ) বলেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - মাথার চুল মুণ্ডন করার প্রসঙ্গে
২৬৪৮-[৩] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজে বলেছেনঃ হে আল্লাহ! যারা মাথার চুল মুন্ডিয়েছে তাদের ওপর তুমি রহমত করো। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! মাথা ছেঁটেছে যারা তাদের প্রতিও। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, হে আল্লাহ! যারা মাথার চুল মুন্ডিয়েছে তাদের প্রতি তুমি রহমত বর্ষণ করো। সাহাবীগণ করলেন, হে আল্লাহর রসূল! যারা মাতা ছেঁটেছে তাদের প্রতিও। এবার তৃতীয়বার তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, যারা মাথা ছেঁটেছে তাদের প্রতিও। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْحَلْقِ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ فِي حَجَّةِ الْوَدَاعِ: «اللَّهُمَّ ارْحَمِ الْمُحَلِّقِينَ» . قَالُوا: وَالْمُقَصِّرِينَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: «اللَّهُمَّ ارْحَمِ الْمُحَلِّقِينَ» . قَالُوا: وَالْمُقَصِّرِينَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: «وَالْمُقَصِّرِينَ»
ব্যাখ্যা: হাদীসের ভাষ্য হলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজ্জে বললেন, হে আল্লাহ! তুমি মাথা মুণ্ডনকারীদের প্রতি করুণা করুন। সাহাবীদের আরযের প্রেক্ষিতে তিনি তৃতীয় বা চতুর্থবার বললেন, মাথার চুল ছোটকারীদের প্রতিও করুণা করুন। কোন সময় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু‘আ করেছেন বিদায় হজ্জে নাকি হুদায়বিয়ায় এ নিয়ে ‘উলামাগণ মতবিরোধ করেছেন। যেহেতু এ বিষয়ে বর্ণিত বর্ণনাগুলোর মাঝে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়েছে। ইমাম ইবনু ‘আবদুল বার (রহঃ) বলেছেন, এটি হুদায়বিয়ার সময় হয়েছে। ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেছেন, বিশুদ্ধ বহুল প্রচলিত বক্তব্য হলো এটি বিদায় হজ্জে ছিল। কাযী ‘ইয়ায বলেন, এটি খুব দূরবর্তী বক্তব্য নয় যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটি উভয় স্থানেই বলেছেন। এ মতভেদের কারণ হলো, এক্ষেত্রে যে বর্ণনাগুলো এসেছে তার কিছুতে বিদায় হজ্জের কথা এসেছে আর কিছুতে হুদায়বিয়ার কথা এসেছে।
ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, উভয় স্থানে বলেছেন এ বক্তব্যটি সুনির্দিষ্ট। তবে উভয় স্থানে বলার কারণটি ভিন্ন। হুদায়বিয়ায় এ দু‘আ করেছেন, কারণ কাফিররা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবীদের মক্কায় প্রবেশে বাধা দিলে উভয় পক্ষের মাঝে এ মর্মে সন্ধি হয় যে, আগামী বছর তারা ‘উমরা করবে। ফলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের ইহরাম মুক্ত হওয়ার আদেশ দিলে তারা মনের দুঃখে তা থেকে বিরত থাকে। তখন উম্মু সালামাহ (রাঃ) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাদের পূর্বে নিজের মাথা মুণ্ডন করার পরামর্শ দিলে তিনি তাই করেন। অতঃপর তারা তার অনুসরণ করে ফলে কেউ মাথা মুণ্ডন করেন আবার কেউ মাথার চুল ছোট করেন। যেহেতু যারা মাথা মুণ্ডন করেছেন তারা তার আদেশ পালনে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে, তাই তাদের জন্য বেশি দু‘আ করেছেন আর যারা মাথার চুল ছোট করেছেন তারা একটু দ্বিধা করেছেন, তাই তাদের জন্য একবার হয়েছে।
আর বিদায় হজ্জে মাথা মুণ্ডনকারীদের জন্য বারবার দু‘আ করার কারণ সম্পর্কে ইবনুল আসীর ‘‘আন নিহায়াহ্’’ গ্রন্থে বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে হজ্জ/হজকারী অধিকাংশ সাহাবী সাথে হাদী বা কুরবানীর পশু আনেননি। অতঃপর যখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদেরকে হজ্জের নিয়্যাত বাতিল করে ইহরাম মুক্ত হয়ে মাথা মুন্ডানোর আদেশ দিলেন তখন তা তাদের উপর কঠিন হয়ে গেল। আর আনুগত্য ভিন্ন অন্য কোন পথ না থাকায় মাথার চুল ছোট করাটাই তাদের মনে অধিক হালকা মনে হল মাথা মুন্ডানোর চেয়ে, তাই অধিকাংশ সাহাবী মাথার চুল ছোট করলেন। আর আদেশ পালনে পরিপূর্ণ হওয়ায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথা মুণ্ডনকারীদের কাজকে প্রাধান্য দিলেন।
মাথার চুল মুণ্ডন বা ছোট করার পরিমাণ নিয়ে ‘উলামাগণ মতবিরোধ করেছেন। এ মর্মে ইমামদের বক্তব্যগুলো উল্লেখ করে ‘আল্লামা শানক্বীত্বী (রহঃ) বলেন, আমার নিকট সবচেয়ে শক্তিশালী বক্তব্য হলো মাথার চুল ছোট করার ক্ষেত্রে প্রতিটি চুল বেছে বেছে ছোট করা আবশ্যক নয়। কারণ এতে বড় ধরনের অসুবিধা রয়েছে। মাথার সকল প্রান্তের চুল ছোট করাই যথেষ্ট তবে মাথার একচতুর্থাংশ বা একতৃতীয়াংশ চুল ছোট করা যথেষ্ট নয় যেটি হানাফী ও শাফি‘ঈদের বক্তব্য। কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, رؤوسكم তিনি বলেননি যে, তোমাদের মাথার কিছু দিকের চুল মুণ্ডন কর।
আয়াতের বাহ্যিক অর্থ সমস্তটুকু মুন্ডানো বা সমস্তটাই ছোট করা। আর আয়াতের বাহ্যিক অর্থ থেকে দলীল ছাড়া অন্য অর্থ নেয়া বৈধ নয়। কেননা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সন্দেহজনক বিষয় ছেড়ে সন্দেহহীন বিষয়ে ধাবিত হও। হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, মাথা মুণ্ডন না করে চুল ছোট করাও যথেষ্ট বা বৈধ।
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - মাথার চুল মুণ্ডন করার প্রসঙ্গে
২৬৪৯-[৪] ইয়াহ্ইয়া ইবনু হুসায়ন তাঁর দাদী হতে বর্ণনা করেছেন। তাঁর দাদী বলেছেন, আমি বিদায় হজে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মাথার চুল মুণ্ডনকারীদের জন্য তিনবার এবং যারা ছেঁটেছেন তাদের জন্য একবার দু’আ করতে শুনেছি। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْحَلْقِ
وَعَن يحيى بن الْحصين عَن جدته أَنَّهَا سَمِعَتِ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي حَجَّةِ الْوَدَاعِ دَعَا لِلْمُحَلِّقِينَ ثَلَاثًا وَلِلْمُقَصِّرِينَ مرّة وَاحِدَة. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: (عَنْ جَدَّتِه) তিনি হলেন উম্মুল হুসায়ন বিনতু ইসহাক মহিলা সাহাবী। এখানে তার নাম উল্লেখ করা হয়নি। ইবনু ‘আবদুল বার (রাহঃ) বলেন, উম্মুল হুসায়ন বিনতু ইসহাক-এর নিকট থেকে তারই নাতি ইয়াহ্ইয়া বিন হুসায়ন ও আল ‘আয়যার বিন হারিস হাদীস বর্ণনা করেছেন এবং তিনি বিদায় হজ্জে উপস্থিত ছিলেন। হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী বলেন, ইবনু ‘আবদুল বার এ মহিলা সাহাবীর পিতার নাম উল্লেখ করেছেন ‘‘ইসহাক’’। আমিও তাই মনে করি। আর তার থেকে আল ‘আয়যার বিন হারিস-এর বর্ণনা করার বিষয়টি ইবনু মানদূহ (রহঃ)-এর নিকট প্রমাণিত। এমনকি ইমাম আহমাদ-এর নিকটও প্রমাণিত। তবে সেখানে ত্বরিক বিন ইউনুস-এর মধ্যস্থতা বিদ্যমান। (আহমাদ ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪০২)
এ পর্যায়ে আল ‘আয়যার ইবনু হারিস এর বর্ণনাটি নিম্নে উল্লেখ করছিঃ তিনি বলেন, আমি উম্মুল হুসায়ন বিনতু ইসহাককে বলতে শুনেছি। তিনি (উম্মুল হুসায়ন) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে চাদর গায়ে দেখেছি।
(أَنَّهَا سَمِعَتِ النَّبِىَّ ﷺ فِىْ حَجَّةِ الْوَدَاعِ) হাদীসের এ অংশটুকু প্রমাণ করছে যে, উম্মুল হুসায়ন (রাঃ) বিদায় হজ্জে উপস্থিত ছিলেন। অপরদিকে মাথা মুণ্ডনকারীদের জন্য তিনবার আর চুল খাটোকারীদের জন্য একবার দু‘আর সময়টি ছিল ‘‘হাজ্জাতুল ওয়াদা’’ তথা বিদায় হজ্জের সময়।
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - মাথার চুল মুণ্ডন করার প্রসঙ্গে
২৬৫০-[৫] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিনায় পৌঁছে প্রথমে জামারাতে গেলেন এবং কংকর মারলেন। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মিনায় উপস্থিত তাঁর তাবুতে এলেন এবং নিজের কুরবানীর পশুগুলো যাবাহ করলেন। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নাপিত ডেকে এনে তাঁর মাথার ডানদিক (তার দিকে) বাড়িয়ে দিলেন। নাপিত তা মুগুন করলো। তারপর তিনি আবূ তলহা আল আনসারীকে ডেকে এনে তা (চুলগুলো) দিলেন। এরপর (নাপিতের দিকে) মাথার বামদিক বাড়িয়ে দিলেন এবং বললেন, মুণ্ডন করো। সে তা মুণ্ডন করলো। এটাও তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মুন্ডিত চুল আবূ ত্বলহাহকে দিয়ে বললেন, যাও মানুষের মাঝে এগুলো বিলিয়ে দাও। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْحَلْقِ
وَعَنْ أَنَسٍ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَتَى مِنًى فَأَتَى الْجَمْرَةَ فَرَمَاهَا ثُمَّ أَتَى مَنْزِلَهُ بِمِنًى وَنَحَرَ نُسُكَهُ ثُمَّ دَعَا بِالْحَلَّاقِ وَنَاوَلَ الْحَالِقَ شِقَّهُ الْأَيْمَنَ ثُمَّ دَعَا أَبَا طَلْحَةَ الْأَنْصَارِيَّ فَأَعْطَاهُ إِيَّاهُ ثُمَّ نَاوَلَ الشِّقَّ الْأَيْسَرَ فَقَالَ «احْلِقْ» فَحَلَقَهُ فَأعْطَاهُ طَلْحَةَ فَقَالَ: «اقْسِمْهُ بَيْنَ النَّاسِ»
ব্যাখ্যা: (فَرَمَاهَا ثُمَّ أَتٰى مَنْزِلَه بِمِنًى) হাদীসের এ অংশটি দ্বারা বুঝা যায় যে, জামারায় ‘আক্বাবাতে ‘আসর আদায়ের পর সর্বপ্রথম কাজ হচ্ছে পাথর নিক্ষেপ করা আর এটা হচ্ছে মুস্তাহাব। অতঃপর তিনি মিনাতে নামবেন।
(وَنَحَرَ نُسُكَه) এবং তার কুরবানীর পশুটি কুরবানী দিবে। এখানে নুসুক দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সেই উট যে উটটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়ে এসেছিলেন কুরবানীর উদ্দেশে। অবশ্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে ৬৩টি কুরবানী দিয়ে অবশিষ্টগুলো কুরবানী করার জন্য ‘আলী (রাঃ)-কে আদেশ করেছেন সর্বমোট কুরবানীর সংখ্যা ছিল ১০০টি। হাদীসের এ অংশটি থেকে বুঝা যায়, মিনাতে কুরবানী দেয়া মুস্তাহাব (ভাল), তবে হারাম এলাকার যে কোন স্থানে কুরবানী দেয়া যায়। যেহেতু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (كل منى منحر وكل نجاج مكة منحر) মিনার প্রতিটি স্থানে ও মক্কার প্রতিটি গলি কুরবানীর স্থান হিসেবে বিবেচিত।
(ثُمَّ دَعَا بِالْحَلَّاقِ) অতঃপর তিনি মুণ্ডনকারীদেরকে ডাকলেন আর তার নাম ছিল মা‘মার বিন ‘আবদুল্লাহ আল ‘আদাবী। (وَنَاوَلَ الْحَالِقَ شِقَّهُ) এবং মাথা হালক্বকারী তার পার্শ্ব নাগালে নিয়ে আসলো। (الْأَيْمَنَ) ডান পার্শ্ব দেশ। অর্থাৎ- মাথা মুণ্ডনকারী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাথা ডান পার্শ্বদেশ হলক করে দিয়েছিলেন।
(فَحَلَقَه) হাদীসের এ অংশটি দ্বারা বুঝা যায় যে, মাথার ডান পাশ থেকে হলক করা মুস্তাহাব (ভাল) আর এটাই (জমহূর) অধিকাংশ ‘আলিমের মত। তবে ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) বলেন, বাম পাশের কথা।
‘আল্লামা ত্বীবী (রগঃ) বলেন, এ হাদীসই প্রমাণ করছে যে, ডান দিক থেকে হলক করা মুস্তাহাব। তবে কোন কোন ‘আলিম বলেন, বাম দিক থেকে হলক করাই মুস্তাহাব।
‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী বলেন, বাম দিক থেকে হলক করা উত্তম হওয়ার কারণ হলো যাতে করে হলককারী ডান দিক হয়। মূলত এ মতটি ইমাম আবূ হানীফার। ‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী হানাফী (রহঃ)-এর নয়। কারণ তিনি এ মত থেকে ফিরে এসেছেন। ঘটনাটি এমন যে, তিনি প্রথমে হলককারীর ডান দিকের কথা বিবেচনা করে বাম দিক থেকে মুন্ডানো শুরু করার কথা বলেছেন, কিন্তু যখন তিনি বুঝতে পারলেন যে, তার বুঝ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীসের সাথে বিপরীত হয়ে গেছে তখন হাদীস গ্রহণ করতঃ নিজের মত বর্জন করেছেন।
তবে মাথা মুন্ডনের সময় মুণ্ডনকারী মুণ্ডনকৃত ব্যক্তির পিছনে দাঁড়াবে তাহলে দু' জনের মাঝে সমন্বয় করা সম্ভব হয় এবং অত্র মাস্আলাতে দৃশ্যমান যে মতবিরোধ রয়েছে তা বিদূরিত হয়। আর যদি সমন্বয় অসম্ভব হয় তাহলে হাদীসে আনাস -কে কিয়াসের উপর প্রাধান্য দেয়া আবশ্যক।
ইবনু ‘আবিদীন তাঁর ‘রদ্দুল মুহতার’ কিতাবের ২য় খণ্ডে ২৪৯ পৃষ্ঠায় বলেন, হানাফী ‘আলিমরা মতামত দিয়েছেন যে, ডান বলতে এখানে মুণ্ডনকারীর ডানকে বুঝানো হয়েছে, যার মুণ্ডন করা হচ্ছে তার ডান এখানে উদ্দেশ্য নয়।
তবে সহীহায়নে বর্ণিত হাদীস এ মতের বিপরীত অর্থ বহন করছে। আর সে হাদীসটি হচ্ছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুন্ডনকারীকে বললেন, তুমি শুরু কর ডান পাশ থেকে, অতঃপর বাম পাশে করবে। এ হাদীসের সমর্থন করে হানাফী ‘আলিম ইবনুল হুমাম তার ‘‘আল ফাত্হ’’ কিতাবে বলেছেন, হ্যাঁ এটাই সঠিক যদিও তা আমাদের মাযহাবের খেলাফ।
(ثُمَّ دَعَا أَبَا طَلْحَةَ الْأَنْصَارِىَّ) আবূ তলহা আল আনসারী তিনি হলেন, উম্মু সালামার স্বামী আনাস এর যিনি মাতা এবং আনাস (রাঃ) হলেন অত্র হাদীসটির বর্ণনাকারী। আবূ ত্বলহার নাম হচ্ছে যায়দ বিন সাহল আন্ নাজারী।
‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী হানাফী (রহঃ) বলেন, আবূ তলহা এবং তার পরিবার-পরিজনের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্পর্ক অন্যান্যদের তুলনায় একটু বেশি ছিল। এত গভীর মুহাববাত সম্পর্ক তাদের মাঝে গড়ে উঠেছিল যা অন্যান্য মুহাজির আনসারদের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হয়নি।
ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেন, অত্র হাদীসটিতে শিক্ষণীয় নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়-
মুযদালাফাহ্ থেকে মিনায় ফিরে এসে কুরবানীর দিনে হজ্জের কার্যাবলী চারটি, যথাঃ
১. জামারায়ে ‘আক্বাবাতে কংকর নিক্ষেপ করা।
২. কুরবানী করা।
৩. মাথা মুন্ডানো অথবা চুল খাটো করা।
৪. মক্কায় প্রবেশ করা এবং তাওয়াফে ওয়াদা' তথা বিদায়ী তাওয়াফ করা। এগুলোর প্রত্যেকটিই অত্র হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে তাওয়াফে ইফাযাহ্ ব্যতীত।
এগুলো কাজের ক্ষেত্রে নিয়ম হলো তা করতে হবে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে। তবে যদি ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে না পারে তাহলে কোন অসুবিধা নেই। যেহেতু নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (افعل ولا حرج) ধারাবাহিকতা বজায় না রেখেও করতে পার কোন সমস্যা নেই।
অত্র হাদীসের আরো কয়েকটি উপকারিতা নিম্নরূপঃ
১. মানুষের চুল পাক আর এটাই জমহূর ‘উলামায়ে কিরামের অভিমত।
২. নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চুলের মাধ্যমে বারাকাত নেয়া বৈধ এবং বারাকাতের উদ্দেশে তা সংগ্রহ করা বৈধ।
৩. ইমাম অথবা নেতৃজনের উচিত অধীনস্থদের প্রতি কোন কিছু বণ্টনের সময়ে পরস্পর সহমর্মিতা বজায় রাখা।
৪. হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, (المواساة) তথা সহমর্মিতা المساواة-কে আবশ্যক করে না। অর্থাৎ- সহমর্মিতার অর্থ এটা নয় যে, উপঢৌকন বা হাদিয়্যাহ্ প্রাপ্তির দৃষ্টিকোণ থেকে সবাই সমান হাক্বদার হবে। এ ক্ষেত্রে কিছু বেশি কম হতে পারে।
৫. যারা দলের নেতৃত্ব দিবেন তাদেরকে একটু অতিরিক্ত কিছু দেয়া বৈধ।
৬. ‘আল্লামা ‘আয়নী (রহঃ) বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণ করে কেউ যদি মাথা মুণ্ডন করেন তাহলে তা সুন্নাত বা মুস্তাহাব বলে গণ্য হবে।
‘আল্লামা যুরক্বানী (রহঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার চুল সহাবায়ে কিরামের মাঝে এ জন্য বণ্টন করে দিয়েছিলেন যাতে করে তা তাদের জন্য বারাকাত বয়ে নিয়ে আসে এবং তারা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে স্মরণে রাখতে পারে। আর এটা যেন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মৃত্যুর সময় সন্নিকটের কথার প্রতি ইঙ্গিত করছে। আর আবূ তলহা (রাঃ)-কে বণ্টনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট করার কারণ হলো আবূ তলহা-ই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কবর খনন করেছিলেন।
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - মাথার চুল মুণ্ডন করার প্রসঙ্গে
২৬৫১-[৬] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ইহরাম বাঁধার আগে এবং কুরবানীর দিন বায়তুল্লাহ তাওয়াফের আগে এমন সুগন্ধি লাগিয়েছি যাতে মিশক (কস্ত্তরী) ছিল। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْحَلْقِ
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: كُنْتُ أُطَيِّبُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قِبَلَ أَنْ يُحْرِمَ وَيَوْمَ النَّحْرِ قَبْلَ أَنْ يَطُوفَ بِالْبَيْتِ بِطِيبٍ فِيهِ مِسْكٌ
ব্যাখ্যা: (كُنْتُ أُطَيِّبُ رَسُولِ اللّٰهِ ﷺ قِبَلَ أَنْ يُحْرِمَ) হাদীসের এ অংশটি থেকে বুঝা যায় যে, ইহরামের পূর্বে সুগন্ধি ব্যবহার শুধু বৈধই নয় বরং মুস্তাহাব। ইহরামের পরে সুগন্ধির রং, আলামাত (চিহ্ন) অবশিষ্ট থাকুক বা না থাকুক। এ মতই পেশ করেছেন ইমাম শাফি‘ঈ, আহমাদ, আবূ হানীফা, সাওরী (রহঃ) আর এটাই জমহূর ‘উলামায়ে কিরামের অভিমত। কিন্তু ইমাম মালিক (রহঃ) বলেছেন, ইহরামের সময় ইচ্ছা করলে সুগন্ধি ব্যবহার করা মাকরূহ যদি ইহরামের পরে তার চিহ্ন, দাগ ইত্যাদি বাকি থাকো। এ মতকে পছন্দ করেছেন মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান ও ইমাম ত্বহাবী (রহঃ)।
(وَيَوْمَ النَّحْرِ قَبْلَ أَنْ يَطُوفَ بِالْبَيْتِ) এখানে তাওয়াফ বলতে প্রথম হালাল যেটা মাথা হলকের মাধ্যমে হতে হয় সেই তাওয়াফে ইফাযাহ্ উদ্দেশ্য।
(مِسْكٌ) অত্র হাদীস থেকে বুঝা যায় তাওয়াফে ইফাযাহ্-এর পূর্বে এবং কংকর নিক্ষেপ, মাথা মুন্ডনের পরে সুগন্ধি ব্যবহার বৈধ। আর এ কথাই বলেছেন, ইমাম শাফি‘ঈ, আহমাদ ও আবূ হানীফা (রহঃ)। তবে ইমা মালিক এটাকে মাকরূহ বলেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - মাথার চুল মুণ্ডন করার প্রসঙ্গে
২৬৫২-[৭] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিন মক্কায় গিয়ে তাওয়াফে ইফাযাহ্ (তাওয়াফে যিয়ারা) করলেন। এরপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মিনায় ফিরে যুহরের সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করলেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْحَلْقِ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَفَاضَ يَوْمَ النَّحْرِ ثُمَّ رجعَ فصلّى الظهْرَ بمنى. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: (أَفَاضَ يَوْمَ النَّحْرِ) অর্থাৎ- নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কংকর নিক্ষেপ ও মাথা মুণ্ডন করার পর ফরয তাওয়াফ তবওয়াফে যিয়ারহ্ ও তাওয়াফে ইফাযাহ্ করেছেন সকালে, অতঃপর তিনি মিনা থেকে মক্কায় অবতরণ করেছেন।
(فَصَلَّى الظُّهْرَ بِمِنٰى) এখান থেকে পরিষ্কারভাবে বুঝা যায় যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফে ইফাযাহ্ করেছিলেন দুপুরে। আর মক্কা থেকে ফিরে আসার পর মিনায় সালাতে যুহর আদায় করেছেন। এ মতের সমর্থনে অপর একটি দীর্ঘ হাদীসও আছে যা জাবির (রাঃ) বর্ণনা করেছেন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হজ্জের বিষয় বর্ণনা প্রসঙ্গে। তবে সালাতের স্থান নিয়ে মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে এমনি একটি হাদীস রয়েছে যেমন বর্ণিত আছে,
ثم ركب رسول الله صلى الله عليه وسلم فافاض إلى البيت فصلى بمكة الظهر অর্থাৎ- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সওয়ারীতে আরোহণ করলেন, অতঃপর বায়তুল্লাহ গেলেন এবং মক্কায় সালাতে যুহর আদায় করলেন।
এখানে স্পষ্ট হলো যে, আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে দ্বিপ্রহরে মক্কা অভিমুখী হয়েছিলেন তা হচ্ছে ইয়াওমুন্ নাহরের দ্বিপ্রহরে এবং ইয়াওমুন্ নাহরের যুহর সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) তিনি মক্কায় আদায় করেছেন। তদ্রূপ ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেছেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াওমুন্ নাহরে তাওয়াফ করেছেন এবং সালাতুয্ যুহর আদায় করেছেন মক্কায়।
সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি, হাদীস দু’টিতে তাওয়াফের সময় নিয়ে কোন মতপার্থক্য নেই, মতপার্থক্য আছে শুধু সালাতের স্থান নিয়ে।
সালাতের স্থান সংক্রান্ত মতবিরোধের সমাধানঃ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুহরের সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) মক্কায় আদায় করেছেন যেমনটা বলেছেন জাবির (রাঃ) ও ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মিনায় প্রত্যাবর্তন করে সাহাবীদের নিয়ে পুনরায় সালাত আদায় করেছেন। যেমনি তিনি সাহাবীগণের নিয়ে সালাতুল খাওফ (শত্রুর ভয়ের মুহূর্তে যে সালাত আদায় করা হয়ে থাকে) আদায় করেছেন দু’বার।
প্রথমবার সাহাবীগণের একদল নিয়ে দ্বিতীয়বার সাহাবীগণের অপর দল নিয়ে বাতনে নাখলে। তাই, ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) ও জাবির (রাঃ) মক্কাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সালাত আদায় করতে দেখে তাই বর্ণনা করেছেন যা দেখেছেন তাই তারা সত্য বলেছেন আবার অপরদিকে ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মিনায় সালাত আদায় করতে দেখেছেন, তাই বর্ণনা করেছেন তিনিও সত্য বলেছেন। ইমাম নাবাবী (রহঃ) সহ অনেকেই উক্ত বিষয়টির সমাধান এভাবে পেশ করেছেন। তবে অপরদিকে কিছু কিছু ‘উলামায়ে কিরাম উপরোক্ত মত বিরোধপূর্ণ মাস্আলাটির সমাধানে অন্য পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। তাই তাদের কতকে একটি বর্ণনাকে অপরটির উপর অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
উপরোক্ত বর্ণনায় তো বুঝা গেল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুপুরে তাওয়াফ করেছেন কিন্তু অন্যান্য কিছু বর্ণনাতে আবার রাতের কথাও এসেছে। ইমাম বুখারী তাঁর সহীহাহ্-তে বলেন, আবুয্ যুবায়র ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে, ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) ইবনে ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, (أخر النبى صلى الله عليه وسلم الزيارة إلى الليل) অর্থাৎ- নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফকে রাত পর্যন্ত বিলম্ব করলেন।
এ কথা সর্বজনবিদিত যে, ইমাম বুখারীর তা‘লীক্ব সবই সহীহ প্রমাণিত। এতদসত্ত্বেও অত্র বর্ণনাটিকে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল, আবূ দাঊদ, তিরমিযী সহ অন্যান্যরা সুফিয়ান সাওরী আবুয্ যুবায়র-এর মাধ্যমে মুত্তাসিল সনদে বর্ণনা করেছেন। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রাতে তাওয়াফ করার বর্ণনাটি ‘আয়িশাহ্ (রাঃ), ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যা পূর্বোক্ত বর্ণনার সাথে সাংঘর্ষিক, যে বর্ণনাটি জাবির ও ইবনু ‘উমার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন।
এ মতবিরোধের অনেকগুলো সমাধান রয়েছে যার কয়েকটি নিম্নরূপঃ
নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফে যিয়ারহ্ করেছেন ইয়াওমুন্ নাহরের দিনে যেমনটি পাওয়া যায় জাবির, ‘আয়িশাহ্ ও ইবনু ‘উমার (রাঃ) এর বর্ণনায়। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় রাতে ফিরে এসেছেন, অতঃপর মিনায় ফিরে গিয়ে সেখানে রাতযাপন করেছেন। মিনার রাতগুলোতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মক্কা আগমনটাই ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) ও ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর উদ্দেশ্য।
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মাথার চুল মুণ্ডন করার প্রসঙ্গে
২৬৫৩-[৮] ’আলী ও ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তাঁরা উভয়ে বলেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদেরকে মাথার চুল মুড়াতে (মুন্ডন করতে) নিষেধ করেছেন। (তিরমিযী)[1]
عَنْ عَلِيٍّ وَعَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَا: نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَن تحلق الْمَرْأَة رَأسهَا. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মাথার চুল মুণ্ডন করার প্রসঙ্গে
২৬৫৪-[৯] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নারীদের জন্যে মাথা মুড়ানো নেই, তবে নারীদের জন্য রয়েছে মাথা ছাঁটানো। (আবূ দাঊদ ও দারিমী)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَيْسَ عَلَى النِّسَاءِ الْحَلْقُ إِنَّمَا عَلَى النِّسَاءِ التَّقْصِيرُ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالدَّارِمِيُّ
وَهَذَا الْبَابُ خَالٍ مِنَ الْفَصْلِ الثَّالِثِ
-
[বিঃ দ্রঃ এ অধ্যায়ে তৃতীয় অনুচ্ছেদ নেই (وَهٰذَا الْبَابُ خَالٍ مِنْ الْفَصْلِ الثَّالِثِ)]
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী (রহঃ) বলেছেন, মহিলাদের সাধারণত এবং বিশেষ করে ইহরাম থেকে হালাল হওয়ার পর বিশেষ কারণে মাথা মুন্ডনে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা তার মাথা হলক মুসলার সদৃশ এবং তা পুরুষের দাড়ি মুন্ডানো যেমন নাজায়িয অনুরূপ হুকুমের আওতাভুক্ত।
‘আল্লামা ‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী বলেন, হাদীসের বাহ্যিক দৃষ্টিতে বুঝা যায় মহিলাদেরকে সাধারণভাবেই যে কোন সময়ে মাথা হলক মুন্ডাতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে জরুরী কোন প্রয়োজন থাকলে তা ভিন্ন ব্যাপার। যদি তার মাথা হলক করা বৈধ হত জরুরী প্রয়োজন ব্যতীত, তাহলে হজ্জের ক্ষেত্রে অন্তত তা জায়িয থাকতো যেহেতু হজ্জে গিয়ে মাথা হলক করাও একটি ‘ইবাদাত যা পুরুষেরা করে থাকেন।
‘আল্লামা হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেছেন, কুরআনে কারীমে এবং হাদীসে রসূল বর্ণিত মাথার চুল খাটো করা বা মুণ্ডন করার ও খাটো করা মুণ্ডন অপেক্ষা উত্তমের বিষয়গুলো পুরুষের সাথে সম্পৃক্ত আর মহিলাদের ক্ষেত্রে সর্বসম্মতিক্রমে শারী‘আতসিদ্ধ হলো খাটো করা যা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
তিনি আরো বলেছেন, অধিকাংশ শাফি‘ঈ মতালম্বী ‘উলামার মত হলো মহিলারা যদি মাথার চুল হলক করে তাহলে তা বৈধ হবে তবে তা মাকরূহ হিসেবে পরিগণিত।
কাযী আবূ ত্বইয়্যিব ও কাযী হুসায়ন (রহঃ) বলেছেন, মহিলাদের মাথা মুন্ডানো বৈধ নয়।
ইবনু কুদামাহ্ (রহঃ) বলেছেন, মহিলাদের ক্ষেত্রে শারী‘আতসম্মত হলো মাথার চুল খাটো করা তারা মাথা হলক করতে পারবে না- এ বিষয়ে কোন মতবিরোধ নেই। ইবনুল মুনযীর (রহঃ) বলেন, ইবনু কুদামাহ্ (রহঃ)-এর যে মত আমারও তাই মত এবং সমস্ত আহলে ‘ইলমের মতও তাই। কারণ তাদের হলক করা মুসলার আওতাভুক্ত আর মুসলা অবৈধ। কেউ কেউ বলেছেন, মহিলারা এক আঙ্গুল পরিমাণ খাটো করবে।
ইমাম আবূ দাঊদ (রহঃ) বলেন, আমি শুনেছি ইমাম আহমাদ (রহঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছে যে, মহিলারা তাদের সমস্ত চুলই খাটো করবে? তিনি বলেছিলেন, হ্যাঁ তার চুলগুলোকে মাথার সম্মুখে নিয়ে আসবে তারপর চুলের অগ্রভাগকে এক আঙ্গুল পরিমাণ খাটো করবে।
‘আল্লামা শানক্বীতী (রহঃ) বলেন, জেনে রাখ, মাথা হলক করা চুল খাটো করার চেয়ে অপেক্ষাকৃত উত্তম এটা বলা হয়েছে বিশেষ করে পুরুষের ক্ষেত্রে আর মহিলাদের ওপর হলক নয় তাদের ক্ষেত্রে মাথার চুল এক আঙ্গুল পরিমাণ খাটো করলেই যথেষ্ট। কেননা মাথার চুল হল তার সৌন্দর্যের অন্তর্ভুক্ত। আবার বেশি পরিমাণে খাটো করাও নিষেধ।
তিনি আরো বলেন, নিম্নোক্ত পাঁচটি কারণে মহিলাদের মাথার চুল হলক করা নিষেধ।
১. তাদের মাথা হলক না করার ব্যাপারে সকল ‘আলিমদের ঐকমত্য পোষণ।
২. তাদের মাথা হলকের নিষেধাজ্ঞামূলক বর্ণিত হাদীসগুলো।
৩. আর এটা আমাদের ‘আমলের অন্তর্ভুক্ত না আর যারা আমাদের দীনের মধ্যে আমরা আদেশ দেইনি এমন কিছু করলো তারা আমাদের দলভুক্ত নয়।
৪. এটা পুরুষের সাথে সাদৃশ্য রাখার শামিল।
৫. এটা হচ্ছে অঙ্গ বিকৃতির অন্তর্গত আর অঙ্গ বিকৃতি সম্পূর্ণভাবে অবৈধ।
সুতরাং যদি প্রশ্ন করা হয় তাহলে বিভিন্ন হাদীস দ্বারা যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের হলকের প্রমাণ পাওয়া যায় তার হুকুম কি? এমনই একটি হাদীস এখন পেশ করছি যা মহিলাদের হলকের প্রমাণ বহন করে।
যেমন ইবনু হিব্বান (রহঃ) তাঁর ‘সহীহ ইবনু হিব্বান’ গ্রন্থে ওয়াহ্ব বিন জারীর থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমার পিতা আমাদেরকে হাদীস শুনিয়েছেন, তিনি বলেছেন, আমি আবূ ফাযারাহকে বলতে শুনেছি তিনি হাদীস বর্ণনা করেছেন ইয়াযীদ বিন আসম থেকে, তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী মায়মূনাহ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, মায়মূনাহ্ (রাঃ) বলেনঃ (زوجها حلالا وبنى بها) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে হালাল অবস্থায় বিবাহ করেছেন ......। আর মায়মূনাহ্ (রাঃ) হজ্জে গিয়ে মাথা হলক করতেন এবং তার মাথায় শিঙ্গা লাগানো ছিল। অত্র হাদীস প্রমাণ করছে যে, মায়মূনাহ্ (রাঃ) মাথা হলক করতেন যদি অবৈধ হতো তাহলে তিনি করতেন না।
উত্তরঃ হাদীসে মায়মূনাহ্ (রাঃ)-এর উত্তর হল, হাদীসের ভিতর একটি কথা রয়েছে যে, তার মাথায় শিঙ্গা লাগানো ছিল এটাই প্রমাণ করে যে, মায়মূনাহ্ (রাঃ) মাথা চুল হলক করেছেন যাতে করে শিঙ্গা লাগানোর যন্ত্রণা একটু হলেও লাঘব হয়। সুতরাং তিনি প্রয়োজনে মাথা হলক করেছেন যেহেতু তিনি ছিলেন অসুস্থ। আর প্রয়োজনের কারণে এমন কাজ বৈধ হয়ে যায় যা অন্য সময় অবৈধ।
যেমন আল্লাহ বলেন, অর্থাৎ- ‘‘তোমাদের জন্য যে সমস্ত বিষয় আল্লাহ হারাম করেছেন তা বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন, হ্যাঁ তবে যদি তোমরা বাধ্য হও।’’ (সূরা আল আন্‘আম ৬ : ১১৯)
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - হজের কার্যাবলীতে আগ-পিছ করা বৈধতা প্রসঙ্গে
২৬৫৫-[১] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আমর ইবনুল ’আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজে মিনায় এসে জনসম্মুখে দাঁড়ালেন, যাতে লোকেরা তাঁর থেকে (হজের বিধি-বিধান সম্বলিত মাস্আলাহ্-মাসায়িল) জিজ্ঞেস করতে পারে। এ সময় জনৈক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলেন, অতঃপর বললেন, আমি না জেনে কুরবানীর আগে মাথা মুণ্ডন করে ফেলেছি। উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এতে দোষণীয় নয়, এখন কুরবানী করো। আরেক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞেস করলো, আমি না জেনে পাথর মারার আগে কুরবানী করে ফেলেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তাতে গুনাহের কিছু নেই, এখন কংকর মারো। অতঃপর আগে পিছে করার যে কোন ’আমলের বিষয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলেই তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলতেন, তাতে কোন গুনাহ হবে না, এখন করো।
[বুখারী, মুসলিম; কিন্তু মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে, জনৈক লোক তাঁর কাছে এসে বললো, আমি কংকর মারার পূর্বে মাথার চুল কেটে ফেলেছি। উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এতে কোন গুনাহ হবে না, এখন কংকর মারো। এরপর আরেক লোক এসে বললো, আমি কংকর মারার পূর্বে তাওয়াফে ইফাযাহ্ করেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তাতে কোন গুনাহ হবে না, এখন কংকর মারো।][1]
بَابٌ فِى التَّحَلُّلِ وَنَقْلِهِمْ بَعْضَ الْأَعْمَالِ عَلٰى بَعْضٍ
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَفَ فِي حَجَّةِ الْوَدَاعِ بِمِنًى لِلنَّاسِ يَسْأَلُونَهُ فَجَاءَهُ رَجُلٌ فَقَالَ: لَمْ أَشْعُرْ فَحَلَقْتُ قَبْلَ أَنْ أَذْبَحَ. فَقَالَ: «اذْبَحْ وَلَا حَرَجَ» فَجَاءَ آخَرُ فَقَالَ: لَمْ أَشْعُرْ فَنَحَرْتُ قَبْلَ أَنْ أَرْمِيَ. فَقَالَ: «ارْمِ وَلَا حَرَجَ» . فَمَا سُئِلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ شَيْءٍ قُدِّمَ وَلَا أُخِّرَ إِلَّا قَالَ: «افْعَلْ وَلَا حرج»
وَفِي رِوَايَةٍ لِمُسْلِمٍ: أَتَاهُ رَجُلٌ فَقَالَ: حَلَقْتُ قَبْلَ أَنْ أَرْمِيَ. قَالَ: «ارْمِ وَلَا حَرَجَ» وأتاهُ آخرُ فَقَالَ: أفَضتُ إِلى البيتِ قَبْلَ أَنْ أَرْمِيَ. قَالَ: «ارْمِ وَلَا حَرَجَ»
ব্যাখ্যা: (وَقَفَ) অর্থাৎ- তারা উটের উপর অবস্থান করলেন। যেমনটি বর্ণনা করেছেন সলিহ বিন কায়সান এর সনদে ইমাম বুখারী (রহঃ) ও ইমাম মুসলিম মা‘মার-এর সনদে অনুরূপ ইবনুল জারূদ ও মা‘মার-এর সনদে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং ইউনুস-এর বর্ণনাটি ইমাম মুসলিমের এবং মা‘মার থেকে ইমাম নাসায়ী ও ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলও বর্ণনা করেছেন, সেখানে শব্দ ছিল (وقف النبى ﷺ على راحلته) আর এরা সবাই বর্ণনা করেছেন ইবনু শিহাব যুহরী থেকে, তিনি ‘ঈসা বিন তলহা থেকে, তিনি ‘আবদুল্লাহ বিন ‘আমর থেকে। অপরদিকে ইয়াহ্ইয়া আল কাত্ত্বান ইমাম মালিক থেকে, তিনি ইমাম যুহরী থেকে, ইমাম যুহরীর বর্ণনায় যে, (انه حلس فى حجة الوداع فقام رجل) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাজ্জাতুল ওয়াদা‘তে বসলেন আর একজন লোক দাঁড়ালেন। এ বর্ণনাটি পূর্বের বর্ণনার সাথে সাংঘর্ষিক, তাই এর সমাধানকল্পে দ্বিতীয় বর্ণনাটিকে এভাবে ধরতে হবে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটে আরোহণ করলেন এবং তার উপর বসলেন।
(بِمِنًى لِلنَّاسِ) অর্থাৎ- মানুষের জন্য। উল্লেখ্য যে, এখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিনার কোন্ স্থানে অবতীর্ণ করেছিলেন এবং কোন্ সময় অবতীর্ণ করেছিলেন তা কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। তবে অপর হাদীস দ্বারা এ বিষয়ে ঝুঝা যায়, যেমন ইমাম বুখারী তার সহীহাতে ‘আবদুল ‘আযীয বিন আবী সালামাহ্ থেকে, তিনি ইমাম যুহরী থেকে এ সূত্রে বর্ণনা করেন (عند الجمرة) তথা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিনার জামারায়ে ‘আক্বাবায়ে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। আর অপর বর্ণনায় রয়েছে যা ইবনু জুরায়য ইমাম যুহরী থেকে বুখারী, মুসলিম ও ইবনুল জারূদ-এর বর্ণনা মতে যেখানে উক্ত সময়ের কথা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে (يخطب يوم النحر) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুৎবা দিয়েছিলেন কুরবানীর দিন।
অপর বর্ণনা মুহাম্মাদ বিন আবী হাফস্ তিনি ইমাম যুহরী থেকে যা বর্ণনা করেছেন ইমাম মুসলিম ও ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল সেটি হচ্ছে, اتاه رجل يوم النحر وهو واقف عند الجمرة অর্থাৎ- তার নিকট একজন লোক আসলো কুরবানীর দিন এমতাবস্থায় তিনি জামারার নিকটে অবস্থান করছিলেন।
কাযী ‘ইয়ায (রহঃ) বলেন, উক্ত রিওয়ায়াতগুলোর ভিন্নতার সমাধানকল্পে কতক ‘আলিম বলেন, মূলত ঐগুলো সব একই স্থানের কথা বলছে। অর্থাৎ- নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম خطب অর্থ হলো তিনি মানুষদের শিক্ষা দিচ্ছিলেন এখানে হজ্জের জন্য যে খুৎবা দেয়া হয় তা উদ্দেশ্য নয়।
তিনি আরো বলেন, তবে উক্ত বর্ণনাটি দু’টি স্থানের সম্ভাবনা রাখে।
১. জামারায়ে ‘আক্বাবাতে যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উটের উপর ছিলেন এবং উল্লেখ্য যে, এ বর্ণনার মধ্যে (خطب) তিনি খুৎবা দিয়েছেন এমন শব্দের ব্যবহার করা হয়নি। বরং বলা হয়েছে, (وقف وسئل) তিনি অবস্থান করলেন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো।
২. কুরবানীর দিন সালাতুয্ যুহরের পর। আর মূলত এটা হচ্ছে সেই শারী‘আতসম্মত খুৎবা যা হজ্জের সময় ইমাম সাহেব প্রদান করেন তাতে তিনি মানবমণ্ডলীকে তাদের হজ্জের কাজে কোন ভুল-ত্রুটি হয়ে থাকলে করণীয়সহ অন্যান্য আনুষাঙ্গিক বিষয়াদি বর্ণনা করেন।
ইমাম নাবাবী (রহঃ) দ্বিতীয় কথাটিতে মতামত ব্যক্ত করেছেন। হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, দ্বিতীয় মত আর প্রথম মতের মধ্যে কোন সাংঘর্ষিক অবস্থা সৃষ্টি হয়নি। কেননা হাদীস দু’টির তথা ‘আবদুল্লাহ বিন ‘আব্বাস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত (যেটি সামনে আসবে) আর অপরটি ‘আবদুল্লাহ বিন ‘আমর (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত-এর কোন একটিতেও এ কথাটি বলা হয়নি যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিনের কোন অংশে খুৎবা প্রদান করেছেন।
‘আল্লামা ‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী (রহঃ) বলেন, হ্যাঁ, এ বিষয়ে স্পষ্টত কোন বর্ণনা নেই ঠিক তবে একটি বর্ণনা আছে যা ইমাম বুখারী (রহঃ) ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, ‘‘কিছু প্রশ্নকারী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললো, আমি তো বিকালের পর কংকর নিক্ষেপ করেছি। এ বর্ণনাটি প্রমাণ করে যে, এ ঘটনাটি ঘটেছিল সূর্য ঢলে যাওয়ার পর কেননা বিকাল বলতে সূর্য ঢুবে যাওয়ার পরের সময়কেই বুঝানো হয়ে থাকে। আর প্রশ্নকারী এ কথা জানতেন যে হাজীদের জন্য সুন্নাত হচ্ছে কংকর নিক্ষেপ করবে সকালেই, তাই তিনি তা বিলম্ব করে ফেললেন, অতএব এর পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করেছেন।
(رجل) হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, এ হাদীসের এবং পরবর্তী হাদীসের প্রশণকারীর নাম সম্পর্কে অবগত হতে পারিনি। বস্ত্তত এ ক্ষেত্রে প্রশ্নকারীর সংখ্যা অধিক হওয়ায় রাবী কারো নাম বলেননি। অন্যত্র ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, প্রচুর গবেষণা সত্ত্বেও এ ব্যক্তির নাম আমি জানতে পারিনি, এমনকি তার এবং এ ঘটনায় প্রশ্নকারী ছিলেন সহাবায়ে কিরামের একটি দল আমি তাদের কারো নামই অবগত হতে পারিনি। তবে ইমাম ত্বহাবী সহ অন্যান্যরা যে শব্দের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন তা হচ্ছে (كان الاعراب لونه) একদল ‘আরব বেদুঈন জিজ্ঞেস করলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ বর্ণনাটিই মূলত তাদের নাম না জানার অন্যতম কারণ। আর তারা যে একাধিক ছিলেন তার প্রমাণ হলো আগে-পিছে করে তাদের প্রশ্নের ভিন্নতা।
(لم أشعر)-এর শব্দটি لم أشعر আইনে পেশ দিয়ে পড়তে হবে। শব্দটি نصر ينصر থেকে এসেছে। অর্থ হল لم افطن আমি বুঝতে পারিনি। তাইতো কেউ যখন বুঝতে পারে কোন বিষয় তখন বলা হয় أشعر بالسير شعورا। কেউ কেউ বলেছেন لم أشعر এর মাধ্যমে বুঝানো হচ্ছে, আমি মনে করতে পারছি না।
বাজী (রহঃ) বলেন, لم أشعر এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আমি ভুলে গিয়েছি। আবার কেউ কেউ বলেন, الشعور অর্থ العلم অর্থাৎ- আমি পূর্বে থেকেই এ মাসআলাটি সম্পর্কে অবগত ছিলাম না। ইমাম মুসলিম ইউনুস থেকে যে বর্ণনা করেছেন তা এ অর্থকেই শক্তিশালী করছে যেখানে বলা হয়েছে, لم أشعر أن الرمى قبل النحر فنحرت قبل أن ارمى وقال أخر لم أشعر ان النحر অর্থাৎ- আমি বুঝতে পারিনি কুরবানী আগে না কংকর নিক্ষেপ আগে, তাই আমি কংকর নিক্ষেপের আগে কুরবানী করেছি। এ দু’টি অর্থের দিকে ইঙ্গিত করেই ইমাম বুখারী (রহঃ) অধ্যায় রচনা করেছেন, (باب اذا رمى بعد ما امسى أو حلق قبل أن يذبح ناسيا أو جاهلا) অর্থাৎ- কোন ব্যক্তি বিকালে কংকর নিক্ষেপ করেছে অথবা ভুলে বা অজ্ঞতাবশতঃ কুরবানী করে ফেলেছে তার অধ্যায়।
‘আল্লামা বাদরুদ্দীন ‘আয়নী (রহঃ) বলেন, তবে যদি প্রশ্ন করা হয় হাদীসের মধ্যে ناسيا ও جاهلا শব্দ নেই তাহলে ইমাম বুখারী কিভাবে এ শব্দদ্বয়ের মাধ্যমে অধ্যায় রচনা করলেন। উত্তরে আমি [‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী (রহঃ)] বলবো এ শব্দ দু’টি ‘আবদুল্লাহ বিন ‘উমার (রাঃ)-এর বর্ণনায় এসেছে আর তা হচ্ছে (لم أشعر فحلقت قبل أن اذبح) এখানে لم أشعر ‘‘আমি বুঝতে পারিনি’’ বলা হয়েছে, এ কথাটি ব্যাপকতার দাবীদার যার মাধ্যমেই ناسيا ও جاهلا-এর অর্থ গৃহীত হয়েছে।
(ولا حرج) অর্থাৎ- কোন অসুবিধা নেই, অতঃপর যারা ফিদিয়া না দেয়ার মতপোষণ করেন তারা মূলত نفى الحرج তথা অসুবিধা না থাকার অর্থটি نفى الاثم والفدية তথা পাপ হবে না ও ফিদিয়া দেয়া লাগবে না এ অর্থের সাথে এক করে দিয়েছেন।
কাযী ‘ইয়ায (রহঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা ‘‘اذبح ولا حرج’’ যাবাহ কর কোন অসুবিধা নেই। এ কথাটি কুরবানী পুনরায় করার প্রতি আদেশসূচক নয় বরং এটা হচ্ছে তার পূর্বোক্ত কর্মের বৈধতা ঘোষণা করেছেন কেননা তিনি তো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কাজ সম্পাদনের পর প্রশ্ন করেছিলেন। সুতরাং সবশেষে অর্থ হল (افعل ذلك متى شئت) যখন ইচ্ছা হয় তখন তা করতে পার এবং ইচ্ছা করে ও ভুলবশতঃ এ ধরনের কাজে যারা জড়িত হয় তাদের কোন ফিদিয়া দেয়া জরুরী নয় আর বিশেষ করে যারা ভুলবশতঃ করেছে তাদের পাপ হবে না। অতঃপর ইচ্ছাকৃতভাবে যে করেছে তার ক্ষেত্রে কথা হলোঃ
الاصل ان تارك السنة عمدا لا يأثم الا ان يتهاون فيأثم للتهاون لا للترك
অর্থাৎ- মূলনীতি হচ্ছে ইচ্ছা করে যারা সূন্নাত বর্জন করবে তারা পাপী হবে না তবে যদি সুন্নাতকে অবজ্ঞা করে তাহলে তারা পাপী হবে, সুতরাং দেখা গেল সুন্নাত কাজ ছেড়ে দিলে নয় বরং অবজ্ঞা করলে পাপ হয়। তবে বিনা কারণে সুন্নাত ছেড়ে দেয়াও তা অবজ্ঞা করারই শামিল।
অপরদিকে যারা বলেছেন ফিদিয়া দেয়া আবশ্যক তারা لا حرج কে نفى الاثم তথা পাপ হবে না এ অর্থে গ্রহণ করেছেন। ‘আল্লামা বাজী (রহঃ)-ও ঠিক একই কথা বলেছেন।
‘আল্লামা সিনদী (রহঃ) বলেন, জমহূর ‘উলামায়ে কিরামের নিকট لا حرج অর্থ لا اثم ولافدية অর্থাৎ- কোন পাপও হবে না এবং কোন ফিদ্ইয়াও দিতে হবে না।
অপরদিকে যারা ফিদিয়া দেয়াকে আবশ্যক বলেছেন তারা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী لا حرج তথা কোন অসুবিধা নেই- এ কথাটিকে دفع الاثم পাপ হবে না-এর অর্থে গ্রহণ করেছেন। যা দূরবর্তী অর্থ কারণ لا حرج কোনই অসুবিধা নেই। এ কথাটি ‘‘আম’’ তথা ব্যাপক অর্থবোধক যা দুনিয়া আখিরাত দু’ ক্ষেত্রটিই অন্তর্ভুক্ত করে। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে যদি (دم) বা ফিদিয়া দিতেই হতো তাহলে অবশ্যই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা বর্ণনা করে দিতেন। তার বর্ণনা না করাই প্রমাণ করে এখানে ফিদিয়া আবশ্যক নয়।
এ বিষয়ে বর্ণিত সবগুলো হাদীস লক্ষ্য করলে বুঝা যায় যে, সহাবায়ে কিরাম সর্বমোট চারটি বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলেন।
১. কুরবানী করার পূর্বে মাথা হলক।
২. কংকর নিক্ষেপ করার পূর্বে মাথা হলক।
৩. কংকর নিক্ষেপ করার পূর্বে কুরবানী এবং
৪. কংকর নিক্ষেপ করার পূর্বে তাওয়াফে ইফাযাহ্।
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - হজের কার্যাবলীতে আগ-পিছ করা বৈধতা প্রসঙ্গে
২৬৫৬-[২] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিন মিনায় কোন ব্যতিক্রম ’আমলের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলতেন, এতে কোন গুনাহের কিছু হবে না। এমন সময় জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এতে কোন গুনাহের কিছু হবে না। এ সময় আরেক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো, আমি সন্ধ্যার পর পাথর মেরেছি। উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এতে কোন গুনাহের কিছু হবে না। (বুখারী)[1]
بَابٌ فِى التَّحَلُّلِ وَنَقْلِهِمْ بَعْضَ الْأَعْمَالِ عَلٰى بَعْضٍ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُسْأَلُ يَوْمَ النَّحْرِ بِمِنًى فَيَقُولُ: «لَا حرَجَ» فَسَأَلَهُ رجل فَقَالَ: رميت بعد مَا أمسَيتُ. فَقَالَ: «لَا حرَجَ» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: এ বিষয়ে আলোচনা ‘আবদুল্লাহ বিন ‘আমর ইবনুল ‘আস (রাঃ)-এর হাদীসে পূর্বে হয়ে গেছে। তাই তো হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) ‘আবদুল্লাহ বিন ‘আব্বাস (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীসটি উল্লেখ করে বলেছেন, এ রিওয়ায়াতটি প্রমাণ করে এ ঘটনা ঘটেছিল সূর্য ঢলে যাওয়ার পর, কেননা (مساء) দ্বারা তখনকার সময় বুঝা যায় যখন সূর্য ঢলে যায় এবং প্রশ্নকারী যেন জানতেন যে, মূলত হাজীদের জন্য নিয়ম হলো সকালে কংকর নিক্ষেপ করা কিন্তু ভুলে বিকালে কংকর নিক্ষেপ করে ফেললেন তখনই বিষয়টি সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট জিজ্ঞেস করলেন।
‘আল্লামা শাওকানী (রহঃ) বলেন, প্রশ্নকারীর কথা, (رَمَيْتُ بَعْدَ مَا أَمْسَيْتُ) এ কথাটি থেকে বুঝা যায় যে, যারা সূর্য ঢলে যাওয়ার পর কংকর নিক্ষেপ করবে তাদের কংকর নিক্ষেপ সহীহ হবে এবং এতে কোন পাপ হবে না।
আমি [‘আল্লামা ‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী (রহঃ)] বলব, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে এ বিষয়ে আলোচনা অতিক্রম হয়েছে যে, বিষয়টি নিয়ে ‘উলামায়ে কিরামের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। অর্থাৎ- যদি কোন ব্যক্তি কুরবানীর দিন পার হয়ে যাওয়ার পরও জামারায়ে ‘আক্বাবায়ে কংকর নিক্ষেপ করেনি আর এমতাবস্থায় সূর্য ডুবে গেল তার এ মুহূর্তে করণীয় কি? কেউ বলেছেন, তিনি ঐ রাতে কংকর নিক্ষেপ করবেন আর এ মতের প্রবক্তা হলেন ইমাম আবূ হানীফা ও ইমাম মালিক (রহঃ) এবং তাদের অনুসারীরা।
অপর দল বলেছেন, তিনি রাতে কংকর নিক্ষেপ করবেন না বরং পরের দিন সূর্য ঢলে গেলে কংকর নিক্ষেপ করবেন। আর এ মত পোষণ করেছেন ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ)। যারা রাতে কংকর নিক্ষেপের কথা বলেছেন তাদের দলীল হলো ‘আবদুল্লাহ ইবনে ‘আব্বাস (রাঃ)-এর হাদীস। কারণ তারা বলে থাকেন, (المساء) শব্দটি রাতের কিছু অংশের উপরন্ত বুঝায়। শুধু তাই নয় তাদের কেউ কেউ এ কথাও বলেছেন যে, (المساء) বলতে সূর্য ডুবার পরের সময়কে বুঝায়।
‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী হানাফী (রহঃ) বলেন, প্রশ্নকারীর কথা (امسيت) সন্ধ্যা করেছি। যার অর্থ اصبحت সকালে করেছি- এর বিপরীত। সুতরাং এর বাহ্যিক দিক থেকেই বুঝা যায়-এর অর্থ হলো সূর্য ডুবার পরের সময়। অপরদিকে রাতে কংকর নিক্ষেপের বিপরীত মতাবলম্বীরা উত্তরে বলেছেন হাদীসের শব্দ (يوم النحر) প্রমাণ করে তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দিনের বেলায় প্রশ্ন করেছিলেন আর সন্ধ্যায় কংকর নিক্ষেপও ঠিক দিনের অর্থ বুঝায় রাত নয়। কেননা (المساء) শব্দটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে যুহর থেকে রাত পর্যন্ত সময়। সুতরাং হাদীস স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, (امساء) দ্বারা এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে দিনের শেষাংশ সূর্য ঢলে যাওয়ার পরে যা আরম্ভ হয়-এর দ্বারা কোনভাবেই রাত উদ্দেশ্য হতে পারে না। (আল্লাহ অধিক অবগত)
পরিচ্ছেদঃ ৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হজের কার্যাবলীতে আগ-পিছ করা বৈধতা প্রসঙ্গে
২৬৫৭-[৩] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি এসে বললো, হে আল্লাহর রসূল! আমি মাথা মুন্ডনের আগে তাওয়াফে ইফাযাহ্ করেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এতে কোন গুনাহ হবে না, এখন মাথার চুল কাটো বা ছাঁটো। তারপর আরেক ব্যক্তি এসে বললো, আমি পাথর মারার আগে কুরবানী করে ফেলেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এতে কোন গুনাহ হবে না, এখন পাথর মারো। (বুখারী)[1]
عَن عَليّ قَالَ: أَتَاهُ رَجُلٌ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي أَفَضْتُ قَبْلَ أَنْ أَحْلِقَ فَقَالَ: «احْلِقْ أَوْ قَصِّرْ وَلَا حَرَجَ» . وَجَاءَ آخَرُ فَقَالَ: ذَبَحْتُ قَبْلَ أَنْ أَرْمِيَ. قَالَ: «ارْمِ وَلَا حرج» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: (أَتَاهُ) অর্থাৎ- নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আগমন করলো (إِنِّىْ أَفَضْتُ) অর্থাৎ- আমি তাওয়াফে ইফাযাহ্ করেছি।
‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী হানাফী (লহঃ) বলেন, ইফরাদ হজ্জকারীর ওপর কোন পাপ নেই এবং তাকে কোন ফিদিয়া-ও দিতে হবে না। আর কিরান ও তামাত্তু' হজ্জকারী তাদের যদি অনিচ্ছাকৃত ভুলটি হয়ে থাকে তাহলে তাদের কোন পাপ হবে না ঠিক তবে তাদের কাফফারা আবশ্যক হবে।
আমি ‘আল্লামা ‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী (রহঃ) বলি, ‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী (রহঃ) উপরোক্ত ব্যাখ্যা করার কারণ হলো হানাফী মতানুসারে ইফরাদ হজ্জকারীর জন্য কোন কুরবানী আবশ্যক নয় এমনকি হজ্জের কর্মগুলো তারতীব (ধারাবাহিকতার) সাথে আদায় করাও তাদের নিকট আবশ্যক নয়। তবে শুধুমাত্র কংকর নিক্ষেপ ও মাথা মুন্ডানো ব্যতিরেকে।
অপরদিকে কিরান ও তামাত্তু' হজ্জকারী তাদের ওপর কংকর নিক্ষেপ, কুরবানী করা ও মাথা হলক করা ইত্যাদি কাজগুলোতে ترتيب বা ধারাবাহিকতা রক্ষা করা আবশ্যক।
ইমাম খিত্বাবী (রহঃ) বলেন, আসহাবে রায়ের যে সমস্ত ব্যক্তিরা হজ্জের কর্মসমূহে কোন হাজী আগে-পিছে করে ফেলে তাহলে ফিদিয়া দেয়া আবশ্যক এ মত পোষণ করে থাকেন তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা (ارْمِ وَلَا حَرَجَ) কংকর নিক্ষেপ কর কোন অসুবিধা নেই- এ কথার ব্যাখ্যায় বলেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো তোমার কোন পাপ হবে না ঠিক তবে ফিদিয়া দেয়া লাগবে।
তারা আরো বলেন, সম্ভবত ঐ প্রশ্নকারী ইফরাদ হজ্জকারী ছিলেন। সুতরাং তার জন্য ফিদিয়া কুরবানী দেয়া আবশ্যক নয়। আর অনাবশ্যক কুরবানী আগে-পিছে করার কারণে তার ওপর আর কিছুই আবশ্যক হবে না।
ইমাম খিত্বাবী (রহঃ) বলেন, আমি বলব, আসহাবে রায়ের এ মত ঠিক নয়, কারণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা لَا حَرَجَ পাপ ও ফিদিয়া দু’টিকেই অন্তর্ভুক্ত করে, কেননা এটি একটি ‘আম্ তথা ব্যাপক কথা। আর সহাবায়ে কিরাম তামাত্তু' করেছিলেন অথবা কিরান হজ্জ/হজ করেছিলেন যা এ ব্যাপারে বর্ণিত হাদীস দ্বারা বুঝা যায়। আর ‘‘ক্বারিন’’ ও ‘‘মুতামাত্তী’’ উভয়ের ওপর কুরবানী করা আবশ্যক। পাশাপাশি এ বিষয়টিও প্রণিধানযোগ্য যে, এখানে (এ বিষয়টি নিয়ে) যারা প্রশ্নকারী তারা ছিলেন একদল। তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেনি যেমনটি উসামাহ্ বিন শারীক (রাঃ)-এর হাদীসে রয়েছে। সুতরাং সবাইকে ইফরাদকারী ধরে সকলের ওপর এক হুকুম লাগানো, যেটা আসহাবে রায়ের লোকেরা করেছেন তা সঠিক হয়নি। আর এই আপত্তিটা ছিল অনাবশ্যকীয়।
পরিচ্ছেদঃ ৯. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - হজের কার্যাবলীতে আগ-পিছ করা বৈধতা প্রসঙ্গে
২৬৫৮-[৪] উসামাহ্ ইবনু শারীক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে হজের উদ্দেশে রওয়ানা হলাম। উপস্থিত লোকদের মধ্যে কেউ তাঁর নিকট এসে বলতো, হে আল্লাহর রসূল! আমি তাওয়াফের আগে সা’ঈ করেছি বা অন্য কোন কাজ আগে বা দেরিতে করেছি। আর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ এতে গুনাহের কিছু নেই। তবে যে লোক অন্যায়ভাবে কোন মুসলিমের সম্মানহানি করবে, সে বড় গুনাহের কাজ করেছে এবং ধ্বংসের পথে এগিয়ে গেছে। (আবূ দাঊদ)[1]
عَن أُسامةَ بنِ شرِيكٍ قَالَ: خَرَجْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَاجًّا فَكَانَ النَّاسُ يَأْتُونَهُ فَمِنْ قَائِلٍ: يَا رَسُولَ اللَّهِ سَعَيْتُ قَبْلَ أَنْ أَطُوفَ أَوْ أَخَّرْتُ شَيْئًا أَوْ قَدَّمْتُ شَيْئًا فَكَانَ يَقُولُ: «لَا حَرَجَ إِلَّا عَلَى رَجُلٍ اقْتَرَضَ عِرْضَ مُسْلِمٍ وَهُوَ ظَالِمٌ فَذَلِكَ الَّذِي حَرِجَ وهَلِك» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (عَنْ أُسَامَةَ بْنِ شَرِيْكٍ) তিনি সা‘লাবী তথা বাণী সা‘লাবাহ্ বিন সা‘দ গোত্রের লোক। তবে কেউ বলেছেন তিনি ছিলেন সা‘লাবাহ্ বিন ইয়ারবূ' গোত্রের আর কেউ বলেছেন তিনি সা‘লাবাহ্ বিন বাকর বিন ওয়ায়িল গোত্রের। তবে প্রথম মতটিই সহীহ। তিনি ছিলেন সাহাবী আহলে কুফার অন্তর্গত। তার নিকট থেকে যিয়াদ বিন ‘আলক্বামাহ্ ও ‘আলী ইবনুল আক্বামার হাদীস বর্ণনা করেছেন। আযদী, সা‘ঈদ বিন সাকান এবং হাকিম ও অন্যান্যরা বলেছেন, তার নিকট থেকে শুধু যিয়াদই বর্ণনা করেছেন। হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) তার কিতাব তাকরীবুত্ তাহযীবে বলেছেন, সহীহ মতানুসারে তার নিকট থেকে শুধুই যিয়াদ বিন ‘আলক্বামাহ্ বর্ণনা করেছেন। খাযরাজী বলেছেন, তার বর্ণিত হাদীস সংখ্যা ৮টি।
(سَعَيْتُ) অর্থাৎ- ইহরাম বাঁধার পর মক্কার বাইরে থেকে আগন্তুক হাজীগণ যারা এ সা‘ঈ করে থাকেন যা মক্কাবাসীর জন্য নফল আর এটা তাওয়াফে কুদূম-এর পর করতে হয়।
‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী হানাফী (রহঃ) বলেছেন, হাদীসের বাহ্যিক দিক থেকে বুঝায় যে, বিষয়টি মক্কা এবং তার বাইরের দুই অধিবাসীদেরই অন্তর্ভুক্ত করবে যেটা আমাদের মাযহাব যদিও ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ)-এর বিপরীত কথা বলেছেন এবং তিনি বিষয়টিকে শুধু মক্কার বাইরে থেকে যারা এসেছেন তাদেরকে শর্ত করেছেন।
(وكان يقول : لا حرج) মিশকাতুল মাসাবীহ-এর সব নুসখাতেই এ রকমই শব্দ পাওয়া যায় যেমনটা বলেছেন ইমাম জাযারী তার জামি‘উল উসূল নামক কিতাবে। তবে সুনানে আবী দাঊদে আছে لا حرج، لا حرج দু’বার। আর ‘আল্লামা কাযী-এর অর্থ করেছেন لا أثم অর্থাৎ- কোন হজ্জের কাজগুলো একটু আগ-পিছ হয়ে গেলে কোন পাপ হবে না।
باب خطبة يوم النحر ورمى ايام التشريق والتوديع
(باب خطبة يوم النحر خطبة) শব্দটি خ তে পেশযোগে পড়তে হবে যা বাবে نصر ينصر এর মাসদার-এর অর্থ হল وعظ তথা খুৎবা দিয়েছেন অর্থ হলো ওয়ায করেছেন আর এটি হল خطبة শব্দটির আভিধানিক অর্থ যা ‘‘আল কামূস’’ নামক অভিধানে উল্লেখিত আছে। অপরদিকে শারী‘আতের পরিভাষায় খুতবার পরিচয় নিম্নরূপ,
