পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
الإمارة শব্দটির অর্থ আমিরের পদ গ্রহণ করা বা চিহ্ন ইত্যাদি। القضاء দ্বারা এখানে উদ্দেশ্য শার্’ঈ আদালত।
৩৬৬১-[১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করল, সে আল্লাহ তা’আলার আনুগত্য করল। আর যে আমার অবাধ্যতা করল, সে আল্লাহ তা’আলার অবাধ্যতা করল। আর যে আমীরের (নেতার) আনুগত্য করল, সে আমারই আনুগত্য করল। যে আমীরের অবাধ্যতা করল, সে আমারই অবাধ্যতা করল। প্রকৃতপক্ষে ইমাম (নেতা) হলেন ঢাল স্বরূপ। তার পিছন থেকে যুদ্ধ করা হয়, তার দ্বারা (শত্রুদের কবল থেকে) নিরাপত্তা পাওয়া যায়। সুতরাং শাসক যদি আল্লাহর প্রতি ভয়প্রদর্শন পূর্বক প্রশাসন চালায় এবং ন্যায়-বিচার প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে এর বিনিময়ে সে সাওয়াব (প্রতিদান) পাবে। কিন্তু সে যদি এর বিপরীত কর্ম সম্পাদন করে, তাহলে তার গুনাহও তার ওপর কার্যকর হবে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ أَطَاعَنِي فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ عَصَى اللَّهَ وَمَنْ يُطِعِ الْأَمِيرَ فَقَدْ أَطَاعَنِي وَمَنْ يَعْصِ الْأَمِيرَ فَقَدْ عَصَانِي وَإِنَّمَا الْإِمَامُ جُنَّةٌ يُقَاتَلُ مِنْ وَرَائِهِ وَيُتَّقَى بِهِ فَإِنْ أَمَرَ بِتَقْوَى اللَّهِ وَعَدَلَ فَإِنَّ لَهُ بِذَلِكَ أَجْرًا وَإِنْ قالَ بغَيرِه فَإِن عَلَيْهِ مِنْهُ»
ব্যাখ্যা: (مَنْ أَطَاعَنِىْ فَقَدْ أَطَاعَ اللّٰهَ) এর ব্যাখ্যায় কুরআনের সূরা আন্ নিসায় ৮০নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে, আয়াতের অর্থ: ‘‘যে ব্যক্তি রসূলের হুকুম মান্য করবে সে আল্লাহর হুকুম মান্য করবে।’’
(وَمَنْ عَصَانِىْ فَقَدْ عَصَى اللّٰهَ) অত্র হাদীস প্রমাণ করে নেতৃত্ব ও প্রতিনিধিত্বের উপর। বলা হয় : ‘আরবের কুরায়শ এবং ঐ সময়ের লোকজনের নেতৃত্ব সম্পর্কে জানা ছিল না। তাদের গোত্রের নেতাদের দীন ছিল না। অতঃপর যখন ইসলাম আগমন করে তাদের মাঝে (নেতা বা খলীফা) নিযুক্ত করা হয়, তাদের মাঝের লোকেরা অস্বীকার করে। কেউ কেউ হুকুম মান্য করতে অস্বীকার করে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেনঃ নিশ্চয় তাদের আনুগত্য করা আবশ্যক তারা যেন আনুগত্য করে যে ব্যক্তিকে তাদের শাসক বানানো হয়।
‘‘ইমাম হলেন ঢাল স্বরূপ।’’ ইমাম নববী (রহঃ) বলেছেনঃ যুদ্ধক্ষেত্রে ঢালের মাধ্যমে দুশমনদের আক্রমণ থেকে মুসলিমদের কষ্ট থেকে রক্ষা করবেন। মানুষকে নিষেধ করবেন কতককে কতকের সাথে যুদ্ধ করা থেকে। ইসলামের ভিতরের অংশকে রক্ষা করবে। ইমামুল মুসলিমীন জনগণকে কাফিরদের সাথে লড়াই করা, ক্রোধ, হিংসা, বিশৃঙ্খলা, হামলা, আক্রমণ থেকে রক্ষা করবেন।
ইবনু তীন (রহঃ) বলেছেনঃ নিশ্চয় তিনি খত্ত্বাবী (রহঃ)-এর কথা গ্রহণ করেছেন: ইবনু ‘উমার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদের একটি দলকে বলেছেনঃ তোমরা কি জান না? নিশ্চয় যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করল, সে আল্লাহর আনুগত্য করল। আর আল্লাহর আনুগত্য করাই আমার আনুগত্য করা। তারা বলেছেনঃ হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য প্রদান করি। তিনি বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আমার অনুসরণ করবে সে যেন শাসকগণেরও অনুসরণ করে।
ইমাম নববী (রহঃ) বলেছেনঃ অত্র হাদীসে সকল অবস্থায় শ্রবণ করা ও আনুগত্য করার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে ইসলাম এবং মুসলিমদের কালিমাকে একত্রিত করার জন্য। কেননা এর বিপরীত হলো দীন ও দুনিয়ায় তাদের অবস্থার বিশৃঙ্খলা ঘটানো। সকল ক্ষেত্রে অবাধ্যতার আনুগত্য থেকে নিষেধ করা হয়েছে। (ফাতহুল বারী ১৩ খন্ড, হাঃ ৩৬৬১)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৬২-[২] উম্মুল হুসায়ন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যদি কোনো বিকলাঙ্গ কুৎসিত গোলামকেও তোমাদের শাসক (নেতা) নিযুক্ত করা হয়। আর সে আল্লাহ তা’আলার কিতাব অনুযায়ী তোমাদেরকে পরিচালিত করে, তাহলে অবশ্যই তোমরা তার কথা শুনবে এবং তার আনুগত্য করবে। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أُمِّ الْحُصَيْنِ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنْ أُمِّرَ عَلَيْكُمْ عَبْدٌ مُجَدَّعٌ يَقُودُكُمْ بِكِتَابِ اللَّهِ فَاسْمَعُوا لَهُ وَأَطيعُوا» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: যদি কোনো কান কাটা, নাক কাটা লোককে তোমাদের আমির হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। সে যদি তোমাদরেকে আল্লাহর কিতাবের ও রসূলের নির্দেশ দেয় তোমরা তাকে মেনে নিবে। যতক্ষণ পর্যন্ত সে তোমাদেরকে আল্লাহর কিতাবের ও রসূলের নিয়ম অনুযায়ী নির্দেশ দেয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
* ইমাম সিন্দী (রহঃ) বলেছেনঃ যদি কোনো দাসকে খলীফা বা আমির হিসেবে নিযুক্ত করা হয় তাহলে তাকে প্রত্যাখ্যান করা যাবে না এবং এটা বলা যাবে না যে, সে আমিরের জন্য উপযুক্ত না। আমিরের আনুগত্য তখন করবে না, যখন সে আল্লাহ তা‘আলার হুকুমের বিপরীত নির্দেশ দেয়। (নাসায়ী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ৪২০৩)
* ‘উলামাগণ হাদীসের অর্থ করেছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা (শাসকগণ) ইসলামকে আঁকড়ে ধরে থাকবে এবং আল্লাহর কিতাবের দিকে আহবান করবে যে কোনো অবস্থাতেই হোক, চাই ব্যক্তিগত, দীনগত, চারিত্রিকগত পার্থক্য হোক না কেন তাদের আনুগত্য করা আবশ্যক যদি তাদের ওপর আল্লাহর অবাধ্যতা প্রকাশ না পায়।
এখানে একটি প্রশ্ন: কিভাবে দাসের নির্দেশ মেনে নিবে শ্রবণ ও আনুগত্য করার জন্য?
এই প্রশ্নের উত্তরে দু’টি উদ্দেশ্য হতে পারে : (১) উদ্দেশ্য এটা হতে পারে যে, কোনো আমির বা শাসক একজন গোলামকে কোনো একটি এলাকার শাসক বা নায়েব হিসেবে নিযুক্ত করবে অস্থায়ীভাবে কিছু সময়ের জন্য। নিশ্চয় সে দাস, শাসক না।
২) উদ্দেশ্য এটা হতে পারে যে, যদি কোনো মুসলিম দাস বলপ্রয়োগ করে শাসন ক্ষমতার কর্তৃত্ব লাভ করে, তাঁর নির্দেশ বাস্তবায়ন করা এবং আনুগত্য করা ওয়াজিব। তার অবাধ্যতা করা জায়িয নেই। (শারহে মুসলিম ৯ম খন্ড, হাঃ ১২৯৮- ৩১১)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৬৩-[৩] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা শুনো এবং আনুগত্য করো, যদিও তোমাদের ওপর হাবশী গোলাম শাসক নিযুক্ত করা হয়, যার মাথা কিসমিসের ন্যায়। (বুখারী)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَنَسٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «اسْمَعُوا وَأَطِيعُوا وَإِنِ اسْتُعْمِلَ عَلَيْكُمْ عَبْدٌ حَبَشِيٌّ كَأَنَّ رَأْسَهُ زَبِيبَةٌ» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: শাসক বা নেতার কথা, তাঁর আদেশ ও নিষেধসমূহ শ্রবণ করবে যতক্ষণ পর্যন্ত তা আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের কথার বিপরীত না হয়।
* ইমাম খত্ত্বাবী (রহঃ) বলেছেনঃ এখানে এমন একটি উদাহরণ পেশ করা হয়েছে বাস্তবে যার অস্তিত্ব নেই।
* ইমাম ত্বীবী (রহঃ) বলেছেনঃ কোনো দেশের শাসক যদি দাস হয় তার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো মাথার সাথে সাদৃশ্য তথা কিসমিসের মতো ছোট। অথবা শাসকের মাথার চুলগুলো এলোমেলো, কুকড়ানো কিসমিসের গঠনের অবস্থার মতো, অথবা কালো বর্ণের হয়।
* এখানে আরো আধিক্যতা বুঝানো হয়েছে শাসকের আনুগত্য করা তুচ্ছ বা নিম্নমানের ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও।
* আশরাফ (রহঃ) বলেছেনঃ তোমরা তার কথা শ্রবণ কর এবং আনুগত্য কর যদিও সে নিম্নশ্রেণীর ব্যক্তি হয়। বুখারী, আহমাদ, নাসায়ী এটাই বর্ণনা করেছেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৬৪-[৪] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রত্যেক মুসলিমের (তার শাসনকর্তার নির্দেশ) শোনা এবং আনুগত্য করা অপরিহার্য; তার মনঃপূত হোক বা না হোক, যতক্ষণ না তাকে গুনাহের দিকে নির্দেশ করে। কিন্তু যদি তাকে গুনাহের কাজের নির্দেশ দেয়া হয়, তখন তা শোনা ও আনুগত্য করা কর্তব্য নয়। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «السَّمعُ والطاعةُ على المرءِ المسلمِ فِيمَا أحب وأكره مَا لَمْ يُؤْمَرْ بِمَعْصِيَةٍ فَإِذَا أُمِرَ بِمَعْصِيَةٍ فَلَا سَمْعَ وَلَا طَاعَةَ»
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসটি সীমাবদ্ধ করেছে পূর্বের দু’টি ব্যাপকতার হাদীস থেকে এবং নির্দেশ করেছে শ্রবণ ও আনুগত্য করার জন্য যদিও হাবশী গোলাম হয়। ধৈর্য ধারণ করা যখন শাসকের মাঝে অপছন্দনীয় জিনিস পাওয়া যাবে। ধমক দেয়া হয়েছে দল বা জামা‘আত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়াকে।
শাসক যখন পাপের কাজে নির্দেশ করবে তখন তাঁর কথা আনুগত্য করা যাবে না এবং শ্রবণ করা যাবে না। বরং অবাধ্যতার কাজ শ্রবণ করা হারাম। হাদীসে বর্ণিত রয়েছে মু‘আয বর্ণনা করেছেন : ঐ ব্যক্তির আনুগত্য করা যাবে না যার মধ্যে আল্লাহর আনুগত্য নেই। (মুসনাদে আহমাদ)
* সার-সংক্ষেপ: ইজমা রয়েছে যখন শাসক/নেতা কুফরী কাজ করবে তখন তাকে পদস্খলন করা। যে ব্যক্তি এটা প্রতিষ্ঠা করতে পারে এরূপ মুসলিমের ওপর তা করা ওয়াজিব। যে ব্যক্তি তা করতে সক্ষম তার জন্য সাওয়াব রয়েছে। যে ব্যক্তি সক্ষম থাকা সত্ত্বেও নরম কথা বলে তার ওপর পাপ রয়েছে। যে ব্যক্তি শাসককে পদস্খলন করতে অক্ষম তার ওপর ওয়াজিব ঐ রাষ্ট্র থেকে হিজরত করা। (ফাতহুল বারী ১৩ খন্ড, হাঃ ৭১৪৪)
* মুত্বহির (রহঃ) বলেছেনঃ শাসকের কথা শ্রবণ করা এবং তার আনুগত্য করা ওয়াজিব প্রতিটি মুসলিমের ওপরে চাই নির্দেশটি স্বভাবগত অনুযায়ী হোক বা তার অনুযায়ী না হোক, অবাধ্যতার ক্ষেত্রে তার আনুগত্য করবে না। যদি শাসক অবাধ্যতার নির্দেশ করে তাহলে তার আনুগত্য জায়িয নেই। কিন্তু তার জন্য বৈধ হবে না শাসকের সাথে লড়াই বা বিদ্রোহ করা।
* সহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যাকারক ইমাম নববী (রহঃ) বলেছেনঃ জুমহূর, আহলুস্ সুন্নাহ, ফাকীহগণ, মুহাদ্দিসগণের মধ্য থেকে বলেছেনঃ পাপ, অত্যাচার অধিকার আদায় না করা, বখাটে শাসক হওয়ার জন্য, নেতাকে বরখাস্ত বা পদস্খলন করবে না। এগুলোর কারণে তার আনুগত্য থেকে বের হওয়া জায়িয নেই বরং ওয়াজিব হলো শাসককে উপদেশ দেয়া এবং তাকে ভয় দেখানো। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, ১৭০৭)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৬৫-[৫] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নাফরমানির ক্ষেত্রে আনুগত্য নেই। আনুগত্য শুধু সৎকর্মের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا طَاعَةَ فِي مَعْصِيَةٍ إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي الْمَعْرُوف»
ব্যাখ্যা: আমীরের নাম কেউ কেউ বলেছেনঃ ‘আব্দুল্লাহ বিন হুযাফাহ্। আমীরের আনুগত্য করতে হবে ভালো কাজে অবাধ্যতার কাজে নয়। আর আমীর এই কাজটি করেছিল, বলা হয়: পরীক্ষা করার জন্য। বলা হয়: কৌতুক করে। বলা হয়: নিশ্চয় এ লোকটি ‘আবদুল্লাহ বিন হুযাফাহ্ দুর্বল শ্রেণীর লোক। যদি তারা আগুনে প্রবেশ করত তাহলে তারা কিয়ামত পর্যন্ত আগুনের মাঝে থাকত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা (সংবাদ/জ্ঞান) ওয়াহীর মাধ্যমে জানতে পেরেছিলেন। সুতরাং শাসকের আনুগত্য করতে হবে ভালো কাজে, পাপের বা অন্যায়ের কাজে নয়। (শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৮৪০-৩৯)
* আবূ দাঊদের-এ ব্যাখ্যা গ্রন্থে ‘আওনুল মা‘বূদে শাসকের নাম নিয়ে মতভেদ রয়েছে : বলা হয়, ‘আব্দুল্লাহ বিন হুযাফাহ্, বলা হয় ‘আলকামাহ্ বিন মুজ্জায।
* খত্ত্বাবী (রহঃ) বলেছেনঃ অত্র হাদীসটি এটা প্রমাণ করে যে, ভালো কাজ ছাড়া শাসকের আনুগত্য করা ওয়াজিব না। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬২২)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৬৬-[৬] ’উবাদাহ্ ইবনুস্ সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট বায়’আত করেছিলাম যে, আমরা শুনব ও আনুগত্য করব যদিও তা কষ্টে, আরামে, সুখে ও দুঃখে হয়। আমাদের ওপর কাউকে প্রাধান্য দিলে আমরা ধৈর্যধারণ করব। আমরা ক্ষমতাশীল ব্যক্তির বিরোধিতা করব না। আমরা হাকের উপর থাকব, যেখানেই থাকি না কেন। আল্লাহর পথে আমরা কোনো নিন্দাকারীর নিন্দাকে মোটেও পরোয়া করব না।
অপর এক বর্ণনাতে আছে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের থেকে বায়’আত নিলেন যে, আমরা ক্ষমতাশীল শাসকের বিরুদ্ধাচরণ করব না। তবে তোমরা তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে পারো, যদি তাকে প্রকাশ্য কুফরীতে নিমজ্জিত হতে দেখো। আর সে ব্যাপারে তোমাদের নিকট আল্লাহর কুরআন (ও রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস)-এর ভিত্তিতে কোনো দলীল প্রমাণ বিদ্যমান থাকে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ قَالَ: بَايَعْنَا رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى السَّمْعِ وَالطَّاعَةِ فِي الْعُسْرِ وَالْيُسْرِ وَالْمَنْشَطِ وَالْمَكْرَهِ وَعَلَى أَثَرَةٍ عَلَيْنَا وَعَلَى أَنْ لَا نُنَازِعَ الْأَمْرَ أَهْلَهُ وَعَلَى أَنْ نَقُولَ بِالْحَقِّ أَيْنَمَا كُنَّا لَا نَخَافُ فِي اللَّهِ لَوْمَةَ لَائِمٍ. وَفِي رِوَايَةٍ: وَعَلَى أَنْ لَا نُنَازِعَ الْأَمْرَ أَهْلَهُ إِلَّا أَنْ تَرَوْا كُفْرًا بَوَاحًا عِنْدَكُمْ مِنَ اللَّهِ فِيهِ بُرْهَانٌ
ব্যাখ্যা: কাযী (রহঃ) বলেছেনঃ আমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছি শ্রবণ করার উপর কষ্ট এবং (স্বচ্ছলতার শাস্তি) সময়ে দুঃখ এবং শান্তির পর্যায়ে। তাদের বায়‘আত করার কারণে সাওয়াব, প্রতিদান ও শাফা‘আত রয়েছে কিয়ামতের দিন।
‘‘আমাদের ওপর কাউকে প্রাধান্য দিলে আমরা সবর করব’’ এই উক্তিটির অর্থ নিয়ে বিভিন্ন মনীষীদের বাণী:
* আযহার (রহঃ) বলেছেনঃ নিশ্চয় এর অর্থ হলো তাদের নিজেদের ওপরে আমীরকে অগ্রাধিকার দিয়ে তারা ধৈর্য ধারণ করবে।
বিদায়াহ্ ওয়ান্ নিহায়াতে বলা হয়েছে: তোমাদের ওপর প্রাধান্য দিবে। অর্থাৎ তোমাদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিবে ‘ফাই’-এর মাল থেকে তাদের অংশ প্রদান করার মাধ্যমে।
* ইমাম নববী (রহঃ) বলেছেনঃ প্রাধান্য, অগ্রাধিকার দিবে দুনিয়াবী বিষয়ে। অর্থাৎ যদি তারা পৃথিবীতে তোমাদের ওপর শাসক হিসেবে নির্দিষ্ট হয় তাহলে তোমরা তাদের কথা শ্রবণ ও মান্য কর। তোমাদের অধিকার তাদেরকে (প্রদান/মিলিত) কর না।
আমরা নেতৃত্ব কামনা করি না, আমরা আমাদের নেতা বরখাস্ত করব না, আমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করব না।
* ইমাম নববী (রহঃ) বলেছেনঃ আমরা ভালো কাজের নির্দেশ করব, মন্দ অপছন্দনীয় কাজ থেকে নিষেধ করব। প্রত্যেক সময়ে এবং স্থানে ছোট ও বড়দের ওপর আমরা কারো সাথে নরম কথা বলব না, আমরা কাউকে ভয় করব না, কারো তিরস্কারের প্রতি আমরা দৃষ্টিপাত করব না।
অত্র হাদীসে ‘কুফর’ (الكفر) দ্বারা উদ্দেশ্য পাপ। অর্থ হবে তোমরা শাসকের সাথে ঝগড়া বা তর্কে লিপ্ত হয়ো না তাদের নেতৃত্বের বিষয়ে এবং তাদের থেকে তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিও না। তবে যখন তোমরা তাদের মাঝে অপছন্দনীয় কোনো কিছু দেখবে নিশ্চতভাবে ইসলামের মূল ভিত্তি হতে যখন তাদেরকে এ অবস্থায় পাবে তখন তোমরা তাদেরকে অস্বীকার করবে এবং হক প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করবে, তোমরা যেখানেই থাক না কেন তাদের আনুগত্য থেকে বের হওয়া এবং তাদের সাথে যুদ্ধ করা হারাম সকল মুসলিমদের ঐকমত্যে।
* কাযী (রহঃ) বলেছেনঃ যদি আমীরের মাধ্যমে কুফরীর কাজ হয়ে যায় বা শারী‘আতের পরিবর্তন হয়ে যায় অথবা বিদ্‘আত সংঘটিত হয়ে যায় তখন তাঁর আনুগত্য থেকে মুক্ত হবে। এমতাবস্থায় মুসিলমদের ওপর ওয়াজিব ঐ শাসক থেকে বিরত থেকে ন্যায়পরায়ণ শাসক বানানো যদি তাদের পক্ষে সম্ভব হয়। আর যদি সম্ভব না হয় তাহলে মুসলিমগণ ঐ রাষ্ট্র থেকে অন্য রাষ্ট্রে চলে যাবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৬৭-[৭] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট বায়’আত করতাম মান্য করা ও আনুগত্যের উপর, তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদেরকে বলতেন, যা তোমাদের সাধ্যের মধ্যে হয়। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: كُنَّا إِذَا بَايَعْنَا رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى السَّمْعِ وَالطَّاعَةِ يَقُولُ لَنَا: «فِيمَا اسْتَطَعْتُمْ»
ব্যাখ্যা: ইমাম নববী (রহঃ) বলেছেনঃ মুসলিমের সকল নুসখায় বর্ণিত হয়েছে যে, তোমরা সাধ্যমত বায়‘আত কর কথা বলার উদ্দেশে। অর্থাৎ তোমরা সাধ্য অনুযায়ী তাদেরকে শিক্ষা দান করবে। এটা পরিপূর্ণ অনুগ্রহ, সহানুভূতি ও দয়া করা উম্মাতের ওপর। এ কারণেই যে, তাদেরকে শিক্ষা দেয়ার জন্য। তাদের মধ্যকার কেউ বলবে : যা তোমার সাধ্যে রয়েছে, যাতে করে এটা বায়‘আতের ‘আম্ বিষয়ের উপর প্রবেশ না করে যা তার সাধ্যে নেই। (শারহে মুসলিম ১৩ খন্ড, ৩৬৬৭)
* সম্ভাবনা রয়েছে বুখারীর নুসখায় রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথার মাঝে শর্তযুক্ত করা হয়েছে অবস্থার আধিক্যতার উপরে শ্রবণ করার ও আনুগত্যের উপরে উম্মাতের অনুগ্রহ করার জন্যে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৬৮-[৮] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো ব্যক্তি যদি তার আমীরকে অনৈতিক কোনো কিছু করতে দেখে, তাহলে সে যেন ধৈর্যধারণ করে। কেননা যে কেউ ইসলামী জামা’আত থেকে এক বিঘত পরিমাণ দূরে সরে যায় এবং এ অবস্থায় মারা যায়, সে জাহিলিয়্যাত যুগের ন্যায় মৃত্যুবরণ করল। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «من رأى أميره يَكْرَهُهُ فَلْيَصْبِرْ فَإِنَّهُ لَيْسَ أَحَدٌ يُفَارِقُ الْجَمَاعَةَ شبْرًا فَيَمُوت إِلَّا مَاتَ ميتَة جَاهِلِيَّة»
ব্যাখ্যা: যে ব্যক্তি আমীর ও শাসকের আনুগত্য থেকে নিজেকে বিরত রাখে, মুসলিমদের দল থেকে বের হয়ে যায়। এমতাবস্থায় তার মৃত্যু হলে সে মৃত্যু হবে জাহিলিয়্যাতের উপর মৃত্যুবরণ করা। কেননা জাহিলী যুগের মানুষেরা দীন সম্পর্কে ছিল মূর্খ, অজ্ঞ। এজন্য তারা তাদের সরদার ও গোত্রপতিদের আনুগত্য করত। তারা তাদের আমীর বা শাসকের নির্দেশকে অবজ্ঞা করত। তারা প্রকাশ্যভাবে ইমামের বিরোধিতায় লিপ্ত হত।
আলোচনার পরিশেষে বলা যায় যে, ইসলামের মজবুত সংগঠন থাকা এবং তার অধীনে মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ থাকার গুরুত্ব অপরিসীম।
অত্র হাদীসে শর্তযুক্ত করা হয়েছে যা মুতালাকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে পূর্বের দু’টি হাদীসে শাসকের নির্দেশ মান্য করা ও শ্রবণ করা যদিও হাবশী গোলাম হয়। আর ধৈর্যধারণ করা ঐ সমস্ত বিষয়ে যার মাঝে শাসকের অপছন্দনীয় কাজ রয়েছে। ভীতিপ্রদর্শন করা হয়েছে জামা‘আত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া। (ফাতহুল বারী ১৩ খন্ড, হাঃ ৭১৪৩)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৬৯-[৯] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আমীরের (শাসকের) আনুগত্যের অবাধ্য হলো এবং মুসলিম জামা’আত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল, এমতাবস্থায় সে মারা গেলে তার মৃত্যু জাহিলিয়্যাত যুগের উপর হবে। আর যে ব্যক্তি এমন পতাকার নিচে যুদ্ধ করে যার হক বা বাতিল হওয়া সম্পর্কে অজানা; বরং সে যেন দলীয় ক্রোধের বশীভূত হয়ে অথবা দলীয় স্বার্থ রক্ষায় লোকেদেরকে আহবান করে কিংবা দলীয় প্রেরণায় মদদ জোগায়। এমতাবস্থায় সে মারা গেলে জাহিলিয়্যাতের উপরই মৃত্যুবরণ করবে। আর যে ব্যক্তি আমার উম্মাতের বিরুদ্ধে তরবারি উত্তোলন করল এবং ভালো-মন্দ সকলকে নির্বিচারে আক্রমণ করতে লাগল। এমনকি তাত্থেকে আমার উম্মাতের কোনো মু’মিনেরও পরোয়া করল না এবং আশ্রিত তথা নিরাপত্তায় অধিকারী ব্যক্তির সাথে যে অঙ্গীকার রয়েছে, তার চুক্তিও পূরণ করল না, সে আমার উম্মাতের অন্তর্ভুক্ত নয় এবং তার সাথে আমার কোনই সম্পর্ক নেই। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَنْ خَرَجَ مِنَ الطَّاعَةِ وَفَارَقَ الْجَمَاعَةَ فَمَاتَ مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً وَمَنْ قَاتَلَ تَحْتَ رَايَةٍ عِمِّيَّةٍ يَغْضَبُ لِعَصَبِيَّةٍ أَوْ يَدْعُو لِعَصَبِيَّةٍ أَوْ يَنْصُرُ عَصَبِيَّةً فَقُتِلَ فَقِتْلَةٌ جَاهِلِيَّةٌ وَمَنْ خَرَجَ عَلَى أُمَّتِي بِسَيْفِهِ يَضْرِبُ بَرَّهَا وَفَاجِرَهَا وَلَا يَتَحَاشَى مِنْ مُؤْمِنِهَا وَلَا يَفِي لِذِي عَهْدٍ عَهْدَهُ فَلَيْسَ مِنِّي وَلَسْتُ مِنْهُ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: যে ব্যক্তির লড়াই করা, যুদ্ধ হওয়া, লোকেদেরকে তার সাহায্যের জন্য আহবান করা অথবা কাউকে সাহায্য করা আল্লাহর বাণীকে বুলন্দ করা ও দীনের ঝান্ডাকে উঁচু করার জন্য ছিল না। বরং সে বংশীয় প্রেরণায় উদ্ধুদ্ধ হয়ে জুলুমের সহায়তা করেছে ও অন্যায়ের পক্ষাবলম্বন করেছে। এমতাবস্থায় সে নিহত হলে সে জাহিলিয়্যাতের উপরই নিহত হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সে আমার উম্মাতের অন্তর্ভুক্ত নয় এবং তার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।
অত্র হাদীসের মাধ্যমে যে সমস্ত বিধি-বিধান প্রমাণিত হয় তা নিম্নে বর্ণনা করা হলো:
মুযহির (রহঃ) বলেছেনঃ তারা (শাসকগণ) তোমাদের জন্য দু‘আ করবে যখন তোমরা মৃত্যুবরণ করবে। আর তোমরা (জনগণ) তাদের জন্য দু‘আ করবে যখন তারা মৃত্যুবরণ করবে। যাদের আদেশ পালন এবং পছন্দ করতে।
ত্বীবী (রহঃ) বলেছেনঃ এটা দ্বারা সম্ভবত প্রথমটি উদ্দেশ্য, অর্থাৎ তোমরা তাদেরকে ভালোবাসবে এবং তারাও তোমাদেরকে ভালোবাসবে যতদিন পর্যন্ত জীবিত থাকবে। অতঃপর যখন মৃত্যু আসবে কেউ কারো জন্য আল্লাহর রহমাত প্রার্থনা করতে কল্যাণকর। আর শাসক যদি নিকৃষ্ট হয় তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না, তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গ করবে না, তাদের সাথে যুদ্ধ করবে না যতদিন পর্যন্ত তারা সালাত প্রতিষ্ঠা করে।
যদি কারে মাঝে আল্লাহ তা‘আলার নাফরমানির কোনো কিছু দেখা যায়, তাহলে সেই নাফরমানির কাজটি ঘৃণার সাথে অপছন্দ করা উচিত। এই মর্মে মহান আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,
فَإِنْ عَصَوْكَ فَقُلْ إِنِّي بَرِيءٌ مِمَّا تَعْمَلُون
‘‘যদি তারা আপনার অবাধ্যতা করে তবে বলে দিন তোমরা যা কর তা থেকে আমি মুক্ত।’’ (সূরা আশ্ শু‘আরা ২৬ : ২১৬)
অর্থাৎ শাসকের মাঝে অপছন্দনীয় কোনো কিছু দেখা গেলে অন্তর দ্বারা ঘৃণা করবে যদি হাত দ্বারা বাধা দেয়া সম্ভব না হয়। তার আনুগত্য থেকে বের হওয়া বৈধ না। (মিরকাতুল মাফাতীহ ৩৬৭০)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৭০-[১০] ’আওফ ইবনু মালিক আল আশজা’ঈ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের মধ্যে ঐ শাসকই সর্বোত্তম, যাদের তোমরা ভালোবাসো এবং তারা তোমাদের ভালোবাসে। তোমরা তাদের জন্য দু’আ করো এবং তারাও তোমাদের জন্য দু’আ করে। আর তোমাদের মধ্যে ঐ শাসকই সর্বনিকৃষ্ট, যাদের প্রতি তোমরা ক্রোধান্বিত হও এবং তারাও তোমাদের প্রতি ক্রোধ ও শত্রুতা পোষণ করে। আর তাদের প্রতি তোমরা অভিসম্পাত করো এবং তারাও তোমাদের প্রতি অভিসম্পাত করে। রাবী বলেন, তখন আমরা জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল! এমতাবস্থায় কি আমরা তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করব না (তবুও কি বায়’আতের উপর থাকব)? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তোমাদের মাঝে সালাত প্রতিষ্ঠা করে। (পুনরায় বললেনঃ) না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তোমাদের মাঝে সালাত প্রতিষ্ঠা করে। সাবধান! যে ব্যক্তিকে তোমাদের প্রতি শাসক নিযুক্ত করা হয় আর তার মধ্যে যদি আল্লাহ তা’আলার নাফরমানি পরিলক্ষেত হয়, তাহলে তার সে নাফরমানির কাজটি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের সাথে অপছন্দ কর, কিন্তু তার আনুগত্য থেকে পিছপা হবে না। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ عَوْفِ بْنِ مَالِكٍ الْأَشْجَعِيِّ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «خِيَارُ أئمتكم الَّذين يحبونهم وَيُحِبُّونَكُمْ وَتُصَلُّونَ عَلَيْهِمْ وَيُصَلُّونَ عَلَيْكُمْ وَشِرَارُ أَئِمَّتِكُمُ الَّذِي تبغضونهم ويبغضونكم وتلعنوهم ويلعنوكم» قَالَ: قُلْنَا: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَفَلَا نُنَابِذُهُمْ عِنْدَ ذَلِكَ؟ قَالَ: «لَا مَا أَقَامُوا فِيكُمُ الصَّلَاةَ لَا مَا أَقَامُوا فِيكُمُ الصَّلَاةَ أَلَا مَنْ وُلِّيَ عَلَيْهِ وَالٍ فَرَآهُ يَأْتِي شَيْئًا مِنْ مَعْصِيَةِ اللَّهِ فَلْيَكْرَهْ مَا يَأْتِي مِنْ مَعْصِيَةِ اللَّهِ وَلَا يَنْزِعَنَّ يَدًا مِنْ طَاعَةٍ» . رَوَاهُ مُسلم
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৭১-[১১] উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের ওপর এমন শাসকবর্গ নিযুক্ত হবে যারা ভালো-মন্দ উভয় প্রকারের কাজ করতে দেখতে পাবে। সুতরাং যে ব্যক্তি তার অসৎ কাজের প্রতিবাদ করল, সে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেল। আর যে ব্যক্তি অন্তর থেকে ঘৃণা করল, সেও নিরাপদ হয়ে গেল। কিন্তু যে ব্যক্তি উক্ত কাজে সন্তুষ্টি প্রকাশ করল ও শাসকের আনুগত্য করল, তখন সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, এমতাবস্থায় কি আমরা তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করব না? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা সালাত কায়িম করে। না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা সালাত কায়িম করে। রাবী বলেন, প্রতিবাদ ও মন্দ জানার অর্থ হলো, যে ব্যক্তি অন্তর দিয়ে তা ঘৃণা করে ও অগ্রাহ্য করে। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أُمِّ سَلَمَةَ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَكُونُ عَلَيْكُمْ أُمَرَاءُ تَعْرِفُونَ وَتُنْكِرُونَ فَمَنْ أَنْكَرَ فَقْدَ بَرِئَ وَمَنْ كَرِهَ فَقَدْ سَلِمَ وَلَكِنْ مَنْ رَضِيَ وَتَابَعَ» قَالُوا: أَفَلَا نُقَاتِلُهُمْ؟ قَالَ: «لَا مَا صَلَّوْا لَا مَا صَلَّوْا» أَيْ: مَنْ كَرِهَ بِقَلْبِهِ وَأنكر بِقَلْبِه. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীস দ্বারা শাসকের মাঝে দু’টি গুণের বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। ১) তোমরা শাসকদের কিছু কর্মকে পছন্দ করবে। ২) তোমরা কিছু কর্মকে অপছন্দ করবে। অর্থাৎ তার কিছু কাজ হবে পছন্দনীয়, আর কিছু কর্ম হবে অপছন্দনীয়। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২২৬৫; মিরকাতুল মাফাতীহ)
উল্লেখিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গায়েব সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন। ইমাম কাযী (রহঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী :
(يَكُونُ عَلَيْكُمْ أُمَرَاءُ تَعْرِفُونَ وَتُنْكِرُونَ) উক্ত হাদীসে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাসকের দু’টি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ তিনি উম্মাতকে জানিয়েছেন যে, অচিরেই তোমাদের ওপর কতিপয় শাসক আসবে যাদের কিছু কাজকে তোমরা ভালো মনে করবে আর কিছু কাজকে খারাপ মনে করবে। তিনি এর দ্বারা উদ্দেশ্য নিয়েছেন যে, তাদের কিছু কর্ম সুন্দর হবে আর এর দ্বারা কিছু কর্ম খারাপ হবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী: (فَمَنْ أَنْكَرَ فَقْدَ بَرِئَ) অর্থাৎ যে ব্যক্তি তাদের মন্দ কাজগুলোকে প্রতিহত করল স্বীয় জিহবার মাধ্যমে সে নিফাক্বী থেকে মুক্ত হলো। আর যে ব্যক্তি তা করতে সক্ষম নয় যদি সে মনে মনে ঘৃণা করে তাহলে সে গুনাহের ক্ষেত্রে তাদের সাথে অংশীদারিত্ব হওয়া থেকে নিরাপদ থাকবে।
(وَلٰكِنْ مَنْ رَضِىَ وَتَابَعَ) অর্থ হলো যে ব্যক্তি সন্তুষ্টচিত্তে তাদের কর্মে রাজি থাকবে এবং তাদের খারাপ ‘আমলের অনুসারী হবে তাহলে সে গুনাহ ও শাস্তির হকদার হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।
(أَفَلَا نُقَاتِلُهُمْ؟) এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যতক্ষণ পর্যন্ত মুসলিম শাসকগণ নিজেরা সালাত আদায় করবে বা মানুষের মাঝে সালাত প্রতিষ্ঠা করবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র জুলুম ও ফাসিক্বীর কারণে বিদ্রোহ করা যাবে না। তবে যদি তারা ইসলামের মৌলিক বিষয়ের পরিবর্তন সাধন করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বৈধ। (শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৮৫৪)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৭২-[১২] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বললেনঃ শীঘ্রই তোমরা আমার পরে স্বজনপ্রীতি এবং এমন সব কাজ দেখবে যা তোমরা পছন্দ করবে না। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রসূল! তখন আমাদের করণীয় কি? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তখন তোমরা তাদের হক আদায় করো। আর তোমাদের হক আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করো। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ لَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّكُمْ سَتَرَوْنَ بَعْدِي أَثَرَةً وَأُمُورًا تُنْكِرُونَهَا» قَالُوا: فَمَا تَأْمُرُنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: «أَدُّوا إِلَيْهِم حَقهم وسلوا الله حقكم»
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসের মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় যে, বান্দার হক আদায় করার জন্য আল্লাহ তা‘আলার কাছে সাহায্য চাইতে হবে।
ত্বীবী (রহঃ) বলেছেনঃ তোমরা জনগণের শাসকের সাথে যুদ্ধ করবে না তোমাদের অধিকার আদায় করার জন্য। তাদের একচেটিয়া ক্ষমতা গ্রহণ করাকে তোমরা যথেষ্ট মনে করো না। বরং তোমরা তাদের অধিকার পূর্ণ কর। শ্রবণ করা, আনুগত্য করা, দীনের হক আদায় করার মাধ্যমে, তোমরা আল্লাহর নিকট অনুগ্রহ প্রার্থনা কর। তিনি তোমাদের হক পৌঁছে দিবেন গনীমাতের মাল এবং ফাই-এর মাল প্রদান করার মাধ্যমে। (মিরকাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২১৯০)
উল্লেখিত হাদীসের মাধ্যমে উৎসাহিত করা হয়েছে শাসকের কথার আনুগত্য করা এবং শ্রবণ করা। যদিও শাসক জুলুমকারী ও অন্যায়কারী হয়। তার অধিকার আদায় করবে আনুগত্য করার মাধ্যমে তার আনুগত্য থেকে বের হবে না বরং বিনয়ী হয়ে প্রার্থনা করবে আল্লাহ তা‘আলার নিকট কষ্ট দূর হওয়া, তার অনিষ্ট প্রতিহত করা এবং সংশোধন করা শাসকের মাঝে। (শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৮৪৩)
শাসকের স্বৈরাচারী বা একচেটিয়া ক্ষমতা গ্রহণ করা সম্পর্কে অনেকগুলো হাদীস বর্ণিত হয়েছে তার মধ্য থেকে প্রসিদ্ধ একটি হাদীস বর্ণনা করা হলো যা আল জামি‘ আস্ সগীরে বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমার পরে অচিরেই তোমরা একচেটিয়া/স্বজনপ্রীতি শাসকের সাক্ষাৎ পাবে। সুতরাং তোমরা ধৈর্য ধারণ কর যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা আমার সাথে সাক্ষাৎ না কর আগামীকাল (কিয়ামতের দিন) হাওযের নিকটে। [আহমাদ, বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী ও নাসায়ী] (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৭৩-[১৩] ওয়ায়িল ইবনু হুজর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন সালামাহ্ ইবনু ইয়াযীদ আল জু’ফী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর নবী! আপনি আমাদেরকে এ ব্যাপারে কি নির্দেশ দেন, যদি আমাদের ওপর এমন শাসক চেপে বসে যারা আমাদের থেকে স্বীয় হক আদায় করে নেয়। অথচ তারা আমাদের প্রতি হক আদায় করে না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তাদের আদেশ মান্য করো এবং আনুগত্য করো। কেননা তাদের কর্তব্য তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করা। আর তোমাদের কর্তব্য তোমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করা। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ وَائِلِ بْنِ حُجْرٍ قَالَ: سَأَلَ سَلَمَةُ بْنُ يَزِيدَ الْجُعْفِيُّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا نَبِيَّ اللَّهِ أَرَأَيْتَ إِنْ قَامَتْ عَلَيْنَا أُمَرَاءُ يَسْأَلُونَا حَقَّهُمْ وَيَمْنَعُونَا حَقَّنَا فَمَا تَأْمُرُنَا؟ قَالَ: «اسْمَعُوا وَأَطِيعُوا فَإِنَّمَا عَلَيْهِمْ مَا حُمِّلُوا وَعَلَيْكُمْ مَا حُمِّلْتُمْ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, রাষ্ট্রনায়ক বা শাসক ও সাধারণ মানুষ সকলের জন্য কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে তা বাস্তবায়ন বা পালন করা অপরিহার্য। শাসকের দায়িত্ব সাধারণ জনগণের ওপর ইনসাফ কায়িম করা, গনীমাতের মাল প্রদান করা ইত্যাদি। আর জনগণের দায়িত্ব হলো শাসকের কথা শ্রবণ করা এবং কথার আনুগত্য করা, বিপদের সময় ধৈর্য ধারণ করা, শাসকের কাজে সহায়তা করা। সুতরাং উভয়ের জন্য জরুরী হলো তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করা ও সীমালঙ্ঘন না করা।
এই মর্মে মহান আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ করেন : বলুন, আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রসূলের আনুগত্য কর। অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তবে তার ওপর ন্যস্ত দায়িত্বের জন্যে সে দায়ী এবং তোমাদের ওপর ন্যস্ত দায়িত্বের জন্য তোমরা দায়ী। তোমরা যদি তাঁর আনুগত্য কর তবে সৎ পথ পাবে। রসূলদের দায়িত্ব তো কেবল সুস্পষ্টরূপে পৌঁছে দেয়া।
উপরে উল্লেখিত আয়াত ও হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, শাসকের ওপর আল্লাহ তা‘আলা যে দায়িত্ব দিয়েছেন তা প্রতিষ্ঠা (বাস্তবায়ন) করা জরুরী। যেমন জনগণের মাঝে সমতা সৃষ্টি করা, আদল প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি যখন তারা এটা কায়িম করবে না তখন তাদের ওপর পাপ হবে। আর তোমাদের যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, যেমন কথা শোনা, আনুগত্য করা, অধিকার আদায় করা। যখন তোমরা এটা সম্পাদন করবে তখন তোমাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা সাওয়াব প্রদান করবেন। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২১৯৯; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৭৪-[১৪] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ইমাম বা শাসকের আনুগত্য থেকে দূরে সরে গেল, কিয়ামতের দিন সে আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় উপস্থিত হবে যে, তার কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকবে না। আর যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে যে, তার ঘাড়ে কোনো বায়’আত নেই, সে জাহিলিয়্যাতের ন্যায় মৃত্যুবরণ করবে। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم يَقُول: «مَنْ خَلَعَ يَدًا مِنْ طَاعَةٍ لَقِيَ اللَّهَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا حُجَّةَ لَهُ. وَمَنْ مَاتَ وَلَيْسَ فِي عُنُقِهِ بَيْعَةٌ مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: উল্লেখিত হাদীসে বায়‘আত ভঙ্গ করার ভয়াবহতা বর্ণনা করা হয়েছে। ইমাম ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ হাত রাখার অর্থ হচ্ছে অঙ্গীকার করা বা বায়‘আত নবায়ন করা। সাধারণতঃ মানুষ হাতের উপর হাত রাখার মাধ্যমে অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়ার অবস্থাকে বুঝে। আর হাত সরানোর মাধ্যমে বায়‘আত ভঙ্গ করার অর্থ নেয়া এর মাধ্যমে তিনি উদ্দেশ্য নিয়েছেন ঐ ব্যক্তিকে যে বায়‘আত ভঙ্গ করে এবং নিজেকে ইমামের অনুগত্য থেকে মুক্ত করে নেয়। এমন ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কিয়ামতের দিন সাক্ষাৎ করবে গুনাগাহগার অবস্থায় তার কোনো ওযর তিনি গ্রহণ করবেন না।
(مَنْ مَاتَ وَلَيْسَ فِىْ عُنُقِه بَيْعَةٌ مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً) এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যে ব্যক্তি মুসলিমদের স্বীকৃত ইমামের বায়‘আত থেকে বের হয়ে যাবে তার জাহিলী মৃত্যু হবে। কিন্তু প্রচলিত ইমামদের বায়‘আত থেকে যে বের হবে তার কোনো দোষ হবে না। (শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৮৫১)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৭৫-[১৫] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বনী ইসরাঈল-এর নবীগণ তাদের ওপর শাসন পরিচালনা করতেন, যখন একজন নবী ইন্তেকাল করতেন তখন অপর আরেকজন নবী তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতেন। কিন্তু আমার পরে আর কোনো নবী নেই, তবে অনেক খলীফা হবেন। সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞেস করলেনঃ তখন আমাদের প্রতি করণীয় দিক-নির্দেশনা দিন? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ প্রথমজনের বায়’আত পূর্ণ করো, অতঃপর তাদের হক আদায় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা শাসিতদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন, তাদের ব্যাপারে যাদের ওপর শাসক নিযুক্ত করেছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «كَانَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ تَسُوسُهُمُ الْأَنْبِيَاءُ كُلَّمَا هَلَكَ نَبِيُّ خَلَفَهُ نبيٌّ وإِنَّه لَا نبيَّ بعدِي وسيكون حلفاء فَيَكْثُرُونَ» قَالُوا: فَمَا تَأْمُرُنَا؟ قَالَ: «فُوا بَيْعَةَ الْأَوَّلِ فَالْأَوَّلِ أَعْطُوهُمْ حَقَّهُمْ فَإِنَّ اللَّهَ سَائِلُهُمْ عَمَّا استرعاهم»
ব্যাখ্যা: প্রথমজনের পর প্রথমজনের বায়‘আত পূর্ণ কর। অর্থাৎ ঐ শাসকের বা আমীরের আনুগত্য কর যে প্রথমে আমীর হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন। এরপর ঐ আমীরের আনুগত্য কর, যে তারপর নিযুক্ত হয়েছেন।
সারকথা, একজনের পর আরেকজন ধারাবাহিকভাবে যে আমীর নিযুক্ত হন অনুরূপভাবে তোমরাও ধারাবাহিকভাবে এক আমীরের পর অপর আমীরের আনুগত্য কর। অবশ্য যদি একই সময় দু’ ব্যক্তি আমীর হওয়ার দাবী করে তাহলে তোমরা ঐ ব্যক্তির বায়‘আত পূর্ণ কর যিনি প্রথমে নিযুক্ত হয়েছেন।
তোমাদের ওপর তাদের যে হক ও অধিকার রয়েছে তা তোমরা আদায় কর। যদিও তারা তোমাদের হক আদায় না করে। কিয়ামতের দিন তাদেরকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। তখন তাদের থেকে জনগণের হক আদায় করে নেয়া হবে। যদি তারা হক আদায় করতে সক্ষম না হয়, তাহলে তাদেরকে কঠিন শাস্তির মুখাপেক্ষী হতে হবে।
উল্লেখিত হাদীসে বলা হয়েছে, যখন বানী ইসরাঈলের কোনো ফাসাদ প্রকাশ পেত তখন আল্লাহ রববুল ‘আলামীন একজন নাবী তাদের মাঝে প্রেরণ করতেন। ঐ নাবী মৃত্যুবরণ করলে অন্য একজন নাবী প্রেরণ করতেন, তিনি তাদের সকল বিষয় দেখা শোনা করতেন এবং তারা তাওরাতের যা পরিবর্তন করেছে তা ঠিক করে দিতেন।
ইমাম নববী (রহঃ) বলেনঃ চাই তারা দ্বিতীয়জনের নিকট চুক্তিবদ্ধ হোক, প্রথমজনের চুক্তিবদ্ধতা জেনে বা না জেনে। চাই তারা একই শহরে হোক বা একাধিক শহরে হোক, চাই তারা খলীফার শহরে হোক বা দূরে হোক- এটাই সঠিক মত যা জুমহূর ‘আলিমগণ বলেছেন। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৪৫৫; শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৮৪২)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৭৬-[১৬] আবূ সা’ঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন দু’ খলীফার বায়’আত করা হয়, তখন তাদের দ্বিতীয়জনকে হত্যা করে ফেলো। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا بُويِعَ لِخَلِيفَتَيْنِ فاقتُلوا الآخِرَ منهُما» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসের মাধ্যমে বুঝা যায় বা জানা যায় যে, একটি রাষ্ট্রে একই সময়ে দু’ জন খলীফা বা শাসকের নিকট বায়‘আত করা বৈধ না। যদি কোনো রাষ্ট্রে দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তি খলীফা দাবী করে তা নিয়ে মুহাদ্দিসের নিকট মতভেদ রয়েছে।
* কাযী (রহঃ) বলেছেনঃ এখানে ‘হত্যা করা’ দ্বারা উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে লড়াই করা।
বলা হয়: অপরজনের বায়‘আতকে বাতিল করা এবং তার নির্দেশকে দুর্বল করা।
* ইমাম হারামায়ন (রহঃ) তার ‘‘ইরশাদ’’ গ্রন্থে বলেছেনঃ আমাদের সঙ্গীগণ বলেছেন, দু’জন ব্যক্তির নিকটে চুক্তি করা, বায়‘আত সম্পাদন করা জায়িয নেই।
উল্লেখিত হাদীসে বলা হয়েছে, যখন দু’জন খলীফা বায়‘আত গ্রহণ করবে তখন প্রথমজনের বায়‘আত সঠিক হিসেবে গণ্য হবে। আর দ্বিতীয়জনকে হত্যা করতে হবে।
ইমাম কাযী (রহঃ) বলেনঃ উল্লেখিত হাদীসে (اقْتُلُوا) শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য লড়াই করা, কেননা এর মাধ্যমে চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছা যায়।
কেউ কেউ বলেছেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য অপরজনের বায়‘আত বাতিল করে দিবে।
ইমাম নববী (রহঃ) বলেনঃ «أَهْلِ الْبَغْيِ» সীমালঙ্ঘনকারীর সাথে যুদ্ধ করবে কোনো প্রকার অঙ্গীকার ভঙ্গ ছাড়াই। কেননা তারা এমন ব্যক্তির সাথে যুদ্ধ করছে যে, ইমামের সাথে যুদ্ধ করাকে আবশ্যক করে নিয়েছে। মুহাদ্দিসগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, একই যুগে দু’ ব্যক্তির হাতে বায়‘আত নেয়া বৈধ নয়। (শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৮৫৩)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৭৭-[১৭] ’আরফাজাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ নিঃসন্দেহে শীঘ্রই কলহ-বিবাদ ও বিশৃঙ্খলার উদ্ভব হবে। সুতরাং উম্মাতের মাঝে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত থাকার পরও যে ব্যক্তি বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়, তাকে তরবারির আঘাতে হত্যা করে ফেলো, সে যে কেউ হোক না কেন। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ عَرْفَجَةَ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «إِنَّهُ سَيَكُونُ هَنَاتٌ وَهَنَاتٌ فَمَنْ أَرَادَ أَنْ يُفَرِّقَ أَمْرَ هَذِهِ الْأُمَّةِ وَهِيَ جَمِيعٌ فَاضْرِبُوهُ بِالسَّيْفِ كَائِنًا مَنْ كانَ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: অচিরেই মুসলিমদের মাঝে জমিনের উপরে ফিতনা-ফাসাদ, হাঙ্গামা, শত্রুতা প্রকাশ পাবে। মানুষ ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অনুসন্ধানকামী হবে। নিশ্চয় প্রথমে যে ইমাম, খলীফার বায়‘আত গ্রহণ করা হয়েছে নেতৃত্ব তার নিকটেই থাকবে, তারা মুসলিমদের ঐক্য বিনষ্ট করা ও ফাটল সৃষ্টি করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
(كَائِنًا مَنْ كانَ) ‘‘চাই সে যে কেউ হোক না কেন?’’
