পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
الصوم ও الصيام-এর আভিধানিক অর্থ হলো সাধারণভাবে বিরত থাকা। অর্থাৎ- সহবাস, কথা বলা, খাওয়া ও পান করা থেকে বিরত থাকা। আরো বলা হয়ে থাকে, সূর্য গতিহীন হয়ে পড়লে দিনও গতিহীন হয়ে পড়ে। আর বাতাস বন্ধ হয়ে যায় তখন তার গতিশীলতা থাকে না। আল্লাহ তা’আলা মারইয়াম সম্পর্কে বলেনঃ ’’মারইয়াম-এর কথা হলো, আমি মানুষের সাথে কথা বলা থেকে বিরত থাকার জন্য মানৎ করেছি রহমানের নিকটে।’’ (সূরা মারইয়াম ১৯ঃ ২৬)
صيام ’’সিয়াম’’-এর পরিভাষায় ইমাম নাবাবী ও হাফেয ইবনু হাজার (রহঃ) বলেনঃ
إمساك مخصوص في زمن مخصوص عن شيء مخصوص بشرائط مخصوصة.
অর্থাৎ- নির্দিষ্ট শর্তের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কাজ থেকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিরত থাকাকে সিয়াম বলে।
ইমাম ত্বীবী বলেনঃ এমন কিছু গুণ যা ইতিবাচক এবং যা ’আমল করা জায়িয তা ব্যতিরেকে সকল নিষিদ্ধ কাজ হারাম।
আমীর ইয়ামানী বলেনঃ নির্দিষ্ট কাজ থেকে বিরত থাকা। আর তা হলো খাওয়া, পান করা ও সহবাস।
১৯৫৬-[১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মাহে রমাযান (রমজান) শুরু হলে আকাশের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়। অন্য এক বর্ণনায় আছে, জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়। জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয়। শয়তানকে শিকলবন্দী করা হয়। অন্য এক বর্ণনায় আছে, ’রহমতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়’। (বুখারী, মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «إِذا دخل شهر رَمَضَانُ فُتِحَتْ أَبْوَابُ السَّمَاءِ» . وَفِي رِوَايَةٍ: «فُتِّحَتْ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ جَهَنَّمَ وَسُلْسِلَتِ الشَّيَاطِينُ» . وَفِي رِوَايَةٍ: «فُتِحَتْ أَبْوَابُ الرَّحْمَةِ»
ব্যাখ্যা: (فُتِحَتْ أَبْوَابُ السَّمَاءِ) ‘‘আকাশের দরজাসমূহ খুলো দেয়া হয়। এখানে আকাশের দরজাসমূহ দ্বারা জান্নাতের দরজা উদ্দেশ্য। কেননা এর বিপরীতে বলা হয়েছে যে, (غُلّقَتْ أبواب النار) জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয়। অতএব বুঝা গেল যে, আকাশের দরজা দ্বারা উদ্দেশ্য জান্নাতের দরজা। ইবনু বাত্ত্বাল-এর বক্তব্যও তাই।
(غُلِّقَتْ أَبْوَابُ جَهَنَّمَ) ‘‘জাহান্নামের দরজা বন্ধ করা হয়।’’ সিন্দী (রহঃ) বলেনঃ এর দ্বারা উদ্দেশ্য বান্দা থেকে শাস্তি দূর করা। হাদীসের এ অংশ থেকে এটাও জানা যায় যে, জাহান্নামের দরজা খোলা থাকে। হাদীসের এ বক্তব্য সূরা আয্ যুমারে আল্লাহর বাণী ‘‘তারা (জাহান্নামীরা) যখন সেখানে আসবে তখন তা খুলে দেয়া হবে’’- সূরা আয্ যুমার আয়াত নং ৭১-এর বিরোধী নয়। কেননা এটা সম্ভব যে, জাহান্নামীদের তাতে নিক্ষেপ করার পূর্বে তা বন্ধ করা হবে। পরে তা আবার খুলে দেয়া হবে। জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়ার কারণে কোন কাফির রমাযানে মৃত্যুবরণ করলে তাকে শাস্তি দেয়ায় কোন প্রতিবন্ধক হবে না। কারণ শাস্তি প্রদানের জন্য কবরের সাথে জাহান্নামের কোন একটি ছোট দরজার সংযোগ স্থাপনই যথেষ্ট, যদিও জাহান্নামের বড় ফটক বন্ধ থাকে।
(سُلْسِلَتِ الشَّيَاطِينُ) ‘‘শয়তানদের শিকলবন্দী করা হয়’’ অর্থাৎ- তাদেরকে প্রকৃত শিকল দ্বারাই আটকে ফেলা হয়। আর এখানে ঐ সমস্ত শয়তান উদ্দেশ্য যারা আকাশ থেকে সংবাদ চুরি করার কাজে লিপ্ত থাকে। অথবা এর দ্বারা সকল শয়তান উদ্দেশ্য, তবে এর অর্থ রূপক অর্থাৎ- শয়তান কর্তৃক মানুষকে বিভ্রান্ত করার প্রবণতা কমে যায়।
যদি প্রশ্ন করা হয় যে, শয়তানকে যদি রমাযান (রমজান) মাসে বন্দী করেই ফেলা হয় তা হলে রমাযানে অপরাধ সংগঠিত হয় কিভাবে? এর জওয়ার এই যে, অপরাধের প্রবণতা ঐ সমস্ত মুসলিমদের থেকে কমে যায় যারা সিয়ামের শর্তাবলী পালনের মাধ্যমে সিয়ামকে সংরক্ষণ করে। অথবা এর দ্বারা উদ্দেশ্য রমাযানে অপরাধ প্রবণতা কমিয়ে দেয়া আর তা প্রকাশ্যভাবেই দৃশ্যমান। এটা সর্বজনবিদিত যে, রমাযান (রমজান) মাসে অন্যান্য মাসের তুলনায় অপরাধ অনেক কর্ম সংঘটিত হয়, আর শয়তান বন্দী করে ফেলার কারণে অপরাধ একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়া জরুরী নয়। কেননা অপরাধ সংঘটিত হওয়ার অনেক কারণ বিদ্যমান, তন্মধ্যে খারাপ অন্তর ও মানবরূপী শয়তান এর অন্তর্ভুক্ত।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
১৯৫৭-[২] সাহল ইবনু সা’দ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জান্নাতের আটটি দরজা রয়েছে। এর মধ্যে ’রইয়্যান’ নামে একটি দরজা রয়েছে। সিয়াম পালনকারীগণ ছাড়া এ দরজা দিয়ে অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। (বুখারী, মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: فِي الْجَنَّةِ ثَمَانِيَةُ أَبْوَابٍ مِنْهَا: بَابٌ يُسَمَّى الرَّيَّانَ لَا يدْخلهُ إِلَّا الصائمون
ব্যাখ্যা: জান্নাতের আটটি দরজার মধ্যে একটি দরজার নাম ‘রইয়্যান’-এর নামকরণ করার কারণ এটাও হতে পরে যে, এ জান্নাত স্বয়ং তৃপ্ত তাতে অধিক নালা ও তাজা ফুলে ফলে তা সমৃদ্ধ। অথবা তাতে যারা প্রবেশ করবে তাদের তৃষ্ণা মিটে থাকে এবং স্থায়ী নিবাসে তাদের এ তৃপ্তি স্থায়িত্ব পাবে।
(لَا يَدْخُلُه إِلَّا الصَّائِمُوْنَ) তাতে শুধু সিয়াম পালনকারীগণই প্রবেশ করবে। অর্থাৎ- যাদের ‘ইবাদাতের মধ্যে সিয়াম প্রাধান্য পেয়েছে তারা তাতে প্রবেশ করবে যদিও তাদের অন্যান্য ‘ইবাদাতেও কোন ঘাটতি নেই।
‘আল্লামা সিন্দী (রহঃ) বলেনঃ صَائِمُوْنَ দ্বারা উদ্দেশ্য যারা অধিক পরিমাণে সিয়াম পালন করে। যেমন العادل ন্যায়পরায়ণ, অর্থাৎ- ন্যায়ানুগ কাজ করা যার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, অনুরূপভাবে الظالم (যালিম) অর্থাৎ- যুলম করা যার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। মাত্র একবার ন্যায়সঙ্গত করলে তাকে ন্যায়পরায়ণ বলা হয় না। অনুরূপ শুধুমাত্র একবার যুলম করলেই তাকে যালিম বলা হয় না।
কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন যে, অত্র হাদীস এবং সহীহ মুসলিমে ‘উমার থেকে বর্ণিত মারফূ‘ হাদীস যাতে বলা হয়েছে তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সুন্দরভাবে উত্তমরূপে উযূ করবে, অতঃপর বলবে (أَشْهَدُ أَنْ لَّاۤ إِلٰهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُه وَرَسُوْلُه)। তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেয়া হবে। সে এর যে কোন দরজা দিয়ে স্বীয় ইচ্ছানুযায়ী প্রবেশ করবে। এখানে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সে ব্যক্তি তার ইচ্ছানুযায়ী যে কোন একটি দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে অথচ এই উযূকারী ব্যক্তি অধিক সিয়াম পালনকারী নাও হতে পারে; তা হলে তো এ দুই হাদীসের মধ্যে বৈপরীত্য হয়ে গেল।
দু’ভাবে এ প্রশ্নের জওয়াব দেয়া যেতে পারে।
১. সায়িমদের দরজা ‘রইয়্যান’ থেকে তার মনকে ঘুরিয়ে দেয়া হবে ফলে সে এই ‘রইয়্যান’ দরজা ব্যতীত অন্য যে কোন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে।
২. ‘উমার এর হাদীসটি বর্ণনার ক্ষেত্রে শব্দের ভিন্নতা রয়েছে। তিরমিযীর বর্ণনায় রয়েছে, জান্নাতের দরজাসমূহের মধ্যে থেকে তার জন্য আটটি দরজা খুলে দেয়া হবে। এতে বুঝা যায় যে, জান্নাতের দরজা আটেরও অধিক। আর ঐ ব্যক্তির খুলে দেয়া আটটি দরজা সিয়াম পালনকারীদের জন্য নির্দিষ্ট দরজা ‘রইয়্যান’ ব্যতীত অন্য যে কোন আটটি দরজা খুলে দেয়া হবে। অতএব দু’ হাদীসের মধ্যে কোন বৈপরীত্য নেই।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
১৯৫৮-[৩] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সাওয়াব লাভের আশায় রমাযান (রমজান) মাসে সিয়াম পালন করবে, তার আগের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। আর যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সাওয়াব লাভের আশায় ’ইবাদাতে রাত কাটাবে, তার আগের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। আর যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সাওয়াব লাভের আশায় লায়লাতুল কদরে ’ইবাদাতে কাটাবে তারও আগের সব গুনাহ ক্ষমা করা হবে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ. وَمَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ. وَمَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ»
ব্যাখ্যা: (مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا) ‘‘বিশ্বাসের সাথে সিয়াম পালন করে’’ অর্থাৎ- এ বিশ্বাস রাখে যে, রমাযানের সিয়াম পালন করা তার জন্য বাধ্যতামূলক এবং তা ইসলামের অন্যতম একটি রূকন, আর তা পালনকারীর জন্য পুরস্কার রয়েছে।
(احْتِسَابًا) ‘‘সাওয়াবের আশায়’’, অর্থাৎ- এ কাজ সম্পাদনের মাধ্যমে সে আল্লাহ তা‘আলার নিকট পুরস্কার প্রাপ্তির আশা করে। মানুষের ভয়ে বা সিয়াম পালন না করলে লজ্জিত হতে হবে এমন আশংকা থেকে নয় অথবা সিয়াম পালনের মাধ্যমে সুখ্যাতি অর্জনের উদ্দেশ্য না থাকে বরং ‘‘খালিস লিওয়াজহিল্লা-হ’’ অর্থাৎ শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য, সিয়াম পালন করে (غُفِرَ لَه مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِه وَمَا تَأَخَّرَ) তার পূর্বাপর সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়। এতে বুঝা যায় যে, তার সগীরাহ্ কাবীরাহ্ সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়। তবে জমহূর ‘আলিমদের মতে শুধু সগীরাহ্ গুনাহ উদ্দেশ্য অর্থাৎ তার সকল প্রকার সগীরাহ্ গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়। কেননা কাবীরাহ্ গুনাহ তাওবাহ্ ব্যতীত ক্ষমা করা হয় না।
(وَمَا تَأَخَّرَ) ‘‘তার পরবর্তী গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়’’ হাদীসের এ অংশটুকু প্রশ্নের সৃষ্টি করে যে, ক্ষমা করা বিষয়টি কৃত অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত। যে অপরাধ এখনও সংঘটিত হয়নি তা ক্ষমা করা হয় কিভাবে?
জওয়াবঃ
১. তার গুনাহ সংঘটিত হয় ক্ষমাকৃত অবস্থায় অর্থাৎ তার দ্বারা কোন গুনাহ সংঘটিত হলে তা ক্ষমা করে দেয়া হবে।
২. আল্লাহ তাকে ভবিষ্যতে গুনাহতে লিপ্ত হওয়া থেকে সংরক্ষণ করবেন। ফলে তার দ্বারা কোন কাবীরাহ্ গুনাহ সংঘটিত হবে না।
(قَامَ رَمَضَانَ) ‘‘রমাযানে কিয়াম করে’’ অর্থাৎ- রমাযানের পূর্ণরাত বা রাতের অধিকাংশ সময় সালাত আদায়, কুরআন তিলাওয়াত ও যিকিরের মাধ্যমে অতিবাহিত করে। ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেনঃ এর দ্বারা উদ্দেশ্য রমাযানের রাতে তারাবীহের সালাত আদায় করা। অর্থাৎ তারাবীহের সালাত দ্বারা قيام الليل (কিয়ামুল লায়ল)-এর উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়ে যায়। এর অর্থ এমন নয় যে, তারাবীহ ব্যতীত قيام الليل হয় না।
(مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ) ‘‘যে ব্যক্তি কদরের রাতে কিয়াম করে’’ অর্থাৎ- এ রাতে জেগে ‘ইবাদাত করে। চাই সে তা অবহিত হোক বা না হোক।
(غُفِرَ لَهٗ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِه) ‘‘তার পূর্বের কৃতগুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়’’ অর্থাৎ ঐ ব্যক্তির যদি সগীরাহ্ গুনাহ থেকে থাকে তবে তা মুছে ফেলা হয়। আর যদি তার কাবীরাহ্ গুনাহ থাকে তবে তা হালকা করে দেয়া হয়। তার যদি কোন গুনাহ না তাকে তবে জান্নাতে তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেয়া হয়।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
১৯৫৯-[৪] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আদম সন্তানের প্রত্যেকটি নেক ’আমল দশ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন, কিন্তু এর ব্যতিক্রম হলো সওম। কেননা, সওম আমার জন্যে রাখা হয় এবং আমিই এর প্রতিদান দিব। কারণ সায়িম (রোযাদার) ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তির তাড়না ও খাবার-দাবার শুধু আমার জন্য পরিহার করে। সায়িমের জন্য দু’টি খুশী রয়েছে। একটি ইফতার করার সময় আর অপরটি আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের সময়। সায়িমের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশকের সুগন্ধির চেয়েও বেশী পবিত্র ও পছন্দনীয় এবং সিয়াম ঢাল স্বরূপ (জাহান্নামের আগুন হতে রক্ষা কবচ)। তাই তোমাদের যে কেউ যেদিন সায়িম হবে সে যেন অশ্লীল কথাবার্তা না বলে আর শোরগোল বা উচ্চবাচ্য না করে। তাকে কেউ যদি গালি দেয় বা কটু কথা বলে অথবা তার সাথে ঝগড়া করতে চায়, সে যেন বলে দেয়, ’আমি একজন সায়িম’। (বুখারী, মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: كُلُّ عَمَلِ ابْنِ آدَمَ يُضَاعَفُ الْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا إِلَى سَبْعِمِائَةِ ضِعْفٍ قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: إِلَّا الصَّوْمَ فَإِنَّهُ لِي وَأَنَا أَجْزِي بِهِ يَدَعُ شَهْوَتَهُ وَطَعَامَهُ مِنْ أَجْلِي لِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ: فَرْحَةٌ عِنْدَ فِطْرِهِ وَفَرْحَةٌ عِنْدَ لِقَاءِ رَبِّهِ وَلَخُلُوفِ فَمِ الصَّائِمِ أَطْيَبُ عِنْدَ اللَّهِ مِنْ رِيحِ الْمِسْكِ وَالصِّيَامُ جُنَّةٌ وَإِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمِ أَحَدِكُمْ فَلَا يَرْفُثْ وَلَا يصخب وفإن سَابَّهُ أَحَدٌ أَوْ قَاتَلَهُ فَلْيَقُلْ إِنِّي امْرُؤٌ صَائِم
ব্যাখ্যা: (إِلَّا الصَّوْمَ) ‘‘তবে সওমের প্রতিদান, অর্থাৎ- যে কোন সৎকাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। সিয়াম এর ব্যতিক্রম তা শুধুমাত্র সাতশত গুণ পর্যন্তই বৃদ্ধি করা হয় না। এর প্রতিদানের কোন সীমারেখা নেই। বরং তার প্রতিদান কি পরিমাণ দেয়া হবে তা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা জানেন।
(فَإِنَّهٗ لِي وَأَنَا أَجْزِي بِه) ‘‘তা (সিয়াম) আমারই জন্য এবং তার প্রতিদান আমিই দিব।’’ অর্থাৎ- সিয়াম আল্লাহর তা‘আলা ও তার বান্দার মাঝে একটি গোপনীয় বিষয়। যা বান্দা শুধুমাত্র আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই পালন করে থাকে। যা কোন বান্দা অবহিত হতে পারে না। কেননা এ সিয়ামের বাহ্যিক কোন রূপ নেই যেমনটি অন্যান্য ‘ইবাদাতের বাহ্যিক রূপ রয়েছে। যা বান্দা দেখতে পায়। যেহেতু এ সিয়ামের বিষয়টি আমি ব্যতীত অন্য কেউ অবহিত হতে পারে না তাই এর প্রতিদানও আমিই দিব। এর প্রতিদানের বিষয়টি অন্য কারো উপর ন্যস্ত করব না। এতে এ ইঙ্গিত রয়েছে যে, সিয়ামের পুরস্কার খুবই বড় আর তা হিসাববিহীন।
একটি প্রশ্নঃ সকল ‘ইবাদাতই একমাত্র আল্লাহর জন্য এবং তার প্রতিদানও একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই দিয়ে থাকেন। তাহলে ‘সওম শুধুমাত্র আমার জন্য এবং আমিই এর প্রতিদান দিব’ এর উদ্দেশ্য কি?
জওয়াবঃ সিয়ামের মধ্যে রিয়া তথা লোকজনকে দেখানো সম্ভব নয় যা অন্যান্য ‘ইবাদাতের প্রযোজ্য। কেননা সিয়ামের কোন বাহ্যিক আকার আকৃতি নেই যা লোকজন দেখতে পাবে যা অন্যত্র ‘ইবাদাতের মধ্যে আছে। যেমন সালাত তার রুকূ' সিজদা্ রয়েছে। সালাত আদায়কারীর এ কাজ অন্যান্য লোকেরা দেখতে পায়। কিন্তু সিয়ামের মধ্যে এমন কিছু নেই। যা লোকেরা দেখবে বরং তা শুধু নিয়্যাতের সাথে সম্পৃক্ত যা মানুষের দৃষ্টির অগোচরে। তাই এটা বলা যুক্তিযুক্ত যে, সিয়াম শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য। আর এ ‘ইবাদাত যেহেতু শুধু আল্লাহর জন্য, তাই এর পুরস্কারও আল্লাহ স্বয়ং নিজ হাতে প্রদান করবেন। কিন্তু অন্যান্য কাজের পুরস্কার মালায়িকাহ্ (ফেরেশতা) (ফেরেশতাগণ) লিখে থাকেন।
(يَدَعُ شَهْوَتَه) ‘‘স্বীয় প্রবৃত্তির চাহিদাকে পরিত্যাগ করে’’ অর্থাৎ- সে প্রবৃত্তির এমন চাহিদাকে পরিত্যাগ করে যা সিয়াম ভঙ্গের কারণ হয়। شَهْوَتَه এর পরে طَعَامَ এর উল্লেখ দ্বারা বুঝা যায় যে, شَهْوَتَه দ্বারা উদ্দেশ্য স্ত্রী সঙ্গম এবং طَعَامَ দ্বারা সিয়াম ভঙ্গের অন্যান্য কারণ উদ্দেশ্য।
(مِنْ أَجْلِيْ) ‘‘আমার কারণে’’ অর্থাৎ- আমার নির্দেশ পালনার্থে এবং সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্তে।
(فَرْحَةٌ عِنْدَ فِطْرِه) একটি খুশী তার ইফতার করার সময়। কুরতুবী বলেন, এর অর্থ হলো ইফতারের মাধ্যমে তার ক্ষুধা তৃষ্ণা দূর হওয়ার কারণে খুশী হয়। অনুরূপভাবে খুশী হওয়ার আরেকটি কারণ এই যে, সে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ইবাদাত সম্পন্ন করতে পেরেছে যার পুরস্কার অসীম।
(وَفَرْحَةٌ عِنْدَ لِقَاءِ رَبِّه) ‘‘আরেকটি খুশী তার রবের সাথে সাক্ষাতের সময়’’, অর্থাৎ- পুরস্কার প্রাপ্তির খুশী অথবা স্বীয় প্রভুর সাক্ষাত লাভের খুশী।
সিয়াম পালনকারীর মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহ তা‘আলার নিকট মিস্কের সুগন্ধির চেয়েও প্রিয়, এতে একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, সুগন্ধির মাধ্যমে সন্তুষ্ট হওয়া এবং দুর্গন্ধের কারণে অসন্তুষ্ট হওয়া থেকে আল্লাহর তা‘আলা পবিত্র। কেননা এটি বান্দার গুণ।
উত্তরঃ এটি একটি তুলনা মাত্র মানুষের অভ্যাস এই যে, সে সুগন্ধিকে ভালবাসে এবং তা তার নিকটবর্তী করে নেয়। অনুরূপ আল্লাহ তা‘আলা সিয়াম পালনকারীকে তার নিকটবর্তী করে নেয়।
অথবা এর অর্থ এই যে, মিসকের সুগন্ধ তোমাদের নিকট যে রকম পছন্দনীয় আল্লাহর নিকট সিয়াম পালনকারীর মুখের দুর্গন্ধ তার চেয়ে অধিক পছন্দনীয়।
(وَالصِّيَامُ جُنَّةٌ) ‘‘সিয়াম ঢালস্বরূপ’’ অর্থাৎ- ঢাল যেমন মানুষকে তরবারির আঘাত থেকে রক্ষা করে, অনুরূপ সিয়াম মানুষকে অপরাধে লিপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করে।
(فَلَا يَرْفُثْ) ‘‘অশ্লীল কাজ করবে না’’ الرفث শব্দ দ্বারা বিভিন্ন অর্থ উদ্দেশ্য হয়। যেমন যৌনসঙ্গম, সঙ্গমের আবেদনমূলক কথাবার্তা। অধিকাংশ ‘আলিমদের মতে অত্র হাদীসে الرفث শব্দ দ্বারা অশ্লীল ও খারাপ কথাবার্তা উদ্দেশ্য। لَا يَصْخَبْ চিৎকার করবে না, অর্থাৎ- মূর্খদের মতো আচরণ করবে না। যেমন চিৎকার করা, ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা, বোকার মতো আচরণ করা, ঝগড়া-বিবাদ করা- এ সকল কাজ থেকে বিরত থাকবে।
(فَإِنْ سَابَّه أَحَدٌ أَوْ قَاتَلَه) ‘‘যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা তার সাথে ঝগড়া করতে চায়।’’ এখানে প্রশ্ন উত্থাপন হয় যে, قاتل শব্দটি বাবে مُفَاعَلَةٌ থেকে এসেছে যার অর্থ হল উভয় পক্ষ কোন কাজে শারীক হওয়া। অথচ সিয়াম পালনকারীকে এমন কাজ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। অতএব তার পক্ষ থেকে এমন কিছু সংঘটিত হবে না যা দ্বারা বুঝা যায় যে, সে এ কাজে অংশগ্রহণ করেছে।
জওয়াবঃ এখানে مُفَاعَلَةٌ দ্বারা উদ্দেশ্য এ কাজের জন্য প্রস্ত্তত হওয়া। অর্থাৎ- একপক্ষ যখন গালি দিবে অথবা অভিসম্পাত করবে তখন সায়িম বলবে, ‘আমি সায়িম’।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
১৯৬০-[৫] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন রমাযান (রমজান) মাসের প্রথম রাত হয়, শয়তান ও অবাধ্য জীনদেরকে বন্দী করা হয়। জাহান্নামের দরজাসমূহকে বন্ধ করে দেয়া হয়। এর একটিও খোলা রাখা হয় না। এদিকে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়। একটিও বন্ধ রাখা হয় না। আহবানকারী (মালাক বা ফেরেশতা) ঘোষণা দেন, হে কল্যাণ অনুসন্ধানকারী! আল্লাহর কাজে এগিয়ে যাও। হে অকল্যাণ ও মন্দ অনুসন্ধানী! (অকল্যাণ কাজ হতে) থেমে যাও। এ মাসে আল্লাহ তা’আলাই মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত করেন এবং এটা (রমাযান (রমজান) মাসের) প্রত্যেক রাতেই হয়ে থাকে। (তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِذَا كَانَ أَوَّلُ لَيْلَةٍ مِنْ شَهْرِ رَمَضَانَ صُفِّدَتِ الشَّيَاطِينُ وَمَرَدَةُ الْجِنِّ وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ النَّارِ فَلم يفتح مِنْهَا بَاب الْجَنَّةِ فَلَمْ يُغْلَقْ مِنْهَا بَابٌ وَيُنَادِي مُنَادٍ: يَا بَاغِيَ الْخَيْرِ أَقْبِلْ وَيَا بَاغِيَ الشَّرِّ أقصر ن وَلِلَّهِ عُتَقَاءُ مِنَ النَّارِ وَذَلِكَ كُلَّ لَيْلَةٍ . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: (مَرَدَةُ الْجِنِّ) ‘‘সীমালঙ্ঘনকারী জিন্।’’ مردة শব্দটি مارد এর বহুবচন। মুল্লা ‘আলী কারী (রহঃ) বলেন, مارد তাকে বলা হয় যার মধ্যে শুধুমাত্র খারাপী আছে কোন কল্যাণ নেই। দাড়ি গজায়নি এমন ব্যক্তিকে أمرد এজন্য বলা হয় যে, সে লোম তথা দাড়িমুক্ত। আর مارد হল কল্যাণমুক্ত।
(يَا بَاغِيَ الْخَيْرِ أَقْبِلْ) ‘‘কল্যাণকামী অগ্রসর হও’’ অর্থাৎ- কাজে আগ্রহী সাওয়াবের প্রত্যাশী অধিক ‘ইবাদাতে ব্রতী হয়ে আল্লাহমুখী হও।(أقصر) বিরত হও,(أقصر) শব্দটি (الاقصار) হতে উদগত। যার অর্থ সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোন কাজ থেকে বিরত থাকা। অর্থাৎ- হে গুনাহের প্রত্যাশী! তুমি গুনাহের কাজ থেকে ক্ষান্ত হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজের দিকে ফিরে আসো।
(ذٰلِكَ كُلَّ لَيْلَةٍ) ‘‘এটা প্রতি রাতেই।’’ অর্থাৎ- এ আহবান অথবা জাহান্নাম থেকে মুক্তি রমাযানের প্রতি রাতেই অব্যাহত থাকে।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
১৯৬১-[৬] ইমাম আহমাদ (রহঃ)-ও এক ব্যক্তি হতে বর্ণনা করেছেন। আর ইমাম তিরমিযী (রহঃ) বলেছেন, হাদীসটি গরীব।[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَرَوَاهُ أَحْمد عَن رجل وَقَالَ التِّرْمِذِيّ هَذَا حَدِيث غَرِيب
ব্যাখ্যা: (عَنْ رَجُلٍ) ‘‘এক ব্যক্তি থেকে।’’ অর্থাৎ- ইমাম আহমাদ উপরে বর্ণিত হাদীসটি এক সাহাবী হতে বর্ণনা করেছেন, কিন্তু তিনি তার নাম উল্লেখ করেননি। হাদীসটি ইমাম নাসায়ীও বর্ণনা করেছেন। উভয়েই ‘আত্বা সূত্রে ‘আরফাজাহ্ হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ আমি এক বাড়ীতে ছিলাম, তাতে ‘উতবাহ্ ইবনু ফারকদ উপস্থিত ছিলেন। হাদীস বর্ণনা করতে ইচ্ছা করেছিলাম, কিন্তু সেখানে একজন সাহাবী ছিলেন যিনি হাদীস বর্ণনা করার জন্য অধিক উপযোগী ছিলেন।
অতঃপর তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদীস বর্ণনা করলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রমাযান (রমজান) মাসে আকাশের দরজা খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়, সকল শয়তানদের বন্দী করা হয়। প্রতি রাতে এক আহবানকারী আহবান করতে থাকে, ‘‘হে কল্যাণকামী! এগিয়ে এসো, হে অকল্যাণকামী! বিরত হও।’’ সানাদের দিক থেকে হাদীসটি গরীব।
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
১৯৬২-[৭] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের জন্য রমাযানের বারাকাতময় মাস এসেছে। এ মাসে সওম রাখা আল্লাহ তোমাদের জন্য ফরয করে দিয়েছেন। এ মাসে আসমানের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয় এবং বন্ধ করে দেয়া হয় জাহান্নামের সব দরজা। এ মাসে বিদ্রোহী শয়তানগুলোকে কয়েদ করা হয়। এ মাসে একটি রাত আছে যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। যে ব্যক্তি এ রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো; সে অবশ্য অবশ্যই প্রত্যেক কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত রইল। (আহমদ ও নাসায়ী)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَتَاكُمْ رَمَضَانُ شَهْرٌ مُبَارَكٌ فَرَضَ اللَّهُ عَلَيْكُمْ صِيَامَهُ تُفْتَحُ فِيهِ أَبْوَابُ السَّمَاءِ وَتُغْلَقُ فِيهِ أَبْوَابُ الْجَحِيمِ وَتُغَلُّ فِيهِ مَرَدَةُ الشَّيَاطِينِ لِلَّهِ فِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ مَنْ حُرِمَ خَيْرَهَا فَقَدْ حُرِمَ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالنَّسَائِيُّ
ব্যাখ্যা: (لَيْلَةٌ خَيْرٌ) ‘‘একটি রাত এমন যা হাজার মাস থেকেও উত্তম’’। (مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ) অর্থাৎ- এ রাতের ‘ইবাদাত হাজার মাসের ‘ইবাদাতের চাইতেও অধিক মর্যাদাবান।
(فَقَدْ حُرِمَ) প্রকৃতই সে বঞ্চিত হল অর্থাৎ- সে সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল। এ থেকে উদ্দেশ্য পূর্ণ সাওয়াব অর্জন থেকে বঞ্চিত হল অথবা এমন ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হল যে ক্ষমা শুধু তাদের জন্য যারা এ রাত জেগে ‘ইবাদাতে মশগুল থাকে।
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
১৯৬৩-[৮] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সিয়াম এবং কুরআন বান্দার জন্য শাফা’আত করবে। সিয়াম বলবে, হে রব! আমি তাকে দিনে খাবার গ্রহণ করতে ও প্রবৃত্তির তাড়না মিটাতে বাধা দিয়েছি। অতএব তার ব্যাপারে এখন আমার শাফা’আত কবূল করো। কুরআন বলবে, হে রব! আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি। অতএব তার ব্যাপারে এখন আমার সুপারিশ গ্রহণ করো। অতঃপর উভয়ের সুপারিশই কবূল করা হবে। (বায়হাক্বী; শু’আবূল ’ঈমান)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: الصِّيَامُ وَالْقُرْآنُ يَشْفَعَانِ لِلْعَبْدِ يَقُولُ الصِّيَامُ: أَيْ رَبِّ إِنِّي مَنَعْتُهُ الطَّعَامَ وَالشَّهَوَاتِ بِالنَّهَارِ فَشَفِّعْنِي فِيهِ وَيَقُولُ الْقُرْآنُ: مَنَعْتُهُ النُّوْمَ بِاللَّيْلِ فَشَفِّعْنِي فِيهِ فيشفعان . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيّ فِي شعب الْإِيمَان
ব্যাখ্যা: (الصِّيَامُ وَالْقُرْاٰنُ يَشْفَعَانِ) ‘‘সিয়াম ও কুরআন উভয়ই সুপারিশ করবে।’’‘ আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ এখানে কুরআন দ্বারা রাতের সালাতের কিরাআত উদ্দেশ্য। পরবর্তী বক্তব্যে এ ইঙ্গিতই রয়েছে। বলা হয়েছে (يَقُولُ الْقُرْاٰنُ : مَنَعْتُهُ النُّوْمَ بِاللَّيْلِ) কুরআন বলবেঃ রাতের ঘুম থেকে আমি তাকে বিরত রেখেছি। অর্থাৎ- ‘‘কুরআন বলবে’’ সে রাত জেগে তাহাজ্জুদের সালাতে কুরআন তিলাওয়াত করেছে। এখানে এ সম্ভাবনা রয়েছে যে, কিয়ামাত দিবসে সিয়াম ও কুরআন উভয়কে শারীরিক রূপ দেয়া হবে। এ সম্ভাবনাও রয়েছে যে, মালাক (ফেরেশতা) প্রেরণ করা হবে যারা উভয়ের পক্ষ হয়ে কথা বলবে।
(فَيُشَفَّعَانِ) অতঃপর তাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হবে। ফলে আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। মুল্লা ‘আলী কারী বলেন, হয়ত বা রমাযানের সুপারিশ হবে গুনাহ ক্ষমা করার জন্য এবং কুরআনের সুপারিশ হবে মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য।
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
১৯৬৪-[৯] আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রমাযান (রমজান) মাস এলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, রমাযান (রমজান) মাস তোমাদের মাঝে উপস্থিত। এ মাসে রয়েছে এমন এক রাত, যা হাজার মাস অপেক্ষাও উত্তম। যে ব্যক্তি এ রাতের (কল্যাণ হতে) বঞ্চিত রয়েছে; সে এর সকল কল্যাণ হতেই বঞ্চিত। শুধু হতভাগ্যরাই এ রাতের কল্যাণ লাভ হতে বঞ্চিত থাকে। (ইবনু মাজাহ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ: دَخَلَ رَمَضَانُ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ هَذَا الشَّهْرَ قَدْ حَضَرَكُمْ وَفِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مَنْ أَلْفِ شَهْرٍ مَنْ حُرِمَهَا فَقَدْ حُرِمَ الْخَيْرَ كُلَّهُ وَلَا يُحْرَمُ خَيْرَهَا إِلَّا كل محروم» . رَوَاهُ ابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: (إِنَّ هٰذَا الشَّهْرَ قَدْ حَضَرَكُمْ) ‘‘এ (রমাযান (রমজান)) মাস তোমাদের নিকট উপস্থিত হয়েছে।’’ অতএব দিনে সিয়াম পালন করে এবং রাতে কিয়ামুল লায়ল তথা রাত জেগে সালাত আদায় করে এ মাস উপস্থিতিকে স্বার্থক করে নাও।
(لَا يُحْرَمُ خَيْرَهَا إِلَّا كُلُّ مَحْرُوْمٍ) ‘‘একমাত্র বঞ্চিতরাই এ রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়’’। অর্থাৎ- সৌভাগ্যের মধ্যে যার কোন অংশ নেই এবং ‘ইবাদাতের মধ্যে যার কোন উৎসাহ নেই একমাত্র সে ব্যক্তিই এ রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত।
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
১৯৬৫-[১০] সালমান আল ফারিসী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, শা’বান মাসের শেষ দিনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন, হে লোক সকল! একটি মহিমান্বিত মাস তোমাদেরকে ছায়া হয়ে ঘিরে ধরেছে। এ মাস একটি বারাকাতময় মাস। এটি এমন এক মাস, যার মধ্যে একটি রাত রয়েছে, যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। আল্লাহ এ মাসের সিয়াম ফরয করেছেন আর নফল করে দিয়েছেন এ মাসে রাতের কিয়ামকে। যে ব্যক্তি এ মাসে একটি নফল কাজ করবে, সে যেন অন্য মাসের একটি ফরয আদায় করল। আর যে ব্যক্তি এ মাসে একটি ফরয আদায় করেন, সে যেন অন্য মাসের সত্তরটি ফরয সম্পাদন করল। এ মাস সবরের (ধৈর্যের) মাস; সবরের সাওয়াব জান্নাত। এ মাস সহমর্মিতার। এ এমন এক মাস যাতে মু’মিনের রিযক বৃদ্ধি করা হয়। যে ব্যক্তি এ মাসে কোন সায়িমকে ইফতার করাবে, এ ইফতার তার গুনাহ মাফের কারণ হবে, হবে জাহান্নামের অগ্নিমুক্তির উপায়। তার সাওয়াব হবে সায়িমের অনুরূপ। অথচ সায়িমের সাওয়াব একটুও কমানো হবে না।
আমরা বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমাদের সকলে তো সায়িমের ইফতারীর আয়োজন করতে সমর্থ নয়। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ সাওয়াব আল্লাহ তা’আলা ঐ ইফতার পরিবেশনকারীকেও প্রদান করেন, যে একজন সায়িমকে এক চুমুক দুধ, একটি খেজুর অথবা এক চুমুক পানি দিয়ে ইফতার করায়। আর যে ব্যক্তি একজন সায়িমকে পেট ভরে খাইয়ে পরিতৃপ্ত করল, আল্লাহ তা’আলা তাকে আমার হাওযে কাওসার থেকে এভাবে পানি খাইয়ে পরিতৃপ্ত করবেন, যার পর সে জান্নাতে (প্রবেশ করার পূর্বে) আর পিপাসার্ত হবে না। এমনকি সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। এটা এমন এক মাস যার প্রথম অংশে রহমত। মধ্য অংশে মাগফিরাত, শেষাংশে জাহান্নামের আগুন থেকে নাজাত। যে ব্যক্তি এ মাসে তার অধিনস্তদের ভার-বোঝা সহজ করে দেবে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন। তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেবেন।[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَن سلمَان قَالَ: خَطَبَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي آخِرِ يَوْمٍ مِنْ شَعْبَانَ فَقَالَ: «يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ أَظَلَّكُمْ شَهْرٌ عَظِيمٌ مُبَارَكٌ شَهْرٌ فِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مَنْ أَلْفِ شهر جعل الله تَعَالَى صِيَامَهُ فَرِيضَةً وَقِيَامَ لَيْلِهِ تَطَوُّعًا مَنْ تَقَرَّبَ فِيهِ بخصلة من الْخَيْرِ كَانَ كَمَنْ أَدَّى فَرِيضَةً فِيمَا سِوَاهُ وَمَنْ أَدَّى فَرِيضَةً فِيهِ كَانَ كَمَنْ أَدَّى سَبْعِينَ فَرِيضَةً فِيمَا سِوَاهُ وَهُوَ شَهْرُ الصَّبْرِ وَالصَّبْر ثَوَابه الْجنَّة وَشهر الْمُوَاسَاة وَشهر يزْدَاد فِيهِ رِزْقُ الْمُؤْمِنِ مَنْ فَطَّرَ فِيهِ صَائِمًا كَانَ لَهُ مَغْفِرَةً لِذُنُوبِهِ وَعِتْقَ رَقَبَتِهِ مِنَ النَّارِ وَكَانَ لَهُ مِثْلُ أَجْرِهِ مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أَجْرِهِ شَيْءٌ» قُلْنَا: يَا رَسُولَ اللَّهِ لَيْسَ كلنا يجد مَا نُفَطِّرُ بِهِ الصَّائِمَ. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يُعْطِي اللَّهُ هَذَا الثَّوَابَ مَنْ فَطَّرَ صَائِمًا عَلَى مَذْقَةِ لَبَنٍ أَوْ تَمْرَةٍ أَوْ شَرْبَةٍ مِنْ مَاءٍ وَمَنْ أَشْبَعَ صَائِمًا سَقَاهُ اللَّهُ مِنْ حَوْضِي شَرْبَةً لَا يَظْمَأُ حَتَّى يَدْخُلَ الْجَنَّةَ وَهُوَ شَهْرٌ أَوَّلُهُ رَحْمَةٌ وَأَوْسَطُهُ مَغْفِرَةٌ وَآخِرُهُ عِتْقٌ مِنَ النَّارِ وَمَنْ خَفَّفَ عَنْ مَمْلُوكِهِ فِيهِ غَفَرَ الله لَهُ وَأعْتقهُ من النَّار» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيّ
ব্যাখ্যা: (خَطَبَنَا رَسُوْلُ اللّٰهِ) ‘‘আমাদের উদ্দেশে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবা দিলেন’’ এ খুতবা জুমার খুতবা হতে পারে অথবা সাধারণ নাসীহাতের খুতবাহ্ হতে পারে। (قَدْ أَظَلَّكُمْ) ‘‘তোমাদেরকে ছায়া দিয়েছে’’। অর্থাৎ- তোমাদের নিকট আগমন করেছে এবং তোমাদের নিকটবর্তী হয়েছে যেন তা তোমাদের ওপর ছায়া ফেলে। (شَهْرٌ عَظِيمٌ) একটি মহান মাস, অর্থাৎ- তার মর্যাদা মহান। কেননা তা সকল মাসের সরদার তথা সেরা মাস। (وَهُوَ شَهْرُ الصَّبْرِ) ‘‘তা সবরের মাস’’। কেননা এর সিয়াম পালন হয় দিনের বেলায় পানাহার থেকে সবর করার (বিরত থাকার) মাধ্যমে আর এর রাতের কিয়াম করা হয় রাত জাগার সব্রের মাধ্যমে। এজন্যই সওমকে সবর বলা হয়েছে।
(الصَّبْر ثَوَابُهُ الْجنَّةُ) ‘‘সবরের প্রতিদান হল জান্নাত’’ আল্লাহর আদিষ্ট কাজ পালনের এবং নিষিদ্ধ কাজ বর্জনের ধৈর্যের প্রতিদান হল জান্নাত। (شَهْرُ الْمُؤَاسَاةِ) ‘‘সহমর্মিতার মাস’’ অর্থাৎ- জীবিকাতে পরস্পরে অংশ গ্রহণ ও ভাগীদার হওয়ার মাস। এতে সকল মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শনদানের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে বিশেষভাবে দরিদ্র্ ও প্রতিবেশীর প্রতি দয়া প্রদর্শনের জন্য সতর্ক করা হয়েছে।
(مَنْ فَطَّرَ فِيهِ صَائِمًا) ‘‘যে ব্যক্তি এ মাসে সিয়াম পালন কারীকে ইফতার করালো’’ অর্থাৎ- ইফতারের সময় কিছু খাওয়ালো বা পান করালো হালাল উপার্জনের দ্বারা।
(مَذْقَةِ لَبَنٍ) পানি মিশ্রিত দুধ, অর্থাৎ- সাধ্যানুযায়ী কোন কিছু দ্বারা সায়িমকে ইফতার করতে সহযোগিতা করলে সে ব্যক্তি এ সাওয়াব অর্জন করবে। আর তৃপ্ত সহকারে খাওয়ালে ও পান করালে তার জন্য আরো বড় পুরস্কার তথা হাওযে কাওসার থেকে পানিয় পান করার সৌভাগ্য অর্জন করবে।
(مَنْ خَفَّفَ عَنْ مَمْلُوكِه فِيْهِ) যে ব্যক্তি এ মাসে তার দাসের কাজ হালকা করে দিবে, অর্থাৎ- রমাযান (রমজান) মাসে দাসের প্রতি দয়া পরশ হয়ে এবং রমাযানের সিয়াম পালন সহজকরণার্থে দাসের কাজ কমিয়ে দিবে। (غَفَرَ اللهُ لَه) আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিবেন। অর্থাৎ- ইতোপূর্বে সে যে গুনাহ করেছে তা তিনি ক্ষমা করে দিবেন।
(وَأعْتَقَه مِنَ النَّارِ) ‘‘এবং জাহান্নাম থেকে তাকে মুক্তি দিবেন’’ অর্থাৎ- কাজের কঠোরতা থেকে দাসকে মুক্তি দেয়ার প্রতিদান স্বরূপ আল্লাহ তাকে জাহান্নামের কঠিন শাস্তি থেকে মুক্তি দিবেন।
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
১৯৬৬-[১১] ইবনু ’আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রমাযান (রমজান) মাস শুরু হলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক বন্দীকে মুক্তি দিতেন এবং প্রত্যেক সাহায্যপ্রার্থীকে দান করতেন।[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا دَخَلَ شَهْرُ رَمَضَانَ أَطْلَقَ كُلَّ أَسِيرٍ وَأَعْطَى كُلَّ سَائِلٍ. رَوَاهُ الْبَيْهَقِيّ
ব্যাখ্যা: (أَطْلَقَ كُلَّ أَسِيرٍ) ‘‘সকল বন্দী মুক্ত করে দিতেন।’’ যদি প্রশ্ন করা হয় যে, কিভাবে সকল বন্দী মুক্ত করে দিতেন? অথচ কোন বন্দীর নিকট কারো অধিকার তথা প্রাপ্য থাকতে পারে।
জওয়াবঃ এখানে বন্দী থেকে উদ্দেশ্য সেই সমস্ত বন্দী যাদেরকে যুদ্ধের ময়দান থেকে বন্দী করে আনা হয়েছে। আর এদেরকে বন্দী করে রাখা বা মুক্তি করে দেয়া, অথবা মুক্তিপণ নেয়া বা গোলাম করে রাখা- এ সকল বিষয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইচ্ছাধীন। আর তাদের মধ্যে এমন কেউ ছিল না যাদের ওপর কারো কোন অধিকার বা পাওনা ছিল। আর পাওনা থেকে থাকলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাওনাদারকে রাযী করিয়ে বন্দী মুক্ত করে দিতেন।
(وَأَعْطٰى كُلَّ سَائِلٍ) ‘‘প্রত্যেক সওয়ালকারীকে দান করতেন।’’ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনিতে কোন সওয়ালকারীকে বঞ্চিত করতেন না। বিশেষ করে রমাযান (রমজান) মাসে তার সাধারণ অভ্যাসের চেয়েও অধিক দান করতেন।
হাদীসের শিক্ষাঃ
১. রমাযান (রমজান) মাসে দাসমুক্ত করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে।
২. এ মাসে দরিদ্রদের প্রতি বিশেষ দানের মাধ্যমে তাদের জীবনে স্বচ্ছলতা আনয়নের প্রচেষ্টা করা।
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
১৯৬৭-[১২] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রমাযানকে স্বাগত জানাবার জন্য বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জান্নাতকে সাজানো হতে থাকে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, বস্তুত যখন রমাযানের প্রথম দিন শুরু হয়, ’আরশের নীচে জান্নাতের গাছপালার পাতাগুলো হতে ’’হূরিল ’ঈন’’-এর মাথার উপর বাতাস বইতে শুরু করে। তারপর হূরিল ’ঈন বলতে থাকে, হে আমাদের রব! তোমার বান্দাদেরকে আমাদের স্বামী বানিয়ে দাও। তাদের সাহচর্যে আমাদের আঁখি যুগল ঠাণ্ডা হোক আর তাদের চোখ আমাদের সাহচর্যে শীতল হোক। (উপরোক্ত তিনটি হাদীস ইমাম বায়হাক্বী তাঁর ’’শু’আবূল ঈমান’’-এ বর্ণনা করেছেন)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّ الْجَنَّةَ تُزَخْرَفُ لِرَمَضَانَ مِنْ رَأْسِ الْحَوْلِ إِلَى حَوْلِ قَابِلٍ» . قَالَ: فَإِذَا كَانَ أَوَّلُ يَوْمٍ مِنْ رَمَضَانَ هَبَّتْ رِيحٌ تَحْتَ الْعَرْشِ مِنْ وَرَقِ الْجَنَّةِ عَلَى الْحُورِ الْعِينِ فَيَقُلْنَ: يَا رَبِّ اجْعَلْ لَنَا مِنْ عِبَادِكَ أَزْوَاجًا تَقَرَّ بِهِمْ أَعْيُنُنَا وَتَقَرَّ أَعْيُنُهُمْ بِنَا . رَوَى الْبَيْهَقِيُّ الْأَحَادِيثَ الثَّلَاثَةَ فِي شُعَبِ الْإِيمَانِ
ব্যাখ্যা: (إِنَّ الْجَنَّةَ تُزَخْرَفُ لِرَمَضَانَ) ‘‘রমাযান (রমজান) উপলক্ষে জান্নাতকে সজ্জিত করা হয়’’ অর্থাৎ- রমাযান (রমজান) মাস আগমন উপলক্ষে জান্নাত সজ্জিত করা হয়।
ইবনু হাজার বলেনঃ সম্ভবতঃ এখানে বৎসরের শুরু হতে শাওয়াল মাস উদ্দেশ্য। মালায়িকাহ্ (ফেরেশতা) (ফেরেশতাগণ) শাওয়াল মাসের শুরু থেকে প্রথম রমাযান (রমজান) আগমন পর্যন্ত জান্নাত সজ্জিত করতে থাকে।
অতঃপর জান্নাতের দরজা খুলে দেয়া হয় যাতে অন্যান্য মালায়িকাহ্ (ফেরেশতা) তা অবলোকন করতে পারে যা ইতোপূর্বে অবলোকন করেনি। (تَحْتَ الْعَرْشِ) ‘আরশের নীচে। অর্থাৎ- জান্নাতের মধ্যে বায়ু প্রবাহিত হয়। কেননা জান্নাতের ছাদ হলো মহান আল্লাহর ‘আরশ।
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
১৯৬৮-[১৩] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ তাঁর উম্মাতকে রমাযান (রমজান) মাসের শেষ রাতে মাফ করে দেয়া হয়। নিবেদন করা হলো, হে আল্লাহর রসূল! সেটা কি লায়লাতুল কদরের রাত? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, না। বরং ’আমলকারী যখন নিজের ’আমল শেষ করে তখনই তার বিনিময় তাকে মিটিয়ে দেয়া হয়। (আহমদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: «يُغْفَرُ لِأُمَّتِهِ فِي آخِرِ لَيْلَةٍ فِي رَمَضَانَ» . قِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَهِيَ لَيْلَةُ الْقَدْرِ؟ قَالَ: «لَا وَلَكِنَّ الْعَامِلَ إِنَّمَا يُوَفَّى أجره إِذا قضى عمله» . رَوَاهُ أَحْمد
ব্যাখ্যা: (يُغْفَرُ لِأُمَّتِه) তাঁর উম্মাতদেরকে ক্ষমা করা হয়। অর্থাৎ- নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উম্মাতদের মধ্যে থেকে সমস্ত সিয়াম পালনকারীকে রমাযানের শেষ রাতে ক্ষমা করা হয়। এ ক্ষমা থেকে পূর্ণাঙ্গ ক্ষমা উদ্দেশ্য।
(قَالَ: لَا) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ না। অর্থাৎ- এ ক্ষমা লায়লাতুল কদরের কারণে নয়। বরং এর কারণ এই যে, তা রমাযানের শেষ রাত। আর ‘আমলকারীকে ‘আমল সম্পাদন করার পরেই তার প্রাপ্য দেয়া হয়। ফলে সিয়াম সম্পাদনকারীকে তার কাজ শেষে তার প্রাপ্য পুরস্কার ক্ষমা প্রদান করা হয়।
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - নতুন চাঁদ দেখার বর্ণনা
আযহারী বলেনঃ চন্দ্র মাসের প্রথম দু’ দিনের চাঁদকে হিলাল বলে। অনুরূপভাবে ২৬ ও ২৭ তারিখের চাঁদকেও হিলাল বলা হয়।
জাওহারী বলেনঃ মাসের প্রথম তিন রাতের চাঁদকে হিলাল বলা হয়, এর পরের বাকী দিনগুলোর চাঁদকে কমার বলা হয়।
১৯৬৯-[১] ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা চাঁদ না দেখা পর্যন্ত সওম (রোযা) পালন করবে না এবং তা না দেখা পর্যন্ত সওম শেষ (ভঙ্গ) করবে না। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় তোমরা যদি চাঁদ না দেখতে পাও তাহলে (শা’বান) মাস ত্রিশ দিন পূর্ণ করো (অর্থাৎ- এ মাসকে ত্রিশ দিন হিসেবে গণ্য করো)।
