পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩০৮০-[১] ’আব্দুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে সে যেন অবশ্যই বিবাহ করে। কেননা বিবাহ দৃষ্টি অবনত করে ও লজ্জাস্থানের অধিক অধিক হিফাযাত করে। আর যার সামর্থ্য নেই, সে যেন সওম (রোযা) রাখে। কেননা, সওম তার জন্য ঢালস্বরূপ (অর্থাৎ- অবৈধ যৌনচাহিদা থেকে বিরত রাখে)। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءٌ»
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা নববী (রহঃ) বলেনঃ الْبَاءَةَ ‘‘বাআত’’ এর উদ্দেশ্য নিয়ে ‘উলামাগণের মাঝে দু’টি অগ্রগণ্য মত রয়েছে। তন্মধ্যে অধিক বিশুদ্ধ মত হলো, الْبَاءَةَ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সহবাস। সুতরাং মূল কথা হলো যে, সহবাসে সক্ষম সে যেন বিবাহ করে। আর যে স্ত্রীর ভরণ-পোষণে অক্ষম ও সহবাসে অক্ষম, তার যৌন চাহিদা দমন করার জন্য সিয়াম পালন করতে হবে আর এটাই তার খারাপ মনোবৃত্তি দূর করবে।
দ্বিতীয় মত হলো, বিবাহের খরচাদি বহনের সক্ষমতা (অর্থাৎ- দেন-মোহর, ওয়ালীমা ইত্যাদি)। সুতরাং হাদীসটির উদ্দেশ্য হলো, যে ব্যক্তি বিবাহের সমস্ত খরচ পরবর্তী স্ত্রী খরচাদি বহনে সক্ষম সে যেন বিবাহ করে। আর যে এতে অক্ষম সে তার প্রবৃত্তি দমনে সিয়াম পালন করবে। তবে আমি (‘আসকালানী) বলবঃ হাদীসে উল্লেখিত বাক্যে (مَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ) এখানে الْبَاءَةَ এর মধ্যে সহবাসে সক্ষমতা ও স্ত্রীর যাবতীয় খরচাদিসহ সবই রয়েছে। কারণ তিরমিযীতে আস্ সাওরী (রহঃ)-এর সূত্রে আ‘মাশ হতে বর্ণিত রয়েছে, যে ব্যক্তি الْبَاءَةَ করতে সক্ষম নয় সে সিয়াম পালন করবে। তিরমিযীর বর্ণনায় আবূ ‘আওয়ানাহ্-এর সূত্রে বর্ণিত রয়েছে, যে ব্যক্তি বিবাহ করতে সক্ষম সে যেন বিবাহ করে। আবার নাসায়ীর বর্ণনায় রয়েছে, যার সামর্থ্য আছে সে বিবাহ করবে।
ইবন হাযম (রহঃ) বলেনঃ সহবাসে সক্ষম ব্যক্তি মাত্র সবার ওপর বিবাহ করা ফরয, যদি তার বিবাহ করার সামর্থ্য থাকে। এতে যদি সে অক্ষম হয় তবে বেশী বেশী সিয়াম পালন করবে। আর এটাই এক দল সালাফগণের বক্তব্য।
ইবনুল বাত্ত্বল (রহঃ) বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা দ্বারা বিবাহ ওয়াজিব প্রমাণিত হয় না। কারণ বিবাহের পরিবর্তে সিয়াম পালন ওয়াজিব না, সুতরাং বিবাহটা অনুরূপই হবে। সিয়াম পালনের নির্দেশ রয়েছে সহবাসে অক্ষমতার কারণে, সুতরাং তা আবশ্যকীয় নয়। ব্যাপারটা এ রকম যে, কেউ কাউকে বলল, এ কাজ তোমার জন্য করা ওয়াজিব, তবে তা যদি না পার তবে তোমার জন্য এটা করা ভালো।
আহমাদ-এর প্রসিদ্ধ বক্তব্য রয়েছে যে, পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা না থাকলে বিবাহ করা ওয়াজিব নয়। ‘আল্লামা কুরতুরী (রহঃ) বলেনঃ সামর্থ্যবান ব্যক্তির যদি বিবাহ ছাড়া নিজের ওপর কিংবা দীনের ব্যাপারে ক্ষতির (যিনায় লিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা) আশঙ্কা থাকে এবং বিবাহ ছাড়া যদি এ অবস্থা থেকে মুক্তির সম্ভাবনা না থাকে তবে তার জন্য বিবাহ করা ওয়াজিব। এতে কারো দ্বিমত নেই। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫০৬৫)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩০৮১-[২] সা’দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেন ’উসমান ইবনু মায্’ঊন -এর বিবাহ না করার সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করার। যদি তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-ও তাঁকে এরূপ অনুমতি দিতেন, তাহলে আমরা সকলে খোজা বা খাসি হয়ে যেতাম। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ سَعْدِ بْنِ أَبِي وَقَّاصٍ قَالَ: رَدَّ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى عُثْمَان ابْن مَظْعُونٍ التَّبَتُّلَ وَلَوْ أَذِنَ لَهُ لَاخْتَصَيْنَا
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, পুরুষত্ব নষ্ট করা, সৃষ্টির পরিবর্তন করা ও নি‘আমাত অস্বীকার করা- এসবই ভ্রান্ত চিন্তা; কেননা মানুষের পুরুষ হিসেবে জন্ম নেয়া একটি বড় নি‘আমাত যখন এটা দূর করবে তখন সে মহিলার সাদৃশ্য হবে এটি পূর্ণতার উপর অপূর্ণতাকে মনোনীত করা।
‘আল্লামা কুরতুবী (রহঃ) বলেনঃ আদাম সন্তান ছাড়া অন্যান্য প্রাণীগুলোর ক্ষেত্রে উপকার পাওয়ার স্বার্থ ছাড়া খাসি করা জায়িয নেই। ‘আল্লামা নববী (রহঃ) বলেনঃ যে সকল প্রাণীর গোশত খাওয়া হয় না সে সব প্রাণীকে খাসি করা সম্পূর্ণ হারাম। আর সে সব প্রাণীর গোশত খাওয়া হালাল সে সব প্রাণী ছোট থাকা অবস্থায় খাসি করা জায়িয, বড় হওয়ার পর তা জায়িয নয়। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫০৭৩-৭৪)
‘আল্লামা বাগাবী (রহঃ) অনুরূপ কথা বলেছেন, অর্থাৎ- যে সব প্রাণীর গোশত খাওয়া হয় না সে সব প্রাণী খাসি করা হারাম। আর যে সব প্রাণী গোশত খাওয়া যায় সে সব প্রাণী ছোট থাকাতে খাসি করা জায়িয। বড় হলে তা হারাম।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩০৮২-[৩] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (মূলত) চারটি গুণের কারণে নারীকে বিবাহ করা হয়- নারীর ধন-সম্পদ, অথবা বংশ-মর্যাদা, অথবা রূপ-সৌন্দর্য, অথবা তার ধর্মভীরুর কারণে। (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন) সুতরাং ধর্মভীরুকে প্রাধান্য দিয়ে বিবাহ করে সফল হও। আর যদি এরূপ না কর তাহলে তোমার দু’ হাত ধূলায় ধূসরিত হোক (ধর্মভীরু মহিলাকে প্রাধান্য না দিলে ধ্বংস অবধারিত)! (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ: لِمَالِهَا وَلِحَسَبِهَا وَلِجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا فَاظْفَرْ بِذَات الدّين تربت يداك
ব্যাখ্যা: এ হাদীসের বিশুদ্ধ অর্থ হলো, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহের ক্ষেত্রে লোকজন যা করত তাই উল্লেখ করেছেন। লোকজন উল্লেখিত চারটি বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিত। আর এ সবগুলোর পর ছিল দীনদারিত্বের বিষয়, আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ হে সঠিক পথের সন্ধানী! তুমি দীন-দারিত্বকেই প্রাধান্য দাও। তবে এটি এ মর্মে নির্দেশ নয়।
‘আল্লামা কুরতুবী (রহঃ) বলেনঃ আলোচ্য হাদীসের অর্থে চারটি বৈশিষ্ট্য যা নারীর বিবাহের প্রতি আগ্রহ যোগায়, তা নির্দেশ বা ওয়াজিব নয়। বরং এ বৈশিষ্ট্যগুলো দেখা বৈধ, তবে দীন-দারিত্ব দেখাটা অধিক অগ্রগণ্য। তিনি আরো বলেন যে, এ হাদীস থেকে এটা মনে করা যাবে না যে, নারী পুরুষের কুফু বা সমতা এ চারটির মধ্যে সীমাবদ্ধ। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫০৯০)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩০৮৩-[৪] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দুনিয়ার সমস্ত কিছুই (তুচ্ছ ও ক্ষণস্থায়ী) ধন-সম্পদ। (তন্মধ্যে) মুসলিম সতীসাধ্বী রমণী সর্বশ্রেষ্ঠ ধন। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الدُّنْيَا كُلُّهَا مَتَاعٌ وَخَيْرُ مَتَاعِ الدُّنْيَا الْمَرْأَة الصَّالِحَة» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: দুনিয়ার ভোগসামগ্রী অতি সামান্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ হে রসূল! আপনি বলুন দুনিয়ার ভোগবিলাশ অতি নগণ্য’’- (সূরা আন্ নিসা ৪ : ৭৭)। এ মর্মে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা‘আলার কাছে দুনিয়া যদি একটি মশার ডানার সমতুল্য হত তাহলে কাফিরদেরকে দুনিয়াতে পানিও পান করতে দিতেন না। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ২৩২০)
আর দুনিয়ার উত্তম উপভোগ্য হলো সতী নারী, কারণ এটা আখিরাতের কর্মের উপর নির্ধারিত। আর আল্লাহ তা‘আলার কথা, ‘‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন’’- (সূরা আল বাকারা ২ : ২০) ‘আলী এর ব্যাখ্যা করেছেন সতী নারী ও ‘আখিরাতে কল্যাণ দান করুন’ এর ব্যাখ্যা করেছেন জান্নাতের হূর। অর্থাৎ- আখিরাতে জান্নাতী হূর দানের মাধ্যমে কল্যাণ দান করুন।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩০৮৪-[৫] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ উট আরোহণকারিণীদের মধ্যে সর্বোত্তম নারী কুরায়শ বংশের নারীগণ, তারা শৈশবকালে সন্তানের প্রতি অধিক স্নেহপরায়ণা হয় এবং স্বামীর ধন-সম্পদের উত্তম রক্ষনাবেক্ষণকারিণী হয়। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «خَيْرُ نسَاء ركبن الْإِبِل صَالح نسَاء قُرَيْش أَحْنَاهُ عَلَى وَلَدٍ فِي صِغَرِهِ وَأَرْعَاهُ عَلَى زَوْجٍ فِي ذَاتِ يَدِهِ»
ব্যাখ্যা: মারইয়াম (আঃ)-এর বর্ণনা সংক্রান্ত হাদীসের শেষে আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)-এর কথা (মারইয়াম বিনতু ‘ইমরান (আঃ) কখনই উটের পিঠে সওয়ার হননি) এর থেকে বুঝা যায় যে, হাদীসে উল্লেখিত গুণাবলী থেকে মারইয়াম (আঃ)-কে তিনি আলাদা করছেন। কারণ তিনি তো উঠের পিঠে সওয়ার হননি, কাজেই কুরায়শী নারীদের শ্রেষ্ঠত্ব তো তার ওপর বর্তায় না। তবে কুরায়শী সকল নারীদের ওপর মারইয়াম (আঃ)-এর শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। অপর বর্ণনায় রয়েছে যে, নারীদের মধ্যে উত্তম নারী হলেন মারইয়াম (আঃ), নারীদের মধ্য উত্তম নারী হলো খাদীজাহ্ (রাঃ)। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা (خَيْرُ نِسَاءِ رَكَبْنَ الْإِبِلَ) এটা দ্বারা আরবের নারীদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। কারণ তাদের অধিকাংশই উটের পিঠে সওয়ার হতেন। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫০৮২)
আর কুরায়শী নারীদের শ্রেষ্ঠত্ব হাদীসে উল্লেখিত গুণাবলীর কারণে। সেগুলো হলো, সন্তানদের প্রতি রক্ষণশীল হওয়া, তাদের প্রতি স্নেহশীল হওয়া, উত্তমভাবে তাদের প্রতিপালন করা তারা ইয়াতীম হলে তাদের প্রতিপালনে অবিচল থাকা। অনুরূপভাবে স্বামীর সম্পদের ক্ষেত্রে তার হক আদায় করা, তা সংরক্ষণ করা, আমানত রক্ষা করা, খরচ বা অন্য বিষয়ের ক্ষেত্রে চিন্তা-ভাবনা করা সহ বিবিধ গুণাবলীর কারণে আরবের নারীরা অন্যদের থেকে শ্রেষ্ঠ। (শারহে মুসলিম ১৫/১৬ খন্ড, হাঃ ২৫২৭)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩০৮৫-[৬] উসামাহ্ ইবনু যায়দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার (ইন্তেকালের) পরে আমার উম্মাতের পুরুষদের জন্য নারী অপেক্ষা অধিক ফিতনার শঙ্কা আর কিছুতেই রেখে যাইনি। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أُسَامَةَ بْنِ زَيْدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا تَرَكْتُ بَعْدِي فِتْنَةً أَضَرَّ عَلَى الرِّجَالِ من النِّسَاء»
ব্যাখ্যা: এ হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, নারীদের ফিতনা অবশ্যই অন্যান্য বিষয়গুলো থেকে অধিক কঠিন এবং আল্লাহর বাণী এটাই সমর্থন করে, ‘‘মানব জাতিকে মোহগ্রস্ত করেছে নারী’’- (সূরা আ-লি ‘ইমরান ৩ : ১৪)। তিনি তাদেরকে দুনিয়ার মোহ ভালোবাসার অন্তর্ভুক্ত করেছেন। কোনো কোনো ‘উলামাগণ বলেন, নারীদের সবকিছুতে অনিষ্টতা আছে, বিশেষ করে তাদের হার না মানা স্বভাবে আরো বেশী অনিষ্টতা রয়েছে। সেই সাথে তাদের জ্ঞানের কমতি ও দীনের কমতিও রয়েছে। জ্ঞানের কমতি হলো, পুরুষকে তার মোহে অন্ধ করা। আর দীনের কমতি হলো, দীনের কর্মের বিষয়ে উদাসীন থাকা এবং দুনিয়া অনুসন্ধানের ফলে পরকালীন ধংস ডেকে আনা। আর এটাই বড় ফাসাদ বা বিপর্যয়। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫০৯৬; শারহে মুসলিম ১৭/১৮ খন্ড, হাঃ ২৭৪০; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩০৮৬-[৭] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দুনিয়া হলো চিত্তাকর্ষক সবুজের সমারোহ। আল্লাহ তা’আলা তোমাদেরকে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে পাঠিয়ে পরীক্ষা করতে চান যে, তোমরা কিরূপে আ’মাল কর। সুতরাং (দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করে) আল্লাহর ভয় কর এবং নারীদের ব্যাপারে সাবধান থাক। কেননা, বনী ইসরাঈলদের মধ্যে সর্বপ্রথম নারীদের মধ্যেই ফিতনা সংঘটিত হয়েছিল। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «إِنَّ الدُّنْيَا حُلْوَةٌ خَضِرَةٌ وَإِنَّ اللَّهَ مُسْتَخْلِفُكُمْ فِيهَا فَيَنْظُرُ كَيْفَ تَعْمَلُونَ فَاتَّقُوا الدُّنْيَا وَاتَّقُوا النِّسَاءَ فَإِنَّ أَوَّلَ فِتْنَةِ بَنِي إِسْرَائِيلَ كَانَتْ فِي النِّسَاء» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: নারীদের থেকে বেঁচে থাক, কারণ তোমরা তাদের কারণে শারী‘আতের নিষিদ্ধ কর্মগুলোতে পতিত হতে পার এবং তাদের কারণে দুনিয়ার ফিতনায় পতিত হয়ে যাবে। কারণ দুনিয়ার প্রথম ফিতনাহ্ তাদের কারণেই হয়েছে।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ তোমরা তাদের (নারীদের) দিকে ঝুঁকে পড়া থেকে বেঁচে থাক এবং তাদের কথা গ্রহণ থেকে বেঁচে থাক। কারণ তাদের জ্ঞান কম এবং তাদের অধিকাংশ কথায় কোনো কল্যাণ নেই। (শারহে মুসলিম ১৫/১৬ খন্ড, হাঃ ২৭৪২; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩০৮৭-[৮] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অকল্যাণ নিহিত রয়েছে নারী ও আরোহণে (গাড়িতে)। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে, অকল্যাণ তিন প্রকার জিনিসে- নারী, বাড়িতে ও আরোহণে (চতুস্পদ জন্তু হতে)।
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الشُّؤْمُ فِي الْمَرْأَةِ وَالدَّارِ وَالْفَرَسِ» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ. وَفِي رِوَايَةٍ: الشُّؤْمُ فِي ثَلَاثَة: فِي الْمَرْأَة والمسكن وَالدَّابَّة
ব্যাখ্যা: অপর বর্ণনায় রয়েছে, যদি অশুভ লক্ষণ থাকত তবে তা ঘোড়া, বাড়ী ও নারীর মধ্যেই থাকত। ‘উলামাগণ এ ব্যাপারে কিছুটা ইখতিলাফ করেছেন। ইমাম মালিক ও একদল ‘উলামাগণের মতে বাড়ী কখনও কখনও আল্লাহ তা‘আলা ক্ষতি কিংবা ধ্বংসের কারণ হিসেবে গণ্য করেন। অনুরূপ নির্ধারিত মহিলা অথবা ঘোড়া কিংবা খাদিম, এগুলোতে কখনও আল্লাহর ফায়সালাতেই ক্ষতি বা ধ্বংস থাকতে পারে।
অতএব, হাদীসের অর্থ হলো, কখনও কখনও উল্লেখিত তিনটির মাধ্যমে অকল্যাণ অর্জিত হতে পারে। খত্ত্বাবী বলেন, এ তিনটিতে সত্বাগতভাবে কোনো অকল্যাণ নেই। বরং এগুলোর মাঝে আল্লাহর ফায়সালাতেই কখনও কখনও অকল্যাণ এসে পড়ে। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫০৯৩; শারহে মুসলিম ১৩/১৪ খন্ড, হাঃ ২২২৫; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩০৮৮-[৯] জাবির ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে এক যুদ্ধে শরীক ছিলাম। (যুদ্ধ শেষে ফেরার সময়) যখন আমরা মদীনার নিকটবর্তী হলাম, তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমি একজন সদ্যবিবাহিত। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, তুমি বিবাহ করেছ! উত্তরে বললাম, জী হ্যাঁ। (পুনরায়) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, কুমারী না বিধবা? আমি বললাম, বিধবা। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, কুমারী বিবাহ করলে না কেন? তাহলে তুমিও তার সাথে আমোদ-প্রমোদ করতে এবং সেও তোমার সাথে মন খুলে আমোদ-প্রমোদ করত।
জাবির(রাঃ) বলেন, অতঃপর আমরা যখন মদীনায় পৌঁছলাম, তখন আমরা নিজ ঘরে প্রবেশে উদ্যত হলাম। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ থাম! রাত (সন্ধ্যা) পর্যন্ত অপেক্ষা কর (এখন তোমরা ঘরে প্রবেশ করো না), আমরা রাতে নিজ নিজ ঘরে প্রবেশ করব। কেননা স্ত্রী তার অবিন্যস্ত চুল আঁচড়ে (পরিপাটি হতে) নিতে পারে এবং স্বামী বিচ্ছিন্না (প্রবাসী স্বামীর) নারী ক্ষুর ব্যবহার করে অবসর হয় (অর্থাৎ- নাভির নীচের চুল পরিষ্কার করে নিতে পারে)। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ جَابِرٍ: قَالَ: كُنَّا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي غَزْوَةِ فَلَمَّا قَفَلْنَا كُنَّا قَرِيبًا مِنَ الْمَدِينَةِ قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي حَدِيثُ عَهْدٍ بعرس قَالَ: «تَزَوَّجْتَ؟» قُلْتُ: نَعَمْ. قَالَ: «أَبِكْرٌ أَمْ ثَيِّبٌ؟» قُلْتُ: بَلْ ثَيِّبٌ قَالَ: «فَهَلَّا بِكْرًا تلاعبها وتلاعبك» . فَلَمَّا قدمنَا لِنَدْخُلَ فَقَالَ: «أَمْهِلُوا حَتَّى نَدْخُلَ لَيْلًا أَيْ عشَاء لكَي تمتشط الشعثة وتستحد المغيبة»
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে রয়েছে যে, (কুমারী) মহিলাকে বিবাহ করা উত্তম এবং স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের সাথে খেল-তামাশা করা ভালো। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ সাইয়িবা (তালাকপ্রাপ্তা) মহিলার অন্তর পূর্ব স্বামীর দিকে ঝুকে থাকে বিধায় তার পূর্ণ ভালোবাসা সে দিতে পারে না, যা কুমারী মহিলা দিতে পারে। যেমনটি বর্ণিত রয়েছে তোমরা কুমারী মহিলা বিয়ে কর, কেননা তারা অধিক প্রেমময়ী।
(لِكَىْ تَمْتَشِطَ الشِّعْثَةَ وَتَسْتَحِدَّ الْمَغِيْبَةَ) এর অর্থ হলো, যাতে স্ত্রী তার স্বামীর উপভোগের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে। সুতরাং পরিবারের কাছে সফর থেকে আগমনের সংবাদ না পৌঁছিয়ে পরিবারের কাছে হঠাৎ যাওয়া বিধিসম্মত নয়। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫২৪৭; শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ৪১৫; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩০৮৯-[১০] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তিন ব্যক্তিকে আল্লাহ তা’আলা অবশ্যই সাহায্য করেন। (প্রথমত) ক্রীতদাস- যে তার মুক্তিপণ পরিশোধ করে স্বাধীন হতে চায়। (দ্বিতীয়ত) বিবাহ উদ্যমী ব্যক্তি- যে স্বীয় চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষার উদ্দেশে হয়। (তৃতীয়ত) মুজাহিদণ্ড যে আল্লাহর পথে জিহাদ করে। (তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: ثَلَاثَةٌ حَقٌّ عَلَى اللَّهِ عَوْنُهُمْ: الْمُكَاتَبُ الَّذِي يُرِيدُ الْأَدَاءَ وَالنَّاكِحُ الَّذِي يُرِيدُ الْعَفَافَ وَالْمُجَاهِدُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَالنَّسَائِيّ وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ উল্লেখিত বিষয়গুলোতে সাহায্যের ঘোষণার কারণ হলো, উল্লেখিত কাজগুলো খুব কঠিন, যা মানুষকে জটিলতায় ফেলে দেয়, যদি আল্লাহ তা‘আলা এ কাজগুলোর জন্য সাহায্যের ঘোষণা না দিতেন তবে মানুষ এ কাজগুলোর জন্য দাঁড়াত না। আর এগুলোর মধ্যে সব চাইতে কঠিন হলো, যিনা থেকে দূরে থাকা। কেননা এটা বহুগামিতা থেকে মানুষকে স্থিতিশীল চারিত্রিক চাহিদায় প্রবেশ করায়। অর্থাৎ- الْعَفَافَ মানুষকে একাধিক নারীর কাছে গমন করা থেকে বিরত রাখে। আর বহুগামিতা হলো, নিম্নশ্রেণীর চতুস্পদ প্রাণীর চাহিদা। সুতরাং যখন কেউ নিজেকে যিনা থেকে বেঁচে রাখবে সে আল্লাহর সাহায্য পাবে। আর আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য তাকে মালায়িকার (ফেরেশতাদের) অবস্থানে উঠাবে এবং উঁচু আসনে সমাসীন করে। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৬৫৫; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩০৯০-[১১] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন তোমাদের নিকট কেউ বিবাহের প্রস্তাব পাঠায়, তখন দীনদারী ও সচ্চরিত্রের মূল্যায়ন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ কর। যদি তোমার তা না কর, তাহলে দুনিয়াতে বড় রকমের ফিতনা-বিশৃঙ্খলা জন্ম দেবে। (তিরমিযী)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا خَطَبَ إِلَيْكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ إِنْ لَا تَفْعَلُوهُ تَكُنْ فِتَنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادٌ عَرِيضٌ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ
ব্যাখ্যা: এটা এ কারণে যে, যদি তোমরা সম্পদ কিংবা অন্য দিক বিবেচনায় বিবাহ না দাও তবে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাবে যে, অধিকাংশ মহিলা স্বামী ছাড়া থাকবে। অন্য দিকে অনেক পুরুষ-ই স্ত্রী ছাড়া থেকে যাবে। এর ফলে যিনা-ব্যভিচারের মাধ্যমে ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি হয়ে যাবে এবং কখনও কখনও এ বিষয় নিয়ে অভিভাবকগণ বিপাকে পড়বেন। আর বংশ বিস্তার বন্ধ হয়ে যাবে এবং মীমাংসার ও সৃষ্ট ফিতনা থেকে মুক্তির সম্ভাবনাক্রমেই ক্ষীণ হয়ে যাবে।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ আলোচ্য হাদীস ইমাম মালিক (রহঃ)-এর মতের স্বপক্ষে দলীল। তিনি বলেন, দীন ব্যতীত অন্য কোনো বিষয়ে কুফু (সমতা) প্রযোজ্য নয়। জুমহূর ‘উলামাগণের মতে চারটি বিষয়ে কুফু লক্ষ্যণীয়- যথা (১) দীনদারিত্ব (২) স্বাধীন হওয়া (৩) বংশ (৪) কর্ম অর্থাৎ কর্ম করে খেতে পারবে কিনা। তবে মহিলা কিংবা তার অভিভাবক যদি কুফু বা সমতা ছাড়াই বিবাহে রাজী হয় তবে বিবাহ সঠিক হবে। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৩য় খন্ড, হাঃ ১০৮৪; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩০৯১-[১২] মা’ক্বিল ইবনু ইয়াসার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা বিবাহ কর স্বামীভক্তি ও অধিক সন্তান প্রসবকারিণীকে। কেননা, (কিয়ামত দিবসে) তোমাদের সংখ্যাধিক্যের গর্ব অন্যান্য উম্মাতের উপর বিজয় প্রকাশ করতে চাই। (আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْ مَعْقِلِ بْنِ يَسَارٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «تَزَوَّجُوا الْوَدُودَ الْوَلُودَ فَإِنِّي مُكَاثِرٌ بِكُمُ الْأُمَم» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে উল্লেখিত الْوَدُودَ (আল ওয়াদূদ) হলো, যে মহিলা তার স্বামীকে বেশী ভালোবাসে তাকে ওয়াদূদ বলা হয়। আর الْوَلُودَ (আল ওয়ালূদ) বলতে সে নারীকে বুঝায়, যে অধিক সন্তান জন্ম দেয়। বিবাহের জন্য পাত্রী যাচাইয়ের ক্ষেত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দু’টো গুণ নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করেছেন। এর কারণ হলো, অধিক সন্তান জন্মাদানে সামর্থ্যবান নারী যদি প্রেমবিনয়ী না হয়, তবে স্বামী তার দিকে আকৃষ্ট হবে না। আবার প্রেমময়ী নারী যদি সন্তান জন্ম না দিতে পারে তাহলে মূল উদ্দেশ্যই অর্জন হবে না। আর জন্মহার বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি জাতি বৃহৎ জাতিকে পরিণত হতে পারে। উল্লেখিত দু’টো গুণই কুমারী নারীর মাঝে বিদ্যমান বলে জানা যায়। (‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২০৪৯)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩০৯২-[১৩] ’আব্দুর রহমান ইবনু সালিম ইবনু ’উতবাহ্ ইবনু ’উওয়াইম ইবনু সা’ইদাহ্ আল আনসারী তাঁর পিতা, তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা কুমারী রমণী বিয়ে কর, কেননা কুমারী রমণীর মুখের মধুময়তা বেশি, অধিক গর্ভধারণযোগ্য এবং অল্পতুষ্টের অধিকারী। (ইবনু মাজাহ মুরসালসূত্রে)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ سَالِمِ بْنِ عُتْبَةَ بْنِ عُوَيْمِ بْنِ سَاعِدَةَ الْأَنْصَارِيِّ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «عَلَيْكُمْ بِالْأَبْكَارِ فَإِنَّهُنَّ أَعْذَبُ أَفْوَاهًا وَأَنْتَقُ أَرْحَامًا وَأَرْضَى بِالْيَسِيرِ» . رَوَاهُ ابْنُ مَاجَه مُرْسلا
ব্যাখ্যাঃ এখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুমারী মেয়েকে বিবাহ করার প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। কেননা তারা অধিক মিষ্টভাষী হয়ে থাকে, যেমন- মহান আল্লাহ বলেনঃ هٰؤُلَاءِ بَنَاتِي هُنَّ أَطْهَرُ لَكُمْ ‘‘তারা আমার সৃষ্ট কন্যা, তারা তোমাদের জন্য অধিক পবিত্র।’’ (সূরা হূদ ১১ : ৭৮)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৩০৯৩-[১৪] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ দম্পতির পরস্পরের প্রতি যে আন্তরিক প্রেম-ভালোবাসা, তা অন্য (কোথাও) দু’জনের মাঝে তুমি দেখতে পাবে না। (ইবনু মাজাহ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَمْ تَرَ لِلْمُتَحَابِّينَ مثل النِّكَاح» . رَوَاهُ ابْن مَاجَه
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৩০৯৪-[১৫] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ তা’আলার সাথে পাক-পবিত্রাবস্থায় সাক্ষাৎ প্রত্যাশা করে, সে যেন স্বাধীনা রমণীকে বিয়ে করে। (ইবনু মাজাহ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ أَرَادَ أَنْ يَلْقَى الله طَاهِرا مطهراً فليتزوج الْحَرَائِر» . رَوَاهُ ابْن مَاجَه
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৩০৯৫-[১৬] আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মু’মিন বান্দা আল্লাহভীতি অর্জনের পর মু’মিনাহ্ স্ত্রী অপেক্ষা অধিক উত্তম আর কোনো নি’আমাত লাভ করবে না। (তার স্বামী) তাকে যদি কোনো কিছুর আদেশ করে তৎক্ষণাৎ সে তা পালন করে; তার দিকে তাকালে সে (হাস্যমুখে) স্বামীকে খুশি করে দেয়; যদি তার বিষয়ে কোনো শপথ করে, সে তা পূর্ণ করে। আর স্বামী যদি তার থেকে দূরে (প্রবাসে) থাকে, তবে সে স্বামীর অনুপস্থিতিতে তার নিজের (লজ্জাস্থানের) হিফাযাত করে ও স্বামীর ধন-সম্পদের মধ্যে কল্যাণ কামনা করে। (ইবনু মাজাহ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ أَبِي أُمَامَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ يَقُولُ: «مَا اسْتَفَادَ الْمُؤْمِنُ بَعْدَ تَقْوَى اللَّهِ خَيْرًا لَهُ مِنْ زَوْجَةٍ صَالِحَةٍ إِنْ أَمْرَهَا أَطَاعَتْهُ وَإِنْ نَظَرَ إِلَيْهَا سرته وَإِن أقسم عَلَيْهِ أَبَرَّتْهُ وَإِنْ غَابَ عَنْهَا نَصَحَتْهُ فِي نَفْسِهَا وَمَاله» . روى ابْن مَاجَه الْأَحَادِيث الثَّلَاثَة
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৩০৯৬-[১৭] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মানুষ যখন বিয়ে করে তখন সে তার ঈমানের অর্ধেক পূর্ণ করে, অবশিষ্টাংশ লাভের জন্য সে যেন আল্লাহভীতি অর্জন করে।[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا تَزَوَّجَ الْعَبْدُ فَقَدِ اسْتَكْمَلَ نِصْفَ الدِّينِ فَلْيَتَّقِ اللَّهَ فِي النِّصْفِ الْبَاقِي»
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৩০৯৭-[১৮] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সর্বাপেক্ষা উত্তম বিবাহ হলো স্বল্প খরচে সম্পন্ন করা। (বায়হাক্বী হাদীস দু’টি শু’আবুল ঈমান গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَن عَائِشَةَ قَالَتْ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ أَعْظَمَ النِّكَاحِ بَرَكَةً أَيْسَرُهُ مُؤْنَةً» . رَوَاهُمَا الْبَيْهَقِيّ فِي شعب الْإِيمَان
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - (বিবাহের প্রস্থাবিত) পাত্রী দেখা ও সতর (পর্দা) প্রসঙ্গে
৩০৯৮-[১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন জনৈক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল যে, আমি জনৈকা আনসারী নারীকে বিয়ে করার ইচ্ছা করেছি (আপনার কী অভিমত?)। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, (বিয়ের পূর্বে) তাকে দেখে নাও। কেননা, আনসারী নারীদের চক্ষুতে কিছু দোষ থাকে। (মুসলিম)[1]
بَابُ النَّظِرِ إِلَى الْمَخْطُوْبَةِ وَبَيَانِ الْعَوْرَاتِ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: إِنِّي تَزَوَّجْتُ امْرَأَةً مِنَ الْأَنْصَارِ قَالَ: «فَانْظُرْ إِلَيْهَا فَإِنَّ فِي أَعْيُنِ الْأَنْصَارِ شَيْئًا» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে রয়েছে যে, বিবাহের জন্য মনোনীত মহিলাকে দেখা মুস্তাহাব। আর এটাই আমাদের মালিকী, হানাফী, কুফী, আহমাদ ও জুমহূর ‘উলামাগণের মত। আর মহিলার চেহারা ও দু’ হাতের কব্জি পর্যন্ত দেখা বৈধ। কেননা চেহারাতেই প্রমাণ পাওয়া যাবে যে, মহিলাটি সুন্দরী নাকি এর বিপরীত। আর হাত দেখার মাধ্যমে মহিলার দেহের নমুনা পাওয়া যাবে যে, দেহ কোমল নাকি এর বিপরীত। আর এটাই অধিকাংশ ‘উলামাগণের মত। (শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪২৪)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - (বিবাহের প্রস্থাবিত) পাত্রী দেখা ও সতর (পর্দা) প্রসঙ্গে
৩০৯৯-[২] ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো নারী যেন অপর কোনো নারীর সাথে ঘনিষ্ঠতার সাথে সাক্ষাতের পরে স্বীয় স্বামীর সামনে উক্ত নারীর (রূপের) এরূপ বর্ণনা না করে, যাতে স্বামী যেন তাকে দেখছে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ النَّظِرِ إِلَى الْمَخْطُوْبَةِ وَبَيَانِ الْعَوْرَاتِ
وَعَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تُبَاشِرُ الْمَرْأَةُ الْمَرْأَةَ فَتَنْعَتُهَا لِزَوْجِهَا كَأَنَّهُ ينظر إِلَيْهَا»
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে উল্লেখিত নিষেধাজ্ঞা দ্বারা হিকমাত হলো, স্বামী উক্ত বর্ণনাকৃত নারীর গুণাবলীর প্রতি আসক্ত হয়ে যেতে পারে। এর ফলশ্রুতিতে স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ হয়ে যেতে পারে, কিংবা দাম্পত্য জীবনে কলহ সৃষ্টি হতে পারে। নাসায়ীর বর্ণনায় ইবনু মাস্‘ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত রয়েছে, যে কোনো মহিলা অপর কোনো মহিলার সঙ্গে শরীর মিলে এক কাপড়ের নিচে রাত যাপন করবে না এবং পুরুষ পুরুষের সাথেও এভাবে রাত যাপন করবে না। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫২৪০)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - (বিবাহের প্রস্থাবিত) পাত্রী দেখা ও সতর (পর্দা) প্রসঙ্গে
৩১০০-[৩] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো পুরুষ যেন অপর পুরুষের এবং কোনো নারী যেন অপর নারীর সতর (লজ্জাস্থান) না দেখে। আর কোনো পুরুষ যেন অপর পুরুষের সাথে এক কাপড়ের নিচে না ঘুমায় (পৌঁছে)। আর কোনো নারীও যেন অপর নারীর সাথে এক কাপড়ের নিচে না থাকে। (মুসলিম)[1]
بَابُ النَّظِرِ إِلَى الْمَخْطُوْبَةِ وَبَيَانِ الْعَوْرَاتِ
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَنْظُرُ الرَّجُلُ إِلَى عَوْرَةِ الرَّجُلِ وَلَا الْمَرْأَةُ إِلَى عَوْرَةِ الْمَرْأَةِ وَلَا يُفْضِي الرَّجُلُ إِلَى الرَّجُلِ فِي ثَوْبٍ وَاحِدٍ وَلَا تُفْضِي الْمَرْأَةُ إِلَى الْمَرْأَةِ فِي ثوب وَاحِد» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: স্বামী-স্ত্রী ছাড়া অন্যদের ক্ষেত্রে একে অন্যের লজ্জাস্থানের দিকে দেখা হারাম। তবে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সবকিছুই দেখতে পারে, তবে যৌনাঙ্গ দেখার ব্যাপারে তিনটি অবস্থা রয়েছে; তার মধ্যে বিশুদ্ধ মত হলো, স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের লিঙ্গের দিকে অপ্রয়োজনীয় দৃষ্টিপাত করা মাকরূহ, তবে হারাম নয়। তবে স্বামী-স্ত্রী ছাড়া অন্যদের একে অন্যের লজ্জাস্থানের দিকে দেখাটা যদি শারী‘আত আবশ্যকীয় কোনো বিষয় হয় তবে তা জায়িয। যেমন- ক্রয়-বিক্রয়, চিকিৎসা ইত্যাদি বিষয়। তবে নির্জনস্থানে পুরুষের লজ্জাস্থান উন্মুক্ত করা যেখানে কোনো মানুষ তাকে দেখবে না এমন স্থানে লজ্জাস্থান উন্মুক্ত করা প্রয়োজনীয় হলে তা জায়িয। আর যদি প্রয়োজন না থাকে, তবে এ ক্ষেত্রে ‘উলামাগণের মাঝে মতবিরোধ আছে। কারো মতে মাকরূহ, আবার কারো কারো মতে তা হারাম। অধিক বিশুদ্ধ মত হলো, তা হারাম। (শারহে মুসলিম ৩/৪ খন্ড, হাঃ ৩৩৮)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - (বিবাহের প্রস্থাবিত) পাত্রী দেখা ও সতর (পর্দা) প্রসঙ্গে
৩১০১-[৪] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো বিবাহিতা নারীর নিকটে স্বামী অথবা মাহরাম ছাড়া (বিবাহ নিষিদ্ধ যাদের সাথে) কেউ যেন রাত্রি যাপন না করে। (মুসলিম)[1]
بَابُ النَّظِرِ إِلَى الْمَخْطُوْبَةِ وَبَيَانِ الْعَوْرَاتِ
وَعَنْ جَابِرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِلَّا لَا يبتن رَجُلٌ عِنْدَ امْرَأَةٍ ثَيِّبٍ إِلَّا أَنْ يَكُونَ ناكحا أَو ذَا محرم» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: ‘উলামাগণ বলেছেন, এখানে সাইয়িবা মহিলাকে খাস করার কারণ হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাইয়িবা মহিলার সংকোচবোধের কমতি থাকায় তার কাছে অন্য পুরুষের প্রবেশ করাটা সহজ হয়। কিন্তু বাকেরা বা কুমারী মহিলার অত্যধিক লজ্জাবোধ ও সংকোচবোধের ফলে তার কাছে বেগানা পুরুষের প্রবেশ করা অনেক কঠিন। তাই হাদীসে সাইয়িবা-কে নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে। (শারহে মুসলিম ১৩/১৪ খন্ড, হাঃ ২১৭১)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - (বিবাহের প্রস্থাবিত) পাত্রী দেখা ও সতর (পর্দা) প্রসঙ্গে
৩১০২-[৫] ’উকবা ইবনু ’আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা কোনো নারীদের নিকট গমন (নিঃসঙ্গভাবে গৃহে প্রবেশ) করো না। (এটা শুনে) জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রসূল! দেবর সম্পর্কে আপনি কি বলেন? (উত্তরে) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, দেবর তো মরণসম বা মরণের ন্যায়। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ النَّظِرِ إِلَى الْمَخْطُوْبَةِ وَبَيَانِ الْعَوْرَاتِ
وَعَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِيَّاكُمْ وَالدُّخُولَ عَلَى النِّسَاءِ فَقَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَرَأَيْتَ الْحَمْوَ؟ قَالَ: «الْحَمْوُ الْمَوْتُ»
ব্যাখ্যা : সহীহ মুসলিমে ইবনু ওয়াহ্ব তাঁর বর্ণনায় বৃদ্ধি করেছেন যে, আমি আল লায়স-এর কাছে শুনেছি حَمْوُ (হাম্ওয়া) হলো স্বামীর ভাই বা তার নিকট আত্মীয়গণ।
আলোচ্য হাদীসে দেবর বা স্বামীর নিকট আত্মীয়কে মৃত্যু বলা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো দেবরের সাথে নির্জন একাকী থাকা দীনের ধ্বংস আবশ্যক করে, যদি তারা নাফরমানীতে পতিত হয়। আর যিনায় পতিত হলে রজম আবশ্যক হয়ে যাবে অথবা স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ হওয়ার মাধ্যমে নারী নিজের ধ্বংস ডেকে আনবে। কারণ ঈর্ষা স্বামীকে তালাক প্রদানে উৎসাহিত করবে। কোনো পুরুষের তার ভাইয়ের স্ত্রীর সাথে নির্জন বাস করা যা মৃত্যুর সমান। ‘আরবীগণ ঘৃণিত কাজকে মৃত্যুর সাথে তুলনা করে থাকেন। ইবনুল আরাবী বলেন যে, এটা এমন কথা যা ‘আরবীগণ বলেন; যেমন আপনি এটা বলবেন ‘‘সিংহই মৃত্যু’’। অর্থাৎ- সিংহের আক্রমণে পরা মানে মৃত্যু। অর্থাৎ- তোমরা তা থেকে বেঁচে থাক যেমন মৃত্যু থেকে বেঁচে থাক। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫২৩২)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - (বিবাহের প্রস্থাবিত) পাত্রী দেখা ও সতর (পর্দা) প্রসঙ্গে
৩১০৩-[৬] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উম্মুল মু’মিনীন উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) শরীরে শিঙ্গা লাগানোর অনুমতি চাইলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ ত্বয়বাহ্ (রাঃ)-কে অনুমতি দিলেন। রাবী (জাবির) বলেন, আমার জানামতে, আবূ ত্বয়বাহ্ উম্মু সালামাহ্ (রাঃ)-এর দুধ-ভাই ছিল, অথবা (অপ্রাপ্তবয়স্ক) বালক ছিল। (মুসলিম)[1]
بَابُ النَّظِرِ إِلَى الْمَخْطُوْبَةِ وَبَيَانِ الْعَوْرَاتِ
وَعَن جَابِرٍ: أَنَّ أُمَّ سَلَمَةَ اسْتَأْذَنَتْ رَسُولَ اللَّهِ فِي الْحِجَامَةِ فَأَمَرَ أَبَا طَيْبَةَ أَنْ يَحْجُمَهَا قَالَ: حَسِبْتُ أَنَّهُ كَانَ أَخَاهَا مِنَ الرَّضَاعَةِ أَو غُلَاما لم يَحْتَلِم. رَوَاهُ مُسلم
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - (বিবাহের প্রস্থাবিত) পাত্রী দেখা ও সতর (পর্দা) প্রসঙ্গে
৩১০৪-[৭] জারীর ইবনু ’আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে (কোনো নারীর প্রতি) আকস্মিক দৃষ্টি নিক্ষেপ হওয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তদুত্তরে তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়ার আদেশ দিলেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ النَّظِرِ إِلَى الْمَخْطُوْبَةِ وَبَيَانِ الْعَوْرَاتِ
وَعَن جرير بْنِ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ: سَأَلَتْ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ نَظَرِ الْفُجَاءَةِ فَأمرنِي أَن أصرف بَصرِي. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: হঠাৎ তাকানোর অর্থ হলো, কোনো বেগানা নারীর দিকে অনিচ্ছাবশত দৃষ্টি যাওয়া, প্রথমবার হঠাৎ দৃষ্টি পড়ায় কোনো পাপ হবে না। অবস্থায় দৃষ্টি ফেরানো আবশ্যক হয়ে যাবে। যদি দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয় তবে পাপ হবে না। কিন্তু নারীর দিকে সর্বদা দৃষ্টি দিয়ে রাখলে অবশ্যই পাপ হবে।
‘উলামাগণ বলেন, এ হাদীসে দলীল রয়েছে যে, নারীর চেহারা ঢাকা আবশ্যক নয় বরং এটা তার জন্য মুস্তাহাব এবং পুরুষের দৃষ্টি সর্বাবস্থায় নিম্নমুখী রাখা আবশ্যক। তবে সাক্ষীপ্রদান, চিকিৎসা, নারীকে বিবাহের প্রস্তাব, কিংবা কেনা-বেচা ইত্যাদি বিষয়ে নারীর দিকে দেখা যাবে। (শারহে মুসলিম ১৩/১৪ খন্ড, হাঃ ২১৫৯)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - (বিবাহের প্রস্থাবিত) পাত্রী দেখা ও সতর (পর্দা) প্রসঙ্গে
৩১০৫-[৮] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (ভিন্ন পুরুষের জন্য) যার সঙ্গে বিবাহ বৈধ এমন নারীর আগমন-প্রত্যাগমন শায়ত্বনরূপী। যখন তোমাদের কারো নিকট কোনো নারী ভালো লাগে (বা তার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে) এবং তোমাদের কারো হৃদয়ে চাঞ্চল্যের (কামভাব) সৃষ্টি হয়, তখন সে যেন নিজ স্ত্রীর নিকট গমন করে সহবাস করে নেয়। এটা তার অন্তরের সব অবস্থা দূর করে দেবে। (মুসলিম)[1]
بَابُ النَّظِرِ إِلَى الْمَخْطُوْبَةِ وَبَيَانِ الْعَوْرَاتِ
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ الْمَرْأَةَ تُقْبِلُ فِي صُورَةِ شَيْطَانٍ وَتُدْبِرُ فِي صُورَةِ شَيْطَانٍ إِذَا أَحَدَكُمْ أَعْجَبَتْهُ الْمَرْأَةُ فَوَقَعَتْ فِي قَلْبِهِ فَلْيَعْمِدْ إِلَى امْرَأَتِهِ فَلْيُوَاقِعْهَا فَإِنَّ ذَلِكَ يَرُدُّ مَا فِي نَفسه» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা : ‘উলামাগণ বলেন, এর অর্থ হলো কু-বাসনার দিকে ইঙ্গিত করা। পুরুষের অন্তরে নারীর প্রতি দুর্বলতার যে এক ফিতনা দিয়েছেন সে দিকে ডাকা, নারীর প্রতি দেখার যে এক স্বাদ এবং এ সংক্রান্ত বিষয়ে পুরুষকে আকৃষ্ট করা- এ সবই আলোচ্য হাদীসের অন্তর্ভুক্ত। আর এটা শায়ত্বনের খারাপ কাজের দিকে মানুষকে ডাকা বা কুমন্ত্রণা দেয়ার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। আর কোনো মহিলার প্রয়োজন ছাড়া পুরুষের মাঝে বের হওয়া উচিত নয় এবং পুরুষেরও উচিত নারীর পোশাক ও তার ইজ্জত-আব্রু থেকে দৃষ্টি নিচু রাখা। (শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪০৩)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - (বিবাহের প্রস্থাবিত) পাত্রী দেখা ও সতর (পর্দা) প্রসঙ্গে
৩১০৬-[৯] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যখন কোনো নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে, আর যদি তার পক্ষে এমন কোনো অঙ্গ দেখা সম্ভব হয় যা বিবাহের পক্ষে যথেষ্ট, তখন তা যেন দেখে নেয়। (আবূ দাঊদ)[1]
عَنْ جَابِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا خَطَبَ أَحَدُكُمُ الْمَرْأَةَ فَإِنِ اسْتَطَاعَ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى مَا يَدْعُوهُ إِلَى نِكَاحهَا فَلْيفْعَل» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা : মুহাম্মাদ বিন মাসলামাহ্ কর্তৃক হাদীসে রয়েছে, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে, যার অন্তরে আল্লাহ তা‘আলা কোনো নারীকে বিবাহ করার আগ্রহ জাগিয়ে দিবেন, তার দিকে দেখতে কোনো দোষ নেই। নববী (রহঃ) বলেনঃ কোনো মহিলাকে বিবাহ করার ইচ্ছা করলে তাকে দেখা মুস্তাহাব। আর এটাই জুমহূর ‘উলামাগণসহ মালিক, শাফি‘ঈ, হানাফী, কুফী মাযহাবের মত। তবে উক্ত মহিলার শুধু চেহারা ও দু’হাত দেখা বৈধ হবে। কারণ এ দু’টো লজ্জাস্থান নয়। আর চেহারাতে নারীর সুন্দরী বা অসুন্দরী হওয়া প্রমাণিত হবে। আর দু’ হাত দেখায় তার দেহের সৌন্দর্য প্রমাণিত হবে। আর এটাই আমাদের ও আধিকাংশ ‘উলামাগণের মত। হাফিয শামসুদ্দীন ইবনুল কইয়্যূম (রহঃ) বলেনঃ ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ) বলেছেন, পয়গামকৃত মহিলা পর্দায় আবৃত অবস্থায় তার চোহারা ও দু’হাত দেখা যাবে, এর বেশী কিছু দেখা যাবে না। (‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২০৮২)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - (বিবাহের প্রস্থাবিত) পাত্রী দেখা ও সতর (পর্দা) প্রসঙ্গে
৩১০৭-[১০] মুগীরাহ্ ইবনু শু’বাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জনৈকা নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলাম, এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে, তুমি কি তাকে দেখেছ? আমি বললাম, না, দেখিনি। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তুমি তাকে দেখে নাও। কেননা, এই দেখা তোমাদের মাঝে (বৈবাহিক সম্পর্ক) প্রণয়-ভালোবাসা জন্ম দিবে। (আহমাদ, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ, দারিমী)[1]
وَعَنِ الْمُغِيرَةِ بْنِ شُعْبَةَ قَالَ خَطَبْتُ امْرَأَةً فَقَالَ لِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «هَلْ نَظَرْتَ إِلَيْهَا؟» قُلْتُ: لَا قَالَ: «فَانْظُرْ إِلَيْهَا فَإِنَّهُ أَحْرَى أَنْ يُؤْدَمَ بَيْنَكُمَا» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَالنَّسَائِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ وَالدَّارِمِيُّ
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - (বিবাহের প্রস্থাবিত) পাত্রী দেখা ও সতর (পর্দা) প্রসঙ্গে
৩১০৮-[১১] ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈকা নারীর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ হওয়ায় (তাঁর মনে তা প্রভাব পড়ায়) তিনি তৎক্ষণাৎ স্বীয় স্ত্রী সাওদাহ্ (রাঃ)-এর নিকট গেলেন। ঐ সময়ে সাওদাহ্ (রাঃ) সুগন্ধি প্রস্তুত করছিলেন এবং তাঁর কাছে কয়েকজন নারী বসে ছিল। তারা রসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখে সাওদাহ্ (রাঃ)-কে একাকী ছেড়ে চলে গেল। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজ চাহিদা পূরণ করলেন। অতঃপর ঘোষণা করলেন যে, অপর নারী দর্শনে কোনো পুরুষের হৃদয়ে চাঞ্চল্যের (কামভাবের) সৃষ্টি হলে সে যেন স্বীয় স্ত্রীর নিকট যায়। কেননা ঐ নারীর সদৃশ তার (প্রত্যেক) স্ত্রীর নিকটও আছে। (দারিমী)[1]
وَعَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: رَأَى رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ امْرَأَةً فَأَعْجَبَتْهُ فَأَتَى سَوْدَةَ وَهِيَ تَصْنَعُ طِيبًا وَعِنْدَهَا نِسَاءٌ فَأَخْلَيْنَهُ فَقَضَى حَاجَتَهُ ثُمَّ قَالَ: «أَيُّمَا رَجُلٍ رَأَى امْرَأَةً تُعْجِبُهُ فَلْيَقُمْ إِلَى أَهْلِهِ فَإِنَّ مَعَهَا مثل الَّذِي مَعهَا» . رَوَاهُ الدَّارمِيّ
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - (বিবাহের প্রস্থাবিত) পাত্রী দেখা ও সতর (পর্দা) প্রসঙ্গে
৩১০৯-[১২] উক্ত রাবী [ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রমণী মাত্রই আবরণীয় (বিষয়), যখন সে বের হয় তখন শায়ত্বন তাকে সুশোভিত করে তোলে বা শায়ত্বন হাত আড় করে তার প্রতি তাকায়। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الْمَرْأَةُ عَوْرَةٌ فَإِذَا خَرَجَتِ اسْتَشْرَفَهَا الشَّيْطَانُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: শায়ত্বনের তাশরীফের অর্থ হলো, নারীর কোনো অঙ্গের দিকে সে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে এবং পর্দার উপর তার হাত বিছিয়ে দেয়। এর অর্থ হলো, নারীর তার নিজকে প্রকাশ করাটা খুব নিকৃষ্ট কাজ। যখন সে বের হয় বাজে দৃষ্টি তাকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে নেয়, ফলে সে অন্যের দিকে ধাবিত হয় এবং অন্য কেউ তার দিকে ধাবিত করে, ফলে উভয় কিংবা উভয়ের একজন ফিতনায় পতিত হয়। অথবা মানবরূপী পাপাচারী ব্যক্তি শায়ত্বনী কাজের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১১৭৩)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - (বিবাহের প্রস্থাবিত) পাত্রী দেখা ও সতর (পর্দা) প্রসঙ্গে
৩১১০-[১৩] বুরায়দাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’আলী (রাঃ)-কে বললেন, হে ’আলী! (কোনো নারীর প্রতি) আকস্মিক একবার দৃষ্টিপাতের পর আবার দৃষ্টিপাত করো না। তোমার জন্য প্রথম দৃষ্টি (অনিচ্ছার কারণে) জায়িয, পরবর্তী দৃষ্টি জায়িয নয়। (আহমাদ, তিরমিযী, আবূ দাঊদ, দারিমী)[1]
وَعَنْ بُرَيْدَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِعَلِيٍّ: «يَا عَلِيُّ لَا تُتْبِعِ النَّظْرَةَ النَّظْرَةَ فَإِنَّ لَكَ الْأُولَى وَلَيْسَتْ لَكَ الْآخِرَةُ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ والدارمي
ব্যাখ্যা: কোনো মহিলার দিকে প্রথমবার তাকানোর পর দ্বিতীয়বার আর তাকাবে না। কারণ প্রথমবার তাকানোটা ছিল অনিচ্ছায়। দ্বিতীয়বার তাকানোটা তো তোমার ইচ্ছায় হলো। আর এটার পাপ তোমার উপরেই বর্তাবে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২১৪৯)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - (বিবাহের প্রস্থাবিত) পাত্রী দেখা ও সতর (পর্দা) প্রসঙ্গে
৩১১১-[১৪] ’আমর ইবনু শু’আয়ব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি তাঁর পিতার মাধ্যমে দাদা হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যখন কোনো স্বীয় ক্রীতদাসীকে নিজের ক্রীতদাসের (অপর স্বাধীন পুরুষের) সাথে বিবাহ দেয়, তখন সে যেন উক্ত দাসীর সত্রের (গোপনাঙ্গের) প্রতি দৃষ্টিপাত না করে। অন্য রিওয়ায়াতে আছে, সে যেন তার নাভি হতে হাঁটুর উপর পর্যন্ত না দেখে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِذَا زَوَّجَ أَحَدُكُمْ عَبْدَهُ أَمَتَهُ فَلَا يَنْظُرَنَّ إِلَى عَوْرَتِهَا» . وَفِي رِوَايَةٍ: «فَلَا يَنْظُرَنَّ إِلَى مَا دُونُ السُّرَّةِ وَفَوْقَ الرُّكْبَةِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা : আলোচ্য হাদীস এটাই স্পষ্ট করেছে যে, নাভী ও হাঁটুদ্বয় সতরের অন্তর্ভুক্ত নয়, যা অন্যান্য হাদীস থেকে প্রমাণিত হয়। নাভী ও হাঁটুদ্বয়ের মাঝে যা তা সতর নয়।
‘উলামাগণ এ মর্মে ঐকমত্য রয়েছেন যে, পুরুষের নাভী সতর নয়। আর হাঁটু ইমাম মালিক, শাফি‘ঈ ও আহমাদ (রহঃ)-এর মতে ‘আওরাত বা লজ্জাস্থান নয়। কিন্তু ইমাম আবূ হানীফাহ্ ও শাফি‘ঈ মাযহাবের কতিপয় অনুসারীর মতে এটা লজ্জাস্থানের অন্তর্ভুক্ত। আর দাসীর লজ্জাস্থান ইমাম মালিক ও শাফি‘ঈ (রহঃ)-এর মতে পুরুষের লজ্জাস্থানের মতই। ইমাম আবূ হানীফাহ্-এর মতে তার পেট ও পিঠ লজ্জাস্থানের অন্তর্ভুক্ত। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪১১০)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - (বিবাহের প্রস্থাবিত) পাত্রী দেখা ও সতর (পর্দা) প্রসঙ্গে
৩১১২-[১৫] জারহাদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তুমি কি জানো না উরু (রান) সতরের (গোপনাঙ্গের) অন্তর্ভুক্ত। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ جَرْهَدٍ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «أَمَا عَلِمْتَ أَنَّ الْفَخِذَ عَوْرَةٌ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - (বিবাহের প্রস্থাবিত) পাত্রী দেখা ও সতর (পর্দা) প্রসঙ্গে
৩১১৩-[১৬] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে ’আলী! তুমি নিজের উরু (রান) খুলো না এবং কোনো জীবিত বা মৃতের উরুর প্রতিও দৃষ্টিপাত করো না। (আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَهُ: «يَا عَلِيُّ لَا تُبْرِزْ فَخِذَكَ وَلَا تَنْظُرْ إِلَى فَخِذِ حَيٍّ وَلَا مَيِّتٍ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: এ হাদীস থেকে প্রতীয়ামান হয় যে, মৃত ও জীবিত ব্যক্তির সতরের হুকুম একই। সতরের ক্ষেত্রে ও জীবিত ব্যক্তির মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। (‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩১৩৮; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - (বিবাহের প্রস্থাবিত) পাত্রী দেখা ও সতর (পর্দা) প্রসঙ্গে
৩১১৪-[১৭] মুহাম্মাদ ইবনু জাহশ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মা’মার নামক এক সাহাবীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন ঐ সময়ে তাঁর উরু খোলা ছিল। (এটা দেখে) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে বললেন, হে মা’মার! তোমার উরুদ্বয় ঢেকে রাখ, কেননা উরুদ্বয় সতরের অন্তর্ভুক্ত। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
وَعَنْ مُحَمَّدِ بْنِ جَحْشٍ قَالَ: مَرَّ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى مَعْمَرٍ وَفَخذه مَكْشُوفَتَانِ قَالَ: «يَا مَعْمَرُ غَطِّ فَخِذَيْكَ فَإِنَّ الفخذين عَورَة» . رَوَاهُ فِي شرح السّنة
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - (বিবাহের প্রস্থাবিত) পাত্রী দেখা ও সতর (পর্দা) প্রসঙ্গে
৩১১৫-[১৮] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা (বিনা প্রয়োজনে) উলঙ্গ হবে না। কেননা তোমাদের সাথে সর্বদা মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) থাকেন, কেবলমাত্র প্রস্রাব-পায়খানা করা ও স্ত্রীসহবাসের সময় ব্যতীত, যাঁরা কখনও বিচ্ছিন্ন হয় না। সুতরাং তোমরা তাঁদের প্রতি লজ্জাবোধ কর এবং তাঁদেরকে (যথাযোগ্য) সস্মান কর। (তিরমিযী)[1]
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِيَّاكُمْ وَالتَّعَرِّيَ فَإِنَّ مَعَكُمْ مَنْ لَا يُفَارِقُكُمْ إِلَّا عِنْدَ الْغَائِطِ وَحِينَ يُفْضِي الرَّجُلُ إِلَى أَهْلِهِ فَاسْتَحْيُوهُمْ وَأَكْرِمُوهُمْ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: ইবনুল মালিক (রহঃ) বলেনঃ একান্ত প্রয়োজন ছাড়া ‘আওরাত বা লজ্জাস্থান উন্মুক্ত করা বৈধ নয়। যেমন প্রস্রাব-পায়খানা, স্ত্রী সহবাস এবং অনুরূপ কোনো একান্ত প্রয়োজনে তা উন্মুক্ত করা যাবে। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৮০০; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - (বিবাহের প্রস্থাবিত) পাত্রী দেখা ও সতর (পর্দা) প্রসঙ্গে
৩১১৬-[১৯] উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন তিনি ও মায়মূনাহ্ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত ছিলেন, এমন সময় ’আব্দুল্লাহ ইবনু উম্মু মাকতূম সেখানে আসলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁদেরকে পর্দার আড়ালে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। আমি (উম্মু সালামাহ্ (রাঃ)) বললাম, সে কি অন্ধ নয়? সে তো আমাদেরকে দেখতে পাচ্ছে না! এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা কি অন্ধ যে, তাকে দেখতে পাচ্ছ না? (আহমাদ, তিরমিযী, আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أُمِّ سَلَمَةَ: أَنَّهَا كَانَتْ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمَيْمُونَةُ إِذْ أقبل ابْن مَكْتُومٍ فَدَخَلَ عَلَيْهِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «احْتَجِبَا مِنْهُ» فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَلَيْسَ هُوَ أَعْمَى لَا يُبْصِرُنَا؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَفَعَمْيَاوَانِ أَنْتُمَا؟ أَلَسْتُمَا تُبْصِرَانِهِ؟» رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: যে সকল ‘উলামাগণ বলেন যে, মহিলাদের জন্য পুরুষের দিকে তাকানো হারাম যেমনটা পুরুষের মহিলার দিকে তাকানো হারাম। আর এটাই ইমাম শাফি‘ঈ ও আহমাদ (রহঃ)-এর একটি কথা। ‘আল্লামা নববী (রহঃ) বলেনঃ এ মতটি অধিক বিশুদ্ধ। যেমন আল্লাহ তা‘আলার কথা : হে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি ঈমানদার নারীদেরকে তাদের দৃষ্টি নিচু রাখতে বলুন। (সূরা আন্ নূর ২৪ : ৩১)
অন্যদিকে যারা বলেন যে, মহিলা পুরুষের নাভীর নিচ থেকে মাঝামাঝি অংশটুকু ছাড়া দেখতে পারবে। তাদের দলীল ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস, সেখানে রয়েছে হাবশীরা মসজিদে তীরন্দাজী খেলছিল আর ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) তা দেখছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার চাদর দ্বারা তাকে পর্দা করে রাখছিলেন। এর জবাবে বলা যায় যে, ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) তখন দায়িত্বশীলা ছিলেন না, অর্থাৎ- নাবালেগা ছিলেন। ‘আল্লামা নববী (রহঃ) বলেনঃ ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) তখন না-বালেগা ছিলেন, অথবা এটি পর্দার বিধান আগমনের পূর্বের ঘটনা।
হাফিয ‘আসকালানী (রহঃ) বলেনঃ যখন হাবশী দল এসেছিল তখন ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর বয়স ছিল ১৬ বছর। এ ছাড়া তারা ফাত্বিমাহ্ বিনতু কয়স বর্ণিত হাদীস দ্বারাও দলীল গ্রহণ করে থাকেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ইবনু উম্মু মাখতুম-এর ঘরে ‘ইদ্দত পালন করতে বলেন এবং তিনি বললেন যে, সে অন্ধ লোক তুমি তার বাড়ীতে তোমরা কাপড়-চোপড় রাখতে পারবে। আবূ দাঊদ (রহঃ) বলেনঃ উম্মু সালামাহ্ বর্ণিত হাদীস নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের জন্য খাস। আর ফাত্বিমাহ্ বিনতু কয়স (রাঃ) বর্ণিত হাদীস সকল নারীদের জন্য প্রযোজ্য। এভাবেই আবূ দাঊদ দু’টি হাদীসের মাঝে সমন্বয় করেছেন। হাফিয ইবনু হাজার (রহঃ) বলেনঃ এটা অনেক উত্তম সমন্বয়। ‘আল্লামা মুনযিরী (রহঃ)-ও অনুরূপ সমন্বয় করেছেন। আর আমাদের শায়খবৃন্দ এটাকে খুব সুন্দর সমন্বয় বলে অবহিত করেছেন। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪১০৮)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - (বিবাহের প্রস্থাবিত) পাত্রী দেখা ও সতর (পর্দা) প্রসঙ্গে
৩১১৭-[২০] বাহয ইবনু হাকীম (রহঃ) তাঁর পিতা ও দাদা (মু’আবিয়াহ্) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ স্বীয় স্ত্রী ও ক্রীতদাসী ছাড়া সকল মানুষ হতে তোমার লজ্জাস্থানের হিফাযাত করবে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! যদি কেউ (নির্জনে) একাকী থাকে? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তখন আল্লাহকেই লজ্জা পাওয়া অধিকতর কর্তব্য। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ بَهْزِ بْنِ حَكِيمٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «احْفَظْ عَوْرَتَكَ إِلَّا مِنْ زَوْجَتِكَ أَو مَا ملكت يَمِينك» فَقلت: يَا رَسُول الله أَفَرَأَيْت إِن كَانَ الرَّجُلُ خَالِيًا؟ قَالَ: «فَاللَّهُ أَحَقُّ أَنْ يستحيى مِنْهُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ
ব্যাখ্যা: বাহয বিন হাকীম (রহঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস প্রমাণ করে যে, নির্জন জায়গাতেও বিবস্ত্র হওয়া বৈধ নয়। কিন্তু ইমাম বুখারী (রহঃ)-এর মতে নির্জন কিংবা একাকীত্ব গোসল করার ক্ষেত্রে বিবস্ত্র হওয়া বৈধ। তিনি মূসা ও আইয়ূব (রহঃ)-এর ঘটনা থেকে দলীল গ্রহণ করেছেন।
এখানে উভয় বর্ণনার সমন্বয়ে বলা যায় যে, বাহয বিন হাকীম (রহঃ)-এর বর্ণনাকৃত হাদীসটির উপর ‘আমল করা উত্তম। ইমাম বুখারী (রহঃ) সেদিকেই ইঙ্গিত করেছেন। তার কথা, যে ব্যক্তি নির্জন স্থানে বিবস্ত্র হয়ে গোসল করবে এবং যে ব্যক্তি ঢেকে গোসল করবে তার অধ্যায়। আর নির্জন স্থানে ঢেকে গোসল করা উত্তম। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৭৬৯)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - (বিবাহের প্রস্থাবিত) পাত্রী দেখা ও সতর (পর্দা) প্রসঙ্গে
৩১১৮-[২১] উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো পুরুষ অপর (মাহরাম নয় তথা বিবাহ বৈধ এমন) নারীর সাথে নিঃসঙ্গে দেখা হলেই শয়তান সেখানে তৃতীয় জন হিসেবে উপস্থিত হয়। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ عُمَرَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثالثهما الشَّيْطَان» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - (বিবাহের প্রস্থাবিত) পাত্রী দেখা ও সতর (পর্দা) প্রসঙ্গে
৩১১৯-[২২] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে গৃহে স্বামী অনুপস্থিত থাকে তাদের (স্ত্রীদের) গৃহে তোমরা প্রবেশ করো না। কেননা, শিরায় রক্তের ন্যায় শায়ত্বন তোমাদের প্রত্যেকের মধ্যে অবাধে বিচরণ করে। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আপনার মধ্যেও কি (অনুরূপ)? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, হ্যাঁ। তবে আল্লাহ তা’আলা শায়ত্বনের মুকাবালায় আমাকে সাহায্য করেছেন বলে আমি (শায়ত্বনের কুমন্ত্রণা ও অনিষ্ট হতে) নিরাপদে আছি। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ جَابِرٌ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا تَلِجُوا عَلَى الْمُغَيَّبَاتِ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِي مِنْ أَحَدِكُمْ مَجْرَى الدَّمِ» قُلْنَا: وَمِنْكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: «وَمِنِّي وَلَكِنَّ الله أعانني عَلَيْهِ فَأسلم» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: এমন হতে পারে যে, মানুষের শিরা-উপশিরায় চলার জন্য শায়ত্বন সক্ষমতা পেয়েছে। অথবা তার অত্যধিক কুমন্ত্রণার কারণে আলোচ্য হাদীসে সতর্ক করা হয়েছে। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১১৭২; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - (বিবাহের প্রস্থাবিত) পাত্রী দেখা ও সতর (পর্দা) প্রসঙ্গে
৩১২০-[২৩] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (কন্যা) ফাতিমা (রাঃ)-এর ঘরে দান করেছেন এমন ক্রীতদাসসহ গমন করেন। তখন তাঁর পরিধানে এত ছোট কাপড় ছিল যে, মাথা ঢাকলে পা খুলে যায়, আর পা ঢাকলে মাথা খুলে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এরূপ অবস্থা দেখে বললেন, তুমি অস্বস্তিবোধ করো না, এখানে তোমার পিতা ও তোমার স্বীয় গোলাম ব্যতীত আর কেউই নেই। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَنَسٍ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَتَى فَاطِمَةَ بِعَبْدٍ قَدْ وَهَبَهُ لَهَا وَعَلَى فَاطِمَةَ ثَوْبٌ إِذَا قَنَّعَتْ بِهِ رَأْسَهَا لَمْ يَبْلُغْ رِجْلَيْهَا وَإِذَا غَطَّتْ بِهِ رِجْلَيْهَا لَمْ يَبْلُغْ رَأْسَهَا فَلَمَّا رَأَى رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا تَلْقَى قَالَ: «إِنَّهُ لَيْسَ عَلَيْكِ بَأْسٌ إِنَّمَا هُوَ أَبُوكِ وغلامك» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে এ মর্মে দলীল রয়েছে যে, দাসের জন্য তার মুনীবাকে দেখা বৈধ, কারণ সে তার জন্য মাহরাম ব্যক্তি। প্রয়োজনীয় তার সঙ্গে সফর করতে পারবে। মাহরাম ব্যক্তির সঙ্গে যেমন দেখা করতে পারবে তেমন দাসের সঙ্গেও দেখা করতে পারবে। আর এমন মত দিয়েছেন ‘আয়িশাহ্ (রাঃ), সা‘ঈদ বিন মুসাইয়্যাব, ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ)। আর এটাই অধিকাংশ সালাফদের কথা। পক্ষান্তরে জুমহূর ‘উলামাগণের মতে দাস বেগানা পুরুষের মতই, কেননা দাস আযাদ হয়ে যাওয়ার পর তার সঙ্গে বিবাহ বৈধ। আল্লাহই ভালো জানেন। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪১০২)
পরিচ্ছেদঃ ১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - (বিবাহের প্রস্থাবিত) পাত্রী দেখা ও সতর (পর্দা) প্রসঙ্গে
৩১২১-[২৪] উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নিকট ছিলেন এবং আমার ঘরে এক নপুংসকও উপস্থিত ছিল। এমন সময়ে সে আমার সহোদর ভাই-কে (’আব্দুল্লাহ ইবনু আবূ উমাইয়্যাহ্-কে) বলল, হে ’আব্দুল্লাহ! আগামীতে আল্লাহ তা’আলা যদি ত্বায়িফবাসীকে বিজয়ী করেন, তাহলে আমি তোমাকে গয়লান-এর কন্যাকে দেখাব, সে তো চার-এর সাথে আসে এবং আট-এর সাথে যায়। এটা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সাবধান! এরা যেন কক্ষনো তোমাদের কাছে আসতে না পারে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ عِنْدَهَا وَفِي الْبَيْتِ مُخَنَّثٌ فَقَالَ: لِعَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي أُمَيَّةَ أَخِي أُمِّ سَلَمَةَ: يَا عَبْدَ اللَّهِ إِنْ فَتَحَ اللَّهُ لَكُمْ غَدًا الطَّائِفَ فَإِنِّي أَدُلُّكَ عَلَى ابْنَةِ غَيْلَانَ فَإِنَّهَا تُقْبِلُ بِأَرْبَعٍ وَتُدْبِرُ بِثَمَانٍ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يدخلن هَؤُلَاءِ عَلَيْكُم»
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা খত্ত্বাবী (রহঃ) বলেনঃ এখানে উদ্দেশ্য হলো, নিশ্চয় তার (বিনতু গয়লান-মুখান্নাস) তার পেটে চারটি ভাঁজ ছিল যখন সে সামনের দিকে আসতো তার এ চারটি ভাঁজ স্পষ্ট দেখা যেত। যখন পিছনে ফিরত তখন এ চারটি ভাঁজের প্রান্ত দেখা যেত যা পেটের দুই প্রান্তের সমন্বয়ে আটটি ভাঁজে রূপান্তরিত হয়। আর এসব গুণাবলী সাধারণত বলিষ্ঠ দেহধারী নারীদের হয়ে থাকে। স্বাস্থ্যবতী নারী ছাড়া এমন গুণাবলী পাওয়া যাবে না। আর অধিকাংশ মানুষের স্বভাব হলো তারা এমন গুণ বিশিষ্ট নারীর প্রতি বেশী আকৃষ্ট হয়।
অন্য বর্ণনায় সা‘দ হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন সে সামনের দিকে আসে তখন সে ছয়টি নিয়ে আসে এবং যখন পিছনে ফেরে তখন চারটি নিয়ে ফিরে। অর্থাৎ- দুই হাত দুই পা ও পেটের দু’ প্রান্তের ভাঁজ সমষ্টি। আর পিছনে ফিরলে তা কমে চারটি হয়ে যাওয়ার কারণ হলো, পিছনে ফিরলে তার দুই বুক ঢেকে যায় যা দেখা যায় না। আর যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন গুণাবলীর কথা শুনলেন যা পুরুষকে আকৃষ্ট করে তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এদেরকে তার স্ত্রীদের (উম্মুল মু’মিনীনের) উপর প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেন। কারণ মানুষের কাছে তাঁদের (উম্মুল মু’মিনীনদের) দৈহিক গুণাগুন বর্ণনা করবে, এর ফলে পর্দার উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়ে যাবে। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫২৩৫)
পরিচ্ছেদঃ ১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - (বিবাহের প্রস্থাবিত) পাত্রী দেখা ও সতর (পর্দা) প্রসঙ্গে
৩১২২-[২৫] মিস্ওয়ার ইবনু মাখরামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি (শৈশবে) এক ভারী পাথর বহন করে চলছিলাম। এমতাবস্থায় আমার পরিধেয় কাপড় খুলে পড়ে গেল এবং আমি তা পরতে পারছিলাম না। এমন সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দেখে বললেনঃ কাপড় পরে নাও, উলঙ্গ হয়ে চলাফেরা করো না। (মুসলিম)[1]
وَعَنِ الْمِسْوَرِ بْنِ مَخْرَمَةَ قَالَ حَمَلْتُ حَجَرًا ثقيلاً فَبينا أَنَا أَمْشِي سَقَطَ عَنِّي ثَوْبِي فَلَمْ أَسْتَطِعْ أَخْذَهُ فَرَآنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ لِي: «خُذْ عَلَيْكَ ثَوْبَكَ وَلَا تَمْشُوا عُرَاة» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা (خُذْ عَلَيْكَ ثَوْبَكَ) অর্থাৎ- কাপড় উঠিয়ে তা পরিধান কর। এটি একক ব্যক্তিকে সম্বোধন করা হয়েছে, কারণ পরনের কাপড় খুলে পরে যাওয়াটা উক্ত ব্যক্তির সাথে (মিসওয়াব বিন মাখরাহ্ ) খাস ছিল। এর পরবর্তী বাক্য (لَا تَمْشُوْا عُرَاةً) অর্থাৎ- তোমরা উলঙ্গ হয়ে পথ চলো না, এটা সকল উম্মাতের জন্য প্রযোজ্য। (শারহে মুসলিম ১৩/১৪ খন্ড, হাঃ ৩৪১)
পরিচ্ছেদঃ ১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - (বিবাহের প্রস্থাবিত) পাত্রী দেখা ও সতর (পর্দা) প্রসঙ্গে
৩১২৩-[২৬] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কক্ষনো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর লজ্জাস্থানের দিকে দৃষ্টিপাত করিনি। (ইবনু মজাহ)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: مَا نَظَرْتُ أَوْ مَا رَأَيْتُ فَرْجَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم قطّ. رَوَاهُ ابْن مَاجَه
পরিচ্ছেদঃ ১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - (বিবাহের প্রস্থাবিত) পাত্রী দেখা ও সতর (পর্দা) প্রসঙ্গে
৩১২৪-[২৭] আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো মু’মিনের যদি মাহরাম নারীর প্রতি প্রথম দৃষ্টি পড়ে, আর সাথে সাথে সে দৃষ্টি নীচু করে দেয়, আল্লাহ তা’আলা তার বিনিময়ে তাকে এমন এক ’ইবাদাতের সুযোগ সৃষ্টি করেন, যার স্বাদ সে অন্তরে অনুভব করে। (আহমাদ)[1]
وَعَنْ أَبِي أُمَامَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَنْظُرُ إِلَى مَحَاسِنِ امْرَأَةٍ أَوَّلَ مَرَّةٍ ثُمَّ يَغُضُّ بَصَرَهُ إِلَّا أَحْدَثَ اللَّهُ لَهُ عِبَادَةً يَجِدُ حلاوتها» . رَوَاهُ أَحْمد
পরিচ্ছেদঃ ১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - (বিবাহের প্রস্থাবিত) পাত্রী দেখা ও সতর (পর্দা) প্রসঙ্গে
৩১২৫-[২৮] হাসান বসরী (রহঃ) হতে মুরসালরূপে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জানতে পেরেছি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ স্বেচ্ছায় নারীকে দর্শনকারী পুরুষ ও স্বেচ্ছায় প্রদর্শনকারিণী নারী উভয়ের ওপর আল্লাহ তা’আলার লা’নাত (অভিশাপ)। (বায়হাক্বী শু’আবুল ঈমানে)[1]
وَعَنِ الْحَسَنِ مُرْسَلًا قَالَ: بَلَغَنِي أَنَّ رَسُولَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَعَنَ اللَّهُ النَّاظِرَ وَالْمَنْظُورَ إِلَيْهِ» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي شُعَبِ الْإِيمَانِ
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিয়ের ওয়ালী (অভিভাবক) এবং নারীর অনুমতি গ্রহণ প্রসঙ্গে
৩১২৬-[১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রাপ্তবয়স্কা বা বিধবা নারীর অনুমতি ব্যতীত তার বিয়ে দেয়া যাবে না। কুমারীর সম্মতি ব্যতীত তার বিয়ে দেয়া যাবে না। তারা (উপস্থিত সাহাবায়ি কিরাম) জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! কুমারীর সম্মতি কিরূপে হবে? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তার নিরবতাই (বিয়ের) সম্মতি। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْوَلِىِّ فِى النِّكَاحِ وَاسْتِئْذَانِ الْمَرْأَةِ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تُنْكَحُ الْأَيِّمُ حَتَّى تُسْتَأْمَرَ وَلَا تُنْكَحُ الْبِكْرُ حَتَّى تُسْتَأْذَنَ» . قَالُوا: يَا رَسُول الله وَكَيف إِذْنهَا؟ قَالَ: «أَن تسكت»
ব্যাখ্যা : أَيِّمُ (আইয়িম) সে মহিলাকে বলা হয় যে তার স্বামীর মৃত্যু কিংবা ত্বলাকের কারণে স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। আর এটাই আইয়িম বা স্বামী পরিত্যক্ত মহিলার মৌলিক পরিচিতি। এ হাদীসে স্বামী পরিত্যক্ত মহিলা ও কুমারী মহিলার মাঝে সস্পষ্টতই পার্থক্য দেখা যায়। এখানে সাইয়িবা মহিলার নির্দেশ পাওয়া ও বাকেরা (কুমারী মহিলা) থেকে অনুমোদন নেয়ার কথা বলা হয়েছে। কাজেই উভয়ের মাঝে এ দৃষ্টিকোণ থেকে পার্থক্য পরিলক্ষেত হয় যে, নির্দেশ পাওয়াটা তার সঙ্গে পরামর্শ করার আবশ্যকতার উপর প্রমাণ করে। সুতরাং ওয়ালী বিবাহের ক্ষেত্রে সাইয়িবা মহিলার প্রকাশ্য অনুমতির দিকে মুখাপেক্ষী হবে। যদি বিবাহে আপত্তি জানায় তবে তার বিবাহ দেয়া সর্বসম্মতিক্রমে নিষেধ। কিন্তু কুমারী মহিলার বিষয় তার বিপরীত। তার অনুমোদন মুখে কথা বলা ও নীরব থাকার মাধ্যমে হতে পারে।
অন্যদিকে «الْأَمْر» নির্দেশ তার বিপরীত, স্পষ্ট মৌখিক কথা বলাটা হলো «الْأَمْر» যা সাইয়িবা মহিলা থেকে পাওয়া জরুরী। অন্যদিকে কুমারী মহিলার নীরব থাকাই অনুমতি হিসেবে গণ্য হবে। কারণ সে মুখে কথা বলতে লজ্জাবোধ করে। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫১৩৬)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিয়ের ওয়ালী (অভিভাবক) এবং নারীর অনুমতি গ্রহণ প্রসঙ্গে
৩১২৭-[২] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রাপ্তবয়স্কা বা স্বামীহীনা নারী তার (বিয়ের অনুমতির) ব্যাপারে ওয়ালী থেকে বেশি অধিকার রাখে। আর কুমারী তার ব্যাপারে অনুমতির অধিকার রাখে এবং (বিয়েতে) নিরবতা তার অনুমতি।
অন্য বর্ণনায় আছে যে, বিবাহিতা (বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্তা) তার (বিয়ের) ওয়ালী অপেক্ষা বেশি (কর্তৃত্বের) অধিকারিণী এবং কুমারীর সম্মতি নিতে হবে, তার নিরবতাই সম্মতি। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْوَلِىِّ فِى النِّكَاحِ وَاسْتِئْذَانِ الْمَرْأَةِ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الْأَيِّمُ أَحَقُّ بِنَفْسِهَا مِنْ وَلِيِّهَا وَالْبِكْرُ تَسْتَأْذِنُ فِي نَفْسِهَا وَإِذْنُهَا صِمَاتُهَا» . وَفِي رِوَايَةٍ: قَالَ: «الثَّيِّبُ أَحَقُّ بِنَفْسِهَا مِنْ وَلِيِّهَا وَالْبِكْرُ تُسْتَأْمَرُ وَإِذْنُهَا سُكُوتُهَا» . وَفِي رِوَايَةٍ: قَالَ: «الثَّيِّبُ أَحَقُّ بِنَفْسِهَا مِنْ وَلِيِّهَا وَالْبِكْرُ يَسْتَأْذِنُهَا أَبُوهَا فِي نَفْسِهَا وَإِذْنُهَا صِمَاتُهَا» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: ইমাম শাফি‘ঈ, ইবনু আবূ ইয়া‘লা, আহমাদ, ইসহক (রহঃ)-সহ অন্যান্য ‘উলামাগণ বলেন, বিবাহের ওয়ালী যদি বাবা কিংবা দাদা হয় তবে কুমারী মহিলা থেকে অনুমতি নেয়া মুস্তাহাব। যদি তার অনুমতি ছাড়াই বিবাহ দিয়ে দেয় তবে বিবাহ বিশুদ্ধ হবে। কারণ বাবা কিংবা দাদা তার প্রতি পূর্ণ স্নেহশীল। অন্যদিকে বাবা কিংবা দাদা ব্যতীত অন্য কেউ ওয়ালী হলে অনুমতি নেয়া ওয়াজিব, অনুমতি ছাড়া বিবাহ বিশুদ্ধ হবে না। তবে আওযা‘ঈ, আবূ হানীফাহ্ এবং কুফার ‘উলামাগণের মতে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্কা কুমারী মহিলা থেকে বিবাহের অনুমতি নেয়া ওয়াজিব। অন্যদিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা কুমারী মহিলার চুপ থাকাই তার অনুমতি, এটি সকল কুমারী মহিলা ও ওয়ালী সবার জন্য প্রযোজ্য। আর কুমারী মহিলার নীরব থাকাই অনুমতির জন্য যথেষ্ট। কিন্তু স্বামী পরিত্যক্ত মহিলার ক্ষেত্রে মৌখিক অনুমতি জরুরী, ওয়ালী তার বাবা কিংবা অন্য যে কেউ হোক না কেন কারণ প্রথম বিবাহের ফলে তার পূর্ণ লজ্জাবোধ দূর হয়ে যায়। (শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪২১; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিয়ের ওয়ালী (অভিভাবক) এবং নারীর অনুমতি গ্রহণ প্রসঙ্গে
৩১২৮-[৩] খানসা বিনতু খিযাম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তার পিতা তাঁকে (পূর্বে বিবাহিতা অবস্থায় দ্বিতীয়বার) বিয়ে দিলেন, এতে তিনি সস্মত ছিলেন না। অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে অভিযোগ করলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ঐ বিয়ে নাকচ করে দেন। (বুখারী)[1]
ইবনু মাজাহ্’র রিওয়ায়াতে রয়েছে, তার পিতার দেয়া বিবাহ বলে উল্লেখ আছে।
بَابُ الْوَلِىِّ فِى النِّكَاحِ وَاسْتِئْذَانِ الْمَرْأَةِ
وَعَن خنساء بنت خذام: أَنْ أَبَاهَا زَوَّجَهَا وَهِيَ ثَيِّبٌ فَكَرِهَتْ ذَلِكَ فَأَتَتْ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَرَدَّ نِكَاحَهَا. رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ وَفِي رِوَايَةِ ابْنِ مَاجَه: نِكَاح أَبِيهَا
ব্যাখ্যা: সাওরীর অপর বর্ণনায় রয়েছে, খানসা বিনতু খিযাম বলেনঃ আমার বাবা আমাকে বিবাহ দিয়েছে আমার পছন্দের বাইরে, আর আমি তখন কুমারী ছিলাম। এ বর্ণনটি সঠিক নয় বরং উক্ত মহিলার সাইয়িবা হওয়ার বর্ণনাটি অধিক বিশুদ্ধ, কারণ ....... ইয়াহইয়া বিন সা‘ঈদ বিন আবুল কাসিম -এর বর্ণনায় রয়েছে যে, উক্ত মহিলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলছে যে, আমি আমার সন্তানের চাচাকে বিবাহ করতে চেয়েছিলাম।
আবূ বাকরাহ্ বিন মুহাম্মাদ হতে বর্ণিত, এক আনসারী ব্যক্তি খানসা বিনতু খিযাম-কে বিবাহ করল, অতঃপর সে উহুদের যুদ্ধে নিহত হলো, তারপর তার বাবা তাকে অন্যত্র বিবাহ দিলে সে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল; আমার বাবা আমাকে বিবাহ দিয়েছে। অন্যদিকে আমার সন্তানের চাচা, অর্থাৎ আমার দেবরকেই বিবাহের জন্য অধিক পছন্দ করি। অতএব হাদীসদ্বয় প্রমাণ করে যে, পূর্ব স্বামীর পক্ষ হতে তার সন্তানও ছিল। সুতরাং উক্ত মহিলার সে সময় কুমারী থাকার প্রশ্নই উঠে না। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫১৩৮)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিয়ের ওয়ালী (অভিভাবক) এবং নারীর অনুমতি গ্রহণ প্রসঙ্গে
৩১২৯-[৪] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ৭ বছর বয়সে বিয়ে করেন, যখন তাঁকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘরে দেয়া হয় তখন তার বয়স ছিল নয় বছর, তাঁর সাথে খেলনা ছিল। আর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন ইন্তেকাল করেন, তখন তাঁর বয়স ১৮ বছর। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْوَلِىِّ فِى النِّكَاحِ وَاسْتِئْذَانِ الْمَرْأَةِ
وَعَنْ عَائِشَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَزَوَّجَهَا وَهِيَ بِنْتُ سَبْعِ سِنِينَ وَزُفَّتْ إِلَيْهِ وَهِيَ بِنْتُ تِسْعِ سِنِينَ وَلُعَبُهَا مَعَهَا وَمَاتَ عَنْهَا وَهِيَ بِنْتُ ثَمَانِيَ عَشْرَةَ. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: এখান থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, বাবা তার ছোট মেয়েকে তার অনুমতি ছাড়াই বিবাহ দিতে পারবেন। আর দাদা তো বাবার মতই। ইমাম শাফি‘ঈ ও তার সাথীগণ বলেছেনঃ বাবা তাঁর মেয়েকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পূর্বে তার অনুমতি ছাড়া বিবাহ না দেয়া মুস্তাহাব, যাতে সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্বামীর সংসারে বন্ধি হতে বাধ্য না হয়। আর ছোট বিবাহিতার সাথে বাসরের সময়ের ব্যাপারে স্বামী এবং ওয়ালী যদি এমন বিষয়ে ঐকমত্য হয় যাতে ছোট মহিলার উপর ক্ষতির আশংকা নেই। তবে উক্ত মহিলার সঙ্গে বাসর কিংবা সহবাস করা যাবে। ইমাম মালিক, শাফি‘ঈ ও আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) বলেনঃ উক্ত মহিলার সঙ্গে বাসর তখনই করা যাবে যখন তার সহবাসে সক্ষমতা আসবে, তবে এটা মহিলা ভেদে ভিন্ন হতে পারে। কোনো মহিলার যদি ৯ বছরের পূর্বেই সহবাসের সক্ষমতা আসে তবে তার সাথে বাসরে কোনো বাধা নেই। অন্যদিকে কোনো মহিলার ৯ বছরের পরেও যদি সহবাসের সক্ষমতা না আসে, তবে তার সঙ্গে বাসর করার অনুমতিও নেই। (শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪২২)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিয়ের ওয়ালী (অভিভাবক) এবং নারীর অনুমতি গ্রহণ প্রসঙ্গে
৩১৩০-[৫] আবূ মূসা আল আশ্’আরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ওয়ালী (অভিভাবক) ছাড়া কোনো বিবাহ নেই। (আহমাদ, তিরমিযী, আবূ দাঊদ, মাজাহ ও দারিমী)[1]
عَن أَبِي مُوسَى عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا نِكَاحَ إِلَّا بِوَلِيٍّ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ وَالدَّارِمِيُّ
ব্যাখ্যা: ইমাম তিরমিযী (রহঃ) বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা হলো ওয়ালী ছাড়া কোনো বিবাহ হবে না। এর উপর ‘আমল বিদ্যমান রয়েছে। বিবাহে ওয়ালীর শর্তারোপের ব্যাপারে ‘উলামাগণের মাঝে ইখতিলাফ রয়েছে। জুমহূর ‘উলামাগণ ইমাম তিরমযীর কথা গ্রহণ করেছেন এবং বলেছেন, কোনো মহিলা কোনক্রমেই নিজেকে বিবাহ দিতে পারবে না। উল্লেখিত হাদীসগুলো থেকে তারা দলীল গ্রহণ করেছেন। পক্ষান্তরে ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) বলেছেনঃ বিবাহে ওয়ালী শর্ত নয় এবং মহিলার জন্য তার নিজেকে বিবাহে দেয়া জায়িয এবং ওয়ালীর অনুমতি ছাড়াই যদি সে নিজেকে বিবাহ দেয় তবে তা যথেষ্ট হবে। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৩য় খন্ড, হাঃ ১১০১)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিয়ের ওয়ালী (অভিভাবক) এবং নারীর অনুমতি গ্রহণ প্রসঙ্গে
৩১৩১-[৬] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে কোনো নারী তার ওয়ালীর (অভিভাবকের) অনুমতি ছাড়া বিয়ে করবে; তার বিয়ে বাত্বিল (না-মঞ্জুর, পরিত্যক্ত), তার বিয়ে বাত্বিল, তার বিয়ে বাত্বিল। যদি এরূপ বিয়েতে স্বামীর সাথে সহবাস হয়ে থাকে, তবে স্ত্রীর মোহর দিতে হবে তার (লজ্জাস্থান) উপভোগ (হালাল) করার জন্যে। আর যদি তাদের (ওয়ালীগণের) মধ্যে আপোসে মতবিরোধ দেখা দেয়, তবে যার ওয়ালী নেই শাসক (প্রশাসন) তার ওয়ালী (বলে বিবেচিত) হবে।
(আহমাদ, তিরমিযী, আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ ও দারিমী)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «أَيُّمَا امْرَأَةٍ نَكَحَتْ بِغَيْرِ إِذْنِ وَلَيِّهَا فَنِكَاحُهَا بَاطِلٌ فَنِكَاحُهَا بَاطِلٌ فَنِكَاحُهَا بَاطِلٌ فَإِنْ دَخَلَ بِهَا فَلَهَا الْمَهْرُ بِمَا اسْتَحَلَّ مِنْ فَرْجِهَا فَإِنِ اشْتَجَرُوا فَالسُّلْطَانُ وَلِيُّ من لَا ولي لَهُ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ والدارمي
ব্যাখ্যা : ইমাম তিরমিযী (রহঃ) বলেনঃ ‘‘ওয়ালী ছাড়া বিবাহ হবে না’’ এ কথার উপর বিদ্বান সাহাবীগণের ‘আমল রয়েছে। তাদের মধ্য ‘উমার ইবনুল খত্ত্বাব, ‘আলী ইবনু আবূ তালিব, ‘আব্দুল্লাহ বিন ‘আব্বাস ও আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)-সহ প্রমুখগণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এবং তাবি‘ঈনদের মধ্য হতে ফুকাহা কিরামগণ অনুরূপ বর্ণনা দিয়েছেন। তাদের মধ্য হতে সা‘ঈদ বিন মুসায়ব, হাসান আল বাসরী, শুরাইহ, ইব্রাহীম আন্ নাখ‘ঈ ও ‘উমার বিন ‘আবদুল ‘আযীয-সহ প্রমুখগণ উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও সুফ্ইয়ান আস্ সাওরী, আওযা‘ঈ, ‘আব্দুল্লাহ বিন মুবারাক, ইমাম শাফি‘ঈ, আহমাদ ও ইসহক (রহঃ)-গণ এটাই বলেছেন। (‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২০৮৩)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিয়ের ওয়ালী (অভিভাবক) এবং নারীর অনুমতি গ্রহণ প্রসঙ্গে
৩১৩২-[৭] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সাক্ষ্য-প্রমাণ ব্যতিরেকে যে নারীর বিয়ে হয়, তারা ব্যভিচারিণী। (রাবী বলেন) তবে উল্লেখিত ইবনু ’আব্বাস -এর হাদীসটি মাওকূফ (অর্থাৎ- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী নয়)। (তিরমিযী)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الْبَغَايَا اللَّاتِي يُنْكِحْنَ أَنْفُسَهُنَّ بِغَيْرِ بَيِّنَةٍ» . وَالْأَصَحُّ أَنَّهُ مَوْقُوفٌ عَلَى ابْنِ عَبَّاس. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ এখানে বাইয়িনা বা প্রমাণ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সাক্ষী। সাক্ষী ছাড়া যে মহিলা নিজেকে বিবাহ দিবে সে যিনাকারিণী হবে। আর সাহাবীগণ ও তাবি‘ঈনগণসহ অন্যান্য বিদ্বানদের এর উপর ‘আমল রয়েছে। তারা বলেছেন, সাক্ষী ছাড়া কোনো বিবাহ হবে না। আর এ মর্মে তাদের মাঝে কোনো মতবিরোধ নেই। তবে কুফাবাসীর অধিকাংশ ‘উলামাহ্গণ বলেছেন, বিবাহের সময় দু’ সাক্ষীর একত্র সাক্ষী ছাড়া বিবাহ বৈধ নয়। অন্যদিকে কিছু সংখ্যক মদীনার ‘উলামাগণ বর্ণনা করেছেন যে, যদি বিবাহ ঘটা করে হয়, তবে একজনের পর অপর সাক্ষী দিলে বিবাহ বিশুদ্ধ হবে। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৩য় খন্ড, হাঃ ১১০৩)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিয়ের ওয়ালী (অভিভাবক) এবং নারীর অনুমতি গ্রহণ প্রসঙ্গে
৩১৩৩-[৮] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ইয়াতীম মেয়ের (বিয়ের) ব্যাপারে তার মতামত নিতে হবে, আর তার নিরবতা সম্মতি বলে গণ্য হবে। আর যদি সে অস্বীকার করে, তবে তাকে বাধ্য করা যাবে না (বৈধ হবে না)। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ, নাসায়ী)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْيَتِيمَةُ تُسْتَأْمَرُ فِي نَفْسِهَا فَإِنْ صَمَتَتْ فَهُوَ إِذْنُهَا وَإِنْ أَبَتْ فَلَا جَوَازَ عَلَيْهَا» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: কতিপয় বিদ্বানদের মতে ইয়াতীমা মহিলাকে যখন বিবাহ দেয়া হবে তখন তার বিবাহ তার সাবালিকা হওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। বালেগা হওয়ার পর তার ঐচ্ছিক থাকবে সে বিবাহ মেনে নিতেও পারে অথবা ভেঙ্গে দিতেও পারে। আর এটা আসহাবে আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-এর কথা। অন্যদিকে আল্লাহ তা‘আলার কথা, অর্থাৎ- ‘‘তোমরা যদি ইয়াতীমা মহিলাদের প্রতি ইনসাফ না করার আশংকা কর তবে তোমাদের চাহিদানুযায়ী বিবাহ কর.....’’- (সূরা আন্ নিসা ৪ : ৩)। ইয়াতীমা মহিলা (অর্থাৎ- সেসব নাবাগেলা মহিলা যাদের বাবা নেই)’’ তাদের বিবাহ বৈধ হওয়ার প্রতি প্রমাণ বহন করে।
হাফিয ‘আসকালানী ফাতহুল বারীতে বলেছেনঃ এই আয়াতে এ মর্মে দলীল রয়েছে যে, পিতাহীন নাবাগেলা মহিলাকে বিবাহ দেয়া বৈধ। কারণ ইয়াতীমা হলো সে নাবালেগা মহিলা যার বাবা নেই। তবে তাকে বিবাহ দেয়া যাবে এ শর্তে যে, তার জন্য নির্ধারিত মোহর যেন যৎসামান্য না হয়। (‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২০৯৩)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিয়ের ওয়ালী (অভিভাবক) এবং নারীর অনুমতি গ্রহণ প্রসঙ্গে
৩১৩৪-[৯] ইমাম দারিমী (রহঃ) আবূ মূসা আল আশ্’আরী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন।[1]
وَرَوَاهُ الدَّارمِيّ عَن أبي مُوسَى
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিয়ের ওয়ালী (অভিভাবক) এবং নারীর অনুমতি গ্রহণ প্রসঙ্গে
৩১৩৫-[১০] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ক্রীতদাস মালিকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করেছে, সে ব্যভিচারী। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ, দারিমী)[1]
وَعَنْ جَابِرٌ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «أَيُّمَا عَبْدٍ تَزَوَّجَ بِغَيْرِ إِذْنِ سَيِّدِهِ فَهُوَ عَاهِرٌ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ والدرامي
ব্যাখ্যা: (فَهُوَ عَاهِرٌ) অর্থাৎ- যিনাকারী। ‘আল্লামা আল মুযহির (রহঃ) বলেনঃ মুনীবের অনুমতি ছাড়া দাসের বিবাহ করা বৈধ নয়। ইমাম শাফি‘ঈ ও ইমাম আহমাদ (রহঃ) এমনটাই বলেছেন এবং বিবাহ যদি মুনীব মেনে নেয় তবুও এ বিবাহ বিশুদ্ধ হবে না, তবে ইমাম আবূ হানীফাহ্ ও মালিক (রহঃ)-এর মতে বিবাহ বিশুদ্ধ হবে। ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তাঁর একজন দাস ছিল সে তাঁর অনুমতি ছাড়াই বিবাহ করেছিল। তিনি (ইবনু ‘উমার ) উভয়ের বিবাহ ভেঙ্গে দিয়েছিলেন এবং মোহরও বাতিল করেছিলেন এবং ঐ দাসকে তিনি বেত্রাঘাত করেছিলেন। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৩য় খন্ড, হাঃ ১১১১)
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - বিয়ের ওয়ালী (অভিভাবক) এবং নারীর অনুমতি গ্রহণ প্রসঙ্গে
৩১৩৬-[১১] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক কুমারী মেয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট অভিযোগ করে বলল, তার অসম্মতিতে পিতা তাকে বিয়ে দিয়েছে। এটা শুনে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে (স্বামীর সংসারে থাকা বা না থাকার ইচ্ছার) অধিকার প্রদান করলেন। (আবূ দাঊদ)[1]
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: إِنَّ جَارِيَةً بِكْرًا أَتَتْ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَذكرت أَن أَبَاهَا زَوجهَا وَهِي كَارِهًا فَخَيَّرَهَا النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যা : আলোচ্য হাদীসে এ মর্মে দলীল রয়েছে যে, কুমারী মেয়েকে বিবাহের জন্য বাধ্য করা বাবার জন্য হারাম এবং বাবা ছাড়া অন্য কোনো ওয়ালী তাকে বিবাহে বাধ্য করতে পারবে না। জোরপূর্বক কোনো মেয়েকে বিবাহ দেয়া বাবার জন্য বৈধ নয়। এমন মত ব্যক্ত করেছেন ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)। (‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২০৯৬)
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - বিয়ের ওয়ালী (অভিভাবক) এবং নারীর অনুমতি গ্রহণ প্রসঙ্গে
৩১৩৭-[১২] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো নারী যেন অপর নারীর বিবাহ সম্পাদন না করে এবং সে নিজেকেও স্বয়ং বিয়ে দিতে পারে না। আর ব্যভিচারিণীই তো সেই, যে নিজেকে বিয়ে দেয়। (ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم: «لَا تزوج الْمَرْأَة الْمَرْأَةَ وَلَا تُزَوِّجُ الْمَرْأَةُ نَفْسَهَا فَإِنَّ الزَّانِيَةَ هِيَ الَّتِي تُزَوِّجُ نَفْسَهَا» . رَوَاهُ ابْنُ مَاجَهْ
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - বিয়ের ওয়ালী (অভিভাবক) এবং নারীর অনুমতি গ্রহণ প্রসঙ্গে
৩১৩৮-[১৩] আবূ সা’ঈদ ও ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তাঁরা উভয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তির কোনো সন্তান (ছেলে বা মেয়ে) জন্মগ্রহণ করে, সে যেন তার উত্তম নাম রাখে। আর (উত্তম) আচার-আচরণ শিক্ষা দেয় এবং যখন বয়ঃপ্রাপ্ত হয় তখন যেন তার বিয়ে দেয়। বয়ঃপ্রাপ্তির পর যদি বিয়ে না দেয় এবং ঐ সন্তান যদি কোনো পাপ করে, তবে ঐ পাপের বোঝা পিতার ওপর বর্তাবে।[1]
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ وَابْنِ عَبَّاسٍ قَالَا: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «من وُلِدَ لَهُ وَلَدٌ فَلْيُحْسِنِ اسْمَهُ وَأَدَبَهُ فَإِذَا بَلَغَ فَلْيُزَوِّجْهُ فَإِنْ بَلَغَ وَلَمْ يُزَوِّجْهُ فَأَصَابَ إِثْمًا فَإِنَّمَا إثمه على أَبِيه»
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - বিয়ের ওয়ালী (অভিভাবক) এবং নারীর অনুমতি গ্রহণ প্রসঙ্গে
৩১৩৯-[১৪] ’উমার ইবনুল খত্ত্বাব ও আনাস ইবনুল মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তাঁরা উভয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (মূসা (আঃ)-এর ওপর অবতীর্ণ) তাওরাত কিতাবে লেখা আছে যে, যখন কারো কন্যা সন্তান বারো বছর বয়সে পৌঁছে, আর সে যদি তার বিয়ে না দেয়, আর তার দ্বারা যদি কোনো পাপকর্ম হয়, তবে ঐ পাপকর্ম পিতার ওপর বর্তাবে।
(উপরোক্ত হাদীস দু’টি [৩১৩৮-৩১৩৯] বায়হাক্বী-এর শু’আবুল ঈমানে বর্ণনা করেন)[1]
وَعَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ وَأَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: فِي التَّوْرَاةِ مَكْتُوبٌ: مَنْ بَلَغَتِ ابْنَتُهُ اثْنَتَيْ عَشْرَةَ سَنَةً وَلَمْ يُزَوِّجْهَا فَأَصَابَتْ إِثْمًا فَإِثْمُ ذَلِكَ عَلَيْهِ «. رَوَاهُمَا الْبَيْهَقِيُّ فِي» شُعَبِ الْإِيمَانِ
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিয়ের প্রচার, প্রস্তাব ও শর্তাবলী প্রসঙ্গে
৩১৪০-[১] রুবায়ই’ বিনতু মু’আবিবয ইবনু ’আফরা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যেদিন আমাকে প্রথম স্বামীর ঘরে দেয়া হলো সেদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে এসে বিছানায় বসলেন, যেমনভাবে তুমি (বর্ণনাকারী রাবী খালিদ ইবনু যাক্ওয়ান) আমার নিকটে বসে আছ। এ সময় বালিকাগণ দফ (একমুখো ঢোল) বাজিয়ে বদর যুদ্ধে শহীদ আমার পিতৃ-পুরুষের শোকগাঁথা গাইতে লাগল। তন্মধ্যে (বালিকাগণের) একজন গেয়ে উঠল, ’’আমাদের মাঝে এমন একজন নবী আছেন, যিনি আগামীদিনের (ভবিষ্যতের) খবর রাখেন’’। এটা শুনে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এগুলো বলো না, বরং যা পূর্ব থেকে বলে আসছিলে তাই বল। (বুখারী)[1]
بَابُ إِعْلَانِ النِّكَاحِ وَالْخِطْبَةِ وَالشَّرْطِ
عَن الرّبيع بنت معوذ بن عَفْرَاءَ قَالَتْ: جَاءَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَدَخَلَ حِينَ بُنِيَ عَلَيَّ فَجَلَسَ عَلَى فِرَاشِي كمجلسك مني فَجعلت جويرات لَنَا يَضْرِبْنَ بِالدُّفِّ وَيَنْدُبْنَ مَنْ قُتِلَ مِنْ آبَائِي يَوْمَ بَدْرٍ إِذْ قَالَتْ إِحْدَاهُنَّ: وَفِينَا نَبِيٌّ يَعْلَمُ مَا فِي غَدٍ فَقَالَ: «دَعِي هَذِهِ وَقُولِي بِالَّذِي كُنْتِ تَقُولِينَ» . رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ
ব্যাখ্যা: তোমরা আমার প্রশংসার সাথে সংশ্লিষ্ট এমন কথা, যা বাড়াবাড়িমূলক তা বর্জন কর। হাম্মাদ বিন সালামাহ্ -এর বর্ণনায় বর্ধিত রয়েছে যে, আগামীকাল কি ঘটবে তা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা জানেন। আলোচ্য হাদীস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, দফ ও গান গাওয়ার মাধ্যমে বিবাহের ঘোষণা করা বৈধ। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতিরঞ্জিত করা ঘৃণা করতেন। অদৃশ্যের সংবাদ জানা এটা আল্লাহ তা‘আলার সিফাত যা আল্লাহ তা‘আলার জন্য খাস। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ হে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি বলুন, আল্লাহ ব্যতীত আকাশমন্ডলী এবং জমিনের কেউ অদৃশ্যের ব্যাপারে অবগত নয়। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বলুন! আমি আমার নিজের লাভ-ক্ষতির ব্যাপারে অবগত নই, তবে আল্লাহ তা‘আলা যা ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত। যদি আমি অদৃশ্যের ব্যাপারে জানতাম তাহলে আমার জন্য কল্যাণই বৃদ্ধি করে নিতাম। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫১৪৭)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিয়ের প্রচার, প্রস্তাব ও শর্তাবলী প্রসঙ্গে
৩১৪১-[২] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আনসার গোত্রের জনৈক পুরুষের সাথে জনৈকা নারীর বিয়ের পরে যখন তাকে স্বামীর নিকট ঘরে পাঠানো হলো, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের নিকট কি কোনো (আনন্দোল্লাস উপকরণ স্বরূপ) ক্রীড়াকৌতুক ছিল না? আনসারগণ তো আমোদ-প্রমোদপ্রিয়। (বুখারী)[1]
بَابُ إِعْلَانِ النِّكَاحِ وَالْخِطْبَةِ وَالشَّرْطِ
وَعَن عَائِشَة رَضِي الله عَنهُ قَالَتْ: زُفَّتِ امْرَأَةٌ إِلَى رَجُلٍ مِنَ الْأَنْصَارِ فَقَالَ نَبِيُّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا كَانَ مَعَكُمْ لَهْوٌ؟ فَإِنَّ الْأَنْصَارَ يُعْجِبُهُمُ اللَّهْو» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: ইবনু ‘আব্বাস ও জাবির (রাঃ)-এর অপর বর্ণনায় রয়েছে, আনসারীরা এমন সম্প্রদায় যারা গজল খুব ভালোবাসে। এছাড়াও একাধিক বিশুদ্ধ হাদীসে মহিলাদের জন্য গান বা গজল গাওয়ার অনুমতি পাওয়া যায়। তবে গান গাওয়া মহিলাদের সঙ্গে যেন পুরুষের সংশ্লিষ্টতা না থাকে। কারণ পুরুষের মহিলার সাদৃশ্য ও মহিলার পুরুষের সাদৃশ্য গ্রহণের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫১৬২)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিয়ের প্রচার, প্রস্তাব ও শর্তাবলী প্রসঙ্গে
৩১৪২-[৩] উক্ত রাবী [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে শাও্ওয়াল মাসে বিবাহ করেছেন এবং ঐ মাসেই আমার বাসর রজনী হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহধর্মিণীগণের মধ্যে আমার চেয়ে কে অধিক (তার ভালোবাসা প্রাপ্তিতে) সৌভাগ্যবতী ছিলেন? (মুসলিম)[1]
بَابُ إِعْلَانِ النِّكَاحِ وَالْخِطْبَةِ وَالشَّرْطِ
وَعَنْهَا قَالَتْ: تَزَوَّجَنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي شَوَّالٍ وَبَنَى بِي فِي شَوَّالٍ فَأَيُّ نِسَاءِ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ أَحْظَى عِنْدَهُ مِنِّي؟ . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) শাও্ওয়াল মাসে বাসর হওয়া ভালোবাসতেন, আর তাতে বিবাহ হওয়া ও বাসর হওয়া মুস্তাহাব। আমাদের সাথীগণ মুস্তাহাব হওয়ার উপরের দলীল গ্রহণ করেছেন। আর ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) এ কথা দ্বারা জাহিলিয়্যাতের সে ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। জাহিলী জামানায় ধারণা ছিল শাও্ওয়াল মাসে বিবাহ বা বাসর হওয়া শুভ নয়। (শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪২৩)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিয়ের প্রচার, প্রস্তাব ও শর্তাবলী প্রসঙ্গে
৩১৪৩-[৪] ’উকবা ইবনু ’আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে সকল শর্ত তোমাদের পূর্ণ করা কর্তব্য, তন্মধ্যে অগ্রাধিকার শর্ত হলো, যার মাধ্যমে তোমরা লজ্জাস্থান হালাল করে থাকো। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ إِعْلَانِ النِّكَاحِ وَالْخِطْبَةِ وَالشَّرْطِ
وَعَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَحَقُّ الشُّرُوطِ أَنْ تُوفُوا بِهِ مَا اسْتَحْلَلْتُمْ بِهِ الْفروج»
