২৬৮১

পরিচ্ছেদঃ ১১. প্রথম অনুচ্ছেদ - ইহরাম অবস্থায় যা থেকে বেঁচে থাকতে হবে

২৬৮১-[৪] ’উসমান (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ইহরাম অবস্থায় বিয়ে করবে না, বিয়ে দেবে না এবং বিয়ের প্রস্তাবও দিবে না। (মুসলিম)[1]

بَابُ مَا يَجْتَنِبُهُ الْمُحْرِمُ

وَعَنْ عُثْمَانَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَنْكِحُ الْمُحْرِمُ وَلَا يُنكِحُ وَلَا يَخْطُبُ» . رَوَاهُ مُسلم

ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসটি প্রমাণ করছে মুহরিমের জন্য বিবাহ করা বা অপর কাউকে বিবাহ দিয়ে দেয়া কোনটাই বৈধ নয়- এটাই অধিকাংশ ‘আলিমের মতামত। ইমাম নাবাবী (রহঃ) তার শারহুল মুহাযযাবে অধিকাংশ সাহাবী, তাবি‘ঈ ও তাবি তাবি‘ঈ-এর মতামতও এটা বলেছেন। তিনি আরো বলেছেন এ মতামত ‘উমার বিন খাত্ত্বাব, ‘উসমান, ‘আলী, যায়দ বিন সাবিত, ইবনু ‘উমার, সা‘ঈদ বিন মুসাইয়্যিব, সুলায়মান বিন ইয়াসার, যুহরী, মালিক, আহমাদ, শাফি‘ঈ, ইসহাক, দাঊদসহ আরো অনেকের।

মুসলিমের ব্যাখ্যায় ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেছেনঃ ইমাম মালিক, শাফি‘ঈ ও ইমাম আহমাদ (রহঃ) বলেছেন, (لا يصح نكاح المحرم) অর্থাৎ- মুহরিমের বিবাহ বৈধ হবে না। কিন্তু ইমাম আবূ হানীফা, হাকাম বিন ‘উতায়বাহ্, সুফিয়ান সাওরী, ইব্রাহীম নাখ্‘ঈ, ‘আত্বা, হাম্মাদ বিন আবী সুলায়মান, ‘ইকরামাহ্, মাসরুকসহ অনেকে বলেছেন মুহরিমের বিবাহ বৈধ। আর কেউ কেউ বলেছেন, এটা ইবনু ‘আব্বাস, ইবনু মাস্‘ঊদ, আনাস ও মু‘আয বিন জাবাল (রাঃ)-এরও উক্তি। আর এ দিকেই ঝুকে গিয়েছেন ইমাম বুখারী (রহঃ), কেননা তিনি ‘‘মানাসিক’’ অধ্যায়ে বাব রচনা করেছেন, (باب تزويبج المحرم) এবং ‘‘নিকাহ’’ অধ্যায়ে (باب نكاح المحرم)-এর মাধ্যমে অধ্যায় রচনা করেছেন। হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, ইমাম বুখারীর এই বাব তথা অধ্যায় রচনা দেখেই অনুমান করা যায় যে, তিনি মুহরিমের বিবাহ বৈধের মতাবলম্বী ছিলেন।

প্রথম মতের প্রবক্তাদের দলীল হলো, ‘উসমান ও ইবনু ‘উমার (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীস, নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (لا ينكح المحرم ولا ينكح ولا يخطب ولا يخطب عليه) অর্থাৎ- মুহরিম বিবাহ করতে পারবে না কাউকে বিবাহ দিতেও পারবে না। অনুরূপ বিবাহের পয়গাম পাঠাতেও পারবে না এবং তাকেও কেউ বিবাহের পয়গাম দিতে পারবে না।

দ্বিতীয় মতের প্রবক্তাদের দলীল দিয়েছে, ইবনু ‘আব্বাস -এর বর্ণিত হাদীসের মাধ্যমে। কেননা সেখানে স্পষ্ট রয়েছে, (ان رسول الله ﷺ تزوج منمونة وهو محرم) অর্থাৎ- নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মায়মূনাহ্-কে বিবাহ করেছেন মুহরিম অবস্থায়। আর মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাঝে উত্তম আদর্শ নিহিত রয়েছে।’’ (সূরা আল আহযাব ৩৩ : ২১)