عبارة عن كلام يشتمل على الذكى والتشهد والصلاة والوعظ
অর্থাৎ- ওয়ায নাসীহাত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর দরূদ, لا إله إلا الله ও محمد رسول الله এর সাক্ষ্য এবং যিকির সম্বলিত কথাকে শারী‘আতের পরিভাষায় খুৎবা বলা হয়।
(ورمى ايام التشريق) তথা গোশ্ত (গোসত/গোশত) শুকানোর দিনগুলো আর তা হচ্ছে তিনদিন কুরবানীর পরের দিন প্রথমদিন হলো যুলহিজ্জাহ্ মাসের ১১ তারিখ এ দিনগুলোকে ايام التشريق বলার কারণ হলো, এ দিনগুলোতে বেশি বেশি গোশ্ত (গোসত/গোশত) শুকাতে দেয়া হয়। আর কেউ কেউ বলেছেন, কুরবানীগুলো দেয়া হয় এ দিনগুলোতে এবং তা শুরু হয় কুরবানীর দিন ১০ তারিখ সূর্য উঠার পর থেকে, তাই এ দিনগুলোর নাম ايام التشريق যেমনটি বলেছেন আবূ ‘উবায়দাহ্ আল কাসিম বিন সালাম। আর এ তিনদিনের প্রথম দিনকে يوم القر বলা হয়, কেননা এ দিনে মানুষেরা মিনায় অবস্থান করেন। এটাকে يوم الرؤس-ও বলা হয়, কারণ এ দিন হাজী সাহেবানরা তাদের কুরবানীর পশুর মাথা খেয়ে থাকেন। আর দ্বিতীয় দিনের আরেক নাম يوم النفر الاول-এর আরেক নাম يوم الاكارع আর তৃতীয় দিনকে বলা হয় يوم النفر الأخر যেমনটি ইমাম ইবনু জারীর (রহঃ) বলেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - কুরবানীর দিনের ভাষণ, আইয়্যামে তাশরীক্বে পাথর মারা ও বিদায়ী তাওয়াফ করা
২৬৫৯-[১] আবূ বকরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিন (১০ যিলহাজ্জ) আমাদের উদ্দেশে এক বক্তৃতা দিলেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, বছর ঘুরে এসেছে সে তারিখের পুনরাবৃত্তি অনুযায়ী, যে তারিখে আল্লাহ তা’আলা আকাশ ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। বছর বারো মাসে, তন্মধ্যে চার মাস হারাম বা সম্মানিত মাস। তিন মাস পরপর এক সাথেই তথা যিলকদ, যিলহজ্জ ও মুহাররম। চতুর্থ মাস মুযার গোত্রের রজব মাস। যে মাস জমাদিউল উখরা ও শা’বানের মাঝখানে। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ এটা কোন্ মাস? আমরা উত্তর দিলাম- আল্লাহ ও আল্লাহর রসূলই এ ব্যাপারে বেশি ভালো জানেন। এরপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। আমরা ভাবলাম তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হয়ত এ মাসের অন্য কোন নাম বলবেন। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এ মাস কি যিলহজ্জ মাস নয়? আমরা বললাম, হ্যাঁ, এ মাস যিলহজ্জ মাস।
এবার তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এটি কোন্ শহর? আমরা বললাম, আল্লাহর রসূলই ভালো জানেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। এতে আমরা ভাবলাম, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মনে হয় এ শহরের অন্য কোন নাম বলবেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এটি কি (মক্কা) শহর নয়? আমরা বললাম, হ্যাঁ, এটি মক্কা শহর, হে আল্লাহর রসূল! এরপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এটা কোন্ দিন? উত্তরে আমরা বললাম, আল্লাহ ও আল্লাহর রসূলই তা ভালো জানেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। এতে আমরা ভাবলাম, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মনে হয় এর অন্য কোন নাম বলবেন। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এটা কি কুরবানীর দিন নয়? আমরা বললাম, হ্যাঁ, কুরবানীর দিন।
তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ’’তোমাদের জীবন, সম্পদ ও সম্মান তোমাদের জন্য পবিত্র; যেমন তোমাদের এ মাস, এ শহর, এ দিন পবিত্র। তোমরা খুব তাড়াতাড়ি আল্লাহর কাছে পৌঁছবে, আর তিনি তোমাদেরকে কর্মকান্ড সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন। সাবধান! আমার পর তোমরা বিভ্রান্ত হয়ে এক অন্যের প্রাণনাশ করো না। তোমরা বলো, আমি কি তোমাদের নিকট (আল্লাহর নির্দেশ) পৌঁছিয়ে দেইনি? সাহাবীগণ বললেন, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রসূল! পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তখন বললেন, হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থেকো। (এরপর বললেন) প্রত্যেক উপস্থিত ব্যক্তি যেন অনুপস্থিত ব্যক্তিকে এ কথা পৌঁছিয়ে দেয়। কেননা এমন অনেক ব্যক্তি আছে, যাকে পরে পৌঁছানো হয় কিন্তু সে আসল শ্রোতা হতেও বেশি উপলব্ধিকারী ও সংরক্ষণকারী হতে পারে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابٌ خُطْبَةُ يَوْمِ النَّحْرِ وَرَمْىِ أَيَّامِ التَّشْرِيْقِ وَالتَّوْدِيْعِ
عَنْ أَبِي بَكْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: خَطَبَنَا النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ النَّحْرِ قَالَ: «إِنَّ الزَّمَانَ قَدِ اسْتَدَارَ كَهَيْئَتِهِ يَوْمَ خَلَقَ اللَّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ السَّنَةُ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ثَلَاثٌ مُتَوَالِيَاتٌ ذُو الْقَعْدَةِ وَذُو الْحِجَّةِ وَالْمُحَرَّمُ وَرَجَبُ مُضَرَ الَّذِي بَيْنَ جُمَادَى وَشَعْبَانَ» وَقَالَ: «أَيُّ شَهْرٍ هَذَا؟» قُلْنَا: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ فَسَكَتَ حَتَّى ظَنَنَّا أَنَّهُ سَيُسَمِّيهِ بِغَيْرِ اسْمِهِ فَقَالَ: «أَلَيْسَ ذَا الْحِجَّةِ؟» قُلْنَا: بَلَى. قَالَ: «أَيُّ بَلَدٍ هَذَا؟» قُلْنَا: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ فَسَكَتَ حَتَّى ظَنَنَّا أَنَّهُ سَيُسَمِّيهِ بِغَيْرِ اسْمِهِ قَالَ: «أَلَيْسَ الْبَلْدَةَ؟» قُلْنَا: بَلَى قَالَ «فَأَيُّ يَوْمٍ هَذَا؟» قُلْنَا: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ فَسَكَتَ حَتَّى ظَنَنَّا أَنَّهُ سَيُسَمِّيهِ بِغَيْرِ اسْمِهِ. قَالَ: «أَلَيْسَ يَوْمَ النَّحْرِ؟» قُلْنَا: بَلَى. قَالَ: «فَإِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ وَأَعْرَاضَكُمْ عَلَيْكُمْ حَرَامٌ كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا فِي بَلَدِكُمْ هَذَا فِي شَهْرِكُمْ هَذَا وَسَتَلْقَوْنَ رَبَّكُمْ فَيَسْأَلُكُمْ عَنْ أَعْمَالِكُمْ أَلَا فَلَا تَرْجِعُوا بِعْدِي ضُلَّالًا يَضْرِبُ بَعْضُكُمْ رِقَابَ بَعْضٍ أَلَا هَلْ بَلَّغْتُ؟» قَالُوا: نَعَمْ. قَالَ: «اللَّهُمَّ اشْهَدْ فَلْيُبَلِّغِ الشَّاهِدُ الْغَائِبَ فَرُبَّ مُبَلَّغٍ أَوْعَى مِنْ سَامِعٍ»
ব্যাখ্যা: (عَنْ أَبِىْ بَكْرَةَ) এ সাহাবীর নাম নুফাই বিন হারিস ।
(خَطَبَنَا النَّبِىُّ ﷺ يَوْمَ النَّحْرِ) হাদীসের এ অংশটির মাধ্যমে বুঝা যায় কুরবানীর দিন খুৎবা দেয়া শারী‘আতসম্মত। ঠিক এ রকমই একটি হাদীস ইমাম বুখারী (রহঃ)-এর বর্ণনায় ‘আবদুল্লাহ বিন ‘উমার (রাঃ) থেকে, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিন বিদায় হজ্জের সময় জামারায়ে ‘আক্বাবার মাঝখানে অবস্থান করে বললেন, আজকে কোনদিন?----- এভাবে হাদীসের শেষ পর্যন্ত।
অনুরূপভাবে বুখারী ও অন্যান্য ইমামগণ ‘আবদুল্লাহ ইবনে ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিনে মানবতাকে লক্ষ্য করে ভাষণ প্রদান করলেন এবং তিনি বললেন, হে মানুষেরা! আজকে কোনদিন? অনুরূপ ইমাম আহমাদ (রহঃ) জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিন আমাদেরকে খুতবাহ প্রদান করলেন এবং তিনি বললেন, আজ কোনদিন সবচেয়ে বেশি সম্মানিত? আর হিরমাস বিন যিয়াদ আল বাহিলী (রাঃ)-এর হাদীস, তিনি বলেন, আমি কুরবানীর দিন মিনাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে খুৎবা দিতে দেখেছি।
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। (৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৮৫; ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭)
অনুরূপভাবে ইমাম আবূ দাঊদ আবূ উমামাহ্ (রাঃ) থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মিনায় কুরবানীর দিন খুৎবা দিতে শুনেছি। এছাড়া আরো একটি হাদীস যা পরবর্তী দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে আসবে যা রাফি' বিন ‘আমর আল মুযানী (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি দেখেছি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজ্জের দিন তার শাহবা নামক খচ্চরের উপর উঠে খুৎবা প্রদান করেছেন। ‘আবদুল্লাহ বিন ‘আমর ইবনুল ‘আস কর্তৃক বর্ণিত হাদীস তিনি অবলোকন করেছেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কুরবানীর দিন খুৎবা দিতে। আর সে সময় তার নিকট একজন প্রশ্ন করতে এসেছিলেন। যে হাদীসটি ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম সহ অনেকে বর্ণনা করেছেন। সুতরাং অত্র হাদীসগুলো প্রমাণ করে যে, কুরবানীর দিন খুৎবা দেয়া শারী‘আতসম্মত এবং হাদীসগুলো তাদের মতকে খণ্ডন করে যারা বলেন কুরবানীর দিন হাজী সাহেবের উদ্দেশে কোন খুৎবা দেয়া শরীয়াতে নেই। আর এ হাদীসগুলোর খুৎবা দ্বারা الوصايا العامة তথা সাধারণ নাসীহাত উদ্দেশ্য। তাদের এ কথা মোটেই ঠিক নয় কারণ অত্র হাদীসগুলোর বর্ণনাকারী সকলেই এটাকে খুৎবা বলেই উল্লেখ করেছেন। যেমনভাবে ‘আরাফার ময়দানের ক্ষেত্রে খুৎবা শব্দটি উল্লেখ করেছিলেন। আর ‘আরাফাতে খুৎবা দেয়ার ক্ষেত্রে সকলের ঐকমত্য রয়েছে।
কুরবানীর দিন খুৎবা নেই বলে মত দিয়েছেন মালিকী ও হানাফীগণ। তারা বলেছেন হজ্জের খুৎবা তিনটি যথাঃ ১. জিলহজ্জ মাসের সাত তারিখ। ২. ‘আরাফার দিন। ৩. কুরবানীর দ্বিতীয় দিন। শাফি‘ঈ মতাবলম্বীগণও একই কথা বলেছেন, তবে তারা কুরবানীর দ্বিতীয় দিনের স্থানে তৃতীয় দিনের কথা বলেছেন এবং চতুর্থ আরেকটি খুতবার কথা বলেছেন তা হচ্ছে কুরবানীর দিন।
ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ) বলেন, কুরবানীর দিন খুৎবা দেয়ার পর একটি প্রয়োজন রয়েছে যাতে করে মানুষেরা কংকর নিক্ষেপ, কুরবানী, মাথা হলক এবং তাওয়াফ সহ বিভিন্ন কাজগুলো শিখে নিতে পারেন।
তবে ইমাম ত্বহাবী (রহঃ) ভিন্ন কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ) কর্তৃক উল্লেখিত চতুর্থ খুতবাটি আসলে হজ্জের কৃতকলাপের সাথে সংশিস্নষ্ট বিষয়ে হয় না, কারণ সেখানে হজ্জের কোন কাজ সম্পর্কেই আলোচনা হয় না, এটা শুধুমাত্র সাধারণ নাসীহাতকেই বুঝাবে। তিনি আরো বলেন, এ খুতবাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা কোন সাহাবী হজ্জের রীতিনীতি সম্পর্কে আলোচনা করেছেন এমন কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না।
‘আল্লামা ইবনুল ক্বিসার (রহঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা করার কারণ হলো, সারা পৃথিবীর আনাচ-কানাচ থেকে মানবতা সেখানে জমা হয়েছেন তাই তাদেরকে তিনি কিছু নাসীহাত করেছেন। সুতরাং এটা কোন খুৎবা ছিল না। তবে যারা তাকে এ কাজ করতে দেখেছেন তারা ধারণা করেছেন যে, এটা খুৎবা ছিল।
‘আল্লামা ইবনুল ক্বিসার আরো বলেন, ইমাম শাফি‘ঈর কথা যেমন তিনি বলেছেন চতুর্থ খুতবাটির মাধ্যমে মানুষেরা কিছু হজ্জের কাজকর্ম শিখতে পারেন এজন্য দেয়া প্রয়োজন ‘‘আমি এ কথার উত্তরে বলি এটা আবশ্যক নয় কারণ হজ্জের কাজগুলো তো মানুষেরা ‘আরাফার দিন ইমামের খুৎবা থেকে শিক্ষা করতে পারে।
‘আল্লামা ‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী (রহঃ) বলেন, ইবনুল কিসার সহ অন্যান্যদের উত্তরে বলা যায়। চতুর্থ খুতবাটির প্রয়োজন রয়েছে কারণ সেখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিন, যিলহজ্জ মাস এবং মক্কা মুকাররামার মর্যাদা সম্পর্কে উপস্থিত জনতাকে সতর্ক করেছেন। আর এটাকে সহাবায়ে কিরাম খুৎবা নামেই আখ্যা দিয়েছেন। তাই এটা খুৎবাই হবে অন্য কিছু নয়।
(يَوْمَ خَلَقَ اللّٰهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ) অর্থাৎ- আল্লাহ তা‘আলা আসমানসমূহ ও জমিনসমূহ সৃষ্টি করেছেন এবং সৃষ্টি করেছেন-এর মধ্যে এমন এক শক্তি যার মাধ্যমে-এর দিন রাত, বছর ও মাসসমূহকে পার্থক্য করা যায়। ‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী হানাফী (রহঃ) বলেন, অর্থাৎ- আল্লাহ তা‘আলা এ আসমান-জমিনকে সৃষ্টি করেছেন এবং এর মাঝে আসমান জমিনের উপর দিয়ে বহুকাল বহু বছর বহু মাস অতিবাহিত হওয়ার পর তা আবার সে স্থানে ফিরে যাবে তথা তার মূলে ফিরে যাবে যেখানে আল্লাহ চাইবেন ফিরে যেতে সেখানেই ফিরে যাবে।
আর কিছু হানাফী বিদ্বান এর ব্যাখ্যায় বলেন, আসমান ও জমিন সেখান দিয়ে প্রদক্ষিণ করছে বা করবে যেখান থেকে আল্লাহ চেয়েছেন। আর তা হল প্রতি ১২ মাসে এক বছর আর প্রতি মাসে ২৯/৩০ দিন হবে। তদানীন্তন ‘আরবরা এ হিসাবকে পরিবর্তন করে কোন বছরকে তারা ১২ মাসে ধরতো আবার কোন বছরকে তারা ১৩ মাস ধরতো। আর তারা প্রতি দু’বছরে এ হজ্জ/হজকে তার স্বীয় মাস থেকে পরবর্তী মাস পর্যন্ত বিলম্ব করতো আর যে মাসকে তারা বিলম্ব করতো তারা সেটাকে বাতিল বলতো। আর এমনিভাবে মাসের সংখ্যা বছরে ১৩ টি করতো ফলে বছরের মাস সংখ্যা পরিবর্তন হয়ে যেত আর এ সুযোগে তারা الاشتهر الحرم তথা সম্মানিত মাসসমূহ (যে মাসগুলো যুদ্ধবিগ্রহ হারাম)-কে উল্টা-পাল্টা করে ফেলতো অর্থাৎ- চারটি মাসকে হারাম মানতো ঠিকই কিন্তু আল্লাহর দেয়া মতে নয় নিজের মন মতো, তাই আল্লাহ তা‘আলা তাদের মতাদর্শকে বাতিল করে আয়াত নাযিল করলেন, إِنَّمَا النَّسِيءُ زِيَادَةٌ فِي الْكُفْرِ অর্থাৎ- ‘‘এ ধরনের কাজকর্ম সব কাফিরদের কাজ।’’ (সূরা আত্ তাওবাহ্ ৯ : ৩৭)
আর আল্লাহ তা‘আলা তাদের এ কাজকে বাতিল করে মাস এবং বছরের হিসাব সেভাবেই প্রতিষ্ঠা করার ঘোষণা দেন যেভাবে আকাশ-জমিন সৃষ্টির শুরুতে ছিল। সুতরাং আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বছর বিদায় হজ্জ/হজ করেন সে সময় জিলহজ্জ মাস তার স্বীয় স্থানে ফিরে এসেছিল। তাইতো নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (ان الزمان قد استدار كهيئته) অর্থাৎ- সময় তার স্বীয় অবস্থায় ফিরে এসেছে। আর যুলহিজ্জাহ্ মাস এখন এটাই আল্লাহ আদেশ করেছেন। সুতরাং তোমরা জিলহজ্জ মাসকে এখানেই রাখ তার সময়কে সংরক্ষণ কর জাহিলিয়্যাতের মতো পরিবর্তন করে ফেলো না।
ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেন, হাদীসের উক্ত অংশটির ব্যাখ্যা হল জাহিলী যুগে মক্কার মুশরিকরা الاشهر الحرم তথা হারাম মাসসমূহের ক্ষেত্রে ইব্রাহীম (আঃ) মিল্লাতের কড়া অনুসারী ছিলেন। তবে ধারাবাহিকভাবে তিনমাস (যুলকাদা, জিলহজ্জ ও মুহাররম) যুদ্ধ বিরতি দিয়ে থাকা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। তাই তারা যখন এসব মাসেও যুদ্ধের প্রয়োজনবোধ করতো তখন মুহাররম মাসের হারামকে পরবর্তী সফর মাসের জন্য নির্ধারণ করতো আর মুহাররম মাসে যুদ্ধ করতো। আর পরবর্তী বছরে আরো একমাস পিছিয়ে নিত। এভাবে তারা বছরের পর বছর এ রকম করতে থাকে। অবশেষে তাদের নিকট হারাম মাসের বিষয়টি সম্পূর্ণ গোলমাল হয়ে যায় এবং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের এ ধরনের কর্মকান্ডের মধ্যে আকস্মিক পরিবর্তন আনেন এবং আল্লাহর নির্দেশ জিলহজ্জ মাসকে তার স্বীয় স্থানে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন।
আবূ ‘উবায়দ (রহঃ)-ও ঠিক একই রকম ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, তারা ينسون অর্থ يؤخرون তথা বিলম্ব করা যেমনটা আল্লাহ কুরআনে ইরশাদ করেছেন, إِنَّمَا النَّسِيءُ زِيَادَةٌ فِي الْكُفْرِ (সূরা আত্ তাওবাহ্ ৯ : ৩৭) কখনো কখনো তারা মুহাররম মাসে যুদ্ধের খুব প্রয়োজনবোধ করতো আর তাইতো মুহাররামের হারামকে বিলম্ব করে ‘‘সফর’’ মাসে নিয়ে যেত। তারপর পরবর্তী বছরে আবার সফর মাসকে পরবর্তী মাসে নিয়ে যেত।
ইমাম বায়যাবী (রহঃ) ‘আরবের জাহিলী যুগের লোকেরা যখন যুদ্ধ করতো ঠিক সে মুহূর্তে কোন হারাম মাস আসলে (অর্থাৎ- যখন যুদ্ধ করা হারাম) তারা হারাম মাসটিকে পরিবর্তন করে পরবর্তী মাসের জন্য নির্ধারণ করতো। তাই তারা হারাম মাস হারাম করার উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরে গিয়েছিল কিন্তু হারাম মাসের সংখ্যা চারটি তারা সংরক্ষণ করতো।
(السنة) এখানে বছর অর্থ ‘আরাবী চন্দ্রের হিসাবের বছর। তা হবে ১২ মাস।
(منها اربعة حرم) এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنْفُسَكُمْ সুতরাং এ হারাম চারটি মাসে তোমরা তোমাদের নিজের ওপর অত্যাচার করিও না। (সূরা আত্ তাওবাহ্ ৯ : ৩৬)
ইমাম বায়যাবী (রহঃ)-এর ব্যাখ্যায় বলেন, (بهتك حرمتها وارتكاب حرامها) অর্থাৎ- তার সম্মান ভঙ্গ করে ও হারাম (নিষিদ্ধ) কাজে জড়িত হয়ে এর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে না।
‘আল্লামা হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, (فلا تظالموا فيهن انفسكم) অর্থাৎ- যুদ্ধ-বিগ্রহ করো না। আবার কেউ বলেছেন, অবৈধ কাজের সাথে জড়িত হয়ো না।
‘আল্লামা হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, (ذكرها من سنتين لمصلحة التوالى بين الثلاثة) অর্থাৎ- গণনাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’বছর থেকে উল্লেখ করেছেন যাতে করে ধারাবাহিকতা রক্ষা পায়। অন্যথায় যদি তিনি মুহাররম থেকে গণনা শুরু করতেন তাহলে ধারাবাহিকতা রক্ষা হতো না। আর এটা থেকে আরো বুঝা যায় যে, জাহিলী যুগে ‘আরবরা যে কিছু কিছু মাসকে তাদের মনমতো বিলম্ব করে নিত তা বাতিল হিসেবে প্রমাণিত, কেননা তারা ঐ চারটি হারাম মাসের কখনো কখনো মুহাররমকে সফর আবার সফরকে মুহাররম করতো ধারাবাহিকতার ভঙ্গনের লক্ষ্যে, কারণ ধারাবাহিকতা তিন মাস যুদ্ধ-বিগ্রহ থেকে বিরত থাকা তাদের জন্য কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম متواليات তথা ধারাবাহিক শব্দ উল্লেখ করে তাদের বিশ্বাস বাতিল করে দিলেন।
আর এ মাসগুলোর হারামের বিষয়ে উলট পালট করার ক্ষেত্রে তারা কয়েক শ্রেণীর ছিল। যেমনঃ তাদের একদল মুহাররম মাসকেই সফর নাম দেয় আর সেখানে তারা যুদ্ধ করে আর সফরকে মুহাররম নাম দেয় সেখানে তারা যুদ্ধ করে না। অপর আরেকটি দল এক বছর এমন করে আবার পরের বছর অন্য রকম করে। আরেকদল এটিকে দু’বছর অন্তর অন্তর করে। আবার আরেকদল সফরকে বিলম্ব করতে করতে রবিউল আওয়াল পর্যন্ত নিয়ে যায় আর রবিউল আওয়ালকে নিয়ে যায় তার পরের মাসে আর এমনভাবে পিছাতে পিছাতে শাও্ওয়াল হয়ে যায় যুলকাদা আর যুলকাদা হয়ে যায় জিলহজ্জ।
(ورجب مضرمضر) শব্দটি غير منصرف (ই‘রাব অপরবির্তনীয়) এটা ‘আরবের একটি প্রসিদ্ধ গোত্রের নাম।
(رجب) ‘রজব’ মাসকে এ গোত্রের দিকে সম্পৃক্ত করার কারণ হলো, এ গোত্রটি ‘আরবের সব গোত্রের চেয়ে বেশি সংরক্ষণকারী ছিল رجب মাসের সম্মানের ক্ষেত্রে।
رجب ‘রজব’ মাসের আরেকটি গুণ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আর তা হলো রজব মাস জামাদিউস্ সানী ও শা‘বানের মাঝে হবে। এ কথার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো বিষয়টিকে আরো পরিষ্কার করা এবং জোড়ালোভাবে বলা। যেমনঃ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (اسنان الصدقة) বা সদাক্বার উটের বয়স সংক্রান্ত বিষয়ে বললেন, যদি ابنة مخاض না থাকে তাহলে একটি পুরুষ ابن لبون দিতে হবে অথচ আমরা জানি ابن لبون পুরুষ ছাড়া হয় না তারপরও নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরুষ শব্দটি অতিরিক্ত বলে বিষয়টি আরো বেশি পরিষ্কার করেছেন। তবে এর আরো একটি কারণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে আর তা হলো, যাতে করে তদানীন্তন জাহিলী যুগের মানুষেরা তাদের মনমতো হিসাবে মাস গণনা করতো তা বন্ধ করা।
‘আল্লামা নাবাবী (রহঃ) বলেন, এ ব্যাপারে সকল ‘আলিম ঐকমত্য যে, হারাম চারটি মাস সেই চারটিই যা হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে চারটি মাস কিভাবে গণনা করা ভাল (مستحب) সে বিষয়ে দ্বিমত রয়েছে। সুতরাং কূফার একদল ‘আলিম বলেন, গণনাটি হবে এমন মুহাররম, রজব, যুলকাদা ও জিলহজ্জ। অর্থাৎ- মুহাররম দিয়ে শুরু আর যিলহিজ্জাহ্ দিয়ে শেষ হবে যাতে করে চারটি মাস একই বছরে হয়। অপরদিকে মদীনাহ্ বাসরার অধিকাংশ ‘উলামায়ে কিরামের মত হচ্ছে, যুলকাদা, জিলহজ্জ, মুহাররম ও সর্বশেষ রজব, অর্থাৎ- তিনটি ধারাবাহিক আর একটি ধারাবাহিকতাবিহীন। আর এটাই সহীহ যা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
‘উলামায়ে কিরামের কেউ কেউ আবার এ ‘আরাবী মাসগুলোর রহস্য উদঘাটনেরও প্রচেষ্টা করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, মুহাররম মাসকে বছরের প্রথমে নিয়ে আসার কারণ হলো, যাতে করে বছরের প্রথম মাসটিই যেন সম্মানসূচক হয় আর শেষটিও সম্মানসূচক হয় আর মাঝখানে রজব তাও সম্মানসূচক কেননা (انما الاعمال بالخواتيم) শেষের উপর ‘আমল নির্ভরশীল।
মোট কথা হলো, বারো মাসের ভিতর এ চারটি মাস হচ্ছে মর্যাদাশীল গুরুত্বপূর্ণ, তাই সঙ্গত কারণেই তাদের দ্বারা বছরের গণনা শুরু, মাঝখান এমনকি শেষ হতে পারে।
(وَقَالَ: أَىُّ شَهْرٍ هٰذَا؟) এ প্রশ্নটির মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে ভাল করে ঐ মাসটি, শহরটি এবং দিনটি সম্পর্কে এবং তার মর্যাদা সম্পর্কে গুরুত্বারোপ করতে বলেছেন।
‘আল্লামা কুরতুবী (রহঃ) বলেন, দিনটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে চুপ করে থাকার ভিতর হিকমাত হলো উপস্থিত জনতার দৃষ্টি আকর্ষণ। যাতে করে এর পরের বাক্যটির দিকে তারা মনোযোগী হয়।
(قُلْنَا: اللّٰهُ وَرَسُولُه أَعْلَمُ) ‘আল্লামা তুরবিশতী (রহঃ) বলেন, উত্তর দিতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও তা আল্লাহ ও তার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর ন্যাস্ত করা, এটি একটি আদব তথা শিষ্টাচার। আর তারা ভেবেছেন যে, আমরা এমন উত্তর দিতে পারি যার চেয়ে বেশি আরো উত্তর থাকতে পারে। তাই প্রথমে তারা উত্তরের বিষয়টিকে علام الغيوب তথা মহান আল্লাহর দিকে ন্যাস্ত করেছেন। পরক্ষণে আবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দিকে ফিরিয়েছেন কারণ তিনি অবশ্যই তাদের চেয়ে ভাল জানেন।
(الْبَلْدَةَ) ‘আল্লামা খিত্বাবী (রহঃ) বলেছেন, এখানে بلدة (শহর) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো পবিত্র মক্কা নগরী। যেমনঃ মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, অর্থাৎ- ‘‘নিশ্চয়ই আমি এ শহরের রবের ‘ইবাদাত করতে আদিষ্ট হয়েছি।’’ (সূরা আন্ নামল ২৭ : ৯১)
‘আল্লামা ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেছেন, فلا ترجعوا بعدي كفارا অর্থাৎ- তোমরা আমার মৃত্যুর পর কাফির হয়ে যেয়ো না- এ কথাটির সাতটি ব্যাখ্যা হতে পারে।
১. ان ذلك كفر فى حق المستحل بغير حق অর্থাৎ- অন্যায়ভাবে বস্ত্ততঃই কাফির বনে যাওয়া।
২. ان ذلك كفر النعمة وحق الاسلام অর্থাৎ- সেটা হচ্ছে আল্লাহর নি‘আমাত ও ইসলামের হাক্বের কুফরী।
৩. انه يقرب من الكفر ويودى إليه অর্থাৎ- এটা কুফরের পর্যায়ভুক্ত।
৪. انه فعل كفعل الكفار অর্থাৎ- এটা কুফরী না তবে কুফরীর মতো।
৫. حقيقة الكفر অর্থাৎ- বস্ত্ততই কুফরী-এর অর্থ হলো তোমরা আমার পর কাফির হয়ে যেয়ো না, বরং মুসলিম থেকো।
৬. ইমাম খিত্বাবী (রহঃ) বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, (المتكبرون بالسلام)
৭. তোমরা একে অপরকে কাফির বলিও না।
উল্লেখ্য যে, চতুর্থ মতটি এখানে প্রণিধানযোগ্য যেমনটা বলেছেন, কাযী ‘ইয়ায (রহঃ)।
(فَرُبَّ مُبَلَّغٍ) হাদীসের এ অংশটিতে ‘ইলম প্রচারের বিষয়ে উৎসাহ দেয়া হয়েছে এবং এ হাদীস থেকে বুঝা যায় পূর্ণযোগ্যতা আসার আগেও ‘ইলম অর্জন করা যায় এবং আরো বুঝা যায় ‘ইলমে প্রচার করাও فرض كفاية (ফারযে কিফায়াহ্) তবে কিছু কিছু মানুষের জন্য তা فرض عين (ফারযে ‘আয়ন) হয়ে যায়।
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - কুরবানীর দিনের ভাষণ, আইয়্যামে তাশরীক্বে পাথর মারা ও বিদায়ী তাওয়াফ করা
২৬৬০-[২] ওয়াবারাহ্ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করলাম, আমি কোন্ দিন পাথর মারবো? তিনি বললেন, তোমার ইমাম যেদিন মারবে তুমিও সেদিন পাথর মারবে। আবার আমি তাঁকে এ মাসআলাটি জিজ্ঞেস করলাম। তখন তিনি বললেন, আমরা সময়ের অপেক্ষায় থাকতাম, যখন সূর্যাস্ত হলো সূর্য ঢলে যেত তখন আমরা পাথর মারতাম। (বুখারী)[1]
লাল মার্ক করা অংশের অনুবাদ সঠিক না হবার কারনে তা সংশোধন করা হল। - হাদিসবিডি এডমিন
بَابٌ خُطْبَةُ يَوْمِ النَّحْرِ وَرَمْىِ أَيَّامِ التَّشْرِيْقِ وَالتَّوْدِيْعِ
وَعَن وَبرةَ قَالَ: سَأَلْتُ ابْنَ عُمَرَ: مَتَى أَرْمِي الْجِمَارَ؟ قَالَ: إِذَا رَمَى إِمَامُكَ فَارْمِهِ فَأَعَدْتُ عَلَيْهِ الْمَسْأَلَةَ. فَقَالَ: كُنَّا نَتَحَيَّنُ فَإِذَا زَالَتِ الشَّمْسُ رمينَا. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: (وَعَنْ وَبَرَةَ) তার প্রকৃত নাম হলো ওয়াবারাহ্ বিন ‘আব্দুর রহমান আল মাসলামী তার কুন্ইয়্যাত হলো আবূ খুযায়মাহ্ অথবা আবুল ‘আব্বাস আল কূফী তিনি সিক্বাহ রাবী। তিনি একজন তাবি‘ঈ ১১৬ হিজরীতে খালিদ বিন ‘আবদুল্লাহ আল কাসরীর শাসনামলে কূফায় মৃত্যুবরণ করেন।
‘আল্লামা হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, اذا رمى امامك فارمه হাদীসের এ অংশে বলা হয়েছে ইমাম কংকর নিক্ষেপ করলে কংকর নিক্ষেপ করার কথা, আর এখানে ইমাম দ্বারা হজ্জের ইমাম উদ্দেশ্য। ইবনু ‘উমার যেন ভয় করছিলেন যে, প্রশ্নকারী হয়তো ইমামের বিপরীত কর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে কোন ক্ষতির সম্মুখীন হবেন, তাই তাকে এ ধরনের নির্দেশ প্রদান করেছেন। কিন্তু প্রশ্নকারী যখন প্রশ্নটি পুনঃরায় করলেন তখন ইবনু ‘উমার (রাঃ) আর ‘ইলম গোপন রাখলেন না, বরং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জামানায় তারা যেভাবে কংকর নিক্ষেপ করতেন তা ব্যাখ্যা করে বললেন।
এ সম্পর্কিত আরো একটি বর্ণনা রয়েছে সুফিয়ান ইবনু ‘উয়াইনাহ্ মিস্‘আর থেকে আর মিস্‘আর ওয়াবারার সূত্রে ওয়াবারাহ্ ইবনু ‘উমার (রাঃ) এর সূত্রে সেখানে রয়েছে। প্রশ্নকারী লোকটি ইবনু ‘উমার (রাঃ)-কে বললেন, আমার ইমাম যদি কংকর নিক্ষেপ করতে দেরী করেন তাহলে সে ক্ষেত্রে আপনার মতামত কি? পরবর্তীতে ইবনু ‘উমার (রাঃ) তার উত্তরে বিস্তারিত বললেন। হাদীসটি ইবনু আবী ‘উমার তার মুসনাদে বর্ণনা করেছেন।
(فَأَعَدْتُ عَلَيْهِ الْمَسْأَلَةَ) অর্থাৎ- এখানে প্রশ্নকারী কংকর নিক্ষেপ করার সময়টিকে নিশ্চিতভাবে জানতে চেয়েছিলেন।
(كُنَّا نَتَحَيَّنُ) এ শব্দটি حين থেকে باب مفاعلة থেকে নির্গত আর حين অর্থ সময়। সুতরাং نتحين অর্থ হবে আমরা কংকর নিক্ষেপ করার জন্য সূর্য ঢলে যাওয়ার সময় পর্যবেক্ষণে রাখতাম। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেন, আমরা কংকর নিক্ষেপ করার সময়ের অপেক্ষায় থাকতাম।
‘আল্লামা তাবারী (রহঃ) বলেন, এর অর্থ হলো, كنا نطلب حينها والحين الوقت অর্থাৎ- আমরা কংকর নিক্ষেপ করার সময়ের অনুসন্ধান করতাম। এর থেকেই অন্য বর্ণনায় শব্দ এসেছে, كانوا يتحينون وقت الصلاة তারা (সহাবায়ে কিরাম) সালাতের প্রহর গুণতেন।
আর অত্র হাদীসটিই ইমাম আবূ দাঊদ (রহঃ) (كنا نتحين زوال الشمس) শব্দে বর্ণনা করেছেন।
(فَإِذَا زَالَتِ الشَّمْسُ رَمَيْنَا) আমরা যুহরের সালাতের পূর্বেই কংকর নিক্ষেপ করতাম। অবশ্যই ইমাম ইবনু মাজাহ হাকাম-এর সনদে মিকসাম থেকে, তিনি ‘আবদুল্লাহ বিন ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য ঢলে যাওয়ার পর জামারায়ে ‘আক্বাবাতে কংকর নিক্ষেপ করতেন এবং কংকর নিক্ষেপ হলেই যুহরের সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করতেন।
‘আল্লামা সিনদী (রহঃ) বলেন, অত্র হাদীসটি প্রমাণ করছে যে, নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য ঢলে যাওয়ার পর প্রথমেই কংকর নিক্ষেপ করতেন, তারপর যুহরের সালাত আদায় করতেন।
অত্র হাদীস থেকে আরো বুঝা যায় ঈদুল আযহার ব্যতীত অন্যান্য দিনে কংকর নিক্ষেপ করার সময় হলো সূর্য ঢলার পর আর কেউ যদি সূর্য ঢলার পূর্বেই কংকর নিক্ষেপ করে তাহলে তা যথেষ্ট হবে না। আর এমনটাই অধিকাংশ ‘আলিমের মতামত। তবে ‘আত্বা, ত্বাউস (রহঃ) সহ অনেকেই এ মতের বিপরীত বলেছেন। কিন্তু এদের কথা ঠিক নয়, কারণ হাদীস তাদের বিপরীতে অবস্থান করছে।
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - কুরবানীর দিনের ভাষণ, আইয়্যামে তাশরীক্বে পাথর মারা ও বিদায়ী তাওয়াফ করা
২৬৬১-[৩] সালিম (রহঃ) (তাঁর পিতা) ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, তিনি [’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ)] প্রথম জামারায় (নিকটবর্তী জামারায়) সাতটি পাথর মারতেন এবং প্রত্যেক পাথরের মারার সময় ’আল্লা-হু আকবার’ বলতেন। তারপর তিনি কিছু দূর আগে বেড়ে নরম মাটিতে যেতেন এবং সেখানে কিবলার দিকে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় হাত তুলে দু’আ করতেন। তারপর জামারায়ে উস্ত্বা’য় (মধ্যম জামারায়) এসে আবার সাতটি পাথর মারতেন। প্রত্যেক (ছোট) পাথর মারার সাথে ’আল্লা-হু আকবার’ বলতেন। তারপর বামদিকে কিছু দূর এগিয়ে নরম মাটিতে পৌঁছে কিবলার দিকে দাঁড়িয়ে দু’আ করতেন। এরপর জামারাতুল ’আক্বাবায় গিয়ে বাত্বনি ওয়াদী (খোলা নিচু জায়গা) হতে সাতটি পাথর মারতেন। প্রত্যেক পাথর মারার সাথে ’আল্লা-হু আকবার’ বলতেন। কিন্তু এখানে দাঁড়াতেন না, বরং (গন্তব্য পথে) চলে যেতেন এবং বলতেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এভাবে পাথর (কঙ্কর) মারতে দেখেছি। (বুখারী)[1]
بَابٌ خُطْبَةُ يَوْمِ النَّحْرِ وَرَمْىِ أَيَّامِ التَّشْرِيْقِ وَالتَّوْدِيْعِ
وَعَن سالمٍ عَن ابنِ عمر: أَنَّهُ كَانَ يَرْمِي جَمْرَةَ الدُّنْيَا بِسَبْعِ حَصَيَاتٍ يُكبِّرُ على إِثْرَ كُلِّ حَصَاةٍ ثُمَّ يَتَقَدَّمُ حَتَّى يُسْهِلَ فَيَقُومُ مُسْتَقْبِلَ الْقِبْلَةِ طَوِيلًا وَيَدْعُو وَيَرْفَعُ يَدَيْهِ ثُمَّ يَرْمِي الْوُسْطَى بِسَبْعِ حَصَيَاتٍ يُكَبِّرُ كُلَّمَا رَمَى بِحَصَاةٍ ثُمَّ يَأْخُذُ بِذَاتِ الشِّمَالِ فَيُسْهِلُ وَيَقُومُ مُسْتَقْبِلَ الْقِبْلَةِ ثُمَّ يَدْعُو وَيَرْفَعُ يَدَيْهِ وَيَقُومُ طَوِيلًا ثُمَّ يَرْمِي جَمْرَةَ ذَاتِ الْعَقَبَةِ مِنْ بَطْنِ الْوَادِي بِسَبْعِ حَصَيَاتٍ يُكَبِّرُ عِنْدَ كُلِّ حَصَاةٍ وَلَا يَقِفُ عِنْدَهَا ثُمَّ يَنْصَرِفُ فَيَقُولُ: هَكَذَا رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَفْعَله. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: (كَانَ يَرْمِىْ جَمْرَةَ الدُّنْيَا) এ রকম বর্ণনাই সবগুলো নুসখা (পান্ডুলিপি)-তে রয়েছে এমনকি মিশকাতুল মাসাবীহ-তেও অর্থাৎ- জামারা শব্দটিকে الدنيا শব্দের দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। তবে সহীহুল বুখারীতে রয়েছে ভিন্নরূপ সেখানে (الجمرة الدنيا) রয়েছে।
ইমাম তুরবিশতী (রহঃ) বলেন, الجمرة শব্দটি একবচনের শব্দ আর জামারাহ্ মূলত তিনটি তার অন্যতম হলো যাতুল ‘আক্বাবাহ্ যা মক্কা নগরীর নিকটে অবস্থিত। আর কুরবানীর দিন শুধু-ই এ যাতুল ‘আক্বাবাতে কংকর নিক্ষেপ করতে হয়। আর কুরবানীর পরের দিন তিনটি কংকর নিক্ষেপ করতে হয় এ ক্ষেত্রে নিয়ম তাই যা অত্র হাদীসে উল্লেখ হয়েছে।
جمرة الدنيا একে جمرة الدنيا নামকরণের কারণ হলো মাসজিদুল খায়ফ-এ যারা সেখানে অবতীর্ণ হন সে অবতীর্ণ হওয়ার স্থানসমূহের নিকটবর্তী স্থানে এটি অবস্থিত আর دنيا শব্দের অর্থই হলো নিকটবর্তী। আর এ স্থানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উট বসাতেন। এ জামারাটিকে ‘‘দুনিয়া’’ শব্দের দিকে ইযাফাতের বিষয়টি اضافة ال صفة إلى الموصوف এর ন্যায়। যেমনঃ মাসজিদ শব্দটিকে الجامع-এর দিকে সম্পৃক্ত করে مسجد الجامع তথা জামি' মাসজিদ নামকরণ করা হয়।
(يُكبِّرُ عَلٰى إِثْرَ كُلِّ حَصَاةٍ) অর্থাৎ- اثر শব্দটি হামযাহতে যের ও ‘‘সা’’-কে সাকিন দিয়ে اثر অথবা হামযা ও ‘‘সা’’ উভয়টিকে যবর দিয়ে اثر-ও পড়া যায়। এর অর্থ হল প্রতিটি কংকর নিক্ষেপ করার পর الله أكبر বলতে হবে। আর হাদীসের বাহ্যিক থেকে বুঝা যায়, কংকর নিক্ষেপ করার পরই الله أكبر বলতে হবে। অপরদিকে ইমাম আহমাদ-এর এক বর্ণনায় (মুসনাদে আহমাদ ২য় খণ্ড পৃষ্ঠা ১৫২) আছে।
(كبر مع كل حصاة) তথা প্রতি কংকরের সাথে ‘আল্লা-হু আকবার’ বলার কথা। ঠিক এ রকমই বর্ণিত হয়েছে ইমাম মুসলিম কর্তৃক জাবির (রাঃ)-এর বর্ণনা ও অন্যান্য বর্ণনায় এবং ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম কর্তৃক ‘আবদুল্লাহ বিন মাস্‘ঊদ (রাঃ)-এর বর্ণনাও ঠিক এ রকম এবং আসছে যে হাদীসটি ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত তাতে রয়েছে (يكبر عند كل حصاة)-এর কথা। ‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী হানাফী (রহঃ) যাকে বেশি ‘‘আম্’’ ব্যাপক অর্থজ্ঞাপক বলেছেন।
অপরদিকে যে হাদীসে مع তথা কংকর নিক্ষেপের সাথে সাথে ‘আল্লা-হু আকবার’ বলার কথা বর্ণিত হয়েছে তার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কংকরটি হাত থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই তাকবীর বলতে হবে এখানে সাথে অর্থ হলো যেহেতু কংকরটি তার নিকট থেকে বের হয়ে শেষ গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত তা তার সাথেই রয়েছে। কেউ কেউ اثر كل حصاة এর ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়াস পেয়েছেন এভাবে যে, এখানে উদ্দেশ্য হলো কংকর নিক্ষেপ করার ইচ্ছা করার পর।
معية তথা একই সাথে হতে হবে বলে মত দিয়েছেন চার ইমামের অনুসারী তথা ছাত্ররা যেমনঃ এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন, ইমাম বাজী, ইবনু কুদামাহ্ ও ইমাম নাবাবী (রহঃ)। ইমাম দাসূকী (রহঃ) বলেন, এ বিষয়ে ‘‘আল মুদাওয়ানাহ্’’ গ্রন্থে যা সন্নিবেশিত হয়েছে তার বাহ্যিক থেকে বুঝা যায় (إن التكبير مع كل حصاة سنة) তথা প্রত্যেক কংকরের সাথে ‘আল্লা-হু আকবার’ বলা সুন্নাহ। অপরদিকে ‘‘আল হিদায়া’’ নামক কিতাবেও (يكبر مع كل حصاة)-এর কথা এসেছে। আর এমন বর্ণনাই এসেছে ‘আবদুল্লাহ বিন মাস্‘ঊদ ও ‘আবদুল্লাহ বিন ‘উমার (রাঃ)-এর বর্ণনায়।
(ثُمَّ يَتَقَدَّمُ) অর্থাৎ- যে স্থানে ছিলেন সেখান থেকে একটু সরে গেলেন। অন্য বর্ণনায় এসছে, (ثم تقدم امامها) তথা একটু সামনে বাড়লেন।
(حَتّٰى يُسْهِلَ) ‘আল্লামা হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, এখানে উদ্দেশ্য হলো সমতল ভূমি যেখানে কোন প্রকার উঁচু নিচু নেই।
‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী হানাফী (রহঃ) বলেন, المكان السهل বলতে নরম মাটি যা শক্ত নয় এমন মাটিকে বুঝানো হয়।
(ثُمَّ يَرْمِى الْوُسْطٰى) অন্য বর্ণনায় আছে, ثم يرمى الجمرة الوسطى التى الاولى والأخرى
‘আল্লামা ইবনুল হুমাম (রহঃ) বলেন, জামারাতে কংকর নিক্ষেপ করার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা রক্ষা করাটি আবশ্যক না উত্তম- এ ব্যাপারে মতপার্থক্য রয়েছে তবে আমার নিকট উত্তম, আবশ্যক নয়। (আল্লাহই ভালো জানেন)
‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী হানাফী (রহঃ) বলেন, তারতীব তথা ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই যুক্তিসঙ্গত কারণ তা ইমাম শাফি‘ঈসহ অন্যান্যদের মতে ওয়াজিব এবং الموالاة তথা অবিচ্ছিন্নভাবে কংকর নিক্ষেপ করা سنة। যেমনঃ উযূর ক্ষেত্রে উযূর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো ধোয়ার ক্ষেত্রে موالاة করা سنة মালিকী মাযহাব অনুপাতে।
‘আল্লামা ইবনু কুদামাহ (রহঃ) বলেন, (মুগনী তৃতীয় খণ্ড পৃষ্ঠা ৪৫২)
والترتيب فى هذه الجمرات واجب على ما وقع فى حديث ابن عمر وحديث عائشة عند أبى داودزد....................................
অর্থাৎ- এ জামারাগুলোতে কংকর নিক্ষেপ করার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা ওয়াজিব যা বুঝা যায় ইমাম আবূ দাঊদ কর্তৃক বর্ণিত ‘আবদুল্লাহ বিন ‘উমার (রাঃ) ও ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর হাদীস দ্বারা। তবে যদি কেউ উল্টিয়ে করতে চায় তাহলে প্রথমে শুরু করবে জামারায়ে ‘আক্বাবাহ্ থেকে, তারপর দ্বিতীয়টি, অতঃপর প্রথমটি অথবা শুরু করবে দ্বিতীয়টি দ্বারা এবং তিনটি করে কংকর নিক্ষেপ করা যথেষ্ট হবে না যতক্ষণ না প্রথমটিতে মারবে এবং মাঝখানের ও প্রান্তেরটির নিক্ষেপ না করবে- এমনটাই বলেছিলেন ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ)। আর যদি শেষ প্রান্তেরটি নিক্ষেপ করে অতঃপর প্রথমটি এবং তারপর মাঝখানেরটি তাহলে প্রান্তেরটি পুনঃরায় করবে- এমনই বলেছেন ইমাম মালিক ও ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ)।
হাসান বাসরী ও ‘আত্বা বলেন, তারতীব তথা ধারাবাহিকতা রক্ষা করা ওয়াজিব নয় এবং এটাই ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ)-এর কথা। কেননা তার যুক্তি হলো, যদি কেউ উল্টাভাবে কংকর নিক্ষেপ করে তাহলে তার উচিত হলো পুনরায় করা আর যদি পুনরায় না করে তাহলে কোন অসুবিধা নেই।
হানাফী বিদ্বানের কেউ কেউ দলীল হিসেবে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিম্নোক্ত হাদীসটি পেশ করে থাকেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, (من قدم نسكا يدي نسك فلا حرج) অর্থাৎ- একটি ‘ইবাদাত আগে আরেকটি করাতে কোন অসুবিধা নেই। এ হাদীসটিতে ‘ইবাদাত বলতে জামারায় কংকর নিক্ষেপ উদ্দেশ্য। আর যেহেতু এ জামারায় কংকর নিক্ষেপ করার বিষয়টি একই সময় বিভিন্ন স্থানে হয়ে থাকে যার একটির সাথে আরেকটির কোনই সম্পর্ক নেই, তাই এক্ষেত্রে তীর নিক্ষেপ ও কুরবানীর মতো ধারাবাহিকতা রক্ষার শর্ত করা হয়নি। আর আমরা (জমহূর ‘উলামাহগণ) বলি ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে কারণ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং বলেছেন, (خذاء عنى منامككم) অর্থাৎ- তোমরা আমার নিকট থেকে হজ্জের বিধানগুলো আকড়ে ধর। হানাফী বিদ্বানগণ যে হাদীসটি দলীল হিসেবে পেশ করেছেন তা সেই ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রয়োগ হবে যিনি একটি কুরবানীর পর আরেকটি কুরবানী করেন, কুরবানী আগে-পিছে করলে কোন অসুবিধা নেই- এ অর্থে হাদীসটি গ্রহণ করা ঠিক হবে না। পক্ষান্তরে তাওয়াফ ও সা‘ঈ করার ক্ষেত্রে তাদের ধারাবাহিকতা রক্ষা করার কারণে তাদের বক্তব্য স্ববিরোধী হয়ে যায় এবং তাদের তথাকথিত অযৌক্তিক ক্বিয়াস বাতিল বলে পরিগণিত হয়।
‘আল্লামা শানক্বীতী (রহঃ) বলেন,
اعلم انه يجب الترتيب فى رمى من الجمار ايام التشريق فيبدأ بالجمرة الاولى التى بلى مسجدا الخيف..................
অর্থাৎ- জেনে রেখ আইয়্যামে তাশরীক্ব যে জামারাগুলোতে কংকর নিক্ষেপ করা হয়, এক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা আবশ্যক, সুতরাং (হাজী সাহব) প্রথমে (الجمرة الاولى) প্রথম জামারার মাধ্যমে যা মাসজিদুল খায়ফ-এর নিকট অবস্থিত সেখান থেকে শুরু করবেন আর সেখানে সাতটি কংকর নিক্ষেপ করবেন প্রত্যেকটির সাথে ‘‘আল্লাহু আকবার’’ বলবেন তারপর সেখান থেকে ফিরে الجمرة الوسطى তথা মধ্যবর্তী জামারার নিকটে আসবেন সেখানেও পূর্বের মতই নিক্ষেপ করবেন। আর শেষে জামারায় ‘আক্বাবাতে এসেও তেমনি নিক্ষেপ করবে। আর এ তারতীব (ধারাবাহিকতা) যা আমরা উল্লেখ করলাম এটাই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাজ তিনি এভাবেই করেছেন আর আমাদের এভাবে করতে আদেশ করেছেন। সুতরাং আমাদের উচিত তার অনুসরণ করা। অতঃপর ‘আল্লামা শানক্বীতী ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসে যার ব্যাখ্যা আমরা এখন করছি তা দলীল হিসেবে উল্লেখ করেন।
অতঃপর বলেন, ইমাম বুখারী (রহঃ) এ হাদীস সম্পর্কে পরপর তিনটি করে (অধ্যায়) উল্লেখ করেছেন। যা ধারাবাহিকতা রক্ষার পক্ষে বিশুদ্ধ এবং স্পষ্ট প্রমাণ। অপরদিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে তার এ রীতি অনুসরণ করতে বলেছেন, তিনি বলেছেন, (خذ عنى مناسككم) তোমরা আমার থেকে এর নিয়ম গ্রহণ কর। সুতরাং কেউ যদি ধারাবাহিকতা রক্ষা না করে আগ-পিছ করে জামারায় কংকর নিক্ষেপ করে থাকে তাহলে তা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশনার সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ায় বাতিল বলে গণ্য হবে। অন্য এক হাদীসে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, (من عمل عملا ليس عليه امرنا فهو رد)
যে ব্যক্তি এমন কোন কাজ করলো যা আমাদের নির্দেশনার মধ্যে নেই তা পরিত্যাজ্য। আর জামারায় কংকর নিক্ষেপে ধারাবাহিকতা রক্ষা না করা এটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশনার মধ্যে নেই তাই তাও পরিত্যাজ্য। এটাই ইমাম শাফি‘ঈ, মালিক ও অধিকাংশ ‘উলামায়ে কিরামের অভিমত।
অত্র হাদীসটি থেকে বুঝা যায় প্রত্যেক কংকরের সাথে তাকবীর দেয়া বিধি সুন্নাত। সকল ‘আলিমের ঐকমত্য যদি কেউ তাকবীর না দেয় তাহলে তার কোনই কাফফারাহ দেয়া লাগবে না তবে সুফিয়ান সাওরী (রহঃ) বলেছেন ভিন্ন কথা, তিনি বলেছেন, সে খাদ্য খাওয়াবে তবে একটি কুরবানী দিয়ে ক্ষতি পূরণ আমার নিকট সর্বোত্তম।
‘উলামাহগণ আরো একমত হয়েছেন যে, কংকর নিক্ষেপের সংখ্যা সাতটি হওয়ার ব্যাপারে এবং কংকর নিক্ষেপের মুহূর্তে কিবলামুখী হওয়া ও প্রথম এবং দ্বিতীয় জামারার নিকটে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা ও বিনয়ী হওয়ার ব্যাপারে। এ হাদীস থেকে আরো বুঝা যায় কংকর নিক্ষেপের পর দু‘আ করার সময় কংকর নিক্ষেপের স্থান থেকে সরে গিয়ে দু‘আ করতে হবে যাতে করে অন্যের কংকর এসে নিজের শরীরে না লাগে।
এ হাদীস থেকে কংকর নিক্ষেপের সময় দু‘আর ক্ষেত্রে রফ্‘উল ইয়াদায়ন তথা দু’হাত উঁচু করার কথা বুঝা যায়। দু‘আ না করার কথাও বুঝা যায় এবং বুঝা যায় জামারায় ‘আক্বাবাতে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না।
‘আল্লামা ইবনু কুদামাহ্ (রহঃ) বলেন,
لا نعلم لما تضمنه حديث ابن عمر هذا مخالفا الا ما روى عن مالك أنه ترك رفع اليدين عند الدعاء بعد رمى الجمار.
অর্থাৎ- আমাদের জানা মতে এ দু‘আর ক্ষেত্রে কংকর নিক্ষেপের পর দু‘আর সময় দু’হাত উত্তোলন করতে হবে এতে কোন বিরোধ নেই। তবে ইমাম মালিক (রহঃ)-এর বিপরীত অবস্থান গ্রহই করেছেন।
‘আল্লামা ইবনুল মুনযীর (রহঃ) বলেন, (لا أعلم أحدا انكر رفع اليدين فى الدعاء عند الجمرة الا ما حكاه ابن القاسم عن مالك) জামারার নিকটে দু‘আর সময় রফ্‘উল ইয়াদায়ন করতে হবে এতে কারো দ্বিমত নেই তবে ইবনুল কাসিম ইমাম মালিক (রহঃ) থেকে যে বর্ণনা করেছেন তা ব্যতীত।
‘আল্লামা হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, ইবনুল মুনযীর রফ্‘উল ইয়াদায়নের বিষয়টি এভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন যে, যদি তা سنة ثابتة (প্রমাণিত সুন্নাত) হতো তাহলে তা মদীনার ‘আলিমরাই সর্বাগ্রে বর্ণনা করতেন। এ বিষয়ে তারা অমনোযোগী হতেন না। তবে ‘আল্লামা কুসত্বালানী (রহঃ) মালিকী মাহযহাবের ইবনু ফারহুন থেকে হজ্জের জামারায় ‘আক্বাবাতে কংকর নিক্ষেপের পর দু‘আর ক্ষেত্রে রফ্‘উল ইয়াদায়ন করা বা না করা এ দু’ধরনের কথাই ইমাম মালিক থেকে বর্ণনা করেছেন।
অত্র হাদীসটিতে কংকর নিক্ষেপ কি হেঁটে চলে করতে হবে না সওয়ারী হয়ে সে বিষয়ে কোন নির্দেশনা নেই। তবে অন্যান্য হাদীসের বিবরণ রয়েছে। যেমনঃ ইবনু আবী শায়বাহ্ সহীহ সনদে বর্ণনা করেন, ان ابن عمر كان عشى الى الجمار مقبلا ومدبرا অর্থাৎ- নিশ্চয়ই ইবনু ‘উমার জামারার দিকে হেঁটে হেঁটে যেতেন এবং জাবির (রাঃ) থেকে আরো একটি বর্ণনা এসেছে, তিনি খুব প্রয়োজন না হলে সওয়ারী হতেন না।
ইমাম তিরমিযী ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে এ বিষয়ে বর্ণনা করেছেন এবং বর্ণনাটিকে সহীহ বলেছেন এমনকি ইমাম বায়হাক্বীও হাদীসটি বর্ণনা করেছেন যে,
(ان النبى ﷺ كان اذا رمى الجمار مشى اليها ذاهبا وراجعا) অর্থাৎ- নিশ্চয়ই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কংকর নিক্ষেপ করতে ইচ্ছা করতেন তখন জামারায় যাওয়া-আসা করতেন পায়ে হেঁটে।
অন্য শব্দে এসেছে, (كان يرمى الجمرة يوم النحر ركبا وسائر ذلك ماشيا) অর্থাৎ- নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু কুরবানীর দিন সওয়ারী হওয়া ছাড়া বাদ বাকী সব সময় পায়ে হেঁটেই জামারায় কংকর নিক্ষেপ করতেন। (মুসনাদে আহমাদ ২য় খণ্ড পৃষ্ঠা ১১৪, ১৩৭, ১৫৬, ১৫২, বুখারী, আবূ দাঊদ, বায়হাক্বী ২য় খণ্ড পৃষ্ঠা ১৪৮)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - কুরবানীর দিনের ভাষণ, আইয়্যামে তাশরীক্বে পাথর মারা ও বিদায়ী তাওয়াফ করা
২৬৬২-[৪] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’আব্বাস ইবনু ’আবদুল মুত্ত্বালিব লোকদেরকে পানি পান করানোর জন্য মিনার রাতগুলো মক্কায় থাকার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে অনুমতি চাইলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে অনুমতি দিলেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابٌ خُطْبَةُ يَوْمِ النَّحْرِ وَرَمْىِ أَيَّامِ التَّشْرِيْقِ وَالتَّوْدِيْعِ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: اسْتَأْذَنَ الْعَبَّاسُ بْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَبِيتَ بِمَكَّةَ لَيَالِيَ منى من أجلِ سِقايتِهِ فَأذن لَهُ
ব্যাখ্যা: (اسْتَأْذَنَ الْعَبَّاسُ بْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ) এর দ্বারা তথা অত্র হাদীসটি দ্বারা ১১, ১২ ও ১৩ তারিখের রাতগুলো উদ্দেশ্য।
(مِنْ أَجْلِ سِقَايَتِه) ‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী হানাফী (রহঃ)-এর ব্যাখ্যায় বলেন, পানি পান করানোর দায়িত্ব থাকার কারণে অর্থাৎ- মাসজিদুল হারামে যেখানে যমযম কূপের পানি দ্বারা ভরপুর আর হাজীদের জন্য সেখান থেকে পানি পান করা ‘‘মানদূব’’ এবং তা পান করতে হয় তাওয়াফে ইফাযাহ্-এর পরপরই। আর অন্যান্য তাওয়াফের পরও তা পান করা যায় এবং প্রচন্ড ভীড় থাকার কারণে এ কূপ থেকে পানি পান করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং যমযম কূপের পানি বারাকাতপূর্ণ এবং এ কূপটি প্রাথমিককালে কুসাই-এর তত্ত্বাবধানে, অতঃপর তার মৃত্যুর পর তারই পুত্র ‘আব্দ মানাফ-এর তত্ত্বাবধানে, অতঃপর তার মৃত্যুর পর তার পুত্র হাশিম-এর তত্ত্বাবধানে, তার মৃত্যুর পর তারই পুত্র ‘আবদুল মুত্ত্বালিব-এর তত্ত্বাবধানে, অতঃপর তার মৃত্যুর পর তারই পুত্র ‘আবদুল্লাহ এর নিকটে, অতঃপর তার মৃত্যুর পর তারই পুত্রের তত্ত্বাবধানে, এভাবে পর্যায়ক্রমে আজ পর্যন্ত এর ধারাবাহিকতা চলছে।
আল ফাকিহী (রহঃ) ‘আত্বা (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেন, ‘আত্বা (রহঃ)-এর ব্যাখ্যায় বলেন, এখানে পানীয় দ্বারা উদ্দেশ্য হলো হাজীদের যমযম কূপের পানি পান করানো।
আযরাক্বী (রহঃ) বলেন, ‘আব্দ মানাফ মশকে করে যমযম কূপের পানি মক্কায় নিয়ে যেতেন এবং তা চামড়ার পাত্রে পান করার জন্য কা‘বার আঙ্গিনায় হাজীদের জন্য ঢেলে দিতেন। তারপর তার মৃত্যুর পর তার ছেলে হাশিম, তারপর ‘আব্দুল মুত্ত্বালিব এ দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর যমযম কূপ খনন করা হলে যাবীব (আঙ্গুর) কিনে তা যমযম কূপের পানিতে দিয়ে ‘নাবীয’ তৈরি করে তা মানুষের জন্য পরিবেশন করতেন।
ঐতিহাসিক ইবনু ইসহাক বলেন, কুসাই বিন কিলাব কাবা ঘরের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হলো তখন তারই দায়িত্ব ছিল কা‘বার গিলাফ পরানোর দায়িত্ব থেকে শুরু করে হাজীদের পানি পান করানো, ঝাণ্ডা ধরা, দারুণ নাদওয়ার দায়িত্ব সবই তার দায়িত্বে ছিল তার মৃত্যুর পর তার ছেলেরা পরস্পর পরামর্শক্রমে পানি পান করানো ও কা‘বার রক্ষণাবেক্ষণ করার দায়িত্ব ‘আব্দ মানাফকে আর বাকী দায়িত্ব অন্যান্য ভাইদের ওপর ন্যাস্ত ছিল। তারপরের বর্ণনাটি আগের মতই উল্লেখ করেছেন এবং একটু বর্ধিত করে বলেছেন,
ثم ولى السقاية من بعد عبد المطلب ولده العباس وهو يومئذ من أحدث اخدثه سنا فلم نزل بيده حتى اقام الاسلام وهي بيده فاقرها رسول الله ﷺ معه فهى اليوم إلى بنى العباس كذا فى الفتح-
অর্থাৎ- অতঃপর ‘আবদুল মুত্ত্বালিব-এর মৃত্যুর পর তদীয় পুত্র ‘আব্বাস (রাঃ) যিনি ছিলেন বয়সে নবীন তার হাতে এ মহান দায়িত্ব ন্যাস্ত হয় এবং ইসলাম ক্বায়িম হওয়া অবধি তা তারই হাতে থাকে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটাকে সমর্থন জানান আর এখন তা ‘আব্বাস (রাঃ)-এর বংশধরের হাতে রয়েছে। এমনটাই হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ)-এর ফাতহুল বারীতে আছে।
(فَأذِنَ لَه) অত্র হাদীস থেকে বুঝা যায়, আইয়্যামে তাশরীক্বের রাতগুলোতে মিনায় কাটানো শারী‘আতসম্মত। আর হাজীদের পানি পান করানোর উদ্দেশ্য যদি কেউ সেখানে রাত না কাটায় তাহলে তার কোন অসুবিধা নেই। এ ব্যাপারে সকল ‘উলামায়ে কিরামের ঐকমত্য রয়েছে। তবে মিনায় রাত কাটানো কি ওয়াজিব না সুন্নাহ- এ ব্যাপারে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে।
ইমাম মালিক ও তার ছাত্ররা বলেছেন ওয়াজিব। তিন রাতের এক রাত হলেও সেখানে কাটাতে হবে। আর সেখানে অবস্থান না করার প্রেক্ষিতে ‘আবদুল্লাহ বিন ‘আব্বাস (রাঃ)-এর কথানুপাতে কাফফারাও দেয়া প্রয়োজন। সে কথাটি হলো, (من نسى من نسكه شيئا اوتركه فليهرق دما- أخرجه البيهقى) অর্থাৎ- হজ্জের কোন কাজ কেউ ইচ্ছা করে ছেড়ে দিলে বা ভুলে গেলে তার অবশ্যই কাফফারাহ্ দিতে হবে। ইমাম বায়হাক্বী (রহঃ) কথাটি বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মালিক (রহঃ) এ ব্যাপারে তার মুয়াত্ত্বাতে নাফি‘ ইবনু ‘উমার, ‘উমার বিন খাত্ত্বাব (রাঃ) থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন, সেটি হলো ‘উমার বলেছেন, (لا يتبين احد من الحاج ليالى منى من واء العقبة) অর্থাৎ- হাজীদের কেউ যেন অবস্থানকালীন রাতগুলোকে ‘আক্বাবার পিছনে অবস্থান না করে।
এ ব্যাপারে ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ)-এর মাযহাব হলো, মিনায় অবস্থানের রাতগুলো মিনা ব্যতীত অন্যত্র অবস্থান করা ‘‘মাকরূহ’’, কেননা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিনাতে অবস্থান করেছেন। তবে ইমাম আবূ হানীফা ও তার ছাত্রদের নিকট যদি কোন ব্যক্তি ইচ্ছা করেই মিনার রাতগুলোতে মিনা ব্যতীত অন্য কোথাও রাত কাটায় তাহলে তার কোন কাফফারাহ্ দিতে হবে না। কেননা তারা মনে করেন, এ রাতগুলোতে মিনায় অবস্থান করার কথা এজন্য বলা হয়েছে যাতে করে ঐ দিনগুলোতে কংকর নিক্ষেপ করা সহজ হয়। তাই কেউ যদি ঐ রাতগুলোতে সেখানে অবস্থান না করেও কংকর নিক্ষেপ করতে পারে তাহলে তা তার জন্য বৈধ হবে।
এ মাসআলাটিকে কেন্দ্র করে ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ)-এর দু’ধরনের কথা রয়েছে সর্বাধিক সহীহ হচ্ছে ওয়াজিব। কেউ কেউ বলেন, সুন্নাহ। সুতরাং প্রথম কথা অনুযায়ী মিনায় অবস্থান করা যদি ওয়াজিবই হয় তাহলে তাঁরা তা না করলে তাদের ওপর এ ভুলের কাফফারাহ্ বর্তাবে ওয়াজিব হিসেবে আর দ্বিতীয় কথানুযায়ী কাফফারা দেয়া সুন্নাহ হবে।
শাফি‘ঈ মাযহাব অবলম্বীদের নিকট কাফফারাহ্ দেয়া আবশ্যক হবে শুধু তার জন্য যিনি তিন রাতের কোন রাতেই মিনায় রাত যাপন করেনি। আর যদি কোন ব্যক্তি তিন রাতের কোন এক রাত মিনায় যাপন না করে তাহলে সে ব্যাপারে ঐ কথাগুলোই প্রণিধানযোগ্য যা বলা হয়েছে কংকর নিক্ষেপ করার বিষয়ে (যদি কেউ সাতটি কংকরের একটি না করে) ঐ কথাগুলোর সর্বাধিক সহীহ কথা হলো প্রথম রাত যাপন না করলে সে জন্য এক মুদ পরিমাণ সাদাকা দিতে হবে। আর দ্বিতীয় রাত না করলে এক দিরহাম। আর তৃতীয় রাত যদি না করে তাহলে ثلث دم তথা তিন ভাগের একভাগ কাফফারাহ্ দিতে হবে। আর তাদের নিকট রাত যাপন অর্থ হলো রাতের বেশি সময় অবস্থান করা কারণ রাত যাপন কথাটি হাদীসের مطابق তথা সাধারণভাবে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং পূর্ণরাত মিনা থাকা আবশ্যক না।
فاقبح المعظم مقام الكل أي للأكثر حكم الكل
এ ক্ষেত্রে রাতের প্রথমাংশ বা শেষাংশের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।
এ মাসআলাতে ইমাম আহমাদ (রহঃ)-এর মতামত হচ্ছে। মিনায় রাত্রিগুলোতে মিনায় অবস্থান করা واجب (ওয়াজিব)। সুতরাং যে কেউ তিন রাতের মধ্যে একটিও যদি সেখানে অবস্থান না করে তাহলে তার ওপর কাফফারাহ্ আবশ্যক। তার থেকে-এর বর্ণিত আছে সে কিছু সাদাকা করে দিবে। অন্য বর্ণনায় এসেছে সাদাকা দেয়া লাগবে না। ইমাম আহমাদ (রহঃ)-এর সর্বাধিক স্পষ্ট দলীল হচ্ছে, মিনার দিনগুলোতে মিনায় রাত যাপন করা এটি হচ্ছে হজ্জের কাজসমূহের একটি অন্যতম কাজ। আর ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন,
(من نسى من نسكه شيئا أو تركه فليهرق دما) অর্থাৎ- যে কেউ হজ্জের কোন কাজ ভুলে গেলে একটি কুরবানী দিবে।
মিনায় রাত যাপনের মোটামুটি তিনটি দলীল হতে পারে,
১. নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে রাত যাপন করেছেন আর তিনি বলেছেন, (خذوا عنى مناسككم) তোমরা আমার নিকট থেকে তোমাদের হজ্জের কাজ শিখে ‘আমল কর। সুতরাং আমাদের নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অনুসরণ করে মিনাতে রাত যাপন করতে হবে।
২. অত্র হাদীসে ‘আব্বাস (রাঃ)-কে সুযোগ দেয়ার কারণ প্রসঙ্গে হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, এ হাদীসটিও মিনায় রাত্রি যাপনের ওয়াজিবের দলীল, কারণ ‘আব্বাস (রাঃ)-কে সুযোগ দেয়ার একটি কারণ ছিল। আর যদি সে কারণ না থাকে তাহলে তো আর কেউ সুযোগ পাবে না। জমহূর ‘উলামায়ে কিরামের মতে মিনায় রাত যাপন করা ওয়াজিব।
৩. ‘উমার বিন খাত্ত্বাব (রাঃ) যিনি খুলাফায়ে রাশিদীনের অন্যতম যাদের অনুসরণ করতে আমরা আদিষ্ট তিনি মিনার দিনগুলোতে হাজীদেরকে মিনার বাইরে থাকতে নিষেধ করেছেন এবং যারা বাহিরে আছে তাদেরকে লোক পাঠিয়ে মিনার ভিতরে নিয়ে আসতে বলেছেন।
সুতরাং মোট কথা হলো, যদি কেউ উযরের কারণে মিনায় রাত যাপন করতে না পারে তাহলে তার কোন কাফফারাহ্ আবশ্যক হবে না। অন্যথায় আবশ্যক হবে।