ব্যাখ্যা : ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ)-সহ অধিকাংশ ‘উলামাগণ বলেছেন যে, এ শর্ত দ্বারা উদ্দেশ্য বিবাহের চাহিদায় বাধা সৃষ্টি করা নয়, বরং বিবাহের চাহিদা পূরণ করা। যেমন স্ত্রীর সাথে ভালো ব্যবহার করার শর্ত করা, তার খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থান নিশ্চিত করার শর্তারোপ করা, স্ত্রীর হক অপূর্ণ না রাখার শর্তারোপ করা ও একাধিক স্ত্রী থাকলে তার পানি বণ্টন করার শর্তারোপ করা। অন্যদিকে স্ত্রী তার স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাহিরে যাবে না। তার অনুমতি ছাড়া নফল সিয়াম পালন করবে না, তার বাড়ীতে স্বামীর অনুমতি ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে দিবে না এবং স্বামীর সংসারের আসবাব সামগ্রী তার অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও স্থানান্তর করবে না।
এছাড়া আরো অনুরূপ যে শর্তগুলো আছে সবগুলো পূরণ করা আবশ্যক, তবে এমন কতগুলো শর্ত রয়েছে যা বিবাহের চাহিদা পূরণে বাধা সৃষ্টি করে, যেমন স্বামী তার একাধিক স্ত্রী থাকলে ঘর বণ্টন করবে না, তার স্ত্রীর ওপর খরচও করবে না, তাকে সাথে নিয়ে কোনো ভ্রমণও করবে না। এমন শর্ত পূরণ করা তো আবশ্যক নয়ই, বরং এগুলো বাতিল বলে গণ্য হবে। (শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪২৮)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিয়ের প্রচার, প্রস্তাব ও শর্তাবলী প্রসঙ্গে
৩১৪৪-[৫] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো ব্যক্তি যেন তার ভাইয়ের (বিয়ের) প্রস্তাবের উপর প্রস্তাব না পাঠায় যতক্ষণ না সে বিয়ে করে অথবা নাকচ করে দেয়। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ إِعْلَانِ النِّكَاحِ وَالْخِطْبَةِ وَالشَّرْطِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَخْطُبُ الرَّجُلُ عَلَى خِطْبَةِ أَخِيهِ حَتَّى يَنْكِحَ أَو يتْرك»
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা খত্ত্বাবী (রহঃ) সহ অন্যান্য ‘উলামাগণ বলেছেন, একজন অপরজনের কেনা-বেচা কিংবা বিবাহের প্রস্তাবের উপর প্রস্তাব করা হরাম, এ বিষয়টা কোনো মুসলিমের প্রস্তাবের উপর অন্য কারো প্রস্তাব করা উদ্দেশ্য। কোনো কাফির ব্যক্তির প্রস্তাবের উপর কোনো মুসলিম প্রস্তাব করলে তা হারাম হবে না। আওযা‘ঈ (রহঃ) অনুরূপ কথা বলেছেন।
জুমহূর ‘উলামাগণ বলেছেন, কাফির ব্যক্তির প্রস্তাবের উপর প্রস্তাব করাও হারাম। উল্লেখিত মতের জবাবে তিনি বলেন, আলোচ্য হাদীসে أَخِيهِ বা তার ভাই দ্বারা এটা উদ্দেশ্য নয় যেমন, আল্লাহ তা‘আলার কথা, অর্থাৎ- ‘‘তোমাদের সন্তানদের খাদ্য খাওয়ার ভয়ে হত্যা করো না’’- (সূরা আল আন্‘আম ৬ : ১৫১)। এ আয়াতে হত্যার নিষেধাজ্ঞা শুধু মুসলিমদের ওপর প্রযোজ্য নয়, বরং সকলের ওপর প্রযোজ্য। সুতরাং বিশুদ্ধ কথা এটাই যে, ফাসিক কাফির কিংবা মুসলিম প্রস্তাবকারীর মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। (শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪১৩)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিয়ের প্রচার, প্রস্তাব ও শর্তাবলী প্রসঙ্গে
৩১৪৫-[৬] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো নারী যেন (স্বয়ং নিজের জন্য) তার বোনের তালাক না চায়; যাতে সে বোনের পাত্র খালি রেখে নিজের পাত্র পূর্ণ করে। কারণ, তার জন্য ভাগ্য নির্ধারিত। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ إِعْلَانِ النِّكَاحِ وَالْخِطْبَةِ وَالشَّرْطِ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تَسْأَلِ الْمَرْأَةُ طَلَاقَ أُخْتِهَا لِتَسْتَفْرِغَ صَحْفَتَهَا وَلِتَنْكِحَ فَإِنَّ لَهَا مَا قُدِّرَ لَهَا»
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিয়ের প্রচার, প্রস্তাব ও শর্তাবলী প্রসঙ্গে
৩১৪৬-[৭] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিগার হতে নিষেধ করেছেন। (রাবী নাফি’ বলেন) আর শিগার হলো এক ব্যক্তি তার কন্যাকে অন্যের নিকট এ শর্তে বিয়ে দেয় যে, অপর ব্যক্তি তার কন্যাকে এর নিকট বিয়ে দেবে, অথচ উভয় বিয়েতে তাদের মধ্যে কোনো মোহর ধার্য হবে না। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
মুসলিম-এর অপর বর্ণনায় আছে- ইসলামে শিগারের কোনো স্থান নেই।
بَابُ إِعْلَانِ النِّكَاحِ وَالْخِطْبَةِ وَالشَّرْطِ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ الشِّغَارِ وَالشِّغَارُ: أَنْ يُزَوِّجَ الرَّجُلُ ابْنَتَهُ عَلَى أَنْ يُزَوِّجَهُ الْآخَرُ ابْنَتَهُ وَلَيْسَ بَيْنَهُمَا صَدَاقٌ
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিয়ের প্রচার, প্রস্তাব ও শর্তাবলী প্রসঙ্গে
৩১৪৭-[৮] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বার যুদ্ধের দিন মুত্’আহ্ বিবাহ করতে এবং গৃহপালিত গাধার গোশ্ত/মাংস খাওয়া হতে নিষেধ করেছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ إِعْلَانِ النِّكَاحِ وَالْخِطْبَةِ وَالشَّرْطِ
وَعَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ مُتْعَةِ النِّسَاءِ يَوْمَ خَيْبَرَ وَعَنْ أكل لُحُوم الْحمر الإنسية
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসের ভিত্তিতে গৃহপালিত গাধার গোশত খাওয়া হারাম মনে করি আমরা এবং সকল ‘উলামাগণ। তবে সালাফদের মধ্য সহজ পন্থা অবলম্বনকারী একদল ‘উলামাহ্ এটা খাওয়া বৈধ মনে করেন।
‘আয়িশাহ্ (রাঃ) ও ইবনু ‘আব্বাস -সহ কতিপয় সালাফদের থেকে বর্ণিত রয়েছে যে, গৃহপালিত গাধার গোশত খাওয়া বৈধ। তাদের থেকে আবার হারামের বর্ণনাও রয়েছে। ইমাম মালিক (রহঃ)-এর বর্ণনায় হারাম মাকরূহ উভয় বর্ণনা রয়েছে। (শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪০৭)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিয়ের প্রচার, প্রস্তাব ও শর্তাবলী প্রসঙ্গে
৩১৪৮-[৯] সালামাহ্ ইবনুল আক্ওয়া’ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আওত্বাস যুদ্ধে তিনদিনের জন্য মুত্’আহ্ বিবাহের অনুমতি দিয়েছিলেন, অতঃপর পরবর্তীতে তা (স্থায়ীভাবে) নিষেধ করেছেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ إِعْلَانِ النِّكَاحِ وَالْخِطْبَةِ وَالشَّرْطِ
وَعَنْ سَلَمَةَ بْنِ الْأَكْوَعِ قَالَ: رَخَّصَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَامَ أَوْطَاسٍ فِي الْمُتْعَةِ ثَلَاثًا ثُمَّ نَهَى عَنْهَا. رَوَاهُ مُسلم
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিয়ের প্রচার, প্রস্তাব ও শর্তাবলী প্রসঙ্গে
৩১৪৯-[১০] ’আব্দুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে সালাতের তাশাহ্হুদ এবং হাজাতের (অন্যান্য কাজে) তাশাহহুদ পাঠ করা শিখিয়েছেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, সালাতের তাশাহহুদ হলো-
’’আত্তাহিয়্যাতু লিল্লা-হি ওয়াস্সলাওয়া-তু ওয়াত্ব ত্বইয়্যিবা-তু, আস্সালা-মু ’আলায়কা আইয়ুহান্ নবীয়্যু, ওয়া রহমাতুল্লা-হি ওয়া বারাকা-তুহ্। আস্সালা-মু ’আলায়না- ওয়া ’আলা- ’ইবা-দিল্লা-হিস্ স-লিহীন, আশহাদু আল্লা- ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান ’আবদুহূ ওয়া রসূলুহ্’’
(অর্থাৎ- সকল প্রকার মৌখিক, দৈহিক ও আর্থিক ’ইবাদাত আল্লাহর জন্য। হে নবী! আপনার ওপর আল্লাহর সালাম, রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক। আমাদের এবং আল্লাহর নেক বান্দাদের ওপর সালাম বর্ষিত হোক। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোনো মা’বূদ নেই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রসূল।)
আর হাজাতের তাশাহহুদ হলো এই যে,
’’ইন্নাল হামদা লিল্লা-হি ওয়া নাস্তা’ঈনুহূ ওয়া নাস্তাগফিরুহূ ওয়ানা’ঊযুবিল্লা-হি মিন্ শুরূরি আনফুসিনা- মাই ইয়াহদিহিল্লা-হু ফালা- মুযিল্লা লাহূ ওয়ামাই ইউযলিল ফালা- হা-দিয়া লাহূ ওয়া আশহাদু আল্লা- ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান্ ’আবদুহূ ওয়া রসূলুহ্’’
(অর্থাৎ- সকল প্রশংসা আল্লাহর। আমরা তাঁর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি এবং তাঁর নিকট ক্ষমা চাই। আমরা তাঁর নিকট প্রার্থনা করছি নিজেদের মনের কুচিন্তা হতে। আল্লাহ যাকে হিদায়াত করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না এবং যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন তাকে কেউ হিদায়াত করতে পারে না। আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকারের কোনো মা’বূদ নেই এবং আমি আরো সাক্ষ্য যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁরা বান্দা ও রসূল।)।
(রাবী ইবনু মাস্’ঊদ বলেন) অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তিনটি আয়াত পড়লেন- [১ম আয়াত] অর্থাৎ- ’’হে মু’মিনগণ! তোমার আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় কর এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না’’- (সূরা আ-লি ’ইমরান ৩ : ১০২)। [২য় আয়াত] অর্থাৎ- ’’হে মু’মিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে একে অপরের নিকট (স্বীয় অধিকার) প্রার্থনা কর এবং সতর্ক থাক আত্মীয়তার বন্ধন সম্পর্কে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন’’- (সূরা আন্ নিসা ৪ : ১)। [৩য় আয়াত] অর্থাৎ- ’’হে মু’মিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তাহলে আল্লাহ তোমাদের কর্মকা-কে ত্রুটিমুক্ত করবেন এবং তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন। যে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে তারা অবশ্যই লাভ করবে মহাসাফল্য’’- (সূরা আল আহযা-ব ৩৩ : ৭১)।
(আহমাদ, তিরমিযী, আবূ দাঊদ, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ, দারিমী)[1]
আর জামি’ আত্ তিরমিযীতে আছে যে, আয়াত তিনটি সুফ্ইয়ান সাওরী বর্ণনা করেছেন।
ইবনু মাজাহ الْحَمْدَ لِلّٰهِ ’’সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর’’ বাক্যের পর বাড়িয়ে বলেছেন, نَحْمَدُه ’’আমরা তার প্রশংসা করছি’’ এবংمِنْ شُرُوْرِ أَنْفُسنَا ’’নিজেদের মন্দকর্ম থেকে’’ বাক্যের পর বৃদ্ধি করেছেন وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا ’’আর আমাদের মন্দ কার্যক্রম থেকে’’।
দারিমী বৃদ্ধি করেছেন عَظِيمًا ’’বড় রকমের কৃতকার্য হয়েছে’’ বাক্যের পর ثُمَّ يَتَكَلَّمُ بِحَاجَتِه ’’অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হাজাতের উল্লেখ করতেন’’। শারহুস্ সুন্নাহ্ কিতাবে ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, ’হাজাত’ তথা বিবাহ ও অন্যান্য কাজ বুঝানো হয়েছে।
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: عَلَّمَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ التَّشَهُّدَ فِي الصَّلَاةِ وَالتَّشَهُّدَ فِي الْحَاجَةِ قَالَ: التَّشَهُّدُ فِي الصَّلَاةِ: «التَّحِيَّاتُ لِلَّهِ وَالصَّلَوَاتُ وَالطَّيِّبَاتُ السَّلَامُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ السَّلَامُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللَّهِ الصَّالِحِينَ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ» . وَالتَّشَهُّدُ فِي الْحَاجَةِ: «إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ نَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسنَا من يهد اللَّهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ» . وَيَقْرَأُ ثَلَاثَ آيَاتٍ (يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسلمُونَ)
(يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تساءلون وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا)
(يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيما)
رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ وَالدَّارِمِيُّ وَفِي جَامِعِ التِّرْمِذِيِّ فَسَّرَ الْآيَاتِ الثَّلَاثَ سُفْيَانُ الثَّوْرِيُّ وَزَادَ ابْنُ مَاجَهْ بَعْدَ قَوْلِهِ: «إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ نَحْمَدُهُ» وَبَعْدَ قَوْلِهِ: «من شرور أَنْفُسنَا وَمن سيئات أَعمالنَا» وَالدَّارِمِيُّ بَعْدَ قَوْلِهِ «عَظِيمًا» ثُمَّ يَتَكَلَّمُ بِحَاجَتِهِ وَرَوَى فِي شَرْحِ السُّنَّةِ عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ فِي خطْبَة الْحَاجة من النِّكَاح وَغَيره
ব্যাখ্যা: ইবনু মাস্‘ঊদ -এর বর্ণিত হাদীস দ্বারা দলীল গৃহীত হয় যে, বিবাহের চুক্তির সময় খুৎবা পড়ার শারী‘আত সুন্নাত। ইমাম তিরমিযী তাঁর সুনানে বলেন, বিদ্বানগণ বলেছেন যে, খুৎবা ছাড়াও বিবাহ বৈধ। আর এটাই সুফ্ইয়ান সাওরীসহ অন্যান্য বিদ্বানদের মতো। ইসমা‘ঈল বিন ইব্রাহীম বর্ণিত হাদীস খুৎবা পড়া বৈধতার উপরে প্রমাণ করে। অতএব বিবাহের খুৎবা পড়া মুস্তাহাব। (‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২১১৮)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিয়ের প্রচার, প্রস্তাব ও শর্তাবলী প্রসঙ্গে
৩১৫০-[১১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে খুৎবায় তাশাহহুদ (আল্লাহর প্রশংসা জ্ঞাপন) নেই, তা কাটা হাতের ন্যায়। (তিরমিযী; তিনি বলেছেন, হাদীসটি হাসান গরীব)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «كُلُّ خُطْبَةٍ لَيْسَ فِيهَا تَشَهُّدٌ فَهِيَ كَالْيَدِ الْجَذْمَاءِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা তূরিবিশতী (রহঃ) বলেনঃ এখানে মৌলিক তাশাহ্হুদ হলো ‘‘আশহাদু আল্লা- ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রসূলুল্লা-হ’’ আর এর দ্বারাই আল্লাহর প্রশংসা গণ্য করা হয়। ‘আল্লামা কারী (রহঃ) বলেনঃ এ হাদীসটি আবূ দাঊদ, আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। আর কাটা হাত দ্বারা সে হাত উদ্দেশ্য যা দ্বারা ব্যক্তি কোনো উপকার পায় না। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৩য় খন্ড, হাঃ ১১০৬)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিয়ের প্রচার, প্রস্তাব ও শর্তাবলী প্রসঙ্গে
৩১৫১-[১২] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজই আল্লাহর তা’আলার প্রশংসার সাথে শুরু না হলে, তবে তা বরকতশূন্য হয়। (ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «كُلُّ أَمْرٍ ذِي بَالٍ لَا يُبْدَأُ فِيهِ بِالْحَمْدِ لِلَّهِ فَهُوَ أَقْطَعُ» . رَوَاهُ ابْنُ مَاجَهْ
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিয়ের প্রচার, প্রস্তাব ও শর্তাবলী প্রসঙ্গে
৩১৫২-[১৩] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা বিবাহকার্য প্রকাশ্য ঘোষণার মাধ্যমে মসজিদে সম্পন্ন কর এবং তাতে দফ বাজাও। (তিরমিযী; তিনি বলেছেন, হাদীসটি গরীব)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَعْلِنُوا هَذَا النِّكَاحَ وَاجْعَلُوهُ فِي الْمَسَاجِدِ وَاضْرِبُوا عَلَيْهِ بِالدُّفُوفِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ
ব্যাখ্যা : ফাক্বীহগণ বলেন, এখানে দফ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, যাতে কোনো ঘণ্টাধ্বনি নেই। ইবনুল হুমাম (রহঃ) অনুরূপ বলেছেন। হাফিয ‘আসকালানী (রহঃ) বলেনঃ তারা (وَاضْرِبُوا) অর্থাৎ- ‘‘দফ বাজাও’’ এর দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছে যে, দফ বাজানো শুধু পুরুষের জন্য খাস নয় বরং নারী-পুরুষ সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু হাদীসটি য‘ঈফ। একাধিক বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, দফ বাজানোটা এমন মহিলাদের জন্য প্রযোজ্য যাদের সাথে পুরুষের সাক্ষাৎ হবে না। অনুরূপভাবে বাসরে গান গাওয়া ও মহিলার জন্য নির্ধারিত। পুরুষের জন্য তা বৈধ নয়। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ১০৮৯)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিয়ের প্রচার, প্রস্তাব ও শর্তাবলী প্রসঙ্গে
৩১৫৩-[১৪] মুহাম্মাদ ইবনু হাত্বিব আল জুমাহী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হালাল ও হারাম বিয়ের মধ্যে পার্থক্য হলো উচ্চৈঃস্বর ও দফ বাজানো। (আহমাদ, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ مُحَمَّدِ بْنِ حَاطِبٍ الْجُمَحِيِّ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: فَصَلَ مَا بَيْنَ الْحَلَالِ وَالْحَرَامِ: الصَّوْتُ وَالدُّفُّ فِي النِّكَاحِ . رَوَاهُ أَحْمد وَالتِّرْمِذِيّ وَالنَّسَائِيّ وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: এখানে الصَّوْتُ (উচ্চৈঃস্বর) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো বৈধ গান, অর্থাৎ (যে গানগুলোতে অহেতুক কথা, প্রেম বিনিময়, অশ্লীল বাক্য ও এমন কথা যাতে শির্ক রয়েছে, এমন কোনো কথা না থাকা)। কেননা বৈধ গান দফ বাজানোর মাধ্যমে বাসর উপলক্ষ্যে গাওয়া জায়িয। আর রুবায়ই‘ বিনতু মু‘আবিবয বর্ণিত হাদীস এটার উপর প্রমাণ করছে। আর এটা সহীহ হাদীস যা বুখারী বর্ণনা করেছেন। তাতে রয়েছে যে, বালিকারা দফ বেজে গান গাওয়া শুরু করল এবং বদরের যুদ্ধে আমাদের পিতৃপুরুষ যারা শাহাদাত বরণ করেছেন তাদের স্মরণ করতে লাগল।
সহীহুল বুখারীর অপর বর্ণনায় রয়েছে, ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) এক মহিলাকে আনসারী এক পুরুষের সঙ্গে বাসরে পাঠালেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে ‘আয়িশাহ্! তোমাদের কাছে কি কোনো গায়িকা ছিল না? কারণ আনসারীরা তো গান খুব পছন্দ করে। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৩য় খন্ড, হাঃ ১০৮৮)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিয়ের প্রচার, প্রস্তাব ও শর্তাবলী প্রসঙ্গে
৩১৫৪-[১৫] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার অধীনে এক আনসারী মেয়ে ছিল; যাকে আমি বিয়ে দিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে ’আয়িশাহ্! (বিয়েতে) তোমরা কি গীত গাইলে না? আনসারী গোত্রের লোকেরা তো গীত পছন্দ করে। (সহীহ ইবনু হিব্বান)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: كَانَتْ عِنْدِي جَارِيَةً مِنَ الْأَنْصَارِ زَوَّجْتُهَا فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَا عَائِشَةُ أَلَا تُغَنِّينَ؟ فَإِنَّ هَذَا الْحَيَّ مِنَ الْأَنْصَارِ يُحِبُّونَ الْغِنَاءَ» . رَوَاهُ ابْن حبَان فِي صَحِيحه
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিয়ের প্রচার, প্রস্তাব ও শর্তাবলী প্রসঙ্গে
৩১৫৫-[১৬] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’আয়িশাহ্ (রাঃ) তাঁর এক আত্মীয় আনসারী নারীর বিবাহ সম্পাদন করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (বাইরে থেকে) এসে বললেন, তোমরা কি মেয়েটিকে স্বামীর কাছে পাঠিয়েছ? তারা বলল, জী, হ্যাঁ। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, মেয়েটির সাথে (গীত) গাইতে পারে এমন কাউকে কি পাঠিয়েছ? তিনি বললেন, না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আনসার গোত্রের মধ্যে গীতপ্রীতি রয়েছে, তাই তোমরা যদি তার সাথে এমন কাউকে পাঠাতে যে গাইত ’’আমরা তোমাদের নিকট এসেছি, আমরা তোমাদের কাছে এসেছি; তোমাদের কল্যাণ হোক ও আমাদের কল্যাণ হোক’’। (ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَن ابْن عَبَّاس قَالَ: أنكحت عَائِشَة ذَات قَرَابَةٍ لَهَا مِنَ الْأَنْصَارِ فَجَاءَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «أَهَدَيْتُمُ الْفَتَاةَ؟» قَالُوا: نعم قَالَ: «أرسلتم مَعهَا من تغني؟» قَالَتْ: لَا فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ الْأَنْصَارَ قَوْمٌ فِيهِمْ غَزَلٌ فَلَوْ بَعَثْتُمْ مَعَهَا مَنْ يَقُولُ:
أَتَيْنَاكُمْ أَتَيْنَاكُمْ فحيانا وحياكم . رَوَاهُ ابْن مَاجَه
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিয়ের প্রচার, প্রস্তাব ও শর্তাবলী প্রসঙ্গে
৩১৫৬-[১৭] সামুরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো মেয়েকে যদি তার দু’জন ওয়ালী (অভিভাবক) বিবাহ সম্পাদন করে (যা দু’জনের অজানা অবস্থায় ভিন্ন ভিন্ন হয়), তাহলে প্রথমজনের (বিয়ে) সঠিক হবে। অনুরূপ কোনো পণ্যদ্রব্য দু’জনের নিকট বিক্রি করলে প্রথমজনের (বিক্রি) বৈধ হবে। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ, নাসায়ী, দারিমী)[1]
وَعَنْ سَمُرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «أَيُّمَا امْرَأَةٍ زَوَّجَهَا وَلِيَّانِ فَهِيَ لِلْأَوَّلِ مِنْهُمَا وَمَنْ بَاعَ بَيْعًا مِنْ رَجُلَيْنِ فَهُوَ لِلْأَوَّلِ مِنْهُمَا» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ والدارمي
ব্যাখ্যা: ইমাম তিরমিযী হাদীসটি বর্ণনা করার পর বলেন, এ হাদীসের উপরেই বিদ্বানদের ‘আমল রয়েছে। এ মর্মে তাদের মাঝে কোনো মতপার্থক্য আছে, এটা আমার জানা নেই। সুতরাং দু’জন ওয়ালী যখন আগপিছ করে এক মহিলাকে বিবাহ দিবে তখন প্রথম বিবাহ কার্যকর হবে আর দ্বিতীয়টি বাতিল হবে। আর উভয় ওয়ালী এক সঙ্গে বিবাহ দিলে উভয়টি বাতিল হয়ে যাবে। আর এটাই আস্ সাওরী, আহমাদ ও ইসহকসহ প্রমুখগণের মত। (‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২০৮৮)
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - বিয়ের প্রচার, প্রস্তাব ও শর্তাবলী প্রসঙ্গে
৩১৫৭-[১৮] ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে থেকে জিহাদে শরীক থাকতাম, তখন আমাদের সাথে স্ত্রীগণ থাকত না, তাই (কাম-উদ্দীপনা হতে হিফাযাতের উদ্দেশে) আমরা খাসী বা খোঁজা হওয়ার কথা জানালে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তা করতে আমাদেরকে নিষেধ করলেন। অতঃপর আমাদেরকে মুত্’আহ্ বিয়ের অনুমতি দিলেন। সুতরাং আমাদের মধ্যে কেউ কেউ কাপড়ের বিনিময়ে নির্ধারিত সময়ের জন্য বিয়ে করত। অতঃপর ’আব্দুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ কুরআন মাজীদের আয়াত তিলাওয়াত করলেন, অর্থাৎ- ’’হে মু’মিনগণ! আল্লাহ তা’আলা তোমাদের জন্য যে পবিত্র জিনিস হালাল করেছেন, তা তোমরা হারাম করো না’’- (সূরা আল মায়িদাহ্ ৫ : ৮৭)। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: كُنَّا نَغْزُو مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَعَنَا نِسَاءٌ فَقُلْنَا: أَلَا نَخْتَصِي؟ فَنَهَانَا عَنْ ذَلِكَ ثُمَّ رَخَّصَ لَنَا أَنْ نَسْتَمْتِعَ فَكَانَ أَحَدُنَا يَنْكِحُ الْمَرْأَةَ بِالثَّوْبِ إِلَى أَجَلٍ ثُمَّ قَرَأَ عَبْدُ اللَّهِ: (يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُحَرِّمُوا طَيِّبَاتِ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكُمْ)
ব্যাখ্যা: বিশুদ্ধ কথা হলো, মুত্‘আহ্ বিবাহ হারাম হওয়া কিংবা বৈধ হওয়ার বিষয়টা দুই বার সংঘটিত হয়েছে। এটি হালাল ছিল খায়বার যুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত। এরপর তা খায়বারের দিনে হারাম করা হয়, এরপর আবার মক্কা বিজয়ের বছরে তিনদিনের জন্য বৈধ ঘোষণা করা হয়। আর এটাই আওত্বাসের দিন ছিল, অতঃপর এটা (মুত্‘আহ্) স্থায়ীভাবে হারাম হয়ে যায় এবং কিয়ামত পর্যন্ত এটি হারাম থাকবে।
সকল ‘উলামাগণহ্ এ মর্মে একমত যে, মুত্‘আহ্ হলো নির্ধারিত সময় পর্যন্ত বিবাহ করা, এতে উক্ত মহিলার জন্য কোনো উত্তরাধিকার থাকবে না। আর এ বিবাহ নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হলেই ভঙ্গ হয়ে যাবে। ত্বলাকের কোনো প্রয়োজন নেই। আর মুত্‘আহ্ বিবাহ যে হারাম, এ মর্মে সকল ‘উলামাগণের ঐকমত্য রয়েছে। শুধু রাফিজীরা (শী‘আরা) এটাকে বৈধ মনে করে। (শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪০৪)
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - বিয়ের প্রচার, প্রস্তাব ও শর্তাবলী প্রসঙ্গে
৩১৫৮-[১৯] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুত্’আহ্ বিবাহ ইসলামের প্রথম (প্রাথমিক) যুগে ছিল। কেউ যখন কোনো অপরিচিত অবস্থায় দূরবর্তী স্থানে যেত, অতঃপর যতদিন তার ধারণায় সে স্থানে থাকবে, তত দিনের জন্য সে বিয়ে করে নিত। আর উক্ত স্ত্রীলোকটি তার আসবাবপত্র দেখাশুনা করত ও তার খাবার তৈরি করত। এভাবে যখন এ আয়াত নাযিল হলো, অর্থাৎ- ’’যারা তাদের স্ত্রীগণ ও ক্রীতদাসীগণ ব্যতীত নিজেদের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করে’’- (সূরা আল মু’মিনূন ২৩ : ৬; সূরা আল মা’আ-রিজ ৭০ : ৩০)। ইবনু ’আব্বাস বলেন, তখন এই দু’ শ্রেণীর নারীগণ ব্যতীত সকল লজ্জাস্থান হারাম হয়ে গেল। (তিরমিযী)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: إِنَّمَا كَانَتِ الْمُتْعَةُ فِي أول الْإِسْلَام كَانَ الرجل يقدم الْبَلدة لَيْسَ لَهُ بِهَا مَعْرِفَةٌ فَيَتَزَوَّجُ الْمَرْأَةَ بِقَدْرِ مَا يرى أَنَّهُ يُقِيمُ فَتَحْفَظُ لَهُ مَتَاعَهُ وَتُصْلِحُ لَهُ شَيَّهُ حَتَّى إِذَا نَزَلَتِ الْآيَةُ (إِلَّا عَلَى أَزوَاجهم أَو مَا ملكت أَيْمَانهم)
قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ: فَكُلُّ فَرْجٍ سِوَاهُمَا فَهُوَ حرَام. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ এ আয়াতে কারীমা দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা তাদের গুণ বর্ণনা করতে চেয়েছেন যে, নিশ্চয় তারা সকলেই স্ত্রী কিংবা দাসী ব্যতীত বহুগামিতা থেকে নিজেদের লজ্জাস্থানকে হিফাযাত করবে। আর মুত্‘আহ্ এটি কোনো বিবাহ নয়, কারণ সকলের ঐকমত্য রয়েছে যে, এতে কোনো মীরাস নেই। আবার এটি দাসত্বও নয়। বরং এটি নির্দিষ্ট দিনের জন্য মহিলার নিজের পারিশ্রমিক, সুতরাং এটি কোনো বিধানের আওতায় পড়বে না। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৩য় খন্ড, হাঃ ১১২২)
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - বিয়ের প্রচার, প্রস্তাব ও শর্তাবলী প্রসঙ্গে
৩১৫৯-২০] ’আমির ইবনু সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এক বিবাহে করাযাহ্ ইবনু কা’ব ও আবূ মাস্’ঊদ আল আনসারী (রাঃ) সাহাবীদ্বয়ের নিকট উপস্থিত হই। উক্ত বিবাহে কিছু মেয়ে গীত গাইছে। এটা দেখে আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর (সম্মানিত) সাহাবীদ্বয় এবং বদর যুদ্ধের মুজাহিদগণ! আপনাদের সামনে এগুলো কি করা হচ্ছে (গীত গাইছে)? তখন তাঁরা বললেন, যদি ইচ্ছা হয় আমাদের সাথে বসে শুনতে পার, অন্যথায় চলে যাও। আমাদের জন্য বিয়েতে বিনোদন, আনন্দের (গীতের) অনুমতি দিয়েছেন। (নাসায়ী)[1]
وَعَنْ عَامِرِ بْنِ سَعْدٍ قَالَ: دَخَلْتُ عَلَى قَرَظَةَ بْنِ كَعْبٍ وَأَبِي مَسْعُودٍ الْأَنْصَارِيِّ فِي عُرْسٍ وَإِذَا جِوَارٍ يُغَنِّينَ فَقُلْتُ: أَيْ صَاحِبَيْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَهْلَ بَدْرٍ يُفْعَلُ هَذَا عِنْدَكُمْ؟ فَقَالَا: اجْلِسْ إِنْ شِئْتَ فَاسْمَعْ مَعَنَا وَإِنْ شِئْتَ فَاذْهَبْ فَإِنَّهُ قَدْ رَخَّصَ لَنَا فِي اللَّهْوِ عِنْدَ الْعُرْسِ. رَوَاهُ النَّسَائِيّ
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যে নারীদেরকে বিয়ে করা হারাম
৩১৬০-[১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো নারী ও তার স্বীয় ফুফু এবং কোনো নারী ও তার স্বীয় খালাকে একত্রে বিয়ে করা যাবে না। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْمُحَرَّمَاتِ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يُجْمَعُ بَيْنَ الْمَرْأَة وعمتها وَلَا بَين الْمَرْأَة وخالتها»
ব্যাখ্যা: অপর বর্ণনায় রয়েছে, ভাতিজির উপর ফুফীকে এবং ভাগ্নির উপর খালাকে বিবাহ করা যাবে না। উল্লেখিত হাদীস ‘উলামাগণের জন্য এ মর্মে যথেষ্ট দলীল, স্ত্রী এবং তার ফুফীকে বিবাহ করা, স্ত্রী এবং তার খালাকে একত্র বিবাহ করা হারাম, চাই সেটা নিজ খালা, অর্থাৎ- বাবার বোন এবং মায়ের বোন হোক, অথবা হুকুমগত খালা ও ফুফী (অর্থাৎ- তা হলো দাদার বোন এবং দাদার বাবার বোন এবং ঊর্ধ্বতন যারা রয়েছেন, অথবা নানার বোন, নানীর মায়ের বোনসহ বাবা এবং মায়ের দিক থেকে ঊর্ধ্বতন যারা রয়েছেন তারা সকলেই হুকুমগত খালা ও ফুফীর অন্তর্ভুক্ত) হোক না কেন, এ সকলকে বিবাহের মাধ্যমে একত্র করা সর্বসম্মতিক্রমে হারাম। তবে খারিজী ও শী‘আদের একদল, যারা মনে করে এটি বৈধ। (শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪০৮)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যে নারীদেরকে বিয়ে করা হারাম
৩১৬১-[২] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বংশগত (রক্ত সম্পর্কের) কারণে ও দুধপান সম্পর্কের ভিত্তিতে সকল ক্ষেত্রে বিবাহ হারাম। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْمُحَرَّمَاتِ
وَعَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَحْرُمُ مِنَ الرَّضَاعَةِ مَا يحرم من الْولادَة» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যে নারীদেরকে বিয়ে করা হারাম
৩১৬২-[৩] উক্ত রাবী [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমার দুধ-চাচা এসে আমার সাথে সাক্ষাতের অনুমতি চাইলে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত অনুমতি দিতে অস্বীকার করলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসলে আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম। উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, সে তো তোমার চাচা, তাকে অনুমতি দাও। ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! (আমি তো জানি) আমাকে নারী দুধপান করিয়েছে, পুরুষে তো পান করায়নি। প্রত্যুত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন যে, তোমার চাচা (আপন চাচার মতো) সে তোমার কাছে আসতেই পারে। (’আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেন) এ ঘটনা আমাদের ওপর পর্দার বিধান অবতীর্ণ হওয়ার পরে সংঘটিত হয়েছে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْمُحَرَّمَاتِ
وَعَنْهَا قَالَتْ: جَاءَ عَمِّي مِنَ الرَّضَاعَةِ فَاسْتَأْذَنَ عَلَيَّ فَأَبَيْتُ أَنْ آذَنَ لَهُ حَتَّى أَسْأَلَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَجَاءَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَسَأَلْتُهُ فَقَالَ: «أَنَّهُ عَمُّكِ فَأْذَنِي لَهُ» قَالَت: فَقلت: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّمَا أَرْضَعَتْنِي الْمَرْأَةُ وَلَمْ يرضعني الرَّجُلُ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّه عمك فليلج عَلَيْك» وَذَلِكَ بَعْدَمَا ضرب علينا الْحجاب
ব্যাখ্যা: বংশীয় সূত্রে মহিলাদের সাথে পুরুষের সাক্ষাতের কিংবা অন্যান্য ক্ষেত্রে যে হুকুম প্রযোজ্য, দুধপান সূত্রেও সকল ক্ষেত্রে সে হুকুমই প্রযোজ্য। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫২৩৯)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যে নারীদেরকে বিয়ে করা হারাম
৩১৬৩-[৪] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললাম) হে আল্লাহর রসূল! আপনি কি আপনার চাচা হামযাহ্’র মেয়েকে বিয়ে করতে আগ্রহী হন না? কেননা, সে তো কুরায়শ যুবতীদের মধ্যে সুন্দরী রমণী। তদুত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তুমি কি জানো না যে, হামযাহ্ আমার দুধ-ভাই? আল্লাহ তা’আলা বংশগত (রক্ত সম্পর্কের) কারণে যা হারাম করেছেন, দুগ্ধপান করার কারণেও তা হারাম করেছেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْمُحَرَّمَاتِ
وَعَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ هَلْ لَكَ فِي بِنْتِ عَمِّكَ حَمْزَةَ؟ فَإِنَّهَا أَجْمَلُ فَتَاةٍ فِي قُرَيْشٍ فَقَالَ لَهُ: «أَمَا عَلِمْتَ أَنَّ حَمْزَةَ أَخِي مَنِ الرَّضَاعَةِ؟ وَأَنَّ اللَّهَ حَرَّمَ مِنَ الرَّضَاعَةِ مَا حرم من النّسَب؟» . رَوَاهُ مُسلم
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যে নারীদেরকে বিয়ে করা হারাম
৩১৬৪-[৫] উম্মুল ফাযল (রাঃ) (’আব্বাস (রাঃ)-এর স্ত্রী) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একবার বা দু’বারের দুধপানে হারাম হয় না।[1]
بَابُ الْمُحَرَّمَاتِ
وَعَنْ أُمِّ الْفَضْلِ قَالَتْ: أَنَّ نَبِيَّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا تُحَرِّمُ الرضعة أَو الرضعتان»
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যে নারীদেরকে বিয়ে করা হারাম
৩১৬৫-[৬] আর ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর বর্ণনায় রয়েছে, (তিনি বলেন) একবার বা দু’বার চোষণে হারাম হয় না।[1]
بَابُ الْمُحَرَّمَاتِ
وَفِي رِوَايَةِ عَائِشَةَ قَالَ: «لَا تُحَرِّمُ الْمَصَّةُ والمصتان»
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যে নারীদেরকে বিয়ে করা হারাম
৩১৬৬-[৭] উম্মুল ফাযল (রাঃ)-এর অপর বর্ণনায় আছে, (তিনি বলেন) একবার বা দু’বার (দুধপানের জন্য) মুখে (স্তনে) প্রবেশ করানোর ফলে হারাম হয় না। (উপরোক্ত তিনটি হাদীস ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন)[1]
بَابُ الْمُحَرَّمَاتِ
وَفِي أُخْرَى لِأُمِّ الْفَضْلِ قَالَ: «لَا تُحَرِّمُ الإملاجة والإملاجتان» . هَذِه رِوَايَات لمُسلم
ব্যাখ্যা: এক বর্ণনায় রয়েছে, লোকটি বলল, ইয়া রসূল্লাল্লাহ! এক ঢোক দুধ পান করলেই কি হারাম হয়ে যাবে? তিনি বললেন, না। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর অপর বর্ণনায় রয়েছে, এ ব্যাপারে কুরআন নাযিল হয়েছে তাতে ১০ ঢোক পান করলে দুধ মা সাব্যস্ত হবে, এর পরবর্তীতে ৫ ঢোক মানসূখ করা হয়। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইনতিকাল করলেন, এ ব্যাপারে এমনই ছিল। (শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪৫১)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যে নারীদেরকে বিয়ে করা হারাম
৩১৬৭-[৮] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কুরআন মাজীদে (প্রথমে) নাযিল হয়েছিল, (وَأُمَّهَاتُكُمُ اللَّاتِىْ أَرْضَعْنَكُمْ) অর্থাৎ- ’’এবং তোমাদের মাতাগণ যারা তোমাদেরকে দুগ্ধপান করিয়েছেন’’- (সূরা আন্ নিসা ৪ : ২৩) এ আয়াতের শেষাংশে] عَشْرُ رَضَعَاتٍ مَعْلُومَاتٍ ’’নিশ্চিত জানা যায় দশবার’’ দুগ্ধপানে হারাম করে, পরে خَمْسٍ مَعْلُومَاتٍ ’’নিশ্চিত জানা যায় পাঁচবার’’-এর দ্বারা তা মানসূখ (রহিত) হয়ে যায়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করেন। অথচ (সাহাবীরা) এটা কুরআনে পড়ত। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْمُحَرَّمَاتِ
وَعَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: كَانَ فِيمَا أُنْزِلَ مِنَ الْقُرْآنِ: «عَشْرُ رَضَعَاتٍ مَعْلُومَاتٍ يُحَرِّمْنَ» . ثُمَّ نُسِخْنَ بِخَمْسٍ مَعْلُومَاتٍ فَتُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهِيَ فِيمَا يُقْرَأُ مِنَ الْقُرْآنِ. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: মানসূখ তিন প্রকার- (১) হুকুম ও তিলাওয়াত উভয় মানসূখ, যেমন ১০ ঢোক দুধ পান করার আয়াত। (২) তিলাওয়াত মানসূখ, তবে হুকুম বলবৎ রয়েছে। যেমন পাঁচ ঢোক দুধ পান করানোর আয়াত। (৩) হুকুম মানসূখ তিলাওয়াত বলবৎ রয়েছে, যেমন- ‘‘তোমাদের মধ্যে যারা মারা যাবে এবং স্ত্রী রেখে যাবে, তারা যেন তাদের স্ত্রীদের ঘর থেকে বের না করে, তাদের এক বছরের ভরণ-পোষণের ওয়াসিয়্যাত করে।’’ (সূরা আল বাকারা ২ : ২৪৩)
কতটুকু পরিমাণ দুধ পান করলে দুধ মা সাব্যস্ত হবে, এ ব্যাপারে ‘উলামাগণের মাঝে ইখতিলাফ রয়েছে। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) এবং ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ) ও তার অনুসারীদের মতে পাঁচ ঢোকের কমে দুধমা সাব্যস্ত হবে না। জুমহূর ‘উলামাগণের মতে ১ ঢোক পান করলেই দুধ মা সাব্যস্ত হবে। এ বর্ণনায় রয়েছে ইবনুল মুনযির, ‘আলী, ইবনু মাস্‘ঊদ, ইবনু ‘উমার, ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ), ‘আত্বা, তাঊস ইবনুল মুসাইয়্যাব, হাসান, মাকহূল, যুহরী, কাতাদাহ (রহঃ) প্রমুখগণ থেকে।
আবূ সূর, আবূ ‘উবায়দ, ইবনুল মুনযির ও দাঊদ (রহঃ)-এর মতে তিন ঢোকের কম দুধ পান করলে দুধ মা সাব্যস্ত হবে না। ইমাম শাফি‘ঈ ও তার অনুসারীগণ দলীল গ্রহণ করেছেন ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) পাঁচ ঢোক দুধ পান করানো হাদীস দ্বারা। ইমাম মালিক (রহঃ) কুরআনুল মাজীদে এ আয়াত, ‘‘তোমাদের মা যারা তোমাদের দুধ পান করিয়েছেন’’- (সূরা আন্ নিসা ৪ : ২৩)। তার মতে নির্ধারিত কোনো সংখ্যা (ঢোকের সংখ্যা) নেই। দাঊদ ও তার সহযোগীরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস এক ঢোক বা দু’ঢোকে দুধ মা সাব্যস্ত হবে না, এ হাদীস থেকে দলীল গ্রহণ করেছেন। (শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪৫২)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যে নারীদেরকে বিয়ে করা হারাম
৩১৬৮-[৯] উক্ত রাবী [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে প্রবেশ করে (অপরিচিত) একজন পুরুষকে দেখতে পেয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করলেন। আমি বললাম, সে তো আমার (দুধ) ভাই। প্রত্যুত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, (শারী’আতের বিধানে দেখ) কারা তোমার দুধ ভাই? কেননা, দুধের বিধান দুধপানের ক্ষুধার তাড়নায় দুধ পান করলে (অর্থাৎ- দুধপানের বয়সের মধ্যে দুধপান করলে বিয়ে হারাম হয় ও পর্দার শিথিলতা থাকে, কিন্তু ঐ বয়সের পরে পান করলে তা নাজায়িয)। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْمُحَرَّمَاتِ
وَعَنْهَا: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دَخَلَ عَلَيْهَا وَعِنْدَهَا رَجُلٌ فَكَأَنَّهُ كَرِهَ ذَلِكَ فَقَالَت: إِنَّه أخي فَقَالَ: «انظرن من إخوانكن؟ فَإِنَّمَا الرضَاعَة من المجاعة»
ব্যাখ্যা: শারী‘আতে দুধ মা সাব্যস্ত হওয়াটা নির্ভর করে, শিশুর ক্ষুধা নিবারণের উপর। আর এটা শিশুকাল ছাড়া হওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং প্রমাণিত হয় বড়দের ক্ষেত্রে দুধ পান করলেও এর কোনো প্রভাব পড়বে না, অর্থাৎ- দুধ মা সাব্যস্ত হবে না। কারণ দুধ পানে তার ক্ষুধা নিবারণ হবে না এবং রুটি বা অন্য কোনো উঠানো খাবার ছাড়া সে পরিতৃপ্তও হবে না। সুতরাং বড় কোনো ছেলেকে কোনো মহিলা দুধ পান করালেও সে দুধ মা হিসেবে পরিগণিত হবে না। শারহেস্ সুন্নাহতেও অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে। অন্যদিকে একজন ধাত্রী কত দিন দুধ পান করাবেন- এ মর্মে ইখতিলাফ রয়েছে। একদল ‘উলামাগণের মত হলো, পূর্ণ দুই বছর।
দলীলঃ ‘‘ধাত্রীগণ তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দুই বছর দুধ পান করাবেন’’- (সূরা আল বাকারা ২ : ২৩৩)। সুতরাং দু’ বছর পূর্ণ হলে দুধ পান করানোর হুকুম আর থাকবে না। ইবনু মাস্‘ঊদ, আবূ হুরায়রাহ্, উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) অনুরূপ বলেছেন, ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ) অনুরূপ বলেছেন। ইমাম মালিক (রহঃ) দুই বছরের বেশী পান করানোর কথা বলেছেন। ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-এর মতে দুধপানের সময়সীমা ৩০ মাস। তার দলীল তাকে গর্ভধারণ করতে ও স্তন্য ছাড়াতে সময় লাগে ৩০ মাস। (ফাতহুল বারী ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬৪৭; শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪৫৫; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যে নারীদেরকে বিয়ে করা হারাম
৩১৬৯-[১০] ’উকবা ইবনুল হারিস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি আবূ ইহাব ইবনু ’আযীয -এর কন্যাকে বিয়ে করেন। অতঃপর জনৈকা মহিলা এসে বলল, আমি ’উকবা এবং তার স্ত্রীকে দুধপান করিয়েছি (তাদের বিবাহ কি বৈধ?)। ’উকবা উক্ত মহিলাটিকে বললেন, আপনি যে আমাকে দুধ পান করিয়েছেন (আমি জানি না) এবং তা কক্ষনো আমাকে বলেননি। অতঃপর তিনি (’উকবা ইবনুল হারিস) তার স্ত্রীর পরিবারের নিকট লোক পাঠিয়ে জানতে চাইলেন, উত্তরে তারা বলল যে, ঐ মহিলাটি যে আমাদের কন্যাকে দুধ পান করিয়েছে, তা আমরাও জানি না। অতঃপর ’উকবা মদীনায় এসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হয়ে জানতে চাইলেন। উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা কিভাবে দাম্পত্য জীবন যাপন করবে, যেহেতু একটি কথা (দুধপানের ব্যাপারে) উঠেছে? এটা শুনে ’উকবা তার স্ত্রীকে ত্যাগ করলেন (তালাক দিলেন) এবং ঐ স্ত্রী অন্যত্র অন্য পুরুষের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলো। (বুখারী)[1]
بَابُ الْمُحَرَّمَاتِ
وَعَنْ عُقْبَةَ بْنِ الْحَارِثِ: أَنَّهُ تَزَوَّجَ ابْنَةً لِأَبِي إِهَابِ بْنِ عَزِيزٍ فَأَتَتِ امْرَأَةٌ فَقَالَتْ: قَدْ أَرْضَعْتُ عُقْبَةَ وَالَّتِي تَزَوَّجَ بِهَا فَقَالَ لَهَا عُقْبَةُ: مَا أَعْلَمُ أَنَّكِ قَدْ أَرْضَعْتِنِي وَلَا أَخْبَرْتِنِي فَأَرْسَلَ إِلَى آلِ أَبِي إِهَابٍ فَسَأَلَهُمْ فَقَالُوا: مَا عَلِمْنَا أَرْضَعْتَ صَاحِبَتُنَا فَرَكِبَ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالْمَدِينَةِ فَسَأَلَهُ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «كَيْفَ وَقَدْ قِيلَ؟» فَفَارَقَهَا عُقْبَةُ وَنَكَحَتْ زوجا غَيره. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: এখানে উদ্দেশ্য হলো, আগন্তুক মহিলা দুধ পান করানোর বিষয়টি নিশ্চিত করছে আর ‘উকবা তা অস্বীকার করছেন, অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত মহিলার কথার উপর ভিত্তি করে তাকে (‘উকবা ) তার স্ত্রীকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। তিনি যা বললেন তা আবশ্যকীয় হতে পারে অথবা তাকওয়ার ভিত্তিতে তা (এমন পরিস্থিতিতে স্ত্রী আলাদা করে দেয়া) বৈধ হতে পারে। সঠিক বিষয় আল্লাহই ভালো জানেন। (ফাতহুল বারী ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬৪০)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যে নারীদেরকে বিয়ে করা হারাম
৩১৭০-[১১] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুনায়ন যুদ্ধের সময় আওত্বাস-এর (ত্বায়িফ-এর সন্নিকটবর্তী এলাকার) দিকে একটি সেনাবাহিনী পাঠালেন। তারা শত্রুর ওপর জয়লাভ করেন এবং কিছুসংখ্যক নারী তাদের হস্তগত হয় (যা গনীমাত হিসেবে পরবর্তীতে দাসীতে রূপান্তরিত হয়)। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো কোনো সাহাবী অধিকৃত নারীদের মুশরিক স্বামীর থাকার কারণে তাদের সাথে সহবাস করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। (যেহেতু তাদের মুশরিক স্বামীগণ পরাজিত ও পলাতক শত্রুদের মধ্যে জীবিত রয়েছে)। অতঃপর এ সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা আয়াত নাযিল করলেন, অর্থাৎ- ’’এবং (নারীর মধ্যে) তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসী ব্যতীত সকল সধবা নিষিদ্ধ’’- (সূরা আন্ নিসা ৪ : ২৪)। (রাবী বলেন) অতঃপর ঐ সমস্ত দাসী তোমাদের জন্য হালাল যখন তাদের ’ইদ্দত (এক ঋতু) পূর্ণ হলো। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْمُحَرَّمَاتِ
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيُّ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ حُنَيْنٍ بَعَثَ جَيْشًا إِلَى أَوْطَاسٍ فَلَقُوا عَدُوًّا فَقَاتَلُوهُمْ فَظَهَرُوا عَلَيْهِمْ وَأَصَابُوا لَهُمْ سَبَايَا فَكَأَنَّ نَاسًا مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَحَرَّجُوا مِنْ غِشْيَانِهِنَّ مِنْ أَجْلِ أَزْوَاجِهِنَّ مِنَ الْمُشْرِكِينَ فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى فِي ذَلِكَ (وَالْمُحْصَنَاتُ مِنَ النِّسَاء إِلَّا مَا ملكت أَيْمَانكُم)
أَيْ فَهُنَّ لَهُمْ حَلَالٌ إِذَا انْقَضَتْ عِدَّتُهُنَّ. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: এখানে উল্লেখিত এ আয়াতে مُحْصَنَاتُ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো বিবাহিতা নারীগণ। এর অর্থ হলো, বিবাহিতা স্ত্রীগণ তাদের স্বামী ছাড়া অন্যদের ওপর হারাম। কিন্তু যে সকল নারীরা যুদ্ধবন্দী হয়ে তোমাদের অধিনস্থ হবে, তাদের পরবর্তী মুশরিক স্বামীর সাথে বিবাহ বন্ধন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। আর তারা পবিত্র হওয়ার পর তোমাদের জন্য তাদের ব্যবহার করা হালাল। এ হাদীসে উল্লেখিত তাদের ‘ইদ্দত শেষ হওয়া দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, তারা যদি গর্ভবর্তী হয় তাহলে সন্তানপ্রসব করা, নতুবা এক হায়িয অতিবাহিত করার মাধ্যমে পবিত্র হওয়া। যেমন একাধিক বিশুদ্ধ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। (শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪৫৬)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যে নারীদেরকে বিয়ে করা হারাম
৩১৭১-[১২] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো পুরুষের পক্ষে বিবাহ করতে নিষেধ করেছেন- কোনো রমণীকে তার ফুফুর সাথে, ফুফুকে তার ভাইয়ের মেয়ের সাথে, ভাইয়ের মেয়েকে তার ফুফুর সাথে, খালাকে তার বোনের মেয়ের সাথে অথবা বোনের মেয়েকে তার খালার সাথে; এমনিভাবে ছোট বোনকে বড় বোনের সাথে, বড় বোনকে ছোট বোনের সাথে। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ, দারিমী; নাসায়ী শেষ বাক্যটি বর্ণনা করেছেন ’’বোনের মেয়ে’’ পর্যন্ত)[1]
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى أَنْ تُنْكَحَ الْمَرْأَةُ عَلَى عَمَّتِهَا أَوِ الْعَمَّةُ عَلَى بِنْتِ أَخِيهَا وَالْمَرْأَةُ عَلَى خَالَتِهَا أَوِ الْخَالَةُ عَلَى بِنْتِ أُخْتِهَا لَا تُنْكَحُ الصُّغْرَى عَلَى الْكُبْرَى وَلَا الْكُبْرَى عَلَى الصُّغْرَى. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ والدارمي وَالنَّسَائِيّ وَرِوَايَته إِلَى قَوْله: بنت أُخْتهَا
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা খত্ত্বাবী (রহঃ) বলেনঃ এমনটা হলে (অর্থাৎ- ভাতিজি বা ভাগ্নির স্ত্রীত্বের উপর তার খালা কিংবা ফুফীকে বিবাহ করা) উভয়ের মাঝে কতটুকু শত্রুতা সৃষ্টি হওয়ার আশংকা আছে এটা আল্লাহ তা‘আলাই ভালো জানেন। কেননা উভয়েই স্বামীর সমান অংশীদার। এর ফলে উভয়ের মাঝে ঝগড়া-বিবাদ লেগে যাবে। আর এর ফলশ্রুতিতে আত্মীয়তার সম্পর্কও ছিন্ন হয়ে যাবে। এ অর্থেই দুই সহোদর দাসীকেও সহবাসের ক্ষেত্রে একত্র করা হারাম। অর্থাৎ কোনো মহিলার সাথে তার মুনীব সহবাস করলে তার দাসত্ব থাকা উক্ত মহিলার বোনের সঙ্গে একই মুনীবের সহবাস করা হারাম। এটাই অধিকাংশ ‘উলামাগণের কথা। এর উপর ক্বিয়াস করে বলা যায় যে, দাসীর সাথে তার ফুফী কিংবা খালাকে সহবাসের ক্ষেত্রে একত্র করা যাবে না। অন্যদিকে খারিজীরা দু’বোনকে একত্র বিবাহ করা, স্ত্রী খালা কিংবা ফুফুকে বিবাহ করা ঐচ্ছিক মনে করে। তবে তাদের এ ভিন্নমত গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা তারা তো দীন থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২০৬৫; তুহফাতুল আহওয়াযী ৩য় খন্ড, হাঃ ১১২৬)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যে নারীদেরকে বিয়ে করা হারাম
৩১৭২-[১৩] বারা ইবনু ’আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমার মামা আবূ বুরদাহ্ ইবনু নায়ার -কে পতাকা হাতে নিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় যাচ্ছেন? উত্তরে বললেন, এক লোক তার পিতার (কোন) স্ত্রীকে বিয়ে করেছে, তার মাথা কাটার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে পাঠিয়েছেন। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
আবূ দাঊদ, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ ও দারিমীর অপর বর্ণনায় আছে যে, আমাকে তার গর্দান কাটতে (হত্যা করার) এবং ধন-সম্পদ ছিনিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এ বর্ণনায় ’মামার’ শব্দের স্থলে ’চাচার’ উল্লেখ আছে।
وَعَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ قَالَ: مَرَّ بِي خَالِي أَبُو بردة بن دِينَار وَمَعَهُ لِوَاءٌ فَقُلْتُ: أَيْنَ تَذْهَبُ؟ قَالَ: بَعَثَنِي النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى رَجُلٍ تَزَوَّجَ امْرَأَةَ أَبِيهِ آتِيهِ بِرَأْسِهِ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা সিনদী (রহঃ) বলেনঃ জাহিলী জামানায় ছেলে তার বাবার স্ত্রীকে (সৎমা) বিবাহ করত। তারা তাদের বাবাদের স্ত্রী (সৎ মাদের) বিবাহ করত পৈত্রিক সম্পদ পাবার জন্য। এজন্য আল্লাহ তা‘আলা সুনির্দিষ্টভাবে তা হারাম করলেন। তোমরা তাদেরকে বিবাহ করো না, যাদেরকে তোমাদের পিতাগণ বিবাহ করেছিল। এ হাদীস থেকে এ মর্মে দলীল পাওয়া যায় যে, কোনো ব্যক্তি যদি শারী‘আতের অকাট্য কোনো বিধানের বিপরীত কাজ করে তবে ইমাম বা নেতা তাকে হত্যার নির্দেশ দিতে পারবেন। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪৪৪৭)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যে নারীদেরকে বিয়ে করা হারাম
৩১৭৩-[১৪] উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দুগ্ধপান ততক্ষণ পর্যন্ত হারাম হয় যখন দুগ্ধপান পাকস্থলীতে প্রবেশ করে এবং যে দুধ ছাড়ানোর পূর্বে পান করা হয়। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ أُمِّ سَلَمَةَ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يُحَرِّمُ مِنَ الرِّضَاعِ إِلَّا مَا فَتَقَ الْأَمْعَاءَ فِي الثَّدْيِ وَكَانَ قبل الْفِطَام» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: ‘আবদুল্লাহ বিন মাস্‘ঊদ (রাঃ)-এর বর্ণনায় রয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ দুধ পান করার কারণে গোশত ও হাড়ের বৃদ্ধি না ঘটলে দুধ মা সাব্যস্ত হবে না। ইমাম তিরমিযী (রহঃ)-এর বক্তব্যঃ অধিকাংশ ‘উলামাগণের এ কথার উপরই ‘আমল রয়েছে যে, দুই বছরের কম বয়সী ছাড়া দুধ পান করলে উক্ত মহিলা তার দুধ মা সাব্যস্ত হবে না। এটাই ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-এর কথা। ইমাম মুহাম্মাদ (রহঃ) তার মুয়াত্ত্বায় বলেছেনঃ দু’ বছরের কম বয়সী ছাড়া দুধ সন্তান সাব্যস্ত হবে না। আর দু’ বছরের কম বয়সে যদি কোনো শিশু এক ঢোক পরিমাণও পান করে তবে উক্ত মহিলা তার জন্য দুধ মা সাব্যস্ত হবে। যেমন ‘আবদুল্লাহ বিন ‘আব্বাস, সা‘ঈদ বিন মুসাইয়্যাব ও ‘উরওয়াহ্ ইবনুয্ যুবায়র (রহঃ) বলেনঃ দু’ বছর অতিক্রম হওয়ার পর দুধ পান করলে কোনো কিছুই হারাম হবে না। কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেছেনঃ ‘‘মাতাগণ তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দু’ বছর দুধ পান করাবেন। এটা তাঁর জন্য যিনি স্তন্য পান কাল পূর্ণ করতে চান’’- (সূরা আল বাকারা ২ : ২৩৩)। সুতরাং দুধ পানের পূর্ণ সময় হলো দুই বছর, আর এ সময়সীমা পার হলে কোনো কিছু হারাম হবে না। অর্থাৎ- দুধ দানকারী দুধ পানকারীর দুধ মা সাব্যস্ত হবে না। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১১৫২)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যে নারীদেরকে বিয়ে করা হারাম
৩১৭৪-[১৫] হাজ্জাজ ইবনু হাজ্জাজ আল আসলামী তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলেন) হে আল্লাহর রসূল! কিভাবে আমি দুধপানের হক আদায় করতে পারি? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, একটি (উত্তম) দাস বা দাসী মুক্ত করলে। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ, নাসায়ী, দারিমী)[1]
وَعَنْ حَجَّاجِ بْنِ حَجَّاجٍ الْأَسْلَمِيِّ عَنْ أَبِيهِ أَنَّهُ قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا يُذْهِبُ عَنِّي مَذَمَّةَ الرِّضَاعِ؟ فَقَالَ: غُرَّةٌ: عَبْدٌ أَوْ أَمَةٌ . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ وَالدَّارِمِيُّ
ব্যাখ্যা: এখানে (مَذَمَّةَ الرِّضَاعِ) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ধাত্রীর আবশ্যকীয় হক বা অধিকার। মনে হয় জিজ্ঞাসাকারীর জিজ্ঞেস ছিল যে, এমনকি কোনো হক আছে যা আদায় করলে ধাত্রীর হক আদায় হয়ে যাবে। আর তারা এটা ভালোবাসত যে, ধাত্রীকে শিশুর দুধ পান শেষ হলে তার সমপরিমাণ পারিশ্রমিক দিতে। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১১৫৩)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যে নারীদেরকে বিয়ে করা হারাম
৩১৭৫-[১৬] আবূ তুফায়ল আল গানবী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট বসেছিলাম এমন সময় এক মহিলা আসলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় (শরীরের) চাদর বিছিয়ে দিলেন, উক্ত মহিলা তার উপর বসলেন। যখন সে চলে গেলেন, তখন (সাহাবীগণের) কেউ বলল, এ মহিলা তো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দুধপান করিয়েছেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي الطُّفَيْلِ الْغَنَوِيِّ قَالَ: كُنْتُ جَالِسًا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذْ أَقْبَلَتِ امْرَأَةٌ فَبَسَطَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رِدَاءَهُ حَتَّى قَعَدَتْ عَلَيْهِ فَلَمَّا ذَهَبَتْ قِيلَ هَذِهِ أَرْضَعَتِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যাঃ জি’রানী হলো, মক্কার নিকটবর্তী একটি পরিচিত জায়গার নাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে হুনায়ন যুদ্ধের গনীমাত বণ্টনের জন্য ১০ দিনের বেশী সময় অবস্থান করছিলেন।
আল হাফিয (রহঃ) বলেনঃ হালিমাতুস্ সা‘দিয়্যাহ্ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দুধ মা ছিলেন। তিনি আবূ যুআয়ব-এর কন্যা ছিলেন। তার নাম ‘আব্দুল্লাহ বিন হারিস বিন সা‘দ বিন বাকর বিন হাওযান। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫১৩৫; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যে নারীদেরকে বিয়ে করা হারাম
৩১৭৬-[১৭] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, গয়লান ইবনু সালামাহ্ আস্ সাকাফী (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁর সাথে জাহিলিয়্যাত যুগে বিবাহিতা ১০ জন স্ত্রীও মুসলিম হলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, তুমি চারজন স্ত্রীকে রেখে বাকি সবাইকে ছেড়ে (পৃথক করে) দাও। (আহমাদ, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ غيلَان بن سَلمَة الثَّقَفِيَّ أَسْلَمَ وَلَهُ عَشْرُ نِسْوَةٍ فِي الْجَاهِلِيَّةِ فَأَسْلَمْنَ مَعَهُ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَمْسِكْ أَرْبَعًا وَفَارِقْ سَائِرَهُنَّ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيّ وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: ইমাম মুহাম্মাদ (রহঃ) তার মুয়াত্ত্বাতে উল্লেখ করেছেন, এ হাদীস থেকে এটাই গ্রহণ করতে পারি যে, তাদের মধ্যে যে কোনো চারজন স্ত্রী গ্রহণ করে অবশিষ্ট একজনকে আলাদা করে দেয়া যাবে। অন্যদিকে ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) বলেছেনঃ প্রথম চারজন স্ত্রীকে গ্রহণ করতে হবে আর অবশিষ্ট সকল স্ত্রীর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাবে। ইব্রাহীম নাখ‘ঈ (রহঃ) অনুরূপ কথা বলেছেন। ইবনুল হুমাম (রহঃ)-এর মতে ইমাম মুহাম্মাদের কথাই অগ্রগণ্য। আর হিদায়াহ্ গ্রন্থে রয়েছে এর বেশী (চারটির বেশী) বিবাহ করা বৈধ নয়। ইবনুল হুমাম (রহঃ) বলেনঃ এর উপর চার ইমাম সহ সকল মুসলিমের ঐকমত্য রয়েছে। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৩য় খন্ড, হাঃ ১১২৮; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যে নারীদেরকে বিয়ে করা হারাম
৩১৭৭-[১৮] নাওফাল ইবনু মু’আবিয়াহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি যখন ইসলাম গ্রহণ করি, তখন আমার ৫ জন স্ত্রী ছিল- এ ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, একজনকে পৃথক করে দাও এবং ৪ জনকে রাখ (বা রাখতে পার)। অতঃপর আমি অধিককাল (সর্বপ্রথমা) আমার সাহযর্যে ৬০ বছর যাবৎ বন্ধ্যা অবস্থায় কাটিয়েছে, তাকেই বিদায় করার ইচ্ছা করে বিদায় করলাম। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
وَعَنْ نَوْفَلِ بْنِ مُعَاوِيَةَ قَالَ: أَسْلَمْتُ وَتَحْتِي خَمْسُ نِسْوَةٍ فَسَأَلْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «فَارِقْ وَاحِدَةً وَأَمْسِكْ أَرْبَعًا» فَعَمَدْتُ إِلَى أَقْدَمِهِنَّ صُحْبَةً عِنْدِي: عَاقِرٍ مُنْذُ سِتِّينَ سنة ففارقتها. رَوَاهُ فِي شرح السّنة
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যে নারীদেরকে বিয়ে করা হারাম
৩১৭৮-[১৯] যহহাক ইবনু ফায়রূয্ আদ্ দায়লামী (রহঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমি মুসলিম হয়েছি, কিন্তু আমার অধীনে দু’ স্ত্রী পরস্পর দু’ বোন। উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তাদের মধ্যে কোনো একজনকে পছন্দ কর (রাখতে পার)। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنِ الضَّحَّاكِ بْنِ فَيْرُوزٍ الدَّيْلَمِيِّ عَنْ أَبِيهِ قَالَ: قَلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي أَسْلَمْتُ وتحتي أختَان قَالَ: «اختر أيتها شِئْتَ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ
ব্যাখ্যা: ইমাম শাফি‘ঈ, মালিক ও আহমাদ (রহঃ)-এর মতে কোনো পুরুষ যদি ইসলাম কবুল করে এবং তার অধীনে যদি দু’বোন স্ত্রী হিসেবে থাকে আর উভয় যদি তার সাথে ইসলাম কবুল করে। তবে দুই স্ত্রীর যে কোনো একজনকে রেখে অপরজনকে বিচ্ছেদ করে দিতে হবে। মিরকাতুল মাফাতীহে অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে। ‘আল্লামা খত্ত্বাবী (রহঃ) বলেনঃ এ হাদীসে দলীল রয়েছে যে, দু’জন স্ত্রীর একজনকে পছন্দ করলেই অন্যটির সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ হবে না, তালাক না দেয়া পর্যন্ত। (‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২২৪০)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যে নারীদেরকে বিয়ে করা হারাম
৩১৭৯-[২০] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈকা নারী মুসলিম হয়ে (নতুন) বিবাহ করে। অতঃপর তার (পূর্ব) স্বামী এসে বলল, হে আল্লাহর রসূল! আমিও মুসলিম হয়েছি এবং সে (স্ত্রী) আমার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ জানে। এটা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত নারীকে তার নবাগত স্বামী হতে বিচ্ছিন্ন করে পূর্ববর্তী স্বামীর কাছে অর্পিত করলেন।
অপর বর্ণনায় আছে, সে (স্বামী) বলল, আমরা একসাথেই মুসলিম হয়েছি, এতে স্ত্রীকে তার (পূর্বের স্বামীর) নিকট ফিরিয়ে দিলেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: أَسْلَمَتِ امْرَأَةٌ فَتَزَوَّجَتْ فَجَاءَ زَوْجُهَا إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي قَدْ أَسْلَمْتُ وَعَلِمَتْ بِإِسْلَامِي فَانْتَزَعَهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ زَوْجِهَا الْآخَرِ وَرَدَّهَا إِلَى زَوْجِهَا الْأَوَّلِ وَفِي رِوَايَةٍ: أَنَّهُ قَالَ: إِنَّهَا أَسْلَمَتْ مَعِي فَرَدَّهَا عَلَيْهِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসটি এ মর্মে দলীল, যখন স্বামী ইসলাম কবুল করবে আর স্ত্রী যদি তার স্বামীর ইসলাম কবুল সম্পর্কে অবগত হয় তবু বিবাহ অটুট থাকবে। যদি স্ত্রী অন্য কারো সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় তবে তা বাতিল হয়ে যাবে এবং বাধ্যতামূলকভাবে তাকে পূর্ব স্বামীর কাছেই যেতে হবে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২২৩৬)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যে নারীদেরকে বিয়ে করা হারাম
৩১৮০-[২১] শারহুস্ সুন্নাহ্-তে বর্ণিত আছে, স্বামী-স্ত্রীর একসাথে মুসলিম হওয়ায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু সংখ্যক স্ত্রীলোকের তাদের পূর্ব স্বামীগণের নিকট ফিরিয়ে দিলেন, যদিও ধর্ম ও অবস্থানগত দিক দিয়ে পার্থক্য দেখা দিল। তন্মধ্যে একজন হলো ওয়ালীদ ইবনু মুগীরাহ্-এর কন্যা ও সফ্ওয়ান ইবনু উমাইয়্যাহ্’র স্ত্রী যারা মক্কা বিজয়ের দিন ইসলাম গ্রহণ করে এবং তাদের স্বামী ইসলাম কবূলের ভয়ে পালিয়ে যায়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফ্ওয়ান-কে নিরাপত্তাদানের উদ্দেশে স্বীয় চাদর দিয়ে তার চাচাতো ভাই ওয়াহ্ব ইবনু ’উমায়র-কে তার নিকট পাঠালেন। যখন সফ্ওয়ান ফিরে আসলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে চারমাস অবাধে ঘুরে বেড়াবার অবকাশ দিলেন (এজন্য যে, মুসলিমদের সাথে চলাফেরায় তাদের ’আমল-আখলাকের সৌন্দর্য দেখে ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হয়)। অবশেষে সে মুসলিম হয় এবং তার স্ত্রী তার নিকটেই থেকে যায়। অপর একজন হলো ’ইকরিমাহ্ ইবনু আবূ জাহাল-এর স্ত্রী হারিস বিনতু হাকীম মক্কা বিজয়ের দিনে ইসলাম গ্রহণের ভয়ে পালিয়ে ইয়ামানে চলে যায়। তার স্ত্রী উম্মু হাকীম স্বামীর উদ্দেশে ইয়ামানে যায় এবং স্বামীকে ইসলামের প্রতি আহবান জানালে সে মুসলিম হয় এবং উভয়ের পূর্ব বিবাহ অটুট থাকে।
(ইমাম মালিক হাদীসটি মুহাম্মাদ ইবনু শিহাব যুহরী হতে মুরসালরূপে বর্ণনা করেন)[1]
وَرُوِيَ فِي «شَرْحِ السُّنَّةِ» : أَنَّ جَمَاعَةً مِنَ النِّسَاءِ رَدَّهُنَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالنِّكَاحِ الأول على أَزوَاجهنَّ عِنْد اجْتِمَاع الإسلاميين بَعْدَ اخْتِلَافِ الدِّينِ وَالدَّارِ مِنْهُنَّ بِنْتُ الْوَلِيدِ بْنِ مُغِيرَةَ كَانَتْ تَحْتَ صَفْوَانَ بْنِ أُمَيَّةَ فَأَسْلَمَتْ يَوْمَ الْفَتْحِ وَهَرَبَ زَوْجُهَا مِنَ الْإِسْلَامِ فَبعث النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَيْهِ ابْنَ عَمِّهِ وَهْبَ بْنَ عُمَيْرٍ بِرِدَاءِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَانًا لِصَفْوَانَ فَلَمَّا قَدِمَ جَعَلَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَسْيِيرَ أَرْبَعَةِ أَشْهُرٍ حَتَّى أَسْلَمَ فَاسْتَقَرَّتْ عِنْدَهُ وَأَسْلَمَتْ أَمُّ حَكِيمٍ بِنْتُ الْحَارِثِ بْنِ هِشَامٍ امْرَأَةُ عِكْرِمَةَ بْنِ أَبِي جَهْلٍ يَوْمَ الْفَتْحِ بِمَكَّةَ وَهَرَبَ زَوْجُهَا مِنَ الْإِسْلَامِ حَتَّى قَدِمَ الْيَمَنَ فَارْتَحَلَتْ أَمُّ حَكِيمٍ حَتَّى قَدِمَتْ عَلَيْهِ الْيَمَنَ فَدَعَتْهُ إِلَى الْإِسْلَامِ فَأَسْلَمَ فَثَبَتَا عَلَى نِكَاحِهِمَا. رَوَاهُ مَالِكٌ عَنِ ابْنِ شهَاب مُرْسلا
পরিচ্ছেদঃ ৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - যে নারীদেরকে বিয়ে করা হারাম
৩১৮১-[২২] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বংশগত বা রক্ত সম্পর্কের কারণে এবং বৈবাহিক বন্ধনের কারণে সাত শ্রেণীর রমণীর সাথে বিবাহ হারাম করা হয়েছে। অতঃপর তিনি কুরআন মাজীদের আয়াত, অর্থাৎ- ’’তোমাদের ওপর হারাম করা হয়েছে তোমাদের মাতাগণকে (বিবাহ করতে)’’- (সূরা আন্ নিসা ৪ : ২৩) শেষ পর্যন্ত তিলাওয়াত করলেন। (বুখারী)[1]
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: حُرِّمَ مِنَ النَّسَبِ سَبْعٌ وَمِنَ الصِّهْرِ سَبْعٌ ثُمَّ قَرَأَ: (حُرِّمَتْ عَلَيْكُم أُمَّهَاتكُم)
الْآيَة. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: বংশীয় সূত্রে যারা মুহরিমাহ্, অর্থাৎ যাদের সাথে বিবাহ হারাম। তারা হলো মা, কন্যা, বোন, ফুফী, খালা, ভাতিজি ও ভাগ্নি। ‘আল্লামা নববী (রহঃ) বলেছেনঃ বৈবাহিক সূত্রে যাদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া হারাম। তারা হলো শাশুড়ী, পুত্র বধূ (স্ত্রীর পূর্ব স্বামীর পক্ষের ছেলে) সে সূত্রে, নাতবধু, নাতনী এবং এর অধস্তন যারা রয়েছে সকলেই এর অন্তর্ভুক্ত। পিতার স্ত্রী, দাদার স্ত্রী ও তার ঊর্ধ্বমুখী সকলেই, স্ত্রীর কন্যা (যে স্ত্রীর সাথে সহবাস হয়েছে তার পূর্ব স্বামীর পক্ষের কন্যা) স্ত্রীর উপস্থিতিতে তার বোন এবং খালা, ফুফীও এর অন্তর্ভুক্ত হবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - যে নারীদেরকে বিয়ে করা হারাম
৩১৮২-[২৩] ’আমর ইবনু শু’আয়ব (রহঃ) তাঁর পিতার মাধ্যমে দাদা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোনো (বিবাহিতা) স্ত্রীর সাথে সহবাস করে, তাহলে ঐ স্ত্রীর (পূর্ব স্বামীর) মেয়েকে বিবাহ করা হালাল নয়। আর যদি সহবাস না করে থাকে, তবে সে (তালাক দিয়ে ’ইদ্দত পালন শেষে) ঐ স্ত্রীর (পূর্ব স্বামীর) মেয়েকে বিয়ে করতে পারে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি কোনো রমণীকে বিয়ে করে, তাদের মধ্যে সহবাস হোক অথবা না হোক উভয় অবস্থায় উক্ত স্ত্রীর মা-কে (শাশুড়িকে) বিয়ে করা তার জন্য হালাল নয়। (তিরমিযী; ইমাম তিরমিযী তাঁর সুনান-এ বলেন, বর্ণনার নীতি অনুযায়ী হাদীসটি সহীহ নয়; কারণ হাদীসটি ইবনু লাহী’আহ্ ও মুসান্না ইবনুস্ সববাহ ’আমর ইবনু শু’আয়ব হতে বর্ণনা করেছেন। তারা উভয়ে হাদীস বর্ণনায় দুর্বল, অর্থাৎ- বর্ণনাকারীর স্বীকৃত গুণাবলীর ত্রুটি-বিচ্যুতিতে দুর্বল)[1]
وَعَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «أَيُّمَا رَجُلٍ نَكَحَ امْرَأَةً فَدَخَلَ بهَا فَلَا يَحِلُّ لَهُ نِكَاحُ ابْنَتِهَا وَإِنْ لَمْ يَدْخُلْ بِهَا فَلْيَنْكِحِ ابْنَتَهَا وَأَيُّمَا رَجُلٍ نَكَحَ امْرَأَةً فَلَا يَحِلُّ لَهُ أَنْ يَنْكِحَ أُمَّهَا دَخَلَ أَوْ لَمْ يَدْخُلْ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ لَا يَصِحُّ مِنْ قِبَلِ إِسْنَادِهِ إِنَّمَا رَوَاهُ ابْنُ لَهِيعَةَ وَالْمُثَنَّى بْنُ الصَّبَّاحِ عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ وَهُمَا يُضَعَّفَانِ فِي الْحَدِيثِ
ব্যাখ্যা: অধিকাংশ বিদ্বানদের এ কথার উপর ‘আমল রয়েছে যে, যখন কেউ কোনো মহিলাকে বিবাহ করবে, অতঃপর সহবাসের পূর্বেই তাকে তালাক দিবে, তবে তার জন্য তার কন্যাকে বিবাহ করা হালাল। অন্যদিকে কেউ যদি কোনো মহিলাকে বিবাহ করে এবং সহবাসের পূর্বে স্ত্রী তালাক দেয় তবে তার জন্য উক্ত স্ত্রীর মাকে বিবাহ করা বৈধ নয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলার কথা- ‘‘তোমাদের স্ত্রীদের মায়েদেরকে তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে.....’’- (সূরা আন্ নিসা ৪ : ২৩)। আর এটাই ইমাম শাফি‘ঈ, আহমাদ ও ইসহক (রহঃ)-এর কথা। হাফিয তাঁর ‘আত্ তাকরীব’ গ্রন্থে বলেছেন যে, এটা ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-এর কথা। হিদায়াহ্ গ্রন্থে তাঁর [হাফিয ‘আসকালানী (রহঃ)] বরাতে রয়েছে, স্ত্রীর মাকে বিবাহ করা যাবে না, চাই তার কন্যার সাথে সহবাস হোক বা না হোক। যেমন আল্লাহর কথা তোমাদের স্ত্রীদের মায়েদেরকে তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে। এখানে সহবাস শর্ত করা হয়নি। অনুরূপভাবে সহবাসকৃত স্ত্রীদের কন্যাদের সাথেও বিবাহ বৈধ নয়। কারণ এক্ষেত্রে সহবাস শর্ত করা হয়েছে। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৩য় খন্ড, হাঃ ১১১৭; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - (স্বামী-স্ত্রীর) সহবাস
৩১৮৩-[১] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইয়াহূদীগণ বলত, কেউ যদি পিছন দিক হতে স্ত্রীর যৌনাঙ্গে সঙ্গম করে তাহলে সন্তান ট্যারা বা টেগ্রা হয়। এমতাবস্থায় কুরআন মাজীদের এ আয়াত নাযিল হয়, অর্থাৎ- ’’তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের শস্যক্ষেত্র, তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা যেতে পার’’- (সূরা আল বাকারা ২ : ২২৩)। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْمُبَاشَرَةِ
عَنْ جَابِرٍ قَالَ: كَانَتِ الْيَهُودُ تَقُولُ: إِذَا أَتَى الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ مِنْ دُبُرِهَا فِي قُبُلِهَا كَانَ الْوَلَد أَحول فَنزلت: (نساوكم حرث لكم فَأتوا حَرْثكُمْ أَنى شِئْتُم)
ব্যাখ্যা: ইবনুল মালিক বলেন, স্ত্রীর পশ্চাৎদ্বারে সঙ্গম সকল ধর্মেই নিষিদ্ধ। কিন্তু পশ্চাৎদিক থেকে সম্মুখের দ্বারে সঙ্গত হওয়া মোটেও নিষিদ্ধ নয়। ইয়াহূদীদের বিশ্বাস ছিল যে, পশ্চাদ্বিক থেকে সঙ্গত হলে তাতে কোনো সন্তান জন্মগ্রহণ করলে সে হবে ট্যারা, এটি একটি কুসংস্কার ও ভ্রান্তধারণা। এই ভ্রান্তধারণা অপনোদনের জন্য আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াত নাযিল করেন, ‘‘তোমাদের স্ত্রীগণ হলো তোমাদের শষ্যক্ষেত্র স্বরূপ; অতএব তোমরা যেভাবে ইচ্ছা স্বীয় ক্ষেত্রে গমন কর।’’
স্ত্রীগণ দ্বারা বিবাহিত ও মালিকানা স্বত্বের দাসীই কেবল উদ্দেশ্য। তাদেরকে ক্ষেতের সাথে তুলনা করা হয়েছে; ক্ষেত যেমন বীজ থেকে ফসল উৎপন্ন করে তদ্রূপ স্ত্রীগণও মানব সন্তানের উৎপাদন ক্ষেত্র। আর এর উপযোগী পন্থা হলো সম্মুখ পথে সঙ্গম হওয়া। পশ্চাৎদ্বার হলো মলের পথ তা (সন্তান) উৎপাদনের ক্ষেত্রও নয়, উপরন্তু এটি ঘৃণিত ও কদর্য কর্ম। ‘‘তোমরা যেভাবে ইচ্ছা স্বীয় ক্ষেত্রে গমন কর’’ এর অর্থ হলো দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে অথবা সম্মুখভাগ হতে অথবা পিছন দিক হতে যেভাবেই ইচ্ছা স্ত্রী গমন তোমাদের জন্য বৈধ, তবে কর্ম সম্পাদন করতে হবে কেবল সম্মুখ দ্বার দিয়ে। আর এতে তোমাদের এবং এর মাধ্যমে জন্মগ্রহণকৃত সন্তানের কোনই ক্ষতির আশংকা নেই।
শারহেস্ সুন্নাহ্ গ্রন্থাকার বলেনঃ সমস্ত ইমাম ও মুহাদ্দিস একমত যে, পুরুষ যে পন্থা ও প্রক্রিয়াই হোক না কেন সম্মুখদ্বারে সঙ্গত হলেই তা বৈধ। অত্র আয়াত তার দলীল ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ)-বলেন, স্ত্রীকে ক্ষেতের সাথে তুলনা করার দ্বারা ইশারা করা হয়েছে এই দিকে যে, উৎপাদন ক্ষেত্র হলো সম্মুখদ্বার, আর তা যেন লঙ্ঘিত না হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সে ব্যক্তি অভিশপ্ত যে তার স্ত্রীর পশ্চাতদ্বার দিয়ে সঙ্গত হয়। সুতরাং তা সর্বসম্মত হারাম। (ফাতহুল বারী ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৫২৮; শারহে মুসলিম ৯/১০ম খন্ড, হাঃ ১৪৩৫; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - (স্বামী-স্ত্রীর) সহবাস
৩১৮৪-[২] উক্ত রাবী [জাবির (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন কুরআন মাজীদ নাযিল হচ্ছিল তখন আমরা ’আযল করতাম। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
মুসলিম-এর অপর বর্ণনায় আছে, আমাদের এ সংবাদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট পৌঁছলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদেরকে নিষেধ করেননি।
بَابُ الْمُبَاشَرَةِ
وَعنهُ كُنَّا نَعْزِلُ وَالْقُرْآنُ يَنْزِلُ. مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ. وَزَادَ مُسْلِمٌ: فَبَلَغَ ذَلِكَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلم ينهنا
ব্যাখ্যা: ‘আযল হলো রতিক্রিয়ার সময় রেতপাতের পূর্বে পুরুষ তার যৌনাঙ্গকে স্ত্রীঅঙ্গ থেকে বের করা।
জাবির (রাঃ)-এর কথা ‘‘আমরা কুরআন অবতরণকালে ‘আযল করতাম’’ এর অর্থ হলো আমাদের ‘আযল করার এই অবস্থাদি আল্লাহ তা‘আলা সম্পূর্ণরূপে অবহিত ছিলেন আর কুরআন তখনও নাযিল হচ্ছিল কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজীদে কোথাও তা নিষেধ করেননি। সুফ্ইয়ান সাওরী (রহঃ)-বলেছেন, এ বিষয়ে যদি কোনো নিষেধাজ্ঞা থাকত তাহলে কুরআনে অবশ্যই নিষেধাজ্ঞা জারী হতো।
সহীহ মুসলিম-এর বর্ণনায় অতিরিক্ত এ কথাও এসেছে যে, ‘‘আমাদের ‘আযল করার খবর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটও পৌঁছল, কিন্তু তিনিও নিষেধ করলেন না।’’ ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ)-বলেন, এর অর্থ হলোঃ ওয়াহী আমাদের এ কাজে নিষেধাজ্ঞা জারী করেনি এবং সুন্নাহ্-ও কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। ইবনুল হুমাম (রহঃ) বলেনঃ অধিকাংশ ‘আলিমের নিকট ‘আযল জায়িয। পক্ষান্তরে সাহাবীদের একদল এবং তৎপরবর্তী এটাকে অপছন্দ করেছেন। তবে বিশুদ্ধ কথা হলো এটা জায়িয। (ফাতহুল কাদীর ৩য় খন্ড, ২৭২ পৃঃ)
‘আল্লামা নববী (রহঃ) বলেনঃ আমাদের নিকট ‘আযল করা মাকরূহ বা অপছন্দনীয় কাজ। কেননা এটা জন্ম নিরোধের একটি পদ্ধতি এজন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে ‘‘আযল হলো গোপন সমাহিত’’।
মিশকাতের ভাষ্যকার মুল্লা ‘আলী আল কারী (রহঃ) বলেনঃ ‘‘আমাদের সাথীগণ বিবাহিতা বাদী ও দাসীর অনুমতি ছাড়াই তাদের সাথে ‘আযল করা বৈধ বলে মনে করেন।’’ তাদের ক্ষেত্রে এটা হারাম নয়, চাই তারা অনুমতি দিক অথবা না দিক। কারণ মালিকানা সত্বের দাসীর গর্ভে সন্তান হলে ঐ দাসী হয় ‘উম্মু ওয়ালাদ’ বা নিজ সন্তানের মা, ফলে তাকে আর বিক্রয় করা বৈধ নয়। আর যদি বিবাহিতা দাসীর ঘরে সন্তান জন্মগ্রহণ করে তাহলে সন্তান মায়ের অনুসরণে দাসত্বের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়; এ উভয় অবস্থাই পুরুষের জন্য ক্ষতির কারণ, সুতরাং এদের সাথে সর্বোতভাবেই ‘আযল বৈধ। পক্ষান্তরে স্বাধীনা স্ত্রী যদি অনুমতি দেয় তবে তার সাথে ‘আযল (সহীহ মতানুযায়ী ) হারাম নয়। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫২০৯; শারহে মুসলিম ৯/১০ম খন্ড, হাঃ ১৪৪০; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - (স্বামী-স্ত্রীর) সহবাস
৩১৮৫-[৩] উক্ত রাবী [জাবির (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটে এসে বলল, আমার এক দাসী আছে, সে আমাদের কাজকর্ম করে। আমি তার সাথে সহবাস করি; কিন্তু সে গর্ভবতী হোক, এটা আমি চাই না? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তুমি ইচ্ছা করলে ’আযল করতে পার। তবে জেনে রেখ তার জন্য যা তাকদীরে নির্ধারিত হয়েছে তা অবশ্যই ঘটবে। কিছু দিন পরে উক্ত ব্যক্তি এসে বলল, সে দাসী (’আযল করা সত্ত্বেও) গর্ভবতী হয়েছে। তাই তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আমি তো পূর্বেই বলেছি, তার জন্য যা অবধারিত আছে তা অবশ্যই হবে। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْمُبَاشَرَةِ
وَعَنْهُ قَالَ: إِنَّ رَجُلًا أَتَى رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: إِن لي جَارِيَةً هِيَ خَادِمَتُنَا وَأَنَا أَطُوفُ عَلَيْهَا وَأَكْرَهُ أَنْ تَحْمِلَ فَقَالَ: «اعْزِلْ عَنْهَا إِنْ شِئْتَ فَإِنَّهُ سَيَأْتِيهَا مَا قُدِّرَ لَهَا» . فَلَبِثَ الرَّجُلُ ثمَّ أَتَاهُ فَقَالَ: إِن الْجَارِيَة قد حبلت فَقَالَ: «قَدْ أَخْبَرْتُكَ أَنَّهُ سَيَأْتِيهَا مَا قُدِّرَ لَهَا» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা : হাদীসে উল্লেখিত ‘আর্বী শব্দ جَارِيَةً মূলত বাদী বা দাসী অর্থেই ব্যবহার হয়, তবে কখনো কন্যা অর্থেও ব্যবহার হয়ে থাকে। এখানে দাসী অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। বর্ণনাকারীর বর্ণনা ‘‘আমি তার নিকট যাতায়াত করি’’ এর অর্থ হলো তার সাথে সঙ্গম করি। কিন্তু তার গর্ভধারণ হোক এটা আমি পছন্দ করি না, সুতরাং আমি কি করতে পারি? এরূপ প্রশ্নের জবাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি ইচ্ছা করলে তার সাথে ‘আযল করতে পার।
ইবনুল মালিক বলেনঃ এ হাদীসের মাধ্যমে সঙ্গমকারীর ইচ্ছার ভিত্তিতে দাসীর সাথে ‘আযল করা বৈধ প্রমাণিত হয়, কিন্তু তা সাধারণ অর্থে সকল নারীর বেলায় প্রযোজ্য নয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকটিকে ‘আযলের অনুমতিদানের ভাষায় যে অর্থ প্রমাণিত হয়েছে তা হলো : তুমি ‘আযল করলে করতে পার, কিন্তু তাতে লাভই বা কি? ঐ মহিলার গর্ভে যা হবার তা হবেই। বাস্তবে ঘটলোও তাই। লোকটি তার দাসীর গর্ভে সন্তান ধারণের ভয়ে তার সাথে ‘আযল করে চলছিল, কিন্তু কিছু দিন পর সে আল্লাহর নাবীর কাছে এসে আরয করল, হে আল্লাহর রসূল! আমার ঐ দাসী তো গর্ভবতী হয়েছে! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, আমিতো তোমাকে আগেই জানিয়েছি তার গর্ভে আল্লাহ যা নির্ধারণ করে রেখেছিল তা অবশ্যই তার গর্ভে আসবে। জেনে রেখ, নিশ্চয় আমি আল্লাহর বান্দা ও রসূল ‘‘আমি কখনও মিথ্যা বলি না এবং নিজের পক্ষ থেকে বানিয়ে কোনো কথা বলি না’’। ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, এর দ্বারা প্রমাণিত যে, ‘আযল করা সত্ত্বেও গর্ভ সঞ্চার সম্ভব। তবে তা কিভাবে? এ প্রশ্নের উত্তরে ‘আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, পূর্বের অবশিষ্ট শুক্রানু যা তার পুরুষাঙ্গে রক্ষেত ছিল তাই গর্ভে নির্গত হয়েছে এবং তার মাধ্যমেই ভ্রূণ সৃষ্টি হয়েছে। ফতোয়ায় কাযীখান-এ এরূপ একটি যুক্তিও উপস্থাপন করা হয়েছে যে, পুরুষ ‘আযল করে হয়তো নারীর যৌনাঙ্গের বাহিরে তার রেতপাত করেছে, তা হতে কিছু শুক্রানু তার গর্ভাশয়ে প্রবেশ করে ভ্রূণ সঞ্চারিত হয়েছে। (শারহে মুসলিম ৯/১০ম খন্ড, হাঃ ১৪৩৯; মিরকাতুল মাফাতীহ)
[এছাড়াও মাযী বা কামরস যা পূর্বেই নির্গত হয় তাতেও শুক্রানু থাকতে পারে বলে বৈজ্ঞানিক মতামত রয়েছে, সুতরাং ‘আযল করা সত্ত্বেও গর্ভধারণ সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত তাতে কোনই সন্দেহ নেই]
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - (স্বামী-স্ত্রীর) সহবাস
৩১৮৬-[৪] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বানী মুসত্বালিক যুদ্ধে আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বের হলাম এবং এ যুদ্ধে আমরা অনেক ’আরাবীয় নারী বন্দীনীরূপে করায়ত্ত করি। যেহেতু আমরা দীর্ঘদিন নারীবিহীন থাকায় অস্বস্থিবোধ করছিলাম, ফলে আমরা নারী সঙ্গমের জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়লাম। কিন্তু আমরা ’আযল করা পছন্দ করলাম এবং আমরা পরস্পরের মধ্যে ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ করে বললাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে সমুপস্থিত থাকতে তাঁকে জিজ্ঞেস না করে এরূপ করা কি ঠিক হবে? অতঃপর আমরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমরা ’আযল করবে না এমনটি নয়, তবে কিয়ামত পর্যন্ত (সৃষ্টিজীব পৃথিবীতে) যা হওয়ার আছে, তা অবশ্যই সৃষ্টি হবে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْمُبَاشَرَةِ
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: خَرَجْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ غَزْوَةِ بَنِي الْمُصْطَلِقِ فَأَصَبْنَا سَبْيًا مِنْ سَبْيِ الْعَرَب فاشتهينا النِّسَاء واشتدت عَلَيْنَا الْعُزْبَةُ وَأَحْبَبْنَا الْعَزْلَ فَأَرَدْنَا أَنْ نَعْزِلَ وَقُلْنَا: نَعْزِلُ وَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَيْنَ أَظْهُرِنَا قَبْلَ أَنْ نَسْأَلَهُ؟ فَسَأَلْنَاهُ عَن ذَلِك فَقَالَ: «مَا عَلَيْكُمْ أَلَّا تَفْعَلُوا مَا مِنْ نَسَمَةٍ كَائِنَةٍ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ إِلَّا وَهِيَ كَائِنَةٌ»
ব্যাখ্যা: বানী মুসত্বালিক ‘আরবের খুযা‘আহ্ গোত্রের একটি কবীলার নাম। এ হাদীসের আলোকে ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, প্রাচীন মুশরিকদের দাসত্বের অপনামটি ছিল। এটা ইমাম শাফি‘ঈ এবং মালিক প্রমুখের অভিমত। পক্ষান্তরে ইমাম আবূ হানীফাহ্, ইমাম শাফি‘ঈ-এর পুরাতন অন্য একটি মত হলো ‘আরবদের মধ্যে কখনো দাসত্বের অপনাম জারী হয়নি। তাদের শরাফত ও উচ্চ মর্যাদা সর্বকালেই অক্ষুণ্ণ ছিল। আর ‘আযল বৈধ হওয়া সংক্রান্ত বিস্তারিত ব্যাখ্যা পূর্বাপর হাদীস দ্রষ্টব্য। (ফাতহুল বারী ৭ম খন্ড, হাঃ ৪১৩৮; শারহে মুসলিম ৯/১০ম খন্ড, হাঃ ১৪৩৮; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - (স্বামী-স্ত্রীর) সহবাস
৩১৮৭-[৫] উক্ত রাবী [আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ’আযলের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, প্রত্যেক পানিতে সন্তান জন্ম হয় না। আর আল্লাহ তা’আলা যখন কোনো কিছু সৃষ্টি করতে চান, তখন কোনো কিছুই তা প্রতিরাধ করার ক্ষমতা রাখে না। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْمُبَاشَرَةِ
وَعَنْهُ قَالَ: سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الْعَزْلِ فَقَالَ: «مَا مِنْ كُلِّ الْمَاءِ يَكُونُ الْوَلَدُ وَإِذَا أَرَادَ اللَّهُ خَلْقَ شَيْءٍ لَمْ يَمْنَعْهُ شَيْءٌ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ সন্তানের ভয়ে লোকেরা ‘আযল করার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট অনুমতি প্রার্থনা করেছিল। তারা মনে করত নারীগর্ভে শুক্রপাত ঘটালেই তা সন্তান জন্মের কারণ হয়। সুতরাং ‘আযল হলো তার প্রতিবন্ধক। এ প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়েছেন সকল পানির দ্বারা অর্থাৎ শুক্রের দ্বারাই সন্তান হয় না, আবার আল্লাহ যখন কোনো সৃষ্টিকে সৃষ্টির ইচ্ছা করেন কোনো কিছুই তাকে বাধা দিয়েও রাখতে পারে না। সুতরাং সন্তান জন্ম আল্লাহর ইচ্ছা বা হুকুমের উপর নির্ভরশীল। ‘আযল করা না করায় কোনো আসে যায় না। (শারহে মুসলিম ৯/১০ম খন্ড, হাঃ ১৪৩৮; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - (স্বামী-স্ত্রীর) সহবাস
৩১৮৮-[৬] সা’দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, আমি স্ত্রীসহবাসের সময় ’আযল করি। এতে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কেন এটা কর? উত্তরে সে বলল, আমি তার সন্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ায় এটা করি। এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এতে যদি কোনো প্রকার ক্ষতি হতো তাহলে পারস্যবাসী (ইরান) ও রোমকগণও ক্ষতিগ্রস্ত হতো। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْمُبَاشَرَةِ
وَعَنْ سَعْدِ بْنِ أَبِي وَقَّاصٍ: أَنَّ رَجُلًا جَاءَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: إِنِّي أعزل عَن امْرَأَتي. فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «لم تفعل ذَلِك؟» فَقَالَ الرَّجُلُ: أَشْفِقُ عَلَى وَلَدِهَا. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَوْ كَانَ ذَلِكَ ضاراً ضرّ فَارس وَالروم» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: প্রাচীন ‘আরব সমাজের মানুষের ধারণা ছিল, গর্ভবতী স্ত্রীর সাথে সহবাস করলে যমজ সন্তান জন্মগ্রহণ করে, এতে উভয় সন্তানই দুর্বল হয়। অথবা গর্ভাবস্থায় কোনো দুগ্ধপোষ্য শিশু থাকলে এবং সেটি দুগ্ধ পান করলে শিশুর ভীষণ ক্ষতি হয়। গর্ভস্থিত সন্তান হোক দুগ্ধপোষ্য সন্তান হোক অথবা উভয় সন্তানই হোক তার ক্ষতির আশংকা করে জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি আমার সন্তানের ওপর অত্যন্ত স্নেহপরায়ণ, আমি তাদের ক্ষতি চাই না। সুতরাং আমি কি আমার স্ত্রীর সাথে ‘আযল করব, না একেবারে সহবাস বন্ধ করে দিব? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এ কাজ কেন করবে? তখন লোকটি বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি আমার স্ত্রীর গর্ভস্থিত সন্তানের প্রতি স্নেহপরায়ণ। সুতরাং সে যেন যমজ হয়ে দুর্বল হয়ে না যায়। অথবা আমি আমার স্ত্রীর দুগ্ধপোষ্য সন্তানের প্রতি আশংকা করি যে, স্ত্রীর সাথে সহবাস করলে তার ক্ষতি হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাকে বললেন, তোমার এই ধারণাই যদি সত্য হতো অর্থাৎ গর্ভাবস্থায় অথবা দুগ্ধদানকালীন সময়ে স্ত্রীর সাথে সহবাস যদি ঐ সন্তানদের ক্ষতিই হতো তাহলে রোম এবং পারস্যের নারীদের সন্তানগণ অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হতো, কেননা তারা গর্ভাবস্থায় তাদের সন্তানদের দুগ্ধ পান করে থাকে এবং তাদের সাথে সহবাসও করিয়ে থাকে। (শারহে মুসলিম ৯/১০ম খন্ড, হাঃ ১৪৪৩; মিরকাতুল মাফাতীহ)
এছাড়া গর্ভাবস্থায় সহবাস করলে যমজ সন্তান হওয়া সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক কথা ও চরম কুসংস্কার। তবে গর্ভস্থিত সন্তানের অন্য ক্ষতির বিষয়টি বিবেচিত। (সম্পাদক)
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - (স্বামী-স্ত্রীর) সহবাস
৩১৮৯-[৭] জুযামাহ্ বিনতু ওয়াহ্ব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কিছু সংখ্যক লোকের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হলাম। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলছিলেন যে, আমি ’গীলাহ্’[1] হতে নিষেধ করতে ইচ্ছা পোষণ করেছিলাম; কিন্তু যখন পারস্য (ইরান) এবং রোমবাসীদের ব্যাপারে জানতে পারলাম যে, তারা (সন্তানের আশঙ্কায়) গীলাহ্ করে অথচ এটা তাদের কোনো প্রকার ক্ষতির কারণ নেই। অতঃপর লোকেরা তাঁকে ’আযল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এটা পরোক্ষভাবে জীবন্ত কন্যা পুঁতে দেয়া (সমাধিস্থ করা), যে সম্পর্কে কুরআন মাজীদের আয়াত আছে- ’’যখন জীবন্ত পুঁতে দেয়া কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে, কি অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?’’ (সূরা আত্ তাকভীর ৮১ : ৮-৯)। (মুসলিম)[2]
بَابُ الْمُبَاشَرَةِ
وَعَن جذامة بِنْتِ وَهْبٍ قَالَتْ: حَضَرْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي أُنَاسٍ وَهُوَ يَقُولُ: «لقد هَمَمْت أَن أَنْهَى عَنِ الْغِيلَةِ فَنَظَرْتُ فِي الرُّومِ وَفَارِسَ فَإِذَا هُمْ يُغِيلُونَ أَوْلَادَهُمْ فَلَا يَضُرُّ أَوْلَادَهُمْ ذَلِكَ شَيْئًا» . ثُمَّ سَأَلُوهُ عَنِ الْعَزْلِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ذَلِكَ الوأد الْخَفي وَهِي (وَإِذا الموؤودة سُئِلت)
رَوَاهُ مُسلم
[2] সহীহ : মুসলিম ১৪৪২, আবূ দাঊদ ৩৮৮২, নাসায়ী ৩৩২৬, তিরমিযী ২০৭৭, আহমাদ ২৭০৩৪, দারিমী ২৬৬৩, সহীহ ইবনু হিব্বান ৪১৯৬, সহীহ আল জামি‘ ৫১৪৫।
ব্যাখ্যা : জুযামাহ্ বিনতু ওয়াহ্ব হলেন ‘উক্কাশাহ্ (রাঃ)-এর বোন। جُذَامَةَ ‘জুযামাহ্’ শব্দটি দাল যোগে ‘জুদামাহ্’ পাঠ অতি বিশুদ্ধ। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো জনসমাবেশে উপস্থিত হয়ে বললেন, আমার মন যা চায় আমি غِيلَةِ ‘গীলাহ্’ করেত নিষেধ করি। غِ (গাইন) অক্ষর যের যোগে অর্থ হলো গর্ভকালে দুগ্ধপান করানো। আর যদি غَ (গাইন) অক্ষরটি যবর যোগে পাঠ করা হয় তাহলে অর্থ হয় দুগ্ধ। নিহায়াহ্ গ্রন্থে আছে غِ (গাইন) বর্ণ যের যোগে বিশেষ্য অর্থে ব্যবহার হয়, আর غَ বর্ণে যবর যোগে অর্থ হলো দুগ্ধদায়িনী স্ত্রীর সাথে সহবাস করা, অনুরূপ গর্ভাবস্থায় দুগ্ধপান করা। কেউ কেউ বলেন, غ বর্ণে যের ও যবর পাঠ করলেও অর্থ একই।
ইমাম মালিক বলেনঃ غِيلَةِ ‘গীলাহ’ হলো দুগ্ধ দানকারী স্ত্রীকে স্পর্শ করা অর্থাৎ সহবাস করা। ইমাম আস্মা‘ঈ এবং অন্যান্য ভাষাবিদগণও এ মত গ্রহণ করেছেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি রোম ও পারস্যবাসীদের প্রতি লক্ষ্য করলাম, তারা তাদের স্ত্রীদের সাথে ‘গীলাহ্’ করে থাকে, কিন্তু তাদের সন্তানদের কোনো ক্ষতি হয় না।
‘উলামাগণ বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিষেধ করতে চাওয়ার কারণ হলো দুগ্ধপোষ্য সন্তানের ক্ষতির আশংকা; কেননা চিকিৎসা বিজ্ঞানীগণ বলেন, গর্ভবতী মায়ের দুধ হয় রোগাক্রান্ত। সুতরাং ‘আরবেরা এটাকে কারাহাত মনে করেন। কাযী ‘ইয়ায বলেনঃ ‘আরবেরা ‘গীলাহ্’ থেকে পরহেয করত, অর্থাৎ গর্ভকালে দুগ্ধপোষ্য সন্তানকে দুগ্ধপান থেকে বিরত রাখত। তারা মনে করত গর্ভবতী নারীর দুগ্ধ পান করলে সন্তানের ক্ষতি হয়, এটা তাদের বহুল প্রচলিত ধারণা। এজন্য নাবী তা থেকে নিষেধ করতে চেয়েছিলেন, পরে তিনি যখন দেখলেন রোম-পারস্যবাসীগণ এটা করা সত্ত্বেও তাদের সন্তানদের কোনো ক্ষতি হয় না, পরে তিনি নিষেধাজ্ঞা জারী থেকে বিরত হন।
এরপর লোকেরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ‘আযল সম্পর্কে প্রশ্ন করলেন, অর্থাৎ ‘আযল বৈধ কিনা? এ প্রশ্ন সাধারণ সময়ের ব্যাপারেও হতে পারে। উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সেটা গোপন হত্যা বা জীবন্ত কবর দেয়া।
ইমাম নববী (রহঃ) বলেনঃ الْوَأدُ বলা হয় কন্যা শিশুকে জীবন্ত কবর দেয়া। জাহিলী যুগে ‘আরবেরা কন্যা সন্তানকে সম্মানহানীকর মনে করে অথবা খাদ্যদানের ভয়ে জীবন্ত কবর দিয়ে ফেলত।
আল্লাহ তা‘আলা শুক্রবৃন্দকে সৃষ্টি করেছেন মানব সৃষ্টির জন্য, ‘আযলের মাধ্যমে সেই শুক্রানু বিনষ্ট করাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবন্ত কবর দেয়ার সাথে তুলনা করেছেন। অতঃপর আল্লাহর নাবী এ আয়াতটি পাঠ করেন : ‘‘আর যখন জীবন্ত প্রোথিত শিশু কন্যাদের জিজ্ঞেস করা হবে কোন্ অপরাধে তোমাদেরকে হত্যা করা হয়েছে?’’ (সূরা আত্ তাকভীর ৮১ : ৮-৯) অর্থাৎ কিয়ামতের দিন জীবন্ত প্রোথিত কন্যা সন্তানদের জীবিত করে জিজ্ঞেস করা হবে তোমাদের পিতাগণ তোমাদের কোন্ অপরাধের কারণে জীবন্ত কবর দিয়ে হত্যা করেছিল?
ইতিপূর্বের আলোচনায় বলা হয়েছে ‘আযল মূলত বৈধ। অত্র হাদীসের ভিত্তিতেও বলা যায় না যে, ‘আযল হারাম, বরং এটা অপছন্দনীয় কাজ। এটা জীবন্ত হত্যা নয়, রূহ ধ্বংস হলো জীবন্ত হত্যা। যেখানে বীর্য নারী গর্ভে তিন চল্লিশ অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত তাতে রূহ প্রবিষ্ট হয় না সেখানে তা নারী গর্ভে না দিয়ে বাহিরে নিক্ষেপ করা কিভাবে জীবন্ত হত্যা হতে পারে? ‘আযল বৈধ হওয়া সত্ত্বেও সাহাবীগণ অনেকেই এটাকে অপছন্দ করতেন। ‘উমার তার সন্তানদের ‘আযলের জন্য প্রহার করতেন। ‘উসমান -ও এটা নিষেধ করতেন। মুল্লা ‘আলী কারী (রহঃ) বলেন, ‘আযল হারাম হওয়ার মতটি বিশ্লেষণে দুর্বল কেননা এটা মূলতঃ রূহের ধ্বংস বা হত্যা নয়। তবে নিঃসন্দেহে এটা অপছন্দনীয় কাজ।
‘আল্লামা ইবনুল হুমাম উল্লেখ করেছন, ‘উমার ‘আলী (রাঃ) সাহাবীদ্বয় একমত হয়েছেন যে, ‘আযল জীবন্ত কবরদেয়া নয়। আবূ ইয়া‘লা প্রমুখ ‘উবায়দ ইবনু রিফা‘আহ্-এর সূত্রে তিনি তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি ‘উমার, ‘আলী, যুবায়র, সা‘দ সহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আরো কতিপয় সাহাবীর এক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, তারা ‘আযল সম্পর্কে আলোচনা করলেন এবং বললেন, ‘আযল দোষণীয় নয়। তাদের মধ্যে এক ব্যক্তি বলে উঠলেন অনেকেই তো মনে করে এটাতো ছোটখাটো জীবন্ত কবর দেয়া! এ কথা শুনে ‘আলী বললেন, কখনো সাতটি স্তরকাল অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত জীবন্ত কবর বলে বিবেচিত হবে না।
মানব সন্তানের ঐ সাতটি স্তর হলো : (১) মাটির নির্যাস (২) নুতফা বা বীর্য (৩) রক্তপি- (৪) [থলথলে বা চর্বিত] গোশত সদৃশ (৫) হাড় হাড্ডি ধারণ (৬) হাড়ে গোশতের আবরণ (৭) মানব আকৃতি বা রূপ অবয়ব ধারণ করা। এ কথা শুনে ‘উমার ‘আলী -কে বললেন, আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘজীবি করুন, আপনি সত্য কথাই বলেছেন।
লোকটি পুনরায় প্রশ্ন করলেন, গর্ভ সঞ্চারের পর গর্ভপাত করা কি বৈধ হবে? উত্তরে বলেন, মানব আকৃতি ধারণের পূর্বে বৈধ। ‘উলামায়ে কিরাম বলেছে একশত বিশ দিনে ভ্রূণে রূহ প্রবিষ্ট হয়, এরপর গর্ভপাত বৈধ নয়। (শারহূ মুসলিম ৯/১০ম খন্ড, হাঃ ১৪৪২; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - (স্বামী-স্ত্রীর) সহবাস
৩১৯০-[৮] আবূ সা’ঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলার নিকট সর্বাধিক আমানত হলো ঐ বিষয়। অন্য বর্ণনায় কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তা’আলার নিকটে সবচেয়ে নিকৃষ্টতম ঐ ব্যক্তি- যে তার স্ত্রীর সাথে সহবাস করে, অতঃপর পরস্পরের মধ্যস্থ গোপনীয়তা (মানুষের মাঝে) প্রকাশ করে দেয়। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْمُبَاشَرَةِ
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ:
إِنَّ أَعْظَمَ الْأَمَانَةِ عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَفِي رِوَايَةٍ: إِنَّ مِنْ أَشَرِّ النَّاسِ عِنْدَ اللَّهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ الرَّجُلُ يُفْضِي إِلَى امْرَأَتِهِ وَتُفْضِي إِلَيْهِ ثمَّ ينشر سرها . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: দাম্পত্য জীবনের একান্তবাস আল্লাহ সুবাহানাহূ ওয়াতা‘আলার দেয়া এক বিশেষ উপহার এবং আমানত। এতে রয়েছে জীবনের প্রশান্তি এবং স্থিতি। এটা অতীব গোপনীয় বিষয় যা রক্ষা করা প্রতিটি মানুষের অবশ্য কর্তব্য। মানুষ তার জৈবিক চাহিদা পূরণের জন্য তার স্ত্রীর নিকট উদ্গত হয় এটা আল্লাহ তা‘আলার অভিপ্রেত চিরাচরিত বিধান। এর কথা এবং কর্ম সম্পূর্ণভাবে গোপন রাখতে হবে, কোনো কিছুই কারো কাছে প্রকাশ করা যাবে না। স্ত্রীর সৌন্দর্য কিংবা ত্রুটি সবকিছুই গোপন রাখতে হবে। কেউ যদি স্ত্রীর নিকট উদ্গত হয়ে তার সৌন্দর্যের কথা অথবা ত্রুটির কথা অপরের নিকট প্রকাশ করে দেয় তাহলে সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট মহা খিয়ানাতকারী হিসেবে এবং সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি হিসেবে উঠবে। স্ত্রীও স্বামীর গোপন কোনো বিষয় প্রকাশ করবে না।
বিজ্ঞজনেরা একটা দৃষ্টান্ত দিয়েছেন : এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তালাক দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছে তখন তাকে কেউ জিজ্ঞেস করল, তুমি তোমার স্ত্রীকে কেন তালাক দিবে? সে উত্তর করল, সে আমার স্ত্রী কিভাবে আমি তার দোষ তুলে ধরতে পারি? অতঃপর সে যখন তাকে ‘‘তার কোনো এক গোপন ত্রুটি বা দোষের কারণে’’ তালাক দিয়েই ফেলল তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো কি দোষে তুমি তাকে তালাক দিলে? উত্তরে সে বলল, কিভাবে আমি একজন বেগানা নারীর দোষ-ত্রুটি উল্লেখ করতে পারি?