* ইমাম নাসায়ী ইবনু হিব্বান বর্ণনা করেছেন : ‘আর্ফাজাহ্ থেকে বর্ণিত। নিশ্চয় অচিরেই ফাসাদণ্ডহাঙ্গামা সৃষ্টি হবে। সুতরাং যে ব্যক্তি দেখবে জামা‘আতের ঐক্য বিচ্ছিন্ন করতে অথবা উম্মাতের মাঝে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত থাকার পরও পার্থক্য করতে চায়। সে যে কেউ হোক না কেন তাকে হত্যা করবে। কেননা আল্লাহর ক্ষমতা, শক্তি জামা‘আতের ঐক্যতার উপরে রয়েছে। কেননা শায়ত্বন জামা‘আতের ঐক্য বিনষ্টকারীর সাথে দৌড়ায়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
উল্লেখিত হাদীসে هَنَاتٌ শব্দের অর্থ হলো অনিষ্ট বা খারাপী কিংবা বিশৃঙ্খলা। এর দ্বারা উদ্দেশ্য ঐ সকল ফিতনাহ্ ফাসাদ যা মানুষের নিকট ধারাবাহিকভাবে আসবে।
উক্ত হাদীসের গোপন অর্থ হচ্ছে অচিরেই পৃথিবীতে বিভিন্ন ফিতনা-ফাসাদ প্রকাশ পাবে নেতৃত্বের লোভে, প্রত্যেক দিক থেকে ঐ সময় ইমাম হিসেবে গণ্য হবে ঐ ব্যক্তি, যার বায়‘আত প্রথমে সংঘটিত হয়েছে। মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থায় যে ব্যক্তি মুসলিম উম্মাহর মাঝে ফাটল সৃষ্টি করে ইসলাম তার গর্দান উড়িয়ে দেয়ার জন্য আদেশ করেছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর (كَائِنًا مَنْ كانَ) এর অর্থ হচ্ছে সে ব্যক্তির আমার বংশধর হোক বা অন্য কেউ হোক সর্বাবস্থায় খিলাফাতের হকদার হবে প্রথমজন। (শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৮৫২; ‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৭৪৯)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৭৮-[১৮] উক্ত রাবী [’আরফাজাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ একজন ন্যায়সঙ্গতভাবে নির্বাচিত ব্যক্তির অধীনে তোমরা ঐক্যবদ্ধ থাকা অবস্থায় যদি কেউ তোমাদের ঐক্য ও সংহতির মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়। সুতরাং তোমরা তাকে হত্যা করে ফেলো। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْهُ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَنْ أَتَاكُمْ وَأَمْرُكُمْ جَمِيعٌ عَلَى رَجُلٍ وَاحِدٍ يُرِيدُ أَنْ يَشُقَّ عَصَاكُمْ أوْ يُفرِّقَ جماعتكم فَاقْتُلُوهُ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, যে ব্যক্তি শাসক বা খলীফার বিরুদ্ধাচরণকারী ও রাষ্ট্রদ্রোহী হবে তাকে হত্যা করা হবে। অথাব ইচ্ছা করবে মুসলিমদের কথার মাঝে, ঐক্যতার মাঝে পার্থক্য সৃষ্টি করতে। বরং এটা থেকে নিষেধ করতে। অতঃপর যদি এটা থেকে বিরত না থাকে তাহলে হত্যা করবে। যদি মন্দের দিকে ধাবিত হয় তাহলে তাকে হত্যা করবে। (শারহে মুসলিম ১২ খন্ড, হাঃ ১৮৫২-৬০)
‘আল বিদায়াহ্ ওয়ান নিহায়াহ্’ গ্রন্থাকার বলেছেনঃ তখনই লাঠি ভাঙ্গবে যখন জামা‘আতে বিচ্ছেদ ঘটবে।
‘‘সে তোমাদের লাঠি ভাঙ্গতে চায়’’ এর দ্বারা উপমা দেয়া হয়েছে যে, মুসলিমদের ঐক্যের মাঝে পার্থক্য সৃষ্টি করা বুঝানো হয়েছে। একটি লাঠির সাথে তুলনা করার মাধ্যমে। তাদের কোনো বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করা একটি লাঠির মতো যখনই তাদের মাঝে মতপার্থক্য ঘটবে তখনই তাদের লাঠি ভাঙ্গবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৭৯-[১৯] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি খলীফার (ইমামের) বায়’আত করল, স্বীয় হাতে হাত দিয়ে আনুগত্যের অঙ্গীকারাবদ্ধ হলো এবং অন্তর দিয়ে সে বায়’আতের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করল। সে যেন পরিপূর্ণরূপে তার আনুগত্য করে। তথাপিও যদি কেউ এসে (খিলাফাতের দাবি করে) প্রথম ইমামের বিপক্ষে অবস্থান নেয়, তাহলে তোমরা তার গর্দান ভেঙ্গে দাও। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «من بَايَعَ إِمَامًا فَأَعْطَاهُ صَفْقَةَ يَدِهِ وَثَمَرَةَ قَلْبِهِ فَلْيُطِعْهُ إِنِ اسْتَطَاعَ فَإِنْ جَاءَ آخَرُ يُنَازِعُهُ فاضربوا عنق الآخر» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: উল্লেখিত হাদীসে বায়‘আতের গুরুত্ব বুঝানো হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী صَفْقَةَ يَدِه
নিহায়াহ্ গ্রন্থে এসেছে الصَفْقَةَ শব্দের অর্থ হচ্ছে হাতে হাত মারা। কেননা দু’জন চুক্তিবদ্ধকারী শপথ বা বায়‘আতের সময়ে একে অপরের হাতে হাত রেখে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়। কেউ কেউ বলেছেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সম্পদ বা সন্তানাদিসহ বায়‘আত বুঝানো হয়েছে।
ثَمَرَةَ قَلْبِه এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো একনিষ্ঠভাবে সন্তুষ্টিচিত্তে ইমামের আনুগত্য করা। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৮০-[২০] ’আবদুর রহমান ইবনু সামুরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেছেনঃ নেতৃত্ব বা পদাধিকার প্রত্যাশা করো না। কেননা তোমার চাওয়ার কারণে যদি তা দেয়া হয়, তাহলে তা তোমার ওপর ন্যস্ত করা হবে। আর যদি তা তোমাকে চাওয়া ব্যতীত দেয়া হয়, তবে তুমি এ ব্যাপারে সাহায্যপ্রাপ্ত হবে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ: قَالَ لِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تَسْأَلِ الْإِمَارَةَ فَإِنَّكَ إِنْ أُعْطِيتَهَا عَنْ مَسْأَلَةٍ وُكِلْتَ إِلَيْهَا وَإِنْ أُعْطِيتَهَا عنْ غيرِ مَسْأَلَة أعنت عَلَيْهَا»
ব্যাখ্যা: নেতৃত্ব বা পদ চাওয়া সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ করেন : ‘‘ইউসুফ (আঃ) বললেন, আমাকে দেশের ধনভাণ্ডারের উপর কর্তৃত্ব প্রদান করুন। আমি বিশ্বস্ত রক্ষক ও সুবিজ্ঞ।’’ (সূরা ইউসুফ ১২ : ৫৫)
হাদীসের উপকারিতা: ১. নেতৃত্বের পদ চেয়ে নেয়া অপছন্দনীয় চাই তা প্রশাসন হোক বা বিচার হোক ইত্যাদি। ২. বর্ণনা করা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি নেতৃত্ব চেয়ে নেয় তার নিকটে আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য থাকে না। এজন্যই ঐ কাজ তার জন্য যথেষ্ট না। সুতরাং উচিত নেতৃত্ব না চাওয়া। এ সম্পর্কে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমরা গভর্নর নিযুক্ত করি না, যে অনুসন্ধান করে বা আগ্রহ প্রকাশ করে। (শারহে মুসলিম ১১ খন্ড, হাঃ ১৬৫২-১৯)
হাদীসের সারমর্ম: যে ব্যক্তি নেতৃত্ব চেয়ে নেয়। অতঃপর চাওয়ার কারণে প্রদান করা হয়। তাহলে আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য উঠিয়ে নেয়া হয়। তাঁর আগ্রহের কারণে অবহিত হওয়া যায়, নিশ্চয় নেতৃত্ব চেয়ে নেয়া মাকরূহ বা অপছন্দনীয়। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৯২৭)
কিছু শর্তের সাথে পদ ও নেতৃত্ব চেয়ে নেয়া জায়িয আছে। যেমন কোনো ক্ষমতা নেতৃত্ব ও মর্যাদার লোভ না থাকা, বরং ন্যায় ইনসাফের সাথে সঠিক পদ্ধতিতে হক আদায় করার উদ্দেশ্য থাকা। এটাই উদ্দেশ্য ছিল ইউসুফ (আঃ) এবং খুলাফায়ে রাশিদীনগণের। (ফাতহুল বারী ১৩শ খন্ড, হাঃ ৩৬৮০)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৮১-[২১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শীঘ্রই তোমরা ক্ষমতা ও নেতৃত্বের জন্য লালায়িত হয়ে পড়বে। আর এ কারণে নিশ্চয় কিয়ামতের দিন তোমরা লজ্জিত হবে। অতঃপর তা কতই না উত্তম দুধপানকারিণী এবং দুধ ছাড়ানোকারিণী কতই না মন্দ। (বুখারী)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّكُمْ سَتَحْرِصُونَ عَلَى الْإِمَارَةِ وَسَتَكُونُ نَدَامَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَنِعْمَ الْمُرْضِعَةُ وَبِئْسَتِ الفاطمةُ» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: নেতৃত্ব দু’ প্রকার। যথা: ১. বড় নেতৃত্ব। আর তা হলো খলীফা বা শাসক হওয়া। ২. ছোট নেতৃত্ব। আর তা হলো দেশের কিছু অংশের গভর্নর হওয়া। (ফাতহুল বারী ১৩শ খন্ড, হাঃ ৭১৪৮)
নেতৃত্ব চেয়ে নেয়ার মাধ্যমে নিজের ক্ষতি হওয়ার উপকরণগুলো হলো: ১. তিরস্কার, ২. লজ্জিত, অপমান, ৩. পরকালের শাস্তি, ৪. জরিমানা। (ত্ববারানীতে বর্ণিত)
ইমাম নববী (রহঃ) বলেছেনঃ এটাই বড় মূলনীতি হলো যে, নেতৃত্ব থেকে বেঁচে থাকা বিশেষ করে শাসক যদি দুর্বল হয়। যদি হক প্রতিষ্ঠা করতে পারে তাহলে সাওয়াব রয়েছে। আর যদি হক প্রতিষ্ঠা করতে না পারে তাহলে ভয়াবহ বিপদ রয়েছে।
‘‘সে কতই উত্তম দুধপানকারিণী, আবার কতই না মন্দ দুধ ছাড়ানোকারিণী’’ এর ব্যাখ্যা আলোচ্য হাদীসে নেতৃত্বের, ক্ষমতার শুরু ভাগকে দুধপানকারিণী মহিলার সাথে এবং তার শেষভাগকে দুধ ছাড়ানো মহিলার সাথে তুলনা করা হয়েছে। দুধ পান করলে শিশু ও মা যেমন আনন্দ পায় তেমনি মানুষ ক্ষমতা ও নেতৃত্ব লাভ করার মাধ্যমে আনন্দ পায়। আবার শিশুকে দুধ পান করানো ছেড়ে দিলে সে যেমন কষ্ট পায় অনুরূপ মানুষের ক্ষমতা চলে গেলে কষ্ট পায়।
ইমাম আবূ দাঊদ (রহঃ) বলেছেনঃ দুধপানকারিণী কতই না উত্তম পৃথিবীতে দুধ ছাড়ানোকারিণী কতই না মন্দ মৃত্যুর পরে। (ফাতহুল বারী ১৩শ খন্ড, হাঃ ৭১৪৮)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৮২-[২২] আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম : হে আল্লাহর রসূল! আপনি কি আমাকে (কোনো অঞ্চলের) শাসক নিযুক্ত করবেন না? তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমার কাঁধে করাঘাত করে বললেনঃ হে আবূ যার! তুমি একজন দুর্বল প্রকৃতির লোক, আর শাসনকার্য হলো একটি আমানত। নিশ্চয় তা হবে কিয়ামতের দিন অপমান ও লাঞ্ছনা। তবে সে ব্যক্তি ব্যতীত, যে তা ন্যায়সঙ্গতভাবে মেনে নিয়েছে এবং নিষ্ঠার সাথে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছে।
অপর এক বর্ণনাতে আছে- তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে বললেনঃ হে আবূ যার! আমি দেখছি তুমি একজন দুর্বলমনা লোক। আর আমি তোমার জন্য সেটাই পছন্দ করি, যা আমি নিজের জন্য পছন্দ করি। তুমি কক্ষনো দু’জন লোকেরও শাসক হয়ো (দায়িত্বভার নিও) না। আর ইয়াতীমের ধন-সম্পদের অভিভাবকও হয়ো না। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَلَا تَسْتَعْمِلُنِي؟ قَالَ: فَضَرَبَ بِيَدِهِ عَلَى مَنْكِبِي ثُمَّ قَالَ: «يَا أَبَا ذَرٍّ إِنَّكَ ضَعِيفٌ وَإِنَّهَا أَمَانَةٌ وَإِنَّهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ خِزْيٌ وَنَدَامَةٌ إِلَّا مَنْ أَخَذَهَا بِحَقِّهَا وَأَدَّى الَّذِي عَلَيْهِ فِيهَا» . وَفِي رِوَايَةٍ: قَالَ لَهُ: «يَا أَبَا ذَرٍّ إِنِّي أَرَاكَ ضَعِيفًا وَإِنِّي أُحِبُّ لَكَ مَا أُحِبُّ لِنَفْسِي لَا تَأَمَّرَنَّ عَلَى اثْنَيْنِ وَلَا تَوَلَّيَنَّ مَالَ يَتِيمٍ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যা: এ হাদীসের মাঝে বড় একটি মৌলিক নেতৃত্ব বা ক্ষমতা থেকে বেঁচে থাকা। বিশেষ করে যে ব্যক্তির মাঝে দুর্বলতা রয়েছে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে না।
অতঃপর নেতৃত্ব পাওয়ার বিষয়টি হক কিন্তু সে তার যোগ্য নয়। অথবা যোগ্যব্যক্তি কিন্তু ন্যায় ইনসাফ করতে পারেনি। আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন অপমানিত এবং লাঞ্ছিত করবেন। আর লাঞ্ছিত হবেন অন্যায় কাজ করার জন্য। আর যে ব্যক্তি নেতৃত্বের যোগ্য এবং নেতৃত্বের সময় ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেছে তার জন্য মহান সাওয়াব রয়েছে। (শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৮২৫-১৬)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৮৩-[২৩] আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি ও আমার দুই চাচাতো ভাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গেলাম। তখন তাদের একজন বলল : হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহ তা’আলা আপনাকে (সমগ্র বিশ্বের মানবের) শাসনকর্তা বানিয়েছেন। আপনি আমাদেরকেও তাত্থেকে কোনো একটি অঞ্চলের শাসনকার্যের দায়িত্ব দিন। এরপর দ্বিতীয়জনও অনুরূপ কথার পুনরাবৃত্তি করল। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আল্লাহর কসম! আমরা এ কাজে এমন কোনো ব্যক্তিকে শাসনকর্তা (শাসক) নিযুক্ত করি না, যে তা চেয়ে নেয় (প্রত্যাশা করে) এবং ঐ ব্যক্তিকেও নয়, যে তার জন্য লালায়িত থাকে।
অপর এক বর্ণনাতে আছে- তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আমরা আমাদের শাসনকার্যে এমন কোনো লোককে নিযুক্ত করি না, যে তার আকাঙ্ক্ষা করে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَبِي مُوسَى قَالَ: دَخَلْتُ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَا وَرَجُلَانِ مِنْ بَنِي عَمِّي فَقَالَ أَحَدُهُمَا: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَمِّرْنَا عَلَى بَعْضِ مَا وَلَّاكَ اللَّهُ وَقَالَ الْآخَرُ مِثْلَ ذَلِكَ فَقَالَ: «إِنَّا وَاللَّهِ لَا نُوَلِّي عَلَى هَذَا الْعَمَلِ أَحَدًا سَأَلَهُ وَلَا أَحَدًا حَرَصَ عَلَيْهِ» . وَفِي رِوَايَةٍ قَالَ: «لَا نَسْتَعْمِلُ عَلَى عَمَلِنَا مَنْ أَرَادَهُ»
ব্যাখ্যা: কাযী বায়যাবী (রহঃ) বলেছেনঃ কোনো জ্ঞানী ব্যক্তির উচিত নয় আনন্দিত হওয়া যার পরিণতিতে রয়েছে কষ্ট।
মুহলাব (রহঃ) বলেছেনঃ ক্ষমতার উপরে আগ্রহী হওয়া এটাই কারণ মানুষের মাঝে পরস্পরে লড়াই করা। এমনকি তাদের মাঝে রক্তপাত ঘটে এবং পৃথিবীতে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এবং লজ্জিত হওয়ার পদ্ধতি হলো যে, নিশ্চয় সে হত্যা করবে অথবা মৃত্যুবরণ করবে অথবা পদস্খলন করবে।
উল্লেখিত হাদীস থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যায়, কেউ দায়িত্ব চাইলে তাকে দায়িত্ব দেয়া যাবে না। কেননা কারো দায়িত্ব চাওয়াটাই প্রমাণ বহন করে যে, সে মাল-সম্পদ ও মান সম্মানের প্রতি আগ্রহী, ফলে দায়িত্ব পেলে অন্যায়ে জড়াতে পারে তাই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি দায়িত্ব চায় আমরা তাকে দায়িত্ব দেই না এবং যে লোভ করে তাকেও দেই না। (ফাতহুল বারী ১৩শ খন্ড, হাঃ ৭১৪৯)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৮৪-[২৪] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ঐ ব্যক্তিকে পাবে, যে শাসনভারকে মারাত্মকভাবে ঘৃণা পোষণ করে, যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার মাঝে নিপতিত না হয়। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «تَجِدُونَ مِنْ خَيْرِ النَّاسِ أَشَدَّهُمْ كَرَاهِيَةً لِهَذَا الْأَمْرِ حَتَّى يقَعَ فِيهِ»
ব্যাখ্যা: উল্লেখিত হাদীস দ্বারা উদ্দেশ্য হতে পারে। ইমাম ত্বীবী (রহঃ) বলেছেনঃ দু’টি উদ্দেশ্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
(এক) লোকেদের মাঝে তোমরা সর্বোত্তম ব্যক্তিকে পাবে, তারা ক্ষমতা গ্রহণ করাকে চরমভাবে ঘৃণা করে এমনকি তার মাঝে লিপ্ত হয়। ঐ সময়ে তাদের মাঝে কল্যাণ থাকে না।
(দুই) নিশ্চয় এর চূড়ান্ত পর্যায় হলো, সে অপছন্দ করে এমনকি তাতে লিপ্ত হয়। ঐ সময় আল্লাহ তা‘আলা তাকে সাহায্য করবে। সুতরাং সে অপছন্দনীয় হবে না। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
কাযী (রহঃ) বলেছেনঃ সম্ভাবনা রয়েছে এটার দ্বারা উদ্দেশ্য হওয়া ইসলাম যেমনটি ধারণা করেছেন ‘উমার, খালিদ বিন ওয়ালীদ, ‘ইকরামাহ্-সহ অন্যান্যরা। তারা ইসলামকে খুব কঠোরভাবে অপছন্দ করেছিল। যখন ইসলামের মাঝে প্রবেশ করেছে তখন একনিষ্ঠতার সাথে অনুসরণ করেছে এবং ইসলামকে ভালোবেসেছে এবং ইসলামের কালিমার জন্য জিহাদ করেছে। (শারহে মুসলিম ১৬শ খন্ড, হাঃ ২৫২৬)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৮৫-[২৫] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই এক একজন দায়িত্বশীল, আর (পরকালে) নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে তোমাদের প্রত্যেককেই জবাবদিহি করতে হবে। সুতরাং জনগণের শাসকও একজন দায়িত্বশীল লোক, তার দায়িত্ব সম্পর্কে তাকে জবাবদিহি করতে হবে। আর প্রত্যেক পুরুষ তার পরিবারের একজন দায়িত্বশীল, তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। আর স্ত্রী তার স্বামীর ঘর-সংসার ও সন্তান-সন্ততির ওপর দায়িত্বশীল, তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। এমনকি কোনো গোলাম বা চাকর-চাকরাণীও তার মুনীবের ধন-সম্পদের উপর একজন দায়িত্বশীল, তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। অতএব সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই এক একজন দায়িত্বশীল, আর তোমাদের প্রত্যেককেই স্বীয় দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হতে হবে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «أَلا كلُّكُمْ راعٍ وكلُّكُمْ مسؤولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ فَالْإِمَامُ الَّذِي عَلَى النَّاسِ رَاعٍ وَهُوَ مسؤولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ وَالرَّجُلُ رَاعٍ عَلَى أَهْلِ بَيْتِهِ وَهُوَ مسؤولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ وَالْمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ عَلَى بَيْتِ زَوْجِهَا وولدِهِ وَهِي مسؤولةٌ عَنْهُمْ وَعَبْدُ الرَّجُلِ رَاعٍ عَلَى مَالِ سَيِّدِهِ وَهُوَ مسؤولٌ عَنهُ أَلا فكلُّكُمْ راعٍ وكلكُمْ مسؤولٌ عَن رعيتِه»
ব্যাখ্যা: উল্লেখিত হাদীসে দায়িত্বের প্রতি যত্নবান হওয়ার জন্য গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
শারহেস্ সুন্নাহ্ গ্রন্থে এসেছে যে, الرَّاع শব্দের অর্থ হচ্ছে ঐ সংরক্ষক ব্যক্তি যে তার দায়িত্বে থাকা বিষয়কে আমানতদারিতার সাথে সংরক্ষণ করে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাসীহাতের মাধ্যমে তাদেরকে এর আদেশ দিয়েছেন। তার মূল্যবান বাণী: أَنَّهُمْ مَسْئُولُونَ عَنْهُ এই সংবাদের মাধ্যমে তাদেরকে খিয়ানাতের সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। সুতরাং আমরা বলতে পারি, رَاعِيَةٌ হচ্ছে বস্তুকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা এবং অঙ্গীকারকে সুন্দর করা। সুতরাং শাসকের رَاعِيَةٌ হচ্ছে রাষ্ট্রকে সুন্দরভাবে দেখাশোনা করা এবং প্রজাদের ওপর ভালোভাবে খেয়াল রাখা এবং তাদের মাঝে حُدُودِ ও ইসলামের হুকুম-আহকাম প্রতিষ্ঠা করা।
رِعَايَةُ الرَّجُلِ أَهْلَه এর অর্থ পরিবারকে ভালোভাবে দেখাশোনা করা এবং তাদেরকে খরচ দেয়া এবং তাদের সাথে সুন্দর আচরণ করা।
رِعَايَةُ الْمَرْأَةِ এর অর্থ হচ্ছে মহিলা তার স্বামীর ঘরের সকল বিষয় সুন্দরভাবে পরিচালনা করবে এবং তার অঙ্গীকার পূর্ণ করবে তার মেহমানদের খিদমাতের মাধ্যমে।
رِعَايَةُ الْخَادِمِ এর অর্থ হচ্ছে খাদেম তার মুনীবের যত মাল সম্পদ তার হাতে রয়েছে তা সংরক্ষণ করবে এবং সর্বদা মুনীবের কাজে দণ্ডায়মান থাকবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৮৬-[২৬] মা’ক্বিল ইবনু ইয়াসার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ মুসলিম জনতার ওপর যদি কোনো শাসক নিযুক্ত হয়, অতঃপর সে আত্মসাৎকারীরূপে মৃত্যুবরণ করে, তাহলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ مَعْقِلِ بْنِ يَسَارٍ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم يقولُ: «مَا مِنْ والٍ بلي رَعِيَّةً مِنَ الْمُسْلِمِينَ فَيَمُوتُ وَهُوَ غَاشٌّ لَهُمْ إِلَّا حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ»
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে আত্মসাৎকারী বলতে বুঝানো হয়েছে প্রজাদের ওপর খিয়ানাতকারী অথবা তাদের ওপর জুলুমকারী তাদের হক বা অধিকার আদায় করে না। তাদের থেকে যা গ্রহণ করে তা তাদের ওপর ওয়াজিব নয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
‘জান্নাত হারাম হওয়া’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো নাজাতপ্রাপ্ত লোকেদের সাথে সে প্রাথমিক পর্যায়ে যেতে পারবে না। তার পাপের শাস্তি ভোগ করার পর সে জান্নাতে যাবে। (শারহে মুসলিম ২য় খন্ড, হাঃ ১৪২)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৮৭-[২৭] উক্ত রাবী [মা’ক্বিল ইবনু ইয়াসার (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ কোনো ব্যক্তিকে যদি আল্লাহ তা’আলা প্রজাপালনের দায়িত্ব প্রদান করেন। আর সে তাদের জন্য কল্যাণকর নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয় বা না পারে, সে জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْهُ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَا مِنْ عَبْدٍ يَسْتَرْعِيهِ اللَّهُ رَعِيَّةً فَلَمْ يَحُطْهَا بِنَصِيحَةٍ إِلَّا لَمْ يجد رَائِحَة الْجنَّة»
ব্যাখ্যা : অত্র হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী (রহঃ) লিখেছেন : ‘‘তার ওপর আল্লাহ তা‘আলা জান্নাত হারাম করেছেন’’ এটা দ্বারা দু’টি উদ্দেশ্য হতে পারে।
এক. এটার সম্ভাবনা রয়েছে যে, তাদের জান্নাতে প্রবেশ করা অসম্ভব।
দুই. প্রথম শ্রেণীর/পূর্ববর্তী সফলকামওয়ালা লোকেদের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করা হারাম। সুতরাং এখানে হারাম অর্থ নিষেধ।
কাযী ‘ইয়ায (রহঃ) বলেনঃ সতর্ক করা যে ব্যক্তি মুসলিমদের সাথে প্রতারণা করে। যাকে আল্লাহ তা‘আলা দায়িত্ব অর্পণ করেছেন প্রজাদের রক্ষনাবেক্ষণের জন্য এবং তাকে নিয়োগ দিয়েছেন তাদের (প্রজাদের) কল্যাণের জন্য। ইহজগতে ও পারলৌকিক জগতের উপরে। অতঃপর সে (দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি) তার নিকট যে আমানত রাখা হয়েছিল তা খিয়ানাত করে। তাদের অধিকার নষ্ট করে, তাদের ওপর ন্যায় ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা ছেড়ে দেয়।
কাযী (রহঃ) আরো বলেনঃ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সতর্ক করেছেন ঐ ধরনের ধ্বংসাত্মক কবীরা গুনাহ থেকে বিরত থাকতে যা জান্নাত থেকে দূরে সরে দেয়। [আল্লাহ তা‘আলা অধিক ভালো জানেন] (শারহে মুসলিম ২য় খন্ড, হাঃ ১৪২)
উক্ত হাদীসে মুসলিমদের ফাটল সৃষ্টি না করতে আদেশ করা হয়েছে। আর হাদীসে شق العصا শব্দ দ্বারা মুসলিমদের ঐক্যকে বুঝানো হয়েছে।
ইমাম ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ লাঠি ভাঙ্গার অর্থ হচ্ছে মুসলিমদের ঐক্যকে নষ্ট করা। মানুষ যখন ঐক্যবদ্ধভাবে কোনো একটা বিষয়ের উপর একত্রিত হয় যা কখনো ফাটল সৃষ্টি হওয়ার মতো নয় এরূপ ঐক্যকে লাঠির সাথে সাদৃশ্য দেয়া হয়েছে উক্ত হাদীসে। আর যখন তারা ঐ বিষয়ে মতানৈক্য করে দলে দলে বিচ্ছিন্ন হয় তখন যে ব্যক্তি তাদের মাঝে বিচ্ছিন্নতার মূল হোতা তাকে হত্যা করতে বলা হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৮৮-[২৮] ’আয়িয ইবনু ’আমর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ শাসকদের মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট শাসক সে, যে অত্যাচারী ও নিপীড়নকারী। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ عَائِذِ بْنِ عَمْرٌو قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «إِنَّ شرَّ الرعاءِ الحُطَمَة» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: উল্লেখিত হাদীসে الْحُطَمَةُ শব্দের দ্বারা উদ্দেশ্য ঐ ব্যক্তি, যে প্রজাদের প্রতি জুলুম নির্যাতন করে কিন্তু তাদের প্রতি নরম আচরণ করে না।
ফায়িক গ্রন্থে এসেছে, الْحُطَمَةُ বলা হয় ঐ ব্যক্তিকে, যে কষ্টকর মারধর করে বাজারে উটকে আনে, সে যেমন অন্যায়ভাবে উটের প্রতি জুলুম করেছে তেমনি দৃষ্টান্ত হলো খারাপ শাসকের সে প্রজাদের প্রতি অন্যায়ভাবে জুলুম নির্যাতন করে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৮৯-[২৯] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হে আল্লাহ! যে ব্যক্তিকে আমার উম্মাতের শাসক (ইমাম, পরিচালক, সচিব) নিযুক্ত করা হয় এবং সে যদি তাদের ওপর এমন কিছু চাপিয়ে দেয় যা তাদের জন্য বিপদগ্রস্ত ও কষ্টদায়কের কারণ হয়, তবে তুমিও তার ওপর অনুরূপ চাপিয়ে দাও। আর যে ব্যক্তিকে আমার উম্মাতের ওপর শাসক নিযুক্ত করা হয় এবং সে তাদের সাথে নম্র ও উত্তম আচরণ করে, তুমিও তার সাথে অনুরূপ নম্রতা প্রদর্শন করো। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اللَّهُمَّ مَنْ وَلِيَ مِنْ أَمْرِ أُمَّتِي شَيْئًا فَشَقَّ عَلَيْهِمْ فَاشْقُقْ عَلَيْهِ وَمَنْ وَلِيَ مِنْ أَمْرِ أُمَّتِي شَيْئًا فَرَفَقَ بهم فارفُقْ بِهِ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: উল্লেখিত হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী (রহঃ) বলেছেনঃ অধিকতর জোরদার করে মানুষের ওপর কষ্ট দেয়া থেকে ধমকি দেয়া হয়েছে। অধিক গুরুত্বতার সাথে উৎসাহিত করা হয়েছে তাদের ওপর দয়া করার জন্য। হাদীসের বাহ্যিক অর্থের প্রতি লক্ষ্য করে দেখলে এটাই স্পষ্ট হয়। (শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৮২৮)
ইমাম ত্বীবী (রহঃ) বলেছেনঃ এটার মাধ্যমে অধিক পূর্ণাঙ্গতার সাথে স্পষ্ট হয় যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন : স্নেহ করা, দয়া করা এবং অনুগ্রহ করা উম্মাতের ওপরে। আমরা বলব, (বর্তমান ভাষার মাধ্যমে) হে আল্লাহ! তুমি দয়া কর, তোমার সম্মানিত প্রিয় বান্দার উম্মাতের ওপরে এবং তাদেরকে মুক্তি দাও মহান কষ্টদায়ক জিনিস থেকে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৯০-[৩০] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর ইবনুল ’আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয় সত্যনিষ্ঠ বিচারক আল্লাহ তা’আলার নিকট তাঁর ডানপাশে নূরের মিম্বারের উপর অবস্থান করবে। যদিও আল্লাহ তা’আলার উভয় হাতই ডান (কল্যাণকর)। তারা হলো সে সমস্ত বিচারক- যারা তাদের বিচারালয়ে, নিজেদের পরিবার-পরিজনদের মাঝে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ন্যায় ও ইনসাফ কায়িম করে। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ الْمُقْسِطِينَ عِنْدَ اللَّهِ عَلَى مَنَابِرَ مِنْ نُورٍ عَنْ يَمِينِ الرَّحْمَنِ وَكِلْتَا يَدَيْهِ يمينٌ الذينَ يعدِلُونَ فِي حُكمِهم وأهليهم وَمَا ولُوا» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসে ন্যায় বিচারক গুণাবলী প্রদান করার সময় মহাগ্রন্থ আল কুরআন থেকে আয়াত উল্লেখ করা হয়েছে। ‘‘তোমরা ইনসাফ করবে, নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা ইনসাফকারীদের পছন্দ করেন।’’ (সূরা আল হুজুরাত ৪৯ : ১৫)
‘‘আর যারা অন্যায়কারী তারা তো জাহান্নামের ইন্ধন।’’ (সূরা আল জিন্ ৭২ : ১৫)
কাযী (রহঃ) বলেছেনঃ ‘মিম্বার’ শব্দটির বিভিন্ন ধরনের অর্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। হাদীসের বাহ্যিক শব্দ অনুযায়ী পৃথিবীর মতো বাস্তব মিম্বার; আবার কেউ কেউ বলেছেন রূপক অর্থে, অর্থাৎ সুউচ্চ স্থান। (শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, ১৮২৮)
‘‘আল্লাহর ডান দিকে থাকবে’’ এর দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার নিকট ন্যায়বিচারক শাসকের মর্যাদা ও উচ্চ আসন বুঝানো হয়েছে। কেননা যে ব্যক্তি মর্যাদাবান হয় সে ডান পাশে থাকে।
‘‘আল্লাহ তা‘আলার উভয় হাতই ডান’’ একটি সন্দেহ নিরসনের জন্য এ কথা ব্যবহার করা হয়েছে। যাতে কেউ মনে না করে বাম হাতের বিপরীত ডান হাত উদ্দেশ্য। কেননা বাম হাত ডান হাতের তুলনায় একটু দুর্বল হয়। অথচ আল্লাহ তা‘আলা সকল দুর্বলতা ও অসম্পূর্ণতা থেকে পবিত্র।
সুতরাং আমরা সাধারণভাবে বিশ্বাস করব আল্লাহ তা‘আলার হাত রয়েছে। তার পদ্ধতি বা কেমন তা আমরা জানব না- এটাই আহলুস্ সুন্নাহ্ ওয়াল জামা‘আতের অভিমত। (মিরকাতুল মাফাতীহ, শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, ১৮২৭)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৯১-[৩১] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা যাঁকে নবী অথবা খলীফাহ্ নিযুক্ত করে প্রেরণ করেন, তখন তাঁর জন্য দু’জন অদৃশ্য পরামর্শদাতা থাকে। এক পরামর্শদাতা তাকে সর্বদা সৎ ও ন্যায়সঙ্গত কাজ করার উৎসাহ-অনুপ্রাণিত করে। আর অপর পরামর্শদাতা তাকে অন্যায় ও অসৎকাজের প্রতি উৎসাহ-উদ্দীপনা দেয়। আর নিষ্পাপ থাকবে সে ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ তা’আলা রক্ষা করবেন। (বুখারী)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَا بَعَثَ اللَّهُ مِنْ نَبِيٍّ وَلَا اسْتَخْلَفَ مِنْ خَلِيفَةٍ إِلَّا كَانَتْ لَهُ بِطَانَتَانِ: بِطَانَةٌ تَأْمُرُهُ بِالْمَعْرُوفِ وَتَحُضُّهُ عَلَيْهِ وَبِطَانَةٌ تَأْمُرُهُ بِالشَّرِّ وَتَحُضُّهُ عَلَيْهِ وَالْمَعْصُومُ مَنْ عصمَه اللَّهُ . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: উপরোক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় হাদীস বিশারদগণ বিভিন্ন ধরনের মতামত উপস্থাপনা করেছেন। ‘‘দুই গোপন পরামর্শদাতা’’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মালাক (ফেরেশতা) এবং শায়ত্বন। এরা উভয়ে মানুষের মাঝে থাকে। মালাক ভালো কাজের আদেশ দেয়। আর পক্ষান্তরে শায়ত্বন মন্দ কাজ করার পরামর্শ দেয় এবং নিকৃষ্ট কাজ করার জন্য উৎসাহিত করে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
কিরমানী (রহঃ) বলেছেনঃ (بِطَانَتَانِ) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, নাফসে আম্মারাহ্, নাফ্সে লাওয়ামাহ্ যা উৎসাহিত করে ভালো কাজের উপরে। যখন উভয়ের মাঝে পাওয়া যাবে ফেরেশতার শক্তি এবং পশুর শক্তি।
ত্ববারী (রহঃ) বলেছেনঃ পরামর্শদাতা হলো অভিভাবক এবং একনিষ্ঠ বন্ধু। (ফাতহুল বারী ১৩শ খন্ড, হাঃ ৭১৯৮)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৯২-[৩২] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কয়স ইবনু সা’দ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এমন মর্যাদায় ছিলেন, যেমন শাসকের নিকট তার একান্ত সহকারীর (মুখপাত্রের) মর্যাদা। (বুখারী)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: كَانَ قَيْسُ بْنُ سَعْدٍ مِنَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِمَنْزِلَةِ صاحبِ الشُّرَطِ منَ الأميرِ. رَوَاهُ البُخَارِيّ
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৬৯৩-[৩৩] আবূ বকরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এ সংবাদ আসলো যে, পারস্যের (ইরানের) অধিবাসীরা কিস্রার কন্যাকে তাদের সম্রাজ্ঞী নিযুক্ত করেছে। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ সে জাতি কক্ষনো সফলকাম হতে পারে না, যারা দেশের শাসনভার কোনো মহিলার ওপর দায়িত্ব অর্পণ করে। (বুখারী)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَبِي بَكْرَةَ قَالَ: لَمَّا بَلَغَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّ أَهْلَ فَارِسَ قَدْ مَلَّكُوا عَلَيْهِمْ بِنْتَ كِسْرَى قَالَ: «لَنْ يُفْلِحَ قَوْمٌ وَلَّوْا أَمْرَهُمُ امْرَأَةً» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: বর্তমানের ইরান তৎকালীন সময়ে পারস্য নামে পরিচিত ছিল। আর পারস্যের বাদশাহদের উপাধি ছিল কিসরা। যেমন রোম বাদশাহদের উপাধি ছিল কায়সার। আর মিসর এর বাদশাহদের উপাধি ছিল ফির্‘আওন।
উল্লেখিত হাদীস থেকে প্রতীয়মান হয়, নারী নেতৃত্ব হারাম যদি কোনো সম্প্রদায়ের নারী আমীর বানায় তাহলে তারা কখনো সফল হবে না।
শারহুস্ সুন্নাহ্ গ্রন্থে এসেছে যে, নারীর জন্য ইমাম কাযী হওয়া বৈধ নয়। কেননা ইমাম ও বিচারপতির জন্য মুসলিমদের সকল বিষয় দেখাশোনা করার বের হওয়ার প্রয়োজন। আর মহিলা সর্বদা পর্দাতে থাকবে। সুতরাং তাদের জন্য এটা বৈধ নয়। কারণ মহিলারা অল্প জ্ঞানের অধিকারী। আর বিচার ফায়সালা করা রাষ্ট্রের একটি পূর্ণাঙ্গ কাজ। এটা মহিলাদের জন্য ঠিক নয় তবে জ্ঞানবান পুরুষের জন্য তা বৈধ। (ফাতহুল বারী ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৪২৫; তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২২৬২)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৬৯৪-[৩৪] হারিস আল আশ্’আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি তোমাদেরকে পাঁচটি কাজের নির্দেশ করছি। যথা- ১. সর্বদা মুসলিম জামা’আতের সাথে থাকো, ২. আমীরের (শাসকদের) আদেশ-নিষেধ মান্য করো, ৩. আমীরের (শাসকদের) আনুগত্য করো, ৪. হিজরত করো, ৫. আল্লাহর পথে জিহাদ করো। আর যে ব্যক্তি মুসলিম জামা’আত থেকে এক বিঘত পরিমাণ দূরে সরে যায়, সে যেন তার গর্দান থেকে ইসলামের রশি খুলে ফেলল, যতক্ষণ না সে প্রত্যাবর্তন করে। আর যে ব্যক্তি জাহিলী যুগের রসম-রিওয়াজের দিকে আহবান করে, সে জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত। যদিও সে সওম পালন করে, সালাত আদায় করে এবং নিজেকে মুসলিম বলে দাবী করে। (আহমাদ ও তিরমিযী)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
عَن الحارِثِ الْأَشْعَرِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: آمُرُكُمْ بِخَمْسٍ: بِالْجَمَاعَةِ وَالسَّمْعِ وَالطَّاعَةِ وَالْهِجْرَةِ وَالْجِهَادِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَإِنَّهُ مَنْ خَرَجَ مِنَ الْجَمَاعَةِ قِيدَ شِبْرٍ فَقَدْ خَلَعَ رِبْقَةَ الْإِسْلَامِ مِنْ عُنُقِهِ إِلَّا أَنْ يُرَاجِعَ وَمَنْ دَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ فَهُوَ مِنْ جُثَى جَهَنَّمَ وَإِنْ صَامَ وَصَلَّى وَزَعَمَ أَنَّهُ مُسْلِمٌ . رَوَاهُ أَحْمد وَالتِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসের মাঝে জামা‘আত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সমস্ত মুসলিম জামা‘আতের আনুগত্য করা। ‘আকীদা, কর্ম, ‘আমল দীনের সংশ্লিষ্ট বিষয়ের মাঝে।
ইমাম ত্বীবী (রহঃ) বলেছেনঃ জামা‘আত দ্বারা উদ্দেশ্য সাহাবীগণ। তাদের পরবর্তী তাবি‘ঈগণ এবং তাবি-তাবি‘ঈগণ সালফে সালিহীনদের মাঝে।
‘শ্রবণ ও আনুগত্য’ দ্বারা উদ্দেশ্য- ইমাম ত্বীবী (রহঃ) বলেছেনঃ হক কথা শ্রবণ করা এবং কবুল করা শাসকের নিকট থেকে চাই সে ধনী হোক বা দরিদ্র হোক। আনুগত্যের নিদর্শনসমূহ বাস্তবায়ন করা এবং যে সমস্ত কাজের মাঝে ধমকী রয়েছে সেগুলো থেকে বিরত থাকা।
‘হিজরত কর’ এর দ্বারা উদ্দেশ্য : অমুসলিম রাষ্ট্রে যে সকল মুসলিমরা বসবাস করে তারা ঐ রাষ্ট্র পরিত্যাগ করে ইসলামী রাষ্ট্রে চলে যাবে। অথবা যদি কোনো এমন মুসলিম দেশ বা শহরে বসবাস করে যা বিদ‘আত ও পাপাচারে পরিপূর্ণ তাহলে ঐ দেশ বা শহর ছেড়ে মুসলিম রাষ্ট্রে চলে যাবে যেখানে পরিপূর্ণভাবে সুন্নাত বাস্তবায়ন হয়।