অপর বর্ণনায় আছেঃ তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ মাস ঊনত্রিশ রাতেও হয়। তাই চাঁদ না দেখা পর্যন্ত সওম পালন করবে না। যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে তাহলে মাসের ত্রিশ দিন পূর্ণ করো। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ رُؤْيَةِ الْهِلَالِ
عَنْ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تَصُومُوا حَتَّى تَرَوُا الْهِلَالَ وَلَا تُفْطِرُوا حَتَّى تَرَوْهُ فَإِنْ غُمَّ عَلَيْكُمْ فَاقْدِرُوا لَهُ» . وَفِي رِوَايَةٍ قَالَ: «الشَّهْرُ تِسْعٌ وَعِشْرُونَ لَيْلَةً فَلَا تَصُومُوا حَتَّى تَرَوْهُ فَإِنْ غُمَّ عَلَيْكُمْ فَأَكْمِلُوا الْعِدَّةَ ثَلَاثِينَ»
ব্যাখ্যা: (لَا تَصُوْمُوْا) ‘‘তোমরা সওম পালন করবে না’’ অর্থাৎ- শা‘বান মাসের ঊনত্রিশ তারিখ শেষে ত্রিশ তারিখের রাতে রমাযানের চাঁদ দেখা না গেলে রমাযানের সওম পালন শুরু করবে না।
(حَتّٰى تَرَوُا الْهِلَالَ) ‘‘রমাযানের চাঁদ দেখার আগেই’’ অর্থাৎ- শা‘বান মাস ত্রিশ দিন পূর্ণ হওয়ার আগেই রমাযানের চাঁদ না দেখে রমাযানের সিয়াম পালন করবে না। তবে শা‘বান মাস ত্রিশ দিন পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর রমাযানের চাঁদ দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। হাদীসের প্রকাশমান অর্থ এই যে, সিয়াম পালন করার জন্য প্রত্যেকেরই চাঁদ দেখা শর্ত। কিন্তু এক্ষেত্রে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত এই যে, এটা ওয়াজিব নয়। বরং কতক লোকের চাঁদ দেখাই যথেষ্ট। অতএব হাদীসের অর্থ এই যে, তোমাদের নিকট চাঁদ দেখা সাব্যস্ত হলে তোমরা সিয়াম পালন শুরু করবে।
হাদীস থেকে এটাও বুঝা যায় যে, চাঁদ দেখা সাব্যস্ত হওয়ার সময় থেকেই সিয়াম শুরু করতে হবে। কিন্তু ‘আমলে তা উদ্দেশ্য নয়। বরং চাঁদ দেখা সাব্যস্ত হওয়ার পর সিয়াম শুরুর সময় অর্থাৎ- ফজরের সময় থেকে সিয়াম পালন শুরু হবে।
এ হাদীস দ্বারা প্রমাণ উপস্থাপন করা হয় যে, পৃথিবীর কোন এক অঞ্চলে চাঁদ দেখা গেলে সকল অঞ্চলের লোকের ওপর সিয়াম পালন করা আবশ্যক। কেননা সিয়াম পালনের জন্য সকলের চাঁদ দেখা শর্ত নয়। অতএব কোন এক অঞ্চলে চাঁদ দেখা সাব্যস্ত হলেই সকল মুসলিমের ওপর সিয়াম পালন আবশ্যক সে যে অঞ্চলেরই হোক না কেন।
এ বিষয়ে ‘উলামাগণের মতভেদ রয়েছে।
১. প্রত্যেক অঞ্চলের লোকদের জন্য পৃথকভাবে চাঁদ দেখা জরুরী। সহীহ মুসলিমে কুরায়ব সূত্রে ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীস, এ অভিমতের সাক্ষ্য বহন করে। ‘ইকরিমাহ্, কাসিম, সালিম, ইসহাক এবং শাফি‘ঈদের একটি অভিমত এ রকম।
২. কোন এক অঞ্চলে চাঁদ দেখা সাব্যস্ত হলেই সব অঞ্চলের লোকের ওপর সিয়াম পালন করা আবশ্যক। মালিকী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত এটিই। ইমাম কুরতুবী বলেনঃ আমাদের শায়খগণ বলেন যে, কোন জায়গায় যদি অকাট্যভাবে চাঁদ দেখা সাব্যস্ত হয়, অতঃপর এ সংবাদ দু’জন সাক্ষীর মাধ্যমে অন্যত্র পৌঁছে যায় যেখানে চাঁদ দেখা যায়নি তাদের বেলায়ও সিয়াম পালন আবশ্যক।
ইবনু মাজিশূন বলেন, যে অঞ্চলের লোকেরা চাঁদ দেখেছে তাদের জন্য তো সিয়াম আবশ্যক, কিন্তু যারা চাঁদ দেখতে পারেনি তাদের অঞ্চলে সাক্ষীর মাধ্যমে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছলেও তাদের জন্য সিয়াম পালন আবশ্যক নয়। তবে যদি ইমামে আ‘যম তথা খলীফার নিকট চাঁদ দেখা সাব্যস্ত হয় তাহলে সকলের জন্যই সিয়াম পালন আবশ্যক। কেননা খলীফার ক্ষেত্রে সকল দেশই একটি বলে গণ্য যেহেতু তাঁর নির্দেশ সকলের জন্যই প্রযোজ্য।
৩. কিছু শাফি‘ঈদের মতে যদি দেশসমূহ পরস্পর নিকটবর্তী হয়, তাহলে এক দেশের চাঁদ দেখা পার্শ্ববর্তী দেশের জন্য প্রযোজ্য হবে আর দূরবর্তী দেশের জন্য তা প্রযোজ্য নয়।
৪. মুহাক্কিক হানাফী, মালিকী ও অধিকাংশ শাফি‘ঈদের অভিমতে যদি দুই দেশের দূরত্ব এত নিকটবর্তী হয় যে, যাতে উদয়স্থলের কোন ভিন্নতা না থাকে যেমন বাগদাদ ও বাসরা- তাহলে এমন দুই দেশের মধ্যে একদেশে চাঁদ দেখা গেলে তা অন্য দেশের জন্যও প্রযোজ্য হবে। আর যদি দুই দেশের মধ্যে এত দূরত্ব হয় যাতে উদয়স্থলের ভিন্নতা থাকে তাহলে একদেশে চাঁদ দেখা গেলে অন্য দেশের জন্য তা প্রযোজ্য নয়; যেমন- ইরাক ও হিজায। এক্ষেত্রে তাদের প্রত্যেকের নিজ নিজ দেশের জন্য চাঁদ দেখা যাওয়া আবশ্যক। আর উদয়স্থলের ভিন্নতার জন্য কমপক্ষে এক মাসের দূরত্ব হওয়া প্রয়োজন। ইমাম যায়লা‘ঈ কানয-এর ভাষ্য গ্রন্থে বলেন, অধিকাংশ শায়খদের নিকট উদয়স্থলের ভিন্নতা ধর্তব্য নয়। তবে তা ধর্তব্যে আনা অধিক যুক্তিযুক্ত। কেননা চাঁদ থেকে সূর্যের আলো পৃথক হওয়া দেশের ভিন্নতার কারণেই ভিন্ন হয়ে থাকে। মুসলিমে বর্ণিত কুরায়ব বর্ণিত হাদীস এর পক্ষে দলীল।
আমি (মুবারকপূরী) বলছিঃ সওম শুরু ও শেষ করার ক্ষেত্রে উদয়স্থলের ভিন্নতাকে গ্রহণ না করে কোন উপায় নেই। কেননা প্রতিদিনের সিয়াম ও সালাতের ক্ষেত্রে তা সকলের ঐকমত্যে তা প্রযোজ্য। প্রতিদিনের ক্ষেত্রে যা প্রযোজ্য, মাস শুরু ও শেষ হওয়ার ক্ষেত্রেও তা আবশ্যিকভাবেই প্রযোজ্য। এ থেকে পালাবার কোন জায়গা বা উপায় নেই।
পশ্চিমের কোন দেশের চাঁদ দেখা গেলে পূর্বদেশের কত দূরত্বের জন্য তা প্রযোজ্য এ নিয়ে ‘আলিমদের মাঝে মতভেদ রয়েছে।
১. অধিকাংশ ফুকাহাদের মতে একমাসের দূরত্বের পূর্ব দেশের জন্য তা প্রযোজ্য। যেমনটি পূর্বে উল্লেখিত হয়েছে।
২. পাঁচশত ষাট মাইল পূর্ব পর্যন্ত তা প্রযোজ্য, কেননা আকাশে চাঁদ দেখা যাওয়ার পর তা যদি বত্রিশ মিনিট স্থায়ী হয়, অর্থাৎ- চাঁদ উদয় হওয়ার বত্রিশ মিনিট পরে যদি তা অস্ত যায় তাহলে চাঁদ দিগন্তে এতটুকু উপরে থাকে যে, তা পাঁচশত ষাট মাইল পূর্বে অবস্থিত এলাকা দেখে তা দেখা যাবে যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন না থাকে। অতএব এটা সাব্যস্ত হল যে, পশ্চিমের কোন দেশে চাঁদ দেখা গেলে তা পাঁচশত ষাট মাইল পূর্বে অবস্থিত দেশের জন্য তা প্রযোজ্য হবে। আর পূর্বে অবস্থিত কোন দেশে চাঁদ দেখা গেলে পশ্চিমে অবস্থিত সকলের জন্য তা প্রযোজ্য হবে।
(وَلَا تُفْطِرُوْا حَتّٰى تَرَوْهُ) আর তা না দেখে সিয়াম ভঙ্গ করো না, অর্থাৎ- শাওয়ালের চাঁদ না দেখে রমাযানের সিয়াম পালন করা পরিত্যাগ করবে না।
(فَإِنْ غُمَّ عَلَيْكُمْ) চাঁদ যদি ঢাকা পরে যায় অর্থাৎ আকাশে মেঘ থাকার কারণে যদি ত্রিশ তারিখের রাতে শাওয়ালের চাঁদ দেখা না যায়। (فَاقْدِرُوْا لَه) তাহলে তা নির্ধারণ করে নাও। অর্থাৎ তাহলে রমাযান (রমজান) মাস ত্রিশ দিন নির্ধারণ কর। অতঃপর চাঁদ দেখা যাক অথবা দেখা না যাক সিয়াম পালন পরিত্যাগ কর।
কেননা চন্দ্রমাস ত্রিশ দিনের বেশী হয় না।
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - নতুন চাঁদ দেখার বর্ণনা
১৯৭০-[২] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা সওম পালন করো চাঁদ দেখে এবং ছাড়ো (ভঙ্গ করো) চাঁদ দেখে। যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে তাহলে শা’বান মাসের ত্রিশ দিন পূর্ণ করো। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ رُؤْيَةِ الْهِلَالِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «صُومُوا لِرُؤْيَتِهِ وَأَفْطِرُوا لِرُؤْيَتِهِ فَإِنْ غم عَلَيْكُم فَأَكْمِلُوا عِدَّةَ شَعْبَانَ ثَلَاثِينَ»
ব্যাখ্যা: (وَأَفْطِرُوْا لِرُؤْيَتِه) চাঁদ দেখে সিয়াম পরিত্যাগ করবে, অর্থাৎ শাওয়ালের চাঁদ দেখে রমাযানের সিয়াম পরিত্যাগ করবে তথা ঈদুল ফিতর উদযাপন করবে।
(فَأَكْمِلُوْا عِدَّةَ شَعْبَانَ ثَلَاثِيْنَ) শা‘বান মাসের গণনা ত্রিশ দিন পূর্ণ কর, অর্থাৎ- ত্রিশ তারিখের রাতে যদি রমাযানের চাঁদ দেখা না যায় তাহলে শা‘বান মাস ত্রিশ দিন পূর্ণ করে রমাযানের সিয়াম শুরু করবে তার আগে নয়। এ হুকুম রমাযানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য যা পূর্বের হাদীসে আলোচনা করা হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - নতুন চাঁদ দেখার বর্ণনা
১৯৭১-[৩] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমরা উম্মি জাতি। হিসাব-কিতাব জানি না, কোন মাস এত, এত, এত (অর্থাৎ- কোন মাস এভাবে বা এভাবে এভাবে হয়।) তিনি তৃতীয়বারে বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ করলেন। তারপর বললেন, মাস এত দিনে, এত দিনে এবং এত দিনে অর্থাৎ- পুরা ত্রিশ দিনে হয়। অর্থাৎ- কখনো মাস ঊনত্রিশ আবার কখনো ত্রিশ দিনে হয়। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ رُؤْيَةِ الْهِلَالِ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَنَا أمة أُميَّة لَا تكْتب وَلَا تحسب الشَّهْرُ هَكَذَا وَهَكَذَا وَهَكَذَا» . وَعَقَدَ الْإِبْهَامَ فِي الثَّالِثَةِ. ثُمَّ قَالَ: «الشَّهْرُ هَكَذَا وَهَكَذَا وَهَكَذَا» . يَعْنِي تَمَامَ الثَّلَاثِينَ يَعْنِي مَرَّةً تِسْعًا وَعِشْرِينَ وَمرَّة ثَلَاثِينَ
ব্যাখ্যা: (نَكْتُبُ وَلَا نَحْسُبُ) ‘‘আমরা লিখতে জানি না এবং হিসাব করতে জানি না’’ অর্থাৎ- আমরা চন্দ্রের গতিপথ সম্পর্কে অবহিত নই, এর হিসাব আমরা জানি না। অতএব সিয়াম পালনে এবং আমাদের অন্যান্য ‘ইবাদাতের ক্ষেত্রে আমরা হিসাব ও লেখার উপর নির্ভর করতে বাধ্য নই। বরং আমাদের ‘ইবাদাত এমন স্পষ্ট আলামতের উপর নির্ভারশীল যাতে হিসাব অভিজ্ঞ ও অনভিজ্ঞ উভয়েই সমান। অত্র হাদীসে হিসাব দ্বারা উদ্দেশ্য নক্ষত্রের গতিপথ। ‘আরবরা এ হিসাবে অনভিজ্ঞ ছিল। তাই তাদের সওম ও অন্যান্য ‘ইবাদাত পালনের ক্ষেত্রে চাঁদ দেখার উপর নির্ভরশীল করা হয়েছে হিসাবের উপর নয়। যাতে তারা এ হিসাবে কষ্ট থেকে পরিত্রাণ পায়।
(وَعَقَدَ الْإِبْهَامَ فِى الثَّالِثَةِ) ‘‘তৃতীয়বারে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একটি বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ করে রাখলেন।’’ এতে সংখ্যা ঊনত্রিশ হল। অর্থাৎ- তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হাতের ইশারায় বুঝালেন যে, চন্দ্র মাস ত্রিশ দিনেও হয় আবার কখনো উনত্রিশ দিনেও হয়।
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - নতুন চাঁদ দেখার বর্ণনা
১৯৭২-[৪] আবূ বকরা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ঈদের দু’ মাস, রমাযান (রমজান) ও যিলহজ কম হয় না। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ رُؤْيَةِ الْهِلَالِ
وَعَنْ أَبِي بَكْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: شَهْرَا عِيدٍ لَا يَنْقُصَانِ: رَمَضَانُ وَذُو الْحِجَّةِ
ব্যাখ্যা: (شَهْرَا عِيْدٍ) ‘‘দুই ঈদের মাস’’ অর্থাৎ- রমাযান (রমজান) মাস ও যিলহজ মাস। হাফেয ইবনু হাজার বলেনঃ রমাযান (রমজান) মাসকে ঈদের মাস এজন্য বলা হয়েছে যে, রমাযান (রমজান) উপলক্ষেই ঈদ অনুষ্ঠিত হয়। যদিও তা শাওয়াল মাসে তবুও তা রমাযানের অব্যবহিত পরেই এবং রমাযানের পাশাপাশি।
(لَا يَنْقُصَانِ) ‘‘কম হয় না’’ অর্থাৎ- ঈদের দুই মাস কম না হওয়াতে কি উদ্দেশ্য? তা নিয়ে ‘উলামাগণের মাঝে ভিন্নমত পরিলক্ষিত হয়।
১. এর ফাযীলাত বা মর্যাদার কোন কমতি হয় না যদিও মাস ত্রিশ বা উনত্রিশ দিনে হয়। ইসহাক ইবনু রাহওয়াইহি বলেনঃ যদিও এ দুই মাসে দিনের সংখ্যা কমে উনত্রিশ দিনে হয় তবুও সাওয়াবের ক্ষেত্রে তা ত্রিশ দিনেরই সমান। রমাযান (রমজান) মাস ঊনত্রিশ দিনে হলে এর সাওয়াব ত্রিশ দিনের সাওয়াবের সমান। এর অভিমতটিই অধিক গ্রহণযোগ্য।
২. এ দুই মাসে এমন বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা অন্য মাসে নেই। এর অর্থ এ নয় যে, দুই মাসের সাওয়াব কম হয় না বরং অন্য মাসে সাওয়াব কম হয় মাসের দিনের সংখ্যা কম হওয়ার কারণে।
৩. যদিও দিনের সংখ্যা কম হওয়ার কারণে বাহ্যিক দৃষ্টিতে তাতে কমতি আছে বলে মনে হয় কিন্তু তা দু’টি মহান ঈদের মাস হওয়ার কারণে তাকে কমতি বলা যায় না যেমন অন্যান্য মাসের বেলায় বলা যায়।
৪. সাধারণত একই বৎসরে এ দুইমাস কম হয় না অর্থাৎ- ঊনত্রিশ দিনে হয় না বরং একমাস ঊনত্রিশ দিনে হলে আরেক মাস ত্রিশ দিনে হবে। যদিও হঠাৎ কোন বৎসরে এ দু’ মাসই ঊনত্রিশ দিনে হয়ে থাকে।
৫. প্রকৃতপক্ষে তো এ দুইমাস একই বৎসরে ঊনত্রিশ দিনে হয় না তবে যদি মাসের শুরুতে আকাশে মেঘ থাকার কারণে চাঁদ দেখা না যেয়ে থাকে তাহলে ভিন্ন কথা।
৬. রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ বক্তব্য বিশেষ করে ঐ বৎসরের জন্য প্রযোজ্য, যে বৎসর তিনি এ বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন।
৭. প্রতিদানের ক্ষেত্রে আল্লাহর নিকট এ দুই মাস সমান। মাস ঊনত্রিশ দিনেই হোক আর ত্রিশ দিনেই হোক। আর তা শীতকালে হওয়ার কারণে দিন ছোট হোক কিংবা গরমকালে হওয়ার কারণে দিন বড় হোক, যাই হোক না কেন আল্লাহর নিকট এ মাসে ‘আমলের সাওয়াব একই মর্যাদা সম্পন্ন।
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - নতুন চাঁদ দেখার বর্ণনা
১৯৭৩-[৫] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যেন রমাযান (রমজান) মাস আসার এক কি দু’দিন আগে থেকে সওম (রোযা) না রাখে। তবে যে ব্যক্তি কোন দিনে সওম রাখতে অভ্যস্ত সে ওসব দিনে সওম রাখতে পারে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ رُؤْيَةِ الْهِلَالِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَتَقَدَّمَنَّ أَحَدُكُمْ رَمَضَانَ بِصَوْمِ يَوْمٍ أَوْ يَوْمَيْنِ إِلَّا أَنْ يَكُونَ رَجُلٌ كَانَ يَصُوم صوما فليصم ذَلِك الْيَوْم»
ব্যাখ্যা: (...لَا يَتَقَدَّمَنَّ أَحَدُكُمْ رَمَضَانَ بِصَوْمِ) ‘‘তোমাদের কেউ যেন রমাযানের মাস শুরু হওয়ার এক দিন বা দু’দিন আগেই সিয়াম পালন করে না।’’ অর্থাৎ- রমাযান (রমজান) শুরু হলো কিনা এ সন্দেহের বশবর্তী হয়ে রমাযান (রমজান) মাসের চাঁদ দেখা না গেলে অথবা শা‘বান মাস ত্রিশ দিন পূর্ণ না হলে রমাযানের সিয়ামের নিয়্যাতে সিয়াম পালন করবে না। হাদীসে (أَوْ يَوْمَيْنِ) অথবা দু’দিন আগের জন্য বলা হয়েছে যে, সন্দেহ দুই দিনের মধ্যেও হতে পারে। পরস্পর দুই-তিন মাস যদি আকাশে মেঘ থাকার কারণে মাসের শুরুতে চাঁদ দেখা না যায় এবং প্রতিটি মাস ত্রিশ দিন পূর্ণ করে পরবর্তী মাস গণনা করা হয়, তাহলে রমাযান (রমজান) মাস দু’দিন আগে শুরু হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। তাই সন্দেহ দুই দিনেরও হতে পারে। তাই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সন্দেহের বশবর্তী হয়ে রমাযান (রমজান) শুরু হওয়ার এক বা দুই দিন আগেই রমাযানের সিয়াম শুরু করবে না।
তবে কোন ব্যক্তি যদি রমাযান (রমজান) শুরু হওয়ার আগের দিনে নিয়মিত কোন সিয়াম পালন করার অভ্যাস থাকে এবং সেই নিয়্যাতে সিয়াম পালন করে তবে তার জন্য তা বৈধ। যেমন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি বৃহস্পতিবার এবং সোমবার সিয়াম পালন করতেন। কোন ব্যক্তি নিয়মিত এ দুই দিন সিয়াম পালন করে থাকেন এবার এমন হল যে, আকাশে মেঘ থাকার কারণে চাঁদ দেখা না যাওয়ায় সোমবার ত্রিশে শা‘বান হওয়ার সম্ভাবনা যে রকম এ রকম ১লা রমাযান (রমজান) হওয়ার সম্ভাবনাও বিদ্যমান। এখন ঐ ব্যক্তি এই সোমবার যদি রমাযানের সিয়াম পালনের নিয়্যাত না করে তার অভ্যাসগত নিয়মিত সিয়াম পালনের নিয়্যাতে সিয়াম পালন করে তবে তা বৈধ।
হাদীসের শিক্ষাঃ রমাযান (রমজান) শুরু হওয়ার একদিন বা দু’দিন পূর্বে সিয়াম পালন করা হারাম। এ নিষেধাজ্ঞার কারণ কি তা নিয়ে ‘উলামাগণের মাঝে মতভেদ রয়েছে।
১. রমাযানের মধ্যে ঐ সিয়াম বৃদ্ধি করার আশংকা যা মূলত রমাযানের সিয়াম নয়।
২. রমাযানের সিয়াম পালনের জন্য শক্তি অর্জন। কেননা পূর্ব থেকেই ধারাবাহিকভাবে সিয়াম পালন করার ফলে ফরয সিয়াম পালনে দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
৩. ফরয ও নফল সিয়ামের মধ্যে সংমিশ্রণের আশংকা।
৪. আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নির্দেশের উপর বাড়াবাড়ি করা। কেননা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযান (রমজান) শুরু করার জন্য চাঁদ দেখা শর্ত করেছেন। যিনি চাঁদ না দেখেই রমাযানের সিয়াম শুরু করলেন তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ নির্দেশ অমান্য করলেন এবং তা যথেষ্ট মনে করলেন না। তাই তিনি যেন এ নির্দেশের উপর দোষারোপ করলেন। হাফেয ইবনু হাজার বলেন, সর্বশেষ এ অভিমতটিই গ্রহণযোগ্য।
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নতুন চাঁদ দেখার বর্ণনা
১৯৭৪-[৬] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শা’বান মাসের অর্ধেক সময় অতিবাহিত হয়ে গেলে তোমরা সওম পালন করবে না। (আবূ দাঊদ, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, দারিমী)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا انْتَصَفَ شَعْبَانُ فَلَا تَصُومُوا» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالتِّرْمِذِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ وَالدَّارِمِيُّ
ব্যাখ্যা: (إِذَا انْتَصَفَ شَعْبَانُ فَلَا تَصُوْمُوْا) ‘‘শা‘বান মাসের অধিক পূর্ণ হলে আর সিয়াম পালন করবে না।’’ আল কারী বলেনঃ এ নিষেধাজ্ঞা দ্বারা এ সময়ে সিয়াম পালন করা মাকরূহ উদ্দেশ্য, হারাম উদ্দেশ্য নয় যাতে লোকজন এ সিয়াম পালনের মাধ্যমে দুর্বল হয়ে ফরয সিয়াম পালনে ব্যাঘাত না ঘটে তাই শারী‘আত প্রণেতা উম্মাতের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে এ নিষেধাজ্ঞা জারী করেছেন। অতএব যে ব্যক্তি শা‘বান মাসে সিয়াম পালন করার পরও স্বাচ্ছন্দ্যে রমাযানের সিয়াম পালন করতে পারে তার জন্য এ নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য নয়। তাইতো নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শা‘বান ও রমাযান (রমজান) এ দুই মাসে একত্রে সিয়াম পালন করেছেন। তবে যারা এ হাদীসটি দুর্বল বলেছেন, অতএব এ মাসে সিয়াম পালন মাকরূহ নয়- তাদের বক্তব্য সঠিক নয় এজন্য যে, এ হাদীসটি সহীহ। কেননা এ হাদীসের এক রাবী ‘আলা ইবনু ‘আবদুর রহমান যদিও তার সম্পর্কে সমালোচনা রয়েছে তা সত্ত্বেও ইমাম মালিক, ইমাম মুসলিম তার বর্ণিত হাদীস গ্রহণ করেছেন। ইমাম বুখারীও তার একক বর্ণিত হাদীস গ্রহণ করেছেন। অতএব হাদীসটি সহীহ। আল্লাহ অধিক অবগত আছেন।
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নতুন চাঁদ দেখার বর্ণনা
১৯৭৫-[৭] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রমাযান (রমজান) মাসের জন্য শা’বান মাসের (নতুন চাঁদের) হিসাব রেখ। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أحصوا هِلَال شعْبَان لرمضان» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: (أَحْصُوْا هِلَالَ شَعْبَانَ لِرَمَضَانَ) রমাযানের উদ্দেশে শা‘বানের চাঁদ গণনা কর। অর্থাৎ রমাযান (রমজান) কখন শুরু হবে তা জানার উদ্দেশে শা‘বান মাসের শুরুকাল এবং তার তারিখসমূহ ভালভাবে গণনা কর। যাতে সহজেই রমাযানের শুরু অবহিত হতে পার।
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নতুন চাঁদ দেখার বর্ণনা
১৯৭৬-[৮] উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কক্ষনো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে শা’বান ও রমাযান (রমজান) ছাড়া একাধারে দু’ মাস সিয়াম পালন করতে দেখিনি। (আবূ দাঊদ, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَن أم سَلمَة قَالَتْ: مَا رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُومُ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ إِلَّا شَعْبَانَ وَرَمَضَانَ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالتِّرْمِذِيُّ وَالنَّسَائِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ
ব্যাখ্যা: নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্ণ শা‘বান মাস অথবা শা‘বান মাসের অধিকাংশ সময় সিয়াম পালন করতেন। এ হাদীস এবং পূর্বে বর্ণিত হাদীস। ‘‘অর্ধ শা‘বানের পর সিয়াম পালন করবে না।’’ হাদীসদ্বয়ের সাথে বাহ্যিকভাবে সাংঘর্ষিক মনে হয়। ইমাম শাওকানী বলেনঃ এ হাদীসদ্বয়ের মধ্যে কোন বৈপরীত্য বা সংঘর্ষ নেই। বরং এ দুই হাদীসের মধ্যে সমন্বয় এই যে, যিনি এ সময়ে সিয়াম পালনে অভ্যস্ত তার জন্য নিষেধাজ্ঞা নেই। আর যিনি অভ্যস্ত নন তার জন্য এ নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য।
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নতুন চাঁদ দেখার বর্ণনা
১৯৭৭-[৯] ’আম্মার ইবনু ইয়াসির (রাঃ) হতে হাদীস বর্ণিত। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি ’ইয়াওমুশ্ শাক-এ’ (অর্থাৎ- সন্দেহের দিন) সিয়াম রাখে সে আবূল কাসিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে নাফরমানী করল। (আবূ দাঊদ, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ, দারিমী)[1]
وَعَنْ عَمَّارِ بْنِ يَاسِرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: «مَنْ صَامَ الْيَوْمَ الَّذِي يُشَكُّ فِيهِ فَقَدَ عَصَى أَبَا الْقَاسِمِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالتِّرْمِذِيُّ وَالنَّسَائِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ والدارمي
ব্যাখ্যা: সামান্যতম সন্দেহ দেখা দিলে সে সময়ে সিয়াম পালন শারী‘আত প্রণেতার অবাধ্য হওয়ার কারণ ঘটবে, আর যেখানে স্পষ্ট সন্দেহ বিদ্যমান সে সময়ে সিয়াম পালনকারী নিশ্চিতভাবেই শারী‘আত প্রণেতার অবাধ্য। আর সন্দেহের দিন থেকে উদ্দেশ্য শা‘বান মাসের ত্রিশ তারিখ যদি ঐ রাতে আকাশে মেঘ থাকার কারণে চাঁদ না দেখা যায়। ফলে এ দিনটি শা‘বান মাসেরও হতে পারে আবার রমাযান (রমজান) মাসেরও হতে পারে। যেহেতু চন্দ্রমাস ঊনত্রিশ দিনেও হয়, তাই এ ত্রিশতম দিন সন্দেহের দিন। এ রাতে চাঁদ দেখা গেলে সন্দেহ দূর হয়ে গেল। আর আকাশ পরিষ্কার থাকার পর চাঁদ না দেখা গেলেও সন্দেহ দূর হয়ে গেল। আর আকাশ মেঘলা থাকলে সন্দেহ সৃষ্টি হল। অতএব এ সন্দেহের সময়ে যে ব্যক্তি ঐ দিনে রমাযানের সিয়াম মনে করে সিয়াম পালন করল, সে নিঃসন্দেহে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবাধ্য হল। কেননা তিনি এ ক্ষেত্রে শা‘বান মাস ত্রিশ দিন পূর্ণ করার আদেশ দিয়েছেন আর সিয়াম পালনকারী এ নির্দেশ লঙ্ঘন করল না।
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নতুন চাঁদ দেখার বর্ণনা
১৯৭৮-[২০] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একজন গ্রাম্য ’আরব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এলো এবং বলল, আমি চাঁদ দেখেছি অর্থাৎ- রমাযানের চাঁদ। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, তুমি কি সাক্ষ্য দিচ্ছো আল্লাহ ছাড়া প্রকৃতপক্ষে আর কোন ইলাহ নেই। সে বলল, হ্যাঁ। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তুমি কি সাক্ষ্য দিচ্ছো যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর রসূল? সে বলল, জ্বি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ হে বিলাল! লোকদের মধ্যে ঘোষণা করে দাও, আগামীকাল যেন সওম রাখে। (আবূ দাঊদ, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ, দারিমী)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: جَاءَ أَعْرَابِيٌّ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: إِنِّي رَأَيْتُ الْهِلَالَ يَعْنِي هِلَالَ رَمَضَانَ فَقَالَ: «أَتَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ؟» قَالَ: نَعَمْ قَالَ: «أَتَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ؟» قَالَ: نَعَمْ. قَالَ: «يَا بِلَالُ أَذِّنْ فِي النَّاسِ أَن يَصُومُوا غَدا» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالتِّرْمِذِيُّ وَالنَّسَائِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ والدارمي
ব্যাখ্যা: (أَتَشْهَدُ أَنْ لَّا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ؟) ‘‘তুমি কি এ সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃতপক্ষে আর কোন ইলাহ নেই’’ হাদীসের এ অংশ প্রমাণ করে যে, সাক্ষ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে ইসলাম শর্ত।
(أَذِّنْ فِى النَّاسِ أَنْ يَصُوْمُوْا غَدًا) ‘‘লোকদের মাঝে ঘোষণা করে দাও তারা যেন আগামীকাল সিয়াম পালন শুরু করে।’’
হাদীসের এ অংশ থেকে জানা গেল যে, শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির খবর তথা সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য। বিশেষ করে রমাযান (রমজান) মাস প্রবেশের ক্ষেত্রে একজনের সংবাদ যথেষ্ট। সিন্দী বলেন, একজন ব্যক্তির সংবাদ তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন আকাশে এমন কিছু ঘটে যা চাঁদ দেখায় বাধা সৃষ্টি করে।
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নতুন চাঁদ দেখার বর্ণনা
১৯৭৯-[১১] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (একবার) চাঁদ দেখার জন্য লোকেরা একত্রিত হলো। (এ সময়) আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানালাম যে, আমি চাঁদ দেখেছি। এতে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজে সওম পালন শুরু করলেন এবং লোকদেরকেও সওমের পালনের নির্দেশ দিলেন। (আবূ দাঊদ, দারিমী)[1]
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: تَرَاءَى النَّاسُ الْهِلَالَ فَأَخْبَرْتُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنِّي رَأَيْتُهُ فَصَامَ وَأَمَرَ النَّاسَ بِصِيَامِهِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد والدارمي
ব্যাখ্যা: (تَرَاءَى النَّاسُ الْهِلَالَ) ‘‘লোকেরা একে অপরকে চাঁদ দেখাল’’ অর্থাৎ- লোকজন চাঁদ দেখার জন্য সমবেত হল এবং চাঁদ খুঁজতে থাকল।
(فَأَخْبَرْتُ أَنِّىْ رَأَيْتُه) ‘‘আমি অবহিত করলাম যে, আমি চাঁদ দেখেছি।’’
(أَمَرَ النَّاسَ بِصِيَامِه) ‘‘নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকজনকে সিয়াম পালনের নির্দেশ দিলেন।’’
এতে জানা গেল যে, একজনের সংবাদ গ্রহণযোগ্য এবং রমাযানের চাঁদ সাব্যস্ত হওয়ার ক্ষেত্রে ইমাম শাফি‘ঈর প্রথম অভিমত এটাই। তবে তার সর্বশেষ অভিমত হল চাঁদ সাব্যস্ত হওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই দু’জন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির সাক্ষ্য প্রয়োজন। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল-এর অভিমতও তাই। পক্ষান্তরে ইমাম আবূ হানীফাহ্ ও আবূ ইউসুফ (রহঃ)-দ্বয়ের অভিমত এই যে, রমাযানের চাঁদ সাব্যস্ত হওয়ার জন্য একজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির সাক্ষ্যই যথেষ্ট। যদিও তিনি দাস হন। অনুরূপভাবে এ ক্ষেত্রে একজন মহিলার সাক্ষ্য যথেষ্ট যদিও তিনি দাসী হন। তবে শাওয়ালের চাঁদ সাব্যস্ত হওয়ার জন্য দু’জন ন্যায়পরায়ণ পুরুষ সাক্ষীর প্রয়োজন অথবা একজন পুরুষ ও দু’জন মহিলার সাক্ষী প্রয়োজন। তবে ইমাম শাফি‘ঈর নিকট এক্ষেত্রে মহিলার সাক্ষী গ্রহণযোগ্য নয়।
ইমাম মালিক, আওযা‘ঈ ও ইসহাক ইবনু রাহওয়াইহি-এর মতে রমাযানের চাঁদ হোক আর শাওয়ালের চাঁদ হোক উভয় ক্ষেত্রেই কমপক্ষে তারা ‘আবদুর রহমান ইবনু যায়দ ইবনুল খাত্ত্বাব বর্ণিত হাদীসকে দলীল হিসেবে পেশ করেছেন। তিনি (‘আবদুর রহমান) বলেন, আমি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীদের সাথে বসেছি এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছি। তারা আমার নিকট হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা চাঁদ দেখে সিয়াম পালন (শুরু) কর এবং চাঁদ দেখে সিয়াম ভঙ্গ (শেষ) কর এবং কুরবানী কর। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হলে মাস ত্রিশদিন পূর্ণ কর। তবে যদি দু’জন মুসলিম সাক্ষ্য প্রদান করে তাহলে সিয়াম পালন (শুরু) কর এবং সিয়াম ভঙ্গ কর। হাদীসটি ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন। ইমাম শাওকানী বলেনঃ এ হাদীসের সানাদে কোন ত্রুটি নেই।
জমহূরগণ এ হাদীসের জবাবে বলেনঃ এ হাদীসের স্পষ্ট বক্তব্য হল দু’জনের সাক্ষী গ্রহণ কর আর এর বিপরীত তথা অস্পষ্ট বক্তব্য হলে একজনের সাক্ষী গ্রহণযোগ্য নয়। পক্ষান্তরে ইবনু ‘আব্বাস ও ইবনু ‘উমার (রাঃ)-দ্বয় হতে বর্ণিত হাদীসের স্পষ্ট বক্তব্য হল, একজনের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য। আর হাদীস দ্বারা দলীল গ্রহণের নীতিমালা হল, স্পষ্ট বক্তব্য অস্পষ্ট বক্তব্যের উপর প্রাধান্য পাবে। তাই তাকে প্রাধান্য দেয়া ওয়াজিব। অতএব রমাযানের চাঁদ সাব্যস্ত হওয়ার ক্ষেত্রে একজনের সাক্ষী যথেষ্ট।
পরিচ্ছেদঃ ১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - নতুন চাঁদ দেখার বর্ণনা
১৯৮০-[১২] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শা’বান মাসে যেরূপ সতর্ক থাকতেন অন্য মাসে এতটা সতর্ক থাকতেন না। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) রমাযানের চাঁদ দেখে সওম পালন করতেন। আকাশ মেঘলা থাকলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) (শা’বান মাস) ত্রিশদিন পুরা করার পর সওম শুরু করতেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَحَفَّظُ مِنْ شَعْبَانَ مَالَا يَتَحَفَّظُ مِنْ غَيْرِهِ. ثُمَّ يَصُومُ لِرُؤْيَةِ رَمَضَانَ فَإِنْ غُمَّ عَلَيْهِ عَدَّ ثَلَاثِينَ يَوْمًا ثُمَّ صَامَ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (يَتَحَفَّظُ مِنْ شَعْبَانَ) ‘‘শা‘বান মাস সংরক্ষণ করতেন’’ অর্থাৎ রমাযানের সিয়াম সংরক্ষণের উদ্দেশে শা‘বান মাসের দিন গণনার জন্য কষ্ট স্বীকার করতেন এবং তা গণনা করতেন এমনি ফেলে রাখতেন না।
(ثُمَّ يَصُومُ لِرُؤْيَةِ رَمَضَانَ) ‘‘অতঃপর রমাযানের চাঁদ দেখা গেলে রমাযানের সিয়াম পালন করতেন’’ অর্থাৎ- ত্রিশে শা‘বানের রাতে রমাযানের চাঁদ দেখা গেলে রমাযানের সিয়াম পালন শুরু করতেন। অন্যথায় শা‘বান মাস ত্রিশদিন পূর্ণ করতেন, অতঃপর রমাযানের সিয়াম শুরু করতেন।
অত্র হাদীসের একজন রাবী ‘‘মু‘আবিয়াহ্ ইবনু সলিহ আল হাযরামী আল হিমসী’’ আন্দালুস-এর একজন কারী। যদিও তার সম্পর্কে সমালোচনা রয়েছে তথাপি ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীস দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ইমাম বুখারী বলেন, ‘আলী ইবনুল মাদানী বলেছেনঃ ‘আবদুর রহমান ইবনু মাহদী তাকে নির্ভরযোগ্য মনে করতেন। আহমাদ ইবনু হাম্বল তাকে সিকাহ বলে মন্তব্য করেছেন। অতএব হাদীসটি ‘আমলযোগ্য।
পরিচ্ছেদঃ ১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - নতুন চাঁদ দেখার বর্ণনা
১৯৮১-[১৩] আবূল বাখতারী (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা ’উমরাহ্ করার জন্য বের হলাম। অতঃপর যখন আমরা ’বাত্বনি নাখলাহ্’ নামক (মক্কা আর ত্বয়িফের মধ্যবর্তী একটি স্থানের নাম) স্থানে পৌঁছে আমরা (নতুন) চাঁদ দেখলাম। কিছু লোক বলল, এ চাঁদ তৃতীয় রাতের (তৃতীয়ার), কিছু লোক বলল, এ চাঁদ দু’ রাতের (দ্বিতীয়ার) চাঁদ। এরপর আমরা ইবনু ’আব্বাস-এর সাক্ষাৎ পেলাম। তাঁকে বললাম, আমরা নতুন চাঁদ দেখেছি। আমাদের কেউ কেউ বলেন, এ চাঁদ তৃতীয়ার চাঁদ। আবার কেউ বলেন, দ্বিতীয়ার চাঁদ। ইবনু ’আব্বাস জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কোন্ রাতে চাঁদ দেখেছ? আমরা বললাম, ঐ ঐ রাতে। তখন ইবনু ’আব্বাস বললেন, নিশ্চয়ই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযানের সময়কে চাঁদ দেখার উপর নির্দিষ্ট করেছেন। অতএব এ চাঁদ সে রাতের যে রাতে তোমরা দেখেছ।
এ বর্ণনাকারী হতেই অন্য একটি বর্ণনায় বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, আমরা ’যা-তি ’ইরক্ব’ নামক স্থানে (বাত্বনি নাখলাহ্’র কাছাকাছি একটি স্থান) রমাযানের চাঁদ দেখলাম। অতএব আমরা ইবনু ’আব্বাসকে জিজ্ঞেস করার জন্য লোক পাঠালাম। ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) বললেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা শা’বানমাসকে রমাযানের চাঁদ দেখা পর্যন্ত দীর্ঘ করেছেন। যদি তোমাদের ওপর আকাশ মেঘলা থাকে, তাহলে গণনা পূর্ণ করো (অর্থাৎ- শা’বান মাসের সময় ত্রিশদিন পূর্ণ করো)। (মুসলিম)[1]
وَعَنْ أَبِي الْبَخْتَرِيِّ قَالَ: خَرَجْنَا لِلْعُمْرَةِ فَلَمَّا نَزَلْنَا بِبَطْنِ نَخْلَةَ تَرَاءَيْنَا الْهِلَالَ. فَقَالَ بَعْضُ الْقَوْمِ: هُوَ ابْنُ ثَلَاثٍ. وَقَالَ بَعْضُ الْقَوْمِ: هُوَ ابْنُ لَيْلَتَيْنِ فَلَقِينَا ابْنَ عَبَّاسٍ فَقُلْنَا: إِنَّا رَأَيْنَا الْهِلَالَ فَقَالَ بَعْضُ الْقَوْمِ: هُوَ ابْنُ ثَلَاثٍ وَقَالَ بَعْضُ الْقَوْمِ: هُوَ ابْنُ لَيْلَتَيْنِ. فَقَالَ: أَيُّ لَيْلَةٍ رَأَيْتُمُوهُ؟ قُلْنَا: لَيْلَةَ كَذَا وَكَذَا. فَقَالَ: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَدَّهُ لِلرُّؤْيَةِ فَهُوَ لِلَيْلَةِ رَأَيْتُمُوهُ وَفِي رِوَايَةٍ عَنْهُ. قَالَ: أَهَلَلْنَا رَمَضَانَ وَنَحْنُ بِذَاتِ عِرْقٍ فَأَرْسَلْنَا رَجُلًا إِلَى ابْنِ عَبَّاسٍ يَسْأَلُهُ فَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِن الله تَعَالَى قد أَمَدَّهُ لِرُؤْيَتِهِ فَإِنْ أُغْمِيَ عَلَيْكُمْ فَأَكْمِلُوا الْعِدَّةَ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: (إِنَّ رَسُوْلَ اللّٰهِ ﷺ مَدَّهُ لِلرُّؤْيَةِ) ‘‘রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সময় নির্ধারণ করেছেন চাঁদ দেখা পর্যন্ত।’’ ত্বীবী বলেন, অর্থাৎ- রমাযান (রমজান) মাসের জন্য সময় নির্ধারণ করেছেন চাঁদ পরিলক্ষিত হওয়া পর্যন্ত। (فَهُوَ لِلَيْلَةِ رَأَيْتُمُوهُ) অতএব তা সে রাতেরই যে রাতে তা তোমরা দেখেছ। অর্থাৎ- রমাযান (রমজান) মাস তখন থেকেই শুরু হয়েছে যখন তোমরা চাঁদ দেখতে পেয়েছ। যদিও চাঁদ দেখতে বড় দেখায়।
(إِنَّ اللهَ تَعَالٰى قَدْ أَمَدَّه لِرُؤْيَتِه) ‘‘আল্লাহ তা‘আলা তার সময় দীর্ঘ করেছেন চাঁদ দেখা পর্যন্ত।’’ অর্থাৎ- তিনি শা‘বান মাসের সময়কে রমাযানের চাঁদ দেখা পর্যন্ত দীর্ঘ করেছেন।
হাদীসের শিক্ষাঃ আকাশে চাঁদ ছোট আকৃতির কিংবা বড় আকৃতির দেখতে পাওয়া কোন ধর্তব্য বিষয় নয়। ধর্তব্যের বিষয় হল, চাঁদ দেখতে পাওয়া আর চাঁদ দেখা না গেলে মাস ত্রিশদিন পূর্ণ করা।
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - সওম পর্বের বিক্ষিপ্ত মাস্আলাহ্
১৯৮২-[১] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা ’সাহরী’ খাও। সাহরীতে অবশ্যই বারাকাত আছে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ فِىْ مسَائِلٍ مُّتَفَرِّقَةٍ مِّنْ كِتَابِ الصَّوْمِ
عَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «تَسَحَّرُوا فَإِنَّ فِي السَّحُورِ بركَة»
ব্যাখ্যা: (تَسَحَّرُوْا) ‘‘তোমরা সাহরী খাও’’ তোমরা সাহরীর সময় (ভোররাতে) কিছু খাও। হাফেয ইবনু হাজার বলেনঃ ভোর রাতে কিছু খাওয়া বা পান করার মাধ্যমে তা অর্জিত হয়। মুসনাদে আহমাদ ৩য় খণ্ড-র ১২৩৪৪ পৃষ্ঠায় আবূ সা‘ঈদ থেকে বর্ণিত আছে, সাহরীর মধ্যে বারাকাত রয়েছে। অতএব তোমরা তা পরিত্যাগ করো না, যদিও একটুকু পানি হয় তা তোমরা পান কর। কেননা সাহরী গ্রহণকারীদের প্রতি আল্লাহ রহমাত বর্ষণ করেন এবং তার মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) তাদের জন্য দু‘আ করে।
এ হাদীসের প্রকাশমান অর্থ এই যে, সাহরী খাওয়া ওয়াজিব। কিন্তু কোন কোন সময় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবীদের সাহরী পরিত্যাগ করা প্রমাণ করে যে, তা মানদূব তথা পছন্দনীয়, ওয়াজিব নয়। সিন্দী বলেনঃ সাহরী খাওয়ার মধ্যে বারাকাত আছে, অর্থাৎ- এতে সাওয়াব আছে এজন্য যে, এ সময় দু‘আ ও জিকির করা হয়। আর সাহরী খাওয়ার মধ্যে সিয়াম পালনের শক্তি অর্জিত হয়।
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - সওম পর্বের বিক্ষিপ্ত মাস্আলাহ্
১৯৮৩-[২] ’আমর ইবনুল ’আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমাদের ও আহলে কিতাবদের (ইয়াহূদী ও খৃষ্টান) সওমের মধ্যে পার্থক্য হলো সাহরীর। (মুসলিম)[1]
بَابُ فِىْ مسَائِلٍ مُّتَفَرِّقَةٍ مِّنْ كِتَابِ الصَّوْمِ
وَعَنْ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «فَصْلُ مَا بَيْنَ صِيَامِنَا وَصِيَامِ أَهْلِ الْكِتَابِ أَكْلَةُ السَّحَرِ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: সাহরী খাওয়াটাই আমাদের সিয়াম পালন আর আহলে কিতাবদের সিয়াম পালনের মধ্যে পার্থক্য। কেননা আল্লাহ তা‘আলা আমাদের জন্য ফজরের আগ পর্যন্ত পানাহার বৈধ করেছেন যদিও ইসলামের সূচনাতে আমাদের জন্যও তা হারাম ছিল। পক্ষান্তরে আহলে কিতাবদের জন্য ইফতারের পর ঘুমিয়ে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত খাওয়া পান করা বৈধ থাকলেও ঘুমানোর পর থেকে তাদের জন্য তা হারাম ছিল। তাদের সাথে আমাদের ভিন্নতা এই যে, এ বিশেষ নিয়ামতের কারণে আমরা তার শুকরিয়া আদায় করব যা থেকে তারা বঞ্চিত।
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - সওম পর্বের বিক্ষিপ্ত মাস্আলাহ্
১৯৮৪-[৩] সাহল (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যতদিন পর্যন্ত মানুষ তাড়াতাড়ি ইফতার করবে, ততদিন তারা কল্যাণের মধ্যে থাকবে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ فِىْ مسَائِلٍ مُّتَفَرِّقَةٍ مِّنْ كِتَابِ الصَّوْمِ
وَعَنْ سَهْلٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَزَالُ النَّاسُ بِخَيْرٍ مَا عَجَّلُوا الْفِطْرَ»
ব্যাখ্যা: (مَا عَجَّلُوا الْفِطْرَ) ‘‘যতক্ষণ তারা তাড়াতাড়ি ইফতার করবে’’ অর্থাৎ যতক্ষণ তারা এ সুন্নাতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা কল্যাণের মধ্যেই থাকবে। এ থেকে উদ্দেশ্য ইফতার করার সময় হওয়ার পর বিলম্ব না করে প্রথম ওয়াক্তেই ইফতার করবে। ইমাম নাবাবী বলেনঃ উম্মাত ততক্ষণ কল্যাণের মধ্যেই থাকবে যতক্ষণ তারা এ সুন্নাতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। যখন তারা ইফতারের সময় হওয়ার পরও বিলম্বে ইফতার করবে তখন এটি তাদের ফ্যাসাদে নিপতিত হওয়ার আলামত বলে গণ্য হবে।
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - সওম পর্বের বিক্ষিপ্ত মাস্আলাহ্
১৯৮৫-[৪] ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন ওদিক থেকে রাত (পূর্বদিক হতে রাতের কালো রেখা) নেমে আসে, আর এদিক থেকে (পশ্চিম দিকে) দিন চলে যায় এবং সূর্য ডুবে যায়, তখনই সায়িম (রোযাদার) ইফতার করে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ فِىْ مسَائِلٍ مُّتَفَرِّقَةٍ مِّنْ كِتَابِ الصَّوْمِ
وَعَنْ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا أَقْبَلَ اللَّيْل من هَهُنَا وَأدبر النَّهَار من هَهُنَا وَغَرَبَتِ الشَّمْسُ فَقَدْ أَفْطَرَ الصَّائِمُ»
ব্যাখ্যা: (وَغَرَبَتِ الشَّمْسُ) ‘‘এবং সূর্য অস্ত যায়’’। ত্বীবী বলেনঃ অত্র হাদীসে وَغَرَبَتِ الشَّمْسُ এজন্য উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে বুঝতে পারা যায় যে, ইফতারের জন্য সূর্য পূর্ণভাবে অস্ত যাওয়া জরুরী। আর এটা ধারণা করা না হয় যে, সূর্য আংশিক অস্ত গেলে ইফতার করা বৈধ।
(فَقَدْ أَفْطَرَ الصَّائِمُ) ‘‘তখন সিয়াম পালনকারী ইফতার করেছে।’’ অর্থাৎ- সিয়াম পালনকারীর সিয়াম পূর্ণ হয়েছে। এখন আর তাকে সায়িম বলা যাবে না। কেননা সূর্যাস্তের মাধ্যমে দিন অতিবাহিত হয়ে গেছে এবং রাত প্রবেশ করেছে আর রাত সিয়াম পালনের সময় নয়। হাফেয ইবনু হাজার বলেনঃ সিয়াম পালনকারী ইফতার করার সময়ে উপনীত হয়েছে এবং তার জন্য ইফতার করা বৈধ। তবে এ অর্থও গ্রহণ করার অবকাশ রয়েছে যে, সায়িম এখন আর সায়িম নেই, সে হয়ে গেছে যদিও বাস্তবে সে ইফতার না করে থাকে। কেননা রাত সিয়াম পালনের সময় নয়।
ইবনু খুযায়মাহ্ বলেনঃ প্রথম অর্থ গ্রহণ করাই সঠিক। কেননা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী فَقَدْ أَفْطَرَ الصَّائِمُ যদিও বাক্যটি খবর প্রদানকারী বাক্য কিন্তু তার অর্থ নির্দেশ উদ্দেশ্য। অতএব বাক্যের অর্থ হবে সিয়াম পালনকারী যেন ইফতার করে। কেননা সূর্যাস্তের মাধ্যমে যদি সিয়াম ভঙ্গ হয়ে যেত তাহলে সকল সিয়াম পালনকারীর সিয়ামই ভঙ্গ হয়ে যেত এবং এতে সকলেই সমান হয়ে যেত তাহলে দ্রুত ইফতার করার উৎসাহ প্রদানের কোন অর্থ থাকতো না বরং তা অনর্থক কথা হত। আর হাফেয ইবনু হাজার (রহঃ) প্রথম অর্থকেই প্রাধান্য দিয়েছেন এজন্য যে, মুসনাদে আহমাদে (৪/৩৮২) ‘আবদুল্লাহ ইবনু আবী আওফা হতে বর্ণিত আছে, যখন এদিক থেকে রাত আগমন করে তখন ইফতার করা বৈধ হয়ে যায়।
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - সওম পর্বের বিক্ষিপ্ত মাস্আলাহ্
১৯৮৬-[৫] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সওমে বিসাল (অর্থাৎ- একাধারে সওম রাখতে) নিষেধ করেছেন। তখন তাঁকে একজন জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনি তো একাধারে সওম রাখেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমাদের মধ্যে কে আমার মতো? আমি তো এভাবে রাত কাটাই যে, আমার রব আমাকে খাওয়ান ও পরিতৃপ্ত করেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ فِىْ مسَائِلٍ مُّتَفَرِّقَةٍ مِّنْ كِتَابِ الصَّوْمِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الْوِصَالِ فِي الصَّوْمِ. فَقَالَ لَهُ رجل: إِنَّك تواصل يَا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: وَأَيُّكُمْ مِثْلِي إِنِّي أَبَيْتُ يُطْعِمُنِي رَبِّي ويسقيني