কেউ কেউ বলেছেন, দাম্পত্য সম্পর্ক পালনে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হলে তা প্রকাশ করা দোষণীয় নয়। (শারহে মুসলিম ৯/১০ম খন্ড, হাঃ ১৪৩৭; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - (স্বামী-স্ত্রীর) সহবাস
৩১৯১-[৯] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর ওয়াহী নাযিল হয়- ’’তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের জন্য শস্যক্ষেত। অতএব, তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেতে যেভাবে ইচ্ছা যেতে পার’’- (সূরা আল বাকারা ২ : ২২৩)। তাই সামনের দিক হতে বা পিছন দিক হতে সহবাস কর; কিন্তু গুহ্যদ্বার (মলদ্বার) ও ঋতুবতী (মাসিক থাকাকালীন) হতে বিরত থাক। (তিরমিযী, ইবনু মাজাহ)[1]
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: أُوحِيَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: (نساوكم حرث لكم فَأتوا حَرْثكُمْ)
الْآيَةَ: «أَقْبِلْ وَأَدْبِرْ وَاتَّقِ الدُّبُرَ وَالْحَيْضَةَ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: ইতিপূর্বে এ হাদীসের অংশ বিশেষের ব্যাখ্যা অতিবাহিত হয়ে গেছে তাই সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন নেই। স্ত্রীর নিকট সঙ্গত হতে হলে অবশ্যই সম্মুখ পথ (যোনীপথ) অবলম্বন করতে হবে। পিছন পথ (পায়ুপথ) অবলম্বন করা যাবে না, অনুরূপভাবে মাসিক ঋতুস্রা্বকালেও উদ্গত হওয়া যাবে না। এ থেকে আত্মরক্ষার জন্য জোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইমাম সারাখসী (রহঃ) উল্লেখ করেছেন, কেউ যদি স্ত্রীর মাসিক ঋতুস্রা্বকালে সহবাস বৈধ মনে করে তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে। কেননা আল্লাহ তা‘আলার এই বাণী তা হারাম হওয়ার স্পষ্ট দলীলঃ ‘‘তোমরা তাদের নিকটেও যেও না যতক্ষণ তারা পূর্ণরূপে পবিত্রতা অর্জন না করে’’- (সূরা আল বাকারা ২ : ২২২)।
সুতরাং আল্লাহর নিষেধ বা হারাম-কে হারাম মনে না করা কুফরীর শামিল। ইমাম মুহাম্মাদ (রহঃ) অবশ্য কাফির না হওয়ার কথা বলেছেন। মোট কথা স্ত্রী সহবাসে অবশ্যই সম্মুখ পথ অবলম্বন করবে এবং মাসিক ঋতুকালে সহবাস থেকে বিরত থাকবে। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৯৮০; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - (স্বামী-স্ত্রীর) সহবাস
৩১৯২-[১০] খুযায়মাহ্ ইবনু সাবিত (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা সত্য প্রকাশে লজ্জাবোধ করেন না, তোমরা তোমাদের স্ত্রীগণের গুহ্যদ্বারে সহবাস করো না। (আহমাদ, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, দারিমী)[1]
وَعَنْ خُزَيْمَةَ بْنِ ثَابِتٍ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّ اللَّهَ لَا يستحيي مِنَ الْحَقِّ لَا تَأْتُوا النِّسَاءَ فِي أَدْبَارِهِنَّ» . رَوَاهُ أَحْمد وَالتِّرْمِذِيّ وَابْن مَاجَه. والدارمي
ব্যাখ্যা: আল্লাহ হক প্রকাশে লজ্জাবোধ করেন না, অর্থাৎ তিনি হক বা সত্য কথা বলতে কোনই পরোয়া করেন না। এমনকি লজ্জাষ্কর কথা হলেও তা থেকে বিরত থাকেন না।
প্রশ্ন হলো হায়া বা লজ্জা হলো অন্তরের পরিবর্তন যা একজন মানুষের ওপর কোনো নিন্দনীয় কর্মের কারণে অপতিত হয়, আল্লাহর ব্যাপারে এটা সম্পৃক্ত হওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব? এর উত্তর হলো, এটা রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে অর্থাৎ ‘আল্লাহ লজ্জাবোধ করেন না’ এ কথার সমার্থ হলো তিনি চরম লজ্জাষ্কর কথা হলেও ব্যক্ত বা প্রকাশ করতে ছাড়েন না। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ আল্লাহ তা‘আলার দিকে লজ্জার সম্পর্ক মুবালাগাহ্ বা চূড়ান্ত কথা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - (স্বামী-স্ত্রীর) সহবাস
৩১৯৩-[১১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ঐ লোক অভিশপ্ত, যে তার স্ত্রীর গুহ্যদ্বারে সহবাস করে। (আহমাদ, আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَلْعُونٌ مَنْ أَتَى امْرَأَتَهُ فِي دُبُرِهَا» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَأَبُو دَاوُدَ
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - (স্বামী-স্ত্রীর) সহবাস
৩১৯৪-[১২] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে লোক তার স্ত্রীর গুহ্যদ্বারে সহবাস করে আল্লাহ তার প্রতি (রহমত, করুণা নিয়ে) দৃষ্টিপাত করেন না। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ الَّذِي يَأْتِي امْرَأَتَهُ فِي دُبُرِهَا لَا يَنْظُرُ اللَّهُ إِلَيْهِ» . رَوَاهُ فِي شرح السّنة
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - (স্বামী-স্ত্রীর) সহবাস
৩১৯৫-[১৩] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা ঐ ব্যক্তির প্রতি (রহমত ও করুণার) দৃষ্টিপাত করেন না, যে কোনো পুরুষের সাথে সহবাস করে অথবা নারীর গুহ্যদ্বারে সহবাস করে। (তিরমিযী)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَنْظُرُ اللَّهُ إِلَى رَجُلٍ أَتَى رَجُلًا أَوِ امْرَأَةً فِي الدبر» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: উপরোক্ত তিনটি হাদীসে একই বিষয় আলোচিত হয়েছে যার ব্যাখ্যাও ইতিপূর্বে হয়ে গেছে। সুতরাং পুনঃআলোচনা নিষ্প্রয়োজন। পুরুষের সাথে সঙ্গম এবং নারীর পায়ুপথে সঙ্গমকারীর প্রতি আল্লাহর লা‘নাত, সে অভিশপ্ত। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার দিকে রহমাতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না (এবং তাকে গুনাহ থেকে মুক্তও করবেন না)। উভয়টি মূলতঃ লাওয়াতাত বা পুং মৈথুন যা হারাম হওয়ার বিস্তারিত বিবরণ ও ব্যাখ্যা অন্যত্র রয়েছে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২১৬২; তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১১৬৬; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - (স্বামী-স্ত্রীর) সহবাস
৩১৯৬-[১৪] আসমা বিনতু ইয়াযীদ (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে, তোমরা তোমাদের সন্তানকে সংগোপনে হত্যা করো না, কেননা ’গীলাহ্’র প্রভাবে আরোহীকে ঘোড়া হতে নিচে ফেলে দেয়। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ يَزِيدَ قَالَتْ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «لَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ سِرًّا فَإِنَّ الْغَيْلَ يُدْرِكُ الْفَارِسَ فيدعثره عَن فرسه» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: غِيلَةِ ‘গীলাহ’ শব্দের বিস্তারিত ব্যাখ্যা ৩১৯৬ নং হাদীসে অতিবাহিত হয়েছে।
অত্র হাদীসে এ শব্দের দ্বারা উদ্দেশ্য হলো দুগ্ধদায়িনী স্ত্রীর সাথে সহবাস করার দরুন স্ত্রী পুনরায় গর্ভবতী হওয়া এবং এই গর্ভাবস্থায় দুগ্ধ দান করা। গর্ভাবস্থায় সন্তানকে দুগ্ধদান করলে তা হয় সন্তানের ক্ষতির কারণ।
চিকিৎসা বিজ্ঞানীগণ বলেছেন, গর্ভবতী নারীর স্তনের দুধ হলো রোগ বিশেষ। তাই এ দুধ শিশু পান করলে সে রোগাক্রান্ত এবং অপ্রকৃতি স্বভাবের হতে পারে।
ইসলামী ‘আকীদা হলো সবকিছুর প্রকৃত প্রভাবক হলো আল্লাহ তা‘আলা, তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরীক্ষেত বিধান মেনে চলা উচিত। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ২১৬২; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - (স্বামী-স্ত্রীর) সহবাস
৩১৯৭-[১৫] ’উমার ইবনুল খত্ত্বাব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বাধীনা রমণীর সম্মতি ব্যতীত তার সাথে ’আযল করতে নিষেধ করেছেন। (ইবনু মাজাহ)[1]
عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَن يعْزل عَن الْحرَّة إِلَّا بِإِذْنِهَا. رَوَاهُ ابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: স্বাধীনা নারীর সাথে ‘আযল করতে তার অনুমতি প্রয়োজন, কেননা যৌন কর্মের পূর্ণ আনন্দ তার উপভোগ্য হক, অথবা সন্তান ধারণের মাধ্যমে মাতৃত্বের সম্মান উপভোগ করা তার নারীত্বের দাবী। সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বাধীনা নারীর অনুমতি ব্যতিরেকে ‘আযল করতে নিষেধ করেছন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - (গোলামদের স্বাধীনতা প্রদান)
৩১৯৮-[১] ’উরওয়াহ্ (রহঃ) ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (জনৈকা দাসী) বারীরাহ্ সম্পর্কে তাঁকে (’আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে) বললেন, তাকে কিনে নিয়ে মুক্ত করে দাও। বারীরাহ্-এর স্বামীও দাস ছিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে (বিবাহ সম্পর্ক রাখা বা বিচ্ছেদের) অধিকার দিলেন, এতে বারীরাহ্ (বিবাহ বিচ্ছেদ করে) নিজেকে মুক্ত করল। (রাবী বলেন) যদি সে (স্বামী) স্বাধীন হতো, তবে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে (বারীরাহ্-কে) স্বীয় অধিকার দিতেন না। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابٌ [خِيَارُ الْمَمْلُوْكِيْنَ]
عَنْ عُرْوَةَ عَنْ عَائِشَةَ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَهَا فِي بَرِيرَةَ: «خُذِيهَا فَأَعْتِقِيهَا» . وَكَانَ زَوْجُهَا عَبْدًا فَخَيَّرَهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاخْتَارَتْ نَفسهَا وَلَو كَانَ حرا لم يخيرها
ব্যাখ্যা: বারীরাহ্ (নাম্নী দাসী) হাদীসে প্রসিদ্ধ একটি নাম। তার সাথে সংশ্লিষ্ট অনেক ঘটনা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরিবারে রয়েছে। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে নির্দেশ করেন, তুমি বারীরাহ্-কে খরিদ করে মুক্ত করে দাও। বারীরাহ্-এর স্বামীও ছিল দাস। স্বাধীনা মুসলিম মহিলা দাস স্বামীর বিবাহ বন্ধনে থাকা না থাকার অধিকার রাখে। সুতরাং ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) যখন বারীরাহ্-কে স্বাধীন করে দিলেন তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারীরাহ্-কে তার দাস স্বামীকে স্বামী হিসেবে বহাল রাখা অথবা তার নিকট থেকে মুক্ত হয়ে যাওয়ার অধিকার বা ইখতিয়ার দিলেন। তিনিও সে ইখতিয়ার গ্রহণ করে তার বিবাহ বন্ধন ভেঙ্গে পৃথক হয়ে গেলেন। তার স্বামী মুগীস কত কান্নাকাটি করে তার পিছনে পিছনে ফিরলেন কিন্তু বারীরাহ্ তাকে আর গ্রহণই করলেন না।
সুনানু আবী দাঊদে ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে অন্য একটি বর্ণনা রয়েছে, বারীরাহ্-কে যখন স্বাধীন করা হয় তখন তার স্বামী দাস নয় বরং স্বাধীনই ছিল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ঐ ইখতিয়ার দিয়েছিলেন। বারীরাহ্ তখন বললেন, আমি তার সাথে থাকা পছন্দ করি না, কারণ সে আমাকে অমুক অমুক দিন অমুক অমুক কথা বলেছে।
উভয়বিধ হাদীসের ভিত্তিতে ইমামদের নিমেণাক্ত বক্তব্য স্মর্তব্য:
* স্বামী দাস হলে সর্বসম্মতভাবে স্ত্রী ইখতিয়ার পাবে।
* স্বামী মুসলিম হলে মালিক, শাফি‘ঈ, আহমাদ প্রমুখ ইমামদের মতে স্ত্রীর ইখতিয়ার থাকবে না, কিন্তু ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-এর মতে এ অবস্থাতেও তার ইখতিয়ার থাকবে। আবূ দাঊদে বর্ণিত ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর হাদীস তার পক্ষে প্রামাণ্য দলীল।
* কিন্তু স্বামী-স্ত্রী উভয়েই যদি একসাথে মুক্ত বা স্বাধীন হয় তখন এই ইখতিয়ার থাকে না। অথবা স্বামী যদি স্বাধীন হয় তখন স্ত্রী স্বাধীনা হোক অথবা দাসী হোক তার বিবাহ বন্ধন ভঙ্গ করার কোনো ইখতিয়ার থাকে না। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫২৭৯; শারহে মুসলিম ৯/১০ম খন্ড, হাঃ ১৫০৪; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - (গোলামদের স্বাধীনতা প্রদান)
৩১৯৯-[২] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বারীরাহ্-এর স্বামী মুগীস হাবশী (কালো) ক্রীতদাস ছিল। আমি যেন সে দৃশ্য এখনও দেখছি, যখন মুগীস মদীনার অলিগলিতে (বারীরাহ্-এর পেছনে পেছনে) অশ্রুসিক্ত নয়নে দাড়ি ভাসিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। এটা দেখে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার পিতাকে বলেন, হে ’আব্বাস! বারীরাহ্-এর প্রতি মুগীস-এর গভীর প্রেমাসক্ত এবং মুগীস-এর প্রতি বারীরাহ্-এর অনীহা দেখে তোমার কি বিস্ময়বোধ হয় না! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারীরাহ্-কে বললেন, তুমি যদি তাকে পুনরায় গ্রহণ কর (এটা কতই না উত্তম হয়)? তখন বারীরাহ্ বলল, হে আল্লাহর রসূল! আপনি কি আমাকে নির্দেশ করছেন? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আমি তো সুপারিশ করছি মাত্র। বারীরাহ্ বলল, তবে আমার তার কোনো প্রয়োজন নেই। (বুখারী)[1]
بَابٌ [خِيَارُ الْمَمْلُوْكِيْنَ]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: كَانَ زَوْجُ بَرِيرَةَ عبدا أسود يُقَالُ لَهُ مُغِيثٌ كَأَنِّي أَنْظُرُ إِلَيْهِ يَطُوفُ خلفهَا فِي سِكَك الْمَدِينَة يبكي وَدُمُوعُهُ تَسِيلُ عَلَى لِحْيَتِهِ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَىَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِلْعَبَّاسِ: «يَا عَبَّاسُ أَلَا تَعْجَبُ مِنْ حُبِّ مُغِيثٍ بَرِيرَةَ؟ وَمِنْ بُغْضٍ بَرِيرَة مغيثاً؟» فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَوْ راجعته» فَقَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ تَأْمُرُنِي؟ قَالَ: «إِنَّمَا أَشْفَعُ» قَالَتْ: لَا حَاجَةَ لِي فِيهِ. رَوَاهُ البُخَارِيّ
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - (গোলামদের স্বাধীনতা প্রদান)
৩২০০-[৩] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি তার অধীনে পরস্পর দু’জন দাস-দাসী দম্পতিকে মুক্ত করার ইচ্ছা পোষণ করেন এবং এ ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জানতে চান। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নির্দেশ করলেন নারীর পূর্বে পুরুষকে মুক্ত করার। (আবূ দাঊদ, নাসায়ী)[1]
عَنْ عَائِشَةَ: أَنَّهَا أَرَادَتْ أَنْ تَعْتِقَ مَمْلُوكَيْنِ لَهَا زَوْجٌ فَسَأَلَتِ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَمَرَهَا أَنْ تَبْدَأَ بِالرَّجُلِ قَبْلَ الْمَرْأَةِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর মালিকানায় যে দু’জন দাস-দাসী ছিল তারা ছিল পরস্পর স্বামী-স্ত্রী। তাদের উভয়কে আযাদ করার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শরণাপন্ন হলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদের পুরুষজনকে আগে আযাদ করার নির্দেশ দেন। যাতে মহিলাটি অর্থাৎ দাসী স্ত্রীটি স্বাধীনা হওয়ার পর তার দাস স্বামীর সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলার সুযোগ না পায়। মুল্লা ‘আলী কারী বলেন, পুরুষের কথা আগে বলা হয়েছে এজন্য যে, সে পূর্ণ এবং উত্তম ব্যক্তি। অথবা কোনো নারীর স্বামী হবে গোলাম বা দাস এটা হবে নারীর জন্য ভীষণ লজ্জাজনক, তাই আগে পুরুষকে মুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২২৩৪; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - (গোলামদের স্বাধীনতা প্রদান)
৩২০১-[৪] উক্ত রাবী [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুগীস-এর স্ত্রী বারীরাহ্ মুক্তি লাভ করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে (বিবাহ সম্পর্ক রাখা বা বিচ্ছেদের) অধিকার দিয়ে বলেন যে, সে যদি তোমার সান্নিধ্য (সহবাস) লাভ করে থাকে, তবে তোমার কোনো অধিকার নেই। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْهَا: أَنْ بَرِيرَةَ عَتَقَتْ وَهِيَ عِنْدَ مُغِيثٍ فَخَيَّرَهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَالَ لَهَا: «إِنْ قَرِبَكِ فَلَا خِيَارَ لَكِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
وَهَذَا الْبَابُ خَالٍ عَنِ الْفَصْلِ الثَّالِثِ
- -
বিঃ দ্রঃ (وَهٰذَا الْبَابُ خَالٍ عَنِ اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ) আর এ অধ্যায়ে তৃতীয় অনুচ্ছেদ নেই।
ব্যাখ্যা: বারীরাহ্-এর স্বামীর নাম ছিল মুগীস। সেও ছিল কৃতদাস। পূর্বের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে দাসী যদি আগে মুক্ত বা স্বাধীন হয় তাহলে তার দাস স্বামীর বিবাহ বন্ধনে থাকা না থাকার ইখতিয়ার লাভ করে। ইচ্ছা করলে সে তার স্বামীকে স্বামী হিসেবে রাখতেও পারে, ইচ্ছা করলে বিবাহ ভঙ্গও করতে পারে। অত্র হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, এই অধিকার ততক্ষণ পর্যন্ত বলবৎ থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত স্বামী তাকে স্পর্শ না করবে অর্থাৎ তার সাথে সঙ্গম না করবে, কিন্তু যদি সে তার সাথে সঙ্গম করে তবে ঐ অধিকার নিঃশেষ হয়ে যাবে। বারীরাহ্ তার কৃতদাস স্বামীকে বর্জন করেছিলেন। (‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২২৩৩; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - মোহর
صَدَاقٌ শব্দটি كِتَابٌ এবং سَحَابٌ এর ওযনে এসেছে, এর অর্থ ’মোহর’; ص বর্ণে যের যোগে পাঠ সবচেয়ে বেশী স্পষ্ট এবং বেশী ব্যবহৃত হয়। একে ’মোহর’ বা ’মুহরানা’ বলা হয় এজন্য যে, এর মাধ্যমে পুরুষের নারীর দিকে উদ্গত হওয়ার সত্যতা ও অধিকার প্রকাশ করা হয়।
৩২০২-[১] সাহল ইবনু সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট জনৈকা রমণী এসে বলল, হে আল্লাহর রসূল! আমি নিজেকে আপনার নিকট (বিবাহের উদ্দেশে) অর্পণ করলাম- এ কথা বলে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। (কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নীরব রইলেন) এমতাবস্থায় জনৈক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রসূল! আপনার যদি (বিয়ের) প্রয়োজন না থাকে, তবে তাকে আমার সাথে বিয়ে দিন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নিকট মোহর হিসেবে এমন কিছু আছে কি যা তুমি দিতে পার? সে বলল, আমার এ লুঙ্গি (জাতীয় পোশাক) ছাড়া আর কিছুই নেই।
তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, লোহার একটি আংটি হলেও সন্ধান কর। কিন্তু সে কিছুই খুঁজে পেল না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি কুরআনের কিয়দংশ (মুখস্থ) আছে? সে বলল, হ্যাঁ, অমুক সূরা, অমুক সূরা আমার জানা আছে। এতে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমার যতটুকু কুরআন (মুখস্থ) আছে তার বিনিময়ে তোমাকে তার সাথে বিবাহ সম্পাদন করলাম।
অন্য বর্ণনায় আছে- ’’যাও, তোমার সাথে তাকে বিয়ে দিলাম, তুমি তাকে কুরআন শিখাও।’’ (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الصَّدَاقِ
عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جَاءَتْهُ امْرَأَةٌ فَقَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي وَهَبْتُ نَفْسِي لَكَ فَقَامَتْ طَوِيلًا فَقَامَ رَجُلٌ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ زَوِّجْنِيهَا إِنْ لَمْ تَكُنْ لَكَ فِيهَا حَاجَةٌ فَقَالَ: «هَلْ عِنْدَكَ مِنْ شَيْءٍ تُصْدِقُهَا؟» قَالَ: مَا عِنْدِي إِلَّا إِزَارِي هَذَا. قَالَ: «فَالْتَمِسْ وَلَوْ خَاتَمًا مِنْ حَدِيدٍ» فَالْتَمَسَ فَلَمْ يَجِدْ شَيْئًا فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «هَلْ مَعَكَ مِنَ الْقُرْآنِ شَيْءٌ» قَالَ: نَعَمْ سُورَةُ كَذَا وَسُورَةُ كَذَا فَقَالَ: «زَوَّجْتُكَهَا بِمَا مَعَكَ مِنَ الْقُرْآنِ» . وَفِي رِوَايَةٍ: قَالَ: «انْطَلِقْ فَقَدْ زَوَّجْتُكَهَا فَعَلِّمْهَا مِنَ الْقُرْآنِ»
ব্যাখ্যা: হাদীসের বর্ণনাকারী সাহল ইবনু সা‘দ আস্ সা‘ইদী ছিলেন আনসারী। তার পূর্ব নাম ছিল ‘হুযন’ অর্থ বিষণ্ণ-চিন্তিত-দুঃখিত ইত্যাদি, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এ নাম পরিবর্তন করে ‘সাহল’ ‘কোমল’ নাম রেখে দেন। তিনি ছিলেন মদীনায় মৃত্যুবরণকারী সর্বশেষ সাহাবী।
মহিলাটি যখন নিজেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট বিবাহের জন্য পেশ করেন, দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো উত্তর দেননি; এর কারণ হলো মহিলাটির নির্লজ্জতা, অথবা এ ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশ না পাওয়া। কিন্তু নির্লজ্জতা কথাটি যথার্থ নয় কারণ আল্লাহর বাণীতে বলা হয়েছে, ‘‘আর কোনো মু’মিনাহ্ মহিলা যদি নিজেকে নাবীর নিকট হেবা করে দেয় এবং নাবীও যদি তাকে বিয়ে করার ইচ্ছা পোষণ করেন .....’’- (সূরা আল আহযাব ৩৩ : ৫০)।
এতে বুঝা যায়, কোনো নারী নিজেকে বিয়ের জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পেশ করা নির্লজ্জ কাজ নয়। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় সাহিবুল মুদারিক বলেনঃ আল্লাহ যেন বলেছেন, ‘‘হে নাবী! কোনো মু’মিনাহ্ নারীর অন্তরে যদি আপনার বিবাহ বন্ধনে থাকার বাসনা সৃষ্টি হয় আর সে নিজেকে নাবীর কাছে হেবা হিসেবে পেশ করে এবং কোনো প্রকার মোহর দাবী না করে আর আপনিও যদি তাকে বিবাহ করতে ইচ্ছা করেন তাহলে বিনা মোহরে তাকে বিবাহ করতে পারবেন, এটা আপনার জন্যই কেবল খাস, অন্য কোনো মু’মিনের জন্য নয়।’’
ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, আল্লাহর ঐ বাণীর হুকুম ভবিষ্যতের জন্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট হেবা হিসেবে দেয়া কোনো স্ত্রী ছিলেন না। কেউ কেউ বলেছন, যে সকল নারী নিজকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট হেবা হিসেবে পেশ করেছিলেন তারা হলেন, মায়মূনাহ্ বিনতু হারিস অথবা যায়নাব বিনতু খুযায়মাহ্, অথবা উম্মু শরীক বিনতু জাবির অথবা খাওলাহ্ বিনতু হাকিম।
মোহর প্রদান প্রত্যেক পুরুষের জন্য আবশ্যক। এমনকি মোহর যদি নির্ধারণ নাও করা হয় কিংবা কোনো পুরুষ এটাকে অস্বীকারও করে তবুও তার ওপর এটা আবশ্যক। ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, নাবীর নিকট কেউ নিজকে সমর্পণ করলে এবং নাবী তাকে বিয়ে করলে মোহর গুণতে হবে না, এমনকি দৈহিক মিলন হলেও নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ব্যাপারে হেবা শব্দ দ্বারা বিবাহ সম্পাদিত হবে কিনা- এ নিয়ে ফুকাহাদের মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য পরিলক্ষেত হয়। কুরআন ও হাদীসের প্রকাশ্য অর্থের ভিত্তিতে বিশুদ্ধ মত হলো বিবাহ সম্পাদিত হবে। অনির্ভরযাগ্য অন্য একটি মত হলো ‘নিকাহ’ ও ‘বিবাহ’ শব্দ ছাড়া অন্য কোনো শব্দ দ্বারা অর্থাৎ হেবা শব্দ দ্বারা অন্যের যেমন বিবাহ শুদ্ধ হবে না নাবীর বেলায়ও শুদ্ধ হবে না। ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) বলেন, যে সকল শব্দ (বিবাহের মাধ্যমে) মালিকানা দৃঢ়তা প্রকাশ করে তা দিয়েই বিবাহ সম্পাদিত হবে। ইমাম মালিক-এর দু’টি মতের একটি হলো হেবা, সাদাকা, বাই ইত্যাদি শব্দ দ্বারা যদি বিবাহের ইচ্ছা প্রকাশ কর হয় তবে বিবাহ শুদ্ধ হবে।
এ হাদীসে কোনো মহিলার নিজকে কোনো নেককার ব্যক্তির নিকট বিবাহের জন্য পেশ করা মুস্তাহাব প্রমাণিত। আরো প্রমাণিত যে, যার কাছে প্রস্তাব পেশ করা হবে তার যদি তা পালন বা গ্রহণ সম্ভব না হয় তাহলে সে পূর্ণ নিরবতা অবলম্বন করবে যাতে প্রশ্নকারী বা প্রস্তাবকারী বুঝে নিতে পারেন যে, তার প্রয়োজন নেই। তিনি তাকে না বলে অপমানিত করবেন না।
মহিলাটির প্রস্তাব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গ্রহণ না করলে পাশের দাঁড়ানো ব্যক্তি যখন নিজের সাথে বিয়ের আবেদন জানালেন তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে মোহর দেয়ার মতো তোমার কাছে কিছু আছে কি? লোকটি বললেন, এই লুঙ্গি ছাড়া আমার কাছে আর কিছুই নেই; এর দ্বারা বুঝা যায় তার চাদরও ছিল না এবং ভিন্ন আরেকটি লুঙ্গিও ছিল না।
হাদীস থেকে প্রমাণিত মহিলাদের মোহর না চাওয়াও জায়িয। বিবাহে মোহর নির্ধারণ করাই মুস্তাহাব, কেননা এতে ঝগড়া নিপাত যায়, আর মহিলারও হয় অধিক উপকার। এতে আরো প্রমাণিত যে, উভয়ের সম্মতির ভিত্তিতে মোহর অতি সামান্য হওয়াও বৈধ, কেননা একটা লোহার আংটি অতীব নগণ্য মূল্যের বস্তুই বটে। এটাই ইমাম শাফি‘ঈ এবং জুমহূর ‘উলামাদের মাযহাব। পক্ষান্তরে ইমাম মালিক (রহঃ) বলেন, মোহরের ন্যূনতম পরিমাণ হতে হবে এক-চতুর্থাংশ দীনার যেটা চুরির নিসাব অর্থাৎ ন্যূনতম এক-চতুর্থাংশ দীনার চুরি করলেই কেবল চোরের হাত কাটা যাবে অন্যথায় নয়। ইমাম আবূ হানীফাহ্ এবং তার অনুসারীরা বলেন, মোহরের ন্যূনতম পরিমাণ হতে হবে দশ দিরহাম। ইমাম শাফি‘ঈ এবং জুমহূরের মাযহাব বা মতটিই অধিক সহীহ, কেননা প্রামাণ্য হাদীসটি সহীহ এবং সরীহ অর্থাৎ সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন।
ইমাম আবূ হানীফাহ্ ও তার অনুসারীরা বলেন, দশ দিরহামের কম মোহর চলবে না। তাদের দলীল হলো বায়হাক্বী, দারাকুত্বনী ইত্যাদি বর্ণিত হাদীস : ‘‘..... দশ দিরহামের কমে কোনো মোহর হবে না।’’
কিন্তু গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, এ হাদীস য‘ঈফ এবং তা সর্বসম্মতভাবেই য‘ঈফ, এমনকি কেউ কেউ এটাকে মাওযূ‘ বা জাল বলেও উল্লেখ করেছেন। সুতরাং মোহরের বিষয়টি স্বামীর সামর্থ্যের উপর এবং স্ত্রীর স্বীকৃতির ভিত্তিতেই সাব্যস্ত হয়, এর সুনির্দ্দিষ্ট কোনো পরিমাণ নেই।
ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, এ হাদীসের ভিত্তিতে লোহার আংটি পরিধান করা বৈধ এবং মোহর নগদ পরিশোধ করা মুস্তাহাব প্রমাণিত।
লোকটির কাছে কোনো কিছুই যখন নেই তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে কুরআনের কিছু মুখস্থ আছে কি? লোকটি বললেন হ্যাঁ, অমুক সূরা মুখস্থ আছে। ইমাম মালিক-এর বর্ণনায় ঐগুলোর নাম উল্লেখ রয়েছে। সুনানু আবী দাঊদে আবূ হুরায়রাহ্ প্রমুখাৎ বর্ণিত, সূরা আল বাকারা এবং তৎসংশ্লিষ্ট সূরার কথা উল্লেখ হয়েছে। এছাড়া দারাকুত্বনীতে মুফাসসাল সূরাসমূহের কথা এবং আবিশ্ শায়খে ইন্না আ‘ত্বয়নাকাল কাওসার-এর কথা এসেছে।
ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, কুরআন শিক্ষা দেয়া যে মোহর হতে পারে এবং কুরআন শিক্ষার বিনিময় নেয়া জায়িয- এ হাদীস তার দলীল। একদল অবশ্য এটা নিষেধ করেন, তাদের মধ্যে ইমাম আবূ হানীফাহ্ও রয়েছেন।
এ হাদীসে আরো প্রমাণিত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কুফু বা সমতাও ধর্তব্য বিষয় নয়।
(ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫১৩৫; শারহে মুসলিম ৯/১০ম খন্ড, হাঃ ১৪২৫; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - মোহর
৩২০৩-[২] আবূ সালামাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর কাছে জানতে চাইলাম, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিবাহের মোহর কি পরিমাণ ছিল? তিনি বললেন, তাঁর সহধর্মিণীগণের মোহরের পরিমাণ ছিল ১২ উকিয়্যাহ্ (১ উকিয়্যাহ্ ৪০ দিরহামের সমপরিমাণ) ও এক নাশ্। তিনি বললেন, তুমি জান ’নাশ্’ কি? আমি বললাম, জানি না। উত্তরে বললেন, অর্ধ উকিয়্যাহ্, অর্থাৎ- এই পাঁচশত দিরহামই (৪০ × ১২ = ৪৮০ + ২০)। (মুসলিম)[1]
নাশ্ نَشٌّ এর شِيْن অক্ষরে ضَمَّةْ শারহুস্ সুন্নাহ্ ও সকল মূল গ্রন্থে এরূপই আছে।
بَابُ الصَّدَاقِ
وَعَنْ أَبِي سَلَمَةَ قَالَ: سَأَلْتُ عَائِشَةَ: كَمْ كَانَ صَدَاقُ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَت: كَانَ صداقه لأزواجه اثْنَتَيْ عَشْرَةَ أُوقِيَّةً وَنَشٌّ قَالَتْ: أَتَدْرِي مَا النَّشٌّ؟ قُلْتُ: لَا قَالَتْ: نِصْفُ أُوقِيَّةٍ فَتِلْكَ خَمْسُمِائَةِ دِرْهَمٍ. رَوَاهُ مُسْلِمٌ. وَنَشٌّ بِالرَّفْعِ فِي شَرْحِ السّنة وَفِي جَمِيع الْأُصُول
ব্যাখ্যা: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের মোহর ছিল ১২ উকিয়্যাহ্ এবং নাশ্ পরিমাণ। এক উকিয়্যাহ্ হলো চল্লিশ দিরহাম, নাশ্ হলো অর্ধ দিরহাম। ইবনুল আ‘রবী বলেন, নাশ্ হলো প্রত্যেক বস্তুর অর্ধেক। সবমিলে সাড়ে বারো উকিয়্যায় পাঁচশত দিরহাম হয়, এটাই ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের সর্বোচ্চ মোহরের পরিমাণ।
ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, এ হাদীসের ভিত্তিতে আমাদের সাথীদের নিকট মুস্তাহাব হলো পাঁচশত দিরহাম মোহর নির্ধারণ করা। কেউ যদি প্রশ্ন তোলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী উম্মু হাবীবাহ্ (রাঃ) এর মোহর চার হাজার দিরহাম অথবা চার লক্ষ দীনার ছিল? এর উত্তর হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মানে উম্মু হাবীবাহ্ (রাঃ)-এর বিবাহের মোহর নাজাশী বাদশাহ রাষ্ট্রীয়ভাবে আদায় করেছিলেন অথবা অনুদান হিসেবে তাকে প্রদান করেছিলেন। সুতরাং তার বিবাহের মোহর পরিমাণ স্বতন্ত্র বিষয়। (শারহে মুসলিম ৯/১০ম খন্ড, হাঃ ১৪২৬; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মোহর
৩২০৪-[৩] ’উমার ইবনুল খত্ত্বাব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তোমরা স্ত্রীদের মোহর নির্ধারণে সীমালঙ্ঘন করো না। কেননা যদি উক্ত মোহর নির্ধারণ দুনিয়াতে সম্মান এবং আল্লাহর নিকট তাকওয়ার বিষয় হতো, তবে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই তোমাদের চেয়ে তা নির্ধারণে অধিক অগ্রগামী হতেন। কিন্তু ১২ উকিয়্যার বেশি পরিমাণ মোহর নির্ধারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কোনো সহধর্মিণীকে বিয়ে করেছেন কিংবা কোনো মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন বলে আমার জানা নেই। (আহমাদ, তিরমিযী, আবূ দাঊদ, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ, দারিমী)[1]
عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: أَلَا لَا تُغَالُوا صَدُقَةَ النِّسَاءِ فَإِنَّهَا لَوْ كَانَتْ مَكْرُمَةً فِي الدُّنْيَا وَتَقْوَى عِنْدَ اللَّهِ لَكَانَ أَوْلَاكُمْ بِهَا نَبِيُّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا عَلِمْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَكَحَ شَيْئًا مِنْ نِسَائِهِ وَلَا أَنْكَحَ شَيْئًا مِنْ بَنَاتِهِ عَلَى أَكْثَرَ مِنَ اثْنَتَيْ عَشْرَةَ أُوقِيَّةً. رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ وَالدَّارِمِيُّ
ব্যাখ্যা : এ হাদীসের বক্তব্য ‘উমার -এর, তিনি অধিক মোহর ধার্য পছন্দ করতেন না। কাযী ‘ইয়ায বলেন, لَا تُغَالُوْا অর্থ হলো لا تكثروا তোমরা বেশী করো না, অর্থাৎ মহিলাদের মোহর খুব বেশী বেঁধো না। বেশী মোহর ধার্য করা কোনো সম্মানের প্রতীক নয় এবং তাকওয়ার কোনো কাজও নয়। আল্লাহ বলেন, ‘‘নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি আল্লাহর নিকট অধিক সম্মানিত যে তোমাদের মধ্যে তাকওয়াবান’’- (সূরা আল হুজুরত ৪৯ : ১৩)।
অধিক মোহর যদি সম্মানের প্রতীক হতো তাহলে সর্বপ্রথম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে অধিক মোহর দিয়ে বিয়ে করতেন এবং তার কন্যাগণকেও অধিক মোহরে বিয়ে দিতেন, অথচ তিনি ১২ উকিয়্যার বেশী মোহরে কোনো নারীকে বিয়ে করেননি এবং তার কোনো কন্যাকেও বিয়ে দেননি। আর উম্মু হাবীবাহ্ -এর বিয়েতে অতিরিক্ত টাকার বিষয়টি পূর্বের হাদীসের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, নাজাশী বাদশা তিনি তা নিজের পক্ষ থেকে নাবীজীর সম্মানে প্রদান করেছিলেন। আর ‘নাশ্’ বা অর্ধ দিরহাম বা ভগ্নাংশের কথা বাদ দিয়ে এখানে বলা হয়েছে। এরূপ বলার বিধান রয়েছে; সুতরাং তা পূর্বের হাদীসের বর্ণিত সংখ্যার পরিপন্থী নয়।
যদি কেউ প্রশ্ন করে মোহর বেশী না বাঁধার কথাটি আল কুরআনের এই আয়াতের পরিপন্থী, আল্লাহ বলেছেনঃ ‘‘আর যদি তোমরা একজনকে অঢেল বা রাশি রাশি সম্পদ দিয়েও থাকো তবে তা থেকে কোনো কিছুই তোমরা গ্রহণ করো না।’’ (সূরা আন্ নিসা ৪ : ২০)
উত্তরে বলব, আল কুরআনের আয়াতটি মোহর বেশী প্রদান জায়িয প্রমাণ করে মাত্র, উত্তমতা প্রমাণকারী নয়। আর আমাদের কথা হলো আফযালিয়াত বা উত্তমতা নিয়ে, জায়িয নিয়ে নয়। ‘উমার -এর বক্তব্যে ঘোষণা করেন, তোমরা মহিলাদের জন্য চল্লিশ উকিয়্যার বেশী নির্ধারণ করো না, কেউ যদি বেশী নির্ধারণ করে তবে তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা নেয়া হবে। এ কথা শুনে একমহিলা প্রতিবাদ করে বললেন, কে আপনাকে এ কথা বলার অধিকার দিল? অর্থাৎ এই চল্লিশ উকিয়্যার সীমা নির্ধারণের অধিকার কে আপনাকে দিয়েছে? অথচ আল্লাহ বলেছেন, ‘‘যদি তোমরা তাদের কাউকে রাশি রাশি সম্পদও মোহর প্রদান কর .....।’’ এ প্রমাণ ও যুক্তিভিত্তিক দলীল শুনে ‘উমার বললেন, মহিলাটি ঠিক বলেছেন, আর লোকটি অর্থাৎ স্বয়ং ‘উমার ভুল করেছেন। (‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২১০৬; তুহফাতুল আহওয়াযী ৩য় খন্ড, হাঃ ১১১৪)
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মোহর
৩২০৫-[৪] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি স্ত্রীর মোহর হিসেবে এক অঞ্জলি (দু’ হাতের মুঠির সমন্বয়ের) পরিমাণ ছাতু অথবা খেজুর দিল, সে তাকে নিজের জন্য হালাল করে নিল। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ جَابِرٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ أَعْطَى فِي صَدَاقِ امْرَأَتِهِ مِلْءَ كَفَّيْهِ سَوِيقًا أَوْ تَمْرًا فَقَدِ اسْتحلَّ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: বিবাহে মোহরের সর্বনিম্ন পরিমাণ নিয়ে ফুকাহায়ে কিরামের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অত্র হাদীসটি মোহরের সর্বনিম্ন পরিমাণ নির্ধারণের ইঈিত বহণ করে। কোনো ব্যক্তি যদি স্ত্রীকে মোহর হিসেবে অঞ্জলিভরে ভাজা গম, যব বা ভুট্টার আটা প্রদান করে, অথবা খেজুর প্রদান করে তাহলে তা মোহর হিসেবে গণ্য হবে এবং স্ত্রী তার জন্য হালাল হয়ে যাবে। যদিও তা দশ দিরহামের চেয়ে কম। ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ) উক্ত হাদীস সহ আরো অন্যান্য হাদীসের প্রামাণিকতার ভিত্তিতে উল্লেখিত পরিমাণের মোহর দিয়ে বিবাহ বৈধ হওয়াকে সাব্যস্ত করেন। অনুরূপভাবে হানাফী মাযহাবের কতক আলিম বলেন, যিনি দশ দিরহামের কমে মোহর জায়িয নয় বলে মনে করেন কম পক্ষে তার জন্য উক্ত হাদীসের ভিত্তিতে ঐ পরিমান মোহরে বিবাহের বৈধতা দেয়া উচিত।
ইমাম খত্ত্বাবী (রহঃ) বলেনঃ মোহর স্বামী-স্ত্রীর বিষয়, স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের সম্মতিক্রমে ও সন্তুষ্টচিত্তে তা নির্ধারিত হয়। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ কত এবং কি বস্তু দিয়ে তা আদায় হবে এটা দু’জনে সানন্দে নির্ধারণ করবে। যদিও ফুকাহায়ে কিরাম মোহরের সর্বনিম্ন পরিমাণ নিয়ে মতানৈক্য করেছেন।
ইমাম সুফ্ইয়ান সাওরী, শাফি‘ঈ, আহমাদ, ইসহক প্রমুখ ইমাম ও ফুকাহার মতে মোহরের সর্বনিম্ন পরিমাণ নির্দিষ্ট নয়, বরং তা স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের সম্মতিতে নির্ধারিত হবে।
প্রখ্যাত তাবি‘ঈ সা‘ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব বলেন, একটি চাবুকও যদি স্ত্রীকে মোহর হিসেবে প্রদান করা হয়, তাহলে স্ত্রী বৈধ হয়ে যাবে।
ইমাম মালিক (রহঃ) বলেনঃ মোহরের সর্বনিম্ন পরিমাণ হলো এক দীনারের এক-চতুর্থাংশ। আসহাবুর রায় বা ক্বিয়াসপন্থহীগণ বলেন, মোহরের সর্বনিম্ন পরিমাণ হলো দশ দিরহাম। তারা এই পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন চোরের হাত কাটার উপর ক্বিয়াস করে, কেননা কোনো চোর সর্বনিম্ন দশ দিরহাম চুরি করলেই কেবল তার হাত কাটা হয়, অন্যথায় নয়। সুতরাং বুঝা গেল একটা অঙ্গের ন্যূনতম বিনিময় দশ দিরহাম, এর নিচে নয়। এ থেকেই তারা ক্বিয়াস করেন যে, স্বামী-স্ত্রী বিবাহের মাধ্যমে একটি অঙ্গকেই বৈধ করে নেয়, আর তা নেয় মোহরের বিনিময়ে। সুতরাং তা দশ দিরহামের নিচে বৈধ নয়।
সা‘ঈদ ইবনু জুবায়র (রহঃ) বলেন, মোহরের সর্বনিম্ন পরিমাণ পঞ্চাশ দিরহাম। ‘আল্লামা নাখ‘ঈ (রহঃ) বলেন, মোহরের সর্বনিম্ন পরিমাণ চল্লিশ দিরহাম। আর ইবনু শুব্রুমাহ্ বলেন, পাঁচ দিরহাম।
যে সকল ফুকাহা বলেন, মোহরের সর্বনিম্ন কোনো পরিমাণ নেই, তারা উল্লেখিত হাদীস ছাড়াও নিমেণর হাদীসটি দলীল হিসেবে পেশ করে থাকেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «فَالْتَمِسْ وَلَوْ خَاتَمًا مِنْ حَدِيدٍ» ‘‘একটি লোহার আংটি হলেও তুমি তোমার স্ত্রীর মোহর দেয়ার জন্য তা অনুসন্ধান কর।’’ মোহরের সর্বনিম্ন পরিমাণ সম্পর্কে এই বিশুদ্ধ হাদীসটি প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। অপরদিরকে হানাফী ‘আলিমগণ বলেন, যদিও হাদীসটি বিশুদ্ধ কিন্তু তা ঐ যুগের একটি প্রথার দিকে নির্দেশ করে তা হলো ‘‘তুমি একটি লোহার আংটি হলেও মোহর হিসেবে তা নগদ প্রদান কর।’’ অর্থাৎ হাদীসটি নগদ প্রদানে সর্বনিম্ন পরিমাণ নির্ধারক, সামগ্রিক মোহরের সর্বনিম্ন পরিমাণ নির্ণয়ক নয়।
বলাবাহুল্য এই তা‘বীল বা ব্যাখ্যা সহীহ হাদীস বর্জনের আরেক কৌশল। তাই ব্যাখ্যাকার মুল্লা ‘আলী আল কারী (হানাফী) (রহঃ) বলেছেনঃ উল্লেখিত মতানৈক্যের ভিত্তিতে ও তাদের প্রামাণ্য দলীলের ভিত্তিতে বলা যায় যে, ইমাম শাফি‘ঈ সহ যারা মোহরের সর্বনিম্ন পরিমাণ নেই বলেছেন তাদের মতটিই সুস্পষ্ট বিশুদ্ধ দলীলের মাধ্যমে প্রমাণিত। (‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২১১০; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মোহর
৩২০৬-[৫] ’আমির ইবনু রবী’আহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বানী ফাযারহ্ গোত্রের জনৈকা রমণীর (মোহর বাবদ) এক জোড়া জুতার বিনিময়ে বিবাহ হয়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি এক জোড়া জুতার বিনিময়ে তোমাকে অর্পণ করতে রাজি হয়েছ? সে বলল, জি, হ্যাঁ। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার বিবাহের সম্মতি দিলেন। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ عَامِرِ بْنِ رَبِيعَةَ: أَنَّ امْرَأَةً مَنْ بَنِي فَزَارَةَ تَزَوَّجَتْ عَلَى نَعْلَيْنِ فَقَالَ لَهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَرَضِيتِ مِنْ نَفْسِكِ وَمَالِكِ بِنَعْلَيْنِ؟» قَالَتْ: نَعَمْ. فَأَجَازَهُ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: মোহরের সর্বনিম্ন পরিমাণ পূর্বেও হাদীসে বিস্তারিত আলোচনা হয়ে গেছে, সুতরাং সে বিষয়ে আলোচনা নিষ্প্রয়োজন।
হানাফী মাযহাবের ‘উলামায়ে কিরাম বলেন, দশ দিরহামের কম মোহর বৈধ হওয়া সংক্রান্ত যত হাদীস রয়েছে সবগুলো দুর্বল, কেবল লোহার আংটি সংক্রান্ত হাদীসটি ছাড়া। ঐ হাদীসের সম্পর্কে তাদের তা‘বীল ও ব্যাখ্যা পূর্বের হাদীসে অতিবাহিত হয়েছে।
অনুরূপভাবে ফাযারহ্ গোত্রের এক মহিলা দু’টো জুতার বিনিময়ে বিবাহে রাযী হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অনুমতি দেন, ফলে তাদের বিয়ে শুদ্ধ হয়ে যায়।
অবশ্য মুল্লা ‘আলী কারী (রহঃ) বলেনঃ বিবাহ শুদ্ধ হয় বটে তবে স্ত্রীর জন্য মোহরে মিসাল ধার্য হবে এবং স্বামীর নিকট তা দাবী করবে। পক্ষান্তরে আরেকদল মুহাদ্দিসের বক্তব্য হলোঃ মূলে একটি হলেও বিশুদ্ধ হাদীস থাকায় য‘ঈফ হাদীসগুলো তার সহায়ক হয় ও শক্তি যোগায়।
মোহরে মিসাল হলো নারীর সৌন্দর্যে কমারিত্বে, অর্থ-সম্পদে সমসাময়িক নিজ বংশের অন্যান্য নারীর সমপরিমাণ মোহর হওয়া। নিজ বংশের অন্যান্য নারী হলো আপন বোন, বৈমাতৃয় বোন, বৈপিতৃয় বোন, ফুপু, চাচাত বোন ইত্যাদি। আর ঐ নারীর ‘ইদ্দত হবে মৃত্যুর ‘ইদ্দত, অর্থাৎ চারমাস দশদিন এবং সে স্বামীর যথাযথ মীরাস লাভ করবে। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৩য় খন্ড, হাঃ ১১১৩; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মোহর
৩২০৭-[৬] ’আলক্বমাহ্ (রহঃ) ইবনু মাস্’ঊদ হতে বর্ণনা করেন। একদিন জনৈক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, এক ব্যক্তি মোহর নির্ধারণ না করে বিয়ে করেছে এবং স্ত্রীর সাথে সহবাসের পূর্বেই মৃত্যুবরণ করেছে; শারী’আতে এর বিধান কি? উত্তরে ইবনু মাস্’ঊদ বললেন, তার পরিবারের অপর নারীদের মোহরের সমপরিমাণ মোহর দিতে হবে। তা হতে কমও নয়, বেশিও নয় এবং স্ত্রীর ’ইদ্দত (৪ মাস ১০ দিন) পালন করতে হবে এবং স্ত্রী তার উত্তরাধিকারী হবে। এটা শুনে আশজা’ঈ গোত্রের এক সাহাবী মা’কল ইবনু সিনান দাঁড়িয়ে বললেন, আমাদের আশজা’ঈ গোত্রের এক স্ত্রীলোক বিরওয়া’ বিনতু ওয়াশিক সম্পর্কেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুরূপ বিধান কার্যকরী করেন। এতে ইবনু মাস্’ঊদ অত্যন্ত খুশী হলেন। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ, নাসায়ী, দারিমী)[1]
وَعَنْ عَلْقَمَةَ عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ: أَنَّهُ سُئِلَ عَنْ رَجُلٍ تَزَوَّجَ امْرَأَةً وَلَمْ يَفْرِضْ لَهَا شَيْئا وَلم يدْخل بهَا حَتَّى مَاتَ فَقَالَ ابْنُ مَسْعُودٍ: لَهَا مِثْلُ صَدَاقِ نِسَائِهَا. لَا وَكْسَ وَلَا شَطَطَ وَعَلَيْهَا الْعِدَّةُ وَلَهَا الْمِيرَاثُ فَقَامَ مَعْقِلُ بْنُ سِنَانٍ الْأَشْجَعِيُّ فَقَالَ: قَضَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي بِرْوَعَ بِنْتِ وَاشَقٍ امْرَأَةٍ مِنَّا بِمِثْلِ مَا قَضَيْتَ. فَفَرِحَ بِهَا ابْنُ مَسْعُودٍ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ والدارمي
ব্যাখ্যা : ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাস্‘ঊদ (রাঃ) ছিলেন সাহাবীদের মধ্যে ফাকীহ সাহাবী। তিনি ঐ মহিলা সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হন যে, মহিলার মোহর নির্ধারণ না করেই বিবাহ হয়, অতঃপর সহবাসের পূর্বেই তার স্বামী ইন্তেকাল করেন, এই মহিলার মোহর কি হবে? ‘ইদ্দত কতদিন এবং সে স্বামীর সম্পদের মীরাস পাবে কিনা? সাহাবী ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাস্‘ঊদ একমাস ভরে ইজতিহাদ করে উত্তর দেন যে, মহিলা মোহরে মিসাল পাবে, এর কমও নয় বেশীও নয়।
ইবনু মাস্‘ঊদ (রাঃ) এ ফায়সালা দেয়ার পর বললেন, ‘‘আমি এ ফয়সালা দিলাম আমার পক্ষ থেকে, যদি সঠিক হয় তবে তা আল্লাহ ও তদীয় রসূলের পক্ষ থেকে, আর যদি ভুল হয় তবে তা এক বান্দার মায়ের পুত্র থেকে হয়েছে।’’ অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, ‘‘যদি সঠিক হয় তবে তা আল্লাহ ও তদীয় রসূলের পক্ষ থেকে, আর যদি ভুল হয় তবে তা আমার পক্ষ থেকে এবং শায়ত্বনের পক্ষ থেকে, আল্লাহ ও তার রসূল এ থেকে দায় মুক্ত।’’ ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাস্‘ঊদ -কে সত্যায়ন করে মা‘আকিল ইবনু সিনান এবং আবুল জার্রাহ্ বলেন, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিরওয়া বিনতু ওয়াসিক-এর কন্যার জন্য এমন ফায়সালাই দিয়েছিলেন। ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাস্‘ঊদ এ কথা শুনে খুবই আনন্দিত হন, কারণ তার ইজতিহাদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ফায়সালার অনুকূল হয়েছে। পক্ষান্তরে ‘আলী সহ সাহাবীগণের একটি দল বলেন, মহিলার স্বামীর সাথে সহবাস বা একান্ত বাস না হওয়ায় সে মোহর পাবে না, তবে তার মীরাস এবং ‘ইদ্দত ধার্য হবে। এ ব্যাপারে ইমাম শাফি‘ঈ-এর অবশ্য উভয়বিধ বক্তব্য রয়েছে। ইমাম মুযহির (রহঃ) বলেন, ইমাম আবূ হানীফাহ্ এবং ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল-এর মাযহাব ইবনু মাস্‘ঊদ -এর মতের উপর।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে এই ইখতিলাফ হলো ঐ মহিলার ব্যাপারে যার বিবাহে কোনো প্রকারের মোহর নির্ধারণ হয়নি এবং তার স্বামী তার সাথে সহবাসের পূর্বেই (স্বামী) মৃত্যুবরণ করল। কিন্তু যদি স্বামী সহবাস করে মৃত্যুররণ করে থাকে তাহলে সর্বসম্মত মতে স্ত্রীর জন্য মোহরে মিসাল ওয়াজিব হবে। কেউ যদি বিবাহ করে স্ত্রীর সাথে সহবাসের পূর্বেই তালাক প্রদান করে তাহলে ঐ মহিলার স্বামীর অর্থনৈতিক সামর্থ্যের উপর বিবেচনা করে বিচারক বা হাকিম তার জন্য মুত্‘আহ্’’ নির্ধারণ করে দিবেন। যেমন পরিধেয় বস্ত্র, ওড়না, আংটি ইত্যাদি। (‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২১১৪; তুহফাতুল আহওয়াযী ৩য় খন্ড, হাঃ ১১৪৫)
পরিচ্ছেদঃ ৭. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - মোহর
৩২০৮-[৭] উম্মু হাবীবাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি ’আব্দুল্লাহ ইবনু জাহশ-এর (বিবাহিতা) স্ত্রী ছিলেন। তার স্বামী ’আব্দুল্লাহ ইবনু জাহশ হাবশায় (পূর্ব নাম আবিসিনিয়া, বর্তমানে ইথিওপিয়া) মৃত্যুবরণ করেন। অতঃপর হাবশার সম্রাট নাজাশী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে উম্মু হাবীবাহ্ (রাঃ)-কে বিবাহ দেন এবং তাঁর পক্ষ হতে চার হাজার দিরহাম মোহর হিসেবে দান করেন।
অপর বর্ণনায় আছে, চার দিরহাম (মোহর দিয়েছেন), অতঃপর শুরাহবীল ইবনু হাসানাহ্-এর সাথে উম্মু হাবীবাহ্ (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে পাঠিয়ে দেন। (আবূ দাঊদ, নাসায়ী)[1]
عَنْ أُمِّ حَبِيبَةَ: أَنَّهَا كَانَتْ تَحْتَ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ جَحْشٍ فَمَاتَ بِأَرْضِ الْحَبَشَةِ فَزَوَّجَهَا النَّجَاشِيُّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَمْهَرَهَا عَنهُ أَرْبَعَة آلَاف. وَفِي رِوَايَة: أَرْبَعَة دِرْهَمٍ وَبَعَثَ بِهَا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَعَ شُرَحْبِيل بن حَسَنَة. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: উম্মু হাবীবাহ্ বিনতু আবূ সুফ্ইয়ান ছিলেন রসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সম্মানিত স্ত্রীদের একজন। তার আসল নাম ছিল রমালাহ্, কেউ কেউ বলেছেন তার নাম ছিল হিন্দ। মায়ের নাম ছিল সফিয়্যাহ্ বিনতু আবুল ‘আস, স্বামীর নাম ‘উবায়দুল্লাহ ইবনু জাহ্শ। অত্র হাদীসে স্বামীর নাম ‘আবদুল্লাহ উল্লেখ হয়েছে, এটা সঠিক নয় বরং ‘উবায়দুল্লাহই সঠিক।
উম্মু হাবীবাহ্ (রাঃ)-এর স্বামী ‘উবায়দুল্লাহ-এর সাথে হাবশায় দ্বিতীয়বারের মতো হিজরত করেন। স্বামী সেখানে গিয়ে ইসলাম ত্যাগ করে খৃষ্টধর্ম গ্রহণ কনে এবং মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু এই মহীয়সী রমণী ইসলামের উপর অটল ও অবিচল থাকেন, অতঃপর হাবশার বাদশাহ নাজাশী নিজে অভিভাবক হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে তার বিবাহ সম্পাদন করে দেন।
নাজাশী হাবাশার বাদশাহর উপাধি, তার আসল নাম হলো আমিন আসহামাহ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দা‘ওয়াত পত্র পেয়ে তিনি নিজ জন্মভূমিতেই ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম হয়েছিলেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সাক্ষাতের সুযোগ পাননি। কেউ কেউ তাকে সাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত করেন তা সঠিক নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং ইসলামের প্রতি ছিল তার অপরিসীম ভালোবাসা। তাই মক্কার কুরায়শদের অত্যাচার থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুইবার মুসলিমদেরকে তার রাজ্যে পাঠিয়েছিলেন, তিনিও মাযলূম মুসলিমদের রাষ্ট্রীয়ভাবে আশ্রয় ও নিরাপত্তা দিয়ে ধন্য করেছিলেন।
বাদশাহ নাজাশী উম্মু হাবীবাহ্ (রাঃ)-এর যাবতীয় মোহর স্বয়ং নিজেই আদায় করেন। এই মোহরের পরিমাণ ছিল চার হাজার দিরহাম মতান্তরে চার হাজার দীনার, মতান্তরে চার দিরহাম।
উম্মু হাবীবাহ্ (রাঃ)-এর বিবাহের স্থান এবং সময় নিয়ে কিছুটা মতপার্থক্য রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, নবূওয়াতের ষষ্ঠ বছরে হাবশাতেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে তার বিবাহ সম্পাদিত হয়েছে। এক বর্ণনায় রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আমর ইবনু উমাইয়াহ্ আয্ যামিরী -কে উম্মু হাবীবাহ্ (রাঃ)-এর বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে নাজাশীর নিকট প্রেরণ করেন। এ প্রস্তাব পেয়ে বাদশাহ নিজেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে তাকে বিয়ে দিয়ে দেন এবং চারশত দীনার মোহর তার নিজের পক্ষ থেকে পরিশোধ করে দেন। অতঃপর বেশ কিছু উপঢৌকন সহ শুরাহবীল ইবনু হাসানাহ্-এর সাথে তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে প্রেরণ করেন।
আরো বর্ণিত আছে, একদা বাদশাহ নাজাশী উম্মু হাবীবাহ্ (রাঃ)-এর নিকট আবরাহা নামক দাসীকে প্রেরণ করলেন, দাসী গিয়ে তাকে বললেন, বাদশাহ আপনাকে বলেছেন, ‘‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট পত্র লিখে পাঠিয়েছেন, আমি যেন তোমাকে (তার সাথে) বিয়ে দিয়ে দেই।’’
খালিদ ইবনু সা‘ঈদ ছিলেন উম্মু হাবীবাহ্ -এর পিতার চাচাত ভাই, সেই ভিত্তিতে দূর সম্পর্কীয় চাচা। বিয়ের প্রস্তাব শুনেই উম্মু হাবীবাহ্ (রাঃ) তার ঐ চাচাকে ডেকে এনে বিয়ের কার্য সম্পাদনের জন্য উকীল নিযুক্ত করলেন, আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে তার বিয়ের এই সুসংবাদ দানের কারণে আনন্দে বাদশাহর দাসী আবরাহাকে নিজের হাতের দু’টি চুড়ি এবং আংটি খুলে বখশিস দিলেন।
সন্ধ্যায় বাদশাহ নাজাশী বিয়ের আয়োজন করলেন, এজন্য তিনি জা‘ফার ইবনু আবূ ত্বালিব এবং সেখানে অবস্থানরত মুসলিমদের উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ প্রদান করলেন। যথাসময়ে লোকজন উপস্থিত হলে বাদশাহ উম্মু হাবীবাহ্ (রাঃ)-এর বিবাহের খুৎবা নিজেই পাঠ করলেন।
খুৎবার কিছু অংশ ছিল নিম্নরূপঃ
اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ الْمَلِكِ الْقُدُّوسِ السَّلَامِ الْمُؤْمِنِ الْمُهَيْمِنِ الْعَزِيزِ الْجَبَّارِ أَشْهَدُ أَنْ لَّا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُه وَرَسُولُه أَرْسَلَه بِالْهُدٰى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَه عَلَى الدِّينِ كُلِّه وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ، أَمَّا بَعْدُ فَقَدْ أَجَبْتُ إِلٰى مَا دَعَا إِلَيْهِ رَسُولُ اللّٰهِ - ﷺ - وَقَدْ أَصْدَقْتُهَا أَرْبَعَمِائَةٍ دِينَارٍ ذَهَبًا
খুৎবা শেষে বাদশাহ উপস্থিত সকলের জন্য প্রচুর স্বর্ণমুদ্রা ঢেলে দিলেন। এরপর খালিদ ইবনু সা‘ঈদ কথা বললেন এবং বাদশাহর খুৎবার ন্যায় খুৎবা পাঠ করলেন, অতঃপর বললেন, হে বাদশাহ নামদার! আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে যেদিকে আহবান করেছেন আপনি সাড়া দিয়েছেন এবং আবূ সুফ্ইয়ান-এর কন্যা উম্মু হাবীবাহ্ -কে তার সাথে বিবাহ সম্পাদন করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা তার রসূলকে বরকত দান করুন।
এ বক্তব্য শুনে বাদশাহ্ খালিদ ইবনু সা‘ঈদকেও প্রচুর স্বর্ণমুদ্রা দিলেন, এবং তিনি এগুলো গ্রহণ করলেন। অনুষ্ঠানাদি শেষ হলে লোকেরা চলে যেতে চাইলে বাদশাহ তাদের নিবৃত করে বললেনঃ আপনারা বসুন, নাবীদের সুন্নাত হলো কোনো বিবাহ সম্পাদন করলে সেখানে আপ্যায়ন করা। সুতরাং আমি একজন নাবীর বিয়ে সম্পাদন করলাম, তাই আপনারা কিছু খানা খেয়ে যাবেন। এরপর তিনি খানা হাজির করলেন এবং লোকেদের খেতে দিলেন, সকলেই খানা খেয়ে (রাজদরবারে অনুষ্ঠিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে উম্মু হাবীবাহ্ -এর বিবাহের) অনুষ্ঠান থেকে বিদায় গ্রহণ করলেন। ঐতিহাসিক ও তাফসীরকার ‘আল্লামা তাবারীর বর্ণনা মতে, এ ঘটনা নবূওয়াতের সপ্তম বর্ষে সংঘটিত হয়েছিল।
উম্মু হাবীবাহ্ -এর এই বিবাহের সময় তার পিতা আবূ সুফ্ইয়ান মুশরিক এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন।
কেউ কেউ এই বিয়ে উম্মু হাবীবাহ্-এর হাবাশাহ থেকে মদীনায় ফেরার পর হয়েছে বলে দাবী করেছেন, তবে প্রথম মতটিই অধিক প্রসিদ্ধ।
বাদশাহ তার দেশে আশ্রিত মুসলিমদের খুব খাতির নাওয়ায করেছেন, তাদের বিন্দু পরিমাণ কষ্টও সহ্য করেননি। তিনি বলেছেন, আমি একজন মুসলিমকে সামান্য একটু কষ্ট দেয়ার বিনিময়ে এক পর্বত পরিমাণ স্বর্ণ লাভকেও প্রিয় মনে করি না। (‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২১০৭; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৭. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - মোহর
৩২০৯-[৮] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ ত্বলহাহ্ উম্মু সুলায়ম (রাঃ)-কে বিয়ে করেন, তাদের মোহর ছিল ইসলাম গ্রহণ। উম্মু সুলায়ম (রাঃ) আবূ ত্বলহাহ্ (রাঃ)-এর পূর্বে ইসলাম কবুল করেন। অতঃপর আবূ ত্বলহাহ্ তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। উম্মু সুলায়ম (রাঃ) বলেন, আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি; যদি তুমি ইসলাম কবুল কর তবে তোমার সাথে বিয়ে হতে পারে। অতঃপর আবূ ত্বলহাহ্ ইসলাম গ্রহণ করেন। এ ইসলাম গ্রহণ তাঁদের বিয়ের মোহর বলে গণ্য হয়। (নাসায়ী)[1]
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: تَزَوَّجَ أَبُو طَلْحَةَ أُمَّ سُلَيْمٍ فَكَانَ صَدَاقُ مَا بَيْنَهُمَا الْإِسْلَامَ أَسْلَمَتْ أُمُّ سُلَيْمٍ قَبْلَ أَبِي طَلْحَةَ فَخَطَبَهَا فَقَالَتْ: إِنِّي قَدْ أَسْلَمْتُ فَإِنْ أَسْلَمْتَ نَكَحْتُكَ فَأَسْلَمَ فَكَانَ صدَاق مَا بَينهمَا. رَوَاهُ النَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: আবূ ত্বলহাহ্-এর আসল নাম হলো যায়দ ইবনু সাহল আল আনসারী আন্ নাজ্জারী। আবূ ত্বলহাহ্ হলো তার কুন্ইয়াত বা উপনাম, উপনামেই তিনি সমাধিক প্রসিদ্ধ। তিনি আনাস ইবনু মালিক-এর মায়ের স্বামী। তিনি ছিলেন নামকরা তীরন্দাজদের অন্যতম। সেনাদলের ভিতর আবূ ত্বলহার আওয়াজের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ভূয়সী প্রশংসাবাণী উচ্চারণ করেছেন।
আনাস-এর মা উম্মু সুলায়ম ছিলেন মিলহান-এর কন্যা। তার আসল নামের ব্যাপারে মতপার্থক্য রয়েছে। মালিক ইবনু নযর প্রথম তাকে বিবাহ করেন, সেখানে তার ঘরে আনাস জন্মগ্রহণ করেন। এই মালিক আনাস-এর মাকে রেখে মুশরিক অবস্থায় নিহত হলে তার মা ইসলাম গ্রহণ করেন। অতঃপর আবূ ত্বলহাহ্ তাকে বিবাহের প্রস্তাব দেন, কিন্তু আবূ ত্বলহাহ্ মুশরিক থাকায় তিনি তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং তাকে ইসলাম গ্রহণে আহবান জানান। এ আহবানে সাড়া দিয়ে আবূ ত্বলহাহ্ ইসলাম গ্রহণ করলেন; উম্মু সুলায়ম তাকে বললেন, ঠিক আছে আমি তোমাকে বিবাহ করব, তোমার ইসলাম গ্রহণের কারণে আমি তোমার নিকট থেকে কোনো মোহরও গ্রহণ করব না।
অতঃপর আবূ ত্বলহাহ্ তাকে বিবাহ করলেন, আর তাঁর ইসলাম গ্রহণই হলো তাদের দু’জনের মাঝের বিবাহের মুহরানা। উম্মু সুলায়ম আবূ ত্বলহার আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
এ হাদীসে ইশারা রয়েছে যে, দীনী উপকারিতা বা উপকারলাভ মোহর (বিনিময়) হতে পারে এবং কুরআন শিক্ষা দেয়াও এ অর্থে ব্যবহার বৈধ হতে পারে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - ওয়ালীমাহ্ (বৌভাত)
৩২১০-[১] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’আব্দুর রহমান ইবনু ’আওফ (রাঃ)-এর শরীরে হলুদের চিহ্ন দেখে জিজ্ঞেস করলেন, কিসের রং এটা? তিনি বললেন, আমি জনৈকা (আনসারী) নারীকে খেজুর দানার সমপরিমাণ স্বর্ণের বিনিময়ে বিয়ে করেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আল্লাহ তা’আলা তোমার বিয়েকে বরকতময় করুন। একটি বকরী দিয়ে হলেও তুমি ওয়ালীমাহ্ কর। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْوَلِيْمَةِ
عَنْ أَنَسٍ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأَى عَلَى عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَوْفٍ أَثَرَ صُفْرَةٍ فَقَالَ: «مَا هَذَا؟» قَالَ: إِنِّي تَزَوَّجْتُ امْرَأَةً عَلَى وَزْنِ نَوَاةٍ مِنْ ذَهَبٍ قَالَ: «بَارَكَ اللَّهُ لَكَ أَوْلِمْ وَلَوْ بِشَاةٍ»
ব্যাখ্যা: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আবদুর রহমান ইবনু ‘আওফ-এর শরীরে অথবা কাপড়ে (জা‘ফরানের) হলোদে চিহ্ন লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করলেন, একি? অর্থাৎ এ হলুদ রং কোত্থেকে এলো? উত্তরে তিনি বললেন, আমি একজন মহিলাকে বিয়ে করেছি।
‘আল্লামা ত্বীবী বলেনঃ প্রশ্ন ছিল গায়ে বা কাপড়ে রং লাগার কারণ কি? উত্তরে যা বলার তাই বললেন। মূলতঃ এটা ছিল استفهام انكارى অর্থাৎ অস্বীকৃতিজ্ঞাপক প্রশ্ন, তিনি যেন এটা অস্বীকার ও অপছন্দ করছিলেন। তিনি সুগন্ধ মিশ্রিত তৈল মাখতে নিষেধ করতেন। এর উত্তরে ‘আবদুর রহমান ইবনু ‘আওফ যেন বললেন, এটা তার মাখানো কোনো সুগন্ধযুক্ত তেলের রং নয় বরং তার নব বিবাহিতা স্ত্রীর সাথে বাসর উদযাপনের ফলে তার সংস্পর্শে লাগা রং বিশেষ, এটা ইচ্ছাজনিত নয় এবং অসাবধানতাজনিত বিষয়। ‘আবদুর রহমান ইবনু ‘আওফ-এর বিবাহের মোহর নির্ধারিত হয়েছিল এক নাওয়াত পরিমাণ ওযনের স্বর্ণ।
কাযী ‘ইয়ায (রহঃ) বলেনঃ নাওয়াত বলা হয় পাঁচ দিরহামকে, যেমন বিশ দিরহামকে এক নাশ্ এবং চল্লিশ দিরহামকে এক উকিয়্যাহ্ বলা হয়। কেউ কেউ বলেছেন, নাওয়াত হলো ঐ পরিমাণ স্বর্ণ যার মূল্য পাঁচ দিরহামের মতো। আবার কেউ কেউ বলেছেন, নাওয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো খেজুরের বিচি। শেষ কথা যা এখানে স্পষ্ট তা হলো সামান্য পরিমাণ স্বর্ণ। এই পরিমাণকেই কেউ এক-ষষ্ঠাংশ মিসকালের কাছাকাছি বলে উল্লেখ করেছেন; কেউ এক-চতুর্থ মিছকাল বা তার চেয়েও কম যার মূল্য দশ দিরহামের সমান বলে উল্লেখ করেছেন। তবে প্রথম মতটি গ্রহণ অধিক সম্ভাবনাময়। সুতরাং নাওয়াতের অর্থ পাঁচ দিরহামের পরিমাণ, যা স্বর্ণের ওযনে সমান, অর্থাৎ সাড়ে তিন মিসকাল স্বর্ণ।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আবদুর রহমান ইবনু ‘আওফ-এর বিবাহের কথা শুনে তার দাম্পত্য জীবনের বারাকাতের জন্য দু‘আ করলেনঃ بَارَكَ اللّٰهُ لَكَ অর্থাৎ আল্লাহ তোমার জীবনকে বরকতময় করুন। এ হাদীস থেকে বিবাহিত ব্যক্তির জন্য বারাকাতের দু‘আ করা মুস্তাহাব বা সুন্নাত প্রমাণিত হয়।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আবদুর রহমান ইবনু ‘আওফ-কে বিবাহোত্তর ওয়ালীমাহ্ খাওয়ানোর নির্দেশ করেন। ইবনুল মালিক বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই প্রকাশ্য নির্দেশসূচক বাক্য দ্বারা কতিপয় ‘উলামাহ্ বিবাহোত্তর ওয়ালীমাহ্ খাওয়ানোকে ওয়াজিব বলে মন করেন। তবে অধিকাংশ ‘উলামারা বলেন, এ নির্দেশ মুস্তাহাব অর্থে ব্যবহৃত হবে।
ওয়ালীমাহ্ কখন করতে হবে? এর উত্তরে বলা হয় ওয়ালীমাহ্ হবে বাসর উদযাপনের পরে, কেউ আবার বিবাহের আকদ সম্পাদন হওয়ার পরেই মতামত পেশ করেছেন। কেউবা আবার বিবাহের সময় এবং বাসর উদযাপনের পর দু’ সময়েই ওয়ালীমা করার কথা বলেছেন। ইমাম মালিকের একদল অনুসারী তো সাতদিন ভরে ওয়ালীমাগ্ খাওয়ানো মুস্তাহাব বলে মনে করে থাকেন। তবে নির্ভরযোগ্য এবং পছন্দনীয় মত হলো ওয়ালীমাহ্ খাওয়ানো বিবাহকারীর সাধ্য ও সামর্থ্যের উপর নির্ভর করবে। (ফাতহুল বারী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২০৪৯; শারহে মুসলিম ৯/১০ম খন্ড, হাঃ ১৪২৭; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - ওয়ালীমাহ্ (বৌভাত)
৩২১১-[২] উক্ত রাবী [আনাস (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়নাব বিনতু জাহশ (রাঃ)-এর বিয়েতে যত বড় আয়োজনে ওয়ালীমাহ্ করেন, আর অন্য কোনো স্ত্রীর বিয়েতে তা করেননি। এতে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এক বকরী দ্বারা ওয়ালীমাহ্ করেছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْوَلِيْمَةِ
وَعَنْهُ قَالَ: مَا أَوْلَمَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى أَحَدٍ مِنْ نِسَائِهِ مَا أولم على زَيْنَب أولم بِشَاة
ব্যাখ্যা: হাদীসের মর্মকথা হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রী যায়নাব-এর সাথে বিবাহোত্তর ওয়ালীমাহ্ যত বেশী সুন্দর এবং পরিসরে করেছিলেন এমনটি অন্য কোনো স্ত্রীর বেলায় করেননি। তিনি বকরী যবেহ করে তার ওয়ালীমাহ্ করেছিলেন।
মাওয়াহিব নামক গ্রন্থে আছে, উম্মুল মু’মিনীন যায়নাব বিনতু জাহ্শ (রাঃ) ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ফুপী আমীমাহ্ বিনতু ‘আবদুল মুত্ত্বালিব-এর কন্যা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তার পালক পুত্র যায়দ ইবনু হারিসাহ্-এর সাথে বিবাহ দিয়ে দেন। দীর্ঘদিন অবস্থানের পর যায়দ ইবনু হারিসাহ্ তাকে তালাক প্রদান করেন। অতঃপর যখন তার ‘ইদ্দত শেষ হয় তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়দ ইবনু হারিসাকে বলেন, তুমি যায়নাব-এর কাছে গিয়ে আমার কথা উল্লেখ কর, অর্থাৎ আমার পক্ষ থেকে তাকে বিয়ের প্রস্তাব পেশ কর। যায়দ ইবনু হারিসাহ্ বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদেশ পালনে যায়নাব (রাঃ)-এর বাড়ী গেলাম এবং দরজার দিকে পিঠ ফিরিয়ে কললাম, হে যায়নাব! আল্লাহর রসূল তোমাকে স্মরণ করিয়ে অর্থাৎ বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে পাঠিয়েছেন। এ কথা শুনে যায়নাব বললেন, আমি কোনো কাজই করতে যাই না যতক্ষণ না আমার রবের নির্দেশ জারী হয়। অতঃপর যায়নাব তার একটি মসজিদ ছিল সেদিকে রওনা হলেন, এরপর এ আয়াত নাযিল হলো:
فَلَمَّا قَضٰى زَيْدٌ مِنْهَا وَطَرًا زَوَّجْنَاكَهَا অর্থাৎ- ‘‘অতঃপর যায়দ যখন যায়নাবের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করল তখন আমি তাকে তোমার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করে দিলাম।’’ (সূরা আল আহযাব ৩৩ : ৩৭)
অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোজা যায়নাব-এর বাড়ী চলে আসলেন এবং অনুমতি ছাড়াই তার ঘরে প্রবেশ করলেন। (সহীহ মুসলিম)
এ ঘটনার পর মুনাফিকরা বলতে লাগল মুহাম্মাদ পুত্রবধূকে হারাম বলে অর্থাৎ ছেলের বউকে বিবাহ করা হারাম বলে ঘোষণা করে থাকে অথচ নিজেই পুত্রবধূকে বিয়ে করে বসেছে। তখনই এ আয়াত নাযিল হলো:
مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّنْ رِّجَالِكُمْ
অর্থাৎ ‘‘মুহাম্মাদ তোমাদের মধ্যেকার কোনো পুরুষের পিতা নয়।’’ (সূরা আল আহযাব ৩৩ : ৪০)
যায়নাব (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অন্যান্য স্ত্রীদের ওপর গর্ব করে বলতেন : তোমাদের পিতাগণ ‘‘তোমাদের অভিভাবক হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে তোমাদেরকে’’ বিয়ে দিয়েছেন আর আমাকে স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা নিজে সপ্তম আসমানের উপর আমাকে (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে) বিয়ে দিয়েছেন। (তিরমিযী)
যায়নাব-এর আসল নাম ছিল বারীরাহ্ , রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নাম রাখলেন যায়নাব।
আনাস (রাঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন যায়নাবকে বিয়ে করলেন তখন ওয়ালীমার জন্য কওমের লোকজনকে দা‘ওয়াত করলেন। লোকজন খানা খাওয়া শেষ হলে বসে বসে গল্প শুরু করল, এটা হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য ভীষণ কষ্টের, কারণ তিনি তাদের উঠে চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত করলেন কিন্তু তারা উঠলেন না। অনেকেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ বিব্রত ও অস্বস্তি অবস্থা দেখে একে একে উঠে চলে গেলেন কিন্তু তিনজন লোক অবশিষ্ট বসেই রইলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে প্রবেশের জন্য এসে দেখেন লোকজন বসেই আছেন। এরপর তারা যখন চলে গেলেন তখন আমি (আনাস) গিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে খবর জানালাম যে, তারা চলে গেছেন।
এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে প্রবেশ করলেন। এ সময় আমি ঘরে ঢোকার জন্য গেলাম কিন্তু তিনি আমার ও তার মাঝে পর্দা টেনে দিলেন, তখনই আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াত নাযিল করলেন:
يٰاَيُّهَا الَّذِينَ اٰمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتَ النَّبِيِّ
অর্থাৎ ‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নাবীর ঘরে প্রবেশ করো না।’’ (সূরা আল আহযাব ৩৩ : ৫৩)
বিস্তারিত ঘটনা তাফসীরে ইবনু কাসীর ও অন্যান্য তাফসীর গ্রন্থ দেখুন। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫১৬৮; শারহে মুসলিম ৯/১০ম খন্ড, হাঃ ১৪২৮; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - ওয়ালীমাহ্ (বৌভাত)
৩২১২-[৩] উক্ত রাবী [আনাস (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়নাব বিনতু জাহশ (রাঃ)-এর বিয়েতে ওয়ালীমাহ্ করেন, তিনি লোকেদেরকে রুটি ও গোশ্ত/মাংস দ্বারা পরিতৃপ্ত করেন। (বুখারী)[1]
بَابُ الْوَلِيْمَةِ
وَعَنْهُ قَالَ: أَوْلَمَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حِينَ بَنَى بِزَيْنَبَ بِنْتِ جَحْشٍ فأشبع النَّاس خبْزًا وَلَحْمًا. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: যায়নাব বিনতু জাহশ-এর সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিবাহ ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্ময়কর বিবাহ। আবহমানকালের সামাজিক কুসংস্কার ভেঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা মানব সভ্যতার সামাজিক সংস্কার সাধন করেন। এ বিবাহ সম্পাদনের কাজ সপ্তম আসমানের উপর সংঘটিত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিবাহে প্রচুর লোকজনকে ওয়ালীমার দা‘ওয়াত করেছিলেন। সেখানে অঢেল গোশত রুটি তৈরি হয়েছিল অথবা গোশত রুটি সংমিশ্রণে সারীদ বা অন্যকিছু তৈরি হয়েছিল। লোকজন এসব খাদ্য অত্যন্ত তৃপ্তিসহ খেয়েছিলেন। (ফাতহুল বারী ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৭৯৪; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - ওয়ালীমাহ্ (বৌভাত)
৩২১৩-[৪] উক্ত রাবী [আনাস (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফিয়্যাহ্ (রাঃ)-কে মুক্ত করে বিয়ে করেন। এ মুক্তিদান মোহর হিসেবে পরিগণিত হয় এবং হায়স (খেজুর, পনির ও ঘি সংমিশ্রণে প্রস্তুতকৃত) খাদ্য দ্বারা ওয়ালীমাহ্ করেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْوَلِيْمَةِ
وَعَنْهُ قَالَ: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ أَعْتَقَ صَفِيَّةَ وَتَزَوَّجَهَا وَجَعَلَ عِتْقَهَا صَدَاقَهَا وَأَوْلَمَ عَلَيْهَا بحيس. مُتَّفق عَلَيْهِ
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা ইবনু হাজার ‘আসকালানী (রহঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী উম্মুল মু’মিনীন সফিয়্যাহ্ (রাঃ) ছিলেন মূসা (আঃ)-এর ভাই হারূন ইবনু ‘ইমরান (আঃ) -এর বংশের হুয়াই ইবনু আখতাব-এর কন্যা। তার পিতা মদীনার বিখ্যাত ইয়াহূদী বানু নাযীর গোত্রের সর্দার ছিলেন, মা ছিলেন বানী কুরায়যাহ্-এর সর্দার সামাওয়াল-এর কন্যা। সফিয়্যাহ্-এর আসল নাম ছিল যায়নাব, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে এসে তার নাম হয় সফিয়্যাহ্। সফিয়্যাহ্ পিতা এবং মাতা উভয়ের বংশের দিক থেকে ছিলেন দারুণ বংশমর্যাদার অধিকারিণী। সপ্তম হিজরীতে খায়বার যুদ্ধের মাধ্যমে তিনি যুদ্ধবন্দী হিসেবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে মুক্ত করে দেন এবং স্বীয় বিবাহ বন্ধনে এনে উম্মুল মু’মিনীনের মর্যাদা দান করেন।
বন্দিত্ব থেকে তাকে মুক্ত করাই ছিল তার বিবাহের মোহর। মুল্লা ‘আলী কারী (রহঃ) বলেন, এটা একমাত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য খাস বা বিশেষত্ব ছিল। শারহুস্ সুন্নাহ্ গ্রন্থকার বলেন, বিদ্বানগণ মতবিরোধ করেছেন ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে যে তার দাসীকে মুক্ত করে বিবাহ করে নেয় এবং ঐ দাসত্ব মুক্তই তার মোহর ধার্য করে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একদল সাহাবীসহ কতিপয় বিদ্বান প্রকাশ্য হাদীসের ভিত্তিতে দাসত্ব মুক্তিকে মোহর ধার্য করা বৈধ মনে করেন। কিন্তু অন্য আরেকদল বিদ্বান এটা বৈধ বলে মনে করেন না। তারা প্রকাশ্য ঐ হাদীসের নানা তা‘বীল বা ব্যাখ্যা করে থাকেন।
এ হাদীস থেকে এটাও দলীল গ্রহণ করা হয় যে, দাসীকে মুক্ত করার পর তাকে বিবাহ করা অপছন্দনীয় নয়। দাস-দাসীর প্রথা বর্তমানে পৃথিবীতে চালু নেই। সুতরাং বিস্তারিত আর আলোচনা করা হলো না।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই স্ত্রী সফিয়্যাহ্ (রাঃ)-এর বিবাহের ওয়ালীমাহ্ হায়স নামক খাদ্য দ্বারা সম্পন্ন করা হয়েছিল। হায়স হলো খেজুর, পনীর এবং ঘি-এর সংমিশ্রণে তৈরি এক প্রকার উপাদেয় এবং অত্যন্ত রুচিকর ও সুস্বাদু খাদ্য, যা ‘আরবদের কাছে খুব জনপ্রিয় ও লোভনীয় ছিল। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫১৬৯; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - ওয়ালীমাহ্ (বৌভাত)
৩২১৪-[৫] উক্ত রাবী [আনাস (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বার ও মদীনার পথে (প্রত্যাবর্তনকালে) সফিয়্যাহ্ (রাঃ)-এর সাথে (বিবাহ বাসরের উদ্দেশে) তিনদিন অবস্থান করেন। আমি মুসলিমগণকে তাঁর ওয়ালীমার দা’ওয়াত করি, কিন্তু উক্ত ওয়ালীমায় রুটি-গোশ্ত/মাংস ছিল না। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) চামড়ার দস্তরখানা বিছানোর নির্দেশ দিলেন। দস্তরখানা বিছানো হলে তাতে খেজুর, পনির ও ঘি রাখলেন। (বুখারী)[1]
بَابُ الْوَلِيْمَةِ
وَعَنْهُ قَالَ: أَقَامَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَيْنَ خَيْبَرَ وَالْمَدِينَةِ ثَلَاثَ لَيَالٍ يُبْنَى عَلَيْهِ بِصَفِيَّةَ فَدَعَوْتُ الْمُسْلِمِينَ إِلَى وَلِيمَتِهِ وَمَا كَانَ فِيهَا مِنْ خُبْزٍ وَلَا لَحْمٍ وَمَا كَانَ فِيهَا إِلَّا أَن أمربالأنطاع فَبُسِطَتْ فَأَلْقَى عَلَيْهَا التَّمْرَ وَالْأَقِطَ وَالسَّمْنَ. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা : খায়বার বিজয় শেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাহ্ এবং খায়বারের মধ্যবর্তী ‘সহবা’ নামক ভূ-খন্ডে তাঁবু খাটিয়ে তিনরাত অতিক্রম করেন। এ সময়ে সফিয়্যাহ্ (রাঃ) তার বাসরেই রাত যাপন করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রীতি ছিল যখনই কোনো অঞ্চল বা কোনো দূর্গ জয় করতেন সেখানে তিনি তিনদিন বা তিনরাত কাটিয়ে বিজয় চূড়ান্ত ও নিশ্চিত করে এবং পরিবেশ স্থিতিশীল করে সেখান থেকে ফিরতেন। এই সহবা নামক স্থানেই আনাস-এর মা উম্মু সুলায়ম বিনতু মিলহান সফিয়্যাহ্ (রাঃ)-কে সাজগোজ করিয়ে বধূবেশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তাঁবুতে প্রেরণ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বাসর উদযাপনের জন্য এ সময় (নতুন) বিশেষ তাঁবু তৈরি করা হয়েছিল। পরদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশক্রমে আনাস ওয়ালীমার জন্য মুসলিমদের দা‘ওয়াত করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চামড়ার বিছানা বা দস্তরখানা বিছানোর জন্যও নির্দেশ করলেন, ফলে তা বিছানো হলো। এবার দস্তরখানে খেজুর, পনীর, ঘি ইত্যাদি রাখা হলো এবং সেগুলো মিশ্রিত করে হায়স তৈরি করা হলো। এই ওয়ালীমার খাদ্য তালিকায় গোশত এবং রুটি ছিল না।
সফিয়্যাহ্ (রাঃ)-এর বিস্তারিত ঘটনা বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। মাওয়াহিব নামক গ্রন্থে উল্লেখ আছে, উম্মুল মু’মিনীন সফিয়্যাহ্ বিনতু হুয়াই ইবনু আখতাব, কেননা ইবনু আবুল হুকায়ক-এর বিবাহাধীন ছিলেন। ৭ম হিজরীতে তার স্বামী খায়বার যুদ্ধে নিহত হলে এবং খায়বার পতন হলে তিনি পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে বন্দী হিসেবে নীত হন। বন্দীদের যখন একত্রিত করা হয় তখন সাহাবী দাহিয়্যাতুল কলবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে আরয কারলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমাকে (বন্দীদের মধ্য থেকে) একটা দাসী দান করুন। আল্লাহর নাবী বললেন, যাও তুমি ঐ বন্দীদের মধ্য থেকে একটি বন্দী নিয়ে নাও। দাহিয়্যাহ্ গিয়ে সফিয়্যাহ্ বিনতু হুয়াই-কে নিয়ে নিলেন। এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে জানালেন, হে আল্লাহর রসূল! সম্ভ্রান্ত বানী নাযীর ও বানী কুবায়যার নেত্রী সফিয়্যাহ্কে দাহিয়্যাহ্-এর হাতে তুলে দিলেন?
তার মতো সম্ভ্রান্ত এবং মহীয়সী নারীর তো সে মর্যাদা দিতে পারবে না, সে তো কেবল আপনার স্বকীয় সত্তার জন্যই শোভন! এ কথা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, দাহিয়্যাহ্-কে ডাকো। দাহিয়্যাহ্ সফিয়্যাহ্কে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে হাযির হলে তিনি দাহিয়্যাহ্-কে বললেন, তুমি বন্দীদের মধ্যে থেকে অন্য একটি বন্দী নিয়ে যাও। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সকল গুণাবলী ও বংশ মর্যাদার খেয়াল করে তাকে মুক্ত করে দিলেন এবং নিজে বিয়ে করে নিলেন। তার মুক্ত হওয়াটাই ছিল তার বিয়ের মোহর। খায়বায় এবং মদীনার মধ্যবর্তী সহবা নামক স্থানে উম্মু সুলায়ম (আনাস -এর মা) সফিয়্যাহ্-এর পোষাক পরিবর্তন করে উত্তম পোষাক পরালেন এবং সুন্দররূপে সাজিয়ে বধূবেশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাসরে পেশ করলেন। লোকেরা সফিয়্যার ব্যাপারে বলাবলি করছিল। কেউ বলল আল্লাহর নাবী তাকে বিয়ে করেছেন, কেউ বলছিল তাকে উম্ম ওয়ালাদ বানিয়েছেন। এক পর্যায়ে লোকেরা যখন দেখল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে লোকজন থেকে পর্দাবৃত করছেন তখন তারা বুঝে নিলেন যে, তিনি তাকে স্ত্রী হিসেবেই গ্রহণ করেছেন।
জাবির থেকে বর্ণিত, খায়বারের যুদ্ধের সময় যেদিন সফিয়্যাহ্-এর বাবা, ভাই নিহত হলো সেদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফিয়্যাহ্-কে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে দিয়ে পরিবারের জীবিত অবশিষ্ট লোকেদের সাথে চলে যাওয়ার অথবা ইসলাম গ্রহণ করার ইখতিয়ার দিয়ে স্বীয় সত্বার সান্নিধ্যে থাকার কথা জানালেন। সফিয়্যাহ্ ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং আল্লাহ ও তার রসূলকেই গ্রহণ করে নিলেন। আনাস -এর বিভিন্ন বর্ণনাবলীর সার-সংক্ষক্ষপ এই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এই প্রস্তাবই দিয়েছিলেন যে, আমাকে কি তোমার প্রয়োজন আছে? উত্তরে সফিয়্যাহ্ বললেন, হে আল্লাহর রসূল আমি শির্কের জীবনেই এটা মনে মনে কামনা করতাম আর আল্লাহ যখন আমাকে সেই সুযোগ করে দিলেন তা কিভাবে আমি ত্যাগ করতে পারি? আবূ হাতিম প্রমুখ মুহাদ্দিস ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার থেকে একটি ঘটনা উদ্বৃত করেছেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফিয়্যাহ্-এর ‘‘চোখে কোনো কিছু দিয়ে আঘাতের নীলাভ’’ দাগ লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করলেন, এ দাগ কিসের? উত্তরে তিনি বললেন, একদা আমি আমার স্বামীর কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়েছিলাম এমন সময় স্বপ্নে দেখি আকাশের চাঁদ আমার কোলে এসে পড়ল! এ স্বপ্নের কথা স্বামীকে জানালে তিনি আমার মুখমণ্ডলে ভীষণভাবে চপটেঘাত করে বলেন, তুমি বুঝি এখন ইয়াসরিবের রাজার আশা করছ? (ফাতহুল বারী ৭ম খন্ড, হাঃ ৪২১৩; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - ওয়ালীমাহ্ (বৌভাত)
৩২১৫-[৬] সফিয়্যাহ্ বিনতু শায়বাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জনৈকা স্ত্রীর বিবাহে দুই মুদ যব (ছাতু) দ্বারা ওয়ালীমাহ্ করেন। (বুখারী)[1]
بَابُ الْوَلِيْمَةِ
وَعَنْ صَفِيَّةَ بِنْتِ شَيْبَةَ قَالَتْ: أَوْلَمَ النَّبِيُّ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم على النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى بَعْضِ نِسَائِهِ بمدين من شعير. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা : হাদীসের বর্ণনাকারী সফিয়্যাহ্ বিনতু শায়বাহ্ আল হাজারী (রাঃ) তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন কিনা অর্থাৎ সহাবিয়াতের মর্যাদা লাভ করেছিলেন কিনা তা নিয়ে জীবনীকারগণ ইখতিলাফ করেছেন। অনেকেই বলেছেন, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাক্ষাৎ পাননি। সুতরাং তার বর্ণিত হাদীস মুরসাল, তবে একটি সানাদে তিনি ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। এ সম্পর্কে বিস্তারিত দেখতে হলে ফাতহুল বারী দ্রষ্টব্য।
‘আল্লামা সুয়ূত্বী (রহঃ) বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামান্য দুই মুদ পরিমাণ যব বা ছাতু দিয়ে যেই স্ত্রীর ওয়ালীমাহ্ করেছিলেন সম্ভবত তিনি ছিলেন উম্মু সালামাহ্ (রাঃ), তার আসল নাম ছিল হিন্দ, উম্মু সালামাহ্ হলো ডাকনাম বা উপনাম। কেউ কেউ তার নাম রামশা বলেও উল্লেখ করেছন, তবে অনেক মুহাদ্দিসই এটাকে ভিত্তিহীন বলেছেন। উম্মু সালামাহ্-এর পিতার নাম ছিল আবূ উমাইয়াহ্ ইবনু মুগীরাহ্ আল মাখযূমী, মাতা আতিকাহ্ বিনতু আমির ইবনু রবী‘আহ্! কোনো কোনো ঐতিহাসিক বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বংশেরই ফুপাতো বোন। উম্মু সালামাহ্-এর প্রথম বিয়ে হয় আবূ সালামাহ্ ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আবদুল আসাদ আল মাখযূমীর সাথে। তিনি তার স্বামীর সাথে হাবাশায় প্রথম হিজরতকারী ছিলেন।
সহীহ মুসলিমে উম্মু সালামাহ্ থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন : কোনো ব্যক্তি যদি বিপদ মুসীবাতে নিপতিত হয়, অতঃপর সে বলে ‘‘ইন্না- লিল্লা-হি ওয়া ইন্না- ইলায়হি র-জি‘ঊন, আল্লা-হুম্মা জুরনী ফী মুসীবাতি ওয়াখলুফলী খয়রম মিনহা-’’, তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তাকে তার চেয়েও উত্তম স্থলাভিষিক্ত-প্রতিনিধি দান করেন। উম্মু সালামাহ্ বলেন, আমার স্বামী আবূ সালামার মৃত্যু হলে আমি ‘‘ইন্না লিল্লা-হি ...’’ পড়তে লাগলাম, কিন্তু মনে মনে ভাবলাম আমার স্বামী আবূ সালামার চেয়ে উত্তম মানুষ আর কে আছে? অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তার রসূলকেই আমার জন্য তার স্থলাভিষিক্ত করলেন।
উম্মু সালামার দীনের প্রতি অগাধ বিশ্বাস এবং আল্লাহ ও তদীয় রসূলের প্রতি অসাধারণ ভালোবাসা ইসলামের ইতিহাস তাকে মহীয়সী করে তুলেছে। তিনি বিধবা হলে তার অসহায়ত্ব দেখে আবূ বাকর তাকে বিবাহের প্রস্তাব দেন, কিন্তু তিনি তা অস্বীকার করেন, অতঃপর ‘উমার প্রস্তাব দেন, এটাও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রস্তাব আসলে তিনি তাকে স্বাগত জানিয়ে আরয করেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনার প্রস্তাব আমার জন্য তো ভীষণ আনন্দের বিষয় কিন্তু আমার যে তিনটি সমস্যা রয়েছে; প্রথমতঃ আমি অত্যন্ত লজ্জাশীলা নারী, দ্বিতীয়তঃ আমি বেশ কয়জন নাবালেগ শিশুর দেখাশুনার দায়িত্বশীলা, তৃতীয়তঃ আমি এমন একজন নারী যে, এখানে আমার কোনো অভিভাবকও নেই যিনি আমাকে ওয়ালী হয়ে বিবাহ দিবেন? এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ডেকে বললেন, ওহে উম্মু সালামাহ্! কোনো তুমি যে লজ্জা-শরমের কথা বলছ আমি আল্লাহর কাছে তোমার জন্য দু‘আ করব যাতে আল্লাহ তা‘আলা তোমার এই অহেতুক লজ্জা দূর করে দেন। আর তুমি যে সন্তানের কথা বলছ নিশ্চয় তাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট হবেন। আর তুমি বলেছ তোমার অভিভাবকের কথা, তোমার নিকটে দূরে এমনকি কোনো অভিভাবক আছে যে আমাকে অপছন্দ করতে পারে? এ কথা শুনে উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) তার ছেলেকে বললেন, হে বৎস! তুমি আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বিয়ে দিয়ে দাও। অতঃপর সে তার মাকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বিয়ে দিয়ে দিলেন। এ দ্বারা প্রমাণিত যে, সন্তান ওয়ালী হয়ে তার বিধবা কিংবা স্বামীহীনা মাকে বিবাহ দিতে পারে। অবশ্য ইমাম শাফি‘ঈ তার ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫১৭২; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - ওয়ালীমাহ্ (বৌভাত)
৩২১৬-[৭] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কাউকেও ওয়ালীমার দা’ওয়াত দিলে সে যেন তাতে শামিল থাকে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْوَلِيْمَةِ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِذَا دُعِيَ أَحَدُكُمْ إِلَى الْوَلِيمَةِ فَلْيَأْتِهَا» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ. وَفِي رِوَايَةٍ لِمُسْلِمٍ: فَلْيُجِبْ عُرْسًا كَانَ أَو نَحوه
ব্যাখ্যা : বিবাহের ওয়ালীমার দা‘ওয়াত দেয়া সুন্নাত, গ্রহণ করাও সুন্নাত। সহীহ মুসলিম-এর এক বর্ণনায় ওয়ালীমাহ্ এবং অনুরূপ অন্যান্য অনুষ্ঠানাদি যেমন ‘আক্বীকার দা‘ওয়াতের কথাও এসেছে। এমনকি খাৎনার দা‘ওয়াত। তবে বিবাহের ওয়ালীমাহ্ ও অনুরূপ অন্যান্য দা‘ওয়াতের কথাটি মুসলিমের উদ্ধৃতিতে বলা হলো, এটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা নয় বরং রাবীর নিজস্ব কথা যা তিনি তাতে সংযোজন করেছেন। জামিউস্ সগীর গ্রন্থে হাদীসটি এভাবে এসেছে, ‘‘তোমাদের কেউ যখন কোনো নব বরের ওয়ালীমার জন্য দা‘ওয়াত দেয় তখন সে যেন তা কবুল করে।’’ মুসলিম ও ইবনু মাজাহও এটি বর্ণনা করেছেন। বলা হয়, ওয়ালীমার দা‘ওয়াত গ্রহণ করা ওয়াজিব, বিনা ওযরে দা‘ওয়াত তরককারী গুনাহগার হবে। এ ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আরো নির্দেশ রয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘যে ব্যক্তি দা‘ওয়াত বর্জন করল সে আল্লাহ ও তদীয় রসূলের নাফরমানী করল।’’ (সহীহ মুসলিম হাঃ ১০৬, ১৪৩১)
কেউ কেউ বলেছেন, দা‘ওয়াতে হাযির হওয়া মুস্তাহাব আর সওম পালন না করলে খাওয়াও ভালো। দা‘ওয়াত যদি ওয়ালীমাহ্ ছাড়া অন্য কিছুর হয় তাহলে তা গ্রহণ করা মুস্তহাব।
যে সকল ওযরের কারণে কবূলের আবশ্যকতা রহিত হবে অর্থাৎ দা‘ওয়াত পরিহার করা যাবে সেগুলো হলো : খাদ্য সন্দেহযুক্ত হওয়া, খাদ্যানুষ্ঠানে শুধু ধনীদের খাস করে দা‘ওয়াত করা হয় এবং গরীবদের বর্জন করা হয়, অথবা সেখানে এমন লোক আছে যে উপস্থিত সভ্যদের কষ্ট দেয়, অথবা সেখানে এমন সব লোক বসবে যাদের সাথে বসা উচিত নয়। অথবা দা‘ওয়াতকারী তার অনিষ্টতা চাপা দেয়ার জন্য কিংবা তার যশ খ্যাতি প্রকাশের লোভে দা‘ওয়াত করেছে। অথবা দা‘ওয়াতকারী তার বাতিল ও নিষিদ্ধ কর্মের সমর্থন আদায় বা সাহায্যের জন্য দা‘ওয়াত করছে। কিংবা সেখানে নিষিদ্ধ কর্ম হয়ে থাকে যেমন মদ্যপান, অশ্লীল খেল-তামাশা ইত্যাদি। এমনকি বিছানাও যদি রেশমীর বিছানা হয় এ জাতীয় অনুষ্ঠানের দা‘ওয়াত বর্জন করা বৈধ, বরং উচিত বর্তমানের দা‘ওয়াতী অনুষ্ঠানগুলোতে কোনো না কোনো দিক থেকে এ জাতীয় কর্মকা- হয়েই থাকে। সুতরাং এ জাতীয় অনুষ্ঠানে যোগদান না করার ওযর বিদ্যমান এবং গ্রহণযোগ্য। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫১৭৩, শারহে মুসলিম ৯ম/১০ম খন্ড, হাঃ ১৪২৯; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - ওয়ালীমাহ্ (বৌভাত)
৩২১৭-[৮] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কাউকেও খাবার আয়োজনে দা’ওয়াত দিলে, সে যেন গ্রহণ করে। তবে ইচ্ছা থাকলে খাবে, অন্যথায় খাবে না। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْوَلِيْمَةِ
وَعَنْ جَابِرٍ: قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا دُعِيَ أَحَدُكُمْ إِلَى طَعَام فليجب وَإِن شَاءَ طَعِمَ وَإِنْ شَاءَ تَرَكَ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যা: ওয়ালীমাহ্ অথবা ‘আক্বীকাহ্ ইত্যাদি খাবার অনুষ্ঠানের দা‘ওয়াত গ্রহণ করা উচিত এবং সেখানে উপস্থিত হওয়াও উচিত। ইবনুল মালিক (রহঃ) বলেন, এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ ঘোষিত হয়েছে, আর নির্দেশসূচক বাণী ওয়াজীবের অর্থ প্রদান করে, যদি সঙ্গত কোনো ওযর না থাকো। অবশ্য যার দূর-দূর্গম কষ্টকর পথপরিক্রমার ওযর রয়েছে তার ওপর থেকে রহিত হয়ে যাবে।
জুমহূর ‘উলামার মতে এ নির্দেশসূচক বাণী মুস্তাহাব অর্থে ব্যবহার হবে।
দা‘ওয়াত কবুল করার পর খাওয়ার বিষয়টিও তার ইচ্ছা, ইচ্ছা করলে সে খেতে পারে ইচ্ছা করলে তা পরিহারও করতে পারে। হাদীসটি আবূ দাঊদও বর্ণনা করেছেন। এছাড়া আবূ দাঊদ, আহমাদ, মুসলিম, তিরমিযী প্রমুখ আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে নিমেণর বাক্য আরেকটি হাদীস বর্ণনা করেছেন :
‘‘তোমাদের কাউকেও যখন কোনো খাদ্যের জন্য দা‘ওয়াত দেয়া হয় সে যেন তা কবুল করে নেয়, যদি সে সায়িম (রোযাদার) না হয় তবে যেন সে খায় আর যদি সায়িম হয় তবে তাদের সাথে যেন (অনুষ্ঠানে) সঙ্গ দেয়।
ত্ববারানী-এর বর্ণনায় ‘‘সে যেন তাদের সাথে সঙ্গ দেয়’’ এর পরিবর্তে ‘‘সে যেন তাদের বারাকাতের জন্য দু‘আ করে’’ বাক্য এসেছে। আবার মুসলিম, আবূ দাঊদ, তিরমিযী ইত্যাদি গ্রন্থে এসেছে ‘‘সায়িম (রোযাদার) হলে সে যেন বলে আমি সায়িম’’। (শারহে মুসলিম ৯/১০ম খন্ড, হাঃ ১৪৩০; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - ওয়ালীমাহ্ (বৌভাত)
৩২১৮-[৯] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ঐ ওয়ালীমার খাদ্য নিকৃষ্ট খাদ্য, যে আয়োজনে শুধু ধনীদের দা’ওয়াত করা হয় এবং গরীবদের বঞ্চিত করা হয়। আর যে (বিনা কারণে) দা’ওয়াত প্রত্যাহার করে, সে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করল। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْوَلِيْمَةِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «شَرُّ الطَّعَامِ طَعَامُ الْوَلِيمَةِ يُدْعَى لَهَا الْأَغْنِيَاءُ وَيُتْرَكُ الْفُقَرَاءُ وَمَنْ تَرَكَ الدَّعْوَةَ فَقَدْ عَصَى الله وَرَسُوله»
ব্যাখ্যা: এখানে মন্দ খাদ্য বলতে ঐ অনুষ্ঠানের খাদ্য যাতে শুধু ধনীদের দা‘ওয়াত করা হয় গরীবদের পরিহার করা হয়, যেমন মানুষের মধ্যে মন্দ মানুষ সেই যে নিজে একাই খায় অন্যকে খাদ্যে অংশ দেয় না বা শরীক রাখে না।
কাযী ‘ইয়ায বলেনঃ খাদ্যকে মন্দ বলে অভিহিত করা হয়েছে এর কারণ পরের বাক্যে উল্লেখ হয়েছে, আর তা হলো গরীবকে বর্জন করা। মূলতঃ কোনো খাদ্য মন্দ নয় বরং খাদ্যের অবস্থার কারণে তাকে মন্দ বলা হয়েছে মাত্র। সুতরাং কোনো ব্যক্তিকে যদি এমন ওয়ালীমাহ্ দা‘ওয়াত করা হয় আর ওয়ালীমার দা‘ওয়াত গ্রহণের নির্দেশসূচক হাদীসের ভিত্তিতে সে দা‘ওয়াত গ্রহণ করে এবং খাদ্যে অংশগ্রহণ করে তবে সে মন্দ বা নিকৃষ্ট খাদ্য খেলো এমনটি নয়।
কেউ যদি বিনা ওযরে দা‘ওয়াত বর্জন করে সে আল্লাহ ও তার রসূলের নাফরমানী করল। আল্লাহর নাফরমানী এজন্য যে, সে ব্যক্তি হাদীস বর্জন করে রসূলের নাফরমানী করল, রসূলের নাফরমানী মানেই আল্লাহর নাফরমানী। দা‘ওয়াত গ্রহণ যারা ওয়াজিব বলেন তারা এই যুক্তিতেই বলে থাকেন। কিন্তু জুমহূর ‘উলামায়ে কিরাম দা‘ওয়াত গ্রহণকে বড় জোর তাকীদযুক্ত মুস্তাহাব বলে মনে করেন। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫১৭৭; শারহে মুসলিম ৯/১০ম খন্ড, হাঃ ১৪৩২; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - ওয়ালীমাহ্ (বৌভাত)
৩২১৯-[১০] আবূ মাস্’ঊদ আল আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আনসারগণের মধ্যে আবূ শু’আয়ব নামক এক ব্যক্তির গোশ্ত/মাংস বিক্রেতা একজন ক্রীতদাস ছিল। সে ক্রীতদাসকে বলল, তুমি আমার জন্য পাঁচজনের অনুপাতে খাদ্য প্রস্তুত কর। আমি পাঁচজনের মধ্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কেও দা’ওয়াত করতে ইচ্ছুক। সুতরাং সে হিসাবে তাঁর জন্য খাবার তৈরি করা হলো। অতঃপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দা’ওয়াত করলেন। অতঃপর পথিমধ্যে তাঁদের (পাঁচজনের) সাথে একজন শামিল হলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ শু’আয়বকে ডেকে বললেন, তুমি ইচ্ছা করলে তাকে (অতিরিক্ত লোকটিকে) অনুমতি দিতে পার, ইচ্ছা করলে না করতে পার। সে বলল, না, বরং আমি তাকে অনুমতি দিলাম। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْوَلِيْمَةِ
وَعَنْ أَبِي مَسْعُودٍ الْأَنْصَارِيِّ قَالَ: كَانَ رَجُلٌ مِنَ الْأَنْصَارِ يُكْنَى أَبَا شُعَيْبٍ كَانَ لَهُ غُلَامٌ لَحَّامٌ فَقَالَ: اصْنَعْ لِي طَعَامًا يَكْفِي خَمْسَةً لَعَلِّي أَدْعُو النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَامِسَ خَمْسَةٍ فَصَنَعَ لَهُ طعيما ثمَّ أتها فَدَعَاهُ فَتَبِعَهُمْ رَجُلٌ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَا أَبَا شُعَيْبٍ إِنَّ رَجُلًا تَبِعَنَا فَإِنْ شِئْتَ أَذِنْتَ لَهُ وَإِنْ شِئْتَ تركته» . قَالَ: لَا بل أَذِنت لَهُ
ব্যাখ্যা: সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বিভিন্ন সময়ই বাড়ীতে দা‘ওয়াত করে নিতেন। আবূ শু‘আয়ব সম্ভবত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারার মধ্যে অনাহারের চিহ্ন দেখতে পেয়েছিলেন, তাই তাকে দা‘ওয়াত করেছিলেন। সুতরাং এজন্য গোলামকে দিয়ে যথাসময়ে কিছু হালকা খাদ্য তৈরি করানো হলো। طُعَيْمًا শব্দটি ক্ষুদ্রার্থ বাহক বিশেষ্য, এর অর্থ ছোট, ক্ষুদ্র, হালকা ইত্যাদি। এখানে অনাড়ম্বর, সাধারণ বা সাদামাটা খাদ্য বুঝানো উদ্দেশ্যও হতে পারে।
খাদ্য তৈরি হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চারজন সাহাবীসহ তাকে ডাকলেন। তাদের সাথে আরেকজন সাহাবীও গেলেন যাকে দা‘ওয়াত করা হয়নি। বাড়ীতে পৌঁছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দা‘ওয়াতকারী আবূ শু‘আয়বকে বললেন, হে আবূ শু‘আয়ব! আমাদের সাথে একজন লোক এসেছে, অর্থাৎ সে রাস্তা থেকে এসেছে যাকে তুমি দা‘ওয়াত করনি, এখন তুমি যদি চাও তাকে ভিতরে আসার এবং খানা খাবার অনুমতি দিতে পার আর তুমি ইচ্ছা করলে তাকে বর্জন করতে পার। আবূ শু‘আয়ব তখন বললেন , হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি তাকে বাদ রাখব না, বরং আমি তাকে অনুমতি দিলাম।
এ হাদীস থেকে প্রমাণিত যে, কোনো কওমের যিয়াফতে যিয়াফতকারীর অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করা বা অংশগ্রহণ করা বৈধ নয় এবং সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশ ছাড়া মেহমানের জন্যও বৈধ নয় তাদের সাথে দা‘ওয়াতবিহীন কোনো লোক গমন করলে তাকে অনুমতি দেয়া। হ্যাঁ যদি সর্বসাধারণের আসার অনুমতি থাকে অথবা অতিরিক্ত কেউ আসাতে দা‘ওয়াতকারী খুশী হয়েছেন জানা যায় তবে তা স্বতন্ত্র কথা।
শারহুস্ সুন্নাহ্ গ্রন্থে উল্লেখ আছে, এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত, যাকে দা‘ওয়াত করা হয়নি তাকে সেখানে গিয়ে খাদ্য গ্রহণ বৈধ নয়। একদল ‘উলামার মতে কারো সাথে যদি পূর্ব বন্ধুত্ব থাকে ঐ বন্ধু যে খাদ্য দিয়েছে তা সে নিজে খেতে পারবে এবং অপরকেও খাওয়াতে পারবে, এমনকি খাবার বহন করে বাড়ীতেও আনতে পারবে। তবে খাবার দস্তরখানে বসে পড়লে তখন স্বভাবসিদ্ধ নিয়ম হলো খেয়েই যেতে হবে, বহন করে বাড়ীতে নিয়ে যাওয়া যাবে না এবং অন্যকেও খাওয়ানো যাবে না। একই দস্তরখানে অংশগ্রহণকারী সকলেই পরস্পর একটি খাদ্যে অংশগ্রহণ করতে পারবে, তবে দস্তরখান ভিন্ন হলে তা বৈধ নয়।
মুযহির বলেনঃ এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুস্পষ্ট বিবরণ যে, কারো বাড়ীতে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষেধ, দা‘ওয়াতী ব্যক্তির জন্য ও দা‘ওয়াতকারীর অনুমতি ছাড়া অন্যকে সাথে নিয়ে যাওয়া বৈধ নয়।
ইমাম নববী (রহঃ) বলেনঃ দা‘ওয়াতী ব্যক্তির সাথে যদি কেউ এসেই পরে তাহলে তার জন্য মুস্তাহাব হলো দা‘ওয়াতকারীর অনুমতি প্রার্থনা করা, আর দা‘ওয়াতকারীরও উচিত তাকে ফিরিয়ে না দেয়া। হ্যাঁ যদি তার দ্বারা উপস্থিত দা‘ওয়াতী মেহমানদের কোনো কষ্ট হয় তবে তাকে স্বহৃদয়তার সাথে মিষ্টি ও নম্র্ কথা বলে বিদায় করে দিবে, পারলে কিছু খাদ্য সাথে দিয়ে বিদায় করলে আরো ভালো ও সুন্দর হয়। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫৪৬১; শারহে মুসলিম ১৩/১৪ খন্ড, হাঃ ২০৩৬; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ওয়ালীমাহ্ (বৌভাত)
৩২২০-[১১] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহধর্মিণী সফিয়্যাহ্ (রাঃ)-এর বিবাহে ছাতু ও খেজুর দ্বারা ওয়ালীমা করেছিলেন। (আহমাদ, তিরমিযী, আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ)[1]
عَنْ أَنَسٍ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أولم على صَفِيَّة بسويق وتمر. رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ
ব্যাখ্যা: পূর্বে ৩২১৪ নং হাদীসে সফিয়্যাহ্ -এর বিবাহোত্তর ওয়ালীমার বিবরণ অতিবাহিত হয়েছে, সেই ওয়ালীমার খানা ছিল হায়স। এ হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফিয়্যাহ্-এর ওয়ালীমাহ্ খেজুর এবং ছাতু দ্বারা সম্পন্ন করেছিলেন। ভিন্ন দু’টি হাদীসের সমন্বয়ে মুহাদ্দিসগণ বলেন, সফিয়্যার সাথে বিয়ের ওয়ালীমায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উভয় খাদ্যই পরিবেশন করেছিলেন, যে বর্ণনাকারীর নিকট যা ছিল অথবা যে যা খেয়েছেন সে তাই বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া আরো বলা যায়, হায়স তৈরি করতেও যব বা ছাতু এবং খেজুর ব্যবহার করা হয়। সুতরাং হয়তো এক বর্ণনাকারী হায়সের কথা বলেছেন, অন্য বর্ণনাকারী হায়সের মৌল উপাদানের কথা বলেছেন, তাই দ্বিবিধ কথার মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। (‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৭৪০; তুহফাতুল আহওয়াযী ৩য় খন্ড, হাঃ ১০৯৫; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ওয়ালীমাহ্ (বৌভাত)
৩২২১-[১২] সাফীনাহ্ (রাঃ) (উম্মুল মু’মিনীন উম্মু সালামাহ্ (রাঃ)-এর মুক্ত দাসী) হতে বর্ণিত। একদিন জনৈক ব্যক্তি ’আলী ইবনু আবূ ত্বালিব (রাঃ)-এর মেহমান হলে তার জন্য খাবারের আয়োজন করেন। এমতাবস্থায় ফাতিমা (রাঃ) বললেন, আমরা যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দা’ওয়াত করি আর তিনি আমাদের সাথে আহার করতেন, তবে কতই না উত্তম হত! অতঃপর তারা তাঁকে দা’ওয়াত করলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এসে ঘরের দরজায় দুই পাশের দুই চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে দেখলেন যে, ঘরের এককোণে একটি রঙিন নকশাদার পর্দা ঝুলছে। এটা দেখে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ফিরে যেতে লাগলে ফাতিমা (রাঃ) তাঁর পিছু ছুটে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনাকে ঘরে প্রবেশ করা থেকে কিসে পিছুটান দিয়েছে (বাধাদান করেছে)? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আমার পক্ষে অথবা কোনো নবীর পক্ষে নকশাকৃত এমন সুসজ্জিত ঘরে প্রবেশ ঠিক নয়। (আহমাদ, ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ سَفِينَةَ: أَنَّ رَجُلًا ضَافَ عَلِيَّ بْنَ أَبِي طَالِبٍ فَصَنَعَ لَهُ طَعَامًا فَقَالَتْ فَاطِمَةُ: لَوْ دَعَوْنَا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَكَلَ مَعَنَا فَدَعَوْهُ فَجَاءَ فَوَضَعَ يَدَيْهِ عَلَى عِضَادَتَيِ الْبَابِ فَرَأَى الْقِرَامَ قَدْ ضُرِبَ فِي نَاحِيَةِ الْبَيْتِ فَرَجَعَ. قَالَتْ فَاطِمَةُ: فَتَبِعْتُهُ فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا رَدَّكَ؟ قَالَ: «إِنَّهُ لَيْسَ لِي أَوْ لِنَبِيٍّ أَنْ يَدْخُلَ بَيْتا مزوقا» . رَوَاهُ أَحْمد وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: হাদীসের বর্ণনাকারী হলেন, উম্মুল মু’মিনীন উম্মু সালমাহ্ (রাঃ)-এর আযাদকৃত দাসী।
এক ব্যক্তি ‘আলী -এর মেহমান হয়েছিল। ‘আরবদের পরিভাষায় إِذَا نَزَلَ بِه ضَيْفًا যখন কোনো বাড়ীতে মেহমান আসে তখন বলা হয় «ضَافَه ضَيْفًا» অর্থাৎ তার নিকটে মেহমান এসেছে। আবার «ضَافَ الرَّجُلُ» লোকটি মেহমানদারী করল; ঐ সময় বলা হয় «إِذَا نَزَلَ بِه ضَيْفًا» যখন তার নিকট মেহমান (হয়েছে) আগমন করে।
ফাতিমা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দা‘ওয়াতের ইচ্ছা পোষণ করার কারণ হলো খাদ্যে বরকত লাভ করা, আর খানার অনুষ্ঠানটাও সুন্দর হওয়া। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সর্বোচ্চ সম্মান প্রর্দশন এবং পিতৃত্বেও পরিচয় তো আছেই। ইচ্ছা মোতাবেক তাকে দা‘ওয়াত করাও হলো এবং তিনি সময়মত আসলেনও, কিন্তু ঘরের দরজার দু’দিকে দুই চৌকাঠে হাত দিয়ে ঘরের মধ্যে তাকাতেই ভিতরে খুব উন্নত চিকন রঙিন পশমী নকশাদার পর্দার কাপড় টাঙ্গানো দেখলেন। এটা দেখেই তিনি খানাপিনা না করে সোজা বাড়ী রওনা হলেন। ফাতিমা (রাঃ) পিছে পিছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনি আমাদের ঘরে না ঢুকে এবং খাদ্য গ্রহণ না করেই ফিরে আসার কারণ কি? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আমার মতো মানুষের অথবা কোনো নাবীর জন্য উচিত নয় এমন ঘরে প্রবেশ করা যা খুব চাকচিক্যময় করে সাজানো হয়। হাদীসে (مُزَوَّقًا) শব্দ এসেছে, যার অর্থ সাজানো, অলংকৃত ও নকশাদার করা, চাকচিক্য করে তোলা ইত্যাদি।
ইবনুল মালিক ঐ হাদীসের মুতাবা‘আত করে বলেন, «كَانَ ذٰلِكَ مُزَيَّنًا مُنَقَّشًا» অর্থাৎ পর্দার কাপড়টি ছিল নকশাদার এবং অলংকৃত। কেউ কেউ বলেছেন ওটা নকশাদার ছিল এমনটি নয় তবে তা বর সাজানোর আসনের মতো ছিল, যা দিয়ে ঘরের প্রাচীর বা বেড়াকে ঢেকে রেখেছে। এটাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মনের ব্যাকুলতা সৃষ্টি করেছিল। যা অহংকারীদের কাজের সাদৃশ্য। এ দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান যে, যেখানে অপছন্দনীয় কাজ বিদ্যমান সেখানে দা‘ওয়াত গ্রহণ করা আবশ্যক নয়।
(‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৭৫১; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ওয়ালীমাহ্ (বৌভাত)
৩২২২-[১৩] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি দা’ওয়াত পেয়ে (ওযরবিহীনভাবে) প্রত্যাখ্যান করে, সে আল্লাহ ও রসূলের অবাধ্যাচরণ করল। আর যে ব্যক্তি বিনা দা’ওয়াতে আসলো সে যেন চোর সেজে ঢুকেছে এবং লুণ্ঠনকারীরূপে বের হয়ে গেছে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ دُعِيَ فَلَمْ يُجِبْ فَقَدْ عَصَى اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَمن دخل على غَيْرِ دَعْوَةٍ دَخَلَ سَارِقًا وَخَرَجَ مُغِيرًا» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসের ব্যাখ্যা পূর্বের ৩২১৮ নং হাদীসের কিঞ্চিৎ অতিবাহিত হয়েছে। ওযর ছাড়া কারো দা‘ওয়াত প্রত্যাখ্যান করা উচিত নয়, যে দা‘ওয়াত প্রত্যাখ্যান করলো করল সে আল্লাহ ও তার রসূলের নাফরমানী করল। কারো খাবার অনুষ্ঠানে কেউ দা‘ওয়াত ছাড়া প্রবেশ সে যেন চোরের মতো সংগোপনে খাবার টেবিলে প্রবেশ করল। এজন্য সে চোরের ন্যায় গুনাহ্গার হবে। সে যদি খায় তাহলে খাবার খেয়ে সে জবরদখলকারী হিসেবে বের হয়। আল্লাহর নাবী ছিলেন উত্তম আদর্শের মূর্তপ্রতীক। তিনি তার উম্মাতকে মাকারিমুল আখলাকিল বাহিয়্যাহ্ বা মনোমুগ্ধকর উত্তম আদর্শ ও চারিত্রিক গুণাবলী শিক্ষা দিয়েছেন এবং তাদেরকে হীনতা নীচুতা ইত্যাদি অশোভন এবং অসৎ চারিত্রিক আচরণ ও গুণাবলী থেকে বারণ করেছেন। দা‘ওয়াত ছাড়া কারো বাড়ীতে প্রবেশ করা হীনতা, নীচুতা, লাঞ্ছনা ও অপমানজনক কর্ম। সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা থেকে তার উম্মাতকে বারণ করেছেন। অনুরূপ কেউ দা‘ওয়াত দিলে তা গ্রহণ না করা আত্মঅহংকারীর কাজ এবং পরস্পর সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য পরিপন্থী কাজ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা থেকেও উম্মাতকে বারণ করেছেন। খুলকুল হাসানাহ্ বা উত্তম চরিত্র হলো উল্লেখিত দু’টি নিন্দনীয় চারিত্রিক গুণাবলী থেকে ভারসাম্যপূর্ণ মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। (‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৭৩৭; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ওয়ালীমাহ্ (বৌভাত)
৩২২৩-[১৪] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণের মধ্যে এক সাহাবী বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাকে যখন দু’ ব্যক্তি (একই সাথে) দা’ওয়াত দেয়, তখন নিকটবর্তীর দা’ওয়াত গ্রহণ কর। আর উভয়ের মধ্যে তার দা’ওয়াত গ্রহণ কর যে আগে দা’ওয়াত দিয়েছে। (আহমাদ, আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ رَجُلٍ مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِذَا اجْتَمَعَ الدَّاعِيَانِ فَأَجِبْ أَقْرَبَهُمَا بَابًا وَإِنْ سَبَقَ أَحَدُهُمَا فَأَجِبِ الَّذِي سَبَقَ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَأَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যা: বর্ণনাকারী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীদের মধ্য হতে কোনো একজন তার নাম বা পরিচিতি নেই; সাহাবীগণ প্রত্যেকেই যেহেতু ন্যায়পরায়ণ আদেল, সুতরাং তাদের অপরিচিতি কোনো দোষণীয় নয়। অন্য রাবীর কারণে এটি দুর্বল।
মুসলিমদের দা‘ওয়াত কবুল করা আবশ্যক, এখন একই সাথে যদি দু’জন মুসলিম দা‘ওয়াত প্রদান করে তবে কার দা‘ওয়াত কবুল করতে হবে অত্র হাদীসে তার বিধান বিধৃত হয়েছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশীর দা‘ওয়াত আগে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলার বাণী : ‘‘নিকটতম প্রতিবেশী এবং দূরতম প্রতিবেশী ’’- (সূরা আন্ নিসা ৪ : ৩৬)।
দু’জনের একজন যদি দা‘ওয়াতে অগ্রণী হয় তবে অগ্রণীর দা‘ওয়াত অগ্রণীয়। কারণ তার হক আগে সাব্যস্ত হয়েছে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৭৫২; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ওয়ালীমাহ্ (বৌভাত)
৩২২৪-[১৫] ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রথম দিনের খাবারের আয়োজন আবশ্যকীয়, দ্বিতীয় দিনের আয়োজন সুন্নাত, তৃতীয় দিনের আয়োজন লোকদেখানো। আর যে লোক দেখানো আয়োজন করে, আল্লাহ তা’আলাও তাকে সর্বসাধারণের সামনে (কিয়ামতের দিন) রিয়াকারী বলেই ঘোষণা করবেন। (তিরযিমী)[1]
وَعَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ
قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «طَعَامُ أَوَّلِ يَوْمٍ حق وَطَعَام يَوْم الثَّانِي سنة وَطَعَام يَوْم الثَّالِثِ سُمْعَةٌ وَمَنْ سَمَّعَ سَمَّعَ اللَّهُ بِهِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: বিবাহ উৎসবে তিনদিন খানা-পিনা অনুষ্ঠানাদি চলে থাকে। এ ক্ষেত্রে বরপক্ষ মানুষকে দা‘ওয়াত করে থাকে, অন্যদের কবুল করার আবশ্যকতা কতটুক অত্র হাদীসে তা বিধৃত হয়েছে। হাদীসে এসেছে, প্রথম দিনের খানা আবশ্যক বা ওয়াজিব। এটা তাদের পক্ষে দলীল যারা ওয়ালীমাহ্ করাকে ওয়াজিব অথবা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ্ মনে করেন। ওয়াজিবের ভিত্তিতেই তা বর্জনকারী গুনাহগার হয়ে থাকে এবং শাস্তি ও ভৎর্সনার উপযোগী হয়।
দ্বিতীয় দিনের খানা সুন্নাত, হতে পারে প্রথম ও দ্বিতীয় উভয় দিনই ‘আক্দের পরে আবার প্রথম দিন আক্দের পূর্বে এবং দ্বিতীয় দিন আক্দের পরে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আর তৃতীয় দিনের খানা (খ্যাতি বা সুনামের জন্য ) সুনাম সুখ্যাতি এবং রিয়া বা লৌকিকতার জন্য হয়ে থাকে। যেন লোকে তা শোনে এবং দেখে, তবে তাতে রিয়া বা লৌকিকতার চেয়েও সুনাম-সুখ্যাতি অথবা ব্যক্তির স্বাবলম্বীতাই প্রাধান্য পেয়ে থাকে, যা পরিত্যাজ্য। কেননা যে ব্যক্তি অহংকারবশত বা লৌকিকতা প্রদর্শন করতঃ নিজেকে বদান্যতা, মহানুভবতা বা উদারতার গুণে প্রসিদ্ধ করার প্রয়াস চালায়, আল্লাহ তা‘আলা তাকে কিয়ামতের দিবসে ‘‘আহলুল আরাসাত’’ বা ফাঁকা জায়গার অধিবাসীর মাঝে একজন চরম মিথ্যাবাদী হিসেবে প্রসিদ্ধি করাবেন।
তথায় আল্লাহ তা‘আলা বিয়াকারী ব্যক্তির রিয়া (লৈাকিকতা) এবং সুম্‘আহ্ (সুনাম-সুখ্যাতি) সৃষ্টিকূলের কর্ণকুহরে পৌঁছিয়ে দিবেন, ফলে রিয়াকারী লোকটি জনসম্মুখে অপমানিত হবে।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ যখন আল্লাহ তা‘আলা কোনো ব্যক্তিকে নি‘আমাত দিয়ে থাকেন তখন ঐ ব্যক্তির উচিত নি‘আমাতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। ফলে প্রথম দিনের ওয়ালীমাহ্ আদায়ে ভুল-ত্রুটি শুদ্ধ করার লক্ষ্যক্ষ দ্বিতীয় দিনে ওয়ালীমাহ্ অনুষ্ঠান করা মুস্তাহাব। কেননা সুন্নাত পালন ওয়াজিবের পরিপূরক। আর তৃতীয় দিবসের ওয়ালীমাহ্ রিয়া এবং সুম্‘আহ্ ছাড়া আর কিছু নয়। তাই প্রথম দিবসের ওয়ালীমার দা‘ওয়াত গ্রহণ করা আবশ্যক, দ্বিতীয় দিবসের দা‘ওয়াত গ্রহণ করা মুস্তাহাব, আর তৃতীয় দিবসের দা‘ওয়াত গ্রহণ করা মাকরূহ তাহরীম তথা হারাম। এতে ইমাম মালিক-এর সাথীদের মতের প্রত্যুত্তর দেয়া হলো। কেননা তারা সাতদিন পর্যন্ত ওয়ালীমার দা‘ওয়াত গ্রহণ করা মুস্তাহাব বলেন।
ইমাম ত্ববারানী ইবনু ‘আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন যে, প্রথম দিবসে ওয়ালীমার খাবার সুন্নাত, দুই দিনের খাবার মর্যাদাপূর্ণ কাজ এবং তিন দিনের খাবার রিয়া ও সুম্‘আহ্। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৩য় খন্ড, হাঃ ১০৯৭; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ওয়ালীমাহ্ (বৌভাত)
৩২২৫-[১৬] ’ইকরিমাহ্ (রহঃ) ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লৌকিকতা প্রদর্শনকারী দুই প্রতিযোগীর খাদ্য আয়োজনে যেতে নিষেধ করেছেন। (আবূ দাঊদ)[1]
মাসাবীহ-এর গ্রন্থকার মুহয়্যিইউস্ সুন্নাহ্ বলেন, প্রকৃতপক্ষে হাদীসটি ’ইকরিমাহ্ মুরসালরূপে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেছেন।
وَعَنْ عِكْرِمَةَ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ طَعَامِ الْمُتَبَارِيَيْنِ أَنْ يُؤْكَلَ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَقَالَ مُحْيِي السُّنَّةِ: وَالصَّحِيحُ أَنَّهُ عَنْ عِكْرِمَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُرْسَلًا
ব্যাখ্যা: মানুষকে খানা খাওয়ানো উত্তম ‘ইবাদাত। এটা হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে, গর্ব-অহংকার কিংবা নাম যশের উদ্দেশে নয়। কেউ যদি ফখর বা গর্ব অহংকার নিয়ে কাউকে দা‘ওয়াত করে অথবা গর্ব-অহংকার প্রকাশার্থে দা‘ওয়াত করে তবে তাদের এ অনুষ্ঠানের খাদ্য খেতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন। বিশেষ করে দু’জন বা ততোধিক ব্যক্তি যদি পরস্পর গর্ব অহংকারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় যে, কে কার উপর প্রাধান্য লাভ করতে পারে। তবে এ শ্রেণীর মানুষের খাদ্য খাওয়া নিষেধ।
এটা নিষেধ এজন্য যে, এতে রয়েছে আত্মঅহংকার ও রিয়া, আর লৌকিকতা হলো সূক্ষ্ম শির্ক যা গুনাহে কবীরা বা মহাপাপ।
অনেক ‘আলিমকে দা‘ওয়াত করা হলে তারা তা কবুল করতেন না। তাদের যদি বলা হতো সালাফদের অনেককেই তো দা‘ওয়াত করা হতো এবং তারা তা কবুলও করতেন? উত্তরে বলতেন, তারা দা‘ওয়াত গ্রহণ করতেন পরস্পর সৌহার্দ ও সস্প্রীতি রক্ষার জন্য আর তোমাদের এ দা‘ওয়াত তো চলছে অহংকার ও প্রতিদানের ভিত্তিতে।
বর্ণিত আছে, একদা ‘উমার ও ‘উসমান (রাঃ) একটি খাদ্যানুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হন এবং তারা দা‘ওয়াত কবুল করেন। দা‘ওয়াতে রওয়ানা হয়ে ‘উমার ‘উসমান -কে বললেন, আমি তো উপস্থিত হলাম বটে কিন্তু মন চাচ্ছে যে, অংশগ্রহণ না করি। ‘উসমান বললেন, কেন? উত্তরে ‘উমার বললেন, আমি ভয় পাচ্ছি যে, খাদ্যানুষ্ঠানটি গর্বাহংকারের হয় কিনা? (‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৭৫০; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৮. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ওয়ালীমাহ্ (বৌভাত)
৩২২৬-[১৭] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (লোক দেখানো) দুই প্রতিযোগীর দা’ওয়াত কবুল করা ঠিক নয় এবং তাদের খাদ্য গ্রহণও ঠিক নয়।
ইমাম আহমাদ (রহঃ) বলেন, ’খাবার আয়োজনে প্রতিযোগী’ এর অর্থ লৌকিকতা ও অহংকার প্রদর্শনীর জন্য দা’ওয়াত প্রতিযোগিতাই উদ্দেশ্য।[1]
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْمُتَبَارِيَانِ لَا يُجَابَانِ وَلَا يُؤْكَلُ طَعَامُهُمَا» . قَالَ الْإِمَامُ أَحْمَدُ: يَعْنِي المتعارضين بالضيافة فخراً ورياء
ব্যাখ্যা: পরস্পর গর্ব অহংকারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত দু’জনের দা‘ওয়াত-যিয়াফতে যোগদান করতে নেই। কেননা তাদের উদ্দেশ্য খারাপ। বিশেষ অবস্থার প্রেক্ষিতে যদি উপস্থিত হতেই হয় তাহলে খানা থেকে বিরত থাকবে, অর্থাৎ খানা খাবে না। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৮. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ওয়ালীমাহ্ (বৌভাত)
৩২২৭-[১৮] ’ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাসিকগণের দা’ওয়াত গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। (বায়হাক্বী)[1]
وَعَن عمرَان ين حُصَيْنٍ قَالَ: نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِجَابَة طَعَام الْفَاسِقين
ব্যাখ্যা: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাসিক বা পাপাচারী লম্পটের খানার দা‘ওয়াত গ্রহণ করতে নিষেধ করেছন। এটা মুতালাক বা সাধারণ নিষেধ, দা‘ওয়াত গ্রহণ করলে গুনাহগার হবে এমনটিও নয়। নিষেধ এজন্য যে, ফাসিক ফাজিরের সাধারণ দা‘ওয়াতে একজন পরহেজগার ব্যক্তি অবাধে যাতায়াত করলে তার পাপাচারের স্পর্ধা আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। অথবা ফাসিক বা পাপাচারীর সাথে একজন পরহেজগার ব্যক্তির অবাধে ওঠা বসা দেখে অন্যদের মধ্যে পাপাচারের প্রতি ঘৃণা ও ভয় দূর হয়ে যাবে, ফলে সমাজে পাপাচারিতার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পাপাচারী ব্যক্তির পাপ স্পষ্ট ও প্রকাশ্য হওয়ার পরে মুত্তাক্বী ব্যক্তি তার সাথে নির্বিঘ্ন সম্পর্ক স্থাপন আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যক্ষ্য কারো সাথে সম্পর্কচ্ছেদের ‘আমল করা হয় না, পাপাচার ব্যক্তিকে মুত্তাক্বী ব্যক্তি কর্তৃক উদারভাবে সম্পর্ক রক্ষা একদিকে পাপের প্রতি উল্লাসিকতা প্রদর্শিত হয়, অন্যদিকে পাপাচারী ব্যক্তি পাপকে বর্জন করতে কোনো রূপ গরজ অনুভব করে না। আর এটি যেন পাপের প্রতি এক নীরব সমর্থন।
একই সাথে পাপের প্রতি মুত্তাক্বী ব্যক্তির এক প্রকার সহনীয় মানসিকতা তৈরি হয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে পাপের প্রতি ঘৃণাবোধ সমাজ থেকে উঠে যায়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৮. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ওয়ালীমাহ্ (বৌভাত)
৩২২৮-[১৯] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন তোমরা কোনো মুসলিম ভাইয়ের (দা’ওয়াতে) তার ঘরে যাও, তখন তার (আপ্যায়নে) খাদ্য খাও এবং জিজ্ঞাসাবাদ করো না (খাদ্য কোথা থেকে কিভাবে প্রস্তুত হলো)। অনুরূপ তার পানীয় পান কর, কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদ করো না। (উপরোল্লিখিত হাদীস তিনটি বায়হাক্বী শু’আবুল ঈমান গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)[1]
আর ইমাম বায়হাক্বী বলেন, যদি হাদীসটি সহীহ হয় তাহলে তার অর্থ হয়- ’মুসলিম ভাই তার অপর মুসলিম ভাইকে হালাল খাদ্য-পানীয় ছাড়া আহার করাবে না’।
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا دَخَلَ أَحَدُكُمْ عَلَى أَخِيهِ الْمُسْلِمِ فَلْيَأْكُلْ مِنْ طَعَامِهِ وَلَا يَسْأَلْ وَيَشْرَبْ مِنْ شَرَابِهِ وَلَا يَسْأَلْ»
رَوَى الْأَحَادِيثَ الثَّلَاثَة الْبَيْهَقِيّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ» وَقَالَ: هَذَا إِنْ صَحَّ فَلِأَنَّ الظَّاهِرَ أَنَّ الْمُسْلِمَ لَا يُطْعِمُهُ وَلَا يسْقِيه إِلَّا مَا هُوَ حَلَال عِنْده
ব্যাখ্যা: একজন মুসলিম আরেকজন মুসলিমের প্রতি সুধারণা পোষণ করবে। দা‘ওয়াত করে খাবার সামনে দিলে তা খাবে, তা নিয়ে এভাবে প্রশ্ন তুলবে না যে, এ খাদ্য কোথায় পেলে? যাতে তা হারাম না হালাল, এটা প্রকাশ পেয়ে যায়। মুসলিমের খাদ্য পানীয় হালাল হওয়ার দৃঢ় ইয়াক্বীন নিয়েই তার বাড়ী খানাপিনা করবে। তাকে প্রশ্ন করে কষ্ট দিবে না এবং অপমানিত করবে না। আর এটা কেবল ঐ সময় যখন কোনো ব্যক্তির ফিসকিয়াত বা পাপাচারিতা সম্পর্কে জানা না থাকবে। পূর্বের হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাসিকের খাদ্য গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন, এ হাদীসে কোনো মুসলিমের খাদ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে নিষেধ করেছেন, এ উভয় হাদীসের সমন্বয় কিভাবে হবে? ‘আল্লামা ত্বীবী বলেনঃ উত্তরে আমরা বলব ফাসিক তো সেই, যে সোজা-সরল সিরাতে মুস্থাক্বীমের সুদৃঢ় পথ লঙ্ঘন করে চলে। সে সোজা-সরল পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে চলে এমনকি অধিকাংশ সময় স্পষ্ট হারাম থেকেও পরহেয করে চলে না, তাই একজন বিচক্ষণ ব্যক্তিকে তার খাদ্যগ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছে।
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)-এর হাদীসে ‘তার ভাই’ শব্দ দ্বারা খাস করা হয়েছে এবং ‘ইসলাম’ শব্দ দ্বারা তাকে বিশেষিত করা হয়েছে। একজন মুসলিমের প্রকাশ্য অবস্থা হবে এই যে, সে হারাম বা নিষিদ্ধ বস্তু থেকে দূরে থাকবে। তাই তার সম্পর্কে অন্যকে ভালো ধারণা এবং এমন আচরণের নির্দেশ করা হয়েছে যাতে তার সাথে ভালোবাসা এবং হৃদ্যতা বেড়ে যায়, প্রশ্ন করে তাকে কষ্ট দেয়া থেকে নিজেকে সে বিরত রাখবে। এটাও সত্য যে, তার খাদ্য থেকে বিরত থাকা তার জন্য ধমকী যেন, সে ফিসকিয়াতে লিপ্ত না হয়; এটা প্রকৃতপক্ষে তার প্রতি সহৃদয়তা ও স্নেহই মাত্র। যেমন হাদীসে এসেছে, তোমার ভাই যালিম এবং মাযলূমকে সাহায্য কর।
ইমাম বায়হাক্বী (রহঃ) বলেনঃ এ বিষয়ে তিনটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। শেষের হাদীসটি যদি সহীহ হয় তাহলে এর অর্থ হলো একজন কামিল মু’মিন যিনি ফাসিক বা পাপাচারী নন তিনি তার কোনো মুসলিম ভাইকে তার নিকট যে হালাল খাদ্য ও পানীয় রয়েছে তা ছাড়া অন্য কিছু দিতে পারে না, কারণ সে নিজের জন্য হালাল ছাড়া কোনো হারামকে পছন্দ করে না। কেননা হাদীসে এসেছে, ‘‘তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মু’মিন হতে পারবে না যতক্ষণ তোমার অন্য (কোনো মুসলিম) ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করবে যা তুমি তোমার নিজের জন্য পছন্দ কর’’- (বুখারী, মুসলিম)। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - ভাগ-বণ্টন (সহধর্মিণীদের মধ্যে পালা নিরূপণ প্রসঙ্গে)
الْقَسْمِ শব্দটির ’কফ’ বর্ণে যবর এবং ’সীন’ বর্ণে সাকীন যোগে মাসদার বা শব্দমূল হিসেবে পঠিত হয়। অর্থ ভাগ-বণ্টনে করা শরীক বা অংশীদারদের মাঝে প্রাপ্য অংশ বণ্টন করে দেয়া। অনুরূপ স্ত্রীদের মাঝে পালি বণ্টন করা, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো স্ত্রীদের নিকট (পালাক্রমিক) রাত যাপন করা। ইবনুল হুমাম (রহঃ) বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো স্ত্রীর মাঝে সমতা বিধান করা, একেই নামকরণ করা হয়েছে ’স্ত্রীদের মাঝে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা’। এই ন্যায়বিচার আবশ্যক হওয়ার বিষয়টি রাতের পালার ক্ষেত্রেই বিশেষভাবে প্রযোজ্য। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
৩২২৯-[১] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকালের সময় নয়জন সহধর্মিণী ছিল। তন্মধ্যে (বিবি সাওদাহ্ (রাঃ) ব্যতীত) আটজনের জন্য পালা বণ্টন করতেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْقَسْمِ
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قُبِضَ عَنْ تِسْعِ نِسْوَةٍ وَكَانَ يقسم مِنْهُنَّ لثمان
ব্যাখ্যা: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নয়জন স্ত্রীকে রেখে মৃত্যুবরণ করেন, তারা হলেন- ‘আয়িশাহ, হাফসাহ্, সাওদাহ্, উম্মু সালামাহ্, সফিয়্যাহ্, মায়মূনাহ্, উম্মু হাবীবাহ্, যায়নাব এবং জুওয়াইরিয়াহ্ (রাঃ)। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এদের আটজনের মধ্যে পালাক্রমে রাত যাপন করতেন। নবম স্ত্রী সাওদাহ্ (রাঃ) বৃদ্ধা হয়ে পড়লে তার অংশ বা পালা ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে হেবা করে দেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর স্ত্রীদের সকলের নিকট গমন করতেন ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর নিকট গিয়ে তার পালা শেষ হতো। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫০৬৭; শারহে মুসলিম ৯/১০ম খন্ড, হাঃ ১৪৬৫; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - ভাগ-বণ্টন (সহধর্মিণীদের মধ্যে পালা নিরূপণ প্রসঙ্গে)
৩২৩০-[২] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহধর্মিণী সাওদাহ্ বার্ধক্যে উপনীত হওয়ায় বলেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনার নিকট আমার প্রাপ্যের দিন (রাত্রি যাপন) আমি ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে দিলাম। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর জন্য দু’দিন নির্ধারণ করেন, একদিন তার নিজের আর একদিন সাওদার। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْقَسْمِ
وَعَنْ عَائِشَةَ أَنَّ سَوْدَةَ لَمَّا كَبِرَتْ قَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ قَدْ جَعَلْتُ يَوْمِي مِنْكَ لِعَائِشَةَ فَكَانَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُقَسَّمُ لِعَائِشَةَ يَوْمَيْنِ يَوْمَهَا وَيَوْم سَوْدَة
ব্যাখ্যা : এ হাদীসটি পূর্বের হাদীসের ব্যাখ্যা স্বরূপ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী সাওদাহ্ (রাঃ) বিনতু যাম্‘আহ্ (রাঃ) যখন অতিবৃদ্ধা হয়ে পড়েন তখন তিনি তার প্রাপ্য পালাটুকু তার সতীন ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে দান করে দেন। সেই ভিত্তিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর পালা দুই দিন নির্ধারণ করেন। হিদায়াহ্ গ্রন্থাকার বলেন, যদি একাধিক স্ত্রীদের মধ্য থেকে কেউ তার প্রাপ্য পালা তার সঙ্গীনীদের (সতীনদের) জন্য ছেড়ে দিতে রাযী হয় তবে তা বৈধ। ইবনুল হুমাম (রহঃ) বলেন, স্বামীর পক্ষ থেকে যদি কোনো স্ত্রীকে ঘুষ দিয়ে তার পালা অন্য স্ত্রীকে দেয়া হয় অথবা স্বামীই এ শর্তে বিয়ে করে যে, আমি তার কাছে দু’দিন থাকব, ইত্যাদি শর্তসমূহ বাতিল বলে গণ্য হবে।
ইমাম নববী (রহঃ) বলেনঃ কোনো স্ত্রী যদি তার পালা অন্যকে হেবা করে দেয় তবে পরবর্তী সময়ে সে যখনই চায় তার হেবা প্রত্যাহার করে অধিকার ফিরে নিতে পারবে। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫২১২; শারহে মুসলিম ৯/১০ম খন্ড, হাঃ ১৪৬৩; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - ভাগ-বণ্টন (সহধর্মিণীদের মধ্যে পালা নিরূপণ প্রসঙ্গে)
৩২৩১-[৩] উক্ত রাবী [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রাণ ওষ্ঠাগতপ্রায় (মৃত্যু হবে এমন) অবস্থায় জিজ্ঞেস করছিলেন, আগামীকাল আমি কোথায় (থাকব)? আগামীকাল কার ঘরে (থাকব)? তিনি [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] বলেন, এই (পুনঃপুনঃ) বলার উদ্দেশ্য হলো, ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর পালা কবে আসবে? এমতাবস্থায় সকল স্ত্রী তাঁকে তাঁর সদিচ্ছায় থাকার অনুমতি দিতেন। অতঃপর তিনি ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর ঘরেই অবস্থান করেন এবং তার কাছে থেকেই ইন্তেকাল করেন। (বুখারী)[1]
بَابُ الْقَسْمِ
وَعَنْهَا أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَسْأَلُ فِي مَرَضِهِ الَّذِي مَاتَ فِيهِ: «أَيْنَ أَنَا غَدًا؟» يُرِيدُ يَوْمَ عَائِشَةَ فَأَذِنَ لَهُ أَزْوَاجُهُ يَكُونُ حَيْثُ شَاءَ فَكَانَ فِي بَيْتِ عَائِشَةَ حَتَّى مَاتَ عِنْدَهَا. رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ
ব্যাখ্যা : নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে অসুখে মৃত্যুবরণ করেন সেই সময় তিনি তার অসুস্থতার দিনগুলো ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর ঘরে কাটানোর অভিপ্রায়ে এ কথা বলেন যে, আগামীকাল আমি কোথায় থাকব? আগামীকাল আমি কোথায় থাকব? ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর প্রতি অধিক মুহববাতের কারণেই তিনি এ কথা বলেছেন। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা (أَيْنَ أَنَا غَدًا؟) ‘‘আগামীকাল আমি কোথায় থাকব?’’ এর ব্যাখ্যা হলো, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর দ্বারা ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর পালা আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন। অথবা তার প্রশ্নটি ছিল স্ত্রীদের নিকট অনুমতি কামনা করা যেন তারা অসুস্থতার দিনগুলো ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর নিকট থাকার অনুমতি প্রদান করে। সে মতে স্ত্রীগণও তিনি যেখানে থাকতে চান সেখানেই থাকার অনুমতি প্রদান করেন। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মৃত্যু পর্যন্ত ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর ঘরেই অবস্থান করেন।
মুযহির (রহঃ) বলেনঃ স্ত্রীদের মধ্যে পালা বণ্টন যে ওয়াজিব এ হাদীস তা প্রমাণ করে এবং এটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্যও আবশ্যক, এমনকি অসুস্থ অবস্থায়ও।