‘আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ কর’ অর্থাৎ কাফিরদের সাথে লড়াই করা এবং শত্রুদেরকে দমন করা এবং নিজের আত্মাকে কুপ্রবৃত্তি থেকে বিরত রাখা। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৬৯৫-[৩৫] যিয়াদ ইবনু কুসায়ব আল ’আদাবী (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি আবূ বকরাহ্ (রাঃ)-এর সাথে ইবনু ’আমির-এর মিম্বারের নিচে বসে ছিলাম, তখন তিনি খুৎবা দিচ্ছিলেন এবং তার পরিধানে ছিল একটি পাতলা মিহিন কাপড়। তখন আবূ বিলাল (রহঃ) বলে উঠলেনঃ তোমরা আমাদের ’আমির-এর দিকে তাকিয়ে দেখ, তিনি ফাসিকদের পোশাক পরিধান করেছেন। তখন আবূ বকরাহ্ বললেনঃ নিশ্চুপ থাকো! আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যাকে আল্লাহ তা’আলা দুনিয়ার প্রতিনিধি (শাসক) নিযুক্ত করেছেন, আর ঐ শাসককে যে ব্যক্তি অপমানিত করে, আল্লাহ তা’আলাও তাকে অপমানিত করবেন। (তিরমিযী; আর তিনি বলেছেন, হাদীসটি হাসান গরীব)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَن زِيادِ بنِ كُسَيبٍ العَدَوِيِّ قَالَ: كُنْتُ مَعَ أَبِي بَكْرَةَ تَحْتَ مِنْبَرِ ابْنِ عَامِرٍ وَهُوَ يَخْطُبُ وَعَلَيْهِ ثِيَابٌ رِقَاقٌ فَقَالَ أَبُو بِلَال: انْظُرُوا إِلَى أَمِير نايلبس ثِيَابَ الْفُسَّاقِ. فَقَالَ أَبُو بَكْرَةَ: اسْكُتْ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُول: «مَنْ أَهَانَ سُلْطَانَ اللَّهِ فِي الْأَرْضِ أَهَانَهُ اللَّهُ» رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ
ব্যাখ্যা: হাদীসের বাহ্যিক শব্দগুলোর প্রতি দৃষ্টি দিলে মনে হয় যে, এ রকম দু’টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে যে, ইবনু ‘আমির তখন কোনো এমন কাপড় পরিধান করেছিলেন যা পরিধান করা পুরুষের জন্য হারাম। যেমন রেশমি কাপড় ইত্যাদি।
কেউ কেউ বলেছেনঃ যে অধিক পাতলা ও মিহিন কাপড় পরিধান করে সে তার দীনকেও পাতলা ও হালকা করে দেয়।
আবূ বাকরাহ্ আবূ বিলালকে নিষেধ করেছিলেন যাতে তিনি ইবনু ‘আমিরকে তিরস্কার ও অপমান না করেন। এর কারণ হলো এ উক্তিটি যেন মুসলিমদের মাঝে ফিতনা ও ফাসাদ সৃষ্টি হওয়ার কারণ না হয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৬৯৬-[৩৬] নাও্ওয়াস ইবনু সিম্’আন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রতিপালকের অবাধ্যতার মাঝে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য নেই। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنِ النَّوَّاسِ بْنِ سِمْعَانَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ» . رَوَاهُ فِي شَرْحِ السّنة
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৬৯৭-[৩৭] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি দশজন লোকেরও আমীর (শাসক) নিযুক্ত হবে, কিয়ামতের দিনে তাকে এমন অবস্থায় উপস্থিত করা হবে যে, তার গলায় বেড়ি পড়ানো থাকবে। তার গলার বেড়ি থেকে তার ন্যায়-নীতি ও ইনসাফ তাকে মুক্ত করবে অথবা তার কৃত জুলুম ও নির্যাতন তাকে ধ্বংস করবে। (দারিমী)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا مِنْ أَمِيرِ عَشرَةٍ إِلا يُؤتى بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَغْلُولًا حَتَّى يُفَكَّ عَنْهُ الْعَدْلُ أَو يوبقه الْجور» . رَوَاهُ الدَّارمِيّ
ব্যাখ্যা: ইমাম ত্বীবী (রহঃ) বলেছেনঃ প্রত্যেক শাসককেই চাই সে ন্যায়পরায়ণ হোক বা অত্যাচারী হোক প্রাথমিক পর্যায়ে আল্লাহ তা‘আলার নিকট তার গলায় রশি লাগিয়ে উপস্থিত করা হবে। যাচাই করার পর সে যদি ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে প্রমাণিত হয় তাহলে তাকে মুক্তি দেয়া হবে। আর যদি অত্যাচারী প্রমাণিত হয় তাহলে তাকে কঠিন শাস্তির মাঝে নিক্ষেপ করা হবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৬৯৮-[৩৮] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দুর্দশা শাসকদের জন্য, দুর্দশা সমাজপতিদের জন্য ও দুর্দশা আমানতদারদের জন্য। অনেক লোক কিয়ামতের দিন অবশ্যই কামনা করবে, যদি তাদের কপালের চুল ধ্রুবতারার সাথে বেঁধে দেয়া হত, আর তারা আকাশমন্ডলী ও জমিনের মাঝে ঝুলিয়ে রাখা হতো, তবুও তাদেরকে সে সব নেতৃত্ব না দেয়া হতো। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
ইমাম আহমাদ (রহঃ)-ও হাদীসটি বর্ণনা করেন, যদি তাদের কপালের কেশগুচ্ছ ধ্রম্নবতারার সাথে বেঁধে দেয়া হত আর তারা আকাশমন্ডলী ও জমিনের মাঝে ঝুলিয়ে রাখা হতো, তবুও উত্তম হতো যদি তাদেরকে কোনো কাজের নেতৃত্ব দেয়া না হত।
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «وَيْلٌ لِلْأُمَرَاءِ وَيْلٌ لِلْعُرَفَاءِ وَيْلٌ لِلْأُمَنَاءِ لَيَتَمَنَّيَنَّ أَقْوَامٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَنَّ نَوَاصِيَهُمْ مُعَلَّقَةٌ بِالثُّرَيَّا يَتَجَلْجَلُونَ بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَأَنَّهُمْ لَمْ يَلُوا عَمَلًا» . رَوَاهُ فِي «شَرْحِ السُّنَّةِ» وَرَوَاهُ أَحْمد وَفِي رِوَايَته: «أنَّ ذوائِبَهُم كَانَتْ مُعَلَّقَةً بِالثُّرَيَّا يَتَذَبْذَبُونَ بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ ولَمْ يَكُونُوا عُمِّلوا على شَيْء»
ব্যাখ্যা: উল্লেখিত হাদীসের মাঝে وَيْلٌ শব্দের অর্থ বলা হয় দুশ্চিন্তা, দুঃখ, ধ্বংস যা শাস্তির কারণে হয়ে থাকে। বলা হয়: وَيْلٌ জাহান্নামের একটি গভীর খাদ। যে খাদে কাফিরেরা চল্লিশ বছর পর্যন্ত নিক্ষিপ্ত হবে। তারপরও তলদেশে পৌঁছতে পারবে না। (আহমাদ, তিরমিযী, ইবনু হিব্বানে বর্ণিত হয়েছে)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৬৯৯-[৩৯] গালিব আল কত্ত্বান (রহঃ) জনৈক ব্যক্তি হতে, তিনি তার পিতা হতে, আর তিনি তার দাদা হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সরদারী একটি সত্যায়িত বিষয়। আর মানুষের জন্য সরদার হওয়াটা অত্যাবশ্যকীয় বটে। কিন্তু (অধিকাংশ) সরদারগণ জাহান্নামী হবে। (আবূ দাঊদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْ غَالِبٍ الْقَطَّانِ عَنْ رَجُلٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «إِن العرافة حق ولابد لِلنَّاسِ مِنْ عُرَفَاءَ وَلَكِنَّ الْعُرْفَاءَ فِي النَّارِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: উল্লেখিত হাদীসে عِرَافَةَ অর্থাৎ গ্রামের মাতববরী ও সরদারী করাকে প্রথমে সাব্যস্ত করা হয়েছে। কিন্তু শেষ অংশে তাকে অস্বীকার করা হয়েছে। সুতরাং হাদীসের প্রথম অংশ দ্বারা ঐ সকল মাতববর ও সরদারকে বুঝানো হয়েছে যারা গ্রামের বিচার ফায়সালার করার ক্ষেত্রে ন্যায় ইনসাফ কায়িম করে। আর হাদীসের শেষ অংশ দ্বারা ঐ মাতব্বর ও সরদারদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা গ্রামের বিচার ফায়সালা করার ক্ষেত্রে ন্যায় ইনসাফ কায়িম করে না। সুতরাং হাদীসের গোপন অর্থ হচ্ছে অধিকাংশ মাতব্বর ও সরদারগণই জাহান্নামে যাবে তবে কিছু ব্যতীত। মোট কথা, মাতববরী বা সরদারী তখনই দোষণীয় যখন ন্যায় ইনসাফ কায়িম করার পরিবর্তে জুলুম নির্যাতন করা হয়।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৭০০-[৪০] কা’ব ইবনু ’উজরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছেনঃ নির্বোধ লোকেদের নেতৃত্ব থেকে আমি তোমাকে আল্লাহ তা’আলার হিফাযাতে অর্পিত করলাম। তিনি (কা’ব ) বললেনঃ হে আল্লাহর রসূল! এটা কিরূপে হবে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ শীঘ্রই আমার পরে বিভিন্ন যুগে তাদের (নির্বোধ ও যালিমরূপে আমীর ও শাসক) আবির্ভূত হবে আর যে ব্যক্তি তাদের সান্নিধ্যে থাকবে এবং তাদের মিথ্যাকে সত্য বলে স্বীকৃতি দিবে এবং তাদের অন্যায় ও জুলুমের সহযোগিতা করবে, সে আমার দলভুক্ত নয় এবং তাদের সাথে আমারও কোনো সম্পর্ক নেই। তারা আমার হাওযে কাওসারে* আসতে পারবে না। আর যে তাদের নিকট যাবে না এবং তাদের মিথ্যাকে সত্যায়িত করবে না এবং তাদের অন্যায়ের কাজে সাহায্য-সহযোগিতা করবে না। তারাই হবে আমার দলভুক্ত। আর আমিও তাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করি। আর তারা হাওযে কাওসারে আমার নিকট আগমন করবে। (তিরমিযী ও নাসায়ী)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْ كَعْبِ بْنِ عُجْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أُعِيذُكَ بِاللَّهِ مِنْ إِمَارَةِ السُّفَهَاءِ» . قَالَ: وَمَا ذَاكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: «أُمَرَاءُ سَيَكُونُونَ مِنْ بَعْدِي مَنْ دَخَلَ عَلَيْهِمْ فَصَدَّقَهُمْ بِكَذِبِهِمْ وَأَعَانَهُمْ عَلَى ظُلْمِهِمْ فَلَيْسُوا مِنِّي وَلَسْتُ مِنْهُمْ وَلَنْ يَرِدُوا عليَّ الحوضَ وَمَنْ لَمْ يَدْخُلْ عَلَيْهِمْ وَلَمْ يُصَدِّقْهُمْ بِكَذِبِهِمْ وَلَمْ يُعِنْهُمْ عَلَى ظُلْمِهِمْ فَأُولَئِكَ مِنِّي وَأَنَا مِنْهُمْ وَأُولَئِكَ يَرِدُونَ عَلَيَّ الْحَوْضَ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَالنَّسَائِيّ
[1] সহীহ : নাসায়ী ৪২০৭, তিরমিযী ৬১৪, আহমাদ ১৮১২৬, সহীহ আত্ তারগীব ২২৪২।
ব্যাখ্যা: উল্লেখিত হাদীসে سُفَهَاءِ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ঐ সকল নির্বোধ লোক যারা ‘ইলম ও ‘আমলের দিক থেকে অজ্ঞ। ইমাম ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ سُفَهَاءِ বলা হয় ঐ সকল লোকেদেরকে যারা অল্প জ্ঞানের অধিকারী।
‘‘নিহায়াহ্’’ গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, السَّفِيهُ মূলতঃ অল্প জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিকে বলা হয়। আর এ কারণে যখন কোনো ব্যক্তি নেতৃত্ব দানের ক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতা প্রকাশে অপারগ হয়। তখন তার ক্ষেত্রে বলা হয়ে থাকে যে, সে নিজের মত প্রকাশের ক্ষেত্রে নির্বোধতার পরিচয় দিয়েছে। মোট কথা হচ্ছে, السَّفِيهُ অজ্ঞ ব্যক্তিকে বলা হয়। তাই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য এক হাদীসে বলেছেন যে, আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন ‘আলিমদের মৃত্যুর মাধ্যমে ‘ইলম উঠিয়ে নিবেন। অতঃপর লোকেরা অজ্ঞদেরকে নিজেদের নেতা হিসেবে নির্ধারণ করবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৭০১-[৪১] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে গ্রামে-গঞ্জে বসবাস করে, সে অচেতন (সামাজিক শিক্ষা-শিষ্টাচার বহির্ভূত) হয়। আর যে শিকারের পিছনে দৌড়ায়, সে উদাসীন হয়। আর যে শাসকের সন্নিকটে থাকে, সে ফিতনায় পর্যবসিত হয় (ঝামেলায় পড়ে)। (আহমাদ, তিরমিযী, নাসায়ী)[1]
আর আবূ দাঊদ-এর বর্ণনাতে আছে, যে শাসকের সান্নিধ্যে থাকে, সে ফিতনায় নিপতিত হয়। আর যখনই যে ব্যক্তি শাসকের যত নিকটবর্তী হয়, সে ততই আল্লাহ থেকে দূরে চলে যায়। (আবূ দাঊদ)
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ سَكَنَ الْبَادِيَةَ جَفَا وَمَنِ اتَّبَعَ الصَّيْدَ غَفَلَ وَمَنْ أَتَى السُّلْطَانَ افْتُتِنَ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَالنَّسَائِيُّ وَفِي رِوَايَةِ أَبِي دَاوُدَ: «مَنْ لَزِمَ السُّلْطَانَ افْتُتِنَ وَمَا ازْدَادَ عَبْدٌ مِنَ السُّلْطَانِ دُنُوًّا إِلَّا ازْدَادَ من اللَّهِ بُعداً»
ব্যাখ্যা: ইমাম কাযী (রহঃ) বলেনঃ লোক কঠোর হয় যখন তার অন্তর শক্ত ও কঠোর হয়। ফলে তার অন্তর সৎ আচরণ ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য নরম হয় না। আর এটা অধিকাংশ সময় গ্রামের অধিবাসীদের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। কারণ তারা ‘আলিম-‘উলামাদের সান্নিধ্যে থেকে বঞ্চিত থাকে এবং লোকেদের সাথে তাদের চলাফেরা কম হওয়ার কারণে ফলে তাদের স্বভাব চরিত্র হিংস্র প্রাণীর স্বভাব চরিত্রের মতো হয়ে যায়।
ইমাম মুযহির বলেনঃ যে ব্যক্তি গ্রামে বসবাস নিজের জন্য আবশ্যক করে নেয় বিশেষ করে সে জামা‘আত ও জুমু‘আর সালাতে উপস্থিত হতে পারে না এবং ‘আলিমদের মাজলিসেও উপস্থিত হতে পারে না। আর এভাবে সে নিজের ওপর জুলুম করে। যে ব্যক্তি আনন্দ ফূর্তি ও খেল-তামাশার জন্য শিকারে অভ্যস্ত হয় সে অলস হয়, কেননা আনন্দ ফূর্তি ও খেল-তামাশা মৃত অন্তরের পক্ষ থেকে সৃষ্টি হয়। আর যে ব্যক্তি শক্তি সঞ্চারণের উদ্দেশে শিকার করবে তার জন্য তা বৈধ, কেননা কিছু সাহাবী শিকার করেছেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৭০২-[৪২] মিকদাম ইবনু মা’দীকারাব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাঁধের উপর হাত রেখে অত্যন্ত আক্ষেপে বলেছেনঃ হে কুদায়ম! (মিকদাম-এর সংক্ষেপ) তুমি যদি আমীর, লেখক ও সরদার না হয়ে মৃত্যুবরণ করো; তাহলে তুমি সাফল্য লাভ করবে। (আবূ দাঊদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَن المقدامِ بن معْدي كِربَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ضَرَبَ عَلَى مَنْكِبَيْهِ ثُمَّ قَالَ: «أَفْلَحْتَ يَا قُدَيْمُ إِنْ مُتَّ وَلَمْ تَكُنْ أَمِيرًا وَلَا كَاتبا وَلَا عريفا» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: উল্লেখিত হাদীসে كَاتِبًا অর্থাৎ লেখক দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যারা সরকারী চাকরিতে লেখার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকে। ফলে তারা কখনো কখনো দুর্নীতি করার জন্য মিথ্যা ও অসত্য কথা লিপিবদ্ধ করে তাই তা নিষেধ করা হয়েছে।
দ্বিতীয়তঃ عَرِيْفًا তথা গ্রামের মাতববর ও সরদার হওয়া তখনই দোষণীয় যখন কোনো ব্যক্তি মাতববর ও সরদার হওয়ার পর বিচার ফায়সালা করার সময় ইনসাফ না করবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৭০৩-[৪৩] ’উকবা ইবনু ’আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কর আদায়কারী তথা অনৈতিকভাবে ’উশর ও যাকাত আদায়কারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (আহমাদ, আবূ দাঊদ ও দারিমী)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ صَاحِبُ مَكْسٍ» : يَعْنِي الَّذِي يَعْشُرُ النَّاسَ. رَوَاهُ أَحْمد وَأَبُو دَاوُد والدارمي
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসে صَاحِبُ مَكْسٍ বলতে ঐ ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে যে অন্যায়ভাবে লোকেদের থেকে ‘উশর বা যাকাত আদায় করে।
নিহায়াহ্ গ্রন্থে এসেছে যে, ট্যাক্স বলতে ঐ অংশকে বুঝানো হয়েছে যে অংশটা আদায়কারী মানুষের থেকে গ্রহণ করা হয় আর তা ‘উশর নামে পরিচিত মানুষের মাঝে।
শারহেস্ সুন্নাহ্ গ্রন্থে এসেছে যে, এর দ্বারা ঐ ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য নিয়েছেন যে অতিক্রমকারী ব্যবসায়ী কাফেলার নিকট থেকে ট্যাক্স গ্রহণ করে ‘উশর নামে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৭০৪-[৪৪] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামত দিবসে আল্লাহর নিকট ন্যায়পরায়ণ শাসকই হবেন সর্বাধিক প্রিয় এবং সর্বোত্তম মর্যাদার অধিকারী। আর কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তা’আলার নিকট যালিম শাসকই হবেন সর্বনিকৃষ্ট ও কঠোরতম ’আযাবের অধিকারী।
অন্য এক বর্ণনাতে আছে, অত্যাচারী শাসক মর্যাদার আসনে আল্লাহর নিকট হতে অনেক দূরে। (তিরমিযী; আর তিনি বলেনঃ হাদীসটি হাসান গরীব)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ أَحَبَّ النَّاسِ إِلَى اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَأَقْرَبَهُمْ مِنْهُ مَجْلِسًا إِمَامٌ عَادِلٌ وَإِنَّ أَبْغَضَ النَّاسِ إِلَى اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَأَشَدَّهُمْ عَذَابًا» وَفِي رِوَايَةٍ: «وَأَبْعَدَهُمْ مِنْهُ مَجْلِسًا إِمَامٌ جَائِرٌ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ
ব্যাখ্যা: উল্লেখিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ন্যায়পরায়ণ বাদশাহর প্রশংসা করেছেন এবং সে কিয়ামতের দিন বিশেষ মর্যাদার অধিকারী হবে তাও বলেছেন। আর অত্যাচারী যালিম বাদশাহর ব্যাপারে কঠিন শাস্তির কথা উল্লেখ করেছেন।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৭০৫-[৪৫] উক্ত রাবী [আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি অত্যাচারী শাসকের সামনে হক কথা বলে, সেটাই সর্বোত্তম জিহাদ। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ্)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَفْضَلُ الْجِهَادِ مَنْ قَالَ كَلِمَةَ حَقٍّ عِنْدَ سُلْطَانٍ جَائِرٍ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُد وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: উল্লেখিত হাদীসে যালিম বাদশাহর সামনে সত্য কথা বলা উত্তম জিহাদ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
ইমাম ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ যে ব্যক্তি শাসকের সামনে সত্য কথা বলল সে উত্তম জিহাদ করল। কেননা সত্য কথা বলার কারণে কখনো কখনো জুলুম নির্যাতনের স্বীকার হতে হয় বাদশাহর পক্ষ থেকে।
ইমাম খত্ত্বাবী (রহঃ) বলেনঃ শাসকের সামনে সত্য বলা উত্তম জিহাদ এটা এভাবে যে, কোনো ব্যক্তি যখন শত্রুর সাথে জিহাদ করে তখন সে ভয় ও আশার মাঝে সন্দিহান থাকে যে, সে বিজয় হবে নাকি পরাজিত হবে। পক্ষান্তরে শাসকের সামনে সত্য কথা প্রকাশকারী শাসকের নিকট পরাস্ত থাকে ফলে যখন সে সত্য কথা বলে বা সৎ কাজের আদেশ দেয় তখন শাসকের পক্ষ থেকে অনেক জুলুম নির্যাতনের স্বীকার হয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৭০৬-[৪৬] আর আহমাদ ও নাসায়ী হাদীসটি ত্বারিক ইবনু শিহাব (রহঃ) হতে বর্ণনা করেছেন।[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَرَوَاهُ أَحْمَدُ وَالنَّسَائِيُّ عَنْ طَارِقِ بْنِ شِهَابٍ
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৭০৭-[৪৭] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা যখন কোনো শাসকের কল্যাণ কামনা করেন, তখন তার জন্য একজন ন্যায়নিষ্ঠ পরামর্শদাতার (পরিচালনা পরিষদবর্গের) ব্যবস্থা করে দেন। তবে শাসক যদি (আল্লাহর কথা) ভুলে যায় তখন পরামর্শদাতা তা স্মরণ করিয়ে দেয়। আর শাসক যদি স্মরণ রাখে তাহলে পরামর্শদাতা তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করে। আর যদি আল্লাহ তা’আলা কোনো শাসকের সাথে এর বিপরীত (তথা অকল্যাণ) কিছু করতে ইচ্ছা পোষণ করেন, তখন তার জন্য এমন একজন পরামর্শদাতার ব্যবস্থা করে দেন, যে যদি শাসক (আল্লাহর হুকুম-আহকাম) ভুলে যায় তাহলে পরামর্শতাদা তা স্মরণ করিয়ে দেয়না। আর যদি শাসক স্মরণ করেন, তাহলেও পরামর্শদাতা তাকে সহযোগিতা করে না। (আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِالْأَمِيرِ خَيْرًا جَعَلَ لَهُ وَزِيرَ صِدْقٍ إِنْ نَسِيَ ذَكَّرَهُ وَإِنْ ذَكَرَ أَعَانَهُ. وَإِذَا أَرَادَ بِهِ غَيْرَ ذَلِكَ جَعَلَ لَهُ وَزِيرَ سُوءٍ إِنْ نَسِيَ لَمْ يُذَكِّرْهُ وَإِنْ ذَكَرَ لَمْ يُعِنْهُ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: উল্লেখিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সৎ উজিরের (পরামর্শদাতার) প্রশংসা করেছেন, কেননা সৎ উজির বিপদের সময় শাসককে সঠিক পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করে।
নিহায়াহ্ গ্রন্থে এসেছে, উজির ঐ ব্যক্তিকে বলে যে আমীরের প্রতিনিধিত্ব করে এবং আমীরের পক্ষ থেকে সকল ভারী কাজগুলো সম্পাদন করে।
আবার কেউ কেউ বলেছেন, উজিরকে উজির বলে নামকরণ করা হয়েছে, কারণ সে অনেক কাজে আমীরের দায়িত্ব পালন করে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৭০৮-[৪৮] আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শাসক যখন জনগণের দোষ-ত্রুটি অনুসন্ধানে লিপ্ত থাকে, তখন তাদেরকে (জনগণের মন-মানসিকতাকে) নিকৃষ্টরূপে অধিষ্ঠিত করে। (আবূ দাঊদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْ أَبِي أُمَامَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّ الْأَمِيرَ إِذَا ابْتَغَى الرِّيبَةَ فِي النَّاسِ أَفْسَدَهُمْ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যা: উল্লেখিত হাদীসে শাসকদের জন্য উপদেশ রয়েছে। তারা যেন জনগণের ছোট খাট দোষ-ত্রুটি ও অপরাধ এবং তাদের আভ্যন্তরীণ বিষয় যেন খুঁজে না বেড়ায় আর যদি এরূপ করা হয় তাহলে তাদের সাধারণ জীবন ও তাদের দেশের শান্তি শৃঙ্খলা নষ্ট হয়ে যাবে। আর ধীরে ধীরে জনগণের ক্রোধ শাসকের ওপর বাড়তে থাকবে। কেননা খুব কম লোকই পাপ থেকে বেঁচে থাকে। যদি প্রত্যেক কথায় কথায় তাদেরকে আদব শিক্ষা দেয়া হয় তাহলে এটা তাদের ওপর অনেক কষ্টকর হয়ে যাবে। ফলে দেশে ফিতনা ফাসাদ ও বিশৃঙ্খলা শুরু হবে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৮৮১)
এজন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
مَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللّٰهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
অর্থাৎ ‘‘যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের দোষ-ত্রুটি গোপন করল আল্লাহ রববুল ‘আলামীন কিয়ামতের মাঠে তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবেন।’’ (সহীহুল বুখারী হাঃ ২৪৪২, সহীহ মুসলিম হাঃ ৫৮/২৫৮০)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৭০৯-[৪৯] মু’আবিয়াহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ তুমি যদি মানুষের লুক্কায়িত দোষ-ত্রুটি অনুসন্ধানে থাকো, তাহলে তুমি তাদেরকে বিপর্যস্ত বিপদগ্রস্ত করে ফেলবে। (বায়হাক্বী-শু’আবুল ঈমান)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْ مُعَاوِيَةَ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «إِنَّكَ إِذَا اتَّبَعْتَ عَوْرَاتِ النَّاسِ أَفْسَدْتَهُمْ» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَان»
ব্যাখ্যা: উল্লেখিত হাদীসে মানুষের দোষ-ত্রুটি অন্বেষণ না করতে বলা হয়েছে। আর কেউ অন্বেষণ করে তাহলে সে যেন তাদেরকে খারাপ করে ফেলে।
ইমাম ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ উক্ত হাদীসে সম্বোধনটা ‘আম্ আর বিষয়টা পূর্বের হাদীসে শাসকের সাথে খাস ছিল। সুতরাং বিষয়টা শুধু আমীরের সাথে সম্পৃক্ত, এরূপ সন্দেহে যেন আমীর না পড়ে বরং বিষয়টা প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির সাথে সম্পৃক্ত যারা মানুষের দোষ-ত্রুটি অন্বেষণ করে বেড়ায়, চাই সে আমীর হোক বা প্রজা হোক। আর যদি আমরা বলি এখানে সম্বোধন দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে মু‘আবিয়াহ্ , তাহলে এ হাদীসই দলীল তিনি আমীর হওয়ার। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৭১০-[৫০] আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা আমার পরে তোমাদের ইমাম বা শাসকের সাথে কিরূপ আচার-ব্যবহার করবে, যখন তারা অমুসলিমদের থেকে ট্যাক্স বা কর ইত্যাদি আদায় করে তারাই ভোগ করবে? তিনি (আবূ যার) বলেন, আমি বললামঃ সে মহান সত্তার কসম! যিনি আপনাকে সত্য নবী করে পাঠিয়েছেন। অবশ্যই আমি নিজ তরবারি কাঁধের উপর রেখে তাকে আঘাত করতে থাকবো যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনার সাথে সাক্ষাৎ হয়। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আমি কি তোমাকে এর চেয়ে উত্তম কোনো কাজের কথা বলব না? আর তা হচ্ছে আমার সাথে সাক্ষাৎ হওয়া পর্যন্ত (মৃত্যু অবধি) তুমি ধৈর্যধারণ করো। (আবূ দাঊদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «كَيْفَ أَنْتُمْ وَأَئِمَّةً مِنْ بَعْدِي يَسْتَأْثِرُونَ بِهَذَا الْفَيْءِ؟» . قُلْتُ: أَمَا وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ أَضَعُ سَيْفِي عَلَى عَاتِقِي ثُمَّ أَضْرِبُ بِهِ حَتَّى أَلْقَاكَ قَالَ: «أَوَلَا أَدُلُّكَ عَلَى خَيْرٍ مِنْ ذَلِكَ؟ تَصْبِرُ حَتَّى تَلقانِي» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: ইমাম ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ উল্লেখিত হাদীসে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবীগণকে বললেন, প্রশ্ন হলো আমার পরে এমন কতিপয় আমীর আসবে যারা নিজেদের ট্যাক্স বা জিয্ইয়ার মাল ভোগ করবে তখন তোমাদের আচরণ তাদের সাথে কিরূপ হবে। এর মাধ্যমে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জানতে চাইলেন যে, তোমরা কি ঐ সময় ধৈর্য ধারণ করবে নাকি লড়াই করবে? কিন্তু আবূ যার বলেছেন যে, আমি শহীদ না হওয়া পর্যন্ত তার সাথে যুদ্ধ করব তখন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে উত্তম পন্থা শিক্ষা দিয়েছেন। আর তা হলো, তুমি যুদ্ধ না করে ধৈর্য ধারণ করবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৩৭১১-]৫১] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা কি জানো! কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তা’আলার (’আরশের) ছায়ায় সর্বপ্রথম কোন্ শ্রেণীর মানুষ স্থান পাবে? সাহাবীগণ বললেনঃ আল্লাহ ও তাঁর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই ভালো জানেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ যে সকল (আমীর ও শাসকের) মানুষেরা যখন তাদের (জনসাধারণের) নিকট হক কথা বলে, তখন তারা তা গ্রহণ করে। আর যখন তাদের নিকট কোনো ন্যায্য অধিকার চাওয়া হয়, তখন তারা তা আদায় করে। আর মানুষের ওপর এমনভাবে শাসন করে, যেরূপ নিজের জন্য করে। (আহমাদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
عَنْ عَائِشَةَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «أَتَدْرُونَ مَنِ السَّابِقُونَ إِلَى ظِلِّ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ؟» قَالُوا: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ قَالَ: «الَّذِينَ إِذَا أُعْطُوا الْحَقَّ قَبِلُوهُ وَإِذَا سُئِلُوهُ بَذَلُوهُ وَحَكَمُوا لِلنَّاسِ كحكمِهم لأنفُسِهم»
ব্যাখ্যা: হাদীস বর্ণিত (ظِلِّ اللّٰهِ) ‘‘আল্লাহর ছায়া’’ দ্বারা উদ্দেশ্য আল্লাহর ‘আরশের ছায়া। কেউ কেউ বিনা প্রশ্নে বা বিনা সাদৃশ্যে ‘আল্লাহর ছায়াকে’ (ব্যাখ্যাবিহীন) শাব্দিক অর্থেই গ্রহণ করেছেন। কিয়ামতের দিন ঐ ছায়ায় সর্বাগ্রে ঐ শাসক ও আমীরগণ স্থান পাবে যারা হক কথা বা বিষয় নিজের বিরুদ্ধে হলেও তা কবুল করে এবং মাথা পেতে নেয়। আর তার কাছে কোনো ন্যায্য অধিকার দাবী করলে সে তা গোপন করে না বা তা আটকিয়ে রাখে না, বরং হকদার চাওয়া মাত্রই তাকে তা দিয়ে দেয়। এ ক্ষেত্রে কোনো নিন্দুকের নিন্দার পরোয়াও সে করে না।
আর কোনো ক্ষুদ্র বিষয়েও বিচার-ফায়সালায় পক্ষপাতিত্ব করে না, বরং নিজের জন্য বা নিকটতম ব্যক্তির জন্য যা ফায়সালা করে অন্যের জন্যও তাই করে। ধনী-দরিদ্র, উঁচু-নীচু কোনো ভেদাভেদ করে না, সবার জন্য সে ইনসাফপূর্ণ ফায়সালা প্রদান করে। সে আল্লাহর এই আদেশ বাণীর অনুসরণ করে, আল্লাহর বাণী : ‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকো আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্য দান করো; তাতে তোমাদের নিজের বা পিতা-মাতার অথবা নিকটবর্তী কোনো আত্মীয়-স্বজনের যদি ক্ষতি হয় তবুও।’’ (সূরা আন্ নিসা ৪ : ১৩৫)
ইতিপূর্বে হাদীস অতিবাহিত হয়েছে, ‘‘তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, আর প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’’ (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৩৭১২-[৫২] জাবির ইবনু সামুরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ আমি আমার উম্মাতের ওপর তিনটি বিষয়ে শঙ্কিত থাকি- তা হলো, চাঁদ বা তারকার কক্ষপথে অতিক্রম করার হিসাব অনুযায়ী বৃষ্টি কামনা করা এবং আমীর বা শাসকের জুলুম-অত্যাচার ও তাকদীদের প্রতি অবিশ্বাস করা। (আহমাদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم يَقُول: ثلاثةٌ أَخَافُ عَلَى أُمَّتِي: الِاسْتِسْقَاءُ بِالْأَنْوَاءِ وَحَيْفُ السُّلْطَانِ وَتَكْذيب الْقدر
ব্যাখ্যা: এখানে তিনটি কর্ম বা তিনটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে, অথবা তিন প্রকারের মানুষের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ তিনটি কর্মের বা বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে আমার উম্মাত পথভ্রষ্ট হয়ে যায় কিনা আমি সেই আশংকা করি।
প্রথমতঃ যারা তারকা অথবা চন্দ্রের কক্ষপথের মাধ্যমে বৃষ্টি বা পানি কামনা করে থাকে। চন্দ্রের ঊনত্রিশটি কক্ষ পথ রয়েছে, প্রত্যহ এক একটি কক্ষ পথে সে পরিভ্রমণ করে থাকে।
অনুরূপ তারকার রয়েছে নির্দিষ্ট কক্ষপথ, এই কক্ষপথেই তারা পরিভ্রমণ করে থাকে। আরবের মুশরিকগণ চন্দ্র অথবা তারকার উদয় অথবা কক্ষপথের মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা করতো। অথবা ধারণা করতো যে, অমুক নক্ষত্রের কারণেই আমরা বৃষ্টিপ্রাপ্ত হয়েছি। এটা মুসলিম ‘আক্বীদার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
সহীহুল বুখারীতে (হাঃ ৪১৪৭) যায়দ ইবনু খালিদ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুদায়বিয়ার বছর আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বের হলোম। একরাতে খুব বৃষ্টি হলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করলেন। এরপর আমাদের দিকে ফিরে বসলেন, অতঃপর বললেনঃ তোমরা জানো কি, তোমাদের রব কি বলেছেন? আমরা বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রসূলই অধিক জানেন। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেনঃ আমার কতিপয় বান্দা আমার প্রতি ঈমান এনেছে, আর কতিপয় আমার প্রতি কুফরী করেছে। যারা বলেছে আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়ায় আমরা বৃষ্টিপ্রাপ্ত হয়েছি তারা আমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী মু’মিন, আর নক্ষত্রের (প্রভাবের) প্রতি অস্বীকারকারী। আর যারা বলেছে যে, অমুক তারকার কারণে বৃষ্টি হয়েছে তারা তারকার প্রতি ঈমান এনেছে এবং আমাকে অস্বীকারকারী কাফির হয়েছে।
আল্লাহ বৃষ্টিদানের একচ্ছত্র কর্তৃত্বের অধিকারী মেনে নিয়ে আল্লাহ প্রদত্ত প্রকৃতির স্বভাব মোতাবেক অমাবস্যা অথবা পূর্ণিমার সময় জোয়ার ভাটা অথবা সম্ভাবনার বৃষ্টিপাতের কথা বলা দোষণীয় নয়।
দ্বিতীয়তঃ বাদশাহ বা শাসকের জুলুমও অত্যাচার। অর্থাৎ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মাতের শাসকদের জুলুমের আশংকা করেছেন। (এ আশংকা আজ কতই না সত্যে পরিণত হয়েছে) [সম্পাদক]
তৃতীয়তঃ তাকদীর বা ভাগ্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা। ভাগ্যের ভালো-মন্দ, মিষ্টতা-তিক্ততা সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়, এটা ইসলামী ‘আক্বীদার অন্যতম একটি বিষয়। কিন্তু উম্মাতের এক দল লোক এই তাকদীরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে, ফলে তারা ঈমানহারা হয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ওপর সেই আশংকা ব্যক্ত করেছেন।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেছেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনটি বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে আশংকা করেছেন। কেননা যারা আসবাব বা উপকরণকেই মৌলিক কারণ ও যথার্থ বলে বিশ্বাস করে এবং উপকরণের স্রষ্টাকে বাদ দেয় তারা মূলতঃ শির্কের মধ্যে আরেক শির্কে পতিত হয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৩৭১৩-[৫৩] আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছেনঃ হে আবূ যার! ছয় দিন পর্যন্ত অপেক্ষা কর এরপর তোমাকে যে কথা বলা হবে (সেজন্য)। অতঃপর যখন সপ্তম দিন আসলো তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আমি তোমাকে ওয়াসিয়্যাত করছি যে, তুমি সর্বদা প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে আল্লাহকে ভয় কর। যদি তোমার থেকে কোনো অসৎ কাজ প্রকাশ পেয়ে যায়, তবে সাথে সাথে কোনো সৎ কাজ করো। কক্ষনো কারো নিকট কোনো কিছু চাইবে (প্রত্যাশা করবে) না, যদিও তোমার ছড়ি বা চাবুক নিচে পড়ে যায়। কারো আমানত নিজের কাছে রেখ না এবং দু’জন মানুষের মধ্যেও বিচারক হয়ো না। (আহমাদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «سِتَّةَ أَيَّامٍ اعْقِلْ يَا أَبَا ذَرٍّ مَا يُقَالُ لَكَ بَعْدُ» فَلَمَّا كَانَ الْيَوْمُ السَّابِعُ قَالَ: «أُوصِيكَ بِتَقْوَى اللَّهِ فِي سِرِّ أَمْرِكَ وَعَلَانِيَتِهِ وَإِذَا أَسَأْتَ فَأَحْسِنْ وَلَا تَسْأَلَنَّ أَحَدًا شَيْئًا وَإِنْ سَقَطَ سَوْطُكَ وَلَا تَقْبِضْ أَمَانَةً وَلَا تَقْضِ بَيْنَ اثْنَيْنِ»
ব্যাখ্যা : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ যার-কে বিশেষভাবে কথাগুলো বলেছিলেন। তিনি তাকে এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করা, ওটা স্মরণ রাখা এবং তার উপর যথাযথ ‘আমল করার প্রতিও উৎসাহিত করেন।
ওয়া‘দা মোতাবেক যখন সপ্তম দিবস এলো তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে গোপনে, প্রকাশ্যে সর্বাবস্থায় তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতির ওয়াসিয়্যাত করেন। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেন, তাকওয়া শব্দটি كَلِمَةً جَامِعَةً পরিপূর্ণ বাণী, যা ব্যাপক অর্থ বহন করে। ওটা মানুষের এমন মানবিক বৈশিষ্ট্য বা গুণ যে তা অর্জন করতে পেরেছে তার জন্য ওটাই যথেষ্ট হয়েছে। কুরআন ও হাদীসে এই তাকওয়ার বহু নির্দেশ রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ ‘‘আমি তোমাদের পূর্ববর্তী গ্রন্থের অধিকারীদেরকে এবং তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করবে।’’ (সূরা আন্ নিসা ৪ : ১৩১)
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদীস বর্ণিত হয়েছে: أُوصِيكَ بِتَقْوَى اللّٰهِ فَإِنَّه رَأَسُ كُلِّ شَيْءٍ» «فَإِنَّه رَأْسُ الْأَمْرِ كُلِّه
‘‘আমি তোমাকে তাকওয়াল্লাহ বা আল্লাহ ভীতির ওয়াসিয়্যাত করছি, কেননা এই তাকওয়া হলো সকল কিছুর মূল।’’
অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘‘নিশ্চয় তা সকল কর্মের মূল।’’
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেন, আল্লাহর বাণী অনুরূপ এটিও ‘‘আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিত ঠিক তেমনি ভয় করো।’’ (সূরা আ-লি ‘ইমরান ৩ : ১০২)