ব্যাখ্যা: (نَهٰى رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ عَنِ الْوِصَالِ فِى الصَّوْمِ) ‘‘রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সওমে বিসাল করতে নিষেধ করেছেন।’’ ইমাম ত্বহাবী বলেনঃ সওমে বিসাল ঐ সওমকে বলা হয়, কোন ব্যক্তি দিনের বেলায় সিয়াম পালন করার পর সূর্যাস্তের পরে ইফতার না করে পরবর্তী দিনের সিয়ামকে পূর্ববর্তী দিনের সিয়ামের সাথে মিলিয়ে দেয়া। সওমে বিসাল ও সওমে দাহর এর মাঝে পার্থক্য এই যে, যে ব্যক্তি রাত্রে ইফতার না করেই ধারাবাহিক একাধিক দিনে সিয়াম পালন করে তা হলো সওমে বিসাল। আর যে ব্যক্তি প্রতিদিনই সিয়াম পালন করে কিন্তু রাতে ইফতার করে তাহলো সওমে দাহর। হাদীস প্রমাণ করে যে, সওমে বিসাল হারাম। তবে সন্ধ্যার সময় ইফতার না করে সাহরীর সময় পর্যন্ত বিসাল করা বৈধ। কেননা বুখারী ও মুসলিমে আবূ সা‘ঈদ আল খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা সওমে বিসাল পালন করো না, তবে কেউ যদি বিসাল করতেই চায় সে যেন সাহরী পর্যন্ত বিসাল করে।
সওমে বিসালের হুকুম সম্পর্কে ‘উলামাগণ মতভেদ করেছেন।
১. সওমে বিসাল হারাম। এ অভিমত ইবনু হাযম এবং ইবনুল ‘আরাবী মালিকী (রহঃ)-এর। শাফি‘ঈদের বিশুদ্ধ মতানুসারেও তা হারাম।
২. তা মাকরূহ। এ অভিমত ইমাম মালিক, আহমাদ, আবূ হানীফাহ্ এবং তাদের অনুসারীদের।
৩. তা বৈধ। এ অভিমত কিছু সালাফ তথা পূর্ববর্তী ‘আলিমদের।
৪. যার পক্ষে তা কষ্টকর তার জন্য তা হারাম। আর যে ব্যক্তির জন্য তা কষ্টকর নয় তার জন্য বৈধ।
যারা তা বৈধ বলেন তাদের দলীলঃ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সওমে বিসাল পালন করতে নিষেধ করার পর যখন সাহাবীগণ তা থেকে বিরত হল না তখন তিনি তাদের নিয়ে সওমে বিসাল করতে থাকেন। দু’দিন বিসাল করার পর শাওয়ালের চাঁদ দেখা গেলে তিনি বললেন চাঁদ উদয় হতে বিলম্ব হলে আমি তোমাদেরকে আরো বিসাল করতাম। সওমে বিসাল যদি হারামই হতো তাহলে তিনি তাদের এ কাজে সম্মতি প্রকাশ করতেন না। অতএব বুঝা গেল যে, এ নিষেধ দ্বারা হারাম বুঝাননি, বরং এ নিষেধ ছিল উম্মাতের প্রতি দয়া স্বরূপ। অতএব যার জন্য তা কষ্টকর নয় এবং এর দ্বারা আহলে কিতাবদের সাথে একাত্বতা ঘোষণার উদ্দেশ্য না থাকে তার জন্য বিসাল করা হারাম নয়।
যারা তা হারাম বলেন তাদের দলীলঃ আবূ হুরায়রাহ্, আনাস, ইবনু ‘উমার ও ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে নিষেধ সম্বলিত বর্ণিত হাদীসসমূহ যা ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন। কেননা নিষেধ দ্বারা প্রকৃতপক্ষে হারামকেই বুঝায় তা নিষেধ করার পর সাহাবীদের নিয়ে বিসাল করা মূলত তাঁর পক্ষ থেকে এ কাজের স্বীকৃতি নয় বরং তাদেরকে উচিত শিক্ষা দেয়ার জন্য এমনটি করেছিলেন এবং বলেছিলেন لست في ذلك مثلكم। এক্ষেত্রে আমি তোমাদের মতো নই। অতএব বিসাল নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য খাস। এক্ষেত্রে চতুর্থ অভিমতটিই সঠিক বলে মনে হয়। আল্লাহই ভাল জানেন।
(يُطْعِمُنِىْ رَبِّىْ وَيَسْقِيْنِىْ) ‘‘আমার রব আমাকে খাওয়ায় ও পান করায়’’ এর ব্যাখাতে ‘উলামাগণ মতভেদ করেছেন।
১. প্রকৃতপক্ষেই আল্লাহ তা‘আলার নিকট হতে তার জন্য রমাযানের রাতে খাদ্য ও পানীয় নিয়ে আসা হত তার সম্মানার্থে। আর তিনি তা গ্রহণ করতেন অর্থাৎ- তিনি তা খাইতেন ও পান করতেন।
২. এটি রূপক অর্থে বলা হয়েছে। এর দ্বারা উদ্দেশ্য যে, আল্লাহ তা‘আলা পানাহারকারীর মতো শক্তি দান করেন যার ফলে সকল প্রকার কাজ করতে আমার মধ্যে কোন দুর্বলতা আসে না, আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহ ক্লান্ত হয় না। অথবা এর দ্বারা উদ্দেশ্য যে, আল্লাহ তা‘আলা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দেহে পরিতৃপ্তি সৃষ্টি করেছেন যার ফলে পানা হারের প্রয়োজন হয় না এবং তিনি ক্ষুধা তৃষ্ণা অনুভব করেন না।
অথবা এর দ্বারা উদ্দেশ্য মহান আল্লাহ আমাকে তাঁর মহত্ব তাঁর সান্নিধ্য তার প্রতি ভালবাসা তাঁর সাথে সর্বদা মুনাজাতে ব্যস্ত রাখেন যার ফলে পানাহারের প্রতি চিন্তা জাগে না।
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সওম পর্বের বিক্ষিপ্ত মাস্আলাহ্
১৯৮৭-[৬] হাফসা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ফজরের আগে সওমের নিয়্যাত করবে না তার সওম হবে না। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ, নাসায়ী, দারিমী। ইমাম আবূ দাঊদ বলেন, মা’মার ও যুবায়দী, ইবনু ’উআয়নাহ্ এবং ইউনুস আয়লী সহ সকলে এ বর্ণনাটি হাফসাহ্’র কথা বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন।)[1]
عَن حَفْصَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ لَمْ يَجْمَعِ الصِّيَامَ قَبْلَ الْفَجْرِ فَلَا صِيَامَ لَهُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ وَالدَّارِمَيُّ وَقَالَ أَبُو دَاوُد: وَقفه على حَفْصَة معمر والزبيدي وَابْنُ عُيَيْنَةَ وَيُونُسُ الَأَيْلِيُّ كُلُّهُمْ عَنِ الزُّهْرِيِّ
ব্যাখ্যা: (مَنْ لَمْ يُجْمِعِ الصِّيَامَ قَبْلَ الْفَجْرِ فَلَا صِيَامَ لَه) ‘‘যে ব্যক্তি ফজরের পূর্বেই সিয়াম পালনের নিয়্যাত করে না তার সিয়াম হয় না।’’
এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, সিয়াম বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য ফজরের পূর্বে অর্থাৎ- রাত থাকতেই সিয়াম পালনের উদ্দেশে নিয়্যাত করা, অর্থাৎ- রাত থাকতেই সিয়াম পালনের উদ্দেশে দৃঢ় প্রত্যয় করা আবশ্যক। তা না হলে তার সিয়াম বিশুদ্ধ হবে না।
আমীর ইয়ামানী বলেনঃ অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, রাতের কোন অংশে সিয়াম পালনের ইচ্ছা ব্যক্ত না করলে তার সিয়াম হবে না। আর এ ইচ্ছা ব্যক্ত করা তথা নিয়্যাত করার প্রথম ওয়াক্ত সূর্যাস্তের পর থেকেই শুরু হয়। কেননা সিয়াম একটি ‘আমল বা কাজ। আর যে কোন কাজ তথা ‘ইবাদাত নিয়্যাতের উপর নির্ভরশীল। অতএব এ ‘ইবাদাত বাস্তবে রূপলাভ করবে না যদি না রাত থাকতেই তার জন্য নিয়্যাত করা হয়। আর এ হুকুম সকল প্রকার সিয়াম তথা ফরয, নফল, কাযা, কাফফারা, মানৎ- সকল সিয়ামের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
আল কারী বলেনঃ হাদীসের প্রকাশমান অর্থ এই যে, ফরয ও নফল যে কোন সিয়ামের জন্যই রাত থাকতেই নিয়্যাত করতে হবে। আর এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন ইবনু ‘উমার, জারির ইবনু যায়দ, ইমাম মালিক, মুযানী ও দাঊদ।
অন্যান্যদের অভিমত এই যে, নফল সিয়ামের জন্য দিনের বেলায় নিয়্যাত করলেও চলবে। অত্র হাদীসকে তারা ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বর্ণিত ঐ হাদীস দ্বারা খাস করেছেন যাতে তিনি বলেছেনঃ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট এসে বলতেন, তোমার নিকট কি খাবার কিছু আছে? আমি বলতাম, না, নেই। তখন তিনি বলতেন আমি সায়িম। কোন বর্ণনায় আছে, তাহলে আমি সায়িম।
ইমাম শাফি‘ঈ ও ইমাম আহমাদ বলেনঃ নফল সিয়ামের ক্ষেত্রে ফজরের পরে নিয়্যাত করলেও চলবে কিন্তু ফরযের ক্ষেত্রে তা চলবে না। ইমাম আবূ হানীফাহ্ বলেনঃ নির্দিষ্ট সময়ের সাথে সম্পৃক্ত সিয়ামের ক্ষেত্রে ফজরের পরে নিয়্যাত করলেও চলবে। যেমন, রমাযানের সিয়াম, নির্দিষ্ট দিনের জন্য মানৎ করা সিয়াম, অনুরূপভাবে নফল সিয়াম। কিন্ত যে সমস্ত ওয়াজিব সিয়ামের জন্য সময় নির্দিষ্ট নেই যেমন কাযা ও কাফফারা তার জন্য ফজরের পূর্বেই নিয়্যাত করতে হবে।
ইমাম আবূ হানীফার পার্থক্য করার কারণ এই যে, নির্দিষ্ট সময়ের সাথে সম্পৃক্ত সিয়ামসমূহের জন্য নির্দিষ্ট সময়ই নিয়্যাতের স্থলাভিষিক্ত তা নির্দিষ্ট করার ক্ষেত্রে।
পক্ষান্তরে যার জন্য নির্দিষ্ট সময় নেই তা নির্দিষ্ট করার জন্য নিয়্যাত প্রয়োজন তথা নিয়্যাত দ্বারা তা নির্দিষ্ট হয় তাই সিয়ামের সময় শুরু হওয়ার পূর্বেই নিয়্যাত দ্বারা নির্দিষ্ট করতে হবে।
ইমাম মালিক-এর মতে সকল প্রকার সিয়ামের জন্যই ফজরের পূর্বেই নিয়্যাত করতে হবে। তিনি তার মতের স্বপক্ষে হাফসা (রাঃ) বর্ণিত হাদীসটি দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সওম পর্বের বিক্ষিপ্ত মাস্আলাহ্
১৯৮৮-[৭] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (সাহরী খাবার সময়) তোমাদের কেউ ফজরের আযান শুনতে পেলে সে যেন হাতের বাসন রেখে না দেয়। বরং নিজের প্রয়োজন সেরে নেবে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا سَمِعَ النِّدَاءَ أَحَدُكُمْ وَالْإِنَاءُ فِي يَدِهِ فَلَا يَضَعْهُ حَتَّى يَقْضِيَ حَاجَتَهُ مِنْهُ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (فَلَا يَضَعْهُ حَتّٰى يَقْضِيَ حَاجَتَه مِنْهُ) ‘‘পাত্র থেকে তার প্রয়োজন শেষ না করে তা রেখে দিবে না।’’ অর্থাৎ- পানাহারের প্রয়োজন শেষ হবার আগেই মুয়ায্যিনের আযান শুনে পানাহারের পাত্র রেখে দিবে না। বরং তার পানাহারের প্রয়োজন শেষ করবে। অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, ফজরের আযান শ্রবণের সময় স্বীয় হাতের পাত্র থেকে পানাহার করা বৈধ। বলা হয়ে থাকে যে, এ আযান দ্বারা ফজরের পূর্বে বিলাল (রাঃ) এর আযান উদ্দেশ্য। কেননা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বিলাল রাত থাকতেই আযান দেয়, অতএব তোমরা ইবনু উম্মু মাকতূম আযান দেয়ার আগ পর্যন্ত পানাহার করতে থাক।
এটাও বলা হয়ে থাকে যে, পানাহার হারাম হওয়ার সম্পর্ক ফজর উদয়ের সাথে আযানের সাথে নয়। মুয়াযযিন ফজর উদয়ের আগেও আযান দিতে পারে। অতএব এখানে আযান কোন ধর্তব্য বিষয় নয় যদি ফজর উদয়ের বিষয়টি জানা না যায়। তবে সাধারণ লোক যারা ফজর হওয়া বা না হওয়া বুঝতে পারে না তাদের জন্য আযানের উপর নির্ভর করাই শ্রেয়।
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সওম পর্বের বিক্ষিপ্ত মাস্আলাহ্
১৯৮৯-[৮] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা বলেন, আমার কাছে সে বান্দা বেশী প্রিয় যে (সময় হয়ে যাবার সাথে সাথে) ইফতার করতে ব্যস্ত হয়। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: أَحَبُّ عِبَادِي إِلَيَّ أَعْجَلُهُمْ فطرا . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: (أَعْجَلُهُمْ فِطْرًا) ‘‘তাদের মধ্যে দ্রুত ইফতারকারী’’ অর্থাৎ স্বচক্ষে সূর্যাস্ত দেখে অথবা সংবাদের মাধ্যমে সূর্যাস্ত সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে দ্রুত ইফতার করে। ত্বীবী বলেনঃ এ পছন্দের কারণ সম্ভবত এই যে, এতে সুন্নাতের অনুসরণ, বিদআত (বিদাত) হতে দূরে অবস্থান এবং আহলে কিতাবদের সাথে মুখালাফাত তথা তাদের বিরোধিতা করা হয়। ইবনু মালিক বলেনঃ যে ব্যক্তি সালাত আদায়ের পূর্বে ইফতার করে সে শান্ত মনে একাগ্রতার সাথে সালাত আদায় করতে সক্ষম হয়। অতএব যার অবস্থা এরূপ সে ঐ ব্যক্তির চাইতে আল্লাহর নিকট বেশী প্রিয় যার অবস্থা এমন নয়। আমীর ইয়ামানী বলেনঃ অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, বিলম্ব না করে দ্রুত ইফতার করা আল্লাহর নিকট পছন্দনীয় কাজ। সূর্যাস্তের পর ইফতার না করে সাহরী পর্যন্ত সিয়াম বিসাল করা বৈধ হলেও তা উত্তম নয়। তবে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিষয়টি ভিন্ন। কেননা তিনি সাধারণ লোকদের মতো নন। অতএব দ্রুত ইফতার না করলেও আল্লাহর নিকট তিনি সকল সায়িমের চাইতে প্রিয়, কেননা তাকে সওমে বিসাল করার অনুমতি দেয়া হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সওম পর্বের বিক্ষিপ্ত মাস্আলাহ্
১৯৯০-[৯] সালমান ইবনু ’আমির হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যখন ইফতার করবে সে যেন খেজুর দিয়ে (শুরু) করে। কারণ খেজুর বারাকাতময়। যদি খেজুর না পায়, তাহলে যেন পানি দিয়ে ইফতার করে। কেননা পানি পবিত্র জিনিস। (আহমাদ, তিরমিযী, আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ, দারিমী। فَإِنَّه بَرَكَةٌ [ফাইন্নাহূ বারাকাতুন] -এ অংশটুকু ইমাম তিরমিযী ছাড়া আর কেউ উল্লেখ করেননি।)[1]
وَعَنْ سَلْمَانَ بْنِ عَامِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا أَفْطَرَ أَحَدُكُمْ فَلْيُفْطِرْ عَلَى تَمْرٍ فَإِنَّهُ بَرَكَةٌ فَإِنْ لَمْ يَجِدْ فَلْيُفْطِرْ عَلَى مَاءٍ فَإِنَّهُ طَهُورٌ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ وَالدَّارِمِيُّ. وَلَمْ يَذْكُرْ: «فَإِنَّهُ بَرَكَةٌ» غَيْرُ التِّرْمِذِيِّ
ব্যাখ্যা: (فَلْيُفْطِرْ عَلٰى تَمْرٍ) ‘‘সে যেন খেজুর দিয়ে ইফতার করে।’’ এখানে আদেশ দ্বারা ওয়াজিব উদ্দেশ্য নয় বরং তা মুস্তাহাব। ইমাম শাওকানী বলেনঃ সুলায়মান-এর অত্র হাদীস এবং আনাস (রাঃ) বর্ণিত পরবর্তী হাদীস এ দু’ হাদীস প্রমাণ করে যে, খেজুর দিয়ে ইফতার বিধিসম্মত। খেজুর না পেলে পানি দিয়ে ইফতার করবে। তবে আনাস (রাঃ)-এর হাদীস প্রমাণ করে যে, শুকনো খেজুরের চাইতে (রুতাব) ভিজা খেজুর উত্তম। অতএব সম্ভব হলে তাকেই অগ্রাধিকার দিবে।
খেজুর দিয়ে ইফতার করার নির্দেশ এজন্য দেয়া হয়েছে যে, তা যেমন মিষ্টিদ্রব্য তেমনি তা প্রধান খাদ্যও বটে। সিয়ামের কারণে ক্ষুধার প্রভাবে শরীর ক্লান্ত হয়ে পরে এবং দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে যায়। আর মিষ্টিদ্রব্য দ্রুত শক্তি বৃদ্ধি করে বিশেষভাবে দৃষ্টিশক্তি। তাই ক্লান্ত ও দুর্বলতা দৃঢ় করার জন্য মিষ্টিদ্রব্য দিয়ে ইফতার করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইমাম শাওকানী বলেনঃ যেহেতু মিষ্টিদ্রব্য হওয়ার কারণে খেজুর দিয়ে ইফতার করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, অতএব সকল প্রকার মিষ্টিদ্রব্য এর মধ্যে শামিল।
(فَإِنَّه بَرَكَةٌ) ‘‘তার মধ্যে বারাকাত রয়েছে’’ অর্থাৎ- খেজুরের মধ্যে বারাকাত এবং অনেক কল্যাণ আছে। ইবনুল কইয়্যিম বলেনঃ খেজুর অথবা পানি দিয়ে ইফতার করার নির্দেশ উম্মাতের প্রতি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পূর্ণ দয়া ও কল্যাণ কামিতার পরিচায়ক। কেননা সিয়াম পালনের কারণে কলিজার মধ্যে শুষ্কতা আসে। তা যদি পানি দ্বারা সিক্ত করার পর খাবার গ্রহণ করা হয় তাহলে এর পূর্ণ উপকারিতা লাভ হয়। আর খেজুরের গুণের কথা তো পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে আর কল্বের উৎকর্ষণ সাধনে পানির বৈশিষ্ট্যের বিষয় একমাত্র চিকিৎসাবিদগণই অবহিত আছেন।
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সওম পর্বের বিক্ষিপ্ত মাস্আলাহ্
১৯৯১-[১০] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতের আগে কিছু তাজা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। যদি তাজা খেজুর না পেতেন, শুকনা খেজুর দিয়ে করতেন। যদি শুকনা খেজুরও না পেতেন, কয়েক চুমুক পানি পান করে নিতেন। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ। আর ইমাম তিরমিযী বলেন, এ হাদীসটি হাসান ও গরীব।)[1]
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُفْطِرُ قَبْلَ أَنْ يُصَلِّيَ عَلَى رطبات فَإِن لم تكن فتميرات فإنلم تكن تُمَيْرَات حسى حَسَوَاتٍ مِنْ مَاءٍ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ. وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيب
ব্যাখ্যা: (يُفْطِرُ قَبْلَ أَنْ يُصَلِّيَ) ‘‘সালাত আদায়ের পূর্বেই ইফতার করতেন।’’ অর্থাৎ- নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাগরিবের সালাতের আগে ইফতার করতেন। এতে এ ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, সূর্যাস্তের পর দ্রুত ইফতার করা মুস্তাহাব। তবে ‘উমার ও ‘উসমান থেকে সহীহ সূত্রে বর্ণিত আছে যে, তারা উভয়ে রমাযান (রমজান) মাসে সূর্যাস্তের পর মাগরিবের সালাত আদায় করতেন। অতঃপর সালাত আদায়ের পর ইফতার করতেন। এতে বুঝা যায়, বিলম্বে ইফতার করা বৈধ, তথা দ্রুত ইফতার করা ওয়াজিব নয়। অত্র হাদীস এটাও প্রমাণ করে যে, রুতাব তথা তাজা খেজুর দ্বারা ইফতার করা মুস্তাহাব। তা পাওয়া না গেলে শুকনা খেজুর, তাও পাওয়া না গেলে পানি দিয়ে ইফতার করবে।
যারা বলে থাকেন মক্কাতে রমাযানের পানি দ্বারা ইফতার করা সুন্নাত, অথবা খেজুরের পানি মিশিয়ে ইফতার করবে তা এ জন্য প্রত্যাখ্যাত যে, তা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণের বিপরীত। কেননা মক্কা বিজয়ের বৎসর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মক্কাতে অনেকদিন সিয়াম পালন করেছেন কিন্তু এটা বর্ণিত হয়নি যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার চিরাচরিত অভ্যাস পরিত্যাগ করে পানি দিয়ে ইফতার করেছেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যদি তা করতেন তবে অবশ্যই তা বর্ণিত হত।
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সওম পর্বের বিক্ষিপ্ত মাস্আলাহ্
১৯৯২-[১১] যায়দ ইবনু খালিদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি সায়িমকে ইফতার করাবে অথবা কোন গাযীর আসবাবপত্র ঠিক করে দেবে সে তাদের (সায়িম ও গাযীর) সমপরিমাণ সাওয়াব পাবে। (বায়হাক্বী- শু’আবূল ঈমান-এ আর মুহয়্যিইউস্ সুন্নাহ্- শারহে সুন্নাহ্’য় এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন হাদীসটি সহীহ)[1]
وَعَنْ زَيْدِ بْنِ خَالِدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «من فَطَّرَ صَائِمًا أَوْ جَهَّزَ غَازِيًا فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِهِ» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي شُعَبِ الْإِيمَانِ وَمُحْيِي السّنة فِي شرح السّنة وَقَالَ صَحِيح
ব্যাখ্যা: যে ব্যক্তি সায়িমকে ইফতার করাবে, অর্থাৎ যে ব্যক্তি সায়িমকে ইফতারের সময় খাবার খাওয়াবে, আর যে ব্যক্তি মুজাহিদের যাবতীয় প্রয়োজন মিটাবে তথা অস্ত্র ঘোড়া এবং সফরের পাথেয় ইত্যাদির ব্যবস্থা করবে তার জন্য ঐ সায়িম ও মুজাহিদের সমপরিমাণ সাওয়াব রয়েছে। কেননা এ দ্বারা সৎকাজ ও আল্লাহ ভীতির কাজে সহযোগিতা করা হয়।
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সওম পর্বের বিক্ষিপ্ত মাস্আলাহ্
১৯৯৩-[১২] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইফতার করার পর বলতেন, পিপাসা চলে গেছে, (শরীরের) রগগুলো সতেজ হয়েছে। আল্লাহর মর্জি হলে সাওয়াব প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا أَفْطَرَ قَالَ: «ذَهَبَ الظَّمَأُ وَابْتَلَّتِ الْعُرُوقُ وَثَبَتَ الْأَجْرُ إِنْ شَاءَ الله» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (وَثَبَتَ الْأَجْرُ) ‘‘পুরস্কার সাব্যস্ত হয়েছে’’ অর্থাৎ- সিয়াম পালনের ক্লান্তি দূর হয়েছে এবং সিয়ামের সাওয়াব সাব্যস্ত হয়েছে।
ইমাম ত্বীবী বলেনঃ ক্লান্তি দূর হওয়ার পর বিনিময় সাব্যস্ত হওয়ার উল্লেখ পরিপূর্ণভাবে স্বাদ গ্রহণের বহিঃপ্রকাশ। যেমন আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতবাসীদের বক্তব্য বর্ণনা করেছেন এ বলে,
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِيْ أَذْهَبَ عَنَّا الْحَزَنَ إِنَّ رَبَّنَا لَغَفُوْرٌ شَكُوْرٌ ‘‘সেই মহান আল্লাহর জন্য সকল প্রশংসা যিনি আমাদের চিন্তা দূর করে দিয়েছেন। নিশ্চয়ই আমাদের রব অতিশয় ক্ষমাকারী এবং অতীব পুরস্কার প্রদানকারী।’’ (সূরা আল ফা-ত্বির ৩৫ : ৩৪)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সওম পর্বের বিক্ষিপ্ত মাস্আলাহ্
১৯৯৪-[১৩] মু’আয ইবনু যুহরা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইফতার করার সময় (এ দু’আ) বলতেনঃ ’’আল্ল-হুম্মা লাকা সুমতু, ওয়া ’আলা- রিযকবিকা আফত্বরতু’’ (অর্থাৎ- হে আল্লাহ! তোমার জন্য সওম রেখে, তোমার [দান] রিযক দিয়ে ইফতবার করছি)। (আবূ দাঊদ, হাদীসটি মুরসাল)[1]
وَعَنْ مُعَاذٍ بْنِ زُهْرَةَ قَالَ: إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ إِذَا أَفْطَرَ قَالَ: «اللَّهُمَّ لَكَ صَمْتُ وَعَلَى رِزْقِكَ أَفْطَرْتُ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد مُرْسلا
ব্যাখ্যা: (اَللّٰهُمَّ لَكَ صَمْتُ وَعَلٰى رِزْقِكَ أَفْطَرْتُ) ‘‘হে আল্লাহ! তোমার জন্যেই আমি সিয়াম পালন করেছি এবং তোমার রিযক দিয়েই ইফতার করেছি।’’ অর্থাৎ- আমার এ সিয়াম লোক দেখানো নয় বরং তা একনিষ্ঠভাবে শুধু তোমারই সন্তুষ্টির জন্য। কেননা একমাত্র তুমিই রিযকদাতা। যেহেতু তোমার দেয়া রিযক ভক্ষণ করি, কাজেই তুমি ব্যতীত অন্য কারো ‘ইবাদাত করা সমিচীন নয়।
‘আল্লামা কারী বলেনঃ লোকজনের মাঝে এ দু‘আর শেষে বাড়তি শব্দ (وبك آمنت وعليك توكلت لصوم غد نويت) এর কোন ভিত্তি নেই। বরং মুখে উচ্চারণের মাধ্যমে নিয়্যাত করা বিদ্‘আতে হাসানাহ্। আমি (মুবারকপূরী) বলছি, সালাত ও সওমের জন্যে মুখে নিয়্যাত উচ্চারণ করার কোন ভিত্তি কুরআন ও হাদীসে নেই। অতএব তা ইসলামী শারী‘আতের মধ্যে একটি বিদআত (বিদাত)। আর শারী‘আতের মধ্যে সকল প্রকার বিদআতই দূষণীয়, তাই পরিত্যাজ্য।
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সওম পর্বের বিক্ষিপ্ত মাস্আলাহ্
১৯৯৫-[১৪] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দীন সর্বদাই বিজয়ী থাকবে (ততদিন), যতদিন মানুষ তাড়াতাড়ি ইফতার করবে। কারণ ইয়াহূদী ও খৃষ্টানরা ইফতার করতে বিলম্ব করে। (আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ)[1]
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَزَالُ الدِّينُ ظَاهِرًا مَا عَجَّلَ النَّاسُ الْفِطْرَ لِأَنَّ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى يُؤَخِّرُونَ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: ‘‘যতদিন পর্যন্ত লোকেরা দ্রুত ইফতার করবে ততদিন পর্যন্ত দীন বিজয়ী থাকবে।’’ ‘আল্লামা আল কারী বলেনঃ আল্লাহই ভাল জানেন এর কারণ হয়ত এই যে, এই দীনে হানীফ তথা ইসলামী জীবন বিধান একটি সহজ সরল জীবন বিধান। এতে কোন প্রকার সংকীর্ণতা নেই। তাই অব্যাহতভাবে এ দীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা অত্যন্ত সহজ যা আহলে কিতাবদের বিপরীত। কেননা আহলে কিতাবগণ নিজেদের ওপর কঠোরতা আরোপ করেছিল বিধায় আল্লাহ তা‘আলাও তাদের ওপর কঠোরতা আরোপ করেন। ফলে তারা তাদের দীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে ব্যর্থ হয়।
(لِأَنَّ الْيَهُوْدَ وَالنَّصَارٰى يُؤَخِّرُوْنَ) ‘‘কেননা ইয়াহূদ ও নাসারাগণ বিলম্বে ইফতার করে।’’ অর্থাৎ- তারা সূর্যাস্তের পরও আকাশে ঘন তারকা দেখা যাওয়া পর্যন্ত ইফতার করতে বিলম্ব করে। সাধারণভাবেই বুঝা যায় যে, এ বিলম্বের জন্য সায়িমের কষ্ট হয়। আর এ কষ্টের কারণেই সিয়াম পালনে ব্যর্থ হয়ে তারা সিয়াম পালনই ছেড়ে দেয়। পক্ষান্তরে ইসলাম সূর্যাস্তের সাথে সাথে ইফতার করার নির্দেশ দিয়ে সায়িমের জন্য সিয়াম সহজ করে দিয়েছেন। আর যারা এ সহজ পথ অবলম্বন করবে তারা সিয়াম পালনে ব্যর্থ হবে না তাই দীন বিজয়ী থাকবে।
ইমাম ত্বীবী বলেনঃ বিলম্ব না করার কারণ উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, তা আহলে কিতাবদের কাজ। এতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, ইসলামের শত্রু আহলে কিতাবদের বিরোধিতা করার মধ্যেই এ দীন ইসলাম প্রতিষ্ঠিত থাকবে। আর তাদের অনুসরণ করার মধ্যেই এ দীনের ধ্বংস নিহীত আছে। যেমন আল্লাহ সুবহানাহূ ওয়াতা‘আলা বলেছেন,
يٰٓايُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُوْدَ وَالنَّصٰرٰى أَوْلِيَآءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَآءُ بَعْضٍ وَمَنْ يَّتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَإِنَّه‘ مِنْهُمْ
‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইয়াহূদ ও নাসারাদেরকে নিজেদের বন্ধু বানাবে না, তারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু, তোমাদের মধ্যে হতে যারা তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে তারা তাদেরই দলভুক্ত।’’ (সূরা আল মায়িদাহ্ ৫ : ৫১)
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সওম পর্বের বিক্ষিপ্ত মাস্আলাহ্
১৯৯৬-[১৫] আবূ ’আত্বিয়্যাহ্ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ও মাসরূক উভয়ে (একদিন) ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর কাছে গেলাম ও আমরা আরয করলাম, হে উম্মুল মু’মিনীন! মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দু’জন সাথী আছেন। তাদের একজন দ্রুত ইফতার করেন, দ্রুত সালাত আদায় করেন। আর দ্বিতীয়জন বিলম্বে ইফতার করেন ও বিলম্বে সালাত আদায় করেন। ’আয়িশাহ্ (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, তাড়াতাড়ি করে ইফতার করেন ও সালাত আদায় করেন কে? আমরা বললাম, ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ। ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বললেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপই করতেন। আর অপর ব্যক্তি যিনি ইফতার করতে ও সালাত আদায় করতে দেরী করতেন, তিনি ছিলেন আবূ মূসা। (মুসলিম)[1]
وَعَنْ أَبِي عَطِيَّةَ قَالَ: دَخَلْتُ أَنَا وَمَسْرُوقٌ عَلَى عَائِشَةَ فَقُلْنَا: يَا أُمَّ الْمُؤْمِنِينَ رَجُلَانِ مِنْ أَصْحَابِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَحَدُهُمَا يُعَجِّلُ الْإِفْطَارَ وَيُعَجِّلُ الصَّلَاةَ وَالْآخَرُ: يُؤَخِّرُ الْإِفْطَارَ وَيُؤَخِّرُ الصَّلَاةَ. قَالَتْ: أَيُّهُمَا يُعَجِّلُ الْإِفْطَارَ وَيُعَجِّلُ الصَّلَاةَ؟ قُلْنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مَسْعُودٍ. قَالَتْ: هَكَذَا صَنَعَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالْآخَرُ أَبُو مُوسَى. رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যা: ইমাম ত্বীবী বলেনঃ যিনি তাড়াতাড়ি ইফতার করেন ও তাড়াতাড়ি সালাত আদায় করেন তিনি শারী‘আতে দৃঢ় বিধান ও সুন্নাতের উপর ‘আমল করেন। আর যিনি বিলম্বে ইফতার করেন ও বিলম্বে সালাত আদায় করেন তিনি শারী‘আত যে সুযোগ দিয়েছে তার উপর ‘আমল করেন। উল্লেখ্য যে, হাদীসে বর্ণিত প্রথম ব্যক্তি হলেন ইবনু মাস্‘ঊদ এবং ২য় ব্যক্তি হলেন আবূ মূসা আল আশ্‘আরী। কারী বলেনঃ উপরোক্ত মতভেদ বলতে তাদের ‘আমলের মতভেদ উদ্দেশ্য হলে তা অবশ্য সঠিক। আর যদি এ মতভেদ দ্বারা তাদের বক্তব্য উদ্দেশ্য হয় তাহলে ইবনু মাস্‘ঊদ (রাঃ) এর বক্তব্য দ্বারা উক্ত কাজ দ্রুত করার ক্ষেত্রে আধিক্য বুঝানো উদ্দেশ্য আর আবূ মূসার বক্তব্য দ্বারা দ্রুততার আধিক্য না বুঝানো উদ্দেশ্য। তবে বিলম্বে সুযোগের ক্ষেত্রে উভয়ের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। এখানে অবশ্য এটাও হতে পারে যে, ইবনু মাস্‘ঊদ (রাঃ) এর কর্ম দ্বারা সুন্নাত বুঝানো উদ্দেশ্য। আর আবূ মূসার কর্ম দ্বারা বিলম্ব করা বৈধ হওয়া বুঝানো উদ্দেশ্য।
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সওম পর্বের বিক্ষিপ্ত মাস্আলাহ্
১৯৯৭-[১৬] ’ইরবায ইবনু সারিয়াহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (একদিন) আমাকে রমাযানের সাহরী খেতে ডাকলেন এবং বললেন, বারাকাতপূর্ণ খাবার খেতে এসো। (আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
وَعَنِ الْعِرْبَاضِ بْنِ سَارِيَةَ قَالَ: دَعَانِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى السَّحُورِ فِي رَمَضَانَ فَقَالَ: «هَلُمَّ إِلَى الْغَدَاءِ الْمُبَارَكِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد والسنائي
ব্যাখ্যা: (هَلُمَّ إِلَى الْغَدَاءِ الْمُبَارَكِ) ‘‘বারাকাতপূর্ণ সকালের খাবারের দিকে এসো’’। দিনের প্রথম ভাগের খাবারকে ‘আরাবীতে (الْغَدَاءُ) বলা হয়। এখানে সাহরীকে (الْغَدَاءُ) ‘‘গাদা’’ এজন্য বলা হয়ছে যে, তা সায়িমের জন্য মুফতিরের তথা সিয়ামবিহীন অবস্থায় সকালের খাবারের তুল্য।
ইমাম খাত্ত্বাবী বলেনঃ সাহরীকে (الْغَدَاءُ) এজন্য বলা হয়েছে যে, সায়িম ব্যক্তি এ খাবার দ্বারা দিনের বেলায় সিয়াম পালনের শক্তি অর্জন করে থাকে। এক্ষেত্রে সে ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে সকালের খাবার দ্বারা শক্তি অর্জন করে। কোন ব্যক্তি যখন তার প্রয়োজন পূরণের জন্য ভোর থেকে নিয়ে সূর্যোদয়ের মধ্যে কোন কাজ করে সে ক্ষেত্রে ‘আরবরা বলে থাকে غدا فلان لحاجته। তাই সিয়াম পালনকারী কর্তৃক সাহরীর সময় প্রয়োজনীয় খাবার গ্রহণকে (الْغَدَاءُ) বলা হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সওম পর্বের বিক্ষিপ্ত মাস্আলাহ্
১৯৯৮-[১৭] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মু’মিনের জন্য সাহরীর উত্তম খাবার হলো খেজুর। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «نِعْمَ سَحُورُ الْمُؤْمِنَ التَّمْرُ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যা: এখানে (تمر) খেজুরকে উত্তম সাহরী বলা হয়েছে। কারণ তা দ্বারা সাহরীর মধ্যে বারাকাত রয়েছে এবং প্রচুর সাওয়াবও রয়েছে। এজন্য অন্যান্য সাহরীর উপর একে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। অনুরূপ ইফতারের ক্ষেত্রেও যদি রুতাব (টাটকা খেজুর) না পাওয়া যায়। ইমাম ত্বীবী বলেনঃ সাহরীর খাবার হিসেবে খেজুরের প্রশংসা করার কারণ এই যে, সাহরী গ্রহণ করাটাই একটি বারাকাতময় কাজ আর খেজুর দ্বারা সাহরী গ্রহণ করা বারাকাতের উপর বারাকাত। যেমন পূর্বে বর্ণিত হয়েছে ‘‘তোমাদের মধ্যে কেউ যখন ইফতার করে সে যেন খেজুর দিয়ে ইফতার করে, কেননা তার মধ্যে বারাকাত রয়েছে’’। অতএব তা দ্বারা শুরু করা এবং তা দ্বারা শেষ করার মাধ্যমে উভয় ক্ষেত্রে বারাকাত অর্জন করাই উদ্দেশ্য।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - সওম পবিত্র করা
১৯৯৯-[১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি (সিয়ামরত অবস্থায়) মিথ্যা কথা বলা ও এর উপর ’আমল করা ছেড়ে না দেয়, তার পানাহার ত্যাগ করায় আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। (বুখারী)[1]
بَابُ تَنْزِيْهِ الصَّوْمِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالْعَمَلَ بِهِ فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةٌ فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابه» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: (قَوْلُ الزُّورِ) ‘‘ত্বীবী বলেনঃ زور হল মিথ্যা ও অপবাদ। অর্থাৎ- কুফরী কথাবার্তা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া, বানোয়াট কথাবার্তা, পরনিন্দা করা, অপবাদ দেয়া, যিনার মিথ্যা অপবাদ দেয়া, গালিগালাজ করা, অভিশাপ দেয়া এসবই (قَوْلُ الزُّورِ) এর অন্তর্ভুক্ত।
(وَالْعَمَلَ بِه) ‘‘বাতিল কাজ করা।’’ অর্থাৎ- অশ্লীল কাজ করা, কেননা অশ্লীল কাজের গুনাহ বাতিল কথার গুনাহের মতই গুনাহ।
ইমাম ত্বীবী বলেনঃ এ দ্বারা উদ্দেশ্য অশ্লীল এবং আল্লাহর নিষিদ্ধ করেছেন এমন সকল কাজ পরিত্যাগ করা।
(فَلَيْسَ لِلّٰهِ حَاجَةٌ) ‘‘আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই।’’ এখানে রূপক অর্থ উদ্দেশ্য। অর্থ তার ‘আমল তথা সিয়াম কবূল হবে না। কেননা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা‘আলার কোন বান্দার ‘ইবাদাতেরই প্রয়োজন নেই।
কাযী বায়যাবী বলেনঃ সওমের বিধান দ্বারা বান্দাকে ক্ষুধার্ত পিপাসার্ত করা উদ্দেশ্য নয়। বরং উদ্দেশ্য হলো এর দ্বারা বান্দার অবৈধ শাহওয়াত দমন করা এবং নাফসে আম্মারাহকে নাফসে মুতমা‘ইন্নার অনুগত বানানো। যখন তা অর্জিত না হবে তখন আল্লাহর নিকট ঐ ‘আমল তথা সিয়াম গ্রহণযোগ্য হবে না।
ইবনু বাত্ত্বাল বলেনঃ এর অর্থ এ রকম নয় যে, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও অনুরূপ কাজ পরিত্যাগ না করবে তাকে সিয়াম পালন থেকে বিরত থাকতে আদেশ করা হবে। বরং উদ্দেশ্য হলো সায়িমকে মিথ্যা বলা হতে সতর্ক করা যাতে সে সিয়ামের পূর্ণ সাওয়াব অর্জনে সক্ষম হয়। জেনে রাখা ভাল যে, জমহূর ‘উলামাগণের মতে মিথ্যা ও পরনিন্দা সওম বিনষ্ট করে না।
ইমাম সওরী ও ইমাম আওযা‘ঈ-এর মতে গীবত তথা পরনিন্দা সওম বিনষ্ট করে। সঠিক কথা হলো তা সওম বিনষ্ট করে না তবে ঐ সমস্ত কাজ সওমের ক্ষতি করে তথা পূর্ণ সাওয়াব অর্জনে বাধার সৃষ্টি করে।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - সওম পবিত্র করা
২০০০-[২] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সওমরত অবস্থায় (নিজের স্ত্রীদেরকে) চুমু খেতেন এবং (তাদেরকে) নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে ধরতেন। কেননা তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রয়োজনে নিজেকে তোমাদের চেয়ে অনেক বেশী নিয়ন্ত্রণে রাখতে সমর্থ ছিলেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ تَنْزِيْهِ الصَّوْمِ
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُقَبِّلُ وَيُبَاشِرُ وَهُوَ صَائِمٌ وَكَانَ أَمْلَكَكُمْ لأربه
ব্যাখ্যা: (يُقَبِّلُ وَيُبَاشِرُ وَهُوَ صَائِمٌ) ‘‘সিয়ামরত অবস্থায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুম্বন দিতেন ও মুবাশারা (আলিঙ্গন) করতেন।’’
ইবনু মালিক বলেনঃ অর্থাৎ তিনি তাঁর কোন স্ত্রীর গায়ে হাতের স্পর্শ বুলাতেন। যদিও মুবাশারাহ্ দ্বারা সহবাস অর্থ নেয়া হয় কিন্ত এখানে তা উদ্দেশ্য নয়। ইমাম শাওকানী বলেনঃ অত্র হাদীসে মুবাশারাহ্ দ্বারা সহবাস ব্যতীত সকল ধরনের মেলামেশা উদ্দেশ্য। মুসলিমের বর্ণনায় রয়েছে, ‘‘তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) রমাযান (রমজান) মাসে সিয়ামরত অবস্থায় চুম্বন দিতেন’’ এর দ্বারা ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) এ কথার ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এক্ষেত্রে নফল সিয়াম ও ফরয সিয়ামের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।
(وَكَانَ أَمْلَكَكُمْ لِأَرْبِه) ‘‘তিনি প্রয়োজনে নিজেকে তোমাদের চেয়ে অনেক বেশী নিয়ন্ত্রণে রাখতে সমর্থ ছিলেন।’’ ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর এ কথার মর্ম কি তা নিয়ে ‘উলামাগণের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে।
১. তিনি এর দ্বারা বুঝিয়েছেন যে, যদিও তিনি সিয়ামরত অবস্থায় তাঁর স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা করতেন তথাপি তিনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে অধিক সক্ষম ছিলেন তোমাদের চাইতে। তাই তাঁর জন্য তা বৈধ হলেও অন্যের জন্য তা বৈধ নয়। কেননা অন্যরা তাঁর মত সওম রক্ষায় নিরাপদ নয়। অতএব অন্যদের জন্য তা মাকরূহ।
২. তিনি চুম্বন দেয়া ও মেলামেশা করা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে তোমাদের চেয়ে অধিক ক্ষমতাশালী ছিলেন এ সত্ত্বেও তিনি চুম্বন দিয়েছেন ও মেলামেশা করেছেন। অন্য কেউ তা পরিত্যাগ করতে তাঁর মত ধৈর্যশীল নয়। কেননা অন্য কেউ স্বীয় প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে তাঁর মত নয়। অতএব তা অন্যের জন্য বৈধ হবে না কেন? এ কথাতে এ ইঙ্গিত রয়েছে যে, অন্যরা এক্ষেত্রে তাঁর চেয়ে অধিক উপযোগী তথা তা তাদের জন্য বৈধ হওয়ার ক্ষেত্রে তারা আরো বেশী উপযোগী। বুখারীতে ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত মু‘আল্লাক হাদীস এ অর্থকে সমর্থন করে। তিনি অর্থাৎ- ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেছেন, ‘‘তার জন্য লজ্জাস্থান হারাম’’।
ইমাম ত্বহাবী হাকীম ইবনু ‘ইকাল থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেনঃ আমি ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে প্রশ্ন করলাম, আমি সিয়ামরত অবস্থায় আমার জন্য আমার স্ত্রীর কতটুকু হারাম? তিনি বললেন, তার লজ্জাস্থান। ‘আবদুর রাজ্জাক সহীহ সূত্রে মাসরূক থেকে বর্ণনা করেছেন। আমি ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম সিয়ামরত একজন পুরুষের জন্য তার স্ত্রীর কতটুকু তার জন্য হালাল? তিনি বললেন, সহবাস ব্যতীত আর সবই হালাল।
সিয়ামরত অবস্থায় সহবাস ব্যতীত স্ত্রীর সাথে মেলামেশা করা সম্পর্কে ‘উলামাগণের মতানৈক্য রয়েছে। তা নিম্নে বর্ণিত হল।
১. তা মাকরূহ- এ অভিমত ইমাম মালিক এবং তার অনুসারীদের।
২. তা হারাম- কুফাবাসী ফকীহ ‘আবদুল্লাহ ইবনু শুবরুমাহ্ এ অভিমত পোষণ করতেন। এ মতের স্বপক্ষে সূরা বাকারার ১৮৭ নং আয়াতের অংশ فَالْآنَ بَاشِرُوهُنَّ পেশ করে বলেছেন, এ আয়াতে দিনের বেলায় সিয়াম পালনকারীর মুবাশারাহ্ হারাম করা হয়েছে। অতএব তা হারাম। এর জওয়াব এই যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর কালামের ব্যাখ্যাকারী। তিনি নিজ কর্ম দ্বারা দিনের বেলায় মুবাশারাহ্ বৈধ হওয়ার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। অতএব অত্র আয়াতে মুবাশারাহ্ দ্বারা সহবাস উদ্দেশ্য।
৩. তা বৈধ- আবূ হুরায়রাহ্, সা‘ঈদ, ও সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস প্রমুখ সাহাবীগণ এ মত পোষণ করতেন। এর প্রমাণ ‘উমার (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীস। তিনি বলেনঃ আমি একদিন উৎফুল্ল হয়ে সিয়ামরত অবস্থায় আমার স্ত্রীকে চুম্বন দেই, অতঃপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলি আমি আজ এক বড় (অপরাধের) কাজ করেছি। সিয়ামরত অবস্থায় আমি আমার স্ত্রীকে চুম্বন দিয়েছি। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সিয়ামরত অবস্থায় পানি দ্বারা কুলি করলে কি হত বলে তুমি মনে কর? আমি বললাম এতে কোন ক্ষতি নেই। তিনি বললেন, তা হলে চুম্বনে আর কি (ক্ষতি)? (মুসনাদ আহমাদ ১/২১-২৫)
৪. যুবকের জন্য তা মাকরূহ, আর বৃদ্ধের জন্য তা বৈধ। ইবনু ‘আব্বাস -এর প্রসিদ্ধ মত এটিই।
৫. যদি নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয় তবে তার জন্য তা বৈধ পক্ষান্তরে যদি নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারার আশংকা থাকে তবে তার জন্য তা বৈধ নয়। সুফ্ইয়ান সাওরী, ইমাম শাফি‘ঈ ও ইমাম আবূ হানীফার মত এটাই। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল-ও এ মত পোষণ করেন।
৬. নফল সিয়ামের ক্ষেত্রে তা বৈধ, ফরয সিয়ামের ক্ষেত্রে তা মাকরূহ। এটা ইমাম মালিক থেকে বর্ণিত একটি অভিমত। এক্ষেত্রে সঠিক অভিমত হচ্ছে ৫ম অভিমত।
যদি মেলামেশা ও চুম্বন দেয়ার ফলে মানী অথবা মাযী নির্গত হয় তাহলে করণীয় কি? এক্ষেত্রে ইমাম শাফি‘ঈ এবং কূফাবাসী ‘আলিমদের অভিমত হল, মানি নির্গত হলে কাযা করতে হবে আর মাযী নির্গত হলে কাযা করতে হবে না।
ইমাম মালিক ও ইসহাক বলেন, মানি নির্গত হলে কাযা ও কাফফারা উভয়টি জরুরী। আর মযী নির্গত হলে কাযা করতে হবে। ইবনু হাযম-এর মতে কাযা ও কাফফারা কিছুই করতে হবে না।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - সওম পবিত্র করা
২০০১-[৩] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযান (রমজান) মাসে ভোর পর্যন্ত অপবিত্র অবস্থায় থাকতেন। এ অপবিত্রতা স্বপ্নদোষের কারণে নয়। এরপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) গোসল করতেন ও সওম পালন করতেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ تَنْزِيْهِ الصَّوْمِ
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُدْرِكُهُ الْفَجْرُ فِي رَمَضَانَ وَهُوَ جُنُبٌ مِنْ غَيْرِ حُلْمٍ فَيَغْتَسِلُ وَيَصُومُ
ব্যাখ্যা: (فَيَغْتَسِلُ وَيَصُوْمُ) ‘‘অতঃপর তিনি গোসল করতেন ও সিয়াম পালন করতেন।’’ এ হাদীসে প্রমাণ করে যে, কোন ব্যক্তি জুনুবী অবস্থায় ফজর ওয়াক্তে উপনীত হলে তার সিয়াম বিশুদ্ধ। এ নাপাকী স্বপ্নদোষের কারণেই হোক অথবা সহবাসের কারণেই হোক জমহূরে ‘আলিমদের অভিমত এটিই।
হাসান ও মালিক ইবনু ‘আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে যে, তার সিয়াম বিশুদ্ধ হবে না এবং তা কাযা করতে হবে।
হায়িয ও নিফাস হতে যে নারী রাতের বেলা পবিত্র হয় এবং গোসলের পূর্বেই ফজর ওয়াক্ত তার বিধানও জুনুবীর মতই। অবশ্য উপরে বর্ণিত সকলের ক্ষেত্রেই ফজরের পূর্বেই সিয়ামের নিয়্যাত করতে হবে।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - সওম পবিত্র করা
২০০২-[৪] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম অবস্থায় শিঙ্গা লাগিয়েছেন। ঠিক এভাবে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সায়িম অবস্থায় শিঙ্গা লাগিয়েছেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ تَنْزِيْهِ الصَّوْمِ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ احْتَجَمَ وَهُوَ مُحْرِمٌ وَاحْتَجَمَ وَهُوَ صَائِمٌ