এটাও সত্য যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুমতি গ্রহণ ছিল স্ত্রীদের প্রতি অধিক ভালোবাসা এবং উত্তম আচরণের ফলশ্রুতি সরূপ এবং তা ছিল মুস্তাহাব। কেউ কেউ বলেছেন, স্ত্রীদের মধ্যে পালা বণ্টন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য ওয়াজিব ছিল না বরং তার জন্য ছিল মুস্তাহাব, কেননা তিনি একই রাতে সমস্ত স্ত্রীদের কাছে গমন করতেন। এর উত্তরে বলা হয়েছে, এটা ছিল পালা বণ্টন ওয়াজিব হওয়ার আগের ঘটনা, অথবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের অনুমতি সাপেক্ষেই তা করেছিলেন। (ফাতহুল বারী ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৪৫০; শারহে মুসলিম ১৫/১৬ খন্ড, হাঃ ২৪৪৩; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - ভাগ-বণ্টন (সহধর্মিণীদের মধ্যে পালা নিরূপণ প্রসঙ্গে)
৩২৩২-[৪] উক্ত রাবী [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো সফরে বের হলে তাঁর সহধর্মিণীগণের মধ্যে লটারির মাধ্যমে (নির্বাচিত করে) যার নাম উঠত তাকে সাথে নিয়ে যেতেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْقَسْمِ
وَعَنْهَا قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا أَرَادَ سَفَرًا أَقْرَعَ بَيْنَ نِسَائِهِ فأيهن خَرَجَ سَهْمُهَا خَرَجَ بِهَا مَعَهُ
ব্যাখ্যা: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো সফরে বের হতেন স্ত্রীদের মধ্যে থেকে একজনকে সফরসঙ্গী করতেন। এতে জাগতিক এবং আত্মিক উভয়বিধ কল্যাণ নিহিত ছিল। স্ত্রীদের একজনকে নির্বাচনের ব্যাপারে তিনি লটারীর ব্যবস্থা করতেন। লটারীতে যার নাম আসত তাকে তিনি সাথে নিয়ে যেতেন।
শারহুস্ সুন্নাহ্ গ্রন্থে রয়েছে, কোনো ব্যক্তি যখন স্বীয় প্রয়োজনে সফরের ইচ্ছা পোষণ করবে আর স্ত্রীদের কাউকে সফরে সাথে রাখতে চাইবে তখন তাদের মধ্যে লটারীর মাধ্যমে একজনকে নির্বাচন করবে। এরপর লটারী করে যখন একজনকে নিয়ে সফরে রওনা হবে তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা বলব তার সফরজনিত অনুপস্থিতকালে সে বাকী স্ত্রীদের মাঝে ন্যায় বিচার করতে পারবে না। (ফাতহুল বারী ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫৯৩; শারহে মুসলিম ১৫/১৬ খন্ড, হাঃ ২৪৪৫; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - ভাগ-বণ্টন (সহধর্মিণীদের মধ্যে পালা নিরূপণ প্রসঙ্গে)
৩২৩৩-[৫] আবূ ক্বিলাবাহ্ (রহঃ) আনাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন। তিনি [আনাস (রাঃ)] বলেছেনঃ সুন্নাত তরীকাহ্ হলো, কেউ যদি পূর্ব বিবাহিতা স্ত্রী থাকাকালীন কুমারী বিয়ে করে তার নিকট সাতদিন অবস্থান করে, পরে পালা বণ্টন করবে। আর যদি বিধবা (বা তালাকপ্রাপ্তা) বিয়ে করে তার নিকট তিনদিন অবস্থান করে, পরে বণ্টন করবে। আবূ ক্বিলাবাহ্ বলেন, আমি যদি বলতে ইচ্ছা করি তবে তা হলো, হাদীসটি আনাস (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে মারফূ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْقَسْمِ
وَعَنْ أَبِي قِلَابَةَ عَنْ أَنَسٍ قَالَ: مِنَ السُّنَّةِ إِذَا تَزَوَّجَ الرَّجُلُ الْبِكْرَ عَلَى الثَّيِّبِ أَقَامَ عِنْدهَا سبعا وَقسم إِذا تَزَوَّجَ الثَّيِّبَ أَقَامَ عِنْدَهَا ثَلَاثًا ثُمَّ قَسَمَ. قَالَ أَبُو قلَابَة: وَلَو شِئْت لَقلت: إِن أَنَسًا رَفْعَهُ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
ব্যাখ্যা : কোনো ব্যক্তি যদি স্ত্রী থাকতে আরো একাধিক বিয়ে করতে চায় তাহলে সে যদি কুমারী নারীকে বিবাহ করে তাহলে অন্যান্য স্ত্রীদের সাথে পালাবণ্টনের পূর্বেই নববিবাহিতা কুমারী স্ত্রীর নিকট সাত দিন কাটাবে, অতঃপর পালাক্রমের আওতাভুক্ত হবে। আর যদি সায়্যেবাহ বা অকুমারী নারীকে বিয়ে করে তাহলেও অন্যান্য স্ত্রীদের সাথে পালাবণ্টনের আওতাভুক্ত হওয়ার আগে তার সাথে তিন দিন কাটাবে, এরপর পালার অন্তর্ভুক্ত হবে। কুমারী কিংবা অকুমারীকে বিবাহের পর পরই সাত কিংবা তিনের এই ভেদাভেদ মাত্র, এই দিনে অতিবাহিত হলে কুমারী-অকুমারী বা নতুন-পুরাতনের আর কোনো ভেদাভেদ থাকবে না।
অনেক হানাফী ‘আলিমসহ ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ) অত্র হাদীসের ভিত্তিতে এই মতের প্রবক্তা; পক্ষান্তরে সামনের মুতালাক বা সাধারণ নির্দেশসূচক দু’টি হাদীসের ভিত্তিতে হানাফী মাযহাবের আরেক দল ‘আলিম বলেন, কুমারী-অকুমারী বা নতুন-পুরাতনের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। সূরা আন্ নিসার ৩ নং আয়াত এবং ১২৯ নং আয়াতকেও তারা দলীল হিসেবে গ্রহণ করে থাকে না সেখানে উল্লেখ হয়েছে: ‘‘যদি তোমরা আশংকা কর যে, (স্ত্রীদের মধ্যে) ন্যায় বিচার করতে পারবে না।’’ (সূরাহ আন্ নিসা ৪ : ৩)
আল্লাহ আরো বলেন, ‘‘তোমরা কক্ষনো (স্ত্রীদের মধ্যে) ন্যায় বিচার করতে সক্ষম হবে না।’’ (সূরাহ আন্ নিসা ৪ : ১২৯)
এখানে স্ত্রীদের অধিকার সমানরূপে বলা হয়েছে। এটা কুরআন, যা অকাট্য, আর হাদীস হলো খবরে ওয়াহিদ যা অকাট্য নয়, সুতরাং তা দ্বারা অকাট্য বস্তুকে রহিত করা যাবে না।
এর উত্তরে বলা হয়, কুরআন যেমন অকাট্য হাদীস সহীহ হলে সেটিও অকাট্য, উপরন্তু এখানে হাদীস দ্বারা কুরআনকে রহিত করাও হচ্ছে না, সুতরাং এরূপ দাবী অবান্তর।
এ হাদীসটি আনাস থেকে বর্ণিত, তিনি এটি মারফূ‘ হাদীস হিসেবে বর্ণনা করেননি। বরং তিনি বলেছেন, সুন্নাত হলো যখন কেউ কুমারীকে বিবাহ করবে ...। বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হয় এটি মারফূ‘ নয়, কিন্তু আনাস -এর শাগরেদ পরবর্তী রাবী আবূ ক্বিলাবাহ্ (রহঃ) বলেন, তুমি ইচ্ছা করলে বলতে পার এ হাদীসটিকে আনাস মারফূ‘ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কেননা কোনো সাহাবী যদি বলেন ‘সুন্নাত হলো’ ... তাহলে এটাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাত ছাড়া আর কি বুঝাবে? নিশ্চয় নিজে ইজতিহাদ করে বলেননি, বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট শুনেই বলেছেন, সুতরাং সেটা মারফূ‘ হাদীসেরই মর্যাদাসম্পন্ন।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ কোনো সাহাবীর মুখে ‘সুন্নাত’ বলা মুহাদ্দিসীন এবং জুমহূর সালাফদের মাযহাব মতে বর্ণনাটি মারফূ‘ হাদীসের মর্যাদা পায়।
কেউ কেউ এটাকে মাওকূফ হাদীসের মর্যাদায় নিয়েছে, কিন্তু তাদের কথার কোনই ভিত্তি নেই।
‘আল্লামা ইবনু হাজার ‘আসকালানী (রহঃ) বলেনঃ কোনো সাহাবীর মুখে সুন্নাতের দাবী হাদীসটি মুসনাদ তথা সানাদ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছেছে হিসেবে বিবেচিত হয়, কেননা সাহাবীগণ সুন্নাত দ্বারা সুন্নাত রসূলই উদ্দেশ্য নিতেন। এছাড়াও এ হাদীসটি আনাস থেকে একাধিক ব্যক্তি মারফূ‘ভাবে বর্ণনা করেছেন যেমন দারাকুত্বনী প্রমুখ মুহাদ্দিস আনাস থেকে বর্ণনা উল্লেখ করেছেন, আনাস বলেছেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, কুমারীর জন্য সাতদিন এবং অকুমারীর জন্য তিনদিন...। ইমাম বাযযারও অনুরূপ হাদীস উল্লেখ করেছেন। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫২১৩; শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪৬১; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - ভাগ-বণ্টন (সহধর্মিণীদের মধ্যে পালা নিরূপণ প্রসঙ্গে)
৩২৩৪-[৬] আবূ বকর ইবনু ’আব্দুর রহমান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মু সালামাহ্ (রাঃ)-কে বিয়ে করার পর তাঁর খিদমাতে থাকাকালীন ভোরে উঠে বললেন, তুমি তোমার বংশের নিকট সম্মানহানী হবে না; যদি তুমি ইচ্ছা কর তবে আমি তোমার নিকট সাতদিন অবস্থান করব। এভাবে অন্য স্ত্রীগণের নিকটও সাতদিন করে থাকব। আর যদি তুমি ইচ্ছা কর তবে তোমার নিকট তিনদিন অবস্থান করব এবং তিনদিন করে পালা বণ্টন করব। তিনি [উম্মু সালামাহ্ (রাঃ)] বললেন, তবে তিনদিন করে পালা বণ্টন করুন।
অপর বর্ণনায় আছে যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে বলেন : কুমারীর জন্য সাতদিন, আর (পূর্ব) বিবাহিতার জন্য তিনদিন। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْقَسْمِ
وَعَنْ أَبِي بَكْرِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حِين تَزَوَّجَ أُمَّ سَلَمَةَ وَأَصْبَحَتْ عِنْدَهُ قَالَ لَهَا: «لَيْسَ بِكِ عَلَى أَهْلِكِ هَوَانٌ إِنْ شِئْتِ سَبَّعْتُ عِنْدَكِ وَسَبَّعْتُ عِنْدَهُنَّ وَإِنْ شِئْتِ ثَلَّثْتُ عِنْدَكِ وَدُرْتُ» . قَالَتْ: ثَلِّثْ. وَفِي رِوَايَةٍ: إِنَّهُ قَالَ لَهَا: «لِلْبِكْرِ سَبْعٌ وَلِلثَّيِّبِ ثَلَاثٌ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মু সালামাহ (রাঃ)-কে বিয়ে করার পর তিনি তাকে বলেন, আমার সাথে তোমার বিয়ের কারণে তোমার বংশের মর্যাদার কোনো হানি ঘটবে না। এখানে ‘আহ্ল’ দ্বারা বংশকে বুঝানো হয়েছে। কেউ কেউ বলেন, ‘আহ্ল’ দ্বারা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কেই বুঝানো হয়েছে, কেননা স্বামী-স্ত্রীর প্রত্যেকেই একে অপরের ‘আহ্ল’। এ অবস্থায় অর্থ হবে তোমার নিকট তিনদিন অবস্থান করায় তোমার প্রতি আমার আগ্রহ ভালোবাসার কমতি বুঝাবে না, কেননা অকুমারীর কাছে তিনদিন অবস্থান করাই বিধান। তবে তুমি যদি চাও তাহলে আমি তোমার নিকট সাতদিনই অবস্থান করতে পারি। কিন্তু তখন অন্যান্যা স্ত্রীদের নিকটও সাতদিন অবস্থান করতে হবে।
হিদায়াহ্ গ্রন্থাকার বলেনঃ স্ত্রীদের মধ্যে গমন পরিক্রমায় সমতাই উদ্দেশ্য, চাই একদিনের হোক অথবা দুই অথবা তিন বা ততোধিক দিনের হোক। এক্ষেত্রে নতুন-পুরাতনের মাঝে কোনো ব্যবধান নেই।
ইবনুল হুমাম (রহঃ) বলেনঃ আমার ধারণা যে, অধিক দিন একত্রিত করা ক্ষতিজনক, তবে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে যদি সম্মত হয়ে করে সেটা ভিন্নকথা।
কেউ কেউ বলেছেন, স্বামী স্ত্রীকে তিনের ইখতিয়ার দিবে, তিনদিন নিলে এই তিন অন্যের মধ্যে বণ্টন হবে না, আর সাতদিনের ইখতিয়ার গ্রহণ করলে তিনের অতিরিক্ত দিনগুলো অন্যান্য স্ত্রীদের মধ্যেও পালাবণ্টন হবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মু সালামাহ্ (রাঃ)-কে বলেছিলেন, তুমি চাইলে তোমার নিকট আমার অবস্থানের জন্য সাতদিনই নির্ধারণ করতে পার; নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথার অর্থ হলো তিনদিনের পর তুমি চাইলে সাতদিনই অবস্থান করব যাতে তোমার গোত্রের লোকেরা খুশী থাকে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মু সালামাহ্ (রাঃ)-কে কুমারী নারীর মর্যাদা দান করেছেন এবং তার গোত্রের সম্মান অক্ষুণ্ণ রেখেছেন।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেছেনঃ নবপরিণিতা কুমারী অকুমারীর জন্য বিশেষ সাত অথবা তিন দিনের বিষয়ে ফুকাহাগণ বিভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন। অনেকেই বলেছেন, উল্লেখিত দিনগুলো অন্যান্য স্ত্রীদের মধ্যে পালাক্রমের হিসেবে আসবে না।
‘আল্লামা তূরিবিশ্তী (রহঃ) বলেন, কুমারীর জন্য সাতদিন এবং অকুমারীর জন্য তিনদিন এটা সুন্নাত। নববিবাহিতাদের জন্য এই বিশেষ দিনগুলো তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ এবং অন্তরঙ্গ হওয়ার জন্য শারী‘আতের বিশেষ ব্যবস্থা। এক্ষেত্রে কুমারীর জন্য বেশী দিন ধার্য করা হয়েছে তার ভীতি ও ঘৃণা দূরীভূত হওয়া এবং হৃদয়ের প্রশান্তি ও স্থিতির জন্য, এটা তার বিশেষ ফযীলত। ‘উলামাদের অধিকাংশের মত হলো, এটা নববিবাহিতাদের বাসর পাওনা। (শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪৬০; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ভাগ-বণ্টন (সহধর্মিণীদের মধ্যে পালা নিরূপণ প্রসঙ্গে)
৩২৩৫-[৭] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রীগণের মাঝে ন্যায়-নিষ্ঠার সাথে পালা বণ্টন করতেন এবং বলতেন, ’’হে আল্লাহ! আমার সাধ্যমত (এই বিষয়ের) বণ্টন করলাম, আর যে ব্যাপারে তোমার আয়ত্তে ও আমার সাধ্যাতীত (মনের দুর্বলতা ও ভালোবাসার দরুন), সে বিষয়ে তুমি আমাকে অপরাধী করিও না’’। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ ও দারিমী)[1]
عَنْ عَائِشَةَ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَقْسِمُ بَيْنَ نِسَائِهِ فَيَعْدِلُ وَيَقُولُ: «اللَّهُمَّ هَذَا قَسْمِي فِيمَا أَمْلِكُ فَلَا تَلُمْنِي فِيمَا تَمْلِكُ وَلَا أَمْلِكُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ والدارمي
ব্যাখ্যা: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল বিষয়েই তার স্ত্রীদের মধ্যে সমবণ্টন করতেন, বিশেষ করে রাত্রি যাপনের পালা নির্ধারণের ক্ষেত্রে তিনি পূর্ণরূপে ইনসাফভিত্তিক ফায়সালা করতেন। কোনো ব্যক্তির একাধিক স্ত্রী থাকলে তাদের কারো বিশেষ কিছু গুণাবলীর কারণে তার প্রতি স্বামীর অধিক ভালোবাসা থাকা স্বাভাবিক। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। এটা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আর এটা ইনসাফের পরিপন্থীও নয়। তবু তিনি এ বিষয়ে আল্লাহকে ভয় করতেন এবং নিজের অপারগতা প্রকাশ করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর কাছে এই বলে প্রার্থনা করতেন, ‘‘হে আল্লাহ! স্ত্রীদের মাঝে ইনসাফ করা বা বাহ্যিক সমতা রক্ষা করা যেহেতু আমার আয়ত্তাধীন, আমি তা করছি, কিন্তু কোনো স্ত্রীর প্রতি হৃদয়ের টান বা অধিক ভালোবাসা এটা আমার আয়ত্তের বাহিরে। হে আল্লাহ! তুমিই তো মানুষের কলব বা হৃদয় পরিবর্তনের মালিক, সুতরাং তুমি যে বিষয়ের মালিক সে বিষয় তুমি আমার অপরাধ ধরো না এবং আমাকে তিরস্কার ও ভৎর্সনা করো না।’’
ইবনুল হুমাম (রহঃ) বলেনঃ প্রকাশ্য হাদীসের দ্বারা বুঝা যায় যে, স্ত্রীদের কারো প্রতি অধিক ভালোবাসা বা হৃদয়ের টান ছাড়া অন্যান্য বিষয় ইনসাফ করা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আয়ত্তের এবং ক্ষমতার মধ্যে ছিল। সুতরাং সেগুলোর মধ্যে ইনসাফ ও সমতা বিধান তার জন্যও আবশ্যক ছিল। তবে মেলামেশা ও আলিঙ্গনে সমতা বজায় (সর্বসম্মতভাবে) আবশ্যক নয়। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৩য় খন্ড, হাঃ ১১৪০; ফাতহুল কাদীর ৩য় খন্ড, ৩০০পৃঃ; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ভাগ-বণ্টন (সহধর্মিণীদের মধ্যে পালা নিরূপণ প্রসঙ্গে)
৩২৩৬-[৮] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যদি কোনো পুরুষের দু’জন সহধর্মিণী থাকে আর সে তাদের মধ্যে যদি ন্যায়বিচার না করে, তবে সে কিয়ামতের দিন একপাশ ভঙ্গ (অঙ্গহীন) অবস্থায় উঠবে। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ ও দারিমী)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِذَا كَانَتْ عِنْدَ الرَّجُلِ امْرَأَتَانِ فَلَمْ يَعْدِلْ بَيْنَهُمَا جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَشِقُّهُ سَاقِطٌ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ والدارمي
ব্যাখ্যা: যার দুই বা ততোধিক স্ত্রী থাকবে তার জন্য ওয়াজিব স্ত্রীদের খাদ্য বস্ত্র এবং তাদের কাছে রাত্রিযাপনে ন্যায়বিচার বা সমতা রক্ষা করা। যে এটা করবে না, সে গুনাহগার হবে। হাদীসে বলা হয়েছে, সে কিয়ামতের দিন একদিকে অবশ তথা প্যারালাইসিসগ্রস্ত হয়ে উঠবে। কেউ কেউ বলেছেন, হাশরের ময়দানের লোকেরা তাকে এ অবস্থায় দেখতে থাকবে, ফলে এটা হবে তার জন্য লজ্জাষ্কর ব্যাপার এবং বেশী শাস্তি। হাদীসে দু’জন স্ত্রীর কথা বলা হয়েছে, কিন্তু দু’জন এখানে সীমাবদ্ধ নয়, তিন বা চারজন স্ত্রীর বেলায়ও সমতা রক্ষা আবশ্যক, অন্যথায় তার বেলায়ও একই শাস্তি প্রযোজ্য হবে।
স্ত্রীদের একজন যদি স্বাধীন অন্যজন দাসী হয় তাহলে স্বাধীন ও দাসীর ক্ষেত্রে বণ্টন ব্যবস্থা অনুযায়ী সমতা বণ্টিত হবে।
(বর্তমানে দাসীর প্রথা নেই, সুতরাং এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো না)। (সম্পাদক)
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে স্ত্রীদের মধ্যে রাত্রি যাপনে অবশ্যই সমতা রক্ষা করতে হবে; কিন্তু সঙ্গম, আলিঙ্গন ইত্যাদিতে সমতা রক্ষা আবশ্যক নয়। কারণ এটা নির্ভর করে ব্যক্তির সুস্থতা, উদ্যম, প্রফুল্লাতা, মানসিকতা, পরিবেশ ইত্যাদির উপর। এতদসত্ত্বেও কখনো কখনো তা ওয়াজিব হয়ে যায়। অর্থাৎ সঙ্গম না করলে কোনো একজন পাপে লিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা হয়ে পড়লে তখন সঙ্গম করা আবশ্যক হয়ে যায়। আর স্বাভাবিকভাবে আবশ্যক না হলেও একেবারে পরিহার করা বৈধ নয়। (‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২১৩৩; তুহ্ফাতুল আহওয়াযী ৩য় খন্ড, হাঃ ১১৪১; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৯. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ভাগ-বণ্টন (সহধর্মিণীদের মধ্যে পালা নিরূপণ প্রসঙ্গে)
৩২৩৭-[৯] ’আত্বা (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা ’সারিফ’ নামক স্থানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী মায়মূনাহ্ (রাঃ)-এর জানাযায় ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)-এর সাথে উপস্থিত হলাম। ইবনু ’আব্বাস(রাঃ) উপস্থিত সকলের উদ্দেশে বললেন, সাবধান! ইনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহধর্মিণী, তোমরা যখন কাঁধে তাঁর লাশ বহন করবে, তখন ঝাকি দিও না এবং জোরে নাড়া-চাড়া দিও না, বরং খুব ধীরস্থিরতার সাথে উঠাও। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নয়জন সহধর্মিণীদের মধ্যে আটজনের জন্য পালা বণ্টন করতেন এবং একজনের জন্য করতেন না। বর্ণনাকারী ’আত্বা (রহঃ) বলেন, আমার জানা মতে সহধর্মিণীর জন্য যার পালা বণ্টন করতেন না, তিনি ছিলেন সফিয়্যাহ্ (রাঃ)। তিনি সহধর্মিণীগণের মধ্যে সর্বশেষ মদীনায় মৃত্যুবরণ করেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
(মিশকাত গ্রন্থাকার বলেন,) ইমাম রযীন বলেনঃ ’আত্বা (রহঃ) ব্যতীত অন্য হাদীস বিশারদগণ বলেছেন, উক্ত সহধর্মিণীর নাম সাওদাহ্ (রাঃ), এটাই অধিকতর সঠিক। (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো কারণে তাঁকে তালাক প্রদানের প্রসঙ্গে বললে) সাওদাহ্ নিজের প্রাপ্য অংশ (পালা) ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে দান করে বলেন যে, আপনি আমাকে আপনার সহধর্মিণীরূপে রাখুন, যাতে জান্নাতে আমি আপনার সহধর্মিণীগণের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি।
عَنْ عَطَاءٍ قَالَ: حَضَرْنَا مَعَ ابْنِ عَبَّاسٍ جَنَازَةَ مَيْمُونَةَ بِسَرِفَ فَقَالَ: هَذِهِ زَوْجَةُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَإِذَا رَفَعْتُمْ نَعْشَهَا فَلَا تُزَعْزِعُوهَا وَلَا تُزَلْزِلُوهَا وَارْفُقُوا بِهَا فَإِنَّهُ كَانَ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تِسْعُ نِسْوَةٍ كَانَ يَقْسِمُ مِنْهُنَّ لِثَمَانٍ وَلَا يَقْسِمُ لِوَاحِدَةٍ قَالَ عَطَاءٌ: الَّتِي كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يَقْسِمُ لَهَا بَلَغَنَا أَنَّهَا صَفِيَّةُ وَكَانَتْ آخِرهنَّ موتا مَاتَت بِالْمَدِينَةِ
وَقَالَ رَزِينٌ: قَالَ غَيْرُ عَطَاءٍ: هِيَ سَوْدَةُ وَهُوَ أصح وهبت يَوْمهَا لِعَائِشَةَ حِينَ أَرَادَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ طَلَاقَهَا فَقَالَتْ لَهُ: أَمْسِكْنِي قَدْ وهبت يومي لعَائِشَة لعَلي أكون من نِسَائِك فِي الْجنَّة
ব্যাখ্যা: বর্ণনাকারী ‘আত্বা একজন জালীলুল কদর তাবি‘ঈ, তিনি ইবনু ‘আব্বাস-এর সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী মায়মূনাহ্ (রাঃ)-এর জানাযায় অংশগ্রহণ করেন। ইবনু ইসহক বলেন, মায়মূনাহ্ (রাঃ) স্বীয় সত্তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীত্ব বরণের জন্য হেবা করে দেন।
মায়মূনাহ্-কে বিয়ের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রস্তাব যখন মায়মূনাহ্ (রাঃ)-এর নিকট পৌঁছল তখন তিনি একটি উটের পিঠে বসা ছিলেন, তিনি খুশিতে সাথে সাথে বলে উঠেন, (এই) উট এবং উটের উপর যা কিছু আছে সবকিছুই আল্লাহ ও তার রসূলের জন্য। কেউ কেউ বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য নিজেকে হেবা দানকারী ছিলেন আরেকজন। মুল্লা ‘আলী কারী (রহঃ) বলেনঃ আমরা বলব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য প্রথম হেবাদানকারী মায়মূনাহ্ (রাঃ)-ই।
সারিফ হলো তান্‘ঈমের নিকটবর্তী একটি স্থান; এখানেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মায়মূনাহ্-কে বিবাহ করেন এবং তার সাথে বিবাহ বাসর উদযাপন করেন। অতঃপর এই সারিফ নামক স্থানেই তিনি ইন্তেকাল করেন এবং সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয়। এ ইতিহাস কি বিস্ময়কর! রাস্তার একই জায়গায় আনন্দ-বিষাদের মিলনস্থল। ইবনু আব্বাস উম্মুল মু’মিনীন মায়মূনাহ্ (রাঃ)-এর লাশ উঠাতে এবং তা বহন করতে বিশেষ সম্মান ও সমীহ প্রদান করেছেন, তার লাশের সাথে সামান্য অবহেলাও যেন না হয়, এ লক্ষ্যক্ষ তিনি সকলকে নির্দেশ করেছেন যে, লাশ বহনে তোমরা ধীরস্থিরতা অবলম্বন করবে, জোরে নাড়া বা ঝাকুনি দিবে না, বরং তার মহান শান ও মর্যাদার প্রতি খেয়াল করে তাকে বহন করবে। তিনি তার মর্যাদার বিশেষ একটি কারণও বর্ণনা করেছেন আর তা হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নয়জন স্ত্রীর আটজনের মধ্যে পালা বণ্টন করেন, মায়মূনাহ্ (রাঃ) তার প্রাপ্যটুকু সতীনদের জন্য ছেড়ে দেন।
‘আত্বা বলেনঃ আমাদের নিকট খবর পৌঁছেছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে স্ত্রীর নিকট পালা বণ্টন করেননি তিনি হলেন সফিয়্যাহ্ (রাঃ)। কিন্তু ‘আল্লামা খত্ত্বাবী (রহঃ) তার প্রতিবাদ করে বলেন, ‘আত্বা (রহঃ)-এর এটা ধারণা সর্বস্বই বটে তবে তা সত্য নয়, যিনি তার পালা হেবা করে দেন তিনি হলেন সাওদাহ্ (রাঃ)। এখানে মূলতঃ ইবনু জারীর (রহঃ)-এর পক্ষ থেকে হাদীসের বর্ণনায় ভুল হয়েছে। কাযী ‘ইয়ায (রহঃ) অবশ্য উভয় মতের মধ্যে সমন্বয় সাধনে সচেষ্ট হয়েছেন। ইমাম রযীন বলেনঃ ‘আত্বা (রহঃ)-এর কথার চেয়ে অন্যের কথাটিই অধিক বিশুদ্ধ। তা হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যার জন্য পালা নির্ধারণ করেননি তিনি হলেন সাওদাহ্ (রাঃ), তিনি তার প্রাপ্য পালা ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে হেবা করে দেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের মধ্যে সফিয়্যাহ্ (রাঃ) সর্বশেষ মৃত ব্যক্তি, যিনি মদীনায় ইন্তেকাল করেন। তিনি মু‘আবিয়াহ্ -এর খিলাফাতকালে পঞ্চাশ হিজরী সনে রমাযান মাসে ইন্তেকাল করেন, মদীনার বাক্বী কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। আর মায়মূনাহ্ (রাঃ) একান্ন হিজরী সনে ইন্তেকাল করেন। কেউ কেউ অবশ্য বলেছেন, তিনি ছিষট্টি সনে; কেউ আবার বলেছেন, তেষট্টি সনে ইন্তেকাল করেছেন। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) সাতান্ন হিজরী সনে মদীনায় ইন্তেকাল করেছেন, কেউ আটান্ন সনের কথাও বলেছেন। সাওদাহ্ (রাঃ) চুয়ান্ন সনে, হাফসাহ্ (রাঃ) পঁয়তাল্লিশ সনে, উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) উনষাট সনে, উম্মু হাবীবাহ্ (রাঃ) চুয়াল্লিশ সনে, যায়নাব (রাঃ) বিশ সনে, জুওয়াইরিয়াহ্ (রাঃ) পঞ্চাশ হিজরী সনে ইন্তেকাল করেছেন।
এ কথা সর্বজনবিদিত যে, খাদীজাহ্ (রাঃ) হিজরতের পূর্বেই মক্কায় ইন্তেকাল করেন। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫০৬৭; শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪৬৫; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৩৮-[১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা নারীদেরকে সদুপদেশ দিবে। কারণ তাদেরকে পাঁজরের বাঁকা হাড় হতে সৃষ্টি করা হয়েছে, পাঁজরের হাড়ের মধ্যে সবচেয়ে বাঁকা (হাড়) হলো উপরেরটি। অতঃপর তুমি যদি ঐ হাড়কে সোজা করতে চেষ্টা কর, তবে তা ভেঙ্গে ফেলবে। আর যদি রেখে দাও, তবে সর্বদা বাঁকাই থাকবে। সুতরাং (আমার নাসীহাত) তোমরা নারীদেরকে সদুপদেশ দিবে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ عِشْرَةِ النِّسَاءِ وَمَا لِكُلِّ وَاحِدَةِ مِّنَ الْحُقُوْقِ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا فَإِنَّهُنَّ خُلِقْنَ مِنْ ضِلَعٍ وَإِنَّ أَعْوَجَ شَيْءٍ فِي الضِّلَعِ أَعْلَاهُ فَإِنْ ذَهَبْتَ تُقِيمُهُ كَسْرَتَهُ وَإِنْ تَرَكْتَهُ لَمْ يَزَلْ أَعْوَجَ فَاسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ»
ব্যাখ্যা : ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ হাদীসে উল্লেখিত اِسْتَوْصُوْا শব্দের س (সীন) বর্ণ তলব বা অনুসন্ধানের অর্থ প্রদান করেছে। এখানে অর্থ হয়েছে তুমি স্ত্রীদের হাকের ব্যাপারে তোমার নিজের পক্ষ থেকে কল্যাণ অনুসন্ধান কর, অর্থাৎ কল্যাণের দিকটি বিবেচনা কর।
কাযী ‘ইয়ায (রহঃ) বলেনঃ اِسْتَوْصُوْا এর অর্থ হলো «أُوصِيكُمْ بِهِنَّ خَيْرًا فَاقْبَلُوا وَصِيَّتِي فِيهِنَّ...» ‘‘আমি তোমাদেরকে স্ত্রীদের ব্যাপারে কল্যাণের ওয়াসিয়্যাত করছি, সুতরাং তাদের ব্যাপারে আমার ওয়াসিয়্যাত কবুল কর।’’ উদ্দেশ্য হলো তাদের সাথে কোমল এবং সৌজন্যমূলক আচরণ কর; সৃষ্টিগতভাবে তাদের বক্রতার কারণে পূর্ণ দৃঢ় অবস্থান এবং তার ওপর স্থায়ী থাকা তাদের থেকে আশা করা যাবে না। প্রবাদ বাক্যে আছে, স্ত্রীর (বেহায়াপনা ও বক্রতা) থেকে ধৈর্য ধারণের চেয়ে স্ত্রী গ্রহণ না করে অবিবাহিত থেকে ধৈর্যধারণ অধিক সহজ। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণীঃ ‘‘(বেহায়া, নির্লজ্জ, বক্র) নারীদেরকে বিয়ে না করে বিরত থেকে ধৈর্যধারণ করাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর’’- (সূরা আন্ নিসা ৪ : ২৫)।
ضِلَعٍ শব্দটির ض বর্ণে কাসরা বা যের যোগে পঠিত হয়। অর্থাৎ পাঁজরের সবচেয়ে উপরের হাড়, যা সাধারণত বক্র হয়ে থাকে। নারীদরেকে এই বক্র হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। ঐতিহাসিক সৃষ্টি তত্ত্ব হলো এই যে, আদি মাতা হাওয়া (আঃ)-কে আদম (আঃ)-এর পাঁজরের বক্র হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। অতএব নারী সৃষ্টির মৌলতত্ত্ব হলো সে বক্র হাড়ের সৃষ্টি। তাই তাদের স্বভাব প্রকৃতিতে রয়েছে বক্রতা, এ বক্রতা কেউই সম্পূর্ণরূপে সোজা করতে পারবে না। বিধায় তাদের সাথে কোমল নরম ও সৌজন্যমূলক আচরণ করে তাদের থেকে কার্যসিদ্ধি করতে হবে। আর তাদের সাথে জীবন যাপনে গুনাহের সম্ভাবনা না থাকলে সৃষ্টিসুলভ বক্র আচরণে ধৈর্যধারণ করবে। এই বক্রতা জোর জবরদস্তি করে সোজা করতে চাইলে তা ভেঙ্গে যাবে। সুতরাং বেশী জোর জবরদস্তি করা যাবে না।
ইমাম নববী (রহঃ) বলেছেনঃ এ হাদীসে নারীদের প্রতি সহানুভূতি এবং ইহসানের জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে, আর সৃষ্টিগত বক্র স্বভাবের ও অপূর্ণ জ্ঞানের কারণে ধৈর্যধারণের উপদেশ প্রদান করা হয়েছে। আনুগত্যে দৃঢ় না থাকায় অথবা কারণ ছাড়াই তাদের তালাক দেয়াও অপছন্দনীয় কাজ, অতএব তা থেকে বিরত থাকবে। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৩৩১; শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪৬৮; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৩৯-[২] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নারীকে পাঁজরের হাড় হতে সৃষ্টি করা হয়েছে, কক্ষনো সে তোমার জন্য সোজা হবার নয়। অতঃপর তুমি যদি তার নিকট হতে উপকার নিতে চাও, তবে ঐ বক্রাবস্থায় আদায় করতে হবে। তুমি যদি সোজা করতে যাও, তবে ভেঙ্গে ফেলতে পার। ’ভেঙ্গে ফেলা’ বলতে তাকে (উপায়-উপায়ন্তর না পেয়ে) তালাক প্রদান করা। (মুসলিম)[1]
بَابُ عِشْرَةِ النِّسَاءِ وَمَا لِكُلِّ وَاحِدَةِ مِّنَ الْحُقُوْقِ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ الْمَرْأَةَ خُلِقَتْ مِنْ ضِلَعٍ لَنْ تَسْتَقِيمَ لَكَ عَلَى طَرِيقَةٍ فَإِنِ اسْتَمْتَعْتَ بِهَا اسْتَمْتَعْتَ بِهَا وَبِهَا عِوَجٌ وَإِنْ ذَهَبْتَ تقيمها كسرتها وَكسرهَا طَلاقهَا» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: এখানে নারী দ্বারা নারী জাতিকে বুঝানো হয়েছে অথবা নারী জাতির আদি সত্বা আদি মাতা হাওয়াকে বুঝানো হয়েছে। তাকে সৃষ্টি করা হয়েছিল আদামের পাঁজরের উপরের বাঁকা হাড় থেকে। তুমি তাকে সর্ববিষয়ে এবং সর্বদাই সোজা রাখতে পারবে না বরং সে একেক সময় একেক অবস্থা ধারণ করবে। কখনো তোমার অবদানের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে, কখনো বা কুফরী করবে, কখনো আনুগত্য করবে, কখনো অবাধ্যচারী হবে, কখনো হবে অল্পে তুষ্ট, কখনো হবে সীমালঙ্ঘনকারী স্বেচ্ছাচারী।
নারীর এ বক্রতার মধ্য দিয়েই তুমি তোমার ফায়দা হাসিল করে নিবে। আর যদি বেশী জোরাজুরি কর তাহলে তাকে সোজা তো করতেই পারবে না, বরং ভেঙ্গে ফেলবে, অর্থাৎ তালাক দিয়ে দিতে হবে। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ এ হাদীসে বাঁকা হাড় সোজা করা যে অসম্ভব তার ঘোষণা রয়েছে। অর্থাৎ সোজা করতে গিয়ে ভাঙ্গা ছাড়া যদি উপায়ই না থাকে তবে তা ভেঙ্গে ফেলবে বা তালাক প্রদান করবে। কিন্তু তালাক দেয়া তো কাম্য নয়। (শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪৬৮; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৪০-[৩] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো মু’মিন যেন মু’মিনাহ্-কে ঘৃণা না করে (বা তার প্রতি শত্রুতা পোষণ না করে); যদি তার কোনো আচরণে সে অসন্তোষ প্রকাশ করে, তবে অন্য আর এক আচার-ব্যবহারে সন্তুষ্টি লাভ করবে। (মুসলিম)[1]
بَابُ عِشْرَةِ النِّسَاءِ وَمَا لِكُلِّ وَاحِدَةِ مِّنَ الْحُقُوْقِ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী : (لَا يَفْرَكْ) শেষ অক্ষর সাকীন বা জযম কিংবা পেশ উভয় যোগ পাঠ সিদ্ধ। (ر) বর্ণটি যবর যোগে পঠিত হয়; আভিধানিক অর্থ মর্দন করা, দলিত করা। মুল্লা ‘আলী কারী (রহঃ) বলেনঃ (فَرْكٌ) শব্দটি بُعْضٌ এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ ঘৃণা, অবজ্ঞা, অপছন্দ ইত্যাদি। হাদীসের অর্থ দাঁড়ায়, কোনো মু’মিন পুরুষ কোনো মু’মিনাহ্ নারীকে অর্থাৎ স্বামী তার স্ত্রীকে ঘৃণা করবে না। কোনো বিষয়েই ঘৃণা বা অবজ্ঞা করবে না, কারণ তার মধ্যে অন্য যে গুণটি রয়েছে তাতে সে খুশি হবে। একজন মানুষ হিসেবে সকল গুণ তার মধ্যে থাকতে পারে না।
কাযী ‘ইয়ায বলেনঃ (لَا يَفْرَكْ) এটা নাফী বা না-বাচক কর্ম কিন্তু অর্থ প্রদান করেছে নাহী বা নিষেধাজ্ঞাবাচক কর্মের। এর অর্থ হয়েছে স্ত্রীর অপছন্দনীয় কিছু দেখে তাকে অবজ্ঞা অথবা ঘৃণা করা কোনো পুরুষের জন্য উচিত নয়। কেননা একটি বিষয় সে অপছন্দ করছে অন্যটি সে অবশ্যই পছন্দ করবে এবং তাতে খুশি হবে। এই ভালো গুণটি দিয়ে সে খারাপটির মোকাবেলা করবে। এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, দোষ ছাড়া কোনো মানুষই পাওয়া যায় না, কেউ যদি দোষ ছাড়া কোনো মানুষ খুঁজতে যায় তাহলে সে সাথিহীন একাই পড়ে থাকবে।
এতে আরো ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, সকল মানুষই বিশেষ করে মু’মিনের মধ্যে কতিপয় উত্তম ও প্রশংসিত স্বভাব বা গুণাবলী রয়েছে, এই উত্তম আচরণ ও গুণাবলীকে বিবেচনায় আনবে আর অন্য খারাপ স্বভাবগুলো ঢেকে রাখবে এবং এড়িয়ে চলবে। (শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪৬৯; মুসনাদ আহমাদ ২য় খন্ড, ৩২৯ পৃঃ; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৪১-[৪] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বনী ইসরাঈল না হলে গোশ্ত/মাংস কক্ষনো নষ্ট হত (পঁচে যেত) না। আর (মা) হাওয়া না হলে কক্ষনো কোনো নারী স্বামীর খিয়ানাত (ক্ষতি সাধন) করত না। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ عِشْرَةِ النِّسَاءِ وَمَا لِكُلِّ وَاحِدَةِ مِّنَ الْحُقُوْقِ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَوْلَا بَنُو إِسْرَائِيلَ لَمْ يَخْنَزِ اللَّحْمُ وَلَوْلَا حَوَّاءُ لَمْ تَخُنْ أُنْثَى زَوجهَا الدَّهْر»
ব্যাখ্যা: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ ‘‘বানী ইসরাঈল যদি না হতো তাহলে গোশত পচন ধরত না।’’ এটা মূসা (আঃ)-এর যামানায় ঘটেছিল। গোশত পচনের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে তার নি‘আমাতের সাথে কুফরীর শাস্তি প্রদান করেছেন। মূসা (আঃ)-এর যামানায় বানী ইসরাঈলদের প্রতি আসমান থেকে সকাল-বিকাল খাদ্য (গোশত রুটি) অবতীর্ণ হতো, শর্ত ছিল তারা খাবে কিন্তু সঞ্চয় রাখতে পারবে না। কিন্তু তারা আল্লাহর প্রতি দৃঢ় আস্থা না থাকায় তার হুকুমকে অমান্য করে জমা করে রাখতে শুরু করল ফলে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের ওপর শাস্তি হিসেবে গোশত পচন ধরা শুরু করল। সেই যে শুরু হলো অদ্যাবধি তা আর বন্ধই হলো না।
‘আল্লামা কাযী ‘ইয়ায (রহঃ) বলেনঃ হাওয়া (আঃ) যদি আদম (আঃ)-কে আল্লাহর আদেশ অমান্য করিয়ে গাছের ফল ভক্ষণে প্ররোচিত না করত তাহলে পৃথিবীর কোনো নারী তার স্বামীর খিয়ানাত করত না।
কেউ কেউ বলেনঃ হাওয়া (আঃ)-এর খিয়ানাতটা ছিল আদম (আঃ)-এর নিষেধ উপেক্ষা করে তার আগেই ফল ভক্ষণ করা।
আবার কেউ কেউ বলেনঃ আদম (আঃ) নিজেই হাওয়া (আঃ)-কে বৃক্ষ কর্তনের উদ্দেশে প্রেরণ করেন এবং তিনি (হাওয়া (আঃ)) উক্ত গাছের দু’টি শাস কর্তন করেন। আর এটিই হলো হাওয়া (আঃ)-এর খিয়ানাতের ধরণ প্রকৃতি। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৩৩০; শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪৭০; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৪২-[৫] ’আব্দুল্লাহ ইবনু যাম্’আহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যেন ক্রীতদাসীর ন্যায় স্ত্রীকে না মারে (অত্যাচার না করা হয়), অথচ দিনের শেষেই তার সাথে সহবাস করে।
অপর বর্ণনায় আছে- তোমাদের কেউ যেন ইচ্ছা করে স্ত্রীকে ক্রীতদাসীর ন্যায় মারমুখো না হয়, হয়তো দিন শেষে তার সাথে সহবাস করতে চাইবে; আর এতে সে অনাগ্রহ প্রকাশ করবে। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বায়ু নির্গত হওয়ায় হাসি-ঠাট্টাচ্ছলের কারণে উপদেশ করলেন, যে কাজ নিজে কর অন্যের সে কাজে তোমরা কেন হাসবে! (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ عِشْرَةِ النِّسَاءِ وَمَا لِكُلِّ وَاحِدَةِ مِّنَ الْحُقُوْقِ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ زَمَعَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَجْلِدْ أَحَدُكُمُ امْرَأَتَهُ جَلْدَ الْعَبْدِ ثُمَّ يُجَامِعْهَا فِي آخِرِ الْيَوْمِ» وَفِي رِوَايَةٍ: «يَعْمِدُ أَحَدُكُمْ فَيَجْلِدُ امْرَأَتَهُ جَلْدَ الْعَبْدِ فَلَعَلَّهُ يُضَاجِعُهَا فِي آخِرِ يَوْمِهِ» . ثُمَّ وَعَظَهُمْ فِي ضَحِكِهِمْ مِنَ الضَّرْطَةِ فَقَالَ: «لِمَ يَضْحَكُ أَحَدُكُمْ مِمَّا يفعل؟»
ব্যাখ্যা: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ ‘‘তোমাদের কেউ স্ত্রীকে গোলামের ন্যায় প্রহার করবে না।’’ এর অর্থ প্রচণ্ড মার মারবে না, মানুষ যেভাবে দাস-দাসীকে প্রহার করে থাকে সেভাবে স্ত্রীকে প্রহার করা সম্পূর্ণরূপে নিষেধ। যে স্ত্রী মধুর রাত্রি যাপনের একান্ত সাথী বা অঙ্কশায়িনী দিনে তাকে প্রহার করা এটা কতই না জ্ঞানের স্বল্পতা আর হীনমন্যতার পরিচায়ক। বলা হয়ে থাকে, স্ত্রীকে প্রহারের এ নিষেধাজ্ঞা প্রহারের অনুমতির আগের বিধান যা পরবর্তী বর্ণনায় আসছে। প্রকাশ থাকে যে, নিষেধের বিষয়টি হলো বিশেষ অবস্থার সাথে সম্পৃক্ত অর্থাৎ বেদম প্রহার নিষেধ যাকে হাদীসে দাস-দাসীদের প্রহারের সাথে সাদৃশ্য দেয়া হয়েছে। জাহিলী যুগে দাস-দাসীদের অমানসিকভাবে প্রহার করা হতো, এ জাতীয় প্রহার নিষেধ।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, দাস-দাসীকে শিষ্টাচার শিক্ষা দানের জন্য প্রহার করা বৈধ, তবে ক্ষমাটাই উত্তম। তিনি আরো বলেন, যে স্ত্রীকে দিবসে প্রহার করা হলো, সে স্ত্রীর সাথে রাত্রি যাপন করা, মধুর আলিঙ্গনে মিলিত হওয়া লজ্জাজনক নয় কি? তুমি রাতে তার সাথে যেহেতু মিলিত হবে দিনে তাকে প্রহার করো না। (ফাতহুল বারী ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৯৪২; শারহে মুসলিম ১৭/১৮ খন্ড, হাঃ ২৮৫৫; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৪৩-[৬] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আমার খেলার পুতুল নিয়ে সঙ্গী-সাথীদের সাথে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘরে খেলতাম (তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৯ বছর)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ঘরে প্রবেশ করতেন, তখন তারা আত্মগোপন করে থাকত। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদেরকে আমার নিকট (খেলতে) পাঠিয়ে দিতেন এবং তারা আমার সাথে খেলা করত। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ عِشْرَةِ النِّسَاءِ وَمَا لِكُلِّ وَاحِدَةِ مِّنَ الْحُقُوْقِ
وَعَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: كُنْتُ أَلْعَبُ بِالْبَنَاتِ عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَكَانَ لِي صَوَاحِبُ يَلْعَبْنَ مَعِي فَكَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا دَخَلَ ينقمعن فيسربهن إِلَيّ فيلعبن معي
ব্যাখ্যা: উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘরে যখন যান তখন তার বয়স ছিল মাত্র নয় বছর। তখনও তার মধ্যে শিশু বা কৈশরসুলভ স্বভাব ছিলই, তাই তিনি অন্যান্য কিশোরীদের সাথে খেলার সামগ্রী এমনকি পুতুল নিয়ে খেলা করতেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে প্রবেশ করলে ঐ বালিকাগুলো লজ্জায় এখানে সেখানে আত্মগোপন করে থাকতো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্বভাবসিদ্ধ নিয়মে শিশু-কিশোরদের প্রতি স্নেহ-বাৎসল্যতা প্রদর্শনপূর্বক তাদের ধরে এনে লজ্জা ভাঙ্গিয়ে দিলেন এবং পুনরায় ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর সাথে খেলায় জুড়ে দিলেন। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেন, এরপর তারা আমার সাথে খেলা শুরু করলো। তখন তারা যে পুতুল দিয়ে খেলা শুরু করতো তা বর্তমানের পুতুলের ন্যায় পুতুল নয় বরং খেলার সামগ্রী কাপড় বা তুলা দ্বারা তৈরি পুতুল সদৃশ এক প্রকার খেলনা ছিল মাত্র। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬১৩০; শারহে মুসলিম ১৫ খন্ড, হাঃ ২৪৪০; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৪৪-[৭] উক্ত রাবী [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর কসম! আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি, (ঈদের দিনে) হাবাশী যুবকরা যখন মসজিদের আঙিনায় বর্শা নিয়ে খেলা করছিল, তখন আমি তাঁর ঘাড় ও কানের ফাঁক দিয়ে তাদের খেলা দেখতে পারি সেজন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চাদর দিয়ে আমাকে ঢেকে রেখেছিলেন এবং (আমার মুহাববাতে) ততক্ষণ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতেন যতক্ষণ না আমি স্বেচ্ছায় ফিরে আসতাম। অতএব এটাই অনুমেয় যে, একজন অল্পবয়স্কা মেয়ের খেলা দেখার প্রতি যে স্বাভাবিক মনোবাসনা, (কত দীর্ঘ সময় ধরে থাকতে পারে) তা অনুমান করা যায়। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ عِشْرَةِ النِّسَاءِ وَمَا لِكُلِّ وَاحِدَةِ مِّنَ الْحُقُوْقِ
وَعَنْهَا قَالَتْ: وَاللَّهِ لَقَدْ رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُومُ عَلَى بَابِ حُجْرَتِي وَالْحَبَشَةُ يَلْعَبُونَ بِالْحِرَابِ فِي الْمَسْجِدَ وَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَسْتُرُنِي بردائه لِأَنْظُرَ إِلَى لَعِبِهِمْ بَيْنَ أُذُنِهِ وَعَاتِقِهِ ثُمَّ يَقُومُ مِنْ أَجْلِي حَتَّى أَكُونَ أَنَا الَّتِي أَنْصَرِفُ فَاقْدُرُوا قَدْرَ الْجَارِيَةِ الْحَدِيثَةِ السِّنِّ الْحَرِيصَةِ على اللَّهْو
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসে (يَقُوْمُ) শব্দটি ‘মাযী’ বা অতীতকালের হেকায়েতের হাল বা অবস্থা বর্ণনার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। (حُجْرَتِىْ) এর ইয়াফতটি লামে ইখতিসাস বা বিশেষত্ববাচক। এ লাম মিলকিয়াতের অর্থ প্রদান করার সম্ভাবনাও বিদ্যমান রয়েছে।
(وَالْحَبَشَةُ يَلْعَبُونَ) বাক্যটি জুমলাতু হালিয়া হয়েছে, তার অর্থ হলো : ‘‘আর হাবাশীরা (সেখানে) খেলাফরত ছিল।’’ (الْحِرَابِ) শব্দটি حربة-এর বহুবচন এর অর্থ ছোট বর্শা বা বল্লাম।
হাবাশীরা মসজিদ সংলগ্ন প্রশস্ত জায়গায় বর্শা পরিচালনার প্রশিক্ষণমূলক খেলায় লিপ্ত ছিল। কেউ বলেছেন, এ জায়গাটি ছিল মসজিদের বাইরে, কেউ বলেছেন ভিতরেই। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর কামরা মসজিদ সংলগ্ন ছিল। তাই তিনি কামরার মধ্যে থেকেই তাদের খেলা দেখছিলেন। এজন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং নিজেই দেখার সুব্যবস্থা করে দিলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) স্বীয় চাদর দ্বারা পর্দা করে দাঁড়ালেন আর ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিছনে দাঁড়িয়ে কাঁধ ও কানের মাঝের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে তাদের খেলা উপভোগ করলেন। যুদ্ধ যেহেতু ‘ইবাদাত, সুতরাং যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষা করাও আবশ্যক।
আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ ‘‘কাফিরদের সাথে (মোকাবেলার জন্য) তোমাদের সাধ্যানুযায়ী শক্তি (সংগ্রহ কর এবং) প্রস্তুত করো।’’ (সূরা আল আনফাল ৮ : ৬০)
সুতরাং মসজিদ প্রাঙ্গণে অথবা মসজিদের মধ্যে এ ধরনের খেলা শারী‘আতসম্মত। আর ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর দেখার বিষয়টি ছিল পর্দার বিধান জারী হওয়ার পূর্বের ঘটনা। ‘আল্লামা তূরিবিশতীও এমনটিই বলেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, মসজিদে খেলায়রত হাবাশীরা ছিল বয়সে অপ্রাপ্ত বয়স্ক। সুতরাং তাদের প্রতি তাকানো অবৈধ ছিল না।
‘আয়িশাহ্ (রাঃ) যতক্ষণ দাঁড়িয়ে খেলা দেখলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ততক্ষণ পর্যন্তই দাঁড়িয়ে তাকে খেলা উপভোগ করার সুযোগ দিলেন। এটা ছিল তার প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সর্বোচ্চ ভালোবাসা এবং মনস্থাত্বিক দিক বিবেচনার চূড়ান্ত নমুনা। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর নিজস্ব বর্ণনাতেই বুঝা যায় যে, খেলা দেখার এ সময়টি ছিল দীর্ঘ, আর এই দীর্ঘ সময়ই তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দাঁড়িয়ে ছিলেন।
(ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫১৯০; শারহে মুসলিম ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৮৯২)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৪৫-[৮] উক্ত রাবী [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, (হে ’আয়িশাহ্!) তোমার মন যখন আমার প্রতি সন্তোষ থাকে এবং যখন অসন্তোষ হয়- তা আমি বুঝতে পারি। আমি [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] জিজ্ঞেস করলাম, কিভাবে তা বুঝতে পারেন? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, যখন তোমার মন আমার প্রতি সন্তোষ থাকে (তখন কথা প্রসঙ্গে কসমের প্রয়োজনে) তুমি বল- ’’না, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রবে্র কসম!’’ অপরদিকে যখন তোমার মন আমার প্রতি অসন্তোষ থাকে তখন তুমি বল- ’’না, ইব্রাহীম (আঃ)-এর রবে্র কসম!’’ আমি [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] বললাম, জি, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রসূল! তবে আমি শুধু আপনার নামই পরিত্যাগ করি (কিন্তু হৃদয়ে আপনার প্রতি শ্রদ্ধা, প্রীতি-ভালোবাসা সর্বদা অটুট থাকে)। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ عِشْرَةِ النِّسَاءِ وَمَا لِكُلِّ وَاحِدَةِ مِّنَ الْحُقُوْقِ
وَعَنْهَا قَالَتْ: قَالَ لِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنِّي لأعْلم إِذا كنت عني راضية وَإِذا كنت عني غَضْبَى» فَقُلْتُ: مِنْ أَيْنَ تَعْرِفُ ذَلِكَ؟ فَقَالَ: إِذَا كُنْتِ عَنِّي رَاضِيَةً فَإِنَّكَ تَقُولِينَ: لَا وَرَبِّ مُحَمَّدٍ وَإِذَا كُنْتِ عَلَيَّ غَضْبَى قُلْتِ: لَا وَرَبِّ إِبْرَاهِيمَ . قَالَتْ: قُلْتُ: أَجَلْ وَاللَّهِ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا أَهْجُرُ إِلَّا اسْمَكَ
ব্যাখ্যা : স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা যত গভীরই হোক না কেন তবু কোনো কোনো সময় তার মধ্যে একটু ভাটা পরে, আর এটার বহিঃপ্রকাশ ঘটে অভিমান দিয়ে। এ অভিমান নিন্দনীয় নয়, বরং এতে তাদের ভালোবাসা আরো গভীর ও অটুট হয়। এটা যেন পরম প্রেমসম্পদকে আরো কাছে টানার আত্মজগতের এক অদৃশ্য প্রস্তাব।
মুসলিম নারীদের আদর্শ উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি অভিমানের ঘটনা এখানে প্রকাশিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন টের পেলেন তখন তা ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর কাছে বলে ফেললেন যে, আমি কিন্তু তোমার এই কাজ বুঝতে পারি। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনি কিভাবে তা বুঝতে পারেন? ওয়াহীর মাধ্যমে বা কাশ্ফের মাধ্যমে, নাকি কোনো কিছুর আলামত আপনার পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উত্তরে বললেন, তুমি যখন আমার প্রতি সন্তুষ্ট ও খুশি থাকো তখন কোনো কিছুর শপথ করতে বলে থাকো, ‘মুহাম্মাদ-এর রবের শপথ’ আর যখন তুমি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট থাকো তখন এ জাতীয় শপথে বলে থাকো, ‘ইব্রাহীম-এর রবের শপথ’ আমার নামের পরিবর্তে তুমি ইব্রাহীম-এর নাম উচ্চারণ করে থাকো। এর প্রতি উত্তরে ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রসূল! হ্যাঁ, তবে এটা আমার মুখের কথাই মাত্র, আল্লাহর শপথ! আমি অভিমানের সময় শুধু মৌখিক আপনার নামটাই বাদ দেই কিন্তু আপনার মহববত এবং শ্রদ্ধা আমার হৃদয়ে গভীর ও স্থায়ীভাবে প্রোথিত।
ইবনুল মুনীর (রহঃ) বলেন, ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাম বাদ দিয়ে ইব্রাহীম (আঃ)-এর নাম উচ্চারণ করে দূর পথে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মর্যাদা অক্ষুণ্ণই রেখেছেন। (শারহে মুসলিম ৯ম খন্ড, হাঃ ২৪৩৯; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৪৬-[৯] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ স্বামী যখন তার স্ত্রীকে (সহবাসের উদ্দেশে) বিছানায় ডাকে আর স্ত্রী তার ডাক প্রত্যাখ্যান করে। এমতাবস্থায় স্বামী অসন্তোষ অবস্থায় রাত্রি যাপন করে, তখন এ স্ত্রী এভাবে রাত্রি যাপন করে যে, মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) তার ওপর অভিশাপ করতে থাকে রাত্রি শেষে ভোর অবধি। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
বুখারী ও মুসলিম-এর অপর বর্ণনায় আছে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ ঐ সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ! কোনো পুরুষ যদি তার স্ত্রীকে বিছানায় (সহবাসের উদ্দেশে) ডাকে আর স্ত্রী তা প্রত্যাখ্যান করে, তবে আকাশমন্ডলীর অধিকারী তার প্রতি অসন্তোষ থাকেন যতক্ষণ পর্যন্ত তার স্বামী তার প্রতি সন্তোষ না হয়।
بَابُ عِشْرَةِ النِّسَاءِ وَمَا لِكُلِّ وَاحِدَةِ مِّنَ الْحُقُوْقِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا دَعَا الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ إِلَى فِرَاشِهِ فَأَبَتْ فَبَاتَ غَضْبَانَ لَعَنَتْهَا الْمَلَائِكَةُ حَتَّى تُصْبِحَ» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ. وَفِي رِوَايَةٍ لَهُمَا قَالَ: «وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا مِنْ رَجُلٍ يَدْعُو امْرَأَتَهُ إِلَى فِرَاشِهِ فَتَأْبَى عَلَيْهِ إِلَّا كَانَ الَّذِي فِي السَّمَاءِ ساخطا عَلَيْهَا حَتَّى يرضى عَنْهَا»
ব্যাখ্যা: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ (إِذَا دَعَا الرَّجُلُ امْرَأَتَه إِلٰى فِرَاشِه) ‘‘যখন কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে বিছানার দিকে আহবান করে’’। এতে ইশারা রয়েছে একাধিক বিছানার বৈধতা এবং দু’জনের একত্রিত হওয়ার প্রতিও ইশারা রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘তারা তোমাদের পোষাক স্বরূপ তোমরাও তাদের পোষাক স্বরূপ।’’ (সূরা আল বাকারা ২ : ১৮৭)
স্ত্রী যদি আহবানে অস্বীকার করে অর্থাৎ শারী‘আত ওযর ছাড়া আহবানে সাড়া না দেয় বা নিকটে আসতে অস্বীকার করে, আর স্বামী তার প্রতি এ চাহিদা নিয়ে অসন্তুষ্ট মনে বা তার প্রতি রাগান্বিত অবস্থায় রাত কাটায়, তাহলে আল্লাহর মালায়িকাহ্ (ফেরেশতামন্ডলী) সারা রাত ঐ নারীর ওপর লা‘নাত বর্ষণ করতে থাকেন। কেননা সে বিনা ওযরে তার স্বামীর প্রতি আনুগত্য নির্দেশ লঙ্ঘন করেছে, যে আনুগত্য কোনো পাপমূলক ছিল না।
অনেকেই বলেছেন, মাসিক ঋতুকালও ওযরের অন্তর্ভুক্ত নয়। অর্থাৎ মাসিক ঋতু অবস্থায়ও যদি স্বামী তাকে স্বীয় বিছানায় আহবান করে তবু তাকে তার সঙ্গ দিতে হবে। কেননা জুমহূর ‘উলামার মতে মাসিক অবস্থায় স্ত্রীর সাথে কেবল যৌনমিলন ছাড়া তার সকল কিছুই উপভোগ করতে পারবে এবং এটা তার অধিকার।
মালাকের (ফেরেশতার) লা‘নাত হবে সারা রাত্রি অর্থাৎ ফযর পর্যন্ত মালাক তার ওপর অভিসম্পাত করতে থাকবে। কেউ কেউ বলেছেনঃ এমনকি সারা দিনও এ অভিসম্পাত চলবে যতক্ষণ না তার চাহিদা থেকে অমুখাপেক্ষী হয়। পরিবর্তী বর্ণনায় তার প্রমাণ এসেছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, স্বামী যদি তার স্ত্রীকে বিছানায় আহবান করে আর সে যদি তা অস্বীকার করে তাহলে আসমানের সত্বা অর্থাৎ মহান আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হন, যতক্ষণ স্বামী তার ওপর সন্তুষ্ট না হন।
এ হাদীস আরো প্রমাণ করে যে, আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হলো স্বামীর অসন্তুষ্টি, অর্থাৎ স্বামী অসন্তুষ্ট হলে আল্লাহ তা‘আলাও অসন্তুষ্ট হন। [এটা তো স্বামীর একটা যৌন চাহিদা মিটানোর বিষয়ে আল্লাহর নির্দেশ অমান্যের কারণে, আর যিনি আল্লাহর দীনের নির্দেশাবলী অমান্য করে চলছেন তার প্রতি আল্লাহর অসন্তুষ্টি কি রকম হতে পারে?] [সম্পাদক] (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খঃ হাঃ ৩২৩৭, মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৪৭-[১০] আসমা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈকা স্ত্রীলোক জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রসূল! আমার এক সতীন আছে। অতঃপর আমি যদি ঐ সতীনের নিকট আমার স্বামী যা আমাকে দেয়নি তা পেয়েছি বলে প্রকাশ করি, তাতে কি আমার গুনাহ হবে? তদুত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, না পেয়েও পেয়েছি বলে প্রকাশ করা যেন দ্বিগুণ মিথ্যুক, সে যেন মিথ্যার দু’খানা পোশাক পরিধানকারী। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ عِشْرَةِ النِّسَاءِ وَمَا لِكُلِّ وَاحِدَةِ مِّنَ الْحُقُوْقِ
وَعَنْ أَسْمَاءَ أَنَّ امْرَأَةً قَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ لِي ضَرَّةً فَهَلْ عَلَيَّ جُنَاحٌ إِنْ تَشَبَّعْتُ مِنْ زَوْجِي غَيْرَ الَّذِي يُعْطِينِي؟ فَقَالَ: «الْمُتَشَبِّعُ بِمَا لَمْ يُعْطَ كَلَابِسِ ثَوْبَيْ زُورٍ»
ব্যাখ্যা: ‘আরবীতে ضَرَّةٌ এর অর্থ সতীন। ضَرَّةٌ আভিধানিক অর্থ ক্ষতি, অনিষ্ট, অপকারিতা ইত্যাদি। সতীন হলো স্বামীর অন্য স্ত্রী। একজন পুরুষের দু’জন স্ত্রী থাকলে স্ত্রীদ্বয় পরস্পর সতীন। একাধিক স্ত্রী পরস্পর একে অপরের জন্য ক্ষতির কারণ। সতীন হিংসা অথবা পরশ্রীকাতরতার কারণে অপরের ক্ষতি করে অথবা তাকে নিয়ে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে, এজন্য ‘আরবেরা একাধিক স্ত্রীকে ضَرَّةٌ ‘ক্ষতি’ নামে নামাঙ্কিত করেছে, যার সহজ বাংলা রূপ হলো সতীন। অবশ্য মুবালাগাহ্ বা আধিক্য হিসেবে এটা বলা হয়েছে। ‘আরবেরা একে طَبَةٌ (ত্ববাহ্)-ও বলে থাকে যার অর্থ পারদর্শিতা। যেহেতু সতীন একজনের জন্য ক্ষতির ব্যাপারে পারদর্শী হয়ে থাকে বা তার থেকে ক্ষতির আশংকা থেকে থাকে, তাই তাকে বলা হয়। এটা এজন্য যে, সতীন সতীনের দোষ অনুসন্ধানে সচেতন, পারদর্শী ও বিচক্ষণও বটে।
মহিলাটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে জানতে চাইলেন তার স্বামী তাকে যা প্রদান করে তার সতীনের কাছে তার চেয়ে বেশি প্রকাশ করা বৈধ কিনা? এর উদ্দেশ্য হলো যাতে স্বামী তার নিজের কাছে অধিক প্রিয় হয় এবং সতীনের মধ্যে গোস্বা সৃষ্টি হয় ফলে এর দ্বারা সতীনের ক্ষতি হয় আর স্বামী তার প্রিয় হয়। এর উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেছেন তা স্পষ্ট। তিনি বললেন, না পেয়ে পাওয়ার ভান করা বা মিথ্যা পরিতৃপ্ত হওয়ার আচ্ছাদন প্রদর্শন করার দৃষ্টান্ত হলো মিথ্যা দু’টি পোশাক পরিধান করা। এ পোশাক দু’টি হয় আমানত অথবা পরের কাছ থেকে ধার করা বা চেয়ে নেয়া পোশাক। মানুষ তাকে দেখে মনে করবে এই চাকচিক্য সুন্দর দৃষ্টি নন্দন পোশাকটি কতই না সুন্দর এ পোশাকটি হয় তো বা তার নিজের, কিন্তু মূলতঃ তার নয়। অথবা কোনো সাধারণ ব্যক্তি বড় কোনো আবিদ যাহিদ আল্লাহওয়ালার পরহেজগারীর আসকান, জুববা ইত্যাদি পরিধান করে নিজেকে মিছামিছি আল্লাহওয়ালা দরবেশ প্রমাণ করতে চাওয়া। এটা যেমন প্রতারণা এবং গুনাহের কাজ ঠিক তেমনি স্বামীর দেয়া কোনো কিছুকে বাড়িয়ে বলা ও প্রকাশ করাও প্রতারণা, বিশেষ করে অন্য সতীনের কাছে প্রকাশ করা গুনাহের কাজ। (ফাতহুল বারী ৯ম খঃ হাঃ ৫২১৯; শারহে মুসলিম ১৪শ খন্ড, হাঃ ২১৩০; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৪৮-[১১] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সহধর্মিণীগণের সাথে এক মাসের ঈলা (পৃথক থাকার কসম) করেছিলেন। কেননা সওয়ারী হতে পড়ে গিয়ে যখন তাঁর (বাম) পা মচকে যায় তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উঁচু কোঠায় ঊনত্রিশ দিন অবস্থান করেছিলেন। অতঃপর নেমে আসলে লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রসূল! আপনি এক মাসের ঈলা করেছিলেন (অথচ ঊনত্রিশ দিনেই নীচে নেমে আসলেন)? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, (চন্দ্র) মাস কখনও ঊনত্রিশ দিনেও হয়। (বুখারী)[1]
بَابُ عِشْرَةِ النِّسَاءِ وَمَا لِكُلِّ وَاحِدَةِ مِّنَ الْحُقُوْقِ
وَعَن أنس قَالَ: آلى رَسُول الله مِنْ نِسَائِهِ شَهْرًا وَكَانَتِ انْفَكَّتْ رِجْلُهُ فَأَقَامَ فِي مَشْرُبَةٍ تِسْعًا وَعِشْرِينَ لَيْلَةً ثُمَّ نَزَلَ فَقَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ آلَيْتَ شَهْرًا فَقَالَ: «إِنَّ الشَّهْرَ يَكُونُ تِسْعًا وَعِشْرِينَ» . رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ
ব্যাখ্যা: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রীদের সাথে ‘ঈলা’ করেছিলেন। ‘ঈলা’ শব্দটি ‘আরবী মাসদার বা শব্দমূল اِيْلَاءٌ থেকে اٰلٰى অতীতকালের ক্রিয়ারূপে ব্যবহৃত হয়েছে। ‘ঈলা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ শপথ করা, কসম করা। পরিভাষায় স্ত্রীর নিকট দাম্পত্য সম্পর্কের জন্য বা সহবাস গমন না করার শপথ করা।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘোড়া কিংবা খচ্চরের পিঠ থেকে পড়ে গিয়ে পায়ে মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হন। এ আঘাতে তাঁর পায়ের জোড়া খুলে যায়। চলতে ফিরতে না পারায় তিনি একটি দ্বিতল ভবনে বিশ্রামের জন্য অবস্থান করেছিলেন। এই সময় তিনি তার স্ত্রীদের সাথে ঈলা করেছিলেন। কেউ কেউ বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রসিদ্ধ ঈলার ঘটনা এটি নয়।
রাবীর বর্ণনা (انْفَكَّتْ رِجْلُه) অর্থাৎ তার পায়ের জোড়া খুলে গিয়েছিল। এখানে انْفَكَّتْ এর অর্থ اِنْفَرَجَتْ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, অর্থাৎ পায়ের গিরার জোড়া থেকে হাড় খুলে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ انفكاك হলো অবষণ্ণতা ও দুর্বলতার একটি প্রকার, আর الخلع শব্দের অর্থ হলো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের এক অংশ থেকে অন্য অংশ সরে যাওয়া, বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ দ্বিতল কক্ষে ঊনত্রিশ দিন অবস্থানের পর যখন সেখান থেকে অবতরণ করেন, অর্থাৎ ঈলার মেয়াদ শেষ হলে তিনি স্ত্রীদের নিকট গমন করলেন। তখন লোকেরা তাকে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনি তো ঈলা করেছিলেন এক মাসের জন্য? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উত্তরে বললেন, মাস কখনো কখনো ঊনত্রিশ দিনেও হয়। সম্ভবতঃ ঐ মাসটি ঊনত্রিশ দিনেই হয়েছিল, তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঊনত্রিশ দিনে তার ঈলার মেয়াদ সমাপ্ত করেছিলেন। শারহুস্ সুন্নাহ্ গ্রন্থকার বলেন, যদি কেউ মাসের কথা উল্লেখ করে বলে আমি আল্লাহর ওয়াস্তে অমুক অমুক মাস সওম পালন করবো, এখন ঐ মাসগুলোর মধ্যে যদি ২৯ দিনের অপূর্ণাঙ্গ মাস এসে যায় তাহলে তার ৩০ পুরতে আরেকটি সিয়াম পালন করতে হবে না। কিন্তু সে যদি মাসের নাম নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ না করে বলে আমি আল্লাহর ওয়াস্তে একমাস সিয়াম পালন করবো, তাহলে তাকে ত্রিশটি সিয়ামই পালন করতে হবে।
আল্লাহ তা‘আলার বাণীঃ ‘‘হে নাবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের বলে দিন।’’ (সূরা আল আহযাব ৩৩ : ২৮)
এ আয়াতের প্রেক্ষিতে ‘আল্লামা বাগাভী (রহঃ) বলেনঃ নাবী পত্নীগণ দুনিয়ার আরাম-আয়েশের সামগ্রী এবং জীবন নির্বাহের উপরকরণাদির বরাদ্দ বাড়িয়ে দিতে আবেদন জানালেন। আর স্ত্রীদের কতিপয় কতিপয়ের উপর গায়রাত বা আত্মমর্যাদা প্রকাশ করে নাবীকে কষ্ট দিলেন, এ সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বর্জন করলেন এবং এক মাস তাদের নিকট গমন না করার শপথ করলেন, তিনি এ সময় তার সাহাবীদের নিকটও বের হননি। লোকেরা বলাবলি করতে লাগলো, তার কি হয়েছে? তারা এও বলতে লাগলেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন। ‘উমার তখন বললেন, আমি অবশ্যই তার আসল ঘটনাটা তোমাদের জানাবো। তিনি বলেন, অতঃপর আমি তখনই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গমন করে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল! আপনি কি আপনার স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়ে দিয়েছেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না। আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমি মুসলিমদের এই মাত্র মসজিদের মধ্যে বলতে শুনে আসলাম, তারা বলছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন। আপনি আমাকে অনুমতি দিন আমি তাদের বলে আসি যে, তিনি তাঁর স্ত্রীদের তালাক দেননি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, ইচ্ছা করলে যেতে পারো। ‘উমার বলেন, অতঃপর আমি গিয়ে মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা দিলাম যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রীদের তালাক দেননি। এ সময় আল্লাহ ‘খিয়ারাতের’ আয়াত নাযিল করেন। (ফাতহুল বারী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৯১১; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৪৯-[১২] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ বকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘরে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করলেন, যদিও বহু লোক তাঁর দরজায় বসে ছিল, কিন্তু তাদের প্রবেশানুমতি দেয়া হয়নি। [রাবী বলেন,] তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আবূ বকর (রাঃ)-কে অনুমতি দিলেন এবং তিনি প্রবেশ করলেন। অতঃপর পরে ’উমার(রাঃ) এসে অনুমতি চাইলে তাঁকেও অনুমতি দেয়া হলো এবং তিনিও প্রবেশ করলেন। কিন্তু প্রবেশ করে দেখতে পেলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিমর্ষ ও নীরব অবস্থায় বসে থাকতে এবং আশপাশে তাঁর সহধর্মিণীগণও বসে রয়েছে। এমতাবস্থায় ’উমার(রাঃ) মনে মনে চিন্তা করলেন যে, এমন কোনো কথা বলা যায় যাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা শুনে হেসে দেন। তাই বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনি যদি দেখতেন বিনতু খারিজাহ্ আমার নিকট (সামর্থ্যের অতিরিক্ত) ভরণ-পোষণের খরচ চাইত, তবে আমি উঠে তার ঘাড় চেপে ধরতাম। এটা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে দিলেন এবং বললেন, এই যে আমার চারপাশ ঘিরে আছে দেখছেন, এরা আমার নিকটও (বেশি পরিমাণ) খোরপোষ চাচ্ছে।
এতে আবূ বকর(রাঃ) উঠে গিয়ে (তার কন্যা) ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর ঘাড় চেপে ধরলেন। অনুরূপভাবে ’উমার (তার কন্যা) হাফসাহ্ (রাঃ)-এর ঘাড় চেপে ধরলেন এবং উভয়ে (আপন আপন কন্যাকে) বলতে লাগলেন, তুমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এমনটি চাচ্ছ যা তার কাছে নেই। তখন সকলেই বলে উঠল, আল্লাহর কসম! আমরা কক্ষনো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এমনটি প্রত্যাশা করব না যা তাঁর কাছে নেই। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একমাস অথবা ঊনত্রিশ দিন তাদের হতে পৃথক রইলেন। অতঃপর এ আয়াত নাযিল হয়, অর্থাৎ- ’’হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীদের বলে দাও- তোমরা যদি পার্থিব জীবন আর তার শোভাসৌন্দর্য কামনা কর, তাহলে এসো, তোমাদেরকে ভোগসামগ্রী দিয়ে দেই এবং উত্তম পন্থায় তোমাদেরকে বিদায় দেই। আর তোমরা যদি আল্লাহ, তাঁর রসূল ও পরকালের গৃহ কামনা কর, তবে তোমাদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীল তাদের জন্য আল্লাহ মহা পুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন’’- (সূরা আল আহযাব ৩৩ : ২৮-২৯)।
রাবী বলেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে দিয়ে আরম্ভ করে বললেন, হে ’আয়িশাহ্! আমি তোমার কাছে এমন এক বিষয় বলতে চাই, যে বিষয়ে তোমার বাবা-মায়ের সাথে পরামর্শ ব্যতীত তাড়াতাড়ি করে কোনো মতামত দিবে না। ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেন, কি সে বিষয়? হে আল্লাহর রসূল! অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে আয়াত তিলাওয়াত করে শুনালেন। তা শুনে ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বললেন, আপনার সম্পর্কে আমি পিতামাতার সাথে কি পরামর্শ করব? বরং আমি আল্লাহ, তাঁর রসূল ও আখিরাতের জীবন গ্রহণ করলাম; অতঃপর বললেন, আমি যা বললাম অনুগ্রহ করে তা আপনার অপর স্ত্রীগণের কাউকেও বলবেন না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তবে স্ত্রীগণের মধ্যে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, তখন তাকে বলতেই হবে। কেননা আল্লাহ তা’আলা আমার দ্বারা কাউকে কষ্ট দেয়া এবং কাউকে অসুবিধায় ফেলার কামনাকারী হিসেবে পাঠাননি; বরং আমাকে শিক্ষাদাতারূপে এবং সহজকারীরূপে (সহযোগীরূপে) পাঠিয়েছেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ عِشْرَةِ النِّسَاءِ وَمَا لِكُلِّ وَاحِدَةِ مِّنَ الْحُقُوْقِ
وَعَن جَابر قَالَ: دخل أَبُو بكر رَضِي الله عَنهُ يَسْتَأْذِنُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَوَجَدَ النَّاسَ جُلُوسًا بِبَابِهِ لَمْ يُؤْذَنْ لِأَحَدٍ مِنْهُمْ قَالَ: فَأُذِنَ لِأَبِي بَكْرٍ فَدَخَلَ ثُمَّ أَقْبَلَ عُمَرُ فَاسْتَأْذَنَ فَأُذِنَ لَهُ فَوَجَدَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جَالِسًا حَوْلَهُ نِسَائِهِ وَاجِمًا سَاكِتًا قَالَ فَقُلْتُ: لَأَقُولَنَّ شَيْئًا أُضْحِكُ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ لَوْ رَأَيْتَ بِنْتَ خَارِجَةَ سَأَلَتْنِي النَّفَقَةَ فَقُمْتُ إِلَيْهَا فَوَجَأْتُ عُنُقَهَا فَضَحِكَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَالَ: «هُنَّ حَوْلِي كَمَا تَرَى يَسْأَلْنَنِي النَّفَقَةَ» . فَقَامَ أَبُو بكر إِلَى عَائِشَةَ يَجَأُ عُنُقَهَا وَقَامَ عُمَرُ إِلَى حَفْصَةَ يَجَأُ عُنُقَهَا كِلَاهُمَا يَقُولُ: تَسْأَلِينَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا لَيْسَ عِنْدَهُ؟ فَقُلْنَ: وَاللَّهِ لَا نَسْأَلُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شَيْئًا أبدا لَيْسَ عِنْدَهُ ثُمَّ اعْتَزَلَهُنَّ شَهْرًا أَوْ تِسْعًا وَعشْرين ثمَّ نزلت هَذِه الْآيَة: (يَا أَيهَا النَّبِي قل لِأَزْوَاجِك)
حَتَّى بلغ (للمحسنات مِنْكُن أجرا عَظِيما)
قَالَ: فَبَدَأَ بعائشة فَقَالَ: «يَا عَائِشَةُ إِنِّي أُرِيدُ أَنْ أَعْرِضَ عَلَيْكِ أَمْرًا أُحِبُّ أَنْ لَا تَعْجَلِي فِيهِ حَتَّى تَسْتَشِيرِي أَبَوَيْكِ» . قَالَتْ: وَمَا هُوَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ فَتَلَا عَلَيْهَا الْآيَةَ قَالَتْ: أَفِيكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَسْتَشِيرُ أَبَوَيَّ؟ بَلْ أَخْتَارُ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالدَّارَ الْآخِرَةَ وَأَسْأَلُكَ أَنْ لَا تُخْبِرَ امْرَأَةً مِنْ نِسَائِكَ بِالَّذِي قُلْتُ: قَالَ: «لَا تَسْأَلُنِي امْرَأَةٌ مِنْهُنَّ إِلَّا أَخْبَرْتُهَا إِنَّ اللَّهَ لَمْ يَبْعَثْنِي مُعَنِّتًا وَلَا مُتَعَنِّتًا وَلَكِنْ بَعَثَنِي معلما ميسرًا» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: খায়বার যুদ্ধ থেকে গনীমাতের মাল সম্পদ আসলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীগণ তাদের খোর পোষের খরচ বাড়িয়ে দেয়ার দাবী জানালেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাতে রাযী হলেন না। এতে তাদের মন খারাপ হয়ে গেলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও মনোকষ্টে পড়ে যান। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আবূ বাকর খবর পেয়ে দৌড়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাড়িতে যান, গিয়ে দেখেন বাড়ির সামনে অনেক লোক বসা কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাউকেই বাড়িতে প্রবেশের অনুমতি প্রদান করেননি। কিন্তু আবূ বাকর উপস্থিত হলে তিনি তাকে প্রবেশের অনুমতি প্রদান করলেন। অতঃপর ‘উমার আসলে তাকেও অনুমতি দেয়া হলো। তিনি গিয়ে দেখেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসে আছেন আর তাঁর স্ত্রীগণ বিষণ্ণ মনে নির্বাক হয়ে তার চারপাশেই উপবিষ্ট রয়েছেন। সম্ভবতঃ এটা পর্দার আয়াত নাযিল হওয়ার পূর্বের ঘটনা।
হাদীসে وَاجِمًا - سَاكِتًا দু’টি শব্দ এসেছে وَاجِمًا এর অর্থ حَزِيْنًا مُهْتَمًّا ভীষণ চিন্তাগ্রস্ত ও শোকাকুল অবস্থা হওয়া। নিহায়াহ্ গ্রন্থে এসেছে, (الْوَاجِمُ مَنْ أَسْكَتَهُ الْهَمُّ) নির্বাক ব্যক্তি, দুঃশ্চিন্তা তাকে নীরব নিস্তব্ধ করে ফেলেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারার মধ্যেও ছিল বিষণ্ণতা, তাই ‘উমার মনে মনে ভাবলেন, আমি এমন একটা কৌতুকপূর্ণ কথা বলবো যাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মনোকষ্ট দূর হয়ে মুখে হাসি ফুটে উঠে। অতঃপর তিনি তাকে আনন্দ দেয়ার জন্য বলে উঠলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি যদি খারিজার কন্যা (স্বীয় পত্নী)-কে এ রকম বেশি বেশি খরচ দাবী করতে দেখতাম তাহলে দৌড়ে গিয়ে তার গলা টিপে ধরতাম। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে ফেললেন। উদ্দেশ্য ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে একটু আনন্দ দান এবং তাকে উজ্জীবিত করা, আর কৌতুককে কদর্যমুক্ত করা।
হাদীসের শব্দঃ (فَضَحِكَ) অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে দিলেন, কোনো বর্ণনায় (اَضْحَكَ) (‘উমার ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হাসালেন। এর ব্যাখ্যায় ইমাম নববী (রহঃ) মুসলিমের শারাহ (ভাষ্য) গ্রন্থে বলেছেন, এটা প্রমাণ করে যে, কেউ যদি তার সাথীকে চিন্তাগ্রস্ত দেখে তবে তাকে এমন কথা বলা অথবা এমন কাজের দিকে মনোযোগী করা মুস্তাহাব, যাতে তার চিন্তা দূর হয় এবং মুখে হাসি ফুটে। এতে যেন তার মন প্রাণ ও হৃদয় পরিচ্ছন্ন এবং সুন্দর হয়ে যায়। ‘আলী থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও চিন্তাগ্রস্ত লোককে (কোনো কথা বলে) একটু আনন্দ দিতেন।
হাদীসের শব্দ, وَجْأ এর অর্থ করতে গিয়ে মিরকাতুল মাফাতীহ গ্রন্থকার বলেন, الْوَجْأ হলো الضَّرْبُ بِالْيَد হাত দ্বারা মারা, কামূস অভিধানে, الْوَجْأ এর অর্থ الضَّرْب দ্বারা করা হয়েছে। ‘আরবেরা ضرب প্রহার শব্দকে পরিবর্তন করে তদস্থলে الْوَجْأ শব্দ ব্যবহার করে থাকে। অবশ্য এটা ছড়ি বা লাঠি দিয়ে নয় বরং নিছক হাত দিয়ে গলা ধরার মতো কিছু করা, যেমন আবূ বাকর এবং ‘উমার স্বীয় কন্যাদের ধরেছিলেন।
আবূ বাকর ও ‘উমার (রাঃ) যখন নিজ নিজ কন্যাকে বললেন, তোমরা এমন সব খরচের আবদার করছো যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট নেই? অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যা দেয়ার সামর্থ্য নেই? তাই তোমরা চাচ্ছো? উত্তরে তারা দু’জনে অথবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সকল স্ত্রীই বললেন, আমরা শপথ করে বলছি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট নেই এমন জিনিস কখনো আমরা চাইবো না। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একমাস কিংবা ঊনত্রিশ দিন তাদের অর্থাৎ স্ত্রীদের স্বীয় বিছানা এবং সঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখেন। অতঃপর এ আয়াত নাযিল হয় : (অর্থ) ‘‘হে নাবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের বলে দিন, তোমরা যদি পার্থিব জীবন ও তার বিলাসিতা কামনা করো, তবে আসো, আমি তোমাদের ভোগের ব্যবস্থা করে দেই এবং উত্তম পন্থায় তোমাদেরকে বিদায় দেই। পক্ষান্তরে যদি তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূল এবং পরকাল কামনা করো, তবে তোমাদের মুহসিন বা সৎকর্মপরায়ণদের জন্য আল্লাহ প্রস্তুত করে রেখেছেন মহাপুরস্কার।’’ (সূরা আল আহযাব ৩৩ : ২৮-২৯)
জাবির (রাঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা‘আলার এ প্রস্তাব ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে দ্বারা শুরু করলেন, স্ত্রীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অধিক বুদ্ধিমতী এবং শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারিণী। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তাড়াহুড়া করে এবং এককভাবে চিন্তা না করে, বরং ধীরস্থিরভাবে পিতা-মাতার সাথে পরামর্শক্রমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রস্তাব পেশ করেন। যাতে বয়সের স্বল্পতাজনিত কারণে এবং দুনিয়ার চাকচিক্যের প্রতি তার (চাহিদার) দৃষ্টি অন্যদিকে না গিয়ে পড়ে। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বভাবতই জানতেন যে, তার পিতা-মাতা কখনো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে তার বিচ্ছেদকে নির্দেশ করবেন না। তাই তিনি পিতা-মাতার সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রস্তাব পেশ করেন।
‘আল্লামা নববী (রহঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে বলেন, ‘‘তুমি তাড়াহুড়া করো না’’, অর্থাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে তাড়াহুড়া করো না; এটা ছিল তাঁর প্রতি এবং তার পিতা-মাতার প্রতি অধিক ভালোবাসা এবং মুহাববাতের কারণে। আর তাকে তার স্ত্রীদের মর্যাদায় অক্ষুণ্ণ রেখে পরিবারিক কল্যাণ সাধনের নিমিত্বে। স্বল্প বয়স এবং ক্ষীণ অভিজ্ঞতার করণে তিনি যদি আল্লাহর রসূলকে গ্রহণ না করে দুনিয়াকেই গ্রহণ করে বসেন তাহলে তিনি যেমন ক্ষতির মুখে পড়ে যাবেন, তার পরিবারও অপরিমিত ক্ষতির মুখে পড়বেন, সাথে সাথে অন্যান্য স্ত্রীরাও তার অনুসরণে নানামুখী ক্ষতির মুখে পড়ে যাবেন।
আল্লাহর রসূলের প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) যে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিলেন ইতিহাসের স্বর্ণ অক্ষরে কিয়ামত পর্যন্ত তা লিপিবদ্ধ থাকবে এবং যুগ যুগ কাল ধরে মুসলিম নর-নারীরা তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতেই থাকবে। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) উত্তর দিলেন, আপনার সম্পর্কে আমি পিতা-মাতার সাথে কি পরামর্শ করবো, আমি আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে গ্রহণ করেছি এবং আখিরাতের জীবন বেছে নিয়েছি। আর আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে গ্রহণ করতে কারো পরামর্শ, সম্মতি ইত্যাদির প্রয়োজন হয় না।
‘আল্লামা কারী (রহঃ) বলেনঃ এ বাক্যে ইশারা পাওয়া যায় যে, দুনিয়ার চাকচিক্যের প্রতি ভালোবাসা বা আকাঙক্ষী হওয়া এবং আখিরাতের সুখ সন্ধান একই সাথে পূর্ণভাবে সম্ভব নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে দুনিয়াকে ভালোবাসে আখিরাতে সে হয় ক্ষতিগ্রস্ত, আর যে আখিরাতকে ভালোবাসে সে দুনিয়াতে হয় ক্ষতিগ্রস্ত, সুতরাং হে কল্যাণ প্রত্যাশীরা! তোমরা চিরস্থায়ী বস্তুকে ধ্বংসশীল বস্তুর উপর প্রাধান্য দাও।
‘আয়িশাহ্ (রাঃ) নিজের পছন্দের কথা অন্যান্য স্ত্রীদের নিকট ব্যক্ত না করার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, স্ত্রীদের যে কেউই জিজ্ঞেস করলে এ ভালো কথাটুকু আমি বলে দিবো, কেননা আমি তো মানুষের জন্য সহজকারী শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছি, কষ্টদানকারী নয়।
অন্য হাদীসে এসেছে, আমি মানুষকে জান্নাতের (চিরস্থায়ী সুখ ও নি‘আমাতের) সুসংবাদদানকারী হিসেবে প্রেরিত হয়েছি। যে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে গ্রহণ করবে, পরকালের জীবনকেই দুনিয়ার জীবনের উপর প্রাধান্য দিবে তার জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার। (শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪৭৮; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৫০-[১৩] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে নারীরা স্বেচ্ছায় নিজেদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য উৎসর্গ করত (প্রকাশ করত), আমি তাদেরকে নিকৃষ্ট মনে করতাম এবং (মনে মনে) বলতাম, কোনো নারী কি এতটা নির্লজ্জ হতে পারে (কোনো পুরুষের নিকট স্বেচ্ছায় নিজেকে উৎসর্গ করবে)? অতঃপর যখন আল্লাহ তা’আলা এ আয়াত নাযিল করলেন, অর্থাৎ- ’’তুমি তাদের যাকে ইচ্ছে সরিয়ে রাখতে পার, আর যাকে ইচ্ছে তোমার কাছে আশ্রয় দিতে পার। আর তুমি যাকে আলাদা ক’রে রেখেছ তাকে কামনা করলে তোমার কোনো অপরাধ নেই...’’- (সূরা আল আহযাব ৩৩ : ৫১)। তখন আমি তাঁকে বললাম- আমি তো দেখি আপনার প্রভু আপনার কামনা-বাসনা পূরণে সর্বদা তৎপর। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসে ’মহিলাদের সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় কর’ বর্ধিতাকারে বিদায় হজে/হজ্জের ঘটনায় বর্ণনা করেন।
بَابُ عِشْرَةِ النِّسَاءِ وَمَا لِكُلِّ وَاحِدَةِ مِّنَ الْحُقُوْقِ
وَعَن عَائِشَة قَالَت: كنت أغار من اللَّاتِي وَهَبْنَ أَنْفُسَهُنَّ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقُلْتُ: أَتَهَبُ الْمَرْأَةُ نَفْسَهَا؟ فَلَمَّا أَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى: (تُرْجِي مَنْ تَشَاءُ مِنْهُنَّ وَتُؤْوِي إِلَيْكَ مَنْ تَشَاءُ وَمَنِ ابْتَغَيْتَ مِمَّنْ عَزَلْتَ فَلَا جنَاح عَلَيْك)
قُلْتُ: مَا أَرَى رَبَّكَ إِلَّا يُسَارِعُ فِي هَوَاكَ. مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ. وَحَدِيثُ جَابِرٍ: «اتَّقُوا اللَّهَ فِي النِّسَاء» وَذكر فِي «قصَّة حجَّة الْوَدَاع»
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর কথা (كُنْتُ أَغَارُ) এর অর্থ হলো أَعِيبُ عَلَيْهِنَّ ‘আমি তাদের দোষ মনে করতাম’, যাতে মহিলারা নিজেকে অপরের জন্য হেবা করে না দেয়। এটা নারী জাতির স্বভাবজাত একটা লজ্জাষ্কর বিষয় তবে এই হেবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য লজ্জাজনক নয় তো বটেই, বরং তা প্রশংসনীয়। কোনো মহিলা তার স্বীয় সত্তাকে নাবীর জন্য হেবা করে দিলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ইচ্ছা করলে গ্রহণ করতে পারেন অথবা নাও করতে পারেন, এটা তার এখতিয়ার। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা যখন এ আয়াত নাযিল করলেনঃ অর্থাৎ- ‘‘আপনি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা দূরে রাখতে পারেন এবং যাকে ইচ্ছা কাছে রাখতে পারেন। আপনি যাকে দূরে রেখেছেন তাকে কামনা করলে তাতে আপনার কোনো দোষ নেই...।’’ (সূরা আল আহযাব ৩৩ : ৫১)
‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেন, আমি তখন বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আপনি যা চান আল্লাহ তা দ্রুতই দিয়ে দেন।
ইমাম নববী (রহঃ) বলেনঃ ঐ আয়াতের ভাবার্থ হলো, হে নাবী! অপরের জন্য যা সীমাবদ্ধ আপনার জন্য তা উন্মুক্ত এবং প্রশস্ত, এটাই আপনার জন্য কল্যাণ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য যে সকল নারী নিজকে হেবা বা উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন তারা হলেন : মায়মূনাহ্ (রাঃ); কেউ কেউ বলেছেন, উম্মু শরীক (রাঃ)। কেউ কেউ যায়নাব বিনতু খুযায়মাহ্ -এর নাম বলেছেন, কেউ খাওলাহ্ বিনতে হাকিম-এর নাম। এ হাদীসের দ্বারা যা প্রকাশ পায় তা হলো উৎসর্গের ঘটনা একদল স্ত্রী দ্বারাই সংঘটিত হয়েছিল। আর এটা সূরা আল আহযাব-এর ৫০ নং আয়াতে বর্ণিত আয়াতের পরিপন্থী নয়; আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ অর্থাৎ- ‘‘কোনো মু’মিনাহ্ নারী যদি নিজকে নাবীর জন্য হেবা করে দেয়.....।’’ (সূরা আল আহযাব ৩৩ : ৫০)
এখানে নাকিরা বা অনির্দিষ্ট শব্দ কখনো উমূম বা ব্যাপক অর্থে ব্যবহার হয়ে থাকে। সুতরাং হেবাকারী কোনো একজন নির্দিষ্ট স্ত্রীই এমনটি নয় বরং একাধিক স্ত্রী হতে পারেন।
হাদীস শেষে জাবির -এর কথা- (اتَّقُوا اللّٰهَ فِى النِّسَاءِ) ‘‘নারী জাতির ব্যাপারে তোমরা আল্লাহকে ভয় করো’’, এর অর্থ হলোঃ তাদের অধিকার তাদের বিশেষত্বের প্রতি খেয়াল করবে এবং তাদের দুর্বলতা ও দায়বদ্ধতার বিষয়টিও খেয়াল রাখবে।’’ (ফাতহুল বারী ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৭৮৮; শারহে মুসলিম ৯/১০ম খন্ড, হাঃ ১৪৬৪; মির্কবাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৫১-[১৪] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সফরে ছিলেন। সেখানে আমি তাঁর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করে জয়ী হই। অতঃপর যখন আমার শরীর (মেদ) ভারী হয়ে গেল তখন পুনরায় দৌড় প্রতিযোগিতা করলাম। এবার তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে পেছনে ফেলে জয়ী হলেন এবং বললেন, (পূর্বের দৌড় প্রতিযোগিতার) পরাজয়ের প্রতিশোধ হলো এই জয়। (আবূ দাঊদ)[1]
عَن عَائِشَة رَضِي الله عَنْهَا أَنَّهَا كَانَتْ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي سَفَرٍ قَالَتْ: فَسَابَقْتُهُ فَسَبَقْتُهُ عَلَى رِجْلَيَّ فَلَمَّا حَمَلْتُ اللَّحْمَ سَابَقْتُهُ فَسَبَقَنِي قَالَ: «هَذِهِ بِتِلْكَ السَّبْقَةِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যা: রসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবন ছিল মানব জীবনের সকল দিক ও বিভাগের শ্রেষ্ঠ আদর্শের নমুনা। স্ত্রীদের মনোরঞ্জন বিধান, তাদের সাথে হাসি-কৌতুকের মতো একটি একান্ত বিষয়েও তিনি পবিত্র আদর্শের স্থপতি। সফরের ক্লান্ত শ্রান্ত অবষণ্ণ মনেও এক রাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রী ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর সাথে দৌড়ের প্রতিযোগিতা করেন। এটি কোনো সওয়ারে আরহণ করে নয় বরং পায়ে হেঁটে অর্থাৎ খালি পায়ে দৌড়ের পাল্লা। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেন, দৌড়ে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে পিছনে ফেলে বিজয়ী হয়ে গেলাম। পরবর্তী সময়ে আরেকবার এমনি প্রতিযোগিতা হলো, এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিজয়ী হলেন এবং ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) পিছনে পড়ে গেলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললেন, এটা তোমার গত প্রতিযোগিতা বিজয়ের প্রতিশোধ।
এটা স্ত্রীদের সাথে হুসনু মুআশারাত বা উত্তম আচরণের একট নমুনা। কাযী খান বলেনঃ চারটি বিষয়ে প্রতিযোগিতা করা বৈধ। ১. উটের দৌড় প্রতিযোগিতা, ২. ঘোড় দৌড় প্রতিযোগিতা, ৩. তীরন্দাজী প্রতিযোগিতা ৪. এবং পদব্রজে দৌড় প্রতিযোগিতা। অনুরূপ কোনো প্রতিযোগিতার হারজিত যদি একদিক থেকে হয় তবে তা বৈধ, যেমন : একজন বললো যদি আমি তোমার আগে যেতে পারি তবে আমার জন্য এই পুরস্কার আর তুমি যদি আমার ওপর অগ্রগামী হও তবে তোমার জন্য কোনো পুরস্কার নেই।
পক্ষান্তরে যদি পুরস্কারের উভয় দিক থেকে করা হয় তবে তা হারাম, কেননা ওটা জুয়া-বাজী।
অনুরূপ কোনো আমির ‘উমারাহ্ যদি দু’জনের মধ্যে ঘোষণা দেয় যে, তোমাদের দু’জনের মধ্যে যে অগ্রগামী হবে তার জন্য এই এই বিনিময় তবে এটাও বৈধ। উপরে উল্লেখিত চারটি বিষয়ে প্রতিযোগিতা জায়িয বলা হয়েছে এজন্য এই বিষয়ে আসার রয়েছে, অন্যান্য প্রতিযোগিতায় আসার নেই। (মিরকাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহওয়াযী হাঃ ২৫৭৫, ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫৭৫)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৫২-[১৫] উক্ত রাবী [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি সর্বোত্তম যে স্বীয় পরিবারের নিকট উত্তম। আর আমি আমার পরিবারের নিকট সর্বোত্তম। আর যখন তোমাদের যে কেউ মারা যায়, তখন তার (নিন্দা করা) হতে বিরত থাক। (তিরমিযী, দারিমী)[1]
وَعَنْهَا قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي وَإِذَا مَاتَ صَاحِبُكُمْ فَدَعُوهُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ. والدارمي
ব্যাখ্যা: হাদীসের উল্লেখিত «أهل» শব্দটি স্বামী-স্ত্রী, পরিবার-পরিজন এবং নিকটতম ব্যক্তির অর্থ বহন করে।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী : ‘‘তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি উত্তম যে তার আহলের কাছে অর্থাৎ স্বামী স্ত্রীর কাছে, স্ত্রী স্বামীর কাছে উত্তম’’- এটা উত্তম আচরণ এবং উত্তম চরিত্রের পথ-নির্দেশক। আর এই উত্তম আচরণ এবং উত্তম চরিত্র মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ণয় হয়।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ (أَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِىْ) ‘‘আমি তোমাদের মধ্যে আমার পরিবারের জন্য শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি’’ এই শ্রেষ্ঠত্ব উত্তম আচরণ এবং উত্তম গুণাবলীর ভিত্তিতে। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন পৃথিবীর সর্বোচ্চ আদর্শ এবং সর্বোত্তম গুণাবলীর অধিকারী।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ (وَإِذَا مَاتَ صَاحِبُكُمْ فَدَعُوهُ) ‘‘যখন তোমাদের সাথী (অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রীর কোনো একজন) মৃত্যুবরণ করবে, তাকে ত্যাগ করবে।’’ এর অর্থ হলো স্মামী-স্ত্রীর কেউ মারা গেলে তার দোষ এবং নিন্দনীয় গুণাবলী আলোচনা করা বা তার কোনো দোষ জনসম্মুখে তুলে ধরা ত্যাগ করবে। কিন্তু উত্তম গুণাবলী আলোচনা করা এবং তা জনসম্মুখে তুলে ধরা, এ নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা হাদীসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ «اذْكُرُوا مَوْتَاكُمْ بِالْخَيْرِ» ‘‘তোমরা মৃতদের ভালো দিকগুলো আলোচনা করো।’’
কেউ কেউ বলেছেন, তোমাদের সাথী মৃত্যুবরণ করলে- তাকে ছেড়ে দিবে বা বর্জন করবে, এর অর্থ হলো তার মুহববাত ত্যাগ করবে এবং তার জন্য বিলাপ বা কান্নাকাটি ত্যাগ করবে। উত্তম হলো তাকে আল্লাহর রহমাতের দিকে ছেড়ে দিবে অর্থাৎ তার রহমাতের আশ্রয়ে সোপর্দ করবে। নেককারদের জন্য আল্লাহর নিকট হলো উত্তম আশ্রয়, আর সৃষ্টিকর্তার আশ্রয়ই তো শ্রেষ্ঠ এবং পূর্ণ আশ্রয়।
কেউ কেউ বলেছেন, এ বাক্য দ্বারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় সত্তাকেই বুঝিয়েছেন অর্থাৎ তোমরা আমার মৃত্যুর পর আমার জন্য আফসোস ও পরিতাপ করবে না।
কেউ কেউ বলেছেন, এর অর্থ হলো তুমি মরে গেলে আমাকে ছেড়ে দিবে অর্থাৎ আমার আহ্ল-পরিবার ও সাহাবীদের কষ্ট দিবে না এবং আমার দীনের ইত্তেবা ছেড়ে দিবে না। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৫৩-[১৬] আর ইবনু মাজাহ-তে ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন ’’আমার পরিবারের জন্য উত্তম’’ পর্যন্ত।[1]
وَرَوَاهُ ابْنُ مَاجَهْ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ إِلَى قَوْله: «لأهلي»
ব্যাখ্যা: ইবনু মাজাহ গ্রন্থে ইবনু ‘আব্বাস-এর সূত্রে (لِأَهْلِىْ) বর্ণিত হয়েছে। এতে প্রমাণিত দু’টি হাদীস স্বতন্ত্রভাবে আলাদা আলাদাভাবে) বর্ণিত হয়েছে। তাই উভয় হাদীসের মধ্যে মুনাসাবাত বা সম্পর্ক সন্ধানের প্রয়োজন নেই। এ কথার সহায়ক হলো ‘আল্লামা সুয়ূত্বীর কথা, তিনি এ পর্যন্তই উল্লেখ করেছেন, অতঃপর তিনি বলেন, তিরমিযী ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, ইবনু মাজাহ, ইবনু ‘আব্বাস থেকে, ত্ববারানী মু‘আবিয়াহ্ থেকে এবং হাকিমে ইবনু ‘আব্বাস-এর সূত্রে «خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِلنِّسَاءِ» বাক্য ব্যবহার হয়েছে, ‘‘তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি উত্তম যে স্ত্রীদের নিকট উত্তম।’’
মুসতাদরাক হাকিম গ্রন্থে আবূ হুরায়রাহ্ -এর বর্ণনায় «خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ» ‘‘আমার পর তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি উত্তম যে আমার পরিবারের নিকট উত্তম!’’ উল্লেখ রয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৫৪-[১৭] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো মহিলা যদি পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে, রমাযানের সিয়াম পালন করে, গুপ্তাঙ্গের হিফাযাত করে, স্বামীর একান্ত অনুগত হয়। তার জন্য জান্নাতের যে কোনো দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশের সুযোগ থাকবে। (আবূ নু’আয়ম হিল্ইয়াহ্ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)[1]
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْمَرْأَةُ إِذَا صَلَّتْ خَمْسَهَا وَصَامَتْ شَهْرَهَا وَأَحْصَنَتْ فَرْجَهَا وَأَطَاعَتْ بَعْلَهَا فَلْتَدْخُلْ مِنْ أَيِّ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ شَاءَتْ» . رَوَاهُ أَبُو نعيم فِي الْحِلْية
বিঃ দ্রঃ আলবানী (রহঃ) অনত্র হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন। দেখুনঃ (هداية الرواة إلى تخريج أحاديث المصابيح والمشكاة)।
ব্যাখ্যা: মহিলার পাঁচ ওয়াক্ত সালাত তার রজঃকাল ছাড়া পবিত্র কালের সালাত। আর একমাস সওম হলো রমাযানের ফরয সওম! তাই তা রমাযান মাসেই আদায়ের মাধ্যমে পালন করা হোক অথবা অসুস্থাজনিত কারণে পরবর্তীতে কাযা আদায়ের মাধ্যমে পালন করা হোক।
(وَأَحْصَنَتْ فَرْجَهَا) এর অর্থ হলো যদি নারী তার যৌনাঙ্গকে হিফাযাত করে, অর্থাৎ নিজের ইজ্জত সম্ভ্রম ও সতীত্বকে রক্ষা করে। ব্যাখ্যাকারকগণ নিজের নফস্ বা প্রবৃত্তিকে সকল প্রকার অশ্লীলতা থেকে বিরত রাখার কথাও বলেছেন।
(وَأَطَاعَتْ بَعْلَهَا) ‘যদি সে স্বামীর ইত্বা‘আত বা আনুগত্য করে, স্বামীর আনুগত্য বলতে যা অবশ্য পালনীয় তা পালন করে। তাহলে সে জান্নাতের যে কোনো দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারবে। এর অর্থ হলো আটটি জান্নাতের যে কোনোটি সে প্রবেশ করতে পারবে। এখানে ইশারা রয়েছে জান্নাতের কোনো একটিতে যেতে তার বাধা নেই এবং সে দ্রুত তা অর্জন করতে পারবে এবং তাতে পৌঁছতে পারবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৫৫-[১৮] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি যদি কোনো মানবকে সিজদা করার নির্দেশ দিতাম, তবে স্ত্রীকে তার স্বামীর জন্য সিজদা করার নির্দেশ দিতাম। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم: «لَو كُنْتُ آمُرُ أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِأَحَدٍ لَأَمَرْتُ الْمَرْأَة أَن تسْجد لزَوجهَا» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: ‘সিজদা’ হলো (انْقِيَادِ) বা বশ্যতা ও আত্মসমর্পণের চূড়ান্তরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ ‘‘যদি আমি কোনো মানুষকে সিজদা করার নির্দেশ করতাম তবে অবশ্যই নারীকে নির্দেশ করতাম তার স্বামীকে সিজদা করতে।’’ কেননা স্ত্রীর ওপর স্বামীর অধিকার এবং হক এতই বেশি যে, সে তার কৃতজ্ঞতা কোনোভাবেই আদায় করতে সক্ষম হবে না।
সাজদার মতো একটি চূড়ান্ত কৃতজ্ঞতা প্রকাশের কাজ যদি আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য বৈধ হতো তবে এর হকদার স্বামীই হতো; কিন্তু সিজদা যেহেতু একমাত্র আল্লাহর অধিকার, তিনিই একচ্ছত্রভাবে এ অধিকার ও হক সংরক্ষণ করেন। সুতরাং এই সাজদার প্রাপ্যতা পৃথিবীর আর কারো জন্যই অবশিষ্ট নেই।
স্বামীকে সাজদার কথা নিছক একটা উপমা হিসেবে বলা হয়েছে মাত্র।
অত্র হাদীসের প্রেক্ষাপট হলোঃ সাহাবী মু‘আয সিরিয়ায় গিয়ে দেখেন তারা তাদের বড়দের সিজদা করছে। তিনি মনে মনে নিয়্যাত করলেন আমি মদীনায় গিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সিজদা করবো। ফিরে এসে তিনি তাই করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, মু‘আয! তুমি একি করছো? তিনি বললেন, আমি সিরিয়ায় গিয়ে দেখেছি সেখানে সর্বসাধারণ বড় বড় পাদ্রী ও রাজন্যবর্গকে সিজদা করছে। তাই অমি মনে মনে ভেবেছিলাম মদীনায় ফিরে গিয়ে আমি আপনাকে সিজদা দিবো। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত হাদীসটি বর্ণনা করেন। অনেকে বলে থাকেন সম্মান ও তা‘যীমের সিজদা বৈধ। যেমন (ফতোয়ায়ে) কাযী খান (গ্রন্থে) বলেছেন,
إِنْ سَجَدَ لِلسُّلْطَانِ إِنْ كَانَ قَصْدُهُ التَّعْظِيمَ وَالتَّحِيَّةَ دُونَ الْعِبَادَةِ لَا يَكُونُ ذٰلِكَ كُفْرًا وَأَصْلُه أَمْرُ الْمَلَائِكَةِ بِالسُّجُودِ لِاٰدَمَ وَسُجُودُ إِخْوَةِ يُوسُفَ - عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ
‘ইবাদাতের উদ্দেশ্য না করে যদি সম্মান এবং শ্রদ্ধার জন্য বাদশাহকে সিজদা করা হয় তাহলে এটা কুফরী হবে না। কেননা আল্লাহ তা‘আলা মালায়িকার (ফেরেশতাদের) নির্দেশ করেছিলেন আদামকে সিজদা করতে। অনুরূপ ইউসুফ (আঃ)-এর ভাইয়েরা ইউসুফকে সিজদা করেছিলেন।
এই যুক্তির ভিত্তিতে অনেক পীর তার মুরীদ বা শিষ্যদের সিজদা গ্রহণ করে থাকেন। এরূপ সিজদা সম্পূর্ণ হারাম ও কবীরা গুনাহ। আদামকে সাজদার যে নির্দেশ ছিল তা মালায়িকার প্রতি, আদাম সন্তানের প্রতি (এ নির্দেশ) নয়। উপরোক্ত আদামের এ ঘটনা ঊর্ধ্ব জগতের বিষয় দুনিয়ার শারী‘আত ও তার বিধানে তা প্রযোজ্য নয়। সর্বোপরি ঐ সাজদার ধরণ ও প্রকৃতি কেমন ছিল তাও আমাদের কারোই জানা নেই; সুতরাং ওটাকে ভিত্তি করে কোনো মানুষ কোনো মানুষকে কোনো প্রকারের সিজদাই করা বৈধ নয়।
অনুরূপ সূরা ইউসুফ-এর আরেকটি আয়াত নিয়ে অনেকে ভ্রান্তিতে পতিত হয়েছেন। সেটা হলো ইউসুফ (আঃ)-এর আমন্ত্রণে তার ভাইয়েরা এবং পিতা-মাতা যখন মিসরে পৌঁছলেন তখন ইউসুফ (আঃ) পিতাকে যথাসম্মানে সিংহাসনে বসালেন। এ অকল্পনীয় ঘটনা দেখে তারা সবাই তার সামনে (আল্লাহর উদ্দেশে) সাজদায় লুটিয়ে পড়লেন। দেখুন সূরা ইউসুফ ১০০; এই সিজদা ইউসুফকে দেয়া হয়নি বরং ইউসুফের সামনে আল্লাহকে সিজদা দেয়া হয়েছিল।
বিশ্ব বিখ্যাত ফাকীহ ‘আল্লামা মুফতী শাফী (পাকিস্থান) স্বীয় গ্রন্থ তাফসীরে মা‘রিফুল কুরআনে এ আয়াতের তাফসীর করতে গিয়ে বলেনঃ
‘‘পিতা-মাতা ও ভ্রাতারা সবাই ইউসুফ (আঃ)-এর সামনে সিজদা করলেন। ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস বলেন, এ কৃতজ্ঞতাসূচক সিজদা্টি ইউসুফ (আঃ)-এর জন্য নয় বরং আল্লাহ তা‘আলার উদ্দেশেই করা হয়েছিল।
কেউ কেউ বলেন, উপাসনামূলক সিজদা প্রত্যেক পয়গাম্বরের শারী‘আতেই হারাম ছিল, কিন্তু সম্মানসূচক সিজদা একে অপরকে দেয়া পূর্ববর্তী নাবীগণের শারী‘আতে বৈধ ছিল। ‘আল্লামা শাফী (রহঃ) বলেছেন, শির্কের সিঁড়ি হওয়ার কারণে ইসলামী শারী‘আতে তাও সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৫৬-[১৯] উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে রমণী নিজের স্বামীকে সন্তোষ রেখে মৃত্যুবরণ করে, নিশ্চয় সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ أُمِّ سَلَمَةَ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَيُّمَا امْرَأَةٍ مَاتَتْ وَزَوْجُهَا عَنْهَا رَاضٍ دَخَلَتِ الْجَنَّةَ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ
ব্যাখ্যা: স্বামী যদি ‘আলিম এবং মুত্তাক্বী হয় আর তার স্ত্রী আল্লাহর হক এবং তার বান্দার হক যথাযথ পালন করে তবে তার জন্য এই ঘোষণা।
ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান গরীব বললেও মূলতঃ হাদীসটি য‘ঈফ। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১১৬১; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৫৭-[২০] ত্বলক্ব ইবনু ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো স্বামী নিজ প্রয়োজনে স্বীয় স্ত্রীকে ডাকলে, সে যেন তৎক্ষণাৎ তার ডাকে সাড়া দেয়, যদিও সে চুলার পাশে (গৃহকর্মীর কাজে) ব্যস্ত থাকে। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ طَلْقِ بْنِ عَلِيٍّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا الرَّجُلُ دَعَا زَوْجَتَهُ لِحَاجَتِهِ فَلْتَأْتِهِ وَإِنْ كَانَتْ عَلَى التَّنور» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: স্বামী তার স্ত্রীর পরিচালক এবং অভিভাবক, সে যে কোনো কাজে তাকে আহবান করে সে আহবানে তাকে সাড়া দেয়া আবশ্যক, বিশেষ করে তার জৈবিক চাহিদা পূরণের আহবানে তাকে অবশ্যই সাড়া দিতে হবে। অত্র হাদীস সেদিকেই ইঙ্গিত করছে। সে যদি চুলায় রুটি তৈরিতেও লিপ্ত থাকে আর সে ছাড়া বিকল্প কোনো লোক না থাকে তবু তা মূলতবী রেখে স্বামীর আহবানে সাড়া দিবে। ইবনুল মালিক বলেন, এ রুটি যদি স্বামীর হয় তবেই এ হুকুম। কারণ স্বামী জানছে যে, সে রুটি তৈরিতে ব্যস্ত, এ সময় ডাকলে তার ক্ষতি হবে, তবু সে যখন ডাকছে, তখন তার ডাকে সাড়া দিতে হবে।
বাযযার কিতাবে যায়দ ইবনু আরকাম-এর সূত্রে হাদীসটি এভাবে এসেছে : কোনো ব্যক্তি যদি তার স্ত্রীকে স্বীয় বিছানায় আহবান করে সে যেন (সাথে সাথে) তার ডাকে সাড়া দেয়, যদি সে জাঁতার খিলের উপরও বসা থাকে। (মিরকাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১১৬০)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৫৮-[২১] মু’আয (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন কোনো স্ত্রী তার স্বামীকে দুনিয়াতে কষ্ট দেয় (অর্থাৎ- অশ্রদ্ধা, অবাধ্যতা ইত্যাদির মাধ্যমে)। তখন উক্ত স্বামীর জান্নাতের রমণীগণ (হূরেরা) বলতে থাকে, তুমি তাকে কষ্ট দিও না, (যদি কর) তবে আল্লাহ তোমাকে ধ্বংস করবেন। তিনি তোমার নিকট (কিছু সময়ের দিনের) মেহমান, শীঘ্রই তিনি তোমাকে ছেড়ে আমাদের নিকট চলে আসবে। (তিরমিযী, ইবনু মাজাহ; ইমাম তিরমিযী বলেন, হাদীসটি গরীব)[1]
وَعَنْ مُعَاذٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لَا تُؤْذِي امْرَأَةٌ زَوْجَهَا فِي الدُّنْيَا إِلَّا قَالَت زَوجته مِنَ الْحُورِ الْعِينِ: لَا تُؤْذِيهِ قَاتَلَكِ اللَّهُ فَإِنَّمَا هُوَ عِنْدَكِ دَخِيلٌ يُوشِكُ أَنْ يُفَارِقَكِ إِلَيْنَا . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ: هَذَا حَدِيث غَرِيب
ব্যাখ্যা: মু’মিনদেরকে আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতে ‘‘হূরি‘ঈন’’ বা আয়তনয়না হূর দিবেন। আল্লাহ বলেনঃ ‘‘আমি জান্নাতীদেরকে হূরি‘ঈনদের সাথে জোড়া মিলিয়ে দিবো’’- (সূরা আদ্ দুখান ৪৪ : ৫৪)। অর্থাৎ বিয়ে দিয়ে দিবো। হূরি‘ঈন হলো অতীব উজ্জ্বল সাদা কালো মিশ্রিত, প্রশস্ত ও আনতচক্ষু বিশিষ্ট বা (ডাগর চক্ষু বিশিষ্ট) অত্যন্ত সুশ্রী, অন্যন্য সুন্দরী জান্নাতের নারী।
মু’মিন নেককার জান্নাতী বান্দাকে যদি তার দুনিয়ার স্ত্রী কষ্ট দেয় তখন তার জন্য নিযুক্ত জান্নাতের ঐ হূরী‘ঈন স্ত্রী তা জানতে পারে।
হে আল্লাহর বান্দা! আল্লাহ তোমাকে ধ্বংস করুন। তুমি তাকে কষ্ট দিও না। এখানে (قَاتَلَكِ اللّٰهُ)-এর ব্যাখ্যা হলো : «لَعَنَكِ عَنْ رَحْمَتِه وَأَبْعَدَكِ عَنْ جَنَّتِه» আল্লাহ তোমাকে তাঁর রহমাত থেকে বঞ্চিত করুন। এবং তাঁর জান্নাত থেকে দূরে রাখুন। সে তো সামান্য কয়দিনের মেহমানস্বরূপ তোমার নিকট গিয়েছে মাত্র, এরপর আমাদের নিকট ফিরে আসবে। তুমি তো তার প্রকৃত সঙ্গী নও, আমরাই তার প্রকৃত সঙ্গী, সুতরাং তোমরা তাকে কষ্ট দিও না।
অত্র হাদীস ও অন্যান্য হাদীসে যেখানে স্বামীর অবাধ্যচারীদের প্রতি মালায়িকার (ফেরেশতাদের) লা‘নাতের কথা বলা হয়েছে। এ জাতীয় হাদীস প্রমাণ করে যে, ‘‘মালা-য়ি আ‘লা-’’ বা ঊর্ধ্ব জগতের কিছু মালাক (ফেরেশতা) দুনিয়াবাসীর কাজকর্মের খবর রাখেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১১৭৪)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৫৯-[২২] হাকীম ইবনু মু’আবিয়াহ্ আল কুশায়রী (রহঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসূল! স্ত্রীগণ আমাদের ওপর কি অধিকার রাখে? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তুমি যখন খাও, তখন তাকেও খাওয়াও; তুমি পরলে তাকেও পরিধান করাও, (প্রয়োজনে মারতে হলে) মুখমণ্ডলে আঘাত করো না, তাকে গালি দিও না, (প্রয়োজনে তাকে ঘরে বিছানা পৃথক করতে পার), কিন্তু একাকিনী অবস্থায় রাখবে না। (আহমাদ, আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ حَكِيمِ بْنِ مُعَاوِيَةَ الْقُشَيْرِيِّ عَنْ أَبِيهِ قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا حَقُّ زَوْجَةِ أَحَدِنَا عَلَيْهِ؟ قَالَ: «أَنْ تُطْعِمَهَا إِذَا طَعِمْتَ وَتَكْسُوَهَا إِذَا اكْتَسَيْتَ وَلَا تَضْرِبِ الْوَجْهَ وَلَا تُقَبِّحْ وَلَا تَهْجُرْ إِلَّا فِي الْبَيْتِ» . رَوَاهُ أَحْمد وَأَبُو دَاوُد وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: স্বামী-স্ত্রী পরস্পর একে অপরের প্রতি কতিপয় হক বা কর্তব্য রয়েছে। স্ত্রীর প্রতি স্বামীর অবশ্য পালনীয় কর্তব্য জানতে চাওয়ায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন, তুমি যখন খাবে তাকেও খাওয়াবে, তুমি যখন পরিধান করবে তাকেও পরিধান করাবে। অর্থাৎ প্রত্যেক স্বামীর জন্য ওয়াজিব হলো তার সাধ্যমতো স্ত্রীকে ভরণ-পোষণ করা। স্বামীর সাধ্যের বাইরে যেমন স্ত্রী উন্নত খাদ্য, উন্নত বস্ত্র পাবে না ঠিক তদ্রূপ স্বামীর সাধ্য থাকতে নিজে খেয়ে স্ত্রীকে উপোস রাখতে এবং বস্ত্রহীন করে রাখতে পারবে না। এমনকি ছিন্ন বস্ত্র অথবা খুব অল্প মূল্যের বস্ত্রও দিবে না। বরং সাধ্যের মধ্যে মানসম্পন্ন এবং ভারসাম্যপূর্ণ বস্ত্র তাকে দিবে।
স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য জীবন একটি মধুময় জীবন। সুতরাং এই মধুময় সম্পর্কের কেউই চির ধরাবে না। স্বামী স্ত্রীকে অহেতুক মারধর করবে না। স্ত্রী শারী‘আতের কোনো বিধি-বিধান লঙ্ঘনের কারণে একান্তই যদি তার ওপর শাসনমূলক কোনো ব্যবস্থা নিতে হয় তাহলে আল্লাহর এ বাণী লক্ষ্য করবে :
‘‘আর যদি তোমরা (স্ত্রীদের নিকট থেকে) অবাধ্যতার আশঙ্কা করো তাহলে তাদের নাসীহাত করো, (তাতে যদি ফল না হয় তাহলে) তাদের বিছানা পৃথক করে দাও, (যাতে তোমার সঙ্গ না পেয়ে অনুতপ্ত হয়ে তোমার আনুগত্যে ফিরে আসতে পারে)। এতেও যদি সে সংশোধন না হয় তবে তাদের (হালকা) প্রহার করো।’’ (সূরা আন্ নিসা ৪ : ৩৫)
এই প্রহারের ক্ষেত্রে নির্দেশনা হলোঃ তুমি তার মুখমণ্ডলে আঘাত করবে না। কেননা মুখমণ্ডল হলো মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং প্রকাশ্য অঙ্গ। শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোর মধ্যে মুখমণ্ডল হলো অধিক সম্মানিত এবং স্পর্শকাতর, তাই সেখানে আঘাত করা নিষেধ।
স্ত্রী ছাড়া অন্য কাউকেও প্রহার করার প্রয়োজন হলে তাকেও মুখমণ্ডলে প্রহার করা এ হাদীসের দ্বারাই নিষিদ্ধ প্রমাণিত; কেননা এ হাদীসে যে মুখমন্ডলীর কথা বলা হয়েছে তা শুধু স্ত্রীর মুখের কথা বলা হয়নি বরং ‘আম্ বা ব্যাপকার্থে সকলের মুখেই প্রহার নিষেধ করা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো তার স্ত্রীদের মার-ধর করেননি। হাদীসে যে প্রহারের কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন তা উপরে উল্লেখিত সূরা আন্ নিসা-এর ঐ আয়াতের ভিত্তিতেই বলেছেন। ফাকীহগণ ঐ প্রহারের একটি দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন যে, ঐ প্রহার হবে মিসওয়াক বা মিসওয়াক জাতীয় কাঠ দ্বারা আঘাত করা। মূলতঃ এটি প্রহার নয় বরং প্রতীকী প্রহার, যাতে স্ত্রী সংশোধিত হয়।
‘ফতোয়া’-এ কাযী খান চার কারণে স্ত্রীকে প্রহার বৈধ করেছেন।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তাকে গালি দিও না। অর্থাৎ তাকে অশ্লীল ও খারাপ ভাষায় গালি গালাজ করো না। অথবা ‘‘আল্লাহ তোমাকে খারাপ বানিয়ে দিক’’ এ জাতীয় কথাও বলো না। আর তাকে বাড়ি ছাড়া করে তাকে অন্যত্রও ফেলে রাখবে না যাতে সে নিরাপত্তাহীনতায় পড়ে যায়। বরং আল কুরআনের নির্দেশ মতো ভিন্ন বিছানায় রাখবে যাতে সে তোমার বিরহ বেদনায় বিনীত হয়ে তোমার আনুগত্যে ফিরে আসে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২১৪২; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৬০-[২৩] লাক্বীত্ব ইবনু সবিরাহ্ হতে (রাঃ) বর্ণিত। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমার স্ত্রী অত্যন্ত মুখরিতা (বাচাল)। উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তবে তালাক দিয়ে দাও। আমি বললাম, কিন্তু ঐ স্ত্রীর ঘরে আমার সন্তান রয়েছে এবং সে আমার দীর্ঘ দিনের দাম্পত্য সঙ্গীনী। উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তবে তাকে নাসীহাত কর। যদি সে তোমার উপদেশে ভালো হয়ে যায় তবে ভালো। কিন্তু স্ত্রীকে ক্রীতদাসীর ন্যায় মারবে না। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ لَقِيطِ بْنِ صَبِرَةَ قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ لِي امْرَأَةً فِي لِسَانِهَا شَيْءٌ يَعْنِي الْبَذَاءَ قَالَ: «طَلِّقْهَا» . قُلْتُ: إِنَّ لِي مِنْهَا وَلَدًا وَلَهَا صُحْبَةٌ قَالَ: «فَمُرْهَا» يَقُولُ عِظْهَا «فَإِنْ يَكُ فِيهَا خَيْرٌ فَسَتَقْبَلُ وَلَا تَضْرِبَنَّ ظَعِينَتَكَ ضَرْبَكَ أُمَيَّتَكَ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: এখানে ‘‘লাক্বীত্ব ইবনু সবিরাহ্’’ নাম এসেছে, কিন্তু أَسْمَاءِ الْمُصَنَّفِ লেখকদের নাম বা রচয়িতাদের নামের মধ্যে ‘‘লাক্বীত্ব ইবনু ‘আমির ইবনু সবিরাহ্’’ রয়েছে। ইনি প্রসিদ্ধ সাহাবী, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তার স্ত্রীর সম্পর্কে অভিযোগ করেন যে, সে গাল-মন্দ এবং অশ্লীল কথা বলে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, ‘তুমি তাকে তালাক দিয়ে দাও, অর্থাৎ তুমি যদি তার কথায় ধৈর্য ধারণ করতে না পারো তবে তাকে তালাক দিয়ে দাও। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ নির্দেশ আবশ্যক হিসেবে বিবেচিত হবে না বরং ইবাহাত বা বৈধতার অর্থে ব্যবহৃত হবে। লোকটি বললেন, তার সাথে আমার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং তার থেকে আমার সন্তানও রয়েছে, কিভাবে আমি এই দীর্ঘ ভালোবাসার অবসান ঘটিয়ে তাকে তালাক দেই। এতে আমার সন্তানের জীবনও হয়ে যেতে পারে বিপন্ন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ তাহলে তুমি তাকে ভালো উপদেশ দাও, অর্থাৎ ভালো ব্যবহারের নাসীহাত করো, তার মধ্যে যদি সামান্য কল্যাণও থাকে তাহলে সে তোমার উপদেশ কবুল করবে এবং তার ঐ মন্দ অভ্যাস ত্যাগ করবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাসীহাতের কথা এজন্য বলেছেন যে, আল্লাহ তা‘আলা তা নির্দেশ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ ‘‘তোমরা স্ত্রীদের নাসীহাত করো।’’ (সূরা আন্ নিসা ৪ : ৩৪)
সেকালে মানুষ দাস-দাসীদের নির্দয়ভাবে প্রহার করতো, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকটিকে বললেনঃ তুমি তোমার স্বাধীনা স্ত্রীকে ঐরূপ দাস-দাসীর মতো প্রহার করো না। অর্থাৎ সে যদি নাসীহাত কবুল নাই করে, তবে আল কুরআনের অনুমোদিত প্রহারটুকু যেন দয়ার্দ্রতার সাথে হয় এবং হালকা ও মৃদু প্রহার হয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২১৪২)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৬১-[২৪] আয়াস ইবনু ’আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা আল্লাহ তা’আলার বান্দীগণকে (স্ত্রীগণকে ক্রীতদাসীর ন্যায়) মেরো না। অতঃপর ’উমার এসে বললেন, (আপনার নিষেধাজ্ঞার দরুন) স্বামীদের ওপর রমণীদের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে (প্রয়োজনসাপেক্ষে) মারার অনুমতি দিলেন। এমতাবস্থায় রমণীগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহধর্মিণীগণের নিকট পুনঃপুন এসে স্বামীদের (অত্যাচারের) ব্যাপারে অভিযোগ করতে লাগল। সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, শুনে রাখ! আমার পরিবার-পরিজনের নিকট স্ত্রীগণ স্বামীদের অভিযোগ নিয়ে পুনঃপুন আসছে যে, তোমাদের মধ্যে (যারা স্ত্রীদেরকে এরূপে কষ্ট দেয়) তারা কোনক্রমেই ভালো মানুষ নয়। (আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ ও দারিমী)[1]
وَعَنْ إِيَاسِ بْنِ عَبْدُ اللَّهِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «لَا تَضْرِبُوا إِمَاءِ اللَّهِ» فَجَاءَ عُمَرُ إِلَى رَسُولِ الله فَقَالَ: ذَئِرْنَ النِّسَاءُ عَلَى أَزْوَاجِهِنَّ فَرَخَّصَ فِي ضَرْبِهِنَّ فَأَطَافَ بَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نِسَاءٌ كَثِيرٌ يَشْكُونَ أَزْوَاجَهُنَّ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَقَدْ طَافَ بِآلِ مُحَمَّدٍ نِسَاءٌ كَثِيرٌ يَشْكُونَ أَزْوَاجَهُنَّ لَيْسَ أُولَئِكَ بِخِيَارِكُمْ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَه والدارمي
ব্যাখ্যা: জাহিলী যুগের নারীদেরকে তাদের স্বামীরা অমানসিকভাবে প্রহার করতো। ইসলাম এসে এই কর্ম বন্ধ করে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে। ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে স্ত্রীকে প্রহার করতেই হলে তা যৎসামান্য, এরপরও বলা হয়েছে এটা কোনো ভদ্রচিত কাজ নয়।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘‘তোমরা আল্লাহর বান্দীদের অর্থাৎ তোমাদের স্ত্রীদের প্রহার করো না।’’ তোমরা যেমন আল্লাহর বান্দা তারাও তেমনি আল্লাহর বান্দি। উভয়ের আদি পিতা আদম (আঃ) ও আদি মাতা হাওয়া (আঃ)। সুতরাং তাদের প্রতি সদাচারী হও। এতে নারীরা আস্কারা পেয়ে কিছুটা বাড়াবাড়ি শুরু করলে ‘উমার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে অভিযোগ করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনার নিষেধাজ্ঞায় স্ত্রীদের স্পর্ধা বেড়ে গেছে, তখন তিনি আবার প্রয়োজনে তাদের প্রহারের অনুমতি প্রদান করলেন। কয়েক দিনের মধ্যে নারীরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের নিকট এসে অভিযোগ দিতে শুরু করলেন যে, তাদের স্বামীরা তাদের প্রহার করে। ফলে আল্লাহর রসূল এক যুগান্তকারী কথা বলে দিলেন যে, ‘‘যারা স্ত্রীকে প্রহার করে তারা কখনো ভালো মানুষ নয়।’’ অর্থাৎ ভদ্র ও সম্ভ্রান্ত মানুষের স্বভাব ও চরিত্র এটা নয় যে, কথায় কথায় স্ত্রীকে ধরে প্রহার করবে।
এটা অতীব ঘৃণিত ও ছোট লোকের কাজ। ইতিপূর্বে আলোচনা হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের প্রহারের যে অনুমতি দিয়েছিলেন সেটাও কুরআনের নির্দেশক্রমেই। কিন্তু মানুষ প্রয়োজনে জায়িয বিষয় নিয়ে অতীব বাড়াবাড়ি করে থাকে। এ হাদীস দ্বারা বুঝা যায়, স্ত্রীকে মারা বৈধ কিন্তু তা কোনো ক্রমেই ভদ্রচিত কাজ নয়, সুতরাং তাকে না মেরে তার খারাপ আচরণ চরিত্রের উপর ধৈর্যধারণ করা এবং তাকে ক্ষমা করাই সবচেয়ে উত্তম এবং অধিকতর সুন্দর। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৭২)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৬২-[২৫] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রীকে, মালিকের বিরুদ্ধে কর্মচারীকে প্ররোচিত করে, ঐ ব্যক্তি আমার দলভুক্ত নয়। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَيْسَ مِنَّا مَنْ خَبَّبَ امْرَأَةً عَلَى زَوْجِهَا أَوْ عَبْدًا عَلَى سَيّده» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসা ও মধুর সম্পর্ক আল্লাহ তা‘আলা স্বয়ং নিজে সৃষ্টি করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ ‘‘আল্লাহর নিদর্শনাবলীর মধ্যে একটি নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গীনীদের সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাকো এবং তিনি তোমাদের (স্বামী-স্ত্রী) পরস্পরের মধ্যে সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করে দিয়েছেন।’’ (সূরা আর্ রূম ৩০ : ২০)
স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের সম্প্রীতি ও মুহববাত এটা আল্লাহ তা‘আলার দেয়া অনুগ্রহ, এই সম্প্রীতি বিনষ্ট করা বা বিনষ্টের চেষ্টা করা ঘৃণিত কাজ।
তথাপি এক শ্রেণীর লোক এই ঘৃণিত কাজে লিপ্ত থাকে। তারা স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রীর কাছে প্রতারণা করে মিথ্যা বানোয়াট বা ভিত্তিহীন কিছু বলে তাদের মধ্যে ফাসাদ সৃষ্টি করে থাকে, অনুরূপ মালিকের বিরুদ্ধে গোলামকে কিছু উষ্কানীমূলক কথা বলে সম্প্রীতির অবনতি ঘটিয়ে থাকে। এরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শের উপরে নেই, তারা তার অনুসারী নয় এবং দলভুক্ত নয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৬৩-[২৬] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সচ্চরিত্রের অধিকারী ও পরিবার-পরিজনের সাথে সদ্ব্যবহারকারী প্রকৃত মু’মিনগণের অন্তর্ভুক্ত। (তিরমিযী)[1]
وَعَن عَائِشَة رَضِي الله عَنهُ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «إِنَّ مِنْ أَكْمَلِ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا وألطفهم بأَهْله» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা : একজন মানুষকে পূর্ণ মু’মিন হতে হলে তাকে অবশ্যই উত্তম চরিত্রের অধিকারী হতে হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের মধ্য থেকে ঐ ব্যক্তি আমার কাছে অধিক প্রিয় যার চরিত্র অধিক ভালো।
নাওয়াস ইবনু সাম্‘আন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নেকী এবং গুনাহের ব্যাপারে প্রশ্ন করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বলেন, নেকী বা সাওয়াব হলো উত্তম চরিত্র...।
অন্য হাদীসে এসেছে, কিয়ামতের দিন উত্তম চরিত্র হবে সবচেয়ে ওযনদার ‘আমল। এজন্যই অত্র হাদীসে বলা হয়েছে, পরিপূর্ণ মু’মিন হলো ঐ ব্যক্তি যে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী।
মু’মিনের আরেকটি গুণ হলো সে হবে সহানুভূতিশীল, দয়ার্দ্র, কোমল ও বিনয়ী। বিশেষ করে তার পরিবার পরিজনের প্রতি অনুগ্রহশীল ও বিনয়ী হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পরিবারের প্রতি ছিলেন অধিক সহানুভূতিশীল। আল্লাহ বলেনঃ ‘‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শের নমুনা’’- (সূরা আল আহযাব ৩৩ : ২১)। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৬৪-[২৭] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রকৃত সচ্চরিত্রবান ব্যক্তিই সর্বোত্তম মু’মিনদের অন্তর্ভুক্ত। আর তোমাদের মধ্যে উত্তম ঐ ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম। (তিরমিযী)[1]
ইমাম তিরমিযী (রহঃ) বলেন, হাদীসটি হাসান ও সহীহ হাদীস। আবূ দাঊদ ’সর্বোত্তম ব্যবহার’ পর্যন্ত বর্ণনা করেছেন।
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ
قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا وَخِيَارُكُمْ خِيَارُكُمْ لِنِسَائِهِمْ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ وَرَوَاهُ أَبُو دَاوُد إِلَى قَوْله «خلقا»
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসের ব্যাখ্যা পূর্বের হাদীসের ব্যাখ্যার অনুরূপ। তবে এখানে অতিরিক্ত বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি উত্তম যে, তার স্ত্রীর কাছে উত্তম’। এর কারণ হলো একজন স্বামীকে তার স্ত্রী যত নিকট থেকে জানতে পারে এবং তার বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ সকল বিষয় যত কিছু জানতে পারে সৃষ্টির মধ্যে পৃথিবীর কেউ এত জানতে পারে না। সুতরাং স্বামীর ভালো হওয়ার সেই সাক্ষ্য প্রকৃতপক্ষেই একজন মানুষের জন্য ভালো হওয়ার সাক্ষ্য ও প্রামাণ্য দলীল। অনুরূপভাবে বিপরীত অর্থাৎ স্ত্রী ভালো হওয়ার ক্ষেত্রে স্বামীর সাক্ষ্যকে ধরা যেতে পারে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
[এখানে আরেকটি কথা জানা থাকা প্রয়োজন, তা হলো এই যে, স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই দীনের পূর্ণ অনুসারী হতে হবে, অন্যথায় দীন শারী‘আতের ধার ধারে না কিন্তু স্ত্রী স্বামীকে ভালো বললেই সে ভালো বলে বিবেচিত হবে না।] (সম্পাদক)
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৬৫-[২৮] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবূক বা হুনায়নের যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তনকালে তাঁর ঘরে (প্রবেশের সময়) পর্দা ঝুলানো দেখতে পেলেন, আর বাতাসে পর্দা দুলতে থাকায় পর্দার অপরদিক দিয়ে ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর খেলনাগুলো দৃষ্টিগোচর হলো। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, হে ’আয়িশাহ্! এগুলো কী? ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বললেন, আমার কন্যাগণ (খেলনা)। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) খেলনাগুলোর মাঝে কাপড়ের দুই ডানাবিশিষ্ট ঘোড়া দেখতে পেয়ে বললেন, এগুলোর মধ্যখানে যা দেখছি, তা কী? ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বললেন, ঘোড়া। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তার উপরে ঐ দু’টি কী? আমি বললাম, দু’টি ডানা। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) (বিস্ময়াভিভূত হয়ে) বললেন, ঘোড়ারও কি আবার দু’টি ডানা হয়? ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বললেন, আপনি কি শুনেননি সুলায়মান (আঃ)-এর ঘোড়ার অনেকগুলো ডানা ছিল। ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেন, এটা শুনে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এত বেশি হেসে উঠলেন যে, আমি তাঁর মাড়ির দাঁতগুলো পর্যন্ত দেখতে পেলাম। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: قَدِمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ غَزْوَة تَبُوك أَو حنين وَفِي سَهْوَتِهَا سِتْرٌ فَهَبَّتْ رِيحٌ فَكَشَفَتْ نَاحِيَةَ السِّتْرِ عَنْ بَنَاتٍ لِعَائِشَةَ لُعَبٍ فَقَالَ: «مَا هَذَا يَا عَائِشَةُ؟» قَالَتْ: بَنَاتِي وَرَأَى بَيْنَهُنَّ فَرَسًا لَهُ جَنَاحَانِ مِنْ رِقَاعٍ فَقَالَ: «مَا هَذَا الَّذِي أَرَى وَسْطَهُنَّ؟» قَالَتْ: فَرَسٌ قَالَ: «وَمَا الَّذِي عَلَيْهِ؟» قَالَتْ: جَنَاحَانِ قَالَ: «فَرَسٌ لَهُ جَنَاحَانِ؟» قَالَتْ: أَمَا سَمِعْتَ أَنَّ لِسُلَيْمَانَ خَيْلًا لَهَا أَجْنِحَةٌ؟ قَالَتْ: فَضَحِكَ حَتَّى رَأَيْتُ نَوَاجِذَهُ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: তাবূক মদীনাহ্ ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী একটি স্থান যা বর্তমান সৌদী ‘আরবের উত্তর পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত একটি শহর। মদীনাহ্ থেকে তার দূরত্ব ৭৭৮ কিঃ মিঃ।
নবম হিজরীর রজব মাসে এ অভিযান প্রেরিত হয়। এ যুদ্ধকে (غَزْوَةُ الْعُسْرَةِ) কষ্টের যুদ্ধ নামেও অভিহিত করা হয়।
হুনায়ন একটি উপত্যকা যা আরবের বিখ্যাত যিলমাযের নিকটবর্তী একটি এলাকা। কেউ কেউ বলেছেন, হুনায়ন হলো মক্কা থেকে তিন রাতের দূরত্বে ত্বায়িফের নিকটবর্তী একটি জলাভূমি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবূকের যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে না হুনায়নের যুদ্ধ থেকে ফিরে দেখেছিলেন, তা বর্ণনাকারীর সন্দেহ থাকায় ‘অথবা’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর ঘরে তার খেলনার সামগ্রী দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করেন, এগুলো কি? তিনি বলেন, এগুলো আমার (খেলার) কন্যা। এই খেলনার মধ্যে কাপড় বা নেকড়া দ্বারা তৈরি পাখা বিশিষ্ট একটি ঘোড়াও ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ঘোড়ার আবার পাখা হয় নাকি? উত্তরে ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বললেন, আপনি কি শোনেননি নাবী সুলায়মান (আঃ)-এর ঘোড়ার অনেকগুলো পাখা ছিল? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা শুনে খুব হাসলেন, এমনকি হাসির কারণে তার মাড়ীর শেষ দু’টি দাঁত প্রকাশ হয়ে গেলো।
বিভিন্ন খেলনা সামগ্রী দ্বারা খেলা করা ‘আরব মেয়েদের প্রাচীন ঐতিহ্য। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) ছোটকালে ‘আরব ঐতিহ্যের ভিত্তিতেই নানা জাতীয় খেলনা দিয়ে অন্যান্য মেয়েদের সাথে খেলাধূলা করতেন যা বিভিন্ন সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। বয়স হলেও হয় তো ঐ সমস্ত খেলনা সামগ্রী তার ঘরে রয়েই গিয়েছিল যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখেছিলেন। যেমন আজকালও অনেকে শিশুকালের খেলনা সামগ্রী শোকেইসে সংরক্ষণ করে রেখে থাকে।
ইবনুল মালিক বলেনঃ প্রাণীর প্রতিকৃতি দ্বারা খেলার প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অস্বীকৃতি না থাকা এবং তার ঘরে ঐ খেলনা অবশিষ্ট থাকা প্রমাণ করে যে, এ ঘটনা তা হারাম হওয়ার পূর্বের ঘটনা। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৬৬-[২৯] কায়স ইবনু সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি (ইরাকে অবস্থিত, কূফার সন্নিকটবর্তী) ’হীরা’ শহরে গিয়ে দেখতে পেলাম যে, তারা তাদের নেতাকে সম্মানার্থে সিজদা করছে। এটা দেখে আমি মনে মনে বললাম, নিশ্চয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই সিজদা পাওয়ার সর্বাধিক উপযুক্ত। অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললাম, আমি হীরা’র সফরে দেখতে পেলাম যে, সেখানকার অধিবাসীরা তাদের নেতাকে সিজদা করে। আমি স্থির করেছি যে, আপনিই সাজদার অধিক হকদার। এ কথা শুনে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, (তবে কি আমার মৃত্যুর পরে) তুমি আমার কবরের সম্মুখ দিয়ে গমনকালে কবরকে সিজদা করবে? উত্তরে আমি বললাম, (নিশ্চয়) না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, না, (কস্মিনকালেও) করো না। কেননা আমি যদি (আল্লাহ ব্যতিরেকে) অপর কাউকে সিজদা করতে বলতাম তবে স্বামীদের জন্য রমণীদেরকে সিজদা করার নির্দেশ করতাম। (আবূ দাঊদ)[1]
عَنْ قَيْسِ بْنِ سَعْدٍ قَالَ: أَتَيْتُ الْحِيرَةَ فَرَأَيْتُهُمْ يَسْجُدُونَ لِمَرْزُبَانٍ لَهُمْ فَقُلْتُ: لَرَسُولُ اللَّهِ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم أَحَق أَن يسْجد لَهُ فَأَتَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقُلْتُ: إِنِّي أَتَيْتُ الْحِيرَةَ فَرَأَيْتُهُمْ يَسْجُدُونَ لِمَرْزُبَانٍ لَهُمْ فَأَنْتَ أَحَقُّ بِأَنْ يُسْجَدَ لَكَ فَقَالَ لِي: «أَرَأَيْتَ لَوْ مَرَرْتَ بِقَبْرِى أَكُنْتَ تَسْجُدُ لَهُ؟» فَقُلْتُ: لَا فَقَالَ: «لَا تَفْعَلُوا لَو كنت آمُر أحد أَنْ يَسْجُدَ لِأَحَدٍ لَأَمَرْتُ النِّسَاءَ أَنْ يَسْجُدْنَ لِأَزْوَاجِهِنَّ لِمَا جَعَلَ اللَّهُ لَهُمْ عَلَيْهِنَّ مِنْ حق» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: হীরাত ইরাকের কুফা নগরীর উপকণ্ঠে একটি প্রাচীন শহর। এখানকার লোকের তাদের সমাজের প্রধান ও বড় বড় বীর বাহাদুরকে সিজদা করে সম্মান প্রদর্শন করতো। হাদীসের বর্ণনাকারী কয়স (রহঃ) এগুলো স্বচক্ষে দর্শন করে মনে মনে ভাবেন আমাদের নেতা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের এই সিজদা পাওয়ার বেশি হকদার; সুতরাং আমরা মদীনাহ্ পৌঁছে তাকেও সিজদা করবো। সফর থেকে ফিরে এসে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট তার মনের ইচ্ছা ব্যক্ত করে বলেন, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমরা কি আপনাকে সিজদা করবো না?