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - কুরবানীর দিনের ভাষণ, আইয়্যামে তাশরীক্বে পাথর মারা ও বিদায়ী তাওয়াফ করা
২৬৬৩-[৫] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেখানে ’পানি পান’ করানো হয় সেখানে এসে পানি চাইলেন। তখন (আমার পিতা) ’আব্বাস (আমার ভাইকে) বললেন, হে ফযল! তোমার মায়ের কাছে যাও। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য তার কাছ থেকে খাবার পানি নিয়ে আসো। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আমাকে এখান থেকে পানি পান করাও। আমার পিতা তখন বললেন, হে আল্লাহর রসূল! এতে লোকেরা হাত দেয়। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আমাকে এখান থেকেই পানি পান করাও। এরপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এখান থেকেই পানি পান করলেন। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যমযমের কূপের কাছে গেলেন। তখনও তারা পানি পান করছিলেন। (এ অবস্থা দেখে) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, কাজ করতে থাকো, কেননা তোমরা নেক কাজে ব্যস্ত আছ। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, যদি লোকেরা তোমাদেরকে পরাভূত করবে- এ আশংকা আমার না থাকতো তাহলে আমি সওয়ারী হতে নেমে এতে রশি নিতাম। (রাবী বলেন) এটা বলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজের কাঁধের দিকেই ইশারা করলেন। (বুখারী)[1]
بَابٌ خُطْبَةُ يَوْمِ النَّحْرِ وَرَمْىِ أَيَّامِ التَّشْرِيْقِ وَالتَّوْدِيْعِ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جَاءَ إِلَى السِّقَايَةِ فَاسْتَسْقَى. فَقَالَ الْعَبَّاسُ: يَا فَضْلُ اذْهَبْ إِلَى أُمِّكَ فَأْتِ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِشَرَابٍ مِنْ عِنْدِهَا فَقَالَ: «اسْقِنِي» فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّهُمْ يَجْعَلُونَ أَيْدِيَهُمْ فِيهِ قَالَ: «اسْقِنِي» . فَشرب مِنْهُ ثُمَّ أَتَى زَمْزَمَ وَهُمْ يَسْقُونَ وَيَعْمَلُونَ فِيهَا. فَقَالَ: «اعْمَلُوا فَإِنَّكُمْ عَلَى عَمَلٍ صَالِحٍ» . ثُمَّ قَالَ: «لَوْلَا أَنْ تُغْلَبُوا لَنَزَلْتُ حَتَّى أَضَعَ الْحَبْلَ عَلَى هَذِهِ» . وَأَشَارَ إِلَى عَاتِقِهِ. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: (أَنَّ رَسُوْلَ اللّٰهِ ﷺ جَاءَ إِلَى السِّقَايَةِ) মুজমাল গ্রন্থকার (রহঃ) বলেন, সিক্বায়াহ্ বলা হয় ঐ স্থানকে যেখান থেকে হজ্জের মওসুমে পানীয় সরবরাহ করা হয়। সেকালে কিসমিস ক্রয় করে যমযম কূপের পানির মধ্যে সংমিশ্রণ করে মানুষদেরকে পান করার জন্য পরিবেশন করা হতো। আর জাহিলী যুগ ও ইসলাম উভয় যুগেই ‘আব্বাস তার দায়িত্বে ছিলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটাকে সমর্থন দিয়েছিলেন। সুতরাং এ দায়িত্ব কারো ছিনিয়ে নেয়া ঠিক হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত ‘আব্বাস-এর বংশধরদের কেউ জীবিত থাকবেন।
(فَقَالَ الْعَبَّاسُ: يَا فَضْلُ اذْهَبْ إِلٰى أُمِّكَ) ফযল তিনি ‘আব্বাস (রাঃ)-এর ছেলে, ‘আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর ভাই আর তার মাতা হলেন উম্মু ফযল লুবাবাহ্ বিনতু হারিস আল হিলালিয়্যাহ্ (রাঃ) আর তিনিই ‘আবদুল্লাহ (রাঃ)-এরও মাতা।
(يَجْعَلُونَ أَيْدِيَهُمْ فِيهِ) তারা তাদের হাতগুলো পানীয়ের মধ্যে ডুবিয়ে দিচ্ছে আর অধিকাংশই তাদের হাত থাকতো অপরিষ্কার। হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) ইয়াযীদ বিন আবী যিয়াদ ‘ইকরামার সূত্রে ত্ববারানীতে এ ব্যাপারে একটি হাদীস আছে, ‘আব্বাস (রাঃ) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলেন, ان هذا قد مرت অর্থাৎ- তাদের অপরিষ্কার হাত এখানে দেয়ার কারণে এ পানীয়ও অপরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে।
আমি কি আপনাকে আমাদের ঘর থেকে পরিষ্কার পানি এনে দিব? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বললেন, না বরং আমাকে সেখান থেকেই পানি দিন যেখান থেকে মানুষেরা পান করছে। ইমাম আহমাদ তার মুসনাদে (১ম খণ্ড পৃষ্ঠা ৩২০, ৩৩৬) য‘ঈফ সনদে একটি হাদীস নিয়ে এসেছেন সেটা হল, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল ‘আব্বাস-এর কাছে এসে বললেন, আমাকে পান করাও। তখন আল ‘আব্বাস বললেন, এই নাবীয মিশ্রিত পানি তো ময়লা হয়ে গেছে আমরা কি আপনাকে দুধ বা মধু পান করতে দিব? তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বললেন, না আমাকে সেখান থেকে পান করাও যেখান থেকে মানুষেরা পান করছে।
হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, অত্র হাদীসটিতে অনেকগুলো উপকারিতা রয়েছে। যেমনঃ
১. অন্যের নিকটে পানীয় অন্বেষণ করা দোষের নয়।
২. কেউ যদি সম্মানের সাথে কোন জিনিস দেয় তাহলে তা ফেরত দেয়া ঠিক নয় তবে যদি সেটা ফেরত দেয়ার মধ্যে ফেরত না দেয়ার চেয়ে বৃহৎ কোন কল্যাণ নিহিত থাকে তাহলে ফেরত দেয়া যাবে। কেননা এ হাদীসে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য আল ‘আব্বাস যে পানীয় নিয়ে আসার কথা বলেছিলেন তা তিনি গ্রহণ করেননি বিনয়ীতার খাতিরে তাই তিনি বলেছেন আমাকে সেখান থেকেই পানি পান করাও যেখান থেকে মানুষেরা পান করছে।
৩. পানি পান করানোর প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে বিশেষ করে যমযম কূপের পানি।
৪. নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিনয় এবং এ বিষয়ে সাহাবীগণের অনুসরণ।
৫. যেখানে মানুষেরা হাত ডুবিয়ে দিয়েছিল তা অপবিত্র হয়নি কারণ অপবিত্র হলে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা গ্রহণ করতেন না।
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - কুরবানীর দিনের ভাষণ, আইয়্যামে তাশরীক্বে পাথর মারা ও বিদায়ী তাওয়াফ করা
২৬৬৪-[৬] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাস্সাব নামক স্থানে যুহর, ’আসর, মাগরিব ও ’ইশার সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করে এখানেই কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলেন। অতঃপর সেখান থেকে বায়তুল্লাহর দিকে রওয়ানা হলেন এবং (বিদায়ী) তাওয়াফ সম্পন্ন করলেন। (বুখারী)[1]
بَابٌ خُطْبَةُ يَوْمِ النَّحْرِ وَرَمْىِ أَيَّامِ التَّشْرِيْقِ وَالتَّوْدِيْعِ
وَعَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَلَّى الظُّهْرَ وَالْعَصْرَ وَالْمَغْرِبَ وَالْعَشَاءَ ثُمَّ رَقَدَ رَقْدَةً بِالْمُحَصَّبِ ثُمَّ رَكِبَ إِلَى الْبَيْتِ فَطَافَ بِهِ. رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ
ব্যাখ্যা: কুরবানীর চতুর্থদিনে মিনা থেকে প্রত্যাবর্তনের পরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুহরের সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করলেন। এখান থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়, সূর্য ঢলে যাওয়ার পরপরই যুহরের সালাত আদায়ের পূর্বেই কংকর নিক্ষেপ করতে হবে। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুহরের সালাত আদায়ের পূর্বেই মিনা থেকে প্রত্যাবর্তন করেছেন। ‘আল্লামা হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, এ হাদীসের সাথে لم يرم الا بعد الزوال তথা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবল সূর্য ঢলে যাওয়ার পরেই কংকর নিক্ষেপ করেছেন- এ হাদীসে কোন বিরোধ নেই। কেননা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিনা থেকে ফিরে আল মুহাসসাবে নেমেছেন, অতঃপর সেখানেই যুহরের সালাত আদায় করেছেন।
(ثُمَّ رَقَدَ رَقْدَةً) হালকা ঘুম দিলেন। অপর এক বর্ণনায় ثم هجع هجعة এর কথা এসেছে।
(الْمُحَصَّبِ) এটা হলো মিনা ও মক্কা নগরীর মাঝে অবস্থিত এক খোলা প্রশস্ত স্থান। এটাকে এ নামে অভিহিত করার কারণ হলো এখানে সব কংকর একত্রিত হয় যেহেতু এটা একটা নিচু ভূমি। সাহেবে শারহুল লুবাব (রহঃ) বলেন, المحصب হল الأبطح-এর অপর নামগুলো হলো আল হাসবা, বাত্বহা, খায়ফ। কেউ কেউ বলেছেন, এটা মিনার খুব সন্নিকটে কিন্তু এ কথা ঠিক নয়।
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - কুরবানীর দিনের ভাষণ, আইয়্যামে তাশরীক্বে পাথর মারা ও বিদায়ী তাওয়াফ করা
২৬৬৫-[৭] ’আবদুল ’আযীয ইবনু রুফাই’ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমি আনাস ইবনু মালিক-এর কাছে জিজ্ঞেস করলাম, এ ব্যাপারে আপনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে যা জেনেছেন তা আমাকে বলুন। (যেমন) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তালবিয়ার দিন (যিলহজ্জ মাসের ৮ তারিখে) যুহরের সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) কোথায় আদায় করেছেন? জবাবে আনাস বললেন, ’মিনায়’। তারপর জিজ্ঞেস করলাম, নাফরের দিন (যিলহজ্জ মাসের ১৩ তারিখে মদীনায় রওনা হবার দিন) ’আসরের সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) কোথায় আদায় করেছেন? তিনি বললেন, আবত্বাহ-এ। অতঃপর আনাস বললেন, কিন্তু তোমরা তোমাদের আমীর বা নেতৃবৃন্দ যেভাবে করেন সেভাবে করবে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابٌ خُطْبَةُ يَوْمِ النَّحْرِ وَرَمْىِ أَيَّامِ التَّشْرِيْقِ وَالتَّوْدِيْعِ
وَعَنْ عَبْدِ الْعَزِيزِ بْنِ رُفَيْعٍ قَالَ: سألتُ أنسَ بنَ مالكٍ. قُلْتُ: أَخْبِرْنِي بِشَيْءٍ عَقَلْتَهُ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَيْنَ صَلَّى الظُّهْرَ يومَ الترويةِ؟ قَالَ: بمنى. قلت: فَأَيْنَ صَلَّى الْعَصْرَ يَوْمَ النَّفْرِ؟ قَالَ: بِالْأَبْطَحِ. ثُمَّ قَالَ افْعَلْ كَمَا يَفْعَلُ أُمَرَاؤُكَ
ব্যাখ্যা: (عَنْ عَبْدِ الْعَزِيْزِ بْنِ رُفَيْعٍ) ‘আবদুল ‘আযীয বিন রুফাই‘ তিনি ছিলেন একজন সুপ্রসিদ্ধ তাবি‘ঈ। ইমাম বুখারী তার উস্তাদ ‘আলী ইবনুল মাদিনী (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেন ‘আব্দুল আযীয বিন রুফাই' প্রায় ৬০টি হাদীস বর্ণনাকারী। তিনি ১৩০ হিজরীতে অথবা কেউ কেউ বলেছেন, তার পরে মৃত্যুবরণ করেছেন। এখানে উল্লেখ্য যে, বুখারী এবং মুসলিমে ‘আবদুল ‘আযীয বিন রুফাই'-এর আনাস (রাঃ) থেকে এই একটি মাত্র হাদীসই উল্লেখিত হয়েছে।
(يَوْمَ التَّرْوِيَةِ) ইয়াওমুত্ তারবিয়াহ্ বলতে জিলহজ্জ মাসের অষ্টম দিনকে বুঝানো হয়েছে- এ দিনটি ইয়াওমুত তারবিয়াহ্ নামে অভিহিত হওয়ার কিছু কারণ পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘আল্লামা হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, لانهم كائما يرمون فيها ابلهم ويتروون من الماء ....الخ। কেননা এ দিনটিতে হাজী সাহেবরা তাদের উটগুলোকে পানি পান করাতেন দূর দূরান্ত থেকে পানি নিয়ে এসে, কারণ সে স্থানে তৎকালীন সময়ে কোন কূপ বা ঝর্ণা জাতীয় কিছু ছিল না। তবে এখন সেখানে পানি পান করার অনেক সুব্যবস্থা আছে তাইতো এখন সেখানে আর দূর থেকে পানি বহন করতে হয় না।
আল ফাকিহী (রহঃ) তার ‘‘মক্কা’’ নামক কিতাবে মুজাহিদ (রহঃ)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, মুজাহিদ বলেন, ‘আবদুল্লাহ বিন ‘উমার বলেছেন, হে মুজাহিদ! যখন তুমি মক্কার রাস্তায় বাধভাঙ্গা পানি দেখতে পাবে তখন তুমি সতর্কতা অবলম্বন কর। অন্য বর্ণনায় আছে, (فاعلم ان الأمر قد أظلك) এ ছাড়া এ দিনকে ইয়াওমুত্ তারবিয়াহ্ নামে অভিহিত করার আরো কারণ রয়েছে। যেমনঃ
১. এ দিনে আদম (আঃ) হাওয়া (আঃ)-কে দেখেছেন এবং তার সাথে তার জমায়েত হয়।
২. ইব্রাহীম (আঃ) কোন একরাত্রে দেখলেন তিনি স্বীয় পুত্রকে যাবাহ করছেন। অতঃপর ভয়ে তিনি চিন্তিত হলেন।
৩. এ দিনেই জিব্রীল (আঃ) ইব্রাহীম (আঃ)-কে مناسك الحج তথা হজ্জের কার্যাবলী দেখিয়ে দিয়েছিলেন।
৪. এ দিনেই ইমাম মানুষদেরকে مناسك الحج তথা হজ্জের কার্যাবলী শিক্ষা দেন। এ কথাগুলো সবই যে বিরল এবং এক প্রকার ভিত্তিহীন কথা তার প্রমাণ হলো, যদি প্রথমটিই কারণ হয় তাহলে তার নাম (يوم التروية) তথা সাক্ষাতের দিন বা দেখার দিন নাম হতো। যদি দ্বিতীয়টিই কারণ হয় তাহলে তার নাম يوم التروية হতো। আর যদি কারণ তৃতীয়টি হয় তাহলে তার নাম يوم الرؤيا তথা স্বপ্নে দেখার দিন হতো। আর যদি কারণ চতুর্থটিই হতো তাহলে তার নাম يوم الزواية তথা বর্ণনা বা শিক্ষা দেয়ার দিন হতো। অথচ কোনটিই হয়নি বরং এর নাম হয়েছে يوم التروية তথা লালন-পালন পানি পান করানো ইত্যাদির দিন। তাই সঙ্গত কারণেই এখানে হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ)-এর কথা প্রণিধানযোগ্য।
(قَالَ: بِمِنًى) হাদীসের এ অংশটি থেকে বুঝা যায় ইয়াওমুত্ তারবিয়াতে হাজী সাহেব যুহরের সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) মিনাতে আদায় করবেন। এ বিষয়ে জমহূরের মত এটাই। এ বিষয়ের সমর্থনে পূর্বে উল্লেখিত জাবির -এর লম্বা হাদীসটিও উল্লেখযোগ্য যে,
فلما كان يوم التروية توجهوا إلى منى فأهلوا بالحج وركب رسول الله صلى الله عليه وسلم فصلى بها الظهر والعصر والمغرب والعشاء و الفجر
অর্থাৎ- যখন ইয়াওমুত্ তারবিয়ার দিন আসলো তখন তারা সবাই মিনা অভিমুখী হলেন এবং হজ্জের তালবিয়াহ্ পাঠ করতে লাগলেন আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সওয়ারীতে আরোহণ করলেন এবং সেই মিনাতেই তিনি যুহর, ‘আসর, মাগরিব, ‘ইশা এবং ফজরের সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করলেন।
অনুরূপভাবে ইমাম আবূ দাঊদ, তিরমিযী, আহমাদ, হাকিম ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে এ রকম হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইবনু খুযায়মাহ্ ও হাকিম কাসিম বিন মুহাম্মাদ থেকে, তিনি ‘আবদুল্লাহ বিন যুবায়র থেকে বর্ণনা করেন, ‘আবদুল্লাহ বিন যুবায়র (রাঃ) বলেন,
من سنة الحج ان يصلى الامام الظهر وما بعدها والفجر بمنى ثم يعدون إلى عرفة
হজ্জের নিয়মাবলীর অন্তর্গত এটাও যে, ইমাম যুহর ও তৎপরবর্তী সালাত এমনকি ফজরের সালাতও মিনায় আদায় করবেন, তারপর সকাল সকাল ‘আরাফাহ্ অভিমুখী হবেন। তবে সুফিয়ান সাওরী তার জামি' কিতাবে ভিন্ন কথা বর্ণনা করেছেন আর তা হলো ‘আমর ইবনে দীনার (রহঃ) বলেন, আমি যুবায়র (রাঃ)-কে দেখলাম ইয়াওমুত্ তারবিয়াতে তিনি যুহরের সালাত আদায় করছেন মক্কায়।
এ দু’ বর্ণনার সংঘর্ষের চমৎকার সমাধান পেশ করেছেন, হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) তিনি বলেন, ইবনুয্ যুবায়র (রাঃ)-এর এমন করার কারণ মূলত দু’টি হতে পারে। ১. لضرورة কোন কারণবশত তিনি তা করেছেন। ২. অথবা لبيان الجواز তথা জায়িযী অবস্থা বর্ণনার উদ্দেশে।
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - কুরবানীর দিনের ভাষণ, আইয়্যামে তাশরীক্বে পাথর মারা ও বিদায়ী তাওয়াফ করা
২৬৬৬-[৮] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’আবত্বাহ’-এ নামা বা অবস্থান করা সুন্নাতসম্মত নয়। কেননা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্যে ’আবত্বাহ’ হতে (মদীনার দিকে) রওয়ানা হওয়াটা সহজ ছিল বিধায় এখানে নেমেছেন বা অবস্থান করেছেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابٌ خُطْبَةُ يَوْمِ النَّحْرِ وَرَمْىِ أَيَّامِ التَّشْرِيْقِ وَالتَّوْدِيْعِ
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: نُزُولُ الْأَبْطَحِ لَيْسَ بِسُنَّةٍ إِنَّمَا نَزَلَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِأَنَّهُ كَانَ أسمح لِخُرُوجِهِ إِذا خرج
ব্যাখ্যা: বাতনুল মুহাস্সাবে অবতরণ করা لَيْسَ بِسُنَّةٍ তথা সুন্নাত নয়।
আবূ দাঊদ-এর রিওয়ায়াতে এসেছে فمن شاء نزل ومن شاء لم ينزل অর্থাৎ- যে চায় সেখানে বাত্বনি মুহাসসাবে অবতরণ করুক আর যে চায় সেখানে অবতরণ না করুক। ‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী হানাফী (রহঃ) ليس بسنة এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, سنة قصدية তথা পালন করতেই হবে এমন সুন্নাত নয় অথবা ليس من سنن الحج অর্থাৎ- হজ্জের সুন্নাতসমূহের অন্তর্গত নয়।
ইমাম বুখারী (রহঃ) ইমাম মুসলিম (রহঃ) ‘আবদুল্লাহ বিন ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, ليس التحصيب بشيئ তথা মুহাসসাবে অবস্থান করার কিছুই নেই। ইবনুল মুনযীর (রহঃ) বলেন, اى من أمر المناسك الذى يلزم فعله অর্থাৎ- এটা হজ্জের আবশ্যক কর্মসমূহের অন্তর্ভুক্ত নয়।
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ) ইবনু আবী মুলায়কার সূত্রে ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, (ثم ارتحل حتى نزل الحصبة) অর্থাৎ- অতঃপর তিনি সফর করে শেষ পর্যন্ত ‘‘হাসবাহ্’’ নামক স্থানে অবতরণ করলেন এবং তিনি বলেন, তিনি এখানে নেমেছিলেন শুধু আমার কারণে। অন্যান্য আরো কিছু হাদীস রয়েছে যা মুহাসসাবে অবতরণ করা এবং না করার প্রমাণ বহন করছে।
এর সমাধানকল্পে হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, لكن لما نزله الشيئ كان النزول به مستحبا اتباعا له ولتقريره على ذلك وفعله الخلفاء অর্থাৎ- এ বিষয়ে বর্ণনা যাই থাকুক না কেন যেহেতু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে অবতরণ করেছেন তাই অবতরণ করা মুস্তাহাব এবং যেহেতু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটাকে সমর্থন করেছেন সহাবায়ে কিরামের একদলসহ খুলাফায়ে রাশিদীনও এ কাজ করেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - কুরবানীর দিনের ভাষণ, আইয়্যামে তাশরীক্বে পাথর মারা ও বিদায়ী তাওয়াফ করা
২৬৬৭-[৯] উক্ত রাবী [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] হতে এ হাদীটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি তান্’ঈম হতে ’উমরার ইহরাম বাঁধলাম এবং মক্কায় পৌঁছে আমি আমার কাযা ’উমরা আদায় করলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবত্বাহ-এ এসে আমার জন্যে অপেক্ষা করলেন যতক্ষণ পর্যন্ত আমি অবসর না হলাম (’উমরা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত)। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) লোকদেরকে (মদীনার দিকে) রওয়ানা হতে আদেশ করলেন এবং নিজেও (মক্কার দিকে) রওয়ানা হলেন। আর বায়তুল্লাহ পৌঁছে ফজরের সালাতের আগেই (বিদায়ী) তাওয়াফ করলেন। অতঃপর মদীনার দিকে রওয়ানা হলেন। (মিশকাত গ্রন্থকার বলেন, ইমাম বাগাবী এ হাদীসকে প্রথম অনুচ্ছেদে স্থান দিলেও আমি তা বুখারী, মুসলিমে পাইনি; তবে কিছু এর শেষে তারতম্যসহ আবূ দাঊদে রয়েছে।)[1]
بَابٌ خُطْبَةُ يَوْمِ النَّحْرِ وَرَمْىِ أَيَّامِ التَّشْرِيْقِ وَالتَّوْدِيْعِ
وَعَنْهَا قَالَتْ: أَحْرَمْتُ مِنَ التَّنْعِيمِ بِعُمْرَةٍ فَدَخَلْتُ فَقَضَيْتُ عُمْرَتِي وَانْتَظَرَنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم بالأبطحِ حَتَّى فَرَغْتُ فَأَمَرَ النَّاسَ بِالرَّحِيلِ فَخَرَجَ فَمَرَّ بِالْبَيْتِ فَطَافَ بِهِ قَبْلَ صَلَاةِ الصُّبْحِ ثُمَّ خَرَجَ إِلَى الْمَدِينَةِ. هَذَا الْحَدِيثُ مَا وَجَدْتُهُ بِرِوَايَةِ الشَّيْخَيْنِ بَلْ بِرِوَايَةِ أَبِي دَاوُدَ مَعَ اخْتِلَاف يسير فِي آخِره
ব্যাখ্যা: (فَأَمَرَ النَّاسَ بِالرَّحِيلِ) তবে এ অংশটুকু বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু হাদীসের পূর্ণ বর্ণনা বুখারীতে মুহাম্মাদ বিন বাশশার এর সনদে বর্ণিত হয়নি।
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - কুরবানীর দিনের ভাষণ, আইয়্যামে তাশরীক্বে পাথর মারা ও বিদায়ী তাওয়াফ করা
২৬৬৮-[১০] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (হজ্জ/হজ সম্পন্ন করে শেষ তাওয়াফ না করেই) লোকজন চারদিক হতে দেশের দিকে ফিরতে শুরু করতো। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের কেউ যেন বায়তুল্লাহর সাথে (শেষ) সাক্ষাৎ না করে বাড়ীর দিকে রওয়ানা না হয়। তবে ঋতুমতী মহিলাদের (প্রতি শিথিলতা স্বরূপ) এর থেকে বিরত থাকার অনুমতি দেয়া হয়েছে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابٌ خُطْبَةُ يَوْمِ النَّحْرِ وَرَمْىِ أَيَّامِ التَّشْرِيْقِ وَالتَّوْدِيْعِ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: كَانَ النَّاسُ يَنْصَرِفُونَ فِي كُلِّ وَجْهٍ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَنْفِرَنَّ أَحَدُكُمْ حَتَّى يَكُونَ آخِرُ عَهْدِهِ بِالْبَيْتِ إِلَّا أَنَّهُ خُفِّفَ عَنِ الْحَائِضِ»
ব্যাখ্যা: মিনায় অবস্থান করার দিনগুলো শেষ হলে সবাই ফিরে যায়, কেউ তাওয়াফ করে আবার কেউ বা তাওয়াফ করে না। ‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী হানাফী (রহঃ) বলেন, এ অংশটুকুর অর্থ হলো, তাদের হজ্জ/হজ শেষে তারা বিভিন্ন রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন কেউ বা তাওয়াফে ওয়াদা' তথা বিদায়ী তাওয়াফকারী হিসেবে আবার কেউ তাওয়াফে ওয়াদা‘ না করে।
(لَا يَنْفِرَنَّ أَحَدُكُمْ) ‘তোমাদের কেউ যেন ফিরে না যায়’ এ ফিরে যাওয়া দ্বারা উদ্দেশ্য হলো النفر الأول প্রথমধাপে ফিরে যাওয়া যেটি তাড়াতাড়ি করে যারা তারা আইয়্যামে তাশরীক্বের দ্বিতীয় দিনে করে থাকে অথবা এর দ্বারা النفر الثانى তথা যারা দেরীতে করতে চায় তারা এটা আইয়্যামে তাশরীক্বের তৃতীয় দিনে করে থাকে এটাও উদ্দেশ্য হতে পারে। অথবা এর দ্বারা এটাও উদ্দেশ্য হতে পারে যে, তোমাদের কেউ যেন মক্কা থেকে বের না হয়। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মক্কার বাইরে থেকে যারা হজ্জে এসেছে তারা মিশকাতের বর্ণনায় احدكم তথা ‘তোমাদের কেউ’ এ শব্দ এসেছে, তবে সহীহ মুসলিমে لاينفرن احد ‘কেউ যেন’ শব্দ এসেছে।
(حَتّٰى يَكُونَ اٰخِرُ عَهْدِه بِالْبَيْتِ) অর্থাৎ- ‘বায়তুল্লাহর বিদায়ী তাওয়াফ না করে যেন ফিরে না যায়’ সেদিকে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে যেমনটা বর্ণনা করেছেন ইমাম আবূ দাঊদ। এটা মূলত সহীহ মুসলিমের বর্ণনা কিন্তু সহীহুল বুখারীতে আছে, (قال ابن عباس : اأمر الناس ان نكون اخر عهدهم بالبيت الا انه خفف عن الحائض) অর্থাৎ- আদেশ দেয়া হয়েছে মানুষদের তারা যেন সবাই তাওয়াফে ওয়াদা‘ করে তবে হায়িযগ্রস্থ মহিলাদের ব্যাপারে একটু ছাড় দেয়া হয়েছে।
হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, এভাবে صيغة مجهول দিয়ে সুফইয়ান ‘আবদুল্লাহ বিন ত্বাউস তার পিতা থেকে এবং তিনি ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। তবে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলেন আদেশ প্রদানকারী নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। অনুরূপ হালকা করা হয়েছে-এর ক্ষেত্রেও হালকাকারী নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। অবশ্য সুফিয়ান-এর অন্য রিওয়ায়াত সুলায়মান আল আওয়াল তিনি তাউস থেকে যেটি বর্ণনা করেছেন সেখানে صيغة مجهول তথা সরাসরি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কর্তা করে বর্ণনা করেছেন।
আর এর শব্দটি ইবনু ‘আব্বাস -এর তিনি বলেন, كان الناس ينهرفون فى كل وجه فقال رسول الله ﷺ : لا ينفرن احد حتى يكون اخر عهده بالبيت
হাদীসের এ ভাষ্য থেকে বুঝা যায় طواف الوداع তথা বিদায়ী তাওয়াফ ওয়াজিব যেহেতু কড়া আদেশ দেয়া হয়েছে।
ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেন, অত্র হাদীসে প্রমাণ রয়েছে তাদের জন্য যারা বলেন, طواف الوداع তথা বিদায়ী তাওয়াফ ওয়াজিব। আর যারা বিদায়ী তাওয়াফ না করবে তাদের কাফফারাহ্ স্বরূপ একটি কুরবানী দেয়া আবশ্যক হবে। এটাই অধিকাংশ ‘উলামায়ে কিরামের মতামত; হাসান বাসরী, হাকাম, হাম্মাদ, সাওরী, আবূ হানীফা, আহমাদ, ইসহাক, আবূ সাওর তাদের অন্যতম।
حَائِضِ ‘‘হায়িয’’ তথা ‘ঋতুবতী মহিলার সাথে যে সব মহিলার নিফাস হয়েছে তারাও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবেন। আর হায়িয-নিফাসওয়ালী মহিলাদের طواف الوداع তথা বিদায়ী তাওয়াফ করা লাগবে না। এ ব্যাপারে সকল ‘উলামায়ে কিরামের ঐকমত্য রয়েছে। তাওয়াফ করার জন্য যে পবিত্রতা শর্ত- এ হাদীস তার দলীল হিসেবে পেশ করা হয়ে থাকে।
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - কুরবানীর দিনের ভাষণ, আইয়্যামে তাশরীক্বে পাথর মারা ও বিদায়ী তাওয়াফ করা
২৬৬৯-[১১] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মদীনাহ্ হতে রওয়ানা হবার রাতেই বিবি সফিয়্যাহ্ ঋতুমতী হয়ে পড়লেন। তিনি (সফিয়্যাহ্) বললেন, আমার মনে হয় আমি আপনাদেরকে আটকে দিলাম। (এ কথা শুনে) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ধ্বংস হোক, নিপাত যাক। সে কি কুরবানীর দিন তাওয়াফ (ইফাযাহ্) করেনি? বলা হলো, হ্যাঁ, করেছে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তবে রওয়ানা হও। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابٌ خُطْبَةُ يَوْمِ النَّحْرِ وَرَمْىِ أَيَّامِ التَّشْرِيْقِ وَالتَّوْدِيْعِ
وَعَن عائشةَ قَالَتْ: حَاضَتْ صَفِيَّةُ لَيْلَةَ النَّفْرِ فَقَالَتْ: مَا أُرَانِي إِلَّا حَابِسَتَكُمْ. قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «عَقْرَى حَلْقَى أَطَافَتْ يَوْمَ النَّحْرِ؟» قيل: نعم. قَالَ: «فانفري»
ব্যাখ্যা: (صَفِيَّةُ) অর্থাৎ- তিনি হচ্ছেন উম্মুল মু’মিনীন সফিয়্যাহ্ বিনতু হুয়াই বিন আখতাব বিন সা‘নাহ্ বিন সা‘লাবাহ্ আল ইসরাঈলিয়্যাত বিন সাবত্বিল লাবী বিন ইয়াকুব (আঃ)-এর বংশধর অতঃপর মূসা (আঃ)-এর সহোদর হারূন (আঃ)-এর বংশধর। তিনি জাহিলী যুগে সাল্লাম বিন মাশকাম আল ইয়াহূদীর স্ত্রী ছিলেন। তারপর কিনানাহ্ বিন আবিল হাক্বীক্ব তাকে বিবাহ করে এ দু’ স্বামীই ছিল কবি। পরে তার স্বামী কিনানাহ্ খায়বার যুদ্ধে নিহত হয়। সেটা ছিল ৭ম হিজরীতে সে সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বার বিজয় করেন। সফিয়্যাহ্ (রাঃ) ছিলেন বন্দীদের মধ্যে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিজের জন্য পছন্দ করেন এবং তিনি ইসলাম গ্রহণ করলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে মুক্ত করে তাকে বিবাহ করেন। আর সেটা ছিল ৭ম হিজরীতে খায়বার যুদ্ধের পর। কেউ কেউ বলেছেন তার নাম ছিল যায়নাব আর ইসলাম গ্রহণ করে যখন পরিষ্কার হয়ে যান তখন তার নামকরণ করা হয় সফিয়্যাহ্। তিনি খুবই বুদ্ধিমতি সহনশীলা মহিলা ছিলেন। ৫০ অথবা ৫২ হিজরীতে খালিদ মু‘আবিয়াহ্ (রাঃ)-এর যুগে তিনি রমাযান মাসে মৃত্যুবরণ করেন। কেউ বলে থাকেন তিনি ৩৬ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেছেন কিন্তু তা ভুল। ‘আলী বিন হুসায়ন সফিয়্যাহ্ (রাঃ)-এর নিকট থেকে হাদীস শুনেছেন যা সহীহুল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে আর তিনি যদি ৩৬ হিজরীতে মারা যেয়ে থাকেন তাহলে কিভাবে হয়? কারণ ‘আলী বিন হুসায়ন তো তখন জন্মগ্রহণই করেননি। সফিয়্যাহ্ (রাঃ) থেকে বুখারী ও মুসলিমে (سماعه) শ্রবণ সাব্যস্ত হয়েছে। ৬০ বছর বয়সে সফিয়্যাহ্ (রাঃ)-কে বাক্বী‘ আল গরকাদে দাফন করা হয়েছে।
(حَاضَتْ) হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী বলেনঃ যিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখ কুরবানীর দিন তাওয়াফে ইফাযাহ্’র তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ঋতুবতী হয়েছিলেন, যেমনটি বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে ‘কুরবানীর দিন যিয়ারত’ অধ্যায়ে।
(عَقْرٰى) এর ব্যাখ্যায় কেউ বলেন, আল্লাহ সফিয়্যাহ্ (রাঃ)-কে বন্ধ্যা বানিয়ে দিন। (حَلْقٰى) এর ব্যাখ্যায় কেউ বলেন, আল্লাহ সফিয়্যাহ্ (রাঃ)-কে মাথা মুন্ডিয়ে দিন। এ উভয় গুণটি মহিলাদের সৌন্দর্যের প্রতীক।
(أَطَافَتْ يَوْمَ النَّحْرِ) বুখারীর অন্য রিওয়ায়াতে রয়েছে, অতঃপর আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ كنت طفت يوم النحر؟ قالت: نعم (قال: فانفري)।
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - কুরবানীর দিনের ভাষণ, আইয়্যামে তাশরীক্বে পাথর মারা ও বিদায়ী তাওয়াফ করা
২৬৭০-[১২] ’আমর ইবনুল আহ্ওয়াস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বলতে শুনেছি, বিদায় হজে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হে লোকেরা! এটা কোন্ দিন? (সমস্বরে) লোকেরা বললো, এটা হজে আকবারের (বড় হজের) দিন। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, (মনে রাখবে) তোমাদের জীবন, সম্পদ, ইজ্জত পরস্পরের মধ্যে যেমন হারাম বা পবিত্র। তেমনি আজকের এ দিন এ শহরে হারাম বা পবিত্র। সাবধান! কোন অপরাধকারী যেন তার জীবনের ওপর যুলুম না করে। সাবধান! কোন অপরাধী যেন নিজের সন্তানের ওপর যুলুম না করে। কোন সন্তান যেন তার পিতার ওপর যুলুম না করে। সাবধান! শয়তান চিরদিনের জন্যে নিরাশ হয়ে গেছে এ শহরে তার কোন পূজা হবে (না এ প্রসঙ্গে)। কিন্তু তোমাদের যে সব কাজের মধ্য দিয়ে তার অনুসারী হবে, অথচ সেসব কাজ তোমরা তুচ্ছ মনে করবে। আর এতেই সে খুশী হবে। (ইবনু মাজাহ, তিরমিযী; তিরমিযী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন)[1]
عَنْ عَمْرِو بْنِ الْأَحْوَصِ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ فِي حَجَّةِ الْوَدَاعِ: «أَيُّ يَوْمٍ هَذَا؟» قَالُوا: يَوْمُ النَّحْر الْأَكْبَرِ. قَالَ: «فَإِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ وَأَعْرَاضَكُمْ بَيْنَكُمْ حَرَامٌ كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا فِي بَلَدِكُمْ هَذَا أَلا لَا يجني جانٍ عَلَى نَفْسِهِ وَلَا يَجْنِي جَانٍ عَلَى وَلَدِهِ وَلَا مَوْلُودٌ عَلَى وَالِدِهِ أَلَا وَإِنَّ الشَّيْطَانَ قد أَيسَ أَنْ يُعْبَدَ فِي بَلَدِكُمْ هَذَا أَبَدًا وَلَكِنْ ستكونُ لهُ طاعةٌ فِيمَا تحتقرونَ مِنْ أَعْمَالِكُمْ فَسَيَرْضَى بِهِ» . رَوَاهُ ابْنُ مَاجَهْ وَالتِّرْمِذِيّ وَصَححهُ
ব্যাখ্যা: (عَنْ عَمْرِو بْنِ الْأَحْوَصِ) তিনি হচ্ছেন ‘আমর ইবনুল আহওয়াস আল জাশমী তিনি বানী জাশম বিন সা‘দ-এর বংশধর। হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) তাকে ‘‘আত্ তাকরীব’’ নামক কিতাবে সাহাবী বলেছেন বিদায় হজ্জ/হজ সম্পর্কে তার বর্ণিত হাদীস রয়েছে। ‘আল্লামা ইবনু ‘আবদুল বার (রহঃ) তার বংশ পরম্পরা বর্ণনা করেছেন এভাবে যে, তিনি হলেন, ‘আমর ইবনুল আহ্ওয়াস বিন জা‘ফার বিন কিলাব আল জাশমী আল কিলাবী। তবে তার বংশ পরস্পর সম্পর্কে সামান্য মতপার্থক্য রয়েছে। তার কাছ থেকে তার ছেলে সুলায়মান হাদীস বর্ণনা করেছেন। কেউ কেউ বলেন, তিনি স্ত্রী-মাতা সহকারে বিদায় হজ্জ/হজ পালন করেছেন আর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খুৎবা সম্পর্কে তার থেকে বর্ণিত হাদীস সহীহ।
হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, তিনি ইয়ারমূকের যুদ্ধে শাহীদ হন। তখন ‘উমার (রাঃ)-এর খিলাফাতকাল চলছিল।
(يَقُولُ فِىْ حَجَّةِ الْوَدَاعِ) অর্থাৎ- يوم النحر তথা কুরবানীর দিন।
(أَىُّ يَوْمٍ هٰذَا؟» قَالُوا: يَوْمُ النَّحْر الْأَكْبَرِ) অন্য এক বর্ণনা রয়েছে اى يوم احرم অর্থাৎ- কোন দিনটি সবচেয়ে বেশি সম্মানিত? উত্তরে সমবেত সকল মানুষ বললেন, يوم الحج الاكبر তথা বড় হজ্জের দিন। যারা বড় হজ্জ/হজ দ্বারা ইয়াওমুন্ নাহর তথা কুরবানীর দিন উদ্দেশ্য নেন এ হাদীস তাদের স্বপক্ষে দলীল। এ ব্যাপারে অনেকগুলো হাদীস বর্ণিত হয়েছে, ইমাম সুয়ূত্বী তার ‘‘আদ দুররুল মানসূর’’ এবং হাফিয ইবনু কাসীর তার তাফসীরে সেগুলো উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে একটি হাদীস যা ইমাম বুখারী (রহঃ) (باب الخطبة)-তে ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে তা‘লীকান বর্ণনা করেছেন সেটা হল, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াওমুন্ নাহরে জামারায়ে ‘আক্বাবার মাঝে অবস্থান করে বলেছিলেন (যে সময় তিনি হজ্জ/হজ করছিলেন) এবং বলছিলেন এটাই হল বড় হজ্জের দিন এবং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতে থাকলেন, (اللهم الشهد) হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাক। মানুষদেরকে তিনি বিদায় জানালেন এবং পরক্ষণে মানুষেরা বলতে থাকলো এটাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর حجة الوداع তথা বিদায় হজ্জ/হজ। এ হাদীসটি ইমাম আবূ দাঊদ, ইমাম ইবনু মাজাহ ও ইমাম ত্ববারানী (রহঃ) মুত্তাসিল সনদে বর্ণনা করেছেন। এটাকে বিদায় হজ্জে নামকরণ করা হলো تمام الحج তথা হজ্জের পূর্ণতা ও معظم افعاله হজ্জের অধিকাংশ কার্যাবলী এখানে সম্পাদন করা হয়েছিল। হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, (لان فيه تتكمل المناسك) কেননা এ দিনে হজ্জের বাকী কর্মগুলোকে পূর্ণাঙ্গরূপ দেয়া হয়।
তবে ‘উলামায়ে কিরামের অপর একদল বলেন, হজ্জে আকবার তথা বড় হজ্জ/হজ দ্বারা ‘‘ইয়াওমুন্ নাহর’’ তথা কুরবানীর দিন উদ্দেশ্য নয় বরং ইয়াওমু ‘আরাফাহ্ তথা ‘আরাফার দিন উদ্দেশ্য। কেননা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, الحج عرفة হজ্জ/হজই ‘আরাফাহ্। ‘উমার ইবনু ‘আব্বাস ও ত্বাউস (রাঃ) তারা এ মতপোষণ করেছেন। এ বিষয়ে আরো অনেকগুলো কথা রয়েছে যা ‘আল্লামা ‘আয়নী ও হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) তাঁর ফাতহুল বারীতে সূরা বারাআতের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন। তবে প্রথম কথাটি সর্বাধিক সহীহ।
(فان دماءكم واموالكم واعراضكم بينكم حرام كحرمة يومكم هذا فى بلدكم هذا)
এখানে بلد তথা শহর দ্বারা মক্কা নগরী উদ্দেশ্য ইবনু মাজাহ ও ইমাম তিরমিযী (রহঃ) তার كتاب التفسير একটু বর্ধিত করে বলেছেন, (فى شهركم هذا) তথা তোমাদের এ মাস। উপরোক্ত কথাটি দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আত্মহত্যা করা অথবা অপর কোন মুসলিমকে হত্যা করা হারাম। অপরদিকে সম্পদের ক্ষেত্রে অপরের সম্পদ ভক্ষণ করা হারাম এমনকি নিজের সম্পদও হারাম তবে যদি হালাল পথে হয় তাহলে কোন অসুবিধা নেই। ‘আল্লামা সিন্দী (রহঃ) এ রকমই ব্যাখ্যা করেছেন।
(لَا يَجْنِىْ جانٍ عَلٰى نَفْسِه) ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেন, এ অংশটুকু খবর হিসেবে ধরা হবে যদি বাহ্যিক দৃষ্টিতে না-বোধকের শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। কথাটির অর্থ হল, কেউ যেন তার নিজের ওপর আক্রমণ না করে। অর্থাৎ- অপর কেউ হত্যা না করে কারণ অপর কাউকে হত্যা করলে তা ক্বিসাস তথা হত্যার বদলা হত্যা হিসেবে তাকেও হত্যার সম্মুখীন হতে হবে। বস্ত্ততঃ এখানে আত্মপক্ষের কথা বলে অপরের ক্ষেত্রে বিষয়টিকে আরো শক্তভাবে বলাই উদ্দেশ্য। কারণ সেখানে নিজেরই ক্ষতি করা নিষেধ সেখানে অপরের ক্ষতি করার তো কোন প্রশ্নই উঠে না।
(أَلَا وَإِنَّ الشَّيْطَانَ) এখানে শয়তান দ্বারা শয়তান প্রধান ইবলীস উদ্দেশ্য।
(أَنْ يُعْبَدَ) ‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী হানাফী (রহঃ) বলেন, এর অর্থ হলো শয়তান নিরাশ হয়ে গেছে যে, তার অনুগত করতে গিয়ে মানুষ গায়রুল্লাহর ‘ইবাদাত করবে। আর কেউ কেউ বলেছেন, এর অর্থ হলো শয়তান নিরাশ হয়ে গেছে যে, কোন মু’মিনীন মূর্তিপূজার দিকে ফিরে আসবে না। তাইতো দেখা গেছে মুসায়লামাহ্ কাযযাব ও তার সাথীরা এবং যাকাত অস্বীকারকারীরাসহ অন্যান্য যারা মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল তারা আর যাই করুক কিন্তু তারা মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়নি। সুতরাং হাদীসটির অর্থ হলো দীন ইসলাম পরিবর্তন হয়ে আবার পূর্বে যেমন গোটা দুনিয়া শির্কের উপর চলছিল সেটা হওয়া থেকে শয়তান নিরাশ হয়ে গেছে।
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - কুরবানীর দিনের ভাষণ, আইয়্যামে তাশরীক্বে পাথর মারা ও বিদায়ী তাওয়াফ করা
২৬৭১-[১৩] রাফি’ ইবনু ’আমর আল মুযানী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে একটি সাদা-কালো মিশ্রিত খচ্চরের উপর থেকে মিনায় ভাষণ দিতে দেখেছি, তখন সূর্য উপরে উঠেছিল। ’আলী(রাঃ) তাঁর বক্তব্যকে লোকদের কাছে পৌঁছাচ্ছিলেন (উচ্চস্বরে ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন)। আর তখন লোকজনের মধ্যে কেউ দাঁড়ানো, কেউ বসা ছিল। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن رافعِ بنِ عمروٍ والمُزَني قَالَ: رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَخْطُبُ النَّاسَ بِمِنًى حِينَ ارْتَفَعَ الضُّحَى عَلَى بَغْلَةٍ شَهْبَاءَ وَعَلِيٌّ يُعَبِّرُ عَنْهُ وَالنَّاسُ بَين قَائِم وقاعد. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (وَعَنْ رَافِعِ بْنِ عَمْرِو الْمُزَنِىْ) তাকে মুযানী বলা হয় মুযায়নাহ্ গোত্রের প্রতি সম্পৃক্ত করে। তার নাম হচ্ছে রাফি' ইবনু ‘আমর ইবনু হিলাল আল মুযানী তার ভাইয়ের ‘আয়িদ বিন ‘আমর তারা দু’ভাই এবং তাদের পিতা সকলেই সাহাবী। ইবনু ‘আবদুল বার (রহঃ) বলেন, রাফি'-এর নিকট থেকে ‘আমর ইবনু সুলায়ম আল মুযানী ও হিলাল ইবনু ‘আমির আল মুযানী হাদীস বর্ণনা করেছেন। হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) তার ‘‘তাহযীবুত্ তাহযীব’’ নামক কিতাবে বলেন, রাফি‘ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে দু’টি হাদীস বর্ণনা করেছেন তার একটি হল (العجوة من الجنة) অর্থাৎ- আজ্ওয়াহ্ খেজুর জান্নাতী ফলমূলের অন্তর্গত। এ হাদীসটিকে ইমাম ইবনু মাজাহ বর্ণনা করেছেন। দু’টি বিদায় হজ্জে তার অংশগ্রহণের হাদীস যা ইমাম আবূ দাঊদ ও ইমাম নাসায়ী বর্ণনা করেছেন।
ইবনু ‘আসাকির (রহঃ) বলেন, বিদায় হজ্জের সময় রাফি' (রাঃ)-এর বয়স পাঁচ অথবা ছয় বছর ছিল।
(يَخْطُبُ النَّاسَ) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ খুতবাটি মিনায় দিয়েছিলেন দিনের শুরুতে, এর প্রমাণ হলো হাদীসের পরবর্তী অংশ, (حين ارتفع الضحى على بغلة الشهباء) অর্থাৎ- যখন সকাল শুরু হল তখন শাহবা খচ্চরের পিঠের উপর বসে খুৎবা দিলেন।
‘শাহবা’ অর্থ হল সামান্য কালো মিশ্রিত সাদা। ‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী হানাফী (রহঃ) বলেন, এ হাদীসের সাথে কুদামাহ্ বর্ণিত হাদীস,
( رأيت النبى ﷺ يرمى الجمرة يوم النحر على ناقة صهباء)
আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখেছি তিনি শাহবা উটের পিঠে উঠে খুৎবা দিয়েছেন। কারণ উপরের হাদীসে খচ্চর আর কুদামাহ্’র হাদীসে উটের কথা আছে তাহলে কি খুৎবা দু’টি ছিল না একটি? এর সমাধানে আমি বলবো, ‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী (রহঃ) এ ব্যাপারে আরো একটি হাদীসে আছে যা ইমাম আহমাদ ও ইমাম আবূ দাঊদ হিরমাস ইবনু যিয়াদ আল বাহিলী থেকে বর্ণনা করেছেন, হাদীসটি হলো,
رأيت النبى صلى الله عليه وسلم يخطب الناس على ناقته العضباء يوم الاضحى.
আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখেছি ইয়াওমুল আযহা তথা কুরবানীর ঈদের দিন ‘আয্বাহ্ উটের উপর বসে খুৎবা দিয়েছেন। এটা হচ্ছে তথা ৩য় নম্বরটি খুত্বাহটি হলো হজ্জের খুৎবা। আর উপরোক্ত গিয়েই হয়তো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুরু করেছিলেন। উটের উপর তারপর পরিবর্তন করে খচ্চরের উপর আরোহণ করেছেন এবং একই সময়ে দু’টি খুৎবা হওয়াও সম্ভব। তার একটি খুৎবা ছিল শুধু মানুষকে শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশে তা হজ্জের খুতবার অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - কুরবানীর দিনের ভাষণ, আইয়্যামে তাশরীক্বে পাথর মারা ও বিদায়ী তাওয়াফ করা
২৬৭২-[১৪] ’আয়িশাহ্ ও ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফে যিয়ারা কুরবানীর দিনে (১০ তারিখে) রাত পর্যন্ত দেরি করেছিলেন। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ وَابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَخَّرَ طَوَافَ الزِّيَارَةِ يَوْمَ النَّحْرِ إِلَى اللَّيْلِ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: (أَخَّرَ طَوَافَ الزِّيَارَةِ يَوْمَ النَّحْرِ إِلَى اللَّيْلِ) অর্থাৎ- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফে যিয়ারাহ্-কে ইয়াওমুন্ নাহরে বিলম্ব করতে করতে রাত পর্যন্ত বিলম্ব করলেন। এ হাদীসটি এ বিষয়ে বর্ণিত পূর্বেকার সব ক’টি বর্ণনার সাথে সাংঘর্ষিক এ বৈপরীত্যের সমাধান বিভিন্ন জনে বিভিন্ন রকম দিয়ে থাকেন। যেমনঃ ইবনুল কাত্ত্বান আলফাসী, ইবনুল ক্বইয়্যিম, ইবনু হাযম সহ অনেকে ‘আয়িশাহ্ থেকে বর্ণিত অত্র হাদীসকে য‘ঈফ বলেছেন। শুধু য‘ঈফই নয় বরং বাতিলও। আবার কোন কোন ‘উলামায়ে কিরাম পূর্বেকার ইবনু ‘উমার ও জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসকে ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) হাদীসের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। ইমাম বায়হাক্বী (রহঃ) এ ধরনের সবগুলো রিওয়ায়াত যেমন ইবনু ‘উমার ও জাবির (রাঃ) অপরদিকে ‘আয়িশাহ্ ও ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর সকল বর্ণনাগুলো উল্লেখ করে বলেছেন,
اصح هذه الروايات حديث نافع عن ابن عمر وحديث جابر وحديث ابى سلمة عن عائشة حتى حديث البخارى نلفظ قالت : حجنا مع رسول الله ﷺ فاقصنا يوم النحر.
অর্থাৎ- এ বিষয়ে বর্ণিত সর্বাধিক সহীহ বর্ণনা হলো ইবনু ‘উমার ও জাবির ও ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বর্ণনা যেটি ইমাম বুখারী বর্ণনা করেছেন।
অপর একদল ‘আলিম তারা এ রিওয়ায়াতগুলোর মধ্যে সমতা ফিরে আনার প্রয়াস পেয়েছেন। তার মধ্যে ইমাম বুখারী, ইবনু হিব্বান ও ‘আল্লামা সিন্দী অন্যতম। ‘আল্লামা সিন্দী সুনানে ইবনু মাজাহ্’র প্রান্তটীকায় বলেন, ‘আয়িশাহ্ ও ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর কথা (اخر طواف الزيارة الليل) এটা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ফে‘ল দ্বারা প্রমাণিত। আর এটা হচ্ছে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরয তাওয়াফ তাওয়াফে ইফাযাহ্ করেছেন রাতের পূর্বে। আর এ হাদীস দ্বারা উদ্দেশ্য এটাও হতে পারে যে, তিনি তাওয়াফে যিয়ারহ্-কে রাত পর্যন্ত বিলম্ব করার অবকাশ দিয়েছেন।
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - কুরবানীর দিনের ভাষণ, আইয়্যামে তাশরীক্বে পাথর মারা ও বিদায়ী তাওয়াফ করা
২৬৭৩-[১৫] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফে ইফাযার (তাওয়াফে যিয়ারার) সাত চক্কর রমল করেননি (জোর পায়ে চলেননি)। (আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمْ يَرْمُلْ فِي السَّبْعِ الَّذِي أَفَاضَ فِيهِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ
ব্যাখ্যা: (فِى السَّبْعِ الَّذِىْ أَفَاضَ فِيهِ) অর্থাৎ- তাওয়াফে ইফাযাতে কোন ‘‘রমল’’ নেই, যেমনিভাবে তাওয়াফুল ওয়াদা' তথা বিদায়ী তাওয়াফে ‘‘রমল’’ নেই। ‘‘রমল’’ শুধুমাত্র তাওয়াফুল কুদূমে আছে। এ হাদীসটি প্রমাণ করছে তাওয়াফে কুদূমের ক্ষেত্রে যেমন ‘‘রমল’’ করা বিধিসম্মত করা হয়েছে তেমনিভাবে তাওয়াফে যিয়ারাতে ‘‘রমল’’-কে বিধিসম্মত করা হয়নি।
ইমাম ত্ববারী (রহঃ) বলেন, এ হাদীস প্রমাণ করছে যে, ‘‘রমল’’ তাওয়াফে কুদূমের সাথে নির্দিষ্ট অথবা ‘‘রমল’’ ঐ সমস্ত তাওয়াফের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে যাতে সা‘ঈ রয়েছে। এ দু’টি কথাই মূলত ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ)-এর, তবে ‘‘রমল’’ তাওয়াফে কুদূমের সাথে নির্দিষ্ট- এ কথাটি সর্বাধিক সহীহ।
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - কুরবানীর দিনের ভাষণ, আইয়্যামে তাশরীক্বে পাথর মারা ও বিদায়ী তাওয়াফ করা
২৬৭৪-[১৬] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ জামারাতুল ’আক্বাবায় (১০ তারিখে) পাথর মারার পর স্ত্রী সহবাস ছাড়া অন্য সকল কাজ তার জন্যে হালাল হয়ে যাবে। [শারহুস্ সুন্নাহ; ইমাম বাগাবী বলেছেন, এর সানাদ দুর্বল।[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِذَا رَمَى أَحَدُكُمْ جَمْرَةَ الْعَقَبَةِ فَقَدْ حَلَّ لَهُ كُلُّ شَيْءٍ إِلَّا النِّسَاءَ» . رَوَاهُ فِي شرح السّنة وَقَالَ: إِسْنَاده ضَعِيف
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী (রহঃ) হানাফী মাযহাবের উপর ভিত্তি করে বলেছেন মাথা হলক অথবা চুল খাটো করার পর।
(فَقَدْ حَلَّ لَه كُلُّ شَىْءٍ إِلَّا النِّسَاءَ) অর্থাৎ- জামারায়ে ‘আক্বাবাতে কংকর নিক্ষেপ করতঃ মাথা হলক অথবা চুল খাটো করার পর স্ত্রী সহবাস, জড়িয়ে ধরা, চুম্বন করা, যৌন কামনার সাথে স্পর্শ করা, বিবাহের ‘আকদ ইত্যাদি ব্যতীত অন্য সবকিছু বৈধ তবে তাওয়াফে ইফাযার পর স্ত্রীর সাথে এ কাজগুলোও বৈধ হবে।
এ হাদীস থেকে আমরা বুঝতে পারলাম, স্ত্রী সঙ্গম ও এ জাতীয় কর্মগুলো ব্যতীত অন্যান্য হজ্জের নিষিদ্ধ কাজগুলো মাথা মুন্ডানোর আগে, কংকর নিক্ষেপও বৈধ হয় কিন্তু অপর এক হাদীস যা ইমাম আহমাদসহ অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন সেখানে বলা হয়েছে,
(اذا رميتم وحلقتم فقد حل لكم كل شيئ الا النساء) অর্থাৎ- যখন তোমরা কংকর নিক্ষেপ ও মাথা হলক করবে তখন তোমাদের জন্য স্ত্রী ব্যতীত অন্যান্য সব কাজ যেগুলো হজ্জের ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ ছিল তা বৈধ হয়ে যাবে।
তাহলে এ হাদীস থেকে বুঝা গেল, কংকর নিক্ষেপ ও মাথা হলক দু’টিই হতে হবে। এ বিপরীত অর্থবোধক দু’টি হাদীসের সমাধান হলো, পরবর্তী হাদীস বা দ্বিতীয়টি য‘ঈফ। কারণ তার সনদে হাজ্জাজ বিন আরত্বাতা রয়েছে যিনি য‘ঈফ ও মুদাল্লিস।
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - কুরবানীর দিনের ভাষণ, আইয়্যামে তাশরীক্বে পাথর মারা ও বিদায়ী তাওয়াফ করা
২৬৭৫-[১৭] কিন্তু আহমাদ ও নাসায়ী ইবনু ’আব্বাস হতে হাদীসটি সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যখন কেউ জামারাতুল ’আক্বাবায়ে পাথর মারা শেষ করবে তার জন্য স্ত্রী সহবাস ছাড়া আর অন্য সব কাজ হালাল হয়ে যাবে।[1]
وَفِي رِوَايَةِ أَحْمَدَ وَالنَّسَائِيِّ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: «إِذَا رَمَى الْجَمْرَةَ فَقَدْ حَلَّ لَهُ كلُّ شيءٍ إِلا النساءَ»
ব্যাখ্যা: (وَفِىْ رِوَايَةِ أَحْمَدَ وَالنَّسَائِىِّ) আর ইবনু মাজাহ, ত্বহাবী এবং বায়হাক্বীতেও (৫ম খণ্ড ১৩৬ পৃষ্ঠা) এ ধরনের বর্ণনা রয়েছে হাসান আল ‘আর্নী-এর সনদে এবং এ হাদীসটি ইবনু ‘আব্বাস থেকে মারফূ‘ এবং মাওকূফ দু’ভাবেই বর্ণিত হয়েছে।
(قَالَ: إِذَا رَمَى الْجَمْرَةَ) এখানে جمرة দ্বারা جمرة العقبة উদ্দেশ্য।
(فَقَدْ حَلَّ لَه كلُّ شَىْءٍ إِلَّا النِّسَاءَ) অর্থাৎ- তার জন্য যতক্ষণ পর্যন্ত সে তাওয়াফে ইফাযাহ্ না করবে এতক্ষণ পর্যন্ত স্ত্রীসঙ্গত ছাড়া সবকিছুই বৈধ। আর এ হাদীসটি প্রমাণ করছে যে, প্রথম হালালের কারণ হিসেবে কংকর নিক্ষেপকেই ধরা হয় যেমনটি মালিকী মাযহাবের ফাতাওয়া রয়েছে। আর হানাফী মাযহাব অনুসারীরা হালক্বের বিষয়টি উহ্য হিসেবে ধরে নেন এ বিষয়ে বর্ণিত দু’ধরনের বর্ণনার মাঝে সমাধানকল্পে। আর এ হাদীসটি (যার ব্যাখ্যায় আমরা রয়েছি) মুনক্বতি। কারণ হাসান আল ‘আরনী ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে শুনেননি। যেমনটা বলেছেন ইমাম আহমাদসহ অনেক।
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - কুরবানীর দিনের ভাষণ, আইয়্যামে তাশরীক্বে পাথর মারা ও বিদায়ী তাওয়াফ করা
২৬৭৬-[১৮] উক্ত রাবী [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুহরের সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায়ে পর দিনের শেষ বেলায় তাওয়াফে ইফাযাহ্ সম্পন্ন করেন। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আবার মিনায় ফিরে এলেন এবং সেখানেই আইয়্যামে তাশরীক্বের দিনগুলো অবস্থান করলেন। এ দিনগুলোতে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সূর্যাস্তের পর জামারায় সাতটি করে পাথর মারতেন। প্রত্যেক পাথর মারার সাথে সাথে ’আল্লা-হু আকবার’ বলতেন। আর প্রথম ও দ্বিতীয় জামারার নিকট দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতেন ও আল্লাহর কাছে (অনুনয়-বিনয় করে) প্রার্থনা করতেন। কিন্তু তৃতীয় জামারায় (পূর্বের ন্যায় পাথর মারার পর) অপেক্ষা করতেন না। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْهَا قَالَتْ
: أَفَاضَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ آخِرِ يَوْمِهِ حِينَ صَلَّى الظُّهْرَ ثُمَّ رَجَعَ إِلَى مِنًى فَمَكَثَ بِهَا لَيَالِيَ أَيَّامِ التَّشْرِيقِ يَرْمِي الْجَمْرَةَ إِذَا زَالَتِ الشَّمْسُ كُلَّ جَمْرَةٍ بِسَبْعِ حَصَيَاتٍ يُكَبِّرُ مَعَ كُلِّ حَصَاةٍ وَيَقِفُ عِنْدَ الْأُولَى وَالثَّانِيَةِ فَيُطِيلُ الْقِيَامَ وَيَتَضَرَّعُ وَيَرْمِي الثَّالِثَةَ فَلَا يَقِفُ عِنْدَهَا. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (أَفَاضَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ مِنْ اٰخِرِ يَوْمِه) এর অর্থ হল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফে ইফাযাহ্ করেছেন ইয়াওমুন্ নাহরের শেষাংশে।
(حِيْنَ صَلَّى الظُّهْرَ) এর থেকে বুঝা যায় তিনি যুহরের সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করেছেন মক্কায় যা পূর্বোক্ত জাবির (রাঃ) কর্তৃক লম্বা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। আরো বুঝা যায় তিনি তাওয়াফ করেছিলেন সূর্য ঢলে যাওয়ার পর এমনকি সালাতুয্ যুহরের পর, কেননা হাদীসের শব্দ হলো (من اخر يومه) তথা কুরবানীর দিনের শেষ ভাগে যা এটাই প্রমাণ করে যদি এটা পূর্বে বর্ণিত ইবনু ‘উমার সহ অন্যান্যদের বর্ণিত হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক যেখানে বলা হয়েছে (انه طاق قبل الظهر) তথা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফ করেছেন যুহরের সালাতের পূর্বে।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেন,
افاض يوم النحر من منى الى مكة حين صلى الظهر، فيقيد انه صلى الظهر بمنى ثم افاض وهو خلاف ماثبت فى الأحاديث لابفاقها على انه صلى الظهر بعد الطواف مع اختلافها انه صلاها بمكة او بمنى.
অর্থাৎ- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিন মিনা থেকে যুহরের সালাত আদায় করে মক্কা অভিমুখী হন।
এখান থেকে বুঝা যায়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুহরের সালাত মিনাতেই আদায় করেছেন, তারপর ইফাযাহ্ করেছেন আর এ বর্ণনাটি অনেক হাদীসের বিপরীত যেখানে এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করা হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুহরের সালাত তাওয়াফের পরই আদায় করেছেন যদি এ ব্যাপারে মতবিরোধ রয়েছে যে, যুহরের সালাত তিনি মক্কায় আদায় করেছেন না মিনাতে আদায় করেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - কুরবানীর দিনের ভাষণ, আইয়্যামে তাশরীক্বে পাথর মারা ও বিদায়ী তাওয়াফ করা
২৬৭৭-[১৯] আবুল বাদ্দাহ ইবনু ’আসিম ইবনু ’আদী তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উট চালকদেরকে মিনায় রাত যাপন না করার এবং কুরবানীর তারিখে (জামারাতুল ’আক্বাবায়) পাথর মারতে এবং তারপর কুরবানী দিনের পর দুই দিনের পাথর একদিনে মারতে অনুমতি দিয়েছিলেন। (মালিক, তিরমিযী, নাসায়ী; ইমাম তিরমিযী বলেন, হাদীসটি সহীহ)[1]
وَعَنْ أَبِي الْبَدَّاحِ بْنِ عَاصِمِ بْنِ عَدِيٍّ عَن أَبِيه قَالَ: رَخَّصَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم لرعاء الْإِبِل فِي البيتوتة: أَن يرملوا يَوْمَ النَّحْرِ ثُمَّ يَجْمَعُوا رَمْيَ يَوْمَيْنِ بَعْدَ يَوْمِ النَّحْرِ فَيَرْمُوهُ فِي أَحَدِهِمَا. رَوَاهُ مَالِكٌ وَالتِّرْمِذِيُّ وَالنَّسَائِيُّ وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ: هَذَا حَدِيثٌ صَحِيحٌ
-
[বিঃ দ্রঃ এ অধ্যায়ে তৃতীয় অনুচ্ছেদ নেই (وَهٰذَا الْبَابُ خَالٍ مِنْ الْفَصْلِ الثَّالِثِ)]
ব্যাখ্যা: (وَعَنْ أَبِىْ الْبَدَّاحِ بْنِ عَاصِمِ بْنِ عَدِىِّ) বর্ণনাকারীর নাম আবুল বাদ্দাহ বিন ‘আসিম বিন ‘আদী ইবনুল জাদ্দ ইবনুল ‘আজলান বিন হারিসাহ্ বিন যবী‘আহ্ আল কুযা‘ঈ আল বালাবী, তারপর আল আনসারী তিনি বানী ‘আমর বিন ‘আওফ গোত্রের নেতা ছিলেন, তিনি আনসারী সাহাবী ছিলেন।
‘আল্লামা ওয়াক্বিদী (রহঃ) ‘‘আবুল বাদ্দাহ’’ হলো তার উপাধী। এ উপাধীই বেশি প্রসিদ্ধ আর তার কুন্ইয়্যাতী তথা উপনাম হলো আবূ ‘আমর। ঠিক এমনইভাবে ‘আলী বিন মাদিনী ও ইবনু হিব্বানও বলেছেন তার উপনাম হলো আবূ ‘আমর।
আবার কেউ কেউ বলেছেন তার উপনাম আবূ বাকর, আবার কেউ কেউ বলেছেন তার উপনাম আবূ ‘আমর। বলা হয়ে থাকে তার নাম ‘আদী, তিনি ১১৭ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। এটাই অধিকাংশের মতামত, আবার কেউ কেউ বলেছেন তার মৃত্যু ১১০ হিজরীতে হয়েছিল। ইবনু ‘আবদুল বার তার ‘‘আল ইস্তি‘আব’’ নামক কিতাবে বলেন, তিনি কি সাহাবী ছিলেন না তাবি‘ঈ ছিলেন- এ ব্যাপারে মতবিরোধ রয়েছে তবে অধিকাংশেরা বলেছেন তিনি সাহাবী ছিলেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাখালদের জন্য আইয়্যামে তাশরীক্বে মিনায় রাত্রিযাপনের বিধানের ক্ষেত্রে ঢিল দিয়েছিলেন কারণ তারা তাদের উট রক্ষণাবেক্ষণের কর্মে লিপ্ত ছিল আর তারা যদি মিনায় রাত্রিযাপন করে তাহলে তাদের মালামাল নষ্ট যাওয়ার আশংকা ছিল। মিনায় রাত্রিযাপন ওয়াজিব নাকি সুন্নাত- এ ব্যাপারে মতভেদ ইমামদের উক্তিসহ পূর্বে আলোচিত হয়েছে। আহলে সিকায়াহ্ ও রাখালদের জন্য মিনায় রাত্রিযাপনের ক্ষেত্রে ছাড় আছে যে, এ ব্যাপারে সব ‘আলিমের মতানৈক্য রয়েছে। তবে এ ব্যাপারে মতবিরোধ আছে যে, এ সুযোগ কি শুধুমাত্র রাখাল ও আহলে সিক্বায়ার জন্য নির্দিষ্ট নাকি এ জাতীয় যত ব্যক্তি আছে যেমন অসুস্থ অথবা অন্য কোন ব্যস্ততায় যিনি ব্যস্ত থাকবেন তাদের সকলের জন্য উন্মুক্ত?