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী: ‘‘আর যখনই তুমি কোনো মন্দ কাজ করবে সঙ্গে সঙ্গে নেক কাজ করো।’’ এটা ইশারা এই দিকে যে, মানুষ স্বভাবগতভাবে শাহ্ওয়াত বা প্রবৃত্তিপরায়ণ। তার মধ্যে যেমন রয়েছে পশুত্ববৃত্তি ঠিক তেমনি রয়েছে মালাক (ফেরেশতা) স্বভাবও। নিন্দনীয় কুস্বভাব ও পশুত্ববৃত্তি যখন মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে তখনই মালাক স্বভাব ঐ কুস্বভাবকে নিভিয়ে দেয় ও নিবৃত করে ফেলে, যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তুমি মন্দ কাজের পর নেক কাজ করো, যা ঐ মন্দকে মুছে দিবে।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী: «وَلَا تَسْأَلَنَّ أَحَدًا» «شَيْئًا» ‘‘তুমি কখনো কারো কাছে কিছু সওয়াল করো না।’’ কারো কাছে কোনো কিছু সওয়াল করা বা চাওয়া খুবই হীন এবং নীচ কাজ।’’ সুতরাং মাখলূকের কাছে কোনো কিছু সওয়াল না করে মহাপরাক্রমশালী, দয়াময় আল্লাহর কাছে চাওয়া এবং সকল প্রয়োজন তাঁর কাছে সোপর্দ করা হলো আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের সর্বোচ্চ স্তর। ছোট প্রয়োজন হলেও দয়াময় আল্লাহর কাছেই চাওয়া উচিত এমনকি ঘোড়ার উপর থেকে চাবুকটি পড়ে গেলে তা উঠিয়ে দেয়ার জন্য কারো কাছে সাহায্য চাওয়া উচিত নয়। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রহঃ) সর্বদাই আল্লাহর কাছে এই বলে প্রার্থনা করতেন, হে আল্লাহ! তুমি আমার চেহারাকে তুমি ছাড়া অন্যকে সিজদা প্রদান থেকে রক্ষা করেছো, ঐ চেহারাকে তুমি ছাড়া অন্যের নিকট কিছু চাওয়া থেকে রক্ষা করো।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী: «وَلَا تَقْبِضْ أَمَانَةً» ‘তুমি কারো আমানত গ্রহণ করো না, এর অর্থ হলো : প্রয়োজন ছাড়া কোনো মানুষের আমানত হিফাযাতের দায়িত্ব গ্রহণ করো না। কারণ এতে খিয়ানাতের এবং অপকর্মের আশংকা রয়েছে। কারো আমানত যথাযথভাবে বহন করা, তা সংরক্ষণ করা, অতঃপর সময় মতো তা মালিকের নিকট পৌঁছে দেয়া কঠিন কাজ।
অনুরূপভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’জনের মাঝে বিচার-ফায়সালার দায়িত্বভার গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। এটা আবূ যার -এর ব্যাপারে খাস হলেও বিধান সার্বজনীন। দুর্বল ও কোমল মনের ব্যক্তিদের এ দায়িত্ব গ্রহণ করা উচিত নয়। আবূ যার (রাঃ)-এর ঘটনা প্রথম অনুচ্ছেদে অতিবাহিত হয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ, আবূ দাঊদ হাঃ ১৬৪৫, নাসায়ী হাঃ ২৫৮৭)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৩৭১৪-[৫৪] আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি দশ বা ততোধিক লোকের অভিভাবক বা জিম্মাদার হয়েছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা তার গলায় শিকল পরা অবস্থায় উপস্থিত করবেন। তার হাত গর্দানের সাথে বাঁধা অবস্থায় থাকবে, তার নেক ’আমল তাকে রক্ষা করবে অথবা তার কৃত অপরাধ তাকে ধ্বংস করবে। নেতৃত্বের প্রথম অবস্থা তিরস্কার ও নিন্দা, মধ্যম অবস্থায় লজ্জা, আর অবশেষে কিয়ামতের দিন অপমানিত ও লাঞ্ছিত হবে। (আহমাদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ أَبِي أُمَامَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: «مَا مِنْ رَجُلٍ يَلِي أَمْرَ عَشَرَةٍ فَمَا فَوْقَ ذَلِكَ إِلَّا أتاهُ اللَّهُ عزَّ وجلَّ مغلولاً يومَ القيامةِ يَدُهُ إِلَى عُنُقِهِ فَكَّهُ بِرُّهُ أَوْ أَوْبَقَهُ إِثْمُهُ أَوَّلُهَا مَلَامَةٌ وَأَوْسَطُهَا نَدَامَةٌ وَآخِرُهَا خِزْيٌ يومَ القيامةِ»
ব্যাখ্যা: সে কিয়ামতের দিন গর্দানের সাথে হাত বাঁধা অবস্থায় উপস্থিত হবে। অর্থাৎ (তার উপর) আল্লাহ অথবা মালায়িকার (ফেরেশতার) নির্দেশক্রমে সে গলবন্ধাবস্থায় আল্লাহর সমীপে উপনীত হবে। তার এই অবস্থা থেকে কেবলমাত্র তার ন্যায় ও ইনসাফ নামক সৎকর্ম তাকে উদ্ধার করতে পারবে। যদি সে ঐ ইনসাফ ও সৎকর্মে ব্যর্থ হয় তাহলে তার পাপ বা গুনাহ তাকে ধ্বংস করে দিবে।
নেতৃত্বের শুরু হয় গাল-মন্দ দিয়ে, মাঝখানে গিয়ে হতে হয় লজ্জিত ও অপমানিত আর শেষে অর্থাৎ কিয়ামতের দিন তার জন্য রয়েছে লাঞ্ছনা। দুনিয়া হলো আখিরাতের ক্ষেত্রস্বরূপ। সুতরাং দুনিয়ার কর্ম ফলই সে আখিরাতে ভোগ করবে। যেহেতু প্রশাসন ছিল তার কর্ম, আর সেখানে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা খুবই কঠিন কাজ, তাই এক্ষেত্রে তাকে জওয়াবদিহিতার মুখোমুখি হতেই হবে। আর যে জওয়াবদিহিতার মুখোমুখি হবে সে ধ্বংস হয়ে যাবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৩৭১৫-[৫৫] মু’আবিয়াহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হে মু’আবিয়াহ্! তুমি যদি কোনো কাজের জন্য শাসক বা জিম্মাদার নিয়োগপ্রাপ্ত হও, তাহলে আল্লাহকে ভয় করবে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে। তিনি [মু’আবিয়াহ্ (রাঃ)] বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ কথার পর থেকে আমি সর্বদা এ ধারণা করছিলাম যে, আমি একদিন এ দায়িত্বে নিযুক্ত হব। শেষ অবধি আমি এ পরীক্ষায় উপনীত হলাম। (আহমাদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ مُعَاوِيَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَا مُعَاوِيَةُ إِنْ وُلِّيتَ أَمْرًا فَاتَّقِ اللَّهَ وَاعْدِلْ» . قَالَ: فَمَا زِلْتُ أَظُنُّ أَنِّي مُبْتَلًى بِعَمَلٍ لِقَوْلِ النَّبِيِّ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسلم حَتَّى ابْتليت
ব্যাখ্যা: মু‘আবিয়াহ্ ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী উম্মু হাবীবাহ্ (রাঃ)-এর আপন ভাই। মু‘আবিয়াহ্ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপদেশটি ছিল তার নেতৃত্ব পাওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী ও ইঙ্গিত।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন, তুমি যদি কখনো হুকুমাত এবং ওয়ালায়াতের অধিকারী হও তাহলে বিচার ও শাসনকার্যে আল্লাহকে ভয় করবে এবং লোকেদের মাঝে ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচারকার্য পরিচালনা করবে। মু‘আবিয়াহ্ অতীব বুদ্ধিমান সাহাবী, তিনি ধারণা করেন যে, একদিন না একদিন তিনি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবেন। তার ظُنُّ বা ধারণা يَقِين (ইয়াক্বীন) নিশ্চয়তার অর্থ প্রদান করেছে। অর্থাৎ তার দৃঢ় বিশ্বাস হলো যে, তিনি একদিন ক্ষমতাশীল হবেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৩৭১৬-[৫৬] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সত্তর সালের সূচনালগ্ন থেকে এবং শিশুদের নেতৃত্ব থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করো। উপরি উল্লেখিত হাদীস ছয়টি ইমাম আহমাদ (রহঃ) বর্ণনা করেছেন। আর মু’আবিয়াহ্ (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীসটি বায়হাক্বী ’দালায়িলিন্ নুবূওয়াহ্’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «تَعَوَّذُوا بِاللَّهِ مِنْ رَأْسِ السَّبْعِينَ وَإِمَارَةِ الصِّبْيَانِ» . رَوَى الْأَحَادِيثَ السِّتَّةَ أَحْمَدُ وَرَوَى الْبَيْهَقِيُّ حَدِيثَ مُعَاوِيَةَ فِي «دَلَائِلِ النُّبُوَّة»
ব্যাখ্যা: সত্তরের গোড়ার যুগ হিজরী সন হিসাবে, না রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মৃত্যুর সময় থেকে তার উল্লেখ নেই। আবার শিশুদের নেতৃত্ব দ্বারা কার রাজত্ব বুঝানো হয়েছে তাও উল্লেখ নেই।
বাস্তবতায় দেখা যায়, হিজরী ৬০ থেকে ৭০ পর্যন্ত ইসলামের কয়েকটি কলঙ্কময় ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এ সময়েই মসজিদে হারামের উপর আক্রমণ, কারবালার বিয়োগান্তক ঘটনা ইত্যাদি সংঘটিত হয়েছিল এবং মুহাক্কিকগণ বালকদের রাজত্ব দ্বারা ইয়াযীদ ইবনু মু‘আবিয়াহ্ এবং হাকাম ইবনু মারওয়ান-এর বংশধরের রাজত্ব চিহ্নিত করেছেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৩৭১৭-[৫৭] ইয়াহ্ইয়া ইবনু হাশিম (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি ইউনুস ইবনু আবূ ইসহক হতে, তিনি তার পিতা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা যেরূপ হবে, তোমাদের ওপর সেরূপ শাসক নিযুক্ত করা হবে।[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ يَحْيَى بْنِ هَاشِمٍ عَنْ يُونُسَ بْنِ أَبِي إِسْحَاقَ عَنْ أَبِيهِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «كَمَا تَكُونُونَ كَذَلِك يُؤمر عَلَيْكُم»
ব্যাখ্যা: শাসক বা রাজ্য পরিচালক জনগণের খাদিম। জনগণ যদি শিক্ষিত সুশৃঙ্খল ও শান্তিকামী হয় তাহলে তাদের শাসকও হবে তাই, ফলে রাজ্য ভূ-স্বর্গে পরিণত হবে। পক্ষান্তরে প্রজা সাধারণ যদি উচ্ছৃঙ্খল, শঠ, প্রতারক এবং মূর্খ হয় তাহলে তাদের শাসকও তাই নির্বাচিত হবে। ফলে রাজ্য হবে অশান্তির কেন্দ্রবিন্দু। তাই জনগণকে আগে ভালো হতে হবে। নিজেরা ভালো না হয়ে শাসকদের ভালো হওয়ার আশা রাখা আদৌ সঙ্গত নয়।
অত্র হাদীসটির ব্যাখ্যা আবুদ্ দারদা কর্তৃক বর্ণিত ৩৭২১ নং হাদীসটিতে আরো স্পষ্ট করেছে। এছাড়াও বিভিন্ন সূত্রে এ অর্থে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৩৭১৮-[৫৮] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয় শাসক হলেন দুনিয়াতে আল্লাহ তা’আলার ছায়ার ন্যায়। নির্যাতিত ও অত্যাচারিত বান্দাগণ শাসকের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকে। সুতরাং তিনি যদি ন্যায়পরায়ণতার পথ অবলম্বন করেন, তবে তার জন্য রয়েছে অফুরন্ত পুরস্কার। আর প্রজাদের কর্তব্য হলো তার শুকরিয়া আদায় করা। আর তিনি যখন জুলুম ও অত্যাচার করেন তখন গুনাহের বোঝা তার ওপর বর্তাবে, এমতাবস্থায় প্রজাসাধারণের ধৈর্যধারণ করা উচিত।[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّ السُّلْطَانَ ظِلُّ اللَّهِ فِي الْأَرْضِ يَأْوِي إِلَيْهِ كُلُّ مَظْلُومٍ مِنْ عِبَادِهِ فَإِذَا عَدَلَ كَانَ لَهُ الْأَجْرُ وَعَلَى الرَّعِيَّةِ الشُّكْرُ وَإِذَا جَارَ كَانَ عَلَيْهِ الْإِصْرُ وعَلى الرّعية الصَّبْر»
ব্যাখ্যা: এখানে (السُّلْطَانَ ظِلُّ اللّٰهِ) বাক্য ব্যবহৃত হয়েছে। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, (السُّلْطَانَ ظِلُّ الرَّحْمٰن) অর্থাৎ ‘সুলত্বন’ হলো জমিনে দয়াময়ের (আল্লাহর) ছায়া। কেননা সে জনসাধারণের কষ্ট দূর করে, যেমন ছায়া মানুষকে রৌদ্রের কষ্ট থেকে রক্ষা করে থাকে। ‘আরব পরিভাষায় ظِلُّ দ্বারা আশ্রয় এবং প্রতিরক্ষার পরোক্ষ অর্থ গ্রহণ করা হয়ে থাকে। তাহলে অর্থ হয় যে, বাদশাহ হলেন দুনিয়ায় জনগণের আশ্রয়স্থল এবং বিপদ ও কষ্টের ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা স্বরূপ।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ বাক্যটি তাশবীহ বা সাদৃশ্য বর্ণনার জন্য এসেছে। (يَأْوِى إِلَيْهِ كُلُّ مَظْلُومٍ مِنْ عِبَادِه) প্রত্যেক মাযলূম নির্যাতিত ব্যক্তি তার কাছে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। এ বাক্যটিতে সাদৃশ্যতা বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ যেমন সূর্যোত্তাপ থেকে রক্ষার জন্য ছায়ার ঠাণ্ডায় আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে ঠিক তেমনি উৎপীড়িত মাযলূম মানুষ জুলুমের উত্তাপ থেকে রক্ষার জন্য বাদশাহর ন্যায় বিচারের স্নিগ্ধ ছায়াতলে আশ্রয় পেয়ে থাকে।
ছায়াকে আল্লাহর দিকে ইযাফত বা সম্পর্কিত করা অর্থাৎ ‘আল্লাহর ছায়া’ এ কথাটি তার মর্যাদা বৃদ্ধি করা। যেমন বলা হয়, বায়তুল্লাহ বা আল্লাহর ঘর, রূহুল্লাহ, নাকাতুল্লাহ ইত্যাদি। আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়ে বলি তার (আল্লাহর) ‘ছায়া’ বলতে সৃষ্টির কোনো কিছুর দৃশ্যমান ছায়া সদৃশ নয়; বরং তাঁর মহান মর্যাদা অনুসারে তিনি বিশেষ গুণে একক ও অদ্বিতীয় এবং তাঁর স্বকীয় মর্যাদা অনুসারেই সেটি তার ক্ষেত্রে যেভাবে হওয়া প্রযোজ্য সেভাবেই। বাদশাহ যেমন দুনিয়াতে দুঃখ ও বেদনাক্লিষ্ট ব্যক্তির আশ্রয়স্থল, ঠিক তেমনি ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ কিয়ামতের দিন আল্লাহর ‘আরশের ছায়াতলে আশ্রয় লাভ করবেন যেদিন ঐ ছায়া ছাড়া কোনো ছায়া থাকবে না।
বাদশাহর ইনসাফ ও ন্যায় বিচারের সুফল সে দুনিয়াতেও পাবে আখিরাতেও পাবে। আর যদি সে ন্যায় বিচার না করে এবং প্রজা সাধারণের ওপর জুলুম করে তাহলে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও অস্ত্রধারণ না করে সবর ইখতিয়ার করা উচিত। জুলুমের কারণে সেই গুনাহগার হবে এবং আল্লাহর দরবারে জওয়াবদিহিতার মুখোমুখি হবে।
হাদীসের এ বাণীতে ইশারা রয়েছে যে, ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ আল্লাহর বিশেষ দান ও অনুগ্রহ। আর যালিম বাদশাহ হলো আল্লাহর প্রতিশোধ, ঘৃণা ও পরীক্ষা।
আল্লাহ তা‘আলার বাণী : ‘‘নিশ্চয় এতে তোমাদের প্রত্যেকের জন্য রয়েছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে মহাপরীক্ষা।’’ (সূরা আল বাকারা ২ : ৪৯)
‘‘নিশ্চয় এতে প্রত্যেক ধৈর্যশীল কৃতজ্ঞ বান্দার জন্য রয়েছে নিদর্শন।’’ (সূরা লুকমান ৩১ : ৩১)
হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, ঈমান দু’ভাগে বিভক্ত অর্ধেক হলো ধৈর্য আর অর্ধেক কৃতজ্ঞতা। আল্লাহ আমাদের দু’টি বস্তুই গ্রহণের তাওফীক দান করুন।
(السُّلْطَانَ ظِلُّ اللّٰهِ) ‘বাদশাহ আল্লাহর ছায়া’ এ বাক্য দ্বারা যেমন বাদশাহর মহান মর্যাদা বুঝানো হয়ে থাকে ঠিক তাকে সম্মান করার ইঙ্গিতও এতে রয়েছে।
অত্র হাদীসে স্পষ্টই এসেছে, «مَنْ أَكْرَمَ سُلْطَانَ اللّٰهِ فِي الدُّنْيَا أَكْرَمَهُ اللّٰهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» যে দুনিয়াতে বাদশাহকে সম্মান করবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে সম্মানিত করবেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৩৭১৯-[৫৯] ’উমার ইবনুল খত্ত্বাব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন সহনশীল ও ন্যায়পরায়ণ শাসক হবেন আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম মর্যাদার অধিকারী। আর কিয়ামতের দিন যালিম ও অত্যাচারী শাসক হবে আল্লাহর নিকট সকল মানুষের মধ্যে নিকৃষ্টতম।[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ أَفْضَلَ عِبَادِ اللَّهِ عِنْدَ اللَّهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِمَامٌ عَادِلٌ رَفِيقٌ وَإِنَّ شَرَّ النَّاسِ عِنْدَ اللَّهِ مَنْزِلَةً يَوْمِ الْقِيَامَةِ إِمامٌ جَائِر خرق»
ব্যাখ্যা: (رَفِيقٌ) এর অর্থ অন্তরঙ্গ বন্ধু, নরম আচরণকারী, সহনশীল। অর্থাৎ ধনী-দরিদ্র, ইতর ভদ্র সকলের সাথে কোমল আচরণকারী, সহনশীল, ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় বান্দা হিসেবে পরিগণিত হবেন।
অনুরূপ কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি হবে যালিম, নিষ্ঠুর শাসক। خَرِقٌ শব্দটি رَفِيقٌ এর বিপরীত। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১১নং হাদীসে এ হাদীসের অনুরূপ হাদীস ও ব্যাখ্যা অতিবাহিত হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৩৭২০-[৬০] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো ব্যক্তি যদি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রতি এমন দৃষ্টিতে তাকায়, যাতে সে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়, তাহলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা তাকে ভীত-সন্ত্রস্ত করবেন। উপরি উল্লেখিত হাদীস চারটি বায়হাক্বী-এর ’শু’আবুল ঈমান’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। আর তিনি ইয়াহ্ইয়া-এর হাদীসের ব্যাপারে বলেছেনঃ এটা মুনক্বতি’ এবং য’ঈফ।[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «من نَظَرَ إِلَى أَخِيهِ نَظْرَةً يُخِيفُهُ أَخَافَهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» . رَوَى الْأَحَادِيثَ الْأَرْبَعَةَ الْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ» وَقَالَ فِي حَدِيثِ يَحْيَى هَذَا: مُنْقَطع وَرِوَايَته ضَعِيف
ব্যাখ্যা: أَخِيهِ ‘তার ভাই’ এর দ্বারা নিজ ভাই, মুসলিম ভাই ইত্যাদি। যে কোনো মুসলিমই হতে পারে। তাকানো যদি রুক্ষ-ভীতিকর তাকানো হয় যার কারণে সে ভয় পায় বা আতংক হয়ে যায় তবে তার পরিণাম এই যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে ভীতিগ্রস্ত করে ফেলবেন।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ ইসলামের ভ্রাতৃত্বের কারণে একে অপরের নিকট নিরাপত্তার দাবী রাখে।
হাদীসে এসেছে, «الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِه وَيَدِه» প্রকৃত মুসলিম তো সেই যার হাত ও মুখ থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদে থাকে।
এ অনুচ্ছেদে এ হাদীস ইশারা করে ঐদিকে ‘একজন মুসলিম অন্য কোনো মুসলিমের প্রতি ভীতিকর তাকানোর কারণেই কিয়ামতের দিন এই শাস্তির ভাগী হতে হচ্ছে। তাহলে যারা এর চেয়ে অধিক ভীতিকর কাজ এবং জুলুম করে- এ শ্রেণীর কর্মের জন্য কি শাস্তি ভোগ করতে পারে? পক্ষান্তরে বায়হাক্বী প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, কেউ যদি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রতি দয়ার দৃষ্টিতে তাকান তাহলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
যদিও হাদীসটি দুর্বল বরং কেউ কেউ জাল বলেও মন্তব্য করেছেন, ফলে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পরিহার করা হলো। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৩৭২১-[৬১] আবুদ্ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা স্বয়ং ঘোষণা করেনঃ আমি হলাম সর্বশক্তিমান, আমি ছাড়া প্রকৃত কোনো ইলাহ নেই। আমি রাজা-বাদশাহদের মালিক ও রাজাধিরাজ। সকল বাদশাহদের অন্তর আমার হাতের মুঠোতে। নিশ্চয় বান্দারা যখন আমার আনুগত্য করে, তখন আমি রাজা-বাদশাহদের অন্তরকে দয়া ও কোমলতার সাথে তাদের দিকে ফিরিয়ে দেই। আর বান্দারা যখন আমার অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়, তখন আমি তাদের অন্তরকে প্রজাদের জন্য কঠোর নিষ্ঠুর করে দেই। ফলে তারা প্রজাদেরকে কঠিন অত্যাচার করতে থাকে। সুতরাং তোমরা তখন তোমাদের শাসকদের জন্য বদ্দু’আ করো না; বরং নিজেদেরকে আল্লাহর জিকির ও ভারাক্রান্ত অন্তরে আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকো, যাতে আমি তোমাদের জন্য যথেষ্ট হয়ে যাই। (আবূ নু’আয়ম ’’হিল্ইয়াহ্’’ গ্রন্থে বর্ণনা করেন)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَقُولُ: أَنَا اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا مَالِكُ الْمُلُوكِ وَمَلِكُ الْمُلُوكِ قُلُوبُ الْمُلُوكِ فِي يَدِي وَإِنَّ الْعِبَادَ إِذَا أَطَاعُونِي حَوَّلْتُ قُلُوبَ مُلُوكِهِمْ عَلَيْهِمْ بِالرَّحْمَةِ وَالرَّأْفَةِ وَإِنَّ الْعِبَادَ إِذَا عَصَوْنِي حَوَّلْتُ قُلُوبَهُمْ بِالسُّخْطَةِ وَالنِّقْمَةِ فَسَامُوهُمْ سُوءَ الْعَذَابِ فَلَا تَشْغَلُوا أَنْفُسَكُمْ بِالدُّعَاءِ عَلَى الْمُلُوكِ وَلَكِنِ اشْغَلُوا أَنْفُسَكُمْ بِالذِّكْرِ وَالتَّضَرُّعِ كَيْ أَكْفِيَكُمْ ملوكَكم «. رَوَاهُ أَبُو نُعَيْمٍ فِي» الْحِلْيَةِ
ব্যাখ্যা: ‘আল্লাহ বলেছেন’ (এটি হাদীসে কুদ্সী) হাদীসে উল্লেখিত (أَنَا اللّٰهُ) বাক্যে أَنَا শব্দটি ওয়াহ্দানিয়াত বা একত্বের জন্য প্রসিদ্ধ এবং প্রচলিত, অথবা শব্দটি একক مَعْبُودُ অর্থে ব্যবহৃত হয়। لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنَا বাক্যটি পূর্ববর্তী বাক্যের حَالٌ مُؤَكِّدَة বা তাকীদযুক্ত হাল হয়েছে।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) আল্লাহর কথা (أَنَا مَالِكُ الْمُلُوكِ وَمَلِكُ الْمُلُوكِ)-এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, مَلِكُ الْمُلُوكِ বাক্যটি مَالِكُ الْمُلُوكِ বাক্যের পরে আসা অগ্রসরতা ও উন্নতির ধাপ প্রকাশার্থে ব্যবহৃত হয়েছে। الْمَلِكَ শব্দের অর্থ বাদশাহ বা রাজা; الْمَالِكِ শব্দের অর্থ মালিক, শাসক ইত্যাদি। কিন্তু الْمَلِكَ শব্দটি সিফাতের মুশাববাহ হিসেবে الْمَالِكِ শব্দের উপরে অধিক মহান ও বড়ত্ব প্রকাশক। আর ক্ষমতা প্রয়োগে অধিকতর শক্তিশালী। আর مَلِكُ হলো আদেশ নিষেধ প্রদানকারী এবং مَالِكُ হলো তা প্রয়োগকারী।مَالِكُ হলো রাজা, مَلِكُ হলেন রাজার রাজা-রাজাধিরাজ, কেউ কেউ এর বিপরীতও বলেছেন।
আল্লাহর কথা : ‘‘সমস্ত বাদশাহর অন্তর আমার মুঠোর মধ্যে’’ এ বাক্য প্রমাণ করে তার একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রয়োগের। তিনি তার অনুগত বান্দাদের জন্য তাদের শাসকের অন্তরকে পরিবর্তন করে দেন ফলে সে তার প্রজাদের প্রতি হয় দয়ার্দ্র ও সহনশীল।
পক্ষান্তরে জনগণ যদি আল্লাহর নাফরমানীতে লিপ্ত হয়, তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদের শাসক শ্রেণীর অন্তরকে জনগণের প্রতি কঠোর ও নিষ্ঠুর বানিয়ে দেন, ফলে তারা প্রজাসাধারণের ওপর কঠিন শাস্তি ও নির্যাতনের স্টীম রোলার চালিয়ে দেয়।
এ সময় মানুষ সাধারণতঃ শাসকদের বিরুদ্ধে বদ্দু‘আ বা অভিশাপ করতে থাকে। এ অবস্থায় শাসকদের অভিশাপ না দিয়ে নিজেদের নৈতিক চরিত্র সংশোধন করে আল্লাহর স্মরণে ফিরে আসার নির্দেশ প্রদান করেছেন। আর নিজেদের নৈতিক স্খলনের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করতে বলা হয়েছে। ফলে আল্লাহই তাদের সরকারের জুলুম থেকে তাদের নিষ্কৃতি প্রদানে এগিয়ে আসবেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - জনগণের প্রতি শাসকের সহনশীলতা প্রদর্শন করা
৩৭২২-[১] আবূ মূসা আল আশ্’আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই কোনো কাজে কোনো সাহাবীকে পাঠাতেন তখন বলতেন, তোমরা জনগণকে আশার বাণী শুনাবে। হতাশাব্যঞ্জক কথা বলে তাদের জন্য অবহেলা-ঘৃণা সৃষ্টি করবে না। তাদের সাথে সহজ-সরল বিধান নীতি ব্যবহার করবে, কঠোরতা অবলম্বন করবে না। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ مَا عَلَى الْوُلَاةِ مِنَ التَّيْسِيْرِ
عَنْ أَبِي مُوسَى قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا بَعَثَ أَحَدًا مِنْ أَصْحَابِهِ فِي بَعْضِ أَمْرِهِ قَالَ: «بَشِّرُوا وَلَا تُنَفِّرُوا وَيَسِّرُوا وَلَا تُعَسِّرُوا»
ব্যাখ্যা: (عَنْ أَبِىْ مُوسٰى قَالَ : كَانَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ إِذَا بَعَثَ أَحَدًا) ‘‘কাউকে পাঠাতেন’’ অর্থাৎ পাঠাতে ইচ্ছা করতেন।
أَمْرِه (مِنْ أَصْحَابِه فِىْ بَعْضِ أَمْرِه) অর্থাৎ নিজের কোনো কর্মের জন্য না বরং রাষ্ট্রের কোনো দায়িত্ব দিয়ে।
(قَالَ : بَشِّرُوْا) অর্থাৎ মানুষদেরকে আল্লাহ প্রদত্ত সাওয়াব যা তিনি সৎকর্মের জন্য দান করেন তা জানিয়ে দাও। এখানে (بَشِّرُوْا) শব্দ বলে যে সম্বোধন করা হয়েছে তার দু’টি দিক হতে পারে। কারণ (بَشِّرُوْا) শব্দটি হলো বহুবচন শব্দ, এমতাবস্থায় এর মাধ্যমে সম্বোধনটি যাকে পাঠাতেন তার জন্য হতে পারে অথবা বিষয়টি সকলের ক্ষেত্রে ব্যাপক হতে পারে।
(وَلَا تُنَفِّرُوْا) অর্থাৎ এখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মানুষদেরকে জাহান্নামের শাস্তির ভয় দেখাতে গিয়ে এত বাড়াবাড়ি করা উচিত নয় যে, তারা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে যায় তাদের পাপের কারণে।
অথবা এটা বুঝানো হয়েছে যে, কল্যাণ লাভের উপর জোর দিয়ে আনুগত্যমূলক কাজ করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। অত্যাচার কঠোরতার ভয় দেখিয়ে আল্লাহর আনুগত্য থেকে বিমুখ করে দিও না।
উপরোক্ত বাক্যটির দু’টি দিক আছে, একটি হলো সুসংবাদ দাও, অপরটি হলো বিমুখ করে দিও না। দু’টি বাক্যই পরস্পর সামঞ্জস্যপূর্ণ।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ উক্ত বাক্য দু’টি রূপকভাবে পরস্পর বিরোধী কারণ যদি বাস্তবিক বিপরীতমুখী হতো তাহলে ইবারতটি হতো بَشِّرُوا وَلَا تُنْذِرُوا، وَاسْتَأْنِسُوا وَلَا تُنَفِّرُوا অর্থাৎ সুসংবাদ দাও ভয় দেখাইও না, দয়াপরবশ হও, বিমুখ করিও না। তাহলে দেখা যায় এখানে সুসংবাদ প্রদান, সতর্কীকরণ, দয়াপরবশ ও বিমুখ করা সবগুলোকেই বুঝাচ্ছেন। তাই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইবারতই এখানে উপযুক্ত এবং তাঁর হাদীস থেকেও এটা বুঝা যায় যে, মানুষদেরকে সতর্ক করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘‘তুমি কুরআনের মাধ্যমে সতর্ক কর তাদেরকে যারা ভয় করে।’’ (সূরা আল আন্‘আম ৬ : ১৫)
অন্য আয়াতে আছে, ‘‘তারা যেন তাদের জাতিকে সতর্ক করে।’’ (সূরা আত্ তাওবাহ্ ৯ : ১২২)
সতর্ক করার প্রয়োজনীয়তা এজন্য বেশী যে, রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক বিষয়গুলো শুধুমাত্র সুসংবাদ দিয়েই পূর্ণ হয় না সেখানে সতর্কীকরণ বা নোটিশ জারি করতে হয়।
(وَيَسِّرُوْا) অর্থাৎ যাকাত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের ওপর সহজনীতি অবলম্বন করো।
(وَلَا تُعَسِّرُوْا) অর্থাৎ মানুষের ওপর চড়াও হয়ো না। এখানে চড়াও কয়েক ধরনের হতে পারে- (ক) তাদের ওপর যাকাত যা ফরয হয়েছে তার চেয়ে বেশী গ্রহণ করা। (খ) উত্তমটি গ্রহণ করা। (গ) তাদের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে তল্লাশী করা। (ঘ) তাদের অবস্থা সম্পর্কে গোয়েন্দাগীরী করা ইত্যাদি। (ফাতহুল বারী ১ম খন্ড, হাঃ ৬৯; শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৭৩২; ‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৮২৭; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - জনগণের প্রতি শাসকের সহনশীলতা প্রদর্শন করা
৩৭২৩-[২] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মানুষের সাথে উদার ব্যবহার করো, কঠোরতা পরিহার করো, তাদেরকে সান্ত্বনা দাও এবং ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দিয়ো না। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ مَا عَلَى الْوُلَاةِ مِنَ التَّيْسِيْرِ
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسلم: «يسوا وَلَا تُعَسِّرُوا وَسَكِّنُوا وَلَا تُنَفِّرُوا»
ব্যাখ্যা: (وَلَا تُعَسِّرُوْا) অর্থাৎ তোমরা মানুষের ওপর এমন বিষয় চাপিয়ে দিও না যাতে তারা ঐ বিষয়টি অস্বীকার করতে বাধ্য হয়।
‘‘আন্ নিহায়াহ্’’ গ্রন্থকারও একই কথা বলেছেনঃ لَا تُكَلِّفُونَهُمْ بِمَا يَحْمِلُهُمْ عَلَى النُّفُورِ অর্থাৎ তাদের কাঁধে এমন বোঝা চাপিয়ে দিও না, যাতে তারা তা ছাড়তে বাধ্য হয়। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬১২৫; শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৭৩৪; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - জনগণের প্রতি শাসকের সহনশীলতা প্রদর্শন করা
৩৭২৪-[৩] ইবনু আবূ বুরদাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (একদিন) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দাদা আবূ মূসা ও মু’আয (রাঃ)-কে ইয়ামানে পাঠালেন এবং অতঃপর বললেনঃ তোমরা মানুষের জন্য সহজসাধ্য কাজ করবে, কঠিন ও কষ্টদায়ক কাজ চাপিয়ে দিও না। তাদেরকে সুসংবাদ দাও, হতাশা ও নৈরাশ্যজনক কথা তাদেরকে শুনাও না। পরস্পর ঐকমত্যের ভিত্তিতে কাজ করবে, মতানৈক্য করবে না। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ مَا عَلَى الْوُلَاةِ مِنَ التَّيْسِيْرِ
وَعَن ابنِ أَبِي بُرْدَةَ قَالَ: بَعَثَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جَدَّهُ أَبَا مُوسَى وَمُعَاذًا إِلَى الْيَمَنِ فَقَالَ: «يَسِّرَا وَلَا تُعَسِّرَا وَبَشِّرَا وَلَا تُنَفِّرَا وَتَطَاوَعَا وَلَا تَخْتَلِفَا»
ব্যাখ্যা: (قَالَ : بَعَثَ النَّبِىُّ ﷺ جَدَّه أَبَا مُوسٰى وَمُعَاذًا) লেখকের বাহ্যিক বাচনভঙ্গি থেকে মনে হচ্ছে যে, আবূ মূসা আবূ বুরদার দাদা কিন্তু বিষয়টি তা নয় বরং আবূ মূসা হলেন তার পিতা। সুতরাং সঠিক হলো এভাবে বলা ‘আব্দুল্লাহ বিন আবূ বুরদাহ্ তিনি তার পিতা থেকে, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দাদা আবূ মূসাকে পাঠালেন এভাবেই ইমাম বুখারী-মুসলিম বিন ইবরাহীম থেকে বর্ণনা করেছেন। কোনো এক নুসখাতে ইবনু আবূ বুরদাহ্ থেকে বর্ণনা করেছেন বলে পাওয়া যায় এটাতে কোনো সমস্যা নেই এমনটাই কতকের মত উল্লেখ করেছেন। অপরদিকে কেউ কেউ বলেন, বুখারীর বর্ণনা মতে ইবনু আবূ বুরদাহ্ বলেন, আমি আমার আব্বাকে বলতে শুনেছি। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার আববা ও মু‘আয বিন জাবাল -কে পাঠালেন ইয়ামান দেশে। কেউ কেউ ‘‘জামিউল উসূল’’ নামক কিতাব থেকে বর্ণনা করেন বিলাল বিন আবূ বুরদাহ্ বিন মূসা আল আশ্‘আরী -কে বাসরার শাসনকর্তা বানানো হয়েছিল, তিনি তার পিতা ও অন্যান্যদের নিকট থেকে শুনেছেন। তার থেকে কাতাদাহ এবং একদল বড় ‘আলিম হাদীস বর্ণনা করেছেন।
(وَلَا تَخْتَلِفَا) অর্থাৎ যে কোনো বিষয়ে তোমরা পরস্পর মতবিরোধ করবে না। কেননা তোমরা দু’জনে যদি মতবিরোধে লিপ্ত হও তাহলে তোমাদের দেখাদেখি তোমাদের অধিনস্থরাও মতবিরোধ করবে। আর তখনই পরস্পর শত্রুতা, যুদ্ধ ইত্যাদি সংগঠিত হবে।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ উপরের তিনটি হাদীস পরস্পর সমার্থক, তাই একনিষ্ঠ ইসলামের কোনো ব্যাপারে কঠোর চাপ প্রয়োগ করা উচিত নয়।
মহান আল্লাহ বলেছেনঃ ‘‘আল্লাহ তোমাদের দীনের ব্যাপারে কষ্টারোপ করেননি’’- (সূরা আল হজ্জ/হজ ২২ : ৭৮)। অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে সহজ করে দিয়েছেন। সুতরাং এখান থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, ইসলামী শারী‘আহ্ সহজ কঠিন নয়। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬১২৪; শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৭৩৩; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - জনগণের প্রতি শাসকের সহনশীলতা প্রদর্শন করা
৩৭২৫-[৪] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামত দিবসে প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকদের জন্য একটি করে পতাকা উত্তোলিত (খাড়া) করা হবে, আর বলা হবে- এটা অমুকের পুত্র, অমুকের বিশ্বাসঘাতকতার দৃষ্টান্ত। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ مَا عَلَى الْوُلَاةِ مِنَ التَّيْسِيْرِ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِنَّ الْغَادِرَ يُنْصَبُ لَهُ لِوَاءٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيُقَالُ: هَذِهِ غَدْرَةُ فُلَانِ بْنِ فُلَانٍ
ব্যাখ্যা: হাদীসটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ غَادِرَ (গা-দির) শব্দের অর্থ হলো অঙ্গীকার ভঙ্গকারী। কাযী ‘ইয়ায বলেনঃ «الْغَدْرُ فِي الْأَصْلِ تَرْكُ الْوَفَاءِ» অর্থাৎ ‘‘গা-দির’’ অর্থ অঙ্গীকার ভঙ্গ করা। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৬১৭৮; শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৭৩৫; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭৫৩; তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৫৮১; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - জনগণের প্রতি শাসকের সহনশীলতা প্রদর্শন করা
৩৭২৬-[৫] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামত দিবসে প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকদের জন্য একটি করে পতাকা দেখা যাবে, যার মাধ্যমে তার পরিচয় পাওয়া যাবে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ مَا عَلَى الْوُلَاةِ مِنَ التَّيْسِيْرِ
وَعَنْ أَنَسٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لِكُلِّ غَادِرٍ لِوَاءٌ يومَ القيامةِ يُعرَفُ بِهِ»
ব্যাখ্যা: কোনো এক বর্ণনায় (لِكُلِّ غَادِرٍ لِوَاءٌ) রয়েছে, সেখানে (يَوْمَ الْقِيَامَةِ) শব্দটিতে নেই যাতে করে বুঝতে পারা যায় যে, এ ব্যক্তি ধোঁকাবাজ, এজন্য তার জন্য একটি ঝান্ডা থাকবে।
ইমাম আহমাদ ও ইমাম মুসলিম, ইবনু মাস্‘ঊদ থেকে, ইমাম মুসলিম এককভাবে ইবনু ‘উমার থেকে, ইমাম ইমাম আহমাদ ও ইমাম আবূ দাঊদ আত্ তায়ালিসী (রহঃ) থেকে, তার শব্দ রয়েছে,
أَنَّ لِكُلِّ غَادِرٍ لِوَاءً يَوْمَ الْقِيَامَةِ (يُعْرَفُ بِه)
অর্থাৎ প্রত্যেক ধোঁকাবাজের জন্য একটি ঝান্ডা লাগানো থাকবে যার দ্বারা তাকে চেনা যাবে। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩১৮৬; শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৭৩৭; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - জনগণের প্রতি শাসকের সহনশীলতা প্রদর্শন করা
৩৭২৭-[৬] আবূ সা’ঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকদের নিতম্বের সাথে তার জন্য (অপরাধ অনুপাতে) একটা করে পতাকা রাখা হবে।
অপর বর্ণনাতে আছে, কিয়ামত দিবসে প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকদের জন্য তার বিশ্বাসঘাতকতার পরিমাণ অনুপাতে পতাকা উত্তোলিত হবে। সাবধান! রাষ্ট্র প্রধানের বিশ্বাসঘাতকতাই হবে সর্ববৃহৎ (অপরাধ)। (মুসলিম)[1]
بَابُ مَا عَلَى الْوُلَاةِ مِنَ التَّيْسِيْرِ
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لِكُلِّ غَادِرٍ لِوَاءٌ عِنْدَ اسْتِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» . وَفِي رِوَايَةٍ: «لِكُلِّ غَادِرٍ لِوَاءٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرْفَعُ لَهُ بِقَدْرِ غَدْرِهِ أَلا وَلَا غادر أعظم مِن أميرِ عامِّةٍ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসে ধোঁকাবাজের জন্য ঝান্ডা স্থাপনের কারণ হলো যাতে করে সকলেই বুঝতে পারে যে, সে একজন প্রতারক, ধোঁকাবাজ এবং ঝান্ডা নিতম্বে স্থাপনের কারণ হলো লাঞ্ছনার পরিমাণ বৃদ্ধিকরণ। অথবা এ কারণে যে, যেহেতু সম্মানের পতাকা থাকে সামনে, সুতরাং অসম্মানের পতাকা পিছনে থাকবে এটাই স্বাভাবিক।
সহীহ মুসলিম-এর ব্যাখ্যা গ্রন্থে এসেছে, «اللِّوَاءِ» বলা হয় এমন বড় পতাকা যা বড় যুদ্ধ দলের কমান্ডার উঁচু করে রাখে অথবা বড় দলের বাহকরা সে পতাকা নিয়ে অগ্রে থাকে এবং লোকজন তার পিছনে যায়।
হাফিয ইবনু হাজার ‘আসকালানী (রহঃ) বলেনঃ «اللِّوَاءِ» হলো ঐ পতাকা যা যুদ্ধে নিয়ে যাওয়া হয় এবং এটা যার হাতে থাকে তিনি হলেন দলপতি মাঝে মধ্যে এটা দলপতি উঁচু করে রাখে, মাঝে মধ্যে সৈন্যদলের সামনে রাখা হয়। ‘আরবী ভাষাবিদগণের একটি দল বলেন, «الرَّايَةُ» এবং «اللِّوَاءِ» শব্দ দু’টি সমার্থক শব্দ।
(وَلَا غَادِرَ أَعْظَمُ مِنْ أَمِيْرِ عَامِّةٍ) এখানে হাদীসের এ অংশটিতে বলা হয়েছে বড় কোনো সৈন্যদলের নেতৃত্ব নিয়ে। তারপর যদি তাদের ধোঁকা দেয়া হয় তাহলে এটিই হলো সর্বাধিক বড় ধোঁকাবাজী, কারণ এতে আল্লাহর সাথে বেঈমানী করা হয় এমনকি মুসলিমদের সাথেও বেঈমানী করা হয়।