সিজদা যেহেতু কারো সম্মান ও দাসত্ব প্রকাশের জন্য করা হয়ে থাকে। আর এই দাসত্ব একমাত্র আল্লাহর জন্যই স্বীকৃত অন্যের জন্য নয়, সুতরাং (এই দাসত্ব ও সম্মানের) সিজদা ও আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য স্বীকৃত নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, হে কায়স! আমার মৃত্যুর পর তুমি যদি আমার কবরের পাশ দিয়ে যাও তবে কি ঐ কবরকে বা ঐ কবরবাসীকে সিজদা করবে? সাহাবী উত্তরে বললেন, না তা করবো না, সাহাবীর এই না বলার পরও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, না তোমরা তা কখনো করো না; আমার মৃত্যুর পর যেমন আমার কবরকে সিজদা করবে না ঠিক তেমনি আমার জীবদ্দশায়ও আমাকে সিজদা করবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঐ নিষেধাজ্ঞা ঐ সাহাবীর জন্য যেমন ছিল ঠিক তেমনি সর্বকালের সকল উম্মাতের জন্য প্রযোজ্য। আল্লাহ তা‘আলার বাণী : ‘‘তোমরা সূর্যকে সিজদা করো না, চন্দ্রকেও না, আল্লাহকে সিজদা করো, যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন, যদি একান্ত তার ‘ইবাদাত করো।’’ (সূরা হা-মীম আস্ সিজদা ৪১ : ৩৭)
এ আয়াতে কারীমার ব্যাখ্যায় ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ ‘‘তোমরা সিজদা করো ঐ সত্বাকে যিনি চিরঞ্জীব, যার মৃত্যু নেই, আর যার রাজত্বের পতন ঘটে না।’’ আজ তোমরা আমার সম্মান ও বড়ত্বের কারণে আমাকে সিজদা দিবে কাল যখন আমি মৃত্যুবরণ করবো এবং কবরে সমাহিত হবো তখন কি করবে? ধ্বংসশীল ও মরণশীল কোনো কিছুকেই সাজদায় দেয়া যাবে না। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নারী জাতির ওপর স্বামীর অধিকার বা হাকের কথা উল্লেখ করে বলেন, আল্লাহ ছাড়া কাউকে সিজদা দেয়া যদি বৈধ হতো তাহলে নারী জাতিকে নির্দেশ করতাম যে, তারা যেন তাদের স্বামীদেরকে সিজদা করে। আল্লাহ ছাড়া অন্যকে সিজদা বৈধ নয়, তাই নারীকেও তার স্বামীদের সাজদার হুকুম করা হয়নি। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
[পীর বা পীরের কবরে সিজদা দানকারীদের এ হাদীস থেকে শিক্ষাগ্রহণ করা উচিত] (সম্পাদক)
পরিচ্ছেদঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৬৭-[৩০] আর আহমাদ মু’আয ইবনু জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন।[1]
وَرَوَاهُ أَحْمد عَن معَاذ بن جبل
ব্যাখ্যা: এ হাদীসের ব্যাখ্যা পূর্বের হাদীসের অনুরূপ। এ হাদীসটি জামি‘ আত্ তিরমিযীতে আবূ হুরায়রাহ্ থেকে, মুসনাদ আহমাদে মু‘আয ইবনু জাবাল থেকে এবং হাকিম বুরায়দাহ্ থেকে বর্ণিত হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৬৮-[৩১] ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ স্বামী স্বীয় স্ত্রীকে (প্রয়োজনসাপেক্ষে) প্রহার করলে (কিয়ামত দিবসে) জিজ্ঞাসিত হবে না। (আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا يُسْأَلُ الرَّجُلُ فِيمَا ضَرَبَ امْرَأَتَهُ عَلَيْهِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: স্ত্রীকে প্রহার করার বৈধতা সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ পূর্বের হাদীসে অতিবাহিত হয়েছে। পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীসের ভিত্তিতে ইসলামী সীমারেখার মধ্য থেকে প্রয়োজনে স্ত্রীকে সামান্য প্রহার করার বৈধতা বিদ্যমান রয়েছে। স্ত্রীকে দীন ও আদব শিক্ষা দেয়ার জন্য, শারী‘আতের বিধান লঙ্ঘনের কারণে প্রহার করা বৈধ। তবে এই প্রহারের অবশ্যই মুখমণ্ডল ও স্পর্শকাতর কোনো অঙ্গে প্রহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। অমানুষিক নির্যাতন করা যাবে না, অঙ্গহানি ঘটে এমন প্রহার করা চলবে না। এ জাতীয় শত স্ত্রীকে প্রহারের জন্য কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে স্বামীকে জওয়াবদিহী করতে হবে না। এ ধরনের হালকা প্রহারের দরুন দুনিয়ার আদালতেও তার বিরুদ্ধে বিচার প্রার্থনা করা যাবে না।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ অত্র হাদীসের মধ্যে উল্লেখিত عَلَيْهِ শব্দের «ه» সর্বনামটি পূর্বে উল্লেখিত «مَا» এর দিকে ফিরেছে, এটা النُّشُوزِ এর অর্থ বহনকারী যা কুরআনে উল্লেখ হয়েছে যেমন: وَاللَّاتِىْ تَخَافُونَ نُشُوْزَهُنَّ ‘‘আর যাদের অবাধ্যতার আশংকা করো’’- (সূরা আন্ নিসা ৪ : ৩৪)। এই نُشُوزِ বা অবাধ্যতার কারণে তাদের নাসীহাত করতে হবে, তাতে সংশোধন না হলে তাদের বিছানা ত্যাগ করতে হবে এতেও সংশোধন না হলে, বলা হয়েছে: وَاضْرِبُوهُنَّ আর তাদের প্রহার করো।’ [এ প্রহার কি পরিমাণ হবে পূর্বে তা অতিবাহিত হয়েছে] (সম্পাদক)
সুতরাং স্ত্রীর মধ্যে نُشُوزِ বা অবাধ্যচারিতা পাওয়া গেলে স্বামী তার সংশোধনের চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রহার করতে পারবেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৬৯-[৩২] আবূ সা’ঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ছিলাম, এমন সময়ে জনৈকা রমণী এসে বলল, যখন আমি সালাত আদায় করি তখন আমার স্বামী সফ্ওয়ান ইবনু মু’আত্ত্বল আমাকে প্রহার করে, আমি যখন সওম পালন করি তখন সওম ভেঙ্গে দেয় এবং তিনি সূর্যোদয়ের পূর্বে ফজরের সালাত আদায় করে না। রাবী বলেন, সফ্ওয়ানও সেখানে উপস্থিত ছিলেন, তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) (অভিযোগের সত্যতা) তাকে জিজ্ঞেস করলে সে বলল, হে আল্লাহর রসূল! তার অভিযোগ হলো সালাত আদায়কালে আমি তাকে প্রহার করি- এর উত্তর হলো, সে সালাতে দু’টি (বা দীর্ঘ) সূরা পাঠ করে, যা আমি তাকে নিষেধ করেছি।
রাবী বলেন, এটা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, একটি সূরাই তো লোকেদের জন্য যথেষ্ট। আর তার (পরবর্তী) অভিযোগ- আমি তাকে সওম ভাঙ্গতে বাধ্য করি। অথচ (একাধারে সওম পালনে) এত ধৈর্য ধারণ করতে পারি না, আমি তো একজন যুবক পুরুষ। এটা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কোনো স্ত্রীলোক যেন স্বামীর অনুমতি ব্যতীত (নফল) সওম পালন না করে। আর তার (শেষ) অভিযোগ- সূর্যোদয়ের পূর্বে ফজরের সালাত আদায় করি না। এর কারণ হলো, আমাদের পরিবারের লোকেরা দীর্ঘ রাত পর্যন্ত জেগে (জমির পানি নিষ্কাশনে লিপ্ত) থাকার দরুন প্রায়ই সূর্যোদয়ের (সঠিক সময়ের) পূর্বে ঘুম হতে উঠতে পারি না। এ কথা শুনে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, হে সফ্ওয়ান! যখনই ঘুম হতে জাগবে তখনই সালাত আদায় করবে। (আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ: جَاءَتِ امْرَأَةٌ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَنَحْنُ عِنْده فَقَالَت: زَوْجِي صَفْوَانُ بْنُ الْمُعَطَّلِ يَضْرِبُنِي إِذَا صَلَّيْتُ وَيُفَطِّرُنِي إِذَا صُمْتُ وَلَا يُصَلِّي الْفَجْرَ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ قَالَ: وَصَفْوَانُ عِنْدَهُ قَالَ: فَسَأَلَهُ عَمَّا قَالَت فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَمَّا قَوْلُهَا: يَضْرِبُنِي إِذَا صَلَّيْتُ فَإِنَّهَا تَقْرَأُ بِسُورَتَيْنِ وَقَدْ نَهَيْتُهَا قَالَ: فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَوْ كَانَتْ سُورَةً وَاحِدَةً لَكَفَتِ النَّاسَ» . قَالَ: وَأَمَّا قَوْلُهَا يُفَطِّرُنِي إِذَا صُمْتُ فَإِنَّهَا تَنْطَلِقُ تَصُوم وَأَنا رجل شَاب فَلَا أَصْبِر فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تَصُومُ امْرَأَةٌ إِلَّا بِإِذْنِ زَوْجِهَا» وَأَمَّا قَوْلُهَا: إِنِّي لَا أُصَلِّي حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ فَإنَّا أهل بَيت قد عرف لنا ذَاك لَا نَكَادُ نَسْتَيْقِظُ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ قَالَ: «فَإِذَا اسْتَيْقَظْتَ يَا صَفْوَانُ فَصَلِّ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: মহিলার অভিযোগ যে, আমার স্বামী সফ্ওয়ান ইবনু মু‘আত্ত্বল সালাত আদায় করলে আমাকে মারে এবং সওম (রোযা) পালন করলে আমার সওম ভেঙ্গে দেয়। অর্থাৎ সে দিনের বেলায় জৈবিক চাহিদা পূরণ করতে আমাকে সওম ভাঙ্গতে বাধ্য করে বা সওম নষ্ট করে দেয়। সূর্য উদয়ের পূর্বে সে ফজরের সালাত আদায় করে না, এটা হাকীকাতেই বা প্রকৃত অর্থেই হতে পারে অথবা কোনো মতে সূর্য উদয়ের পূর্বে আদায়কে মুবালাগাতান বা আধিক্যভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, সূর্য উদয়ের আগে ফযর সালাত আদায় করে না। অভিযোগকারিণী মহিলার স্বামী সফ্ওয়ান সেখানেই উপস্থিত ছিলেন, আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবার সফ্ওয়ান -কে তার বক্তব্য কি তা পেশ করতে বললেন। সফ্ওয়ান তার প্রতিটি অভিযোগ স্বীকার করলেন। অতঃপর তার কারণ উল্লেখ করে বললেন, সে রাতে বড় বড় সূরা দিয়ে সালাত আদায় করে, দিনে প্রত্যহ নফল সওম পালন করে- আমি যুবক মানুষ, দিনের বেলায়ও তার সাথে মেলামেশা করতে পারি না, রাতেও পারি না। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মানুষ যদি একটি সূরা পাঠ করতো যথেষ্ট হতো। সালাতের জন্য এটাই যথেষ্ট হতো।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ এর অর্থ হলো যদি শুধু একটি সূরা অর্থাৎ ফাতিহাই পাঠ করতো তা যথেষ্ট হতো।
সওমের ব্যাপারেও তিনি ঘোষণা করলেন, কোনো মহিলা স্বামীর অনুমতি ছাড়া নফল সওম পালন করতে পারবে না। লোকটি ফজরের সালাত বিলম্বে আদায়ের কারণ বর্ণনা করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে সফ্ওয়ান! তুমি যখনই জাগবে সালাত আদায় করে নিবে।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ সফ্ওয়ান-এর ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ওযর গ্রহণ করেছেন, আর স্ত্রীর ত্রুটি না থাকা সত্ত্বেও তার ওযর গ্রহণ করেননি। এটা পুরুষের অধিক হক নারীর ওপর তা অবহিত করার জন্য। (‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২৪৫৬; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৭০-[৩৩] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাজির ও আনসারগণের মাঝে উপস্থিত ছিলেন। তখন একটি উট এসে তাঁকে সিজদা করল। এটা দেখে সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনাকে জীব-জন্তু, গাছপালা সিজদা করে, সুতরাং আপনাকে সিজদা করা আমরা বেশী হকদার। এতে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমরা তোমাদের রবে্র ’ইবাদাত (সিজদা) কর এবং তোমাদের ভাইকে (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে যথাযোগ্য) সম্মান কর। আমি যদি (দুনিয়াতে) কারো প্রতি সিজদা করতে নির্দেশ দিতাম, তাহলে স্ত্রীকে তার স্বামীর প্রতি সিজদা করার অনুমতি দিতাম। স্বামী যদি স্ত্রীকে (ন্যায়সঙ্গত ও প্রয়োজনে) হলুদ বর্ণের পর্বত হতে কালো বর্ণের পর্বতে এবং কালো বর্ণের পর্বত হতে সাদা বর্ণের পর্বতে পাথর স্থানান্তরের নির্দেশ করে, তবে তার দায়িত্বনিষ্ঠার সাথে তা পালন করা। (আহমাদ)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ فِي نَفَرٍ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ فَجَاءَ بِعِيرٌ فَسَجَدَ لَهُ فَقَالَ أَصْحَابُهُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ تَسْجُدُ لَكَ الْبَهَائِمُ وَالشَّجَرُ فَنَحْنُ أَحَقُّ أَنْ نَسْجُدَ لَكَ. فَقَالَ: «اعْبُدُوا رَبَّكُمْ وَأَكْرِمُوا أَخَاكُمْ وَلَوْ كُنْتُ آمُرُ أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِأَحَدٍ لَأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا وَلَوْ أَمَرَهَا أَنْ تَنْقُلَ مِنْ جَبَلٍ أَصْفَرَ إِلَى جَبَلٍ أَسْوَدَ وَمِنْ جَبَلٍ أَسْوَدَ إِلَى جَبَلٍ أَبْيَضَ كَانَ يَنْبَغِي لَهَا أَن تَفْعَلهُ» . رَوَاهُ أَحْمد
ব্যাখ্যা: বিভিন্ন বর্ণনা থেকেই জানা যায় যে, পাথর বৃক্ষাদি এবং চতুস্পদ প্রাণী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সিজদা করতো। এমনি একটি ঘটনা প্রত্যক্ষ করে সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! চতুষ্পদ প্রাণী এবং বৃক্ষাদি আপনাকে সিজদা করছে আর আমরা করছি না? অথচ পিতা-মাতার আদাব-শিষ্টাচার শিক্ষা দানের চেয়ে নবূওয়াতী দীন শিক্ষা দানের শুকরিয়া ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ক্ষেত্রে আপনি অধিক হকদার। সুতরাং এজন্য কি আমরা আপনাকে সিজদা করবো না? উত্তরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘ইবাদাত করবে আল্লাহর, অর্থাৎ ‘ইবাদাতের চূড়ান্ত এবং সর্বোচ্চ অবস্থা হলো সিজদা প্রদান করা, সুতরাং তা খাস একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত, অন্য কারো জন্যই তা প্রযোজ্য নয়।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমার ভাইকে সম্মান করবে, অর্থাৎ তাকে অন্তরে ভালোবাসবে এবং তার কথা মেনে চলবে। এর অর্থ হলো তোমরা তোমাদের নাবীর আনুগত্য করবে এবং তাঁর কথা মেনে চলবে, আর তাঁর নিষেধাজ্ঞা থেকে দূরে থাকবে। তাঁর এ অধিকার নেই যে, লোকে তাঁকে সিজদা করবে।
এতে আল্লাহ তা‘আলার এই বাণীর প্রতি ইশারা রয়েছে : ‘‘কোনো মানুষ যাকে আল্লাহ তা‘আলা কিতাব, রাজত্ব ও নবূওয়াত দান করেছেন, তার এ অধিকার নেই যে, সে লোকেদেরকে বলবে, তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমার ‘আব্দ বা বান্দা হয়ে যাও; বরং তোমরা সকলেই আল্লাহওয়ালা হয়ে যাও’’- (সূরা আ-লি ‘ইমরান ৩ : ৭৯)। আল্লাহর এ বাণীর দিকেও ইঙ্গিত রয়েছে : ‘‘তুমি আমাকে যা নির্দেশ করেছো তা ছাড়া আমি তাদের (উম্মাতদের) কিছুই বলিনি, (যা বলেছি তা হলো) তোমরা ঐ আল্লাহর ‘ইবাদাত করো যিনি আমার রব এবং তোমাদের রব।’’ (সূরা আল মায়িদাহ্ ৫ : ১১৭)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে উটের সিজদা করার ঘটনাবলী ছিল আদত পরিপন্থী ব্যতিক্রম ঘটনা যা আল্লাহর নির্দেশক্রমে সংঘটিত হয়েছিল। ঐ কাজের মধ্যে আল্লাহর রসূলের কোনো ক্ষমতা বা হাত ছিল না। উটও নিজস্ব ইচ্ছায় সিজদা করেনি বরং আল্লাহর আদেশ পালনে বাধ্য হয়েছিল, যেমন মালায়িকার (ফেরেশতাগণের) প্রতি আদামকে সিজদা দানের নির্দেশ হয়েছিল। অতঃপর তারা সিজদা করেছিল।
স্বামীর আনুগত্য ওয়াজিব হওয়া অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে বুঝানোর জন্য সিজদা দেয়ার দৃষ্টান্ত পেশ করা হয়েছে। এ দৃষ্টান্ত মুবালাগাহ্ বা অতিরঞ্জন হিসেবে বলা হয়েছে। স্বামী যদি স্ত্রীকে এক পাহাড়ের পাথর অন্য পাহাড়ে নেয়ার মতো কষ্টকর কাজের নির্দেশও করে তবু তা পালন করা উচিত।
দুই রংয়ের দু’টি পাহাড়ের কথা পূর্ণ মুবালাগাহ্ হিসেবে বলা হয়েছে। কেননা সাদা কালো দু’টি পাহাড় পাশাপাশি পাওয়া যাবে না। পাওয়া গেলেও হয় তো একটি থেকে অন্যটি হবে অনেক দূরে, ঐ এক পাহাড় থেকে অন্যটিতে পাথর স্থানান্তরিত করা হবে ভীষণ কষ্টকর কাজ। স্বামী যদি তাও নির্দেশ করে স্ত্রীকে তাই পালন করতে হবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৭১-[৩৪] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তিন লোকের সালাত গৃহীত হয় না এবং তাদের নেক আ’মাল ঊর্ধ্বাকাশে পৌঁছায় না। (প্রথমত) পলাতক ক্রীতদাস- যতক্ষণ পর্যন্ত না সে মালিকের কাছে ফিরে আসে। (দ্বিতীয়ত) সে স্ত্রী- যার প্রতি তার স্বামী অসন্তুষ্ট, যতক্ষণ পর্যন্ত না তার স্বামী মনোতুষ্ট হয়। (তৃতীয়ত) মদ্যাসক্ত ব্যক্তি- যতক্ষণ পর্যন্ত না তার হুঁশ ফিরে আসে। (বায়হাক্বী- শু’আবুল ঈমান)[1]
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «ثَلَاثَةٌ لَا تُقْبَلُ لَهُمْ صَلَاةٌ وَلَا تَصْعَدُ لَهُمْ حَسَنَةٌ الْعَبْدُ الْآبِقُ حَتَّى يَرْجِعَ إِلَى مَوَالِيهِ فَيَضَعَ يَدَهُ فِي أَيْدِيهِمْ وَالْمَرْأَةُ السَّاخِطُ عَلَيْهَا زَوْجُهَا وَالسَّكْرَانُ حَتَّى يصحو» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيّ فِي شعب الْإِيمَان
ব্যাখ্যা : তিন ব্যক্তি বলতে তিন শ্রেণীর মানুষ বা তিন প্রকৃতি ও বর্ণের মানুষ, এতে নারী পুরুষের কোনো ভেদাভেদ নেই। তাদের সালাত কবুল করা হবে না। এর অর্থ পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করা হবে না।
لَا تَصْعَدُ এটি فعل الْمُضَارَعَةِ এর চিহ্ন ي বর্ণে যবর এবং পেশ উভয় যোগে পাঠ করা যায় এতে কর্ম ও কর্তৃবাচ্য হিসেবে অর্থের পার্থক্য বুঝে নিতে হবে।
«لَا تَصْعَدُ لَهُمْ حَسَنَةٌ» তাদের নেক ‘আমল উপরে উঠবে না’ বা তাদের নেকী উপরে উঠানো হবে না, উপরের অর্থ হলো আল্লাহর নিকটে উঠানো। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ ‘‘তাঁরই দিকে উত্থিত হয় পবিত্র কথাগুলো আর সৎকাজ সেগুলোকে উচ্চে তুলে ধরে।’’ (সূরা আল ফা-ত্বির ৩৫ : ১০)
অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, অর্থাৎ তাদের নেক ‘আমল আসমানে উঠানো হবে না। তিন ব্যক্তি বা তিন শ্রেণীর মধ্যে একজন হলো গোলাম বা দাস যে তার মুনীব বা মালিক থেকে পালিয়ে যায়। দাস প্রথা বর্তমানে নেই, সুতরাং এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা বর্জন করা হলো।
দ্বিতীয় ব্যক্তি হলো ঐ মহিলা যার স্বামী তার ওপর অসন্তুষ্ট। এ মহিলার স্বামী সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত তার কোনো ‘ইবাদাত আল্লাহর কাছে পৌঁছবে না, অর্থাৎ আল্লাহ তা গ্রহণ করবেন না। তৃতীয় হলো নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি, নেশার ঘোর থেকে ফিরে তাওবাহ্ না করা পর্যন্ত আল্লাহর দরবারে তার নেক ‘আমল কবুল হবে না। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৭২-[৩৫] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো যে, কোন্ রমণী সর্বোত্তম? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, যে স্বামী স্ত্রীর প্রতি তাকালে তাকে সন্তুষ্ট করে দেয়, স্বামী কোনো নির্দেশ করলে তা (যথাযথভাবে) পালন করে এবং নিজের প্রয়োজনে ও ধন-সম্পদের ব্যাপারে স্বামীর ইচ্ছার বিরুদ্ধাচরণ করে না। (নাসায়ী ও বায়হাক্বী- শু’আবুল ঈমানে)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قِيلَ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَيْ النِّسَاءِ خَيْرٌ؟ قَالَ: «الَّتِي تَسُرُّهُ إِذَا نَظَرَ وَتُطِيعُهُ إِذَا أَمَرَ وَلَا تُخَالِفُهُ فِي نَفْسِهَا وَلَا مَالِهَا بِمَا يَكْرَهُ» . رَوَاهُ النَّسَائِيُّ وَالْبَيْهَقِيُّ فِي شُعَبِ الْإِيمَان
ব্যাখ্যা: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে উত্তম নারীর গুণাবলী বর্ণনা করেছেন। ইসলামের মৌলিক ‘ইবাদাত বন্দেগী যথাযথ পালন সত্ত্বেও অনেক নারী স্বামী সোহাগিনী হতে পারে না। অনেকে স্বামীর অবাধ্য না হলেও আদেশ পালনে যত্নবান ও তৎপর নয়। কেউ বা আবার স্বামীর সম্পদ রক্ষণে দায়িত্বশীল নয়। অনেক সাহাবীর প্রশ্নের প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ
(১) উত্তম নারী হলো সে, যে তার স্বামীকে আনন্দিত করে সে যখন তার দিকে তাকায়। এর অর্থ হলো : সে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি হয়ে হাস্যোজ্জ্বল কমনীয় চেহারায় বিনম্রপদে স্বামীর সামনে আসে। মধুমাখা মিষ্টি ভাষায় তার সাথে কথা বলে। তার দিকে তাকিয়ে তার কথা শুনে স্বামী আনন্দিত হয়। (২) ‘সে তার স্বামী কোনো আদেশ করলে তা পালন করে।’ এই আদেশ আল্লাহর নাফরমানী এবং পাপমূলক আদেশ হওয়া চলবে না এবং শারী‘আতের আওতা বহির্ভূত হতে পারবে না। (৩) ‘সে তার নিজের জীবন এবং স্বামীর সম্পদের ব্যাপারে এমন কিছু করবে না যা তার স্বামী অপছন্দ করে।’ অর্থাৎ সে নারী তার স্বামীর সম্পদের পূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণকারী হবে, স্বামীর মাল-সম্পদ তার দ্বারা খোয়া যাবে না। স্বামীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে খরচ করবে না এবং তার খিয়ানাত করবে না। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৭৩-[৩৬] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যাকে চারটি নি’আমাত দান করা হয়েছে, তাকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করা হয়েছে- ১- শুকরগুজার অন্তর, ২- জিকির-আযকারে রত জিহবা, ৩- বিপদাপদে ধৈর্যশীল শরীর, ৪- নিজের (ইজ্জত-আব্রু) ও স্বামীর ধন-সম্পদে আমানতদারিতায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ স্ত্রী। (বায়হাক্বী- শু’আবুল ঈমান)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسلم قَالَ: أَربع من أعطيهن فقد أعطي خير الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ: قَلْبٌ شَاكِرٌ وَلِسَانٌ ذَاكِرٌ وَبَدَنٌ عَلَى الْبَلَاءِ صَابِرٌ وَزَوْجَةٌ لَا تَبْغِيهِ خَوْنًا فِي نَفسهَا وَلَا مَاله . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيّ فِي شعب الْإِيمَان
ব্যাখ্যা: আমাদের জীবন ধারণের জন্য যা কিছু ব্যবহার করি সবকিছুই আল্লাহর নি‘আমাত। মানুষ যদি এ নি‘আমাতসমূহ ব্যবহার করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে পারে এবং বিপদে ধৈর্য ধারণ করতে পারে তবে উভয় জগতেই সে সার্থক। এসব নি‘আমাতরাজির মধ্যে ঐ নি‘আমাত আরো শ্রেষ্ঠ নি‘আমাত যার বিনিময়ে আখিরাতে সে আল্লাহর নৈকট্য লাভে ধন্য হবে। এ জাতীয় নি‘আমাতের মধ্যে এখানে চারটি নি‘আমাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
(১) কৃতজ্ঞ অন্তরঃ অর্থাৎ আল্লাহর নি‘আমাত পেয়ে যে হৃদয় তাঁর শুকরিয়া আদায় করতে পারে এমন হৃদয় আল্লাহ যাকে দান করেছেন সে দুই জগতেরই মহা কল্যাণ লাভ করেছে।
(২) জিকিরকারী জিহবাঃ অর্থাৎ আল্লাহ যাকে তার জিকির আদায়কারী রসনা দান করেছেন সে প্রকাশ্যে গোপনে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং যিক্রের মাধ্যমে সে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে ধন্য হয়, এমন ব্যক্তি দুনিয়া ও আখিরাতের প্রকৃত কল্যাণ হাসিল করেছেন।
(৩) বিপদে ধৈর্যশীল শরীরঃ এর অর্থ আল্লাহ তা‘আলা যাকে এমন শরীর দান করেছেন যে শরীর সাংসারিক কষ্ট-ক্লেশের পরও ‘ইবাদাতে ধৈর্যশীল থাকে, রোগ-ব্যাধি, শোক, বিপদ-মুসীবাত ইত্যাদি ধৈর্যের সাথে সহ্য করে এবং তাতে আল্লাহকে ভুলে যায় না।
(৪) এমন স্ত্রী, যে নিজের ব্যাপারে এবং স্বামীর ধন-সম্পদের ব্যাপারে খিয়ানাতের চেষ্টা করে না। অর্থাৎ নিজের ইজ্জত-আব্রু এবং স্বামীর মাল-সম্পদ হিফাযাতে সে সংকল্পবদ্ধ।
এই চারটি নি‘আমাত আল্লাহ যাকে দান করেছেন তাকে দুনিয়া আখিরাতের শ্রেষ্ঠ নি‘আমাত দান করেছেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১১. প্রথম অনুচ্ছেদ - খুল্‘ই (খুলা‘ তালাক) ও তালাক প্রসঙ্গে
খুলা’ শব্দটি ’আরবী خُلْعُِ الثوب থেকে নেয়া হয়েছে, ’আরবেরা এ কথা তখনই বলে اذا ازاله যখন কাপড় খুলে ফেলানো হয়। কেননা নারী পুরুষের পোষাক স্বরূপ, অনুরূপ পুরুষও নারীর পোষাক স্বরূপ। আল্লাহর বাণী : ’’স্ত্রীগণ তোমাদের পোষাক স্বরূপ তোমরাও তাদের পোষাক।’’ (সূরা আল বাকারাহ্ ২ : ১৮৭)
ইসলামের পরিভাষায় মহিলা তার স্বামীর নিকট থেকে কোনো কিছুর (মোহরের) বিনিময়ে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নেয়াকে খুলা’ বলা হয়।
কুরআন ও সহীহ হাদীসে খুলা’ করার বৈধতা রয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ ’’অতঃপর যদি তোমাদের ভয় হয় যে, তারা উভয়েই আল্লাহর নির্দেশ বজায় রাখতে পারবে না, তাহলে সেক্ষেত্রে স্ত্রী যদি কিছু বিনিময় দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় তবে উভয়ের কারো পাপ হবে না।’’ (সূরা আল বাকারহ্ ২ : ১২৯)
নিম্নের বিশুদ্ধ হাদীসটিসহ একাধিক বিশুদ্ধ হাদীসও খুলা’ বৈধ হওয়ার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। খুলা’ তালাক কিনা? এ নিয়ে ফুকাহায়ে কিরামের মাঝে ইখতিলাফ বিদ্যমান।
ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-সহ কতিপয় ইমামের মতে খুলা’ তালাক। পক্ষান্তরে ইমাম আহমাদসহ আরো কতিপয় ফকীহরে মতে খুলা’ তালাক নয়। বরং ’ফাস্খে নিকাহ’ বা বিবাহ বাতিল করা। পূর্বে উল্লেখিত আভিধানিক অর্থের দিকে লক্ষ্য রেখেও বলা যায়। খুলা’ হলো বিবাহ খুলে ফেলানো।
মিশকাতের আধুনিক ভাষ্যগ্রন্থ আনোয়ারুল মিশকাতের ব্যাখ্যাকার ইমাম আহমাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, তিনি বলেছেন, খুলা’ তালাক নয়, বরং ’বিচ্ছেদ।’ কেননা আল্লাহর কালামে বলা হয়েছে- অর্থাৎ ’’তালাক দু’বার ..., অতঃপর সে যদি তালাক দেয়’’- (সূরা আত্ব তালাক ৬৫ : ২৯-৩০)। এ শেষ বাক্যের পূর্বে খুলা’র কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এতে বুঝা যায় যে, খুলা’ তালাক নয়। কেননা প্রথমে ২ তালাক, খুলা’কে যদি তালাক ধরা হয় তাহলে সেটা এক তালাক, পরের বাক্যে (এক) তালাক উল্লেখ হয়েছে, এতে মোট ৪ তালাক হয়। অথচ এটা কারো কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়। সুতরাং খুলা’ তালাক নয় বরং ’ফাসখে নিকাহ’ বা বিবাহ ভঙ্গ মাত্র। অবশ্য খুলা’কে ত্বলাক (তালাক)ের বর্ণনার মধ্যেই উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র।
তালাক ও তাহলীল গ্রন্থকার হাফিয ইবনু কইয়িম-এর বরাত দিয়ে লিখেছেন, তিনি বলেন, খুলা’ যে তালাক নয়, তার প্রমাণ হলো ত্বলাক (তালাক)ের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা’আলা যে তিনটি বিধানের কথা বলেছেন, যেগুলোর সব কটি খুলা’তে পাওয়া যায় না। সে তিনটি নিম্নরূপ :
(১) ত্বলাক (তালাক)ে রজ্’ই-এর পর স্বামী তার স্ত্রীকে ’ইদ্দাতের মধ্যে বিনা বিবাহ ও (বিনা বাধায়) ফিরিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু খুলা’ হলে স্ত্রীর সম্মতি ব্যতীত তা পারবে না।
(২) ’তালাক’ তিন পর্যন্ত সীমিত। তালাক সংখ্যা পূর্ণ হয়ে গেলে স্ত্রীর অন্য স্বামীর সাথে বিবাহ ও মিলন না হওয়া পর্যন্ত প্রথম স্বামী তাকে ফিরিয়ে নিতে পারবে না। কিন্তু খুলা’য় স্ত্রীকে অপর কারো সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ না হয়েই প্রথম স্বামীর কাছে নতুন বিবাহের মাধ্যমে ফিরে যেতে পারবে।
(৩) খুলা’র ’ইদ্দত হলো এক ঋতু। পক্ষান্তরে সহবাসকৃত স্ত্রীর ’ইদ্দত হলো তিন তুহর।
(’তালাক ও তাহলীল’ ১১-১২ পৃঃ, ড. আসাদুল্লাহ আল গালীব)
এ ছাড়াও ঋতুকালে কিংবা পবিত্রকালে, ঋতু পরবর্তী সহবাসকৃত কিংবা সহবাসহীন, সকল অবস্থায়ই খুলা’ করতে পারে, কিন্তু ঋতুকালে তালাক দেয়ার বিধান নেই। অনুরূপ ঋতুর পর সহবাসের পূর্বে তালাক দিতে হবে সহবাসের পরে নয়।
স্বামী স্ত্রী উভয়ের যদি দাম্পত্য জীবন মনোমালিন্য, অসহনীয় এবং অপছন্দনীয় হয়; স্বামী যদি বিচ্ছিন্ন হতে চায় তবে সেটা তার হাতে এবং সে তা প্রয়োগ করবে। আর যদি স্ত্রী বিচ্ছিন্ন হতে চায়, তবে তার হাতে রয়েছে খুলা’ এবং সে এটা প্রয়োগ করবে। সুতরাং খুলা’ ও তালাক ভিন্ন বস্তু তা স্পষ্ট।
(ফিকহুস্ সুন্নাহ্ ২য় খন্ড, পৃঃ ২৯৯, বৈরুত)
৩২৭৪-[১] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাবিত ইবনু কয়স-এর স্ত্রী (হাবীবাহ্ বিনতু সাহল) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! সাবিত ইবনু কয়স-এর আচার-ব্যবহার ও দীনদারীর ব্যাপারে আমার কোনো অভিযোগ নেই, কিন্তু ইসলামের ছায়ায় থেকে আমার দ্বারা স্বামীর অবাধ্যতা (কুফরী) মোটেই অনুচিত। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন- তুমি কি (মোহরে প্রাপ্ত) খেজুরের বাগান তাকে ফিরিয়ে দিতে সম্মত আছ? সে বলল- জি, হ্যাঁ। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্বামীকে বললেন, তুমি তোমার খেজুরের বাগান ফেরত নিয়ে তাকে এক তালাক দিয়ে দাও। (বুখারী)[1]
بَابُ الْخُلْعِ وَالطَّلَاقِ
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ: أَنَّ امْرَأَةَ ثَابِتِ بْنِ قِيسٍ أَتَتِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ ثَابِتُ بْنُ قَيْسٍ مَا أَعْتِبُ عَلَيْهِ فِي خُلُقٍ وَلَا دِينٍ وَلَكِنِّي أَكْرَهُ الْكُفْرَ فِي الْإِسْلَامِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَتَرُدِّينَ عَلَيْهِ حَدِيقَتَهُ؟» قَالَتْ: نَعَمْ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اقْبَلِ الْحَدِيقَةَ وَطَلِّقْهَا تَطْلِيقَةً» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: সাবিত ইবনু কায়স-এর স্ত্রীর নামের ব্যাপারে ইখতিলাফ রয়েছে। অধিক গ্রহণযোগ্য মত হলো তার নাম হাবীবাহ্ বিনতু সাহল। ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) ‘তাকরীব’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন তিনি সাহবিয়্যাহ্ ছিলেন, তিনি তার স্বামী সাবিত ইবনু কয়স-এর সাথে খুলা‘ করেন। এর পর উবাই ইবনু কা‘ব তাকে বিবাহ করেন।
সাবিত-এর স্ত্রী হাবীবাহ্ বিনতু সাহল (রাঃ) তার স্বামীর ব্যাপারে অভিযোগ করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তার স্বামীর মোহর বাবদ দেয়া দু’টি খেজুর বাগান ফেরত দেয়া, অতঃপর সাবিতকে তা গ্রহণপূর্বক তাকে তালাক দেয়ার নির্দেশ করেন।
এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর أمْر বা নির্দেশ واجب (আবশ্যক) অর্থে নয়, বরং إرشاد ও إصلاح তথা দিক নির্দেশনা ও সংশোধন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
মুল্লা ‘আলী কারী (রহঃ) বলেনঃ এ হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, খুলা‘ ‘ফাসখে নিকাহ’ নয়, বরং ‘তালাক’। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১১. প্রথম অনুচ্ছেদ - খুল্‘ই (খুলা‘ তালাক) ও তালাক প্রসঙ্গে
৩২৭৫-[২] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার তিনি স্বীয় স্ত্রীকে মাসিক (ঋতুস্রাব) অবস্থায় তালাক দেন। এ বিষয়টি ’উমার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট জানালেন। এটা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, সে যেন তাকে রুজু করে (অর্থাৎ- প্রত্যাহার করে) নেয় এবং পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাকে নিজের কাছে রেখে দেয়। অতঃপর একান্তই তালাক দিতে চাইলে, তবে এক ঋতুস্রাব হতে পবিত্রাবস্থায় উপনীত হলে সহবাসের পূর্বে সে তালাক দিতে পারে। এটাই ত্বলাক (তালাক)ের ’ইদ্দত, আল্লাহ তা’আলা যা নির্দেশ করেছেন। অপর বর্ণনায় আছে- তাকে রজ্’আহ্ (প্রত্যাহার) করার আদেশ দাও। অতঃপর (একান্ত প্রয়োজনে) সে যেন পবিত্রাবস্থায় অথবা গর্ভাবস্থায় তালাক দেয়। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْخُلْعِ وَالطَّلَاقِ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ: أَنَّهُ طَلَّقَ امْرَأَةً لَهُ وَهِيَ حَائِضٌ فَذَكَرَ عُمَرُ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَتَغَيَّظَ فِيهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثُمَّ قَالَ: «ليراجعها ثمَّ يمْسِكهَا حَتَّى تطهر ثمَّ تحيض فَتطهر فَإِن بدا لَهُ أَنْ يُطْلِّقَهَا فَلْيُطْلِّقْهَا طَاهِرًا قَبْلَ أَنْ يَمَسَّهَا فَتِلْكَ الْعِدَّةُ الَّتِي أَمَرَ اللَّهُ أَنْ تُطْلَّقَ لَهَا النِّسَاءُ» . وَفِي رِوَايَةٍ: «مُرْهُ فَلْيُرَاجِعْهَا ثُمَّ لْيُطَلِّقْهَا طَاهِرًا أَوْ حَامِلًا»
ব্যাখ্যা: তালাক দাম্পত্য সম্পর্ক ছিন্ন করার শারী‘আত ব্যবস্থা। এটা কখন ও কিভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং তা কিভাবে কার্যকর হবে ইসলামে তার সুবিধিবদ্ধ বিধান রয়েছে। স্ত্রীকে ঋতুকালীন সময়ে কখনো তালাক প্রদান করা যাবে না। ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘উমার তার স্ত্রীকে ঋতুস্রাবের সময় তালাক প্রদান করেছিলেন, যা শারী‘আতসিদ্ধ নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ খবর পেয়ে ভীষণভাবে রাগান্বিত হয়ে যান এবং তার তালাক অকার্যকর করে দিয়ে স্ত্রীকে ফেরত আনতে নির্দেশ করেন। অতঃপর তার প্রতি নির্দেশনা প্রদান করেন যে, একান্তই তালাক দেয়ার প্রয়োজন হলে ঋতুস্রাব অতিবাহিত হয়ে, প্রথম পবিত্রকালে তালাক না দিয়ে দ্বিতীয় পবিত্রকালে তালাক দিবে।
ইমাম নববী (রহঃ) বলেনঃ দ্বিতীয় তুহর বা পরবর্তী পবিত্রকাল পর্যন্ত তালাককে বিলম্বিত করার নির্দেশনার কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। তন্মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য কারণ হলো- ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘উমার স্ত্রীর সাথে মনের দূরত্বের কারণেই তালাক দিয়েছিলেন। আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীকে ফেরত এনে তার সাথে স্বাভাবিক সংসার জীবন যাপনের দীর্ঘ সুযোগ করে দিয়েছেন, যাতে এই সময়ের মধ্যে তার সাথে দৈহিক মিলন ঘটায়, এতে তার মনের সঞ্চিত রাগ ও ঘৃণা দূর হয়ে যায় যা ত্বলাকের মূল কারণ, এটা নিঃশেষ হয়ে গেলে ত্বলাকের আর প্রয়োজনই যেন না হয় এবং তাকে স্ত্রী হিসেবে রেখে দেয়।
মুসলিম উম্মাহ ঋতুস্রাবকালে তালাক প্রদানকে হারাম বলেছেন। এ অবস্থায় তালাক প্রদান করলে গুনাহগার হবে এবং তাকে রজ্‘আহ্ করতে হবে, অর্থাৎ স্ত্রীকে প্রত্যাহার করে নিতে হবে।
ইমাম আবূ হানীফাহ্, ইমাম আহমাদ, ইমাম শাফি‘ঈসহ জুমহূর ইমাম ও ফুকাহার মতে এই রজ্‘আহ্ মুস্তাহাব, ওয়াজিব নয়। অবশ্য ইমাম মালিক ও তার অনুসারীগণ ওয়াজিব বলেছেন।
হাদীসে যে তুহর বা পবিত্রকালে (স্বামী-স্ত্রী) সহবাস হয়নি সেই সময় তালাক দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এর কারণ পরবর্তীতে যাতে গর্ভ প্রকাশিত হয়ে লজ্জিত হতে না হয় এবং প্রসবকাল পর্যন্ত ‘ইদ্দতও দীর্ঘ না হয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৯০৮; শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪৭১)
পরিচ্ছেদঃ ১১. প্রথম অনুচ্ছেদ - খুল্‘ই (খুলা‘ তালাক) ও তালাক প্রসঙ্গে
৩২৭৬-[৩] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে আল্লাহ ও তার রসূলকে গ্রহণের অধিকার দিয়েছেন, অতঃপর আমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে গ্রহণ করে নিয়েছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এটা আমাদের ওপর (তালাক) হিসেবে গণ্য করেননি। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْخُلْعِ وَالطَّلَاقِ
وَعَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: خَيَّرَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاخْتَرْنَا اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَلَمْ يَعُدَّ ذَلِكَ عَلَيْنَا شَيْئًا
ব্যাখ্যা: উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর বর্ণনা (خَيَّرَنَا رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের ইখতিয়ার দিয়েছেন, এর অর্থ হলো আমরা উম্মাহাতুল মু’মিনদের অধিকার বা স্বাধীনতা দিয়েছেন যে, ইচ্ছা করলে আমরা আল্লাহর রসূলকে গ্রহণ করে থাকতে পারি, ইচ্ছা করলে তাকে ত্যাগ করে চলে যেতে পারি।
সহীহ মুসলিমের এক বর্ণনায়: خَيَّرَ نِسَاءَه ‘তার স্ত্রীদের ইখতিয়ার দিয়েছিলেন’ বাক্য ব্যবহার হয়েছে, উভয়ের অর্থ ও উদ্দেশ্য একই।
‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেনঃ (فَاخْتَرْنَا اللّٰهَ وَرَسُوْلَه فَلَمْ يَعُدَّ ذٰلِكَ عَلَيْنَا شَيْئًا) ‘আমরা (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীগণ) আল্লাহ ও তাঁর রসূলকেই গ্রহণ করলাম, তিনি এটাকে আমাদের ওপর কোনো তালাক গণ্য করেননি। অর্থাৎ এ কথা দ্বারা স্ত্রী তালাক হয়ে যায় না। এক তালাক, দুই তালাক কিংবা তিন তালাক রজ্‘ই কিংবা বায়েন কোনো তালাকই হয় না। এটাই অধিকাংশ সাহাবীর মত। ইমাম আবূ হানীফাহ্, ইমাম শাফি‘ঈ- এই মতই ব্যক্ত করেছেন। পক্ষান্তরে সাহাবীগণের মধ্যে ‘আলী, যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ) ফুকাহাগণের মধ্যে ইমাম মালিক সহ কতিপয় ইমাম ও ফাকীহ বলেন, এতে এক তালাক রজ্‘ই পতিত হবে।
‘আল্লামা বাগাভী (রহঃ) নাবী পত্নীদের ইখতিয়ার প্রদান সংক্রান্ত আয়াতে তাফসীরে বলেন-
اخْتَلَفَ الْعُلَمَاءُ فِي هٰذَا الْخِيَارِ، هَلْ كَانَ ذٰلِكَ تَفْوِيضَ الطَّلَاقِ إِلَيْهِنَّ حَتّٰى يَقَعَ بِنَفْسِ الِاخْتِيَارِ أَمْ لَا؟
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রীদের যে ইখতিয়ার দিয়েছিলেন তা নিয়ে ‘উলামাদের মাঝে ইখতিলাফ রয়েছে। সেটা কি তাদের প্রতি ত্বলাকেব তাফবীয ছিল যে, তারা ওটা গ্রহণ করলে তা পতিত হতো আর গ্রহণ না করলে পতিত হতো না?
হাসান বাসরী, কাতাদাহ প্রমুখসহ অধিকাংশ আহলে ‘ইলমের মত হলো, কুরআনের এ আয়াতে ত্বলাকে তাফবীযের কথা বলা হয়নি। বরং এখানে নাবী পত্নীগণকে দুনিয়ার সুখ সামগ্রী অথবা আল্লাহ ও তাঁর রসূল (তথা আখিরাত) এ দুয়ের যে কোনো একটিকে গ্রহণের ইখতিয়ার প্রদান করা হয়েছে। যার কারণে এর তাৎক্ষণিক জওয়াব নয়, বরং চিন্তা ভাবনা করে প্রয়োজনে অভিভাবকের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে বলেন, তুমি তাড়াহুড়া করো না, বরং ধীরস্থির মতো তোমার পিতা-মাতার সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিবে। এটা যদি ত্বলাকে তাফবীয হতো তাহলে উত্তরটি তাৎক্ষণিক প্রয়োজন ছিল। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫২৬২)
পরিচ্ছেদঃ ১১. প্রথম অনুচ্ছেদ - খুল্‘ই (খুলা‘ তালাক) ও তালাক প্রসঙ্গে
৩২৭৭-[৪] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোনো ব্যাপারে (হালালকে) হারাম করলে কাফফারা দিতে হবে, ’’নিশ্চয় তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মধ্যে (জীবনীতে) রয়েছে উত্তম আদর্শ’’। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْخُلْعِ وَالطَّلَاقِ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: فِي الْحَرَامِ يُكَفَّرُ لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ الله أُسْوَة حَسَنَة
ব্যাখ্যা: কেউ যদি ইচ্ছা করে কোনো বৈধ জিনিস নিজের ওপর হারাম ঘোষণা দেয় তবে তা ভঙ্গ করলে কাফফারা দিতে হবে। কেননা এটা কসমের পর্যায় হয়ে যায়, কসম ভঙ্গ করলে যেমন কাফফারা দিতে হয় এটাও ঠিক তাই। এর প্রমাণ দিতে গিয়ে ইবনু ‘আব্বাস কুরআনের এই আয়াত পাঠ করেন : ‘‘আল্লাহর রসূলের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ।’’ (সূরা আল আহযাব ৩৩ : ২১)
‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস মূলতঃ এটাই বুঝাতে চেয়েছেন, কেউ যদি আল্লাহর হালালকৃত বস্তুকে স্বেচ্ছায় নিজের ওপর হারাম করে নেয় তার ওপর কসমের কাফফারা ধার্য হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নিজের ওপর আল্লাহর দেয়া হালাল বস্তুকে হারাম করে নিয়েছিলেন তখন আল্লাহ তা‘আলা তাকে তার কাফফারা আদায়ের নির্দেশ প্রদান করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘হে নাবী! আল্লাহ আপনার জন্য যা হালাল করেছেন তা কেন নিজের ওপর হারাম করে নিচ্ছেন?’’ (সূরা আত্ তাহরীম ৬৫ : ০১)। (ফাতহুল বারী ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৯০৮; মিরকাতুল মাফাতীহ)
এ বিষয়ে সামনের হাদীসে বিস্থাতির আলোচনা আসছে।
পরিচ্ছেদঃ ১১. প্রথম অনুচ্ছেদ - খুল্‘ই (খুলা‘ তালাক) ও তালাক প্রসঙ্গে
৩২৭৮-[৫] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহধর্মিণী যায়নাব বিনতু জাহশ-এর নিকট তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) (কিছু সময় বেশি) অবস্থান করতেন। অতঃপর একদিন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর নিকট মধু পান করেন। এ সংবাদ পেয়ে আমি ও হাফসাহ্ উভয়ে পরামর্শ করলাম যে, আমাদের মধ্যে যার নিকটই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত হবেন, সে যেন বলে, আমি আপনার (মুখ) হতে মাগাফীর-এর (দুর্গন্ধযুক্ত ফলের রস যা মৌমাছি সঞ্চয়ন করে) গন্ধ পাচ্ছি, আপনি কি মাগাফীর খেয়েছেন? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁদের [’আয়িশাহ্ ও হাফসাহ্ (রাঃ)] কোনো একজনের নিকট পৌঁছলে একজন বললেন। উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আমি যায়নাব বিনতু জাহশ-এর নিকট মধু খেয়েছি। আমি শপথ করছি, আর কক্ষনো মধু খাবো না, কিন্তু তুমি এটা কাউকেও বলো না। মূলত তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সহধর্মিণীগণের সন্তুষ্টি কামনার্থে এটা (শপথ) করেছিলেন। এমতাবস্থায় কুরআন মাজীদের আয়াত নাযিল হয়- ’’হে নবী! আল্লাহ যা তোমার জন্য হালাল করেছেন তা তুমি কেন হারাম করছ? (এর দ্বারা) তুমি তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি পেতে চাও?’’ (সূরা আত্ তাহরীম ৬৬ : ১)। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْخُلْعِ وَالطَّلَاقِ
وَعَنْ عَائِشَةَ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَمْكُثُ عِنْدَ زَيْنَبَ بِنْتِ جَحْشٍ وَشَرِبَ عِنْدَهَا عَسَلًا فَتَوَاصَيْتُ أَنَا وَحَفْصَةُ أَنَّ أَيَّتَنَا دَخَلَ عَلَيْهَا النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلْتَقُلْ: إِنِّي أَجِدُ مِنْكَ رِيحَ مَغَافِيرَ أَكَلْتَ مَغَافِيرَ؟ فَدَخَلَ عَلَى إِحْدَاهُمَا فَقَالَتْ لَهُ ذَلِكَ فَقَالَ: «لَا بَأْسَ شَرِبْتُ عَسَلًا عِنْدَ زَيْنَبَ بِنْتِ جَحْشٍ فَلَنْ أَعُودَ لَهُ وَقَدْ حَلَفْتُ لَا تُخْبِرِي بِذَلِكِ أَحَدًا» يَبْتَغِي مرضاة أَزوَاجه فَنَزَلَتْ: (يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَا أَحَلَّ الله لَك تبتغي مرضاة أَزوَاجك)
الْآيَة
ব্যাখ্যা: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মধু পছন্দ করতেন। ‘আস্র নামাযের পর তিনি প্রত্যেক স্ত্রীর খোঁজ খবর নেয়ার জন্য তাদের ঘরে যেতেন। এ সময় তার স্ত্রী যায়নাব বিনতু জাহ্শ তাকে মধু পান করাতেন। মানব স্বভাবসুলভ কারণে অন্যান্য স্ত্রীদের অনেকের কাছেই এটা অপছন্দনীয় ছিল। উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) এবং হাফসাহ্ (রাঃ) উভয় মিলে ফন্দি আটলেন এবং যুক্তি পাকালেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের যার কাছেই আসে সে বলবে আপনার কাছ থেকে মাগাফীরের গন্ধ পাচ্ছি। আপনি কি মাগাফীর খেয়েছেন?
যুক্তি মোতাবেক যথাসময়ে তারা তাই করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু বুঝে উঠতে পারলেন না, তিনি বললেনঃ আমি তো মধুপান করেছি মাত্র। অতঃপর তিনি শপথ করে বললেন, ঠিক আছে আমি আর মধু পান করবো না, তুমি এ কথা আর কাউকে বলো না। এটা ছিল স্ত্রীদের কতিপয়ের মন খুশির জন্য। আল্লাহ তার এ কথা পছন্দ করলেন না। সাথে সাথে আয়াত নাযিল করলেন,
يٰاَيُّهَا النَّبِيُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَا أَحَلَّ اللّٰهُ لَكَ تَبْتَغِىْ مَرْضَاةَ أَزْوَاجِكَ
‘‘হে নাবী! আল্লাহ আপনার জন্য যা বৈধ করেছেন তা আপনি হারাম করছেন কেন? আপনি স্ত্রীদের সন্তুষ্টি খুঁজছেন?’’ (সূরা আত্ তাহরীম ৬৬ : ০১)
মাগাফীর হলো এক প্রকার কাঁটাযুক্ত বৃক্ষের ফলের নির্যাস যা মিষ্ট অথচ ভীষণ দুর্গন্ধযুক্ত।
ইবনুল মালিক বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হালাল বস্তু নিজের ওপর হারাম করে নেয়াটা ছিল পদস্খলন বা আকস্মিক ভুল, পাপ বা গুনাহের কাজ নয়। এটা ছিল খেলাফে আওলা বা উত্তমতার পরিপন্থী।
সুতরাং আল্লাহর বাণী: لِمَ تُحَرِّمُ এবং عَفَا اللّٰهُ عَنْكَ বাক্য দ্বারা তার নিন্দা জানানো হয়েছে।
হাদীস দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, মধু হারাম করার কারণে অত্র আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু আরেকটি সহীহ হাদীসে এসেছে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হাফসার গৃহে মধু পান করেছিলেন, তখন উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়িশাহ্, সফিয়্যাহ্, সাওদাহ্ এরা মিলে পূর্বে উল্লেখিত যুক্তি পাকিয়েছিলেন।
‘আল্লামা বাগাভী (রহঃ) উক্ত আয়াতের শানে নুযূল বর্ণনা করতে গিয়ে মুফাস্সিরীনদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীদের মধ্যে পালা বণ্টন করতেন। হাফসাহ্ (রাঃ)-এর পালার দিন এলে তিনি তার বাপের সাক্ষাৎ যাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অনুমতি প্রদান করলেন তিনি বাপের বাড়ী চলে গেলেন। হাফসাহ্ (রাঃ) যখন চলে গেলেন তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মারিয়াহ্ আল ক্বিবত্বিয়্যাহ্ (রাঃ)-কে ডেকে পাঠালেন। মারিয়াহ্ আল ক্বিবত্বিয়্যাহ্ (রাঃ) আসলে তিনি তাকে হাফসাহ্ (রাঃ)-এর ঘরে প্রবেশ করালেন এবং তার সাথে মিলিত হলেন। ইতোমধ্যে হাফসাহ্ (রাঃ) যখন ফিরে এলেন, এসে দেখেন তার ঘরের দরজা বন্ধ। তিনি অগত্যা দরজায় বসে রইলেন, এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘর্মাক্ত অবস্থায় ঘর থেকে বের হলেন- এ অবস্থা দেখে হাফসাহ্ (রাঃ) কাঁদতে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন- তুমি কাঁদছো কেন? উত্তরে হাফসাহ্ (রাঃ) বললেন, এজন্যই কি আপনি আমাকে বাপের বাড়ী যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন? আমার পালার দিন, আমার বিছানায় একজন দাসীকে প্রবেশ করিয়েছেন? আপনি কি আমার মর্যাদা এবং আমার সম্মানের কথা ভাবেন না? আপনি স্ত্রীদের একজনের সাথে এই আচরণ করবেন?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে কি আল্লাহ তা‘আলা আমার জন্য হালাল করে দেননি? (হে হাফসাহ্!) তুমি থামো! তাকে (মারিয়াহ্ আল ক্বিবত্বিয়্যাহ্ (রাঃ)) আমার জন্য হারাম করে নিলাম। আমি তোমার সন্তুষ্টি চাই, তবে তুমি এ কথা স্ত্রীদের অন্য কাউকে বলো না- তখন আল্লাহ তা‘আলা يٰاَيُّهَا النَّبِيُّ لِمَ تُحَرِّمُ এ আয়াত নাযিল করেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - খুল্‘ই (খুলা‘ তালাক) ও তালাক প্রসঙ্গে
৩২৭৯-[৬] সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে রমণী বিনা কারণে স্বামীর নিকট তালাক চায়, সে জান্নাতের গন্ধও পাবে না। (আহমাদ, তিরমিযী, আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ, দারিমী)[1]
عَنْ ثَوْبَانَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَيُّمَا امْرَأَةٍ سَأَلَتْ زَوْجَهَا طَلَاقًا فِي غَيْرِ مَا بَأْسٍ فَحَرَامٌ عَلَيْهَا رَائِحَةُ الْجَنَّةِ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ والدارمي
ব্যাখ্যা: তালাক স্বামীর অধিকার, স্ত্রীর নয়। স্ত্রীর সঙ্গত কারণ থাকলে খুলা‘র মাধ্যমে সে স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন হবে। কোনো মহিলা একান্ত কারণ ছাড়া স্বামীর কাছ থেকে তালাক প্রার্থনা করবে না। কোনো কোনো বর্ণনায় এ কথাও এসেছে, কোনো মহিলা নিজের জন্য অথবা অন্যের জন্য তালাক প্রার্থনা করবে না।
যে নারী বিনা কারণে তার স্বামীর কাছে তালাক প্রার্থনা করবে তার জন্য জান্নাতের ঘ্রাণ হারাম অর্থাৎ জান্নাতে প্রবেশ নিষিদ্ধ। এটা ভীতি ও ধমকিমূলক বাক্য। মুহসিন বা নেককারগণ যেমন প্রথম ধাপেই জান্নাতের সুঘ্রাণ পাবেন তারা সেই সুঘ্রাণ পাবে না। ‘আল্লামা কাযী ‘ইয়ায বলেনঃ এটাও হতে পারে যে, যদি সে জান্নাতে প্রবেশ করে তবে সুঘ্রাণ থেকে বঞ্চিত থাকবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - খুল্‘ই (খুলা‘ তালাক) ও তালাক প্রসঙ্গে
৩২৮০-[৭] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলার কাছে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট হালাল কার্য হলো তালাক। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «أَبْغَضُ الْحَلَالِ إِلَى اللَّهِ الطلاقُ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: বিবাহ একটি জান্নাতী বন্ধন। এ সম্পর্কের অবসান কারো জন্যই কাম্য নয়। তবু জীবনের অনিবার্য প্রয়োজনে এ সম্পর্কের অবসান ঘটাতেই হয়। স্বামী স্ত্রীর এই বন্ধন ছিন্নের মাধ্যম হলো তালাক।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ তালাক ইসলামে বৈধ হলেও তা আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয়, কেননা শায়ত্বনের কাছে সবচেয়ে প্রিয় কাজ হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো। সুতরাং শায়ত্বনের প্রিয় কাজ আল্লাহর কাছে কখনো পছন্দনীয় হতে পারে না।
কেউ কেউ বলেন, ত্বলাকের প্রকৃতি ও স্বভাবগত বিধান হলো তা হালাল, কিন্তু ওটাকে যখন পাপের সাথে সংমিশ্রণ করা হয়, তখন তা হয় আল্লাহর কাছে অপ্রিয়। যেমন মানুষ অন্যায় ও অযাচিতভাবে স্ত্রীকে তালাক দিয়ে ফেলে, অসময়ে স্ত্রীকে তালাক দেয়, শারী‘আত সীমালঙ্ঘন করে একই সঙ্গে একাধিক তালাক দিয়ে দেয় ইত্যাদি। তালাক বৈধ হওয়া সত্ত্বেও হারাম ও বিদ্‘আত পন্থায় তা প্রয়োগের কারণে তা হয় আল্লাহর কাছে অপ্রিয় ও অপছন্দনীয়। অথবা ত্বলাকের দ্বারা উভয়ে যখন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাদের সন্তান-সন্ততি ও পরিবার যখন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এমনকি অনেকের জীবন বিপন্ন হয়ে উঠে তখন তা হয় আল্লাহর কাছে অপ্রিয়।
হাদীসটির ইসনাদ রোগগ্রস্ত অর্থাৎ মু‘আল্লাল (সহীহ নয়), সুতরাং বিস্তারিত ব্যাখ্যা পরিত্যাগ করা হলো।
পরিচ্ছেদঃ ১১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - খুল্‘ই (খুলা‘ তালাক) ও তালাক প্রসঙ্গে
৩২৮১-[৮] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বিয়ের পূর্বে তালাক নেই, মালিকানা ছাড়া মুক্তিদান হয় না, সিয়ামের মধ্যে বিসাল (ইফত্বার ছাড়া অনবরত সওম পালন করা) নেই, বয়ঃপ্রাপ্তির পরে ইয়াতীমত্ব নেই, দুধ ছাড়ানোর পরে দুগ্ধদান সম্পর্ক (দুধ মা) হয় না, একটানা রাত-দিন নীরবতা পালনে কোনো কিছু (’ইবাদাত) নেই। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
وَعَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا طَلَاقَ قَبْلَ نِكَاحٍ وَلَا عَتَاقَ إِلَّا بَعْدَ مِلْكٍ وَلَا وِصَالَ فِي صِيَامٍ وَلَا يُتْمَ بَعْدَ احْتِلَامٍ وَلَا رَضَاعَ بَعْدَ فِطَامٍ وَلَا صَمْتَ يَوْمٍ إِلَى اللَّيْلِ» . رَوَاهُ فِي شَرْحِ السُّنَّةِ
ব্যাখ্যা: বিবাহের মাধ্যমে স্বামীত্ব এবং দাসের ওপর মালিকানা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে তালাক এবং দাস-দাসীর মুক্তির অধিকার লাভ করা যায় না। যেমন কোনো নারীকে বিবাহের পূর্বে তালাক প্রদানের ঘোষণা দিয়ে পরে তাকে বিবাহ করলে পূর্বের ঐ তালাক কার্যকর হবে না।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ (لَا طَلَاقَ) এর অর্থ হলো: «لَا وُقُوعَ لِطَلَاقٍ قَبْلَ نِكَاحٍ» অর্থাৎ বিবাহের পূর্বে তালাক পতিত হয় না বা কার্যকর হয় না। সওমে বিসাল বা বিরতিহীন সিয়াম হলো ইফত্বার না করে একাধারে বা ক্রমাগত সওম বা রোযা পালন করতে থাকা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ সওম পালন নিষেধ করেছেন। সাওমের অধ্যায়ে এ সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা অতিবাহিত হয়েছে।
একটি শিশুর ইয়াতীম থাকার মেয়াদকাল হলো বালেগ হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত। সুতরাং বালেগ হওয়ার পর ইয়াতীম আর ইয়াতীম থাকে না। অনুরূপ দুধ সম্পর্ক স্থাপিত হয় দুধপানের মেয়াদ কালের মধ্যে দুধপান করলে। এ দুধপানের মেয়াদ হলো দু’ বছর। অর্থাৎ দু’ বছর বয়সের মধ্যে কোনো শিশু কোনো মহিলার স্তন্য পান করলে তার সাথে দুধ মা সম্পর্ক স্থাপিত হয়। এর পরে পান করলে দুধ সম্পর্ক স্থাপিত হয় না।
দুধপানের মেয়াদ দু’ বছর, আল্লাহ বলেনঃ ‘‘আর জননীগণ তাদের সন্তানদের পুরা দু’বছর দুধ পান করাবে, যে দুধপানের পূর্ণ মেয়াদ পুরো করতে চায়।’’ (সূরা আল বাকারা ২ : ২৩৩)
অন্যত্র আল্লাহ বলেনঃ ‘‘আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের ওয়াসিয়্যাত করছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো (মেয়াদ) দু’ বছরে হয়।’’ (সূরা লুকমান ৩১ : ১৪)
পূর্ববর্তী দীনে সওম পালনকালে কারো সাথে কথা বলা চলতো না বরং সূর্যাস্ত পর্যন্ত কথা বন্ধ রাখতে হতো। পবিত্র কুরআনে এর একাধিক প্রমাণ রয়েছে; দেখুন- সূরা মারইয়াম আয়াত ২৬। ইসলামের সওম পালনকালে চুপ থাকার বিধান রহিত হয়েছে। অথবা জাহিলী যুগে মানুষ কোনো কথাবার্তা না বলে ধ্যান মগ্ন থাকাকে ‘ইবাদাত মনে করতো। ইসলামে এর বিধান কি, এই প্রশ্নে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, (لَا صَمْتَ يَوْمٍ إِلَى اللَّيْلِ) অর্থাৎ দিন থেকে রাত পর্যন্ত নিরবতা পালনে কোনো ‘ইবাদাত নেই।
মুল্লা ‘আলী আল কারী (রহঃ) বলেনঃ এই নিরবতায় শিক্ষণীয় কিছু নেই এবং সাওয়াবও কিছু নেই। এটা আমাদের শারী‘আতের বিধানও নয়, বরং পূর্ব জাতিদের বিধান।
কেউ কেউ বলেন, এটা নিষেধ এজন্য যে, এটা খৃষ্টানদের সাথে সাদৃশ্যশীল কাজ। জাহিলী যুগেও ই‘তিকাফকালে মানুষ কথাবার্তা বন্ধ রাখতো, তাদের প্রতিবাদে এ হাদীস হতে পারে। (শারহুস্ সুন্নাহ্ হাঃ ২৩৫০; মিরকাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ৩/৪৪২, ইবনু হুমাম ‘আলী -এর সূত্রে মারফূ‘ হিসেবে বর্ণিত হাদীসটি)
পরিচ্ছেদঃ ১১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - খুল্‘ই (খুলা‘ তালাক) ও তালাক প্রসঙ্গে
৩২৮২-[৯] ’আমর ইবনু শু’আয়ব তাঁর পিতার মাধ্যমে দাদা হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মানুষের যে বিষয়ের মালিকানা বা অধিকার নেই, তার কোনো নযর (মানৎ) হয় না, যার মালিকানা নেই তার কোনো দাস মুক্ত করার অধিকার নেই। বিবাহ বন্ধন ব্যতীত তার তালাক নেই। (তিরমিযী)[1]
আর ইমাম আবূ দাঊদ (রহঃ) অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন যে, মালিকানা ছাড়া কেনা-বেচা নেই।
وَعَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا نَذْرَ لِابْنِ آدَمَ فِيمَا لَا يَمْلِكُ وَلَا عِتْقَ فِيمَا لَا يَمْلِكُ وَلَا طَلَاقَ فِيمَا لَا يَمْلِكُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَزَادَ أَبُو دَاوُدَ: «وَلَا بَيْعَ إِلَّا فِيمَا يملك»
ব্যাখ্যা: ‘নযর’ বা মানৎ ইসলামে একটি ‘ইবাদাত। কেউ যদি কোনো কিছু দান বা হেবার জন্য মানৎ করে তবে তার ওপর অবশ্যই মালিকানা স্বত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত থাকতে হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আদাম সন্তানের কারো কোনো বস্তুর উপর মালিকানা স্বত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত না হলে তাতে নযর বা মানৎ বৈধ নয়। যদি সে কোনো কৃতদাসের ব্যাপারে বলে যে, আমি আল্লাহর ওয়াস্তে এ দাসটি মুক্ত করবো অথচ এই মানতের সময় সে তার মালিকই হয়নি, তাহলে তার এই মানৎ সহীহ হবে না। আর এই মানতের পর যদি মালিক হয় তবে তাকে মুক্ত করতে হবে না।
আবূ দাঊদ-এর বর্ণনায় এসেছে ‘মালিকানা স্বত্ত্ব প্রতিষ্ঠার পূর্বে ক্রয়-বিক্রয় নেই’। এর ব্যাখ্যা পূর্বানুরূপ। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১১৮১)
পরিচ্ছেদঃ ১১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - খুল্‘ই (খুলা‘ তালাক) ও তালাক প্রসঙ্গে
৩২৮৩-[১০] রুকানাহ্ ইবনু ’আব্দ ইয়াযীদ হতে বর্ণিত। তিনি স্বীয় স্ত্রী সুহায়মাহ্-কে নিশ্চিত তালাক দিলেন। অতঃপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বিষয়টি অবহিত করে বললেন, আল্লাহর কসম! আমি এক ত্বলাক (তালাক)ের নিয়্যাত করেছি, অন্য কিছু নয়। এটা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর কসম! তুমি কি এক তালাক ব্যতীত অন্য কিছু নিয়্যাত করনি? আমি বললাম, আল্লাহর কসম! এক তালাক ব্যতীত অন্য কিছু নিয়্যাত করিনি। এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার নির্দেশ করলেন। বর্ণনাকারী বলেন, রুকানাহ্ তার স্ত্রীকে ’উমার (রাঃ)-এর যুগে দ্বিতীয় এবং ’উসমান (রাঃ)-এর যুগে তৃতীয় তালাক দেন। (আবূ দাঊদ, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ ও দারিমী; কিন্তু নিশ্চয় তারা দ্বিতীয় ও তৃতীয় ত্বলাক (তালাক)ের উল্লেখ করেননি)[1]
وَعَنْ رُكَانَةَ بْنِ عَبْدِ يَزِيدَ أَنَّهُ طَلَّقَ امْرَأَتَهُ سُهَيْمَةَ الْبَتَّةَ فَأَخْبَرَ بِذَلِكَ النَّبِيَّ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسلم وَقَالَ: وَالله مَا أردتُ إِلَّا وَاحِدَةً فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «وَاللَّهِ مَا أَرَدْتَ إِلَّا وَاحِدَةً؟» فَقَالَ ركانةُ: واللَّهِ مَا أردتُ إِلَّا وَاحِدَة فَرَدَّهَا إِلَيْهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَطَلَّقَهَا الثَّانِيَةَ فِي زَمَانِ عُمَرَ وَالثَّالِثَةَ فِي زَمَانِ عُثْمَانَ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالتِّرْمِذِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ وَالدَّارِمِيُّ إِلَّا أَنَّهُمْ لَمْ يَذْكُرُوا الثانيةَ وَالثَّالِثَة
ব্যাখ্যা: রুকানাহ্ ইবনু ‘আব্দ ইয়াযীদ তার স্ত্রী সুহায়মাহ্-কে الْبَتَّةَ ‘‘আল বাত্তাহ্’’ তালাক প্রদান করেন। ‘আল বাত্তাহ্’ অর্থ নিশ্চিত, অবশ্যই; অর্থাৎ তিনি তার স্ত্রীকে নিশ্চিত তালাক দিয়েছিলেন যা নিশ্চিত কার্যকর। কেউ যদি স্ত্রীকে ‘আল বাত্তাহ্’ তালাক দেয় তা কত তালাক হবে- এ নিয়ে ইমাম ও ফুকাহায়ে কিরামের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ)-এর মতে এ অবস্থায় এক ত্বলাকে রজ্‘ঈ পতিত হবে। তবে যদি দুই অথবা তিনের নিয়্যাত করে তবে তার নিয়্যাত মোতাবেকই হবে।
ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) বলেনঃ ‘আল বাত্তাহ্’ তালাক এক ত্বলাকে বায়্যিনাহ্ বলে বিবেচিত হবে। তিনের নিয়্যাত করলে তিন হবে।
ইমাম মালিক-এর মতে, তিন-ই হবে। সালাফ ও খালাকের একদল মুহাক্কিকের মতে এক তালাক রজ্‘ঈ হওয়াটাই অধিক যুক্তিযুক্ত। কেননা একত্রে প্রদত্ত তিন তালাক তিন তালাক হয় না, বরং এক হওয়ার পক্ষে সহীহ মুসলিমে একাধিক বিশুদ্ধ হাদীস বিদ্যমান রয়েছে। ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে, আবূ বাকর-এর খিলাফাতকালে, অতঃপর ‘উমার (রাঃ)-এর খিলাফাতের প্রথম দুই বছর পর্যন্ত একত্রে প্রদত্ত তিন তালাককে এক তালাক বলে গণ্য করা হতো..........। (সহীহ মুসলিম- হাঃ ৩৭৪৬)
পরিচ্ছেদঃ ১১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - খুল্‘ই (খুলা‘ তালাক) ও তালাক প্রসঙ্গে
৩২৮৪-[১১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তিন বিষয়ে হাসি-ঠাট্টা ও (স্বজ্ঞানে) কথার উক্তি, উভয়ই সঠিক উক্তিরূপে পরিগণিত হবে। বিবাহ, তালাক ও রজ্’আহ্ (এক ত্বলাক (তালাক)ান্তে প্রত্যাহার)। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ; ইমাম তিরমিযী বলেন, হাদীসটি হাসান গরীব)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: ثَلَاثٌ جَدُّهُنَّ جَدٌّ وَهَزْلُهُنَّ جَدُّ: النِّكَاحُ وَالطَّلَاقُ وَالرِّجْعَةُ . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيب
ব্যাখ্যা: ‘আরবী جِدٌّ-এর অর্থ ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, আগ্রহ, একাগ্রতা ইত্যাদি। মিরকাতুল মাফাতীহ গ্রন্থাকার বলেন, «وَالْجَدُّ مَا يُرَادُ بِه مَا وُضِعَ لَه» শব্দটি যে অর্থের জন্য গঠন করা হয়েছে সেই অর্থ গ্রহণ করা বা উদ্দেশ্য হওয়া। আর «المهزل» শব্দটির আভিধানিক অর্থ ঠাট্টা, কৌতুক, রসিকতা ইত্যাদি। পরিভাষায় কোনো শব্দকে যে উদ্দেশে গঠন করা হয়েছে সে অর্থ ছাড়া ভিন্ন কোনো অর্থ গ্রহণ করা, যদিও ঐ অর্থের সাথে গঠিত অর্থের কোনো সম্পর্ক ও সাদৃশ্য নেই।
৩টি বিষয় আগ্রহ বা একান্তভাবে বললে কিংবা কৌতুক রসিকতার সাথে বললেও তা কার্যকর হবে। (এক) তালাক (দুই) নিকাহ বা বিবাহ (তিন) রজ্‘আহ্ বা স্ত্রীকে প্রত্যাহার করে নেয়া। অর্থাৎ কেউ যদি সরীহ বা স্পষ্ট শব্দে স্ত্রীকে তালাক দিয়ে বলে আমি খেলাচ্ছলে বা রসিকতা করে তালাক দিয়েছি তার ঠাট্টা রসিকতা ধর্তব্য হবে না বরং তার তালাকই কার্যকর হবে।
কাযী ‘ইয়ায (রহঃ) বলেনঃ আহলে ‘ইলম বা বিদ্বানগণ একমত যে, ঠাট্টাচ্ছলে তালাক প্রদান করলে তা কার্যকর হবে। প্রাপ্তবয়স্ক জ্ঞানবান ব্যক্তি যখন স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন শব্দে তালাক প্রদান করবে তখন তার এ কথার কোনো মূল্য বা ভিত্তি হবে না যে, আমি খেলাচ্ছলে বা ঠাট্টাচ্ছলে তালাক দিয়েছিলাম। কেননা ঠাট্টাচ্ছলের তালাক অকার্যকর হলে ইসলামের অনেক বিধানই অকার্যকর হয়ে যাবে। ইমাম তিরমিযী (রহঃ) হাদীসটিকে হাসান ও গরীব বলেছেন। ‘আল্লামা মুনযিরী বলেনঃ হাদীসটি সহীহের শর্তে পৌঁছেনি, অর্থাৎ হাদীসটি য‘ঈফ। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - খুল্‘ই (খুলা‘ তালাক) ও তালাক প্রসঙ্গে
৩২৮৫-[১২] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে, জোর-জবরদস্তিমূলক তালাক ও (ক্রীতদাস বা দাসী) মুক্তি হয় না। (আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «لَا طَلَاقَ وَلَا عَتَاقَ فِي إِغْلَاقٍ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَه قيل: معنى الإغلاق: الْإِكْرَاه
ব্যাখ্যা: اغْلَاقٍ এর অর্থ إِكْرَاهُ বাধ্য করা, জবরদস্তি করা, কাউকে কোনো কাজে বাধ্য করা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ জবরদস্তি করে কাউকে তালাক প্রদানে বাধ্য করলে সে তালাক কার্যকর হয় না। কেননা এ সময় ব্যক্তির স্বাধীনতা থাকে না। অত্র হাদীসের ভিত্তিতে ইমাম শাফি‘ঈ, মালিক, আহমাদ প্রমুখ ইমাম এই মতই পোষণ করেছেন। পক্ষান্তরে ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) ঠাট্টাচ্ছলে বিয়ে করলে অথবা তালাক দিলে বিয়ে ও তালাক কার্যকর হওয়ার উপর ক্বিয়াস করে জবরদস্তি করে তালাক প্রদান করলে তালাকও কার্যকর হবে বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু এ ক্বিয়াসের চেয়ে হাদীসের উপর ‘আমলই উত্তম ও নিরাপদ। (শারহে বিকায়ার হাওলায় মিরকাতুল মাফাতীহ)
‘উসমান (রাঃ) বলেনঃ পাগল ও নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির তালাক বৈধ নয়। সাহাবী ‘উকবাহ্ ইবনু ‘আমির (রাঃ) বলেন, মাতাল ও জবরদস্তিমূলক তালাক অবৈধ। পক্ষান্তরে ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) ঠাট্টাচ্ছলে তালাক দিলেও তা কার্যকর হবে, এ কথার উপর ক্বিয়াস করে বলেন, জবরদস্তিমূলক তালাক কার্যকর হবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - খুল্‘ই (খুলা‘ তালাক) ও তালাক প্রসঙ্গে
৩২৮৬-[১৩] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নির্বোধ ব্যক্তির তালাক ব্যতীত সর্বপ্রকার তালাক গৃহীত হয়ে থাকে। (তিরমিযী; তিনি বলেন, হাদীসটি গরীব এবং হাদীসের জনৈক বর্ণনাকারী ’আত্বা ইবনু ’আজলান দুর্বল ও ত্রুটিযুক্ত)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «كُلُّ طَلَاقٍ جَائِزٌ إِلَّا طَلَاقَ الْمَعْتُوهِ وَالْمَغْلُوبِ عَلَى عَقْلِهِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ وَعَطَاءُ بْنُ عجلانَ الرَّاوي ضعيفٌ ذاهبُ الحَدِيث
ব্যাখ্যা: مَعْتُوهِ এবং مَغْلُوْبٌ الْعَقْلِ ব্যতীত সকলের তালাকই বৈধ বা কার্যকর হয়।
مَعْتُوهٌ এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে «الْمَجْنُونُ الْمُصَابُ فِي عَقْلِه» পাগল, যার জ্ঞানের মধ্যে বিকৃতি ঘটেছে। কেউ বলেছেন نَاقِصُ الْعَقْلِ ত্রুটিযুক্ত কিংবা স্বল্প জ্ঞানের অধিকারী।
مَغْلُوْبٌ الْعَقْلِ হলো المَعْتُوهِ-এর তাফসীর বা ব্যাখ্যামূলক শব্দ। কেউ কেউ বলেছেন, «الْمُرَادُ بِالْمَغْلُوبِ السَّكْرَانُ» অর্থাৎ মাগলূব দ্বারা উদ্দেশ্য হলো السَكْرَانُ নেশাগ্রস্ত মাতাল এবং অপ্রকৃতস্থ ব্যক্তি। এরূপ অপ্রকৃতস্থ বা বিকৃত মস্তিষ্ক পাগলের তালাক কার্যকর হবে কিনা, তা নিয়ে ফুকাহায়ে কিরামের মধ্যে ইখতিলাফ বা মতপার্থক্য রয়েছে।
মুহাক্কিক সালাফ ও খালাফগণের মতে طَلَاقَ الْمَعْتُوهِ কার্যকর হবে না। পূর্বের হাদীসের ব্যাখ্যায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবী ‘উকবাহ্ ইবনু ‘আমির-এর বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেছেন, মাতাল ও জবরদস্তিমূলক তালাক অবৈধ। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর মতে طَلَاقِ السَّكْرَانِ মাতাল বা নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির তালাক পতিত হয় না। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - খুল্‘ই (খুলা‘ তালাক) ও তালাক প্রসঙ্গে
৩২৮৭-[১৪] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তিন ব্যক্তি (কিয়ামত দিবসে) দায়-দায়িত্বমুক্ত। ঘুমন্ত ব্যক্তি জেগে না ওঠা পর্যন্ত, অপ্রাপ্তবয়স্ক বালেগ না হওয়া পর্যন্ত এবং নির্বোধ ব্যক্তি (বুদ্ধি-বিবেচনার) জ্ঞান ফিরে না আসা পর্যন্ত। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةٍ: عَنِ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ وَعَنِ الصَّبِيِّ حَتَّى يَبْلُغَ وَعَنِ الْمَعْتُوهِ حَتَّى يعقل . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: ‘কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছে’, এর অর্থ এসব ব্যক্তির পাপ বা গুনাহ ও অপরাধ লিপিবদ্ধ করা হয় না এবং তাদের অপরাধের জন্য শাস্তি প্রযোজ্য হয় না। সুতরাং অপ্রাপ্তবয়স্ক, উম্মাদ, মা‘তুহ বা স্বল্প জ্ঞানের অধিকারী এবং ঘুমন্ত ব্যক্তির তালাক পতিত হয় না। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - খুল্‘ই (খুলা‘ তালাক) ও তালাক প্রসঙ্গে
৩২৮৮-[১৫] আর দারিমী ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে এবং ইবনু মাজাহ উভয় হতে বর্ণনা করেছেন।[1]
وَرَوَاهُ الدَّارِمِيُّ عَنْ عَائِشَةَ وَابْنُ مَاجَهْ عَنْهُمَا
ব্যাখ্যা: পূর্ব উল্লেখিত হাদীসটি ইমাম দারিমী ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে এবং ইবনু মাজাহ ‘আলী এবং ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) উভয় থেকে বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি সামান্য শব্দ পার্থক্যসহ এবং সানাদ পার্থক্যসহ বিভিন্ন কিতাবে বর্ণিত হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ১১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - খুল্‘ই (খুলা‘ তালাক) ও তালাক প্রসঙ্গে
৩২৮৯-[১৬] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বাঁদি স্ত্রীর তালাক (সর্বোচ্চ) দু’টি এবং তার ’ইদ্দতও দুই ঋতুস্রাব। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ ও দারিমী)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «طَلَاقُ الْأَمَةِ تَطْلِيقَتَانِ وَعِدَّتُهَا حَيْضَتَانِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ وَالدَّارِمِيُّ
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসে দাসী বা বাঁদির ‘ইদ্দাতের সময়সীমা বর্ণিত হয়েছে। দাস-দাসী প্রথা বর্তমান না থাকায় বিস্তারিত ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা মনে করছি না। (সম্পাদক)
পরিচ্ছেদঃ ১১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - খুল্‘ই (খুলা‘ তালাক) ও তালাক প্রসঙ্গে
৩২৯০-[১৭] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বিবাহ বন্ধন হতে (বিনা কারণে) বিচ্ছিন্নকারিণীগণ (অর্থাৎ- ধন-সম্পদের বিনিময়ে খুলা’ তালাক প্রার্থনাকারিণীগণ) মুনাফিক রমণী। (নাসায়ী)[1]
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الْمُنْتَزِعَاتُ وَالْمُخْتَلِعَاتُ هُنَّ الْمُنَافِقَاتُ» . رَوَاهُ النَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: যদি কোনো নারী বিনা কারণে, স্বামীর বিবাহ বন্ধন থেকে বিচ্ছিন্ন বা মুক্তির অভিলাষী হয় এবং স্বামীর নিকটে খুলা‘ ত্বলাকের প্রার্থনা করে তবে সে মুনাফিক।
‘আল্লামা ত্বীবী মুনাফিক বলার ব্যাপারে বলেন, এটা তিরস্কারের ক্ষেত্রে মুবালাগাহ্ করা হয়েছে।
‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী (রহঃ) مُنَافِقَاتُ-এর ব্যাখ্যায় বলেন, «الْعَاصِيَاتُ بَاطِنًا، وَالْمُطِيعَاتُ ظَاهِرًا» অর্থাৎ গোপনে অবাধ্যচারিণী কিন্তু প্রকাশ্যে হবে, অনুগতশীলা।
ইবনুল হুমাম (রহঃ) সামান্য শব্দ পার্থক্যসহ বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে হাদীসটি এসেছে সেই উদ্ধৃতি পেশ করেছেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - খুল্‘ই (খুলা‘ তালাক) ও তালাক প্রসঙ্গে
৩২৯১-[১৮] নাফি’ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি ’সফিয়্যাহ্ বিনতু আবূ ’উবায়দ’-এর ক্রীতদাসী হতে বর্ণনা করেন, সফিয়্যাহ্ (রাঃ) তাঁর স্বামী [’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ)] হতে নিজের সমস্ত সহায়-সম্পত্তির বিনিময়ে খুলা’ (তালাক) চান। অথচ ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার(রাঃ) এতে কোনো দ্বিমত পোষণ করেননি। (মালিক- মুয়াত্ত্বা)[1]
وَعَنْ نَافِعٍ عَنْ مَوْلَاةٍ لِصَفِيَّةَ بِنْتِ أَبِي عُبَيْدٍ أَنَّهَا اخْتَلَعَتْ مِنْ زَوْجِهَا بِكُلِّ شَيْءٍ لَهَا فَلَمْ يُنْكِرْ ذَلِكَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عمر. رَوَاهُ مَالك
ব্যাখ্যা: সফিয়্যাহ্ হলেন মুখতার ইবনু আবূ ‘উবায়দাহ্ আস্ সাকাফিয়্যাহ্-এর বোন এবং ‘উমার তনয় ‘আব্দুল্লাহ-এর স্ত্রী। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন এবং তাঁর নিকট থেকে হাদীস শ্রবণও করেছেন, তবে তিনি সরাসরি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদীস রিওয়ায়াত করেননি, অবশ্য ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) হাফসাহ্ (রাঃ) থেকে রিওয়ায়াত করেছেন। তিনি তার স্বামী ‘আবদুল্লাহ -এর নিকট থেকে খুলা‘র প্রস্তাব দেন। বলা হয়েছে, (بِكُلِّ شَيْءٍ لَهَا) তার সকল কিছুর বিনিময়ে। এই সকল কিছু বলতে তার নিজের সকল সম্পদ অথবা তার কাছে স্বামীর দেয়া সকল সম্পদ অথবা তার স্বামীর অধিকার বা পাওনা সকল সম্পদ হতে পারে। ‘আব্দুল্লাহ তা প্রদানে অস্বীকার করেননি।
খুলা‘ করতে গিয়ে স্ত্রীর তার প্রাপ্ত মোহরের টাকা ফেরত দিবে। সে তার প্রাপ্ত টাকার চেয়ে আরো বেশি টাকা কি ফেরত দিতে পারবে? এবং স্বামী তার দেয়া মোহরের চেয়ে বেশি নিতে পারবে কিনা?