(أَنْ يَرْمُوْا يَوْمَ النَّحْرِ) অর্থাৎ- জামারায়ে ‘আক্বাবায়ে তারা অন্যান্য সকল হাজীদের মতো কংকর নিক্ষেপ করবেন।
‘আল্লামা বাজী (রহঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে জানিয়ে দিলেন যে যারা রাখালী ও পানি পান করানোর দায়িত্বে ব্যস্ত থাকবেন তারা কুরবানীর দিন কংকর নিক্ষেপ করবেন এক্ষেত্রে কোন শিথিলতা করা হবে না।
(ثُمَّ يَجْمَعُوْا رَمْىَ يَوْمَيْنِ) অর্থাৎ- এখানে ১১ ও ১২ তারিখের কথা বলা হয়েছে।
(فَيَرْمُوهُ) এটাই মিশকাত ও মাসাবীহের বর্ণনা তবে তিরমিযীতে (فَيَرْمُوهُ) রয়েছে এবং এটাই রয়েছে মুসনাদে আহমাদ ও ইবনু মাজাহতে।
পরিচ্ছেদঃ ১১. প্রথম অনুচ্ছেদ - ইহরাম অবস্থায় যা থেকে বেঁচে থাকতে হবে
২৬৭৮-[১] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। জনৈক লোক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এসে জিজ্ঞেস করলো, মুহরিম কোন্ ধরনের পোশাক পরবে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, জামা, পাগড়ি, পাজামা, টুপী, মোজা পরবে না। তবে যে লোকের জুতা নেই সে মোজা পরতে পারবে কিন্তু পায়ের গোড়ালির নিচ হতে মোজাদ্বয়কে কেটে দিবে। এমন কোন কাপড়ও পরবে না যাতে জা’ফারানের ও ওয়ার্স-এর রং রয়েছে। (বুখারী, মুসলিম; বুখারীর এক বর্ণনায় আরো একটু বেশি আছে- মুহরিম নারী বোরকা পরবে না, হাত মোজাও পরবে না।)[1]
بَابُ مَا يَجْتَنِبُهُ الْمُحْرِمُ
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ: أَنَّ رَجُلًا سَأَلَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَا يلبس مِنَ الثِّيَابِ؟ فَقَالَ: «لَا تَلْبَسُوا الْقُمُصَ وَلَا الْعَمَائِمَ وَلَا السَّرَاوِيلَاتِ وَلَا الْبَرَانِسَ وَلَا الْخِفَافَ إِلَّا أَحَدٌ لَا يَجِدُ نَعْلَيْنِ فَيَلْبَسُ خُفَّيْنِ وليقطعهما أَسْفَل الْكَعْبَيْنِ وَلَا تَلْبَسُوا مِنَ الثِّيَابِ شَيْئًا مَسَّهُ زَعْفَرَانٌ وَلَا وَرْسٌ» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ وَزَادَ الْبُخَارِيُّ فِي رِوَايَةٍ: «وَلَا تَنْتَقِبُ الْمَرْأَةُ الْمُحْرِمَةُ وَلَا تلبس القفازين»
ব্যাখ্যা: (عَنْ عَبْدِ اللّٰهِ بْنِ عُمَرَ: أَنَّ رَجُلًا) হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, কোন সনদেই এ লোকটির নাম খুঁজে পাইনি।
(سَأَلَ رَسُوْلَ اللّٰهِ ﷺ: مَا يَلْبِسُ) এখানে ما টি হরফে ইসতিফহাম তথা প্রশ্নবোধক অব্যয় অথবা মায়ে মাওসূলাহ্ অথবা سأل ক্রিয়ার দ্বিতীয় (مفعول) কর্ম- এই তিন পদ্ধতির প্রয়োগ হতে পারে। আর لبس এ শব্দটি যখন سَمِعَ يَسْمَعُ বাব থেকে ব্যবহৃত হয় তখন এর অর্থ পরিধান করা আর যদি (ضَرَبَ يَضْرِبُ) থেকে আসে তাহলে সন্দেহ, সংমিশ্রণ ঘটা এ ধরনের অর্থ হয়।
(الْمُحْرِمُ) হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, সমস্ত ‘আলিম এ ব্যাপারে একমত যে, এখানে المحرم দ্বারা পুরুষই উদ্দেশ্য মহিলা এখানে অন্তর্ভুক্ত হবে না। ‘আল্লামা ইবনুল মুনযির (রহঃ) বলেন, হজ্জের ক্ষেত্রে পুরুষ মহিলার কাপড় একই হবে শুধুমাত্র জা‘ফারান ও ওয়ারস্ মিশ্রিত কাপড়ের ক্ষেত্রে একটু পার্থক্য থাকে।
(مِنَ الثِّيَابِ) এখানে বলা হচ্ছে কোন্ প্রকার কাপড় পরবে? এ কথা আর মুসনাদে আহমাদ (২য় খণ্ড পৃষ্ঠা ৫৪) ‘উবায়দুল্লাহর সনদে এবং পৃষ্ঠা ৬৫ টি তে আইয়ূব থেকে, তবে দু’টি সানাদই মিলেছে নাফি‘-এর নিকট গিয়ে। আর এ বর্ণনাটি থেকে বুঝা যায় এ প্রশ্ন তিনি ইহরাম বাঁধার পূর্বেই করেছিলেন। ইমাম বায়হাক্বী (রহঃ)-এর বর্ণনায় ‘আবদুল্লাহ বিন ‘আওন তিনি নাফি' থেকে, তিনি ইবনু ‘উমার থেকে এ সূত্রে বর্ণিত হাদীসে আছে, ইবনু ‘উমার (রাঃ) বলেন, ‘‘মদীনার মসজিদের কোন এক দরজায় দাঁড়িয়ে একটি লোক বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! ما يلبس المحرم؟ তথা মুহরিম কি কি কাপড় পরিধান করবেন? বায়হাক্বী (রহঃ)-এর অন্য বর্ণনায় আইয়ূব, তিনি নাফি' থেকে, তিনি ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে نادى رجل رسول الله صلى الله عليه وسلم তথা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুৎবা দিচ্ছিলেন এই স্থানে তথা মসজিদে নাবাবীর সম্মুখভাগে দাঁড়িয়ে। সুতরাং এ বর্ণনা থেকে বুঝা যায় প্রশ্নটি তিনি করেছিলেন মদীনায়।
আর রাবীর কথা (ما يلبس المحرم من الثياب) এটাই এ ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ বর্ণনা যা বর্ণিত হয়েছে নাফি‘ ইবনু ‘উমার -এর সূত্রে এবং এটাকে আবূ ‘আওয়ানাহ্ ইবনু জুরায়জ-এর সূত্রে নাফি‘ থেকে যে শব্দে বর্ণনা করেছেন তা হলো (ما يترك المحرم) তথা মুহরিম কি কি কাপড় পরিধান থেকে বিরত থাকবেন। তবে ইমাম ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বর্ণনাটি শায বলেছেন।
এ ক্ষেত্রে মতবিরোধ মূলত ইবনু জুরায়জকে নিয়ে নাফি'-কে নিয়ে নয়।
(لَا تَلْبَسُوا) বুখারী (রহঃ)-এর অন্য বর্ণনায় لا يلبس শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এ উত্তরটি এ বিষয়ে বর্ণিত দু’ধরনের প্রশ্নের একটির সাথে সামঞ্জস্য হয় সে প্রশ্নটি হলো, ما يترك المحرم অথবা ما يجتنبى المحرم؟ তবে অধিকাংশ এবং সর্বাধিক সহীহ বর্ণনায় যে প্রশ্নটি এসেছে তা হলো (ما يلبس المحرم؟) তথা মুহরিম কি কি পরিধান করবে? আর এ প্রশ্নের উত্তর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিয়েছেন পরিধানে নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ উল্লেখ করে, অর্থাৎ- এখানে প্রশ্ন হয়েছে কি কি পরিধান করবে উত্তরও সে অনুপাতে এটা পরবে ওটা পরবে এমন হওয়া দরকার ছিল কিন্তু তা না হয়ে হয়েছে এমন যে শুধু বলা হয়েছে সেগুলোর নাম যা পরিধান নিষেধ। এর রহস্য পরিধান বর্ণনা করতে গিয়ে ‘উলামায়ে কিরাম বলেন, মুহরিমের জন্য নিষিদ্ধ বিষয়ের সংখ্যা কমগুলো উল্লেখ করে বেশিগুলোকে জায়িয বলা হয়েছে। কারণ, যেগুলো নিষিদ্ধ তা ব্যতীত অন্যান্যগুলো বৈধ।
আর যদি বৈধগুলোর নাম উল্লেখ করা হতো তখন কথা বেশি হতো। এখান থেকে আরো বুঝা যায় যে, প্রশ্নকর্তা প্রশ্ন ঠিক মতো করতে পারেননি। কারণ তার উচিত ছিল নিষিদ্ধগুলো সম্পর্কে প্রশ্ন করা। অলংকার শাস্ত্রের কিছু বিদ্বান এ ধরনের প্রশ্নে এ ধরনের উত্তরকে اسلوب الحكيم বলে আখ্যা দিয়েছেন। এ জাতীয় ব্যবহার কুরআনে কারীমেও লক্ষ্য করা যায় যেমন, মহান আল্লাহ বলেন,
يَسْأَلُونَكَ مَاذَا يُنْفِقُوْنَ قُلْ مَا أَنْفَقْتُمْ مِنْ خَيْرٍ فَلِلْوَالِدَيْنِ
অর্থাৎ- ‘‘তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করে তারা কি খরচ করবে তুমি বলে দাও যা খরচ করবে তা পিতা-মাতার জন্য।’’ (সূরা আল বাক্বারাহ্ ২ : ২১৫)
অত্র আয়াতে জিজ্ঞেস করা হয়েছে খরচের বিষয়বস্ত্ত সম্পর্কে আর উত্তর দেয়া হয়েছে খরচের স্থান সম্পর্কে। কেননা, এখানে প্রশ্নকর্তাকে বুঝানো হচ্ছে খরচের বিষয়বস্ত্তর চেয়ে খরচের স্থান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা বেশি প্রয়োজন ছিল।
(الْقُمُصَ) এটা এক ধরনের কাপড় যা বর্ম হিসেবে পরিচিত। ইবনুল হুমাম তার ফাতহুল কাদীরের ‘‘খরচ’’ অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন ‘‘درع’’ তথা বর্ম ও قمص (জামা) প্রায় একই বিষয়, কেবল পার্থক্য হলো জামার ক্ষেত্রে কাঁধের নিকট আর বর্মের ক্ষেত্রে বক্ষের নিকট পকেট লাগানো থাকে। অত্র হাদীস قميص তথা জামা এবং পরবর্তী سروايلات তথা পায়জামার কথা উল্লেখ করে মূলত এ ধরনের সব পোশাক যা শরীরকে বেষ্টন করে রাখে অথবা যা সেলাই করা যেমনঃ জুব্বা, জামা, আলখেল্লা, ট্রাউজার ও হাতমোজা থেকে নিষেধ করা হয়েছে।
‘আল্লামা ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেন,
قال العلماء : الحكمة فى تحريم اللباس المذكور فى الحديث على المحرم ولباسة الازار والرداء ان يبعد عن الترفه ويتصف بصفة الخاشع الذليل..........الخ
অর্থাৎ- ‘উলামায়ে কিরাম বলেন, হাদীসে উল্লেখিত পোশাকগুলো হারাম করে মুহরিমের জন্য শুধুমাত্র লুঙ্গী ও চাদর পরিধানের কথার রহস্য হলো যাতে করে মুহরিম আনন্দ থেকে নিজেকে গুটিয়ে রেখে ভয়ভীতি সহকারে আল্লাহকে স্মরণ করে বেশি বেশি যিকরে লিপ্ত থাকতে পারে, মৃত্যুর কথা স্মরণ করতে পারে কাফনের কাপড়ের কথা এবং কাল ক্বিয়ামতের দিন খালি গাঁয়ে খালি পায়ে আল্লাহর দরবারে হাজির হতে হবে- এ কথা স্মরণ করতে পারে। অপরদিকে সুগন্ধি ও স্ত্রী ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞার কারণ হলো, যাতে করে সে দুনিয়াবী চাকচিক্য পরিত্যাগ করতে পারে আর যেহেতু সুগন্ধি ব্যবহারে স্ত্রী সহবাসের চাহিদা জাগে যা হাজীদের জন্য নিষেধ। সুতরাং ঐ মুহূর্তটিতে কেবলই পরকালের চিন্তাই যেন করতে পারে, তাই উল্লেখিত বিষয়গুলো মুহরিমের জন্য হারাম করা হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ১১. প্রথম অনুচ্ছেদ - ইহরাম অবস্থায় যা থেকে বেঁচে থাকতে হবে
২৬৭৯-[২] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এক বক্তৃতায় বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ মুহরিম যদি জুতা না পায় তবে মোজা পরতে পারবে এবং সেলাইবিহীন লুঙ্গি না পায় তবে পাজামা পরতে পারবে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَجْتَنِبُهُ الْمُحْرِمُ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَخْطُبُ وَهُوَ يَقُولُ: «إِذَا لَمْ يَجِدِ الْمُحْرِمُ نَعْلَيْنِ لَبَسَ خُفَّيْنِ وَإِذَا لَمْ يَجِدْ إِزَارًا لَبَسَ سَرَاوِيل»
ব্যাখ্যা: (إِذَا لَمْ يَجِدِ الْمُحْرِمُ نَعْلَيْنِ لَبِسَ خُفَّيْنِ) অর্থাৎ- মুহরিম যদি দু’ জুতা না পায় বা পরতে না পারে তাহলে অধিকাংশ ‘উলামার মত হচ্ছে তিনি দু’টি মোজা পায়ের তলদেশ থেকে ছেড়ে তা ব্যবহার করবেন তবে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল বলেছেন ভিন্ন কথা।
(وَإِذَا لَمْ يَجِدْ إِزَارًا لَبَسَ سَرَاوِيْلَ) অর্থাৎ- যখন লুঙ্গি পাবে না তখন পায়জামা পরবে। এখান থেকে বুঝা যায় লুঙ্গি না পাওয়া গেলে পায়জামা পরা বৈধ এবং সেক্ষেত্রে কোন ফিদিয়া দেয়া আবশ্যক হবে না। এটাই মত দিয়েছেন ইমাম আহমাদ ও ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ), তবে ইমাম আবূ হানীফা বলেছেন পায়জামা সাধারণতই তথা সব সময়েই নিষেধ আর এ ধরনের বক্তব্য ইমাম মালিক (রহঃ)-এরও। তার এরূপ বক্তব্য দেয়ার কারণ সম্ভবত তার নিকট ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসটি পৌছায়নি। যেমনঃ তার প্রমাণ মুয়াত্ত্বায় পাওয়া যায়, ইমাম মালিক-কে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘‘মুহরিম যখন লুঙ্গি না পাবে তখন পায়জামা পরবে’’ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিল এমনটা উল্লেখ করেছেন- এ ব্যাপারে আপনার মতামত কি? তখন তিনি বলেছিলেন,
لم اسمع بهذا ولا ارى ان يلبس المحرم سروايل لأن رسول الله ﷺ نهى
অর্থাৎ- আমি এমন কথা শুনিনি আর আমি মনে করি না যে, মুহরিম পায়জামা পরতে পারেন কারণ এ ব্যাপারে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিষেধ আছে। যে হাদীসটি ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। সুতরাং যদি লুঙ্গি না পাওয়া গেলে পায়জামা পরার বিধান থাকতো তাহলে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা জানিয়ে দিতেন।
ইমাম ইবনু ‘আবদুল বার (রহঃ) বলেন, ‘আত্বা বিন আবী রিবাহ, শাফি‘ঈ ও তার ছাত্ররা, সাওরী, আহমাদ বিন হাম্বল, ইসহাক বিন রহ্ওয়াহি, আবূ সাওর ও দাঊদ সবাই বলেছেন, اذا لم يجد المحرم ازارا لبس السروايل ولا شيئ عليه অর্থাৎ- মুহরিম যদি লুঙ্গি না পায় তাহলে পায়জামা পরবে এতে তার কোন ফিদিয়া দিতে হবে না। আর ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেছেন- এটাই জমহূর ‘উলামায়ে কিরামের ফাতাওয়া।
পরিচ্ছেদঃ ১১. প্রথম অনুচ্ছেদ - ইহরাম অবস্থায় যা থেকে বেঁচে থাকতে হবে
২৬৮০-[৩] ইয়া’লা ইবনু উমাইয়্যাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা জি’রানাহ্ নামক স্থানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলাম। তখন তাঁর নিকট একজন বেদুঈন আসলো। তার পরনে ছিল জুব্বা আর শরীরে ছিল সুগন্ধি ছিটানো। সে বললো, হে আল্লাহর রসূল! আমি ’উমরা করার জন্য ইহরাম বেঁধেছি আর আমার গায়ে এসব আছে। তার কথা শুনে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমার শরীরে যে সুগন্ধি রয়েছে তা তিনবার করে ধুয়ে ফেলো, আর জুব্বা খুলে ফেলো। অতঃপর হজে যা কর ’উমরাতেও তাই কর। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَجْتَنِبُهُ الْمُحْرِمُ
وَعَنْ يَعْلَى بْنِ أُمَيَّةَ قَالَ: كُنَّا عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بالجعرانة إِذْ جَاءَ رَجُلٌ أَعْرَابِيٌّ عَلَيْهِ جُبَّةٌ وَهُوَ مُتَضَمِّخٌ بِالْخَلُوقِ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي أَحْرَمْتُ بِالْعُمْرَةِ وَهَذِهِ عَلَيَّ. فَقَالَ: «أَمَا الطِّيبُ الَّذِي بِكَ فَاغْسِلْهُ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ وَأَمَّا الْجُبَّةُ فَانْزِعْهَا ثُمَّ اصْنَعْ فِي عُمْرَتِكَ كَمَا تَصْنَعُ فِي حَجِّكَ»
ব্যাখ্যা: (يَعْلَى بْنِ أُمَيَّةَ) তার পূর্ণ নাম ইয়া‘লা বিন উমাইয়্যাহ্ বিন আবী ‘উবায়দুল্লাহ বিন হাম্মাম আত্ তামীমী, তিনি ছিলেন কুরায়শ মিত্র ইয়া‘লা বিন মুনাইয়্যাহ্ নামে পরিচিত। মুনাইয়্যাহ্ তার মাতা আবার কেউ কেউ বলেছেন তার পিতার মাতা- দাদী। তার উপনাম আবূ খালফ, আবার কেউ কেউ বলেছেন আবূ খালিদ, আবার কেউ বলেছেন আবূ সাফওয়ান। মক্কা বিজয়কালে ইসলাম গ্রহণ করেন তিনি একাধারে ত্বয়িফ হুনায়ন, তাবূক যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে অংশগ্রহণ করেন। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ‘উমার থেকে হাদীস বর্ণনা করেন আবার তার নিকট থেকে তার ছেলেরা সফ্ওয়ান মুহাম্মাদ ‘উসমান ও অন্যান্যরা হাদীস বর্ণনা করেন। আবূ বাকর (রাঃ) তাকে রিদ্দার সময় কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেন, অতঃপর ‘উমার (রাঃ)-এর সময় তিনি ইয়ামানের কিছু অংশে নিয়োগ পান এবং নিজের জন্য একটি ভূখণ্ড দখল করে নিলে তাকে বরখাস্ত করা হয়। অতঃপর ‘উসমান (রাঃ)-এর সময় ইয়ামানের সান্‘আতে কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান। ‘উসমান (রাঃ)-এর শাহাদাতের বছর হজ্জ/হজ করেন। উষ্ট্রের যুদ্ধে ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর পক্ষে যুদ্ধ করেন, অতঃপর সিফফীনের যুদ্ধে ‘আলী (রাঃ)-এর পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেন। তিনি ছিলেন দানশীল। তার বর্ণিত হাদীস সংখ্যা ১৯টি, হিজরী ৪৩ সনে তিনি মারা যান।
(كُنَّا عِنْدَ النَّبِىِّ ﷺ بِالْجِعِرَّانَةِ) অর্থাৎ- ‘উমরা করার মুহূর্তে ৮ম জিরীতে মক্কা বিজয়ের পরে যুলকাদা মাসে এ ‘উমরার নাম হলো ‘উমরাতুল জি‘রানাহ্। আর জি‘রানাহ্ ত্বায়িফ ও মক্কার মাঝে অবস্থিত একটি স্থানের নাম, এটা মক্কার বেশ নিকটে অবস্থিত। এ শব্দটি উচ্চারণের ক্ষেত্রে দু’টি প্রসিদ্ধ উচ্চারণ লক্ষ্য করা যায় প্রথমটি ‘আয়ন-কে সাকিন দিয়ে جعرانة আর দ্বিতীয়টি হলো ‘‘আয়ন’’-কে যের এবং ‘‘রা’’-কে তাশদীদ দিয়ে جعرانة পড়া। তবে প্রথম কিরাআতটিই বেশি প্রচলিত এবং বেশি শুদ্ধ।
ইমাম শাফি‘ঈসহ অধিকাংশ ভাষাবিদ দু’ভাবেই উচ্চারণ করেন। ইবনুল আসীর (রহঃ) বলেন, এ স্থানটি মক্কার নিকটবর্তী এবং হিল্ল-এ অবস্থিত এবং ইহরামের মিকাতের স্থান। ‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী হানাফী (রহঃ) ‘উমরার ইহরাম বেঁধেছেন। ইহরাম বাঁধার স্থান হিসেবে ‘‘তান্‘ঈম’’ নামক স্থানের চেয়ে এ স্থানটি বেশি ভাল- এ কথাই বলেছেন ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ)। ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) বলেছেন, ‘‘তান্‘ঈম’’ই ইহরাম বাঁধার জন্য উত্তম। কারণ তান্‘ঈম থেকে ইহরাম বাঁধার বিষয় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বক্তব্যমূলক হাদীস রয়েছে আর নিয়ম হলো নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বক্তব্যমূলক হাদীস এবং কর্মমূলক হাদীস যখন বিরোধপূর্ণ হবে তখন বক্তব্যমূলক হাদীস প্রাধান্য পাবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) তান্‘ঈম থেকে ইহরাম বাঁধতে বলেছেন।
(إِذْ جَاءَ رَجُلٌ أَعْرَابِىٌّ) শব্দটিকে اعراب-এর দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এরা হলো যারা গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করে। এদেরকে বেদুঈন বলা হয়।
হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, আমি এ লোকটির নাম সম্পর্কে অবগত হতে পারিনি। তবে ফাতহুল বারীর মুক্বদ্দামাতে বলা হয়েছে বস্ত্ততঃ এ লোকটি স্বয়ং এ হাদীসের বর্ণনাকারী ইয়া‘লা বিন উমাইয়্যাহ্ নিজেই। যেমনটি বর্ণনা করেছেন ইমাম তাহাবী শু‘বাহ্ থেকে, শু‘বাহ্ কাতাদা থেকে, কাতাদা ‘আত্বা থেকে, বর্ণনাটি হলো- নিশ্চয়ই একজন লোক যার নাম ইয়া‘লা বিন উমাইয়্যাহ্ ইহরাম বাঁধলেন জুব্বা গায়ে দিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জুব্বা খুলে ফেলতে বললেন। তবে তিনি যে কেন তার নাম অস্পষ্ট রেখেছেন সে ব্যাপারে আল্লাই ভাল জানেন।
(كَمَا تَصْنَعُ فِىْ حَجِّكَ) ‘আল্লামা বাজী (রহঃ) বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা প্রমাণ করে যে, তিনি জানতেন প্রশ্নকারী হজ্জের কৃতকলাপ সম্পর্কে অবহিত। কেননা যদি তিনি না জেনে থাকেন তাহলে এ ধরনের কথা বলা সঠিক হতো না।
‘আল্লামা বাজী (রহঃ) আরো বলেন, ‘উলামাগণ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ কথা নিয়ে মতবিরোধ করেছেন, ইবনুল ‘আরাবী (রহঃ) বলেন, জাহিলী যুগে তারা হজ্জের ইহরামের সময় কাপড় খুলে রাখতো এবং সুগন্ধি বর্জন করতো ঠিক তবে হজ্জের ক্ষেত্রে এ কাজে শিথিলতা প্রদর্শন করতো। তাই এ হাদীসের মাধ্যমে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝিয়ে দিলেন হজ্জ/হজ ও ‘উমরার মধ্যে পার্থক্য করা ঠিক নয়।
পরিচ্ছেদঃ ১১. প্রথম অনুচ্ছেদ - ইহরাম অবস্থায় যা থেকে বেঁচে থাকতে হবে
২৬৮১-[৪] ’উসমান (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ইহরাম অবস্থায় বিয়ে করবে না, বিয়ে দেবে না এবং বিয়ের প্রস্তাবও দিবে না। (মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَجْتَنِبُهُ الْمُحْرِمُ
وَعَنْ عُثْمَانَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَنْكِحُ الْمُحْرِمُ وَلَا يُنكِحُ وَلَا يَخْطُبُ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসটি প্রমাণ করছে মুহরিমের জন্য বিবাহ করা বা অপর কাউকে বিবাহ দিয়ে দেয়া কোনটাই বৈধ নয়- এটাই অধিকাংশ ‘আলিমের মতামত। ইমাম নাবাবী (রহঃ) তার শারহুল মুহাযযাবে অধিকাংশ সাহাবী, তাবি‘ঈ ও তাবি তাবি‘ঈ-এর মতামতও এটা বলেছেন। তিনি আরো বলেছেন এ মতামত ‘উমার বিন খাত্ত্বাব, ‘উসমান, ‘আলী, যায়দ বিন সাবিত, ইবনু ‘উমার, সা‘ঈদ বিন মুসাইয়্যিব, সুলায়মান বিন ইয়াসার, যুহরী, মালিক, আহমাদ, শাফি‘ঈ, ইসহাক, দাঊদসহ আরো অনেকের।
মুসলিমের ব্যাখ্যায় ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেছেনঃ ইমাম মালিক, শাফি‘ঈ ও ইমাম আহমাদ (রহঃ) বলেছেন, (لا يصح نكاح المحرم) অর্থাৎ- মুহরিমের বিবাহ বৈধ হবে না। কিন্তু ইমাম আবূ হানীফা, হাকাম বিন ‘উতায়বাহ্, সুফিয়ান সাওরী, ইব্রাহীম নাখ্‘ঈ, ‘আত্বা, হাম্মাদ বিন আবী সুলায়মান, ‘ইকরামাহ্, মাসরুকসহ অনেকে বলেছেন মুহরিমের বিবাহ বৈধ। আর কেউ কেউ বলেছেন, এটা ইবনু ‘আব্বাস, ইবনু মাস্‘ঊদ, আনাস ও মু‘আয বিন জাবাল (রাঃ)-এরও উক্তি। আর এ দিকেই ঝুকে গিয়েছেন ইমাম বুখারী (রহঃ), কেননা তিনি ‘‘মানাসিক’’ অধ্যায়ে বাব রচনা করেছেন, (باب تزويبج المحرم) এবং ‘‘নিকাহ’’ অধ্যায়ে (باب نكاح المحرم)-এর মাধ্যমে অধ্যায় রচনা করেছেন। হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, ইমাম বুখারীর এই বাব তথা অধ্যায় রচনা দেখেই অনুমান করা যায় যে, তিনি মুহরিমের বিবাহ বৈধের মতাবলম্বী ছিলেন।
প্রথম মতের প্রবক্তাদের দলীল হলো, ‘উসমান ও ইবনু ‘উমার (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীস, নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (لا ينكح المحرم ولا ينكح ولا يخطب ولا يخطب عليه) অর্থাৎ- মুহরিম বিবাহ করতে পারবে না কাউকে বিবাহ দিতেও পারবে না। অনুরূপ বিবাহের পয়গাম পাঠাতেও পারবে না এবং তাকেও কেউ বিবাহের পয়গাম দিতে পারবে না।
দ্বিতীয় মতের প্রবক্তাদের দলীল দিয়েছে, ইবনু ‘আব্বাস -এর বর্ণিত হাদীসের মাধ্যমে। কেননা সেখানে স্পষ্ট রয়েছে, (ان رسول الله ﷺ تزوج منمونة وهو محرم) অর্থাৎ- নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মায়মূনাহ্-কে বিবাহ করেছেন মুহরিম অবস্থায়। আর মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাঝে উত্তম আদর্শ নিহিত রয়েছে।’’ (সূরা আল আহযাব ৩৩ : ২১)
জেনে রাখা প্রয়োজন যে, হাদীসে উল্লেখিত لا ينكح ولا ينكح এ দু’টি শব্দই হারামের জন্য এসেছে। সকলের ঐকমত্যে তবে لا يخطب বিবাহের পয়গামও পাঠানো যাবে না, এটিকে তাহরীমের ফায়দা দিবে নাকি নাহিয়ে তানযীহী তথা মাকরূহের ফায়দা দিবে- এ নিয়ে ‘উলামায়ে কিরামের মাঝে মতবিরোধ আছে। তিন ইমামের নিকট তা মাকরূহে ফায়দা দিবে ইমাম আবূ হানীফার ও তাই মত। কিন্তু আমাদের কথা হলো উপরোক্ত সবগুলো সিগাহতে যে নাহীর শব্দ আছে তা তাহরীমের ফায়দা দিবে। সুতরাং মুহরিমের জন্য যেমন কোন মহিলাকে বিবাহের পয়গাম পাঠানো হারাম অনুরূপ মুহরিমা নারীর জন্য অপর কোন পুরুষকে বিবাহের পয়গাম পাঠানো হারাম। তাই বিবাহের হারাম আর বিবাহের পয়গাম পাঠানোর হারাম একই হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হবে। যেহেতু সিগাহ একই। সুতরাং যদি কেউ একটিকে হারাম আর অপরটিকে মাকরূহ বলে তাহলে তার দলীল লাগবে, কিন্তু দলীল নেই। কোন কোন শাফি‘ঈ মতাবলম্বী আবার কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে বিবাহের পয়গাম পাঠানোকে হারাম না বলে মাকরূহ বলতে চান আর তা হলো, মহান আল্লাহ তা‘আলার বাণী,
كُلُوْا مِنْ ثَمَرِهٖ إِذَا أَثْمَرَ وَاٰتُوْا حَقَّهٗ يَوْمَ حَصَادِه
অর্থাৎ- ‘‘গাছগুলো ফল দিলে তোমরা খাও এবং যাকাত দাও।’’ (সূরা আল আন্‘আম ৬ : ১৪১)
তার অর্থ এখানে মা‘তুফ আর মা‘তুফ ‘আলায়হির হুকুম ভিন্ন হচ্ছে, কারণ খাওয়া ওয়াজিব নয় কিন্তু যাকাত ওয়াজিব তাই এখানেও বিবাহ করা হারাম হতে পারে কিন্তু পয়গাম পাঠানো হারাম হবে না কারণ মা‘তুফ ও মা‘তুফ আলায়হির হুকুম ভিন্ন ভিন্নও হতে পারে। শাফি‘ঈ মতাবলম্বীদের এ গবেষণার কোন মূল্য নেই বরং আমরা সুন্নাহকেই আকড়ে ধরবো।
ইহরাম অবস্থায় বিবাহ বৈধ কিনা- এ বিষয়ে মতবিরোধ থাকলেও বিবাহ না করার মতই অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। এদিকে যারা বিবাহ বৈধ বলেন তারা বিভিন্নভাবে উত্তর দেয়ার প্রয়াস পান। যেমনঃ
১. তারা বলেন, ইবনু ‘আব্বাস-এর হাদীসটি বেশি সহীহ এবং শক্তিশালী কারণ সেটা বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনা। অপরদিকে ‘উসমান (রাঃ)-এর হাদীসটি ইমাম মুসলিমের একার বর্ণনা, তাই এখানে ইবনু ‘আব্বাস-এর বর্ণিত হাদীসটি অগ্রাধিকার পাবে।
এদের উত্তরে আমরা বলি, ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর হাদীস হলো নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কর্মগত হাদীস আর উসমান (রাঃ)-এর হাদীস নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বক্তব্যমূলক হাদীস, আর আমরা জানি কর্মমূলক হাদীস আর বক্তব্যমূলক হাদীস বিরোধপূর্ণ হলে বক্তব্যমূলকটি প্রাধান্য পায়, তাই এখানে ‘উসমান (রাঃ)-এর হাদীসটি প্রাধান্য পাবে। যদিও সানাদগত ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর হাদীস শক্তিশালী।
হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, ‘উসমান -এর হাদীসটি প্রাধান্য পাবে কারণ সেটা একটি মৌলিক নিয়মের কথা বলছে আর ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর হাদীস একটি নির্দিষ্ট ঘটনা যা অনেকগুলো বিষয়ের সম্ভাবনা রাখে।
২. তারা বলে থাকেন, ‘উসমান -এর হাদীসে নিকাহ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো وطأ الزوجة তথা স্ত্রী সহবাস যা ইহরাম অবস্থায় সকলের ঐকমত্যে হারাম। এখানে নিকাহ দ্বারা ‘আক্বদ উদ্দেশ্য নয়। এর উত্তরে আমরা বলবো, আপনাদের কথাটি ঠিক নয়। ঠিক না হওয়ার প্রথম কারণ হলো সরাসরি ঐ হাদীস দু’টি ইঙ্গিত যা প্রমাণ করছে এখানে নিকাহ দ্বারা عقد النكاح তথা বিবাহের বন্ধনই উদ্দেশ্য وطأ তথা স্ত্রী সহবাস উদ্দেশ্য নয়।
১নং ইঙ্গিতঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা لا ينكح ই দলীল যে এখানে নিকাহ দ্বারা বিবাহ উদ্দেশ্য وطأ তথা স্ত্রী সহবাস উদ্দেশ্য নয়, কারণ ওলী যখন বিবাহ করিয়ে দিবে তার পরে তা স্বামী স্ত্রী সহবাস চাইবে। কিন্তু এখানে তো ওলীর বিবাহ করিয়ে দেয়াকেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
২য় ইঙ্গিতঃ لا يخطب বিবাহের পয়গাম দিবে না- এ শব্দটিই প্রমাণ করছে পূর্বোক্ত নিকাহ শব্দের অর্থ মূলত عقد النكاح তথা বিবাহের বন্ধন وطأ তথা সহবাস নয়।
আর দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে আবান বিন ‘উসমান তথা হাদীসের বর্ণনাকারীই তার অর্থ সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত আর সেই আবান বিন ‘উসমানই لا ينكح-এর অর্থ لا يزوج করেছেন এবং এটা অথবা আরো ভালোভাবে জানতে পারি এ হাদীসের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানি আর তা হলো ‘উমার বিন ‘উবায়দুল্লাহর ছেলে তলহা বিন ‘উমার যখন শায়বাহ্ বিন জুবায়র-এর মেয়েকে বিবাহ করলো ইহরাম অবস্থায় তখন এ বিবাহের ঘোরবিরোধিতা করা হলো এবং ‘উসমান (রাঃ) থেকে বর্ণিত ইহরাম অবস্থায় বিবাহ নিষেধের হাদীসটি বর্ণনা করে শুনানো হলো এবং সবাই তখন এ হাদীস দ্বারা বিবাহের বন্ধনই বুঝেছিলেন وطأ তথা স্ত্রী সহবাস বুঝেনি।
তৃতীয় কারণ হচ্ছে, ইমাম আহমাদ (রহঃ) ইবনু ‘উমার থেকে বর্ণনা করেন, ইবনু ‘উমার (রাঃ)-কে এ মর্মে প্রশ্ন করা হলো যে, কোন মহিলাকে যদি কোন পুরুষ ‘উমরা অথবা হজ্জের ইহরাম অবস্থায় বিবাহ করতে চায় তাহলে তা বৈধ হবে কি না? উত্তরে তিনি বললেন, (لا تتزوج وانت محرم فان رسول الله ﷺ نهى عنه) অর্থাৎ- তুমি মুহরিম অবস্থায় বিবাহ করিও না, কারণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা করতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং এ হাদীস থেকেও বুঝা গেল نكاح দ্বারা উদ্দেশ্য عقد النكاح তথা বিবাহের চুক্তি وطأ তথা সহবাস নয়।
পরিচ্ছেদঃ ১১. প্রথম অনুচ্ছেদ - ইহরাম অবস্থায় যা থেকে বেঁচে থাকতে হবে
২৬৮২-[৫] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মায়মূনাহ্ (রাঃ)-কে ইহরাম অবস্থায় বিয়ে করেছিলেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَجْتَنِبُهُ الْمُحْرِمُ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَزَوَّجَ مَيْمُونَةَ وَهُوَ محرم
ব্যাখ্যা: (تَزَوَّجَ مَيْمُوْنَةَ) মায়মূনাহ্ (রাঃ) তিনি উম্মুল মু’মিনীন বিনতু হারিস আল হিলালিয়্যাহ্ (রাঃ) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সর্বশেষ স্ত্রী, যার সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মিলন ঘটেছে। তিনি তাকে সপ্তম হিজরীতে বিবাহ করেন। তিনি ‘‘সারিফ’’ নামক স্থানে মৃত্যুবরণ করেন। ৫১ বছর বয়স পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেখানে অবস্থান করেন।
‘আবদুল্লাহ বিন ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে গ্রহণযোগ্য বর্ণনাকারীদের সূত্রে বর্ণিত আছে, নিশ্চয়ই ইবনু ‘আব্বাস বলেছেন, (تزوج رسول الله ﷺ ميمونة وهو محرم) অর্থাৎ- নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মায়মূনাহ্ (রাঃ)-কে বিবাহ করেছিলেন মুহরিম অবস্থায়। ইতিপূর্বে অতিবাহিত হয়েছে যে, এর দু’টি শক্তিশালী ‘‘শাহিদ’’ আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) ও ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে। তবে পরবর্তীতে বর্ণিত ইয়াযীদ বিন আসম মায়মূনাহ্ (রাঃ) থেকে যে হাদীসটি রয়েছে তা এ হাদীসের বিপরীত এবং তা আবূ রাফি‘ থেকেও বর্ণিত হয়েছে, হাদীসটি হলো, (تزوج رسول الله ﷺ ميمونة وهو حلال)
অর্থাৎ- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মায়মূনাহ (রাঃ)-কে বিবাহ করেন হালাল অবস্থায়। এ বর্ণনাটির স্বপক্ষে আরো একটি হাদীস রয়েছে ইবনু সা‘দ মায়মূনাহ্ বিন মিহরান থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, সফিয়্যাহ্ বিনতু শায়বাহ্ যখন বৃদ্ধা তখন আমি তার নিকট গিয়ে প্রশ্ন করলাম যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি মায়মূনাহ্ (রাঃ)-কে মুহরিম অবস্থায় বিবাহ করেছিলেন? তিনি উত্তরে বলেছিলেন না, আল্লাহর শপথ! তারা দু’জনে হালাল অবস্থায়ই বিবাহ করেছিলেন। (মাজমাউয্ যাওয়ায়িদ খণ্ড ৪র্থ, পৃষ্ঠা ২৬৮)
উপরোক্ত আলোচনার মাধ্যমে বুঝা যায় মায়মূনাহ্ (রাঃ)-কে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিবাহ কি হালাল অবস্থায় ছিল না মুহরিম অবস্থায় ছিল? এ বিষয় নিয়ে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে, ‘আল্লামা ইবনুল ক্বইয়্যিম (রহঃ) বলেন, এ বিষয়ে তিন রকমের কথা পাওয়া যায় প্রথম কথাটি যা মায়মূনাহ্ (রাঃ) এবং হাদীস বর্ণনাকারী আবূ রাফি'-এর ভাষ্য থেকে পাওয়া, তথ্যানুযায়ী সেটি হচ্ছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বিবাহ করেছিলেন ‘উমরা থেকে হালাল হওয়ার পর। এটাই অধিকাংশ বর্ণনাকারীর মত।
দ্বিতীয় কথা, যা আহলে কূফা, ইবনু ‘আব্বাস ও একদল ‘আলিমের ভাষ্যমতে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বিবাহ করেছিলেন ইহরাম বাঁধা অবস্থায়।
তৃতীয় কথা হলো নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বিবাহ করেছিলেন ইহরাম বাঁধার পূর্বে।
ইতিপূর্বে আমাদের আলোচনা অতিবাহিত হয়ে গেছে যে, যে সমস্ত ‘আলিম ইহরাম অবস্থায় বিবাহ করা বৈধ বলে ফাতাওয়া দেন তাদের অন্যতম দলীল হলো ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর এ হাদীস। এ মতের বিপরীত অবস্থানকারীগণ বিভিন্ন উত্তর প্রদান করে থাকেন। যেমনঃ তারা বলে থাকেন যা বর্ণিত হয়েছে তিরমিযীতে যে, (تزوجها حلالا وظهرا مر تزويجها وهو محرم وبنى بها وهو حلال بسرف فى طريق مكة) অর্থাৎ- বিবাহের ‘আক্বদ হয়েছিল হালাল অবস্থায় তবে বিবাহের খবর চারদিকে যখন ছড়িয়ে পড়ে তখন তিনি মুহরিম অবস্থায় ছিলেন বাসর করেছেন মক্কার পথে সারিফ নামক স্থানে হালাল অবস্থায়।
দ্বিতীয় উত্তর হচ্ছে ইবনু ‘আব্বাস -এর কথা (تزوجها وهو محرم) এর অর্থ হলো, তিনি তাকে হারাম মাসে বিবাহ করেছেন। মুহরিম অবস্থায় নয়। আর সেটা যিলকদ মাস ‘উমরাতুল কাযা-এর মাস এমনটাই বলেছেন ইমাম বুখারী (রহঃ) তার কিতাবুল মাগাযীতে ‘উমরাতুল কাযা’ অধ্যায়ে।
এ বিশাল মতবিরোধপূর্ণ মাস্আলাতে মায়মূনাহ্ ও আবূ রাফি'-এর বর্ণনাটিই অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত, কারণ তারা ঘটনার বাস্তবসাক্ষী আর দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে ঐ সময় ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হাদীস বর্ণনা করার বয়সে উপনীত হননি, তাই তার হাদীসের উপর তাদের হাদীস বর্ণিত হাদীস স্বভাবতই প্রাধান্য পেতে পারে। (আল্লাহ অধিক অবগত আছেন)
পরিচ্ছেদঃ ১১. প্রথম অনুচ্ছেদ - ইহরাম অবস্থায় যা থেকে বেঁচে থাকতে হবে
২৬৮৩-[৬] উম্মুল মু’মিনীন মায়মূনাহ্ (রাঃ)-এর ভাগিনা ইয়াযীদ ইবনু আসম (রহঃ) তাঁর খালা মায়মূনাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মায়মূনাহ্ (রাঃ)-কে হালাল অবস্থায় (ইহরাম অবস্থায় নয়) বিয়ে করেছিলেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَجْتَنِبُهُ الْمُحْرِمُ
وَعَنْ يَزِيدَ بْنِ الْأَصَمِّ ابْنِ أُخْتِ مَيْمُونَةَ عَنْ مَيْمُونَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَزَوَّجَهَا وَهُوَ حَلَالٌ. رَوَاهُ مُسْلِمٌ
قَالَ الشيخُ الإِمَام يحيى السّنة: وَالْأَكْثَرُونَ عَلَى أَنَّهُ تَزَوَّجَهَا حَلَالًا وَظَهَرَ أَمْرُ تَزْوِيجِهَا وَهُوَ مُحْرِمٌ ثُمَّ بَنَى بِهَا وَهُوَ حَلَال بسرف فِي طَرِيق مَكَّة
ব্যাখ্যা: (يَزِيدَ بْنِ الْأَصَمِّ) তার পূর্ণনাম ইয়াযীদ বিন আল আসম বিন ‘উবায়দ বিন মু‘আবিয়াহ্ বিন ‘উবাদাহ্ বিন আল বাক্কা আসম-এর নাম হলো ‘আমর এবং আবূ ‘আওফ আল বাকাঈ আল কূফী। তাকে তার খালা উম্মুল মু’মিনীন মায়মূনাহ্ (রাঃ) লালন-পালন করেন, তার মাতার নাম বারযাহ বিনতু হারিস মায়মূনাহ্ (রাঃ)-এর বোন। হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, তিনি সিক্বাহ রাবী মধ্যস্তরের তাবি‘ঈ ১০৩ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন ‘আল্লামা আল ওয়াকীদী বলেন, তিনি ৭৩ বছরের জীবন পেয়েছিলেন।
(تَزَوَّجَهَا وَهُوَ حَلَالٌ) অর্থাৎ- মুহরিম অবস্থা ব্যতীত বিবাহ করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন ইহরাম বাঁধার পূর্বে বিবাহ করেছেন এমনটাই বর্ণনা করেছেন ইমাম মালিক (রহঃ) রবী‘আহ্ থেকে, রবী‘আহ্ সুলায়মান বিন ইয়াসার থেকে তবে বর্ণনাটি ‘‘মুরসাল’’। সে হাদীসে পাওয়া যায় বিবাহ হয়েছিল মদীনায়, আবার কেউ বলেছেন বিবাহ হয়েছিল ‘উমরা থেকে হালাল হওয়ার পর মক্কায় অথবা সারিফ নামক স্থানে, যাই হোক না কেন হাদীসটি পূর্বে বর্ণিত ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর হাদীসের বিপরীত।
যারা ইহরাম অবস্থায় বিবাহ বৈধ বলেন, তারা মূলত দু’ভাবে তা বলে থাকেন।
১। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর হাদীস থেকে ইয়াযীদ বিন আসম (রাঃ)-এর হাদীসের উপর প্রাধান্য দেয়ার মাধ্যমে আর এ প্রাধান্যটি কয়েকটি কারণে হতে পারে।
(ক) ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীস যেহেতু ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম উভয়ের বর্ণনা, তাই সেটা সানাদগত দিক থেকে বেশি শক্তিশালী। অপরদিকে ইয়াযীদ বিন আসম সহ অন্যান্যদের বর্ণিত হাদীস এমনটি নয়, কারণ সেটা ইমাম বুখারী (রহঃ) বর্ণনা করেননি। এর উত্তর পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে আর তা হলো যদিও ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর হাদীস মুত্তাফাক্ব ‘আলায়হি হওয়ার কারণে হাদীসটি বিশুদ্ধতার শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছেছে ঠিক কিন্তু এর অর্থ এটা নয় যে, সেটা ইয়াযীদ বিন আসমসহ অন্যান্যদের বর্ণিত হাদীসের উপরে উঠে গেছে ও মায়মূনাহ্ (রাঃ) যারা এ ঘটনার বাস্তবসাক্ষী তাদের কথাই এখানে প্রাধান্য পাবে।
(খ) ইয়াযীদ বিন আসম-এর তুলনায় ইবনু ‘আব্বাস অনেক অনেক বেশি (সিক্বাহ্) নির্ভরযোগ্য, তাই ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর হাদীসই প্রাধান্য পাবে।
(গ) ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীসটি অতিরিক্ত একটি বিষয়কে সাব্যস্ত করে। আর তা হলো ইহরাম অবস্থায়। ইবনু আসম এর হাদীসটি ইহরাম অবস্থার বিপরীত। আরো প্রকাশ থাকে যে, ইতিবাচক হাদীসটি নেতিবাচক হাদীসটির উপর প্রাধান্য পাবে।
(ঘ) ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীসটি মুহকাম। এতে ন্যূনতম কোন ব্যাখ্যার সম্ভাবনা রাখে না। যেমনটি ইবনু আসম এর হাদীসটি রাখে। ইবনু আসম এর বর্ণিত হাদীসটি ব্যাখ্যাসাপেক্ষ, যাতে বিবাহের খুতবাহ্ ও বিবাহের বিষয়টি প্রকাশ পায় হালাল অবস্থায়। অর্থাৎ- মক্কা থেকে মদীনায় ফেরার পথে সারিফ নামক স্থানে।
(ঙ) বিবাহের বিষয়টির সম্পূর্ণ দায়িত্ব ছিল ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর ওপর। আর ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) ছিলেন এই বিবাহের ওয়াকীল বা অভিভাবক। আর ওয়াকীলই বেশী জানে মু’কাল থেকে। অর্থাৎ- ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) ছিলেন এই বিবাহের প্রত্যক্ষদর্শী যে, বিবাহ হালাল অবস্থায় হয়েছিল নাকি, হারাম অবস্থায় হয়েছিল।
(চ) ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর হাদীসটি ক্বিয়াস সমর্থিত। কেননা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই বিবাহের বন্ধনটি ছিল অন্যান্য সকল মানুষের বিবাহের বন্ধনের মতই।
২। যারা বলেছেন যে, ইহরাম অবস্থায় বিবাহ বৈধ এবং ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস -এর হাদীসটিকে ইবনু আসম -এর হাদীসের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন তাদের দ্বিতীয় মতঃ ইবনু আসম এর হাদীসের মধ্যে النكاح والتزويج ‘‘নিকাহ ও তাযবীজ’’ শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সহবাস বা মিলন বিবাহের বন্ধন উদ্দেশে নয়।
‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী (রহঃ) বলেনঃ ‘‘তাযবীজ’’ শব্দ দ্বারা সহবাস উদ্দেশ্য।
এজন্য দেখা যায় এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে ‘আমর বিন দীনার ইমাম যুহরী (রহঃ)-কে বলেছেন, ইয়াযীদ বিন আসম একজন গ্রাম্য মানুষ সে আর কিইবা বুঝবে? আপনি কি তাকে ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর সমপর্যায়ভুক্ত করছেন? ইয়াযীদ বিন আসম কখনোই জ্ঞান-গরীমায় ও হিফযে ইবনু আব্বাস (রাঃ)-এর সমপর্যায়ের হবেন না। তাই ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীস এখানে প্রাধান্য পাবে।
এর উত্তর দিয়েছেন ইমাম ইবনু হাযম। তিনি বলেছেন, ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-কে ইয়াযীদ-এর ওপর অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে এটা ঠিক আছে। কিন্তু এখানে সমস্যা একটু রয়ে গেছে সেটা হলো ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) ইয়াযীদ বিন আসম-এর চেয়ে বেশি ভাল হলেও এখানে তার হাদীস প্রাধান্য পাবে না কারণ কম বয়সী ছোট ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-কে আমরা উম্মুল মু’মিনীন মায়মূনাহ্ (রাঃ)-এর চেয়ে উপযুক্ত বলতে পারছি না। এক্ষেত্রে ইয়াযীদ কর্তৃক মায়মূনাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসই সঠিক এবং ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর হাদীস সন্দেহযুক্ত, এর কারণ হলো মায়মূনাহ্ (রাঃ) হলেন এর বাস্তবসাক্ষী আর ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) শুধুমাত্র বর্ণনাকারী। আবার মায়মূনাহ্ একজন পূর্ণ বয়ঃপ্রাপ্ত মহিলা অপরদিকে ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর বয়স তখন মাত্র ১০ বছর।
[উভয় হাদীসের মধ্যে সমন্বয়ের কয়েকটি দিকঃ
১। এই ঘটনা যাকে কেন্দ্র করে তিনি হলেন উম্মুল মু’মিনীন মায়মূনাহ্ (রাঃ)। আর তিনি নিজেই বলেছেনঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বিবাহ করেছেন এমতাবস্থায় যে, তখন তিনি ছিলেন হালাল।
২। এ বিবাহের ঘটক ছিলেন আবূ রাফি‘ঈ; আর তিনি নিজেই বলছেন যে, আমি উভয়ের (মায়মূনাহ্ ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিবাহের মাঝে সমন্বয়কারী) ঘটক হিসেবে ছিলাম। আর আল্লাহর নাবী বিবাহ করেছেন এমন অবস্থায় তিনি ছিলেন হালাল।
৩। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর মতে মুহরিম বলা হয় এমন ব্যক্তিকে, যে মক্কায় প্রবেশ করার পূর্বেই হাদী বা কুরবানীর জন্তুকে মক্কায় পাঠিয়ে দেয়। আর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো আগেই হাদী পাঠিয়ে ছিলেন।
৪। এখানে মুহরিম দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- যে মক্কায়, অর্থাৎ- হারাম এলাকায় প্রবেশ করল সেই মুহরিম। অর্থাৎ- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মায়মূনাহ্ (রাঃ)-কে বিবাহ করেছেন এমন অবস্থায় তিনি হেরেমের সীমানার মধ্যে প্রবেশকারী। অর্থাৎ- তিনি মুহরিম অবস্থায় ছিলেন না।] (সম্পাদক)
পরিচ্ছেদঃ ১১. প্রথম অনুচ্ছেদ - ইহরাম অবস্থায় যা থেকে বেঁচে থাকতে হবে
২৬৮৪-[৭] আবূ আইয়ূব আল আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম অবস্থায় নিজের মাথা ধুতেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَجْتَنِبُهُ الْمُحْرِمُ
وَعَن أَبِي أَيُّوبَ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَغْسِلُ رَأْسَهُ وَهُوَ مُحْرِمٌ
ব্যাখ্যা: এ হাদীস থেকে বুঝা যায়, মুহরিমের জন্য গোসল করা বৈধ এবং মাথা ধোয়া চুল ভিজানো ইত্যাদিও জায়িয। এখানে একটি ঘটনা উল্লেখ করতে হয় এ হাদীস প্রসঙ্গে যা ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম (রহঃ) বর্ণনা করেছেন ‘আবদুল্লাহ বিন হুনায়ন থেকে যে, একদা ‘আবদুল্লাহ বিন ‘আব্বাস ও মিসওয়ার বিন মাখরামাহ্ (রাঃ) মতবিরোধে লিপ্ত হলেন আব্ওয়া নামক স্থানে। আর তা হলো ইবনু ‘আব্বাস বলেন, মুহরিমের জন্য মাথা গোসল করানো জায়িয আছে আর মিসওয়ার বলেন, জায়িয নেই। ‘আবদুল্লাহ বিন হুনায়ন বলছেন ঘটনার এক পর্যায়ে ‘আবদুল্লাহ বিন ‘আব্বাস (রাঃ) এ বিষয়ে সঠিক জ্ঞান জানার জন্য আমাকে আবূ আইয়ূব আল আনসারী (রাঃ)-এর নিকট পাঠালেন, আমি সেখানে যেয়ে দেখলাম তিনি কাপড় দিয়ে চারপাশ ঘিরে রেখে গোসল করছেন আমি তাকে সালাম দিলাম, তিনি বললেন, কে? আমি বললাম ‘আবদুল্লাহ বিন হুনায়ন, আমাকে ‘আবদুল্লাহ বিন ‘আব্বাস (রাঃ) পাঠিয়েছেন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহরিম অবস্থায় কিভাবে গোসল করতেন- এটা জিজ্ঞেস করার জন্য।
অতঃপর আবূ আইয়ূব আল আনসারী (রাঃ) তার হাত কাপড়ের উপর রাখলেন এবং মাথার কাপড় আস্তে আস্তে টানতে লাগলেন এবং এক পর্যায়ে তার মাথা দেখতে পেলাম, অতঃপর তিনি একজন লোককে বললেন তার মাথায় পানি ঢালতে এ অনুপাতে তার মাথায় পানি ঢালা হলো এবং তিনি তার দু’হাতে মাথা নাড়াতে শুরু করেন এবং হাত দিয়ে মাথার সামনে একবার এবং পিছনে একবার নিয়ে যান এবং বলেন, এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে করতে দেখেছি।
এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রহঃ) যে অধ্যায়ে নিয়ে এসেছেন তার নাম দিয়েছেন (باب الاغسال للمحرم) তথা মুহরিমের জন্য গোসল অধ্যায়। হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, এ গোসলটি মূলত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য এবং ফরয গোসল ও মুহরিমের জন্য অবধারিত।
পরিচ্ছেদঃ ১১. প্রথম অনুচ্ছেদ - ইহরাম অবস্থায় যা থেকে বেঁচে থাকতে হবে
২৬৮৫-[৮] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম অবস্থায় শিঙ্গা লাগিয়েছেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَجْتَنِبُهُ الْمُحْرِمُ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: احْتَجَمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ محرم
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা হাযিমী সহ অনেক ‘আলিমের মতামত হলো এ শিঙ্গা লাগানোর সময়টি ছিল বিদায় হজ্জের দিন।
(وَهُوَ مُحْرِمٌ) সহীহুল বুখারীতে অতিরিক্ত এসেছে, (فى راسه من وجع كان به تماء يقال له لحى جمل) অর্থাৎ- শিঙ্গাটা লাগিয়েছিলেন মাথায় আঘাতজনিত কারণে পানি দ্বারা যাকে ‘‘লুহা জামাল’’ বলা হয়। অন্য সনদে ইবনু ‘আব্বাস থেকে মু‘আল্লাক সূত্রে বর্ণনা এসেছে,
(ان رسول الله ﷺ احتجم وهو محرم فى راسه من شقيقة كانت به)
অর্থাৎ- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম অবস্থায় শিঙ্গা লাগিয়েছিলেন মাথায় ‘‘শাক্বীক্বাহ্’’-এর কারণে। শাক্বীক্বাহ্ অর্থ وجع يأخذ فى احد نبى الرأس او فى مقدمه অর্থাৎ- এমন ব্যথা যা মাথার এক পাশে অথবা মাথার সম্মুখভাগে। অপর একটি হাদীস যেটি ইবনু হায়নাহ্ বর্ণনা করেছেন তৃতীয় পরিচ্ছেদে হাদীসটি আসবে তাতে রয়েছে মাথার মধ্যভাগের কথা।
আর আনাস (রাঃ)-এর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণিত হাদীস যা তৃতীয় পরিচ্ছেদে রয়েছে সেখানে রয়েছে পায়ের উপরিভাগে ব্যথা পাওয়ার কারণে সেখানে তিনি শিঙ্গা লাগিয়েছিলেন এবং জাবির (রাঃ) কর্তৃক হাদীস যেটি ইমাম আহমাদ ও ইমাম নাসায়ী বর্ণনা করেছেন সেখানে রয়েছে, তিনি পিঠে শিঙ্গা লাগিয়েছেন। যাই হোক উপরোক্ত মতবিরোধের সমাধাকল্পে ‘উলামায়ে কিরাম বলেছেন, বস্ত্তত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শিঙ্গা লাগানো একবার ছিল না তা ছিল কয়েকবার।
এ হাদীস থেকে বুঝা যায় মুহরিমের জন্য শিঙ্গা লাগানো বৈধ আছে- এর সমর্থনে ইমাম বুখারী (রহঃ) তারজামাতুল বাব তথা অধ্যায় রচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, (باب الحجامة للمحرم) হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ)-এর অর্থ করেছেন باب الحجامة للمحرم অর্থ হলো (هل يجوز الحجامة للمحرم) অর্থাৎ- মুহরিমের জন্য শিঙ্গা লাগানো কি বৈধ আছে নাকি নেই? এ বর্ণনাগুলোর প্রত্যেকটিতে উদ্দেশ্য মাহজূম তথা শিঙ্গা যাকে লাগানো হয়েছে الحاجم তথা শিঙ্গা যিনি লাগিয়ে দিয়েছেন তিনি উদ্দেশ্য নন।
‘আল্লামা ইবনু কুদামাহ্ (রহঃ) তাঁর ‘আল মুগনী’ নামক কিতাবে (৩য় খণ্ড পৃষ্ঠা ৩০৫) বলেন, অতঃপর শিঙ্গা যদি লাগানোর ফলে একটি চুলও না কাটে তাহলে তা বৈধ হবে কোন প্রকার ফিদিয়া ব্যতীত আর এটাই জমহূর ‘উলামায়ে কিরামের ফাতাওয়া। ইমাম মালিক (রহঃ) বলেছেন, বিশেষ কারণ ব্যতীত শিঙ্গা লাগাবে না। তবে হাসান বাসরী (রহঃ) মনে করেন শিঙ্গা লাগালে জরিমানা দিতে হবে।
‘আল্লামা ‘আয়নী (রহঃ) বলেন, যে কোন অবস্থাতেই শিঙ্গা লাগানো বৈধতার ফাতাওয়া দিয়েছেন ‘আত্বা, মাসরূক, ইব্রাহীম নাখ্‘ঈ, ত্বাউস, সাওরী, আবূ হানীফা, শাফি‘ঈ, আহমাদ, ইসহাক। আর এক দল বলেছেন, বিশেষ কারণ ব্যতীত শিঙ্গা লাগানো নিষেধ, ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে কথার বর্ণনা পাওয়া যায়। আর এটাই ইমাম মালিক (রহঃ)-এর অভিমত।
ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেছেন, সকলের ঐকমত্যে মাথা বা শরীরের অন্য যে কোন অঙ্গে শিঙ্গা লাগানো বৈধ যদি কোন অসুবিধা থাকে। এ ক্ষেত্রে যদি চুলও কেটে যায় তাহলেও কোন অসুবিধা নেই। তবে চুল কাটানোর কারণে ফিদিয়া দেয়া আবশ্যক হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘‘অর্থাৎ- তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ থাকবে অথবা তার মাথায় যখন হবে সে ফিদিয়া দিবে।’’ (সূরা আল বাক্বারাহ্ ২ : ১৯৬)
আর অত্র হাদীস (যার ব্যাখ্যা আমরা করছি) সে হাদীসটির অর্থ এমন হবে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মাথার মধ্যভাগে শিঙ্গা লাগিয়েছেন তার অসুবিধার কারণে এবং তিনি কোন চুল কাটেননি। কিন্তু প্রয়োজন ছাড়াই যদি মুহরিম মাথার বা অন্য কোথাও শিঙ্গা লাগায় আর তাতে যদি তার চুল কেটে যায় তাহলে শিঙ্গা লাগানো হারাম হবে যেহেতু মুহরিম অবস্থায় চুল কাটা নিষেধ। আর যদি চুল না কাটে যেমন সে এমন জায়গায় শিঙ্গা লাগালো যেখানে কোন চুল নেই তাহলে অধিকাংশ ‘আলিমের মতে তাকে কোন ফিদিয়া দিতে হবে না। আর ইবনু ‘উমার (রাঃ) ও ইমাম মালিক (রহঃ)-এর নিকট এটা মাকরূহের অন্তর্ভুক্ত হবে। ইমাম হাসান বাসরী (রহঃ) বলেন, চুল না কাটলে, এখানে তাকে ফিদিয়া দিতে হবে। আমাদের (জমহূর) এক্ষেত্রে দলীল হল সে ফিদিয়া দিবে না এ কারণে যে, কোন হাদীস এমন নেই যে ইহরাম অবস্থায় রক্ত বের হলে ফিদিয়া দিতে হবে। তবে দাঊদ আয্ যাহিরীর মতানুসারীরা শুধু মাথার চুলকে নির্দিষ্ট করেছেন।
মোট কথা হচ্ছে এখানে জমহূরের মতই প্রাধান্য কারণ, এ সম্পর্কে যতগুলো রিওয়ায়াত এসেছে তার একটিতেও এ কথা বর্ণিত হয়নি যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিঙ্গা লাগানোর ফলে চুল কেটে গেলে ফিদিয়া দিয়েছেন।
আর যারা ফিদিয়া আবশ্যকের মতাবলম্বী তাদের দলীল মহান আল্লাহর বাণী, অর্থাৎ- ‘‘কুরবানীর পশু তার স্বীয় স্থানে পৌঁছার পূর্বে তোমরা মাথা হলক করিও না।’’ (সূরা আল বাক্বারাহ্ ২ : ১৯৬)
এ আয়াতের ব্যাপকতার মাধ্যমে অর্থাৎ- এখানে যেহেতু মাথা হলক করা নিষেধ আছে তাই শিঙ্গা লাগাতে গিয়ে একটি চুলও যদি কাটা যায় তাহলে ফিদিয়া দিতে হবে। তাদের এ ফাতাওয়া ঠিক নয়, কারণ আয়াতটি শুধু একটি চুল কাটলেই ফিদিয়া দিতে হবে এমন কথা বলছে না বরং সমস্ত মাথা হলক করলে ফিদিয়া দেয়ার কথা বলছে। সুতরাং কিংয়দংশ হলকের সাথে ফিদইয়ার কোন সম্পর্ক নেই। তবে মাথার কতটুকু হলক করলে ফিদিয়া দিতে হবে এ বিষয়টি নিয়ে ‘আলিমদের মাঝে বিরোধ আছে। তাই ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ) বলেছেন, তিনটি চুল বা ততোধিক চুল কাটলে ফিদিয়া আবশ্যক হবে।
ইমাম আহমাদ (রহঃ)-এর এক বর্ণনায়ও তাই আছে। তবে অন্য বর্ণনায় আছে চারটি চুলের কথা। ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ)-এর মত হলো যদি মাথার এক চতুর্থাংশ হলক করে তাহলে ফিদিয়া দিবে। ইমাম মালিক (রহঃ) বলেছেন, ফিদিয়া দিতে হবে যদি চাকচিক্যের উদ্দেশে বা اماطة الأذى তথা ময়লা দূর করার জন্য মাথা হলক করে থাকে এ ক্ষেত্রে চুলের সংখ্যা অনির্ধারিত। (আল্লাহ অধিক অবগত আছেন)
পরিচ্ছেদঃ ১১. প্রথম অনুচ্ছেদ - ইহরাম অবস্থায় যা থেকে বেঁচে থাকতে হবে
২৬৮৬-[৯] ’উসমান (রাঃ) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে ঐ ব্যক্তির ব্যাপারে বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি ইহরাম অবস্থায় চোখে ব্যথা অনুভব করে সে মুসাববার দিয়ে পট্টি বাঁধবে। (মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَجْتَنِبُهُ الْمُحْرِمُ
وَعَن عُثْمَان حَدَّثَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الرَّجُلِ إِذَا اشْتَكَى عَيْنَيْهِ وَهُوَ محرمٌ ضمدهما بِالصبرِ. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: (فِى الرَّجُلِ) এখানে পুরুষের সাথে মহিলাও অন্তর্ভুক্ত হবে।
(ضَمَّدَهُمَا) এ শব্দটি বাবে তাফ্‘ঈল থেকে নির্গত এবং তা ماضى তথা অতীতকালীন অর্থবোধক শব্দ। ‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী হানাফী (রহঃ) বলেন, মিশকাতের মূল পাণ্ডুলিপিতে ضمد তথা ‘আমর অর্থাৎ- নির্দেশসূচক শব্দের ব্যবহার আছে এবং নির্দেশসূচক শব্দটি আবশ্যকের অর্থ না দিয়ে বৈধতার অর্থ বুঝাবে।
আমি বলব, [‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী (রহঃ)] শব্দটি باب نصر অথবা ضرب থেকে ماضى তথা অতীতকালীন ক্রিয়া হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। বলা হয়ে থাকে, ضمد الجرح يضمد অর্থাৎ- ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেস লাগিয়েছে। এ হচ্ছে ضمد শব্দের আসল ব্যাখ্যা, অতঃপর সেটা ঔষধ তরল পদার্থের সাথে মিশানো তারপর ক্ষতস্থানে লাগানো ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়।
(بِالصَّبْرِ) শব্দটি صبر অথবা صبر সাকিন দেয়া চলে এ দু’ভাবেই পড়া যায়। আল কামূস গ্রন্থকার বলেন, কবিতার পংতির মিল করার মতো জরুরী কারণ ব্যতীত باء এ সাকিন পড়া বৈধ নয়। এ শব্দটির অর্থ হচ্ছে عصاره شجر مر তথা তিক্ত গাছের রস।
বাহরুল জাওয়াহির গ্রন্থকার (রহঃ) বলেন, যেমন সু’সিন নামক এক প্রকার গাছ যা লাল ও হলুদের মাঝামাঝি রংয়ের।
উর্দূ ভাষায় একে ঈলূআ বলা হয়। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, ‘সাবির’ নামক এ দ্রব্যটিকে পানির সাথে মিশিয়ে চোখে ড্রপ হিসেবে ব্যবহার করা অথবা এ দুয়ের মাধ্যমে সুরমা বানিয়ে তা চোখে লাগানো।
এ হাদীস থেকে বুঝা যায়, চোখে সাবির বা এ জাতীয় জিনিসের মাধ্যমে ড্রপ ব্যবহার করা জায়িয আছে। ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেন, ‘উলামায়ে কিরামের ঐকমত্যে সুগন্ধি ব্যতীত চোখে সাবির বা এ জাতীয় জিনিস ব্যবহার করা যায় এতো কোন ফিদিয়া দিতে হবে না, তবে সুগন্ধি যদি প্রয়োজন মনে করে তাহলে তা করতে পারে, এর জন্য ফিদিয়া আবশ্যক হবে।
আর এ বিষয়েও ঐকমত্য আছে যে, মুহরিমের জন্য সুরমা যা সুগন্ধিবিহীন তা ব্যবহার করা জায়িয এক্ষেত্রে কোন ফিদিয়া দেয়া লাগবে না তবে যদি সৌন্দর্যের জন্য দেয় তাহলে ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ) এটাকে মাকরূহ বলেছেন। অপর একদল ‘আলিম যাদের অন্যতম হলেন, ইমাম আহমাদ ও ইসহাক (রহঃ) এটাকে সম্পূর্ণভাবে নিষেধ করেছেন। ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ)-এর মতো এক্ষেত্রে শাফি‘ঈ (রহঃ)-এর মত।
পরিচ্ছেদঃ ১১. প্রথম অনুচ্ছেদ - ইহরাম অবস্থায় যা থেকে বেঁচে থাকতে হবে
২৬৮৭-[১০] মহিলা সাহাবী উম্মুল হুসায়ন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উসামাহ্ ও বিলাল (রাঃ)-কে দেখেছি তাদের একজন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উটনীর লাগাম ধরে রেখেছে আর অপরজন কাপড় উপরে উঠিয়ে রোদ্র হতে তাঁকে ছায়া দিচ্ছে জামারাতুল ’আক্বাবায় পাথর মারা পর্যন্ত। (মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَجْتَنِبُهُ الْمُحْرِمُ
وَعَنْ أُمِّ الْحُصَيْنِ قَالَتْ: رَأَيْتُ أُسَامَةَ وَبِلَالًا وَأَحَدُهُمَا آخِذٌ بِخِطَامِ نَاقَةِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالْآخَرُ رَافِعٌ ثَوْبَهُ يَسْتُرُهُ من الْحَرِّ حَتَّى رَمَى جَمْرَةَ الْعَقَبَةِ. رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যা: (عَنْ أُمِّ الْحُصَيْنِ) উম্মুল হুসায়ন (রাঃ) হলেন ইসহাক-এর কন্যা, মহিলা সাহাবী কিন্তু তাঁর নাম জানা যায়নি।
(رَأَيْتُ أُسَامَةَ) উসামাহ্ হলেন যায়দ ইবনু হারিসাহ্-এর সন্তান এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুক্ত দাস। (وَبِلَالًا) বিলাল হলেন রিবাহ্-এর সন্তান এবং আবূ বাকর সিদ্দীক্ব (রাঃ)-এর দাস। (وَأَحَدُهُمَا) মুল্লা ‘আলী কারী বলেনঃ প্রকাশ থাকে যে, তিনি হলেন বিলাল। (وَالْاٰخَرُ) অন্যজন হলেন উসামাহ্। (يَسْتُرُه) অর্থাৎ- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাথা থেকে উপরে কাপড় ঝুলিয়ে দেয়ার মাধ্যমে ছায়া দিচ্ছিলেন।
(مِنَ الْحَرِّ) অন্য বর্ণনায় এসেছেন, (رافع ثوبه على رأس رسول الله ﷺ من الشمس) অর্থাৎ- তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সূর্যের কিরণ থেকে রক্ষা করার জন্য তার কাপড় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাথার উপর উঁচু করে ধরেছেন।
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ) আবূ উমামাহ্ থেকে বর্ণনা করেন, আবূ উমাম তার কাছ থেকে বর্ণনা করেন যিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখছেন যে, (راح إلى منى يوم التروية والى جانبه بلال، بيده عود........الخ)
নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তারবিয়ার দিন মিনায় প্রস্থান করেন তার পাশে বিলাল ছিলেন তার হাতে একটি কাঠের লাঠি ছিল লাঠির উপর একট টুকরা কাপড় ছিল-এর মাধ্যমে তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ছায়া দিচ্ছিলেন।
সুতরাং এ হাদীস থেকে বুঝা গেল, মুহরিমকে কাপড় বা এ জাতীয় জিনিসের মাধ্যমে ছায়া প্রদান করা বৈধ চাই সে সওয়ারী হোক বা হেঁটে যাক- এটাই ইমাম আবূ হানীফা, শাফি‘ঈসহ অধিকাংশ ‘উলামায়ে কিরামের মতামতের মতের স্বপক্ষে, উপরোক্ত উম্মুল হুসায়ন ও আবূ উমামার বর্ণিত হাদীসকে তারা দলীল হিসেবে পেশ করেছেন। তবে ইমাম মালিক ও ইমাম আহমাদ (রহঃ) বলেছেন, শুধুমাত্র নিচ দিয়ে হেঁটে গেলে ছায়া প্রদান বৈধ আছে। সুতরাং সওয়ারী অবস্থায় ছায়া দিলে ফিদিয়া দিতে হবে। তবে ইমাম আহমাদের অন্য বর্ণনায় রয়েছে, কোন ফিদিয়া দিতে হবে না। তবে যদি কোন তাঁবুর নিচে বসে অথবা ছাদের নিচে বসে ছায়া গ্রহণ করে তাহলে তা জায়িয হবে- এ ব্যাপারে সকলের ঐকমত্য রয়েছে।
ছায়া গ্রহণ নিষেধ প্রসঙ্গে ইমাম আহমাদ ও মালিক (রহঃ)-এর দলীল বায়হাক্বীতে ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে সহীহ সূত্রে বর্ণিত হাদীস, ‘‘নিশ্চয়ই ইবনু ‘উমার (রাঃ) একজন লোককে দেখলেন ইহরাম অবস্থায় সওয়ারীর পিঠে উঠে কোন কিছুর মাধ্যমে ছায়া গ্রহণ করছে ফলে তিনি তাকে নিষেধ করলেন এবং বললেন, (اضح لمن احرمت له) অর্থাৎ- ‘যার জন্য হারাম করা হয়েছিল তা বৈধ করলে’।’’
‘আল্লামা শানক্বীতী (রহঃ) বলেনঃ সামিয়ানা, তাঁবু গাছ, কাপড় ইত্যাদির মাধ্যমে ছায়া গ্রহণ বৈধ, এতে সবার ঐকমত্য রয়েছে ইমাম মালিক (রহঃ) থেকে গাছের উপর কাপড় লটকিয়ে ছায়া গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। ‘আবদুল মালিক বিন মাজিশূন (রহঃ) সেটাকে গাছের উপর ক্বিয়াস করে বৈধ বলেছেন এবং এটাই বেশি গ্রহণযোগ্য।
এ বিষয়ে সঠিক কথা হলো যে কোন অবস্থাতেই مطلقا তথা সাধারণভাবেই ছায়া গ্রহণ বৈধ উপরোক্ত হাদীসের মাধ্যমে এটা প্রমাণিত আর যেহেতু এ বিষয়ে সুন্নাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট। সুতরাং তা আকড়ে ধরাই উৎকৃষ্ট সমাধান। সেটা বাদ দিয়ে কোন মুজতাহিদের কথার দিকে যাওয়া জায়িয হবে না। তিনি যত বড়ই জ্ঞানী হোন না কেন?