ইমাম নববী (রহঃ) বলেনঃ হাদীসের এ অংশটিতে ধোঁকাবাজী সম্পূর্ণ হারাম করা হয়েছে, বিশেষ করে কোনো বড় সেনাদলের নেতার জন্য আরো বেশী হারাম, কারণ তার ভুলের কারণে তার অধিনস্থ অনেক মানুষের করুণ পরিণতি হতে পারে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জনগণের প্রতি শাসকের সহনশীলতা প্রদর্শন করা
৩৭২৮-[৭] ’আমর ইবনু মুররাহ্(রহঃ) হতে বর্ণিত। একদিন তিনি মু’আবিয়াহ্ (রাঃ)-কে বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা মুসলিমদের মধ্যে যে ব্যক্তিকে কোনো কাজের দায়িত্বে নিযুক্ত করেন, আর সে তাদের প্রয়োজন, চাহিদা ও অভাব-অভিযোগের প্রতি পরোয়া করে না (গাফিল থাকে); আল্লাহ তা’আলাও তার প্রয়োজন, চাহিদা ও অভাব-অভিযোগ (মিটানো) থেকে আড়ালে থাকেন। অতঃপর মু’আবিয়াহ্ (রাঃ) মানুষের প্রয়োজন ও অভাব-অভিযোগ শোনার জন্য একজন লোক নিয়োগ করেন। (আবূ দাঊদ ও তিরমিযী)[1]
তিরমিযী’র অপর এক বর্ণনা ও আহমাদ-এর বর্ণনাতে আছে, আল্লাহ তা’আলা ঐ শ্রেণীর লোকের চাহিদা, প্রয়োজন ও অভাব মোচনের ব্যাপারে আকাশমন্ডলীর সমস্ত দরজা বন্ধ করে দিবেন।
عَنْ عَمْرِو بْنِ مُرَّةَ أَنَّهُ قَالَ لِمُعَاوِيَةَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: « (مَنْ وَلَّاهُ اللَّهُ شَيْئًا مِنْ أَمْرِ الْمُسْلِمِينَ فَاحْتَجَبَ دُونَ حَاجَتِهِمْ وَخَلَّتِهِمْ وَفَقْرِهِمُ احْتَجَبَ اللَّهُ دُونَ حَاجَتِهِ وَخَلَّتِهِ وَفَقْرِهِ» . فَجَعَلَ مُعَاوِيَةُ رَجُلًا عَلَى حَوَائِجِ النَّاسِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالتِّرْمِذِيُّ وَفِي رِوَايَةٍ لَهُ وَلِأَحْمَدَ: «أَغْلَقَ اللَّهُ لَهُ أَبْوَابَ السَّمَاءِ دُونَ خَلَّتِهِ وَحَاجَّتِهِ وَمَسْكَنَتِهِ»
ব্যাখ্যা: (احْتَجَبَ اللّٰهُ دُوْنَ حَاجَتِه وَخَلَّتِه وَفَقْرِه) অর্থাৎ যদি কোনো নেতা তার অধিনস্থদের খোঁজখবর না নেয় তাহলে আল্লাহ তা‘আলাও তাকে তার ধর্মীয় এবং পার্থিব চাওয়া-পাওয়া পূর্ণ করবেন না, ফলে সে তার জরুরী প্রয়োজনগুলো পূর্ণ করার কোনো পথ খুঁজে পাবে না। এ বিষয়টির স্বপক্ষে আরো একটি হাদীস রয়েছে যা ইমাম ত্ববারানী ইবনু ‘উমার থেকে মারফূ‘ সূত্রে বর্ণনা করেছেন, مَنْ وَلِيَ شَيْئًا مِنْ أُمُورِ الْمُسْلِمِينَ لَمْ يَنْظُرِ اللّٰهُ فِي حَاجَتِهِ حَتّٰى يَنْظُرَ فِي حَوَائِجِهِمْ অর্থাৎ যে কেউ মুসলিমদের কোনো বিষয়ের দায়িত্বশীল হবেন আল্লাহ তার প্রয়োজন মিটাবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত সে তাদের প্রয়োজন না মিটায়।
কাযী ‘ইয়ায বলেনঃ ‘নেতা তার অধিনস্থদের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে’ এ কথার অর্থ হলো যে গরীব, দুস্থ, নিঃস্বরা তার নিকট তাদের আবেদন নিয়ে আসতে চাইলে সে আসতে দিবে না বরং বাধার সৃষ্টি করবে এবং তাদের আবেদন মঞ্জুর না করে কঠিন করবে। ফলে আল্লাহ তা‘আলা ও তার জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবেন-এর অর্থ হলো আল্লাহ তার দু‘আ কবুল করবেন না তার সব স্বপ্ন ভেঙ্গে দিবেন।
হাদীসে উল্লেখিত তিনটি শব্দ الفقر، الخلة، الحاجة এ তিনটি শব্দের অর্থ প্রায় কাছাকাছি একটু সূক্ষ্ম পার্থক্য আর তা হলো حاجة বলা হয় যা প্রয়োজন তবে তা না হলে কোনো কাজই সম্ভব নয় এমন পর্যায়ভুক্ত না, الخلة-ও ঠিক তাই তবে একটু পার্থক্য হলো মাঝে মধ্যে الخلة আবশ্যকীয় ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় অর্থাৎ তা অর্জিত না হলে জীবনধারণই সম্ভব নয়। আর الفقر হচ্ছে যা অতি আবশ্যক অর্থাৎ তা না হলে জীবনধারণই সম্ভব নয়, এ শব্দটি فقاره শব্দ থেকে গৃহীত আর فقار অর্থ হলো মেরুদণ্ডের হাড়। মেরুদণ্ডবিহীন যেমন জীবন চলে না তেমনি فقر হচ্ছে এমন প্রয়োজন যা না হলে জীবন চলে না। এজন্য ফাকীরের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে الَّذِي لَا شَيْءَ لَه أَصْلا অর্থাৎ মূলত যার কিছু নেই। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাকীরত্ব থেকে আশ্রয় চেয়েছেন। তবে এখানে সবচেয়ে স্পষ্ট কথা হলো শব্দ তিনটি «أَلْفَاظٌ مُتَقَارِبَةٌ» তথা পরস্পর নিকটবর্তী অর্থজ্ঞাপক শব্দাবলীর অন্তর্গত। বিষয়টিকে জোড়ালোভাবে তুলে ধরার জন্য এরূপ একই অর্থজ্ঞাপক একাধিক শব্দের প্রয়োগ করা হয়েছে। (‘আওনুল মা‘বুদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৯৪৬; তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৩৩২; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জনগণের প্রতি শাসকের সহনশীলতা প্রদর্শন করা
৩৭২৯-[৮] আবূ শাম্মাখ আল আযদী (রহঃ) তার এক চাচাতো ভাই হতে বর্ণনা করেন। যিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবী ছিলেন। একদিন তিনি মু’আবিয়াহ্ (রাঃ)-এর নিকট গিয়ে বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যে ব্যক্তিকে মানুষের কোনো কাজের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করা হয়। অতঃপর সে মুসলিম, মাযলূম অথবা দুস্থ লোকেদের জন্য তার প্রবেশদ্বার বন্ধ করে রাখেন, আল্লাহ তা’আলাও তার প্রয়োজন বন্ধ করে দেবেন যখন সে চরম অভাবে নিপতিত হবে। (বায়হাক্বী- শু’আবুল ঈমান)[1]
عَنْ أَبِي الشَّمَّاخِ الْأَزْدِيِّ عَنِ ابْنِ عَمٍّ لَهُ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ أَتَى مُعَاوِيَةَ فَدَخَلَ عَلَيْهِ فَقَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَنْ وَلِيَ مِنْ أَمْرِ النَّاسِ شَيْئًا ثُمَّ أَغْلَقَ بَابَهُ دُونَ الْمُسْلِمِينَ أَوِ الْمَظْلُومِ أَوْ ذِي الْحَاجَةِ أَغْلَقَ اللَّهُ دُونَهُ أَبْوَابَ رَحْمَتِهِ عِنْدَ حَاجَتِهِ وَفَقْرِهِ أَفْقَرَ مَا يَكُونُ إليهِ»
ব্যাখ্যা: এ হাদীসটি পূর্বের হাদীসের সাথে খুবই সামঞ্জস্যশীল। দুনিয়ার কোনো নেতা তার অধিনস্থদের ওপর অত্যাচার করলে তার শাস্তি সে কিয়ামতে অবশ্যই পাবে। কাউকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে বঞ্চিত করবেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘‘সাবধান! তারা সেদিন তাদের রবের থেকে আড়ালে থাকবে’’- (সূরা আল মুতাফফিফীন ৮৩ : ১৫)। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জনগণের প্রতি শাসকের সহনশীলতা প্রদর্শন করা
৩৭৩০-[৯] ’উমার ইবনুল খত্ত্বাব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি যখনই কোনো দেশে প্রতিনিধি বা শাসক পাঠাতেন তখন তাদের ওপর শর্তারোপ করে দিতেন- তোমরা তুর্কি ঘোড়ায় আরোহণ করবে না, ময়দার রুটি খাবে না, পাতলা মিহিন কাপড় পরবে না, মানুষের প্রয়োজন মিটানো থেকে তোমার দরজা বন্ধ করবে না। যদি তোমরা এর মধ্য হতে কোনটি করো, তাহলে তোমরা শাস্তিযোগ্য অপরাধী হবে। অতঃপর কিছুদূর পর্যন্ত তিনি তাদেরকে এগিয়ে দিয়ে আসতেন। (এ হাদীস দু’টি বায়হাক্বী’র ’’শু’আবুল ঈমানে’’ বর্ণনা করেছেন)[1]
وَعَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّهُ كَانَ إِذَا بَعَثَ عُمَّالَهُ شَرَطَ عَلَيْهِمْ: أَنْ لَا تَرْكَبُوا بِرْذَوْنًا وَلَا تَأْكُلُوا نَقِيًّا وَلَا تَلْبَسُوا رَقِيقًا وَلَا تُغْلِقُوا أَبْوَابَكُمْ دُونَ حَوَائِجِ النَّاسِ فَإِنْ فَعَلْتُمْ شَيْئًا مِنْ ذَلِكَ فَقَدْ حَلَّتْ بِكُمُ الْعُقُوبَةُ ثُمَّ يُشَيِّعُهُمْ. رَوَاهُمَا الْبَيْهَقِيُّ فِي شُعَبِ الْإِيمَانِ
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসটি পূর্বের হাদীসেরই সমার্থক। অত্র হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের প্রতি কিছু নীতি অনুসরণের আদেশ দিয়েছেন আর তা হলো তারা بِرْذَوْنَةٌ তথা তুর্কী ঘোড়া ব্যবহার করবে না। কারণ তাতে অহংকার প্রকাশ পায়। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ অধিনস্থ সবাই সাধারণ ঘোড়া ব্যবহার করে, আর নেতা যদি তুর্কী ঘোড়া যা সাধারণ ঘোড়ার চেয়ে ভালো এবং এতে যদি তার অহমিকা এবং লৌকিকতা চলে আসে- এ আশংকা দূর করার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নেতাদের প্রতি তুর্কী ঘোড়ার ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন।
(وَلَا تَلْبَسُوا رَقِيقًا وَلَا تُغْلِقُوْا أَبْوَابَكُمْ دُونَ حَوَائِجِ النَّاسِ فَإِنْ فَعَلْتُمْ شَيْئًا مِنْ ذٰلِكَ فَقَدْ حَلَّتْ بِكُمُ الْعُقُوبَةُ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অংশে নেতাদের বললেন, তোমরা পাতলা-মিহি কাপড় পরিধান করবে না এবং জনগণের প্রয়োজন মিটানো বন্ধ করবে না, অতঃপর তোমরা তার কোনো কিছু যদি করো তাহলে অবশ্যই শাস্তি ভোগ করতে হবে। পূর্বের অংশে তুর্কী ঘোড়া নিষেধের কারণ ছিল অহমিকা প্রদর্শন বন্ধ আর এ অংশে মিহি কাপড় পরিধান নিষেধের কারণ হলো অপচয়, বিলাসিতা রোধ করা এবং মানুষকে বাধা দেয়া। নিষেধের কারণ হলো যাতে করে তারা মানুষের প্রয়োজনীয় দিকগুলো পূরণ না করে নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত না হয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - প্রশাসনিক কর্মস্থলে কাজ করা এবং তা গ্রহণের দায়িত্বে ভয় করা
৩৭৩১-[১] আবূ বকরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ কোনো বিচারক রাগান্বিত অবস্থায় দু’জনের মাঝে বিচার-ফায়সালা করবে না। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْعَمَلِ فِى الْقَضَاءِ وَالْخَوْفِ مِنْهُ
عَنْ أَبِي بَكْرَةَ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «لَا يَقْضِيَنَّ حَكَمٌ بَيْنَ اثْنَيْنِ وَهُوَ غَضْبَانُ»
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসে রাগান্বিত অবস্থায় বিচার শালিস করতে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা রাগান্বিত অবস্থায় বিচারক বাদী-বিবাদীর কথা বুঝতে পারবেন না এবং সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে পারবে না, ফলে ফায়সালায় ভুল হয়ে যেতে পারে। ‘উলামায়ে কিরাম বলেছেন, রাগান্বিত অবস্থায় যেমন বিচার করা যাবে না ঠিক তেমনিভাবে প্রখর গরম, কনকনে শীত, প্রচণ্ড ক্ষুধা, পিপাসা ও অসুস্থতা নিয়েও বিচার করা যাবে না যদি এসব অবস্থায় বিচার করে তাহলে তা মাকরূহ অপছন্দনীয় হবে। আবার বিচার ভুল হওয়ার কারণে হারামও হবার আশংকা রয়েছে। (ফাতহুল বারী ১৩শ খন্ড, হাঃ ৭১৫৮; শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৭১৭; তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৩৩৪; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - প্রশাসনিক কর্মস্থলে কাজ করা এবং তা গ্রহণের দায়িত্বে ভয় করা
৩৭৩২-[২] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর ও আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তারা উভয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো বিচারক যদি বিচারকার্য পরিচালনায় সঠিক ফায়সালা প্রদান করেন, তবে তার জন্য দ্বিগুণ প্রতিদান রয়েছে। পক্ষান্তরে যথাসাধ্য চিন্তা-ভাবনা করার পরও যদি ফায়সালায় ত্রুটিপূর্ণ হয়, তারপর তার জন্য একটি প্রতিদান রয়েছে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْعَمَلِ فِى الْقَضَاءِ وَالْخَوْفِ مِنْهُ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو وَأَبِي هُرَيْرَةَ قَالَا: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا حَكَمَ الْحَاكِمُ فَاجْتَهَدَ فَأَصَابَ فَلَهُ أَجْرَانِ وَإِذَا حَكَمَ فَاجْتَهَدَ فَأَخْطَأَ فلهُ أجرٌ واحدٌ»
ব্যাখ্যা: (وَإِذَا حَكَمَ فَاجْتَهَدَ فَأَخْطَأَ فَلَه أَجْرٌ) বিচারক বিচারকার্যে খুব বিচার-বিশ্লেষণের পর যদি ভুল করে তাহলে তার জন্য একটি সাওয়াব রয়েছে।
ইমাম খত্ত্বাবী (রহঃ) বলেনঃ ভুল করার পরও তাকে সাওয়াব দেয়ার কারণ হলো তার ইজতিহাদ একটি ‘ইবাদাত, সে ‘ইবাদাতের সাওয়াব দেয়া হয়েছে, ভুলের জন্য সাওয়াব দেয়া হয়নি। এ বিধান সকলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না বরং যারা ইজতিহাদ তথা গবেষণার সকল শর্তপূরণ, মূলনীতি সম্পর্কে জ্ঞাত। একটি বিধানের সাথে আরেকটি বিধানের সমন্বয় ঘটানোর সম্পর্কে জ্ঞাত ইত্যাদি লোকেদের গবেষণার ভুল হলেও সাওয়াব প্রদান করা হবে। কিন্তু যে ইজতিহাদ গবেষণার যোগ্যতা রাখে না তারপরও বিচার করে, এমতাবস্থায় ভুল করলে তাকেও সাওয়াব দেয়া হবে বিষয়টি এমন নয়।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ বিচারক তিন শ্রেণীর, এক শ্রেণীর বিচারক জান্নাতে যাবে আর দু’ শ্রেণীই জাহান্নামে যাবে। আর ভুল করলেও সাওয়াব দেয়ার যে কথা বলা হয়েছে তা হলো শাখা মাস্আলার ক্ষেত্রে যেগুলোতে একাধিক সম্ভাবনা থাকে। মূল মাসআলাহ্ যেগুলো শারী‘আতের মূলভিত্তি এবং أُمَّهَاتِ الْأَحْكَامِ তথা মৌলিক বিধানসমূহ যা পরিষ্কার এবং একাধিক মতের সম্ভাবনা থেকে মুক্ত সেগুলোতে ভুল করলে সে ভুলের জন্য সাওয়াবের কোনো প্রশ্নই আসে না। এক্ষেত্রে তার বিচার বাতিল বলে গণ্য হবে।
ইমাম নববী (রহঃ) বলেনঃ ‘উলামায়ে কিরাম মতবিরোধ করেছেন যে, প্রত্যেক গবেষকই পৌঁছতে সক্ষম নাকি একজন যার গবেষণা আল্লাহর হুকুমের সাথে মিল আর অপরজনের গবেষণা আল্লাহর হুকুমের সাথে না মিলার কারণে তার ইজতিহাদ ভুল?
এ প্রশ্নের উত্তরে ইমাম শাফি‘ঈ ও তাঁর সহচরগণ বলেছেন, একটি বিষয় গবেষণার পর বিভিন্ন গবেষক বিভিন্ন মত প্রদান করলে সকলের মত সঠিক হয় না সঠিক হয় একজনের মত, কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজনকে مُصِيبًا তথা সঠিক আর অপরজনকে مُخْطِئًا তথা ভুলকারী বলেছেন।
আর যে সমস্ত ‘উলামায়ে কিরাম বলেছেনঃ দু’জনই সঠিক, তারা বলেছেন, যদি সঠিক এবং বেঠিক সবাই সঠিক না হয় তাহলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাওয়াবের ক্ষেত্রে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করতেন না। তবে এক্ষেত্রে ভুলকারী গবেষককে ইজতিহাদ বা গবেষণার যোগ্য হতে হবে। নচেৎ সে তো ইজতিহাদই করতে পারবে না। আর যদি সে ইজতিহাদ করতে না পারে তাহলে তার সাওয়াবের প্রশ্নই আসে না। সে তার বিচার করার কারণে পাপী হবে।
ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) বলেনঃ সে সমস্ত ক্ষেত্রে গবেষকের নিকট কুরআন, হাদীস, ইজমা থাকবে না, সেক্ষেত্রে তার হুকুম হলো ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে সালাতের সময় ক্বিবলাহ্ খুঁজে পাচ্ছে না। এমতাবস্থায় চেষ্টার পরও যদি সে সালাত আদায়ের পর দেখে, ভুল দিকে ফিরে সালাত হয়ে গেছে, সে যেমন ভুল করার পরও তার সালাত হয়ে যাবে তদ্রূপ ইজতিহাদের যোগ্যতা থাকার পরও ভুল করলে সে সাওয়াব পাবে।
(ফাতহুল বারী ১৩শ খন্ড, হাঃ ৭৩৫২; শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৭১৬; তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৩২৬; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - প্রশাসনিক কর্মস্থলে কাজ করা এবং তা গ্রহণের দায়িত্বে ভয় করা
৩৭৩৩-[৩] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তিকে জনগণের মাঝে কাযী (বিচারক) নিয়োগ দেয়া হলো, মূলত তাকে যেন চাকু ছাড়া যাবাহ করা হলো। (আহমাদ, তিরমিযী, আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ্)[1]
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مِنْ جُعِلَ قَاضِيًا بَيْنَ النَّاسِ فَقَدْ ذُبِحَ بِغَيْرِ سِكِّينٍ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ
ব্যাখ্যা: (قَاضِيًا بَيْنَ النَّاسِ فَقَدْ ذُبِحَ بِغَيْرِ سِكِّينٍ) অত্র হাদীসে বলা হয়েছে যাকে মানুষের বিচারক বানানো হলো তাকে যেন ছুরিবিহীন যাবাহ করা হলো।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেছেনঃ এর কয়েকটি দিক হতে পারে।
১) কাযী ‘ইয়ায বলেনঃ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ছুরিবিহীন হত্যা। যেমন : শ্বাসরুদ্ধ করে, পানিতে ডুবিয়ে, আগুনে জ্বালিয়ে ও খানা খাদ্য বন্ধের মাধ্যমে হত্যা করা, কেননা এভাবে হত্যা করা ছুরি দ্বারা হত্যার চেয়ে বেশী কষ্টকর।
২) যাবাহ সাধারণত ছুরি দ্বারাই হয় কিন্তু এখানে ছুরি ব্যতীত যাবাহের কথা এজন্য বলা হয়েছে যে, যাতে করে বুঝা যায় তার শাস্তি আরো বেশী মারাত্মক, যেমন : তার দীন নষ্ট হওয়া। এখানে শারীরিক শাস্তি উদ্দেশ্য নয়।
আল আশরাফ (রহঃ) গ্রন্থকার বলেন, তূরিবিশতী (রহঃ) বলেছেনঃ ছুরি দ্বারা ছুরিবিহীন যাবাহ এ দু’য়ের মাঝে ব্যাপক পার্থক্য বিরাজমান। কেননা ছুরি দ্বারা যাবাহের কষ্ট ক্ষণিকের আর ছুরি ছাড়া যাবাহের কষ্ট আমরণ, এমনকি পরকালেও এর জন্য অপমানিত হতে হবে।
৩) আল আশরাফ (রহঃ) গ্রন্থকার বলেনঃ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হতে পারে যে, যাকে মানুষের বিচারপতি বানানো হলো তার ওপর আবশ্যক হয়ে গেল সকল প্রকার খারাপ প্রবৃত্তি থেকে বিরত থাকা এটাই যেন তাকে ছুরিবিহীন যাবাহের মতো। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ তৃতীয় নং অর্থে বিচার ফায়সালার কাজ উৎসাহমূলক কাজ হলো অপরদিকে পূর্বে দু’আর্থে বিচার কাজের প্রতি আগ্রহ থাকাকে অনুৎসাহিত করা হয়েছে, কেননা সেখানে রয়েছে অনেক ক্ষতিকর দিক।
আল মুযহির বলেনঃ বিচার ব্যবস্থার দায়িত্ব একটি ভয়ানক দায়িত্ব, এর ভয়াবহতা খুব বেশী এবং তার অনিষ্টতা খুবই মারাত্মক। কেননা খুব কম বিচারপতিই আছেন যারা বাদী-বিবাদীর মাঝে ইনসাফ করতে পারেন। এর কারণ হলো আত্মার সমস্যা যে, সে যাকে ভালোবাসে বিচার তার পক্ষেই দিতে চায় অথবা যার বিপক্ষে রায় যাবে সে খুব প্রতাপশালী হওয়ায় বিচার তার বিপক্ষে না করে থাকেন। আবার মাঝে মধ্যে দেখা যায় ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে বিচার সুষ্ঠু হয় না, এটা এক দুরারোগ্য ব্যাধি।
(তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৩২৫; ‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৫৬৮; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - প্রশাসনিক কর্মস্থলে কাজ করা এবং তা গ্রহণের দায়িত্বে ভয় করা
৩৭৩৪-[৪] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি বিচারকের পদ কামনা করে এবং তা চেয়ে নেয়, সে পদ যেন তার নিজের দিকে (স্বীয় বোঝা) সোপর্দ করা হয়। আর যে ব্যক্তিকে উক্ত পদে বাধ্য-বাধকতাভাবে দেয়া হয়, আল্লাহ তা’আলা তার সাহায্যার্থে একজন মালাক (ফেরেশ্তা) অবতরণ করেন। তিনি তার কাজ-কর্মগুলো সুষ্ঠু-সুন্দরভাবে পরিচালনা করেন। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ্)[1]
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنِ ابْتَغَى الْقَضَاءَ وَسَأَلَ وُكِلَ إِلَى نَفْسِهِ وَمَنْ أُكْرِهَ عَلَيْهِ أَنْزَلَ اللَّهُ عَلَيْهِ مَلَكًا يُسَدِّدُهُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُد وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ অত্র হাদীসে ابْتَغٰى তথা চাওয়া এবং سَأَلَ তথা আবেদন করা, একই জাতীয় দু’টি শব্দ একত্রে আসার কারণ হলো সে নেতৃত্ব চায় প্রকাশ্যে জনসম্মুখে এটা বুঝাবার জন্য। কেননা নেতৃত্বের প্রতি মানুষের ওপর কর্তৃত্বের প্রতি অন্তর সর্বদা আশান্বিত থাকে। সুতরাং যারা এগুলো থেকে বিরত থাকলো তারা নিরাপদে থাকলো আর যারা তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করলো তারা ধ্বংস হলো। সুতরাং বাধ্যবাধকতা না থাকলে নেতৃত্বের সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়া ঠিক নয় আর যদি বাধ্য করা হয় তাহলে সেখানে অন্তরের প্রবৃত্তিকে দমানো হলো আর যখন প্রবৃত্তিকে দমানো সম্ভব হবে তখন সঠিকতায় পৌঁছানো সম্ভব হবে। যারা বলে থাকেন যাকে বিচারপতি বানানো হলো তার ওপর আবশ্যক হলো তার সব খারাপ চিন্তাধারা, কুপ্রবৃত্তি মন থেকে মুছে ফেলা এ কথা ঠিক না, তাদের প্রতিউত্তরে আমি বলবো না, কথা ঠিক কারণ ইমাম দারাকুত্বনী, বায়হাক্বী ও ত্ববারানী মারফূ‘ সূত্রে যে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন তা এ কথারই সমার্থক। সেখানে বলা হয়েছে, ‘‘যাকে মুসলিমদের বিচারপতি বানানো হলো সে যেন তার আচার-ব্যবহার, ইশারা ইঙ্গিতে, উঠা-বসা সবক্ষেত্রেই ইনসাফ বজায় রাখে।’’
ত্ববারানী ও বায়হাক্বী-এর অন্য বর্ণনা উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণনা এসেছে, ‘‘যাকে মুসলিমদের বিচারপতি বানিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে সে যেন বাদী-বিবাদীর কারো ওপরই তার কন্ঠস্বর উঁচু না করে। ইমাম আবূ দাঊদ, ইমাম তিরমিযী ও ইমাম ইবনু মাজাহ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৩৩৪; ‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৫৭৫; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - প্রশাসনিক কর্মস্থলে কাজ করা এবং তা গ্রহণের দায়িত্বে ভয় করা
৩৭৩৫-[৫] আবূ বুরায়দাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বিচারক তিন শ্রেণীর হয়। তন্মধ্যে এক প্রকারের (বিচারকদের) জন্য জান্নাত আর দু’ প্রকারের জন্য রয়েছে জাহান্নাম। সে বিচারক জান্নাতে যাবেন, যিনি হক চিনলেন এবং তদানুযায়ী ফায়সালা করেন। আর যে বিচারক হক উপলব্ধি করেও বিচার-ফায়সালার মধ্যে অন্যায়-অবিচার করে, সে বিচারক জাহান্নামী এবং যে বিচারক অজ্ঞতার সাথে বিচার-ফায়সালা করে, সেও জাহান্নামী। (আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ্)[1]
وَعَنْ بُرَيْدَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: الْقُضَاةُ ثَلَاثَةٌ: وَاحِدٌ فِي الْجَنَّةِ وَاثْنَانِ فِي النَّارِ فَأَمَّا الَّذِي فِي الْجَنَّةِ فَرَجُلٌ عَرَفَ الْحَقَّ فَقَضَى بِهِ وَرَجُلٌ عَرَفَ الْحَقَّ فَجَارَ فِي الْحُكْمِ فَهُوَ فِي النَّارِ وَرَجُلٌ قَضَى لِلنَّاسِ عَلَى جَهْلٍ فَهُوَ فِي النَّارِ . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ
ব্যাখ্যা: বিচারপতি তিন শ্রেণীর, একশ্রেণী জান্নাতী বাকী দু’শ্রেণী জাহান্নামী।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) এ হাদীসের ব্যাখ্যায় গুরুত্বপূর্ণ মতামত ব্যক্ত করেছেন, তিনি বলেছেনঃ হাদীসটির মধ্যে (فَأَمَّا الَّذِىْ فِى الْجَنَّةِ) এ অংশটিকে পূর্বের অংশের সাথে মিলানো বা সম্পৃক্ত করা হয়েছে এবং স্পষ্ট কোনো প্রকার বিশ্লেষণমূলক অধ্যায় ব্যবহার থেকে বিরত থাকা হয়েছে যাতে করে তাদের সম্পৃক্ততা আরো প্রগাঢ় হয়। আমরা এখানে স্পষ্ট শব্দটি এজন্য বলেছি যে, হাদীসের ইবারতে فَهُوَ فِى النَّارِ না হয়ে فَأَمَّا الَّذِي فِي النَّارِ হলে তখন এভাবে ব্যবহারটাই বেশী শ্রুতিমধুর, এরূপ ব্যবহারের একটি দৃষ্টান্ত আমরা কুরআন থেকে দিতে পারি।
আ-লি ‘ইমরান এর ৭ নং আয়াত فَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ زَيْغٌ فَيَتَّبِعُونَ مَا تَشَابَهَ مِنْهُ এখানে পরবর্তী وَالرَّاسِخُونَ فِي الْعِلْمِ অংশটি فَأَمَّا لرَّاسِخُونَ فِي الْعِلْمِ হওয়া প্রয়োজন ছিল তা কিন্তু হয়নি এটাই হলো ভাষার শৈথিলতা। হাদীসটি ইমাম আবূ দাঊদ ও ইমাম ইবনু মাজাহ বর্ণনা করেছেন।
আল জামি‘ আস্ সগীরে এসেছে,
الْقُضَاةُ ثَلَاثَةٌ اثْنَانِ فِي النَّارِ وَوَاحِدٌ فِي الْجَنَّةِ رَجُلٌ عَلِمَ الْحَقَّ فَقَضٰى بِه فَهُوَ فِي الْجَنَّةِ وَرَجُلٌ قَضٰى لِلنَّاسِ عَلٰى جَهْلٍ فَهُوَ فِي النَّارِ وَرَجُلٌ عَرَفَ الْحَقَّ فَجَارَ فِي الْحُكْمِ فَهُوَ فِي النَّارِ
অর্থাৎ বিচারক তিন শ্রেণীর, দু’শ্রেণী জাহান্নামী আর এক শ্রেণী জান্নাতী- যে সত্য জানলো সে অনুযায়ী ফায়সালা করলো সে জান্নাতী, যে না জেনে বিচার করলো সে জাহান্নামী আর যে জানলো কিন্তু বিচার কাজে জুলুম করলো সেও জাহান্নামী। (‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৫৭০; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - প্রশাসনিক কর্মস্থলে কাজ করা এবং তা গ্রহণের দায়িত্বে ভয় করা
৩৭৩৬-[৬] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি মুসলিমদের বিচারক হওয়ার মনোষ্কামনা করবে, এমনকি সে তা পেয়েও যাবে। এমতাবস্থায় তার ইনসাফ যদি জুলুম ও অন্যায়ের উপর প্রাধান্য লাভ করে, তাহলে তার জন্য জান্নাত সুনির্ধারিত। আর যার জুলুম ও অন্যায় তার ইনসাফের উপর প্রাধান্য লাভ করে, তবে তার জন্য জাহান্নাম। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ طَلَبَ قَضَاءَ الْمُسْلِمِينَ حَتَّى يَنَالَهُ ثُمَّ غَلَبَ عَدْلُهُ جَوْرَهُ فَلَهُ الْجَنَّةُ وَمَنْ غَلَبَ جَوْرُهُ عَدْلَهُ فَلَهُ النَّار» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: এ হাদীসে বলা হয়েছে, যারা নেতৃত্ব চাইবে এবং এক পর্যায়ে তা পেয়ে যাবে, অতঃপর তার ইনসাফ জুলুমের উপর বিজয় হবে তার জন্য রয়েছে জান্নাত আর যার জুলুম ইনসাফের উপর বিজয় হবে তার জন্য রয়েছে জাহান্নাম।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ হাদীসে উল্লেখিত حَتّٰى শব্দটি যদি আকাঙ্ক্ষার চূড়ান্ত পর্যায়ের অর্থের জন্য ব্যবহৃত হয় তাহলে এখান থেকে বুঝতে হবে যে, সে নেতৃত্ব চাওয়াতে খুবই আগ্রহী ছিল। অতঃপর এক পর্যায়ে সে নেতৃত্ব পায় এ শ্রেণীর বিচারকদের সাহায্যের জন্য কোনো মালাক (ফেরেশতা) অবতীর্ণ হয় না বরং তার নিজের দায়িত্বশীল তাকেই করা হয়, সুতরাং এমতাবস্থায় কিভাবে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবে পূর্বের হাদীসে বলা হয়েছে। যে ক্ষমতা চায় তার জন্য আশান্বিত থাকে তাকে তার দিকেই সোপর্দ করা হয়, আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন না। তাহলে এ দু’ হাদীসের মতপার্থক্যের সমাধান কিভাবে? সমাধান এভাবে সম্ভব যে, এখানে ক্ষমতাপ্রার্থী লোকের সংখ্যা দু’জন তার মধ্যে একজন যাকে আল্লাহ তার নিজস্ব শক্তির মাধ্যমে শক্তিশালী করেন যেমন সাহাবীগণ এবং তৎপরবর্তী তাবি‘ঈগণ যেহেতু তিনি তার প্রাপ্য চেয়েছেন আর অন্যজন এরূপ নন। তাকে তার নিজের ওপর সোপর্দ করা হবে, ফলে সে ইনসাফ করতে পারবে না, এটাই হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা তথা (وَمَنْ غَلَبَ جَوْرُه عَدْلَه فَلَهُ النَّار) এর অর্থ।
‘আল্লামা তূরিবিশতী বলেনঃ কোনো কোনো লোক এ হাদীসের অর্থ বিশ্লেষণ ছাড়াই এ কথা বলেন যে, হাদীসে বলা হয়েছে যার ইনসাফ জুলুমের উপর বিজয় হবে তার জন্য জান্নাত। সুতরাং যদি মাঝে মাঝে জুলুম করে তাহলে কোনো অসুবিধা নেই, কারণ ‘বিজয়’ শব্দটি ব্যবহৃত হয় তুলনামূলক সংখ্যাধিক্যের জন্য।
যদি এমন কথা বা এমন মতামত কেউ পেশ করে থাকেন তাহলে তা ভুল হবে। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেন, এর ব্যাখ্যা কয়েকভাবে হতে পারে। ১ম নম্বর ব্যাখ্যা তা যা বলেছেন তূরিবিশতী যে, এখানে বিজয় দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সে কখনোই জুলুম করবে না। আমি আরো একটু বাড়িয়ে বলতে পারি যে, যার জুলুমের পরিমাণ ইনসাফের তুলনায় বেশী হবে সেও তো জাহান্নামী, সুতরাং এখানে আর কোনো সমস্যা রইল না। (‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৫৭২; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - প্রশাসনিক কর্মস্থলে কাজ করা এবং তা গ্রহণের দায়িত্বে ভয় করা
৩৭৩৭-[৭] মু’আয ইবনু জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাকে (শাসক নিযুক্ত করে) ইয়ামানে পাঠালেন, তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার নিকট যদি কোনো মুকদ্দামা পেশ করা হয়, তখন তুমি কিভাবে বিচার-ফায়সালা পরিচালনা করবে? তিনি (মু’আয) বললেনঃ আমি আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী বিচার-ফায়সালা করব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুনরায় জিজ্ঞেস করলেনঃ আল্লাহর কিতাবের মধ্যে যদি (তার সুষ্ঠু সমাধান বুঝতে) না পাও, তখন কিভাবে করবে? তিনি (মু’আয) বলেনঃ তাহলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাত (হাদীস) অনুযায়ী সমাধান করব। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আবার জিজ্ঞেস করলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতের মাঝেও যদি (তার সুষ্ঠু সমাধান বুঝতে) না পাও, তখন কি করবে? এর জবাবে তিনি (মু’আয) বললেনঃ তখন আমি আমার ন্যায়-নিষ্ঠার সাথে ইজতিহাদ করব এবং সামান্য পরিমাণও ত্রুটি করব না। তিনি (মু’আয ) বলেন : আমার এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বুকে হাত মেরে বললেন, সমস্ত প্রশংসা একমাত্র সে আল্লাহর জন্য যিনি আল্লাহর রসূল-এর প্রতিনিধিরূপে সে কাজটি করার তাওফীক দিয়েছেন, যে সকল কাজে আল্লাহর রসূল সন্তুষ্ট আছেন। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ ও দারিমী)[1]
وَعَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمَّا بَعَثَهُ إِلَى الْيَمين قَالَ: «كَيْفَ تَقْضِي إِذَا عَرَضَ لَكَ قَضَاءٌ؟» قَالَ: أَقْضِي بِكِتَابِ اللَّهِ قَالَ: «فَإِنْ لَمْ تَجِدْ فِي كِتَابِ اللَّهِ؟» قَالَ: فَبِسُنَّةِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «فَإِنْ لَمْ تَجِدْ فِي سُنَّةِ رَسُولِ اللَّهِ؟» قَالَ: أَجْتَهِدُ رَأْيِي وَلَا آلُو قَالَ: فَضَرَبَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى صَدْرِهِ وَقَالَ: «الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي وَفَّقَ رَسُولَ رَسُولِ اللَّهِ لِمَا يَرْضَى بِهِ رَسُولُ اللَّهِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد والدارمي
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু‘আয বিন জাবাল -কে ইয়ামানে বিচারপতি হিসেবে পাঠানোর সময় প্রশ্ন করলেন, কি দ্বারা ফায়সালা করবে? মু‘আয বললেন, আল্লাহর কিতাব দ্বারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর কিতাবে স্পষ্ট না পেলে কি দ্বারা করবে? মু‘আয বললেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাত দ্বারা। নাবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাত যদি না পাও তাহলে কিভাবে? মু‘আয বললেন, ‘আমি ইজতিহাদ করবো’ এর অর্থ হলো আমি ঐ মাসআলার উত্তর অনুসন্ধান করবো। ইজতিহাদের মাধ্যমে এবং অনুরূপ মাসআলাহ্ অনুসন্ধান করবো যাতে শারী‘আতের পক্ষ থেকে স্পষ্ট দলীল বিদ্যমান এবং একটি মাসআলাকে আরেকটির সাথে তুলনা করবো।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ মু‘আয (রাঃ)-এর কথা (أَجْتَهِدُ رَائِىْ) এর মধ্যে দৃঢ়তা বিরাজমান। إجْتهاد (ইজতিহাদ) শব্দটির অর্থ হলো প্রচেষ্টা চালানো, আবার তাকে رَائِىْ এর দিক সম্পৃক্ত করার কারণে অর্থের মধ্যে আরো দৃঢ়তা এসেছে। ইমাম রাগিব আস্ ইস্পাহানী বলেনঃ الْجُهْدُ ‘‘আল জুহ্দ’’ শব্দের অর্থ হলো শক্তি সামর্থ্য আর ইজতিহাদ অর্থ কষ্ট করা, পরিশ্রম করা। ইমাম খত্ত্বাবী (রহঃ) বলেনঃ এখানে রায় বলতে নিজের মনগড়া কথা যার কুরআন-হাদীসের সাথে নূন্যতম সম্পর্ক নেই এমন নয় বরং কুরআন ও হাদীসের সাথে মিল রেখে গবেষণার মাধ্যমে বিচার করতে হবে এটা উদ্দেশ্য।
অত্র হাদীস থেকে বুঝা যায়, ক্বিয়াস তথা ইজতিহাদের মাধ্যেমে ফতোয়া প্রদান করা যায়। আল-মাযহাব বলেন, যদি এমন মাসাআলাহ্ আসে যার কুরআন ও হাদীসের সরাসরি কোনো দলীল পাওয়া যাচ্ছে না তাহলে অনুরূপ আরেকটি মাসআলাহ্ দেখতে হবে যার দলীল সরাসরি কুরআন-হাদীসে রয়েছে এবং একটির সাথে আরেকটির সমতা বিধান করে ফতোয়া দিতে হবে। একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার হতে পারে, যেমন : গমে সুদ হয়, এটা সরাসরি হাদীসে উল্লেখ আছে কিন্তু তরমুজে সুদ হয় এটা হাদীসে উল্লেখ নেই। তাই তরমুজে সুদ হয় কি না? এমন প্রশ্নের উত্তরে বলা হলো, হ্যাঁ, তরমুজেও সুদ হয় কারণ গম যেমন খাবার বস্তু, তেমনি তরমুজও খাওয়ার বস্তু তাই গমে সুদ হলে তরমুজেও সুদ হবে এটাই স্বাভাবিক। এমনটাই বলেছেন ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ)। (‘আওনূল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৫৮৯; তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৩২৭; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - প্রশাসনিক কর্মস্থলে কাজ করা এবং তা গ্রহণের দায়িত্বে ভয় করা
৩৭৩৮-[৮] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে শাসক নিযুক্ত করে যখন ইয়ামানে পাঠালেন, তখন আমি জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রসূল! আপনি আমাকে পাঠাচ্ছেন অথচ আমি একজন যুবক, আর বিচারকার্য বা শাসনভার পরিচালনায় আমি অনভিজ্ঞ। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আল্লাহ তা’আলা তোমার অন্তরকে শীঘ্রই সৎপথ দেখাবেন এবং তোমার জবানকেও হিফাযাত করবেন। যদি দু’ ব্যক্তি তাদের মুকদ্দামা নিয়ে তোমার নিকট উপস্থিত হয়, তখন অপর পক্ষের কথা না শুনা পর্যন্ত প্রথম ব্যক্তির পক্ষে কোনো ফায়সালা দিও না। কেননা প্রতিপক্ষের বর্ণনা থেকে মুকদ্দামার ফায়সালা দিতে তোমার সহজসাধ্য হবে। তিনি [’আলী (রাঃ)] বলেনঃ অতঃপর আমি আর কোনো মুকদ্দামায় দ্বিধাগ্রস্ত হইনি। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ্)[1]
গ্রন্থকার বলেনঃ ’’আকযিয়াহ্ ও শাহাদাত’’ (সাক্ষী ও ফায়সালা প্রদান) অধ্যায়ে আমরা উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত اِنَّمَا اَقْضِىْ بَيْنَكُمْ رَائِىْ হাদীসটি বর্ণনা করব ইনশা-আল্লা-হু তা’আলা।
عَن عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: بَعَثَنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى الْيَمَنِ قَاضِيًا فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ تُرْسِلُنِي وَأَنَا حَدِيثُ السِّنِّ وَلَا عِلْمَ لِي بِالْقَضَاءِ؟ فَقَالَ: «إِنَّ اللَّهَ سَيَهْدِي قَلْبَكَ وَيُثَبِّتُ لِسَانَكَ إِذَا تَقَاضَى إِلَيْكَ رَجُلَانِ فَلَا تَقْضِ لِلْأَوَّلِ حَتَّى تَسْمَعَ كَلَامَ الْآخَرِ فَإِنَّهُ أَحْرَى أَنْ يَتَبَيَّنَ لَكَ الْقَضَاءُ» . قَالَ: فَمَا شَكَكْتُ فِي قَضَاءٍ بَعْدُ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ
وَسَنَذْكُرُ حَدِيثَ أُمِّ سَلَمَةَ: «إِنَّمَا أَقْضِي بَيْنَكُمْ برأيي» فِي بَابِ «الْأَقْضِيَةِ وَالشَّهَادَاتِ» إِنْ شَاءَ اللَّهُ تَعَالَى
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসে বলা হয়েছে, ‘আলী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললেন, নাবীজী! আপনি আমাকে বিচারপতি হিসেবে পাঠাচ্ছেন অথচ আমি অল্পবয়সী এবং বিচার ফায়সালা সম্পর্কে আমার কোনো জ্ঞান নেই। এখানে ‘আলী -এর কথাগুলো একটু ব্যাখ্যা করতে হবে এভাবে যে, জ্ঞান নেই অর্থ পূর্ণ জ্ঞান নেই আর অল্পবয়সী অর্থ অনভিজ্ঞ। এ রকম ভাষা দেখতে পাওয়া যায় মূসা ও হারূন (আঃ)-এর ঘটনায় যেখানে আল্লাহ বললেন, ‘‘তোমরা ফির্‘আওনের নিকট যাও নিশ্চয় সে সীমালঙ্ঘন করেছে’’- (সূরা ত্ব-হা ২০ : ৪৩)। আল্লাহ তা‘আলার এ নির্দেশ শুনে তারা বললেন, হে আমাদের রব! নিশ্চয় আমরা ভয় করছি আমাদের প্রতি তারা জুলুম করবে অথবা সীমালঙ্ঘন করবে। আল্লাহ বললেন, তোমরা ভয় পেও না আমি তোমাদের সাথে আছি, শুনছি ও দেখছি।
