৩২১৪

পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - ওয়ালীমাহ্ (বৌভাত)

৩২১৪-[৫] উক্ত রাবী [আনাস (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বার ও মদীনার পথে (প্রত্যাবর্তনকালে) সফিয়্যাহ্ (রাঃ)-এর সাথে (বিবাহ বাসরের উদ্দেশে) তিনদিন অবস্থান করেন। আমি মুসলিমগণকে তাঁর ওয়ালীমার দা’ওয়াত করি, কিন্তু উক্ত ওয়ালীমায় রুটি-গোশ্ত/গোশত ছিল না। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) চামড়ার দস্তরখানা বিছানোর নির্দেশ দিলেন। দস্তরখানা বিছানো হলে তাতে খেজুর, পনির ও ঘি রাখলেন। (বুখারী)[1]

بَابُ الْوَلِيْمَةِ

وَعَنْهُ قَالَ: أَقَامَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَيْنَ خَيْبَرَ وَالْمَدِينَةِ ثَلَاثَ لَيَالٍ يُبْنَى عَلَيْهِ بِصَفِيَّةَ فَدَعَوْتُ الْمُسْلِمِينَ إِلَى وَلِيمَتِهِ وَمَا كَانَ فِيهَا مِنْ خُبْزٍ وَلَا لَحْمٍ وَمَا كَانَ فِيهَا إِلَّا أَن أمربالأنطاع فَبُسِطَتْ فَأَلْقَى عَلَيْهَا التَّمْرَ وَالْأَقِطَ وَالسَّمْنَ. رَوَاهُ البُخَارِيّ

ব্যাখ্যা : খায়বার বিজয় শেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাহ্ এবং খায়বারের মধ্যবর্তী ‘সহবা’ নামক ভূ-খন্ডে তাঁবু খাটিয়ে তিনরাত অতিক্রম করেন। এ সময়ে সফিয়্যাহ্ (রাঃ) তার বাসরেই রাত যাপন করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রীতি ছিল যখনই কোনো অঞ্চল বা কোনো দূর্গ জয় করতেন সেখানে তিনি তিনদিন বা তিনরাত কাটিয়ে বিজয় চূড়ান্ত ও নিশ্চিত করে এবং পরিবেশ স্থিতিশীল করে সেখান থেকে ফিরতেন। এই সহবা নামক স্থানেই আনাস-এর মা উম্মু সুলায়ম বিনতু মিলহান সফিয়্যাহ্ (রাঃ)-কে সাজগোজ করিয়ে বধূবেশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তাঁবুতে প্রেরণ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বাসর উদযাপনের জন্য এ সময় (নতুন) বিশেষ তাঁবু তৈরি করা হয়েছিল। পরদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশক্রমে আনাস ওয়ালীমার জন্য মুসলিমদের দা‘ওয়াত করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চামড়ার বিছানা বা দস্তরখানা বিছানোর জন্যও নির্দেশ করলেন, ফলে তা বিছানো হলো। এবার দস্তরখানে খেজুর, পনীর, ঘি ইত্যাদি রাখা হলো এবং সেগুলো মিশ্রিত করে হায়স তৈরি করা হলো। এই ওয়ালীমার খাদ্য তালিকায় গোশত এবং রুটি ছিল না।

সফিয়্যাহ্ (রাঃ)-এর বিস্তারিত ঘটনা বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। মাওয়াহিব নামক গ্রন্থে উল্লেখ আছে, উম্মুল মু’মিনীন সফিয়্যাহ্ বিনতু হুয়াই ইবনু আখতাব, কেননা ইবনু আবুল হুকায়ক-এর বিবাহাধীন ছিলেন। ৭ম হিজরীতে তার স্বামী খায়বার যুদ্ধে নিহত হলে এবং খায়বার পতন হলে তিনি পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে বন্দী হিসেবে নীত হন। বন্দীদের যখন একত্রিত করা হয় তখন সাহাবী দাহিয়্যাতুল কলবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে আরয কারলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমাকে (বন্দীদের মধ্য থেকে) একটা দাসী দান করুন। আল্লাহর নাবী বললেন, যাও তুমি ঐ বন্দীদের মধ্য থেকে একটি বন্দী নিয়ে নাও। দাহিয়্যাহ্ গিয়ে সফিয়্যাহ্ বিনতু হুয়াই-কে নিয়ে নিলেন। এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে জানালেন, হে আল্লাহর রসূল! সম্ভ্রান্ত বানী নাযীর ও বানী কুবায়যার নেত্রী সফিয়্যাহ্কে দাহিয়্যাহ্-এর হাতে তুলে দিলেন?