অন্য রিওয়ায়াতে রয়েছে যে, (رافع ثوبه على رأس رسول الله - ﷺ - من الشمس) অর্থাৎ- ‘‘সূর্যের তাপ থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে রক্ষা করার জন্য তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) স্বীয় কাপড় তাঁর মাথার উপর উঁচু করে ধরে ছিলেন।’’
ইমাম আহমাদ (রহঃ) আবূ উমামাহ্ (রহঃ) থেকে বর্ণিত,
رأى النبي - ﷺ- (راح إلى منى يوم التروية وإلى جانبه بلال، بيده عود عليه ثوب يظلل به رسول الله - ﷺ-)
নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তারবিয়ার দিন মিনার দিকে রওয়ানা হলেন। তাঁর পাশে ছিলেন বিলাল (রাঃ), তার হাতে একটি লাকড়ি ছিল যাতে একটি কাপড় ছিল, তা দিয়ে তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ছায়া দিচ্ছিলেন।
এ হাদীস প্রমাণ করে যে, মুহরিম ব্যক্তির মাথার উপরে কাপড় বা অন্য কোন জিনিসের মাধ্যমে ছায়ার ব্যবস্থা করা বৈধ আছে। এই মত পোষণ করেছেন ইমাম আবূ হানীফা ও ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ), আর অধিকাংশ ‘আলিমগণও এই দুই হাদীসের মাধ্যমে দলীল গ্রহণ করেছেন (অর্থাৎ- উম্মুল হুসায়ন ও আবূ উমামাহ্ (রাঃ)-এর বর্ণিত)। আর আমি (মুবারকপূরী) মালিক ও আহমাদ (রহঃ)-এর মত হল, শুধুমাত্র অবতরণের সময় ছাড়া অন্য কোন সময় মুহরিমের জন্য ছায়ার ব্যবস্থা করা বৈধ নয়। ইমাম আহমাদ (রহঃ) হতে অন্য রিওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, যদি ছায়ার ব্যবস্থা করে তার জন্য কোন মুক্তিপণ দিতে হবে না। তবে যদি ছাদের নিচে অথবা তাঁবুর নিচে হয় তাহলে বৈধ রয়েছে।
ইমাম মালিক ও আহমাদ (রহঃ) দলীল গ্রহণ করেছেন, ছায়া নিষেধ হওয়ার ব্যাপারে ইমাম বায়হাক্বীর সহীহ সনদে বর্ণিত হাদীস দ্বারা, যা বর্ণনা করেছেন ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে।
ইমাম শাওকানী (রহঃ) বলেনঃ ইবনু ‘উমার (রাঃ)-এর কথার দ্বারা যে জওয়াব দেয়া হয়েছে তাতে কোন নিষেধের প্রমাণ নেই। আর জাবির-এর হাদীসটি যা বর্ণনা করেছেন ইমাম বায়হাক্বী, তা য‘ঈফ হওয়া সত্ত্বেও এ প্রমাণ বহন করে না যে, ছায়ার ব্যবস্থা করা নিষেধ। আর তাতে যা রয়েছে তা হল উত্তম।
ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেনঃ জাবির-এর হাদীসটি য‘ঈফ হওয়া সত্ত্বেও এতে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। অনুরূপভাবে ‘উমারের কাজ ও কথার মাঝে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। যদি থাকত তাহলে উম্মুল হুসায়ন বর্ণিত হাদীসটিই তার ওপর প্রাধান্য পেত।
‘আল্লামা শানক্বীত্বী (রহঃ) বলেনঃ মালিকীদের নিকটে মুহরিম ব্যক্তির মাথার উপর ছায়ার ব্যবস্থা করা বৈধ নয়, যদি করে তাহলে ফিদিয়া দিতে হবে। আর এ ব্যাপারে যারা বলেছেন ফিদিয়া দেয়া আবশ্যক নয়, তাদের নিকটে এটাই সঠিক। আর উম্মুল হুসায়ন (রাঃ) বর্ণিত হাদীস যাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাথার উপর কাপড় দিয়ে ছায়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, এমতাবস্থায় তিনি পাথর নিক্ষেপ করছিলেন। অনুসরণের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতই অধিক উত্তম। মালিকীদের নিকটে বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য মুহরিম ব্যক্তি মাথার উপর কাপড় ঝুলাতে পারে।
পরিচ্ছেদঃ ১১. প্রথম অনুচ্ছেদ - ইহরাম অবস্থায় যা থেকে বেঁচে থাকতে হবে
২৬৮৮-[১১] কা’ব ইবনু ’উজরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় পৌঁছার আগে হুদায়বিয়ায় তাঁর (কা’ব-এর) নিকট দিয়ে গেলেন। তখন তিনি (কা’ব) ইহরাম অবস্থায় একটি হাঁড়ির তলায় আগুন ধরাচ্ছে, আর তার মুখমণ্ডল বেয়ে উকুন ঝরছিল। এটা দেখে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমার (গায়ের) পোকা কি তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে? তিনি (কা’ব) বললেন, জি, হ্যাঁ। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তাহলে তুমি তোমার মাথা মুণ্ডন করে ফেলো এবং ছয়জন মিসকীনকে এক ’ফারাক্ব’ খাবার খাওয়াও কিংবা তিনদিন সিয়াম পালন কর অথবা একটি পশু কুরবানী কর। বর্ণনাকারী বলেন, এক ’ফারাক্ব’ তিন সা’-এর সমতুল্য। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَجْتَنِبُهُ الْمُحْرِمُ
وَعَنْ كَعْبِ بْنِ عُجْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرَّ بِهِ وَهُوَ بِالْحُدَيْبِيَةَ قَبْلَ أَنْ يَدْخُلَ مَكَّةَ وَهُوَ مُحْرِمٌ وَهُوَ يُوقِدُ تَحْتَ قِدْرٍ وَالْقَمْلُ تهافت عَلَى وَجْهِهِ فَقَالَ: «أَتُؤْذِيكَ هَوَامُّكَ؟» . قَالَ: نَعَمْ. قَالَ: «فَاحْلِقْ رَأْسَكَ وَأَطْعِمْ فَرَقًا بَيْنَ سِتَّةِ مَسَاكِينَ» . وَالْفَرَقُ: ثَلَاثَةُ آصُعٍ: «أَوْ صُمْ ثَلَاثَةَ أَيَّام أوانسك نسيكة»
ব্যাখ্যা: ইবনু ‘আবদুল বার আহমাদ বিন সালিহ আল মিসরী থেকে বর্ণনা করে বলেছেন, ফিদ্ইয়ার ক্ষেত্রে কা‘ব বিন ‘উজরার হাদীসটিই সুন্নাত এটাই ‘আমলযোগ্য। সাহাবীদের মধ্যে কেবল তিনিই এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন আর তার থেকে কেবল ইবনু আবী লায়লা ও ইবনু মা‘ক্বিল- এ দু’জন বর্ণনা করেছেন। তিনি আরো বলেন, এটা সুন্নাত আহলে কূফা থেকে আহলে মাদিনী এ ‘আমল গ্রহণ করেছেন।
ইমাম যুহরী (রহঃ) বলেন, এ বিষয়টি সম্পর্কে আমি আমাদের ‘উলামায়ে কিরামদের জিজ্ঞেস করেছিলাম এমনকি সা‘ঈদ বিন মুসাইয়্যিবকেও কিন্তু ক’জন মিসকীনকে খাওয়াতে হবে ফিদ্ইয়ার জন্য তা কেউ বর্ণনা করেননি। হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, ইবনু সালিহ যা বলেছেন তাতে সমস্যা আছে। কেননা এ রিওয়ায়াতটি কা‘ব বিন ‘উজরা ছাড়াও সাহাবীদের একটি দল বর্ণনা করেছেন। অতঃপর তিনি তাদের উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, উল্লেখিত ব্যক্তিরা ছাড়াও কা‘ব থেকে এ রিওয়ায়াতটি আবূ ওয়ায়িল বর্ণনা করেছেন। যেটি ইমাম নাসায়ীর বর্ণনায় আছে আর ইমাম ইবনু মাজাহ মুহাম্মাদ বিন কা‘ব আল কুরাযীর সূত্রে, ইমাম আহমাদ ইয়াহ্ইয়া বিন জা‘দাহ্-এর সূত্রে।
মুল্লা ‘আলী কারী হানাফী (রহঃ) বলেছেনঃ (ان النبى ﷺ مر به) এখানে বর্ণনাটি অর্থগত হয়েছে। আমি (‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী) বলব, অন্য বর্ণনায় আছে, (وقف عل رسول الله ﷺ بالحديبية) অর্থাৎ- তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসেছিলেন হুদায়বিয়ার সময়।
অপর বর্ণনায় আছে, (اتى على رسول الله ﷺ زمن الحديبية) অর্থাৎ- কা‘ব বিন ‘উজরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসলেন হুদায়বিয়ার সময়।
কোন রিওয়ায়াতে আছে, (أتيت رسول الله ﷺ فقال : ادنه فدنوت، فقال : ادنه، فدنوت) অর্থাৎ- আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসলাম তিনি আমাকে বললেন, তুমি নিকটে আসো, সুতরাং আমি নিকটে আসলাম তিনি আমাকে আবার বললেন, আরো নিকটে আসো, ফলে আমি আরো নিকটে আসলাম।
কোন রিওয়ায়াতে আছে, (حملت الى رسول الله صلى الله عليه وسلم والقمل يتاثر على وجهى)
অর্থাৎ- আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসলাম আর এমতাবস্থায় আমার চেহারায় উকুন হাঁটছিল তখন তিনি বললেন, তোমার অনেক কষ্ট হচ্ছে। অন্য রিওয়ায়াতে আছে, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে মুহরিম অবস্থায় সাক্ষাৎ করলেন, আর এমতাবস্থায় উকুন তার মাথা ও দাড়ি দিয়ে হাঁটছিল- এটা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে পারলেন এবং নাপিত ডেকে তার মাথা হলক করে দিলেন।
(فَاحْلِقْ رَأْسَكَ) এখানে নির্দেশটি (إباحة) তথা বৈধতার অর্থ দিবে এমনই বলেছেন মুল্লা ‘আলী কারী হানাফী (রহঃ) অন্য বর্ণনায় আছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আদেশ করলেন মাথা মুণ্ডন করতে।
‘আল্লামা বাজী (রহঃ)-এর নির্দেশ ওয়াজিব ও মানদূবের দাবী করলেও, এখানে সম্ভবত নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মাথা হলকের কাজটিকে মানদূবই বলেছেন। আর মানদূব হওয়াই শ্রেয় মনে করেছেন। কেননা আমরা অপর বর্ণনায় পাই যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মানুষকে নিষেধ করেছেন নিজের ওপর অতিরিক্ত বোঝা নিতে, যা সে বহন করতে পারবে না। এজন্য আমরা দেখতে পাই হাওলাহ্ বিনতু তুয়াইত-এর জন্য রাতে না ঘুমিয়ে ‘ইবাদাত করতে নিষেধ করেছেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (اكلفوا من العمل ما تطيقون) অর্থাৎ- তোমাদের সাধ্যমতে তোমরা ‘আমল করি।
এখানে (فرقا) ‘‘ফারাক্ব’’ অর্থ হলো مكيال معروف بالمدينة মদীনায় পরিচিত এক প্রকার ওযন যা ১৬ রিতল সমপরিমাণ। হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, যখন এটা জানতে পারা গেছে যে, এক ‘‘ফারাক্ব’’ সমপরিমাণ তিন সা', তাহলে বুঝা গেল যে, এক সা' সমান ৫ রিতল ও এক-তৃতীয়াংশ। তবে তার বিপরীত কেউ বলেছেন, এক সা' সমপরিমাণ ৮ রিতল।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেন, সুতরাং প্রতিটি মিসকীন পাবে অর্ধ সা'- এক্ষেত্রে তাদেরকে প্রদত্ত পরিমাণসম হওয়া জরুরী।
‘আল্লামা বদরুদ্দীন ‘আয়নী (রহঃ) বলেছেন, ৬ জন মিসকীনদের যে খাদ্য দিতে বলা হয়েছে তার কম দিলে বৈধ হবে না- এটাই অধিকাংশ ‘আলিমের কথা, তবে ইমাম হানীফা (রহঃ) থেকে বর্ণনা করা হয়েছে যে, এসব খাদ্য একজন মিসকীনকে দিলেও তা যথেষ্ট হবে।
(أَوْ صُمْ ثَلَاثَةَ أَيَّامِ)-এর ব্যাখ্যাঃ এ কথাটি কুরআনে কারীমের (ففدية من صيام) এর ব্যাখ্যা স্বরূপ।
ইবনুত্ তীন সহ অন্যান্যরা বলেছেন, এখানে শারী‘আত প্রণেতা একটি সওমকে এক সা'-এর স্থলাভিষিক্ত করেছেন, অপরদিকে রমাযান মাসের একটি সওমকে এক মুদ সমপরিমাণ করা হয়েছে। অনুরূপভাবে যিহার তথা স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে ‘‘মা’’-এর পিঠের সাথে সাদৃশ্য দেয়া এবং রমাযান মাসে দিনে স্ত্রী সহবাসের ক্ষেত্রে এবং শপথ ভঙ্গের কাফফারার ক্ষেত্রে যে সওম রাখতে হয় তাকে তিন মুদ-এর এবং এক-তৃতীয়াংশের সমতুল্য বলা হয়েছে। সুতরাং এখান থেকে বুঝা গেল, শারী‘আত কর্তৃক নির্ধারিত কোন বিষয়ে ক্বিয়াসের কোন দখল নেই যেখানে যা নির্ধারিত সেখানে তাই মানতে হবে। হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) তাঁর ‘ফাতহুল বারী’-তে এমনটাই বলেছেন।
এ হাদীস থেকে আরো বুঝা গেল যে, মাথার চুল হলক করার জন্য যে ফিদিয়া আবশ্যক হয়েছে তা যদি কেউ সওমের মাধ্যমে আদায় করেন তাহলে তাকে তিনটি সওম রাখতে হবে। অবশ্য ইতিপূর্বে হাসান বাসরী (রহঃ) থেকে বর্ণনা গেছে সেখানে রয়েছে, দশদিন সওম পালনের কথা।
‘আল্লামা ইবনু কাসীর (রহঃ) এ প্রসঙ্গে বলেছেন, হাসান (রহঃ)-এর হাদীসটি একটি বিরল কথা এতে সমস্যা রয়েছে কেননা কা‘ব বিন ‘উজরাহ্ (রাঃ)-এর হাদীস থেকে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে, তিনদিন সওম পালনের কথা দশদিন নয়।
ইবনু ‘আবদুল বার (রহঃ) বলেছেন, তার ‘‘আল ইসতিযকার’’ নামক কিতাবে হাসান বাসরী (রহঃ) ‘ইকরামাহ্ এবং নাফি' থেকে দশদিন সাওম পালনের যে কথা এসেছে তা কেউ সমর্থন করেননি।
এ ক্ষেত্রে আরেক মাসআলাহ্ হলো, এ সওম রাখার বিষয়ে অর্থাৎ- তা মক্কাতে অবস্থানকালেই রাখতে হবে না বাড়িতে এসে রাখতে হবে- এ ব্যাপারে চার ইমামসহ অন্যান্যদের ঐকমত্যে যেখানে খুশি সেখানেই রাখা যাবে, তবে খাদ্য খাওয়ানোর বিষয়ে মতপার্থক্য আছে। ইমাম শাফি‘ঈ ও ইমাম আহমাদ বলেছেন, হারামের অবস্থানের সময়েই খাওয়াতে হবে। তবে ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) ও ইমাম মালিক (রহঃ) বলেছেন, যেখানে খুশি সেখানেই খাওয়াতে পারবে।
পরিচ্ছেদঃ ১১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ইহরাম অবস্থায় যা থেকে বেঁচে থাকতে হবে
২৬৮৯-[১২] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদেরকে তাদের ইহরামে হাত মোজা ও বোরকা এবং ওয়ারস্ (জা’ফরানে রঞ্জিত কাপড়) পরতে নিষেধ করতে শুনেছেন। তারপর (ইহরামের পর) তারা যে কোন কাপড় পছন্দ করে পরতে পারবে- তা কুসুমী বা রেশমী হোক অথবা যে কোন ধরনের অলংকার অথবা পাজামা বা পিরান বা মোজা পরতে পারে। (আবূ দাঊদ)[1]
عَنِ ابْنِ عُمَرَ: أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَنْهَى النِّسَاءَ فِي إِحْرَامِهِنَّ عَنِ الْقُفَّازَيْنِ وَالنِّقَابِ وَمَا مَسَّ الْوَرْسُ وَالزَّعْفَرَانُ مِنَ الثِّيَابِ وَلْتَلْبَسْ بَعْدَ ذَلِكَ مَا أحبَّتْ من ألوانِ الثيابِ معصفر أوخز أَو حلي أَو سروايل أَو قميصٍ أَو خُفٍّ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (النِّقَابِ) ‘‘নিক্বাব’’ এখান থেকে বুঝা যায় মুহরিমার জন্য জায়িয নেই মোজা ও বোরকা পরা, আর এটাই সহীহ এবং সঠিক।
(مُعَصْفَرٍ) আমি [‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী (রহঃ)] বলব, (مُعَصْفَرٍ) শব্দটি মিশকাত ও মাসাবীহের সব পাণ্ডুলিপিতে এ শব্দই রয়েছে। আবূ দাঊদে রয়েছে (مُعَصْفَرٍ) এমনটাই বলেছেন আল মুনতাকা কিতাবের লেখক এবং শারহুল মুহাযযাব-এর লেখকের ‘আল্লামা ইমাম নাবাবী, হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) তাঁর ‘তালখীস’-এ, ইমাম বায়হাক্বী তাঁর ‘সুনান’-এ, ইমাম যায়লা‘ঈ তাঁর ‘নাসবুর রায়াহ্’-এ। ইমাম হাকিম তাঁর ‘মুসতাদরাক’ কিতাবে বলেছেন, (من معصفر) অর্থাৎ- من অতিরিক্ত করে। ইবনু ‘আবদুল বার-এর ‘‘জামি‘উল উসূল’’-এও এমনটিই আছে।
এ হাদীস থেকে বুঝা যায়, মুহরিমার জন্য ‘উসফুর (হলুদ) রঙের কাপড় পরিধান জায়িয আছে- এমনটাই মতামত ব্যক্ত করেছেন ইমাম শাফি‘ঈ ও ইমাম আহমাদ। ইমাম মালিক (রহঃ) এটাকে মাকরূহ বলেছেন এবং ইমাম সাওরী ও ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) এটা নিষেধ করেছেন। খারক্বী (রহঃ) বলেন, উসফুর রং মিশ্রিত কাপড় পরতে কোন অসুবিধা নেই।
‘আল্লামা ইবনু কুদামাহ্ বলেছেনঃ উসফুর যেহেতু কোন সুগন্ধি না তাই সেটা ব্যবহারে এবং তার ঘ্রাণ নিতে কোন অসুবিধা নেই- এটাই জাবির ইবনু ‘উমার, ‘আবদুল্লাহ বিন জা‘ফার, ‘আক্বীল বিন আবী ত্বলিব বলেছেন; এটা ইমাম শাফি‘ঈ-এরও মত। ‘আল্লামা শানক্বীতী (রহঃ) বলেছেন, সঠিক কথা হলো উসফুর কোন সুগন্ধি নয়, ঠিক তবে তা পরিধান করা জায়িয নেই।
পরিচ্ছেদঃ ১১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ইহরাম অবস্থায় যা থেকে বেঁচে থাকতে হবে
২৬৯০-[১৩] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ইহরাম অবস্থায় ছিলাম, তখন আরোহী দল আমাদের কাছ দিয়ে অতিক্রম করতো। তারা আমাদের কাছাকাছি আসলে আমাদের সকলেই নিজ নিজ মাথার চাদর চেহারার উপর ঢেকে দিতাম। আর তারা চলে যেত আমরা তখন তা (খুলতাম) সরিয়ে নিতাম। (আবূ দাঊদ, আর ইবনু মাজাহ এর মর্মার্থ)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: كَانَ الرُّكْبَانُ يَمُرُّونَ بِنَا وَنَحْنُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُحْرِمَاتٌ فَإِذَا جَاوَزُوا بِنَا سَدَلَتْ إِحْدَانَا جِلْبَابَهَا مِنْ رَأْسِهَا عَلَى وجهِها فإِذا جاوزونا كشفناهُ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَلابْن مَاجَه مَعْنَاهُ
ব্যাখ্যা: এ হাদীসটি থেকে বুঝা যায়, প্রয়োজন সাপেক্ষে মুহরিমাহ্ মহিলা তার চেহারার উপর পর্দা দিতে পারে যেমনটি ‘আমল করেছেন উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) ও তার সাথের অন্যান্য মহিলা সাহাবী (রাঃ), অথচ তারা ছিলেন মুহরিমাহ্ ঠিক এ মুহূর্তে তারা পুরুষদের পাশ অতিক্রমকালে মুখে পর্দা ফেলেছিলেন যদিও মুহরিমাহ্ অবস্থায় মুখে পর্দা ফেলানো বা মুখ ঢেকে রাখা ঠিক নয়।
‘আল্লামা খাত্ত্বাবী (রহঃ) বলেন, মুহরিমাহ্ মুখে নিক্বাব দিবে না- এ মর্মে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা রয়েছে কিন্তু মাথা থেকে কাপড় একটু ঝুলিয়ে দেবার ব্যাপারে একাধিক ফকীহ মতামত দিয়েছেন। তবে নিষেধ করেছেন ওড়না, কাপড়- এগুলো মুখে শক্ত করে বাঁধতে এবং বোরকা পরতে। প্রথম কথার কথক হলেন ‘আত্বা, মালিক, সুফিয়ান, সাওরী, আহমাদ বিন হাম্বল, ইসহাক, মুহাম্মাদ ইবনু হাসান, ইমাম শাফি‘ঈ এটাকে সহীহ বলেছেন এবং এ কথাই বলেছেন ‘আল্লামা শাওকানী (রহঃ) এবং ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ)-এর ছাত্রবৃন্দ।
‘আল্লামা ইবনু কুদামাহ্ (রহঃ) তাঁর মুগনী কিতাবে (৩য় খণ্ড ৩২৬ পৃষ্ঠায়) বলেন, পুরুষদের নিকট দিয়ে অতিক্রমকালে মুহরিমাহ্ যদি প্রয়োজনবোধ করেন তার মুখ ঢেকে রাখতে, তাহলে মাথার উপরের কাপড়টি তার মুখে ঝুলিয়ে দিতে পারেন।
পরিচ্ছেদঃ ১১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ইহরাম অবস্থায় যা থেকে বেঁচে থাকতে হবে
২৬৯১-[১৪] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম অবস্থায় সুগন্ধিহীন তেল ব্যবহার করতেন। (তিরমিযী)[1]
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَدَّهِنُ بالزيت وَهُوَ محرمٌ غيرَ المقنّتِ يَعني غيرَ المطيَّبِ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: এ হাদীস থেকে বুঝা যায়, তেল যদি সুগন্ধি মিশ্রিত না থাকে তাহলে তা দ্বারা তেল মালিশ করা জায়িয। কিন্তু অত্র হাদীসটি একটি য‘ঈফ হাদীস। আরো বুঝা গেল যদি তেলে সুগন্ধি মিশ্রিত থাকে তাহলে মালিশ বৈধ হবে না মুহরিমের জন্য। ‘আল্লামা ইবনুল মুনযীর (রহঃ) বলেন, মুহরিমের জন্য যায়তুন, চর্বি, ঘি এবং তিলের তৈল খাওয়া এবং তা মাথা ও দাড়ি ব্যতীত মাখানো জায়িয। তিনি আরো বলেছেন, ‘উলামায়ে কিরামের ঐকমত্যে মুহরিমের শরীরে সুগন্ধি ব্যবহার নিষেধ তবে যায়তুন মাখতে পারে।
আমি [‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী (রহঃ)] বলব, তেল সারা শরীরে মাথা ও দাড়ি ব্যতীত ব্যবহার জায়িয- এটা সকলের ঐকমত্যের কথা যারা বলেছেন তাদের কথার ভিতর ইজমা নিয়ে একটু সংশয় রয়েছে।
কেননা হানাফী ও মালিকী বিদ্বানদের কথা থেকে বুঝা যায় যে, তারা তেল মালিশ করার বিপক্ষে। যেমন প্রসিদ্ধ ফিকহের কিতাব হিদায়াতে রয়েছে, ‘‘মুহরিম কোন প্রকার সুগন্ধি ব্যবহার করবে না। যেহেতু নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, الحاج الشعث التفل হাজী নিজেকে আল্লাহমুখী করতে গিয়ে এলোমেলো করে রাখবে।
‘আল্লামা ইবনুল হুমাম (রহঃ) বলেন, والشعث انتشار الشعر وتغييره لعد تعهده অর্থাৎ- شعث অর্থ হলো চুল বিক্ষিপ্ত ও পরিবর্তন করে রাখা নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার মাধ্যমে। সুতরাং এ হাদীসই প্রমাণ করে মুহরিম তেল মাখবে না, কারণ তেল মাখালে তো আর চুল এলোমেলো থাকে না।
‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী হানাফী (রহঃ) তাঁর ‘‘শারহুল মানাসিক’’ নামক কিতাবে বলেন, ‘‘যদি মুহরিম সুগন্ধি মিশ্রিত ছাড়া তেল যেমনঃ খাঁটি তেল অথবা তেলের অধিকাংশটা যায়তুন ব্যবহার করে তাহলে ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) বলেছেন, তার ফিদিয়া দেয়া লাগবে। আর ইমাম আবূ ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহঃ) বলেছেন, সাদাকা দিতে হবে। তবে আবূ হানীফা (রহঃ) থেকে সাদাকা দেয়ার মতও পাওয়া যায়। অপরদিকে যদি পুরোটাই যায়তুন হয়, তাহলে সকলের ঐকমত্যে সাদাকা দিতে হবে। যদি সে সুগন্ধি তেল মাখে তাহলে এ ফাতাওয়া, তবে যদি ঔষধ হিসেবে তেল মাখে অথবা খায় তাহলে সকলের ঐকমত্যে তাকে কোন কিছুই দেয়া লাগবে না। যদি ঘি, চর্বি, তেল হিসেবে ব্যবহার করে অথবা তা যদি ভক্ষণ করে তাহলে কোন অসুবিধা নেই। এ ক্ষেত্রে চুল আর শরীরের মধ্যে কোন পার্থক্য হবে না।
আল বাযায়ী কিতাবে আছে, যদি মুহরিম এমন কোন প্রকার তেল মাখে যা সুগন্ধিযুক্ত এবং তা যদি শরীরের পুরো অঙ্গে হয় তাহলে তার ওপর ফিদিয়া দেয়া আবশ্যক। আর যদি সুগন্ধি মিশ্রিত না হয় তাহলে ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) বলেন, তারও ফিদিয়া দেয়া লাগবে। আর ইমাম আবূ ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহঃ) বলেছেন, সাদাকা দিতে হবে। আমাদের সাথীরা বলেছেন, ‘‘শরীরে যেসব জিনিস ব্যবহার করা হয় তা মোটামুটি তিন প্রকার।
এক প্রকার হল যা শুধুই সুগন্ধি, যেমনঃ মিসকে আম্বার কোন মুহরিম যদি এ প্রকারের সুগন্ধি ব্যবহার করেন যেভাবেই করুন না কেন তার কাফফারাহ্ আবশ্যক হবে। এমনকি যদি এর মাধ্যমে তার চোখের ঔষধ লাগিয়ে থাকেন তাহলেও একই হুকুম।
দ্বিতীয় প্রকার হলো যেটা বস্ত্তত কোন সুগন্ধি নয় যেমনঃ চর্বি, সুতরাং মুহরিম যদি এটার মাধ্যম তেল মালিশ করে বা খেয়ে ফেলেন তাতে কোন সুগন্ধি নয় তবে মাঝে মধ্যে তা সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যেমনঃ তেল, তিলের তেল ইত্যাদি। সুতরাং যদি কোন মুহরিম এটাকে সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহার করে তাহলে তার ওপর কাফফারাহ ওয়াজিব হবে। পক্ষান্তরে যদি খাওয়ার কাজে বা ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করে তাহলে কাফফারাহ আবশ্যক হবে না।
পরিচ্ছেদঃ ১১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ইহরাম অবস্থায় যা থেকে বেঁচে থাকতে হবে
২৬৯২-[১৫] নাফি’ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) শীত অনুভব করে বললেন, নাফি’! আমার গায়ে একটি কাপড় জড়িয়ে দাও। (নাফি’ বলেন) আমি তাঁর গায়ের উপর একটি ওভারকোট জড়িয়ে দিলাম। তখন তিনি (ইবনু ’উমার) বললেন, আমার গায়ে ওভারকোট জড়িয়ে দিলে অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহরিমের জন্য তা নিষেধ করেছেন। (আবূ দাঊদ)[1]
عَنْ نَافِعٍ
أَنَّ ابْنَ عُمَرَ وَجَدَ الْقُرَّ فَقَالَ: ألق عَليّ ثوبا نَافِعُ فَأَلْقَيْتُ عَلَيْهِ بُرْنُسًا فَقَالَ: تُلْقِي عَلَيَّ هَذَا وَقَدْ نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَلْبَسَهُ الْمُحْرِمُ؟ . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد؟
ব্যাখ্যা: (قَدْ نَهٰى رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ أَنْ يَلْبَسَهُ الْمُحْرِمُ؟) ‘‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহরিম ব্যক্তিকে তা পড়তে নিষেধ করেছেন’’। ‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী (রহঃ) বলেনঃ নাফি' (রহঃ) ইবনু ‘উমার (রাঃ)-এর শরীরের উপর ঢিলেঢালা লম্বা পোশাক ঝুলিয়ে দিলেন। আমাদের মত হলো, মুহরিম ব্যক্তির জন্য সেলাই করা পোশাক পড়া অথবা তা দ্বারা শরীরের কোন অঙ্গ ঢেকে ফেলা বৈধ নয়। শুধুমাত্র অপারগ অবস্থা ছাড়া। তিনি আরো বলেন, ইবনু ‘উমার (রাঃ) সাবধানতা অবলম্বনের জন্য সেলাই করা কাপড়কে মুহরিম ব্যক্তির জন্য অপছন্দ করতেন।
পরিচ্ছেদঃ ১১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ইহরাম অবস্থায় যা থেকে বেঁচে থাকতে হবে
২৬৯৩-[১৬] ’আব্দুল্লাহ ইবনু মালিক ইবনু বুহায়নাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম বাঁধা অবস্থায় মক্কার পথে ’লুহা- জামাল’ নামক জায়গায় নিজের মাথার মাঝখানে শিঙ্গা লাগিয়েছিলেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَالِكٍ بن بُحَيْنَةَ قَالَ: احْتَجَمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ مُحْرِمٌ بِلَحْيِ جَمَلٍ مِنْ طريقِ مكةَ فِي وسط رَأسه
ব্যাখ্যা: কোন কোন বর্ণনায় لحيى جمل আছে, ‘জামাল’ মক্কা নগরীর একটি রাস্তার নাম। হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, বাকরী তাঁর ‘‘মু‘জামাহ্’’য় বলেছেন ‘জামাল’ হলো একটি কূপ যার আলোচনা তায়াম্মুম অধ্যায়ের মধ্যে আবূ জাহম-এর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। ইবনু ওয়াযযাহ্ বলেন, ‘জামাল’ হলো জুহফার গিরিপথ মক্কায় হাজীদের পানি পান করানোর স্থান থেকে সাত মাইল দূরে। আল ক্বমূস প্রণেতা বলেন, لحى جمل হলো হারামায়নের মাঝে অবস্থিত একটি স্থান এবং তা মদীনার নিকটবর্তী।
পরিচ্ছেদঃ ১১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ইহরাম অবস্থায় যা থেকে বেঁচে থাকতে হবে
২৬৯৪-[১৭] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম অবস্থায় ব্যথার কারণে তাঁর পায়ের পাতার উপর শিঙ্গা লাগিয়েছিলেন। (আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
وَعَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: احْتَجَمَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ مُحْرِمٌ عَلَى ظَهْرِ الْقَدَمِ مِنْ وَجَعٍ كَانَ بِهِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ
ব্যাখ্যা: নাসায়ীর বর্ণনায় রয়েছে, (وثئ) ‘‘ওয়াসয়ুন’’ হচ্ছে এমন আঘাত বা ব্যথা যা গোশতে হয় হাড্ডি পর্যন্ত পৌঁছে না, অথবা ব্যথাটি হাড় পর্যন্ত পৌঁছায় কিন্তু হাড় ভাঙ্গে না। ‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী হানাফী (রহঃ) বলেছেন, পায়ের উপরিভাগে শিঙ্গা লাগানো কোন চুল বা পশম কাটা ছাড়াই সম্ভব। সুতরাং চুল কাটা ছাড়া শিঙ্গা লাগালে তাতে কোন অসুবিধা নেই, পাশাপাশি শিঙ্গা তো লাগানো হয়েছে অসুস্থতার কারণে, তাই এখানে অতিরিক্ত আরো সুযোগ প্রদত্ত হল। আমি [‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী (রহঃ)] বলবো, এ হাদীসে আছে পায়ের উপরিভাগে শিঙ্গা লাগানোর কথা, কিন্তু ইবনু ‘আব্বাস ও ইবনু বুহায়নাহ্’র হাদীসে আছে, মাথা ব্যথার কারণে মাথায় শিঙ্গা লাগানোর কথা, আবার জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসে পিঠের অথবা গুপ্তাঙ্গে। এগুলো ভিন্ন হওয়ার কারণ কয়েকটিঃ
১. দু’ ধরনের যন্ত্রণার জন্য নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’ জায়গায় শিঙ্গা লাগিয়েছেন।
২. একবার ছিল ‘উমরার ক্ষেত্রে আর অন্যবার ছিল বিদায় হজ্জের সময়। কেউ কেউ এর বলেছেন বিদায় হজ্জে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিঙ্গা লাগিয়েছেন একাধিকবার।
পরিচ্ছেদঃ ১১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ইহরাম অবস্থায় যা থেকে বেঁচে থাকতে হবে
২৬৯৫-[১৮] আবূ রাফি’ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবি মায়মূনাহ্-কে হালাল অবস্থায় বিয়ে করেছিলেন এবং হালাল অবস্থায়ই তার সাথে মেলামেশা করেছিলেন। আর আমিই ছিলাম তাদের মধ্যে বার্তাবাহক। (আহমাদ, তিরমিযী; ইমাম তিরমিযী হাদীসটি হাসান বলেছেন)[1]
وَعَن أبي رافعٍ
قَالَ: تَزَوَّجَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَيْمُونَةَ وَهُوَ حَلَالٌ وَبَنَى بِهَا وَهُوَ حَلَالٌ وَكُنْتُ أَنَا الرَّسُولَ بَيْنَهُمَا. رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ
ব্যাখ্যা: এ হাদীসটি প্রথম পরিচ্ছেদের ইয়াযীদ বিন আসম-এর, যা পূর্বে চলে গেছে তারই মত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মায়মূনাহ্ (রাঃ)-কে বিবাহ করেছেন হালাল অবস্থায় যদিও এ বর্ণনাটি ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর বর্ণনার বিপরীত। ইমাম হাযিমী তাঁর কিতাব ‘বায়ানুন্ নাসিখ ওয়াল মানসূখ’ (পৃঃ ১১) বলেন, আবূ রাফি'-এর হাদীসই বেশি ‘আমলের উপযুক্ত, কারণ তিনি হচ্ছেন ঘটনার বাস্তবসাক্ষী আর ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হলেন বর্ণনাকারী। সুতরাং বাস্তব সাক্ষী যিনি তার বর্ণনার সাথে অন্য কোন সাধারণ বর্ণনাকারীর বর্ণনা যদি সাংঘর্ষিক হয় তাহলে বাস্তবসাক্ষী যিনি তার বর্ণনাটা অগ্রাধিকার পাওয়াই স্বাভাবিক। এমনটাই ঘটেছিল যখন ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) মোজার উপর মাসেহ করার মাসআলাহ্ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হয়েছিলেন তখন তিনি মাসআলাটি প্রশ্নকারীকে ‘আলী (রাঃ)-এর নিকট থেকে জেনে নিতে বলেন এবং বলেন, কারণ ‘আলী (রাঃ) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সফর করতেন। সুতরাং সফরে মোজার উপর মাসেহ কেমন হবে তা আমার চেয়ে তিনিই ভালো জানেন। এ মতই ইমাম যায়লা‘ঈ সমর্থন করেছেন। (নাস্বুর রায়াহ ৩য় খণ্ড পৃঃ ১৭৪)
পরিচ্ছেদঃ ১২. প্রথম অনুচ্ছেদ - মুহরিম ব্যক্তির শিকার করা হতে বিরত থাকবে
المحرم – يجتنب الصيد মুহরিম ব্যক্তি শিকার করা হতে বিরত থাকবে। তথা তা হত্যা ও শিকার করা হতে বিরত থাকবে যদিও সে তা ভক্ষণ না করে এবং তা ভক্ষণ করে যদি অন্য মুহরিম ব্যক্তি তা যাবাহ করবে না।
মুল্লা ’আলী কারী বলেনঃ শিকার দ্বারা উদ্দেশ্য সে সব বন্যজন্তু, সৃষ্টির মূলনীতিতে পৃথিবীতে যার জন্ম ও বংশ বিস্তার রয়েছে।
আর সমুদ্রের শিকার মুহরিম ও অমুহরিম সবার জন্য বৈধ। খাদ্য হিসেবে হোক বা না হোক, যেমন- আল্লাহ তা’আলার বাণী-
أُحِلَّ لَكُمْ صَيْدُ الْبَحْرِ وَطَعَامُهٗ مَتَاعًا لَكُمْ
’’তোমাদের জন্য সমুদ্রের শিকার ও সমুদ্রের খাদ্য হালাল করা হয়েছে তোমাদের উপকারার্থে।’’ (সূরা আল মায়িদাহ্ ৫ : ৯৬)
’আল্লামা শানক্বীত্বী বলেনঃ ’’তোমাদের জন্য সমুদ্রের শিকার হালাল করা হয়েছে’’। আল্লাহ তা’আলার এ বাণী সুস্পষ্ট ’আম্ প্রমাণ করে সমুদ্রের শিকার হজ্জ/হজ ও ’উমরাহকারী মুহরিম ব্যক্তির জন্য বৈধ, অনুরূপ আল্লাহ তা’আলা খাসভাবে বর্ণনা করেছেন যে, মুহরিম ব্যক্তির ওপর স্থল শিকার হারাম।
وَحُرِّمَ عَلَيْكُمْ صَيْدُ الْبَرِّ مَا دُمْتُمْ حُرُمًا
’’তোমাদের ইহরামকারীদের জন্যে হারাম করা হয়েছে স্থল শিকার যতক্ষণ ইহরাম অবস্থায় থাকো।’’ (সূরা আল মায়িদাহ্ ৫ : ৯৬)
এটা হতে সুস্পষ্ট বুঝা যায় যে, মুহরিম ব্যক্তির জন্য সমুদ্রের শিকার হারাম নয়।
ইবনু কুদামাহ্ বলেনঃ মুহরিম ব্যক্তির জন্য সমুদ্রের শিকার বৈধ। আল্লাহ তা’আলার এ বাণী দ্বারা-
أُحِلَّ لَكُمْ صَيْدُ الْبَحْرِ وَطَعَامُه
’’তোমাদের জন্যে সমুদ্রের শিকার ও সমুদ্রের খাদ্য হালাল করা হয়েছে।’’ (সূরা আল মায়িদাহ্ ৫ : ৯৬)
বিজ্ঞ ’উলামাহগণ ঐকমত্য পোষণ করেন যে, সমুদ্রের শিকার মুহরিম ব্যক্তির জন্য শিকার করা, খাওয়া এবং ক্রয়-বিক্রয় করা বৈধ। আর সমুদ্রের শিকার বলতে এমন প্রাণীকে বুঝায় যা সমুদ্রে জীবন-যাপন করে সেখানেই ডিম পাড়ে এবং বাচ্চা ফুটায়, যেমন- মাছ, কচ্ছপ, কাকড়া ইত্যাদি অনুরূপ।
আর স্থল শিকার হজ্জ/হজ ও ’উমরাহকারী মুহরিম ব্যক্তির জন্যে সকল ’উলামাগণের মতে হারাম আর ঐকমত্য এমন বন্যজন্তুর ক্ষেত্রে যার মাংস (গোসত/মাংস) খাওয়া হালাল, যেমন হরিণ ও হরিণের বাচ্চারা অনুরূপ জন্তু, আর শিকারী জন্তুর প্রতি ইঙ্গিত করাও হারাম। আর শিকারীর ব্যাপারে কোন প্রকার সাহায্য করাও হারাম।
ইমাম শাফি’ঈ-এর নিকট শিকার বলতে যার মাংস (গোসত/মাংস) খাওয়া হালাল এমন পশু শিকার করা। আর যার মাংস (গোসত/মাংস) খাওয়া হালাল নয় এমন পশু শিকারে কোন বাধা নেই। তবে সদ্য ভূমিষ্ট শিশু জন্তু চাই তার মাংস খাওয়া হালাল হোক বা না হোক তা শিকার করা বৈধ নয়। যেমন- নেকড়ে শাবক যার জন্ম হায়েনা ও বাঘের সংমিশ্রণে। তিনি আরো বলেনঃ শকুন, সিংহ অনুরূপ শিকার ও যার মাংস খাওয়া হারাম এমন পশু শিকারে বাধা নেই। কেননা তা শিকারের অন্তর্ভুক্ত নয়, মহান আল্লাহ তা’আলার বাণী-
وَحُرِّمَ عَلَيْكُمْ صَيْدُ الْبَرِّ مَا دُمْتُمْ حُرُمًا
’’আর তোমাদের ইহরামধারীদের জন্য হারাম করা হয়েছে স্থল শিকার যতক্ষণ ইহরাম অবস্থায় থাকো’’- (সূরা আল মায়িদাহ্ ৫ : ৯৬)। আর এটা ইমাম আহমাদ-এর মাযহাব।
ইবনু কুদামাহ্ বলেনঃ শিকার তথা যা হত্যাতে জরিমানা ওয়াজিব হয় তা এমন জন্তু যা তিনটি বিষয়কে একত্রিত করে। যার মাংস খাওয়া বৈধ কিন্তু তার কোন মালিক নেই তা শিকার করা সম্পূর্ণ নিষেধ। সুতরাং প্রথম বৈশিষ্ট্য হতে বের হয়, যার মাংস হালাল নয় এবং হত্যাতে কোন জরিমানা নেই। যেমন- হিংস্র প্রাণী এবং কষ্টদায়ক কীটপতঙ্গ, পাখি।
ইমাম আহমাদ বলেনঃ জরিমানা নির্ধারণ করা হয়েছে হালাল জন্তু শিকারে- এটা অধিকাংশ ’উলামাগণের বক্তব্য; তবে শিশু জন্তুর ক্ষেত্রে চাই তার মাংস হালাল হোক বা না হোক, যেমন নেকড়ে শাবক যা হত্যাতে জরিমানা রয়েছে অধিকাংশদের নিকট তা হত্যা করা হারাম।
দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য বন্যজন্ত। অতএব বন্যজন্তু নয় এমন জন্তু মুহরিম ব্যক্তির জন্য যাবাহ করা এবং খাওয়া হারাম নয় যেমন সকল চতুষ্পদ প্রাণী এবং ঘোড়া ও মুরগী এবং অনুরূপ প্রাণীর ব্যাপারে ’উলামাগণের মধ্যে কোন মতভেদ নেই।
হাফিয ইবনু হাজার বলেনঃ সকলে ঐকমত্য হয়েছেন শিকার দ্বারা উদ্দেশ্য এমন বন্যপশু যার মাংস খাওয়া হালাল।
ইবনু কুদামাহ্ বলেনঃ চতুষ্পদ গৃহপালিত জন্তুর ব্যাপারে ইহরামধারীর জন্য এবং হারামের মধ্যে অবস্থান হারাম হওয়ার ব্যাপারে কোন প্রভাব পড়বে না। কেননা তা শিকারের অন্তর্ভুক্ত নয়। আর আল্লাহ তা’আলা শিকার করাকে হারাম করেছেন। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম অবস্থায় হারামে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য উট কুরবানী করেছেন এবং তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন-أفضل الحج العج والثج। সর্বোত্তম হজ্জ/হজ হলো চিৎকার করে তালবিয়াহ্ পাঠ করা, যাবাহ ও নাহর-এর মাধ্যমে রক্ত প্রবাহিত করা। আর এ ব্যাপারে কোন মতানৈক্য নেই। আর ইমাম বুখারী তাঁর সহীহ গ্রন্থে বলেনঃ ইবনু ’আব্বাস ও আনাস মুহরিম ব্যক্তির যাবাহতে কোন দোষ মনে করতেন না।
মুল্লা ’আলী কারী বলেনঃ স্থলে যেসব জন্তুর মাংস খাওয়া হালাল তা সকলের ঐকমত্যে শিকার করা হারাম, আর সেসব জন্তুর মাংস খাওয়া হারাম তাদের ব্যাপারে বক্তব্য হলো- যদি তা কষ্ট দেয় এবং আক্রমণ করে এমন জন্তুকে হত্যা করা মুহরিম ব্যক্তির জন্য বৈধ এবং তাতে কোন জরিমানা নেই। যেমন- বাঘ, চিতা বাঘ, সিংহ ইত্যাদি।
আর যে প্রাণী অধিকাংশ সময়ে শুরুতেই কষ্ট দেয় না, যেমন- শিয়াল ইত্যাদি প্রাণী যদি তা আক্রমণ করে তাহলে হত্যা করা বৈধ, এতে কোন জরিমানা নেই।
২৬৯৬-[১] সা’ব ইবনু জাসামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি আব্ওয়া বা ওয়াদ্দান নামক স্থানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে একটি বন্যগাধা (শিকার করে এনে) হাদিয়্যাহ্ (উপহার) দিলেন। কিন্তু তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) গাধাটি ফেরত দিলেন। এতে তার মুখমণ্ডল ে বিমর্ষভাব (মনোকষ্ট হওয়ার নিদর্শন) লক্ষ্য করে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আমরা মুহরিম হওয়ার কারণে তা তোমাকে ফেরত দিলাম। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ الْمُحْرِمِ يَجْتَنِبُ الصَّيْدَ
عَن الصعب بن جثامة أَنه أهْدى رَسُول اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حِمَارًا وَحْشِيًّا وَهُوَ بِالْأَبْوَاءِ أَوْ بِوَدَّانَ فَرَدَّ عَلَيْهِ فَلَمَّا رأى مَا فِي وَجْهَهُ قَالَ: «إِنَّا لَمْ نَرُدَّهُ عَلَيْكَ إِلَّا أنَّا حُرُمٌ»
ব্যাখ্যা: (أهْدٰى رَسُولَ اللّٰهِ ﷺ) ‘‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে উপঢৌকন দিয়েছিল বিদায় হজ্জে।’’
(حِمَارًا وَحْشِيًّا) - জংলী গাধা অনুরূপ বর্ণনা মালিক যুহরী হতে, তিনি ‘উবায়দুল্লাহ ইবনু ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘উত্ববাহ্ হতে, তিনি ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস হতে, তিনি সা‘ব ইবনু জাসামাহ্ হতে।
মালিক হতে বর্ণনাটি সকল রাবীদের ঐকমত্য এবং তার অনুসরণ করেছে যুহরীর নয়জন মেধাবী ছাত্র।
আর তাদের বিরোধিতা করেছে সুফিয়ান ইবনু ‘উয়াইনাহ্ যুহরী হতে, তিনি বলেছেন- أحديت له من لحم حمار وحش.- رواه مسلم ‘‘তাকে হাদিয়্যাহ্ দেয়া হয়েছে জংলী গাধার গোশ্ত (গোসত/গোশত)।’’ (সহীহ মুসলিম)
সা‘ঈদ ইবনু জুবায়র ইবনু ‘আব্বাস হতে বর্ণনা করেছেন (رجل حمار وحش) জংলী গাধার পা। অন্য রিওয়ায়াতে (عجز حمار وحش) জংলী গাধার পাছা, তাতে রক্ত ঝড়ছিল। আবার অন্য বর্ণনায় (شق حمار وحش) জংলী গাধার কিছু অংশ, আর এ বর্ণনাগুলো প্রমাণ করে গাধার কিছু অংশ হাদিয়্যাহ্ দেয়া হয়েছিল পূর্ণ গাধা নয়। এ দু’ বর্ণনার মাঝে বৈপরীত্য রয়েছে।
কেউ কেউ দু’ হাদীসের সমন্বয়কে প্রাধান্য দিয়েছে, আবার কেউ ইমাম মালিক-এর বর্ণনাকে প্রাধান্য দিয়েছে। যেমন- ইমাম শাফি‘ঈ বলেন। মালিক-এর হাদীস যে, সা‘ব গাধা হাদিয়্যাহ্ দিয়েছেন- এ হাদীসটি ‘‘গাধার গোশ্ত (গোসত/গোশত)’’-এর হাদীসের চেয়ে বেশী শক্তিশালী।
এজন্য ইমাম বুখারী অধ্যায় বেঁধেছেন- (باب إذا أهدى للمحرم حمارًا وحشيًا حيًا لم يقبل)
অর্থাৎ- যখন মুহরিম ব্যক্তিকে জীবিত জংলী গাধা উপহার দেয়া হবে তা গ্রহণ করা হবে না। অতঃপর মালিক-এর বর্ণনাকৃত হাদীসটি নিয়ে আসেন।
আবার ‘উলামাগণের মধ্যে কেউ গোশতের হাদীসকে প্রাধান্য দিয়েছেন। যেমন- ইবনু ক্বইয়্যিম (রহঃ) বলেন, গোশতের বর্ণনাকৃত হাদীসটি প্রাধান্য পাবে তিনটি কারণে।
১. এ হাদীসের বর্ণনাকারী হাদীস মুখস্থ করেছে এবং যথাযথভাবে ঘটনা সংরক্ষণ করেছেন। এমনকি বলেছেন- (أنه يقطر دمًا) ‘যে রক্ত ঝড়ঝড় করে পড়ছে’। এটা প্রমাণ করে ঘটনাকে দৃঢ়ভাবে সংরক্ষণের যা অস্বীকার করা যাবে না।
২. গাধা এবং গোশ্ত (গোসত/গোশত) দু’টি শব্দে কোন বৈপরীত্য নেই। কেননা গোশ্ত (গোসত/গোশত) বলতে জীবন্ত প্রাণীও বুঝায় যা বাকরীতি কক্ষনো প্রত্যা্যখ্যান করে না।
৩. সকল বর্ণনা একমত হয়েছে এ বিষয়ে তা গাধার কিছু অংশ তবে মতভেদ করেছে ঐ অংশটি কি তা নিয়ে, তা পা অথবা পাছা, অথবা কোন অংশ অথবা তা হতে কিছু গোশ্ত (গোসত/গোশত)। আর এ সমস্ত রিওয়ায়াতে কোন বৈপরীত্য নেই। সম্ভবত কিছু অংশ বলতে পাছা হতে পারে আবার পা দিয়ে এটা দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আর ইবনু ‘উয়াইনাহ্ তার এ বক্তব্য حمارًا ‘‘গাধা’’ হতে মত পরিবর্তন করে (لحم حمار حتى مات) গাধার গোশ্ত এমনকি মারা গেছে বলে প্রমাণ করেছেন।
আর এটা প্রমাণ করে গোশত হাদিয়্যাহ্ দেয়া হয়েছে জীবন্ত গাধা নয়।
আবার কেউ গাধার উপঢৌকন দেয়ার হাদীসকে এভাবে সমন্বয় করেছেন যে, কুল তথা পূর্ণ দ্বারা কিছু অংশ উদ্দেশ্য, যেমন যুরক্বানী শারহে মুয়াত্ত্বায় ও ইবনু হুমাম ফাতহুল ক্বদীরে বর্ণনা করেছেন।
আবার কেউ এভাবে সমন্বয় করেছেন যে, সা‘ব প্রথমে যাবাহকৃত গাধা নিয়ে এসেছেন। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনেই কিছু অংশ কেটে তার সামনেই উপস্থাপন করেছেন।
(أَبْوَاءِ) ‘‘আব্ওয়া’’ পাহাড় যা মক্কার নিকটবর্তী আর সেখানে শহর রয়েছে তার দিকে সম্বোধন করা হয়। কারো মতে সেখানে মহামারী হওয়ার কারণে ঐ স্থানকে আব্ওয়া বলা হয়।
‘আয়নী বলেনঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মা এখানে মারা গেছেন।
(أَوْ بِوَدَّانَ) অথবা ‘‘ওয়াদ্দান’’ রাবী সন্দেহের কারণে এমনটি বলেছেন।
হাফিয ইবনু হাজার বলেনঃ সেটা আবওয়া হতে জুহফার নিকটবর্তী। আর মদীনাহ্ হতে আসার পথে আব্ওয়া হতে জুহফার দূরত্ব তের মাইল আর ওয়াদ্দান হতে জুহফাহ্ আট মাইল।
(إِنَّا لَمْ نَرُدَّه عَلَيْكَ إِلَّا أنَّا حُرُمٌ) ‘‘আমরা ইহরাম অবস্থায় আছি, তাই আমরা তোমার হাদিয়্যাহ্ ফেরত দিয়েছি।’’ অর্থাৎ- আমরা তা অন্য কান কারণে ফেরত দেইনি। বরং ইহরাম অবস্থায় আছি, এজন্য তা ফেরত দিয়েছি। এ হাদীসটি তাদের দলীল যারা বলেনঃ মুহরিম ব্যক্তির জন্য শিকারকৃত পশুর গোশ্ত (গোসত/গোশত) খাওয়া বৈধ নয়।
এ হাদীসের শিক্ষাঃ
১। উপঢৌকন গ্রহণে কোন বাধা থাকলে তা ফেরত দেয়া বৈধ।
২। বিনা কারণে উপঢৌকন ফেরত দেয়া মাকরূহ।
৩। উপঢৌকনদাতার মনোতুষ্টির জন্য উপঢৌকন ফেরত দেয়ার কারণ বর্ণনা করা জরুরী।
৪। দানকৃত বস্ত্ত গ্রহণ না করা পর্যন্ত দাতাই তার মালিক।
পরিচ্ছেদঃ ১২. প্রথম অনুচ্ছেদ - মুহরিম ব্যক্তির শিকার করা হতে বিরত থাকবে
২৬৯৭-[২] আবূ কাতাদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে (’উমরা করতে) বের হয়েছেন এবং পথিমধ্যে তিনি তাঁর কিছু সহযাত্রীসহ পিছনে পড়ে গেলেন। সাথীদের সকলেই মুহরিম ছিলেন, কিন্তু আবূ কাতাদা তখনও ইহরাম বাঁধেননি। আবূ কাতাদা’র দেখার পূর্বে তার সাথীরা একটি বন্যগাধা দেখলেন। তারা বন্যগাধাটি দেখার পর তাকে (আবূ কাতাদা-কে) এভাবেই থাকতে দিলেন। অবশেষে আবূ কাতাদাও ওটাকে দেখে ফেললেন। এরপর তিনি (আবূ কাতাদা) তার ঘোড়ায় চড়ে সাথীদেরকে তার চাবুকটা দিতে বললেন। কিন্তু সাথীরা তা তাকে দিতে অস্বীকৃতি জানালেন। অতঃপর তিনি নিজেই চাবুক উঠিয়ে নিলেন।
তারপর বন্যগাধাটির ওপর আক্রমণ করে আহত (দুর্বল) করলেন। অবশেষে (তা যাবাহ করার পর) আবূ কাতাদা তা খেলেন এবং তারাও (সাথীরাও) খেলেন কিন্তু এতে তারা অনুতপ্ত হলেন। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট পৌঁছে তাকে বিষয়টি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের সাথে বন্যগাধার কিছু আছে কি? তারা উত্তরে বললেন, আমাদের সাথে (রন্ধনকৃত) এর একটি পা আছে। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা গ্রহণ করলেন ও খেলেন। (বুখারী, মুসলিম)
বুখারী মুসলিমের আর এক বর্ণনায় আছে- তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের কেউ কি আবূ কাতাদা-কে বন্যগাধাকে আক্রমণ করার জন্য বলেছিলে? তারা বললেন, জ্বি না। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তবে তোমরা এর অবশিষ্ট মাংস (গোসত/মাংস) খেতে পারো।[1]
بَابُ الْمُحْرِمِ يَجْتَنِبُ الصَّيْدَ
وَعَنْ أَبِي قَتَادَةَ أَنَّهُ خَرَجَ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَتَخَلَّفَ مَعَ بَعْضِ أَصْحَابِهِ وَهُمْ مُحْرِمُونَ وَهُوَ غَيْرُ مُحْرِمٍ فَرَأَوْا حِمَارًا وَحْشِيًّا قَبْلَ أَنْ يَرَاهُ فَلَمَّا رَأَوْهُ تَرَكُوهُ حَتَّى رَآهُ أَبُو قَتَادَةَ فَرَكِبَ فَرَسًا لَهُ فَسَأَلَهُمْ أَنْ يُنَاوِلُوهُ سَوْطَهُ فَأَبَوْا فَتَنَاوَلَهُ فَحَمَلَ عَلَيْهِ فَعَقَرَهُ ثُمَّ أَكَلَ فَأَكَلُوا فَنَدِمُوا فَلَمَّا أَدْرَكُوا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَأَلُوهُ. قَالَ: «هَلْ مَعَكُمْ مِنْهُ شَيْءٌ؟» قَالُوا: مَعَنَا رِجْلُهُ فَأَخَذَهَا النَّبِيُّ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسلم فَأكلهَا
وَفِي رِوَايَةٍ لَهُمَا: فَلَمَّا أَتَوْا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «أَمِنْكُمْ أَحَدٌ أَمَرَهُ أَنْ يَحْمِلَ عَلَيْهَا؟ أَوْ أَشَارَ إِلَيْهَا؟» قَالُوا: لَا قَالَ: «فَكُلُوا مَا بَقِيَ مِنْ لَحمهَا»
ব্যাখ্যা: (أَنَّه خَرَجَ مَعَ رَسُولِ اللّٰهِ ﷺ) ‘‘তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বের হলেন’’। অর্থাৎ- হুদায়বিয়ার বৎসর। জেনে রাখা ভাল যে, আবূ কাতাদা কর্তৃক বন্যগাধা শিকার করার বর্ণনার মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে।
হাফিয ইবনু হাজার বলেনঃ মোটকথা এই যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৬ষ্ঠ হিজরী সালে ‘উমরা করার উদ্দেশে মদীনাহ্ থেকে রওয়ানা হলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যুলহুলায়ফাহ্ হতে ৩৪ মাইল দূরে রওহা নামক স্থানে পৌঁছলে খবর পান যে, মুশরিক শত্রুরা গয়ক্বাহ্ নামক উপত্যকাতে অবস্থান করছে।
আশঙ্কা করা হয় যে, তারা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অসতর্কতার সুযোগে তাঁর ওপর তারা আক্রমণ করতে পারে। তাই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ শত্রুদলের অনিষ্ট থেকে নিরাপত্তা লাভের উদ্দেশে একদল লোক সেদিকে প্রেরণ করেন। তাদের মাঝে আবূ কাতাদা ছিলেন। অতঃপর যখন তারা নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিত হন তখন তারা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে এসে মিলিত হন। আবূ কাতাদা ব্যতীত অন্য সবাই ‘উমরা করার নিমিত্তে ইহরাম বাঁধে। আবূ কাতাদা (রাঃ) ইহরামবিহীন অবস্থায় তার ভ্রমণ অব্যাহত রাখেন এজন্য যে, হয়তঃ তিনি তখনো তার মীকাতে পৌঁছেনি অথবা তার ‘উমরা করার ইচ্ছা ছিল না। মোটকথা, তিনি এ অবস্থায় ‘‘সুক্বইয়্যাহ্’’ নামক স্থানে এসে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাক্ষাৎ লাভ করেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সাক্ষাৎ লাভের পূর্বে রওহা নামক স্থানে শিকারের ঘটনা ঘটে।
(حَتّٰى رَاٰهُ أَبُو قَتَادَةَ فَرَكِبَ فَرَسًا لَه) ‘‘আবূ কাতাদা শিকারী পশু দেখতে পেয়ে তিনি তার বাহনে আরোহণ করেন।’’
(فَسَأَلَهُمْ أَنْ يُنَاوِلُوهُ سَوْطَه فَأَبَوْا) ‘‘তিনি তার সঙ্গীদেরকে চাবুক তুলে দিতে বললে তারা তা তুলে দিতে অস্বীকার করে।’’ কেননা ইহরাম অবস্থায় যেরূপ কোন কিছু শিকার করা হারাম অনুরূপ শিকারীর সহযোগিতা করাও হারাম। তাই তারা আবূ ক্বাতাদার হাতে চাবুক তুলে দিয়ে পশু শিকার কাজে তাকে সহায়তা করতে অস্বীকার করেন।
(ثُمَّ أَكَلَ فَأَكَلُوا فَنَدِمُوْا) ‘‘এরপর আবূ কাতাদা শিকারী পশু রান্না করে তার গোশ্ত (গোসত/গোশত) খেলেন এবং তাঁর সঙ্গীরাও তা খাবার পর আফসোস করতে থাকল।’’ কেননা তারা ধারণা করেছিল যে, কোন অবস্থাতেই মুহরিম ব্যক্তির জন্য শিকারী পশুর গোশ্ত (গোসত/গোশত) খাওয়া বৈধ নয়।
মুসলিমের অন্য বর্ণনায় আছে যে, (فأكل بعض أصحاب رسول الله - ﷺ - وأبي بعضهم) ‘‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কিছু সহাবা তা খেলেন আর কিছু সহাবা তা খেতে অস্বীকার করেন।’’ হাফিয ইবনু হাজার বলেনঃ অনেক বর্ণনা দ্বারা সাব্যস্ত যে, তারা ঐ পশুর গোশ্ত (গোসত/গোশত) খেয়েছিল। পরবর্তীতে তাদের মনে সন্দেহের উদ্রেক হয়েছিল যে, ইহরাম অবস্থায় আমরা কি শিকারী পশুর গোশ্ত (গোসত/গোশত) খেতে পারি?
(فَلَمَّا أَدْرَكُوْا رَسُوْلَ اللّٰهِ ﷺ سَأَلُوْهُ) ‘‘তারা যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হলেন তখন তারা তার নিকট এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলেন। অর্থাৎ- ইহরাম অবস্থায় শিকারকৃত পশুর গোশত খাওয়া বৈধ কি-না।
(فَأَخَذَهَا النَّبِىُّ ﷺ فَأَكَلَهَا) ‘‘নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা নিয়ে খেলেন।’’ এতে ইঙ্গিত রযেছে যে, কাজের মাধ্যমে প্রশ্নের উত্তর দেয়া কথার মাধ্যমে উত্তর দেয়ার চেয়ে বেশী মজবুত।
কাযী ‘আরায বলেনঃ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্বাতাদার নিকট হতে উক্ত শিকারী পশু চেয়ে নিয়ে খেলেন যাতে তাদের অন্তরে প্রশান্তি আসে যারা তা হতে খেয়েছিলেন। কেননা তাদের মধ্যে যে সন্দেহের উদ্রেক হয়েছিল তা দূর করতে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কথা ও কাজের মাধ্যমে তা বৈধ হওয়ার প্রমাণ দিলেন।
অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, বন্য গাধা খাওয়া হালাল এবং তা এক প্রকার শিকারী পশু।
এতে এ প্রমাণও পাওয়া যায় যে, মুহরিম ব্যক্তির পক্ষে শিকারকৃত পশুর গোশত (গোসত/গোশত) খাওয়া বৈধ যদি উক্ত পশু মুহরিমের খাবার উদ্দেশে শিকার করা না হয়।
মুসনাদ আহমাদ (৫ম খণ্ড, ৩০৪ পৃঃ) ইবনু মাজাহ্, মুসান্নাফ ‘আবদুর রাযযাক (৪র্থ খণ্ড, ৪৩০ পৃঃ) দারাকুত্বনী, ইসহাক ইবনু রহওয়াইহ্, ইবনু খুযায়মাহ্ ও বায়হাক্বী (৫ম খণ্ড, ১৯০ পৃঃ) মা‘মার (রহঃ)-এর বরাতে ইয়াহ্ইয়া ইবনু আবী কাসীর থেকে ‘আবদুল্লাহ ইবনু আবী কাতাদা সূত্রে তার পিতা আবূ কাতাদা হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেনঃ হুদায়বিয়ার সময়ে আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সফরসঙ্গী ছিলাম। আমার সঙ্গীগণ ইহরাম বেঁধেছিলেন কিন্তু আমি ইহরাম বাঁধিনি। আমি একটি বন্যগাধা দেখতে পেয়ে তা আক্রমণ করে শিকার করি। বিষয়টি আমি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উল্লেখপূর্বক বললামঃ এটা কিন্তু আপনার জন্যই শিকার করেছি। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সঙ্গীদেরকে তা খেতে বললেন কিন্তু আমি তাঁর জন্য শিকার করেছি এ কথা বলাতে তিনি তা আর খেলেন না।
ইবনু খুযায়মাহ্ বলেনঃ এ হাদীসের এ অতিরিক্ত অংশটুকু যদি সহীহ বলে গণ্য হয় তাহলে এর মর্ম হলো যে, আবূ কাতাদা তাঁর উদ্দেশে পশুটি শিকার করেছেন এ কথা বলার আগে তিনি তা থেকে খেয়েছিলেন। অতঃপর তিনি যখন তাঁকে অবহিত করলেন যে, এটি তাঁর উদ্দেশেই শিকার করেছেন তখন তা খাওয়া থেকে বিরত থাকলেন।
(فَكُلُوْا مَا بَقِىَ مِنْ لَحْمِهَا) ‘‘এর অবশিষ্ট গোশত তোমরা খাও’’। এ আদেশসূচক শব্দ বৈধতা বুঝানোর জন্য, আবশ্যক বুঝানোর জন্য নয়। কেননা এ আদেশটি ছিল তাদের প্রশ্নের জবাব স্বরূপ। আর প্রশ্ন ছিল খাওয়া বৈধ কি-না, এ সম্পর্কে?
এ হাদীসের শিক্ষাঃ মুহরিম ব্যক্তির জন্য শিকার করা বৈধ নয় এবং এ সংক্রান্ত সাহায্য-সহযোগিতাও বৈধ নয়।
হালাল ব্যক্তি যে পশু শিকার করে তা থেকে মুহরিম ব্যক্তির খাওয়া বৈধ যদি না তার উদ্দেশে শিকার করা হয়। এ বিষয়ে সকলেই একমত। তবে যদি পশুটি মুহরিম ব্যক্তির উদ্দেশে শিকার করা হয় তাহলে জমহূর ‘উলামাগণের মতে তা মুহরিম ব্যক্তির পক্ষে খাওয়া বৈধ নয়। পক্ষান্তরে ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ)-এর মতে তা খাওয়া বৈধ যদিও তা মুহরিম ব্যক্তির জন্য শিকার করা হয়। আবূ কাতাদা বর্ণিত এ হাদীসটিই তাদের সপক্ষে দলীল।
জমহূর ‘উলামাগণ এ হাদীসের জবাবে বলেন যে, মা‘মার (রহঃ)-এর বরাতে বর্ণিত হাদীসে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, আবূ কাতাদা যখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অবহিত করলেন যে, পশুটি তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উদ্দেশেই শিকার করেছেন তখন তিনি তা থেকে খেতে বিরত থাকলেন।
পরিচ্ছেদঃ ১২. প্রথম অনুচ্ছেদ - মুহরিম ব্যক্তির শিকার করা হতে বিরত থাকবে
২৬৯৮-[৩] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি হারামে কিংবা ইহরাম অবস্থায় পাঁচটি প্রাণী তথা ইঁদুর, কাক, চিল, বিচ্ছু ও হিংস্র কুকুর হত্যা করেছে, তার কোন গুনাহ হবে না। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ الْمُحْرِمِ يَجْتَنِبُ الصَّيْدَ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: خَمْسٌ لَا جُنَاحَ عَلَى من قتلَهُنّ فِي الْحل وَالْإِحْرَامِ: الْفَأْرَةُ وَالْغُرَابُ وَالْحِدَأَةُ وَالْعَقْرَبُ وَالْكَلْبُ الْعَقُورُ
ব্যাখ্যা: (فِى الْحَرَمِ وَالْإِحْرَامِ) ‘‘হারাম এলাকায় ও ইহরাম অবস্থায়।’’ অর্থাৎ- মক্কার হারাম এলাকায় মুহরিম ব্যক্তির জন্য হাদীসে উল্লিখিত পাঁচ প্রকার প্রাণী হত্যা করা বৈধ।
হাফিয ইবনু হাজার বলেনঃ এ হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, হারাম এলাকার বাইরে ইহরামবিহীন ব্যক্তির পক্ষে তা হত্যা করা অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বৈধ। কেননা ইহরাম অবস্থায় কোন কিছু হত্যা করা অবৈধ হওয়া সত্ত্বেও যখন তার জন্য এ প্রাণীগুলো হত্যা করা বৈধ তখন যার মধ্যে এ অবৈধতা নেই তার জন্য নিশ্চিতভাবে তা বৈধ।
ইবনু ‘উমার (রাঃ) বর্ণিত অত্র হাদীসে এগুলো হত্যা করার মধ্যে ক্ষতি নেই বলা হয়েছে যা দ্বারা এগুলো হত্যা করা বৈধতা বুঝায়। আর আয়িশাহ্ (রাঃ) কর্তৃক মুসলিমে বর্ণিত হাদীসে এগুলো হত্যা করার নির্দেশ রয়েছে যা দ্বারা বুঝা যায় যে, এগুলো হত্যা করা মুস্তাহাব; শাফি‘ঈ, হাম্বালী ও আহলুয্ যাহিরদের মতানুযায়ী তা হত্যা করা মুস্তাহাব।
অত্র হাদীসে পাঁচ প্রকার প্রাণী হত্যা করার বৈধতা বর্ণিত হয়েছে। যদিও পাঁচ সংখ্যাটি খাস, অর্থাৎ- নির্দিষ্ট সংখ্যা বুঝায় কিন্তু অধিকাংশ ‘আলিমদের মতে নির্দিষ্ট সংখ্যা উদ্দেশ্য নয়। বরং সকল প্রকার কষ্টদায়ক প্রাণীই হত্যা করা বৈধ।
(الْفَأْرَةُ) ইঁদুর। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী জমহূর ‘উলামাগণের মতে মুহরিমের জন্য ইঁদুর হত্যা করা বৈধ। একমাত্র ইব্রাহীম নাখ্‘ঈ তা হারাম বলেছেন। ‘আল্লামা ইবনুল মুনযীর বলেনঃ এ অভিমত হাদীস ও ‘উলামাগণের মতের বিরোধী। ‘আল্লামা খাত্ত্বাবী বলেন, এ অভিমত সুস্পষ্ট দলীল ও ‘আলিমদের মতের বিরোধী।
(الْغُرَابُ) ‘‘কাক’’। অর্থাৎ- সাদা-কালো ডোরাকাটা কাক। যে কাকের পিঠে ও পেটে সাদা বর্ণের পালক রয়েছে তাকেই الْغُرَابُ الْأَبْقَعْ বলা হয় আর তা হত্যা করা বৈধ।
সকল ‘আলিমগণ একমত যে, যে সমস্ত ছোট কাক শুধু শস্যদানা ভক্ষণ করে সে কাক হত্যা করা বৈধ নয়। আর তা খাওয়াও বৈধ।
(وَالْكَلْبُ الْعَقُوْرُ) ‘‘হিংস্র কুকুর। এ দ্বারা কি উদ্দেশ্য এ নিয়ে ‘আলিমদের মতপার্থক্য রয়েছে।
(১) ইমাম যুফার বলেনঃ এখানে الْعَقُوْرُ শব্দ দ্বারা নেকড়ে বাঘ উদ্দেশ্য।
(২) ইমাম মালিক বলেনঃ প্রত্যেক ঐ হিংস্রপ্রাণী উদ্দেশ্য যা মানুষের ওপর আক্রমণ চালায় যেমন- চিতা বাঘ, সিংহ, নেকড়ে বাঘ ইত্যাদি। জমহূর ‘আলিমদের অভিমতও তাই।
(৩) ইমাম আবূ হানীফা বলেনঃ (الْكَلْبُ الْعَقُوْرُ) দ্বারা কুকুরই উদ্দেশ্য তবে পাগলা বা ক্ষ্যাপা কুকুর।
ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেনঃ সকল ‘আলিমগণ এ বিষয়ে একমত যে, কুকুর ইহরামধারী, ইহরামবিহীন, হারাম এলাকা বা হারামের বাইরে সর্বত্র হত্যা করা বৈধ।
হাফিয ইবনু হাজার বলেনঃ হাদীসে উল্লিখিত পাঁচ প্রকার প্রাণী ছাড়াও কষ্টদায়ক অন্যান্য প্রাণীও হত্যা করা বৈধ। কিন্তু এ বৈধতার কারণ সম্পর্কে তারা মতভেদ করেছেন।
(১) ইমাম মালিক-এর মতে তা কষ্টদায়ক প্রাণী, তাই হত্যা করা বৈধ।
(২) ইমাম শাফি‘ঈ-এর মতে তা খাওয়া অবৈধ, তাই তা হত্যা করা বৈধ।
(৩) হানাফীদের মতে হাদীসে বর্ণিত শুধু পাঁচ প্রকার প্রাণীই হত্যা করা বৈধ। তবে সাপ হত্যা করা অন্য দলীলের ভিত্তিতে এবং নেকড়ে বাঘ কুকুরের সাথে সাদৃশ্য থাকার কারণে তা হত্যা করা বৈধ।
পরিচ্ছেদঃ ১২. প্রথম অনুচ্ছেদ - মুহরিম ব্যক্তির শিকার করা হতে বিরত থাকবে
২৬৯৯-[৪] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পাঁচটি ক্ষতিকর প্রাণী হিল্ ও হারাম (সর্বস্থানে) যে কোন স্থানেই হত্যা করা যেতে পারে। সেগুলো হলো সাপ, (সাদা কালো) কাক, ইঁদুর, হিংস্র কুকুর ও চিল। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ الْمُحْرِمِ يَجْتَنِبُ الصَّيْدَ
وَعَنْ عَائِشَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: خَمْسٌ فَوَاسِقُ يُقْتَلْنَ فِي الْحِلِّ وَالْحَرَمِ: الْحَيَّةُ وَالْغُرَابُ الْأَبْقَعُ وَالْفَأْرَةُ وَالْكَلْبُ الْعَقُورُ وَالْحُدَيَّا
ব্যাখ্যা: حِلِّ (হিল্): এর অর্থ কয়েকটি- হালাল, মক্কার আশেপাশের সম্মানিত স্থান ব্যতীত অন্য জায়গাকে বলা হয়, ইহরাম থেকে বের হওয়ার সময়, কোন স্থানে অবতরণকারীকেও হিল্ করা হয়।
(حَرَمِ) হারামঃ এর অর্থ প্রত্যেক ঐ বস্ত্ত যার সংরক্ষণ করা হয়। নিষিদ্ধ, পবিত্র, পবিত্র স্থান, হেরেম, ক্যাম্পাস, যার দিক থেকে প্রতিরোধ করা হয়।
(خَمْسٌ فَوَاسِقُ) ‘‘পাঁচ প্রকার ক্ষতিকর প্রাণী।’’ পাঁচ প্রকার প্রাণীকে ফাসিক্ব বলার কারণ এই যে, অন্যান্য প্রাণীর হুকুম থেকে এ প্রাণীগুলোর হুকুম পৃথক। অর্থাৎ- অন্যান্য প্রাণী হত্যা করা হারাম, আর এগুলো হত্যা করা বৈধ অথবা এগুলো খাওয়া হারাম, অথবা এগুলো অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় ক্ষতিকারক, এর মধ্যে কোন উপকার নেই। পক্ষান্তরে অন্যান্য প্রাণী উপকারী।
‘আল্লামা তুরবিশতী বলেনঃ প্রাণীকুলের মধ্য থেকে এ পাঁচ প্রকার ক্ষতিকর প্রাণীকে অন্যান্য প্রাণী হতে পৃথক হুকুম দেয়ার কারণ এই যে, এর অপকারিতা সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা অবহিত অথবা এগুলো অন্যান্য প্রাণীর তুলনার মানুষের জন্য অধিক ও দ্রুত ক্ষতিকর। এ হাদীস দ্বারা প্রমাণ পেশ করা হয় যে, কোন হত্যাকারী হত্যা করার পর হেরেমে আশ্রয় গ্রহণ করলে তাকে হত্যা করা বৈধ। কেননা এ প্রাণী হত্যা করা বৈধ হওয়ার কারণ হলো এগুলো ফাসিক। আর হত্যাকারীও ফাসিক্ব, তাই ঐ প্রাণীগুলোর মতো হত্যাকারীকেও হেরেমে হত্যা করা বৈধ।
পরিচ্ছেদঃ ১২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মুহরিম ব্যক্তির শিকার করা হতে বিরত থাকবে
২৭০০-[৫] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শিকারের মাংস (গোসত/মাংস) ইহরাম অবস্থায়ও তোমাদের জন্য হালাল। যদি না তোমরা নিজেরা তা শিকার করো অথবা তোমাদের জন্য শিকার করা হয়ে থাকে। (আবূ দাঊদ, তিরমিযী ও নাসায়ী)[1]
عَنْ جَابِرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَحْمُ الصَّيْدِ لَكُمْ فِي الْإِحْرَامِ حَلَالٌ مَا لَمْ تَصِيدُوهُ أَوْ يُصَادُ لَكُمْ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالتِّرْمِذِيّ وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: (لَحْمُ الصَّيْدِ لَكُمْ فِى الْإِحْرَامِ حَلَالٌ) ‘‘শিকারী প্রাণীর গোশ্ত (গোসত/গোশত) তোমাদের জন্য ইহরাম অবস্থায়ও হালাল।’’ অর্থাৎ- শিকারী প্রাণী মুহরিম ব্যক্তির কোন নির্দেশ ইশারা-ইঙ্গিত ও সহযোগিতা ব্যতীত ইহরামবিহীন ব্যক্তি যাবাহ করলে বা শিকার করলে তা মুহরিম ব্যক্তির জন্য খাওয়া বৈধ।