ইমাম মালিক, শাফি‘ঈ, নাসায়ী, ‘ইকরিমাহ্, মুজাহিদ প্রমুখ ফাকীহ বলেন, মোহরের চেয়ে বেশি সম্পদের বিনিময়ে স্ত্রীর খুলা‘ করা বৈধ আছে। সাহাবীদের মধ্যে ইবনু ‘আব্বাস, ইবনু ‘উমার প্রমুখের একই মত। পক্ষান্তরে ইমাম আহমাদ, ইসহক প্রমুখের মতে মোহরের অতিরিক্ত সম্পদ দিয়ে খুলা‘ বৈধ নয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
এ সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা ফাতহুল কদীর ৫৮-৫৯ পৃঃ দ্রষ্টব্য।
পরিচ্ছেদঃ ১১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - খুল্‘ই (খুলা‘ তালাক) ও তালাক প্রসঙ্গে
৩২৯২-[১৯] মাহমূদ ইবনু লাবীদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট জনৈক ব্যক্তি এসে বলল, তিনি তার স্ত্রীকে একসঙ্গে তিন তালাক দিয়েছেন। এটা শুনে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ভীষণভাবে রাগের সাথে দাঁড়িয়ে বললেন- আমি তোমাদের মধ্যে থাকাবস্থায় আল্লাহর কিতাব (শারী’আতের বিধান)-এর সাথে খেলা (অবজ্ঞা-অবহেলা) করছ? এ কথা শুনে জনৈক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রসূল! আমি কি তাকে হত্যা করব? (নাসায়ী)[1]
حَدِيث رِجَاله ثِقَات وَعَن مَحْمُود بن لبيد قل: أَخْبَرَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ رَجُلٍ طَلَّقَ امْرَأَتَهُ ثَلَاثَ تَطْلِيقَاتٍ جَمِيعًا فَقَامَ غَضْبَانَ ثُمَّ قَالَ: «أَيُلْعَبُ بِكِتَابِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ وَأَنَا بَيْنَ أَظْهُرِكُمْ؟» حَتَّى قَامَ رَجُلٌ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَلَا أَقْتُلُهُ؟ . رَوَاهُ النَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসের বর্ণনাকারী মাহমূদ ইবনু লাবীদ বানী আশহাল গোত্রের আনসারী ছিলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময় জন্মগ্রহণ করেছেন এবং তার থেকে বেশ কিছু হাদীসও বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারী (রহঃ) বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহচার্য লাভ করেছেন। ইমাম হাকিম বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সহচার্যের কথা জানা যায় না। ইমাম মুসলিম তাকে তাবি‘ঈনদের মধ্যে উল্লেখ করেছেন। ইবনু ‘আব্দিল বার (রহঃ) বলেন, ইমাম বুখারীর কথাটি সঠিক।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوْفٍ أَوْ تَسْرِيْحٌ بِاحْسَانٍ
তালাক দুইবার মাত্র। অতঃপর স্ত্রীকে হয় বিধিমত রেখে দিবে, না হয় স্বহৃদয়তার সাথে মুক্ত করে দিবে।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ ‘‘অতঃপর সে যদি স্ত্রীকে তালাক দেয়, তবে সে তার জন্য বৈধ হবে না, যে পর্যন্ত না সে অন্য স্বামীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে।’’ (সূরা আল বাকারা ২ : ২২৯-৩০)
অতঃপর আল্লাহ বলেনঃ ‘‘তোমরা আল্লাহর আয়াতকে খেল-তামাশা হিসেবে গ্রহণ করো না।’’ (সূরা আল বাকারা ২ : ২৩১)
উপরে উল্লেখিত তিনটি আয়াত উল্লেখপূর্বক মুল্লা ‘আলী কারী (রহঃ) ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন এভাবে,
التَّطْلِيقُ الشَّرْعِيُّ تَطْلِيقَةٌ بَعْدَ تَطْلِيقَةٍ عَلَى التَّفْرِيقِ دُونَ الْجَمْعِ وَالْإِرْسَالِ دَفْعَةً وَاحِدَةً
শারী‘আত তালাক হলো একটির পর একটি পৃথক পৃথকভাবে প্রদান করা, (দু’টি বা তিনটি) একত্রে প্রদান না করা। এজন্য ‘উলামাগণ সাধারণভাবে একত্রে তিন তালাক প্রদানকে অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করেছেন। কেননা এতে কুরআনে উল্লেখিত التَّطْلِيقُ الشَّرْعِيُّ এর যথাযথ সুযোগ থাকে না।
মুল্লা ‘আলী কারী (রহঃ) বলেনঃ অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, একত্রে তিন তালাক প্রদান করা হারাম। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গোস্বা ও প্রত্যাখ্যান পাপের কারণ ছাড়া হয়নি। তিনি শুনে গোস্বায় অগ্নিশর্মা হয়ে দাঁড়িয়ে যান এবং বলে উঠেন: (أَيُلْعَبُ بِكِتَابِ اللّٰهِ) আমি তোমাদের মধ্যে বর্তমান থাকতেই আল্লাহর কিতাব নিয়ে খেল তামাশা? তিনি আরও বলেনঃ এটা বড় ধরনের অস্বীকার, বরং পূর্ণ চূড়ান্ত প্রত্যাখ্যান ও অস্বীকার।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ একত্রে তালাক প্রদান না করে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে পৃথক পৃথক ভাবে তালাক প্রদান করার হিকমাত বা গুরুত্ব হলো আল্লাহর কুরআনের এই আয়াতের দাবী বাস্তবায়ন। আল্লাহর বাণী : ‘‘আশা করা যায় আল্লাহ এর পরেও (অর্থাৎ ‘ইদ্দত মোতাবেক বা দুই ত্বলাকের পরও সমঝোতার) কোনো পথ বের করে দিতে পারেন।’’ (সূরা আত্ব তালাক ৬৫ : ০১)
স্বামী যখন তাকে ‘ইদ্দত অনুযায়ী তালাক দিয়ে পৃথক করে দিবেন আল্লাহ তখন তার রাগ-গোস্বাকে মুহববাত দ্বারা পরিবর্তন করে দিবেন। তার প্রতি ঘৃণার স্থলে ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিবেন এবং চূড়ান্ত ত্বলাকের দৃঢ় ইচ্ছা বা সংকল্পকে আল্লাহ অনুতপ্তে পরিবর্তন করে দিবেন, ফলে সে তার স্ত্রীকে রজ্‘আহ্ বা প্রত্যাহার করে নিবে। ইমাম নববী (রহঃ) বলেনঃ কেউ যদি তার স্ত্রীকে বলে- ‘‘তুমি তিন তালাক’’ তার ব্যাপারে ইমাম ও ফুকাহাগণ মতবিরোধ করেছেন।
ইমাম মালিক, শাফি‘ঈ, আবূ হানীফাহ্, আহমাদ এবং জুমহূর সালাফ ও খলাফ বলেনঃ এ ক্ষেত্রে তিন তালাক-ই পতিত হবে। সহাবা তাবি‘ঈগণ থেকে শুরু করে সালাফ ও খলাফের কতিপয় মুহাক্কিক ‘উলামাহ্ বলেন, এ ক্ষেত্রে এক তালাক পতিত হবে। ইমাম ত্বাউস ও আহলুয্ যাহিরগণও এই মতের প্রবক্তা। এ মতের অনুকূলে একাধিক বিশুদ্ধ হাদীস রয়েছে। ৩২৮৩ নং হাদীসে এর কিঞ্চিৎ প্রমাণ পেশ করা হয়েছে।
ইবনু মুকাতিল এবং ইসহক-এর (এক বর্ণনা) মতে এ ক্ষেত্রে কোনো তালাক-ই পতিত হবে না। কারণ একত্রে তিন তালাক দেয়া হারাম এবং গুনাহের কাজ। আর সেই হারাম পদ্ধতিতে কোনো কাজ করলে তা কার্যকর হবে না। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - খুল্‘ই (খুলা‘ তালাক) ও তালাক প্রসঙ্গে
৩২৯৩-[২০] মালিক (রহঃ) হতে বর্ণিত। তাঁর নিকট (বিশ্বস্ত সূত্রে) খবর এসেছে যে, জনৈক ব্যক্তি ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করল, আমি স্বীয় স্ত্রীকে একশ’ তালাক দিয়েছি, এ সম্পর্কে আমার প্রতি আপনার অভিমত কি? উত্তরে তিনি বললেন, তিনটির মাধ্যমেই তোমার স্ত্রী তালাকপ্রাপ্ত হয়েছে, বাকি সাতানব্বইটি দ্বারা তুমি আল্লাহর আয়াত (শারী’আতের বিধান)-এর সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছ। (মুয়াত্ত্বা)[1]
وَعَن مَالك بلغه رَجُلًا قَالَ لِعَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَبَّاسٍ: إِنِّي طَلَّقْتُ امْرَأَتِي مِائَةَ تَطْلِيقَةٍ فَمَاذَا تَرَى عَلَيَّ؟ فَقَالَ ابْن عَبَّاس: طلقت مِنْك ثَلَاث وَسَبْعٌ وَتِسْعُونَ اتَّخَذْتَ بِهَا آيَاتِ اللَّهِ هُزُوًا. رَوَاهُ فِي الْمُوَطَّأ
ব্যাখ্যা: ত্বলাকের উদ্দেশ্য হলো স্ত্রীকে বিচ্ছিন্ন করা, বিবাহ বন্ধন থেকে মুক্ত করা। এই উদ্দেশ্য এক ত্বলাকের মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করা যায়, দুই বা তিন ত্বলাকের প্রয়োজন হয় না। এরপরও যদি কেউ দ্বিতীয় এবং তৃতীয় তালাক দিতে চায় তাহলে এই তিন পর্যন্তই, তার বেশি নয়।
পবিত্র কুরআনে এই তিনের কথাই বলা হয়েছে এবং তা পর্যায়ক্রমে যে, সূরা আল বাকারা-এর ২২৯ ও ২৩০ আয়াতে যা উল্লেখ হয়েছে।
ত্বলাকের এই অধিকার ও পন্থা পরিত্যাগ করে কেউ যদি একই সঙ্গে বহু সংখ্যক তালাক প্রদান করে তবে সেটা সীমালঙ্ঘন এবং আল্লাহর কিতাব বা বিধান নিয়ে খেল-তামাশার শামিল হবে।
পরিচ্ছেদঃ ১১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - খুল্‘ই (খুলা‘ তালাক) ও তালাক প্রসঙ্গে
৩২৯৪-[২১] মু’আয ইবনু জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, হে মু’আয! আল্লাহ তা’আলা জমিনের উপর ক্রীতদাস মুক্ত করা হতে সর্বোৎকৃষ্ট কোনো কাজ সৃষ্টি করেননি। অনুরূপভাবে আল্লাহ তা’আলা তালাক অপেক্ষা তার নিকট নিকৃষ্ট কাজও জমিনের উপর ব্যবস্থা করেননি। (দারাকুত্বনী)[1]
وَعَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَا مُعَاذُ مَا خَلَقَ اللَّهُ شَيْئًا عَلَى وَجْهِ الْأَرْضِ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنَ الْعَتَاقِ وَلَا خَلَقَ اللَّهُ شَيْئًا عَلَى وَجْهِ الْأَرْضِ أَبْغَضَ إِلَيْهِ مِنَ الطَّلاقِ» . رَوَاهُ الدَّارَقُطْنِيّ
ব্যাখ্যা: হাদীসের প্রথমাংশে ইতিপূর্বে বলা হয়েছে দাস-দাসীর প্রচলন বর্তমানে নেই তাই এর ব্যাখ্যা পরিহার করা হলো।
হাদীদের দ্বিতীয় অংশ হলো জমিনের উপর আল্লাহর নিকট ত্বলাকের চেয়ে অধিক অপ্রিয় এবং অধিক অপছন্দনীয় কোনো বস্তু করেননি। এ হাদীস এবং এই অর্থের আরো দুই একটি হাদীসের উপর গবেষণা করে দেখা গেছে এগুলো য‘ঈফ বা দুর্বল, য‘ঈফ হাদীস ‘আমলযোগ্য নয়। কেননা এর বিপরীত কুরআন ও সহীহ হাদীস বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা তার নাবীকে বলেন, ‘‘হে নাবী! আপনারা যখন স্ত্রীদের তালাক দিতে যাবেন, তখন তাদের ‘ইদ্দত পালনের জন্য তালাক দিবেন।’’ (সূরা আত্ব তালাক ৬৫ : ০১)
প্রশ্ন হলো আল্লাহ তা‘আলা কি তার নাবীকে অপছন্দনীয় কাজটি করার কথা বলেছেন? সহীহ হাদীসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কোনো এক স্ত্রীকে তালাক দিয়েছিলেন, পরে তাকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশায় সাহাবীগণ অনেকেই তাদের স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন, হাদীসের এর বহু প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে। তবে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণ সকলেই কি আল্লাহর কাছে অপ্রিয় কাজটিই করেছেন? না‘ঊযুবিল্লাহ। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১২. প্রথম অনুচ্ছেদ - তিন তালাকপ্রাপ্তা রমণীর বর্ণনা
৩২৯৫-[১] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রিফা’আহ্ আল কুরাযী নামে এক সাহাবীর স্ত্রী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, আমি রিফা’আহ্-এর বিবাহিতা স্ত্রী ছিলাম, সে আমাকে তিন তালাক দিয়ে সম্পূর্ণ সম্পর্ক নিঃশেষ করে দিয়েছে। অতঃপর ’আব্দুর রহমান ইবনুয্ যাবীর -এর সাথে আমার বিবাহ হয়, কিন্তু তাঁর কাছে এই কাপড়ের আঁচলের মতো ছাড়া আর কিছুই নেই। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি রিফা’আহ্-এর নিকট ফিরে যেতে চাও? সে বলল, জি, হ্যাঁ। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, না, যে পর্যন্ত না তুমি তার স্বাদ আস্বাদন (সহবাস) কর এবং সে তোমার স্বাদ আস্বাদন করে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْمُطَلَّقَةِ ثَلَاثًا
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: جَاءَتِ امْرَأَةُ رِفَاعَةَ الْقُرَظِيِّ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَتْ: إِنِّي كُنْتُ عِنْدَ رِفَاعَةَ فَطَلَّقَنِي فَبَتَّ طَلَاقِي فَتَزَوَّجْتُ بَعْدَهُ عَبْدَ الرَّحْمَنِ بْنَ الزُّبَيْرِ وَمَا مَعَهُ إِلَّا مِثْلُ هُدْبَةِ الثَّوْبِ فَقَالَ: «أَتُرِيدِينَ أَنْ تَرْجِعِي إِلَى رِفَاعَةَ؟» قَالَتْ: نَعَمْ قَالَ: «لَا حَتَّى تَذُوقِي عُسَيْلَتَهُ وَيَذُوقَ عُسَيْلَتَكِ»
ব্যাখ্যা: عَبْدَ الرَّحْمٰنِ بْنَ الزَّبِيْرِ (‘আবদুর রহমান ইবনুয্ যাবীর)। এখানে ‘যা’ হরফটি যবর এবং ‘বা’ হরফটি যের বিশিষ্ট। এতে কোনো মতানৈক্য নেই। তিনি হলেন যাবীর ইবনু বাত্ত্বা। তাকে ‘বাত্বায়া-’ও বলা হয়। ‘আবদুর রহমান একজন সাহাবী ছিলেন। এই ‘আবদুর রহমান ইবনুয্ যাবীর ইবনু বাত্ত্বল কুরাযী তিনিই রিফা‘আহ্ আল কুরাযী-এর স্ত্রীকে বিবাহ করেছিলেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
(هُدْبَةِ الثَّوْبِ) অর্থাৎ কাপড়ের আচল বা ঝালর। চোখের পাপড়ি যাকে ‘হাদবুন’ বলা হয় তার সাথে সাদৃশ্য রেখে ‘হুদবাতুন’ বলা হয়েছে।
(لَا حَتّٰى تَذُوقِى عُسَيْلَتَه وَيَذُوْقَ عُسَيْلَتَكِ) ‘আইন’ হরফ পেশ এবং ‘সীন’ হরফে যবর। عَسَلَة শব্দের তাসগীর। যার অর্থ মধু। সহবাসের প্রতি ইঙ্গিত। সহবাসের স্বাদকে মধুর স্বাদ ও তার মিষ্টের সাথে সাদৃশ্য দেয়া হয়েছে।
হাদীসের মর্মঃ তিন তালাকপ্রাপ্তা নারীকে তালাকদাতা স্বামী বিবাহ করতে পারবে না, যতক্ষণ না এই নারী অন্য কোনো পুরুষের সাথে বিবাহে আবদ্ধ হয়েছে এবং নতুন স্বামী তাকে সহবাস করে তালাক দিয়েছে এবং ত্বলাকের পর ‘ইদ্দত অতিক্রান্ত হয়েছে। অর্থাৎ দ্বিতীয় স্বামী সহবাসের পর যদি তাকে তালাক দেয় এবং ত্বলাকের পর ‘ইদ্দত শেষ হয় তখনই পূর্বের স্বামী আবার তাকে নতুনভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করতে পারে। কেবল বিবাহের ‘আকদ হওয়া যথেষ্ট নয়। কেবল ‘আকদ করেই তালাক দিয়ে দিলে উক্ত নারী পূর্বের স্বামীর জন্য বৈধ হবে না। এটাই সহাবা, তাবি‘ঈন এবং তাদের পরবর্তী সমস্ত ‘আলিমের মত। কেবলমাত্র সা‘ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব তিনি সবার ব্যতিক্রম মত পোষণ করেন এবং বলেন, দ্বিতীয় স্বামী ‘আকবদের পর সহবাস ছাড়া তালাক দিয়ে দিলেও পূর্বের স্বামীর জন্য বিবাহ করা বৈধ হয়ে যাবে। তিনি কুরআনের আয়াতঃ حَتّٰى تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَه অর্থাৎ ‘‘যতক্ষণ না অন্য স্বামীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে’’- (সূরা আল বাকারা ২ : ২৩) দিয়ে দলীল দেন। কেননা বিশুদ্ধ মতে ‘নিকাহ’ শব্দটি ‘আকদের উপর প্রয়োগ হয়। অর্থাৎ কুরআনের মর্মানুযায়ী ‘আকদ হলেই পূর্বের স্বামী এই স্ত্রী হালাল হয়ে যাবে। জুমহূর ‘উলামাহ্ তার কথার উত্তরে বলেন, আয়াতটি যদিও ব্যাপক কিন্তু হাদীস আয়াতটিকে বিশেষিত করে দিয়েছে এবং আয়াতের উদ্দেশ্য বর্ণনা করে দিয়েছে। ‘উলামাগণ বলেন, হতে পারে সা‘ঈদ-এর কাছে হাদীসটি পৌঁছেনি।
কাযী ‘ইয়ায বলেনঃ খারিজীদের এক গোত্র ছাড়া সা‘ঈদ-এর কথা কেউই গ্রহণ করেননি।
‘উলামারা এ কথার উপরও একমত যে, স্বামী স্ত্রীর মিলনই পূর্বের স্বামী বৈধ হওয়ার জন্য যথেষ্ট। অর্থাৎ পুরুষের সামনের অঙ্গ মহিলার সামনের অঙ্গে প্রবেশ করলেই বৈধ হয়ে যায়। সহবাসের চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে বীর্য বের হওয়া জরুরী নয়। (শারহে মুসলিম ৯/১০ম খন্ড, হাঃ ১৪৩৩)
[রিফা‘আহ্ হলো মদীনার বিখ্যাত ইয়াহূদী ফুরায়যাহ্ গোত্রের লোক, তিনি ইসলাম গ্রহণ করার পর তার স্ত্রীকে তিন তালাক প্রদান করেন। এটা একত্রেই প্রদান করেন না পৃথক পৃথক, তা উল্লেখ নেই। একত্রে তিন তালাক দেয়ার যেহেতু বিধান নেই। সুতরাং ধরা হবে এ তিন তালাক পৃথক পৃথকভাবেই দিয়েছিলেন।] (সম্পাদক)
পরিচ্ছেদঃ ১২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - তিন তালাকপ্রাপ্তা রমণীর বর্ণনা
৩২৯৬-[২] ’আব্দুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হীলাকারী (২য় স্বামী) এবং যার জন্য হীলা করা হয় (তথা প্রথম স্বামীর), উভয়ের প্রতি অভিসম্পাত করেছেন। (দারিমী)[1]
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: لَعَنَ رسولُ الله المحلّلَ والمُحلَّلَ لَهُ. رَوَاهُ الدَّارمِيّ
ব্যাখ্যা: اَلْمُحَلِّلَ শব্দের প্রথম ‘লাম’ যের বিশিষ্ট। অর্থাৎ দ্বিতীয় স্বামী যে ত্বলাকের ইচ্ছায় বা তালাক দেয়ার শর্তে বিবাহ করেছে।
(وَالمُحلَّلَ لَه) এখানে প্রথম ‘লাম’ যবর বিশিষ্ট। অর্থাৎ প্রথম স্বামী যে তার স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়েছে।
কাযী বলেনঃ মুহাল্লিল হলো ঐ ব্যক্তি যে অন্যের তিন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে এই উদ্দেশে বিবাহ করে যে, সহবাসের পর তাকে তালাক দিয়ে দিবে, যাতে করে তালাকদাতার জন্য বিবাহ বৈধ হয়ে যায়। সে যেন এই নারীকে বিবাহ এবং সহবাসের মাধ্যমে বৈধ করল। আর ‘মুহাল্লাল লাহূ’ হলো প্রথম স্বামী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উভয়কে অভিশাপ দেয়ার কারণ হলো, এতে মানবতাবোধ নষ্ট করা হয়, আত্মমর্যাদার ঘাটতি এবং নিজ আত্মসম্মানের তুচ্ছতা এবং তা বিলিন হয়ে যাওয়ার প্রমাণ বহন করে। ‘মুহাল্লাল লাহূ’র দিক থেকে এই অপমানকর বিষয়টি প্রকাশ্য। আর ‘মুহাল্লিল’ এর দিক থেকে অপমানকর, কেননা সে যেন অন্যের উদ্দেশে নিজেকে সহবাসের জন্য ধার দিল। কেননা সে এই স্ত্রীর সাথে সহবাস করছে যাতে ‘মুহাল্লাল লাহূ’র জন্য হালাল হয়ে যায়। এজন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন ব্যক্তিকে ভাড়া করা পাঠার সাথে তুলনা করেন।
তবে এ ধরনের বিবাহে ‘আকদ বা বিবাহ বাতিল হবে বলে প্রমাণ নেই। যদিও কেউ কেউ এমন বলে থাকেন। বরং হাদীস থেকে বিবাহ বিশুদ্ধ হয়ে যাওয়ার প্রমাণ মিলে। কেননা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহকারীকে ‘মুহাল্লিল’ তথা বৈধকারী আখ্যা দিয়েছেন। আর বিবাহ শুদ্ধ হলেই বৈধকারী হবে। কেননা ফাসিদ বা অকার্যকর বিবাহ বৈধ করতে পারে না। তবে যদি সহবাসের পর তালাক দেয়ার শর্ত করে নেয়, এ ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। যদিও এ ক্ষেত্রে বিবাহ বাতিল বা অকার্যকর হওয়াটাই প্রকাশ্য।
‘আল্লামা তাক্বীউদ্দীন শুমুনী মিসরী (১৪৬৭ হিঃ) বলেনঃ মুহাল্লিলকে অভিশাপ দেয়ার কারণ হলো, সে বিচ্ছেদের ইচ্ছায় বিবাহ করেছে, অথচ বিবাহ স্থায়ী সম্পর্কের জন্যই শারী‘আতসিদ্ধ। সে এমনটি করে ভাড়া করা পাঠার ন্যায় হয়ে গেছে। আর যার জন্য বৈধ করা হচ্ছে তার ওপর অভিশাপের কারণ হলো, সে এর মাধ্যম হয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - তিন তালাকপ্রাপ্তা রমণীর বর্ণনা
৩২৯৭-[৩] ইবনু মাজাহ (রহঃ) ’আলী, ইবনু ’আব্বাস ও ’উকবা ইবনু ’আমির (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন।[1]
وَرَوَاهُ ابْنُ مَاجَهْ عَنْ عَلِيٍّ وَابْنِ عَبَّاسٍ وَعقبَة بن عَامر
ব্যাখ্যা: মুসান্নিফ বলেনঃ ইবনু মাজাহ হাদীসটি ‘আলী, ইবনু ‘আব্বাস এবং ‘উকবা বিন ‘আমির থেকে বর্ণনা করেন।
ইবনু মাস্‘ঊদ (রাঃ)-এর হাদীসটি ইবনু মাজাহ ছাড়াও ইমাম তিরমিযী, আবূ দাঊদ এবং নাসায়ী ‘আলী থেকে বর্ণনা করেন। ইমাম সুয়ূত্বী হাদীসটি আল জামি‘উস্ সগীরে উল্লেখ করে বলেন, ইমাম আহমাদ এবং চারজন অর্থাৎ সুনানে আর্বা‘আ-এর চার ইমাম হাদীসটি ‘আলী থেকে বর্ণনা করেন। তিরমিযী এবং নাসায়ী ইবনু মাস্‘ঊদ থেকে বর্ণনা করেন। তিরমিযী আবার জাবির থেকেও হাদীসটি বর্ণনা করেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - তিন তালাকপ্রাপ্তা রমণীর বর্ণনা
৩২৯৮-[৪] সুলায়মান ইবনু ইয়াসার (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দশাধিক সাহাবীর সাক্ষাৎ পেয়েছি; তাঁদের প্রত্যেকেই ঈলাকারীকে অপেক্ষা করতে বলেন।(শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
وَعَنْ سُلَيْمَانَ بْنِ يَسَارٍ قَالَ: أَدْرَكْتُ بِضْعَةَ عَشَرَ مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كُلُّهُمْ يَقُولُ: يُوقَفُ الْمُؤْلِي. رَوَاهُ فِي شرح السّنة
ব্যাখ্যা: সুলায়মান ইবনু ইয়াসার। প্রখ্যাত তাবি‘ঈ এবং প্রসিদ্ধ সাত ফাকীহদের একজন।
(إيلاء) ‘ঈলা’ হচ্ছে কোনো ব্যক্তি চার মাস বা তার অধিক স্ত্রীর নিকট গমন না করার কসম করা। অতএব কোনো ব্যক্তি যদি স্ত্রীর সাথে ‘ঈলা’ করে তবে চার মাস পূর্বে তার নিকট গমন করবে না। গমন করলে সে কসম ভঙ্গকারী বলে গণ্য হবে এবং কসমের যে কাফফারা রয়েছে তাকে তা আদায় করতে হবে। এই অবস্থায় চার মাস পার হয়ে গেলে কি করবে- এ ব্যাপারে ‘আলিমদের মতানৈক্য রয়েছে। অধিকাংশ সাহাবীর মতে এভাবে চার মাস অতিক্রম করার কারণে স্ত্রীর ওপর তালাক পতিত হবে না। বরং তাদের বিষয়টি স্থগিত থাকবে। এমতাবস্থায় সে স্ত্রীকে গ্রহণ করে নিলে কাফফারা দিবে, গ্রহণের ইচ্ছা না থাকলে তালাক দিবে। স্ত্রীকে গ্রহণ করা বা তালাক দেয়া কোনটি না করলে কাযী এক ত্বলাকের মাধ্যমে তাদের বিবাহ বিচ্ছিন্ন করে দিবেন। ইমাম মালিক, ইমাম শাফি‘ঈ, ইমাম আহমাদ প্রমুখ (রহঃ) এই মত পোষণ করেন।
‘আলিমদের কারো কারো মতে চার মাসের ভিতর স্ত্রীকে গ্রহণ না করলে অটোমেটিক বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে এক তালাক বায়্যিনাহ্ পতিত হয়ে যাবে। ইমাম সাওরী (রহঃ), ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) ও তাঁর অনুসারীরা এই মত পোষণ করেন। উভয়পক্ষই কুরআনে বর্ণিত ‘ঈলা’ সংক্রান্ত আয়াত দিয়ে দলীল পেশ করেন। ‘ঈলা’ সংক্রান্ত যে আয়াতটি কুরআনে বর্ণিত সেখানে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘যারা নিজেদের স্ত্রীদের নিকট গমন করবে না বলে কসম খেয়ে বসে তাদের জন্য চার মাসের অবকাশ রয়েছে, অতঃপর যদি পারস্পরিক সমঝোতা করে নেয়, তবে আল্লাহ ক্ষমাকারী দয়ালু। আর যদি তালাক দেয়ার সংকল্প করে নেয়, তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ শ্রবণকারী ও জ্ঞানী।’’ (সূরা আল বাকারা ২ : ২২৭)
আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) ও তাঁর অনুসারীদের মতে, যদি বর্জনের সংকল্প করে অর্থাৎ চার মাসের ভিতর স্ত্রীকে গ্রহণ না করাই বর্জন বা ত্বলাকের সংকল্প। তাই চার মাসের ভিতর গ্রহণ না করলে চার মাস পার হতেই এক তালাক পতিত হয়ে বিবাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। ‘আবদুর রাযযাক এবং ইবনু আবূ শায়বাহ্ তাদের মুসান্নাফে ‘উসমান, ‘আলী, ইবনু মাস্‘ঊদ, ইবনু ‘আব্বাস প্রমুখ সহাবা (রাঃ) থেকে চার মাস পার হয়ে গেলে এক তালাক হয়ে যাওয়ার মতটি বর্ণনা করেন। (মুসান্নাফ ‘আব্দুর রাযযাক, অধ্যায় : তালাক, অনুচ্ছেদ : চার মাস অতিক্রম হওয়া, হাঃ ৬/৪৫৩; মুসান্নাফ ইবনু আবূ শায়বাহ্, অধ্যায় : তালাক, অনুচ্ছেদ : যে ঈলা করল তার সম্পর্কে তারা যা বলেন, হাঃ ৫/১৪৪)
আর যারা বলেন চার মাস পার হলে বিষয়টি স্থগিত থাকবে তাদের মতে আয়াতের ব্যাখ্যা হলো, যদি চার মাস পার হওয়ার পর তালাক দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ইমাম বুখারী ইবনু ‘উমার থেকে বর্ণনা করেন,
إِذَا مَضَتْ أَرْبَعَةُ أَشْهُرٍ يُوقَفُ حَتّٰى يُطَلِّقَ وَلَا يَقَعُ عَلَيْهِا الطَّلَاقُ حَتّٰى يُطَلِّقَ وَيُذْكَرُ ذٰلِكَ عَنْ عُثْمَانَ وَعَلِيٍّ وَأَبِي الدَّرْدَاءِ وَعَائِشَةَ وَاثْنَيْ عَشَرَ رَجُلًا مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ ﷺ
‘‘যখন চার মাস অতিক্রম করবে তালাক না দেয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। তালাক না দেয়া পর্যন্ত স্ত্রীর ওপর তালাক পতিত হবে না। ‘উসমান, ‘আলী, আবুদ্ দারদা, ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বারোজন সাহাবী থেকে এই মত বর্ণিত।’’ (সহীহুল বুখারী- অধ্যায় : তাফসীর, [لِّلَّذِينَ يُؤْلُونَ مِن نِّسَائِهِمْ] -এর ব্যাখ্যা অনুচ্ছেদ, হাঃ ৪৮৮১)
পরিচ্ছেদঃ ১২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - তিন তালাকপ্রাপ্তা রমণীর বর্ণনা
৩২৯৯-[৫] আবূ সালামাহ্ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। নিশ্চয় সালমান ইবনু সখর, যাকে সালামাহ্ ইবনু সখর আল বায়াযী বলা হতো, তিনি রমাযান মাসে স্বীয় স্ত্রীকে নিজের মায়ের পিঠের মতো বলে ফেললেন, কিন্তু অর্ধেক রমাযানের পর এক রাতে তার সাথে সহবাস করে বসলেন। অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে এতদসম্পর্কে বর্ণনা করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, একটি ক্রীতদাস মুক্ত করে দাও। তিনি বললেন, আমার তো দাস নেই। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তবে বিরতিহীনভাবে দু’ মাস সওম পালন কর। তিনি বললেন, আমার এমন সামর্থ্য নেই। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তবে ষাটজন মিসকীনকে খাইয়ে দাও। তিনি বললেন, আমার এ ক্ষমতাও নেই। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফার্ওয়াহ্ ইবনু ’আমর -কে বললেন, তাকে ’আরক দান কর যাতে সে ষাটজন মিসকীনকে খাওয়াতে পারে।
عَرَقْ (’আরক) হলো (খেজুর পাতার প্রস্তুতকৃত) এক প্রকার ঝুড়ি, যেখানে ১৫ বা ১৬ সা’ পরিমাণ খেজুর ধরে। [উল্লেখ্য যে, এক সা’ = ৩ সের ৯ ছটাক, ১৫ সা’ = ১ মণ ১৩ সের ৭ ছটাক, ১৬ সা’ = ১ মণ ১৭ সের] (তিরমিযী)[1]
وَعَن أبي سلمةَ: أَنَّ سَلْمَانَ بْنَ صَخْرٍ وَيُقَالُ لَهُ: سَلَمَةُ بْنُ صَخْرٍ الْبَيَاضِيُّ جَعَلَ امْرَأَتَهُ عَلَيْهِ كَظَهْرِ أُمِّهِ حَتَّى يَمْضِيَ رَمَضَانُ فَلَمَّا مَضَى نِصْفٌ مِنْ رَمَضَانَ وَقَعَ عَلَيْهَا لَيْلًا فَأَتَى رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَذَكَرَ لَهُ فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَعْتِقْ رَقَبَةً» قَالَ: لَا أَجِدُهَا قَالَ: «فَصُمْ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ» قَالَ: لَا أَسْتَطِيعُ قَالَ: «أَطْعِمْ سِتِّينَ مِسْكِينًا» قَالَ: لَا أَجِدُ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِفَرْوَةَ بْنِ عَمْرٍو: «أَعْطِهِ ذَلِكَ الْعَرَقَ» وَهُوَ مِكْتَلٌ يَأْخُذُ خَمْسَةَ عَشَرَ صَاعًا أَوْ سِتَّةَ عَشَرَ صَاعا «ليُطعِمَ سِتِّينَ مِسْكينا» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: শারী‘আতের পরিভাষায় যিহার হলোঃ নিজ স্ত্রীকে বা স্ত্রীর এমন কোনো অঙ্গ যা দ্বারা পুরো শরীর উদ্দেশ্য হয়ে থাকে এমন কোনো অঙ্গকে চিরতরে বিবাহ হারাম কোনো মহিলার সাথে সাদৃশ্য উপস্থাপন করা। যেমন মা, বোন ইত্যাদি। ‘আরবরা যিহার করার সময় স্ত্রীকে মায়ের পিঠের সাথে তুলনা করে বলত (انْتِ عَلَيَّ كَظَهْرِ اُمِّيْ) অর্থাৎ তুমি আমার নিকট আমার মায়ের পিঠের মতো। উদ্দেশ্য হলো আমার মায়ের পিঠ যেমন আমার জন্য ব্যবহার করা হারাম ঠিক তুমিও আমার জন্য হারাম। এ থেকেই এভাবে স্ত্রীকে নিজের জন্য হারাম করা যিহার হিসেবে পরিচিত হয়। আইয়্যামে জাহিলিয়্যাতে কেউ স্ত্রিকে যিহার করলে স্ত্রী চিরতরে হারাম হয়ে যেত। খাওলা বিনতে সা‘লাবাহ্ নামক মহিলা সাহাবীর সাথে যিহারের ঘটনা ঘটলে কাফ্ফারার বিধান নাযিল হয়। (দেখুন ৫৮ নং সূরা আল মুজাদালাহ্ অবতীর্ণের শানে নুযূল)
(أَعْتِقْ رَقَبَةً) তুমি একজন দাস আযাদ করে দাও। এখান থেকে যিহারের বিধান বর্ণনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ কেউ যিহার করে আবারো সেই স্ত্রীর সাথে বৈবাহিক জীবন যাপন করতে হলে তাকে কাফফারা স্বরূপ একটি দাস আযাদ বা মুক্ত করে দিতে হবে। হাদীসের ইবারতের বাহযত থেকে প্রতীয়মান হলো, দাস ঈমানদার বা মুসলিম হওয়া আবশ্যক নয়। যে কোনো একটি দাস বা দাসী স্বাধীন করে দিলেই কাফফারা আদায় হয়ে যাবে। ইমাম ‘আত্বা, নাখ‘ঈ, আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) এই মত পোষণ করেন। অপরদিকে ইমাম মালিক, শাফি‘ঈ ও অন্যদের নিকট কাফির দাস বা দাসী স্বাধীন করলে কাফফারা আদায় হবে না। কুরআনে হত্যার কাফফারা ঈমানদার দাস বা দাসী দিয়ে আদায় করতে বলা হয়েছে। তাই এখানে ঈমানের শর্ত না থাকলেও অন্য আয়াত দ্বারা এ আয়াতটিও শর্তযুক্ত হয়ে যাবে। এর উত্তর এই দেয়া হয় যে, এক হুকুমকে অন্য আরেকটির হুকুম দিয়ে শর্তযুক্ত করা যায় না। অর্থাৎ কুরআনে হত্যার কাফ্ফারার ক্ষেত্রে ঈমানদার দাসের শর্ত করা হয়েছে। তাই এ হুকুম এই শর্তের সাথে যুক্ত থাকবে। অপরদিকে যিহারের কাফ্ফারায় ঈমানের শর্ত করা হয়নি। তাই যিহারের হুকুম এই শর্তমুক্ত থাকবে। কুরআনের এক হুকুমকে আরেক হুকুমের শর্ত দিয়ে শর্তযুক্ত করলে কুরআনের শর্তমুক্ত বিধানকে শর্তযুক্ত করে দেয়া হবে, যা শুদ্ধ নয়। তবে ইমাম শাফি‘ঈ-এর মত মু‘আবিয়াহ্ থেকে বর্ণিত একটি হাদীস দ্বারা সমর্থিত হয়। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তার একটি দাসী আযাদ করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন, যা আদায় করা তার ওপর করণীয় ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই দাসীকে প্রশ্ন করেন, «أَيْنَ اللّٰهُ قَالَتْ فِي السَّمَاءِ قَالَ مَنْ أَنَا قَالَتْ أَنْتَ رَسُولُ اللّٰهِ قَالَ أَعْتِقْهَا فَإِنَّهَا مُؤْمِنَةٌ» ‘‘আল্লাহ কোথায়? সে বললো, আসমানে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি কে? সে বললো, আপনি আল্লাহ তা‘আলার রসূল। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আযাদ করে দাও; কেননা সে মু’মিনাহ্।’’ (সহীহ মুসলিম- অধ্যায় : মসজিদ ও সালাতের স্থান, অনুচ্ছেদ : সালাতের মাঝে কথা হারাম... হাঃ ৮৩৬)
(فَصُمْ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ) ধারাবাহিক দুই মাস সওম পালন কর। যিহারের কাফ্ফারার দ্বিতীয় বিধান। অর্থাৎ যে ব্যক্তি দাস আযাদ করতে অপারগ হবে সে দুই মাস ধারাবাহিক সওম পালন করবে। দুই মাস সওম পালনের মাঝে কোনো বিরতি দেয়া যাবে না। একদিন সওম পালন না করলেই আবার তাকে পুনরায় সওম শুরু করে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে দুই মাস সওম পালন করতে হবে।
(أَطْعِمْ سِتِّينَ مِسْكِينًا) ষাট মিসকীনকে খাবার দাও। যিহারের কাফ্ফারার তৃতীয় বিধান। অর্থাৎ সওম পালনে অপারগ হলে ষাট জন মিসকীনকে এক বেলা খাবার দিবে। প্রশ্নকারী সওম পালনে অপারগতা প্রকাশ করায় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এই হুকুম দেন। মিসকীনের সংখ্যা ষাট পূর্ণ হতে হবে নাকি এর কম সংখ্যায় ষাটবার খাবার দিলে চলবে এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কুরআন বা হাদীসের বাহ্যিক অর্থ হিসেবে ষাট সংখ্যা পূর্ণ করা জরুরী বলে মনে করেন ইমাম মালিক, শাফি‘ঈ আরো অনেকে। অপরদিকে ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) ও তার অনুসারীদের মতে একজনকে ষাট দিন খাবার প্রদান করলেও আদায় হয়ে যাবে। এক মিসকীন তার প্রতিদিনের প্রয়োজন হিসেবে পরের দিন নতুন মিসকীন বলে গণ্য হবে।
(أَعْطِه ذٰلِكَ الْعَرَقَ) তাকে ঐ ‘আর্ক্বটি দিয়ে দাও। ‘আরাক বা ‘আর্ক্ব পরিমাপের একটি পাত্র। হাদীসের বর্ণনাকারীর মতে যে পাত্রে ১৫ বা ১৬ সা‘ খেজুর সংকুলান। এর আলোকে ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ)-এর মতে একজন মিসকীনকে এক মুদ্দ তথা এক সা‘-এর চার ভাগের এক ভাগ খাবার দান করে দিলে চলবে। অপরদিকে ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-এর মতে প্রত্যেক মিসকীনকে একটি ফিতরার পরিমাণ অর্থাৎ খেজুর, ভুট্টা, যব, কিশমিশ হলে এক সা‘ আর গম হলে অর্ধ সা‘ পরিমাণ দিতে হবে। আবূ দাঊদ-এর বর্ণনা দিয়ে এই মতের পক্ষে দলীল দেয়া হয়। কেননা আবূ দাঊদ-এর বর্ণনায় রয়েছে, (فَأَطْعِمْ وَسْقًا مِنْ تَمْرٍ بَيْنَ سِتِّينَ مِسْكِينًا) অর্থাৎ তুমি এক ওয়াসাক খেজুর ষাটজন মিসকীনকে খাবার প্রদান কর। এক ওয়াসাক সমান ষাট সা‘। অতএব প্রত্যেক মিসকীনকে এক সা‘ করে প্রদান করতে হবে। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১২০০; মিরকাতুল মাফাতীহ :৪০৯-১০)
পরিচ্ছেদঃ ১২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - তিন তালাকপ্রাপ্তা রমণীর বর্ণনা
৩৩০০-[৬] আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ ও দারিমী সুলায়মান ইবনু ইয়াসার (রহঃ) হতে, তিনি সালামাহ্ ইবনু সখর হতে অনুরূপ বর্ণনা করেন। সালামাহ্ বলেন, আমি নারীদের কাছে এত অধিক গমন করতাম যা অন্যদের দেখা যেত না। আবার আবূ দাঊদ এবং দারিমী-এর বর্ণনায় রয়েছে, তাহলে তুমি এক ওয়াসাক খেজুর ষাট মিসকীনের মধ্যে বিলিয়ে দিতে পার (এক ওয়াসাক ষাট সা’ পরিমাণ)।[1]
وروى أَبُو دَاوُد وابنُ مَاجَه والدارمي عَن سُلَيْمَانَ بْنِ يَسَارٍ عَنْ سَلَمَةَ بْنِ صَخْرٍ نحوَه قَالَ: كنتُ امْرأ أُصِيبُ مِنَ النِّسَاءِ مَا لَا يُصِيبُ غَيْرِي وَفِي روايتهِما أَعنِي أَبُو دَاوُدَ وَالدَّارِمِيَّ: «فَأَطْعِمْ وَسْقًا مِنْ تَمْرٍ بَيْنَ سِتِّينَ مِسْكينا»
ব্যাখ্যা: (أصيب من النساء ما لا يصيب غيري) অর্থাৎ আমি মেয়েদের থেকে এমন জিনিস লাভ করতে পারি যা অন্যরা পারে না। এ কথা বলে সহবাসের সামর্থ্যের দিকে ইঙ্গিত করছেন। অর্থাৎ সহবাস ছাড়া থাকা আমার জন্য অধিক কষ্টকর।
হাদীসটি ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-এর মতের পক্ষে দলীল, যার আলোচনা উপরের হাদীসের ব্যাখ্যায় করা হয়েছে। এক ওয়াসাক সমান ষাট সা‘। অতএব প্রত্যেক মিসকিনকে এক সা‘ খেজুর প্রদান করবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - তিন তালাকপ্রাপ্তা রমণীর বর্ণনা
৩৩০১-[৭] সুলায়মান ইবনু ইয়াসার (রহঃ) সালামাহ্ ইবনু সাখর (রাঃ) হতে। আর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, যদি যিহারকারী কাফফারা দেয়ার পূর্বে সহবাস করে, তার প্রতিও একটি কাফফারা দিতে হবে। (তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ سُلَيْمَانَ بْنِ يَسَارٍ عَنْ سَلَمَةَ بْنِ صَخْرٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الْمُظَاهِرِ يُوَاقِعُ قَبْلَ أَنْ يُكَفِّرَ قَالَ: «كَفَّارَة وَاحِدَة» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: মুযাহির ব্যক্তি অর্থাৎ যে তার স্ত্রীর সাথে যিহার করেছে সে উক্ত স্ত্রীকে নিয়ে বৈবাহিক জীবন-যাপন করতে হলে তাকে কাফফারা দিতে হয়। যার আলোচনা ওপরে হয়েছে। সহবাসের পূর্বেই তাকে কাফফারা আদায় করতে হয়। যিহারের কাফফারা আদায় করার পর সে তার স্ত্রীর সাথে সহবাস করবে। তবে কেউ যদি কাফফারা না দিয়েই সহবাস করে ফেলে তবে তাকে যিহারের কাফফারা ছাড়াও কাফফারা দেয়ার পূর্বে সহবাসের কারণে অতিরিক্ত আরেকটি কাফফারা দিতে হবে। বর্ণিত হাদীসে এই বিধানের কথাই বলা হয়েছে। এই হাদীসের আলোকে অধিকাংশ ‘আলিম এই মতই পোষণ করেন যে, কেউ যিহারের কাফফারা আদায়ের পূর্বে স্ত্রীর সাথে কাম পুরো করার কাজে লিপ্ত হলে তাকে যিহারের কাফফারা ছাড়াও আরেকটি অতিরিক্ত কাফফারা দিতে হবে। ইমাম মালিক, শাফি‘ঈ, আহমাদ প্রমুখ (রহঃ) এই মত পোষণ করেন। অপরদিকে হানাফী ‘আলিমদের মতে যিহারের কাফফারা আদায়ের পূর্বে স্ত্রীর সাথে সহবাস করে ফেললে সে গুনাহ করল। এজন্য তাকে আল্লাহ তা‘আলার কাছে তাওবাহ করতে হবে। কিন্তু প্রথম কাফফারা অর্থাৎ যিহারের মূল কাফফারা ছাড়া অন্য কোনো কাফফারা ওয়াজিব হবে না। তবে যিহারের কাফফারা প্রদান না করা পর্যন্ত সহবাসের পুনরাবৃত্তি করবে না।
ইমাম মালিক (রহঃ)-এর মত অধিকাংশের ‘আলিমের মতের সাথে উল্লেখ করলেও মুয়াত্ত্বায় রয়েছে,
ومن تظاهر من امرأته ثم مسها قبل ان يكفر ليس عليه الا كفارة واحدة ويكف عنها حتى يكفر وليستغفر الله وذلك أحسن ما سمعت.
‘‘যে তার স্ত্রীর সাথে যিহার করবে, তারপর যিহারের কাফফারা আদায়ের পূর্বেই স্ত্রীর সহবাস করে ফেলে তবে তার ওপর একটি কাফফারা ছাড়া অন্য কিছু নেই। তবে সে কাফফারা দেয়া পর্যন্ত বিরত থাকবে এবং আল্লাহ তা‘আলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে। এ ব্যাপারে আমি যা মতামত শুনেছি এটাই সর্বোত্তম।’’ (মুয়াত্ত্বা মালিক, অধ্যায় : তালাক, অনুচ্ছেদ : স্বাধীন ব্যক্তির যিহার, হাঃ ১১৬৭)
এখানে আরো দু’টি মত রয়েছে। ‘আবদুর রাহমান ইবনু মাহদীর নিকট যিহারের কাফফারার পূর্বে সহবাস করলে দু’টি কাফফারা প্রদান করতে হবে। ‘আমর ইবনুল ‘আস, কাবীসাহ্, সা‘ঈদ ইবনু জুবায়র, যুহরী এবং কাতাদাহ (রহঃ) থেকে এই মতটি বর্ণনা করা হয়। আবার হাসান বাসারী, নাখ‘ঈ (রহঃ) থেকে তিনটি কাফফারা ওয়াজিব হওয়ার বিবরণ রয়েছে। তবে বর্ণিত হাদীসটি সবার বিরুদ্ধে দলীল। অর্থাৎ মুযাহির ব্যক্তি যিহারের কাফফারা আদায়ের পূর্বে সহবাস করে নিলে তাকে যিহারের কাফফারা ছাড়া আরো একটি কাফফারা আদায় করতে হবে। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১১৯৮; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - তিন তালাকপ্রাপ্তা রমণীর বর্ণনা
৩৩০২-[৮] ’ইকরিমাহ্ (রহঃ) ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি স্বীয় স্ত্রীর সাথে যিহার করে, কিন্তু কাফফারা দেয়ার পূর্বেই তার সাথে সহবাস করে বসে। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে এতদসম্পর্কে বর্ণনা করে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কেন এরূপ করলে? সে বলল, হে আল্লাহর রসূল! আমি চাঁদের আলোতে তার পায়ের সৌন্দর্যতা দেখে নিজেকে সংবরণ করতে পারিনি। এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে ফেললেন এবং বললেন, কাফফারা দেয়ার পূর্বে যেন তার সংস্পর্শ হতে বিরত থাকে। (ইবনু মাজাহ)[1]
ইমাম তিরমিযী (রহঃ)-ও অনুরূপ বর্ণনা করে বলেছেন- হাদীসটি হাসান, সহীহ, গরীব।
আবূ দাঊদ ও নাসায়ী মুসনাদ ও মুরসালরূপে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। আর ইমাম নাসায়ী (রহঃ) বলেন, হাদীসটি মুসনাদ অপেক্ষা মুরসাল হওয়াই অধিক সঠিক।
عَنْ عِكْرِمَةَ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ: أَنَّ رَجُلًا ظَاهَرَ مِنِ امْرَأَتِهِ فَغَشِيَهَا قَبْلَ أَنْ يَكَفِّرَ فَأَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَذَكَرَ ذَلِكَ لَهُ فَقَالَ: «مَا حَمَلَكَ عَلَى ذَلِكَ؟» قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ رَأَيْتُ بَيَاضَ حِجْلَيْهَا فِي الْقَمَرِ فَلَمْ أَمْلِكْ نَفْسِي أَنْ وَقَعَتُ عَلَيْهَا فَضَحِكَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَمَرَهُ أَنْ لَا يَقْرَبَهَا حَتَّى يُكَفِّرَ. رَوَاهُ ابْنُ مَاجَهْ. وَرَوَى التِّرْمِذِيُّ نَحْوَهُ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ غَرِيبٌ
وَرَوَى أَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ نَحْوَهُ مُسْنَدًا وَمُرْسَلًا وَقَالَ النَّسَائِيُّ: المُرسل أوْلى بالصَّوابِ من المسْندِ
ব্যাখ্যা: بَيَاضَ حِجْلَيْهَا)) তার দুই পায়ের শুভ্রতা। حجل শব্দটির ‘হা’ হরফে যের বা যবর দু’ ভাবেই উচ্চারিত হয়। অর্থ হলো পায়ের নূপুর। তার পায়ের পায়ের শুভ্রতা বলে সম্ভবত তার পায়ের সুন্দর রূপের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। কোনো কোনো বর্ণনায় بياض ساقيها শব্দ এসেছে। অর্থাৎ তার পায়ের গোছার শুভ্রতা। এই বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তার পায়ের সুন্দর রূপের দিকে ইঙ্গিত করাই সাহাবীর উদ্দেশ্য।
(فَلَمْ أَمْلِكْ نَفْسِىْ) আমি আমার নাফসের মালিক হতে পারিনি। অর্থাৎ তার পায়ের রূপ দেখে আমি নিজেকে সংবরণ করতে পারিনি।
(وَأَمَرَه أَنْ لَا يَقْرَبَهَا حَتّٰى يُكَفِّرَ) অর্থাৎ কাফফারা না দিয়ে তাকে স্ত্রীর নিকট যেতে বারণ করেন। এই হাদীস থেকে প্রমাণ হয় যে, যিহারকারী ব্যক্তি অবশ্যই স্ত্রীর নিকট গমনের পূর্বে কাফফারাহ্ দিয়ে দিবে। কাফফারা না দিয়ে গমন করলে সে গুনাহগার হবে। তবে গুনাহগার হওয়ার সাথে সাথে যিহারের কাফফারা ছাড়া পূর্বে গমনের কারণে অতিরিক্ত আরেকটি কাফফারা দিতে হবে কিনা, তার আলোচনা ইতোপূর্বে করা হয়েছে।
[বর্ণিত হাদীসটির মাধ্যমে বুঝা যায় যে, তাকে অতিরিক্ত আরেকটি কাফফারা দিতে হবে না। কেননা এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকটিকে নির্দেশ দিলেন, সে যেন কাফফারা না দিয়ে স্ত্রীর নিকট না যায়। এটা অবশ্যই যিহারের কাফফারা। বাকী সে যে একবার চলে গেল এজন্য তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতিরিক্ত কোনো কাফফারার নির্দেশ দেননি।] (সম্পাদক)
হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে, স্ত্রীর সাথে যিহার করলে কাফফারা আদায় না করে তার সাথে সহবাস না-জায়িয বা অবৈধ। তবে সহবাস ছাড়া সহবাসের প্রাসঙ্গিক কর্ম বৈধ কিনা- এ ব্যাপারে মুল্লা ‘আলী কারী মিরকাতুল মাফাতীহে লিখেন, ‘‘এরপর জেনে রাখো, ইমাম আবূ হানীফাহ্, ইমাম মালিক (রহঃ)-গণের নিকট সহবাসের প্রাসঙ্গিক বা সহবাসের দিকে আকৃষ্ট করে এমন কাজ হারাম। আর এটা যুহায়রী, আওযা‘ঈ, নাখ‘ঈ-এর মত। ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ)-এরও একটি মত। ইমাম আহমাদ (রহঃ) থেকে একটি বর্ণনা। ইবনুল হুমাম বলেন, ‘প্রকৃত কথা হলো, যিহারের মধ্যে সহবাসের প্রাসঙ্গিক বিষয় নিষেধের ব্যাপারটি মানসূস অর্থাৎ স্পষ্ট উদ্ধৃত। কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেন, مِنْ قَبْلِ أَنْ يَتَمَاسَّا অর্থাৎ ‘‘স্পর্শ করার পূর্বে’’- (সূরা আল মুজাদালাহ্ ৫৮ : ৩)। এখানে রূপক অর্থ সহবাস না নিয়ে প্রকৃত অর্থ স্পর্শ নেয়া সম্ভব। আর সহবাস হারাম হয়ে যাবে, কেননা তা স্পর্শের অন্তর্ভুক্ত। অতএব স্পর্শ সহবাস ও স্পর্শ সবই নস্ দ্বারা হারাম হয়ে গেলো।’’ (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - (যিহারের কাফফারা ও মু’মিনাহ্ দাসী মুক্তি প্রসঙ্গে)
অনুচ্ছেদটি উদ্ধৃত করে মুসান্নিফের উদ্দেশ্য হলো, হাদীস দ্বারা এ কথা প্রমাণ করা যে, যিহারের কাফ্ফারায় আযাদকৃত দাস বা দাসী মু’মিন হওয়া আবশ্যক। উসূলে ফিকহে মুতলাক তথা শর্তবিহীন হুকুমকে শর্তযুক্ত করার উসূল বা নীতিতে এর বিশদ আলোচনা রয়েছে। এই অনুচ্ছেদের অধীনের হাদীসটি কুরআনের মুতলাক বা যিহারের কাফ্ফারার শর্তমুক্ত হুকুমকে ঈমানের শর্তে শর্তযুক্ত করার প্রমাণ বহন করে, এতে কোনো দ্বিমত পোষণের সুযোগ নেই। তবে মুকাইয়াদ অর্থাৎ শর্তটি কি এভাবে নির্ধারিত যে, ভুলে হত্যার কাফ্ফারার মতো ঈমানদার ছাড়া আযাদ করলে আদায় হবে না, নাকি উত্তমের বর্ণনা- এতে মতভেদ রয়েছে। আল্লাহ অধিক ভালো জানেন। ২৯৯৯ নং হাদীসের ব্যাখ্যায় এর কিছুটা আলোচনা করা হয়েছে। (সম্পাদক)
৩৩০৩-[১] মু’আবিয়াহ্ ইবনুল হাকাম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললাম- হে আল্লাহর রসূল! আমার জনৈকা দাসী আমার মেষ পাল চরাত। অতঃপর একদিন আমি মেষ পালের নিকট গিয়ে দেখি, একটি মেষ নেই। দাসীকে জিজ্ঞেস করলে সে বলল, নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলেছে। এতে আমি অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হলাম এবং আমি অতি সাধারণ মানুষ, তাই (ধৈর্য ধরতে না পেরে) তার গালে এক চড় মেরে দিলাম। অতঃপর আমি বললাম, (কোনো এক কারণে) আমার ওপর একজন দাস বা দাসী মুক্ত করা শারী’আতের বিধানুযায়ী জরুরী হয়ে আছে (যা এখনও করিনি), এমতাবস্থায় উক্ত দাসীকে তার স্থলে মুক্তি দান করলে কি হবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত দাসীকে জিজ্ঞেস করলেন- বলো তো আল্লাহ কোথায়? সে বলল, আকাশমন্ডলীতে। আবার জিজ্ঞেস করলেন, বলো তো! আমি কে? সে বলল, আপনি আল্লাহর রসূল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে (মু’আবিয়াহ্কে) বললেন, হ্যাঁ, তুমি ওকে মুক্ত করতে পার। (মুয়াত্ত্বা মালিক)[1]
মুসলিম-এর বর্ণনায় আছে, সে [মু’আবিয়াহ্ (রাঃ)] বলল, আমার এক দাসী উহুদ পাহাড় ও জাও্ওয়ানিয়্যাহ্-এর অঞ্চলে মেষ পাল চরাত। একদিন আমি তার কাছে গিয়ে দেখলাম যে, আমাদের একটি মেষ নেকড়ে বাঘ নিয়ে চলে গেছে। আমি অতি সাধারণ মানুষ বিধায় তাদের মতো আমিও ক্রোধ সংবরণ করতে ব্যর্থ হয়ে তাকে চপেটাঘাত করে ফেলি। অতঃপর আমি (ভারাক্রান্ত হৃদয়ে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে এতদসম্পর্কে বর্ণনা করলাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমার এ কাজকে গুরুতর অন্যায় বলে মনে করলেন। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমি কি ওকে মুক্ত করতে পারব? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তাকে আমার কাছে নিয়ে আসো। আমি তাকে তাঁর কাছে নিয়ে গেলাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, বলো তো আল্লাহ কোথায়? সে বলল, আকাশমন্ডলীতে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, বলো তো আমি কে? সে বলল, আপনি আল্লাহর রসূল। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে বললেন, হ্যাঁ, ওকে মুক্ত করতে পার। কারণ, সে মু’মিনাহ্।
بَابٌ [فِىْ كَوْن الرَّقَبَةِ فِى الْكَفَّارَة مُؤمنَة]
عَن مُعَاوِيَة بنِ الحكمِ قَالَ: أَتَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ جَارِيَةً كَانَتْ لِي تَرْعَى غَنَمًا لِي فَجِئْتُهَا وَقَدْ فَقَدَتْ شَاةً مِنَ الْغَنَمِ فَسَأَلْتُهَا عَنْهَا فَقَالَتْ: أَكَلَهَا الذِّئْبُ فَأَسِفْتُ عَلَيْهَا وَكُنْتُ مَنْ بَنِي آدَمَ فَلَطَمْتُ وَجْهَهَا وَعَلَيَّ رَقَبَةٌ أَفَأُعْتِقُهَا؟ فَقَالَ لَهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَيْنَ اللَّهُ؟» فَقَالَتْ: فِي السَّمَاءِ فَقَالَ: «مَنْ أَنَا؟» فَقَالَتْ: أَنْتَ رَسُولَ اللَّهِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَعْتِقْهَا» . رَوَاهُ مَالِكٌ
وَفِي رِوَايَةِ مُسْلِمٍ قَالَ: كَانَتْ لِي جَارِيَةٌ تَرْعَى غَنَمًا لِي قِبَلَ أُحُدٍ وَالْجَوَّانِيَّةِ فَاطَّلَعْتُ ذَاتَ يَوْمٍ فَإِذَا الذِّئْبُ قَدْ ذَهَبَ بِشَاةٍ مِنْ غَنَمِنَا وَأَنَا رَجُلٌ مِنْ بَنِي آدَمَ آسَفُ كَمَا يَأْسَفُونَ لَكِنْ صَكَكْتُهَا صَكَّةً فَأَتَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَعَظَّمَ ذَلِكَ عَلَيَّ قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أفَلا أُعتِقُها؟ قَالَ: «ائتِني بهَا؟» فأتيتُه بِهَا فَقَالَ لَهَا: «أَيْنَ اللَّهُ؟» قَالَتْ: فِي السَّمَاءِ قَالَ: «مَنْ أَنَا؟» قَالَتْ: أَنْتَ رَسُولُ الله قَالَ: «أعتِقْها فإنَّها مؤْمنةٌ»
ব্যাখ্যা: (فَقَدَتْ شَاةً) সীগাটি মা‘রূফ মুতাকাল্লিম এবং شاة শব্দে নসব অর্থাৎ যবর। অর্থাৎ আমি একটি বকরী হারিয়েছি। কোনো কোনো পাণ্ডুলিপিতে সীগাটি মাজহূলের গায়ব হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং شاة শব্দে রফা‘ অর্থাৎ পেশ। অর্থাৎ একটি বকরী হারিয়ে গেছে।
(وَكُنْتُ مَنْ بَنِىْ اٰدَمَ) ‘আমি তো একজন মানুষ’ এ কথা বলে সাহাবী বকরী হারিয়ে যাওয়ার উপর রাগ ও আক্ষেপ এবং তার কারণে দাসীকে থাপ্পড় মারার ওযর বর্ণনা করছেন। কেননা হারিয়ে যাওয়া তাকদীরের বিষয়। এখানে আক্ষেপ বিশেষ করে রাগ মু’মিনের শান নয় এবং থাপ্পড় মারা একটি জুলুম। তাই ওযর পেশ করছেন যে, মানুষের ক্ষেত্রে তো অনেক সময় এমনটি হয়েই যায়। কেননা সে অনেক সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
(وَعَلَىَّ رَقَبَةٌ) অর্থাৎ আমার ওপর একটি দাস আযাদের দায় রয়েছে। একটি দাস আযাদ করা অন্য কোনো কারণে পূর্ব থেকে ওয়াজিব থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সে ওয়াজিবটি তিনি এই দাসীটি মুক্ত করে আযাদ করতে চান। আবার থাপ্পড় মারার কারণে একটি দাস মুক্ত করা ওয়াজিব হয়েছে এ উদ্দেশ্যও হতে পারে। যেমন ইবনু ‘উমার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
سَمِعْتُ رَسُولَ اللّٰهِ ﷺ يَقُولُ مَنْ ضَرَبَ غُلَامًا لَه حَدًّا لَمْ يَأْتِه أَوْ لَطَمَه فَإِنَّ كَفَّارَتَه أَنْ يُعْتِقَه
‘‘আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কোনো কারণ ছাড়া তার গোলামকে মারধর করে অথবা চপেটাঘাত করে, তবে এই গোলামকে আযাদ করে দেয়াই তার কাফফারা।’’ (সহীহ মুসলিম- অধ্যায় : কসম, অনুচ্ছেদ : ক্রীতদাসের সাথে সদ্ধ্যবহার এবং তাকে চপেটাঘাতের কাফফারা, হাঃ ৩১৩১)
মোটকথা, এই দুই কারণের যে কোনো একটি বা উভয় কারণে তিনি এই ক্রীতদাস আযাদ করে দায়মুক্ত হতে পারবেন কিনা তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জানতে চান।
(أَيْنَ اللّٰهُ؟) আল্লাহ কোথায়? অর্থাৎ তোমার প্রতিপালক কোথায়? রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রথম প্রশ্ন, আল্লাহ কোথায়? দ্বিতীয় প্রশ্ন আমি কে? কেননা আল্লাহ তা‘আলাকে মা‘বূদ হিসেবে এবং তাঁকে রসূল হিসেবে বিশ্বাস করার উপর ঈমান নির্ভর করে। আল্লাহ কোথায় এ প্রশ্নের উত্তরে সে বললো, (في السماء) অর্থাৎ আল্লাহ আসমানে। আল্লাহ আসমানে বলায় তার ঈমানের উপর বিশ্বাসের কারণ হলো, সে মক্কার কাফির ও মুশরিকদের মতো প্রতিমায় বিশ্বাসী নয়। বরং মা‘বূদ যিনি তিনি উপরে রয়েছেন। পৃথিবীতে যাদের মূর্তি বানিয়ে ‘ইবাদাত করা হয় তারা কেউই মা‘বূদ নয়। আমি কে এ প্রশ্নের উত্তরে সে বললো (أنت رسول الله) অর্থাৎ আপনি আল্লাহর রসূল। উভয় প্রশ্নের উত্তর সঠিকভাবে প্রদানের কারণে সে মু’মিনাহ্ বলে প্রমাণিত হলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (أعتقها) অর্থাৎ তাকে আযাদ করে দাও।
মুসান্নিফ (রহঃ) এই বর্ণনাটি উল্লেখের পর সহীহ মুসলিমের আরেকটি বিবরণ উল্লেখ করেন। যেখানে পরিষ্কার রয়েছে, (أعتقها فإنها مؤمنة) অর্থাৎ তাকে আযাদ করে দাও; কেননা সে মু’মিনাহ্।
এ থেকেই তাদের মতটি প্রমাণিত হয় যারা মনে করেন যে, কোনো ওয়াজিব কাফফারার বেলায় ঈমানদার ক্রীতদাস বা ক্রীতদাসী আযাদ করতে হবে।
এ থেকে এই কথার প্রতিও ইঙ্গিত মিলে যে, বর্ণিত সাহাবীর ওপর যে দাসমুক্তির দায়টি ছিল তা অন্য কোনো কারণে ওয়াজিব ছিল। থাপ্পড় মারার কারণে নয়। কেননা যে হাদীসে বলা হয়েছে, ’’যে ব্যক্তি কোনো কারণ ছাড়া তার গোলামকে মারধর করে অথবা চপেটাঘাত করে.....’’ এখানে ঈমানদার গোলামকে মারধরের কথা নেই। বরং গোলাম যেই হোক না কেন তাকে কারণ ছাড়া প্রহার করলে এর নিষ্কৃতি সেই গোলামকে আযাদ বা মুক্ত করে দেয়ার মাধ্যমেই হবে। (শারহে মুসলিম ৫/৬ খন্ড, হাঃ ৫৩৭; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - লি‘আন
৩৩০৪-[১] সাহল ইবনু সা’দ আস্ সা’ইদী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’উওয়াইমির আল আজলানী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! কোনো ব্যক্তি যদি স্বীয় স্ত্রীর সাথে অপর পুরুষকে (ব্যভিচারে) দেখতে পায় এবং সে যদি (ক্রোধান্বিত হয়ে) তাকে হত্যা করে বসে, তবে কি নিহতের আত্মীয়স্বজন তাকে হত্যা করবে? (আর এরূপ যদি না করে) তবে সে (স্বামী) কি করবে (অর্থাৎ- এই ব্যভিচারের কারণে তার করণীয় কি)? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার এবং তোমার স্ত্রীর ব্যাপারে ওয়াহী নাযিল হয়েছে, ’যাও তোমার স্ত্রীকে নিয়ে আসো’। বর্ণনাকারী সাহল বলেন, অতঃপর তারা উভয়ে মসজিদে এসে লি’আন করল, আমিও অন্যান্য লোকের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটে উপস্থিত থেকে ঘটনা প্রত্যক্ষ করছিলাম।
অতঃপর উভয়ে যখন লি’আন শেষ করল, তখন ’উওয়াইমির বলল, আমি যদি তাকে আমার বিবাহের বন্ধনে রাখি, তাহলে আমি তার ওপর মিথ্যারোপ করেছি, এটা বলে সে তাকে তিন তালাক প্রদান করল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি স্ত্রী লোকটি কালো রংয়ের এবং কালো চক্ষুবিশিষ্ট, বড় বড় নিতম্ব, মোটা মোটা পা-বিশিষ্ট সন্তান প্রসব করে, তবে মনে করতে হবে ’উওয়াইমির তার সম্পর্কে সত্য বলেছেন। আর যদি রক্তিম বর্ণের ক্ষুদ্রাকৃতির কীটের ন্যায় সন্তান প্রসব করে, তবে মনে করব ’উওয়ামির মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর স্ত্রীলোক এমন বর্ণের সন্তান প্রসব করল যেরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা দিয়েছিলেন- সে সেরূপ সন্তানই প্রসব করল।’ এর দ্বারা ’উয়াইমির-এর দাবির সত্যতার ধারণা জন্মে, অতঃপর সন্তানটিকে (পিতার পরিবর্তে) মায়ের পরিচয়ে ডাকা হতো। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ اللِّعَانِ
عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ السَّاعِدِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنهُ قَالَ: إِن عُوَيْمِر الْعَجْلَانِيَّ قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَرَأَيْتَ رَجُلًا وجدَ معَ امرأتِهِ رجُلاً أيقْتُلُه فيَقْتُلُونه؟ أمْ كَيفَ أفعل؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «قدْ أُنْزِلُ فِيكَ وَفِي صَاحِبَتِكَ فَاذْهَبْ فَأْتِ بِهَا» قَالَ سَهْلٌ: فَتَلَاعَنَا فِي الْمَسْجِدِ وَأَنَا مَعَ النَّاسِ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَمَّا فَرَغَا قَالَ عُوَيْمِرٌ: كَذَبْتُ عَلَيْهَا يَا رسولَ اللَّهِ إِن أَمْسكْتُها فطلقتها ثَلَاثًا ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: انْظُرُوا فَإِنْ جَاءَتْ بِهِ أَسْحَمَ أَدْعَجَ الْعَيْنَيْنِ عَظِيمَ الْأَلْيَتَيْنِ خَدَلَّجَ السَّاقَيْنِ فَلَا أَحسب عُوَيْمِر إِلَّا قَدْ صَدَقَ عَلَيْهَا وَإِنْ جَاءَتْ بِهِ أُحَيْمِرَ كَأَنَّهُ وَحَرَةٌ فَلَا أَحْسِبُ عُوَيْمِرًا إِلَّا قَدْ كَذَبَ عَلَيْهَا فَجَاءَتْ بِهِ عَلَى النَّعْتِ الَّذِي نَعْتُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ تَصْدِيقِ عُوَيْمِرٍ فَكَانَ بَعْدُ يُنْسَبُ إِلَى أمه
ব্যাখ্যা: ‘‘লি‘আন’’ অর্থাৎ একে অপরে অভিশাপ দেয়া। ইমাম নববী লিখেন, ‘‘লি‘আন’’-কে লি‘আন বলার কারণ হলো, স্বামী স্ত্রী উভয় এর মাধ্যমে একে অপর থেকে দূরে সরে যায় এবং তাদের মাঝে বিবাহ চিরস্থায়ীভাবে হারাম হয়ে যায়। ফাতহুল বারীতে লিখেন, লি‘আনকে এজন্য লি‘আন বলা হয় যেহেতু স্বামী বলে, ‘‘আমার ওপর আল্লাহর লা‘নাত, যদি আমি মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হই।’’
(قدْ أُنْزِلُ فِيكَ وَفِىْ صَاحِبَتِكَ فَاذْهَبْ فَأْتِ بِهَا) অর্থাৎ তোমার ও তোমার স্ত্রীর বেলায় হুকুম অবতীর্ণ হয়েছে। অতএব তুমি যাও, গিয়ে তাকে নিয়ে এসো।
লি‘আনের বিধান সংক্রান্ত আয়াত কার বেলায় নাযিল হয়- এ নিয়ে ‘উলামাহ্ কিরামদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। কারো কারো মতে লি‘আনের বিধান সংক্রান্ত আয়াত ‘উওয়াইমির আল ‘আজলানীর বেলায় নাযিল হয়। বর্ণিত হাদীসটি তাদের মতের পক্ষে দলীল। তবে জুমহূর বা সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘আলিমের মতে হিলাল ইবনু উমাইয়াহ্-এর ঘটনা কেন্দ্র করে লি‘আনের আয়াত অবতীর্ণ হয়। কেননা সহীহ মুসলিমে হিলাল ইবনু উমাইয়াহ্-এর ঘটনার বিবরণে রয়েছে, (وَكَانَ أَوَّلَ رَجُلٍ لَاعَنَ فِي الْإِسْلَامِ) অর্থাৎ ‘‘তিনি সর্বপ্রথম ব্যক্তি যিনি ইসলামে লি‘আন করেন।’’
বর্ণনার মাঝে উভয় সম্ভাবনা থাকায় ‘আল্লামা ইবনু হাজার লিখেন, ‘‘আমি বলি, যথাসম্ভব উভয়ের বেলায় অবতীর্ণ হয়েছে। সম্ভবত উভয়ের প্রশ্ন পাশাপাশি দুই সময়ে সময়ে ছিল। তাই উভয়ের বেলায় লি‘আনের আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে, যদিও হিলালের ঘটনা আগের। তাই ‘উওয়াইমির-এর বেলায় অবতীর্ণ হয়েছে বা হিলাল ইবনু উমাইয়াহ্-এর অবতীর্ণ হয়েছে উভয় কথায়ই সঠিক। তবে হিলাল প্রথমে লি‘আনের বিধান কার্যকর করেছেন। লি‘আন কিভাবে করতে হবে তার বিবরণ লি‘আন সংক্রান্ত আয়াত অর্থাৎ সূরা আন্ নূর-এর ৪ নং আয়াতে রয়েছে।
(فَطَلَّقَهَا ثَلَاثًا) অতএব আমি তাকে তিন তালাক দেই। হাদীসের এই অংশ থেকে বুঝা যায়, লি‘আন সংঘটিত হয়ে গেলে কেবল লি‘আনে বিচ্ছেদ ঘটবে না। কেবল লি‘আনে বিচ্ছেদ ঘটলে তালাক দেয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না। হয় তালাক দিতে হবে অথবা কাযী বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিবে। পরবর্তী বিবরণে আমরা দেখব যে, (فَفَرَّقَ بَيْنَهُمَا) অর্থাৎ অতএব রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেন। এর আলোকে ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-এর মতে স্বামীর তালাক বা কাযীর ফায়সালা ছাড়া বিচ্ছেদ ঘটবে না।
তবে ইমাম মালিক, শাফি‘ঈসহ জুমহূর ‘উলামার মতে কেবল লি‘আনেই বিচ্ছেদ ঘটে যাবে। কেননা পরবর্তীতে আরেকটি সহীহ বর্ণনায় আমরা দেখব যে, স্বামী স্ত্রী উভয়ে লি‘আন করার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ «حسابكما على الله أحدكما كاذب لا سبيل لك عليها» অর্থাৎ তোমাদের হিসাব আল্লাহ তা‘আলার ওপর, তোমাদের একজন মিথ্যা, তোমার জন্য স্ত্রীকে পাওয়ার আর কোনো রাস্তা নেই। এই হাদীস থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, লি‘আনের মাধমেই বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে যায়। বিচ্ছেদ ঘটে যাওয়ার পর কাযী তাদেরকে ভালোভাবে পৃথক করে দিবেন। বিচ্ছেদ ঘটার কারণেই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরক পৃথক করে দিয়েছেন। আর ‘উওয়াইমির নিজ থেকে আবার তালাক দেয়ার কারণে বিচ্ছেদ ঘটেনি এর কোনো ইঙ্গিত হাদীসে নেই। হয়ত তার অতিরিক্ত ঘৃণাবোধ সৃষ্টি হওয়ার কারণে তিনি অধিক সতর্কতাবশত তিন তালাক দিয়ে দেন, যাতে কোনো সময় এই স্ত্রীকে সংসারে নিয়ে আসার আর কোনো ধরনের সুযোগ বের না হয়।
(ফাতহুল বারী ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৭৪৫; শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪৯২)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - লি‘আন
৩৩০৫-[২] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক ব্যক্তি ও তার স্ত্রীর মাঝে লি’আনের বিধান কার্যকর করে দিলেন, কারণ সন্তানকে পুরুষলোকটি স্বীয় সন্তান বলে অস্বীকৃতি জানাল। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদের মধ্যে বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটিয়ে সন্তানটি স্ত্রীলোকটির কাছে অর্পণ তথা মায়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত করলেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
অত্র হাদীসে আরও উল্লেখ আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরুষটিকে উপদেশ ও ভীতিপ্রদর্শন করে বললেন, জেনে রাখ, দুনিয়ার শাস্তির তুলনায় আখিরাতের ’আযাব অতি কঠিন। অতঃপর স্ত্রীলোকটিকে ডেকে অনুরূপভাবে উপদেশ ও ভীতিপ্রদর্শন করে বললেন, জেনে রাখ, দুনিয়ার শাস্তির তুলনায় আখিরাতের ’আযাব অতি সামান্য। কিন্তু তারা উভয়ে তাদের নিজ নিজ রায় ও জিদের উপর অবিচল থাকল, ফলে লি’আন কার্যকরী করতে হলো।
بَابُ اللِّعَانِ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَاعن بَين رجل وَامْرَأَته فانتقى مِنْ وَلَدِهَا فَفَرَّقَ بَيْنَهُمَا وَأَلْحَقَ الْوَلَدَ بِالْمَرْأَةِ. مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ. وَفِي حَدِيثِهِ لَهُمَا أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَعَظَهُ وَذَكَّرَهُ وَأَخْبَرَهُ أَنَّ عَذَابَ الدُّنْيَا أَهْوَنُ مِنْ عَذَابِ الْآخِرَةِ ثُمَّ دَعَاهَا فَوَعَظَهَا وَذَكَّرَهَا وَأَخْبَرَهَا أَنَّ عَذَاب الدُّنْيَا أَهْون من عَذَاب الْآخِرَة
ব্যাখ্যা: (فَانْتَفٰى مِنْ وَلَدِهَا) হাদীসের এই অংশ থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, এখানে লি‘আনের ঘটনাটি ঘটেছিল বাচ্চাকে অস্বীকার করা নিয়ে। অর্থাৎ লোকটি সরাসরি স্ত্রীর ওপর যিনার অভিযোগ আরোপ করেনি, বরং নিজ স্ত্রীর সন্তানটিকে তার নয় বলে দাবী করার ভিত্তিতে লি‘আনের ঘটনা ঘটে। অতএব এ হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, নিজ বাচ্চাকে অস্বীকার করার ক্ষেত্রে লি‘আন বৈধ।
(فَفَرَّقَ بَيْنَهُمَا) অর্থাৎ অতএব রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেন। হাদীসের এই অংশ দিয়ে ইমাম আবূ হানীফাহ্ দলীল দেন যেন কেবল লি‘আন দ্বারা বিচ্ছেদ ঘটবে না। (এ সংক্রান্ত আলোচনা আমরা ইতোপূর্বে করে এসেছি।)
(وَأَلْحَقَ الْوَلَدَ بِالْمَرْأَةِ) সন্তানটিকে মায়ের সাথে সম্পৃক্ত করে দেন। অর্থাৎ সন্তানের সম্পর্ক পিতার দিকে না থেকে নাকচ করে মায়ের দিকে করে দেন এবং একক মায়ের জন্য বানিয়ে দেন। এ ধরনের সন্তানকে মায়ের দিকে সম্পৃক্ত করে ডাকা হবে এবং মা ও সন্তানের মাঝে মীরাসের বিধান কার্যকর হবে। সহীহ মুসলিমে সাহল (রাঃ)-এর বিবরণে রয়েছে, فَكَانَ ابْنُهَا يُدْعٰى إِلٰى أُمِّه ثُمَّ جَرَتْ السُّنَّةُ أَنَّه يَرِثُهَا وَتَرِثُ مِنْهُ مَا فَرَضَ اللّٰهُ لَهَا
‘‘অতএব তার ছেলেকে মায়ের দিকে সম্পৃক্ত করে ডাকা হতো। এরপর সুন্নাহ চালু হয় যে, সে মায়ের ওয়ারিস হয় এবং মা তার ওয়ারিস হয়, আল্লাহ মায়ের জন্য যা নির্ধারণ করেছেন।’’ (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫৩১৫; সহীহ মুসলিম- অধ্যায় : লি‘আন, হাঃ ২৭৪১)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - লি‘আন
৩৩০৬-[৩] উক্ত রাবী [ইবনু ’উমার (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লি’আনকারী স্বামী-স্ত্রী উভয়কে বলেছেনঃ তোমাদের প্রকৃত বিচার (কিয়ামত দিবসে) আল্লাহই করবেন, নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে একজন মিথ্যাবাদী (কিন্তু তোমরা তা স্বীকার করছ না)। তোমার সাথে তার আর কোনো সম্পর্ক থাকল না। এটা শুনে স্বামী বলে উঠল, হে আল্লাহর রসূল! (মোহরে প্রদত্ত) আমার ধন-সম্পদের কি হবে? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তাতে তোমার কোনো অধিকার থাকবে না। কেননা তুমি যদি (ব্যভিচারের দাবিতে) সত্য বলে থাক, তবে ইতঃপূর্বে যে স্ত্রীর স্বাদ গ্রহণ করেছ তার বিনিময় প্রদান হয়ে গেছে। আর যদি মিথ্যারোপ করে থাক, তবে সে ধন-সম্পদ তোমার নিকট ফেরতের কথাই আসবে না, কাজেই এর দাবী তো করতেই পার না। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ اللِّعَانِ
وَعَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لِلْمُتَلَاعِنَيْنِ: «حِسَابُكُمَا عَلَى اللَّهِ أَحَدُكُمَا كَاذِبٌ لَا سَبِيلَ لَكَ عَلَيْهَا» قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَالِي قَالَ: «لَا مَالَ لَكَ إِنْ كُنْتَ صَدَقْتَ عَلَيْهَا فَهُوَ بِمَا اسْتَحْلَلْتَ مِنْ فَرْجِهَا وَإِنْ كُنْتَ كَذَبْتَ عَلَيْهَا فَذَاكَ أَبْعَدُ وَأبْعد لَك مِنْهَا»
ব্যাখ্যা: (حِسَابُكُمَا عَلَى اللّٰهِ أَحَدُكُمَا كَاذِبٌ) অর্থাৎ তোমাদের দু’জনের প্রকৃত হিসাব, মূল বিষয় উদঘাটন এবং এর প্রতিফল দেয়া আল্লাহ তা‘আলার ওপর। কেননা দু’জনের একজন অবশ্যই মিথ্যাবাদী। নিজ স্বীকারোক্তি ছাড়া তা জানার আমাদের ব্যবস্থা নেই। তা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা জানেন এবং তিনি প্রকৃত হিসাব নিতে পারেন। এই হাদীস থেকে আমরা এও বুঝতে পারি যে, গায়ব বা অদৃশ্যের জ্ঞানের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অদৃশ্য জ্ঞানের ক্ষমতা রাখেন না। তার সম্মুখে উপস্থিত দুই ব্যক্তির মাঝে কে সত্যবাদী এবং কে মিথ্যাবাদী এইটুকু যেখানে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জ্ঞানের ক্ষমতা দিয়ে বলতে পারছেন না সেখানে তিনি সার্বিক গায়বের জ্ঞানের অধিকারী কিভাবে হতে পারেন? আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া কেউই গায়বের জ্ঞানের অধিকারী নন, এর প্রমাণে কুরআন ও হাদীসের অসংখ্য বক্তব্য রয়েছে।
(لَا سَبِيلَ لَكَ عَلَيْهَا) অর্থাৎ তাকে পাওয়ার তোমার আর কোনো রাস্তা নেই। হাদীসের এই অংশটুকু তাদের দলীল যারা বলেন, লি‘আন সংঘটিত হওয়ার সাথে সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে যায়। পৃথক তালাক দেয়া বা বিচারকের বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এ সম্পর্কে ইতোপূর্বে আলোচনা হয়েছে।
(يَا رَسُوْلَ اللّٰهِ! مَالِىْ) হে আল্লাহর রসূল! আমার সম্পদ। অর্থাৎ তার অনৈতিক আচরণে বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটে গেল। এখন আমি তাকে বিবাহ করতে যে খরচ করেছি, মহর ব্যয় করেছি তার কি হবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এ কথার উত্তরে বললেন, তুমি সত্যবাদী হলে তোমার সম্পদ তাকে এতদিন ভোগ করার পিছনে খরচ হয়েছে। তাই তুমি কোনো সম্পদ পাবে না। বিয়ে করে ভোগের বিনিময়ে তা কেটে গেছে। আর তুমি মিথ্যাবাদী হলে তা পাওয়া তো অনেক দূরের কথা অর্থাৎ তা পাওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - লি‘আন
৩৩০৭-[৪] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন হিলাল ইবনু উমাইয়্যাহ্ (রাঃ) তার স্বীয় স্ত্রীর ওপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট অভিযোগ করেন যে, সে শরীক ইবনু সাহমাহ্-এর সাথে ব্যভিচারের লিপ্ত হয়েছে। এটা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ কর, অন্যথায় তোমার পিঠে (মিথ্যা অপবাদের দরুন) শাস্তি দেয়া হবে। তিনি উত্তরে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! যখন কোনো স্বামী স্বীয় স্ত্রীর সাথে কোনো পুরুষকে ব্যভিচারে লিপ্ত দেখতে পাবে, তখন কি সে (ত্বলাক (তালাক)ের জন্য) সাক্ষ্য-প্রমাণ সন্ধানে বের হবে? কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতে থাকলেন, সাক্ষ্য-প্রমাণ নিয়ে এসো, অন্যথায় তোমার পিঠে (মিথ্যা অপবাদের) শাস্তি দেয়া হবে। হিলাল বললেন, শপথ সেই আল্লাহর! যিনি আপনাকে নবীরূপে সত্যায়িত করে পাঠিয়েছেন। আমার (অভিযোগে) আমি নিশ্চয় সত্যবাদী। অবশ্যই আল্লাহ তা’আলা এমন বিধান নাযিল করবেন, যার দরুন আমার পিঠ (অপবাদের) কোড়া হতে রক্ষা করবেন। (রাবী বলেন) অতঃপর জিবরীল (আঃ) অবতরণ করে (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর) আল্লাহর আয়াত নাযিল করলেন- অর্থাৎ- ’’এবং যারা নিজের স্ত্রীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে ..... তার স্বামী সত্যবাদী হলে’’- (সূরা আন্ নূর ২৪ : ৬-৯ আয়াত) পর্যন্ত পৌঁছলেন।
এরপর হিলাল এসে (স্ত্রীসহ) লি’আনের জন্য প্রস্তুত হলো। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উভয়কে বলতে লাগলেন- জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ অবগত আছেন যে, তোমাদের মধ্যে একজন মিথ্যাবাদী। অতএব তোমাদের মধ্যে কেউ কি তওবা্ করতে প্রস্তুত? (উভয়ের অনড় অবস্থানের দরুন) অতঃপর তার স্ত্রী উঠে দাঁড়াল এবং লি’আনের সাক্ষ্য দিল। কিন্তু যখন পঞ্চমবারে সে উদ্যত হলো, তখন উপস্থিত লোকেরা তাকে থামাতে চেষ্টা করে বলল, সাবধান! এবারের শপথে আল্লাহর গযব অবধারিত (তাই বিরত হও)। এতে স্ত্রীলোকটি থেমে গেল এবং স্থির হয়ে গেল। আমাদের ধারণা হতে লাগল যে, স্ত্রীলোকটি স্বীয় দাবি হতে সরে যাবে। কিন্তু পরক্ষণেই এই বলে লি’আন করল যে, চিরকালের জন্য আমি আমার বংশের মর্যাদাহানী করব না, এ কথা বলে সে পঞ্চমবারের শপথও শেষ করল। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা দেখে রাখবে, যদি সে কালো ভ্রূযুক্ত ও বড় বড় নিতম্ব এবং মোটা নলাবিশিষ্ট সন্তান প্রসব করে, তবে সন্তানটি শরীক ইবনু সাহমাহ্-এর। পরিশেষে স্ত্রীলোকটি এরূপ বর্ণনার সন্তানই প্রসব করল। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যদি আল্লাহর কিতাবের হুকুম-আহকাম জারী না হতো, তবে আমি ঐ স্ত্রীলোকটিকে নিদারুণ শিক্ষা দিতাম। (বুখারী)[1]
بَابُ اللِّعَانِ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ: أَنَّ هِلَالَ بْنَ أُمَيَّةَ قَذَفَ امْرَأَتَهُ عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِشَرِيكِ بْنِ سَحْمَاءَ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْبَيِّنَةَ أَوْ حَدًّا فِي ظَهْرِكَ» فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِذَا رَأَى أَحَدُنَا عَلَى امْرَأَتِهِ رَجُلًا يَنْطَلِقُ يَلْتَمِسُ الْبَيِّنَةَ؟ فَجَعَلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «الْبَيِّنَةَ وَإِلَّا حَدٌّ فِي ظَهْرِكَ» فَقَالَ هِلَالٌ: وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ إِنِّي لَصَادِقٌ فَلْيُنْزِلَنَّ اللَّهُ مَا يُبَرِّئُ ظَهْرِي مِنَ الْحَدِّ فَنَزَلَ جِبْرِيلُ وَأنزل عَلَيْهِ: (وَالَّذين يرْمونَ أَزوَاجهم)
فَقَرَأَ حَتَّى بَلَغَ (إِنْ كَانَ مِنَ الصَّادِقِينَ)
فَجَاءَ هِلَالٌ فَشَهِدَ وَالنَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «إِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ أَنَّ أَحَدَكُمَا كَاذِبٌ فَهَلْ مِنْكُمَا تَائِبٌ؟» ثُمَّ قَامَتْ فَشَهِدَتْ فَلَمَّا كَانَتْ عِنْدَ الْخَامِسَةِ وَقَفُوهَا وَقَالُوا: إِنَّهَا مُوجِبَةٌ فَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ: فَتَلَكَّأَتْ وَنَكَصَتْ حَتَّى ظَنَنَّا أَنَّهَا تَرْجِعُ ثُمَّ قَالَتْ: لَا أَفْضَحُ قَوْمِي سَائِرَ الْيَوْمِ فَمَضَتْ وَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَبْصِرُوهَا فَإِنْ جَاءَتْ بِهِ أَكْحَلَ الْعَيْنَيْنِ سَابِغَ الْأَلْيَتَيْنِ خَدَلَّجَ السَّاقِينَ فَهُوَ لِشَرِيكِ بْنِ سَحْمَاءَ» فَجَاءَتْ بِهِ كَذَلِكَ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَوْلَا مَا مَضَى مِنْ كِتَابِ اللَّهِ لَكَانَ لِي وَلَهَا شَأْن» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: (إِنَّ اللّٰهَ يَعْلَمُ أَنَّ أَحَدَكُمَا كَاذِبٌ فَهَلْ مِنْكُمَا تَائِبٌ؟) অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘‘আল্লাহ জানেন নিশ্চয় তোমাদের একজন মিথ্যুক। তোমাদের মধ্যে কি কোনো একজন তাওবাকারী আছে?’’ অর্থাৎ তোমাদের উভয়ে জিদের উপর না থেকে প্রকৃত কথা স্বীকার করে নিলে হয়। দু’জনের একজন নিশ্চিত মিথ্যুক। বাহযত মনে হয় রসূলুল্লাহ এই কথা লি‘আন কার্যকর হওয়ার পর বলেছেন। উদ্দেশ্য হলো যে, মিথ্যুক যেন তাওবাহ্ করে নেয়। আবার লি‘আনের পূর্বেই তাদেরকে সতর্ক করার জন্যও বলতে পারেন। প্রকৃতপক্ষে যে মিথ্যুক সে যেন লি‘আন দ্বারা নিজের উপর অভিশাপ ডেকে না আনে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
(إِنَّهَا مُوجِبَةٌ) নিশ্চয় এটা সাব্যস্তকারী। অর্থাৎ এভাবে নিজের ওপর অভিশাপ দেয়া নিজের বিপদ ডেকে আনা। যে লি‘আনের মাধ্যমে নিজের ওপর অভিশাপের দু‘আ করে তা কার্যকর হয়ে যায়। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে থামাও। কেননা সে এর পরিণতি লক্ষ্য না করে লি‘আন করেই যাচ্ছে।
হাদীস থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিশ্চয় বুঝে নিয়েছিলেন যে, প্রকৃত মিথ্যাবাদী হিলাল নয়, বরং তার স্ত্রীই মিথ্যাবাদী। বিভিন্ন আলামত থেকে বিষয়টি মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে গেছে। বিশেষ করে হিলালের দাবীর উপর আয়াত নাযিল হওয়া তার একটি প্রমাণ। সত্য কথা বলে সাক্ষী নিয়ে আসতে না পারার অপরাধে তিনি যেন অপরাধী হয়ে শাস্তি ভোগ না করেন, তাই আল্লাহ তার কথার পর পরই এ সংক্রান্ত বিধান নাযিল করেন। বিভিন্ন নিদর্শন থেকে হিলালের স্ত্রী মিথ্যাবাদী হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও যিনা সাব্যসেত্মর শারী‘আত দলীল না থাকায় তার ওপর যিনার বিধান আরোপ করা হয়নি। এ থেকে বুঝা যায়, বিচারককে সর্বদা দলীলের উপর নির্ভর করতে হবে। যে বস্তু প্রমাণের জন্য যে দলীল শারী‘আত কর্তৃক নির্ধারিত সেই দলীল ছাড়া অন্য কোনা আকার ইঙ্গিতে কোনো কিছু বুঝা গেলে এর উপর নির্ভর করে কোনো ফায়সালা করা যাবে না।
(لَا أَفْضَحُ قَوْمِىْ سَائِرَ الْيَوْمِ) অর্থাৎ এখন যিনার স্বীকারোক্তি করে আমার গোত্রকে সর্বদার জন্য লাঞ্ছিত করব না। অর্থাৎ যিনা স্বীকার করলে আমাকে ও আমার গোত্রকে লাঞ্ছনার কালিমা লেপন করতে হবে। এখান থেকে জানা যায় যে, হিলালের দাবীর ভিত্তিতে যিনার স্বীকার না করা কেবল তার দুনিয়াবী লাঞ্ছনা থেকে বাঁচার কারণে ছিল। দুনিয়ার স্বার্থ আখিরাতের তুলনায় বড় করে দেখার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাসীহাত তার কাছে কাজে আসেনি।
(فَإِنْ جَاءَتْ بِه أَكْحَلَ الْعَيْنَيْنِ) ‘‘যদি সে জন্ম দেয় কাজলকালো চোখওয়ালা.....।’’ হাদীসের এই অংশ থেকে বাহযত বুঝা যায় যে, সাদৃশ্য থেকে কারো বংশ নির্বাচন করা যেতে পারে। কিন্তু বিষয়টি যেহেতু নিশ্চিত নয়, তাই কেবল সাদৃশ্যের মাধ্যমে কারো বংশ সাব্যস্ত হবে না। তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদৃশ্যের ভিত্তিতে বাচ্চাকে একজনের দিকে সম্পৃক্ত করলেও বিষয়টিকে একটি অনুমানমূলক হিসেবে ধরা হয়েছে। কেননা সাদৃশ্য বংশের চূড়ান্ত ফায়সালা হলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে বাচ্চা প্রসবের অপেক্ষা করে বাচ্চা দেখে লি‘আন না করেই হিলালের স্ত্রীকে যিনাকারিণী সাব্যস্ত করে যিনার বিধান জারী করতে পারতেন। রসূলের এমনটি না করাই প্রমাণ করে, তাঁর এ কথাটি একটি ধারণার উপর ছিল। যদিও রসূলের ধারণা সঠিক। এছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়াহীর মাধ্যমে বিষয়টি জানার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু শারী‘আত দলীল না থাকায় যিনার বিধান কার্যকর করা যায়নি। তাই এ হাদীসের আলোকে বাচ্চার সাদৃশ্যতা দেখে কাউকে তার দিকে সম্পৃক্ত করা যাবে না এবং কোনো মেয়েকে যিনাকারিণী সাব্যস্ত করা যাবে না।
(لَوْلَا مَا مَضٰى مِنْ كِتَابِ اللّٰهِ) যদি আল্লাহর কিতাবে এর হুকুম না যেত, অর্থাৎ যদি আল্লাহ তা‘আলার কিতাবে যিনার বিধান ও তা সাব্যসেত্মর নির্ধারিত নীতি না থাকত তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটা ব্যবস্থা নিতেন। কারণ বিভিন্ন আলামত দ্বারা রসূলের কাছে হিলালের স্ত্রী যিনাকারিণী বলে প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যিনার দণ্ডবিধি প্রয়োগের জন্য আল্লাহ তা‘আলার নির্ধারিত হুকুম রয়েছে। তিনি এর বাহিরে যাওয়ার ক্ষমতা রাখেন না। (ফাতহুল বারী ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৭৪৭)
সতর্কতাঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর প্রেরিত নাবী ও রসূল। আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে ইজতিহাদ গবেষণা করে মাসআলাহ্ দেয়ার ক্ষমতাপ্রাপ্ত। কিন্তু ইজতিহাদ বা গবেষণার আলোকে যে হুকুম তিনি দিবেন তা কুরআনের হুকুমের বাহিরে চলে যায় কিনা এ ক্ষেত্রে তার এত ভয় হলে আমরা যারা বিভিন্ন ওজুহাত ও যুক্তির আলোকে কুরআনের ব্যাখ্যার নামে অপব্যাখ্যা করি এবং কুরআনের খেলাফ বিধান দেই তাদের চিন্তা করা উচিত এবং আল্লাহ ও আখিরাতের হিসাবের ভয় করে এমন কর্ম থেকে বিরত থাকা অপরিহার্য।
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - লি‘আন
৩৩০৮-[৫] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (খাযরাজ গোত্রের নেতা) সা’দ ইবনু ’উবাদাহ্ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট জানতে চাইলেন, যদি কোনো পুরুষকে আমার স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত দেখি, তবে চারজন সাক্ষ্য-প্রমাণ ব্যতীত তাকে কি কিছু বলব না? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন- হ্যাঁ (কিছুই বলবে না)। সা’দ(রাঃ) বললেন, কক্ষনো সম্ভব নয়! সেই আল্লাহর শপথ, যিনি আপনাকে সত্য নবীরূপে পাঠিয়েছেন, আমি তো চারজন সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের পূর্বেই তাকে তরবারির আঘাতে নিঃশেষ করে দিব। এটা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (আনসারীগণের উদ্দেশে) বললেন, শুন! তোমাদের নেতা কি বলে? নিশ্চয় সা’দ অত্যন্ত আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি, আর আমি তার অপেক্ষা অধিক আত্মমর্যাদাশীল। আর আল্লাহ তা’আলা তো আমার চেয়েও অধিক আত্মমর্যাদাসম্পন্ন। (মুসলিম)[1]
بَابُ اللِّعَانِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ سَعْدُ بْنُ عُبَادَةَ: لَوْ وَجَدْتُ مَعَ أَهْلِي رَجُلًا لَمْ أَمَسَّهُ حَتَّى آتِيَ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ؟ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «نَعَمْ» قَالَ: كَلَّا وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ إِنْ كُنْتُ لَأُعَاجِلُهُ بِالسَّيْفِ قَبْلَ ذَلِكَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اسْمَعُوا إِلَى مَا يَقُولُ سَيِّدُكُمْ إِنَّهُ لَغَيُورٌ وَأَنَا أَغْيَرُ مِنْهُ وَالله أغير مني» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: (لَمْ أَمَسَّه حَتّٰى اٰتِىَ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ؟) বর্ণিত বাক্যটিতে সুদূর পরাহতমূলক প্রশ্ন চিহ্ন হামযাহ হরফ উহ্য রয়েছে। অর্থাৎ আমার স্ত্রীকে পর পুরুষের সাথে পাওয়ার পরও কি আমি চার সাক্ষী না নিয়ে আসা পর্যন্ত তাকে স্পর্শ করব না? অর্থাৎ তার শরীরে হাত তুলব না? তাকে প্রহার করব না? সাহাবীর আত্মমর্যাদার কাছে কাজটি অনেক বড় মনে হলে তিনি আশ্চর্য হয়ে এই প্রশ্ন করেন। তার প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হ্যাঁ। অর্থাৎ এমনটি করা যাবে না। কেননা এর জন্য নির্ধারিত বিধান রয়েছে।
হাদীসের এই অংশ থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, যে আইন প্রয়োগের যে নীতি বা বিধান রয়েছে তা সেই নীতির আলোকেই চলবে এবং সেভাবেই প্রয়োগ করতে হবে। আইন বা কানুনকে কখনো নিজের হাতে তুলে নেয়া যাবে না। সবাই নিজের হাতে আইনকে তুলে নিলে সমাজের কি দুরাবস্থা হবে তা একটু চিন্তা করলেই বুঝা যায়।
(كلا) অর্থাৎ কখনো এমন হতে পারে না। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথার উপর এমনটি বলা অবশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ। তবে মানুষ অনেক সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অনিচ্ছায় কিছু ঘটে গেলে সে ক্ষমাপ্রাপ্ত। সা‘দ ইবনু ‘উবাদার ঘটনাটি এমনই ছিল। ইমাম নববী (রহঃ) মাওয়ার্দী এবং অন্যান্যদের বরাত দিয়ে বলেন, ‘‘তার কথা ‘কখনো না...’’ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথাকে প্রত্যাখ্যান করতঃ ছিল না, রসূলের নির্দেশের বিরোধবশত ছিল না। এটি কেবল মানুষের সেই সময়কার অনিয়ন্ত্রিত অবস্থার খবর দেয়া, যখন সে কোনো বে-গানা পুরুষকে তার স্ত্রীর সাথে দেখে এবং ক্রোধ তার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এমতাবস্থায় সে লোক দ্রুত তরবারিই ব্যবহার করবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রতিবাদের কারণ বুঝতে পেরেছেন। অর্থাৎ সে এ কথা রসূলের কথার বিরোধী হয়ে বলেনি বরং আত্মমর্যাদার আবেগে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বলেছে। তাই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এমন কথার ওযর তুলে ধরে বলেন, তোমাদের সাথীর আত্মমর্যাদা দেখো। আমি আরো বেশি আত্মমর্যাদাবান এবং আল্লাহ তা‘আলা আমার চেয়ে বেশি আত্মমর্যাদাবান। (শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪৯৮; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - লি‘আন
৩৩০৯-[৬] মুগীরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সা’দ ইবনু ’উবাদাহ্(রাঃ) বললেন, আমি যদি কোনো পুরুষকে আমার স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত দেখি, তবে আমি তরবারি দিয়ে হত্যা করে ফেলব। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি বলেন, তোমরা কি সা’দ-এর আত্মমর্যাদবোধে বিস্ময় প্রকাশ করছ? আল্লাহর কসম! নিশ্চয় আমি তো তার চেয়ে অধিক আত্মমর্যাদসম্পন্ন, আর আল্লাহ তা’আলা তো আমার চেয়েও অধিক আত্মমর্যাদাশীল। তাঁর আত্মসম্ভ্রমের দরুন তিনি প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল প্রকার অশ্লীল বিষয় হারাম বা নিষিদ্ধ করেছেন। আর মানুষের ওযর-আপত্তি দূর করা আল্লাহর চেয়ে অধিক কেউ ভালোবাসে না। এ কারণে তিনি মানুষের মাঝে সুসংবাদদাতা ও ভয়প্রদর্শনকারী নবী-রসূলরূপে পাঠিয়েছেন, আর আল্লাহ সর্বাপেক্ষা নিজের প্রশংসা-স্তুতি শুনতে ভালোবাসেন বলে জান্নাতের ওয়া’দাহ্ দিয়েছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ اللِّعَانِ
وَعَنِ الْمُغِيرَةَ قَالَ: قَالَ سَعْدُ بْنُ عُبَادَةَ: لَوْ رَأَيْتُ رَجُلًا مَعَ امْرَأَتِي لَضَرَبْتُهُ بِالسَّيْفِ غَيْرَ مُصْفِحٍ فَبَلَغَ ذَلِكَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «أَتَعْجَبُونَ مِنْ غَيْرَةِ سَعْدٍ؟ وَاللَّهِ لَأَنَا أَغْيَرُ مِنْهُ وَاللَّهُ أَغْيَرُ مِنِّي وَمِنْ أَجْلِ غَيْرَةِ اللَّهِ حَرَّمَ اللَّهُ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَلَا أَحَدَ أَحَبُّ إِلَيْهِ الْعُذْرُ مِنَ اللَّهِ مِنْ أَجْلِ ذَلِكَ بَعَثَ الْمُنْذِرِينَ وَالْمُبَشِّرِينَ وَلَا أَحَدَ أَحَبُّ إِلَيْهِ الْمِدْحَةُ مِنَ اللَّهِ وَمِنْ أَجْلِ ذَلِكَ وَعَدَ اللَّهُ الْجَنَّةَ»
ব্যাখ্যা: বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সা‘দ-এর কথাকে প্রশংসনীয়রূপে দেখলেন; কেননা তার কথাটি আত্মমর্যাদার উপর আঘাত আসার ভিত্তিতে ছিল। পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা‘আলা আত্মমর্যাদার ব্যাখ্যা দেন। হাদীসের আলোকে এর সারমর্ম হলো, গইরত বা আত্মমর্যাদা হচ্ছে, ব্যক্তি তারা মালিকানাধীন বস্তুতে অন্যকে হস্তক্ষেপ করতে দেখলে অপছন্দ করে এবং রাগাম্বিত হয়। মানুষের কাছে প্রসিদ্ধ যে, কেউ তার স্ত্রীর দিকে অন্যকে তাকাতে দেখলে বা স্ত্রীর সাথে কোনো কর্মে লিপ্ত দেখলে মানুষ রাগ করে; কেননা এতে তার অধিকারে হস্তক্ষেপ করা হয়। তদ্রূপ আল্লাহর তা‘আলার মালিকানাধীন বিষয়ে হস্তক্ষেপ আল্লাহর ক্রোধের কারণ। আল্লাহ তাঁর এই আত্মমর্যাদার কারণেই অশ্লীলতাকে হারাম করেছেন। নিজের অধিকারভুক্ত ব্যক্তির সাথে অশ্লীলতা দেখলে মানুষের আত্মমার্যায় যেমন আঘাত হানে, তার চেয়ে বেশি আঘাত হানে আল্লাহর আত্মমর্যাদায়; কেননা সবই আল্লাহর প্রকৃত মালিকানাধীন। আর এ কারণে আল্লাহ তা‘আলা প্রকাশ্য এবং গোপনীয় সর্বপ্রকার অশ্লীলতাকে হারাম করেছেন। মালিকানার আধিক্যের ভিত্তিতে আল্লাহর আত্মমর্যাদাও তেমন অধিক।
(وَلَا أَحَدَ أَحَبُّ إِلَيْهِ الْمِدْحَةُ مِنَ اللّٰهِ) অর্থাৎ ওযুহাতকে আল্লাহর চেয়ে অধিক ভালোবাসে এমন কেউ নেই। এ কথার মাধ্যমে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সা‘দ -কে তার কর্ম থেকে বারণ করা উদ্দেশ্য। অর্থাৎ আল্লাহর তা‘আলার গাইরত অধিক হওয়া সত্ত্বেও তিনি ওযর ভালোবাসেন। তার মর্যাদায় আঘাত হানলেও যে কোনো ওযুহাতে তিনি তা ছেড়ে দেন। পূর্ণ দলীল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত শাস্তি দেন না। শাস্তির দলীল পূর্ণ প্রতিষ্ঠার জন্য নাবী পাঠান, যারা সতর্ক করেন এবং সুসংবাদ দেন। তাই সা‘দ বা যে কারো জন্যেই আত্মমর্যাদায় আবেগপ্রবণ হয়ে দলীল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে কোনো কর্মতৎপরতায় যাওয়া ঠিক নয়। মোটকথা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সা‘দ-এর আবেগপ্রবণ কথার উপর আপত্তি না করলেও সা‘দ যে ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন সেই কর্মে যাওয়ার উপর আপত্তি করেন। (ফাতহুল বারী ১৩ম খন্ড, হাঃ ৭৪১৬)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - লি‘আন
৩৩১০-[৭] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা আত্মমর্যাদাসম্পন্ন; আর মু’মিন মাত্রই আত্মমর্যাদাবোধ থাকে। আল্লাহর আত্মমর্যাদা হলো, তিনি যা হারাম করেছেন, মু’মিন যেন তা হতে দূরে থাকে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ اللِّعَانِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم: «إِن اللَّهَ تَعَالَى يَغَارُ وَإِنَّ الْمُؤْمِنَ يَغَارُ وَغَيْرَةُ اللَّهِ أَنْ لَا يَأْتِيَ الْمُؤْمِنُ مَا حَرَّمَ الله»
ব্যাখ্যা: (وَغَيْرَةُ اللّٰهِ أَنْ لَّا يَأْتِىَ) সহীহুল বুখারীর কোনো কোনো নুসখায় বর্ণিত ইবারতটি এভাবে (لا) সহকারে এসেছে। অর্থাৎ আল্লাহর গাইরত হলো, মু’মিন আল্লাহ কর্তৃক হারামে লিপ্ত হবে না। কিন্তু বুখারীর অধিকাংশ নুসখায় ইবারতটি (لا) ছাড়া। ফাতহুল বারীতে লিখেন, বুখারীর অধিকাংশ বর্ণনাকারী (لا) ছাড়া বর্ণনা করেছেন। অনেকের মতে এটাই সঠিক। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫২২৩)
আমরা ইবারতটিকে (لا) সহ ধরে নিলে তার মর্ম হবে, আল্লাহর মর্যাদার রক্ষা হলো; মু’মিন আল্লাহ কর্তৃক হারামে লিপ্ত হবে না। আর (لا) ছাড়া হলে ইবারতটির মর্ম হবে, আল্লাহর মর্যাদার লঙ্ঘন হলো; মু’মিন আল্লাহ কর্তৃক হারামে লিপ্ত হওয়া। الله اعلم
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - লি‘আন
৩৩১১-[৮] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন জনৈক বেদুইন এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলল, আমার স্ত্রী এক কালো পুত্রসন্তান প্রসব করেছে, আমি তা (আমার সন্তান বলে) অস্বীকার করি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি উট আছে? সে বলল, জি, হ্যাঁ। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, উটগুলো কি রঙের? সে বলল, লাল রঙের। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এর মধ্যে কি লাল-কালো বা ছাই রঙেরও উট আছে? সে বলল, হ্যাঁ, সে রকম উটও আছে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, প্রশ্ন করলেন, তাহলে ঐ রঙের কিভাবে আসলো? সে বলল, বংশানুক্রমে এসেছে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমার সন্তানও তো বংশানুক্রমে কালো বর্ণের লাভ করতে পারে। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে সন্তান অস্বীকৃতির অনুমতি দিলেন না। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ اللِّعَانِ
وَعَنْهُ أَنَّ أَعْرَابِيًّا أَتَى رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: إنَّ امْرَأَتي ولدَتْ غُلَاما أسودَ وَإِنِّي نكرته فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «هَلْ لَكَ مِنْ إِبِلٍ؟» قَالَ: نَعَمْ قَالَ: «فَمَا أَلْوَانُهَا؟» قَالَ: حُمْرٌ قَالَ: «هَلْ فِيهَا مِنْ أَوْرَقَ؟» قَالَ: إِنَّ فِيهَا لَوُرْقًا قَالَ: «فَأَنَّى تُرَى ذَلِكَ جَاءَهَا؟» قَالَ: عِرْقٌ نَزَعَهَا. قَالَ: «فَلَعَلَّ هَذَا عِرْقٌ نَزَعَهُ» وَلَمْ يُرَخِّصْ لَهُ فِي الِانْتِفَاءِ مِنْهُ
ব্যাখ্যা: (عِرْقٌ نَزَعَهَا) বংশ সূত্রের প্রভাবে এমনটি হয়েছে। অর্থাৎ লাল উট থেকে ধূসরবর্ণ বাচ্চা জন্ম নেয়ার কারণ বংশ সূত্রের প্রভাবে হতে পারে। তথা উটের পূর্ব বংশের কোনো একটি এই বর্ণের থাকার প্রভাব অনেক পরেও পড়তে পারে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেদুইনের কথার উত্তরে বললেন, উটের মতো এই সন্তানটিও বংশ সূত্রের প্রভাবে কালো হতে পারে। অর্থাৎ মায়ের মতো না হওয়া ছেলেটি এই মায়ের নয়- এ কথা প্রমাণ করে না।
‘আল্লামা ত্বীবী বলেনঃ এই হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, দুর্বল আলামত দ্বারা বাচ্চার বংশ অস্বীকার করা যাবে না। বরং বাচ্চার বংশ নাকচ করতে স্পষ্ট দৃঢ় দলীলের প্রয়োজন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
ইমাম নববী বলেনঃ বর্ণিত হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, সন্তান তার পিতার দিকে সম্পৃক্ত হবে, যদিও পিতার বর্ণ ও সন্তানের বর্ণ এক না হয়। এমনকি যদি পিতা সাদা হয় এবং সন্তান কালো হয় বা এর বিপরীত পিতা কালো এবং সন্তান সাদা হয় তবুও সন্তান পিতার দিকেই সম্পৃক্ত হবে। কেবল বর্ণের কারণে বাচ্চার বংশ নাকচ করা যাবে না। এভাবে স্বামী স্ত্রী উভয় সাদা হয় এবং বাচ্চা কালো হয় বা এর বিপরীত হয় তবু বাচ্চাকে নাকচ করা যাবে না। কেননা তার পূর্বের কারো প্রভাব বাচ্চার উপর পড়তে পারে।
হাদীস থেকে আরো বুঝা যায় যে, বাচ্চা নাকচের ইঙ্গিতে তা নাকচ করা হয়েছে বলে গণ্য হবে না এবং অপবাদের দিকে ইঙ্গিত করলে অপবাদ করা হয়েছে বলে গণ্য হবে না।
বর্ণিত হাদীস থেকে ক্বিয়াস ও সাদৃশ্যের ধর্তব্য এবং উপমা পেশ করার প্রমাণ মিলে।
হাদীস থেকে বংশ নাকচ যাতে না হয় সেদিকে সতর্কতা অবলম্বন এবং কেবল সম্ভাবনার দ্বারা বংশের সম্পৃক্ত করার প্রমাণ মিলে। (শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৫০০)
ইমাম নববী (রহঃ)-এর কথা, হাদীসে ক্বিয়াস জায়িযের প্রমাণ মিলে অর্থাৎ মূল ক্বিয়াস জায়িয হওয়ার প্রমাণ মিলে। যদিও এখানে ক্বিয়াস দুর্বল হওয়ার কারণে এর ভিত্তিতে বাচ্চাকে নাকচ করা যাচ্ছে না।
এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, কেবল সাদৃশ্যের ভিত্তিতে বাচ্চাটি কার এ কথা প্রমাণিত হবে না। পূর্বে আমরা এই মাসআলার দিকে ইঙ্গিত করে এসেছি।
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - লি‘আন
৩৩১২-[৯] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কুরায়শ নেতা ’উতবাহ্ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (উহুদ যুদ্ধে কাফির অবস্থায় যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দন্ত মুবারক শহীদ করেছিল) সে তার ভাই সা’দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ)-এর নিকট মৃত্যুর পূর্বে ওয়াসিয়্যাত করে যায় যে, কুরায়শ নেতা যাম্’আহ্-এর দাসীর গর্ভজাত সন্তান আমার ঔরসের, তুমি তাকে (স্বীয় ভাইয়ের পুত্ররূপে) নিয়ে এসো। তিনি [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] বলেন, মক্কা বিজয়ের সময়ে সা’দ তাকে গ্রহণ করে বলল, এ আমার ভাইয়ের পুত্র। এদিকে যাম্’আহ্-এর পুত্র ’আব্দ (অস্বীকৃতি জানিয়ে বাধা সৃষ্টি করল), এ তো আমার ভাই। অতঃপর উভয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হলো।
সা’দ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমার ভাই একে গ্রহণ করার জন্য আমাকে ওয়াসিয়্যাত করেছে। এর প্রতিবাদে ’আব্দ ইবনু যাম্’আহ্ বলল, আমার ভাই, আমার পিতার দাসীর গর্ভের সন্তান, আমার পিতার শয্যাসঙ্গিনীর উৎসে জন্মেছে। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে ’আবদ ইবনু যাম্’আহ্! সে তোমারই অংশিদারিত্ব হবে। শয্যা যার সন্তান তার আর ব্যভিচারীর জন্য পাথর (অর্থাৎ- বঞ্চিত হওয়া)। অতঃপর তিনি স্বীয় সহধর্মিণী সাওদাহ্ বিনতু যাম্’আহ্ (রাঃ)-কে সম্বোধন করে বললেন, তুমি ঐ সন্তান হতে পর্দা করবে, সে তোমার ভাই নয়। কারণ তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পুত্রটির মাঝে ’উত্বার গঠন-প্রকৃতির সাদৃশ্য দেখতে পান। অতঃপর ছেলেটি মৃত্যু পর্যন্ত সাওদার সামনে আসেনি। অপর এক বর্ণনায় আছে- হে ’আব্দ ইবনু যাম্’আহ্! ঐ ছেলেটি তোমার ভাই, কেননা সে তার পিতার শয্যাসঙ্গিনীর উৎসে জন্মগ্রহণ করেছে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ اللِّعَانِ
وَعَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: كَانَ عُتْبَةُ بْنُ أَبِي وَقَّاصٍ عَهِدَ إِلَى أَخِيهِ سَعْدِ بْنِ أَبِي وَقَّاصٍ: أَنَّ ابْنَ وَلِيدَةِ زَمْعَةَ مِنِّي فَاقْبِضْهُ إِلَيْكَ فَلَمَّا كَانَ عَامُ الْفَتْحِ أَخَذَهُ سَعْدٌ فَقَالَ: إِنَّهُ ابْنُ أَخِي وَقَالَ عَبْدُ بْنُ زَمْعَةَ: أَخِي فَتَسَاوَقَا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ سَعْدٌ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ أَخِي كَانَ عَهِدَ إِلَيَّ فِيهِ وَقَالَ عَبْدُ بْنُ زَمْعَةَ: أَخِي وَابْن وليدة أبي وُلِدَ على فرَاشه فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «هُوَ لَكَ يَا عَبْدُ بْنَ زَمْعَةَ الْوَلَدُ لِلْفِرَاشِ وَلِلْعَاهِرِ الْحَجَرُ» ثُمَّ قَالَ لِسَوْدَةَ بِنْتِ زَمْعَةَ: «احْتَجِبِي مِنْهُ» لِمَا رَأَى مِنْ شَبَهِهِ بِعُتْبَةَ فَمَا رَآهَا حَتَّى لَقِيَ اللَّهَ وَفِي رِوَايَةٍ: قَالَ: «هُوَ أَخُوكَ يَا عَبْدُ بْنَ زَمَعَةَ مِنْ أَجْلِ أَنَّهُ وُلِدَ عَلَى فِرَاشِ أَبِيهِ»
ব্যাখ্যা: (الْوَلَدُ لِلْفِرَاشِ) ‘‘শয্যা যার সন্তান তার’’ অর্থাৎ যদি কোনো ব্যক্তির স্ত্রী থাকে বা তার মালিকানাধীন দাসী থাকে যাকে সে শয্যায় নিয়েছে, তবে সম্ভাবনাময় সময়ের ভিতর মেয়েটি বাচ্চা জন্ম দিলে সেই বাচ্চার বংশ উক্ত ব্যক্তির দিকে সম্পৃক্ত হবে, আর পিতা ও বাচ্চার মাঝে মীরাসের বিধান এবং পিতা পুত্রের অন্যান্য বিধান কার্যকর হবে। চাই বাচ্চা বর্ণ বা সাদৃশ্যে পিতার মতো হোক বা না হোক।
মহিলা কারো ফিরাশ বা শয্যা কেবল বিবাহের ‘আকদের মাধ্যমে হয়ে যায়। ‘আলিমগণ এ বিষয়ে ইজমা বা ঐকমত্য বর্ণনা করেন। তবে তারা শর্ত করেন যে, শয্যা প্রমাণিত হওয়ার পর সহবাসের সম্ভাবনা থাকতে হবে। যদি সহবাসের কোনো সম্ভাবনা না থাকে যেমন পশ্চিমা কোনো ব্যক্তি প্রাচ্য কোনো নারীকে বিবাহ করল কিন্তু তাদের কেউই কোনো সময় তাদের দেশ ত্যাগ করেনি, এমতাবস্থায় মেয়ে যদি সম্ভাবনাময় সময় তথা বিয়ের ছয় মাস পরেও বাচ্চা জন্ম দেয় তবে বাচ্চাটি ঐ ব্যক্তির হবে না। কেননা এটা তার হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। এটা হচ্ছে ইমাম মালিক, শাফি‘ঈ এবং সমস্ত ‘আলিমদের মত। তবে ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) সম্ভাবনার শর্ত করেননি। কেবল বিবাহের ‘আকদের মাধমে তার নিকট বাচ্চার বংশ প্রমাণ হয়ে যাবে যদি ঐ ব্যক্তি বাচ্চাকে তার বলে অস্বীকার না করে।
ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) বাচ্চার বংশ প্রমাণে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনে এই মত পোষণ করেছেন। অর্থাৎ একটি বাচ্চাকে জারজ না বলার সর্বোচ্চ উপায় খুঁজতে হবে। একান্ত নিরুপায় না হলে চেষ্টা করতে হবে তার বংশ প্রমাণের। এখানে বিয়েটাকেই একটি উপায় হিসেবে ধরে নেয়া হয়েছে। তাই অসম্ভবের ক্ষেত্রেও লোকটি যদি বাচ্চাকে তার বলে গ্রহণ করে নেয় তবে তাকে জারজ বলে সমাজে আখ্যায়িত করে বংশ জড় কাটার চেয়ে ভালো।
এ হলো স্ত্রীর ক্ষেত্রে শয্যা প্রমাণিত হওয়া। তবে দাসীর ক্ষেত্রে শয্যা কেবল সহবাস দ্বার প্রমাণিত হবে। কোনো দাসী কারো মালিকানায় আসলে সে তার শয্যা বলে গণ্য হবে না যতক্ষণ না উক্ত ব্যক্তি তার সাথে সহবাস করেছে।
(وَلِلْعَاهِرِ الْحَجَرُ) ‘‘আর ব্যভিচারী বঞ্চিত’’ বাক্যটির শাব্দিক অর্থ হলো যিনাকারীর জন্য পাথর। অর্থাৎ তার জন্য ব্যর্থতা ও বঞ্চিত হওয়া ছাড়া কিছু নেই। বাচ্চার বেলায় তার কোনো অধিকার নেই। ‘আরবরা তার জন্য পাথর এবং তার মুখে মাটি বলে উদ্দেশ্য করেন, তার জন্য ব্যর্থতা ও বঞ্চিত হওয়া ছাড়া কিছু নেই। কেউ কেউ বলেন, তার জন্য পাথর অর্থাৎ তার ওপর রজমের দণ্ডবিধি প্রয়োগ হবে। ইমাম নববী এই মত উল্লেখের পর বলেন, এটি দুর্বল; কেননা যে কোনো যিনাকারীকে রজম করা যায় না। রজম কেবল শারী‘আতে বিবাহিতা ব্যক্তির ওপর প্রয়োগ হয়। এছাড়া কেবল বাচ্চা নাকচের দ্বারা রজমের বিধান জারী হয় না। অথচ হাদীসটি বাচ্চা নাকচের বেলায় বর্ণিত হয়েছে। (শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪৫৭)
(احْتَجِبِىْ مِنْهُ) ‘‘তুমি তার থেকে পর্দা করো’’ এই হুকুমটি সতর্কতামূলক। কেননা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাচ্চাকে ‘আব্দ বিন যাম্‘আহ্-এর বলে সাব্যস্ত করেছেন। এই হিসেবে সে সাওদার ভাই। কিন্তু মূল উসূলের ভিত্তিতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছেলেটিকে ‘আব্দ বিন যাম্‘আহ্-এর জন্য সাব্যস্ত করলেও সাদৃশ্যের ভিত্তিতে রসূলের পূর্ণ অনুমান ছিল ছেলেটি সা‘দ এর ভাইয়ের। তাই সাওদাকে পর্দা করতে বলেন।
এখানে আবারো প্রমাণিত হলো যে, সাদৃশ্যের ভিত্তিতে কোনো কিছু অনুমান করা যেতে পারে। কিন্তু এর ভিত্তিতে কোনো হুকুম প্রদান করা যাবে না। এখানে ছেলেটি সা‘দ এর ভাইয়ের বলে প্রবল ধারণায় না পৌঁছলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাওদাকে পর্দা করার হুকুম দিতেন না। কিন্তু ছেলেকে সা‘দ-এর ভাইয়ের বলার দৃঢ় কোনো দলীল না থাকায় শয্যার দলীলের ভিত্তিতে ছেলেকে ‘আব্দ বিন যাম‘আহ্-এর জন্য সাব্যস্ত করলেন। অপরদিকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুমানে ছেলেটি সা‘দ এর ভাইয়ের হওয়ায় সাওদাকে পর্দা করতে বলেন।
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - লি‘আন
৩৩১৩-[১০] উক্ত রাবী [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত প্রফুল্লাচিত্তে আমার ঘরে ঢুকে বললেন, হে ’আয়িশাহ্! তুমি কি জানো, মুজাযযিয মুদলিজী কি বলেছে? সে মসজিদে প্রবেশ করে দেখল যে, উসামাহ্ ও যায়দ (রাঃ) একই চাদরে মাথাসহ শরীর ঢেকে শুয়ে আছে, কিন্তু উভয়ের পা দেখা যাচ্ছিল। এটা দেখে সে বলে উঠল, এ পাগুলো একে অপরের অংশ। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ اللِّعَانِ
وَعَنْهَا قَالَتْ: دَخَلَ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ذَاتَ يَوْمٍ وَهُوَ مَسْرُورٌ فَقَالَ: أَيْ عَائِشَةُ أَلَمْ تَرَيْ أَنَّ مُجَزِّزًا الْمُدْلِجِيَّ دَخَلَ فَلَمَّا رَأَى أُسَامَةَ وَزَيْدًا وَعَلَيْهِمَا قطيفةٌ قد غطيَّا رؤوسَهُما وَبَدَتْ أَقْدَامُهُمَا فَقَالَ: إِنَّ هَذِهِ الْأَقْدَامَ بَعْضُهَا من بعضٍ
ব্যাখ্যা: (وَهُوَ مَسْرُورٌ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুশি হওয়ার কারণ ছিল, যায়দ রসূলের পালকপুত্র বলে সবাই জানত। যায়দ-এর সন্তান উসামাহ্ জন্ম নেয়ার পর উসামাহ্ প্রকৃতই যায়দের সন্তান কিনা- এ নিয়ে অনেকের মাঝে কানাঘুষা শুরু হয়ে যায়; কেননা যায়দ ছিলেন ফর্সা আর উসামাহ্ ছিলেন কালো। ব্যতিক্রম বর্ণ বংশের মাঝে কোনো প্রভাব না পড়লেও কারো কারো কানাঘুষা রসূলের মনে কষ্ট দেয়। এদিকে মুজায্যিয আল মুদলিজীকে বংশ চিহ্নিতকারী মনে করা হত। সে যখন উসামার পা দেখে বলল, যায়দ ও উসামার উভয়ে পা সাদৃশ্যপূর্ণ। তখন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কারণে আনন্দিত হলেন যে, এখন তাদের কানাঘুষা দূর হবে।
দুই ব্যক্তির অঙ্গের প্রকৃতি, কাঠামো ইত্যাদির নিদর্শনের মাধ্যমে সাদৃশ্য প্রমাণ করে বংশ সূত্র প্রমাণ করাকে ‘ইলমুল কিয়াফাহ্ বলা হয়। কিয়াফার দ্বারা বংশ প্রমাণ আরবের মাঝে প্রচলিত ছিল।
কিয়াফার জ্ঞানে জ্ঞানী ব্যক্তির কথার দ্বারা বংশ প্রমাণ হবে কিনা- এ নিয়ে ‘আলিমদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। ইমাম আবূ হানীফাহ্ ছাড়া বাকী প্রসিদ্ধ তিন ইমামই মনে করেন, কিয়াফার দ্বারা বংশ প্রমাণ হবে। বর্ণিত হাদীসটি তাদের পক্ষে দলীল। মুদলিজীর কিয়াফায় রসূল আনন্দিত হওয়া কিয়াফার জায়িযের বৈধতা প্রমাণ করে। তবে ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-এর মতে কিয়াফার মাধ্যমে বংশ প্রমাণিত হবে না। কেননা অনেক হাদীসের আলোকে এ কথা প্রমাণিত হয়েছে যে, সাদৃশ্যতা প্রকৃতপক্ষে দলীল নয়। বিভিন্ন কারণে ছেলে পিতা থেকে ভিন্ন হতে পারে আবার সন্তান না হয়ে কারো সাথে মিলে যেতে পারে। কেননা সাদৃশ্য একটা অনুমান মাত্র। আর অনুমানের ভিত্তিতে কোনো কিছু প্রমাণিত হয় না। ইতোপূর্বে কয়েকটি হাদীসে আমরা বিষয়টি দেখতে পেয়েছি।
তাছাড়া বর্ণিত হাদীসে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়াফাহ্ দ্বারা উসামার বংশ প্রমাণ করেননি। বরং মুদলিজীর কিয়াফায় আনন্দ প্রকাশ করেছেন মাত্র। এই আনন্দ প্রকাশের কারণ ছিল ‘আরবের কিছু লোকের কানাঘুষা দূর হওয়া। এতে সর্বোচ্চ কিয়াফাহ্ জায়িয হওয়ার প্রমাণ মিলে যা মনের সান্তবনার কারণ হতে পারে; কিন্তু বংশ প্রমাণের দলীল হয় না। তাই কিয়াফাহ্ দ্বারা বংশ প্রমাণের উপর এই হাদীস দলীল হয় না। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - লি‘আন
৩৩১৪-[১১] সা’দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস ও আবূ বকরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তাঁরা উভয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি সদিচ্ছায় স্বীয় পিতৃ-পরিচয় ব্যতীত অন্যকে পিতা বলে পরিচয় দেয়, জান্নাত তার জন্য হারাম। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ اللِّعَانِ
وَعَنْ سَعْدِ بْنِ أَبِي وَقَّاصٍ وَأَبِي بَكْرَةَ قَالَا: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنِ ادَّعَى إِلَى غَيْرِ أَبِيهِ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ غَيْرُ أَبِيهِ فَالْجَنَّةُ عَلَيْهِ حرَام»
ব্যাখ্যা: ‘‘যে ব্যক্তি জেনেশুনে তার পরিচয় নিজ পিতার সাথে না দিয়ে অন্যের সাথে দিবে।’’ অর্থাৎ নিজেকে অন্যের পুত্র বলে দাবী করবে তার জন্য জান্নাত হারাম।
নিজেকে আপন পিতার সাথে সম্পৃক্ত না করে অন্যের দিকে সম্পৃক্ত করা কবীরা গুনাহ। আহলুস্ সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের ‘আলিমদের মতে কবীরা গুনাহ করলে কেউ কাফির হয় না। কুরআনের বিভিন্ন আয়াত ও হাদীসের আলোকে বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণিত। তাই বর্ণিত হাদীসে জান্নাত হারাম হওয়ার বিষয়টি শুধুমাত্র অন্যের দিকে নিজেকে সম্পৃক্ত করার কারণে নয়। বরং কেউ যদি এই গুনাহের কাজকে হালাল মনে করে তবে সে কাফির হয়ে তার জন্য জান্নাত হারাম হয়ে যাবে। কেননা গুনাহকে বৈধ মনে করা কুফরী। অথবা হাদীসের মর্ম এও হতে পারে যে, কিছু দিনের জন্য জান্নাত তার জন্য হারাম থাকবে। এই গুনাহের শাস্তি ভোগ করেই তাকে জান্নাতে যেতে হবে। আবার পাপটি অত্যন্ত মারাত্মক হওয়ার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধমকীর স্বরে এ কথা বলতে পারেন, যদিও জান্নাত তার জন্য হারাম নয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - লি‘আন