অত্র হাদীসে ‘আলী -এর বিনয় প্রকাশমান যে, তিনি সব উঁচু নেতৃত্বের চেয়ে আল্লাহ এবং তার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহচর্যকে বেশী গুরুত্বারোপ করেছেন। এ বিনয়ের কারণেই সুলতান মাহমূদ যখন তার বিশেষ দূতকে তার সমস্ত মসনদ দিতে চেয়েছিলেন তখন বিশেষ দূত তা প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ লোকেদের সাহচর্যকে পছন্দ করলেন। আল মুযহির বলেন, এখানে ‘‘ইলম নেই’’ অর্থ হলো অনভিজ্ঞ, অর্থাৎ দু’জনের মধ্যে বাদানুবাদ হলে তা শান্ত করার পর্যাপ্ত জ্ঞান আমার নেই। (‘আওনূল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৫৭৯; তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৩৩১; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - প্রশাসনিক কর্মস্থলে কাজ করা এবং তা গ্রহণের দায়িত্বে ভয় করা
৩৭৩৯-[৯] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি শাসক হয়ে জনগণের মধ্যে রাষ্ট্রকার্য পরিচালনা করে, সে কিয়ামতের দিন এরূপ অবস্থায় উপস্থিত হবে যে, একজন মালাক (ফেরেশতা) তার গর্দান ধরে রাখবেন। অতঃপর মালাক তার মাথা আকাশের দিকে তুলবেন। অতএব আল্লাহ তা’আলা যখন নির্দেশ দেন তাকে নিক্ষেপ করো, তখন মালাক তাকে জাহান্নামের নিম্নদেশে ছুঁড়ে ফেলবেন। যার গভীরতা চল্লিশ বছরের পথ। (আহমাদ ও ইবনু মাজাহ্, আর বায়হাক্বী-এর ’’শু’আবুল ঈমান’’)[1]
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَا مِنْ حَاكِمٍ يَحْكُمُ بَيْنَ النَّاسِ إِلَّا جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَمَلَكٌ آخِذٌ بِقَفَاهُ ثُمَّ يَرْفَعُ رَأْسَهُ إِلَى السَّمَاءِ فَإِنْ قَالَ: أَلْقِهْ أَلْقَاهُ فِي مَهْوَاةٍ أَرْبَعِينَ خَرِيفًا . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَابْنُ مَاجَهْ والْبَيْهَقِيُّ فِي شُعَبِ الْإِيمَان
ব্যাখ্যা: خريف (أَرْبَعِينَ خَرِيفًا) শব্দের অর্থ বছর। নিহায়াহ্ গ্রন্থাকার বলেন, خريف (খরীফ) বলা হয় বছরের ঋতু সময়ের একটি ঋতুকে যা গ্রীষ্ম ও শীতকালের মাঝে হয়ে থাকে। তবে অত্র হাদীসে উদ্দেশ্য হলো বছর। কেননা এটা বছরে মাত্র একবারেই আসে। এমনটাই মতামত দিয়েছেন ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ)। ‘‘আল মুগরিব’’ গ্রন্থে রয়েছে, মাহওয়া বলা হয় গিরিপথকে। আবার কেউ বলেছেন মাহওয়া অর্থ গর্ত। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ হাদীসের শব্দ «مَلَكٌ آخِذٌ بِقَفَاهُ» দ্বারা বুঝা যায়, তাকে জোর করে তার মাথা আকাশমন্ডলীর দিকে দেয়া হবে। যেমন : আল্লাহ তা‘আলা বলেন, অর্থাৎ ‘‘আমি তাদের স্কন্ধে বেড়ি পরাবো থুতনি পর্যন্ত ফলে তারা চোখ বন্ধ করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে’’- (সূরা ইয়াসীন ৩৬ : ৮)। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - প্রশাসনিক কর্মস্থলে কাজ করা এবং তা গ্রহণের দায়িত্বে ভয় করা
৩৭৪০-[১০] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামত দিবসে ন্যায়পরায়ণ শাসক এমন অবস্থায় উপস্থিত হবে; তখন সে আকাঙ্ক্ষা করবে যে, একটি খেজুরের ব্যাপারেও যদি সে দুই ব্যক্তির মধ্যে পরস্পর বিবাদের ফায়সালা না করত (কতই না উত্তম হতো)। (আহমাদ)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَيَأْتِيَنَّ عَلَى الْقَاضِي الْعَدْلِ يومُ القيامةِ يَتَمَنَّى أَنَّهُ لَمْ يَقْضِ بَيْنَ اثْنَيْنِ فِي تَمْرَة قطّ» . رَوَاهُ أَحْمد
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসটিতে পূর্বের হাদীসগুলোর ন্যায় উচ্চারণ কার্যের প্রতি চরম হুশিয়ারী উচ্চারিত হয়েছে। হাদীসটির সারকথা হলো-
(ক) যতদূর সম্ভব বিচারকার্য তথা বিচারপতি হওয়ার দায়িত্ব থেকে বিরত থাকা উচিত।
(খ) বিচারকাজে ভুল-ভ্রান্তি হয়ে গেলে এর জন্য কিয়ামতে চরম লাঞ্ছনার স্বীকার হতে হবে।
(গ) মানুষের হক নষ্ট করা কখনোই সমর্থনযোগ্য নয়।
(ঘ) বিচারকার্যে ছোট থেকে ছোট কোনো বিষয়কেও তুচ্ছ করার সুযোগ নেই। (সম্পাদকীয়)
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - প্রশাসনিক কর্মস্থলে কাজ করা এবং তা গ্রহণের দায়িত্বে ভয় করা
৩৭৪১-[১১] ’আবদুল্লাহ ইবনু আবূ আওফা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শাসক যে পর্যন্ত না জুলুম ও অবিচার করে, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তা’আলা তার সাথে থাকেন। কিন্তু যখন সে জুলুম ও অবিচার করতে থাকে, তখন আল্লাহর সাহায্য তার ওপর থেকে সরে যায় এবং শায়ত্বন তার সহচর হয়। (তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ্)[1]
আর ইবনু মাজাহ্-এর অপর বর্ণনাতে আছে, যখন সে জুলুম ও অবিচার করে তখন আল্লাহ তা’আলা তাকে তার নাফসের প্রতি অর্পণ করেন।
وَعَنْ عَبْدُ اللَّهِ بْنِ أَبِي أَوْفَى قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ اللَّهَ مَعَ الْقَاضِي مَا لَمْ يَجُرْ فَإِذَا جَارَ تَخَلَّى عَنْهُ وَلَزِمَهُ الشَّيْطَانُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ وَفِي رِوَايَةٍ: «فَإِذَا جارَ وَكله إِلَى نَفسه»
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসে বিচার কাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বিচারক যদি ন্যায় বিচার করেন তাহলে তার ওপর আল্লাহর রহমাত বর্ষিত হয়। পক্ষান্তরে যদি জুলুম করেন তাহলে আল্লাহর সাহায্য বন্ধ হয়ে যায় এবং শায়ত্বন তার সাথী হয়ে যায়। ইবনু মাজাহ-এর অপর বর্ণনায় এসেছে, তাকে তার অভিভাবক বানিয়ে দেয়া হয় আল্লাহ তার দায়িত্ব নেয়া থেকে মুক্ত হয়ে যান। এ বিষয়ে ‘আব্দুল্লাহ বিন মাস্‘ঊদ থেকে মারফূ‘ সূত্রে বর্ণনা আছে সেখানে বলা হয়েছে, আল্লাহ বিচারকের সাথে থাকেন অর্থাৎ তাকে সাহায্য করেন যতক্ষণ পর্যন্ত সে ইচ্ছাকৃত জুলুম না করে। ইমাম ত্ববারানী হাদীসটি বর্ণনা করেন এবং মানাবী (রহঃ) বলেনঃ অত্র হাদীসের সানাদে জা‘ফার বিন সুলায়মান আল কাবী নামক রাবী য‘ঈফ হওয়ার কারণে হাদীসটি য‘ঈফ। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৩৩০; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - প্রশাসনিক কর্মস্থলে কাজ করা এবং তা গ্রহণের দায়িত্বে ভয় করা
৩৭৪২-[১২] সা’ঈদ ইবনু মুসাইয়্যাব (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন এক মুসলিম ও এক ইয়াহূদীর মধ্যে পরস্পর বিবাদ নিয়ে ’উমার (রাঃ)-এর নিকট আসলো। এমতাবস্থায় ’উমার (রাঃ) তা সত্যায়িত করে ইয়াহূদীর পক্ষে রায় দিয়ে দিলেন। তখন ইয়াহূদী ’উমার (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললঃ আল্লাহর কসম! আপনি হক বিচার করেছেন। অতঃপর ’উমার তাকে চাবুক দিয়ে আঘাত করে বললেনঃ তুমি কিভাবে জানলে (হক বিচার হয়েছে)? উত্তরে ইয়াহূদী বললঃ আল্লাহর কসম! আমরা তাওরাত কিতাবে পেয়েছি, যে শাসক ন্যায়বিচার করে তার ডানপাশে একজন মালাক (ফেরেশতা) থাকেন এবং বামপাশে একজন মালাক থাকেন। তারা তার কাজটিকে সহজসাধ্য করে দেন এবং ন্যায় ও সঠিক কাজ করার মধ্যে সাহায্য করেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি ন্যায়ের সাথে থাকেন। কিন্তু যখন তিনি ন্যায় ও হক পন্থা পরিহার করেন, তখন মালায়িকাহ্ (ফেরেশতারা) উপরে চলে যান এবং তার সঙ্গ পরিত্যাগ করেন। (মালিক)[1]
وَعَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيَّبِ: أَنَّ مُسْلِمًا وَيَهُودِيًّا اخْتَصَمَا إِلَى عُمَرَ فَرَأَى الْحَقَّ لِلْيَهُودِيِّ فَقَضَى لَهُ عُمَرُ بِهِ فَقَالَ لَهُ الْيَهُودِيُّ: وَاللَّهِ لَقَدْ قَضَيْتَ بِالْحَقِّ فَضَرَبَهُ عُمَرُ بِالدِّرَّةِ وَقَالَ: وَمَا يُدْريكَ؟ فَقَالَ الْيَهُودِيُّ: وَاللَّهِ إِنَّا نَجِدُ فِي التَّوْرَاةِ أَنَّهُ لَيْسَ قَاضٍ يَقْضِي بِالْحَقِّ إِلَّا كَانَ عَنْ يَمِينِهِ مَلَكٌ وَعَنْ شِمَالِهِ مَلَكٌ يُسَدِّدَانِهِ وَيُوَفِّقَانِهِ لِلْحَقِّ مَا دَامَ مَعَ الْحَقِّ فَإِذَا تركَ الحقَّ عرَجا وترَكاهُ. رَوَاهُ مَالك
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসটি বিশিষ্ট তাবি‘ঈ সা‘ঈদ বিন মুসাইয়্যাব (রহঃ) কর্তৃক বর্ণিত বিচার কাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার উজ্জ্বল নমুনা। যেখানে দ্বিতীয় খলীফা ‘উমার -এর ন্যায়নীতির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। ঘটনার বিবরণ হলো একজন মুসলিম ও একজন ইয়াহূদী বিচার নিয়ে ‘উমার -এর নিকট আসলেন। ‘উমার দেখলেন ইয়াহূদী সঠিকতার উপর আছে, তাই ইনসাফ করতঃ বিচার তার পক্ষে করলেন। ইয়াহূদী বলে উঠলো, আল্লাহর শপথ! ‘আপনি ন্যায় করেছেন’ এ কথা বললে ‘উমার তাকে প্রহার করলেন এবং বললেন, তুমি কিভাবে বুঝলে? তখন ইয়াহূদী বললো, আমরা তাওরাতে পেয়েছি যে, কোনো বিচারক যদি ন্যায়সঙ্গত বিচার করে তাহলে তার ডান ও বাম পাশে দু’জন মালাক থাকেন তারা তাকে সঠিকতায় পৌঁছানোর জন্য সহযোগিতা করেন। যতক্ষণ পর্যন্ত সে ন্যায়ের পথে থাকে যখন সে ন্যায় বিচার না করে তখন মালায়িকাহ্ তাকে বর্জন করেন।
এখানে প্রশ্ন হলো, ‘উমার ন্যায় করলে ইয়াহূদী ব্যক্তি তাকে সমর্থন করলেন এবং আপনি ন্যায় বিচার করেছেন। পরবর্তীতে ‘উমার ইয়াহূদীকে বেত্রাঘাত করার কারণ কি? এ প্রশ্নের উত্তরে ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ তাকে ব্যথাদায়ক হয় এমন আঘাত করেননি বরং সে প্রহারটি ছিল এরূপ যেমন আমরা কেউ আমাদের পক্ষে সমর্থন দিলে তাকে একটু মৃদু আঘাত করে থাকি এরূপ ছিল। অত্র হাদীসের ইয়াহূদী যেহেতু যিম্মী ছিলেন, তাই তাদের মাঝে ইসলামের হুকুম বাস্তবায়িত হয়েছে।
মাস্আলাহ্ : যদি আহলে কুফুরের তথা অমুসলিমদের মাঝে বিচার করতে হয় তাহলে তা কয়েক শ্রেণীর হতে পারে। বাদী-বিবাদী দু’জনই ইয়াহূদী অথবা দু’জনই নাসারা অথবা একজন ইয়াহূদী অপরজন নাসারা। সুতরাং যদি দু’জনেই ইয়াহূদী হয় তাহলে মুসলিমরা তাদের বিচার করবে না। আর যদি বিচার করতে হয় তাহলে তারা চাইলে করা যেতে পারে ন্যায়সঙ্গতভাবে। ইবনু ‘আবদুল হাকাম বলেন, বিচারক চাইলে বিচার করতে পারে। যদি বাদী-বিবাদী উভয়জন সন্তুষ্টচিত্তে কোনো মুসলিম বিচারকের নিকটে বিচার চায় তাহলে এক্ষেত্রে মুসলিম বিচারকের পথ দু’টি একটি বিচার না করা আর অপরটি হলো বিচার করলে তাদের মধ্যে ইসলাম অনুপাতে ন্যায়সঙ্গত বিচার করা- এ দু’টি বিষয়ে মুসলিম বিচারপতি স্বাধীন যেটি ইচ্ছা করতে পারেন।
মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘‘হে নাবী! বেধর্মীরা আপনার নিকট বিচার নিয়ে আসলে আপনি তাদের বিচার করুন অথবা ফিরিয়ে দেন আপনি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে তারা আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না আর তাদের মাঝে বিচার করলে ন্যায়সঙ্গত বিচার করুন, নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায় বিচারকারীকে পছন্দ করেন’’- (সূরা আল মায়িদাহ্ ৫ : ৪২)। (আল্ মুনতাকা ৭ম খন্ড, হাঃ ১৩৮০; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - প্রশাসনিক কর্মস্থলে কাজ করা এবং তা গ্রহণের দায়িত্বে ভয় করা
৩৭৪৩-[১৩] ইবনু মাওহাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’উসমান ইবনু ’আফফান (রাঃ) ইবনু ’উমার (রাঃ)-কে বললেনঃ আপনি মানুষের মাঝে ইনসাফ কায়িম (বিচারকের দায়িত্ব গ্রহণ) করুন। ইবনু ’উমার(রাঃ) বললেন, হে আমীরুল মু’মিনীন! আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন না? ’উসমান(রাঃ) বললেনঃ আপনি এই দায়িত্বকে অপছন্দ করছেন, অথচ আপনার পিতা তো (খলীফাহ্ নিযুক্ত হওয়ার পূর্বেও) বিচার-ফায়সালা করেছেন। ইবনু ’উমার (রাঃ) বললেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি বিচারক নিযুক্ত হয়ে ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচারকার্য পরিচালনা করে তার জন্য এটাই উত্তম যে, সে তা থেকে ন্যায্যভাবে অব্যাহতি লাভ করতে পারে। অতঃপর ’উসমান(রাঃ) ইবনু ’উমার (রাঃ)-কে এ সম্পর্কে আর কিছুই বলেননি। (তিরমিযী)[1]
وَعَنِ ابْنِ مَوْهَبٍ: أَنَّ عُثْمَانَ بْنِ عَفَّانَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ لِابْنِ عُمَرَ: اقْضِ بَين النَّاس قَالَ: أَو تعاقبني يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ؟ قَالَ: وَمَا تَكْرَهُ مِنْ ذَلِك وَقد كَانَ أَبوك قَاضِيا؟ قَالَ: لِأَنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَنْ كَانَ قَاضِيًا فَقَضَى بِالْعَدْلِ فَبِالْحَرِيِّ أَنْ يَنْقَلِبَ مِنْهُ كَفَافًا» . فَمَا راجعَه بعدَ ذَلِك. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসটিতে দেখা যাচ্ছে তৃতীয় খলীফা ‘উসমান বিন ‘আফ্ফান তার শাসনামলে দ্বিতীয় খলীফা ‘উমার ইবনুল খত্ত্বাব -এর পুত্র ‘আব্দুল্লাহ বিন ‘উমার (রাঃ)-কে বিচারকার্য গ্রহণের আহবান জানাচ্ছেন অথচ ইবনু ‘উমার (রাঃ) তা বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করছেন। পরক্ষনে ‘উসমান (রাঃ) তাকে বললেন, আপনি কেন বিচারের দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানান অথচ আপনার পিতা এ দায়িত্ব পালন করেছেন। এ প্রশ্নের উত্তরে ইবনু ‘উমার (রাঃ) বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যারা বিচারক হয় তারা যেন ন্যায়বিচার করে।
(فَبِالْحَرِىِّ أَنْ يَنْقَلِبَ مِنْهُ كَفَافًا) অংশটুকু ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ‘আল্লামা ত্বীবী (রহ) বলেছেনঃ
أَنَّ مَنْ تَرَكَ الْقَضَاءَ وَاجْتَهَدَ فِي تَحَرِّي الْحَقَّ وَاسْتَفْرَغَ جَهْدَه فِيهِ حَقِيقٌ أَنْ لَا يُثَابَ وَلَا يُعَاقَبَ، فَإِذَا كَانَ كَذٰلِكَ، فَأَيُّ فَائِدَةٍ فِي تَوَلِّيهِ.
অর্থাৎ- যারা বিচারপতি হলো, অতঃপর ন্যায়সঙ্গত বিচারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখলো তাদের এ কাজে কোনো সাওয়াবও নেই গুনাহও নেই। সুতরাং বিষয়টির অবস্থা যখন এরূপ যে, তা গ্রহণে সাওয়াব পাপ কেনটিই নেই। সুতরাং তা গ্রহণে কে রাজী হবে? (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - প্রশাসনিক কর্মস্থলে কাজ করা এবং তা গ্রহণের দায়িত্বে ভয় করা
৩৭৪৪-[১৪] আর রযীন-এর এক বর্ণনাতে নাফি’ (রহঃ) হতে বর্ণিত, ইবনু ’উমার (রাঃ) ’উসমান (রাঃ)-কে বললেনঃ হে আমীরুল মু’মিনীন! আমি পরস্পর দু’ ব্যক্তির মধ্যেও বিচার-ফায়সালা করব না। তখন ’উসমান(রাঃ) বললেনঃ আপনার পিতা তো বিচারকের দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করেছেন। তখন ইবনু ’উমার(রাঃ) বললেনঃ হ্যাঁ, তবে আমার পিতা যদি কোনো সমস্যায় পড়তেন, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট জিজ্ঞেস করে নিতেন। আর যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো বিষয়ে সমস্যা অনুভব করতেন, তখন জিবরীল (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করতেন। তাই এখন আমি এমন কাউকে পাব না যার স্মরণাপন্ন হব।
আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, সে মহান সত্তার আশ্রিত হলো। আর আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে আশ্রয় চায়, তোমরা তাকে আশ্রয় দাও। সুতরাং আমাকে বিচারক নিযুক্ত করা থেকে আমি আল্লাহর ওয়াস্তে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। অতঃপর ’উসমান ইবনু ’উমার (রাঃ)-কে অব্যাহতি দিয়ে বললেনঃ আপনি এ কথাগুলো কারো নিকট বহিঃপ্রকাশ করবেন না (কেননা, বিচারকের দায়িত্ব নিতে সবাই অনীহা প্রকাশ করবে)।[1]
وَفِي رِوَايَةِ رَزِينٍ عَنْ نَافِعٍ أَنَّ ابْنَ عُمَرَ قَالَ لِعُثْمَانَ: يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ لَا أَقْضِي بَيْنَ رَجُلَيْنِ: قَالَ: فَإِنَّ أَبَاكَ كَانَ يَقْضِي فَقَالَ: إِنَّ أَبِي لَوْ أُشْكِلَ عَلَيْهِ شَيْءٌ سَأَلَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَوْ أُشْكِلَ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شَيْءٌ سَأَلَ جِبْرِيلَ عَلَيْهِ السَّلَامُ وَإِنِّي لَا أَجِدُ مَنْ أَسْأَلُهُ وَسَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَنْ عَاذَ بِاللَّهِ فَقَدْ عَاذَ بِعَظِيمٍ» . وَسَمِعْتُهُ يَقُولُ: «مَنْ عَاذَ بِاللَّهِ فَأَعِيذُوهُ» . وَإِنِّي أَعُوذُ باللَّهِ أنْ تجعلَني قاضِياً فأعْفاهُ وَقَالَ: لَا تُخبرْ أحدا
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসের মূল বিষয়বস্তু হলো বিচারকাজ করতে বা বিচারক হওয়ার আশা না করা। ‘উসমান ইবনু ‘উমার -কে বিচারক হওয়ার আমন্ত্রণ জানালে তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং বিচারক হওয়া থেকে পরিত্রাণ চান। ‘উসমান তাকে পুনরায় বললেন, বিচারক হলে অসুবিধা কি আপনার আববা ‘উমার তো বিচারক ছিলেন? এর উত্তরে ইবনু ‘উমার বলেন, আমার পিতা কোনো বিষয়ে না বুঝলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করে জেনে নিতেন আর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম না বুঝলে জিবরীলের মারফতে আল্লাহর নিকট থেকে জেনে নিতেন। কিন্তু আমার বিষয়টিতো এমন নয়। এ কথা বলে তিনি বিচারকাজ গ্রহণ করা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন। হাদীসের বাহ্যিক অর্থ থেকে বুঝা যায়, ‘উমার রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবিত থাকাকালীনই বিচারক ছিলেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিচারকদের (সহকর্মীদের) বেতন ও হাদিয়া গ্রহণ করা
৩৭৪৫-[১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি স্বেচ্ছায় তোমাদেরকে কিছু প্রদান করি না এবং বঞ্চিতও করি না, আমি শুধু বণ্টনকারী। অতএব আমি যে স্থানে দেয়ার সেখানে প্রদান করি। (বুখারী)[1]
بَابُ رِزْقِ الْوُلَاةِ وَهَدَايَاهُمْ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا أُعْطِيكُمْ وَلَا أَمْنَعُكُمْ أَنَا قَاسِمٌ أَضَعُ حَيْثُ أُمِرْتُ» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসটি প্রশাসকদের বেতন-ভাতা প্রসঙ্গ অধ্যায়ে এসেছে। হাদীসে এ ব্যাপারে দু’ ধরনের শব্দ এসেছে, (ক) رزق রিযক তথা মাসিক বেতন, (খ) العطاء তথা বাৎসরিক বা এককালীন দান।
(مَا أُعْطِيْكُمْ وَلَا أَمْنَعُكُمْ) এর ব্যাখ্যায় ‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী হানাফী (রহ) বলেনঃ হাদীসের এ অংশ নাবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে দায়িত্বপ্রাপ্ত সকল সাহাবীদের লক্ষ্য করে বলেছেন, হে সাহাবীগণ! রাষ্ট্রের থেকে আমি তোমাদেরকে যে বেতন-ভাতা দিয়ে থাকি তা আল্লাহর নির্দেশক্রমেই দিয়ে থাকি। সুতরাং আল্লাহ যাকে যতটুকু দিতে বলেন তাকে ততটুকুই দিয়ে থাকি কমবেশী করি না। হাদীসের এ অংশ কুরআনে কারীমের ঐ আয়াতটিকে নির্দেশ করছে যেখানে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেনঃ অর্থাৎ- ‘‘মুনাফিকদের কেউ কেউ আপনাকে বেতন ভাতা বণ্টনের ক্ষেত্রে সমালোচনা করে।’’ (সূরা আত্ তাওবাহ্ ৯ : ৫৮)
এ ব্যাপারে সহীহুল বুখারীতে আরো পরিষ্কার এসেছে, অর্থাৎ তাদের অবস্থা এমন যে, যদি তাদেরকে বেশী দেয়া হতো তাহলে তারা বেজায় খুশী আর যদি কম দেয়া হয় তাহলে চরম অখুশী। কিন্তু তারা যদি এমন করতো যে, আল্লাহর নাবী যা দিবেন তাতেই খুশী যেমন মু’মিনরা করতো তাহলে এটা তাদের জন্য খুবই ভালো হতো। অন্য হাদীস এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ «اللّٰهُ يُعْطِي وَأَنَا أَقْسِمُ» অর্থ আমি শুধু বণ্টনকারী, দান মূলত আল্লাহই করেন। (মুসতাদরাক হাকিম ৬ষ্ঠ খন্ড, ৬৪ পৃঃ; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিচারকদের (সহকর্মীদের) বেতন ও হাদিয়া গ্রহণ করা
৩৭৪৬-[২] খাওলাতাল আনসারিয়্যাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিছু সংখ্যক মানুষ আল্লাহ তা’আলার (যাকাত, বায়তুল মাল বা গনীমাতের) সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করে থাকে। কিয়ামত দিবসে তাদের জন্য জাহান্নামের আগুন নির্ধারিত। (বুখারী)[1]
بَابُ رِزْقِ الْوُلَاةِ وَهَدَايَاهُمْ
وَعَن خَوْلةَ الْأَنْصَارِيَّةِ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ رِجَالًا يَتَخَوَّضُونَ فِي مَالِ اللَّهِ بِغَيْرِ حَقٍّ فَلَهُمُ النَّارُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসটি মাল-সম্পদ অপব্যবহার করার ক্ষেত্রে চরম সতর্কবাণী প্রদান করে। হাদীসটির রাবী মহিলা সাহাবী খাওলাহ্ তার পরিচিতি হলো সামির আল্ আনসারী-এর মেয়ে। কেউ কেউ বলেছেন তিনি খাওলাহ্ বিনতু আল্ কয়স তিনি বানী মালিক বিন আন্ নাজ্জার গ্রোত্রের আর সামির হলো কায়স-এর উপাধি। এ ব্যাপারে বিশুদ্ধ কথা হলো, এরা দু’জন ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি।
অত্র হাদীসে যাকাতের মাল ইমাম বা রাষ্ট্রপ্রধানের অনুমতি ব্যতীত কেউ গ্রহণ করলে তার প্রতি কাঠোর হুশিয়ারী উল্লেখ করতঃ বলা হয়েছে, তার জন্য জাহান্নাম প্রস্তুত রয়েছে। পবিত্র কুরআনেও এ সম্পর্কে বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘‘তাদের ছেড়ে দিন তারা এভাবে সম্পদের অপব্যবহার করুক, এরপর তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নাম’’- (সূরা আল আন্‘আম ৬ : ৯১)।
শিক্ষণীয় হলো, বায়তুল মাল তথা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে যাকাত, খারাজ, জিয্ইয়াহ্, গনীমাত ইত্যাদি কোনো মালই যা জনগণের সম্পদ হিসেবে বিবেচিত তা অন্যায়ভাবে ভোগ-দখল করা সম্পূর্ণ হারাম। এখানে অন্যায়ভাবে বলতে যেটুকু প্রাপ্য তার চেয়ে অধিক গ্রহণ করা। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩১১৮; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিচারকদের (সহকর্মীদের) বেতন ও হাদিয়া গ্রহণ করা
৩৭৪৭-[৩] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ বকর (রাঃ)-কে খলীফাহ্ নিযুক্ত করা হলে তিনি বললেনঃ আমার গোত্রের লোকেরা ভালোভাবে জানে যে, আমার ব্যবসা-বাণিজ্য আমার পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণের ব্যয়ভার বহনে অক্ষম ছিল না। কিন্তু এখন আমি মুসলিমদের কাজে নিযুক্ত হয়েছি। সুতরাং আবূ বকর (রাঃ)-এর পরিবার-পরিজন এখন থেকে এ মাল (বায়তুল মাল বা সরকারী কোষাগার) থেকে খরচ মিটাবে। আর সে মুসলিমদের জন্য কাজ করে যাবে। (বুখারী)[1]
بَابُ رِزْقِ الْوُلَاةِ وَهَدَايَاهُمْ
وَعَن عائشةَ قَالَتْ: لِمَّا اسْتُخْلِفَ أَبُو بَكْرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: لَقَدْ عَلِمَ قَوْمِي أَنَّ حِرْفَتِي لم تكنْ تعجِزُ عَن مَؤونةِ أَهْلِي وَشُغِلْتُ بِأَمْرِ الْمُسْلِمِينَ فَسَيَأْكُلُ آلُ أَبِي بَكْرٍ مِنْ هَذَا الْمَالِ وَيَحْتَرِفُ لِلْمُسْلِمِينَ فِيهِ. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসটিতে আবূ বাকর -এর খিলাফাত লাভের পর রাষ্ট্রের বায়তুল মাল তথা রাষ্ট্রীয় সম্পদের সাথে তার ব্যবহার কেমন ছিল তারই আলোচনা করা হয়েছে। বায়তুল মাল থেকে পরিবার-পরিজনের জন্য অর্থগ্রহণ তিনি অপছন্দ করতেন। ‘আমার গোত্র’ দ্বারা তিনি উদ্দেশ্য করেছেন কুরায়শকে অথবা সমগ্র মুসলিমকে।
কাযী ‘ইয়ায (রহঃ) বলেনঃ আলু আবূ বাকর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো তাঁর পরিবার-পরিজন। কেউ বলেছেন তিনি নিজেই। ‘আল্লামা তূরিবিশতী (রহঃ) বলেনঃ আবূ বাকর নিজের জন্য বায়তুল মাল থেকে সামান্য খাদ্য, গ্রীষ্মকালে একটি লুঙ্গি ও চাদর, শীতকালে একটি জুববা আর চলাচলের জন্য একটি বাহন গ্রহণ করেছিলেন।
আল মুযহির বলেনঃ অত্র হাদীস থেকে বুঝা যায়, রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদের জন্য বৈধ আছে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ন্যায়সঙ্গতভাবে তাদের ভরণ-পোষণ গ্রহণ করা, তবে এক্ষেত্রে যাতে বাড়াবাড়ি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরী।
অত্র হাদীসটির মূল মর্মবাণী হলো দায়িত্ব পেয়ে কেউ যেন জনগণের সম্পদ নিয়ে খেল-তামাশা না করে। অন্যায়ভাবে তাদের মাল-সম্পদ যেন লুটে না নেয়। (ফাতহুল বারী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২০৭০; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিচারকদের (সহকর্মীদের) বেতন ও হাদিয়া গ্রহণ করা
৩৭৪৮-[৪] বুরায়দাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো লোককে যদি আমরা কোনো কাজে নিযুক্ত করি এবং তাকে সে কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক দেই। অতঃপর যদি সে অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করে, তবে তা হলো খিয়ানাত। (আবূ দাঊদ)[1]
عَن بُرَيْدَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنِ اسْتَعْمَلْنَاهُ عَلَى عَمَلٍ فَرَزَقْنَاهُ رِزْقًا فَمَا أَخَذَ بَعْدَ ذَلِكَ فَهُوَ غُلُولٌ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: হাদীসটিতে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যাকে আমার কোনো দায়িত্ব দিলাম আর এজন্য তাকে পারিশ্রমিকও দিলাম। সুতরাং এর অতিরিক্ত কিছু যদি সে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে গ্রহণ করে তাহলে এটাই غُلُوْلٌ (গুলূল) বা হারাম। এর জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।
হাদীসটির বর্ণনাকারী সাহাবী বুরায়দাহ্ বিন হুসায়ব আল্ আসলামী (রাঃ) বদর যুদ্ধে অংশে নেননি, বায়যাতুর্ রিয্ওয়ানে অংশ নিয়েছেন। প্রথমে মদীনায় বসবাস করলেও পরে বাসরায় আসেন, পরবর্তীতে সেখান থেকে খুরাসানে আসেন। অতঃপর ইয়াযীদ বিন মু‘আবিয়াহ্-এর শাসনামলে ৬২ হিজরী সালে ‘‘মার্ও’’ শহরে মৃত্যুবরণ করেন। তার থেকে একদল সাহাবী, তাবি‘ঈ হাদীস বর্ণনা করেন। হাদীসটিতে উল্লেখিত غُلُوْلٌ শব্দের অর্থ হলো খিয়ানাত করা বিশ্বাসঘাতকতা করা। এক্ষেত্রে খিয়ানাত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো গনীমাত বা ফা‘ই এর মাল থেকে অন্যায়ভাবে গ্রহণ করা। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৯৪১; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিচারকদের (সহকর্মীদের) বেতন ও হাদিয়া গ্রহণ করা
৩৭৪৯-[৫] ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে (রাষ্ট্রীয়) কাজে নিযুক্ত হয়েছিলাম। আর আমাকে তার পারিশ্রমিক দেয়া হয়েছে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: عَمِلْتُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فعملني. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: দ্বিতীয় খলীফা ‘উমার ইবনুল খত্ত্বাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। এ হাদীসে তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময় রাষ্ট্রের বিভিন্ন দায়িত্ব তিনি আমাকে দিয়েছেন, আমাকে পারিশ্রমিকও দিয়েছেন। অত্র হাদীসটি থেকে বুঝা যায়, দায়িত্বপ্রাপ্ত হলে তার জন্য পারিশ্রমিক (ন্যায়সঙ্গতভাবে) গ্রহণ ইসলাম নিষেধ করেনি। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিচারকদের (সহকর্মীদের) বেতন ও হাদিয়া গ্রহণ করা
৩৭৫০-[৫] মু’আয (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে (গভর্নর নিয়োগ করে) ইয়ামানে পাঠালেন। যখন আমি রওয়ানা হলাম, তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমার পিছনে একজন লোক পাঠালেন। অতঃপর যখন আমি ফিরে আসলাম, তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে বললেনঃ তুমি কি জানো, কেন আমি তোমার কাছে লোক পাঠালাম? আমার অনুমতি ব্যতীত তুমি কোনো মাল গ্রহণ করবে না। কেননা এভাবে গ্রহণ করা খিয়ানাত বা আত্মসাৎ। আর যে ব্যক্তি খিয়ানাত করবে, কিয়ামতের দিন সে তা বহন করেই (হাশরের ময়দানে উত্থিত হবে) আসবে। আমি তোমাকে এ কথাগুলো বলার জন্যই ডেকে পাঠিয়েছি। এখন তুমি তোমার কাজে রওয়ানা হয়ে যাও। (তিরমিযী)[1]
وَعَن مُعَاذٍ قَالَ: بَعَثَنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى الْيَمَنِ فَلَمَّا سِرْتُ أَرْسَلَ فِي أَثَرِي فَرُدِدْتُ فَقَالَ: «أَتَدْرِي لِمَ بَعَثْتُ إِلَيْكَ؟ لَا تُصِيبَنَّ شَيْئًا بِغَيْرِ إِذْنِي فَإِنَّهُ غُلُولٌ وَمَنْ يَغْلُلْ يَأْتِ بِمَا غَلَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لهَذَا دعوتك فَامْضِ لعملك» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: মু‘আয (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত অত্র হাদীসটির মূল শিক্ষা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় কোনো দায়িত্ব পেয়ে সে ক্ষেত্রে খিয়ানাত করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ খিয়ানাত সেটা তো মস্তবড় পাপ, এর জন্য কিয়ামতের কঠিন ময়দানে নিদারুণ দুঃখ পেতে হবে।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘‘কোন নাবী খিয়ানাত করতে পারে না, যে ব্যক্তি খিয়ানাত করবে, সে খিয়ানাতকৃত বিষয়বস্তুসহ কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে, অতঃপর প্রত্যেককে যা সে অর্জন করেছে তা পুরোপুরি দেয়া হবে, কারও প্রতি কোন প্রকার জুলুম করা হবে না।’’ (সূরা আ-লি ‘ইমরান ৩ : ১৬১)
অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
لَا أُلْفِيَنَّ أَحَدَكُمْ يَجِيءُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلٰى رَقَبَتِه بَعِيرٌ لَه رُغَاءٌ
অর্থাৎ আমি যেন কিয়ামতের দিন তোমাদের কাউকে এমতাবস্থায় না পাই তার কাঁধে একটি উট থাকবে যেটি গরগর শব্দ করতে থাকবে। (বুখারী হাঃ ৩০৭৩; মুসলিম হাঃ ১৫৩১)
সুতরাং সর্বপ্রকার খিয়ানাত থেকে বিরত থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৩৩৫; মিরকাতুল মাফাতীহ
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিচারকদের (সহকর্মীদের) বেতন ও হাদিয়া গ্রহণ করা
৩৭৫১-[৭] মুসতাওরিদ ইবনু শাদ্দাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আমাদের শাসনকার্যে নিযুক্ত হবে, তার যদি স্ত্রী না থাকে তবে সে একজন স্ত্রীর ব্যবস্থা করতে পারে। আর যদি তার খাদিম না থাকে, তাহলে একজন খাদিম রাখতে পারে। আর যদি তার কোনো ঘর না থাকে, তাহলে একটি ঘরেরও ব্যবস্থা করতে পারে। অপর এক বর্ণনাতে আছে, সে যদি তা ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করে, তবে তা খিয়ানাত হবে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن المستَوْرِدِ بنِ شدَّادٍ قَالَ: سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَنْ كَانَ لَنَا عَامِلًا فَلْيَكْتَسِبْ زَوْجَةً فَإِنْ لَمْ يَكُنْ لَهُ خَادِمٌ فَلْيَكْتَسِبْ خَادِمًا فَإِنْ لَمْ يَكُنْ لَهُ مَسْكَنٌ فَلْيَكْتَسِبْ مَسْكَنًا» . وَفِي رِوَايَةٍ: «مَنِ اتَّخَذَ غَيْرَ ذَلِكَ فَهُوَ غالٌّ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: মুসতাওরিদ ইবনু শাদ্দাদ বলেনঃ আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, কেউ ইসলামী রাষ্ট্রের সচিব বা কর্মকর্তা নিযুক্ত হলে যদি স্ত্রীর ভরণ-পোষণ না করতে পারে তাহলে রাষ্ট্র থেকে নিতে পারবে। মুযহির বলেন, হাদীসে বর্ণিত ‘‘স্ত্রী না থাকলে স্ত্রী গ্রহণ করবে’’ এর অর্থ হলো যদি বিবাহ করার মোহর না থাকে তাহলে মোহর রাষ্ট্রের থেকে নিতে পারবে। অনুরূপভাবে ন্যায়সঙ্গতভাবে স্ত্রীর ভরণ-পোষণ নিতে পারবে তবে অন্যায়ভাবে বা অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করলে তা হারাম সাব্যস্ত হবে। অনুরূপভাবে যদি খাদিমের প্রয়োজন হয় তা নিতে পারবে যদি বাড়ী না থাকে বাড়ী নিতে পারবে। এসবগুলোই নিতে পারবে ন্যায়সঙ্গতভাবে অন্যায়ভাবে একটি পয়সাও নিতে পারবে না। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৯৪৩; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিচারকদের (সহকর্মীদের) বেতন ও হাদিয়া গ্রহণ করা
৩৭৫২-[৮] ’আদী ইবনু ’উমায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ হে মানব সকল! তোমাদের কাউকে যদি আমাদের কোনো কাজে নিযুক্ত করা হয়। অতঃপর সে যদি তা থেকে একটি সুঁই পরিমাণ অথবা তার চেয়ে অধিক কিছু লুক্কায়িত রাখে, তাহলে সে খিয়ানাতকারী বলে সাব্যস্ত হবে। কিয়ামতের দিনে সে তা বহন করে উত্থিত হবে। তখন জনৈক আনসারী দাঁড়িয়ে বলে উঠলেনঃ হে আল্লাহর রসূল! আপনি আমার ওপর যে কাজ অর্পণ করেছেন, তা অনুগ্রহপূর্বক প্রত্যাহার করে নিন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ কেন এটা বলছ? লোকটি বলল, আমি শুনেছি যে, আপনি এরূপ এরূপ (ভীতিকর) কথা বলেছেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ হ্যাঁ, আমি আবারও বলছি, যাকে আমরা কোনো কাজে নিযুক্ত করি, তখন সে যেন তার কম ও বেশি যাই হোক (সবকিছু) আমাদের কাছে বুঝিয়ে দেয়। অতঃপর তাকে যা কিছু দেয়া হবে, শুধু তাই গ্রহণ করবে। আর যা থেকে নিষেধ করা হবে, তা থেকে সর্বদা বিরত থাকে। (মুসলিম ও আবূ দাঊদ; তবে শব্দবিন্যাস আবূ দাঊদ-এর)[1]
وَعَن عَدِيِّ بنِ عَمِيرةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «يَا أَيُّهَا النَّاسُ مَنْ عُمِّلَ مِنْكُمْ لَنَا عَلَى عَمَلٍ فَكَتَمَنَا مِنْهُ مِخْيَطًا فَمَا فَوْقَهُ فَهُوَ غَالٌّ يَأْتِي بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» . فَقَامَ رَجُلٌ مِنَ الْأَنْصَارِ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ اقْبَلْ عَنِّي عَمَلَكَ. قَالَ: «وَمَا ذَاكَ؟» قَالَ: سَمِعْتُكَ تَقُولُ: كَذَا وَكَذَا قَالَ: «وَأَنَا أَقُولُ ذَلِكَ مَنِ اسْتَعْمَلْنَاهُ عَلَى عَمَلٍ فَلْيَأْتِ بِقَلِيلِهِ وَكَثِيرِهِ فَمَا أُوتِيَ مِنْهُ أَخَذَهُ وَمَا نُهِيَ عَنْهُ انْتَهَى» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ وَأَبُو دَاوُد وَاللَّفْظ لَهُ
ব্যাখ্যা: এ হাদীসটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পেয়ে তাতে খিয়ানাত সম্পর্কে কঠোর হুশিয়ারী স্বরূপ। হাফিয ইবনু হাজার আস্ক্বালানী (রহঃ) বলেছেনঃ ‘উমায়রাহ্ নামে আসমায়ে রিজালে কোনো রাবী নেই বরং ‘আমীরাহ্ আছে, তবে নাসায়ীতে ‘উমায়রাহ্ ও ‘আমিরাহ্ দু’টিই ব্যবহৃত হয়েছে। এমনটাই বর্ণনা এসেছে সহীহ মুসলিম-এর ব্যাখ্যায়। কেউ কেউ বলেন, তিনি হলেন আল্ কিনদী আল্ হাযরামী কূফায় বসবাস করতেন, অতঃপর সেখান থেকে জাযিরায় স্থানান্তরিত হন, সেখানে বসবাস করতে থাকেন, পরে সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন।
