৩৩০৩

পরিচ্ছেদঃ ১৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - (যিহারের কাফফারা ও মু’মিনাহ্ দাসী মুক্তি প্রসঙ্গে)

অনুচ্ছেদটি উদ্ধৃত করে মুসান্নিফের উদ্দেশ্য হলো, হাদীস দ্বারা এ কথা প্রমাণ করা যে, যিহারের কাফ্ফারায় আযাদকৃত দাস বা দাসী মু’মিন হওয়া আবশ্যক। উসূলে ফিকহে মুতলাক তথা শর্তবিহীন হুকুমকে শর্তযুক্ত করার উসূল বা নীতিতে এর বিশদ আলোচনা রয়েছে। এই অনুচ্ছেদের অধীনের হাদীসটি কুরআনের মুতলাক বা যিহারের কাফ্ফারার শর্তমুক্ত হুকুমকে ঈমানের শর্তে শর্তযুক্ত করার প্রমাণ বহন করে, এতে কোনো দ্বিমত পোষণের সুযোগ নেই। তবে মুকাইয়াদ অর্থাৎ শর্তটি কি এভাবে নির্ধারিত যে, ভুলে হত্যার কাফ্ফারার মতো ঈমানদার ছাড়া আযাদ করলে আদায় হবে না, নাকি উত্তমের বর্ণনা- এতে মতভেদ রয়েছে। আল্লাহ অধিক ভালো জানেন। ২৯৯৯ নং হাদীসের ব্যাখ্যায় এর কিছুটা আলোচনা করা হয়েছে। (সম্পাদক)


৩৩০৩-[১] মু‘আবিয়াহ্ ইবনুল হাকাম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললাম- হে আল্লাহর রসূল! আমার জনৈকা দাসী আমার মেষ পাল চরাত। অতঃপর একদিন আমি মেষ পালের নিকট গিয়ে দেখি, একটি মেষ নেই। দাসীকে জিজ্ঞেস করলে সে বলল, নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলেছে। এতে আমি অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হলাম এবং আমি অতি সাধারণ মানুষ, তাই (ধৈর্য ধরতে না পেরে) তার গালে এক চড় মেরে দিলাম। অতঃপর আমি বললাম, (কোনো এক কারণে) আমার ওপর একজন দাস বা দাসী মুক্ত করা শারী‘আতের বিধানুযায়ী জরুরী হয়ে আছে (যা এখনও করিনি), এমতাবস্থায় উক্ত দাসীকে তার স্থলে মুক্তি দান করলে কি হবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত দাসীকে জিজ্ঞেস করলেন- বলো তো আল্লাহ কোথায়? সে বলল, আকাশমন্ডলীতে। আবার জিজ্ঞেস করলেন, বলো তো! আমি কে? সে বলল, আপনি আল্লাহর রসূল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে (মু‘আবিয়াহ্কে) বললেন, হ্যাঁ, তুমি ওকে মুক্ত করতে পার। (মুয়াত্ত্বা মালিক)[1]

মুসলিম-এর বর্ণনায় আছে, সে [মু‘আবিয়াহ্ (রাঃ)] বলল, আমার এক দাসী উহুদ পাহাড় ও জাও্ওয়ানিয়্যাহ্-এর অঞ্চলে মেষ পাল চরাত। একদিন আমি তার কাছে গিয়ে দেখলাম যে, আমাদের একটি মেষ নেকড়ে বাঘ নিয়ে চলে গেছে। আমি অতি সাধারণ মানুষ বিধায় তাদের মতো আমিও ক্রোধ সংবরণ করতে ব্যর্থ হয়ে তাকে চপেটাঘাত করে ফেলি। অতঃপর আমি (ভারাক্রান্ত হৃদয়ে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে এতদসম্পর্কে বর্ণনা করলাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমার এ কাজকে গুরুতর অন্যায় বলে মনে করলেন। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমি কি ওকে মুক্ত করতে পারব? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তাকে আমার কাছে নিয়ে আসো। আমি তাকে তাঁর কাছে নিয়ে গেলাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, বলো তো আল্লাহ কোথায়? সে বলল, আকাশমন্ডলীতে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, বলো তো আমি কে? সে বলল, আপনি আল্লাহর রসূল। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে বললেন, হ্যাঁ, ওকে মুক্ত করতে পার। কারণ, সে মু’মিনাহ্।

بَابٌ [فِىْ كَوْن الرَّقَبَةِ فِى الْكَفَّارَة مُؤمنَة]