৩৩১৫-[১২] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা তোমাদের পিতৃ-পরিচয়কে অস্বীকৃতি জানিও না। যে স্বীয় পিতৃ-পরিচয়ে অস্বীকার করল, সে কুফরী করল। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
এখানে ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে আছে, যা প্রথমে উল্লেখ হয়েছে, আল্লাহ অপেক্ষা অধিক কেউ আত্মমর্যাদাসম্পন্ন নয়- সালাতুল খুসূফ (সূর্যগ্রহণের সালাত) অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে।
بَابُ اللِّعَانِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تَرْغَبُوا عَنْ آبَائِكُمْ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ أَبِيهِ فقد كفر»
وَذُكِرَ حَدِيثُ عَائِشَةَ «مَا مِنْ أَحَدٍ أَغْيَرُ من الله» فِي «بَاب صَلَاة الخسوف»
ব্যাখ্যা: ‘‘আপন পিতার দিকে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে অনীহা পোষণ করো না। যে ব্যক্তি নিজ পিতা থেকে বিমুখ হয়ে অন্যের দিকে নিজেকে সম্পৃক্ত করে সে কাফির হয়ে গেছে।’’
হাদীসদ্বয়ের উদ্দেশ্য হলো, যে জেনে বুঝে স্বেচ্ছায় নিজ বংশের পরিবর্তন ঘটাতে নিজেকে আপন পিতা বাদ দিয়ে অন্যের দিকে সম্পৃক্ত করে। জাহিলিয়্যাহ্ বা অন্ধকার যুগে কেউ অন্যের ছেলেকে তার বানিয়ে নেয়াকে আপত্তি করা হতো না। এই পুত্রই তখন তার দিকে সম্পৃক্ত হত যে তাকে পুত্র বানিয়েছে, এমনকি আয়াত নাযিল হয়, ‘‘তোমরা তাদেরকে তাদের পিতৃ-পরিচয়ে ডাক। এটাই আল্লাহর কাছে ন্যায়সঙ্গত।’’ (সূরা আল আহযাব ৩৩ : ৫)
আরো নাযিল হয়, ‘‘এবং আল্লাহ তোমাদের পোষ্যপুত্রদেরকে তোমাদের পুত্র করেননি।’’ (সূরা আল আহযাব ৩৩ : ৪)
আয়াতদ্বয় নাযিল হলে সবাই নিজেকে প্রকৃত পিতার দিকে সম্পৃক্ত করে ডাকতে থাকেন এবং যে তাকে পালকপুত্র বানিয়েছে তার দিকে সম্পৃক্ত করা ছেড়ে দেন। তবে কেউ কেউ যারা অন্যের দিকে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে প্রসিদ্ধ হয়ে যান, পরিচিতি লাভের জন্য তাদেরকে ঐভাবেই ডাকা হয়। তবে তা বংশ সম্পৃক্তের উদ্দেশে ছিল না। যেমন মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ এর প্রকৃত পিতা হলেন ‘আমর ইবনু সা‘লাবাহ্। আসওয়াদ তারা বন্ধু হওয়ায় তিনি তাকে পুত্র বানিয়ে নিয়েছিলেন।
হাদীসে ‘কাফির হয়ে গেছে’ বলতে কুফরী কর্ম করে কুফরীর নিকট পৌঁছে যাওয়া উদ্দেশ্য; কেননা গুনাহ কবীরা করলে কাফির হয় না বলে আমরা জেনে এসেছি। তাই কুফরী বলতে এমন কুফরী উদ্দেশ্য নয় যা তাকে চিরস্থায়ী জাহান্নামী করে দেয়। তবে পূর্বের মতো এখানেও যদি সে এমন কর্মকে বৈধ মনে করে তবে কাফির হয়ে যাবে। ধমকীর স্বরে এই ধরনের কথা বলারও অবকাশ থাকে। আবার এ অর্থও হতে পারে যে, তার কুফরীর আশঙ্কা রয়েছে।
কোনো কোনো ব্যাখ্যাকার বলেন, এখানে কুফরী শব্দের প্রয়োগটি করার কারণ হলো, সে এমন কর্ম করে আল্লাহ তা‘আলার ওপর মিথ্যারোপ করেছে। সে যেন বলছে, আল্লাহ আমাকে অমুকের পানি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, অথচ আল্লাহ তাকে ঐ ব্যক্তির পানি দিয়ে সৃষ্টি করেননি। (ফাতহুল বারী ১২শ খন্ড, হাঃ ৬৭৬৮)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - লি‘আন
৩৩১৬-[১৩] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন লি’আন সম্পর্কিত আয়াত নাযিল হলো, তখন তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন, যে মহিলা জারজ সন্তান প্রসব করে তাকে স্বামীর বা মালিকের বলে অন্য গোত্রের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়, অথচ সে ঐ বংশোদ্ভূত নয়, দীনের মধ্যে তার কোনই স্থান নেই এবং আল্লাহ তা’আলা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না। আর যে পুরুষ স্বীয় ঔরসের সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকার করে অথচ সন্তান স্নেহমায়া-মমতার মুখ নিয়ে পিতৃত্ব আশায় চেয়ে থাকে, আল্লাহ তার সাথে সাক্ষাৎ করবেন না এবং (হাশরের ময়দানে) অগ্র-পশ্চাতের সমগ্র মানবসন্তানের সামনে অপমান-অপদস্ত করবেন। (আবূ দাঊদ, নাসায়ী ও দারিমী)[1]
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّهُ سَمِعَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ لَمَّا نَزَلَتْ آيَةُ الْمُلَاعَنَةِ: «أَيُّمَا امْرَأَةٍ أَدْخَلَتْ عَلَى قَوْمٍ مَنْ لَيْسَ مِنْهُمْ فَلَيْسَتْ مِنَ اللَّهِ فِي شَيْءٍ وَلَنْ يُدْخِلَهَا اللَّهُ جَنَّتَهُ وَأَيُّمَا رَجُلٍ جَحَدَ وَلَدَهُ وَهُوَ يَنْظُرُ إِلَيْهِ احْتَجَبَ اللَّهُ مِنْهُ وفضَحَهُ على رؤوسِ الْخَلَائِقِ فِي الْأَوَّلِينَ وَالْآخِرِينَ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيّ والدارمي
ব্যাখ্যা: এক গোত্রের নয় এমন কাউকে এই গোত্রে প্রবেশ করানোর অর্থ হলো মিথ্যা বংশ সম্পৃক্ত করা। একজন নারীর গর্ভের সন্তানের ব্যাপারে সেই প্রকৃত মূল অবস্থা সম্পর্কে অবগত। তাই এই মহিলা যদি কোনো সন্তানকে মিথ্যা বলে কোনদিকে সম্পৃক্ত করে তবে সে আল্লাহর দীন ও রহমাতের মাঝে থাকবে না। এই সম্পৃক্তকরণ দুইভাবে হতে পারে। তন্মধ্যে একটি হলো, মহিলা গোপনে কারো সাথে যিনা করে তার গর্ভে অন্যের সন্তানকে নিজের বলে দাবী করা। আর এটাই এ হাদীসের মর্ম। আবার তার গর্ভে নিজের স্বামীর ছেলেকেও মিথ্যা বলে অন্যের দিকে সম্পৃক্ত করতে পারে। উভয়টাই অন্যতম কবীরা গুনাহ এবং জঘন্য অপারাধ।
(وَلَنْ يُدْخِلَهَا اللّٰهُ جَنَّتَه) ‘‘আর আল্লাহ তাকে কখনো জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না।’’ কুরআন হাদীসের আলোকে প্রমাণিত যে, মু’মিন যত বড়ই কবীরা গুনাহ করুক না কেন আল্লাহর অনুগ্রহে ক্ষমা পেয়ে বা নির্ধারিত শাস্তি ভোগের পর জান্নাতে যাবে। তাই ‘উলামায়ে কিরাম হাদীসের এই অংশের ব্যাখ্যা করেন। ‘আল্লামা তূরিবিশতী বলেনঃ অর্থাৎ আল্লাহ তাকে সৎকর্মপরায়ণ লোকেদের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না। বরং তাকে দেরীতে প্রবেশ করাবেন অথবা যতদিন চান শাস্তি দিবেন। তবে যদি সে কাফির হয়ে থাকে তখন তার জন্য চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নাম নির্ধারিত হয়ে যাবে। মহিলা এই জঘন্য অপরাধ বৈধ মনে করে করলে হাদীসের বাহ্যিক অর্থই তার ওপর প্রয়োগ হবে এবং সে কখনো জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।
(وَأَيُّمَا رَجُلٍ جَحَدَ وَلَدَه وَهُوَ يَنْظُرُ إِلَيْهِ) অর্থাৎ যে নিজ সন্তানকে অস্বীকার করে এবং তার বংশ নাকচ করে অথচ সে তাকে দেখছে। সে তাকে দেখছে বলে তার জানার দিকে ইঙ্গিত। অর্থাৎ সে জানে এটা আসলে তারই ছেলে। জেনেশুনে সে ছেলেকে অস্বীকার করছে। দেখছে বলে, তারা মায়া মমতার কমতি ও কঠোর হৃদয় এবং তার এই গুনাহের বিশালতার দিকে ইঙ্গিত করা হচ্ছে। অর্থাৎ নিজের সন্তানকে দেখেও তার একটু মায়ার উদয় হচ্ছে না, বরং সে তাকে অস্বীকার করে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। এই ধরনের পাপী ব্যক্তিকে আল্লাহ তা‘আলা পর্দা দিয়ে তাঁর থেকে পৃথক করে দেন এবং তাকে তাঁর রহমাত থেকে দূরে ঠেলে দেন এবং তাকে সব মানুষের সম্মুখে অপমানিত করেন।
(عَلٰى رُؤُوْسِ الْخَلَائِقِ فِى الْأَوَّلِينَ وَالْاٰخِرِيْنَ) অর্থাৎ সমস্ত মাখলূকের নিকট, পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের সমবেত হওয়ার স্থলে তাকে অপমান করবেন। এখানে তার অপমান ও লাঞ্ছনাকে অধিক প্রসার প্রচার করার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - লি‘আন
৩৩১৭-[১৪] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে অভিযোগ করল যে, আমার স্ত্রী কাউকেই প্রত্যাহার করে না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তবে তাকে তালাক দাও। সে বলল, আমি তার প্রতি অত্যন্ত দুর্বল (তথা ভালোবাসী)। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তাহলে তাকে (নাসীহাত করে) সংযত রাখ। (আবূ দাঊদ, নাসায়ী)[1]
ইমাম নাসায়ী (রহঃ) বলেন, কোনো কোনো রাবী ইবনু ’আব্বাস পর্যন্ত এর সানাদ বর্ণনা করেছেন, আবার কেউ করেননি। তিনি আরো বলেন, সুতরাং হাদীসটি মুত্তাসিল নয়।
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: إِن لِي امْرَأَةً لَا تَرُدُّ يَدَ لَامِسٍ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «طَلِّقْهَا» قَالَ: إِنِّي أُحِبُّها قَالَ: «فأمسِكْهَا إِذا» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ وَقَالَ النَّسَائِيُّ: رَفَعَهُ أَحَدُ الرُّوَاةِ إِلَى ابْنِ عَبَّاسٍ وَأَحَدُهُمْ لَمْ يرفعهُ قَالَ: وَهَذَا الحَدِيث لَيْسَ بِثَابِت
ব্যাখ্যা: (لَا تَرُدُّ يَدَ لَامِسٍ) কোনো কোনো বর্ণনায় (لا تمنع يد لامس) স্পর্শকারীর হাত প্রতিহত করে না। মর্ম হলো, কেউ তার সাথে অশ্লীলতা করলে সে কোনো আপত্তি করে না অথবা তার স্বামীর সম্পদে কেউ হাত দিলে সে বাধা দেয় না।
(طَلِّقْهَا) তুমি তাকে তালাক দিয়ে দাও। কোনো কোনো বর্ণনায় (غَرِّبْها) অর্থাৎ তাকে দূরে সরিয়ে দাও। এর মর্মও তাকে তালাক দিয়ে দাও। হাফিয ইবনু হাজার (রহঃ) তালখীসে বলেন, ‘উলামায়ে কিরাম হাদীসের বাক্য (لَا تَرُدُّ يَدَ لَامِسٍ) নিয়ে মতানৈক্য পোষণ করেন। কারো কারো মতে এর অর্থ অশ্লীলতা। অর্থাৎ যে তার সাথে অশ্লীলতার আবেদন করত সে প্রত্যাখ্যান করত না বরং সুযোগ দিত। কারো কারো মতে এখানে উদ্দেশ্য হলো, অপচয় করা। অর্থাৎ কেউ তার স্বামীর সম্পদ থেকে কিছু নিতে চাইলে বা নিয়ে নিলে সে বারণ করত না।
(فَأَمْسِكْهَا إِذَنْ) অর্থাৎ তুমি যখন তাকে ভালোবাস তবে তাকে অশ্লীলতা থেকে বা সম্পদের অপচয় থেকে আটকে রাখো, হয় তাকে চোখের সামনে রেখে অথবা সম্পদের হিফাযাত বা তার সাথে বেশি বেশি সহবাস করে।
হাদীসের উভয় মর্মের মাঝে কাযী আবুত্ তাইয়িব প্রথম মর্মকে অগ্রাধিকার দেন; কেননা কেউ মাল চাইলে তা দেয়া বদান্যতার পরিচয়। আর বদান্যতা ভালো কাজ। অতএব তা ত্বলাকের কারণ হতে পারে না। এছাড়া অপচয় যদি তার নিজের সম্পদ থেকে হয় এখানে সে স্বাধীন। আর স্বামীর সম্পদ থেকে হলে স্বামী তার মালের হিফাযাত করে নিবে। অতএব এর কোনটাই ত্বলাকের কারণ নয়।
‘আল্লামা মুহাম্মাদ বিন ইসমা‘ঈল সুবুলুস্ সালামে উভয় মর্ম উল্লেখের পর লিখেন, প্রথম মর্ম নেয়া কঠিন, এমনকি আয়াতের আলোকে তা বিশুদ্ধ নয়; কেননা এ ধরনের অশ্লীল নারীকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ঘরে রেখে দেয়ার অনুমোদন দিতে পারেন না। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাউকে দাইয়ূস হওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন না। অতএব হাদীসের এই মর্ম নেয়া ঠিক নয়। আবার দ্বিতীয় মর্ম নেয়াও দূরবর্তী। কেননা অপচয় তার নিজের মালের ক্ষেত্রে হোক বা স্বামীর মালের ক্ষেত্রে তাকে বাধা দেয় সম্ভব। এটা তালাককে ওয়াজিব করতে পারে না। এছাড়া ‘‘অমুক স্পর্শকারীর হাত প্রতিহত করে না’’ বলে বদান্যতার প্রতি ইঙ্গিত করা হয় না। অতএব হাদীসের নিকটতম উদ্দেশ্য হলো, সে নরম চরিত্রের অধিকারী। তার মাঝে অপরিচিতদের প্রতি ঘৃণাবোধ বা সংকোচবোধ নেই। এমন নয় যে, সে তাদের সাথে অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়ে যায়। পুরুষ মহিলার অনেকেই এ ধরনের রয়েছে যদিও তারা অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকে। যদি তার ইচ্ছা হত যে, সে নিজেকে যিনা থেকে বারণ করে না তবে স্ত্রীর ওপর অপবাদদানকারী হত। (‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২০৪৮)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - লি‘আন
৩৩১৮-[১৫] ’আমর ইবনু শু’আয়ব তাঁর পিতা হতে দাদার মাধ্যমে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত সন্তানের ব্যাপারে ফায়সালা প্রদান করেন, যে পিতার মৃত্যুর পরে (দাসীর গর্ভে) সন্তানকে উক্ত পিতার পিতৃত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ তার ওয়ারিসগণের সাথে সংযোজিত করা হয়েছে। তথা ব্যক্তি যদি তার দাসীকে সহবাসকালে তার মালিক থাকে তবে ঐ সন্তান মালিকের সন্তান বলে গণ্য হবে। তবে সহবাসের পূর্বে বণ্টিত সম্পত্তি হতে এ সন্তান উত্তরাধিকার পাবে না, আর বণ্টিত হওয়ার পূর্বে যা সে পেয়েছে তার উত্তরাধিকার এ সন্তান পাবে। ঐ পিতা যাকে সন্তানের পিতা বলে দাবি করা হচ্ছে সে যদি স্বীয় দাসীর গর্ভজাত অথবা ব্যভিচারিণী স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তানের পিতৃত্ব স্বীকার না করে, তবে তার সন্তান বলে স্বীকৃত হবে না। এরূপ যে সন্তান এমন দাসীর ঘরে জন্ম নেয়, সে তার মালিক ছিল না। অথবা, এমন স্বাধীনা মহিলার সন্তান যার সাথে সে যিনা করেছে; তবে সে সন্তান পিতা বলে ঐ ব্যক্তির ওয়ারিসদের সাথে সংযোজিত হবে না, যদিও সে তাকে স্বীয় পুত্র বলে দাবি করে। কেননা সে যিনার সন্তান, স্বাধীনা মহিলার ঘরে হোক বা দাসীর ঘরে হোক। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قضى أَن كل مستحلق استحلق بَعْدَ أَبِيهِ الَّذِي يُدْعَى لَهُ ادَّعَاهُ وَرَثَتُهُ فَقَضَى أَنَّ كُلَّ مَنْ كَانَ مِنْ أَمَةٍ يملكهَا يَوْم أَصَابَهَا فقد لحق بِمن استحلقه وَلَيْسَ لَهُ مِمَّا قُسِمَ قَبْلَهُ مِنَ الْمِيرَاثِ شَيْءٌ وَمَا أَدْرَكَ مِنْ مِيرَاثٍ لَمْ يُقْسَمْ فَلَهُ نَصِيبُهُ وَلَا يَلْحَقُ إِذَا كَانَ أَبُوهُ الَّذِي يُدْعَى لَهُ أَنْكَرَهُ فَإِنْ كَانَ مِنْ أمَةٍ لم يَملِكْها أَو من حُرَّةٍ عَاهَرَ بِهَا فَإِنَّهُ لَا يَلْحَقُ بِهِ وَلَا يَرِثُ وَإِنْ كَانَ الَّذِي يُدْعَى لَهُ هُوَ الَّذِي ادَّعَاهُ فَهُوَ وَلَدُ زِنْيَةٍ مِنْ حُرَّةٍ كَانَ أَوْ أَمَةٍ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যা: (مُسْتَلْحَقٍ) যাকে নিজ বংশভুক্ত বা ঔরসভুক্ত বলে ঘোষণা করা হয়। হাদীসে এমন ব্যক্তির বংশ নির্ধারণ ও এর মাধ্যমে মীরাসের বিবরণ দেয়া হচ্ছে। অর্থাৎ যাকে কোনো ব্যক্তি জীবিত থাকাবস্থায় তার সন্তান বলে দাবী বা অস্বীকার কোনটাই করেনি, যার দিকে দাবী করা হচ্ছে তার মৃত্যুর পর অন্যান্য ওয়ারিসরা তাকে এই মৃত ব্যক্তির ঔরসজাত অর্থাৎ তাদের মতো সেও এই ব্যক্তির একজন ওয়ারিস বলে দাবী করছেন। এমন ব্যক্তির বেলায় বংশ বা মীরাসের ফায়সালা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই হাদীসে দিচ্ছেন। বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে ফায়সালা দেন তা হলো,
* সন্তানটি যদি এমন দাসী থেকে হয় যে দাসীর মালিক ঐ মৃত ব্যক্তি ছিল এবং সে তার সাথে যেদিন সহবাস করেছে সেদিনও ঐ দাসীর মালিক। তবে ওয়ারিসদের দাবী মতে তাকে ঔরসজাত সাব্যস্ত করা হবে।
* ওয়ারিসরা এই দাবীর পূর্বে যে সম্পদ বণ্টন করা হয়ে গেছে তা থেকে সে কোনো অংশ পাবে না। অর্থাৎ পূর্বের বণ্টনকে রহিত বা পূর্বে যাদেরকে সম্পদ মীরাসের ভিত্তিতে বণ্টন করে দেয়া হয়ে গেছে তাদের কাছ থেকে ফেরত নিয়ে তাকে দিতে হবে না।
* যে মীরাস দাবীর পূর্বে বণ্টন হয়নি উক্ত মীরাসে অন্যান্য ওয়ারিসের মতো সেও অংশীদার হবে; কেননা ওয়ারিসদের দাবীর ভিত্তিতে সেও একজন ওয়ারিস সাব্যস্ত হয়ে গেছে।
* যার সন্তান বলে দাবী করা হচ্ছে সে যদি মৃত্যুর পূর্বে একে তার সন্তান বলে অস্বীকার করে যায় তবে অন্যান্য ওয়ারিসদের দাবীতে বংশ সাব্যস্ত হবে না এবং সে ঐ লোকের ওয়ারিস হবে না।
* যদি সে এমন দাসীর হয় যে দাসীর মালিক মৃত ব্যক্তি ছিল না অথবা স্বাধীনা নারী থেকে হয় যার সাথে ঐ ব্যক্তি যিনা করেছে তবে ওয়ারিসদের দাবীর মাধ্যমে বংশ সাব্যস্ত হবে না। এমন ছেলেকে যার দিকে দাবী করা হচ্ছে সেও যদি দাবী করে তবুও সে তার বংশোদ্ভূত সন্তান হবে না। বরং জারজ সন্তান হবে, চাই সে স্বাধীনা নারী থেকে হোক অথবা দাসী থেকে হোক।
পরিচ্ছেদঃ ১৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - লি‘আন
৩৩১৯-[১৬] জাবির ইবনু ’আতীক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আত্মমর্যাদাবোধ আল্লাহর নিকট কোনো ক্ষেত্রে পছন্দনীয় হয়, আবার কোনো ক্ষেত্রে নিন্দনীয় হয়। যে আত্মমর্যাদাবোধ আল্লাহ পছন্দ করেন, তা হলো সন্দেহভাজন আত্মমর্যাদা লালন করা। পক্ষান্তরে সন্দেহভাজন নয় এমন ক্ষেত্রে আত্মমর্যাদা লালন করা আল্লাহর নিকট নিন্দনীয়। অনুরূপভাবে গর্ববোধ কোনো ক্ষেত্রে আল্লাহ পছন্দ করেন এবং কোনো ক্ষেত্রে নিন্দনীয়। আর যে গর্বকে আল্লাহ ভালোবাসেন তা হলো, (ইসলামের শত্রুদের সাথে) যুদ্ধক্ষেত্রে ও দান-সদাকাতে গর্ববোধ আল্লাহর নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয়। আর যে গর্ববোধ আল্লাহর কাছে নিন্দনীয় তা হলো (বংশ-মর্যাদার) অহংকারের উদ্দেশে গর্ববোধ। অপর বর্ণনায়, অহংকারের পরিবর্তে জুলুম বা অন্যায় শব্দ এসেছে। (আহমাদ, আবূ দাঊদ, নাসায়ী)[1]
وَعَن جابرِ بنِ عتيكٍ أَنَّ نَبِيَّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ الْغَيْرَةِ مَا يُحِبُّ اللَّهُ وَمِنْهَا مَا يُبْغِضُ اللَّهُ فَأَمَّا الَّتِي يُحِبُّهَا اللَّهُ فَالْغَيْرَةُ فِي الرِّيبَةِ وَأَمَّا الَّتِي يُبْغِضُهَا اللَّهُ فَالْغَيْرَةُ فِي غَيْرِ رِيبَةٍ وَإِنَّ مِنَ الْخُيَلَاءِ مَا يُبْغِضُ اللَّهُ وَمِنْهَا مَا يُحِبُّ اللَّهُ فَأَمَّا الْخُيَلَاءُ الَّتِي يُحِبُّ اللَّهُ فَاخْتِيَالُ الرَّجُلِ عِنْدَ الْقِتَالِ وَاخْتِيَالُهُ عِنْدَ الصَّدَقَةِ وَأَمَّا الَّتِي يُبْغِضُ اللَّهُ فَاخْتِيَالُهُ فِي الْفَخْرِ» وَفِي رِوَايَةٍ: «فِي الْبَغْيِ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَأَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ
ব্যাখ্যা: (فَالْغَيْرَةُ فِى الرِّيبَةِ) ‘‘গইরত’’ অর্থ আত্মমর্যাদাবোধ। কোনকিছুর দ্বারা আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগার নাম গাইরত। এর কোনটা আল্লাহর পছন্দ আবার কোনটা আল্লাহ তা‘আলা অপছন্দ। হাদীসে বলা হচ্ছে, (الريبة) এর স্থানে গাইরত আল্লাহর পছন্দ। ‘রীবাহ্’ অর্থাৎ সন্দেহমূলক স্থান, অপবাদের স্থান। এই আত্মমর্যাদার দুই দিক হতে পারে। একটি হলোঃ আত্মমর্যাদার কারণে নিজে এমন স্থানে পতিত না হওয়া। আত্মমর্যাদা তাকে নিষিদ্ধ অপবাদমূলক জায়গা থেকে তাকে দূরে রাখার কারণে তা আল্লাহর নিকট পছন্দ। আরেকটি হলো, নিজের মাহরাম কারো সাথে অন্য কাউকে হারাম কাজে লিপ্ত দেখে আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগা। এ ধরনের গাইরত আল্লাহর নিকট পছন্দনীয়। সহীহ হাদীসে রয়েছেঃ
مَا مِنْ أَحَدٍ أَغْيَرُ مِنْ اللّٰهِ مِنْ أَجْلِ ذٰلِكَ حَرَّمَ الْفَوَاحِشَ
‘‘আল্লাহর চেয়ে অধিক আত্মমর্যাদাশীল কেউ নেই। আর এজন্যই তিনি অশ্লীলতা (যিনা) হারাম করেছেন।’’ (সহীহুল বুখারী- অধ্যায় : নিকাহ, অনুচ্ছেদ : গাইরত, হাঃ ৪৮১৯)
(فَالْغَيْرَةُ فِىْ غَيْرِ رِيبَةٍ) অর্থাৎ সন্দেহযুক্ত স্থান বা অপবাদমূলক স্থান ছাড়া গাইরত। এই গইরত আল্লাহ তা‘আলার নিকট অপছন্দ। অর্থাৎ বাস্তব কোনো সন্দেহ ছাড়া কারো ওপর খারাপ ধারণার ভিত্তিতে নিজের আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগা। যেমন কাউকে দরজা দিয়ে বের হতে দেখে বা কাউকে কারো সাথে কথা বলতে দেখেই মন্দ ধারণার ভিত্তিতে আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগা। এ ধরনের গইরতে পরস্পরের মাঝে অযথা বিদ্বেষ, ক্রোধ ও ফিতনা সৃষ্টি হয়। এও হতে পারে যে, নিজের মা থাকাবস্থায় পিতা আরেক নারীকে বিয়ে করার কারণে ছেলের আত্মমর্যাদায় আঘাত। এভাবে তার অন্যান্য মাহরামের ক্ষেত্রে। এ ধরনের গাইরতকে আল্লাহ তা‘আলা অপছন্দ করেন। কেননা আল্লাহ তা‘আলা যা হালাল করেছেন তার উপর আমাদের সন্তুষ্ট থাকা ওয়াজিব। আল্লাহ কর্তৃক বৈধ বিষয়ে গইরত দেখানো মানে জাহিলিয়্যাতে তথা অন্ধকার যুগের অহংবোধ আত্মমর্যাদাকে অগ্রাধিকার দেয়া। তাই আল্লাহ এমন গাইরতকে অপছন্দ করেন।
(وَإِنَّ مِنَ الْخُيَلَاءِ مَا يُبْغِضُ اللّٰهُ وَمِنْهَا مَا يُحِبُّ اللّٰهُ) অর্থাৎ অহঙ্কার ও আত্মঅহমিকা কোনটা আল্লাহ অপছন্দ করেন এবং কোনটা আল্লাহ ভালোবাসেন।
অহঙ্কার মূলত হারাম হলেও গইরতের মতই কোনো কোনো ক্ষেত্রে অহঙ্কার আল্লাহ তা‘আলার পছন্দ। হাদীসে আল্লাহর পছনদনীয় অহঙ্কার ও অপছন্দীয় অহঙ্কারের বিবরণ দেয়া হয়েছে। যে অহঙ্কার বা গর্বকে আল্লাহ তা‘আলা ভালোবাসেন তা হলো, জিহাদে কোনো ব্যক্তির অহঙ্কার। অর্থাৎ যুদ্ধের সময় সে দুশমনের সাথে মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে অগ্রে থাকবে; শক্তি, সাহসিকতা ও বীরত্ব প্রকাশ করবে, যুদ্ধের ময়দানে অহঙ্কারী ভঙ্গিতে চলবে এবং দুশমনকে তুচ্ছ মনে করবে। এই গর্ব আল্লাহর নিকট পছন্দ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিহাদের ময়দানে গর্বস্বরে বলতেন, (أَنَا النَّبِيُّ لَا كَذِبْ أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبْ) ‘‘আমি নাবী এ কথা মিথ্যা নয়, আমি ইবনুল মুত্ত্বালিব-এর ছেলে।’’ (সহীহুল বুখারী- অধ্যায় : জিহাদ, হাঃ ২৬৫২। উল্লেখ্য, বুখারীর একাধিক অধ্যায় ও অনুচ্ছেদের বিভিন্ন জায়গায় হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে)
জিহাদের ময়দানে গর্বে নিজের শক্তি সাহস ছাড়াও সাথীদের মাঝে শক্তি সাহস জোগায়।
পছন্দনীয় গর্বের আরেকটি স্থান হলো দান। অর্থাৎ আল্লাহর রাস্তায় দান ও সাদাকা করতে গর্বভরে করবে। বেশি দিয়েও কম মনে করবে। অর্থাৎ সে ভাববে আমার মতো ধনীর জন্য আরো দেয়া দরকার। কেউ কেউ বলেন, এখানে অহঙ্কার বলতে সে বলবে, আমি ধনী, অতএব বেশি বেশি দান করব, আল্লাহর ওপর আমার আস্থা রয়েছে। এই গর্ব তাকে এবং অন্যকে অধিক দানে উৎসাহিত করে। তাই তা আল্লাহ তা‘আলার নিকট পছন্দীয়।
(وَأَمَّا الَّتِىْ يُبْغِضُ اللّٰهُ فَاخْتِيَالُه فِى الْفَخْرِ) এখানে এমন অহঙ্কারের কথা বলা হচ্ছে যা আল্লাহ তা‘আলার নিকট অপছন্দ। অর্থাৎ কেবল বড়াইয়ের অহঙ্কার। যেমন কেউ বলে, আমার বংশ অধিক মর্যাদাবান, আমার পিতা অধিক সম্মানিত। অথচ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক পরহেযগার’’- (সূরা আল হুজুরাত ৪৯ : ৩)। অর্থাৎ অন্যকে হেয় করে নিজেকে বড় ভাবার অহঙ্কার আল্লাহর নিকট অপছন্দীয়।
কোনো কোনো বর্ণনায় (فَاخْتِيَالُه في الفخر) এর স্থলে (فَاخْتِيَالُه فِي الْبَغْيِ) বলা হয়েছে। অর্থাৎ অন্যায় কাজের উপর অহঙ্কার। যেমন কেউ গর্ব করে বলে, সে অমুককে হত্যা করেছে, অমুকের মাল ছিনিয়ে নিয়েছে, অথবা অন্যায় কাজ করার সময় গর্ব করে কাজ করে। এ ধরনের অহঙ্কারে আল্লাহ তা‘আলা রাগাম্বিত হন। (সুনানু আবী দাঊদ- অধ্যায় : জিহাদ, অনুচ্ছেদ : যুদ্ধে অহঙ্কার, হাঃ ২২৮৬)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - লি‘আন
৩৩২০-[১৭] ’আমর ইবনু শু’আয়ব তাঁর পিতার মাধ্যমে তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন। জনৈক ব্যক্তি (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট) দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রসূল! অমুক আমার সন্তান। জাহিলিয়্যাতের সময় (ইসলাম-পূর্ব যুগে) আমি তার মায়ের সাথে ব্যভিচার করেছিলাম। এটা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, জাহিলিয়্যাতের প্রথা বাতিল হয়ে গেছে, ইসলামের বিধানে পিতৃত্বের কোনো দাবি নেই, ইসলামী বিধান হলো- সন্তান হবে শয্যাশায়িনীর, আর ব্যভিচারীর জন্য পাথর (নিক্ষেপ)। (আবূ দাঊদ)[1]
عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ قَالَ: قَامَ رَجُلٌ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ فَلَانًا ابْنِي عَاهَرْتُ بِأُمِّهِ فِي الْجَاهِلِيَّةِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا دِعْوَةَ فِي الْإِسْلَامِ ذَهَبَ أَمْرُ الْجَاهِلِيَّةِ الْوَلَدُ لِلْفِرَاشِ وَلِلْعَاهِرِ الْحَجَرُ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (إِنَّ فَلَانًا ابْنِىْ) অর্থাৎ অমুক আমার ছেলে। ছেলে দাবী করা দলীল হিসেবে পরবর্তী বাক্য (عاهرت بأمه في الجاهلية) নিয়ে আসা হয়েছে। অর্থাৎ আমি তার মায়ের সাথে জাহিলিয়্যাতের যুগে যিনা করেছি। মূর্খতার যুগে যিনার মাধ্যমে যে সন্তান হতো তাকেও যিনাকারী তার দিকে সম্পৃক্ত করত। ইসলাম এসে বংশের পবিত্রতা রক্ষা করে এবং বিবাহ ও বৈধ মালিকানাধীন দাসীর মাধ্যমে যে সন্তান হয় কেবল তাকেই নিজ বংশীয় সন্তান বলে স্বীকৃতি দিয়ে বাকী সব অবৈধ পন্থা নাকচ করে। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণিত ব্যক্তির দাবীর উপর বলেন, (لَا دِعْوَةَ فِى الْإِسْلَامِ ذَهَبَ أَمْرُ الْجَاهِلِيَّةِ) অর্থাৎ দাবী করে সন্তানের মালিক হওয়ার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। জাহিলী যুগের বিধান ইসলামে কার্যকর নয়। ইসলাম এসে জাহিলী বিধানকে মিটিয়ে দিয়েছে। সন্তানের বংশ বৈবাহিক বা মালিকানার শয্যার মাধ্যমে প্রমাণিত হবে। যে যিনা করবে সে সন্তান পাবে না বরং পাথর পাবে। অর্থাৎ তাকে পাথর দিয়ে আঘাত করে মারা হবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২২৭১)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - লি‘আন
৩৩২১-[১৮] উক্ত রাবী (’আমর ইবনু শু’আয়ব) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ চার শ্রেণীর রমণীর সাথে স্বামীর লি’আন গৃহীত হয় না- ১. মুসলিম পুরুষের নাসারা (খ্রিষ্টান) স্ত্রী, ২. মুসলিম পুরুষের ইয়াহূদী স্ত্রী, ৩. গোলাম স্বামীর স্বাধীনা স্ত্রী এবং ৪. স্বাধীনা পুরুষের বাঁদী স্ত্রী। (ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: أَرْبَعٌ مِنَ النِّسَاءِ لَا مُلَاعَنَةَ بَيْنَهُنَّ: النَّصْرَانِيَّةُ تَحْتَ الْمُسْلِمِ وَالْيَهُودِيَّةُ تَحْتَ الْمُسْلِمِ وَالْحُرَّةُ تَحْتَ الْمَمْلُوكِ وَالْمَمْلُوكَةُ تَحْتَ الْحُرِّ . رَوَاهُ ابْنُ مَاجَه
ব্যাখ্যা: (أَرْبَعٌ مِنَ النِّسَاءِ لَا مُلَاعَنَةَ بَيْنَهُنَّ) স্ত্রীর স্বামী যিনার অভিযোগ তুললে এবং স্ত্রী তা অস্বীকার করলে শারী‘আত লি‘আনের বিধান রেখেছে। অধ্যায়ের শুরুতে আমরা এ সংক্রান্ত হাদীস দেখে এসেছি। এই হাদীসে যাদের মাঝে লি‘আনের বিধান কার্যকর হবে না তাদের একটি বিবরণ দেয়া হয়েছে। হাদীসে চার ধরনের নারীর বিবরণ দেয়া হয়েছে যাদের সাথে লি‘আন কার্যকর হবে না। যেমনঃ স্বামী মুসলিম স্ত্রী খ্রীষ্টান, স্বামী মুসলিম স্ত্রী ইয়াহূদ, স্বামী দাস স্ত্রী স্বাধীনা, স্ত্রী দাসী স্বামী স্বাধীন। এই চার প্রকারের মাঝে লি‘আনের বিধান নেই।
এ হাদীসের উপর ক্বিয়াস করে ফুকাহায়ে কিরাম আরো যাদের মাঝে লি‘আনের বিধান কার্যকর হবে না বলে মনে করেন তা হলোঃ স্বামী যদি পূর্বে কাউকে অপবাদ দেয়ার কারণে দণ্ডে দণ্ডিত হয়ে থাকে তবে তার কথা গ্রহণ করে লি‘আন কার্যকর করা যাবে না। তদ্রূপ স্ত্রী যদি অপবাদের দণ্ডে দণ্ডিত হয়ে থাকে তবে লি‘আন হবে না। এভাবে স্ত্রী না-বালেগাহ, পাগল, ব্যভিচারিণী হলে লি‘আন কার্যকর হবে না। মূলত লি‘আন একটি গুরুত্বপূর্ণ কসমের বিধান যার মাঝে স্বামী স্ত্রীর একের উপর অন্যের অভিযুক্ত করা রয়েছে; তাই একজনের কথা অন্যের উপর গ্রহণ করতে হলে মৌলিক মর্যাদায় সমান থাকা বাঞ্ছনীয়। এ কারণে হয়ত শারী‘আত এই শর্ত আরোপ করেছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - লি‘আন
৩৩২২-[১৯] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বামী-স্ত্রী উভয়কে লি’আন করার সময় একব্যক্তিকে (পুরুষকে) নির্দেশ দিলেন- লি’আন চলাকালীন পঞ্চমবার যখন সে বলতে উদ্যত হবে তখন তার মুখের উপর হাত চেপে ধর। কারণ, পঞ্চমবারের উক্তি ’’আমি যদি মিথ্যাবাদী হই, তবে আল্লাহর লা’নাত (অভিসম্পাত) আমার ওপর হোক’’ তথা নিজের ওপর অবধারিত করে নেয়। (নাসায়ী)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَرَ رَجُلًا حِينَ أَمَرَ الْمُتَلَاعِنَيْنِ أَنْ يَتَلَاعَنَا أَنْ يَضَعَ يَدَهُ عِنْدَ الْخَامِسَةِ عَلَى فِيهِ وَقَالَ: «إِنَّهَا مُوجِبَةٌ» . رَوَاهُ النَّسَائِيُّ
ব্যাখ্যা: (إِنَّهَا مُوجِبَةٌ) নিশ্চয় এটা কার্যকরকারী। অর্থাৎ এই পঞ্চমবার বললেই হুকুম কার্যকর হয়ে যাবে। হাদীসের বাহযত দৃষ্টিতে এই বাক্যটি ঐ ব্যক্তিকে শিখিয়ে দিয়ে বলা হয়েছে, সে যেন লি‘আনকারীর মুখে হাত রেখে এই বাক্যটি বলে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - লি‘আন
৩৩২৩-[২০] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একরাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘর হতে নিঃশব্দে বের হয়ে গেলেন। এতে আমার ব্যথাতুর মনে ক্ষোভের উদ্রেক করে। পরক্ষণেই তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ফিরে এসে আমাকে বিমর্ষ ভাব দেখে জিজ্ঞেস করলেন, হে ’আয়িশাহ্! কি হয়েছে তোমার? তুমি কি ঈর্ষান্বিত হয়েছ? আমি বললাম, আপনার মতো মানুষের প্রতি (সাহচর্য হতে বঞ্চিত হয়ে) আমার মতো নারী কি করে ঈর্ষান্বিত না হয়ে থাকতে পারে? এটা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাকে শায়ত্বন প্ররোচিত করেছে। আমি (বিস্ময়াভিভূত হয়ে) জিজ্ঞেস করলাম- হে আল্লাহর রসূল! আমার সাথেও কি শায়ত্বন থাকতে পারে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনার নিকটও শায়ত্বন আসতে পারে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, হ্যাঁ, তবে তার বিরুদ্ধে আল্লাহ আমাকে সাহায্য করায় আমি (তার ওয়াস্ওয়াসাহ্ হতে) নিরাপদপ্রাপ্ত হই। (মুসলিম)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَرَجَ مِنْ عِنْدِهَا لَيْلًا قَالَتْ: فَغِرْتُ عَلَيْهِ فَجَاءَ فَرَأَى مَا أَصْنَعُ فَقَالَ: «مَا لَكِ يَا عَائِشَةُ أَغِرْتِ؟» فَقُلْتُ: وَمَا لِي؟ لَا يَغَارُ مِثْلِي عَلَى مِثْلِكَ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَقَدْ جَاءَكِ شَيْطَانُكِ» قَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَمْعِي شَيْطَانٌ؟ قَالَ: «نَعَمْ» قُلْتُ: وَمَعَكَ يَا رَسُولَ الله؟ قَالَ: «نعم وَلَكِن أعانني علَيهِ حَتَّى أسلَمَ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: (لَقَدْ جَاءَكِ شَيْطَانُكِ) ‘‘নিশ্চয় তোমার কাছে তোমার শায়ত্বন এসেছে।’’ এ কথা বলার কারণ হলো, এখানে গাইরতের কোনো কারণ নেই। বৈধ কাজের উপর গাইরত বা আত্মমর্যাদা আল্লাহ তা‘আলার পছন্দ নয় বলে আমরা ইতোপূর্বে দেখেছি। এ কারণেই হয়ত রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আয়িশাহ্ -কে এ কথা বলেছেন। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর মনে রসূলের ওপর সন্দেহ থেকে গাইরত সৃষ্টি হয়েছে এমন কল্পনার সুযোগ নেই। বরং রসূলের জন্য তার অতিরিক্ত ভালোবাসাই এই গাইরতের কারণ। তাই তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, (لَا يَغَارُ مِثْلِىْ عَلٰى مِثْلِكَ؟) অর্থাৎ আমার মতো মানুষ আপনার মতো ব্যক্তিত্বের ওপর গাইরত করবে না কেন? তথাপি যেহেতু এখানে গাইরত ভিত্তিহীন তাই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা বলেছেন।
(حَتّٰى أسلَمَ) সিগাটি মুযারে‘ মুতাকাল্লিম। حتى হরফের কারণে সিগার শেষের ‘মীম’ হরফে যবর হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার সাহায্যের কারণে আমি শায়ত্বনের ওয়াস্ওয়াসা বা কুমন্ত্রণা থেকে মুক্ত থাকি। অথবা সিগাটি মাযির এবং সর্বনাম শায়ত্বনের দিকে প্রত্যাবর্তিত। মাযির সিগা হিসেবে ‘উলামাগণ দু’টি অর্থ করে থাকেন। أسلم অর্থ استسلم অর্থাৎ সে আমার অনুগত হয়ে গেছে, ফলে আমাকে কুমন্ত্রণা দেয় না। কেউ কেউ বলেন, অর্থ হলো সে মুসলিম মু’মিন হয়ে গেছে। বাহ্যিক অর্থ এটাই। আল্লাহ অধিক ভালো জানেন।
কাযী ‘ইয়ায বলেনঃ জেনে রাখো, উম্মাত এ কথার উপর একমত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শায়ত্বনের সব ধরনের কুমন্ত্রণা থেকে সংরক্ষিত ও মুক্ত। শরীর, অন্তর, যবান কোথায়ও শায়ত্বন তাকে কুমন্ত্রণা দিতে পারে না। (শারহে মুসলিম ১৭/১৮ খন্ড, হাঃ ২৮১৫; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - ‘ইদ্দত
৩৩২৪-[১] আবূ সালামাহ্ (রহঃ) ফাত্বিমাহ্ বিনতু কয়স (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন। তার স্বামী আবূ ’আমর ইবনু হাফস্ তাকে চূড়ান্ত তালাক দেয়, ঐ সময়ে সে মদীনায় উপস্থিত ছিল না। অতঃপর স্বামীর ওয়াকীল (প্রতিনিধি : আইয়্যাস ইবনু আবূ রবী’ এবং হারিস ইবনু হিশাম) আমার নিকট কিছু যব নিয়ে আসে, যাতে আমি (অতি নগণ্য মনে করে) অসন্তোষ হই। ওয়াকীল বলল, আল্লাহর কসম! আমাদের নিকট তোমার আর কিছুই পাওনা নেই। (কারণ, তুমি ত্বলাক (তালাক)ে বায়িনপ্রাপ্তা অর্থ বাবদ যব ছাড়া আর কিছুই রেখে যায়নি) এতে ফাতিমা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে অভিযোগ করলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমার কোনো খোরাকি খরচ নেই। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে উম্মু শরীক-এর ঘরে ’ইদ্দত পালনের নির্দেশ দেন। কিন্তু পরক্ষনেই বললেন, ঐ রমণীর ঘরে তো লোকজনের চলাচল বেশি হয় (অত্যন্ত দানশীলা ও অতিথিপরায়ণতার জন্য)। বরং তুমি ইবনু উম্মি মাকতূম-এর ঘরে ’ইদ্দত পালন কর, সে অন্ধ ব্যক্তি বিধায় তুমি নির্দ্বিধায় গায়ের পোশাক ছাড়তে পারবে। অতঃপর যখন তোমার ’ইদ্দতকাল শেষ হবে, তখন আমাকে খবর দিবে।
ফাতিমা (রাঃ) বলেন, আমার ’ইদ্দতকাল শেষ হলে আমি তাঁকে জানালাম যে, মু’আবিয়াহ্ ইবনু আবূ সুফ্ইয়ান ও আবূ জাহ্ম (রাঃ)উভয়ে আমার নিকট বিয়ের প্রস্তাব (’ইদ্দত শেষে) পাঠিয়েছে। তদুত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আবূ জাহম তো তার কাঁধ হতে লাঠি নামিয়ে রাখে না (তথা সে স্ত্রীকে অত্যধিক মারধর করে অথবা অধিকাংশ সময় সফরে থাকে)। আর মু’আবিয়াহ্ তো দরিদ্র মানুষ, তার কোনো সহায়-সম্পত্তি নেই। তুমি উসামাহ্ ইবনু যায়দণ্ডকে বিয়ে কর (দীনদারী ও স্বভাব-চরিত্রতায় উত্তমতায় প্রাধান্য দাও)। ফাতিমা (রাঃ) বলেন, আমি তাকে বিয়ে করব না (উসামাহ্ কৃষ্ণবর্ণ ক্রীতদাস পুত্র হওয়ার কারণে)। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পুনরায় উসামাকে বিবাহ করতে বললে তিনি তাকেই বিয়ে করলেন। আল্লাহ তা’আলা এ বিয়েতে এমন বরকত দিলেন যে, অন্য রমণীরা ঈর্ষা পোষণ করত।
অপর বর্ণনায় আছে, আবূ জাহ্ম স্ত্রীকে অতিমাত্রায় মারধর করত। (মুসলিম)[1]
অপর বর্ণনায় আছে যে, তার স্বামী তাকে তিন তালাক দিলে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট অভিযোগ করলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমার কোনো খোরাকী নেই, তবে তুমি গর্ভবতী হলে পেতে।
بَابُ الْعِدَّةِ
عَنْ أَبِي سَلَمَةَ عَنْ فَاطِمَةَ بِنْتِ قَيْسٍ: أَنَّ أَبَا عَمْرِو بْنَ حَفْصٍ طَلَّقَهَا الْبَتَّةَ وَهُوَ غَائِبٌ فَأَرْسَلَ إِلَيْهَا وَكِيْلُهُ الشَّعِيرَ فَسَخِطَتْهُ فَقَالَ: وَاللَّهِ مَا لَكِ عَلَيْنَا مِنْ شَيْءٍ فَجَاءَتْ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَذَكَرْتُ ذَلِكَ لَهُ فَقَالَ: «لَيْسَ لَكِ نَفَقَةٌ» فَأَمَرَهَا أَنْ تَعْتَدَّ فِي بَيْتِ أُمِّ شَرِيكٍ ثُمَّ قَالَ: «تِلْكِ امْرَأَةٌ يَغْشَاهَا أَصْحَابِي اعْتَدِّي عِنْدَ ابْنِ أُمِّ مَكْتُومٍ فَإِنَّهُ رَجُلٌ أَعْمَى تَضَعِينَ ثِيَابَكِ فَإِذَا حَلَلْتِ فَآذِنِينِي» . قَالَتْ: فَلَمَّا حَلَلْتُ ذَكَرْتُ لَهُ أَنَّ مُعَاوِيَةَ بْنَ أَبِي سُفْيَانَ وَأَبَا جَهْمٍ خَطَبَانِي فَقَالَ: «أَمَّا أَبُو الْجَهْمِ فَلَا يَضَعُ عَصَاهُ عَنْ عَاتِقِهِ وَأَمَّا مُعَاوِيَةُ فَصُعْلُوكٌ لَا مَالَ لَهُ انْكِحِي أُسَامَةَ بْنَ زَيْدٍ» فَكَرِهْتُهُ ثُمَّ قَالَ: «انْكِحِي أُسَامَةَ» فَنَكَحْتُهُ فَجَعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا وَاغْتَبَطْتُ وَفِي رِوَايَةٍ عَنْهَا: «فَأَمَّا أَبُو جَهْمٍ فَرَجُلٌ ضَرَّابٌ لِلنِّسَاءِ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ وَفِي رِوَايَةٍ: أَنَّ زَوْجَهَا طَلَّقَهَا ثَلَاثًا فَأَتَتِ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «لَا نَفَقَةَ لَكِ إِلَّا أَنْ تَكُونِي حَامِلا»
ব্যাখ্যা: (طَلَّقَهَا الْبَتَّةَ) অর্থাৎ তিনি তাকে আবশ্যক কার্যকর তালাক দেন। আবশ্যক কার্যকর তালাক বলতে এমন তালাক বুঝানো হয়েছে যারপর স্ত্রীকে রাখার কোনো সুযোগ থাকে না। তাই এখানে তিন তালাক অথবা তৃতীয় তালাক বুঝানো হয়েছে। হাদীসটির বর্ণনা বিভিন্নভাবে এসেছে। উল্লেখিত বর্ণনায় (طلقها البتة)। কোনো কোনো বর্ণনায় (طلقها ثلاثا) অর্থাৎ তিনি তাকে তিন তালাক দেন। আবার কোনো কোনো বর্ণনায় : (طلقها اخرثلاث تطليقات) অর্থাৎ তিন ত্বলাকের শেষ তালাক দেন। আবার কোনো বর্ণনায় (طلقها طلقة كانت بقية من طلاقها) অর্থাৎ তিনি তাকে এক তালাক যা তার ত্বলাকের মধ্যে অবশিষ্ট ছিল। আবার কোনো বর্ণনায় البتة বা সংখ্যা শব্দের উল্লেখ ছাড়া কেবল তালাক দেয়ার কথা রয়েছে। অতএব বর্ণনাগুলোর সামঞ্জস্য বিধান হলো, তিনি ইতোপূর্বে দুই তালাক দিয়েছিলেন। শেষবার তিন নম্বর তালাকটি দেন। এতে সকল বর্ণনার সামঞ্জস্য বিধান হয়ে যায়। যে বর্ণনায় শুধু ত্বলাকের কথা রয়েছে অথবা এক তালাক বা তিন ত্বলাকের শেষ তালাক এগুলো স্পষ্ট। আর যিনি আবশ্যক ত্বলাকের কথা বর্ণনা করেন, তার কথার উদ্দেশ্য হলো তিনি এক তালাক দিয়েছেন। এর মাধ্যমে পূর্বের তালাকসহ তিন তালাক হয়ে সম্পর্ক একেবারে ছিন্ন হয়ে গেছে। আর যিনি বলেছেন তিন তালাক তার কথার উদ্দেশ্য তিন পরিপূর্ণ হয়ে যাওয়া। (শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪৮০)
(لَيْسَ لَكِ نَفَقَةٌ) তোমার জন্য কোনো খোরাকী নেই, অর্থাৎ তুমি ‘ইদ্দত পালনকালে স্বামীর পক্ষ থেকে তুমি খোরাক পাওয়ার অধিকার রাখো না।
তালাকপ্রাপ্তা নারী ‘ইদ্দত পালনকালে খোরাকী ও বাসস্থান পাওয়ার অধিকারী হবে কিনা- এ ব্যাপারে ‘আলিমদের মতামত হলো, যদি তালাক রজ্‘ঈ হয় তবে সর্বসম্মতিক্রমে নারী খোরাকী পাওয়ার অধিকারী থাকবে। এভাবে যদি তালাক বায়্যিনাহ্ হয় এবং তালাকপ্রাপ্তা নারী গর্ভবতী হয় তবে ‘ইদ্দতকালীন সময়ে নারী বাসস্থান ও খোরাকী পাবে। কেননা আল্লাহ তা‘আলা তালাকপ্রাপ্তা গর্ভবতী নারীর বেলায় বলেন, وَإِن كُنَّ أُولَاتِ حَمْلٍ فَأَنفِقُوا عَلَيْهِنَّ حَتّٰى يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ ‘‘যদি তারা গর্ভবতী হয়, তবে সন্তানপ্রসব পর্যন্ত তাদের ব্যয়ভার বহন করবে।’’ (সূরা আল আন্‘আম ৬ : ৬৫)
আর যদি নারী ত্বলাকে বায়্যিনাহ্প্রাপ্তা হয় এবং গর্ভবতী না হয়- এ ব্যাপারে ‘আলিমগণ মতানৈক্য পোষণ করেন। ইমাম আহমাদ (রহঃ)-এর মতে উক্ত নারী খোরাক বা বাসস্থান কিছুই পাবে না। বর্ণিত হাদীসটি তিনি এবং তাঁর অনুসারীদের দলীল।
ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ) বাসস্থান পাবে; কেননা তা কুরআনের আয়াত দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, أَسْكِنُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ سَكَنتُم مِّن وُجْدِكُمْ
‘‘তোমরা তোমাদের সামর্থ্যনুযায়ী যেরূপ গৃহে বাস কর, তাদেরকেও বসবাসের জন্যে সেরূপ গৃহ দাও।’’ (সূরা আল আন্‘আম ৬ : ৬৫)
বর্ণিত আয়াত মোতাবেক বাসস্থানের জন্য গৃহ দিতে হবে, তবে খোরাক দিতে হবে না। কেননা খোরাক প্রদান আল্লাহ তা‘আলা গর্ভবতী হওয়ার সাথে নির্ধারণ করেছেন। যেমন উপরে আমরা দেখেছি, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘যদি তারা গর্ভবতী হয়, তবে সন্তানপ্রসব পর্যন্ত তাদের ব্যয়ভার বহন করবে।’’ এর দ্বারা বুঝা যায় যে, গর্ভবতী না হলে খোরাক দেয়ার প্রয়োজন নেই।
ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-এর মতে বাসস্থান ও খোরাক উভয়টি দিতে হবে। তাঁর দলীল উপরোক্ত আয়াত। কেননা আল্লাহ এখানে বাসস্থান দেয়ার কথা বলেছেন। আর বাসস্থান দিয়ে একজন নারীকে আটকে রাখতে বাধ্য করলে তার খোরাক দেয়া এমনিতেই আবশ্যক হয়ে পড়ে। আর অন্য আয়াতে গর্ভবতী হলে খোরাক দেয়ার কথা বলায় গর্ভবতীর খোরাকের বিধান প্রমাণিত হয়। গর্ভবতী না হলে খোরাক না দেয়ার হুকুম উক্ত আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় না। এছাড়া এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ‘উমার বলেন, لا ندع كتاب ربنا ولا سنة نبينا لقول امرأة : لها النفقة والسكنى ‘‘একজন নারীর কথায় আমরা আমাদের রবে্র কিতাব এবং নাবীর সুন্নাত ছাড়ব না। তার জন্য খোরাক ও বাসস্থান রয়েছে।’’ (শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪৮০; সহীহ ইবনু হিব্বান ১০/৬৩, হাঃ ৪২৫০)
(تَضَعِينَ ثِيَابَكِ) তুমি তোমার কাপড় রাখবে। এখানে ‘ইদ্দত পালনকালীন সময়ের একটি বিধান বলে দেয়া হচ্ছে। অর্থাৎ ‘ইদ্দত পালনকালে তুমি সাজ-সজ্জার কোনো কাপড় পরিধান করবে না বরং তা রেখে দিয়ে অন্য সাধারণ কাপড় পরিধান করবে।
(أن معاوية بن أبي سفيان وأبا جهم خطباني) অর্থাৎ মু‘আবিয়াহ্ এবং আবূ জাহ্ম আমাকে বিবাহের জন্য প্রস্তাব পাঠালেন।
এ হাদীস থেকে বুঝা যায়, কেউ কাউকে বিবাহের প্রস্তাব দিলে অন্য কেউ প্রস্তাব দিতে কোনো সমস্যা নেই। যেমন এখানে আবূ জাহম এবং মু‘আবিয়াহ্ দু’জনের বিবাহের প্রস্তাব দেয়ার কথা এসেছে। অথচ অন্য হাদীসে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, يَتْرُكَ) أَوْ يَنْكِحَ حَتّٰى أَخِيهِ خِطْبَةِ (وَلَا يَخْطُبُ الرَّجُلُ عَلٰى ‘‘ব্যক্তি যেন তার ভাইয়ের বিবাহের প্রস্তাবের উপর প্রস্তাব না দেয় যতক্ষণ না সে বিবাহ করবে বা ছেড়ে দেয়।’’ (সহীহুল বুখারী- অধ্যায় : বিবাহ, অনুচ্ছেদ : বিয়ের প্রস্তাবের উপর প্রস্তাব না দেয়া, হাঃ ৪৭৪৭)
এ হাদীস থেকে বুঝা যায়, কারো প্রস্তাবের উপর প্রস্তাব দেয়া বৈধ নয়। ‘উলামায়ে কিরাম উভয় হাদীসের মাঝে সামঞ্জস্য বিধান এভাবে করেন যে, বিবাহের প্রস্তাব দেয়ার পর তারা যদি একে অপরের প্রতি ঝুঁকে পড়ে এবং কথাবার্তা মোটামুটি পাকাপাকির পর্যায়ে চলে যায়, এমতাবস্থায় অন্য কারো জন্য প্রস্তাব দেয়া জায়িয নয়। এর আগে যেমন কেউ ভালো প্রস্তাবের অপেক্ষায় থাকার কারণে কাউকে কোনো ধরনের কথা দিচ্ছে না, এমতাবস্থায় প্রস্তাবের উপর প্রস্তাব দিতে কোনো সমস্যা নেই।
(فَلَا يَضَعُ عَصَاهُ) সে তার কাঁধ থেকে লাঠি সরায় না। এর দ্বারা দু’টি উদ্দেশ্য হতে পারে। এক. সে অধিক সফর করে এ কথার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। সফরের সময় লাঠি সাথে রাখার নিয়ম তাদের ছিল। দুই. ‘সে অধিক প্রহারকারী’ এ কথার দিকে ইঙ্গিত করা। এখানে এই অর্থই উদ্দেশ্য; কেননা অন্য বর্ণনায় রয়েছে (انه ضراب للنساء) অর্থাৎ সে মেয়েদেরকে খুব প্রহারকারী।
এ হাদীস থেকে আমরা আরো বুঝতে পারি যে, বিবাহের পূর্বে স্বামী বা স্ত্রী সম্পর্কে কেউ জানতে চাইলে তার দোষ বলা গীবাতের অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা হাদীসে রয়েছে (الْمُسْتَشَارُ مُؤْتَمَنٌ) অর্থাৎ পরামর্শ চাওয়া হয় এমন ব্যক্তির কাছে আমানত কাম্য। (তিরমিযী- অধ্যায় : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শিষ্টাচার, অনুচ্ছেদ : পরামর্শ চাওয়া হয় এমন ব্যক্তির কাছে আমানত কাম্য, হাঃ ২৭৪৭)
অতএব স্বামী বা স্ত্রী কারো ব্যাপারে কেউ জানতে চাইলে তাদের ভিতর বাস্তব কোনো দোষ থাকলে তা বলে দেয়া কর্তব্য। যাতে দোষ না জেনে বিয়ের পরবর্তীতে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এ ক্ষেত্রে পরামর্শদাতাকে অত্যন্ত সতর্কতার দিকে লক্ষ্য রেখে একমাত্র বাস্তব ক্ষতিকারক দোষটিই বলার অনুমোদন থাকবে। অতিরিক্ত বা মিথ্যা কিছু বললেই আমানাতের খিয়ানাতকারী বলে গণ্য হবে।
এ হাদীস থেকে আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতি দারিদ্রের বিষয়টি লক্ষ্য রেখেছেন। অতএব যার কাছে স্ত্রীর ভরণ-পোষণ পরিমাণ সম্পদ নেই তার বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা দোষের কিছু নয়। হাদীসে এমন ব্যক্তির জন্য বিয়ে না করে সওম পালনের পরামর্শ দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ، فَإِنَّه أَغَضُّ لِلْبَصَرِ، وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ، وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ، فَإِنّه لَه وِجَاءٌ
‘‘হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিয়ে করে। কেননা, বিবাহ তার দৃষ্টিকে সংযত রাখে ও যৌনতাকে সংযমী করে এবং যাদের বিবাহ করার সামর্থ্য নেই, সে যেন সওম পালন করে। কেননা, সওম তার যৌনতাকে দমন করবে।’’ (সহীহুল বুখারী- অধ্যায় : বিবাহ, অনুচ্ছেদ : যার বিয়ের সামর্থ্য নেই সে সওম পালন করবে, হাঃ ৪৬৭৮)
কুরআনেও এদিক ইঙ্গিত রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘যারা বিবাহে সামর্থ্য নয়, তারা যেন সংযম অবলম্বন করে যে পর্যন্ত না আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেন’’- (সূরা আল আহযাব ৩৩ : ২৪)। (মিরকাতুল মাফাতীহ; শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪৮০)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - ‘ইদ্দত
৩৩২৫-[২] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেন, (উপরোক্ত হাদীসের প্রেক্ষিতে) ফাতিমা (রাঃ) নিঃসঙ্গ এক ঘরে অবস্থানের ব্যাপারে শঙ্কার দরুন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে (’ইদ্দত পালনের সময়) অন্যত্র যাওয়ার (গৃহ-ত্যাগের) অনুমতি দান করেন। অপর বর্ণনায় আছে, অতঃপর ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেন, ফাত্বিমার কি হয়েছে? সে কি আল্লাহকে ভয় করে না, সে বলে (’ইদ্দতকালে) বাসস্থান ও খোরপোষের বিধান তার জন্য করা হয়নি। (বুখারী)[1]
بَابُ الْعِدَّةِ
وَعَن عائشةَ قَالَتْ: إِنَّ فَاطِمَةَ كَانَتْ فِي مَكَانٍ وَحِشٍ فَخِيفَ عَلَى نَاحِيَتِهَا فَلِذَلِكَ رَخَّصَ لَهَا النَّبِيُّ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم تَعْنِي النُّقْلَةِ وَفِي رِوَايَةٍ: قَالَتْ: مَا لِفَاطِمَةَ؟ أَلَا تَتَّقِي اللَّهَ؟ تَعْنِي فِي قَوْلِهَا: لَا سُكْنَى وَلَا نَفَقَة. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: ‘ইদ্দত পালনরত নারীর জন্য স্বামীর ঘর ছেড়ে অন্য কোথায়ও যাওয়া বৈধ নয়, তবে যদি এমন কোনো জটিল কারণ দেখা দেয় যার কারণে স্বামীর ঘরে থাকা সম্ভব না হয়, এক্ষেত্রে মহিলা বের হয়ে নিরাপদ স্থানে গিয়ে ‘ইদ্দত পালন করতে পারবে। এ হাদীস এবং পূর্বের হাদীসটিও এই মাসআলার প্রমাণ বহন করে। এখানে স্বামীর ঘরে থাকা জটিল হওয়ার যে কারণটি বলা হয়েছে তা হলো, ঘরটি নির্জন দূর এলাকায় হওয়ায় ভয়ের কারণ ছিল। কোনো কোনো বর্ণনায় ভিন্ন কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। সামনের বর্ণনাটিতে আমরা ভিন্ন কারণ দেখতে পাব।
এ হাদীসটিও তাদের পক্ষে দলীল যারা বলেন, বায়্যিনাহ্ তালাকপ্রাপ্তা নারীর ‘ইদ্দত পালনকালে স্বামী তার গৃহ এবং খোরাক দু’টোই দিবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - ‘ইদ্দত
৩৩২৬-[৩] সা’ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব (রহঃ) এতদসম্পর্কে বলেন যে, স্বামীর আত্মীয়-স্বজনের সাথে মুখরা হয়ে ঝগড়া-বিবাদ করার কারণে তাকে গৃহ-ত্যাগের অনুমতি দিয়েছিল। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
بَابُ الْعِدَّةِ
وَعَن سعيدِ بنِ المسيِّبِ قَالَ: إِنَّمَا نُقِلَتْ فَاطِمَةُ لِطُولِ لِسَانِهَا عَلَى أحمائِها. رَوَاهُ فِي شرح السّنة
ব্যাখ্যা: তাকে স্বামীর ঘর ছেড়ে অন্য ঘরে যেতে বলার কারণ হলো, স্বামীর আত্মীয়দের বেলায় তার যবান লম্বা ছিল। অর্থাৎ তার মুখের ভাষা খারাপ ছিল। মুখ দিয়ে সে সবাইকে কষ্ট দিত। কোনো কোনো বর্ণনায় রয়েছে, তাকে বাহিরে যেতে দেয়ার কারণ ছিল, তার স্বভাব ভালো ছিল না।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - ‘ইদ্দত
৩৩২৭-[৪] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার খালাকে তিন তালাক দেয়া হয়েছে। এমতাবস্থায় একদিন তিনি স্বীয় বাগানের খেজুর পাড়তে চাইলে জনৈক ব্যক্তি তাকে ঘরের বাইরে যেতে নিষেধ করলেন। এতদসম্পর্কে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানালেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, হ্যাঁ, তুমি বের হয়ে তোমার বাগানের খেজুর পাড়তে পার। কেননা তুমি তো তোমার খেজুরের বিনিময়ে সাদাকা করবে বা অন্য কোনো সৎকাজ করবে। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْعِدَّةِ
وَعَن جابرٍ قَالَ: طُلِّقَتْ خَالَتِي ثَلَاثًا فَأَرَادَتْ أَنْ تَجُدَّ نَخْلَهَا فَزَجَرَهَا رَجُلٌ أَنْ تَخْرُجَ فَأَتَتِ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «بَلَى فَجُدِّي نَخْلَكِ فَإِنَّهُ عَسَى أَنْ تَصَّدَّقِي أَوْ تَفْعَلِي مَعْرُوفا» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: হাদীসটি প্রমাণ বহন করে যে, তালাকপ্রাপ্তা নারী ‘ইদ্দত পালনকালে প্রয়োজনীয় কাজের জন্য বাহিরে যেতে পারবে।
ইমাম মালিক, সাওরী, শাফি‘ঈ, আহমাদ (রহঃ) ও অন্যান্যদের নিকট প্রয়োজনীয় কাজে দিনে বের হতে পারবে। তাদের নিকট ত্বলাকের ‘ইদ্দত এবং স্বামী মৃত্যুর ‘ইদ্দত উভয় ‘ইদ্দাতেই প্রয়োজনে দিনে বের হতে পারবে। স্বামী মৃত্যুকালীন ‘ইদ্দাতের ক্ষেত্রে ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-ও তাদের সাথে ঐকমত্য পোষণ করেন। তবে বায়্যিনাহ্ তালাকপ্রাপ্তা নারীর ক্ষেত্রে তাঁর অভিমত হলো, রাত বা দিন কখনোই সে ঘরের বাহিরে বের হবে না। (শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪৮৩)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - ‘ইদ্দত
৩৩২৮-[৫] মিস্ওয়ার ইবনু মাখরমাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সুবায়’আহ্ আল আসলামী (রাঃ)তার স্বামীর (সা’দ ইবনু খাওয়ালাহ্-এর) মৃত্যুর কয়েক দিন পরে সন্তান প্রসব করেন। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বিবাহের অনুমতি চাইলে তিনি তাকে অনুমতি দেন। অতঃপর তিনি অন্যত্র বিয়ে করেন। (বুখারী)[1]
بَابُ الْعِدَّةِ
وَعَنِ الْمِسْوَرِ بْنِ مَخْرَمَةَ: أَنَّ سُبَيْعَةَ الْأَسْلَمِيَّةَ نُفِسَتْ بَعْدَ وَفَاةِ زَوْجِهَا بِلَيَالٍ فَجَاءَتِ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاسْتَأْذَنَتْهُ أَنْ تَنْكِحَ فأذِنَ لَهَا فنكحت. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: সুবায়‘আহ্ আল আসলামিয়্যাহ্-এর স্বামী মারা যাওয়ার কতদিন পর বাচ্চা প্রসব হয়েছিল- এ নিয়ে বিভিন্ন মতামত রয়েছে। এই বর্ণনায় কোনো সংখ্যা ছাড়া কয়েক রাতের কথা বলা হয়েছে। আবার বিশ, পনের, পঁচিশ, বিশ আরো কয়েক রাত, আধা মাস, পনের দিন অর্থাৎ আধা মাস এভাবে সর্বোচ্চ দুই মাসের বর্ণনা পাওয়া যায়। বিভিন্ন বর্ণনা থাকলেও সব বর্ণনা এ কথাটি নিশ্চিত করে যে, তার বাচ্চা প্রসব চার মাস দশ দিনের পূর্বে হয়েছে।
স্বামী মারা গেলে স্ত্রীর ‘ইদ্দাতের মেয়াদ চার মাস দশ দিন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘আর তোমাদের মধ্যে যারা মৃত্যুবরণ করবে এবং নিজেদের স্ত্রীদেরকে ছেড়ে যাবে, তখন সে স্ত্রীদের কর্তব্য হলো নিজেকে চার মাস দশ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করিয়ে রাখা।’’ (সূরা আল বাকারা ২ : ২৩৪)
‘উলামাদের যারা এ আয়াতটি ব্যাপক মনে করেন তাদের মতে স্বামী মারা যাওয়া যে কোনো ধরনের নারীকে চার মাস দশ দিন ‘ইদ্দত পালন করতে হবে। যেমন কোনো নারীকে গর্ভবতী রেখে যদি তার স্বামী মারা যায় এবং স্বামীর মৃত্যুর কিছুদিন পর অর্থাৎ চার মাস দশ দিনের পূর্বেই বাচ্চা প্রসব করে তবে তার ‘ইদ্দত শেষ হবে না। বরং তাকে চার মাস দশ দিন পূর্ণ করতে হবে।
অপরদিকে অধিকাংশ ‘আলিমদের মতে আয়াতটি ব্যাপক নয়। বরং যে নারী গর্ভবতী নয় তার ক্ষেত্রে এ আয়াতটি প্রযোজ্য। গর্ভবতী নারীর ‘ইদ্দত সর্বাবস্থায় তার বাচ্চা প্রসব। স্বামী মারা যাওয়ার পরপরই যদি স্ত্রী বাচ্চা প্রসব করে তবে তার ‘ইদ্দত শেষ হয়ে যাবে। বর্ণিত হাদীসটি তাদের পক্ষে প্রমাণ বহন করে। এ হাদীসের আলোকে তারা বলেন, গর্ভবতী নারীর ‘ইদ্দত বাচ্চা প্রসব। চাই ‘ইদ্দত স্বামীর মৃত্যুর কারণে হোক অথবা স্বামী তাকে তালাক দেয়ার কারণে হোক। তাদের মতে, কুরআনের আয়াত যেখানে চার মাস দশ দিনের কথা বলা হয়েছে তা ঐ নারীর জন্য যে গর্ভবতী নয়। তাদের আরো দলীল হচ্ছে, কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ ‘‘গর্ভবতী নারীদের ‘ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত।’’ (সূরা আত্ব তালাক ৬৫ : ৪)
হাদীসের আলোকে তারা উপরের আয়াতটিকে ব্যাপক মনে না করে এই আয়াতটিকেই ব্যাপক মনে করেন এবং এই আয়াতের আলোকে গর্ভবতী নারী চাই ত্বলাকের কারণে ‘ইদ্দত পালন করুক বা স্বামী মারা যাওয়ার কারণে ‘ইদ্দত পালন করুক সন্তান প্রসবের মাধ্যমে তার ‘ইদ্দত শেষ হবে। তবে ‘আলী , ইবনু ‘আব্বাস -সহ অনেকের মতে, স্বামী মারা যাওয়া গর্ভবতী নারীর ‘ইদ্দত হবে দুই সময়ের দীর্ঘ সময়। অর্থাৎ যেটা পরে হবে সতর্কতা স্বরূপ সেটাকেই ‘ইদ্দত গণ্য করতে হবে। যেমন স্বামী মারা যাওয়ার পর চার মাস দশ দিন পূর্বেই যদি বাচ্চা প্রসব হয়ে যায় এক্ষেত্রে ‘ইদ্দত চার মাস দশ দিন পুরো করবে। আর যদি বাচ্চা প্রসব চার মাস দশ দিন পরে হয় তবে এই মেয়াদ পার হলে ‘ইদ্দত শেষ হবে না বরং বাচ্চা প্রসব হওয়ার পর ‘ইদ্দত শেষ হবে।
হাদীসে সন্তান প্রসব না বলে নিফাস হওয়া বলায় আরেকটি জিনিস বুঝা যায়, প্রসবের মাধ্যমে মহিলার ‘ইদ্দত শেষ হয়ে যাবে বাচ্চাটি যে কোনো প্রকৃতির হোক না কেন। পরিপূর্ণ বাচ্চা, অপরিপূর্ণ বাচ্চা এমনটি গোশতের টুকরো গর্ভপাত করলেও ‘ইদ্দত শেষ হয়ে যাবে। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫৩২০)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - ‘ইদ্দত
৩৩২৯-[৬] উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট জনৈক মহিলা এসে বলল যে, আমার মেয়ের স্বামী মারা গেছে। এমতাবস্থায় তার চোখে অসুখ হয়েছে, (’ইদ্দতকালে) আমি কী তার চোখে সুরমা ব্যবহার করাতে পারব? উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না। এতে স্ত্রীলোকটি দু’ বা তিনবার অনুমতি চাইল। প্রতিবারেই তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, না। অতঃপর বললেন- দেখ! মাত্র ৪ মাস ১০ দিন, অথচ জাহিলিয়্যাত (অন্ধকার) যুগে তোমাদের এক একজন নারীকে ’ইদ্দতকাল এক বছর পূর্ণ হলে উটের গোবর ফেলতে হতো। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْعِدَّةِ
وَعَن أُمِّ سلمةَ قَالَتْ: جَاءَتِ امْرَأَةٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ ابْنَتِي تُوُفِّيَ عَنْهَا زَوْجُهَا وَقَدِ اشْتَكَتْ عَيْنُهَا أَفَنَكْحُلُهَا؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا» مَرَّتَيْنِ أَوْ ثَلَاثًا كُلُّ ذَلِكَ يَقُولُ: «لَا» قَالَ: «إِنَّمَا هِيَ أَرْبَعَةُ أَشْهُرٍ وعشرٌ وَقد كَانَت إِحْدَاهُنَّ فِي الجاهليَّةِ تَرْمِي بِالْبَعْرَةِ عَلَى رَأْسِ الْحَوْلِ»
ব্যাখ্যা: ‘ইদ্দত পালনকালীন সময়ে মহিলার জন্য কোনো ধরনের সাজ-সজ্জা জায়িয নয়। সাজ-সজ্জার মাঝে চোখে সুরমা লাগানো অন্তর্ভুক্ত। তাই বিনা প্রয়োজনে সুরমা লাগানোও অবৈধ এতে কোনো সন্দেহ বা দ্বিমত নেই। কিন্তু প্রয়োজনে সুরমা লাগাতে পারবে কিনা- এ নিয়ে কিছুটা মতানৈক্য রয়েছে। বর্ণিত হাদীসের আলোকে বুঝা যায় যে, ‘ইদ্দতকালীন সময়ে সুরমার ব্যবহার প্রয়োজনে হোক বা অপ্রয়োজনে হোক কোনো ক্ষেত্রেই জায়িয নয়। তবে আরেকটি হাদীস যেখানে আবূ সালামাহ্-এর ওপর উম্মু সালামার শোক পালনকালে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার চোখে সাবির (চোখে লাগানোর ওষুধ বিশেষ) দেখে বলেন, এটা কি? তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসূল! এটা সাবির ছাড়া কিছু নয়। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «اجْعَلِيهِ بِاللَّيْلِ وَامْسَحِيهِ بِالنَّهَارِ» ‘‘এটাকে রাতে দাও এবং দিনে মুছে ফেল।’’ (বায়হাক্বী, মা‘রিফাতুস সুনানি ওয়াল আসার, কিতাবুল লি‘আন, ইহদাদ অনুচ্ছেদ, হাঃ ১৫৩৪২)
দুই হাদীসের সমন্বয় হলো, প্রয়োজনে রাতে সুরমা বা এ জাতীয় কিছু ব্যবহার জায়িয। কিন্তু দিনে তা কোনো অবস্থায়ই জায়িয নয়। রাতে ব্যবহার করলেও দিনে মুছে ফেলবে।
তবে মূলত নিষেধের হাদীসগুলো অপ্রয়োজনের সাথে সংশ্লিষ্ট। কিন্তু বর্ণিত হাদীসে চোখের অভিযোগের পরও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুরমা ব্যবহারের নিষেধ করার কারণে বুঝা যায় যে, নিষেধের হাদীস কেবল অপ্রয়োজনের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। বরং প্রয়োজন অপ্রয়োজন সর্বক্ষেত্রে সুরমা ব্যবহার নিষেধ থাকবে। তবে ‘ইদ্দত পালনকালে মূল নিষেধ হলো সাজ-সজ্জা। তাই সাজ-সজ্জা ছাড়া প্রয়োজনে ঔষধরূপে ব্যবহারের নিষেধকে ‘উলামায়ে কিরাম মাকরূহ তানযিহী হিসেবে ধরে নেন। অর্থাৎ সাজের কারণে ব্যবহার আর প্রয়োজনে ব্যবহার এক নয়। আবার কোনো কোনো ‘আলিম বলেন, চিকিৎসার প্রয়োজনে ব্যবহার জায়িয। তাদের মতে এখানে রসূলের নিষেধের কারণ হয়তবা তার অভিযোগটি সাধারণ ছিল, সুরমা ব্যবহার না করলে কোনো অসুবিধা ছিল না। তাই অভিযোগের পরও রসূল নিষেধ করেন।
(إِنَّمَا هِىَ أَرْبَعَةُ أَشْهُرٍ وَعَشْرٌ) এটাতো কেবল চার মাস দশ দিনই। রাসুল -এর এ কথার উদ্দেশ্য হলো, ‘ইদ্দত পালন করতে একটু ত্যাগ স্বীকার করা তেমন কিছু নয়। এ কথা বলার পর জাহিলিয়্যাতের যুগে তাদের ‘ইদ্দত পালনের কষ্টের বিবরণ দেন। মূর্খতার যুগে দীর্ঘ এক বছর অনেক কষ্ট করে যে ‘ইদ্দত পালন করা হত ইসলাম সে ধরনের কঠিন কোনো হুকুম দেয়নি। জাহিলী যুগের ‘ইদ্দত পালনের তুলনায় ইসলামের ‘ইদ্দত পালন একেবারেই সহজ। তাই এই সহজ হুকুমটি পালন করতে তোমাদের একটু ত্যাগ করতে হবে।
হাদীস থেকে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেল যে, জাহিলী যুগের এক বছরের ‘ইদ্দত পালনের প্রথা কুরআনের আয়াত দ্বারা রহিত হয়ে গেছে।
(تَرْمِىْ بِالْبَعْرَةِ عَلٰى رَأْسِ الْحَوْلِ) ‘‘বছরের মাথায় গোবর নিক্ষেপ করত’’। হাদীসের এ অংশে জাহিলী যুগের অনর্থক নিজেকে কষ্ট দেয়ার কুসংস্কারের বিবরণ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ এক বছর ‘ইদ্দত পালন করার পর ‘ইদ্দত শেষে তারা ঘর থেকে বের হয়ে গোবর নিক্ষেপ করে ‘ইদ্দাতের সমাপ্তি ঘটাত। কোনো কোনো ‘আলিম বলেন, গোবর নিক্ষেপ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, ‘ইদ্দত শেষ করা। অর্থাৎ এক বছর অযথা নোংরা কষ্টের পর ‘ইদ্দত থেকে বের হয়ে পৃথক হত যেমন গোবর শরীর থেকে বের হয়ে পৃথক হয়। কেউ কেউ বলেন, এখানে ইঙ্গিত হলো, জাহিলী যুগে ‘ইদ্দত পালনকালে নারী যে কাজ করেছে, এক বছর ‘ইদ্দত পালনের যে ধৈর্য ধরেছে, সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাপড় পরিধান করেছে এবং একেবারে ছোট ঘর আঁকড়ে থেকেছে, স্বামীর অধিকার হিসেবে এমন ‘ইদ্দত পালন করা অত্যন্ত তুচ্ছ বিষয় যেমন কেউ গোবর নিক্ষেপ করল।
(শারহে মুসলিম ৯ম খন্ড, হাঃ ১৪৮৮)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - ‘ইদ্দত
৩৩৩০-[৭] উম্মু হাবীবাহ্ ও যায়নাব বিনতু জাহশ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তারা উভয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে মু’মিনাহ্ আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের ওপর ঈমান আনে, তার পক্ষে কোনো মৃতের জন্য তিন দিনের অধিক শোক প্রকাশ করা বৈধ নয়। অবশ্য কোনো রমণীর স্বামীর মৃত্যুতে ৪ মাস ১০ দিনের জন্য শোক প্রকাশ করবে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْعِدَّةِ
وَعَنْ أُمِّ حَبِيبَةَ وَزَيْنَبَ بِنْتِ جحش عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ تُحِدَّ عَلَى مَيِّتٍ فَوْقَ ثَلَاثِ لَيَالٍ إِلَّا عَلَى زَوْجٍ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا»
ব্যাখ্যা: বর্ণিত হাদীসটিও এ কথার উপর দলীল যে, স্বামীর মৃত্যতে ‘ইদ্দত পালনকারী নারী শোক পালন করবে। ‘ইদ্দাতের মেয়াদ ও শোকের মেয়াদ একই। চার মাস দশ দিন যেমন ‘ইদ্দত পালন করবে তেমনিভাবে চার মাস দশ দিন সাজ-সজ্জা থেকে বিরত থেকে শোক পালন করবে। আর স্বামী মৃত্যুতে ‘ইদ্দত পালনকারী নারী ছাড়া অন্য কারো জন্য তিন দিনের বেশি শোক পালন জায়িয নয়। কারো মৃত্যুতে দুঃখী হয়ে একজন সর্বোচ্চ তিনদিন এই নিয়্যাতে সাজ-সজ্জা থেকে বিরত থাকতে পারে। শোকের নিয়্যাতে এর বেশি থাকলে গুনাহগার হবে।
শোক পালন উদ্দেশ্য ছাড়া মৃতের দুঃখ কাটতে অধিক সময় গেলে তা এই হাদীসের অন্তর্ভুক্ত নয়।
পরিচ্ছেদঃ ১৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - ‘ইদ্দত
৩৩৩১-[৮] উম্মু ’আত্বিয়্যাহ্ (নুসায়বাহ্) (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো রমণী যেন মৃতের জন্য তিনদিনের অধিক শোক পালন না করে, অবশ্য স্বামীর মৃত্যুতে ৪ মাস ১০ দিন ব্যতীত। এছাড়া সে যেন রং করা সুতার কাপড় ছাড়া কোনো রঙিন কাপড় না পরে, সুরমা না লাগায় ও সুগন্ধি ব্যবহার না করে। অবশ্য ঋতুস্রাব হতে পাক হওয়ার সময় (শরীরের দুর্গন্ধ দূরীকরণে) ’কুস্ত্ব’ ও ’আয্ফার’ জাতীয় কাঠের সুগন্ধি ব্যবহার করতে পারে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
আবূ দাঊদ-এর বর্ণনায় আছে, মেহেদিও না লাগায়।
بَابُ الْعِدَّةِ
وَعَن أُمِّ عطيَّةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا تُحِدُّ امْرَأَةٌ عَلَى مَيِّتٍ فَوْقَ ثَلَاثٍ إِلَّا عَلَى زَوْجٍ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا وَلَا تَلْبَسُ ثَوْبًا مَصْبُوغًا إِلَّا ثَوْبَ عَصْبٍ وَلَا تكتحِلُ وَلَا تَمَسُّ طِيبًا إِلَّا إِذَا طَهُرَتْ نُبْذَةً مِنْ قُسْطٍ أَوْ أَظْفَارٍ» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ. وَزَادَ أَبُو دَاوُدَ: «وَلَا تختضب»
ব্যাখ্যা: لَا تُحِدُّ امْرَأَةٌ عَلٰى مَيِّتٍ)) অর্থাৎ আত্মীয় বা অনাত্মীয় কেউ মারা গেলে মহিলার জন্য তিন দিনের অতিরিক্ত শোক পালন করা জায়িয নয়। কেবল স্বামীর ক্ষেত্রে চার মাস দশ দিন শোক পালন করতে পারবে। এমনকি এই শোক পালন করা জরুরী।
এখানে আমাদেরকে দু’টি বিষয় লক্ষ্য রাখা দরকার। এক : স্বামী ছাড়া অন্যের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিন দিন শোক পালন জায়িয। জরুরী বা ওয়াজিব নয়। তিন দিনের বেশি পালন করলে না-জায়িয হবে। দুই : স্বামীর ক্ষেত্রে চার মাস দশ দিন শোক পালন করা কেবল জায়িয নয় বরং ওয়াজিব বা অপরিহার্য। স্বামীর ক্ষেত্রে শোক পালনে শৈথিল্যপ্রদর্শন করলে স্ত্রী গুনাহগার হবে। স্বামীর বেলায় শোক পালনের বিষয়টি বিভিন্ন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।
আরেকটি বিষয় হলো, চার মাস দশ দিনের শোক পালনের কথা অধিকাংশ নারীর দিকে লক্ষ্য করে বলা হয়েছে। নতুবা মহিলা যদি গর্ভবতী হয় তবে তার ‘ইদ্দত যেমন বাচ্চা প্রসব তেমনি তার শোক পালনের মেয়াদও বাচ্চা প্রসব পর্যন্ত। স্বামীর মৃত্যুর পর বাচ্চা প্রসব পর্যন্ত মহিলা শোক পালন করবে। চার মাস দশ দিনের পূর্বেই যদি বাচ্চা প্রসব হয়ে যায় তবে শোক পালনের জন্য মহিলাকে চার মাস দশ দিন পূর্ণ করতে হবে না। মোটকথা, গর্ভপাত পর্যন্ত সময় চার মাস দশ দিনের কম হোক বা বেশি হোক গর্ভবতী মহিলার জন্য এ সময়টুকু শোক পালন করতে হবে। তবে কোনো কোনো ‘আলিম বলেন, গর্ভবতী মহিলা চার মাস দশ দিন পার করে ফেললে প্রসব না হলেও তাকে শোক পালন করতে হবে না। অর্থাৎ তাদের মতে শোক পালনের মেয়াদ সবার ক্ষেত্রে চার মাস দশ দিন।
‘আলিমগণ বলেন, স্বামী মারা গেলে ‘ইদ্দত পালনের সাথে সাথে শোক পালন করতে হয়, কিন্তু তালাকপ্রাপ্তা নারীকে কেবল ‘ইদ্দত পালন করতে হয়, ‘ইদ্দাতের সাথে শোক পালন করতে হয় না, এর রহস্য হলো; সাজ-সজ্জা এবং সুগন্ধি বিবাহের দিকে আকৃষ্ট করে, তাই এ থেকে বাধা দেয়া হয়েছে। যাতে এই বিরত থাকাটা মহিলাকে বিবাহ থেকে বারণ করে; কেননা মারা যাওয়া স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে বারণ সম্ভব নয়। তাই বিরত থাকাটা স্বামীর পক্ষ হয়ে বারণ করার ন্যায়। অপরদিকে তালাকপ্রাপ্তা নারীর স্বামী জীবিত থাকায় ‘ইদ্দাতের পূর্বে বিবাহতে বিবাহকারী তার প্রতি ভ্রূক্ষেপ করবে। তাই অন্য কোনো বাধার প্রয়োজন নেই। আর চার মাস দশ দিনের রহস্য হলো, চার মাস পূর্ণ হলে সন্তানের আত্মা আসে, এর সাথে আরো দশ দিন সতর্কতাবশত। (শারহে মুসলিম ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২২৯৯)
وَلَا تَلْبَسُ ثَوْبًا مَصْبُوغًا إِلَّا ثَوْبَ عَصْبٍ অর্থাৎ রঙিন কাপড় পরবে না তবে ‘আস্বের’ কাপড় পরতে পারে। ‘আস্বে’র কাপড় বলতে ইবনুল কইয়্যিম ও ইবনু কুদামার মতে, ‘আস্ব’ এক ধরনের উদ্ভিদ, যা দিয়ে কাপড় রঙানো। রঙিন কাপড়ের মাঝে ‘আস্ব’ দ্বারা রঙানো কাপড়ের বৈধতা দেয়া হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য রঙ দ্বারা রঙানো কাপড় না জায়িয।
ইবনু হাজার-এর বর্ণনা মতে, এটি এক ধরনের নকশাকৃত চাদর। যার সুতা গিরো দিয়ে রঙিন করার পর কাপড়ের বুননের মাধ্যমে এমন নকশা হত যে, যে জায়গাটি গিরো দেয়া হয়েছে তা রঙিন না হয়ে সাদা থাকত। ইবনুল মুনযির বলেন, ‘আলিমগণ এ ব্যাপারে একমত যে, শোক পালনকারিণী নারীর জন্য হলুদ বা রঙিন কাপড় পরিধান করা জায়িয নয়। তবে কালো রঙে রঙিন কাপড় পরা জায়িয। ইমাম শাফি‘ঈ, ইমাম মালিক (রহঃ)-এর অনুমোদন দেন; কেননা কালোকে সজ্জার জন্য পরিধান করা হয় না, বরং তা চিন্তিত সময়ের পোশাক। (‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২২৯৯)
ইমাম নববী লিখেন: আমাদের ইমামগণ বলেন, যে কাপড় রঙিন, অথচ তা দ্বারা সজ্জা অবলম্বন করা হয় না তা জায়িয। (শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪৮৮)
সারকথা, ‘ইদ্দত পালনকারী নারীর জন্য সাজ-সজ্জা অবলম্বন জায়িয নয়। তাই অতি সাধারণ পুরাতন রঙিন কাপড় পরলে তা না জায়িয অবৈধ হবে না। আবার ধবধবে সাদা নতুন উন্নতমানের কাপড় যা সাজের ক্ষেত্রে রঙিনকে হার মানায় বলে দেখা যায় তা পরিধান করা বৈধ হবে না। অর্থাৎ মূল বিষয় হচ্ছে সাজ-সজ্জা অবলম্বন থেকে বিরত থাকা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রঙিন কাপড়কেই সাজের জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাই হাদীসে রঙিন কাপড়ের কথা বলা হয়েছে। অতএব অতি সাধারণ রঙিন কাপড় যেমন না-জায়িয হবে না, তেমনি অতি উন্নত সাদা কাপড় জায়িয হবে না। আল্লাহ অধিক জানেন।
(قُسْطٍ أَوْ أَظْفَارٍ) ‘কুস্ত্ব’ এবং ‘আযফার’ দু’টো সুগন্ধির নাম। শোক পালনকারী নারীর জন্য সুগন্ধি ব্যবহারের অনুমোদন না থাকলেও হায়িয থেকে পবিত্র হওয়ার সময় এই সুগন্ধি সামান্য ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়েছে। অল্প একটু ব্যবহারের মাধ্যমে শরীর থেকে হায়িযের রক্তের দুর্গন্ধের যে একটি প্রভাব রয়েছে তা দূর করবে। শরীরকে সুগন্ধযুক্ত করার জন্য ব্যবহার করবে না। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই হালকা সুগন্ধি ব্যবহারের অনুমতি দেন।
(وَلَا تَخْتَضِبُ) আর খিযাব লাগাবে না। শোক পালন অবস্থায় না-জায়িয আরেকটি বস্তু হলো মেহেদী ব্যবহার। মেহেদী সজ্জার অন্তর্ভুক্ত একটি জিনিস। তাই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেহেদী দ্বারা নিজের শরীরে রঙ্গ লাগাতে নিষেধ করেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ‘ইদ্দত
৩৩৩২-[৯] যায়নাব বিনতু কা’ব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ)-এর বোন ফুরয়’আহ্ বিনতু মালিক ইবনু সিনান (রাঃ)আমাকে বলেছেন যে, ’ইদ্দত পালনকালে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে নিজের পিতৃবংশীয় খুদরীর লোকজনের নিকট ফিরে যেতে পারেন কিনা জানতে চাইলেন? কেননা, তাঁর স্বামী তার কয়েকজন পলাতক দাসদের সন্ধানে বের হলে তারা তাকে হত্যা করে ফেলে। যায়নাব (রাঃ) বলেন, ফুরয়’আহ্ (রাঃ)রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট পিত্রালয়ে যাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করলেন। কারণ, তার স্বামী ঘরে কোনো প্রকার খোরপোষের ব্যবস্থা করে যায়নি। এমতাবস্থায় তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সম্মতি দিলে ফুরয়’আহ্ (রাঃ) রওয়ানা হলেন। কিন্তু হুজরা বা মসজিদ পর্যন্ত তখনও অতিক্রম করেননি, এ সময়ে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পুনরায় ডাক দিয়ে বললেন, তুমি যে ঘরে আছ তথায় ’ইদ্দত শেষ হওয়া পর্যন্ত থাক। ফুরয়’আহ্ (রাঃ) বলেন, অতঃপর আমি উক্ত ঘরেই ৪ মাস ১০ দিন ’ইদ্দত পালন করলাম। (মালিক, তিরমিযী, আবূ দাঊদ, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ, দারিমী)[1]
عَن زَيْنَب بنت كَعْب: أَنَّ الْفُرَيْعَةَ بِنْتَ مَالِكِ بْنِ سِنَانٍ وَهِيَ أُخْتُ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ أَخْبَرَتْهَا أَنَّهَا جَاءَتْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَسْأَلُهُ أَنْ تَرْجِعَ إِلَى أَهْلِهَا فِي بَنِي خُدْرَةَ فَإِنَّ زَوْجَهَا خَرَجَ فِي طَلَبِ أَعْبُدٍ لَهُ أَبَقُوا فَقَتَلُوهُ قَالَتْ: فَسَأَلْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ أَرْجِعَ إِلَى أَهْلِي فَإِنَّ زَوْجِي لَمْ يَتْرُكْنِي فِي مَنْزِلٍ يَمْلِكُهُ وَلَا نَفَقَةٍ فَقَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «نَعَمْ» . فَانْصَرَفْتُ حَتَّى إِذَا كُنْتُ فِي الْحُجْرَةِ أَوْ فِي الْمَسْجِدِ دَعَانِي فَقَالَ: «امْكُثِي فِي بَيْتِكِ حَتَّى يَبْلُغَ الْكِتَابُ أَجَلَهُ» . قَالَتْ: فَأَعْتَدَدْتُ فِيهِ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا. رَوَاهُ مَالِكٌ وَالتِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ وَالدَّارِمِيُّ
ব্যাখ্যা: (اُمْكُثِىْ فِىْ بَيْتِكِ حَتّٰى يَبْلُغَ الْكِتَابُ أَجَلَه) অর্থাৎ ‘ইদ্দত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তুমি তোমার বাড়িতেই অবস্থান করো।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে তাকে তার পরিবারে চলে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। পরক্ষনেই আবার বারণ করে তার ঘরেই ‘ইদ্দত শেষ হওয়া পর্যন্ত থাকতে বলেছেন। হতে পারে প্রথম হুকুমটি ইজতিহাদের মাধ্যমে দিয়েছিলেন। সাথে সাথে ওয়াহীর মাধ্যমে তাকে হুকুম জানানো হলে তিনি ফুরয়‘আহ্-কে এই হুকুম দেন। অনেকে মনে করেন, প্রথম হুকুমটি পরবর্তী হুকুমের মাধ্যমে রহিত হয়েছে।
‘আল্লামা শাওকানী নায়লুল আওত্বারে লিখেন, ফুরায়‘আহ্ এর হাদীসটি এই মাসআলার উপর দলীল যে, স্বামী মারা গেছে এমন মহিলা ‘ইদ্দত ঐ বাড়িতে পালন করবে যে বাড়িতে থাকাবস্থায় তার কাছে স্বামীর মৃত্যুর খবর এসেছে। এই বাড়ি থেকে বের হয়ে অন্য কোথায় যাবে না। সহাবা, তাবি‘ঈন এবং তাদের পরবর্তী এক দল এই মত পোষণ করেন। ‘আল্লামা ‘আবদুর রাযযাক, ‘উমার, ‘উসমান, ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে এই মতের বর্ণনা নিয়ে আসেন। সা‘ঈদ ইবনু মানসূর ইবনু মাস্‘ঊদ -এর অধিকাংশ ছাত্র থেকে এবং কাসিম ইবনু মুহাম্মদ, সালিম বিন ‘আবদুল্লাহ, সা‘ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব এবং আতা থেকে এই মতের বর্ণনা করেন এবং হাম্মাদ ইবনু সীরীন থেকে এই মতের বর্ণনা করেন। আর এই মতই পোষণ করেন ইমাম মালিক, আবূ হানীফাহ্, শাফি‘ঈ ও তাদের ছাত্ররা এবং আওযা‘ঈ, ইসহক, আবূ ‘উবায়দ। শাওকানী বলেন, যিনি এই মতের বিপরীত মত পোষণ করেন তাদের দলীল ফুরয়‘আহ্-এর হাদীসের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো নয়। অতএব এ হাদীসের উপর ‘আমল নির্ধারিত। (‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২২৯৭)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ‘ইদ্দত
৩৩৩৩-[১০] উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার স্বামী আবূ সালামার মৃত্যুর পরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকটে (সান্তবনা দিতে) এসে দেখলেন যে, আমি মুখে ’সাবির’ মেখেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, হে উম্মু সালামাহ্! এটা কী (মেখেছ)? আমি বললাম, এটা ’সাবির’ যার সুগন্ধি নেই। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এটা মুখকে উজ্জ্বল করে, তাই তুমি রাতে ব্যবহার কর, দিনে মুছে ফেল। আর সুগন্ধি ও মেহেদী মেখে চুল পরিপাটি করো না। কেননা মেহেদী হলো খিযাব (রং)। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তবে কী দিয়ে চুল আঁচড়াব, হে আল্লাহর রসূল? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, বরই পাতা দিয়ে তোমার মাথায় প্রলেপ দাও। (আবূ দাঊদ, নাসায়ী)[1]
وَعَن أُمِّ سلمَةَ قَالَتْ: دَخَلَ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حِينَ تُوُفِّيَ أَبُو سَلَمَةَ وَقَدْ جعلتُ عليَّ صَبِراً فَقَالَ: «مَا هَذَا يَا أُمَّ سَلَمَةَ؟» . قُلْتُ: إِنَّمَا هُوَ صَبِرٌ لَيْسَ فِيهِ طِيبٌ فَقَالَ: «إِنَّهُ يَشُبُّ الْوَجْهَ فَلَا تَجْعَلِيهِ إِلَّا بِاللَّيْلِ وَتَنْزِعِيهِ بِالنَّهَارِ وَلَا تَمْتَشِطِي بِالطِّيبِ وَلَا بِالْحِنَّاءِ فَإِنَّهُ خضاب» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: (وَقَدْ جَعَلْتُ عَلَىَّ صَبِرًا) অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে প্রবেশ করলেন যখন আমি আমার চেহারায় ‘সাবির’ লাগিয়ে ছিলাম। صَبِرٌ বা صَبْرٌ শব্দটির অর্থ হলো: ঔষধরূপে ব্যবহৃত তিক্ত উদ্ভিদ বিশেষ। এই উদ্ভিদের রস যা ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হয় তাকেও ‘صَبِر’ বলা হয়। এটা মূলত সজ্জার বস্তু নয় বরং ওষুধী বস্তু। তথাপি রসূল এটাকে বারণ করলেন এবং তার কারণ বলে দিলেন। অর্থাৎ এটা মূলত ঔষধ হলেও তা চেহারার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করার কারণে সজ্জা অবলম্বনের সাথে সাদৃশ্য রাখে। তাই কেউ তা সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করতেই পারে। তাই ঔষধ হিসেবে যদি ব্যবহার করতেই হয় তবে রাত্রি বেলায় ব্যবহার করার নির্দেশ দিলেন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। রাতে লাগালে আবার দিনের বেলায় তা তুলে ফেলার নির্দেশ দেন। এ থেকে শোকাবস্থায় সজ্জা জাতীয় কোনো কিছু ব্যবহারের ব্যাপারে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কঠোরতা অবশ্যই উপলব্ধি করা যায়। হাদীসে ‘সাবির’ এর সাথে আরো দু’টি জিনিস নিষেধ করা হয়েছে।
এক. সুগন্ধি দ্বারা চিরুনী করা। অর্থাৎ সুগন্ধি জাতীয় তেল মাথায় ব্যবহার করে মাথার পরিপাটি করা।
দুই. মেহেদী ব্যবহার। উভয়টাই সজ্জা।
তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শোকাবস্থায় মেহেদী ও সুগন্ধি তেল মাথায় ব্যবহার নিষেধ করেন। তেল অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাথার চুল পরিপাটির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। তাই সুগন্ধি দিয়ে মাথা চিরুনীর কথা বলা হয়েছে। তার মানে এই নয় যে, মাথা ছাড়া অন্যস্থানে সুগন্ধি তেল ব্যবহার করা যাবে। বরং সুগন্ধি জাতীয় যে কোনো কিছু শরীরের যে কোনো অঙ্গে ব্যবহার নিষেধ। কেননা মূল হলে সজ্জা থেকে বিরত থাকা। তবে সুগন্ধি ছাড়া সাধারণ তেল শরীরে যেমন ব্যবহার করা যাবে তেমনি মাথায়ও ব্যবহার করা যাবে। হাদীসের শব্দ ‘সুগন্ধি দিয়ে চিরুনী করো না’ এ থেকে সুগন্ধিবিহীন তেলের ব্যবহারের অনুমোদন বুঝা যায়। সুগন্ধিযুক্ত তেল ব্যবহার নিষেধের বেলায় ‘আলিমদের কোনো মতানৈক্য নেই। কিন্তু সুগন্ধি নেই এমন তেল ব্যবহার জায়িযের অনুমোদন হাদীস থেকে বুঝা গেলেও কেউ কেউ এতে দ্বিমত পোষণ করেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ‘ইদ্দত
৩৩৩৪-[১১] উক্ত রাবী [উম্মু সালামাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে রমণীর স্বামী মারা গেছে, সে (’ইদ্দতকালে লাল বা) হলুদ রংয়ের কাপড় এবং গেরুয়া রঙের কাপড় পরবে না, অলঙ্কার পরবে না, চুলে বা হাতে মেহেদী লাগাবে না এবং চোখে সুরমা লাগাবে না। (আবূ দাঊদ, নাসায়ী)[1]
وَعَنْهَا عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «المُتوَفّى عَنْهَا زوجُها لَا تَلبسُ المُعَصفَرَ مِنَ الثِّيَابِ وَلَا الْمُمَشَّقَةَ وَلَا الْحُلِيَّ وَلَا تَخْتَضِبُ وَلَا تَكْتَحِلُ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ
ব্যাখ্যা: শোক পালনকারিণী নারীর জন্য সাধারণভাবে রঙিন কাপড় এবং সজ্জা অবলম্বন নিষেধের সাথে সাথে কিছু রঙের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হচ্ছে। বর্ণিত হাদীসে বিশেষ রঙের যে কাপড় নিষেধ করা হয়েছে তার মাঝে একটি মু‘আস্ফার অর্থাৎ ‘উসফুর’ দ্বারা রঙিন করা কাপড়। উসফুর রঞ্জক উদ্ভিদ বিশেষ। যা থেকে হলুদ রঞ্জক বের করা হয় এবং এর দ্বার রঞ্জিত কাপড় টকটকে হলুদ হয়। অতিরিক্ত সজ্জার ক্ষেত্রে হলুদ রঙের প্রচলন বেশি থাকায় হয়ত রসূল বিশেষভাবে এটার উল্লেখ করেন।
বিশেষভাবে উল্লেখিত আরেকটি রঙ হলো, ‘মুমাশ্শাকাহ’ অর্থাৎ মিশ্ক দ্বারা রঞ্জক। মিশক হচ্ছে লাল মাটি যা লাল রঞ্জক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সে সময়কার বিশেষ প্রচলন হিসেবে হয়ত বিশেষভাবে এগুলোর উল্লেখ করা হয়েছে। সাজ-সজ্জার জন্য অলঙ্কারের ব্যবহার অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। বর্ণিত হাদীসে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অলঙ্কারের কথা পৃথক উল্লেখ করে তা নিষেধ করেন। এর খিযাব অর্থাৎ চুলে রঙ ব্যবহার এবং সুরমা নিষেধ করেন। ইতোপূর্বে আমরা বিভিন্ন হাদীসে এর নিষেধাজ্ঞা দেখেছি। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ‘ইদ্দত
৩৩৩৫-[১২] সুলায়মান ইবনু ইয়াসার (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আহ্ওয়াস (রহঃ) যখন শামে (সিরিয়ায়) মৃত্যুবরণ করেন, তখন তার তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর (’ইদ্দত পালনকালে) তৃতীয় ঋতুস্রাব শুরু হয়। এতদসম্পর্কে মাস্আলাহ্ জানার জন্য মু’আবিয়াহ্ ইবনু আবূ সুফ্ইয়ান যায়দ ইবনু সাবিত আল আনসারী -এর নিকট পত্র লেখেন। যায়দ ইবনু সাবিত মু’আবিয়াকে পত্রযোগে জানালেন যে, (তালাকপ্রাপ্তা) স্ত্রীর যখন তৃতীয় ঋতুস্রাব শুরু হয়েছে, তখনই সে স্বামী হতে সম্পূর্ণরূপে পৃথক হয়ে গেল এবং স্বামীও তার হতে উত্তরাধিকার পাবে না, সেও স্বামীর উত্তরাধিকার হবে না। (মালিক)[1]
عَن سُليمانَ بنِ يَسارٍ: أَنَّ الْأَحْوَصَ هَلَكَ بِالشَّامِ حِينَ دَخَلَتِ امْرَأَتُهُ فِي الدَّمِ مِنَ الْحَيْضَةِ الثَّالِثَةِ وَقَدْ كَانَ طَلَّقَهَا فَكَتَبَ مُعَاوِيَةُ بْنُ أَبِي سُفْيَانَ إِلَى زَيْدِ بْنِ ثَابِتٍ يَسْأَلُهُ عَنْ ذَلِكَ فَكَتَبَ إِلَيْهِ زِيدٌ: إِنَّهَا إِذَا دَخَلَتْ فِي الدَّمِ مِنَ الْحَيْضَةِ الثَّالِثَةِ فَقَدْ بَرِئَتْ مِنْهُ وَبَرِئَ مِنْهَا لَا يرِثُها وَلَا ترِثُه. رَوَاهُ مَالك
ব্যাখ্যা: (هَلَكَ بِالشَّامِ حِينَ دَخَلَتِ امْرَأَتُه فِى الدَّمِ مِنَ الْحَيْضَةِ الثَّالِثَةِ وَقَدْ كَانَ طَلَّقَهَا) অর্থাৎ আহওয়াস তার স্ত্রীকে মৃত্যুর কিছু দিন পূর্বে তালাক দেন এবং স্ত্রী সেই ত্বলাকে ‘ইদ্দত পালনের সময় তৃতীয় হায়িযে পৌঁছলে আহওয়াস মারা যান।
(يَسْأَلُه عَنْ ذٰلِكَ) ঐ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে। অর্থাৎ এমতাবস্থায় আহওয়াস-এর স্ত্রী উত্তরাধিকার সূত্রে স্বামীর সম্পদের নির্ধারিত অংশ পাবে কিনা- এই মাসআলাহ্ সম্পর্কে জানতে যায়্দ বিন সাবিত -এর কাছে চিঠি দেন।
(إِنَّهَا إِذَا دَخَلَتْ فِى الدَّمِ مِنَ الْحَيْضَةِ الثَّالِثَةِ فَقَدْ بَرِئَتْ مِنْهُ وَبَرِئَ مِنْهَا لَا يرِثُها وَلَا ترِثُه) অর্থাৎ সে যখন তৃতীয় হায়িযে প্রবেশ করেছে তখন তার ‘ইদ্দত শেষ হয়ে তারা একে অপরের কাছ থেকে পরিপূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তাই এমতাবস্থায় স্বামী বা স্ত্রী কেউ কারো ওয়ারিস হবে না।
এই হাদীস থেকে হায়িয হয় এমন নারীর ‘ইদ্দত হায়িয দ্বারা পালিত হবে নাকি পবিত্রতা দ্বারা পালিত হবে, এই মাসআলাটি বের হয়। হায়িয হয় এমন নারীর ‘ইদ্দাতের ক্ষেত্রে কুরআনে তিন ‘কুরূ’ অপেক্ষা করার কথা বলা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন- আর তালাকপ্রাপ্তা নারী নিজেকে অপেক্ষায় রাখবে তিন হায়িয (কুরূ) পর্যন্ত।’’ (সূরা আল বাকারা ২ : ২২৮)
‘কুরূ’ শব্দটি হায়িয এবং পবিত্রতা উভয় অর্থে ব্যবহৃত হয়। এ থেকে ইমামদের মাঝে ঋতুবতী নারীর ‘ইদ্দত পালন হায়িয দ্বারা হবে নাকি পবিত্রতা দ্বারা হবে- এ নিয়ে মতভেদ দেখা দেয়। ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ) পবিত্রতা দ্বারা হবে। অর্থাৎ একজন নারী তালাকপ্রাপ্তা হওয়ার পর তিনটি পবিত্রতা অতিক্রম করলে ‘ইদ্দত শেষ হয়ে যাবে। অপরদিকে ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-এর মতে তিন হায়িয অতিক্রম হলে ‘ইদ্দত শেষ হবে।
বর্ণিত হাদীসে তৃতীয় হায়িয প্রবেশের সাথে সাথে ‘ইদ্দত শেষ হয়ে বিবাহ সংক্রান্ত সবকিছু পূর্ণ বিচ্ছেদের হুকুম দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ তিনবার পবিত্রতা অতিক্রম করাকে ‘ইদ্দত ধরা হয়েছে। তাই হাদীসটি ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ)-এর পক্ষে দলীল। ‘ইদ্দত তিন হায়িয হলে বর্ণিত হায়িয শেষ হওয়ার পর বিবাহ বিচ্ছেদের কথা। তবে হাদীসটি মাওকূফ এবং একজন সাহাবীর ফতোয়া। বিভিন্ন সাহাবী থেকে এর বিপরীত ফতোয়া পাওয়া যায়। তাই আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-এর মতের বিরুদ্ধে হাদীসটি অকাট্য দলীলরূপে গ্রহণযোগ্য নয় বলে হানাফী ‘আলিমগণ মনে করেন।
মাসআলাহ্: বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ থাকাবস্থায় স্বামী বা স্ত্রীর কোনো একজন মারা গেলে অপরজন যেমন ওয়ারিস সূত্রে প্রাপ্ত নির্ধারিত অংশের মালিক হোন তেমনিভাবে তালাকপ্রাপ্তা নারী ‘ইদ্দত পালনকালে স্বামী বা স্ত্রীর কোনো একজন মারা গেলে অপরজন ওয়ারিস সূত্রে সম্পদের নির্ধারিত অংশের মালিক হোন। কিন্তু ‘ইদ্দত পার করার পর তাদের কারো মৃত্যু হলে কেউ কারো ওয়ারিস হবে না। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ‘ইদ্দত
৩৩৩৬-[১৩] সা’ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’উমার ইবনুল খত্ত্বাব বলেন, তালাকপ্রাপ্তা রমণীর এক বা দুই ঋতুস্রাবের পরে যদি স্রাব বন্ধ হয়ে যায়, তবে তার ’ইদ্দত প্রসবান্তে অপেক্ষা করবে, অন্যথায় নয় মাস পরে আরও তিন মাস ’ইদ্দত পালন করবে। অতঃপর তার ’ইদ্দত শেষ হবে। (মালিক)[1]
وَعَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيَّبِ قَالَ: قَالَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَيُّمَا امْرَأَةٍ طُلِّقَتْ فَحَاضَتْ حَيْضَةً أَوْ حَيْضَتَيْنِ ثُمَّ رُفِعَتْهَا حيضتُها فإنَّها تنتظِرُ تسعةَ أشهرٍ فإنْ بانَ لَهَا حَمْلٌ فَذَلِكَ وَإِلَّا اعْتَدَّتْ بَعْدَ التِّسْعَةِ الْأَشْهَرِ ثلاثةَ أشهرٍ ثمَّ حلَّتْ. رَوَاهُ مَالك
ব্যাখ্যা: ‘উমার ইবনুল খত্ত্বাব (রাঃ)-এর বর্ণিত আসারে তালাকপ্রাপ্তা নারীর ‘ইদ্দাতের একটি রূপ তুলে ধরা হয়েছে। মূলত ‘ইদ্দত পালনের ক্ষেত্রে নারীভেদে বিভিন্ন রূপ রয়েছে। যেমন হায়িয হয় এমন নারী গর্ভবতী না হলে তিন হায়িয বা তিন পবিত্রতা পার করার মাধ্যমে ‘ইদ্দত পালন করবে। গর্ভবতী হলে প্রসবের মাধ্যমে ‘ইদ্দত শেষ হবে। আর যে নারীর হায়িয হয় না সে তিন মাস অতিক্রম করার মাধ্যমে ‘ইদ্দত পালন করবে। তালাকপ্রাপ্তা নারীর এই তিনটি হুকুম কুরআনুল মাজীদে বর্ণিত। বর্ণিত হাদীস বা আসারে ভিন্ন একটি রূপ তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো মেয়ে তালাকপ্রাপ্তা হওয়ার পর মেয়েটি ঋতুবতী হওয়ার কারণে মাসিক ঋতু অতিক্রমের মাধ্যমে ‘ইদ্দত পালন শুরু করলো, এক বা দুই হায়িয অতিক্রম করার পর মেয়েটির হায়িয বন্ধ হয়ে গেলো, হায়িয বন্ধ হওয়ার কারণে মেয়েটি গর্ভবতী কিনা, এই সন্দেহ আসার কারণে নয় মাস অপেক্ষা করবে, নয় মাস পর যদি গর্ভের কোনো লক্ষণ না দেখা দেয় তখন নিশ্চিত হলো যে, মেয়েটির গর্ভবতী হওয়ার কারণে হায়িয বন্ধ হয়নি, তাই তখন থেকে সে হায়িয হয় না এমন নারীর ‘ইদ্দত অর্থাৎ তিন মাস ‘ইদ্দত পালন করবে। এই মাসআলার ক্ষেত্রে ‘উমার -এর মতো ইবনু ‘আব্বাস -এরও এই মত। (আল মুনতাকা ৫ম খন্ড, হাঃ ১১৯৮)
পরিচ্ছেদঃ ১৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - জরায়ু মুক্তকরণ বা পবিত্রকরণ
৩৩৩৭-[১] আবুদ্ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসন্ন প্রসবা জনৈকা রমণীর নিকট দিয়ে গমনকালে তার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন, সে কে? উপস্থিত লোকজন বলল, অমুকের দাসী। উক্ত ব্যক্তি কী (এ অবস্থায়) তার সাথে সহবাস করে থাকে? তারা বলল, হ্যাঁ। এতে (ক্রোধান্বিত হয়ে) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আমার তাকে এমনভাবে অভিশাপ দিতে ইচ্ছা করছে যে, এ অভিসম্পাত যেন তার সাথে কবর পর্যন্ত পৌঁছে, যাতে ইহকাল-পরকাল বরবাদ হয়। কিরূপে সে তার থেকে বাঁদির ন্যায় খিদমাত গ্রহণ করছে, অথচ তার জন্য তা নাজায়িয। প্রকৃতপক্ষে সে কিরূপে অপরের সন্তানকে নিজের ওয়ারিস করবে, অথচ তার জন্য তা নাজায়িয। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْاِسْتِبْرَاءِ
عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ قَالَ: مَرَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِامْرَأَةٍ مُجِحٍّ فَسَأَلَ عَنْهَا فَقَالُوا: أَمَةٌ لِفُلَانٍ قَالَ: «أَيُلِمُّ بِهَا؟» قَالُوا: نَعَمْ. قَالَ: «لَقَدْ هَمَمْتُ أَنْ أَلْعَنَهُ لَعْنًا يَدْخُلُ مَعَهُ فِي قَبْرِهِ كَيْفَ يَسْتَخْدِمُهُ وَهُوَ لَا يَحِلُّ لَهُ؟ أَمْ كَيْفَ يُوَرِّثُهُ وَهُوَ لَا يحلُّ لَهُ؟» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: (مُجِحٍّ) শব্দের অর্থ হলো ঐ মহিলা যার গর্ভ নিকটবর্তী হয়ে গেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, সে দাসী নাকি স্বাধীনা নারী। যখন সাহাবীরা বললেন, সে অমুকের দাসী, তখন জিজ্ঞেস করলেন, সে কি তার সাথে সহবাস করে? তারা বললেন, হ্যাঁ। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার ইচ্ছা হয় যে, তাকে এমন অভিশাপ দিবো যা নিয়ে সে কবরে প্রবেশ করবে।
হাদীস থেকে যে মাস্আলাটি বের হয় তা হলো, স্বাধীনা নারীর ত্বলাকের পর যেমন ‘ইদ্দত পালন করা জরুরী তেমনি দাসী নারীর মালিকানা পরিবর্তনের সময় পরবর্তী মালিক তাকে ব্যবহার করার জন্য তার গর্ভাশয় মুক্ত করা জরুরী। গর্ভবতী নারীর ‘ইদ্দত যেমন গর্ভপাত তেমনি স্বাধীনা নারী গর্ভবতী হলে তার এই গর্ভ প্রসবের পরই অন্যের জন্য হালাল হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিশ্চয় জানা ছিল যে, বর্ণিত ব্যক্তি উক্ত দাসীর মালিক গর্ভাবস্থায় হয়েছে। তাই গর্ভের বাচ্চা প্রসব পর্যন্ত তার সাথে স্ত্রীসুলভ আচরণ জায়িয ছিল না। তাই এই হারাম কাজ দেখে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাগ করে অভিশাপ দেয়ার ইচ্ছা করেন।
(لَقَدْ هَمَمْتُ أَنْ أَلْعَنَه) আমার ইচ্ছা হয় যেন অভিশাপ দেই। এতে প্রমাণ হয় না যে, তিনি অভিশাপ দিয়েছেন। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উম্মাতকে অভিশাপ দেন না। তবে সে কাজ করেছে তা অভিশাপ পাওয়ার যোগ্য হওয়ায় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা বলেন।
(أَمْ كَيْفَ يُوَرِّثُه وَهُوَ لَا يحِلُّ لَه؟) অর্থাৎ এই বাচ্চাকে ওয়ারিস বানানো তার জন্য হালাল নয়। এমতাবস্থায় সে কেমনে এই বাচ্চাকে ওয়ারিস বানাবে? কেননা বাচ্চাটি যদি ছয় মাসের মাথায় প্রসব হয় তখন জানা যাবে না যে, এটা তার সন্তান নাকি তার পূর্বে যার সাথে এই দাসীর মিলন হয়েছে তার সন্তান। তার বলে নিশ্চিত না হলে এই বাচ্চা ওয়ারিস হবে না, কেননা এতে তার কারণে অন্য ওয়ারিসদের মীরাসে কমতি পড়বে। নিশ্চিত না হয়ে অন্যের মীরাসে কমতি করার কোনো সুযোগ নেই। এছাড়া সে দাস হিসেবে অন্যরা তার মালিক হয়ে তার সাথে দাসের আচরণের ব্যাপারটি ধুম্রজালে পড়ে যাবে। বাস্তবে তার সন্তান না হলে তার ওয়ারিসরা একে গোলাম হিসেবে তাদের মালিকানায় নিতে পারছে না। কেননা এখানে কোনো কিছুই স্পষ্ট নয়। তাই অবস্থা স্পষ্ট হওয়ার জন্য দাসী নারীর সাথে সহবাস করতে তার ‘ইসতিবরায়ি রেহেম’ বা গর্ভাশয় পাক হওয়া জরুরী। (শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪৪১)
পরিচ্ছেদঃ ১৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জরায়ু মুক্তকরণ বা পবিত্রকরণ
৩৩৩৮-[২] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, আওত্বাস যুদ্ধেলব্ধ বন্দীনীদের ব্যাপারে ঘোষণা করেন, গর্ভবতীর সাথে সন্তান প্রসব না পর্যন্ত এবং ঋতুবতীর সাথে ঋতুস্রাব শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ যেন সহবাস না করে। (আহমাদ, আবূ দাঊদ, দারিমী)[1]
عَن أبي سعيدٍ الخدريِّ رَفْعَهُ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ فِي سَبَايَا أَوْطَاسٍ: «لَا تُوطَأُ حَامِلٌ حَتَّى تَضَعَ وَلَا غَيْرُ ذَاتِ حَمْلٍ حَتَّى تَحِيضَ حَيْضَةً» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَأَبُو دَاوُدَ وَالدَّارِمِيُّ
ব্যাখ্যা: হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে, গর্ভবতী দাসী অন্যের জন্য বৈধ হতে তার গর্ভ প্রসব হওয়া জরুরী। এই হাদীসের পূর্ববতী হাদীসেও আমরা বিষয়টি জেনে এসেছি। তবে দাসী যদি গর্ভবতী না হয় তবে সে অন্যের জন্য বৈধ হতে একটি হায়িয বা ঋতুস্রাব অতিক্রম করবে। এ ক্ষেত্রে স্বাধীনা নারীর ‘ইদ্দাতের সাথে বেশকম হলো, স্বাধীনা নারী গর্ভবতী না হলে ‘ইদ্দত তিন হায়িয। আর দাসী নারীর গর্ভাশয় মুক্ত কিনা এক হায়িয দিয়ে দেখাই যথেষ্ট। মূলত একবার হায়িয না হলেই নারী গর্ভবতী নয়- এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু শারী‘আত চূড়ান্ত সতর্কতা অবলম্বনের কারণে স্বাধীনা নারীর ক্ষেত্রে তিন হায়িয ‘ইদ্দত পালনের নির্দেশ দিয়েছে।
গর্ভবতী নয় এমন দাসীর ইসতিব্রা বা গর্ভাশয়মুক্ত এক হায়িয দিয়ে দেখার বিষয়টি হাদীসে স্পষ্ট। তাই এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই। তবে দাসী নারী যদি এমন হয় যার হায়িয হয় না, তার ক্ষেত্রে ‘উলামাদের দু’টি মত পাওয়া যায়। একমতে একমাস অপেক্ষা করে ইসতিব্রা করবে। আরেক মতে তিন মাস। প্রথম মতটিই অধিকাংশ ‘আলিমদের মত। কেননা গর্ভবতী নয় আবার হায়িয হয় না এমন নারী স্বাধীনা হলে তিন মাস ‘ইদ্দত পালন করতে হয়।
শারী‘আত একেকটি হায়িযকে একেক মাসের স্থলে রেখেছে। অতএব হায়িযপ্রাপ্তা দাসীকে যখন এক হায়িয দিয়ে ইসতিব্রা করতে হয় তখন যার হায়িয হয় না সে একমাস দিয়ে ইসতিব্রা করবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জরায়ু মুক্তকরণ বা পবিত্রকরণ
৩৩৩৯-[৩] রুওয়াইফা’ ইবনু সাবিত আল আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুনায়ন যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের উপর ঈমান রাখে, তার পক্ষে অপরের শস্যক্ষেত্রে নিজের পানি সিঞ্চন করা বৈধ নয়। তিনি (রুওয়াইফা’) বলেন, অন্যের ক্ষেত্রে পানি সিঞ্চন দ্বারা গর্ভবতীর সাথে সহবাস করাই বুঝিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের উপরে ঈমান রাখে, তার পক্ষে যুদ্ধবন্দীনী রমণীর সাথে সহবাস করা জায়িয নয় (তথা জরায়ুমুক্ত বা পবিত্রকরণ ছাড়া)। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের উপর ঈমান রাখে, তার পক্ষে বণ্টনের পূর্বে গনীমাতের মাল বিক্রি করা জায়িয নয়। (আবূ দাঊদ)[1]
ইমাম তিরমিযী (রহঃ) শুধুমাত্র ’অপরের শস্যক্ষেত্রে নিজের পানি সিঞ্চন করা’ পর্যন্ত বর্ণনা করেছেন।
وَعَنْ رُوَيْفِعِ بْنِ ثَابِتٍ الْأَنْصَارِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم يَوْم حُنَيْنٍ: «لَا يَحِلُّ لِامْرِئٍ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ يسْقِي مَاء زَرْعَ غَيْرِهِ» يَعْنِي إِتْيَانَ الْحُبَالَى «وَلَا يَحِلُّ لِامْرِئٍ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ يَقَعَ عَلَى امْرَأَةٍ مِنَ السَّبْيِ حَتَّى يَسْتَبْرِئَهَا وَلَا يَحِلُّ لِامْرِئٍ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ يَبِيعَ مَغْنَمًا حَتَى يُقَسَّمَ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَرَوَاهُ التِّرْمِذِيّ إِلَى قَوْله «زرع غَيره»
ব্যাখ্যা: হাদীসে তিনটি জিনিসকে অবৈধ করা হয়েছে। প্রত্যেকবারই রসূল বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে তার জন্য বৈধ নয়...। এভাবে বলে এই বিষয়গুলোর অবৈধ হওয়ার দৃঢ়তা বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ যার ঈমান আছে তার জন্য এই তিন কাজের কোনোটিই শোভা পায় না। প্রথমতঃ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এই হাদীসে যে বিষয়টি হারাম করেন তা হলো, অন্যের গর্ভবতী নারীর সাথে সহবাস না করা। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীসে ইঙ্গিতমূলক শব্দ ব্যবহার করে বলেছেন, (أَنْ يسْقِى مَاء زَرْعَ غَيْرِه) অর্থাৎ বৈধ নয় যে, সে অন্যের ক্ষেতের স্থানে কোনো পানি দিবে। পানি দ্বারা বীর্য এবং ক্ষেতের জায়গা দ্বারা নারীর গর্ভাশয় বুঝানো হয়েছে। কুরআনেও আল্লাহ তা‘আলা নারীকে ক্ষেতের সাথে তুলনা করেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘‘তোমাদের স্ত্রীরা হলো তোমাদের জন্য শস্যক্ষেত্র।’’ (সূরা আল বাকারা ২ : ২২৩)
শস্যক্ষেত্র থেকে আমরা যেমন ফসল পাই তেমনি একজন নারী থেকে সন্তানের মতো উত্তম ফসল পাওয়া যায়। তাই নারীকে শস্য ক্ষেতের সাথে সাদৃশ্য দেয়া একেবারে স্পষ্ট।
দ্বিতীয়তঃ হাদীসে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বিষয়টি হারাম করেন তা হলো দাসী নারীর গর্ভাশয় ইসতিব্রা না করেই তার সাথে সহবাস করা। যার আলোচনা ইতোপূর্বের দুই হাদীসে আমরা দেখেছি।
তৃতীয়তঃ যে বিষয়টি হাদীসে হারাম করা হয়েছে তা হলো গনীমাতের সম্পদ মুজাহিদদের মাঝে বণ্টনের পূর্বেই বিক্রি করে দেয়া।
গনীমাতের মাল যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুজাহিদদের হক। বণ্টনের আগে সবাই এর সমষ্টিগত মালিক। তাই বণ্টনের আগে কারো জন্যই এই সম্পদে কোনো ধরনের গোপন হস্তক্ষেপ জায়িয নয়। একটি হাদীসে এসেছে- «لَا تُقْبَلُ صَلَاةٌ بِغَيْرِ طُهُورٍ وَلَا صَدَقَةٌ مِنْ غُلُولٍ» ‘‘পবিত্রতা ছাড়া সালাত কবুল হয় না এবং গনীমাতের মালে খিয়ানাতের সাদাকা কবুল হয় না।’’ (সহীহ মুসলিম- অধ্যায় : পবিত্রতা, অনুচ্ছেদ : সালাতে পবিত্রতা ওয়াজিব, হাঃ ৩২৯)
পরিচ্ছেদঃ ১৬. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জরায়ু মুক্তকরণ বা পবিত্রকরণ
৩৩৪০-[৪] ইমাম মালিক (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঋতুবতী বাঁদীদের সাথে এক ঋতু ’ইসতিবরা’ (পবিত্রকরণ ব্যবস্থা) করার নির্দেশ দিতেন। আর ঋতুবতী না হলে তিন মাসের অপেক্ষমাণ হতে এবং অপরের শস্যক্ষেত্রে নিজের পানি সিঞ্চন করতে নিষেধ করতেন।[1]
عَن مَالِكٍ قَالَ: بَلَغَنِي أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَأْمُرُ بِاسْتِبْرَاءِ الْإِمَاءِ بِحَيْضَةٍ إِنْ كَانَتْ مِمَّنْ تَحِيضُ وَثَلَاثَةِ أَشْهُرٍ إِنْ كَانَت مِمَّن تحيض وَينْهى عَن سقِِي مَاء الْغَيْر
ব্যাখ্যা: বর্ণিত হাদীসে হায়িয হয় না এমন দাসী নারীর ইসতিব্রার ক্ষেত্রে তিন মাসের কথা বলা হয়েছে। উপরে আমরা দেখেছি যে, হায়িয হয় না এমন দাসীর ক্ষেত্রে অধিকাংশের মতে এক মাস ইসতিব্রার জন্য যথেষ্ট। এক হায়িযের উপর ক্বিয়াস করে তারা এক মাসের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। জুমহূর ‘উলামার মতে হয়ত বর্ণিত হাদীসটি প্রশ্নবিদ্ধ। তাই তারা এ হাদীস বাদ দিয়ে গ্রহণযোগ্য ক্বিয়াসের আশ্রয় নেন। যথাসাধ্য অনুসন্ধানের পরও হাদীসটি বিশুদ্ধতা সম্পর্কে জানতে পারিনি। তাই অধিকাংশ ‘আলিমের মতে হায়িয হয় না এমন নারীর ইসতিব্রা এক মাস হওয়াটাই অগ্রগণ্য বলে মনে হয়।
পরিচ্ছেদঃ ১৬. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জরায়ু মুক্তকরণ বা পবিত্রকরণ
৩৩৪১-[৫] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে বাঁদীর সাথে সহবাস করা হয় ঐ বাঁদী দান, বিক্রয় অথবা মুক্ত করা হলে এক ঋতুস্রাব দ্বারা তার ’ইসতিবরা’ (জরায়ুমুক্ত বা পবিত্রকরণ) করতে হবে। তবে কুমারী জরায়ুমুক্ত কিনা, তা নিস্প্রয়োজন। (উপরোক্ত হাদীস দু’টি রযীন বর্ণনা করেন)[1]
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ: أَنَّهُ قَالَ: إِذَا وُهِبَتْ الْوَلِيدَةُ الَّتِي تُوطَأُ أَوْ بِيعَتْ أَوْ أُعْتِقَتْ فَلْتَسْتَبْرِئْ رَحِمَهَا بِحَيْضَةٍ وَلَا تُسْتَبْرَئُ الْعَذْرَاءُ. رَوَاهُمَا رزين
ব্যাখ্যা: (وَلَا تُسْتَبْرَئُ الْعَذْرَاءُ) কুমারী মেয়ে ইসতিবরা করবে না অর্থাৎ দাসী কুমারী হলে ইসতিবরা বা গর্ভাশয়ের পবিত্রতা দেখার জন্য অপেক্ষার প্রয়োজন নেই। আমরা দেখছি যে, এটি ইবনু ‘উমার (রাঃ)-এর মত। ইমাম নববীর বরাত দিয়ে মিরকাতুল মাফাতীহে লিখেন, ‘‘নববী বলেনঃ ইসতিব্রার কারণ হলো কারো মালিকানা অর্জিত হওয়া। অতএব যে ব্যক্তি কোনো দাসীর মালিক হলো, মীরাস, উপঢৌকন অথবা অন্য কোনো মাধ্যমে; তবে দাসীর জন্য ইসতিবরা করা জরুরী। চাই মালিকানার পরিবর্তন এমন ব্যক্তির নিকট থেকে হোক যার বীর্য এই দাসীর গর্ভে থাকার সম্ভাবনা আছে বা নাই, যেমন কোনো বাচ্চা বা নারী এই দাসীর মালিক ছিল এবং চাই দাসী ছোট হোক বা বৃদ্ধা হোক, চাই কুমারী হোক বা কুমারী না হোক, চাই বিক্রেতা বিক্রির পূর্বেই ইসতিবরা করে নিক বা না নিক।’’ (মিরকাতুল মাফাতীহ)
ইমাম নববীর কথা গ্রহণযোগ্য। কেননা একটা মেয়ে কুমারী কিনা তা গোপন বিষয়। গোপন বিষয়ের উপর শারী‘আতের বাহ্যিক হুকুম লাগানো হয় না। যেমন কোনো মেয়ে বিয়ে হওয়ার পরও প্রকৃতভাবে কুমারী থাকতে পারে, তবুও তাকে ‘ইদ্দত পালন করতে হয়। কেননা গোপন বিষয়ের উপর শারী‘আতের বাহ্যিক আহকাম নির্ভর করে না। তাই যে কোনো দাসীর জন্য তার ইসতিব্রার বিধি মোতাবেক ইসতিবরা করা জরুরী।
পরিচ্ছেদঃ ১৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৪২-[১] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। হিন্দা বিনতু ’উতবাহ্ (আবূ সুফ্ইয়ান-এর স্ত্রী ও মু’আবিয়াহ্ (রাঃ)-এর মা) বলেন, হে আল্লাহর রসূল! আবূ সুফ্ইয়ান একজন কৃপণ মানুষ। আমার এবং আমার সন্তান-সন্ততির জন্য প্রয়োজনানুযায়ী খাদ্য নির্বাহ করে না, ফলে আমি তার অগোচরে কিছু ব্যবস্থা করি। উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমার এবং তোমার সন্তান-সন্ততির জন্য প্রয়োজনানুপাতে ন্যায়সঙ্গতভাবে গ্রহণ কর। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ النَّفَقَاتِ وَحَقِّ الْمَمْلُوْكِ
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: إِنَّ هندا بنت عتبَة قَالَت: يَا رَسُول الله إِن أَبَا سُفْيَان رجل شحيح وَلَيْسَ يعطيني مَا يَكْفِينِي وَوَلَدي إِلَّا مَا أخذت مِنْهُ وَهُوَ يعلم فَقَالَ: «خذي مَا يَكْفِيك وولدك بِالْمَعْرُوفِ»
ব্যাখ্যা: (إِنَّ أَبَا سُفْيَانَ رَجُلٌ شَحِيْحٌ) অর্থাৎ আবূ সুফ্ইয়ান একজন কৃপণ ব্যক্তি। আবূ সুফ্ইয়ান -এর স্ত্রী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তথা বিচারকের সামনে তার সমস্যার বাস্তব অবস্থা তুলে ধরেছেন। তাই এটা হারাম গীবাতের অন্তর্ভুক্ত নয়। ফাতহুল বারীতে লিখেন, কুরতুবী বলেনঃ এখানে আবূ সুফ্ইয়ান-এর স্ত্রী তার সব সময়ের অবস্থা কৃপণতা বলছেন না, আর তার কথায় এটা জরুরীও হয় না। কেননা তিনি বলছেন, সে আমার ও আমার বাচ্চার খরচ দিতে কৃপণ। আর এমন অনেক মানুষ রয়েছেন যারা অপরিচিতদের জন্য অনায়াসে খরচ করলেও পরিবারের জন্য খরচ করতে অনেকটা সঙ্কীর্ণতা করেন।
(إِلَّا مَا أَخَذْتُ مِنْهُ وَهُوَ لَا يَعْلَمُ) তবে আমি যা নেই তার থেকে অথচ সে জানে না। অর্থাৎ সে খরচে কৃপণতা করায় যা দেয় তাতে আমার ও বাচ্চার হয় না, বরং আমি তাকে না জানিয়ে কিছু নিলে তখন আমাদের জন্য যথেষ্ট হয়।
ইমাম শাফি‘ঈ এ হাদীসের বর্ণনায় এই অংশটুকু বৃদ্ধি করেন : (سرا، فهل على في ذلك من شيء) অর্থাৎ আমি গোপনে কিছু নিয়ে নেই, এতে কি আমার কোনো অসুবিধা আছে?
ইমাম যুহরীর বর্ণনায় : (فهل على حرج أن اطعم من الذي في له عيالنا) অর্থাৎ আমাদের পরিবারে তার যে সন্তান রয়েছে আমি তাকে খাওয়ালে আমার কোনো সমস্যা আছে কি?