ব্যাখ্যা: (وَاحْتَجَمَ وَهُوَ صَائِمٌ) ‘‘আর সিয়ামরত অবস্থায় তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) রক্তমোক্ষণ করিয়েছেন।’’ আমীর ইয়ামানী বলেনঃ হাদীসের প্রকাশ্য অর্থ এই যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিয়াম অবস্থায় রক্তমোক্ষণ করিয়েছেন। অনুরূপভাবে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইহরাম অবস্থায়ও রক্তমোক্ষণ করিয়েছেন কিন্তু এ দু’টি বিষয় তিনি একত্রে করেননি। কেননা বিদায় হাজ্জের ইহরামে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সিয়াম পালন করেননি। অনুরূপভাবে মক্কা বিজয়ের বৎসর তিনি সিয়াম পালন করলেও ইহরাম অবস্থায় ছিলেন না। অনুরূপভাবে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কোন ‘উমরাতেও ইহরাম অবস্থায় নফল সিয়াম পালন করেছেন বলে কোন প্রমাণ নেই। অতএব তার এ দু’টি কাজ একত্রে হয়নি। বরং তা পৃথকভাবে ভিন্ন সময়ে সংঘটিত হয়েছে। সিয়াম অবস্থায় রক্তমোক্ষণ করার বিধান কি? এ বিষয়ে ‘উলামাগণের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে।
১. তা সিয়াম ভঙ্গ করে না। এ অভিমত পোষণ করেন ইমাম মালিক, ইমাম শাফি‘ঈ, ইমাম আবূ হানীফাহ সহ জমহূর ‘আলিমগণ। ইবনু ‘আব্বাস থেকে বর্ণিত অত্র হাদীসটি তাদের মতের স্বপক্ষে দলীল।
২. যে রক্তমোক্ষণ করায় এবং যিনি তা করেন, উভয়ের সিয়াম ভঙ্গ হয়ে যাবে। এ অভিমত পোষণ করেন ‘আত্বা, আওযা‘ঈ, আহমাদ, ইসহাক, আবূ সাওর, ইবনু খুযায়মাহ্, ইবনুল মুনযির, আবূল ওয়ালীদ নীসাপূরী ও ইবনু হিববান প্রমুখ ‘আলিমগণ। তাদের দলীল (أفطر الحاجم) রক্তমোক্ষণকারী এবং যে তা করালো উভয়ের সিয়াম ভঙ্গ হয়ে গেছে, অত্র হাদীস।
৩. সায়িমের জন্য তা মাকরূহ। এ অভিমত পোষণ করেন মাসরূক, হাসান বাসরী এবং ইবনু সিরীন। যারা বলেন রক্তমোক্ষণ সিয়াম ভঙ্গ করেন তারা বলেন, (أفطر الحاجم والمحجوم) হাদীসটি মানসূখ।
ইবনু হাযম বলেনঃ আবূ সা‘ঈদ থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সায়িমকে রক্তমোক্ষণ করার অনুমতি দিয়েছেন, এর সানাদ সহীহ। এতে জানা গেল যে, অনুমতি দেয়ার পূর্বে তা নিষেধ ছিল। এ অনুমতির ফলে পূর্বের নিষেধাজ্ঞা বাতিল হয়ে গেল।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - সওম পবিত্র করা
২০০৩-[৫] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি সওম অবস্থায় ভুলে কিছু খেয়ে বা পান করে ফেলে, সে যেন সওম পূর্ণ করে। কেননা এ খাওয়ানো ও পান করানো আল্লাহর তরফ থেকেই হয়ে থাকে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ تَنْزِيْهِ الصَّوْمِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «من نسي وَهُوَ صَائِم فأل أَوْ شَرِبَ فَلْيُتِمَّ صَوْمَهُ فَإِنَّمَا أَطْعَمَهُ اللَّهُ وسقاه»
ব্যাখ্যা: (فَأَكَلَ أَوْ شَرِبَ) ‘‘অতঃপর সে খেল অথবা পান করল’’ এ বাক্য থেকে বুঝা যায় যে, খাওয়া বা পান পরিমাণ কম বা বেশী যাই হোক না কেন তাতে সিয়াম ভঙ্গ হবে না।
(فَإِنَّمَا أَطْعَمَهُ اللّٰهُ وَسَقَاهُ) ‘‘আল্লাহ তাকে খাইয়েছে ও পান করিয়েছে।’’ অর্থাৎ- বান্দার এখানে কোন কর্তৃত্ব নেই। সিন্দী বলেনঃ এ বাক্য দ্বারা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কাজকে বান্দার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেছেন ভুলে যাওয়ার কারণে। ফলে তার এ কাজ সিয়াম ভঙ্গের অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না।
হাদীসের শিক্ষাঃ যে ব্যক্তি সিয়ামের কথা ভুলে গিয়ে কিছু খায় বা পান করে এতে তার সিয়াম ভঙ্গ হয় না। ফলে তার এ সিয়াম কাযা করতে হবে না। ইমাম শাফি‘ঈ, আহমাদ, আবূ হানীফাহ্, ইসহাক, আওযা‘ঈ, সাওরী, ‘আত্বা ও তাউস সহ জমহূর ‘উলামাগণের এ অভিমত। পক্ষান্তরে ইমাম মালিক ও তার শায়খ রবী‘আহ্-এর মত এই যে, তার সওম ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং তাকে তা কাযা করতে হবে। এতে ফরয ও নফল সিয়ামের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। এদের দলীল এই যে, পানাহার থেকে বিরত থাকা সিয়ামের একটি রুকন। যখন এ রুকন হাতছাড়া হয়ে যাবে তখন সিয়ামও ভঙ্গ হয়ে যাবে তা যেভাবেই হোক না কেন।
কেউ যদি সিয়ামের কথা ভুলে গিয়ে রমাযানের দিনের বেলায় সহবাস করে তাহলে সিয়াম ভঙ্গ হবে কিনা এ বিষয়ে ‘উলামাগণের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে।
১. সিয়াম ভঙ্গ হবে না- এ অভিমত পোষণ করেন ইমাম সাওরী, আবূ হানীফাহ্, শাফি‘ঈ, ইসহাক, হাসান বাসরী এবং মুজাহিদ। এদের দলীল আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত অত্র হাদীস। যদিও হাদীসটি ভুলে গিয়ে পানাহার সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রেও কারণ এই একটিই তা হল ভুলে যাওয়া। পানাহারের ক্ষেত্রে ভুলে যাওয়ার কারণে যেমন তা বান্দার কর্তৃত্বের বহির্ভূত তেমনিভাবে সহবাসের ক্ষেত্রেও তা বান্দার কর্তৃত্বের বহির্ভূত। অতএব উভয় ক্ষেত্রেই বিধান একই আর তা হল সিয়াম ভঙ্গ না হওয়া।
২. ইমাম ‘আত্বা, আওযা‘ঈ, মালিক ও লায়স ইবনু সা‘দ বলেনঃ তার সিয়াম ভঙ্গ হয়ে যাবে। ফলে তা কাযা করতে হবে। তবে কোন কাফফারা দিতে হবে না।
৩. ইমাম আহমাদ বলেনঃ তার সিয়াম ভঙ্গ হয়ে যাবে। ফলে তাকে তা কাযা করতে হবে এবং কাফফারাও দিতে হবে। এ মতের স্বপক্ষে তিনি দলীল হিসেবে বলেন যে, যে ব্যক্তি দিনের বেলায় স্ত্রী সহবাস করেছিলেন এবং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে এ বিষয়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তা অবহিত করলে তিনি এ কথা জিজ্ঞেস করেননি যে, সে কি ভুলে গিয়ে এ কাজ করেছে না ইচ্ছাকৃতভাবে করেছে। যদি এ দুই অবস্থার মধ্যে কোন পার্থক্য থাকত তাহলে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা বিস্তারিতভাবে জানতে চাইতেন।
জমহূরের পক্ষ থেকে এর জওয়াব দেয়া হয়েছে যে, ইমাম আহমাদের অভিমত অনুযায়ী ভুলে পানাহারকারীর সিয়াম ভঙ্গ হয় না, কেননা এটি তার কোন অপরাধ নয়। অনুরূপ ভুলে সহবাসকারীও অপরাধী নয়। অতএব তার সিয়াম ভঙ্গ হবে না। ফলে তা কাযাও করতে হবে না এবং কাফফারাও দিতে হবে না। আর এ অভিমতটিই সঠিক। আল্লাহই ভাল জানেন।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - সওম পবিত্র করা
২০০৪-[৬] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা এক সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে বসেছিলাম। হঠাৎ করে এক ব্যক্তি (সালামাহ্ ইবনু সাখর আল বায়াযী) তাঁর কাছে হাযির হলো ও বলতে লাগল, হে আল্লাহর রসূল! আমি ধ্বংস হয়ে গেছি! তিনি বললেন, তোমার কি হয়েছে? সে বলল, আমি সওমরত অবস্থায় স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করে বসেছি। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমার কি কোন গোলাম আছে যাকে তুমি মুক্ত করে দিতে পার? লোকটি বলল, না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তুমি কি একাধারে দু’ মাস সিয়াম পালন করতে পারবে? সে বলল, না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তুমি কি ষাটজন মিসকীনকে খাওয়াতে পারবে? সে বলল, না। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তুমি বসো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও এখানে কিছুক্ষণ বসে রইলেন। ঠিক এ সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট একটি ’আরাক’ নিয়ে আসা হলো। এতে ছিল খেজুর।
’আরাক’ একটি বড় ভাণ্ড বা গাঁইটকে বলা হয় (যা খেজুরের পাতা দিয়ে তৈরি; এতে ষাট থেকে আশি সের পর্যন্ত খেজুর ধরে)। এটা দেখে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ প্রশ্নকারী কোথায়? লোকটি বলল, এই তো আমি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এটি নিয়ে নাও। এগুলো সাদাকা্ করে দাও। লোকটি বলল, হে আল্লাহর রসূল! আমি কি এগুলো আমার চেয়েও গরীবকে দান করব? আল্লাহর কসম, মদীনার উভয় প্রান্তে এমন কোন পরিবার নেই, যারা আমার পরিবারের চেয়ে বেশী অভাবী। মদীনার উভয় প্রান্ত বলতে সে দু’টি কঙ্করময় এলাকা বুঝিয়েছে। (তার কথা শুনে) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে ফেললেন। এমনকি তাঁর সামনের পাটির দাঁতগুলো দেখা গেল। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আচ্ছা এ খেজুরগুলো তোমার পরিবার-পরিজনকে খাওয়াও। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ تَنْزِيْهِ الصَّوْمِ
وَعَن أبي هُرَيْرَة قَالَ: بَيْنَمَا نَحْنُ جُلُوسٌ عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذْ جَاءَهُ رَجُلٌ فَقَالَ: يَا رَسُول الله هَلَكت. قَالَ: «مَالك؟» قَالَ: وَقَعْتُ عَلَى امْرَأَتِي وَأَنَا صَائِمٌ. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «هَلْ تَجِدُ رَقَبَةً تُعْتِقُهَا؟» . قَالَ: لَا قَالَ: «فَهَلْ تَسْتَطِيعُ أَنْ تَصُومَ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ؟» قَالَ: لَا. قَالَ: «هَلْ تَجِدُ إِطْعَامَ سِتِّينَ مِسْكِينًا؟» قَالَ: لَا. قَالَ: «اجْلِسْ» وَمَكَثَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم فَبينا نَحْنُ عَلَى ذَلِكَ أُتِيَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِعَرَقٍ فِيهِ تَمْرٌ وَالْعَرَقُ الْمِكْتَلُ الضَّخْمُ قَالَ: «أَيْنَ السَّائِلُ؟» قَالَ: أَنَا. قَالَ: «خُذْ هَذَا فَتَصَدَّقْ بِهِ» . فَقَالَ الرَّجُلُ: أَعَلَى أَفْقَرَ مِنِّي يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ فَوَاللَّهِ مَا بَيْنَ لَابَتَيْهَا يُرِيدُ الْحَرَّتَيْنِ أَهْلُ بَيْتِ أَفْقَرُ م أَهْلِ بَيْتِي. فَضَحِكَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَتَّى بَدَتْ أَنْيَابُهُ ثُمَّ قَالَ: «أَطْعِمْهُ أهلك»
ব্যাখ্যা: (يَا رَسُوْلَ اللهِ هَلَكْتُ) ‘‘হে আল্লাহর রসূল! আমি ধ্বংস হয়ে গিয়েছি’’ হাদীসের এ অংশ দ্বারা প্রমাণ করা হয় যে, লোকটি স্বেচ্ছায় এ কাজ করে ছিল। কেননা هلك শব্দটি অবাধ্যতার রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আর ইচ্ছাকৃত অন্যায়কে অবাধ্যতা বলা যায়। ভুলে কোন অন্যায় করলে তা অবাধ্যতা নয়। এ থেকে বুঝা গেল যে, ভুলে গিয়ে কেউ এ কাজ করলে তার জন্য কাফফারা নেই। এ বিষয়ে মতভেদ পূর্বের হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে।
(هَلْ تَجِدُ رَقَبَةً تُعْتِقُهَا؟) ‘‘তুমি কি দাস আযাদ করতে সক্ষম?’’ যারা বলেন কাফফারার ক্ষেত্রে কাফির দাস আযাদ করা বৈধ তারা হাদীসটিকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। যেমন হানাফীগণ এবং ইবনু হাযম। পক্ষান্তরে ইমাম মালিক, শাফি‘ঈ এবং আহমাদ ইবনু হাম্বল-এর মতে অবশ্যই মুসলিম দাস হতে হবে। কেননা হত্যার কাফফারাতে মুসলিম হওয়া শর্ত। এর ভিত্তি এই যে, বিধান যখন একই হয় তখন কারণ ভিন্ন হলেও শর্তমুক্ত বিধানকে শর্তযুক্ত বিধানের আওতাভুক্ত করা হবে কি? যদি শর্তযুক্ত করা হয় তা কি কিয়াম কিয়াসের ভিত্তিতে, না অন্য কিছু দ্বারা? যার বিস্তারিত বর্ণনা উসূলের কিতাবসমূহের মধ্যে বিদ্যমান।
(إِطْعَامَ سِتِّينَ مِسْكِينًا؟) ‘‘ষাটজন মিসকীনকে খাওয়াতে সক্ষম কি?’’ ইবনু দাক্বীক আল ‘ঈদ বলেনঃ হাদীসের এ অংশ প্রমাণ করে উল্লেখিত সংখ্যক মিসকীনকে খাওয়াতে হবে। দশজন মিসকীনকে ছয়দিন খাওয়ালে চলবে না। হানাফীদের প্রসিদ্ধ অভিমত এই যে, একজন মিসকীনকে ষাটদিন খাওয়ালেও চলবে। হাফেয ইবনু হাজার বলেনঃ إِطْعَامَ থেকে উদ্দেশ্য খাদ্য দান করা, খাওয়ানো শর্ত নয়।
হাদীস প্রমাণ করে যে, সিয়াম ভঙ্গের কাফফারা হাদীসে বর্ণিত তিনটি বিষয়ের যে কোন একটি কাফফারা হিসেবে যথেষ্ট জমহূর ‘উলামাগণের অভিমত এটিই।
ইমাম মালিক-এর প্রসিদ্ধ মত এই যে, সহবাসের মাধ্যমে সিয়াম ভঙ্গ হলে তার কাফফারা হবে খাদ্য খাওয়ানো অন্য কিছু নয়। আর পানাহারের মাধ্যমে সিয়াম ভঙ্গ হলে হাদীসে বর্ণিত তিনটির কোন একটি বিষয় কাফফারা হিসেবে যথেষ্ট।
হাদীসে বর্ণিত কাফফারার বিষয়সমূহ হতে যে কোন একটি ইচ্ছামত দেয়া যাবে। নাকি প্রথমে বর্ণিত বিষয় আদায়ে অপারগ হলে ২য়টি আর ২য়টিতে অপারগ হলে ৩য়টি করতে হবে? এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে।
১. ইমাম শাফি‘ঈ, আহমাদ ও আবূ হানীফার মতে গোলাম আযাদ করতে অসমর্থ হলে দুই মাস সিয়াম পালন করবে। তা করতে অপারগ হলে ষাটজন মিসকীন খাওয়াবে। অত্র হাদীসটি তাদের দলীল।
২. কাযী ‘ইয়ায-এর মতে ধারাবাহিকতা উদ্দেশ্য নয়। অতএব যে কোন একটি করলেই চলবে।
(خُذْ هٰذَا فَتَصَدَّقْ بِه) ‘‘এটা নিয়ে যাও এবং তা দ্বারা সদাকাহ্ কর’’ প্রমাণিত হয় যে, অসমর্থ হলেই কাফফারা রহিত হয়ে যায় না।
(أَطْعِمْهُ أَهْلَكَ) ‘‘তোমার আহালকে খাওয়াবে’’ অর্থাৎ- যাদের ভরণ-পোষণ তোমার দায়িত্বে তাদের খাওয়াবে।
হাদীসের এ অংশ প্রমাণ করে যে, অসমর্থ ব্যক্তির কাফফারা রহিত হয়ে যায়। ইমাম আওযা‘ঈ এ মতের প্রবক্তা। কেননা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত গ্রাম্য ব্যক্তিতে বললেন, ‘‘তোমার আহালকে খাওয়াবে’’ তিনি তাকে আর অন্য কোন কাফফারা দিতে বলেননি। ইমাম শাফি‘ঈ ও ইমাম আহমাদ হতেও এমন একটি বর্ণনা রয়েছে। ইমাম যুহরী বলেনঃ অবশ্যই কাফফারা দিতে হবে। কেননা ঐ ব্যক্তি যখন তার অক্ষমতার কথা প্রকাশ করলেন তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাফফারা রহিত করেননি। ইমাম আহমাদ হতেও এমন একটি বর্ণনা রয়েছে অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে আবূ হানীফাহ্, সাওরী ও আবূ সাওর থেকে।
ইমাম শাফি‘ঈ থেকে উপরে বর্ণিত দু’ ধরনের মন্তব্যই বর্ণিত আছে। প্রথম অভিমতটিই সঠিক। কেননা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বশেষ ঐ গ্রাম্য ব্যক্তিকে কাফফারা থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী (أَطْعِمْهُ أَهْلَكَ) এটিই তার প্রমাণ। আল্লাহ অধিক ভাল জানেন। জমহূর ‘উলামাগণের মতে কাফফারা আদায়ের সাথে সাথে উক্ত সিয়ামটিও কাযা করতে হবে। ইমাম চতুষ্টয়ের অভিমতও তাই।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সওম পবিত্র করা
২০০৫-[৭] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সায়িম অবস্থায় চুমু খেতেন এবং তিনি তাঁর জিহ্বা লেহন করতেন। (আবূ দাঊদ)[1]
عَن عَائِشَة: أَن الني صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: كَانَ يُقَبِّلُهَا وَهُوَ صَائِم ويمص لسنانها. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (يَمُصُّ لِسَانَهَا) ‘‘তিনি তার (‘আয়িশার) জিহবা লেহন করতেন।’’ মীরাক বলেনঃ সর্বসম্মত অভিমত এই যে, অন্যের থুথু গিলে ফেললে সিয়াম ভঙ্গ হয়ে যাবে। হাফেয ইবনু হাজার বলেনঃ অত্র হাদীসটি য‘ঈফ। যদি সহীহও হয় তবে এর অর্থ এই যে, তিনি তার থুথু গিলেননি। ফাতহুল ওয়াদূদ-এ বলা হয়েছে যে, এ জিহবা লেহন সিয়ামের অবস্থায় ছিল না। কেননা এতে উল্লেখ নেই যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা সিয়ামরত অবস্থায় করেছিলেন অথবা এর অর্থ এই যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার (‘আয়িশার) থুথু ফেলে দিয়েছেন।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সওম পবিত্র করা
২০০৬-[৮] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সায়িম অবস্থায় স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে তা করার অনুমতি দিলেন। এরপর আরো এক ব্যক্তি এসে তাঁকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। এ ব্যক্তিকে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তা করতে নিষেধ করলেন। যাকে তিনি অনুমতি দিয়েছিলেন সে ছিল বৃদ্ধ। আর যাকে নিষেধ করেছিলেন সে ছিল যুবক। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ إِنَّ رَجُلًا سَأَلَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ الْمُبَاشَرَةِ لِلصَّائِمِ فَرخص لَهُ. وَأَتَاهُ آخَرُ فَسَأَلَهُ فَنَهَاهُ فَإِذَا الَّذِي رَخَّصَ لَهُ شَيْخٌ وَإِذَا الَّذِي نَهَاهُ شَابٌّ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (الْمُبَاشَرَةِ) ‘‘মেলামেশা’’ দ্বারা উদ্দেশ্য স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে স্পর্শ করা তবে তা লজ্জাস্থান ব্যবহার ব্যতীত। (وَإِذَا الَّذِي نَهَاهُ شَابٌّ) তিনি যাকে মেলামেশা করতে নিষেধ করলেন সে ছিল যুবক।
মেলামেশা ও চুম্বন দেয়ার ক্ষেত্রে যারা যুবক ও বৃদ্ধের মাঝে পৃথক করেন এ হাদীসটি তাদের দলীল। এ বিষয়ে পূর্বে বিস্তারিতভাবে আলোচনা হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সওম পবিত্র করা
২০০৭-[৯] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তির সায়িম অবস্থায় (অনিচ্ছায়) বমি হবে তার সওম কাযা করতে হবে না। আর যে ব্যক্তি গলার ভিতর আঙ্গুল বা অন্য কিছু ঢুকিয়ে দিয়ে ইচ্ছাকৃত বমি করবে তাকে কাযা আদায় করতে হবে। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ, দারিমী। ইমাম তিরমিযী বলেন, হাদীসটি গরীব। কারণ ’ঈসা ইবনু ইউনুস ছাড়া এ হাদীসটি আর কারো বর্ণনায় রয়েছে তা আমরা জানি না। ইমাম বুখারীও এ হাদীসটিকে মাহফূয [সংরক্ষিত] মনে করেন না, অর্থাৎ- হাদীসটি মুনকার।)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم: «من ذرعه الْقَيْء وَهُوَ صَائِمٌ فَلَيْسَ عَلَيْهِ قَضَاءٌ وَمَنِ اسْتَقَاءَ عَمْدًا فَلْيَقْضِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ وَالدَّارِمِيُّ. وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ لَا نَعْرِفُهُ إِلَّا مِنْ حَدِيثِ عِيسَى بْنِ يُونُس. وَقَالَ مُحَمَّد يَعْنِي البُخَارِيّ لَا أرَاهُ مَحْفُوظًا
ব্যাখ্যা: (وَمَنِ اسْتَقَاءَ عَمْدًا فَلْيَقْضِ) ‘‘যে ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করে সে যেন সিয়াম কাযা করে।’’
হাদীসের শিক্ষাঃ অনিচ্ছাকৃত বমি দ্বারা সিয়াম ভঙ্গ হয় না। পক্ষান্তেরে ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করলে তার সিয়াম ভঙ্গ হয়ে যায়। কেননা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে উক্ত সিয়াম কাযা করতে বলেছেন। ইমাম শাফি‘ঈ আহমাদ, মালিক ও ইসহাকসহ জমহূর ‘আলিমদের অভিমত এটাই। একদল ‘আলিমদের মতে বমি যেভাবেই হোক তা সিয়াম ভঙ্গ করে, তাদের দলীল আবূ দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত পরবর্তী হাদীস।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সওম পবিত্র করা
২০০৮-[১০] মা’দান ইবনু তালহা (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি আবূ দারদা (রাঃ) থেকে এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সওম অবস্থায়) বমি করেছেন। এরপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সওম ভেঙ্গে ফেলেছেন। মা’দান বলেন, এরপর আমি (দামেশকের মসজিদে) সাওবান-এর সাথে মিলিত হই। তাকে আমি বলি যে, আবূ দারদা আমাকে এ হাদীসটি শুনিয়েছেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (একবার) বমি করেছেন। এরপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সওম ভেঙ্গে ফেলেছেন। সাওবান (এ কথা শুনে) বললেন, আবূ দারদা (রাঃ) পুরোপুরি সত্য বলেছেন। আর সে সময় আমিই তাঁর জন্য উযূর পানির ব্যবস্থা করেছিলাম। (আবূ দাঊদ, তিরমিযী, দারিমী)[1]
وَعَنْ مَعْدَانَ بْنِ طَلْحَةَ أَنَّ أَبَا الدَّرْدَاءِ حَدَّثَهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَاءَ فَأَفْطَرَ. قَالَ: فَلَقِيتُ ثَوْبَانَ فِي مَسْجِدِ دِمَشْقَ فَقُلْتُ: إِنَّ أَبَا الدَّرْدَاءِ حَدَّثَنِي أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَاءَ فَأَفْطَرَ. قَالَ: صَدَقَ وَأَنَا صَبَبْتُ لَهُ وضوءه. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالتِّرْمِذِيّ والدارمي
ব্যাখ্যা: (أَنَّ رَسُوْلَ اللّٰهِ ﷺ قَاءَ فَأَفْطَرَ) ‘‘রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বমি করলেন, অতঃপর সিয়াম ভেঙ্গে ফেললেন।’’ এ হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করা হয় যে, বমি সিয়াম ভঙ্গের কারণ তা যেভাবেই ঘুটুক। কেননা হাদীসে বর্ণিত فَأَفْطَرَ শব্দের মধ্যে الفاء বর্ণটি প্রমাণ করে যে, ইফতারের কারণ ছিল বমি করা। অতএব বুঝা গেল যে, বমি সিয়াম ভঙ্গের কারণ। এর জবাব বিভিন্নভাবে দেয়া হয়ে থাকে।
১. অত্র হাদীসের সানাদে ইযতিরাব (অস্থিরতা) রয়েছে। অতএব অত্র হাদীসটি দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।
২. বর্ণনাকারীর বক্তব্য (قَاءَ فَأَفْطَرَ) ‘‘বমি করলেন, অতঃপর ইফতার করলেন।’’ এতে এ কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়নি যে, বমিই সিয়াম ভেঙ্গে দিয়েছে। কেননা فاء বর্ণটি কারণ না বুঝিয়ে তা তা‘কীবের জন্যও হতে পারে। অর্থাৎ- নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বমি করলেন। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দুর্বল হয়ে পড়ার কারণে সওম ভেঙে ফেলেছেন। ইমাম তিরমিযী বলেনঃ এ হাদীসের অর্থ হল নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নফল সিয়ামরত ছিলেন। অতঃপর বমি করার ফলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দুর্বল হয়ে যান এবং সওম ভেঙে ফেলেন। কোন কোন হাদীসে এভাবে ব্যাখ্যাসহ বর্ণিত হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সওম পবিত্র করা
২০০৯-[১১] ’আমির ইবনু রবী’আহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সওম অবস্থায় এতবার মিসওয়াক করতে দেখেছি যে, তা আমি হিসাব করতে পারি না। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَامِرِ بْنِ رَبِيعَةَ قَالَ: رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا لَا أُحْصِي يَتَسَوَّكُ وَهُوَ صَائِمٌ . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যা: (يَتَسَوَّكُ وَهُوَ صَائِمٌ) ‘‘তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সিয়াম পালন অবস্থায় মিসওয়াক করতেন’’ হাদীসের এ অংশ প্রমাণ করে যে, সিয়ামরত অবস্থায় মিসওয়াক করা বৈধ। মিসওয়াক শুকনা ডাল দ্বারা হোক অথবা তাজা ডাল দ্বারা হোক। সিয়াম ফরয হোক অথবা নফল হোক। তা দিনের প্রথম ভাগে হোক অথবা শেষ ভাগে হোক, সর্বাবস্থায় মিসওয়াক করা বৈধ।
এ অভিমত পোষণ করেন ইমাম সাওরী, আওযা‘ঈ, ইবনু ‘উলাইয়্যাহ্, আবূ হানীফাহ্ ও তাঁর সহচরবৃন্দ, সা‘ঈদ ইবনু জুবায়র, মুজাহিদ, ‘আত্বা এবং ইব্রাহীম নাখ্‘ঈ প্রমুখ। ইমাম বুখারীও এ অভিমতের প্রবক্তা।
ইমাম আবূ সাওর এবং ইমাম শাফি‘ঈ-এর মতে সূর্য ঢলে যাওয়ার পর সিয়ামরত অবস্থায় মিসওয়াক করা মাকরূহ। এর পূর্বে মিসওয়াক করা মুস্তাহাব, মিসওয়াক তাজা বা শুকনা যাই হোক।
ইমাম আহমাদ ও ইসহাক ইবনু রহ্ওয়াইহি-এর মতে সূর্য ঢলে যাওয়ার পর মিসওয়াক করা মাকরূহ। তবে মিসওয়াকটি যদি তাজা ডালের হয় তা হলে তা দিনের প্রথম ভাগেও মাকরূহ।
ইমাম মালিক এবং তাঁর সহচরদের মতে দিনের প্রথম ভাগেই হোক অথবা শেষ ভাগে তাজা ডাল দ্বারা মিসওয়াক করা মাকরূহ শুকনা ডাল দ্বারা মিসওয়াক করা মাকরূহ নয়।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সওম পবিত্র করা
২০১০-[১২] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, আমার চোখে অসুখ। এ কারণে আমি কি সায়িম অবস্থায় চোখে সুরমা লাগাতে পারি? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, হ্যাঁ। (তিরমিযী; তিনি বলেন, এ হাদীসের সানাদ মজবুত নয়। আর এক বর্ণনাকারী আবূ ’আতিকাহ্-কে দুর্বল মনে করা হয়।)[1]
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: اشتكيت عَيْني أَفَأَكْتَحِلُ وَأَنَا صَائِمٌ؟ قَالَ: «نَعَمْ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: لَيْسَ إِسْنَادُهُ بِالْقَوِيِّ وَأَبُو عَاتِكَةَ الرَّاوِي يضعف
ব্যাখ্যা: أَفَأَكْتَحِلُ وَأَنَا صَائِمٌ؟ قَالَ: نَعَمْ ‘‘আমি কি সায়িমরত অবস্থায় (চোখে) সুরমা লাগাবো? নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ।’’ এতে প্রমাণিত হয় যে, সায়িমরত অবস্থায় চোখে সুরমা লাগানো বৈধ।
অধিকাংশ ‘আলিমদের অভিমতও তাই। ইমাম মালিক মনে করেন চোখে সুরমা লাগালে তা যদি কণ্ঠনালী পোঁছে যায় তবে সায়িম ভঙ্গ হয়ে যাবে। আবূ মুস্‘আব মনে করেন, সিয়াম ভঙ্গ হবে না। ইমাম সাওরী, ‘আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, আহমাদ এবং ইসহাক মনে করেন, সিয়ামরত অবস্থায় সুরমা লাগানো মাকরূহ। ইমাম আহমাদ থেকে এক বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, সুরমার স্বাদ কণ্ঠনালী পৌঁছে গেলে সিয়াম ভঙ্গ হয়ে যাবে।
‘আত্বা, হাসান বাসরী, ইব্রাহীম নাখ্‘ঈ, আওযা‘ঈ, আবূ হানীফাহ্, আবূ সাওর এবং শাফি‘ঈর মতে সিয়ামরত অবস্থায় সুরমা লাগাতে কোন ক্ষতি নেই। অতএব তা বৈধ এবং তা সিয়াম ভঙ্গের কোন কারণ নয় চাই হলকুমে তার স্বাদ অনুভব করুক বা না করুক। অত্র হাদীস তাদের স্বপক্ষে দলীল। যদিও হাদীসটি দুর্বল কিন্তু তার শাহিদ রয়েছে যা সমষ্টিগতভাবে দলীল গ্রহণযোগ্য। পক্ষান্তরে সিয়ামরত অবস্থায় সুরমা লাগানো মাকরূহ হওয়ার বিষয়ে কোন সহীহ অথবা হাসান হাদীস নেই। তাই সঠিক কথা এই যে, সিয়ামরত অবস্থায় সুরমা লাগানো বৈধ তা মাকরূহ নয়।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সওম পবিত্র করা
২০১১-[১৩] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কিছু সাহাবী হতে বর্ণিত। একজন সাহাবী বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ’আরজ’-এ (মক্কা মদীনার মাঝখানে একটি জায়গার নাম) সায়িম অবস্থায় পিপাসা দমনের জন্য অথবা গরম কমানোর জন্য মাথায় পানি ঢালতে দেখেছি। (মালিক ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ بَعْضِ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لَقَدْ رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالْعَرْجِ يَصُبُّ عَلَى رَأْسِهِ الْمَاءَ وَهُوَ صَائِمٌ مِنَ الْعَطَشِ أَوْ مِنَ الْحَرِّ. رَوَاهُ مَالك
ব্যাখ্যা: (يَصُبُّ عَلٰى رَأْسِهِ الْمَاءَ وَهُوَ صَائِمٌ) ‘‘সিয়ামরত অবস্থায় তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) স্বীয় মাথায় পানি ঢালতেন।’’
‘আল্লামা আল-বাজী বলেনঃ এটি একটি মূলনীতি যে, যা ব্যবহার করলে সিয়াম ভঙ্গ হয় না অথচ তা দ্বারা সিয়াম পালনকারী সিয়াম পালনে শক্তি অর্জন করতে পারে তার জন্য তা ব্যবহার করা বৈধ যেমন পানি ঢেলে শরীর ঠাণ্ডা করা অথবা কুলি করা। কেননা তা সিয়াম পালনকারীকে সিয়াম পালনে সহযোগিতা করে অথচ তা দ্বারা তার সিয়াম ভঙ্গ হয় না।
ইবনু মালিক বলেনঃ অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, সিয়ামরত অবস্থায় মাথায় পানি ঢালা অথবা পানিতে ডুব দেয়া মাকরূহ নয় যদিও ঠাণ্ডার তীব্রতা তার ভিতরে প্রকাশ পায়।
ইমাম শাওকানী বলেন, এ হাদীস দ্বারা জানা গেল সিয়াম পালনকারী তার শরীরের কোন অংশে অথবা সমস্ত শরীরে পানি ঢেলে গরমের তীব্রতা কমাতে পারে, জমহূর ‘আলিমদের অভিমত এটাই। তারা ওয়াজিব গোসল বা সুন্নাত ও বৈধ গোসলের মধ্যে কোন পার্থক্য করেন না। হানাফীগণ বলেনঃ সিয়ামরত অবস্থায় গোসল করা মাকরূহ। তারা দলীল হিসেবে ‘আলী (রাঃ) থেকে ‘আবদুর রাযযাক বর্ণিত সেই হাদীস উপস্থাপন করেছেন যাতে সিয়ামরত অবস্থায় গোসলখানায় প্রবেশ করা নিষেধ করা হয়েছে। তবে এ হাদীসের সানাদ দুর্বল।
‘আল্লামা আল কারী বলেনঃ ইমাম আবূ হানীফার বক্তব্যের উদ্দেশ্য হল সিয়ামরত অবস্থায় গোসল করা উত্তমের বিপরীত কাজ। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাথায় পানি ঢালার উদ্দেশ্য হল তিনি তা বৈধতা প্রমাণের জন্য করেছেন।
আমি (মুবারকপূরী) বলছিঃ মাকরূহ হওয়া তথা উত্তমের বিপরীত হওয়া ইসলামী শারী‘আতের একটি বিধান। কুরআন অথবা হাদীসের কোন প্রমাণ ছাড়া তা সাব্যস্ত হয় না। সিয়ামরত অবস্থায় গোসল করা মাকরূহ হওয়ার কোন দলীল কুরআনে অথবা হাদীসে নেই। বরং এর বিপরীত দলীল রয়েছে। অতএব যিনি তা দলীল ছাড়াই মাকরূহ বলেছেন তার কথা প্রত্যাখ্যাত ও পরিত্যাজ্য।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সওম পবিত্র করা
২০১২-[১৪] শাদ্দাদ ইবনু আওস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রমাযান (রমজান) মাসের আঠার তারিখে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাক্বী’তে (মদীনার কবরস্থানে) এমন এক লোকের কাছে আসলেন, যে শিঙ্গা লাগাচ্ছিল। এ সময় তিনি আমার হাত ধরেছিলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, যে শিঙ্গা লাগায় ও যে শিঙ্গা দেয় উভয়েই নিজেদের সওম ভেঙ্গে ফেলেছে। (আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ ও দারিমী)[1]
ইমাম মুহয়্যিইউস্ সুন্নাহ্ (রহঃ) এ প্রসঙ্গে বলেছেন যে, কতিপয় এ হাদীসের বিকল্প অর্থ গ্রহণ করেছেন, শিঙ্গা লাগানোর অনুমতি দিয়েছেন ইফতার করতে বাধা দেয়ার জন্য, যাকে শিঙ্গা লাগানো তার দুর্বলতার জন্য। আর(حَاجِمُ) অর্থাৎ- যে শিঙ্গা লাগায় তার পেটে কোন কিছু পৌঁছে যাওয়া থেকে নিরাপদ নয়, অত্যাবশ্যক বস্তু চোষার কারণে।
وَعَنْ شَدَّادِ بْنِ أَوْسٍ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَتَى رَجُلًا بِالْبَقِيعِ وَهُوَ يَحْتَجِمُ وَهُوَ آخِذٌ بِيَدِي لِثَمَانِيَ عَشْرَةَ خَلَتْ مِنْ رَمَضَانَ فَقَالَ: «أَفْطَرَ الْحَاجِمُ وَالْمَحْجُومُ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ وَالدَّارِمِيُّ. قَالَ الشَّيْخُ الْإِمَامُ مُحْيِي السُّنَّةِ رَحِمَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ: وَتَأَوَّلَهُ بَعْضُ مَنْ رَخَّصَ فِي الْحِجَامَةِ: أَيْ تَعَرُّضًا لِلْإِفْطَارِ: الْمَحْجُومُ لِلضَّعْفِ وَالْحَاجِمُ لِأَنَّهُ لَا يَأْمَنُ مِنْ أَنْ يَصِلَ شَيْءٌ إِلَى جَوْفِهِ بمص الملازم
ব্যাখ্যা: (أَفْطَرَ الْحَاجِمُ وَالْمَحْجُومُ) ‘‘রক্তমোক্ষণকারী এবং যার জন্য রক্তমোক্ষণ করা হয় উভয়ের সিয়াম ভেঙ্গে গেছে।’’ অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, সিয়ামরত অবস্থায় রক্তমোক্ষণ করা বৈধ নয়। [এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা পূর্বের হাদীসের ব্যাখ্যায় করা হয়েছে]
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সওম পবিত্র করা
২০১৩-[১৫] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন শার’ঈ কারণ কিংবা কোন রোগ ছাড়া রমাযানের কোনদিন ইচ্ছা করে সওম পালন না করে, তাহলে সারা জীবন সওম রেখেও তার কাযা আদায় হবে না। (আহমদ, তিরমিযী, আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ, দারিমী, তারজামাতুল বাব, বুখারী। ইমাম তিরমিযী বলেন, আমি মুহাম্মাদ অর্থাৎ- ইমাম বুখারীকে বলতে শুনেছি, আবূল মুত্বও্য়িস নামক রাবী এ হাদীস ছাড়া অন্য কোন হাদীস বর্ণনা করেছেন বলে জানি না।)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ أَفْطَرَ يَوْمًا مِنْ رَمَضَانَ مِنْ غَيْرِ رُخْصَةٍ وَلَا مَرَضٍ لَمْ يَقْضِ عَنْهُ صَوْمُ الدَّهْرِ كُلِّهِ وَإِنْ صَامَهُ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ وَالدَّارِمِيُّ وَالْبُخَارِيُّ فِي تَرْجَمَةِ بَابٍ وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ: سَمِعْتُ مُحَمَّدًا يَعْنِي البُخَارِيّ يَقُول. أَبُو الطوس الرَّاوِي لَا أَعْرِفُ لَهُ غَيْرَ هَذَا الْحَدِيثِ
ব্যাখ্যা: (لَمْ يَقْضِ عَنْهُ صَوْمُ الدَّهْرِ كُلِّه وَإِنْ صَامَه) ‘‘যদিও সারা জীবন সিয়াম পালন করে তথাপি (বিনা কারণে) রমাযানের একটি সিয়াম ভেঙ্গে ফেললে তা পূর্ণ হবে না।’’ অর্থাৎ- সারা জীবন নফল সিয়াম করলেও রমাযান (রমজান) মাসের ভেঙ্গে ফেলা সিয়ামের ফাযীলাত ও বারাকাত পাবে না, যদিও ঐ ভাঙ্গা সিয়ামের কাযা করার নিয়্যাতে সিয়াম পালন করার ফলে তার ওপর অর্পিত ফরযের দায় থেকে মুক্তি পাবে তথা সিয়াম ভঙ্গের গুনাহ থেকে রেহাই পাবে।
ইবনু মাস্‘ঊদ, ‘আলী ও আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, বিনা ‘উযরে ইচ্ছাকৃতভাবে রমাযানের একটি সিয়াম ভেঙ্গে সারা জীবন সিয়াম পালন করলেও ঐ সিয়াম ভঙ্গের গুনাহ থেকে রেহাই পাবে না। ইবনু হাযম-এর অভিমতও তাই। পক্ষান্তরে সা‘ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব, শা‘বী, ইবনু জুবায়র, ইব্রাহীম, কাতাদাহ্, হাম্মাদ ও অধিকাংশ ‘আলিমগণ মনে করেন রমাযানের ভেঙ্গে ফেলা এক সিয়ামের পরিবর্তে একদিন কাযা সিয়াম পালন করলেই যথেষ্ট হবে।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সওম পবিত্র করা
২০১৪-[১৬] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অনেক সায়িম এমন আছে যারা তাদের সওম দ্বারা ’ক্ষুধার্ত থাকা ছাড়া’ আর কোন ফল লাভ করতে পারে না। এমন অনেক কিয়ামরত (দন্ডায়মান) ব্যক্তি আছে যাদের রাতের ’ইবাদাত নিশি জাগরণ ছাড়া আর কোন ফল আনতে পারে না। (দারিমী)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «كَمْ مِنْ صَائِمٍ لَيْسَ لَهُ مِنْ صِيَامِهِ إِلَّا الظَّمَأُ وَكَمْ مِنْ قَائِمٍ لَيْسَ لَهُ من قِيَامه إِلَّا السهر» . رَوَاهُ الدَّارمِيّ
ব্যাখ্যা: (لَيْسَ لَهُ مِنْ صِيَامِهِ إِلَّا الظَّمَأُ) ‘‘তার সিয়াম দ্বারা ক্ষুধা ও পিপাসার কষ্ট ব্যতীত কিছুই অর্জিত হয় না।’’ অর্থাৎ- আল্লাহ তা‘আলার নিকট তার সিয়াম কবূল হয় না, ফলে এ সিয়াম দ্বারা তার কোন সাওয়াব অর্জিত হয় না। যদিও ‘আলিমদের মতে তাঁর ওপর ফরযের দায়িত্ব থেকে সে মু্ক্ত হবে।
ইমাম ত্বীবী বলেনঃ সিয়াম পালনকারী যদি সাওয়াবের আশায় সিয়াম পালন না করে, অথবা অশ্লীল কাজ, মিথ্যা কথা, অপবাদ ও গীবত থেকে বিরত না থাকে, তাহলে ঐ সিয়াম পালনকারীর জন্য ক্ষুধা ও পিপাসা ছাড়া আর কিছুই অর্জিত হয় না। এটা শুধুমাত্র সিয়ামের ক্ষেত্রে নয় বরং সকল ‘ইবাদাতের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অর্থাৎ- যদি ‘ইবাদাতকারী নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ‘ইবাদাত না করে তবে তা রিয়ায় পরিণত হয়। যদিও এ রকম ‘ইবাদাত দ্বারা কাযা করা থেকে রেহাই পাওয়া যায় কিন্তু তা দ্বারা কোন পুরস্কার বা সাওয়াব অর্জিত হয় না।
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সওম পবিত্র করা
২০১৫-[১৭] আবূ সা’ঈদ আল্ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তিনটি জিনিস সায়িমের সওম ভঙ্গ করে না। শিঙ্গা, বমি ও স্বপ্নদোষ। (তিরমিযী; তিনি বলেন, এ হাদীসটি ত্রুটিমুক্ত নয়। এর একজন বর্ণনাকারী ’আবদুর রহমন ইবনু যায়দকে হাদীস সম্পর্কে দুর্বল হিসেবে গণ্য করা হয়।)[1]
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «ثَلَاثٌ لَا يُفْطِرْنَ الصَّائِمَ الْحِجَامَةُ وَالْقَيْءُ وَالِاحْتِلَامُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَيْرُ مَحْفُوظٍ وَعَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ زيد الرَّاوِي يضعف فِي الحَدِيث
ব্যাখ্যা: রক্তমোক্ষণ এবং বমি সম্পর্কে পূর্বে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। (وَالِاحْتِلَامُ) স্বপ্নদোষ সিয়াম ভঙ্গের কারণ নয় যদিও জাগ্রত হওয়ার পরে স্বপ্নে সঙ্গমের কথা মনে পরে এবং কাপড়ে বীর্য দেখতে পায় তবুও সিয়াম ভঙ্গ হবে না। যদিও স্বপ্নদোষ জাগ্রত অবস্থায় স্ত্রী সহবাসের সমার্থক তবুও সিয়াম ভঙ্গ হবে না। এজন্য যে, এখানে তা নিজের ইচ্ছায় সংঘটিত হয়নি।
অতএব যে ব্যক্তি রমাযান (রমজান) মাসে দিনের বেলায় ঘুমের মধ্যে স্বপ্নদোষে আক্রান্ত হয় এবং বীর্যপাত ঘটে তবুও সিয়াম ভঙ্গ হবে না। ফলে তা কাযা করতে হবে না।
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সওম পবিত্র করা
২০১৬-[১৮] সাবিত আল বুনানী (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনারা কী রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময়ে সায়িমকে শিঙ্গা দেয়া মাকরূহ মনে করতেন? তিনি বলেন, না; তবে দুর্বল আশংকা থাকলে। (বুখারী)[1]
وَعَنْ ثَابِتٍ الْبُنَانِيِّ قَالَ: سُئِلَ أَنَسُ بْنُ مَالِكٍ: كُنْتُمْ تَكْرَهُونَ الْحِجَامَةَ لِلصَّائِمِ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ قَالَ: لَا إِلَّا مِنْ أَجْلِ الضَّعْفِ. رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ
ব্যাখ্যা: (قَالَ: لَا إِلَّا مِنْ أَجْلِ الضَّعْفِ) ‘‘তিনি বললেন, না, তবে দুর্বলতার কারণে।’’ অর্থাৎ- সিয়ামরত অবস্থায় রক্তমোক্ষণ করাকে আমরা মাকরূহ মনে করতাম না। আর সিয়াম পালনকারী যদি এর ফলে স্বীয় শরীরে দুর্বলতা আসবে বলে মনে করে তবে তা মাকরূহ, এমতাবস্থায় রক্তমোক্ষণ না করাই ভাল যাতে শরীর দুর্বল না হয়ে যায়।
বায়হাক্বীতে (৪/২৬৪) আবূ সা‘ঈদ থেকে বর্ণিত আছে, ‘‘দুর্বলতার আশংকা থাকলে সিয়ামরত অবস্থায় রক্তমোক্ষণ করা মাকরূহ।’’
অনুরূপভাবে মুসনাদে ‘আবদুর রাজ্জাক এবং আবূ দাঊদে ‘আবদুর রহমান ইবনু আবী লায়লা সূত্রে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এক সাহাবী থেকে বর্ণিত আছে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিয়ামরত অবস্থায় রক্তমাক্ষণ করাতে ও ধারাবাহিকভাবে সিয়াম পালন করতে নিষেধ করেছেনও, কিন্তু তা হারাম করেননি। তবে এ নিষেধাজ্ঞা ছিল তার সহচরদের শক্তি অটুট রাখার নিমিত্তে। এর সানাদ সহীহ। আল কারী বলেনঃ হাদীসটি মাওকূফ, তবে তা মারফূ‘ হাদীসের হুকুম রাখে যেমনটি উসূলের কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। অতএব তা দলীলযোগ্য।
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সওম পবিত্র করা
২০১৭-[১৯] ইমাম বুখারী হাদীসের তা’লীক পদ্ধতিতে বর্ণনা করেছেন যে, ইবনু ’উমার (প্রথম প্রথম) সায়িম অবস্থায় (শরীরে) শিঙ্গা লাগাতেন। কিন্তু পরে তিনি তা ত্যাগ করেন। তবে রাতের বেলা তিনি শিঙ্গা লাগাতেন।[1]
وَعَنِ الْبُخَارِيِّ تَعْلِيقًا قَالَ: كَانَ ابْنُ عُمَرَ يَحْتَجِمُ وَهُوَ صَائِمٌ ثُمَّ تَرَكَهُ فَكَانَ يَحْتَجِمُ بِاللَّيْلِ
ব্যাখ্যা: (فَكَانَ يَحْتَجِمُ بِاللَّيْلِ) ‘‘(ইবনু ‘উমার রমাযান (রমজান) মাসে) রাত্রে রক্তমোক্ষণ করাতেন।’’ ‘আল্লামা আল বাজী বলেনঃ ইবনু ‘উমার যখন বৃদ্ধ হয়ে পরেন এবং দুর্বল হয়ে যান তখন দিনের বেলায় রক্তমোক্ষণ করালে দুর্বলতার কারণে সিয়াম ভেঙ্গে ফেলতে হতে পারে এই আশংকায় রাতে রক্তমোক্ষণ করাতেন। এজন্য যারা দিনে রক্তমোক্ষণ করালে দুর্বলতার কারণে সিয়াম ভেঙ্গে ফেলতে হতে পারে এই আশংকা করেন তাদের জন্য দিনের বেলায় রক্তমোক্ষণ করা মাকরূহ। এ মু‘আল্লাক হাদীসটি ইমাম মালিক স্বীয় মুয়াত্ত্বাতে নাফি' সূত্রে ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি সিয়ামরত অবস্থায় রক্তমোক্ষণ করাতেন। পরবর্তীতে তিনি তা পরিত্যাগ করেন এবং রমাযান (রমজান) মাসে ইফতার না করে রক্তমোক্ষণ করাতেন না।
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সওম পবিত্র করা
২০১৮-[২০] ’আত্বা (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সায়িম (রোযাদার) ব্যক্তি কুলি করে মুখ থেকে পানি ফেলে দেয় আর তার মুখের থুথু বা পানির অবশিষ্টাংশ যা থেকে যায় তাতে সওমের কোন ক্ষতি হবে না। আর কোন ব্যক্তি যেন চুইংগাম না চিবায়। যদি চিবানোর কারণে তার রস গিলে ফেলে, তাহলে তার ক্ষেত্রে আমি বলিনি যে, সে সওম ভঙ্গ করল, বরং তা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। (বুখারী- তরজমাতুল বাব)[1]
وَعَن عَطاء قَالَ: إِن مضمض ثُمَّ أَفْرَغَ مَا فِي فِيهِ مِنَ الْمَاءِ لَا يضيره أَنْ يَزْدَرِدَ رِيقَهُ وَمَا بَقِيَ فِي فِيهِ وَلَا يَمْضُغُ الْعِلْكَ فَإِنِ ازْدَرَدَ رِيقَ الْعِلْكَ لَا أَقُولُ: إِنَّهُ يُفْطِرُ وَلَكِنْ يُنْهَى عَنْهُ. رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ فِي تَرْجَمَةِ بَابٍ
ব্যাখ্যা: (ثُمَّ أَفْرَغَ مَا فِىْ فِيهِ مِنَ الْمَاءِ) ‘‘কুলি করার পর মুখের পানি যখন ফেলে দিবে।’’ (لَا يَضِيْرُه أَنْ يَزْدَرِدَ رِيقَه) ‘‘তখন মুখের থুথু গিলে ফেললে তার সিয়ামের কোন ক্ষতি করবে না।’’ (وَمَا بَقِيَ فِىْ فِيْهِ) ‘‘আর তার মুখে যা বাকী থাকে তা গিলে ফেললেও কোন ক্ষতি হবে না।
ইবনু বাত্ত্বাল বলেনঃ এর প্রকাশমান অর্থ এই যে, কুলি করার পর মুখের অভ্যন্তরের অবশিষ্ট পানি থুথুর সাথে গিলে ফেললে সিয়ামের কোন ক্ষতি হবে না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ অর্থ উদ্দেশ্য নয়। কেননা ‘আবদুর রাজ্জাক-এর বর্ণনায় আছে, وماذا بقي في فيه অর্থাৎ- কুলি করে মুখের পানি ফেলে দিয়ে তাতে আর কিই বা অবশিষ্ট থাকে। কুসতুলানী বলেনঃ কুলি করে মুখের পানি ফেলে দিলে মুখের অভ্যন্তরে ভিজা ছাড়া আ কী থাকে? অতএব এমতাবস্থায় থুথু গিলে ফেললে তার সিয়ামের কোন ক্ষতি হবে না।
হাফেয ইবনু হাজার বলেনঃ এই মু‘আল্লাক হাদীসটি সা‘ঈদ ইবনু মানসূর, ইবনুল মুবারক সূত্রে ইবনু জুরায়জ থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমি ‘আত্বাকে প্রশ্ন করলাম, সিয়াম পালনকারী কুলি করার পর থুথু গিলে ফেললে কি হবে? উত্তরে তিনি বললেন, তার সিয়ামের কোন ক্ষতি হবে না। কুলি করার পর তার মুখে কিই বা আর অবশিষ্ট থাকে?