عَن مُعَاوِيَة بنِ الحكمِ قَالَ: أَتَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ جَارِيَةً كَانَتْ لِي تَرْعَى غَنَمًا لِي فَجِئْتُهَا وَقَدْ فَقَدَتْ شَاةً مِنَ الْغَنَمِ فَسَأَلْتُهَا عَنْهَا فَقَالَتْ: أَكَلَهَا الذِّئْبُ فَأَسِفْتُ عَلَيْهَا وَكُنْتُ مَنْ بَنِي آدَمَ فَلَطَمْتُ وَجْهَهَا وَعَلَيَّ رَقَبَةٌ أَفَأُعْتِقُهَا؟ فَقَالَ لَهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَيْنَ اللَّهُ؟» فَقَالَتْ: فِي السَّمَاءِ فَقَالَ: «مَنْ أَنَا؟» فَقَالَتْ: أَنْتَ رَسُولَ اللَّهِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَعْتِقْهَا» . رَوَاهُ مَالِكٌ
وَفِي رِوَايَةِ مُسْلِمٍ قَالَ: كَانَتْ لِي جَارِيَةٌ تَرْعَى غَنَمًا لِي قِبَلَ أُحُدٍ وَالْجَوَّانِيَّةِ فَاطَّلَعْتُ ذَاتَ يَوْمٍ فَإِذَا الذِّئْبُ قَدْ ذَهَبَ بِشَاةٍ مِنْ غَنَمِنَا وَأَنَا رَجُلٌ مِنْ بَنِي آدَمَ آسَفُ كَمَا يَأْسَفُونَ لَكِنْ صَكَكْتُهَا صَكَّةً فَأَتَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَعَظَّمَ ذَلِكَ عَلَيَّ قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أفَلا أُعتِقُها؟ قَالَ: «ائتِني بهَا؟» فأتيتُه بِهَا فَقَالَ لَهَا: «أَيْنَ اللَّهُ؟» قَالَتْ: فِي السَّمَاءِ قَالَ: «مَنْ أَنَا؟» قَالَتْ: أَنْتَ رَسُولُ الله قَالَ: «أعتِقْها فإنَّها مؤْمنةٌ»

عن معاوية بن الحكم قال: أتيت رسول الله صلى الله عليه وسلم فقلت: يا رسول الله إن جارية كانت لي ترعى غنما لي فجئتها وقد فقدت شاة من الغنم فسألتها عنها فقالت: أكلها الذئب فأسفت عليها وكنت من بني آدم فلطمت وجهها وعلي رقبة أفأعتقها؟ فقال لها رسول الله صلى الله عليه وسلم: «أين الله؟» فقالت: في السماء فقال: «من أنا؟» فقالت: أنت رسول الله فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: «أعتقها» . رواه مالك وفي رواية مسلم قال: كانت لي جارية ترعى غنما لي قبل أحد والجوانية فاطلعت ذات يوم فإذا الذئب قد ذهب بشاة من غنمنا وأنا رجل من بني آدم آسف كما يأسفون لكن صككتها صكة فأتيت رسول الله صلى الله عليه وسلم فعظم ذلك علي قلت: يا رسول الله أفلا أعتقها؟ قال: «ائتني بها؟» فأتيته بها فقال لها: «أين الله؟» قالت: في السماء قال: «من أنا؟» قالت: أنت رسول الله قال: «أعتقها فإنها مؤمنة»

ব্যাখ্যা: (فَقَدَتْ شَاةً) সীগাটি মা‘রূফ মুতাকাল্লিম এবং شاة শব্দে নসব অর্থাৎ যবর। অর্থাৎ আমি একটি বকরী হারিয়েছি। কোনো কোনো পাণ্ডুলিপিতে সীগাটি মাজহূলের গায়ব হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং شاة শব্দে রফা‘ অর্থাৎ পেশ। অর্থাৎ একটি বকরী হারিয়ে গেছে।

(وَكُنْتُ مَنْ بَنِىْ اٰدَمَ) ‘আমি তো একজন মানুষ’ এ কথা বলে সাহাবী বকরী হারিয়ে যাওয়ার উপর রাগ ও আক্ষেপ এবং তার কারণে দাসীকে থাপ্পড় মারার ওযর বর্ণনা করছেন। কেননা হারিয়ে যাওয়া তাকদীরের বিষয়। এখানে আক্ষেপ বিশেষ করে রাগ মু’মিনের শান নয় এবং থাপ্পড় মারা একটি জুলুম। তাই ওযর পেশ করছেন যে, মানুষের ক্ষেত্রে তো অনেক সময় এমনটি হয়েই যায়। কেননা সে অনেক সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