(خُذِىْ مَا يَكْفِيْكَ وَوَلَدِكِ بِالْمَعْرُوْفِ) আবূ সুফ্ইয়ান -এর স্ত্রীর কথার উত্তরে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি স্বাভাবিক নিয়ম মোতাবেক তোমার ও তোমার সন্তানের খরচ নিয়ে নিতে পার। অর্থাৎ প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিবে না। সামাজিকভাবে যতটুকুতে তোমার ও সন্তানের প্রয়োজন বুঝায় এবং যা শারী‘আত কর্তৃক স্বামীর ওপর অর্পিত হয়, সেই পরিমাণ নিবে।
কোনো কোনো বর্ণনায় : (لاحرج عليكِ أن تطعميهم بالمعروف) অর্থাৎ স্বাভাবিক নিয়ম মোতাবেক তাদেরকে খাওয়ালে কোনো সমস্যা নেই। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫৩৬৪)
এ হাদীস থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, স্ত্রী ও সন্তানের প্রয়োজনীয় খরচ স্বামীর ওপর ওয়াজিব। কুরআনেও এর বিবরণ রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ
‘‘বিত্তশালী ব্যক্তি তার বিত্ত অনুযায়ী ব্যয় করবে। যে ব্যক্তি সীমিত পরিমাণে রিযকপ্রাপ্ত, সে আল্লাহ যা দিয়েছেন, তা থেকে ব্যয় করবে।’’ (সূরা আত্ব তালাক ৬৫ : ৭)
বর্ণিত হাদীস থেকে ‘উলামায়ে কিরাম বিভিন্ন মাস্আলাহ্ উদঘাটন করেন। ইমাম নববী বলেনঃ এ হাদীস থেকে যে বিষয়গুলো জানা যায়:
• স্ত্রীর খরচ স্বামীর ওপর ওয়াজিব।
• ছোট দরিদ্র সন্তানের খরচ পিতার ওপর ওয়াজিব।
• খরচের পরিমাণ নির্ধারিত নয় বরং যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু।
• ফতোয়া বা ফায়সালা দেয়ার সময় বে-গানা নারীর কথা শুনা বৈধ।
• ফতোয়া জিজ্ঞাসার জন্য এমন কথা বলা যায় যা শুনলে যার সম্পর্কে কথা হচ্ছে সে অপছন্দ করবে।
• কারো কাছে যার পাওনা অধিকার রয়েছে এবং এই অধিকার আদায়ে সে অক্ষম, তবে তার জন্য সেই ব্যক্তির সম্পদ থেকে তার অনুমোদন ছাড়া নেয়া বৈধ আছে। তবে ইমাম মালিক ও আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) তা নিষেধ করেন।
• সন্তানের লালন পালনের দায়িত্ব আদায়ে মায়ের জন্য তাদের পিতার সম্পদ থেকে খরচের অধিকার রয়েছে।
• যে বিষয়ে শারী‘আতে কোনো পরিমাণ নির্ধারিত নেই সেখানে সামাজিক রীতির উপর নির্ভর করা জায়িয।
• স্বামীর অনুমতি বা তার বাধা না থাকলে স্ত্রীর জন্য প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়া জায়িয আছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ; শারহে মুসলিম ১১/১২ খন্ড, হাঃ ১৭১৪)
কেউ কেউ এ হাদীস থেকে ব্যক্তির অনুপস্থিতে তার ওপর বিচারের ফায়সালা কার্যকর জায়িযের ফতোয়া দেন। কিন্তু এ হাদীস থেকে অনুপস্থিত ব্যক্তির ওপর বিচারের ফায়সালা বৈধ প্রমাণ হয় না। কেননা এটা আবূ সুফ্ইয়ান-এর ওপর কোনো ফায়সালা কার্যকর নয়। বরং তার স্ত্রীর জিজ্ঞাসিত মাসআলার ফতোয়া প্রদান করেছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
শারহুস্ সুন্নাহ্ কিতাবে রয়েছে, এই হাদীস থেকে এটাও বুঝা যায় যে, কাযী তার জানা মোতাবেক কোনো কিছুর ফায়সালা দিতে পারেন; কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ সুফ্ইয়ান-এর স্ত্রীকে দলীল পেশ করতে বাধ্য করেননি।
ব্যক্তির ওপর তার পিতা-মাতা ও সন্তানাদির ভরণ-পোষণ জরুরী। কেননা যখন তার ওপর সন্তানের ভরণ পোষণ জরুরী তখন পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ জরুরী হওয়া অধিক বাঞ্ছনীয় পিতা-মাতার সম্মানের কারণে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৪৩-[২] জাবির ইবনু সামুরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা যখন তোমাদের কাউকে ধন-সম্পদ দান করেন, তখন তা যেন সর্বাগ্রে নিজের ও পরিবার-পরিজনের প্রয়োজন পূরণ করে। (মুসলিম)[1]
بَابُ النَّفَقَاتِ وَحَقِّ الْمَمْلُوْكِ
وَعَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «إِذا أعْطى الله أحدكُم خيرا فليبدأ بِنَفسِهِ وَأهل بَيته» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: একজন মানুষের সম্পদ থেকে খরচ পাওয়ার কে বেশি অগ্রাধিকার রাখে সে কথাই এই হাদীসে তুলে ধরেছেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। অর্থাৎ প্রথমে ব্যক্তি তার নিজের জন্য খরচ করবে। অর্থাৎ নিজের সম্পদের উপর তার নিজের অধিকার সবার আগে। এরপর তার পরিবারের অধিকার। পরিবার অর্থাৎ তার স্ত্রী, সন্তান।
জাবির থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ
ابْدَأْ بِنَفْسِكَ فَتَصَدَّقْ عَلَيْهَا فَإِنْ فَضَلَ شَيْءٌ فَلِأَهْلِكَ فَإِنْ فَضَلَ عَنْ أَهْلِكَ شَيْءٌ فَلِذِي قَرَابَتِكَ فَإِنْ فَضَلَ عَنْ ذِي قَرَابَتِكَ شَيْءٌ فَهَكَذَا وَهَكَذَا يَقُولُ فَبَيْنَ يَدَيْكَ وَعَنْ يَمِينِكَ وَعَنْ شِمَالِكَ
‘‘তুমি তোমার নিজেকে দিয়ে শুরু কর, অতএব নিজের জন্য খরচ কর। যদি এখান থেকে অতিরিক্ত থাকে তবে তোমার পরিবারের জন্য। পরিবারের খরচের পর বাঁচলে আত্মীয়-স্বজনের জন্য। আত্মীয়-স্বজনকে দেয়ার পর বাঁচলে এভাবে পর্যায়ক্রমে তোমার সামনে, ডানে, বামে খরচ করবে।’’ (সহীহ মুসলিম- অধ্যায় : যাকাত, অনুচ্ছেদ : প্রথমে নিজের জন্য খরচ, তারপর পরিবার.., হাঃ ১৬৬৩)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৪৪-[৩] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (প্রাপ্যাধিকার) দাস-দাসীকে খাদ্যদ্রব্য ও পোশাক-পরিচ্ছদ (মালিকের কর্তব্য পালনার্থে) প্রদান করতে হবে এবং তাদের ওপর চাপপ্রয়োগ করে সাধ্যাতীত কাজ করানো যাবে না। (মুসলিম)[1]
بَابُ النَّفَقَاتِ وَحَقِّ الْمَمْلُوْكِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم: «للمملوك طَعَامه وَكسوته وَلَا يُكَلف من الْعَمَل إِلَّا مَا يُطيق» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: বর্ণিত হাদীসে দাসের অধিকার ও তার ব্যয়ভারের আলোচনা করা হয়েছে। দাসের অন্ন বস্ত্রের দায়িত্ব তার মালিকের ওপর। সামাজিক রীতিনুযায়ী তাদের যে খাবার রয়েছে বা পরিধেয় বস্ত্র রয়েছে তা মালিককে বহন করতে হবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
হাদীসে দাসের যে অধিকারের কথা বলা হয়েছে তা হলো তার ওপর তার সাধ্যের বাহিরে কোনো কাজ না চাপানো। এ হাদীসসহ পরবর্তী কয়েকটি হাদীসে দাসের অধিকার সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ কেউ কারো দাস হলেই তাকে মানবিক মূল্যায়ন না করে তার সাথে পশুসুলভ আচরণ ইসলাম সমর্থন করে না। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মৃত্যু পূর্ব ওয়াসিয়্যাতটিতেও দাসদের প্রতি খেয়াল রাখার কথা বলেছেন। (সম্পাদক)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৪৫-[৪] আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তারা (দাসগণ) তোমাদের ভাই, আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধীনন্থ করে দিয়েছেন। অতঃপর আল্লাহ যখন তার কোনো ভাইকে অধীন করে দেন, সে যেন নিজে যা খায়, তাকেও তাই খাওয়ায়; নিজে যা পরিধান করে, তাকেও তা পরিধান করায়। তাদের সাধ্যাতীত কাজের জন্য যেন চাপপ্রয়োগ না করে। আর একান্তই যদি সাধ্যাতীত কাজে বাধ্য করে, তবে নিজেও যেন তাকে সর্বাত্মকভাবে সাহায্য করে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ النَّفَقَاتِ وَحَقِّ الْمَمْلُوْكِ
وَعَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِخْوَانُكُمْ جَعَلَهُمُ اللَّهُ تَحْتَ أَيْدِيكُمْ فَمَنْ جَعَلَ اللَّهُ أَخَاهُ تَحْتَ يَدَيْهِ فَلْيُطْعِمْهُ مِمَّا يَأْكُلُ وَلْيُلْبِسْهُ مِمَّا يَلْبَسُ وَلَا يُكَلِّفْهُ مِنَ الْعَمَلِ مَا يَغْلِبُهُ فَإِنْ كَلَّفَهُ مَا يَغْلِبُهُ فَلْيُعِنْهُ عَلَيْهِ»
ব্যাখ্যা: إِخْوَانُكُمْ جَعَلَهُمُ اللّٰهُ تَحْتَ)) বাক্যের মুবতাদা বা উদ্দেশ্য উহ্য রয়েছে। অর্থাৎ যারা তোমাদের গোলাম তারা তোমাদের ভাই। কেননা তোমরা সবাই এক আদামের সন্তান। তোমাদের সকলেরই মূল এক। পার্থক্য এই যে, আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধিনস্থ করেছেন। অধিনস্থ হওয়ার কারণে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক থেকে সে বেরিয়ে যায়নি। তাই তার সাথে ভ্রাতৃত্বসুলভ আচরণ করতে হবে।
(فَلْيُطْعِمْهُ مِمَّا يَأْكُلُ وَلْيُلْبِسْهُ مِمَّا يَلْبَسُ) সে যা খায় গোলামকে তা খাওয়াবে এবং যা পরিধান করে গোলামকে তা পরাবে।
মালিক যা খাবে গোলাম সেই মানের খাবার দেয়া, মালিক যা পরিধান করবে গোলামকে সেই মানের বস্ত্র পরিধান করতে দেয়ার নির্দেশটি মুস্তাহাব পর্যায়ের। ওয়াজিব বা জরুরী হিসেবে নয়। ‘উলামারা এই কথার উপর একমত। তবে আবূ যার গিফারী নিজে যে খাবার খেতেন তার গোলামকে হুবহু সেই খাবার দিতেন, তিনি যে বস্ত্র পরিধান করতেন হুবহু সেই মানের বস্ত্র গোলামকে দেয়ার ‘আমলটি মুস্তাহাব ‘আমল ছিল। তবে মালিকের ওপর ওয়াজিব হলো যে শহরে যে খাবার প্রচলিত এবং ব্যক্তি হিসেবে যে পরিধেয় বস্ত্র প্রচলিত সেই এলাকার সামাজিক রীতি অনুযায়ী গোলামকে অন্ন ও বস্ত্র দেয়া। চাই তার মান মালিকের খাবার ও পরিধেয় বস্ত্রর সমান হোক বা কম বেশ হোক। এমনকি মালিক যদি কোনো কারণবশত স্বেচ্ছায় তার নিজের অন্ন ও বস্ত্রের মাঝে সংকোচ করে গোলামের জন্য সংকোচ বা কমতি করা জায়িয হবে না। বরং গোলামকে সেই এলাকার প্রচলন অনুযায়ী খাবার ও বস্ত্র দিতে হবে।
(وَلَا يُكَلِّفْهُ مِنَ الْعَمَلِ مَا يَغْلِبُه فَإِنْ كَلَّفَه مَا يَغْلِبُه فَلْيُعِنْهُ عَلَيْهِ) গোলামকে তার সাধ্যের উপর কাজ চাপাবে না। যদি চাপায় তবে সে তাকে সহযোগিতা করবে।
‘উলামায়ে কিরাম এই মাসআলার উপরও একমত যে, গোলামকে এমন কাজ দেয়া যাবে না যা তার সাধ্য বা সামর্থ্যের বাহিরে। অর্থাৎ অতিরিক্ত কষ্টদায়ক কাজ যা সাধারণত করতে অপারগ এমন কোনো কাজ গোলামের কাঁধে চাপাবে না। যদি এমন কাজ দিয়েই দেয় তবে নিজে গোলামকে সাহায্য করবে অথবা তার সাহায্যের জন্য লোক নিয়োগ করবে যাতে উভয়ের সহযোগিতায় কাজটি সহজসাধ্য হয়। সহজসাধ্য করা ছাড়া গোলামের উপর অতিরিক্ত ভারী কোনো কাজের দায়িত্ব দিবে না। (শারহে মুসলিম ১১/১২ খন্ড, হাঃ ১৬৬১)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৪৬-[৫] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন তার কর্মচারী তার নিকট উপস্থিত হলে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি আমার অধীনস্থ দাসদেরকে তাদের পারিশ্রমিক দিয়েছ? সে বলল, না। তিনি বললেন, যাও এক্ষুণি তাদের খোরাকি আদায় কর। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো মানুষের গুনাহের জন্য এটাই যথেষ্ট যে, অধীনস্থ দাসকে তার প্রাপ্যাধিকার থেকে বঞ্চিত করা।
অন্য বর্ণনায় রয়েছে, কোনো মানুষের গুনাহের জন্য এটাই যথেষ্ট যে, পাওনাদারের প্রাপ্য হক নষ্ট করা। (মুসলিম)[1]
بَابُ النَّفَقَاتِ وَحَقِّ الْمَمْلُوْكِ
وَعَن عبد الله بن عَمْرو جَاءَهُ قَهْرَمَانٌ لَهُ فَقَالَ لَهُ: أَعْطَيْتَ الرَّقِيقَ قُوتَهُمْ؟ قَالَ: لَا قَالَ: فَانْطَلِقْ فَأَعْطِهِمْ فَإِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «كَفَى بِالرَّجُلِ إِثْمًا أَنْ يَحْبِسَ عَمَّنْ يَمْلِكُ قُوتَهُ» . وَفِي رِوَايَةٍ: «كَفَى بِالْمَرْءِ إِثْمًا أَنْ يُضَيِّعَ مَنْ يَقُوتُ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: (قَهْرَمَانٌ) শব্দটি ‘কাফ’ হরফে যবর, ‘হা’ হরফে সাকিন এবং ‘রা’ অক্ষরে যবর দিয়ে। পারস্য শব্দ। যার অর্থ হলো : মানুষের প্রয়োজন দেখাশুনার জন্য দায়িত্বশীল খাজাঞ্চি। ওয়াকীল অর্থেও শব্দটি ব্যবহৃত হয়। (শারহে মুসলিম ৭/৮ খন্ড, হাঃ ৯৯৬)
হাদীসের দু’টি বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রথম বর্ণনাটি হলো: (كَفٰى بِالرَّجُلِ إِثْمًا أَنْ يَحْبِسَ عَمَّنْ يَمْلِكُ قُوتَه) যার অর্থ লোক গুনাহগার হওয়ার জন্য এইটুকু যথেষ্ট যে, সে যার খাবারের মালিক তথা দায়িত্বশীল তার খাবার আটকে রাখা।
দ্বিতীয় বর্ণনা: (كَفٰى بِالْمَرْءِ إِثْمًا أَنْ يُضَيِّعَ مَنْ يَقُوتُ) মানুষ গুনাহগার হওয়ার জন্য এইটুকু যথেষ্ট যে, পরিবারের যার খাবার দায়িত্ব তার ওপর তাকে ধ্বংস করা। উভয় বর্ণনার মর্ম এক। অর্থাৎ খাবারের দায়িত্ব যার ওপর রয়েছে তিনি খাবার আটকে রেখে অধীনস্থকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়া। তাই পরিবারের দায়িত্বশীল ব্যক্তির জন্য যার ভরণ-পোষণ তার ওপর রয়েছে তাদের খাবার আটকে রেখে বিপদের দিকে ফেলা বৈধ নয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৪৭-[৬] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের খাদিম যখন তোমাদের জন্য খাদ্য প্রস্তুত করে নিয়ে আসে, আর সে-ই খাদ্য প্রস্তুতকালে তাপ ও ধোঁয়ার কষ্ট সহ্য করে, তবে তাকে যেন নিজের সাথে বসিয়ে খাওয়ায়। নিতান্তই যদি খাদ্যের পরিমাণ কম হয়, তবে তা হতে এক-দুই লোকমা যেন তার হাতে তুলে দেয়। (মুসলিম)[1]
بَابُ النَّفَقَاتِ وَحَقِّ الْمَمْلُوْكِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا صَنَعَ لِأَحَدِكُمْ خَادِمُهُ طَعَامَهُ ثُمَّ جَاءَهُ بِهِ وَقَدْ وَلِيَ حره ودخانه فليقعده مَعَه فَليَأْكُل وَإِن كَانَ الطَّعَامُ مَشْفُوهًا قَلِيلًا فَلْيَضَعْ فِي يَدِهِ مِنْهُ أَكلَة أَو أكلتين» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: (مَشْفُوْهًا قَلِيْلًا) প্রথম ও দ্বিতীয় শব্দের একই অর্থ। সম্ভবত তাকিদ হিসেবে দ্বিতীয় শব্দটি নিয়ে আসা হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ হিসেবে খাবার যদি তুলনামূলক একেবারেই কম হয় তবুও এই খাবারের জন্য যে শ্রম দিয়েছে প্রথমেই তার হাতে এক দুই লোকমা তুলে দেয়া।
হাদীসটিতে সামাজিক উত্তম শিষ্টাচারের প্রতি, খাবারের ক্ষেত্রে পরস্পর সহমর্মিতার প্রতি উৎসাহ দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে যে খাবারের ব্যবস্থাপনা করে সে যখন এর জন্য অনেক কষ্ট করেছে, রান্না করতে আগুনের তাপ ও ধোঁয়া সহ্য করেছে, খাবারের সাথে নিজেকে লাগিয়েছে, খাবারের গন্ধ শুকেছে তাকে প্রথমে এই খাবার থেকে দেয়া ইসলামিক শিষ্টাচারের অংশ এবং মানবিক বিবেক, যা শিক্ষা দিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তবে হাদীসের এ সমস্ত নির্দেশ মুস্তাহাব পর্যায়ের। (শারহে মুসলিম ১১/১২ খন্ড, হাঃ ১৬৬৩)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৪৮-[৭] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো দাস যখন স্বীয় মালিকের কল্যাণকামী হয় ও উত্তমরূপে আল্লাহ তা’আলার ’ইবাদাত (সৎকর্ম) করে, তখন তাকে দ্বিগুণ সাওয়াব প্রদান করা হয়। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ النَّفَقَاتِ وَحَقِّ الْمَمْلُوْكِ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّ الْعَبْدَ إِذَا نَصَحَ لِسَيِّدِهِ وَأَحْسَنَ عِبَادَةَ اللَّهِ فَلَهُ أَجْرُهُ مرَّتَيْنِ»
ব্যাখ্যা: ইতোপূর্বে বর্ণিত হাদীসগুলোতে দাসের প্রতি মালিকের আচরণের কথা বলা হয়েছে বলে আমরা দেখতে পেয়েছি। দাসের প্রতি মালিকের যেমন কিছু করণীয় রয়েছে, দাসের ওপরও মালিকের প্রতি কিছু করণীয় রয়েছে, আর তা হলো মালিকের সেবা সঠিভাবে আঞ্জাম দেয়া। যে দাস তার মালিকের প্রতি অনুগত এবং আল্লাহ তা‘আলার প্রতিও অনুগত, এমন দাসের মর্যাদার কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ হাদীসে বলেছেন।
(إِنَّ الْعَبْدَ إِذَا نَصَحَ لِسَيِّدِه) ‘আরবীতে নাসীহাত শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক। যার সার কথা হলো, যে কোনো পন্থায় কারো কল্যাণ কামনা করা। দাস তার মুনীবের কল্যাণ কামনা বলতে : মুনীবের সেবায় নিরেটভাবে নিয়োজিত থাকা, মুনীবের জন্য কল্যাণ কামনা করা, সুপরামর্শ দেয়া ইত্যাদি।
(فَلَه أَجْرُه مَرَّتَيْنِ) তবে সে দ্বিগুণ প্রতিদান পাবে। কেননা প্রতিদানের বিষয়টি কষ্টের উপর নির্ভর করে। কোনো কাজ করতে যাকে যত বেশি বেগ পেতে হয় তার প্রতিদান তত বেশি থাকে। দাস এখানে দু’টি আনুগত্য একত্রে পালন করছে। এক তার প্রভুর আনুগত্য। দুই তার মালিকের আনুগত্য। মালিকের আনুগত্যের সাথে সাথে প্রভুর আনুগত্য করার দরুন তার ওপর অতিরিক্ত চাপ রয়েছে যা স্বাধীন ব্যক্তির ওপর নেই। তাই স্বাধীন ব্যক্তির তুলনায় সে দ্বিগুণ প্রতিদান পাবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৪৯-[৮] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ঐ দাসের জন্য কতই না সৌভাগ্য, যে উত্তমরূপে আল্লাহ তা’আলার ’ইবাদাত করে এবং স্বীয় মালিকের পূর্ণ আনুগত্যের মধ্যে মৃত্যুবরণ করে। সে কতই না ভাগ্যবান! (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ النَّفَقَاتِ وَحَقِّ الْمَمْلُوْكِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «نِعِمَّا لِلْمَمْلُوكِ أَنْ يَتَوَفَّاهُ اللَّهُ بِحُسْنِ عِبَادَةِ رَبِّهِ وَطَاعَة سَيّده نعما لَهُ»
ব্যাখ্যা: (نِعِمَّا) শব্দটি কয়েকভাবে উচ্চরণ করা যায়। প্রথম অক্ষর ‘নূনে’ যবর অথবা যের সহ ‘আইন’ হরফে যের এবং ‘মীম’ হরফে তাশদীদ দিয়ে। যেমন ‘না‘ইম্মা’ বা ‘নি‘ইম্মা’। আবার মাঝের হরফ ‘আইনে’ সাকিন দিয়ে আরো দুইভাবে যেমনঃ ‘না‘মা’ বা নি‘মা’। (ফাতহুল বারী ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫৪৯)
‘আরবীতে একে প্রশংসার ক্রিয়া বলা হয়। কারো কাজ প্রশংসনীয় হলে মুগ্ধ হয়ে এই সব ক্রিয়া ব্যবহার করা হয়। অতএব যে দাস বা গোলাম তাঁর প্রতিপালক ও মুনীব উভয়ের আনুগত্য করবে এবং এই অবস্থায় সে মারা যাবে তার প্রশংসা করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কতই না ভালো সেই গোলাম যে তার প্রতিপালকের ‘ইবাদাত এবং মালিকের আনুগত্য করা অবস্থায় আল্লাহ তা‘আলা তার মৃত্যু দেন।
আমরা দেখছি যে, প্রশংসামূলক ক্রিয়াটি হাদীসে দুইবার ব্যবহার করা হয়েছে। এ থেকে এমন গোলামের মর্যাদা সহজেই অনুমেয়।
পরিচ্ছেদঃ ১৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৫০-[৯] জারীর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে দাস পালিয়ে যায়, তার সালাত গৃহীত হয় না।
অপর বর্ণনায় আছে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ পলাতক দাসের ওপর (ইসলামের) কোনো দায়ভার নেই। অপর বর্ণনায় আছে যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যে গোলাম স্বীয় মালিক হতে পালিয়ে যায়, সে অবশ্যই কুফরী করে যতক্ষণ পর্যন্ত না মালিকের নিকট ফিরে আসে। (মুসলিম)[1]
بَابُ النَّفَقَاتِ وَحَقِّ الْمَمْلُوْكِ
وَعَنْ جَرِيرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا أَبَقَ الْعَبْدُ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ» . وَفِي رِوَايَةٍ عَنْهُ قَالَ: «أَيّمَا عبد أبق فقد بَرِئت مِنْهُ الذِّمَّةُ» . وَفِي رِوَايَةٍ عَنْهُ قَالَ: «أَيُّمَا عَبْدٍ أَبَقَ مِنْ مَوَالِيهِ فَقَدْ كَفَرَ حَتَّى يَرْجِعَ إِلَيْهِم» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: গোলামের জন্য মুনীবের আনুগত্য করা জরুরী এবং মুনীবের কাছ থেকে পালিয়ে যাওয়া হারাম। আনুগত্যের মাঝে যেমন তার মর্যাদা রয়েছে, তদ্রূপ এর বিপরীত পলায়নের মাঝে তার জন্য অনেক ধমকি রয়েছে। গোলামের পলায়ন কোন্ ধরনের অপরাধ, তা এ হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। পলায়নের অপরাধ সংক্রান্ত তিনটি বর্ণনা এখানে একত্র করা হয়েছে। এক হাদীসে বলা হয়েছে, ‘‘যখন গোলাম পলায়ন করে তার কোনো সালাত কবুল হয় না’’। সালাত কবুল হয় না অর্থাৎ সে এই সালাতের কোনো সাওয়াব পায় না। যদিও সালাতের সমস্ত শর্ত এবং রুকন পাওয়ার কারণে তার সালাত শুদ্ধ হয়ে যাবে এবং সে ফরয আদায় করেছে বলা যাবে। কিন্তু এর দ্বারা সে কোনো সাওয়াব পাবে না। তাই হাদীস ‘সালাত শুদ্ধ হবে না’ এ কথা বলা হয়নি, বরং বলা হয়েছে সালাত কবুল হবে না।
আরেক বর্ণনায় এসেছে, (فقد برئت منه الذمة) অর্থাৎ তার ওপর থেকে যিম্মাহ্ উঠে যাবে, অর্থাৎ তার কোনো যিম্মাহ্ নেই। যিম্মাহ্ অর্থ নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি। অর্থাৎ নিরাপত্তার যে প্রতিশ্রুতি সে পেয়েছিল তা নষ্ট হয়ে যাবে। যেমন কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, (ذمة الله تعالى وذمة رسول الله ﷺ) অর্থাৎ আল্লাহ এবং রসূলের যিম্মাহ্। এভাবে গোলাম তার মুনীবের আওতায় থাকলেও মুনীবের শাস্তি থেকে সে রক্ষেত ছিল। অর্থাৎ তাকে শাস্তি দেয়ার অধিকার মুনীবের ছিল না। পলায়নের কারণে তার এ অধিকার নষ্ট হয়ে গেছে। (শারহে মুসলিম ১/২ খন্ড, হাঃ ৭০; ১১/১২ খন্ড, হাঃ ৬৯)
সর্বশেষ বর্ণনায় পলায়নের সবচেয়ে বড় অপরাধের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ যে পলায়ন করলো সে কুফরী করলো। কুরআন হাদীসের আলোকে আহলুস্ সুন্নাহ্ ওয়াল জামা‘আতের ‘আকীদা মতে কেউ কবীরা গুনাহ করলেই কাফির হয়ে যায় না। তাই কুফরী করলো বলতে, কুফরীর নিকবর্তী হয়ে গেল অথবা তার কাফির হয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে অথবা সে এমন কাজ করেছে যা মূলত কাফিরের কাজ। ঈমান পরিত্যাগ না করলে সে কাফির হয়ে গেছে, এ কথা বলা যাবে না। তবে সে যদি পলায়নকে বৈধ মনে করে তখন প্রকৃতপক্ষেই কাফির হয়ে যাবে। কেননা হারামকে হালাল বিশ্বাস করা কুফরী কর্ম। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৫১-[১০] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবুল কাসিম (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি স্বীয় দাসের ওপর (ব্যভিচারের) মিথ্যারোপ করে অথচ সে তা হতে মুক্ত; তাকে (মালিককে) কিয়ামতের দিন কোড়া লাগানো বা চাবুক মারা হবে অবশ্য গোলাম যদি তার অপবাদ অনুযায়ী হয় (তবে মালিককে বেত্রাঘাত করা হবে না)। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ النَّفَقَاتِ وَحَقِّ الْمَمْلُوْكِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: سَمِعْتُ أَبَا الْقَاسِمِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَنْ قَذَفَ مَمْلُوكَهُ وَهُوَ بَرِيءٌ مِمَّا قَالَ جُلِدَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِلَّا أَنْ يَكُونَ كَمَا قَالَ»
ব্যাখ্যা: নাসায়ীর বর্ণনায় রয়েছে, (أقام عليه الحد يوم القيامة) অর্থাৎ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা তার ওপর দণ্ডবিধি কায়িম করবেন। উভয় বর্ণনার আলোকে বুঝা যায় যে, মুনীব তার গোলামের ওপর অপবাদ দিলে দণ্ডবিধির শাস্তি দুনিয়ায় কায়িম করা হবে না। দুনিয়ায় কায়িম হয়নি বলেই আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামত দিবসে তার দণ্ডবিধি কায়িম করে তার প্রতি অবিচারের বিচার করবেন। দুনিয়ায় দণ্ড কায়িমের নিয়ম থাকলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়ার কথাও বলে দিতেন যেমন আখিরাতের কথা বলে দিয়েছেন। এটাকেই ‘আলিমদের সর্বসম্মত মত বলে উল্লেখ করা হয়। (ফাতহুল বারী ১২শ খন্ড, হাঃ ৬৮৫৮)
ইমাম নববী বলেনঃ হাদীসে ইঙ্গিত রয়েছে যে, গোলামের ওপর অপবাদ দেয়া হলে দণ্ডবিধি কায়িম হবে না। এটা সর্বসম্মত মত। তবে অপবাদ যে দিবে তাকে তা‘যীর বা উপযুক্ত কিছু শাস্তি অবশ্যই দিবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৫২-[১১] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি স্বীয় দাসের ওপর বিনা দোষে ’হাদ্দ’ (শাস্তি) প্রয়োগ করে অথবা থাপ্পড় মারে, তবে তার কাফফারা হলো তাকে মুক্ত করা। (মুসলিম)[1]
بَابُ النَّفَقَاتِ وَحَقِّ الْمَمْلُوْكِ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَنْ ضَرَبَ غُلَامًا لَهُ حَدًّا لَمْ يَأْتِهِ أَوْ لَطَمَهُ فَإِن كَفَّارَته أَن يعتقهُ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: হাদীসের মর্ম হলো বিনা অপরাধে বা বিনা কারণে গোলামকে প্রহার করলে এ অপরাধের কাফফারা তথা এ থেকে মুক্ত হওয়ার উপায় হলো, উক্ত গোলামকে আযাদ করে দেয়া। তবে সবার মতে এই কাফ্ফারার নির্দেশটি ওয়াজিব হিসেবে নয় বরং মুস্তাহাব হিসেবে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ যে এমন অপরাধ করবে সে তার গুনাহের কাফ্ফারার আশায় উক্ত গোলামকে ‘আযাব বা মুক্ত করে দিবে। হাদীসে কাফফারার হুকুমটি ওয়াজিব না হওয়ার দলীল হিসেবে সুওয়াই বিন মুকাররিন থেকে বর্ণিত সহীহ মুসলিমের হাদীসটি উল্লেখযোগ্য। হাদীসে রয়েছে, রসূলের সময়ে তাদের কেউ তাদের গোলামকে থাপ্পড় মারলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই গোলামকে আযাদ করে দেয়ার নির্দেশ দেন। সাহাবীরা বললেন, তাদের এছাড়া আর কোনো গোলাম নেই। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তারা যেন এরই সেবা নেয়, তবে যখন দরকার থাকবে না তখন যেন একে আযাদ করে দেয়।
‘উলামাগণ এ কথার উপর একমত যে, মুনীব যদি তার দাসকে অতি সাধারণ হালকা শাস্তি দেয় তবে তার জন্য গোলামকে আযাদ করতে হবে না। কিন্তু যদি কঠিন প্রহার করে, যেমন প্রহার করে তার একটি অঙ্গ নষ্ট করে দিলো, এ ক্ষেত্রে ইমাম মালিক ও তার ছাত্ররা এবং ইমাম লায়স-এর মতে গোলামকে আযাদ করে দেয়া ওয়াজিব। অন্যান্য ‘আলিমদের মতে আযাদ করা ওয়াজিব নয়, তবে বাদশাহ এর বিচার স্বরূপ মুনীবকে শাস্তি দিবে। (শারহে মুসলিম ১১/১২ খন্ড, হাঃ ১৬৫৭)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৫৩-[১২] আবূ মাস্’ঊদ আল আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি স্বীয় দাসকে প্রহাররত অবস্থায় আমার পেছন হতে উচ্চস্বরে একটি আওয়াজ শুনলাম, হে আবূ মাস্’ঊদ! সাবধান! তুমি তোমার দাসের ওপর যতটুকু ক্ষমতা রাখ আল্লাহ তদপেক্ষা তোমার ওপর অধিক ক্ষমতার অধিকারী। অতঃপর আমি পিছন ফিরে দেখি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (এ কথাটি) বলছেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! তাকে আল্লাহর ওয়াস্তে মুক্ত করে দিলাম। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তুমি যদি এটা না করতে তবে জাহান্নামের আগুন তোমাকে ঝলসিয়ে দিত। (মুসলিম)[1]
بَابُ النَّفَقَاتِ وَحَقِّ الْمَمْلُوْكِ
وَعَنْ أَبِي مَسْعُودٍ الْأَنْصَارِيِّ قَالَ: كُنْتُ أَضْرِبُ غُلَامًا لِي فَسَمِعْتُ مِنْ خَلْفِي صَوْتًا: «اعْلَمْ أَبَا مَسْعُودٍ لَلَّهُ أَقْدَرُ عَلَيْكَ مِنْكَ عَلَيْهِ» فَالْتَفَتُّ فَإِذَا هُوَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ هُوَ حُرٌّ لِوَجْهِ اللَّهِ فَقَالَ: «أَمَا لَوْ لَمْ تَفْعَلْ لَلَفَحَتْكَ النَّارُ أَوْ لَمَسَّتْكَ النَّارُ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: اَللّٰهُ أَقْدَرُ عَلَيْكَ مِنْكَ عَلَيْهِ)) অর্থাৎ তুমি তার ওপর যতটুকু ক্ষমতাবান আল্লাহ তোমার ওপর তার চেয়ে অধিক ক্ষমতাবান। মর্ম হলো, আজ তার ক্ষমতা না থাকায় তোমার অবিচারের পাল্টা প্রতিশোধ নিতে পারেনি। কিন্তু একদিন সবাইকে আল্লাহর সম্মুখীন হতে হবে যার ক্ষমতা সবার ওপর। সেদিন সব জুলুমের বিচার করা হবে। কেউ তা প্রতিরোধ করতে পারবে না।
(أَمَا لَوْ لَمْ تَفْعَلْ لَلَفَحَتْكَ النَّارُ أَوْ لَمَسَّتْكَ النَّارُ) অর্থাৎ তুমি তাকে আযাদ না করে দিলে জাহান্নামের আগুন তোমাকে ঝলসিয়ে দিত অথবা জাহান্নামের আগুন তোমায় স্পর্শ করত।
এখানে গোলামকে অন্যায়ভাবে মারার শাস্তির কথা বলা হয়েছে। এই শাস্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার রাস্তা হলো তাকে আযাদ করে দেয়া। ইমাম নববী বলেনঃ মুসলিমরা একমত যে, এ কারণে গোলামকে আযাদ করা ওয়াজিব নয়, তবে তা মুস্তাহাব। আযাদ করে দিলে মুস্থাহাবের সাথে সাথে তার গুনাহের কাফফারা হয়ে যাবে এবং যে অন্যায় অবিচার করা হয়েছিল এই গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৫৪-[১৩] ’আমর ইবনু শু’আয়ব তাঁর পিতার মাধ্যমে তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, আমার নিকট ধন-সম্পদ আছে এবং আমার পিতা দারিদ্র্যতার দরুন আমার ধন-সম্পদের মুখাপেক্ষী। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তুমি এবং তোমার ধন-সম্পদ তোমার পিতার। তোমাদের সন্তান-সন্ততিগণ তোমাদের উত্তম রিযক। সুতরাং তোমরা সন্তানের উপার্জন খাও। (আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ)[1]
عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ: أَنَّ رَجُلًا أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: إِنَّ لِي مَالًا وَإِنَّ وَالِدِي يَحْتَاجُ إِلَى مَالِي قَالَ: «أَنْتَ وَمَالُكَ لِوَالِدِكَ إِنَّ أَوْلَادَكُمْ مِنْ أَطْيَبِ كَسْبِكُمْ كُلُوا مِنْ كَسْبِ أَوْلَادِكُمْ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَابْنُ ماجة
ব্যাখ্যা: (أَنْتَ وَمَالُكَ لِوَالِدِكَ) ‘‘তুমি এবং তোমার মাল তোমার পিতার।’’ হাদীসের মর্ম হলো, পিতা যদি ছেলের মালের মুখাপেক্ষী হয় তবে ছেলের জন্য জরুরী হলো পিতার খোরাক ও চলার পরিমাণ খরচ নিতে পিতাকে বাধা না দেয়া। কেননা ছেলের ওপর তা আদায় করা ওয়াজিব। তাই পিতা নিজেই যদি এই পরিমাণ নিয়ে নেন তবে বাধা দেয়ার কিছু নেই। ছেলের যদি মাল না থাকে তবে তাকে পিতার জন্য উপার্জন করা ওয়াজিব। এটাকেই বলা হয়েছে ‘তুমি এবং তোমার মাল তোমার পিতার’। অর্থাৎ মাল থাকলে পিতা ঐ মাল থেকে নিবে, আর মাল না থাকলে তুমি পিতার জন্য উপার্জন করবে।
হাদীসের পরবর্তী অংশ পূর্ববর্তী অংশের অর্থকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। অর্থাৎ ‘‘তোমাদের সন্তান তোমাদের কামাইয়ের সর্বোত্তম পন্থা, তোমরা তাদের কামাই থেকে খাও’’ এই অংশ প্রথম অংশের ব্যাখ্যা স্বরূপ।
হাদীস থেকে সন্তানের ওপর পিতার খোরাকের দায়িত্বের মাসআলাটি বের হয়। সন্তান তার মাল থেকে বা উপার্জন করে পিতার খোরাক বহন করবে। মাল থাকাবস্থায় খোরাক দিতে অবহেলা করলে পিতার জন্য তা নিয়ে নেয়া বৈধ রয়েছে।
তবে এই হাদীস থেকে পিতা তার ছেলের মালের মালিক হয়ে যাওয়া এবং এবং তার ইচ্ছামত ব্যয় করার অধিকার ফুকাহায়ে কিরামের কেউই দেন না। কেননা সবাই নিজ নিজ মালের মালিক। নির্ধারিত শারী‘আত পন্থা ছাড়া কেউ অন্যের মালের মালিক হয় না। তাই পিতাও ছেলের মালের মালিক হবে না। (‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৫২৭)
বর্ণিত হাদীসে ছেলের মালে পিতার একটি ন্যায়সঙ্গত অধিকার দেয়া হয়েছে। পিতাকে ছেলের মালের মালিক বানিয়ে দেয়া হয়নি।
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৫৫-[১৪] উক্ত রাবী (’আমর ইবনু শু’আয়ব) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, আমি একজন হতদরিদ্র মানুষ, আমার সহায়-সম্বল নেই, কিন্তু আমার তত্ত্বাবধানে একজন (সম্পদশালী) ইয়াতীম আছে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তুমি অপব্যয়ী না হয়ে, মিতব্যয়ী হয়ে, পুঁজি না করে তোমার প্রতিপালিত ইয়াতীমের ধন-সম্পদ হতে খেতে পার। (আবূ দাঊদ, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ)[1]
وَعنهُ وَعَن أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ: أَنَّ رَجُلًا أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: إِنِّي فَقِيرٌ لَيْسَ لِي شَيْءٌ وَلِي يَتِيمٌ فَقَالَ: «كُلْ مِنْ مَالِ يَتِيمِكَ غَيْرَ مُسْرِفٍ وَلَا مُبَادِرٍ وَلَا مُتَأَثِّلٍ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ وَابْنُ مَاجَه
ব্যাখ্যা: ইয়াতীম হলো যে নাবালক শিশুর পিতা নেই। ইয়াতীম বাচ্চার লালন পালন যদি এমন কারো দায়িত্বে আসে যে নিজে দরিদ্র, তবে সে তার দেখাশুনা করছে হিসেবে ইয়াতীমের মাল থেকে ভক্ষণ করতে পারবে। তবে এই ব্যক্তির জন্য ইয়াতীমের মাল থেকে ভক্ষণ করতে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য রাখার নির্দেশ দেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
এক. (غَيْرَ مُسْرِفٍ) অপচয় করবে না অর্থাৎ প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবে না, বরং দরিদ্র ব্যক্তি সাধারণত যে খাবার খায় সেই খাবার খাবে।
দুই. (وَلَا مُبَادِرٍ) অর্থাৎ খেতে দ্রুত করবে না। খেতে দ্রুত করার দু’টি অর্থ উল্লেখ করা হয়।
এক. প্রয়োজনের আগে আগে খাওয়া। অর্থাৎ দরিদ্রের ইয়াতীমের মাল থেকে খাওয়ার বৈধতা হচ্ছে একান্ত প্রয়োজন পড়লে। তাই প্রয়োজন পড়ার আগেই খেয়ে নেয়া ঠিক নয়। আরেকটি অর্থ হলো: ইয়াতীম বালেগ হওয়ার পূর্বেই তার মাল তড়িঘড়ি করে খেয়ে শেষ করে দেয়া, যাতে করে বালেগ হয়ে সে আর কোনো মালের দাবী করতে না পারে। কুরআনের আলোকে এই অর্থটি অগ্রগণ্য। যেহেতু কুরআনে বলা হয়েছে- ‘‘ইয়াতীমের মাল প্রয়োজনাতিরিক্ত খরচ করো না বা তারা বড় হয়ে যাবে মনে করে তাড়াতাড়ি খেয়ে ফেলো না।’’ (সূরা আন্ নিসা ৪ : ৬)
তিন. (وَلَا مُتَأَثِّلٍ) এই বাক্যেরও দু’টি অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে।
[এক] ইয়াতীমের মাল কাজে না লাগিয়ে তার মূল মাল খেয়ে নেয়া। [দুই] ইয়াতীমের মালকে নিজের মালের সাথে মিশিয়ে এটাকে ব্যবসার মূলধন বানিয়ে ব্যবসা করা, যাতে ইয়াতীম বড় হলে এই মাল চাইতে না পারে। দ্বিতীয় অর্থটা অনেকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কারণ কুরআনে ইয়াতীমের মাল ভক্ষণের দু’টি শর্ত দেয়া হয়েছে। তাই দ্বিতীয় অর্থ গ্রহণ করলে দুই শর্তই থাকে এবং এটি কুরআনের আয়াতের তাফসীরের ন্যায় হয়ে যায়। প্রথম অর্থটির কথা কুরআনে উল্লেখ নেই। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৫৬-[১৫] উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রাণ-ওষ্ঠাগতপ্রায় অবস্থায় বারবার বলছিলেন, তোমরা সালাতের প্রতি যত্নবান হও এবং অধীনস্থ দাস-দাসীগণের হক আদায় কর। (বায়হাক্বী- শু’আবুল ঈমান)[1]
وَعَنْ أُمِّ سَلَمَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ كَانَ يَقُولُ فِي مَرَضِهِ: «الصَّلَاةَ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي شعب الْإِيمَان
ব্যাখ্যা: (وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ) শাব্দিক অর্থঃ আর তোমাদের ডান হাত যার মালিক। ডান হাত যার মালিক বলতে কেউ কেউ মনে করেছেন এখানে যাকাতের কথা বলা হয়েছে। কেননা কুরআনে যেখানেই সালাতের কথা এসেছে সেখানেই যাকাতের কথা এসেছে। তাই রসূল তার মৃত্যুশয্যায় সালাত ও যাকাতের প্রতি যত্নবান হতে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে কুরআন ও হাদীসে এ বাক্যটি ব্যবহার করে, অর্থাৎ ‘তোমাদের ডান হাত যার মালিক’ বলে দাসকেই বুঝানো হয়েছে এবং দাস বুঝাতে এই বাক্যের ব্যবহার কুরআনের একাধিক জায়গায় করা হয়েছে। তাই হাদীসের বাহযত অর্থ এটাই যে, তোমরা সালাত ও তোমাদের দাসদের প্রতি যত্নবান হবে। অর্থাৎ মালিক হিসেবে তোমাদের ওপর যতটুকু দায়িতব রয়েছে তা আদায় করবে। স্বাভাবিক তাদের সাথে একজন স্বাধীন মানুষের মতো আচরণ করা হয় না। তাই মহান আদর্শ মানব হিসেবে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মৃত্যশয্যায়ও এই ওয়াসিয়্যাত করতে ভুলেননি।
আজ যারা মুসলিমদেরকে মানবতার শিক্ষা দেয়, এসব হাদীস থেকে তাদের যেমন শিক্ষা নেয়া উচিত তেমনি মুসলিমদের যারা নিজের রসূল ব্যতীত অন্যকে মানবতার শিক্ষক মনে করে তাদেরও শিক্ষা নেয়া উচিত। তবে আফসোস যে, আমরা আজ রসূলের আদর্শ থেকে এতই দূরে সরেছি যে, কাফিররা আমাদের পূর্ব পুরুষ থেকে মানবতা শিখে আজ তারা আমাদের জন্য মানবতা, সহমর্মিতার আদর্শ হয়ে গেছে। আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক বুঝা এবং রসূলের আদর্শে আদর্শিত হওয়ার তাওফীক দিন। আমীন। (সম্পাদক)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৫৭-[১৬] আর আহমাদ ও আবূ দাঊদ (রহঃ) ’আলী হতে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।[1]
وَرَوَى أَحْمَدُ وَأَبُو دَاوُدَ عَنْ عَلِيٍّ نَحْوَهُ
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৫৮-[১৭] আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অধীনস্থ দাস-দাসীদের সাথে অসদাচরণকারী জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। (তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ أَبِي بَكْرٍ الصِّدِّيقِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ سَيِّئُ الْمَلَكَةِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: (سَيِّئُ الْمَلَكَةِ) বলা হয় যে তার অধীনস্থ দাস বা দাসীর সাথে মন্দ আচরণ করে। দাস দাসীর সাথে মন্দ আচরণ তার চরিত্র খারাপ- এ কথা প্রমাণ করে। কারণ ভালো চরিত্রের অধিকারী দাস বা দাসীর সাথে মন্দ আচরণ করতে পারে না। আর মন্দ চরিত্র নিন্দনীয় যা অপমান ও জাহান্নামে প্রবেশের কারণ। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
অনেক মানুষ পাহাড় পরিমাণ নেক ‘আমল নিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও তাকে জাহান্নামে যেতে হবে। কেননা বিচারের মাঠেই তার সব আ‘মাল শেষ হয়ে যাবে। যাদের সাথে সে দুর্ব্যবহার বা মন্দ আচরণ করেছে বিচারের মাঠে সব নেক আ‘মাল তাদেরকে দিয়ে শেষ হয়ে গেলে শেষ পর্যন্ত অন্যের গুনাহ নিজের আ‘মালনামায় বহন করে তাকে জাহান্নামে যাওয়ার কথা হাদীসে এসেছে। (মুসনাদে আহমাদ হাঃ ৮০১৬, সহীহ ইবনু হিব্বান হাঃ ৪৪১১)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৫৯-[১৮] রাফি’ ইবনু মাকীস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অধীনস্থ দাস-দাসীদের সাথে সদ্ব্যবহার করা কল্যাণকর ও বরকতময় এবং অসদাচরণকারী কল্যাণ ও বারাকাতের প্রতিবন্ধক। (আবূ দাঊদ)[1]
মিশকাত গ্রন্থকার বলেন, মাসাবীহ গ্রন্থ ছাড়া অন্য কোনো হাদীসের এ অতিরিক্ত বর্ণনাটুকু আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি, ’দান-সাদাকা অপমৃত্যু দূরীভূত করে এবং সৎকাজ আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি করে’।
وَعَنْ رَافِعِ بْنِ مَكِيثٍ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «حُسْنُ الْمَلَكَةِ يُمْنٌ وَسُوءُ الْخُلُقِ شُؤْمٌ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَلَمْ أَرَ فِي غَيْرِ الْمَصَابِيحِ مَا زَادَ عَلَيْهِ فيهِ منْ قولِهِ: «والصَّدَقةُ تمنَعُ مِيتةَ السُّوءِ والبِرُّ زيادةٌ فِي العُمُرِ»
ব্যাখ্যা: (حُسْنُ الْمَلَكَةِ يُمْنٌ) ‘‘দাস-দাসীর সাথে ভালো আচরণ বরকত।’’ অর্থাৎ দাস দাসীর মন্দ আচরণ যেমন ধ্বংস ও অশুভের কারণ ঠিক এর বিপরীত তাদের সাথে ভালো আচরণ করা কল্যাণ ও বারাকাতের কারণ। যখন কেউ তার দাস-দাসীর ভালো আচরণ করবে আল্লাহ তা‘আলা তাকে কল্যাণ ও বরকত দান করবেন। এছাড়া মালিক যখন তার অধীনস্থের সাথে ভালো আচরণ করবে তখন তারা তাদের মালিকের সাথে ভালো আচরণ এবং মালিকের হক পুরো আদায় করবে। তখন মালিকের মনে অনাবিল শান্তি বয়ে আনবে। কল্যাণ ও বরকত বলতে এটাও হতে পারে।
(وَسُوْءُ الْخُلُقِ شُؤْمٌ) ‘‘মন্দ আচরণ অশুভের কারণ।’’ (يمن)-এর বিপরীত হলো (شؤم) অর্থাৎ ভালো আচরণ যেমন বরকত ও কল্যাণ নিয়ে আসে, এর বিপরীত মন্দ আচরণ অকল্যাণ ও অনিষ্টতা নিয়ে আসে। কেননা অধিনস্থের সাথে মন্দ আচরণ পরস্পর হিংসা, ঘৃণা, জিদ, ঝগড়া ও হঠকারিতা সৃষ্টি করে যার প্রভাব মালিকের জান ও মাল উভয়ে পড়বে। তখন কেবল ক্ষতি হতে থাকা তার মনে অশান্তির কারণ হবে। এটা হলো তার অকল্যাণ ও অশুভ পরিণাম। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫১৫৪)
(وَالصَّدَقةُ تَمْنَعُ مِيْتَةَ السُّوْءِ) ‘‘সাদাকা মন্দ মৃত্যুকে বাধা দেয়।’’ মন্দ মৃত্যু বলতে দুর্ঘটনার কবলে হঠাৎ মৃত্যুকে বুঝানো হয়ে থাকে। কেননা মানুষের জীবনের দৈনন্দিন কোনো না কোনোভাবে গুনাহ সংঘটিত হয়ে যায়। মৃত্যু কাছে দেখলে, অসুস্থ হয়ে পড়লে মানুষ সাধারণত তার গুনাহ থেকে সকাতরে আল্লাহ তা‘আলার কাছে ক্ষমা চায়। এই তাওবাহ্ তার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া হতে পারে। কিন্তু হঠাৎ করে মারা গেলে সে তাওবাহ্ করার সুযোগ পায় না। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
তাই হঠাৎ মৃত্যুকে মন্দ মৃত্যু বলা হয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হঠাৎ মৃত্যু থেকে রক্ষা করুন। আমীন।
(وَالْبِرُّ زِيَادَةٌ فِى الْعُمُرِ) ‘‘কল্যাণকর্ম বয়স বৃদ্ধির কারণ।’’ কল্যাণ কর্ম করলে আল্লাহর ‘ইবাদাত অথবা তার সৃষ্টির প্রতি দয়া ও ভালো আচরণ হতে পারে। কুরআন ও হাদীস দ্বারা এ কথাটি অকাট্যভাবে প্রমাণিত একটি বিষয় হলো, সবার বয়স নির্ধারিত। নির্ধারিত সময়ের আগে বা পরে কারো মৃত্যু হবে না। তাই এ জাতীয় হাদীসের অর্থা ‘উলামায়ে কিরাম এই নেন যে, বয়স বৃদ্ধি বলতে তার বয়সের মাঝে বরকত দেয়া বুঝানো হয়েছে। যে ব্যক্তি সৎকর্ম করবে আল্লাহ তা‘আলা তার বয়সকে বরকতময় করে তুলবেন। আল্লাহ অধিক ভালো জানেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৬০-[১৯] আবূ সা’ঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের মধ্যে কেউ যখন তার খাদিম (চাকর-বাকর)-কে মারধর করে, আর ঐ সময়ে সে যদি আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে, তখন তোমরা হাত সরিয়ে নাও। (তিরমিযী ও বায়হাক্বী- শু’আবুল ঈমান)[1]
ইমাম বায়হাক্বী’র বর্ণনায় ’হাত সরানোর’ পরিবর্তে ’তাত্থেকে বিরত থাক’ রয়েছে।
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا ضَرَبَ أَحَدُكُمْ خَادِمَهُ فَذَكَرَ اللَّهَ فَارْفَعُوا أَيْدِيَكُمْ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَالْبَيْهَقِيُّ فِي شُعَبِ الْإِيمَانِ لَكِنْ عِنْدَهُ «فَلْيُمْسِكْ» بدل «فارفعوا أَيْدِيكُم»
ব্যাখ্যা: (فَارْفَعُوا أَيْدِيَكُمْ) তোমরা তোমাদের হাত তুলে নাও, অর্থাৎ প্রহার বন্ধ করে দাও। কোনো বর্ণনায় এসেছে, (فَلْيُمْسِكْ) অর্থাৎ সে যেন বিরত হয়ে যায়।
হাদীসের মর্ম হলো: কেউ তার গোলামকে যদি শিক্ষা দানের জন্য প্রহার করে এবং তার প্রহার করা অবস্থায় গোলাম আল্লাহর নাম নেয়, তখন আল্লাহর নামের সম্মানার্থে তাকে প্রহার বন্ধ করে দিবে। এই হুকুম হচ্ছে আদাব বা শিষ্টাচার শিক্ষা দিতে তাকে যখন ন্যায়সঙ্গত হালকা শাস্তি দিবে। অন্যায় শাস্তি দেয়া, প্রচণ্ড প্রহার করা কোনোক্রমেই জায়িয নয়। এমন অত্যাচার তো এমনিতেই বন্ধ করতে হবে। উপরে একাধিক হাদীসে আমরা বিষয়টি দেখে এসেছি। তবে গোলাম যদি কোনো অন্যায় করে যার কারণে তার ওপর শারী‘আত নির্ধারিত দণ্ডবিধি কায়িম করা হচ্ছে, এমতাবস্থায় সে আল্লাহর নাম নিলে প্রহার বন্ধ করতে হবে না। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৯৪৯)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৬১-[২০] আবূ আইয়ূব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি মা ও তার সন্তান-সন্ততির মাঝে বিচ্ছেদ ঘটায়, আল্লাহ তা’আলা কিয়ামত দিবসে তার ও তার পরিবার-পরিজনদের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটাবেন। (তিরমিযী ও দারিমী)[1]
وَعَن أبي أيوبَ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَنْ فَرَّقَ بَيْنَ وَالِدَةٍ وَوَلَدِهَا فَرَّقَ اللَّهُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ أَحِبَّتِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ والدارمي
ব্যাখ্যা: (مَنْ فَرَّقَ بَيْنَ وَالِدَةٍ وَوَلَدِهَا) ‘‘যে ব্যক্তি মা ও তার সন্তানের মাঝে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করল...।’’ মা ও সন্তানের মাঝে বিচ্ছেদ, যেমন কারো দাসীর সঙ্গে তার মেয়ে রয়েছে, লোকটি মাকে রেখে মেয়েকে বিক্রি করে দিল অথবা কাউকে হাদিয়া হিসেবে দিয়ে দিল ইত্যাদি। অথবা মেয়েকে রেখে মাকে বিক্রি করে দিল। মোটকথা, যে কোনোভাবে মেয়েকে মার কাছ থেকে পৃথক করে দিল, তবে কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তা‘আলা তার আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিবেন। কিয়ামত দিবসে আল্লাহর অনুমতিতে অনেক সময় নিজের প্রিয় মানুষের সুপারিশ কাজে আসে। আবার দুনিয়ায় নিজের যে প্রিয় মানুষ রয়েছে তার সাথে জান্নাতে থাকলে মানুষ আনন্দবোধ করবে দেখে আল্লাহ এই ব্যবস্থাও করবেন। কিন্তু যে ব্যক্তি দুনিয়ায় আরেকজনের রক্ত সম্পর্কে বিচ্ছেদ ঘটাবে কিয়ামত দিবসে সে নিজের প্রিয়জনের সুপারিশ পাওয়া বা প্রিয়জনের সাথে জান্নাতে থাকার আনন্দ হতে বঞ্চিত হবে।
‘আল্লামা মুনাবী বলেনঃ বেচাকেনা ইত্যাদির মাধ্যমে বিচ্ছেদ ঘটানো ইমাম শাফি‘ঈ-এর মতে সন্তান বুঝদার হওয়ার পূর্বে হারাম। সন্তানের মাঝে বুঝ ও ভালো-মন্দের পার্থক্য এসে গেলে মাকে রেখে সন্তান বা সন্তানকে রেখে মাকে বিক্রয় করা জায়িয। আর ইমাম আবূ হানীফাহ্-এর মতে সন্তানের বালেগ বা বালেগা হওয়ার পূর্বে এমন কাজ করা হারাম। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৫৬৬)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৬২-[২১] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দু’টি দাস দান করেন, যারা ছিল একে অপরের ভাই। আমি তন্মধ্যে একজনকে বিক্রি করে দিলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার অপর দাসটি কোথায়? আমি তাঁকে এতদসম্পর্কে জানালে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে নির্দেশ করলেন, তাকে ফেরত নাও, তাকে ফেরত নাও। (তিরমিযী, ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: وَهَبَ لِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ غلامين أَخَوَيْنِ فَبعث أَحدهمَا فَقَالَ لي رَسُول صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَا عَلِيُّ مَا فَعَلَ غُلَامُكَ؟» فَأَخْبَرْتُهُ. فَقَالَ: «رُدُّهُ رُدُّهُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: উপরের হাদীসে মা ও সন্তানের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটানোর আলোচনা করা হয়েছে। বর্ণিত হাদীসে দুই ভাইয়ের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটানোর কথা বলা হয়েছে। তাই মা ও সন্তান ও আপন ভাইদের মাঝে বিক্রি ইত্যাদির মাধ্যমে বিচ্ছেদ ঘটানো হারাম হওয়ার বেলায় কোনো মতানৈক্য নেই। কেননা বিষয়টি হাদীসে স্পষ্ট। এছাড়া অন্যান্য রক্ত সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটানো যাবে কিনা- এ নিয়ে ‘আলিমদের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। মা এবং সন্তান ও ভাইদের ওপর ক্বিয়াস করে অনেকে মনে করেন, অন্যদের মাঝেও বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করা হারাম। যেমন পিতা ও সন্তানের বিচ্ছিন্নতার বিষয়টি ভাইদের বিচ্ছিন্নতার চেয়ে অসুবিধাজনক। এটা হচ্ছে হানাফী ‘আলিমদের মত। অপরদিকে অন্যান্য ‘আলিমদের মতে বিক্রির মাধ্যমে বিচ্ছিন্নতা হারাম কেবল মা ও সন্তান এবং ভাইদের সাথে। অন্যদের বেলায় হারাম নয়। অন্যদেরকে এর উপর ক্বিয়াস করাকে তারা যুক্তিসঙ্গত মনে করেন না। কেননা বিচ্ছিন্নতার কষ্ট সবার ক্ষেত্রে সমান নয়। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১২৮৪)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৬৩-[২২] উক্ত রাবী [’আলী (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তিনি এক দাসী ও তার সন্তানের মাঝে (একজনকে বিক্রির মাধ্যমে) বিচ্ছেদ ঘটালে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করলেন এবং বিক্রয় প্রত্যাহার করার নির্দেশ দিলেন। (আবূ দাঊদ হাদীসটি মুনক্বতি’ [বিচ্ছিন্ন] সানাদে বর্ণনা করেছেন)[1]
وَعَنْهُ أَنَّهُ فَرَّقَ بَيْنَ جَارِيَةٍ وَوَلَدِهَا فَنَهَاهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ ذَلِكَ فردَّ البَيعَ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد مُنْقَطِعًا
ব্যাখ্যা : এ হাদীসটিও ‘আলী থেকে বর্ণিত। এ হাদীসেও আমরা দেখছি যে, বিক্রির মাধ্যমে আলি মা ও তার সন্তানের মাঝে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টির কারণে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বিক্রয় প্রত্যাখ্যান করেন। তাই দাসী ও তার অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে বিক্রি করতে হলে একজনের কাছেই উভয়কে এক সাথে বিক্রি করতে হবে। একজনকে রেখে অপরজনকে বিক্রি করে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করায় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বিক্রয় প্রত্যাখ্যান করেন।
খত্ত্বাবী বলেনঃ ছোট সন্তান ও তার মায়ের মাঝে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করা জায়িয না হওয়ার ব্যাপারে ‘আলিমদের মাঝে কোনো দ্বিমত নেই। তবে সন্তানের ছোট হওয়ার সীমা যার ভিতর বিচ্ছিন্নতা জায়িয নেই- এ নিয়ে ‘আলিমদের মাঝে মতভেদ রয়েছে।
ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-ও তাঁর অনুসারীদের মতে এই সীমা হচ্ছে বালেগ হওয়া। অর্থাৎ সন্তান বালেগ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিক্রয় বা অন্য কিছুর মাধ্যমে বিচ্ছিন্নতা ঘটানো জায়িয নেই। বালেগ হওয়ার পর বিচ্ছিন্ন করা না-জায়িয নয়।
ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ) বলেনঃ এর সীমা সাত বা আট বছর। আট বছর পার হয়ে গেলে বিচ্ছিন্নতা জায়িয। ইমাম আওযা‘ঈ বলেনঃ যখন সন্তান তার প্রয়োজনে মায়ের মুখাপেক্ষী হবে না তখন বিচ্ছিন্ন করা যাবে। ইমাম মালিক (রহঃ)-এর সন্তানের বুঝ আসা পর্যন্ত এর সীমা। ইমাম আহমাদ (রহঃ)-এর মতে কোনো অবস্থায়ই মা ও সন্তানের মাঝে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করা জায়িয নয়, যদিও সে বড় হয়ে বালেগ হয়ে যায়। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬৯৩)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৬৪-[২৩] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যার মধ্যে তিনটি গুণ বিদ্যমান রয়েছে আল্লাহ তা’আলা তার মৃত্যু সহজ করে দেবেন এবং তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন- অসহায়-দুর্বলের সাথে সদাচরণ, পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহার ও দাস-দাসীর প্রতি উত্তম ব্যবহার। (তিরমিযী; তিনি হাদীসটিকে গরীব বলেছেন)[1]
وَعَنْ جَابِرٌ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: ثَلَاثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ يَسَّرَ اللَّهُ حَتْفَهُ وَأَدْخَلَهُ جَنَّتَهُ: رِفْقٌ بِالضَّعِيفِ وَشَفَقَةٌ عَلَى الْوَالِدَيْنِ وَإِحْسَانٌ إِلَى الْمَمْلُوكِ . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ
ব্যাখ্যা: (يَسَّرَ اللّٰهُ حَتْفَه) ‘আরবী ‘হাত্ফুন’ শব্দের অর্থ ধ্বংস। কারো স্বাভাবিক মৃত্যু হলে ‘আরবরা বলে থাকেন (ماتَ حَتْفَ أنفِه) অর্থাৎ সে স্বাভাবিকভাবে মারা গেছে। পূর্বেকার মানুষের ধারণা ছিল, কেউ কোনো ধরনের আঘাতপ্রাপ্ত, এ্যাকসিডেন্ট ইত্যাদির মাধ্যমে মারা গেলে যে স্থান ক্ষত সেদিকেই তার শেষ নিঃশ্বাস বের হয়। আর যে স্বাভাবিক মারা যায় তার শেষ নিঃশ্বাস নাক দিয়ে বের হয়। এ থেকে স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটলে তারা (ماتَ حَتْفَ أنفِه) বাক্য ব্যবহার করে থাকেন। তাই হাদীসের বাক্যের অর্থ হচ্ছে : যার মাঝে বর্ণিত তিন গুণ থাকবে আল্লাহ তা‘আলা তার মৃত সহজ করে দিবেন এবং সাকারাত তথা মৃত্যুর পূর্ব যন্ত্রণা দূর করে দিবেন। সেই তিনটি গুণ হলো-
(رِفْقٌ بِالضَّعِيفِ) দুর্বলের সাথে নরম ব্যবহার। দুর্বল বলতে শারীরিক দুর্বল, অবস্থার দিক থেকে দুর্বল, জ্ঞানের দিক থেকে দুর্বল হতে পারে। মোটকথা, যে কোনো ধরনের দুর্বলের সাথে নরম আচরণ করা।
(شَفَقَةٌ عَلَى الْوَالِدَيْنِ) পিতা-মাতার ওপর দয়াশীল হওয়া। অর্থাৎ পিতা-মাতার প্রতি দয়া, তাদের যত্ন, তাদের প্রতি মমতা ও তাদের মর্যাদা ইত্যাদির খেয়াল রাখা।
(إِحْسَانٌ إِلَى الْمَمْلُوكِ) দাসের প্রতি করুণা। অর্থাৎ মালিকের ওপর দাসের প্রতি যে জরুরী দায়িত্ব রয়েছে তা আদায়ের সাথে সাথে তার প্রতি অতিরিক্ত কল্যাণ পৌঁছানো। এর মাঝে মালিকের জন্যও কল্যাণ ও বরকত নিহিত রয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৬৫-[২৪] আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’আলী (রাঃ)-কে একটি গোলাম দান করে বললেন, একে প্রহার করো না। কেননা, আল্লাহ আমাকে সালাত আদায়কারীকে প্রহার করতে নিষেধ করেছেন, আর আমি তাকে সালাত আদায় করতে দেখেছি। (এটা মাসাবীহ-এর বাক্য)[1]
وَعَنْ أَبِي أُمَامَةَ
أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم وَهَبَ لِعَلِيٍّ غُلَامًا فَقَالَ: «لَا تَضْرِبْهُ فَإِنِّي نُهِيتُ عَنْ ضَرْبِ أَهْلِ الصَّلَاةِ وَقَدْ رَأَيْتُهُ يُصَلِّي» . هَذَا لفظ المصابيح
ব্যাখ্যা: (فَإِنِّىْ نُهِيتُ) ‘আমাকে নিষেধ করা হয়েছে।’ অর্থাৎ আমার প্রতিপালক আমাকে সালাত আদায়কারী দাসকে মারতে নিষেধ করেছেন।
সালাত আদায়কারী গোলামকে প্রহার নিষেধ অর্থাৎ শারী‘আত হাদ্দ তথা দণ্ডবিধি জাতীয় কোনো অপরাধ ছাড়া অন্য কোনো সাধারণ অপরাধের কারণে প্রহার নিষেধ। তবে সে যদি এমন কোনো দোষ করে যার কারণে তার ওপর শারী‘আত দণ্ডের শাস্তি অনিবার্য হয় তবে তা প্রয়োগ করতে হবে।
(وَقَدْ رَأَيْتُه يُصَلِّىْ) অর্থাৎ আর আমি তাকে সালাত আদায় করতে দেখেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথার উদ্দেশ্য এই হতে পারে যে, শিষ্টাচারের জন্য এমন গোলামকে প্রহার করার প্রয়োজন হবে না; কেননা সে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তার প্রকৃত মালিকের সাথে করণীয় দাসত্বের শিষ্টাচার বজায় রাখছে, আর সালাত মানুষকে অশ্লীল ও আপত্তিকর কাজ থেকে বাধা প্রদান করে, অতএব তাকে আপত্তিকর কাজের জন্য প্রহারের প্রয়োজন হবে না। এছাড়া সে যখন তার প্রকৃত মালিকে হক আদায় করছে তখন অন্য কিছুতে ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে গেলে তা ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখা উচিত।
‘আল্লামা ত্বীবী বলেনঃ সালাত আদায়কারী সাধারণত এমন কোনো কাজ করে না যার দ্বারা সে প্রহৃত হওয়ার উপযুক্ত হয়; কেননা সালাত অশ্লীল ও আপত্তিকর কাজ থেকে বাধা প্রদান করে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৬৬-[২৫] আর দারাকুত্বনী’র ’মুজতাবা’ গ্রন্থে আছে যে, ’উমার ইবনুল খত্ত্বাব (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে নিষেধ করেছেন সালাত আদায়কারীকে প্রহার করা হতে।[1]
وَفِي «الْمُجْتَبَى» لِلدَّارَقُطْنِيِّ: أَنَّ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: نَهَانَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ ضَرْبِ الْمُصَلِّينَ
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৬৭-[২৬] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রসূল! গোলামকে তার অপরাধের জন্য কতবার আমরা ক্ষমা করব? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিশ্চুপ রইলেন। সে ব্যক্তি পুনরায় জিজ্ঞেস করল, (এবারও) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিশ্চুপ রইলেন। তৃতীয়বার প্রশ্নের জবাবে বললেন, তাকে ক্ষমা কর, প্রত্যহ ৭০ বার (অপরাধ করলেও) মাফ করে দাও। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ كم نَعْفُو عَنِ الْخَادِمِ؟ فَسَكَتَ ثُمَّ أَعَادَ عَلَيْهِ الْكَلَامَ فصمتَ فلمَّا كانتِ الثَّالثةُ قَالَ: «اعفُوا عَنْهُ كُلَّ يَوْمٍ سَبْعِينَ مَرَّةً» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (فَصَمَتَ) صمت এবং سَكَتَ একই অর্থ। অর্থাৎ চুপ থাকেন। দুইবার প্রশ্ন করার পরও চুপ থাকার কারণ হিসেবে বলা হয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ধরনের প্রশ্ন অপছন্দ করেন; কেননা ক্ষমা করা সর্বদাই ভালো কাজ। যত বেশি ক্ষমা করবে তত বেশি প্রতিদান পাবে। অতএব এখানে নির্ধারিত সংখ্যার প্রশ্নের কোনো প্রয়োজন নেই। অথবা এও হতে পারে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিতে ওয়াহীর অপেক্ষা করেন। আল্লাহই ভালো জানেন।
(كُلَّ يَوْمٍ سَبْعِينَ مَرَّةً) প্রতিদিন সত্তরবার হলেও। অর্থাৎ প্রতিদিন সত্তরবার ক্ষমা করার প্রয়োজন পড়লেও ক্ষমা কর। সত্তরবার উল্লেখ করে আধিক্য বুঝানো উদ্দেশ্য। নির্ধারিত সত্তর সংখ্যা উদ্দেশ্য নয়। বরং উদ্দেশ্য হলো বেশি বেশি ক্ষমা কর, যত বেশি পারো ক্ষমা কর। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫১৫৫)
প্রত্যেক ভাষাতেই এমন ব্যবহার রয়েছে। অর্থাৎ সংখ্যা বলে নির্ধারিত সংখ্যা উদ্দেশ্য না করে অধিক বুঝানো হয়ে থাকে।
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৬৮-[২৭] আর তিরমিযী (রহঃ) ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।[1]
وَرَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৬৯-[২৮] আবূ যার্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের অধীনস্থ দাস-দাসীকে নিজেরা যা খাবে, তাকেও তাই খাওয়াবে; নিজেরা যা পরিধান করবে, তাকেও তাই পরিধান করাবে। আর যারা তোমাদের (অধীনস্থ) উপযোগী বা মানানসই নয়, তাদের বিক্রি করে দাও এবং তোমরা আল্লাহর বান্দাকে কষ্ট দিও না। (আহমাদ, আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ لَاءَمَكُمْ مِنْ مَمْلُوكِيكُمْ فَأَطْعِمُوهُ مِمَّا تَأْكُلُونَ وَاكْسُوهُ مِمَّا تَكْسُونَ وَمَنْ لَا يُلَائِمُكُمْ مِنْهُمْ فَبِيعُوهُ وَلَا تُعَذِّبُوا خَلَقَ اللَّهِ» . رَوَاهُ أَحْمد وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (لَاءَمَكُمْ) ‘আরবী শব্দ (المُلاءَمَةُ) থেকে নির্গত। যার অর্থ উপযোগী হওয়া, খাপ খাওয়া, সন্ধি হওয়া ইত্যাদি। হাদীসের অর্থ হলো, যে গোলামের সাথে তোমাদের খাপ খায় তথা বনিবনা হয় তাকে নিজে যা খাও খাওয়ায়, নিজে যা পরিধান করো তাকে পরিধান করাও। অর্থাৎ তাকে সাথে রাখো এবং তার সাথে কোনো বৈষম্য আচরণ করো না। তবে ইতোপূর্বে এই মর্মের হাদীসের আলোচনায় আমরা জেনেছি যে, মালিকের সাদৃশ্য হুবহু খাবার ও পরিধেয় বস্তু গোলামকে দেয়ার হুকুমটি মুস্তাহাব পর্যায়ের। তবে গোলামকে তার জন্য প্রচলিত মানের খাবার ও পরিধেয় বস্তু অবশ্যই দিতে হবে। এতে কৃপণ করা যাবে না।
(وَمَنْ لَا يُلَائِمُكُمْ مِنْهُمْ فَبِيْعُوْهُ) আর গোলামের মধ্যে যে তোমাদের উপযোগী না হয় তাকে বিক্রি করে দাও। অর্থাৎ গোলামের সাথে বনিবনা না হলে তাকে প্রহার করবে না, বরং বিক্রি করে দিবে; কেননা আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্টিকে কষ্ট দেয়া জায়িয নয়। বনিবনা না হওয়ার কারণে অনেক সময় অযথা তাকে কষ্ট দিতে পার যা তোমার গুনাহের কারণ হবে। পরবর্তীতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্টিকে কষ্ট না দেয়ার বিষয়টি ব্যাপক আকারে নির্দেশ দিয়ে বলেন, (وَلَا تُعَذِّبُوْا خَلَقَ اللّٰهِ) আল্লাহর সৃষ্টিকে কষ্ট দিয়ো না। অর্থাৎ আল্লাহর তা‘আলার কোনো সৃষ্টিকেই কষ্ট দেয়া যাবে না। আল্লাহর দাসকে কষ্ট দিয়ো না বলে সাধারণভাবে আল্লাহর সৃষ্টির কষ্ট না দেয়ার কথার বলার মাঝে দু’টি ফায়েদা রয়েছে। (এক) গোলামকে যেমন কষ্ট দেয়া জায়িয নেই তেমনি আল্লাহর কোনো সৃষ্টিকেই অন্যায় কষ্ট দেয়া জায়িয নেই। গোলামকে কষ্ট না দেয়ার কথা বলতে গিয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যান্য সৃষ্টির কথাও ঢুকিয়ে দিলেন। (দুই) যে কোনো সৃষ্টির কষ্ট দেয়ার কথা নিষেধ করলে গোলামের কষ্ট দেয়ার নিষেধাজ্ঞা আরো দৃঢ় হয়। কেননা যে কোন সৃষ্টিকে কষ্ট দেয়া যেখানে নিষেধ, সেখানে গোলাম সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ, সেই তুলনায় তাকে কষ্ট আরো বেশি খারাপ ও নিষেধের আওতায় পড়বে। মোটকথা, ব্যাপকভাবে বলে গোলামকে কষ্ট দেয়ার নিষেধাজ্ঞা দৃঢ় করা উদ্দেশ্য। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৭০-[২৯] সাহল ইবনু হানযালিয়্যাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি উটের পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে দেখতে পেলেন যে, তার পিঠ পেটের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমরা এ জাতীয় বাকশক্তিহীন পশুদের (সওয়ারীদের) ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা এদের উপর আরোহণ এবং অবতরণ সর্বাবস্থায় সুস্থ ও সবল রাখ। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن سهلِ بنِ الحَنظلِيَّةِ قَالَ: مَرَّ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِبَعِيرٍ قَدْ لَحِقَ ظَهْرُهُ بِبَطْنِهِ فَقَالَ: «اتَّقُوا اللَّهَ فِي هَذِهِ الْبَهَائِمِ الْمُعْجَمَةِ فَارْكَبُوهَا صَالِحَة واترُكوها صَالِحَة» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: উপরোক্ত হাদীসে উটকে কষ্ট দেয়া নিষেধাজ্ঞার অধীনে অন্য সৃষ্টিকে কষ্ট না দেয়ার বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছিল। বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টভাবে অন্য সৃষ্টি যেমন প্রাণীকে কষ্টের নিষেধের ব্যাপারটি বর্ণনা করেন।
(قَدْ لَحِقَ ظَهْرُه بِبَطْنِه) পিঠ পেটের সাথে মিলে গেছে। অর্থাৎ উটকে যথাযথ খাবার না দেয়ার কারণে তার পেট খালি হয়ে পিটের সাথে মিলে গেছে। উটের এই অবস্থা দেখে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
(اتَّقُوا اللّٰهَ فِىْ هٰذِهِ الْبَهَائِمِ الْمُعْجَمَةِ) কথা বলতে পারে না এই চতুষ্পদের ব্যাপারে তোমরা আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় কর। অর্থাৎ আল্লাহকে ভয় করে এদের সাথে ভালো আচরণ কর। এদের যত্ন নাও।
الْبَهَائِمِ শব্দটি بَهِيْمِةٌ শব্দের বহুবচন। অহিংস্র চতুষ্পদ প্রাণীকে ‘আরবীতে ‘বাহীমাতুন’ বলা হয়।
الْمُعْجَمَةِ শব্দের অর্থ বোবা, যে কথা বলতে পারে না। অর্থাৎ সে মালিকের কাছে তার ক্ষুধা, পিপাসা ইত্যাদির কথা তুলে ধরতে পারে না। তাই তার মালিককেই তার প্রতি খেয়াল রাখতে হবে।
মুল্লা ‘আলী কারী (রহঃ) বলেনঃ এ হাদীসটির দলীল হলো, মালিকের জন্য প্রাণীর ঘাস ইত্যাদি খাবারের ব্যবস্থা করা ওয়াজিব। শাবক মালিককে এর উপর বাধ্য করতে পারে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
(فَارْكَبُوْهَا صَالِحَةً) তার উপর আরোহণ কর সে উপযুক্ত থাকা অবস্থায়। অর্থাৎ প্রাণীর উপর চড়তে বা আরোহণ করতে হলে দেখ সে তোমাকে বহন করার ক্ষমতা রাখে কিনা। তোমাকে নিয়ে চলার ক্ষমতা রাখে কিনা। প্রাণী সেই ক্ষমতা না রাখলে তার উপর চড়া বা অতিরিক্ত বোঝা যা সে বহনের ক্ষমতা রাখে না তা চাপানো জায়িয নয়।
(وَاتْرُكُوْهَا صَالِحَةً) তাকে ছেড়ে দাও উপযুক্ত থাকা অবস্থায়। অর্থাৎ প্রাণীর উপর আরোহণ করলে বা বোঝা চাপালে সে ক্লান্ত হয়ে অক্ষম হওয়ার পূর্বে আরোহণ ত্যাগ করো এবং বোঝা নামিয়ে নাও। প্রাণী ক্লান্ত হয়ে নুয়ে পড়লে বা চলতে অক্ষম হলে তা তাকে কষ্ট দেয়ার অন্তর্ভুক্ত। তাই এ প্রাণী এই কঠিন পরিস্থিতিতে পৌঁছার পূর্বে আরোহণ ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। অর্থাৎ আরোহণ করা এবং না করা সর্বাবস্থায় সুস্থ ও সবল রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
পরিচ্ছেদঃ ১৭. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৭১-[৩০] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন কুরআন মাজীদের এ আয়াত ’’তোমরা ইয়াতীমের সম্পদের নিকটবর্তী হয়ো না উত্তম পন্থা ছাড়া’’- (সূরা আল আন্’আম্ ৬ : ১৫২) এবং এ আয়াত ’’যারা ইয়াতীমের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করে’’- (সূরা আন্ নিসা ৪ : ১০) নাযিল হলো, তখন যাদের অধীনস্থ ইয়াতীম ছিল, তারা তাদের স্বীয় খাদ্য হতে তার খাদ্য, তাদের স্বীয় পানীয় হতে তার পানীয় পৃথক করতে লাগল। এভাবে যখন ইয়াতীমের খাদ্য ও পানীয় যা উদ্বৃত্ত হতো তখন তা তাদের জন্য রেখে দিতে লাগল, পরে ইয়াতীম আহার্য করত অথবা নষ্ট হয়ে যেতো। এটা ইয়াতীমদের তত্ত্বাবধায়কদের জন্য সঠিন মনে হলো। এমতাবস্থায় তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এতদসম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা এ আয়াত নাযিল করলেন ’’লোকেরা আপনাকে ইয়াতীমদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে; বলুন, তাদের সুব্যবস্থা করা উত্তম। আর তোমরা যদি তাদের সাথে থাক, তবে তারা তো তোমাদের ভাই’’- (সূরা আল বাকারা ২ : ২২০)। অতঃপর তারা ইয়াতীমদের খাদ্য ও পানীয় নিজেদের খাদ্যের সাথে একত্রিত করল। (আবূ দাঊদ, নাসায়ী)[1]
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: لَمَّا نَزَلَ قَوْلُهُ تَعَالَى (وَلَا تَقْرَبُوا مَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أحسن)
وَقَوْلُهُ تَعَالَى: (إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتَامَى ظُلْمًا)
الْآيَةَ انْطَلَقَ مَنْ كَانَ عِنْدَهُ يَتِيمٌ فَعَزَلَ طَعَامه من طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ مِنْ شَرَابِهِ فَإِذَا فَضَلَ مِنْ طَعَامِ الْيَتِيمِ وَشَرَابِهِ شَيْءٌ حُبِسَ لَهُ حَتَّى يَأْكُلَهُ أَوْ يَفْسُدَ فَاشْتَدَّ ذَلِكَ عَلَيْهِمْ فَذَكَرُوا ذَلِكَ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى: (وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْيَتَامَى قُلْ: إصْلَاح لَهُم خير وَإِن تخالطوهم فإخوانكم)
فَخَلَطُوا طَعَامَهُمْ بِطَعَامِهِمْ وَشَرَابَهُمْ بِشَرَابِهِمْ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: وَلَا تَقْرَبُوا مَالَ الْيَتِيمِ ‘‘ইয়াতীমের মালের কাছে যেও না’’- (সূরা আল আন্‘আম ৬ : ১৫২)। অর্থাৎ ইয়াতীম সন্তান যাদের লালন পালনের দায়িত্বে রয়েছে তোমরা ইয়াতীমের মালে অন্যায়ভাবে হস্তক্ষেপ করো না। অন্যায় হস্তক্ষক্ষপের নিষেধাজ্ঞাকে জোরালো করতে কাছে না যাওয়ার কথা বলা হয়েছে; কেননা সাথে সাথে আল্লাহ বলেনঃ إِلَّا بِالَّتِىْ هِيَ أَحْسَنُ অর্থাৎ তবে উত্তম পন্থায় হলে ভিন্ন কথা। তাই ন্যায়সঙ্গত হস্তক্ষেপ, যেমন- ইয়াতীমের স্বার্থে তার সম্পদ ব্যয় করা, ইয়াতীমকে লালনকারী দরিদ্র হলে ন্যায় লালনের পারিশ্রমিক হিসেবে ন্যায়সঙ্গত আহার গ্রহণ করা জায়িয।
إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتَامٰى ظُلْمًا (সূরা আন্ নিসা ৪ : ১০) আয়াতের পরবর্তী অংশ إِنَّمَا يَأْكُلُوْنَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًا وَسَيَصْلَوْنَ سَعِيرًا (সূরা আন্ নিসা ৪ : ১০) অর্থাৎ যারা ইয়াতীমের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে তারা নিজ পেটে আগুন খায় এবং অচিরেই তারা জাহান্নামের আগুনে মিলিত হবে।
এই কঠিন বিধান শুনে সহাবায়ে কিরাম ইয়াতীমের মাল সম্পূর্ণ পৃথক করা আরম্ভ করলেন, এমনকি তাদের জন্য আলাদা রান্না, আলাদা খাবার ইত্যাদি ব্যবস্থা করলেন। ইয়াতীমের খাবার বেঁচে গেলে তা নষ্ট হতো তবুও কেউ তাতে হাত দিতো না। একই পরিবারে এভাবে চলাফেরা অত্যন্ত কষ্টকর হলে সহাবায়ে কিরাম রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গিয়ে বিষয়টির সুরাহা কামনা করেন। তখন নাযিল হয়ঃ
وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْيَتَامٰى قُلْ إِصْلَاحٌ لَهُمْ خَيْرٌ وَإِنْ تُخَالِطُوهُمْ فَإِخْوَانُكُمْ
‘‘তারা আপনাকে ইয়াতীমদের মাল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলে দিন, তাদের জন্য সঠিভাবে গুছিয়ে দেয়া উত্তম, আর যদি তাদের ব্যয়ভার নিজেদের সাথে মিশিয়ে নাও তবে মনে করবে তারা তোমাদের ভাই।’’
(إِصْلَاحٌ لَهُمْ) তাদের মালামাল পৃথক করে গুছিয়ে রাখাটাই সর্বোত্তম।
(وَإِنْ تُخَالِطُوهُمْ فَإِخْوَانُكُمْ) অর্থাৎ গুছিয়ে রাখা কষ্টকর হলে তারা তোমাদের ভাই হিসেবে তাদের মাল তোমাদের মালের সাথে মিশিয়ে নিতে পার। অর্থাৎ মিশিয়ে নেয়াটা হবে কঠিন ঝামেলা এড়ানোর জন্য। তাদের মাল ভোগ করার জন্য নয়। তাই এই বাক্যের পরেই আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَاللّٰهُ يَعْلَمُ الْمُفْسِدَ مِنَ الْمُصْلِحِ অর্থাৎ ‘‘কে মাল ফাসিদকারী আর কে কল্যাণকামী তা আল্লাহ তা‘আলা জানেন।’’ (সূরা আল বাকারা ২ : ২২০)
এতএব এ আয়াত নাযিল হলে সহাবায়ে কিরাম অবকাশ পান এবং ইয়াতীমদের খাবার ও পানীয় তাদের খাবার ও পানীয়ের সাথে একত্রিত করেন। (ইবনু কাসীর বর্ণিত আয়াতের অধীনে)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৭২-[৩১] আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লা’নাত করেছেন, যে ব্যক্তি পিতা পুত্রের মধ্যে এবং দুই ভাইয়ের মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ ঘটায়। (ইবনু মাজাহ, দারাকুত্বনী)[1]
وَعَن أبي مُوسَى قَالَ: لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ فَرَّقَ بَيْنَ الْوَالِدِ وَوَلَدِهِ وَبَيْنَ الْأَخِ وَبَيْنَ أَخِيهِ. رَوَاهُ ابْنُ مَاجَهْ وَالدَّارَقُطْنِيُّ
ব্যাখ্যা: এই মর্মের হাদীস আমরা ইতোপূর্বে দেখে এসেছি। এ হাদীসটি আরেকটি কথার উপর ইঙ্গিত বহন করে যে, বিচ্ছিন্ন করা হারাম হওয়ার সম্পর্ক কেবল পিতা-মাতা ও সন্তানের সাথে নয়।
পরিচ্ছেদঃ ১৭. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৭৩-[৩২] ’আব্দুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট যখন যুদ্ধবন্দী হয়ে আসতো তখন তাদের মাঝে যাতে সম্পর্কচ্ছেদ না ঘটে, সেজন্য এক পরিবারের সকলকে এক ব্যক্তির অধীন করে দিতেন। (ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا أُتِيَ بِالسَّبْيِ أَعْطَى أَهْلَ الْبَيْتِ جَمِيعًا كَرَاهِيَةَ أَنْ يفرق بَينهم. رَوَاهُ ابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: (بِالسَّبْىِ) শব্দের অর্থ বন্দী বা বন্দিনী। যুদ্ধে যাদেরকে বন্দী করে নিয়ে আসা হয়, তারা গোলাম বা দাসী হয়।
এক্ষেত্রে এক পরিবারের ছোট বড় বন্দী হয়ে থাকলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মাঝে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করতেন না। অর্থাৎ এক পরিবারের সদস্যদেরকে বণ্টন করে কয়েকজনকে দিতেন না। বরং সবাইকে একজনের কাছে দিতেন যাতে তারা একাকিত্ব অনুভব না করে।
এ হাদীসটিও এই কথা প্রমাণ করে যে, বিচ্ছিন্নতা অবৈধ হওয়া কেবল পৈত্রিক সম্পর্কের সাথে সীমাবদ্ধ নয়। (সম্পাদক)
পরিচ্ছেদঃ ১৭. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৭৪-[৩৩] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি কি তোমাদের মাঝে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তির ব্যাপারে বলব না? সে হলো যে একাকী খায়, স্বীয় দাসকে প্রহার করে এবং দান-সাদাকা হতে বিরত থাকে। (রযীন)
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «أَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِشِرَارِكُمُ؟ الَّذِي يَأْكُلُ وَحْدَهُ وَيَجْلِدُ عَبْدَهُ وَيَمْنَعُ رِفْدَهُ» . رَوَاهُ رزين
ব্যাখ্যা: হাদীসটিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তির কথা বলেন। যার মাঝে এই সব গুণাবলী বিদ্যমান থাকবে সে নিকৃষ্ট ব্যক্তি বলে গণ্য। এই মন্দ গুণাবলী একটি: (الَّذِىْ يَأْكُلُ وَحْدَه) ‘‘যে একাকি খায়’’। অর্থাৎ অহংকার ও কৃপণতাবশত তার খাবারে অন্য কাউকে অংশীদার বানায় না। দ্বিতীয় মন্দ গুণ : (وَيَجْلِدُ عَبْدَه) এবং দাসকে প্রহার করে। অর্থাৎ অন্যায়ভাবে তার মালিকানাভুক্তদের প্রহার করে। তৃতীয়তঃ (وَيَمْنَعُ رِفْدَه) এবং দান করতে বাধা দেয়।
হাদীসের সার হলো, যার মাঝে কৃপণতা ও মন্দ আচরণ থাকবে সে সর্বাধিক নিকৃষ্ট ব্যক্তি। এ হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কৃপণতা ও মন্দ আচরণের তিনটি দিক তুলে ধরেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ১৭. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - স্ত্রীর খোরপোষ ও দাস-দাসীর অধিকার
৩৩৭৫-[৩৪] আবূ বকর আস্ সিদ্দীক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দাস-দাসীর সাথে অসদাচরণকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনি কি আমাদেরকে ইতঃপূর্বে বলেননি যে, সকল উম্মাতের তুলনায় আপনার উম্মাতের মধ্যে অধিকহারে দাস-দাসী ও ইয়াতীম হবে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, হ্যাঁ। তবে তোমরা যদি জান্নাতে প্রবেশ করতে চাও, তাহলে তাদেরকে স্বীয় সন্তান-সন্ততির মতো সদ্ব্যবহার কর। যা নিজেরা খাও তাদেরকেও তাই খাওয়াও। তারা জিজ্ঞেস করল, তারা আমাদের পার্থিব কি উপকারে আসবে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এমন ঘোড়সওয়ার, যা তুমি শত্রুর বিরুদ্ধে আল্লাহর পথে জিহাদের উদ্দেশে বেঁধে রাখ। আর এমন দাস, যা তোমার কাজকর্মের জন্য যথেষ্ট। আর যখন সে সালাত আদায় করে, তখন সে তোমার ভাই। (ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ أَبِي بَكْرٍ الصِّدِّيقِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ سَيِّئُ الْمَلَكَةِ» . قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَلَيْسَ أَخْبَرْتَنَا أَنَّ هَذِهِ الْأُمَّةَ أَكْثَرُ الْأُمَمِ مَمْلُوكِينَ وَيَتَامَى؟ قَالَ: «نَعَمْ فَأَكْرِمُوهُمْ كَكَرَامَةِ أَوْلَادِكُمْ وَأَطْعِمُوهُمْ مِمَّا تَأْكُلُونَ» . قَالُوا: فَمَا تنفعنا الدُّنْيَا؟ قَالَ: «فَرَسٌ تَرْتَبِطُهُ تُقَاتِلُ عَلَيْهِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَمَمْلُوكٌ يَكْفِيكَ فَإِذَا صَلَّى فَهُوَ أَخُوكَ» . رَوَاهُ ابْنُ مَاجَهْ
ব্যাখ্যা: (سَيِّئُ الْمَلَكَةِ) ‘‘মালিকানায় মন্দ আচরণকারী’’। অর্থাৎ যে মালিক তার মালিকানাভুক্ত দাসদের সাথে অন্যায় আচরণ করে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। জান্নাতে প্রবেশ করবে না বলতে প্রথমেই জান্নাতে প্রবেশ করবে না উদ্দেশ্য। তবে তার এই অন্যায় আচরণের শাস্তি ভোগ করার পর আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছায় সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। কেননা যার মাঝে অণু পরিমাণ ঈমান রয়েছে সেও জান্নাতে প্রবেশ করবে বলে আমরা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী থেকেই জানতে পারি। অর্থাৎ অন্যায়ের শাস্তি ভোগ করার পর সব মু’মিনই একদিন জান্নাতে প্রবেশ করবে।
(أَلَيْسَ أَخْبَرْتَنَا أَنَّ هٰذِهِ الْأُمَّةَ) ‘‘আপনি কি আমাদেরকে খবর দেননি যে,...’’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সাহাবীদের এই প্রশ্নের সারমর্ম হলো, হে রসূল! আপনি যখন বললেন, মালিকানাভুক্ত দাসদের সাথে অন্যায় আচরণকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না। অতএব আপনার এই উম্মাত যখন সবচেয়ে বেশি দাস-দাসীর অধিকারী তখন তাদের জন্য সবার সাথে নরম আচরণ সম্ভব নয়। তাই তারা স্বাভাবিকতই তাদের সাথে মন্দ আচরণ করবে। অতএব তাদের অবস্থা এবং শেষ পরিণাম কি হবে?
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের প্রশ্নের উত্তরে বললেন, হ্যাঁ। তবে ভয়ের তো কারণ নেই। তোমরা জান্নাতে না যাওয়ার মন্দ পরিণাম থেকে বাঁচতে দাস-দাসীদের যথাযথ মর্যাদা রক্ষা কর, যেমন তোমাদের সন্তানদের যথাযথ মূল্যায়ন করে থাক এবং তাদেরকে খাওয়ায় যা তোমরা নিজে যা খাও।
সাহাবীরা আবার প্রশ্ন করলেন যার সার হলো, দুনিয়ায় দাসদের এমন মূল্যায়ন করতে হলে দুনিয়ায় তাদের দিয়ে আমাদের লাভ কি? রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের এই প্রশ্নের উত্তর একটি উপমা সহ পেশ করলেন। অর্থাৎ ঘোড়া যেমন আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় জিহাদের জন্য বেঁধে রেখেছো কেবল আখিরাতের সাওয়াব পাওয়ার জন্য, তবে তার দ্বারা দুনিয়ার উদ্দেশ্য না থাকলেও জিহাদে গিয়ে গনীমাতের মাল পাওয়ার মাধ্যমে দুনিয়াবী উদ্দেশ্য অর্জিত হয়ে যায়। ঠিক তদ্রূপ দাস থাকায় তুমি নিজে আখিরাতের কাজে মনোযোগ দিতে পারছো। সে না থাকলে তোমাকে আখিরাতের কর্ম ছেড়ে দুনিয়াবী অনেক কাজ-কর্ম করতে হতো। গোলাম তোমার সেই কাজের জন্য যথেষ্ট হওয়ায় তুমি নির্বিঘ্নে আখিরাতের কর্ম করতে পারছো। এটাই তোমার দুনিয়ার স্বার্থকতা। তারপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি যেমন তার মাধ্যমে আখিরাতের কর্মের সুযোগ পাচ্ছ তাকেও আখিরাতের কর্ম সালাত আদায়ের সুযোগ দাও। দাস যখন সালাত আদায় করছে তখন সে তোমার ভাই।
পরিচ্ছেদঃ ১৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - শিশুর বালেগ হওয়া ও ছোট বেলায় তাদের প্রতিপালন প্রসঙ্গে
৩৩৭৬-[১] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি যখন উহুদ যুদ্ধে শামিল হবার উদ্দেশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট নিজেকে পেশ করলাম, তখন আমার বয়স ১৪ বছর। কিন্তু তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অসম্মতি জানালেন। অতঃপর ১৫ বছর বয়সে খন্দাকের যুদ্ধে নিজেকে পেশ করলে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অনুমতি দিলেন। (এ হাদীস শুনে) পরবর্তীকালে খলীফা ’উমার ইবনু ’আব্দুল ’আযীয (রহঃ) বলেন, এটাই হলো মুজাহিদ ও বালকের মাঝে বয়সের পার্থক্য নির্ণয়কারী। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ بُلُوْغِ الصَّغِيْرِ وَحَضَانَتِه فِى الصِّغَرِ
عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: عُرِضْتُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَامَ أُحُدٍ وَأَنَا ابْنُ أَرْبَعَ عَشْرَةَ سَنَةً فَرَدَّنِي ثُمَّ عُرِضْتُ عَلَيْهِ عَامَ الْخَنْدَقِ وَأَنَا ابْنُ خَمْسَ عَشْرَةَ سَنَةً فَأَجَازَنِي فَقَالَ عُمَرُ بْنُ عَبْدِ الْعَزِيزِ: هَذَا فَرْقُ مَا بَين الْمُقَاتلَة والذرية
ব্যাখ্যা: (عَامَ أُحُدٍ) উহুদ যুদ্ধের বছর। তৃতীয় হিজরী সনের শাও্ওয়াল মাসে উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। আবার অধিকাংশ ঐতিহাসিকদের মতে খন্দাক যুদ্ধ পঞ্চম হিজরী সনে সংঘটিত হয়। এই হিসেবে উহুদ যুদ্ধের সময় ইবনু ‘উমার -এর বয়স চৌদ্দ বছর হলে খন্দাক যুদ্ধকালে তার বয়স পনের না হয়ে ষোল হওয়ার কথা। তবে ইমাম বুখারী (রহঃ) হাদীসটিকে এই জোরালো আপত্তির প্রতি ভ্রূক্ষেপ করা ছাড়াই উল্লেখের কারণ হিসেবে বলা হয়, তিনি ঐতিহাসিক মূসা ইবনু ‘উকবার কথার প্রতি ধাবিত ছিলেন। আর মূসা বিন ‘উকবার মতে খন্দাক যুদ্ধ চতুর্থ হিজরীতে সংঘটিত হয়। চতুর্থ হিজরী সংঘটিত হওয়ার পক্ষে বর্ণিত হাদীসটিকে দলীল বানানো হয়। কেননা উহুদ তৃতীয় হিজরীতে, সে সময় ইবনু ‘উমারের বয়স চৌদ্দ, আবার খন্দাকে তার বয়স পনের হয়েছে বলে তিনি নিজে উল্লেখ করছেন। অতএব খন্দাক যুদ্ধ চতুর্থ হিজরী হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে ঐতিহাসিক ইবনু ইসহকসহ অধিকাংশের মতে খন্দাক যুদ্ধ পঞ্চম হিজরীতেই সংঘটিত হয়েছে। ঐতিহাসিক বাস্তবতার আলোকে তা প্রমাণিত হয়েছে। অতএব ইবনু ‘উমারের কথা দিয়ে খন্দাক যুদ্ধ চতুর্থ হিজরীতে হয়েছে এ কথা বলার সুযোগ নেই। বরং ইবনু ‘উমারের কথারই ব্যাখ্যা করতে হবে।
খন্দাক পঞ্চম হিজরীতে হলে এ সময় ইবনু ‘উমারের বয়স ষোল হওয়ার কথা। কিন্তু তিনি নিজে তার বয়স পনের বলে উল্লেখ করার দরুন যে প্রশ্নের উদ্রেক হয় তার উত্তর ইমাম বায়হাক্বী এবং অন্যান্যরা এই বলে দেন যে, ইবনু ‘উমারের কথা : ‘‘উহুদের যুদ্ধে আমাকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে পেশ করা হয়, যে সময় আমার বয়স চৌদ্দ’’, তার মানে আমি চৌদ্দ বছরে প্রবেশ করেছি। এরপর তার কথা: ‘‘খন্দাকের যুদ্ধে আমাকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামনে পেশ করা হয়, যে সময় আমার বয়স পনের’’, অর্থাৎ পনের পার করেছি। পনের পার হয়ে ষোল বছরের যে কয় মাস তা তিনি হিসেবে আনেননি। বয়সের বর্ণনার ক্ষেত্রে এ ধরনের ব্যবহারের প্রচলন অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। এভাবে ইবনু ‘উমার -এর কথা এবং ঐতিহাসিক বাস্তবতা উভয়টি সঠিক হয়ে যায়। (ফাতহুল বারী ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬৬৪)
هٰذَا فَرْقُ مَا بَيْنَ الْمُقَاتَلَةِ وَالذُّرِّيَّةِ ‘‘এটা হলো যোদ্ধা ও বাচ্চার বয়সের পার্থক্য।’’ এই বাক্যের দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, অপ্রাপ্ত বয়স্ক বাচ্চা যখন পনের বছর বয়সে উপনীত হবে তখন সে যোদ্ধার তালিকায় প্রবেশ করবে এবং যোদ্ধাদের রেজিস্ট্রিতে তার নাম যুক্ত করা হবে। আর বয়স পনের উপনীত না হলে সে বাচ্চাদের তালিকায় থাকবে। তাকে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমোদন দেয়া হবে না।
এ হাদীস থেকে ‘উলামায়ে কিরাম আরেকটি মাসআলাহ্ বের করেন। মাসআলাটি হলো, নাবালক বা অপ্রাপ্ত বাচ্চার মাঝে বালেগ বা সাবালক হওয়ার অন্যান্য নিদর্শন যেমন স্বপ্নদোষ হওয়া বা নাভীর নিচের লোম প্রকাশ না পাওয়া গেলে পনের বছর বয়সকেই তার সময়সীমা ধরা হবে এবং এই বয়স থেকেই সে সাবালক বা প্রাপ্তবয়স্ক গণ্য হবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - শিশুর বালেগ হওয়া ও ছোট বেলায় তাদের প্রতিপালন প্রসঙ্গে
৩৩৭৭-[২] বারা ইবনু ’আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুদায়বিয়ার সন্ধিতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার কুরায়শদের সাথে তিনটি বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ হন। (প্রথমত) মুশরিকদের মধ্য হতে কেউ মুসলিমদের নিকট উপস্থিত হলে তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে; কিন্তু মুসলিমদের কেউ কাফিরদের নিকট ধৃত হলে তারা ফেরত পাঠাবে না। (দ্বিতীয়ত) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ বছর চলে যাবেন, পরবর্তী বছর ’উমরার উদ্দেশে মক্কায় প্রবেশ ও তিনদিন সেখানে অবস্থান করতে পারবেন। [তৃতীয়ত ’আরবের যে কোনো গোত্র যে কোনো পক্ষের সাথে সন্ধির সাথে যুক্ত হতে পারবে।] সন্ধির শর্তানুযায়ী যখন পরবর্তী বছর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মক্কায় প্রবেশ করলেন ও সেখানে অবস্থানের সময়সীমা শেষ হলো, তখন তিনি মক্কা হতে রওয়ানা হলেন। তখন হামযাহ্ (রাঃ)-এর শিশুকন্যা ’হে চাচা’ ’হে চাচা’ বলে তাঁর অনুসরণ করে ডাকতে লাগল। ’আলী তাকে হাত ধরে তুলে নিলেন।
অতঃপর ঐ কন্যার লালন-পালনে ’আলী , যায়দ ও জা’ফার - এই তিনজনের মধ্যে বিরোধ দেখা দিল। ’আলী বললেন, আমিই তাকে প্রথম উঠিয়েছি এবং সে আমার চাচাত বোন। জা’ফার বললেন, সে তো আমারও চাচাত বোন এবং তার খালা আমার সহধর্মিণী। যায়দ বললেন, সে তো আমার ভাতিজি। এমতাবস্থায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খালার পক্ষে রায় দিয়ে বললেন, খালা মাতৃসম। অতঃপর ’আলীকে বললেন, তুমি আমার, আমি তোমার (আপনজন)। জা’ফারকে বললেন, তুমি আমার শারীরিক গঠন ও চারিত্রিক গুণের সাদৃশ্যের অধিকারী। আর যায়দকে বললেন, তুমি আমারই ভাই, আমাদের প্রিয়তম। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ بُلُوْغِ الصَّغِيْرِ وَحَضَانَتِه فِى الصِّغَرِ
وَعَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ قَالَ: صَالَحَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ الْحُدَيْبِيَةِ عَلَى ثَلَاثَةِ أَشْيَاءَ: عَلَى أَنَّ مَنْ أَتَاهُ مِنَ الْمُشْرِكِينَ رَدَّهُ إِلَيْهِمْ وَمَنْ أَتَاهُمْ مِنَ الْمُسْلِمِينَ لَمْ يَرُدُّوهُ وَعَلَى أَنْ يَدْخُلَهَا مِنْ قَابِلٍ وَيُقِيمَ بِهَا ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ فَلَمَّا دَخَلَهَا وَمَضَى الْأَجَلُ خَرَجَ فَتَبِعَتْهُ ابْنَةُ حَمْزَةَ تُنَادِي: يَا عَمِّ يَا عَمِّ فَتَنَاوَلَهَا عَلِيٌّ فَأَخَذَ بِيَدِهَا فَاخْتَصَمَ فِيهَا عَلِيٌّ وَزَيْدٌ وَجَعْفَرٌ قَالَ عَلِيٌّ: أَنَا أَخَذْتُهَا وَهِيَ بِنْتُ عَمِّي. وَقَالَ جَعْفَرٌ: بِنْتُ عَمِّي وَخَالَتُهَا تَحْتِي وَقَالَ زَيْدٌ: بِنْتُ أَخِي فَقَضَى بِهَا النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِخَالَتِهَا وَقَالَ: «الْخَالَةُ بِمَنْزِلَةِ الْأُمِّ» . وَقَالَ لَعَلِيٍّ: «أَنْتَ مِنِّي وَأَنَا مِنْكَ» وَقَالَ لِجَعْفَرٍ: «أَشْبَهْتَ خَلْقِي وَخُلُقِي» . وَقَالَ لزيد: «أَنْت أخونا ومولانا»
ব্যাখ্যা: (فَلَمَّا دَخَلَهَا وَمَضَى الْأَجَلُ خَرَجَ) অর্থাৎ হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তি মোতাবেক মক্কায় প্রবেশ করে তিন দিন সময় অতিবাহিত করে যখন মক্কা ত্যাগের সময় এসে গেল রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেরিয়ে পড়লেন।
(يَا عَمِّ يَا عَمِّ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেরিয়ে আসার সময় হামযাহ্ -এর মেয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ‘চাচা’ ‘চাচা’ বলে ডাক দিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চাচা হামযাহ্ উহুদের যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করলে হামযাহ্ -এর এই মেয়ে ইয়াতীম হয়ে যায়। হামযাহ্ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চাচা বিধায় ইয়াতীম মেয়েটি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চাচাতো বোন। এরপরও সে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ভাই না ডেকে চাচা ডাকার কারণ হলো রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হামযাহ্ এবং যায়দ দুধ সম্পর্কের ভাই ছিলেন। এই হিসেবে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হামযাহ্ -এর মেয়ের দুধ সম্পর্কের চাচা।
(فَقَضٰى بِهَا النَّبِىُّ ﷺ لِخَالَتِهَا) অর্থাৎ হামযাহ্ -এর ইয়াতীম মেয়েকে লালনের দায়িত্ব নিয়ে ‘আলী , জা‘ফার এবং যায়দ -এর মাঝে টানাটানি শুরু হয়। প্রত্যেকেই অধিকারের দাবী করেন এবং সবাই যার যার যুক্তি উপস্থাপন করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেয়ের লালনের দায়িত্ব তাদের কাউকে না দিয়ে তাঁর খালা যায়নাব-এর হাতে ন্যস্ত করেন।
এ হাদীস থেকেই ‘উলামায়ে কিরামের অনেকে যেমন ইমাম মালিক, ইমাম যুফার মায়ের অনুপস্থিতিতে ইয়াতীম সন্তানের লালনের দায়িত্ব পালনে খালার অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। অর্থাৎ লালন পালনের দায়িত্বে মায়ের পরেই খালার স্থান। কেননা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই হাদীসে খালার কাছে দায়িত্ব ন্যস্ত করার সাথে সাথে খালাকে মায়ের সমতুল্য গণ্য করে বলেন, (الْخَالَةُ بِمَنْزِلَةِ الْأُمِّ) অর্থাৎ খালা মায়ের সমতুল্য। যদিও অনেকে সেণহের দিক বিবেচনায় মায়ের অনুপস্থিতিতে নানী লালনের যোগ্য থাকলে নানীকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন; কেননা নানীর স্নেহ খালার চেয়ে বেশি এবং মায়ের মা হিসেবে তার অগ্রাধিকার বেশি। তাদের এই মতকে বর্ণিত হাদীসের ঘটনা দিয়ে খন্ডন করার যুক্তি নেই। কেননা নানী না থাকায় বা নানী পালনের যোগ্য বা আগ্রহী না থাকার কারণে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই ফায়সালা দিয়ে থাকার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
(وَقَالَ لَعَلِىٍّ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আলী, জা‘ফার, যায়দ -এর কারো জন্য ফায়সালা না করে খালার জন্য ফায়সালা করায় তাদের মনে মানবীয় কিছুটা কষ্ট আসা অস্বাভাবিক নয়। তাই প্রত্যেকে সান্তবনা দেয়ার জন্য তিনি একেক জনকে সম্বোধন করে একে সান্তবনার বাণী শুনান। তাই ‘আলী -কে বলেন, ‘‘তুমি আমার আমি তোমার’’। জা‘ফার (রাঃ)-কে বলেন, ‘‘তুমি অবয়বে ও চরিত্রে আমার সাদৃশ্য’’। যায়দ (রাঃ)-কে বলেন, ‘‘তুমি আমার ভাই ও বন্ধু’’। এই হৃদয় কাড়া কথাগুলো এবং সুসংবাদগুলো ছিল তাদের হৃদয়ে সান্তবনা দেয়ার জন্য এবং তাদের মনের কষ্ট দূর করার জন্য। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - শিশুর বালেগ হওয়া ও ছোট বেলায় তাদের প্রতিপালন প্রসঙ্গে
৩৩৭৮-[৩] ’আমর ইবনু শু’আয়ব তাঁর পিতার মাধ্যমে দাদা ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন। জনৈকা রমণী এসে বলল, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! এ আমার পুত্র, আমার পেট তাঁর জন্য খাদ্যভাণ্ডার ছিল, আমার বুক ছিল তাঁর মশক বা পানপাত্র স্বরূপ এবং আমার কোল ছিল তার দোলনা স্বরূপ। কিন্তু তার পিতা আমাকে তালাক দিয়েছে এবং এমতাবস্থায় তাকে আমার নিকট হতে ছিনিয়ে নিতে চাচ্ছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত রমণীকে বললেন, ঐ সন্তান প্রতিপালনে তুমিই অধিক হকদার, যতক্ষণ না তোমার অন্যত্র বিবাহ হয়। (আহমাদ, আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو: أَنَّ امْرَأَةً قَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ ابْنِي هَذَا كَانَ بَطْنِي لَهُ وِعَاءً وَثَدْيِي لَهُ سِقَاءً وَحِجْرِي لَهُ حِوَاءً وَإِنَّ أَبَاهُ طَلَّقَنِي وَأَرَادَ أَنْ يَنْزِعَهُ مِنِّي فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَنْتِ أَحَقُّ بِهِ مَا لم تنكحي» . رَوَاهُ أَحْمد وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (كَانَ بَطْنِىْ لَه وِعَاءً) ‘‘আমার পেট তার পাত্র ছিল।’’ অর্থাৎ গর্ভ ধারণের সময় আমার পেট তাকে ধারণ করেছে। তাই পেটকে পাত্রের সাথে তুলনা করেছেন।
(وَثَدْيِىْ لَه سِقَاءً) ‘‘এবং আমার স্তন তার মশক ছিল।’’ অর্থাৎ দুধ পান করার সময় আমার স্তন থেকেই সে পান করেছে। আমার স্তন তার দুধের পাত্র ছিল।
(وَحِجْرِىْ لَه حِوَاءً) ‘‘এবং আমার কোল তার আশ্রয়স্থল।’’ অর্থাৎ কোল তাকে হিফাযাত ও সংরক্ষণ করেছে।
এসব কথা বলে মায়ের উদ্দেশ্য হলো, সে তার বাচ্চাকে পাওয়ার অগ্রাধিকার রাখে; কেননা এসব গুণের কোনোটিই পিতার মাঝে নেই।
(أَنْتِ أَحَقُّ بِه مَا لَمْ تَنْكَحِىْ) অর্থাৎ তোমার বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত তুমিই বাচ্চার অধিক হকদার।
এ হাদীসের আলোকে ‘উলামায়ে কিরামের ঐকমত্য যে, পিতা ও মায়ের মাঝে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে এবং সন্তান লালন নিয়ে মা ও পিতার মাঝে বিবাদ তথা উভয়ে ছেলেকে নিজের রাখা নিয়ে টানটানি দেখা দিলে বাচ্চা লালনের অধিকার মায়ের। মায়ের দাবী সত্ত্বে পিতা বাচ্চা পাওয়ার অধিকার রাখেন না। বাচ্চার প্রতি স্নেহ-মমতা পিতার তুলনায় মায়ের অধিক বলেই শারী‘আত মাকে এই অধিকার দিয়েছে। তবে মায়ের এই অধিকার অন্যত্র বিবাহের পূর্ব পর্যন্ত। কেননা অন্য বিবাহে আবদ্ধ হলে তার জন্য বাচ্চার সঠিক রক্ষনাবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। তাই অন্যত্র বিবাহ হলে মায়ের এই অধিকার বাতিল হয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহের পূর্ব পর্যন্ত তাকে অধিকার দিয়েছেন। তবে মায়ের এই অধিকার বাচ্চার ভালো মন্দ পার্থক্যের বয়সের পূর্ব পর্যন্ত। ভালো মন্দ পার্থক্যের বয়সে বাচ্চা উপনীত হয়ে গেলে বাচ্চাকেই পিতা মাতার কোনো জনকে বেছে নিতে অবকাশ দিয়েছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। যেমন আমরা সামনের হাদীসে দেখতে পাব। তাই সেই হাদীসের আলোকে মায়ের অগ্রাধিকারের বিষয়টি বাচ্চার ভালো মন্দ পার্থক্যের বুঝ আসার পূর্ব পর্যন্ত নির্ধারিত হয়ে যায়। (‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২২৭৩; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - শিশুর বালেগ হওয়া ও ছোট বেলায় তাদের প্রতিপালন প্রসঙ্গে
৩৩৭৯-[৪] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক বালককে তার পিতা ও মায়ের মধ্যে একজনকে (লালন-পালনের উদ্দেশে) বেছে নেয়ার অধিকার দিয়েছেন। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَيَّرَ غُلَامًا بَيْنَ أَبِيهِ وَأمه. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: এ হাদীসে আমরা দেখছি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাচ্চাকে পিতা-মাতার মাঝে যাকে ইচ্ছা নির্বাচন করে বেছে নেয়ার অবকাশ দিয়েছেন। অর্থাৎ বাচ্চার মাঝে বিবেচনাবোধ এসে গেলে সে যাকে অবলম্বন করবে সেই বাচ্চাকে লালনের অধিকার রাখবে। তবে এই বিবেচনাবোধের বয়স বা সময় কোন্টি- এ নিয়ে ‘উলামাদের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। কারো মতে বাচ্চা প্রাপ্তবয়স্ক হলে তাকে এই অবকাশ দেয়া হবে। যেমন কুরআনে বলা হয়েছে- ‘‘ইয়াতীমদেরকে তাদের সম্পদ বুঝিয়ে দাও।’’ (সূরা আন্ নিসা ৪ : ২)
এ আয়াতে যেমন সম্পদ পৌঁছিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক হলেই ইয়াতীমকে বুঝদার ধরা হয়েছে, তদ্রূপ পিতা-মাতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে।
আবার কেউ কেউ বলেন, বাচ্চার মাঝে ভালো-মন্দের পার্থক্যের জ্ঞান এসে গেলেই তাকে পিতা-মাতার কোনো একজনকে বেছে নেয়ার অধিকার থাকবে। বাচ্চা যার সঙ্গে থাকতে চাইবে সেই তাকে লালন করবে। শাফি‘ঈ (রহঃ)-এর এটি মত। তবে শাফি‘ঈ (রহঃ)-এর মতে বাচ্চার এই জ্ঞানের বয়স সাত অথবা আট ধরা হয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৩৫৭)
পরিচ্ছেদঃ ১৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - শিশুর বালেগ হওয়া ও ছোট বেলায় তাদের প্রতিপালন প্রসঙ্গে
৩৩৮০-[৫] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈকা রমণী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, আমার স্বামী আমার ছেলেকে নিয়ে যেতে চায়, অথচ সে আমাকে পানাহার করায়, আমার উপকার করে ও আমার প্রয়োজনীয় কাজকর্ম করে দেয়। এমতাবস্থায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত বালককে বললেন, এই তোমার পিতা, ঐ তোমার মা, তুমি যার কাছে ইচ্ছা যেতে পার। অতঃপর সে তার মায়ের হাত ধরে চলে গেল। (আবূ দাঊদ, নাসায়ী, দারিমী)[1]
وَعنهُ قَالَ: جَاءَتِ امْرَأَةٌ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَتْ: إِنَّ زَوْجِي يُرِيدُ أَنْ يَذْهَبَ بِابْنِي وَقَدْ سَقَانِي وَنَفَعَنِي فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «هَذَا أَبُوكَ وَهَذِهِ أُمُّكَ فَخُذْ بِيَدِ أَيِّهِمَا شِئْتَ» . فَأَخَذَ بِيَدِ أُمِّهِ فَانْطَلَقَتْ بِهِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ وَالدَّارِمِيُّ
ব্যাখ্যা: (وَقَدْ سَقَانِىْ وَنَفَعَنِىْ) ‘‘সে আমাকে পান করায় এবং আমার উপকারে আসে।’’ এ কথা বলে মহিলার উদ্দেশ্য তার ছেলে এমন বয়সে উপনীত হয়েছে যে, সে মায়ের সেবা করতে পারে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে পিতা-মাতার দু’জনের যার সাথে ইচ্ছা যেতে বললেন।
এ হাদীস থেকে এই কথা প্রমাণ হয় যে, বাচ্চার মাঝে বুঝ এসে গেলে সে যার সাথে থাকতে চাইবে তার সাথেই দিতে হবে। এর পূর্ব পর্যন্ত মায়ের একক অধিকার থাকবে।
পরিচ্ছেদঃ ১৮. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - শিশুর বালেগ হওয়া ও ছোট বেলায় তাদের প্রতিপালন প্রসঙ্গে
৩৩৮১-[৬] হিলাল ইবনু উসামাহ্ (রহঃ) মদীনার এক ক্রীতদাস আবূ মায়মূনাহ্ সুলায়মান (রহঃ) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একদিন আমি আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)-এর নিকটে বসেছিলাম, এমতাবস্থায় একটি ছেলে (কোলে করে) এক অনারবীয় রমণী আসলেন, যাকে তার স্বামী তালাক দিয়েছে। কিন্তু উভয়ে ছেলেটির প্রতিপালনের দাবি করছে। রমণীটি ফারসীতে বলল, হে আবূ হুরায়রাহ্! আমার (তালাকদাতা) স্বামী আমার ছেলেকে নিয়ে যেতে চায়। আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) ফারসী ভাষাতেই তাদেরকে বললেন, তোমরা এ ব্যাপারে লটারী কর। তখন স্বামী এসে বলল, আমার ছেলের ব্যাপারে আমার সাথে কে টানাটানি করতে চায়? আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহ! আমি এ ফায়সালা এজন্যই দিয়েছি যে, একদিন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট বসা ছিলাম।
এমন সময়ে তাঁর নিকটে এক স্ত্রীলোক এসে বলল, হে আল্লাহর রসূল! আমার স্বামী আমার এ ছেলেকে নিয়ে যেতে চায়। অথচ সে আমার যাবতীয় কাজকর্মের মাধ্যমে উপকার করে এবং নাসায়ীর বর্ণনায় আবূ ’ইনাবার কূপ হতে মিষ্টি পানি এনে আমাকে পান করায়। এটা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা উভয়ে লটারী কর। এতে তার স্বামী বলল, আমার ছেলের ব্যাপারে আমার সাথে কে টানাটানি করে? এ কথায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ তোমার পিতা, এ তোমার মা, তুমি যার কাছে ইচ্ছা যেতে পার। অতঃপর সে মায়ের হাত ধরে চলে গেল। (আবূ দাঊদ, নাসায়ী)[1]
মুসনাদ গ্রন্থকার এ হাদীসটি উল্লেখ করেছেন এবং দারিমী হিলাল ইবনু উসামাহ্ (রহঃ) হতে বর্ণনা করেছেন।
عَنْ هِلَالِ بْنِ أُسَامَةَ عَنْ أَبِي مَيْمُونَةَ سُلَيْمَانَ مَوْلًى لِأَهْلِ الْمَدِينَةِ قَالَ: بَيْنَمَا أَنَا جَالِسٌ مَعَ أَبِي هُرَيْرَةَ جَاءَتْهُ امْرَأَةٌ فَارِسِيَّةٌ مَعَهَا ابْنٌ لَهَا وَقَدْ طَلَّقَهَا زَوْجُهَا فَادَّعَيَاهُ فَرَطَنَتْ لَهُ تَقُولُ: يَا أَبَا هُرَيْرَةَ زَوْجِي يُرِيدُ أَنْ يَذْهَبَ بِابْنِي. فَقَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ: اسْتهمَا رَطَنَ لَهَا بِذَلِكَ. فَجَاءَ زَوْجُهَا وَقَالَ: مَنْ يُحَاقُّنِي فِي ابْنِي؟ فَقَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ: اللَّهُمَّ إِنِّي لَا أَقُولُ هَذَا إِلَّا أَنِّي كُنْتُ قَاعِدًا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَتَتْهُ امْرَأَةٌ فَقَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ زَوْجِي يُرِيدُ أَنْ يَذْهَبَ بِابْنِي وَقَدْ نَفَعَنِي وَسَقَانِي مِنْ بِئْرِ أَبِي عِنَبَةَ وَعِنْدَ النَّسَائِيِّ: مِنْ عَذْبِ الْمَاءُ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اسْتَهِمَا عَلَيْهِ» . فَقَالَ زَوْجُهَا مَنْ يُحَاقُّنِي فِي وَلَدِي؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «هَذَا أَبُوكَ وَهَذِهِ أُمُّكَ فَخُذْ بِيَدِ أَيِّهِمَا شِئْتَ» فَأَخَذَ بيد أمه. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد. وَالنَّسَائِيّ لكنه ذكر الْمسند. وَرَوَاهُ الدَّارمِيّ عَن هِلَال بن أُسَامَة
ব্যাখ্যা: (فَقَالَ أَبُوْ هُرَيْرَةَ : اِسْتَهِمَا) অর্থাৎ স্বামী এবং স্ত্রী উভয়ে বাচ্চার দাবী করায় আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) লটারী করার নির্দেশ দিলেন। লটারীতে যার নাম আসবে সে ছেলেকে পাওয়ার অধিকারী হবে।
(مَنْ يُّحَاقُّنِىْ فِى ابْنِىْ) অর্থ : আমার ছেলেকে নিয়ে কে টানাটানি করে। অর্থাৎ বাচ্চাটির পিতার কাছে আবূ হুরায়রাহ্ -এর এই নির্দেশ পছন্দ হয়নি। কেননা তার খেয়াল মতে সেই ছেলেকে লালনের অধিকার রাখে। আর বর্ণিত পন্থা অবলম্বন করলে ছেলে মায়ের কাছে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই লোকটি আবূ হুরায়রাহ্ -এর এ ফায়সালার উপর আপত্তির সুরে এ কথা বলে। লোকটি আপত্তি তুললে আবূ হুরায়রাহ্ হুবহু এ ধরনের ফায়সালার একটি ঘটনা শুনান যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে ঘটেছিল। এ ধরনের বিষয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লটারীর ফায়সালা দেন। আবূ হুরায়রাহ্ -এর এই হাদীস শুনানোর উদ্দেশ্য হলো, তিনি যে ফায়সালা দিচ্ছেন তা তার নিজের পক্ষ থেকে নয়। বরং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এই একই ফায়সালা দিয়েছেন।
বাচ্চা লালনের ক্ষেত্রে লটারীর ভিত্তিতে অগ্রাধিকার : এই হাদীসে আমরা দেখছি যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে পিতা মাতার মাঝে লটারীর ফায়সালা করেন। কিন্তু সন্তানের পিতা এই ফায়সালায় এই বলে আপত্তি জানায় যে, (مَنْ يُّحَاقُّنِىْ فِىْ وَلَدِىْ) অর্থাৎ আমার সন্তানকে নিয়ে কে টানাটানি করে? লটারীর ফায়সালা না মানার পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাচ্চাকে যে কোনো একজন গ্রহণের অবকাশ দেন। তাই অনেকে মনে করেন, প্রথমে লটারীর ফায়সালা হবে। লটারী না মানলে বাচ্চাকে বেছে নেয়ার সুযোগ দেয়া হবে। যেহেতু রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে লটারীর নির্দেশ দেন। কিন্তু একই ঘটনায় উপরের হাদীসে আমরা দেখেছি যে, লটারীর কথার উল্লেখ নেই। অর্থাৎ এই ঘটনার সকল বর্ণনায় বাচ্চার ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয়ার কথা থাকলেও লটারীর কথা সব বর্ণনায় নেই। তাই সকল বর্ণনার আলোকে বাচ্চার ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয়াই উত্তম মনে করেন অনেক ‘আলিম এবং এটাই খুলাফায়ে রাশিদীনের ‘আমল। কেউ কেউ উভয়ের যে কোনো একটি গ্রহণ করার অবকাশ দেন।
হাদীস থেকে আরেকটি মাস্আলাহ্ বের হয় যে, দু’টি বিষয় সমান হলে তার একটি নির্বাচনের জন্য লটারী একটি শারী‘আত পদ্ধতি। সন্তানের লালন পালনের অধিকারের হাদীসে আমরা দেখেছি যে, বাচ্চা লালনের ক্ষেত্রে পিতা-মাতা উভয়ে দাবী করলে বাচ্চা মোটামুটি বুঝদার হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মায়ের অগ্রাধিকার দিয়েছেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এর হিকমাত বা রহস্য হলো, এই বয়সে বাচ্চা মায়ের স্নেহ পাওয়ার অধিক উপযুক্ত। মায়ের মাঝে সেণহের যে পরিমাণ রয়েছে তা পিতার মাঝে নেই। তাই এই সময় পিতার কামনাকে অগ্রাহ্য করে মাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।
বাচ্চা বুঝদার হওয়ার পর দুই ধরনের হুকুম পাওয়া যায়। এক : লটারী, দুই : বাচ্চার নিজের বাছাই। লটারীর ব্যাপার সম্পূর্ণ ভাগ্য নির্ভর এবং একই ঘটনার অনেক বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়নি। তাই এ ক্ষেত্রে বাচ্চা কার কাছে যাওয়া অধিক উপযুক্ত বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে অগ্রাহ্য হয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত বাচ্চার হাতে কোনো একজনকে গ্রহণ করে নেয়ার অধিকার দেয়া হলে এই সময় তার জন্য সঠিক উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করা সম্ভব নয়। বাচ্চা যার কাছে বেশি সোহাগ পেয়েছে তার কাছেই যাবে। কিন্তু এই সময় তার থাকার উপযুক্ত স্থান নির্বাচন না করতে পারার কারণে তার যে ক্ষতি হবে সে বুঝতে পারবে না। এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই অধিকার কেন দিলেন। বর্ণিত হাদীস ছাড়া বাচ্চাকে অধিকার দেয়ার তথা পিতা মাতার কোনো একজনকে বেছে নেয়ার অধিকার সম্বলিত আরো হাদীস রয়েছে। যেখানে দেখা যায় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাচ্চাকে বেছে নিতে দিয়ে তার জন্য দু‘আ করে দিয়েছেন। এক ঘটনায় পিতা মুসলিম এবং মা অমুসলিম অবস্থায় বাচ্চা নিয়ে টানাটানি হলে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাচ্চাকে মা বাবার যার কাছে ভালো লাগে যাওয়ার সুযোগ দিয়ে দু‘আ করেন, ‘‘হে আল্লাহ! তুমি তাকে পিতার দিকে পথপ্রদর্শন করো’’। তখন বাচ্চা পিতার দিকে যায়।
এসব হাদীসের আলোকে ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) মনে করেন যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাচ্চাকে অবকাশ দেয়ার হুকুম ভিন্ন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দু‘আর বারাকাতে ছেলে সঠিক স্থান বেছে নিতে পারে। কিন্তু অন্যের জন্য এই হুকুম নয়। ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) মত পোষণ করেন যে, শিশু অবস্থায় বাচ্চার ক্ষেত্রে মায়ের অধিকার; কেননা এই সময় সে সেণহের মুখাপেক্ষী এবং কাজকর্মে অন্যের মুখাপেক্ষী, তাই মা তার যে চাহিদা মিটাতে পারবে পিতা বা অন্য কেউ পারবে না। এর আলোকে শারী‘আত মাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। তারপর ছেলে যখন একটু বড় হবে এবং তার মাঝে ভালো-মন্দ পার্থক্যে বুঝ চলে আসবে, সে তার একান্ত ব্যক্তিগত কাজ যেমন প্রস্রাব-পায়খানা, খাওয়া-দাওয়া, পোশাক পরিধান ইত্যাদি একাকি করতে পারবে তখন সে সেণহের মুখাপেক্ষী নয়, বরং শিক্ষা-দীক্ষার মুখাপেক্ষী। আর এই শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থাপনা মায়ের তুলনায় পিতা অধিক যোগ্য এবং পিতার দায়িত্ব। তাই এই সময় লালন পালনের অধিকার পিতার হবে। মোটকথা, হানাফী ‘আলিমদের মতে বাচ্চার মাঝে সবকিছুতে পরমুখাপেক্ষী থাকার মতো বয়সে লালনের অধিকার মায়ের। এই বয়স অতিক্রম করার পর লালনের অধিকার পিতার। বাচ্চাকে বেছে নেয়ার অধিকার রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য বিশেষিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দু‘আর মাধ্যমে বাচ্চা সঠিক বেছে নিতে পারতো। [আল্লাহ অধিক জ্ঞাত] (‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২২৭৪; মিরকাতুল মাফাতীহ)