তার মতো সম্ভ্রান্ত এবং মহীয়সী নারীর তো সে মর্যাদা দিতে পারবে না, সে তো কেবল আপনার স্বকীয় সত্তার জন্যই শোভন! এ কথা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, দাহিয়্যাহ্-কে ডাকো। দাহিয়্যাহ্ সফিয়্যাহ্কে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে হাযির হলে তিনি দাহিয়্যাহ্-কে বললেন, তুমি বন্দীদের মধ্যে থেকে অন্য একটি বন্দী নিয়ে যাও। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সকল গুণাবলী ও বংশ মর্যাদার খেয়াল করে তাকে মুক্ত করে দিলেন এবং নিজে বিয়ে করে নিলেন। তার মুক্ত হওয়াটাই ছিল তার বিয়ের মোহর। খায়বায় এবং মদীনার মধ্যবর্তী সহবা নামক স্থানে উম্মু সুলায়ম (আনাস -এর মা) সফিয়্যাহ্-এর পোষাক পরিবর্তন করে উত্তম পোষাক পরালেন এবং সুন্দররূপে সাজিয়ে বধূবেশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাসরে পেশ করলেন। লোকেরা সফিয়্যার ব্যাপারে বলাবলি করছিল। কেউ বলল আল্লাহর নাবী তাকে বিয়ে করেছেন, কেউ বলছিল তাকে উম্ম ওয়ালাদ বানিয়েছেন। এক পর্যায়ে লোকেরা যখন দেখল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে লোকজন থেকে পর্দাবৃত করছেন তখন তারা বুঝে নিলেন যে, তিনি তাকে স্ত্রী হিসেবেই গ্রহণ করেছেন।

জাবির থেকে বর্ণিত, খায়বারের যুদ্ধের সময় যেদিন সফিয়্যাহ্-এর বাবা, ভাই নিহত হলো সেদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফিয়্যাহ্-কে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে দিয়ে পরিবারের জীবিত অবশিষ্ট লোকেদের সাথে চলে যাওয়ার অথবা ইসলাম গ্রহণ করার ইখতিয়ার দিয়ে স্বীয় সত্বার সান্নিধ্যে থাকার কথা জানালেন। সফিয়্যাহ্ ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং আল্লাহ ও তার রসূলকেই গ্রহণ করে নিলেন। আনাস -এর বিভিন্ন বর্ণনাবলীর সার-সংক্ষক্ষপ এই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এই প্রস্তাবই দিয়েছিলেন যে, আমাকে কি তোমার প্রয়োজন আছে? উত্তরে সফিয়্যাহ্ বললেন, হে আল্লাহর রসূল আমি শির্কের জীবনেই এটা মনে মনে কামনা করতাম আর আল্লাহ যখন আমাকে সেই সুযোগ করে দিলেন তা কিভাবে আমি ত্যাগ করতে পারি? আবূ হাতিম প্রমুখ মুহাদ্দিস ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার থেকে একটি ঘটনা উদ্বৃত করেছেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফিয়্যাহ্-এর ‘‘চোখে কোনো কিছু দিয়ে আঘাতের নীলাভ’’ দাগ লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করলেন, এ দাগ কিসের? উত্তরে তিনি বললেন, একদা আমি আমার স্বামীর কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়েছিলাম এমন সময় স্বপ্নে দেখি আকাশের চাঁদ আমার কোলে এসে পড়ল! এ স্বপ্নের কথা স্বামীকে জানালে তিনি আমার মুখমণ্ডলে ভীষণভাবে চপটেঘাত করে বলেন, তুমি বুঝি এখন ইয়াসরিবের রাজার আশা করছ? (ফাতহুল বারী ৭ম খন্ড, হাঃ ৪২১৩; মিরকাতুল মাফাতীহ)


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)
পুনঃনিরীক্ষণঃ