(أَوْ يُصَادُ لَكُمْ) ‘‘অথবা তোমাদের জন্য শিকার না করা হয়।’’ অর্থাৎ- শিকারী প্রাণী যদি মুহরিম ব্যক্তির জন্য শিকার না করা হয় তাহলে তা মুহরিম ব্যক্তির জন্য খাওয়া বৈধ।
এ হাদীসটি তাদের পক্ষে দলীল যারা বলেন, শিকারী প্রাণী যদি মুহরিমের উদ্দেশে শিকার না করা হয় তাহলে তা মুহরিমের জন্য খাওয়া বৈধ। পক্ষান্তরে তা যদি মুহরিমের উদ্দেশে শিকার করা হয় তাহলে তা মুহরিমের জন্য খাওয়া বৈধ নয়। ইমাম মালিক, ইমাম শাফি‘ঈ ও জমহূর ‘আলিমদের অভিমত এটিই।
‘আল্লামা শানক্বীত্বী বলেনঃ দলীল অনুযায়ী এ অভিমতটিই উত্তম। আর তা দু’টি কারণে।
(ক) ভিন্নমুখী দলীলের মধ্যে যথাসম্ভব সমন্বয় করা ওয়াজিব। কেননা কোন দলীল পরিত্যাগ করার চাইতে দু’ বিপরীতমুখী দলীলের মধ্যে সমন্বয় করা উত্তম। উপরে বর্ণিত অভিমত ব্যতীত সমন্বয় সম্ভব নয়। অতএব এ অভিমতটিই উত্তম।
(খ) জাবির (রাঃ) বর্ণিত অত্র হাদীস। ইমাম শাওকানী বলেনঃ হাদীস সুস্পষ্টভাবে পার্থক্য করেছে যে, যা মুহরিম স্বয়ং শিকার করে অথবা তার জন্য শিকার করা হয় আর যা মুহরিম স্বয়ং শিকার করেনি অথবা তার জন্য শিকার করা হয়নি- এ দু’ প্রকার প্রাণীর হুকুম ভিন্ন। অতএব যা মুহরিম স্বয়ং শিকার করেনি অথবা তার জন্য শিকার করা হয়নি ঐ শিকারী প্রাণীর গোশ্ত (গোসত/গোশত) মুহরিমের জন্য হালাল। আর মুহরিম যা স্বয়ং শিকার করেছে অথবা অন্য কেউ মুহরিমের উদ্দেশে শিকার করেছে, তা মুহরিমের জন্য হালাল নয়।
পরিচ্ছেদঃ ১২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মুহরিম ব্যক্তির শিকার করা হতে বিরত থাকবে
২৭০১-[৬] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ টিড্ডি (ফড়িং) সমুদ্রের শিকারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। (আবূ দাঊদ ও তিরমিযী)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الْجَرَادُ مِنْ صَيْدِ الْبَحْرِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالتِّرْمِذِيُّ
ব্যাখ্যা: (الْجَرَادُ مِنْ صَيْدِ الْبَحْرِ) ‘‘ফড়িং সামুদ্রিক শিকারী প্রাণীর অন্তর্ভুক্ত।’’
বলা হয়ে থাকে যে, ফড়িং-এর জন্ম মাছ থেকে। যেমন- মাছের পোকার জন্ম হয় তেমনি ফড়িং-ও মাছ থেকেই জন্মে। অতঃপর পানি থেকে সমুদ্র উপকূলে এসে তা ডাঙ্গায় ছড়িয়ে যায়। এতে ফড়িং-এর প্রথম সৃষ্টির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। ‘আল্লামা আল্ বাজী কা‘বা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেনঃ ফড়িং-এর উৎপত্তি মাছের নাসিকা থেকে।
এ হাদীস প্রমাণ করে যে, ফড়িং সামুদ্রিক প্রাণীর অন্তর্ভুক্ত। অতএব সামুদ্রিক প্রাণী শিকার করলে যেমন মুহরিম ব্যক্তির কোন কাফফারাহ দিতে হয় না, অনুরূপ ফড়িং হত্যা করলেও মুহরিম ব্যক্তিকে কোন কাফফারাহ দিতে হবে না।
এ বিষয়ে ‘আলিমদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। ইমাম আবূ হানীফা, ইমাম মালিক ও ইমাম শাফি‘ঈ প্রমুখদের মতানুযায়ী ফড়িং সামুদ্রিক প্রাণী নয় বরং তা স্থলপ্রাণী এবং তা শিকার করলে মুহরিম ব্যক্তিকে কাফফারাহ দিতে হবে। ‘উমার, ‘উসমান ও ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) এবং ‘আত্বা হতেও এ অভিমত বর্ণিত হয়েছে। আর অধিকাংশ ‘উলামাগণেরও অভিমত এটিই।
আবূ সা‘ঈদ আল খুদরী বলেনঃ তা শিকার করলে মুহরিম ব্যক্তিকে কোন কাফফারাহ দিতে হবে না। কা‘ব আহবার এবং ‘উরওয়াহ্ ইবনুয্ যুবায়র হতেও এ অভিমত পাওয়া যায়- আহমাদ ইবনু হাম্বল (রহঃ) হতেও একটি বর্ণনা এরূপ বর্ণিত হয়েছে।
হাফিয ইবনু হাজার (রহঃ) বলেনঃ অত্র হাদীসের সানাদ য‘ঈফ। যদি হাদীসটি সহীহ হত তাহলে তা দলীলযোগ্য হত।
অতএব বিশুদ্ধ মত হলো ফড়িং স্থলপ্রাণী এবং কোন মুহরিম তা শিকার করলে তাকে কাফফারাহ দিতে হবে। এ হাদীস এটিও প্রমাণ করে যে, ফড়িং খাওয়া বৈধ। একাধিক বিজ্ঞ ‘আলিম বর্ণনা করেছেন যে, এ বিষয়ে সকল ‘আলিম ঐকমত্য পোষণ করেন যে, ফড়িং খাওয়া বৈধ।
পরিচ্ছেদঃ ১২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মুহরিম ব্যক্তির শিকার করা হতে বিরত থাকবে
২৭০২-[৭] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ মুহরিম ব্যক্তি হিংস্র প্রাণী হত্যা করতে পারে। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «يَقْتُلُ الْمُحْرِمُ السَّبُعَ الْعَادِيَ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ
ব্যাখ্যা: (السَّبُعَ الْعَادِىَ) ‘‘অত্যাচারী হিংস্র প্রাণী’’। অর্থাৎ- যে প্রাণী মানুষকে আক্রমণ করে ক্ষত-বিক্ষত করে। অতএব যে সকল হিংস্র প্রাণীর মধ্যে এ গুণ পাওয়া যাবে তা মুহরিমের জন্য হত্যা করা বৈধ। এজন্য মুহরিমকে কোন ফিদিয়া দিতে হবে না।
ইমাম তিরমিযী বলেনঃ ‘আলিমগণ এ হাদীসের বক্তব্য অনুযায়ী ‘আমল করে থাকেন। সুফিয়ান সাওরী এবং ইমাম শাফি‘ঈ-এর অভিমতও এটিই। ইমাম শাফি‘ঈ বলেনঃ যে সকল হিংস্র প্রাণী মানুষের ওপর অথবা তাদের গৃহপালিত পশুর ওপর আক্রমণই করে সে সকল প্রাণী মুহরিমের জন্য হত্যা করা বৈধ। ইমাম মালিক, আহমাদ এবং জমহূর ‘উলামাগণের অভিমতও এরূপ।
পরিচ্ছেদঃ ১২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মুহরিম ব্যক্তির শিকার করা হতে বিরত থাকবে
২৭০৩-[৮] ’আবদুর রহমান ইবনু আবূ ’আম্মার (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জাবির ইবনু ’আব্দুল্লাহ আল আনসারী (রাঃ)-কে যবু’ (অর্থাৎ- ধারালো নখ ও হিংস্র দাঁতবিশিষ্ট হায়েনা, বেজি, কাঠবিড়ালী এবং মরু অঞ্চলের হিংস্র প্রাণী) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, এটা শিকারী প্রাণী কিনা? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তবে যবু’ কি খাওয়া যায়? তিনি বললেন, হ্যাঁ। এরপর আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি এটা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে শুনেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। (তিরমিযী, নাসায়ী ও শাফি’ঈ; ইমাম তিরমিযী বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ)[1]
وَعَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِيِ عَمَّارٍ قَالَ: سَأَلت جابرَ بنَ عبدِ اللَّهِ عَنِ الضَّبُعِ أَصَيْدٌ هِيَ؟ فَقَالَ: نَعَمْ فَقُلْتُ: أَيُؤْكَلُ؟ فَقَالَ: نَعَمْ فَقُلْتُ: سَمِعْتُهُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ قَالَ: نَعَمْ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَالنَّسَائِيُّ وَالشَّافِعِيُّ وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ: هَذَا حديثٌ حسنٌ صَحِيح
ব্যাখ্যা: (الضَّبُعُ) ‘‘হায়েনা (গোরখোদা)’’ (أَصَيْدٌ هِىَ) ‘‘তা কি শিকারী পশু’’। অর্থাৎ- মুহরিম তা হত্যা করলে কি ফিদিয়া দিতে হবে? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। তা হত্যা করলে ফিদিয়া দিতে হবে।
আবূ দাঊদ-এর বর্ণনায় আছে- (وَِيُجْعَلُ فِيْهِ كَبْشٌ إِذَا صَادَهُ الْمُحْرِمُ) ‘‘মুহরিম তা শিকার করলে তাকে ফিদিয়া হিসেবে একটি মেষ দিতে হবে।
হাদীসটি সুস্পষ্ট দলীল যে, হায়েনা হত্যাকারী মুহরিমকে ফিদিয়া দিতে হবে। এ বিষয়ে চার ইমামের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। তবে ইমাম মালিক, শাফি‘ঈ ও আহমাদ-এর মতে তাকে একটি মেষ অথবা ছাগল দিতে হবে। পক্ষান্তরে ইমাম আবূ হানীফার মতে তার মূল্য দেয়া ওয়াজিব। হিদায়াতে উল্লেখ আছে যে, ইমাম আবূ হানীফা ও আবূ ইউসুফ-এর মতে যে অঞ্চলে শিকারী প্রাণী হত্যা করা হয় সে এলাকায় সেটার মূল্য নির্ধারণ করতে হবে।
অতএব দু’জন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি সেটার মূল্য নির্ধারণ করবে। অতঃপর ইচ্ছা করলে সে ঐ মূল্য দ্বারা কোন পশু ক্রয় করবে যদি তা দ্বারা পশু ক্রয় করা যায় অথবা খাদ্য-দ্রব্য ক্রয় করে তা সাদাকা করবে অথবা তিনদিন সওম পালন করবে।
(أَيُؤْكَلُ) ‘‘তা কি খাওয়া যাবে?’’ তিরমিযী’র বর্ণনায় আছে- (قلت: آكلها؟) ‘‘আমি জিজ্ঞেস করলাম আমি কি তা খাবো?’’ (قال : نعم) ‘‘তিনি বললেনঃ হ্যাঁ’’।
অত্র হাদীসে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, হায়েনা খাওয়া হালাল। ইমাম শাফি‘ঈ ও ইমাম আহমাদ-এর অভিমত এটাই। ইমাম শাফি‘ঈ বলেনঃ লোকেরা তা খেতো এবং কোন প্রকার বাধা ব্যতীত সাফা-মারওয়ার মাঝে তা বেচাকেনা করত ‘আরবদের নিকট তা পছন্দনীয়।
পক্ষান্তরে ইমাম আবূ হানীফা ও ইমাম মালিক-এর মতে তা হারাম। তাদের দলীল সে হাদীস যাতে আছে যে, প্রত্যেক কর্তন দাঁতওয়ালা হিংস্র প্রাণী হারাম এবং খুযায়মাহ্ ইবনু জায বর্ণিত (২৭৩০ নং) হাদীস। ইমাম শাওকানী প্রতিপক্ষের দ্বিতীয় মতের প্রথম হাদীসের জওয়াবে বলেন যে, জাবির (রাঃ) বর্ণিত হাদীসটি খাস এবং তাদের উত্থাপিত (كل ذي ناب) হাদীসটি ‘আম্।
অতএব খাস হাদীসটি ‘আম্ হাদীসের উপর প্রাধান্য পাবে। তাদের দ্বিতীয় দলীল খুযায়মাহ্ ইবনু জায বর্ণিত হাদীসটি য‘ঈফ। কেননা তার একজন রাবী ‘আবদুল কারীম ইবনু আবিল মুখারিক্ব। যিনি সর্বসম্মতিক্রমে য‘ঈফ। অতএব উক্ত হাদীসটি দলীলযোগ্য নয়।
পরিচ্ছেদঃ ১২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মুহরিম ব্যক্তির শিকার করা হতে বিরত থাকবে
২৭০৪-[৯] জারির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে যবু’ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম (তা শিকারের অন্তর্গত প্রাণী কিনা)। তিনি বললেন, তা শিকার (জাতীয় প্রাণী)। তাই মুহরিম যবু’ শিকার করলে ক্ষতিপূরণে (কাফফারাহ হিসেবে) একটি দুম্বা দিতে হবে। (আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ ও দারিমী)[1]
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: سَأَلَتْ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الضَّبُعِ؟ قَالَ: «هُوَ صَيْدٌ وَيُجْعَلُ فِيهِ كَبْشًا إِذَا أَصَابَهُ الْمُحْرِمُ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَابْن مَاجَه والدارمي
ব্যাখ্যা: (وَيُجْعَلُ فِيهِ كَبْشًا) ‘‘তাতে একটি মেষ (দুম্বা) দিতে হবে’’। (إِذَا أَصَابَهُ الْمُحْرِمُ) ‘‘যদি মুহরিম ব্যক্তি তা শিকার করে।’’
হাদীসের এ অংশ প্রমাণ করে যে, মুহরিম ব্যক্তির জন্য আল্লাহ তা‘আলা সে শিকারী প্রাণী হত্যা করতে নিষেধ করেছেন যে শিকারী প্রাণী খাওয়া হালাল। আর মুহরিম তো শুধুমাত্র খাওয়ার উদ্দেশেই তা হত্যা করতে পারে অযথা হত্যা করতে যাবে না।
পরিচ্ছেদঃ ১২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মুহরিম ব্যক্তির শিকার করা হতে বিরত থাকবে
২৭০৫-[১০] খুযায়মাহ্ ইবনু জাযী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে যবু’ (খাওয়ার ব্যাপারে) জিজ্ঞেস করলাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, যবু’ কি কেউ খায়? তারপর আমি নেকড়ে বাঘ খাওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, যার মধ্যে কল্যাণ আছে এমন কেউ কি নেকড়ে খায়? (তিরমিযী; তিনি বলেন, হাদীসটির সানাদ দুর্বল)[1]
وَعَن خُزَيمةَ بنَ جَزَيّ قَالَ: سَأَلَتْ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ أَكْلِ الضَّبُعِ. قَالَ: أَوَ يَأْكُلُ الضَّبُعَ أَحَدٌ؟ . وَسَأَلْتُهُ عَنْ أَكْلِ الذِّئْبِ. قَالَ: «أوَ يَأَكلُ الذِّئْبَ أَحَدٌ فِيهِ خَيْرٌ؟» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: لَيْسَ إِسْنَاده بِالْقَوِيّ
ব্যাখ্যা: (أَوَ يَأْكُلُ الضَّبُعَ أَحَدٌ؟) ‘‘কেউ কি হায়েনা খায়?’’ এখানে প্রশ্নবোধক অব্যয়টি অস্বীকার করার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ইবনু মাজাহ্-এর বর্ণনায় আছে, (ومن يأكل الضبع؟) এমন কোন ব্যক্তি আছে, যে হায়েনা খায়? ‘আল্লামা সিন্দী বলেনঃ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বক্তব্য এ কথা ইঙ্গিত করে যে, মানুষ স্বভাবগতভাবেই তা অপছন্দ করে থাকে।
(أوَ يَأَكلُ الذِّئْبَ أَحَدٌ فِيهِ خَيْرٌ؟) ‘‘যার মধ্যে কল্যাণ আছে এমন কেউ কি নেকড়ে খায়?’’ এখানে خَيْرٌ শব্দটি أَحَدٌ -এর গুণ বুঝানো হয়েছে, যার অর্থ তাক্বওয়া অর্থাৎ- আল্লাহ ভীতি। যারা হায়েনা খাওয়া হারাম বলে থাকেন তারা এ হাদীসটিকে দলীল হিসেবে উপস্থাপন করে থাকেন। কিন্তু হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণে তা দলীলযোগ্য নয়।
পরিচ্ছেদঃ ১২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - মুহরিম ব্যক্তির শিকার করা হতে বিরত থাকবে
২৭০৬-[১১] ’আবদুর রহমান ইবনু ’উসমান আত্ তায়মী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমরা (আমার চাচা) তলহা ইবনু ’উবায়দুল্লাহ-এর সাথে ছিলাম। আমরা সকলেই ইহরাম অবস্থায় ছিলাম। এ সময় তাঁকে পাখী হাদিয়্যাহ্ দেয়া হল। তখন তিনি (তলহা) ঘুমে ছিলেন। আমাদের কেউ কেউ তার মাংস (গোসত/মাংস) খেলেন, আবার কেউ কেউ খাওয়া থেকে বিরত থাকলেন। তলহা ঘুম থেকে যখন জেগে উঠলেন তখন যারা মাংস (গোসত/মাংস) খেলেন তাদের সমর্থন দিলেন এবং বললেন, আমরা এটা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে খেয়েছি। (মুসলিম)[1]
عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عُثْمَانَ التَّيْمِيِّ قَالَ: كنَّا مَعَ طَلحةَ بنِ عُبيدِ اللَّهِ وَنَحْنُ حُرُمٌ فَأُهْدِيَ لَهُ طَيْرٌ وَطَلْحَةُ رَاقِدٌ فَمِنَّا مَنْ أَكَلَ وَمِنَّا مَنْ تَوَرَّعَ فَلَمَّا اسْتَيْقَظَ طَلْحَةُ وَافَقَ مَنْ أَكَلَهُ قَالَ: فَأَكَلْنَاهُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: (وَافَقَ مَنْ أَكَلَه) ‘‘যারা তা খেয়েছিল তিনি (ত্বলহা) তাদের সমর্থন করলেন’’। অর্থাৎ- যে মুহরিম ব্যক্তি ঐ শিকারকৃত পাখীর গোশত (গোসত/গোশত) খেয়েছিল। তিনি কথা অথবা কাজের মাধ্যমে তাদের উক্ত কাজকে সমর্থন করলেন।
(فَأَكَلْنَاهُ مَعَ رَسُولِ اللّٰهِ ﷺ) ‘‘আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে তা খেয়েছি।’’ অর্থাৎ- নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে আমরা এরূপ পাখীর গোশ্ত (গোসত/গোশত) হাদিয়্যাহ্ দেয়া হলে তা আমরা খেয়েছি।
যারা বলেন শিকারী ব্যক্তি মুহরিমের জন্য শিকার করুক বা নিজের জন্যই শিকার করুক মুহরিমকে তা থেকে হাদিয়্যাহ্ দিলে তিনি তা খেতে পারবেন- এ হাদীসটি তাদের দলীল। তবে তিন ইমামের (মালিক, শাফি‘ঈ ও আহমাদ) মতে যে ব্যক্তি নিজের জন্য পাখী শিকার করার পর তা থেকে মুহরিমকে হাদিয়্যাহ্ স্বরূপ দান করলে তা মুহরিমের জন্য খাওয়া বৈধ।
ইমাম শাওকানী বলেন, অবশ্যই এ হাদীসের অর্থ হবে যাকে হাদিয়্যাহ্ দেয়া হলো শিকারী ব্যক্তি সেটা তার জন্য শিকার করেননি বরং নিজের জন্য শিকার করার পর তা থেকে মুহরিমকে হাদিয়্যাহ্ দিয়েছিল। যাতে দু’ ধরনের হাদীসের সমন্বয় ঘটে।
পরিচ্ছেদঃ ১৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং হজ্জ ছুটে যাওয়া
(الْإِحْصَارِ) ’’ইহসা-র’’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো আবদ্ধ রাখা ও বাধা দেয়া। ইসলামী শারী’আতের পরিভাষায় কাবা ঘরের তাওয়াফ ও ’আরাফাতে অবস্থান করতে বাধা প্রদানকে إِحْصَارِ বলে। যদি কোন ব্যক্তি তাওয়াফ এবং ’আরাফাতে অবস্থান এ দু’টি কাজের কোন একটি কাজ করতে সমর্থ হয় তবে তিনি মুহসার তথা বাধাপ্রাপ্ত নন।
(فوت الحج) হজ্জ/হজ ছুটে যাওয়া।
কোন ধরনের বাধাকে(إِحْصَارِ) বলা হবে- এ সম্পর্কে তিনটি অভিমত পাওয়া যায়।
(১) ’ইহসা-র’ দ্বারা উদ্দেশ্য শত্রু দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হওয়া। এ মতের প্রবক্তা ইবনু ’আব্বাস, ইবনু ’উমার, আনাস, ইবনুয্ যুবায়র (রাঃ) সা’ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব, সা’ঈদ ইবনু জুবায়র (রহঃ) প্রমুখ এ অভিমত গ্রহণ করেছেন মারওয়ান, ইসহাক প্রসিদ্ধ মতানুযায়ী আহমাদ ইবনু হাম্বল। ইমাম মালিক ও ইমাম শাফি’ঈর মাযহাব এটাই। এ অভিমত অনুযায়ী কোন ব্যক্তি ইহরাম বাধার পর অসুস্থ হয়ে পড়লে তার জন্য হালাল হওয়া বৈধ নয়। এ মতের পক্ষে দলীলঃ
(ক) আল্লাহ তা’আলার বাণী-فَإِنْ أُحْصِرْتُمْ فَمَا اسْتَيْسَرَ مِنَ الْهَدْيِ ’’কিন্তু যদি তোমরা বাধাগ্রস্ত হও, তবে যা সম্ভব কুরবানী দিবে’’- (সূরা আল বাক্বারাহ্ ২ : ১৯৬)। এ আয়াতটি তখন নাযিল হয়েছে যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সহচরবৃন্দ হুদায়বিয়াতে মুশরিকদের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। আর উসূলবিদগণের নিকট এটি সর্বসম্মতিক্রমে সাব্যস্ত যে, যে কারণে আয়াত নাযিল হয়েছে ঐ বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে হুকুমের অন্তর্ভুক্ত, কোন বিশেষ কারণ দ্বারা ঐ বিষয়টি ঐ হুকুম থেকে বের করা যায় না।
(খ) বিভিন্ন আসার দ্বারা সাব্যস্ত আছে যে, অসুস্থতার কারণে তাওয়াফ ও সা’ঈ ব্যতীত হালাল হওয়া যায় না। অতএব বুঝা গেল যে, ইহসার দ্বারা শত্রু কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হওয়াই উদ্দেশ্য।
(২) ইহসা-র দ্বারা উদ্দেশ্য যে কোন ধরনের বাধা, তা শত্রু কর্তৃক বাধাই হোক অথবা অসুস্থতার কারণে বা অনুরূপ কোন কারণে বাধাপ্রাপ্ত হোক। এ অভিমতের প্রবক্তা হলেন ইবনু মাস্’ঊদ, মুজাহিদ, ’আত্বা, কাতাদা ’উরওয়া ইবনুয্ যুবায়র ইব্রাহীম নাখ্’ঈ, আলক্বমাহ্, সাওরী, হাসান বাসরী, আবূ সাওর ও দাঊদ প্রমুখ ’উলামাগণ। ইমাম আবূ হানীফার অভিমত এটিই।
এ অভিমতের দলীলঃ
(ক) পূর্বে বর্ণিত আয়াত যা দ্বারা শত্রু কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত আছে।
(খ) অসুস্থতা একটি বাধা, তার দলীল- আহমাদ, সুনান আরবা’আহ্, ইবনু খুযায়মাহ্, হাকিম, বায়হাক্বী প্রভৃতি গ্রন্থে হাজ্জাজ ইবনু ’আমর আল আনসারী বর্ণিত হাদীস। তিনি বলেনঃ আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যার হাড় ভেঙ্গে যায় অথবা লেংড়া হয়ে যায় সে হালাল হয়ে যাবে এবং তাকে আবার পুনরায় হজ্জ/হজ করতে হবে। ’ইকরিমাহ্ (রহঃ) বলেনঃ বিষয়টি আমি ইবনু ’আব্বাস ও আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) এর নিকট উপস্থাপন করলে তারা উভয়ে বলেনঃ তিনি সত্য বলেছেন।
প্রথমপক্ষ হাজ্জাজ ইবনু ’আমর (রাঃ) বর্ণিত হাদীসের দু’টি জবাব দিয়েছেনঃ
(ক) অত্র হাদীসে হালাল হওয়া দ্বারা উদ্দেশ্য অসুস্থতা ব্যতীত অন্য কোন কারণে হজ্জ/হজ ছুটে গেলে যেভাবে হালাল হতে হয় এখানেও সেভাবেই হালাল হতে হবে।
(খ) কেউ যদি ইহরামের সময় শর্ত করে যে, যেখানেই সে বাধাপ্রাপ্ত সেখানেই সে হালাল হবে, অনুরূপ অত্র হাদীসে হালাল দ্বারা উদ্দেশ্য শর্তযুক্ত ইহরাম থেকে হালাল হওয়া।
(৩) তৃতীয় অভিমতঃ ইহসার দ্বারা উদ্দেশ্য শুধুমাত্র অসুস্থ হওয়ার কারণে বাধা প্রাপ্ত হওয়া, অন্য কোন ওযর দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত উদ্দেশ্য নয়। অধিকাংশ ভাষাবিদগণের অভিমত এটাই।
এদের মতে শত্রু দ্বারা বাধাপ্রাপ্তের হুকুম অসুস্থতার দ্বারা বাধাপ্রাপ্তের হুকুমের সাথে সংযুক্ত।
’আল্লামা শানক্বীত্বী বলেনঃ আমাদের মতে দলীলের ভিত্তিতে ইমাম মালিক, শাফি’ঈ ও আহমাদ ইবনু হাম্বল-এর প্রসিদ্ধ বর্ণনাটিই সঠিক।
২৭০৭-[১] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (৬ষ্ঠ হিজরীতে কুরায়শদের দ্বারা ’উমরা করতে গিয়ে) বাধাপ্রাপ্ত হলেন। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মাথা মুণ্ডন করলেন, স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা করলেন এবং কুরবানীর পশু যাবাহ করলেন। অতঃপর পরবর্তী বছর (কাযা হিসেবে) ’উমরা আদায় করলেন। (বুখারী)[1]
بَابُ الْإِحْصَارِ وَفَوْتِ الْحَجِّ
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَدْ أُحْصِرَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَحَلَقَ رَأَسَهُ وَجَامَعَ نِسَاءَهُ وَنَحَرَ هَدْيَهُ حَتَّى اعْتَمَرَ عَامًا قَابلا. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: (جَامَعَ نِسَاءَه) ‘‘তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার স্ত্রীদের সাথে সহবাস করলেন’’। অর্থাৎ- কুরবানীর পশু যাবাহ করা ও মাথা মুন্ডনের মাধ্যমে পূর্ণ হালাল হওয়ার পর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার স্ত্রীদের সাথে সহবাস করেছেন।
নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুদায়বিয়ার বৎসর ‘উমরা পালনে বাধাগ্রস্থ হয়ে তাঁর কুরবানীর পশু হেরেমের মধ্যে যাবাহ করেছিলেন না-কি হেরেমের বাইরে যাবাহ করেছিলেন- এ নিয়ে ‘উলামাগণের মাঝে মতভেদ রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলার বাণীঃ ‘‘কুরবানীর পশু যাবাহ করার নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছতে অপেক্ষমাণ’’- এ আয়াত দ্বারা বুঝা যায় যে, তিনি হেরেমের বাইরে কুরবানীর পশু যাবাহ করেছিলেন। বাধাপ্রাপ্ত ব্যক্তির কুরবানীর পশু যাবাহ করার স্থান কোনটি এ ব্যাপারে অনেক বক্তব্য রয়েছে।
(১) বাধাপ্রাপ্ত ব্যক্তি যেখানে হালাল হবে সেখানেই কুরবানীর পশু যাবাহ করবে। জমহূর ‘উলামাগণের অভিমত এটি।।
(২) হেরেমের বাইরে কুরবানীর পশু যাবাহ করা যাবে না। হানাফীদের অভিমত এটাই।
(৩) কুরবানীর পশু যদি হেরেমে পৌঁছানো সম্ভব হয় তাহলে তা সেখানে পৌঁছানো ওয়াজিব এবং তা নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছাবার পূর্বে হালাল হওয়া বৈধ নয়। আর তা সম্ভব না হলে যেখানে বাধাপ্রাপ্ত হবে সেখানেই যাবাহ করে হালাল হয়ে যাবে।
(حَتّٰى اِعْتَمَرَ عَامًا قَابِلًا) ‘‘পরবর্তী বৎসর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ‘উমরা করলেন।’’ অর্থাৎ- কুরায়শদের সাথে সন্ধি চুক্তি অনুযায়ী তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পরবর্তী বৎসর ‘উমরা করলেন।
এ হাদীস দ্বারা দলীল প্রদান করা হয় যে, বাধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে কাযা ‘উমরা করতে হবে। কিন্তু এ হাদীসে কাযা ‘উমরা করার দলীল নেই। কেননা অত্র হাদীসে সংঘটিত ঘটনার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। কেননা পরবর্তী বৎসর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ‘উমরা করেন তখন হুদায়বিয়ার বৎসর যে সকল সাহাবী নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে হালাল হয়েছিলেন তাদের অনেকেই এ ‘উমরাতে অংশগ্রহণ করেননি। তাদের কোন ওযরও ছিল না। কাযা ‘উমরা করা যদি ওয়াজিব হত তাহলে অবশ্যই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে তা পালন করতে আদেশ করতেন। অথচ তিনি তা করেননি। তবে যদি কোন ব্যক্তি ওয়াজিব হজ্জ/হজ ও ‘উমরা পালন করতে গিয়ে বাধাপ্রাপ্ত হন তাহলে তাকে অবশ্যই তা কাযা করতে হবে। এ বিষয়ে কোন মতভেদ নেই।
অতএব ‘উমরা পালনকারী ব্যক্তি বাধাপ্রাপ্ত হলে তিনি হালাল হয়ে যাবে। আর বাধাপ্রাপ্ত হয়ে হালাল হওয়া শুধুমাত্র হজ্জের জন্য খাস নয়। যেমনটি ইমাম মালিক মনে করে থাকেন।
পরিচ্ছেদঃ ১৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং হজ্জ ছুটে যাওয়া
২৭০৮-[২] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে (’উমরা করতে) বের হলাম। কুরায়শ কাফিররা আমাদের ও বায়তুল্লাহর মধ্যে (হুদায়বিয়ায়) প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ালো। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে নিজের কুরবানীর পশুগুলো যাবাহ করলেন, মাথা মুণ্ডন করলেন এবং তাঁর সাথীগণ মাথার চুল ছাটলেন। (বুখারী)[1]
بَابُ الْإِحْصَارِ وَفَوْتِ الْحَجِّ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ قَالَ: خَرَجْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَحَالَ كَفَّارُ قُرَيْشٍ دُونَ الْبَيْتِ فَنَحَرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ هَدَايَاهُ وَحَلَقَ وَقَصَّرَ أَصْحَابه. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: (فَنَحَرَ النَّبِىُّ ﷺ هَدَايَاهُ وَحَلَقَ) ‘‘নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কুরবানীর পশুসমূহ যাবাহ করলেন এবং স্বীয় মাথা মুন্ডালেন।’’ অর্থাৎ- নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুদায়বিয়াতে বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার পর তিনি সেখানেই কুরবানীর পশু যাবাহ করার পর স্বীয় মাথা মুণ্ডন করে ইহরাম থেকে হালাল হয়ে গেলেন।
মুহসার তথা হজ্জ/হজ অথবা ‘উমরার ইহরাম বাঁধার পর বাধাপ্রাপ্ত হলে কুরবানীর পশু যাবাহ করার পর মাথা মুন্ডানো অথবা চুল ছেঁটে ফেলা ওয়াজিব কি-না এ বিষয়ে ‘আলিমদের মাঝে ভিন্ন মত রয়েছে।
(ক) শাফি‘ঈ-এর মতে মাথা নেড়ে করা অথবা চুল ছেঁটে ফেলা ওয়াজিব। কেননা মাথা নেড়ে করা অথবা চুল ছেঁটে ফেলাও ‘ইবাদাত। ইমাম আবূ ইউসুফ এবং আহমাদ ইবনু হাম্বল থেকেও একটি বর্ণনা এরূপ পরিলক্ষিত হয়।
(খ) ইমাম আহমাদ-এর প্রসিদ্ধ মত হলো তা ওয়াজিব নয়। ইমাম আবূ হানীফা এবং মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান- এ মতের প্রবক্তা, মালিকীদের অভিমত এটাই।
ইমাম নাবাবী তাঁর মানাসিক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, তিনটি কাজের মাধ্যমে ইহরাম থেকে হালাল হওয়া অর্জিত হয়।
(ক) পশু যাবাহ করা,
(খ) হালাল হওয়ার নিয়্যাত করা,
(গ) মাথা নেড়ে করা অথবা চুল ছেঁটে ফেলা।
পরিচ্ছেদঃ ১৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং হজ্জ ছুটে যাওয়া
২৭০৯-[৩] মিস্ওয়ার ইবনু মাখরামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথা মুন্ডনের আগে পশু যাবাহ করেছেন এবং এভাবে করার জন্য সাহাবীগণকে আদেশ করেছেন। (বুখারী)[1]
بَابُ الْإِحْصَارِ وَفَوْتِ الْحَجِّ
وَعَنِ الْمِسْوَرِ بْنِ مَخْرَمَةَ قَالَ: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَحَرَ قَبْلَ أَنْ يَحْلِقَ وَأَمَرَ أَصْحَابَهُ بِذَلِكَ. رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ
ব্যাখ্যা: (إِنَّ رَسُوْلَ اللّٰهِ ﷺ نَحَرَ قَبْلَ أَنْ يَحْلِقَ) অর্থাৎ- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে কুরবানীর পশু যাবাহ করেছেন, এরপর মাথা নেড়ে করেছেন এবং তার সঙ্গীদেরকেও এ আদেশ দিয়েছেন। হাদীসের এ অংশ প্রমাণ করে যে, প্রথমে কুরবানীর পশু যাবাহ করবে, এরপর মাথা নেড়ে করবে। পূর্বে আলোচিত হয়েছে যে, প্রথমে মাথা নেড়ে করবে এরপর কুরবানী করবে।
অতএব অত্র হাদীসের জবাবে বলা হয়েছে যে, মিস্ওয়ার (রাঃ) বর্ণিত এ হাদীসটিতে হুদায়বিয়ার বৎসরে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কর্মের বিবরণ বর্ণিত হয়েছে যখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বাধাপ্রাপ্ত হয়ে কুরবানীর পশু যাবাহ করার পর মাথা নেড়ে করেছিলেন। অতএব এ বিধান বাধাপ্রাপ্ত ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য।
ইমাম শাওকানী বলেনঃ এ হাদীসে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, বাধাপ্রাপ্ত ব্যক্তি প্রথমে কুরবানীর পশু যাবাহ করবে এরপর মাথা নেড়ে করবে। অতএব বাধাপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি কুরবানীর পশু যাবাহ করার পূর্বে মাথা নেড়ে করে তাহলে তাকে দম দিতে হবে। অর্থাৎ- কাফফারাহ স্বরূপ একটি পশু যাবাহ করতে হবে। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকেও অনুরূপ বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে প্রকাশমান দলীল হলো তা ওয়াজিব হবে না, বরং তা সুন্নাত।
ইমাম মালিক (রহঃ)-এর মতে বাধাপ্রাপ্ত ব্যক্তির ওপর কুরবানী করা ওয়াজিব নয়। তবে অত্র হাদীস তার বিপক্ষে দলীল।
পরিচ্ছেদঃ ১৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং হজ্জ ছুটে যাওয়া
২৭১০-[৪] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তোমাদের জন্য রসূলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাত কি যথেষ্ট নয়? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, যদি তোমাদের কাউকে (’আরাফার অবস্থান হতে) হজে আটকে রাখা হয় তবে সে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ ও সাফা মারওয়ায় সা’ঈ করবে। অতঃপর আগামী বছরে হজ্জ/হজ করা পর্যন্ত সব জিনিস হতে হালাল হয়ে যাবে। (সা’ঈর পর) সে কুরবানীর পশু যাবাহ করবে অথবা যদি কুরবানীর পশু না পায় তবে সিয়াম পালন করবে। (বুখারী)[1]
بَابُ الْإِحْصَارِ وَفَوْتِ الْحَجِّ
وَعَن ابنِ عمَرَ أَنَّهُ قَالَ: أَلَيْسَ حَسْبُكُمْ سُنَّةِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ إِنْ حُبِسَ أَحَدُكُمْ عَنِ الْحَجِّ طَافَ بِالْبَيْتِ وَبِالصَّفَا وَالْمَرْوَةِ ثُمَّ حَلَّ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ حَتَّى يَحُجَّ عَامًا قَابِلًا فَيَهْدِيَ أَوْ يَصُومَ إِنْ لَمْ يَجِدْ هَديا. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: (أَلَيْسَ حَسْبُكُمْ سُنَّةِ رَسُولِ اللّٰهِ ﷺ؟) ‘‘তোমাদের জন্য কি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতই যথেষ্ট নয়।’’ এর দ্বারা ইবনু ‘উমার (রাঃ)-এর উদ্দেশ্য হলো বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ইহরাম থেকে হালাল হওয়ার জন্য ইহরাম বাঁধার সময় শর্ত করা জরুরী নয়। কেননা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুদায়বিয়াতে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ইহরাম থেকে হালাল হয়েছিলেন অথচ তিনি ইহরাম বাঁধার সময় এ শর্ত করেননি যে, আমি যদি বাধাপ্রাপ্ত হই তাহলে সেখানেই হালাল হব।
ইমাম বায়হাক্বী বলেনঃ ইবনু ‘উমার যদি যুবা‘আহ্ বর্ণিত হাদীস জানতে পারতেন তাহলে ইহরাম বাধার সময় শর্তারোপ করার বিষয় অস্বীকার করতেন না।
ثم حل) أي بالحلق والذبح (من كل شيء)) অতঃপর সবকিছু থেকেই হালাল হয়ে যাবে। মাথা মুড়িয়ে ও কুরবানীর পশু যাবাহ করে ইহরাম অবস্থায় হারামকৃত সকল বিষয় থেকে হালাল হয়ে যাবে।
(فَيَهْدِىَ) ‘‘অতঃপর একটি ছাগল যাবাহ করবে।’’ কেননা হালাল হওয়ার নিয়্যাত এবং কুরবানীর পশু যাবাহ করা ও মাথা মুড়ানো ছাড়া হালাল হওয়া যায় না।
(أَوْ يَصُوْمَ إِنْ لَمْ يَجِدْ هَدْيًا) ‘‘পশু যাবাহ করতে সামর্থ্য না হলে সিয়াম পালন করবে।’’ এ সিয়াম সফররত অবস্থায় করা যাবে। সফর থেকে ফিরে বাড়ীতে এসেও করা যাবে।
(حَتّٰى يَحُجَّ عَامًا قَابِلًا) ‘‘পরবর্তী বৎসর পুনরায় হজ্জ/হজ করবে।’’ হাদীসের এ অংশ দ্বারা প্রমাণ পেশ করা হয় যে, বাধাপ্রাপ্ত হয়ে হালাল হলে তার জন্য পুনরায় হজ্জ/হজ করা ওয়াজিব। এ বিষয়ে ‘আলিমদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। হানাফীদের মতে কাযা করা ওয়াজিব। অত্র হাদীস তাদের দলীল।
শাফি‘ঈ ও মালিকীদের মতে তা ওয়াজিব নয়। তবে এ হজ্জ/হজ যদি ফরয হজ্জ/হজ হয়ে থাকে তাহলে তার ওপর ফরয হজ্জ/হজ পূর্বের অবস্থায়ই থাকবে। অর্থাৎ- তাকে অবশ্যই ফরয হজ্জ/হজ পুনরায় সম্পাদন করতে হবে। আর এটিই সঠিক।
পরিচ্ছেদঃ ১৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং হজ্জ ছুটে যাওয়া
২৭১১-[৫] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার রসূলুলাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (আপন চাচাতো বোন) যুবা’আহ্ বিনতুয্ যুবায়র-এর নিকট এসে বললেন, মনে হয় তুমি হজ্জ/হজ পালনের ইচ্ছা পোষণ করো। তিনি (যুবা’আহ্) বললেন, আল্লাহর কসম! (হ্যাঁ, কিন্তু) আমি তো অধিকাংশ সময় অসুস্থ হয়ে পড়ি। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে বললেন, হজের নিয়্যাত করে ফেলো এবং শর্ত করে বলো, হে আল্লাহ! তুমি আমাকে (অসুখের কারণে) যেখানেই আটকে ফেলবে সেখানেই আমি হালাল হয়ে যাবো। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْإِحْصَارِ وَفَوْتِ الْحَجِّ
وَعَنْ عَائِشَةَ. قَالَتْ: دَخَلَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى ضُبَاعَةَ بِنْتِ الزُّبَيْرِ فَقَالَ لَهَا: «لَعَلَّكِ أَرَدْتِ الْحَجَّ؟» قَالَتْ: وَاللَّهِ مَا أَجِدُنِي إِلَّا وَجِعَةً. فَقَالَ لَهَا: حُجِّي وَاشْتَرِطِي وَقُولِي: اللَّهُمَّ مَحِلِّي حَيْثُ حبستني
ব্যাখ্যা: (حُجِّىْ وَاشْتَرِطِىْ وَقُوْلِىْ: اَللّٰهُمَّ مَحِلِّىْ حَيْثُ حَبَسْتَنِىْ) ‘‘তুমি হজ্জের ইহরাম বাঁধো এবং শর্তারোপ করো আর বলো যে, আমি সেখানেই হালাল হব যেখানে আমাকে অসুস্থতা বাধা প্রদান করে।’’ ‘আল্লামা ‘আয়নী বলেনঃ এর অর্থ হলো তুমি যেখানেই হজ্জের কার্যাবলী সম্পাদন করতে অপারগ হবে এবং তা করতে বাধাপ্রাপ্ত হবে অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ার কারণে সেখানেই তুমি হালাল হয়ে যাবে।
যারা মনে করেন অসুস্থতা দ্বারা (মুহসার হয় না) হজ্জ/হজ সম্পাদনের ক্ষেত্রে বাধাপ্রাপ্ত হয় না তারা এ হাদীস দলীল হিসেবে পেশ করে বলেন যে, অসুস্থতা যদি বাধা হত তাহলে শর্ত করার কোন প্রয়োজন ছিল না এবং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে শর্তারোপ করতে বলতেন না। ইমাম শাফি‘ঈ ও তার সমর্থকদের বক্তব্য এটাই। আর যারা মনে করেন অসুস্থতাও হজ্জ/হজ পালনে বাধা, অর্থাৎ- এর দ্বারা মুহসার হয় যেমনটি হানাফীদের অভিমত তারা হাজ্জাজ ইবনু ‘আমর-এর হাদীস যাতে আছে- ‘‘যার হাড় ভেঙ্গে গেল অথবা লেংড়া হয়ে গেল সে হালাল হয়ে গেল’’ এটি দলীল হিসেবে পেশ করে থাকেন।
‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বর্ণিত এ হাদীসটি ঐ ব্যক্তির জন্য শর্তারোপ করার বৈধতা প্রমাণ করে যিনি আশংকা করেন যে, আগত কোন বিপদ বা অসুস্থতা তাকে হজ্জে বাধা প্রদান করতে পারে। যে ব্যক্তি ইহরামের সময় এরূপ শর্তারোপ করে অতঃপর অসুস্থতা বা অনুরূপ কোন বাধার সম্মুখীন হয় তার জন্য হালাল হওয়া বৈধ। আর যে ব্যক্তি এরূপ শর্তারোপ করেনি তার জন্য অসুস্থতার কারণে হালাল হওয়া বৈধ নয়।
আর এরূপ শর্তারোপ করা মুবাহ, না-কি মুস্তাহাব, না-কি তা ওয়াজিব- এ বিষয়ে ‘আলিমদের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে।
(১) এরূপ শর্ত করা বৈধ- এটি শাফি‘ঈদের প্রসিদ্ধ মত।
(২) এরূপ শর্ত করা মুস্তাহাব- ইমাম আহমাদের অভিমত এটিই।
(৩) এরূপ শর্ত করা ওয়াজিব- ইবনু হাযম আল যাহিরী এ মতের প্রবক্তা।
(৪) এরূপ শর্ত করা বৈধ নয়- হানাফী এবং মালিকী মাযহাবের অভিমত এটিই।
শর্ত করা বৈধ নয় এর অর্থ হলো এরূপ শর্ত করার কোন লাভ নেই, অর্থাৎ- এর ফলে তার জন্য হালাল হওয়া বৈধ হবে না। কেননা অসুস্থতা হানাফীদের মতানুসারে হজ্জ/হজ পালনে এমনিতেই বাধা। অতএব শর্তারোপ ছাড়াই অসুস্থ ব্যক্তি মুহসার তথা বাধাপ্রাপ্ত বলে গণ্য হবে। তাই এ শর্ত নিষ্প্রয়োজন। তবে আবূ হানীফার মতে এ শর্তের একটি উপকারিতা এই যে, শর্তকারী ব্যক্তি হালাল হলে তাকে দম (কাফফারাহ) দিতে হবে না।
হাদীসের প্রকাশমান অর্থ এই যে, হজ্জের ইহরামে শর্তারোপকারী হজ্জ/হজ সম্পাদনের পূর্বেই বাধাপ্রাপ্ত হয়ে হালাল হলে তাকে কাফফারাহ (দম) দিতে হবে না হাম্বালী এবং শাফি‘ঈদের মত এটিই।
জমহূর ‘আলিমগণ এ হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করেন যে, শর্তারোপ ব্যতীত অসুস্থ ব্যক্তির জন্য হালাল হওয়া বৈধ নয়। কেননা তা যদি বৈধ হত তাহলে শর্তারোপের প্রয়োজন হত না। অত্র হাদীস এও প্রমাণ করে যে, শর্তারোপ করার পর অসুস্থতার কারণে হালাল হয়ে গেলে তাকে তা কাযা করতে হবে না।
(مَحِلِّىْ حَيْثُ حَبَسْتَنِىْ) ‘‘বাধাপ্রাপ্ত স্থানই আমার হালালস্থল।’’ হাদীসের এ অংশ প্রমাণ করে যে, বাধাপ্রাপ্ত ব্যক্তি যেখানে বাধাপ্রাপ্ত হবে সেখানেই হালাল হবে এবং সেখানেই কুরবানীর পশু যাবাহ করবে যদিও তা হেরেম এলাকার বাইরে হয়। ইমাম শাফি‘ঈ ও ইমাম আহমাদ-এর অভিমত এটিই।
ইমাম আবূ হানীফা বলেনঃ হেরেম এলাকা ব্যতীত কুরবানীর পশু যাবাহ করা যাবে না।
পরিচ্ছেদঃ ১৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং হজ্জ ছুটে যাওয়া
২৭১২-[৬] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীগণকে হুদায়বিয়ার বছরে তারা যে পশু কুরবানী করেছিলেন (পরের বছর) কাযা ’উমরার সময় তার বদলে অন্য পশু কুরবানীর হুকুম দিয়েছিলেন। (আবূ দাঊদ)[1]
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَرَ أَصْحَابَهُ أَنْ يُبَدِّلُوا الْهَدْيَ الَّذِي نَحَرُوا عَامَ الْحُدَيْبِيَةِ فِي عُمْرَةِ الْقَضَاءِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَفِيهِ قِصَّةٌ وَفِي سَنَدِهِ مُحَمَّدُ بْنُ إِسْحَاقَ
ব্যাখ্যা: (أَمَرَ أَصْحَابَه أَنْ يُبَدِّلُوا الْهَدْىَ الَّذِىْ نَحَرُوْا عَامَ الْحُدَيْبِيَةِ) ‘‘নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের আদেশ করলেন যে, হুদায়বিয়াতে তারা যে পশু যাবাহ করেছে তার পরিবর্তে তারা যেন পুনরায় যাবাহ করে।’’
(فِىْ عُمْرَةِ الْقَضَاءِ) ‘‘কাযা ‘উমরাতে’’ অর্থাৎ- পরবর্তী বৎসর সাহাবীরা যখন ‘উমরা করলেন তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের আদেশ দিলেন তারা হুদায়বিয়াতে যে কুরবানীর পশু যাবাহ করেছে এর পরিবর্তে কাযা ‘উমরার সময় পুনরায় যেন কুরবানী করে। যারা মনে করেন যে, ‘উমরা করতে গিয়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে হালাল হলে তাদেরকে কাযা ‘উমরা করতে হবে তারা হাদীসের (فِىْ عُمْرَةِ الْقَضَاءِ) এ অংশটিকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছে।
আর যারা মনে করে যে, বাধাপ্রাপ্ত হয়ে হালাল হলে সেজন্য কাযা করতে হবে না তারা বলেন এখানে الْقَضَاءِ শব্দটি المقاضاة থেকে নেয়া হয়েছে। কেননা মক্কাবাসীগণ হুদায়বিয়াতে এ বিষয়ের উপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল তথা ফায়সালা করেছিল যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সঙ্গীগণ এবার ‘উমরা না করেই ফিরে যাবে এক বৎসর পর এ সময়ে তারা ‘উমরা করতে পারবে এবং এজন্য তারা তিনদিন সময় পাবে এজন্য এ ‘উমরার নাম হয়েছে (عُمْرَةُ الْقَضَاءِ)। আর এ শব্দটি قضى يقضي قضاء শব্দ থেকে নির্গত নয় যার অর্থ কাযা করা।
যারা মনে করেন বাধাপ্রাপ্ত ব্যক্তি হেরেম ব্যতীত তার কুরবানীর পশু যাবাহ করতে পারবে না তারা এ হাদীসটিকে দলীল হিসেবে উপস্থাপন করে থাকেন। কেননা হুদাযবিয়ার বৎসর সাহাবীগণ হেরেমের বাইরে কুরবানীর পশু যাবাহ করেছিলেন। তাই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পরিবর্তে পুনরায় কুরবানী করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। যারা বলেন, বাধাপ্রাপ্ত ব্যক্তি যেখানে বাধাপ্রাপ্ত হবে সেখানেই কুরবানীর পশু যাবাহ করবে তারা বলেন এখানে পুনরায় যাবাহ করার নির্দেশ এজন্য দেননি যে, তা হেরেমে যাবাহ করা হয়নি। কেননা হুদায়বিয়ার অধিকাংশ এলাকাই হেরেমের অন্তর্ভুক্ত। বরং এ নির্দেশ ছিল পুনরায় ফাযীলাত অর্জনের জন্য এবং এ আদেশ মুস্তাহাবের জন্য ওয়াজিবের জন্য নয়।
পরিচ্ছেদঃ ১৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং হজ্জ ছুটে যাওয়া
২৭১৩-[৭] হাজ্জাজ ইবনু ’আমর আল আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুলাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যার হাড় ভেঙ্গে গেছে অথবা খোঁড়া হয়ে গেছে সে হালাল হয়ে গেছে। তবে পরের বছর তার ওপর হজ্জ/হজ করা অত্যাবশ্যক। [তিরমিযী, আবূ দাঊদ, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ ও দারিমী; কিন্তু আবূ দাঊদ আরেক বর্ণনায় আরো বেশি বলেছেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ ’’অথবা রোগাক্রান্ত হয়েছে’’। তিরমিযী বলেন, হাদীসটি হাসান। ইমাম বাগাবী মাসাবীহ গ্রন্থে বলেন, হাদীসটি দুর্বল।][1]
وَعَنِ الْحَجَّاجِ بْنِ عَمْرٍو الْأَنْصَارِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «من كُسِرَ أَوْ عَرِجَ فَقَدْ حَلَّ وَعَلَيْهِ الْحَجُّ من قَابل» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَأَبُو دواد وَالنَّسَائِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ وَالدَّارِمِيُّ وَزَادَ أَبُو دَاوُدَ فِي رِوَايَةٍ أُخْرَى: «أَوْ مَرِضَ» . وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ: هَذَا حَدِيث حسن. وَفِي المصابيح: ضَعِيف
ব্যাখ্যা: (مَنْ كُسِرَ أَوْ عَرِجَ فَقَدْ حَلَّ) ‘‘যে ব্যক্তির পা ভেঙ্গে যাবে অথবা লেংড়া হয়ে যাবে সে হালাল হয়ে যাবে।’’ অর্থাৎ- এমন ব্যক্তির জন্য ইহরাম পরিত্যাগ করে স্বদেশে ফিরে যাওয়া বৈধ।
‘আল্লামা সিন্দী (রহঃ) বলেনঃ ইহরাম বাঁধার পর যে ব্যক্তি শত্রু দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত ব্যতীত যে কোন কারণে যদি সফর অব্যাহত রাখতে অপারগ হয়ে যায়। যেমন- কারো পা ভেঙ্গে গেল অথবা এমনিতেই লেংড়া হয়ে গেল তার জন্য ইহরাম ছেড়ে দিয়ে হালাল হওয়া বৈধ যদিও ইহরাম বাঁধার সময় কোন শর্ত না করে থাকেন। তবে শাফি‘ঈ ও হাম্বালীদের মতে শর্তারোপ করলে তার জন্য হালাল হওয়া বৈধ নচেৎ নয়। আর হানাফীগণ এটা কেউ ইহসার মনে করে যেমন- শত্রু কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হওয়াটাকে ইহসার বলা হয়।
এদের মতে এখানে حل শব্দের অর্থ হলো সে হালাল হওয়ার নিকটবর্তী হয়েছে। অর্থাৎ- সে কারো মাধ্যমে কুরবানীর পশু মক্কায় পাঠিয়ে দিবে এবং তা যাবাহ করার নির্দিষ্ট দিন ও সময় ধার্য করে দিবে। অতঃপর নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হওয়ার পর ইহরাম পরিত্যাগ করে হালাল হয়ে যাবে।
(عَلَيْهِ الْحَجُّ مِنْ قَابِلٍ) ‘‘সে পরবর্তী বৎসর হজ্জ/হজ করবে।’’ অর্থাৎ- যিনি ফরয হজ্জ/হজ সম্পাদন করতে গিয়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে হালাল হবে তাকে পরবর্তী বৎসর পুনরায় হজ্জ/হজ করতে হবে। আর নফল হজ্জ/হজ সম্পাদনকারীর জন্য হালাল হওয়ার নিমিত্তে কুরবানী করা ব্যতীত তাকে আর কিছুই করতে হবে না। এ অভিমত ইমাম মালিক ও ইমাম শাফি‘ঈর। আর আবূ হানীফার মতে তার হজ্জ/হজ ও ‘উমরা করা ওয়াজিব। ইব্রাহীম নাখ্‘ঈর অভিমতও এরূপ।
‘আল্লামা ইবনুল ক্বইয়্যিম বলেনঃ সহাবা এবং পরবর্তী ‘আলিমগণ এ বিষয়ে মতভেদে লিপ্ত হয়েছেন যে, শত্রু কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হওয়া ব্যতীত অন্য কোন কারণে বাধাপ্রাপ্ত হলে তার জন্য বায়তুল্লাহ-তে পৌঁছার আগেই হালাল হওয়া বৈধ কি-না?
ইবনু ‘আব্বাস, ইবনু ‘উমার ও মারওয়ান-এর মতে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ ব্যতীত তার জন্য হালাল হওয়া বৈধ নয়। ইমাম মালিক, শাফি‘ঈ, ইসহাক ও আহমাদ প্রমুখ ‘আলিমগণের অভিমতও এটাই।
ইবনু মাস্‘ঊদ (রাঃ)-এর মতে সে ব্যক্তি শত্রু কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত ব্যক্তির মতই। ‘আত্বা, সাওরী ও আবূ হানীফার মত এটাই।
পরিচ্ছেদঃ ১৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং হজ্জ ছুটে যাওয়া
২৭১৪-[৮] ’আবদুর রহমান ইবনু ইয়া’মুর আদ্ দায়লী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি ’আরাফাই হচ্ছে হজ্জ/হজ। যে ব্যক্তি ’আরাফায় মুযদালিফার রাতে (৯ যিলহজ্জ শেষ রাতে) ভোর হবার আগে ’আরাফাতে পৌঁছতে পেরেছে সে হজ্জ/হজ পেয়ে গেছে। মিনায় অবস্থানের সময় হলো তিনদিন। যে দুই দিনে তাড়াতাড়ি মিনা হতে ফিরে আসলো তার গুনাহ হলো না। আর যে (তিনদিন পূর্ণ করে) দেরী করবে তারও গুনাহ হলো না। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ ও দারিমী; তিরমিযী বলেছেন, হাদীসটি হাসান সহীহ)[1]
وَعَن عبدِ الرَّحمنِ بنِ يَعمُرَ الدَّيْلي قَالَ: سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «الْحَجُّ عَرَفَةُ مَنْ أَدْرَكَ عَرَفَةَ لَيْلَةَ جَمْعٍ قَبْلَ طُلُوعِ الْفَجْرِ فَقَدْ أَدْرَكَ الْحَجَّ أيَّامُ مِنىً ثلاثةَ أيَّامٍ فَمَنْ تَعَجَّلَ فِي يَوْمَيْنِ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ وَمَنْ تَأَخَّرَ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ وَالدَّارِمِيُّ وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ
هَذَا الْبَابُ خَالٍ عَنِ الْفَصْلِ الثَّالِثِ
-
[বিঃ দ্রঃ এ অধ্যায়ে তৃতীয় অনুচ্ছেদ নেই (هٰذَا الْبَابُ خَالٍ عَنِ الْفَصْلِ الثَّالِثِ)]
ব্যাখ্যা: (الْحَجُّ عَرَفَةُ) ‘‘আরাফাই হজ্জ/হজ’’। অর্থাৎ- যিলহজ্জ মাসের নবম তারিখে ‘আরাফাতে অবস্থান করা হজ্জের মূল বিষয়। কেননা যে ব্যক্তি ‘আরাফাতে অবস্থান করতে ব্যর্থ হলো তার হজ্জ ছুটে গেল। ‘আল্লামা শাওকানী বলেন, যিনি ‘আরাফার দিনে ‘আরাফাতে অবস্থান করতে সমর্থ হয়েছে তার হজ্জই সঠিক হজ্জ। এ হাদীসের একটি ঘটনা আছে তা এই যে, নাজদ এলাকার কিছু লোক নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আগমন করলেন তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আরাফাতে অবস্থানরত ছিলেন। তারা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট হজ্জ সম্পর্কে জানতে চাইলে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষককে ঘোষণা দিতে বললে তিনি ঘোষণা দিলেন ‘আরাফাই হজ্জ।
(مَنْ أَدْرَكَ عَرَفَةَ لَيْلَةَ جَمْعٍ قَبْلَ طُلُوْعِ الْفَجْرِ) যে ব্যক্তি মুযদালিফাতে রাত যাপনের রাতে ফজর উদয় হওয়ার পূর্বেই ‘আরাফাতে অবস্থান করতে সমর্থ হলো (فَقَدْ أَدْرَكَ الْحَجَّ) সে হজ্জ পেল। অর্থাৎ- তার হজ্জ সঠিক হয়েছে। তার হজ্জ ছুটে যায়নি। এতে তাদের দাবী প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে যারা বলেন, ‘আরাফার দিনে সূর্য ডুবে যাওয়ার পর ‘আরাফাতে অবস্থানের সময় শেষ হয়ে গেছে।
অথবা যারা বলেন মুযদালিফাতে রাত যাপনের রাতে ফজরের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত ‘আরাফাতে অবস্থানের সুযোগ রয়েছে।
(أيَّامُ مِنىً ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ) মিনাতে অবস্থানের দিন তিনটি। অর্থাৎ- আইয়্যামে তাশরীক। আর এ তিনদিন ইয়াওমুন্ নাহর তথা ঈদের পরের তিনদিন। ঈদের দিন এ তিন দিনের অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা এতে সবাই একমত তথা ইজমা প্রতিষ্ঠিত যে ঈদের পরের দিনই হজ্জের কাজ শেষ করে বাড়ীতে ফিরে যাওয়া বৈধ নয়। বরং ঈদের দিন বাদে ২য় দিনে ফিরে যাওয়া বৈধ। আর তৃতীয় দিনে ফিরে যাওয়া ইত্তম।
হাদীসের শিক্ষাঃ
১. ‘আরাফাতে অবস্থান করা হজ্জের প্রাধান্যতম রুকন। ‘আরাফাতে অবস্থান ব্যতীত হজ্জ বিশুদ্ধ হয় না।
২. ‘আরাফাতে অবস্থানের সময় মুযদালিফাতে অবস্থানের রাতে ফজর উদয় হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিস্তৃত।
৩. ‘আরাফাতে অবস্থানকারীর জন্য সূর্য ডুবে যাওয়ার পরও অপেক্ষা করা ওয়াজিব।
৪. যে ব্যক্তি সূর্যাস্তের পূর্বেই ‘আরাফাহ্ ত্যাগ করবে অধিকাংশ ‘আলিমদের মতে তার ওপর দম ওয়াজিব। তাদের মাঝে ‘আত্বা, সাওরী, শাফি‘ঈ, আবূ সাওর এবং আহলুর রায়।
তবে ইমাম শাফি‘ঈ ও ইমাম মালিক-এর মতে, সে যদি সূর্যাস্তের পূর্বেই ফিরে এসে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করে তাহলে তাকে দম দিতে হবে না।
ইমাম আবূ হানীফার মতে সে ফিরে আসুক বা না আসুক তাকে অবশ্যই দম দিতে হবে।
‘আরাফাতে অবস্থানের সময়ের শুরু ও শেষ নিয়ে মতভেদ রয়েছে তবে তার নির্যাস নিম্নরূপ-
সকলের ঐকমত্যে ‘আরাফাতে অবস্থান একটি অন্যতম রুকন। ‘আরাফার দিন সূর্য ঢলে যাবার পর থেকে রাতের কিছু অংশ পর্যন্ত যিনি ‘আরাফাতে অবস্থান করবেন তার এ অবস্থান পূর্ণ এ বিষয়ে সকলেই ঐকমত্য পোষণ করেন।
* যিনি দিনে অবস্থান না করে শুধু রাতে অবস্থান করবেন জমহূরের মতে তার অবস্থান পূর্ণাঙ্গ। তাকে কোন দম দিতে হবে না। তবে মালিকীদের মতে তাকে দম দিতে হবে।
* যিনি শুধুমাত্র দিনে অবস্থান করবেন রাতে অবস্থান করবেন না মালিকীদের মতে তার অবস্থান বিশুদ্ধ নয়। অর্থাৎ- তাকে পুনরায় হজ্জ/হজ করতে হবে। আর জমহূর ‘আলিমদের মতে তার হজ্জ বিশুদ্ধ, ইমাম আবূ হানীফা, শাফি‘ঈ, ‘আত্বা, সাওরী, আবূ সাওর প্রমুখদের অভিমত এটাই। ইমাম আহমাদ-এর বিশুদ্ধ মতও এটিই। তবে তার ওপর দম ওয়াজিব কিনা, এ নিয়ে তাদের মধ্যে ভিন্ন মত রয়েছে।
ইমাম আবূ হানীফা ও আহমাদ-এর মতানুযায়ী তার ওপর দম ওয়াজিব।
ইমাম শাফি‘ঈর সঠিক মতানুযায়ী তার ওপর দম ওয়াজিব নয়। অন্য মতে দম ওয়াজিব।
জমহূর ‘আলিমদের মতে ‘আরাফার দিনে সূর্য ঢলে যাবার পূর্বে অবস্থানের সময় নয়। তবে ইমাম আহমাদ-এর মতে তা অবস্থানের সময়।
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - মক্কার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
মক্কার এ পবিত্র ও বারাকাতময় ভূমির প্রসিদ্ধ নাম مَكَّةَ মক্কা। তবে আল্লাহ তা’আলা এ ভূমিকে পাঁচটি নামে অভিহিত করেছেন। ১. মক্কা ২. বাক্কাহ্ ৩. আল বালাদ ৪. আল ক্বরি’আহ্ ৫. উম্মুল কুরা।
হারামের মাক্কী সীমানা: মক্কা থেকে মদীনার পথে : মক্কা থেকে তিন অথবা চার মাইল দূরবর্তী তান্’ঈম। মক্কা থেকে ইয়ামানের পথে : মক্কা থেকে ছয় মাইল অথবা সাত মাইল দূরে আযাহ এর প্রান্ত পর্যন্ত। মক্কা জি’রানাহ্ এর পথে বারো মাইল পর্যন্ত। ত্বয়িফের দিকে ’আরাফার ময়দানের পাশে অবস্থিত নামিরাহ্ পর্যন্ত। আর জিদ্দার দিকে দশ মাইল।
২৭১৫-[১] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুলাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের দিন বলেছেনঃ আর হিজরত নেই, তবে অবশিষ্ট আছে জিহাদ ও নিয়্যাত। তাই যখন তোমাদেরকে জিহাদের জন্য বের হতে বলা হবে, বের হয়ে পড়বে। সেদিন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আবার বললেন, এ শহরকে সেদিন হতে আল্লাহ তা’আলা সম্মানিত করেছেন যেদিন তিনি আকাশ ও জমিন সৃষ্টি করেছেন; আর এটা ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) পর্যন্ত আল্লাহর সম্মানেই সম্মানিত (হারাম বা পবিত্র) থাকবে। এ শহরে আমার আগে কারো জন্য যুদ্ধ করা হালাল ছিল না আর আমার জন্যও একদিনের অল্প সময়ের জন্য মাত্র হালাল করা হয়েছিল। অতঃপর তা ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) পর্যন্ত আল্লাহর সম্মানেই সম্মানিত। এ শহরের কাঁটাযুক্ত গাছ পর্যন্ত কাটা যাবে না, এখানে শিকার হাঁকানো যাবে না, এর রাস্তায় পড়ে থাকা কোন জিনিস ঘোষণাকারী ছাড়া কেউ উঠাতে পারবে না। আর এর ঘাসও কাটতে পারবে না। বর্ণনাকারী ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) বলেন, এ সময় ’আব্বাস(রাঃ) বলে উঠলেন, হে আল্লাহর রসূল! ইযখির ঘাস ছাড়া? এ ঘাসতো কর্মকরদের জন্যে ও লোকদের ঘরের জন্য বিশেষ প্রয়োজন। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ঠিক আছে ইযখির ঘাস ছাড়া। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ حَرَمِ مَكَّةَ حَرَسَهَا اللهُ تَعَالٰى
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ فَتْحِ مَكَّةَ: «لَا هِجرةَ وَلَكِنْ جِهَادٌ وَنِيَّةٌ وَإِذَا اسْتُنْفِرْتُمْ فَانْفِرُوا» . وَقَالَ يَوْمَ فَتْحِ مَكَّةَ: «إِنَّ هَذَا الْبَلَدَ حَرَّمَهُ اللَّهُ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فَهُوَ حَرَامٌ بِحُرْمَةِ اللَّهِ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَإِنَّهُ لَمْ يحِلَّ القتالُ فيهِ لأحدٍ قبْلي وَلم يحِلَّ لِي إِلَّا سَاعَةً مِنْ نَهَارٍ فَهُوَ حَرَامٌ بِحُرْمَةِ اللَّهِ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ لَا يُعْضَدُ شَوْكُهُ وَلَا يُنَفَّرُ صَيْدُهُ وَلَا يَلْتَقِطُ لُقَطَتُهُ إِلَّا مَنْ عَرَّفَهَا وَلَا يُخْتَلَى خَلَاهَا» . فَقَالَ الْعَبَّاسُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِلَّا الْإِذْخِرَ فَإِنَّهُ لِقَيْنِهِمْ وَلِبُيُوتِهِمْ؟ فَقَالَ: «إِلَّا الْإِذْخِرَ»
ব্যাখ্যা: (لَا هِجْرَةَ) হিজরত নেই। অর্থাৎ- মক্কা বিজয়ের পর এখন আর মক্কা থেকে হিজরত করার সুযোগ নেই। এতে এ ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, কোন অঞ্চলে মুসলিমগণ বিজয় লাভ করলে সে অঞ্চল থেকে কোন মুসলিমের হিজরত করার আর সুযোগ থাকে না যেমনটি বিজয়ের পূর্বে এ সুযোগ থাকে। কোন অঞ্চল মুসলিমগণ বিজয় করার পূর্বে সে অঞ্চলের মুসলিমদের তিনটি অবস্থা,
১. মুসলিম ব্যক্তি- ঐ অঞ্চলে তার ইসলাম প্রকাশ করতে পারেনা এবং তার ওপর ওয়াজিব কার্যাবলী সম্পাদন করতে পারেনা। আর সে ব্যক্তি ঐ অঞ্চল থেকে হিজরত করতেও সক্ষম। এমতাবস্থায় তার জন্য হিজরত করা ওয়াজিব।
২. মুসলিম ব্যক্তি- ঐ অঞ্চলে তার ইসলামকে প্রকাশ করতে পারে এবং তার ওপর ওয়াজিব কার্যাবলীও সম্পাদন করতে পারে। সেই সাথে উক্ত অঞ্চল হতে হিজরত করতেও সক্ষম। এমতাবস্থায় তার জন্য হিজরত মুস্তাহাব যাতে সে মুসলিমদের সাথে মিলিত হয়ে তাদের সহযোগিতা করতে পারে কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারে। সেই সাথে কাফিরদের গাদ্দারী থেকে নিরাপত্তা লাভ করতে পারে। অন্যায় কাজ দর্শনের কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে পারে।
৩. অসুস্থতা অথবা আবদ্ধ থাকার কারণে অথবা অন্য কোন উযরের কারণে হিজরত করতে অক্ষম, এমতাবস্থায় তার জন্য উক্ত অঞ্চলে অবস্থান করা বৈধ। তবে কোন উপায়ে কষ্ট স্বীকার করে যদি সে অঞ্চল হতে হিজরত করতে পারে তাহলে সাওয়াবের অধিকারী হবে।
(وَإِذَا اسْتُنْفِرْتُمْ فَانْفِرُوْا) ‘‘যখন তোমাদেরকে জিহাদে যাওয়ার জন্য ডাকা হয় তখন তোমরা জিহাদের জন্য বের হও।’’ অর্থাৎ- মুসলিম শাসক যখন তোমাদেরকে যুদ্ধে যাওয়ার নির্দেশ দেন তখন তোমরা যুদ্ধের জন্য বেরিয়ে পরবে।
হাদীসের শিক্ষাঃ
১. মক্কা নগরী স্থায়ীভাবে ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার সুসংবাদ। যেহেতু সেখান থেকে আর হিজরত প্রয়োজন হবে না। অতএব এটা সুনিশ্চিত যে, মক্কা আর কখনো কাফিরদের হস্তগত হবে না।
২. ইমাম তথা মুসলিম শাসক যাকে যুদ্ধে যাওয়ার নির্দেশ দিবে তার জন্য জিহাদে অংশগ্রহণ করা ফারযে ‘আইন।
৩. নিয়্যাতের উপর ‘আমলের পুরস্কার তথা প্রতিদান নির্ভরশীল।
(فَهُوَ حَرَامٌ بِحُرْمَةِ اللّٰهِ إِلٰى يَوْمِ الْقِيَامَةِ) ‘‘মক্কা নগরীকে আল্লাহ তা‘আলা হারাম (সম্মানিত) ঘোষণা করার ফলে তা ক্বিয়ামাত পর্যন্ত হারাম তথা সম্মানিত থাকবে।’’ অর্থাৎ- মক্কা নগরীর এ মর্যাদা কখনো রহিত হবে না, রবং তা ক্বিয়ামাত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী বলেন, অত্র হাদীসটি মক্কা নগরীতে হত্যা করা ও যুদ্ধ-বিগ্রহ করা হারাম হওয়ার দলীল। তবে কোন ব্যক্তি যদি মক্কা নগরীতে হত্যাকান্ড ঘটায় ক্বিসাস স্বরূপ ঐ হত্যাকারীকে হত্যা করা বৈধ। এ বিষয়ে ‘আলিমদের ঐকমত্য রয়েছে।
কোন ব্যক্তি যদি মক্কার বাইরে হত্যাকান্ড ঘটিয়ে মক্কা নগরীতে এসে আশ্রয় গ্রহণ করে তাহলে ক্বিসাস স্বরূপ তাকে মক্কা নগরীতে হত্যা করা বৈধ হবে কিনা- এ বিষয়ে ‘আলিমদের মাঝে মতভেদ রয়েছে।
* ইমাম আবূ ইউসুফ বলেন, তাকে বলপূর্বক হারাম থেকে বের করে ক্বিসাস করতে হবে।
* ইমাম মালিক ও শাফি‘ঈর মতে মক্কা নগরীতেই তার ওপর শাস্তি কার্যকর করা যাবে। কেননা অপরাধী স্বয়ং তার মর্যাদা বিনষ্ট করে আল্লাহর দেয়া নিরাপত্তা সে বাতিল করে ফেলেছে।
(لَا يُنَفَّرُ صَيْدُه) শিকারী জানোয়ারকে তা থেকে বিতাড়িত করা যাবে না। কোন ব্যক্তি যদি হারাম অঞ্চল থেকে শিকারী পশু তাড়িয়ে দেয় তারপরও ঐ পশু নিরাপদ থাকে তাহলে বিতাড়নকারীর ওপর কোন প্রকার কাফফারাহ বর্তাবে না। কিন্তু যদি বিতাড়ন করার মাধ্যমে ঐ পশুকে স্বয়ং ধ্বংস করে অথবা তার বিতাড়নের কারণে ঐ পশু ধ্বংসে পতিত হয় তাহলে বিতাড়নকারীকে কাফফারাহ্ দিতে হবে। অর্থাৎ- যে ধরনের পশু সে ধ্বংস করলো ঐ ধরনের পশু ক্রয় করে অথবা তার মূল্য দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করতে হবে।
(إِلَّا الْإِذْخِرَ) ‘‘তবে ইযখির কাটা যাবে।’’ ইযখির এক প্রকার ঘাস যা মক্কাবাসীগণ তাদের ঘরের ছাদ নির্মাণে এবং কর্মকারগণ জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। তাই ‘আব্বাস (রাঃ) এ ঘাস কাটার অনুমতি চাইলে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা কাটার অনুমতি দিলেন। কিন্তু এ অনুমতি কি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ থেকেই দিলেন নাকি আল্লাহর নির্দেশে এ অনুমতি দিলেন?