অত্র হাদীসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বললেন, আমরা যাকে দায়িত্ব দিলাম তারপর সে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের একটি সুতাও যদি গোপনে নিয়ে নেয় তাহলে এর জন্য সে কিয়ামতে খিয়ানাতকারীর কাতারে দাঁড়াবে। রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এহেন ভীতসন্ত্রস্ত বক্তব্য শুনে তিনি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিতে চাইলেন। এ থেকে বুঝা যায়, দায়িত্ব শুধু নিলেই হবে না তা যথাযথ পালন না করতে পারলে অব্যাহতি নেয়াই শ্রেয়। (শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৮৩৩; ‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৫৭৮; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিচারকদের (সহকর্মীদের) বেতন ও হাদিয়া গ্রহণ করা
৩৭৫৩-[৯] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুষ গ্রহণকারী ও ঘুষ প্রদানকারী উভয়ের ওপর অভিসম্পাত করেছেন। (আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ্)[1]
وَعَن عبد الله بن عَمْرو قَالَ: لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم الرَّاشِيَ وَالْمُرْتَشِيَ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসটিতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সরকারী দায়িত্ব পালনকারী ঐসব লোকেদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন যারা দায়িত্ব পালনে ঘুষ লেন-দেন করে থাকে। ঘুষ বলা হয় যার মাধ্যমে তদবীর করে কাঙ্খিত লক্ষ্য পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয় যদিও তা ভুল পন্থা। ‘রাশী’ হলো সে যে কাউকে কিছু দিল এ আশায় যে, সে তাকে অন্যায় কাজে সহযোগিতা করবে। অপরদিকে যে তা গ্রহণ করে তাকে হাদীসের পরিভাষায় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘মুরতাশী’ বলেছেন। আর ‘রাশী’ ও ‘মুরতাশী’র মধ্যে লেন-দেনের পরিমাণ কম-বেশী করতে ভূমিকা পালনকারীকে রায়শ বলে।
কারো ওপর থেকে জুলুম অপসারণের নিমিত্তে প্রদত্ত টাকা বা অর্থ ঘুষের অন্তর্ভুক্ত নয়, তাবি‘ঈদের একদল থেকে প্রমাণিত আছে, তারা বলেনঃ لَا بَأْسَ أَنْ يُصَانِعَ الرَّجُلُ عَنْ نَفْسِه وَمَالِه إِذَا خَافَ الظلم অর্থাৎ- যদি কেউ তার নিজের আত্মা ও অর্থের ব্যাপারে জুলুমের আশংকা করে তাহলে এ থেকে বাঁচার জন্য কোনো উপায় অবলম্বন করলে তাতে কোনো অসুবিধা নেই। ইবনুল আসীর (রহঃ) এ কথাই বলেছেন।
মিরকাতুল মাফাতীহ গ্রন্থকার বলেন, الرِّشْوَةُ مَا يُعْطٰى لِإِبْطَالِ حَقٍّ أَوْ لِإِحْقَاقِ بَاطِلٍ অর্থাৎ- সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য বানানোর উদ্দেশে অর্থনৈতিক লেন-দেনকে ঘুষ বলা হয়। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৩৩৬)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিচারকদের (সহকর্মীদের) বেতন ও হাদিয়া গ্রহণ করা
৩৭৫৪-[১০] আর তিরমিযী ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর ও আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।[1]
وَرَوَاهُ التِّرْمِذِيّ عَنهُ وَعَن أبي هُرَيْرَة
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিচারকদের (সহকর্মীদের) বেতন ও হাদিয়া গ্রহণ করা
৩৭৫৫-[১১] আর আহমাদ ও বায়হাক্বী শু’আবুল ঈমানে সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। এর মধ্যে অতিরিক্ত আছে, গ্রহণকারী ও প্রদানকারীর মাঝে সংযোগ স্থাপনকারীকেও তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অভিসম্পাত করেছেন।[1]
وَرَوَاهُ أَحْمَدُ وَالْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ» عَنِ ثَوْبَانَ وَزَادَ: «وَالرَّائِشَ» يَعْنِي الَّذِي يَمْشِي بَيْنَهُمَا
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিচারকদের (সহকর্মীদের) বেতন ও হাদিয়া গ্রহণ করা
৩৭৫৬-[১২] ’আমর ইবনুল ’আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট সংবাদ পাঠালেন যে, (সফরের উদ্দেশে) তুমি তোমার যুদ্ধাস্ত্র ও প্রয়োজনীয় বস্ত্রাদি নিয়ে আমার নিকট চলে আসো। তিনি বলেনঃ অতএব আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হলাম, তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উযূ করছিলেন। আমাকে দেখে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ হে ’আমর! আমি তোমাকে এজন্য ডেকে এনেছি যে, তোমাকে (গভর্নর বা শাসকরূপে) এক অঞ্চলে পাঠাব। আল্লাহ তা’আলা তোমাকে নিরাপত্তায় রাখুন এবং গনীমাতের ধন-সম্পদও দান করুন। আর আমিও তোমাকে কিছু মাল দিবো। তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম : হে আল্লাহর রসূল! ধন-সম্পদের লোভে আমার হিজরত ছিল না; বরং আমার হিজরত ছিল আল্লাহ ও তাঁর রসূল-এর সন্তুষ্টি কামনায়। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ সৎলোকের জন্য পবিত্র মাল কতই না উত্তম। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
আর আহমাদও অনুরূপ বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর অপর বর্ণনাতে আছে, সৎলোকের জন্য ভালো মালই উত্তম জিনিস।
وَعَن عَمْرِو بن العاصِ قَالَ: أَرْسَلَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَنِ اجْمَعْ عَلَيْكَ سِلَاحَكَ وَثِيَابَكَ ثُمَّ ائْتِنِي» قَالَ: فَأَتَيْتُهُ وَهُوَ يَتَوَضَّأُ فَقَالَ: «يَا عَمْرُو إِنِّي أَرْسَلْتُ إِلَيْكَ لِأَبْعَثَكَ فِي وُجْةٍ يُسَلِّمُكَ اللَّهُ وَيُغَنِّمُكَ وَأَزْعَبَ لَكَ زَعْبَةً مِنَ الْمَالِ» . فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا كَانَتْ هِجْرَتِي لِلْمَالِ وَمَا كَانَتْ إِلَّا لِلَّهِ ولرسولِه قَالَ: «نِعِمَّا بِالْمَالِ الصَّالِحِ لِلرَّجُلِ الصَّالِحِ» . رَوَاهُ فِي «شَرْحِ السُّنَّةِ» وَرَوَى أَحْمَدُ نَحْوَهُ وَفِي روايتِه: قَالَ: «نِعْمَ المالُ الصَّالحُ للرَّجُلِ الصالحِ»
ব্যাখ্যা: ‘আমর বিন ‘আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত এ হাদীসটি থেকে আমরা যা শিখতে পারি-
(ক) নেতার প্রতি আনুগত্য।
(খ) অযূরত অবস্থায় দীনী কথাবার্তা বলা জায়িয।
(গ) নেতা তার অধিনস্থদেরকে কল্যাণের প্রতি আহবান করবে।
(ঘ) ধন-সম্পদের ক্ষেত্রে বিশেষ নাসীহাত প্রয়োজন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - বিচারকদের (সহকর্মীদের) বেতন ও হাদিয়া গ্রহণ করা
৩৭৫৭-[১৩] আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোনো শাসক বা বিচারকের নিকট সুপারিশ করে, আর সে সুপারিশ স্বরূপ তার নিকট কোনো হাদিয়া (উপহার) পাঠায় এবং তিনি তা গ্রহণ করেন। তাহলে সে সুদের দরজাসমূহের মধ্য থেকে কোনো একটি বিরাট দরজায় প্রবেশ করল। (আবূ দাঊদ)[1]
عَنْ أَبِي أُمَامَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ شَفَعَ لِأَحَدٍ شَفَاعَةً فَأَهْدَى لَهُ هَدِيَّةً عَلَيْهَا فَقَبِلَهَا فَقَدْ أَتَى بَابًا عَظِيمًا مِنْ أَبْوَابِ الرِّبَا» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসের শিক্ষাঃ
(ক) সুপারিশ করা বৈধ, অনেক ক্ষেত্রে আবশ্যক।
(খ) সুপারিশ করার প্রেক্ষিতে সুপারিশকৃত ব্যক্তির কাছ থেকে কোনো প্রকার অর্থ লেন-দেন করা যাবে না।
(গ) সুপারিশ করার পর যদি কিছু হাদিয়া দেয়া হয় তাহলে তা বর্জন করাই শ্রেয়, যেহেতু সেখানে সুদের সংশ্লিষ্টতা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
এক্ষেত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক ‘আলী প্রদত্ত উপদেশ প্রণিধানযোগ্য। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, دَعْ مَا يُرِيبُكَ إِلٰى مَا لَا يُرِيبُك অর্থাৎ সন্দেহভাজন বিষয় থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে যাতে সন্দেহ নেই সেদিকে চল। তাই এখান থেকে বিরত থাকাই একান্ত কাম্য। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যদান
’আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ বিচারকের নিকট যে মুকদ্দামাহ্ পেশ করা হয় তাকে বিচার বলে। আযহারী (রহঃ) বলেনঃ কোনো বিষয়ে বিচারকার্য শেষ করাকে কাযাউ বা বিচারকার্য বলা হয়।
কুরআন কারীমে আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ ’’আমি বনী ইসরাঈলের নিকট ফায়সালা করেছিলাম’’- (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭ : ৪)। হাকিম-কে কাযী বলা হয় এ কারণে যে, তিনি আইন-কানুন মেনে বিচার ফায়সালা করে থাকেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
৩৭৫৮-[১] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ লোকেদের কোনো দাবির ভিত্তিতেই যদি তাদের পক্ষে রায় দেয়া হয়, তাহলে অনেকেই পরস্পরের মধ্যে লোকেদের জান ও মাল (মিথ্যা দাবি করে) আত্মহরণ করতে থাকবে। এজন্য বিবাদীর ওপর কসম অবধারিত। (মুসলিম)
তবে মুসলিম-এর শারহেন্ নববীতে আছে, তিনি বলেন, বায়হাক্বীর বর্ণনাতে হাসান অথবা সহীহ সানাদ দ্বারা আরো অতিরিক্ত শব্দ ইবনু ’আব্বাস থেকে মারফূ’ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। আর তা হলো- সাক্ষ্য-প্রমাণ বাদী পক্ষ দাখিল করবে আর বিবাদী বা প্রতিপক্ষের ওপর কসম অত্যাবশ্যকীয় হবে।[1]
بَابُ الْأَقْضِيَةِ وَالشَّهَادَاتِ
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَوْ يُعْطَى النَّاسُ بِدَعْوَاهُمْ لَادَّعَى نَاسٌ دِمَاءَ رِجَالٍ وَأَمْوَالَهُمْ وَلَكِنَّ الْيَمِينَ عَلَى الْمُدَّعَى عَلَيْهِ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ وَفِي «شَرْحِهِ لِلنَّوَوِيِّ» أَنَّهُ قَالَ: وَجَاءَ فِي رِوَايَةِ «الْبَيْهَقِيِّ» بِإِسْنَادٍ حَسَنٍ أَوْ صَحِيحٍ زِيَادَةٌ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ مَرْفُوعًا: «لَكِنَّ الْبَيِّنَةَ على المدَّعي واليمينَ على مَنْ أنكر»
ব্যাখ্যা: হাদীসটি বিচারকার্য সম্পাদনের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ গাইডলাইন। এতে বলা হয়েছে, বিচারকার্যকে কোনো মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর ছেড়ে দেয়া যাবে না, বরং বিচারকার্য সম্পাদনে বিচারকরা সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবেন।
হাদীস থেকে বুঝা যায়:
(ক) মনমত তথা মনে যা চায় সেরূপ বিচার করা বৈধ নয়।
(খ) বিচার হবে শারী‘আহ্নীতি অনুসরণের মাধ্যমে।
(গ) মানুষের রক্ত ও সম্পদ রক্ষা করা এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
(ঘ) যদি কেউ কোনো জিনিসের দাবী করে তাহলে তাকে অবশ্যই দলীল পেশ করতে হবে- আর যে অস্বীকার করবে তাকে শপথ করতে হবে।
অত্র হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী (রহঃ) বলেছেনঃ হাদীসটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম বলে দিচ্ছে বিচারকার্য সম্পাদনের ক্ষেত্রে। সুতরাং এ হাদীসে রয়েছে কোনো মানুষের শুধুমাত্র তার দাবীর প্রেক্ষিতেই তার স্বপক্ষে বিচার করা বৈধ হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত সে দলীল বা তার সঠিকতা প্রমাণ না করতে পারে। এর রহস্য বা কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই বলেছেন, যদি প্রমাণবিহীন ফায়সালা করা হয় তাহলে সবাই বিনা প্রমাণে অপর মানুষের রক্ত ও সম্পদ দাবী করে বসবে। (ফাতহুল বারী ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৫৫২; শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৭১১; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যদান
৩৭৫৯-[২] ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি মিথ্যা কসম করে কোনো মুসলিমের অর্থ-সম্পদ আত্মসাৎ করতে চায়, কিয়ামতের দিন সে এমন অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ লাভ করবে যে, আল্লাহ তা’আলা তার ওপর অত্যন্ত ক্রোধান্বিত থাকবেন। অতঃপর এ কথার প্রেক্ষিতে আল্লাহ তা’আলা এ আয়াত নাযিল করলেনঃ ’’যারা আল্লাহ তা’আলার সাথে কৃত অঙ্গীকার ও তাঁর নামে করা কসম তুচ্ছমূল্যে (পার্থিব হাসিলের বিনিময়) বিক্রি করে দেয়.....’’- (সূরা আ-লে ’ইমরান ৩ : ৭৭)। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْأَقْضِيَةِ وَالشَّهَادَاتِ
وَعَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ حَلَفَ عَلَى يَمِينِ صَبْرٍ وَهُوَ فِيهَا فَاجِرٌ يَقْتَطِعُ بِهَا مَالَ امْرِئٍ مُسْلِمٍ لَقِيَ اللَّهَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَهُوَ عَلَيْهِ غَضْبَانُ» فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَصْدِيقَ ذَلِكَ: (إِنَّ الَّذِينَ يشترونَ بعهدِ اللَّهِ وأيمانِهمْ ثمنا قَلِيلا)
إِلَى آخر الْآيَة
ব্যাখ্যা: ‘আব্দুল্লাহ বিন মাস্‘ঊদ কর্তৃক এ হাদীসটি বিচারকার্যে মিথ্যা কথা বলার মাধ্যমে অপরের হক ছিনিয়ে নেয়ার বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারীমূলক। ইমাম নববী (রহঃ) বলেনঃ হাদীসে উল্লেখিত (يَمِينِ صَبْرٍ) (ইয়ামীনি সব্র) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো স্থির বা দৃঢ়তার সাথে কৃত শপথ। এ শপথকে (مَصْبُورَ) তথা দৃঢ়করণ শপথও বলা হয়, অথবা এখানে শপথকারীকে ধৈর্যধারণকৃত বলা যেতে পারে যেহেতু এটা সে নিজের ওপর আবশ্যক করে নিয়েছে। (يَمِينِ صَبْرٍ) দ্বারা উদ্দেশ্য আরো পরিষ্কার করে এভাবে বলা যায় যে, আইনের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রকর্তৃপক্ষ কোনো ব্যক্তি আইনানুগভাবে সুষ্ঠু বিচারকার্যের স্বার্থে যদি শপথ করতে বলে।
কেউ কেউ বলেছেন, মুসলিমের মাল-সম্পদ হরণের ঘৃণ্য উদ্দেশ্য নিয়ে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা শপথের নামে (يَمِينِ صَبْرٍ) হাদীসটি উল্লেখিত فَاجِرٌ (ফাজির) শব্দের অর্থ হলো মিথ্যবাদী। হাদীসে উল্লেখিত মুসলিমের সস্পদ দ্বারা কেউ যিম্মীর সম্পদ উদ্দেশ্য করে তাহলে তা ভুল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেছেনঃ সাক্ষ্যদানকালে মিথ্যা বলা কঠিনতম পাপাচারের অন্তর্ভুক্ত। কেননা এ ধরনের অপরাধী অপরাধের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
ক) অন্যায়ভাবে অপরের সম্পদ হরণ।
খ) যে বিষয়টি সংরক্ষণের চরম গুরুত্ব দেয়া আবশ্যক ছিল তার প্রতি চরম অজ্ঞতা করা আর সেটি ইসলাম সংরক্ষণের দায়িত্ব ও আখিরাতকে গুরুত্ব প্রদান- এটি মানতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
গ) অন্যায় ও মিথ্যা শপথের প্রচলন ঘটালো।
এ ধরনের ব্যক্তির শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে, এমতাবস্থায় আল্লাহ তার ওপর রাগান্বিত থাকবেন। আল্লাহ তার প্রতি দয়ার দৃষ্টি দিবেন না। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেছেনঃ আল্লাহ তার থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন।
এ হাদীসের সত্যায়ন পাওয়া যায় মহাগ্রন্থ আল কুরআনের সূরা আ-লি ‘ইমরান-এর ৭৭ নং আয়াতের মাঝে যেখানে আল্লাহ তা‘আলা সুস্পষ্টভাবে বলেছেনঃ ‘‘নিশ্চয় যারা আল্লাহর সাথে কেউ কৃত ওয়া‘দাকে সুলভমূল্যে বিক্রয় করে দেবে তাদের আখিরাতে কোনো অংশ নেই আল্লাহ তাদের সাথে কথা বলবেন না কিয়ামতে তাদের দিকে রহমাতের দৃষ্টি দিবেন না তাদেরকে পবিত্রও করবেন না, তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি’’। (ফাতহুল বারী ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৫৫০; শারহে মুসলিম ২য় খন্ড, হাঃ ১৩৭; তুহফাতুল আহওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ৩০১২; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যদান
৩৭৬০-[৩] আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কসমের মাধ্যমে কোনো মুসলিমের হক আত্মসাৎ করলো, আল্লাহ তা’আলা তার জন্য জাহান্নাম অবধারিত করে দিয়েছেন এবং তার জন্য জান্নাত হারাম করেছেন। অতঃপর জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রসূল! যদি তা নগণ্য কিছু হয়? তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ যদিও তা পিলু গাছের একটি ডালও হয় (’পিলু’ গাছ মিসওয়াক হিসেবে ব্যবহৃত হয়)। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْأَقْضِيَةِ وَالشَّهَادَاتِ
وَعَنْ أَبِي أُمَامَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنِ اقْتَطَعَ حَقَّ امْرِئٍ مُسْلِمٍ بِيَمِينِهِ فَقَدْ أَوْجَبَ اللَّهُ لَهُ النَّارَ وَحَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ» فَقَالَ لَهُ رَجُلٌ: وَإِنْ كَانَ شَيْئا يسير يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: «وَإِنْ كَانَ قَضِيبًا من أَرَاك» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: অন্যায় শপথ করে মানুষের মাল সম্পদ জবর-দখল করার ভয়াবহতা বর্ণনাকারী অত্র হাদীসটির ব্যাখ্যাকার ‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী আল হানীফাহ্ (রহঃ) বলেনঃ অত্র হাদীস ‘‘সম্পদ নিয়ে নেয়’’ এর অর্থ হলো সম্পদের একটি বিরাট অংশ নিয়ে নেয়। ‘আল্লামা তূরিবিশতী-এর বরাত দিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘‘হক’’ ‘‘মাল’’ এর চেয়ে ব্যাপক অর্থ প্রদানকারী একটি শব্দ।
ইমাম নববী (রহঃ) বলেনঃ মৃত পশুর চামড়া নিয়ে নিলেও তা হারাম হবে যেহেতু তাও ‘‘হক’’ শব্দটি অন্তর্ভুক্ত করে। অনুরূপভাবে ঘোড়া চালানোর জিন এমনকি পশুর মাল যা দ্বারা উপকার লাভ সম্ভব এমন জিনিস মিথ্যা শপথ দ্বারা নিলে তাও হারাম হবে।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ আল্লাহ তার নিকট থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন এবং তাকে স্থায়ীভাবে জাহান্নামী করে দিবেন। কেউ বলেন, এর ব্যাখ্যা দু’ ধরনের হতে পারে। প্রথমতঃ যদি কেউ এ ধরনের মিথ্যা সাক্ষী দেয়াকে হালাল মনে করে, অতঃপর তার সাথে জড়িত হয় এবং এ অবস্থায় তার মৃত্যু হয় তাহলে সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে। দ্বিতীয়তঃ সে জাহান্নামী হবে তবে আল্লাহ তা‘আলা ইচ্ছা করলে তাকে ক্ষমা করে দিবেন। (শারহে মুসলিম ২য় খন্ড, হাঃ ১৩৭; আল মুনতাকা ৭ম খন্ড, হাঃ ১৩৯২; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যদান
৩৭৬১-[৪] উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি তো একজন মানুষ মাত্র। তোমরা বিভিন্ন বিবাদ-মীমাংসা নিয়ে আমার নিকট আসো। আর সম্ভবত তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ সাক্ষী-প্রমাণ উপস্থাপনের ক্ষেত্রে অন্যের চেয়ে বেশি সচেতন ও পারদর্শী। অতঃপর আমি তোমাদের বিষয়াদি শুনার সময় যা উপলব্ধি করি তদানুযায়ী বিচার-ফায়সালা করি। অতএব আমি কোনো ব্যক্তির জন্য তার মুসলিম ভাইয়ের হক থেকে কোনো কিছু (ভুলক্রমে) ফায়সালা দিয়ে দেই, তাহলে সে যেন তা গ্রহণ না করে। কেননা আমি তার জন্য একখন্ড আগুনের টুকরাই ফায়সালা করলাম। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْأَقْضِيَةِ وَالشَّهَادَاتِ
وَعَنْ أُمِّ سَلَمَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ وَإِنَّكُمْ تَخْتَصِمُونَ إِلَيَّ وَلَعَلَّ بَعْضَكُمْ أَنْ يَكُونَ أَلْحَنَ بِحُجَّتِهِ مِنْ بَعْضٍ فَأَقْضِي لَهُ عَلَى نَحْوِ مَا أَسْمَعُ مِنْهُ فَمَنْ قَضَيْتُ لَهُ بِشَيْءٍ مِنْ حَقِّ أَخِيهِ فَلَا يَأْخُذَنَّهُ فَإِنَّمَا أَقْطَعُ لَهُ قِطْعَةً مِنَ النَّار»
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীস থেকে বুঝা যায়-
(ক) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মতই মানুষ। মহান আল্লাহ সূরা কাহফ-এর ১১০ নং আয়াতে বলেন, অর্থাৎ ‘‘হে নাবী! আপনি বলে দিন আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ (পার্থক্য এটুকু যে,) আমার নিকট আল্লাহর নিকট থেকে ওয়াহী আসে তোমাদের আসে না।’’
খ) নাবী-রসূলগণও মা’সূম নন তবে তাদের ভুল হলে সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ সংশোধন করিয়ে দিতেন।
গ) কুরআন ও হাদীস থেকে তারাই হিদায়াত পায় যাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় আছে।
ঘ) বিচারকার্যে বাদী-বিবাদীর মধ্যে একে অপরের চেয়ে অপেক্ষাকৃত বেশী যুক্তি উপস্থাপনকারী, ভাষায় দক্ষ হতে পারে, মিথ্যা কথার ফুলঝুড়ি দিয়ে অপরের সম্পদ গ্রহণ কোনোভবেই বৈধ নয়।
ঙ) বিচারকের জন্য অবধারিত যে, তিনি বাদী-বিবাদী উভয়ের কথা শুনেই বিচার করবেন। একপক্ষের কথা শুনে বিচারের রায় প্রদান কোনভাবে গ্রহণীয় নয়।
এক্ষেত্রে একটি হাদীস খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত যেখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হাকিম যদি ন্যায়বিচারের চেষ্টা করে সফল হয় তাহলে তার দ্বিগুণ সাওয়াব আর যদি সফল না হয় তাহলে এক সাওয়াব, তাই সকল বিচারপতিদের উচিত ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হওয়া।
অত্র হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী (রহঃ) বলেছেনঃ অত্র হাদীস থেকে বুঝা যায়, মানুষের বাস্তবিক অবস্থা আরো বুঝা যায় সে গায়েব জানে না, তাই বাহ্যিক দলীলাদি দেখেই তাকে ফায়সালা দিতে হয়।
(ফাতহুল বারী ১২শ খন্ড, হাঃ ৬৯৬৭; শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৭১৩; তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৩৩৯; ‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৫৮০; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যদান
৩৭৬২-[৫] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলার নিকট সবচেয়ে নিকৃষ্ট লোক হলো অতিমাত্রায় ঝগড়াটে, অর্থাৎ বেশী বেশী সর্বদা ঝগড়া করে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْأَقْضِيَةِ وَالشَّهَادَاتِ
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ أَبْغَضَ الرِّجَالِ إِلَى اللَّهِ الْأَلَدُّ الخَصِمُ»
ব্যাখ্যা: أَلَدُّ الخَصِمُ ‘‘আলাদ্দুল খসিম’’ শব্দটির অর্থ চরম বিতার্কিক যার সাথে কেউ তর্ক করে পারে না। কুরআনে মাজীদে সূরা আল বাকারা-এর ২০৪ নং আয়াতে এসেছে, এ শ্রেণীর লোকের আলোচনা মহান আল্লাহ বলেন, অর্থাৎ ‘‘মানুষের মধ্যে এক শ্রেণীর মানুষ রয়েছে যার কথা খুবই চমৎকার এবং অন্তরের বিষয় সম্পর্কে আল্লাহকে সাক্ষী মানে আর সে হচ্ছে সবচেয়ে বড় বিতার্কিক।’’
অত্র হাদীসটির সমর্থনে তাম্মাম মু‘আয বিন জাবাল থেকে আরো একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন যেখানে বলা হয়েছে,
أَبْغَضُ الْخَلْقِ إِلَى اللّٰهِ مَنْ آمَنَ، ثُمَّ كَفَرَ অর্থাৎ সর্বনিকৃষ্ট সৃষ্টি আল্লাহর নিকটে সে যে ঈমান আনয়ন করলো, তারপর কাফির হয়ে গেল।
অত্র হাদীসটিতে মুখের জোর খাটিয়ে অন্যের হক মারাকে কুফরী হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে।
‘উকায়লী ও দায়লামী ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন,
أَبْغَضُ الْعِبَادِ إِلَى اللّٰهِ مَنْ كَانَ ثَوْبَاهُ خَيْرًا مِنْ عَمَلِه أَنْ تَكُونَ ثِيَابُه ثِيَابَ الْأَنْبِيَاءِ وَعَمَلُه عَمَلَ الْجَبَّارِينَ
অর্থাৎ আল্লাহর নিকট সর্বাধিক নিকৃষ্ট বান্দা সে যার বাহির ভিতরের চেয়ে ভালো, তার কাপড় নাবীদের আর ‘আমল যালিমদের।
অত্র হাদীস থেকে বুঝা যায়, অন্যায়ভাবে মুখের জোর খাটিয়ে মানুষের হক মেরে খেলে কিয়ামতে কঠিন পরিস্থিতির স্বীকার হতে হবে। আল্লাহ সবাইকে হিফাযাত করুন। আমীন। (ফাতহুল বারী ৫ম খন্ড, হাঃ ২৪৫৭; শারহে মুসলিম ১৬শ খন্ড, হাঃ ২৬৬৮; তুহফাতুল আহওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৯৭৬; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যদান
৩৭৬৩-[৬] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি কসম ও এক সাক্ষীর মাধ্যমে বিচার-ফায়সালা করেছেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْأَقْضِيَةِ وَالشَّهَادَاتِ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسلم قضى بِيَمِين وَشَاهد. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসে বিচারকার্যে সাক্ষী প্রয়োজন দু’জন যদি একজন না পাওয়া যায়, তাহলে শপথ দ্বারা এক সাক্ষীর ঘাটতি পূরণ করতে হবে। এটা বুঝা যায় যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন।
আল্ মুযহির বলেনঃ অত্র হাদীসে বাদীর সাক্ষী ছিল একজন তাই তাকে নাবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শপথ করতে বললেন যাতে তার এক সাক্ষীর ঘাটতি পূর্ণ হয়। এ শপথটি তার একজন সাক্ষীর পরিবর্তে। সুতরাং যখন সে শপথ করল তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পক্ষে রায় দিলেন। এ মতই পোষণ করেছেন ইমাম শাফি‘ঈ, মালিক এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ)। অপরদিকে ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) বলেছেন, একজন সাক্ষী আর একটি শপথের মাধ্যমে ফায়সালা বৈধ নয় বরং দু’জন সাক্ষী আবশ্যক। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘‘তোমরা দু’জন সাক্ষী সন্ধান কর যদি না পাও তাহলে একজন পুরুষ ও দু’জন নারী’’- (সূরা আল বাকারা ২ : ২৮৬)। (শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৭১২; ‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৬০৭; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যদান
৩৭৬৪-[৭] ’আলকমাহ্ ইবনু ওয়ায়িল (রহঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একদিন হাযরামাওত এবং কিনদাহ্ গোষ্ঠীর জনৈক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হলো। অতঃপর হাযরামী গোষ্ঠীর লোকটি বললঃ হে আল্লাহর রসূল! এই ব্যক্তি আমার জমি জোর-জবরদস্তিভাবে দখল করে নিয়েছে। তখন কিনদী গোষ্ঠীর লোকটি বলল, উক্ত জমির মালিক আমি এবং তা আমারই তত্ত্বাবধানে আছে। তাতে ঐ লোকটির কোনো অধিকার নেই। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হায্রামীকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি কোনো দলীল-প্রমাণ আছে? সে বলল, না। তাহলে বিবাদীর (প্রতিপক্ষের) কসমই তোমার প্রাপ্য।
হাযরামী লোকটি বললঃ হে আল্লাহর রসূল! সে অসৎলোক। কিসের উপর কসম করছে, সে তার কোনো পরোয়া করে না, তার মধ্যে কোনো আল্লাহভীতি নেই। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তার ব্যাপারে তোমার জন্য তাছাড়া আর কোনো পথও খোলা নেই। অতঃপর সে কিনদী লোকটি যখন কসম করতে চাইল, তখন সে পিঠ ফিরে গেল। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যদি এ লোকটি প্রকৃতপক্ষে জোরপূর্বকভাবে অপরের সম্পত্তি ভোগ করার জন্য কসম করে, তাহলে সে আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করবে যে, আল্লাহ তা’আলা এ লোকটির প্রতি অসন্তুষ্ট থাকবেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْأَقْضِيَةِ وَالشَّهَادَاتِ
وَعَنْ عَلْقَمَةَ بْنِ وَائِلٍ عَنْ أَبِيهِ قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ مِنْ حَضْرَمَوْتَ وَرَجُلٌ مِنْ كِنْدَةَ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ الْحَضْرَمِيُّ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ هَذَا غَلَبَنِي عَلَى أَرْضٍ لِي فَقَالَ الْكِنْدِيُّ: هِيَ أَرْضِي وَفِي يَدِي لَيْسَ لَهُ فِيهَا حَقٌّ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِلْحَضْرَمِيِّ: «أَلَكَ بَيِّنَةٌ؟» قَالَ: لَا قَالَ: «فَلَكَ يَمِينُهُ» قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ الرَّجُلَ فَاجِرٌ لَا يُبَالِي عَلَى مَا حَلَفَ عَلَيْهِ وَلَيْسَ يَتَوَرَّعُ منْ شيءٍ قَالَ: «ليسَ لكَ مِنْهُ إِلَّا ذَلِكَ» . فَانْطَلَقَ لِيَحْلِفَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمَّا أَدْبَرَ: «لَئِنْ حَلَفَ عَلَى مَالِهِ لِيَأْكُلَهُ ظُلْمًا لَيَلْقَيَنَّ اللَّهَ وَهُوَ عَنهُ معرض» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: হাদীসের ব্যাখ্যায় ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ অত্র হাদীসে বলা হয়েছে, যারা অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখবে তাদের দিকে কিয়ামতের দিন তাকাবেন না, এর উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ তাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন যেমন অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘‘আল্লাহ তাদের সাথে কথা বলবেন না এবং তাদের দিকে রহমাতের দৃষ্টি দিবেন না।’’ (সূরা আ-লি ‘ইমরান ৩ : ৭৭) [না‘ঊযুবিল্লাহ]
হাদীসের উল্লেখযোগ্য শিক্ষা:
১) যার হাতে সম্পদ আছে তার শক্তি বেশী।
২) বিবাদীকে অবশ্যই শপথ করতে হবে।
৩) যদি বাদী তার স্বপক্ষে দলীল উপস্থাপনে সক্ষম হয় তাহলে মাল বিবাদীর হাতে থাকলেও তা বাদীর হয়ে যাবে।
৪) মিথ্যা শপথ আর সত্য শপথের বিচার কার্যে কোনো পার্থক্য থাকে না কারণ মিথ্যা বলছে কি না এটাতো বিচারক মিথ্যাবাদীর বুক ফেড়ে দেখতে পারবেন না। তাই অদৃশ্যেও বিষয় নয় বরং বাহ্যিক না বুঝা যায় তার উপর ভিত্তি করেই বিচারপতি তার রায় প্রদান করবেন। (শারহে মুসলিম ২য় খন্ড, হাঃ ৬১; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যদান
৩৭৬৫-[৮] আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো ব্যক্তি যদি এমন জিনিসের দাবী করে, যে জিনিসের প্রকৃত (মালিক) সে নয়, সে আমার দলভুক্ত নয়। সে যেন তার বাসস্থান জাহান্নামে নির্দিষ্ট করে নেয়। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْأَقْضِيَةِ وَالشَّهَادَاتِ
وَعَنْ أَبِي ذَرٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَنِ ادَّعَى مَا لَيْسَ لَهُ فَلَيْسَ مِنَّا وَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসটিতে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি এমন কিছু দাবী করবে যা তার নয় তাহলে সে আমাদের দলভুক্ত নয় এবং সে তার স্থান জাহান্নামে করে নিল।
অত্র হাদীসের অংশ (فَلَيْسَ مِنَّا)-এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, (فَلَيْسَ مِنَّا) مَعْشَرِ أَهْلِ الْجَنَّةِ অর্থাৎ- সে জান্নাতীদের দলভুক্ত নয়। পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে, ‘‘সে যেন তার থাকার স্থান জাহান্নামে করে নেয়’’ এ অংশটুকু বাহ্যিকভাবে নির্দেশবাচক হলেও বস্তুত তা বিবৃতিমূলক, অর্থাৎ যে এমন করবে তার থাকার জায়গা জাহান্নাম। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যদান
৩৭৬৬-[৯] যায়দ ইবনু খালিদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি কি তোমাদেরকে বলে দিবো না, সর্বোত্তম সাক্ষ্যদানকারী কারা? সে ব্যক্তিই উত্তম সাক্ষ্যদানকারী, যাকে চাওয়ার আগে স্বীয় সাক্ষী প্রদান করে। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْأَقْضِيَةِ وَالشَّهَادَاتِ
وَعَنْ زَيْدِ بْنِ خَالِدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِخَيْرِ الشُّهَدَاءِ؟ الَّذِي يَأْتِي بشهادتِه قبلَ أنْ يسْأَلهَا» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসে সত্য সাক্ষী প্রদানের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। ইমাম নববী (রহঃ) বলেনঃ অত্র হাদীসের দু’টি ব্যাখ্যা হতে পারে, এর মধ্যে সর্বাধিক সহীহ মত হচ্ছে ইমাম মালিক ও ইমাম শাফি‘ঈ-এর ছাত্ররা যে মত পোষণ করেছেন আর সেটি হচ্ছে কোথাও কোনো বিচার কাজ হচ্ছে দেখা যাচ্ছে বাদী-বিবাদীর কেউ সত্য সাক্ষীর অভাবে পরাজিত হচ্ছে আর মাজলিসে এমন একজন লোক রয়েছে যে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে অভিহিত, এমতাবস্থায় তার নিকট সাক্ষী না চাওয়া হলেও সে যদি এটাকে আমানত মনে করে সাক্ষী দেয় তাহলে সে সর্বোত্তম সাক্ষী হবে। এ হাদীসের দ্বিতীয় আরেকটি ব্যাখ্যা হলো, মানুষের হাকের বিষয়ের সাক্ষী যেমন ত্বলাকের সাক্ষী, স্বাধীন করানোর সাক্ষী, জমি-জমা ওয়াক্ফ করার সাক্ষী, সাধারণ ওয়াসিয়্যাতের সাক্ষী, হাদ্দসমূহের সাক্ষী ইত্যাদি। যেমন- পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেনঃ অর্থাৎ ‘‘তোমরা আল্লাহর জন্য সাক্ষী কায়িম কর।’’ (সূরা আত্ব তালাক ৬৫ : ২)
অত্র হাদীসটি পরবর্তী হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক নয় যেখানে বলা হয়েছে, সাক্ষী না চাইলেও সাক্ষী দিবে। কারণ অত্র হাদীসটি হলো সত্য সাক্ষ্য প্রদানের আর পরের হাদীসটি হলো মিথ্যা সাক্ষী প্রদানের।
(শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৭১৯; ‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৫৯৩; তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২২৯৫; আল মুনতাকা ৭ম খন্ড, হাঃ ১৩৮১; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যদান
৩৭৬৭-[১০] ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার যুগের মানুষ সর্বোত্তম। তারপর তাদের পরবর্তী যুগের লোকেরা এবং এরপর তাদের পরবর্তী যুগের লোকেরা। অতঃপর এমন সব লোকের আগমন ঘটবে যাদের প্রত্যেকের সাক্ষ্য কসমের অগ্রগণ্য হবে এবং কসম সাক্ষ্য হতে অগ্রগণ্য হবে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْأَقْضِيَةِ وَالشَّهَادَاتِ
وَعَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِي ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ثُمَّ يَجِيءُ قَوْمٌ تَسبِقُ شَهَادَة أحدِهمْ يَمِينه وَيَمِينه شَهَادَته»
ব্যাখ্যা: এ হাদীসটিতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের মধ্যে একটি নির্দেশনা দিয়ে দিলেন যে, মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম মানুষ হলেন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগের মানুষ অর্থাৎ সাহাবীগণ, অতঃপর উত্তম মানুষ হলেন তৎপরবর্তী লোকেরা অর্থাৎ তাবি‘ঈগণ, এরপর উত্তম মানুষ হলেন তাবি-তাবি‘ঈগণ। অত্র হাদীটিতে বলা হয়েছে, সর্বোত্তম যুগ, আমার যুগ এখানে ‘যুগ’ দ্বারা উদ্দেশ্য কি? তা নিয়ে বিজ্ঞজনের মাঝে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন ৩০ বছর, কেউ বলেছেন ৪০ বছর, কেউ বলেছেন ৬০ বছর, কেউ বলেছেন ৭০ বছর, কেউ বলেছেন ৮০ বছর, কেউ বলেছেন ১০০ বছর এর কথা ব্যক্ত করেছে।
অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার একটি বাচ্চার মাথায় হাত দিয়ে বলেছিলেন, তুমি একযুগ বেঁচে থাক, পরবর্তীতে দেখা গেল বাচ্চাটি ১০০ বছর জীবিত ছিল। এখান থেকে দলীল নিয়ে কেউ কেউ একযুগ সমান সমান ১০০ বছর এর উল্লেখ করেছন।