(وَعَلَىَّ رَقَبَةٌ) অর্থাৎ আমার ওপর একটি দাস আযাদের দায় রয়েছে। একটি দাস আযাদ করা অন্য কোনো কারণে পূর্ব থেকে ওয়াজিব থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সে ওয়াজিবটি তিনি এই দাসীটি মুক্ত করে আযাদ করতে চান। আবার থাপ্পড় মারার কারণে একটি দাস মুক্ত করা ওয়াজিব হয়েছে এ উদ্দেশ্যও হতে পারে। যেমন ইবনু ‘উমার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

سَمِعْتُ رَسُولَ اللّٰهِ ﷺ يَقُولُ مَنْ ضَرَبَ غُلَامًا لَه حَدًّا لَمْ يَأْتِه أَوْ لَطَمَه فَإِنَّ كَفَّارَتَه أَنْ يُعْتِقَه

‘‘আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কোনো কারণ ছাড়া তার গোলামকে মারধর করে অথবা চপেটাঘাত করে, তবে এই গোলামকে আযাদ করে দেয়াই তার কাফফারা।’’ (সহীহ মুসলিম- অধ্যায় : কসম, অনুচ্ছেদ : ক্রীতদাসের সাথে সদ্ধ্যবহার এবং তাকে চপেটাঘাতের কাফফারা, হাঃ ৩১৩১)
মোটকথা, এই দুই কারণের যে কোনো একটি বা উভয় কারণে তিনি এই ক্রীতদাস আযাদ করে দায়মুক্ত হতে পারবেন কিনা তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জানতে চান।

(أَيْنَ اللّٰهُ؟) আল্লাহ কোথায়? অর্থাৎ তোমার প্রতিপালক কোথায়? রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রথম প্রশ্ন, আল্লাহ কোথায়? দ্বিতীয় প্রশ্ন আমি কে? কেননা আল্লাহ তা‘আলাকে মা‘বূদ হিসেবে এবং তাঁকে রসূল হিসেবে বিশ্বাস করার উপর ঈমান নির্ভর করে। আল্লাহ কোথায় এ প্রশ্নের উত্তরে সে বললো, (في السماء) অর্থাৎ আল্লাহ আসমানে। আল্লাহ আসমানে বলায় তার ঈমানের উপর বিশ্বাসের কারণ হলো, সে মক্কার কাফির ও মুশরিকদের মতো প্রতিমায় বিশ্বাসী নয়। বরং মা‘বূদ যিনি তিনি উপরে রয়েছেন। পৃথিবীতে যাদের মূর্তি বানিয়ে ‘ইবাদাত করা হয় তারা কেউই মা‘বূদ নয়। আমি কে এ প্রশ্নের উত্তরে সে বললো (أنت رسول الله) অর্থাৎ আপনি আল্লাহর রসূল। উভয় প্রশ্নের উত্তর সঠিকভাবে প্রদানের কারণে সে মু’মিনাহ্ বলে প্রমাণিত হলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (أعتقها) অর্থাৎ তাকে আযাদ করে দাও।
মুসান্নিফ (রহঃ) এই বর্ণনাটি উল্লেখের পর সহীহ মুসলিমের আরেকটি বিবরণ উল্লেখ করেন। যেখানে পরিষ্কার রয়েছে, (أعتقها فإنها مؤمنة) অর্থাৎ তাকে আযাদ করে দাও; কেননা সে মু’মিনাহ্।

এ থেকেই তাদের মতটি প্রমাণিত হয় যারা মনে করেন যে, কোনো ওয়াজিব কাফফারার বেলায় ঈমানদার ক্রীতদাস বা ক্রীতদাসী আযাদ করতে হবে।

এ থেকে এই কথার প্রতিও ইঙ্গিত মিলে যে, বর্ণিত সাহাবীর ওপর যে দাসমুক্তির দায়টি ছিল তা অন্য কোনো কারণে ওয়াজিব ছিল। থাপ্পড় মারার কারণে নয়। কেননা যে হাদীসে বলা হয়েছে, ’’যে ব্যক্তি কোনো কারণ ছাড়া তার গোলামকে মারধর করে অথবা চপেটাঘাত করে.....’’ এখানে ঈমানদার গোলামকে মারধরের কথা নেই। বরং গোলাম যেই হোক না কেন তাকে কারণ ছাড়া প্রহার করলে এর নিষ্কৃতি সেই গোলামকে আযাদ বা মুক্ত করে দেয়ার মাধ্যমেই হবে। (শারহে মুসলিম ৫/৬ খন্ড, হাঃ ৫৩৭; মিরকাতুল মাফাতীহ)


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
পুনঃনিরীক্ষণঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১৩: বিবাহ (كتاب النكاح)