ইবনু কুদামাহ্ বলেনঃ যা থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব নয় তা গিলে ফেললে সিয়ামের কোন ক্ষতি হবে না যেমন- মুখের থুথু, ধূলাবালি ইত্যাদি। কেননা তা থেকে বেঁচে থাকা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। ইবনুল হুমাম ও অন্যান্য হানাফী বিদ্বানগণ বলেনঃ ধূলাবালি, ধোয়া অথবা মাছি যদি সায়িমের মুখে প্রবেশ করে এতে সিয়ামের কোন ক্ষতি হবে না। কেননা তা থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। যেমন নাকি কুলি করার পর মুখের অভ্যন্তরের ভিজা থেকে বেঁচে থাকা অসম্ভব।
(فَإِنِ ازْدَرَدَ رِيقَ الْعِلْكَ لَا أَقُولُ: إِنَّه يُفْطِرُ) ‘‘কেউ যদি চুইংগাম চিবানোর পর থুথু গিলে ফেলে তাহলে আমি বলি না যে, তার সিয়াম ভেঙ্গে গেছে।’’
ইবনুল মুনযির বলেনঃ অধিকাংশ ‘আলিমগণ সিয়ামরত অবস্থায় চুইংগাম চিবানোর অনুমতি দিয়েছেন এই শর্তে যে, তা যেন গলে গিয়ে অভ্যন্তরে প্রবেশ না করে। তা যদি গলে যায়, অতঃপর এর ঢুক গিলে ফেলে তাহলে সিয়াম ভঙ্গ হয়ে যাবে।
ইসহাক ইবনু মানসূর বলেনঃ আমি ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল-কে জিজ্ঞেস করলাম, সিয়াম পালনকারী কি চুইংগাম চিবাতে পারবে? তিনি বললেন, না। অতঃপর বললেন, আমাদের সহচরগণ বলেন, চুইংগাম দুই প্রকার। এক প্রকার এমন যে, তা গলে যায়, এ জাতীয় চুইংগাম চিবানো যাবে না। যদি তা চিবায় এবং তার কোন অংশ পেটে প্রবেশ করে তাহলে সিয়াম নষ্ট হয়ে যাবে।
এক প্রকার চুইংগাম এমন যে, তা যত চিবাবে তত শক্ত হবে। এ প্রকার চুইংগাম চিবানো মাকরূহ, হারাম নয়। ইমাম শা‘বী, ইব্রাহীম নাখ্‘ঈ, মুহাম্মাদ ইবনু ‘আলী, কাতাদাহ্, শাফি‘ঈ এবং হানাফীগণের মতে তা মাকরূহ।
‘আয়িশাহ্ (রাঃ) তা চিবানোর অনুমতি দিয়েছেন। কেননা এ জাতীয় চুইংগাম চিবালেও তার কোন অংশ পেটের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে না, যেমন- ছোট পাথর মুখে দিয়ে চিবালে তার কিছুই পেটে প্রবেশ করে না।
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - মুসাফিরের সওম
মুসাফির ব্যক্তির জন্য সিয়াম পালনের বিধান বর্ণনা করাই এ অধ্যায়ের মূল উদ্দেশ্য। সফর অবস্থায় সিয়াম পালন করা বা না করা এবং এ দুয়ের কোনটি উত্তম- এ বিষয়ে আলোচ্য অধ্যায়ে বিবরণ রয়েছে।
আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ
فَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ مَرِيضًا أَوْ عَلٰى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ أُخَرَ
’’তোমাদের মধ্য যে অসুস্থ কিংবা ভ্রমণে থাকবে, সে অন্যদিনগুলোতে তা পূর্ণ করবে।’’ (সূরা আল বাকারাহ্ ২ঃ ১৮৪)
২০১৯-[১] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হামযাহ্ ইবনু ’আমর আল আসলামী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করেছেন, আমি কি সফরে সওম পালন করব? হামযাহ্ খুব বেশী সওম পালন করতেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ এটা তোমার ইচ্ছাধীন। চাইলে রাখবে, না চাইলে না রাখবে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ صَوْمِ الْمُسَافِرِ
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: إِنَّ حَمْزَةَ بْنَ عَمْرٍو الْأَسْلَمِيَّ قَالَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَصُومُ فِي السَّفَرِ وَكَانَ كَثِيرَ الصِّيَامِ. فَقَالَ: «إِنْ شِئْتَ فَصم وَإِن شِئْت فَأفْطر»
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে فَقَالَ: إِنْ شِئْتَ فَصُمْ وَإِنْ شِئْتَ فَأفْطِرْ অর্থাৎ- সফর অবস্থায় চাইলে সিয়াম পালন করবে, না চাইলে ছেড়ে দিবে। এখানে সফরে সওম রাখা বা না রাখার ঐচ্ছিকতার দলীল রয়েছে।
সওম রাখা কিংবা না রাখার বিষয়টা মুসাফিরের ইচ্ছাধীন, এটা প্রমাণের ক্ষেত্রে এটি একটি পূর্ণ বিবরণ। এখানে এ বিবরণও রয়েছে যে, সফরে মুসাফির যদি সওম রাখে তবে তা বৈধ, আর এটাই বিদ্বানদের সকলের মত। তবে ইবনু ‘উমার (রাঃ) বলেন, যে সফরে সওম রাখবে পরবর্তী মুকীম অবস্থায় তাকে আবার কাযা আদায় করতে হবে। তবে অধিকাংশ ‘উলামাগণ যথাক্রমে ইমাম মালিক, শাফি‘ঈ ও আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) মনে করেন যে, সফরে সামর্থ্যবান ব্যক্তির সওম রাখাই উত্তম। তাদের মধ্য হতে অনেকেই মনে করেন যে, সফরে অব্যাহতি গ্রহণপূর্বক সওম না রাখাই উত্তম। আর এটা আওযা‘ঈ, আহমাদ ও ইসহাক (রহঃ)-এর মত। আর ইবনু ‘আব্বাস, আবূ সা‘ঈদ, সা‘ঈদ বিন মুসাইয়্যিব, ‘আত্বা, হাসান, মুজাহিদ ও লায়স (রহঃ) প্রমুখগণের মতে এটি সাধারণত ঐচ্ছিক বিষয়। অর্থাৎ- যার ইচ্ছা সে সফরে সওম রাখবে ইচ্ছা না হলে সওম রাখবে না। অন্যরা বলেছেনে যে, এ দুয়ের মাঝে যেটা সহজ সেটাই উত্তম, আল্লাহ তা‘আলার কথা, ‘‘আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের প্রতি সহজ করতে চান।’’ (সূরা আল বাকারাহ্ ২ : ১৮৫)
সফরে যদি কারো পক্ষে সওম না রাখা সহজ হয় তবে তা-ই তার ক্ষেত্রে উত্তম, আর যদি কারো পক্ষে সওম রাখা সহজ হয় তবে তার ক্ষেত্রে তা-ই উত্তম, আর এটাই ‘উমার বিন ‘আবদুল ‘আযীয (রহঃ)-এর কথা এবং ইবনু মুনযির (রহঃ) এ মতকেই পছন্দ করেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - মুসাফিরের সওম
২০২০-[২] আবূ সা’ঈদ আল্ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (একবার) আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে যুদ্ধে রওনা হলাম। সে সময় রমাযান (রমজান) মাসের ষোল তারিখ অতিবাহিত হয়েছিল। (এ সময়) আমাদের কেউ সওম রেখেছে, আবার কেউ রাখেনি। সায়িমগণ সওমে না থাকা লোকদেরকে খারাপ জানেনি আবার সওমে না থাকা লোকজনও সায়িমগণকে খারাপ মনে করেনি। (মুসলিম)[1]
بَابُ صَوْمِ الْمُسَافِرِ
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: غَزَوْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَسِتَّ عَشْرَةَ مَضَتْ مِنْ شَهْرِ رَمَضَانَ فَمِنَّا مَنْ صَامَ وَمِنَّا مَنْ أَفْطَرَ فَلَمْ يَعِبِ الصَّائِمُ عَلَى الْمُفْطِرِ وَلَا الْمُفْطِرُ عَلَى الصَّائِمِ. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: উল্লেখিত হাদীসে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রমাযানে ভ্রমণের তারিখ নির্ধারণে একাধিক বর্ণনা রয়েছে। সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় রমাযানের ১৮ তারিখের কথা রয়েছে। কোন কোন বর্ণনায় ১২, কোন বর্ণনায় ১৭, কোন বর্ণনায় ১৯ তারিখের কথাও রয়েছে। তবে আল মাগাযী’র প্রসিদ্ধ গ্রন্থগুলোতে রয়েছে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের ভ্রমণে রওনা দিয়েছেন রমাযানের ১০ তারিখে, এবং মক্কায় পৌঁছেছেন রামযানের ১৯ তারিখে। এ ভ্রমণে সাহাবীগণের মধ্য কিছু সংখ্যক সিয়াম পালন করছেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা অপছন্দ করেননি। আবার অনেকেই সিয়াম ছেড়ে দিয়েছেন। এ ব্যাপারে তিনি তা অপছন্দ করেননি। সুতরাং প্রমাণিত হয় উভয়টি (সফরে সওম রাখা বা না রাখা) জায়িয। তবে কোন বর্ণনায় কিছু বর্ধিত বর্ণনা রয়েছে যে, সফরে যে সিয়াম পালনে সক্ষম সে সিয়াম পালন করবে এবং তার জন্য এটাই উত্তম। আর যে অক্ষম সে ছেড়ে দিবে এটাই তার জন্য উত্তম। ‘আল্লামা নাবাবী (রহঃ) বলেন যে, অধিকাংশ ‘উলামাগণের মতানুযায়ী সফরে সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য সওম বর্জন করাটাই অধিক অগ্রগণ্য। কারো কারো মতে সফরে সওম রাখা বা না রাখা উভয়েই সমান। তবে অধিকাংশ ‘উলামাগণের কথাই অগ্রগণ্য।
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - মুসাফিরের সওম
২০২১-[৩] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার এক সফরে ছিলেন। এক স্থানে তিনি কিছু লোকের সমাগম ও এক ব্যক্তিকে দেখলেন। (রোদের তাপ থেকে রক্ষা করার জন্য) ওই লোকটির ওপর ছায়া দিয়ে রাখা হয়েছে। (এ দৃশ্য দেখে) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, ওখানে কী হয়েছে? লোকেরা বলল, এ ব্যক্তি সায়িম (দুর্বলতার কারণে পড়ে গেছে)। এ কথা শুনে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, সফর অবস্থায় সওম রাখা নেক কাজ নয়। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ صَوْمِ الْمُسَافِرِ
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي سَفَرٍ فَرَأَى زِحَامًا وَرَجُلًا قَدْ ظُلِّلَ عَلَيْهِ فَقَالَ: «مَا هَذَا؟» قَالُوا: صَائِمٌ. فَقَالَ: «لَيْسَ مِنَ الْبِرِّ الصَّوْمُ فِي السَّفَرِ»
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসের সমর্থনে ইমাম বুখারী (রহঃ) সহীহুল বুখারীতে একটি অধ্যায় এনেছেন, (باب قول النبي ﷺ لمن ظلل عليه واشتد الحر ليس من البر الصوم في السفر) অর্থাৎ- অধ্যায় : নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা যার উপর ছায়া দেয়া আবশ্যক এবং যখন গরম তিব্ররূপ ধারণ করবে তখন সফরে সিয়াম পালন কোন নেক কাজ নয়।
হাফেয আসকালানী (রহঃ) বলেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ কথার (لَيْسَ مِنَ الْبِرِّ الصَّوْمُ فِى السَّفَرِ) তথা ‘‘সফরে সিয়াম পালন কোন নেক কাজ নয়’’ দ্বারা সফরের কষ্ট ও জটিলতাকেই বুঝানো হয়েছে।
‘আল্লামা ইবনু দাক্বীক (রহঃ) বলেন, যে ব্যক্তির জন্য সফরে সিয়াম পালন করা কঠিন কিংবা অধিক কষ্টকর হবে তার জন্য সফরে সিয়াম পালন করা অনুচিত, আর কষ্টের আধিক্য না থাকলে সিয়াম পালন করাই উত্তম।
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - মুসাফিরের সওম
২০২২-[৪] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা (একবার) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে তাঁর সফরসঙ্গী ছিলাম। আমাদের কেউ সায়িম ছিলেন। আবার কেউ সওম রাখেননি। আমরা এক মঞ্জীলে পৌঁছলাম। এ সময় খুব রোদ ছিল। (রোদের প্রখরতায়) সায়িম ব্যক্তিগণ (মাটিতে) ঘুরে পড়ল। যারা সওমরত ছিল না, ঠিক রইল। তারা তাঁবু বানাল, উটকে পানি পান করাল। (এ দৃশ্য দেখে) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সওম না থাকা লোকজন আজ সাওয়াবের ময়দান জিতে নিলো। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ صَوْمِ الْمُسَافِرِ
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: كُنَّا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي السَّفَرِ فَمِنَّا الصَّائِمُ وَمِنَّا الْمُفْطِرُ فَنَزَلْنَا مَنْزِلًا فِي وم حَارٍّ فَسَقَطَ الصَّوَّامُونَ وَقَامَ الْمُفْطِرُونَ فَضَرَبُوا الْأَبْنِيَةَ وَسَقَوُا الرِّكَابَ. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «ذَهَبَ الْمُفْطِرُونَ
الْيَوْمَ بِالْأَجْرِ»
ব্যাখ্যা: এখানে الْأَجْرِ বা ‘‘প্রতিদান দ্বারা উদ্দেশ্য হলো পরিপূর্ণ’’ এর দ্বারা সিয়াম পালন প্রতিদানকারীদের নেকীর স্বল্পতা হওয়া উদ্দেশ্য নয়। বরং এখানে উদ্দেশ্য হলো, নিশ্চয় সিয়াম পরিত্যাগ কারীগণ তাদের কাজের পূর্ণ নেকী অর্জন করলেন। অর্থাৎ- তাঁবু খাটানোর জন্য তারা যে পরিশ্রম করেছেন তার পূর্ণ প্রতিদান তারা পাবেন এবং সিয়াম পালনকারীদের মতই তারাও পূর্ণ সাওয়াব পাবেন।
‘আল্লামা কারী (রহঃ) বলেন, الْأَجْرِ বা প্রতিদান দ্বারা পূর্ণ সাওয়াব উদ্দেশ্য। কেননা তাদের ক্ষেত্রে, (যুদ্ধের সফরের ক্ষেত্রে) সিয়াম পালনের তুলনায় তা পরিত্যাগ করাই অধিক উত্তম।
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - মুসাফিরের সওম
২০২৩-[৫] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (মক্কা বিজয়ের বছর) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাহ্ হতে মক্কার দিকে রওনা হলেন। (এ সফরে) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সওম রেখেছেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন (মক্কা হতে দু’ মঞ্জীল দূরে) ’উসফান’-এ (নামক ঐতিহাসিক স্থানে) পৌঁছলেন তখন পানি চেয়ে আনালেন। এরপর তা হাতে ধরে অনেক উঁচুতে উঠালেন। যাতে লোকেরা পানি দেখতে পায়। এরপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সওম ভাঙলেন। এভাবে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মক্কায় পৌঁছলেন। এ সফর হয়েছিল রমাযান (রমজান) মাসে। ইবনু ’আব্বাস বলতেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে সওম রেখেছেন, আবার ভেঙেছেন। অতএব যার খুশী সওম রাখবে (যদি কষ্ট না হয়)। আর যার ইচ্ছা রাখবে না। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ صَوْمِ الْمُسَافِرِ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: خَرَجَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ الْمَدِينَةِ إِلَى مَكَّةَ فَصَامَ حَتَّى بَلَغَ عُسْفَانَ ثُمَّ دَعَا بِمَاءٍ فَرَفَعَهُ إِلَى يَدِهِ لِيَرَاهُ النَّاسُ فَأَفْطَرَ حَتَّى قَدِمَ مَكَّةَ وَذَلِكَ فِي رَمَضَانَ. فَكَانَ ابْنُ عَبَّاسٍ يَقُولُ: قَدْ صَامَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَفْطَرَ. فَمن شَاءَ صَامَ وَمن شَاءَ أفطر
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা ‘ইয়ায (রহঃ) বলেন, ‘উসফান একটি গ্রাম, যার দূরত্ব মক্কা হতে ৩৩ মাইলেরও বেশি। ‘আল্লামা নাবাবী (রহঃ) তা উল্লেখ করার পর বলেন, মক্কা থেকে তার দূরত্ব ৪ বুর্দ পরিমাণ, আর প্রত্যেক বুর্দ সমান পাঁচ ফারসাখ। আর প্রতি ফারসাখ সমান তিন মাইল, সেই হিসাবে চার বুর্দ হলো ৪৮ মাইল এবং এটাই সঠিক বলে মত দিয়েছেন জমহূর ‘উলামাগণ।
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - মুসাফিরের সওম
২০২৪-[৬] সহীহ মুসলিমের অন্য রিওয়ায়াতে জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ’আসরের পর পানি পান করেছেন।[1]
بَابُ صَوْمِ الْمُسَافِرِ
وَفِي رِوَايَة لمُسلم عَن جَابر رَضِي الله عَنهُ أَنه شرب بعد الْعَصْر
ব্যাখ্যা: (شَرِبَ بَعْدَ الْعَصْرِ) অর্থাৎ- নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেদিন ‘আসর পর্যন্ত সিয়াম অবস্থায় ছিলেন, অতঃপর মানুষদেরকে এ কথা জানানোর জন্য সিয়াম ভঙ্গ করছেন যে, সফরে সিয়াম ভঙ্গ করা বৈধ। এমনকি সিয়াম পালন কঠিন হলে তা ভঙ্গ করাই উত্তম।
জাবির (রাঃ) এর বর্ণনায় অপর শব্দে রয়েছে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলা হলো, নিশ্চয়ই মানুষদের ওপর সিয়াম পালন করা অত্যন্ত কষ্টকর হচ্ছে, আর সিয়াম পালনের ক্ষেত্রে আপনি কি সিদ্ধান্ত নেন, তাই তারা লক্ষ্য করছে। অতঃপর ‘আসর সালাতের পর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পানির পাত্র চাইলেন এবং তা পান করে সিয়াম ভঙ্গ করলেন।
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মুসাফিরের সওম
২০২৫-[৭] আনাস ইবনু মালিক আল কা’বী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা মুসাফির থেকে অর্ধেক সালাত কমিয়ে দিয়েছেন। এভাবে মুসাফির, দুগ্ধবতী মা ও গর্ভবতী নারীদের জন্য সওম (আপাতত) মাফ করে দিয়েছেন। (আবূ দাঊদ, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ)[1]
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ الْكَعْبِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «إِن اللَّهَ وَضَعَ عَنِ الْمُسَافِرِ شَطْرَ الصَّلَاةِ وَالصَّوْمَ عَنِ الْمُسَافِرِ وَعَنِ الْمُرْضِعِ وَالْحُبْلَى» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالتِّرْمِذِيُّ وَالنَّسَائِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ
ব্যাখ্যা: ইবনু কুদামাহ্ ও যুরকানী (রহঃ) বর্ণনা করেন যে, সকল ‘উলামাগণ এ মর্মে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, গর্ভধারিণী ও সন্তানকে দুধদানকারিণী নারী যদি সফর অবস্থায় নিজের ওপর ক্ষতির আশংকায় সিয়াম পালন না করে থাকে, তবে তার ওপর কাযা ওয়াজিব হবে, তবে ফিদয়ার কোন প্রয়োজন নেই।
‘আল্লামা ইবনুল কুদামাহ্ (রহঃ) বলেন, নিশ্চয়ই গর্ভবতী ও দুধদানকারিণী নারী যখন নিজেদের ক্ষতির আশংকা করবে উভয়ই সিয়াম বর্জন করবে এবং পরবর্তীতে তা কাযা করতে হবে। আর এ মর্মে ‘উলামাগণের মাঝে কোন মতপার্থক্য আছে বলে আমার জানা নেই। কেননা উভয়ই তো প্রকৃতপক্ষে রুগ্ন ব্যক্তির অবস্থায়ই রয়েছে। আর ‘আল্লামা যুরকানী (রহঃ) বলেন, তারা উভয়ই যখন নিজেদের ওপর ক্ষতির আশংকা করবে, তবে তাদের ফিদ্ইয়ার প্রয়োজন নেই এবং এ মর্মেই ঐকমত্য ও ইজমা রয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - মুসাফিরের সওম
২০২৬-[৮] সালামাহ্ ইবনু মুহাব্বাক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (সফরের সময়) যে ব্যক্তির কাছে এমন সওয়ারী থাকবে, যা তাকে তার গন্তব্য পর্যন্ত অনায়াসে ও আরামে পৌঁছে দিতে পারে (অর্থাৎ- সফরে কষ্ট না হয়); যে জায়গায়ই রমাযান (রমজান) মাস আসুক সে ব্যক্তি যেন সওম পালন করে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ سَلَمَةَ بْنِ الْمُحَبَّقِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ كَانَ لَهُ حَمُولَةٌ تَأْوِي إِلَى شِبْعٍ فَلْيَصُمْ رَمَضَانَ من حَيْثُ أدْركهُ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে নির্দেশসূচক ক্রিয়া (فَلْيَصُمْ) টি মুস্তাহাবের জন্য ব্যবহৃত, এবং তা উত্তম কর্মের উপর উৎসাহ প্রদান করছে। কারণ সাধারণভাবে সফর অবস্থায় সিয়াম পালন না করার উপর পূর্ণাঙ্গ দলীল রয়েছে। অর্থাৎ- সফরে যদি কোন ধরনের কষ্ট বা জটিলতা নাও থাকে তবুও সিয়াম পরিত্যাগ করা যাবে।
কারো মতে এর প্রকৃত অর্থ হলো, যে ব্যক্তি সওয়ার অবস্থায় সফর করবে এবং তার সফরটা এমন সংক্ষিপ্ত হবে যে, ভ্রমণের দিনেই নিজ গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে, সে যেন রমাযানের সিয়াম পালন করে।
এ ক্ষেত্রে আমর বা নির্দেশসূচক ক্রিয়া (فَلْيَصُمْ) টি ওয়াজিবের অর্থে ব্যবহৃত। কেননা জমহূর ‘উলামাগণের নিকট দীর্ঘ সফর ব্যতীত রমাযানের সিয়াম পরিত্যাগ করা বৈধ নয়।
পরিচ্ছেদঃ ৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - মুসাফিরের সওম
২০২৭-[৯] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের বছর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযান (রমজান) মাসে (মদীনাহ্ হতে) মক্কা অভিমুখে রওনা হলেন। তিনি (মক্কা মদীনার মধ্যবর্তী স্থান ’উসফানের কাছে) ’’কুরা-’আল গমীম’’ পৌঁছা পর্যন্ত সওম রাখলেন। অন্যান্য লোকেরাও সওমে ছিলেন। (এখানে পৌঁছার পর) তিনি পেয়ালায় করে পানি চেয়ে আনলেন। পেয়ালাটিকে (হাতে উঠিয়ে এতো) উঁচুতে তুলে ধরলেন যে, মানুষেরা এর দিকে তাকাল। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পানি পান করলেন। এরপর কিছু লোক আরয করল যে, (এখনো) কিছু লোক সওম রেখেছে (অর্থাৎ- রসূলের অনুসরণে সওম ভাঙেনি)। (এ কথা শুনে) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ এসব লোক পাক্কা গুনাহগার, এসব লোক পাক্কা গুনাহগার। (মুসলিম)[1]
عَنْ جَابِرٍ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَرَجَ عَامَ الْفَتْحِ إِلَى مَكَّةَ فِي رَمَضَانَ فَصَامَ حَتَّى بَلَغَ كُرَاعَ الْغَمِيمِ فَصَامَ النَّاسُ ثُمَّ دَعَا بِقَدَحٍ مِنْ مَاءٍ فَرَفَعَهُ حَتَّى نَظَرَ النَّاسُ إِلَيْهِ ثُمَّ شَرِبَ فَقِيلَ لَهُ بَعْدَ ذَلِكَ إِنَّ بَعْضَ النَّاسِ قَدْ صَامَ. فَقَالَ: «أُولَئِكَ الْعُصَاةُ أُولَئِكَ الْعُصَاةُ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: তিরমিযী, নাসায়ী, বায়হাক্বী ও ত্বহাবীও অনুরূপ বর্ণনা করেছেন এবং তারা (أُولٰئِكَ الْعُصَاةُ) বা তারাই অতিশয় গুনাহগার, এটি একবার উল্লেখ করেছেন। তিরমিযীতে রয়েছে যে, নিশ্চয়ই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের দিনে মক্কাহভিমুখে রওনা করলেন এবং কুরা-‘আল গমীম (‘উসফান-এর নিকটবর্তী একটি জায়গার নাম) নামক স্থানে পৌঁছালেন এবং সেখানে সিয়াম পালন আরম্ভ করলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলা হলো যে, আপনি কি করছেন তাই তারা লক্ষ্য করছে। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এক পাত্র পানি তলব করলেন এবং জনগণকে দেখিয়ে তা পান করলেন, এবং তা দেখে কতক লোক সিয়াম ভঙ্গ করল এবং কতক লোক সিয়াম পালন অব্যাহত রাখল। আর এ বিষয়টি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট পৌঁছে গেল যে, লোকজন এখনও সিয়াম পালন করছে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, তারা গুনাহগার।
উল্লেখিত হাদীসে সিয়াম পালনকারীগণকে গুনাহগার হওয়ার দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে, তার কারণ হলো, তারা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কর্মের পরিপন্থী কাজ করেছে। আর তারা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পানীয় পাত্র উপরে উঠিয়ে তা পান করার মাধ্যমে সিয়াম ভঙ্গ করে তাদের যে আনুগত্য আশা করেছিলেন, সিয়াম পালন কঠিন হওয়ার পরেও তা তারা বাস্তবায়ন করেনি।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেন, তারা পূর্ণ গুনাহগার কেননা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিয়াম ভাঙ্গার প্রস্ত্ততি নিলেন এমনকি পানির পাত্র উপরে উঠালেন, এরপর পান করলেন যাতে তারা তার অনুসরণ করে এবং আল্লাহর দেয়া অব্যাহতি গ্রহণ করে। সুতরাং যে তা গ্রহণ করতে অনিহা প্রকাশ করবে সে গুনাহগারেই পৌঁছে যাবে।
পরিচ্ছেদঃ ৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - মুসাফিরের সওম
২০২৮-[১০] ’আবদুর রহমন ইবনু ’আওফ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রমাযান (রমজান) মাসে সফরের সায়িম, নিজের বাসস্থানে সায়িম না থাকার মতো। (ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَوْفٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «صَائِمُ رَمَضَانَ فِي السَّفَرِ كَالْمُفْطِرِ فِي الْحَضَرِ» . رَوَاهُ ابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীস থেকে বুঝা যায়, সফর অবস্থায় সিয়াম পালন নিষিদ্ধ যেমন মুকীম অবস্থায় সিয়াম বর্জন নিষিদ্ধ।
হাফেয আসকালানী (রহঃ) বলেন, সফর অবস্থায় সিয়াম পালন না করাই উত্তম। আর এটাই হাদীসের মূল উদ্দেশ্য। আর হাদীসটি যেহেতু য‘ঈফ সেহেতু এটি গ্রহণযোগ্য নয়।
পরিচ্ছেদঃ ৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - মুসাফিরের সওম
২০২৯-[১১] হামযাহ্ ইবনু ’আমর আল আসলামী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসূল! সফর অবস্থায় আমি সওম পালনে সমর্থ। (না রাখলে) আমার কী কোন গুনাহ হবে? তিনি বললেন, এ ক্ষেত্রে আল্লাহ ’আযযা ওয়াজাল্লা তোমাকে অবকাশ দিয়েছেন। যে ব্যক্তি এ অবকাশ গ্রহণ করবে, সে উত্তম কাজ করবে। আর যে ব্যক্তি সওম রাখা পছন্দ করবে (সে রাখবে), তার কোন গুনাহ হবে না। (মুসলিম)[1]
وَعَن حَمْزَة بن عَمْرو السّلمِيّ أَنَّهُ قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي أَجِدُ بِي قُوَّةً عَلَى الصِّيَامِ فِي السَّفَرِ فَهَلْ عَلَيَّ جُنَاحٌ؟ قَالَ: «هِيَ رُخْصَةٌ مِنَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ فَمَنْ أَخَذَ بِهَا فَحَسَنٌ وَمَنْ أَحَبَّ أَنْ يَصُومَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: এ মর্মে ‘আল্লামা ‘উবায়দুল্লাহ আল মুবারকপূরী (রহঃ) বলেন, আলোচ্য হাদীসে সাধারণত সফর অবস্থায় সিয়াম পালন না করার উপরই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে, যেমন ইমাম আহমাদের মাযহাব। তবে জমহূর ‘উলামাগণ তার বিপরীত মতামত ব্যক্ত করেছেন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর (فَحَسَنٌ) শব্দের ভিত্তিতে।
‘আল্লামা শাওকানী (রহঃ) বলেন, হাদীসে জিজ্ঞাসাকালীন কথা, ‘আমি সিয়াম পালনে সক্ষম’ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, নিশ্চয়ই সিয়াম পালন করাটা তার উপর কঠিন নয়। এমন সফরে সিয়াম পালন করলে তার দ্বারা অন্য কোন হকও নষ্ট হবে না।
আল মুনতাক্বী প্রণেতার মতে আলোচ্য হাদীসটি সফর অবস্থায় সিয়াম বর্জনের ফাযীলাতের উপর মজবুত দলীল, কারণ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা (فَمَنْ أَخَذَ بِهَا فَحَسَنٌ وَمَنْ أَحَبَّ أَنْ يَصُومَ فَلَا جُنَاحَ)। সুতরাং প্রমাণিত হলো অব্যাহতি গ্রহণ করাটাই উত্তম। জমহূর ‘উলামাগণ তার জবাবে বলেন, এটা সে ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যার সফরে সিয়াম পালন করলে ক্ষতির আশংকা রয়েছে, অথবা সিয়াম পালন তার জন্য কষ্টকর। যেমন একাধিক হাদীসে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - (সিয়াম) কাযা করা
২০৩০-[১] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রমাযান (রমজান) মাসের সওমের কাযা আমি শুধু শা’বান মাসেই করতে পারি। ইয়াহ্ইয়া ইবনু সা’ঈদ বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে ব্যস্ত থাকায় অথবা বলেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতের ব্যস্ততা ’আয়িশাহকে (শা’বান মাস ছাড়া অন্য কোন মাসে) কাযা সওম আদায়ের সুযোগ দিত না। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ الْقَضَاءِ
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: كَانَ يَكُونُ عَلَيَّ الصَّوْمُ مِنْ رَمَضَانَ فَمَا أَسْتَطِيعُ أَنْ أَقْضِيَ إِلَّا فِي شَعْبَانَ. قَالَ يَحْيَى بْنُ سَعِيدٍ: تَعْنِي الشّغل من النَّبِي أَو بِالنَّبِيِّ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীস থেকে জমহূর ‘উলামাগণ দলীল গ্রহণ করেছেন যে, নিশ্চয়ই রমাযানের কাযা সিয়াম তাৎক্ষণিক আদায় করা ওয়াজিব নয়, যদি বিলম্বে নিষিদ্ধ হত তবে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে পরবর্তী শা‘বান পর্যন্ত বিলম্বের স্বীকৃতি দিতেন না। তবে হ্যাঁ! তা দ্রুত আদায় করা মুস্তাহাব। কেননা আনুগত্যের প্রতিযোগিতা করা ও কল্যাণমূলক কাজে দ্রুততা অবলম্বন করা উত্তম। ‘আল্লামা শাওকানী (রহঃ) বলেন, আলোচ্য হাদীসে দলীল রয়েছে যে, রমাযানে কাযা হয়ে যাওয়া সিয়াম মুত্বলাকভাবেই বিলম্বে আদায় করা জায়িয। তাতে কোন ওযর বা কারণ থাকুক বা না থাকুক। আর জমহূর ‘উলামাগণ আল্লাহ তা‘আলার বাণী (সূরা আল বাকারাহ্ ২ : ১৮৫) فَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ أُخَرَ দ্বারাও দলীল গ্রহণ করেছেন, আল্লাহ তা‘আলা মুত্বলাকভাবে কাযা আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং দলীল ছাড়া তা কোন সময়ের সাথে নির্দিষ্ট করা বৈধ নয়। সুতরাং তা বিলম্বের সাথে আদা করা ওয়াজিব, তাৎক্ষণিক আবশ্যক নয়।
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - (সিয়াম) কাযা করা
২০৩১-[২] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন নারীর উচিত নয় স্বামীর উপস্থিতিতে তার অনুমতি ছাড়া নফল সওম পালন করা। ঠিক তেমনই কোন নারীর জন্য স্বামীর অনুমতি ছাড়া কাউকে ঘরে প্রবেশ করার অনুমতি দেয়াও অনুচিত। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْقَضَاءِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَحِلُّ لِلْمَرْأَةِ أَنْ تَصُومَ وَزَوْجُهَا شَاهِدٌ إِلَّا بِإِذْنِهِ وَلَا تَأْذَنَ فِي بَيْتِهِ إِلَّا بِإِذْنِهِ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী (রহঃ) বলেন, স্ত্রীর জন্য তার নিকট কিংবা দূরবর্তী আত্মীয় এমনকি কোন নারীকেও স্বামীর অনুমতি ব্যতীত প্রবেশের অনুমতি দেয়া বৈধ নয়।
‘আল্লামা নাবাবী (রহঃ) স্বামীর অনুমতি ব্যতীত স্ত্রীর কাউকে তার বাড়িতে প্রবেশের অনুমতি দিতে পারবে না। এটা যে ব্যাপারে স্বামীর অনুমোদন সম্পর্কে অবহিত হওয়া না যাবে সে ক্ষেত্রে, অর্থাৎ- পূর্ব হতে এ মর্মে স্বামীর অনুমোদন যদি না থাকে। তবে কারো প্রবেশে যদি স্বামীর সন্তুষ্টি সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায় তখন তার প্রবেশে কোন সমস্যা নেই। যেমন স্বভাবগতভাবেই যে সকল মেহমানদের প্রবেশের অনুমতি আছে, চাই স্বামী উপস্থিত থাকুক বা না থাকুক।
আর স্বামীর অনুমতি ব্যতীত স্ত্রীর সিয়াম পালনের ক্ষেত্রে তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ্’র বর্ণনায় রয়েছে যে, স্ত্রী তার স্বামীর উপস্থিতিতে তার অনুমতি ছাড়া রমাযান (রমজান) ব্যতীত কোন সিয়াম পালন করতে পারবে না। তবে ঐ সকল মেহমান স্ত্রীর জন্য মাহরাম হওয়া জরুরী।
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - (সিয়াম) কাযা করা
২০৩২-[৩] মু’আযাহ্ আল ’আদাবিয়্যাহ্ (রহঃ) (কুনিয়াত উম্মুস্ সুহবা) থেকে বর্ণিত। তিনি উম্মুল মু’মিনীনাহ্ ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ঋতুবতী মহিলাদের সওম কাযা করতে হয়, অথচ সালাত কাযা করতে হয় না, কারণ কী? ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশায় আমাদের যখন মাসিক হত, তখন সওম কাযা করার হুকুম দেয়া হত। কিন্তু সালাত কাযা করার হুকুম দেয়া হত না। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْقَضَاءِ
وَعَنْ مُعَاذَةَ الْعَدَوِيَّةِ أَنَّهَا قَالَتْ لِعَائِشَةَ: مَا بَالُ الْحَائِضِ تَقْضِي الصَّوْمَ وَلَا تَقْضِي الصَّلَاةَ؟ قَالَتْ عَائِشَةُ: كَانَ يُصِيبُنَا ذَلِكَ فَنُؤْمَرُ بِقَضَاءِ الصَّوْمِ وَلَا نُؤْمَرُ بِقَضَاءِ الصَّلَاةِ. رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যা: ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে এটা জিজ্ঞেস করার কারণ হলো, ‘সালাত এবং সিয়াম’ উভয়টি হুকুমগতভাবে সমান হবে, এটাই বিবেকের দাবি। কারণ উভয়টি তো ‘ইবাদাত, এবং বিশেষ কারণে তা পরিত্যাগ করতে হয়। সুতরাং সিয়াম কাযা ওয়াজিব। আর সালাত কাযা ওয়াজিব নয়, এটা জিজ্ঞাসাকারীর বোধগম্য ছিল না। এ মর্মে ইমাম বুখারী (রহঃ) তার বিশুদ্ধ গ্রন্থে সিয়াম অধ্যায়ে আবূয্ যিনাদ (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, নিশ্চয়ই সুন্নাতসমূহ ও হুকুমের বিভিন্ন দিক অধিকাংশ ক্ষেত্রে যুক্তির বিপরীতে আসে কাজেই মুসলিমগণ শারী‘আতে যা পাবে তার অনুসরণ করবে। সুতরাং ঋতুমতী নারী সিয়াম কাযা করবে এবং সালাত কাযা করবে না।
তবে ফিকহবিদগণ সালাত ও সিয়ামের পার্থক্য নির্ধারণে বলেছেন, সালাত কাযা করার বিধান না থাকার মাঝে হিকমাত হলোঃ সালাত বার বার আদায় করতে হয় বিধায় তা কাযা করা অত্যন্ত কঠিন। (অর্থাৎ- ঋতুস্রাব সাধারণত ৩, ৫, ৭, ১০ দিন পর্যন্ত হয়, যে নারীর মাসিক ১০ দিন হয় তার ১০x৫= ৫০ ওয়াক্ত সালাত কাযা করতে হবে যা খুবই কঠিন) পক্ষান্তরে সিয়াম বছরে মাত্র একবার যা কাযা করা মোটেই কঠিন নয়। তবে ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) শুধু রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশের কথা বলেছেন। সুতরাং ফকীহদের এ রহস্য জানার প্রয়োজন নেই।
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - (সিয়াম) কাযা করা
২০৩৩-[৪] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করেছে অথচ তার সওম অনাদায়ী ছিল, এ ক্ষেত্রে তার ওয়ারিসগণ সওমের কাযা আদায় করে দেবে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ الْقَضَاءِ
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ مَاتَ وَعَلَيْهِ صَوْمٌ صَامَ عَنْهُ وليه»
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা ইবনু দাক্বীক (রহঃ) বলেন, আলোচ্য হাদীসটি জোরালোভাবে প্রমাণ করে যে, মৃত ব্যক্তির পক্ষ হতে তার ওয়ারিসগণ সিয়াম পালন করতে পারবে এবং সিয়ামে প্রতিনিধিত্ব বৈধ। ‘উলামাগণ এ মতেরই পক্ষ অবলম্বন করেছেন। এর স্বপক্ষে অন্য আর একটি হাদীস রয়েছে। ‘আবদুল্লাহ বিন ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। এক মহিলা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে বলল, ইয়া রসূলাল্লাহ! আমার মা মৃত্যুবরণ করেছেন কিন্তু তার ওপর মানৎ-এর সিয়াম ছিল আমি কি তার পক্ষ হতে তা আদায় করতে পারি?
জবাবে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার মায়ের ওপর যদি কোন ঋণ থাকে তবে তা কি পূর্ণ করবে? মহিলাটি বলল, হ্যাঁ; নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার মায়ের পক্ষ হতে তুমি সিয়াম পালন কর। (মুসলিম, আহমাদ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - (সিয়াম) কাযা করা
২০৩৪-[৫] নাফি’ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করেছে অথচ তার ওপর সওম আদায়ের দায়িত্ব ছিল, এমতাবস্থায় তার তরফ থেকে (তার ওয়ারিসগণকে) প্রতিটি সওমের পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাবার খাইয়ে দিতে হবে। (তিরমিযী; ইমাম তিরমিযী বলেন, এ হাদীসটির ব্যাপারে সঠিক কথা হলো, এটি ইবনু ’উমার পর্যন্ত মাওকূফ। এটি তাঁর কথা [অর্থাৎ- রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা নয়]।)[1]
عَنْ نَافِعٍ عَنِ ابْنِ عُمَرَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ مَاتَ وَعَلَيْهِ صِيَامُ شَهْرِ رَمَضَانَ فَلْيُطْعَمْ عَنْهُ مَكَانَ كُلِّ يَوْمٍ مِسْكِينٌ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: وَالصَّحِيحُ أَنه مَوْقُوف على ابْن عمر
ব্যাখ্যা: এ হাদীস দ্বারা হানাফী ও মালিকী মাযহাবীগণ দলীল গ্রহণ করেছেন, তবে শর্তসাপেক্ষে, অর্থাৎ- যদি মৃত ব্যক্তি ওয়াসিয়্যাত করে থাকে তবে তার পক্ষ হতে মিসকীনকে খাদ্য খাওয়াতে হবে। আর যদি ওয়াসিয়্যাত না থাকে তাহলে আবশ্যক নয়। যা ইমাম শাফি‘ঈর মতের বিপরীত। ইমাম শাফি‘ঈর মতে মৃত ব্যক্তি ওয়াসিয়্যাত করুক বা না করুক মিসকীনকে খাদ্য দিতে হবে। ‘আল্লামা কারী (রহঃ) বলেন, ওয়ারিসদের ওপর মিসকীনকে খাদ্য খাওয়ানোর আবশ্যকতার ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির ওয়াসিয়্যাত আবশ্যক।
পরিচ্ছেদঃ ৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - (সিয়াম) কাযা করা
২০৩৫-[৬] মালিক (রহঃ) হতে বর্ণিত। তাঁর পর্যন্ত এ বর্ণনাটি পৌঁছেছে যে, ইবনু ’উমার (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করা হত, কোন ব্যক্তি কি অন্য কোন ব্যক্তির পক্ষ থেকে সওম আদায় করে দিতে পারে, কিংবা সালাত আদায় করে দিতে পারে? এ প্রশ্নের জবাবে ইবনু ’উমার বলতেন, কোন লোকের পক্ষ থেকে কেউ না সালাত আদায় করতে পারে আর না কেউ সওম রাখতে পারে। (মুয়াত্ত্বা)[1]
عَنْ مَالِكٍ بَلَغَهُ أَنَّ ابْنَ عُمَرَ كَانَ يُسْأَلُ: هَلْ يَصُومُ أَحَدٌ عَنْ أَحَدٍ أَوْ يُصَلِّي أَحَدٌ عَنْ أَحَدٍ؟ فَيَقُولُ: لَا يَصُومُ أَحَدٌ عَنْ أَحَدٍ. وَلَا يُصَلِّي أَحَدٌ عَنْ أحد. رَوَاهُ فِي الْمُوَطَّأ
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা ‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী (রহঃ) বলেন, যারা মৃত ব্যক্তির পক্ষ হতে সালাত ও সিয়ামের মধ্য থেকে কোন একটি আদায় করা বৈধ মনে করেন না, তারা ইবনু ‘উমার (রাঃ) এর এ হাদীস দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন। অবশ্য পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে যে, নিশ্চয়ই ইমাম বুখারী (রহঃ) (باب من مات وعليه نذر) (অধ্যায়: যে ব্যক্তি তার ওপর মানৎ রেখে মৃত্যুবরণ করল) ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত সালাতের প্রতি নির্দেশ সংক্রান্ত হাদীস তা‘লীকভাবে বর্ণিত রয়েছে। তাঁর কথায় ইখতিলাফ থাকলেও অনুসরণের ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ হাদীস অধিক অগ্রগণ্য।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৩৬-[১] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন (নফল) সওম রাখা শুরু করতেন, এমনকি আমরা বলতাম, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কি এখন সওম বন্ধ করবেন না। আবার তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন সওম রাখা ছেড়ে দিতেন আমরা বলতাম, এখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কি আর সওম রাখবেন না। রমাযান (রমজান) ছাড়া অন্য কোন মাসে তাঁকে পূর্ণ মাস সওম রাখতে দেখিনি। আর শা’বান ছাড়া অন্য কোন মাসে তাঁকে আমি এত বেশী সওম রাখতে দেখিনি। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে তিনি [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু দিন ছাড়া শা’বানের গোটা মাস সওম পালন করতেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ صِيَامِ التَّطَوُّعِ
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُومُ حَتَّى نَقُولَ: لَا يُفْطِرُ وَيُفْطِرُ حَتَّى نَقُولَ: لَا يَصُومُ وَمَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اسْتكْمل صِيَام شهر قطّ إِلَّا رَمَضَانَ وَمَا رَأَيْتُهُ فِي شَهْرٍ أَكْثَرَ مِنْهُ صِيَامًا فِي شَعْبَانَ
وَفِي رِوَايَةٍ قَالَتْ: كَانَ يَصُوم شعْبَان كُله وَكن يَصُوم شعْبَان إِلَّا قَلِيلا
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা ‘আমীর আল ইয়ামীনী (রহঃ) বলেন, আলোচ্য হাদীসটি এ মর্মে দলীল যে, নিশ্চয়ই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নফল সিয়াম পালনের নির্ধারিত কোন মাস ছিল না। বরং কখনও তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) লাগাতার সিয়াম পালন করতেন, আবার কখনও লাগাতার সিয়াম বর্জন করতেন। তার ব্যস্ততাসাপেক্ষে তার চাহিদা অনুযায়ী সিয়াম পালন ও সিয়াম বর্জন করতেন। আর শা‘বান মাসে অধিক সিয়াম পালন দ্বারা উদ্দেশ্য হলোঃ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযান (রমজান) মাস ছাড়া শা‘বান ও অন্যান্য মাসেও সিয়াম পালন করতেন। তবে অন্যান্য মাসের তুলনায় শা‘বান মাসে অধিক সিয়াম পালন করতেন। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) অনুরূপ বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। তবে শা‘বানে অধিক সিয়াম পালনের বিশেষত্ব সম্পর্কে অনেক মতপার্থক্য রয়েছে।
হাফেয আসকালানী (রহঃ) বলেন, এ মর্মে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিশুদ্ধ হাদীসই উত্তম। হাদীসটি বর্ণনা করেছেন নাসায়ী এবং ইবনু খুযায়মাহ্ তা সহীহ বলেছেন। উসামাহ্ বিন যায়দ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আপনি শা‘বান মাসে যত সিয়াম পালন করেন অন্য মাসে তো আপনাকে তত সিয়াম পালন করতে দেখি না।
তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, একটি মাস যা থেকে মানুষ উদাসীন থাকে, আর তা হলো রজব ও রমাযানের মধ্যবর্তী মাস। আর এ মাসে বিশ্ব প্রতিপালকের দরবারে ‘আমলনামা উঠানো হয়। অতএব আমি চাই যে, আমার ‘আমলনামাটা সিয়াম অবস্থায় উঠানো হোক। ‘আল্লামা মুবারকপূরী (রহঃ) বলেন, উসামাহ্ বিন যায়দ এর বর্ণিত হাদীস দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, বিশেষ ‘আমলনামা উঠানো, প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যার ‘আমলনামা উঠানো হয়, এ হাদীস দ্বারা তা উদ্দেশ্য নয়।
(كَانَ يَصُوْمُ شَعْبَانَ كُلَّه) এখানে পূর্ণ শা‘বান মাস সিয়াম পালন দ্বারা উদ্দেশ্য আধিক্য বুঝানো, পূর্ণ শা‘বান উদ্দেশ্য নয়। যা পরবর্তী (إِلَّا قَلِيْلًا) শব্দ দ্বারা বুঝা যায়। কারণ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযান (রমজান) ব্যতীত কোন মাসই পূর্ণ সিয়াম পালন করতেন না। সহীহুল বুখারীতে ‘আবদুল্লাহ বিন ‘আব্বাস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস রয়েছে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযান (রমজান) ব্যতীত কোন মাসেই পূর্ণ করে সিয়াম পালন করতেন না।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৩৭-[২] ’আবদুল্লাহ ইবনু শাক্বীক (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছি যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি গোটা মাস সওম রাখতেন? তিনি [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] বললেন, আমি জানি না যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযান (রমজান) ছাড়া অন্য কোন মাস পুরো সওম রেখেছেন কিনা? কিংবা এমন কোন মাসের কথাও জানি না যে, মাসে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মোটেও সওম রাখেননি। তিনি প্রতি মাসেই কিছু দিন সওম পালন করতেন। এ নিয়মেই তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জীবন কাটিয়েছেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ صِيَامِ التَّطَوُّعِ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ شَقِيقٍ قَالَ: قُلْتُ لِعَائِشَةَ: أَكَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُوم شهرا كُله؟ قَالَ: مَا عَلِمْتُهُ صَامَ شَهْرًا كُلَّهُ إِلَّا رَمَضَانَ وَلَا أَفْطَرَهُ كُلَّهُ حَتَّى يَصُومَ مِنْهُ حَتَّى مضى لسبيله. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীস থেকে বুঝা যায়, কোন মাসেই সিয়ামমুক্ত না থাকা মুস্তাহাব। অর্থাৎ- প্রতি মাসেই সিয়াম পালন করা উচিত।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৩৮-[৩] ’ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ’ইমরানকে অথবা অন্য কোন লোককে জিজ্ঞেস করেছেন, আর ’ইমরান তা শুনছিলেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, হে অমুক ব্যক্তির পিতা! তুমি কী শা’বান মাসের শেষ দিনগুলো সওম রাখো না? তখন তিনি বললেন, না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তুমি (রমাযানের শেষে শা’বান মাসের) দু’টি সওম পালন করে নিবে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ صِيَامِ التَّطَوُّعِ
وَعَنْ عِمْرَانَ بْنِ حُصَيْنٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَنَّهُ سَأَلَهُ أَوْ سَأَلَ رَجُلًا وَعِمْرَانَ يَسْمَعُ فَقَالَ: «يَا أَبَا فُلَانٍ أَمَا صُمْتَ مِنْ سَرَرِ شَعْبَانَ؟» قَالَ: لَا قَالَ: «فَإِذَا أَفْطَرْتَ فَصُمْ يَوْمَيْنِ»
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে سَرَرِ শব্দটি নিয়ে ‘উলামাগণের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে, তবে প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী এ শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, মাসের শেষাংশ (অর্থাৎ- ২৮, ২৯, ৩০ তম রাম) এবং এটাই জমহূর ভাষাবিদদের মত। আর এটাই ইমাম বুখারী (রহঃ) প্রণীত সহীহ আল বুখারীর তরজমাতুল বাব (باب الصوم آخرالشهر) এর সমর্থক। তবে এ ক্ষেত্রে আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত পূর্বে উল্লেখিত হাদীসের মাধ্যমে একটি জটিলতা পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা হলোঃ আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে রয়েছে যে, তোমরা একদিন কিংবা দু’দিন সিয়াম পালনের মাধ্যমে রমাযান (রমজান)কে এগিয়ে নিও না। অথচ এ হাদীসে শা‘বানের শেষের দিনে সিয়াম পালনের বিষয়টি স্পষ্ট। এর জবাবে বলা যায় যে, লোকটি প্রতি মাসের শেষে সিয়াম পালন করা তার নিয়মতান্ত্রিক রুটিন ছিল। অথবা তার ওপর মানৎ-এর সিয়াম ছিল। ‘আল্লামা যায়নুল মুনীর (রহঃ) বলেন, হয়ত লোকটি প্রতি মাসের শেষ তারিখে সিয়াম পালন করত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর (তোমরা একদিন কিংবা দু’দিন সিয়াম পালনের মাধ্যমে রমাযানকে এগিয়ে নিও না) এ নিষেধের কারণে তা পরিত্যাগ করে। অতঃপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তা আদায় করার জন্য নির্দেশ দেন, যাতে সে তার ‘ইবাদাতের উপর অবিচল থাকে। কেননা আল্লাহর নিকট ঐ ‘আমলই সর্বপ্রিয় যা সর্বদা করা হয়। আর এ সিয়াম ছুটে গেলে পরবর্তী মাসের শুরুতে তা আদায় করতে হবে। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা (فَإِذَا أَفْطَرْتَ فَصُمْ يَوْمَيْنِ) অর্থাৎ- রমাযানের সিয়াম যখন শেষ করবে তখন ঈদের পরবর্তী সময়ে শা‘বানের শেষ তারিখের বদলা স্বরূপ দু’দিন সিয়াম পালন করবে। আহমাদ ও মুসলিমের বর্ণনায় রয়েছে, শা‘বানের শেষের সিয়ামের স্থলে দু’দিন সিয়াম পালন করবে। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে, নফল ‘ইবাদাতের কাযা আদায় করা শারী‘আতসম্মত, অতএব ফরয ‘ইবাদাতের কাযা আদায় করা তো আরো অধিক অগ্রগণ্য এবং অপরিহার্য।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৩৯-[৪] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রমাযান (রমজান) মাসের সওমের পরে উত্তম সওম হলো আল্লাহর মাস, মুহাররম মাসের ’আশূরার সওম। আর ফরয সালাতের পরে সর্বোত্তম সালাত হলো রাতের সালাত (অর্থাৎ- তাহাজ্জুদ)। (মুসলিম)[1]
بَابُ صِيَامِ التَّطَوُّعِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَفْضَلُ الصِّيَامِ بَعْدَ رَمَضَانَ شَهْرُ اللَّهِ الْمُحَرَّمِ وَأَفْضَلُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ صَلَاةُ اللَّيْلِ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেন, এখানে মুহাররমের সিয়াম দ্বারা ‘আশূরার সিয়াম উদ্দেশ্য।
‘আল্লামা সিনদী (রহঃ) আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহর প্রান্তটীকায় উল্লেখ করেছেন যে, এক লোক নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! রমাযানের পর আমাদেরকে কোন্ মাসের সিয়াম পালনের নির্দেশ প্রদান করবেন? জবাবে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, রমাযানের পর যদি তুমি সিয়াম পালন করতে চাও তবে মুহাররম মাসে সিয়াম পালন করবে। কেননা তা আল্লাহর মাস। অর্থাৎ- তা হারাম মাসের একটি।
(وَأَفْضَلُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ صَلَاةُ اللَّيْلِ) আর সালাতের ব্যাপারে ‘আল্লামা নাবাবী (রহঃ) বলেন, এতে দলীল রয়েছে এবং ‘উলামাগণের ঐকমত্যও রয়েছে যে, দিনের নফল ‘ইবাদাতের তুলনায় রাত্রের নফল ‘ইবাদাতই উত্তম।
আর এতে আবূ ইসহাক আল মারূযী-এর দলীল রয়েছে, তার মত হলো, ধারাবাহিক সুন্নাত (দৈনন্দিন ১২ রাক্‘আত) এর চাইতে রাতের নফল সালাতই উত্তম। তবে অধিকাংশ ‘উলামার মতে দৈনন্দিন ১২ রাক্‘আতই উত্তম। কারণ তা ফরযের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৪০-[৫] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কখনো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সওম পালনের ক্ষেত্রে ’আশূরার দিনের সওম ছাড়া অন্য কোন দিনের সওমকে এবং এ মাস (অর্থাৎ-) রমাযান (রমজান) ছাড়া অন্য কোন মাসের সওমকে অধিক মর্যাদা দিতে দেখিনি। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ صِيَامِ التَّطَوُّعِ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: مَا رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَحَرَّى صِيَامَ يَوْمٍ فَضَّلَهُ عَلَى غَيْرِهِ إِلَّا هَذَا الْيَوْمَ: يَوْمَ عَاشُورَاءَ وَهَذَا الشَّهْرُ يَعْنِي شَهْرَ رَمَضَان
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসের ক্ষেত্রে ‘আল্লামা আসকালানী (রহঃ) বলেন, ইবনু ‘আব্বাস (هٰذَا الشَّهْرُ) ‘‘এই মাস পর্যন্ত বলেছেন’’-এর দ্বারা তিনি ইঙ্গিত করেছেন, তিনি যেন রমাযান (রমজান) এবং ‘আশূরার আলোচনাকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন। আর এ কারণে তার থেকে যিনি বর্ণনা করেছেন তিনি (يَعْنِىْ شَهْرَ) অর্থাৎ- রমাযান (রমজান) কথাটি বললেন, কিংবা রাবী তা সীমাবদ্ধতার দৃষ্টিতে গ্রহণ করলেন যে, রমাযান (রমজান) ব্যতীত কোন মাসেই তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পূর্ণ সিয়াম পালন করেননি। যেমন ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) কর্তৃক অপর বর্ণনায় রয়েছে যে, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে রমাযান (রমজান) ব্যতীত অন্য কোন মাসেই পূর্ণ করে সিয়াম পালন করতে দেখিনি।
‘আল্লামা শাওকানী (রহঃ) বলেন, আলোচ্য হাদীসটি এ মর্মে চাহিদা রাখে যে, রমাযানের পর সর্বোত্তম সিয়াম হলো ‘আশূরার সিয়াম।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৪১-[৬] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে (এ হাদীসটিও) বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, যে সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’আশূরার দিন সওম রেখেছেন; আর সাহাবীগণকেও রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। সাহাবীগণ আরয করেন, হে আল্লাহর রসূল! এদিন তো ঐদিন, যেটি ইয়াহূদী ও খ্রিষ্টানদের নিকট খুবই গুরুত্বপূর্ণ! (আর যেহেতু ইয়াহূদী-খ্রিষ্টানদের আমরা বিরোধিতা করি, তাই আমরা সওম রেখে তো এ দিনের গুরুত্ব প্রদানের ব্যাপারে তাদের সহযোগিতা করছি)। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যদি আমি আগামী বছর জীবিত থাকি, তাহলে অবশ্য অবশ্যই নয় তারিখেও সওম রাখবো। (মুসলিম)[1]
بَابُ صِيَامِ التَّطَوُّعِ
وَعَن ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: حِينَ صَامَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ عَاشُورَاءَ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّهُ يَوْمٌ يُعَظِّمُهُ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَئِنْ بَقِيتُ إِلَى قَابِلٍ لأصومن التَّاسِع» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: অপর বর্ণনায় রয়েছে, যখন আগামী বছর আসবে তখন ৯ম তারিখেও সিয়াম রাখব ইনশাআল্লাহ, কিন্তু আগামী বছর না আসতেই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকাল করেছেন। এর অর্থ হলো, ১০ম তারিখের সাথে নবম তারিখেও সিয়াম রাখব আহলুল কিতাদের (ইয়াহূদী ও নাসারাদের) বিপরীত করার জন্য।