জেনে রাখা প্রয়োজন যে, হাদীসে উল্লেখিত لا ينكح ولا ينكح এ দু’টি শব্দই হারামের জন্য এসেছে। সকলের ঐকমত্যে তবে لا يخطب বিবাহের পয়গামও পাঠানো যাবে না, এটিকে তাহরীমের ফায়দা দিবে নাকি নাহিয়ে তানযীহী তথা মাকরূহের ফায়দা দিবে- এ নিয়ে ‘উলামায়ে কিরামের মাঝে মতবিরোধ আছে। তিন ইমামের নিকট তা মাকরূহে ফায়দা দিবে ইমাম আবূ হানীফার ও তাই মত। কিন্তু আমাদের কথা হলো উপরোক্ত সবগুলো সিগাহতে যে নাহীর শব্দ আছে তা তাহরীমের ফায়দা দিবে। সুতরাং মুহরিমের জন্য যেমন কোন মহিলাকে বিবাহের পয়গাম পাঠানো হারাম অনুরূপ মুহরিমা নারীর জন্য অপর কোন পুরুষকে বিবাহের পয়গাম পাঠানো হারাম। তাই বিবাহের হারাম আর বিবাহের পয়গাম পাঠানোর হারাম একই হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হবে। যেহেতু সিগাহ একই। সুতরাং যদি কেউ একটিকে হারাম আর অপরটিকে মাকরূহ বলে তাহলে তার দলীল লাগবে, কিন্তু দলীল নেই। কোন কোন শাফি‘ঈ মতাবলম্বী আবার কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে বিবাহের পয়গাম পাঠানোকে হারাম না বলে মাকরূহ বলতে চান আর তা হলো, মহান আল্লাহ তা‘আলার বাণী,

كُلُوْا مِنْ ثَمَرِهٖ إِذَا أَثْمَرَ وَاٰتُوْا حَقَّهٗ يَوْمَ حَصَادِه

অর্থাৎ- ‘‘গাছগুলো ফল দিলে তোমরা খাও এবং যাকাত দাও।’’ (সূরা আল আন্‘আম ৬ : ১৪১)

তার অর্থ এখানে মা‘তুফ আর মা‘তুফ ‘আলায়হির হুকুম ভিন্ন হচ্ছে, কারণ খাওয়া ওয়াজিব নয় কিন্তু যাকাত ওয়াজিব তাই এখানেও বিবাহ করা হারাম হতে পারে কিন্তু পয়গাম পাঠানো হারাম হবে না কারণ মা‘তুফ ও মা‘তুফ আলায়হির হুকুম ভিন্ন ভিন্নও হতে পারে। শাফি‘ঈ মতাবলম্বীদের এ গবেষণার কোন মূল্য নেই বরং আমরা সুন্নাহকেই আকড়ে ধরবো।

ইহরাম অবস্থায় বিবাহ বৈধ কিনা- এ বিষয়ে মতবিরোধ থাকলেও বিবাহ না করার মতই অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। এদিকে যারা বিবাহ বৈধ বলেন তারা বিভিন্নভাবে উত্তর দেয়ার প্রয়াস পান। যেমনঃ

১. তারা বলেন, ইবনু ‘আব্বাস-এর হাদীসটি বেশি সহীহ এবং শক্তিশালী কারণ সেটা বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনা। অপরদিকে ‘উসমান (রাঃ)-এর হাদীসটি ইমাম মুসলিমের একার বর্ণনা, তাই এখানে ইবনু ‘আব্বাস-এর বর্ণিত হাদীসটি অগ্রাধিকার পাবে।

এদের উত্তরে আমরা বলি, ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর হাদীস হলো নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কর্মগত হাদীস আর উসমান (রাঃ)-এর হাদীস নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বক্তব্যমূলক হাদীস, আর আমরা জানি কর্মমূলক হাদীস আর বক্তব্যমূলক হাদীস বিরোধপূর্ণ হলে বক্তব্যমূলকটি প্রাধান্য পায়, তাই এখানে ‘উসমান (রাঃ)-এর হাদীসটি প্রাধান্য পাবে। যদিও সানাদগত ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর হাদীস শক্তিশালী।

হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, ‘উসমান -এর হাদীসটি প্রাধান্য পাবে কারণ সেটা একটি মৌলিক নিয়মের কথা বলছে আর ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর হাদীস একটি নির্দিষ্ট ঘটনা যা অনেকগুলো বিষয়ের সম্ভাবনা রাখে।

২. তারা বলে থাকেন, ‘উসমান -এর হাদীসে নিকাহ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো وطأ الزوجة তথা স্ত্রী সহবাস যা ইহরাম অবস্থায় সকলের ঐকমত্যে হারাম। এখানে নিকাহ দ্বারা ‘আক্বদ উদ্দেশ্য নয়। এর উত্তরে আমরা বলবো, আপনাদের কথাটি ঠিক নয়। ঠিক না হওয়ার প্রথম কারণ হলো সরাসরি ঐ হাদীস দু’টি ইঙ্গিত যা প্রমাণ করছে এখানে নিকাহ দ্বারা عقد النكاح তথা বিবাহের বন্ধনই উদ্দেশ্য وطأ তথা স্ত্রী সহবাস উদ্দেশ্য নয়।

১নং ইঙ্গিতঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা لا ينكح ই দলীল যে এখানে নিকাহ দ্বারা বিবাহ উদ্দেশ্য وطأ তথা স্ত্রী সহবাস উদ্দেশ্য নয়, কারণ ওলী যখন বিবাহ করিয়ে দিবে তার পরে তা স্বামী স্ত্রী সহবাস চাইবে। কিন্তু এখানে তো ওলীর বিবাহ করিয়ে দেয়াকেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

২য় ইঙ্গিতঃ لا يخطب বিবাহের পয়গাম দিবে না- এ শব্দটিই প্রমাণ করছে পূর্বোক্ত নিকাহ শব্দের অর্থ মূলত عقد النكاح তথা বিবাহের বন্ধন وطأ তথা সহবাস নয়।

আর দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে আবান বিন ‘উসমান তথা হাদীসের বর্ণনাকারীই তার অর্থ সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত আর সেই আবান বিন ‘উসমানই لا ينكح-এর অর্থ لا يزوج করেছেন এবং এটা অথবা আরো ভালোভাবে জানতে পারি এ হাদীসের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানি আর তা হলো ‘উমার বিন ‘উবায়দুল্লাহর ছেলে তলহা বিন ‘উমার যখন শায়বাহ্ বিন জুবায়র-এর মেয়েকে বিবাহ করলো ইহরাম অবস্থায় তখন এ বিবাহের ঘোরবিরোধিতা করা হলো এবং ‘উসমান (রাঃ) থেকে বর্ণিত ইহরাম অবস্থায় বিবাহ নিষেধের হাদীসটি বর্ণনা করে শুনানো হলো এবং সবাই তখন এ হাদীস দ্বারা বিবাহের বন্ধনই বুঝেছিলেন وطأ তথা স্ত্রী সহবাস বুঝেনি।

তৃতীয় কারণ হচ্ছে, ইমাম আহমাদ (রহঃ) ইবনু ‘উমার  থেকে বর্ণনা করেন, ইবনু ‘উমার (রাঃ)-কে এ মর্মে প্রশ্ন করা হলো যে, কোন মহিলাকে যদি কোন পুরুষ ‘উমরা অথবা হজ্জের ইহরাম অবস্থায় বিবাহ করতে চায় তাহলে তা বৈধ হবে কি না? উত্তরে তিনি বললেন, (لا تتزوج وانت محرم فان رسول الله ﷺ نهى عنه) অর্থাৎ- তুমি মুহরিম অবস্থায় বিবাহ করিও না, কারণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা করতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং এ হাদীস থেকেও বুঝা গেল نكاح দ্বারা উদ্দেশ্য عقد النكاح তথা বিবাহের চুক্তি وطأ তথা সহবাস নয়।


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
পুনঃনিরীক্ষণঃ