হাদীসটিতে একশ্রেণীর মানুষের কথা উল্লেখ করা হয়েছে যারা সাক্ষী না চাওয়া হলেও তারা সাক্ষী দিবে এর অর্থ হলো তারা মিথ্যা সাক্ষী দিবে। এমনটিই ব্যাখ্যা করেছেন কাযী ‘ইয়াযসহ অন্যান্য ‘উলামায়ে কিরাম। (শারহে মুসলিম ১৬শ খন্ড, হাঃ ২৫৩৩; তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৩০৩; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যদান
৩৭৬৮-[১১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। (একদিন) নিশ্চয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক গোত্রের ওপর কসম করার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর তারা সকলেই (কসমের জন্য) স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এলো। অতএব তিনি তাদের মধ্যে কে কসম করবে, সে ব্যাপারে লটারী করার হুকুম দিলেন। (বুখারী)[1]
بَابُ الْأَقْضِيَةِ وَالشَّهَادَاتِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَرَضَ عَلَى قَوْمٍ الْيَمِينَ فَأَسْرَعُوا فَأَمْرَ أَنْ يُسْهَمَ بَيْنَهُمْ فِي اليَمينِ أيُّهُمْ يحْلِفُ. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: বিচারকার্য সম্পাদনের জন্য অত্র হাদীসটি মাইলফলক। যেখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লটারীর মাধ্যমে বিচার করেছেন।
প্রখ্যাত ‘আলিমী দীন আল্ মুযহির (রহঃ) বলেনঃ এ রকম বিচারের পদ্ধতি হলো দু’ব্যক্তি জিনিসের দাবীদার জিনিসটি রয়েছে তৃতীয় ব্যক্তির নিকটে দু’জনের, একজনেরও কোনো প্রমাণ নেই অথবা দু’জনেরই প্রমাণ রয়েছে। তৃতীয় ব্যক্তি বলছেন, আমি জানি না জিনিসটি কার? অর্থাৎ জিনিসটি কি এদের দু’জনের কারো নাকি অন্য কারো। এমতাবস্থায় তাদের মাঝে তিনি লটারী করবেন, লটারীতে যার নাম উঠবে তাকে শপথ করতে বললেন, শপথ করলে তার পক্ষে রায় দিবেন। এভাবে ফায়সালার পক্ষে অবস্থান ‘আলী (রাঃ)-এর। ইমাম শাফি‘ঈ বলেনঃ জিনিসটি তৃতীয় ব্যক্তির হাতে থাকবে। ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) বলেনঃ জিনিসটি দু’ খন্ড করে দু’জনকে দিয়ে দিতে হবে। (ফাতহুল বারী ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬৭৪; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যদান
৩৭৬৯-[১২] ’আমর ইবনু শু’আয়ব তাঁর পিতা হতে, তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সাক্ষ্য-প্রমাণ বাদীকেই পেশ করতে হবে। আর বিবাদীর ওপর বর্তাবে কসম। (তিরমিযী)[1]
عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الْبَيِّنَةُ عَلَى الْمُدَّعِي وَالْيَمِينُ عَلَى الْمُدَّعَى عَلَيْهِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসটিতে বলা হয়েছে, মামলা বাদী-বিবাদী যদি কোনো একটি জিনিসের দাবীদার হয় তাহলে বাদীর দলীল পেশ করতে হবে তার স্বপক্ষে আর বিবাদী তার স্বপক্ষে কসম করবে, তবে কসামার ক্ষেত্র ব্যতীত। কসামাহ্ হলো কোনো গ্রামের আঙ্গিনায় যদি একটি লাশ পাওয়া যায় কিন্তু হত্যাকারী শনাক্ত হয়নি তাহলে ঐ গ্রামের বাসিন্দারাই আসামী হবে এবং তারা তাদের পক্ষে ৫০টি কসম খাবে তাদের নির্দোষ প্রমাণের উদ্দেশে, এ ধরনের বিচার পদ্ধতিকে কসামাহ্ বলে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যদান
৩৭৭০-[১৩] উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন দু’ ব্যক্তি উত্তরাধিকার সম্পর্কীয় ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হয়ে সাক্ষী ব্যতীত শুধু প্রাপ্যের দাবী নিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসেছিল।এমতাবস্থায় তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আমি যদি তোমাদের কাউকে তার ভাইয়ের হক (তোমাদের একজনের মিথ্যার বলার দরুন) প্রদান করি, তখন আমার সে ফায়সালা দোষী ব্যক্তির জন্য হবে জাহান্নামের একখন্ড আগুন। এ কথা শুনে তারা উভয়েই বলে উঠলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমার অংশটি আমার সঙ্গীকে দিয়ে দিন। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, না; বরং তোমরা উভয়ে (সমানভাবে) ভাগ-বণ্টন করে নাও। আর ভাগ-বণ্টনের মধ্যে হক পন্থা অবলম্বন করবে এবং পরস্পরের মধ্যে লটারী করে নিবে। অতঃপর তোমরা একে অপরকে ঐ অংশ থেকে ক্ষমা করে দিবে।
অপর এক বর্ণনাতে আছে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ আমি তোমাদের মাঝে এ ফায়সালা স্বীয় জ্ঞান-বুদ্ধির দ্বারা করছি। এ ব্যাপারে আমার নিকট কোনো ওয়াহী অবতীর্ণ হয়নি। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أُمِّ سَلَمَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: فِي رَجُلَيْنِ اخْتَصَمَا إِلَيْهِ فِي مَوَارِيثَ لَمْ تَكُنْ لَهُمَا بَيِّنَةٌ إِلَّا دَعْوَاهُمَا فَقَالَ: «مَنْ قَضَيْتُ لَهُ بِشَيْءٍ مِنْ حَقِّ أَخِيهِ فَإِنَّمَا أَقْطَعُ لَهُ قِطْعَةً مِنَ النَّارِ» . فَقَالَ الرَّجُلَانِ: كُلُّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا: يَا رَسُولَ اللَّهِ حَقِّي هَذَا لِصَاحِبِي فَقَالَ: «لَا وَلَكِنِ اذْهَبَا فَاقْتَسِمَا وَتَوَخَّيَا الْحَقَّ ثُمَّ اسْتَهِمَا ثُمَّ لْيُحَلِّلْ كُلُّ وَاحِدٍ مِنْكُمَا صَاحِبَهُ» . وَفِي رِوَايَةٍ قَالَ: «إِنَّمَا أَقْضِي بَيْنَكُمَا برأيي فِيمَا لم يُنزَلْ عليَّ فِيهِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে কুক্ষিগত করার উপর অত্যন্ত নরম ভাষায় কড়া হুশিয়ারী দেয়া হয়েছে।
হাদীস থেকে শিক্ষা:
(১) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গায়েব তথা অদৃশ্যের জ্ঞান রাখতেন না। যদি রাখতেন তাহলে তিনি তা দিয়েই ফায়সালা করতে পারতেন।
(২) অন্যের হক মেরে খাওয়া চরম ঘৃণ্যতম কাজ যা পরিহার ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই।
(৩) বিচারপতি বাহ্যিক সাক্ষী আচার-অনুষ্ঠান থেকেই ফায়সালা করবেন। ভিতরকার খবরাখবর সে জানতে পারে না এবং তা সম্ভবও নয়।
(৪) সাহাবীদের আদর্শের অন্যতম হলো তারা জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাওয়াকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন।
(৫) সাহাবীদের তাকওয়া। (‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৬১৬; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যদান
৩৭৭১-[১৪] জাবির ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, দু’ ব্যক্তি একটি পশুর ব্যাপারে স্বীয় দাবী পেশ করল। অতঃপর তারা উভয়েই স্বীয় দাবীর সমর্থনে সাক্ষ্য-প্রমাণ পেশ করে বলল, ষাঁড় দ্বারা প্রজনন করিয়ে বাচ্চা লাভ করেছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পশুটি তার জন্য ফায়সালা করলেন, যার তত্ত্বাবধানে ছিল। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
وَعَن جابرِ بن عبدِ الله: أَنَّ رَجُلَيْنِ تَدَاعَيَا دَابَّةً فَأَقَامَ كُلُّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا الْبَيِّنَةَ أَنَّهَا دَابَّتُهُ نَتَجَهَا فَقَضَى بِهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِلَّذِي فِي يدِهِ. رَوَاهُ فِي «شرح السّنة»
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসে পাওয়া যাচ্ছে, দু’জন লোক একটি জন্তুর দাবী করছে এবং দু’জনের দলীল আছে কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিচারের সময় যার হাতে জন্তুটি ছিল তারপক্ষে রায় দিলেন, তাই এসব ক্ষেত্রে এভাবেই বিচারকার্য সমাধা করতে হয়। এক্ষেত্রে ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) যে মতামত দিয়েছিলেন তা হলো, যে জিনিস নিয়ে বাদী-বিবাদীর মাঝে মতবিরোধ দেখা যাবে তা দু’ভাগ করে দু’জনকে দিয়ে দিতে হবে।
ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-এর কথাটি ব্যখ্যা করলে এরূপ দাঁড়ায় যে, জন্তুটিকে দু’ভাগ করতে হবে এবং তা দু’জনের মাঝে বণ্টন করতে হবে। এটা সর্বদা সম্ভব নাও হতে পারে, এজন্য জন্তুটি বিক্রয় করে তার মূল্য দু’জনকে দেয়া যেতে পারে। অথবা ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-এর কথাটিকে এভাবে নেয়া যেতে পারে যে, যা কিছু দু’ভাগ করার পর্যায়ভুক্ত তাতে যদি দু’জন দাবীদার থাকে তাহলে ভাগ করে দু’জনকে দিয়ে দিতে হবে।
এ হাদীস থেকে আরো বুঝা যায় যে, যার হাতে জন্তুটি থাকবে তার প্রমাণকে অন্যের তুলনায় প্রাধান্য দিতে হবে এবং এটাই সাধারণ নিয়ম। শারহুস্ সুন্নাহ্-তে বলা হয়েছে, ‘উলামায়ে কিরাম বলেন, যখন দু’জন ব্যক্তি একটি বিষয়ের দাবীদার হবে আর দু’জনেরই প্রমাণ থাকবে যার জন্য তারা বিচার দায়ের করেছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যদান
৩৭৭২-[১৫] আবূ মূসা আল আশ্’আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে দু’ ব্যক্তি একটি উট দাবী করল এবং তারা উভয়েই দু’জন করে সাক্ষ্য-প্রমাণও পেশ করল। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটটিকে তাদের উভয়ের মাঝে আধা-আধি করে ভাগ করে দিলেন। (আবূ দাঊদ)[1]
আবূ দাঊদ-এর অপর বর্ণনায় এবং নাসায়ী ও ইবনু মাজাহতে আছে, দু’ ব্যক্তি একটি উটের দাবী করল, অথচ তাদের কারো কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই। এমতাবস্থায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটটি তাদের উভয়ের জন্য সাব্যস্ত করলেন।
وَعَن أبي مُوسَى الأشعريِّ: أَنَّ رَجُلَيْنِ ادَّعَيَا بَعِيرًا عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَبَعَثَ كُلُّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا شَاهِدَيْنَ فَقَسَّمَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَيْنَهُمَا نِصْفَيْنِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَفِي رِوَايَةٍ لَهُ وَلِلنَّسَائِيِّ وَابْنِ مَاجَهْ: أَنَّ رَجُلَيْنِ ادَّعَيَا بَعِيرًا لَيْسَتْ لِوَاحِدٍ مِنْهُمَا بَيِّنَةٌ فَجَعَلَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَيْنَهُمَا
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসটিতে বলা হয়েছে, একই জিনিসের যদি দুই দাবীদার থাকে দু’জনেরই প্রমাণ থাকে- এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হলো ঐ জিনিসটি উভয়ের মাঝে সমভাবে বণ্টিত হবে। ইবনুল মালিক (রহঃ) অত্র হাদীসের বিশ্লেষণে বলেছেন।
অত্র হাদীসটি প্রমাণ করছে, দু’জন ব্যক্তি যদি একটি জিনিসের দাবীদার হয় একজনেরও কোনো প্রমাণ না থাকে অথবা উভয়েরই প্রমাণ থাকে আর জিনিসটি উভয়েই ধরে রেখেছে অথবা কেউ ধরে রাখেনি তাহলে এমন পরিস্থিতিতে জিনিসটি সমভাগে দু’জনের মধ্যে ভাগ করে দিতে হবে। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ)-সহ অনেকেই এ অভিমত পেশ করেছেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যদান
৩৭৭৩-[১৬] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ দু’ ব্যক্তি একটি পশুর ব্যাপারে পরস্পরের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হলো, কিন্তু তাদের কারো নিকট কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই। এমতাবস্থায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা কসম করার মাধ্যমে লটারী করে নাও। (আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ্)[1]
وَعَن أبي هريرةَ أنَّ رجُلينِ اختَصما فِي دَابَّة وَلَيْسَ لَهما بَيِّنَةٌ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «استهِما على اليَمينِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وابنُ مَاجَه
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যদান
৩৭৭৪-[১৭] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক কসমকারীকে বললেনঃ তুমি সে আল্লাহর নামে কসম করো যিনি ব্যতীত সত্যিকারে কোনো মা’বূদ নেই এবং তোমার ওপর তার কোনো হক নেই (বাদীর কোনো হক নেই)। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لِرَجُلٍ حَلَّفَهُ: «احْلِفْ بِاللَّهِ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ مَاله عِنْدَكَ شَيْءٌ» يُعْنَى لِلْمُدَّعِي. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যদান
৩৭৭৫-[১৮] আশ্’আস ইবনু কায়স (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমার ও এক ইয়াহূদীর যৌথ মালিকানায় একটি জমি ছিল। কিন্তু সে (এক সময়) আমার মালিকানাকে অস্বীকার করায় আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট অভিযোগ পেশ করলাম। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেনঃ তোমার নিকট এর কোনো দলীল-প্রমাণাদি আছে কি? আমি বললাম, না। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইয়াহূদীকে বললেনঃ তুমি কসম করে বলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম : হে আল্লাহর রসূল! সে তো এখন কসম করে আমার সম্পদ দখলে নিয়ে যাবে। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা নাযিল করলেনঃ ’’যারা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ও তার নামে কসম করে নগণ্যমূল্যে বিক্রি করে’’- (সূরা আ-লি ’ইমরান ৩ : ৭৭) আয়াতের শেষ পর্যন্ত। (আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ্)[1]
وَعَن الأشعثِ بنِ قيسٍ قَالَ: كَانَ بَيْنِي وَبَيْنَ رَجُلٍ مِنَ الْيَهُودِ أرضٌ فحَجَدني فَقَدَّمْتُهُ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «أَلَكَ بَيِّنَةٌ؟» قُلْتُ: لَا قَالَ لِلْيَهُودِيِّ: «احْلِفْ» قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِذَنْ يَحْلِفَ وَيَذْهَبَ بِمَالِي فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى: (إِنَّ الَّذِينَ يشترونَ بعهدِ اللَّهِ وأَيمانِهِم ثمنا قَلِيلا)
الْآيَة. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা : অত্র হাদীসের বর্ণনাকারী সাহাবীর নাম আশ্‘আস বিন কয়স বিন মা‘দীকারাব তার উপনাম আবূ মুহাম্মাদ আল্ কিনদী। তিনি কিনদাহ্ গোত্রের নেতা হয়ে স্বদল বলে নাবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসেছিলেন। এটা ছিল ১০ হিজরীর ঘটনা, তিনি জাহিলী যুগে তার জাতির সর্দার ছিলেন, তার জাতি তাকে খুব শ্রদ্ধা করতো তার কথা মেনে চলতো। ইসলাম গ্রহণের পরও তিনি সম্মানিত ছিলেন মাঝে একবার মুরতাদ হয়ে যান। পরে আবার ইসলামে ফিরে আসেন।
আবূ বাকর -এর শাসনামলে ‘উলামায়ে কিরাম বলেন, ইমাম শাফি‘ঈ তাকে সাহাবী বলেছেন। আমাদের নিকট সহীহ মতানুসারে তিনি তাবি‘ঈ যেহেতু তার সাহাবীত্ব মুরতাদ হওয়ার কারণে বাতিল হয়ে গিয়েছিল। তিনি বলেন, আমার মাঝে আর অপর এক ইয়াহূদীর মাঝে একখন্ড জমি নিয়ে বিবাদ চলছিল আমি বিষয়টি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানালাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমার কি কোনো দলীল প্রমাণ আছে? আমি বললাম, না, তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াহূদীকে তার স্বপক্ষে শপথ করতে বললেন। এ হাদীসের অংশ থেকে বুঝা যায়, বিচারকার্যে শপথ অমুসলিমদের জন্যও হতে পারে, শপথের বিষয়টি শুধু মুসলিমদের জন্য নির্দিষ্ট নয়। তবে এক্ষেত্রে যদি সে মিথ্যা শপথ করে মুসলিমের মাল-সম্পদ হরণ করে তাহলে এর জন্য তাকে কঠিন পরিণতি বহন করতে হবে। মহান আল্লাহ সূরা আ-লি ‘ইমরান-এর ৭৭নং আয়াতে বলেছেন, ‘‘নিশ্চয় যারা সামান্য কিছু লাভের আশায় মিথ্যা শপথ করবে তাদের জন্য আখিরাতে কোনো অংশ নেই, আল্লাহ তাদের সাথে কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না, কিয়ামতের দিন তাদেরকে পবিত্র করবেন না, তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’’ (‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৬১৮; তুহফাতুল আহওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৯৯৬; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যদান
৩৭৭৬-[১৯] উক্ত রাবী [আশ্’আস ইবনু কায়স (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন কিনদাহ্ এবং হাযরা মাওত-এর অধিবাসীর দু’জন লোক ইয়ামানের একটি জমির ব্যাপারে বিবাদে লিপ্ত হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হলো। হাযরামী লোকটি বলল, হে আল্লাহর রসূল! জমিটি আমার। এ লোকের পিতা জোরপূর্বক আমার থেকে দখলদারিত্ব নিয়েছে এবং বর্তমানে তা তার তত্ত্বাবধানেই আছে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তোমার নিকট কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ আছে কি? সে বললঃ না। তবে আমি তাকে এরূপ কসম দিব যে, সে কসম করে বলবেঃ আল্লাহর কসম! সে জানে না যে, এ জমি আমার এবং তার পিতা আমার থেকে জোরপূর্বক দখলে নিয়েছে। অতঃপর কিনদী লোকটি কসম করতে উদ্যত হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ (সাবধান) যে ব্যক্তি (মিথ্যা) কসম করে অপরের ধন-সম্পদ নিজের করায়ত্বে নেয়, সে (কিয়ামতের দিন) হাতকাটা অবস্থায় আল্লাহর নিকট উপস্থিত হবে। অতঃপর কিনদী বলে উঠল, এ জমিন তারই (হাযরামীর)। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْهُ أَنْ رَجُلًا مَنْ كِنْدَةَ وَرَجُلًا مِنْ حَضْرَمَوْتَ اخْتَصَمَا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي أَرْضٍ مِنَ الْيَمَنِ فَقَالَ الْحَضْرَمِيُّ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ أَرْضِي اغْتَصَبَنِيهَا أَبُو هَذَا وَهَى فِي يَدِهِ قَالَ: «هَلْ لَكَ بَيِّنَةٌ؟» قَالَ: لَا وَلَكِنْ أُحَلِّفُهُ وَاللَّهِ مَا يَعْلَمُ أَنَّهَا أَرْضِي اغْتَصَبَنِيهَا أَبُوهُ؟ فَتَهَيَّأَ الْكِنْدِيُّ لِلْيَمِينِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَقْطَعُ أَحَدٌ مَالًا بِيَمِينٍ إِلَّا لَقِيَ اللَّهَ وَهُوَ أَجْذَمُ» فَقَالَ الْكِنْدِيُّ: هِيَ أرضُهُ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসটি পূর্বের হাদীসের মতই যে হাদীসটি আশ্‘আস বিন কয়স থেকে বর্ণিত। হাদীসটির মর্মকথা হলো কিনদী ও হাযরামাওত-এর দু’জন লোক ইয়ামান থেকে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট একটি ভূমির ব্যাপারে মামলা নিয়ে আসলো, এমতাবস্থায় জমিটি হাযরামাওত-এর অধীনেই ছিল। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার প্রমাণ কি? সে বললো, আমার কোনো প্রমাণ নেই কিন্তু আমি শপথ খেতে পারবো। পরবর্তীতে যা ঘটার ঘটলো নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এভাবে শপথের মাধ্যমে কেউ যদি অপর মুসলিমের সম্পদ হরণ করে নেয় তাহলে কিয়ামতে সে বরকতশূন্য হয়ে উঠবে। হাদীসটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, আমরা যেন কোনক্রমেই অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে হরণ না করি। (‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৬১৯; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যদান
৩৭৭৭-[২০] ’আবদুল্লাহ ইবনু উনায়স (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ গুনাহের মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট গুনাহ হলো- ১. আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করা, ২. মা-বাবার অবাধ্য হওয়া, ৩. মিথ্যা কসম করা। (সাবধান) যখন কোনো কসমকারী নিরুপায় হয়ে আল্লাহর কসম করে এবং তাতে মাছির ডানার পরিমাণও মিথ্যার আশ্রয় নেয়, তখনই তার অন্তরে একটি দাগ পড়ে যায় যা কিয়ামত অবধি থাকবে। (তিরমিযী; আর তিনি বলেনঃ হাদীসটি গরীব)[1]
وَعَن عبدِ اللَّهِ بنِ أُنَيْسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ مِنْ أَكْبَرِ الْكَبَائِرِ الشِّرْكَ بِاللَّهِ وَعُقُوقَ الْوَالِدَيْنِ وَالْيَمِينَ الْغَمُوسَ وَمَا حَلَفَ حَالِفٌ بِاللَّهِ يَمِينَ صَبْرٍ فَأَدْخَلَ فِيهَا مِثْلَ جَنَاحِ بَعُوضَةٍ إِلَّا جُعِلَتْ نُكْتَةً فِي قَلْبِهِ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيب
ব্যাখ্যা: এ হাদীসটি ইসলামের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধানের কথা বলেছে, প্রথমত সর্বাধিক বড় গুনাহ শির্ক সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি, তারপর পিতা-মাতার অবাধ্য হতে নিষেধকরণ ও মিথ্যা শপথ থেকে পুরোপুরি বেঁচে থাকার আদেশ। অত্র হাদীসে মিথ্যা শপথের ক্ষেত্রে যে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা হল মাছির ডানাসম মিথ্যা বলা হলেও তা ঘৃণ্যতম আর যদি পুরা শপথটাই মিথ্যা হয় তাহলে তো আরো মারাত্মক অপরাধ হিসেবে তা বিবেচিত হবে। আর বলা হয়েছে, একটি মাছির সমপরিমাণ মিথ্যা শপথে প্রবেশ করালেও তার শাস্তি হলো কিয়ামত পর্যন্ত তার অন্তরে একটি কালিমা লেগে থাকবে। তাহলে পুরা শপথটাই যদি মিথ্যা হয় তাহলে অবস্থা আরো ভয়াবহ হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) সহ অন্যান্য বিদ্বানের এটাই সিদ্ধান্ত।
এ ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, মিথ্যা শপথের শাস্তিকে আখিরাতের সাথে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ‘আযাবের তীব্রতা বুঝানোর জন্য। আবার তাকে কবীরা গুনাহের অন্তর্গত করা হয়েছে যাতে মানুষ তা অবহেলা না করে, আবার কোনো কোনো হাদীসে মিথ্যা সাক্ষীকে শির্কের অন্তর্গত করা হয়েছে এর শাস্তিকে আরো ভয়াবহ করার জন্য। মোট কথা হলো আমাদের মিথ্যা সাক্ষী দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ৩০২০; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যদান
৩৭৭৮-[২১] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আমার এ মিম্বারের নিকট মিথ্যা কসম করল, যদিও তা সবুজ রংয়ের একটি মিসওয়াকের জন্য হয়। সে জাহান্নামের আগুনে তার ঠিকানা অবধারিত করে নিল। অথবা বলেছেনঃ তার জন্য জাহান্নামের আগুন অপরিহার্য হয়ে গেল। (মালিক, আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ্)[1]
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَحْلِفُ أَحَدٌ عِنْدَ مِنْبَرِي هَذَا عَلَى يَمِينٍ آثِمَةٍ وَلَوْ عَلَى سِوَاكٍ أَخْضَرَ إِلَّا تَبَوَّأَ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ أَوْ وَجَبَتْ لَهُ النَّارُ» . رَوَاهُ مَالِكٌ وَأَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ
ব্যাখ্যা: এ হাদীস মিথ্যা শপথের চরম ভয়াবহতা সতর্কবাণী দেয়া হয়েছে। ইবনুল মালিক বলেনঃ মিথ্যা শপথ স্বাভাবিকভাবেই চরম শাস্তির দিকে ধাবিত করে আবার যদি তা নাবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বারের কাছে, তখন পাপ আরো গুরুতর হবে বৈ কি? মিম্বারের কথা উল্লেখ করে মূলত মিম্বারের সম্মান বৃদ্ধি করা হয়েছে আর দ্বিতীয়তঃ এ ধরনের মিথ্যা শপথের চরম ভয়াবহ শাস্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ মিথ্যা শপথের শাস্তি যেভাবেই দেয়া হোক না কেন তা আল্লাহর ক্রোধ ডেকে আনে এতে কোনো সন্দেহ নেই।
অত্র হাদীস থেকে শিক্ষণীয় বিষয় হলো, মিথ্যা শপথ স্থান কালভেদে তার পাপের স্তর পরিবর্তন হয় বটে তবে সর্বাবস্থায় তার শাস্তি খুবই ভয়াবহ। (‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩২৪৪; আল মুনতাকা ৭ম খন্ড, হাঃ ১৩৯২; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যদান
৩৭৭৯-[২২] খুরায়ম ইবনু ফাতিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের সালাত আদায় করে দাঁড়িয়ে তিনবার বললেনঃ মিথ্যা সাক্ষ্যদানকে আল্লাহর সাথে শির্ক করার সমতুল্য করা হয়েছে। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ আয়াত তিলাওয়াত করলেনঃ ’’মূর্তিপূজার অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকো এবং মিথ্যা কথা থেকেও বিরত থাকো এমতাবস্থায় যে, বাতিলকে বর্জন করতঃ আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না। (আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ্)[1]
وَعَن خُريمِ بن
فاتكٍ قَالَ: صَلَّى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَلَاةَ الصُّبْحِ فَلَمَّا انْصَرَفَ قَامَ قَائِمًا فَقَالَ: «عُدِلَتْ شَهَادَةُ الزُّورِ بِالْإِشْرَاكِ بِاللَّهِ» ثَلَاثَ مَرَّاتٍ. ثُمَّ قَرَأَ: (فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْأَوْثَانِ وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ حُنَفَاءَ لِلَّهِ غَيْرَ مُشْرِكِينَ بهِ)
رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসে قَوْلَ الزُّوْرِ তথা মিথ্যা সাক্ষীকে শির্কের সমগোত্রীয় করা হয়েছে অর্থাৎ মিথ্যা সাক্ষী দিলে সেই অপরাধ হয় যা শির্ক করলে হয়।
হাদীসটিতে উল্লেখিত قَوْلَ الزُّوْرِ -এর ব্যাখ্যায় ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ এর অর্থ হচ্ছে সঠিকটা না বলে মিথ্যার আশ্রয় নেয়া। হাদীসটিতে মিথ্যা সাক্ষীর কঠোর বিরোধিতা করা হয়েছে। এর ভয়াবহতা বর্ণনায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত নিয়ে এসেছেন, মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘‘তোমরা মূর্তিপূজা থেকে বিরত থাক এবং মিথ্যা সাক্ষী প্রদান থেকে বিরত থাক আল্লাহর সাথে শির্ক না করে একনিষ্ঠ হয়ে যাও’’- (সূরা আল হজ্জ/হজ ২২ : ৩০)। (‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৫৯৬; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যদান
৩৭৮০-[২৩] আর আহমাদ ও তিরমিযী হাদীসটি আয়মান ইবনু খুরায়ম হতে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু ইবনু মাজাহ্-এর বর্ণনায় (উপরোল্লিখিত হাদীসে) কুরআনের আয়াতটি পাঠের কথা উল্লেখ নেই।[1]
وَرَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ عَنْ أَيْمَنَ بْنِ خُرَيْمٍ إِلَّا أَنَّ ابْنَ مَاجَهْ لَمْ يَذْكُرِ الْقِرَاءَةَ
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যদান
৩৭৮১-[২৪] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ঐ সকল লোকেদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। যথা- ১. খিয়ানাতকারী পুরুষ ও খিয়ানাতকারিণী নারী, ২. শারী’আতের বিধান অনুযায়ী দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি, ৩. শত্রু, যদিও তার মুসলিম ভাই হয়, ৪. সে গোলাম, যে তার মুক্তকারীকে অস্বীকার করে, ৫. বংশ পরিবর্তনকারী, যে স্বীয় বংশসূত্র গোপন করে অন্য বংশের দাবী করে, ৬. পরিবারভুক্ত গোলাম বা চাকর, যে ঐ পরিবারের উপর নির্ভরশীল। (তিরমিযী; আর তিনি বলেন, হাদীসটি গরীব। আর এ হাদীসের অপর রাবী ইয়াযীদ ইবনু যিয়াদ আদ্ দিমাশক্বী মুনকারুল হাদীস)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تَجُوزُ شَهَادَةُ خَائِنٍ وَلَا خَائِنَةٍ وَلَا مَجْلُودٍ حَدًّا وَلَا ذِي غِمْرٍ عَلَى أَخِيهِ وَلَا ظَنِينٍ فِي وَلَاءٍ وَلَا قَرَابَةٍ وَلَا الْقَانِعِ مَعَ أَهْلِ الْبَيْتِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حديثٌ غريبٌ ويزيدُ بن زيادٍ الدِّمَشْقِي الرَّاوِي مُنكر الحَدِيث
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসটিতে পরিষ্কার করে বলা হয়েছে তাদের কথা যাদের সাক্ষী গ্রহণীয় নয় তারা হলো আমানাতের খিয়ানাতকারী পুরুষ অথবা মহিলা এবং যাকে যিনার হাদ্দ লাগানো হয়েছে এবং এমন জনের সাক্ষী যে, তার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিচ্ছে যার সাথে তার আগে থেকেই শত্রুতা চলে আসছে ; আর ঐ সমস্ত লোকের সাক্ষী গ্রহণ করা হবে না, যারা সমাজে খিয়ানাতকারী হিসেবে চিহ্নিত। এক্ষেত্রে কেউ কেউ বলেছেন, যদি দীনের হুকুম-আহকামে কিছু একটা ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে থাকে তাহলে কোনো অসুবিধা নেই; তবে মানুষের মাল-সম্পদে খিয়ানাত করলে তার সাক্ষী গ্রহণ করা হবে না ; তবে সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করে ‘উলামায়ে কিরাম বলেছেন যে, কোনো খিয়ানাতকারীরই সাক্ষী গ্রহণীয় নয়।
মহান আল্লাহ বলেছেনঃ ‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের খিয়ানাত করো না এবং তোমাদের পরস্পরের আমানতও খিয়ানাত করো না।’’ (সূরা আল আনফাল ৮ : ২৭)
(وَلَا مَجْلُوْدٍ) এর ব্যাখ্যায় ‘উলামায়ে কিরাম বলেন, যেমন ইমাম ইবনুল মালিক বলেনঃ এ ব্যক্তি হলো সে যে তার স্ত্রীর প্রতি যিনার অপবাদ দিয়েছে এবং ৪ জন সাক্ষী উপস্থিত করতে পারেনি। তার সাক্ষীও গ্রহণীয় নয়। ইমাম ইবনুল মালিক-এর সাথে একমত হয়ে ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-ও একই কথা বলেছেন বরং ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) আরো একটু বেশী করে বললেন, সে তাওবাহ্ করলেও তার সাক্ষী গ্রহণ করা হবে না। মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘‘আর যারা সত্বী সাধী নারীকে যিনার অপবাদ দিল, অতঃপর চারজন সাক্ষী আনতে ব্যর্থ হলে তাদের ৮০ বেত্রাঘাত কর এবং তাদের সাক্ষী কখনোই গ্রহণ করিও না।’’ (সূরা আন্ নূর ২৪ : ৪)
তাই অত্র আয়াত থেকেও বুঝা যায়, তার সাক্ষী কখনোই গ্রহণ করা যাবে না যদিও তাওবাহ্ করে। তবে এর ব্যতিক্রম মতামত ও ‘উলামায়ে কিরাম পোষণ করেছেন এবং তারা বলেছেন, তাওবাহ্ করলে তার সাক্ষী গ্রহণ করা হবে। যেহেতু সূরা আন্ নূর-এর ৫ নং আয়াতেই তা উল্লেখ আছে, মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘‘তবে যারা তাওবাহ্ করলো তারা ব্যতীত। (সূরা আন্ নূর ২৪ : ৫)
সাক্ষী দিতে গিয়ে কোনো প্রকার স্বজন-প্রীতির আশ্রয় নেয়া বৈধ হবে না। কোনো কোনো রিওয়ায়াতে এমনও আছে যারা অধিক ভুল করে তাদেরও সাক্ষী গ্রহণ হবে না। [আল্লাহই ভালো জানেন] (তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২২৯৮; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যদান
৩৭৮২-[২৫] ’আমর ইবনু শু’আয়ব তাঁর পিতা হতে, তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ খিয়ানাতকারী পুরুষ ও খিয়ানাতকারিণী নারীর সাক্ষ্য কবুলযোগ্য নয়। ব্যভিচারী পুরুষ ও ব্যভিচারিণী নারীর সাক্ষ্যও কবুলযোগ্য নয় (গ্রহণ করা হবে না)। আর শত্রুর সাক্ষ্যদান বৈধ নয়, যদিও সে তার মুসলিম ভাই হয়। আর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এমন ব্যক্তির সাক্ষ্যকেও অগ্রহণযোগ্য বলেছেন, যে কোনো পরিবারের গোলাম বা চাকর। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا تَجُوزُ شَهَادَةُ خَائِنٍ وَلَا خَائِنَةٍ وَلَا زَانٍ وَلَا زَانِيَةٍ وَلَا ذِي غِمْرٍ عَلَى أَخِيهِ» . وَرَدَّ شَهَادَةَ الْقَانِعِ لِأَهْلِ الْبَيَتْ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসটিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে তাদের কথা বিচারকার্যে যাদের সাক্ষী গ্রহণীয় নয়।
(ক) খিয়ানাতকারী মহিলা-পুরুষ।
(খ) যিনাকারী পুরুষ-মহিলা।
(গ) এমন লোকের সাক্ষী এমন কারো সম্পর্কে যার সাথে তার আগে থেকেই শত্রুতা ছিল।
অত্র হাদীসের শিক্ষা হলো সাক্ষী প্রদানের বিষয়টি খুব গুরুত্বের দাবীদার, সুতরাং যে কেউ সাক্ষী দান করতে পারবে না, এটাই বাস্তবতার দাবী। (‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৫৯৮; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যদান
৩৭৮৩-[২৬] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শহরের অধিবাসীর পক্ষে গ্রাম্য লোকের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। (আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ্)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا تَجُوزُ شَهَادَةُ بَدَوِيٍّ عَلَى صَاحِبِ قَرْيَةٍ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَه
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসে বলা হয়েছে, শহরের লোকেরা গ্রামের লোকের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে পারবে না। এর কারণ বিশ্লেষণে ‘উলামায়ে কিরাম বলেন, এর কারণ হলো শহরের লোকেরা গ্রামের লোক ও গ্রাম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণার অভাব এবং তার ইসলামের বিধি-বিধান সম্পর্কে পরিষ্কার ধ্যান-ধারণা না থাকা। এমনটি মতামত ব্যক্ত করেছেন ‘আল্লামা খত্ত্বাবী, ইবনুল মালিকসহ অনেকেই। ‘আল্লামা তূরিবিশ্তী-এর আরো একটি কারণ বলেছেন তা হলো সাক্ষী চাওয়ার সময় তাকে শহর থেকে নিয়ে আসা সম্ভব নাও হতে পারে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৫৯৯; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যদান
৩৭৮৪-[২৭] ’আওফ ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’জন লোকের মাঝে বিচার করলেন। কিন্তু সে ব্যক্তির বিপক্ষে রায় হয়েছে, সে চলে যাওয়ার প্রাক্কালে বলল, আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম সাহায্যকারী। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা অচেতন মূর্খকে তিরস্কার করেন। তোমাকে সচেতন ও সজাগ হওয়া উচিত। এরপরও যদি তোমার ওপর কোনো বিপদ-মুসীবাত এসে পড়ে তাহলে ’’হাসবিয়াল্লা-হু ওয়া নি’মাল ওয়াকীল’’ (আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম সাহায্যকারী) বলো। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَوْفِ بْنِ مَالِكٍ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَضَى بَيْنَ رَجُلَيْنِ فَقَالَ الْمَقْضِيُّ عَلَيْهِ لَمَّا أَدْبَرَ: حَسْبِيَ اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَلُومُ عَلَى الْعَجْزِ وَلَكِنْ عَلَيْكَ بِالْكَيْسِ فَإِذَا غَلَبَكَ أَمْرٌ فَقُلْ: حَسْبِيَ اللَّهُ ونِعْمَ الوكيلُ . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যদান
৩৭৮৫-[২৮] বাহয ইবনু হাকীম (রহঃ) তাঁর পিতা হতে, তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপবাদের অভিযোগের দণ্ড স্বরূপ এক ব্যক্তিকে বন্দী করেছেন। (আবূ দাঊদ)[1]
আর তিরমিযী ও নাসায়ী অতিরিক্ত বর্ণনা করেন যে, পরে তাকে ছেড়ে দেন।
وَعَنْ بَهْزِ بْنِ حَكِيمٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَبَسَ رَجُلًا فِي تُهْمَةٍ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وزادَ التِّرْمِذِيّ وَالنَّسَائِيّ: ثمَّ خَلّى عَنهُ
পরিচ্ছেদঃ ৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - বিচারকার্য এবং সাক্ষ্যদান
৩৭৮৬-[২৯] ’আবদুল্লাহ ইবনুয্ যুবায়র (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ করেছেন, উভয়পক্ষ (বাদী ও বিবাদী) বিচারকের সামনেই সমুপস্থিত থাকবে। (আহমাদ ও আবূ দাঊদ)[1]
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ الزُّبَيْرِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: قَضَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّ الْخَصْمَيْنِ يَقْعُدَانِ بَيْنَ يَدَيِ الْحَاكِمِ. رَوَاهُ أَحْمَدُ وَأَبُو دَاوُدَ