আহমাদের বর্ণনায় অন্যভাবে ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত রয়েছে, তোমরা ‘আশূরার সিয়াম পালন কর এবং ইয়াহূদীদের বিপরীত কর (ইয়াহূদীরা শুধু ১০ম তারিখে সিয়াম পালন করত) এবং তার পূর্বে একদিন অথবা তার পরে একদিন সিয়াম পালন কর, অর্থাৎ- ৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ তারিখে সিয়াম পালন কর। আর এটাই ছিল নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শেষ জীবনের নির্দেশ। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশেষ করে মূর্তিপূজকদের বিরোধিতার ক্ষেত্রে শারী‘আতের নির্দিষ্ট বিধান না আশা পর্যন্ত ইয়াহূদীদের সাথে সমন্বয় রেখে চলাই পছন্দ করতেন। অতঃপর যখন মক্কা বিজয় হলো ইসলামের নির্দেশগুলো ব্যাপকতা লাভ করল, তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আহলে কিতাবদের বিপরীত করাই ভালোবাসতেন। যেমন বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমরা মূসা (আঃ)-এর অনুসরণের ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার, আর আমি তাদের (আহলে কিতাব) বিপরীত করতে ভালোবাসি। অতঃপর বিপরীত করার জন্য ‘আশূরার ১০ম তারিখের আগে-পরে একদিন সিয়াম পালনের নির্দেশ দিলেন। তবে হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী ৯ ও ১০ তারিখ সওম পালনই উত্তম।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৪২-[৭] উম্মুল ফাযল বিনতু হারিস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার ’আরাফার দিন আমার সামনে কিছু লোক রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সওম সম্পর্কে তর্কবিতর্ক করছিল। কেউ বলছিল, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আজ সওমে আছেন। আর কেউ বলছিল, না, আজ তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সায়িম নন। তাদের এ তর্কবিতর্ক দেখে আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এক কাপ দুধ পাঠালাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তখন ’আরাফাতের ময়দানে নিজের উটের উপর বসা ছিলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) (পেয়ালা হাতে নিয়ে) দুধ পান করলেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ صِيَامِ التَّطَوُّعِ
وَعَنْ أُمِّ الْفَضْلِ بِنْتِ الْحَارِثِ: أَنَّ نَاسًا تَمَارَوْا عِنْدَهَا يَوْمَ عَرَفَةَ فِي صِيَامِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ بَعْضُهُمْ: هُوَ صَائِمٌ وَقَالَ بَعْضُهُمْ: لَيْسَ بِصَائِمٍ فَأَرْسَلْتُ إِلَيْهِ بقدح لبن وَهُوَ وَاقِف عل بعيره بِعَرَفَة فشربه
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা বাজী (রহঃ) বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সিয়াম ভাঙ্গানোটা মানুষদের দেখানোর জন্যই উক্ত স্থানে দুধ পান করলেন, যাতে সহাবায়ে কিরামগণ শার‘ঈ বিধান সম্পর্কে অবগত হতে পারে। আলোচ্য হাদীসের চাহিদা এবং মায়মূনা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসেও আরাফার সিয়াম মুস্তাহাব হওয়ার কোন দলীল নেই। কিন্তু কাতাদাহ্ বর্ণিত হাদীসে রয়েছে যে, নিশ্চয়ই ‘আরাফার সিয়াম আগে ও পরের এক বছরের গুনাহ মাফের কাফফারা। ‘আল্লামা যুরকানী (রহঃ) বলেন, ‘আরাফার দিনে হাজীদের জন্য সিয়াম রাখার চেয়ে তা বর্জন করাই উত্তম। কেননা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা নিজের জন্য পছন্দ করেছেন।
‘আল্লামা খাত্ত্বাবী তাঁর ‘‘আল মা‘আলিম’’ নামক গ্রন্থের ২/১৩১ পৃঃ ‘আরাফার দিনের সিয়াম পালনের নিষেধ সংক্রান্ত আবূ হুরায়রার বর্ণিত হাদীস উল্লেখ করার পর বলেন, এ নিষেধাজ্ঞাটা মুস্তাহাবের জন্য, তা আবশ্যকতার জন্য নয়। আর নিষেধের কারণ হলো, যাতে মানুষ সিয়ামের কারণে দু‘আ, তাসবীহ ও তাহলীল হতে দুর্বল না হয়ে পড়ে। উক্ত যারা ‘আরাফার ময়দানে উপস্থিত হননি তাদের জন্য ঐ দিনের সওম অন্য যে কোন দিনের নফল সওম পালনের চেষ্টা উত্তম, কেননা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘আরাফার সিয়াম আগে ও পরের বছরের গুনাহের কাফফারা।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৪৩-[৮] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কখনো ’আশর-এ (অর্থাৎ- যিলহজ মাসের প্রথম দশকে) সওম পালন করতে দেখিনি। (মুসলিম)[1]
بَابُ صِيَامِ التَّطَوُّعِ
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: مَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَائِما فِي الْعشْر قطّ. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: অপর বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে যিলহজ মাসের প্রথম দশকে সিয়াম পালন করতে কখনই দেখিনি। অন্যদিকে কাতাদাহ্ বর্ণিত হাদীসে যিলহজ মাসের ৯ম তারিখের সিয়াম মুস্তাহাব বলা হয়েছে আর তা হলো ‘আরাফার দিন। আবার হাফসা (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সিয়াম কখনও পরিত্যাগ করেননি মর্মে দলীল পাওয়া যায়।
কাজেই ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বর্ণিত হাদীসের জবাবে বলা যায় যে, তার সিয়াম পালন না করার কথা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, অসুস্থতা ও সফর অবস্থায় সিয়াম পালন না করা। অথবা তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সিয়াম পালন করতে দেখেননি, আর তার না দেখাটা সিয়াম পালন না করা বুঝায় না। কারণ যখন নাফী (না-বাচক) ও ইস্বাত (হ্যাঁ-বাচক) বৈপরীত্যপূর্ণ হয় তখন হ্যাঁ-বাচকটাই গ্রহণযোগ্যতা পায়।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৪৪-[৯] আবূ কাতাদাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে হাযির হয়ে জিজ্ঞেস করল, আপনি কিভাবে সওম রাখেন? তার কথা শুনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাগান্বিত হলেন। ’উমার তাঁর রাগ দেখে বলে উঠলেন,
’’রযীনা- বিল্লা-হি রব্বান, ওয়াবিল ইসলা-মি দীনান, ওয়াবি মুহাম্মাদিন নাবিয়্যা। না’ঊযুবিল্লা-হি মিন গযাবিল্লা-হি ওয়া গযাবি রসূলিহী’’
(অর্থাৎ- আমরা রব হিসেবে আল্লাহর ওপর সন্তুষ্ট। দীন হিসেবে ইসলামের ওপর সন্তুষ্ট। আর নবী হিসেবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর সন্তুষ্ট। আমরা আল্লাহ ও আল্লাহর রসূলের গযব হতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।)
’উমার এ বাক্যগুলো বার বার আওড়াতে থাকেন। এমনকি এ সময় রসূলের রাগ প্রশমিত হলো। এরপর ’উমার জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! যে ব্যক্তি একাধারে সওম রাখে তার কী হুকুম? তিনি বললেন, সে ব্যক্তি না সওম রেখেছে, আর না ছেড়েছে। অথবা তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, না সওম রেখেছে আর না সওম ছেড়ে দিয়েছে। (অর্থাৎ- এখানে বর্ণনাকারীর সন্দেহ রসূলুল্লাহ কিلَا صَامَ وَلَا أَفْطَرَ বলেছেন, না কিلَمْ يَصُمْ وَلَمْ يُفْطِرْ বলেছেন)।
তারপর ’উমার জিজ্ঞেস করলেন, ওই ব্যক্তির ব্যাপারে কি হুকুম, যে দু’ দিন সওম রাখে আর একদিন তা ছাড়া থাকে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ কেউ কী এমন শক্তি রাখে? তারপর ’উমার বললেন, ওই ব্যক্তির ব্যাপারে কি হুকুম, যে একদিন রাখে আর একদিন রাখে না? এবার তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এটা হলো দাঊদ (আঃ)-এর সওম।
’উমার জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা ওই ব্যক্তির ব্যাপারে কি হুকুম যে, একদিন সওম রাখে আর দু’দিন রাখে না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আমি এটা পছন্দ করি যে, এতটুকু শক্তি আমার সংগ্রহ হোক। এরপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এক রমাযান (রমজান) থেকে আর এক রমাযান (রমজান) পর্যন্ত প্রতি মাসের তিনটি সওম একাধারে রাখার সমান। ’আরাফার দিনের সওমের ব্যাপারে আমি আশা করি আল্লাহ এর আগের ও পরের বছরের সব গুনাহ মাফ করে দেবেন। আর ’আশূরার দিনের সওমের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে আমার প্রত্যাশা, আল্লাহ এর দ্বারা আগের বছরের সব গুনাহ মাফ করে দেবেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ صِيَامِ التَّطَوُّعِ
وَعَنْ أَبِي قَتَادَةَ: أَنَّ رَجُلًا أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ كَيْفَ تَصُومُ فَغَضِبَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ قَوْله. فَلَمَّا رأى عمر رَضِي الله عَنْهُم غَضَبَهُ قَالَ رَضِينَا بِاللَّهِ رَبًّا وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا وَبِمُحَمَّدٍ نَبِيًّا نَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ غَضَبِ اللَّهِ وَغَضب رَسُوله فَجعل عمر رَضِي الله عَنْهُم يُرَدِّدُ هَذَا الْكَلَامَ حَتَّى سَكَنَ غَضَبُهُ فَقَالَ عمر يَا رَسُول الله كَيفَ بِمن يَصُومُ الدَّهْرَ كُلَّهُ قَالَ: «لَا صَامَ وَلَا أَفْطَرَ» . أَوْ قَالَ: «لَمْ يَصُمْ وَلَمْ يُفْطِرْ» . قَالَ كَيْفَ مَنْ يَصُومُ يَوْمَيْنِ وَيُفْطِرُ يَوْمًا قَالَ: «وَيُطِيقُ ذَلِكَ أَحَدٌ» . قَالَ كَيْفَ مَنْ يَصُوم يَوْمًا وَيفْطر يَوْمًا قَالَ: «ذَاك صَوْم دَاوُد عَلَيْهِ السَّلَام» قَالَ كَيْفَ مَنْ يَصُومُ يَوْمًا وَيُفْطِرُ يَوْمَيْنِ قَالَ: «وَدِدْتُ أَنِّي طُوِّقْتُ ذَلِكَ» . ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «ثَلَاث مِنْ كُلِّ شَهْرٍ وَرَمَضَانُ إِلَى رَمَضَانَ فَهَذَا صِيَامُ الدَّهْرِ كُلِّهِ صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ وَالسَّنَةَ الَّتِي بَعْدَهُ وَصِيَامُ يَوْمِ عَاشُورَاءَ أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: প্রতিমাসে তিনদিন সিয়াম পালন করা বাহ্যিকভাবে পূর্ণ বছরেরই সিয়াম হবে, কেননা তার প্রতিদান বা নেকী হলো দশগুণ। কাজেই যে ব্যক্তি মাসের তিনদিন সিয়াম পালন করবে তা পূর্ণ মাস সিয়াম পালনের মতই আর বছরের প্রতি মাসে তিনদিন সিয়াম পালন পূর্ণ বছরের সিয়ামের মতই। আর صيام رمضان الى رمضان দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, রমাযান (রমজান) মাসের সিয়ামের সাথে শাওয়াল মাসের ছয়টি সিয়াম পালন পূর্ণ বছরেরই সিয়াম। যেমন আবূ আইয়ূব বর্ণিত হাদীস সামনে আসবে এবং ‘আবদুল্লাহ বিন ‘আমর -এর বর্ণিত হাদীসে রয়েছে যে, প্রতি মাসে তিনদিন সিয়াম পালন কর। কেননা তার নেকী হবে দশগুণ এবং এটাই পূর্ণ বছরের সিয়াম।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৪৫-[১০] আবূ কাতাদাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সোমবারের সওম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ এ দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি। এ দিনে আমার ওপর (কুরআন) নাযিল করা হয়েছে। (মুসলিম)[1]
بَابُ صِيَامِ التَّطَوُّعِ
وَعَن أَبِي قَتَادَةَ قَالَ: سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ صَوْمِ الِاثْنَيْنِ فَقَالَ: «فِيهِ وُلِدْتُ وَفِيهِ أُنْزِلَ عَلَيَّ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যা: বায়হাক্বীর অপর বর্ণনায় রয়েছে, ‘উমার (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রসূল! যে সোমবারে সিয়াম পালন করে তার ব্যাপারে আপনি কি বলেন? জবাবে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এ দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এ দিনেই আমাকে নবূওয়াত দান করা হয়েছে। আর এটা এ কথাই সমর্থন করে যে, এখানে জিজ্ঞাসাবাদটা শুধু সিয়ামের ব্যাপারে, সিয়ামের আধিক্যের ব্যাপারে নয়। আর আলোচ্য হাদীসে প্রমাণিত হয় যে, সোমবারে সিয়াম পালন করা মুস্তাহাব। আর নিশ্চয়ই উক্ত দিনের সম্মান করা উচিত, যে দিনে আল্লাহ তা‘আলা তার বান্দাকে নিয়ামত দান করেছেন। সিয়ামের মাধ্যমে ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যমে উক্ত দিনের সম্মান করা কর্তব্য। আর আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) এর বর্ণনায় সোমবার ও বৃহস্পতিবার সিয়াম পালন করার কারণ রয়েছে যে, এ দিনে ‘আমলনামা উঠানো হয়, আর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিয়াম অবস্থায় ‘আমলনামা উঠানোকে ভালোবাসতেন।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৪৬-[১১] মু’আযাহ্ ’আদাবিয়্যাহ্ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি উম্মুল মু’মিনীন ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি প্রতি মাসে তিনটি করে (নফল সওম) রাখতেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তারপর আবার আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, মাসের কোন্ দিনগুলোতে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সওম রাখতেন? তিনি বললেন, মাসের বিশেষ কোন দিনের সওমের প্রতি লক্ষ্য করতেন না। (মুসলিম)[1]
بَابُ صِيَامِ التَّطَوُّعِ
وَعَنْ مُعَاذَةَ الْعَدَوِيَّةِ أَنَّهَا سَأَلَتْ عَائِشَةَ: أَكَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُومُ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ؟ قَالَتْ: نَعَمْ فَقُلْتُ لَهَا: مِنْ أَيِّ أَيَّامِ الشَّهْرِ كَانَ يَصُومُ؟ قَالَتْ: لَمْ يَكُنْ يُبَالِي مِنْ أَيِّ أَيَّام الشَّهْر يَصُوم. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে রয়েছে যে, নিশ্চয়ই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আইয়্যামে বীজ-এর সিয়াম সফরে কিংবা মুকীম অবস্থায় কখনও পরিত্যাগ করতেন না। আর হাফসা (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে রয়েছে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি মাসে তিনদিন সিয়াম পালন করতেন। যথাক্রমে সোমবার বৃহস্পতিবার এবং পরবর্তী সপ্তাহের সোমবার। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে শনি, রবি ও সোমবারের কথাও রয়েছে। এ মর্মে ‘আল্লামা আসকালানী (রহঃ) বলেন, যে ব্যাপারে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ, উৎসাহ ও ওয়াসিয়্যাত প্রকাশ পায় তা অন্যের তুলনায় উত্তম।
অতএব ব্যস্ততায় যা ছেড়ে দিয়েছেন, কিংবা তা বৈধতা বর্ণনা করার জন্য করেছেন, প্রত্যেকটি নিজ নিজ অবস্থানে উত্তম, তবে আইয়্যামে বীজ-এর সিয়াম অগ্রগণ্য হবে। তা মাসের মধ্যবর্তী ‘ইবাদাত হওয়ায়।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৪৭-[১২] আবূ আইয়ূব আল আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি রমাযান (রমজান) মাসের সওম রাখবে। এরপর সে শাওয়াল মাসের ছয়টি সওমও রাখবে তাহলে সে একাধারে সওম পালনকারী গণ্য হবে। (মুসলিম)[1]
بَابُ صِيَامِ التَّطَوُّعِ
وَعَنْ أَبِي أَيُّوبَ الْأَنْصَارِيِّ أَنَّهُ حَدَّثَهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ صَامَ رَمَضَانَ ثُمَّ أَتْبَعَهُ سِتًّا مِنْ شَوَّال كَانَ كصيام الدَّهْر» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে দলীল রয়েছে যে, শাওয়াল মাসে ছয়টি সিয়াম পালন করা মুস্তাহাব। আর এটাই ইমাম শাফি‘ঈ, ইমাম আহমাদ, দাঊদ (রহঃ) এবং হানাফী মাযহাবের মুতাআখখিরীন ‘উলামাগণের মত। তবে ইমাম মালিক ও ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-এর মতে এ সিয়াম পালন করা মাকরূহ।
কতিপয় হানাফী ‘আলিমগণ বলেন যে, ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-এর শাওয়াল মাসের ছয়টি সিয়াম পালন করা মাকরূহ বলা দ্বারা উদ্দেশ্য হলোঃ ঈদুল ফিতরের দিনসহ পরবর্তী পাঁচদিন সিয়াম পালন করা মাকরূহ। ঈদুল ফিতর বাদে পরবর্তী ছয়দিন সিয়াম পালন করলে তা কখনই মাকরূহ হবে না। বরং তা মুস্তাহাব এবং সুন্নাত।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৪৮-[১৩] আবূ সা’ঈদ আল্ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিন সওম পালন করতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ صِيَامِ التَّطَوُّعِ
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ صَوْمِ يَوْمِ الْفِطْرِ وَالنَّحْرِ
ব্যাখ্যা: সহীহ মুসলিমে ‘উমার (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে রয়েছে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের সালাত আদায় করলেন, অতঃপর মানুষদের উপলক্ষে খুৎবাহ্ প্রদান করলেন এবং বললেন, নিশ্চয়ই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দু’দিনে (ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা) সিয়াম পালন করতে নিষেধ করেছেন। একদিন তোমাদের সিয়াম (রমাযানের সিয়াম) ভঙ্গের দিন আর অপরদিন কুরবানী ভক্ষণের দিন। আলোচ্য হাদীসটি উল্লেখিত দু’দিনে সিয়াম পালন করা হারাম হওয়ার জন্য দলীল। কেননা نَهٰى-এর মৌলিকত্ব হলো হারাম সাব্যস্ত করা। আর সকল ‘উলামাগণ এ মতই প্রদান করেছেন।
‘আল্লামা ইবনুল কুদামাহ্ (রহঃ) বলেন, সকল বিদ্বানগণ এই মর্মে একমত হয়েছেন যে, উল্লেখিত দু’দিনে (ঈদুল ফিতর ও আযহা) নফল সিয়াম, মানৎ-এর সিয়াম, কাযা সিয়াম ও কাফফারার সিয়াম পালন করা নিষিদ্ধ ও হারাম। এ মর্মে ইবনু আযহারের ক্রীতদাস আবূ ‘উবায়দ (রহঃ) এর সূত্রে উপরে উল্লেখিত হাদীসের অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে। আর আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) ও আবূ সা‘ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বুখারী ও মুসলিমে অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে, এবং এরই উপরে ইমাম নাবাবী, হাফেয আসকালানী, যুরক্বানী, আয়নী প্রমুখগণের ইজমা রয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৪৯-[১৪] আবূ সা’ঈদ আল্ খুদরী (রাঃ) হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দু’ দিন কোন সওম নেই। ঈদুল ফিতর আর ঈদুল আযহা। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ صِيَامِ التَّطَوُّعِ
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَا صَوْم فِي يَوْمَيْنِ: الْفطر وَالضُّحَى
ব্যাখ্যা: এখানে প্রমাণিত হয় যে, ঈদুল ফিতর ও আযহার দিনে সিয়াম পালন করা হারাম হওয়ায় উক্ত দিন দু’টি সিয়াম পালনের জন্য উপযুক্ত নয়। অতএব তাতে মানৎ-এর সিয়াম পালনও বৈধ নয়। আর আইয়্যামে তাশরীকের হুকুমও অনুরূপ, অতি শীঘ্রই তার বর্ণনা আসবে। আর ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহাকে নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করার কারণ হলো, এ দু’টি দিন হলো মূল, আর আইয়্যামে তাশরীক ঈদুল আযহার দিনের অনুগামী হওয়ায় আলোচ্য হাদীসে আইয়্যামে তাশরীক আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৫০-[১৫] নুবায়শাহ্ আল হুযালী (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ’আইয়্যামুত তাশরীক’ হলো খানাপিনার ও পান করার এবং আল্লাহর জিকির করার দিন। (মুসলিম)[1]
بَابُ صِيَامِ التَّطَوُّعِ
وَعَنْ نُبَيْشَةَ الْهُذَلِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَيَّامُ التَّشْرِيقِ أَيَّامُ أكل وَشرب وَذكر الله» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: আইয়্যামে তাশারীক হলো কুরবানীর পরবর্তী তিনদিন, অর্থাৎ- কুরবানীর দিন ব্যতীত তার পরবর্তী তিনদিন এবং এটাই ইবনু ‘উমার ও অধিকাংশ ‘উলামাগণের সিদ্ধান্ত। তন্মধ্যে যথাক্রমে চার ইমাম ও তাদের অনুসারীগণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে ইবনু ‘আব্বাস ও ‘আত্বা হতে বর্ণিত রয়েছে যে, আইয়্যামে তাশরীক হলো চারদিন, কুরবানীর দিন ও তার পরবর্তী তিনদিন। আর ‘আত্বা তার নামকরণ করেছেন আইয়্যামে তাশরীক। তবে প্রথম বর্ণিত হাদীস, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আইয়্যামে তাশরীক্বের দিনে সিয়াম পালন করতে নিষেধ করেছেন, আর তা হলো কুরবানীর পরবর্তী তিনদিন। আর ইয়া‘লা অনুরূপ শব্দে বর্ণনা করেছেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বছরে পাঁচদিনে সিয়াম পালন করতে নিষেধ করেছেন। যথাক্রমে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা ও আইয়্যামে তাশরীক্বের দিন। কুরবানীর গোশ্ত (গোসত/গোশত) সূর্যের আলোয় ছড়িয়ে দিয়ে শুকানো হতো বিধায় এর নাম আইয়্যামে তাশরীক নামকরণ করা হয়েছে।
কারো মতে হাদী এবং কুরবানী সূর্য উদিত হওয়া পর্যন্ত যাবাহ করা হয় না, বিধায় এর নামকরণ করা হয়েছে আইয়্যামে তাশরীক। আর আলোচ্য হাদীসে (ذِكْرِ اللهِ) দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার এ কথার দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছেঃ
وَاذْكُرُوا اللهِ فِى ايَّامٍ مَعْدُودَاتٍ
‘‘তোমরা নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহকে স্মরণ করবে।’’ (সূরা আল বাকারাহ্ ২ : ২০৩)
অর্থাৎ- এ দিনে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিয়াম পালন করতে নিষেধ করেছেন এবং তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তোমাদের নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহর জিকির করতে যাতে কুপ্রবৃত্তি থেকে বেঁচে থাকা যায়।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৫১-[১৬] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কোন ব্যক্তি যেন জুমার দিন সওম না রাখে। হ্যাঁ, জুমার আগের অথবা পরের দিনসহ সওম রাখতে পারে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ صِيَامِ التَّطَوُّعِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَصُومُ أَحَدُكُمْ يَوْمَ الْجُمُعَةِ إِلَّا أَن بِصَوْم قبله أَو بِصَوْم بعده»
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসটি এককভাবে জুমার দিনে সিয়াম পালন হারাম হওয়ার উপর দলীল। উক্ত দিনে তার জন্য সিয়াম পালন বৈধ যে তার (জুমার দিনের) আগে ও পরে সিয়াম পালন করবে। এককভাবে সিয়াম পালন করলে (জুমার দিনে) সিয়াম ভঙ্গ করা ওয়াজিব।
সহীহুল বুখারী ও আবূ দাঊদ-এর বর্ণনায় রয়েছে যে, জুয়াইরিয়াহ্ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট প্রবেশ করলেন, আর তিনি ছিলেন সায়িম (রোযাদার)। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি কি গতকাল সিয়াম রেখেছিলে? জবাবে তিনি বললেন, না। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি আগামীকাল সিয়াম রাখবে? তিনি বললেন না। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তবে সিয়াম ভঙ্গ কর। আর আমরের মৌলিকত্ব হল আবশ্যক। আলোচিত হাদীসটি তারই সিয়াম পালন বৈধতার প্রমাণ করছে, যে জুমার দিনের সাথে অন্য কোন দিনের সিয়ামযুক্ত করবে। যেমন আইয়্যামে বীয-এর সিয়াম। অথবা নির্দিষ্ট দিনের সিয়াম যদি জুমার দিন অনুযায়ী হয় যেমন ‘আরাফার দিনের সিয়াম, অথবা একদিন সিয়াম পালন ও একদিন (দাঊদ (আঃ)-এর সুন্নাত) ইফতারকারী ব্যক্তির সিয়াম যদি জুমার দিনে হয় তবে অবশ্যই তা বৈধ।
হাফেয আসকালানী (রহঃ) বলেন, এককভাবে জুমার দিনে সিয়াম পালন নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে, তন্মধ্যে একটি হলো, তা (সাপ্তাহিক) ঈদের দিন, আর ঈদের দিনে সিয়াম পালন করা যাবে না। আবূ সা‘ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ঈদের দিনে কোন সিয়াম নেই এবং এটাই বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য মত। এর সমর্থনে আরো দু’টি হাদীস রয়েছে।
১. আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা তোমাদের ঈদের দিনকে সিয়ামের দিন বানিও না। তবে আগে ও পরে একদিন করে যে পালন করবে সে ব্যতীত।
২. ‘আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত, যে ব্যক্তি কোন মাসে সিয়াম পালন করতে চায়, সে যেন বৃহস্পতিবারে পালন করে, তবে জুমার দিনে যেন সিয়াম পালন না করে। কেননা তা খাওয়া, পান করা ও জিকির-আযকারের দিন।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৫২-[১৭] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অন্যান্য রাতগুলোর মধ্যে লায়লাতুল জুমাকে ’ইবাদাত বন্দেগীর জন্য খাস করো না। আর ইয়াওমুল জুমাকেও (জুমার দিন) অন্যান্য দিনের মধ্যে সওমের জন্য নির্দিষ্ট করে নিও না। তবে তোমাদের কেউ যদি আগে থেকেই অভ্যস্ত থাকে, জুমাহ্ ওর মধ্যে পড়ে যায়, তাহলে জুমার দিন সওমে অসুবিধা নেই। (মুসলিম)[1]
بَابُ صِيَامِ التَّطَوُّعِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تَخْتَصُّوا لَيْلَةَ الْجُمُعَةِ بِقِيَامٍ مِنْ بَيْنِ اللَّيَالِي وَلَا تَخْتَصُّوا يَوْمَ الْجُمُعَةِ بِصِيَامٍ مِنْ بَيْنِ الْأَيَّامِ إِلَّا أَنْ يَكُونَ فِي صَوْمٍ يَصُومهُ أحدكُم» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে জুমার দিনের রাতে নফল ‘ইবাদাত এবং কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে উক্ত রাতকে নির্দিষ্ট করা হারাম হওয়ার উপর দলীল রয়েছে। তবে সহীহ হাদীস দ্বারা যা প্রমাণিত রয়েছে তা ব্যতীত, যেমন এই রাতে সূরা আল কাহাফ তিলাওয়াত করা। কেননা জুমার রাতে তা তিলাওয়াত করার বিশুদ্ধ বর্ণনা রয়েছে। আর এটাও প্রমাণিত হয় যে, সালাতুর্ রগায়িব (যা রজব মাসের প্রথম জুমার রাতে আদায় করা হয়) শারী‘আতসম্মত নয়। ‘আল্লামা নাবাবী (রহঃ) বলেন, এ হাদীসে অন্যান্য রাতগুলোর মধ্য হতে জুমার রাতকে বিশেষ সালাতের মাধ্যমে নির্দিষ্ট করার নিষেধাজ্ঞাটা সুস্পষ্ট। আর এ মর্মে প্রমাণও রয়েছে, এবং এটার কারাহিয়্যাতের ব্যাপারে সকলেই একমত। আর ‘উলামাগণ সালাতুর্ রগায়িব নামক বিদআত (বিদাত), ঘৃণিত হওয়ার উপর দলীল গ্রহণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা তার আবিষ্কারকের উপর লা‘নাত করুন, কেননা তা ঘৃণিত বিদআত (বিদাত)।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৫৩-[১৮] আবূ সা’ঈদ আল্ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি একদিন আল্লাহর পথে (অর্থাৎ- জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ-এর সময় খালিসভাবে আল্লাহর জন্য) সওম রাখে, আল্লাহ তা’আলা তার মুখম-লকে (অর্থাৎ- তাকে) জাহান্নামের আগুন থেকে সত্তর বছরের দূরত্বে রাখবেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ صِيَامِ التَّطَوُّعِ
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ صَامَ يَوْمًا فِي سَبِيلِ اللَّهِ بَعَّدَ اللَّهُ وَجْهَهُ عَنِ النَّارِ سَبْعِينَ خَرِيفًا»
ব্যাখ্যা: আন্ নিহায়াতে রয়েছে سَبِيْلِ اللّٰهِ টি ব্যাপক। যা সকল প্রকার একনিষ্ঠ ‘ইবাদাত যা দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথে চলা যায়। যেমন ফরয ‘ইবাদাত, নফল ‘ইবাদাত ও অন্যান্য নফল ‘ইবাদাত। আর যখন سَبِيْلِ اللّٰهِ টি ব্যাপক অর্থে ব্যবহার হয় যেন তা জিহাদের উপরই প্রাধান্য পায়।
কেউ বলেছেন, এর দ্বারা যুদ্ধ ও জিহাদ উদ্দেশ্য, অর্থাৎ- যে ব্যক্তি যুদ্ধরত অবস্থায় সিয়াম পালন করবে। ‘আল্লামা ‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী এ মতকেই যথার্থ বলেছেন। আর এর সমর্থনে আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) এর বর্ণিত হাদীসে রয়েছে যে, এমন কোন পাহারাদার নেই, যে আল্লাহর রাস্তায় পাহারা দিবে, অতঃপর আল্লাহর রাস্তায় সিয়াম পালন করবে। (তার জন্য উল্লেখিত পুরস্কার) এখানে خريف অর্থাৎ- নির্দিষ্ট সময়কাল, যা দ্বারা বছর উদ্দেশ্য। কেননা খরীফ বছরে একবারই আসে, কাজেই খরীফ গত হওয়ার পর অর্থ হলো বছর অতিবাহিত হওয়া।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৫৪-[১৯] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর ইবনুল ’আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হে ’আবদুল্লাহ! আমি জানতে পেরেছি, তুমি দিনে সওম রাখো ও রাত জেগে সালাত আদায় করো। আমি বললাম, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রসূল! তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ না, (এরূপ) করো না। সওম রাখবে, আবার ছেড়ে দেবে। সালাত আদায় করবে, আবার ঘুমাবে। অবশ্য অবশ্যই তোমার ওপর তোমার শরীরের হক আছে, তোমার চোখের ওপর হক আছে, তোমার ওপর তোমার স্ত্রীর হক আছে। তোমার মেহমানদেরও তোমার ওপর হক আছে। যে সবসময় সওম রাখে সে (যেন) সওমই রাখল না। অবশ্য প্রতি মাসে তিনটি সওম সবসময়ে সওম রাখার সমান। অতএব প্রতি মাসে (আইয়্যামে বীযে অথবা যে কোন দিনে তিনদিন) সওম রাখো। এভাবে প্রতি মাসে কুরআন পড়বে। আমি নিবেদন করলাম, আমি তো এর চেয়ে বেশী করার সামর্থ্য রাখি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তাহলে উত্তম দাঊদ (আঃ)-এর সওম রাখো। একদিন রাখবে, আর একদিন ছেড়ে দেবে। আর সাত রাতে একবার কুরআন খতম করবে। এতে আর মাত্রা বাড়াবে না। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ صِيَامِ التَّطَوُّعِ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو بْنِ الْعَاصِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَا عَبْدَ اللَّهِ أَلَمْ أُخْبَرْ أَنَّكَ تَصُومُ النَّهَارَ وَتَقُومُ اللَّيْلَ؟» فَقُلْتُ: بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ. قَالَ: «فَلَا تَفْعَلْ صُمْ وَأَفْطِرْ وَقُمْ وَنَمْ فَإِنَّ لِجَسَدِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَإِنَّ لِعَيْنِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَإِنَّ لِزَوْجِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَإِنَّ لِزَوْرِكَ عَلَيْكَ حَقًّا. لَا صَامَ مَنْ صَامَ الدَّهْرَ. صَوْمُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ صَوْمُ الدَّهْرِ كُلِّهِ. صُمْ كُلَّ شَهْرٍ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ وَاقْرَأِ الْقُرْآنَ فِي كُلِّ شَهْرٍ» . قُلْتُ: إِنِّي أُطِيقُ أَكْثَرَ مِنْ ذَلِكَ. قَالَ: صُمْ أَفْضَلَ الصَّوْمِ صَوْمَ دَاوُدَ: صِيَامُ يَوْمٍ وَإِفْطَارُ يَوْمٍ. وَاقْرَأْ فِي كُلِّ سَبْعِ لَيَالٍ مَرَّةً وَلَا تَزِدْ عَلَى ذَلِكَ
ব্যাখ্যা: আহমাদে রয়েছে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মাসে কুরআন তিলাওয়াত কর। আমি (‘আবদুল্লাহ বিন ‘আমর) বললাম, আমি তার চাইতে বেশি সক্ষম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, প্রতি দশদিনে তিলাওয়াত কর। আমি বললাম আমি আরো বেশি সক্ষম। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, প্রতি তিনদিনে তিলাওয়াত (খতম) কর। বুখারীর অপর বর্ণনায় রয়েছে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, প্রতি মাসে কুরআন তিলাওয়াত কর। ‘আবদুল্লাহ বললেন, আমি এর চেয়ে বেশি পালনে সক্ষম। এমনকি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন দিনের কথা বললেন।
‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর বর্ণনায় রয়েছে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন দিনের কম সময়ে কুরআন খতম করতেন না এবং এ মতই ইমাম আহমাদ (রহঃ)-এর পছন্দ। যেমন আল মুগনী (২য় খণ্ড ১৮৪ পৃঃ) উল্লেখ রয়েছে। আর আবূ ‘উবায়দ, ইসহাক বিন রহ্ওয়াইহি-ও অনুরূপ মত গ্রহণ করেছেন।
‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী বলেন, আমার নিকট ইমাম আহমাদ (রহঃ) এর মতই অধিক গ্রহণযোগ্য, আর তিনি তিন দিনের কমে কুরআন খতম অপছন্দ করতেন।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৫৫-[২০] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোমবার ও বৃহস্পতিবারে সওম রাখতেন। (তিরমিযী, নাসায়ী)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُومُ الِاثْنَيْنِ وَالْخَمِيس. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: হাদীসটির শব্দবিন্যাস নাসায়ীর একটি বর্ণনায়। তার অপর বর্ণনায় রয়েছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোমবার ও বৃহস্পতিবারে সিয়াম পালনের উপর উৎসাহ দিতেন।
অনুরূপ তিরমিযী ও ইবনু মাজাহতে রয়েছে, অর্থাৎ- তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ঐ দু’দিনে সিয়াম পালনের ইচ্ছা করতেন এবং এ সিয়ামদ্বয়কে উত্তম মনে করতেন।
ইবনু মাজাহয় আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে রয়েছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কেউ বলল, হে আল্লাহর রসূল! আপনি সোম ও বৃহস্পতিবার সিয়াম পালন করেন, এর কারণ কি? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, সোম এবং বৃহস্পতিবারে আল্লাহ সকল মুসলিমদের ক্ষমা করেন।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৫৬-[২১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সোমবার ও বৃহস্পতিবারে (আল্লাহর দরবারে বান্দার) ’আমল পেশ করা হয়। তাই আমি চাই আমার ’আমল পেশ করার সময় আমি সওম অবস্থায় থাকি। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «تُعْرَضُ الْأَعْمَالُ يَوْمَ الِاثْنَيْنِ وَالْخَمِيسِ فَأُحِبُّ أَنْ يُعْرَضَ عَمَلِي وَأَنَا صَائِمٌ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা ইবনুল মালিক (রহঃ) বলেন, এ হাদীস নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা (রাতের ‘আমলনামা দিনের পূর্বে উঠানো হয় এবং দিনের ‘আমলনামা রাতের পূর্বে উঠানো হয়)-এর বিরোধী নয়। কেননা رفع (উত্তোলন করা) ও عرض (উপস্থাপন করা) এর মাঝে পার্থক্য রয়েছে। কারণ সপ্তাহের মাঝে ‘আমলনামাগুলো একত্রিত করা হয়, আর তা উল্লেখিত দু’দিনে আল্লাহ তা‘আলার দরবারে উপস্থাপন করা হয়। সহীহ মুসলিমের অপর বর্ণনায় রয়েছে যে, মানুষের ‘আমল প্রতি জুমায় (সপ্তাহে) দু’বার যথাক্রমে সোমবার ও বৃহস্পতিবার উপস্থাপন করা হয়। আর আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক ঈমানদারদেরকে ক্ষমা করেন, তবে একে অপরের সাথে বিদ্বেষপরায়ণ ব্যক্তি ব্যতীত। অতঃপর বলা হয় যে, তাদের মাঝে মীমাংসা হওয়া পর্যন্ত তাদের প্রতি লক্ষ্য কর।
‘আল্লামা ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, এটি শা‘বান মাসে ‘আমলনামা উঠানোর হাদীসের বিরোধ নয়। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, নিশ্চয়ই এ মাসে ‘আমল উঠানো হয় আর আমি চাই যে, আমার ‘আমলনামাটা সিয়াম অবস্থায় উঠানো হোক।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৫৭-[২২] আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হে আবূ যার! তুমি যখন কোন মাসে তিনদিন সওম পালন করতে চাও, তাহলে তেরো, চৌদ্দ ও পনের তারিখে করবে। (তিরমিযী ও নাসায়ী)[1]
وَعَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَا أَبَا ذَرٍّ إِذَا صُمْتَ مِنَ الشَّهْرِ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ فَصُمْ ثَلَاثَ عَشْرَةَ وَأَرْبَعَ عَشْرَةَ وَخَمْسَ عَشْرَةَ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: নাসায়ীর অপর বর্ণনায় রয়েছে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে প্রতি মাসে তিনদিন আইয়্যামে বীয-এর সিয়াম যথাক্রমে ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে সিয়াম পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। এখানে আইয়্যামে বীয-এর সিয়াম নির্ধারিত তিনদিন আদায় করা মুস্তাহাব হওয়ার দলীল রয়েছে। আর আইয়্যামে বীয-এর তিনটি সিয়াম যে মাসের মাঝামাঝিতে আদায় করা মুস্তাহাব এ মর্মে ‘উলামাগণের ঐকমত্য রয়েছে।
ইমাম নাবাবী যেমনটি বর্ণনা করেছেন। তবে আইয়্যামে বীয-এর সিয়ামের দিন নির্ধারণে মতপার্থক্য রয়েছে। জমহূর ‘উলামাগণের মতে তা ‘আরাবী মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ। আর কারো মতে ১২, ১৩ ও ১৪ তারিখ। তবে আবূ যার (রাঃ)-এর এ হাদীস দ্বারা তা প্রত্যাখ্যাত।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৫৮-[২৩] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (কখনো) মাসের প্রথম তিনদিন সওম রাখতেন। আর খুব কম দিনই তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জুমার দিন সওম ছাড়তেন। (তিরমিযী, নাসায়ী। আর ইমাম আবূ দাঊদ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ অর্থাৎ- ’’তিনদিন’’ পর্যন্ত বর্ণনা করেছেন।)[1]
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُومُ مِنْ غُرَّةِ كُلِّ شَهْرٍ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ وَقَلَّمَا كَانَ يفْطر يَوْم الْجُمُعَةَ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَالنَّسَائِيُّ وَرَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ إِلَى ثَلَاثَة أَيَّام
ব্যাখ্যা: আল কামূস-এ উল্লেখ রয়েছে যে, غُرَّةِ হলো মাসের প্রথমাংশ। (মাসের প্রথমে তিনদিন সিয়াম পালন প্রসঙ্গে) বলা যায় যে, আলোচ্য হাদীস এবং ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীসদ্বয়ের মাঝে কোন বৈপরীত্য নেই, কেননা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাসের যে কোন দিনে সিয়াম পালন করতে কোন দ্বিধা করতেন না। আর এ রাবী অধিকাংশ ক্ষেত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অবস্থায় দেখেছেন, তাই তিনি আর জানা অনুযায়ী বর্ণনা করেছেন। আর ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীস, (নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোম ও বৃহস্পতিবারে সিয়াম পালন করতেন) তিনি যা জানতেন তাই বর্ণনা করেছেন। সুতরাং উভয়ের মাঝে কোন বৈপরীত্য নেই। ‘আল্লামা আল কারী অনুরূপ উল্লেখ করেছেন।
আর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমার দিনে খুব কমই সওম ভঙ্গ করতেন। বরং এ দিনে বেশি বেশি সিয়াম পালন করতেন। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলোঃ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমার দিনের আগে কিংবা পরের একদিন তার সাথে মিলিয়ে নিতেন। কেননা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনও এককভাবে জুমার দিনে সিয়াম রাখতেন না।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৫৯-[২৪] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন মাসে শনি, রবি, সোমবার, আবার কোন মাসে মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার দিন সওম রাখতেন। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُومُ مِنَ الشَّهْرِ السَّبْتَ وَالْأَحَدَ وَالِاثْنَيْنِ وَمِنَ الشَّهْرِ الآخر الثُّلَاثَاء وَالْأَرْبِعَاء وَالْخَمِيس. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেন, জুমার দিন সিয়াম পালনের হাদীস পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে, সুতরাং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সপ্তাহের দিনগুলোকে পূর্ণ করতেন সিয়ামের মাধ্যমে। ‘আল্লামা ইবনুল মালিক (রহঃ) বলেন, এর দ্বারা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উদ্দেশ্য হলো বছরের সিয়াম হলো পূর্ণ সপ্তাহ অর্থাৎ- সপ্তাহের যে কোন দিন সিয়াম পালন করা যাবে। আর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছয়দিন লাগাতার সিয়াম পালন করতেন না, যাতে উম্মাতের ইকতিদা করা কঠিন না হয়।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৬০-[২৫] উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে প্রতি মাসে তিনটি সওম রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। (আর এ সওমের) শুরু সোমবার অথবা বৃহস্পতিবার থেকে করতে বলেছেন। (আবূ দাঊদ, নাসায়ী)[1]
وَعَنْ أُمِّ سَلَمَةَ قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْمُرُنِي أَنْ أَصُومَ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ أَوَّلُهَا الِاثْنَيْنِ وَالْخَمِيس. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: আহমাদ (২/২৮৭, ২৮৮ পৃঃ) নাসায়ী ও বায়হাক্বীর (৪/২৯৫) বর্ণনায় হাফসা (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীসে রয়েছে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি মাসের তিনদিন সিয়াম পালন করতেন, যথাক্রমে সোমবার, বৃহস্পতিবার এবং পরবর্তী সপ্তাহের সোমবার। নাসায়ীতে উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) থেকেও অনুরূপ হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৬১-[২৬] মুসলিম আল কুরাশী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি অথবা অন্য কোন ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সবসময়ে সওম পালনের বিষয় জিজ্ঞেস করেছে। তখন তিনি বলেছেন, তোমার ওপর তোমার পরিবার-পরিজনের হক আছে। রমাযান (রমজান) মাসের সওম রাখো। আর রমাযান (রমজান) মাসের সাথের দিনগুলোতে রাখো। অর্থাৎ- ঈদুল ফিতরের পরের দিন থেকে ছয়টি সওম পালন কর। আর প্রত্যেক বুধ, বৃহস্পতিবার রাখতে পার। যদি তুমি এ দিনগুলো সওম রাখো তাহলে মনে করবে যে, তুমি সব সময়ই সিয়াম রেখেছ। (আবূ দাঊদ, তিরমিযী)[1]
وَعَن مُسلم الْقرشِي قَالَ: سَأَلت أَوْ سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَن صِيَام الدَّهْر فَقَالَ: «إِنَّ لِأَهْلِكَ عَلَيْكَ حَقًّا صُمْ رَمَضَانَ وَالَّذِي يَلِيهِ وَكُلَّ أَرْبِعَاءَ وَخَمِيسٍ فَإِذًا أَنْتَ قَدْ صُمْتَ الدَّهْرَ كُلَّهُ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالتِّرْمِذِيُّ
ব্যাখ্যা: রমাযান (রমজান) মাসের সিয়াম ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট শাওয়াল মাসের ছয়টি সিয়াম পালন করা পূর্ণ বছরের সিয়াম পালনের সমান। যেমন পূর্বে আবূ আইয়ূব (রাঃ) বর্ণিত হাদীস অতিবাহিত হয়েছে। আর প্রতি বুধবার ও বৃহস্পতিবারের সিয়ামও অনুরূপ। বরং এটা পূর্ণ বছরের সিয়ামের উপর অতিরিক্তও বটে। কেননা কোন মাস তো চারটি বুধবার ও চারটি বৃহস্পতিবার হতে মুক্ত নয়। সুতরাং প্রতি মাসে চারটি বুধবার ও চারটি বৃহস্পতিবারে সিয়াম পালন করবে। তখন তো প্রতি মাসে আটটি সিয়াম পালন করা হবে। আর তিনদিন (আইয়্যামে বীয) সিয়াম পালন করা যখন পূর্ণ মাসের সিয়ামের সমান হবে তখন তো আটদিন সিয়াম পালন করা পূর্ণ মাসের সিয়ামেরও বেশি হবে।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৬২-[২৭] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’আরাফার দিন ’আরাফার ময়দানে সওম রাখতে নিষেধ করেছেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: نَهَى عَنْ صَوْمِ يَوْمِ عَرَفَةَ بِعَرَفَةَ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (نَهٰى) অর্থাৎ- ‘আরাফায় অবস্থানকালে, তবে অন্যান্যদের জন্য উক্ত দিনে সিয়াম রাখা মুস্তাহাব। যেমন আবূ কাতাদাহ্ (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে তা অতিবাহিত হয়েছে।
‘আমীর আল ইয়ামামী (রহঃ) বলেন, হাদীসের বাহ্যিক দিক হতে প্রতীয়মান হয় যে, ‘আরাফার ময়দানে উক্ত দিবসে সিয়াম পালন করা হারাম। আর ইয়াহ্ইয়া বিন সা‘ঈদ এ মতই গ্রহণ করেছেন। আর তিনি বলেছেন, হাজীদের ওপর ঐ দিনে সিয়াম পালন না করাই মুস্তাহাব। কেউ কেউ বলেছেন যে, নির্ধারিত দু‘আ পাঠ হতে দুর্বল হওয়ার আশংকা না থাকলে এ দিনে সিয়াম পালনে কোন অসুবিধা নেই। ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ) হতে বর্ণিত রয়েছে এবং আল খাত্ত্বাবী (রহঃ) তা পছন্দ করেছেন।
আর জমহূর ‘উলামাগণ বলেন, এ দিনে সিয়াম পালন না করাই মুস্তাহাব। এবং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিশুদ্ধ বাণী প্রমাণিত আছে যে, তিনি হাজ্জের সময় ‘আরাফায় সিয়ামবিহীন ছিলেন। যেমন তা পূর্বে আলোচিত হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৬৩-[২৮] ’আবদুল্লাহ ইবনু বুসর তার বোন সাম্মা হতে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা শনিবার দিন একান্ত প্রয়োজন না হলে সওম রেখ না। যদি কিছু না পাও তাহলে অন্ততঃ গাছের ছাল অথবা ডালপালা চিবিয়ে হলেও ইফতার করবে। (আহমদ, আবূ দাঊদ, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, দারিমী)[1]
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ بُسْرٍ عَنْ أُخْتِهِ الصَّمَّاءِ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا تَصُومُوا يَوْمَ السَّبْتِ إِلَّا فِيمَا افْتُرِضَ عَلَيْكُمْ فَإِنْ لَمْ يَجِدْ أَحَدُكُمْ إِلَّا لِحَاءَ عِنَبَةٍ أَوْ عُودَ شَجَرَةٍ فَلْيَمْضُغْهُ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَأَبُو دَاوُدَ وَالتِّرْمِذِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ والدارمي
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা মুনযিরী ‘আত্ তার্গীব’ নামক গ্রন্থে বলেছেন যে, এ নিষেধাজ্ঞা বলতে এককভাবে শনিবারে সিয়াম পালন উদ্দেশ্য। যেমন আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) বর্ণিত হাদীস অতিবাহিত হয়েছে যে, তোমাদের কেউ জুমার দিনের আগে কিংবা পরের একদিন সিয়াম পালন ব্যতীত শুধু জুমার দিন সিয়াম পালন করবে না।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেন, এখানে নিষেধ দ্বারা এককভাবে জুমার দিন সিয়াম পালন উদ্দেশ্য। আর মূল উদ্দেশ্য হলো ইয়াহূদীদের বিপরীত করা।
উল্লেখ্য যে, ইয়াহূদীরা একক দিবসে সিয়াম পালন করত তা হলো শনিবার।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৬৪-[২৯] আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে একদিন সওম রাখবে, আল্লাহ তা’আলা তার ও জাহান্নামের মধ্যে এমন একটা পরিখা আড় হিসেবে বানিয়ে দেবেন যা আসমান ও জমিনের মধ্যে দূরত্বের সমান হবে। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ أَبِي أُمَامَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ صَامَ يَوْمًا فِي سَبِيلِ اللَّهِ جَعَلَ اللَّهُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ النَّارِ خَنْدَقًا كَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: ত্ববারানীর বর্ণনায় রয়েছে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় (জিহাদরত অবস্থায়) সিয়াম পালন করবে আল্লাহ তা‘আলা তাকে জাহান্নাম থেকে ১০০ বছরের দূরত্বে রাখবেন। আর ‘উলামাগণের কয়েকটি দল মতামত ব্যক্ত করেছেন যে, এ হাদীসগুলো জিহাদ অবস্থায় সিয়াম পালনের শ্রেষ্ঠত্বের বর্ণনার জন্য এসেছে। তিরমিযী ও অন্যান্য ইমাম এর উপর অধ্যায় এনেছেন। তবে একদল ‘উলামা বলেন যে, প্রতিটি সিয়ামই আল্লাহর রাস্তায়ই হবে, যদি তা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর জন্যই হয়ে থাকে।
‘আল্লামা ‘উবায়দুর রহমান মুবারাকপূরী বলেন, আমার নিকট প্রথম মতটি প্রাধান্যযোগ্য।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৬৫-[৩০] ’আমির ইবনু মাস্’ঊদ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ঠাণ্ডা গনীমাত (অর্থাৎ- বিনা কষ্ট-ক্লেশে সাওয়াব পাওয়া) শীতের দিনে সওম পালন করা। [আহমদ ও তিরমিযী;[1] ইমাম তিরমিযী (রহঃ) বলেন, হাদীসটি মুরসাল।]
وَعَنْ عَامِرِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْغَنِيمَةُ الْبَارِدَةُ الشِّتَاءِ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ مُرْسل
ব্যাখ্যা: সিয়াম পালনকারী ব্যক্তি গরমের তৃষ্ণা এবং বড়দিনের ক্ষুধার যন্ত্রণা ছাড়াই সিয়ামের পূর্ণ প্রতিদানের অধিকারী হবে (অর্থাৎ- গ্রীষ্মকালে সিয়াম পালন করতে অধিক গরমের তৃষ্ণা ও বড়দিনের ক্ষুধার যন্ত্রণা পেতে হয়, কিন্তু শীতকালে পেতে হয় না। যা জটিল কোন যুদ্ধ ছাড়াই গনীমাত পাওয়ার মতই)।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৬৬-[৩১] আর আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীস (তিরমিযী’র) কুরবানীর অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এমন কোন দিন নেই যা আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়।[1]
وَذَكَرَ حَدِيثَ أَبِي هُرَيْرَةَ: «مَا مِنْ أَيَّامٍ أحب إِلَى الله» فِي بَاب الْأُضْحِية
পরিচ্ছেদঃ ৬. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৬৭-[৩২] ইবনু ’আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় গমন করার পর দেখলেন ইয়াহূদীরা ’আশূরার দিন সওম রাখে। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদের জিজ্ঞেস করলেন, এ দিনটার বৈশিষ্ট্য কি যে, তোমরা সওম রাখো? তারা বলল, এটা একটি গুরুত্ববহ দিন। এ দিনে আল্লাহ তা’আলা মূসা (আঃ) ও তাঁর জাতিকে মুক্তি দিয়েছেন। আর ফির্’আওন ও তার জাতিকে (সমুদ্রে) ডুবিয়েছেন। মূসা (আঃ) শুকরিয়া হিসেবে এ দিন সওম রেখেছেন। অতএব তাঁর অনুসরণে আমরাও রাখি। এ কথা শুনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ দীনের দিক দিয়ে আমরা মূসার বেশী নিকটে আর তার তরফ থেকে শুকরিয়া আদায়ের ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমরা বেশী হকদার। বস্তুত ’আশূরার দিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও সওম রেখেছেন অন্যদেরকেও রাখার হুকুম দিয়েছেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَدِمَ الْمَدِينَةِ فَوَجَدَ الْيَهُودَ صِيَامًا يَوْمَ عَاشُورَاءَ فَقَالَ لَهُمْ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا هَذَا الْيَوْمُ الَّذِي تَصُومُونَهُ؟» فَقَالُوا: هَذَا يَوْمٌ عَظِيمٌ: أَنْجَى اللَّهُ فِيهِ مُوسَى وَقَوْمَهُ وَغَرَّقَ فِرْعَوْنَ وَقَوْمَهُ فَصَامَهُ مُوسَى شُكْرًا فَنَحْنُ نَصُومُهُ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «فَنَحْنُ أَحَقُّ وَأَوْلَى بِمُوسَى مِنْكُمْ» فَصَامَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَمَرَ بصيامه
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা আসকালানী (রহঃ) বলেন, কুরায়শরা ‘আশূরার সিয়াম পালন করত, সম্ভবত তারা তাদের পূর্ববর্তী শারী‘আতের অনুসরণে তা করত। আর এ কারণেই তারা এ দিনে কা‘বায় নতুন কাপড় পরিধান করানোর মাধ্যমে সম্মান প্রদর্শন করত। ‘আল্লামা ইবনুল কইয়্যূম বলেন, কুরায়শরা এ দিনকে সম্মান করত এতে কোন সন্দেহ নেই। আর এ দিনে কা‘বায় কাপড় পরাত এবং সম্মানের পূর্ণতা দিত সিয়ামের মাধ্যমে। ‘আল্লামা কুরতুবী (রহঃ) বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরতের পূর্বে এ দিনে সিয়াম পালন করতেন। হতে পারে এটি তাদের (কুরায়শের) প্রতি (আরোপিত) হুকুম অনুযায়ী করতেন, যেমন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হজ পালনের ক্ষেত্রে করতেন। অথবা আল্লাহই তাঁকে সিয়াম পালনের নির্দেশ দিয়েছিলেন, কারণ এটি উত্তম কাজ। যখন তিনি মদীনায় হিজরত করলেন, তখন ইয়াহূদীদেরকে পেলেন যে, তারা সিয়াম রাখছে। তাদেরকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন এবং তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সিয়াম রাখলেন ও অন্যান্যদের সিয়াম রাখার নির্দেশ দিলেন। আর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে সময় যে সকল বিষয়ে আল্লাহর নিষেধ না থাকত সেক্ষেত্রে আহলে কিতাবদের (ইয়াহূদী ও নাসারা) অনুযায়ী করতে ভালোবাসতেন। ফাতহুল বারীতেও অনুরূপ উল্লেখ রয়েছে।