সঠিক কথা হল নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ অনুমতি আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর হুকুম তাঁর বান্দাদের প্রতি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়ে দিয়েছেন। এ নির্দেশ তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইলহামের মাধ্যমেও পেতে পারেন অথবা ওয়াহীর মাধ্যমে।
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - মক্কার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭১৬-[২] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) এর বর্ণনায় রয়েছে, এর গাছ-পালা কাটা যাবে না এবং এর পথে-ঘাটে পড়ে থাকা জিনিস ঘোষণাকারী ছাড়া উঠাতে পারবে না। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ حَرَمِ مَكَّةَ حَرَسَهَا اللهُ تَعَالٰى
وَفِي رِوَايَة لأبي هريرةَ: «لَا يُعضدُ شجرُها وَلَا يلتَقطُ ساقطتَها إِلاَّ مُنشِدٌ»
ব্যাখ্যা: (لَا يُعْضَدُ شَجَرُهَا) ‘‘তার গাছ কাটা যাবে না।’’ জেনে রাখা দরকার যে, হারাম এলাকার উদ্ভিদ ও তৃণ চার প্রকারের।
১. যে সকল উদ্ভিদ প্রকৃতপক্ষেই মানুষ উৎপাদন করেছে আর তা সাধারণত মানুষ উৎপাদন করে এমন জাতের উদ্ভিদ, যেমনঃ শস্য।
২. যা মানুষ উৎপাদন করেছে কিন্তু সাধারণত মানুষ উৎপাদন করে এমন জাতের উদ্ভিদ নয়, যেমনঃ ‘আরাক্ব গাছ যা দ্বারা মিসওয়াক করা হয়।
৩. যা এমনিতেই গজিয়েছে কিন্তু তা এমন জাতের উদ্ভিদ যা সাধারণত মানুষ উৎপাদন করে থাকে
হারাম এলাকার এ তিন প্রকারের উদ্ভিদ কেটে ফেলা অথবা তা উপড়িয়ে ফেলা বৈধ এবং তা ব্যবহার করাও জায়িয। এজন্য কোন কাফফারাহ দিতে হবে না।
৪. যে সকল উদ্ভিদ নিজে নিজেই গজিয়েছে আর তা এমন জাতের যা সাধারণত মানুষ উৎপাদন করে না- এ ধরনের উদ্ভিদ কাটা বা তুলে ফেলা হারাম। চাই তা কোন মানুষের নিজস্ব ভূমিতে হোক বা অন্য কোন জায়গায় হোক। তবে তন্মধ্য হতে যা মরে শুকিয়ে গেছে তা কাটা বা তুলে ফেলা বৈধ। কেননা তা এখন জ্বালানী কাঠে পরিণত হয়েছে। তবে ইযখির ঘাস তা তাজাই হোক বা শুকনা হোক উভয়টিই কাটা বৈধ।
হারাম এলাকায় স্বয়ং উৎপাদিত আরাক গাছ, অনুরূপভাবে সকল প্রকার গাছ যা স্বয়ং উৎপাদিত হয় তা যতক্ষণ তাজা থাকে তা দ্বারা মিসওয়াক বানানো বৈধ নয়। তবে কোন গাছের পাতা ছিঁড়লে তা যদি গাছের জন্য ক্ষতিকর না হয় তাহলে তা ছেঁড়া বৈধ।
(وَلَا يَلْتَقِطُ سَاقِطَتَهَا إِلاَّ مُنشِدٌ) ‘‘প্রচারকারী ব্যতীত অন্য কেউ তাতে পরে থাকা দ্রব্য উঠাবে না।’’
জমহূর ‘আলিমদের মতে হারাম মাক্কী অঞ্চলে রাস্তায় পড়ে থাকা মালের মালিক হওয়ার উদ্দেশে তুলে নেয়া বৈধ নয়। শুধুমাত্র প্রচার করার উদ্দেশে তুলে নেয়া বৈধ। যদিও হারামের বাহির অঞ্চলে পড়ে থাকা মাল মালিকানা লাভের উদ্দেশে তুলে নেয়া বৈধ।
হানাফী ও মালিকীদের মতে হারাম ও তার বাহির অঞ্চল উভয় এলাকার মালের হুকুম একই। অর্থাৎ- মালিকানা লাভের উদ্দেশে তা কুড়িয়ে নেয়া বৈধ।
শিক্ষাঃ ‘আল্লামা মুল্লা আলী কারী হানাফী বলেন, শাফি‘ঈদের মতে হারাম এলাকার মাটি ও তার পাথর অন্য এলাকায় নিয়ে যাওয়া হারাম। আর অধিকাংশ ‘আলিমের মতে তা মাকরূহ।
ইবনু ‘উমার ও ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তারা উভয়েই হারাম এলাকার মাটি ও পাথর হারামের বাহিরে নিয়ে যাওয়াকে অপছন্দ করতেন। আবূ হানীফার মতে এ কাজে কোন ক্ষতি নেই।
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - মক্কার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭১৭-[৩] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, মক্কায় অস্ত্র বহন করা কারো জন্য হালাল নয়। (মুসলিম)[1]
بَابُ حَرَمِ مَكَّةَ حَرَسَهَا اللهُ تَعَالٰى
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «لَا يَحِلُّ لِأَحَدِكُمْ أَنْ يَحْمِلَ بمكةَ السِّلَاح» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: (لَا يَحِلُّ لِأَحَدِكُمْ أَنْ يَحْمِلَ بِمَكَّةَ السِّلَاحَ) ‘‘তোমাদের কারো জন্যই মক্কাতে অস্ত্র বহন করে নিয়ে যাওয়া বৈধ নয়।’’
জমহূরের মতে প্রয়োজন ব্যতীত মক্কাতে অস্ত্র বহন করা বৈধ নয়। হাসান বাসরীর মতে কোনভাবেই তাতে অস্ত্র বহন করা বৈধ নয়। জমহূরের দলীলঃ বারা বর্ণিত হাদীস যাতে আছে- ‘‘নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিলকদ মাসে ‘উমরা করতে রওয়ানা হলে মক্কাবাসী তাকে বাধা প্রদান করে। অতঃপর তারা এ মর্মে চুক্তিতে উপনীত হন যে, মুসলিমগণ কোষবদ্ধ তরবারি নিয়ে মক্কাতে প্রবেশ করতে পারবে।
ইবনু ‘উমার (রাঃ) বর্ণিত হাদীস ‘‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘উমরা করার উদ্দেশে বের হলে মক্কার কুরায়শগণ তাকে বাধা প্রদান করে। অতঃপর তারা এ মর্মে চুক্তিতে উপনীত হন যে, পরবর্তী বৎসর তারা শুধুমাত্র তরবারি নিয়ে মক্কাতে প্রবেশ করতে পারবে।’’ এ হাদীস দু’টি ইমাম বুখারী বর্ণনা করেছেন। ‘আল্লামা শাওকানী (রহঃ) বলেনঃ উপরে বর্ণিত হাদীসদ্বয় প্রমাণ করে যে, প্রয়োজনে মক্কাতে অস্ত্র বহন করা বৈধ।
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - মক্কার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭১৮-[৪] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের দিন মক্কায় প্রবেশ করার সময় তাঁর মাথায় ছিল লোহার শিরস্ত্রাণ। যখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শিরস্ত্রাণটি খুললেন জনৈক ব্যক্তি এসে বললো, ইবনু খাত্বাল কা’বার গেলাফের সাথে ঝুলে (আশ্রয় নিয়েছে) রয়েছে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তাকে হত্যা করো। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ حَرَمِ مَكَّةَ حَرَسَهَا اللهُ تَعَالٰى
وَعَنْ أَنَسٍ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دَخَلَ مَكَّةَ يَوْمَ الْفَتْحِ وَعَلَى رَأْسِهِ الْمِغْفَرُ فَلَمَّا نَزَعَهُ جَاءَ رَجُلٌ وَقَالَ: إِنَّ ابْنَ خَطَلٍ مُتَعَلِّقٌ بِأَسْتَارِ الْكَعْبَةِ. فَقَالَ: «اقتله»
ব্যাখ্যা: (وَعَلٰى رَأْسِهِ الْمِغْفَرُ) ‘‘তাঁর মাথায় ছিল লোহার টুপি (হেলমেট)।’’ জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ আছে যে, ‘‘তাঁর মাথায় ছিল কালো রং-এর পাগড়ী’’- এ হাদীসদ্বয়ের মাঝে কোন বৈপরীত্য নেই। কেননা এ সম্ভাবনা রয়েছে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাগড়ীর উপর লোহার টুপি পরেছিলেন। অথবা টুপির উপর পাগড়ী পেঁচানো ছিল। অথবা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কায় প্রবেশ করেন তখন তাঁর মাথায় লোহার টুপি ছিল। যুদ্ধ শেষে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) লোহার টুপি ফেলে দিয়ে পাগড়ী পরেছিলেন।
সহীহ মুসলিমে ‘আমর ইবনু হুরায়স থেকে বর্ণিত আছে যে, সেদিন নাবী ভাষণ দিয়েছিলেন সে সময় তাঁর মাথায় কালো রং-এর পাগড়ী ছিল। কেননা এ ভাষণ ছিল বিজয় সম্পন্ন হওয়ার পরে কাবা ঘরের দরজার নিকটে।
إِنَّ ابْنَ خَطَلٍ مُتَعَلِّقٌ بِأَسْتَارِ الْكَعْبَةِ. فَقَالَ: اُقْتُلْهُ
‘‘ইবনু খাত্বাল কাবা ঘরের চাদর ধরে লটকে আছে।’’ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাকে হত্যা করো।’’
ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ইবনু খাত্বাল-এর নাম ছিল ‘আবদুল ‘উযযা। ইসলামে প্রবেশ করার পর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নাম রাখেন ‘আব্দুল্লাহ। ইবনু ইসহাক মাগাযীতে উল্লেখ করেছেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবনু খাত্বালকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়ার কারণ এই যে, তিনি মুসলিম ছিলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে যাকাত আদায় করার জন্য প্রেরণ করেন। তার সাথে একজন আনসারী ব্যক্তি এবং একজন মুক্ত দাস প্রেরণ করেন। এ দাস তার সেবায় নিয়োজিত ছিল। এ খাদিমও মুসলিম ছিল। তিনি রাস্তায় একস্থানে বিশ্রামের জন্য অবতরণ করেন এবং খাদিমকে একটি পাঠা যাবাহ করে খাদ্য প্রস্ত্তত করার নির্দেশ দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুম জেগে দেখতে পান যে, খাদিম তার জন্য কিছুই করেননি। ফলে তার উপর চড়াও হয়ে তাকে হত্যা করে এবং পুনরায় মুশরিক হয়ে মক্কাতে চলে যায়। তার দু’জন গায়িকা ছিল যারা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামে কুৎসা গাইত। তাই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
ওয়াক্বিদী উল্লেখ করেন যে, ইবনু খাত্বাল-এর কাবা ঘরের চাদর ধরে লটকে থাকার কারণ এই ছিল যে, সে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য একটি ঘোড়া ও তীর ধনুক নিয়ে জানদামাহ্ নামক স্থানে গমন করে। যখন সে আল্লাহর রাহে যুদ্ধরত মুসলিম বাহিনী দেখতে পায় তখন তার মাঝে ভয় প্রবেশ করে এমনকি ভয়ে কম্পনের কারণে ঘোড়ার উপর স্থির থাকতেও অক্ষম হয়ে পড়ে। তাই সে ঘোড়া থেকে নেমে অস্ত্র ফেলে দিয়ে নিরাপত্তার জন্য কাবা ঘরের চাদর ধরে বাঁচার চেষ্টা করে। মুসলিম বাহিনীর এক ব্যক্তি তার ঘোড়া ও অস্ত্র স্বীয় অধিকারে নিয়ে ঘোড়ায় আরোহণ করে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গিয়ে তাঁকে বিষয়টি অবহিত করেন। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে হত্যার নির্দেশ দেন। অতঃপর তাকে হত্যা করা হয়। তাকে কে হত্যা করেছিল তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ওয়াক্বিদীর মতে তার হত্যাকারী ছিল আবূ বারযাহ্ আল্ আসলামী।
ইবনু খাত্বাল কাবা ঘরের চাদর ধরে আশ্রয় গ্রহণ করার পরও তাকে হত্যার বিষয়টিকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করা হয় যে, যাকে হত্যা করা ওয়াজিব এমন অপরাধী কাবা ঘরে তথা হারামে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করলেও তাকে আশ্রয় দেয়া হবে না। বরং এমন অপরাধীকে হারামেও হত্যা করা জায়িয। যারা বলেন, তা বৈধ নয় তারা বলেন তা ছিল ঐ সময় যখন হারামে হত্যা করা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য বৈধ করা হয়েছিল। আর তা ছিল সাময়িক। এরপর হত্যা করা পূর্বের মতই হারাম
‘আল্লামা ত্বীবী বলেনঃ অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, হজ্জ/হজ বা ‘উমরা করতে ইচ্ছুক নয় এমন ব্যক্তির জন্য ইহরাম ব্যতীতই মক্কাতে প্রবেশ করা বৈধ।
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - মক্কার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭১৯-[৫] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের দিন ইহরাম বাঁধা ছাড়াই মক্কায় প্রবেশ করেছিলেন তখন তাঁর মাথায় একটি কালো পাগড়ী ছিল। (মুসলিম)[1]
بَابُ حَرَمِ مَكَّةَ حَرَسَهَا اللهُ تَعَالٰى
وَعَنْ جَابِرٍ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دَخَلَ يَوْمَ فَتْحِ مَكَّةَ وَعَلَيْهِ عمامةٌ سوْداءُ بِغَيْر إِحْرَام. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: (وَعَلَيْهِ عِمَامَةٌ سَوْدَاءُ) ‘‘তার মাথায় ছিল কালো রং-এর পাগড়ী।’’
ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেনঃ অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, কালো রং-এর পোষাক পরিধান করা বৈধ। অন্য বর্ণনায় আছে- তাঁর মাথায় কালো পাগড়ী ছিল এমতাবস্থায় ভাষণ দিয়েছেন। এতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, কালো রং-এর পাগড়ী পরিধান করে খুৎবাহ্ তথা ভাষণ দেয়া বৈধ। যদিও সাদা পাগড়ী পরিধান করা উত্তম।
(بِغَيْرِ إِحْرَامٍ) ‘‘ইহরামবিহীন অবস্থায় (তিনি মক্কা প্রবেশ করেন)’’ হাদীসের এ অংশটুকু ইবনু দাক্বীক্ব আল ‘ঈদ-এর ঐ মত প্রত্যাখ্যান করে যে, তিনি ইহরাম অবস্থায় ছিলেন। কিন্তু ওযরের কারণে মাথায় শিরস্ত্রাণ (লোহার টুপি) পড়েছিলেন।
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - মক্কার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭২০-[৬] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুলাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (শেষ জামানায়) কাবা ঘর ধ্বংস করার জন্য এক বিশাল বাহিনী রওয়ানা হবে। কিন্তু যখন তারা এক সমতল ময়দানে এসে পৌঁছবে, তাদের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সকলকেই জমিনে ধসিয়ে দেয়া হবে। ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল! কি করে তাদের প্রথম থেকে শেষ ব্যক্তিটি পর্যন্ত ধসিয়ে দেয়া হবে, তাদের মধ্যে বাজার থাকবে এবং এমন লোকও থাকবে যারা এদের দলভুক্ত নয়। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, নিশ্চয়ই তাদের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সকলকে ধসিয়ে দেয়া হবে। তবে তাদেরকে (কিয়ামতের দিন) প্রত্যেকের নিয়্যাত অনুসারেই উঠানো হবে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ حَرَمِ مَكَّةَ حَرَسَهَا اللهُ تَعَالٰى
وَعَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَغْزُو جَيْشٌ الْكَعْبَةَ فَإِذَا كَانُوا بِبَيْدَاءَ مِنَ الْأَرْضِ يُخْسَفُ بِأَوَّلِهِمْ وَآخِرِهِمْ» . قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَكَيْفَ يُخْسَفُ بِأَوَّلِهِمْ وَآخِرِهِمْ وَفِيهِمْ أسواقُهم وَمن لَيْسَ مِنْهُم؟ قَالَ: «يخسف وَآخِرِهِمْ ثُمَّ يُبْعَثُونَ عَلَى نِيَّاتِهِمْ»
ব্যাখ্যা: (فَإِذَا كَانُوا بِبَيْدَاءَ مِنَ الْأَرْضِ) ‘‘যখন তারা বায়দা-তে পৌঁছবে।’’ মূলত বায়দা বলা হয় এমন স্থানকে যেখানে কোন কিছুই নেই। ‘আল্লামা ‘আয়নী বলেনঃ অত্র হাদীসে বায়দা বলতে মক্কা ও মদীনার মাঝে নির্দিষ্ট একটি স্থানকে বুঝানো হয়েছে।
(يُخْسَفُ بِأَوَّلِهِمْ وَاٰخِرِهِمْ) ‘‘তাদের সবাইকে ধ্বসিয়ে দেয়া হবে’’, অর্থাৎ- ঐ বাহিনীর সবাই জমিনের মধ্যে দেবে যাবে।
(وَفِيهِمْ أَسْوَاقُهُمْ) ‘‘তাদের মাঝে বাজার থাকবে’’, অর্থাৎ- বাজারের লোকজন যারা বেচা-কেনাতে মশগুল।
وفي رواية مسلم ((فقلنا: إن الطريق قد يجمع الناس، قال: نعم فيهم المستبصر والمجبور وابن السبيل)
মুসলিমের বর্ণনায় আছে, আমরা বললামঃ রাস্তা বিভিন্ন ধরনের লোক একত্রিত করে। তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। তাদের মধ্যে স্বজ্ঞানে অংশগ্রহণকারী লোক রয়েছে যারা জেনে-বুঝে ঐ বাহিনীতে যোগদান করেছে। আবার কিছু লোক রয়েছে যারা মজবুর, অর্থাৎ- তারা স্বেচ্ছায় যোগদান করেনি। তাদেরকে যোগদান করতে বাধ্য করা হয়েছে। আর কিছু আছে পথিক, অর্থাৎ- তারা ঐ রাস্তায় চলার কারণে তাদের সাথে মিলিত হয়েছিল কিন্তু তাদের লোক নয়।
(ثُمَّ يُبْعَثُوْنَ عَلٰى نِيَّاتِهِمْ) অর্থাৎ- ‘‘অতঃপর তাদেরকে তাদের নিয়্যাত অনুযায়ী উঠানো হবে।’’ ‘আল্লামা ‘আয়নী বলেনঃ খারাপ লোকদের সঙ্গী হওয়ার কারণে সকলকেই ধ্বংস করা হবে। অতঃপর হাশরের ময়দানে তাদের কর্মের নিয়্যাত অনুযায়ী পুনরুত্থান করা হবে। যাদের নিয়্যাত ভাল ছিল তাদেরকে ভালো লোকদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। আর যাদের নিয়্যাত খারাপ ছিল তাদেরকে খারাপ লোকদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং সে অনুযায়ী প্রতিদান দেয়া হবে।
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - মক্কার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭২১-[৭] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (শেষ জামানায়) কাবা ঘর ধ্বংস করবে আবিসিনিয়ার এক ছোট নলাবিশিষ্ট (আল্লাহদ্রোহী) ব্যক্তি। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ حَرَمِ مَكَّةَ حَرَسَهَا اللهُ تَعَالٰى
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ «يُخَرِّبُ الْكَعْبَة ذُو السويقتين من الْحَبَشَة»
ব্যাখ্যা: (يُخَرِّبُ الْكَعْبَةَ ذُو السَّوَيْقَتَيْنِ مِنَ الْحَبَشَةِ) ‘‘হাবশার একজন ছোট পা বিশিষ্ট লোক কাবা ঘর ধ্বংস করবে’’ অর্থাৎ- হাবশার একজন দুর্বল লোক কাবা ঘরের মর্যাদা বিনষ্ট করবে। অথবা ঐ লোকটির নামই হবে যুল্ সুওয়াই ক্বতায়ন।
‘আল্লামা কুরতুবী বলেনঃ এটি সংঘটিত হবে ক্বিয়ামাত হওয়ার নিকটবর্তী সময়ে যখন মানুষের হৃদয় থেকে কুরআন উঠিয়ে নেয়া হবে এবং মুসহাফেও তা আর অবশিষ্ট থাকবে না। আর তা হবে ‘ঈসা (আঃ)-এর দুনিয়াতে পুনরায় আগমনের পর তাঁর মৃত্যু পরবর্তী সময়ে।
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - মক্কার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭২২-[৮] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ আমি যেন কাবা ঘর ধ্বংসকারী সেই ব্যক্তিটিকে দেখছি। সে কালো এবং কোল ভেঙ্গুর কা’বার এক একটি পাথর খসিয়ে ফেলছে। (বুখারী)[1]
بَابُ حَرَمِ مَكَّةَ حَرَسَهَا اللهُ تَعَالٰى
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «كَأَنِّي بِهِ أَسْوَدَ أَفْحَجَ يقْلعُها حجَراً حجَراً» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: (كَأَنِّىْ بِه أَسْوَدَ أَفْحَجَ) ‘‘আমি যেন দেখতে পাচ্ছি লোকটি কালো বর্ণের তার পাদ্বয় ছড়ানো।’’ أَفْحَجَ (আফহাজা) এমন ব্যক্তিকে বলা হয় যার পাদ্বয়ের অগ্রভাগ কাছাকাছি এবং গোড়ালিদ্বয় দূরবর্তী থাকে অথবা দু’পা কিছুটা ছড়ানো থাকে।
(يَقْلَعُها حَجَرًا حَجَرًا) ‘‘তা থেকে একটি একটি পাথর খুলছে’’। অর্থাৎ- ঐ কালো বর্ণের পাদ্বয় ছড়ানো লোকটি কাবা ঘরের দেয়াল থেকে একটি একটি করে পাথর খুলে ফেলছে।
পরিচ্ছেদঃ ১৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মক্কার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭২৩-[৯] ইয়া’লা ইবনু উমাইয়্যাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মূল্য বাড়ার উদ্দেশে হারামে খাদ্যশস্য জমা করে রাখা হলো ইলহাদ (সত্য হতে সরে যাওয়া, ধর্মবিমুখতা করা, হারামে অপবিত্র বা নিষিদ্ধ কাজ করা)। (আবূ দাঊদ)[1]
عَن يَعْلَى بْنِ أُمَيَّةَ قَالَ: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «احْتِكَارُ الطَّعَامِ فِي الْحَرَمِ إِلْحَادٌ فِيهِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যা: (اِحْتِكَارُ الطَّعَامِ) ‘‘দাম বৃদ্ধির উদ্দেশে খাদ্য-দ্রব্য আটকিয়ে রাখা।’’
‘আল্লামা মানাবী বলেনঃ সাধারণভাবে সকল খাদ্য উদ্দেশ্য নয়। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য প্রধান প্রধান খাদ্য-দ্রব্য ক্রয় করে বাজারে সংকট সৃষ্টি করে বেশী মূল্যে বিক্রি করার উদ্দেশে আটকিয়ে রাখা। ইমাম শাফি‘ঈর মতে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য বাজারে যখন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায় তখন খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করে আটকিয়ে রাখা নিষিদ্ধ।
(فِى الْحَرَمِ) হারাম এলাকায়। অর্থাৎ- মক্কার হারাম এলাকার জন্য এ নিষেধাজ্ঞা। আলক্বামী বলেনঃ ইলহাদের মূল অর্থ কোন দিকে ঝুকে পড়া। সকল প্রকার যুলুম ও ছোট-বড় সকল পাপ এ ইলহাদের অন্তর্ভুক্ত। অন্যায় সর্বস্থানে নিষিদ্ধ ও অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও মক্কার হারাম এলাকাতে তা হারাম বলার উদ্দেশ্য হলো তাতে পাপের কাজ করা অন্যান্য এলাকার চাইতে হারাম এলাকায় পাপের কাজ করার গুনাহ অধিক। যেমন- হারামের বাইরে কোন অপরাধ করার ইচ্ছা করলেই তার জন্য কোন জবাবদিহি করতে হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন না করে। কিন্তু হারাম এলাকায় অপরাধ করার ইচ্ছা করলেই তার জন্য জবাবদিহি করতে যদিও তা বাস্তবায়ন না করা হয়। কারো নিকট নিজস্ব উৎপাদিত খাদ্যদ্রব্য মূল্য বৃদ্ধির সময় পর্যন্ত আটকিয়ে রাখা এ নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত নয়।
পরিচ্ছেদঃ ১৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মক্কার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭২৪-[১০] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার রসূলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, কি উত্তম শহর তুমি! তুমি আমার কত পছন্দনীয়! যদি আমার জাতি আমাকে তোমার থেকে বিতাড়িত না করতো, তবে আমি কক্ষনো তোমাকে ছেড়ে অন্য কোথাও বাস করতাম না। (তিরমিযী; তিনি বলেছেন, হাদীসটি হাসান সহীহ। তবে সানাদ হিসেবে গরীব।)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِمَكَّةَ: «مَا أَطْيَبَكِ مِنْ بَلَدٍ وَأَحَبَّكِ إِلَيَّ وَلَوْلَا أَنَّ قَوْمِي أَخْرَجُونِي مِنْكِ مَا سَكَنْتُ غَيْرَكِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ غَرِيب إِسْنَادًا
ব্যাখ্যা: (لَوْلَا أَنَّ قَوْمِىْ أَخْرَجُوْنِىْ مِنْكِ مَا سَكَنْتُ غَيْرَكِ) ‘‘আমার জাতি যদি আমাকে তোমা থেকে বের করে না দিত তাহলে আমি তোমাকে ছেড়ে অন্য কোথাও বাস করতাম না।’’ অর্থাৎ- আমার জাতি যদি আমাকে বের করে দেয়ার কারণ না হয়ে দাঁড়াতো তাহলে আমি মক্কাতেই বাস করতাম।
এ হাদীসটি জমহূরের মতের পক্ষে দলীল যে, মদীনার চাইতে মক্কার মর্যাদা বেশী। তবে ইমাম মালিক-এর মতে মদীনার মর্যাদা বেশী।
পরিচ্ছেদঃ ১৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মক্কার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭২৫-[১১] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আদী ইবনু হামরা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে হায্ওয়ারাহ্’য় দাঁড়ানো অবস্থায় দেখেছি, তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলছেনঃ (হে মক্কা!) আল্লাহর কসম! তুমি হলো আল্লাহর সর্বোত্তম জমিন ও আল্লাহর নিকট আল্লাহর জমিনের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় জমিন। যদি আমি তোমার কাছ থেকে বিতাড়িত না হতাম, তাহলে (তোমাকে ছেড়ে) কক্ষনো অন্যত্র বের হতাম না। (তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَدِيِّ بْنِ حَمْرَاءَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَاقِفًا عَلَى الْحَزْوَرَةِ فَقَالَ: «وَاللَّهِ إِنَّكِ لَخَيْرُ أَرْضِ اللَّهِ وَأَحَبُّ اللَّهِ إِلَى اللَّهِ وَلَوْلَا أَنِّي أُخْرِجْتُ مِنْكِ مَا خرجْتُ» . رَوَاهُ الترمذيُّ وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: (رَأَيْتُ رَسُوْلَ اللّٰهِ ﷺ وَاقِفًا عَلَى الْحَزْوَرَةِ) ‘‘আমি আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হায্ওয়ারাহ্-তে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখেছি।’’ হায্ওয়ারাহ্ মক্কার একটি স্থানের নাম। হায্ওয়াহ্’র আসল অর্থ ছোট টিলা। এ স্থানে টিলা ছিল বলে ঐ স্থানের এ নামকরণ করা হয়েছে।
(وَاللّٰهِ إِنَّكِ لَخَيْرُ أَرْضِ اللّٰهِ) ‘‘আল্লাহর কসম! অবশ্যই তুমি আল্লাহর জমিনের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।’’ এতে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, মক্কার মর্যাদা মদীনার চেয়ে বেশী।
ইমাম শাওকানী বলেনঃ অত্র হাদীসে এ দলীল পাওয়া যায় যে, মক্কা সাধারণভাবেই সকল জায়গার চাইতে মর্যাদাবান এবং আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট তা অধিক প্রিয়। এটা তাদেরও দলীল যারা বলেন মদীনার চাইতে মক্কা বেশী মর্যাদাবান। ‘আল্লামা দিম্ইয়ারী বলেনঃ হাদীস হিসেবে যা বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘‘হে আল্লাহ! তুমি জান যে, তারা আমাকে আমার প্রিয় স্থান থেকে বের করে দিয়েছে তাই তুমি আমাকে তোমার প্রিয় স্থানে আবাসন বানিয়ে দাও।’’
এ সম্পর্কে ইবনু ‘আবদুল বার বলেছেনঃ হাদীসটি মুনকার তথা বানোয়াট এতে কোন দ্বিমত নেই। ইবনু দাহ্ইয়াহ্ তাঁর ‘‘তানবীর’’ নামক গ্রন্থে বলেনঃ সকলের ঐকমত্য অনুযায়ী এ হাদীসটি বাতিল। তবে হ্যাঁ, বাসস্থান হিসেবে মদীনাহ্ উত্তম।
ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মদীনার কালের গ্রাস ও কঠিন পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ করে যে অবস্থান করবে ক্বিয়ামাত দিবসে আমি তার জন্য সাক্ষী ও সুপারিশকারী হব। কিন্তু মক্কাতে বসবাস করা সম্পর্কে এ ধরনের কোন হাদীস বর্ণিত হয়নি। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এও বলেছেন যে, যার পক্ষে মদীনাতে মৃত্যুবরণ করা সম্ভব হয় সে যেন তাতে মৃত্যুবরণ করে। যে ব্যক্তি তাতে মৃত্যুবরণ করবে আমি তার জন্য সুপারিশ করব। তবে মদীনার মর্যাদা তার নিজস্ব কোন মর্যাদা নয়। বরং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিদ্যমানতার জন্য তার মর্যাদা। পক্ষান্তরে মক্কার মর্যাদা তার নিজস্ব মর্যাদা। এমনিভাবে বায়তুল্লাহতে সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায়ের সাওয়াব অন্য জায়গায় সালাত আদায়ের তুলনায় এক লক্ষ গুণ বেশী মর্যাদাসম্পন্ন। আর মদীনার মসজিদে নাবাবীতে সালাতের সাওয়াব মাত্র এক হাজার গুণ বেশী।
পরিচ্ছেদঃ ১৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - মক্কার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭২৬-[১২] আবূ শুরাইহ আল ’আদাবী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি ’আমর ইবনু সা’ঈদ-কে বললেন, যখন আমীর মক্কায় সেনাবাহিনী পাঠাচ্ছিলেন (’আব্দুল্লাহ ইবনুয্ যুবায়র-এর বিরুদ্ধে এমন সময় বললেন), হে আমীর! আমাকে অনুমতি দিন, আমি আপনাকে একটি কথা বলব যা মক্কা বিজয়ের দিন সকালে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভাষণ দানকালে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন- এমন কথা যা আমার এই দুই কান শুনেছে, অন্তর মনে রেখেছে এবং দুই চোখ দেখেছে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন ভাষণ দান শুরু করলেন, তখন প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা স্বরূপ শুকরিয়া আদায় করলেন, এরপর বললেন, আল্লাহ মক্কাকে হারাম করেছেন। কোন মানুষ তা হারাম করেনি। তাই আল্লাহ তা’আলা ও পরকালে বিশ্বাসী এমন কোন লোকের পক্ষে মক্কায় রক্তপাত ঘটানো এবং এর গাছ কাটা হালাল হবে না।
যদি কেউ মক্কায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুদ্ধের অজুহাত দেখিয়ে অনুমতি আছে মনে করে, তবে তাকে বলবে- আল্লাহ তাঁর রসূলকে অনুমতি দিয়েছেন, তোমাকে অনুমতি দেননি। আল্লাহ তা’আলা আমাকে (রসূলকে) দিনের খুব অল্প সময়ের জন্য অনুমতি দিয়েছিলেন। অতঃপর তার পবিত্রতা পুনরায় ফিরে এসেছে, যেমন গতকাল ছিল। প্রত্যেক উপস্থিত ব্যক্তিই আমার এ কথা যেন অনুপস্থিত ব্যক্তিকে পৌঁছিয়ে দেয়। তারপর আবূ শুরাইহ-কে জিজ্ঞেস করা হলো, এ কথা শুনে ’আমর আপনাকে কি উত্তর দিয়েছিলেন? তিনি (আবূ শুরাইহ্) বললেন, জবাবে তখন তিনি বললেন, এ কথা আমি আপনার চেয়েও বেশি জানি। (মক্কার) হারাম কোন অপরাধীকে আশ্রয় দেয় না এবং রক্তপাত করে এমন পলাতককেও আশ্রয় দেয় না। অথবা আশ্রয় দেয় না তাকে যে অপরাধ করে মক্কায় পালিয়েছে (এমন ব্যক্তিকে)। (বুখারী, মুসলিম)[1]
عَن أبي شُريَحٍ العَدوِيِّ أَنَّهُ قَالَ لِعَمْرِو بْنِ سَعِيدٍ وَهُوَ يَبْعَثُ الْبُعُوثَ إِلَى مَكَّةَ: ائْذَنْ لِي أَيُّهَا الْأَمِيرُ أُحَدِّثْكَ قَوْلًا قَامَ بِهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الغدَ مِنْ يَوْمِ الْفَتْحِ سَمِعَتْهُ أُذُنَايَ وَوَعَاهُ قَلْبِي وَأَبْصَرَتْهُ عَيْنَايَ حِينَ تَكَلَّمَ بِهِ: حَمِدَ اللَّهَ وَأَثْنَى عَلَيْهِ ثُمَّ قَالَ: إِنَّ مَكَّةَ حَرَّمَهَا اللَّهُ وَلَمْ يُحَرِّمْهَا النَّاسُ فَلَا يَحِلُّ لِامْرِئٍ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ يَسْفِكَ بِهَا دَمًا وَلَا يَعْضِدَ بِهَا شَجَرَةً فَإِنْ أَحَدٌ تَرَخَّصَ بِقِتَالِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِيهَا فَقُولُوا لَهُ: إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَذِنَ لرَسُوله وَلم يَأْذَن لِرَسُولِهِ وَلَمْ يَأْذَنْ لَكُمْ وَإِنَّمَا أُذِنَ لِي فِيهَا سَاعَة نَهَارٍ وَقَدْ عَادَتْ حُرْمَتُهَا الْيَوْمَ كَحُرْمَتِهَا بِالْأَمْسِ وَلْيُبْلِغِ الشَّاهِدُ الْغَائِبَ . فَقِيلَ لِأَبِي شُرَيْحٍ: مَا قَالُ لَكَ عَمْرٌو؟ قَالَ: قَالَ: أَنَا أَعْلَمُ بِذَلِكَ مِنْكَ يَا أَبَا شُرَيْحٍ أَنَّ الْحَرَمَ لَا يُعِيذُ عَاصِيًا وَلَا فَارًّا بِدَمٍ وَلَا فَارًّا بِخَرْبَةٍ. مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ. وَفِي الْبُخَارِيِّ: الْخَرْبَةُ: الْجِنَايَة
ব্যাখ্যা: (وَهُوَ يَبْعَثُ الْبُعُوْثَ إِلٰى مَكَّةَ) ‘‘তিনি (‘আমর ইবনু সা‘ঈদ) মক্কাতে সৈন্যদল প্ররণ করছিলেন।’’ যে কারণে সৈন্যদল প্রেরণ করছিলেন তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এরূপ, মু‘আবিয়াহ্ (রাঃ) তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর অন্তর্ধানের পর স্বীয় পুত্র ইয়াযীদ কে খলীফাহ্ মনোনীত করেন। হুসায়ন ইবনু ‘আলী এবং ‘আব্দুল্লাহ ইবনুয্ যুবায়র ব্যতীত মদীনার সকলেই তার নিকট আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেন। হুসায়ন ইবনু ‘আলী (রাঃ) কূফার লোকেদের আহবানে সাড়া দিয়ে তিনি সেখানে গমন করেন এবং এটি তাঁর মৃত্যুর কারণ ঘটে। ‘আব্দুল্লাহ ইবনুয্ যুবায়র মক্কায় গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে এবং মক্কার নেতৃত্ব তাঁর হাতে চলে আসে।
ফলে ইয়াযীদ ইবনু মু‘আবিয়াহ্ মদীনার গভর্নর ‘আমর ইবনু সা‘ঈদকে ‘আব্দুল্লাহ ইবনুয্ যুবায়র (রাঃ)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সৈন্য প্রেরণ করার নির্দেশ দেন। ‘আমর ইবনু সা‘ঈদ ‘আমর ইবনুয্ যুবায়রকে তার নিযুক্ত সৈন্য বাহিনীর প্রধান নিযুক্ত করেন। অতঃপর তাকে তাঁর ভাই ‘আব্দুল্লাহ ইবনুয্ যুবায়র-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রেরণ করেন, কেননা তার ভাই ‘আব্দুল্লাহর সাথে ‘আমর-এর শত্রুতা ছিল। ইত্যবসরে আবূ শুরাইহ্ এসে ‘আমর ইবনু সা‘ঈদের সাথে তার অনুমতিক্রমে এ বিষয়ে আলোচনা করেন যা অত্র হাদীসে বিবৃত্ত হয়েছে।
(إِنَّمَا أُذِنَ لِىْ فِيهَا سَاعَةًمِنْ نَهَارٍ) ‘‘আমাকে শুধুমাত্র কিছু সময়ের জন্য সেখানে লড়াই করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল।’’ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, এ সময়ের পরিমাণ ঐ দিনের সূর্যোদয়ের পর থেকে ‘আসরের সময় হওয়া পর্যন্ত।
(وَقَدْ عَادَتْ حُرْمَتُهَا الْيَوْمَ كَحُرْمَتِهَا بِالْأَمْسِ) ‘‘পূর্বের মতই আজকে তার নিষিদ্ধতা পুনরায় ফিরে এসেছে।’’ অর্থাৎ- মক্কা বিজয়ের পূর্বের দিন সেখানে যেরূপ যুদ্ধ-বিগ্রহ হারাম ছিল এখন থেকে সে নিষিদ্ধতা পুনর্বহাল হয়েছে।
অত্র হাদীসের শিক্ষাঃ
(১) আমীরের সাথে কথা বলার পূর্বে অনুমতি নেয়া
(২) আমীরের সাথে উত্তম পন্থায় কথা বলার চেষ্টা করা
(৩) মক্কায় রক্ত প্রবাহিত করা হারাম, অর্থাৎ- অন্যায়ভাবে যুদ্ধ-বিগ্রহ করা হারাম।
(৪) মক্কার গাছ কাটা নিষেধ।
(৫) নিষ্ঠাবান কোন এক ব্যক্তির সংবাদ গ্রহণ করা বৈধ।
(أَنَّ الْحَرَمَ لَا يُعِيْذُ عَاصِيًا) ‘‘হারাম এলাকা কোন অপরাধীকে আশ্রয় দেয় না।’’ ‘আমর ইবনু সা‘ঈদ মনে করতেন যেহেতু মু‘আবিয়াহ্ (রাঃ) স্বীয় পুত্রকে খলীফাহ্ মনোনীত করেছেন। আর ইয়াযীদ (রাঃ) ইবনুয্ যুবায়র (রাঃ)-কে তার নিকট এসে আনুগত্যের শপথ গ্রহণের আদেশ দিয়েছিলেন, তাই ইবনুয্ যুবায়র-এর কর্তব্য হলো ইয়াযীদের নির্দেশ পালন করা। কিন্তু তিনি তার নির্দেশ পালন না করে অবাধ্য হয়েছিলেন, তাই তিনি তাকে অপরাধী মনে করতেন। এজন্য তিনি আবূ শু‘বাহ্-এর জওয়াবে এ কথা বলেছিলেন।
পরিচ্ছেদঃ ১৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - মক্কার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭২৭-[১৩] ’আইয়্যাশ ইবনু আবূ বরী’আহ্ আল মাখযূমী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এ উম্মাত সবসময় কল্যাণের মধ্যেই থাকবে, যতদিন পর্যন্ত তারা (মক্কার) হারামের এ মর্যাদা পরিপূর্ণরূপে রক্ষা করবে। আর যখন তারা মক্কার এ মর্যাদা বিনষ্ট করে ফেলবে (ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে) তখন ধ্বংস হয়ে যাবে। (ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَن عيَّاشِ بنِ أبي ربيعةَ المَخْزُومِي قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تَزَالُ هَذِهِ الْأُمَّةُ بِخَيْرٍ مَا عَظَّمُوا هَذِهِ الْحُرْمَةَ حَقَّ تَعْظِيمِهَا فَإِذَا ضَيَّعُوا ذلكَ هلَكُوا» . رَوَاهُ ابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: (مَا عَظَّمُوْا هٰذِهِ الْحُرْمَةَ حَقَّ تَعْظِيمِهَا) ‘‘যতক্ষণ তারা এর মর্যাদা যথাযথ রক্ষা করবে। অর্থাৎ- যতক্ষণ উম্মাত মক্কার হারাম এলাকার মর্যাদা যথাযথভাবে রক্ষা করবে, ততদিন পর্যন্ত এ উম্মাত কল্যাণের মধ্যেই থাকবে।
(فَإِذَا ضَيَّعُوْا ذٰلِكَ هَلَكُوْا) ‘‘যখন তা বিনষ্ট করবে তখন তারা ধ্বংস হবে।’’ অর্থাৎ- যখন তারা মক্কার যথাযথ মর্যাদা না দিয়ে তার মর্যাদা বিনষ্ট করবে তখন তারা শাস্তি স্বরূপ অপদস্থ হবে ও ধ্বংস হবে।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
ইমাম যুরক্বানী (রহঃ) বলেন, মদীনাহ্ বলা হয় বড় শহরকে। অতঃপর শব্দটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দারুল হিজরতকেই মদীনাহ্ নামে নামাঙ্কিত করা হয়েছে।
ইবনু হাজার ’ফাতহুল বারী’ গ্রন্থে বলেন, মদীনাহ্ একটি সুপরিচিত শহরের নাম যেখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরত করেছেন, (এবং মৃত্যুর পর) সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয়েছে। এর প্রাচীন নাম ছিল ইয়াসরিব। বর্তমান এ মদীনাহ্ শহরটির নাম ’’মদীনাহ্’’ এবং ’’ইয়াসরিব’’ উভয়টি পবিত্র কুরআনুল কারীমে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন- মহান আল্লাহর বাণীঃ
(ক) يَقُوْلُوْنَ لَئِنْ رَجَعْنَا إِلَى الْمَدِيْنَةِ
’’তারা বলে- আমরা যদি মদীনায় প্রত্যাবর্তন করি, তাহলে সম্মানীরা অবশ্য অবশ্যই হীনদেরকে সেখানে থেকে বহিষ্কার করবে।’’ (সূরা আল মুনা-ফিকূন ৬৩ : ৮)
(খ) وَإِذْ قَالَتْ طَائِفَةٌ مِنْهُمْ يَا أَهْلَ يَثْرِبَ
’’স্মরণ কর, যখন তাদের একদল বলেছিল- হে ইয়াসরিববাসী! তোমরা (শত্রুর আক্রমণের বিরুদ্ধে) দাঁড়াতে পারবে না, কাজেই তোমরা ফিরে যাও।’’ (সূরা আল আহযা-ব ৩৩ : ১৩)
ইয়াসরিব (বর্তমানের মদীনাহ্ শহরের) একটি স্থানের নাম। অতঃপর পুরো শহরটিকেই ইয়াসরিব নামে নামাঙ্কিত করা হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, নূহ (আঃ) এর পুত্র শাম, তদীয় পুত্র ইরাম, তদীয় পুত্র ক্বনিয়াহ্, তদীয় পুত্র ইয়াসরিব-এর নামানুসারে এ শহরের নাম রাখা হয় ইয়াসরিব।
অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাম রাখেন ত্ববাহ্ ও ত্বইয়্যিবাহ্। এখানে ’আমলীক্ব’গণ বসবাস করত। অতঃপর বনী ইসরাঈলের একটি সম্প্রদায় এখানে উপনীত হন ও বসবাস শুরু করেন।
যুবায়র ইবনু বাকর ’’আখবারে মদীনাহ্’’ নামক গ্রন্থে একটি দুর্বল সনদে উল্লেখ করেছেন, এদের (ইসরাঈলদের) মূসা (আঃ) এখানে প্রেরণ করেছিলেন। এরপর আওস এবং খাযরাজ গোত্র এখানে আসেন এবং বসতি স্থাপন করেন।
ইমাম নাবাবী (রহঃ) মদীনাহ্ শহরের পাঁচটি নামের উল্লেখ করেছেন। যথা- মদীনাহ্, ত্ববাহ্, ত্বইয়্যিবাহ্, আদ্দার ও ইয়াসরিব।
সহীহ মুসলিমে জাবির (রাঃ) থেকে মারফূ’ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে- ’’নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলাই মদীনার নাম রেখেছেন ’’ত্ববাহ্’’ বা পবিত্র। ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেন, ত্ববাহ্ এবং ত্বইয়্যিবাহ্ নাম রাখা হয়েছে এজন্য যে, এ শহর শির্ক থেকে মুক্ত ও পবিত্র।
গবেষকগণ মদীনাহ্ শহরের অনেকগুলো নাম বর্ণনা করেছেন, বিস্তারিত দেখতে চাইলে ’’ওয়াফাউল ওয়াফা’’ এবং ’’উম্দাতুল আখবার’’ নামক গ্রন্থ দেখুন।
জানা আবশ্যক যে, হানাফীদের নিকট মদীনার একটি মর্যাদা রয়েছে, তবে তা মক্কার মতো নয়। পক্ষান্তরে আয়িম্মায়ে সালাসা তথা তিন ইমাম এর বিরোধী তারা মনে করেন মদীনার হুরমত মক্কার মতই। এখানকার শিকার ধরা হারাম, বৃক্ষ কর্তন হারাম ইত্যাদি। (সামনে এর বিস্তারিত বিবরণ আসবে)
২৭২৮-[১] ’আলী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কুরআন ও এ সহীফায় (পুস্তকে) যা আছে তা ছাড়া অন্য কোন কিছু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছ থেকে আমরা লিখে রাখিনি। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মদীনাহ্ হারাম (অর্থাৎ- সম্মানিত বা পবিত্র) ’আয়র হতে সওর পর্যন্ত। যে ব্যক্তি এতে কোন বিদ্’আত (অসৎ প্রথা) চালু করবে অথবা বিদ্’আত চালুকারীকে আশ্রয় দেবে তার ওপর আল্লাহ ও মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) এবং সকল মানুষেরই অভিসম্পাত। তার ফরয বা নফল কিছুই কবূল (গ্রহণযোগ্য) হবে না। সকল মুসলিমের প্রতিশ্রুতি বা দায়িত্ব এক; তাদের ক্ষুদ্র ব্যক্তিও তার চেষ্টা করতে পারে। যে কোন মুসলিমের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তার ওপর আল্লাহ ও মালায়িকাহ্ এবং সকল মানুষেরই অভিসম্পাত। তার ফরয ও নফল কোনটিই গৃহীত হবে না। আর যে নিজের মালিকের অনুমতি ছাড়া অন্য সম্প্রদায়ের সাথে বন্ধুত্ব (সম্পর্ক) স্থাপন করে তার ওপর আল্লাহর ও মালায়িকাহ্’র এবং সকল মানুষেরই অভিসম্পাত। তার ফরয বা নফল কোনটিই গৃহীত হবে না। (বুখারী, মুসলিম)
বুখারী ও মুসলিমের আর এক বর্ণনায় আছে, যে ব্যক্তি নিজের পিতা ছাড়া অন্যকে পিতা বলে স্বীকার করেছে অথবা যে ক্রীতদাস নিজের মালিক ছাড়া অন্যকে মালিক বলে গ্রহণ করেছে তার ওপর আল্লাহর, মালায়িকাহ্’র এবং সকল মানুষেরই অভিসম্পাত। তার কোন ফরয বা নফল কোনটাই গৃহীত হবে না।[1]
بَابُ حَرَمِ الْمَدِيْنَةِ حَرَسَهَا اللّٰهُ تَعَالٰى
عَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: مَا كَتَبْنَا عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَّا الْقُرْآنَ وَمَا فِي هَذِهِ الصَّحِيفَةِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «الْمَدِينَةُ حَرَامٌ مَا بَيْنَ عَيْرٍ إِلَى ثَوْرٍ فمنْ أحدَثَ فِيهَا حَدَثًا أَوْ آوَى مُحْدِثًا فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ لَا يُقْبَلُ مِنْهُ صَرْفٌ وَلَا عَدْلٌ ذمَّةُ المسلمينَ واحدةٌ يَسْعَى بِهَا أَدْنَاهُمْ فَمَنْ أَخْفَرَ مُسْلِمًا فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ لَا يُقْبَلُ مِنْهُ صَرْفٌ وَلَا عَدْلٌ وَمَنْ وَالَى قَوْمًا بِغَيْرِ إِذْنِ مَوَالِيهِ فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ لَا يُقْبَلُ مِنْهُ صَرْفٌ وَلَا عدل»
وَفِي رِوَايَةٍ لَهُمَا: «مَنِ ادَّعَى إِلَى غَيْرِ أَبِيهِ أَوْ تَوَلَّى غَيْرَ مَوَالِيهِ فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ لَا يُقْبَلُ مِنْهُ صرف وَلَا عدل»
ব্যাখ্যা: ‘আলী (রাঃ)-এর উক্তি- ‘‘আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কুরআন ছাড়া কিছুই লিখি না, আর যা এ সহীফায় রয়েছে।’’ উল্লেখিত বাক্যে হাদীসটি ইমাম বুখারীর সহীহ গ্রন্থে সুফিয়ান-এর সূত্রে তিনি আ‘মাশ হতে, তিনি ইব্রাহীম আত্ তায়মী হতে, তিনি তার পিতা হতে, তিনি ‘আলী হতে বর্ণনা করেছেন।
হাদীসটি ইমাম মুসলিম আবূ মু‘আবিয়াহ্-এর সূত্রে তিনি আ‘মাশ থেকে, তিনি ইব্রাহীম থেকে, তিনি তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি অর্থাৎ- ইয়াযীদ ইবনু শারীক আত্ তায়মী (ইব্রাহীম-এর পিতা) বলেছেন, ‘আলী ইবনু আবূ ত্বলিব আমাদের মাঝে খুৎবাহ্ দিতে গিয়ে বললেন, ‘‘যে ধারণা করে যে কুরআন ছাড়া এবং এ সহীফাহ্ ছাড়া আমাদের নিকট আরো কিছু আছে যা আমরা পাঠ করে থাকি সে মিথ্যা বলল।’’
ইমাম বুখারী আবূ জুহাফাহ্’র সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি ‘আলী -কে জিজ্ঞেস করলাম আপনাদের নিকট কি কোন কিতাব আছে? তিনি বললেন, না, তবে আল্লাহর কিতাব (আল কুরআন) এবং ঐ বুঝ বা জ্ঞান যা একজন মুসলিম মুসলিমকে (আল্লাহর পক্ষ থেকে) দেয়া হয়েছে আর এ সহীফায় যা রয়েছে।
হাফিয ইবনু হাজার আল আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, প্রশ্নকারী ‘আলী (রাঃ)-কে বহুবচনে সম্বোধন করে প্রশ্ন করেছেন; এর দ্বারা হয়তো পুরো আহলে বায়ত উদ্দেশ্য অথবা তার সম্মান উদ্দেশ্য।
আবূ জুহায়ফাহ্ ‘আলী (রাঃ)-কে এ প্রশ্নের করার কারণ হলো শী‘আদের ধারণা- আহলে বাইত তথা নাবী পরিবার, বিশেষ করে ‘আলী (রাঃ)-এর নিকট ওয়াহীর এমন কতিপয় বিষয় ছিল যা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে খাসভাবে দান করেছিলেন, যে সম্পর্কে অন্যদের কোন অবহিত ছিল না।
ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেনঃ শী‘আ এবং রাফিযীরা বলে থাকে, ‘আলী (রাঃ)-এর প্রতি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেকগুলো ওয়াসিয়্যাত করে গেছেন এবং শারী‘আতের গুপ্ত ভান্ডার, দীনের কাওয়ায়িদ এবং আসরারুল ‘ইলম বা ‘ইলমের গুপ্ত রহস্য বা তত্ত্বজ্ঞান তাকে দিয়ে গেছেন। তিনি আহলে বাইতদের এমন কিছু দিয়ে গেছেন যার সম্পর্কে অন্যদের কোন জ্ঞান-ই নেই। তাদের এ দাবী সম্পূর্ণ ভ্রান্ত, মিথ্যা এবং বাতিল। ‘আলী (রাঃ)-এর নিজের কথাই তার ব্যাখ্যা প্রদান করেছে, যা অন্য বর্ণনায় এসেছে। আবূ জুহায়ফাহ্ ‘আলী (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন- ‘‘আপনার এ সহীফায় কি আছে?’’ উত্তরে তিনি বলেছেন, বন্দীপণ, অর্থাৎ- বন্দীর মুক্তিপণ।
হাফিয ইবনু হাজার আল আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, বুখারী এবং মুসলিমে ইয়াযীদ আত্ তায়মীর সূত্রে ‘আলী (রাঃ) থেকে এভাবে বর্ণনা এসেছে, তিনি বলেছেন,
ما عندنا شيء نقرؤه إلا كتاب الله وهذه الصحيفة، فإذا فيها الجراحات وأسنان الإبل والمدينة حرم.
আমাদের নিকট রক্ষিত আল্লাহর কিতাব ছাড়া আর কিছুই পাঠ করি না, আর এ সহীফায় যা রয়েছে। এতে রয়েছে, যখমের বিধান, উটের দাঁতের বিধান এবং মদীনার সম্মানের বিধান।
সহীহ মুসলিমে আবূ তুফায়ল-এর সূত্রে রয়েছে- ‘আলী (রাঃ) বলেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বসাধারণের নিকট থেকে আমাদের কোন কিছুতেই বিশেষ কোন কিছু দ্বারা খাস করেননি। তবে এ তরবারির খাপে যা সংরক্ষিত। এরপর তিনি সেটা হতে লিখিত সংকলন বের করে দেখেন সেখানে লেখা আছে- لعن الله من ذبح لغير الله... الحديث। আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন ঐ ব্যক্তির ওপর যে আল্লাহর নাম ছাড়া অন্যের নামে পশু যাবাহ করে......। মুসনাদে আহমাদের বর্ণনায় এসেছে- সেটাতে ফারায়িযুস্ সাদাকা লিখা ছিল। এ সকল বিভিন্ন রকম অর্থ সম্বলিত বর্ণনা সত্ত্বেও এ সহীফাহ্ ছিল একটি মাত্র এবং সকল বর্ণনার কথাগুলোই সেটাতে লিখা ছিল। যে যে বাক্য স্মরণ রেখেছেন সে সেটুকুই বর্ণনা করেছেন।
সহীহুল বুখারীতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বর্ণনা ‘‘মদীনাহ্ সম্মানিত’’-এর মূলে ‘আরাবী حرام শব্দ ব্যবহার হয়েছে যার অর্থ নিষিদ্ধ।
আহমাদ, আবূ দাঊদ প্রভৃতি গ্রন্থেও অনুরূপ ‘আলিফ’সহ ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু মুসলিমের বর্ণনায় المدينة حرم ‘আলিফ’ ছাড়া বর্ণিত হয়েছে। এমনকি বুখারী, আহমাদ, তিরমিযী, নাসায়ী প্রভৃতি গ্রন্থেও।
الحرام শব্দটি ‘আলিফ’ ছাড়া حَرَمٌ-এর অর্থ প্রদান করেছে। কেননা বিভিন্ন রকমের বর্ণনার একটি আরেকটির তাফসীর করে থাকে।
মুল্লা ‘আলী কারী (রহঃ) বলেন, حرام-এর অর্থ محترم ممنوع مما يقتضي إهانة الموضع المكرم অর্থ ‘‘সম্মানিত’’, যে সম্মানিত স্থানের অবমাননা নিষিদ্ধ। ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ) الحرام-এর অর্থ গ্রহণ করেছে الحرم নিষিদ্ধ ও সম্মানিত।
মদীনার এ নিষিদ্ধ এরিয়া হলো ‘আয়র এবং সাওর-এর মধ্যবর্তী স্থান। ‘আয়র হলো মদীনাহ্ থেকে কিবলার দিকে যুল্ হুলায়ফার (যা মদীনাবাসীদের মীকাত) সন্নিকটে প্রসিদ্ধ একটি পাহাড়। আর সাওর হলো উহুদ পাহাড়ের পিছনে ছোট্ট একটি পাহাড়, তাই বলে এটা মক্কার সে সাওর পাহাড় নয়।
(ثور) ‘সাওর’ শব্দটি ইমাম মুসলিমের একক বর্ণনা, বুখারীতে (إلى كذا) শব্দে বর্ণিত হয়েছে, যাতে ইব্হাম বা অস্পষ্টতা রয়েছে।
আবূ ‘উবায়দ আল কাসিম ইবনুস্ সালাম বলেন, (مَا بَيْنَ عَيْرِ إِلٰى ثَوْرٍ) এ শব্দ সম্বলিত বাক্যটি ইরাকবাসীদের বর্ণনা, মদীনাবাসীরা ‘সাওর’ নামক কোন পর্বত আছে বলে তারা জানে না। ‘সাওর’ হলো মক্কার পাহাড়ের নাম। আমরা মনে করি হাদীসের আসল কথা হলোঃ (مَا بَيْنَ عَيْرِ إِلٰى ثَوْرٍ)
হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, এটা ত্ববারানী এবং আহমাদ-এর বর্ণনা যা ‘আব্দুল্লাহ ইবনুস্ সালাম রিওয়ায়াত করেছেন, উভয় বর্ণনায় উহুদ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। মদীনার সম্মানিত বা নিষিদ্ধ এরিয়া হলো পূর্বে কঙ্করময় টিলা এবং পশ্চিমেও কঙ্করময় টিলা আর উত্তর দক্ষিণে সাওর এবং ‘আয়র।
ইমাম শাফি‘ঈ, মালিক, আহমাদ তথা জমহূর আহলে ‘ইলম মনে করেন মক্কার মতই মদীনারও একটি নিষিদ্ধতা রয়েছে, এখানকার শিকার হত্যা করা যাবে না, বৃক্ষ কর্তন করা যাবে না। তবে ইমাম শাফি‘ঈ এবং মালিক (রহঃ)-এর একটি মত কেউ যদি কোন শিকার হত্যা করেই ফেলে অথবা কোন বৃক্ষ কর্তন করেই ফেলে তবে তার ওপর কোন জরিমানা ধার্য হবে না। কিন্তু ইবনু আবিয্ যি’ব এবং আবূ লায়লা প্রমুখ মনীষী বলেন, মক্কার মতই এদের ওপর শান্তির বিধান বর্তাবে। ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) বলেন, মদীনার নিষিদ্ধতা মূলত মক্কার নিষিদ্ধতার মত নয়। মদীনার শিকার হত্যা, বৃক্ষ কর্তনের নিষিদ্ধতা মুস্তাহাব অর্থে, হারাম অর্থে নয় এবং এটা মদীনার বিশেষ সম্মানার্থে বলা হয়েছে।
[এ মতামতগুলো বিভিন্ন ইমাম ও মুহাদ্দিসদের ব্যক্তিগত চিন্তার কথা অন্যথায় হাদীসে সেটাকে মুত্বলাক্বভাবেই হারাম বলা হয়েছে] -অনুবাদক
‘‘যে মদীনায় ইহদাস করল’’, এর অর্থ হলো যে মদীনাহ্ শহরে কোন মুনকার কাজ, বিদ্‘আত কাজ অর্থাৎ- যা কিতাব ও সুন্নাহ পরিপন্থী কাজ সম্পাদন করবে অথবা এ জাতীয় কার্য সম্পাদনকারীকে আশ্রয়দান করবে তার প্রতি আল্লাহর লা‘নাত, তার মালায়িকাহ্’রও লা‘নাত এবং সমগ্র মানবমণ্ডলীর লা‘নাত বর্ষিত হবে। আল্লাহর লা‘নাত অর্থ আল্লাহর রহমাত থেকে দূরে থাকা এবং বঞ্চিত থাকা। আর মালায়িকাহ্’র লা‘নাত মানে তার জন্য আল্লাহর রহমাত থেকে দূরে থাকার (বদ্দু‘আ) করা।
হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, এ বাক্য দ্বারা বুঝা যায় যে, কোন গুনাহগারের প্রতি লা‘নাত করা বৈধ। এতে আরো প্রমাণ পাওয়া যায় যে, বিদ্‘আতকারী এবং বিদ্‘আতীকে আশ্রয়দানকারী উভয়েই সমান গুনাহগার।
কাযী ‘ইয়ায (রহঃ) বলেন, এ হাদীস দ্বারা দলীল গ্রহণ করা যায় যে, মদীনাহ্ শহরে কোন বিদ্‘আত কার্য বা কুরআন সুন্নাহ পরিপন্থী কার্য সম্পাদন করা কাবীরাহ্ গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। কেননা কাবীরাহ্ গুনাহ ছাড়া লা‘নাত করা প্রযোজ্য নয়। মালায়িকাহ্’র লা‘নাত এবং সমগ্র মানবমণ্ডলীর লা‘নাত দ্বারা আল্লাহর রহমাত থেকে দূরে বা বঞ্চিত থাকার কথা মুবালাগাতান বলা হয়েছে (অর্থাৎ- অতিরিক্ততা বা জোর দেয়া)। কেননা লা‘নাত শব্দের আভিধানিক অর্থ (اَلطَّرْدُ وَالإِبْعَادُ) বিতারিত করা, দূরে রাখা।
কেউ বলেছেন, লা‘নাত দ্বারা এখানে উদ্দেশ্য হলো ঐ শাস্তি, যে শাস্তি তার গুনাহের কারণে প্রথমে ভোগ করে নিবে (পরে সে জান্নাতে যাবে)। কাফিরদের ঐ লা‘নাত উদ্দেশ্য নয় যা আল্লাহর রহমাত থেকে সম্পূর্ণরূপে দূরে ও বঞ্চিত করে রাখবে।
তাদের নিকট থেকে কোন বিনিময় অথবা দান গ্রহণ করা হবে না, এখানে عَدْلٌ এবং صَرْفٌ শব্দ দু’টি নিয়ে মনীষীগণ ইখতিলাফ করেছেন। জমহূরের মতে صَرْفٌ হলো ফরয দান এবং عَدْلٌ হলো নফল দান। ইমাম ইবনু খুযায়মাহ্ হাসান বাসরী (রহঃ)-এর সূত্রে ঠিক এর বিপরীত বর্ণনা করেছেন। ইমাম আসমা‘ঈ বলেন, الصرف অর্থ হলো التوبة, আর العدل হলো الفدية। এছাড়া আরো অনেকে অনেক কথা বলেছেন।
সমগ্র মু’মিন যেমন একটি দেহের ন্যায়, দেহের একটি অঙ্গ আক্রান্ত হলে সমস্ত দেহই তার ব্যথা অনুভব করে, ঠিক অনুরূপ সমগ্র মুসলিমের যিম্মাহ ও প্রতিশ্রুতি যা কেউই তা ভঙ্গ করতে পারবে না। হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, একজন মুসলিমও যদি কোন কাফিরকে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেয় তবে অন্য কোন মুসলিম তা ভঙ্গ করতে পারবে না।
অন্য বর্ণনায় এসেছে, যে আপন পিতাকে বাদ দিয়ে অন্যকে পিতৃ-পরিচয় দিবে এবং যে কৃতদাস নিজ মনিবের পরিবর্তে অন্যকে মনিব পরিচয় দিবে তার প্রতিও লা‘নাত। অপরকে পিতৃ পরিচয় দেয়া বহু কারণেই হতে পারে তন্মধ্যে দু’টি কারণ প্রধান। যথা- (১) মীরাসী সম্পদ গ্রহণের জন্য এবং (২) বংশীয় মর্যাদা লাভের জন্য। যে কারণেই হোক এ কাজ সম্পূর্ণরূপে হারাম ও নিষিদ্ধ।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭২৯-[২] সা’দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি মদীনার দু’ সীমানার মধ্যবর্তী জায়গাকে হারাম ঘোষণা করছি- এর বৃক্ষলতা কাটা যাবে না এবং এর শিকার করা যাবে না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরো বলেন, মদীনাহ্ ঐসব লোকের জন্য কল্যাণকর, যদি তারা বুঝতে পারে। যে ব্যক্তি অনাগ্রহী হয়ে মদীনাহ্ ত্যাগ করবে, তার বদলে আল্লাহ তা’আলা তার চেয়েও উত্তম ব্যক্তিকে সেখানে স্থান দেবেন। যে ব্যক্তি মদীনার অভাব-অনটন ও বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করে অটুট থাকবে, কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য সাক্ষী ও সুপারিশকারী হবো। (মুসলিম)[1]
بَابُ حَرَمِ الْمَدِيْنَةِ حَرَسَهَا اللّٰهُ تَعَالٰى
وَعَنْ سَعْدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنِّي أُحَرِّمُ مَا بَيْنَ لَابَتَيِ الْمَدِينَةِ: أَنْ يُقْطَعَ عِضَاهُهَا أَوْ يُقْتَلَ صَيْدُهَا وَقَالَ: «الْمَدِينَةُ خَيْرٌ لَهُمْ لَوْ كَانُوا يعلَمونَ لَا يَدَعُهَا أَحَدٌ رَغْبَةً عَنْهَا إِلَّا أَبْدَلَ اللَّهُ فِيهَا مَنْ هُوَ خَيْرٌ مِنْهُ وَلَا يَثْبُتُ أَحَدٌ عَلَى لَأْوَائِهَا وَجَهْدِهَا إِلَّا كُنْتُ لَهُ شَفِيعًا أَو شَهِيدا يَوْم الْقِيَامَة» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: মদীনার মর্যাদা ও সম্মানের কিছু কথা পূর্বের হাদীসে অতিবাহিত হয়েছে। এখানকার বৃক্ষাদি কর্তন করা যাবে না এবং কোন শিকার হত্যা করা যাবে না। এ নিষিদ্ধ এলাকার সীমাও বর্ণিত হয়েছে। অত্র হাদীসে ঐগুলো ছাড়া আরো বর্ণিত হয়েছে- ‘‘মদীনাহ্ তাদের জন্য কল্যাণ যদি তারা জানত’’।
মুল্লা ‘আলী কারী (রহঃ) বলেন, এ ঘোষণা মদীনার মুসলিম অধিবাসীদের জন্য। আর এ কল্যাণ দুনিয়া এবং আখিরাত উভয় জগতের জন্যই। অথবা খায়রিয়্যাত বা কল্যাণ দ্বারা উদ্দেশ্য দুনিয়ার জীবন-জিন্দেগীতে অধিক বারাকাত লাভ করা।
এ হাদীসের ব্যাখ্যায় (মুসলিমের হাশিয়ায়) ‘আল্লামা সিনদী বলেন, এ হাদীস ঐ ব্যক্তিদের জন্য যারা মদীনাহ্ ত্যাগ করে সুখের আশায় অন্য শহরে চলে যায় তাদের জন্য সতর্কবাণী।
কেউ কেউ বলেছেন, মদীনার এ ফাযীলাতের ঘোষণা ‘আলিম ব্যক্তিদের জন্য। যেহেতু এটি একটি মর্যাদাসম্পন্ন শহর সুতরাং সেটার মর্যাদা কেবল মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরাই অনুভব করতে পারে। আর তার চাহিদা অনুপাতে নিজ নিজ ‘ইলমের দ্বারা সেটার দাবী মোতাবেক ‘আমল করতে পারে। পক্ষান্তরে যাদের ‘ইলম নেই তারা ঐ শহরের যথাযথ মর্যাদাও দিতে পারে না এবং সেটার ফাযীলাত ও কল্যাণও লাভ করতে পারে না। এ শহরের প্রতি আগ্রহহীন হয়ে (এ শহরে) বসবাস ত্যাগ করলে আল্লাহ তা‘আলা তার চেয়ে উত্তম ব্যক্তিকে সেখানে আবাসন দান করবেন। তবে যদি কেউ এ শহরের প্রতি বিতশ্রদ্ধ হয়ে নয় বরং অনিবার্য কারণে বা কোন ফিতনাহ্ থেকে বাঁচার জন্য তা ত্যাগ করে সে এ হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হবে না।
আল্লামা বাজী (রহঃ) বলেন, আমি মনে করি যারা মদীনার আদীবাসী বা স্থায়ী বাসিন্দা তাদের জন্য এ হুকুম। কিন্তু যারা অন্য স্থানের বাসিন্দা পরবর্তীতে তারা মদীনায় ‘ইলম শিক্ষার জন্য অথবা মদীনার ফাযীলাত লাভের জন্য এসে বসবাস করছেন অথবা অত্যাবশ্যক প্রয়োজনেই এ শহর ত্যাগ করছেন তাদের জন্য এ হুকুম নয়।
এরপর প্রশ্ন হলো- ফাযীলাতের এ বিধান কতদিন পর্যন্ত? ইবনু ‘আবদিল বার এবং ‘আল্লামা যুরক্বানী সহ বহু মনীষী বলেন, এ ফাযীলাত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশাকাল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তিকালের পর হাজার হাজার সাহাবী মদীনাহ্ শহর ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন এবং অন্যত্র বসতি স্থাপন করেছেন। যেমন- আবূ মূসা আল আশ্‘আরী, ইবনু মাস্‘ঊদ, মু‘আয, আবূ ‘উবায়দাহ্, ‘আলী, তলহা, যুবায়র, ‘আম্মার, হুযায়ফাহ্, ‘উবাদাহ্ ইবনুস্ সামিত, বিলাল, আবুদ্ দারদা, আবূ যার প্রমুখ সহাবা (রাঃ) স্ববিশেষ উল্লেখযোগ্য এ সকল মহান ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সহাবা (রাঃ) মদীনাহ্ ছেড়ে অন্যত্র বসবাস করেছেন এবং সেখানেই তারা ইন্তিকাল করেছেন।
সুতরাং বুঝা যায় মদীনার এ ফাযীলাত তার জীবিত থাকাকাল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ।
অন্য আরেকদলের মতে মদীনার ঐ ফাযীলাত সর্বকাল ব্যপ্ত। এখনও সেটাতে বসবাসে ঐ ফাযীলাত মিলবে। উপরে বর্ণিত সাহাবীগণ যারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তিকালের পর মদীনাহ্ ত্যাগ করে অন্য শহরে গিয়ে বসবাস করেছেন, তারা মদীনায় আর ফিরে আসেন নেই, বরং সেখানেই ইন্তিকাল করেছেন। তারা কেউ মদীনার প্রতি অনাসক্ত বা বিতশ্রদ্ধ হয়ে মদীনাহ্ ত্যাগ করেননি, বরং তারা দীনের যে কোন কল্যাণে যেমন- ‘ইলম কিংবা জিহাদের জন্য অথবা অন্য কোন অতীব প্রয়োজনীয় উম্মাতে মুসলিমার বৃহত্তর কল্যাণে মদীনাহ্ ত্যাগ করেছেন।
মদীনার অভাব-অনটন এবং দুঃখ-কষ্টে যে ধৈর্য ধারণ করে থাকবে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্বিয়ামাতের দিন তার জন্য সাক্ষ্যদানকারী শাফা‘আতকারী হবেন। এ দুঃখ-কষ্ট হলো- অভাব-অনটন বা ক্ষুধা, মদীনার প্রচন্ড ক্ষরা, এখানে বিদ্‘আতী অধিবাসীদের পক্ষ থেকে আগত অত্যাচার বা দুঃখ-কষ্ট ইত্যাদি।
‘আল্লামা জাওহারী দুঃখ-কষ্টের মূলে اللاواء শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে যার অর্থ الشدة কষ্ট-কাঠিন্যতা, কিন্তু এখানে উদ্দেশ্য হলো জীবন-জিন্দেগীর সংকীর্ণতা এবং দুর্ভিক্ষ।
মানুষের অবস্থাভেদে কারো জন্য নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাক্ষী হবেন কারো জন্য সুপারিশকারী হবেন।
অত্র হাদীসে এদিকে ইশারা রয়েছে যে, জীবনের অবসান যেন সুন্দরভাবে হয়, অর্থাৎ- ঈমানের উপর হয়। আর মু’মিনের উচিত ধৈর্য ধারণ করা, বরং মদীনায় অবস্থানের সুযোগ পেয়ে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ হওয়া। অন্য শহরের চাকচিক্যময় সুখণ্ডসামগ্রীর প্রতি দৃষ্টিনিবদ্ধ করা উচিত নয়। কেননা আখিরাতের নি‘আমাতই হলো প্রকৃত নি‘আমাত বা সুখ-সামগ্রী।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭৩০-[৩] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার উম্মাতের মধ্যে যে ব্যক্তি মদীনায় অভাব-অনটন ও বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করবে আমি অবশ্যই কিয়ামতের দিন তার জন্য সুপারিশকারী হবো। (মুসলিম)[1]
بَابُ حَرَمِ الْمَدِيْنَةِ حَرَسَهَا اللّٰهُ تَعَالٰى
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا يَصْبِرُ عَلَى لَأْوَاءِ الْمَدِينَةِ وَشِدَّتِهَا أَحَدٌ مِنْ أُمَّتِي إِلَّا كُنْتُ لَهُ شَفِيعًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যা: (لَا يَصْبِرُ عَلٰى لَأْوَاءِ الْمَدِيْنَةِ) অর্থাৎ- মদীনার প্রচন্ড দুর্ভিক্ষতা। (وَشِدَّتِهَا) এর দ্বারাও মদীনার অসহ্য পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে।
আবূ ‘উমার বলেনঃ মদীনাহ্ ও তার অবর্ণনীয় পরিস্থিতির কথা বলা হয়ছে। যেমন- দুর্ভিক্ষ, অনাবৃষ্টি, উপার্জনহীনতা ইত্যাদি।
ইমাম বাজী (রহঃ) বলেনঃ لَأْوَاءِ ‘‘লাওয়া’’ শব্দের অর্থ হলো দুর্ভিক্ষ, প্রচন্ড ক্ষুধা ও উপার্জনহীনতা। شِدَّتِهَا শব্দের উদ্দেশ্য ‘‘লাওয়া’’-ও হতে পারে এবং মদীনার সকল অধিবাসীর অবর্ণনীয় পরিস্থিতি হতে পারে।
ইমাম মাযিরী (রহঃ) বলেনঃ لَأْوَاءِ বলা হয় উপার্জনহীনতা। আর شِدَّتِهَا هَا ‘যমির’টি মদীনাহ্ ও لَأْوَاءِ ‘‘লাওয়া’’ উভয় শব্দের দিকে ফিরার সম্ভাবনা রাখে।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭৩১-[৪] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, লোকেরা যখন গাছের প্রথম ফল দেখতো তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে হাযির করতো। যখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ ফল গ্রহণ করতেন, তখন বলতেন, আল্লাহ! আমাদের ফলে (শস্য-ফসলে) বারাকাত দান কর এবং আমাদের এ শহরে বারাকাত দান কর। আমাদের সা’-তে বারাকাত দান কর, আমাদের মুদ-এ (মাপার যন্ত্র বা পাত্রে) বারাকাত দান কর। হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই ইব্রাহীম (আঃ) তোমার বান্দা, তোমার বন্ধু ও তোমার নবী। আর আমিও তোমার বান্দা ও নবী। তিনি মক্কার জন্য তোমার কাছে দু’আ করেছেন, আর আমিও মদীনার জন্য তোমার কাছে দু’আ করছি, যেভাবে তিনি মক্কার জন্য তোমার কাছে দু’আ করেছেন। বর্ণনাকারী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] বলেন, অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সবচেয়ে ছোট শিশু সন্তানকে ডাকতেন এবং তাকে ঐ ফল (খেতে) দিতেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ حَرَمِ الْمَدِيْنَةِ حَرَسَهَا اللّٰهُ تَعَالٰى
وَعَنْهُ قَالَ: كَانَ النَّاسُ إِذَا رَأَوْا أَوَّلَ الثَّمَرَةِ جَاءُوا بِهِ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَإِذَا أَخَذَهُ قَالَ: «اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي ثَمَرِنَا وَبَارِكْ لَنَا فِي مَدِينَتِنَا وَبَارِكْ لَنَا فِي صَاعِنَا وَبَارِكْ لَنَا فِي مُدِّنَا اللَّهُمَّ إِنَّ إِبْرَاهِيمَ عَبْدُكَ وَخَلِيلُكَ وَنَبِيُّكَ وَإِنِّي عَبْدُكَ وَنَبِيُّكَ وَإِنَّهُ دَعَاكَ لِمَكَّةَ وَأَنَا أدعوكَ للمدينةِ بمثلِ مَا دعَاكَ لمكةَ ومِثْلِهِ مَعَهُ» . ثُمَّ قَالَ: يَدْعُو أَصْغَرَ وَلِيدٍ لَهُ فيعطيهِ ذَلِك الثَّمر. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: যে সমস্ত লোকেরা তাদের গাছের নতুন ফল নিয়ে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসতেন তারা হলেন সহাবায়ে কিরাম। তারা তাদের নতুন ফল বা প্রথম ফল নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে হাদিয়্যাহ্ বা উপঢৌকন পেশ করতেন। ‘উলামায়ে কিরাম বলেছেন, তারা এ কাজ এজন্য করেছেন যেন আল্লাহর নাবীর দু‘আ লাভ করতে পারেন। কেননা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট কোন ফল হাদিয়্যাহ্ পেশ করলেই তিনি ফলের জন্য দু‘আ করতেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাহ্ শহরের জন্য দু‘আ করতেন, মদীনার সা' এবং মুদ-এর জন্য দু‘আ করতেন।
[এ দু‘আর ফলে দু’ একজনের গাছে বছরে দু’বারও খেজুর ধরতে দেখা গেছে। -অনুবাদক]
কেউ কেউ বলেছেন, নিজেদের ওপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রাধান্য দেয়ার এবং তার প্রতি মুহাববাতের খাতিরেই তারা এ কাজ করেছেন।
‘আল্লামা যুরক্বানী (রহঃ) বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মহান স্বকীয় সত্তার মর্যাদা ও মহাব্বাতের কারণেও এ হাদিয়্যাহ্ হতে পারে, আবার তার দু‘আ থেকে বারাকাত লাভের জন্যও হতে পারে।
নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে কোন ফল হাদিয়্যাহ্ পেশ করলেই দু‘আ করতেনঃ ‘‘হে আল্লাহ! তুমি আমাদের ফলে বারাকাত দান করো।’’ অর্থাৎ- এতে ফলন ও প্রবৃদ্ধি দান করো, এর স্থায়িত্ব দান করো। কাযী ‘ইয়াযও এমনটিই ব্যাখ্যা করেছেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ মুহূর্তে মদীনাহ্ শহরের জন্য দু‘আ করতেন, হে আল্লাহ! তুমি আমাদের মদীনাহ্ শহরকে বারাকাতমণ্ডিত করো। মদীনাহ্ শহরের বারাকাত হলো তার স্থানের, আবহাওয়ার এবং তার অধিবাসীদের সঠিক প্রশস্ততা। আল্লাহ তা‘আলা এ শহরের বাহ্যিক এবং আত্মিক উভয় বারাকাত দ্বারা সমৃদ্ধ করে রেখেছেন।
নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনার পরিমাপের পাত্র বা মাধ্যম সা' এবং মুদ-এর জন্য দু‘আ করেছেন। ‘আল্লামা ইবনু ‘আবদিল বার (রহঃ) বলেন, এটা তার অলঙ্কারপূর্ণ বিজ্ঞচিত বাক্যবিশেষ, মূলত দু‘আ ছিল খাদ্যে বারাকাতের জন্য এবং পরিমাপ যন্ত্রে বা মাধ্যমে যা ধারণ করা হয় তার জন্যে, পরিমাপ যন্ত্রের জন্য দু‘আ নয়। তবে উভয়ের জন্যও হতে পারে যেমন- ‘আল্লামা নাবাবী (রহঃ) বলেছেন, ইব্রাহীম (আঃ) মক্কার জন্য দু‘আ করেছিলেন, আল্লাহ তা‘আলা তার দু‘আ কবূল করেছেন ফলে মক্কার মানুষ বিশ্বের নানা ফলমূল দ্বারা রিযক্বপ্রাপ্ত হতে আছে। আমাদের নাবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেটা উল্লেখ করে মদীনার জন্য দু‘আ করেছেন, ফলে আল্লাহ তা‘আলা মদীনাহ্ শহরকেও অনুরূপ বারাকাতপূর্ণ করেছেন। দূর-দূরান্ত থেকে এখানেও এসে মানুষ আল্লাহ তা‘আলার নি‘আমাত ও মসজিদে নাবাবীর ফাযীলাত হাসিলে ধৈন্য হয়। বরং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার চেয়ে দ্বিগুণ বারাকাত চেয়ে মদীনার জন্য দু‘আ করেছেন। এতদসংক্রান্ত বর্ণনা তৃতীয় পরিচ্ছেদে আসছে। উক্ত হাদীস দ্বারা কেউ কেউ মক্কার উপর মদীনার ফাযীলাত বর্ণনা করতে প্রয়াস পেয়েছেন।
‘আল্লামা বাজী (রহঃ) বলেন, ইব্রাহীম (আঃ) মক্কাবাসীদের জন্য দু‘আ করেছিলেন যা তা ছিল নিছক দুনিয়ার ফলমূল দ্বারা রিযক্ব দানের বিষয়ে, কিন্তু নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাবাসীদের জন্য যে দু‘আ করেছিলেন তা দুনিয়া বিষয়ক এবং তার সাথে অনুরূপ আরো। সম্ভবত সেটি ছিল আখিরাতের বিষয় যেমন- মক্কায় পুণ্যার্জন বহুগুণে লাভ করা যায় অনুরূপ মদীনার পুণ্যও যেন বহুগুণে পাওয়া যায়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আগত নতুন ফল ছোট বাচ্চাদের ডেকে দিয়ে দিতেন। এটা ছিল তার শিশুদের প্রতি ভালবাসার সর্বোচ্চ নমুনা। শিশুদের আনন্দদান বড়দের আনন্দদানের চেয়ে অনেক বেশী ভাল। আবূ ‘উমার (রহঃ) বলেন, এটা উত্তম শিষ্টাচারের এবং সর্বোত্তম চরিত্রের নমুনা ঐ শিশু নিজ পরিবারের হোক অথবা পাড়া-প্রতিবেশীর হোক তাতে কোন ভেদাভেদ ছিল না।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭৩২-[৫] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ইব্রাহীম (আঃ) মক্কাকে সম্মানিত করেছেন এবং একে হারাম (পবিত্রতা) ঘোষণা করেছেন, আর আমি মদীনাকে এর দু’ সীমার মধ্যবর্তী স্থানকে যথাযথভাবে সম্মানে সম্মানিত করলাম। এতে রক্তপাত করা যাবে না, যুদ্ধের জন্য অস্ত্র গ্রহণ করা যাবে না, পশুর খাবার ছাড়া এতে কোন গাছপালার পাতা ঝরানো যাবে না। (মুসলিম)[1]
بَابُ حَرَمِ الْمَدِيْنَةِ حَرَسَهَا اللّٰهُ تَعَالٰى
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّ إِبْرَاهِيمَ حَرَّمَ مَكَّةَ فَجَعَلَهَا حَرَامًا وَإِنِّي حَرَّمْتُ الْمَدِينَةَ حَرَامًا مَا بَيْنَ مَأْزِمَيْهَا أَنْ لَا يُهْرَاقَ فِيهَا دَمٌ وَلَا يُحْمَلَ فِيهَا سلاحٌ لقتالٍ وَلَا تُخبَطَ فِيهَا شجرةٌ إِلَّا لعلف» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ ‘‘ইব্রাহীম মক্কাকে হারাম করেছেন’’-এর অর্থ হলো তিনি এর হারাম হওয়ার বিষয়টি জনগণের নিকট প্রকাশ করে তা ঘোষণা করেছেন। সুতরাং পূর্বে বর্ণিত যে হাদীসে এ কথা এসেছে যে, ‘‘নিশ্চয় মক্কাকে আল্লাহ তা‘আলাই হারাম করেছেন, কোন মানুষ একে হারাম করেনি’’, এর সাথে কোন বিরোধ নেই। মূলত এটা আল্লাহ তা‘আলাই হারাম করেছেন, নাবী ইব্রাহীম তা ঘোষণা করেছেন মাত্র। তার দিকে হারামের নিসবাত বা সম্পর্ক ইস্তিআরাহ্ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা ‘‘মক্কার সম্মান’’ পর্বে ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর হাদীসে অতিবাহিত হয়েছে। ‘আরাবীতে শব্দ مَأْزِمَيْهَا -এর অর্থ দুই পাহাড়, উদ্দেশ্য দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানকে হারাম ঘোষণা করলাম। এখানে কোন মুসলিমের রক্ত প্রবাহ করবে না, এটা জঘন্য কাজ।
মুল্লা ‘আলী কারী (রহঃ) বলেন, ‘‘এখানে রক্ত প্রবাহ নিষেধ’’-এর দ্বারা উদ্দেশ্য যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষেধ, যার দ্বারা রক্ত প্রবাহ হয়ে থাকে। যাদের রক্ত প্রবাহ এমনি সাধারণভাবে হারাম মক্কা মদীনার হারাম এরিয়ায় তাদের রক্ত প্রবাহ আরো কঠিনতরভাবে হারাম।
এখানে কোন প্রকার অস্ত্র বহনও হারাম, প্রয়োজন ব্যতিরেকে বৃক্ষ কর্তন, অর্থাৎ- পশুর খাদ্য সংগ্রহ ইত্যাদি ব্যতীত গাছের পাতা ছেড়া ও কর্তন করাও নিষেধ।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭৩৩-[৬] ’আমির ইবনু সা’দ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (আমার পিতা) সা’দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ) সওয়ারীতে চড়ে তাঁর আক্বীক্বস্থ গৃহস্থলের দিকে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি দেখলেন একটি ক্রীতদাস (মদীনায়) একটি গাছ অথবা পাতা কাটছে বা ঝড়াচ্ছে। এতে তিনি কৃতদাসটির জামা-কাপড় ও অস্ত্রশস্ত্র কেড়ে নিলেন। অতঃপর সা’দ মদীনায় ফিরে আসলে ক্রীতদাসের মালিকগণ তার নিকট এসে তাদের দাসের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া সমস্ত জিনিস ফিরিয়ে দিতে অনুরোধ করলেন। তখন তিনি (সা’দ) বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে যা দান করেছেন তা আমি ফিরিয়ে দেয়া হতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। আর তিনি তা ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করলেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ حَرَمِ الْمَدِيْنَةِ حَرَسَهَا اللّٰهُ تَعَالٰى
وَعَنْ عَامِرِ بْنِ سَعْدٍ: أَنَّ سَعْدًا رَكِبَ إِلَى قَصْرِهِ بِالْعَقِيقِ فَوَجَدَ عَبْدًا يَقْطَعُ شَجَرًا أَوْ يَخْبِطُهُ فَسَلَبَهُ فَلَمَّا رَجَعَ سَعْدٌ جَاءَهُ أَهْلُ الْعَبْدِ فَكَلَّمُوهُ أَنْ يَرُدَّ عَلَى غُلَامِهِمْ أَوْ عَلَيْهِمْ مَا أَخَذَ مِنْ غُلَامِهِمْ فَقَالَ: مَعَاذَ اللَّهِ أَنْ أَرُدَّ شَيْئًا نَفَّلَنِيهِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَبِي أَنْ يرد عَلَيْهِم. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: এ সা‘দ ছিলেন আশারায়ে মুবাশশারাহ্-এর অন্যতম ব্যক্তিত্ব। মদীনার অনতিদূরে ‘আক্বীক্ব নামক স্থানে তার একটি ভবন ছিল। হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেনঃ ‘আক্বীক্ব হলো যুল্ হুলায়ফার সন্নিকটে একটি স্থান। সেখানে একটি কৃতদাসকে দেখেন মদীনার নিষিদ্ধ স্থানে বৃক্ষ কর্তন করছে এবং তার পাতা ছিঁড়ছে। তাই তিনি তার অস্ত্র-শস্ত্র কেড়ে নিয়ে মদীনায় ফিরে আসলেন। অতঃপর কৃতদাসের মালিক যখন তার কাছে এসে কেড়ে আনা সামগ্রী ফেরত চাইলেন তখন তিনি আল্লাহর আশ্রয় চেয়ে বললেনঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা আমার জন্য নফল নির্ধারণ করেছেন। অর্থাৎ- যে মদীনার এ নিষিদ্ধ স্থানে শিকার ধরবে, বৃক্ষ কর্তন করবে তার মালামাল ক্রোক করে নিতে হবে। সুতরাং তার এ মালামাল ফেরত দেয়া হবে না।
‘আল্লামা নাবাবী (রহঃ) বলেনঃ এ হাদীস মদীনার নিষিদ্ধ স্থানে শিকার ধরা, বৃক্ষ কর্তন করা ইত্যাদি নিষেধ হওয়ার পক্ষে ইমাম শাফি‘ঈ, মালিক, আহমাদ এবং জমহূর ইমাম ও মুজতাহিদের পক্ষে সুস্পষ্ট প্রমাণ-দলীল। ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) তার বিপক্ষে মত পোষণ করেন, ইতিপূর্বে এ বিষয়ে আলোচনা হয়ে গেছে। ইমাম মুসলিম মদীনার ঐ নিষিদ্ধতার পোষকতায় ‘আলী, সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস, আনাস ইবনু মালিক, জাবির ইবনু ‘আবদিল্লাহ, আবূ সা‘ঈদ (খুদরী), আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ), ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘উবায়দ, রাফি‘ ইবনু খাদীজ, সাহল ইবনু হুনায়ফ প্রমুখ সহাবা থেকে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মারফূ' হাদীস উল্লেখ করেছেন। অন্যেরাও আরো অন্যান্য সহাবা থেকেও হাদীস বর্ণনা করেছেন।
সুতরাং এ সকল সহীহ হাদীসের ভিত্তিতে প্রচলিত বা জারীকৃত ‘আমলের বিরোধীদের দিকে ভ্রুক্ষেপের কোনই প্রয়োজন নেই। মদীনার হারাম স্থানের মধ্য থেকে বৃক্ষ কর্তন বা শিকার ধরার কারণে তার সবকিছু ছিনিয়ে নেয়ার এ হাদীস হানাফীগণ মানসূখ বা রহিত অথবা বিশেষ ব্যাখ্যার দাবী করে থাকেন।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭৩৪-[৭] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আসার পর আমার পিতা আবূ বকর ও (মুয়াযযিন) বিলাল (রাঃ) ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত হলেন। আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গিয়ে তাঁকে তাদের অসুস্থতার খবর জানালে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, হে আল্লাহ! তুমি আমাদের জন্য মদীনাকে প্রিয় কর যেভাবে মক্কা আমাদের নিকট প্রিয় অথবা তার চেয়েও বেশি। হে আল্লাহ! তুমি মদীনাকে আমাদের জন্য স্বাস্থ্যকর কর, আমাদের জন্য এর সা’ এবং মুদ-এ (পরিমাপ যন্ত্রে) বারাকাত দাও, এর জ্বরকে ’’জুহফাহ্’’য় (হাওযের কিনারাসমূহে) স্থানান্তরিত করে দাও। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ حَرَمِ الْمَدِيْنَةِ حَرَسَهَا اللّٰهُ تَعَالٰى
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: لَمَّا قَدِمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَدِينَةَ وُعِكَ أَبُو بَكْرٍ وَبِلَالٌ فَجِئْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَخْبَرْتُهُ فَقَالَ: «اللَّهُمَّ حَبِّبْ إِلَيْنَا الْمَدِينَةَ كَحُبِّنَا مَكَّةَ أَوْ أَشَدَّ وَصَحِّحْهَا وَبَارِكْ لَنَا فِي صاعها ومدها وانقل حماها فاجعلها بِالْجُحْفَةِ»
ব্যাখ্যা: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মদীনায় আগমনের এ সময়টি নিয়ে বিভিন্ন মতামত রয়েছে। ‘আল্লামা যুরক্বানী (রহঃ) বলেনঃ এটি ছিল হিজরতের সময়কার ঘটনা, রবিউল আও্ওয়ালের ১২ দিন অবশিষ্ট থাকতে। বুখারীর বর্ণনা মতে বিদায় হজ্জের সফর থেকে ফিরে আসার সময়ের ঘটনা। এ সময় মদীনাহ্ ছিল মহামারী কবলিত এলাকা। এ মহামারী বিভিন্ন রোগের মাধ্যমেই হতে পারে, তবে জ্বরের ও প্লেগের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ পাওয়া যায়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় পৌঁছলে আবূ বাকর ও বিলাল (রাঃ) জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়েন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এ খবর দেয়া হলে তিনি মদীনার জন্য এবং তার আবহাওয়ার জন্য দু‘আ করলেন। এছাড়াও তিনি মদীনার সা' এবং মুদ্-এ বারাকাতের জন্য দু‘আ করলেন। তিনি মদীনার জ্বরকে জুহ্ফায় স্থানান্তরের জন্যও দু‘আ করলেন।
ইমাম যুরক্বানী (রহঃ) বলেন, আল্লাহ তা‘আলা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ দু‘আ কবূল করেন, ফলে মদীনাকে তার জন্য প্রিয় করে দেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ দু‘আ ইতিপূর্বে মক্কাকে প্রিয় ভূমি হিসেবে বলার পরিপন্থী নয়। যেমন- মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের মুহূর্তে তিনি বলেছিলেনঃ
إنك أحب البلاد إليَّ وإنك أحب أرض الله إلى الله.
অন্য বর্ণনায়ঃ (لقد عرفت أنك أحب البلاد إلى الله)
অর্থাৎ- (হে মক্কা!) নিশ্চয় তুমি আমার প্রিয় ভূমি, তুমি আল্লাহর জমিনের মধ্য হতে আল্লাহর নিকটও প্রিয় জমিন।
ব্যাখ্যাকার ‘আল্লামা ‘উবায়দুল্লাহ মুবারাকপূরী (রহঃ) বলেন, এ মুহাব্বাতের কথা মুবালাগাহ্ হিসেবে বলা হয়েছে। অথবা আল্লাহ তা‘আলা যখন মুহাজিরগণকে মক্কার নিজ মাতৃভূমি, বসতবাড়ী ত্যাগ করে মদীনায় হিজরত করা আবশ্যক করেছিলেন তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘আ করলেন তিনি যেন তাদের অন্তরে মদীনার মুহাববাত বাড়িয়ে দেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনার জ্বরকে জুহফায় স্থানান্তরিত হওয়ার জন্য দু‘আ করেছেন। জুহফার বিবরণ ইতিপূর্বে অতিবাহিত হয়েছে।
‘আল্লামা খাত্ত্বাবী বলেন, ঐ সময় জুহফায় ইসলাম ও মুসলিমদের চিরশত্রু ইয়াহূদীরা বসবাস করত। এ হাদীস থেকে অমুসলিমদের ওপর রোগ-ব্যাধি আপতিত হওয়ার এবং তাদের ধ্বংসের দু‘আ বৈধতা প্রমাণিত হয়। সাথে সাথে মুসলিমদের সুস্থতা কামনা তাদের শহরের জন্য বারাকাত কামনা এবং তাদের নিকট থেকে কষ্ট ও ক্ষতি দূরীভূত হওয়ার জন্য দু‘আ করা আবশ্যক প্রমাণিত হয়।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭৩৫-[৮] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি মদীনাহ্ সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্বপ্নের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ আমি দেখলাম একটি এলোমেলো চুলবিশিষ্টা কালো মহিলা মদীনাহ্ হতে বের হয়ে মাহ্ইয়া’আহ্ (নামক স্থানে) গিয়ে পৌঁছলো। তখন আমি এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করলাম যে, মদীনার মহামারী মাহ্ইয়া’আহ্ স্থানান্তরিত হয়ে গেলো। বর্ণনাকারী বলেন, (মাহ্ইয়া’আহ্) হলো ’জুহফাহ্’। (বুখারী)[1]
بَابُ حَرَمِ الْمَدِيْنَةِ حَرَسَهَا اللّٰهُ تَعَالٰى
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ فِي رُؤْيَا النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الْمَدِينَةِ: رَأَيْتُ امْرَأَةً سَوْدَاءَ ثَائِرَةَ الرَّأْسِ خَرَجَتْ مِنَ الْمَدِينَةِ حَتَّى نَزَلَتْ مَهْيَعَةَ فَتَأَوَّلْتُهَا: أَنَّ وَبَاءَ الْمَدِينَةِ نُقِلَ إِلَى مَهْيَعَةَ وَهِيَ الْجُحْفَةُ . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দু‘আর কারণে মদীনার ‘‘ওয়াবা’’ অর্থাৎ- মহামারী জ্বর মাহ্ইয়া‘আহ্ বা জুহফায় স্থানান্তরিত হয়ে যায়। এ সময় সেটা এলোকেশী কালো মহিলার রূপ ধরে চলে যায়। ইমাম যুরক্বানী বলেন, প্রকৃতির নিয়ম ভঙ্গ করে কোন রোগের এ রকম রূপ অবয়ব ধারণ করা অসম্ভব কিছু নয়। এর পরিপূরকতায় একটি বর্ণনা রয়েছে- এক ব্যক্তি মক্কার পথ বেয়ে আসলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, পথে কি তোমার সাথে কারো সাক্ষাৎ হয়েছিল? লোকটি বলল না, তবে একটি কালো উলঙ্গ মহিলার সাক্ষাত হয়েছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ওটাই মদীনার জ্বর, আজকের পর সে আর কখনো মদীনায় ফিরে আসবে না। অন্য বর্ণনায় আছে- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মদীনায় বর্তমান যে জ্বর আছে সেটি মহামারীময় বরং আমার রবের পক্ষ থেকে রহমাত।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭৩৬-[৯] সুফিয়ান ইবনু আবূ যুহায়র (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, ইয়ামান বিজিত হবে, সেখানে (মদীনার) কিছু লোক (স্থায়ীভাবে) চলে যাবে এবং তাদের সাথে তাদের পরিবার-পরিজন ও অনুসারীদেরও নিয়ে যাবে। অথচ মদীনাই তাদের জন্য উত্তম, যদি তারা বুঝতে পারতো। ঠিক এভাবেই শাম (সিরিয়া) দেশ বিজিত হবে, সেখানে কিছু লোক চলে যাবে তাদের পরিবার-পরিজন ও অনুসারীদেরকেও সাথে নিয়ে যাবে। অথচ মদীনাহ্ হচ্ছে তাদের জন্য উত্তম, যদি তারা বুঝতে পারতো। অনুরূপভাবে ’ইরাক বিজিত হবে, সেখানে কিছু লোক চলে যাবে তাদের সাথে তাদের পরিবার-পরিজন ও অনুসারীদেরকেও নিয়ে যাবে। অথচ মদীনাই হচ্ছে তাদের জন্য উত্তম, যদি তারা বুঝতে পারতো। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ حَرَمِ الْمَدِيْنَةِ حَرَسَهَا اللّٰهُ تَعَالٰى
وَعَنْ سُفْيَانَ بْنِ أَبِي زُهَيْرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «يُفْتَحُ الْيَمَنُ فَيَأْتِي قومٌ يبُسُّونَ فيَتَحمَّلونَ بأهليهم وَمن أطاعهم وَالْمَدِينَةُ خَيْرٌ لَهُمْ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ وَيُفْتَحُ الشَّامُ فَيَأْتِي قَوْمٌ يَبُسُّونَ فَيَتَحَمَّلُونَ بِأَهْلِيهِمْ وَمَنْ أَطَاعَهُمْ وَالْمَدِينَةُ خَيْرٌ لَهُمْ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ وَيُفْتَحُ الْعِرَاقُ فَيَأْتِي قَوْمٌ يَبُسُّونَ فَيَتَحَمَّلُونَ بِأَهْلِيهِمْ وَمَنْ أَطَاعَهُمْ وَالْمَدِينَةُ خَيْرٌ لَهُمْ لَوْ كَانُوا يعلمُونَ»
ব্যাখ্যা: ইয়ামানকে ইয়ামান এজন্য বলা হয় যে, এটা কিবলার ডানদিকে অবস্থিত। ইয়ামান শব্দের অর্থ ডানদিকে, অথবা সূর্যের ডানদিকে হওয়ার কারণে একে ইয়ামান বলা হয়। অথবা ইয়ামান ইবনু ক্বহত্বান-এর নামানুসারে ওর নাম রাখা হয় ইয়ামান।
অত্র হাদীসে ইয়ামান বিজয়ের কথা বলা হয়েছে- এরপর শাম বা সিরিয়ার নাম, এরপর ইরাক্বের নাম উল্লেখ হয়েছে, কিন্তু সহীহ মুসলিমের এক বর্ণনায় আগে সিরিয়ার নাম দিয়ে শুরু করা হয়েছে, এরপর ইয়ামান, অতঃপর ‘ইরাক। ‘আল্লামা যুরক্বানী (রহঃ) বিভিন্ন দেশ বিজয়ের এ ভবিষ্যদ্বাণীকে নবূওয়াতের চিহ্ন বলে অভিহিত করেছেন। ইবনু ‘আবদুল বার (রহঃ) বলেছেনঃ ইয়ামান রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবূওয়াতকালেই বিজিত হয়। অতঃপর আবূ বাকর-এর খিলাফাতকালে শাম বা সিরিয়া, এরপর ইরাক।
এ হাদীসে উল্লেখিত শহরের ওপর মদীনার শ্রেষ্ঠত্ব ও ফাযীলাত সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃত হয়েছে। (কিন্তু মক্কা-মদীনার উত্তমতা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে)। তথাপি লোকেরা মদীনাহ্ শহর ত্যাগ করে উক্ত শহরগুলোতে সুখের ও আরামের অন্বেষায় পরিবার-পরিজন নিয়ে ছুটে চলবে। তারা যদি মদীনার সত্যিকার মর্যাদা বুঝত তাহলে কস্মিনকালেও তা ত্যাগ করত না।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭৩৭-[১০] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি এমন এক জনপদে হিজরতের জন্য আদিষ্ট হলাম যে জনপদ অন্য জনপদসমূহকে গ্রাস করবে। লোকেরা একে ইয়াসরিব বলে, আর এটাই হলো মদীনাহ্। মদীনাহ্ মানুষকে খাঁটি করে। যেভাবে হাঁপর খাদ ঝেড়ে লোহাকে খাঁটি করে। (বুখারী , মুসলিম)[1]
بَابُ حَرَمِ الْمَدِيْنَةِ حَرَسَهَا اللّٰهُ تَعَالٰى
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أُمِرْتُ بِقَرْيَةٍ تَأْكُلُ الْقُرَى. يَقُولُونَ: يَثْرِبَ وَهِيَ الْمَدِينَةُ تَنْفِي النَّاسَ كَمَا يَنْفِي الْكِيرُ خَبَثَ الْحَدِيدِ
ব্যাখ্যা: এ হাদীসের ব্যাখ্যায় ‘আল্লামা ইবনু হাজার আল আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ ‘‘আমার প্রভু আমাকে (একটি গ্রামের দিকে) হিজরতের নির্দেশ করেছেন এবং সেখানে বসবাসেরও নির্দেশ করেছেন।’’ এ গ্রামটি হলো মদীনাহ্। কেউ কেউ এটাকে মক্কার কথাও বলেছেন, তবে মদীনার অর্থ নেয়া অধিক সামঞ্জস্যশীল।
এ গ্রামটি, অর্থাৎ- মদীনাহ্ শহর অন্যান্য গ্রামগুলোকে খেয়ে ফেলবে; এর ব্যাখ্যায় ‘আল্লামা তুরবিশতী (রহঃ) বলেন, এখানে খাওয়ার অর্থ হলো অন্যান্য শহরগুলো বিজিত হওয়া এবং তথাকার সম্পদ অর্জন করা বা নিয়ে নেয়া।
ইবনুল বাত্ত্বাল (রহঃ) বলেন, এর অর্থ হলো মদীনার লোকেরা অন্যান্য শহরগুলো বিজয় করবে এবং তাদের সম্পদ ভক্ষণ করবে। এটা ‘আরবদের একটি ফাসাহাত পূর্ণবাক্যের দৃষ্টান্ত। ‘আরবেরা যখন কোন রাজ্য জয় করে তখন বলে থাকে أكلنا بلد كذا আমরা অমুক দেশ খেয়েছি।
লোকেরা এ স্থানকে ইয়াসরিব বলে থাকে। এ নামকরণের কারণ ইতিপূর্বে কিঞ্চিৎ বলা হয়েছে। বর্তমানে সেটার নাম মদীনাহ্। কতিপয় ‘আলিম মদীনাকে ইয়াসরিব নামে ডাকা মাকরূহ মনে করেন, কারণ ইমাম আহমাদ বারা ইবনু ‘আযিব থেকে মারফূ' হাদীস বর্ণনা করেছেন, (নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ) যে ব্যক্তি মদীনাকে ইয়াসরিব বলবে সে যেন ইস্তিগফার করে, অর্থাৎ- আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে নেয়, ওটা হলো ত্ব-বাহ্, ওটা ত্ব-বাহ্। অনুরূপ আরেকটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নিশ্চয় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাকে ইয়াসরিব বলতে নিষেধ করেছেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াসরিব শব্দ উচ্চারণ করেছেন তা জনগণকে অধিক পরিচিত নাম দিয়ে বুঝানোর জন্য অথবা এটা ছিল নিষেধাজ্ঞা জারী হওয়ার আগের ঘটনা।
‘আল্লামা ইবনু হাজার আল আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, এ ঘটনাটি ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্বপ্নের ঘটনা এবং মদীনায় হিজরতের পূর্বের ঘটনা। সুতরাং তখন মদীনার ঐ নামই ছিল, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে গিয়ে তার খারাপ নাম পরিবর্তন করে মদীনাহ্ নির্ধারণ করেন।
মদীনাকে কামারের হাফরের সাথে তুলনা করা হয়েছে। ক্বামারের হাফর যেমন লৌহ বা অন্যান্য স্বর্ণ-চাঁদির ন্যায় ধাতব পদার্থের ময়লা দূরীভূত করে দিয়ে খাঁটি স্বর্ণ রৌপ্যে পরিণত করে দেয় ঠিক তেমনিভাবে মদীনাহ্ শহর তার অধিবাসীর অন্তর থেকে হিংসা-বিদ্বেষ, ক্লেশ ইত্যাদি সহ জ্বর, প্লেগ ও অন্যান্য মহামারী থেকে পবিত্র ও মুক্ত রাখে এবং খারাপ লোককে মদীনাহ্ থেকে বের করে দেয়। কাযী ‘ইয়ায বলেন, মদীনার এ ফাযীলাত নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশাকাল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। কিন্তু ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেন, এ ফাযীলাত ক্বিয়ামাত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। সহীহ মুসলিমে এর প্রমাণে হাদীস রয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭৩৮-[১১] জাবির ইবনু সামুরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা মদীনার নাম রেখেছেন ’ত্ব-বাহ্’ (পবিত্র)। (মুসলিম)[1]
بَابُ حَرَمِ الْمَدِيْنَةِ حَرَسَهَا اللّٰهُ تَعَالٰى
وَعَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «إِنَّ الله سمى الْمَدِينَة طابة» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: আল্লাহ তা‘আলা নিজেই মদীনার নাম দিয়েছেন ‘ত্ব-বাহ্’। এ নাম তিনি লাওহে মাহফূযে লিখে রেখেছিলেন, অথবা তাওরাতে এ নাম উল্লেখ করেছিলেন। আর তিনি তার নাবীকে মুনাফিক্বদের দেয়া ইয়াস্রিব নাম পরিবর্তন করে ঐ নাম রাখতে নির্দেশ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনুল কারীমের কয়েক জায়গায় সেটাকে মদীনাহ্ নামে উল্লেখ করেছেন। সহীহ মুসলিমে যায়দ ইবনুস্ সাবিত-এর হাদীসে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেটাকে ত্বইয়্যিবাহ্ বলে উল্লেখ করেছেন। এছাড়াও মদীনার আরো বেশ কয়েকটি নাম রয়েছে, যায়দ ইবনু আসলাম-এর বর্ণনায় এসেছে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘‘মদীনার দশটি নাম রয়েছে.....।’’ আর তা হলোঃ আল মদীনাহ্, ত্ব-বাহ্, ত্বইয়্যিবাহ্, আল মুত্বাইয়্যিবাহ্ ইত্যাদি। মদীনাহ্ ছাড়া এ তিনটি, শব্দ ও অর্থগতভাবে একই অর্থ প্রদান করে। আর গঠনগতভাবে ভিন্নতা রয়েছে।
ইমাম সামহূদী (রহঃ) বলেনঃ এই নামে নামকরণ করা হয়েছে কয়েকটি কারণে-
১। মদীনার পবিত্রতার দিকে লক্ষ্য রেখে। মদীনাহ্ হলো পবিত্র শহর, যে সকল শির্কের অমানিষা থেকে পবিত্র করে। অথবা আল্লাহ তা‘আলার কথার সাথে সম্পর্কের কারণে; যেমন- আল্লাহ তা‘আলার বাণীঃ بِرِيْحِ طَيِّبَةٍ অথবা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবতরণের স্থান বা যাত্রা বিরতির স্থান হওয়ার কারণে। অথবা মদীনাহ্ হল হাফরের ন্যায় যা ইসলামের সকল কলূষতা বা অন্যায়কে দূর করে। আর তাকে খাঁটি সুগন্ধিময় করে তুলে।
২। মদীনার নাম রাখার অন্য কারণ হলো যে, মদীনার সকল বিষয় ভালো অথবা মদীনাহ্ থেকে খাঁটি সুঘ্রাণ পাওয়া যায় এজন্য নামকরণ করা হয়েছে (طَابَةً) ত্ব-বাহ্ নামে।
ইবনু বাত্ত্বাল বলেনঃ যে এখানে বাস করে সে মদীনার মাটি ও পরিবেশ থেকে ভালো সুঘ্রাণ পায়।
ইমাম আসবিলী (রহঃ) বলেনঃ মদীনার মাটি উর্বর হওয়ার কারণে।
হাফিয ইবনু হাজার বলেনঃ শব্দ ভিন্ন হলেও অর্থ একই ভালো জিনিস থেকে উদগত হয়েছে।
কেউ বলেনঃ মাটি ভালো বা সুগন্ধিময় হওয়ার হওয়ার কারণে। আবার কেউ বলেনঃ বাতাস ভালোবা সুগন্ধি হওয়ার করণে। কিছু ‘আলিম বলেনঃ মদীনার বাতাস ও মাটি প্রমাণ করে এর নাম ‘ত্ব-বাহ্’ রাখা সঠিক হয়েছে। কেননা যে ব্যক্তি এখানে বসবাস করে সে এখানকার মাটি ও বাতাসা থেকে সুঘ্রাণ পায় যা অন্য কোন জায়গা থেকে পাওয়া যায় না।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭৩৯-[১২] জাবির ইবনু ’আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক বেদুঈন এসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে বায়’আত করলো। অতঃপর মদীনায় সে (বেদুঈন) জ্বরে পতিত হল। সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললো, হে মুহাম্মাদ! আমার বায়’আত বাতিল করে দিন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অস্বীকার করলেন। আবারও সে এসে বললো, হে মুহাম্মাদ! আমার বায়’আত বাতিল করে দিন। এবারও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা করতে অস্বীকৃতি জানালেন। আবারও সে এসে বললো, আমার বায়’আত বাতিল করে দিন। এবারও তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তা করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন জানালেন। এরপর বেদুঈন মদীনাহ্ ছেড়ে চলে গেলো। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ মদীনাহ্ হচ্ছে হাঁপরের মতো। যে এর খাদকে দূর করে দেয়, আর এর উত্তমটাকে খাঁটি করে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ حَرَمِ الْمَدِيْنَةِ حَرَسَهَا اللّٰهُ تَعَالٰى
وَعَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ: أَنَّ أَعْرَابِيًّا بَايَعَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَصَابَ الْأَعْرَابِيَّ وَعَكٌ بِالْمَدِينَةِ فَأَتَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا مُحَمَّدُ أَقِلْنِي بَيْعَتِي فَأَبَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثُمَّ جَاءَهُ فَقَالَ: أَقِلْنِي بَيْعَتِي فَأَبَى ثُمَّ جَاءَهُ فَقَالَ: أَقِلْنِي بَيْعَتِي فَأَبَى فَخَرَجَ الْأَعْرَابِيُّ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّمَا الْمَدِينَةُ كَالْكِيرِ تَنْفِي خبثها وتنصع طيبها»
ব্যাখ্যা: যে গ্রাম্য লোকটি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটে এসে বায়‘আত গ্রহণ করেছিলেন তার নাম উল্লেখ হয়নি। ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, আমি তার নামের ব্যাপারে কোন কিছু অবগত হতে পারিনি। ‘আল্লামা যামাখশারী বলেন, তার নাম হলো ক্বায়স ইবনু আবী হাযিম। তিনি একজন প্রসিদ্ধ তাবি‘ঈ ছিলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাক্ষাতে রওয়ানা হয়েছিলেন, কিন্তু এসে শুনেন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকাল করেছেন। কিন্তু অন্যদের বর্ণনায় তিনি ক্বায়স ইবনু আবী হাযিম সাহাবী ছিলেন। ‘আল্লামা মুবারাকপূরী (রহঃ) এ বর্ণনাটি সঠিক বলে মন্তব্য করেছেন।
তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার বায়‘আত গ্রহণ করেছিলেন। মদীনার প্রচন্ড তাপদাহে লোকটি জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়ল। ফলে সে মদীনাহ্ থেকে নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে তার বায়‘আত প্রত্যাহার করে নেয়ার অনুরোধ জানালেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এ আবেদন প্রত্যাখ্যান করলেন, এমনকি লোকটি বারবার (তিনবার) একই আবেদন জানালেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেকবারই তার আবেদন পূরণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অস্বীকৃতির কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে ‘আল্লামা নাবাবী ‘উলামায়ে কিরামের মতামত উল্লেখ করে বলেন, লোকটির বায়‘আত ছিল ইসলামের উপর, আর ইসলামের উপর থাকার বায়‘আত প্রত্যাহার করা বৈধ নয়। অনুরূপ যে ব্যক্তি হিজরত করে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট চলে এসেছেন সে হিজরত প্রত্যাহার বা ভঙ্গ করে স্বীয় কাফির এলাকায় বা দারুল কুফরে ফিরে যাওয়া বৈধ নয়।
প্রকাশ্য হাদীস থেকে জানা যায় যে, মদীনাহ্ শহর থেকে বের হওয়া নিন্দনীয় কাজ, কিন্তু সাহাবী এবং পরবর্তী অনেক নেক্কার ব্যক্তিদের মদীনাহ্ ত্যাগ করে অন্যত্র বসবাস ছিল ইসলামের কল্যাণে। ‘ইলম বিস্তার, রাজ্যর বিস্তার, বিজিত রাজ্যে প্রশাসন পরিচালনা ইত্যাদি কার্যে তারা অন্যত্র বসবাস করেছেন কিন্তু মদীনার ফাযীলাত এবং মুহাববাত তাদের অন্তরে পুরোদমে বিদ্যমান ছিল। সুতরাং এটা মোটেও হাদীসে বর্ণিত হুকুমের অন্তর্ভুক্ত নয়।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭৪০-[১৩] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) অনুষ্ঠিত হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত মদীনাহ্ এর মন্দ লোকদেরকে দূর না করবে, যেমনিভাবে হাঁপর লোহার খাদকে দূর করে দেয়। (মুসলিম)[1]
بَابُ حَرَمِ الْمَدِيْنَةِ حَرَسَهَا اللّٰهُ تَعَالٰى
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى تَنْفِيَ الْمَدِينَةُ شِرَارَهَا كَمَا يَنْفِي الْكِيرُ خَبَثَ الْحَدِيد» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: মদীনাহ্ তার অভ্যন্তরের খারাপ মানুষগুলো বের করে না দেয়া পর্যন্ত ক্বিয়ামাত অনুষ্ঠিত হবে না। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেন, এটা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যামানাতেই সম্পন্ন হয়েছে। অর্থাৎ- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবূওয়াতকালে মদীনার খারাপ লোকগুলোকে মদীনাহ্ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল, ফলে ঐ সময় মদীনাহ্ নিখাদ ও পবিত্র হয়ে গিয়েছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগমন হলো ক্বিয়ামাতের আলামাতসমূহের একটি আলামাত। এ বিষয়ে ইতিপূর্বে আলোচনা হয়ে গেছে।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭৪১-[১৪] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মদীনার দরজাসমূহে মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) পাহারায় রয়েছেন। তাই এতে (মদীনায়) মহামারী ও দাজ্জাল প্রবেশ করতে পারবে না। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ حَرَمِ الْمَدِيْنَةِ حَرَسَهَا اللّٰهُ تَعَالٰى
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «عَلَى أَنْقَابِ الْمَدِينَةِ مَلَائِكَةٌ لَا يَدْخُلُهَا الطَّاعُونُ وَلَا الدَّجَّالُ»
ব্যাখ্যা: মদীনার প্রত্যেক প্রবেশদ্বারে প্রতিরক্ষী মালায়িক্বাহ্ পাহারায় নিযুক্ত রয়েছেন। এ শহরে প্লেগ-মহামারী প্রবেশ করতে পারে না। নিহায়াহ্ গ্রন্থকার বলেন, ‘‘ত্বা‘ঊন’’ প্লেগ এমন একটি ব্যাপক রোগ যার দ্বারা বাতাশও দূষিত হয়ে যায়।
ইবনুল ‘আরাবী বলেন, ত্বা‘ঊন বা প্লেগ এমন একটি মারাত্মক রোগ যা মানুষের মধ্যে প্রবেশ করলে তার আত্মাকে ধ্বংস করবেই।
ইমাম নাবাবী (রহঃ) সহ কেউ কেউ বলেন, ত্বা‘ঊন হলো গ্রন্থি কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়া রোগ। ইমাম নাবাবী অন্যত্র বলেন, ত্বা‘ঊন হলো বাউশী বা টিউমার জাতীয় অত্যন্ত বেদনাদায়ক ফোঁড়া বিশেষ যা কখনো লাল, কখনো সবুজ কখনো কালো রূপ ধারণ করে এবং সেটা থেকে কখনো রক্ত প্রবাহিত হয়; আর এর আশপাশ সেটার কারণেই আক্রান্ত হয়ে যায়।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের অমর সম্রাট হাফিয আবূ ‘আলী ইবনু সীনা বলেন, ত্বা‘ঊন হলো- মৌলিক নামের ধ্বংসাত্মক রোগবিশেষ।
শরীরের যে কোন স্পর্শকাতর বা নরম অঙ্গ ফুলে সেটার আত্মপ্রকাশ ঘটে। অধিকাংশ সময় তা বগলে অথবা কানের পিছনে কিংবা নাসিকারন্ধে হয়ে থাকে। এ রোগের মূল কারণ হলো রক্ত দূষিত হওয়া। এ দূষিত রক্ত আশেপাশের জীবকোষকে সংক্রামিত করে, অবশেষে তার হৃদপিন্ডও আক্রান্ত হয়ে পড়ে। অথবা এটা জিনে্র খোঁচা বা স্পর্শ থেকে উৎপন্ন হয়। ‘‘ওয়াবা’’ বা মহামারী প্লেগ ছাড়া অন্য রোগও হতে পারে যেমন- কলেরা, বসন্ত ইত্যাদি। কেউ কেউ বলেছেন পেস্নগ মহামারী নয়। যারা প্রত্যেক মহামারীকেই ত্বা‘ঊন বা প্লেগ বলে অভিহিত করেছেন তা মাযায বা রূপক হিসেবে বলেছেন।
ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেন, মক্কা-মদীনায় প্লেগ রোগ প্রবেশ করতে পারবে না। কিন্তু একদল গবেষক বলেছেন, ৭৪৫ হিঃ সনে মক্কায় প্লেগ রোগ দেখা দিয়েছিল, কিন্তু মদীনায় কখনো দেখা যায়নি। মদীনায় যে পেস্নগ রোগ প্রবেশ করতে পারবে না তার প্রমাণে বহু হাদীস রয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭৪২-[১৫] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মক্কা মদীনাহ্ ছাড়া এমন কোন শহর নেই, যেখানে দাজ্জালের পদচারণা (বিপর্যয়) হবে না। মক্কা মদীনায় এমন কোন দরজা নেই যেখানে মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) সারিবদ্ধ হয়ে পাহারা দিচ্ছে না। সুতরাং দাজ্জাল সাবিখাহ্’য় পৌঁছবে। তখন মদীনাহ্ ভূমিকম্পের মাধ্যমে তিনবার এর অধিবাসীদেরকে কাঁপিয়ে দিবে। আর এতে সকল কাফির মুনাফিক্ব মদীনাহ্ ছেড়ে দাজ্জালের দিকে রওনা হয়ে যাবে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ حَرَمِ الْمَدِيْنَةِ حَرَسَهَا اللّٰهُ تَعَالٰى
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَيْسَ مِنْ بلدٍ إِلا سَيَطَؤهُ الدَّجَّالُ إِلَّا مَكَّةَ وَالْمَدِينَةَ لَيْسَ نَقْبٌ مِنْ أَنِقَابِهَا إِلَّا عَلَيْهِ الْمَلَائِكَةُ صَافِّينَ يَحْرُسُونَهَا فَيَنْزِلُ السَّبِخَةَ فَتَرْجُفُ الْمَدِينَةُ بِأَهْلِهَا ثَلَاثَ رَجَفَاتٍ فَيَخْرُجُ إِلَيْهِ كُلُّ كَافِرٍ وَمُنَافِقٍ»
ব্যাখ্যা: দাজ্জালের সকল শহরে গমন ও বিপর্যয় সৃষ্টি হয় স্বয়ং নিজের দ্বারা হবে আর না হয় তার অনুসারীদের দ্বারা হবে। জমহূরের মতে কথাটি ‘আম্ বা সাধারণভাবে বলা হয়েছে এর দ্বারা স্বয়ং দাজ্জালের নিজের উপস্থিতিই উদ্দেশ্য। ইবনু হাযম (রহঃ) এককভাবে ভিন্ন মত পোষণ করে বলেন, দাজ্জাল স্বয়ং নিজে সকল শহরে প্রবেশ করবে না। বরং সে তার বাহিনীকে প্রেরণ করবে। কেননা দাজ্জালের এ অল্প সময়কালের ভিতর সমস্ত পৃথিবীর শহরগুলোতে প্রবেশ অসম্ভব কথা।
‘আল্লামা মুবারকপূরী (রহঃ) এ প্রশ্নের উত্তরে বলেন, হাদীসে বর্ণিত অল্প সময়ের মধ্যে দাজ্জালের সমস্ত পৃথিবী পরিক্রম করা মোটেও অসম্ভব নয়, কেননা আমাদের বর্তমান যুগেই যে সকল দ্রুত গতিসম্পন্ন বিদ্যুৎ চালিত যান্ত্রিক বাহন বা আধুনিক প্রযুক্তি আবিষ্কার হয়েছে যার ফলে জলে, স্থলে এবং আকাশ পথে নিমিষেই দীর্ঘ পথ পরিক্রমা অতিক্রম করা সম্ভব হচ্ছে যা ইতিপূর্বেকার মানুষ কল্পনাও করতে পারেনি।
ইমাম হাকিম আবূ তুফায়ল-এর সূত্রে হাদীস বর্ণনা করেনঃ ‘‘দাজ্জাল যখন প্রকাশ পাবে তখন পৃথিবী সংকুচিত বা সংকীর্ণ হয়ে যাবে.....।’’ কিন্তু দাজ্জাল ও তার বাহিনী মক্কা-মদীনায় প্রবেশ করতে পারবে না। ইমাম যুরক্বানী (রহঃ) ইবনু ‘উমার (রাঃ)-এর সূত্রে ‘‘বায়তুল মুক্বাদ্দাস’’-এর কথাও উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ- দাজ্জাল বায়তুল মুক্বাদ্দাসেও প্রবেশ করতে পারবে না। ত্বহাবীর এক বর্ণনায় মসজিদে তূর-এর কথাও এসেছে। এ শহরগুলোর প্রতিটি প্রবেশদ্বারে মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তারা দাজ্জালকে দেখা মাত্র তাড়িয়ে দিবে। ব্যর্থ হয়ে দাজ্জাল মদীনার অনতিদূরে সাবখাহ্ নামক স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করবে। এ সময় পর পর তিনটি ভূমিকম্প হবে ফলে মদীনার খারাপ লোকগুলো, অর্থাৎ- কাফির ও মুনাফিক্ব মদীনাহ্ ছেড়ে দাজ্জালের নিকট চলে যাবে।
হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, তিনটি কম্পনে মদীনার মুখলিস ঈমানদার ব্যতীত সকলেই বের হয়ে যাবে। মদীনায় শুধু খালেস ঈমানদারগণই অবশিষ্ট থাকবে, আর এদের ওপরে দাজ্জাল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। ‘আল্লামা ত্বীবী বলেন, সম্ভবত নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ (تَرْجُفُ الْمَدِينَةُ بِأَهْلِهَا) বাক্যের ب হরফটি سبب বা কারণ অর্থে ব্যবহার হয়েছে তখন ঐ বাক্যের অর্থ দাঁড়ায়ঃ মদীনাহ্ প্রকম্পিত হবে তার অধিবাসীর (মুনাফিক্ব ও কাফিরদের) কারণে এবং তাদেরকে দাজ্জালের দিকে বের করে দেয়ার জন্য।
উপরে উল্লেখিত বর্ণনাটি আবূ বাক্রাহ্ বর্ণিত সহীহুল বুখারীতে বর্ণিত হাদীসের পরিপন্থী নয়, সে হাদীসে এসেছে- (لا يدخل المدينة رعب المسيح الدجال) অর্থাৎ- মাসীহে দাজ্জালের ভীতি মদীনায় প্রবেশ করতে পারবে না। কেননা এ ভূমিকম্প শুধু মুনাফিক্ব ও কাফিরদের জন্যই ভীতিকর হবে মু’মিনদের জন্য নয়। অথবা এটা ঐ যামানার সাথে খাস, অর্থাৎ- সে নির্দিষ্ট যামানা বা কালে দাজ্জালের ভীতি মদীনায় প্রবেশ করতে পারবে না।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭৪৩-[১৬] সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে কেউই মদীনাবাসীদের সাথে প্রতারণা করবে সে গলে যাবে, যেভাবে লবণ পানিতে গলে যায়। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ حَرَمِ الْمَدِيْنَةِ حَرَسَهَا اللّٰهُ تَعَالٰى
وَعَنْ سَعْدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَكِيدُ أَهْلَ الْمَدِينَةِ أَحَدٌ إِلَّا انْمَاعَ كَمَا يَنْمَاعُ الْملح فِي المَاء»
ব্যাখ্যা: মদীনাবাসীর সাথে প্রতারণা করা মানে তাদের বিরুদ্ধে কৌশল করা, ষড়যন্ত্র করা, নাহক খারাপ বা ক্ষতির চিন্তা করা ইত্যাদি।
মদীনাবাসীর প্রতি খারাপ আচরণকারী আল্লাহর ক্রোধে এভাবে নিঃশেষ হয়ে যাবে যেভাবে লবণ পানিতে গলে নিঃশেষ হয়ে যায়। সহীহ মুসলিমে আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে গলিয়ে ফেলবেন.....।
‘‘গলিয়ে ফেলবেন’’ এ বাক্যের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ‘আল্লামা মুবারাকপূরী (রহঃ) সহীহ মুসলিমে বর্ণিত ‘আমির ইবনু সা‘দ তার পিতা প্রমুখাৎ বর্ণিত হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে কেউই মদীনাবাসীর সাথে খারাপ আচরণের ইচ্ছা পোষণ করবে আল্লাহ তা‘আলা তাকে জাহান্নামের আগুনে পুড়ে সীসার ন্যায় গলিয়ে ফেলবেন অথবা পানিতে লবণ গলানোর ন্যায় গলিয়ে ফেলবেন। কাযী ‘ইয়ায বলেন, এ ব্যাখ্যা (হাদীস) সকল প্রশ্ন নিঃশেষ করে দেয়। আরো প্রকাশ যে, এটা আখিরাতের শাস্তির ঘটনা।
কেউ কেউ বলেছেন, এও সম্ভব যে, যারা মদীনাবাসীর সাথে দুনিয়ায় আচরণের ইচ্ছা করবে আল্লাহ তা‘আলা তাদের কোন অবকাশ দিবেন না এবং তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ দিবেন না বরং অনতিবিলম্বে তাদের কর্তৃত্ব হরণ করে নিবেন। যেমন- বানী ‘উমাইয়্যার খিলাফাতকালে যারা মদীনাবাসীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল, আল্লাহ তা‘আলা তাদের ধ্বংস করে দিয়েছিলেন, অনুরূপ ইয়াযীদ ইবনু মু‘আবিয়াহ্-ও। এমনিভাবে যুগে যুগে কালে কালে যারাই মদীনার ওপর অন্যায়ভাবে চড়াও হয়েছে তারাই ধ্বংস হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭৪৪-[১৭] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোন সফর হতে আসার সময় মদীনার দেয়াল দেখতে পেতেন তখন নিজের আরোহীকে তাড়া করতেন। আর যদি তিনি ঘোড়া বা খচ্চরের পিঠে থাকতেন, তবে মদীনার ভালবাসার উচ্ছাসে ওকে নাড়া দিতেন। (বুখারী)[1]
بَابُ حَرَمِ الْمَدِيْنَةِ حَرَسَهَا اللّٰهُ تَعَالٰى
وَعَنْ أَنَسٍ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ إِذَا قَدِمَ مِنْ سَفَرٍ فَنَظَرَ إِلى جُدُراتِ الْمَدِينَةِ أَوْضَعَ رَاحِلَتَهُ وَإِنْ كَانَ عَلَى دَابَّةٍ حركها من حبها. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন সফর শেষে মদীনায় ফেরার সময় মদীনার কোন দেয়াল দর্শনেই তার মুহাব্বাতে এত উদ্বেলিত হয়ে পড়তেন যে, কখন তিনি তাতে প্রবেশ করবেন? উটে থাকলে তাকে জোরে চালাতেন, ঘোড়া-গাধা-খচ্চর ইত্যাদিতে থাকলে তাকে দু’ পা দিয়ে নাড়া দিতেন।
‘আল্লামা কুস্তুলানী (রহঃ) বলেন, এটা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঐ দু‘আ কবূলের প্রমাণ; তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দু‘আ করেছিলেনঃ اَللّٰهُمَّ حَبِّبْ إِلَيْنَا الْمَدِيْنَةَ كَحُبِّنَا مَكَّةَ أَوْ أَشَدَّ অর্থাৎ- ‘‘হে আল্লাহ! তুমি আমাদের প্রতি মক্কার মতই মদীনার মুহাববাত বৃদ্ধি করে দাও অথবা তার চেয়েও বেশী।’’ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ ভালবাসা এবং ভালবাসার জন্য দু‘আ মদীনার মর্যাদারই প্রামাণ্য দলীল।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭৪৫-[১৮] উক্ত রাবী [আনাস (রাঃ)] হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উহুদ পাহাড় দৃষ্টিগোচর হলো। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তা দেখে বললেন, এ পাহাড় আমাদেরকে ভালবাসে, আর আমরাও এ পাহাড়কে ভালবাসি। হে আল্লাহ! ইব্রাহীম (আঃ) মক্কাকে সম্মানিত করেছেন, আর আমি মদীনার দু’ সীমানার মধ্যবর্তী স্থানকে সম্মানিত করলাম। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ حَرَمِ الْمَدِيْنَةِ حَرَسَهَا اللّٰهُ تَعَالٰى
وَعَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ طَلَعَ لَهُ أُحُدٌ فَقَالَ: «هَذَا جَبَلٌ يُحِبُّنَا وَنُحِبُّهُ اللَّهُمَّ إِنَّ إِبْرَاهِيمَ حَرَّمَ مَكَّةَ وَإِنِّي أحرم مَا بَين لابتيها»
ব্যাখ্যা: উহুদ পাহাড়ের নামকরণের কারণ বলতে গিয়ে ‘আল্লামা সুহায়লী (রহঃ) বলেন, (أُحُدٌ) ‘‘উহুদ’’ শব্দটি (أَحَدٌ) ‘‘আহাদুন’’ থেকে, অর্থ একক, একাকী; এটা অন্যান্য পাহাড় থেকে একাকি বা এককভাবে দাঁড়িয়ে আছে, এজন্য তার নাম উহুদ রাখা হয়েছে।
অথবা তার উপরের আরোহীগণই কিংবা আহলে উহুদগণই তাওহীদের সাহায্য করেছে এবং তার জন্য যুদ্ধ করেছে, এ কারণে এর নাম রাখা হয়েছে উহুদ।
নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ্জের সফর থেকে ফেরার সময় উহুদ পাহাড় দর্শন করে সেটার দিকে ইশারা করে বলেছিলেন, এ পাহাড়কে আমরা ভালবাসী সেও আমাদের ভালবাসে। সহীহুল বুখারীতে কিতাবুল জিহাদে আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত এক হাদীসের মাধ্যমে জানাযায় যে, এটা খায়বার যুদ্ধ থেকে ফেরার সময়ের ঘটনা। সহীহুল বুখারীতে আবূ হুমায়দ-এর অন্য এক বর্ণনায় তাবূক যুদ্ধ থেকে ফেরার সময়ের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ সকল বিভিন্ন সময়ের ঘটনার ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে ইবনু হাজার আল আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, মূলত উপরে বর্ণিত প্রত্যেক সফর থেকে ফেরার সময়ই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথাটি পুনরাবৃত্তি করেছিলেন।
উক্ত বাক্যটি নিয়ে ‘উলামাগণের মাঝে আরেক বক্তব্য রয়েছে, তা হলো একদলের মতে পাহাড়কে লক্ষ্য করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ ‘‘আমরা সেটাকে ভালোবাসী’’ এর মনে হলো আহলে উহুদকে ভালোবাসী, আর আহলে উহুদ হলো আনসারগণ, এরা ছিলেন উহুদের প্রতিবেশী। দ্বিতীয় আরেকদল ‘আলিম বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনন্দের আতিশয্যে কথার কথায় বলে ফেলেছেন। ভালোবাসার ক্ষেত্রটা এরূপ হয়ে থাকে। তৃতীয় আরেকদলের মতে উহুদ পাহাড় যেহেতু জান্নাতের একটি পাহাড়, যেমন- হাদীসে এসেছে, সুতরাং তার প্রতি ভালোবাসার অভিব্যক্তি ব্যক্ত করা হয়েছে মানে জান্নাতের প্রতি ভালোবাসার কথা ব্যক্ত করা হয়েছে।
পাহাড় একটি জড়বস্ত্ত সে কিভাবে মানুষকে ভালোবাসতে পারে? এ ব্যাপারেও নানা জন নানা কথা বলেছেন। সবগুলো বক্তব্য তুলে ধরে ‘আল্লামা নাবাবী (রহঃ) বলেন, সবচেয়ে বিশুদ্ধ এবং পছন্দনীয় কথা হলো ‘‘উহুদ আমাদের ভালোবাসে’’ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ কথার অর্থ প্রকৃত অর্থেই ভালোবাসা (কোন রূপক অর্থে নয়)। আল্লাহ তা‘আলা তার মধ্যে ভাল-মন্দ তামীয করার মতো একটি শক্তি ও যোগ্যতা দান করেছেন যার মাধ্যমে সে ভালোবাসে। যেমন- আল্লাহ তা‘আলার বাণীঃ ‘‘অনেক পাথরই আল্লাহর ভয়ে (পাহাড় থেকে) পড়ে যায়’’- (সূরা আল বাক্বারাহ্ ২ : ৭৪)। অনুরূপ শুকনো কাঠ (আল্লাহর নাবীর সামনে) ক্রন্দন করেছিল, কংকর তাসবীহ পাঠ করেছিল, অনুরূপ পাথর মূসা (আঃ)-এর কাপড় নিয়ে দৌড়িয়ে পালাচ্ছিল ইত্যাদি, এগুলো প্রকৃতির ব্যতিক্রম কিছু ঘটনার দৃষ্টান্ত যা আল্লাহ তা‘আলা ঐ বস্ত্তগুলোর দ্বারা সংঘটিত করিয়েছেন। ইব্রাহীম (আঃ)-এর মক্কাকে হারাম ঘোষণার ব্যাখ্যা ইতিপূর্বে হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭৪৬-[১৯] সাহল ইবনু সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ উহুদ এমন একটি পাহাড়, যে পাহাড় আমাদেরকে ভালোবাসে আর আমরাও একে ভালোবাসি। (মুসলিম)[1]
بَابُ حَرَمِ الْمَدِيْنَةِ حَرَسَهَا اللّٰهُ تَعَالٰى
وَعَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أُحُدٌ جَبَلٌ يُحِبُّنَا ونحبُّه» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: উহুদ একটি জড় পদার্থ সে কিভাবে মানুষকে ভালোবাসতে পারে তার কিঞ্চিৎ ব্যাখ্যা ইতিপূর্বে হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো বহু পাহাড় থাকা সত্ত্বেও উহুদকে ভালোবাসার কথা বিশেষভাবে বলা হলো কেন? ‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী (রহঃ) তার উত্তরে বলেন, যেহেতু সে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার তিনজন সাহাবীকে (আবূ বকর, ‘উমার এবং ‘উসমান (রাঃ)-কে) পেয়ে খুশীতে বা আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছিল, তাই তার কথা বিশেষভাবে বলা হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭৪৭-[২০] সুলায়মান ইবনু আবূ ’আব্দুল্লাহ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি সা’দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ) কে দেখলাম, তিনি জনৈক ব্যক্তির জামা-কাপড় কেড়ে নিয়েছেন, (কারণ) সে মদীনার হারামে শিকার করছিল, যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হারাম (শিকার নিষিদ্ধ) করে দিয়েছিলেন। অতঃপর লোকটির অভিভাবকগণ এসে তার সাথে এ ব্যাপারে আলাপ করলে তিনি উত্তরে বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ হারামকে হারাম (সম্মানিত) ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, যে ব্যক্তি এতে কাউকে শিকার করতে দেখে সে যেন তার জামা-কাপড় ও অস্ত্র কেড়ে নেয়। তাই আমি তোমাদেরকে এমন খাবার ফিরিয়ে দিতে পারি না, যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে খেতে দিয়েছেন। তবে হ্যাঁ, তোমরা যদি চাও তাহলে আমি তোমাদেরকে এর মূল্য দিতে পারি। (আবূ দাঊদ)[1]
عَنْ سُلَيْمَانَ بْنِ أَبِي عَبْدِ اللَّهِ قَالَ: رَأَيْتُ سَعْدَ بْنَ أَبِي وَقَّاصٍ أَخَذَ رَجُلًا يَصِيدُ فِي حَرَمِ الْمَدِينَةِ الَّذِي حَرَّمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَسَلَبَهُ ثِيَابَهُ فَجَاءَهُ مَوَالِيهِ فَكَلَّمُوهُ فِيهِ فَقَالَ: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَرَّمَ هَذَا الْحَرَمَ وَقَالَ: «مَنْ أَخَذَ أَحَدًا يَصِيدُ فِيهِ فَلْيَسْلُبْهُ» . فَلَا أَرُدُّ عَلَيْكُمْ طُعْمَةً أَطْعَمَنِيهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَكِنْ إِنْ شِئْتُمْ دفعتُ إِليكم ثمنَه. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: সা‘দ (রাঃ)-সহ কতিপয় সাহাবীর এ বিশ্বাস বা ই‘তিক্বদ ছিল যে, মদীনার নিষিদ্ধতা মক্কার নিষিদ্ধতার মতই, কিন্তু অন্যান্য সাহাবীগণ তা মনে করতেন না। মদীনার নিষিদ্ধ এলাকায় কেউ শিকার করলে তার পোষাক-পরিচ্ছদ ছিনিয়ে নিতে হবে।
হাদীসের প্রকাশ্য অর্থে দেখা যায় সকল কাপড়ই নিয়ে নিতে হবে। কিন্তু ‘আল্লামা মাওয়ারদী (রহঃ) বলেন, তার ছতরে মহিলাদের জন্য প্রয়োজনীয় কাপড় রেখে দিতে হবে, ইমাম নাবাবী (রহঃ) এটাকে সহীহ বলেছেন এবং শাফি‘ঈদের এক জামা‘আত এটা পছন্দ করেছেন।
‘আল্লামা শাওকানী (রহঃ) বলেন, সা‘দ (রাঃ)-এর কিসসা শুনে ইমাম শাফি‘ঈর মদীনাহ্ এলাকায় শিকার ও বৃক্ষ কর্তনকারীর সবকিছু ফেড়ে নেয়ার মতটি পুরাতন মত।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭৪৮-[২১] সালিহ (রহঃ) [তাওয়ামার মুক্তদাস] সা’দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ) এর একটি মুক্ত দাস হতে বর্ণনা করেন, একদিন সা’দ মদীনার কিছু দাসকে মদীনার কোন গাছ কাটতে দেখে তাদের আসবাবপত্র কেড়ে নিলেন। আর (তাদের অভিভাবকগণ ফেরত চাইলে) তিনি তাদেরকে বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মদীনার কোন গাছ-পালা কাটার নিষিদ্ধতার কথা শুনেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি মদীনার কোন গাছ কাটবে, তাকে যে ধরতে পারবে, সে তার জামা-কাপড় কেড়ে নেবে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ صَالِحٍ مَوْلًى لِسَعْدٍ أَنَّ سَعْدًا وَجَدَ عَبِيدًا مِنْ عَبِيدِ الْمَدِينَةِ يَقْطَعُونَ مِنْ شَجَرِ الْمَدِينَةِ فَأَخَذَ مَتَاعَهُمْ وَقَالَ يَعْنِي لِمَوَالِيهِمْ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ينْهَى أَنْ يُقْطَعَ مِنْ شَجَرِ الْمَدِينَةِ شَيْءٌ وَقَالَ: «مَنْ قَطَعَ مِنْهُ شَيْئًا فَلِمَنْ أَخَذَهُ سَلَبُهُ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: এ হাদীসের ব্যাখ্যা পূর্বের হাদীসের মতই।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭৪৯-[২২] যুবায়র ইবনুল ’আও্ওয়াম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ওয়াজ্জ-এর শিকার করা ও এর কাঁটাযুক্ত গাছ কেটে ফেলা আল্লাহর পক্ষ থেকে হারাম করা হারাম। [আবূ দাঊদ; মুহয়্যিইউস্ সুন্নাহ্ বলেন, وَجٌّ (ওয়াজ্জ) হলো ত্বয়িফের একটি অঞ্চল। ইমাম খাত্ত্বাবী (রহঃ) أَنَّهَا এর স্থলে إِنَّه বলেছেন।][1]
وَعَنِ الزُّبَيْرِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ صَيْدَ وَجٍّ وَعِضَاهَهُ حِرْمٌ مُحَرَّمٌ لِلَّهِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَقَالَ مُحْيِي السُّنَّةِ: «وَجٌّ» ذَكَرُوا أَنَّهَا مِنْ نَاحِيَةِ الطَّائِف وَقَالَ الْخطابِيّ: «إِنَّه» بدل «إِنَّهَا»
ব্যাখ্যা: (وَجٌّ) ‘‘ওয়াজ্জ’’ হলো ত্বয়িফ কিংবা ত্বয়িফের একটি এলাকা, কেউ বলেছেন ত্বয়িফের একটি দূর্গের নাম ‘‘ওয়াজ্জ’’। ইমাম শাফি‘ঈর একদল অনুসারী এখানকার শিকার ধরা ও বৃক্ষ কর্তন মাকরূহ মনে করেন। এদেরই আরেকদল মাকরূহ তো মনে করেনই সেটা মাকরূহে তাহরীমী। তারা বলেন, ইমাম শাফি‘ঈ এটাকে যে মাকরূহ মনে করতেন সেটা মাকরূহে তাহরীমীই।
ত্বয়িফের এ ‘‘ওয়াজ্জ’’ নামক স্থানের শিকার ও বৃক্ষ কর্তনের নিষিদ্ধতা কি স্থায়ী, না সাময়িক? এ প্রশ্নের উত্তরে ‘উলামাগণ বলেছেন, এ নিষিদ্ধতা একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ছিল। অতঃপর নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। জানা যায় একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সেনাগণ ত্বয়িফ অবরোধ করেছিল এ সময় অন্য সর্বসাধারণের জন্য শিকার ইত্যাদি নিষেধ করা হয়েছিল, যাতে সেনাদের শিকার ধরা সহজসাধ্য হয়।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭৫০-[২৩] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে লোক মদীনায় মৃত্যবরণ করতে (সমর্থ হয়) পারে, সে যেন সেখানেই মৃত্যুবরণ করে; কেননা যে লোক মদীনায় মৃত্যুবরণ করবে আমি তার জন্যে (পরিপূর্ণরূপে) সুপারিশ করবো। (আহমাদ, তিরমিযী; তিরমিযী বলেছেন, হাদীসটি হাসান সহীহ, তবে সানাদ হিসেবে গরীব)[1]
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنِ اسْتَطَاعَ أَنْ يَمُوت بالمدية فليمت لَهَا فَإِنِّي أَشْفَعُ لِمَنْ يَمُوتُ بِهَا» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيح غَرِيب إِسْنَادًا
ব্যাখ্যা: মদীনায় দীর্ঘদিন অবস্থান করা বা স্থায়ীভাবে বসবাস করা যাতে সেখানেই মৃত্যু হয়। এটা মদীনার ওপর ভালবাসার প্রতি উৎসাহ প্রদান করা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ ‘‘আমি তার সুপারিশকারী হব’’। ইবনু মাজাহ্’র এক বর্ণনায় ‘‘আমি তার জন্য সাক্ষ্য হব’’, শব্দ এসেছে, এটা ঐ ব্যক্তির জন্য যে মদীনায় ইন্তিকাল করবেন।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এখানে মৃত্যুর জন্য হুকুম বা নির্দেশ করেছেন, অথচ সেটা কারো ক্ষমতা বা আয়ত্বের মধ্যে নয় বরং তা সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর আয়ত্বে ও ক্ষমতায়। এ প্রশ্নের উত্তরে বলা হয় হুকুম দ্বারা এখানে মৃত্যু গ্রহণ নয় বরং মদীনাকে আমৃত্যু গ্রহণ ও বরণ করে নিয়ে সেখানে বসবাস করা এবং কখনো মদীনাহ্ ত্যাগ না করা যাতে মদীনায়ই তার নিশ্চিত মৃত্যু হয়।
এটা আল্লাহ তা‘আলার ঐ কথার ন্যায় যাতে তিনি বলেছেনঃ ‘‘তোমরা মুসলিম না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করো না।’’ (সূরা আ-লি ‘ইমরান ৩ : ৯৭)
এ হাদীসের দ্বারা দলীল গ্রহণ করা যায় যে, মদীনায় বসবাস মক্কায় বসবাসের চেয়ে উত্তম। এজন্য আল্লাহর নাবী মক্কা বিজয়ের পরও জীবনের বাকী অংশটুকু মদীনায় কাটিয়েছেন। নিশ্চয় আল্লাহর নাবী অপেক্ষাকৃত উত্তম বস্ত্তটিই গ্রহণ করেছেন। ‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী আল কারী (রহঃ) বলেন, মদীনাহ্ মক্কার চেয়ে উত্তম মুত্বলাক্বভাবে, এ হাদীস তার সরীহ বা স্পষ্ট দলীল নয়। কেননা কখনো অপেক্ষাকৃত অনুত্তমের মধ্যেও এমন বিশেষ কোন বৈশিষ্ট্য থাকে যার কারণে সে উত্তমের উপর শ্রেষ্ঠত্ব রাখে।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭৫১-[২৪] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (কিয়ামতের সন্নিকটবর্তী সময়ে) ইসলামী জনপদসমূহের মধ্যে সর্বশেষে ধ্বংস হবে মদীনাহ্। (তিরমিযী; তিনি বলেছেন, হাদীসটি হাসান গরীব)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «آخِرُ قَرْيَةٍ مِنْ قُرَى الْإِسْلَامِ خَرَابًا الْمَدِينَةُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ
ব্যাখ্যা: মদীনাহ্ শব্দটি সাধারণভাবে শহর অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এতে সকল শহরকেই মদীনাহ্ বলা যায়। তবে শব্দটি ‘আলিফ লাম’ যুক্ত করে, অর্থাৎ- الْمَدِينَةُ ব্যবহার হলে সেটি সাধারণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মদীনাকেই বুঝানো হয় না। এজন্য এ শহরের অধিবাসীকে মাদানী বলা হয় অন্য শহরের অধিবাসীকে মাদীনী বলা হয়। ক্বিয়ামাতের আগে সকল ইসলামী শহরের নির্মাণশৈলী, দালান-কোঠা সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। সর্বশেষে ধ্বংস হবে মদীনার দালান-কোঠা ও নির্মিত অট্টালিকাসমূহ। এটা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তথায় অবস্থানের কারণে হবে।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭৫২-[২৫] জারীর ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা আমার কাছে ওয়াহী নাযিল করেছিলেন যে, এ তিনটি জায়গায় যে কোনটিতে আপনি অবতরণ করবেন সেটিই হবে আপনার হিজরতের স্থল- মদীনাহ্, বাহরায়ন ও ক্বিন্নাস্রীন (দেশের নাম)। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ جَرِيرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِنَّ اللَّهَ أَوْحَى إِلَيَّ: أَيَّ هَؤُلَاءِ الثَّلَاثَةِ نَزَلْتَ فَهِيَ دَارُ هِجْرَتِكَ الْمَدِينَةِ أَوِ الْبَحْرَيْنِ أَوْ قِنَّسْرِينَ . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তিনটি শহরের যে কোন একটি শহরে হিজরত করা এবং সেখানে বসবাসের অধিকার দেয়া হয়েছিল। এর একটি হলো বাহরায়ন, আরেকটি মদীনাহ্ এবং অপরটি হলো কিন্নাসরীন। বাহরায়ন হলো বুসরাহ্ এবং ‘আম্মান-এর মধ্যবর্তী একটি স্থান, কেউ কেউ ইয়ামানের একটি প্রসিদ্ধ শহরকে বাহরায়ন বলে মতামত করেছেন। ‘আল্লামা ত্বীবী বলেনঃ ওমান সাগরের একটি উপদ্বীপকে বাহরায়ন বলা হয়। কিন্নাসরীন হলো সিরিয়ার একটি শহর।
মুল্লা ‘আলী কারী (রহঃ) বলেন, এটি একটি মুশকিল বিষয়, কেননা এর চেয়ে অধিক সহীহ হাদীসে আছে- নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তার হিজরতের যে স্থান দেখানো হয়েছে অথবা তাকে নির্দেশ করা হয়েছিল সেটি ছিল মদীনাহ্। এ সমস্যার সমাধানে মুহাদ্দিসগণ বলেন, প্রথমে তাকে তিনটি শহরের যে কোন একটি শহরকে গ্রহণের ইখতিয়ার দেয়া হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে মদীনাকেই নির্দিষ্ট করে দেয়া হয় যা হলো শ্রেষ্ঠ স্থান।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭৫৩-[২৬] আবূ বকরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ মদীনায় কক্ষনো মাসীহ দাজ্জালের আতঙ্ক বা ভীতি প্রবেশ করতে পারবে না। তখন মদীনায় সাতটি গেট থাকবে এবং প্রতিটি গেটেই দু’জন করে মালাক (ফেরেশতা) নিযুক্ত থাকবেন। (বুখারী)[1]
عَنْ أَبِي بَكْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا يَدْخُلُ الْمَدِينَةَ رُعْبُ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ لَهَا يَوْمَئِذٍ سَبْعَةُ أَبْوَابٍ عَلَى كُلِّ بَابٍ مَلَكَانِ» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: দাজ্জালের ভীতি এবং আতংক মদীনায় প্রবেশ করবে না, অর্থাৎ- মাসীহে দাজ্জাল পৃথিবীর সকল স্থানে প্রবেশ করলেও মক্কা এবং মদীনায় প্রবেশ করতে পারবে না। দাজ্জালকে মাসীহ বলা হয় এজন্য যে, মাসীহ শব্দের অর্থ স্পর্শকারী যেহেতু সে সমগ্র জমিন স্পর্শ করবে, অর্থাৎ- ভ্রমণ ও করতলগত করবে। অথবা সে হবে কানা, অর্থাৎ- একটি চোখ কারো দ্বারা মাসেহ (স্পর্শ) বা আক্রান্ত হয়েছে। দাজ্জালের নামের সাথে মাসীহ শব্দটি যুক্ত করা হয়ে থাকে, এটা ‘ঈসা যে মাসীহ (আঃ) তা থেকে পৃথক করার জন্য। মাসীহে দাজ্জাল পৃথিবীতে প্রকাশ পেলে সে সমগ্র পৃথিবী পরিভ্রমণ করবে কিন্তু মক্কা-মদীনায় প্রবেশ ও অনিষ্ট সাধন করতে পারবে না। ঐ সময় মদীনার সাতটি প্রবেশ পথ থাকবে, প্রত্যেক প্রবেশ পথে দু’জন করে মালাক দন্ডায়মান থাকবে, তারা তাকে প্রবেশে বাধা দিবে।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭৫৪-[২৭] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এই দু’আ করেছেন, ’’আল্লা-হুম্মাজ্’আল বিল মদীনাতি যি’ফাই মা- জা’আলতা বিমক্কাতা মিনাল বারাকাহ্’’ (অর্থাৎ- হে আল্লাহ! তুমি মক্কায় যে বারাকাত দান করেছো মদীনায় তার দ্বিগুণ বারাকাত দান কর।)। (বুখারী, মুসলিম)[1]
وَعَنْ أَنَسٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «اللَّهُمَّ اجْعَلْ بِالْمَدِينَةِ ضِعفَي مَا جعلت بِمَكَّة من الْبركَة»
ব্যাখ্যা: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনার জন্য মক্কার বারাকাতে দ্বিগুণ বারাকাত চেয়ে দু‘আ করেছেন। ‘আরাবীতে ضِعْفِ এর অর্থ এর সমপরিমাণ; হাদীসে এরই দ্বিবচন ব্যবহার করা হয়েছে, সুতরাং তার অর্থ দাঁড়ায় দু’ গুণ। মদীনার এ বারাকাত দুনিয়ার ক্ষেত্রে, সাওয়াব বা আখিরাতের পুণ্যের ক্ষেত্রে নয়। যেমন- তিনি মদীনার ‘‘সা’’ এবং ‘‘মুদ্’’ এর মধ্যে বারাকাতে প্রার্থনা করেছেন। সাওয়াবের ক্ষেত্রে এমনটি নয়, সুতরাং বলা যাবে না যে, মদীনার সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) মক্কার সালাতের দ্বিগুণ হবে। অথবা বলা যায় এ বারাকাত ‘আম্ সকল বিষয়েই প্রযোজ্য সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) ছাড়া, কারণ এ ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র হাদীস রয়েছে। আল্লাহর নাবী অনুরূপভাবে সিরিয়া ও ইয়ামানের বারাকাতের জন্যও দু‘আ করেছেন, এটা তাকীদের জন্য এর দ্বারা এ দেশ বা শহরগুলো মক্কার ওপর প্রাধান্য পাবে না।
‘আল্লামা মুবারাকপূরী তাঁর পিতার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, তিনি বলেছেনঃ মক্কার দ্বিগুণ চেয়ে দু‘আর অর্থ হলো মক্কার বাইরে যে বস্ত্ত দ্বারা একজন পরিতৃপ্ত হবে মক্কায় তা দিয়ে দু’জন পরিতৃপ্ত হবে, আর মদীনায় তা তিনজনের পরিতৃপ্তিদায়ক হবে। প্রকাশ যে হাদীসের এ বারাকাত নির্দিষ্ট সময়কাল দ্বারা সীমাবদ্ধ। ইমাম নাবাবী বলেন, এটা ‘‘মুদ্’’ এবং ‘‘সা’’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ অন্য বস্ত্ততে নয়। কেউ কেউ বলেছেনঃ বারাকাত সকল যুগেই বিদ্যমান থাকবে।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭৫৫-[২৮] ’উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ)-এর পরিবারের এক ব্যক্তি (সাহাবী) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কেবল আমার উদ্দেশেই এসে আমার কবর যিয়ারত করবে, কিয়ামতের দিন সে আমার পাশে থাকবে। আর যে ব্যক্তি মদীনাতে বসবাস করবে এবং মুসীবাতে ধৈর্য ধারণ করবে, কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য সাক্ষী ও সুপারিশকারী হবো। আর যে ব্যক্তি দু’ হারামের কোন একটিতে মৃত্যুবরণ করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা তাকে বিপদমুক্তদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে উঠাবেন।[1]
وَعَنْ رَجُلٍ مِنْ آلِ الْخَطَّابِ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ زَارَنِي مُتَعَمِّدًا كَانَ فِي جِوَارِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَمَنْ سَكَنَ الْمَدِينَةَ وَصَبَرَ عَلَى بَلَائِهَا كُنْتُ لَهُ شَهِيدًا وَشَفِيعًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَمَنْ مَاتَ فِي أَحَدِ الْحَرَمَيْنِ بَعَثَهُ اللَّهُ مِنَ الْآمِنِينَ يَوْمَ الْقِيَامَة»
ব্যাখ্যা: খাত্ত্বাবের বংশের একজন লোক দ্বারা হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে, মীরাক-এর লিখনীতে হাতিব-এর বংশের একজন লোকের কথা উল্লেখ হয়েছে।
বায়হাক্বীর এক সনদে ‘উমার-এর বংশের একজন লোকের কথা উল্লেখ হয়েছে। এভাবে আরো কিছু বৈসাদৃশ্যমূলক শব্দে হাদীসটি বর্ণিত হওয়ায় মুল্লা ‘আলী আল কারী এটিকে হাদীসে মুযত্বরাব বলে উল্লেখ করেছেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ ‘‘যে ব্যক্তি ইচ্ছা করে আমার যিয়ারত করবে.....।’’ এ যিয়ারত দ্বারা বৈধ যিয়ারত উদ্দেশ্য। ইচ্ছা করে এর মূলে ‘আরাবীতে مُتَعَمِّدًا -এর দ্বারা উদ্দেশ্য শুধুমাত্র যিয়ারতের জন্য গমন করা, কোন ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য নয়, অথবা লোক দেখানো কিংবা অন্য কোন বাতিল উদ্দেশেও নয়, বরং ইখলাসের সাথে সাওয়াবের উদ্দেশেই যিয়ারত করা। আর যে মদীনায় বাস করবে এবং সেখানকার দুঃখ-কষ্টে ধৈর্য ধারণ করবে। এখানে দুঃখ-কষ্ট বলতে সেটার ক্ষরা, অর্থ সংকট ও দৈন্যতা, বিভিন্ন আহলে বিদ্‘আতীদের দ্বারা অত্যাচার ইত্যাদি। আমি তার সাক্ষ্য দানকারী এবং সুপারিশকারী হব, এর অর্থ হলো তার গুনাহের জন্য সুপারিশকারী এবং নেক কাজের সাক্ষ্য দানকারী হব।
মুল্লা ‘আলী কারী (রহঃ) বলেন, واو (ওয়াও) অক্ষরটি এবং অর্থের পরিবর্তে او (আও) অর্থেও হতে পারে; তখন এর অর্থ হবে আমি তার সুপারিশকারী অথবা সাক্ষ্য দানকারী হব।
নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ ‘‘যে ব্যক্তি দু’ হারামের কোন একটিতে মৃত্যুবরণ করবে আল্লাহ তা‘আলা তাকে ক্বিয়ামাতের দিবসে নিরাপদে উঠাবেন।’’ এখানে নিরাপদ বলতে ক্বিয়ামাতের ভয়াবহ ভীতিপ্রদ অবস্থাদির থেকে নিখাদ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কবর যিয়ারতের উদ্দেশে সফর করার বিষয়ে সামনে বিস্তারিত বিবরণ আসছে।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭৫৬-[২৯] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি মারফূ’ হিসেবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আমার মৃত্যুর পর হজ্জ/হজ সম্পন্ন করে আমার (কবর) যিয়ারত করবে, সে ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে আমার জীবিতাবস্থায় আমার সাথেই যিয়ারত করেছে। (অত্র হাদীস দু’টি ইমাম বায়হাক্বী ’’শু’আবুল ঈমান’’-এ বর্ণনা করেছেন)[1]
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ مَرْفُوعًا: «مَنْ حَجَّ فَزَارَ قَبْرِي بَعْدَ مَوْتِي كَانَ كَمَنْ زَارَنِي فِي حَياتِي» . رَوَاهُمَا الْبَيْهَقِيّ فِي شعب الْإِيمَان
ব্যাখ্যা: নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ ‘‘যে ব্যক্তি হজ্জ/হজ করল। অতঃপর আমার মৃত্যুর পর আমার কবর যিয়ারত করল, সে আমার জীবদ্দশাকালে আমার সাথে সাক্ষাতকারীর ন্যায়।’’ মুল্লা ‘আলী কারী (রহঃ) বলেন, فَزَارَ শব্দের মধ্যে ف অক্ষরটি তা‘ক্বীবিয়াহ্ বা অনুবর্তী অর্থে ব্যবহার হয়েছে। যার ফলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কবর যিয়ারতটি হজ্জের পরেই হবে আগে নয়। স্বাভাবিক কায়দার চাহিদাও ফারযের পরই সুন্নাতের স্থান। এ ব্যাপারে ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) থেকে একটি সুন্দর ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছে ইমাম হাসান (রহঃ)। তিনি বলেছেনঃ যদি হজ্জটি ফরয হজ্জ/হজ হয়ে থাকে তাহলে হাজীর জন্য সর্বোত্তম হলো আগে হজ্জ সম্পন্ন করে নিবে, এরপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারতে উদ্যোগ গ্রহণ করতে। আর যদি হজ্জ নফল হয়ে থাকে তবে তার ইচ্ছা যে কোনটি আগে করতে পারে।
প্রকাশ যে, হাদীসের প্রকাশ্য দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রথমে হজ্জ করাই উত্তম, কেননা আল্লাহর হাক্ব সর্বদাই অগ্রণীয়। যেমন- মসজিদে নাবাবীতে ঢুকে কবর যিয়ারতের আগে তাহিয়্যাতুল মাসজিদ পড়ে নিতে হয়। আল্লামা ‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী (রহঃ) বলেনঃ সালফে সলিহীন সাহাবী এবং তাবি‘ঈ যারা মদীনায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কবর যিয়ারতের মাধ্যমে শুরু করেছেন বলে উল্লেখ রয়েছে, সেটা ইহরাম বাঁধা উত্তম। আর তিনি মদীনার যুল্ হুলায়ফাহ্ থেকে ইহরাম বেঁধেছেন। এ অবস্থায় মদীনায় ইহরামের পূর্বে কবর যিয়ারত করে নিবে। এ উত্তম কেবল ঐ ব্যক্তিদের জন্য যাদের মীকাত যুল্ হুলায়ফাহ্, আর মদীনাহ্ হয়েই তো সেখানে যেতে হয়।
এ হাদীস দ্বারা সর্বসম্মতভাবে কবর যিয়ারতের ফাযীলাত স্বীকৃত হয়। কিন্তু নিসক কবর যিয়ারতের উদ্দেশে সফর করা বৈধ কি-না তা নিয়ে ‘উলামাগণের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। ইমাম সুবকী নিসক কবর যিয়ারতের উদ্দেশে সফর করাকে বৈধ বলে মনে করেন।
পক্ষান্তরে আরেক শ্রেণী তথা জমহূর সাহাবী, তাবি‘ঈ এবং আয়িম্মায়ে কিরামের মতে নিসক (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর) কবর যিয়ারতের উদ্দেশে সফর করা বৈধ নয়। কেননা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সর্বজনবিদিত হাদীসঃ لا تشدوا الرحال إلا إلى ثلاثة مساجد، إلخ তিনটি মাসজিদ ছাড়া কোথাও সফরের জন্য বাহন বাঁধবে না.....। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কর্ম দ্বারাও কোন কবর যিয়ারতের উদ্দেশে সফর প্রমাণিত হয়নি, সুতরাং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ক্ববরের জন্যও সফর বৈধ নয়।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭৫৭-[৩০] ইয়াহ্ইয়া ইবনু সা’ঈদ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসেছিলেন, এমন সময় মদীনায় একটি কবর খোঁড়া হচ্ছিল। তখন জনৈক ব্যক্তি কবরে উঁকি মেরে বললো, মু’মিনের জন্য কি এটা মন্দ স্থান? এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি কি খারাপ কথাই না বললে! লোকটি তখন বললো, হে আল্লাহর রসূল! আমি কথাটি এ উদ্দেশে বলিনি, বরং আমার কথা বলার অর্থ হলো, সে আল্লাহর পথে বিদেশে এসে কেন শাহীদ হলো না (অর্থাৎ- মদীনায় মৃত্যুবরণ করল এবং এখানে কবরস্থ হতে চলল)? তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, আল্লাহর পথে শাহীদ হবার মতো সমতুল্য আর অন্য কিছুই সম্ভব নয়। তবে মনে রাখবে, আল্লাহর জমিনে এমন কোন জায়গা নেই, যেখানে আমার কবর হওয়া মদীনার চেয়ে আমার কাছে প্রিয়তম হতে পারে। এ কথাটি তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তিনবার বললেন। [ইমাম মালিক (রহঃ) হাদীসটি মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন][1]
لإرساله وَعَنْ يَحْيَى بْنِ سَعِيدٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ جَالِسًا وَقَبْرٌ يُحْفَرُ بِالْمَدِينَةِ فَاطَّلَعَ رَجُلٌ فِي الْقَبْرِ فَقَالَ: بِئْسَ مَضْجَعِ الْمُؤْمِنِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «بئس مَا قُلْتَ» قَالَ الرَّجُلُ إِنِّي لَمْ أُرِدْ هَذَا إِنَّمَا أَرَدْتُ الْقَتْلَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا مِثْلَ الْقَتْلِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ مَا عَلَى الْأَرْضِ بُقْعَةٌ أَحَبُّ إِلَيَّ أَنْ يَكُونَ قَبْرِي بِهَا مِنْهَا» ثَلَاثَ مَرَّاتٍ. رَوَاهُ مَالِكٌ مُرْسَلًا
ব্যাখ্যা: মু’মিনের ক্ববরের উপর লোকটির মন্তব্য ছিল খারাপ, যদিও তার নিয়্যাত তথাকথিত খারাপ উদ্দেশে ছিল না। কেননা মু’মিন ব্যক্তির কবর হবে জান্নাতের বাগান সদৃশ, তাকে খারাপ বলা মোটেও সঠিক হয়নি। এজন্য নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ঐ কথাটিকেই খারাপ বলে প্রতিবাদ করেছেন। সাথে সাথে মদীনায় তার অন্তিম শয়ন কক্ষ, অর্থাৎ- কবর হওয়ার আশাব্যক্ত করেছেন। লোকটির উদ্দেশ্য ছিল মদীনাহ্ ত্যাগ করে দূর দেশে আল্লাহর রাস্তায় বের হয়ে যুদ্ধ শাহীদ হয়ে সেখানে সমাহিত হওয়াই অধিক ফাযীলাতের বিষয়। তার উদ্দেশ্য সঠিক হলেও কথাটি সঠিক হয়নি, তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রতিবাদ করেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - মদীনার হারামকে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
২৭৫৮-[৩১] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) বলেছেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে (হজের সফরে) ’আক্বীক্ব উপত্যকায় বলতে শুনেছি, তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, এ রাতে আমার রবের পক্ষ হতে আমার কাছে এক আগন্তুক এসে বললো, আপনি এ বারাকাতময় উপত্যকায় (দু’ রাক্’আত নফল) সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করুন এবং বলুন, ’উমরা হজের মধ্যে গণ্য। অন্য এক বর্ণনায় আছে, একে ’উমরা ও হজ্জ/হজ বলুন। (বুখারী)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ بِوَادِي الْعَقِيقِ يَقُولُ: أَتَانِي اللَّيْلَةَ آتٍ مِنْ رَبِّي فَقَالَ: صَلِّ فِي هَذَا الْوَادِي الْمُبَارَكِ وَقُلْ: عُمْرَةٌ فِي حَجَّةٍ . وَفِي رِوَايَة: «قل عُمرةٌ وحِجّةٌ» . رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ
ব্যাখ্যা: (عَقِيْقِ) ‘আক্বীক্ব মদীনার যুলহুলায়ফার সন্নিকটের একটি জায়গা। মদীনাহ্ থেকে সেটার দূরত্ব চার মাইল। মুসনাদে আহমাদ-এর শারাহ গ্রন্থে শায়খ আহমাদ শাকির বলেছেন, এখানে ‘উমার (রাঃ)-এর হাদীসে ‘আক্বীক্ব বলতে যুলহুলায়ফার বাত্বনি ওয়াদীর সন্নিকটে অবস্থিত একটি স্থান। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটে (আল্লাহর নিকট থেকে) আগন্তুক ছিলেন জিবরীল (আঃ), তিনি তাকে সেখানে যে সালাতের নির্দেশ করেছিলেন সেটি ছিল ইহরামের জন্য সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) আদায় করা।
কেউ কেউ বলেছেন, এটা ছিল ফজরের সালাত (সালাত/নামাজ/নামায)। জিবরীল (আঃ) ‘আক্বীক্ব উপত্যকাকে বলেছেন, এটা বারাকাতপূর্ণ উপত্যকা অবশ্য ‘আক্বীক্ব উপত্যকা এই বারাকাত ঐ সময়ের জন্যই ছিল পরবর্তী সময়ের তা মদীনার বারাকাতপূর্ণ বা ফাযীলাতপূর্ণ কোন স্থান হিসেবে খ্যাতি লাভ করতে পারেনি।
মালাক (ফেরেশতা) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্যই সফরের ‘উমরাকে বন্ধুর সাথে সংযুক্ত করার কথা বলেছেন। সুতরাং এই ভিত্তিতে বলা যায় তিনি কিরান হজ্জকারী ছিলেন। এর অন্যান্য ব্যাখ্যা করেছেন উদ্দেশের অতীব দূর অর্থ, যেমন- কেউ কেউ বলেছেন, তিনি হজ্জের কার্যক্রম সম্পন্ন করার পর ঐ বছরেই বাড়ী ফেরার আগে ‘উমরা করেছেন। ‘আল্লামা ত্ববারী বলেন, আল্লাহর নাবীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যেন তার সাহাবীগণকে বলে দিতে পারেন যে কিরান হজ্জ/হজ করা বৈধ।