(أَمَرَ بِصِيَامِه) বাহ্যিকভাবে أَمَرَ (আমার)-টি ওয়াজিবের জন্য। সুতরাং এতে তাদের দলীল রয়েছে যারা বলে থাকেন যে, মানসূখ হওয়ার পূর্বে তা (‘আশূরা) ওয়াজিব ছিল। আর যারা এমনটি বলেন না তাদের দৃষ্টিতে এখানে أَمَرَ মুস্তাহাবের দৃঢ়তার জন্য। যখন تاكيد বা দৃঢ়তা রহিত হয়ে গেছে, ফলে এখন মানদূব (মুস্তাহাব) অবশিষ্ট রয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৬. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৬৮-[৩৩] উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যান্য দিন সওম রাখার চেয়ে শনি ও রবিবার দিন বেশী রাখতেন। তিনি বলতেন, এ দু’ দিন মুশরিকদের ঈদের দিন। তাই আমি তাদের বিপরীত কাজ করতে ভালবাসি। (আহমদ)[1]
وَعَنْ أُمِّ سَلَمَةَ قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُومُ يَوْمَ السَّبْتِ وَيَوْمَ الْأَحَدِ أَكْثَرَ مَا يَصُومُ مِنَ الْأَيَّامِ وَيَقُولُ: «إِنَّهُمَا يَوْمَا عِيدٍ لِلْمُشْرِكِينَ فَأَنَا أُحِبُّ أَن أخالفهم» . رَوَاهُ أَحْمد
ব্যাখ্যা: এখানে দলীল রয়েছে যে, আহলে কিতাবদের পরিপন্থী কর্ম হিসেবে শনি ও রবিবারে সিয়াম রাখা মুস্তাহাব। বাহ্যিকভাবে এ সিয়াম এককভাবে ও যুক্তভাবে পালনের উপর প্রমাণ করে। কিন্তু উল্লেখিত দু’টি সিয়াম (শনি ও রবি বার) দ্বারা যুক্ত ও ধারাবহিকভাবে পালন উদ্দেশ্য অর্থাৎ- শনি ও রবি বারের সিয়াম লাগাতার দু’দিন করতে হবে। যাতে করে পূর্বে উল্লেখিত শনিবারের দিন সিয়াম পালনের নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত হাদীসের বিরোধী ‘আমল না হয়। পৃথকভাবে শনি ও রবিবারে সিয়াম পালন নিষিদ্ধ তবে ধারাবহিকভাবে পালন করা মুস্তাহাব। দু’টি ফিরকার (ইয়াহূদী ও নাসারা) বিপরীত হওয়ার কারণে।
পরিচ্ছেদঃ ৬. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৬৯-[৩৪] জাবির ইবনু সামুরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম প্রথম আমাদেরকে ’আশূরার দিন সওম রাখার হুকুম দিয়েছেন। এর প্রতি অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন; এ দিন আসার সময় আমাদের খোঁজ-খবর নিয়েছেন। কিন্তু রমাযানের সওম ফরয হবার পর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আর আমাদেরকে এ দিনের সওম রাখতে না হুকুম দিয়েছেন, না নিষেধ করেছেন। আর এ দিন এলে আমাদের না কোন খোঁজ-খবর নিয়েছেন। (মুসলিম)[1]
وَعَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْمُرُ بِصِيَامِ يَوْمِ عَاشُورَاءَ وَيَحُثُّنَا عَلَيْهِ وَيَتَعَاهَدُنَا عِنْدَهُ فَلَمَّا فُرِضَ رَمَضَانُ لَمْ يَأْمُرْنَا وَلَمْ يَنْهَنَا عَنْهُ وَلم يتعاهدنا عِنْده. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে দলীল রয়েছে যে, ‘আশূরার সিয়াম ওয়াজিব ছিল। অতঃপর তা মানসূখ হয়ে নাফলে রূপান্তরিত হয়। আর এমন মতই পোষণ করেছেন ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) এবং আহমাদ থেকে অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে। হাফেয আসকালানী ও ইবনুল কইয়্যূম তা সমর্থন করেছেন।
‘আল্লামা আল বাজী (রহঃ) বলেন, প্রথমে যে সিয়াম ফরয ছিল তা হলো ‘আশূরার সিয়াম। পরবর্তীতে রমাযান (রমজান) ফরয হলে তা মানসূখ হয়ে যায়। তবে ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ)-এর অধিক বিশুদ্ধ মত হলো, ‘আশূরা কখনই ওয়াজিব ছিল না তা সর্বদাই সুন্নাত ছিল। ‘আল্লামা ‘আয়নী (রহঃ) বলেন, ‘উলামাগণ এ মর্মে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, বর্তমানে ‘আশূরার সিয়াম সুন্নাত, ওয়াজিব নয়। তবে প্রাক-ইসলামে তার হুকুম নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) বলেন, ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ে তা ওয়াজিব ছিল। শাফি‘ঈর অনুসারীদের মাঝে দু’টি মত রয়েছে। [১] প্রসিদ্ধ মতে তা সর্বদাই সুন্নাত, উম্মাতের ওপর তা কখনই ওয়াজিব ছিল না। [২] আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-এর মতের অনুরূপ অর্থাৎ- তা ওয়াজিব ছিল।
‘আল্লামা ‘ইয়ায, ইবনু ‘আবদিল বার ও নাবাবী (রহঃ) এবং অন্যান্যদের ঐকমত্য রয়েছে যে, বর্তমান সময়ে ‘আশূরার সিয়াম ফরয নয় এবং তা মুস্তাহাব হওয়ার উপরই ঐকমত্য রয়েছে। আহমাদে ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর বর্ণনায় রয়েছে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আশূরার সিয়াম পালন করতেন, এবং তা পালনের নির্দেশ দিতেন। যখন রমাযান (রমজান) ফরয হলো তখন ‘আশূরার সিয়ামের ওয়াজিব রহিত হয়ে গেল। সুতরাং যে চায় সে ‘আশূরার সিয়াম রাখবে, না চাইলে বর্জন করবে। (হাদীস সহীহ)
যারা বলেন যে, প্রাক-ইসলামী যুগে ‘আশূরা ফরয ছিল, তারা একাধিক হাদীস দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন। তা আল হায়সামী (রহঃ) মাজমা‘উয্ যাওয়ায়িদ-এ, ‘আল্লামা ‘আয়নী (রহঃ) শারহে বুখারীতে এবং ইমাম ত্বহাবী (রহঃ) শারহু মা‘আনী আল আসার-এ উল্লেখ করেছেন। আর এটাই আমাদের নিকট অধিক গ্রহণযোগ্য কথা।
পরিচ্ছেদঃ ৬. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৭০-[৩৫] হাফসা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, চারটি জিনিস এমন আছে যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়তেন না। ১. ’আশূরার সওম। ২. যিলহজ মাসের প্রথম নয় দিনের সওম। ৩. প্রতি মাসের তিনদিন সওম। ৪. আর ফাজ্রের (ফরযের) আগের দু’ রাক্’আত (সুন্নাত) সালাত। (নাসায়ী)[1]
وَعَنْ حَفْصَةَ قَالَتْ: أَرْبَعٌ لَمْ يَكُنْ يَدَعُهُنَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «صِيَامُ عَاشُورَاءَ وَالْعَشْرِ وَثَلَاثَةُ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ وَرَكْعَتَانِ قبل الْفجْر» . رَوَاهُ النَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: এখানে عَشْرِ শব্দটি রূপকার্থে নয়দিন বুঝায়। আহমাদ আবূ দাঊদ ও নাসায়ী নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক স্ত্রী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিলহজ মাসের নয়দিন সিয়াম রাখতেন এবং ‘আশূরার দিনেও সিয়াম রাখতেন।
পরিচ্ছেদঃ ৬. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৭১-[৩৬] ইবনু ’আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’আইয়ামে বীয’-এ সফরে অথবা মুকীম অবস্থায় সওম ছাড়া থাকতেন না। (নাসায়ী)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يُفْطِرُ أَيَّامَ الْبيض فِي حضر وَلَا فِي سفر. رَوَاهُ النَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: ‘আইয়্যামে বীয’ দ্বারা উদ্দেশ্য চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ। এ রাতগুলোকে (بِيْضِ) বীয নামকরণের কারণ হলো, এ রাতগুলোতে রাতের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত চন্দ্রের আলো বিদ্যমান থাকে। সুতরাং সে অনুপাতে কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ।
পরিচ্ছেদঃ ৬. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৭২-[৩৭] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রত্যেক জিনিসেরই যাকাত আছে। শরীরের যাকাত হলো সওম। (ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لِكُلِّ شَيْءٍ زَكَاةٌ وَزَكَاةُ الْجَسَدِ الصَّوْمُ» . رَوَاهُ ابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা সিনদী (রহঃ) বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা (لِكُلِّ شَىْءٍ زَكَاةٌ) অর্থাৎ- প্রতি মানুষের উচিত হলো, প্রত্যেক বিষয়ের মধ্য হতে আল্লাহর নির্ধারিত অংশ বের করা। আর এটাই হবে তার যাকাত, আর শরীরের যাকাত হলো সিয়াম। কেননা আল্লাহর রাস্তায় সিয়ামের কারণে শরীরের শক্তি কমে যায়। সুতরাং শরীর থেকে যতটুকু কমে যায়, তা হবে শরীরের যাকাত।
পরিচ্ছেদঃ ৬. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৭৩-[৩৮] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোমবার ও বৃহস্পতিবার সওম রাখতেন। তাঁর কাছে আরয করা হলো, হে আল্লাহর রসূল! আপনি অধিকাংশ সময়ই সোম ও বৃহস্পতিবার সওম রাখেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, সোম ও বৃহস্পতিবার হলো ঐ দিন, যেদিন আল্লাহ তা’আলা প্রত্যেক মুসলিমকে মাফ করে দেন। কিন্তু ওদেরকে মাফ করে দেন না যারা সম্পর্কচ্ছেদ করে রাখে। তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা মালায়িকাহ্ (ফেরেশতা)-কে (ফেরেশতাগণকে) বলেন, ওদেরকে ছেড়ে দাও যে পর্যন্ত তারা পরস্পর সম্পর্ক ঠিক করে নেয় (এরপর তাদেরকে মাফ করে দেয়া হবে)। (আহমদ, ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: كَانَ يَصُومُ يَوْمَ الِاثْنَيْنِ وَالْخَمِيسِ. فَقِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّكَ تَصُومُ يَوْمَ الِاثْنَيْنِ وَالْخَمِيسِ. فَقَالَ: إِنَّ يَوْمَ الِاثْنَيْنِ وَالْخَمِيسِ يَغْفِرُ اللَّهُ فِيهِمَا لِكُلِّ مُسْلِمٍ إِلَّا ذَا هَاجِرَيْنِ يَقُولُ: دَعْهُمَا حَتَّى يصطلحا . رَوَاهُ أَحْمد وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: সহীহ মুসলিমের শব্দে রয়েছে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সোম ও বৃহস্পতিবারে ‘আমলনামা উঠানো হয়, আর আল্লাহ তা‘আলা উক্ত দিনে ঐ সকল লোকদেরকে ক্ষমা করেন যারা আল্লাহর সাথে কাউকে শারীক করেনি। আর ঐ ব্যক্তি ছাড়া যার মাঝে তার মুসলিম ভাইয়ের বিদ্বেষ রয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা মালায়িকাহ্ (ফেরেশতা)-কে (ফেরেশতাদের) বলেন, তারা সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত তাদের পরিত্যাগ কর। অর্থাৎ- তাদের ‘আমলনামা উঠাইও না। আর মুসলিম-এর অপর বর্ণনায় ও আহমাদ-এ (২/২৬৮, ৩৭৯, ৪০০, ৪৬৫ পৃঃ) রয়েছে যে, সোম এবং বৃহস্পতিবারে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়।
পরিচ্ছেদঃ ৬. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৭৪-[৩৯] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় সওম রাখে, আল্লাহ তা’আলা তাকে জাহান্নাম থেকে ওই উড়তে থাকা কাকের দূরত্বের পরিমাণ দূরে রাখবেন, যে কাক বাচ্চা অবস্থায় উড়তে শুরু করে বৃদ্ধ অবস্থায় মারা যায়। (আহমদ, বায়হাক্বী)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ صَامَ يَوْمًا ابْتِغَاءَ وَجْهِ اللَّهِ بَعَّدَهُ اللَّهُ مِنْ جَهَنَّمَ كَبُعْدِ غُرَابٍ طَائِرٍ وَهُوَ فرخ حَتَّى مَاتَ هرما» . رَوَاهُ أَحْمد
ব্যাখ্যা: বলা হয় যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাকের দৃষ্টান্ত দিয়েছেন উদাহরণ স্বরূপঃ কাকের সুদীর্ঘ জীবনকালটা সিয়াম পালনকারীর জাহান্নাম থেকে দূরে রাখার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। অর্থাৎ- কাকের জীবনের শুরু থেকে উড়া আরম্ভ করে জীবনের শেষ প্রান্তে যেখানে পৌঁছে যাবে। সিয়াম পালনকারী ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে তত দূরে অবস্থান করবে। কারো মতে কাকের জীবনকাল হলো ১০০০ বছর। (মিরকাত)
পরিচ্ছেদঃ ৬. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - নফল সিয়াম প্রসঙ্গে
২০৭৫-[৪০] সালামাহ্ ইবনু কায়স হতে শু’আবূল ঈমান-এ এটি বর্ণনা করেছেন।[1]
وَرَوَى الْبَيْهَقِيُّ فِي شُعَبِ الْإِيمَانِ عَنْ سَلَمَةَ بن قيس
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - নফল সিয়ামের ইফতারের বিবরণ
’আল্লামা ’আলী কারী (রহঃ) বলেন, অপর অনুলিপিতে রয়েছে(في توابع لصوم التطوع) অর্থাৎ- নফল সিয়ামের অনুগামী।
২০৭৬-[১] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে এলেন। তিনি বললেন, তোমার কাছে কী (খাবার) কিছু আছে? আমি বললাম, না (কিছুতো নেই)। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তাহলে আমি (আজ) সিয়াম পালন করবো! এরপর আর একদিন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমার কাছে এলেন। (জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে কী খাবার কিছু আছে?) আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমাদের জন্য ’হায়স’ হাদিয়্যাহ্ এসেছে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আনো, আমাকে দেখাও। আমি সকাল থেকে সওম রেখেছি। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ’হায়স’ খেয়ে নিলেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ فِى الْاِفْطَارِ مِنَ التَّطَوُّعِ
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: دَخَلَ عَلَيَّ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ذَاتَ يَوْمٍ فَقَالَ: «هَلْ عِنْدَكُمْ شَيْءٌ؟» فَقُلْنَا: لَا قَالَ: «فَإِنِّي إِذًا صَائِمٌ» . ثُمَّ أَتَانَا يَوْمًا آخَرَ فَقُلْنَا: يَا رَسُولَ اللَّهِ أُهْدِيَ لَنَا حَيْسٌ فَقَالَ: «أَرِينِيهِ فَلَقَدْ أَصْبَحْتُ صَائِمًا» فَأَكَلَ. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা সিনদী (রহঃ) বলেন, আলোচ্য হাদীস প্রমাণ করে যে, কোন ধরনের ওযর ছাড়াই নফল সিয়াম ভঙ্গ করা জায়িয এবং এর উপর অধিকাংশ ‘উলামায়ে আহনাফদের মত রয়েছে। কিন্তু তারা কাযা ওয়াজিব করেছেন। ‘আল্লামা ইবনুল হাম্মাম বলেন, যখন নফল সিয়াম পালনকারিণী রমণীর ঋতুস্রাব আসার কারণে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় সিয়াম ভঙ্গ হবে, তখন অবশ্যই তা কাযা করতে হবে। এ ব্যাপারে আমাদের ‘উলামাগণের মাঝে কোন মতপার্থক্য নেই। তবে ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ)-এর বিপরীত মত দিয়েছেন। অর্থাৎ তাঁর মতে কাযা ওয়াজিব নয়। ‘আল্লামা খাত্ত্বাবী (রহঃ) বলেন, রাত হওয়ার পূর্বেই নফল সিয়াম ভঙ্গ করা জায়িয, তবে তিনি কাযার কথা উল্লেখ করেননি এবং এর উপর একাধিক সাহাবীর ‘আমল রয়েছে। তাদের মধ্য হতে ‘আবদুল্লাহ বিন মাস্‘ঊদ, হুযায়ফাহ্, আবূ দারদা, আবূ আইয়ূব আল আনসারী (রাঃ) এবং অনুরূপ কথা বলেছেন ইমাম শাফি‘ঈ ও ইমাম আহমাদ (রহঃ)। ‘আল্লামা ইবনুল কুদামাহ্ (রহঃ) বলেন, যে নফল সিয়াম শুরু করবে, তার জন্য তা পূর্ণ করা মুস্তাহাব, ওয়াজিব নয়। সুতরাং তা পরিত্যাগ করলে তার ওপর কাযা নেই। ইবনু ‘উমার ও ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তারা দু’জনই সিয়াম অবস্থায় সকাল করলেন, অতঃপর সিয়াম ভঙ্গ করলেন।
ইবনু ‘উমার (রাঃ) বলেন, যদি মানতের সিয়াম ও রমাযানের কাযা না হয়, তবে সিয়াম ভঙ্গে কোন সমস্যা নেই। অর্থাৎ- তাতে কোন কাযা নেই। ‘আল্লামা আসকালানী (রহঃ) বলেন, কোন কারণ ছাড়া নফল সিয়াম ভঙ্গ করা জায়িয, এটা জমহূর ‘উলামাগণের মত। আর তারা কাযা ওয়াজিব করেননি, বরং তা মুস্তাহাব রেখেছেন। মির্‘আত প্রণেতা বলেন, নফল সিয়াম ভঙ্গ করা জায়িয এটা জমহূর ‘উলামাগণের কথা দ্বারা প্রমাণিত। আর এটা কাযা ওয়াজিব নয়, এটা জুহায়ফাহ্ এর হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। যা বর্ণনা করেছেন বুখারী ও তিরমিযী। আর এ হাদীসের প্রথম অংশের দ্বারা এটাও প্রমাণিত হয়েছে যে, নফল সিয়ামের জন্য দিনের বেলা নিয়্যাত করা জায়িয আছে।
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - নফল সিয়ামের ইফতারের বিবরণ
২০৭৭-[২] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন উম্মু সুলায়ম-এর কাছে গেলেন। সে রসূলের জন্য ঘি ও খেজুর আনল। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তুমি ঘি পাত্রে ঢালো আর খেজুরগুলোকে থালায় রাখো। কেননা আমি সায়িম। এরপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে ফরয সালাত ছাড়া সালাত আদায় করতে লাগলেন। অতঃপর উম্মু সুলায়ম ও তাঁর পরিবারের জন্য দু’আ করলেন। (বুখারী)[1]
بَابُ فِى الْاِفْطَارِ مِنَ التَّطَوُّعِ
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: دَخَلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى أُمِّ سُلَيْمٍ فَأَتَتْهُ بِتَمْرٍ وَسَمْنٍ فَقَالَ: «أَعِيدُوا سَمْنَكُمْ فِي سِقَائِهِ وَتَمْرَكُمْ فِي وِعَائِهِ فَإِنِّي صَائِمٌ» . ثُمَّ قَامَ إِلَى نَاحِيَةٍ مِنَ الْبَيْتِ فَصَلَّى غَيْرَ الْمَكْتُوبَةِ فَدَعَا لأم سليم وَأهل بَيتهَا. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে দলীল রয়েছে যে, নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি নফল সিয়াম রাখবে, তার নিকট খাদ্য উপস্থিত হলে তার ওপর সিয়াম ভঙ্গ করা ওয়াজিব নয়। তবে যদি সিয়াম ভঙ্গ করে তাহলে পূর্বে উল্লেখিত হাদীসের ভিত্তিতে তা জায়িয।
এ হাদীসের উপকারিতার মধ্য হতে একটি হলো, আগমনকারীকে সাধ্যানুযায়ী হাদিয়্যাহ্ দেয়া বৈধ, আর হাদিয়্যাহ্ দাতা যদি কষ্টকর মনে না করে তবে উক্ত হাদিয়্যাহ্ ফিরিয়ে দেয়াও বৈধ রয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - নফল সিয়ামের ইফতারের বিবরণ
২০৭৮-[৩] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কাউকে যদি খাবার জন্য দা’ওয়াত দেয়া হয়, আর সে ব্যক্তি সায়িম হয়, তার বলা উচিত, ’আমি সায়িম’ (রোযাদার)। অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ তোমাদের কাউকে দা’ওয়াত দেয়া হলে তার উচিত দা’ওয়াত কবূল করা। সে সায়িম হলে দু’ রাক্’আত (নফল) সালাত আদায় করবে। আর সায়িম না হলে খাওয়ায় অংশ নেবে। (মুসলিম)[1]
بَابُ فِى الْاِفْطَارِ مِنَ التَّطَوُّعِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِذَا دُعِيَ أَحَدُكُمْ إِلَى طَعَامٍ وَهُوَ صَائِمٌ فَلْيَقُلْ: إِنِّي صَائِمٌ . وَفِي رِوَايَةٍ قَالَ: «إِذَا دُعِيَ أَحَدُكُمْ فَلْيُجِبْ فَإِنْ كَانَ صَائِمًا فَلْيُصَلِّ وَإِن كَانَ مُفطرا فيطعم» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: (فَإِنِّىْ صَائِمٌ) ‘‘সে যেন বলে আমি সায়িম’’ অর্থাৎ- দা‘ওয়াতদাতার জন্য কারণ পেশ করা এবং তার অবস্থা ঘোষণা করা যদি সে তা মেনে নেয়। আর মেহমানের উপস্থিত না তলব করে তবে তার জন্য দা‘ওয়াত থেকে পিছে থাকা বা দা‘ওয়াতে উপস্থিত না হওয়া বৈধ। নতুবা দা‘ওয়াতে উপস্থিত হতে হবে। সিয়াম দা‘ওয়াত থেকে পশ্চাৎপদের কারণ নয়, বরং যখন দা‘ওয়াতে উপস্থিত হবে তখন মেজবানীর খাদ্য খাওয়া (সিয়াম পালনকারী মেহমানের জন্য) আবশ্যক নয়। আর সিয়াম মেজবানী খাদ্য বর্জনের কারণ হতে পারে। নতুবা ইফতার বর্জন করাটা খাদ্য প্রদানকারীর জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হতে পারে।
আলোচ্য হাদীস থেকে এটাও প্রমাণিত হয় যে, নফল ‘ইবাদাত যেমন- সালাত, সিয়াম আরো অন্যান্য ‘ইবাদাত প্রকাশ করাতে কোন অসুবিধা নেই, তবে যদি প্রকাশের কোন প্রয়োজন না থাকে তবে তা গোপন করাই মুস্তাহাব।
(إِذَا دُعِيَ أَحَدُكُمْ) অর্থাৎ- সে যেন খাদ্যগ্রহণের জন্য বারাকাতের দু‘আ করে, যেমন ‘আবদুল্লাহ বিন মাস্‘ঊদ (রাঃ) এর বর্ণনায় রয়েছে যে, যদি সে (দা‘ওয়াত গ্রহীতা) সিয়ামধারী হয়, তবে সে যেন বারাকাতের দু‘আ করে।
আর নাফি' (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইবনু ‘উমার (রাঃ)-কে যখন দা‘ওয়াত দেয়া হত তখন তিনি দা‘ওয়াতে সাড়া দিতেন, যদি সিয়াম না রাখতেন, তবে মেজবানী খাবার খেতেন। আর যদি সিয়াম রাখতেন তাহলে দা‘ওয়াত দাতার জন্য দু‘আ করতেন, আর বারাকাত কামনা করতেন। অতঃপর সেখান থেকে প্রস্থান করতেন।
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নফল সিয়ামের ইফতারের বিবরণ
২০৭৯-[৪] উম্মু হানী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন ফাতিমা (রাঃ) এলেন এবং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাম পাশে বসলেন। আর উম্মু হানী (রাঃ) ছিলেন তাঁর ডান পাশে। এ সময় একটি দাসী হাতে একটি পাত্র নিয়ে এলো। এতে কিছু পানীয় ছিল। দাসীটি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে পান পাত্রটি রাখল। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সেখান থেকে কিছু পান করে তা উম্মু হানীকে দিলেন। উম্মু হানী (রাঃ)-ও ঐ পাত্র হতে কিছু পান করে বলতে লাগলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি তো ইফতার করে ফেলেছি। অথচ আমি সায়িম ছিলাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি রমাযান (রমজান) মাসের কোন সওম বা মানৎ কাযা করছিলে? উম্মু হানী (রাঃ) বললেন, না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তখন বললেন, নফল সওম হলে কোন অসুবিধা নেই- (আবূ দাঊদ, তিরমিযী, দারিমী)।
ইমাম আহমদ ও আত্ তিরমিযীর এক বর্ণনায় এরূপই বর্ণিত হয়েছে। আর এতে আরো আছে, তখন উম্মু হানী (রাঃ) বললেন, আপনার জানা থাকতে পারে যে, আমি সায়িম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ নফল সায়িম নিজের নাফসের মালিক (সে রাখতেও পারে ভাঙতেও পারে)।[1]
عَنْ أُمِّ هَانِئٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: لَمَّا كَانَ يَوْمُ الْفَتْحِ فَتْحِ مَكَّةَ جَاءَتْ فَاطِمَةُ فَجَلَسَتْ عَلَى يَسَارِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَمُّ هَانِئٍ عَنْ يَمِينِهِ فَجَاءَتِ الْوَلِيدَةُ بِإِنَاءٍ فِيهِ شَرَابٌ فَنَاوَلَتْهُ فَشَرِبَ مِنْهُ ثُمَّ نَاوَلَهُ أُمَّ هَانِئٍ فَشَرِبَتْ مِنْهُ فَقَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ لَقَدْ أَفْطَرْتُ وَكُنْتُ صَائِمَةً فَقَالَ لَهَا: «أَكُنْتِ تَقْضِينَ شَيْئًا؟» قَالَتْ: لَا. قَالَ: «فَلَا يَضُرُّكِ إِنْ كَانَ تَطَوُّعًا» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالتِّرْمِذِيُّ وَالدَّارِمِيُّ وَفِي رِوَايَةٍ لِأَحْمَدَ وَالتِّرْمِذِيِّ نَحْوُهُ وَفِيهِ فَقَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَمَا إِنِّي كُنْتُ صَائِمَةً فَقَالَ: «الصَّائِم أَمِيرُ نَفْسِهِ إِنْ شَاءَ صَامَ وَإِنْ شَاءَ أفطر»
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা খাত্ত্বাবী (রহঃ) বলেন, এখানে এই বর্ণনায় রয়েছে যে, নফল সিয়াম ভঙ্গ করলে তা কাযা আদায় করা ওয়াজিব নয়। কেননা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীসে কাযার কথা উল্লেখ করেননি। যদি তা ওয়াজিব হত অবশ্যই বর্ণনা করতেন। অবশ্য পূর্বে আহমাদ, নাসায়ী, দারাকুত্বনী, দারিমী, ত্বহাবী ও বায়হাক্বীর বর্ণনায় অতিবাহিত হয়েছে। সেখানে স্পষ্টভাবেই উল্লেখ রয়েছে যে, নফল সিয়ামের কাযা ওয়াজিব নয়, তা ঐচ্ছিক। ইমাম তিরমিযী এ পর্বের হাদীস উল্লেখ করার পর বলেন, সহাবায়ে কিরামদের কতক বিদ্বানদের মাঝে ‘আমল রয়েছে যে, নফল সিয়াম ভঙ্গ করলে তার জন্য কাযা ওয়াজিব নয়, বরং মুস্তাহাব।
আর এটাই সুফ্ইয়ান আস্ সাওরী, আহমাদ, ইসহাক, শাফি‘ঈ (রহঃ) এদের কথা। আমি বলব, (মির্‘আত প্রণেতা) এটা মুজাহিদ, ত্বাউস এবং ইবনু ‘আব্বাস-এর কথা। আর সালমান, আবূ দারদা (রাঃ) ও অন্যান্যদের থেকে অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নফল সিয়ামের ইফতারের বিবরণ
২০৮০-[৫] যুহরী ’উরওয়াহ্ হতে এবং ’উরওয়াহ্ ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন। ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেন, আমি ও হাফসাহ্ দু’জনেই সওমে ছিলাম। আমাদের সামনে খাবার আনা হলো। খাবার দেখে আমাদের লোভ হলো। আমরা সওমে খেয়ে নিলাম। অতঃপর হাফসা (রাঃ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আরয করল, হে আল্লাহর রসূল! আমরা সওমে ছিলাম। আমাদের সামনে খাবার আনা হলে আমাদের লোভ হলো। তাই খেয়ে ফেললাম (আমাদের ব্যাপারে এখন হুকুম কী?) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ অন্য একদিন তা কাযা করে নিও- (তিরমিযী)।
আর (হাদীসের) হাফেযদের একদল যুহরী হতে, যুহরী ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। (তাতে ’উরওয়াহ্ হতে উল্লেখ করা হয়নি।) এটাই বেশী সহীহ। হাদীসটি ইমাম আবূ দাঊদ যুমায়ল হতে উদ্ধৃত করেছেন। যুমায়ল ছিলেন ’উরওয়ার আযাদ করা গোলাম। যুমায়ল ’উরওয়াহ্ হতে, আর উরওয়াহ্ ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন।[1]
وَعَنِ الزُّهْرِيِّ عَنْ عُرْوَةَ عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: كُنْتُ أَنَا وَحَفْصَةُ صَائِمَتَيْنِ فَعَرَضَ لَنَا طَعَامٌ اشْتَهَيْنَاهُ فَأَكَلَنَا مِنْهُ فَقَالَتْ حَفْصَةُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّا كُنَّا صَائِمَتَيْنِ فَعُرِضَ لَنَا طَعَامٌ اشْتَهَيْنَاهُ فَأَكَلَنَا مِنْهُ. قَالَ: «اقْضِيَا يَوْمًا آخَرَ مَكَانَهُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَذَكَرَ جَمَاعَةً مِنَ الْحُفَّاظِ رَوَوْا عَنِ الزُّهْرِيِّ عَنْ عَائِشَةَ مُرْسَلًا وَلَمْ يذكرُوا فِيهِ عَن عُرْوَة وَهَذَا أصح
وَرَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ عَنْ زُمَيْلٍ مَوْلَى عُرْوَةَ عَن عُرْوَة عَن عَائِشَة
ব্যাখ্যা: অবশ্য এ হাদীস থেকে দলীল গ্রহণ করা যায় যে, নফল সিয়াম ভঙ্গ করলে উক্ত সিয়ামের কাযা আবশ্যক। কিন্তু হাদীস য‘ঈফ। আর যদি বিশুদ্ধ হয় তাহলে এ হাদীস ও উম্মু হানী (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীসের মাঝে সমন্বয় করে বলা যায় যে, এ হাদীসে কাযার প্রতি নির্দেশটা মুস্তাহাবের জন্য (ওয়াজিবের জন্য নয়)।
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নফল সিয়ামের ইফতারের বিবরণ
২০৮১-[৬] উম্মু ’উমারাহ্ বিনতু কা’ব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মু ’উমারার ওখানে গেলেন। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য খাবার আনলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উম্মু ’উমারাহ্-কে বললেন, তুমিও খাও। উম্মু উমারাহ্ বললেন, আমি তো সায়িম। তিনি বললেন, যখন কোন সায়িমের সামনে খাওয়া হয় (তখন তারও খেতে লোভ হয়, সওম রাখা তার জন্য কষ্ট কর হয়), তখন যতক্ষণ খাবার গ্রহণকারী খাবার খেতে থাকে ততক্ষণ মালায়িকাহ্ (ফেরেশতা) (ফেরেশতাগণ) তার ওপর রহমত বর্ষণ করতে থাকেন। (আহমদ, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, দারিমী)[1]
وَعَن أم عمَارَة بنت كَعْب إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دَخَلَ عَلَيْهَا فَدَعَتْ لَهُ بِطَعَامٍ فَقَالَ لَهَا: «كُلِي» . فَقَالَتْ: إِنِّي صَائِمَةٌ. فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ الصَّائِمَ إِذَا أُكِلَ عِنْدَهُ صَلَّتْ عَلَيْهِ الْمَلَائِكَةُ حَتَّى يَفْرَغُوا» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيّ وَابْن مَاجَه والدارمي
ব্যাখ্যাঃ (إِنَّ الصَّائِمَ إِذَا أُكِلَ عِنْدَه) অর্থাৎ- সায়িম ব্যক্তির উপস্থিতিতে দিনের বেলায় খাদ্যগ্রহণ। তিরমিযীর বর্ণনায় রয়েছে, সায়িম ব্যক্তির নিকট কোন লোক যখন খাদ্য খাবে, তখন (صَلَّتْ عَلَيْهِ الْمَلَائِكَةُ) অর্থাৎ- মালায়িকাহ্ (ফেরেশতা) (ফেরেশতাগণ) তাদের জন্য দু‘আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করেন। কারণ তার নিকট খাদ্যের উপস্থিতি খাওয়ার চাহিদা বৃদ্ধি করে দেয়। সুতরাং যখন সে তার খাওয়ার চাহিদা দমন করে এবং নিজেকে আল্লাহর নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য বাধা দিয়ে রাখে তখন মালায়িকাহ্ (ফেরেশতা) তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
পরিচ্ছেদঃ ৭. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - নফল সিয়ামের ইফতারের বিবরণ
২০৮২-[৭] বুরায়দাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বিলাল(রাঃ) একবার রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে এলেন। এ সময় তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সকালের নাশতা করছিলেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিলালকে বললেন, হে বিলাল! এসো খাবার খাও। বিলাল বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি সওমে আছি। তিনি বললেন, আমরা তো (এখানে অর্থাৎ- দুনিয়ায়) আমাদের রিযক খাচ্ছি। আর বিলালের উত্তম খাবার হবে জান্নাতে। হে বিলাল! তুমি কি জানো? (সায়িমের সামনে যখন খাবার খাওয়া হয় তখন) সায়িমের হাড় আল্লাহর তাসবীহ করে। যতক্ষণ তার সামনে খাওয়া চলে। ততক্ষণ আল্লাহর মালায়িকাহ্ (ফেরেশতা) (ফেরেশতাগণ) তার জন্য মাগফিরাত কামনা করতে থাকেন। (বায়হাক্বী, শু’আবিল ঈমান)[1]
عَن بُرَيْدَة قَالَ: دَخَلَ بِلَالٌ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ يَتَغَدَّى فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْغَدَاءَ يَا بِلَالُ» . قَالَ: إِنِّي صَائِمٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «نَأْكُلُ رِزْقَنَا وَفَضْلُ رِزْقِ بِلَالٍ فِي الْجَنَّةِ أشعرت يَا بِلَال أَن الصَّائِم نُسَبِّح عِظَامه وَتَسْتَغْفِر لَهُ الْمَلَائِكَةُ مَا أَكَلَ عِنْدَهُ؟» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي شعب الْإِيمَان
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসের সমর্থনে পূর্বে উল্লেখিত উম্মু ‘উমারাহ্ (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীস এবং ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীস মারফূ‘ভাবে এই শব্দে রয়েছে যে, যখন সায়িম ব্যক্তি কোন দলের মাঝে উপবিষ্ট থাকবে, আর তারা খাওয়াতে রত, তখন মালায়িকাহ্ (ফেরেশতা) উক্ত সিয়াম পালনকারী ব্যক্তির দু‘আ করতে থাকে তার ইফতার করা পর্যন্ত।
‘ত্ববারানী আল আওসাত’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন এবং তাতে আবান বিন ‘আয়াশ নামক রাবী রয়েছেন, যিনি মাতরূক। মাজমা‘উয্ যাওয়ায়িদ-এও অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - লায়লাতুল কদর
নামকরণ:
লায়লাতুল কদর-এর নামকরণ নিয়ে ’উলামাগণের মাঝে মতপার্থক্য বিদ্যমান। তবে গ্রহণযোগ্য ও বাস্তবসম্মত মত হলো, এ রাতের নামلَيْلَةِ الْقَدْرِ (লায়লাতুল কদর) রাখা হয়েছে তার সম্মান ও মর্যাদার কারণে। আর القدر শব্দের অর্থ التعظيم বা সম্মান বা মর্যাদাবান। যেমন আল্লাহ তা’আলার বাণী,
وَمَا قَدَرُوا اللهَ حَقَّ قَدْرِه অর্থাৎ- ’’তারা আল্লাহ তা’আলাকে যথাযথ সম্মান করেনি।’’ (সূরা আল আন্’আম ৬: ৯১)
এর অর্থ হলো, নিশ্চয়ই এ রাতে কুরআন অবতীর্ণ হওয়ায় তা সম্মানের অধিকারী হয়েছে। আর তার গুণ বর্ণনা করা হয়েছে যে, এ রাত হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। অথবা এ রাতে মালায়িকাহ্ (ফেরেশতা) (ফেরেশতাগণ) অবতীর্ণ হয় বিধায় এটি সম্মানী। অথবা এ রাতে রহমত, বারাকাত ও ক্ষমা অবতীর্ণ হয়, অথবা এ রাত ’ইবাদাতের মাধ্যমে জাগরণ করা হয়। বিবিধ কারণে তা সম্মানী।
লায়লাতুল কদর নির্ধারণ:
এ রাত নির্ধারণে ’উলামাগণের অধিকতর মতপার্থক্য রয়েছে।
’আল্লামা হাফেয আসকালানী (রহঃ) ফাতহুল বারীতে ৪০টির বেশি মতামত উল্লেখ করেছেন। আর এ সকল মতামতগুলো একে অপরের পরিপূরক। তবে সর্বপ্রসিদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য মতের ক্ষেত্রে ’আল্লামা আবূ সওর আল মুযানী, ইবনু খুযায়মাহ্ এবং মাযহাবীদের একদল ’উলামাগণ বলেন, নিশ্চয়ই তা রমাযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে হবে, এবং তা স্থানান্তরিত হবে, অর্থাৎ- কখনো তা ২১তম রাতে যেতে পারে, আবার কখনো ২৫শে কখনো ২৭শে এবং কখনো ২৯শে রাতে যেতে পারে। আর ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীসটি তার উপরই প্রমাণ করে। এটাই সর্বগ্রাহ্য ও প্রাধান্য মত।
হাফেয আসকালানী (রহঃ) এ সংক্রান্ত মতামতগুলো উল্লেখ করার পর বলেন, এ সকল মতের মধ্যে প্রাধান্য ও অগ্রগণ্য মত হলো: নিশ্চয়ই তা শেষ দশকের বেজোড় রাতে হবে।
ইমাম বুখারী (রহঃ) ’আয়িশাহ্ (রাঃ) ও অন্যান্যদের বর্ণিত হাদীসের মাধ্যমে অধ্যায় বেঁধেছেন যে, (باب تحري ليلة القدر في الوتر من العشر الأواخر) অর্থাৎ- অধ্যায়: লায়লাতুল কদরের রাত (রমাযানের) শেষ দশকের বেজোড় রাতে অনুসন্ধান করা।
’আল্লামা আসকালানী (রহঃ) বলেন, (ইমাম বুখারীর) এ অধ্যায়ে এদিকে ইঙ্গিত রয়েছে যে, লায়লাতুল কদর রমাযানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, এর পর তা শেষ দশকে নির্ধারিত, অতঃপর তা বেজোড় রাতগুলোতে, তবে তা কোন রাতে তা নির্ধারিত নয়।
এ রাত গোপন করার হিকমাত:
লায়লাতুল কদরের রাতকে গোপন করার হিকমাত প্রসঙ্গে ’উলামাগণ বলেন, এটি গোপন রাখা হয়েছে এ কারণে যে, যাতে এ রাত অনুসন্ধানের জন্য ইজতিহাদ বা প্রচেষ্টা করা যায়। এর বিপরীতে যদি তা নির্দিষ্ট করে দেয়া হত তাহলে মানুষ শুধু ওই নির্ধারিত রাতটির মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকত। (আল্লাহ ভালো জানেন)
২০৮৩-[১] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কদর রজনীকে রমাযান (রমজান) মাসের শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতে অনুসন্ধান করো। (বুখারী)[1]
بَابُ لَيْلَةِ الْقَدْرِ
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْوِتْرِ مِنَ الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ من رَمَضَان» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: অপর বর্ণনায় রয়েছে الْتَمِسُو (সন্ধান কর) উভয়টির অর্থ হলো অনুসন্ধান করা, ইচ্ছা করা। তবে (تَحَرَّوْا) শব্দটি কঠোর চেষ্টা ও গবেষণায় অগ্রগামী।
এখানে দলীল রয়েছে যে, ‘‘লায়লাতুল কদর’’টা রমাযানেই সীমাবদ্ধ, অতঃপর তার শেষ দশকে। তারপর শেষ দশকের বেজোড় রাতে নির্ধারিত হয়, তবে তা কোন্ রাতে নির্ধারিত নয়, আর এ বিষয়ে বর্ণনা অতিবাহিত হয়েছে, এটাই অগ্রগণ্য মত।
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - লায়লাতুল কদর
২০৮৪-[২] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথীদের কয়েক ব্যক্তিকে লায়লাতুল কদর (রমাযান (রমজান) মাসের) শেষ সাতদিনে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমি দেখছি তোমাদের সকলের স্বপ্ন শেষ সাত রাতের ব্যাপারে এক। তাই তোমাদের যে ব্যক্তি কদর রজনী পেতে চাও সে যেন (রমাযান (রমজান) মাসের) শেষ সাত রাতে তা খুঁজে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ لَيْلَةِ الْقَدْرِ
وَعَن ابْن عمر قَالَ: أَنَّ رَجُلًا مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أُرُوا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْمَنَامِ فِي السَّبْعِ الْأَوَاخِرِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَرَى رُؤْيَاكُمْ قَدْ تَوَاطَأَتْ فِي السَّبْعِ الْأَوَاخِرِ فَمَنْ كَانَ مُتَحَرِّيهَا فَلْيَتَحَرَّهَا فِي السَّبْعِ الْأَوَاخِر»
ব্যাখ্যা: (فَلْيَتَحَرَّهَا فِى السَّبْعِ الْأَوَاخِرِ) এখানে (سَبْعِ الْأَوَاخِرِ) দ্বারা উদ্দেশ্য হলোঃ মাসের শেষ, অর্থাৎ- উল্লেখিত سبع টা মাসের শেষ বুঝায়। অতএব তা শুরু হবে ২৪ তারিখ হতে, যদি মাস ৩০ দিনে হয়। (উল্লেখ্য যে, ‘আরাবী মাসের হিসাব রাত আগে আসে। সুতরাং এখানে ২৪ তারিখ রাত হলোঃ ২৩ তারিখের পরবর্তী রাত।) আর سبع দ্বারা ২০ এর পরবর্তী দিনগুলোও হতে পারে।
ইমাম বুখারী (রহঃ) কিতাবুত্ তা‘বির-এ বিশুদ্ধ সানাদে বর্ণিত রয়েছে। নিশ্চয়ই মানুষেরা লায়লাতুল কদর দেখেছিল শেষ সাতে এবং কতক মানুষ তা দেখেছিল শেষ দশে। অতঃপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা তা খোঁজ কর মাসের শেষ রাতগুলোত।
হাফেয আসকালানী (রহঃ) বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের উভয় দলের দেখার ঐকমত্যের দিকে লক্ষ্য করেছেন, অতঃপর এ নির্দেশ দিয়েছেন এবং তিনি আত্ তা‘বির-এ বলেন, এককভাবে سبع বা সাত সংখ্যাটি عَشْرِ বা দশ সংখ্যার অন্তর্ভুক্ত। যখন একদল দেখল নিশ্চয়ই তা দশের মধ্যে আবার আর একদল দেখল, তা শেষ সাতে। যাতে তারা সাতের উপর ঐকমত্য হয়, সেজন্য নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উভয় দলকেই লায়লাতুল কদর শেষ সাতে অনুসন্ধান করার নির্দেশ দিয়েছেন (অর্থাৎ- ২৩ তারিখ দিবাগত রাত হতে শুরু হবে)।
মুসনাদে আহমাদ-এর বর্ণনায় সালিম (রাঃ) হতে বর্ণিত রয়েছে যে, এক লোক লায়লাতুল কদর দেখল ২৭শে রাতে অথবা অনুরূপ অনুরূপ। অতঃপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা লায়লাতুল কদর অনুসন্ধান কর অবশিষ্ট দশের বেজোড় রাতে আর মুসলিমে ইবনু ‘উমার হতে বর্ণিত রয়েছে, যে ব্যক্তি লায়লাতুল কদর সন্ধান করতে চায় সে যেন শেষ দশকের বেজোড় রাতে সন্ধান করে এবং তিনি ৭ এবং ১০ এর বর্ণনা দ্বয়ের মাঝে সমন্বয় করেছেন যে, ১০ শব্দটি সীমাবদ্ধতার জন্য অথবা দু’ বছরের দু’টি বিষয়ের সংখ্যার উপর প্রমাণ করবে। কেননা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লায়লাতুল কদর সম্পর্কে জানতেন যে, তা শেষ দশকেই হয়।
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - লায়লাতুল কদর
২০৮৫-[৩] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা লায়লাতুল কদরকে রমাযান (রমজান) মাসের শেষ দশকে সন্ধান করো। লায়লাতুল কদর হলো নবম রাতে (অর্থাৎ- একুশতম রাতে), বাকী দিন হলো সপ্তম রাতে (সেটা হলো তেইশতম রাত), আর অবশিষ্ট থাকল পঞ্চম রাত (আর তা হলো পঁচিশতম) রাত। (বুখারী)[1]
بَابُ لَيْلَةِ الْقَدْرِ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: الْتَمِسُوهَا فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ: فِي تَاسِعَةٍ تَبْقَى فِي سَابِعَةٍ تَبْقَى فِي خَامِسَةٍ تَبْقَى. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা আল কারী (রহঃ) বলেন যে, তার কথা (تَبْقٰى) অবশিষ্ট থাকবে, অর্থাৎ- ২০ এর পর তা অবশিষ্ট থাকবে। আর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম تَاسِعَةٍ বা ৯ম দ্বারা ২৯ তারিখ, ৭ম দ্বারা ২৭ ও পঞ্চম দ্বারা ২৫ তারিখ উদ্দেশ্য নিয়েছেন। এর সমর্থনে সহীহ মুসলিম ও আবূ দাঊদ-এর বর্ণনায় আবী আন্ নাযরাহ্ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি আবূ সা‘ঈদ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন, তোমরা তা (লায়লাতুল কদর) অনুসন্ধান কর ৯ম, ৭ম, ৫ম রাতে।
আমি (আবূ আন্ নাযরাহ্) বললাম, নিশ্চয়ই আপনারা সংখ্যার ব্যাপারটি আমাদের চেয়ে বেশি জানেন। তিনি (আবূ সা‘ঈদ) বললেন, হ্যাঁ, আমরা তা জানার বেশি হকদার। আমি বললাম ৯ম, ৭ম, ৫ম কি? জবাবে তিনি বললেন, যখন ২১ তারিখ অতিবাহিত হবে, অতঃপর যে রাতটি ২২ তারিখের সাথে সাথে মিলিত, তা হলো ৯ম। আর যখন ২৩ তারিখ অতিবাহিত হবে, অতঃপর দিবাগত রাত হলো ৭ম, অতঃপর যখন ২৫ তারিখ অতিবাহিত হবে, অতঃপর তার সাথে সংশিস্নষ্ট রাত হলো ৫ম। এই বিশুদ্ধ হাদীসগুলোর ভিন্নতাই প্রমাণ করে যে, লায়লাতুল কদর রাতটা (শেষের দশকের) বেজোড় রাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - লায়লাতুল কদর
২০৮৬-[৪] আবূ সা’ঈদ আল্ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযানের প্রথম দশ দিনে ইতিকাফ করেছেন। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একটি তুর্কী ছোট তাঁবুতে ইতিকাফ করেছেন মধ্যের দশ দিন। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর মাথা (তাঁবুর বাইরে) বের করে বলেছেন, আমি ’কদর রজনী’ সন্ধান করার জন্য প্রথম দশ দিনে ইতিকাফ করেছি। তারপর করেছি মাঝের দশ দিনে। তারপর আমার কাছে তিনি এসেছেন। মালাক (ফেরেশতা) আমাকে বলেছেন, ’লায়লাতুল কদর’ রমাযানের শেষ দশ দিনে। অতএব যে আমার সাথে ’ইতিকাফ’ করতে চায় সে যেন শেষ দশ দিনে করে। আমাকে স্বপ্নে ’কদর রজনী’ নির্দিষ্ট করে দেখিয়েছেন। তারপর তা আমাকে ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে (অর্থাৎ- জিবরীল (আঃ) আমাকে বললেন, অমুক রাতে শবে কদর। তারপর তা কোন্ রাত আমি ভুলে গিয়েছি)।
(স্বপ্নে) নিজেকে দেখলাম যে, আমি এর ভোরে (অর্থাৎ- লায়লাতুল কদরের ভোরে) কাদামাটিতে সিজদা্ করছি। যেহেতু আমি ভুলে গিয়েছি সেটা কোন্ রাত ছিল। তাই এ রাতকে (রমাযানের) শেষ দশ দিনের মধ্যে সন্ধান করো। তাছাড়াও লায়লাতুল কদরকে বেজোড় রাতে অর্থাৎ- শেষ দশের বেজোড় রাতে সন্ধান করো। বর্ণনাকারী বলেন, (যে রাতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বপ্নে দেখেছিলেন) সে রাতে বৃষ্টি হয়েছিল। মসজিদের ছাদ খেজুরের ডালপাতার হওয়ায় একুশতম রাতের সকালে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কপালে পানি ও মাটির চিহ্ন ছিল। (এ হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে অর্থের দিক দিয়ে বুখারী ও মুসলিম একমত। অবশ্য এ পর্যন্ত বর্ণনার শব্দগুলো ইমাম মুসলিম উদ্ধৃত করেছেন। আর রিওয়ায়াতের বাকী শব্দগুলো উদ্ধৃত করেছেন ইমাম বুখারী।)[1]
بَابُ لَيْلَةِ الْقَدْرِ
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اعْتَكَفَ الْعَشْرَ الْأَوَّلَ مِنْ رَمَضَانَ ثُمَّ اعْتَكَفَ الْعَشْرَ الْأَوْسَطَ فِي قُبَّةٍ تُرْكِيَّةٍ ثُمَّ أَطْلَعَ رَأسه. فَقَالَ: «إِنِّي اعتكفت الْعشْر الأول ألتمس هَذِه اللَّيْلَة ثمَّ اعتكفت الْعَشْرَ الْأَوْسَطَ ثُمَّ أُتِيتُ فَقِيلَ لِي إِنَّهَا فِي الْعشْر الْأَوَاخِر فَمن اعْتَكَفْ مَعِي فَلْيَعْتَكِفِ الْعَشْرَ الْأَوَاخِرَ فَقَدْ أُرِيتُ هَذِهِ اللَّيْلَةَ ثُمَّ أُنْسِيتُهَا وَقَدْ رَأَيْتُنِي أَسْجُدُ فِي مَاءٍ وَطِينٍ مِنْ صَبِيحَتِهَا فَالْتَمِسُوهَا فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ وَالْتَمِسُوهَا فِي كُلِّ وِتْرٍ» . قَالَ: فَمَطَرَتِ السَّمَاءُ تِلْكَ اللَّيْلَةَ وَكَانَ الْمَسْجِدُ عَلَى عَرِيشٍ فَوَكَفَ الْمَسْجِدُ فَبَصُرَتْ عَيْنَايَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَعَلَى جَبْهَتِهِ أَثَرُ المَاء والطين وَالْمَاء مِنْ صَبِيحَةِ إِحْدَى وَعِشْرِينَ. مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ فِي الْمَعْنَى وَاللَّفْظُ لِمُسْلِمٍ إِلَى قَوْلِهِ: فَقِيلَ لِي: إِنَّهَا فِي الْعشْر الْأَوَاخِر . وَالْبَاقِي للْبُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা, অর্থাৎ- শেষ দশকে বেজোড় রাতে সন্ধান কর। তার প্রথম রাত হলো ২১ তারিখ, আর সর্বশেষ হলো ২৯ তারিখ। তবে জোড় রাত নয়।
আলোচ্য হাদীসে নিশ্চয়ই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বপ্নে যা দেখেছিলেন, তার ব্যাখ্যা এমনও হতে পারে যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অনুরূপ জাগ্রতাবস্থায় দেখতেন। আর এ হাদীস দ্বারা যারা মনে করেন যে, লায়লাতুল কদর সর্বদাই ২১শে রাতে হবে তারা দলীল গ্রহণ করেছেন। তবে এ হাদীসে তাদের কোন দলীল নেই। কেননা এটি উক্ত বছরের জন্য প্রযোজ্য।
বার বার এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে যে, নিশ্চয়ই তা স্থানান্তরিত হবে। অর্থাৎ- তা ২৩, ২৫, ২৭, ২৯ তারিখেও হতে পারে। বছরের ভিন্নতায় শেষ দশকের বিভিন্ন রাতে তা হতে পারে।
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - লায়লাতুল কদর
২০৮৭-[৫] যে রিওয়ায়াতটি ’আবদুল্লাহ ইবনু উনায়স (রাঃ) হতে বর্ণিত, সে বর্ণনা ’২১তম রাতের সকালের’ স্থলে ’২৩তম রাতের সকালে’ শব্দটি আছে। (মুসলিম)[1]
بَابُ لَيْلَةِ الْقَدْرِ
وَفِي رِوَايَةِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أُنَيْسٍ قَالَ: «لَيْلَة ثَلَاث وَعشْرين» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: ‘আবদুল্লাহ বিন উনায়স হতে আবূ সা‘ঈদ-এর বর্ণিত হাদীসের অনুরূপ বর্ণিত রয়েছে, সেখানে ২১শে রাতের পরিবর্তে ২৩ রাতের কথা উল্লেখ রয়েছে। তার শব্দে মুসলিমে রয়েছে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, লায়লাতুল কদর আমাকে দেখানো হয়েছিল, অতঃপর তা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে এবং ঐ দিনে সকালে দেখানো হয়েছে যে, আমি পানি ও কাদা মাটিতে সিজদা্ দিয়েছি। তিনি বলেন, অতঃপর ২৩ রাতে আমাদের ওপর বৃষ্টি হয়েছিল। অতঃপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সাথে সালাত আদায় করলেন এবং ফিরে গেলেন। আর পানি ও কাদা মাটির চিহ্ন কপালে ও নাকে লেগে ছিল। ‘আবদুল্লাহ বিন উনায়স বলেন, এ দিনটি ছিল ২৩শে রাত, এখানে স্পষ্টই বুঝা যায় যে, ‘আবদুল্লাহ বিন উনায়স ও আবূ সা‘ঈদ (রাঃ)-এর হাদীসের মাঝে রাত নির্ধারণে বৈপরীত্য রয়েছে। কারো মতে আবূ সা‘ঈদ-এর হাদীসে মুত্তাফাকুন ‘আলাইহি হওয়ায় তা প্রাধান্যযোগ্য। এ হাদীস থেকে যারা দলীল গ্রহণ করেছেন তারা বলেন, লায়লাতুল কদর রাতটা ২৩তম রাতে হবে। তবে সর্বোপরি কথা হল, নিশ্চয়ই তা ঐ বছরের জন্য খাস ছিল। কিন্তু ‘আবদুল্লাহ বিন উনায়স এবং তার মতের অনুসারী ও তাবি‘ঈনগণ এটা ‘আমভাবে প্রতি বছরের উপর ধরে নিয়েছেন।
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - লায়লাতুল কদর
২০৮৮-[৬] যির ইবনু হুবায়শ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উবাই ইবনু কা’বকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার (দীনী) ভাই ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ বলেন, যে ব্যক্তি গোটা বছর ’ইবাদাত করার জন্য রাত জাগরণ করবে, সে ’কদর রজনী’ পাবে। উবাই ইবনু কা’ব বললেন, আল্লাহ তা’আলা ইবনু মাস’ঊদ এর ওপর রহম করুন। তিনি এ কথাটা এজন্য বলেছেন, যেন মানুষ ভরসা করে বসে না থাকে। নতুবা তিনি তো জানেন যে, ’কদর’ রমাযান (রমজান) মাসেই আসে। আর রমাযান (রমজান) মাসের শেষ দশ দিনের এক রাতে কদর রজনী হয়। সে রাতটা সাতাশতম রাত। এদিকে উবাই ইবনু কা’ব কসম করেছেন এবং ’ইনশা-আল্ল-হ’ বলা ছাড়াই বলেছেন, ’নিঃসন্দেহে কদর রাত (রমাযানের) সাতাশতম রাত’। আমি আরয করলাম, হে আবূল মুনযির (উবাই-এর ডাক নাম)! কিসের ভিত্তিতে আপনি এ কথা বলেছেন? তিনি বললেন, ঐ আলামাত ও আয়াতের ভিত্তিতে, যা আমাদেরকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন। (তিনি বলেছেন), ঐ রাতের সকালে সূর্য উদয় হবে, কিন্তু এতে কিরণ বা আলো থাকবে না। (মুসলিম)[1]
بَابُ لَيْلَةِ الْقَدْرِ
وَعَنْ زِرِّ بْنِ حُبَيْشٍ قَالَ: سَأَلْتُ أُبَيَّ بْنَ كَعْبٍ فَقُلْتُ إِنَّ أَخَاكَ ابْنَ مَسْعُودٍ يَقُولُ: مَنْ يَقُمِ الْحَوْلَ يُصِبْ لَيْلَةَ الْقَدْرِ. فَقَالَ C أَرَادَ أَنْ لَا يَتَّكِلَ النَّاسُ أَمَا إِنَّهُ قَدْ عَلِمَ أَنَّهَا فِي رَمَضَانَ وَأَنَّهَا فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ وَأَنَّهَا لَيْلَةُ سَبْعٍ وَعِشْرِينَ ثُمَّ حَلَفَ لَا يَسْتَثْنِي أَنَّهَا لَيْلَةُ سَبْعٍ وَعِشْرِينَ. فَقُلْتُ: بِأَيِّ شَيْءٍ تَقُولُ ذَلِكَ يَا أَبَا الْمُنْذِرِ؟ قَالَ: بِالْعَلَامَةِ أَوْ بِالْآيَةِ الَّتِي أَخْبَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّهَا تَطْلُعُ يَوْمَئِذٍ لَا شُعَاعَ لَهَا. رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে (شُعَاعَ لَهَا)-এর شُعَاعٌ শব্দটি এটি শিন অক্ষরে পেশ যোগে। ভাষাবিদগণ বলেন, সূর্য উদিত হওয়ার রশির মতো সূর্যের যে কিরণ দেখা যায় তা-ই। হাফেয আসকালানী (রহঃ) বলেন, যে লায়লাতুল কদর পাবে তার আলাদা কোন নিদর্শন প্রকাশ পাবে কি-না, এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন যে, লায়লাতুল কদর পাবে সে সব কিছুকে সিজদা্ অবস্থায় দেখতে পাবে। কেউ বলেন, সকল স্থানে এমনকি ঘোর অন্ধকারেও আলো দেখতে পাবে। কেউ বলেন, সালাম ফিরালে তাকে সম্বোধন করে মালায়িকাহ’র (ফেরেশতাগণকে) শুনতে পাবে। কেউ বলেন যে, লায়লাতুল কদর পাবে, তার দু‘আ কবূল হওয়াই তার নিদর্শন। তবে ‘আল্লামা ত্ববারী (রহঃ) বলেনঃ এসবের কোনটিও আবশ্যকীয় নয় এবং লায়লাতুল কদর অর্জন হওয়ার ক্ষেত্রে কোন কিছু দেখা বা শোনা শর্ত নয়।
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - লায়লাতুল কদর
২০৮৯-[৭] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযান (রমজান) মাসের শেষ দশ দিনে যত ’ইবাদাত বন্দেগী (মুজাহাদাহ্) করতেন এতো আর কোন মাসে করতেন না। (মুসলিম)[1]
بَابُ لَيْلَةِ الْقَدْرِ
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَجْتَهِدُ فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ مَا لَا يَجْتَهِدُ فِي غَيره. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা আল কারী (রহঃ) বলেন, নিশ্চয়ই সে অধিক আনুগত্য ও ‘ইবাদাতের ক্ষেত্রে প্রচেষ্টা করবে, অর্থাৎ- সকল ভালো কাজ পুণ্যের কাজ ও ‘ইবাদাত পরিপূর্ণরূপে পালন করবে।
(مَا لَا يَجْتَهِدُ فِىْ غَيْرِه) অর্থাৎ- শেষের দশক ছাড়াও এখানে দলীল রয়েছে যে, ‘ইবাদাতের কঠোর প্রচেষ্টা করা, রমাযানের শেষ দশকের রাতগুলোতে কিয়াম করার উপর উৎসাহিত করা মুস্তাহাব। এতে শেষ ‘আমলের সৌন্দর্য ও তা উত্তম হওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - লায়লাতুল কদর
২০৯০-[৮] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযানের শেষ দশ দিন এলে ’ইবাদাতের জন্য জোর প্রস্তুতি নিতেন। রাত জেগে থাকতেন, নিজের পরিবার-পরিজনকে জাগিয়ে দিতেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ لَيْلَةِ الْقَدْرِ
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا دَخَلَ الْعَشْرُ شَدَّ مِئْزَرَهُ وَأَحْيَا ليله وَأَيْقَظَ أَهله
ব্যাখ্যা: এখানে( شَدَّ مِئْزَرَه) এর অর্থ ‘উলামাগণের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে বিশুদ্ধ মত হলো, ‘ইবাদাতের মাধ্যমে ব্যস্ততার জন্য নারীদের থেকে দূরে থাকাই (شَدَّ مِئْزَرَه) এর উদ্দেশ্য। আর সালাফে সলিহীন ও পূর্ববর্তী ইমামগণ তার বিশ্লেষণ করেন এবং আস্ সাওরী তার প্রতি নিশ্চিত সমর্থন দিয়েছেন এবং কবীর কাব্য দ্বারা দলীল দিয়েছেন।
قوم إذا حاربوا شدوا مآزرهم عن النساء ولو باتت بأطهار.
অর্থাৎ- যখন কোন সম্প্রদায় যুদ্ধ করে, তাদের কোমর নারীদের থেকে শক্তভাবে বাঁধবে, যদিও রমণী পবিত্রতায় রাত যাপন করে।
আর নিশ্চয়ই এটি রমাযানের শেষের জন্য খাসকরণ ‘ইবাদাতের সময় বের করা তাতে সহজ, অতঃপর তাতে ‘ইবাদাতের ইজতিহাদ করা যায়, কারণ তা শেষের ‘আমল, আর শেষের ‘আমলই উত্তম। তিরমিযীর বর্ণনায় উম্মু সালামাহ্ হতে বর্ণিত, তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পরিবার হতে যে কিয়াম করতে সক্ষম, তাকে কিয়াম ছাড়া রাখতেন না।
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - লায়লাতুল কদর
২০৯১-[৯] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমাকে বলে দিন, যদি আমি ’কদর রাত’ পাই, এতে আমি কী দু’আ করব? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তুমি বলবে, ’’আল্ল-হুম্মা ইন্নাকা ’আফুব্বুন, তুহিব্বুল আফ্ওয়া’, ফা’ফু ’আন্নী’’ (অর্থাৎ- হে আল্লাহ! তুমিই ক্ষমাকারী। আর ক্ষমা করাকে তুমি পছন্দ করো। অতএব তুমি আমাকে মাফ করে দাও।) (আহমদ, ইবনু মাজাহ, তিরমিযী; আর ইমাম তিরমিযী এটিকে সহীহ বলেছেন)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَرَأَيْتَ إِنْ عَلِمْتُ أَيُّ لَيْلَةٍ الْقَدْرِ مَا أَقُولُ فِيهَا؟ قَالَ: قُولِي: اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعَفُ عَنِّي . رَوَاهُ أَحْمد وَابْن مَاجَه وَالتِّرْمِذِيّ وَصَححهُ
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে দলীল রয়েছে যে, (لَيْلَةُ الْقَدْرِ) ‘‘লায়লাতুল কদর’’ অর্থাৎ- মর্যাদাবান রাতে উপরোল্লিখিত শব্দের দ্বারা দু‘আ করা মুস্তাহাব।
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - লায়লাতুল কদর
২০৯২-[১০] আবূ বকরা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তোমরা লায়লাতুল কদরকে (রমাযান (রমজান) মাসের) অবশিষ্ট নবম রাতে, অর্থাৎ- ২৯তম রাতে; অথবা অবশিষ্ট সপ্তম রাতে, অর্থাৎ- ২৭তম রাতে; অথবা অবশিষ্ট পঞ্চম রাতে, অর্থাৎ- ২৫তম রাতে; অথবা অবশিষ্ট তৃতীয় রাতে, অর্থাৎ- ২৩তম রাতে; অথবা শেষ রাতে খোঁজ করো। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ أَبِي بَكْرَةَ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «الْتَمِسُوهَا يَعْنَى لَيْلَة الْقدر فِي تسع بَقينَ أَو فِي سبع بَقينَ أَو فِي خمس بَقينَ أَوْ ثَلَاثٍ أَوْ آخِرِ لَيْلَةٍ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ
ব্যাখ্যা: কতক ‘উলামাগণ বলে থাকেন যে, মাস যখন ২৯ হবে তখন (লায়লাতুল কদরের) প্রথম রাত হবে ২১ তারিখ, দ্বিতীয়টি ২৩ রাত, তৃতীয়টি ২৫ রাত, চতুর্থটি ২৭তম রাত এবং বেজোড় রাতের হাদীসগুলোর মধ্যে এ সংক্রান্ত হাদীসের আধিক্য থাকায় এটি (২৭তম রাত) উত্তম। আমরা বলব, উল্লেখিত সংখ্যার কোনটিকে অগ্রাধিকার দেয়ার দলীল নেই। আর উল্লেখিত হাদীস দ্বারা বেজোড় সংখ্যার সকল রাত (২১, ২৩, ২৫, ২৭, ২৯ রাত) উদ্দেশ্য।
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - লায়লাতুল কদর
২০৯৩-[১১] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে লায়লাতুল কদর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, তা প্রত্যেক রমাযানে আসে। (আবূ দাঊদ। ইমাম আবূ দাঊদ বলেন, সুফ্ইয়ান ও শু’বাহ্ আবূ ইসহাক হতে, তিনি মাওকূফ হিসেবে এ হাদীসটি ইবনু ’উমার হতে বর্ণনা করেছেন।)[1]
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ لَيْلَةِ الْقَدْرِ فَقَالَ: «هِيَ فِي كُلِّ رَمَضَانَ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَقَالَ: رَوَاهُ سُفْيَان وَشعْبَة عَن أبي إِسْحَق مَوْقُوفا على ابْن عمر
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেন, এ হাদীসটি দু’টি বিষয়ে সম্ভাবনা রাখে।
১. নিশ্চয়ই তা বছরগুলোর মধ্য হতে প্রতি রমাযানের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য। সুতরাং তা (লায়লাতুল কদর) রমাযানের সাথে খাস। অতএব অন্য সকল মাসে তা গণ্য হবে না।
২. রমাযানের প্রত্যেক রাতের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য। সুতরাং রমাযানের শেষের কিছু অংশের সাথে তা খাস হবে না। অর্থাৎ- পুরো রমাযানই লায়লাতুল কদর। ‘আল্লামা ‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী (রহঃ) বলেন, এ হাদীস দ্বারা দলীল গ্রহণ করা হয় যা আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) থেকে বর্ণিত রয়েছে যে, লায়লাতুল কদরটা রমাযানের সকল রাতে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু এ ক্ষেত্রে হাদীসটি পূর্ণ বক্তব্য নয়। যেমন ‘আল্লামা কারী (রহঃ) বলেন, এ হাদীসটি মাওকূফ ও মারফূ' হওয়ার ব্যাপারে মতপার্থক্য রয়েছে। যদি তা মাওকূফ হয় তবে তা নস বা পূর্ণ হুকুম নয়। আর আমার [‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী (রহঃ)] নিকট প্রাধান্যযোগ্য মত হল, ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ)-এর উল্লেখিত দু’টি বিষয়ের প্রথমটি। কারণ একাধিক বিশুদ্ধ ও স্পষ্ট হাদীস থেকে জানা যায় যে, লায়লাতুল কদর রমাযানের শেষ দশকের সাথে নির্দিষ্ট।
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - লায়লাতুল কদর
২০৯৪-[১২] ’আবদুল্লাহ ইবনু উনায়স (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একবার রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললাম, হে আল্লাহর রসূল! গ্রামে-গঞ্জে আমার বাড়ী। ওখানেই আমি বসবাস করি। আলহামদুলিল্লাহ্ ওখানেই সালাতও আদায় করি। অতএব রমাযানের একটি নির্দিষ্ট রাতের কথা বলে দিন, (যে রাতে আমি সে রাত খুঁজতে) আপনার এ মসজিদে আসতে পারি। এ কথা শুনে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আচ্ছা তুমি তবে (রমাযান (রমজান) মাসের) ২৩ তারিখ দিবাগত রাতে এসো। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর কেউ তাঁর ছেলেকে জিজ্ঞেস করল, আপনার পিতা তখন কি করতেন? ছেলে উত্তরে বলল, তিনি ’আসরের সালাত আদায়ের সময় মসজিদে প্রবেশ করতেন ফজরের সালাত আদায়ের আগে (প্রাকৃতিক প্রয়োজন ছাড়া) কোন কাজে বের হতেন না। ফজরের সালাত শেষে মসজিদের দরজায় নিজের বাহনটি প্রস্তুত পেতেন। এরপর বাহনটিতে বসতেন এবং নিজের গ্রামে চলে যেতেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أُنَيْسٍ قَالَ: قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ لِي بَادِيَةً أَكُونُ فِيهَا وَأَنا أُصَلِّي فِيهَا بِحَمْد الله فَمُرْنِي بِلَيْلَةٍ أَنْزِلُهَا إِلَى هَذَا الْمَسْجِدِ فَقَالَ: «انْزِلْ لَيْلَة ثَلَاث وَعشْرين» . قيل لِابْنِهِ: كَيْفَ كَانَ أَبُوكَ يَصْنَعُ؟ قَالَ: كَانَ يَدْخُلُ الْمَسْجِدَ إِذَا صَلَّى الْعَصْرَ فَلَا يَخْرُجُ مِنْهُ لِحَاجَةٍ حَتَّى يُصَلِّيَ الصُّبْحَ فَإِذَا صَلَّى الصُّبْحَ وَجَدَ دَابَّتَهُ عَلَى بَابِ الْمَسْجِدِ فَجَلَسَ عَلَيْهَا وَلحق بباديته. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: লায়লাতুল কদর রমাযানের ২৩তম রাত হওয়ার দিকে সাহাবী ও তাবি‘ঈগণের একটি দল মত দিয়েছেন। হাফেয আসকালানী (রহঃ) বলেন, মু‘আবিয়াহ্ (রাঃ) হতে বিশুদ্ধ সনাদে বর্ণিত রয়েছে যে, লায়লাতুল কদর রমাযানের ২৩তম রাত। ইবনু ‘উমার (রাঃ)-এর বর্ণনায় রয়েছে, যে লায়লাতুল কদর অনুসন্ধান করতে চায় সে যেন ২৩তম রাতে তা অনুসন্ধান করে। তিনি বলেন, আইয়ূব (রাঃ) ২৩তম দিনে গোসল করতেন এবং সুগন্ধি লাগাতেন।
পরিচ্ছেদঃ ৮. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - লায়লাতুল কদর
২০৯৫-[১৩] ’উবাদাহ্ ইবনুস্ সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার আমাদেরকে লায়লাতুল কদরের খবর দেবার জন্য (মসজিদে নাবাবীর হুজরা থেকে) বের হলেন। এ সময় মুসলিমদের দু’ ব্যক্তি ঝগড়া শুরু করল। (এ অবস্থা দেখে) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আমি তোমাদেরকে লায়লাতুল কদর সম্পর্কে খবর দিতে বের হয়েছিলাম। কিন্তু অমুক অমুক ব্যক্তি ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হলো। ফলে (লায়লাতুল কদরের খবর আমার মন হতে) উঠিয়ে নেয়া হলো। বোধ হয় (ব্যাপারটি) তোমাদের জন্য কল্যাণকর হয়েছে। তাই তোমরা লায়লাতুল কদরকে (রমাযানের) ২৯, ২৭ কিংবা ২৫-এর রাতে খোঁজ করবে। (বুখারী)[1]
عَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ قَالَ: خَرَجَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِيُخْبِرَنَا بِلَيْلَةِ الْقَدْرِ فَتَلَاحَى رَجُلَانِ مِنَ الْمُسْلِمِينَ فَقَالَ: «خَرَجْتُ لِأُخْبِرَكُمْ بِلَيْلَةِ الْقَدْرِ فَتَلَاحَى فُلَانٌ وَفُلَانٌ فَرُفِعَتْ وَعَسَى أَنْ يَكُونَ خَيْرًا لَكُمْ فَالْتَمِسُوهَا فِي التَّاسِعَةِ وَالسَّابِعَة وَالْخَامِسَة» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা হাফেয (রহঃ) বলেন, বলা হয় যে, উক্ত দুই ব্যক্তি ছিলেন ‘আবদুল্লাহ ইবনু আবী হাদ্রদ ও কা‘ব বিন মালিক। ইবনু দিহ্ইয়াহ্-ও এটি উল্লেখ করেছেন।
‘আল্লামা আস্ সুবকী এখান থেকে মাস্আলাহ্ সংকলন করেছেন যে, যে ব্যক্তি লায়লাতুল কদর দেখবে তার জন্য তা গোপন করা মুস্তাহাব। কেননা আল্লাহ তা‘আলা তার নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে তা গোপন করেছেন। আর তার সম্পূর্ণটাই কল্যাণ আল্লাহ যা গোপন করেছেন। অতএব এ ক্ষেত্রে তার অনুসরণই মুস্তাহাব। আর অনেক হাদীসে বর্ণিত রয়েছে, যা হাদীস সন্ধানীদের নিকট গোপন নেই যে, লায়লাতুল কদরের নির্দিষ্টকরণ উঠে যাওয়াই তোমাদের জন্য কল্যাণকর। যাতে তিনি শেষ দশকের সকল রাতে ‘ইবাদাতের কঠোর প্রচেষ্টার উপর উৎসাহ দেন।
‘আল্লামা ইবনু আত্ তীন বলেন, তিনি তার জানা অনুযায়ী যদি লায়লাতুল কদর নির্ধারণ করে দিতেন, তবে এ রাত ছাড়া অন্য রাত তারা ‘আমল খুব কম করত, আর নির্ধারিত রাতে বেশি ‘আমল করত। আর অন্য সকল রাতের অধিক ‘আমলটা তাদের থেকে অদৃশ্য হয়ে যেত।
পরিচ্ছেদঃ ৮. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - লায়লাতুল কদর
২০৯৬-[১৪] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ’লায়লাতুল কদর’ শুরু হলে জিবরীল আমীন মালায়িকাহ্’র (ফেরেশতাগণের) দলবলসহ (পৃথিবীতে) নেমে আসেন। তাঁরা দাঁড়িয়ে বা বসে থাকা আল্লাহর স্মরণকারী আল্লাহর প্রত্যেক বান্দার জন্য দু’আ করতে থাকেন। এরপর ঈদুল ফিতরের দিন এলে আল্লাহ তা’আলা মালায়িকার কাছে তাঁর বান্দাদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন, হে আমার মালায়িকাহ্ (ফেরেশতা)! বলো দেখি সে প্রেমিকের কী পুরস্কার হতে পারে যে নিজ কাজ সম্পাদন করেছে? মালায়িকাহ্ (ফেরেশতা) বলেন, হে আমাদের রব! তার পারিশ্রমিক পরিপূর্ণভাবে দিয়ে দেয়াই হচ্ছে তার পুরস্কার। তখন আল্লাহ বলেন, আমার মালায়িকাহ্ (ফেরেশতা)! আমার বান্দা ও বান্দীগণ তাদের ওপর আমার অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছে। আজ (ঈদের দিন) আমার নিকট দু’আর ধ্বনি দিতে দিতে ঈদগাহের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আমার ইজ্জতের, বড়ত্বের, উঁচু শানের কসম! জেনে রাখো তাদের দু’আ আমি নিশ্চয়ই কবূল করব। এরপর আল্লাহ বলেন, আমার (বান্দাগণ)! আমি নিশ্চয়ই তোমাদের সকল অপরাধ মাফ করে দিলাম। তোমাদের গুনাহখাতাগুলোকে নেক কাজে পরিবর্তন করে দিলাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, অতঃপর তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে বাড়ী ফিরে যায়। (বায়হাক্বী- শু’আবূল ঈমান)[1]
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِذَا كَانَ لَيْلَةُ الْقَدْرِ نزل جِبْرِيل عَلَيْهِ السَّلَام فِي كُبْكُبَةٍ مِنَ الْمَلَائِكَةِ يُصَلُّونَ عَلَى كُلِّ عَبْدٍ قَائِمٍ أَوْ قَاعِدٍ يَذْكُرُ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ فَإِذَا كَانَ يَوْمُ عِيدِهِمْ يَعْنِي يَوْمَ فِطْرِهِمْ بَاهَى بِهِمْ مَلَائِكَتَهُ فَقَالَ: يَا مَلَائِكَتِي مَا جَزَاءُ أَجِيرٍ وَفَّى عَمَلَهُ؟ قَالُوا: رَبَّنَا جَزَاؤُهُ أَنْ يُوَفَّى أَجْرَهُ. قَالَ: مَلَائِكَتِي عَبِيدِي وَإِمَائِي قَضَوْا فَرِيضَتِي عَلَيْهِمْ ثُمَّ خَرَجُوا يَعُجُّونَ إِلَى الدُّعَاءِ وَعِزَّتِي وَجَلَالِي وَكَرَمِي وَعُلُوِّي وَارْتِفَاعِ مَكَاني لأجيبنهم. فَيَقُول: ارْجعُوا فقد غَفَرْتُ لَكُمْ وَبَدَّلْتُ سَيِّئَاتِكُمْ حَسَنَاتٍ. قَالَ: فَيَرْجِعُونَ مَغْفُورًا لَهُمْ . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي شُعَبِ الْإِيمَانِ
ব্যাখ্যা: আহলুস্ সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত-এর ‘উলামাগণ এ মর্মে একমত হয়েছেন যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা তার ‘আরশের উপর সমাসীন এবং তার ‘আরশ সাত আসমানের উপর।
আর اِسْتَوَاءُ হলো اَلْاِرْتِفَاعُ বা উত্তোলন করা, উচ্চাসনে সমাসীন হওয়া। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর ‘আরশের উপর সমাসীন আছেন। আর তাঁর জ্ঞান ও ক্ষমতা সকল স্থানে বিস্তৃত এবং তার ‘আরশে আরোহণ করা বা সমাসীন হওয়াটা বোধগম্যহীন, তার মতো কিছুই নেই।
(আরো জানতে) ফিরে চলুন আয্ যাহাবী (রহঃ)-এর কিতাব ‘‘আল উলূ’’, বায়হাক্বী (রহঃ)-এর রচিত ‘‘কিতাবুল আসমা- ওয়াস্ সিফা-ত’’ এবং ‘আল্লামা শায়খুল ইসলাম তাক্বীউদ্দীন ইবনু তায়মিয়াহ্ (রহঃ)-এর ‘‘মাস্আলাতুল ইস্তাওয়া ‘আলাল ‘আরশি’’ নামক গ্রন্থের দিকে। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন।
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - ইতিকাফ
الإِعْتِكَابِ এর শাব্দিক অর্থ হলো, কোন বিষয়ের আবশ্যকতা এবং নিজকে তার ওপর আটকে রাখা, তার ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকা, সাধারণ অবস্থান তা যে কোন স্থানেই হোক।
পারিভাষিক অর্থে ইতিকাফ হলো, নির্দিষ্ট কোন বিষয়কে আবশ্যকীয় করতঃ মসজিদে অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলা হয়।
’আল্লামা কুসতুলানী (রহঃ) বলেন, শাব্দিক অর্থেই ইতিকাফ হলো, অবস্থান করা, আটক রাখা, ভালো কিংবা মন্দ কোন বিষয়কে আবশ্যক করা। যেমন আল্লাহ তা’আলার বাণী,
لَا تُبَاشِرُوْهُنَّ وَأَنْتُمْ عَاكِفُوْنَ অর্থাৎ- ’’মসজিদে ইতিকাফ অবস্থায় তোমরা রমণীদের সাথে সঙ্গম কর না।’’ (সূরা আল বাকারাহ্ ২ : ১৮৭)
’আল্লামা ইবনুল মুনযির (রহঃ) বলেন, বিদ্বানগণ এ মর্মে একমত হয়েছেন যে, ইতিকাফ সুন্নাত, তা মানুষের ওপর ওয়াজিব নয়। তবে যদি কোন ব্যক্তি তার নিজের ওপর মানতের মাধ্যমে ইতিকাফ ওয়াজিব করে নেয়, তবে তা পালন করা ওয়াজিব।
২০৯৭-[১] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। (তিনি বলেন) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সবসময়ই মাসের শেষ দশদিন ইতিকাফ করেছেন, তাঁর পরে তাঁর স্ত্রীগণও ইতিকাফ করেছেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ الْاِعْتِكَافِ
وَعَنْ عَائِشَةَ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَعْتَكِفُ الْعَشْرَ الْأَوَاخِرَ مِنْ رَمَضَانَ حَتَّى تَوَفَّاهُ اللَّهُ ثُمَّ اعْتَكَفَ أَزْوَاجُهُ مِنْ بعده
ব্যাখ্যা: (ثُمَّ اعْتَكَفَ أَزْوَاجُه مِنْ بَعْدِه) অর্থাৎ- মৃত্যুর পরে তার সুন্নাত জিন্দা করণার্থে এবং তার পথের উপর অবিচল থাকার জন্য তার রমণীগণ ইতিকাফ করতেন।
এখানে দলীল হলো ইতিকাফ খাস ‘ইবাদাতের অন্তর্ভুক্ত নয় এবং নারীরা ইতিকাফের ক্ষেত্রে পুরুষের মতই। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কতিপয় স্ত্রীকে ইতিকাফ করার অনুমতি প্রদান করেছেন।
‘আল্লামা নাবাবী বলেন, এ হাদীস নাবীদের ইতিকাফ বিশুদ্ধ হওয়ারই দলীল, কেননা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জন্য অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-এর মতে নারীদের ইতিকাফ বাড়ির মসজিদে বৈধ এবং তা হলো তার বাড়ির নির্জন ঘর যা সালাতের জন্য বরাদ্দ। আর তিনি বলেন, মসজিদে ইতিকাফ করা পুরুষের জন্য বরাদ্দ। তিনি বলেন, পুরুষের জন্য বাড়ির সালাতের জায়গায় ইতিকাফ বৈধ নয়। ‘আল্লামা ইবনুল কুদামাহ্ বলেন, নারীর জন্য প্রত্যেক মসজিদে ইতিকাফ করা বৈধ, জামা‘আত প্রতিষ্ঠিত হওয়া (জামা‘আত) তার ওপর ওয়াজিব নয়। আর ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ) বলেন, নারীর ইতিকাফ বাড়িতে হবে না।
আমরা বলব, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَأَنْتُمْ عَاكِفُوْنَ فِى الْمَسَجِدِ ‘‘তোমরা মসজিদে ইতিকাফকারী।’’ (সূরা আল বাকারাহ্ ২ : ১৮৭)
এখানে মাসজিদ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, এমন স্থানের নাম যা গঠন করা হয়েছে তাতে সালাত আদায় করার জন্য। আর বাড়িতে যে সালাতের স্থান তা মাসজিদ নয়, কেননা তা সালাতের জন্য গঠিত হয়নি। যদি তাকে মাসজিদ বা নামাজের জায়গা বলা হয় তা মাযাজী বা হুকমী। অতএব তার জন্য প্রকৃত মসজিদের হুকুম প্রযোজ্য নয়। কারণ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীগণ তাঁর নিকট মসজিদে ইতিকাফ করার অনুমতি চেয়েছেন। আর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের অনুমতি দিয়েছেন মসজিদেই ইতিকাফ করার জন্য।
যদি (মাসজিদ) তাদের ইতিকাফের স্থান না হতো, তবে মসজিদে ইতিকাফের অনুমতি দিতেন না। যদি মাসজিদ ব্যতীত অন্যত্র ইতিকাফ বৈধ হত, তবে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা তাদেরকে জানিয়ে দিতেন। যেহেতু ইতিকাফের জন্য নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ক্ষেত্রে মাসজিদ শর্ত, কাজেই নারীদের জন্যও মাসজিদ শর্ত। যেমন ত্বওয়াফের জন্য উভয়ের একই শর্ত।
আর ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর হাদীস যা আমরা উল্লেখ করেছি তা আমাদের জন্য দলীল। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর স্ত্রীদের ইতিকাফ অপছন্দ করেছেন ঐ অবস্থাতে তাদের তাঁবুর আধিক্যের কারণে। কারণ তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদের মাঝে প্রতিযোগিতা দেখছিলেন, অতঃপর তাদের ওপর তাদের নিয়্যাতের বিপর্যয়ের আশংকা করছিলেন। আর এজন্যই তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইতিকাফ বর্জন করেছিলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ধারণা করেছিলেন যে, নিশ্চয়ই তারা (নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীগণ) তাঁর সাথে অবস্থানের প্রতিযোগিতা করছে। তারা (ইমাম আবূ হানীফাহ্ সহ অন্যান্যরা) যে অর্থ উল্লেখ করেছেন, (নারীদের ইতিকাফ বাড়িতে করতে হবে, মসজিদে বৈধ নয়) ব্যাপারটা তাই যদি হত, তবে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বাড়িতে ইতিকাফের নির্দেশ দিতেন, তাদের জন্য মসজিদে ইতিকাফের অনুমতি দিতেন না।
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - ইতিকাফ
২০৯৮-[২] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কল্যাণকর কাজের ব্যাপারে (দান-খয়রাত) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে প্রশস্ত হৃদয়ের অধিকারী। আর তাঁর হৃদয়ের এ প্রশস্ততা রমাযান (রমজান) মাসে বেড়ে যেত সবচেয়ে বেশী। রমাযান (রমজান) মাসে প্রতি রাতে জিবরীল আমীন তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে কুরআন শুনাতেন। জিবরীল আমীনের সাক্ষাতের সময় তাঁর দান প্রবাহিত বাতাসের বেগের চেয়েও বেশী বেড়ে যেত। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ الْاِعْتِكَافِ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَجْوَدَ النَّاسِ بِالْخَيْرِ وَكَانَ أَجْوَدَ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَان وَكَانَ جِبْرِيلُ يَلْقَاهُ كُلَّ لَيْلَةٍ فِي رَمَضَانَ يَعْرِضُ عَلَيْهِ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْقُرْآنَ فَإِذَا لَقِيَهُ جِبْرِيلُ كَانَ أَجْوَدُ بِالْخَيْرِ مِنَ الرّيح الْمُرْسلَة
ব্যাখ্যা: ইবনু হাজার (রহঃ) বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও জিবরীল (আঃ) পরস্পরের দারসে্র ভিত্তিতে কুরআন পাঠ করতেন। বুখারীর অপর বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি (জিবরীল) তাঁকে কুরআনের পাঠ শিখালেন আর তা হলো, তুমি অন্যের নিকট কুরআনের নির্দিষ্ট অংশ পড়বে এবং সে তোমাদের ওপর নির্দিষ্ট অংশ পড়বে এবং উল্লেখিত হাদীসে কয়েকটি উপকারিতা রয়েছে। তার মধ্য সর্বদাই দানশীলতার প্রতি উৎসাহ প্রদান করা এবং রমাযানে তা বৃদ্ধি করা। সৎকর্মশীলদের সাথে সংঘবদ্ধ থাকা, সৎকর্মশীলদের সাথে সাক্ষাৎ করা, যদি সাক্ষাতকৃত ব্যক্তি বিরক্ত না হয় তবে বারংবার সাক্ষাৎ করা। আর রমাযানে অধিক অধিক কুরআন তিলাওয়াত করা মুস্তাহাব এবং তা অন্যান্য জিকির-আযকারের তুলনায় উত্তম। যদি জিকিরই উত্তম হত কিংবা তিলাওয়াত সমান হত তবে তারা দু’জন (জিবরীল ও নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাই করতেন।
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - ইতিকাফ
২০৯৯-[৩] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রতি বছর (রমাযানে) একবার কুরআন শরীফ পড়ে শুনানো হত। তাঁর মৃত্যুবরণের বছর কুরআন শুনানো হয়েছিল (দু’বার)। তিনি প্রতি বছর (রমাযান (রমজান) মাসে) দশ দিন ইতিকাফ করতেন। কিন্তু ইন্তিকালের বছর তিনি ইতিকাফ করেছেন বিশ দিন। (বুখারী)[1]
بَابُ الْاِعْتِكَافِ
وَعَن أبي هُرَيْرَة قَالَ: كَانَ يعرض على النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْقُرْآنَ كُلَّ عَامٍ مَرَّةً فَعَرَضَ عَلَيْهِ مَرَّتَيْنِ فِي الْعَامِ الَّذِي قُبِضَ وَكَانَ يَعْتَكِفُ كُلَّ عَامٍ عَشْرًا فَاعْتَكَفَ عِشْرِينَ فِي الْعَامِ الَّذِي قُبِضَ. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: আল ইসমা‘ঈলী (রহঃ)-এর বর্ণনায় রয়েছে জিবরীল (আঃ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর কুরআন উপস্থাপন করতেন প্রতি রমাযানে। এ হাদীস ও পূর্বোল্লিখিত হাদীসের মাঝে কোন বৈপরীত্য নেই। পূর্বের হাদীসে রয়েছে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরীল (আঃ) উভয়েই একে অপরকে কুরআন শুনাতেন।
‘আল্লামা আসকালানী (রহঃ) বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ইনতিকালের বছর ২০ দিন ইতিকাফ করেছেন তার কারণ হলো, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পূর্ববর্তী বছরে সফর অবস্থায় ছিলেন, এর উপর প্রমাণ করে নাসায়ীর বর্ণিত হাদীস এবং তার শব্দে উল্লেখিত আবূ দাঊদ-এর বর্ণিত হাদীস। ইবনু হিব্বান এবং অন্যান্যগণ তা সহীহ বলেছেন। উবাই বিন কা‘ব (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীস নিশ্চয়ই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন। অতঃপর এক বছর সফর করলেন ফলে তিনি ইতিকাফ করতে পারেননি, যখন আগামী বছর আগমন করল নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন ২০ দিন ইতিকাফ করলেন।
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - ইতিকাফ
২১০০-[৪] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইতিকাফ করার সময় মাসজিদ থেকে আমার দিকে তাঁর মাথা বাড়িয়ে দিতেন। আমি মাথা আঁচড়ে দিতাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রাকৃতিক প্রয়োজন ছাড়া কখনো ঘরে প্রবেশ কর তেন না। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ الْاِعْتِكَافِ
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا اعْتَكَفَ أَدْنَى إِلَيَّ رَأَسَهِ وَهُوَ فِي الْمَسْجِدِ فَأُرَجِّلُهُ وَكَانَ لَا يَدْخُلُ الْبَيْتَ إِلَّا لحَاجَة الْإِنْسَان
ব্যাখ্যা: উল্লেখিত হাদীসে রয়েছে যে, ইতিকাফকারীর জন্য পরিচ্ছন্নতা, পবিত্রতা অর্জন গোসল করা মাথা মুন্ডানো, মাথা আঁচড়ানোর মাধ্যমে সৌন্দর্য বজায় রাখা বৈধ। ‘আল্লামা খাত্ত্বাবী (রহঃ) বলেন, নিশ্চয়ই ইতিকাফকারীর জন্য চুল চরিতার্থ করা বৈধ। অন্য অর্থে মাথা মুন্ডানো, নখ কাটা, ময়লা থেকে শরীর পরিষ্কার করা। ‘আল্লামা আল হাফেয (রহঃ) বলেন, (স্বাভাবিকভাবে) মসজিদে যে সকল কাজ ঘৃণিত নয়, ইতিকাফ অবস্থায়ও তা ঘৃণিত নয়। ‘আল্লামা ইবনুল মুনযির (রহঃ) বলেন, বিদ্বানগণ এ মর্মে একমত হয়েছেন, ইতিকাফকারী ব্যক্তি প্রসাব এবং পায়খানার জন্য ইতিকাফ থেকে বের হতে পারবে। কারণ এটি তার জন্য আবশ্যক যা মসজিদে করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, আলোচ্য হাদীস (لِحَاجَةِ الْإِنْسَانِ) বা মানুষের প্রয়োজন দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, প্রস্রাব ও পায়খানা। কেননা প্রতিটি মানুষের খাদ্য ও পানীয়ের দিকে প্রয়োজন রয়েছে। যখন তার নিকট খাদ্য পৌঁছানোর কেউ না থাকবে তখন তার খাদ্যের জন্য বের হওয়া বৈধ এবং যদি বমন (বমি) চেপে যায় তবে বমনের জন্য মসজিদের বাইরে যাওয়া বৈধ। কারণ এগুলো আবশ্যকীয় বিষয় যা মসজিদে সম্পাদন করা সম্ভব নয়। এমন কাজে বাইরে গেলে ইতিকাফ নষ্ট হবে না।
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - ইতিকাফ
২১০১-[৫] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার ’উমার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলেন, (হে আল্লাহর রসূল!) জাহিলিয়্যাতের যুগে আমি এক রাতে মসজিদে হারামে ইতিকাফ করার মানৎ করেছিলাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমার মানৎ পুরা করো। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ الْاِعْتِكَافِ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ: أَنَّ عُمَرَ سَأَلَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: كُنْتُ نَذَرْتُ فِي الْجَاهِلِيَّةِ أَنْ أَعْتَكِفَ لَيْلَةً فِي الْمَسْجِد الْحَرَام؟ قَالَ: «فأوف بِنَذْرِك»
ব্যাখ্যা: উল্লেখিত হাদীস দ্বারা দলীল গ্রহণ করা যায় যে, সিয়াম ছাড়াই ইতিকাফ করা বৈধ। কেননা রাত তো সিয়ামের সময় নয়, আর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানৎ যে গুণাবলীতে আবশ্যক সে গুণাবলীতে পূর্ণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। (অর্থাৎ- আলোচ্য হাদীস ইবনু ‘উমার রাতে ইতিকাফের মানৎ করেছিলেন) ‘আল্লামা হাফেয আসকালানী (রহঃ) বলেন, ইতিকাফের জন্য যদি সিয়াম শর্ত হত তবে অবশ্যই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিতেন। বলা হয় যে, ইতিকাফের জন্য সিয়ামের নির্দেশ বর্ণিত রয়েছে, বিশুদ্ধ সানাদে ‘আবদুল্লাহ বিন বুদায়ল এর সূত্রে আবূ দাঊদ ও নাসায়ীতে রয়েছে, নিশ্চয়ই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, ইতিকাফ কর এবং সিয়াম রাখো।
আমি বলব যে, এটি আবূ দাঊদ, নাসায়ী, দারাকুত্বনী, বায়হাক্বী ও হাকিম প্রত্যেকেই ‘আবদুল্লাহ বিন বুদায়ল বিন ওয়ারাকা আল মাক্কী থেকে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু ‘আল্লামা হাফেয দারাকুত্বনী, ইবনু জুরায়জ ইবনু ‘উওয়াইনাহ্, হাম্মাদ বিন সালামাহ্ ও হাম্মাদ বিন যায়দ- সকলের দৃষ্টিতে তিনি য‘ঈফ। আর সহীহুল বুখারীতে ‘উবায়দুল্লাহ বিন ‘উমার হতে বর্ণিত রয়েছে যে, তিনি রাতে ইতিকাফ করলেন। অতএব প্রমাণিত হয় যে, ‘উমার (রাঃ) তার মানতের সিয়াম কিছু বৃদ্ধি করেননি। নিশ্চয়ই ইতিকাফের জন্য সিয়াম জরুরী নয় এবং তার জন্য নির্দিষ্ট কোন সিয়ামও নেই। এখানে লক্ষণীয় বিষয় যে, ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বিশুদ্ধ সানাদে বর্ণিত রয়েছে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাওয়ালের প্রথম দশকে ইতিকাফ করেছেন এবং ঈদুল ফিত্বরের দিনও তো তার অন্তর্ভুক্ত ছিল।
‘আল্লামা আল ইসমা‘ঈলী (রহঃ) বলেন, এখানে সিয়াম ছাড়া ইতিকাফ বৈধ হওয়ার দলীল রয়েছে। কেননা শাওয়ালের প্রথম তারিখে ঈদুল ফিত্বরের দিন আর এ দিনে সিয়াম রাখা হারাম। ‘আল্লামা শাওকানী (রহঃ) বলেন, ‘উমার (রাঃ)-এর হাদীস কাফির থেকে ইসলাম কবূলের পরে কাফির অবস্থায় কৃত মানৎ পূর্ণ করা ওয়াজিব হওয়ার দলীল, শাফি‘ঈ মাযহাবের কতক অনুসারী এ মতই গ্রহণ করছেন। জমহূরের মতে কাফিরের মানৎ সংঘটিত হবে না। তবে ‘উমার (রাঃ)-এর হাদীস তাদের বিরুদ্ধে দলীল।
পরিচ্ছেদঃ ৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ইতিকাফ
২১০২-[৬] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক রমাযানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন। কিন্তু এক বছর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তা করতে পারলেন না। এর পরের বছর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বিশ দিন ’ইতিকাফ’ করলেন। (তিরমিযী)[1]
عَنْ أَنَسٍ قَالَ: كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَعْتَكِفُ فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ فَلَمْ يَعْتَكِفْ عَامًا. فَلَمَّا كَانَ الْعَامُ الْمقبل اعْتكف عشْرين. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেন, এ হাদীস প্রমাণ করে যে, নির্ধারিত নফল ‘ইবাদাত ছুটে গেলে তা কাযা করতে হবে, যেমনঃ ফরয ছুটে গেলে তা কাযা করতে হয়। ‘আল্লামা আল কারী (রহঃ) বলেন, ফরয ‘ইবাদাতের কাযা ফরয এবং নাফলের কাযা আদায় করা নফল। ‘আল্লামা ‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী (রহঃ) বলেন, আমি বলব যে, এ হাদীসে এ মর্মে দলীল রয়েছে, যে ব্যক্তি ইতিকাফের প্রস্ত্ততি নিল, অতঃপর তা পালন সম্ভব হল না, তার জন্য তা কাযা করা মুস্তাহাব। কেননা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাযা করাটা তা মুস্তাহাব হওয়ার দলীল। ইমাম তিরমিযী (রহঃ) এ হাদীসটির উপর অধ্যায় বেঁধেছেন।
(باب ما جاء في الاعتكاف إذا خرج منه) অধ্যায়ঃ ইতিকাফ ছুটে যাওয়ার বিষয়ে যা বর্ণিত হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ইতিকাফ
২১০৩-[৭] আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ হাদীসটি উবাই ইবনু কা’ব (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন।[1]
وَرَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ عَنْ أَبِي بن كَعْب
ব্যাখ্যা: উবাই বিন কা‘ব (রাঃ) হতে বর্ণিত রয়েছে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কোন এক বছরে সফর করলেন বিধায় ইতিকাফ করতে পারলেন না। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আগামী বছরে ২০ দিন ইতিকাফ করলেন। ‘আল্লামা খাত্ত্বাবী (রহঃ) বলেন, নিশ্চয়ই নফল ‘ইবাদাত যখন ছুটে যাবে তখন তা কাযা আদায় করতে হবে। যেমনিভাবে ফরযের কাযা আদায় করতে হয় এবং এ দৃষ্টিকোণ থেকেই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আসরের সালাতের পর সে দুই রাক্‘আত সালাত (যুহরের পরের ২ রাক্‘আত) আদায় করলেন, যা থেকে তিনি প্রতিনিধি দলের আগমনের কারণে ব্যস্ত ছিলেন।
পরিচ্ছেদঃ ৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ইতিকাফ
২১০৪-[৮] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’ইতিকাফ’ করার নিয়্যাত করলে (প্রথম) ফজরের সালাত আদায় করতেন। তারপর ইতিকাফের স্থানে প্রবেশ করতেন। (আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا أَرَادَ أَنْ يَعْتَكِفَ صَلَّى الْفَجْرَ ثُمَّ دَخَلَ فِي مُعْتَكَفِهِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ
ব্যাখ্যা: নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের সালাতের পর নিজেকে মুক্ত করতেন (অর্থাৎ- ইতিকাফের জায়গায় প্রবেশ করতেন) কিন্তু এটাই ইতিকাফের সময়ের শুরু নয়। বরং তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ২১ রাতর সূর্য অস্ত যাওয়া থেকে ইতিকাফ করতেন। তা না হলে ইতিকাফ ১০ দিন পূর্ণ হবে না। সে ব্যাপারে বর্ণিত রয়েছে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১০ দিন পূর্ণ ইতিকাফ করতেন। আর ১০ দিন কিংবা একমাস পূর্ণ ইতিকাফের ইচ্ছা পোষণকারীর জন্য এটাই জমহূর ‘উলামাগণের নিকট অগ্রগণ্য, আর চার ইমামগণ এমন কথাই বলেছেন। আল হাফেয আল ‘ইরাক্বী এটা উল্লেখ করেছেন এবং শারহু জামিউস্ সগীরেও অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে।
আমি (‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী) বলব যে, জমহূর ‘উলামাগণ ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীসের ব্যাখ্যা করেছেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইতিকাফের নিয়্যাতে মসজিদে প্রবেশ করতেন রাতের প্রথমাংশে কিন্তু তার জন্য প্রস্ত্ততকৃত স্থানে নির্জনে (ইতিকাফের স্থলে) যেতেন ফজর সালাতের পর। ফজর উদিত হওয়ার সময় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদেই থাকতেন। আর ইতিকাফের জন্য প্রস্ত্ততকৃত স্থানে ফজর সালাতের পরে যেতেন। আর জমহূর ‘উলামাগণ উল্লেখিত ব্যাখ্যা প্রণয়ন করেছেন, নিম্নে বর্ণিত দু’টি হাদীসের উপর ‘আমল করার স্বার্থে-
১. সহীহুল বুখারীতে ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন।
২. আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযানে ১০ দিন ইতিকাফ করতেন। প্রথম হাদীসে পাওয়া যায় ১০ রাত আর দ্বিতীয় হাদীসে রয়েছে ১০ দিন। এ উভয় হাদীসের সমন্বয়ে উল্লেখিত ব্যাখ্যা তারা প্রদান করেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ইতিকাফ
২১০৫-[৯] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইতিকাফ অবস্থায় হাঁটতে হাঁটতে পথের এদিক সেদিক না গিয়ে ও না দাঁড়িয়ে রোগীর অবস্থা জিজ্ঞেস করতেন। (আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَعُودُ الْمَرِيضَ وَهُوَ مُعْتَكِفٌ فَيَمُرُّ كَمَا هُوَ فَلَا يُعَرِّجُ يَسْأَلُ عَنْهُ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ
ব্যাখ্যা: এখানে দলীল রয়েছে যে, ইতিকাফকারী যখন বৈধ কোন কারণে বের হবে, যেমন মানবীয় প্রয়োজন। অতঃপর অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করল কিংবা জানাযায় শারীক হলো। যদি তার বের হওয়াটা উক্ত ইচ্ছায় না হয়। অর্থাৎ- জানাযায় কিংবা রোগীর সেবা করার ইচ্ছায় যদি বের না হয়, তবে তাতে কোন ক্ষতি হবে না এবং ইতিকাফ নষ্টও হবে না- এ ব্যাপারে চার ইমামগণ একমত।
পরিচ্ছেদঃ ৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ইতিকাফ
২১০৬-[১০] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, ইতিকাফকারীর জন্য এ নিয়ম পালন করা জরুরী- (১) সে যেন কোন রোগী দেখতে না যায়। (২) কোন জানাযায় শারীক না হয়। (৩) স্ত্রী সহবাস না করে। (৪) স্ত্রীর সাথে ঘেঁষাঘেষি না করে। (৫) প্রয়োজন ছাড়া কোন কাজে বের না হয়। (৬) সওম ছাড়া ইতিকাফ না করে এবং (৭) জামি’ মাসজিদ ছাড়া যেন অন্য কোথাও ইতিকাফে না বসে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن عَائِشَة رَضِي الله عَنْهَا قَالَتْ: السُّنَّةُ عَلَى الْمُعْتَكِفِ أَنْ لَا يَعُودَ مَرِيضًا وَلَا يَشْهَدُ جِنَازَةً وَلَا يَمَسُّ الْمَرْأَةَ وَلَا يُبَاشِرُهَا وَلَا يَخْرُجُ لِحَاجَةٍ إِلَّا لِمَا لابد مِنْهُ وَلَا اعْتِكَافَ إِلَّا بِصَوْمٍ وَلَا اعْتِكَافَ إِلَّا فِي مَسْجِدٍ جَامِعٍ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যা: উল্লেখিত হাদীসটি এ মর্মে দলীল, ইতিকাফকারী রোগীর সেবা ও জানাযায় উপস্থিত হওয়ার জন্য বের হতে পারবে না- এ মর্মে ‘উলামাগণের মাঝে ইখতিলাফ রয়েছে।
‘আল্লামা আল খিরক্বী (রহঃ) বলেন, ইতিকাফকারী ব্যক্তি রোগীর সেবা ও জানাযায় অংশগ্রহণ করতে পারবে, না তবে যদি এ বিষয়ে শর্ত করে তবে পারবে। (অর্থাৎ- রোগীর সেবা করা ও জানাযায় শারীক হওয়াটা যদি ইতিকাফের শর্ত হয়, তবে রোগীর সেবা কিংবা জানাযায় শারীক হতে পারবে।)
‘আল্লামা ‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী (রহঃ) বলেন, যারা ইতিকাফের ক্ষেত্রে কোন শর্তের কথা বলেননি তাদের কথাই আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য। কারণ ইতিকাফে শর্তারোপ করা সহীহ, য‘ঈফ, আসার এমনকি বিশুদ্ধ কোন কিয়াস দ্বারাও প্রমাণিত নয়। আমাদের কাছে প্রাধান্য কথা হলো, রোগীর সেবা করা কিংবা জানাযার জন্য বের হওয়া জায়িয নেই, চাই ইতিকাফ ওয়াজিব বা ওয়াজিব নয়, যেমন ইতিকাফ হোক। কেননা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইতিকাফ থেকে রোগীর সেবা ও জানাযার সালাতের উদ্দেশে বের হননি। আর তার ইতিকাফ ওয়াজিব ছিল না। ‘আল্লামা নাবাবী (রহঃ) বলেন, ওয়াজিব ইতিকাফের ক্ষেত্রে রোগীর সেবা ও জানাযায় গমন করা জায়িয নেই। তবে নাফলের ক্ষেত্রে তা জায়িয। আশ্ শামিল প্রণেতা বলন, এটা স্পষ্ট সুন্নাহ পরিপন্থী। কেননা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইতিকাফ থেকে রোগীর সেবা ও জানাযায় বের হতেন না। আর তার ইতিকাফ ছিল নফল, মানৎ-এর ইতিকাফ (ওয়াজিব) নয়।
পরিচ্ছেদঃ ৯. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ইতিকাফ
২১০৭-[১১] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইতিকাফ করার সময় তাঁর জন্য মসজিদে বিছানা পাতা হত। সেখানে তাঁর জন্য ’তাওবার’ খুঁটির পেছনে খাট লাগানো হত। (ইবনু মাজাহ)[1]
عَنِ ابْنِ عُمَرَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ كَانَ إِذَا اعْتَكَفَ طُرِحَ لَهُ فِرَاشُهُ أَوْ يُوضَعُ لَهُ سَرِيرُهُ وَرَاءَ أسطوانه التَّوْبَة. رَوَاهُ ابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: উল্লেখিত হাদীসটি এ মর্মে দলীল যে, ইতিকাফকারীর জন্য মসজিদে খাট রাখা কিংবা বিছানা বিছানো জায়িয। ইতিকাফের ক্ষেত্রে মসজিদের নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থানও জায়িয।
নাফি' থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইবনু ‘উমার (রাঃ) আমাকে উক্ত স্থান দেখিয়েছেন, মসজিদের যে স্থানে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইতিকাফ করতেন।
পরিচ্ছেদঃ ৯. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ইতিকাফ
২১০৮-[১২] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইতিকাফকারী সম্পর্কে বলেছেন যে, ইতিকাফকারী ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে বাইরে থেকে সকল নেক কাজ করে, গুনাহ হতে বেঁচে থাকে-তার জন্য নেকী লেখা হয়। (ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ فِي الْمُعْتَكَفِ: «هُوَ يَعْتَكِفُ الذُّنُوبَ وَيُجْرَى لَهُ مِنَ الْحَسَنَاتِ كَعَامِلِ الْحَسَنَات كلهَا» . رَوَاهُ ابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: (وَيُجْزٰى لَه مِنَ الْحَسَنَاتِ) অর্থাৎ- ইতিকাফের কারণে যে সকল সৎকর্ম থেকে বিরত থেকেছে, যেমন রোগীর সেবা, জানাযায় শারীক হওয়া ও ভ্রাতৃত্ববন্ধন বৃদ্ধি করা ইত্যাদি এসব কিছুর প্রতিদান তাকে দান করা হবে। আর হাদীসটি যেহেতু য‘ঈফ, সুতরাং এ ধরনের ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই।