পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - শিঙ্গায় ফুৎকার
৫৫২১-[১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: দুটি ফুঁকের মধ্যখানে দূরত্ব হবে চল্লিশ। লোকেরা প্রশ্ন করল, হে আবূ হুরায়রাহ্! চল্লিশ দিন? তিনি বললেন, আমি উত্তর দিতে অপারগ। (অর্থাৎ আমি জানি না) তারা প্রশ্ন করল, চল্লিশ মাস? তিনি বললেন, আমি উত্তর দিতে অস্বীকার করি। লোকেরা প্রশ্ন করল, চল্লিশ বছর? তিনি বললেন, আমি জবাব দিতে অস্বীকার করি। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তখন মৃত দেহগুলো এমনভাবে জীবিত হয়ে উঠবে, যেমনিভাবে (বৃষ্টির পানিতে) ঘাস-লতা ইত্যাদি গজিয়ে উঠে। অতঃপর তিনি (সা.) বলেছেন, মেরুদণ্ডের নিম্নাংশের একটি হাড় ছাড়া মানবদেহের সকল কিছুই মাটিতে গলে বিলীন হয়ে যাবে এবং কিয়ামতের দিন সেই হাড্ডি হতে গোটা দেহের পুনর্গঠন করা হবে। (বুখারী ও মুসলিম)
আর মুসলিম-এর অপর এক বর্ণনায় আছে, তিনি (নবী সা.) বলেছেন: মাটি আদম সন্তানের প্রতিটি অংশ খেয়ে ফেলবে, তবে তার মেরুদণ্ডের নিম্নাংশ খাবে না। তা হতেই মানবদেহ সৃষ্টি করা হয়েছে এবং (কিয়ামতের দিন) তা হতে তাকে পত্তন করা হবে।
الفصل الاول (بَاب النفخ فِي الصُّور )
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا بَيْنَ النَّفْخَتَيْنِ أَرْبَعُونَ» قَالُوا: يَا أَبَا هُرَيْرَةَ أَرْبَعُونَ يَوْمًا؟ قَالَ: أَبَيْتُ. قَالُوا: أَرْبَعُونَ شَهْرًا؟ قَالَ: أَبَيْتُ. قَالُوا: أَرْبَعُونَ سَنَةً؟ قَالَ: أَبَيْتُ. «ثُمَّ يَنْزِلُ اللَّهُ مِنَ السَّمَاءِ مَاءٌ فَيَنْبُتُونَ كَمَا يَنْبُتُ الْبَقْلُ» قَالَ: «وَلَيْسَ مِنَ الْإِنْسَانِ شَيْءٌ لَا يَبْلَى إِلَّا عَظْمًا وَاحِدًا وَهُوَ عَجْبُ الذَّنَبِ وَمِنْهُ يُرَكَّبُ الْخَلْقُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ. وَفِي رِوَايَةٍ لِمُسْلِمٍ قَالَ: «كُلُّ ابْنِ آدَمَ يَأْكُلُهُ التُّرَابُ إِلَّا عَجْبَ الذَّنَبِ مِنْهُ خُلِقَ وَفِيهِ يركب»
متفق علیہ ، رواہ البخاری (4814) و مسلم (141 / 2955، (7414) و الروایۃ الثانیۃ 142 / 2955)، (7415) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: (مَا بَيْنَ النَّفْخَتَيْنِ) দু' ফুঁকের মাঝে অর্থাৎ মেরে ফেলার ফুক ও জীবিত করার ফুঁকের মাঝে ব্যবধান হবে চল্লিশ।
(أَبَيْتُ) অস্বীকার করলাম। অর্থাৎ আমি জবাব দানে অপারগ হলাম। কারণ আমি জানি না কোনটি সঠিক। কাযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এর অর্থ হলা দু ফুকের মধ্যবর্তী সময়ের ব্যবধান চল্লিশ বলতে কী বুঝানো হয়েছে তা আমি জানি না, সেটা চল্লিশ দিন, না চল্লিশ মাস, নাকি চল্লিশ বছর? তাই আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপরে মিথ্যা বলা থেকে এবং যা আমি জানি না সেটা সম্পর্কে বর্ণনা থেকে বিরত থাকলাম। ফাতহুল বারী ভাষ্যকার বলেন, (أَبَيْتُ) এর অর্থ হলো চল্লিশ সংখ্যা থেকে উদ্দেশ্য দিন, না মাস, না বছর তা নিশ্চিতভাবে বলতে রাযী হলাম না বরং আমি নিশ্চিতভাবে বললাম যে, তা শুধু চল্লিশই ছিল।
(فَيَنْبُتُونَ) বৃষ্টিতে সৃষ্টজীবের দেহগুলো গজিয়ে উঠবে। এ কথা সুস্পষ্ট যে, এ ঘটনা ঘটবে দ্বিতীয় ফুৎকার দেয়ার পরে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
(كُلُّ ابْنِ آدَمَ يَأْكُلُهُ) বানী আদম-এর দেহের সকল অংশকেই মাটি খেয়ে ফেলবে শুধু একটি হাড্ডি ব্যতীত। এটা বিশেষ হাড্ডি। যেমন বিশেষভাবে নবী-রাসূলদের দেহকে মাটিতে খাওয়া আল্লাহ তা'আলা হারাম করেছেন।
(عَجْبَ الذَّنَبِ) আইন বর্ণে যবর ও জিম বর্ণে সুকূন যোগে এটা এমন সূক্ষ্ম-মিহি হাড্ডি যা পৃষ্ঠদেশের সর্বনিন্মে অবস্থিত। আর সেটা হলো মেরুদণ্ডের হাড়ের নীচের মাথা। আদম সন্তানের এই হাড্ডি সর্বপ্রথম সৃষ্টি করা হয়। আর এ অংশটুকু অবশিষ্ট থেকে যায় যাতে তার উপর সৃষ্টজীবকে পুনরায় গঠন করা যায়। (ফাতহুল বারী ১৮ খণ্ড, হা. ২৯৫৫)
মিশকাতের (উর্দু অনুবাদে) ব্যাখ্যায় অনুরূপ লিখা হয়েছে, (عَجْبَ الذَّنَبِ) এমন হাড্ডিকে বলা হয় যেখান থেকে জানোয়ারদের লেজ বের হয়। মানব শরীরের এই হাড্ডিকে নিতম্বের হাড় বলা হয়। মানুষের সমস্ত দেহ মাটিতে মিশে যাবে কিন্তু এ হাড্ডি ব্যতীত। মায়ের পেটে মানুষকে সৃষ্টি করার সময় প্রথমে এখান থেকে শুরু করা হয়। কিয়ামতের সময় এ হাড্ডি থেকে দেহ গঠন করা শুরু হবে। সমস্ত দেহের অঙ্গগুলো এর সাথে যুক্ত হয়ে যেমন দেহ ছিল তেমনভাবে প্রস্তুত হবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ - মুম্বাই ছাপা, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৩৭৬)।
মিরকাত ভাষ্যকার বলেন, কোন হাদীসে এসেছে, এ অংশকে সর্বপ্রথম সৃষ্টি করা হয় এবং এ অংশ সর্বশেষ জীর্ণ করা হয়। এর রহস্য হলো এটা মানবদেহের ভিত্তি। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - শিঙ্গায় ফুৎকার
৫৫২২-[২] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন জমিনকে মুষ্ঠির মধ্যে নিয়ে নেবেন, আর আকাশকে ডান হাতে পেঁচিয়ে নেবেন। অতঃপর বলবেন, আমিই বাদশাহ, দুনিয়ার বাদশাহগণ কোথায়? (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب النفخ فِي الصُّور )
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَقْبِضُ اللَّهُ الْأَرْضَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَيَطْوِي السَّمَاءَ بِيَمِينِهِ ثُمَّ يَقُولُ: أَنَا الْمَلِكُ أَيْنَ مُلُوكُ الْأَرْضِ؟ . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (4812) و مسلم (23 / 2787)، (7050) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: (الْمَلِكُ) এখানে দুটি অর্থের সম্ভাবনা রয়েছে। (এক) এর অর্থ ক্ষমতা। তখন সেটা আল্লাহর সত্তাগত গুণ হিসেবে গণ্য হবে। (দুই) তার অর্থ জোর খাটানো বা পরিবর্তন করা। তখন এটা কর্মগত গুণ হিসেবে ধর্তব্য হবে। এ হাদীসে আল্লাহর ডান হাতের প্রমাণ বিদ্যমান যা আল্লাহর জাতের গুণের অন্যতম। তবে তার হাত কোন মাখলুকের হাতের মতো নয়, যেমনটি মুজাসসামাহ তথা কায়াবাদীগণ আকৃতি বর্ণনা করে থাকে। এ হাদীস দ্বারা জামিয়াদের মতো খণ্ডন হয়ে যায়। কারণ সব সৃষ্টি মরে যাওয়ার পরে ধ্বংস হয়ে গেলে কোন কিছু আর মাখলুক হিসেবে থাকে না, তাহলে কিভাবে আল্লাহর কালামকে মাখলুক বলা যাবে? যখন কেউ থাকবে না তখন আল্লাহ বলবেন: আজ কার রাজত্ব? যখন কেউ উত্তর দেয়ার থাকবে না। তখন আল্লাহ তা'আলা নিজেই নিজের উত্তর দিয়ে বলবেন, প্রতাপশালী এক আল্লাহর জন্যই সবকিছু। আর যারা বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহ তা'আলা কথাকে সৃষ্টি করেন, অতঃপর যাকে ইচ্ছা তাকে শুনিয়ে থাকেন তাদের মতটিও এর দ্বারা বাতিল হয়ে যায়। কারণ যখন আল্লাহ তা'আলা এ কথা বলবেন তখন কোন মাখলুক জীবিত থাকবে না। সেজন্য তিনি নিজেই স্বীয় উত্তর দিয়ে বলবেন, (..لِلّٰهِ الۡوَاحِدِ الۡقَهَّارِ) “অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার অধিকারী এক ও একক আল্লাহর”- (সূরাহ্ ইউসুফ ১২: ৩৯, সোয়াদ ৩৮: ৫, আহ্ যুমার ৩৯: ৪, আল মু'মিন ৪০: ১৬)। অতএব প্রমাণ হলো যে, তিনি এসব কথা বলবেন। আর তার কথাগুলো হচ্ছে। তাঁর সত্তাগতগুণ যা মাখলুক নয়।
ইসহাক ইবনু রহ্ওয়াই বলেন: এ কথা সঠিক যে, কুল মাখলুক ধ্বংস হবার পরে আল্লাহ বলবেন, আজ কার রাজত্ব? যখন এর উত্তর কেউ দিবে না তখন আল্লাহ স্বীয় জবাবে বলবেন, (..لِلّٰهِ الۡوَاحِدِ الۡقَهَّارِ) ..”প্রবল পরাক্রান্ত এক আল্লাহর”- (সূরাহ্ আল মু'মিন ৪০: ১৬)।
হিশাম ইবনু উবায়দুল্লাহ -এর বর্ণনায় রয়েছে: তিনি বলেন, যখন সমস্ত সৃষ্টিজীব মারা যাবে এবং আল্লাহ ব্যতীত যখন কেউ বাকী থাকবে না, তখন আল্লাহ বলবেন, (لِمَنِ الۡمُلۡکُ الۡیَوۡمَ) “আজ একচ্ছত্র কর্তৃত্ব কার?” (সূরাহ্ আল মু'মিন ৪০: ১৬)। কিন্তু কেউ এর উত্তর দিবে না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা নিজের কথার জবাব নিজে দিয়ে বলবেন, (..ِلِلّٰهِ الۡوَاحِدُ الۡقَهَّارُ)। অতএব এটা আল্লাহ তা'আলার কথা এতে কারো সন্দেহ নেই। আর এটা কোন ওয়াহীও নয়। কারণ সব প্রাণ মৃত্যুর করাল গ্রাসে নিপতিত হয়েছে, অতএব আল্লাহ নিজেই এর উত্তর দিবেন। (ফাতহুল বারী ১৩ খণ্ড, হা. ৭৩৮২)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - শিঙ্গায় ফুৎকার
৫৫২৩-[৩] ’আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন আসমানসমূহকে গুটিয়ে নেবেন, অতঃপর তাকে ডান হাতে রেখে বলবেন, আমিই বাদশাহ, কোথায় দুনিয়ার অহংকারী ও স্বৈরাচারী যালিমরা? অতঃপর বাম হাতে জমিনসমূহকে গুটিয়ে নিবেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, অপর হাতে নিয়ে বলবেন, আমিই বাদশাহ, কোথায় স্বৈরাচারী অবিচার ও অহংকারীগণ। (মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب النفخ فِي الصُّور )
وَعَن عبد الله بن عَمْرو قَالَ: قا ل رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَطْوِي اللَّهُ السَّمَاوَاتِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ثُمَّ يَأْخُذُهُنَّ بِيَدِهِ الْيُمْنَى ثُمَّ يَقُولُ: أَنَا الْمَلِكُ أَيْنَ الْجَبَّارُونَ؟ أَيْنَ الْمُتَكَبِّرُونَ؟ ثُمَّ يَطْوِي الْأَرَضِينَ بِشِمَالِهِ - وَفِي رِوَايَة: يَأْخُذُهُنَّ بِيَدِهِ الْأُخْرَى - ثُمَّ يَقُولُ: أَنَا الْمَلِكُ أينَ الجبَّارونَ أينَ المتكبِّرونَ؟ . رَوَاهُ مُسلم
رواہ مسلم (24 / 2788)، (7051) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: আল্লাহর দুই হাতকে কুদরত অর্থে প্রয়োগ করা বাতিল ব্যাখ্যা। আর এ কাজকে দুই হাত দ্বারা সমাধা করার ইঙ্গিত হাদীসে দেয়া হয়েছে। কারণ আমাদের কাজকর্ম দুই হাত দ্বারাই সম্পাদন হয়। তাই যা দিয়ে বুঝব তা দ্বারা আমাদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। যাতে আমাদের অন্তকরণে বিষয়টি আরো অধিক স্পষ্ট হয়ে যায়। আর এখানে ডান ও বাম হাতের উল্লেখ হয়েছে যাতে উদাহরণটি পূর্ণতা লাভ করে। কারণ আমরা যা কিছু ভালো তা ডান হাত দ্বারা সমাধা করি এবং অন্যগুলো বাম হাত দ্বারা সম্পাদন করি। আর আমাদের ক্ষেত্রে ডান হাত বেশি শক্তিশালী যতটুকু শক্তিশালী বাম হাত নয়। বুঝা গেল, আসমানসমূহ জমিনের তুলনায় বেশি বড় তাই তাকে ডান হাতের সাথে যুক্ত করা হয়েছে এবং জমিনকে বাম হাতের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। যদিও আল্লাহর কোন হাতেই কোন কিছু ভারী নয় এবং কোন হাত দুর্বল নয়। আর আল্লাহ তা'আলা এমন গুণে গুণান্বিত নন যে, কোন কিছু তার নিকটে অধিক ভারী বা কঠিন। (শারহু নাবাবী ১৭ খণ্ড, হা, ২৭৮৮)
সহীহ মুসলিম-এর অপর বর্ণনায় রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বীয় হাতকে মুষ্টিবদ্ধ করলেন, অতঃপর হাতকে মুড়ালেন ও খুললেন। এ হাদীস থেকে ভালোভাবে প্রমাণ হয় যে, আল্লাহর সিফাতের ক্ষেত্রে যে হাতের উল্লেখ রয়েছে তা দ্বারা হাতই উদ্দেশ্য। কিন্তু এই হাতকে কুদরতের ব্যাখ্যা করা বাতিল। এজন্য যে, নবী (সা.) সাহাবীদেরকে হাত, মুষ্টিবদ্ধ করে দেখিয়েছেন। এতে তাদের কোন আশ্চর্যের কারণ ছিল না। এতেই বুঝা গেল, সাহাবীদের ও আক্বীদাহ্ এটাই ছিল। আরো বুঝা গেল আল্লাহ তা'আলা যেমন স্বীয় সত্তার ক্ষেত্রে যেভাবে গুণান্বিত, অনুরূপভাবে হাত মুবারকের ক্ষেত্রেও তেমনভাবে গুণান্বিত। (মিশকাতুল মাসাবীহ - মুম্বাই ছাপা, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৩৭৭)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - শিঙ্গায় ফুৎকার
৫৫২৪-[8] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন জনৈক ইয়াহূদী পাদ্রি নবী (সা.) -এর কাছে এসে বলল, হে মুহাম্মাদ! আমরা (তাওরাতে) পেয়েছি যে, আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন আকাশমণ্ডলীকে এক আঙ্গুলের উপর স্থাপন করবেন। জমিনকে এক আঙ্গুলের উপর, পর্বতমালা ও গাছসমূহকে এক আঙ্গুলের উপর, পানি এবং কাদা-মাটিকে এক আঙ্গুলের উপর, আর অন্যান্য সমস্ত সৃষ্টিজগতকে এক আঙ্গুলের উপর রাখবেন। অতঃপর এ সমস্ত কিছুকে নাড়া দিয়ে বলবেন, আমিই বাদশাহ, আমিই আল্লাহ! ইয়াহুদী পাদ্রির কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) এই বিস্ময়ে হয়ে হেসে ফেললেন, তিনি যেন তার কথার সত্যতা স্বীকার করলেন। অতঃপর তিনি (সা.) কুরআনের এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন- (وَ مَا قَدَرُوا اللّٰهَ حَقَّ قَدۡرِهٖ ٭ۖ وَ الۡاَرۡضُ جَمِیۡعًا قَبۡضَتُهٗ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ وَ السَّمٰوٰتُ مَطۡوِیّٰتٌۢ بِیَمِیۡنِهٖ ؕ سُبۡحٰنَهٗ وَ تَعٰلٰی عَمَّا یُشۡرِکُوۡنَ) - “আল্লাহ তা’আলার যতটুকু সম্মান করা দরকার ছিল তারা ততটুকু সম্মান করেনি, অথচ কিয়ামতের দিন সম্পূর্ণ পৃথিবী তাঁর মুষ্টিতে থাকবে এবং আকাশমণ্ডলী ডান হাতে গুটানো থাকবে। তিনি পবিত্র, তারা যাকে শরীক করে তিনি তার উর্ধ্বে"- (সূরা আয যুমার ৩৯: ৬৭)। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب النفخ فِي الصُّور )
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: جَاءَ حَبْرٌ مِنَ الْيَهُودِ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا مُحَمَّدُ إِنَّ اللَّهَ يُمْسِكُ السَّمَاوَاتِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى أُصْبُعٍ وَالْأَرَضِينَ عَلَى أُصْبُعٍ وَالْجِبَالَ وَالشَّجَرَ عَلَى أُصْبُعٍ وَالْمَاءَ وَالثَّرَى عَلَى أُصْبُعٍ وَسَائِرَ الْخَلْقِ علىأصبع ثُمَّ يَهُزُّهُنَّ فَيَقُولُ: أَنَا الْمَلِكُ أَنَا اللَّهُ. فَضَحِكَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَعَجُّبًا مِمَّا قَالَ الْحَبْرُ تَصْدِيقًا لَهُ. ثُمَّ قَرَأَ: (وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ وَالْأَرْضُ جَمِيعًا قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَالسَّماوَاتُ مَطْوِيَّاتٌ بِيَمِينِهِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يشركُونَ) مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (4811) و مسلم (19 / 2786)، (7046) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: ইয়াহুদী ‘আলিমের কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) বিস্মিত হয়ে হাসলেন এটা তার কথাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্য নয় বরং তাকে সত্যায়ন করার জন্য এবং তার কথার সঠিকতাকে জানার জন্য। (وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ) এর অর্থ মানুষ আল্লাহকে যেভাবে চেনা দরকার সেভাবে চেনে না। যেভাবে সম্মান করা প্রয়োজন। সেভাবে সম্মান দেখায় না এবং যেভাবে তার উপাসনা করা উচিত সে মতো উপাসনা করে না। এ হাদীস দ্বারা আল্লাহ তা'আলার আঙ্গুলের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়। যেমনভাবে কুরআন ও হাদীস থেকে তাঁর হাতের প্রমাণ রয়েছে। এর পূর্বেও বলা হয়েছে যে, আল্লাহর গুণাবলি সংক্রান্ত হাদীসগুলোর ব্যাপারে সালাফে সালিহীনদের ‘আক্বীদাহ্ এই যে, তারা এসব হাদীসকে প্রকাশ্য অর্থের উপর গ্রহণ করেন এবং তার উপর ঈমান আনেন।
আল্লাহ তা'আলার আকৃতিতে আল্লাহ তা'আলার ওপর সোপর্দ করেন এবং সাদৃশ্য প্রদান থেকে বিরত থাকেন। কোন কোন যুক্তিবিদ বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইয়াহুদী ‘আলিমের কথাকে রদ করার জন্য হেসেছিলেন, কিন্তু এ কথা ঠিক নয়। কারণ ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাস্উদ-সহ বড় বড় ফকীহ সাহাবী স্বয়ং এ রিওয়ায়াতে সত্যায়ন করেছেন। যদি তিনি (সা.) তার রূপদান করাকে বাধা দিতেন তাহলে নবী (সা.) এ আয়াত পাঠ করতেন না। অতএব পরিষ্কারভাবে বুঝা গেল যে, ঐ এসব যুক্তিবাদীরা চিন্তাভাবনা না করে মনের বশে পড়ে যা ইচ্ছা বলেছেন। এ ব্যাপারে সঠিক কথা হলো, আল্লাহ তা'আলার নাম ও গুণাবলি কী কী তা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত। অর্থাৎ যেসব নাম ও গুণাবলি কুরআন ও হাদীসে এসেছে সেগুলো স্বীকার করা এবং যা প্রমাণিত নয় তা না বলা উচিত। (মিশকাতুল মাসাবীহ মুম্বাই ছাপা, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৩৭৮)।
ক্বাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বীয় আঙ্গুলকে মুষ্টিবদ্ধ করলেন এবং সম্প্রসারিত করলেন আসমান ও জমিনকে মুষ্টিবদ্ধ ও সম্প্রসারিত করা হবে শুধুমাত্র মাখলুকের সাথে এর উদাহরণ দেয়ার জন্য।
তিনি আরো বলেন: আল্লাহ তা'আলার গুণাবলি সম্পর্কিত মুশকিল হাদীসগুলোর দ্বারা নবী (সা.)-এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লাহই অধিক অবগত। আমরা আল্লাহ ও তার গুণাবলির উপর বিশ্বাস রাখি। তার সাথে কোন কিছুর সাদৃশ্য দেই না। কারণ কুরআন মাজীদে বর্ণিত হয়েছে,
(لَیۡسَ کَمِثۡلِهٖ شَیۡءٌ ۚ وَ هُوَ السَّمِیۡعُ الۡبَصِیۡرُ) - “কোন কিছুই তাঁর সাদৃশ্য নয়, তিনি সব শোনেন, সব দেখেন”- (সূরাহ আশ শূরা ৪২: ১১)। আর রাসূলুল্লাহ (সা.) যা বলেছেন এবং তাঁর কাছ থেকে যা নিশ্চিত হয়েছেন তা সঠিক ও সত্য। তার জ্ঞান সম্পর্কে আমরা যতটুকু জানব তা মহান আল্লাহরই অনুগ্রহে আর যা আমাদের নিকটে অস্পষ্ট থাকবে তার উপর আমরা ঈমান আনব। আর এর প্রকৃত জ্ঞানকে মহান আল্লাহর। নিকটে সোপর্দ করব। (শারহুন নাবাবী ১৭ খণ্ড, হা. ২৭৮৮)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - শিঙ্গায় ফুৎকার
৫৫২৫-[৫] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে এ আয়াতের ব্যাখ্যা সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম (يَوْمَ تُبَدَّلُ الأرضُ غيرَ الأَرْض والسَّماواتُ) “যেদিন এ জমিনকে আরেক জমিনে রূপান্তরিত করা হবে এবং আকাশমণ্ডলীকে আরেক আকাশে”- (সূরাহ ইবরাহীম ১৪: ৪৮)। সেদিন সকল মানুষ কোথায় থাকবে? তিনি বললেন, ’পুলসিরাতের উপর। (মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب النفخ فِي الصُّور )
وَعَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: سَأَلَتْ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ قَوْلِهِ: (يَوْمَ تُبَدَّلُ الأرضُ غيرَ الأَرْض والسَّماواتُ) فَأَيْنَ يَكُونُ النَّاسُ يَوْمَئِذٍ؟ قَالَ: «عَلَى الصِّرَاطِ» . رَوَاهُ مُسلم
رواہ مسلم (29 / 2791)، (7056) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (تُبَدَّلُ الأرضُ...) শারহুস্ সুন্নাতে রয়েছে (تُبَدَّلُ) বলা হয় কোন জিনিসের অবস্থার পরিবর্তন হওয়া এবং (إِبْدَال) বলা হয় কোন কিছুকে অন্য জায়গায় স্থাপন করা।
‘আল্লামাহ্ ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: এ পরিবর্তন কখনো সত্তা বা অস্তিত্বে হয়ে থাকে। যেমন তোমার কথা (بَدَّلْتُ الدَّرَاهِمَ دَنَانِيرَ) আমি দিরহামকে দীনারে পরিবর্তন করলাম। আবার কখনো পরিবর্তন গুণের মধ্যে হয়ে থাকে। যেমন তোমার কথা (بَدَّلْتُ الْحَالَقَةَ خَاتَمًا) আমি আংটাকে আংটিতে রূপান্তরিত করলাম। যখন তুমি সেটাকে গলিয়ে আংটিতে পরিবর্তন করবে। জমিনের পরিবর্তন নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন, এ পরিবর্তনটা আসমান-জমিনের গুণের মধ্যে হবে। যেমন শিঙ্গার প্রসিদ্ধ হাদীসে বর্ণিত আছে যে, নবী (সা.) বলেছেন: আল্লাহ তা'আলা জমিনকে সমতল করে উকাযী চামড়ার মতো টানবেন যাতে কোন উচু নীচু না থাকে। আবার কেউ বলেন, পরিবর্তনটা অস্তিত্বে হবে। তখন জমিনকে অন্য এক অপরিচিতরূপে পরিবর্তন করা হবে। আবদুল্লাহ ইবনু মাস'ঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত একটি মারফু হাদীসে রয়েছে মানুষকে সাদা রঙের জমিনের উপর জমায়েত করা হবে তাতে খুনাখুনি ও পাপের কাজ হবে না। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
সাহল ইবনু সা'দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: কিয়ামতের দিন মানুষকে চ্যাপ্টা ও গোলাকার রুটির মতো সাদা মাটির জমিনে একত্রিত করা হবে। যেখানে কারো কোন চিহ্ন থাকবে না। (সহীহুল বুখারী)
‘আমর ইবনু মায়মূন (রাঃ) বলেন: এ জমিন পরিবর্তিত হয়ে যাবে এবং তা হবে সাদা রূপার মতো যাতে থাকবে না কোন রক্তারক্তি, না থাকবে কোন পাপকর্ম। ইবনু জারীর (রহিমাহুল্লাহ)-এর বর্ণনায় রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: সেদিন জমিন রৌপ্যের ন্যায় সাদা বরণ ধারণ করবে। আরেক বর্ণনায় রয়েছে, ঐ দিন জমিন ময়দার ন্যায় সাদা হবে। ‘আলী (রাঃ) বলেন, সেদিন জমিন হবে রৌপ্যের এবং আসমান হবে স্বর্ণের। উবাই ইবনু কা'ব (রাঃ) বলেন, সেদিন আসমান বাগান হয়ে থাকবে।
‘আবদুল্লাহ ইবনু মাস্'উদ (রাঃ) বলেন, কিয়ামতের দিন সারা জমিন আগুন হয়ে যাবে। এর পিছনে থাকবে জান্নাত, যার নি'আমাতরাশি বাইরে থেকে দেখা যাবে। (তাফসীর ইবনু কাসীর ৪র্থ খণ্ড, মাকতাবাতুস্ সফা, সূরাহ্ ইবরাহীম ৪৮ আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য)
(الصِّرَاطِ) জাহান্নামের উপরে অবস্থিত পুলকে সিরাত বলা হয়। যখন মানুষেরা হিসাবের জন্য অবস্থানস্থল ত্যাগ করার পর পুলের নিকট অন্ধকারে পৌছবে। যেমন ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে জিজ্ঞেস করা হলো যখন আসমান-জমিনকে পরিবর্তন করা হবে তখন মানুষেরা কোথায় থাকবে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তারা পুলের নিকট অন্ধকারের মধ্যে থাকবে। আর এ স্থানে মুনাফিকরা মু'মিনদের থেকে আলাদা হয়ে যাবে এবং মুমিনদের পিছে পড়বে ও মু'মিনরা এগিয়ে যাবে। তাদের মাঝে একটা দেয়ালের আড় হয়ে যাবে যাতে তারা মু'মিনদের নিকটে পৌছতে বাধাপ্রাপ্ত হয় । ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) মাসরূক-এর সূত্রে বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলা মানুষদেরকে কিয়ামতের দিন সমবেত করবেন, অতঃপর তাদেরকে স্বীয় ‘আমলের পরিমাণ অনুসারে নূর দান করবেন, কাউকে এর চাইতেও বেশি, কাউকে তার ডান হাতে খেজুর গাছের সমান দান করবেন, কাউকে তার ডান হাতে এর চাইতে কম। এমনকি সর্বশেষ জনকে তার পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলে নূর দান করা হবে যা একবার জ্বলে উঠবে আর একবার নিভে যাবে। যখন তা আলো দিবে তখন সে তার পা এগিয়ে নিবে। আর যখন নিভে যাবে সে দাড়িয়ে পড়বে। তারপর সে এবং অন্যরা পুলসিরাত পার হবে। পুল হবে তরবারির ধারের মত পিচ্ছিল ও স্খলনকারী।
তাদেরকে বলা হবে, তোমরা তোমাদের নূর অনুসারে পার হও। তাদের মধ্যে কেউ তারকা ছুটার গতির ন্যায়, কেউ বাতাসের গতির মতো, কেউ চোখের পলকে, আবার কেউ পুরুষদের দৌড়ের গতিতে। আবার কেউ ধীরে দৌড়ে পার হয়ে যাবে। তারা সবাই আমল অনুযায়ী পার হবে। এভাবে শেষে এক ব্যক্তি আসবে যার পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলের উপরে নূর থাকবে। এক হাত পড়ে যাবে আর এক হাত লেগে থাকবে এক পা পড়ে যাবে এবং এক পা লেগে থাকবে। আগুন তার পার্শ্বদেশকে ধরে ফেলবে। রাবী বলেন: অতঃপর তারা মুক্তি পাবেন। যখন তারা এখান থেকে রেহাই পাবে তখন তারা বলবে, আলহামদুলিল্লা-হ সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি আমাদেরকে তোমার কাছ থেকে মুক্তি দিয়েছেন তোমাকে দেখিয়ে দেয়ার পর। আর অবশ্যই আল্লাহ তা'আলা আমাদের এমন বস্তু দিয়েছেন যা আর কাউকে প্রদান করেননি। (হাকিম হা. ৩৪২৪, ৮৭৫১; শারহুল আকীদাতুত্ তহাবীয়া পৃ. ৩৪১-৪২)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - শিঙ্গায় ফুৎকার
৫৫২৬-[৬] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: কিয়ামতের দিন সূর্য ও চন্দ্রকে পেঁচিয়ে নেয়া হবে। (বুখারী)
الفصل الاول (بَاب النفخ فِي الصُّور )
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الشَّمْسُ وَالْقَمَرُ مُكَوَّرَانِ يَوْم الْقِيَامَة» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
رواہ البخاری (3200) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (التَّكْوِير) অর্থ (اللَّفُّ) গুটানো, জড়ানো, মোড়ানো। এখান থেকেই (تَكْوِيرُ الْعِمَامَةِ) (পাগড়ি পেঁচানো)। আল্লাহ তা'আলা বলেন, (یُکَوِّرُ الَّیۡلَ عَلَی النَّهَارِ) “রাত দিনকে ঢেকে নেয়”- (সূরা আয যুমার ৩৯: ৫)।
এটা একত্রিত হওয়ার অর্থে ব্যবহৃর হয়। যেমন কুরআনে এসেছে, (وَ جُمِعَ الشَّمۡسُ وَ الۡقَمَرُ) “সূর্য আর চাঁদকে একত্রে জুড়ে দেয়া হবে”- (সূরাহ আল কিয়া-মাহ্ ৭৫:৯)।
‘আল্লামাহ্ তুরিবিশতী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: এখানে কয়েক অর্থের সম্ভাবনা রয়েছে- (এক) একত্রিত হওয়া বা মোড়ানো অর্থে। (দুই) উত্তোলন অর্থে। (তিন) যখন কোন কিছুকে নিক্ষেপ করে তখন তারা বলে, (طَعْنَةٌ مُكَوَّرَةٌ مِنْ كَوَّرِهِ) অর্থাৎ সূর্য ও চন্দ্রকে নিজ কক্ষপথ থেকে নিক্ষেপ করা হবে। এই অর্থ অধিকতর সামঞ্জস্যপূর্ণ। কেননা কোন কোন বর্ণনার শেষে (مُكَوَّرَانِ فِي النَّارِ) “জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে” রয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
ইবনু ওয়াহহাব কিতাবুল আহওয়ালে’ ‘আত্বা ইবনু ইয়াসার-এর সূত্রে আল্লাহর বাণী (وَ جُمِعَ الشَّمۡسُ وَ الۡقَمَرُ) “সূর্য আর চাঁদকে একত্রে জুড়ে দেয়া হবে”- (সূরাহ্ আল কিয়া-মাহ্ ৭৫: ৯); এর ব্যাখ্যায় বলেন, কিয়ামতের দিন চন্দ্র-সূর্যকে একত্রিত করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এ দুটোকে শাস্তি দেয়ার উদ্দেশে জাহান্নামে ফেলা হবে না। বরং দুনিয়াতে যারা এ দুটোর ইবাদত করেছে, তাদেরকে তিরস্কার করার জন্য। যাতে তারা বুঝতে পারে যে, চন্দ্র ও সূর্যের 'ইবাদত করা বাতিল ছিল। কেউ কেউ বলেন, এ দুটোকে জাহান্নাম থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। সেথায় আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। (ফাতহুল বারী হা. ৩২০০)
সূর্য ও চন্দ্রকে জড়ানো হবে যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে এবং এ পৃথিবী ধ্বংস হবে। তখন আর আলোর কোন প্রয়োজন থাকবে না। আর দ্বিতীয় কারণ এই যে, এগুলোর ক্ষতি ও ধ্বংসের কারণে এর উপাসনাকারীরা লজ্জিত হবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ - মুম্বাই ছাপা, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৩৭৮)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - শিঙ্গায় ফুৎকার
৫৫২৭-[৭] আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আমি কিভাবে আরাম-আয়েশে থাকতে পারি? অথচ শিঙ্গাওয়ালা (ইসরাফীল আলাইহিস সালাম) শিঙ্গা মুখে দাবিয়ে রেখেছেন, কান ঝুঁকিয়ে রেখেছেন, মাথা নুয়ে রেখেছেন। তিনি কেবল এ প্রতীক্ষায় রয়েছেন যে, তাতে ফুঁক দেয়ার জন্য কখন নির্দেশ দেয়া হয়। এ কথা শুনে লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল (সা.)! যখন অবস্থা এমনই, তাহলে আমাদেরকে কি করতে আদেশ দেন? তিনি (সা.) বললেন, তোমরা (حَسْبُنَا اللَّهُ ونِعمَ الْوَكِيل) (আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি উত্তম কার্য নির্বাহক) পড়তে থাক। (তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب النفخ فِي الصُّور)
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «كَيْفَ أَنْعَمُ وَصَاحِبُ الصُّورِ قَدِ الْتَقَمَهُ وَأَصْغَى سَمْعَهُ وَحَنَى جَبْهَتَهُ يَنْتَظِرُ مَتَى يُؤْمَرُ بِالنَّفْخِ» . فَقَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا تَأْمُرُنَا؟ قَالَ: قُولُوا: حَسْبُنَا اللَّهُ ونِعمَ الْوَكِيل . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
سندہ ضعیف ، رواہ الترمذی (2431 وقال : حسن ، 3243) * عطیۃ العوفی ضعیف
ব্যাখ্যা: (أَنْعَمُ) অর্থাৎ আমি খুশিতে থাকব কিভাবে? বা সুখী জীবন নিয়ে স্বাচ্ছন্দে জীবনযাপন করব কিভাবে? নিহায়াতে রয়েছে, এটা (نَعْمَة) (নূনে যবর যোগে) থেকে গৃহীত, এর অর্থ সুখ, আনন্দ, বিলাসিতা। (التقام) (মুখে বাঁশির মাথা রাখা) এবং (إِصْغَاءِ) (মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করা)।
ক্বাযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: এর অর্থ কিভাবে আমার জীবনযাপন সুখের হবে অথচ শিঙ্গায় ফুঁক দেয়ার সময় অতি আসন্ন। এর দ্বারা এ ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, বাঁশিওয়ালা তার মুখে বাঁশির মাথাকে রেখে প্রতিক্ষা করছে যাতে সে নির্দেশ দেয়া মাত্র ফুঁ দিতে পারে।
(حَسْبُنَا اللَّهُ) এটা মুবতাদা ও খবর অর্থাৎ (كَفِينَا اللَّهُ) “আল্লাহ আমাদের জন্য যথেষ্ট”। এখানে (مَخْصُوصُ بِالْمَدْح) উহ্য রয়েছে। যা মূলত ছিল (نِعْمَ الْمَوْكُولُ إِلَيْهِ اللَّهُ) মহাশক্তিশালী হিসেবে আল্লাহ উত্তম। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খণ্ড, হা. ২৪৩১)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - শিঙ্গায় ফুৎকার
৫৫২৮-[৮] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: ’সূর’ হলো একটি শিং যাতে ফুঁ দেয়া হবে। (তিরমিযী, আবূ দাউদ ও দারিমী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب النفخ فِي الصُّور)
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الصُّورُ قَرْنٌ يُنْفَخُ فِيهِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَالدَّارِمِيُّ
اسنادہ ضعیف ، رواہ الترمذی (2430 وقال : حسن صحیح) و ابوداؤد (4742) و الدارمی (2 / 325 ح 2801)
ব্যাখ্যা: (قَرْنٌ يُنْفَخُ) অর্থাৎ শিঙ্গায় ইসরাফীল আলায়হিস সালাম দু’বার ফুৎকার দিবেন। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খণ্ড, হা. ২৪৩০)
কেউ কেউ বলেন, শিঙ্গার মাথা আসমান ও জমিনের প্রস্থতার সমান। কেউ কেউ বলেন, শিঙ্গার মাথা আসমান ও জমিনের প্রস্থতার সমপরিমাণ গোলাকার। (মিশকাতুল মাসাবীহ - মুম্বাই ছাপা, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৩৭৯)।
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - শিঙ্গায় ফুৎকার
৫৫২৯-[৯] ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ তা’আলার বাণী- (فإِذا نُقر فِي النَّاقور) “যেদিন শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে”- (সূরাহ্ আল মুদ্দাসসির ৭৪: ৮)-এর মধ্যে (نَاقُورِ) (না-কূর) দ্বারা শিঙ্গা এবং (یَوۡمَ تَرۡجُفُ الرَّاجِفَۃُ ۙ) সেদিন ভূকম্পন প্রকম্পিত করবে”- (সূরা আন্ নাযি’আত ৭৯:৬)। এর মধ্যে (الرَّاجِفَۃُ ۙ) (রা-জিফাহ) দ্বারা প্রথম ফুৎকার এবং (تَتۡبَعُهَا الرَّادِفَۃُ ؕ) “তারপর আসবে আরেকটি ভূকম্পন”- (সূরা আন্ নাযি’আত ৭৯: ৭) (الرَّادِفَۃُ ؕ) (রা-দিফাহ) দ্বারা দ্বিতীয় ফুৎকারের অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে। (বুখারী)
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (بَاب النفخ فِي الصُّور)
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ فِي قَوْلِهِ تَعَالَى (فإِذا نُقر فِي النَّاقور) : الصّور قَالَ: و (الرجفة) : النَّفْخَةُ الْأُولَى وَ (الرَّادِفَةُ) : الثَّانِيَةُ. رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ فِي تَرْجَمَة بَاب
رواہ البخاری (کتاب الرقاق باب 43 قبل ح 6517 تعلیقًا) * اسندہ ابن جریر فی تفسیرہ (29 / 95) و سندہ ضعیف ، علی بن ابی طلحۃ عن ابن عباس : منقطع کما تقدم 5117) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (نَاقُورِ) থেকে উদ্দেশ্য শিঙ্গা। আয়াতের অর্থ হলো যখন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে সেদিন কাফিরদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে। (یَوۡمَ تَرۡجُفُ الرَّاجِفَۃُ ۙ) আয়াতে (راجِفَةُ) থেকে উদ্দেশ্য হলো এতে পৃথিবী ও পাহাড় নড়ে উঠবে এবং কম্পিত হবে। (راجِفَةُ) শব্দটি (رجف) থেকে বের হয়েছে। যার অর্থ নড়াচড়া করা, প্রকম্পিত হওয়া। (تَتۡبَعُهَا الرَّادِفَۃُ ؕ) আয়াতে (رَادِفَةُ) থেকে উদ্দেশ্য দ্বিতীয় ফুৎকার যা প্রথমটির পরে হবে। এর অর্থ একটি বস্তুর পরে আরেকটি পৌছা। (মিশকাতুল মাসাবীহ - মুম্বাই ছাপা, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৩৭৯)
‘আল্লামাহ্ ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, (الرَّاجِفَۃُ) হলো সে মহাপ্রলয় যখন আসমান জমিন প্রকম্পিত হবে। আর সেটা প্রথম ফুৎকারের সময় ঘটিতব্য অবস্থা সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। আর (الرَّادِفَۃُ ؕ) হলো সে মহাঘটনা যা প্রথমটার পরে সংঘটিত হবে। আর সেটা হচ্ছে দ্বিতীয় ফুৎকার।
(الصُّورُ) এর আলোচনা কুরআনের সূরাহ্ আ'আম, মু'মিনূন, নামল, যুমার, কাফ বিভিন্ন সূরায় একাধিকবার বর্ণিত হয়েছে। শব্দটি সোয়াদ বর্ণে পেশ ও ওয়াও বর্নে সুকূনযোগে। এভাবে প্রসিদ্ধ কিরাআতে ও হাদীসসমূহে রয়েছে। এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, দেহসমূহে ফুৎকার দেয়ার উদ্দেশ্য হলো যাতে আত্মাগুলো দেহে ফিরে আসে। তবারী একদল মানুষ থেকে বর্ণনা করে বলেন, তারা বলেন: শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া থেকে উদ্দেশ্য হলো দেহসমূহে যাতে আত্মাগুলো ফিরে আসে। যেমন আল্লাহ বলেন (وَ نَفَخۡتُ فِیۡهِ مِنۡ رُّوۡحِیۡ) “আর তাতে আমার পক্ষ হতে রুহ ফুঁকে দেব”- (সূরা আল হিজর ১৫: ২৯, সোয়াদ ৩৮:৭২)।
আবূ শায়খ ‘কিতাবুল উযমায় ওয়াহ্ ইবনু মুনাব্বিহ-এর সূত্রে বলেন, আল্লাহ তা'আলা শিঙ্গাকে সৃষ্টি করেছেন সাদা মতি দ্বারা নির্মল কাঁচপাত্রে, অতঃপর ‘আরশকে বললেন, শিঙ্গাকে নিয়ে ঝুলিয়ে রাখতে। তারপর বললেন, (كن) (হয়ে যাও)। এতে ইসরাফীল আলায়হিস সালাম সৃষ্টি হলেন। অতঃপর তিনি ইসরাফীলকে শিঙ্গা নিয়ে থাকার জন্য নির্দেশ দিলে তিনি তা গ্রহণ করলেন। তাতে সৃষ্টিকুলের রূহ সংখ্যক ছিদ্র রয়েছে। তারপর তিনি লম্বা হাদীস বর্ণনা করলেন। এতে আছে সমস্ত আত্মাকে শিঙ্গায় জমা করা হবে। অতঃপর আল্লাহ ইসরাফীল আলায়হিস সালাম-কে আদেশ দিলে তাতে ফুৎকার দিবেন। ফলে সব আত্মা দেহে প্রবেশ করবে। এভাবে প্রথমে শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে। (ফাতহুল বারী ১১ খণ্ড, ৪৩ নং অধ্যায় باب نفخ الصور এর তা'লীক)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - শিঙ্গায় ফুৎকার
৫৫৩০-[১০] আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) শিঙ্গা ফুৎকারকারীর (অর্থাৎ ইসরাফীল-এর) বর্ণনায় বলেছেন, তার ডান পার্শ্বে জিবরীল আলায়হিস সালাম এবং বাম পার্শ্বে মীকাঈল আলায়হিস সালাম থাকবেন।
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (بَاب النفخ فِي الصُّور)
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ: ذَكَرَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَاحِبُ الصُّورِ وَقَالَ: «عَن يَمِينه جِبْرِيل عَن يسَاره مِيكَائِيل»
ضعیف ، رواہ رزین (لم اجدہ) [و ابوداؤد (3999)] * عطیۃ العوفی ضعیف ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: তাফসীরে বায়যাবীতে (جِبْريْل) (জিবরীল) সম্বন্ধে আট রকম শব্দ রয়েছে। যার মধ্যে ৪টি প্রসিদ্ধ- [جِبْرءِيْل(١) جِبْرِيْلُ (٢) جِبَْرَءِيْلُ (٣) جَبْرِيْلُ (٤)] ('আওনুল মাবুদ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, হা. ৩৯১১ ও ৯২)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - শিঙ্গায় ফুৎকার
৫৫৩১-[১১] আবূ রযীন আল ’উক্কায়লী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তা’আলা তাঁর সৃষ্টিজগতকে কিভাবে পুনরুত্থান করবে, তার সৃষ্টির মধ্যে তার কোন চিহ্ন আছে কি? তিনি (সা.) বললেন, আচ্ছা বল দেখি। তুমি কি তোমার এলাকার (খরার সময়) কোন তৃণ মাঠের উপর দিয়ে অতিক্রম করনি? অতঃপর (বৃষ্টি বর্ষণের পরে) যখন তুমি সেই মাঠের উপর দিয়ে চলাচল কর তখন তা বাতাসে দোলায়িত তরতাজা ঘাস ইত্যাদিতে রূপান্তরিত হয়ে যায়? আমি বললাম, হ্যা দেখেছি। এবার তিনি (সা.) বললেন, আল্লাহর সৃষ্টিজগতে এটাই তার বাস্তব নিদর্শন। এভাবেই আল্লাহ তা’আলা মৃতকে জীবিত করবেন। (হাদীস দুটি রযীন রিওয়ায়াত করেছেন)
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (بَاب النفخ فِي الصُّور)
وَعَن أبي رزين الْعقيلِيّ قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ كَيْفَ يُعِيدُ الله الْخلق؟ مَا آيَةُ ذَلِكَ فِي خَلْقِهِ؟ قَالَ: «أَمَا مَرَرْتَ بِوَادِي قَوْمِكَ جَدْبًا ثُمَّ مَرَرْتَ بِهِ يَهْتَزُّ خَضِرًا؟» قُلْتُ: نَعَمْ. قَالَ: فَتِلْكَ آيَةُ اللَّهِ فِي خلقه (كَذَلِك يحيي اللَّهُ الْمَوْتَى) رَوَاهُمَا رزين
اسنادہ حسن ، رواہ رزین (لم اجدہ) [و احمد (4 / 11 ، 12 ح 16294 ، 16297)
ব্যাখ্যা: (جَدُبٌ) যেটা (الْخِصْبُ) (উর্বর)-এর বিপরীত। ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, (يَهْتَزُّ) অবস্থাসূচক বাক্য (خَضِرًا) শব্দটি (تَمْيِيز) এর ভিত্তিতে নসব হয়েছে। উপত্যকার গাছপালার সাথে (اهْتِزَازَ) শব্দের ব্যবহার দ্বারা সুন্দর চিত্রের প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে। যেমন বলা হয় (اهْتَزَّفُلَانٌ فَرَحًا) (অমুক ব্যক্তি আনন্দে আলোড়িত হয়েছে) অর্থাৎ সে কারণে চঞ্চল হয়েছে।
আর যে ব্যক্তি কোন বিষয়ে চঞ্চল হয় এবং আনন্দিত হয় সে তখন শিহরিত হয়। (فَتِلْكَ آيَةُ اللَّهِ) অর্থাৎ তার পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তাঁর ক্ষমতার নিদর্শন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ( وَ هُوَ الَّذِیۡ یَبۡدَؤُا الۡخَلۡقَ ثُمَّ یُعِیۡدُهٗ وَ هُوَ اَهۡوَنُ عَلَیۡهِ) “তিনিই সৃষ্টির সূচনা করেন, অতঃপর তার পুনরাবৃত্তি করেন আর তা তার জন্য খুবই সহজ”- (সূরা আর রূম ৩০: ২৭)।
(کَذٰلِکَ یُحۡیِ اللّٰهُ الۡمَوۡتٰی) “এভাবে আল্লাহ মৃতকে জীবন দান করেন”- (সূরা আল বাকারাহ ২: ৭৩)। সুস্পষ্ট কথা হল- এসব আয়াত আল্লাহ তা'আলার ক্ষমতার চিহ্নের প্রমাণস্বরূপ। ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, নতুনভাবে সৃষ্টি করা এবং পুনরায় সৃষ্টি করার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। আল্লাহ তা'আলার বাণী-
(قُلۡ یُحۡیِیۡهَا الَّذِیۡۤ اَنۡشَاَهَاۤ اَوَّلَ مَرَّۃٍ ؕ وَ هُوَ بِکُلِّ خَلۡقٍ عَلِیۡمُۨ) “বল, তাকে তিনিই জীবন্ত করবেন যিনি ওগুলোকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, আর তিনি প্রতিটি সৃষ্টি সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অবগত- (সূরাহ্ ইয়া-সীন ৩৬: ৭৯)। অর্থাৎ নতুন সূচনা এবং পুনরাবৃত্তির প্রত্যেকটির ব্যাপারে জ্ঞান রাখেন। এ হাদীসের মতো অর্থ আল্লাহ তা'আলার আয়াতে বিদ্যমান। যেমন- তিনি বলেন, (فَانۡظُرۡ اِلٰۤی اٰثٰرِ رَحۡمَتِ اللّٰهِ کَیۡفَ یُحۡیِ الۡاَرۡضَ بَعۡدَ مَوۡتِهَا ؕ اِنَّ ذٰلِکَ لَمُحۡیِ الۡمَوۡتٰی ۚ وَ هُوَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ) “অতএব আল্লাহর রহমতের ফল দেখে নাও, কিভাবে তিনি ভূমিকে তার মৃত্যুর পর জীবিত করেন, এভাবেই নিশ্চয় তিনি মৃতকে জীবিত করবেন, কেননা সব কিছুর উপর তিনি সর্বশক্তিমান”- (সূরা আর রূম ৩০: ৫০)। মানে যিনি মৃত্যু জমিনকে জীবিত করতে পারেন তিনিই মানুষকে মরার পরে জীবিত করতে ক্ষমতা রাখেন। তিনিই সব নির্ধারিত বস্তুর উপর ক্ষমতাবান। সৃষ্টির দলীলের উপর ভিত্তি করেই বলা যায় যে, তিনি সামগ্রিক ক্ষমতার অধিকারী। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাশর
৫৫৩২-[১] সাহল ইবনু সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: কিয়ামতের দিন মানবমণ্ডলীকে লাল-শ্বেত মিশ্রিত এমন এক সমতল ভূমিতে একত্রিত করা হবে যেমন তা সাফাই করা আটার রুটির মতো। সে জমিনে কারো (ঘর বা ইমারতের) কোন চিহ্ন থাকবে না। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب الْحَشْر)
عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يُحْشَرُ النَّاسُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى أَرْضٍ بَيْضَاءَ عَفْرَاءَ كَقُرْصَةِ النَّقِيِّ لَيْسَ فِيهَا عَلَمٌ لأحدٍ» . مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (6521) و مسلم (28 / 2790)، (7055) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: (أَرْضٍ عَفْرَاءَ) খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, (الْعَفَرُ) হলো সাদা যা তুষারশুভ্র নয়। কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, (الْعَفَرُ) এমন সাদা যাকে কিছুটা লাল করা হয়। এজন্য বলা হয়, (عَفَرُالْأَرْضِ) তা হচ্ছে জমিনের উপরিভাগ। ইবনু ফারিস বলেন, (عَفْرَاءَ) অর্থ নির্ভেজাল সাদা। দাউদী বলেন, (شَدِيدَةُ الْبَيَاضِ) প্রচুর সাদা। তিনি বলেন, প্রথম অর্থটি অধিক নির্ভরযোগ্য।
(كَقُرْصَةِ ا لنَّقِيِّ) আটা যা ভেজাল ও আবর্জনামুক্ত। এটা খত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ)-এর মত।
(لَيْسَ فِيهَا مَعْلَمٌ لِأَحَدٍ) অন্য বর্ণনায় (مَعْلَم) রয়েছে। (عَلَمٌ) ও (مَعْلَم) একই অর্থে ব্যবহার হয়। খত্তাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো চিহ্ন। (مَعْلَم) মীম ও লাম বর্ণের যবর এবং এ দুটোর মাঝে ‘আইন সাকিন। আর তা এমন জিনিস যার দ্বারা পথের নির্দেশনা লাভ করা যায়। কাযী ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ)। বলেন, উদ্দেশ্য হলো তাতে কোন বসবাস, বাড়িঘর বা প্রাচীন ঐতিহ্যের কোন চিহ্ন নেই। আর নেই তাতে এমন কোন প্রকারের নিদর্শন যাতে পথের দিশা পাওয়া যায়। যেমন- পাহাড় বা স্পষ্ট বড় প্রস্তরখণ্ড। আবূ মুহাম্মাদ ইবনু জামরাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন- এতে আল্লাহর মহান ক্ষমতার দলীল রয়েছে। আর এর দ্বারা কিয়ামত দিবসের আনুসাঙ্গিক বিষয়াদি জানানো যায়। যাতে শ্রোতারা জাগ্রত জ্ঞানসম্পন্ন হতে পারে এবং এ বিপদ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে। কারণ কোন কিছুতে পতিত হওয়ার পূর্বে তার বিশেষ বিষয়াদি সম্পর্কে জানা থাকলে অন্তরকে প্রস্তুত ও উদ্দীপ্ত করা যায়। হঠাৎভাবে আপতিত হতে হয় না। সে দিনটা হবে ন্যায়নীতি কায়িম করার দিন ও হক প্রকাশের দিন। অতএব হিকমতের দাবী হলো যে স্থানে এসব কিছু হবে সে স্থানটা গুনাহ ও যুলুমের কর্মকাণ্ডমুক্ত থাকবে। আর এতে মু'মিন বান্দাদের নিকটে আল্লাহ তা'আলা তার মর্যাদার সাথে উপযুক্ত জমিনে সমাসীন হবেন। কারণ সেখানে কর্তৃত্ব শুধুমাত্র এক আল্লাহর জন্য নিবেদিত ও নির্ধারিত, আর সে স্থান শুধুমাত্র তার জন্য হওয়াই সমীচিন। [সংক্ষেপিত] (ফাতহুল বারী ১১ খণ্ড, হা. ৬৫২১)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাশর
৫৫৩৩-[২] আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: কিয়ামতের দিন দুনিয়ার এই জমিনটি হবে একটি রুটির মতো, মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তাকে হাতের মাঝে নিয়ে এমনভাবে উলট-পালট করবেন যেমন তোমাদের কেউ সফর অবস্থায় তাড়াতাড়ি করে এই হাতে সেই হাতে নিয়ে রুটি তৈরি করে এবং এই রুটি দিয়ে জান্নাতবাসীদের আপ্যায়ন করা হবে। নবী (সা.) -এর আলোচনা এ পর্যন্ত পৌছলে তখন জনৈক ইয়াহুদী এসে বলল, হে আবূল কাসিম ! আল্লাহ তা’আলা আপনাকে কল্যাণ দান করুন। আমি কি আপনাকে অবগত করব না যে, (তাওরাতে উল্লেখ আছে,) কিয়ামতের দিন জান্নাতবাসীদেরকে কি বস্তু দিয়ে সর্বপ্রথম আপ্যায়ন করা হবে? তিনি (সা.) বললেন, হ্যা, বল! সে বলল, এ জমিন হবে একটি রুটি, যেরূপ নবী (সা.) বলেছিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, ইয়াহূদীর কথা শুনে নবী (সা.) আমাদের দিকে তাকিয়ে এমনভাবে হাসলেন যে, তাঁর চোয়ালের দাঁত পর্যন্ত প্রকাশ হয়ে পড়ল। অতঃপর ইয়াহুদী বলল, আমি কি আপনাকে জানাব না যে, সে খাদ্যের তরকারি কি হবে? তা হবে বালাম ও নূন। সাহাবীগণ প্রশ্ন করলেন, এটা আবার কী? সে বলল, ষাঁড় ও মাছ। সে দু’টির কলিজার উপরের অতিরিক্ত যে মাংস তা সত্তর হাজার লোকে খাবে। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب الْحَشْر)
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «تَكُونُ الْأَرْضُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ خُبْزَةً وَاحِدَةً يَتَكَفَّؤُهَا الْجَبَّارُ بِيَدِهِ كَمَا يَتَكَفَّأُ أَحَدُكُمْ خُبْزَتَهُ فِي السّفر نُزُلاً لِأَهْلِ الْجَنَّةِ» . فَأَتَى رَجُلٌ مِنَ الْيَهُودِ. فَقَالَ: بَارَكَ الرَّحْمَنُ عَلَيْكَ يَا أَبَا الْقَاسِمِ أَلَا أُخبرُك بِنُزُلِ أهل الجنةِ يومَ القيامةِ؟ قَالَ: «بَلَى» . قَالَ: تَكُونُ الْأَرْضُ خُبْزَةً وَاحِدَةً كَمَا قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. فَنَظَرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَيْنَا ثُمَّ ضَحِكَ حَتَّى بَدَتْ نَوَاجِذُهُ ثُمَّ قَالَ: أَلَا أُخْبِرُكَ بِأَدَامِهِمْ؟ بَالَامٌ وَالنُّونُ. قَالُوا: وَمَا هَذَا؟ قَالَ: ثَوْرٌ وَنُونٌ يَأْكُلُ مِنْ زَائِدَةِ كَبِدِهِمَا سَبْعُونَ ألفا. مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (6520) و مسلم (30 / 2792)، (7057) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: (خُبْزَةً) অর্থ রুটি আর তা এমন আটা যা চুলায় আগুনে জ্বালানোর পর তার গর্তে রাখা হয়। সে গর্তকে মানুষ গরম ছাই বা খাক বা মাটি বলে।
(يَتَكَفَّؤُهَا)-এর অর্থ নোয়ানো, ঝুকানো। এ থেকে ব্যবহৃর হয় (كَفَأْتُ الْإِنَاءَ) (যখন তুমি তাকে উল্টাবে)।
(خُبْزَتَهُ فِي السّفر) খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এমন রুটি যা মুসাফিরের জন্য তৈরি করা হয়। কারণ এটাকে বিছানো হয় না যেমন পাতলা রুটিকে বিছানো হয়। মূলত হাতের উপরে উলটপালট করা হয় যাতে সেটা সমান হয়।
(نُزُلاً لِأَهْلِ الْجَنَّةِ) তা হলো এমন জিনিস যা আহলে জান্নাতদের মেহমানদারী হিসেবে তৈরি করা হবে। বলা হয়, (أصلح القوم نزلهم) অর্থাৎ খাবারের পূর্বে মেহমানের জন্য তাড়াতাড়ি যা পেশ করা হয়। হাদীসের জমিনের রুটির সাদৃশ্য তার দুটি অর্থ হতে পারে (এক) সেদিন জমিনের আকৃতি বর্ণনা করা। অন্যটি হলো রুটির বর্ণনা সম্পর্কে যা জান্নাতীদের জন্য আতিথেয়তা হবে। অথবা নতুনভাবে এবং বিরাট পরিমাণের বর্ণনা সম্পর্কে।
হাফিয ইবনু হাজার (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: দুনিয়ার জমিন আগুনে পরিবর্তিত হওয়া হাক্বীকৃী বা আসল অর্থে ধরতে হবে এবং অবস্থান স্থলের ব্যক্তিদের খাদ্যের জন্য রুটিতে পরিবর্তিত হওয়াকে রূপক অর্থে গণ্য করতে হবে।
(بَالَامٌ) শব্দটির ব্যাপারে মতভেদ আছে। শব্দটি হাদীসের বর্ণনায় হিব্রু ভাষায় রয়ে গেছে। যে কারণে সাহাবীগণ শব্দটির ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছেন। আল্লামাহ্ নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) সম্পূর্ণ নিশ্চিত হয়ে বলেন, এটা হিব্রু ভাষা যার অর্থ বলদ।
(يَأْكُلُ مِنْ زَائِدَةِ كَبِدِهِمَا سَبْعُونَ ألفا) কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, অতিরিক্ত অংশ বলতে কলিজার সাথে যুক্ত আলাদা অংশ বুঝানো হয়েছে যা উৎকৃষ্ট। সে কারণে তা খাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে সত্তর হাজার জনকে। আর তারাই বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাদেরকে উৎকৃষ্টমানের খাদ্য সামগ্রী দ্বারা আপ্যায়ন করা হবে। আর সত্তর হাজার সংখ্যা দ্বারা অধিক সংখ্যককে বুঝানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এতে কোন সীমাবদ্ধতা নেই। (ফাতহুল বারী ১১ খণ্ড, হা, ৬৫২০-২১)।
জমিন খাদ্যে রূপান্তরিত হওয়া বিবেকবিরোধী নয়। এখন জমিনের মাটি থেকে নতুন নতুন চমৎকার সাদযুক্ত ফলমূল উৎপাদন হচ্ছে। আবার আল্লাহ তা'আলা যদি জমিনকে দুধে ময়দায় রূপান্তর করেন, এটা আল্লাহর নিকটে দূরের ব্যাপার নয়। যে দলটি জমিনী রুটিকে খাবে তারা বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশকারী দল। তাদের চেহারা পূর্ণিমার চাঁদের মতো হবে। (মিশকাতুল মাসাবীহ - মুম্বাই ছাপা, ৪র্থ খণ্ড, ৩৮১ পৃ.)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাশর
৫৫৩৪-[৩] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: (কিয়ামতের দিন) তিন ধরনের মানবমণ্ডলীর হাশর হবে। জান্নাতের আকাক্ষী, জাহান্নাম হতে ভীত-সন্ত্রস্ত; আর একদল হবে এক উটে (সওয়ারীতে) দু’জন কোন একটিতে তিনজন, কোন এক উটে চারজন, আবার কোন এক উটে দশজন ধারাক্রমে আরোহণ করবে। অবশিষ্ট আরেক দল তাদেরকে আগুনে একত্রিত করবে। দিনের বেলায় তারা যেখানে অবস্থান করবে, আগুনও সেখানে তাদের সাথে অবস্থান করবে। তারা রাতে যেখানে অবস্থান করবে, আগুনও সেখানে তাদের সঙ্গে রাত্রে অবস্থান করবে। অনুরূপভাবে ভোরে ও সন্ধ্যায় তারা যেখানে থাকবে, আগুনও তাদের সঙ্গে সেখানে থাকবে। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب الْحَشْر)
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يُحْشَرُ النَّاسُ عَلَى ثَلَاثِ طَرَائِقَ: رَاغِبِينَ رَاهِبِينَ وَاثْنَانِ عَلَى بَعِيرٍ وَثَلَاثَةٌ عَلَى بَعِيرٍ وَأَرْبَعَةٌ عَلَى بَعِيرٍ وَعَشَرَةٌ عَلَى بَعِيرٍ وَتَحْشُرُ بَقِيَّتَهُمُ النَّارُ. تَقِيلُ مَعَهُمْ حَيْثُ قَالُوا وَتَبِيتُ مَعَهُمْ حَيْثُ باتو وَتُصْبِحُ مَعَهُمْ حَيْثُ أَصْبَحُوا وَتُمْسِي مَعَهُمْ حَيْثُ يمسوا . مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (6522) و مسلم (59 / 2861)، (7202) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: (عَلَى ثَلَاثِ طَرَائِقَ) মানুষকে তিন স্তরে জমায়েত করা হবে। (رَاغِبِينَ رَاهِبِينَ) জান্নাতের আকাক্ষী এবং জাহান্নাম থেকে ভীত, এরা প্রথম উপায়ে আসবে।
(وَاثْنَانِ عَلَى بَعِيرٍ وَثَلَاثَةٌ عَلَى بَعِيرٍ وَأَرْبَعَةٌ عَلَى بَعِيرٍ وَعَشَرَةٌ عَلَى بَعِيرٍ) সহীহ মুসলিম-এর বর্ণনায় সবগুলোর পূর্বে (واو) রয়েছে। তবে বুখারীর বর্ণনায় শুধু প্রথমে (واو), আছে। দু' বর্ণনায় এরা দ্বিতীয় উপায়ে জমায়েত হবে।
(تَحْشُرُ بَقِيَّتَهُمُ النَّارُ) সহীহ মুসলিম-এর অপর বর্ণনাতে কিয়ামতের পূর্বের ঘটিত নিদর্শনাদির উল্লেখ রয়েছে। যেমন পশ্চিমদিকে সূর্যোদয় হওয়া। এর শেষে আছে এগুলোর শেষে বের হবে আগুন যা এডেনের গর্ত থেকে বের হবে এবং মানুষকে খেদিয়ে প্রস্থান করাবে। তাদের সাথে আগুন অবিচ্ছিন্নভাবে থাকবে। এরা তৃতীয় উপায়ে জমায়েত হবে। খত্তাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: এ হাশর কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার পূর্বে হবে। মানুষদেরকে জীবিত অবস্থায় শামের দিকে জমা করা হবে। এদের ব্যাপার ইবনু আব্বাস (রাঃ) -এর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে তারা খালি পায়ে বিবস্ত্র হয়ে পায়ে হেটে আসবে।
ক্বাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: এই হাশর তথা জমায়েতটা হবে দুনিয়াতে কিয়ামতের পূর্বে। এটা হচ্ছে কিয়ামতের শেষ নিদর্শন, যা আলোচ্য হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়। কারণ তাতে সকাল, সন্ধ্যা, রাত্রি যাপন ও কায়লূলাহ বা বিশ্রামের বিষয়ে উল্লেখ হয়েছে যা আখিরাতে থাকে না। আবার অন্য হাদীসে রয়েছে, যতক্ষণ হিজায থেকে আগুন বের না হবে ততক্ষণ কিয়ামত হবে না। মুসলিম ব্যতীত অন্য বর্ণনায় রয়েছে, যখন তোমরা এ আগুনের কথা শুনবে তখন তোমরা শামের উদ্দেশে বের হও এ যেন তিনি তাদেরকে কষ্ট দেয়ার পূর্বে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন।
হুলায়মী ও গাযালী (রহিমাহুয়াল্লাহ) উল্লেখ করেন যে, এটা আখিরাতের হাশর। হুলায়মী বলেন, তিন ধরনের মানুষকে তিন উপায়ে আখিরাতে জমা করা হবে। প্রথম শ্রেণি হলো (أبرار) তথা নেককারগণ যারা আল্লাহর সাওয়াবের প্রত্যাশী বা রাগিবীন এবং ভয় ও আশার মধ্যে অবস্থানকারী বা রাহিবীন।
২য় শ্রেণি- মিশ্রিত ব্যক্তি যারা উটের উপরে আসবে। আর ৩য় শ্রেণি হলো কাফির, যাদেরকে আগুনে একত্রিত করবে। তাদের দলীল নাসায়ীতে রয়েছে, (يُحْشَرُالنَّاسُ يَوْمَ الْقِيَاماَةِ)
সিনদী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, অধিকাংশ বিদ্বানের মত হলো, এটা দুনিয়ার হাশর এবং কিয়ামতের সর্বশেষ নিদর্শন। এটাই উপযুক্ত মত, এতে কায়লূলাহ্ বা আরাম নেয়া অথবা অনুরূপ বিষয়ের উল্লেখ হয়েছে।
ইসমাঈলী আলোচিত আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)-এর হাদীস ও ইবনু আব্বাস (রাঃ)-এর নগ্ন, খালি পা ও পব্ৰজের হাদীসের মাঝে সমন্বয় করেছেন এভাবে যে, হাশর থেকে ধর্তব্য হলো বিক্ষিপ্ত মানুষকে একত্রিত করা। যেটা মাখলুককে কবর থেকে খালি পায়ে বিবস্ত্র অবস্থায় বের করা, অতঃপর হাঁকিয়ে হিসাবের জন্য একত্রিত করা হবে। এ সময় মুত্তাকীদেরকে উটের উপর আরোহণ করে জমায়েত করা হবে। আবার অন্য কেউ এভাবে দুই বিপরীত হাদীসকে একত্রিত করেছেন যে, মানুষদের কবর থেকে উঠার বর্ণনা দেয়া হয়েছে ইবনু আব্বাস-এর হাদীসে, অতঃপর সেখান থেকে অবস্থানস্থলে যাওয়ার বিভিন্ন অবস্থা বর্ণিত হয়েছে আবূ হুরায়রাহ (রাঃ)-এর হাদীসে।
এ মতটিকে আরো শক্তিশালী করেছে আহমাদ, নাসায়ী ও বায়হাকীতে বর্ণিত আবূ যার (রাঃ)-এর হাদীস। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদেরকে বর্ণনা করেছেন যে, মানুষেরা কিয়ামতের দিন তিন দলে একত্রিত হবে- এক) কাপড় পরিহিত, আগ্রহী আরোহী দল। দুই) পদব্রজে চলা দল। তিন) এমন দল যাদেরকে মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) মুখের ভরে টেনে আনবেন। কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ)-এর মতকে সঠিক বলে আখ্যা দিয়েছেন। (ফাতহুল বারী ১১ খণ্ড, হা, ৬৫২২; নাসায়ী ২য় খণ্ড, হা. ২০৮৪)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাশর
৫৫৩৫-[৪] ইবনু আব্বাস (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: (হে লোক সকল!) কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে খালি পায়ে, খালি দেহে ও খতনাবিহীন অবস্থায় একত্রিত করা হবে। তারপর তিনি (সা.) এ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন- (کَمَا بَدَاۡنَاۤ اَوَّلَ خَلۡقٍ نُّعِیۡدُهٗ ؕ وَعۡدًا عَلَیۡنَا ؕ اِنَّا کُنَّا فٰعِلِیۡنَ) “আমি তোমাদেরকে আবার আমার কাছে ফিরিয়ে আনব যেমন প্রথমবার তৈরি করেছিলাম, এটা আমার প্রতিশ্রুতি, যা আমি অবশ্যই পূরণ করব"- (সূরাহ আল আম্বিয়া ২১: ১০৪)। [অতঃপর রাসূল (সা.) বললেন,] সর্বপ্রথম যাকে কাপড় পরিধান করানো হবে, তিনি হবেন ইবরাহীম আলায়হিস সালাম। তিনি (সা.) আরো বলেছেন, আমি দেখব যে, আমার উম্মতের কিছুসংখ্যক লোককে গ্রেফতার করে বামদিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তখন আমি বলব, তারা যে আমার উম্মতের কিছু লোক, তারা যে আমার উম্মতের কিছু লোক। (কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?) তখন আল্লাহ বলবেন, যখন থেকে আপনি তাদেরকে রেখে পৃথক হয়ে চলে এসেছেন, তখন হতেই তারা দীনকে পরিত্যাগ করে উল্টা পথে চলেছিল। তিনি (সা.) বলেন, তখন আল্লাহর নেক বান্দা ’ঈসা আলায়হিস সালাম যেমন বলেছিলেন অনুরূপ বলব, ’আমি যতদিন তাদের মাঝে ছিলাম ততদিনই আমি তাদের অবস্থা অবহিত ছিলাম..... আপনি সর্বশক্তিমান ও মহাজ্ঞানী’ পর্যন্ত। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب الْحَشْر)
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّكُمْ مَحْشُورُونَ حُفَاةً عُرَاةً غُرْلًا» ثُمَّ قَرَأَ: (كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُعِيدُهُ وَعْدًا عَلَيْنَا إِنَّا كُنَّا فاعلين) وَأَوَّلُ مَنْ يُكْسَى يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِبْرَاهِيمُ وَإِنَّ نَاسًا مِنْ أَصْحَابِي يُؤْخَذُ بِهِمْ ذَاتَ الشِّمَالِ فَأَقُولُ: أُصَيْحَابِي أُصَيْحَابِي فَيَقُولُ: إِنَّهُمْ لَنْ يَزَالُوا مرتدين على أَعْقَابهم مذْ فَارَقْتهمْ. فَأَقُول كَمَا قَالَ الْعَبْدُ الصَّالِحُ: (وَكُنْتُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا مَا دمت فيهم) إِلى قَوْله (الْعَزِيز الْحَكِيم) مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (3349) و مسلم (58 / 2860)، (7201) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: (الْغُرْلُ يُحْشَرُ النَّاسُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حُفَاةً عُرَاةً غُرْلًا) এর অর্থ (غَيْرُمَخْتُونِينَ) (খতনাহীন)। (قُلْفَةٌ) অর্থাৎ এমন চামড়াকে বলা হয় যাকে খতনা দেয়াতে কেটে ফেলতে হয়। এটা কাটাবিহীন উঠানো হবে। (শারহু নাবাবী ১৭শ খণ্ড, হা. ২৮৬)
(حُفَاة) এমন ব্যক্তি যার কোন জুতা এবং মোজা নেই। (عُرَاة) যার কোন আবরণ বা সতর নেই। বায়হাকী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আবূ দাউদে বর্ণিত আবূ সাঈদ-এর হাদীসে রয়েছে, যখন আবূ সাঈদ-এর মৃত্যু হাজির হলো তখন তিনি নতুন কাপড় নিয়ে ডাকলেন ও তা পরিধান করে বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে বলতে শুনেছি। তিনি (সা.) বলেন, নিশ্চয় মৃত্যু ব্যক্তি যে কাপড়ে মারা গেছে, সে কাপড়ে তাকে পুনরুত্থান করা হবে। ইবনু 'আব্বাস-এর হাদীস ও আবূ সাঈদ (রাঃ)-এর হাদীসকে এভাবে এক করা যায় যে, কারো হাশর হবে বিবস্ত্র হয়ে। আর কারো হাশর হবে কাপড় পরে অথবা সবাইকে উলঙ্গ করে জমা করা হবে। অতঃপর নবী 'আলায়হিস সালাম-দেরকে কাপড় পরানো হবে। আর যাকে প্রথমে কাপড় পরানো হবে তিনি হলেন ইবরাহীম আলায়হিস সালাম। অথবা মানুষ যে কাপড়ে মারা গেছে সে কাপড়সহ কবর থেকে উত্থিত হবে। অতঃপর কাপড় তাদের থেকে খুলে পড়বে হাশরের সূচনালগ্নে। তারপর তারা উলঙ্গ হয়ে জমায়েত হবে। অতঃপর প্রথমে ইবরাহীম আলায়হিস সালাম-কে কাপড় পরিধান করানো হবে। আবার কেউ আবূ সা'ঈদ-এর হাদীসকে শহীদের জন্য ধরেছেন। কারণ তাদের ব্যাপারে নির্দেশ হলো যে, তাদেরকে স্ব স্ব কাপড়ে ঢেকে দাফন করতে হবে। আবূ সাঈদ শহীদদের ব্যাপারে উপরোক্ত নির্দেশনা শুনেছেন কিন্তু তা সবার জন্য ধরে নিয়েছেন। যারা সাধারণের জন্য ধরেছেন, তাদের মধ্যে মু'আয ইবনু জাবাল (রাঃ) অন্যতম।
ইবনু আবদ্ দুনিয়া ‘আম্র ইবনু আসওয়াদ-এর সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমরা মু'আয ইবনু জাবাল-এর আম্মাকে দাফন করতে গেলে তিনি নির্দেশ দিলেন মায়ের জন্য। তাই আমরা নতুন কাপড়ে কাফন দিলাম। আর তিনি বললেন, তোমরা তোমাদের মৃত ব্যক্তিদের উত্তম কাফনের ব্যবস্থা কর। কারণ এতেই তাদেরকে উঠানো হবে। কোন বিদ্বান কাপড়কে ‘আমলের অর্থ গ্রহণ করেছেন। কাপড় ‘আমল অর্থে ব্যবহার হওয়ার উদাহরণ হলো আল্লাহ তা'আলার বাণী: (وَ لِبَاسُ التَّقۡوٰی ۙ ذٰلِکَ خَیۡرٌ ؕ) “আর তাকওয়ার পোশাক হচ্ছে সর্বোত্তম পোশাক”- (সূরাহ্ আল আ'রাফ ৭: ২৬)।
(وَ ثِیَابَکَ فَطَهِّرۡ) “তোমার পোশাক-পরিচ্ছদ পবিত্র রাখ”- (সূরাহ্ আল মুদ্দাসসির ৭৪: ৪)।
এটা কতাদাহ্ (রহিমাহুল্লাহ)-এর ব্যাখ্যা। তিনি এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, এর অর্থ হলো (وَعَمَلَكَ فَأَخْلِصْهُ) আর তোমার আমাকে নির্ভেজাল কর।
এ কথাটা আরো মজবুত হয় জাবির (রাঃ)-এর মারফু হাদীস দ্বারা, বলা হয়েছে, (يُبْعَثُ كُلُّ عَبْدٍ عَلَى مَا مَتَ عَلَيْهِ) “প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার শেষ ‘আমলের সাথে উঠানো হবে” হাদীসটিকে মুসলিম বর্ণনা করেন। কুরতুবী (রহিমাহুল্লাহ) হাদীসকে প্রকাশ্য অর্থে গ্রহণ করেন। তার মতটি কুরআনের আয়াত দ্বারা সুদৃঢ় হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন, (وَ لَقَدۡ جِئۡتُمُوۡنَا فُرَادٰی کَمَا خَلَقۡنٰکُمۡ اَوَّلَ مَرَّۃٍ) “(কিয়ামতের দিন আল্লাহ বলবেন) তোমরা আমার নিকট তেমনই নিঃসঙ্গ অবস্থায় হাজির হয়েছ যেমনভাবে আমি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম”- (সূরা আল আন'আম ৬: ৯৪)।
তিনি আরো বলেন, (...کَمَا بَدَاَکُمۡ تَعُوۡدُوۡنَ) “...যেভাবে প্রথমবার তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন পুনরায়ও সেভাবেই সৃজিত হবে”- (সূরা আল আ'রাফ ৭: ২৯)। অতএব আবূ সা'ঈদ-এর হাদীসকে শহীদদের জন্য প্রযোজ্য হিসেবে ধরতে হবে। কারণ তাদেরকে স্বীয় কাপড়ে দাফন করতে হয় এবং তাতেই তাদেরকে উঠানো হবে যাতে তাদেরকে অন্যদের থেকে আলাদা করা যায়।
(أَوَّلُ مَنْ يُكْسَى يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِبْرَاهِيمُ) কুরতুবী (রহিমাহুল্লাহ) সহীহ মুসলিম-এর শারাহতে বলেন, (خلائق) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আমাদের নবী ব্যতীত বাকী সব। অতএব তিনি নিজের সম্বোধনের ব্যাপকতার মধ্যে প্রবেশ করবেন না। কিন্তু কুরতুবী (রহিমাহুল্লাহ)-এর ছাত্র পরে বলেন, যদি ‘আলী (রাঃ) বর্ণিত হাদীস না থাকত তবে তাঁর কথা ঠিক হত। আলী (রাঃ) বর্ণনা করেন, কিয়ামতের দিন প্রথম খলীলুল্লাহ আলায়হিস সালাম-কে দুটি কিবতী কাপড় পরানো হবে। অতঃপর মুহাম্মাদ (সা.)-কে ‘আরশের ডানে চমৎকার এক সেট পোশাক পরানো হবে।
‘উবায়দ ইবনু উমায়র-এর মুরসালে বর্ণিত হয়েছে, মানুষকে খালি পায়ে উলঙ্গ করে উঠানো হবে। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন, আমি আমার খলীলকে উলঙ্গ দেখেছি। তাই ইবরাহীম আলায়হিস সালাম-কে সাদা কাপড় পরানো হবে। তিনি হবেন প্রথম কাপড় পরিহিত ব্যক্তি। ইবরাহীম 'আলায়হিস সালাম প্রথম কাপড় পরা ব্যক্তি হওয়ার রহস্য হলো তাঁকে আগুনে নিক্ষেপ করার সময় বিবস্ত্র করা হয়েছিল। কেউ বলেন, পায়জামা দ্বারা সতর ঢাকার সুন্নাত তিনিই প্রথম চালু করেছিলেন। সে কারণে তাকে প্রথম কাপড় পরানো হবে। আল্লাহ বলবেন, তোমরা আমার খলীলকে কাপড় পরাও যাতে মানুষেরা বুঝতে পারে যে, তাদের ওপর তার শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে।
হাফিয ইবনু হাজার (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, ইবরাহীম আলায়হিস সালাম প্রথম কাপড় পরিহিত ব্যক্তি হিসেবে বিশেষিত হওয়াতে এ কথা আবশ্যক হয় না যে, তিনি আমাদের নবী মুহাম্মাদ (সা.) থেকে সাধারণভাবে উত্তম।
(إِنَّهُمْ لَنْ يَزَالُوا مرتدين على أَعْقَابهم مذْ فَارَقْتهمْ) এটা রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর বাণী (ما احد ثوابعدك) এর ব্যাখ্যা। নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এ কথার উদ্দেশ্য নিয়ে ‘আলিমগণ বিভিন্ন মত পোষণ করেন।
(এক) এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মুনাফিক মুরতাদগণ। তাদেরকে উজ্জ্বল চিহ্নসহ হাশর করা হবে। অতঃপর নবী (সা.) তাদের ওপর থাকা চিহ্ন দেখে ডাকতে থাকবেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলা হবে এরা সেসব লোক নয় যাদের সাথে আপনি ওয়াদা করেছেন। এরা আপনার পরে পরিবর্তন হয়ে গেছে। অর্থাৎ তাদের জন্য যে ইসলাম প্রকাশ পেয়েছিল তার উপর তারা মৃত্যুবরণ করেনি।
(দুই) এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সে সমস্ত ব্যক্তিরা যারা রাসূল (সা.) -এর যামানায় ছিল, পরে তারা মুরতাদ হয়েছে। তাদের ওপরে উযূর চিহ্ন না থাকলেও নবী (সা.) তাদেরকে ডাকবেন। কারণ তিনি (সা.) স্বীয় জীবদ্দশায় তাদের ইসালাম সম্পর্কে জানতেন। তাদের ব্যাপারে বলা হবে, আপনার পরে তারা মুরতাদ হয়েছে।
(তিন) এ কথার অর্থ হলো উদ্দেশ্য হবে কবীরা গুনাহগার ব্যক্তি, যারা তাওহীদের উপরে মৃত্যুবরণ করেছে এবং বিদআতী ব্যক্তি যারা বিদ'আতের কারণে ইসালামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যায়নি।
(তুহফাতুল আহওয়াযী, ৬ষ্ঠ খণ্ড হা, ২৪২৩)
বায়যাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, (مرتدين) শব্দটি তাঁদের ইসালাম থেকে মুরতাদ হওয়ার দলীল নয়। বরং তারা গণ্য হবে মু'মিনদের বিরুদ্ধাচরণকারী হিসেবে এবং ঈমানের দৃঢ়তা থেকে বিচ্যুত মুরতাদ হিসেবে। তারা সৎ ‘আমলকে মন্দ দিয়ে বদলিয়ে দিত। (ফাতহুল বারী ১১ খণ্ড, হা. ৬৫২৬)
(الْعَبْدُ الصَّالِحُ) থেকে উদ্দেশ্য ‘ঈসা আলায়হিস সালাম। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাশর
৫৫৩৬-[৫] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে বলতে শুনেছি, কিয়ামতের দিন মানুষদেরকে খালি পায়ে, খালি দেহে ও খতনাবিহীন অবস্থায় সমবেত করা হবে। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! নারী পুরুষ সকলে কি একজন আরেকজনের লজ্জাস্থান দেখতে থাকবে না? তিনি (সা.) বললেন, হে ’আয়িশাহ্! সে সময়টি এত ভয়ঙ্কর হবে যে, কেউ কারো প্রতি দৃষ্টি দেয়ার সুযোগ পাবে না। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب الْحَشْر)
وَعَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «يُحْشَرُ النَّاسُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حُفَاةً عُرَاةً غُرْلًا» . قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ الرِّجَالُ وَالنِّسَاءُ جَمِيعًا يَنْظُرُ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ؟ فَقَالَ: «يَا عَائِشَةُ الْأَمْرُ أَشَدُّ مِنْ أَنْ يَنْظُرَ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (6527) و مسلم (56 / 2859)، (7198) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: ‘আবদুল্লাহ ইবনু উনায়স থেকে মুসনাদে আহমাদ ও হাকিমে বর্ণিত আছে, আল্লাহ বান্দাদেরকে একত্রিত করবেন। তিনি (সা.) স্বীয় হাত দ্বারা শামের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, (عُرَاةً غُرْلًا، بُهْمًا بُهْمًا) আমরা বললাম, (بُهْمًا) কাকে বলে? তিনি (সা) বললেন, যার কাছে কিছু নেই।
সহীহ মুসলিমে ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ-এর বর্ণনায় রয়েছে, (يَا عَائِشَةُ الْأَمْرُ أَشَدُّ مِنْ أَنْ يَنْظُرَ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ) নাসায়ী এবং হাকিম-এর বর্ণিত হয়েছে, 'আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে যে, (يَا رَسُولَ اللَّهِ فَكَيْفَ بِالْعَوْرَاتِ) আমি বললাম, লজ্জাস্থানের কি অবস্থা হবে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, (لِكُلِّ امْرِئٍ مِنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأَنٌ يُغْنِبهِ) তিরমিযী ও হাকিমে একটু বেশি এসেছে। তাতে রয়েছে পুরুষ ও নারীগণ অপরকে বাদ দিয়ে নিজকে নিয়ে ব্যস্ত থাকায় পুরুষেরা মহিলার দিকে বা নারীরা পুরুষের দিকে তাকাবে না। ইবনু আবদ দুন্ইয়াতে আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) নবী (সা.) -কে জিজ্ঞেস করলেন, কিভাবে মানুষের হাশর হবে? তিনি (সা.) বললেন, খালি পায়ে বিবস্ত্র হয়ে। তিনি আবার বললেন, লজ্জাস্থানের কি হবে? তিনি (সা.) বলেন, আমার ওপরে একটি আয়াত নাযিল হয়েছে যে, তোমার গায়ে কাপড় থাকুক বা না থাকুক তোমার এতে কোন ক্ষতি হবে না। তা হলো (لِكُلِّ امْرِئٍ الْآيَةَ) (ফাতহুল বারী ১১শ খণ্ড, হা, ৬৫২৭)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাশর
৫৫৩৭-[৬] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন জনৈক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামতের দিন কাফিরদেরকে কিরূপে মুখের উপরে হাঁটিয়ে একত্রিত করা হবে? উত্তরে তিনি (সা.) বললেন, যিনি দুনিয়াতে মানুষকে দুই পায়ে চালিয়েছিলেন তিনি কি কিয়ামতের দিন তাকে মুখের উপর চালানোর সাধ্য রাখেন না? (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب الْحَشْر)
وَعَنْ أَنَسٍ أَنَّ رَجُلًا قَالَ: يَا نَبِيَّ اللَّهِ كَيْفَ يُحْشَرُ الْكَافِرُ عَلَى وَجْهِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ؟ قَالَ: «أَلَيْسَ الَّذِي أَمْشَاهُ عَلَى الرِّجْلَيْنِ فِي الدُّنْيَا قَادِرًا عَلَى أَنْ يُمْشِيَهُ عَلَى وَجْهِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ؟» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (4760) ومسلم (2806)، (7087) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: (يُحْشَرُ الْكَافِرُ) আনাস (রাঃ) থেকে অন্য সূত্রে হাকিম-এর বর্ণনায় রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে প্রশ্ন করা হলো, জাহান্নামীদেরকে মুখের ভরে জমা করা হবে। বাযযারে বর্ণিত আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)-এর হাদীসে রয়েছে, মানুষকে তিনভাবে জমায়েত করা হবে। একদল বাহনের উপরে, আরেক দল পদব্রজে এবং একদল মুখের ভরে। বলা হলো কিভাবে তারা মুখের ভরে চলবে? এসব হাদীসের সামষ্টিক অর্থ হলো নৈকট্যশীলরা আরোহণ করে, অন্য মুসলিমরা পায়ে হেঁটে আর কাফিরদেরকে মুখের ভরে এনে জমা করা হবে। (ফাতহুল বারী ৮ম খণ্ড, হা, ৪৭৬০)
অন্য এক বর্ণনায় আছে, সে ব্যক্তি বলল, কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, কাফিররা মুখের উপর ভর করে চলবে। এটা কিভাবে সম্ভব? হাদীসের উদ্দেশ্য হলো, যে সত্তা পায়ে চলার ক্ষমতা দেন তিনি মুখমণ্ডলকেও ক্ষমতা দিতে পারেন। অর্থাৎ আল্লাহর নিকটে সব কঠিন বিষয় সহজ। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাশর
৫৫৩৮-[৭] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: কিয়ামতের দিন ইবরাহীম আলায়হিস সালাম তার পিতা আযর-এর সাক্ষাৎ পাবেন। তখন আযর-এর চেহারা হবে কালো ধুলাবালি মিশ্রিত। তখন ইবরাহীম আলায়হিস সালাম তাকে বলবেন, আমি কি আপনাকে (দুনিয়াতে) বলেছিলাম না যে, আপনি আমার কথা অমান্য করবেন না? তখন তার পিতা তাকে বলবেন, আজ আমি তোমার অবাধ্যতা করব না। অতঃপর ইবরাহীম আলায়হিস সালাম বলবেন, হে প্রতিপালক! আপনি আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, হাশরের দিন আমাকে অপমানিত করবেন না। অথচ আজ আমার পিতা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত, অতএব এর চেয়ে অধিক লাঞ্ছনা ও অপমান আর কি হতে পারে? তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, আমি কাফিরদের জন্য জান্নাত অবৈধ করে রেখেছি। অতঃপর ইবরাহীম আলায়হিস সালাম-কে বলা হবে, তুমি তোমার পায়ের তলার দিকে দেখ। তিনি সে দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই হঠাৎ দেখবেন যে, তার সামনে কাদা গোবরে লণ্ডভণ্ড শিয়াল আকৃতি একটি নিকৃষ্ট পশু দাঁড়িয়ে আছে। তখনি তাকে চার পা ধরে জাহান্নামে ফেলে দেয়া হবে। (বুখারী)
الفصل الاول (بَاب الْحَشْر)
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: يَلْقَى إِبْرَاهِيمُ أَبَاهُ آزَرَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَعَلَى وَجْهِ آزَرَ قَتَرَةٌ وَغَبَرَةٌ فَيَقُولُ لَهُ إِبْرَاهِيمُ: أَلَمْ أَقُلْ لَكَ: لَا تَعْصِنِي؟ فَيَقُولُ لَهُ أَبُوهُ: فَالْيَوْمَ لَا أَعْصِيكَ. فَيَقُول إِبراهيم: يَا رب إِنَّك وَعَدتنِي أَلا تخزني يَوْمَ يُبْعَثُونَ فَأَيُّ خِزْيٍ أَخْزَى مِنْ أَبِي الْأَبْعَدِ فَيَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى: إِنِّي حَرَّمْتُ الْجَنَّةَ عَلَى الْكَافِرِينَ ثُمَّ يُقَالُ لِإِبْرَاهِيمَ: مَا تَحْتَ رِجْلَيْكَ؟ فَيَنْظُرُ فَإِذَا هُوَ بِذِيخٍ مُتَلَطِّخٍ فَيُؤْخَذُ بقوائمه فَيُلْقى فِي النَّار . رَوَاهُ البُخَارِيّ
رواہ البخاری (3350) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (عَلَى وَجْهِ آزَرَ قَتَرَةٌ) এটা কুরআনের প্রকাশ্য অর্থের সাথে মিল রয়েছে; যেমন আল্লাহর বাণী, (وَ وُجُوۡهٌ یَّوۡمَئِذٍ عَلَیۡهَا غَبَرَۃٌ ﴿ۙ۴۰﴾ تَرۡهَقُهَا قَتَرَۃٌ ﴿ؕ۴۱﴾) “সেদিন কতক মুখ হবে ধূলিমলিন। তাদেরকে কালিমা আচ্ছন্ন করে রাখবে”- (সূরা আল ‘আবাসা ৮০: ৪০-৪১)। অর্থাৎ তাকে ধুলোই ঢেকে ফেলবে। (غَبَرَۃٌ) বলা হয় মাটির ধুলোকে। আর (قَتَرَۃٌ) বলা হয় হতাশায় বা দুঃখে সৃষ্ট মলিনতাকে। কেউ বলেন, দুঃখ বা বিপদে মুখমণ্ডল ঢেকে ফেললে তাকে (قَتَرَۃٌ) বলা হয়। আর যার গায়ে ধুলো পড়ে তাকে (غَبَرَۃٌ) বলা হয়। এটি একটি বাহ্যিক বা অনুভবযোগ্য, অন্যটি আত্মিক বা মানসিক। কেউ বলেন, অধিক এমন ধুলোকে (قَتَرَۃٌ) বলা হয় যা মুখমণ্ডলকে মলিন করে দেয়। কেউ বলেন, ধোয়াশে কালোকে (قَتَرَۃٌ) বলা হয়। এখানে সেদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
(فَأَيُّ خِزْيٍ أَخْزَى مِنْ أَبِي الْأَبْعَدِ) এখানে ইবরাহীম আলায়হিস সালাম স্বীয় পিতার ব্যাপারে তাঁর শাফা'আত কবুল না হওয়ায় নিজকে (أَبْعَدِ) বলে ধরে নিয়েছেন। কেউ বলেন, (أَبْعَدِ) শব্দটি (ابيه) থেকে (صِفَةُ) হয়েছে। অর্থাৎ তাঁর পিতা আল্লাহর রহমত থেকে অনেক দূরে। কারণ পাপী ব্যক্তি আল্লাহর রহমত থেকে দূরে থাকে। আর কাফির তো আরো দূরে। কেউ বলেছেন, (أَبْعَدِ) ইসমে তাফযীল (بعيد) সিফাতুল মুশাববাহার অর্থে ব্যবহার হয়েছে যার অর্থ ধ্বংস। ইসমে তাফযীলের অর্থে ব্যবহার হওয়াই অধিক মজবুত। কারণ ইবরাহীম ইবনু তহমান-এর বর্ণনায় রয়েছে, (وَإِنْ أَخْزَيْتَ أَنِي فَقَدْ أَخْزَيْتَ الْأَبْعَدَ)
(فَإِذَا هُوَ بِذِيخٍ مُتَلَطِّخٍ فَيُؤْخَذُ بقوائمه فَيُلْقى فِي النَّار) এ বাক্যের মধ্যে (زِيخٍ) শব্দটি ‘যাল' বর্ণে যের, ইয়া সার্কিন ও পরে ‘খা অর্থ পুরুষ হায়েনা। কেউ কেউ বলেন, অধিক চুলবিশিষ্ট হলে তাকে (زِيخ) বলা হয়। (مُتَلَطِّخ) শব্দের অর্থ মেখে যাবে। কোন ভাষ্যকার বলেন, গোবর, রক্ত বা মাটিতে মেখে যাবে। কোন বর্ণনায় আছে, তার কাছ থেকে তাকে সরিয়ে নেয়া হবে। অতঃপর বলবেন, হে ইবরাহীম! তোমার পিতা কোথায়? তিনি বলবেন, আপনি তো আমার নিকট থেকে তাকে সরিয়ে নিয়েছেন। তিনি বলবেন, নিচে লক্ষ্য কর। তিনি যখন তাকাবেন তখন দেখবেন একটি প্রাণী ময়লায় গড়াগড়ি দিচ্ছে।
অন্য বর্ণনায় আছে, আল্লাহ তাঁর পিতাকে বিকৃত করে হায়েনা করবেন। আবূ সাঈদ-এর হাদীসে রয়েছে, হায়েনার আকৃতিতে দুর্গন্ধযুক্ত বিভৎস চেহারায় পরবর্তিত হবে।
আইয়ুব-এর বর্ণনায় রয়েছে, তার নাক ধরে বলবেন, হে আমার বান্দা! এটা তোমার পিতা। তিনি বলবেন, তোমার কসম! এটা নয়।
বলা হয়, তার চেহারাকে বিকৃত করার হিকমত হলো ইবরাহীম আলায়হিস সালাম-এর মন যেন তার থেকে সরে যায় এবং সে আসল চেহারায় জাহান্নামে না থাকে। কারণ এতে ইবরাহীম আলায়হিস সালাম অপমানিত হবেন।
কেউ বলেন, হায়েনার চেহারায় বিকৃত হওয়ার হিকমত হলো, হায়েনা প্রাণীর মধ্যে সর্বাধিক আহমাদ। আর আযর মানুষের মাঝে সবচাইতে বড় আহাম্মক। কারণ তার ছেলের কাছে সুস্পষ্ট নিদর্শন প্রকাশিত হবার পরেও কুফরীর উপর অনঢ় থেকেছে আমৃত্যু। ইবরাহীম আলায়হিস সালাম তার পিতার প্রতি অত্যন্ত বিনয়ী ছিলেন। আর তিনি তার জন্য বাহুকে কোমল করেছেন। কিন্তু সে অমান্য করেছে এবং অহংকারবশত কুফরীর উপর গো ধরেছে। সে কারণে কিয়ামতের দিন তার সাথে অপমানজনক আচরণ করা হবে।
কেবলমাত্র তার প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে যা সে তার পিতাকে দিয়েছিলেন। কিন্তু যখন এটা তার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, সে আল্লাহর শত্রু, তখন সে তার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন। দেখুন- সূরাহ্ আত্ তাওবাহ্ ৯: ১১৪। (ফাতহুল বারী ৮ম খণ্ড, হা. ৪৭৬৮-৬৯)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাশর
৫৫৩৯-[৮] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: কিয়ামতের দিন সকল মানুষ ঘর্মাক্ত হয়ে পড়বে, যা তাদের ঘাম জমিনের সত্তর গজ পর্যন্ত ছড়িয়ে যাবে, এমনকি তা দু’কান পর্যন্ত পৌছে লাগামে পরিণত হবে। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب الْحَشْر)
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَعْرَقُ النَّاسُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يَذْهَبَ عَرَقُهُمْ فِي الْأَرْضِ سَبْعِينَ ذِرَاعًا وَيُلْجِمُهُمْ حَتَّى يَبْلُغَ آذَانَهُمْ» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (6532) و مسلم (61 / 2863)، (7205) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: বায়হাক্বীতে ‘আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, সেদিনের বিপদ খুব কঠিন হবে। এমনকি ঘাম কাফিরের মুখ বরাবর হবে। তাঁকে বলা হলো, মু'মিনরা কোথায় থাকবে? তিনি (সা.) বললেন, তারা থাকবে স্বর্ণের চেয়ারের উপরে। আর তাদেরকে মেঘ ছায়া দান করবে। আবূ মূসা (রাঃ)-এর বর্ণনায় রয়েছে, কিয়ামতের দিন মানুষের মাথার উপর সূর্য থাকবে। আর তাদের ‘আমালসমূহ মাথার উপর ছায়া দিবে।
ইবনু আবূ শায়বায় সালমান (রাঃ) বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, কিয়ামতের দিন সূর্যকে দশ বছরের তাপ প্রদান করা হবে। অতঃপর তা মানুষের খুলির কাছাকাছি করা হবে যেন তা ধনুকের রশির সমান। মানুষেরা ঘর্মাক্ত হবে, এতে ঘাম চুয়ে মানুষের দেহের সমান হয়ে যাবে। এত উঁচু হয়ে যাবে যে, মানুষেরা ঘড় ঘড় আওয়াজ করবে। সে তাপে সেদিন মুমিন নারী-পুরুষের কোন ক্ষতি হবে না।
আবূ ইয়ালা (রাঃ)-এর বর্ণনায় আছে, কিয়ামতের দিন ঘাম মানুষের মুখ পরিমাণ হবে যেমন মুখে লাগাম থাকে। এতে সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! জাহান্নামে দিয়ে হলেও এখান থেকে আমাকে অবকাশ দিন। এসব অবস্থা হাশরের ময়দানে ঘটবে। তাদের ‘আমল অনুযায়ী শাস্তির অবস্থা বিভিন্ন রকম হবে। আর কাফিররা তো কঠিন বিপদে অবস্থান করবে।
হাদীসের প্রকাশ্য অর্থানুযায়ী মানুষ এই বিপদের অন্তর্ভুক্ত। তবে অন্য হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, এটা বিশেষ এক শ্রেণি, তারা সংখ্যায় বেশি। এর মধ্য থেকে বাদ দেয়া হয়েছে নবীদেরকে, শহীদদের ও আরো যাদেরকে আল্লাহ ইচ্ছা করেন। অতএব সবচেয়ে বেশি ঘাম হবে কাফিরদের, অতঃপর কবীরা গুনাহগারদের, অতঃপর পরবর্তী শ্রেণিদের। কাফিরদের সংখ্যার তুলনায় মুসলিমদের সংখ্যা অতি নগণ্য হবে।
এগুলো সব অদৃশ্যের প্রতি ঈমান আনয়নের অন্তর্ভুক্ত, যে এথেকে বিরত থাকবে, সে বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এসব জানিয়ে দেয়ার উপকারিতা হলো যাতে শ্রোতাগণ সতর্ক হয় এবং ঐসব বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করে। (ফাতহুল বারী ১১শ খণ্ড, হা. ৬৫৩২)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাশর
৫৫৪০-[৯] মিকদাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে বলতে শুনেছি, কিয়ামতের দিন সূর্যকে সৃষ্টিকুলের অতি কাছাকাছি করে দেয়া হবে। এমনকি তা প্রায় এক মাইলের ব্যবধানে হয়ে যাবে। অতএব তখন তার তাপে মানব সম্প্রদায় আপন আপন ’আমল অনুযায়ী ঘামের মধ্যে ডুবে থাকবে। কারো ঘাম টাখনু পর্যন্ত হবে। কারো হাঁটু অবধি। কারো কোমর অবধি আর কারো জন্য এ ঘাম লাগাম পর্যন্ত হয়ে যাবে (অর্থাৎ তার মুখের ভিতরে লাগামের ন্যায় ঢুকে যাবে) এ কথাটি বলে রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজের মুখের দিকে হাত দ্বারা ইঙ্গিত করলেন। (মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب الْحَشْر)
وَعَنِ الْمِقْدَادِ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «تُدْنَى الشَّمْسُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنَ الْخَلْقِ حَتَّى تَكُونَ مِنْهُمْ كَمِقْدَارِ مِيلٍ فَيَكُونُ النَّاسُ عَلَى قَدْرِ أَعْمَالِهِمْ فِي الْعَرَقِ فَمِنْهُمْ مَنْ يَكُونُ إِلَى كَعْبَيْهِ وَمِنْهُمْ مَنْ يَكُونُ إِلَى رُكْبَتَيْهِ وَمِنْهُمْ مَنْ يَكُونُ إِلَى حَقْوَيْهِ وَمِنْهُمْ مَنْ يُلْجِمُهُمُ الْعَرَقُ إِلْجَامًا» وَأَشَارَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِيَدِهِ إِلَى فِيهِ. رَوَاهُ مُسلم
رواہ مسلم (62 / 2864)، (7206) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (كَمِقْدَارِ مِيلٍ) এটা মূলত (حَتَّى يَكُونَ مِقْدَارُقُوْبِ الشَّمْسِ مِنْهُمْ مِثْلَ مِقْدَارِمِيلٍ) সূর্য তাদের কাছে দূরত্ব হবে এক মাইলের সমপরিমাণ।
কেউ কেউ এ হাদীসে এ সন্দেহের সৃষ্টি করেছে যে, সূর্য পৃথিবী থেকে কয়েক লক্ষ মাইল দূরে থাকার পরেও এত তাপ অনুভূত হয় তাহলে এক মাইল উপরে হলে তার কিরণ বা তার অগ্নিশিখা দ্বারা সব কিছু মুহূর্তের মধ্যে পুড়ে মাটিতে রূপান্তরিত হয়ে যাবে। এসব বিষয় আখিরাতের বর্ণনা। তথাকার দেহে সে মতোই হবে। ফলে সে দেহ এত তাপ সহ্য করার ক্ষমতা রাখবে। যেমন বুধ গ্রহ সূর্যের এ পরিমাণ কাছে যে, জমিনবাসী এক মুহূর্ত টিকতে পারবে না। এ সত্ত্বেও বুধ গ্রহের মাখলুকরা আরামে রয়েছে। যাদের ঘাম পায়ের টাখনু পর্যন্ত পৌছবে তাদের ভালো আমল খুব বেশি। এদের উপরে অন্যদেরকে অনুমান করে নিতে হবে যে, যার যত নেক আমল কম হবে, তার ততটুকু পরিমাণ ঘামে ডুবে যাবে।
ইবনু মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, তুমি যদি বল, যখন ঘাম হবে সমুদ্রের মতে, এতে কারো মুখ পর্যন্ত পৌঁছবে, তাহলে কিভাবে অন্যের টাখনু পর্যন্ত হবে? এর জবাবে আমরা বলব যে, আল্লাহ তা'আলা কারো পায়ের নীচে জমিনকে উঁচু করবেন। অথবা বলা যায়, মানুষের ‘আমাল অনুযায়ী তার ঘামকে আটকিয়ে রাখবেন। ফলে এর বিপরীত কারো নিকটে পৌছবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা মূসা আলায়হিস সালাম-এর জন্য নদীর স্রোতকে আটকিয়ে ছিলেন। মিরক্বাতুল মাফাতীহ প্রণেতা বলেন, শেষের মতটি গ্রহণযোগ্য। কারণ আখিরাতের সব বিষয় স্বাভাবিক ব্যাপারগুলোর ব্যতিক্রম। সবকিছুই বিবেকের কাছে স্পষ্টভাবে প্রকশিত হয় না।
তুমি কি দেখ না এক কবরে দু’জন ব্যক্তির একজনকে শাস্তি দেয়া হয় এবং অন্যজন সুখে আরামে থাকে। একজন তো অন্যজনের ব্যাপারে কিছুই বুঝে না। এর উদাহরণ দুনিয়াতেও দু’জন ঘুমন্ত ব্যক্তির স্বপ্ন দু' রকম। একজন চিন্তিত ও পেরেশান হয়। আর অন্যজন আনন্দে থাকে। উপরন্তু একই জায়গায় দু’জন উপবিষ্ট থাকে। তন্মধ্যে একজন উপরে থাকে। আবার অন্যজন সর্বনিম্নে অবস্থান করে। অথবা একজন সুস্থ থাকে অন্যজন ব্যথায় অথবা দুঃখ কষ্টে থাকে। (মিকাতুল মাফাতীহ)।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাশর
৫৫৪১-[১০] আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। একদিন তিনি (সা.) বললেন: (কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা আদম আলায়হিস সালাম-কে লক্ষ্য করে বলবেন, হে আদম! আদম আলায়হিস সালাম উত্তরে বলবেন, হে আমার প্রভু! আমি উপস্থিত! আপনার আনুগত্যই আমার জন্য সৌভাগ্য। সমস্ত কল্যাণ আপনারই হাতে। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, তোমার আওলাদের মধ্য হতে জাহান্নামের দলকে বের কর। আদম আলায়হিস সালাম বলবেন, জাহান্নামের দলে কতজন? আল্লাহ তা’আলা বলবেন, প্রত্যেক হাজারে নয়শত নিরানব্বই জন। এ সময় শিশু বৃদ্ধ হয়ে যাবে, প্রত্যেক সন্তানধারী মহিলার গর্ভপাত হয়ে যাবে। আর তোমরা লোকেদেরকে দেখবে নেশাগ্রস্ত, মূলত তারা নেশাগ্রস্ত নয়, বরং আল্লাহর আযাবই কঠিন। সাহাবীগণ প্রশ্ন করলেন, আমাদের মধ্য থেকে কে হবে সেই একজন? তিনি বললেন, বরং তোমরা এ সুসংবাদ জেনে রাখ যে, তোমাদের মধ্য থেকে একজন এবং ইয়াজুজ-মাজুজদের থেকে এক হাজার। অতঃপর তিনি (সা.) বললেন, সে মহান সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ! আমি আশা করি যে, তোমরা হবে জান্নাতবাসীদের এক-চতুর্থাংশ। আবূ সাঈদ (রাঃ) বলেন, এ কথা শুনে আমরা সকলে ’আল্লা-হু আকবার বলে উঠলাম। অতঃপর বললেন, আমি আশা করি, তোমরা হবে জান্নাতীদের এক-তৃতীয়াংশ। তখন আমরা পুনরায় বললাম ’আল্লা-হু আকবার’। অতঃপর তিনি (সা.) বললেন, আমি আশা করি যে, তোমরা জান্নাতীদের অর্ধেক হবে। এ কথা শুনে আমরা আবার বললাম, ’আল্লা-হু আকবার। অতঃপর তিনি (সা.) বললেন, মানুষের মধ্যে তোমাদের সংখ্যার তুলনা হবে যেমন একটি সাদা গরুর চামড়ার মধ্যে একটি কালো লোম অথবা একটি কালো গরুর চামড়ার মধ্যে একটি সাদা লোম ।(বুখারী ও মুসলিম)।
الفصل الاول (بَاب الْحَشْر)
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى: يَا آدَمُ فَيَقُولُ: لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ وَالْخَيْرُ كُلُّهُ فِي يَدَيْكَ. قَالَ: أَخْرِجْ بَعْثَ النَّارِ. قَالَ: وَمَا بَعْثُ النَّارِ؟ قَالَ: مِنْ كُلِّ أَلْفٍ تِسْعَمِائَةٍ وَتِسْعَةً وَتِسْعِينَ فَعِنْدَهُ يَشِيبُ الصَّغِيرُ (وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى النَّاسَ سُكَارَى وَمَا هُمْ بِسُكَارَى وَلَكِنَّ عَذَابَ اللَّهِ شديدٌ) قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَأَيُّنَا ذَلِكَ الْوَاحِدُ؟ قَالَ: «أَبْشِرُوا فَإِنَّ مِنْكُمْ رَجُلًا وَمِنْ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ أَلْفٌ» ثُمَّ قَالَ: «وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ أَرْجُو أَنْ تَكُونُوا رُبُعَ أَهْلِ الْجَنَّةِ» فَكَبَّرْنَا. فَقَالَ: «أَرْجُو أَنْ تَكُونُوا ثُلُثَ أَهْلِ الْجَنَّةِ» فَكَبَّرْنَا فَقَالَ: «أَرْجُو أَنْ تَكُونُوا نِصْفَ أَهْلِ الْجَنَّةِ» فَكَبَّرْنَا قَالَ: «مَا أَنْتُمْ فِي النَّاسِ إِلَّا كَالشَّعْرَةِ السَّوْدَاءِ فِي جِلْدِ ثَوْرٍ أَبْيَضَ أَوْ كشعرة بَيْضَاءَ فِي جِلْدِ ثَوْرٍ أَسْوَدَ» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (3348) و مسلم (379 / 222)، (532) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: (بَعْثَ النَّارِ) অর্থাৎ জাহান্নামে প্রেরিত হওয়ার জন্য উপযুক্ত দল। (مَا بَعْثُ النَّارِ؟) এর অর্থ (مَا مِقْدَارُمَبْعُوثِالنَّارِ؟) জাহান্নামে প্রেরিত লোকেদের সংখ্যা কত? কেউ বলেন, (مَا) এখানে সংখ্যাবাচক (كَمِ) এর অর্থে ব্যবহার হয়েছে।
(مِنْ كُلِّ أَلْفٍ تِسْعَمِائَةٍ وَتِسْعَةً وَتِسْعِينَ) প্রতি হাজারে নয়শত নিরানব্বই জন। এর বিপরীতে আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) -এর হাদীসে রয়েছে, (مِنْ كُلِّ مِائَةٍ وَتِسْعَةً وَتِسْعِينَ) প্রতি একশতে নিরানব্বই জন এর উত্তরে কিরমানী বলেন, এখানে সংখ্যার কোন বিবেচনা নেই বরং এর দ্বারা মু'মিনদের সংখ্যা কম ও কাফিরদের সংখ্যা বেশি বুঝানো হয়েছে, আবার আবূ সা'ঈদ (রাঃ)-এর হাদীসকে মোট বানী আদম-এর ওপর প্রয়োগ করতে হবে। তখন প্রতি হাজারে দশজন হবে। এই অর্থই বেশি কাছাকাছি হবে। কারণ ইয়াজুজ-মাজুজের আলোচনা আবূ সা'ঈদ-এর হাদীসে এসেছে। আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)-এর হাদীসে নয়। অথবা প্রথম হাদীসকে সমগ্র সৃষ্টির সাথে যুক্ত করতে হবে এবং দ্বিতীয় হাদীসকে এ উম্মতে মুহাম্মাদীর সাথে যুক্ত করতে হবে। অতএব প্রতি এক হাজারে নয়শত নিরানব্বই জন হবে কাফির এবং প্রতি একশতে নিরানব্বই জন হবে পাপী। এটাই অধিক স্পষ্ট।
(يَشِيبُ الصَّغِيرُ) ছোটরা বৃদ্ধ হয়ে যাবে অধিক চিন্তা ও বড় উদ্বেগের কারণে। বাগাবীর বর্ণনায় রয়েছে, এতে শিশুরা বুড়ো হয়ে যাবে। আর ভয়ে গর্ভবতী মহিলা গর্ভপাত করে ফেলবে।
হাসান বলেন, স্তন্যদানকারিণী মা দুধ ছাড়ার আগেই সন্তানকে ভুলে যাবে। গর্ভবতী পেটে থাকা বাচ্চাকে অপূর্ণ প্রসব করবে। এ অর্থ সে ব্যক্তির মতকে অধিক মজবুত করে যে বলে, এ কম্পন সংঘটিত হবে দুনিয়াতে। কারণ কিয়ামতের পর গর্ভবর্তী হয় না। আর যারা বলে, এসব ঘটনা কিয়ামতে সংঘটিত হবে। তারা বলেন, এর দ্বারা বিষয়টি ভয়াবহতা বুঝানো হয়েছে। ব্যাপারটি বাস্তব নয়। যেমন মানুষের কথা (أَصَابِنَا أَمْرٌ يَشِيبُ فِيهِ الْوَلِيدُ) আমাদের এমন ব্যাপার হয়েছে যাতে শিশুরা বুড়ো হয়ে যাবে। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো বিপদ। যখন তারা বিষয়টিকে খুব বড় মনে করল এবং তাতে ভয়ের উদ্রেক হলো তখন তিনি (সা.) তাদের মনে আশায় সঞ্চার করার জন্য বললেন, (أَبْشِرُوا) “তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর।'
(فَإِنَّ مِنْكُمْ رَجُلًا وَمِنْ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ أَلْفٌ) এর অর্থ হলো, অবশ্যই তোমাদের প্রত্যেক ব্যক্তির বিপরীতে ইয়াজুজ-মাজুজ থেকে একহাজার জন হবে। এতে এ কথার ইঙ্গিত রয়েছে যে, জাহান্নামীদের সংখ্যা জান্নাতীদের সংখ্যা থেকে বেশি হবে। হয়তো নৈকট্যশীল মালাক (ফেরেশতা) ও হুরদের থাকার মাধ্যমে জান্নাতীদের সংখ্যা বাড়বে।
(أَرْجُو أَنْ تَكُونُوا نِصْفَ أَهْلِ الْجَنَّةِ» فَكَبَّرْنَا) ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: হাদীসে এ নির্দেশনা আছে যে, ইয়াজুজ-মাজুজেরা এ হুমকির মধ্যে শামিল। আর ইয়াজুজ-মাজুজ ছাড়া অন্য পূর্ববর্তী উম্মতরাও এর মধ্যে শামিল। অতএব যখন মোট জান্নাতীদের অর্ধেক পূর্ববর্তী উম্মাতের উপরে সমবেত হবে তখন তাদের এক হাজারের জন্য একজন করেই হবে। সম্ভবত এ হাদীসটির উম্মতে মুহাম্মাদীর দুই-তৃতীয়াংশ জান্নাতে যাওয়ার বর্ণিত হাদীসের পূর্বের হাদীস। কারণ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, জান্নাতীদের একশত বিশটি কাতার হবে। তন্মধ্যে আশিটি হবে উম্মতে মুহাম্মাদীর ও চল্লিশটি হবে বাকী উম্মাতের। আর এটাও হতে পারে যে, তাদের অর্ধেক প্রথমে প্রবেশ করবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাশর
৫৫৪২-[১১] উক্ত রাবী [আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে বলতে শুনেছি, (কিয়ামতের দিন) যখন আমাদের প্রভু পায়ের নলা বা গোছা উন্মোচিত করবেন, তখন ঈমানদার নারী-পুরুষ প্রত্যেকেই তাঁকে সিজদাহ্ করবে। আর বিরত থাকবে ঐ সকল লোক যারা দুনিয়াতে রিয়া (লোক দেখানো) ও শুনানোর জন্য সিজদাহ্ করত, তারা সিজদাহ করতে চাইবে কিন্তু তাদের পৃষ্ঠদেশ ও কোমর একটি কাষ্ঠফলকের মতো শক্ত হয়ে যাবে। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب الْحَشْر)
وَعَنْهُ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «يَكْشِفُ رَبُّنَا عَنْ سَاقِهِ فَيَسْجُدُ لَهُ كُلُّ مُؤْمِنٍ وَمُؤْمِنَةٍ وَيَبْقَى مَنْ كَانَ يَسْجُدُ فِي الدُّنْيَا رِيَاءً وَسُمْعَةً فَيَذْهَبُ لِيَسْجُدَ فَيَعُودُ ظَهْرُهُ طَبَقًا وَاحِدًا» . مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (4919) و مسلم (لم اجدہ ، و انظر ح 5579 من ھذا الکتاب) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: আল্লাহ তা'আলা যে সব বস্তু নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন সে সবগুলো সত্য এবং প্রকাশ্য অর্থেই গণ্য। যেমন আল্লাহ তা'আলার আকার আকৃতি ও হাকীকাত, কোন মানুষের নিকট জানা নেই। এসবের উপর ঈমান আনা উচিত। আর এসবের আকৃতি প্রকৃতির ব্যাপার আল্লাহর নিকট সোপর্দ করা উচিত। উপমা ও তুলনা থেকে বেঁচে থাকা দরকার। এ কল্পনা না হয় যে, (আল্লাহ মাফ করুক) আল্লাহ তাআলার হাত, চেহারা, চোখ অথবা নলা কোন সৃষ্টির হাত, চেহারা ও চোখের মতো। বরং যেমন তার জাত বা সত্তার তুলনাহীন তেমনিভাবে তাঁর গুণাবলির ক্ষেত্রেও। এটা সালাফদের ‘আক্বীদাহ্ বা বিশ্বাস। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাশর
৫৫৪৩-[১২] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: কিয়ামতের দিন খুব মোটাতাজা একজন বড় লোক আসবে। কিন্তু আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা একটি মশার পাখার সমানও হবে না। অতঃপর তিনি এর প্রমাণস্বরূপ বললেন, তোমরা এই আয়াতটি পাঠ কর- (فَلَا نُقِیۡمُ لَهُمۡ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ وَزۡنًا) “আমি কিয়ামতের দিন কাফিরদের (নেক ’আমলের) জন্য কোন ওযনই স্থাপন করব না”- (সূরা আল কাহফ ১৮: ১০৫)। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب الْحَشْر)
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَيَأْتِي الرَّجُلُ الْعَظِيمُ السَّمِينُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لَا يَزِنُ عندَ الله جَناحَ بعوضة» . وَقَالَ: اقرؤوا (فَلَا نُقيمُ لَهُم يومَ القيامةِ وَزْناً) مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (4729) و مسلم (18 / 2785)، (7045) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: (لَيَأْتِي الرَّجُلُ الْعَظِيمُ) অর্থাৎ মান-মর্যাদা, প্রভাব, মাংস-চর্বি নিয়ে উপস্থিত হবে। তখন (السَّمِينُ) শব্দটি (عَطْفَ بَيَانٍ) হবে। (لَايَزِنُ) সমান হবে না। (عندَ الله جَناحَ بعوضة) আল্লাহর নিকটে একটি মাছি পাখা পরিমাণও ওযন হবে না, এর অর্থ তার কোন মূল্য নেই। যেমন 'আরবদের কথা, (مَا لِفُلَانٍ عِنْدَنَا) অমুকের আমাদের কাছে কোন দাম নেই। হাদীসে এসেছে, যদি দুনিয়ামূল্য আল্লাহর নিকটে মাছির ডানার সমান হত তাহলে আল্লাহ কাফিরকে সামান্য পরিমাণ পানিও পান করাতেন না। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হাশর
৫৫৪৪-[১৩] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.): এ আয়াতটি পাঠ করলেন- (یَوۡمَئِذٍ تُحَدِّثُ اَخۡبَارَهَا) “কিয়ামতের দিন জমিন তার বৃত্তান্তসমূহ প্রকাশ করে দেবে”- (সূরাহ্ আয-যিলযাল ৯৯: ৪)। অতঃপর বললেন, তোমরা কি জান, জমিনের বর্ণনা কি? সাহাবীগণ বললেন, আল্লাহ তা’আলা এবং তাঁর রাসূলই অধিক জানেন। তিনি (সা.) বললেন, জমিনের বক্তব্য হলো, প্রত্যেক পুরুষ ও প্রত্যেক নারী সম্পর্কে এ সাক্ষ্য দিবে যে, সে তার পিঠে থাকাকালে কী কী কর্মকাণ্ড করেছে। তা এভাবে বলবে যে, অমুকে অমুক কাজটি অমুক দিন করেছে। এটাই জমিনের বৃত্তান্ত। [আহমাদ ও তিরমিযী এবং ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, হাদীসটি হাসান, সহীহ ও গরীব]
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب الْحَشْر)
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَرَأَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ هَذِهِ الْآيَةَ: (يَوْمَئِذٍ تُحدِّثُ أخبارَها) قَالَ: أَتَدْرُونَ مَا أَخْبَارُهَا؟ قَالُوا: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ: فَإِنَّ أَخْبَارَهَا أَنْ تَشْهَدَ عَلَى كلِّ عَبْدٍ وَأَمَةٍ بِمَا عَمِلَ عَلَى ظَهْرِهَا أَنْ تَقول: عمِلَ عَليَّ كَذَا وَكَذَا يومَ كَذَا وَكَذَا . قَالَ: «فَهَذِهِ أَخْبَارُهَا» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ غَرِيبٌ
اسنادہ ضعیف ، رواہ احمد (2 / 374 ح 8854) و الترمذی (2429) * یحیی بن ابی سلیمان ضعیف ضعفہ الجمھور (انظر نیل المقصود : 893) ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: (تُحدِّثُ) অর্থাৎ (জমিন) বর্ণনা করবে।
(أَنْ تَشْهَدَ عَلَى كلِّ عَبْدٍ وَأَمَةٍ بِمَا عَمِلَ) বান্দা-বান্দী বলতে প্রত্যেক নর-নারীর ক্রিয়াকর্ম সম্পর্কে সাক্ষ্য দেয়া যে, অমুক এমন সৎকাজ বা এমন পাপ কাজ সম্পাদন করেছে।
(يومَ كَذَا وَكَذَا) অর্থাৎ এই মাসে বা এই বছরে। (قَالَ: هَذِهِ) অর্থাৎ এই সাক্ষ্যসমূহ বা উপরোক্ত ব্যাপারগুলো হলো তার বর্ণনা। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খণ্ড, হা, ২৪২৯, মিকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হাশর
৫৫৪৫-[১৪] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: যে কোন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে সে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়। সাহাবীগণ প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সেই অনুশোচনার কারণ কী? তিনি বললেন, যদি সে ভালো হয়, তখন এজন্য অনুতপ্ত হয় যে, কেন সে আরো অধিক পুণ্যের কাজ করেনি। আর যদি খারাপ হয়, তখন এজন্য লজ্জিত হয় যে, কেন সে নিজেকে মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখেনি। (তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب الْحَشْر)
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا مِنْ أَحَدٍ يَمُوتُ إِلَّا نَدِمَ» . قَالُوا: وَمَا نَدَامَتُهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: «إِنْ كَانَ مُحْسِنًا نَدِمَ أَنْ لَا يَكُونَ ازْدَادَ وَإِنْ كَانَ مُسِيئًا نَدِمَ أَنْ لَا يكونَ نزع» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
اسنادہ ضعیف جذا ، رواہ الترمذی (2403) * یحیی بن عبید اللہ : متروک (تقدم : 5323) ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: (إِلَّا نَدِمَ) এর অর্থ আফসোস করা বা আক্ষেপ করা, অনুতপ্ত হওয়া। অতএব প্রত্যেকের উচিত মৃত্যুর পূর্বে জীবনকে গনীমতরূপে গ্রহণ করা এবং মরণ আসার আগেই ভালো কাজের প্রতিযোগিতা করা। সাহাবীগণের প্রশ্ন (مَا نَدَامَتُهُ) তাদের আফসোসের কারণ কী? আর তা হলো যদি সে সৎকর্মশীল হয় তাহলে সে দুঃখিত হয়ে বলবে, কেন যে তার ভালো ‘আমালকে বাড়ায়নি। আর যদি সে মন্দ ব্যক্তি হয় তাহলে সে দুঃখ করে বলবে, কেন যে গুনাহ পরিত্যাগ করেনি এবং নিজকে পাপকাজে জড়ানো থেকে বিরত রাখেনি। যদি সে গুনাহ ছেড়ে দিত ও মন্দ কাজে জড়ানো থেকে মুক্ত থাকত এবং তাওবাহ্ করে ভালো হয়ে। যেত! (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খণ্ড, হা. ২৪০৩)।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হাশর
৫৫৪৬-[১৫] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: কিয়ামতের দিন মানুষদেরকে তিন ভাগে একত্রিত করা হবে। একদল আসবে পায়ে হেঁটে, দ্বিতীয় দল আসবে আরোহীত হয়ে এবং তৃতীয় দল আসবে নিজেদের মুখের উপরে ভর করে। প্রশ্ন করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! তারা নিজেদের চেহারা উপরে ভর করে কিভাবে চলবে। তিনি (সা.) বললেন, নিশ্চয় যিনি তাদেরকে দু’পায়ে চালিত করতে পারেন, তিনি তাদেরকে চেহারার উপরে ভর দিয়ে চালাবার সাধ্যও রাখেন। তোমরা জেনে রাখা তারা নিজেদের মুখের উপরে চলাকলে প্রতিটি টিলা-টঙ্কর ও কাঁটা-কুটা ইত্যাদি থেকে আত্মরক্ষা করে চলবে। (তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب الْحَشْر)
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يُحْشَرُ النَّاسُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ثَلَاثَةَ أَصْنَافٍ: صِنْفًا مُشَاةً وَصِنْفًا رُكْبَانًا وَصِنْفًا عَلَى وُجُوهِهِمْ قِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَكَيْفَ يَمْشُونَ عَلَى وُجُوهِهِمْ؟ قَالَ: «إِنَّ الَّذِي أَمْشَاهُمْ عَلَى أَقْدَامِهِمْ قَادِرٌ عَلَى أَنْ يُمْشِيَهُمْ عَلَى وُجُوهِهِمْ أَمَا إِنَّهُمْ يَتَّقُونَ بِوُجُوهِهِمْ كُلَّ حَدَبٍ وَشَوْكٍ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
اسنادہ ضعیف ، رواہ الترمذی (3142 وقال : حسن) * علی بن زید بن جدعان : ضعیف ، و شیخہ مجھول و لاصل الحدیث شواھد عند البخاری (6522) و مسلم (2861)، (7202) وغیرھما ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: (صِنْفًا مُشَاةً) একদল পায়ে হেঁটে আসবে, তারা এমন মু'মিন যারা সৎ ‘আমলের সাথে মন্দকে মিশ্রিত করেছে। এক শ্রেণি উটের উপরে আরোহণ করবে, তারা অগ্রগামীপূর্ণ মু'মিন। আসলে (مُشَاةً) বা পদব্রজে গমনকারী দ্বারা শুরু করেছেন তাদেরকে সান্তনা দেয়ার জন্য। যেমন আল্লাহর বাণীতে বলা হয়েছে, (.. فَمِنۡهُمۡ ظَالِمٌ لِّنَفۡسِهٖ..) “...অতঃপর তাদের কতক নিজেদের প্রতি অত্যাচার করেছে...”- (সূরাহ্ আল ফা-ত্বির ৩৫: ৩২)।
অন্যত্র বলা হয়েছে, (..یَهَبُ لِمَنۡ یَّشَآءُ اِنَاثًا..) “...যাকে চান তাকে কন্যা সন্তান দান করেন..."- (সূরা আশ শূরা- ৪২: ৪৯)। অথবা প্রথমত তাদের ক্ষমার প্রয়োজন থাকার কারণে।
তূরিবিশতী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, যদি কেউ প্রশ্ন করেন কেন অগ্রগামীদের পূর্বে পদব্রজে গমনকারীদেরকে উল্লেখ করেছেন? এর উত্তরে আমরা বলব যে, ঈমানদারদের মধ্যে তাদের সংখ্যা অধিক হওয়ার কারণে।
(كَيْفَ يَمْشُونَ عَلَى وُجُوهِهِمْ؟) কিভাবে তারা মুখের উপর ভর দিয়ে চলবে? এ ব্যাপারে কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে, (..وَ نَحۡشُرُهُمۡ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ عَلٰی وُجُوۡهِهِمۡ عُمۡیًا وَّ بُکۡمًا وَّ صُمًّا..)“...কিয়ামতের দিন আমি তাদেরকে একত্রিত করব তাদের মুখের উপর ভর করে চলা অবস্থায় অন্ধ, বোবা ও বধির অবস্থায়...”(সূরাহ্ বানী ইসরাঈল ১৭: ৯৭); তাঁর সংবাদ সত্য ওয়াদা সত্য এবং তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।
(يَتّاقُونَ) অর্থাৎ তারা আত্মরক্ষা করবে এবং বেঁচে থাকতে চাইবে সব উঁচু-নীচু ও কষ্টকর জায়গা থেকে।
কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এর অর্থ হলো, তারা মুখের মাধ্যমে বাঁচতে চাইবে। এর দ্বারা তাদের অপমানজনক অবস্থা ও কঠিন কষ্টের অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। নির্দিষ্ট জায়গায় হেঁটে যেতে ও রাস্তায় কষ্টদায়ক বস্তু থেকে বাঁচতে হাত ও পায়ের পরিবর্তে মুখমণ্ডল ব্যবহার করবে। এটা এজন্য যে, যে সত্তা তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন ও পরিমিত আহার দান করেছেন তাঁকে তারা সিজদাহ্ করেনি। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৮ম খণ্ড, হা. ৩১৪২)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হাশর
৫৫৪৭-[১৬] ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: যে ব্যক্তি কিয়ামতের দৃশ্যটি এমনভাবে দেখতে পছন্দ করে যে, তা তার চোখের সামনে উপস্থিত সে যেন (إِذا الشَّمسُ كُوِّرَتْ) “যখন সূর্য আলোহীন হয়ে যাবে”- (সূরাহ্ আত্ তাকভীর ৮১: ১); এবং (إِذا السَّماءُ انفطرَتْ)“যখন আকাশ বিদীর্ণ হবে”- (সূরা আল ইনফিত্বা-র ৮২: ১); ও (إِذا السَّماءُ انشقَّتْ) “যখন আকাশ ভেঙ্গে খান খান হয়ে যাবে”- (সূরা আল ইনশিক্বাক ৮৪: ১); এ সূরাহ্ কয়েকটি (মর্ম বুঝে) পাঠ করে। (আহমাদ ও তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب الْحَشْر)
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ سَرَّهُ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ كَأَنَّهُ رَأْيُ عَيْنٍ فليَقرأْ: (إِذا الشَّمسُ كُوِّرَتْ) و (إِذا السَّماءُ انفطرَتْ) و (إِذا السَّماءُ انشقَّتْ) رَوَاهُ أَحْمد وَالتِّرْمِذِيّ
اسنادہ حسن ، رواہ احمد (2 / 27 ح 4806) و الترمذی (3333) ۔
(حسن)
ব্যাখ্যা: (مَنْ سَرَّهُ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ) অর্থাৎ যে ব্যক্তি কিয়ামত দিবসের অবস্থা ও তার ভয়াবহতা সম্পর্কে জেনে সন্তুষ্ট হতে চায়।
(كَأَنَّهُ رَأْيُ عَيْنٍ) স্বচোখে দেখা বা চোখের সামনে দেখা। যেমন তুমি বলে থাক (جَيَلْتُ الشَّيْءَ رَأْيَ عَيْنِكَ وَبِمَرْاى مِنْكَ) আমি বস্তুটিকে তোমার চোখের সামনে রাখলাম যাতে তুমি দেখতে পার।
(إِذا الشَّمسُ كُوِّرَتْ) হাফিয ইবনু কাসীর-এর ব্যাখ্যায় বলেন, এর অর্থ (أَظْلَمَتْ) অন্ধকার হয়ে পড়বে। মুজাহিদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, যখন তা বিলীন ও অন্তর্হিত হবে। আওফী, মুজাহিদ ও যহ্হাক একই অর্থ বলেন। কতাদাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: যখন তার আলো দূরীভূত হবে। (كُوِّرَتْ)-এর ব্যাখ্যায় রাবী ইবনু হাস্সাম বলেন, যখন তাকে ছুঁড়ে ফেলা হবে। আবূ সালিহ বলেন, এর অর্থ যখন তাকে নিক্ষেপ করা হবে এবং উল্টানো হবে। যায়দ ইবনু আসালাম (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, জমিনে নিপতিত হবে। ইবনু জারীর (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমাদের নিকট সঠিক ব্যাখ্যা হলো, কোন বস্তুকে অপর বস্তুর সাথে একত্রিত করাকে (تَكْوِيرُ) বলা হয়। এখান থেকে (تَكْوِيرُ الْعِمَامَة) পাগড়ির কোন অংশকে অন্য অংশের সাথে মিলানো।
তখন আল্লাহর বাণী, (كُوِّرَتْ) এর অর্থ হবে তার কিছু অংশ অন্য অংশের সাথে একত্রিত করা। অতঃপর তা লেপ্টিয়ে নিক্ষেপ করা। যখন এরূপ করা হবে তখন তা আলোহীন হয়ে পড়বে। হাফিয ইবনু কাসীর (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, (انفطرَتْ) অর্থ (انشقَّتْ) বিদীর্ণ হওয়া এবং (انشقَّتْ) অর্থ (انْصَدَعَتْ) ফেটে যাবে; এ সূরাগুলো উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হলো এগুলোতে কিয়ামত দিবসের ভয়াবহ আতঙ্কজনক অবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৮ম খণ্ড, হা. ৩৩৩৩)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - হাশর
৫৫৪৮-[১৭] আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সত্যবাদী সত্যায়নকারী (সা.) আমাকে বর্ণনা করেছেন, কিয়ামতের দিন মানুষদেরকে তিন দলে একত্রিত করা হবে। একদল হবে আরোহী, খাওয়াদাওয়ায় পরিতৃপ্ত ও পোশাকে আচ্ছাদিত। আরেক দল হবে এমন যাদেরকে ফেরেশতাকুল মুখের উপরে হেঁচড়িয়ে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাবে। আরেক দল হবে, যারা পায়ে হেঁটে চলবে এবং দৌড়াতে থাকবে। আল্লাহ তা’আলা বাহনের উপর বিপদে আপতিত করবেন। এটা থেকে কোনটিই নিরাপদ থাকবে না। এমনকি যে একটি বাগানের মালিক সে উক্ত বাগানের বিনিময়ে বাহনের জন্য হাওদাসহ একটি উট পেতে চাইলেও তা পেতে সক্ষম হবে না। (নাসায়ী)
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (بَاب الْحَشْر)
عَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ: إِنَّ الصَّادِقَ الْمَصْدُوقَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَدَّثَنِي: أَنَّ النَّاسَ يُحْشَرُونَ ثَلَاثَةَ أَفْوَاجٍ: فَوْجًا رَاكِبِينَ طَاعِمِينَ كَاسِينَ وفوجا تسحبنهم الْمَلَائِكَةُ عَلَى وُجُوهِهِمْ وَتَحْشُرُهُمُ النَّارُ وَفَوْجًا يَمْشُونَ وَيَسْعَوْنَ وَيُلْقِي اللَّهُ الْآفَةَ عَلَى الظَّهْرِ فَلَا يَبْقَى حَتَّى إِنَّ الرَّجُلَ لَتَكُونُ لَهُ الْحَدِيقَةُ يُعْطِيهَا بِذَاتِ الْقَتَبِ لَا يَقْدِرُ عَلَيْهَا . رَوَاهُ النَّسَائِيّ
اسنادہ حسن ، رواہ النسائی (4 / 116 ۔ 117 ح 2088) [و صححہ الحاکم (2 / 367 ، 4 / 564) و تعقبہ الذھبی مرۃ]
ব্যাখ্যা: (يَسْعَوْنَ) অর্থাৎ দ্রুত গতিতে জমিনে চলা। (الْآفَةَ) থেকে উদ্দেশ্য হলো (الْآفَةَ الموت) মৃত্যুর মহামারি। (بِذَاتِ الْقَتَبِ) এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো উষ্ট্রী।
এ ব্যাপারটি আখিরাতের সাথে সামঞ্জস্যশীল নয়। (قطب) কফ ও ত্বো বর্ণে যবর যোগে এটা উটের অর্থে ব্যবহার হয়। যেমন অন্যদের ক্ষেত্রে (إكاف) ব্যবহার হয়।
(فَوْجًا يَمْشُونَ وَيَسْعَوْنَ ...لَا يَقْدِرُ عَلَيْهَا) কুরতুবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: এ বাক্যটি ইঙ্গিত করে যে, এসব কিছু দুনিয়াতে সংঘটিত হবে।
কাযী ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ)-ও অনুরূপ মত ব্যক্ত করেন। (শারহু সুনান আন্ নাসায়ী ২য় খণ্ড, হা. ২০৮৫)
এটা হাশর যা কিয়ামতের পূর্বে পৃথিবীতে সংঘটিত হবে। আর এগুলোই সর্বশেষ নিদর্শন। হাদীসের বর্ণনা প্রসঙ্গ ও হাদীসটির এ অধ্যায় উল্লেখ করার মাধ্যমে এ ইঙ্গিত বহন করে যে, এর দ্বারা কিয়ামতের হাশর উদ্দেশ্য কিন্তু রাসূল (সা.) -এর বাণী (إِنَّ الرَّجُلَ لَتَكُونُ لَهُ الْحَدِيقَةُ) “নিশ্চয় কোন ব্যক্তির বাগান থাকবে....” এ কথা দ্বারা স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, কিয়ামতের হাশর নয়। তেমনিভাবে নবী –(সা.) এর বাণী (طَاعِمِينَ كَاسِينَ) একদল খাওয়া-দাওয়া পরিতৃপ্ত ও পোশাকাচ্ছাদিত হয়ে উপস্থিত হবে, এটাও সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, এর দ্বারা কিয়ামতের হাশর উদ্দেশ্য নয়। এ ব্যাপারে ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ)-ও বলেন, এ হাশর কিয়ামতের হাশর নয়। কারণ আখিরাতের হাশরে কেউ খাওয়া-দাওয়ায় পরিতৃপ্ত অবস্থায় এবং পোশাকাচ্ছাদিত হয়ে উপস্থিত হবে না। বরং এটা এমন হাশর যা কিয়ামতের আলামত। যেমনটি অধ্যায়ের অনুচ্ছেদের হাদীসের পূর্বে আলোচিত হয়েছে। অতএব এ অধ্যায়ে উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক। (মিশকাতুল মাসাবীহ - মুম্বাই ছাপা, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৩৮৮)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হিসাব-নিকাশ, প্রতিশোধ গ্রহণ ও মীযানের বর্ণনা
৫৫৪৯-[১] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী (সা.) বলেছেন: কিয়ামতের দিন যার হিসাব নেয়া হবে, সে অবশ্যই ধ্বংস হবে। [’আয়িশাহ (রাঃ) বলেন,] আমি বললাম, আল্লাহ তা’আলা কি এ কথা বলেননি, “শীঘ্রই তার নিকট থেকে সহজ হিসাব নেয়া হবে”। উত্তরে তিনি (সা.) বললেন, সেটা হলো শুধু পেশ করা মাত্র। কিন্তু যার হিসাব খুটিনাটি যাচাই করা হবে, সে ধ্বংস হবেই। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (باب الحساب و القصاص و المیزان )
عَنْ عَائِشَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَيْسَ أَحَدٌ يُحَاسَبُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِلَّا هَلَكَ» . قلتُ: أوَ ليسَ يقولُ اللَّهُ: (فسوْفَ يُحاسبُ حسابا يَسِيرا) فَقَالَ: «إِنَّمَا ذَلِكَ الْعَرْضُ وَلَكِنْ مَنْ نُوقِشَ فِي الْحساب يهلكُ» . مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (103) و مسلم (79 / 2876)، (7225) ۔
(مُتَّفق عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: (مَنْ نُوقِشَ فِي الْحِسَابِ) ফায়িক গ্রন্থকার বলেন, বলা হয় (نَاقَشَهُ الْحِسَابَ) যখন খুঁটিনাটি করে হিসাব নেয়া হয় এবং কম বা বেশি কিছুই ছাড়া হয় না। তন্ন তন্ন করে খোঁজা, অর্থাৎ বলা হবে, অমুকে কেন কাজ করেছে, অমুকে কেন করেনি। এজন্য হিসাবের সামনে মুক্তি পাওয়া খুবই মুশকিল। প্রতি নিঃশাসে আল্লাহর নি'আমাত রয়েছে। আর সব নি'আমাতের শুকরিয়া করা ওয়াজিব। তো এমন ইবাদত কোন বান্দা করতে সক্ষম হবে যে, সে এক মুহূর্তও আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল থাকবে না?
(هلك) এর অর্থ ধ্বংস হওয়া, যেসব মন্দ ‘আমল প্রকাশ করেছে তার বিনিময়ে শাস্তি দেয়া। আল্লাহ তা'আলার বাণীতে সহজ হিসাব বলতে এর মর্মার্থ হলো তার ‘আমলকে পেশ করা মাত্র। আসলে খুঁটিনাটি করে হিসাব নেয়া নয়। আয়াতে হিসাব দ্বারা উদ্দেশ্য হলো পেশ করা অর্থাৎ ‘আমল প্রকাশ করে দেয়া। এতে সে তার গুণাহকে চিনতে পারবে। পরে তাকে ক্ষমা করা হবে তার প্রতি অনুগ্রহ দেখিয়ে। যেমন খুঁটিনাটি হিসাব তা প্রতি ইনসাফ করার অর্থে ব্যবহার হয়। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খণ্ড, হা. ২৪২৬)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হিসাব-নিকাশ, প্রতিশোধ গ্রহণ ও মীযানের বর্ণনা
৫৫৫০-[২] ’আদী ইবনু হাতিম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যার সাথে তার রব কথাবার্তা বলবেন না। তার ও তার প্রভুর মাঝে কোন দোভাষী এবং এমন কোন পর্দা থাকবে না, যা তাকে লুকিয়ে রাখবে। সে তার ডানে তাকাবে, তখন আগে প্রেরিত ’আমল ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাবে না। আবার বামে তাকাবে, তখন আগে পাঠানো ’আমল ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাবে না। আর সম্মুখের দিকে তাকালে জাহান্নাম ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাবে না, যা একেবারে চেহারার সামনে অবস্থিত। অতএব এক টুকরা খেজুরের বিনিময়ে হলেও জাহান্নাম থেকে বাঁচতে চেষ্টা কর। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (باب الحساب و القصاص و المیزان )
وَعَن عديِّ بن حاتمٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «مَا مِنْكُم أَحَدٍ إِلَّا سَيُكَلِّمُهُ رَبُّهُ لَيْسَ بَيْنَهُ وَبَيْنَهُ تُرْجُمَانٌ وَلَا حِجَابٌ يَحْجُبُهُ فَيَنْظُرُ أَيْمَنَ مِنْهُ فَلَا يَرَى إِلَّا مَا قَدَّمَ مِنْ عَمَلِهِ وَيَنْظُرُ أَشْأَمَ مِنْهُ فَلَا يَرَى إِلَّا مَا قَدَّمَ وَيَنْظُرُ بَيْنَ يَدَيْهِ فَلَا يَرَى إِلَّا النَّارَ تِلْقَاءَ وَجْهِهِ فَاتَّقُوا النَّارَ وَلَوْ بِشِقِّ تَمْرَة» . مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (6539) و مسلم (67 / 1016)، (2348) ۔
(مُتَّفق عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: (مِنْ<مَا مِنْكُم أَحَدٍ>) অতিরিক্ত হিসেবে ব্যবহার হয়েছে না-বোধকের পরিব্যপ্তি বুঝানোর জন্য। বার্তাটি মু'মিনদের জন্য। আল্লাহ বান্দার সাথে কথা বলবেন বিনা মাধ্যমে। আল্লাহ ও বান্দার মাঝে কোন দোভাষী থাকবে না। (تُرْجُمَانٌ) অর্থ দোভাষী, যিনি কোন কথাকে এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় বুঝিয়ে দেন, রূপান্তরিত করেন, ব্যাখ্যা করেন।
বান্দা ডানদিকে তার সৎ “আমলগুলোকে উপস্থিত পাবে অথবা তার নির্ধারিত বিনিময় দেখতে পাবে। আর বামদিকে স্বীয় মন্দ ‘আমলকে উপস্থিত পাবে।
(وَلَوْ بِشِقِّ تَمْرَة) অর্থাৎ তোমরা অর্ধেক খেজুর অথবা কিয়দাংশ সদাক্বাহ করে হলেও তা করো, এর অর্থ সামান্য খেজুর বা অন্য কিছু হলেও তা দান কর। কারণ তা তোমাদের ও জাহান্নামের মাঝে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। আর অবশ্যই সদাক্বাহ ঢালস্বরূপ এবং জান্নাতের যাওয়ার ওয়াসীলাহ। (মিরকাতুল মাফাতীহ)।
হাফিয (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, স্বল্প পরিমাণে হলেও সদাকাহ্ ও সৎ ‘আমলকে তোমাদের ও জাহান্নামের মাঝে রক্ষার উপায় অবলম্বন করো। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খণ্ড, হা. ২৪১৫)।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হিসাব-নিকাশ, প্রতিশোধ গ্রহণ ও মীযানের বর্ণনা
৫৫৫১-[৩] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: (কিয়ামতের দিন) আল্লাহ তা’আলা মু’মিনদেরকে নিজের কাছাকাছি করবেন এবং আল্লাহ তা’আলা নিজ বাজু তার উপরে রেখে তাকে ঢেকে নেবেন। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা সে বন্দাকে বলবেন, আচ্ছা বল দেখি! তুমি এ গুনাহটি করেছ কি? তুমি এ গুনাহটি সম্পর্কে অবহিত আছ কি? সে বলবে, হ্যাঁ, হে আমার রব! আমি অবহিত আছি।
শেষ পর্যন্ত এক একটি করে তার কৃত সকল গুনাহের স্বীকৃতি আদায় করবেন। এদিকে সে বান্দা মনে মনে ধারণা করবে যে, সে এই সমস্ত অপরাধের কারণে নিঃসন্দেহে ধ্বংস হবে। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, দুনিয়াতে আমি তোমার এ সকল অন্যায় ঢেকে রেখেছিলাম। আর আজ আমি তা মাফ করে তোমাকে মুক্তি দিব। অতঃপর তাকে নেকির ’আমলনামা দেয়া হবে। আর কাফির ও মুনাফিকদেরকে সমস্ত সৃষ্টিকুলের সামনে আনা হবে এবং উচ্চৈঃস্বরে এ ঘোষণা দেয়া হবে- এরা তারা, যারা আপন প্রভুর বিরুদ্ধে মিথ্যারোপ করত। জেনে রাখ, এ সমস্ত যালিমদের ওপর আজ আল্লাহর লানত। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (باب الحساب و القصاص و المیزان )
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: إِن الله يدني الْمُؤمن فَيَضَع على كَنَفَهُ وَيَسْتُرُهُ فَيَقُولُ: أَتَعْرِفُ ذَنْبَ كَذَا؟ أَتَعْرِفُ ذَنْب كَذَا؟ فَيَقُول: نعم يَا رب حَتَّى قَرَّرَهُ ذنُوبه وَرَأى نَفْسِهِ أَنَّهُ قَدْ هَلَكَ. قَالَ: سَتَرْتُهَا عَلَيْكَ فِي الدُّنْيَا وَأَنَا أَغْفِرُهَا لَكَ الْيَوْمَ فَيُعْطَى كِتَابَ حَسَنَاتِهِ وَأَمَّا الْكُفَّارُ وَالْمُنَافِقُونَ فَيُنَادَى بِهِمْ على رؤوسِ الْخَلَائِقِ: (هَؤُلَاءِ الَّذِينَ كَذَبُوا عَلَى رَبِّهِمْ أَلَا لعنةُ اللَّهِ على الظالمينَ) مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (2441) و مسلم (52 / 2768)، (7015) ۔
(مُتَّفق عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: (كنف) অর্থ বাজু বা ডানা, এর উপরেও আকার-আকৃতি বর্ণনা ব্যতীত ঈমান আনা ওয়াজিব। এ হাদীস থেকে আরো বুঝা যায় যে, আল্লাহ তা'আলা কথা বলেন। এর হরফ ও আওয়াজ রয়েছে, সম্বোধিত ব্যক্তি এ পবিত্র কথাকে বিনা কষ্টে বুঝতে পারবে। আর এটা হরফ ও আওয়াজ ব্যতিরেকে সম্ভব নয়। (মিশকাতুল মাসাবীহ মুম্বাই ছাপা, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৩৯০)
(إِن الله يدني الْمُؤمِنَ) মু'মিন এখানে অনির্দিষ্ট অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এর দ্বারা মু'মিনের জিনস উদ্দেশ্য। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
কাফির ও মুনাফিকদের কোনভাবেই ক্ষমা করা হবে না, বরং আল্লাহর লানত বা অভিশাপ তাদের ওপর কার্যকর হবে। হে আল্লাহ! আমরা তোমার লানত থেকে তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। (সম্পাদকীয়)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হিসাব-নিকাশ, প্রতিশোধ গ্রহণ ও মীযানের বর্ণনা
৫৫৫২-[৪] আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) - বলেছেন: যখন কিয়ামতের দিন আসবে, তখন আল্লাহ তা’আলা প্রত্যেক মুসলিমকে এক একটি করে ইয়াহূদী অথবা নাসারা প্রদান করবেন, অতঃপর বলবেন, এটা জাহান্নাম থেকে তোমার মুক্তির বিনিময়। (মুসলিম)
الفصل الاول (باب الحساب و القصاص و المیزان )
وَعَنْ أَبِي مُوسَى قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ دَفَعَ اللَّهُ إِلَى كُلِّ مُسْلِمٍ يَهُودِيًّا أَوْ نَصْرَانِيًّا فَيَقُولُ: هَذَا فِكَاكُكَ مِنَ النَّارِ رَوَاهُ مُسلم
رواہ مسلم (49 / 2767)، (7011) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (إِلَى كُلِّ مُسْلِمٍ) মুসলিম পুরুষ হোক বা মহিলা (او) হরফটি এখানে (تَنْوِيعِ) শ্রেণি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। (هَذَا فِكَاكُكَ مِنَ النَّارِ) অর্থাৎ এ কিতাবীরা তোমাদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তোমাদের বিনিময়স্বরূপ। তূরিবিশতী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, মুক্তিপণ হলো যার মাধ্যমে রক্ষা পাওয়া যায়।
কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, যেহেতু প্রত্যেক দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির জন্য জান্নাতের একটি স্থান ও জাহান্নামের একটি স্থান নির্ধারিত রয়েছে। অতএব যে ব্যক্তি যথাযথভাবে ঈমান আনবে তার জাহান্নামের স্থানকে জান্নাতের স্থানের সাথে বদলানো হবে আর যে ঈমান আনবে না সে এর বিপরীত। কাফিররা জাহান্নামের মুমিনদের জায়গায় স্থলাভিষিক্ত হবে। এর আরেকটি কারণ হলো যেহেতু আল্লাহ তা'আলা জাহান্নাম পূর্ণ করার কসম করেছেন, সেহেতু মু'মিনদের বাঁচিয়ে ও রক্ষা করে কাফির দ্বারা পূর্ণ করবেন। অতএব কাফিররা সেখানে মু'মিনদের বিনিময় বা মুক্তিপণস্বরূপ জাহান্নামে নিপতিত হবে। ইয়াহুদী ও নাসারাদেরকে বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ হয়তো তাদেরকে তিরস্কার করা। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
এ হাদীসের অর্থ আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)-এর হাদীসে এভাবে এসেছে, প্রত্যেকের জন্য জান্নাতে একটি স্থান ও জাহান্নামে একটি স্থান আছে। অতঃপর যখন মু'মিন জান্নাতে প্রবেশ করে তখন জাহান্নামে কাফির তার স্থলাভিষিক্ত হয় স্বীয় গুনাহের কারণে।
অন্য একটি বর্ণনার মর্মার্থ এরূপ যে, আল্লাহ তা'আলা মুসলিমদের পাপকে ক্ষমা করবেন। আর তা ঝরিয়ে সমপরিমাণ গুনাহ কাফিরদের ওপর চাপিয়ে দিবেন তাদের গুনাহ ও কুফরীর কারণে। ফলে আল্লাহ তাদেরকে স্বীয় ‘আমলের দরুন জাহান্নামে দাখিল করবেন, মুসলিমদের গুনাহের জন্য নয়। কারণ একের বোঝা অন্যজন বহন করবে না। আল্লাহ যখন মুসলিমদের পাপকে ক্ষমা করবেন, তখন কাফিরদের গুনাহকে রেখে দিবেন। (শারুহুন্ নাবাবী ১৭শ খণ্ড, হা, ২৭৬৭)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হিসাব-নিকাশ, প্রতিশোধ গ্রহণ ও মীযানের বর্ণনা
৫৫৫৩-[৫] আবূ সাঈদ [আল খুদরী (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: কিয়ামতের দিন নূহ আলাহিস সালাম-কে উপস্থিত করে প্রশ্ন করা হবে, তুমি কি আমার হুকুম-আহকাম মানুষদের কাছে পৌছিয়েছিলে? তিনি বলবেন, হ্যাঁ, পৌছিয়ে ছিলাম হে আমার রব! তখন তার উম্মতগণকে প্রশ্ন করা হবে, তিনি কি তোমাদেরকে (আমার হুকুম-আহকাম) পৌছিয়ে দিয়ে ছিলেন? তারা বলবে, আমাদের কাছে (এ দিন সম্পর্কে) কোন ভয় প্রদর্শনকারী আসেনি। তখন নূহ আলায়হিস সালাম-কে বলা হবে, তোমার সাক্ষী কে আছে? উত্তরে নূহ আলায়হিস সালাম বলবেন, মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর উম্মতগণ! রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমাদেরকে তখন উপস্থিত করা হবে এবং তোমরা এ সাক্ষ্য দিবে যে, অবশ্যই নূহ আলায়হিস সালাম তাঁর উম্মাতের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছিয়ে দিয়েছিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) এ আয়াতটি পাঠ করলেন- অর্থাৎ আর আমি তোমাদেরকে এভাবেই একটি মধ্যপন্থী উম্মতরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছি, যাতে তোমরা মানব জাতির সাক্ষী হতে পার। আর রাসূল (মুহাম্মাদ) তোমাদের জন্য সাক্ষী হন। (বুখারী)
الفصل الاول (باب الحساب و القصاص و المیزان )
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يُجَاءُ بِنُوحٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيُقَالُ لَهُ: هَلْ بَلَّغْتَ؟ فَيَقُولُ: نَعَمْ يَا رَبِّ فَتُسْأَلُ أُمَّتُهُ: هَلْ بَلَّغَكُمْ؟ فَيَقُولُونَ: مَا جَاءَنَا مِنْ نَذِيرٍ. فَيُقَالُ: مَنْ شُهُودُكَ؟ فَيَقُولُ: مُحَمَّدٌ وَأُمَّتُهُ . فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «فيجاء بكم فتشهدون على أنَّه قد بلَّغَ» ثُمَّ قَرَأَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ (وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدا) رَوَاهُ البُخَارِيّ
رواہ البخاری (3339) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: এটা আল্লাহ তা'আলার বাণী, (یَوۡمَ یَجۡمَعُ اللّٰهُ الرُّسُلَ فَیَقُوۡلُ مَا ذَاۤ اُجِبۡتُمۡ ؕ قَالُوۡا لَا عِلۡمَ لَنَا ؕ اِنَّکَ اَنۡتَ عَلَّامُ الۡغُیُوۡبِ) “আল্লাহ যেদিন রাসূলগণকে একত্রিত করবেন, অতঃপর বলবেন, তোমাদেরকে কী জবাব দেয়া হয়েছিল। তারা বলবে, আমরা কিছুই জানি না, তুমিই সকল গোপন তত্ত্ব জান”- (সূরাহ্ আল মায়িদাহ ৫:১০৯); এর বিপরীত নয়। কারণ সাড়া দেয়া এক জিনিস এবং প্রচার করা অন্য জিনিস। তাছাড়া রাসূলগণ এ বিষয়টিকে আল্লাহর ‘ইলমের উপর ছেড়ে দিবেন।
(وَسَطًا) শব্দের অর্থ মধ্যম। কেউ কেউ ন্যায়পরায়ণ ও শ্রেষ্ঠ বলেন, কারণ তারা নাসারাদের মতো বাড়াবাড়ি করেন না। আর ইয়াহুদীদের মতো অবহেলা বা সম্মানকে খাটো চোখে দেখে না, নবীদের ব্যাপারে তাদের অস্বীকার করা হত্যা করা বা শূলে চড়ানোর মতো অতি বাড়াবাড়ি করে না। উপরন্তু (الوَسَطًا) এর ব্যাখ্যা (العدل) ন্যায়পরায়ণতা (هو من وسط قو مه) সে তাদের কওমের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।
(عَلَيْكُمْ شَهِيدا) অর্থাৎ তিনি তোমাদের পর্যবেক্ষক এবং তোমাদের ব্যাপারে অবগত। তিনি তোমাদের কর্মকাণ্ডের প্রতি লক্ষ্য রাখেন এবং কথার প্রশংসা করেন আর তোমাদের জন্য সাক্ষী।
(شَهِيد) শব্দটি (رَقِيبَ) অর্থে ব্যবহার হয়েছে। কারণ ন্যায়পরায়ণতার জন্য পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন। সে কারণে তাদের গোপন ও বাহ্যিক বিষয়সমূহ অবগত হওয়ার জন্য তিনি তাদের অবস্থাসমূহকে সংরক্ষণ করবেন। অতঃপর তাদের প্রশংসা করবেন। আর এজন্যও যে, তারা সমস্ত উম্মতের মধ্যে ন্যায়পরায়ণ। উম্মতে মুহাম্মাদী পূর্বের উম্মতদের সাক্ষ্য হবেন আর তিনি (সা.) তাঁর উম্মাতের সাক্ষ্য হবেন। সমস্ত নবী সবার সাক্ষ্য প্রদান করবেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হিসাব-নিকাশ, প্রতিশোধ গ্রহণ ও মীযানের বর্ণনা
৫৫৫৪-[৬] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর কাছে ছিলাম, হঠাৎ তিনি হাসলেন। অতঃপর প্রশ্ন করলেন, তোমরা কি জান আমি কেন হাসছি? আমরা বললাম, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি (সা.) বললেন, কিয়ামতের দিন বান্দা যে তার প্রভুর সাথে কথা বলবে, সে কথাটি স্মরণ করে হাসছি। বান্দা বলবে, হে প্রভু! তুমি কি আমাকে অবিচার থেকে নিরাপত্তা দান করনি? আল্লাহ তা’আলা বলবেন, হ্যাঁ। তখন বান্দা বলবে, আজ আমি আমার সম্পর্কে আপনজন ছাড়া আমার বিরুদ্ধে অন্য কারো সাক্ষ্য গ্রহণ করব না। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, তুমি আজ নিজেই তোমার সাক্ষী হিসেবে এবং কিরামান কাতিবীনের সাক্ষ্যই তোমার জন্য যথেষ্ট। অতঃপর তার মুখের উপর আল্লাহ তা’আলা মোহর লাগিয়ে দিবেন এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে বলা হবে, তোমরা (কে কখন কি কি কাজ করেছ) বল? তখন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহ তাদের কৃতকর্মসমূহ প্রকাশ করে দেবে। এরপর তার মুখকে স্বাভাবিক অবস্থায় খুলে দেয়া হবে। তখন সে স্বীয় অঙ্গসমূহকে লক্ষ্য করে আক্ষেপের সাথে বলবে, হে হতভাগা অঙ্গসমূহ! তোরা দূর হ! তোদের ধ্বংস হোক। তোদের জন্যই তো আমি আমার প্রভুর সাথে তর্ক করছিলাম। (মুসলিম)
الفصل الاول (باب الحساب و القصاص و المیزان )
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: كُنَّا عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَضَحِكَ فَقَالَ: هَلْ تَدْرُونَ مِمَّا أَضْحَكُ؟ . قَالَ: قُلْنَا: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ: مِنْ مُخَاطَبَةِ الْعَبْدِ رَبَّهُ يَقُولُ: يَا رَبِّ أَلَمْ تُجِرْنِي مِنَ الظُّلْمِ؟ قَالَ: يَقُولُ: بَلَى . قَالَ: فَيَقُولُ: فَإِنِّي لَا أُجِيزُ عَلَى نَفْسِي إِلَّا شَاهِدًا مِنِّي . قَالَ: فَيَقُولُ: كَفَى بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ شَهِيدًا وَبِالْكِرَامِ الْكَاتِبِينَ شُهُودًا . قَالَ: فَيُخْتَمُ عَلَى فِيهِ فَيُقَالُ لِأَرْكَانِهِ: انْطِقِي . قَالَ: «فَتَنْطِقُ بِأَعْمَالِهِ ثُمَّ يُخَلَّى بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْكَلَامِ» . قَالَ: فَيَقُولُ: بُعْدًا لَكُنَّ وَسُحْقًا فعنكنَّ كنتُ أُناضلُ . رَوَاهُ مُسلم
رواہ مسلم (17 / 2969)، (7439) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (لَا أُجِيزُ)-এর অর্থ (لا أقبل) অর্থাৎ অনুমোদন করব না বা গ্রহণ করব না। (عَلَى نَفْسِي إِلَّا شَاهِدًا مِنِّي) অর্থাৎ আমার শ্রেণি বা জাতি ব্যতীত সাক্ষী গ্রহণ করব না। কারণ মালায়িকাহ (ফেরেশতারা) আমাদের বিরুদ্ধে সৃষ্টির পূর্বে ফ্যাসাদ সৃষ্টির সাক্ষ্য প্রদান করেছিল।
(كَفَى بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ شَهِيدًا) সেদিন প্রত্যেকের বিচারের জন্য নিজের সাক্ষ্যই যথেষ্ট। কারণ প্রত্যেকের মুখের উপর মোহর মেরে দেয়া হবে। ফলে তাদের হাত কথা বলবে এবং তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে তাদের পা সাক্ষ্য দিবে।' (সূরা ইয়াসীন ৩৬: ৬৫) অন্যত্র রয়েছে, “যেদিন প্রকাশ করে দিবে তাদের জিহ্বা, হাত ও পা যা তারা করেছে।” (সূরা আন্ নূর ২৪: ২৪)
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “তাদের কর্ণ, চক্ষু ও চামড়া তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করবে।” (সূরাহ্ ফুসসিলাত ৪১: ২০)
আবূ ইয়া'লা, ইবনু আবূ হাতিম, তবারানী ও ইবনু মারদুওয়াইহ সা'ঈদ (রহিমাহুমুল্লাহ) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, যখন কিয়ামত হবে, তখন কাফিরেরা তাদের ‘আমল বুঝতে পারবে। অতঃপর অস্বীকার করবে ও ঝগড়ায় লিপ্ত হবে। তাকে বলা হবে এরা তোমার পড়শি তোমাদের বিপক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছে। সে বলবে, তারা মিথ্যা বলছে। তাকে আবার বলা হবে, তোমার পরিবার-পরিজন তোমাকে ধ্বংস করেছে? সে বলবে, তারা মিথ্যা বলেছে। অতঃপর বলা হবে, তোমরা কসম খাও। তারা কসম খেলে আল্লাহ তাদের মুখ বন্ধ করে দিবেন। আর তাদের জিহ্বা, পা ও হাত বিপক্ষে সাক্ষ্য দিবে। অতঃপর তাদেরকে জাহান্নামে দাখিল করাবেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হিসাব-নিকাশ, প্রতিশোধ গ্রহণ ও মীযানের বর্ণনা
৫৫৫৫-[৭] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (সাহাবীগণ বললেন) হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামতের দিন কি আমরা আমাদের প্রভুকে দেখতে পাব? তিনি (সা.) বললেন, দ্বিপ্রহরে মেঘমুক্ত আকাশে সূর্য দেখতে কি তোমাদের মধ্যে পরস্পরের বাধা সৃষ্টি হয়? তারা বললেন, না। তিনি (সা.) আরো বললেন, পূর্ণিমার রাত্রে মেঘমুক্ত আকাশে পূর্ণ চাঁদ দেখতে কি তোমাদের কোন প্রকারের অসুবিধা হয়? তারা বললেন, না।
অতঃপর তিনি (সা.) বললেন, সেই মহান সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! এ দু’টির কোন একটিকে দেখতে তোমাদের যে পরিমাণ অসুবিধা হয়, সেদিন তোমাদের প্রভুকে দেখতে সে পরিমাণ অসুবিধা হবে না। এরপর তিনি (সা.) বলেছেন, তখন আল্লাহ তা’আলা কোন এক বান্দাকে লক্ষ্য করে বলবেন, হে অমুক! আমি কি তোমাকে সম্মান দান করিনি? আমি কি তোমাকে নেতৃত্ব দান করিনি? আমি কি তোমাকে স্ত্রী দান করিনি? আমি কি তোমার জন্য ঘোড়া ও উটকে বশবর্তী করে দেইনি? আমি কি তোমাকে এ সুযোগ দেইনি যে, তুমি নিজ গোত্রের নেতৃত্ব দিবে এবং তাদের নিকট থেকে এক-চতুর্থাংশ সম্পদ ভোগ করবে?
জবাবে বান্দা বলবে, হ্যাঁ, (হে আমার পরোয়ারদিগার!) অতঃপর রাসূল (সা.) বলেন, বান্দাকে তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, আচ্ছা বল দেখি, তুমি আমার সাক্ষাৎ লাভ করবে? তোমার কি এ ধারণা ছিল? বান্দা বলবে, না। এবার আল্লাহ বলবেন, (দুনিয়াতে) তুমি যেভাবে আমাকে ভুলে রয়েছিলে, আজ আমিও অনুরূপভাবে তোমাকে ভুলে থাকব।
অতঃপর আল্লাহ তা’আলা দ্বিতীয় এক ব্যক্তিকে প্রশ্ন করবেন, সেও অনুরূপ বলবে। তারপর তৃতীয় এক লোকের সাথে সাক্ষাৎ করবেন এবং তাকেও অনুরূপ কথা জিজ্ঞেস করলে সে বলবে, হে প্রভু! আমি তোমার প্রতি, তোমার কিতাবের প্রতি এবং তোমার সমস্ত নবীগণের প্রতি ঈমান রেখেছি, সালাত আদায় করেছি, সিয়াম রেখেছি এবং দান-সদাক্বাহ্ করেছি। মোটকথা সে সাধ্য পরিমাণ নিজের নেক কার্যসমূহের একটি তালিকা আল্লাহর সামনে উপস্থাপন করবে। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, আচ্ছা! তুমি তো তোমার কথা বললে, এখন এখানেই দাঁড়াও, এক্ষুণি তোমার সাক্ষী উপস্থিত করছি। এ কথা শুনে বান্দা মনে মনে চিন্তা করবে, কে আছে এমন যে আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে? অতঃপর তার মুখে মোহর লাগিয়ে দেয়া হবে এবং তার উরুকে বলা হবে, তুমি বল, তখন তার উরু, হাড় মাংস প্রভৃতি এক একটি করে বলে ফেলবে, তারা যা যা করেছিল। তার মুখে মোহর লাগিয়ে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে এজন্য সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে যেন সে বান্দা কোন ওযর-আপত্তি পেশ করতে না পারে। মূলত যে বান্দার কথা আলোচনা করা হয়েছে, সে হলো মুনাফিক এবং এ কারণেই আল্লাহ তা’আলা তার প্রতি অত্যন্ত রাগান্বিত হবেন। (মুসলিম)
আর আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস (يَدْ خُلُ مِنْ أُمَّتِي الْجَنَّةَ) আমার উম্মত থেকে জান্নাতে প্রবেশ করবে; “তাওয়াক্কুলের অধ্যায়ে” ইবনু আব্বাস (রাঃ)-এর রিওয়ায়াতে বর্ণনা করা হয়েছে।
الفصل الاول (باب الحساب و القصاص و المیزان )
وَعَن أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ هَلْ نَرَى رَبنَا يَوْم الْقِيَامَة؟ قَالَ: «فَهَل تُضَارُّونَ فِي رُؤْيَةِ الشَّمْسِ فِي الظَّهِيرَةِ لَيْسَتْ فِي سَحَابَةٍ؟» قَالُوا: لَا قَالَ: «فَهَلْ تُضَارُّونَ فِي رؤيةالقمر لَيْلَةَ الْبَدْرِ لَيْسَ فِي سَحَابَةٍ؟» قَالُوا: لَا قَالَ: «فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا تُضَارُّونَ فِي رُؤْيَةِ رَبِّكُمْ إِلَّا كَمَا تُضَارُّونَ فِي رُؤْيَةِ أَحَدِهِمَا» . قَالَ: فَيَلْقَى الْعَبْدَ فَيَقُولُ: أَيْ فُلْ: أَلَمْ أُكْرِمْكَ وَأُسَوِّدْكَ وَأُزَوِّجْكَ وَأُسَخِّرْ لَكَ الْخَيْلَ وَالْإِبِلَ وَأَذَرْكَ تَرْأَسُ وَتَرْبَعُ؟ فَيَقُولُ بَلَى قَالَ: أَفَظَنَنْتَ أَنَّكَ مُلَاقِيَّ؟ فَيَقُولُ لَا فَيَقُولُ: فَإِنِّي قَدْ أَنْسَاكَ كَمَا نَسِيتَنِي ثُمَّ يَلْقَى الثَّانِيَ فَذَكَرَ مِثْلَهُ ثُمَّ يَلْقَى الثَّالِثَ فَيَقُولُ لَهُ مثل ذَلِك فَيَقُول يارب آمَنْتُ بِكَ وَبِكِتَابِكَ وَبِرُسُلِكَ وَصَلَّيْتُ وَصُمْتُ وَتَصَدَّقْتُ ويثني بِخَير مااستطاع فَيَقُول: هَهُنَا إِذا. ثمَّ يُقَال الْآن تبْعَث شَاهِدًا عَلَيْكَ وَيَتَفَكَّرُ فِي نَفْسِهِ: مَنْ ذَا الَّذِي يَشْهَدُ عَلَيَّ؟ فَيُخْتَمُ عَلَى فِيهِ وَيُقَالُ لِفَخِذِهِ: انْطِقِي فَتَنْطِقُ فَخِذُهُ وَلَحْمُهُ وَعِظَامُهُ بِعَمَلِهِ وَذَلِكَ لِيُعْذِرَ مِنْ نَفْسِهِ وَذَلِكَ الْمُنَافِقُ وَذَلِكَ يسخطُ اللَّهُ عَلَيْهِ رَوَاهُ مُسلم وذُكر حَدِيث أبي: «يَدْخُلُ مِنْ أُمَّتِي الْجَنَّةَ» فِي «بَابِ التَّوَكُّلِ» بِرِوَايَة ابْن عَبَّاس
رواہ مسلم (16 / 2968)، (7438) 0 حدیث ’’ یدخل من امتی الجنۃ ‘‘ تقدم (5295) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (هَلْ تُضَارُّونَ) এর অর্থ হলো এতে কি তোমাদের কোন ভিড় হয় যাতে কেউ তোমাদের কারো দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উদ্দেশ্য হলো শ্রোতাকে স্বীকৃতি দানের উপর উদ্বুদ্ধ করা। (ظَهِيرَةِ) বলা হয় মধ্য দিবসকে যখন সূর্য উপরে থাকে ও কিরণ পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এর প্রকাশ্য অর্থ হলো, তোমাদের প্রতিপালককে দর্শন করতে তোমাদের পরস্পরের কোন কষ্ট হবে না। যেমন চন্দ্র বা সূর্যের কোনটিকে দেখতে তোমাদের পরস্পরের কষ্ট হয় না। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর (مَعَالِم السُّنَن) গ্রন্থে বলেন, (الضَّرَرِ) বলা হয় কোন বস্তু নিয়ে মতানৈক্যের সময় দু’জনের বিতর্ক করা। একজন এটা নিয়ে বিতর্ক করে, অন্যজন আরেকটা নিয়ে মতভেদ করে। তখন বলা হয় – (قَدْ وَقَعَ الضِّرَار بَيْنهمَا) তাদের উভয়ের মাঝে মতানৈক্য বা মতভেদ হয়েছে। ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, (كَمَا تُضَارُّونَ) অর্থাৎ তোমরা এতে সন্দেহ পোষণ করবে না। অতএব আল্লাহর দিদার লাভের ক্ষেত্রে কখনো তোমরা সন্দেহ করবে না। ('আওনুল মা'বুদ ৮ম খণ্ড, হা, ৪৭১৭)
(لَيْلَةَ الْبَدْرِ) পূর্ণিমার রাত্রিকে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ তখন চাঁদ সর্বাধিক পরিমাণে আলোময় হয়। (তুহফাতুল আওয়াযী ৬ষ্ঠ খণ্ড, হা. ২৫৪৯)
এ উপমা হলো আল্লাহ তা'আলাকে দেখার সাথে আল্লাহ তা'আলার সত্তার সাথে নয়। কারণ সূর্য ও চন্দ্র হলো আল্লাহর সৃষ্টি। আর সৃষ্টিজীব কক্ষনো আল্লাহর মতো হতে পারে না। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, কোন জিনিস তাঁর মতো নয়। উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ তা'আলার দীদার কোন কঠিন বিষয় নয়। এ হাদীস থেকে কিয়ামতের দিনে আল্লাহ তা'আলার পূর্ণ দীদার স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আর এটাই আহলুস্ সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের মত। বিদ্বানদের মত ও অধিকাংশ উম্মাতের নিকট আখিরাতে দীদারে ইলাহী প্রমাণিত বিষয়। আর খারিজী, মু'তাযিলা ও মুর্জিয়াদের কেউ কেউ এটাকে অস্বীকার করে। (ফাতহুল বারী সংক্ষিপ্ত; মিশকাতুল মাসাবীহ - মুম্বাই ছাপা, ৪র্থ খণ্ড, ৩৯৩ পৃ.)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হিসাব-নিকাশ, প্রতিশোধ গ্রহণ ও মীযানের বর্ণনা
৫৫৫৬-[৮] আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, আমার প্রভু আমার সাথে ওয়াদা করেছেন যে, তিনি আমার উম্মতের মধ্য থেকে সত্তর হাজার লোককে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং তাদের ওপর ’আযাবও হবে না। আবার উক্ত প্রত্যেক হাজারের সাথে সত্তর হাজার এবং আমার প্রভুর তিন অঞ্জলি ভর্তি লোকও জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। (আহমাদ, তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (باب الحساب و القصاص و المیزان)
عَنْ أَبِي أُمَامَةَ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «وَعَدَنِي رَبِّي أَنْ يُدْخِلَ الْجَنَّةَ مِنْ أُمَّتِي سَبْعِينَ أَلْفًا لَا حِسَابَ عَلَيْهِمْ وَلَا عَذَابَ مَعَ كُلِّ أَلْفٍ سَبْعُونَ أَلْفًا وَثَلَاثُ حَثَيَاتٍ مِنْ حَثَيَاتِ رَبِّي» . رَوَاهُ أَحْمد وَالتِّرْمِذِيّ وَابْن مَاجَه
اسنادہ حسن ، رواہ احمد (5 / 268 ح 22659) و الترمذی (2437 وقال : حسن غریب) و ابن ماجہ (4286) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (لَا حِسَابَ عَلَيْهِمْ) অর্থ হিসাব-নিকাশে তাদেরকে খুঁটিনাটি প্রশ্ন করা হবে না। (وَلَا عَذَابَ) এর অর্থ দু'টি হতে পারে। (এক) তাদেরকে প্রথমে শাস্তি দেয়া হবে না। (দুই) তারা যে শাস্তির জন্য ধার্য হয়েছে সে শাস্তি হবে না।
(سَبْعُونَ أَلْفًا) কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এর দ্বারা দু'টি উদ্দেশ্য হতে পারে। হয়তবা নির্দিষ্ট সংখ্যা অথবা অধিক পরিমাণে বুঝানো। (حَشَيَات) শব্দকে (رَنِّيْ) এর সাথে (إضَافَة) করাতে আধিক্য বেশি বুঝানো হয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)।
(ثَلَاثُ حَثَيَاتٍ) حاء ও (ياء) বর্ণে যবর সহকারে যা (حَثْيَة) এর বহুবচন। মানুষ তার দুই হাত দ্বারা পরিমাপ ছাড়া বিনা হিসাবে দান করলে তাকে (الْحَثْيَة) অথবা (الْحَثْوَة) বলে।
ইমাম আহমাদ (রহিমাহুল্লাহ) আবূ উমামাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: অবশ্যই আল্লাহ আমাকে এ মর্মে ওয়াদা দিয়েছেন যে, আমার উম্মত থেকে সত্তর হাজার বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। ইয়াযীদ ইবনু আখনাস বলেন, আল্লাহর কসম! আপনার সে উম্মাতের দৃষ্টান্ত যেমন মাছির মাঝে লালচে সুন্দর মাছির মতো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমার সাথে সত্তর হাজারের ওয়াদা করেছেন। আবার প্রত্যেক হাজারের সাথে সত্তর হাজার এবং আমার জন্য আরো তিন অঞ্জলি বেশি করেছেন। (তুহফাতুল আহওয়ালী ৬ষ্ঠ খণ্ড, হা, ২৪৩৭)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হিসাব-নিকাশ, প্রতিশোধ গ্রহণ ও মীযানের বর্ণনা
৫৫৫৭-[৯] হাসান বাসরী (রহিমাহুল্লাহ) আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: কিয়ামতের দিন মানবমণ্ডলীকে তিনবার আল্লাহ তা’আলার কাছে উপস্থিত করা হবে। প্রথম দু’বার কথোপকথন ও ওযর-আপত্তির জন্য আর তৃতীয়বার ’আমলনামা উড়ে প্রত্যেকের হাতে পৌছবে এবং তা কেউ ডান হাতে গ্রহণ করবে আর কেউ বাম হাতে। (আহমাদ ও তিরমিযী)
ইমাম তিরমিযী বলেছেন, হাসান বাসরী (রহিমাহুল্লাহ) আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে কোন হাদীস শুনেছেন বলে প্রমাণ নেই, কাজেই এ হাদীসটি বিশুদ্ধ নয়।
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (باب الحساب و القصاص و المیزان)
وَعَن الحسنِ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يُعْرَضُ النَّاسُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ثَلَاثَ عَرَضَاتٍ: فَأَمَّا عَرْضَتَانِ فَجِدَالٌ وَمَعَاذِيرُ وَأَمَّا الْعَرْضَةُ الثَّالِثَةُ فَعِنْدَ ذَلِكَ تَطِيرُ الصُّحُفُ فِي الْأَيْدِي فَآخِذٌ بِيَمِينِهِ وَآخِذٌ بِشِمَالِهِ . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَقَالَ لَا يَصِحُّ هَذَا الْحَدِيثُ مِنْ قِبَلِ أَنَّ الْحَسَنَ لَمْ يَسْمَعْ مِنْ أبي هُرَيْرَة
اسنادہ ضعیف ، رواہ احمد (لم اجدہ من ھدیث ابی ھریرۃ عندہ ، انما رواہ من حدیث ابی موسی ، انظر الحدیث الآتی : 5558) و الترمذی (2425) * الحسن البصری مدلس عنعن ولم یسمع من ابی ھریرۃ رضی اللہ عنہ فی القول الراجح ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: (يُعْرَضُ النَّاسُ) আল্লাহর সামনে পেশ করা হবে। (ثَلَاثَ عَرَضَاتٍ) কেউ বলেন, এর অর্থ তিনবার। প্রথমবার তারা আত্মরক্ষার জন্য বলবে, নবীরা আমাদের কাছে প্রচার করেনি। আর তারা আল্লাহর সাথে ঝগড়া করবে। দ্বিতীয়বার তারা অজুহাত পেশ করে স্বীকার করবে এই বলে যে, এসব আমি না জেনে ভুলে ‘আমল করেছি বা অনুরূপ বলবে। তৃতীয়বারে প্রমাণপঞ্জিসহ হাতেনাতে ধরা পড়ে যাবে। অর্থাৎ প্রত্যেকেই তার ‘আমলনামা ডান অথবা বাম হাতে ধারণ করবে।
(فَآخِذٌ بِيَمِينِهِ وَآخِذٌ بِشِمَالِهِ) এখানে (فاء) ব্যাখ্যামূলক। অর্থাৎ তাদের যে ডান হাতে গ্রহণ করবে সে সৌভাগ্যবান। আর যে বাম হাত গ্রহণ করবে, সে দুর্ভাগা। (তুহফাতুন আহওয়াযী, ৬ষ্ঠ খণ্ড, হা. ২৪২৫)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হিসাব-নিকাশ, প্রতিশোধ গ্রহণ ও মীযানের বর্ণনা
৫৫৫৮-[১০] আর কেউ কেউ এভাবে বর্ণনা করেছেন যে, হাসান বাসরী (রহিমাহুল্লাহ) এ হাদীসটি আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন।
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (باب الحساب و القصاص و المیزان)
وَقَدْ رَوَاهُ بَعْضُهُمْ عَنِ الْحَسَنِ عَنْ أَبِي مُوسَى
اسنادہ ضعیف ، [رواہ ابن ماجہ (4277) و احمد (4 / 414 ح 19953)] * الحسن البصری مدلس و عنعن ، انظر الحدیث السابق (5557) ۔
(ضَعِيف)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হিসাব-নিকাশ, প্রতিশোধ গ্রহণ ও মীযানের বর্ণনা
৫৫৫৯-[১১] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: কিয়ামতের দিন এমন এক লোককে (মুক্তি দেয়া হবে এভাবে যে, তাকে) জনসম্মুখে উপস্থিত করা হবে যার ’আমলনামা খোলা হবে নিরানব্বই ভলিউমে এবং প্রতিটি ভলিউম বিস্তীর্ণ হবে দৃষ্টির সীমা অবধি। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা তাকে প্রশ্ন করবেন, আচ্ছা বল দেখি, তুমি এর কোন একটিকে অস্বীকার করতে পারবে? অথবা আমার লেখক মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) কি তোমার প্রতি অবিচার করেছে? সে বলবে না; হে আমার প্রভু!
আল্লাহ তা’আলা প্রশ্ন করবেন, তবে কি তোমার পক্ষ হতে কোন ওযর পেশ করার আছে? সে বলবে, না; হে আমার রব! তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, হ্যাঁ, তোমার একটি পুণ্য আমার নিকট আছে। তুমি নিশ্চিত জেনে রাখ, আজ তোমার প্রতি কোন যুলম বা অবিচার করা হবে না। এরপর এক টুকরা কাগজ বের করা হবে, যাতে রয়েছে- (أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ) “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন ইবাদত পাওয়ার যোগ্য নেই এবং মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর বান্দা ও রাসূল"।
অতঃপর আল্লাহ তা’আলা তাকে বলবেন, তোমার ’আমালের ওযন দেখার জন্য উপস্থিত হও। তখন সে বলবে, হে প্রভু! ঐ সমস্ত বিরাট বিরাট রেজিস্ট্রারের মোকাবিলায় এই এক টুকরা কাগজের মূল্যই বা কি আছে?
তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, তোমার ওপর কোন অবিচার করা হবে না। তিনি (সা.) বলেন, অতঃপর ঐ সকল রেজিস্ট্রারগুলো পাল্লার এক পালিতে এবং এ কাগজের টুকরাখানি আরেক পালিতে রাখা হবে। তখন দফতরগুলোর পালি হালকা হয়ে উপরে উঠে যাবে এবং কাগজের টুকরার পালি ভারী হয়ে নিচের দিকে ঝুঁকে থাকবে। মোটকথা, আল্লাহর নামের সাথে অন্য কোন জিনিস ওযন হতে পারবে না। (তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (باب الحساب و القصاص و المیزان)
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ اللَّهَ سيخلِّصُ رجلا من أُمّتي على رُؤُوس الْخَلَائِقِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيَنْشُرُ عَلَيْهِ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ سِجِلًّا كُلُّ سِجِلٍّ مِثْلَ مَدِّ الْبَصَرِ ثُمَّ يَقُولُ: أَتُنْكِرُ مِنْ هَذَا شَيْئًا؟ أَظَلَمَكَ كَتَبَتِي الحافظون؟ فَيَقُول: لَا يارب فَيَقُول: أَفَلَك عذر؟ قَالَ لَا يارب فَيَقُولُ بَلَى. إِنَّ لَكَ عِنْدَنَا حَسَنَةً وَإِنَّهُ لَا ظُلْمَ عَلَيْكَ الْيَوْمَ فَتُخْرَجُ بِطَاقَةٌ فِيهَا أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ فَيَقُولُ احْضُرْ وَزْنَكَ. فَيَقُولُ: يَا رَبِّ مَا هَذِهِ الْبِطَاقَةُ مَعَ هَذِهِ السِّجِلَّاتِ؟ فَيَقُولُ: إِنَّكَ لَا تُظْلَمُ قَالَ: فَتُوضَعُ السِّجِلَّاتُ فِي كِفَّةٍ وَالْبِطَاقَةُ فِي كِفَّةٍ فَطَاشَتِ السِّجِلَّاتُ وَثَقُلَتِ الْبِطَاقَةُ فَلَا يَثْقُلُ مَعَ اسْمِ الله شَيْء . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَابْن مَاجَه
اسنادہ صحیح ، رواہ الترمذی (2639 وقال : حسن غریب) و ابن ماجہ (4300) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (إِنَّ اللَّهَ سيخلِّصُ) অর্থাৎ বের করবেন বা বাছাই করবেন সমস্ত সৃষ্টির সামনে এক ব্যক্তিকে এবং তাকে মুক্তি দিবেন। (تِسْعَةً وَتِسْعِينَ سِجِلًّا) আর তাদের ‘আমলনামার খাতা হবে নিরানব্বই ভলিউম, অর্থাৎ বড় খাতা। প্রত্যেক খাতার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ হবে মানুষের দৃষ্টি সীমার সমপরিমাণ। (كتبة) যা (كَاتِب) এর বহুবচন। এ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো (الْكِرَامُ الْكَاتِبُونَ) (সম্মানিত ফেরেশতাগণ)।
(فَتُخْرَجُ بِطَاقَةٌ) الْبِطَاقَة হলো ছোট্ট টুকরা, আর কোন কোন অভিধানে বলা হয়েছে, (كتبة) এর ওযনে (بِطَاقَه) অর্থ কাপড়ের ছোট টুকরা যাতে তার মূল্যমান লেখা থাকে।
(أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ) মুল্লা আলী ক্বারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এটা হতে পারে তার প্রথম উচ্চারিত কালিমাহ। অথবা অন্য সময়েরও হতে পারে যা তৎক্ষণাৎ গ্রহণযোগ্য ছিল।
(احْضُرْ وَزْنَكَ) অর্থাৎ তোমার আমালের ওযনের সময় তোমার এ ছোট্ট টুকরা নিরানব্বই খাতার সাথে ওযন করা হবে তখন তুমি হাযির থাকবে। যাতে তোমার ওপর যুলমহীনতা এবং অনুগ্রহের বাস্তবতা প্রকাশিত হয়।
(مَا هَذِهِ الْبِطَاقَةُ) এখানে (اسْمَ الْإِشَارَة) তুচ্ছতার অর্থে প্রয়োগ হয়েছে। যেন সে এতগুলো খাতার সঙ্গে তুচ্ছ এ টুকরাকে ওযন করা মেনে নিতে পারছে না। সে কারণে পুনরায় বলা হলো, তুমি এটাকে তুচ্ছ ভেব না। কারণ এটা মহান আল্লাহর নিকটে অনেক বড়। (شَقُلَتِ الْبِطَاقَةُ) অর্থাৎ টুকরাটি ভারী হয়ে গেল।
কেউ যদি প্রশ্ন করে, ‘আমলগুলো তো আকৃতিহীন বস্তু? যা ওযন করা সম্ভব নয়। কায়িক বস্তুকে পরিমাপ করা যায়। এর উত্তরে বলা যায় 'আমলনামা বা খাতাকে মাপা হবে যাতে আমলগুলো লিপিবদ্ধ থাকবে। এটা অবস্থাভেদে বিভিন্ন রকম হয়। অথবা আল্লাহ তাআলা কথা ও কাজসমূহকে কায়াসম্পন্ন বানাবেন, অতঃপর তা পরিমাপ করবেন। আকৃতিবিহীন বস্তুর ওযন নিয়ে প্রশ্ন উঠানো আজকাল অনর্থক, কেননা আধুনিক অনেক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে অনেক কায়া বা আকৃতিবিহীন বস্তুর ওযন সম্পন্ন হচ্ছে। যেমন শরীরের তাপমাত্রা, হৃদকম্পন, রক্তের চলাচল গতি ইত্যাদি পরিমাপের নির্ভুল পরিমাপ যন্ত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। মহান আল্লাহর নিকট কায়া ও আকৃতিবিহীন ‘আমল মাপা কি কোন ব্যাপার হলো? এতে গুনাহের চাইতে ‘ইবাদত ভারী হওয়ার কারণে ভালো ‘আমল ভারী হবে এবং মন্দ ‘আমল হালকা হয়ে উপরে উঠে যাবে। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৭ম খণ্ড, হা. ২৬৩৯; মিশকাতুল মাসাবীহ - মুম্বাই ছাপা, ৪র্থ খণ্ড, ৩৯৫ পৃ.)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হিসাব-নিকাশ, প্রতিশোধ গ্রহণ ও মীযানের বর্ণনা
৫৫৬০-[১২] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন তিনি জাহান্নামের কথা স্মরণ করে কেঁদে ফেললেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) - প্রশ্ন করলেন, কিসে তোমাকে কাঁদাচ্ছে? তিনি [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] বললেন, জাহান্নামের আগুনের কথা স্মরণ করে কাঁদছি। (আচ্ছা বলুন তো!) কিয়ামতের দিন আপনি আপনার পরিবার-পরিজনকে স্মরণ করবেন কি? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, (হে ’আয়িশাহ্!) জেনে রাখ, তিনটি জায়গা এমন হবে, যেখানে কেউ কাউকে স্মরণ করবে না। একটি মীযানের কাছে যতক্ষণ না সে জেনে নিবে যে, তার ’আমলের পাল্লা ভারী হয়েছে নাকি হালকা। দ্বিতীয়টি ’আমলনামা পাওয়ার সময়, যখন তাকে বলা হবে, আরে অমুক! এই নাও তোমার আমলনামা এবং তা পড়ে দেখ। যে পর্যন্ত না সে জেনে নিবে যে, তা তাকে ডান হাতে দেয়া হচ্ছে নাকি পিছন থেকে বাম হাতে? আর তৃতীয় হলো ’পুলসিরাত পার হওয়ার সময়, যখন তা জাহান্নামের উপর স্থাপন করা হবে। (আবূ দাউদ)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (باب الحساب و القصاص و المیزان)
وَعَن عائشةَ أَنَّهَا ذَكَرَتِ النَّارَ فَبَكَتْ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا يُبْكِيكِ؟» . قَالَتْ: ذَكَرْتُ النَّارَ فَبَكَيْتُ فَهَلْ تَذْكُرُونَ أَهْلِيكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَمَّا فِي ثَلَاثَةِ مَوَاطِنَ فَلَا يَذْكُرُ أَحَدٌ أَحَدًا: عِنْدَ الْمِيزَانِ حَتَّى يَعْلَمَ: أَيَخِفُّ مِيزَانُهُ أَمْ يَثْقُلُ؟ وَعِنْدَ الْكِتَابِ حِينَ يُقَالُ (هاؤم اقرؤوا كِتَابيه) حَتَّى يَعْلَمَ: أَيْنَ يَقَعُ كِتَابُهُ أَفِي يَمِينِهِ أم فِي شِمَاله؟ أم مِنْ وَرَاءِ ظَهْرِهِ؟ وَعِنْدَ الصِّرَاطِ: إِذَا وُضِعَ بينَ ظَهْري جَهَنَّم . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
اسنادہ ضعیف ، رواہ ابوداؤد (4755) * الحسن البصری مدلس و عنعن ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: (فَهَلْ تَذْكُرُونَ... فَلَا يَذْكُرُ أَحَدٌ أَحَدًا) অর্থাৎ আপনি কী আপনার পরিবারদেরকে কিয়ামতের দিন স্মরণ করবেন? রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, তিন স্থানে কেউ কাউকে স্মরণ করবে না। এর অর্থ হলো, বিশেষভাবে কেউ কাউকে স্মরণ করবে না। কিন্তু (الشَّفَاعَةُ الْعُظْمَى) (বড় শাফা'আত) সবার জন্য আম। কিয়ামতের দিন দাড়িপাল্লা কায়িম করে খাতাগুলোকে পরিমাপ করা হবে যাতে বান্দাদের ‘আমলসমূহ লিপিবদ্ধ থাকবে। যার দুটি পাল্লা থাকবে, একটি নেকীর জন্য অপরটি গুনাহর। প্রত্যেক ব্যক্তি জানতে পারবে তার পাল্লা হালকা হচ্ছে না ভারী। এর প্রকাশ্য অর্থ থেকে বুঝা যায়, এটা প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য। এর বাইরে নবী-রাসূলগণও নন।
(هَاؤُم) অর্থ গ্রহণ কর। নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আহলে হাক্বদের অভিমত হলো, অবশ্যই এটা বিস্তৃত পুল যা জাহান্নামের পৃষ্ঠের উপরে অবস্থিত, সব মানুষকে সেটা অতিক্রম করতে হবে। অতঃপর মুমিনরা তাদের ‘আমল ও মর্যাদা অনুযায়ী রেহাই পাবে আর অন্যরা তথায় পতিত হবে।
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - হিসাব-নিকাশ, প্রতিশোধ গ্রহণ ও মীযানের বর্ণনা
৫৫৬১-[১৩] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন এক লোক রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে এসে বসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার কাছে কতিপয় গোলাম আছে। আমার কাছে মিথ্যা কথা বলে, আমার ধন-সম্পদ খিয়ানত করে এবং আমার নির্দেশের অবাধ্য হয়, তাই আমি তাদেরকে গালমন্দ করি এবং মারধরও করে থাকি। (কিয়ামতে) তাদের ব্যাপারে আমার অবস্থা কী হবে? তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে তখন গোলামদের খিয়ানত, অবাধ্য, মিথ্যা বলা এবং তোমার শাস্তি দেয়া সবকিছুর হিসাব নেয়া হবে। যদি তোমার শাস্তি প্রদান তাদের অন্যায়ের সমান হয়, তখন ব্যাপার সমান সমান থাকবে। তুমি পুণ্যও পাবে না এবং তোমাকে কোন শাস্তিও দেয়া হবে না। আর যদি তোমার শাস্তি প্রদান তাদের অন্যায়ের তুলনায় কম হয়, তখন তাদের অতিরিক্ত অপরাধের শাস্তি না দেয়ার জন্য তুমি সাওয়াব পাবে। কিন্তু যদি তোমার শাস্তি প্রদান তাদের অন্যায়ের তুলনায় বেশি হয়, তখন গোলামদের জন্য তোমার নিকট থেকে প্রতিশোধ নেয়া হবে। এ সকল কথা শুনে লোকটি অন্যত্র সরে দাঁড়াল এবং চিৎকার দিয়ে কাঁদতে লাগল। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে লক্ষ্য করে বললেন, তুমি কি আল্লাহর এ বাণীটি পড়নি?
(وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا وَإِنْ كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ أَتَيْنَا بِهَا وَكَفَى بِنَا حَاسِبِينَ) “কিয়ামতের দিন আমি ন্যায় ও নির্ভুল ওযনের পাল্লা স্থাপন করব এবং কোন লোকের প্রতি একটুও যুলম হবে না। যদি কোন ’আমল সরিষা দানা পরিমাণও হয় আমি তাও উপস্থিত করব, আর আমি হিসাব গ্রহণকারী হিসেবে যথেষ্ট"- (সূরাহ আল আম্বিয়া- ২১: ৪৭)। তখন লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার নিজের এবং ঐ সমস্ত গোলামদের ব্যাপারে তাদেরকে আমার কাছ থেকে পৃথক করে দেয়া অপেক্ষা উত্তম আর কিছু পচ্ছি না। আমি আপনাকে সাক্ষী করে বলছি যে, তারা সকলেই মুক্ত। (তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (باب الحساب و القصاص و المیزان)
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: جَاءَ رَجُلٌ فَقَعَدَ بَيْنَ يَدَيْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ لِي مَمْلُوكِينَ يَكْذِبُونَنِي وَيَخُونُونَنِي وَيَعْصُونَنِي وَأَشْتِمُهُمْ وَأَضْرِبُهُمْ فَكَيْفَ أَنَا مِنْهُمْ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ يُحْسَبُ مَا خَانُوكَ وَعَصَوْكَ وَكَذَّبُوكَ وَعِقَابُكَ إِيَّاهُمْ فَإِنْ كَانَ عِقَابُكَ إِيَّاهُمْ بِقَدْرِ ذُنُوبِهِمْ كَانَ كَفَافًا لَا لَكَ وَلَا عَلَيْكَ وَإِنْ كَانَ عِقَابُكَ إِيَّاهُمْ دُونَ ذَنْبِهِمْ كَانَ فَضْلًا لَكَ وَإِنْ كَانَ عِقَابُكَ إِيَّاهُمْ فَوْقَ ذُنُوبِهِمْ اقْتُصَّ لَهُمْ مِنْكَ الْفَضْلُ فَتَنَحَّى الرَّجُلُ وَجَعَلَ يَهْتِفُ وَيَبْكِي فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَمَا تَقْرَأُ قَوْلَ اللَّهِ تَعَالَى: (وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا وَإِنْ كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ أَتَيْنَا بِهَا وَكَفَى بِنَا حَاسِبِينَ) فَقَالَ الرَّجُلُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا أَجِدُ لِي وَلِهَؤُلَاءِ شَيْئًا خَيْرًا مِنْ مُفَارَقَتِهِمْ أُشْهِدُكَ أَنهم كلَّهم أحرارٌ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
اسنادہ ضعیف ، رواہ الترمذی (3165 وقال : غریب) * الزھری مدلس و عنعن
ব্যাখ্যা: (مَمْلُوكِينَ) ক্রীতদাস শব্দটি বহু বচনে ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে পুরুষ-মহিলা উভয়েই শামিল। অধিকাংশের প্রতি খেয়াল রেখে পুংলিঙ্গের সীগাহ ব্যবহার করা হয়েছে।
(فَكَيْفَ أَنَا مِنْهُمْ) অর্থাৎ তাদের গালমন্দ ও শাস্তির দেয়ার কারণে আল্লাহর সামনে আমার কি অবস্থা হবে? এ প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সা.) বিস্তারিত বিবরণ দেন যা হাদীসের নীচের অংশ বিধৃত হয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - হিসাব-নিকাশ, প্রতিশোধ গ্রহণ ও মীযানের বর্ণনা
৫৫৬২-[১৪] উক্ত রাবী [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কোন কোন সালাতে রাসূলুল্লাহ (সা.) এ-কে বলতে শুনেছি, [রাসূল (সা.) বলতেন]। (اللَّهُمَّ حَاسِبْنِي حِسَابًا يَسِيرً) (হে আল্লাহ! আমার নিকট থেকে সহজ হিসাব নিও) আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী! সহজ হিসাব কি? তিনি (সা.) বললেন, আল্লাহ তার বান্দার ’আমলনামার প্রতি দৃষ্টিদান মাত্র, অতঃপর তিনি তাকে ক্ষমা করে দিবেন। হে ’আয়িশাহ্! জেনে রাখ, সেদিন যার হিসাবে যাচাই-বাছাই করা হবে, সে নিঃসন্দেহে ধ্বংস হবে। (আহমাদ)
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (باب الحساب و القصاص و المیزان)
وَعَنْهَا قَالَتْ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ فِي بَعْضِ صَلَاتِهِ: اللَّهُمَّ حَاسِبْنِي حِسَابًا يَسِيرًا قُلْتُ: يَا نَبِيَّ اللَّهِ مَا الْحِسَابُ الْيَسِيرُ؟ قَالَ: «أَنْ يَنْظُرَ فِي كِتَابه فيتجاوز عَنْهُ إِنَّهُ مَنْ نُوقِشَ الْحِسَابَ يَوْمَئِذٍ يَا عَائِشَة هلك» . رَوَاهُ أَحْمد
اسنادہ حسن ، رواہ احمد (6 / 48 ح 24719) [و صححہ الحاکم (1 / 57) و وافقہ الذھبی] و اصلہ متفق علیہ (البخاری : 103 ، مسلم : 2876)، (7225) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (يَقُولُ فِي بَعْضِ صَلَاتِهِ) এটা ফরয সালাতে অথবা নফল সালাতে হতে পারে। দাঁড়ানোর কোন অংশে বা রুকূ'র মধ্যে অথবা রুকূ থেকে উঠার মধ্যে অথবা সিজদাতে বা সিজদাহ থেকে উঠে বসার মধ্যে বলতেন।
(اللَّهُمَّ حَاسِبْنِي حِسَابًا يَسِيرً) এটা হয়তোবা উম্মতকে শিক্ষা দেয়ার জন্য এবং গাফলতি থেকে সতর্ক করার জন্য। (الْمُنَاقَشَةُ) অর্থ তদন্ত করা বা খতিয়ে দেখা। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - হিসাব-নিকাশ, প্রতিশোধ গ্রহণ ও মীযানের বর্ণনা
৫৫৬৩-[১৫] আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর কাছে এসে বললেন, মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ যেদিন সম্পর্কে বলেছেন, সেদিন সকল মানুষ উভয় জাহানের প্রভুর সম্মুখে দণ্ডায়মান হবে। আমাকে বলুন! কোন লোকের সেই কিয়ামতের দিন আল্লাহর সম্মুখে দাঁড়ানোর সাধ্য হবে। তখন তিনি (সা.) বললেন, সেদিন (-এর ভয়াবহতা) ঈমানদারের জন্য খুবই হালকা করা হবে। এমনকি ঐ দিন তার জন্য একটি ফরয সালাত (আদায়ের সময়ের) ন্যায় হবে।
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (باب الحساب و القصاص و المیزان)
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ أَنَّهُ أَتَى رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: أَخْبِرْنِي مَنْ يَقْوَى عَلَى الْقِيَامِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الَّذِي قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ: (يَوْمَ يَقُومُ النَّاسُ لربِّ الْعَالمين) ؟ فَقَالَ: «يُخَفَّفُ عَلَى الْمُؤْمِنِ حَتَّى يَكُونَ عَلَيْهِ كَالصَّلَاةِ الْمَكْتُوبَة»
حسن ، رواہ البیھقی فی البعث و النشور (لم اجدہ ، شعب الایمان 1 / 324قبل ح 362 تعلیقًا) و ابن حبان (الاحسان : 729 / 7334 و سندہ حسن) * شیخ دراج : (مبھم وھو) ابو الھیشم ولہ شاھد حسن فی شعب الایمان (362 ، نسخۃ محققۃ : 356) ولم یذکر الآیۃ ، فیہ نعیم بن حماد حسن الحدیث
ব্যাখ্যা: (من يَقْوَى) অর্থ (من يقدر) কে সক্ষম হবে। (عَلَى الْقِيَامِ) অর্থ আল্লাহর সামনে হিসাবের জন্য দাঁড়াতে।
(يَوْمَ يَقُومُ النَّاسُ لربِّ الْعَالمين) ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: এটা (لِيَوْمٍ عَظِيمٍ) এর পরিবর্তে। অর্থাৎ যেদিন আল্লাহ তা'আলা তার মর্যাদা প্রকাশ করবেন ও প্রতাপশালীদের ওপর তার ক্ষমতার কর্তৃত্ব প্রকাশ করবেন। বর্ণিত হয়েছে যে, ইবনু উমার (রাঃ) এ সূরাটি পড়তেন। অতঃপর যখন তিনি (يَوْمَ يَقُومُ النَّاسُ لربِّ الْعَالمين) পর্যন্ত পৌছতেন তখন তিনি কেঁদে ফেলতেন এবং এরপর তিনি পড়তে পারতেন না। (عَلَ الْمُؤْمِنِ) অর্থাৎ পূর্ণ মু’মিন অথবা সালাত আদায়কারীদের ওপর। (عَلَيْهِ كَالصَّلَاةِ الْمَكْتُوبَةِ) অর্থাৎ ফরয সালাত আদায়ের সমপরিমাণ অথবা ফরয সালাতের ওয়াক্তের সমপরিমাণ। স্পষ্ট কথা হলো মু'মিনদের বিভিন্ন অবস্থাভেদে সেটার সময় বিভিন্ন রকম হবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - হিসাব-নিকাশ, প্রতিশোধ গ্রহণ ও মীযানের বর্ণনা
৫৫৬৪-[১৬] উক্ত রাবী [আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে ঐ দিন সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলো যেদিনের পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। সেই অস্বাভাবিক দীর্ঘদিনে মানুষের অবস্থা কেমন হবে? তিনি (সা.) বললেন, সেই পবিত্র সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! মু’মিনের জন্য সেদিন খুবই হালকা করা হবে, এমনকি দুনিয়াতে একটি ফরয সালাত আদায় করার সময়ের তুলনায় তার জন্য এটা হালকা সময় মনে হবে। (হাদীস দু’টি বায়হাক্বী’র “কিতাবুল বা’সি ওয়ানুশূর”-এ রিওয়ায়াত করেছেন)
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (باب الحساب و القصاص و المیزان)
وَعَنْهُ قَالَ: سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ (يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ ألف سنةٍ) مَا طُولُ هَذَا الْيَوْمِ؟ فَقَالَ: «وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنَّهُ لَيُخَفَّفُ عَلَى الْمُؤْمِنِ حَتَّى يَكُونَ أَهْوَنَ عَلَيْهِ مِنَ الصَّلَاةِ الْمَكْتُوبَةِ يُصَلِّيهَا فِي الدُّنْيَا» . رَوَاهُمَا الْبَيْهَقِيُّ فِي كِتَابِ «الْبَعْثِ وَالنُّشُورِ»
حسن ، رواہ البیھقی فی البعث و النشور (لم اجدہ) [و احمد (3 / 75 ح 11740)] * انظر الحدیث السابق (5564) و للحدیث شاھد حسن ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: (مَا طُولُ هَذَا الْيَوْمِ) অর্থাৎ এ দীর্ঘ দিনে মানুষের কী অবস্থা হবে? এত দীর্ঘ দিনে তারা দাঁড়াতে সক্ষম হবে? এ প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, এ দীর্ঘ দিন পূর্ণ মু'মিনদের ওপর হালকা হবে।
এমনকি তাদের নিকটে একটি ফরয সালাত আদায়ের চাইতে বা তার জন্য কিয়াম করার সময়ের চাইতে সহজ হবে। যে সালাত তারা দুনিয়ায় আদায় করত। (মিরকাতুল মাফাতীহ)।
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - হিসাব-নিকাশ, প্রতিশোধ গ্রহণ ও মীযানের বর্ণনা
৫৫৬৫-[১৭] আসমা বিনতু ইয়াযীদ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: কিয়ামতের দিন মানবমণ্ডলীকে একটি ময়দানে একত্রিত করা হবে, তখন একজন ঘোষক এ ঘোষণা করবে, ঐ সমস্ত লোকেরা কোথায়? যারা (রাত্রে) আরামের বিছানা থেকে নিজেদের পার্শ্বকে দূরে রেখেছিল, তখন অল্প কিছু সংখ্যক লোক উঠে দাঁড়াবে এবং তারা বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। অতঃপর অবশিষ্ট সকল মানুষ থেকে হিসাব নেয়ার নির্দেশ করা হবে। (বায়হাক্বী’র শুআবূল ঈমান)
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (باب الحساب و القصاص و المیزان)
وَعَن أَسمَاء بنت يزِيد عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: يُحْشَرُ النَّاسُ فِي صَعِيدٍ وَاحِدٍ يَوْمَ الْقِيَامَة فينادي منادٍ فَيَقُول: أَيْنَ الَّذِينَ كَانَتْ تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ؟ فَيَقُومُونَ وَهُمْ قَلِيلٌ فَيَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ بِغَيْرِ حِسَابٍ ثمَّ يُؤمر لسَائِر النَّاسِ إِلَى الْحِسَابِ «. رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي» شُعَبِ الْإِيمَان
اسنادہ ضعیف ، رواہ البیھقی فی شعب الایمان (3244 ، نسخۃ محققۃ : 2974) [و ھناد بن السری فی الزھد (176) و المروزی کما فی مختصر قیام اللیل (ص 18)] ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: (تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ؟) তাদের পার্শ্ব বিছানা থেকে দূরে থাকে। এখানে রূপক ও ব্যাপকাৰ্থক রয়েছে। এতে আল্লাহর বাণী, (يَدْعُونَ رَبَّهُمْ) “তারা (জাহান্নামের) ভীতি ও (জান্নাতের) আশা নিয়ে তাদের প্রতিপালককে ডাকে”- (সূরাহ আস সিজদাহ ৩২: ১৬); এর ইঙ্গিত অস্পষ্ট নয়। এর দ্বারা কারা উদ্দেশ্য এ নিয়ে মতভেদে রয়েছে। কেউ বলেন, এর দ্বারা তাহাজ্জুদগুজার লোকেরা উদ্দেশ্য। কেউ বলেন, আওয়াবীন সালাত আদায়কারী ব্যক্তিরা উদ্দেশ্য। অথবা এর দ্বারা ইশা ও ফজর সালাত আদায়কারী ব্যক্তিরাও উদ্দেশ্য হতে পারে। আর এ ধরনের গুণসম্পন্ন লোক ইসলামে খুব কম সংখ্যক। আল্লাহ বলেন, (کَانُوۡا قَلِیۡلًا مِّنَ الَّیۡلِ مَا یَهۡجَعُوۡنَ) “তারা রাত্রিকালে খুব কমই শয়ন করত”- (সূরহ্ আহ্ যারিয়াত ৫১: ১৭)।
(اِلَّا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ وَ قَلِیۡلٌ مَّا هُمۡ)“...কিন্তু যারা ঈমান আনে আর সৎ ‘আমল করে তারা ব্যতীত, এদের সংখ্যা খুবই কম...”- (সূরাহ্ সোয়াদ ৩৮: ২৪)।
তারা জান্নাতে যাবে বিনা হিসাবে কারণ তারা আনুগত্যের তিক্ততার উপর সবর করেছে আর রাতের নিদ্রার স্বাদকে পরিত্যাগ করেছে। আল্লাহ বলেন, (اِنَّمَا یُوَفَّی الصّٰبِرُوۡنَ اَجۡرَهُمۡ بِغَیۡرِ حِسَابٍ) “আমি ধৈর্যশীলদেরকে তাদের পুরস্কার অপরিমিতভাবে দিয়ে থাকি”- (সূরা আয যুমার ৩৯: ১০)। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
কুরতুবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর দুটি হাওয থাকবে। একটি পুলসিরাতের পূর্বে অবস্থানের জায়গায়, অন্যটি থাকবে জান্নাতে। উভয় হাওযের নাম কাওসার। তাদের ভাষায় কাওসার অর্থ অধিক কল্যাণ। সঠিক কথা হলো হাওযের ব্যবস্থা হবে মীযানের পূর্বে। কারণ মানুষেরা কবর থেকে পিপাসার্ত হয়ে বের হবে। অতঃপর তারা নবীদের অবস্থানস্থলে হাওয থাকবে। আমি বলি, জামি’তে রয়েছে, হে নবী (সা.) আপনার জন্য হাওযে কাওসার রয়েছে। তারা গর্ব করে বলবে যে, কারা বেশি আগমন করেছে? আমি আশা করি যে, আমি তাদের মাঝে সর্বাধিক সংখ্যা নিয়ে আগমনকারী হব।
রাগিব (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, (الشَّفْعُ) বলা হয় কোন জিনিসকে অনুরূপ জিনিসের সাথে যুক্ত করা এখান থেকে (الشَّفَاعَةُ) নির্গত হয়েছে। আর তা বলা হয় অন্যকে সাহায্য করার জন্য তার সাথে যোগদান করা তার থেকে গোপন হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাধারণের তুলনায় বেশি মর্যাদাবান ব্যক্তির যুক্ত হওয়া তার চাইতে কম মর্যাদার লোকের সাথে শাফা’আত সংঘটিত হবে কিয়ামতে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
৫৫৬৬-[১] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: (মি’রাজের রাত্রে) জান্নাত ভ্রমণকালে অকস্মাৎ আমি একটি নহরের কাছে উপস্থিত হলাম, যার উভয় পার্শ্বে শূন্যগর্ভ মুক্তার গুম্বুজ সাজানো রয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরীল! এটা কী? তিনি বললেন, এটাই সেই কাওসার যা আপনার প্রভু আপনাকে দান করেছেন। তার মাটি মিশকের মতো সুগন্ধময়। (বুখারী)
الفصل الاول (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
عَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: بَيْنَا أَنَا أَسِيرُ فِي الجنَّةِ إِذا أَنا بنهر حافتاه الدُّرِّ الْمُجَوَّفِ قُلْتُ: مَا هَذَا يَا جِبْرِيلُ؟ قَالَ: الْكَوْثَرُ الَّذِي أَعْطَاكَ رَبُّكَ فَإِذَا طِينُهُ مِسْكٌ أذفر . رَوَاهُ البُخَارِيّ
رواہ البخاری (6581) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর এই ভ্রমণ ছিল মি'রাজের রজনীতে যা সহীহুল বুখারীতে সূরাহ্ আল কাওসার-এর তাফসীরে বিদ্যমান রয়েছে। অবশ্য ইমাম দাউদী (রহিমাহুল্লাহ)-এর ধারণা এটা কিয়ামতে সংঘটিত হবে। তিনি বলেন, যদি এটা ঠিক হয় তবে বুঝা যাচ্ছে যে, নিশ্চয় হাওয এমন যাকে মানুষেরা জান্নাতে থাকা নদী ব্যতীত অন্য হাওযকে ছেড়ে আসবে। অথবা তারা জান্নাতের বাহিরে থেকে ভিতরে নহরকে দেখতে পাবে।
এ ব্যাখ্যা বিনা প্রয়োজনে অদ্ভুত কষ্টের নামান্তর। এটা বাদ দিয়ে বলা যায় যে, জান্নাতের বাহিরে থাকা হাওযটা বিস্তৃত হয়ে এসেছে জান্নাতের অভ্যন্তর থেকে। তাহলে এতে কোন জটিলতা থাকবে না।
শূন্যগর্ভ মোতির গম্বুজ পরিবেষ্টিত নহর দেখে রাসূলুল্লাহ (সা.) জিবরীল-কে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কি?
আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সা.)- কে যে হাওযে কাওসার দান করেছেন যা সূরায়ে কাওসারে উল্লেখ হয়েছে জিবরীল সেদিকে ইশারা করে বললেন, এটা সেই নহর। আল্লাহ তা'আলা বলেন, “নিশ্চয় আমি আপনাকে কাওসার দান করেছি....।” (সূরাহ আল কাওসার)
‘কাওসার’ হলো প্রভূত কল্যাণ, এ কল্যাণ রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর বিশেষ মর্যাদা। রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর প্রতি আল্লাহ তা'আলার বিশেষ মর্যাদা হলো আল কুরআন, নুবুওয়্যাত ও রিসালাত, উম্মতের আধিক্যতা এবং অন্যান্য উচ্চ মর্যাদাসমূহ। যেমন মাকামে মাহমূদ, প্রশংসার দীর্ঘ পতাকা এবং হাওয, এসবই কাওসার শব্দের অন্তর্ভুক্ত।
এখানে উল্লেখ আছে, (فَإِذَا طِينُهُ مِسْكٌ أذفر) তার মাটি মিশকের ন্যায় সুঘ্রাণযুক্ত। কোন কোন বর্ণনায় (طِيبه)-এর পরিবর্তে (طِيبه) 'তার সুগন্ধি মিশকের ন্যায় উল্লেখ রয়েছে। ইমাম বায়হাকী (রহিমাহুল্লাহ) 'আবদুল্লাহ ইবনু মুসলিম তিনি আনাস (রাঃ)-এর সূত্রে (طِينُه)-এর পরিবর্তে (تُرَابُهُ) 'তার ধুলা উল্লেখ করেছেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ, ফাতহুল বারী ১১খণ্ড, ৫৩৩ পৃ., হা, ৬৫৮১)
(فَإِذَاطِيبُهُ) হুদবাহ সন্দেহে পড়েছেন সেটা (طِيب) হবে না (طِين) হবে? কিন্তু আবূল ওয়ালীদ সন্দেহাতীতভাবে বলেছেন যে, সেটা নূন সহকারে অর্থাৎ (طِين) হবে, এটাই নির্ভরযোগ্য। (ফাতহুল বারী হা. ৬৫৮১)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৬৭-[২] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আমার হাওযের প্রশস্ততা এক মাসের পথের সমপরিমাণ এবং তার চতুর্দিকও সমপরিমাণ আর তার পানি দুধ অপেক্ষাও অধিক সাদা এবং তার ঘ্রাণ মৃগনাভি অপেক্ষাও অধিক সুগন্ধিময়, আর তার পানপাত্রসমূহ আকাশের তারকার মতো। যে তা থেকে একবার পান করবে সে আর কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «حَوْضِي مَسِيرَةُ شَهْرٍ وَزَوَايَاهُ سَوَاءٌ مَاؤُهُ أَبْيَضُ مِنَ اللَّبَنِ وَرِيحُهُ أَطْيَبُ مِنَ الْمِسْكِ وَكِيزَانُهُ كَنُجُومِ السَّمَاءِ مَنْ يَشْرَبُ مِنْهَا فَلَا يظمأ أبدا» . مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (6579) و مسلم (27 / 2292)، (5971) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: এখানে হাওযে কাওসারের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বা তার পরিধির বিবরণ প্রদান করা হয়েছে, যা চতুর্ভুজ আকারে ধরলে প্রত্যেক পাড়ের দূরত্ব এক মাসের পথ। কেউ কেউ এর গভীরতাকেও সমপরিমাণ বলে মনে করেন। আরবীতে (سَوَاءٌ) শব্দ দ্বারা পরিমাপের সকল দিককেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
হাওযে কাওসারের পানি দুধের চেয়েও অধিক সাদা। ইমাম নবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, أَبْيَضُ শব্দটি ইসমে তাফযীলের সাধারণ অর্থে না এসে (اشد أَبْيَض) এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যা ‘ইলমে নাহু-এর একটি ব্যতিক্রম নিয়ম। তার পানি মৃগণাভী অপেক্ষা বেশি সুঘ্রাণযুক্ত বা খুশবুদার হবে যা মানুষের হৃদয়কে প্রশান্ত করে দিবে। তার কিনারায় রক্ষিত পানপাত্ৰসমূহ হবে আকাশের তারকার ন্যায় অসংখ্য এবং উজ্জ্বল। যে ব্যক্তি এ নহরের পানি পান করতে পারবে সে আর কখনো হাশরের পিপাসায় পিপাসিত হবে না। মূলত এটি জান্নাতের একটি পানীয় যা হাশরের ময়দানে নবী (সা.) নিজ হাতে কুরআন সুন্নাহর সঠিক অনুসারীদের পান করাবেন। বিদ্আতীরাও এ পানি পান করতে হাওযে কাওসারের দিক এগিয়ে যাবে, নবী (সা.) তাদের পান করানোর জন্য উদ্যত হবেন, এমন সময় তাদের এবং পানির মাঝে পর্দা পড়ে যাবে। মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) নবী (সা.) -কে উক্ত পানি পান করাতে দিবেন না। পরের হাদীসে এর বিস্তারিত বিবরণ এসেছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ, ফাতহুল বারী ১১শ খণ্ড, ৫৩ পৃ., হা. ৬৫৭৯, শারহুন নাবাবী ১৫শ খণ্ড, হা. ২২৯২)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৬৮-[৩] আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আমার হাওযের (উভয় পার্শ্বের) দূরত্ব আয়লাহ ও ’আদন-এর মধ্যবর্তী দূরত্ব থেকেও অধিক। তার পানি বরফের চেয়ে অধিক সাদা এবং দুধমিশ্রিত মধুর তুলনায় অনেক মিষ্ট। তার পানপাত্রসমূহ নক্ষত্রের সংখ্যা অপেক্ষা অধিক। আর আমি আমার হাওযের কাওসারে আগমন করা থেকে লোকেদেরকে (অন্যান্য উম্মতদেরকে) তেমনিভাবে বাধা দেব, যেমনিভাবে কোন লোক তার নিজের হাওয থেকে অন্যের উটকে পানি পানে বাধা দিয়ে থাকে। সাহাবীগণ প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সেদিন কি আপনি আমাদেরকে চিনতে পারবেন? তিনি (সা.) বললেন, হ্যাঁ, সেদিন তোমাদের বিশেষ চিহ্ন থাকবে যা অন্যান্য উম্মাতের কারো জন্য হবে না। তোমরা আমার কাছে এমন অবস্থায় আসবে যে, তোমাদের মুখমগুল এবং হাত-পা উযূর কারণে উজ্জ্বল থাকবে। (মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ حَوْضِي أَبْعَدُ مِنْ أَيْلَةَ مِنْ عَدَنٍ لَهُوَ أَشَدُّ بَيَاضًا مِنَ الثَّلْجِ وَأَحْلَى مِنَ الْعَسَلِ بِاللَّبَنِ وَلَآنِيَتُهُ أَكْثَرُ مِنْ عَدَدِ النُّجُومِ وَإِنِّي لَأَصُدُّ النَّاسَ عَنْهُ كَمَا يَصُدُّ الرَّجُلُ إِبِلَ النَّاسِ عَنْ حَوْضِهِ» . قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَتَعْرِفُنَا يَوْمَئِذٍ؟ قَالَ: «نَعَمْ لَكُمْ سِيمَاءُ لَيْسَتْ لِأَحَدٍ مِنَ الْأُمَم تردون عليّ غرّاً من أثر الْوضُوء» . رَوَاهُ مُسلم
رواہ مسلم (36 / 247)، (581) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসের ব্যাখ্যার কিয়দংশ পূর্বের হাদীসের ব্যাখ্যায় অতিবাহিত হয়েছে, তার পূনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। এখানে হাওযে কাওসারের দৈর্ঘ্য বা প্রস্থের দূরত্ব আয়লাহ্ হতে ‘আদন-এর দূরত্বের চেয়েও বেশি উল্লেখ করা হয়েছে। আয়লাহ্ হলো সিরিয়ার শেষ প্রান্তের একটি শহর যা ইয়ামান সাগরের নিকটে অবস্থিত। আর ‘আদন হলো ভারত মহাসাগরের সন্নিকটে ইয়ামানের প্রান্তসীমা। কোন কোন হাদীসে দূরত্বের সীমা বর্ণনা করতে গিয়ে আরো কয়েকটি স্থানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন ‘আদন থেকে আম্মান, আয়লা থেকে সন্'আ ইত্যাদি। এসবগুলো স্থানের দূরত্ব মোটামুটি একই আর তা হলো প্রায় একমাসের পথ বা তার চেয়ে একটু বেশি।
অতএব বর্ণনার ভিন্নতা দোষণীয় কিছু নয়। শ্রোতা সাধারণের অবস্থার আলোকে তাদের পরিচিত স্থানের ধারণা দিয়ে দূরত্ব বুঝানোই উদ্দেশ্য। কাযী ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এটা তো নিছক দৃষ্টান্ত মাত্র।
রাসূলুল্লাহ (সা.) ও কতিপয় মানুষকে এখানে অর্থাৎ হাওযের পাড়ে আসতে বাধা দিবেন এবং তাদের তাড়িয়ে দিবেন। এরা হলো মুনাফিক, মুরতাদ। সামনের হাদীস থেকে বুঝা যায়, তারা বিদ'আতী। রাখাল যেমন অন্যের উটকে নিজের ঘাস-পানির হাওয বা বাসনে অংশগ্রহণের ভয়ে তাড়িয়ে দিয়ে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সা.) ও ঠিক তেমনিভাবে তাদের তাড়িয়ে দিবেন। কতিপয় সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল ! সেদিন কি আপনি আমাদের চিনতে পারবেন? এর অর্থ হলো সেদিন কি আপনি আমাদেরকে ঐ সকল মুনাফিক, মুরতাদ, বিদ্আতীদের মধ্য থেকে চিনে আলাদা করতে পারবেন এবং আপনার ঐ হাওযে কাওসারের পানি পান করাবেন? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, হ্যাঁ। তিনি (সা.) আরো বললেন, সেদিন তোমাদের বিশেষ চিহ্ন বা নিদর্শন থাকবে, যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,
(سِیۡمَاهُمۡ فِیۡ وُجُوۡهِهِمۡ مِّنۡ اَثَرِ السُّجُوۡدِ) “চিহ্নসমূহ তাদের মুখমণ্ডলের উপর সিজদার কারণে পরিস্ফুট হয়ে আছে...।” (সূরা আল ফাতহ ৪৮: ২৯)
যে চিহ্ন অন্য কোন উম্মতের মধ্যেই আর নেই। এছাড়াও তোমরা আমার নিকট দিয়ে এমন অবস্থায় অতিক্রম করবে যে, তোমাদের মুখমণ্ডল ও হাত-পা গুলো উযুর কারণে উজ্জ্বল হয়ে চমকাতে থাকবে। যা দেখে আমি তোমাদের অন্যদের থেকে বাছাই করে নিব।
অন্যান্য নবীদের শারী'আতেও উযূর বিধান ছিল এবং তাদের উম্মতগণ হয়তো বা উযূ করেছেন কিন্তু কোন নবীর উম্মতের মধ্যেই ঐ উজ্জ্বলতা প্রকাশ পাবে না, তবে নবীগণের মর্যাদা অনেক উর্ধ্বে, অতএব তাদের কথা স্বতন্ত্র। (মিরকাতুল মাফাতীহ, শারহুন নাবাবী ৩য় খণ্ড, ১১৭ পৃ., হা, ২৪৭)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৬৯-[৪] অপর এক বর্ণনায় আছে, আনাস (রাঃ) বলেন, উক্ত হাওযে সোনা ও রূপার এত অধিক পানপাত্র থাকবে, যার সংখ্যা হবে আকাশের তারকারাজির মতো (অগণিত)।
الفصل الاول (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَفِي رِوَايَةٍ لَهُ عَنْ أَنَسٍ قَالَ: «تَرَى فِيهِ أَبَارِيقَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ كَعَدَدِ نُجُومِ السَّمَاءِ»
رواہ مسلم (43 / 2303)، (6000) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: আনাস (রাঃ)-এর সূত্রে সহীহ মুসলিমের অন্য বর্ণনায় হাওযের কিনারায় রক্ষিত পানপাত্রগুলোর বিবরণ এসেছে এই যে, সেগুলো স্বর্ণ ও রৌপ্যের তৈরি আর সংখ্যা হলো আকাশের নক্ষত্র সমপরিমাণ। আল্লামাহ্ মুল্লা আলী ক্বারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, একাধিক গুণের ও মূল্যমানের পানপাত্র পানকারী আওলিয়া, স্বালিহীন ইত্যাদির মর্যাদার তারতম্যের কারণেই ভিন্ন ভিন্ন হবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৭০-[৫] অন্য এক বর্ণনায় আছে, সাওবান (রাঃ) বলেন, [রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে জিজ্ঞেস করা হলো] তার পানীয় কেমন হবে? তিনি (সা.) বললেন, দুধের চেয়ে অধিক সাদা এবং মধু অপেক্ষা অধিক সুমিষ্ট। তাতে জান্নাত হতে আগত দুটি জলধারা প্রবাহিত হতে থাকবে। এটার একটি সোনার অপরটি চাঁদির।
الفصل الاول (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَفِي أُخْرَى لَهُ عَنْ ثَوْبَانَ قَالَ: سُئِلَ عَنْ شَرَابِهِ. فَقَالَ: أَشَدُّ بَيَاضًا مِنَ اللَّبَنِ وَأَحْلَى مِنَ الْعَسَلِ يَغُتُّ فِيهِ مِيزَابَانِ يَمُدَّانِهِ مِنَ الْجَنَّةِ: أَحَدُهُمَا مِنْ ذَهَبٍ وَالْآخَرُ مِنْ ورق
رواہ مسلم (37 / 2301)، (5990) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: সহীহ মুসলিমে সাওবান (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে ঐ হাওযের পানির গুণাবলি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, উত্তরে তিনি (সা.) বললেন, সেটা দুধের চেয়েও অধিক সাদা এবং মধুর চেয়ে অধিক মিষ্ট। এ পানি জান্নাতের মূল হাওয থেকে দুটি স্বর্ণ ও রৌপ্যের জলপ্রবাহ দিয়ে এসে হাওযে স্বজোরে পতিত হচ্ছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৭১-[৬] সাহল ইবনু সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আমি তোমাদের পূর্বেই হাওযে কাওসারের কাছে পৌছব। যে ব্যক্তি আমার কাছে পৌছবে, সে তার পানি পান করবে। আর যে একবার পান করবে, সে আর কখনো পিপাসার্ত হবে না। আমার কাছে এমন কিছু লোক আসবে যাদেরকে আমি চিনতে পারব এবং তারাও আমাকে চিনতে পারবে। অতঃপর আমার ও তাদের মাঝে আড়াল করে দেয়া হবে। তখন আমি বলব, তারা তো আমার উম্মত। তখন আমাকে বলা হবে, আপনি জানেন না, আপনার অবর্তমানে তারা যে কি সকল নতুন নতুন মত পথ তৈরি করেছে। তা শুনে আমি বলব, যারা আমার অবর্তমানে আমার দীনকে পরিবর্তন করেছে, তারা দূর হোক (অর্থাৎ এ ধরনের লোক আমার শাফা’আত ও আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হবে। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنِّي فَرَطُكُمْ عَلَى الْحَوْضِ مَنْ مَرَّ عَلَيَّ شَرِبَ وَمَنْ شَرِبَ لَمْ يَظْمَأْ أَبَدًا لَيَرِدَنَّ عَلَيَّ أَقْوَامٌ أَعْرِفُهُمْ وَيَعْرِفُونَنِي ثُمَّ يُحَالُ بَيْنِي وَبَيْنَهُمْ فَأَقُولُ: إِنَّهُمْ مِنِّي. فَيُقَالُ: إِنَّكَ لَا تَدْرِي مَا أَحْدَثُوا بَعْدَكَ؟ فَأَقُولُ: سُحْقًا سحقاً لمن غير بعدِي . مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (6583 ۔ 6584) و مسلم (26 / 2290)، (5968) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: হাওযে কাওসার জান্নাতের একটি নহর; আল্লাহ তা'আলা তা মুহাম্মাদ (সা.)-কে দান করেছেন। কিয়ামতের দিন পিপাসিত উম্মতকে তিনি তা থেকে পান করাবেন। এজন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) সর্বাগ্রে হাওযের নিকট উপনীত হবেন। কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, হাদীসে বাহ্যিক অর্থ প্রমাণ করে এই পানি পান হাশরের হিসাবের পর এবং জাহান্নাম থেকে অব্যাহতির পর।” তবে এটা সত্য যে, তা জান্নাতে প্রবেশের পূর্বেই হবে, কারণ জান্নাতে প্রবেশের পর তার আর কোন পিপাসা থাকবে না। কাযী ‘ইয়ায় (রহিমাহুল্লাহ)-এর বক্তব্যে প্রশ্ন জাগে হিসাবের পর যারা জাহান্নাম থেকে অব্যাহতি পাবে তারা তো প্রকৃতপক্ষে সফলতাই অর্জন করেছে, এমন লোকেদের হাওযে কাওসারের পানির ঘাট থেকে দূরে তাড়িয়ে দেয়া কি বিস্ময়কর নয়?
দীনের মধ্যে যারা ইহদাস করেছে অথাৎ নতুন বিষয়ের উদ্ভব ঘটিয়েছে, বিদ্আত করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের পানির ঘাটে পৌছতে দিবেন না বরং তাড়িয়ে দিবেন। সুহকান শব্দটি শাস্তির দু'আ অর্থ রহমত থেকে দূরে থাক। (মিরকাতুল মাফাতীহ, ফাতহুল বারী ১৩খণ্ড, ০৫ পৃ., হা. ৭০৪৯; ইবনু মাজাহ হা, ৪৩০৪)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৭২-[৭] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী (সা.) বলেছেন: কিয়ামতের দিন ঈমানদারদেরকে (হাশরের ময়দানে) আটক করে রাখা হবে। এমনকি তাতে তারা ভীষণ চিন্তাযুক্ত ও অস্থির হয়ে বলবে, যদি আমরা আমাদের প্রভুর কাছে কারো দ্বারা সুপারিশ করাই তাহলে হয়তো আমাদের বর্তমান অবস্থা থেকে মুক্তি লাভ করে আরাম পেতে পারি। তাই তারা আদম আলায়হিস সালাম-এর কাছে গিয়ে বলবে, আপনি সমস্ত মানবমণ্ডলীর পিতা। আল্লাহ স্বীয় হাতে আপনাকে সৃষ্টি করেছেন ও জান্নাতে বসবাস করতে দিয়েছিলেন, মালায়িকার (ফেরেশতাদের) দিয়ে সিজদাহ্ করিয়েছিলেন এবং সমস্ত জিনিসের নাম আপনাকে শিখিয়েছিলেন, আপনি আমাদের জন্য আপনার প্রভুর কাছে সুপারিশ করুন, যাতে তিনি আমাদেরকে এ কষ্টদায়ক স্থান হতে মুক্ত করে প্রশান্তি দান করেন। তখন আদম আলায়হিস সালাম বলবেন, আমি তোমাদের এ কাজের যোগ্য নই। নবী (সা.) বলেন, তখন তিনি গাছ থেকে (ফল) খাওয়ার গুনাহের কথা যা থেকে তাঁকে বারণ করা হয়েছিল, স্মরণ করবেন। (তিনি বলবেন,) বরং তোমরা পৃথিবীবাসীর জন্য প্রেরিত আল্লাহ তা’আলা সর্বপ্রথম নবী নূহ আলায়হিস সালাম-এর কাছে যাও।
অতএব তারা সকলে নূহ আলায়হিস সালাম-এর কাছে গেলে তিনি তাদেরকে বলবেন, আমি তোমাদের এ কাজের উপযুক্ত নই এবং সাথে সাথে তিনি তার ঐ গুনাহের কথা স্মরণ করবেন, অজ্ঞতাবশত নিজের ছেলেকে পানিতে না ডুবানোর জন্য স্বীয় প্রভুর কাছে যে প্রার্থনা করেছিলেন। তখন তিনি বলবেন, বরং তোমরা আল্লাহর খলীল ইবরাহীম আলায়হিস সালাম-এর কাছে যাও।
তিনি (সা.) বলেন, এবার তারা ইবরাহীম আলায়হিস সালাম-এর কাছে আসবে তখন তিনি বলবেন, আমি তোমাদের এ কাজের উপযুক্ত নই এবং তিনি তাঁর তিনটি মিথ্যা উক্তির কথা স্মরণ করে বলবেন, বরং তোমরা মূসা আলায়হিস সালাম-এর কাছে যাও। তিনি আল্লাহ তা’আলার এমন এক বান্দা যাকে আল্লাহ তাওরাত কিতাব দিয়েছেন। তার সাথে কথা বলেছেন এবং তাঁকে নৈকট্য দান করে হিকমার অধিকারী বানিয়েছেন। নবী (সা) বলেন, তখন সকলে মূসা (আঃ) -এর কাছে আসলে তিনি বলবেন, আমি তোমাদের এ কাজের উপযুক্ত নই। তিনি তখন সেই প্রাণনাশের গুনাহের স্মরণ করবেন, যা তার হাতে ঘটেছিল, বরং তোমরা আল্লাহর বান্দা ও রাসূল এবং তার কালিমাহ ও রূহ ’ঈসা আলায়হিস সালাম-এর কাছে যাও।
তিনি (সা.) বলেন, তখন তারা সকলে ’ঈসা আলায়হিস সালাম-এর কাছে আসবে। তিনি বলবেন, আমি তোমাদের এ কাজের উপযুক্ত নই। তোমরা বরং মুহাম্মাদ (সা.) -এর কাছে যাও। তিনি আল্লাহর এমন এক বান্দা, যাকে আল্লাহ তা’আলা তার আগের ও পরের সকল গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। তিনি (সা.) বলেন, তারা আমার কাছে আসবে, তখন আমি আমার রবের কাছে তাঁর নিকট উপস্থিত হওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করব, আমাকে তাঁর কাছে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হবে। আমি যখন তাকে দেখব, তখনই তাঁর উদ্দেশ্যে সিজদায় পড়ে যাব, আল্লাহ তা’আলা যতক্ষণ আমাকে চাবেন এ অবস্থায় রাখবেন। তারপর বলবেন, হে মুহাম্মাদ! মাথা উঠাও। আর বল, তোমার কথা শুনা হবে। তুমি সুপারিশ কর, তা গ্রহণ করা হবে। আর প্রার্থনা কর, যা চাবে দেয়া হবে।
তিনি (সা.) বলেন, তখন আমি মাথা উঠাব এবং আমার প্রভুর এমনভাবে প্রশংসা-স্তুতি বর্ণনা করব, যা তিনি সেই সময় আমাকে শিখিয়ে দেবেন। অতঃপর আমি শাফা’আত করব, কিন্তু এ ব্যাপারে আমার জন্য একটি সীমা নির্দিষ্ট করে দেয়া হবে। আমি তখন আল্লাহর কাছ থেকে উঠে আসব এবং ঐ নির্দিষ্ট সীমার লোকদেরকে জাহান্নামে থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করাব। তারপর আমি পুনরায় ফিরে এসে আমার রবের দরবারে তাঁর কাছে হাজির হওয়ার অনুমতি চাব, আমাকে অনুমতি দেয়া হবে। যখন আমি তাকে দেখব, তখনই তার উদ্দেশে সিজদায় পড়ে যাব এবং আল্লাহ তা’আলা যতক্ষণ চাইবেন আমাকে এ অবস্থায় থাকতে দেবেন।
তারপর বলবেন, হে মুহাম্মাদ! মাথা উঠাও। আর বল, তোমার কথা শুনা হবে। সুপারিশ কর, গ্রহণ করা হবে। আর তুমি প্রার্থনা কর, যাই চাবে, তা দেয়া হবে। তখন আমি মাথা উঠাব এবং আমার প্রভুর এমন প্রশংসা ও স্তুতি বর্ণনা করব, যা আমাকে তখন শিখিয়ে দেয়া হবে। এরপর আমি শাফা’আত করব, কিন্তু আমার জন্য এ ক্ষেত্রে একটি সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হবে। তখন আমি আমার প্রভুর নিকট থেকে বের হয়ে আসব এবং ঐ নির্দিষ্ট লোকগুলোকে জাহান্নাম হতে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করাব।
তারপর তৃতীয়বার ফিরে এসে আমার প্রভুর কাছে উপস্থিত হওয়ার অনুমতি চাব। আমাকে তার কাছে উপস্থিত হওয়ার অনুমতি দেয়া হবে। যখন আমি তাকে (রবকে) দেখব, তখনই সিজদায় পড়ে যাব। আল্লাহর যতক্ষণ ইচ্ছা আমাকে এ অবস্থায় রেখে দেবেন। তারপর বলবেন, হে মুহাম্মাদ! মাথা উঠাও। বল, যা বলবে তা শুনা হবে। শাফা’আত কর, তোমার শাফা’আত গ্রহণ করা হবে। আর প্রার্থনা কর, যা প্রার্থনা করবে তা দেয়া হবে। তিনি (সা.) বলেন, তখন আমি মাথা তুলব এবং আমার প্রভুর এমন প্রশংসা-গুণকীর্তন করব, যা তিনি আমাকে সে সময় শিখিয়ে দেবেন। তিনি (সা.) বলেন, তারপর আমি শাফা’আত করব। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা আমার জন্য একটা সীমা নির্দিষ্ট করে দেবেন। তখন আমি সেই সান্নিধ্য থেকে বাইরে আসব এবং তথায় যেয়ে তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করাব। অবশেষে কুরআন যাদেরকে আটকে রাখবে অর্থাৎ যাদের জন্য কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী চিরস্থায়ী জাহান্নামবাসী নির্ধারিত হয়ে গেছে তারা ছাড়া আর কেউই জাহান্নামে থাকবে না।
বর্ণনাকারী আনাস (রাঃ) বলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কুরআনের এ আয়াত (عَسٰۤی اَنۡ یَّبۡعَثَکَ رَبُّکَ مَقَامًا مَّحۡمُوۡدًا) “আপনার প্রভু শীঘ্রই আপনাকে ’মাকামে মাহমূদে পৌছিয়ে দেবেন”- (সূরাহ্ বানী ইসরাঈল ১৭: ৭৯); তিলাওয়াত করে বললেন, এটাই সেই ’মাকামে মাহমূদ তোমাদের নবীকে যার অঙ্গীকার দেয়া হয়েছে। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَنْ أَنَسٍ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: يُحْبَسُ الْمُؤْمِنُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُهَمُّوا بِذَلِكَ فَيَقُولُونَ: لَوِ اسْتَشْفَعْنَا إِلَى رَبِّنَا فَيُرِيحَنَا مِنْ مَكَانِنَا فَيَأْتُونَ آدَمَ فَيَقُولُونَ: أَنْتَ آدَمُ أَبُو النَّاسِ خَلَقَكَ اللَّهُ بِيَدِهِ وَأَسْكَنَكَ جَنَّتَهُ وَأَسْجَدَ لَكَ مَلَائِكَتَهُ وَعَلَّمَكَ أَسْمَاءَ كُلِّ شَيْءٍ اشْفَعْ لَنَا عِنْدَ رَبِّكَ حَتَّى يُرِيحَنَا مِنْ مَكَانِنَا هَذَا. فَيَقُولُ: لَسْتُ هُنَاكُمْ. وَيَذْكُرُ خَطِيئَتَهُ الَّتِي أَصَابَ: أَكْلَهُ مِنَ الشَّجَرَةِ وَقَدْ نُهِيَ عَنْهَا - وَلَكِنِ ائْتُوا نُوحًا أَوَّلَ نَبِيٍّ بَعَثَهُ اللَّهُ إِلَى أَهْلِ الْأَرْضِ فَيَأْتُونَ نُوحًا فَيَقُولُ: لَسْتُ هُنَاكُمْ - وَيَذْكُرُ خَطِيئَتَهُ الَّتِي أَصَابَ: سُؤَالَهُ رَبَّهُ بِغَيْرِ عِلْمٍ - وَلَكِنِ ائْتُوا إِبْرَاهِيمَ خَلِيلَ الرَّحْمَنِ. قَالَ: فَيَأْتُونَ إِبْرَاهِيمَ فَيَقُولُ: إِنِّي لَسْتُ هُنَاكُمْ - وَيَذْكُرُ ثَلَاثَ كِذْبَاتٍ كَذَبَهُنَّ - وَلَكِنِ ائْتُوا مُوسَى عَبْدًا آتَاهُ اللَّهُ التَّوْرَاةَ وَكَلَّمَهُ وَقَرَّبَهُ نَجِيًّا. قَالَ: فَيَأْتُونَ مُوسَى فَيَقُولُ: إِنِّي لَسْتُ هُنَاكُمْ - وَيَذْكُرُ خَطِيئَتَهُ الَّتِي أَصَابَ قَتْلَهُ النَّفْسَ - وَلَكِنِ ائْتُوا عِيسَى عَبْدَ اللَّهِ وَرَسُولَهُ وَرُوحَ اللَّهِ وَكَلِمَتَهُ قَالَ: فَيَأْتُونَ عِيسَى فَيَقُولُ: لَسْتُ هُنَاكُمْ وَلَكِنِ ائْتُوا مُحَمَّدًا عبدا غفر اللَّهُ لَهُ ماتقدم مِنْ ذَنْبِهِ وَمَا تَأَخَّرَ . قَالَ: فَيَأْتُونِي فَأَسْتَأْذِنُ عَلَى رَبِّي فِي دَارِهِ فَيُؤْذَنُ لِي عَلَيْهِ فَإِذَا رَأَيْتُهُ وَقَعْتُ سَاجِدًا فَيَدَعُنِي مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ يَدَعَنِي فَيَقُولُ: ارْفَعْ مُحَمَّدُ وَقُلْ تُسْمَعْ وَاشْفَعْ تُشَفَّعْ وَسَلْ تُعْطَهْ . قَالَ: فَأَرْفَعُ رَأْسِي فأثني على رَبِّي بثناء تحميد يُعَلِّمُنِيهِ ثُمَّ أَشْفَعُ فَيَحُدُّ لِي حَدًّا فَأَخْرُجُ فَأُخْرِجُهُمْ مِنَ النَّارِ وَأُدْخِلُهُمُ الْجَنَّةَ ثُمَّ أَعُودُ الثَّانِيَةَ فَأَسْتَأْذِنُ عَلَى رَبِّي فِي دَارِهِ. فَيُؤْذَنُ لِي عَلَيْهِ فَإِذَا رَأَيْتُهُ وَقَعْتُ سَاجِدًا. فَيَدَعُنِي مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ يَدَعَنِي ثُمَّ يَقُولُ: ارْفَعْ مُحَمَّدُ وَقُلْ تُسْمَعْ وَاشْفَعْ تُشَفَّعْ وَسَلْ تُعْطَهْ. قَالَ: فَأَرْفَعُ رَأْسِي فَأُثْنِي عَلَى رَبِّي بِثَنَاءٍ وَتَحْمِيدٍ يُعَلِّمُنِيهِ ثُمَّ أَشْفَعُ فَيَحُدُّ لِي حَدًّا فَأَخْرُجُ فَأُخْرِجُهُمْ مِنَ النَّارِ وَأُدْخِلُهُمُ الْجَنَّةَ ثُمَّ أَعُودُ الثَّالِثَةَ فَأَسْتَأْذِنُ عَلَى رَبِّي فِي دَاره فيؤذي لِي عَلَيْهِ فَإِذَا رَأَيْتُهُ وَقَعْتُ سَاجِدًا فَيَدَعُنِي مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ يَدَعَنِي ثُمَّ يَقُولُ: ارْفَعْ مُحَمَّدُ وَقُلْ تُسْمَعْ وَاشْفَعْ تُشَفَّعْ وَسَلْ تُعْطَهْ . قَالَ: «فَأَرْفَعُ رَأْسِي فَأُثْنِي عَلَى رَبِّي بثناءوتحميد يُعَلِّمُنِيهِ ثُمَّ أَشْفَعُ فَيَحُدُّ لِي حَدًّا فَأَخْرُجُ فَأُخْرِجُهُمْ مِنَ النَّارِ وَأُدْخِلُهُمُ الْجَنَّةَ حَتَّى مَا يَبْقَى فِي النَّارِ إِلَّا مَنْ قَدْ حَبَسَهُ الْقُرْآنُ» أَيْ وَجَبَ عَلَيْهِ الْخُلُودُ ثُمَّ تَلَا هَذِه الْآيَة (عَسى أَن يَبْعَثك الله مقَاما مَحْمُودًا) قَالَ: «وَهَذَا الْمقَام المحمود الَّذِي وعده نَبِيكُم» مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (6565) و مسلم (322 / 193)، (475) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক নবীকে দুনিয়াতে একটি করে দু'আ কবুলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেই সুযোগে প্রত্যেকেই নিজ নিজ সুবিধা ও চাহিদা মোতাবেক তা পূরণ করে নিয়েছেন; আমাদের নবী মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন, আমি আমার সেই সুযোগটি কিয়ামতের জন্য রেখে দিয়েছি সেটি হলো তার উম্মতের জন্য “শাফাআত”। কিয়ামতের দিন তিনি তা ব্যবহার করবেন, আল্লাহ তা'আলা তার সেই শাফাআত কবুল করবেন।
কিয়ামতের দিন কোন নবীই আল্লাহর কাছে যাওয়া, তার সাথে কথা বলা এবং উম্মাহর জন্য শাফাআতের সাহস করবেন না। কেবলমাত্র আমাদের নবীই আল্লাহর সাথে কথা বলবেন এবং শাফাআত করবেন, আর তার শাফা'আত কবুলও করা হবে।
প্রথমেই লোকেরা আদি পিতা আদম-এর কাছে যাবে, কেননা আল্লাহর কাছে তার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। লোকেরা সেই মর্যাদাগুলো উল্লেখ করে তাকে আল্লাহর সাথে কথা বলা এবং তাদের জন্য সুপারিশের অনুরোধ করবে, কিন্তু তিনি আল্লাহ তা'আলার একটি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার কারণে এত ভীত এবং লজ্জিত হবেন যে, আল্লাহর কাছে যেতেই সাহস করবেন না। তিনি তার পরবর্তী নবীর নাম নিয়ে বলবেন, তোমরা তার নিকটে যাও। লোকেরা পর্যায়ক্রমে হাদীসে বর্ণিত নবীগণের নিকট যাবে কিন্তু প্রত্যেক নবীই ওযর পেশ করবেন, অতঃপর আমাদের নবীর নিকট বলার সাথে সাথে তিনি সম্মত হবেন এবং শাফা'আতের নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত আল্লাহর সমীপে সিজদায় পড়ে থাকবেন। এই সিজদায় পড়ে থাকার সময় হবে দীর্ঘ। হাদীসের ভাষায় রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: (فَإِذَا رَأَيْتُهُ وَقَعْتُ سَاجِدًا فَيَدَعُنِي مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ يَدَعَنِي) “আমি যখন আল্লাহ তা'আলাকে দেখব তখন সিজদায় পড়ে যাব, তিনি আমাকে (এই সিজদার মধ্যে) যতক্ষণ ইচ্ছা ফেলে রাখবেন।"
এই দীর্ঘ সময় আল্লাহ তা'আলা তার সাথে কথাও বলবেন না এবং সিজদাহ্ থেকে মাথাও উঠাতে বলবেন না। সে দীর্ঘ সময় যে কত দীর্ঘ হবে তার কোন ইয়ত্তা নেই।
এরপর আল্লাহ তা'আলা তাকে মাথা উঠাতে বলবেন এবং তার চাওয়া পূরণের ও শাফা'আত গ্রহণের ওয়াদা দিবেন। সে মতে নবী (সা.) শাফা'আত করবেন এবং আল্লাহ তা'আলার দেয়া নির্দিষ্ট সংখ্যক জাহান্নামীকে জাহান্নাম থেকে উঠিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। এভাবে তিনি তিনবার আল্লাহর নিকট গিয়ে সিজদায পড়বেন এবং পূর্বের ন্যায় আল্লাহ তা'আলার অনুমতিসাপেক্ষে শাফা'আত করবেন। এ শাফা'আতে কেউ আর জাহান্নামে অবশিষ্ট থাকবে না কেবল কুরআন যাদের আটকিয়ে রেখেছে তারা ছাড়া অর্থাৎ যারা চিরস্থায়ী জাহান্নামী হিসেবে পূর্ব থেকে নির্ধারিত হয়ে গেছে। তারা ছাড়া জাহান্নামে আর কোন লোক বাকী থাকবে না, তারা হলো কাফির ও মুশরিক।
রাসুসুল্লাহ (সা.) -এর বাণী: “কিন্তু কুরআন কাদের আটকিয়ে রাখবে”-এর ব্যাখ্যা এটাও যে, আল কুরআন কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে বান্দার পক্ষে অথবা বিপক্ষে সাক্ষ্য দান করবে, সে সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বান্দার জান্নাত ও জাহান্নাম নির্ভর করবে।
নবী (সা.) -এর শাফা'আতের এই একক মর্যাদাকেই আল্লাহ তা'আলার প্রতিশ্রুত মাকামে মাহমূদ নামে অভিহিত করা হয়। যেমন আল্লাহর বাণী, “সত্বর আপনার প্রতিপালক আপনাকে মাকামে মাহমূদ তথা প্রশংসিত স্থানে পৌছাবেন” (সূরা বানী ইসরাঈল ১৭:৭৯)
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ, ফাতহুল বারী ১১খণ্ড, ৪৮৮ পৃ., হা. ৬৫৬৫, ইবনু মাজাহ ৩য় খণ্ড, ৫৪১ পৃ., হা. ৪৩১২) |
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৭৩-[৮] উক্ত রাবী [আনাস (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেনঃ যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে, তখন মানুষ একে অপরে সমবেত অবস্থায় উদ্বেলিত ও উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়বে। তাই তারা সকলে আদম ’আলায়হিস সালাম-এর কাছে গিয়ে বলবে, আমাদের জন্য আপনার প্রভুর কাছে শাফা’আত করুন। তিনি বলবেন, আমি এ কাজের উপযুক্ত নই, বরং তোমরা ইবরাহীম আলায়হিস সালাম-এর কাছে যাও। তিনি আল্লাহর খলীল। তাই তারা ইবরাহীম আলায়হিস সালাম-এর কাছে যাবে। তিনি বলবেন, আমি এ কাজের যোগ্য নই, বরং তোমরা মূসা আলায়হিস সালাম-এর কাছে যাও। কারণ তিনি কালীমুল্লাহ (যিনি আল্লাহর সাথে কথোপকথন করেছেন)। এবার তারা মুসা আলায়হিস সালাম-এর কাছে যাবে। তিনি বলবেন, আমি এ কাজের যোগ্য নই, বরং তোমরা ’ঈসা আলায়হিস সালাম-এর কাছে যাও। কারণ তিনি আল্লাহর আত্মা ও কালিমাহ্। তখন তারা ’ঈসা আলায়হিস সালাম-এর কাছে যাবে। তিনিও বলবেন, আমি এ কাজের যোগ্য নই। তোমরা বরং মুহাম্মাদ (সা.) -এর কাছে যাও।
তখন তারা সকলে আমার কাছে আসবে। তখন আমি বলব, আমিই এ কাজের জন্য। এবার আমি আমার প্রভুর কাছে অনুমতি প্রার্থনা করব। আমাকে অনুমতি দেয়া হবে। এ সময় আমাকে প্রশংসা ও স্তুতির এমন সব বাণী ইলহাম করা হবে, যা এখন আমার জানা নেই। আমি ঐ সকল প্রশংসা দিয়ে আল্লাহর প্রশংসা করব এবং তার উদ্দেশে সিজদায় পড়ে যাব। তখন বলা হবে, হে মুহাম্মাদ। মাথা উঠাও। বল, তোমার বক্তব্য শুনা হবে। প্রার্থনা কর, যা চাবে তা দেয়া হবে। আর শাফা’আত কর, গ্রহণ করা হবে। তখন আমি বলব, হে প্রভু! আমার উম্মত, আমার উম্মত। (অর্থাৎ আমার উম্মতের উপর রহম করুন, আমার উম্মতকে ক্ষমা করুন) বলা হবে, যাও, যাদের হৃদয়ে যবের দানা পরিমাণ ঈমান আছে তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আন। তখন আমি গিয়ে তাই করব। অতঃপর ফিরে আসব এবং ঐ প্রশংসা বাণী দিয়ে আল্লাহর প্রশংসা করব, তারপর সিজদায় পড়ে যাব। তখন বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! মাথা উঠাও। বল, তোমার বক্তব্য শুনা হবে। চাও, যা চাবে তা দেয়া হবে। আর শাফা’আত কর গ্রহণ করা হবে। তখন আমি বলব, হে আমার প্রভু! আমার উম্মত আমার উম্মত! (আমাকে) বলা হবে, যাও যাদের হৃদয়ে এক অণু বা সরিষা পরিমাণ ঈমান আছে, তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আন। অতএব আমি গিয়ে তাই করব। তারপর আবার ফিরে আসব এবং উক্ত প্রশংসা বাণী দিয়ে আল্লাহর প্রশংসা করব এবং সিজদায় পড়ে যাব। তখন আমাকে বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! মাথা উঠাও। বল, তোমার কথা শুনা হবে, যাও যাদের হৃদয়ে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরিমাণ ঈমান আছে, তাদের সকলকেই জাহান্নাম থেকে বের করে আন। তখন আমি গিয়ে তাই করব।
তিনি (সা.) বলেন, অতঃপর আমি চতুর্থবার ফিরে আসব এবং ঐ সকল প্রশংসা বাণী দিয়ে আল্লাহর প্রশংসা করব এবং সিজদায় পড়ে যাব। তখন বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! মাথা উঠাও এবং বল, তোমার কথা শুনা হবে। চাও, যা চাইবে তা দেয়া হবে। সুপারিশ কর, তোমার শাফা’আত গ্রহণ করা হবে। আমি বলব, হে প্রভু! যারা শুধু লা- ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ’ বলেছেন, আমাকে তাদের জন্যও শাফা’আত করার অনুমতি দিন। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, আমার ’ইযযত ও জালাল এবং আমার শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্বের শপথ করে বলছি, যারা লা- ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ’ বলেছে, আমি নিজেই তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করব। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ مَاجَ النَّاسُ بَعْضُهُمْ فِي بَعْضٍ فَيَأْتُونَ آدم فَيَقُولُونَ: اشفع لنا إِلَى رَبِّكَ فَيَقُولُ: لَسْتُ لَهَا وَلَكِنْ عَلَيْكُمْ بِإِبْرَاهِيمَ فَإِنَّهُ خَلِيلُ الرَّحْمَنِ فَيَأْتُونَ إِبْرَاهِيمَ فَيَقُولُ لَسْتُ لَهَا وَلَكِنْ عَلَيْكُمْ بِمُوسَى فَإِنَّهُ كَلِيمُ الله فَيَأْتُونَ مُوسَى فَيَقُولُ لَسْتُ لَهَا وَلَكِنْ عَلَيْكُمْ بِعِيسَى فَإِنَّهُ رُوحُ اللَّهِ وَكَلِمَتُهُ فَيَأْتُونَ عِيسَى فَيَقُولُ لَسْتُ لَهَا وَلَكِنْ عَلَيْكُمْ بِمُحَمَّدٍ فَيَأْتُونِّي فَأَقُولُ أَنَا لَهَا فَأَسْتَأْذِنُ عَلَى رَبِّي فَيُؤْذَنُ لِي وَيُلْهِمُنِي مَحَامِدَ أَحْمَدُهُ بِهَا لَا تَحْضُرُنِي الْآنَ فَأَحْمَدُهُ بِتِلْكَ الْمَحَامِدِ وَأَخِرُّ لَهُ سَاجِدًا فَيُقَالُ يَا مُحَمَّدُ ارْفَعْ رَأْسَكَ وَقُلْ تُسْمَعْ وَسَلْ تُعْطَهْ وَاشْفَعْ تشفع فَأَقُول يارب أُمَّتِي أُمَّتِي فَيُقَالُ انْطَلِقْ فَأَخْرِجْ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالَ شَعِيرَةٍ مِنْ إِيمَانٍ فَأَنْطَلِقُ فأفعل ثمَّ أَعُود فأحمده بِتِلْكَ المحامدوأخر لَهُ سَاجِدًا فَيُقَالُ يَا مُحَمَّدُ ارْفَعْ رَأْسَكَ وَقُلْ تُسْمَعْ وَسَلْ تُعْطَهْ وَاشْفَعْ تُشَفَّعْ فَأَقُولُ يارب أُمَّتِي أُمَّتِي فَيُقَالُ انْطَلِقْ فَأَخْرِجْ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ أَوْ خَرْدَلَةٍ مِنْ إِيمَانٍ فَأَنْطَلِقُ فَأَفْعَلُ ثُمَّ أَعُودُ فَأَحْمَدُهُ بِتِلْكَ المحامدوأخر لَهُ سَاجِدًا فَيُقَالُ يَا مُحَمَّدُ ارْفَعْ رَأْسَكَ وَقُلْ تُسْمَعْ وَسَلْ تُعْطَهْ وَاشْفَعْ تُشَفَّعْ فَأَقُولُ يارب أُمَّتِي أُمَّتِي فَيُقَالُ انْطَلِقْ فَأَخْرِجْ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ أَدْنَى أَدْنَى أَدْنَى مِثْقَالِ حَبَّةِ من خَرْدَلَةٍ مِنْ إِيمَانٍ فَأَخْرِجْهُ مِنَ النَّارِ فَأَنْطَلِقُ فأفعل ثمَّ أَعُود الرَّابِعَة فأحمده بِتِلْكَ المحامدوأخر لَهُ سَاجِدًا فَيُقَالُ يَا مُحَمَّدُ ارْفَعْ رَأْسَكَ وَقُلْ تُسْمَعْ وَسَلْ تُعْطَهْ وَاشْفَعْ تُشَفَّعْ فَأَقُولُ يارب ائْذَنْ لِي فِيمَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ قَالَ لَيْسَ ذَلِكَ لَكَ وَلَكِنْ وَعِزَّتِي وَجَلَالِي وَكِبْرِيَائِي وَعَظَمَتِي لَأُخْرِجَنَّ مِنْهَا مَنْ قَالَ لَا إِلَه إِلَّا الله . مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (7510) و مسلم (326 / 193)، (475) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসের বিষয়বস্তু পূর্বের হাদীসের মতই। হাদীসের দীর্ঘ বর্ণনা ও স্পষ্টতা সর্বজনবিদিত, অতএব ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন।
কিয়ামতের দিন এমন ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হবে যে মানুষের দিক-বিদিক জ্ঞান থাকবে না। মানুষ দিশেহারা হয়ে এদিক-সেদিক ছুটাছুটি করতে থাকবে, অতঃপর কিছু মানুষ পরামর্শ করে আদি পিতা আদম এর কাছে আসবে এবং বলবে, আপনি আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে একটু শাফা'আত বা সুপারিশ করুন, তিনি যেন দ্রুত হিসাবের নির্দেশ করেন যাতে আমরা একটু শান্তি পাই অথবা আমাদের প্রতিফল যাই হোক এটা পেয়ে যাই এবং হাশরের ময়দানের এই দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে অব্যাহতি পাই। আদম 'আলায়হিস সালাম বলবেন, আমি এ কাজের উপযুক্ত নই বরং তোমরা ইবরাহীম-এর কাছে যাও তিনি আল্লাহর খলীল। লোকেরা ইবরাহীম-এর কাছে যাবে তিনিও একই কথা বলবেন। এভাবে বিভিন্ন নবীদের কাছে মানুষ যাবে কিন্তু কেউ শাফাআতের সাহস করবেন না। সকল নবী নিজ নিজ ভুলের কথা স্মরণ করে ভীত এবং লজ্জিত হয়ে আল্লাহর সামনে যেতে সাহস করবেন না।
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, তারা সবাই বলবেন, আল্লাহ তা'আলা আজ এত রাগান্বিত হয়েছেন যা ইতোপূর্বে আর কখনো হননি এবং হবেন না। অতএব তার সামনে যেতে পারব না। অবশেষে লোকেরা যখন নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর কাছে আসবে তিনি বলবেন, হ্যাঁ, আমিই এ কাজের জন্য উপযুক্ত। অতঃপর তিনি (সা.) আল্লাহর নিকট যাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করবেন, ফলে তাকে অনুমতি দেয়া হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) এ আল্লাহর সমীপে গিয়ে এমন প্রশংসা করবেন, যে প্রশংসায় আল্লাহ তাআলা খুশি হয়ে যাবেন। অতঃপর সিজদায় পড়বেন আল্লাহ তা'আলা তাকে মাথা উঠাতে বলবেন আর বলবেন, তুমি বল তোমার কথা শুনা হবে। প্রার্থনা কর (যা চাইবে) দেয়া হবে, আর শাফা'আত কর কবূল করা হবে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) তখন বলবেন, হে প্রভু! আমার উম্মত, আমার উম্মত। অর্থাৎ তাদের ক্ষমা কর তাদের প্রতি রহম কর। আল্লাহ বলবেন, যাও তোমার উম্মতের যাদের অন্তরে একটি যবের দানা পরিমাণ ঈমান রয়েছে তাদের জাহান্নাম থেকে বের কর। এভাবে তিনবার শাফা'আত করবেন এবং যার অন্তরে একটি সরিষা দানার ক্ষুদ্রতম অংশ পরিমাণ ঈমানও থাকবে তাকেও জাহান্নাম থেকে বের করবেন। চতুর্থবার আল্লাহর নবী (সা.) এই জীবনে একবার যারা লা- ইলাহা ইল্লাল্প-হ' পাঠ করেছে তাদের জন্য সুপারিশের অধিকার প্রার্থনা করবেন। আল্লাহ বলবেন, এ অধিকার আপনার নয় বরং আমার। আমার ‘ইয্যত, মহত্ব, বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের শপথ-যারা লা- ইলা-হা ইল্লাল্লহ পাঠ করেছে আমি নিজেই তাদের জাহান্নাম থেকে বের করব। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং নিজেই জাহান্নাম থেকে তাদের বের করবেন। কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এটা আল্লাহ তা'আলার মহত্ব ও নামের মহান মর্যাদার প্রতিশ্রুতি, এ মর্যাদা অন্য কারো থাকতে পারে না। আল্লামাহ্ ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আমল ছাড়া শুধুমাত্র বিশ্বাসের ভিত্তিতে জাহান্নাম থেকে মুক্তির ব্যবস্থা আল্লাহ তা'আলার জন্য একান্ত, আর রাসূলুল্লাহ (সা.) ও-এর ক্ষেত্রে শাফা'আতের বিশেষত্বের বিষয়টি বিশ্বাসের সাথে খুব নগণ্য হলেও আমলের শর্তে বিভিন্ন স্তরের মুমিনের বেলায় প্রযোজ্য। অতএব উভয়ের আলাদা-আলাদা বিশেষত্ব সুস্পষ্ট। (মিরকাতুল মাফাতীহ, শারহুন নাবাবী ৩য় খণ্ড ৫১ পৃ., হা. ৩২২)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৭৪-[৯] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: আমার শাফা’আত লাভের ব্যাপারে কিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তিই সর্বাপেক্ষা সৌভাগ্যবান হবে, যে তার অন্তর বা মন থেকে একান্ত সচ্ছতা সহকারে ’লা- ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ বলেছে। (বুখারী)
الفصل الاول (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَنْ قَالَ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ خَالِصا من قلبه أونفسه رَوَاهُ البُخَارِيّ
رواہ البخاری (99) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: কিয়ামতের দিন আল্লাহর নবীর শাফা'আত পাওয়ার মূল যোগ্যতা ও শর্ত হবে ঈমান, যার মূলমন্ত্র হলো ‘লা- ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ। ঈমান বাড়ে এবং কমে। অতএব এক যাররা পরিমাণ ঈমান থাকলেও সে সর্বশেষে শাফা'আতের আওতায় পড়বে। যে ব্যক্তি খালেস অন্তরে এই ‘লা- ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ পাঠ করবে যাতে কোন প্রকার লৌকিকতা, কপটতা, সন্দেহ এবং শির্ক থাকবে না; কিয়ামতের দিন প্রথম পর্যায়েই সে শাফা'আত পেয়ে ধন্য হবে।
মু'মিনেরা প্রত্যেকেই শাফা'আতের সৌভাগ্য লাভ করবে, কিন্তু হাদীসে বর্ণিত খালেস অন্তরের মু'মিনগণ শাফা'আতের অধিক মাত্রা পেয়ে ধন্য হবে। তারা হাশরের ময়দানের মহাভীতিকর পরিস্থিতিতে (আরশের ছায়াতলে অথবা বিশেষ রহমতের আশ্রয় পাওয়ার) সুপারিশপ্রাপ্ত হবে, যা অন্যেরা পাবে না।
কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, (أَسْعَدُ) ‘অধিক সৌভাগ্যবান'-এর দ্বারা এখানে উদ্দেশ্য: (أَاَسَّعَيْدُ) ‘সৌভাগ্যবান অর্থাৎ এটা সাধারণ সৌভাগ্যবান অর্থে ব্যবহৃত হবে। যেহেতু আহলে তাওহীদ ছাড়া কেউ শাফা'আতের মর্যাদা লাভ করতে পারবে না। অথবা এর দ্বারা উদ্দেশ্য ঐ ব্যক্তি যার ‘আমলের দ্বারা রহমত প্রাপ্তির অধিকারী এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। সে আমার শাফা'আত পেয়ে ধন্য হবে।
আল্লামাহ্ ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, ইতোপূর্বে অতিবাহিত হয়েছে যে, শাফা'আত লাভের সৌভাগ্য তথা ঈমানের ফলশ্রুতিতে এবং তার জন্য অধিক আশা রাখার কারণে হবে অথবা আমলের কারণে হবে।
আর ‘আমল এবং ইয়াক্বীনের মারাতিব বা স্তর বিভিন্ন রয়েছে। অতএব স্তর ভিত্তিতেই মর্যাদার কম বেশি হবে। এজন্য (خَالِصًا) শব্দের তাক্বীদ (قَلْبِهِ) দ্বারা করা হয়েছে। অর্থাৎ (خَالِصًاكَائِنًامِنْ قَلْبِهِ) অন্তরের অন্তঃস্থল থেকেই যদি লা- ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ হয় তবে সে শাফাআতের সর্বোচ্চ সৌভাগ্য লাভ করবে।
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ, ফাতহুল বারী ১ম খণ্ড হা. ৯৯, ২৩৫ পৃ.)।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৭৫-[১০] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। একদিন নবী (সা.) -এর কাছে কিছু মাংস আনা হলো এবং তাঁর জন্য বাজুর (রান) মাংসটিই পেশ করা হলো। মূলত তিনি (সা.) এ মাংস (খেতে) খুব পছন্দ করতেন। কাজেই তিনি তা থেকে দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেলেন। তারপর বললেন, কিয়ামতের দিন আমি হব সকল মানুষের সরদার, যেদিন মানবমণ্ডলী রাব্বুল আলামীনের সামনে দণ্ডায়মান হবে এবং সূর্য থাকবে (মাথার) খুব কাছে। হতাশা ও দুশ্চিন্তায় মানুষ এমন এক করুণ অবস্থায় পৌছবে, যা সহ্য করার শক্তি তাদের থাকবে না। তখন তারা (পরস্পরে) বলাবলি করবে, তোমরা কি এমন কোন ব্যক্তিকে খোঁজ করে পাও না, যিনি তোমাদের প্রভুর কাছে তোমাদের জন্য সুপারিশ করবেন?
তখন তারা আদম ’আলায়হিস সালাম-এর কাছে আসবে। এরপর বর্ণনাকারী আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)- এর শাফা’আত সম্পর্কীয় হাদীসটি (পূর্বে বর্ণিত হয়েছে) বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেন, তখন আমি ’আরশের নিচে যাব এবং আমার প্রভুর উদ্দেশ্যে সিজদায় লুটিয়ে পড়ব। তখন আল্লাহ তা’আলা তাঁর হামদ ও সানার এমন কিছু উত্তম বাক্য আমার হৃদয়ে ঢেলে দেবেন যা আমার পূর্বে কারো জন্য উন্মুক্ত করেননি।
অতঃপর আল্লাহ তা’আলা বলবেন, হে মুহাম্মাদ। আপনার মাথা উঠান। আপনি প্রার্থনা করুন, যা চাবেন তা দেয়া হবে। সুপারিশ করুন, আপনার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে। নবী (সা.) বলেন, তখন আমি মাথা উঠাব এবং বলব, হে আমার প্রভু! আমার উম্মত, হে আমার প্রভু! আমার উম্মত, হে আমার প্রভু! আমার উম্মত। তখন আমাকে বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! আপনার উম্মতের যাদের কাছ থেকে কোন বিচার নেয়া হবে না তাদেরকে আপনি জান্নাতের দরজাসমূহের ডানদিকের দরজা দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দিন এবং তারা সে সকল দরজা ছাড়াও অন্যান্য দরজা দিয়ে অপরাপর লোকেদের সাথে প্রবেশ করারও অধিকার রাখে। অতঃপর নবী (সা.) বলেন, সেই সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ! জান্নাতের দরজাসমূহের উভয় পাটের দূরত্ব, যেমন মক্কাহ্ ও হিজ্বর নামক স্থানের মাঝের দূরত্ব পরিমাণ। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَنْهُ قَالَ أَتَى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِلَحْمٍ فَرُفِعَ إِلَيْهِ الذِّرَاعُ وَكَانَتْ تُعْجِبُهُ فَنَهَسَ مِنْهَا نَهْسَةً ثُمَّ قَالَ: «أَنَا سَيِّدُ النَّاسِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَوْمَ يَقُومَ النَّاسُ لِرَبِّ الْعَالمين وتدنو الشَّمْس فَيبلغ مِنَ الْغَمِّ وَالْكَرْبِ مَا لَا يُطِيقُونَ فَيَقُولُ النَّاس أَلا تنْظرُون من يشفع لكم إِلَى ربكُم؟ فَيَأْتُونَ آدَمَ» . وَذَكَرَ حَدِيثَ الشَّفَاعَةِ وَقَالَ: «فَأَنْطَلِقُ فَآتِي تَحْتَ الْعَرْشِ فَأَقَعُ سَاجِدًا لِرَبِّي ثُمَّ يَفْتَحُ اللَّهُ عَلَيَّ مِنْ مَحَامِدِهِ وَحُسْنِ الثَّنَاءِ عَلَيْهِ شَيْئًا لَمْ يَفْتَحْهُ عَلَى أَحَدٍ قَبْلِي ثُمَّ قَالَ يَا مُحَمَّدُ ارْفَعْ رَأْسَكَ وَسَلْ تُعْطَهْ وَاشْفَعْ تُشَفَّعْ فَأَرْفَعُ رَأْسِي فَأَقُولُ أُمَّتِي يارب أمتِي يارب فَيُقَالُ يَا مُحَمَّدُ أَدْخِلْ مِنْ أُمَّتِكَ مَنْ لَا حِسَابَ عَلَيْهِمْ مِنَ الْبَابِ الْأَيْمَنِ مِنْ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ وَهُمْ شُرَكَاءُ النَّاسِ فِيمَا سِوَى ذَلِكَ مِنَ الْأَبْوَابِ» . ثُمَّ قَالَ: «وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنَّ مَا بَيْنَ الْمِصْرَاعَيْنِ مِنْ مَصَارِيعِ الْجَنَّةِ كَمَا بَيْنَ مَكَّةَ وَهَجَرَ» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (4712) و مسلم (327 / 194)، (480) ۔
(مُتَّفق عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর নিকট কিছু ভুনা গোশত আনা হলো, রাসূলুল্লাহ (সা.) বকরীর সামনের রানের গোশত বেশি পছন্দ করতেন বলে তার সামনে বকরীর সামনের একখানা রান তুলে ধরা হলো।
(فَنَهَسَ مِنْهَا) তিনি (সা.) তা থেকে দাঁত দিয়ে কেটে কেটে বা টুকরা টুকরা করে খেতে লাগলেন। (نَهَس) শব্দটি (نَهَش) ও পড়া যায়। কাযী ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, অধিকাংশ বর্ণনায় নুকতাবিহিন শীন অক্ষর যোগে পঠিত হয়েছে, কিন্তু ইবনু হামান-এর বর্ণনায় নুকতাসহ ‘শীন’ যোগে পঠিত হয়েছে। এর অর্থ দাঁতের কিনারা দিয়ে ধরা বা মাড়ির দাঁতে কামড়ানো।
রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর বাণী: (أنَاسَيِّدُالنَّسِ) “আমি মানবজাতির সর্দার”-এর অর্থ আমি নবী এবং তাদের উম্মতসহ সকলের সর্দার। যেহেতু কিয়ামতের দিন সকলেই আমার শাফা'আতের মুখাপেক্ষী হবে।
এটা আল্লাহর নিকট আমার কারামতের কারণেই হবে। মানুষ যখন নিরুপায় হয়ে যাবে তখন আমার কাছে আসবে শাফাআতের জন্য, আর আমিই সর্বপ্রথম শাফা'আত করব। যেমন অন্য হাদীসে এসেছে, “আমি কিয়ামত দিবসে আদম সন্তানের সর্দার হব এতে আমার কোন গর্ব নেই। আর আমার হাতেই থাকবে প্রশংসার পতাকা তাতে আমার কোন গর্ব নেই। কোন নবীই আমার পতাকার নীচে আশ্রয় নেয়া ছাড়া থাকবে না।
আমি প্রথম ব্যক্তি যার জন্য সর্বপ্রথম জমিন বিদীর্ণ হবে, এতে আমার কোন গর্ব নেই। আমিই সর্বপ্রথম শাফা'আতকারী হব এবং প্রথম ব্যক্তি হব যার শাফা'আত কবুল করা হবে এতেও আমার কোন গর্ব নেই।” (আহমাদ হা, ৪৩০৮, তিরমিযী হা. ৩৬১৫)
‘আল্লামাহ্ ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, (وْمَ يَقُومَ النَّاسُ لِرَبِّ الْعَالمين) বাক্যটি পূর্বে উল্লেখিত (يَوْمَ الْقِيَامَةِ) বাক্য থেকে বদল হয়েছে।
ইবনুল মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, সম্ভবত কোন প্রশ্নকারীর প্রশ্ন- কিয়ামত কি? এর উত্তরে বলা হয়েছে- “যেদিন সমস্ত মানুষ বিশ্ব প্রতিপালক (আল্লাহ)-এর সমীপে দণ্ডায়মান হবে। (يَوْمَ) শব্দটি উহ্য (اعْنِىْ) ক্রিয়া থেকে কর্ম হিসেবে (نَصَبْ) হয়েছে।
(وتدنو الشَّمْس....) “সূর্য মানুষের নিকটে পৌছে যাবে"-এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, মানুষ সূর্যের প্রচণ্ড তাপের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী দাঁড়ানোর ফলে অধৈর্য ও অস্থির হয়ে যাবে, উপরন্ত ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে। এহেন পরিস্থিতিতে মানুষের মধ্য থেকে একে অপরকে বলবে, চিন্তা কর অথবা খুঁজে দেখ তো আমাদের এই দুঃসহ অবস্থা থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করার মতো কোন লোক পাওয়া যায় কিনা? অতঃপর লোকেরা আদম আলায়হিস সালাম-এর নিকট আসবে। এরপর বর্ণনকারী আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) শাফা'আতের দীর্ঘ হাদীস বর্ণনা করেন যা ইতোপূর্বে অতিবাহিত হয়েছে। অর্থাৎ বিভিন্ন নবীদের কাছে যাওয়া এবং তাদের নিকট সুপারিশের আবেদন করা। অবশেষে লোকেরা মুহাম্মাদ (সা.) -এর নিকট যাবে, তিনি তাদের আবেদনে সাড়া দিয়ে আল্লাহর আরশের নীচে গিয়ে সিজদায় পড়ে যাবেন। এ সিজদায় আল্লাহ তা'আলা খুশি হবেন, ফলে তার অন্তরে এমন সব প্রশংসার বাণী ও ভাষা উদয় করে দিবেন যা কাউকে দেয়া হয়নি। আল্লাহর নবী সেই বাক্যগুলো দিয়ে যখন আল্লাহর প্রশংসা করবেন তখন আল্লাহ তা'আলা তার মাথা উঠাতে বলবেন এবং চাহিদা পূরণ করা ও শাফা'আত কবুল করার ওয়াদা করবেন। এ সময় তিনি (সা.) মাথা উঠিয়ে “ইয়া রব্বী উম্মতী’ ‘ইয়া রব্বী উম্মতী’ বলে তিনবার আল্লাহকে আহ্বান জানাবেন।
‘আল্লামাহ্ মুল্লা আলী ক্বারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, তিনবার করে ‘ইয়া রব্বী উম্মতী' বলা তাগিদ হিসেবে অথবা মুবালাগাহ্ হিসেবে অথবা পাপীদের স্তরের প্রতি ইশারা করে বলবেন। এ আহ্বানের পরে আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বলবেন, তোমার উম্মতের যাদের কোন হিসাব-নিকাশ নেই এবং তারা জান্নাতে সবগুলো দরজা দিয়ে প্রবেশের অধিকার রাখে এতদসত্ত্বেও তাদের ডানদিকের দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করাও, এটা তাদের জন্য খাস। এরা কখনো আল্লাহর সাথে শরীক করেনি অবৈধ ঝাড়-ফুক করেনি এবং কোন কিছুকে অশুভ লক্ষণ মনে করেনি। নবী জান্নাতের দরজার পরিধি বর্ণনা করেন যে, তার একপাট থেকে অন্যপাটের ব্যবধান মক্কাহ্ থেকে হিজর পর্যন্ত। হিজর হলো বাহরাইনের একটি প্রসিদ্ধ জনপদ। কেউ কেউ বলেছেন, এটা মদীনার একটি গ্রাম বা জনপদ। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ, শারহুন নাবাবী ৩য় খণ্ড, হা. ৩২৭, তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খণ্ড ২৮৩ পৃ., হা. ১৮৩৭)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৭৬-[১১] হুযায়ফাহ্ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সা.) এ থেকে শাফা’আতের হাদীস বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, তিনি (সা.) বলেছেন: আমানত ও আত্মীয়তাকে পাঠানো হবে, তখন উভয়টি পুলসিরাতের ডানে ও বামে উভয় পার্শ্বে দাঁড়াবে। (মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَنْ حُذَيْفَةَ فِي حَدِيثِ الشَّفَاعَةِ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «وَتُرْسَلُ الْأَمَانَةُ وَالرَّحِمُ فَتَقُومَانِ جَنَبَتَيِ الصِّرَاطِ يَمِينًا وَشِمَالًا» رَوَاهُ مُسلم
رواہ مسلم (329 / 195)، (482) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: আমানত এবং রেহেম বা আত্মীয়তার সম্পর্ক- এ দুটি বস্তুর রয়েছে মহান মর্যাদা। কিয়ামতের দিন এ দু'টিকে বিরাট মর্যাদা ও অধিকার দিয়ে পুলসিরাতের নিকট পাঠানো হবে, তারা পুলসিরাতের ডানপার্শ্বে ও বামপার্শে দাঁড়াবে এবং তাদের অধিকারের ব্যাপারে বান্দাকে ধরবে, কে আমানত রক্ষা করেছে, আর কে খিয়ানত করেছে, আর কে আত্মীয়তা সম্পর্ক বজায় রেখেছে, আর কে ছিন্ন করেছে। অতঃপর উভয়ে আমানত রক্ষাকীর পক্ষে এবং আত্মীয়তা রক্ষাকারীর পক্ষে বাদানুবাদ তথা যুক্তিতর্ক পেশ করবে, আর যে এগুলোর হক নষ্ট করবে তার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিবে। কেউ কেউ বলেছেন, তাদের জন্য মালাক (ফেরেশতা) প্রেরণ করা হবে যারা তাদের পক্ষে অথবা বিপক্ষে যুক্তি-তর্ক পেশ করবেন।
‘আল্লামাহ্ ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমানত দ্বারা এখানে আমানতে উযমা বা মহা আমানতও উদ্দেশ্য হতে পারে, সেটা হলো আল কুরআন অথবা তার নির্দেশাবলী। যেমন আল্লাহর বাণী, “আমি এই আমানত পেশ করেছিলাম। আসমানসমূহ, জমিন এবং পর্বতমালার সম্মুখে, অনন্তর তারা ঐ আমানত গ্রহণ করতে অস্বীকার করল....।” (সূরা আল আহযাব ৩৩: ৭২)
আর সিলায়ে রেহমী বা আত্মীয়তার সম্পর্ক দ্বারা সবচেয়ে বড় সম্পর্ক রক্ষা উদ্দেশ্য আর তা হলো আল্লাহর এই বাণীর মধ্যে নিহিত, “হে মানবমণ্ডলী! তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় কর, যিনি একটি মাত্র প্রাণ থেকে তোমাদের সৃষ্টি করেছেন.... আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যার নামে তোমরা পরস্পরের নিকট স্বীয় অধিকারের দাবী করে থাক এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক (বিনষ্ট করা) হতেও ভয় কর....।” (সূরা আন্ নিসা ৩: ১)।
অতএব হাদীসের অর্থ হলো আল্লাহর নির্দেশসমূহের তা'যীম করা এবং তার সৃষ্টিকে মুহাব্বাত করা। এটা যেন ইসলামের দুই পার্শ্বকে অন্তর্ভুক্ত করে নেয় আর তা হলো সিরাতে মুস্তাকীম এবং ঈমান ও দীনের দুই প্রান্ত। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৭৭-[১২] আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর ইবনুল আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন নবী (সা.) ইবরাহীম আলায়হিস সালাম-এর উক্তি সংবলিত এ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন, (অর্থাৎ) “হে প্রভু! এ সকল মূর্তিগুলো বহু মানুষকে বিভ্রান্ত ও গোমরাহ করেছে, অতএব যে আমার অনুকরণ করবে সে-ই আমার দলভুক্ত, কিন্তু কেউ আমার অবাধ্য হলে তুমি তো ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু”- (সূরাহ ইব্রাহীম ১৪: ৩৬)।
আর ’ঈসা আলায়হিস সালাম-এর উক্তিও পাঠ করলেন, অর্থাৎ “যদি তুমি তাদেরকে শাস্তি দাও, তারা তো তোমারই বান্দা”- (সূরাহ্ আল মায়িদাহ্ ৫:১১৮)। অতঃপর নবী (সা.) নিজের হস্তদ্বয় উঠিয়ে এ ফরিয়াদ করতে লাগলেন, হে আল্লাহ! আমার উম্মত, আমার উম্মত। (তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর) এই বলে তিনি কাঁদতে লাগলেন। তখন আল্লাহ তা’আলা জিবরীল (আঃ)-কে বললেন, তুমি মুহাম্মাদ (সা.) -এর কাছে যাও এবং তাঁকে প্রশ্ন কর তিনি (সা.) কেন কাঁদছেন? অবশ্য আল্লাহ তা’আলা ভালোভাবেই জানেন, তাঁর কান্নার কারণ কী? তখন জিবরীল (আঃ) তাঁকে প্রশ্ন করলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁকে তাই অবগত করলেন যা তিনি বলেছিলেন, অতঃপর আল্লাহ
তা’আলা জিবরীল (আঃ)-কে পুনরায় বললেন, মুহাম্মাদ (সাঃ) -এর কাছে যাও এবং তাঁকে বল, আমি আপনাকে আপনার উম্মতের ব্যাপারে সন্তুষ্ট করে দেব এবং আপনাকে কষ্ট দেব না। (মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَلَا قَوْلَ اللَّهِ تَعَالَى فِي إِبْرَاهِيمَ: [رَبِّ إِنَّهُنَّ أَضْلَلْنَ كَثِيرًا مِنَ النَّاسِ فَمَنْ تَبِعَنِي فَإِنَّهُ مني] وَقَالَ عِيسَى: [إِن تُعَذبهُمْ فَإِنَّهُم عِبَادك] فَرَفَعَ يَدَيْهِ فَقَالَ «اللَّهُمَّ أُمَّتِي أُمَّتِي» . وَبَكَى فَقَالَ اللَّهُ تَعَالَى: «يَا جِبْرِيلُ اذْهَبْ إِلَى مُحَمَّدٍ وَرَبُّكَ أَعْلَمُ فَسَلْهُ مَا يُبْكِيهِ؟» . فَأَتَاهُ جِبْرِيلُ فَسَأَلَهُ فَأَخْبَرَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِمَا قَالَ فَقَالَ اللَّهُ لِجِبْرِيلَ اذْهَبْ إِلَى مُحَمَّدٍ فَقُلْ: إِنَّا سَنُرْضِيكَ فِي أمَّتك وَلَا نسوؤك . رَوَاهُ مُسلم
رواہ مسلم (346 / 202)، (499) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যাঃ রাসূলুল্লাহ (সা.) ইবরাহীম (আঃ)-এর উক্তি সম্বলিত আয়াতটি ঘটনা বর্ণনা হেতু অথবা সূরা তিলাওয়াতকালে পাঠ করছিলেন। ইবরাহীম (আঃ) মূর্তিগুলোর প্রতি ইশারা করে দু'আ করছিলেন, “হে আমার প্রতিপালক! এ সমস্ত প্রতিমা বহু সংখ্যক মানুষকে পথভ্রষ্ট করে ফেলেছে, অতএব যে আমার অনুসরণ করবে সে আমার দলভুক্ত, কিন্তু কেউ আমার অবাধ্য হলে তুমি তো ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।”
ইবরাহীম (আঃ)-এর কথা, "এ সমস্ত প্রতিমাগুলো বহু মানুষকে পথভ্রষ্ট ও গোমরাহ করে ফেলেছে।” এর অর্থ হলো এ সকল প্রতিমা পথভ্রষ্ট ও গোমরাহের কারণে হয়েছে।
“যে আমার অনুসরণ করবে” এর অর্থ হলো যে তাওহীদের ক্ষেত্রে, ইখলাসের ক্ষেত্রে এবং তাওয়াক্কুলের ক্ষেত্রে আমার অনুসরণ করবে। সে সকল বিষয়ে আমার অনুসারী দলভুক্ত বা সম্প্রদায়ভুক্ত হবে।
“আর কেউ আমার অবাধ্য হলে তুমি তো ক্ষমাশীল পরম দয়ালু”, এর অর্থ হলো- “হে আল্লাহ! তুমি তো শিরক ছাড়া যাকে চাও তার সব গুনাহ ক্ষমা করে থাক, আর যাকে চাও তার প্রতি স্বীয় অনুগ্রহে রহম কর। এমনকি শিরককারীর প্রতিও তুমি অনুগ্রহ হলে তাকে ঈমান গ্রহণের তাওফীক দান করে থাক এবং সকর্মপরায়ণশীল করে দিয়ে থাক।”
রাসূলুল্লাহ (সা.) ও ঈসা (আঃ)-এর দু'আ সম্বলিত উক্তিটিও তিলাওয়াত করলেন। 'ঈসা (আঃ) দু'আ করেছেন, “(হে আল্লাহ!) তুমি যদি তাদের শাস্তি দাও তবে তারা তো তোমারই বান্দা আর যদি তুমি তাদের ক্ষমা করে দাও তবে তুমি তো পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।”
অর্থাৎ কোন কিছুই তোমাকে পরাভূত করতে পারে না, তুমি মহাশক্তিমান কুদরতওয়ালা; তুমি যা ইচ্ছা তাই কর। তুমি এমন ফায়সালাকারী যে ফায়সালা কেউ খণ্ডন করতে পারে না।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর দরবারে তার হাত দু'খানি উত্তোলন করে বললেন, “আল্ল-হুম্মা উম্মাতী উম্মাতী, হে আল্লাহ! আমার উম্মত, আমার উম্মত। অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমার উম্মতকে ক্ষমা কর, আমার উম্মতের প্রতি রহম কর। এ বাক্যটি একাধিকবার উল্লেখের উদ্দেশ্য হলো সম্ভবত আবেদনটি গুরুত্বের সাথে পেশ করা অথবা পূর্বাপর সকল উম্মতকে শামিল করা। (وبكى) এ সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) কাঁদলেন, কেননা নবী (সা.) যে আয়াত পাঠ করলেন তাতে তার স্মরণ হলো ইবরাহীম খলীল আলায়হিস সালাম-এর কথা এবং ঈসা আলায়হিস সালাম-এর কথা, তারা উভয়ই তাদের উম্মতদের জন্য আল্লাহ তা'আলার নিকট সুপারিশ করেছেন। এতে আল্লাহর নবীর হৃদয় তার উম্মতের জন্য বিগলিত হয়ে গেল, ফলে তিনি কাঁদলেন।
আল্লাহ তা'আলা নবী মুহাম্মাদ-এর কান্নার কারণ জানা সত্ত্বেও জিবরীলকে পাঠিয়ে দিয়ে তার কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করতে বললেন, জিবরীল আলায়হিস সালাম এসে জিজ্ঞেস করলে রাসূলুল্লাহ (সা.) তা বললেন, অর্থাৎ তিনি তার উম্মতের জন্য কাঁদছিলেন। জিবরীল আল্লাহ তা'আলার কাছে এসে কান্নার কারণ জানালে আল্লাহ তা'আলা জিবরীলকে বললেন, তুমি মুহাম্মাদের কাছে ফিরে গিয়ে বল, আমি (আল্লাহ) তার সকল উম্মাতের ব্যপারে তাকে সন্তুষ্ট করব, অসন্তুষ্ট করব না বা তাকে চিন্তিত ও দুঃখিত করে রাখব না। আপনার সন্তুষ্টির জন্য আপনার উম্মতকেও ক্ষমা করব এবং তাদের প্রতি রহম করব।
মহান আল্লাহর বাণী:
(وَ لَسَوۡفَ یُعۡطِیۡکَ رَبُّکَ فَتَرۡضٰی) “আর সত্বর আল্লাহ আপনাকে (এরূপ বস্তু) দান করবেন যা পেয়ে আপনি সন্তুষ্ট হবেন।” (সূরাহ্ আহ্ যুহা- ৯৩:৫)
‘আল্লামাহ্ নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এ হাদীসটি বিভিন্ন ফায়দা সম্বলিত হাদীস। সেগুলোর কতিপয় হলো-
(এক) উম্মতের প্রতি রাসূলুল্লাহ (সা.) চূড়ান্ত ভালোবাসার পরিচয় বর্ণনা করা এবং তাদের বিপদ ও মুসীবতকালে তাতে দেখাশুনা ও যত্নশীল থাকার দৃষ্টান্ত পেশ করা।
(দুই) এ উম্মতের মহাসুসংবাদ পেশ করা, যেমন মহান আল্লাহর ওয়াদা: (سَنُرْ ضِيكَ فِىْ أمَّتك وَلَانَسُوْؤُكَ) আমি আপনার উম্মতের ব্যাপারে আপনাকে সন্তুষ্ট করব, আপনাকে অসন্তুষ্ট রাখব না। এ উম্মাতের জন্য এ হাদীস সর্বোচ্চ খুশির ও সন্তুষ্টির হাদীস।
(তিন) আল্লাহ তা'আলার নিকট আমাদের নবীর মহান মর্যাদা বর্ণনা করা।
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ, শারহুন নাবাবী ৩য় খণ্ড, ৭০ পৃ, হা. ৩৪৬)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৭৮-[১৩] আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন কতিপয় লোক প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামতের দিন কি আমরা আমাদের প্রভুকে দেখতে পাব? তিনি (সা.) বললেন, হ্যাঁ, মেঘমুক্ত দ্বিপ্রহরের আকাশে তোমরা সূর্য দেখতে কি কষ্ট পাও? এবং মেঘমুক্ত আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে কি তোমাদের কোন সমস্যা হয়? তারা বলল, না, হে আল্লাহর রাসূল। তিনি (সা.) বললেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহকে দেখতে তোমাদের এর চেয়ে বেশি কোন সমস্যা হবে না যা এ দুটিকে দেখতে তোমাদের হয়ে থাকে। যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে, তখন একজন ঘোষক ঘোষণা দেবে, প্রত্যেক উম্মত, যে যার ইবাদত করত সে যেন তার অনুসরণ করে। তখন যারা আল্লাহকে ছাড়া মূর্তি-প্রতিমা ইত্যাদির ইবাদত করত, তাদের একজনও অবশিষ্ট থাকবে না, বরং সকলেই জাহান্নামের মধ্যে গিয়ে পড়বে। শেষ পর্যন্ত এক আল্লাহর ’ইবাদতকারী ভালো ও গুনাহগার ছাড়া সেখানে আর কেউই বাকি থাকবে না। এরপর রাবুল আলামীন তাদের নিকট এসে বললেন, তোমরা কার অপেক্ষায় আছ? প্রত্যেক উম্মত, যে যার ইবাদত করত, সে তো তারই অনুসরণ করেছে। তারা বলবে, হে আমাদের প্রভু। আমরা তো সেই সকল লোকেদেরকে দুনিয়াতেই বর্জন করেছিলাম যখন আজকের তুলনায় তাদের কাছে আমাদের বেশি প্রয়োজন ছিল। আমরা কক্ষনো তাদের সঙ্গে চলিনি। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ أَنَّ أُنَاسًا قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ هَلْ نَرَى رَبَّنَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ؟ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «نَعَمْ هَلْ تُضَارُّونَ فِي رُؤْيَةِ الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ صَحْوًا لَيْسَ فِيهَا سَحَابٌ؟» قَالُوا: لَا يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ: مَا تَضَارُّونَ فِي رُؤْيَةِ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِلَّا كَمَا تُضَارُّونَ فِي رُؤْيَةِ أَحَدِهِمَا إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ أَذَّنَ مُؤَذِّنٌ لِيَتَّبِعْ كُلُّ أُمَّةٍ مَا كَانَتْ تَعْبُدُ فَلَا يَبْقَى أَحَدٌ كَانَ يعبد غيرالله مِنَ الْأَصْنَامِ وَالْأَنْصَابِ إِلَّا يَتَسَاقَطُونَ فِي النَّارِ حَتَّى إِذَا لَمْ يَبْقَ إِلَّا مَنْ كَانَ يَعْبُدُ اللَّهَ مِنْ بَرٍّ وَفَاجِرٍ أَتَاهُمْ رَبُّ الْعَالَمِينَ قَالَ: فَمَاذَا تَنْظُرُونَ؟ يَتْبَعُ كُلُّ أُمَّةٍ مَا كَانَت تعبد. قَالُوا: ياربنا فَارَقْنَا النَّاسَ فِي الدُّنْيَا أَفْقَرَ مَا كُنَّا إِلَيْهِم وَلم نصاحبهم
متفق علیہ ، رواہ البخاری (806) و مسلم (229 / 182)، (451) ۔
(متفّق عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: আল্লাহ তা'আলা একাধিক জায়াগায় তার সাথে সাক্ষাতের কথা বলেছেন, সেই প্রেক্ষিতে সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে প্রশ্ন করেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামতের দিন আমরা কি আমাদের রবকে দেখতে পাব? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, হ্যাঁ, তোমরা তোমাদের রবকে দেখতে পাবে।
‘আল্লামাহ্ সুয়ূত্বী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, কিয়ামতের অবস্থানস্থলে প্রত্যেক নর-নারীর পক্ষেই আল্লাহকে দেখা সম্ভব হবে; এমনকি বলা হয় কাফির-মুশরিক এবং মুনাফিকদেরও সাক্ষাৎ হাসিল হবে। অতঃপর তাদের থেকে আড়াল হয়ে যাবে যাতে তাদের আফসোসের কারণ হয়। মুল্লা আলী ক্বারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমি বলি এ বিষয়ে আল্লাহ তা'আলার বাণী (নিম্নে) নিয়ে স্বতন্ত্র আলোচনা রয়েছে:
(کَلَّاۤ اِنَّهُمۡ عَنۡ رَّبِّهِمۡ یَوۡمَئِذٍ لَّمَحۡجُوۡبُوۡنَ) “কক্ষনো না, তারা সেদিন তাদের প্রতিপালক থেকে পর্দার আড়ালে থাকবে।” (সূরাহ্ আল মুতাফফিফীন ৮৩: ১৫)
রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর বাণীও সামনে আসছে, কেবল আল্লাহর ইবাদতকারীরাই অবশিষ্ট থাকবে অতঃপর তাদের সামনে আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন আগমন করবেন। অর্থাৎ একনিষ্ঠ ইবাদতকারীরাই কেবল আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভে ধন্য হবেন।
আল্লাহর দর্শনের স্বাদ এমন হবে যে, মানুষ তার ক্লেশ ক্লান্তি সব ভুলে যাবে। (জান্নাতীগণ জান্নাতে আল্লাহকে দেখে জান্নাতের আরাম-আয়েশের কথাও ভুলে যাবে)
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের সর্ববাদী সম্মত মত হলো নবী-রাসূলগণ এবং সকল যুগের উম্মাতের সিদ্দীকগণ ও এ উম্মতের নেককার মু'মিনগণ আল্লাহর দর্শন লাভে ধন্য হবেন। এ উম্মাতের নারীদের ব্যাপারে তিনটি মত রয়েছে- ১) তারা দেখতে পাবে না, ২) তারাও দেখতে পাবে, ৩) ঈদ বা এ রকম কোন বিশেষ দিনে দেখতে পাবে।
মালায়িকার (ফেরেশতাদের ব্যাপারে দুটি মত- ১) তারা তাদের রবকে দেখতে পাবে না, ২) তারাও দেখতে পাবে।
জিনদের ব্যাপারেও অনুরূপ ইখতিলাফ রয়েছে। (মু'মিনাহ্ নারীদের দর্শনের ব্যাপারে পুরুষদের থেকে আলাদা ভাবার কোন কারণ নেই, অতএব তারাও পুরুষের মতই আল্লাহর দর্শন লাভে ধন্য হবে।) [সম্পাদক]
কিয়ামতের দিন মু'মিনগণ আল্লাহকে এমনভাবে দেখবে যেভাবে মেঘমুক্ত আকাশে দ্বিপ্রহরকালে সূর্যকে এবং পূর্ণিমার রাতে চাঁদকে বিনা ক্লেশে দর্শন করা যায়।
সূর্য এবং চন্দ্রের দৃষ্টান্ত একটা অবহিত মাত্র, অন্যথায় মুমিনদের আল্লাহর দর্শন হবে চূড়ান্ত আলোকরশ্মিতে আর এ আলো মু'মিনদের নেকির স্তর হিসেবে কম বেশি হবে।
কিয়ামতের দিবসে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন ঘোষক ঘোষণা দিবেন, “তোমরা যে যার ইবাদত করতে সে আজ তার অনুসরণ কর এবং তার সাথে চলে যাও। ফলে আল্লাহ ছাড়া অন্যের ‘ইবাদতকারী সবাই নিজ নিজ মা'বুদের সাথে চলে যাবে এবং জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। একমাত্র আল্লাহর ইবাদতকারীরা হাশরের ময়দানে অবশিষ্ট থাকবে, এর মধ্যে নেককার গুনাহগার সবাই থাকবে।”
(إصنام)-এর অর্থ মূর্তি (أنصاب) শব্দটি (نصب)-এর বহুবচন, অর্থ ঐ পাথর যা পূজার জন্য স্থাপন করা হয় এবং তার উপর দেবতাদের সন্তুষ্টির উদ্দেশে পশু যাবাহ করা হয়। অনুরূপ পাথর অথবা বৃক্ষ যাই হোক না কেন তাকে পূজার জন্য অথবা সম্মানের জন্য স্থাপন করা হলেই সেটা (نُصُبٌ)।
(أَتَاهُمْ رَبُّ الْعَالَمِينَ) তাদের নিকট রাব্বুল আলামীন উপস্থিত হবেন, এর অর্থ হলো তার নির্দেশ আসবে, যেমন পরবর্তী বাক্যে রয়েছে: আল্লাহ বলবেন, তোমরা কার প্রতিক্ষা করছ? ঈমানদারেরা যা উত্তর দিবে হাদীসে তা এসেছে। কেউ কেউ বলেছেন, আল্লাহ স্বয়ং নিজেই আগমন করবেন তবে মালাক (ফেরেশতা)-এর রূপ ধারণ করে। কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) আসবেন, আমার মতে এ ব্যাখ্যাটাই হাদীসের সাথে অধিক সাদৃশ্যশীল।
মালাকরূপ আগমনকারী যখন বলবে: আমি তোমাদের রব্ আর লোকেরা তাকে মাখলুক সদৃশ অবলোকন করবে তখন তারা তা থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করবে এবং তাকে রব বলে স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানাবে, তারা জানবে ইনি তাদের রব নন।
যা হোক আল্লাহ মুমিনদের বলবেন, প্রত্যেকেই তো যে যার উপাসনা করেছে তাদের সাথে চলে গেছে। তারা বলবে, আমরা দুনিয়াতেই তাদের বর্জন করেছি, তাদের সাথে আমরা কখনো চলিনি এবং তারা যেসব মূর্তি ও দেবতার ‘ইবাদত করেছে আমরা করিনি, অতএব এখানে তাদের অনুসরণ করার প্রশ্নই আসে না, বরং আমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করেছি আপনার সন্তুষ্টির লক্ষ্যে তাদের সাথে শত্রুতা পোষণ করেছি। অথচ দুনিয়ায় নানা পার্থিব প্রয়োজনে তাদের সাথে সম্পর্কের বেশি প্রয়োজন ছিল। এমতাবস্থায় আখিরাতের এই দিনে আমরা কিভাবে তাদের সাথে চলতে পারি? (মিরক্বাতুল মাফাতীহ, শারহুন নাবাবী ৩য় খণ্ড হা. ২৯৯)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৭৯-[১৪] আর আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)-এর বর্ণনায় আছে, তখন তারা বলবে, যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের রব আমাদের কাছে না আসেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা এ স্থানে অপেক্ষা করব। যখন আমাদের রব আসবেন, তখন আমরা তাকে চিনতে পারব। আর আবূ সাঈদ (রাঃ)-এর বর্ণনাতে আছে, আল্লাহ তআলা প্রশ্ন করবেন, তোমাদের এবং তোমাদের প্রভুর মধ্যে এমন কোন চিহ্ন আছে কি, যাতে তোমরা তাকে চিনতে পারবে? তারা বলবে, হ্যা, তখন আল্লাহ তা’আলা স্বীয় পায়ের নলা উন্মোচিত করবে। তখন যে ব্যক্তি সচ্ছতার সাথে আল্লাহ তা’আলাকে সিজদাহ্ করত, শুধু তাকেই আল্লাহ তা’আলা সিজদার অনুমতি দেবেন। আর যারা কারো প্রভাবে বা ভয়ে কিংবা মানুষকে দেখানোর জন্য সিজদাহ্ করত, তারা থেকে যাবে। তাদের মেরুদণ্ডের হাড়কে আল্লাহ তা’আলা একটি তক্তার মতো শক্ত করে দেবেন, বরং যখনই সিজদাহ্ করতে চাবে, তখনই পিছনের দিকে চিৎ হয়ে পড়ে যাবে। অতঃপর জাহান্নামের উপর দিয়ে পুলসিরাত পাতা হবে এবং শাফা’আতের অনুমতি দেয়া হবে। তখন নবী-রাসূলগণ (স্ব-স্ব উম্মতের জন্য) এ ফরিয়াদ করবেন, হে আল্লাহ! নিরাপদে রাখ! নিরাপদে রাখ! এ পুলসিরাতের উপর দিয়ে মু’মিনদের কেউ চোখের পলকে, কেউ বিদ্যুতের গতিতে, কেউ বাতাসের গতিতে, কেউ পাখির গতিতে এবং কেউ দ্রুতগামী ঘোড়ার গতিতে আবার কেউ উটের গতিতে অতিক্রম করবে। কেউ নিরাপদে বেঁচে যাবে। আবার কেউ এমনভাবে পার হয়ে আসবে যে, তার দেহ ক্ষত-বিক্ষত হবে এবং কেউ খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে জাহান্নামে পড়বে।
অবশেষে মু’মিনগণ যখন জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করবে। সেই মহান সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! তোমাদের যে কেউ নিজের অধিকারের দাবিতে কত কঠোর, তা তো তোমাদের কাছে পরিষ্কার। কিন্তু কিয়ামতের দিন মু’মিনগণ তাদের সেই সকল ভাইদের মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে আরো অধিক ঝগড়া করবে, যারা তখনো জাহান্নামে পড়ে রয়েছে। তারা বলবে, হে আমাদের প্রভু! এ সকল আমাদের সাথে সিয়াম রাখত, সালাত আদায় করত এবং হজ্জ আদায় করত। (অতএব তুমি তাদেরকে মুক্তি দাও) তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, যাও তোমরা। যাদেরকে চিন তাদেরকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে আন, তাদের চেহারা-আকৃতি পরিবর্তন করা জাহান্নামের আগুনের উপর হারাম করা হবে। তখন তারা জাহান্নাম থেকে বহু সংখ্যক লোককে বের করে আনবে। অতঃপর বলবে, হে আমাদের প্রভূ! এখন সেখানে এমন আর একজন লোকও অবশিষ্ট নেই যাদেরকে বের করার জন্য আপনি আদেশ দিয়েছেন। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, আবার যাও, যাদের হৃদয়ে এক দানার পরিমাণ ঈমান পাবে তাদের সকলকে বের করে আন। তাতেও তারা বহু সংখ্যক লোককে বের করে আনবে।
তারপর আল্লাহ তা’আলা বলবেন, আবার যাও, যাদের হৃদয়ে অর্ধ দীনার পরিমাণ ঈমান পাবে তাদের সকলকে বের করে আন। অতএব তাতেও বহু সংখ্যককে বের করে আনবে। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা বলবেন, আবারো যাও, যাদের হৃদয়ে এক বিন্দু পরিমাণ ঈমান পাবে তাদের সকলকে বের করে আন। এবারও তারা বহু সংখ্যককে বের করে এনে বলবে, হে আমাদের প্রভু! ঈমানদার কোন ব্যক্তিকেই আমরা আর জাহান্নামে রেখে আসিনি।
তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ), নবীগণ এবং মুমিনগণ সকলেই শাফা’আত করেছেন, এখন এক ’আরহামুর রহিমীন’ তথা আমি পরম দয়ালু ছাড়া আর কেউই অবশিষ্ট নেই- এই বলে তিনি মুষ্টিভরে এমন একদল লোককে জাহান্নাম থেকে বের করবেন যারা কখনো কোন ভালো কাজ করেনি। যারা জ্বলে-পুড়ে কালো কয়লা হয়ে গেছে। অতঃপর তাদেরকে জান্নাতের সম্মুখ ভাগের একটি নহরে নিক্ষেপ করবেন, যার নাম হলো ’নহরে হায়াত’। এটাতে থেকে তারা স্রোতের ধারে যেমনভাবে ঘাসের বীজ গজায় তেমনিভাবে বের হয়ে আসবে এবং তারা মুক্তার মতো (চকচকে অবস্থায় বের হবে) তাদের স্কন্দ্বে সিলমোহর থাকবে। জান্নাতবাসীগণ তাদের দেখে বলবে, এরা পরম দয়ালু আল্লাহর আজাদকৃত। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন, অথচ তারা পূর্বে কোন ’আমল বা কল্যাণকর কাজ করেনি। অতঃপর তাদেরকে বলা হবে, এই জান্নাতে তোমরা যা দেখছ, তা তোমাদেরকে দেয়া হলো এবং এর সাথে অনুরূপ পরিমাণ আরো দেয়া হলো। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَفِي رِوَايَةِ أَبِي هُرَيْرَةَ فَيَقُولُونَ: هَذَا مَكَانُنَا حَتَّى يَأْتِيَنَا رَبُّنَا فَإِذَا جَاءَ رَبُّنَا عَرَفْنَاهُ وَفِي رِوَايَةِ أَبِي سَعِيدٍ: فَيَقُولُ هَلْ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُ آيَةٌ تَعْرِفُونَهُ؟ فَيَقُولُونَ: نَعَمْ فَيُكْشَفُ عَنْ سَاقٍ فَلَا يَبْقَى مَنْ كَانَ يَسْجُدُ لِلَّهِ مِنْ تِلْقَاءِ نَفْسِهِ إِلَّا أَذِنَ اللَّهُ لَهُ بِالسُّجُودِ وَلَا يَبْقَى مَنْ كَانَ يَسْجُدُ اتِّقَاءً وَرِيَاءً إِلَّا جَعَلَ اللَّهُ ظَهْرَهُ طَبَقَةً وَاحِدَةً كُلَّمَا أَرَادَ أَنْ يَسْجُدَ خَرَّ عَلَى قَفَاهُ ثُمَّ يُضْرَبُ الْجِسْرُ عَلَى جَهَنَّمَ وَتَحِلُّ الشَّفَاعَةُ وَيَقُولُونَ اللَّهُمَّ سَلِّمْ سَلِّمْ فَيَمُرُّ الْمُؤْمِنُونَ كَطَرَفِ الْعَيْنِ وَكَالْبَرْقِ وَكَالرِّيحِ وَكَالطَّيْرِ وَكَأَجَاوِيدِ الْخَيْلِ وَالرِّكَابِ فَنَاجٍ مُسَلَّمٌ وَمَخْدُوشٌ مُرْسَلٌ وَمَكْدُوسٌ فِي نَارِ جَهَنَّمَ حَتَّى إِذَا خَلَصَ الْمُؤْمِنُونَ مِنَ النَّارِ فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا مِنْ أحد مِنْكُم بأشدَّ مُناشدةً فِي الْحق - قد تبين لَكُمْ - مِنَ الْمُؤْمِنِينَ لِلَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لِإِخْوَانِهِمُ الَّذِينَ فِي النَّارِ يَقُولُونَ رَبَّنَا كَانُوا يَصُومُونَ مَعَنَا وَيُصَلُّونَ وَيَحُجُّونَ فَيُقَالُ لَهُمْ: أَخْرِجُوا مَنْ عَرَفْتُمْ فَتُحَرَّمُ صُوَرَهُمْ عَلَى النَّارِ فَيُخْرِجُونَ خَلْقًا كَثِيرًا ثُمَّ يَقُولُونَ: رَبَّنَا مَا بَقِيَ فِيهَا أَحَدٌ مِمَّنْ أَمَرْتَنَا بِهِ. فَيَقُولُ: ارْجِعُوا فَمَنْ وجدْتُم فِي قلبه مِثْقَال دنيار مِنْ خَيْرٍ فَأَخْرِجُوهُ فَيُخْرِجُونَ خَلْقًا كَثِيرًا ثُمَّ يَقُولُ: ارْجِعُوا فَمَنْ وَجَدْتُمْ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالَ نِصْفِ دِينَارٍ مِنْ خَيْرٍ فَأَخْرِجُوهُ فَيُخْرِجُونَ خَلْقًا كَثِيرًا ثُمَّ يَقُولُ: ارْجِعُوا فَمَنْ وَجَدْتُمْ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ مِنْ خَيْرٍ فَأَخْرِجُوهُ فَيُخْرِجُونَ خَلْقًا كَثِيرًا ثُمَّ يَقُولُونَ: رَبَّنَا لَمْ نَذَرْ فِيهَا خَيِّرًا فَيَقُولُ اللَّهُ شُفِّعَتِ الْمَلَائِكَةُ وَشُفِّعَ النَّبِيُّونَ وَشُفِّعَ الْمُؤْمِنُونَ وَلَمْ يَبْقَ إِلَّا أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ فَيَقْبِضُ قَبْضَةً مِنَ النَّارِ فَيُخْرِجُ مِنْهَا قَوْمًا لَمْ يَعْمَلُوا خَيْرًا قَطُّ قَدْ عَادُوا حُمَمًا فَيُلْقِيهِمْ فِي نَهْرٍ فِي أَفْوَاهِ الْجَنَّةِ يُقَالُ لَهُ: نَهْرُ الْحَيَاةِ فَيَخْرُجُونَ كَمَا تَخْرُجُ الْحِبَّةُ فِي حَمِيلِ السَّيْلِ فَيَخْرُجُونَ كَاللُّؤْلُؤِ فِي رِقَابِهِمُ الْخَوَاتِمُ فَيَقُولُ أَهْلُ الْجَنَّةِ: هَؤُلَاءِ عُتَقَاءُ الرَّحْمَن أدخلهم الْجنَّة بِغَيْر عمل وَلَا خَيْرٍ قَدَّمُوهُ فَيُقَالُ لَهُمْ لَكُمْ مَا رَأَيْتُمْ وَمثله مَعَه . مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (7439) و مسلم (302 / 183)، (454) ۔
(متفّق عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: আবূ হুরায়রাহ (রাঃ)-এর বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হাশরের ময়দানে মুমিনদের বলবেন, তোমরা এখানে কার প্রতিক্ষা করছ? মুমিনগণ বলবেন, এটা আমাদের অবস্থানস্থল, আমরা এখানেই অবস্থান করব যতক্ষণ না আমাদের রব আমাদের নিকট আগমন করেন। এ সময় আল্লাহ তা'আলা তার পায়ের নলা তাদের সামনে প্রকাশ করবেন অর্থাৎ তিনি তার নূরের তাজাল্লী প্রকাশ করবেন।
মু'মিনদের প্রথম দর্শন অস্বীকার সম্ভবত তাদের সাথে মুনাফিকরা থাকবে সেজন্য, কেননা তারা আল্লাহকে দর্শনের হাক্ব রাখে না। মুনাফিকরা যখন পৃথক হয়ে যাবে তখন মু'মিনদের সামনে থেকে পর্দা উঠিয়ে দেয়া হবে। অতঃপর তারা যখন আল্লাহকে দর্শন করবে তখন বলবে, হ্যা, আপনি আমাদের রব। আবূ সাঈদ (রাঃ)-এর অন্য বর্ণনায় আছে, আল্লাহ বলবেন, তোমাদের আল্লাহকে চেনার কি কোন নিদর্শন আছে? মুমিনেরা উত্তর দিবে, হ্যা, আছে; এমন সময় আল্লাহ তা'আলা তার পায়ের নলা উন্মোচিত করে দিবেন। মুমিনেরা তা দর্শন মাত্রই চিনতে পারবেন এবং আল্লাহর অনুগ্রহে বা অনুমতিসাপেক্ষে সিজদায় পড়ে যাবেন। এ সময় মুনাফিক অপরের দ্বারা প্রভাবিত, রিয়াকার ইত্যাদি ব্যক্তিরাও সিজদার চেষ্টা করবে কিন্তু সিজদাহ করতে গিয়ে পিছনের দিকে উল্টে পড়ে যাবে। আল্লাহ বলেন, “সেদিন পায়ের গোছা উন্মুক্ত করা হবে এবং লোকেদের সিজদার প্রতি আহ্বান করা হবে, তখন তারা সিজদাহ্ দিতে পারবে না।” (সূরাহ্ আল কলাম ৬৮: ৪২)
ইমাম নবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এ হাদীসের মাধ্যমে অনেকে ধারণা করে যে, মুনাফিকরাও আল্লাহকে দেখবে, যেহেতু তারা মুমিনদের সাথেই রয়ে গেছে; অতঃপর আল্লাহ সিজদার মাধ্যমে তাদের পরীক্ষা গ্রহণ করবেন। যে সিজদাহ্ করতে পারবে সে খাটি মু'মিন, আর যে তাতে সক্ষম হবে না সে হবে মুনাফিক।
এরপর আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামের উপর ব্রীজ স্থাপন করবেন। একেই বলা হয় পুলসিরাত। প্রত্যেক ব্যক্তিকেই এই পুল পার হয়ে যেতে হবে। মুমিনেরা তাদের ‘আমল ও ঈমান অনুসারে কেউ চোখের পলকে, কেউ বিদ্যুৎ গতিতে, কেউ বাতাসের গতিতে, কেউ পাখির গতিতে, কেউ দ্রুতগামী ঘোড়ার এবং কেউ উটের গতিতে পার হবে। কেউ নিরাপদেই পার হবে, কেউ পার হবে এমনভাবে তার দেহ ক্ষত বিক্ষত হয়ে যাবে, কেউ তো ক্ষত-বিক্ষত হয়ে জাহান্নামে পড়েই যাবে।
এ সময় আল্লাহ তা'আলা নবী-রাসূল এবং মুমিনদের শাফা'আতের অনুমতি দিবেন। তারা বলবেন, “আল্ল-হুম্মা সাল্লিম আল্ল-হুম্মা সাল্লিম”, হে আল্লাহ! শান্তি দাও, হে আল্লাহ! শান্তি দাও। যে সকল মু'মিন জাহান্নাম থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছে অথবা পুলসিরাত পাড়ি দিয়ে জাহান্নাম থেকে নিরাপদ হয়ে গেছে তারা জাহান্নামে পড়ে থাকা মুমিনদের মুক্তির জন্য জোর দাবী পেশ করতে থাকবে। তারা বলবেন, হে আল্লাহ! এরা আমাদের সাথে আমাদের ন্যায় সালাত আদায় করেছে, সিয়াম পালন এবং সঠিক হজ্জ পালন করেছে, অতএব তাদের মুক্তি দাও। তখন মুমিনদের বলা হবে ঠিক আছে যাও সালাত, সওম, হজ্জ ইত্যাদি পালনকারী হিসেবে যাদের চিনতে পার তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের কর।
জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত সালাত আদায়কারী মু'মিনগণের সর্বাঙ্গ পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও সিজদার জায়গাগুলো পুড়বে না, ফলে ঐ সকল চিহ্ন দেখে বহু সংখ্যক জাহান্নামীদেরকে তারা বের করে এনে বলবেন, হে আল্লাহ! জাহান্নামে এ গুণের আর কোন মুমিন অবশিষ্ট নেই। অর্থাৎ সালাত আদায়কারী, সিয়াম পালনকারী, হজ্জ পালনকারী আর কেউ বাকী নেই। আল্লাহ তা'আলা বলবেন, আবার যাও দেখ যাদের অন্তরে এক দীনার পরিমাণ খায়র বা কল্যাণ পাও তাদের বের করে আন।
কাযী ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, (خير) (খায়র) শব্দের অর্থ ইয়াকীন। সহীহ হলো নিরেট ঈমানের পর অতিরিক্ত কোন নেক কর্ম। এবারও তারা গিয়ে বহু মানুষকে বের করে আনবেন। আল্লাহ তা'আলা মু'মিনদের আবার বলবেন, যাদের অন্তরে অর্ধ দীনার পরিমাণ খায়র রয়েছে তাদের বের কর, অতঃপর তাদের বের করা হবে। এদের সংখ্যাও হবে অনেক। আবার বলা হবে, ফিরে যাও যার অন্তরে এক যাররা পরিমাণ খায়র পাও তাকেও বের কর। এবারও অনেক মানুষকে বের করা হবে। তারা বলবেন, হে আল্লাহ! আমরা খায়র থাকা কোন ব্যক্তিকে রেখে আসিনি।
এরপর আল্লাহ তাআলা বলবেন, সবাই শাফা'আত করেছে এখন কেবল বাকি আমি আরহামুর রহীমীন, যার রহমত সমগ্র স্থানে পরিব্যপ্ত এবং সকল কিছু তার রহমতে ধন্য। এ বলে আল্লাহ তা'আলা মুষ্ঠিভরে এমন একদল লোককে জাহান্নাম থেকে বের করবেন যারা কখনও কোন خير (খায়র) নেক আমল করেনি। শুধু ঈমানের বিশ্বাসটুকুই তাদের ছিল, নেক ‘আমল বলতে কিছুই ছিল না।
তাদের আদৌ কোন নেক আমল না থাকা এবং ঈমান অতীব সূক্ষ্ম এবং হালকা থাকায় নবী-রাসূল এবং মু'মিনগণের দৃষ্টিতে তা আসেনি, ফলে তারা তাদের জন্য শাফা'আত করতে পারেননি। অবশেষে আহকামুল হাকিমীন তাদের মধ্যে ঐ লুক্কায়িত ঈমান দেখে জাহান্নাম থেকে বের করবেন।
এদের জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতের দরজার সামনে উপস্থিত করা হবে, “হায়াত’ নামক নহরে গোসল করিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। এদের গর্দানে জাহান্নাম থেকে মুক্তির মোহর অঙ্কিত থাকবে, যা দেখে জান্নাতের সকল লোক তাদের চিনতে পারবে যে, এরা দয়াময় রহমানের অনুগ্রহপ্রাপ্ত এবং বিনা আমালে জান্নাতপ্রাপ্ত লোক।
তারা জান্নাতে প্রবেশ করলে আল্লাহ তা'আলা বলবেন, তোমরা যে জান্নাত দেখছ, অর্থাৎ তোমাদের দৃষ্টিসীমার মধ্যে এর বাগ-বাগিচা, বালাখানা ও হুর গেলেমান যা রয়েছে এটা তোমাদের জন্য এবং এর সমপরিমাণ আরো। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ, শারহুন নাবাবী ৩য় খণ্ড, হা. ২৯৯)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৮০-[১৫] উক্ত রাবী [আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: যখন জান্নাতীগণ জান্নাতে এবং জাহান্নামীগণ জাহান্নামে প্রবেশ করবে তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, যার হৃদয়ে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমান আছে, তাকে জাহান্নাম থেকে বের করে আন। তাদেরকে এমন অবস্থায় বের করা হবে যে, তারা পুড়ে কালো কয়লায় পরিণত হয়ে গেছে। অতঃপর তাদেরকে ’হায়াত’ নামক নহরে ফেলে দেয়া হবে। তাতে তারা স্রোতের ধারে যেন ঘাসের বীজ উদ্গত হয় তেমনি স্বচ্ছ-সুন্দর হয়ে উঠবে। তোমরা কি দেখনি, উক্ত গাছগুলো হলুদ রং জড়িত অবস্থায় অংকুরিত হয়? (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِذَا دَخَلَ أَهْلُ الْجَنَّةِ الْجَنَّةَ وَأَهْلُ النَّارِ النَّارَ يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى: مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ مِنْ إِيمَانٍ فَأَخْرِجُوهُ فَيَخْرُجُونَ قَدِ امْتَحَشُوا وَعَادُوا حُمَمًا فَيُلْقَوْنَ فِي نَهْرِ الْحَيَاةِ فَيَنْبُتُونَ كَمَا تَنْبُتُ الْحِبَّةُ فِي حَمِيلِ السَّيْلِ أَلَمْ تَرَوْا أَنَّهَا تَخْرُجُ صَفْرَاءَ مُلْتَوِيَةً . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (6560) و مسلم (204 / 184)، (457) ۔
(متفّق عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশের পর আল্লাহ বলবেন, যাদের অন্তরে সরিষা দানা পরিমাণ ঈমান আছে তাদের বের কর। এ নির্দেশ নবী রাসূল, ফেরেশতা এবং অন্যান্য যারা শাফা'আতের অধিকার লাভ করবেন তাদের প্রতি করা হবে। সামনে আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)-এর বর্ণনায় এর বিস্তারিত বিবরণ আসছে। বলা হয় এ হাদীস থেকে প্রকাশ পায় যে, দয়াময় রহমান যাদের মুষ্ঠিতে ভরে জাহান্নাম থেকে বের করবেন তারা মু'মিন কিন্তু সম্পূর্ণ আ'মলবিহীন। উম্মাতের সর্ববাদী সম্মত মতে তারা কাফির ছিল না, যেটা অনেকেই মনে করে থাকেন। তাদের এমন অবস্থায় বের করা হবে যে তারা পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর বাণী: (قَدِ امْتَحَشُوا) তারা পুড়ে কয়লায় পরিণত হয়ে গেছে। এটাকে কর্তৃবাচ্য অথবা কর্ম বাচ্য উভয়ই ধরা হয়ে থাকে। এটা চামড়া এবং হাড়ের উপরিভাগ পুড়ে ফেলানোর অর্থে ব্যবহৃত হয়। ‘আল কামূস’ নামক বিশ্ববিখ্যাত অভিধান গ্রন্থে (إحْتَحَشَ) শব্দটি (إِحْتَرَقَ) পুড়িয়ে ফেলা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ইবনু হাজার আসকালানী (রহিমাহুল্লাহ) (إحْتَحَشَ) শব্দটিকে (إِحْتَرَقَ)-এর ওযনে এবং অর্থে ধরেছেন। কেউ এর ‘তা বর্ণে পেশ এবং ‘হা বর্ণে যের দিয়ে পাঠ করে থাকেন। কিন্তু অভিধানে এটাকে স্বকর্মক ক্রিয়া হিসেবে জানা যায় না। ইমাম নবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, “তা বর্ণে, ‘হা' বর্ণে এবং ‘শীন বর্ণে যবর দিয়ে পাঠ-ই বিধেয়।
এ পদ্ধতিতেই বিভিন্ন রিওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে। আল্লামাহ্ খত্ত্বাবী, হারুবী প্রমুখ এভাবেই হরকত দান করেছেন। জাহান্নামে পুড়ে পুড়ে তারা কয়লা হয়ে যাবে জাহান্নাম থেকে উঠিয়ে যখন তাদের হায়াত নদীতে ফেলা হবে তখন তাদের দেহ ড্রেনের দুই পাশের কর্দমাক্ত বা ভিজা পানিতে অঙ্কুরিত শস্য দানার মতো হলুদ, কোমল ও মসৃণ হয়ে যাবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ, ফাতহুল বারী ১১খণ্ড ৪৮৪ পৃ., হা. ৬৫৬০)।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৮১-[১৬] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। লোকেরা প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামাতের দিন আমরা কি আমাদের প্রভুকে দেখতে পাব? অতঃপর আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হাদীসের অবশিষ্ট অংশ থেকে আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) -এর বর্ণিত হাদীসের অর্থানুরূপ বর্ণনা করেছেন। তবে আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ ) (كَشْفِ السَّاقِ) “আল্লাহ তা’আলা পায়ের নলা উন্মুক্ত করবেন তিনি এ কথাটি উল্লেখ করেননি। আর তিনি (সা.) বলেছেন: জাহান্নামের উপর পুলসিরাত স্থাপন করা হবে। সে সময় রাসূলদের মধ্যে আমি এবং আমার উম্মতই সর্বপ্রথম তা অতিক্রম করব। সেদিন (পুল অতিক্রমকালে) রাসূলগণ ছাড়া আর কেউই কথা বলবে না।
আর রাসূলগণও শুধু বলতে থাকবেন, আল্ল-হুম্মা সাল্লিম, সাল্লিম। অর্থাৎ হে আল্লাহ নিরাপদে রাখ। হে আল্লাহ নিরাপদে রাখ। আর জাহান্নামের মধ্যে সাদানের কাঁটার মতো আংটা থাকবে, সে সমস্ত আংটাগুলোর বিশালত্ব সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহই জানেন। ঐ আংটাগুলো মানুষদেরকে তাদের ’আমল অনুপাতে আঁকড়ে ধরবে। অতএব কিছু সংখ্যক লোক নিজ ’আমলের কারণে ধ্বংস হবে এবং কিছু লোক টুকরা টুকরা হয়ে যাবে। আবার পরে মুক্তি পাবে।
অবশেষে যখন আল্লাহ তা’আলা বান্দাদের বিচার-ফায়সালা শেষ করবেন এবং (নিজের দয়া ও অনুগ্রহে) কিছুসংখ্যক ঐ সকল জাহান্নামবাসীকে মুক্তি দেয়ার ইচ্ছা করবেন, যারা এ সাক্ষ্য দিয়েছে যে, এক আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত আর কোন মা’বুদ নেই’, তখন মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাদের)-কে আদেশ করবেন যে, যারা একমাত্র আল্লাহ তা’আলার ইবাদত করছে, তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আন। তখন তারা ঐ সকল লোক যাদের কপালে সিজদার চিহ্ন রয়েছে তা দেখে সনাক্ত করবেন এবং তাদের জাহান্নাম থেকে বের করে আনবেন। আর আল্লাহ তা’আলা সিজদার চিহ্নসমূহ পুড়িয়ে দগ্ধ করা আগুনের জন্য হারাম করে দিয়েছেন। ফলে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত প্রতিটি আদম সন্তানের সিজদার স্থানটি ছাড়া তার সারা দেহ অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় জাহান্নাম থেকে বের করা হবে যে, তারা একেবারে কালো কয়লা হয়ে গেছে। তখন তাদের ওপর সঞ্জীবনী পানি ঢেলে দেয়া হবে। এর ফলে তারা এমনভাবে তরতাজা ও সজীব হয়ে উঠবে, যেমন কোন বীজ প্রবহমান পানির ধারে উদ্দাত হয়।
সে সময় জাহান্নামবাসীদের মধ্যে থেকে সর্বশেষে জান্নাতে প্রবেশকারী এক লোক জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী স্থানে থেকে যাবে, যার মুখ হবে জাহান্নামের দিকে। সে বলবে, হে আমার প্রভু! জাহান্নামের দিক হতে আমার মুখখানা ফিরিয়ে দিন। কেননা জাহান্নামের গরম বাতাস আমাকে অত্যধিক কষ্ট দিচ্ছে এবং অগ্নিশিখা আমাকে জ্বালিয়ে দিচ্ছে। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, তবে কি যা তুমি চাচ্ছ, যদি তোমাকে আমি দান করি তাহলে আরো অন্য কিছুও তো চাইতে পার? তখন সে বলবে, না, তোমার সম্মানের শপথ করে বলছি, আমি আর কিছুই চাইব না। তখন সে আল্লাহ তা’আলাকে আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি প্রদান করবে। তখন আল্লাহ তা’আলা তার মুখকে জাহান্নামের দিক থেকে ফিরিয়ে দেবেন। যখন সে জান্নাতের দিকে মুখ করবে এবং তার চাকচিক্য ও শ্যামল দৃশ্য দেখবে আল্লাহ যতক্ষণ তাকে চুপ রাখতে চাইবেন ততক্ষণ সে চুপ করে থাকবে।
অতঃপর বলবে, হে আমার প্রভু! আমাকে জান্নাতের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিন। এ কথা শুনে মহামহিম বারাকাতময় আল্লাহ বলবেন, তুমি কি ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি দাওনি যে, তুমি একবার যা চেয়েছ তা ছাড়া কখনো আর কিছুই চাইবে না? তখন সে বলবে, হে আমার প্রভু! তুমি আমাকে তোমার সৃষ্টিকুলের মধ্যে সর্বাধিক হতভাগা বানিয়ো না। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, আচ্ছা, তোমাকে যদি এ সকল কিছু দেয়া হয়, তাহলে আবার অন্য আর কিছু চাবে না তো? সে বলবে, না, তোমার সম্মানের শপথ! এটা ছাড়া আমি আর কিছুই চাইব না। তারপর সে আল্লাহ তা’আলাকে এই মর্মে ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি প্রদান করবে যা আল্লাহ তা’আলা ইচ্ছা করবেন। তখন তাকে জান্নাতের দরজার কাছে এগিয়ে দেয়া হবে। যখন সে জান্নাতের দরজার কাছে পৌছবে, তখন তার মধ্যকার আরাম আয়েশ ও আনন্দের প্রাচুর্য দেখতে পাবে এবং আল্লাহ তা’আলা যতক্ষণ চুপ রাখতে চাবেন ততক্ষণ সে চুপ থাকবে। অতঃপর সে বলবে, হে আমার প্রভু! আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিন। তখন মহামহিম বারাকাতময় আল্লাহ বলবেন, আফসোস হে আদম সন্তান! তুমি কি মারাত্মক ওয়াদা ভঙ্গকারী! তুমি কি এই মর্মে প্রতিশ্রুতি দাওনি যে, আমি যা কিছু দেব তা ছাড়া অন্য কিছুই চাবে না? তখন সে বলবে, হে আমার প্রভু! আমাকে তোমার সৃষ্টির মাঝে সকলের চেয়ে দুর্ভাগা করো না। এই বলে সে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে থাকবে। এমনকি তার এ মিনতি দেখে আল্লাহ তা’আলা হেসে উঠবেন।
যখন হেসে ফেলবেন তখন তাকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দিয়ে বলবেন, এখন চাও (তোমরা যা কিছু চাওয়ার আছে) তখন সে আল্লাহ তা’আলার কাছে অন্তর খুলে চাবে। এমনকি যখন তার আকাঙ্ক্ষা শেষ হয়ে যাবে, তখন আল্লাহ তা’আলা তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলবেন, এটা চাও, ওটা চাও। এমনকি সেই আকাঙ্ক্ষাও যখন শেষ হয়ে যাবে, তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, এ সকল কিছুই তোমাকে দেয়া হলো এবং সাথে সাথে আরো অনুরূপ পরিমাণ দেয়া হলো।
আর আবূ সাঈদ (রাঃ)-এর রিওয়ায়াতে আছে- আল্লাহ তা’আলা বলবেন, যাও, তোমাকে এ সমস্ত কিছু তো দিলামই এবং এর দশগুণ পরিমাণও এর সাথে দিলাম। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَن أبي هُرَيْرَة أَنَّ النَّاسَ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ هَلْ نَرَى رَبَّنَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ؟ فَذَكَرَ مَعْنَى حَدِيثِ أَبِي سَعِيدٍ غَيْرَ كَشْفِ السَّاقِ وَقَالَ: يُضْرَبُ الصِّرَاطُ بَيْنَ ظَهْرَانَيْ جَهَنَّمَ فَأَكُونُ أَوَّلَ مَنْ يَجُوزُ مِنَ الرُّسُلِ بِأُمَّتِهِ وَلَا يَتَكَلَّمُ يَوْمَئِذٍ الرُّسُلُ وَكَلَامُ الرُّسُلِ يَوْمَئِذٍ: اللَّهُمَّ سَلِّمْ سَلِّمْ. وَفِي جهنمَ كلاليب مثلُ شوك السعدان وَلَا يَعْلَمُ قَدْرَ عِظَمِهَا إِلَّا اللَّهُ تَخْطَفُ النَّاسَ بِأَعْمَالِهِمْ فَمِنْهُمْ مَنْ يُوبَقُ بِعَمَلِهِ وَمِنْهُمْ مَنْ يُخَرْدَلُ ثُمَّ يَنْجُو حَتَّى إِذَا فَرَغَ اللَّهُ مِنَ الْقَضَاءِ بَيْنَ عِبَادِهِ وَأَرَادَ أَنْ يُخْرِجَ مِنَ النَّارِ مَنْ أَرَادَ أَنْ يُخْرِجَهُ مِمَّنْ كَانَ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ أَمر الْمَلَائِكَة أَن يخرجُوا من يَعْبُدُ اللَّهَ فَيُخْرِجُونَهُمْ وَيَعْرِفُونَهُمْ بِآثَارِ السُّجُودِ وَحَرَّمَ اللَّهُ تَعَالَى عَلَى النَّارِ أَنْ تَأْكُلَ أَثَرَ السُّجُودِ فَكُلُّ ابْنِ آدَمَ تَأْكُلُهُ النَّارُ إِلَّا أَثَرَ السُّجُودِ فَيَخْرُجُونَ مِنَ النَّارِ قَدِ امْتَحَشُوا فَيُصَبُّ عَلَيْهِمْ مَاءُ الْحَيَاةِ فَيَنْبُتُونَ كَمَا تَنْبُتُ الْحِبَّةُ فِي حَمِيلِ السَّيْلِ وَيَبْقَى رَجُلٌ بَيْنَ الجنَّةِ والنارِ وَهُوَ آخرُ أهلِ النارِ دُخولاً الْجَنَّةَ مُقْبِلٌ بِوَجْهِهِ قِبَلَ النَّارِ فَيَقُولُ: يَا رب اصرف وَجْهي عَن النَّار فَإِنَّهُ قد قَشَبَنِي رِيحُهَا وَأَحْرَقَنِي ذَكَاؤُهَا. فَيَقُولُ: هَلْ عَسَيْتَ إِنْ أَفْعَلْ ذَلِكَ أَنْ تَسْأَلَ غَيْرَ ذَلِكَ؟ فَيَقُول: وَلَا وعزَّتكَ فيُعطي اللَّهَ مَا شاءَ اللَّهُ مِنْ عَهْدٍ وَمِيثَاقٍ فَيَصْرِفُ اللَّهُ وَجْهَهُ عَنِ النارِ فإِذا أقبلَ بِهِ على الجنةِ وَرَأى بَهْجَتَهَا سَكَتَ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ يَسْكُتَ ثُمَّ قَالَ: يَا رَبِّ قَدِّمْنِي عِنْدَ بَابِ الجنةِ فَيَقُول الله تبَارك وَتَعَالَى: الْيَسْ أَعْطَيْتَ الْعُهُودَ وَالْمِيثَاقَ أَنْ لَا تَسْأَلَ غَيْرَ الَّذِي كُنْتَ سَأَلْتَ. فَيَقُولُ: يَا رَبِّ لَا أَكُونُ أَشْقَى خَلْقِكَ. فَيَقُولُ: فَمَا عَسَيْتَ إِنْ أُعْطِيتُ ذَلِكَ أَنْ تَسْأَلَ غَيْرَهُ. فَيَقُولُ: لَا وَعِزَّتِكَ لَا أَسْأَلُكَ غَيْرَ ذَلِكَ فَيُعْطِي رَبَّهُ مَا شَاءَ مِنْ عَهْدٍ وَمِيثَاقٍ فَيُقَدِّمُهُ إِلَى بَابِ الْجَنَّةِ فَإِذَا بَلَغَ بَابَهَا فَرَأَى زَهْرَتَهَا وَمَا فِيهَا مِنَ النَّضْرَةِ وَالسُّرُورِ فَسَكَتَ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ يَسْكُتَ فَيَقُولُ: يَا رَبِّ أَدْخِلْنِي الْجَنَّةَ فَيَقُولُ اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى: وَيْلَكَ يَا ابْنَ آدَمَ مَا أَغْدَرَكَ أَلَيْسَ قَدْ أَعْطَيْتَ الْعُهُودَ وَالْمِيثَاقَ أَنْ لَا تَسْأَلَ غَيْرَ الَّذِي أُعْطِيتَ. فَيَقُولُ: يَا رَبِّ لَا تَجْعَلْنِي أَشْقَى خَلْقِكَ فَلَا يَزَالُ يَدْعُو حَتَّى يَضْحَكَ اللَّهُ مِنْهُ فَإِذَا ضَحِكَ أَذِنَ لَهُ فِي دُخُولِ الْجَنَّةِ. فَيَقُولُ: تَمَنَّ فَيَتَمَنَّى حَتَّى إِذَا انْقَطَعَتْ أُمْنِيَّتُهُ قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: تَمَنَّ مِنْ كَذَا وَكَذَا أَقْبَلَ يُذَكِّرُهُ رَبُّهُ حَتَّى إِذَا انْتَهَتْ بِهِ الْأَمَانِيُّ قَالَ اللَّهُ: لَكَ ذَلِكَ ومثلُه معَه وَفِي رِوَايَةِ أَبِي سَعِيدٍ: قَالَ اللَّهُ: لَكَ ذلكَ وعشرةُ أمثالِه . مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (806) و مسلم (299 / 182)، (451) ۔
(متفّق عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: ইতোপূর্বে ৫৫৭৯ নং হাদীসে যা অতিবাহিত হয়েছে এখানেও তাই বিবৃত হয়েছে। জাহান্নামের উপর পুলসিরাত ব্রীজ স্থাপন করা হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমিই সর্বপ্রথম ব্যক্তি যে তার উম্মতসহ ঐ ব্রীজ অতিক্রমকারী হব। অর্থাৎ আমার আগে কোন নবীই তার উম্মতকে নিয়ে ঐ পুলসিরাত পাড়ি দিতে পারবে না। সেই স্থানে রাসূলগণ ছাড়া কেউ আল্লাহর সাথে কথাও বলতে পারবে না। ইবনুল মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, (يِوْمَئِذٍ) দ্বারা পুলসিরাত পার হওয়ার সময় উদ্দেশ্য, সেখানে মানুষের কথা বলার জায়গা নয়। মহান আল্লাহ বলেন, (هٰذَا یَوۡمُ لَا یَنۡطِقُوۡنَ) “এটা সেদিন হবে যেদিন তারা কথা বলতেও পারবে না।” (সূরা আল মুরসালাত ৭৭: ৩৫)
কিন্তু পাশেই অন্যান্য অবস্থানস্থলে লোকেরা কথা বলবে। সেদিন পুলসিরাতের ঘাটে কথা না বলার বিষয়টি তাগিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। রাসূলগণ সেখানে শুধু বলতে থাকবেন, “আল্ল-হুম্মা সাল্লিম সাল্লিম”, “হে আল্লাহ! শান্তি দাও, শান্তি দাও।”
জাহান্নামের মধ্যে সাদানের কাঁটার মতো কাটাদার বিরাট বিরাট আংটা থাকবে সেগুলো জাহান্নামের চতুর্দিকে থাকবে। অথবা সেগুলো পুলসিরাতের সাথে ঝুলানো থাকবে, গুনাহগারেরা পুলসিরাত পার হতে কেটে কেটে জাহান্নামের ঐ কাঁটার সাথে আটকে যাবে।
(كَلَالِيْبُ) শব্দটি গায়রি মুনসরিফ, এটা প্রান্তিক জুমু'আহ্, অর্থ চারদিকে লোহার বাকা আলযুক্ত মাথা বের করে তৈরি করা বস্তু। তা দ্বারা মানুষকে আটকানো হবে অথবা গুনাহগারদের মাংসের সাথে আটকিয়ে (জাহান্নামের) তন্দুরে ঝুলিয়ে রাখা হবে।
(شَوْكِ السَّعْدَانِ) “সা'দান বৃক্ষের কাটা” আরবের প্রসিদ্ধ সা'দান বৃক্ষ, যার রয়েছে বড় বড় কাঁটা। এটা গঠনের সাদৃশ্য মাত্র, আকারের নয়, তার আকার বা প্রকাণ্ডতা যে কত বড় তা আল্লাহ তা'আলাই ভালো জানেন। মানুষকে তার খারাপ আমল অনুপাতে ঐ কাঁটা আটকিয়ে ধরবে। কেউ একেবারে আটকে থাকবে এবং ধ্বংস হয়ে যাবে। কেউ আবার কেটে টুকরা টুকরা বা রেযা রেযা হয়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে (অবশ্য অনেকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে)।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বিচার-ফায়সালা শেষ করে একত্ববাদের সাক্ষ্য দানকারী হওয়া সত্ত্বেও খারাপ আমলের কারণে যারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়েছে তাদের জাহান্নাম থেকে বের করার ইচ্ছা করবেন। আর মালায়িকার (ফেরেশতাগণের) নির্দেশ করবেন যে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করেছে তাদের বের কর। এখানে এক আল্লাহর ইবাদত বলতে তার তাওহীদ স্বীকার করা এবং তাওহীদ চেনা অথবা তাওহীদের দাবী পূরণে যে ইবাদত সঠিক সেই ‘ইবাদত করা। (অনেক মানুষ আছেন যারা অন্তরে তাওহীদের বিশ্বাস ও দাবী সঠিক থাকলেও ‘ইবাদতে শির্ক করে ফেলে, তারা এ সুযোগের অন্তর্ভুক্ত হবে না) মালায়িকাহ্ সিজদার চিহ্ন দেখে দেখে তাদের জাহান্নাম থেকে বের করবেন। যেমন- মহান আল্লাহর বাণী:
(سِیۡمَاهُمۡ فِیۡ وُجُوۡهِهِمۡ مِّنۡ اَثَرِ السُّجُوۡدِ) “তাদের চিহ্নগুলো তাদের মুখমণ্ডলে সিজদার কারণে পরিস্ফুট হয়ে থাকবে।” (সূরা আল ফাতহ ৪৮: ২৯)।
আল্লাহ তা'আলা সিজদার স্থানকে পোড়ানো জাহান্নামের আগুনের উপর হারাম করে দিয়েছেন। ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, হাদীসের দ্বারা এ কথা স্পষ্ট যে, জাহান্নামের আগুন সিজদার সাতটি অঙ্গের কোন কিছু ভক্ষণ করতে পারবে না। সে সাতটি অঙ্গ হলো: (নাকসহ) কপাল, দুই হাত, দুই হাঁটু ও দুই পা।
কাযী “ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, সিজদার চিহ্ন বলতে শুধু কপালকেই খাস করা হয়েছে। মুল্লা আলী কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, প্রথম মতটিই অধিক যুক্তিযুক্ত। অবশ্য দ্বিতীয় মতটির সপক্ষে হাদীসের প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে।
গুনাহগার সালাত আদায়কারীদের সিজদার চিহ্ন দেখে জাহান্নাম থেকে তুলে তুলে আবে হায়াতে গোসল করিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করানোর পরও এক ব্যক্তি জান্নাত এবং জাহান্নামের মাঝখানে আ'রাফ নামক স্থানে থাকবে। এ ব্যক্তি হবে জাহান্নাম থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত সর্বশেষ ব্যক্তি এবং সর্বশেষে জান্নাতে প্রবেশকারী। এ ব্যক্তির মুখ জাহান্নামের দিকে রাখা হবে। তখন সে মহামহিম দয়াময় আল্লাহর কাছে পর্যায়ক্রমে আবেদন করে এবং আবেদন পূর্ণ হলে আর আল্লাহর কাছে কিছু চাইবে না বলে পাকা ওয়া'দা দিবে, কিন্তু ধীরে ধীরে জান্নাতের দরজায় পৌছে তার নিআমাতরাজি দর্শন করে ধৈর্য ধরে থাকতে পারবে না, অতঃপর জান্নাতে প্রবেশের আবেদন জানাবে। এ বান্দার বার বার ওয়াদা ভঙ্গ এবং জান্নাতে প্রবেশের মিনতি দেখে আল্লাহ তা'আলা হেসে দিবেন এবং জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দিবেন।
জান্নাতে প্রবেশের পর আল্লাহ তা'আলা তাকে বলবেন, তুমি তোমার মনের চাহিদা মতো চাও, সে চাইতে থাকবে, এমনকি তার আকাক্ষা চাহিদা শেষ হয়ে যাবে তখন আল্লাহ তা'আলা তাকে বিভিন্ন নি'আমাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলবেন, এটা চাও, ওটা চাও। এটাও যখন শেষ হয়ে যাবে তখন আল্লাহ বলবেন, এসবগুলো তোমার অনুরূপ আরো সমপরিমাণ দেয়া হলো।
আবূ সা'ঈদ (রাঃ)-এর বর্ণনায় আছে, তোমার জন্য তোমার চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা পরিমাণ এবং অনুরূপ আরো দশগুণ দেয়া হলো। (মিরকাতুল মাফাতীহ, ফাতহুল বারী ১১ খণ্ড, ৫০৪ পৃ., শারহুন নাবাবী ৩য় খণ্ড, হা, ২৯৯)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৮২-[১৭] ইবনু মাস্’উদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: সর্বশেষ যে লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে, সে জাহান্নাম থেকে বের হওয়ার সময় একবার চলবে, একবার সম্মুখের দিকে ঝুঁকে পড়বে এবং আরেকবার আগুন তাকে জ্বালিয়ে দেবে। অতঃপর যখন (এ অবস্থায়) সে জাহান্নামের সীমানা অতিক্রম করে আসবে, তখন তার দিকে তাকিয়ে বলবে, বড়ই কল্যাণময় সেই মহান প্রভু! যিনি আমাকে তোমার থেকে মুক্তি দান করেছেন। নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা আমাকে এমন কিছু দান করেছেন, যা আগের ও পিছনের কোন লোককেই তা প্রদান করেননি। অতঃপর তার সামনে একটি বৃক্ষ প্রকাশ করা হবে। তখন সে বলবে, হে আমার প্রভু! আমাকে ঐ গাছটির কাছে পৌছিয়ে দিন যাতে আমি তার নিচে ছায়া হাসিল করি এবং তার ঝরনা থেকে পানি পান করি। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, হে আদম সন্তান! যদি আমি তোমাকে তা প্রদান করি তখন হয়তো তুমি আমার কাছে অন্য কিছু চাইতে থাকবে। সে বলবে, হে আমার প্রভু! আর সে আল্লাহর সাথে এ ওয়াদা-অঙ্গীকার করবে যে, তা ছাড়া সে আর কিছুই চাইবে না। অথচ তার অধৈর্য ও অস্থিরতা দেখে আল্লাহ তা’আলা তাকে অসহায় অবস্থায় পেয়ে তার মনোকাংখা পূরণ করবেন। তখন তাকে উক্ত গাছের কাছে পৌছিয়ে দেবেন। অতঃপর আরেকটি গাছ প্রকাশ পাবে যা প্রথমটি অপেক্ষা উত্তম। তখন সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ঐ গাছটির কাছাকাছি করে দিন, যেন আমি সেখানে ঝরনার পানি পান করতে পারি এবং তার ছায়ায় বিশ্রাম নিতে পারি, এটা ছাড়া আমি অন্য আর কিছু তোমার কাছে চাব না।
তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, হে আদম সন্তান। তুমি কি আমার সাথে এই প্রতিশ্রুতি দাওনি যে, তোমাকে যা কিছু দেয়া হয়েছে তুমি তা ছাড়া আর কিছুই চাবে না? আল্লাহ তা’আলা আরো বলবেন, এমনও তো হতে পারে, যদি আমি তোমাকে তার কাছে পৌছিয়ে দেই, তখন তুমি অন্য আরো কিছু চেয়ে বসবে? তখন সে এই প্রতিশ্রুতি দেবে যে, সে তা ছাড়া আর কিছুই চাবে না। আল্লাহ তা’আলা তাকে অক্ষম মনে করবেন। কেননা তিনি ভালোভাবে অবগত আছেন যে, ঐখানে যাওয়ার পর সে যা কিছু দেখতে পাবে, তাতে সে লোভ সামলাতে পারবে না। পরিশেষে আল্লাহ তা’আলা তাকে তার নিকটবর্তী করে দেবেন।
সে তার ছায়ায় আরাম উপভোগ করবে এবং পানি পান করবে। অতঃপর জান্নাতের দরজার কাছে এমন একটি গাছ প্রকাশ করবেন, যা প্রথম দুটির তুলনায় উত্তম। তা দেখে সে বলবে, হে আমার প্রভু! আমাকে ঐ গাছটির কাছে পৌছিয়ে দিন যাতে আমি তার ছায়া উপভোগ করি এবং তার পানি পান করি। তা ছাড়া আর কিছুই তোমার কাছে চাব না।
তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, হে আদম সন্তান! তুমি কি আমার সাথে এ অঙ্গীকার করনি যে, তোমাকে যা কিছু দেয়া হয়েছে, তুমি তা ছাড়া আর কিছুই চাবে না? সে বলবে, হ্যাঁ, অঙ্গীকার তো করেছিলাম, তবে হে আমার প্রভু! আমার এ আকাঙ্ক্ষাটি পূরণ করে দাও, এরপর আমি আর কিছুই তোমার কাছে চাব না এবং আল্লাহ তা’আলা তাকে অক্ষম জানবেন। কেননা তিনি জানেন, এরপর সে যা কিছু দেখতে পাবে, তাতে সে ধৈর্যধারণ করতে পারবে না। তখন তাকে তার কাছাকাছি করে দেয়া হবে। যখন সে গাছটির কাছে যাবে, জান্নাতবাসীদের শব্দ শুনতে পাবে তখন বলবে, হে আমার প্রভু! আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিন। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, হে আদম সন্তান! আমার কাছে তোমার চাওয়া কখন শেষ হবে? আচ্ছা, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট হবে যে, আমি তোমাকে দুনিয়ার সমপরিমাণ জায়গা এবং তার সাথে অনুরূপ জায়গাও তোমাকে জান্নাতে প্রদান করি? তখন লোকটি বলবে, হে প্রভু! তুমি সমস্ত জাহানের প্রভু হয়েও আমার সাথে ঠাট্টা করছ? এ কথা বলার পর ইবনু মাস্’উদ (রাঃ) হাসলেন। অতঃপর বলেন, তোমরা আমাকে কেন প্রশ্ন করছ না যে, আমার হাসার কারণ কী? তখন তারা প্রশ্ন করলেন, আচ্ছা, বলুন তো আপনি কেন হাসলেন? তিনি বললেন, এভাবে রাসূলুল্লাহ (সা.) হেসেছিলেন।
তখন সাহাবীগণ প্রশ্ন করেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! কিসে আপনাকে হাসালো? উত্তরে তিনি বললেন, যখন ঐ লোকটি বলল, তুমি রাব্বুল আলামীন হয়েও আমার সাথে ঠাট্টা করছ?’ তখন স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা হেসে ফেলবেন, অতঃপর আল্লাহ তা’আলা বলবেন, আমি তোমার সাথে ঠাট্টা করছি না, বরং আমি যা চাই তা করতে সক্ষম। (মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: آخِرُ مَنْ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ رَجُلٌ يَمْشِي مَرَّةً وَيَكْبُو مَرَّةً وَتَسْفَعُهُ النارُ مرّة فإِذا جاؤوها الْتَفَتَ إِلَيْهَا فَقَالَ: تَبَارَكَ الَّذِي نَجَّانِي مِنْكِ لَقَدْ أَعْطَانِي اللَّهُ شَيْئًا مَا أَعْطَاهُ أَحَدًا مِنَ الْأَوَّلِينَ وَالْآخِرِينَ فَتُرْفَعُ لَهُ شَجَرَةٌ فَيَقُولُ: أَيْ رَبِّ أَدْنِنِي مِنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِ فَلْأَسْتَظِلَّ بِظِلِّهَا وَأَشْرَبَ مِنْ مَائِهَا فَيَقُولُ اللَّهُ: يَا ابْنَ آدَمَ لَعَلِّي إِنْ أَعْطَيْتُكَهَا سَأَلْتَنِي غَيْرَهَا؟ فَيَقُولُ: لَا يَا رَبِّ وَيُعَاهِدُهُ أَنْ لَا يَسْأَلَهُ غَيْرَهَا وَرَبُّهُ يَعْذُرُهُ لِأَنَّهُ يَرَى مَا لَا صَبْرَ لَهُ عَلَيْهِ فَيُدْنِيهِ مِنْهَا فَيَسْتَظِلُّ بِظِلِّهَا وَيَشْرَبُ مِنْ مَائِهَا ثُمَّ تُرْفَعُ لَهُ شَجَرَةٌ هِيَ أَحْسَنُ مِنَ الْأُولَى فَيَقُولُ: أَيْ رَبِّ أَدْنِنِي مِنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِ لِأَشْرَبَ مِنْ مَائِهَا وَأَسْتَظِلَّ بِظِلِّهَا لَا أَسْأَلُكَ غَيْرَهَا. فَيَقُولُ: يَا ابْنَ آدَمَ أَلَمْ تُعَاهِدْنِي أَنْ لَا تَسْأَلَنِي غَيْرَهَا؟ فَيَقُولُ: لَعَلِّي إِنْ أَدْنَيْتُكَ مِنْهَا تَسْأَلُنِي غَيْرَهَا؟ فَيُعَاهِدُهُ أَنْ لَا يَسْأَلَهُ غَيْرَهَا وَرَبُّهُ يَعْذُرُهُ لِأَنَّهُ يَرَى مَا لَا صَبْرَ لَهُ عَلَيْهِ فَيُدْنِيهِ مِنْهَا فَيَسْتَظِلُّ بِظِلِّهَا وَيَشْرَبُ مِنْ مَائِهَا ثُمَّ تُرْفَعُ لَهُ شَجَرَةٌ عِنْدَ بَابِ الْجَنَّةِ هِيَ أَحْسَنُ مِنَ الْأُولَيَيْنِ فَيَقُولُ: أَيْ رَبِّ أَدْنِنِي مِنْ هَذِهِ فَلِأَسْتَظِلَّ بِظِلِّهَا وَأَشْرَبَ مِنْ مَائِهَا لَا أَسْأَلُكَ غَيْرَهَا. فَيَقُولُ: يَا ابْنَ آدَمَ أَلَمْ تُعَاهِدْنِي أَنْ لَا تَسْأَلَنِي غَيْرَهَا؟ قَالَ: بَلَى يَا رَبِّ هَذِهِ لَا أَسْأَلُكَ غَيْرَهَا وَرَبُّهُ يَعْذُرُهُ لِأَنَّهُ يَرَى مَا لَا صَبْرَ لَهُ عَلَيْهِ فَيُدْنِيهِ مِنْهَا فَإِذَا أَدْنَاهُ مِنْهَا سَمِعَ أَصْوَاتَ أَهْلِ الْجَنَّةِ فيقولُ: أَي رَبِّ أَدْخِلْنِيهَا فَيَقُولُ: يَا ابْنَ آدَمَ مَا يصريني مِنْك؟ أيرضيك أَن أُعْطِيك الدُّنْيَا وَمِثْلَهَا مَعَهَا. قَالَ: أَيْ رَبِّ أَتَسْتَهْزِئُ مِنِّي وَأَنْتَ رَبُّ الْعَالَمِينَ؟ فَضَحِكَ ابْنُ مَسْعُودٍ فَقَالَ: أَلا تسألونيّ ممَّ أضْحك؟ فَقَالُوا: مِم تضحك؟ فَقَالَ: هَكَذَا ضَحِكَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. فَقَالُوا: مِمَّ تَضْحَكُ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: من ضحك رَبُّ الْعَالَمِينَ؟ فَيَقُولُ: إِنِّي لَا أَسْتَهْزِئُ مِنْكَ وَلَكِنِّي على مَا أَشَاء قدير . رَوَاهُ مُسلم
رواہ مسلم (310 / 187)، (463) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: পূর্বের হাদীসে সর্বশেষ জাহান্নাম থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত এবং সর্বশেষে জান্নাতে প্রবেশকারী ব্যক্তির বিবরণ বর্ণিত হয়েছে। অত্র হাদীসেও সামান্য বর্ণনা পার্থক্যে অনুরূপ ঘটনাই বর্ণিত হয়েছে।
এ লোক জাহান্নামের সীমানা পার হয়ে এসে জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝখানে বসেই আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। সে মনে করবে আল্লাহ তা'আলা আমাকে যা দান করেছেন পূর্বাপর কাউকেই তা দান করেননি।
এ ব্যক্তির নিকট পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন আরামদায়ক বৃক্ষ প্রকাশ করা হবে আর সে তা থেকে ফায়দা নেয়ার আবেদন পেশ করবে। সেটা দেয়া হলে সে যেন আর কিছু না চায় সেই ওয়া'দা ও চুক্তির ভিত্তিতে তাকে দেয়া হবে কিন্তু বান্দা সে ওয়াদা বেমালুম ভুলে আবারও পরবর্তী অধিক সুন্দর ও আরামদায়ক বৃক্ষের নিকট যাওয়ার আবেদন করবে। এভাবে আবেদন করতে করতে একসময় সে জান্নাতেই প্রবেশ করে ফেলবে। আল্লাহ তা'আলা সেই জান্নাতে তার চাহিদার চেয়েও অধিক দান করবেন, এমনকি নিম্নের বর্ণনা মতে দশগুণ বেশি। আল্লাহ তা'আলা এ বান্দার চাওয়া-পাওয়া দেখে হাসবেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ, শারহুন নাবাবী ৩য় খণ্ড, ৪৩ পৃ. হা. ৩১০)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৮৩-[১৮] (সহীহ মুসলিম-এর) অপর এক বর্ণনায় আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। আল্লাহর উক্তি, “হে আদম সন্তান! কবে নাগাদ আমি তোমার চাহিদা থেকে রেহাই পাব? তা থেকে শেষ পর্যন্ত হাদীসের অংশটি তিনি বর্ণনা করেননি। অবশ্য এ কথাগুলো বেশি আছে যে, আল্লাহ তা’আলা তাকে স্মরণ করিয়ে বলবেন, তুমি আমার কাছে এটা চাও, ওটা চাও। সবশেষে যখন তার আকাঙ্ক্ষা ফুরিয়ে যাবে, তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, যাও, তোমার চাহিদানুযায়ী যা তা তো তোমাকে দিলামই এবং অনুরূপ আরো দশগুণ প্রদান করলাম। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: সে জান্নাতে তার ঘরে প্রবেশ করবে এবং সাথে প্রবেশ করবে হুরুল’ঈন (ডাগর নয়নাবিশিষ্ট) থেকে তার দু’জন স্ত্রী। তখন হূরদ্বয় বলবে, সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য যিনি তোমাকে আমাদের জন্য এবং আমাদেরকে তোমার জন্য জীবিত রেখেছেন। তিনি (সা.) এটাও বলেছেন, তখন লোকটি বলবে, আমাকে যা কিছু দেয়া হয়েছে, তা আর কাউকেও দেয়া হয়নি।
الفصل الاول (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَفِي رِوَايَة لَهُ عَن أبي سعيدٍ نَحْوَهُ إِلَّا أَنَّهُ لَمْ يَذْكُرْ فَيَقُولُ: يَا ابْنَ آدَمَ مَا يَصْرِينِي مِنْكَ؟ إِلَى آخِرِ الْحَدِيثِ وَزَادَ فِيهِ: وَيَذْكُرُهُ اللَّهُ: سَلْ كَذَا وَكَذَا حَتَّى إِذَا انْقَطَعَتْ بِهِ الْأَمَانِيُّ قَالَ اللَّهُ: هُوَ لَكَ وَعَشَرَةُ أَمْثَالِهِ قَالَ: ثُمَّ يَدْخُلُ بَيْتَهُ فَتَدْخُلُ عَلَيْهِ زَوْجَتَاهُ مِنَ الْحُورِ الْعِينِ فَيَقُولَانِ: الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَحْيَاكَ لَنَا وَأَحْيَانَا لَكَ. قَالَ: فَيَقُولُ: مَا أَعْطَى أَحَدٌ مثلَ مَا أَعْطَيْت
رواہ مسلم (311 / 188)، (464) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: এ হাদীসের ব্যাখ্যা পূর্বের হাদীসের মতোই। আল্লাহ তা'আলা এই সর্বশেষ জান্নাতে প্রবেশকারীকে জান্নাতের সাধারণ নি'আমাতরাজী দেয়ার পরও নিজের পক্ষ থেকে তাকে জান্নাতের বিভিন্ন নি'আমাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলবেন, এটা চাও ওটাও। এমনকি তার আশা-আকাঙ্ক্ষা ও চাহিদা শেষ হয়ে গেলে আল্লাহ বলবেন, যাও এগুলো তোমার জন্য এর সাথে আরো এর দশগুণ।
এরপর ঐ বান্দা যখন তার বালাখানায় প্রবেশ করবে তখন তাঁর নিকট হুরুল'ঈন থেকে দু’জন স্ত্রী তার কক্ষে প্রবেশ করবে। তারা বলবে, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি আপনাকে আমাদের জন্য জীবিত করেছেন এবং আমাদেরকে আপনার জন্য জীবিত করেছেন।
এখানে জীবিত করার অর্থ সৃষ্টি করা। জীবিত শব্দটি চিরস্থায়ী জান্নাতে রাখার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কেননা আল্লাহ তাদেরকে সেখানে মিলিত করে দিয়েছে যেখানে আর কোন মৃত নেই, আনন্দই শুধু কষ্ট নেই, চিরস্থায়ী জীবন আর আনন্দ। আল্লাহ বলেন, (وَ اِنَّ الدَّارَ الۡاٰخِرَۃَ لَهِیَ الۡحَیَوَانُ...)
“নিশ্চয় আখিরাতের জীবনই প্রকৃত জীবন...।” (সূরা আল আনকাবুত ২৯: ৬৪)
এসব পেয়ে লোকটি বলবে, আমাকে যা দেয়া হলো এ পরিমাণ আর কাউকেই দেয়া হয়নি। এ কথা বলবে সে তার ধারণা অনুসারে, অন্যথায় অন্যকে যে আরো বেশি দেয়া হয়েছে কিন্তু সে সম্পর্কে তার ধারণা এবং অবগতি না থাকায় এ কথা বলবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ, শারহুন নাবাবী ৩য় খণ্ড, ৪৪ পৃ. হা. ৩১১)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৮৪-[১৯] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী (সা.) বলেছেন: কিছু সংখ্যক লোক তাদের কৃত গুনাহের কারণে শাস্তিস্বরূপ জাহান্নামের আগুনে জ্বলে যাবে। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা তাঁর রহমত ও দয়ায় তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। তবে সেখানে তাদেরকে জাহান্নামী বলে ডাকা হবে। (বুখারী)
الفصل الاول (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَن أنس أَن النَّبِي الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لَيُصِيبَنَّ أَقْوَامًا سَفْعٌ مِنَ النَّارِ بِذُنُوبٍ أَصَابُوهَا عُقُوبَةً ثُمَّ يُدْخِلُهُمُ اللَّهُ الْجَنَّةَ بِفَضْلِهِ وَرَحْمَتِهِ فَيُقَالُ لَهُمُ: الجهنميون . رَوَاهُ البُخَارِيّ
رواہ البخاری (6559) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসটি ইতোপূর্বে বর্ণিত শাফা'আত সংক্রান্ত যত হাদীস অতিবাহিত হয়েছে তার সারসংক্ষেপ কথা। গুনাহগার মু'মিনেরা যারা তাদের পাপের কারণে জাহান্নামে পতিত হবে, তারা ঈমান থাকার কারণে সকলেই আল্লাহর অনুগ্রহে এবং রহমতে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে। জাহান্নাম থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত এবং জান্নাত লাভে ধন্য এদেরকে জান্নাতের মধ্যেও জাহান্নামী হিসেবে অভিহিত করা হবে। আল্লামাহ্ ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এ নাম তাদের খাটো করার জন্য নয়, বরং তাদের (অতীতের কথা) স্মরণ করানোর জন্য যাতে তারা খুশি ও আনন্দের পর আরো বেশি আনন্দিত হয়। আর আল্লাহর শাস্তি থেকে মুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সেটা একটি প্রতীক হয়।
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ, ফাতহুল বারী ১১ খণ্ড, ৪৮৪ পৃ., হা. ৬৫৫৯; তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৫১১ পৃ.)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৮৫-[২০] ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: একদল মানুষকে মুহাম্মাদ (সা.) -এর শাফা’আতে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে। অতঃপর তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের নাম রাখা হবে জাহান্নামী। (বুখারী)
অপর এক বর্ণনায় আছে, তিনি (সা.) বলেছেন: আমার উম্মতের একদল লোক আমার সুপারিশে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করবে। তাদেরকে জাহান্নামী নামে ডাকা হবে।
الفصل الاول (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَنْ عِمْرَانَ بْنِ حُصَيْنٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَخْرُجُ أَقْوَامٌ مِنَ النَّارِ بِشَفَاعَةِ مُحَمَّدٍ فَيَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَيُسَمَّوْنَ الْجَهَنَّمِيِّينَ» . رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ وَفِي رِوَايَةٍ: «يَخْرُجُ قَوْمٌ مِنْ أُمَّتِي مِنَ النَّارِ بِشَفَاعَتِي يُسَمَّوْنَ الْجَهَنَّمِيِّينَ»
رواہ البخاری (6566) و الترمذی (2600) ۔
(صَحِيح)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৮৬-[২১] আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জাহান্নাম হতে সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত এবং সর্বশেষে জান্নাতে প্রবেশকারীকে আমি খুব ভালোভাবেই চিনি। সে এমন এক লোক, যে হামাগুড়ি দিয়ে জাহান্নাম থেকে বের হয়ে আসবে। আল্লাহ তা’আলা বলবেন, যাও, তুমি জান্নাতে প্রবেশ কর। তোমাকে জান্নাতে দুনিয়ার সমপরিমাণ এবং তার দশগুণ জায়গা দেয়া হলো। তখন সে বলবে, হে প্রভু! আপনি কি আমার সাথে হাসি-ঠাট্টা করছেন? অথচ আপনি তো (সকল বাদশাহর) বাদশাহ! ইবনু মাস্’উদ (রাঃ) বলেন, আমি দেখলাম, এ কথাটি বলে রাসূলুল্লাহ (সা.) এমনভাবে হাসলেন যে, তার মাড়ির দাত পর্যন্ত প্রকাশ হয়ে পড়ল। আর বলা হয়, এ লোক মর্যাদার দিক দিয়ে হবে জান্নাতীদের সর্বনিম্ন স্তরের। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنِّي لَأَعْلَمُ آخِرَ أَهْلِ النَّارِ خُرُوجًا مِنْهَا وَآخِرَ أَهْلِ الْجَنَّةِ دُخُولًا رَجُلٌ يَخْرُجُ مِنَ النَّارِ حَبْوًا. فَيَقُولُ اللَّهُ: اذْهَبْ فَادْخُلِ الْجَنَّةَ فَإِنَّ لَكَ مِثْلَ الدُّنْيَا وَعَشَرَةَ أَمْثَالِهَا. فَيَقُولُ: أَتَسْخَرُ مِنِّي - أَوْ تَضْحَكُ مِنِّي - وَأَنْتَ الْمَلِكُ؟ وَلَقَدْ رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ضَحِكَ حَتَّى بَدَتْ نَوَاجِذُهُ وَكَانَ يُقَالُ: ذَلِكَ أَدْنَى أَهْلِ الْجَنَّةِ مَنْزِلَةً. مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (6571) و مسلم (308 / 186)، (461) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: সর্বশেষে যাকে জান্নাতে দেয়া হবে সে ধারণা করবে যে, জান্নাত মনে হয় ভরে গেছে। এটা আল্লাহ তা'আলার দেয়া জান্নাতের বর্ণনা বা আকৃতি অনুসারে বলবে। সে বলবে, হে আল্লাহ! আমি তো জান্নাত পরিপূর্ণ পেলাম! অর্থাৎ আমার জন্য সেখানে কোন জায়গা নেই, আমি কোথায় যাব? আল্লাহ তা'আলা তখন তাকে বলবেন, তুমি যাও জান্নাতে প্রবেশ কর। তুমি জান্নাতে প্রবেশ কর, এখানে ‘জান্নাত’ দ্বারা জিনস্ উদ্দেশ্য অথবা খাস জান্নাত। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলবেন, তোমার জন্য দুনিয়া সমপরিমাণ প্রশস্ত অথবা মূল্যমান জান্নাত দেয়া হলো সাথে আরো তার দশগুণ। এতে আল্লাহ তা'আলার ঐ বাণীর দিকে ইশারা রয়েছে যেখানে ইরশাদ হয়েছে:
(مَنۡ جَآءَ بِالۡحَسَنَۃِ فَلَهٗ عَشۡرُ اَمۡثَالِهَا...) “যে নেক কাজ করবে তার জন্য দশগুণ সাওয়াব রয়েছে...।” (সূরাহ আল আ'আম ৬ : ১৬০)
মু'মিন যখন দুনিয়া বর্জন করে তখন সে আর অধিকারের ক্ষেত্রে একপ্রকার অবরুদ্ধ ও বন্দি হয়ে যায়। অতএব তখন তাকে ইনসাফের ভিত্তিতে তার সমপরিমাণ প্রতিদান দেয়া হয় তার আল্লাহ তা'আলা স্বীয় অনুগ্রহে তা কয়েকগুণে বৃদ্ধি করেন।
এসব কথা শুনে বান্দা সহজে তা বিশ্বাস করতে চাইবে না, ফলে সে আল্লাহ তা'আলাকে বলবে, হে আল্লাহ! তুমি ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডলের মালিক, পূতঃপবিত্র, তুমি আমার সাথে হাসি-ঠাট্টা করছ?
হাদীসের বাক্যে (أَتَسْخَرُ مِنِّي - أَوْ تَضْحَكُ مِنِّي - وَأَنْتَ الْمَلِكُ؟) এখানে (أَوْ) হলো রাবীর সন্দেহ। অর্থাৎ জান্নাতে প্রবেশমুখী লোকটি (أَتَسْخَرُنِىْ) বলবে না, (أَتَضْحَكُ نِىْ) বলবে, এটা রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে সঠিক স্মরণ নেই। যদি (أَتَضْحَكُ نِىْ) শব্দটিই বাস্তবে হয়ে থাকে তাহলে সেটা (أَتَسْخَرُنِىْ) এর অর্থই প্রদান করবে। কেননা (ساخر) বা উপহাসকারী যাকে নিয়ে উপহাস করে তাকে দেখে হাসে, তাই (ضحك) হাসিকে রূপকার্থে ঠাট্টার স্থানে আনা হয়েছে।
(أَتَسْخَرُنِىْ) “তুমি আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করছ’, এ কথার অর্থ নিয়ে কয়েকটি মত রয়েছে।
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ, ফাতহুল বারী ১১শ খণ্ড, ৫০১ পৃ. হা. ৬৫৭১; শারহুন নাবাবী ৩য় খণ্ড, হা, ৩০৮; তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৫০৬ পৃ.)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৮৭-[২২] আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আমি এমন এক লোক সম্পর্কে অবহিত আছি, যে জান্নাতীদের মধ্যে সর্বশেষ জান্নাতে প্রবেশকারী ব্যক্তি এবং সর্বশেষ জাহান্নামী, যে তা থেকে বের হয়ে আসবে। কিয়ামতের দিন তাকে আল্লাহ তা’আলার সামনে উপস্থিত করা হবে। তখন মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাদের)-কে বলা হবে, তার ছোট ছোট গুনাহসমূহ তার সামনে উপস্থিত কর এবং বড় বড় গুনাহগুলো সরিয়ে রাখ। তখন তার ছোট ছোট গুনাহগুলোই তার সামনে উপস্থিত করা হবে। তখন তাকে প্রশ্ন করা হবে, আচ্ছা বল তো অমুক অমুক দিন অমুক অমুক কাজটি তুমি করেছিলে? সে বলবে, হ্যা করেছি। মূলত তা সে অস্বীকার করতে পারবে না। তবে বড় বড় গুনাহসমূহ উপস্থিত করা সম্পর্কে সে অত্যন্ত ভীত-সন্ত্রস্ত থাকবে। তখন তাকে বলা হবে, যাও! তোমার প্রতিটি গুনাহের স্থলে তোমাকে এক একটি পুণ্য দেয়া হলো। তখন সে বলবে, হে আমার প্রভু! আমি তো এমন কিছু (বড় বড়) গুনাহও করেছিলাম, যেগুলাকে আমি এখানে দেখতে পাচ্ছি না। বর্ণনাকারী আবূ যার (রাঃ) বলেন, এ সময় আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) - কে এমনভাবে হাসতে দেখেছি যে, তাঁর মাড়ির দাঁত পর্যন্ত প্রকাশ হয়ে পড়েছে। (মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنِّي لَأَعْلَمُ آخِرَ أَهْلِ الْجَنَّةِ دُخُولًا الْجَنَّةَ وَآخِرَ أَهْلِ النَّارِ خُرُوجًا مِنْهَا رَجُلٌ يُؤْتَى بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيُقَالُ: اعْرِضُوا عَلَيْهِ صِغَارَ ذُنُوبِهِ وَارْفَعُوا عَنْهُ كِبَارهَا فتعرض عَلَيْهِ صغَار ذنُوبه وفيقال: عملت يَوْم كَذَا وَكَذَا وَكَذَا وَكَذَا وَعَمِلْتَ يَوْمَ كَذَا وَكَذَا كَذَا وَكَذَا؟ فَيَقُولُ: نَعَمْ. لَا يَسْتَطِيعُ أَنْ يُنْكِرَ وَهُوَ مُشْفِقٌ مِنْ كِبَارِ ذُنُوبِهِ أَنْ تُعْرَضَ عَلَيْهِ. فَيُقَالُ لَهُ فَإِنَّ لَكَ مَكَانَ كُلِّ سَيِّئَةٍ حَسَنَةً. فَيَقُولُ: رَبِّ قَدْ عَمِلْتُ أَشْيَاءَ لَا أَرَاهَا هَهُنَا وَقَدْ رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ضَحِكَ حَتَّى بَدَتْ نَوَاجِذُهُ. رَوَاهُ مُسْلِمٌ
رواہ مسلم (314 / 190)، (467) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: ইতোপূর্বের হাদীসগুলোতে জাহান্নাম থেকে সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত এবং সর্বশেষে জান্নাতে প্রবেশকারী ব্যক্তির কিছু কর্মকাণ্ডের কথা পেয়েছি।
অত্র হাদীসে তার আরো কিছু কর্মকাণ্ডের কথা বিবৃত হয়েছে। তাকে জাহান্নাম থেকে উঠানোর পর আল্লাহ তা'আলা মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাদের) বলবেন- এ লোকের ছোট ছোট গুনাহগুলো এর সামনে পেশ কর এবং বড় বড় গুনাহগুলো সরিয়ে রাখ। সরিয়ে রাখার অর্থ ক্ষমার মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা অথবা আড়াল করে রাখা। মালায়িকাহ্ যখন ছোট ছোট গুনাহগুলো তার সামনে উপস্থিত করবেন তখন আল্লাহ তা'আলা সবগুলো দৃশ্যমান পাপের দিকে ইশারা করে বলবেন, তুমি অমুক দিন এই এই কাজ করেছিলে? এ পাপগুলো ছিল ‘ইবাদত তরক করা এবং নিষিদ্ধ কার্যসমূহ সম্পাদন করা। পাপের প্রত্যক্ষ নমুনা দেখে সে ঐগুলোর কোনটিই অস্বীকার করতে পারবে না। তার যে কবীরাহ গুনাহগুলো রয়েছে সেগুলো প্রকাশ করলে তার কি হবে এই ভয়ে সে আরো শঙ্কিত ও ভীত হয়ে যাবে। কেননা অধিকাংশ ‘আযাব এবং অধিক ‘আযাব হবে কবীরা গুনাহের কারণে।
অতঃপর তার সামনে উপস্থাপিত সগীরা গুনাহগুলোর দিকে ইশারা করে তাকে বলা হবে তোমার প্রতিটি গুনাহের পরিবর্তে একটি করে হাসানাহ বা নেকী দেয়া হলো। গুনাহের পরিবর্তে এ হাসানাহ হয়তো তার তওবার কারণে, যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, “তবে যে তওবাহ্ করবে এবং ঈমান আনবে আর নেক আমল করবে তারা হলো এমন যে আল্লাহ তা'আলা তাদের পাপগুলোকে নেকীতে পরিণত করে দিবেন।” (সূরা আর ফুরকান ২৫: ৭০)
প্রশ্ন আসে যে তওবার কারণেই যদি তার গুনাহ মাফ হয়ে থাকে তবে জাহান্নামের শাস্তি কেন? উত্তর তওবার পর পুনরায় যে গুনাহ করেছিল সেটাই শাস্তির কারণ হয়েছিল। যা হোক সুযোগ দেখে সে তার কবীরা গুনাহগুলোর প্রতি ইশারা করে বলবে, আমি তো জানি আমার আরো অনেক পাপ রয়েছে কিন্তু সেগুলোকে এখানে দেখতে পাচ্ছি না? তার এ সুযোগ গ্রহণের এ কথা বলতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) হাসলেন। সর্বোপারি সে আল্লাহর বিশেষ রহমতে জাহান্নাম থেকে মুক্তিলাভ করে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৮৮-[২৩] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জাহান্নাম থেকে চার লোককে বের করে আল্লাহ তা’আলার সামনে উপস্থিত করা হবে। অতঃপর তাদেরকে আবার জাহান্নামে পাঠানোর জন্য নির্দেশ করা হবে। তখন তাদের একজন পিছন ফিরে তাকিয়ে বলবে, হে প্রভু! আমি তো এ আশায় ছিলাম যে, যখন তুমি একবার আমাকে তা থেকে বের করে এনেছ, পুনরায় আমাকে সেখানে ফেরত পাঠাবে না। তখন আল্লাহ তা’আলা তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে দেবেন। (মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَنْ أَنَسٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: يَخْرُجُ مِنَ النَّارِ أَرْبَعَةٌ فَيُعْرَضُونَ عَلَى اللَّهِ ثُمَّ يُؤْمَرُ بِهِمْ إِلَى النَّارِ فَيَلْتَفِتُ أَحَدُهُمْ فَيَقُولُ: أَيْ رَبِّ؟ لَقَدْ كنتُ أَرْجُو إِذا أَخْرَجْتَنِي مِنْهَا أَنْ لَا تُعِيدَنِي فِيهَا قَالَ: «فينجيه الله مِنْهَا» . رَوَاهُ مُسلم
رواہ مسلم (321 / 192)، (474) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: ইবনুল মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, যাদেরকে সর্বশেষে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে এরা তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।
‘আল্লামাহ্ ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আল্লাহই ভালো জানেন, সম্ভবত এই বের হওয়াটা জাহান্নামে ঢোকা মাত্র কিনা? যাতে তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করানো হয়েছিল এটা নাম হয় অথবা জাহান্নামের উপর দিয়ে স্থাপিত পুলসিরাত যা অতিক্রম করতেই হবে। যেমন আল্লাহর বাণী,
(وَ اِنۡ مِّنۡکُمۡ اِلَّا وَارِدُهَا ۚ کَانَ عَلٰی رَبِّکَ حَتۡمًا مَّقۡضِیًّا) “আর তোমাদের মধ্যে এমন কেউই নেই তা অতিক্রম করবে না আর এটা তোমার রবের অনিবার্য নির্দেশ যা সম্পন্ন হবে।” (সূরা মারইয়াম ১৯ : ৭১)
কেউ কেউ বলেছেন এখানে (اَلْوُرُوْدُ) এর অর্থ অতিক্রম নয় বরং তাতে প্রবেশ করা অর্থাৎ জাহান্নামে প্রবেশ করা। প্রত্যেককেই জাহান্নামের উপর দিয়ে স্থাপিত পুলসিরাত পাড়ি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে হবে। কাফির মুশরিক ও গুনাহগার ব্যক্তিরা তা পাড়ি দিতে গিয়ে কেটে টুকরা টুকরা হয়ে জাহান্নামে নিপতিত হবে, কিন্তু মুমিনেরা শুধু জাহান্নাম দেখেই অথবা সামান্য তাপ পেয়েই তা পাড়ি দিয়ে চলে যাবে অথবা তাদের জন্য তা নিভে যাবে, ফলে সে ঐ জাহান্নাম পাড়ি দিয়ে চলে যাবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)।
আল্লাহ তা'আলা তার বিশেষ অনুগ্রহে এ ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিবেন।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৮৯-[২৪] আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ঈমানদারদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝামাঝি একটি পুলের উপর আটক রাখা হবে এবং দুনিয়াতে পরস্পর পরস্পরে যা অন্যায়-অবিচার হয়েছিল তার প্রতিশোধ নেয়া হবে। সবশেষে যখন তারা পবিত্র এবং পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে, তখন তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে। ঐ সত্তার শপথ! যার হাতে আমি মুহাম্মাদের প্রাণ! মু’মিনদের প্রত্যেকে পৃথিবীতে তার নিজ বাড়িকে যেমনিভাবে চিনত, তার তুলনায় সে জান্নাতে তার স্থান ভালোরূপে চিনতে পারবে। (বুখারী)
الفصل الاول (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَخْلُصُ الْمُؤْمِنُونَ مِنَ النَّارِ فَيُحْبَسُونَ عَلَى قَنْطَرَةٍ بَيْنَ الْجَنَّةِ وَالنَّارِ فَيُقْتَصُّ لِبَعْضِهِمْ مِنْ بَعْضٍ مَظَالِمُ كَانَتْ بَيْنَهُمْ فِي الدُّنْيَا حَتَّى إِذَا هُذِّبُوا وَنُقُّوا أُذِنَ لَهُمْ فِي دُخُولِ الْجَنَّةِ فَوَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَأَحَدُهُمْ أَهْدَى بِمَنْزِلِهِ فِي الْجَنَّةِ مِنْهُ بِمَنْزِلِهِ كَانَ لَهُ فِي الدُّنْيَا» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
رواہ البخاری (2440) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (يَخْلُصُ الْمُؤْمِنُونَ مِنَ النَّارِ) মু'মিনদের জাহান্নাম থেকে বের করা হবে বা মুক্ত করা হবে, এখানে (يُخْلَصُ) শব্দটিকে ‘মাজহুল' বা কর্মবাচ্য হিসেবে (باب افعال) এর (الاخلاص) ক্রিয়ামূল থেকে পাঠযোগ্য। কোন কোন সংস্করণে (باب تفعيل) থেকে তাশদীদযোগে পঠিত হয়েছে। আবার কোনটিতে (يَخْلُصُ) ‘ইয়া বর্ণে যবর, এবং ‘লাম' বর্ণে পেশযোগে (ثلاثيات) থেকে পঠিত হয়েছে।
নিহায়াহ্ গ্রন্থে (خلص) এর অর্থ (سَلِمَ وَنَجَا) ‘নিরাপদ হয়েছে-‘মুক্ত হয়েছে উল্লেখ হয়েছে।
(القَنْطَرَة) শব্দের অর্থ সেতু বা ব্রীজ, এখানে জাহান্নামের উপরে প্রসারিত পুলসিরাতকে বুঝানো হয়েছে অথবা জান্নাত এবং জাহান্নামের মাঝখানে একটি উঁচু জায়গা আ'রাফও হতে পারে। এখানে আল্লাহ তা'আলা মুমিনদের পরস্পরের যুলুমের প্রতিকার গ্রহণ করে তাদের এতদসংক্রান্ত হক্কুল ইবাদের দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত এবং পবিত্র করবেন। কাফিরদের জন্য এ বিধান প্রযোজ্য নয় কারণ তারা চিরস্থায়ী জাহান্নামী। রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর বাণী: (لَأَحَدُهُمْ أَهْدَى بِمَنْزلِهِ) “তাদের প্রত্যেকেই জান্নাতে তাদের ঘর অধিক চিনতে পারবে।” এ বাক্যের মধ্যে (بِمَنْزلِهِ) এর ‘বা’ অব্যয়টি (الى) এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এখন বাক্যটি হয়েছে, (لَأَحَدُهُم أَعْرَفُ وَأَكْشَرُهِدَايَةً إِلَى مَنْزِلِهِ) তারা প্রত্যেকেই তাদের জান্নাতের অবস্থানস্থলের দিকে অধিক পথপ্রাপ্ত ও পরিচয়প্রাপ্ত হবে।
‘আল্লামাহ্ ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, (هُدًى) শব্দটি (ب) দ্বারা স্বকর্মক হয় না বরং (ل) অথবা (الى) দ্বারা হয়। (ب) এর মধ্যে ইলসাক তথা সম্পৃক্ততার অর্থ বিদ্যমান। অতএব এর অর্থ হবে, সে জান্নাতে তার অবস্থানস্থলকে চেনার ক্ষেত্রে অধিক অগ্রণী হবে। এ অর্থে আল্লাহর বাণী: (.. یَهۡدِیۡهِمۡ رَبُّهُمۡ بِاِیۡمَانِهِمۡ ۚ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِهِمُ الۡاَنۡهٰرُ..) “...তাদের রব তাদের ঈমানের কারণে তাদের লক্ষস্থলে অর্থাৎ জান্নাতে পৌছাবেন যার তলদেশ দিয়ে নহরসমূহ প্রবাহিত হবে...।” (সূরা ইউনুস ১০: ৯)।
মুল্লা আলী ক্বারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, অর্থাৎ তাদের ঈমানের নূরের কারণে আখিরাতে তাদের জান্নাতের পথে পরিচালিত করবেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৯০-[২৫] আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: কোন লোকই জান্নাতে প্রবেশ করবে না যে অবধি না অপরাধ করলে জাহান্নামে তার যে স্থান হত, তা তাকে দেখানো হয়, যাতে সে অধিক কৃতজ্ঞ হয়। আর কোন জাহান্নামীকে জাহান্নামে প্রবেশ করানো হবে না যে পর্যন্ত ভালো কাজ করলে জান্নাতে তার যে স্থান হত, তা তাকে দেখানো না হয়, যেন তার আফসোস ও অনুশোচনা বৃদ্ধি পায়। (বুখারী)
الفصل الاول (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَدْخُلُ أَحَدٌ الْجَنَّةَ إِلَّا أُرِيَ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ لَوْ أَسَاءَ لِيَزْدَادَ شُكْرًا وَلَا يَدْخُلُ النَّارَ أَحَدٌ إِلَّا أُرِيَ مَقْعَدَهُ مِنَ الْجَنَّةِ لَوْ أَحْسَنَ ليَكُون عَلَيْهِ حسرة» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
رواہ البخاری (6569) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: যে কেউই জান্নাতে অথবা জাহান্নামে প্রবেশ করুক না কেন তাকে তার বিপরীত কর্মের প্রতিফল হিসেবে সম্ভাবনাযুক্ত বিপরীত অবস্থানটিও দেখানো হবে। অর্থাৎ জান্নাতী ব্যক্তিকে খারাপ আমল করলে জাহান্নামে কোথায় তার ঠিকানা হত তা দেখানো হবে, অনুরূপ জাহান্নামী ব্যক্তি যদি ভালো আমল করত তাহলে জান্নাতে তার কোথায় ঠিকানা হত তাকে তা দেখানো হবে।
এই দেখানো কখন হবে? ইবনু মাজাহ প্রমুখাৎ বিশুদ্ধ সনদে আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন, এটা কবরে সওয়াল জওয়াবকালে দেখানো হবে। কবর থেকে জাহান্নামের দিকে সুড়ঙ্গ সৃষ্টি করা হবে এবং সে ঐ সুড়ঙ্গ দিয়ে জাহান্নাম অথবা জান্নাতের ঠিকানা দেখবে। এটা মু'মিনকে দেখানো হবে এজন্যে যে, মুমিন যেন অধিক হারে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে পারে আর কাফির মুশরিক অথবা পাপীদের জন্য অধিক লজ্জা ও আফসোসের কারণ হয়। আর হাদীসের প্রকাশ্য অর্থ দ্বারা বুঝা যায় যে, এই দেখানো হাশরে হবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ, ফাতহুল বারী ১১ খণ্ড, ৫০০ পৃ., হা. ৬৫৬৯)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৯১-[২৬] ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: যখন জান্নাতবাসীগণ জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে, তখন মৃত্যুকে জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝামাঝি স্থানে উপস্থিত করা হবে এবং তাকে যাবাহ করে দেয়া হবে। অতঃপর একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করবে, হে জান্নাতবাসীগণ! (এখানে কোন) মৃত্যু আর নেই। হে জাহান্নামীরা! মৃত্যু আর নেই। তাতে জান্নাতীদের আনন্দের উপর আনন্দ আরো অধিক মাত্রায় বৃদ্ধি পাবে, অপরদিকে জাহান্নামীদের দুশ্চিন্তার উপর আরো দুশ্চিন্তা বৃদ্ধি পাবে। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِذَا صَارَ أَهْلُ الْجَنَّةِ إِلَى الْجَنَّةِ وَأَهْلُ النَّارِ إِلَى النَّارِ جِيءَ بِالْمَوْتِ حَتَّى يُجْعَلَ بَيْنَ الْجَنَّةِ وَالنَّارِ ثُمَّ يُذْبَحَ ثُمَّ يُنَادِي مُنَادٍ: يَا أَهْلَ الْجَنَّةِ لَا مَوْتَ وَيَا أَهْلَ النَّارِ لَا مَوْتَ. فَيَزْدَادُ أَهْلُ الْجَنَّةِ فَرَحًا إِلَى فَرَحِهِمْ وَيَزْدَادُ أَهْلُ النَّارِ حُزْنًا إِلَى حزنهمْ . مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (6548) و مسلم (2850)، (7184) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: জান্নাতীগণ জান্নাতে এবং জাহান্নামীগণ জাহান্নামে যাওয়া শেষ হলে জাহান্নামের মাঝখানে একটি উঁচু জায়গায় (সম্ভবত আ'রাফ নামক স্থানে, তিরমিযীতে আবূ হুরায়রার বর্ণনায় জান্নাত এবং জাহান্নামের মাঝের উঁচু দেয়ালের উপর) মৃত্যুকে একটি সাদা-কালো দুম্বার আকৃতিতে উপস্থিত করে যাবাহ করা হবে। কে এই যাবাহ করবে হাদীসের তার নাম উল্লেখ নেই। ইমাম কুরতুবী (রহিমাহুল্লাহ) কতিপয় সূফী থেকে নকল করেছেন যে, নবী মুহম্মদ (সা.) -এর উপস্থিতিতে ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়্যা আলায়হিস সালাম মৃত্যু নামক দুম্বাটি যাবাহ করবেন। কোন কোন লেখনীতে জিবরীল (আঃ)-এর নাম উল্লেখ আছে।
যাবাহর পর একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দিবেন, হে জান্নাতবাসী! আর মৃত্যু নেই, হে জাহান্নামবাসী! আর মৃত্যু নেই। এ ঘোষণাকারী কে হবে তার নাম উল্লেখ নেই।
অত্র হাদীস থেকে জানা যায় যে, যাবাহের পর ঘোষণা হবে, কিন্তু আবূ সাঈদ (রাঃ)-এর হাদীসের দ্বারা বুঝা যায় যাবাহের পূর্বেই একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দিবেন। আল্লামাহ্ ইবনু হাজার আসকালানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, দ্বিবিধ বর্ণনায় কোন বৈপরীত্য নেই। কেননা ঘোষণা দুটিই হবে, প্রথম ঘোষণা যাবাহের পূর্বে যেন সকলে যাবাহ পরিদর্শন করে তারই সতর্কীকরণ আর দ্বিতীয় ঘোষণা হলো ‘মৃত্যু আর ফিরে আসবে না’ তারই অবহিতি ও সতর্কীকরণ।
মৃত্যুকে প্রাণীর আকৃতি দান করে সকলের সামনে যাবাহ করা এজন্য যে, জান্নাতীদের আনন্দ ও খুশির সাথে যেন খুশি আরো বেড়ে যায় আর জাহান্নামীদের দুঃখ, দুশ্চিন্তা এবং হতাশা যেন আরো বেড়ে যায়। জামি আত্ তিরমিযীতে আবূ সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, কেউ যদি আনন্দের কারণে মারা যেত তাহলে জান্নাতীগণ এই ঘোষণা শুনে আনন্দে মারা যেত, আর কেউ যদি দুঃখ-দুশ্চিন্তায় মারা যেত তাহলে জাহান্নামীরা এই ঘোষণা শুনে দুঃখে-দুশ্চিন্তায় মারা যেত।
ইবনু মাজাহ ও সহীহ ইবনু হিব্বান গ্রন্থে আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, মৃত্যুকে পুলসিরাতের উপর উপস্থিত করে জান্নাতীদের ডাক দিয়ে যখন বলা হবে, হে জান্নাতীগণ! তখন জান্নাতীরা সেদিকে মাথা তুলে তাকাবে এবং ভীত হয়ে পড়বে যে তাদের মনে হয় এই চির সুখের আশ্রয় জান্নাত থেকে বের করে দেয়া হবে! অতঃপর যখন বলা হবে হে জাহান্নামীরা! তখন জাহান্নামবাসীরা আনন্দিত হয়ে যাবে যে, তাদের বুঝি এই জাহান্নাম থেকে বের করা হবে। কিন্তু তাদের উভয়কে বলা হবে তোমরা উভয় দলই যেখানে রয়েছ তা চিরস্থায়ী এখানে তোমাদের আর কখনো মৃত্যু হবে না। (মিরকাতুল মাফাতীহ, ফাতহুল বারী ১১শ খণ্ড, ৪৭১ পৃ., হা. ৬৫৪৮)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৯২-[২৭] সাওবান (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: আমার হাওয ’আদান থেকে বালকা’র ’উম্মানের মধ্যবর্তী দূরত্ব পরিমাণ হবে। তার পানি দুগ্ধ অপেক্ষা সাদা ও মধুর চেয়ে মিষ্টি এবং তার পানপাত্রের সংখ্যা আকাশের নক্ষত্রের মতো অগণিত। যে তা থেকে এক ঢোক পান করবে, সে আর কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না। উক্ত হাওযের কাছে সর্বপ্রথম ঐ সকল গরীব মুহাজিরীনগণ আসবে, যাদের মাথার চুল অগোছালো, পরনের কাপড়-চোপড় ময়লা, সম্ভ্রান্ত পরিবারের মহিলাগণকে যাদের সাথে বিবাহ দেয়া হয় না এবং তাদের জন্য (গৃহের) দরজা খোলা হয় না। [আহমাদ, তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ এবং ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, হাদীসটি গরীব]
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
عَن ثَوْبَانَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «حَوْضِي مِنْ عَدَنٍ إِلَى عُمَّانَ الْبَلْقَاءِ مَاؤُهُ أَشَدُّ بَيَاضًا مِنَ اللَّبَنِ وَأَحْلَى مِنَ الْعَسَلِ وَأَكْوَابُهُ عَدَدُ نُجُومِ السَّمَاءِ مَنْ شَرِبَ مِنْهُ شَرْبَةً لَمْ يَظْمَأْ بَعْدَهَا أَبَدًا أَوَّلُ النَّاسِ وُروداً فقراءُ المهاجرينَ الشُّعثُ رؤوساً الدُّنْسُ ثِيَابًا الَّذِينَ لَا يَنْكِحُونَ الْمُتَنَعِّمَاتِ وَلَا يُفْتَحُ لَهُمُ السُّدَدُ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ. وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ
سندہ ضعیف ، رواہ احمد (5 / 275 ح 22725) و الترمذی (2444) و ابن ماجہ (4303) * السند منقطع ، العباس بن سالم لم یسمعہ من ابی سلام ، انظر سنن ابن ماجہ (4303) و احادیث مسلم (2301)، (5990) و ابن حبان (الموارد : 2601) وغیرھما تغنی عنہ
ব্যাখ্যা: কিয়ামতের দিন প্রত্যেক নবীর একটা করে হাওয হবে। অত্র হাদীসে নবী (সা.) -এর হাওযের পরিধি ও অন্যান্য কতিপয় গুণাবলি বর্ণিত হয়েছে। নবী (সা.) বলেছেন, আমার হাওয এডেন (আদন) থেকে বালকার আম্মান-এর মধ্যবর্তী দূরত্ব পরিমাণ হবে। ‘আদন (এডেন) হলো ইয়ামানের সীমান্তে ভারত সাগর সংলগ্ন একটি স্থান। আম্মান হলো সিরিয়ার বালকা শহরের একটি স্থান। এখানে হাওযে কাওসারের প্রশস্ততা চিহ্নিত করার জন্য দু'টি স্থানের কথা বলা হয়েছে। অন্য হাদীসে, আয়লাহ্ থেকে সন্’আ পর্যন্ত। আবার হারিসার হাদীসে সন্'আ থেকে মদীনার দূরত্বের কথা বলা হয়েছে। বিভিন্ন বর্ণনার দ্বারা কেবল হাওযে কাওসারের দীর্ঘতা অথবা প্রশস্ততা বুঝানোই উদ্দেশ্য, হুবহু সীমা বর্ণনা উদ্দেশ্য নয়। আল্লাহর রাসূল প্রত্যেক ব্যক্তিকে সহজভাবে বুঝানোর জন্য তার পরিচিত জায়গার নাম উচ্চারণ করেছেন।
হাদীসের বাণী, “তার পানি দুধের চেয়েও অধিক সাদা” এতে ইশারা রয়েছে যে, সাদা সবচেয়ে পছন্দনীয় রং। অবশ্য কেউ কেউ স্বভাবগতভাবে হলুদকে প্রিয় মনে করে থাকে।
‘তা মধুর চেয়েও মিষ্টি, এর অর্থ মধুর চেয়েও সুস্বাদু। এছাড়াও এতে রয়েছে বান্দার জন্য আরোগ্য বিধান।
‘তার পানপাত্রসমূহ আকাশের নক্ষত্রসম', এ বাক্যে (أَكْوَابُ) শব্দটি (كُوْبٌ)-এর বহুবচন, অর্থ পেয়ালা, গ্লাস, পানপাত্র। এটা এমন হবে যার কোন হাতল এবং নল হবে না।
উম্মতে মুহাম্মাদী (সা.) - (সুন্নাতের অনুসারীরা) নবীজীর হাতে এখান থেকে এক পেয়ালা করে পানি পান করবে। যে এক পেয়ালা পান করবে সে জান্নাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আর পিপাসার্ত হবে না।
এ পানি পানকারীদের মর্যাদার স্তর হবে। সর্বপ্রথম স্তরের পানকারী হবে ঐ গরীব মুহাজির সাহাবীগণ যাদের চুলগুলো ছিল এলোমেলো উষ্কখুশকো, পরনে ছিল ময়লাযুক্ত পুরাতন ও ছিন্ন বস্ত্র, হতদরিদ্রতার কারণে কোন সম্পদশালী সম্ভ্রান্ত লোক তাদের কাছে মেয়ে বিয়ে দিতে চাইত না, তারা কোন বাড়ীতে গিয়ে ডাক দিলে তাদের জন্য বন্ধ দরজাও খোলা হত না। এরা সর্বপ্রথম হাওযে কাওসারের পানি এজন্য পান করবে যে, তারাই হলো বাহ্যিক এবং আত্মিকভাবে প্রকৃত পিপাসিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে যারা দুনিয়াতে অধিক ক্ষুধার্ত থাকবে আখিরাতে তারাই হবে অধিক পরিতৃপ্ত। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
(کُلُوۡا وَ اشۡرَبُوۡا هَنِیۡٓـئًۢا بِمَاۤ اَسۡلَفۡتُمۡ فِی الۡاَیَّامِ الۡخَالِیَۃِ)
“(নির্দেশ হবে যে,) তোমরা সানন্দে খাও এবং পান কর ঐ সমস্ত কাজের বিনিময়ে যা তোমরা বিগত দিনে প্রতিদানের আশায় করেছিলে।” (সূরা আল হাককাহ্ ৬৯: ২৪)।
মুহাজির হলো যারা মক্কাহ্ থেকে মদীনায় হিজরত করেছিলেন। হাদীসে বর্ণিত মুহাজির দ্বারা উদ্দেশ্য তারাই, যদিও বাড়ী-ঘর বা মাতৃভূমি থেকে যারাই হিজরত করেছে তারাই মুহাজির নামের অন্তর্ভুক্ত। মুহাজিরগণ আল্লাহর জন্য স্বীয় আবাসভূমি ত্যাগ করেছেন, প্রাচুর্যতার উপর দারিদ্রতাকে বেছে নিয়েছেন, প্রসিদ্ধির চেয়ে নিজের দুর্বলতাকে, সম্মান-খ্যাতি ও ধন-সম্পদ আহরণের চেয়ে দুনিয়াবিরাগীকে পছন্দ করে নিয়েছেন আর আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষে “ইলম ও ‘আমলেই নিমগ্ন থেকেছেন। ফলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা পুরস্কারকে অগ্রণী করবেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ, তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খণ্ড, হা, ২৪৪৪)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৯৩-[২৮] যায়দ ইবনু আরকম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর সাথে কোন এক সফরে ছিলাম। এক মনযিলে আমরা অবস্থান করলাম। তখন তিনি (সা.) উপস্থিত লোকেদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, হাওযে কাওসারে যে সকল লোক উপস্থিত হবে, তোমাদের সংখ্যা তাদের লক্ষ ভাগের এক ভাগও নয়। লোকেরা যায়দ ইবনু আরকাম (রাঃ)-কে প্রশ্ন করল, সেদিন আপনাদের সংখ্যা কত ছিল? তিনি বললেন, সাতশত অথবা আটশত। (আবূ দাউদ)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَنْ زَيْدِ بْنِ أَرْقَمَ قَالَ: كُنَّا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَنَزَلْنَا منزلا فَقَالَ: «مَا أَنْتُمْ جُزْءٌ مِنْ مِائَةِ أَلْفِ جُزْءٍ مِمَّنْ يَرِدُ عَلَى الْحَوْضِ» . قِيلَ: كَمْ كُنْتُمْ يَوْمَئِذٍ؟ قَالَ: سَبْعَمِائَةٍ أَوْ ثَمَانِمِائَةٍ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
اسنادہ صحیح ، رواہ ابوداؤد (4746) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসে কোন্ সফরের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে তা উল্লেখ নেই। এ সফরের প্রত্যেকেই সাহাবী ছিলেন এবং তাদের সংখ্যা ছিল সাত থেকে আটশত। এরা কিয়ামতের দিন সবাই রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর নিকট হাওযে কাওসারের পাড়ে উপনীত হবেন। এ কয়জন সাহাবী হাওযের পাড়ে উপনীত জনসংখ্যার লক্ষ ভাগের একভাগও নয়। এখানে নির্দিষ্ট সংখ্যা উদ্দেশ্য নয়, বরং আধিক্যতাই উদ্দেশ্য। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সা.) - এর বেশি উম্মত হাওযের পানি পান করবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ, 'আওনুল মা'বুদ ৮ম খণ্ড, ১৪৮ পৃ., হা, ৪৭৩৩)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৯৪-[২৯] সামুরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতে প্রত্যেক নবীর এক একটি হাওয হবে এবং নবীগণ নিজেদের হাওয নিয়ে গর্ব করবেন যে, কার হাওযে আগমনকারীর সংখ্য বেশি। কিন্তু আমি আশা করি যে, আমার হাওযে আগমনকারীর সংখ্যা হবে তাদের সকলের চেয়ে বেশি। [ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং তিনি বলেছেন, হাদীসটি গরীব]
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَن سَمُرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ لِكُلِّ نَبِيٍّ حَوْضًا وَإِنَّهُمْ لَيَتَبَاهَوْنَ أَيُّهُمْ أَكْثَرُ وَارِدَةً وَإِنِّي لَأَرْجُو أَنْ أَكُونَ أَكْثَرَهُمْ وَارِدَةً» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيب
ضعیف ، رواہ الترمذی (2443) * سعید بن بشیر : ضعیف و قتادۃ مدلس و عنعن
ব্যাখ্যা: প্রত্যেক নবীর পৃথক পৃথক হাওয হবে এবং তাদের উম্মাতেরা সেখান থেকে পান করবেন। নবীগণ নিজ নিজ উম্মাতের আধিক্যতা নিয়ে গর্ব করবেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমি আশা করি হাওযের কিনারায় অধিকাংশ লোক হব আমরা।
রাসূলুল্লাহ (সা.) এ আশা ব্যক্ত করেন ঐ সময় যখন তার জান্নাতী উম্মাতের সংখ্যা জানা ছিল না। কিয়ামতের দিন রাসূলুল্লাহর জান্নাতী উম্মাতের সংখ্যা হবে আশি কাতার আর অন্যান্য সকল নবীর জান্নাতী উম্মাতের সংখ্যা হবে চল্লিশ কাতার। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ, তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৩৪৭ পৃ., হা, ২৪৪৩)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৯৫-[৩০] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (সা.) -এর নিকটে আবেদন করলাম, কিয়ামতের দিন আপনি অনুগ্রহপূর্বক আমার জন্য বিশেষভাবে শাফা’আত করবেন। তিনি (সা.) বললেন, আচ্ছা আমি তা করব। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনাকে কোথায় অনুসন্ধান করব? তিনি (সা.) বললেন, সর্বপ্রথম তুমি আমাকে পুলসিরাতের উপর অনুসন্ধান করবে। বললাম, যদি আমি আপনাকে পুলসিরাতের সাক্ষাৎ না পাই? তিনি (সা.) বললেন, তখন তুমি আমাকে মীযানের (’আমলনামা ওযনের) কাছে খোঁজ করে বললাম, যদি আমি আপনাকে মীযানের কাছেও সাক্ষাৎ না পাই? তিনি (সা.) বললেন, তখন তুমি আমাকে হাওযে কাওসারের কাছে অনুসন্ধান করব। স্মরণ রাখ, আমি এ তিন জায়গা থেকে অনুপস্থিত থাকব না। [ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং তিনি বলেছেন, হাদীসটি গরীব।]
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَن أنس قا ل سَأَلْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَشْفَعَ لِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَقَالَ: «أَنَا فَاعِلٌ» . قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَأَيْنَ أَطْلُبُكَ؟ قَالَ اطْلُبْنِي أَوَّلَ مَا تَطْلُبُنِي عَلَى الصِّرَاطِ . قُلْتُ فَإِنْ لَمْ أَلْقَكَ عَلَى الصِّرَاطِ؟ قَالَ: «فَاطْلُبْنِي عِنْدَ الْمِيزَانِ» قُلْتُ فَإِنْ لَمْ أَلْقَكَ عِنْدَ الْمِيزَانِ؟ قَالَ: «فَاطْلُبْنِي عِنْدَ الْحَوْضِ فَإِنِّي لَا أُخطىءُ هَذِه الثلاثَ المواطن» رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وقا لهَذَا حَدِيث غَرِيب
اسنادہ حسن ، رواہ الترمذی (2433) ۔
(إِسْنَاده جيد)
ব্যাখ্যা: কিয়ামতের দিন রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর শাফা'আত হবে দু’ প্রকার। ১) শাফা'আতে আম্মাহ্ বা সাধারণ শাফা'আত। ২) শাফা'আতে খসসাহ বা বিশেষ শাফা'আত।
আনাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর নিকট শাফা'আতে খসসাহ বা বিশেষ শাফা'আতের আবেদন করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে শাফা'আতের স্বীকৃতি দিলে তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সেদিন আমি আপনাকে কোথায় সন্ধান করব?
‘আল্লামাহ্ ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এর অর্থ হলো যে সকল স্থানে আপনার শাফা'আতের মুখাপেক্ষী হব আর সেই সকল ঘাঁটি পাড়ি দিতে আপনার শাফা'আত তলব করব, সে সময় আপনাকে কোথায় খুঁজে পাব? রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে তিনটি স্থানে সন্ধান করার কথা বললেন।
হিসাব-নিকাশের পর্বের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে ‘আয়িশাহ্ এ কর্তৃক বর্ণিত হাদীস, “(হে আল্লাহর রাসূল!) কিয়ামতের দিন আপনি আপনার পরিবার-পরিজনকে স্মরণ করবেন কি? জবাবে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, জেনে রেখ (হে ‘আয়িশাহ!) তিনটি জায়গা এমন হবে যেখানে কেউ কাউকে স্মরণ করবে না...।” উভয় হাদীসের মধ্যে বিরোধ পরিলক্ষিত হচ্ছে, এর সমন্বয় কিভাবে হবে?
‘আল্লামাহ্ মুল্লা আলী ক্বারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ‘আয়িশার প্রশ্নের জওয়াবে যা বলেছিলেন তা এজন্য যে, সে যেন রসূলের স্ত্রী হওয়ার উপর ভরসা করে বসে না থাকেন। আর আনাস-কে রাসূলুল্লাহ (সা.) যে উত্তর দিয়েছিলেন তা এজন্য যে, সে যেন নিরাশ হয়ে না যায়।
প্রশ্ন হতে পারে যে, রসূলের খাদিম হওয়ার কারণে আনাস (রাঃ) -ও তো ভরসা করে বসে থাকতে পারে? অনুরূপভাবে নিরাশ না হওয়ার বিষয়টি আয়িশার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে? উত্তরে বলা যায় যে, ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) -এর হাদীসটি অনুপস্থিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, আর আনাস (রাঃ)-এর হাদীসটি উপস্থিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অর্থাৎ কোন অনুপস্থিত ব্যক্তিকে কেউ স্মরণ করবে না। (মিরকাতুল মাফাতীহ, তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৩৩৪ পৃ., হা. ২৪৩৩)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৯৬-[৩১] ইবনু মা’ঊদ (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: একদিন তাকে প্রশ্ন করা হলো, (আল্লাহর ওয়াদাকৃত) মাকামে মাহমূদ কী? তিনি (সা.) বললেন, তা এমন একদিন আল্লাহ তা’আলা তাঁর কুরসীতে অবতরণ করবেন যেদিন তা এমনভাবে কড়মড় করবে, যেমন ঠাসাঠাসির কারণে কড়মড় করে থাকে চামড়ার তৈরি নতুন গদি। কুরসীর প্রশস্ততা হবে আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী দূরত্বের পরিমাণ। অতঃপর তোমাদেরকে কাপড়হীন, খালি পায়ে ও খতনাবিহীন অবস্থায় উপস্থিত করা হবে। সেদিন যাদেরকে পোশাক পরিধান করানো হবে, তাদের মধ্যে সর্বপ্রথম লোক হবেন ইবরাহীম আলায়হিস সালাম। আল্লাহ তা’আলা মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাদের)-কে আদেশ দেবেন আমার বন্ধু ইবরাহীম আলায়হিস সালাম-কে তোমরা পোশাক পরিয়ে দাও। তখন জান্নাতের কোমল রেশমি ধবধবে সাদা দু’খানা কাপড় আনা হবে এবং তা তাকে পরানো হবে। অতঃপর আমাকে পোশাক পরিধান করানো হবে। তারপর আমি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ডান পার্শ্বে এমন এক স্থানে দণ্ডায়মান হব, যা দেখে পূর্বের ও পরের (সমস্ত মানুষ) আমার প্রতি ঈর্ষা পোষণ। করবে। (দারিমী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قا ل: قيل لَهُ مَا الْمقَام الْمَحْمُود؟ قا ل: ذَلِكَ يَوْمَ يَنْزِلُ اللَّهُ تَعَالَى عَلَى كُرْسِيِّهِ فَيَئِطُّ كَمَا يئطُّ الرحلُ الْجَدِيد من تضايقه بِهِ وَهُوَ كَسَعَةِ مَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَيُجَاءُ بِكُمْ حُفَاةً عُرَاةً غُرْلًا فَيَكُونُ أَوَّلُ مَنْ يُكْسَى إِبراهيم يَقُول الله تَعَالَى: أُكسوا خليلي بِرَيْطَتَيْنِ بَيْضَاوَيْنِ مِنْ رِيَاطِ الْجَنَّةِ ثُمَّ أُكْسَى عَلَى أَثَرِهِ ثُمَّ أَقُومُ عَنْ يَمِينِ اللَّهِ مقَاما يغبطني الْأَولونَ وَالْآخرُونَ . رَوَاهُ الدَّارمِيّ
اسنادہ ضعیف ، رواہ الدارمی (2 / 325 ح 2803 ، نسخۃ محققۃ : 2842) * فیہ عثمان بن عمیر : ضعیف ۔
ব্যাখ্যা: আল্লাহ তা'আলা তার রাসূল (সা.) -কে বলেন, “অচিরেই আপনার রব আপনাকে মাকামে মাহমূদে পৌছে দিবেন।” (সূরাহ্ ইসরা/বানী ইসরাঈল ১৭: ৭৯)
মাকামে মাহমূদ অর্থ প্রশংসিত স্থান, এখানে আল্লাহ তার রাসূলকে পৌছানোর ওয়াদা করেছেন। এই মাকাম রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর জন্য নির্দিষ্ট, অন্য কোন পয়গম্বরের জন্য নয়। সহীহ হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, এ হচ্ছে শাফা'আতে কুবরার মাকাম।
(يَنْزِلُ اللَّهُ تَعَالَى عَلَى كُرْسِيِّهِ) আল্লাহ তা'আলা সেদিন কুরসীতে অবতরণ করবেন’-এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মুল্লা আলী ক্বারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, সম্ভবত এটি বিচার ফায়সালার দিন ন্যায়বিচারের জন্য হুকুম প্রদানের প্রতি ইঙ্গিত। কেউ কেউ বলেছেন, এর অর্থ হলো আল্লাহ তা'আলা তার রসূলের প্রতি স্থগিতকৃত শাফা'আতের ঘোষণা পেশ করা যা তার সৃষ্টির প্রতি বড় ধরনের প্রত্যক্ষ অনুগ্রহ। অথবা এটা আল্লাহ তা'আলার রাজত্ব ও বিচার ফায়সালার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বহিঃপ্রকাশ। কেউ বলেছেন, এর অর্থ হলো আল্লাহ তা'আলা তার বড়ত্ব গুণের তাজাল্লি সেদিন প্রকাশ করবেন এবং কিবরিয়্যার গুণে সেই প্রতিশ্রুত দিবসে আগমন করবেন।
কুরসীর বর্ণনা দিতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, (وَهُوَ كَسَعَةِ مَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ) তার প্রশস্ততা আসমান জমিনের মধ্যবর্তী স্থানের প্রশস্ততার সমান। এটা পবিত্র কুরআনের ঐ আয়াতের দিকে ইশারা যেখানে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, (وَسِعَ کُرۡسِیُّهُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضَ...) “তার কুরসীখানা আসমানসমূহ এবং জমিনব্যাপী পরিব্যপ্ত....।” (সূরা আল বাকারাহ ২ : ২৫৫)।
কিন্তু অন্য হাদীসে এসেছে, আসমানের তুলনায় জমিন হলো উন্মুক্ত বিশাল মাঠের মধ্যে একটি আংটিতুল্য। অর্থাৎ বিশাল মাঠের তুলনায় একটি আংটি যেমন অতীব ক্ষুদ্র তেমনি বিশাল আকাশের তুলনায় জমিন হলো অতীব ক্ষুদ্র বস্তু। অনুরূপ প্রতিটি আসমান তার উপরের আসমানের সমভিব্যাহারে সপ্ত স্তর এবং জমিনসমূহ কুরসীর নিকট বিশাল মাঠের মধ্যে একটি আংটিতুল্য।
কিয়ামতের দিন সবাই উলঙ্গ হয়ে উঠবে, সেদিন সর্বপ্রথম ইবরাহীম আলায়হিস সালাম-কে জান্নাতের নরম মসৃণ ধবধবে সাদা মিহি রেশমীর দুখানি কাপড় এনে পরানো হবে। ইবরাহীম আলায়হিস সালাম-এর পরে মুহাম্মাদ (সা.) -কে কাপড় পরানো হবে। ইবরাহীম আলায়হিস সালাম-এর এই মর্যাদা কেন? হাদীসে তার উল্লেখ পাওয়া যায় না, তবে ইবনু হাজার ‘আসক্বালানী (রহিমাহুল্লাহ) স্বীয় ‘ফাতহুল বারী’ গ্রন্থে বলেন, ইবরাহীম (আঃ)-এর এই বিশেষত্ব এজন্য যে, তাকে যখন (নমরূদ-এর) আগুনে ফেলানো হয়েছিল তখন তাকে উলঙ্গ করে ফেলানো হয়েছিল। কেউ বলেছেন, তিনিই সর্বপ্রথম পায়জামা পরিধান করেছিলেন এজন্য তাকে কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম কাপড় পরানো হবে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর বাণী: (شُمَّ أَقُوْمُ عَنْ يَمِينِ اللَّهِ مَقَامًا) অতঃপর আমি আল্লাহ তা'আলার ডান পাশে এমন একটি মাকামে (স্থানে) দাঁড়াব যা দেখে আমার প্রতি আগের ও পরের লোকেরা (নবীরা) ঈর্ষা পোষণ করবেন অর্থাৎ তারা তা কামনা করবেন। এটাই হলো সেই মাক্বামে মাহমূদ যা আল্লাহ তা'আলার ডানপার্শ্বে অবস্থিত।
‘আল্লামাহ্ ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এ হাদীস সকল সৃষ্টির উপর এমনকি পূর্বাপর জিন ইনসান ও মালাকের (ফেরেশতার) ওপর রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ। কোন মহান বাদশাহ যখন রাজ্যের প্রজা সাধারণের জন্য সম্মানের কোন প্যান্ডেল সাজান এবং সেখানে প্রজাদের সম্মানিত ও শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের আসন নির্ধারণ করেন সেটা বাদশাহর আসনের ডান পাশেই করে থাকেন। অতএব মহান আল্লাহর বিচার আসনের ডানপাশেই মাকামে মাহমূদে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর অবস্থান এবং আসন স্থাপন করা হবে। এটা সৃষ্টির সর্বোচ্চ সম্মান। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৯৭-[৩২] মুগীরাহ্ ইবনু শু’বাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: কিয়ামতের দিন পুলসিরাতের উপর মু’মিনদের পরিচিতি বা প্রতীক হবে ’রব্বি সাল্লিম, সাল্লিম’। (অর্থাৎ- হে রব! আমাকে নিরাপদে রাখ, আমাকে নিরাপদে রাখ) [ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং তিনি বলেন, হাদীসটি গরীব।]
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَن الْمُغيرَة بن شُعْبَة قا ل: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شِعَارُ الْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى الصِّرَاطِ: رَبِّ سَلِّمْ سَلِّمْ . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيب
اسنادہ ضعیف ، رواہ الترمذی (2432) * عبد الرحمن بن اسحاق الکوفی : ضعیف ضعفہ الجمھور و فیہ علۃ أخری و حدیث البخاری (7437) و مسلم (195)، (482) یغنی عنہ ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: (شِعَارُ) শব্দের অর্থ চিহ্ন, প্রতীক, আলামত, নিদর্শন, যে চিহ্ন দ্বারা তাকে চেনা যায়। কিয়ামতের দিন প্রত্যেক উম্মত তাদের রাসূলগণের সাথে উঠবেন, উম্মতে মুহাম্মাদীও তাদের রাসূল মুহাম্মাদ (সা.) -এর সাথে উঠবেন, কিন্তু এদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও নিদর্শন হবে এই যে, তারা পুলসিরাতের পাড়ে বলতে থাকবে, রব্বী সাল্লিম সাল্লিম- “হে রব! শান্তি দাও শান্তি দাও।
“রব্বী সাল্লিম-সাল্লিম” এ বাক্যটি হবে নবীদের কিন্তু উম্মতে মুহাম্মাদীর বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে তারাও এই দু'আ বলতে থাকবে। ইমাম ত্ববারানী (রহিমাহুল্লাহ) ইবনু উমার থেকে বর্ণনা করেন, উম্মাতে মুহাম্মাদীকে যখন পুলসিরাতের কিনারায় উপনীত করা হবে তখন তাদের চিহ্ন হবে যে, তারা বলবে, (يَالَا إلَهَ إِلَّا أَنْتَ) “হে মহান সত্তা। তুমি ছাড়া কোন উপাস্য নেই। দ্বিবিধ হাদীসের সমন্বয় সাধনে বলা যায়, এ হাদীসটিতে উম্মতে মুহাম্মাদীর বিশেষত্ব উল্লেখ করা হয়েছে আর পূর্বের হাদীসটিতে পূর্বতন সকল উম্মাতের বিশেষত্ব উল্লেখ করা হয়েছে। আরো প্রকাশ থাকে যে, উম্মতের কথা, ‘রব্বি সাল্লিম সাল্লিম, এটা এ উম্মাতের নেককার ‘উলামাহ, শুহাদা প্রমুখ কামিল মু'মিনদের বিশেষত্ব, যারা আম্বিয়াগণের পরে। শাফা'আতের অধিকার ও মর্যাদা লাভ করে ধন্য হবেন।
ইবনু মারদুবিয়া ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে মারফূ’ভাবে বর্ণনা করেছেন। “মুমিনদের কিয়ামতের দিন বিশেষ বৈশিষ্ট্য হবে যে, তারা কবর থেকে (لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ) বলেতে বলতে উঠবে।” (জামি আস্ সগীর হা. ৪৮৮৬)
সিরাজী ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে এও বর্ণনা করেছেন, কিয়ামতের অন্ধকারে মুমিনদের বৈশিষ্ট্য হবে: (لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ) “আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন মা'বুদ নেই।” (মিরক্বাতুল মাফাতীহ, জামি আস্ সগীর হা. ৪৮৮৭, তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৩৩৩ পৃ., হা, ২৪৩২)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৯৮-[৩৩] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী (সা.) বলেছেন: আমার উম্মতের কবীরা গুনাহকারীগণ বিশেষভাবে আমার শাফা’আত লাভ করবে (অন্য উম্মতেরা শাফা’আত লাভ করতে পারবে না)। (তিরমিযী ও আবূ দাউদ)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَنْ أَنَسٍ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قا ل: «شَفَاعَتِي لِأَهْلِ الْكَبَائِرِ مِنْ أُمَّتِي» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُد
صحیح ، رواہ الترمذی (2435 وقال : حسن صحیح غریب) و ابوداؤد (4739) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: কবীরা গুনাহগারদের ক্ষমার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর শাফা'আত হলো খাস, এটা অন্য কোন উম্মতের জন্য হবে না। আল্লামাহ্ ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এর অর্থ হলো কবীরা গুনাহের কারণে ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মুক্তির জন্য আমার শাফা'আত একমাত্র বিশেষায়িত।
কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আহলুস্ সুন্নাহ্ ওয়াল জামা'আতের মাযহাব বা মত হলো কুরআনুল কারীমের সরীহ বা স্পষ্ট আয়াত দ্বারা গুনাহগারদের জন্য শাফা'আত প্রমাণিত। যেমন আল্লাহর বাণী: (یَوۡمَئِذٍ لَّا تَنۡفَعُ الشَّفَاعَۃُ اِلَّا مَنۡ اَذِنَ لَهُ الرَّحۡمٰنُ وَ رَضِیَ لَهٗ قَوۡلًا) “সেদিন সুপারিশ কারো কাজে আসবে না, কিন্তু দয়াময় (আল্লাহ) যাকে অনুমতি দিবেন এবং তার কথার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন।” (সূরাহ্ ত্ব-হা- ২০: ১০৯)
এছাড়া মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারা কিয়ামাতের শাফা'আত প্রমাণিত। এটা সালাফে সালিহীন এবং তৎপরবর্তী আহলুস্ সুন্নাহ ওয়াস জামা'আতের সর্ববাদী সম্মত মত। কিন্তু খারিজী সম্প্রদায় এবং কতিপয় মু'তাযিলা আহলে কাবায়িরদের জন্য শাফা'আত বৈধ হওয়া এবং গ্রহণ হওয়াকে অস্বীকার করে থাকে, ফলে তাদের চিরস্থায়ী জাহান্নামী বলে মনে করে।
যেমন মহান আল্লাহর বাণী: (فَمَا تَنۡفَعُهُمۡ شَفَاعَۃُ الشّٰفِعِیۡنَ) অতএব সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোন কাজে আসবে না।” (সূরাহ্ আল মুদ্দাসসির ৭৪ : ৪৮)
মহান আল্লাহ আরো বলেন, (.... مَا لِلظّٰلِمِیۡنَ مِنۡ حَمِیۡمٍ وَّ لَا شَفِیۡعٍ یُّطَاعُ) “...সেদিন যালিমদের কোন অন্তরঙ্গ বন্ধু থাকবে না এবং এমন কোন সুপারিশকারীও থাকবে না যার কথা গ্রহণ হয়।” (সূরাহ আল মু'মিন ৪০ : ১৮)
মু'তাযিলা ও খারিজীদের ধারণা ও প্রদত্ত দু’টি দলীলের জওয়াবে আমরা বলব যে, উক্ত আয়াতদ্বয় কাফিরদের ব্যাপারে বলা হয়েছে, আর যুলুম দ্বারা উদ্দেশ্য হলো শিরক। তারা শাফা'আতের তাবীল বা ব্যাখ্যায় বলে থাকে যে, শাফা'আত হবে জান্নাতীদের মর্যাদা বাড়ানোর জন্য (কবীরা গুনাহগারদের মুক্তির জন্য নয়) তাদের এ ব্যাখ্যা বাতিল বা অগ্রহণযোগ্য। কবীরা গুনাহগার জাহান্নামীদের জন্য শাফা'আত গ্রহণের মাধ্যমে জাহান্নাম থেকে মুক্তির ভূরিভূরি হাদীস কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে। বক্ষমাণ হাদীসটি এর প্রামাণ্য দলীল।
শাফা'আত পাঁচ প্রকার:
* প্রথম প্রকার শাফাআত যা আমাদের নবীর জন্য খাস বা বিশেষিত; সেটা হলো হাশরের মাঠের দুঃসহ অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে দ্রুত হিসাবের ব্যবস্থার জন্য শাফা'আত।
* দ্বিতীয় প্রকার হলো এক শ্রেণির মানুষকে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশের জন্য শাফা'আত। এটাও আমাদের নবীর মাধ্যমে সম্পাদিত হবে।
* তৃতীয় প্রকার হলো ঐ সম্প্রদায়ের জন্য শাফা'আত যাদের জন্য জাহান্নাম অবধারিত হয়ে যাবে। তাদের জন্য আমাদের নবী (সা.) শাফা'আত করবেন এবং আল্লাহ তা'আলা অন্য যাদের চান সেও শাফা'আত করবেন।
* চতুর্থ প্রকার তাদের জন্য শাফা'আত যারা গুনাহের কারণে জাহান্নামে প্রবেশ করেছে। তাদের জন্য আমাদের নবী শাফা'আত করবেন, মালায়িকাহ্ (ফেরেশতারা) শাফা'আত করবেন ঐ সকল গুনাহগারদের মুমিন ভাইয়েরা শাফা'আত করবেন। এরপর যারা “লা- ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ” পাঠ করেছে আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং নিজে তাদের বের করবেন।
* পঞ্চম প্রকার শাফাআত হলো জান্নাতীদের জান্নাতের মধ্যে মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য শাফা'আত, অবশ্য এ শাফা'আতকে খারিজী ও মুতাযিলীগণ অস্বীকার করে না। (মিরকাতুল মাফাতীহ, তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খণ্ড, হা, ২৪৩৫)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৫৯৯-[৩৪] আর ইবনু মাজাহ জাবির (রাঃ) থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَرَوَاهُ ابْن مَاجَه عَن جَابر
صحیح ، رواہ ابن ماجہ (4310) ۔
(صَحِيح)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৬০০-[৩৫] ’আওফ ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আমার প্রভুর কাছে থেকে একজন আগমনকারী (ফেরেশতা) আসলেন এবং তিনি (আল্লাহর পক্ষ হতে) আমাকে এ দুয়ের মধ্যে একটির ইচ্ছা স্বাধীনতা প্রদান করলেন, হয়তো আমার উম্মতের অর্ধেক সংখ্যা জান্নাতের সুযোগ গ্রহণ করুক অথবা আমি শাফা’আতের অধিকার গ্রহণ করি? অতঃপর আমি শাফা’আত গ্রহণ করলাম। অতএব তা ঐ সকল লোকের জন্য, যারা আল্লাহর সাথে অংশীস্থাপন না করে মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের জন্য আমার শাফা’আত কার্যকারী হবে। (তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَنْ عَوْفِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَتَانِي آتٍ مِنْ عِنْدِ رَبِّي فَخَيَّرَنِي بَيْنَ أَنْ يُدْخِلَ نِصْفَ أُمَّتِي الْجَنَّةَ وَبَيْنَ الشَّفَاعَةِ فَاخْتَرْتُ الشَّفَاعَةَ وَهِيَ لِمَنْ مَاتَ لَا يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَابْن مَاجَه
حسن ، رواہ الترمذی (2441) و ابن ماجہ (4317) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: যে আগন্তুক রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর কাছে এসেছিলেন তিনি বড় মানের একজন মালাক (ফেরেশতা)। হাদীসে এই মালাক (ফেরেশতা)’র নাম উল্লেখ নেই, তবে প্রকাশ থাকে যে, তিনি জিবরীল হবেন না।
হাদীসের শব্দ (خَيَّرَنِي) তিনি আমাকে ইখতিয়ার দিলেন, এ ক্রিয়াবাচক শব্দের কর্তা আল্লাহ অথবা মালাক উভয়ই হতে পারে। তবে কর্তা মালাক হওয়া মাজায বা রূপকার্থে।
হাদীসের ভাষা আমার অর্ধেক উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করাবেন', এ উম্মত হলো উম্মতে ইজাবত অর্থাৎ যারা রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর দাওয়াত কবুল করেছেন এবং শিরক থেকে আত্মরক্ষা করেছেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) এটা গ্রহণ না করে শাফা'আতের সুযোগ ইখতিয়ার করেছেন, কারণ এর পরিসর ব্যাপক এবং দীর্ঘসূত্রী। একজন মু'মিন ব্যক্তিও জাহান্নামে থাকা পর্যন্ত আল্লাহর রসূলের শাফা'আত চলবে। এ শাফা'আতের ফলে আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্যদানকারী উম্মাতের কেউ আর জাহান্নামে অবশিষ্ট থাকবে না। (মিরকাতুল মাফাতীহ, তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খণ্ড, হা. ২৪৪১, সুনানু ইবনু মাজাহ ৩য় খণ্ড, হা. ৪৩১১, ইন্টারনেট)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৬০১-[৩৬] ’আবদুল্লাহ ইবনু আবূল জা’আ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) - কে বলতে শুনেছি, আমার উম্মতের জন্য এক লোকের সুপারিশে বানী তামীম গোত্রের লোক সংখ্যা অপেক্ষা অধিক মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করবে। (তিরমিযী, দারিমী ও ইবনু মাজাহ)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَن عبدِ الله بن أبي الجَدعاءِ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «يَدْخُلُ الْجَنَّةَ بِشَفَاعَةِ رَجُلٍ مِنْ أُمَّتِي أَكْثَرُ مِنْ بَنِي تَمِيمٍ» رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ والدارمي وَابْن مَاجَه
اسنادہ صحیح ، رواہ الترمذی (2438 وقال : حسن صحیح غریب) و الدارمی (2 / 328 ح 2811 ، و ابن ماجہ (4316) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: বানু তামীম ‘আরবের প্রসিদ্ধ একটি গোত্রের নাম যাদের সংখ্যা ছিল অনেক। রাসুলুল্লাহ (সা.) শাফা'আতের সংখ্যাধিকতা বুঝানোর জন্য উক্ত গোত্রের নাম উল্লেখ করেছেন। উপরোক্ত হাদীসে তিনি বলেছেন যে, আমার উম্মতের এক ব্যক্তির সুপারিশে বানূ তামীম গোত্রের লোকেদের চেয়ে আরো অনেক বেশি লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে। কতিপয় ‘আলিম বলেন যে, রাসূল (সা.) আমার উম্মতের এক ব্যক্তি দ্বারা ‘উসমান (রাঃ) -কে বুঝিয়েছেন। আবার অনেকে বলেন যে, তিনি এর দ্বারা উয়াইস কারনীকে বুঝিয়েছেন।
তবে ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এ ক্ষেত্রে সারকথা হলো যদি নির্দিষ্টকরণে কোন দলীল থেকে থাকে তাহলে নির্দিষ্ট ব্যক্তিই উদ্দেশ্য হবে। অন্যথায় আমরা বলব, এটা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনই ভালো জানেন। (তুহফাতুল আহওয়াজী ৬ষ্ঠ খণ্ড, হা. ২৪৩৮)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৬০২-[৩৭] আবূ সা’ঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আমার উম্মতের কোন লোকের এমন হবে যে, বিরাট একটি দলের সুপারিশ করবে, কেউ একটি গোত্রের জন্য সুপারিশ করবে। আবার কেউ নিজ আত্মীয়-স্বজনের জন্য সুপরিশ করবে, আবার কেউ একটি লোকের জন্য সুপারিশ করবে। সবশেষে আমার সকল উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে। (তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّ مِنْ أُمَّتِي مَنْ يَشْفَعُ لِلْقَبِيلَةِ وَمِنْهُمْ مَنْ يَشْفَعُ لِلْعُصْبَةِ وَمِنْهُمْ مَنْ يَشْفَعُ لِلرَّجُلِ حَتَّى يَدْخُلُوا الْجَنَّةَ» رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ
اسنادہ ضعیف ، رواہ الترمذی (2440 وقال : حسن) * عطیۃ العوفی ضعیف ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, কিয়ামতের মাঠে যারা সুপারিশ করবে তাঁরা হলেন, ১) প্রকৃত ‘আলিমগণ, ২) প্রকৃত শহীদগণ, ৩) সৎব্যক্তিগণ। ইমাম জাওহারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, উক্ত হাদীসে উল্লেখিত (فِئَامِ) শব্দটি (الْجَمَاعَةُ مِنَ انَّاسِ) অর্থাৎ একদল মানুষকে বুঝানোর জন্য ব্যবহার হয়েছে। মুল্লা আলী ক্বারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, প্রাধান্য মত অনুযায়ী (فِئَامِ) শব্দটি (قَبَائِلُ) অর্থাৎ একটি গোত্রকে বুঝানোর জন্য ব্যবহার হয়। আর (عُصْبَةِ) শব্দটি দশ থেকে চল্লিশ পর্যন্ত সংখ্যা বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। (তুহফাতুল আহওয়াযী হা. ২৪৪০)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৬০৩-[৩৮] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ আমাকে এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি আমার উম্মতের চার লক্ষ লোককে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। তখন আবূ বকর (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি করুন। তখন তিনি বললেন, এই পরিমাণ- এই বলে তিনি উভয় হাত একত্রিত করে অঞ্জলি একসাথে করলেন। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি করুন। এবারও রাসূল (সা.) ঐ রকম অঞ্জলি একত্র করে দেখিয়ে বললেন, আরো এই পরিমাণ। তখন ’উমার (রাঃ) বললেন, হে আবূ বকর! আমাদেরকে নিজ নিজ অবস্থায় থাকতে দিন। (অর্থাৎ আমাদেরকে ’আমল করতে দাও) তখন আবূ বকর (রাঃ) বললেন, হে ’উমার! এতে তোমার কি ক্ষতি যদি আল্লাহ তা’আলা আমাদের সকলকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেন?
জবাবে ’উমার (রাঃ) বললেন, যদি মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ ইচ্ছা করেন, তবে তাঁর সকল সৃষ্ট মাখলুকূকে তিনি এক অঞ্জলিতেই জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারেন। এ কথা শুনে তখন নবী (সা.) বললেন, “উমার সত্যিই বলেছে। (শারহুস্ সুন্নাহ্)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ وعَدَني أَن يدْخل الجنةَ من أُمتي أربعمائةِ أَلْفٍ بِلَا حِسَابٍ» . فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ زِدْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ وَهَكَذَا فَحَثَا بِكَفَّيْهِ وَجَمَعَهُمَا فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ: زِدْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ. قَالَ: وَهَكَذَا فَقَالَ عُمَرُ دَعْنَا يَا أبكر. فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ: وَمَا عَلَيْكَ أَنْ يُدْخِلَنَا اللَّهُ كُلَّنَا الْجَنَّةَ؟ فَقَالَ عُمَرُ: إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ إِنْ شَاءَ أَنْ يُدْخِلَ خَلْقَهُ الْجَنَّةَ بِكَفٍّ وَاحِدٍ فَعَلَ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «صَدَقَ عُمَرُ» رَوَاهُ فِي شرح السّنة
اسنادہ ضعیف ، رواہ البغوی فی شرح السنۃ (15 / 163 ح 4335) [و احمد (3 / 165 ح 12725)] * قتادۃ مدلس و عنعن و للحدیث طرق ضعیفۃ عند البزار (کشف الاستار : 3547 ، 3545) و ابی یعلی (3783) وغیرھما
ব্যাখ্যা: আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ইচ্ছা করলে জিন-ইনসান, নেককার ও বদকার মুমিন সকলকে একবারেই জান্নাতে প্রবশে করাতে পারেন। কিন্তু আমল ব্যতীত আল্লাহর অনুগ্রহের আশা বসে থাকা মুমিনের কাজ নয় ‘উমার (রাঃ)-এর উক্তির উদ্দেশ্য এটাই যে, আমাদের কর্তব্য আমরা পালন করে যাব আর আল্লাহ তাঁর দয়ার মাধ্যমে যে ব্যবহার করবেন তাতে খুশি থাকব। (মিরক্বাতুর মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৬০৪-[৩৯] উক্ত রাবী [আনাস (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জাহান্নামীগণ কাতারবন্দি হয়ে দাঁড়াবে, তখন জান্নাতী এক ব্যক্তি তাদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করবে। এ সময় জাহান্নামীদের সারি থেকে এক ব্যক্তি বলবে, হে অমুক! তুমি কি আমাকে চিনতে পারনি? আমি সেই লোক যে একদিন তোমাকে পান করিয়েছিলাম। আর একজন বলবে, আমি সেই লোক যে একদিন তোমাকে উযূর জন্য পানি দিয়েছিলাম। তখন সে জান্নাতী লোক তার জন্য সুপারিশ করবে এবং জান্নাতে নিয়ে যাবে। (ইবনু মাজাহ)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يُصَفُّ أَهْلَ النَّارِ فَيَمُرُّ بِهِمُ الرَّجُلُ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ فَيَقُولُ الرَّجُلُ مِنْهُمْ: يَا فُلَانُ أَمَا تَعْرِفُنِي؟ أَنَا الَّذِي سَقَيْتُكَ شَرْبَةً. وَقَالَ بَعْضُهُمْ: أَنَا الَّذِي وَهَبْتُ لَكَ وَضُوءًا فَيَشْفَعُ لَهُ فَيُدْخِلُهُ الْجَنَّةَ . رَوَاهُ ابْنُ مَاجَه
اسنادہ ضعیف ، رواہ ابن ماجہ (3685) * یزید الرقاشی : ضعیف ، و الاعمش مدلس و عنعن ۔
(ضَعِيفٌ)
ব্যাখ্যা: উক্ত হাদীসে জাহান্নামীগণ দ্বারা গুনাহগার মুমিনদেরকে বুঝানো হয়েছে, আর তাদের মধ্যে যারা পুণ্যবান নেক লোকদের খিদমাত বা সহযোগিতা করেছে, তাদের জন্য কিয়ামতের দিন উক্ত নেককার ব্যক্তিরা শাফা'আত করার অধিকার পাবে। ফলে তাদের সুপারিশের ফলে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। (মিরক্বাতুর মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৬০৫-[৪০] আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জাহান্নামীদের মধ্যে থেকে দুই ব্যক্তি খুব শোর-চিৎকার করতে থাকবে। তাদের চিৎকার শুনে মহান রব মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাদের)-কে বলবেন, এ ব্যক্তিদ্বয়কে জাহান্নাম থেকে বের করে আন। যখন তাদেরকে উপস্থিত করা হবে আল্লাহ তা’আলা। প্রশ্ন করবেন, কি কারণে তোমরা দুজন এত বিলাপ-চিৎকার করছ? তারা বলবে, আমরা এরূপ করেছি যাতে আপনি আমাদের প্রতি দয়া করেন। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, তোমাদের উভয়ের প্রতি আমার দয়া এই যে, জাহান্নামের যে স্থানে তোমরা অবস্থানরত ছিলে এখন সেখানে চলে যাও এবং সে স্থানেই তোমরা নিজেদেরকে স্বেচ্ছায় নিক্ষেপ কর। এ আদেশ শুনে উভয়ের একজন স্বেচ্ছায় নিজেকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে। তখন আল্লাহ তা’আলা জাহান্নামের আগুনকে তার জন্য ঠাণ্ডা ও আরামদায়ক করে দেবেন। কিন্তু দ্বিতীয় ব্যক্তিটি দাঁড়িয়ে থাকবে, সে নিজেকে তাতে নিক্ষেপ করবে না। তখন প্রভু তাকে বলবেন, যেভাবে তোমার সাথি নিজেকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করেছে, কিসে তোমাকে ঐভাবে নিক্ষেপ করা হতে বিরত রাখল? তখন সে বলবে, হে আমার রব! আমি আশা রাখি যে, যে জায়গা থেকে তুমি একবার আমাকে বের করেছ, আবার সেখানে তুমি আমাকে ফেরত পাঠাবে না, অতঃপর রাব্বুল আলামীন বলবেন, তুমি যে আশা পোষণ। করেছ, তা পূরণ করা হলো। তখন আল্লাহ তা’আলা তার বিশেষ দয়ায় দু’জনকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। (তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِنَّ رَجُلَيْنِ مِمَّنْ دَخَلَ النَّارَ اشْتَدَّ صِيَاحُهُمَا فَقَالَ الرَّبُّ تَعَالَى: أَخْرِجُوهُمَا. فَقَالَ لَهُمَا: لِأَيِّ شَيْءٍ اشْتَدَّ صِيَاحُكُمَا؟ قَالَا: فَعَلْنَا ذَلِكَ لِتَرْحَمَنَا. قَالَ: فَإِنَّ رَحْمَتِي لَكُمَا أَنْ تَنْطَلِقَا فَتُلْقِيَا أَنْفُسَكُمَا حَيْثُ كُنْتُمَا مِنَ النَّارِ فَيُلْقِي أَحَدُهُمَا نَفْسَهُ فَيَجْعَلُهَا اللَّهُ بَرْدًا وَسَلَامًا وَيَقُومُ الْآخَرُ فَلَا يُلْقِي نَفْسَهُ فَيَقُولُ لَهُ الرَّبُّ تَعَالَى: مَا مَنَعَكَ أَنْ تُلْقِيَ نَفْسَكَ كَمَا أَلْقَى صَاحِبُكَ؟ فَيَقُولُ: رَبِّ إِنِّي لَأَرْجُو أَنْ لَا تُعِيدَنِي فِيهَا بَعْدَ مَا أَخْرَجْتَنِي مِنْهَا. فَيَقُولُ لَهُ الرَّبُّ تَعَالَى: لَكَ رَجَاؤُكَ. فَيُدْخَلَانِ جَمِيعًا الْجَنَّةَ بِرَحْمَةِ اللَّهِ . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
اسنادہ ضعیف ، رواہ الترمذی (2599 وقال : ضعیف الخ) * رشدین و الافریقی ضعیفان ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: তোমাদের উভয়ের প্রতি আমার অনুগ্রহ এই যে, তোমরা জাহান্নামে চলে যাও। ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, যদি বলা হয় যে, স্বেচ্ছায় জাহান্নামে যাওয়া এবং নিজেদেরকে আগুনে নিক্ষেপ করা এটাকে কিভাবে অনুগ্রহের অর্থে ব্যবহার করা হল? উত্তর হচ্ছে, এ ঘোষণা মূলত (سَبَبِ) কে (مُسَبِّبِ) এর উপর প্রয়োগ করার সাথে সম্পৃক্ত।
সুস্পষ্টভাবে ব্যাপারটা এভাবে বলা যায় যে, এখানে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের আনুগত্য করাটাই মূল বিষয়। তাঁর আদেশ মেনে নিজেকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করাই হচ্ছে অনুগ্রহ লাভের অন্যতম উপায়।
(فَيَجْعَلُهَا اللَّهُ بَرْدًا وَسَلَامًا) আল্লাহ তা'আলা তার জন্য জাহান্নামের আগুনকে আরামদায়ক ও শীতল করে দিবেন যেমনটি করে দিয়েছিলেন ইবরাহীম আলায়হিস সালাম-এর জন্য।
(لَكَ رَجَاؤُكَ) তুমি যা আশা পোষণ করেছ যা পূরণ করা হল। বান্দা আল্লাহর প্রতি ভালো আশা পোষণ করা তাঁর অনুগ্রহ ও দয়া অর্জনের ক্ষেত্রে খুবই প্রভাব রাখে। (তুহফাতুল আহওয়াযী হা, ২৫৯৯)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৬০৬-[৪১] ইবনু মাস’উদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) এই বলেছেন: সকল মানুষ জাহান্নামে উপস্থিত হবে এবং আমলের অনুপাতে মুক্তি পাবে। তাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উত্তম লোক সকলের আগে বিদ্যুতের গতিতে কেউ দ্রুতগামী ঘোড়ার গতিতে, কেউ উটের গতিতে, কেউ মানুষের দৌড়ের গতিতে, অতঃপর পায়ে হাঁটার গতিতে। (তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَرِدُ النَّاسُ النَّارَ ثمَّ يصدون مِنْهَا بِأَعْمَالِهِمْ فَأَوَّلُهُمْ كَلَمْحِ الْبَرْقِ ثُمَّ كَالرِّيحِ ثُمَّ كَحُضْرِ الْفَرَسِ ثُمَّ كَالرَّاكِبِ فِي رَحْلِهِ ثُمَّ كَشَدِّ الرَّجُلِ ثُمَّ كَمَشْيِهِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَالدَّارِمِيُّ
اسنادہ حسن ، رواہ الترمذی (3159 وقال : حسن) و الدارمی (2 / 329 ح 2813) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে, সকল মানুষ (পুলসিরাত অতিক্রমের সময়) জাহান্নামে উপস্থিত হবে। এ ব্যাপারে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআনুল মাজীদে বলেছেন, (وَ اِنۡ مِّنۡکُمۡ اِلَّا وَارِدُهَا...) “তোমাদের প্রত্যেককেই পুলসিরাত অতিক্রম করতে হবে"- (সূরা মারইয়াম ১৯: ৭১)। উক্ত আয়াতের মাঝে (الْوُرُودُ) শব্দের অর্থ নিয়ে সালাফগণ মতবিরোধ করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, এর দ্বারা হলো (الرَّخُولُ) (প্রবেশ করা) তারা এর সমর্থনে জাবির (রাঃ) থেকে মারফূ সূত্রে বর্ণিত হাদীসকে নিয়ে এসেছেন যে, “রাসূল (সা.) বলেন, (الْوُرُودُ) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো (الرَّخُولُ) ভালো ও খারাপ সকলেই তাতে প্রবেশ করবে কিন্তু মু'মিনদের জন্য তা শীতল ও আরামদায়ক হবে। আবার কেউ কেউ বলেছেন যে, (الْوُرُودُ) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো (اَلْمُمَرُّ عَلَيْهَا) “প্রত্যেকেই পুলসিরাত অতিক্রম করতে হবে”। মুহাদ্দিসগণ বলেন, প্রত্যেকের ‘আমল অনুপাতে পুরসিরাত অতিক্রমের ধরণ বিভিন্ন প্রকারের হবে। যার নেক আমল তুলনামূলক ভালো, তার গতিবেগও হবে তুলনামূলক দ্রুত। পক্ষান্তরে যার আমল তুলনামূলক মন্দ, তার গতিবেগও হবে ধীর। হাদীসে বলা হয়েছে, কেউ বিদ্যুতের গতিতে অতিক্রম করবে আবার কেউ প্রচণ্ড বাতাসের বেগে, কেউ দ্রুতগামী ঘোড়ার গতিতে; কেউ উটের গতিতে, কেউ মানুষের দৌড়ের গতিতে, কেউ পায়ে হাঁটা ব্যক্তির গতিতে অতিক্রম করবে। (তুহফাতুল আহওয়াযী হা, ৩১৫৯)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৬০৭-[৪২] ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: তোমাদের সামনে (কিয়ামতের দিন) আমার হাওয থাকবে, যার দুই কিনারার দূরত্ব জারবা’ ও আযরুহ স্থানদ্বয়ের মধ্যবর্তী দূরত্বের মতো। কোন রাবী বলেছেন, এ দুটি সিরিয়ার দুই বস্তির নাম। এর মধ্যবর্তী দূরতু তিন রজনীর পথ। অপর এক বর্ণনায় আছে, তার পেয়ালার সংখ্যা আকাশের নক্ষত্রের মতো (অগণিত)। যে উক্ত হাওযে এসে একবার তা থেকে পান করবে, সে পরে আর কখনো পিপাসার্ত হবে না। (বুখারী ও মুসলিম)
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
عَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّ أَمَامَكُمْ حَوْضِي مَا بَيْنَ جَنْبَيْهِ كَمَا بَيْنَ جَرْبَاءَ وَأَذْرُحَ» . قَالَ بَعْضُ الرُّوَاةِ: هُمَا قَرْيَتَانِ بِالشَّامِ بَيْنَهُمَا مَسِيرَةُ ثَلَاثِ لَيَالٍ. وَفِي رِوَايَةٍ: «فِيهِ أَبَارِيقُ كَنُجُومِ السَّمَاءِ مَنْ وَرَدَهُ فَشَرِبَ مِنْهُ لَمْ يَظْمَأْ بَعْدَهَا أَبَدًا» . مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (6577) و مسلم (34 / 2299)، (5986 و 5988) ۔
(مُتَّفق عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের সম্মুখে (কিয়ামতের দিন) আমার হাওয থাকবে যার দুই কিনারার দূরত্ব হবে জাবরা ও আযরুহ স্থানদ্বয়ের দূরত্বের ন্যায়। কোন কোন রাবী বলেছেন, এ দুটি সিরিয়ারে দু'টি বস্তির নাম। উভয়টির মধ্যবর্তী দূরত্ব তিন রাতের পথ। তবে মুহাক্কিক মুহাদ্দিসগণের মতে, এ দুটি স্থান সিরিয়ায় অবস্থিত এটা ঠিক কিন্তু এ দুটির মধ্যবর্তী দূরত্ব তিন রাতের পথ এ কথা ঠিক নয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৬০৮-[৪৩] ও ৫৬০৯-[৪৪] হুযায়ফাহ্ ও আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তাঁরা বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন সকল মানুষকে একত্রিত করবেন। অতঃপর মু’মিনগণ এক স্থানে দাঁড়াবেন, সবশেষে জান্নাতকে তাদের কাছাকাছি করা হবে। এরপর তারা আদম ’আলায়হিস-এর নিকট এসে বলবে, হে আমাদের পিতা! আমাদের জন্য জান্নাত খুলে দিন। তিনি বলবেন, তোমাদের পিতার অপরাধই তো তোমাদেরকে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছে। অতএব আমি এ কাজের উপযুক্ত নই। তোমরা আমার পুত্র আল্লাহর বন্ধু ইবরাহীম আলায়হিস সালাম-এর কাছে যাও। তিনি বলেন, তখন ইবরাহীম আলায়হিস সালাম বলবেন, এ কাজের যোগ্য আমি নই। আমি আল্লাহর বন্ধু ছিলাম বটে, কিন্তু পশ্চাতে পশ্চাতে (কখনো আল্লাহর সম্মুখীন হওয়ার সুযোগ হয়নি,) বরং তোমরা মূসা আলায়হিস সালাম -এর দারস্থ হও। যার সাথে আল্লাহ তা’আলা সরাসরি কথা বলেছেন। অতএব তারা মূসা আলায়হিস সালাম -এর কাছে আসবে। তিনি বলবেন, আমি এর যোগ্য নই। তোমরা ’ঈসা আলায়হিস সালাম -এর কাছে যাও। তিনি আল্লাহর কালিমাহ এবং তাঁর রূহ। তখন ’ঈসা আলায়হিস সালাম বলবেন, আমি যোগ্য নই। সবশেষে তারা মুহাম্মাদ (সা.)-এর নিকট আসবে।
তখন তিনি (’আরশের ডানপার্শ্বে) দাঁড়াবেন। (শাফা’আতের জন্য) তাঁকে অনুমতি দেয়া হবে। অতঃপর আমানত ও রেহেমকে (আত্মীয়তার সম্পর্কে) পাঠানো হবে, তখন উভয়টি (ইনসাফের প্রার্থী হয়ে) পুলসিরাতের ডানে ও বামে দুই পার্শে দাড়িয়ে যাবে। তার উপর দিয়ে এবার লোকেরা অতিক্রম করতে থাকবে। তোমাদের প্রথম দল বিদ্যুতের মতো চলে যাবে। আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) বলেন, আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতামাতা আপনার প্রতি কুরবান, বিদ্যুতের মতো চলে যাবে’ এর অর্থ কী? তিনি বলবেন, তোমরা কি দেখতে পাও না, বিদ্যুতের রশ্মি কিরূপে দ্রুত গতিতে চলে যায় এবং চোখের পলকেই পুনরায় ফিরে আসে? তারপরের দল বাতাসের মতো এবং পুরুষদের দৌড়ের মতো আমল তাদেরকে (সম্মুখের দিকে) নিয়ে যাবে। আর তোমাদের নবী পুলসিরাতের উপর দাঁড়িয়ে বলতে থাকবেন, ’ইয়া- রব্বি! সাল্লিম সাল্লিম (অর্থাৎ হে আমার রব। নিরাপদে রাখ, নিরাপদে রাখ)
পরিশেষে কিছুসংখ্যক বান্দার ’আমল এতই কম হবে যে, তাদের পুলসিরাত অতিক্রম করার সাধ্য থাকবে না। এমনকি সে সময় এক লোক হামাগুড়ি দিতে দিতে অতিক্রম করবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, পুলসিরাতের উভয় কিনারায় আংটা ঝুলন্ত থাকবে। যাকে পাকড়াও করার নির্দেশ থাকবে উক্ত আংটা তাকে পাকড়াও করবে। ফলে কেউ কেউ ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় মুক্তি পাবে আবার কোন কোন ব্যক্তিকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। শপথ ঐ সত্তার! যার হাতে আবূ হুরায়রার প্রাণ! জাহান্নামের গভীরতা সত্তর বছর দূরত্বের সমান। (মুসলিম)
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَن حذيفةَ وَأَبِي هُرَيْرَةَ قَالَا: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَجْمَعُ اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى النَّاسَ فَيَقُومُ الْمُؤْمِنُونَ حَتَّى تُزْلَفَ لَهُمُ الْجَنَّةُ فَيَأْتُونَ آدَمَ فَيَقُولُونَ: يَا أَبَانَا اسْتَفْتِحْ لَنَا الْجَنَّةَ. فَيَقُولُ: وَهَلْ أَخْرَجَكُمْ مِنَ الْجَنَّةِ إِلَّا خَطِيئَةُ أَبِيكُمْ لَسْتُ بِصَاحِبِ ذَلِكَ اذْهَبُوا إِلَى ابْنِي إِبْرَاهِيمَ خَلِيلِ اللَّهِ قَالَ: فَيَقُولُ إِبْرَاهِيمُ: لَسْتُ بِصَاحِبِ ذَلِكَ إِنَّمَا كُنْتُ خَلِيلًا مِنْ وَرَاءَ وَرَاءَ اعْمَدُوا إِلَى مُوسَى الَّذِي كَلَّمَهُ اللَّهُ تَكْلِيمًا فَيَأْتُونَ مُوسَى عَلَيْهِ السَّلَام فَيَقُولُ: لَسْتُ بِصَاحِبِ ذَلِكَ اذْهَبُوا إِلَى عِيسَى كَلِمَةِ اللَّهِ وَرُوحِهِ فَيَقُولُ عِيسَى: لَسْتُ بِصَاحِبِ ذَلِكَ فَيَأْتُونَ مُحَمَّدًا صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَيَقُومُ فَيُؤْذَنُ لَهُ وَتُرْسَلُ الْأَمَانَةُ وَالرَّحِمُ فَيَقُومَانِ جَنَبَتَيِ الصِّرَاطِ يَمِينًا وَشِمَالًا فَيَمُرُّ أَوَّلُكُمْ كَالْبَرْقِ . قَالَ: قُلْتُ: بِأَبِي أَنْتَ وَأُمِّي أَيُّ شَيْءٍ كَمَرِّ الْبَرْقِ؟ قَالَ: أَلَمْ تَرَوْا إِلَى الْبَرْقِ كَيْفَ يَمُرُّ وَيَرْجِعُ فِي طَرْفَةِ عَيْنٍ. ثُمَّ كَمَرِّ الرِّيحِ ثُمَّ كَمَرِّ الطَّيْرِ وَشَدِّ الرِّجَالِ تَجْرِي بِهِمْ أَعْمَالُهُمْ وَنَبِيُّكُمْ قَائِمٌ عَلَى الصِّرَاطِ يَقُولُ: يَا رَبِّ سَلِّمْ سَلِّمْ. حَتَّى تَعْجِزَ أَعْمَالُ الْعِبَادِ حَتَّى يَجِيءَ الرَّجُلُ فَلَا يَسْتَطِيعُ السَّيْرَ إِلَّا زَحْفًا . وَقَالَ: «وَفِي حَافَتَيِ الصِّرَاطِ كَلَالِيبُ مُعَلَّقَةٌ مَأْمُورَةٌ تَأْخُذُ مَنْ أُمِرَتْ بِهِ فَمَخْدُوشٌ نَاجٍ وَمُكَرْدَسٌ فِي النَّارِ» . وَالَّذِي نَفْسُ أَبِي هُرَيْرَةَ بِيَدِهِ إِنَّ قَعْرَ جَهَنَّمَ لَسَبْعِينَ خَرِيفًا. رَوَاهُ مُسلم
رواہ مسلم (329 / 195)، (482) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (يَجْمَعُ اللَّهُ النَّاسَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ) যখন কিয়ামতের দিন মানুষেরা পরস্পর অস্থির হয়ে পড়বে তখন তারা কঠিন ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের জন্য সুপারিশ পাওয়ার আশায় একের পর এক সকল নবীর নিকট যাবে। সকলেই নিজেদের ত্রুটির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে অক্ষমতা প্রকাশ করবেন। পরিশেষে রাসূল (সা.) -এর নিকটে এসে তারা সুপারিশ কামনা করবে। এরপর রাসূল (সা.) আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিকট সুপারিশের অনুমতি প্রার্থনা করবেন। অনুমতি পাওয়ায় তিনি তাদের জন্য কঠিন ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের সুপারিশ করবেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার সুপারিশ কবুল করে তাদেরকে মুক্তি দিবেন। (ফাতহুল বারী হা. ৬৫৬৫)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৬০৮-[৪৩] ও ৫৬০৯-[৪৪] হুযায়ফাহ্ ও আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তাঁরা বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন সকল মানুষকে একত্রিত করবেন। অতঃপর মু’মিনগণ এক স্থানে দাঁড়াবেন, সবশেষে জান্নাতকে তাদের কাছাকাছি করা হবে। এরপর তারা আদম ’আলায়হিস-এর নিকট এসে বলবে, হে আমাদের পিতা! আমাদের জন্য জান্নাত খুলে দিন। তিনি বলবেন, তোমাদের পিতার অপরাধই তো তোমাদেরকে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছে। অতএব আমি এ কাজের উপযুক্ত নই। তোমরা আমার পুত্র আল্লাহর বন্ধু ইবরাহীম আলায়হিস সালাম-এর কাছে যাও। তিনি বলেন, তখন ইবরাহীম আলায়হিস সালাম বলবেন, এ কাজের যোগ্য আমি নই। আমি আল্লাহর বন্ধু ছিলাম বটে, কিন্তু পশ্চাতে পশ্চাতে (কখনো আল্লাহর সম্মুখীন হওয়ার সুযোগ হয়নি,) বরং তোমরা মূসা আলায়হিস সালাম -এর দারস্থ হও। যার সাথে আল্লাহ তা’আলা সরাসরি কথা বলেছেন। অতএব তারা মূসা আলায়হিস সালাম -এর কাছে আসবে। তিনি বলবেন, আমি এর যোগ্য নই। তোমরা ’ঈসা আলায়হিস সালাম -এর কাছে যাও। তিনি আল্লাহর কালিমাহ এবং তাঁর রূহ। তখন ’ঈসা আলায়হিস সালাম বলবেন, আমি যোগ্য নই। সবশেষে তারা মুহাম্মাদ (সা.)-এর নিকট আসবে।
তখন তিনি (’আরশের ডানপার্শ্বে) দাঁড়াবেন। (শাফা’আতের জন্য) তাঁকে অনুমতি দেয়া হবে। অতঃপর আমানত ও রেহেমকে (আত্মীয়তার সম্পর্কে) পাঠানো হবে, তখন উভয়টি (ইনসাফের প্রার্থী হয়ে) পুলসিরাতের ডানে ও বামে দুই পার্শে দাড়িয়ে যাবে। তার উপর দিয়ে এবার লোকেরা অতিক্রম করতে থাকবে। তোমাদের প্রথম দল বিদ্যুতের মতো চলে যাবে। আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) বলেন, আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতামাতা আপনার প্রতি কুরবান, বিদ্যুতের মতো চলে যাবে’ এর অর্থ কী? তিনি বলবেন, তোমরা কি দেখতে পাও না, বিদ্যুতের রশ্মি কিরূপে দ্রুত গতিতে চলে যায় এবং চোখের পলকেই পুনরায় ফিরে আসে? তারপরের দল বাতাসের মতো এবং পুরুষদের দৌড়ের মতো আমল তাদেরকে (সম্মুখের দিকে) নিয়ে যাবে। আর তোমাদের নবী পুলসিরাতের উপর দাঁড়িয়ে বলতে থাকবেন, ’ইয়া- রব্বি! সাল্লিম সাল্লিম (অর্থাৎ হে আমার রব। নিরাপদে রাখ, নিরাপদে রাখ)
পরিশেষে কিছুসংখ্যক বান্দার ’আমল এতই কম হবে যে, তাদের পুলসিরাত অতিক্রম করার সাধ্য থাকবে না। এমনকি সে সময় এক লোক হামাগুড়ি দিতে দিতে অতিক্রম করবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, পুলসিরাতের উভয় কিনারায় আংটা ঝুলন্ত থাকবে। যাকে পাকড়াও করার নির্দেশ থাকবে উক্ত আংটা তাকে পাকড়াও করবে। ফলে কেউ কেউ ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় মুক্তি পাবে আবার কোন কোন ব্যক্তিকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। শপথ ঐ সত্তার! যার হাতে আবূ হুরায়রার প্রাণ! জাহান্নামের গভীরতা সত্তর বছর দূরত্বের সমান। (মুসলিম)
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَن حذيفةَ وَأَبِي هُرَيْرَةَ قَالَا: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَجْمَعُ اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى النَّاسَ فَيَقُومُ الْمُؤْمِنُونَ حَتَّى تُزْلَفَ لَهُمُ الْجَنَّةُ فَيَأْتُونَ آدَمَ فَيَقُولُونَ: يَا أَبَانَا اسْتَفْتِحْ لَنَا الْجَنَّةَ. فَيَقُولُ: وَهَلْ أَخْرَجَكُمْ مِنَ الْجَنَّةِ إِلَّا خَطِيئَةُ أَبِيكُمْ لَسْتُ بِصَاحِبِ ذَلِكَ اذْهَبُوا إِلَى ابْنِي إِبْرَاهِيمَ خَلِيلِ اللَّهِ قَالَ: فَيَقُولُ إِبْرَاهِيمُ: لَسْتُ بِصَاحِبِ ذَلِكَ إِنَّمَا كُنْتُ خَلِيلًا مِنْ وَرَاءَ وَرَاءَ اعْمَدُوا إِلَى مُوسَى الَّذِي كَلَّمَهُ اللَّهُ تَكْلِيمًا فَيَأْتُونَ مُوسَى عَلَيْهِ السَّلَام فَيَقُولُ: لَسْتُ بِصَاحِبِ ذَلِكَ اذْهَبُوا إِلَى عِيسَى كَلِمَةِ اللَّهِ وَرُوحِهِ فَيَقُولُ عِيسَى: لَسْتُ بِصَاحِبِ ذَلِكَ فَيَأْتُونَ مُحَمَّدًا صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَيَقُومُ فَيُؤْذَنُ لَهُ وَتُرْسَلُ الْأَمَانَةُ وَالرَّحِمُ فَيَقُومَانِ جَنَبَتَيِ الصِّرَاطِ يَمِينًا وَشِمَالًا فَيَمُرُّ أَوَّلُكُمْ كَالْبَرْقِ . قَالَ: قُلْتُ: بِأَبِي أَنْتَ وَأُمِّي أَيُّ شَيْءٍ كَمَرِّ الْبَرْقِ؟ قَالَ: أَلَمْ تَرَوْا إِلَى الْبَرْقِ كَيْفَ يَمُرُّ وَيَرْجِعُ فِي طَرْفَةِ عَيْنٍ. ثُمَّ كَمَرِّ الرِّيحِ ثُمَّ كَمَرِّ الطَّيْرِ وَشَدِّ الرِّجَالِ تَجْرِي بِهِمْ أَعْمَالُهُمْ وَنَبِيُّكُمْ قَائِمٌ عَلَى الصِّرَاطِ يَقُولُ: يَا رَبِّ سَلِّمْ سَلِّمْ. حَتَّى تَعْجِزَ أَعْمَالُ الْعِبَادِ حَتَّى يَجِيءَ الرَّجُلُ فَلَا يَسْتَطِيعُ السَّيْرَ إِلَّا زَحْفًا . وَقَالَ: «وَفِي حَافَتَيِ الصِّرَاطِ كَلَالِيبُ مُعَلَّقَةٌ مَأْمُورَةٌ تَأْخُذُ مَنْ أُمِرَتْ بِهِ فَمَخْدُوشٌ نَاجٍ وَمُكَرْدَسٌ فِي النَّارِ» . وَالَّذِي نَفْسُ أَبِي هُرَيْرَةَ بِيَدِهِ إِنَّ قَعْرَ جَهَنَّمَ لَسَبْعِينَ خَرِيفًا. رَوَاهُ مُسلم
رواہ مسلم (329 / 195)، (482) ۔
(صَحِيح)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৬১০-[৪৫] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: শাফা’আতের দ্বারা এমন কিছু সংখ্যক লোক জাহান্নাম থেকে বের হবে, তারা সা’আরীর-এর মতো। আমরা প্রশ্ন করলাম, সা’আরীর কি? তিনি বললেন, তা হলো ক্ষীরা। (বুখারী ও মুসলিম)
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَخْرُجُ مِنَ النَّار بالشفاعة كَأَنَّهُمْ الثعارير؟ قَالَ: «إِنَّه الضغابيس» . مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (6558) و مسلم (318 / 191)، (471) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: শাফা'আতের মাধ্যমে এমন কিছু সংখ্যক লোক জাহান্নাম থেকে বের হবে যারা দেখতে ক্ষিরার মতো হবে। কেউ কেউ বলেছেন, ক্ষিরা যেমন তরতাজা ও সুন্দর আকৃতিতে বের হয় ঠিক তারাও জাহান্নাম থেকে অনুরূপ হৃষ্টপুষ্ট ও সুন্দর আকৃতিতে বের হবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা
৫৬১১-[৪৬] ’উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ বলেছেন: কিয়ামতের দিন তিন ধরনের লোক সুপারিশ করবেন- নবীগণ, ’আলিমগণ ও শহীদগণ। (ইবনে মাজাহ)
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (بَاب الْحَوْض والشفاعة )
مَوْضُوع وَعَن عُثْمَان بن عَفَّان قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يُشَفَّعُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ثَلَاثَةٌ: الْأَنْبِيَاءُ ثُمَّ الْعلمَاء ثمَّ الشُّهَدَاء . رَوَاهُ ابْن مَاجَه
اسنادہ موضوع ، رواہ ابن ماجہ (4313) * عنبسۃ بن عبد الرحمن کان ’’ یضع الحدیث ‘‘ کما قال ابو حاتم و ابن معین رحمھما اللہ و علاق : مجھول و السند ضعفہ العراقی و البوصیری ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: নবী, ‘আলিম ও শাহীদগণ কিয়ামতের দিন সুপারিশ করবে। কেননা এ তিন শ্রেণির সম্মান ও মর্যাদা সর্বাধিক। তাই তাদের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু অন্যান্য মুমিন ও সৎ ব্যক্তিরাও সীমিত পর্যায়ে সুপারিশ করবেন, যা মশহুর হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। মুসলিমদের মাঝে খারিজী ও মু'তাযিলা সম্প্রদায় ব্যতীত আর কেউ শাফা'আতকে অস্বীকার করে না। (ফাতহুল বারী হা. ৬৫৭৭)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬১২-[১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “আমি আমার পুণ্যবান বান্দাদের জন্য এমন সব জিনিস প্রস্তুত রেখেছি, যা কক্ষনো কোন হৃদয় চিন্তাও করেনি।’ (তিনি বললেন) এর সত্যতা প্রমাণে তোমরা ইচ্ছা করলে এ আয়াতটি তিলাওয়াত করতে পার। এছাড়াও তাদের জন্য চক্ষু শীতলকারী আনন্দদায়ক যে সকল সামগ্রী গোপন রাখা হয়েছে কোন প্রাণীরই তার খবর নেই”(সূরাহ্ আস্ সিজদাহ্ ৩২: ১৭)। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: أَعْدَدْتُ لِعِبَادِيَ الصَّالِحِينَ مَا لَا عَيْنٌ رَأَتْ وَلَا أُذُنٌ سَمِعَتْ وَلَا خَطَرَ عَلَى قَلْبِ بشر. واقرؤوا إِنْ شِئْتُمْ: (فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَا أُخْفِيَ لَهُمْ مِنْ قُرَّة عين) مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (3244) و مسلم (2 / 2824)، (7132) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: উক্ত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) - মু'মিনদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দান করেছেন যে, আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন তাঁর সৎ বান্দাদের জন্য জান্নাতে এমন সব বস্তু প্রস্তুত করে রেখেছেন, যা মানুষের চক্ষু কখনো অবলোকন করেনি। মানুষের কর্ণ কখনো শুনেনি এবং মানুষ কখনো তা নিয়ে কল্পনাও করেনি। তাই তিনি বলেছেন, (فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَا أُخْفِيَ لَهُمْ مِنْ قُرَّة عين) অর্থাৎ চক্ষু শীতকারী আনন্দায়ক যে সমস্ত বস্তু তাদের জন্য গোপন রাখা হয়েছে তা কোন আত্মা জানে না। (তুহফাতুল আহওয়াযী হা. ৩১৯৭)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬১৩-[২] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতে একটি চাবুক রাখা পরিমাণ স্থান গোটা দুনিয়া ও তার মধ্যে যা কিছু আছে, তা থেকে উত্তম। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَوْضِعُ سَوْطٍ فِي الْجَنَّةِ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (2796 ، 6568) و مسلم (لم اجدہ) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জান্নাতের চাবুক সমপরিমাণ ক্ষুদ্রতম জায়গা সারা দুনিয়ার অপেক্ষায় অনেক উত্তম। কেননা দুনিয়ার সুখ-শান্তি আরাম-আয়েশ অস্থায়ী, পক্ষান্তরে জান্নাতের সুখ-শান্তি আরাম আয়েশ চিরস্থায়ী বিধায় এই মর্যাদার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬১৪-[৩] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আল্লাহর পথে এক সকাল এবং এক সন্ধ্যা কাটানো দুনিয়া ও তার সকল সম্পদ থেকে উত্তম। যদি জান্নাতবাসিনী কোন নারী (হুর) পৃথিবীর দিকে উঁকি দেয়, তবে সমগ্র জগৎটা (তার রূপের ছটায়) আলোকিত হয়ে যাবে এবং আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী স্থানসমূহ সুগন্ধিতে মোহিত করে ফেলবে। এমনকি তাদের (হুরদের) মাথার ওড়নাও গোটা দুনিয়া এবং সম্পদরাশি থেকে উত্তম। (বুখারী)
الفصل الاول (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «غَدْوَةٌ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوْ رَوْحَةٌ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا وَلَوْ أَنَّ امْرَأَةً مِنْ نِسَاءِ أَهْلِ الْجَنَّةِ اطَّلَعت إِلى الأَرْض لَأَضَاءَتْ مابينهما وَلَمَلَأَتْ مَا بَيْنَهُمَا رِيحًا وَلَنَصِيفُهَا عَلَى رَأْسِهَا خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا» . رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ
رواہ البخاری (2796) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: উক্ত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের ফযীলত বর্ণনা করেছেন। মুহাদ্দিসগণ বলেন, (غَدْوَةٌ) শব্দটি দিনের প্রথমাংশ বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, আর (رَوْحَةٌ) শব্দটি দিনের শেষাংশ বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, আল্লাহর রাস্তায় এক সকাল ও এক বিকাল ব্যয় করা সমগ্র দুনিয়ার চেয়ে অনেক উত্তম। এই অতিবাহিত করাটা আল্লাহর রাস্তায় সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য জিহাদ, হিজরত হতে পারে। এরপর উক্ত হাদীসে জান্নাতের হুরদের অপরূপ সৌন্দর্যের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, যদি ঐ সকল হুরেরা পৃথিবীতে একবার উঁকি মারতো তাহলে পুরো পৃথিবীতে আলোকিত হয়ে যেত।
ইমাম আযহারী (রহিমাহুল্লাহ) (نَصِيفٌ) শব্দের অর্থ (خِمَارٌ) (ওড়না) যা হুরেরা পাগড়ীর মতো পেঁচিয়ে রাখবে তাও পুরো দুনিয়া থেকে অনেক উত্তম হবে। (ফাতহুল বারী হা. ৬৫৬৮)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬১৫-[8] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতে এমন একটি বিশাল গাছ আছে (’তূবা’ নামক) যদি কোন বাহন তার ছায়ায় একশত বছরও পরিভ্রমণ করে, তবুও তার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পৌছতে পারবে না। জান্নাতে তোমাদের কারো একটি ধনুকের সমান স্থানও এর চেয়ে উত্তম, যার উপর সূর্য উদিত হয় এবং অস্ত যায়। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِن فِي الْجَنَّةِ شَجَرَةً يَسِيرُ الرَّاكِبُ فِي ظِلِّهَا مِائَةَ عَامٍ لَا يَقْطَعُهَا وَلَقَابَ قَوْسِ أَحَدِكُمْ فِي الْجَنَّةِ خَيْرٌ مِمَّا طَلَعَتْ عَلَيْهِ الشَّمْسُ أَو تغرب» . مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (3252) ومسلم (6 / 2826)، (7136) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: ইমাম ইবনু জাওযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) মু'মিনদেরকে সুসংবাদ দান করেছেন, জান্নাতের ‘তূবা' নামক উক্ত গাছের বর্ণনার মাধ্যমে। তিনি (সা.) বলেছেন, উক্ত গাছের ছায়ায় একজন উন্নতমানের ঘোড়সওয়ারী একশত বছর অতিক্রম করেও তা শেষ করতে পারবে না। ইমাম ইবনু হাজার ‘আসকালানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, অনুরূপ হাদীস ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল, ইমাম তবারানী ও ইবনু হিব্বান (রহিমাহুমুল্লাহ)-ও বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, 'ছায়া” দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ঐ ছায়া যা সকাল থেকে নিয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত সূর্যের কিরণের মুকাবেলা করে মানুষকে প্রশান্তি দেয়।
(مِمَّا طَلَعَتْ عَلَيْهِ الشَّمْسُ) যার উপর সূর্য উদিত হয় তার চেয়ে জান্নাতের চাবুক পরিমাণ জায়গা অনেক উত্তম। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো পৃথিবীতে যা আছে তা তার চেয়ে অনেক উত্তম। (ফাতহুল বারী হা. ৬৫৫৩)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬১৬-[৫] আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতে মু’মিনদের জন্য মুক্তা দ্বারা তৈরি একটি তাঁবু থাকবে, যার মাঝে ফাঁকা হবে। তার প্রশস্ততা, অন্য বর্ণনায় তার দৈর্ঘ্য ষাট মাইল। তার প্রত্যেক কোণে থাকবে তার পরিমাণ। এক কোণের লোক অন্য কোণের লোককে দেখতে পাবে না। ঈমানদারগণ তাদের কাছে যাতায়াত করবে। দু’টি জান্নাত হবে রৌপ্যের, তার ভিতরের পাত্র ও অন্যান্য সামগ্রী হবে রৌপ্যের এবং অপর দুটি জান্নাত হবে স্বর্ণের। যার পাত্র ও ভিতরের সব জিনিস হবে সোনার। আর ’আদন জান্নাত’ জান্নাতবাসী এবং তাদের প্রভুর দিদার লাভের মাঝখানে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের আভা ছাড়া আর কোন আড়াল থাকবে না। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْ أَبِي مُوسَى قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ لِلْمُؤْمِنِ فِي الْجَنَّةِ لَخَيْمَةً مِنْ لُؤْلُؤَةٍ وَاحِدَةٍ مُجَوَّفَةٍ عَرْضُهَا وَفِي رِوَايَةٍ: طُولُهَا سِتُّونَ مِيلًا فِي كُلِّ زَاوِيَةٍ مِنْهَا أَهْلٌ مَا يَرَوْنَ الْآخَرِينَ يَطُوفُ عَلَيْهِم المؤمنُ وجنَّتانِ من فضةٍ آنيتهما مَا فِيهِمَا وَجَنَّتَانِ مِنْ ذَهَبٍ آنِيَتُهُمَا وَمَا فِيهِمَا وَمَا بينَ أَنْ يَنْظُرُوا إِلَى رَبِّهِمْ إِلَّا رِدَاءُ الْكِبْرِيَاءِ على وجههِ فِي جنَّة عدْنٍ . مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (3243) و مسلم (23 / 2838)، (7158) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতে মু'মিনদের জন্য মুক্তা দ্বারা তৈরি একটি তাঁবু থাকবে যার প্রশস্ততা বা দৈর্ঘ্য ষাট মাইল হবে। উক্ত তাবুর প্রতিটি প্রান্তের জন্য আলাদা আলাদা অধিবাসী থাকবে। মুমিনদের জন্য বিশেষ দুটি স্বর্ণের জান্নাত থাকবে যার ভিতরের সকল জিনিস হবে স্বর্ণের আরো দুটি জান্নাত থাকবে রূপার তার ভিতরের পান পাত্র ও অন্যান্য সামগ্রী হবে রূপার।
ইমাম বায়হাক্কী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, কুরআন ও সুন্নাহ প্রমাণ বহন করে যে, মু'মিনদের জন্য চারটি জান্নাত হবে, কেননা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সূরা আর রহমানে বলেছেন, (وَ لِمَنۡ خَافَ مَقَامَ رَبِّهٖ جَنَّتٰنِ) “আর যে তার প্রতিপালকের সামনে হাজির হওয়ার ভয় রাখে তার জন্য আছে দুটো বাগান”- (সূরাহ্ আর রহমান ৫৫ : ৪৬)। এরপর একটু পরে তিনি আবার বলেন (وَ مِنۡ دُوۡنِهِمَا جَنَّتٰنِ) “এ দুটো বাগান ছাড়াও আরো দুটি বাগান আছে”- (সূরা আর রহমান ৫৫ : ৬২)।
সারাংশে আমরা বলব যে, প্রথম দুটি জান্নাত হবে যারা অগ্রে প্রবেশ করবে তাদের জন্য। যারা তাদের সাথে প্রবেশ করবে তারা উঁচু মর্যাদার অধিকারী হবে। আর পরে দুটি জান্নাত হতে পারে যারা জান্নাতে প্রবেশ করবে তাদের জন্য। যারা প্রবেশ করবে তারা একটু নীচু মর্যাদার অধিকারী হবে। (তুহফাতুল আহওয়াযী হা. ২৫২৮)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬১৭-[৬] ’উবাদাহ্ ইবনুস সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতের স্তর হবে একশটি প্রত্যেক দুই স্তরের মাঝখানের দূরত্ব হবে আসমান ও জমিনের দূরেত্বের পরিমাণ। জান্নাতুল ফিরদাউসের স্তর হবে সর্বোপরি। তা হতেই প্রবাহিত হয় ঝরনাধারা এবং তার উপরেই রয়েছে মহান প্রভুর ’আরশ’। অতএব তোমরা যখনই আল্লাহ তা’আলার কাছে প্রার্থনা করবে, তখন ফিরদাউস জান্নাতই চাইবে। (তিরমিযী)
الفصل الاول (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «فِي الْجَنَّةِ مائةُ درجةٍ مَا بينَ كلِّ دَرَجَتَيْنِ كَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَالْفِرْدَوْسُ أَعْلَاهَا دَرَجَةً مِنْهَا تُفَجَّرُ أَنْهَارُ الْجَنَّةِ الْأَرْبَعَةُ وَمِنْ فَوْقِهَا يَكُونُ الْعَرْشُ فَإِذَا سَأَلْتُمُ اللَّهَ فَاسْأَلُوهُ الْفِرْدَوْسَ» رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَلَمْ أَجِدْهُ فِي الصَّحِيحَيْنِ وَلَا فِي كِتَابِ الْحُمَيْدِيِّ
اسنادہ صحیح ، رواہ الترمذی (2531) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতের স্তর হবে একশত, প্রতিটি দুই স্তরের মাঝখানের ব্যবধান হবে আসমান ও জমিনের দূরত্বের ন্যায়। মুহাদ্দিসগণ বলেন, এর দ্বারা আধিক্যতা বুঝানো উদ্দেশ্য। কেননা সুনানে বায়হাকীতে ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে মারফু সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, জান্নাতের স্তরের সংখ্যা কুরআনের আয়াতের সংখ্যার ন্যায়। অতএব কুরআনের ধারক বাহক যে জান্নাতে প্রবেশ করবে তার উপরে আর কোন স্তর নেই। মুহাদ্দিসগণ বলেন, জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তরের নাম হলো জান্নাতুল ফিরদাউস, যার অধিকারী হবেন নবীগণ ও বিশেষ মু'মিনবর্গ। আর জান্নাতের নহর হবে চারটি। যথা: ১) পানির নহর, ২) দুধের শরাবের নহর, ৩) মধুর শরাবের নহর, ৪) মদের নহর। (শারহুন নাবাবী হা, ২৮২৬, তুহফাতুল আহওয়াযী হা. ২৫৩১)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬১৮-[৭] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতে একটি বাজার আছে। জান্নাতবাসীগণ সপ্তাহের প্রত্যেক জুমু’আর দিন সেখানে একত্রিত হবে। তখন উত্তরী বাতাস প্রবাহিত হবে এবং তা তাদের মুখমণ্ডলে ও কাপড়চোপড়ে সুগন্ধি নিক্ষেপ করবে, ফলে তাদের রূপ-সৌন্দর্য আরো অধিক বৃদ্ধি পাবে। অতঃপর যখন তারা বর্ধিত সুগন্ধি ও সৌন্দর্য অবস্থায় নিজেদের স্ত্রীদের কাছে যাবে, তখন স্ত্রীগণ তাদেরকে বলবে, আল্লাহর শপথ! তোমরা তো আমাদের অবর্তমানে সুগন্ধি ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে ফেলেছ। তার উত্তরে তারা বলবে, আল্লাহ শপথ! আমাদের অনুপস্থিতিতে তোমাদের রূপ-সৌন্দর্যও বৃদ্ধি পেয়েছে। (মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ فِي الْجَنَّةِ لَسُوقًا يَأْتُونَهَا كُلَّ جُمُعَةٍ فَتَهُبُّ رِيحُ الشَّمَالِ فَتَحْثُو فِي وُجوهِهم وثيابِهم فيزدادونَ حُسنا وجمالاً فيرجعونَ إِلى أَهْليهمْ وَقَدِ ازْدَادُوا حُسُنًا وَجَمَالًا فَيَقُولُ لَهُمْ أَهْلُوهُمْ وَاللَّهِ لَقَدِ ازْدَدْتُمْ بَعْدَنَا حُسْنًا وَجَمَالًا فَيَقُولُونَ وَأَنْتُم واللَّهِ لقدِ ازددتم حسنا وجمالا»
رواہ مسلم (13 / 2833)، (7146) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (إِنَّ فِي الْجَنَّةِ لَسُوقًا) জান্নাতে একটি বাজার থাকবে উক্ত বাজার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সৌন্দর্য ও কমনীয়তা বৃদ্ধির কেন্দ্র। যেখানে জান্নাতবাসীরা একত্রিত হবেন। আর সেখানে বিভিন্ন ধরনের হৃদয়গ্রাহী, মনোরম ও সুশ্রী আকৃতি-প্রকৃতি প্রতিচ্ছবি উপস্থিত থাকবে। আর প্রত্যেক জান্নাতী তাঁর পছন্দ মতে যে আকৃতি ধারণের ইচ্ছা করবে তা অবলম্বন করতে পারবে।
(كُلَّ جُمُعَةٍ) “প্রত্যেক জুমু'আর দিন”, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, প্রতি সপ্তাহে একদিন লোকজন একত্রিত হবেন। আর সপ্তাহ দ্বারাও পৃথিবীর মতো সপ্তাহ উদ্দেশ্য নয়। ইমাম নবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, বাজার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো জান্নাতীদের একত্রিত হওয়ার স্থান, তারা সেখানে প্রতি জুমু'আর একদিন একত্রিত হবে।
জান্নাতীরা জান্নাতে ‘আলিমদেরকে ভালোবাসবে এবং তাদের নিকট বিভিন্ন প্রয়োজনে মুখাপেক্ষী হবে এবং প্রতি জুমু'আর দিন তারা আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলবেন, তোমাদের যা ইচ্ছা চাও তারা তাদের মন মতো বিভিন্ন জিনিস চাইবে তিনি তাদেরকে তাই প্রদান করবেন।
(رِيحُ الشَّمَالِ) ‘উত্তরী হাওয়া’ এ হাওয়া যেহেতু উত্তরদিক থেকে প্রবাহিত হয় তাই তাকে উত্তরী হাওয়া বলে। সাধারণত শীতপ্রধান দেশসমূহে লোহিত সাগরের উপর দিয়ে এই হাওয়া বয়ে যায় এবং যথেষ্ট ঠাণ্ডা হয়, ঠিক অনুরূপভাবে জান্নাতেও উত্তরী হাওয়া বইবে যা জান্নাতীদের শরীরকে আরামদায়ক ও প্রশান্তিময় করে দিবে। (শারহুন নাবাবী হা. ২৮৩৪)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬১৯-[৮] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: প্রথম যে দল জান্নাতে প্রবেশ করবে, পূর্ণিমা রজনির চাঁদের মতো (উজ্জ্বল ও সুন্দর) রূপ ধারণ করেই তারা প্রবেশ করবে। আর পরবর্তী তাদের যে দল যাবে, তারা হবে আকাশের সমুজ্বল তারকার মতো উদ্দীপ্ত, জান্নাতবাসী সকলের অন্তর এক লোকের অন্তরের মতো হবে। তাদের মধ্যে কোন ঝগড়া থাকবে না এবং কোন হিংসা-বিদ্বেষও থাকবে না। তাদের প্রত্যেকের জন্য হুরি ’ঈন থেকে দু’ দু’জন স্ত্রী থাকবে। সৌন্দর্যের কারণে তাদের হাড় ও মাংসের উপর থেকে নলার ভিতরের মজ্জা দেখা যাবে। তারা সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনায় ব্যস্ত থাকবে। তারা কখনো রোগাগ্রস্ত হবে না। তাদের পেশাব হবে না, পায়খানাও করবে না, থুথু ফেলবে না, নাক দিয়ে শ্লেষ্মা ঝরবে না। তাদের পাত্রসমূহ হবে সোনা-রূপার। আর তাদের চিরুনি হবে স্বর্ণের এবং তাদের ধুনীর জ্বালানি হবে আগরের, তাদের গায়ের ঘর্ম হবে কস্তুরীর মতো (সুগন্ধি)। তাদের স্বভাব হবে এক লোকের মতো, শারীরিক গঠন অবয়বে হবে তাদের পিতা আদাম ’আলায়হিস সালাম -এর ন্যায়, উচ্চতায় ষাট গজ লম্বা। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَن أبي هُرَيْرَة قا ل: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ أَوَّلَ زُمْرَةٍ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ عَلَى صُورَةِ الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ كَأَشَدِّ كَوْكَبٍ دُرِّيٍّ فِي السَّمَاءِ إِضَاءَةً قُلُوبُهُمْ عَلَى قَلْبِ رَجُلٍ وَاحِدٍ لَا اخْتِلَافَ بَيْنَهُمْ وَلَا تَبَاغُضَ لِكُلِّ امْرِئٍ مِنْهُمْ زَوْجَتَانِ مِنَ الْحُورِ الْعِينِ يُرَى مُخُّ سُوقِهِنَّ مِنْ وَرَاءِ الْعَظْمِ وَاللَّحْمِ مِنَ الْحُسْنِ يُسَبِّحُونَ اللَّهَ بُكْرَةً وَعَشِيًّا لَا يَسْقَمُونُ وَلَا يَبُولُونَ وَلَا يَتَغَوَّطُونَ وَلَا يَتْفُلُونَ وَلَا يَتَمَخَّطُونَ آنِيَتُهُمُ الذَّهَبُ وَالْفِضَّةُ وَأَمْشَاطُهُمُ الذَّهَبُ وَوَقُودُ مَجَامِرِهِمُ الْأَلُوَّةُ وَرَشْحُهُمُ الْمِسْكُ عَلَى خُلُقِ رَجُلٍ وَاحِدٍ عَلَى صُورَةِ أَبِيهِمْ آدَمَ ستونَ ذِرَاعا فِي السَّمَاء. رَوَاهُ مُسلم
متفق علیہ ، رواہ البخاری (3245 ۔ 3246 ، 3254) و مسلم (16 ، 15 / 2834)، (7147 و 7149) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: মুহাদ্দিসগণ বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর উক্ত হাদীস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশকারী দলটি পূর্ণিমা রজনীর চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল ও সুন্দর রূপ ধারণ করে প্রবেশ করবে। এরপরে যারা প্রবেশ করবে তাদের চেহারা আকাশের সমুজ্জ্বল তারকার ন্যায় চমকাবে এবং হাদীস থেকে জানা যায় যে, জান্নাতে কোন প্রকার দলাদলি ও হিংসা বিদ্বেষ থাকবে না। আর জান্নাতে কোন প্রকার রোগব্যাধি কষ্ট-ক্লেশ কিছুই থাকবে না। জান্নাতবাসীরা সেখানে অনাবিল সুখ-শান্তি ভোগ করবে। (ফাতহুল বারী হা. ৩২৪২)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬২০-[৯] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতবাসীগণ সেখানে আহার করবে, সেখানে পান করবে কিন্তু তারা থুথু ফেলবে না, মল-মূত্র ত্যাগ করবে না এবং তাদের নাক থেকে শ্লেষ্মা ঝরবে না। সাহাবীগণ প্রশ্ন করলেন, এমতাবস্থায় তাদের খাদ্যের পরিণতি কি হবে? তিনি (সা.) বললেন, ঢেকুর এবং মিশকের মতো সুগন্ধি ঘামের দ্বারা নিঃশেষ হয়ে যাবে। আল্লাহর পবিত্রতা ও প্রশংসা তাদের অন্তরে এমনভাবে ঢেলে দেয়া হবে যেমন শ্বাস-নিঃশ্বাস অনবরত চলছে। (মুসিলম)
الفصل الاول (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ أَهْلَ الْجَنَّةِ يَأْكُلُونَ فِيهَا وَيَشْرَبُونَ ولايتفلون ولايبولون وَلَا يَتَغَوَّطُونَ وَلَا يَتَمَخَّطُونَ» . قَالُوا: فَمَا بَالُ الطَّعَامِ؟ قَالَ: «جُشَاءٌ وَرَشْحٌ كَرَشْحِ الْمِسْكِ يُلْهَمُونَ التَّسْبِيحَ وَالتَّحْمِيدَ كَمَا تُلْهَمُونَ النَّفَسَ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
رواہ مسلم (18 / 2835)، (7152) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: জান্নাতবাসীগণ যেখানে খাবার-দাবার ও পানাহার করবে ও বিভিন্ন প্রকারের নিআমাত তারা সেখানে ভোগ করবে। তাদের সেখানে কোন প্রকারের পেশাব-পায়খানার প্রয়োজন হবে না। তাদের খাবারসমূহ ঢেকুর ও মিশকের ন্যায় সুগন্ধি ঘামের মাধ্যমে নিঃশেষ হয়ে যাবে। তারা সেখানে অবিরাম আল্লাহর তাসবীহ ও প্রশংসা করতে থাকবে। ঢেকুরের মাধ্যমে জান্নাতীদের খাবার নিঃশেষ হয়ে যাবে, এর হিকমাত হলো আল্লাহ রাব্বুল আলামীন উক্ত ঢেকুরের মাধ্যমে জান্নাতবাসীদের নিত্য প্রয়োজনীয় পেশাব পায়খানার বেগ মিটিয়ে দিবেন যাতে করে জান্নাতের মতো পবিত্র স্থান অপবিত্র না হয়ে যায়। (শারহুন নাবাবী হা. ২৮৩৫)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬২১-[১০] আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: যে লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে, সে সেখানে সুখে-স্বচ্ছন্দে আয়েশের মধ্যে ডুবে থাকবে, কোন প্রকারের দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনা তাকে পাবে না এবং তার পোশাক-পরিচ্ছদ ময়লা বা পুরাতন হবে না, আর তার যৌবনও নিঃশেষ হবে না। (মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ يَنْعَمُ وَلَا يَبْأَسُ وَلَا تَبْلَى ثِيَابُهُ وَلَا يفْنى شبابُه» . رَوَاهُ مُسلم
رواہ مسلم (21 / 2836)، (7156) ۔
(صَحِيح)
সহীহ: মুসলিম ২১-(২৮৩৬), মুসনাদে আহমাদ ৮৮১৩, সহীহুল জামি ৬৬০৮, সহীহ আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩৭৪৪, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ ১০৮৬, আবূ ইয়া'লা ৬৪২৮, দারিমী ২৮১৯।
ব্যাখ্যা: জান্নাতবাসীদের কোন প্রকার কষ্ট-ক্লেশ থাকবে না এবং তাদের কাপড় কখনো পুরাতন হবে না এবং তাদের যৌবন কখনো শেষ হবে না। ইমাম কাযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, জান্নাত হলো স্থায়ী ঘর ও স্থায়ী বাসস্থান। পরিবর্তন কিংবা পুরাতন জান্নাতে থাকবে না। তার নিআমাতরাজি অস্বীকারকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না। কেননা জান্নাতটা দুনিয়ার মতো বিশৃঙ্খল ও অশান্তির ঘর নয়। (ফাতহুল বারী হা. ৩২৫৬)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬২২-[১১] ও ৫৬২৩-[১২] আবূ সাঈদ ও আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতবাসী জান্নাতে প্রবেশ করার পর একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দিবেন, তোমরা সর্বদা সুস্থ থাকবে, আর কখনো রোগগ্রস্ত হবে না। তোমরা সর্বদা জীবিত থাকবে আর কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। তোমরা সর্বদা যুবক থাকবে, আর কখনো বার্ধক্যে উপনীত হবে না এবং সর্বদা আরাম-আয়েশে থাকবে, আর কখনো হতাশ ও দুশ্চিন্তা তোমাদেরকে পাবে না। (মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ وَأَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: يُنَادِي مُنَادٍ: إِنَّ لَكُمْ أَنْ تَصِحُّوا فَلَا تَسْقَمُوا أَبَدًا وَإِنَّ لَكُمْ أَنْ تَحْيَوْا فَلَا تَمُوتُوا أَبَدًا وَإِنَّ لَكُمْ أَنْ تَشِبُّوا فَلَا تَهْرَمُوا أَبَدًا وَإِنَّ لَكُمْ أَنْ تَنْعَمُوا فَلَا تَبْأَسُوا أبدا رَوَاهُ مُسلم
رواہ مسلم (22 / 2837)، (7157) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: জান্নাতে একজন ঘোষক জান্নাতবাসীদের উদ্দেশ্য করে বলবে, তোমরা চিরসুস্থ হয়ে যাও আর কখনো অসুস্থ হবে না। তোমরা চিরঞ্জীব হয়ে যাও আর কখনো মরবে না। তোমাদের যৌবনকাল চিরস্থায়ী হবে, আর কখনো বার্ধক্যে উপনীত হবে না। তোমরা চিরস্থায়ী নি'আমাতে ডুবে থাক কখনো নৈরাশ হবে না। ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এই আহ্বান জান্নাতবাসীদেরকে অনেক আনন্দ ও প্রফুল্লতায় ভাসিয়ে দিবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬২২-[১১] ও ৫৬২৩-[১২] আবূ সাঈদ ও আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতবাসী জান্নাতে প্রবেশ করার পর একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দিবেন, তোমরা সর্বদা সুস্থ থাকবে, আর কখনো রোগগ্রস্ত হবে না। তোমরা সর্বদা জীবিত থাকবে আর কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। তোমরা সর্বদা যুবক থাকবে, আর কখনো বার্ধক্যে উপনীত হবে না এবং সর্বদা আরাম-আয়েশে থাকবে, আর কখনো হতাশ ও দুশ্চিন্তা তোমাদেরকে পাবে না। (মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ وَأَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: يُنَادِي مُنَادٍ: إِنَّ لَكُمْ أَنْ تَصِحُّوا فَلَا تَسْقَمُوا أَبَدًا وَإِنَّ لَكُمْ أَنْ تَحْيَوْا فَلَا تَمُوتُوا أَبَدًا وَإِنَّ لَكُمْ أَنْ تَشِبُّوا فَلَا تَهْرَمُوا أَبَدًا وَإِنَّ لَكُمْ أَنْ تَنْعَمُوا فَلَا تَبْأَسُوا أبدا رَوَاهُ مُسلم
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬২৪-[১৩] আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: নিশ্চয় জান্নাতবাসীগণ তাদের ঊর্ধ্বের বালাখানার অধিবাসীদেরকে এমনিভাবে দেখতে পাবে, যেমনিভাবে আকাশের পূর্ব কিংবা পশ্চিম দিগন্তে তোমরা একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র দেখতে পাও। তাদের মধ্যে মর্যাদার ব্যবধানের কারণে এরূপ হবে। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! তা তো হবে আম্বিয়ায়ে কিরামদেরই স্থান, অন্যেরা তো সেখানে পৌছতে পারবে না। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, না, বরং সে সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! যে সমস্ত লোকেরা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং রাসূলগণের সত্যতা স্বীকার করবে তারাও সেখানে পৌছতে সক্ষম হবে। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيُّ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّ أَهْلَ الْجَنَّةِ يَتَرَاءَوْنَ أَهْلَ الْغُرَفِ مِنْ فَوْقِهِمْ كَمَا تَتَرَاءَوْنَ الْكَوْكَبَ الدُّرِّيَّ الْغَابِرَ فِي الْأُفُقِ مِنَ الْمَشْرِقِ أَو الْمَغْرِبِ لِتَفَاضُلِ مَا بَيْنَهُمْ» قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ تِلْكَ مَنَازِلُ الْأَنْبِيَاءِ لَا يَبْلُغُهَا غَيْرُهُمْ قَالَ: «بَلَى وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ رِجَالٌ آمَنُوا باللَّهِ وصدَّقوا الْمُرْسلين» . مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (3256) و مسلم (11 / 2831)، (7144) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: জান্নাতবাসীরা তাদের উপরস্থ বালাখানার বাসিন্দাদেরকে এমনিভাবে দেখতে পাবে যেমনিভাবে আকাশের পূর্ব কিংবা পশ্চিম দিগন্তে উজ্জ্বল নক্ষত্র দেখা যায়। মুহাদ্দিসগণ বলেন, তাদের মধ্যে মর্যাদার পার্থক্যের কারণে এরূপ অবস্থা হবে। প্রত্যেক ঐ সকল ব্যক্তি যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে এবং রাসূলগণকে সত্যায়ন করেছে তারা উপরোক্ত মর্যাদার অধিকারী হবে। (শারহুন নাবাবী ১৭ খণ্ড, হা. ২৮৩১/১১)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬২৫-[১৪] আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: এমন একদল লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে, যাদের অন্তঃকরণ হবে পাখিদের অন্তরের মতো। (মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَن أبي هُرَيْرَة قا ل: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَدْخُلُ الْجَنَّةَ أَقْوَامٌ أَفْئِدَتُهُمْ مِثْلُ أَفْئِدَةِ الطَّيْرِ» . رَوَاهُ مُسلم
رواہ مسلم (27 / 2840)، (7162) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: এমন একদল লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে যাদের অন্তর হবে পাখির অন্তরের ন্যায়। তাদের অন্তরকে পাখির অন্তরের সাথে তুলনা করার কারণ হলো পাখিদের অন্তর কোমল এবং ভীতু ও পরস্পর শত্রুতা হতে সম্পূর্ণ মুক্ত এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ নির্ভরশীল হয়, উপরোক্ত জান্নাতীরা ঠিক অনুরূপ হবে। সর্বমোট কথা হলো তাদের অন্তর খুবই কোমল ও মমতাময় হবে। (শারুহুন নাবাবী হা, ২৮৪০)।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬২৬-[১৫] আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আল্লাহ তা’আলা জান্নাতবাসীদেরকে লক্ষ্য করে বলবেন, হে জান্নাতবাসীগণ! উত্তরে তারা বলবেন, ’আমরা উপস্থিত, সৌভাগ্য তোমার কাছ থেকে অর্জিত এবং যাবতীয় কল্যাণ তোমারই হাতে।” তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, তোমরা কি সন্তুষ্ট? তারা উত্তরে বলবে, কেন সন্তুষ্ট হব না, হে আমাদের প্রভু! অথচ আপনি আমাদেরকে এমন জিনিস দান করেছেন যা আপনার সৃষ্ট জগতের কাউকেও দান করেননি। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, আমি কি তা অপেক্ষাও উত্তম জিনিস তোমাদেরকে দান করব না? তারা বলবে, হে প্রভু! তা অপেক্ষা উত্তম কিছু আর কি হতে পারে?
অতঃপর আল্লাহ তা’আলা বলবেন, আমি তোমাদের ওপর আমার সন্তুষ্টি দান করছি, অতএব এরপর তোমাদের ওপর আর কখনো আমি অসন্তুষ্ট হব না। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَن أبي سعيد قا ل: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَقُولُ لِأَهْلِ الْجَنَّةِ يَا أهلَ الجنةِ فيقولونَ لَبَّيْكَ رَبَّنَا وَسَعْدَيْكَ وَالْخَيْرُ كُلُّهُ فِي يَدَيْكَ فَيَقُولُ: هَلْ رَضِيتُمْ؟ فَيَقُولُونَ: وَمَا لَنَا لَا نَرْضَى يَا رَبِّ وَقَدْ أَعْطَيْتَنَا مَا لَمْ تُعْطِ أَحَدًا مِنْ خَلْقِكَ؟ فَيَقُولُ أَلَا أُعْطِيكُمْ أَفْضَلَ مِنْ ذَلِكَ؟ فَيَقُولُونَ: يَا رَبِّ وَأَيُّ شَيْءٍ أَفْضَلُ مِنْ ذَلِكَ؟ فَيَقُولُ: أُحِلُّ عَلَيْكُمْ رِضْوَانِي فَلَا أَسْخَطُ عَلَيْكُمْ بَعْدَهُ أَبَدًا . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (6549) و مسلم (9 / 2829)، (7140) ۔
(مُتَّفق عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: জান্নাতবাসীদের সাথে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জান্নাতে কথা বলবেন। এরপর তারা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে উদ্দেশ্য করে বলবেন, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা উপস্থিত। এরপর তিনি তাদেরকে জান্নাতে যে নি'আমাতরাজি প্রদান করেছেন তা পেয়ে তারা সন্তুষ্ট কিনা এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবেন। তারা বলবে, আমরা কি আপনার নাশোকর বান্দা যে, আমরা তা স্বীকার করব না। আপনি তো আমাদের অসংখ্য নি'আমাত দান করেছেন যা আমরা কখনো কল্পনাও করেনি। তারপর আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন জান্নাতবাসীদেরকে উদ্দেশ্য করে বলবেন, আজ থেকে তোমাদের জন্য আমার সন্তুষ্টি চিরঅবধারিত হয়ে গেল আমি আর কখনো তোমাদের প্রতি রাগ করব না। ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, সবচেয়ে বড় নি'আমাত হবে আল্লাহর দর্শন। (ফাতহুল বারী ১৩ খণ্ড, হা. ৭৫১৮, শারহুন নাবাবী ১৭ খণ্ড, হা. ২৮২৯/৯)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬২৭-[১৬] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: তোমাদের মধ্যে যে লোক জান্নাতে সবচেয়ে নিম্নমানের হবে তাকে বলা হবে, তুমি তোমার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ কর। তখন সে আগ্রহ প্রকাশ করবে, আরো আগ্রহ প্রকাশ করবে (বার বার)। তখন আল্লাহ তা’আলা তাকে প্রশ্ন করবেন, তোমার আকাঙ্ক্ষা শেষ হয়েছে কি? সে বলবে, হ্যাঁ। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা বলবেন, তুমি যতটুকু আশা-আকাঙ্ক্ষা করেছ তা এবং তার সমপরিমাণ (দ্বিগুণ) তোমাকে দেয়া হলো। (মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِنَّ أَدْنَى مَقْعَدِ أَحَدِكُمْ مِنَ الْجَنَّةِ أَنْ يَقُولَ لَهُ: تَمَنَّ فَيَتَمَنَّى وَيَتَمَنَّى فَيَقُولُ لَهُ: هَلْ تَمَنَّيْتَ؟ فَيَقُولُ نَعَمْ فَيَقُولُ لَهُ: فَإِنَّ لَكَ مَا تَمَنَّيْتَ ومثلَه معَه . رَوَاهُ مُسلم
رواہ مسلم (301 / 182)، (453) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: জান্নাতের সর্বাপেক্ষা নিম্নমানের ব্যক্তিকেও তার আকাক্ষা অনুযায়ী নি'আমাতরাজি দেয়া হবে। সে বারবার আকাক্ষা করবে, পরিশেষে তাকে বলা হবে আরো চাও। এরপর বলা হবে, তুমি যতটুকু আশা-আকাঙ্ক্ষা করেছ তা এবং তার সমপরিমাণ দ্বিগুণ তোমাকে দেয়া হবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬২৮-[১৭] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: সায়হান, জায়হান, ফুরাত ও নীল- এ সকল নদীগুলো জান্নাতের নহর। (মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «سَيْحَانُ وَجَيْحَانُ وَالْفُرَاتُ وَالنِّيلُ كُلٌّ من أنهارِ الْجنَّة» . رَوَاهُ مُسلم
رواہ مسلم (26 / 2839)، (7161) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: সায়হান ও জায়হান অধিকাংশ মুহাদ্দিসগণের মতে এশিয়ার খুরাসান এলাকায় অবস্থিত। ফুরাত ‘ইরাকের কুফা নগরীর পাশ দিয়ে প্রবাহিত নদী এবং নীল মিসরের প্রসিদ্ধ নদী। প্রকৃতপক্ষে নবীগণ এ সমস্ত নদীর পানি পান করেছেন। অথবা জান্নাতের নহরসমূহের সাথে এগুলোর সদৃশ থাকার কারণে এগুলোকে জান্নাতী নদী বলা হয়েছে। (শারহুন নাবাবী ১৭শ খণ্ড, হা. ২৮৩৯/২৬)।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬২৯-[১৮] ’উতবাহ্ ইবনু গযওয়ান (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমাদের সম্মুখে [রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর হাদীস] বর্ণনা করা হয় যে, যদি জাহান্নামের উপরের প্রান্ত থেকে একটি পাথর নিক্ষেপ করা হয়, তা সত্তর বছরেও জাহান্নামের গভীর তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না। আল্লাহ শপথ! জাহান্নামের এই গভীরতা (কাফির-মুশরিক, জিন্ ও মানব দ্বারা) পরিপূর্ণ করা হবে এবং তাও বর্ণনা করা হয় যে, জান্নাতের দরজার উভয় কপাটের মধ্যবর্তী স্থান চল্লিশ বছরের দূরত্ব হবে। নিশ্চয় একদিন এমন আসবে যে, (তার অধিবাসী দ্বারা) তাও ভরপুর হয়ে যাবে। (মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْ عُتْبَةَ بْنِ غَزْوَانَ قَالَ: ذُكِرَ لَنَا أَنَّ الْحَجَرَ يُلْقَى مِنْ شَفَةِ جَهَنَّمَ فَيَهْوِي فِيهَا سَبْعِينَ خَرِيفًا لَا يُدْرِكُ لَهَا قَعْرًا وَاللَّهِ لَتُمْلَأَنَّ وَلَقَدْ ذُكِرَ لَنَا أَنَّ مَا بَيْنَ مِصْرَاعَيْنِ مِنْ مَصَارِيعِ الْجَنَّةِ مَسِيرَةُ أَرْبَعِينَ سَنَةً وَلَيَأْتِيَنَّ عَلَيْهَا يَوْمٌ وَهُوَ كَظِيظٌ مِنَ الزحام . رَوَاهُ مُسلم
رواہ مسلم (14 / 2967)، (7435) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: উক্ত হাদীসে জাহান্নামের গভীরতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, জাহান্নামের গভীরতার কোন সীমা নেই। যদি একটি পাথরকে নিক্ষেপ করা হয় তাহলে তা সত্তর বছরও জাহান্নামের গভীর তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না। অতএব এই সুবিশাল জাহান্নামকে কাফির-মুশরিক, জিন্ ও মানব দ্বারা পরিপূর্ণ করা হবে। অনুরূপভাবে উক্ত হাদীসে জান্নাতের প্রশস্ততার কথা উল্লেখ করা হয়েছে যে, জান্নাত এত সুবিশাল হবে তার দৈর্ঘ্যের কোন কুল-কিনারা পাওয়া যাবে না। আর বলা হয়েছে যে, জান্নাতের দরজার দুই কপাটের ব্যবধান হবে চল্লিশ বছরের দূরত্বের ন্যায়। আর বলা হয়েছে যে, জান্নাত একদিন তার অধিবাসীদের মাধ্যমে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে এবং তাতে এক প্রকার ভিড় জমবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬৩০-[১৯] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তা’আলা সমস্ত সৃষ্টিজীবকে কিসের দ্বারা তৈরি করেছেন? তিনি (সা.) বললেন, পানি দ্বারা। আবার প্রশ্ন করলাম, জান্নাতের নির্মাণ কিসের দ্বারা? তিনি (সা.) বললেন, একটি ইট স্বর্ণের এবং একটি ইট রৌপ্যের। তার খামির বা মসল্লা হলো সুগন্ধময় কস্তুরী এবং তার কঙ্কর মণি-মুক্তা আর জাফরানের মাটি। যে লোক তাতে প্রবেশ করবে সে সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে থাকবে, কখনো হতাশা বা দুশ্চিন্তায় পতিত হবে না। সেখানে চিরস্থায়ী থাকবে, কখনো মৃত্যুবরণ করবে না, তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ ময়লা-পুরানা হবে না এবং তাদের। যৌবনও শেষ হবে না। (আহমাদ, তিরমিযী, দারিমী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مِمَّ خُلِقَ الْخَلْقُ؟ قَالَ: «مِنَ الْمَاءِ» . قُلْنَا: الْجَنَّةُ مَا بِنَاؤُهَا؟ قَالَ: «لَبِنَةٌ مِنْ ذَهَبٍ وَلَبِنَةٌ مِنْ فِضَّةٍ وَمِلَاطُهَا الْمِسْكُ الْأَذْفَرُ وَحَصْبَاؤُهَا اللُّؤْلُؤُ وَالْيَاقُوتُ وَتُرْبَتُهَا الزَّعْفَرَانُ مَنْ يَدْخُلُهَا يَنْعَمُ وَلَا يَبْأَسُ وَيَخْلُدُ وَلَا يَمُوتُ وَلَا يَبْلَى ثِيَابُهُمْ وَلَا يَفْنَى شَبَابُهُمْ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيّ والدارمي
سندہ ضعیف ، رواہ احمد (2 / 305 ح 8030) و الترمذی (2526 و ضعفہ) و الدارمی (2 / 333 ح 2824) * زیاد الطائی لم یثبت سماعہ من ابی ھریرۃ رضی اللہ عنہ و لبعض الحدیث شاھد عند الترمذی (3598) و سندہ حسن
عن أبي هريرة قال: قلت: يا رسول الله مم خلق الخلق؟ قال: «من الماء» . قلنا: الجنة ما بناؤها؟ قال: «لبنة من ذهب ولبنة من فضة وملاطها المسك الأذفر وحصباؤها اللؤلؤ والياقوت وتربتها الزعفران من يدخلها ينعم ولا يبأس ويخلد ولا يموت ولا يبلى ثيابهم ولا يفنى شبابهم» . رواه أحمد والترمذي والدارمي
ব্যাখ্যা: (مِمَّ خُلِقَ الْخَلْقُ؟) আল্লাহর রাসূল (সা.) -কে জিজ্ঞেস করা হলো যে, সকল মানুষকে কি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে? তিনি (সা.) বললেন, পানি থেকে।
প্রকৃতপক্ষে তিনি (সা.) কুরআন আয়াতের আলোকে তা বলেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন, (وَ جَعَلۡنَا مِنَ الۡمَآءِ کُلَّ شَیۡءٍ حَیٍّ...) “আর প্রাণসম্পন্ন সব কিছু পানি থেকে সৃষ্টি করেছি...”- (সূরাহ আল আম্বিয়া ২১ : ৩০)।
অন্যত্র তিনি বলেছেন, (وَ اللّٰهُ خَلَقَ کُلَّ دَآبَّۃٍ مِّنۡ مَّآءٍ...) “আল্লাহ সকল প্রাণীকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন”- (সূরা আন্ নূর ২৪ : ৪৫)। এর মূল কারণ হলো পানি হলো একটি মৌলিক উপাদান এবং মানব জীবনের অন্যতম একটি অংশ যা ছাড়া মানুষের জীবন-যাপন একেবারেই দুষ্কর হয়ে যায়। আর এখানে পানি দ্বারা সাধারণ পানিকে বুঝানো হয়নি, বরং এই পানি দ্বারা বিশেষ এক প্রকার পানি (বীর্য)-কে বুঝানো হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে এই পানি সাধারণ পানি থেকে তৈরি হয় সেটা কিভাবে? উত্তর: আমরা যে সকল শাকসবজী ও ফল-ফলাদি খাই তা মূলত পানির মাধ্যমে উৎপন্ন হয়, এরপর তা আমরা খাওয়ার পর বীর্য তৈরি হয়, আল্লাহর রসূলের সংক্ষিপ্ত কথার সারাংশ এটাই। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী হা. ২৫০৬)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬৩১-[২০] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জান্নাতের সকল গাছেরই কাণ্ড হবে স্বর্ণের। (তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا فِي الْجَنَّةِ شَجَرَةٌ إِلَّا وساقُها من ذهب» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
اسنادہ حسن ، رواہ الترمذی (2525 وقال : غریب حسن)
ব্যাখ্যা: জান্নাতের সকল গাছের কাণ্ড স্বর্ণেরই হবে। অবশ্য ঐ সকল গাছের ডালসমূহ ও শাখাপ্রশাখাসমূহ বিভিন্ন প্রকারের হবে। কোনটি স্বর্ণের হবে, কোনটি রূপার হবে, আবার কোনটির শাখা ইয়াকূত পাথরে মতি প্রভৃতি হবে আর প্রতিটি শাখা বিভিন্ন ধরনের ফলে সুসজ্জিত এবং তাতে নানা ধরনের ফলফলাদি ঝুলে থাকবে। তা ছাড়াও জান্নাতের সকল গাছের নিচ দিয়ে পানির ঝরনা প্রবাহিত হবে। (তুহফাতুল আহওয়াযী হা, ২৫২৫)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬৩২-[২১] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতের একশতটি স্তর আছে, প্রত্যেক দুই স্তরের মধ্যে একশত বছরের দূরত্ব। [ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং তিনি বলেছেন, হাদীসটি হাসান গরীব]
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ فِي الْجَنَّةِ مِائَةَ دَرَجَةٍ مَا بَيْنَ كُلِّ دَرَجَتَيْنِ مِائَةُ عَامٍ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ
صحیح ، رواہ الترمذی (2529) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: মুহাদ্দিগণ বলেন, এখানে স্তর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো উঁচু স্তর বা মর্যাদা আর আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন কুরআনে উল্লেখ করেছেন, (...دَرَجٰتٌ عِنۡدَ رَبِّهِمۡ...) “..তাদের জন্য তাদের রবের নিকট উঁচু মর্যাদা রয়েছে...”- (সূরা আল আনফাল ৮ : ৪)।
আর এই মর্যাদা প্রতিটি মু'মিন তাদের ‘আমল অনুপাতে লাভ করবে। যেমনিভাবে, জাহান্নামীরাও জাহান্নামের বিভিন্ন স্তর লাভ করবে তাদের পাপাচার ও কুফরীর কারণে। আর এটার প্রতি আল্লাহ কুরআনে ইঙ্গিত করেছেন, (اِنَّ الۡمُنٰفِقِیۡنَ فِی الدَّرۡکِ الۡاَسۡفَلِ مِنَ النَّارِ...) “আর মুনাফিকরা জাহান্নামের সবচেয়ে নিচু স্তরে প্রবেশ করবে”- (সূরা আন্ নিসা ৪ : ১৪৫)। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী হা. ২৫২৯)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬৩৩-[২২] আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতের একশত স্তর আছে। যদি বিশ্বের লোক একত্রিত হয়ে তার একটিতে (স্তরে) একত্রিত হয় তবুও তা সকলের জন্য যথেষ্ট হবে। ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং তিনি বলেছেন, হাদীসটি গরীব।
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ فِي الْجَنَّةِ مِائَةَ دَرَجَةٍ لَوْ أَنَّ الْعَالَمِينَ اجْتَمَعُوا فِي إِحْدَاهُنَّ لَوَسِعَتْهُمْ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ
اسنادہ ضعیف ، رواہ الترمذی (2532) * ابن لھیعۃ مدلس و عنعن و حدث بہ قبل اختلاطہ و باقی السند حسن لذاتہ ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: জান্নাতে এমন একশত স্তর রয়েছে যদি পুরো পৃথিবীবাসী একত্রিত হয়ে তার একটিতে প্রবেশ করে তাহলে একটিতেই তাদের সংকুলান হয়ে যাবে। অতএব এ থেকে বুঝা যায়, যদি জান্নাতের একটি স্তর এত সুবিশাল হয় তাহলে জান্নাত কত সুবিশাল যা আমরা কল্পনাও করতে পারব না। (তুহফাতুল আহওয়াযী হা, ২৫৩২)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬৩৪-[২৩] উক্ত রাবী [আবূ সাঈদ (রাঃ)] নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। আল্লাহ তা’আলার বাণী (وَّ فُرُشٍ مَّرۡفُوۡعَۃٍ) “সুউচ্চ বিছানা”- (সূরাহ্ আল ওয়াকি’আহ্ ৫৬ : ৩৪)-এর সম্পর্কে বলেছেন, ঐ সমস্ত বিছানার উচ্চতা আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী দূরত্বের সমপরিমাণ অর্থাৎ পাঁচশত বছরের পথ। [ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং তিনি বলেছেন, হাদীসটি গরীব]
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي قَوْلِهِ تَعَالَى (وفُرُشٍ مرفوعةٍ) قَالَ: «ارْتِفَاعُهَا لَكَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ مَسِيرَةَ خَمْسِمِائَةِ سَنَةً» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ
حسن ، رواہ الترمذی (2540) [و ابن حبان (الاحسان : 7362 / 7405) بسند حسن عن عمرو بن الحارث عن دراج ،،، بہ] ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: আল্লাহর বাণী, (وَّ فُرُشٍ مَّرۡفُوۡعَۃٍ) “আর উঁচু উঁচু বিছানায়”- (সূরাহ্ আল ওয়াকি'আহ্ ৫৬ : ৩৪) সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ঐ সকল বিছানার উচ্চতা আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী ব্যবধানের পরিমাণ হবে অর্থাৎ পাচঁশত বছরের পথ হবে। ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, কতিপয় আহলুল ‘ইলমের ব্যাখ্যা করেছেন যে, ঐ সকল বিছানার উচ্চতা ও পরিমাপ আকাশ ও জমিনের মধ্যবর্তী ব্যবধানের ন্যায়। কেউ কেউ বলেছেন, জান্নাতের বিছানো সুউচ্চ বিছানাসমূহের উচ্চতা হবে আকাশ ও জমিনের মধ্যবর্তী ব্যবধানের ন্যায়।
ইমাম তূরিবিশতী (রহিমাহুল্লাহ) জান্নাতের স্তরসমূহে সুউচ্চ বিছানার উচ্চতা হবে জান্নাতের দুই স্তরের মধ্যবর্তী ব্যবধানের ন্যায়। (তুহফাতুল আহওয়াযী হা. ২৫৪০)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬৩৫-[২৪] উক্ত রাবী [আবূ সা’ঈদ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যে দলটি জান্নাতে প্রবেশ করবে, তাদের চেহারা পূর্ণিমার চাঁদের মতো আলোকিত হবে। আর দ্বিতীয় দলটির চেহারা হবে আকাশের সর্বাধিক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো ঝকঝকে। তথায় প্রত্যেক লোকের জন্য দু’ দু’ জন করে স্ত্রী থাকবে, যাদের প্রত্যেক স্ত্রীর পরিধানে সত্তর জোড়া কাপড় থাকবে, যাদের পায়ের নলার মজ্জা কাপড়ের উপর দিয়ে দেখা যাবে। (তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ أَوَّلَ زُمْرَةٍ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ضَوْءُ وُجُوهِهِمْ عَلَى مِثْلِ ضَوْءِ القمرِ ليلةَ البدْرِ وَالزُّمْرَةُ الثَّانِيَةُ عَلَى مِثْلِ أَحْسَنِ كَوْكَبٍ دُرِّيٍّ فِي السَّمَاءِ لِكُلِّ رَجُلٍ مِنْهُمْ زَوْجَتَانِ عَلَى كُلِّ زَوْجَةٍ سَبْعُونَ حُلَّةً يُرَى مُخُّ سَاقِهَا من وَرَائِهَا» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
صحیح ، رواہ الترمذی (2535 وقال : حسن صحیح)
ব্যাখ্যা: জান্নাতে যে দলটি সর্বপ্রথম প্রবেশ করবে তারা হবেন নবীগণ। পূর্ণিমার রাতের চাঁদের মতো তাদের চেহারাগুলো সমুজ্জ্বল হবে, এরপর দ্বিতীয় যে দল প্রবেশ করবে তারা হবেন আল্লাহর ওয়ালী ও সৎব্যক্তিগণ, তাদের চেহারা আকাশের সর্বাধিক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো সমুজ্জ্বল হবে।
(كُلِّ رَجُلٍ مِنْهُمْ زَوْجَتَانِ) জান্নাতবাসী প্রত্যেকের দু’জন করে স্ত্রী থাকবে, তাদের পরিধানে সত্তর জোড়া কাপড় থাকবে। যাদের পায়ের নলার মজ্জা কাপড়ের উপর থেকে দেখা যাবে। মুহাদ্দিসগণ বলেন, উপরোক্ত হাদীসে জান্নাতী স্ত্রীদের অপরূপ সৌন্দর্যের কথা আলোচনা করা হয়েছে। (তুহফাতুল আহওয়াযী হা. ২৫৩৫)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬৩৬-[২৫] আনাস (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: জান্নাতী মুমিনদেরকে এত এত সহবাসের শক্তি প্রদান করা হবে। প্রশ্ন করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! এক লোক এত শক্তি রাখবে কি? তিনি (সা.) বললেন, প্রত্যেক লোককে একশত পুরুষের শক্তি দান করা হবে। (তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْ أَنَسٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «يُعْطَى الْمُؤْمِنُ فِي الْجَنَّةِ قُوَّةَ كَذَا وَكَذَا مِنَ الْجِمَاعِ» . قِيلَ: يَا رَسُولَ الله أَو يُطيق ذَلِكَ؟ قَالَ: «يُعْطَى قُوَّةَ مِائَةٍ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ
سندہ ضعیف ، رواہ الترمذی (2536 وقال : صحیح غریب) * قتادۃ عنعن و للحدیث شواھد ضعیفۃ عند البزار (کشف الاستار 4 / 198 ح 3526) و البیھقی (البعث و النشور : 403) وغیرھما
ব্যাখ্যা: মুহাদ্দিসগণ বলেন, জান্নাতী একজন পুরুষকে বিশ ত্রিশ কিংবা তার চেয়ে বেশি স্ত্রীর সাথে সহবাস করার ক্ষমতা প্রদান করা হবে। কেউ কেউ বলেছেন, বিশ, ত্রিশ, চল্লিশ কিংবা একশত বা তার চেয়ে বেশি স্ত্রী সাথে সহবাস করার ক্ষমতা দেয়া হবে। কারণ আল্লাহর রাসূলকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, একজন পুরুষ কি এত স্ত্রীর সাথে সহবাস করতে পারবে? উত্তরে তিনি (সা.) বলেছেন, একজন পুরুষকে একশতজন পুরুষের শক্তি দেয়া হবে। (তুহফাতুল আহওয়াযী হা. ২৫৩৬)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬৩৭-[২৬] সা’দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: যদি জান্নাতের বস্তু সামগ্রী থেকে নখ অপেক্ষা একটি ক্ষুদ্র জিনিসও দুনিয়াতে প্রকাশ হয়ে পড়ে, তবে আসমান ও জমিনের সমগ্র পার্শ্ব-প্রান্ত সুসজ্জিত হয়ে যাবে। আর যদি জান্নাতের কোন এক লোক দুনিয়ার দিকে উঁকি মারে এবং তার (হাতের) কঙ্কন প্রকাশ পায়, তবে তার আলো সূর্যের আলোকে এমনভাবে বিলীন করে দেবে, যেমন সূর্যের আলো তারকার আলোকে বিলীন করে দেয়। [ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং তিনি বলেছেন, হাদীসটি গরীব]
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْ سَعْدِ بْنِ أَبِي وَقَّاصٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَوْ أَنَّ مَا يُقِلُّ ظُفُرٌ مِمَّا فِي الْجَنَّةِ بَدَا لَتَزَخْرَفَتْ لَهُ مَا بَيْنَ خَوَافِقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلَوْ أَنَّ رَجُلًا مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ اطَّلَعَ فَبَدَا أَسَاوِرُهُ لَطَمَسَ ضَوْؤُهُ ضَوْءَ الشَّمْسِ كَمَا تَطْمِسُ الشَّمْسُ ضَوْءَ النُّجُومِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ
حسن ، رواہ الترمذی (2538)
ব্যাখ্যা: মুহাদ্দিসগণ বলেন, উক্ত হাদীসে জান্নাতের আসবাবপত্র ও সামগ্রীর মান-মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন বলা হয়েছে জান্নাতের নখের সমপরিমাণ কোন বস্তু যদি দুনিয়াতে প্রকাশ পায় তাহলে আকাশ ও জমিনের পূর্ব ও পশ্চিম দিগন্ত সুসজ্জিত হয়ে যাবে। আর যদি জান্নাতবাসী একজন ব্যক্তির হাতের বালা দুনিয়াতে প্রকাশ পায় তাহলে তা সূর্যের কিরণকে ম্লান করে দিবে যেমনিভাবে সূর্য তারকারাজির কিরণকে ম্লান করে দেয়। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ হা. ৫৩৮)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬৩৮-[২৭] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতবাসী কেশবিহীন (পশমবিহীন) ও দাড়িবিহীন হবেন, তাদের চক্ষু সুরমায়িত হবে, তাদের যৌবন কোন দিনই হারাবে না এবং তাদের কাপড়চোপড়ও পুরনো হবে না। (তিরমিযী ও দারিমী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَهْلُ الْجَنَّةِ جُرْدٌ مُرْدٌ كَحْلَى لَا يَفْنَى شَبَابُهُمْ وَلَا تَبْلَى ثِيَابهمْ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ والدارمي
حسن ، رواہ الترمذی (2539 وقال : غغریب) و الدارمی (2 / 335 ح 2829)
ব্যাখ্যা: মুহাদ্দিসগণ বলেন, উপরোক্ত হাদীসের জান্নাতবাসীদের কিছু বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা হয়েছে।
১. (جُرْدٌ) বলা হয় ঐ ব্যক্তিকে যার শরীরে কোন প্রকারের লোম বা পশম নেই। অর্থাৎ জান্নাতবাসীরা পশমবিহীন হবে।
২. (مُرْدٌ) বলা হয় ঐ সকল বালকদেরকে যার দাড়ি নেই। অর্থাৎ জান্নাতবাসীরা দাড়িবিহীন হবে।
৩. (كَحْلَى) ঐ ব্যক্তিকে বলা হয় যার চক্ষুর পলকের গোড়া জন্মগতভাবে কালো থাকে অর্থাৎ জান্নাতবাসীদের চক্ষু সুরমা লাগানো ব্যক্তির মতো হবে।
৪. (لَا يَفْنَى شَبَابُهُمْ) অর্থাৎ জান্নাতবাসীরা চিরকুমার হবে তাদের যৌবন কখনো শেষ হবে না। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬৩৯-[২৮] মু’আয ইবনু জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী (সা.) বলেছেন: জান্নাতবাসীগণ কেশবিহীন (লোম বা পশমহীন), দাড়িবিহীন ও সুরমায়িত চক্ষুবিশিষ্ট ত্রিশ বা তেত্রিশ বছর বয়সীর মতো প্রবেশ করবে। (তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «يَدْخُلُ أَهْلُ الْجَنَّةِ الْجَنَّةَ جُرْدًا مُرْدًا مُكَحَّلِينَ أَبْنَاءَ ثَلَاثِينَ - أَوْ ثلاثٍ وَثَلَاثِينَ - سنة» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
سندہ ضعیف ، رواہ الترمذی (2545 وقال : حسن غریب) * قتادۃ مدلس و عنعن فاسند ضعیف و للحدیث شواھد ضعیفۃ عند احمد (2 / 295 ، 343 ، 415) وغیرہ ، و انظر الحدیث السابق [و النھایۃ بتحقیقی (1019)]
ব্যাখ্যা: ত্রিশ বা তেত্রিশ বছরের বয়স পূর্ণাঙ্গ যৌবন ও শক্তি সামর্থ্যে ভরপুর হয়ে থাকে। এজন্য জান্নাতী পুরুষকে এ বয়স প্রদান করেই জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। প্রকাশ থাকে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ত্রিশ-তেত্রিশ দুই সংখ্যার কোন একটি নির্দিষ্ট করে বলেছেন কিন্তু বর্ণনাকারী সংশয় প্রকাশ করে দু’টিই বলেছেন, তার স্মরণে না থাকার কারণে। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী হা. ২৫৪৬)।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬৪০-[২৯] আসমা বিনতু আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) - কে বলতে শুনেছি এবং যখন তাঁর সামনে সিদরাতুল মুনতাহা’র আলোচনা করা হলো, তিনি বললেন, তার শাখার ছায়ায় দ্রুতগামী বাহন একশত বছর ভ্রমণ করতে পারলে অথবা বলেছেন, একশত বাহন তার ছায়ায় আশ্রয় নিতে পারবে। এ দু বাক্যের মধ্যে নবী (সা.)- কোন বাক্যটি বলেছেন তাতে বর্ণনাকারীর সন্দেহ রয়েছে তা সোনার পতঙ্গ দ্বারা বেষ্টিত থাকবে। তার ফল মটকার মতো বিশাল আকারের হবে। [ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং তিনি বলেছেন, হাদীসটি গরীব]
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَن أَسمَاء بنت أبي بكر قَالَتْ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَذُكِرَ لَهُ سِدْرَةُ الْمُنْتَهَى قَالَ: «يَسِيرُ الرَّاكِبُ فِي ظِلِّ الْفَنَنِ مِنْهَا مِائَةَ سَنَةٍ أَوْ يَسْتَظِلُّ بِظِلِّهَا مِائَةُ رَاكِبٍ - شَكَّ الرَّاوِي - فِيهَا فَرَاشُ الذَّهَبِ كَأَنَّ ثَمَرَهَا الْقِلَالُ» رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ
اسنادہ حسن ، رواہ الترمذی (2541) * محمد بن اسحاق بن یسار مدلس و صرح بالسماع عند ھناد بن السری فی الزھد (1 / 98 ح 115) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (سِدْرَةُ الْمُنْتَهَى) ‘সিদরাতুল মুনতাহা যা সপ্তাকাশে ‘আরশের ডানপ্রান্তে অবস্থিত কুলগাছ। ঐ বৃক্ষকে ‘সিদরাতুল মুনতাহা' এজন্য বলা হয় যে, এটি আরশের এমন প্রান্তে অবস্থিত যার পর কারো যাওয়া অনুমতি নেই। এমনকি মালায়িকার (ফেরেশতাদের) যাওয়াও অনুমতি নেই। জিবরীল আলায়হিস সালাম-এর শেষ গন্তব্যও এ পর্যন্ত, এর বেশি তিনিও সামনে যেতে পারেন না। কেবল রাসূলুল্লাহ (সা.) - মি'রাজের রজনীতে এ বৃক্ষ অতিক্রম করে সামনে গিয়েছিলেন।
(فِيهَا فَرَاشُ الذَّهَبِ) তা সোনার পতঙ্গ দ্বারা বেষ্টিত থাকবে। মুহাদ্দিসগণ এর ব্যাখ্যায় বলেন, হয়তো নূরের তৈরি মালাক (ফেরেশতা) উক্ত বৃক্ষের উপরে থাকবে ফলে তাদের ডানাসমূহ এরূপ চমকাবে ও ঝলমল করবে। আবার কেউ কেউ বলেছেন, উক্ত বৃক্ষের উপর সোনার তৈরি পতঙ্গ এদিক সেদিক লাফালাফি করবে।
আবার কেউ কেউ বলেছেন, এর ব্যাখ্যা কুরআনের ঐ আয়াতটি যা আল্লাহ বলেছেন:
(اِذۡ یَغۡشَی السِّدۡرَۃَ مَا یَغۡشٰی) “যখন বৃক্ষটি যা দ্বারা আচ্ছাদিত হবার তা দ্বারা আচ্ছাদিত হবে”- (সূরাহ্ আন্ নাজম ৫৩ : ১৬); এর ব্যাখ্যায় কেউ কেউ বলেছেন, একদল মালাক উক্ত গাছকে আচ্ছাদিত করে আল্লাহর ‘ইবাদতে নিয়োজিত থাকবে। (ফাতহুল বারী হা. ২৫৪১)।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬৪১-[৩০] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে প্রশ্ন করা হলো, কাওসার কি? তিনি (সা.) বললেন, তা জান্নাতে অবস্থিত একটি নহর, যা আল্লাহ তা’আলা আমাকে দান করেছেন। তার পানি দুধ তুলনায় অধিক সাদা এবং মধুর চেয়ে মিষ্টি। তাতে এমন কিছু পাখি থাকবে, যাদের ঘাঢ় উটের গর্দানের মতো (লম্বা-লম্বা)। ’উমার (রাঃ) বলে উঠলেন, ঐ সমস্ত পাখিগুলো নিশ্চয় খুব মোটাতাজা হবে। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, সে সমস্ত পাখিগুলো ভক্ষণকারীগণ তাদের চেয়েও হৃষ্টপুষ্ট হবে। (তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ماالكوثر؟ قَالَ: «ذَاكَ نَهْرٌ أَعْطَانِيهِ اللَّهُ يَعْنِي فِي الْجَنَّةِ أَشَدُّ بَيَاضًا مِنَ اللَّبَنِ وَأَحْلَى مِنَ الْعَسَلِ فِيهِ طَيْرٌ أَعْنَاقُهَا كَأَعْنَاقِ الْجُزُرِ» قَالَ عُمَرُ: إِنَّ هَذِهِ لَنَاعِمَةٌ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ «أَكَلَتُهَا أَنْعَمُ مِنْهَا» رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
اسنادہ صحیح ، رواہ الترمذی (2542 وقال : حسن) ۔
(حسن)
ব্যাখ্যা: (ماالكوثر؟) মুহাদ্দিসগণ বলেন, (كوثر) এমন একটি নদী যা আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন বিশেষভাবে রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে দান করবেন। সহীহ মুসলিম-এর বর্ণনায় এসেছে, আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, একদিন আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর নিকটে বসছিলাম, এরপর তিনি (সা.) মাথা উঠিয়ে মুচকি হাসলেন। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, আপনাকে কিসে হাসালো? তিনি (সা.) বলেন, এই মাত্র আমার ওপর একটি সূরাহ্ অবতীর্ণ হলো। এরপর তিনি (সা.) তিলাওয়াত করতে শুরু করলেন,
(اِنَّاۤ اَعۡطَیۡنٰکَ الۡکَوۡثَرَ) “আমি তোমাকে বিশেষ কল্যাণ ‘হাওযে কাওসার’ও দান করেছি (যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত)”- (সূরাহ্ আল কাওসার ১০৮ : ১)।
এরপর তিনি (সা.) বলেন, তোমরা কি জানো ‘কাওসার’ কি? আমরা বললাম, আল্লাহ ও তার রাসূলই ভালো জানেন। তখন তিনি (সা.) বলেন, সেটা এমন এক নদী আল্লাহ তা'আলা আমাকে দান করবেন। আর এটা সেই হাওয যার নিকটে এসে আমার উম্মত ভিড় করবে। ইমাম হাকিম (রহিমাহুল্লাহ) মারফু সূত্রে বর্ণনা করেছেন, আনাস (রাঃ) থেকে যে, সেটা এমন এক নদী আল্লাহ তা'আলা আমাকে জান্নাতে দান করবেন। তার মাটি হবে মিশক আম্বরের চেয়ে সুগন্ধিময়, দুধের চেয়ে সাদা এবং তাঁর পানি হবে মধুর চেয়ে সুমিষ্ট।
(طَيْرٌ أَعْنَاقُهَا كَأَعْنَاقِ الْجُزُرِ) তাতে এক প্রকার পাখি থাকবে যেগুলোর ঘাড় হবে উটের ঘাড়ের ন্যায় অর্থাৎ ঐ নদীর চতুষ্পর্শ্বে উক্ত পাখিগুলো বিচরণ করবে। সেগুলো দেখে ঐ পরিবেশকে মনোমুগ্ধকর মনে হবে। আর সেই পাখিগুলো খুবই হৃষ্টপুষ্ট হবে। আর ঐ পাখিগুলো যারা খাবে তারা আরো অনেক হৃষ্টপুষ্ট হবে। (তুহফাতুল আহওয়াযী হা, ২৫৪২)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬৪২-[৩১] বুরয়দাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন জনৈক লোক প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসূল! জান্নাতে ঘোড়া পাওয়া যাবে কি? তিনি (সা.) বললেন, যদি আল্লাহ তা’আলা তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করান আর তুমি ঘোড়ায় সওয়ার হবার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ কর, তখন তোমাকে লাল বর্ণের মুক্তার ঘোড়ায় আরোহণ করানো হবে এবং তুমি জান্নাতের যেখানে যাওয়ার ইচ্ছা করবে ঘোড়া তোমাকে দ্রুত উড়িয়ে সেখানে নিয়ে যাবে। আর এক লোক প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসূল! জান্নাতে উট পাওয়া যাবে কি? বর্ণনাকারী বলেন, তিনি পূর্বের লোককে যেভাবে উত্তর দিয়েছেন, এ লোককে সেভাবে উত্তর না দিয়ে বললেন, যদি আল্লাহ তা’আলা তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করান, তবে তুমি সে সকল জিনিস পাবে, যা কিছু তোমার মনে চাবে এবং তোমার চোখ জুড়াবে। (তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَن بُريدةَ أَنَّ رَجُلًا قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ هَلْ فِي الْجَنَّةِ مِنْ خَيْلٍ؟ قَالَ: «إِنِ اللَّهُ أَدْخَلَكَ الْجَنَّةَ فَلَا تَشَاءُ أَنْ تُحْمَلَ فِيهَا عَلَى فَرَسٍ مِنْ يَاقُوتَةٍ حَمْرَاءَ يَطِيرُ بِكَ فِي الْجَنَّةِ حَيْثُ شِئْتَ إِلَّا فَعَلْتَ» وَسَأَلَهُ رجل فَقَالَ: يارسول الله هَل فِي الجنةِ من إِبلٍ؟ قَالَ: فَلَمْ يَقُلْ لَهُ مَا قَالَ لِصَاحِبِهِ. فَقَالَ: «إِنْ يُدْخِلْكَ اللَّهُ الْجَنَّةَ يَكُنْ لَكَ فِيهَا مَا اشْتَهَتْ نَفْسُكَ وَلَذَّتْ عَيْنُكَ» رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
سندہ ضعیف ، رواہ الترمذی (2543) * المسعودی صدوق اختلط ولم یثبت تحدیثہ بہ قبل اختلاطہ و للحدیث شواھد ضعیفۃ و الحدیث الآتی یغنی عنہ
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬৪৩-[৩২] আবূ আইয়ুব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন এক বেদুঈন নবী (সা.) -এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি ঘোড়াকে খুব বেশি ভালোবাসি, জান্নাতে ঘোড়া আছে কি? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, যদি তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়, তবে তোমাকে মুক্তার তৈরি এমন একটি ঘোড়া দেয়া হবে যার দুটি ডানা রয়েছে, তোমাকে তার উপরে আরোহণ করানো হবে। অতঃপর তুমি যেখানে যেতে চাবে, তা উড়িয়ে তোমাকে সেখানে নিয়ে যাবে।
[তিরমিযী; তিনি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এ হাদীসটির সূত্র নির্ভরযোগ্য নয়। এতে বর্ণনাকারী আবূ সাওরাহ্-কে হাদীস বর্ণনায় দুর্বল গণ্য করা হয়। ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) আরো বলেছেন, আমি মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল বুখারী (রহিমাহুল্লাহ)-কে বলতে শুনেছি, আবূ সাওরাহ্ ’মুনকারুল হাদীস’। তিনি মুনকার হাদীস বর্ণনা করেন।]
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْ أَبِي أَيُّوبَ قَالَ أَتَى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَعْرَابِيٌّ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي أُحِبُّ الْخَيْلَ أَفِي الْجَنَّةِ خَيْلٌ؟ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنْ أُدْخِلْتَ الْجَنَّةَ أُتِيتَ بِفَرَسٍ مِنْ يَاقُوتَةٍ لَهُ جَنَاحَانِ فَحُمِلْتَ عَلَيْهِ ثُمَّ طَارَ بِكَ حَيْثُ شِئْتَ» رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ. وَقَالَ هَذَا حَدِيثٌ لَيْسَ بِالْقَوِيِّ وَأَبُو سَوْرَةَ الرَّاوِي يُضَعَّفُ فِي الْحَدِيثِ وَسَمِعْتُ مُحَمَّدَ بْنَ إِسْمَاعِيلَ يَقُولُ: أَبُو سَوْرَةَ هَذَا مُنكر الحَدِيث يروي مَنَاكِير
حسن ، رواہ الترمذی (2544) * و للحدیث شاھد عند البیھقی فی البعث و النشور (439) و سندہ حسن لذاتہ ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: উক্ত হাদীসে জান্নাতে মানুষ প্রবেশ করার পর যা চাইবে, তাই পাবে- এটা বলা হয়েছে। ইমাম কাযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, উক্ত হাদীসের উদ্দেশ্য হলো মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করার পর তাদের মনের চাহিদা অনুপাতে যা চাইবে তাই সেখানে পাবে। যদি কেউ চায় ঘোড়ায় আরোহণ করতে তাহলে তাকে ঘোড়ায় আরোহণ করানো হবে। যদি কেউ চায় মণি-মুক্তার ঘোড়ায় আরোহণ করতে তাহলে তাকে অনুরূপ আকৃতির ঘোড়ায় আরোহণ করানো হবে। মোটকথা জান্নাতবাসীরা তাদের মনের চাহিদা অনুপাতে যা চাইবে তাই তারা সেখানে বিদ্যমান পাবে। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী হা. ২৫৪৪)।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬৪৪-[৩৩] বুরয়দাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতাবাসীদের একশত বিশ কাতার হবে। তন্মধ্যে আশি কাতার হবে এই উম্মতের আর অবশিষ্ট চল্লিশ কাতার হবে অন্যান্য উম্মতের। (তিরমিযী, দারিমী ও বায়হাকী’র “কিতাবুল বাসি ওয়ান্ নুশূর”)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْ بُرَيْدَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَهْلُ الْجَنَّةِ عِشْرُونَ وَمِائَةُ صَفٍّ ثَمَانُونَ مِنْهَا مِنْ هَذِهِ الْأُمَّةِ وَأَرْبَعُونَ مِنْ سَائِرِ الْأُمَمِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَالدَّارِمِيُّ وَالْبَيْهَقِيُّ فِي كتاب الْبَعْث والنشور
حسن ، رواہ الترمذی (2546 وقال : حسن) و الدارمی (2 / 337 ح 2838) و البیھقی فی البعث و النشور (لم اجدہ) [و صححہ ابن حبان (الموارد : 2639) و الحاکم علی شرط مسلم (2 / 81 ۔ 82) و وافقہ الذھبی] ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: উক্ত হাদীসে এই উম্মাতের সংখ্যার আধিক্যতা বুঝানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, জান্নাতবাসীরা একশত বিশ কাতার হবে। এর মাঝে উম্মতে মুহাম্মাদী আশি কাতার, আর অন্যান্য জাতি ৪০ কাতার। ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আল্লাহর রাসূল (সা.) -এর উক্ত হাদীস এবং তার থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেছেন, আমি আশা করি তোমরা জান্নাতের এক-চতুর্থাংশ হবে। এরপরে তিনি (সা.) আবার বলেছেন যে, আমি আশা করি তোমরা জান্নাতের এক-তৃতীয়াংশ হবে। এরপর তিনি (সা.) বলেছেন, আমি আশা করি তোমরা জান্নাতের অর্ধেক হবে। এই হাদীসের মাঝে কি সমাধান হবে?
ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) উক্ত দুই হাদীসের সমাধানে বলেন, সম্ভবত ঐ আশি কাতারই সংখ্যার দিক থেকে চল্লিশ কাতারের সমান হবে। আর (ثلث) ও (ربع) এরপর যে বলা হয়েছে, (نِصْفَ أَهْلُ الْجَنَّةِ) তোমরা জান্নাতের অর্ধেক হবে, এটা আল্লাহর রাসূল (সা.) -এর সম্মানার্থে বৃদ্ধি করা হয়েছে।
শায়খ আবদুল হক (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, রাসূল -এর বাণী, (أَنْ تَكُونُوانِصْفَ أَهْلِ الْجَنَّثِ) এটা পূর্বের বাণীর সাথে সাংঘর্ষিক নয়। কারণ তিনি (সা.) প্রথমে আশা করেছেন যে, তোমরা জান্নাতের (ثلث) বা (ربع) হবে। এটা ছিল শুধুমাত্র তাঁর আশা। এরপর বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে অতিরিক্ততার সংবাদ দেয়া হয়েছে। (তুহফাতুল আহওয়াযী হা, ২৫৪৬)।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬৪৫-[৩৪] সালিম তাঁর পিতা [ইবনু উমার (রাঃ)] হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আমার উম্মাত জান্নাতের যে দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে, তার প্রশস্ততা হবে উত্তম অশ্বারোহীর তিনদিন অথবা তিন বছরের পথের দূরত্ব। এছাড়াও দরজা অতিক্রমের সময় এত ভিড় হবে যে, ধাক্কার চোটে তাদের কাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম হবে।
[তিরমিযী; আর তিনি বলেছেন, হাদীসটি য’ঈফ। তিনি আরো বলেন, আমি মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল বুখারী (রহিমাহুল্লাহ)-কে অত্র হাদীস সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি হাদীসটি সম্পর্কে অবগত নন বলে ব্যক্ত করেছেন এবং বলেছেন, অধস্তন রাবী ইয়াখলুদ ইবনু আবূ বা মুনকার হাদীস বর্ণনা করেন।]
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَن سَالم عَنْ أَبِيهِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «بَابُ أُمَّتِي الَّذِينَ يَدْخُلُونَ مِنْهُ الْجَنَّةَ عَرْضُهُ مَسِيرَةُ الرَّاكِبِ الْمُجَوِّدِ ثَلَاثًا ثُمَّ إِنَّهُمْ لَيُضْغَطُونَ عَلَيْهِ حَتَّى تَكَادُ مَنَاكِبُهُمْ تَزُولُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ هَذَا حَدِيثٌ ضَعِيفٌ وَسَأَلْتُ مُحَمَّدَ بْنَ إِسْمَاعِيلَ عَنْ هَذَا الْحَدِيثِ فَلَمْ يَعْرِفْهُ وَقَالَ: خَالِد بن أبي بكر يروي الْمَنَاكِير
اسنادہ ضعیف ، رواہ الترمذی (2548) * خالد بن ابی بکر : فیہ لین وعد الذھبی ھذا الحدیث من مناکیرہ ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: মুহাদ্দিসগণ বলেন: উক্ত হাদীসে জান্নাতের দরজার দুই পার্শ্বের যে চৌকাঠ রয়েছে এবং উভয় চৌকাঠের মাঝে যে প্রশস্ততা রয়েছে তার দূরত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে যে, তা উত্তম অশ্বারোহীর তিন দিন বা তিন বছরের পথের দূরত্বের মতো হবে। অন্য এক রিওয়ায়াতে এসেছে, উভয় পার্শ্বের দূরত্ব হবে মক্কাহ ও হাজার শহরের দূরত্বের ন্যায়। কেউ কেউ বলেছেন, এর দ্বারা আধিক্যতা বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ অনেক প্রশস্ত হবে এবং এক সাথে অনেক মানুষ প্রবেশ করতে পারবে। আবার কেউ কেউ বলেছেন, এর দ্বারা জান্নাতবাসীরা যে তাদের মর্যাদা অনুপাতে বিভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে তা বুঝানো হয়েছে। (তুহফাতুল আহওয়াযী হা. ২৫৪৮)।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬৪৬-[৩৫] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতে একটি বাজার রয়েছে, সেখানে ক্রয়বিক্রয় নেই, বরং তাতে নারী-পুরুষদের আকৃতিসমূহ থাকবে। অতএব যখনই কেউ কোন আকৃতিকে পছন্দ করবে, তখন সে সেই আকৃতিতে প্রবেশ করবে।
[ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং তিনি বলেছেন, হাদীসটি গরীব।]
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِن فِي الْجَنَّةِ لَسُوقًا مَا فِيهَا شِرًى وَلَا بَيْعٌ إِلَّا الصُّوَرَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ فَإِذَا اشْتَهَى الرَّجُلُ صُورَةً دَخَلَ فِيهَا» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ
اسنادہ ضعیف ، رواہ الترمذی (2550) * فیہ عبد الرحمن بن اسحاق الکوفی ضعیف (تقدم : 5597) ۔
(ضَعِيفٌ)
ব্যাখ্যা: উক্ত বাজার মূলত সৌন্দর্য ও কামনিয়তা দ্বারা সজ্জিত হওয়ার এবং সুন্দর হতে সুন্দর আকার আকৃতিতে রূপান্তরিত হওয়ার এক মিলনকেন্দ্র হবে। সেখানে চতুর্দিকে মনোরম ও মনোমুগ্ধকর আকার আকৃতি উপস্থিত থাকবে। আর জান্নাতবাসী নারী-পুরুষদের যে কেউ উক্ত আকার-আকৃতি হতে যেটি পছন্দ করবে তাতে রূপান্তরিত হতে পারবে। ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এর দ্বারা দু’টি উদ্দেশ্য হতে পারে:
১) জান্নাতবাসীদের নিকট বিভিন্ন প্রকার মনোমুগ্ধকর ও মনোরম আকার-আকৃতি পেশ করা হবে প্রত্যেকেই তাদের ইচ্ছা মতো সেটিতে রূপান্তরিত হতে পারবে।
২) জান্নাতে ঐ বাজারে বিভিন্ন আকৃতির মনোরম ও মনোমুগ্ধকর সাজ-সজ্জা থাকবে যা সাধারণত মানুষ গ্রহণ করে থাকে যেমন স্বর্ণ অলংকার, সোনার মালা ও সোনার টুপি ইত্যাদি। জান্নাতবাসীরা তাদের ইচ্ছা অনুপাতে সেগুলো দ্বারা সাজ-সজ্জা করবে। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী হা, ২৫৫০)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬৪৭-[৩৬] সা’ঈদ ইবনু মুসাইয়াব (রহ.) হতে বর্ণিত। একদিন তিনি আবূ হুরায়রাহ (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। তখন আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কাছে আমি এ দু’আ করি, আমাকে ও তোমাকে তিনি যেন জান্নাতের বাজারে একত্রিত করেন। তখন সা’ঈদ (রাঃ) বললেন, সেখানে কি বাজারও আছে? তিনি উত্তরে বললেন, হ্যা, আমাকে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতবাসীগণ যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন তারা নিজ নিজ ’আমালের মান অনুযায়ী স্থান লাভ করবে। অতঃপর দুনিয়ার দিনগুলোর হিসাব ও পরিমাণ অনুযায়ী সপ্তাহের জুমু’আর দিন তাদেরকে একটি বিশেষ অনুমতি প্রদান করা হবে, আর তা হলো তারা তাদের প্রভুর সাক্ষাৎ লাভ করবে। সেদিন আল্লাহ তা’আলা তাঁর ’আরশকে জনসম্মুখে করে দেবেন এবং জান্নাতবাসীদের সামনে জান্নাতের বৃহৎ বাগান একটি বাগানে আত্মপ্রকাশ করবেন এবং জান্নাতবাসীদের জন্য তাদের মান ও মর্যাদা অনুপাতে নূরের, মণি-মুক্তার, মতি এবং সোনা-রোপার মিম্বার স্থাপন করা হবে। তাদের মধ্যে সাধারণ মর্যাদাবান ব্যক্তি- অথচ জান্নাতীদের মধ্যে কেউ হীন হবে না- কাফুর কস্তুরীর টিলার উপর বসবে। এ সমস্ত টিলায় বসা লোকেরা কুরসী বা আসনে বসা ওই লোকেদেরকে নিজেদের অপেক্ষা অধিক মর্যাদা লাভকারী বলে ধারণা করবে না। (অর্থাৎ প্রত্যেক জান্নাতী স্বীয় স্থানে সন্তুষ্ট থাকবে)
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) বলেন, আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি আমাদের প্রভুকে দেখতে পাব? তিনি (সা.) বললেন, হ্যা, দেখতে পাবে। আচ্ছা বল দেখি, সূর্য এবং পূর্ণিমার রাতে চাঁদ দেখতে তোমাদের কোন প্রকারের সন্দেহ হয়? আমরা বললাম, না। কোন সন্দেহ হয় না। রাসূল (সা.) বললেন, ঐভাবে তোমাদের রবকে দেখতে তোমাদের কোন রকমের সন্দেহ হবে না এবং উক্ত বৈঠকে এমন কোন লোক অবশিষ্ট থাকবে না, যার সাথে আল্লাহ তা’আলা সরাসরি কথা বলবেন না। এমনকি আল্লাহ তা’আলা উপস্থিত এক লোককে বলবেন, হে অমুকের পুত্র অমুক! তোমার কি স্মরণ আছে যে, অমুক দিন তুমি এ কথাটি বলেছিলে? মোটকথা, দুনিয়াতে সে যে সকল অন্যায় করেছিল তার কিছু কিছু তাকে আল্লাহ তা’আলা স্মরণ করিয়ে দেবেন। তখন সে বলবে, হে আমার প্রভু! তুমি কি আমাকে ক্ষমা করে দাওনি? আল্লাহ তা’আলা বলবেন, হ্যাঁ, নিশ্চয়। আমার ক্ষমার বদৌলতেই তুমি আজ এ মর্যাদার অধিকারী হয়েছ।
ফলকথা, তারা এ অবস্থায় থাকতেই একখণ্ড মেঘ এসে তাদেরকে ওপর থেকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে এবং তা তাদের ওপর এমন সুগন্ধি বর্ষণ করবে যে, ঐ রকম সুগন্ধি তারা আর কখনো পায়নি। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা বলেন, তোমরা উঠ এবং তার দিকে চল, যা আমি তোমাদের সম্মান বৃদ্ধির জন্য তৈরি করে রেখেছি। আর তোমাদের মনে যা যা চায় তা থেকে নিয়ে নাও। অতঃপর আমরা এমন একটি বাজারে আসব, যাকে ফেরেশতাগণ বেষ্টন করে রেখেছেন। তাতে এমন সকল জিনিস রক্ষিত থাকবে, যা মানব চক্ষু কখনো দেখতে পারেনি, তার সংবাদ কানে শুনতে পাইনি, এমনকি মানুষের হৃদয়ও কল্পনা করতে পারেনি। অতএব আমাদেরকে সেই বাজার থেকে এমন সব কিছু দেয়া হবে যা আমরা পছন্দ করব, অথচ উক্ত বাজারে কোন জিনিসই ক্রয়-বিক্রয় হবে না, বরং সেখানে জান্নাতীগণ একজন অন্যজনের সাথে সাক্ষাৎ করবে। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: সেই বাজারে একজন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন লোক একজন সাধারণ ধরনের লোকের সাথে সাক্ষাৎ করবে, অবশ্য জান্নাতীদের মধ্যে কেউ হীন নয়। তখন সে তার পোশাক-পরিচ্ছদ দেখে আশ্চর্যান্বিত হবে কিন্তু তার কথা শেষ হতে না হতেই সে অনুধাবন করবে যে, তার পোশাক তার চেয়ে আরো উত্তম হয়ে গেছে। আর এটা এজন্য যে, জান্নাতে কোন লোকের অনুতপ্ত ও দুশ্চিন্তায় পতিত হওয়ার সুযোগ থাকবে না।
অতঃপর (উক্ত বাজার ও পরস্পরে দেখা-সাক্ষাৎ করে) আমরা নিজ নিজ বাসস্থানের দিকে ফিরে যাব। এ সময় আমাদের স্ত্রীগণ আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করে বলবে, মারহাবা, খোশ আমদেদ! মূলত যখন তোমরা আমাদের কাছ থেকে পৃথক হয়েছিলে, সে অবস্থা অপেক্ষা এখন তোমরা আরো অধিক সুন্দর চেহারা ও সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে আমাদের কাছে ফিরে এসেছ। তখন আমরা বলব, আজ আমরা আমাদের মহাপরাক্রশালী প্রভুর সাথে বসার সৌভাগ্য লাভ করেছি। কাজেই এ মর্যাদার অধিকারী হয়ে প্রত্যাবর্তন করা আমাদের জন্য যথার্থ উপযোগী হয়েছে এবং এমন হওয়াই উচিত ছিল।
[তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ; আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন হাদীসটি গরীব]
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَن سعيد بن الْمسيب أَنه لقيَ أَبَا هريرةَ فَقَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ: أَسْأَلُ اللَّهَ أَنْ يَجْمَعَ بَيْنِي وَبَيْنَكَ فِي سُوقِ الْجَنَّةِ. فَقَالَ سَعِيدٌ: أَفِيهَا سُوقٌ؟ قَالَ: نَعَمْ أَخْبَرَنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ أَهْلَ الْجَنَّةِ إِذَا دَخَلُوهَا نَزَلُوا فِيهَا بِفَضْلِ أَعْمَالِهِمْ ثُمَّ يُؤْذَنُ لَهُمْ فِي مِقْدَارِ يَوْمِ الْجُمُعَةِ مِنْ أَيَّامِ الدُّنْيَا فَيَزُورُونَ رَبَّهُمْ وَيَبْرُزُ لَهُمْ عَرْشُهُ وَيَتَبَدَّى لَهُم فِي روضةٍ من رياضِ الجنَّة فَيُوضَع لَهُم مَنَابِر من نور ومنابرمن لُؤْلُؤٍ وَمَنَابِرُ مِنْ يَاقُوتٍ وَمَنَابِرُ مِنْ زَبَرْجَدٍ وَمَنَابِرُ مِنْ ذَهَبٍ وَمَنَابِرُ مِنْ فِضَّةٍ وَيَجْلِسُ أَدْنَاهُم - وَمَا فيهم دنيٌّ - عَلَى كُثْبَانِ الْمِسْكِ وَالْكَافُورِ مَا يَرَوْنَ أَنَّ أَصْحَابَ الْكَرَاسِيِّ بِأَفْضَلَ مِنْهُمْ مَجْلِسًا» . قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَهَلْ نَرَى رَبَّنَا؟ قَالَ: «نَعَمْ هَلْ تَتَمَارَوْنَ فِي رُؤْيَةِ الشَّمْسِ وَالْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ؟» قُلْنَا: لَا. قَالَ: كَذَلِكَ لَا تَتَمَارَوْنَ فِي رُؤْيَةِ رَبِّكُمْ وَلَا يَبْقَى فِي ذَلِكَ الْمَجْلِسِ رَجُلٌ إِلَّا حَاضَرَهُ اللَّهُ مُحَاضَرَةً حَتَّى يَقُولَ لِلرَّجُلِ مِنْهُمْ: يَا فلَان ابْن فلَان أَتَذكر يَوْم قلت كَذَا وَكَذَا؟ فيذكِّره بِبَعْض غدارته فِي الدُّنْيَا. فَيَقُولُ: يَا رَبِّ أَفَلَمْ تَغْفِرْ لِي؟ فَيَقُولُ: بَلَى فَبِسِعَةِ مَغْفِرَتِي بَلَغْتَ مَنْزِلَتَكَ هَذِهِ. فَبَيْنَا هُمْ عَلَى ذَلِكَ غَشِيتْهُمْ سَحَابَةٌ مِنْ فَوْقِهِمْ فَأَمْطَرَتْ عَلَيْهِمْ طِيبًا لَمْ يَجِدُوا مِثْلَ رِيحِهِ شَيْئًا قَطُّ وَيَقُولُ رَبُّنَا: قُومُوا إِلَى مَا أَعْدَدْتُ لَكُمْ مِنَ الْكَرَامَةِ فَخُذُوا مَا اشْتَهَيْتُمْ فَنَأْتِي سُوقًا قَدْ حَفَّتْ بِهِ الْمَلَائِكَةُ فِيهَا مَا لَمْ تَنْظُرِ الْعُيُونُ إِلَى مِثْلِهِ وَلَمْ تَسْمَعِ الْآذَانُ وَلَمْ يَخْطُرْ عَلَى الْقُلُوبِ فَيُحْمَلُ لَنَا مَا اشْتَهَيْنَا لَيْسَ يُبَاعُ فِيهَا وَلَا يُشْتَرَى وَفِي ذَلِكَ السُّوقِ يَلْقَى أَهْلُ الْجَنَّةِ بَعْضُهُمْ بَعْضًا . قَالَ: فَيُقْبِلُ الرَّجُلُ ذُو الْمَنْزِلَةِ الْمُرْتَفِعَةِ فَيَلْقَى مَنْ هُوَ دُونَهُ - وَمَا فيهم دنيٌّ - فيروعُه مَا يرى عَلَيْهِ من اللباسِ فِيمَا يَنْقَضِي آخِرُ حَدِيثِهِ حَتَّى يَتَخَيَّلَ عَلَيْهِ مَا هُوَ أحسن مِنْهُ وَذَلِكَ أَنَّهُ لَا يَنْبَغِي لِأَحَدٍ أَنْ يَحْزَنَ فِيهَا ثُمَّ نَنْصَرِفُ إِلَى مَنَازِلِنَا فَيَتَلَقَّانَا أَزْوَاجُنَا فَيَقُلْنَ: مَرْحَبًا وَأَهْلًا لَقَدْ جِئْتَ وَإِنَّ بِكَ مِنَ الْجَمَالِ أَفْضَلَ مِمَّا فَارَقْتَنَا عَلَيْهِ فَيَقُولُ: إِنَّا جَالَسْنَا الْيَوْمَ رَبَّنَا الْجَبَّارَ وَيَحِقُّنَا أَنْ نَنْقَلِبَ بِمِثْلِ مَا انْقَلَبْنَا . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ: هَذَا حَدِيث غَرِيب
اسنادہ ضعیف ، رواہ الترمذی (2549) و ابن ماجہ (4336) * ھشام بن عمار صدوق اختلط ، ولم یثبت بانہ حدث بھذا الحدیث قبل اختلاطہ ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: (أَسْأَلُ اللَّهَ أَنْ يَجْمَعَ) আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) সা'ঈদ ইবনু মুসাইয়্যাব (রহিমাহুল্লাহ)-কে বলেন, আল্লাহর রাব্বুল আলামীন যেন আমাকে ও তোমাকে জান্নাতের বাজারে একত্রিত করেন। আসলে জান্নাতে প্রতি সপ্তাহে একদিন সকলের মিলন হবে সেটাকেই জান্নাতের বাজার বলা হয়েছে উক্ত হাদীসে। উক্ত বাজারে মনোমুগ্ধকর অনেক আকার-আকৃতি থাকবে যে কেউ তার মনের চাহিদা অনুপাতে তাতে রূপান্তরিত হতে পারবে। জান্নাতবাসীরা তাদের ‘আমল অনুপাতে সেই বাজারে উপস্থিত হবে। প্রতি জুমু'আর দিন একবার করে অনুমতি পাবে। প্রত্যেকের জন্য আসন থাকবে। তাদের ‘আমল অনুপাতে কারো জন্য মণি-মুক্তার আসন থাকবে। কারো জন্য ইয়াকূত ও পান্না পাথরের এবং কারো জন্য স্বর্ণ ও রূপার। জান্নাতবাসীদের সর্বনিম্ন ব্যক্তি মিশক আম্বারের আসনে বসবে।
(هَلْ نَرَى رَبَّنَا) জান্নাতে মু'মিনরা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে দেখতে পাবে কোন প্রকার কষ্ট-ক্লেশ ছাড়া। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সকলের সামনে উপস্থিত হয়ে জান্নাতবাসীদের সাথে সরাসরি কথা বললেন এবং তাদেরকে দেয়া বিভিন্ন নি'আমাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ হা. ৫৬৪৭, তুহফাতুল আহওয়াযী হা. ২৫৪৯)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬৪৮-[৩৭] আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: নিম্নমানের জান্নাতবাসীর জন্য আশি হাজার সেবক এবং বাহাত্তর জন স্ত্রী হবে, তার জন্য গম্বুজ আকৃতির ছাউনি স্থাপন করা হবে, যা মণি-মুক্তা, হীরা ও ইয়াকুত দ্বারা তৈরি। উক্ত ছাউনির প্রশস্ততা হবে জাবিয়াহ্ থেকে সন্’আ পর্যন্ত মধ্যবর্তী দূরত্বের পরিমাণ। উক্ত সূত্রে আরো বর্ণিত হয়েছে, তিনি (সা.) বলেছেন: ছোট বয়সে কিংবা বৃদ্ধ বয়সে যে কোন জান্নাতী লোক (দুনিয়াতে) মারা যাবে, সে জান্নাতে ত্রিশ বছর বয়সী (যুবক) হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং বয়স (-এর আকৃতি) কখনো বৃদ্ধি পাবে না। জাহান্নামবাসীরাও ঐ রকম (৩০ বছর বয়সী) হবে।
উক্ত সূত্রে অপর এক বর্ণনায় আছে, রাসূল (সা.) বলেছেন, জান্নাতবাসীদের মাথায় এমন মুকুট রাখা হবে, যার সাধারণ মুক্তা দুনিয়ার পূর্বপ্রান্ত থেকে পশ্চিমপ্রান্ত পর্যন্ত আলোকিত করবে।
অত্র সনদে অপর এক বর্ণনায় আছে (সহীহ লিগায়রিহী), জান্নাতে সন্তান কামনা করবে, তখন গর্ভ, প্রসব এবং তার বয়স চাহিদা অনুযায়ী মুহুর্তের মধ্যে সংঘটিত হয়। জান্নাতে যখনই সন্তানের আকাঙ্ক্ষা করবে, তখনই সে সন্তান পাবে, তবে কেউই আশা করবে না। (এ কথাটি ইসহাক-এর)
ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং তিনি আরো বলেছেন, হাদীসটি গরীব; ইবনু মাজাহ চতুর্থটি আর দারিমী কেবলমাত্র শেষাংশটি বর্ণনা করেছেন।
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَدْنَى أَهْلِ الْجَنَّةِ الَّذِي لَهُ ثَمَانُونَ أَلْفَ خَادِمٍ وَاثْنَتَانِ وَسَبْعُونَ زَوْجَةً وَتُنْصَبُ لَهُ قُبَّةٌ مِنْ لُؤْلُؤٍ وَزَبَرْجَدٍ وَيَاقُوتٍ كَمَا بَيْنَ الْجَابِيَةِ إِلَى صَنْعَاءَ» وَبِهَذَا الْإِسْنَاد قَالَ (ضَعِيف) : «وَمَنْ مَاتَ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ مِنْ صَغِيرٍ أَوْ كَبِيرٍ يُرَدُّونَ بَنِي ثَلَاثِينَ فِي الْجَنَّةِ لَا يَزِيدُونَ عَلَيْهَا أَبَدًا وَكَذَلِكَ أَهْلُ النَّارِ» وَبِهَذَا الْإِسْنَاد قَالَ (ضَعِيف) : «إِنَّ عليهمُ التيجانَ أَدْنَى لُؤْلُؤَةٍ مِنْهَا لَتُضِيءُ مَا بَيْنَ الْمَشْرِقِ والمغربِ» وَبِهَذَا الإِسناد قَالَ (صَحِيح لغيره) : «الْمُؤْمِنُ إِذَا اشْتَهَى الْوَلَدَ فِي الْجَنَّةِ كَانَ حَمْلُهُ وَوَضْعُهُ وَسِنُّهُ فِي سَاعَةٍ كَمَا يُشْتَهَى» وَقَالَ إِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ فِي هَذَا الْحَدِيثِ: إِذَا اشْتَهَى الْمُؤْمِنُ فِي الْجَنَّةِ الْوَلَدَ كَانَ فِي سَاعَة وَلَكِن لَا يَشْتَهِي (قَول اسحاق لَيْسَ من الحَدِيث) رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيث غَرِيب. روى ابْن مَاجَه الرَّابِعَة والدارمي الْأَخِيرَة
حسن ، رواہ الترمذی (1 / 2562) * قلت : و رواہ عبداللہ بن وھب : اخبرنی عمرو بن الحارث بہ (ابن حبان ، الاحسان : 7358 / 7401) و سندہ حسن ۔ ۔ ۔ حسن ، رواہ الترمذی (2 / 2562)و ابن ابی داود کما فی النھایۃ فی الفتن و الملاحم (2 / 132 ح 1203 و سندہ حسن) * قلت : رواہ ابن وھب : اخبرنا عمرو بن الحارث بہ ۔۔۔ حسن ، رواہ الترمذی (3 / 2563) و ابن حبان (الاحسان : 7354 / 7397 و سندہ حسن) * قلت : رواہ ابن وھب : أخبرنی عمرو بن الحارث بہ ۔ 0 حدیث ’’ المومن اذا اشتھی ‘‘ الخ سندہ حسن ، رواہ الترمذی (2563 وقال : حسن غریب) و ابن ماجہ (4328) والدارمی (2 / 337 ح 2837) ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: উক্ত হাদীসে বলা হয়েছে সর্বনিম্ন জান্নাতী ব্যক্তির জন্য আশি হাজার খাদেম ও বাহাত্তরজন স্ত্রী হবে হুরদের মধ্য থেকে এবং তাদের জন্য মণিমুক্তা, হীরা ও ইয়াকুত পাথরের গোলাকৃতির ছাউনি স্থাপন করা হবে। তাতে তারা বসে আনন্দ প্রকাশ করবে। অনেকে বলেছেন, উপরোক্ত সংখ্যা দ্বারা আধিক্যতা বুঝানো হয়েছে।
(مَنْ مَاتَ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ مِنْ صَغِيرٍ) অর্থাৎ জান্নাতবাসী কেউ দুনিয়াতে ছোট অবস্থায় মারা গেলে সে জান্নাতে ত্রিশ বছর বয়সী যুবক হয়ে প্রবেশ করবে। উক্ত বয়স কখনো দুনিয়ার মতো বৃদ্ধি পাবে না। মোটকথা জান্নাতবাসীরা চিরকাল উক্ত বয়সেই থাকবে, বার্ধক্য কখনো তাদেরকে স্পর্শ করবে না।
(كَذَلِكَ أَهْلُ النَّارِ) জাহান্নামবাসীরাও অনুরূপ ত্রিশ বছর বয়সী হবে অর্থাৎ যেভাবে জান্নাতবাসীরা ত্রিশ বছর বয়সী হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে দুনিয়াতে তারা যেই বয়সেই মৃত্যুবরণ করুক না কেন? অনুরূপভাবে জাহান্নামবাসীরাও ত্রিশ বছর বয়সী হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে এবং তারা চিরকাল সেখানে বসবাস করবে।
ত্রিশ বছর নির্ধারণের কারণ: যাতে করে জান্নাতবাসীরা পরিপূর্ণরূপে আরাম-আয়েশ ভোগ করতে পারে এবং জাহান্নামবাসীরা পরিপূর্ণরূপে ‘আযাব ভোগ করতে পারে। (তুহফাতুল আহওয়াযী হা. ৫৬৪৮)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬৪৯-[৩৮] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতের হুরগণ এক জায়গায় সমবেত হয়ে উঁচুস্বরে এমন সুন্দর লহরীতে গাইবে, সৃষ্ট জীব সেই ধরনের লহরী কখনো শুনতে পায়নি। তারা বলবে, আমরা চিরদিন থাকব, কখনো ধ্বংস হব না। আমরা সর্বদা সুখে-সানন্দে থাকব, কখনো দুঃখ ও দুশ্চিন্তায় পতিত হব না। আমরা সদা খুশি থাকব কখনো নাখোশ হব না। অতএব তাকে ধন্যবাদ, যার জন্য আমরা এবং আমাদের জন্য যিনি। (তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْ عَلِيٍّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ فِي الْجَنَّةِ لَمُجْتَمَعًا لِلْحُورِ الْعِينِ يَرْفَعْنَ بِأَصْوَاتٍ لَمْ تَسْمَعِ الْخَلَائِقُ مِثْلَهَا يَقُلْنَ: نَحْنُ الْخَالِدَاتُ فَلَا نَبِيدُ وَنَحْنُ النَّاعِمَاتُ فَلَا نَبْأَسُ وَنَحْنُ الرَّاضِيَاتُ فَلَا نَسْخَطُ طُوبَى لِمَنْ كانَ لنا وَكُنَّا لَهُ . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
اسنادہ ضعیف ، رواہ الترمذی (2564 ، 2550) * عبد الرحمن بن اسحاق الکوفی ضعیف ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: জান্নাতে হুরদের জন্য একটি মিলনকেন্দ্র হবে, সেখানে হুরেরা বিভিন্ন প্রকার কবিতা আবৃত্তি করবে সুরভিত কণ্ঠে, উঁচু আওয়াজে যা মানুষ কখনো শুনেনি। তারা বলবে,
(نَحْنُ الْخَالِدَاتُ فَلَا نَبِيدُ) আমরা চিরদিন থাকব কখনো ধ্বংস হব না। (وَنَحْنُ النَّاعِمَاتُ فَلَا نَبْأَسُ) আমাদের সর্বদা মুখে আনন্দ থাকবে কখনো দুঃখ ও দুশ্চিন্তায় পতিত হব না। (وَنَحْنُ الرَّاضِيَاتُ فَلَا نَسْخَطُ) আমরা সর্বদা সন্তুষ্ট থাকব কখনো নাখোশ হব না। (طُوبَى لِمَنْ كانَ لنا وَكُنَّا لَهُ) অতএব সুসংবাদ তাকে যার জন্য আমরা এবং আমাদের জন্য যিনি।
অন্য এক রিওয়ায়াতে এসেছে, সাহাবীরা বলেন, আমরা বললাম, হে আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)! সেই গানটি কি হবে? তিনি বলেন, তা হবে আল্লাহর তাসবীহ ও প্রশংসা এবং তার পবিত্রতা বর্ণনা করা। (তুহফাতুল আহওয়াযী হা. ৫৬৪৯)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬৫০-[৩৯] হাকীম ইবনু মু’আবিয়াহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতে রয়েছে পানির সমুদ্র, মধুর দরিয়া, দুধের সমুদ্র এবং শরাবের দরিয়া। অতঃপর তা থেকে আরো বহু নদী প্রবাহিত হবে। (তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَن حكيمِ بن مُعَاوِيَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ فِي الْجَنَّةِ بَحْرُ الْمَاءِ وَبَحْرُ الْعَسَلِ وَبَحْرُ اللَّبَنِ وَبَحْرُ الْخَمْرِ ثُمَّ تشقَّقُ الأنهارُ بعدُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
حسن ، رواہ الترمذی (2571 وقال : حسن صحیح) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: উক্ত হাদীসে বলা হয়েছে যে, জান্নাতে পানির ও মধুর সাগর থাকবে এবং দুধের সাগর থাকবে ও মদের সাগর থাকবে। ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) (بَحْرُ) দ্বারা উদ্দেশ্য দাজলা ও ফুরাত এবং জান্নাতের নদীসমূহ। উপরে উল্লেখিত প্রত্যেকটির আলাদা আলাদাভাবে নদী হবে। যে যেটি থেকে পান করার ইচ্ছা পান করবে।
(تشقَّقُ الأنهارُ) উপরোল্লেখিত প্রত্যেকটির যে আলাদা আলাদা নদী হবে সেগুলো থেকে যেই শাখাপ্রশাখা বের হবে সেগুলোকে (أَنْهَارُ) বলা হয়েছে। (তুহফাতুল আহওয়াযী হা. ৫৬৫০)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬৫১-[৪০] আর দারিমী হাদীসটি মু’আবিয়াহ্ (রাঃ) হতে রিওয়ায়াত করেছেন।
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
رَوَاهُ الدَّارمِيّ عَن مُعَاوِيَة
حسن ، رواہ الدارمی (2 / 337 ح 2839) ۔
(صَحِيح)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬৫২-[৪১] আবূ সাঈদ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: কোন জান্নাতী লোক সত্তরটি গদিতে (সিংহাসনে) হেলান দিয়ে বসবে। এটা শুধু তার একই স্থান থাকবে। অতঃপর একজন মহিলা (হুর) এসে তার কাঁধে চাপড় মারবে, তখন সে ঐ মহিলার দিকে দৃষ্টি দেবে, তার চেহারার উজ্জ্বলতা আয়নার চেয়ে বেশি স্বচ্ছ হবে এবং তার গায়ে রক্ষিত মামুলি মুক্তার আলো পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের মধ্যবর্তী স্থানকে আলোকিত করে ফেলবে। মহিলাটি উক্ত পুরুষটিকে সালাম করবে, সে সালামের জবাব দিয়ে প্রশ্ন করবে, তুমি কে? মহিলাটি উত্তরে বলবে, আমি ’অতিরিক্ত সেবকদের অন্তর্ভুক্ত। তার পরনে বিভিন্ন রঙের সত্তরটি কাপড় থাকবে এবং তার ভিতর দিয়েই তার পায়ের নলার মজ্জা দেখা যাবে। আর তার মাথায় এমন মুকুট হবে, যার নিম্নমানের মুক্তার আলো পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্তের মধ্যবর্তী স্থান আলোকিত করে দেবে। (আহমাদ)
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِنَّ الرَّجُلَ فِي الْجَنَّةِ لَيَتَّكِئُ فِي الْجَنَّةِ سَبْعِينَ مَسْنَدًا قَبْلَ أَنْ يَتَحَوَّلَ ثُمَّ تَأْتِيهِ امْرَأَةٌ فَتَضْرِبُ عَلَى مَنْكِبِهِ فَيَنْظُرُ وَجْهَهُ فِي خَدِّهَا أَصْفَى مِنَ الْمِرْآةِ وَإِنَّ أَدْنَى لُؤْلُؤَةٍ عَلَيْهَا تُضِيءُ مَا بينَ المشرقِ والمغربِ فتسلِّمُ عَلَيْهِ فيردُّ السلامَ وَيَسْأَلُهَا: مَنْ أَنْتِ؟ فَتَقُولُ: أَنَا مِنَ الْمَزِيدِ وَإِنَّهُ لَيَكُونُ عَلَيْهَا سَبْعُونَ ثَوْبًا فَيَنْفُذُهَا بَصَرُهُ حَتَّى يَرَى مُخَّ سَاقِهَا مِنْ وَرَاءِ ذَلِكَ وإِنَّ عَلَيْهَا من التيجان أَن أدنىلؤلؤة مِنْهَا لَتُضِيءُ مَا بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ . رَوَاهُ أَحْمد
حسن ، رواہ احمد (3 / 75 ح 11738) و ابن حبان فی صحیحہ (الاحسان : 7354 / 7397 و سندہ حسن) ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: (لَيَتَّكِئُ فِي الْجَنَّةِ سَبْعِينَ مَسْنَدً) জান্নাতী ব্যক্তি জান্নাতে সত্তরটি সোফার সেটে হেলান দিবে। প্রত্যেকটি সোফার সেট অনন্য হবে একটি অন্যটির সাথে মিশবে না।
এক একটির রং, উচ্চতা, বসার আরাম ইত্যাদির বিবেচনায় অন্যটির থেকে ভিন্নতর হবে। আর এটিই আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, (وَّ فُرُشٍ مَّرۡفُوۡعَۃٍ) “আর উঁচু উঁচু বিছানায়” (সূরাহ আল ওয়াকি'আহ্ ৫৬ : ৩৪)। এ আয়াতও প্রমাণ করে যে, জান্নাতীদের বিছানা, আরাম করার আসবাবপত্র অনেক বেশি হবে। এই সমস্ত আসবাবপত্রের ধরণ ও সৌন্দর্য ইত্যাদি ভিন্ন ভিন্ন হবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬৫৩-[৪২] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন নবী (সা.) কথাবার্তা বলছিলেন। এ সময় তাঁর কাছে একজন গ্রাম্য বেদুইন উপস্থিত ছিল। তিনি (সা.) বললেন, জান্নাতবাসী এক লোক সেখানে কৃষিকাজ করার জন্য তার প্রভুর কাছে অনুমতি চাবে। তখন আল্লাহ তা’আলা তাকে বলবেন, তোমার চাহিদা মতো সবই কি পাচ্ছ না? লোকটি বলল, হ্যা, তবে আমি কৃষিকাজ ভালোবাসি। অতঃপর সে বীজ বপন করবে এবং চক্ষুর পলকে তা উদ্গত হবে, পোক্ত হবে এবং ফসল কাটা হবে। এমনকি পাহাড়ের সমান স্তুপ হয়ে যাবে। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, হে আদম সন্তান নিয়ে যাও, কোন কিছুতেই তোমার তৃপ্তি হয় না। তখন গ্রাম্য বেদুইন লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর শপথ! দেখবেন, সে হয়তো কোন কুরায়শী অথবা আনসার গোত্রীয় লোক হবে। কেননা তারাই কৃষিকাজ করে থাকে। আর আমরা তো কৃষিকাজ করি না। রাসূলুল্লাহ (সা.) তার কথা শুনে হেসে দিলেন। (বুখারী)
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَتَحَدَّثُ - وَعِنْدَهُ رَجُلٌ مِنْ أَهْلِ الْبَادِيَةِ -: إِنَّ رَجُلًا مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ اسْتَأْذَنَ رَبَّهُ فِي الزَّرْعِ. فَقَالَ لَهُ: أَلَسْتَ فِيمَا شِئْتَ؟ قَالَ: بَلَى وَلَكِنْ أُحِبُّ أَنْ أَزْرَعَ فَبَذَرَ فَبَادَرَ الطَّرْفَ نَبَاتُهُ وَاسْتِوَاؤُهُ وَاسْتِحْصَادُهُ فَكَانَ أَمْثَالَ الْجِبَالِ. فَيَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى: دُونَكَ يَا ابْن آدم فَإِنَّهُ يُشْبِعُكَ شَيْءٌ . فَقَالَ الْأَعْرَابِيُّ: وَاللَّهِ لَا تَجِدُهُ إِلَّا قُرَشِيًّا أَوْ أَنْصَارِيًّا فَإِنَّهُمْ أَصْحَابُ زَرْعٍ وَأَمَّا نَحْنُ فَلَسْنَا بِأَصْحَابِ زَرْعٍ فَضَحِكَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ
رواہ البخاری (2348) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (رَجُلٌ مِنْ أَهْلِ الْبَادِيَةِ) অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলেন, তখন তাঁর পাশে একজন বেদুইন ব্যক্তি বসা ছিল। যিনি মরুতে বাস করেন।
(أَلَسْتَ فِيمَا شِئْتَ؟) আল্লাহ তা'আলা জান্নাতী লোকটিকে সম্বোধন করে বললেন, হে আমার বান্দা! তুমি যে জান্নাতে আছ তাতে কি সকল প্রকারের নাজ-নিআমাত নেই? এখানে তো খাদ্য-পানিয় ও সব ধরনের চাওয়া-পাওয়া বিদ্যমান। এখানে কৃষি উৎপন্ন শষ্যাদিও বিদ্যমান আছে। অতএব তুমি যা চাইবে তাই পাইবে।
(دُونَكَ يَا ابْن آدم) আল্লাহ তা'আলা বলবেন, হে আদম সন্তান! গ্রহণ কর যা তোমার মন চায়। এখানে সবকিছুই আছে। এটা সব কিছু পাওয়ার স্থান।
(فَإِنَّهُ يُشْبِعُكَ شَيْءٌ) অর্থাৎ জান্নাতে এত সব জিনিস থাকতেও তুমি কৃষি করতে চাচ্ছ। তাহলে কি কোন জিনিস দ্বারাই তুমি তৃপ্তি লাভ করবে না?
(فَقَالَ الْأَعْرَابِيُّ: وَاللَّهِ لَا تَجِدُهُ إِلَّا قُرَشِيًّا أَوْ أَنْصَارِيًّا) বেদুইন লোকটি অবাক হয়ে বলল, জান্নাতে গিয়েও কৃষিকাজ করতে চাইবে? তাহলে এই স্বভাবের লোক কেবল কুরায়শের ও আনসারীদের মধ্য থেকেই হবে। এখানে বেদুইন লোকটি কুরায়শ বলতে মক্কাবাসী ও আনসারী বলতে মদীনাবাসীদেরকে বুঝিয়েছে। কেননা মক্কাহ্ ও মদীনাবাসী কৃষিকাজ করে থাকে। (ফাতহুল বারী হা. ২৩৪৮)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ
৫৬৫৪-[৪৩] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে জিজ্ঞেস করল, জান্নাতবাসীগণ কি ঘুমাবে? তিনি বললেন, নিদ্রা তো মৃত্যুর সহোদর। আর জান্নাতবাসী মরবে না (অতএব তাদের কোন নিদ্রা নেই)। (বায়হাকী’র শু’আবূল ঈমান)
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (بَاب صفةالجنة وَأَهْلهَا)
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: سَأَلَ رَجُلٌ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَيَنَامُ أَهْلُ الْجَنَّةِ؟ قَالَ: «النَّوْمُ أَخُو الْمَوْتِ وَلَا يَمُوتُ أَهْلُ الجنةِ» . رواهُ البيهقيُّ فِي «شعب الْإِيمَان»
اسنادہ ضعیف ، رواہ البیھقی فی شعب الایمان (4745 ، نسخۃ محققۃ : 4416) * سفیان الثوری مدلس و عنعن و لحدیثہ شواھد ضعیفۃ و مرسلۃ فی الصحیحۃ للالبانی (1087) و معناہ صحیح
ব্যাখ্যা: উক্ত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে যখন প্রশ্ন করা হলো যে, জান্নাতীরা কি ঘুমাবে? তখন রাসূল (সা.) দলীলে বুরহানী দ্বারা উত্তর দিয়েছেন। আর সরাসরি “না” দ্বারা উত্তর না দিয়ে এভাবে উত্তর দেয়ায় আত্মার প্রশান্তি এবং ঈমানের দৃঢ়তা আসে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তাআলার দর্শনলাভ
৫৬৫৫-[১] জাবীর ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: শীঘ্রই তোমরা নিশ্চিত তোমাদের প্রভুকে স্বচক্ষে প্রকাশ্যে দেখতে পাবে। আর অপর এক বর্ণনাতে আছে- জারীর (রাঃ) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর কাছে বসাছিলাম। তিনি (সা.) পূর্ণিমার রাত্রে চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমরা অচিরেই তোমাদের প্রভুকে দেখতে পাবে, যেমন তোমরা এই চাঁদকে দেখছ। তাঁর দর্শনে তোমরা কোনরূপ বাধাপ্রাপ্ত হবে না। অতএব তোমরা সাধ্যমত চেষ্টা করবে সূর্য উদয়ের পূর্বের সলাত সূর্যোদয়ের আগে এবং সূর্যাস্তের আগের সলাত সূর্যাস্তের আগে আদায় করতে যেন ব্যর্থ না হও। অতঃপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করলেন- (وَ سَبِّحۡ بِحَمۡدِ رَبِّکَ قَبۡلَ طُلُوۡعِ الشَّمۡسِ وَ قَبۡلَ غُرُوۡبِهَا) “সূর্যোদয়ের পূর্বে এবং সূর্যাস্তের পূর্বে আপন প্রভুর প্রশংসা ও স্তুতি বর্ণনা কর”- (সূরাহ্ ত্ব-হা- ২০ : ১৩০)। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب رؤيةالله تَعَالَى)
عَن جَرِيرِ بْنِ عَبْدُ اللَّهِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّكُمْ سَتَرَوْنَ رَبَّكُمْ عِيَانًا» . وَفِي رِوَايَةٍ: قَالَ: كُنَّا جُلُوسًا عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَنَظَرَ إِلَى الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ فَقَالَ: «إِنَّكُمْ سَتَرَوْنَ رَبَّكُمْ كَمَا تَرَوْنَ هَذَا الْقَمَرَ لَا تُضَامُونَ فِي رُؤْيَتِهِ فَإِنِ اسْتَطَعْتُمْ أَنْ لَا تُغْلَبُوا عَلَى صَلَاةٍ قَبْلَ طُلُوعِ الشَّمْسِ وَقَبْلَ غُرُوبِهَا فَافْعَلُوا» ثُمَّ قَرَأَ (وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ قَبْلَ طُلُوعِ الشَّمْسِ وَقَبْلَ غُرُوبهَا) مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (554) و مسلم (211 / 632)، (1432) ۔
(مُتَّفق عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: (إِنَّكُمْ سَتَرَوْنَ رَبَّكُمْ عِيَانًا) হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের রবকে কোন ধরনের পর্দা বা প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই স্বচক্ষে দেখবে।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের মাযহাব হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলাকে কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই দেখা সম্ভব, আর তা মু'মিনদের জন্য পরকালে হবে।
মুতাজিলা, খারিজী এবং মুরজিয়ারা বলেন, কোন সৃষ্টি আল্লাহকে দেখতে পাবে না আর আল্লাহ তা'আলাকে দেখা সম্পূর্ণ অসম্ভব। কেননা কুরআন হাদীস এবং সাহাবীদের ইজমা এবং তাদের পরবর্তী সালাফদের বক্তব্য এ ব্যাপারে দলীল হয়ে আছে। বিশজন সাহাবী রাসূল এ থেকে আল্লাহকে দেখার ব্যাপারে হাদীস বর্ণনা করেছেন। (তুহফাতুল আহওয়াযী হা. ২৫৫১)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তাআলার দর্শনলাভ
৫৬৫৬-[২] সুহায়ব (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: জান্নাতবাসীগণ যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন আল্লাহ তা’আলা তাদের দিকে দৃষ্টি দিয়ে বলবেন, তোমরা কি আরো কিছু চাও, যা আমি তোমাদেরকে অতিরিক্ত প্রদান করব। তারা বলবে, তুমি কি আমাদের মুখমণ্ডলকে আলোকিত করনি? তুমি কি আমাদের জান্নাতে প্রবেশ করাওনি। তিনি (সা.) বলেন, অতঃপর আল্লাহ তা’আলা হিজাব বা পর্দা তুলে ফেলবেন, তখন তারা আল্লাহ তা’আলার দর্শন লাভ করবে। মূলত আল্লাহ তা’আলার দর্শন লাভ ও তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকার তুলনায় বেশি প্রিয় কোন বস্তুই তাদেরকে প্রদান করা হয়নি। অতঃপর তিনি কুরআনের এ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন- “যারা উত্তম কাজ করেছে তার প্রতিদান ভালোই (অর্থাৎ জান্নাত তার উপর অতিরিক্ত)”- (সূরাহ্ ইউনুস ১০: ২৬)। তার উপর অতিরিক্ত হলো- তাদের জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান এবং তার উপর অতিরিক্ত অবদান (অর্থাৎ দীদারে এলাহী)। (মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب رؤيةالله تَعَالَى)
وَعَن صُهَيْب عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِذَا دَخَلَ أَهْلُ الْجَنَّةِ الْجَنَّةَ يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى: تُرِيدُونَ شَيْئًا أَزِيدُكُمْ؟ فَيَقُولُونَ: أَلَمْ تُبَيِّضْ وُجُوهَنَا؟ أَلَمْ تُدْخِلْنَا الْجَنَّةَ وَتُنَجِّنَا مِنَ النَّارِ؟ قَالَ: «فَيُرْفَعُ الْحِجَابُ فَيَنْظُرُونَ إِلَى وَجْهِ اللَّهِ فَمَا أُعْطُوا شَيْئًا أَحَبَّ إِلَيْهِمْ مِنَ النَّظَرِ إِلَى رَبِّهِمْ» ثُمَّ تَلَا (لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَة) رَوَاهُ مُسلم
رواہ مسلم (298 ، 297 / 181)، (449) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (فَيُرْفَعُ الْحِجَابُ) অর্থাৎ পর্দা উঠিয়ে নেয়া হবে। মূলত আল্লাহ তা'আলা পর্দাবৃত হওয়া থেকে মুক্ত এবং পবিত্র, তাহলে পর্দা উঠিয়ে নেয়ার মর্মার্থ হচ্ছে, মানুষের চক্ষু থেকে পর্দা উঠিয়ে নেয়া হবে তখন তারা আল্লাহ তা'আলার চেহারার দিকে তাকাবে। আর কুরআনে বর্ণিত, (لِلَّذِیۡنَ اَحۡسَنُوا الۡحُسۡنٰی وَ زِیَادَۃٌ ؕ…) “যারা কল্যাণকর কাজ করে তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ...”- (সূরাহ্ ইউনুস ১০ : ২৬)। এ আয়াতে (زِیَادَۃٌ) এর ব্যাখ্যায় অধিকাংশ মুফাসসিরগন বলেছেন, তা হচ্ছে আল্লাহ তা'আলাকে দেখা। (তুহফাতুল আহওয়াযী হা, ২৫৫২)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তাআলার দর্শনলাভ
৫৬৫৭-[৩] ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: নিম্নমানের জান্নাতী তার উদ্যানসমূহ, স্ত্রীগণ, নি’আমাতের সারি, সেবক ও সেবককুল এবং তার আসনসমূহ একহাজার বছরের দূরত্ব পরিমাণ বিস্তীর্ণ দেখতে পাবে। আর আল্লাহ তা’আলার কাছে সেই লোকই উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ও সম্মানী হবে, যে সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহ তা’আলার দর্শন লাভ করবে। অতঃপর রাসূল (সা.) এ আয়াতটি পাঠ করলেন, “সেদিন কিছু সংখ্যক চেহারা স্বীয় প্রভুর দর্শন লাভে তরতাজা ও আলোকিত হয়ে উঠবে এবং তাদের প্রভুর দিকে তাকিয়ে থাকবে”- (সূরাহ আল কিয়ামাহ ৭৫: ২২-২৩)। (আহমাদ ও তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب رؤيةالله تَعَالَى)
عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ أَدْنَى أَهْلِ الْجَنَّةِ مَنْزِلَةً لَمَنْ يَنْظُرُ إِلَى جِنَانِهِ وَأَزْوَاجِهِ وَنَعِيمِهِ وَخَدَمِهِ وَسُرُرِهِ مَسِيرَةَ أَلْفِ سَنَةٍ وَأَكْرَمَهُمْ عَلَى اللَّهِ مَنْ يَنْظُرُ إِلَى وَجْهِهِ غُدْوَةً وَعَشِيَّةً» ثُمَّ قَرَأَ (وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَاضِرَةٌ إِلَى ربّها ناظرة) رَوَاهُ أَحْمد وَالتِّرْمِذِيّ
اسنادہ ضعیف ، رواہ احمد (2 / 64 ح 5317) و الترمذی (2553) * فیہ ثویر : ضعیف ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: (إِنَّ أَدْنَى أَهْلِ الْجَنَّةِ) অত্র হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) সর্বনিম্ন সুবিধাপ্রাপ্ত জান্নাতীর নি'আমাতরাজির কথা বলেছেন তাকে যে পরিমাণ আসবাবপত্র এবং নাজ-নি'আমাত দেয়া হবে এর দিকে যদি তাকায় এবং তার বাগান, অন্যান্য নি'আমাত খাদিম, খাট-পালংক ইত্যাদির দিকে যদি তাকায় এবং তা হিসাব করে, তাহলে এগুলোর দূরত্ব হবে এক হাজার বছর চলার দূরত্ব। অর্থাৎ তার রাজত্ব হবে এক হাজার বছরের দূরত্ব পরিমাণ। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী হা. ২৫৫৩)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তাআলার দর্শনলাভ
৫৬৫৮-[8] আবূ রযীন আল ’উকায়লী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামতের দিন আমাদের প্রত্যেক লোকই কি স্বতন্ত্রভাবে তার প্রভুকে দেখতে পাবে? তিনি (সা.) বললেন, হ্যা দেখতে পাবে। আবূ রযীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমি আবার প্রশ্ন করলাম, আচ্ছা, তার সৃষ্টিকুলের মাঝে এর কোন উপমা আছে কি? উত্তরে তিনি (সা.) বললেন, হে আবূ রযীন! তোমাদের প্রত্যেক লোক কি মানুষের ভিড় ছাড়া স্বতন্ত্রভাবে পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে পায় না? আবূ রযীন (রহিমাহুল্লাহ) বললেন, হা। তখন তিনি [রাসূলুল্লাহ (সা.)] বললেন, চাঁদ হলো আল্লাহ তা’আলার সৃষ্টিসমূহের একটি সৃষ্টি। অথচ আল্লাহ তা’আলা হলেন সুমহান ও বিরাট সত্তা। (আবূ দাউদ)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب رؤيةالله تَعَالَى)
وَبَعْضهمْ يُحسنهُ) وَعَن أبي رزين الْعقيلِيّ قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَكُلُّنَا يَرَى رَبَّهُ مُخْلِيًا بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ؟ قَالَ: «بَلَى» . قَالَ: وَمَا آيَةُ ذَلِكَ فِي خَلْقِهِ؟ قَالَ: «يَا أَبَا رَزِينٍ أَلَيْسَ كُلُّكُمْ يَرَى الْقَمَرَ لَيْلَةَ البدرِ مُخْلِيًا بِهِ؟» قَالَ: بَلَى. قَالَ: «فَإِنَّمَا هُوَ خَلْقٌ مِنْ خَلْقِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَجَلُّ وَأَعْظَمُ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
اسنادہ حسن ، رواہ ابوداؤد (4731)
ব্যাখ্যা: (كُلُّنَا يَرَى رَبَّهُ) সাহাবী আশ্চর্য হয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে প্রশ্ন করল, আমাদের সবাই কি আল্লাহ তা'আলাকে স্বচক্ষে দেখতে পাবে। সাহাবী পুনরায় প্রশ্ন করল- আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টির মাঝে এর কি নিদর্শন আছে? উত্তরে রাসূল বললেন, তোমাদের সবাই কি চন্দ্রকে দেখতে পাও না? সাহাবী বলল, হ্যা, দেখতে পাই। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, চন্দ্র হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার একটি সৃষ্টিমাত্র। তিনি এর চেয়েও অনেক মহান সুউচ্চ ও মর্যাদাবান। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তাআলার দর্শনলাভ
৫৬৫৯-[৫] আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে প্রশ্ন করলাম, আপনি কি (মি’রাজের রাত্রে) আপনার প্রভুকে দেখেছেন? জবাবে তিনি (সা.) বললেন, তিনি তো এক বিরাট জ্যোতি বা আলো, অতএব আমি তাকে কিভাবে দেখতে পারি? (মুসলিম)
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (بَاب رؤيةالله تَعَالَى)
عَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ سَأَلَتْ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: هَلْ رَأَيْتَ رَبَّكَ؟ قَالَ: «نُورٌ أَنَّى أَرَاهُ» . رَوَاهُ مُسلم
رواہ مسلم (291 / 178)، (443) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (نُورٌ أَنَّى أَرَاهُ) ইমাম নবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আল্লাহ তা'আলার পর্দা তথা নূর। অতএব কিভাবে তাকে দেখব? ইমাম আবূ আবদুল্লাহ আল মাযীব্যু আয যমীর (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, (أَرَاهُ) শব্দের জমির ফিরবে, আল্লাহর দিকে। এর অর্থ হলো, তার নূর তাকে দেখতে বাধা দিয়েছে।
কেউ কেউ বলেছেন, একটি নূর কোথায় থেকে তা দেখতে পাব? তখন (أَنِّىْ) এর স্থলে (أَنَّى) হবে। কোন কোন হানাফী মাশায়েখ বলেন, মূল ইবারত হবে (نُورٌأَنَّى أَرَاهُ) অর্থাৎ আমি নূরানী আল্লাহকে দেখেছি।
এখানে উল্লেখযোগ্য যে, (نُورٌ أَنَّى) দুই শব্দকে একসাথে মিশিয়ে এক শব্দ বানানো বড় ভুল এবং হাদীসের ইবারতে হস্তক্ষেপ করার শামিল। (তুহফাতুল আহওয়াযী হা. ৩২৮২)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তাআলার দর্শনলাভ
৫৬৬০-[৬] ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি (مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَى. . . . وَلَقَدْ رَآهُ نزلة أُخْرَى) “(নবীর) অন্তঃকরণ মিথ্যে মনে করেনি যা সে দেখে ছিল। সে যা দেখেছে সে বিষয়ে তোমরা কি তার সঙ্গে বিতর্ক করবে? অবশ্যই সে [নবী (সা.)] তাঁকে (জিবরীল আলায়হিস সালাম-কে) আরেকবার দেখেছিল” (সূরাহ আন্ নাজুম ৫৩: ১১-১৩); আয়াতের তাফসীর বা ব্যাখ্যায় বলেছেন, মুহাম্মাদ (সা.) অন্তর-চক্ষু দ্বারা আল্লাহ তা’আলাকে দু’বার দেখেছেন। (মুসলিম)
আর তিরমিযীর বর্ণনাতে আছে- উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনু আব্বাস (রাঃ) বললেন, মুহাম্মাদ (সা.) তার প্রভুকে দেখেছেন, “ইকরিমাহ্ বলেন, আমি ইবনু আব্বাস (রাঃ)-কে প্রশ্ন করলাম, আল্লাহ তা’আলা কি বলেননি- (لَا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ وَهُوَ يدْرك الْأَبْصَار) “চক্ষুসমূহ তাঁকে দেখতে পারে না, কিন্তু তিনি চক্ষুসমূহকে দেখতে পান”- (সূরা আল আ’আম ৬ : ১০৩)। উত্তরে ইবনু আব্বাস (রাঃ) বললেন, তোমার প্রতি আক্ষেপ। আরে! তা তো সেই সময়ের সম্পর্কে বলা হয়েছে, যখন আল্লাহ তা’আলা তাঁর বিশেষ জ্যোতিতে আত্মপ্রকাশ করবেন (তখন তাঁকে দেখা সম্ভব নয়) তবে মুহাম্মাদ (সা.) তার প্রভুকে (স্বাভাবিক অবস্থায়) দু’বার দেখেছেন।
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (بَاب رؤيةالله تَعَالَى)
وَعَن ابْن عَبَّاس: (مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَى. . . . وَلَقَدْ رَآهُ نزلة أُخْرَى) قَالَ: رَآهُ بِفُؤَادِهِ مَرَّتَيْنِ. رَوَاهُ مُسْلِمٌ وَفِي رِوَايَة لِلتِّرْمِذِي قَالَ: رَأَى مُحَمَّدٌ رَبَّهُ. قَالَ عِكْرِمَةُ قُلْتُ: أَلَيْسَ اللَّهُ يَقُولُ: (لَا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ وَهُوَ يدْرك الْأَبْصَار) ؟ قَالَ: وَيحك إِذَا تَجَلَّى بِنُورِهِ الَّذِي هُوَ نُورُهُ وَقَدْ رأى ربه مرَّتَيْنِ
رواہ مسلم (285 / 176)، (437) و الترمذی (3279 وقال : حسن غریب) و حدیث الترمذی حدیث حسن و رواہ ابن خزیمۃ فی التوحید (ص 198 ح 273) و ابن ابی عاصم فی السنۃ (437 / 446) بسند حسن بہ ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (ربه مرَّتَيْنِ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে যে, নবী মুহাম্মাদ (সা.) - কে দু’বার দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ নবী মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহ তা'আলাকে দু'বার দেখেছেন। উল্লেখিত ইবারতটুকু অধিকাংশ সালাফে-সালিহীনের অভিমতের বিপক্ষে এবং সরাসরি কুরআনের আয়াতেরও বিরুদ্ধে যায়। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী হা. ৩২৭৯)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তাআলার দর্শনলাভ
৫৬৬১-[৭] শা’বী (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবনু আব্বাস (রাঃ)-এর সাথে ’আরাফাতের মাঠে কাবে আহবার (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ হলে তিনি তাঁকে এ বিষয়ে (আল্লাহ তা’আলার দর্শন সম্পর্কে) প্রশ্ন করলেন। তা শ্রবণে কা’ব (রাঃ) এমন জোরে আল্লা-হু আকবার আওয়াজ দিলেন যে, তা পাহাড় পর্যন্ত প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল। তখন ইবনু আব্বাস (রাঃ) বললেন, আমরা হাশিম-এর বংশধর (অর্থাৎ যথার্থ জ্ঞানের অধিকারী, অতএব অবাস্তব ও অযৌক্তিক কথা আমরা বলি না)। অতঃপর কা’ব (রাঃ) বললেন, আল্লাহ তা’আলা তাঁর দর্শন ও বচনকে মুহাম্মাদ (সা.) ও মূসা আলায়হিস সালাম-এর মাঝে বিভক্ত করেছেন। অতএব মূসা আলায়হি সালাম আল্লাহ তা’আলার সাথে দু’বার কথাবার্তা বলেছেন এবং মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহকে দু’বার দেখেছেন। মাসরূক (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমি ’আয়িশাহ্ (রাঃ) -এর কাছে উপস্থিত হয়ে প্রশ্ন করলাম, মুহাম্মাদ (সাঃ) প্রভুকে দেখেছেন কি? জবাবে ’আয়িশাহ্ (সাঃ) বললেন, হে মাসরূক! তুমি আমাকে এমন এক কথা জিজ্ঞেস করেছ, যা শ্রবণে আমার দেহের পশম খাড়া হয়ে গেছে। মাসরূক (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমি বললাম, আপনি আমাকে সুযোগ দিন। অতঃপর আমি এ আয়াতটি পাঠ করলাম- (لقد رأى من آيَات ربّه الْكُبْرَى) “মুহাম্মাদ ও তাঁর প্রভুর বিরাট বিরাট নিদর্শনসমূহ দেখেছেন"- (সূরা আন্ নাজম ৫৩ : ১৮)। তখন ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বললেন, এ আয়াত তোমাকে কোথায় নিয়ে পৌছিয়েছে? বরং তা দ্বারা জিবরীল (আঃ)-কে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। [অতঃপর ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বললেন,] যে লোক তোমাকে বলে, মুহাম্মাদ (সা.) তার প্রভুকে দেখেছেন অথবা তাঁকে যা কিছু নির্দেশ করা হয়েছে, তা থেকে তিনি কিছু গোপন করেছেন অথবা মুহাম্মাদ (সা.) সেই পাঁচটি বিষয় অবগত ছিলেন, যেগুলো এ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে- (اِنَّ اللّٰهَ عِنۡدَهٗ عِلۡمُ السَّاعَۃِ ۚ وَ یُنَزِّلُ الۡغَیۡثَ) “কিয়ামাতের জ্ঞান কেবল আল্লাহর নিকটই আছে, তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন...”- (সূরা লুকমান ৩১ : ৩৪)। [অর্থাৎ সে লোক মুহাম্মাদ (সা.) -এর ওপর জঘন্য মিথ্যারোপ করল।
প্রকৃত কথা হলো, না তিনি আল্লাহকে দেখেছেন, না তিনি আল্লাহর কোন বিধান গোপন করেছেন, আর না তিনি ঐ পাঁচটি ব্যাপারে অবগত ছিলেন, যেগুলোর জ্ঞান আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত ও তার একক বৈশিষ্ট্য]
হ্যাঁ; বরং তিনি জিবরীল (আঃ)-কে দেখেছেন। অবশ্য জিবরীল আলায়হিস সালাম-কেও তিনি তাঁর আসলরূপে মাত্র দু’বার দেখেছেন। একবার সিদরাতুল মুনতাহার কাছে, আরেকবার ’উক্বার ’আজইয়াদে। (আজইয়াদ মক্কা নগরীতে একটি বস্তির নাম। (أَجْيَادٍ) নামে হেরেম শরীফের একটি দ্বারও আছে) রাসূলুল্লাহ (সা.) - যখন তাঁকে প্রকৃত আকৃতিতে দেখেছেন তখন তাঁর ছয়শত ডানা ছিল এবং তা গোটা আকাশ জুড়ে বিস্তৃত ছিল। (তিরমিযী)
তবে বুখারী ও মুসলিম-এর বর্ণনাতে কিছু বাক্য বৃদ্ধি ও পার্থক্যসহ বর্ণিত আছে। যথা- মাসরূক (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমি ’আয়িশাহ্ (রাঃ) -কে প্রশ্ন করলাম, দূরত্বে যদি তাই হয়, যা আপনি বলেছেন, তাহলে আল্লাহর বাণী- (ثُمَّ دَنَا فَتَدَلّٰی ۙ﴿۸﴾ فَکَانَ قَابَ قَوۡسَیۡنِ اَوۡ اَدۡنٰی ۚ﴿۹﴾) “অতঃপর তিনি নিকটবর্তী হলেন, অতঃপর আরো কাছে এলেন, তখন সে নৈকট্য ছিল দু’ ধনুকের পরিমাণ, অথবা তারও কম”- (সূরাহ আন্ নাজম ৫৩ : ৮-৯)। এটার অর্থ কি? উত্তরে ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বললেন, এর দ্বারা জিবরীল আলায়হিস সালাম-কে বুঝানো হয়েছে। তিনি সাধারণত মানুষের আকৃতিতে রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর কাছে আসতেন, কিন্তু এবার তিনি তাঁর প্রকৃতরূপে রাসূল-এর সামনে এসেছিলেন, ফলে তা গোটা আকাশ জুড়ে গিয়েছিল।
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (بَاب رؤيةالله تَعَالَى)
وَعَن الشّعبِيّ قَالَ: لَقِيَ ابْنُ عَبَّاسٍ كَعْبًا بِعَرَفَةَ فَسَأَلَهُ عَنْ شَيْءٍ فَكَبَّرَ حَتَّى جَاوَبَتْهُ الْجِبَالُ. فَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ: إِنَّا بَنُو هَاشِمٍ. فَقَالَ كَعْبٌ: إِنَّ اللَّهَ قَسَّمَ رُؤْيَتَهُ وَكَلَامَهُ بَيْنَ مُحَمَّدٍ وَمُوسَى فَكَلَّمَ مُوسَى مَرَّتَيْنِ وَرَآهُ مُحَمَّدٌ مَرَّتَيْنِ. قَالَ مسروقٌ: فَدخلت على عَائِشَة فَقلت: هَل رَأَى مُحَمَّدٌ رَبَّهُ؟ فَقَالَتْ: لَقَدْ تَكَلَّمْتَ بِشَيْءٍ قَفَّ لَهُ شَعَرِي قُلْتُ: رُوَيْدًا ثُمَّ قَرَأْتُ (لقد رأى من آيَات ربّه الْكُبْرَى) فَقَالَتْ: أَيْنَ تَذْهَبُ بِكَ؟ إِنَّمَا هُوَ جِبْرِيلُ. مَنْ أَخْبَرَكَ أَنَّ مُحَمَّدًا رَأَى رَبَّهُ أَوْ كَتَمَ شَيْئًا مِمَّا أُمِرَ بِهِ أَوْ يَعْلَمُ الْخَمْسَ الَّتِي قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: (إِنَّ اللَّهَ عِنْدَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ) فَقَدْ أَعْظَمَ الْفِرْيَةَ وَلَكِنَّهُ رَأَى جِبْرِيلَ لَمْ يَرَهُ فِي صُورَتِهِ إِلَّا مَرَّتَيْنِ: مَرَّةً عِنْدَ سِدْرَةِ الْمُنْتَهَى وَمَرَّةً فِي أَجْيَادٍ لَهُ سِتُّمِائَةِ جَنَاحٍ قَدْ سَدَّ الْأُفُقَ رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَرَوَى الشَّيْخَانِ مَعَ زِيَادَةٍ وَاخْتِلَافٍ وَفِي رِوَايَتِهِمَا: قَالَ: قُلْتُ لِعَائِشَةَ: فَأَيْنَ قَوْلُهُ (ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى) ؟ قَالَتْ: ذَاكَ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ كَانَ يَأْتِيهِ فِي صُورَةِ الرَّجُلِ وَإِنَّهُ أَتَاهُ هَذِهِ الْمَرَّةَ فِي صُورَتِهِ الَّتِي هِيَ صُورَتُهُ فَسَدَّ الْأُفُقَ
اسنادہ ضعیف ، رواہ الترمذی (3278) * فیہ مجالد بن سعید : ضعیف و اصل الحدیث عند البخاری [4855] و مسلم [177]، بغیر ھذا اللفظ) و الروایۃ الثانیۃ صحیحۃ متفق علیھا (رواھا البخاری : 3235 و مسلم : 290 / 177)، (439) ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: (حَتَّى جَاوَبَتْهُ الْجِبَالُ) ‘আল্লামাহ্ ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন যে, তিনি (কাব) আওয়াজ উঁচু করে এমন তাকবীর দিলেন পাহাড় পর্যন্ত আকাশ প্রতিধ্বনি দিল, মনে হচ্ছিল যে, তিনি প্রশ্নটাকে খুব বড় মনে করেছিলেন তাই তিনি তাকবীর দিয়েছেন। হয়তো ঐ প্রশ্নটি ছিল আল্লাহর দর্শন সম্পর্কিত, তাই তার শরীরের পশম পর্যন্ত দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।
(هَل رَأَى مُحَمَّدٌ رَبَّهُ؟) ‘আল্লামাহ্ ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমি প্রতিটি আয়াত পড়েছি, যার উপসংহার হলো এই আয়াতটি, (لَقَدۡ رَاٰی مِنۡ اٰیٰتِ رَبِّهِ الۡکُبۡرٰی) “সে তার প্রতিপালকের বড় বড় নিদর্শন দেখেছিল”- (সূরা আন নাজম ৫৩: ১৮)। যেমন অন্য আরেকটি বর্ণনাতে তার সমর্থন করে, অর্থাৎ: قُلْتُ لِعَائِشَةَ: فَأَيْنَ قَوْلُهُ (ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى) অতএব আমি বলব, অন্য বর্ণনাটির মধ্যেও (رَأَى) শব্দটি নেই, অতএব স্পষ্ট হয়ে গেল যে, তিনি (আল্লাহ) উদ্দেশ্য নিয়েছেন তার মান মুতাবেক বড় একটি নিদর্শন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(فَقَالَتْ: أَيْنَ تَذْهَبُ بِكَ؟) আল্লামাহ্ ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, অর্থাৎ তুমি আয়াতের অর্থ থেকে যা বুঝেছ ভুল বুঝেছ এবং এই মত পোষণ করছ। আর আয়াত তাকে এই ভুল মতের দিকে নিয়ে যাওয়ার কথাটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, অতএব সার কথা হলো উক্ত আয়াতে জিবরীল আলায়হিস সালাম-ই উদ্দেশ্য। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ, তুহফাতুল আহওয়াযী হা. ৩২৭৮)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তাআলার দর্শনলাভ
৫৬৬২-[৮] ইবনু মাস’উদ (রাঃ) বর্ণনা করেন। আল্লাহর বাণী- (فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى) ফলে [নবী (সা.) ও জিবরীলের মাঝে] দুই ধনুকের ব্যবধান রইল অথবা আরো কম”- (সূরা আন্ নাজম ৫৩ : ৯) এবং (مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَى) “(নবীর) অন্তঃকরণ মিথ্যে মনে করেনি যা সে দেখেছিল” (সূরা আন্ নাজম ৫৩ : ১১) ও (لَقَدۡ رَاٰی مِنۡ اٰیٰتِ رَبِّهِ الۡکُبۡرٰی) “সে তার প্রতিপালকের বড় বড় নিদর্শন দেখেছিল”- (সূরাহ্ আন্ নাজম ৫৩ : ১৮) এ সকল আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) জিবরীল (আঃ)-কে দেখেছেন এবং তার ছয়শত ডানা আছে। (বুখারী ও মুসলিম)
আর তিরমিযীর বর্ণনায় আছে, ইবনু মাস্’উদ (রাঃ) (مَا کَذَبَ الۡفُؤَادُ مَا رَاٰی) (সূরা আন নাজম ৫৩ : ১১)-এর সম্পর্কে বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) - জিবরীল (আঃ)-কে এক জোড়া সবুজ পোশাক পরিহিত অবস্থায় দেখেছেন, তিনি আকাশ ও জমিনের মধ্যবর্তী শূন্যতাকে জুড়ে রেখেছেন।
আর বুখারীর এক বর্ণনায় আছে, (لَقَدۡ رَاٰی مِنۡ اٰیٰتِ رَبِّهِ الۡکُبۡرٰی) (সূরা আন্ নাজম ৫৩ : ১৮)-এর ব্যাখ্যায় ইবনু মাস্উদ (রাঃ) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) সবুজ রঙের রফরফ (পরিহিত জিবরীল আলায়হিস সালাম-কে) দেখেছেন, যা গোটা আকাশ জুড়ে রেখেছে।
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (بَاب رؤيةالله تَعَالَى)
وَعَن ابْن مَسْعُود فِي قَوْلِهِ: (فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى) وَفِي قَوْلِهِ: (مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَى) وَفِي قَوْلِهِ: (رَأَى مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى) قَالَ فِيهَا كُلِّهَا: رَأَى جِبْرِيلَ عَلَيْهِ السَّلَامُ لَهُ سِتُّمِائَةِ جَنَاحٍ. مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ وَفِي رِوَايَةِ التِّرْمِذِيِّ قَالَ: (مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَى) قَالَ: رَأَى رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جِبْرِيلَ فِي حُلَّةٍ مِنْ رَفْرَفٍ قَدْ مَلَأَ مَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَلَهُ وَلِلْبُخَارِيِّ فِي قَوْلِهِ: (لَقَدْ رَأَى مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى) قَالَ: رَأَى رَفْرَفًا أَخْضَرَ سَدَّ أُفُقَ السَّمَاءِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (4856 و الروایۃ الاخیرۃ : 4858) و مسلم (282 ، 281 / 174)، (432) و الترمذی (3283 وقال : حسن صحیح) ۔
(مُتَّفق عَلَيْهِ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তাআলার দর্শনলাভ
৫৬৬৩-[৯] ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ) ইবনু আনাস (রহিমাহুল্লাহ)-কে আল্লাহর বাণী- (اِلٰی رَبِّهَا نَاظِرَۃٌ) “তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে”- (সূরাহ্ আল কিয়া-মাহ্ ৭৫ : ২৩); সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয় এবং বলা হয়, এক সম্প্রদায় (মু’তাযিলাগণ) বলে যে, এর অর্থ তারা স্বীয় সাওয়ারের দিকে তাকিয়ে থাকবে। তখন ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, তারা মিথ্যা বলেছে। তারা এ আয়াতের কি ব্যাখ্যা করবে? (کَلَّاۤ اِنَّهُمۡ عَنۡ رَّبِّهِمۡ یَوۡمَئِذٍ لَّمَحۡجُوۡبُوۡنَ) “কাফিরদেরকে তাদের প্রভুর দর্শন থেকে আলাদা রাখা হবে”- (সূরাহ্ আল মুত্বাফফিফীন ৮৩ : ১৫)।
অতএব ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আয়াতটির ভাষ্য থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ঈমানদার লোকেরা কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলাকে চাক্ষুষ দেখতে পাবে। তিনি আরো বলেন, কিয়ামতের দিন যদি ঈমানদারগণ তাদের প্রভুর দেখা না পায়, তাহলে- (كَلَّا إِنَّهُمْ عَنْ رَبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لمحجوبون) এ বাক্য দ্বারা আল্লাহ তা’আলা কাফিরদেরকে তাঁর দর্শন না পাওয়াতে তিরস্কার করতেন না। (শারহুস্ সুন্নাহ)
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (بَاب رؤيةالله تَعَالَى)
وسُئل مَالك بن أَنسٍ عَن قَوْله تَعَالَى (إِلى ربِّها ناظرة) فَقِيلَ: قَوْمٌ يَقُولُونَ: إِلَى ثَوَابِهِ. فَقَالَ مَالِكٌ: كَذَبُوا فَأَيْنَ هُمْ عَنْ قَوْلُهُ تَعَالَى: (كَلَّا إِنَّهُمْ عَنْ رَبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لمحجوبونَ) ؟ قَالَ مَالِكٌ النَّاسُ يَنْظُرُونَ إِلَى اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِأَعْيُنِهِمْ وَقَالَ: لَوْ لَمْ يَرَ الْمُؤْمِنُونَ رَبَّهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لَمْ يُعَيِّرِ اللَّهُ الْكَفَّارَ بِالْحِجَابِ فَقَالَ (كَلَّا إِنَّهُمْ عَنْ رَبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لمحجوبون) رَوَاهُ فِي «شرح السّنة»
ضعیف ، رواہ البغوی فی شرح السنۃ (15 / 329 ۔ 330 قبل ح 4393 بدون سند) ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: (فَقِيلَ: قَوْمٌ يَقُولُونَ...) উল্লেখিত গোষ্ঠী দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মু'তাযিলা ফিরকা। কেননা তারা আখিরাতে আল্লাহর দর্শনকে অস্বীকার করে, তাই তারা ঐ আয়াতের (إِلى ربِّها ناظرة) অর্থাৎ তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে ব্যাখ্যা করে এভাবে: তাদের রবের প্রতিদানের দিকে তাকিয়ে থাকবে। যা একদম স্পষ্ট অপব্যাখ্যা, তাই ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ) রাগান্বিত হয়ে বললেন যে, তারা আল্লাহর উপরে মিথ্যারোপ করে, এরপর তিনি কুরআন থেকে একটি দলীল দিলেন যে, আল্লাহ বলেন, (کَلَّاۤ اِنَّهُمۡ عَنۡ رَّبِّهِمۡ یَوۡمَئِذٍ لَّمَحۡجُوۡبُوۡنَ) অর্থাৎ তারা (কাফিরগণ) সেদিন তাদের রবের থেকে আড়ালকৃত হবে- (সূরাহ আল মুত্বাফিফীন ৮৩ : ১৫)। অতএব এ আয়াতের তারা কি ব্যাখ্যা করবে? আর সমস্ত মানুষ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মুমিনগণ, কেননা কাফিররা আল্লাহকে দেখতে পারবে না। অতএব যদি মু'মিনগণ আল্লাহকে না দেখে তাহলে কাফিরদেরকে আড়াল করার কোন অর্থ হয় না? তাই স্পষ্ট হয়ে গেল যে, মু'তাযিলাদের মতাদর্শ ভ্রান্ত। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তাআলার দর্শনলাভ
৫৬৬৪-[১০] জাবির (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: জান্নাতবাসীগণ যখন তাদের আনন্দ উপভোগে লিপ্ত থাকবে, এমন সময় হঠাৎ তাদের ওপর একটি আলো চমকিত হবে, তখন তারা মাথা তুলে সেদিকে তাকিয়ে দেখবে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন উপর থেকে তাদের দিকে লক্ষ্য করে আছেন। সে সময় আল্লাহ তা’আলা বলবেন, হে জান্নাতবাসীগণ! আসসালা-মু আলায়কুম (তোমরা আরামে ও নিরাপদে থাক) আল্লাহর কালামে (سَلٰمٌ ۟ قَوۡلًا مِّنۡ رَّبٍّ رَّحِیۡمٍ) “দয়াময় প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তাদেরকে সালাম’ বলে সম্ভাষণ করা হবে”- (সূরাহ্ ইয়াসীন ৩৬ : ৫৮); দ্বারা এ সময়ের অবস্থার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ তা’আলা জান্নাতীদের দিকে এবং জান্নাতীগণ আল্লাহর দিকে দৃষ্টি দিবে, ফলে তারা আল্লাহর দর্শন থেকে চক্ষু ফিরিয়ে অন্য কোন নি’আমাতের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করবে না এবং আল্লাহ তা’আলা আড়াল হয়ে যাওয়া পর্যন্ত এক দৃষ্টিতে শুধু সেদিকে চেয়ে থাকবে, সবশেষে কেবলমাত্র তাঁর নূর এবং বারাকাত অবশিষ্ট থাকবে। (ইবনু মাজাহ)।
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (بَاب رؤيةالله تَعَالَى)
وَعَنْ جَابِرٌ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: بَيْنَا أَهْلُ الْجَنَّةِ فِي نَعِيمِهِمْ إِذْ سَطَعَ نورٌ فَرفعُوا رؤوسَهم فَإِذَا الرَّبُّ قَدْ أَشْرَفَ عَلَيْهِمْ مِنْ فَوْقِهِمْ فَقَالَ: السَّلَامُ عَلَيْكُمْ يَا أَهْلَ الْجَنَّةِ قَالَ: وَذَلِكَ قَوْلُهُ تَعَالَى (سَلَامٌ قَوْلًا مِنْ رَبٍّ رحيمٍ) قَالَ: فَيَنْظُرُ إِلَيْهِمْ وَيَنْظُرُونَ إِلَيْهِ فَلَا يَلْتَفِتُونَ إِلَى شَيْءٍ مِنَ النَّعِيمِ مَا دَامُوا يَنْظُرُونَ إِلَيْهِ حَتَّى يَحْتَجِبَ عَنْهُمْ وَيَبْقَى نُورُهُ وَبَرَكَتُهُ عَلَيْهِم فِي دِيَارهمْ . رَوَاهُ ابْن مَاجَه
اسنادہ ضعیف ، رواہ ابن ماجہ (184) * الفضل الرقاشی : منکر الحدیث و رمی بالقدر ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: এ হাদীসটিও জান্নাতে আল্লাহর দর্শনকে প্রমাণ করে, কুরআনের এক আয়াতে এদিকেই ইশারা দেয়া হয়েছে,
(اِنَّ اَصۡحٰبَ الۡجَنَّۃِ الۡیَوۡمَ فِیۡ شُغُلٍ فٰکِهُوۡنَ ﴿ۚ۵۵﴾ هُمۡ وَ اَزۡوَاجُهُمۡ فِیۡ ظِلٰلٍ عَلَی الۡاَرَآئِکِ مُتَّکِـُٔوۡنَ ﴿۵۶﴾ لَهُمۡ فِیۡهَا فَاکِهَۃٌ وَّ لَهُمۡ مَّا یَدَّعُوۡنَ ﴿ۚۖ۵۷﴾ سَلٰمٌ ۟ قَوۡلًا مِّنۡ رَّبٍّ رَّحِیۡمٍ ﴿۵۸﴾) অর্থাৎ “নিশ্চয় জান্নাতীরা সেদিন আনন্দ করবে তারা এবং তাদের স্ত্রীরা সকলে মিলে ছায়ার নিচে গদির উপর টেক লাগিয়ে। আর তাদের জন্য থাকবে বিভিন্ন রকমের ফল এবং তারা যা চাইবে তাই পাবে আর তাদের দয়াময় রবের পক্ষ থেকে সালাম পাবে"- (সূরা ইয়াসীন ৩৬: ৫৫-৫৮)। (মিকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
৫৬৬৫-[১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: তোমাদের (ব্যবহৃত) আগুনের উত্তাপ জাহান্নামের আগুনের সত্তর অংশের এক অংশ মাত্র। বলা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! (জাহান্নামীদের শাস্তিদানের জন্য) দুনিয়ার আগুন তো যথেষ্ট ছিল। তিনি (সা.) বললেন, দুনিয়ার আগুনের উপর তার সমপরিমাণ তাপসম্পন্ন জাহান্নামের আগুন আরো ঊনসত্তর ভাগ বর্ধিত করা হয়েছে। (বুখারী ও মুসলিম)
উল্লিখিত হাদীসটির শব্দগুলো বুখারীর। আর মুসলিম-এর বর্ণনার শব্দ হলো- (نَارُكُمُ الَّتِي يُوقِدُ ابْنُ آدَمَ) তোমাদের (ব্যবহৃত) আগুন যা আদম সন্তান প্রজ্বলিত করে এবং তার বর্ণনায় «عَلَيْهَا» و «كلهَا» এ শব্দ দু’টির পরিবর্তে «عَلَيْهِنَّ» و «كُلهنَّ» উল্লেখ রয়েছে।
الفصل الاول (بَاب صفةالنار وَأَهْلهَا)
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «نَارُكُمْ جُزْءٌ مِنْ سَبْعِينَ جُزْءًا مِنْ نَارِ جَهَنَّمَ» قِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنْ كَانَتْ لَكَافِيَةً قَالَ: «فُضِّلَتْ عَلَيْهِنَّ بِتِسْعَةٍ وَسِتِّينَ جُزْءًا كُلُّهُنَّ مِثْلُ حَرِّهَا» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ. وَاللَّفْظُ لِلْبُخَارِيِّ. وَفِي رِوَايَةِ مُسْلِمٍ: «نَارُكُمُ الَّتِي يُوقِدُ ابْنُ آدَمَ» . وَفِيهَا: «عَلَيْهَا» و «كلهَا» بدل «عَلَيْهِنَّ» و «كُلهنَّ»
متفق علیہ ، رواہ البخاری (3265) و مسلم (30 / 2843)، (7165) ۔
(مُتَّفق عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: (نَارُكُمْ جُزْءٌ مِنْ سَبْعِينَ جُزْءً) ইমাম গাজালী (রহিমাহুল্লাহ) “ইয়াহইয়াউ উলুমিদ্দীন”-এ বলেন, তুমি জান যে তুমি অনুমান করতে ভুল করবে। কেননা দুনিয়ার আগুন দিয়ে জাহান্নামের আগুন অনুমান করা যাবে না। কিন্তু দুনিয়াতে যেহেতু এই আগুনের শাস্তিকেই সবচেয়ে কঠিন শাস্তি মনে করা হয়। তাই এই আগুন দিয়েই উদাহরণ দেয়া হয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(مِنْ سَبْعِينَ) এখানে সংখ্যাটাই মূল উদ্দেশ্য নয় বরং তাপমাত্রার আধিক্যতা হলো মূল উদ্দেশ্য, অন্য আরেক বর্ণনায় একশত গুণের কথা বলা হয়েছে। (ফাতহুল বারী হা. ৩৭৩)
‘আল্লামাহ্ ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) দুনিয়ার আগুনের উপরে জাহান্নামের আগুনের শ্রেষ্ঠত্ব উক্ত আয়াত দ্বারা পুনরাবৃত্তি করলেন এজন্য যে, দুনিয়ার আগুনটা মূলতপক্ষে জাহান্নামের আগুনের কোন অংশ নয়, বরং একটা উদাহরণমাত্র, কেননা মাখলুকের ‘আযাব যদি এত ভয়ঙ্কর হয় তাহলে খালিকের ‘আযাব আরো কত ভয়ঙ্কর হবে? (তুহফাতুল আহওয়াযী হা. ৫০০, ২৫৮৯; ফাতহুল বারী হা. ৩২৬৫)।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
৫৬৬৬-[২] ইবনু মাস্’উদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: কিয়ামতের দিন জাহান্নামকে এমন অবস্থায় উপস্থিত করা হবে যে, তার সত্তরটি লাগাম থাকবে এবং সত্তর হাজার মালাক (ফেরেশতা) প্রতিটি লাগামের সাথে থাকবে, তারা তা টেনে আনবে। (মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب صفةالنار وَأَهْلهَا)
وَعَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يُؤْتَى بِجَهَنَّمَ يَوْمَئِذٍ لَهَا سَبْعُونَ أَلْفَ زِمَامٍ مَعَ كُلِّ زِمَامٍ سبعونَ ألفَ مَلَكٍ يجرُّونها» . رَوَاهُ مُسلم
رواہ مسلم (29 / 2842)، (7164) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (يُؤْتَى بِجَهَنَّمَ) অর্থাৎ জাহান্নামকে নিয়ে আসা হবে তার জায়গা থেকে, যেই জায়গাতে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং এর সমর্থনে একটি আয়াত রয়েছে, (وَ جِایۡٓءَ یَوۡمَئِذٍۭ بِجَهَنَّمَ) “সেদিন জাহান্নামকে নিয়ে আসা হবে”- (সূরা আল ফাজর ৮৯ : ২৩)। আর সেদিন দ্বারা উদ্দেশ্য কিয়ামতের দিন।
(سَبْعُونَ أَلْفَ زِمَامٍ) এখানে লাগামের কথা বলা হয়েছে, কেননা সত্তর হাজার মালাক (ফেরেশতা) প্রতিটা লাগাম ধরে টানবে- এটা বলার উদ্দেশ্য হলো তার বড়ত্ব বুঝানো এবং হাশরের ময়দানে চলে আসা থেকে বাধা দেয়া তবে যাদের ক্ষেত্রে আল্লাহ চাইবেন তাদের নিকট চলে আসবে। মিরক্বাতুল মাফাতীহ, তুহফাতুল আহওয়াযী হা. ২৫৭৩)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
৫৬৬৭-[৩] নুমান ইবনু বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জাহান্নামবাসীদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সহজতর শাস্তি ঐ লোকের হবে, যাকে আগুনের ফিতাসহ দু’খানা জুতা পরানো হবে, তাতে তার মগজ এমনিভাবে ফুটতে থাকবে, যেমনিভাবে তামার পাত্রে পানি ফুটতে থাকে। সে ধারণা করবে, তার অপেক্ষা কঠিন শাস্তি আর কেউ ভোগ করছে না, অথচ সে হবে সর্বাপেক্ষা সহজতর শাস্তিপ্রাপ্ত লোক। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب صفةالنار وَأَهْلهَا)
وَعَنِ النُّعْمَانِ بْنِ بَشِيرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ أَهْوَنَ أَهْلِ النَّارِ عَذَابًا مَنْ لَهُ نَعْلَانِ وَشِرَاكَانِ مِنْ نَارٍ يَغْلِي مِنْهُمَا دِمَاغُهُ كَمَا يَغْلِي الْمِرْجَلُ مَا يُرَى أَنَّ أَحَدًا أَشَدُّ مِنْهُ عَذَابًا وَإِنَّهُ لَأَهْوَنُهُمْ عَذَابًا» . مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (6561 ۔ 6562) و مسلم (364 / 213)، (516) ۔
(مُتَّفق عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: হাদীসে স্পষ্টভাবে ইশারা করা হয়েছে যে, জাহান্নামীদের ‘আযাবের মধ্যে কম বেশি হবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
৫৬৬৮-[8] ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জাহান্নামবাসীদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সহজতর শাস্তি হবে আবূ ত্বালিব-এর। তার দুই পায়ে দু’টি আগুনের জুতা পরিয়ে দেয়া হবে। তাতে তার মাথার মগজ ফুটতে থাকবে। (বুখারী)
الفصل الاول (بَاب صفةالنار وَأَهْلهَا)
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ أَهْوَنَ أَهْلِ النَّارِ عَذَابًا أَبُو طَالِبٍ وَهُوَ مُنْتَعِلٌ بِنَعْلَيْنِ يغلي مِنْهُمَا دماغه» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
رواہ البخاری (لم اجدہ) [و مسلم (362 / 212)، (515)] ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: এ হাদীসের মধ্যে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, আবূ ত্বালিবই হলেন জাহান্নামীদের মধ্যে সবচেয়ে সহজ ‘আযাব ভোগকারী হবে। তবে গুনাহগার মুমিনদের ‘আযাবের কথা বলা হয়নি অত্র হাদীসে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
৫৬৬৯-[৫] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: কিয়ামতের দিন জাহান্নামীদের মধ্য থেকে দুনিয়ার সর্বাধিক সম্পদশালী লোককে উপস্থিত করা হবে এবং তাকে জাহান্নামের আগুনে চুবিয়ে উঠানো হবে। অতঃপর তাকে বলা হবে, হে আদম সন্তান! তুমি কি কখনো আরাম-আয়েশ দেখেছ? পূর্বে কি কখনো তোমার নি’আমাতের সুখ অর্জিত হয়েছিল? সে বলবে, না আল্লাহর শপথ, হে আমার প্রভু! অতঃপর জান্নাতবাসীদের থেকে এমন এক লোককে উপস্থিত করা হবে, যে দুনিয়াতে সবচাইতে দুঃখ-কষ্টের জীবনযাপন করেছিল। তখন তাকে মুহুর্তের জন্য জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে প্রশ্ন করা হবে, হে আদাম সন্তান! তুমি কি কখনো দুঃখ-কষ্ট দেখেছ? এবং তুমি কি কখনো কঠোরতার মুখোমুখী হয়েছিলে? সে বলবে, না আল্লাহর শপথ, হে আমার প্রভু! আমি কখনো দুঃখকষ্টে পতিত হইনি। আর কখনো কোন কঠোর পরিস্থিতির সম্মুখীন হইনি। (মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب صفةالنار وَأَهْلهَا)
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يُؤْتَى بِأَنْعَمِ أَهْلِ الدُّنْيَا مِنْ أَهْلِ النَّارِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيُصْبَغُ فِي النارِ صَبْغَةً ثمَّ يُقَال: يَا ابْنَ آدَمَ هَلْ رَأَيْتَ خَيْرًا قَطُّ؟ هَلْ مَرَّ بِكَ نَعِيمٌ قَطُّ؟ فَيَقُولُ: لَا وَاللَّهِ يَا رَبِّ وَيُؤْتَى بِأَشَدِّ النَّاسِ بُؤْسًا فِي الدُّنْيَا مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ فَيُصْبَغُ صَبْغَةً فِي الْجَنَّةِ فَيُقَالُ لَهُ: يَا ابْنَ آدَمَ هَلْ رَأَيْتَ بُؤْسًا قَطُّ؟ وَهَلْ مَرَّ بِكَ شِدَّةٌ قَطُّ. فَيَقُولُ: لَا وَاللَّهِ يَا رَبِّ مَا مَرَّ بِي بُؤْسٌ قَطُّ وَلَا رَأَيْتُ شدَّة قطّ . رَوَاهُ مُسلم
رواہ مسلم (55 / 2807)، (7088) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (هَلْ مَرَّ بِكَ نَعِيمٌ) এখানে কথার মধ্যে অতিরিক্ততা আছে তা স্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে, জাহান্নামী দুনিয়ার সমস্ত ভোগ বিলাসের কথা অস্বীকার করবে আর জান্নাতী দুনিয়ার সমস্ত কষ্ট-ক্লান্তির কথা অস্বীকার করবে। কেননা জাহান্নামের কঠোরতা জাহান্নামীকে সব ভুলিয়ে দিবে আর জান্নাতীকে জান্নাতের আরাম-আয়েশ দুনিয়ার সমস্ত কষ্টকে ভুলিয়ে দিবে। অতএব ঐ বিলাসিতায় কি লাভ আছে, যার শেষ হলো জাহান্নাম এবং ঐ দুঃখে কি সমস্যা আছে যার ভবিষ্যত হলো জান্নাত। (মিরকাতুল মাফাতীহ, শারহুন নাবাবী হা. ১৭/২৮০৭)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
৫৬৭০-[৬] উক্ত রাবী [আনাস (রাঃ)] নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন সর্বাপেক্ষা কম ও সহজতর শাস্তিপ্রাপ্ত লোককে বলবেন, যদি গোটা পৃথিবী পরিমাণ সম্পদ তোমার থাকত, তাহলে তুমি কি সেগুলোর বিনিময়ে এ শাস্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করতে? সে বলবে, হ্যাঁ। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, আদমের ঔরসে থাকাকালে এর চেয়েও সহজতর বিষয়ে আমি আদেশ করেছিলাম যে, আমার সাথে কাউকে শরীক করো না, কিন্তু তুমি এটা অগ্রাহ্য করেছ এবং আমার সাথে শারীক করেছ। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب صفةالنار وَأَهْلهَا)
وَعَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: يَقُولُ اللَّهُ لِأَهْوَنِ أَهْلِ النَّارِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ: لَوْ أَنَّ لَكَ مَا فِي الْأَرْضِ مِنْ شَيْءٍ أَكَنْتَ تَفْتَدِي بِهِ؟ فَيَقُولُ: نَعَمْ. فَيَقُولُ: أَرَدْتُ مِنْكَ أَهْوَنَ مِنْ هَذَا وَأَنْتَ فِي صُلْبِ آدَمَ أَنْ لَا تُشْرِكَ بِي شَيْئًا فَأَبَيْتَ إِلَّا أَنْ تُشْرِكَ بِي . مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (6557) و مسلم (51 / 2805)، (7083) ۔
(مُتَّفق عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: এটা হাদীসে কুদসী অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর থেকে বর্ণনা করেন,
(أَرَدْتُ مِنْكَ) এই হাদীসের বাহ্যিকটা মু'তাযিলাদের মতাদর্শের সমর্থন করে। কেননা তারা মনে করে যে, আল্লাহর ইচ্ছাশক্তিটা অস্থায়ী, স্থায়ী নয় অথচ আল্লাহ যেমন চিরস্থায়ী অনুরূপ তার ইচ্ছা, তার সমস্ত গুণাবলি স্থায়ী। অতএব এ হাদীসের উদ্দেশ্য হলো (إرارة) শব্দটি (امر) এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, আর ইচ্ছা ও আদেশের মধ্যে পার্থক্য হলো, যে জিনিসটা দুনিয়াতে অবশ্যই একমাত্র তার ইচ্ছাতেই চলবে সেটা হলো ইচ্ছা। আর আদেশ হলো যে তার বিরোধিতাও করার শক্তি দেয়া হবে। অতএব আমি (মুল্লা আলী ক্বারী) বলছি, নিশ্চয় ঈমানের আদেশটা সমস্ত মুকাল্লাফ (শারী'আতের আদেশপ্রাপ্ত) ব্যক্তিদের ওপর করা হয়েছে আর ঈমান আনার ইচ্ছাটা কিছু কিছু মানুষের সাথে করা হয়েছে আর কিছু কিছু মানুষের সাথে কুফরীর ইচ্ছা করা হয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ, ফাতহুল বারী হা. ৩৩৩৪, শারহুন নাবাবী হা. ১৭/২০০৫)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
৫৬৭১-[৭] সামুরাহ্ ইবনু জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী (সা.) বলেছেন: জাহান্নামীদের মধ্যে কোন কোন লোক এমন হবে, জাহান্নামের আগুন তার পায়ের টাখনু অবধি পৌছবে। তাদের মধ্যে কারো হাঁটু পর্যন্ত আগুন পৌছবে, কারো কারো কোমর পর্যন্ত এবং কারো কারো ঘাড় পর্যন্ত পৌছবে। (মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب صفةالنار وَأَهْلهَا)
وَعَنْ سَمُرَةَ بْنِ جُنْدُبٍ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مِنْهُمْ مَنْ تَأْخُذُهُ النَّارُ إِلَى كَعْبَيْهِ وَمِنْهُمْ مَنْ تَأْخُذُهُ النَّارُ إِلَى رُكْبَتَيْهِ وَمِنْهُمْ مَنْ تَأْخُذُهُ النَّارُ إِلَى حُجْزَتِهِ وَمِنْهُمْ مَنْ تَأْخُذُهُ النَّار إِلَى ترقوته» . رَوَاهُ مُسلم
رواہ مسلم (33 / 2845)، (7169) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: এ হাদীসে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, জাহান্নামে গুনাহগার মুমিনদের ও শাস্তির মধ্যে কম বেশি থাকবে।
‘আল্লামাহ্ ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এ হাদীসের প্রথম অংশ শারহুস্ সুন্নাতে রয়েছে, আবূ সাঈদ এর বর্ণনায় যে, যখন মু'মিনরা জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে, অতএব আগুন কারো টাখনু পর্যন্ত খেয়ে ফেলবে ইত্যাদি এবং শেষে রয়েছে তারা তাদেরকে চিনবে তাদের চেহারা দেখে, কেননা তাদের চেহারাগুলো আগুন খাবে না। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
৫৬৭২-[৮] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জাহান্নামের মধ্যে কাফিরদের উভয় ঘাড়ের দূরত্ব হবে কোন দ্রুতগামী অশ্বারোহীর তিন দিনের ভ্রমণের দূরত্ব পরিমাণ। অপর এক বর্ণনায় আছে- কাফিরের এক একটি দাঁত হবে উহুদ পাহাড়ের সমান এবং তার দেহের চামড়া হবে তিন দিনের সফরের দূরত্ব পরিমাণ পুরু বা মোটা। (মুসলিম)
এ প্রসঙ্গে আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত «إِذا اشْتَكَتِ النَّارُ إِلَى رَبِّهَا» “যখন জাহান্নাম তার রবের নিকট অভিযোগ করবে” হাদীসটি «تَعْجِيلِ الصَّلَوَات» “সঠিক সময়ে সলাত আদায় করা”-এর অধ্যায়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
الفصل الاول (بَاب صفةالنار وَأَهْلهَا)
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا بَيْنَ مَنْكِبَيِ الْكَافِرِ فِي النَّارِ مَسِيرَةَ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ لِلرَّاكِبِ الْمُسْرِعِ» . وَفِي رِوَايَةٍ: «ضِرْسُ الْكَافِرِ مِثْلُ أُحُدٍ وَغِلَظُ جِلْدِهِ مَسِيرَةُ ثَلَاثٍ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ وَذِكْرُ حَدِيث أبي هُرَيْرَة: «إِذا اشْتَكَتِ النَّارُ إِلَى رَبِّهَا» . فِي بَابِ «تَعْجِيلِ الصَّلَوَات»
رواہ مسلم (44 / 2851 ، 45 / 2852)، (7185 و 7186) 0 حدیث ’’ اشتکت النار الی ربھا ‘‘ تقدم (591) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: কাফিরদের অঙ্গসমূহের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়া হবে ‘আযাব আস্বাদন করার জন্য।
ইমাম কুরতুবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এটা কাফিরদের জন্য। কেননা অনেক হাদীসে আসছে যে, অহঙ্কারীদেরকে কিয়ামতের দিন একত্রিত করা হবে ধূলিকণার মতো করে পুরুষের আকৃতিতে, এরপর জাহান্নামের শিকলে টেনে নেয়া হবে।
ইবনু মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, নিশ্চয় এ হাদীসটি প্রমাণ বহন করে জাহান্নামের ভিতরে কাফিরদের শরীর বড় হওয়ার ব্যাপারে। তবে ইমাম কুরতুবী (রহিমাহুল্লাহ) যেটা উল্লেখ করেছেন সেটা হাশরের দিনের কথা বলা হয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ, ফাতহুল বারী হা. ৬৫৫১)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
৫৬৭৩-[৯] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: জাহান্নামের আগুনকে প্রথমে একহাজার বছর পর্যন্ত জ্বালানো হয়েছে, তাতে তা লাল হয়ে যায়। তারপর এক হাজার বছর প্রজ্জ্বলিত করা হয়, ফলে তা সাদা হয়ে যায়। অতঃপর একহাজার বছর অবধি জ্বালানো হয়, অবশেষে তা কালো হয়ে যায়। অতএব তা এখন ঘোর অন্ধকার কালো অবস্থায় রয়েছে। (তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالنار وَأَهْلهَا)
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «أُوقِدَ عَلَى النَّارِ أَلْفَ سَنَةٍ حَتَّى احْمَرَّتْ ثُمَّ أُوقِدَ عَلَيْهَا أَلْفَ سَنَةٍ حَتَّى ابْيَضَّتْ ثُمَّ أُوقِدَ عَلَيْهَا أَلْفَ سَنَةٍ حَتَّى اسْوَدَّتْ فَهِيَ سَوْدَاءُ مُظْلِمَةٌ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
سندہ ضعیف ، رواہ الترمذی (2591) و ابن ماجہ (4320) * شریک القاضی مدلس و عنعن وقال ابو ھریرۃ رضی اللہ عنہ :’’ اترونھا حمراء کنارکم ھذہ ؟ لھی اسود من القار و القار الزفت ‘‘ (الموطا للامام مالک (2 / 994) و سندہ صحیح و حکمہ الرفع : وھو یغنی عنہ ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: হাদীসটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ বহন করে যে, জাহান্নামকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং এটাই আহলুস সুন্নাহর মত, তবে ব্যতিক্রম মত পোষণ করে মু'তাযিলা এবং কিছু বিদ্আতী ভ্রান্ত ফিরকাসমূহ। তাদের ‘আক্বীদাহ্ হলো জান্নাত জাহান্নামকে এখনো তৈরি করা হয়নি।
অতএব এমনটি খুবই দুর্বল এবং ভুল ধারণামাত্র। জান্নাত-জাহান্নাম তৈরি করা হয়েছে এই পক্ষে আরো বহু হাদীস আছে যেখানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ, তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৬/২৬৯১)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
৫৬৭৪-[১০] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: কিয়ামতের দিন কাফিরের দাঁত হবে উহুদ পাহাড়ের মতো, রান বা উরু হবে বায়যা পাহাড়ের মতো মোটা এবং জাহান্নামে তার বসার স্থান হবে তিন দিনের দূরত্ব পরিমাণ বিস্তীর্ণ। যেমন- ’রবযাহ’ (মদীনাহ্ হতে তিন দিনের দূরত্বের ব্যবধান)। (তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالنار وَأَهْلهَا)
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «ضِرْسُ الْكَافِرِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِثْلُ أُحُدٍ وَفَخِذُهُ مِثْلُ الْبَيْضَاءِ وَمَقْعَدُهُ مِنَ النَّارِ مسيرَة ثَلَاث مثل الربذَة» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
اسنادہ حسن ، رواہ الترمذی (2578 وقال : حسن غریب
ব্যাখ্যা: (الْبَيْضَاءِ) এটা একটি পাহাড়ের নাম। ব্যাখ্যাকার বলেন, এটা ‘আরবের অঞ্চলগুলোর মধ্যে থেকে একটি জায়গা।
(مثل الربذَة) মদীনার নিকটবর্তী একটি প্রসিদ্ধ গ্রামের নাম এমনটিই নিয়াহাহ্ গ্রন্থে এসেছে। কেউ বলেছেন, মক্কার নিকটবর্তী একটি জায়গার নাম।
কেউ বলেছেন যে, মদীনার একটি গ্রাম, মদীনাহ্ থেকে তিন রাতের দূরত্ব। ব্যাখ্যাকার বলেন, যাতু ‘ইরকের নিকটবর্তী।
(مثل الربذَة) অর্থাৎ মদীনাহ এবং রবাযাহ্-এর মাঝের দূরত্বের সমান হবে। কেননা নবী (সা.) যখন এ হাদীস বলেছেন তখন তিনি মদীনাতেই ছিলেন এবং এর সমর্থন করে অন্য একটি বর্ণনা যা মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে যেখানে বলা হয়েছে, আমার মাঝে এবং রবাযার মাঝে যতটুকু দূরত্ব আছে জাহান্নামীদের নিতম্ব এই পরিমাণ হবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
৫৬৭৫-[১১] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জাহান্নামের মধ্যে কাফিরের দেহের চামড়া হবে বিয়াল্লিশ হাত মোটা, দাঁত হবে উহুদ পাহাড়ের সমান এবং জাহান্নামে তার বসার স্থান হবে মক্কাহ্-মদীনার মধ্যবর্তী দূরত্ব সমান পরিমাণ। (তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالنار وَأَهْلهَا)
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ غِلَظَ جِلْدِ الْكَافِرِ اثْنَانِ وَأَرْبَعُونَ ذِرَاعًا وَإِنَّ ضِرْسَهُ مِثْلُ أُحُدٍ وَإِنَّ مَجْلِسَهُ مِنْ جَهَنَّمَ مَا بَيْنَ مَكَّةَ وَالْمَدِينَةِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
سندہ ضعیف ، رواہ الترمذی (2577 وقال : حسن غریب صحیح) * الاعمش مدلس و عنعن و للحدیث شواھد عند احمد (3 / 328 ، 334) وغیرہ دون قولہ :’’ مکۃ و المدینۃ ‘‘ و ھذہ اللفظہ منکرۃ و الحدیث السابق (5674) یغنی عنہ
ব্যাখ্যা: আল জামি গ্রন্থের শব্দ হচ্ছে, (اثْنَانِ وَأَرْبَعُونَ ذِرَاعًا بِذِرَاعِ الْجَنَّارِ) অর্থাৎ বিয়াল্লিশ গজ হবে জাববার-এর হাতে। কামূস-এর মধ্যে বলা হয়েছে যে, (ذِرَاع) হলো কনুই থেকে মধ্যম অঙ্গুলির মাথা পর্যন্ত। (মিরকাতুল মাফাতীহ, তুহফাতুল আহওয়াযী হা. ২৫৭৭)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
৫৬৭৬-[১২] ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: (জাহান্নামে) কাফির তার জিহ্বা এক ক্রোশ দুই ক্রোশ পর্যন্ত বের করে হেঁচড়িয়ে চলবে এবং লোকেরা তা মাড়িয়ে চলবে। (আহমাদ ও তিরমিযী এবং ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, হাদীসটি গরীব]
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالنار وَأَهْلهَا)
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ الْكَافِرَ لَيُسْحَبُ لسانُه الفرسَخ والفرسخين يتوطَّؤُه النَّاس» . رَوَاهُ أَحْمد وَالتِّرْمِذِيّ وَقَالَ: هَذَا حَيْثُ غَرِيب
حسن ، رواہ احمد (2 / 92 ح 5671) و الترمذی (2580) ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: (فرسَخ) শব্দটিকে আরবীতে তিন মাইল বুঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয়।
এ হাদীসটি ইমাম বায়হাকী (রহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেছেন, (إِنَّ الْكَافِرَ ليجر لسانه فرسخين) অর্থাৎ কাফিরদের জিহ্বা কিয়ামতের দিন দুই (فرسَخ) ফারসাখ (ছয় মাইল) পর্যন্ত বিস্তৃত করে দেয়া হবে আর মানুষ সেই জিহ্বা পাড়াবে এবং এটাই সহীহ। (তুহফাতুল আহওয়াযী হা. ৪৮৯, ২৫৮০)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
৫৬৭৭-[১৩] আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: জাহান্নামে স’উদ নামে একটি পাহাড় আছে (কুরআনেও এর উল্লেখ রয়েছে) কাফিরকে সত্তর বছরে তার উপরে উঠানো হবে এবং সেখান হতে তাকে নীচে নিক্ষেপ করা হবে। এ অবস্থায় সর্বদা উঠানামা করতে থাকবে। (তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالنار وَأَهْلهَا)
وَعَن أبي سعيد الْخُدْرِيّ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الصَّعُودُ جَبَلٌ مِنْ نَارٍ يُتَصَعَّدُ فِيهِ سَبْعِينَ خَرِيفًا وَيُهْوَى بِهِ كَذَلِكَ فِيهِ أَبَدًا» . رَوَاهُ التِّرْمِذِي
حسن ، رواہ الترمذی (2576 وقال : غریب) و الحاکم (4 / 496 ح 8764 و سندہ حسن) ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: (الصَّعُودُ) এটা কুরআনের আয়াত (سَاُرۡهِقُهٗ صَعُوۡدًا) অর্থাৎ আমি তাকে জাহান্নামের পিচ্ছিল পাথুরে নির্মিত স'উদ পাহাড়ে আরোহণ করতে বাধ্য করব- (সূরাহ আল মুদ্দাসসির ৭৪ : ১৭)। অতএব স্পষ্ট হয়ে গেল যে, জাহান্নামের মধ্যে পিচ্ছিল পাথরের একটি পাহাড় থাকবে এবং কাফিরকে চড়তে বাধ্য করা হবে। (خَرِيفٍا) শব্দটির অর্থ হলো শরৎকাল কিন্তু ‘আরবরা এই শব্দটিকে বছরের অর্থে ব্যবহার করে, কেননা প্রতিটি কাল বা ঋতু বছরে একবার করেই আসে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
৫৬৭৮-[১৪] উক্ত রাবী [আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ)] নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: আল্লাহ তা’আলার বাণী (كَالْمهْلِ) “(তেলের) গাদ” (সূরা আল কাহফ ১৭ : ২৯)-এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, তা যায়তুন তেলের নীচের তপ্ত গাদের মতো। যখন তা তার মুখের কাছে নেয়া হবে, তখন গরম উত্তাপে তার মুখের চামড়া-মাংস তাতে খসে পড়বে। (তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالنار وَأَهْلهَا)
وَعَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ فِي قَوْله: (كَالْمهْلِ) أَيْ كَعَكَرِ الزَّيْتِ فَإِذَا قُرِّبَ إِلَى وَجْهِهِ سَقَطت فَرْوَة وَجهه فِيهِ رَوَاهُ التِّرْمِذِيّّّّّّّ
حسن ، رواہ الترمذی (2581 ، 2584) و الحاکم (2 / 501 ح 3850) و ابن حبان (الاحسان : 7430 / 7473 و سندہ حسن) ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: (كَالْمهْلِ) শব্দটির ব্যাখ্যা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) করলেন যে, এটা হচ্ছে তেলের নীচের গাদ।
(سَقَطت فَرْوَة وَجهه) فَروَةُ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো চামড়া। মূলতপক্ষে (فَروَةُ) মানে হলো মাথার চামড়া যার উপর চুল গজায়, তবে এখানে চেহারার চামড়া উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ, তুহফাতুল আহওয়াযী হা, ২৫৮৪)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
৫৬৭৯-[১৫] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: জাহান্নামীদের মাথার উপর তপ্ত গরম পানি ঢালা হবে এবং তা তার পেটের মধ্যে প্রবেশ করবে, ফলে পেটের মধ্যে যা কিছু আছে, সমস্ত কিছু বিগলিত হয়ে পায়ের দিক দিয়ে নির্গত হবে। কুরআনে বর্ণিত (الصِّهْرُ) (বিগলিত) করা হবে দ্বারা এটাই বুঝানো হয়েছে। আবার সে আগের অবস্থায় ফিরে আসবে (পুনরায় তা ঢালা হবে)। (তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالنار وَأَهْلهَا)
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّ الْحَمِيمَ لَيُصَبُّ عَلَى رؤوسهم فَينفذ الْحَمِيم حَتَّى يخلص إِلَى جَوْفه فسلت مَا فِي جَوْفِهِ حَتَّى يَمْرُقَ مِنْ قَدَمَيْهِ وَهُوَ الصَّهْرُ ثُمَّ يُعَادُ كَمَا كَانَ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
حسن ، رواہ الترمذی (2582 وقال : حسن غریب صحیح) * روایۃ شعبۃ عن الاعمش محمولۃ علی السماع ، انظر ’’ مسالۃ التسمیۃ ‘‘ لمحمد بن طاھر المقدسی (ص 47) و للحدیث علۃ غیر قادحۃ عند ابن ابی شیبۃ (13 / 161 ح 15991) و احمد (1 / 338 ح 3138) وغیرھما
ব্যাখ্যা: এ হাদীসে ঐ আয়াতের প্রতি ইশারা করা হয়েছে, (یُصۡهَرُ بِهٖ مَا فِیۡ بُطُوۡنِهِمۡ وَ الۡجُلُوۡدُ) অর্থাৎ যার দ্বারা তাদের পেটের অভ্যন্তরে যা কিছু রয়েছে এবং তাদের চামড়াসমূহ বিগলিত করা হবে। (সূরাহ্ আল হাজ্জ ২২ : ২০)।
(شُمَّ يُعَادُكَماكَانَ) এটা দ্বারা ঐ আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, (کُلَّمَا نَضِجَتۡ جُلُوۡدُهُمۡ بَدَّلۡنٰهُمۡ جُلُوۡدًا غَیۡرَهَا) “যখনই তাদের চামড়াগুলো পুড়ে যাবে তখনই আমি তাদের চামড়াগুলো পাল্টিয়ে দিব যাতে তারা আবার আস্বাদন করতে পারে”- (সূরা আন্ নিসা ৪ : ৫৬)। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ, তুহফাতুল আহওয়াযী হা. ২৫৮২)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
৫৬৮০-[১৬] আবূ উমামাহ্ (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। আল্লাহর বাণী- (يُسْقَى مِنْ مَاءٍ صديد يتجرَّعُه) “জাহান্নামীদের পুঁজ ও কদর্য রক্ত জাহান্নামীদেরকে পান করানো হবে, যা তারা ঢগটগ করে গিলবে”- (সূরাহ্ ইব্রাহীম ১৪ : ১৬)। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, উক্ত পানীয় তার মুখের কাছে নেয়া হবে, কিন্তু সে তাকে পছন্দ করবে না। আর যখন তাকে মুখের কাছাকাছি করা হবে, তখন তার চেহারা (তার উত্তাপে) দগ্ধ হয়ে যাবে এবং তার মাথার চামড়া খসে পড়বে। আর যখন সে তা পান করবে তখন তার নাড়িভুড়ি খণ্ড খণ্ড হয়ে মলদ্বার দিয়ে নির্গত হবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেন, (وَسُقُوا مَاءً حَمِيمًا فَقَطَّعَ أمعاءهم) ...এবং জাহান্নামীদেরকে এমন তপ্ত গরম পানি পান করানো হবে যে, তাতে তাদের নাড়িভুঁড়ি খণ্ড খণ্ড হয়ে বের হবে”- (সূরাহ্ মুহাম্মাদ ৪৭ : ১৫)। আল্লাহ তা’আলা আরো বলেছেন, (وَإِنْ يَسْتَغِيثُوا يُغَاثُوا بِمَاءٍ كَالْمُهْلِ يَشْوِي الْوُجُوه بئس الشَّرَاب)“...জাহান্নামীগণ যখন পানি চাবে তখন তেলের গাদের মতো পানি তাদেরকে দেয়া হবে, যাতে তাদের চেহারা দগ্ধ হয়ে যাবে। এটা খুবই মন্দ পানীয় বস্তু...”- (সূরা আল কাহফ ১৮ : ২৯)। (তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالنار وَأَهْلهَا)
وَعَنْ أَبِي أُمَامَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي قَوْلِهِ: (يُسْقَى مِنْ مَاءٍ صديد يتجرَّعُه) قَالَ: يُقَرَّبُ إِلَى فِيهِ فَيَكْرَهُهُ فَإِذَا أُدْنِي مِنْهُ شَوَى وَجْهَهُ وَوَقَعَتْ فَرْوَةُ رَأْسِهِ فَإِذَا شَرِبَهُ قَطَّعَ أَمْعَاءَهُ حَتَّى يَخْرُجَ مِنْ دُبُرِهِ. يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى: (وَسُقُوا مَاءً حَمِيمًا فَقَطَّعَ أمعاءهم) وَيَقُولُ: (وَإِنْ يَسْتَغِيثُوا يُغَاثُوا بِمَاءٍ كَالْمُهْلِ يَشْوِي الْوُجُوه بئس الشَّرَاب) رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
اسنادہ حسن ، رواہ الترمذی (2583) ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: (يُقَرَّبُ إِلَى فِيهِ) এ হাদীসের সমর্থন কুরআনে এভাবে এসেছে যে, (یَّتَجَرَّعُهٗ وَ لَا یَکَادُ یُسِیۡغُهٗ…)... অর্থাৎ সে তা গিলতে চাইবে কিন্তু সে সহজে গিলতে পারবে না- (সূরাহ্ ইবরাহীম ১৪ : ১৭)। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ, তুহফাতুল আহওয়াযী হা. ২৫৮৪)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
৫৬৮১-[১৭] আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: জাহান্নাম চারটি প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত। প্রত্যেক প্রাচীর চল্লিশ বছরের দূরত্ব পরিমাণ পুরু বা মোটা। (তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالنار وَأَهْلهَا)
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لِسُرَادِقِ النَّارِ أَرْبَعَةُ جُدُرِ كِثَف كل جِدَار مسيرَة أَرْبَعِينَ سنة . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
حسن ، رواہ الترمذی (1 / 2584) و الحاکم (4 / 601 ح 8775 و سندہ حسن) ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, (لِسُرَادِقِ النَّارِ) এখানে ‘লাম’-এর উপর যবর পড়া যাবে তখন এই অংশটুকু মুবতাদাহ্ হবে আর ‘লাম’-এর উপর যেরও পড়া যায় তখন এই অংশটুকু খবর হবে আর এটাই অধিক স্পষ্ট। (لِسُرَادِقِ) বলা হয় প্রত্যেক ঐ জিনিসকে যা কোন কিছুকে বেষ্টন করে রাখে যেমন দেয়াল, তাবু ইত্যাদি। আর কুরআনে অন্য আয়াতে এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, (نَّاۤ اَعۡتَدۡنَا لِلظّٰلِمِیۡنَ نَارًا ۙ اَحَاطَ بِهِمۡ سُرَادِقُهَا) অর্থাৎ “আমি যালিমদের জন্য আগুন প্রস্তুত করে রেখেছি যার বেষ্টনি তাদেরকে বেষ্টন করে রাখবে।” (সূরাহ আল কাহফ ১৮: ২৯)।
(كِثَفُ) এই শব্দে (كاف)-এর উপর পেশও পড়া যায় এবং যেরও যবরও পড়া যায়, তবে যেরটাই পড়া ভালো, অধিকাংশ ব্যাখ্যা গ্রন্থে যেরই আছে। আর এটা (كِثَفُ) এর বহুবচন যার অর্থ হলো মোটা পুরু ইত্যাদি। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
৫৬৮২-[১৮] উক্ত রাবী [আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জাহান্নামীদের কদর্য পুঁজের এক বালতি যদি দুনিয়াতে ঢেলে দেয়া হয়, তাহলে এটা সমস্ত দুনিয়াবাসীকে দুর্গন্ধময় করে দেবে। (তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالنار وَأَهْلهَا)
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَوْ أَنَّ دَلْوًا مِنْ غَسَّاقٍ يَهَرَاقُ فِي الدُّنْيَا لَأَنْتَنَ أَهْلُ الدُّنْيَا» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
حسن ، رواہ الترمذی (2 / 2584) و الحاکم (4 / 602 ح 8779 و سندہ حسن) ۔
(ضَعِيفٌ)
ব্যাখ্যা: (غَسَّاقٍ) হলো জাহান্নামীদের পুঁজ এবং ময়লা পানি। কেউ বলেছেন, তাদের পঁচা রক্ত, কেউ বলেন তীব্র ঠাণ্ডা হওয়ার কারণে পান করা অসাধ্য হবে, যেমন অধিক গরম হওয়ার কারণে পানি পান করা যায় না। কিন্তু আমি (মুল্লা আলী ক্বারী) বলছি, এসবগুলো মিশ্রিত পানি হবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
৫৬৮৩-[১৯] ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.) এ আয়াতটি পাঠ করলেন, (اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُم مُسلمُونَ) “...তোমরা আল্লাহকে যথার্থ ভয় কর এবং পূর্ণ মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না”- (সূরাহ আ-লি ’ইমরান ৩ : ১০২)। (অতঃপর) রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, যদি ’যাক্কুম’ গাছের এক ফোঁটা এ দুনিয়ায় পড়ে, তবে সমস্ত দুনিয়াবাসীর জীবনধারণের উপকরণসমূহ ধ্বংস হয়ে যাবে। এমতাবস্থায় ঐ সমস্ত লোকদের দুর্দশা কিরূপ হবে, এটা যাদের খাদ্য হবে? [ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং তিনি বলেছেন, হাদীসটি হাসান সহীহ]
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالنار وَأَهْلهَا)
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَرَأَ هَذِهِ الْآيَةَ: (اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُم مُسلمُونَ) قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَو أَن قَطْرَة من الزقوم قطرات فِي دَارِ الدُّنْيَا لَأَفْسَدَتْ عَلَى أَهْلِ الْأَرْضِ مَعَايِشَهُمْ فَكَيْفَ بِمَنْ يَكُونُ طَعَامَهُ؟» رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ
صحیح ، رواہ الترمذی (2585) [و ابن ماجہ (4325) و صححہ ابن حبان (الموارد : 2611 ، الاحسان : 7427) و الحاکم علی شرط الشیخین (2 / 294 ، 451) و وافقہ الذھبی]
ব্যাখ্যা: (اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ...) অর্থাৎ আল্লাহকে ভয় করা ওয়াজিব ফরযগুলো আদায়ের মাধ্যমে এবং গুনাহের কাজ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে। 'আবদুল্লাহ ইবনু মাস্'উদ (রাঃ) এই আয়াতের ব্যাখ্যা করেছেন যে, তার আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা না করা, কৃতজ্ঞতা আদায় করা, কুফরী না করা এবং তাকে স্মরণ করা, ভুলে না যাওয়া।
(مُسلمُونَ) অর্থাৎ একত্ববাদী, নিবেদিত, বশীভূত, অনুতপ্ত এবং ভয় এবং আশার সমন্বয়কারী এবং আল্লাহর প্রতি ভালো ধারণা পোষণকারী। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(الزقوم) এক প্রকারের গাছের পানি যে গাছ জাহান্নামের গোড়া থেকে একাকি বলে হবে। কেউ বলেছেন, যাক্কুম হলো একটি তিক্ত ও দুর্গন্ধময় খবীস গাছ, যা জাহান্নামীরা ভক্ষণ করতে অপছন্দ করবে।
কেউ কেউ বলেন যে, (الزقوم) হলো এক প্রকারের খাদ্য যা খেজুর ও মাখন দ্বারা তৈরি করা হত এবং তা গিলে খেতে হত। অতএব যখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত নাযিল করলেন, (اِنَّ شَجَرَتَ الزَّقُّوۡمِ ﴿ۙ۴۳﴾ طَعَامُ الۡاَثِیۡمِ ﴿ۖۛۚ۴۴﴾) অর্থাৎ নিশ্চয় যাক্কুম বৃক্ষ গুনাহগারদের খাদ্য”- (সূরা আদ দুখা-ন ৪৪ : ৪৩-৪৪)। তখন আবূ জাহল বলল যে, মাখন দিয়ে খেজুর গিলে খাব সমস্যা কি? তখন আল্লাহ উক্ত আয়াত নাযিল করলেন যে, এটা জাহান্নামের গোড়া থেকে গজায় এটা দুনিয়ার মতো নয়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ, তুহফাতুল আহওয়াযী ৬/২৫৮৫)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
৫৬৮৪-[২০] আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: আল্লাহর বাণী- (وهم فِيهَا كَالِحُونَ) “আগুন তাদের মুখমণ্ডল দগ্ধ করবে”- (সূরাহ্ আল মুমিনূন ২৩ : ১০৪); এর অর্থ হলো, জাহান্নামী লোকের অবস্থা এই হবে যে, আগুনের প্রচণ্ড তাপে তার মুখ ভাঁজা-পোড়া হয়ে উপরের ঠোট সঙ্কুচিত হয়ে মাথার মধ্যস্থলে পৌছবে এবং নিচের ঠোট ঝুলে নাভির সাথে এসে লাগবে। (তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالنار وَأَهْلهَا)
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: (وهم فِيهَا كَالِحُونَ) قَالَ: «تَشْوِيهِ النَّارُ فَتَقَلَّصُ شَفَتُهُ الْعُلْيَا حَتَّى تَبْلُغَ وَسْطَ رَأْسِهِ وَتَسْتَرْخِي شَفَتُهُ السُّفْلَى حَتَّى تضرب سُرَّتَهُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
اسنادہ حسن ، رواہ الترمذی (2587 وقال : حسن صحیح غریب) ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: (كَالِحُونَ) বিভৎস চেহারাবিশিষ্ট, এমনকি আগুন তাদের চেহারাগুলো জ্বালিয়ে দিবে। কেউ বলেছেন, তাদের দাঁতগুলো বেড়িয়ে যাবে আর এটাই রাসূল (সা.) -এর ব্যাখ্যার উপযোগী।
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ, তুহফাতুল আহওয়াযী হা, ২৫৮৭)।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
৫৬৮৫-[২১] আনাস (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন, তিনি (সা.) বলেছেনঃ হে মানুষ সকল! তোমরা (আল্লাহর ভয়ে) খুব বেশি বেশি ক্রন্দন কর। যদি কাঁদতে ব্যর্থ হও, তাহলে ক্রন্দনের রূপ ধারণ কর। কেননা জাহান্নামী জাহান্নামের মধ্যে কাঁদতে থাকবে, এমনকি পানির নালার মতো তাদের চেহারার অশ্রু প্রবাহিত হবে। এমন সময় অশ্রুও শেষ হয়ে যাবে এবং রক্ত প্রবাহিত হতে থাকবে, তাতে তার চক্ষুসমূহে এমন গভীরভাবে ক্ষত হবে যে, যদি তাতে নৌকা চালাতে হয় তবে তাও চলবে। (শারহুস্ সুন্নাহ্)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالنار وَأَهْلهَا)
وَعَنْ أَنَسٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «يَا أَيُّهَا النَّاسُ ابْكُوا فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِيعُوا فَتَبَاكَوْا فَإِنَّ أَهْلَ النَّارِ يَبْكُونَ فِي النَّارِ حَتَّى تَسِيلَ دُمُوعُهُمْ فِي وُجُوهِهِمْ كَأَنَّهَا جَدَاوِلُ حَتَّى تَنْقَطِعَ الدُّمُوعُ فَتَسِيلَ الدِّمَاءُ فَتَقَرَّحَ الْعُيُونُ فَلَوْ أَنَّ سُفُنًا أُزْجِيَتْ فِيهَا لجَرَتْ» . رَوَاهُ فِي «شرح السّنة»
اسنادہ ضعیف ، رواہ البغوی فی شرح السنۃ (15 / 253 ح 4418) * فیہ یزید الرقاشی : ضعیف و عمران بن زید التغلبی : لین و للحدیث لون آخر عند ابن ماجہ (4324) و سندہ ضعیف ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যাঃ (ابْكُوا) তোমরা তোমাদের গুনাহের উপর অনুতপ্ত হয়ে কাঁদো এবং তোমাদের রবের থেকে ক্ষমার আকাক্ষা করে কাঁদো।
‘আইন বর্ণমালায় পেশ দিয়ে এটা বহুবচন, একবচন হলো ‘আইন, যার অর্থ চোখ। অর্থাৎ চোখ অশ্রুশিক্ত হয়ে যাবে বা রক্তে রঞ্জিত হয়ে যাবে। (سُفُن) এটা (سَفِينَة) এর বহুবচন অর্থ হলো নৌকা। (أُزْجِيَتْ) এটা (الْإِزْجَاءِ) থেকে অর্থ পাঠানো। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
৫৬৮৬-[২২] আবুদ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জাহান্নামবাসীদের ভীষণ ক্ষুধায় লিপ্ত করা হবে এবং ক্ষুধার কষ্ট সেই ’আযাবের সমান হবে, যা তারা পূর্ব হতে জাহান্নামে ভোগ করছিল। তারা প্রার্থনা করবে। এর প্রেক্ষিতে তাদেরকে যরী’ নামক এক প্রকার কাঁটাযুক্ত দুর্গন্ধময় খাদ্য দেয়া হবে। তা তাদেরকে তৃপ্ত করবে না এবং ক্ষুধা নিবারণ করবে না। অতঃপর পুনরায় খাদ্যের জন্য প্রার্থনা করবে, এবার এমন খাদ্য দেয়া হবে, যা তাদের গলায় আটকে যাবে। তখন তাদের দুনিয়ার ঐ কথাটি স্মরণে আসবে যে, এভাবে গলায় কোন খাদ্য আটকে গেলে তখন পানি পান করে তাকে নীচের দিকে ঢুকানো হত, অতএব তারা পানির জন্য ফরিয়াদ করবে, তখন তপ্ত গরম পানি লোহার কড়া দ্বারা উঠিয়ে কাছে ধরা হবে, যখন তা তাদের মুখের কাছাকাছি করা হবে, তখন তাদের মুখের গোস্ত ভাজা-পোড়া হয়ে যাবে, আর যখনই সে পানি তাদের পেটের ভিতরে ঢুকবে, তা তাদের পেটের ভিতরে যা কিছু আছে, তা খণ্ডবিখণ্ড করে ফেলবে। এবার জাহান্নামীগণ একে অপরে বলবে, জাহান্নামের রক্ষীদেরকে আহ্বান কর; (যেন আমাদের শাস্তি হ্রাস করা হয়) তখন রক্ষীগণ বলবেন, তোমাদের কাছে কি আল্লাহর রাসূল (সা.) স্পষ্ট দলীল-প্রমাণ নিয়ে উপস্থিত হননি? তারা বলবে, হ্যা, এসেছিলেন।
তখন প্রহরীরা বলবেন, তোমাদের প্রার্থনা তোমরা নিজেরাই কর। অথচ কাফিরদের প্রার্থনা অর্থহীন (কবুল করবেন না) তিনি (সা.) বলেন, এবার জাহান্নামীগণ বলাবলি করবে, (জাহান্নামের দারোগা) মালিককে ডাক। তখন তারা বলবে, হে মালিক! তুমি আমাদের জন্য তোমার রবের কাছে এই আবেদন কর, তিনি যেন আমাদেরকে মৃত্যু দান করেন। উত্তরে মালিক বলবেন, তোমরা সর্বদার জন্য এখানে এ অবস্থাতেই থাকবে। অধস্তন রাবী আমাশ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমাকে বর্ণনা করা হয়েছে, জাহান্নামীদের আহ্বান বা ফরিয়াদ আর মালিকের উত্তরের মাঝখানে একহাজার বছর অতিবাহিত হবে। তিনি (সা.) বললেন, জাহান্নামীগণ সর্বদিক হতে নিরাশ হয়ে অতঃপর তারা পরস্পরে বলবে, এবার তোমরা তোমাদের প্রভুর কাছে সরাসরি ফরিয়াদ কর। তোমাদের রবের চেয়ে উত্তম আর কেউ নেই। তখন তারা বলবে, হে আমাদের পরোয়ারদিগার! আমাদের দুর্ভাগ্য আমাদের ওপর প্রবল হয়ে গেছে, ফলে আমরা গোমরাহ সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছি। হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে এ জাহান্নাম হতে বের করে দাও। এরপরও যদি আমরা আবার অবাধ্যতায় লিপ্ত হই, তাহলে আমরাই হব নিজেদের উপর অত্যাচারী।
তিনি (সা.) বলেন, তখন আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে উত্তর দেবেন, (হে হতভাগার দল!) দূর হও, জাহান্নামেই পড়ে থাক, তোমরা আমার সাথে আর কথা বলবে না। তিনি (সা.) বলেন, এ সময় তারা আল্লাহ তা’আলার সর্বপ্রকারের কল্যাণ হতে নিরাশ হয়ে পড়বে এবং এরপর হতে তারা (জাহান্নামের মধ্যে থেকে) বিকটভাবে চিৎকার ও হা-হুতাশ এবং নিজেদের ওপর ধিক্কার করতে থাকবে। আবদুল্লাহ ইবনু আবদুর রহমান (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, লোকেরা এ হাদীসটি মারফু’রূপে বর্ণনা করেন না। (তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالنار وَأَهْلهَا)
وَعَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يُلْقَى عَلَى أَهْلِ النَّارِ الْجُوعُ فَيَعْدِلُ مَا هُمْ فِيهِ مِنَ الْعَذَابِ فَيَسْتَغِيثُونَ فَيُغَاثُونَ بِطَعَامٍ مِنْ ضَرِيعٍ لَا يُسْمِنُ وَلَا يُغْنِي مِنْ جُوعٍ فَيَسْتَغِيثُونَ بِالطَّعَامِ فَيُغَاثُونَ بِطَعَامٍ ذِي غُصَّةٍ فَيَذْكُرُونَ أَنَّهُمْ كَانُوا يُجِيزُونَ الْغُصَصَ فِي الدُّنْيَا بِالشَّرَابِ فَيَسْتَغِيثُونَ بِالشَّرَابِ فَيُرْفَعُ إِلَيْهِمُ الْحَمِيمُ بِكَلَالِيبِ الْحَدِيدِ فَإِذَا دَنَتْ مِنْ وُجُوهِهِمْ شَوَتْ وُجُوهَهُمْ فَإِذَا دَخَلَتْ بُطُونَهُمْ قطعتْ مَا فِي بطونِهم فيقولونَ: ادْعوا خَزَنَةَ جهنمَ فيقولونَ: أَلمْ تَكُ تَأْتِيكُمْ رُسُلُكُمْ بِالْبَيِّنَاتِ؟ قَالُوا: بَلَى. قَالُوا: فَادْعُوا وَمَا دُعَاءُ الْكَافِرِينَ إِلَّا فِي ضَلَالٍ قَالَ: فيقولونَ: ادْعوا مَالِكًا فيقولونَ: يَا مالكُ ليَقْضِ علَينا ربُّكَ قَالَ: «فيُجيبُهم إِنَّكم ماكِثونَ» . قَالَ الْأَعْمَشُ: نُبِّئْتُ أَنَّ بَيْنَ دُعَائِهِمْ وَإِجَابَةِ مَالِكٍ إِيَّاهُمْ أَلْفَ عَامٍ. قَالَ: فَيَقُولُونَ: ادْعُوا رَبَّكُمْ فَلَا أَحَدَ خَيْرٌ مِنْ رَبِّكُمْ فَيَقُولُونَ: رَبَّنَا غَلَبَتْ عَلَيْنَا شِقْوَتُنَا وَكُنَّا قَوْمًا ضَالِّينَ رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْهَا فَإِنْ عُدْنَا فَإِنَّا ظَالِمُونَ قَالَ: فيُجيبُهم: اخْسَؤوا فِيهَا وَلَا تُكلمونِ قَالَ: «فَعِنْدَ ذَلِكَ يَئِسُوا مِنْ كُلِّ خَيْرٍ وَعِنْدَ ذَلِكَ يَأْخُذُونَ فِي الزَّفِيرِ وَالْحَسْرَةِ وَالْوَيْلِ» . قَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ: وَالنَّاسُ لَا يرفعونَ هَذَا الحديثَ. رَوَاهُ الترمذيُّ
اسنادہ ضعیف ، رواہ الترمذی (2586) * الاعمش مدلس و عنعن و قال احمد :’’ الاعمش لم یسمع من شمر بن عطیۃ ‘‘ (المراسیل لابن ابی حاتم ص 82) ۔
(ضعيفٌ)
ব্যাখ্যা: (فَيَعْدِلُ مَا هُمْ فِيهِ) অর্থাৎ তাদের ওপর এমন ক্ষুধা লাগিয়ে দেয়া হবে যে, তারা আর সমস্ত শাস্তি থেকে এই ‘আযাবকেই অধিক কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক মনে করবে বা অন্য সমস্ত শাস্তির সমান মনে করবে শুধু ক্ষুধার শাস্তিটাকেই।
(ضَرِيعٍ) এটা হিজাযের একটি উদ্ভিত যার কাটা রয়েছে এবং কোন প্রাণী এর নিকটে যায় না তার দুর্গন্ধের কারণে আর যদি কোন প্রাণী তা ভক্ষণ করে তাহলে মারা যায়। এখানে উদ্দেশ্য হলো আগুনের কাটা যা এক প্রকার তিক্ত গাছের রসের থেকেও তিক্ত এবং মৃত প্রাণী থেকেও দুর্গন্ধ এবং আগুনের চেয়েও গরম।
(ذِي غُصَّةٍ) যা গলার মধ্যে আটকে যাবে এবং গিলতে পারবে না হাড্ডি বা অন্য কোন কিছুর কারণে যা উপরেও উঠবে না নিচেও নামবে না। (غُصَّة) এটা এক বচন এর বহুবচন (غُصَص) অর্থ হলো কাঁটা।
(كَلَالِيبِ)এটা বহুবচন একবচন হলো (كَلَاب) অর্থ লোহার বাঁকা পেরেক।
(الزَّفِيرِ وَالْحَسْرَةِ وَالْوَيْلِ)বলা হয় নিজেকে জালিয়ে দেয়া কঠোরতার কারণে। আর (الْحَسْرَةِ) হলো লজ্জা (الْوَيْلِ) হলো ধ্বংস ও শাস্তির কঠোরতা। কেউ বলেছেন, এটা জাহান্নামের একটি উপত্যকার নাম। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
৫৬৮৭-[২৩] নু’মান ইবনু বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে বলতে শুনেছি, ’আমি তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুন হতে ভীতি প্রদর্শন করেছি, আমি তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুন হতে ভীতি প্রদর্শন করেছি।’ তিনি এ বাক্যগুলো বারংবার এমনভাবে উচ্চৈঃস্বরে বলতে থাকলেন যে, বর্তমানে আমি যে স্থানে বসে আছি, যদি তিনি (সা.) এ স্থান হতে উক্ত বাক্যগুলো বলতেন, তবে তা বাজারের লোকেরাও শুনতে পারত। আর তিনি এমনভাবে (হেলে দুলে) বাক্যগুলো বলেছেন যে, তার কাঁধের উপর রক্ষিত চাদরটি পায়ের উপরে গড়িয়ে পড়েছিল। (দারিমী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالنار وَأَهْلهَا)
وَعَنِ النُّعْمَانِ بْنِ بَشِيرٍ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «أَنْذَرْتُكُمُ النَّارَ أَنْذَرْتُكُمُ النَّارَ» فَمَا زَالَ يَقُولُهَا حَتَّى لَوْ كَانَ فِي مَقَامِي هَذَا سَمِعَهُ أَهْلُ السُّوقِ وَحَتَّى سَقَطَتْ خَمِيصَةٌ كَانَتْ عَلَيْهِ عِنْدَ رجلَيْهِ. رَوَاهُ الدَّارمِيّ
اسنادہ حسن ، رواہ الدارمی (2 / 330 ح 2815 ، نسخۃ محققۃ : 2854) [و صححہ الحاکم (1 / 287) و وافقہ الذھبی] ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (أَنْذَرْتُكُمُ النَّارَ) আমি তোমাদেরকে জানিয়েছি যার দ্বারা তোমরা আগুন থেকে বাঁচতে পার, এমনকি বলেছি আগুন থেকে বাঁচ যদিও খেজুরের বিচির দ্বারা হোক।
(خَمِيصَةٌ) এক প্রকারের কাপড় যা চাদরের পরিবর্তে পরিধান করা হত। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
৫৬৮৮-[২৪] ’আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: যদি একখানা সীসা দ্বারা নির্মিত গোলা- এ কথা বলে তিনি মাথার খুলির মতো গোল জিনিসের দিকে ইঙ্গিত করলেন- আকাশ হতে জমিনের দিকে ছেড়ে দেয়া হয়, তখন তা একটি রাত্র অতিবাহিত হওয়ার পূর্বেই জমিনে পৌছে যাবে, অথচ এ দুয়ের মধ্যবর্তী শূন্যস্থানটি পাঁচশত বছরের পথ। কিন্তু যদি তাকে ঐ শিকল বা জিঞ্জিরের এক পার্শ্ব হতে ছেড়ে দেয়া হয়, যার দ্বারা জাহান্নামীদেরকে বাধা হবে, তখন তা দিবারাত্রি অতিক্রম করতে করতে চল্লিশ বছর পর্যন্তও তার মূলে অথবা বলেছেন, তার গভীর তলদেশে পৌছতে পারবে না। (তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالنار وَأَهْلهَا)
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَوْ أَنَّ رَصَاصَةً مِثْلَ هَذِهِ - وَأَشَارَ إِلَى مِثْلِ الْجُمْجُمَةِ - أُرْسِلَتْ مِنَ السَّمَاءِ إِلَى الْأَرْضِ وَهِيَ مَسِيرَةُ خَمْسِمِائَةِ سَنَةٍ لَبَلَغَتِ الْأَرْضَ قَبْلَ اللَّيْلِ وَلَوْ أَنَّهَا أُرْسِلَتْ مِنْ رَأْسِ السِّلْسِلَةِ لَسَارَتْ أَرْبَعِينَ خَرِيفًا اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ قَبْلَ أنْ تبلع أَصْلهَا أَو قعرها» رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
اسنادہ حسن ، رواہ الترمذی (2588 وقال : حسن صحیح) ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: (رَصَاصَةً) সীসার একটা টুকরা আবার ছোট ছোট পাথরকেও (رَصَاصَةً) বলা হয় যেগুলোর কাজ করে এবং এটা আধুনিক অর্থ হলো গুলি বুলেট।
(جُمْجُمَةِ) এর অর্থ হলো মাথায় খুলি। কেউ বলেছেন, এটার দ্বারা একটি ছোট পেয়ালা বুঝানো হয়েছে। তবে প্রথমটাই অধিক সহীহ।
(سِّلْسِلَةِ) এটা একটি শিকলের নাম যা দ্বারা জাহান্নামীদেরকে বেঁধে রাখা হবে। এ হাদীসের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সা.) জাহান্নামের গভীরতা বুঝানোর চেষ্টা করেছেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ, তুহফাতুল আহ্ওয়াযী হা. ২৫৮৮)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
৫৬৮৯-[২৫] আবূ বুরদাহ্ (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন। নবী (সা.) বলেছেন: জাহান্নামের মধ্যে এমন একটি নালা বা গর্ত আছে, যার নাম ’হাবহাব’। প্রত্যেক স্বৈরাচারী অহংকারীকে সেখানে রাখা হবে। (তিরমিযী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب صفةالنار وَأَهْلهَا)
وَعَن أبي بُردةَ عَنْ أَبِيهِ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِنَّ فِي جَهَنَّمَ لَوَادِيًا يُقَالُ لَهُ: هَبْهَبُ يسكنُه كلُّ جبَّارٍ رَوَاهُ الدَّارمِيّ
اسنادہ ضعیف ، رواہ الدارمی (2 / 331 ح 2819 ، نسخۃ محققۃ : 2858) * فیہ ازھر بن سنان : ضعیف ۔
ব্যাখ্যা: (وَادِيًا) এটা একবচন, বহুবচন হলো (أوديه) অর্থ হলো উপত্যকা। (هَبْهَبُ) এটা একটি নাম। কেউ বলেছেন, এখানে (أَمْرٌ) এর সীগাকে দু’বার আনা হয়েছে (هَبْهَبُ), কেননা যে উপস্থিত হবে সে বলবে (كلُّ جبَّارٍ) هَبْهَبُ প্রত্যেক অহংকারী বিদ্বেষী যে সত্য থেকে দূরে অবস্থানকারী সৃষ্টিজীবের উপর কঠোর।
ইবনু মারদাওয়াইহ ইবনু উমার থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, (فَلَق) জাহান্নামের একটি জেলখানার নাম। এর মধ্যে বন্দি করা হবে প্রত্যেক অহংকারী, প্রতাপশালী এবং স্বেচ্ছাচারীদেরকে। এখানে উল্লেখিত হয়েছে যে, জাহান্নামও এই জেলখানা থেকে আশ্রয় চায়। অনুরূপ আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, (الْفَلَقُ) হলো জাহান্নামের একটি গভীর গর্তের নাম যা ঢাকা থাকবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
৫৬৯০-[২৬] ইবনু উমার (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: জাহান্নামে জাহান্নামীদের দেহ হবে প্রকাণ্ড ও বিরাট বিরাট। এমনকি তাদের কানের লতি হতে ঘাড় পর্যন্ত দূরত্ব হবে সাতশত বছরের দূরত্ব, গায়ের চামড়া হবে সত্তর গজ মোটা এবং এক একটি দাঁত হবে উহুদ পাহাড়ের মতো।
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (بَاب صفةالنار وَأَهْلهَا)
عَنِ ابْنِ عُمَرَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «يَعْظُمُ أَهْلُ النَّارِ فِي النَّارِ حَتَّى إِنَّ بَيْنَ شَحْمَةِ أُذُنِ أَحَدِهِمْ إِلَى عَاتِقِهِ مَسِيرَةَ سبعمائةِ عامٍ وإِنَّ غِلَظَ جلدِه سَبْعُونَ ذراعان وَإِن ضرسه مثل أحد»
اسنادہ ضعیف ، رواہ احمد (2 / 26 ح 4800) * فیہ ابو یحیی : لین الحدیث و انظر النھایۃ بتحقیقی (1076) لمزید التحقیق ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: (يَعْظُمُ أَهْلُ النَّارِ) জাহান্নামীদের শরীর অনেক বড় করে দেয়া হবে যাতে তারা তাদের শাস্তি ভালো করে আস্বাদন করতে পারে। তবে তাদেরকে জাহান্নামের ভিতরে বড় করে দেয়া হবে কিন্তু হাশরের ময়দানে তাদেরকে একদম ছোট ছোট করে একত্রিত করা হবে, যেমন পূর্বেও এর আলোচনা গেছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
৫৬৯১-[২৭] ’আবদুল্লাহ ইবনু হারিস ইবনু জাযই (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জাহান্নামের মধ্যে খুরাসানী উটের মতো বিরাট বিরাট সাপ আছে, সেই সাপের একটি একবার দংশন করলে তার বিষ ও ব্যথার ক্রিয়া চল্লিশ বছর পর্যন্ত অনুভব করবে। আর জাহান্নামের মাঝে এমন সব কিছু আছে, যা পালান বাঁধা খচ্চরের মতো। এর একটি একবার দংশন করলে তার বিষ বেদনার ক্রিয়াও চল্লিশ বছর পর্যন্ত অনুভব করবে। (হাদীস দু’টি আহমাদ রিওয়ায়াত করেছেন)
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (بَاب صفةالنار وَأَهْلهَا)
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ الْحَارِثِ بْنِ جَزْءٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ فِي النَّارِ حَيَّاتٍ كَأَمْثَالِ الْبُخْتِ تَلْسَعُ إِحْدَاهُنَّ اللَّسْعَةَ فَيَجِدُ حَمْوَتَهَا أَرْبَعِينَ خَرِيفًا وَإِنَّ فِي النَّارِ عَقَارِبَ كَأَمْثَالِ الْبِغَالِ الْمُؤْكَفَةِ تَلْسَعُ إِحْدَاهُنَّ اللَّسْعَةَ فَيَجِدُ حَمْوَتَهَا أَرْبَعِينَ خَرِيفًا» . رَوَاهُمَا أَحْمد
حسن ، رواہ احمد (4 / 191 ح 17864) [و صححہ ابن حبان (7471 نسخۃ محققۃ) و الحاکم (4 / 593) و وافقہ الذھبی و سندہ حسن]
ব্যাখ্যা: (الْبُخْتِ) খোরাসানী উটকে (بُخْت) বলা হয়। সেই সাপগুলো এত বড় বড় হবে যে, খোরাসানী উটের মতো দেখা যাবে।
(الْبِغَالِ الْمُؤْكَفَةِ) এটা বহুবচন, একবচন হলো (بِغْلَةٌ) অর্থ খচ্চর। আর এখানে (بِغَال) অর্থ হলো সিটওয়ালা বা গদিবিশিষ্ট, অর্থাৎ জাহান্নামের বিচ্ছুগুলোর শরীর এতটাই বড় হবে যে, তাদের পিঠের উপর বসা যাবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)।
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
৫৬৯২-[২৮] হাসান বাসরী (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে আমাদেরকে বর্ণনা করেছেন, তিনি (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন সূর্য ও চাঁদকে দুটি পনীরের আকৃতি বানিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তখন হাসান (রহিমাহুল্লাহ) প্রশ্ন করলেন, তাদের অপরাধ কী? উত্তরে আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) হতে এ সম্পর্কে যা কিছু শুনেছি, তাই বর্ণনা করলাম (এর অধিক কিছু আমি জানি না)। এ কথা শুনার পর হাসান (রহিমাহুল্লাহ) নীরব হয়ে গেলেন। (বায়হাক্বী কিতাবুল বা’সি ওয়ান্ নুশূর)
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (بَاب صفةالنار وَأَهْلهَا)
وَعَن الحسنِ قَالَ: حَدَّثَنَا أَبُو هُرَيْرَةَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الشَّمْسُ وَالْقَمَرُ ثَوْرَانِ مُكَوَّرَانِ فِي النَّارِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» . فَقَالَ الْحَسَنُ: وَمَا ذَنْبُهُمَا؟ فَقَالَ: أُحَدِّثُكَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَسَكَتَ الْحَسَنُ. رَوَاهُ البيهقيُّ فِي «كتاب الْبَعْث والنشور»
صحیح ، رواہ البیھقی فی البعث و النشور (ذکرہ السیوطی فی اللآلی المصنوعۃ 1 / 82) ولہ شاھد عند الطحاوی فی مشکل الآثار (1 / 66 ۔ 67) و سندہ صحیح] ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (ثَوْرَانِ مُكَوَّرَانِ فِي النَّارِ) ثَوْرَانِ অর্থ হলো চন্দ্র ও সূর্য প্রত্যেককেই নিক্ষেপ করা হবে তার আপন কক্ষপথ থেকে জাহান্নামের মধ্যে ভাঁজ করে আলোকহীন অবস্থায়। এটা করা হবে জাহান্নামীদের শাস্তি বাড়ানোর জন্য, কেননা ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল (সা.) বলেন যে, সূর্য ও চন্দ্রের চেহারা আরশের নিচে আর তার পিটটা হলো দুনিয়ার দিকে, হাদীসটি দায়লামী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর কিতাব মুসনাদুন ফিরদাওসে উল্লেখ করেছেন। অতএব স্পষ্ট হয়ে গেল যে, যদি সূর্য ও চন্দ্রের মুখটা দুনিয়ার দিকে করা হত তাহলে দুনিয়াবাসীরা তার তাপ সহ্য করতে পারত না। ইবনুল মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেন যে, এই দুটোকে ভাঁজ করা হবে এবং একত্রিত করা হবে এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)।
(فَقَالَ الْحَسَنُ: وَمَا ذَنْبُهُمَا؟) অর্থাৎ হাসান (রহিমাহুল্লাহ) তাদের অপরাধ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, উত্তরে আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) বললেন যে, রাসূল (সা.) থেকে আমি হাদীস বর্ণনা করেছি। এখানে কোন যুক্তি খাটানো যাবে না। অতএব তিনি চুপ হয়ে গেছেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের বর্ণনা
৫৬৯৩-[২৯] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: হতভাগ্য ছাড়া কোন লোক জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। প্রশ্ন করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! হতভাগ্য কে? তিনি (সা.) বললেন, যে আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি লাভের জন্য আনুগত্য করে না এবং তাঁর অবাধ্যতার কাজ পরিত্যাগ করে না। (ইবনু মাজাহ)
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (بَاب صفةالنار وَأَهْلهَا)
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَدْخُلُ النَّارَ إِلَّا شَقِيٌّ» . قِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَنِ الشَّقِيُّ؟ قَالَ: «مَنْ لَمْ يَعْمَلْ لِلَّهِ بِطَاعَةٍ وَلم يتركْ لَهُ مَعْصِيّة» . رَوَاهُ ابْنُ مَاجَهْ
اسنادہ ضعیف ، رواہ ابن ماجہ (4298) * ابن لھیعۃ مدلس و عنعن ۔
(ضَعِيفٌ)
ব্যাখ্যা: (مَنْ لَمْ يَعْمَلْ لِلَّهِ) যে একমাত্র আল্লাহর জন্য কোন ‘ইবাদাত করে না এবং কোন গুনাহ ছাড়ে না সেই হলো দুর্ভাগা। এ বিষয়ে কুরআনে ইঙ্গিত করা হয়েছে,
وَ اَمَّا مَنۡ خَافَ مَقَامَ رَبِّهٖ وَ نَهَی النَّفۡسَ عَنِ الۡهَوٰی ﴿ۙ۴۰﴾ فَاِنَّ الۡجَنَّۃَ هِیَ الۡمَاۡوٰی ﴿ؕ۴۱﴾ “আর যে ব্যক্তি তার রবের অবস্থানকে ভয় করে এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করা থেকে বিরত থাকে তারই ঠিকানা হলো জান্নাত।” (সূরা আন্ না-যি'আত ৭৯ : ৪০-৪১) অনুরূপ অন্য আয়াতে আসছে,
لَا یَصۡلٰىهَاۤ اِلَّا الۡاَشۡقَی ﴿ۙ۱۵﴾ الَّذِیۡ کَذَّبَ وَ تَوَلّٰی ﴿ؕ۱۶﴾ অর্থাৎ “জাহান্নামে একমাত্র দুর্ভাগাই ঢুকবে যে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে এবং সত্য পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।” (সূরা আল লায়ল ৯২: ১৫-১৬) অতএব এই দুর্ভাগা ব্যক্তি কাফির এবং ফাসিক গুনাহগার মু'মিন যে কেউ হতে পারে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জাহান্নামের সৃষ্টি
৫৬৯৪-[১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়ে (তাদের রবের কাছে) অভিযোগ করল। জাহান্নাম বলল, ব্যাপার কি? আমাকে শুধু অহংকারী ও স্বৈরাচারীদের জন্য ধার্য করা হয়েছে? আর জান্নাত বলল, ব্যাপার কি? আমার মধ্যে শুধুমাত্র দুর্বল, নিম্নস্তরের ও বোকা লোকেরাই প্রবেশ করবে? তখন আল্লাহ তা’আলা জান্নাতকে বললেন, তুমি আমার রহমতের বিকাশ। অতএব আমার বান্দাদের হতে যাকে চাই, আমি তোমার দ্বারা তার প্রতি অনুগ্রহ করব। আর জাহান্নামকে বললেন, তুমি আমার শাস্তির বিকাশ। অতএব আমার বান্দাদের যাকে চাই, আমি তোমার দ্বারা তাকে ’আযাব ও শাস্তি দেব এবং তোমাদের প্রত্যেককে পরিপূর্ণ করা হবে।
অবশ্য জাহান্নাম তখন পর্যন্ত পূর্ণ হবে না; যতক্ষণ না আল্লাহ তা’আলা তাঁর পবিত্র পা তার মধ্যে স্থাপন করবেন। তখন জাহান্নাম বলবে, যথেষ্ট, যথেষ্ট, যথেষ্ট হয়েছে। এ সময় জাহান্নাম পরিপূর্ণ হয়ে যাবে এবং তার এক অংশকে আরেক অংশের সাথে চাপিয়ে দেয়া হবে। মূলত আল্লাহ তা’আলা তাঁর সৃষ্টিজীবের কারো প্রতি সামান্য পরিমাণও অন্যায় করবেন না। আর জান্নাতের ব্যাপার হলো, তার (খালি অংশ পূরণের) জন্য আল্লাহ তা’আলা নতুন নতুন সৃষ্টজীব সৃষ্টি করবেন। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول ( بَاب خلق الْجنَّة وَالنَّار)
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: تَحَاجَّتِ الْجَنَّةُ وَالنَّارُ فَقَالَتِ النَّارُ: أُوثِرْتُ بِالْمُتَكَبِّرِينَ وَالْمُتَجَبِّرِينَ وَقَالَتِ الْجَنَّةُ: فَمَا لِي لَا يَدْخُلُنِي إِلَّا ضُعَفَاءُ النَّاسِ وَسَقَطُهُمْ وَغِرَّتُهُمْ. قَالَ اللَّهُ تَعَالَى لِلْجَنَّةِ: إِنَّمَا أَنْتِ رَحْمَتِي أَرْحَمُ بِكِ مَنْ أَشَاءُ مِنْ عِبَادِي وَقَالَ لِلنَّارِ: إِنَّمَا أَنْتِ عَذَابِي أُعَذِّبُ بِكِ مَنْ أَشَاءُ مِنْ عِبَادِي وَلِكُلِّ وَاحِدَةٍ مِنْكُمَا مِلْؤُهَا فَأَمَّا النَّارُ فَلَا تَمْتَلِئُ حَتَّى يَضَعَ اللَّهُ رِجْلَهُ. تَقُولُ: قَطْ قَطْ قَطْ فَهُنَالِكَ تَمْتَلِئُ وَيُزْوَى بَعْضُهَا إِلَى بَعْضٍ فَلَا يَظْلِمُ اللَّهُ مِنْ خَلْقِهِ أَحَدًا وَأَمَّا الْجَنَّةُ فإِنَّ اللَّهَ ينشئ لَهَا خلقا . مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (4850) و مسلم (36 / 2846)، (7173 و 7175) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: এ অধ্যায়টি জান্নাত ও জাহান্নাম সৃষ্টি করা হয়েছে এই বিষয়ে হাদীস আনা হবে যেমনটিই আহলুস সুন্নাহর মাযহাব, যদিও এর বিপরীত মত পোষণ করে মু'তাযিলা এবং জাহমিয়ারা কিন্তু তাদের এ বিষয়ে কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই।
(تَحَاجَّتِ الْجَنَّةُ وَالنَّارُ) ‘আল্লামাহ্ ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন যে, জান্নাত জাহান্নামের এই ঝগড়া বাস্তবে সরাসরি হয়েছে, কেননা আল্লাহ তা'আলা সমস্ত জড়বস্তুকে কথা বলাতে সক্ষম এটা কোন উদাহরণস্বরূপ কথা নয়।
মুল্লা আলী ক্বারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন যে, অবশ্যই ত্বীবী ঠিক বলেছেন; কেননা দুনিয়ার সমস্ত বস্তুর কথা আল্লাহ তা'আলা বুঝেন যা আমরা বুঝি না। যেমন আল্লাহ কুরআনে বিভিন্ন স্থানে বলেছেন যে, দুনিয়ার সমস্ত জড়বস্তু ও জীব বস্তু যা আছে সকলেই তাসবীহ পড়ে, সালাত আদায় করে এবং তারা আল্লাহকে ভয় করে, যা তোমরা বুঝ না। অতএব এখানে এ রকম ব্যাখ্যা করার কোন দরকার নেই যে, এটা একটা উদাহরণমাত্র। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)।
(سَقَطُهُمْ) যারা নিম্ন শ্রেণির হয় এবং অগ্রহণযোগ্য তুচ্ছ মানুষের নজরে পড়ে যায় বা ছোট নজরে দেখা হয়, তবে এটা অধিকাংশ মানুষের চোখে তারা এমন নগণ্য হবে, কিন্তু আল্লাহর নিকটে তারাই সবচেয়ে বড় হবে।
(وَغِرَّتُهُمْ) এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যাদের দুনিয়াবী বিষয়ে গাফিলতি রয়েছে এবং কোন অভিজ্ঞতা নেই এবং কোন গুরুত্বও নেই। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, দুনিয়াবী বিষয়ে অধিকাংশ জান্নাতবাসীরা হবে বোকা হাবা। আর কাফিরদের ব্যপারে আল্লাহ বলেছেন, “তারা দুনিয়াবী জীবনের বাহ্যিকটা খুব ভালো জানে অথচ তারা আখিরাত থেকে গাফিল”- (সূরা আর রূম ৩০ : ৭)। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহওয়াযী হা. ২৫৬১, শারহুন নাবাবী হা, ২৮৪৬)
(كُلِّ وَاحِدَةٍ مِنْكُمَا مِلْؤُهَا) অর্থাৎ তোমাদের প্রত্যেকের জন্যই ভর্তি করে দেয়া হবে কিন্তু জাহান্নাম সে ক্ষান্ত হবে না বরং বলতে থাকবে আরো কিছু আছে? যখন আল্লাহ তার পা দিবেন তখন জাহান্নাম বলবে, ব্যস ব্যস হয়েছে হয়েছে।
শারহুস্ সুন্নাতে আছে যে, এ হাদীসে কদম পা যা কিছু উল্লেখ করা হলো সবই আল্লাহর সিফাত, যার কোন ব্যাখ্যা করা যাবে না, বিশ্বাস করতে হবে এবং অবস্থা বর্ণনা করা যাবে না। আবার আল্লাহ তা'আলার হাত, পা আঙ্গুল, চোখ, এগুলোর অস্তিত্বও অস্বীকার করা যাবে না। যেমনটি মু'তাযিলা এবং জাহমিয়্যারা করে। (মিরকাতুল মাফাতীহ, ফাতহুল বারী হা. ৪৮৫০)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জাহান্নামের সৃষ্টি
৫৬৯৫-[২] আনাস (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: জাহান্নামে অবিরাম (জিন-ইনসানকে) নিক্ষেপ করা হবে। তখন জাহান্নাম বলতে থাকবে, আরো বেশি কিছু আছে কি? এভাবে ততক্ষণ পর্যন্ত বলতে থাকবে, যতক্ষণ না মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তার মধ্যে নিজের পবিত্র পা রাখবেন। তখন জাহান্নামের একাংশ অপর অংশের সাথে চেপে যাবে এবং বলবে, তোমার মর্যাদা ও অনুগ্রহের শপথ। যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে। আর জান্নাতের মধ্যে লোকেদের প্রবেশের পরও অতিরিক্ত স্থান থেকে যাবে, এমনকি আল্লাহ তা’আলা তার জন্য নতুন নতুন সৃষ্টজীব সৃষ্টি করে তাদেরকে জান্নাতের সেই সমস্ত খালি স্থানে অবস্থান করাবেন। (বুখারী ও মুসলিম)
আর এ প্রসঙ্গে আনাস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস (حُفَّتِ الجنَّةُ بالمكارِه) “জান্নাতকে কষ্টদায়ক জিনিস দ্বারা ঘিরে দেয়া হয়েছে” ’রিকাক’ (সদয় হওয়া) অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে।
الفصل الاول ( بَاب خلق الْجنَّة وَالنَّار)
وَعَنْ أَنَسٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لَا تَزَالُ جَهَنَّمَ يُلْقَى فِيهَا وَتَقُولُ: هَلْ مِنْ مَزِيدٍ؟ حَتَّى يَضَعَ رَبُّ العزَّةِ فِيهَا قدَمَه فينزَوي بَعْضُهَا إِلَى بَعْضٍ فَتَقُولُ: قَطْ قَطْ بِعِزَّتِكَ وَكَرَمِكَ وَلَا يَزَالُ فِي الْجَنَّةِ فَضْلٌ حَتَّى يُنْشِئَ اللَّهُ لَهَا خَلْقًا فَيُسْكِنُهُمْ فَضْلَ الْجَنَّةِ . مُتَّفق عَلَيْهِ وذكرَ حَدِيث أنسٍ: «حُفَّتِ الجنَّةُ بالمكارِه» فِي «كتاب الرقَاق»
متفق علیہ ، رواہ البخاری (7384) و مسلم (38 / 2848)، (7179) 0 حدیث ’’ حفت الجنۃ بالمکارہ ‘‘ تقدم (5160) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: (وَلَا يَزَالُ فِي الْجَنَّةِ فَضْلٌ) জান্নাত সংস্কারের কাজ বাড়তেই থাকবে এমনকি আল্লাহ তার জন্য নতুন সৃষ্টজীব সৃষ্টি করবেন আর তারা জান্নাতের অতিরিক্ত অংশে বসবাস করাবেন।
ইমাম নবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এ হাদীসটির হলো দলীল আহলুস সুন্নাহর নিকট সাওয়াব বা প্রতিদান আ'মালের উপর নির্ভরশীল নয়, বরং কিছু লোককে সৃষ্টি করা হবে এবং কোন আ'মাল ছাড়াই জান্নাতে ঢুকানো হবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী হা, ৪৮৪৮, শাহুন নাবাবী হা, ৩৭, ১৭/২৮৪৮)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জাহান্নামের সৃষ্টি
৫৬৯৬-[৩] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: আল্লাহ তা’আলা যখন জান্নাত তৈরি করলেন, তখন জিবরীল আলায়হিস সালাম-কে বললেন, যাও জান্নাতখানা দেখে আসো। তিনি গিয়ে তা এবং তার অধিবাসীদের জন্য যে সকল জিনিস আল্লাহ তা’আলা তৈরি করে রেখেছেন, সবকিছু দেখে এসে বললেন, হে আল্লাহ! তোমার সম্মানের শপথ! যে কেউ এ জান্নাতের সম্পর্কে শুনবে, সে অবশ্যই তাতে প্রবেশ ( আকাঙ্ক্ষা ) করবে। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা জান্নাতের চতুষ্পর্শ কষ্টসমূহ দ্বারা বেষ্টন করে দিলেন, অতঃপর আবার জিবরীল আলায়হিস সালাম-কে বললেন, হে জিবরীল! আবার যাও এবং পুনরায় জান্নাত দেখে আসো। তিনি গিয়ে তা দেখে এসে বললেন, হে আমার প্রভু! এখন যা কিছু দেখলাম, তার প্রবেশপথ যে,
কষ্টকর। এতে আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে, কেউই তাতে প্রবেশ করবে না। তিনি (সা.) বলেন, অতঃপর আলাহ তা’আলা যখন জাহান্নামকে তৈরি করলেন, তখন বললেন, হে জিবরীল! যাও জাহান্নামটি দেখে আসো, তিনি গিয়ে দেখলেন, অতঃপর এসে বললেন, হে প্রভু! তোমার সম্মানের শপথ! যে কেউ এ জাহান্নামের ভয়ঙ্কর অবস্থার কথা শুনবে, সে কখনো তাতে প্রবেশ করবে না। অতঃপর জাহান্নামের চতুষ্পর্শ্বে আল্লাহ তা’আলা বেষ্টন করলেন প্রবৃত্তির আকর্ষণীয় বস্তু দ্বারা এবং পুনরায় জিবরীল আলায়হিস সালাম -কে বললেন, আবার যাও এবং দ্বিতীয়বার তা দেখে আসো। তিনি গেলেন এবং এবার দেখে এসে বললেন, হে প্রভু! তোমার সম্মানের শপথ করে বলছি, আমার আশঙ্কা হচ্ছে, একজন লোকও তাতে প্রবেশ ব্যতীত অবশিষ্ট থাকবে না। (তিরমিযী, আবূ দাউদ ও নাসায়ী)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ ( بَاب خلق الْجنَّة وَالنَّار)
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لَمَّا خَلَقَ اللَّهُ الْجَنَّةَ قَالَ لِجِبْرِيلَ: اذْهَبْ فَانْظُرْ إِلَيْهَا فَذَهَبَ فَنَظَرَ إِلَيْهَا وَإِلَى مَا أَعَدَّ اللَّهُ لِأَهْلِهَا فِيهَا ثُمَّ جَاءَ فَقَالَ: أَيْ رَبِّ وَعِزَّتِكَ لَا يَسْمَعُ بِهَا أَحَدٌ إِلَّا دَخَلَهَا ثُمَّ حَفَّهَا بالمكارِه ثُمَّ قَالَ: يَا جِبْرِيلُ اذْهَبْ فَانْظُرْ إِلَيْهَا فَذَهَبَ فَنَظَرَ إِلَيْهَا ثُمَّ جَاءَ فَقَالَ: أَيْ رَبِّ وَعِزَّتِكَ لَقَدْ خَشِيتُ أَنْ لَا يَدْخُلَهَا أَحَدٌ . قَالَ: فَلَمَّا خَلَقَ اللَّهُ النَّارَ قَالَ: يَا جبريلُ اذهبْ فانظرْ إِليها فذهبَ فنظرَ إِليها فَقَالَ: أَيْ رَبِّ وَعِزَّتِكَ لَا يَسْمَعُ بِهَا أَحَدٌ فَيَدْخُلُهَا فَحَفَّهَا بِالشَّهَوَاتِ ثُمَّ قَالَ: يَا جبريلُ اذهبْ فانظرْ إِليها فذهبَ فَنَظَرَ إِلَيْهَا فَقَالَ: أَيْ رَبِّ وَعِزَّتِكَ لَقَدْ خَشِيتُ أَنْ لَا يَبْقَى أَحَدٌ إِلَّا دَخَلَهَا . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ
اسنادہ حسن ، رواہ الترمذی (2560 وقال : حسن صحیح) و ابوداؤد (4744) و النسائی (7 / 3 ح 3794) ۔
(حسن)
ব্যাখ্যা: এ হাদীসটি পূর্ববর্তী সহীহ হাদীসটির ব্যাখ্যা, যে জান্নাতকে বেষ্টন করে রাখা হয়েছে। অপছন্দনীয় বস্তু দ্বারা আর জাহান্নামকে বেষ্টন করে রাখা হয়েছে আকর্ষণীয় বস্তু দ্বারা। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ, তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৬/২৫৬০)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জান্নাত ও জাহান্নামের সৃষ্টি
৫৬৯৭-[8] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদেরকে সালাত আদায় করালেন। অতঃপর মিম্বারে উঠলেন এবং মসজিদের কিবলার দিকে হাত দ্বারা ইঙ্গিত করে বললেন, আমি এখন তোমাদেরকে সালাত আদায় করার সময় জান্নাত ও জাহান্নামকে এ দেয়ালের সামনে এক বিশেষ বিশেষ রূপ ও আকৃতিতে দেখতে পেয়েছি, কিন্তু আজকের মতো এত উত্তম এবং এত নিকৃষ্ট এর আগে আর কখনো দেখতে পাইনি। (বুখারী)
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ ( بَاب خلق الْجنَّة وَالنَّار)
عَنْ أَنَسٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صلى بِنَا يَوْمًا الصَّلَاةَ ثُمَّ رَقِيَ الْمِنْبَرَ فَأَشَارَ بِيَدِهِ قِبَلَ قِبْلَةِ الْمَسْجِدِ فَقَالَ: «قَدْ أُرِيتُ الْآنَ مُذْ صَلَّيْتُ لَكُمُ الصَّلَاةَ الْجَنَّةَ وَالنَّارَ مُمَثَّلَتَيْنِ فِي قِبَلِ هَذَا الْجِدَارِ فَلَمْ أَرَ كَالْيَوْمِ فِي الْخَيْر وَالشَّر» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
رواہ البخاری (749) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (مُمَثَّلَتَيْنِ) অর্থাৎ জান্নাত জাহান্নামের সামগ্রিক রূপ এবং বিশ্লেষণমূলক দুটি রূপই দেখেছি।
(فَلَمْ أَرَ كَالْيَوْمِ) অর্থাৎ আজকের মতো ভালোভাবে আর কোন দিন দেখিনি, ভালো ও মন্দ সবকিছু আজকে স্পষ্টভাবে বিস্তারিত দেখেছি। (মিরকাতুল মাফাতীহ, ফাতহুল বারী হা. ৪৭১৯)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৬৯৮-[১] ’ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। তখন তাঁর কাছে বানূ তামীম-এর কিছু লোক আসলো। তিনি (সা.) বললেন, হে বানূ তামীম! তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর। উত্তরে তারা বলল, আপনি শুভ সংবাদ তো শুনিয়েছেন, এবার আমাদেরকে কিছু দান করুন। পরক্ষণে তাঁর কাছে ইয়ামানের কিছু লোক আসলো। তিনি তাদেরকে বললেন, হে ইয়ামানবাসী! শুভ সংবাদ গ্রহণ কর। কেননা বানূ তামীম তা গ্রহণ করেনি। তারা উত্তর দিল, আমরা তা কবুল করলাম। অবশ্য আমরা দীনের বিধান সম্পর্কে কিছু অবহিত হওয়ার জন্য আপনার কাছে উপস্থিত হয়েছি। আমরা এ সৃষ্টির সূচনা সম্পর্কে কিছু অবগত হওয়ার জন্য আপনার কাছে উপস্থিত হয়েছি। আমরা আপনাকে এ সৃষ্টির সূচনা সম্পর্কে প্রশ্ন করতে চাই, সর্বপ্রথম কি ছিল? উত্তরে তিনি (সা.) বললেন, আদিতে একমাত্র আল্লাহই ছিলেন এবং তার আগে কিছুই ছিল না। আর তার আরশ স্থাপিত ছিল পানির উপরে।
অতঃপর তিনি আকাশ ও জমিন সৃষ্টি করেন এবং লাওহে মাহফুযে প্রত্যেক জিনিসের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেন। ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ) বলেন, এ সময় এক লোক এসে আমাকে বলল, হে ’ইমরান! তুমি তোমার উষ্ট্রীর খোঁজ কর, তা তো পালিয়েছে। অতএব আমি তার খোঁজে চলে গেলাম। আল্লাহর শপথ! যদি উষ্ট্রীটি চলে যেত আর আমি তথা হতে উঠে না যেতাম, তাই আমার কাছে প্রিয় ছিল। (বুখারী)
الفصل الاول (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
عَنْ عِمْرَانَ بْنِ حُصَيْنٍ قَالَ: إِنِّي كُنْتُ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذْ جَاءَ قومٌ منْ بَني تميمٍ فَقَالَ: «اقْبَلُوا الْبُشْرَى يَا بَنِي تَمِيمٍ» قَالُوا: بَشَّرْتَنَا فَأَعْطِنَا فَدَخَلَ نَاسٌ مِنْ أَهْلِ الْيَمَنِ فَقَالَ: «اقْبَلُوا الْبُشْرَى يَا أَهْلَ الْيَمَنِ إِذْ لَمْ يَقْبَلْهَا بَنُو تَمِيمٍ» . قَالُوا: قَبِلْنَا جِئْنَاكَ لِنَتَفَقَّهَ فِي الدِّينِ وَلِنَسْأَلَكَ عَنْ أَوَّلِ هَذَا الْأَمْرِ مَا كَانَ؟ قَالَ: «كَانَ اللَّهُ وَلَمْ يَكُنْ شَيْءٌ قَبْلَهُ وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ ثُمَّ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَكَتَبَ فِي الذِّكْرِ كلَّ شيءٍ» ثُمَّ أَتَانِي رَجُلٌ فَقَالَ: يَا عِمْرَانُ أَدْرِكْ ناقتَكَ فقدْ ذهبتْ فانطلقتُ أطلبُها وايمُ اللَّهِ لَوَدِدْتُ أَنَّهَا قَدْ ذَهَبَتْ وَلَمْ أَقُمْ. رَوَاهُ البُخَارِيّ
رواہ البخاری (7418) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: বানূ তামীম আরবের একটি বড় প্রসিদ্ধ গোত্র। তাদের একটি দল রাসূল (সা.) -এর কাছে এলে তিনি তাদেরকে সুসংবাদ গ্রহণের উপদেশ দেন। কিন্তু তারা এই সুসংবাদের প্রকৃত মর্ম বুঝে উঠতে পারেনি। তাই তারা বলে উঠে, সুসংবাদ তো দিলেন, এখন আমাদের দান করুন। তারা সুসংবাদ দ্বারা জাগতিক ও আর্থিক কোন দান বুঝেছে। তাই তারা বাহ্যিক দান চেয়েছে। এটা তাদের দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা ও আগ্রহ এবং আখিরাত থেকে উদাসীন থাকার প্রমাণ বহন করে। প্রবাদে বলা হয়ে থাকে, প্রত্যেক পাত্র তাই ছিটায় যা তার মাঝে থাকে। কুরআনে এই প্রবাদের মর্ম যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে- অর্থাৎ- “প্রত্যেকে তার নিজ নিজ পানি সংগ্রহের স্থান চিনে নিলো”- (সূরা আল বাক্বারাহ্ ২: ৬০)। আরেকটি আয়াতে বলেন- অর্থাৎ “প্রত্যেক সম্প্রদায় নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে আনন্দিত”- (সূরাহ্ আল মু'মিনূন ২৩: ৬০), (সূরাহ্ আবূ রূম ৩০: ৩২)। আল্লামাহ্ ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, হাদীসের অর্থ হলো, তোমরা আমার নিকট হতে এমন জিনিস গ্রহণ করো যা গ্রহণ করলে জান্নাত লাভ করে আনন্দিত হবে। এই জিনিস হলো দীনের বুঝ ও তদনুযায়ী ‘আমাল। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)।
ইবনু হাজার (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, “সুসংবাদ তো দিলেন”; এতে বুঝা যায় তারা মুসলিম ছিল। তবে তারা দুনিয়া কামানোর আশা করেছে এবং আখিরাত কামানো থেকে উদাসীন রয়েছে। তবে নবী (সা.) তাদের ওপর রাগ এবং সুসংবাদ গ্রহণ করাকে অস্বীকৃতির কারণ হলো, রাসূল (সা.) তাদের জ্ঞানের অভাব এবং যোগ্যতার অভাব টের পেয়েছেন; কেননা তারা তাদের আশাকে অস্থায়ী দুনিয়ার সাথে জুড়ে দিয়েছে এবং দীন অর্জন করে আখিরাতের স্থায়ী বিনিময় গ্রহণ করা থেকে পিছু হটেছে।
কিরমানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, তাদের কথা “সুসংবাদ তো দিলেনই”; এর দ্বারা বুঝা যায়, তারা রাসূল (সা.) -এর কথা পুরোপুরি অগ্রাহ্য করেছে এমন নয়। বরং মোটামুটিভাবে তা গ্রহণ করেছে। কিন্তু এর সাথে তারা কিছু দুনিয়ার বস্তু চেয়েছে। তাই তাদের গ্রহণ করাকে ঢালাওভাবে নাকচ করা নয়। তারপরও রাসূল (সা.)-এর রাগ করার কারণ হলো, তারা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পূর্ণাঙ্গরূপে কবুল করেনি। যার কারণে তারা মৌলিক বিষয়ে প্রশ্ন করার বেলায় গুরুত্ব দেয়নি। অথচ তাদের উচিত ছিল কালিমায়ে তাওহীদের তাৎপর্য, ইহকাল, পরকাল এবং তার ওয়াজিব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা এবং এগুলো ধারণ করা। (ফাতহুল বারী, অধ্যায়: তাওহীদ, হা. ৬৯৮২)
(اقْبَلُوا الْبُشْرَى يَا أَهْلَ الْيَمَنِ...) “তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো হে ইয়ামানবাসী...।” বানূ তামীম-এর উত্তর রাসূল (সা.)-এর পছন্দ না হওয়াতে তিনি ইয়ামানবাসীদের প্রতি লক্ষ্য করে বলেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো। তারা উত্তরে বলল, আমরা গ্রহণ করলাম। আমরা তো এসেছি দীনের জ্ঞান অর্জনের জন্য এ বিষয়ের সূচনা সম্পর্কে আপনার কাছে জিজ্ঞাসার জন্য। অর্থাৎ তাদের আসার কারণ ছিল দুটি। [এক] দীনী জ্ঞান অর্জন, [দুই] পৃথিবীর সূচনা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ। দীনী জ্ঞান অর্জনের প্রতি উৎসাহিতকারী আয়াত তাদের আগমনের কারণ হতে পারে। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেন
(فَلَوۡ لَا نَفَرَ مِنۡ کُلِّ فِرۡقَۃٍ مِّنۡهُمۡ طَآئِفَۃٌ لِّیَتَفَقَّهُوۡا فِی الدِّیۡنِ وَ لِیُنۡذِرُوۡا قَوۡمَهُمۡ اِذَا رَجَعُوۡۤا اِلَیۡهِمۡ لَعَلَّهُمۡ یَحۡذَرُوۡنَ) “তাদের প্রত্যেক দলের একটি অংশ কেন বের হলো না, যাতে তারা দীনের জ্ঞান লাভ করে এবং সংবাদ দান করে স্বজাতিকে, যখন তারা তাদের কাছে প্রত্যাবর্তন করবে, যেন তারা বাঁচতে পারে।” (সূরাহ্ আত্ তাওবাহ্ ৯: ১২২)
অর্থাৎ এ আয়াত আমাদেরকে আপনার কাছে আসতে উদ্বুদ্ধ করেছে। দীনী জ্ঞান অর্জনের বেলায় তাদের নিয়্যাত বিশুদ্ধ ও নির্ভেজাল ছিল। দুনিয়ার কোন লোভ তাদের মাঝে ছিল না। তাই তাদের জন্য সুসংবাদ, দীন কবুল, দীনের জ্ঞান, তদনুযায়ী আমাল ও লক্ষ্যে পৌছা সবই হয়েছে। আর প্রথম দল সুসংবাদ থেকে বঞ্চিত থাকার সাথে সাথে দুনিয়ার তুচ্ছ স্বার্থ অর্জন থেকেও বঞ্চিত থেকেছে। অতএব উচ্চ সাহস ও নিয়্যাতই মানুষকে উচ্চ মর্যাদায় পৌছায়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
তাদের আসার দ্বিতীয় কারণটি ছিল, পৃথিবীর সূচনা ও সৃষ্টির সূচনা সম্পর্কে জানা। অর্থাৎ সূচনালগ্নে এই পৃথিবীর অবস্থা ও সৃষ্টির অবস্থা কী ছিল? রাসূল (সা.) এর উত্তরে বলেন, আল্লাহ তা'আলা ছিলেন এবং তার পূর্বে কিছুই ছিল না। অর্থাৎ অনাদি অনন্তকাল থেকে তিনি ছিলেন। তাঁর কোন সূচনা ও শেষ নেই। তিনি সর্বদা আছেন এবং সর্বদা থাকবেন। সৃষ্টি ও পরিবর্তনের গুণ তার মাঝে নেই। বরং এগুলো বান্দা ও সৃষ্টির গুণ। তার পূর্বে কিছু ছিল না। কেননা তিনি প্রত্যেক জিনিসের স্রষ্টা এবং অস্তিত্বের ধারণকারী। অতএব কোন বস্তু তার পূর্বে বিদ্যমান থাকা সম্ভব নয়। মোটকথা, প্রত্যেক বস্তুর পূর্বে যিনি ছিলেন তিনি মহান আল্লাহ তা'আলা। তার পূর্বে না কিছু ছিল, আর না কোন কিছু থাকা সম্ভব। তিনি অনাদি তার শুরু নেই। তিনি সর্বশেষ তার সমাপ্তি নেই। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)।
কুরআনে এ মর্মটি যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে
(هُوَ الۡاَوَّلُ وَ الۡاٰخِرُ وَ الظَّاهِرُ وَ الۡبَاطِنُ ۚ وَ هُوَ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمٌ) “তিনিই প্রথম, তিনিই সর্বশেষ, তিনিই প্রকাশমান ও অপ্রকাশমান এবং তিনি সব বিষয়ে সম্যক পরিজ্ঞাত।” (সূরা আল হাদীদ ৫৭ : ৩)
(وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ) “তার ‘আরশ পানির উপর ছিল।” এটা হলো সৃষ্টির সূচনা। আল্লাহ তা'আলার পূর্বে কোন সৃষ্টি ছিল না। আবার তার কোন পূর্ব নেই। তিনি অনাদি অনন্ত। তবে তিনি সর্বপ্রথম সৃষ্টির সূচনা করেন ‘আরশ ও পানির দ্বারা। আসমান জমিন সৃষ্টির পূর্বেই এ দুইয়ের সৃষ্টি করেছেন। তবে এ দুয়ের মাঝে পানি আগে সৃষ্টি বলে ইঙ্গিত বহন করে। তবে সহীহ সনদে তিরমিযীতে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে- (إنَّ أَوَّلَمَا خَلَقَ اللَّهُ الْقَلَمَ فَقَالَ لَهُ اكْتُبْ) “আল্লাহ তা'আলা সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করে তাকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, লিখ।” (তিরমিযী- অধ্যায়: তাফসীর, সূরাহ্ কলমের তাফসীর অনুচ্ছেদ)
এ হাদীসে বুঝা যায় প্রথম সৃষ্টি কলম। উভয় হাদীসের সমন্বয়ে ‘উলামায়ে কিরাম বলেন, কলমের প্রথম সৃষ্টি তুলনামূলক। অর্থাৎ ‘আরশ ও পানির পর সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করা হয়েছে। অথবা এ হাদীসে কলম প্রথম সৃষ্টি তা বলা হয়নি। বরং প্রথম সৃষ্টির পর সর্বপ্রথম তাকে যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে সেটি ছিল, লিখ। আবূল আ'লা আল হামদানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, প্রথম সৃষ্টি ‘আরশ নাকি কলম; এ ব্যাপারে ‘উলামাদের দুটি মত রয়েছে অধিকাংশের মতে ‘আরশ প্রথমে সৃষ্টি করা হয়েছে। (ফাতহুল বারী ৬/২৮৯)
(لَوَدِدْتُ أَنَّهَا قَدْ ذَهَبَتْ وَلَمْ أَقُمْ) “আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল যদি একেবারে চলে যেত আর আমি উঠতাম না।”
উষ্ট্রির রশি ছুটে উষ্ট্রি চলে গেছে। তাকে পাওয়ার আশায় আমাকে রাসূল (সা.)-এর মাজলিস ছেড়ে আসতে হলো। এর চেয়ে যদি উষ্ট্রিটি একেবারে চলে যেত এবং পাওয়ার আশা থাকত না, সেটাই ভালো হত। কেননা পাওয়ার আশা না থাকলে উঠতাম না এবং ইয়ামানবাসীদের সাথে রাসূল (সা.) ও বাকী কথাগুলো শুনা থেকে বঞ্চিত থাকতাম না।
(بَشَّرْتَنَا فَأَعْطِنَا) তারা এ কথা বলার দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, তারা আখিরাতের উপর দুনিয়াকে প্রাধান্য দিয়ে ফেলেছে, তাই রাসূলুল্লাহ (সা.) ইয়ামানবাসীদেরকে বললেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর যেহেতু বানূ তামীম গ্রহণ করল না।
(كَانَ اللَّهُ) আল্লাহ অনন্তকাল থেকেই ছিলেন এবং থাকবেন কোন প্রকার পরিবর্তন পরিবর্ধন ছাড়াই।
(وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ) এ কথাটি স্পষ্ট দলীল বহন করে যে, ‘আরশ এবং পানি আসমান জমিন সৃষ্টির পূর্বেই তিনি সৃষ্টি করেছেন।
ইবনু হাজার (রহিমাহুল্লাহ) বলেন যে, এখানে পানি দ্বারা সমুদ্রের পানি উদ্দেশ্য নয় বরং এটা ‘আরশের নিচের পানি, আল্লাহ ভালো জানেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৬৯৯-[২] ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের মাঝে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিলেন, এতে তিনি সৃষ্টির সূচনা হতে জান্নাতবাসীদের তাদের বাসস্থানে প্রবেশ এবং জাহান্নামীদের তাদের শাস্তির স্থলে প্রবেশ পর্যন্ত আলোচনা করলেন। সে আলোচনা যে স্মরণ রাখার সে স্মরণ রেখেছে, আর যে ভোলার সে ভুলে গেছে। (বুখারী)
الفصل الاول (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَن عمر قَالَ: قَامَ فِينَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَقَامًا فَأَخْبَرَنَا عَنْ بَدْءِ الْخَلْقِ حَتَّى دَخَلَ أَهْلُ الْجَنَّةِ مَنَازِلَهُمْ وَأَهْلُ النَّارِ مَنَازِلَهُمْ حَفِظَ ذَلِكَ مَنْ حَفِظَهُ وَنَسِيَهُ مَنْ نسيَه . رَوَاهُ البُخَارِيّ
رواہ البخاری (3192) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (قَامَ فِينَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَقَامًا) “রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের মাঝে দাঁড়ালেন।” (مَقَامًا) শব্দটি ব্যাকরণে মাসদার। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, রাসূল (সা.)-এর দাঁড়ানোটা বিরাট গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি দাঁড়িয়ে সৃষ্টির সূচনা ও সমাপ্তির বর্ণনা দিলেন। অর্থাৎ জান্নাত প্রবেশ পর্যন্ত তার সমস্ত উম্মাতের অবস্থা তুলে ধরলেন। উম্মতের মাঝে কাদের জন্য কল্যাণ এবং কাদের জন্য অকল্যাণ লেখা হয়েছে, কারা কল্যাণ নিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং অকল্যাণ নিয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে তাদেরকে নির্দিষ্ট করে দিলেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
ইবনু হাজার (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, (فَأَخْبَرَنَا عَنْ بَدْءِ الْخَلْقِ حَتَّى) “আমাদেরকে খবর দিলেন এমনকি...” অর্থাৎ পৃথিবীর সূচনার কথা একের পর এক বলতে থাকলেন। এমনকি মানুষের সর্বশেষ ঠিকানা ও অবস্থান জান্নাত ও জাহান্নামের কথা বলে শেষ করলেন। কারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং কারা জাহান্নামে; ভবিষ্যতের এ কথাকে (دخل) তথা অতিতকালের ক্রিয়া দিয়ে ব্যক্ত করার কারণ হলো নিশ্চয়তা বুঝানো। কেননা ভবিষ্যতের নিশ্চিত কর্মকে অতিতকালের ক্রিয়া দ্বারা ব্যক্ত করার প্রচলন রয়েছে এবং এতে নিশ্চয়তার অর্থ রয়েছে। (ফাতহুল বারী হা. ৬/২৯০)
(فَأَخْبَرَنَا عَنْ بَدْءِ الْخَلْقِ) তিনি শুরু এবং শেষের সমস্ত বর্ণনা দিলেন। এমনকি জান্নাতীরা জান্নাতে প্রবেশ করার আগ পর্যন্ত আর জাহান্নামীগণ জাহান্নামে প্রবেশ করা এবং সেখানকার অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দিলেন। ইবনু হাজার (রহিমাহুল্লাহ) বলেন যে, একই মাজলিসে সৃষ্টিজীবের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত বর্ণনা দেয়াটা রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর মু'জিযা মাত্র। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭০০-[৩] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তা’আলা সমস্ত সৃষ্টজীব সৃষ্টি করার পূর্বে এটা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন যে, আমার রহমত আমার গজবের উপর সর্বদাই অগ্রগামী। আর এ বাক্যটি তাঁর কাছে আরশের উপরে লিখিতভাবে রয়েছে। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى كَتَبَ كِتَابًا قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَ الْخَلْقَ: إِنَّ رَحْمَتِي سَبَقَتْ غَضَبِي فَهُوَ مَكْتُوب عِنْده فَوق الْعَرْش . مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (7554) و مسلم (14 / 2751)، (6969) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: (إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى كَتَبَ كِتَابًا) “আল্লাহ তা'আলা একটি কিতাব লিখেন মাখলুক সৃষ্টির পূর্বে।” এই কিতাব বা লিখনি দ্বারা লাওহে মাহফুয উদ্দেশ্য। অর্থাৎ মাখলুক সৃষ্টির পূর্বে তিনি লাওহে মাহফুযে যে কথাটি লিখে রাখেন সেটি হচ্ছে, আমার রহমত রাগের উপর প্রাধান্য পেয়েছে। অর্থাৎ রাগের তুলনায় রহমতের সংখ্যা ও রহমত সংশ্লিষ্ট বস্তু বেশি।
সারকথা; বান্দার প্রতি তাঁর কল্যাণের ইচ্ছা, নি'আমাত প্রদান, প্রতিদান দান, বান্দার জন্য অকল্যাণ কামনা ও শাস্তি প্রদানের তুলনায় বেশি। কেননা তাঁর রহমত ব্যাপক ও বিস্তৃত। অপরদিকে তাঁর বিশেষ রহমত বিশেষ ক্ষেত্রে প্রযোজিত। যেমন ‘আর রহমানুর রহীম’-এর বেলায় বলা হয়, তাঁর ‘রহমান’ গুণের রহমত বা দয়া মু'মিন কাফির সবার জন্য বিস্তৃত। এমনকি সমস্ত সৃষ্টির জন্য তার এই রহমত। এ কারণেই ‘রহমান' শব্দকে আল্লাহ তা'আলা ছাড়া কারো বেলায় প্রয়োগ করা বৈধ নয়।
(فَهُوَ مَكْتُوب عِنْده فَوق الْعَرْش) “তা আল্লাহর কাছে ‘আরশের উপর লিখিত।” ফাতহুল বারীতে রয়েছে, এর দ্বারা ইঙ্গিত হলো লাওহে মাহফুযের অবস্থান ‘আরশের উপরে। (১৩/৫২৬)
মিরকাত প্রণেতা বলেন, এর মর্ম হলো, লাওহে মাহফুযের লিখনি ও বর্ণনা সমস্ত সৃষ্টির আড়ালে এবং তা বুঝা মানুষের ক্ষমতার বাহিরে। কেউ কেউ বলেন, এর উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ তা'আলার জ্ঞানে এই বাক্য লিপিবদ্ধ। তবে লাওহে মাহফুযের কিছু কিছু বিষয় সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা তার বান্দার মাঝে যাকে ইচ্ছা তাকে অবগত করেন। যেমন মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ), নবীগণ, বিশেষ বিশেষ ওয়ালীদেরকে কিছু কিছু বিষয় অবগত করানো হয়ে থাকে। বিশেষ করে ইসরাফীল (আঃ)। কেননা তিনি এর দায়িত্বশীল। তিনি লাওহে মাহফুযের বিষয়কে নিয়ে জিবরীল, মীকাঈল এবং মালাকুল মাওতকে নির্দেশ দেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)।
(إِنَّ رَحْمَتِي سَبَقَتْ) নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন যে, আল্লাহর রাগ ও তার সন্তুষ্টি আনুগত্যশীলদেরকে প্রতিদান দেয়া আর গুনাহগারদেরকে শাস্তি দেয়ার মাধ্যমে তিনি প্রকাশ করেন। অতএব এখানে দয়া রাগের উপর প্রাধান্য পাওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যে, তার দয়াটা অধিক এবং ব্যাপক। আর তা ছাড়াও আল্লাহর দয়া দুনিয়াতে ব্যাপক, তিনি কাফির মুশরিক সকলকে রিযক দান করছেন, অনুরূপভাবে তিনি সকলকে বাতাস পানি ইত্যাদি সকলকে সমানভাবে দিচ্ছেন। অতএব স্পষ্ট হলো যে, তার দয়া তার রাগের উপর প্রাধান্য পেয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭০১-[8] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাদের)-কে নূরের দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে। আর জিন্ জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে ধোঁয়া মিশ্রিত অগ্নিশিখা হতে এবং আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে ঐ বস্তু দ্বারা, যার বর্ণনা (কুরআনে) তোমাদেরকে বলা হয়েছে। (মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنْ عَائِشَةَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «خُلِقَتِ الْمَلَائِكَةُ مِنْ نُورٍ وَخُلِقَ الْجَانُّ مِنْ مَارِجٍ مِنْ نَارٍ وَخُلِقَ آدَمُ مِمَّا وصف لكم» . رَوَاهُ مُسلم
رواہ مسلم (60 / 2996)، (7495) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (خُلِقَتِ الْمَلَائِكَةُ مِنْ نُورٍ) “মালায়িকাহ্ সৃষ্টি করা হয়েছে নূর দিয়ে”। মালাক (ফেরেশতা) আল্লাহ তা'আলার এক মহান সৃষ্টি যারা না পুরুষ, না মহিলা। তারা খায় না, পান করে না, বিবাহ করে না, তাদের সন্তান হয় না। মালায়িকা’র আলোচনা নবীর আগে নিয়ে আসার অর্থ এই নয় যে, মালায়িকাহ নবীদের থেকে উত্তম। বরং সৃষ্টির ক্ষেত্রে তারা আগের এবং কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে নবীদের আগে তাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন –
( ؕ کُلٌّ اٰمَنَ بِاللّٰهِ وَ مَلٰٓئِکَتِهٖ وَ کُتُبِهٖ) (وَ مَنۡ یَّکۡفُرۡ بِاللّٰهِ وَ مَلٰٓئِکَتِهٖ وَ کُتُبِهٖ وَ رُسُلِهٖ) (وَ لٰکِنَّ الۡبِرَّ مَنۡ اٰمَنَ بِاللّٰهِ وَ الۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ وَ الۡمَلٰٓئِکَۃِ وَ الۡکِتٰبِ وَ النَّبِیّٖنَ ۚ) “...তারা সবাই আল্লাহর ওপর, তাঁর মালায়িকাহ্'র (ফেরেশতাদের) ওপর, তাঁর কিতাবসমূহের ওপর এবং রাসূলগণের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে...”- (সূরাহ্ আল বাকারাহ্ ২: ২৮৫)। “...যে ব্যক্তি আল্লাহকে ও তার মালায়িকাহ্’কে, তাঁর কিতাবসমূহকে, তাঁর রাসূলগণকে এবং শেষ দিবসকে অস্বীকার করে...”- (সূরা আন্ নিসা ৪: ১৩৬)। “...বরং কল্যাণ আছে এতে যে, কোন ব্যক্তি ঈমান আনবে আল্লাহ, শেষ দিবস, মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ), কিতাবসমূহ ও নবীগণের প্রতি...”- (সূরা আল বাক্বারাহ্ ২:১৭৭)।
আর জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত হজ্জের বিবরণের দীর্ঘ হাদীসে রাসূল (সা.) ও বলেছেন- (اِبْرَؤُوابِمَابَدَأَ اللَّهُ بِهِ) অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা যা দিয়ে শুরু করেছেন তোমরাও তা দিয়ে শুরু করো।”
(সহীহ মুসলিম অধ্যায়: হজ্জ, অনুচ্ছেদ: নবী (সা.) এ-এর হজ্জ, হা. ২১৩৭)
তাছাড়া তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের মাঝে খবর আদান প্রদানের মাধ্যম। তাই আল্লাহ তা'আলার পর তাদের নাম এবং পরে নবীদের নাম আসাটা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু এর দ্বারা তারা নবী ও রাসূলদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এটা আবশ্যক হয় না। (ফাতহুল বারী হা. ৬/৩০৬)
কুরআনের বিবরণ মতে, মালাক ডানাবিশিষ্ট। আল্লাহ তা'আলা বলেন (اَلۡحَمۡدُ لِلّٰهِ فَاطِرِ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ جَاعِلِ الۡمَلٰٓئِکَۃِ رُسُلًا اُولِیۡۤ اَجۡنِحَۃٍ مَّثۡنٰی وَ ثُلٰثَ وَ رُبٰعَ ؕ)
“সমস্ত প্রংসা আল্লাহর, যিনি আসমান ও জমিনের স্রষ্টা এবং মালায়িকাকে করেছেন বার্তাবাহক যারা দুই, তিন ও চার পাখাবিশিষ্ট।” (সূরা আল ফা-ত্বির ৩৫ : ১)।
তারা পাখা দিয়ে উড়তে পারে আবার মানবরূপ ধারণ করতে পারে। তারা কোন পাপ করে না। আল্লাহ তাদেরকে যা নির্দেশ দেন তারা তাই করে। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বিভিন্ন দায়িত্ব দিয়ে রেখেছেন। এই মালাক নূরের সৃষ্টি আমরা কেবল এটুকু জানি। নূরের অবস্থা বা ধরণ সম্পর্কে আমাদেরকে জানানো হয়নি।
(وَخُلِقَ الْجَانُّ مِنْ مَارِجٍ مِنْ نَارٍ) الْجَانُّ অর্থাৎ জিন্। জিন্ দ্বারা জিন জাতি উদ্দেশ্য। কারো কারো মতে, জিনদের পিতা উদ্দেশ্য। আদমের বিপরীতে এই অর্থই উপযুক্ত। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
ইমাম নবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, (الْجَانُّ) অর্থাৎ জিন্। আর (مَارِجٍ) কালো ধোঁয়া মিশ্রিত অগ্নি।
(নবাবীর ব্যাখ্যাগ্রন্থ)।
সূরা আর রহমানে রয়েছে, (وَ خَلَقَ الۡجَآنَّ مِنۡ مَّارِجٍ مِّنۡ نَّارٍ) অর্থাৎ “তিনি জিনকে অগ্নিশিখা থেকে সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা আর রহমান ৫৫ : ১৫)।
অন্য আয়াতে রয়েছে, (وَ الۡجَآنَّ خَلَقۡنٰهُ مِنۡ قَبۡلُ مِنۡ نَّارِ السَّمُوۡمِ) অর্থাৎ “আর আমি জিনকে আগুনের লেলিহান শিখা থেকে সৃষ্টি করেছি।” (সূরাহ আল হিজর ১৫ :২৭)।
(وَخُلِقَ آدَمُ مِمَّا وصف لكم) “আর আদম-এর সৃষ্টি যেভাবে তোমাদেরকে বিবরণ দেয়া হয়েছে।” অর্থাৎ আদম মাটির সৃষ্টি এটা তোমাদের জানা। আল্লাহ তোমাদেরকে কুরআনে এর বিবরণ যেভাবে দিয়েছেন তা দিয়েই আদমের সৃষ্টি। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন- (خَلَقَهٗ مِنۡ تُرَابٍ) “তিনি তাকে মাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন”- (সূরাহ আ-লি ইমরান ৩ : ৫৯)। অন্য আয়াতে রয়েছে, (خَلَقَ الۡاِنۡسَانَ مِنۡ صَلۡصَالٍ کَالۡفَخَّارِ) “তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন পোড়া মাটির ন্যায় শুষ্ক মৃত্তিকা থেকে”- (সূরা আর রহমান ৫৫ : ১৪)। আরেক আয়াতে রয়েছে, (وَ لَقَدۡ خَلَقۡنَا الۡاِنۡسَانَ مِنۡ صَلۡصَالٍ مِّنۡ حَمَاٍ مَّسۡنُوۡنٍ) “আমি মানবকে পচা কর্দম থেকে তৈরি বিশুষ্ক ঠনঠনে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছি”- (সূরাহ্ আল হিজর ১৫ : ২৬)। অন্য আয়াতে রয়েছে, (اِنِّیۡ خَالِقٌۢ بَشَرًا مِّنۡ طِیۡنٍ) “নিশ্চয় আমি মাটি থেকে মানুষ সৃষ্টি করছি”- (সূরাহ্ আস্ সোয়াদ ৩৮ : ৭১)।
এভাবে কুরআনে বিষয়টি অনেক বেশি বর্ণনা হওয়া ও সবার কাছে স্পষ্ট থাকার দরুন নবী (সা.) এ বিষয়টি অস্পষ্ট রেখেছেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭০২-[৫] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আল্লাহ তা’আলা যখন জান্নাতে আদম (আঃ)-এর দেহ আকৃতি তৈরি করলেন এবং যতদিন ইচ্ছা তিনি এ অবস্থায় রেখে দিলেন, তখন ইবলীস উক্ত আকৃতির চতুস্পার্শ্বে ঘোরাফেরা করত এবং তার প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। অতঃপর যখন সে দেখতে পেল তার মধ্যস্থল শূন্য, তখন সে বুঝতে পারল যে, এটা এমন একটি সৃষ্টিজীব যে নিজেকে আয়ত্তে রাখতে পারবে না। (মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنْ أَنَسٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَمَّا صَوَّرَ اللَّهُ آدَمَ فِي الْجَنَّةِ تَرَكَهُ مَا شَاءَ أَنْ يَتْرُكَهُ فَجَعَلَ إِبْلِيسُ يُطِيفُ بِهِ يَنْظُرُ مَا هُوَ فَلَمَّا رَآهُ أَجْوَفَ عَرَفَ أَنَّهُ خُلِقَ خَلْقًا لَا يتمالَكُ» . رَوَاهُ مُسلم
رواہ مسلم (111 / 2611)، (6649) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: “যখন আল্লাহ তা'আলা আদমকে জান্নাতে সৃষ্টি করলেন।” তূরিবিশতী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমার কাছে হাদীসটি অত্যন্ত জটিল মনে হয়; কেননা কুরআন ও হাদীস থেকে প্রমাণিত যে, আল্লাহ তা'আলা আদমকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। আর যখন তিনি জান্নাতে প্রবেশ করেন তখন তিনি একজন জীবন্ত মানুষ। কুরআনের স্পষ্ট বাণী এ কথার সমর্থন করে। আল্লাহ তা'আলা বলেন (وَ قُلۡنَا یٰۤاٰدَمُ اسۡکُنۡ اَنۡتَ وَ زَوۡجُکَ الۡجَنَّۃَ) “আর আমি বললাম, হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করো”- (সূরাহ্ আল-বাকারা ২ : ৩৫)। তবে মাটি থেকে সৃষ্টি ও জান্নাতে আকৃতি প্রদানের মধ্যে মূলত কোন বৈপরীত্য নেই। কেননা মাটি থেকে অংশ নেয়া হয়েছে, তারপর তাকে খামীরের মতো করা হয়েছে, তারপর শুকানোর জন্য আরো কিছু দিন রাখা হয়েছে, এভাবে কয়েকটি ধাপ যাওয়ার পর যখন মানবিক রূপ গ্রহণের উপযুক্ত হয়েছে তখন তাকে জান্নাতে নিয়ে আকৃতি দেয়া ও তার মাঝে আত্মা ফুকা হয়েছে। আর উপরোক্ত আয়াত অর্থাৎ “আর আমি বললাম, হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করো।” এখানে এমন কিছু বুঝায় না যে, তার মাঝে আত্মা ফুকার পর তাকে জান্নাতে প্রবেশ করতে বলা হয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)।
(تَرَكَهُ مَا شَاءَ أَنْ يَتْرُكَهُ) অর্থাৎ জান্নাতের যে কোন জায়গায় তাকে বিচরণ করতে ছেড়ে দিলেন। তবে নির্দিষ্ট গাছের কাছে যাওয়া নিষেধের ঘটনা আমাদের কাছে প্রসিদ্ধ। তাই প্রকৃত অর্থ হবে, নিষিদ্ধ সেই গাছ ব্যতীত জান্নাতের যে কোন জায়গায় তার বিচরণের অনুমোদন ছিল।
(فَجَعَلَ إِبْلِيسُ يُطِيفُ بِهِ يَنْظُرُ مَا هُوَ) অর্থাৎ ইবলীস প্রথমে আদমকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করল; যাতে তার ষড়যন্ত্র বিফলে না হয়ে যায়।
(فَلَمَّا رَآهُ أَجْوَفَ عَرَفَ أَنَّهُ خُلِقَ خَلْقًا لَا يتمالَكُ) অর্থাৎ যখন দেখলো আদম পেটবিশিষ্ট, তখনই সে বুঝে নিলো তাকে এমনভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে যে, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। তার মাঝে শক্তি ও দঢ়তা থাকবে না। বরং প্রতিজ্ঞা নড়বড়ে হবে, অবস্থা পরিবর্তনশীল হবে এবং বিপদ আপদের সম্মুখীন হবে। কেউ কেউ বলেন, ইবলীস বুঝে নিলো, এই সৃষ্টি প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। কারো কারো মতে এর অর্থ: এই সৃষ্টি প্ররোচনা বারণ করতে পারবে না। কেউ কেউ বলেন, রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭০৩-[৬] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ইবরাহীম আলায়হিস সালাম স্বয়ং স্বীয় হাতে নিজের খৎনা করেছেন ’কদূম’ দ্বারা এবং তখন তার বয়স ছিল আশি বছর। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اخْتَتَنَ إِبْرَاهِيمُ النَّبِيُّ وَهُوَ ابْنُ ثَمَانِينَ سَنَةً بِالْقَدُومِ» . مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (3356) و مسلم (151 / 2370)، (6141) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: বর্ণিত হাদীস থেকে খতনার গুরুত্ব এবং তা ইবরাহীম আলায়হিস সালাম থেকে শুরু হয়েছে মর্মে প্রমাণ পাওয়া যায়। কেননা এর পূর্ব থেকে এই সুন্নাতের নির্দেশ থাকলে ইবরাহীম আলায়হিস সালাম ছোট বেলায়ই খতনা করতেন।
ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ) তার মুয়াত্ত্বায় সা'ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব থেকে এ ব্যাপারে একটি আসার বর্ণনা করেছেন। আসারটিতে রয়েছে- (كَانَ إِبْرَاهِيمُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَوَّلَ انَّاسِ ضَيَّفَ الضَّيْفَ وَأَوَّلَ النَّاسِ اخْتَتَنَ) “ইবরাহীম আলায়হিস সালাম যিনি সর্বপ্রথম মেহমানের মেহমানদারী করেন এবং তিনি সর্বপ্রথম খতনা করেন।”
(মুয়াত্তা মালিক- অধ্যায়: স্বভাবজাত সুন্নাতের বিবরণ, হা. ৩৪০৮) ইবরাহীম আলায়হিস সালাম -কে যখন এই খতনার নির্দেশ দেয়া হয় তখন তাঁর বয়স আশি বছর হয়েছে বলে হাদীসটিতে বর্ণিত হয়েছে। কোন কোন বর্ণনায় একশত বিশ বছরের কথা বলা হয়েছে। তবে আশি বছরের বর্ণনাই অধিক বিশুদ্ধ। (قَدُومِ) শব্দটি ‘দাল’ অক্ষরে তাশদীদ এবং তাশদীদ ছাড়া দু'ভাবে উচ্চারিত হয়। যার অর্থ: কুড়াল। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭০৪-[৭] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ইবরাহীম আলায়হিস সালাম তিনবার ছাড়া আর কখনো মিথ্যা বলেননি। এর মধ্যে দু’বার ছিল শুধু আল্লাহ তা’আলার (সত্তার ক্ষেত্রে) জন্য। যেমন- তিনি বলেছেন, ’আমি অসুস্থ’ এবং তার অপর কথাটি হলো, বরং তাদের এই বড় মূর্তিটিই এটা করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, একদিন ইবরাহীম আলায়হিস সালাম ও তাঁর স্ত্রী সারা এক অত্যাচারী শাসনকর্তার এলাকায় (মিসরে) এসে পৌছলেন। শাসনকর্তাকে খবর দেয়া হলো যে, এখানে একজন লোক এসেছে, তার সাথে আছে অতি সুন্দরী এক রমণী। রাজা তখন ইবরাহীম আলায়হিস সালাম -এর কাছে (লোক) পাঠাল। সে তাঁকে প্রশ্ন করল, এই মহিলাটি কে? ইবরাহীম আলায়হিস সালাম জবাব দিলেন, আমার দীনী ভগ্নি। অতঃপর ইবরাহীম আলায়হিস সালাম সারার কাছে এসে বললেন, হে সারা! যদি এই যালিম জানতে পারে যে, তুমি আমার স্ত্রী তাহলে সে তোমাকে আমার কাছে থেকে বলপূর্বক ছিনিয়ে নেবে। অতএব যদি সে তোমাকে প্রশ্ন করে, তখন বলে দেবে তুমি আমার বোন। মূলত তুমি আমার দীনী বোন। প্রকৃত আমি এবং তুমি ছাড়া এই জমিনের উপর আর কোন মুমিন নেই। রাজা এবার সারা’র নিকট (তাকে আনার জন্য) লোক পাঠাল। তাকে উপস্থিত করা হলো। অন্যদিকে ইবরাহীম আলায়হিস সালাম সালাত আদায় করার জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন। অতঃপর সারা যখন তার কাছে প্রবেশ করলেন তখন রাজা তাকে ধরার জন্য হাত বাড়াল, তখনই সে আল্লাহর ক্রোধে পাকড়াও হলো। অন্য বর্ণনায় রয়েছে- তার দম বন্ধ হয়ে গেল, এমনকি জমিনে পা মারতে লাগল। অত্যাচারী (অবস্থা বেগতিক দেখে সারাকে) বলল, আমার জন্য আল্লাহর কাছে দু’আ কর, আমি তোমার ক্ষতি করব না। তখন সারা (তার জন্য) আল্লাহর কাছে দু’আ করলেন। ফলে সে মুক্তি পেল। অতঃপর সে দ্বিতীয়বার তাঁকে ধরার জন্য হাত বাড়াল। তখন সে আগের মতো কিংবা আরো কঠিনভাবে পাকড়াও হলো। এবারও সে বলল, আমার জন্য আল্লাহর কাছে দু’আ কর, আমি তোমার কোন অকল্যাণ করব না। অতএব সারা আবারও আল্লাহর কাছে দু’আ করলেন। ফলে সে মুক্তি পেয়ে গেল। তখন সে রাজা তার একজন দারোয়ানকে ডেকে বলল, তোমরা তো আমার কাছে কোন মানুষকে আননি; বরং তোমরা আমার কাছে এনেছ একজন শয়তানকে। এরপর সে সারার সেবার জন্য ’হাজেরা (নামে একটি রমণী)-কে দান করল। অতঃপর সারা ইবরাহীম আলায়হিস সালাম -এর কাছে ফিরে আসলেন, তখনো তিনি দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছিলেন। (সালাতের মধ্যেই) হাতের ইশারায় সারাকে প্রশ্ন করলেন, ঘটনা কি হলো? সারা বললেন, আল্লাহ তা’আলা কাফিরের চক্রান্ত তারই বক্ষে পাল্টা নিক্ষেপ (নস্যাৎ) করেছেন। আর সে আমার সেবার জন্য ’হাজেরা’কে দান করেছে। আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হাদীসটি বর্ণনা করে বললেন, হে আকাশের পানির সন্তান! অর্থাৎ হে ’আরববাসীগণ! এই ’হাজেরাই তোমাদের আদি মাতা। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَمْ يَكْذِبْ إِبْرَاهِيمُ إِلَّا فِي ثَلَاثَ كَذَبَاتٍ: ثِنْتَيْنِ مِنْهُنَّ فِي ذَاتِ اللَّهِ قولُه (إِني سَقيمٌ) وقولُه (بلْ فعلَه كبيرُهم هَذَا) وَقَالَ: بَيْنَا هُوَ ذَاتَ يَوْمٍ وَسَارَةُ إِذْ أَتَى عَلَى جَبَّارٍ مِنَ الْجَبَابِرَةِ فَقِيلَ لَهُ: إِن هَهُنَا رَجُلًا مَعَهُ امْرَأَةٌ مِنْ أَحْسَنِ النَّاسِ فَأَرْسَلَ إِلَيْهِ فَسَأَلَهُ عَنْهَا: مَنْ هَذِهِ؟ قَالَ: أُخْتِي فَأَتَى سَارَةَ فَقَالَ لَهَا: إِنَّ هَذَا الْجَبَّارَ إِنْ يَعْلَمْ أَنَّكِ امْرَأَتِي يَغْلِبُنِي عَلَيْكِ فَإِنْ سألكِ فأخبِريهِ أنَّكِ أُختي فإِنكِ أُخْتِي فِي الْإِسْلَامِ لَيْسَ عَلَى وَجْهِ الْأَرْضِ مُؤْمِنٌ غَيْرِي وَغَيْرُكِ فَأَرْسَلَ إِلَيْهَا فَأُتِيَ بِهَا قَامَ إِبْرَاهِيمُ يُصَلِّي فَلَمَّا دَخَلَتْ عَلَيْهِ ذَهَبَ يَتَنَاوَلُهَا بِيَدِهِ. فَأُخِذَ - وَيُرْوَى فَغُطَّ - حَتَّى رَكَضَ بِرِجْلِهِ فَقَالَ: ادْعِي اللَّهَ لِي وَلَا أَضُرُّكِ فَدَعَتِ اللَّهَ فَأُطْلِقَ ثُمَّ تَنَاوَلَهَا الثَّانِيَةَ فَأُخِذَ مِثْلَهَا أَوْ أَشَدُّ فَقَالَ: ادْعِي اللَّهَ لِي وَلَا أَضُرُّكِ فَدَعَتِ اللَّهَ فَأُطْلِقَ فَدَعَا بَعْضَ حجَبتِه فَقَالَ: إِنَّكَ لم تأتِني بِإِنْسَانٍ إِنَّمَا أَتَيْتَنِي بِشَيْطَانٍ فَأَخْدَمَهَا هَاجَرَ فَأَتَتْهُ وَهُوَ قائمٌ يُصلي فأوْمأَ بيدِه مَهْيَمْ؟ قَالَتْ: رَدَّ اللَّهُ كَيْدَ الْكَافِرِ فِي نَحْرِهِ وَأَخْدَمَ هَاجَرَ قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ: تِلْكَ أُمُّكُمْ يَا بَنِي مَاءِ السَّمَاءِ. مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (2213 ، 3358) و مسلم (154 / 2371)، (6145) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: (لَمْ يَكْذِبْ إِبْرَاهِيمُ إِلَّا ثَلَاثَ) “ইবরাহীম আলায়হিস সালাম কেবল তিনটি মাত্র মিথ্যা বলেছেন।” আলাহ তা'আলার বিধান উম্মাতের কাছে পৌছানোর ক্ষেত্রে নবীরা কম বেশ সকল মিথ্যা থেকে পবিত্র। এ ব্যাপারে তারা কখনো মিথ্যার আশ্রয় নিতে পারেন না এবং কোন ধরনের মিথ্যা বলা তাদের জন্য সম্ভব নয় বলে সবাই একমত। তবে দুনিয়ার সাথে জড়িত অন্যান্য তুচ্ছ বিষয়ে মিথ্যা বলতে পারেন, নাকি তারা মিথ্যা থেকে মুক্ত; এ ব্যাপারে পূর্ববর্তী পরবর্তী ‘আলিমদের মাঝে প্রসিদ্ধ দু'টি মত রয়েছে।
কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, বিশুদ্ধ মত হলো, আল্লাহ তা'আলার বিধানে তাবলীগের ক্ষেত্রে নবীদের থেকে মিথ্যা সংঘটিত হওয়া কল্পনা করা যায় না। আমরা নবীদের বেলায় তাদের থেকে সগীরাহ গুনাহ সংঘটিত হওয়া অসম্ভব বা সম্ভব যে মতেরই প্রবক্তা হই না কেন, তাবলীগের ক্ষেত্রে তারা কখনো মিথ্যা বলতে পারেন না। চাই মিথ্যা কম হোক বা বেশি। কেননা নুবুওয়্যাতের মর্যাদা এ সব কিছুর উর্ধ্বে। আর নবীদের বেলায় মিথ্যার সম্ভাবনা মানেই তাদের কথার উপর থেকে আস্থা হারিয়ে যাওয়া। কিন্তু এখানে নবী (সা.) -এর উক্তি “ইবরাহীম কেবল তিনটি মিথ্যা বলেছেন। দু’টি আল্লাহ তা'আলার সত্তার ক্ষেত্রে আর একটি তার স্ত্রী সারার ক্ষেত্রে” এর অর্থ হলো, উল্লেখিত মিথ্যা সম্বোধিত ব্যক্তি ও শ্রোতার বুঝার উপর নির্ভর করে। কেননা শ্রোতার কাছে এগুলো সাধারণত মিথ্যা। কিন্তু বাস্তবতার আলোকে এগুলো নিন্দিত মিথ্যার আওতায় পড়ে না। এগুলো নিন্দিত মিথ্যা না হওয়ার দুটি কারণ:
এক: এগুলো ইঙ্গিতবহ বাক্য যা একটি বলে অন্যদিকে ইঙ্গিত করা হয়। অতএব তিনি সারা ইসলামের দিক থেকে বোন বলেছেন এবং এটা বিশুদ্ধ।
দুই: যদি এটি তাওরিয়াহ বা ইঙ্গিতবহ কথা না হয়ে মিথ্যা হয় তবুও তা বৈধ; কেননা এটা যালিমের যুলম প্রতিহত করার কারণে ছিল। আর ফুকাহায়ে কিরাম এই ব্যাপারে একমত যে, কোন যালিম এসে যদি কোন গোপন লোকের সন্ধান করে তাকে হত্যা বা তার মাল ছিনিয়ে নিতে চায়; এমতাবস্থায় যার কাছে সন্ধান চেয়েছে তার জন্য ওয়াজিব হলো সেই লোকের খবর গোপন রাখা এবং তার সন্ধান জানা আছে বলে অস্বীকার করা। এই মিথ্যা বৈধ। এমনকি এমতাবস্থায় মিথ্যা বলা ওয়াজিব। অতএব নবী (সা.) মূলত এখানে এই সতর্ক করছেন যে, এগুলো ঢালাওভাবে নিন্দিত মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত নয়।
মাযিরী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, কেউ কেউ এই বাক্যগুলোর ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং এগুলো মিথ্যা হওয়া থেকে বের করেছেন। অথচ রাসূলুল্লাহ (সা.) যে বাক্যগুলোর বেলায় মিথ্যা শব্দের ব্যবহার করেছেন সেগুলোকে মিথ্যা বলতে বারণ করার কোন অর্থ নেই। আমি [ইমাম নবাবী (রহিমাহুল্লাহ)] বলি, এই বাক্যগুলোর উপর মিথ্যার প্রয়োগ করতে বারণ করা যাবে না; কেননা এগুলোর ব্যাপারে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে এবং হাদীসে এগুলোকে মিথ্যা বলা হয়েছে। তবে এগুলোর ব্যাখ্যা দেয়াও শুদ্ধ, ব্যাখ্যা করতে কোন বাধা নেই।
‘উলামাগণ বলেন, যে মিথ্যা ‘সারার’ বেলায় বলা হয়েছে সেটি আল্লাহ তা'আলার মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রেও বিবেচ্য; কেননা এই মিথ্যা এক যালিম কাফিরের যুলম ও অশ্লীলতা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বলা হয়েছে। সহীহ মুসলিম ছাড়া অন্যান্য হাদীসের কিতাবে দীর্ঘ ব্যাখ্যাসহ এসেছে। তবে কেবল প্রথম দু'টিকে আল্লাহ তা'আলার জন্য বলার কারণ হলো, তৃতীয়টি আল্লাহ তা'আলার জন্য তারপরও এখানে নিজেরও কিছু লাভের অংশ রয়েছে। আর উলামায়ে কিরাম ইবরাহীম আলায়হিস সালাম -এর উক্তি (إِني سَقيمٌ) “আমি অসুস্থ”-এর ব্যাখ্যায় বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আমি অসুস্থ হয়ে পড়ব। আর মানুষ সর্বদা অসুস্থতার সম্মুখীন। তাই এটা বলে তিনি তাদের সাথে তাদের মেলায় না যাওয়া এবং তাদের বাতিল ও কুফরী কাজে উপস্থিত না হওয়ার একটি ওযর পেশ করেছেন। কেউ কেউ বলেন, সে সময় তিনি কিছুটা জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন।
আর ইবরাহীম আলায়হিস সালাম -এর উক্তি (بلْ فعلَه كبيرُهم) “বরং তাদের বড়জন এটি করেছে।” এর ব্যাখ্যায় কুতায়বাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) ও একদল ‘আলিম বলেন, এখানে বড় করেছে এটাকে একটি কাজের শর্তসহ উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ তারা কথা বলতে পারলে তাদের বড় জন এটি করেছে। অতএব প্রকৃতপক্ষে এগুলো ঢালাও মিথ্যা নয়। তারপরও বাহ্যত দৃষ্টিতে মিথ্যা বলে মনে হয়, তাই রাসূল (সা.) এগুলো মিথ্যা বলে আখ্যা দিয়েছেন যা পূর্বে বলা হয়েছে। (ইমাম নবাবীর ব্যাখ্যাগ্রন্থ)
(فإِنكِ أُخْتِي فِي الْإِسْلَامِ) “নিশ্চয় ইসলামে তুমি আমার বোন”। এটা বলে নিশ্চয় ইবরাহীম আলায়হিস সালাম তাকে বুঝিয়ে দিলেন যে, তুমি আমার বোন বলা মিথ্যা নয়। আল্লামাহ্ ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এখানে (اِنَّمَا الۡمُؤۡمِنُوۡنَ اِخۡوَۃٌ) আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, অর্থাৎ “নিশ্চয় মু'মিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই”- (সূরা আল হুজুরাত ৪৯ : ১০)। অর্থাৎ ঈমানের বন্ধন আমাকে আর তোমাকে ভ্রাতৃত্বে আবদ্ধ করেছে। ভ্রাতৃত্বের এই বন্ধনে পৃথিবীর বুকে এখন আমি ও তুমি ছাড়া কেউ নেই। কেননা এখন ভূখণ্ডে আমি আর তুমি ছাড়া কোন ঈমানদার নেই।
এখানে একটি আপত্তি এই যে, লূত আলায়হিস সালাম তখন ছিলেন এবং তিনি তাদের সাথে ঈমানে শরীক ছিলেন। এর উত্তর এই দেয়া যেতে পারে যে, ইবরাহীম-এর কথা ‘এখন ভূখণ্ডে’ এর দ্বারা পৃথিবী উদ্দেশ্য নয়। বরং কেবল তার এলাকা। আর এই ঘটনার সময় লুত আলায়হিস সালাম সেখানে ছিলেন না।
(قَامَ إِبْرَاهِيمُ يُصَلِّي) অর্থাৎ ইবরাহীম আলায়হিস সালাম সালাত আদায় করতে দাঁড়িয়ে গেলেন। কেননা বিপদের সময় ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার সাহায্য চাওয়ার কথা বলা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন (وَ اسۡتَعِیۡنُوۡا بِالصَّبۡرِ وَ الصَّلٰوۃِ ؕ) “তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য কামনা করো”- (সূরাহ আল-বাকারা ২ : ৪৫)।
রাসূলুল্লাহ (সা.) -ও কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তার সামনে আসলে তিনি সালাতের আশ্রয় নিতেন। (সুনানু আবূ দাউদ হা. ১১২৪)
(ذَهَبَ يَتَنَاوَلُهَا بِيَدِهِ. فَأُخِذَ) অর্থাৎ যালিম যখন তাকে হাত দিয়ে স্পর্শ করতে গেল তখন আটকে পড়ল বা তার হাত বা পুরো শরীর অবশ হয়ে গেল। তাই সে তার কোন ধরনের সম্ভ্রমহানী করতে পারল না।
(وَيُرْوَى فَغُطَّ) অর্থাৎ কোন বর্ণনায় (أُخِذَ) শব্দের স্থলে (غط) শব্দ রয়েছে। ইবনু হাজার (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, অর্থাৎ তার শ্বাসরুদ্ধ হয়ে গেল। শাসরুদ্ধ হয়ে সে মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়ল এবং তার ‘গাতীত’ তথা নাকডাক আরম্ভ হলো। (ফাতহুল বারী হা. ৬/৩৯৩)
(ادْعِي اللَّهَ لِي وَلَا أَضُرُّكِ) “আল্লাহর কাছে আমার জন্য দু'আ করো আমি তোমার ক্ষতি করব না” অর্থাৎ আমার মুক্তির জন্য দু'আ করো।
(إِنَّكَ لم تأتِني بِإِنْسَانٍ إِنَّمَا أَتَيْتَنِي بِشَيْطَانٍ) কেননা আমি তার সাথে পেরে উঠছি না। বার বার সে আমাকে আছাড় মারছে এবং আমাকে মেরে ফেলতে চাচ্ছে। অতএব নিশ্চয় এটি শয়তান। সে মানব হলে আমি তার সাথে পেরে উঠতাম।
ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, শয়তান বলে তার উদ্দেশ্য হলো অবাধ্য জিন্। কেননা তারা জিনকে কঠিন ভয় করত এবং জিনের বিষয় খুব বড় করে দেখত। অস্বাভাবিক কিছু দেখলেই তারা এগুলোকে জিনের কারসাজি মনে করত।
(فَأَخْدَمَهَا هَاجَرَ) “তার সেবায় হাজেরা (রমণী) দিয়ে দিলো।” আপত্তিকর কর্মে ব্যর্থ আবার এমন পরিস্থিতির শিকার হওয়ার পর হাজেরাকে উপঢৌকন হিসেবে দেয়ার কারণ হলো, সারাকে ধরতে গিয়ে এমন
পরিস্থিতির শিকার হওয়ায় সে সারার বিষয়টিকে বড় করে দেখেছে এবং তাকে সম্মানিত এবং আল্লাহর কাছে সে একজন প্রিয় বলে বুঝতে পেরেছে। অথবা সারার শ্লীনতাহানীর চেষ্টা করার কারণে তার অন্তরে ভয়ের সঞ্চার হলে এর ক্ষতিপূরণ স্বরূপ হাজেরাকে দিয়েছে, যাতে তার মন রক্ষা করতে পারে এবং সারা তার কোন ক্ষতি না করেন। (ফাতহুল বারী হা, ৬/৩৯৩, মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(فأوْمأَ بيدِه مَهْيَمْ) অর্থাৎ তিনি সালাতের ভিতর হাতের ইশারায় তাকে বললেন, (مَهْيَمْ) অর্থাৎ- কী অবস্থা? শব্দটি মূল ইয়ামানী। এর দ্বারা কারো অবস্থা জানতে প্রশ্ন করা হয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭০৫-[৮] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ইবরাহীম আলায়হিস সালাম অপেক্ষা আমরা সন্দেহ পোষণ করার অধিক হকদার। যখন তিনি বলেছিলেন, হে আমার প্রভু! আপনি কিরূপ মৃতকে জীবিত করবেন তা আমাকে দেখিয়ে দিন। আল্লাহ তা’আলা লূত আলায়হিস সালাম -এর ওপর দয়া করুন! (আল্লাহর দীন প্রচারে অসহায়তার দরুন) তিনি একটি দৃঢ় খুঁটির (ব্যক্তি বা দলের) আশ্রয় পেতে চেয়েছিলেন। আর ইউসুফ আলায়হিস সালাম যত দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন, এত দীর্ঘ সময় আমিও যদি কারাগারে থাকতাম, তাহলে তখনই আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিতাম। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: نَحْنُ أَحَقُّ بِالشَّكِّ مِنْ إِبْرَاهِيمَ إِذْ قَالَ: (رَبِّ أَرِنِي كَيْفَ تحيي الْمَوْتَى) وَيَرْحَمُ اللَّهُ لُوطًا لَقَدْ كَانَ يَأْوِي إِلَى رُكْنٍ شَدِيدٍ وَلَوْ لَبِثْتُ فِي السِّجْنِ طُولَ مَا لَبِثَ يُوسُفُ لَأَجَبْتُ الدَّاعِيَ . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (3372) و مسلم (152 / 151)، (382) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: (نَحْنُ أَحَقُّ بِالشَّكِّ مِنْ إِبْرَاهِيمَ) ইমাম নবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, “উলামায়ে কিরাম এই বাক্যের কয়েকটি অর্থ বলেছেন। তন্মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ও বিশুদ্ধ উক্তি যা ইমাম আবূ ইবরাহীম আল মুযানী এবং একদল ‘আলিম উল্লেখ করেছেন। তারা বলেন, বাক্যটির অর্থ হলো, ইবরাহীম আলায়হিস সালাম-এর জন্য এমন সন্দেহ করা অসম্ভব। কেননা মৃতকে জীবিত করার সন্দেহ যদি নবীদের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে তবে এই সন্দেহ ইবরাহীম আলায়হিস সালাম -এর চেয়ে আমার মাঝে প্রবেশ অধিক যথাযথ। অথচ তোমরা জানো আমি সন্দেহ করি না। অতএব এও জেনে রাখ যে, ইবরাহীম আলায়হিস সালাম সন্দেহ করেননি। ইবরাহীম আলায়হিস সালাম -এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখের কারণ হলো, আয়াত থেকে কারো মনে ইবরাহীম আলায়হিস সালাম -এর প্রতি মন্দ ধারণা সৃষ্টি হতে পারে এবং আল্লাহর তা'আলার কুদরতের উপর তার দৃঢ় বিশ্বাস সম্পর্কে সন্দেহের সৃষ্টি হতে পারে। আবার রাসূলুল্লাহ (সা.) , ইবরাহীম আলায়হিস সালাম -কে তাঁর নিজের ওপর অগ্রাধিকার দেয়ার কারণ বিনয় ও শিষ্টাচারের প্রকাশ। অথবা তিনি আদম সন্তানদের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ এই ওয়াহী আসার আগে হয়তো তিনি এমন বলেছেন।
তাহরীর কিতাবের লেখক বলেন, যখন আল্লাহ তা'আলার বাণী: (... اَوَ لَمۡ تُؤۡمِنۡ....) ..তুমি কি বিশ্বাস করো না...”- (সূরা আল বাকারাহ্ ২ : ২৬০); নাযিল হলো; একদল বলে উঠল ইবরাহীম আলায়হিস সালাম সন্দেহ করেছেন, অথচ আমাদের নবী (সা.) সন্দেহ করেননি। তখন নবী (সা.) বলেন, “সন্দেহের বেলায় আমি অধিক উপযুক্ত।” তারপর তিনি (সা.) উপরের আলোচনা করেন। তিনি (সা.) আরো বলেন, আমার কাছে এই বাক্যের দু’টি অর্থ রয়েছে বলে মনে হয়:
[এক] এটা কথার স্বাভাবিক রীতির আলোকে বের হয়েছে। কেননা মানুষ যখন কোন মানুষের ওপর থেকে বদনাম প্রতিহত করতে চায় তখন সে বলে, তাকে যেটা বলছ বা তার সাথে যেটা করছ আমাকে বলো বা আমার সাথে করো। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হয় লোকটির সাথে এমন আচরণ করতে বারণ করা। অর্থাৎ তার বেলায় এমন বলো না বা এমন করো না।
[দুই] এর অর্থ হচ্ছে, তোমরা যেটাকে সন্দেহ বলে ভাবছ এটার আমি অধিক উপযুক্ত; কেননা এটা সন্দেহই নয়। এর দ্বারা কেবল অধিক দৃঢ়তা সৃষ্টি উদ্দেশ্য। (ইমাম নবাবীর ব্যাখ্যাগ্রন্থ, অধ্যায়: ঈমান, ২/১৮৩)
(إِلَى رُكْنٍ شَدِيدٍ) ‘রুকনে শাদীদ' বা দৃঢ় আশ্রয়স্থল হলেন আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা; কেননা তিনি সবচেয়ে দৃঢ় ও শক্তিশালী প্রতিরোধকারী আশ্রয়স্থল। হাদীসের মর্ম হলো, লুত্ব 'আলায়হিস সালাম যখন তার মেহমানের ব্যাপারে ভয় করলেন এবং যালিমদের থেকে তাদের রক্ষা করার মতো তার কোন গোষ্ঠী ছিল না, তাই তিনি অক্ষম হলেন এবং তার চিন্তা চরমে পৌছল, তখন তিনি এই চরম পরিস্থিতির শিকার হয়ে বলেন, যদি আমার নিজের শক্তি থাকত তাদের প্রতিহত করার অথবা যদি আমি আমার গোষ্ঠীর আশ্রয় নিতে পারতাম, তবে তোমাদেরকে বারণ করতাম। লূত আলায়হিস সালাম এটা বলে মেহমানের কাছে তার ওযর প্রকাশের ইচ্ছা করেছেন। অর্থাৎ তিনি যদি যে কোনভাবে তাদের থেকে এই অপছন্দনীয় কাজ প্রতিহত করতে পারতেন তবে তাদের সম্মান ও বিপদ প্রতিহতে তার সর্বোচ্চ চেষ্টা ব্যয় করতেন এবং তাদেরকে রক্ষা করতেন। এখানে আল্লাহ তা'আলার ওপর ভরসা থেকে বিমুখ হওয়ার কিছু নেই। (ইমাম নবাবীর ব্যাখ্যাগ্রন্থ, অধ্যায়: ঈমান, ২/১৮৩)
(...وَلَوْ لَبِثْتُ فِي السِّجْنِ طُولَ) এখানে নবী (সা.) ইউসুফ আলায়হিস সালাম -এর প্রশংসা এবং তাঁর ধৈর্য সহনশীলতার বর্ণনা দিচ্ছেন। এখানে দাঈ বা আহ্বানকারী দ্বারা উদ্দেশ্য হলো বাদশার দূত যার কথা আল্লাহ তুলে ধরছেন, “বাদশাহ বলল, তাকে আমার কাছে নিয়ে আসো। যখন দূত তার কাছে এলে তিনি বললেন, ফিরে যাও তোমাদের প্রভুর কাছে এবং তাকে জিজ্ঞেস করো ঐ মহিলাদের স্বরূপ কী, যারা স্বীয় হস্ত কর্তন করেছিল।” (সূরা ইউসুফ ১২ : ৫০)
ইউসুফ আলায়হিস সালাম এই দূতের ডাকে সাড়া দিয়ে জেলের দীর্ঘ জীবন থেকে পরিত্রাণের জন্য দ্রুত বের হননি বরং অবিচল থেকেছেন, দৃঢ় থেকেছেন। বাদশার কাছে তার জেলে যাওয়ার কারণটি উদঘাটনের নিবেদন করেছেন; যাতে তিনি বাদশাহ ও অন্যদের কাছে নির্দোষ প্রমাণিত হন। তাই নবী (সা.) এটা বলে ইউসুফ আলায়হিস সালাম -এর মর্যাদা ও দৃঢ় মনোবল বর্ণনা করেছেন। ইউসুফ আলায়হিস সালাম -এর মর্যাদা বর্ণনার সাথে তিনি নিজের ব্যাপারে যা বলেছেন তা বিনয় প্রকাশ এবং ইউসুফ আলায়হিস সালাম -এর মর্যাদা অধিক প্রকাশের স্বার্থে।
(ইমাম নাবাবীর ব্যাখ্যাগ্রন্থ, অধ্যায়: ঈমান, ২/১৮৩)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭০৬-[৯] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: মূসা আলায়হিস সালাম ছিলেন খুবই লাজুক স্বভাবের লোক। সব সময় শরীর ঢেকে রাখতেন। লজ্জাশীলতার কারণে তাঁর দেহের কোন অংশ কখনো খোলা দেখা যেত না। বানী ইসরাঈল সম্প্রদায়ের একদল লোক (এ ব্যাপারে) তাঁকে মারাত্মক কষ্ট দিল। তারা (অভিযোগ এনে) বলল, তিনি যে শরীর ঢেকে রাখতে এত বেশি তৎপর, এর একমাত্র কারণ হলো, তার দেহে নিশ্চয় কোন দোষ আছে। হয়তো শ্বেত (কুষ্ঠ) রোগ রয়েছে কিংবা অণ্ডকোষে একশিরা আছে। মহান আল্লাহ তা’আলা নির্দোষিতা প্রকাশ করার ইচ্ছা করলেন। অতএব একদিন গোসল করার জন্য মূসা আলায়হিস সালাম একা এক নির্জন স্থানে গেলেন এবং পরনের কাপড় খুলে একটি পাথরের উপর রাখলেন এবং অমনি তার কাপড়সহ পাথরটি ছুটে চলল। সাথে সাথেই মূসা আলায়হিস সালাম পাথরটিকে ধাওয়া করলেন; আর চিৎকার দিয়ে বলতে লাগলেন, হে পাথর! আমার কাপড়! হে পাথর, আমার কাপড়! শেষ পর্যন্ত পাথরটি বানী ইসরাঈলের এক বৈঠকে এসে পৌছল। ফলে তারা মূসা আলায়হিস সালাম -কে পোষাকহীন অবস্থায় দেখে ফেলল। তারা দেখতে পেল, মূসা আলায়হিস সালাম -এর শরীর আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সর্বাধিক সৌন্দর্যপূর্ণ এবং সকলে এক বাক্যে বলে উঠল- আল্লাহর শপথ! মূসা আলায়হিস সালাম -এর শরীরে কোন প্রকারের দোষ নেই। এবার তিনি কাপড়টি নিয়ে পরিধান করলেন এবং (হাতের লাঠি দ্বারা) পাথরকে খুব জোরে মারতে লাগলেন। আল্লাহর শপথ! এতে পাথরের গায়ে তিন, চার কিংবা পাঁচটি আঘাতের দাগ পড়ে গেল। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ مُوسَى كَانَ رَجُلًا حَيِيًّا سِتِّيرًا لَا يُرَى مِنْ جِلْدِهِ شَيْءٌ اسْتِحْيَاءً فَآذَاهُ مَنْ آذَاهُ مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ فَقَالُوا: مَا تَسَتَّرَ هَذَا التَّسَتُّرَ إِلَّا مِنْ عَيْبٍ بِجِلْدِهِ: إِمَّا بَرَصٌ أَوْ أُدْرَةٌ وَإِنَّ اللَّهَ أَرَادَ أَنْ يُبَرِّئَهُ فَخَلَا يَوْمًا وَحده ليغتسل فَوَضَعَ ثَوْبَهُ عَلَى حَجَرٍ فَفَرَّ الْحَجَرُ بِثَوْبِهِ فَجمع مُوسَى فِي إِثْرِهِ يَقُولُ: ثَوْبِي يَا حَجَرُ ثَوْبِي يَا حَجَرُ حَتَّى انْتَهَى إِلَى مَلَأٍ مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ فَرَأَوْهُ عُرْيَانًا أَحْسَنَ مَا خَلَقَ اللَّهُ وَقَالُوا: وَاللَّهِ مَا بِمُوسَى مِنْ بَأْسٍ وَأَخْذَ ثَوْبَهُ وَطَفِقَ بِالْحَجَرِ ضَرْبًا فَوَاللَّهِ إِنَّ بِالْحَجَرِ لَنَدَبًا مِنْ أَثَرِ ضَرْبِهِ ثَلَاثًا أَو أَرْبعا أَو خمْسا . مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (3404) و مسلم (156 / 2371)، (6147) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: حَيِيًّا(حَيِيًّا سِتِّيرً) - শব্দের প্রথম (ي) যের বিশিষ্ট এবং তাশদীদমুক্ত এবং দ্বিতীয় (ي) তাশদীদযুক্ত। যার অর্থ: অধিক লজ্জাশীল। (سِتِّيرً) শব্দের (س) অক্ষরে যবর এবং (ت) বর্ণে তাশদীদযুক্ত যের। যার অর্থ পর্দায় ঢাকা। শব্দ দুটিই মুবালাগার সিগাহ যা আধিক্য বুঝায়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(فَآذَاهُ مَنْ آذَاهُ مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ) অর্থাৎ বানী ইসরাঈলের অনেকে তাকে কথার মাধ্যমে কষ্ট দিতো। অধিক লজ্জাশীল হওয়া, শরীরকে ঢেকে রাখার প্রতি অধিক মনোযোগ দেয়া, তাদের মতো সর্বত্র খোলামেলা চলাফেরা না করাকে তারা খারাপ দৃষ্টিতে দেখত। তারা মনে করত তিনি তাঁর আভ্যন্তরীণ দোষ ঢাকার জন্যই সবার মতো চলেন না, সবার সাথে খোলামেলা গোসল করেন না। তারা মনে করত মূসার শরীরে হয় কুষ্ঠব্যাধি রয়েছে অথবা তার অণ্ডকোষে একশিরা রোগ রয়েছে। এসব ঢেকে রাখার জন্যই তিনি কারো সামনে শরীর উন্মুক্ত না এবং সবার সাথে গোসল করেন না। কিন্তু মূসা আলায়হিস সালাম লজ্জা ও পর্দার অবস্থা এই যে, নিজেকে দোষমুক্ত বা অপবাদ মুক্ত করার জন্য শরীর উন্মুক্ত করতেন না। কারণ অপবাদ সহ্য করার চেয়ে কারো সামনে বেপর্দা হয়ে গোসল করাই তার কাছে অধিক লজ্জাজনক ছিল। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ছিল তার প্রিয় নবী কে অপবাদমুক্ত করা। যার কারণে আল্লাহ তা'আলা এ ঘটনা ঘটান। কুরআনে আল্লাহ তা'আলা এই ঘটনার দিকে ইঙ্গিত দিয়ে বলেন -
(یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَکُوۡنُوۡا کَالَّذِیۡنَ اٰذَوۡا مُوۡسٰی فَبَرَّاَهُ اللّٰهُ مِمَّا قَالُوۡا ؕ وَ کَانَ عِنۡدَ اللّٰهِ وَجِیۡهًا) “হে মুমিনগণ! মূসাকে যারা কষ্ট দিয়েছে, তোমরা তাদের মতো হয়ো না। তারা যা বলেছিল, আল্লাহ তা থেকে তাঁকে নির্দোষ প্রমাণ করেছিলেন। তিনি আল্লাহর কাছে ছিলেন মর্যাদাবান।”
(সূরাহ্ আল আহযাব ৩৩ : ৬৯)
ইমাম নবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এখানে মূসা আলায়হিস সালাম -এর স্পষ্ট দু'টি মু'জিযাহ্ বা অলৌকিক নিদর্শন রয়েছে -
[এক] পাথর তার কাপড় নিয়ে বানী ইসরাঈলের সমাবেশের দিকে হাঁটতে শুরু করা।
[দুই] মূসা আলায়হিস সালাম -এর লাঠির আঘাতে পাথরে দাগ বসে যাওয়া। হাদীস থেকে এও প্রমাণিত হয় যে, জড় পদার্থের মধ্যেও অনুধাবন ক্ষমতা রয়েছে। হাদীস থেকে আরো বুঝা যায় যে, নির্জন অবস্থায় উলঙ্গ হয়ে গোসল বৈধ, যদিও উত্তম হচ্ছে লজ্জাস্থান ঢেকে গোসল করা। এটাই ইমাম শাফি'ঈ, মালিক ও সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘আলিমদের অভিমত।
হাদীসে আরো জানা যায়, মূর্খ ও নির্বোধদের পক্ষ থেকে অশালীন আচরণের কারণে নবীদের কষ্ট ও এর উপর তাদের ধৈর্য করার বিষয়টিও অত্র হাদীস থেকে জানা যায়। কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) ও অন্যরা বলেন, নবীগণ সৃষ্টি, চারিত্রিক ও শারীরিক দোষ-ত্রুটি থেকে নিরাপদ। তারা বলেন, ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় কোন কোন নবীর ব্যাপারে এমন কিছু শারীরিক ত্রুটির বিবরণ যা তাদের প্রতি মানুষের ঘৃণার সৃষ্টি করে, এসব বিবরণের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা যাবে না। (ইমাম নবাবীর ব্যাখ্যাগ্রন্থ, ২/১৮৩)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭০৭-[১০] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: একদিন আইয়ুব আলায়হিস সালাম উলঙ্গ অবস্থায় গোসল করছিলেন, এমনি অবস্থায় তাঁর ওপর সোনালী পঙ্গপাল পতিত হলো। তখন আইয়ুব আলায়হিস সালাম সেগুলোকে দ্রুত ধরে কাপড়ে রাখতে লাগলেন। তখন তার প্রভু তাকে ডেকে বললেন, হে আইয়ূব! তুমি যা দেখছ, আমি কি তা হতে তোমাকে অমুখাপেক্ষী করে দেইনি। উত্তরে তিনি বললেন, হ্যা, নিশ্চয় আপনার ’ইজ্জতের শপথ! কিন্তু আপনার বারাকাত ও কল্যাণ হতে তো আমি অভাবমুক্ত নই। (বুখারী)
الفصل الاول (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: بَيْنَا أَيُّوبُ يَغْتَسِلُ عُرْيَانًا فَخَرَّ عَلَيْهِ جَرَادٌ مِنْ ذَهَبٍ فَجَعَلَ أَيُّوبُ يَحْثِي فِي ثَوْبِهِ فَنَادَاهُ رَبُّهُ: يَا أَيُّوبُ أَلَمْ أَكُنْ أَغْنَيْتُكَ عَمَّا تَرَى؟ قَالَ: بَلَى وَعِزَّتِكَ وَلَكِن لَا غنى بِي عَن بركتك . رَوَاهُ البُخَارِيّ
رواہ البخاری (279) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (بَيْنَا أَيُّوبُ يَغْتَسِلُ عُرْيَانًا) “একদিন আইয়ুব আলায়হিস সালাম বিবস্ত্র অবস্থায় গোসল করছিলেন। অর্থাৎ মানুষ থেকে আড়াল হয়ে একাকি অবস্থায় কাপড় ছাড়া গোসল করছিলেন। তাই বুখারী (রহিমাহুল্লাহ) অধ্যায়টি এভাবে রচনা করেন, “নির্জনে বিবস্ত্র হয়ে গোসল করা এবং আঁড় করে গোসল করা।” ইমাম বুখারী (রহিমাহুল্লাহ) যে অধ্যায়ে এই হাদীসটি উল্লেখ করেন তারা পুরো শিরোনামটি এমন - مَنِ اغْتَسَلَ عُرْيَانًا وَحْدَهُ فِي الْخَلْوَةِ، وَمَنْ تَسَتَّرَ فَالتَّسَتُّرُ أَفْضَلُ (وَقَالَ بَهْزٌ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اللَّهُ أَحَقُّ أَنْ يُسْتَحْيَا مِنْهُ مِنَ النَّاسِ».)
“নির্জনে বিবস্ত্র হয়ে গোসল করা এবং পর্দা করে গোসল করা। তবে পর্দা করে গোসল করাই উত্তম। বাহয ইবনু হাকীম তার পিতা ও দাদার সূত্রে নবী (সা.) -এর বাণী বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলা লজ্জা পাওয়ার জন্য মানুষের চেয়ে অধিক হকদার।” (সহীহুল বুখারী- অধ্যায়, অনুচ্ছেদ: গোসল, নির্জনে বিবস্ত্র গোসল...)
এ হাদীস থেকে নির্জনে উলঙ্গ হয়ে গোসল করার বৈধতা প্রমাণিত হয়, যদিও নির্জনে ও বিবস্ত্র না হয়েই গোসল করা উত্তম। যেমনটি বুখারীর অনুচ্ছেদ থেকে প্রমাণিত হয়। তবে আইয়ূব আলায়হিস সালাম গোসলের সময় পুরো বিবস্ত্র ছিলেন বলে প্রমাণিত হয় না। হতে পারে লুঙ্গি পরা ছিল এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গ খোলা ছিল। কেননা হাদীসের বাক্য (فَجَعَلَ أَيُّوبُ يَحْثِي فِي ثَوْبِهِ) “আইয়ূব তার কাপড়ে স্বর্ণের টিড়িগুলো তুলতে লাগলেন”; এখানে লুঙ্গি পরিহিত থাকার প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। তবে নির্জন অবস্থায় বস্ত্রহীন হয়ে গোসল বৈধ হিসেবে পুরো বিবস্ত্র থাকারও সম্ভাবনা রয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(أَلَمْ أَكُنْ أَغْنَيْتُكَ عَمَّا تَرَى) “তুমি যা দেখছ তা থেকে আমি কি তোমাকে অমুখাপেক্ষী করে দেইনি?” ‘আল্লামাহ্ ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এমন বলা তিরস্কার নয়। কেননা ধনী হলেও সে তার ধনে তৃপ্ত হয় না, বরং আরো বেশি চায়। তাই আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এমন বলা হয় স্নেহ ও পরীক্ষাস্বরূপ। তিনি এটা বলে দেখেন, বান্দা তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে কিনা। তখন সে তার অধিক কৃতজ্ঞ হয়। তাই আইয়ূব আলায়হিস সালাম আল্লাহ তা'আলার কথার উত্তর দিয়ে বলেন, (بَلَى وَعِزَّتِكَ وَلَكِن لَا غنى بِي عَن بركتك) “অবশ্যই, হে আমার রব! তবে আপনার বরকত থেকে আমার অমুখাপেক্ষিতা নেই”। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭০৮-[১১] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] বলেন, একবার একজন মুসলিম ও একজন ইয়াহূদী একে অপরে গালাগালিতে লিপ্ত হলো। মুসলিম লোকটি বলল, সেই মহান সত্তার শপথ! যিনি মুহাম্মাদ (সা.) - কে সমস্ত জগতের উপর নির্বাচন করেছেন। তখন ইয়াহুদী বলে উঠল, শপথ সেই সত্তার! যিনি মূসা আলায়হিস সালামকে সারা জগতের উপর নির্বাচন করেছেন। (এ কথাটি শুনামাত্রই) মুসলিম লোকটি তৎক্ষণাৎ ইয়াহূদীর গালে একটি থাপ্পড় মারল। অতঃপর সেই ইয়াহূদী নবী (সা.) -এর কাছে গিয়ে তার ও মুসলিম লোকটির মধ্যে সংঘটিত ব্যাপারটি তাঁকে জানাল। তখন নবী (সা.) লোকটিকে ডেকে আনলেন এবং ঘটনাটির সত্যতা সম্পর্কে প্রশ্ন করলেন, সেও ঘটনাটি বর্ণনা করল। তখন নবী (সা.) বললেন, ’আমাকে মূসা আলায়হিস সালাম -এর ওপর প্রাধান্য দিতে যেয়ো না। কেননা কিয়ামতের দিন সকল মানুষই হুশ হারিয়ে ফেলবে, আমিও তাদের সাথে বেহুশ থাকব। তবে আমি সর্বপ্রথম হুঁশ ফিরে পেতেই দেখব, মূসা আলায়হিস সালাম ’আরশের এক কিনারা ধরে রয়েছেন। তবে আমি জানি না, তিনিও বেহুশ হয়েছেন এবং আমার পূর্বেই হুঁশপ্রাপ্ত হয়েছেন অথবা তিনি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত, যাদেরকে মহান আল্লাহ (বেহুঁশ হওয়া হতে) বাদ রেখেছেন। অন্য এক বর্ণনায় আছে -
নবী (সা.) বলেছেন: আমি জানি না, তূর পাহাড়ের ঘটনার দিন তিনি যে বেহুশ হয়েছিলেন, তা হিসাবে রাখা হয়েছে অথবা আমার পূর্বেই তিনি হুঁশ ফিরে পেয়েছেন? তিনি আরো বলেছেন, ’আমি এটাও বলব না যে, কোন লোক ইউনুস ইবনু মাত্তা অপেক্ষা উত্তম।
الفصل الاول (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنْهُ قَالَ: اسْتَبَّ رَجُلٌ مِنَ الْمُسْلِمِينَ وَرَجُلٌ مِنَ الْيَهُودِ. فَقَالَ الْمُسْلِمُ: وَالَّذِي اصْطَفَى مُحَمَّدًا عَلَى الْعَالَمِينَ. فَقَالَ الْيَهُودِيُّ: وَالَّذِي اصْطَفَى مُوسَى عَلَى الْعَالَمِينَ. فَرَفَعَ الْمُسْلِمُ يَدَهُ عِنْدَ ذَلِكَ فَلَطَمَ وَجْهَ الْيَهُودِيِّ فَذَهَبَ الْيَهُودِيُّ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَخْبَرَهُ بِمَا كَانَ من أمره وأمرِ الْمُسلم فَدَعَا النَّبِي صلى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمُسْلِمَ فَسَأَلَهُ عَنْ ذَلِكَ فَأَخْبَرَهُ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تُخَيِّرُونِي عَلَى مُوسَى فَإِنَّ النَّاسَ يُصْعَقُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَأُصْعَقُ مَعَهُمْ فَأَكُونُ أَوَّلَ مَنْ يُفِيقُ فَإِذَا مُوسَى بَاطِشٌ بِجَانِبِ الْعَرْشِ فَلَا أَدْرَى كَانَ فِيمَنْ صُعِقَ فَأَفَاقَ قَبْلِي أَوْ كَانَ فِيمَنِ اسْتَثْنَى اللَّهُ.» . وَفِي رِوَايَةٍ: فَلَا أَدْرِي أَحُوسِبَ بِصَعْقَةِ يَوْمِ الطُّورِ أَوْ بُعِثَ قَبْلِي؟ وَلَا أَقُولُ: أَنَّ أَحَدًا أَفْضَلَ مِنْ يُونُسَ بنِ مَتَّى
رواہ البخاری (2411) [و مسلم (160 / 2373)، (6151) الروایۃ الثانیۃ : البخاری (3415)] ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (اسْتَبَّ رَجُلٌ) বুখারীর এক বর্ণনায় এই ঘটনার শুরুর বিবরণ এভাবে রয়েছে, “একবার এক ইয়াহূদী তার কিছু দ্রব্য-সামগ্রী বিক্রির জন্য পেশ করছিল, তার বিনিময়ে তাকে এমন কিছু দেয়া হলো যা সে পছন্দ করল না। তখন সে বলল, না! সেই সত্তার কসম, যে মূসা আলায়হিস সালাম-কে মানব জাতির ওপর মর্যাদা দান করেছেন। এ কথাটি একজন আনসারী (মুসলিম) শুনলেন, তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন, আর তার (ইয়াহুদীর) মুখের উপর এক চড় মারলেন।” (সহীহুল বুখারী- অধ্যায়: তাফসীর, হা. ৩২৬১)
এ থেকে বুঝা যায়, মূলত দ্রব্য-সামগ্রীর কেনাবেচা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। বিতর্কের এক পর্যায়ে ইয়াহূদী মূসা আলায়হিস সালাম-কে পৃথিবীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সর্বশ্রেষ্ঠ বলার কারণে মুসলিম আনসার ব্যক্তি উত্তেজিত হয়ে পড়েন। মূলত রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর প্রতি প্রচণ্ড ভালোবাসা তাকে এমন কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
(لَا تُخَيِّرُونِي عَلَى مُوسَى) অর্থাৎ আমাকে মূসার ওপর বেশি মর্যাদা দিও না। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, (لا تفضلو ابين أنبياء اللَّه) “আল্লাহর নবীগণের মধ্যে কাউকে কারো ওপর মর্যাদা দান করো না।” এর কারণ হলো, অন্যের সাথে তুলনা করে কারো শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করলে অন্যজনের প্রতি অবজ্ঞা ও হেয় প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর কোন নবীর প্রতি অবজ্ঞা ও হেয় প্রদর্শন বৈধ নয়।
(يُصْعَقُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ) “কিয়ামত দিবসে বেহুশ হবে” কিয়ামতের দিন চারবার শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে। প্রথম ফুৎকার হবে সবাইকে মেরে ফেলার ফুৎকার। এই ফুৎকার দেয়ার সাথে সাথে পৃথিবীতে যারা জীবিত ছিল তাদের সবাই মারা যাবে। দ্বিতীয় ফুৎকার; এই ফুৎকার দিলে আবার সবাই কবর থেকে জেগে উঠবে এবং হিসাবের জন্য সমবেত হবে। তৃতীয় ফুৎকার; ভীতি ও বেহুশের। চতুর্থ ফুৎকার; সবার হুশ ফিরে আসার জন্য। (ফাতহুল বারী হা, ৬/৪৪৬)
বাহ্যত তৃতীয় ফুৎকারই উদ্দেশ্য, যা কিয়ামত দিবসে সমবেত হওয়ার পরের প্রথম ফুৎকার। এই ফুঁৎকারে বেহুশ হওয়ার পর যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) হুঁশ ফিরে পাবেন তখন দেখবেন মূসা আলায়হিস সালাম ‘আরশের একটি খুঁটি ধরে রয়েছেন। তাই রাসূলুল্লাহ (সা.) ও বুঝতে পারেননি, তিনি বেহুশ হয়ে সবার আগে হুঁশ ফিরে পেয়েছেন, নাকি বেঁহুশই হননি। অর্থাৎ আমার আগে তিনি হুঁশ ফিরে পেলে এখানে তার মর্যাদা স্পষ্ট। আর যদি তিনি বেঁহুশ না-ই হন বরং আল্লাহ তা'আলাকে তাকে ব্যতিক্রম করে রাখেন, তবে এখানেও তার মর্যাদা স্পষ্ট। নবীদের মাঝে তুলনা ও কাউকে কারো ওপর মর্যাদা দেয়া নিষেধের কারণ সম্পর্কে ‘উলামারা বলেন, এই নিষেধ ঐ ব্যক্তির জন্য যে তার নিজের রায় থেকে একে অপরকে মর্যাদা দিবে। দলীলটি কোন নবীর ওপর অন্য কোন নবীকে মর্যাদাগতভাবে অগ্রাধিকার দেয়ার ক্ষেত্রে নয়। অথবা যে এমনভাবে কারো মর্যাদা দিবে যার কারণে অন্যের মর্যাদার অসম্মান করা হয় এবং এর মাধ্যমে পরস্পর ঝগড়া বিবাদ শুরু হয়। অথবা হাদীসের অর্থ এই যে, সব গুণে একজনকে অন্যের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিও না। (ফাতহুল বারী হা, ৬/৪৪৬)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭০৯-[১২] অপর এক বর্ণনায় আবূ সাঈদ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: তোমরা নবীদের একে অপরের মধ্যে একজনকে আরেকজনের ওপর প্রধান্য দিয়ো না। (বুখারী ও মুসলিম)
আর আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) -এর অপর এক বর্ণনায় আছে- তিনি (সা.) বলেছেন: তোমরা নবীদের মধ্যে একজনকে আরেকজনের ওপর মর্যাদা প্রদান করো না।
الفصل الاول (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَفِي رِوَايَةِ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ: «لَا تُخَيِّرُوا بَيْنَ الْأَنْبِيَاءِ» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ. وَفِي رِوَايَةِ أَبِي هُرَيْرَة: «لَا تفضلوا بَين أَنْبيَاء الله»
متفق علیہ ، رواہ البخاری (6916) و مسلم (163 / 2374)، (6156) و روایۃ سیدنا ابی ھریرۃ رضی اللہ عنہ ، رواھا البخاری (3414) و مسلم (159 / 2372)، (6156) ۔
(مُتَّفق عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: উভয় বর্ণনার মর্ম এক। তূরিবিশতী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, নবী (সা.) -এর উক্তি “আমাকে মূসার ওপর মর্যাদা দিও না”, “আমাকে মূসার ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিও না।” এটা তিনি প্রথম দিকে বিনয়ের আকারে বলেছেন; যাতে উম্মত নিজ থেকে নবীদের মাঝে তুলনা না করে এবং একজনকে অপরজনের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব না দেয়। কেননা এটা গোড়ামীর দিকে পৌছিয়ে দিবে এবং শয়তান তাদের ওপর আরোহী হয়ে তাদেরকে কারো বেলায় সীমালঙ্ঘন এবং কারো বেলায় যথাযথ মর্যাদা না দেয়ার দিকে পৌছিয়ে দিবে। তখন শ্ৰেষ্ঠকে তার শ্রেষ্ঠত্বের সীমা ছড়িয়ে দিবে এবং যিনি তুলনামূলক কম শ্রেষ্ঠ তাকে তার মর্যাদা থেকে নামিয়ে দিবে। এভাবে তারা ভ্রান্তিতে নিপতিত হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর কথাও একই ধরনের অর্থ বহন করে। لَا أَقُوْلُ إِنَّ أَحَدًا أَفْضَلُ مِنْ يُونُسَ بْنِ مَتَّى
“আমি কাউকে ইউনুস ইবনু মাত্তা থেকে শ্রেষ্ঠ বলি না।” (সহীহুল বুখারী- অধ্যায়: নবীদের বর্ণনা, হা. ৩৪১৫)
অর্থাৎ আমি আমার নিজের পক্ষ থেকে কাউকে শ্রেষ্ঠত্ব দেই না। কেননা রিসালাত ও নুবুওয়্যাতের দিক থেকে সবাই সমান। বরং যাকেই নুবুওয়্যাত দ্বারা সম্মানিত করা হয়েছে তাদের সকলের সম্মানের কথা বলি। এদিকেই কুরআন মাজীদের ইঙ্গিত হলো
(لَا نُفَرِّقُ بَیۡنَ اَحَدٍ مِّنۡهُمۡ) “আমরা তাদের কারো মাঝে পার্থক্য করি না।” (সূরা আল বাকারাহ্ ২ : ১৩৬)
অন্যান্য নবীদের মাঝে ইউনুস আলায়হিস সালাম -এর কথা বিশেষভাবে বলার কারণ হলো, আল্লাহ তা'আলা কুরআন মাজীদে ইউনুস আলায়হিস সালাম -এর কিছু কাহিনী তুলে ধরেছেন, যেখানে তাঁর পলায়ন ও উম্মতের ওপর বিরক্ত হওয়া, ধৈর্য না ধরার কথা রয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, (وَ لَا تَکُنۡ کَصَاحِبِ الۡحُوۡتِ) “আর তুমি মাছওয়ালার মতো হয়ো না”- (সূরা আল কলাম ৬৮ : ৪৮)। অন্যত্র বলেন, (وَ هُوَ مُلِیۡمٌ) “আর সে তিরস্কৃত”- (সূরাহ্ আস্ সফফাত ৩৭ : ১৪২)। এগুলো রাসূল (সা.) তাঁর উম্মাতের বেলায় ইউনুস আলায়হিস সালাম -এর সম্মানহানী ঘটানোর ব্যাপারে আশঙ্কামুক্ত হতে পারেননি। তাই উম্মাতকে সতর্ক করার জন্য নবী (সা.) ইউনুস আলায়হিস সালাম -এর কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন এবং তার জীবনের যেসব ঘটনা ঘটেছে এগুলো তার নুবুওয়্যাতকে কলঙ্কিত করে না বলে বুঝিয়ে দিয়েছেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭১০-[১৩] আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: কারো পক্ষেই এ কথা বলা উচিত নয় যে, আমি (মুহাম্মাদ) ইউনুস ইবনু মাত্তার তুলনায় উত্তম। (বুখারী ও মুসলিম)
বুখারী-এর অন্য এক বর্ণনায় আছে- রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: যে লোক বলবে, আমি (মুহাম্মাদ) ইউনুস ইবনু মাত্তা আলায়হিস সালাম হতে উত্তম, সে মিথ্যা বলেছে।
الفصل الاول (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَا يَنْبَغِي لِعَبْدٍ أَنْ يَقُولَ: إِنِّي خَيْرٌ مِنْ يُونُسَ بْنِ مَتَّى . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ وَفِي رِوَايَةِ البُخَارِيّ قَالَ: من قَالَ: أَنَا خَيْرٌ مِنْ يُونُسَ بْنِ مَتَّى فقد كذب
متفق علیہ ، رواہ البخاری (3416) و مسلم (116 / 2376)، (6159) و الروایۃ الثانیۃ ، رواھا البخاری (4604) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
লিল হাকিম ৪১২২।
ব্যাখ্যা: নুবুওয়্যাতের মর্যাদার ক্ষেত্রে আমাকে ইউনুস ইবনু মাত্তা থেকে শ্রেষ্ঠ বলা কারো জন্য উচিত নয়; কেননা নুবুওয়্যাতের মর্যাদার বেলায় সকল নবী সমান। অন্যান্য বিষয়ে কারো ওপর কারো শ্রেষ্ঠত্ব থাকতে পারে। তবে ইউনুস আলায়হিস সালাম-এর কথা বিশেষভাবে বলার কারণ পূর্বের হাদীসের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা কুরআনে ইউনুস আলায়হিস সালাম-এর এমন কিছু কথা উল্লেখ করেছেন যা তার মর্যাদা কম হওয়ার সন্দেহ সৃষ্টি করতে পারে। অথচ নুবুওয়্যাতের মর্যাদায় এসব ঘটনায় কোন প্রভাবে ফেলেনি। তাই নবী (সা.) উম্মাতকে সতর্ক করলেন, যেন তারা নবীদের মানহানী করার ভ্রান্তিতে লিপ্ত না হয়।
وَفِي رِوَايَةِ البُخَارِيّ قَالَ: من قَالَ: أَنَا خَيْرٌ مِنْ يُونُسَ بْنِ مَتَّى فقد كذب
“আমি ইউনুস থেকে উত্তম”; এই বাক্যের দুই উদ্দেশ্য হতে পারে।
[এক] (أَنَا) দ্বারা রাসূল (সা.) উদ্দেশ্য। অর্থাৎ রাসূল (সা.) বলছেন, যে ব্যক্তি আমি মুহাম্মাদ-কে ইউনুস থেকে উত্তম মনে করবে সে মিথ্যা বলেছে। বিষয়টি এমন হলে রাসূল (সা.) তার বিনয় প্রকাশ ও অন্যান্য নবীর মানহানী না ঘটার কারণে এমন বলেছেন।
[দুই] (أَنَا) দ্বারা উদ্দেশ্য উক্তিকারী নিজে। অর্থাৎ- কোন ব্যক্তি বলে যে, আমি ইউনুস ইবনু মাত্তা থেকে উত্তম তবে সে মিথ্যা বলল। রাসূল (সা.) -এর এ কথার উদ্দেশ্য হলো, কুরআনে বর্ণিত ইউনুস আলায়হিস সালাম ঘটনা দেখে কেউ যদি নিজেকে ইউনুস ইবনু মাত্তা থেকে উত্তম মনে করে আর ভাবে সে ইউনুস ইবনু মাত্তা থেকে উত্তম, তবে সে মিথ্যা বলল। জ্ঞান, ‘ইবাদাত ও মর্যাদা সম্পর্কে মূর্খ ছাড়া কেউ এমন কথা বলতে পারে না। কেননা কেউ মর্যাদার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্থানে পৌছে গেলেও নুবুওয়্যাতের মর্যাদার স্তরে পৌঁছতে পারে না। পূর্বের বর্ণনা যেখানে বলা হয়েছে, “কোন বান্দার উচিত নয় যে, সে বলবে, আমি ইউনুস ইবনু মাত্তা থেকে উত্তম।” এ বর্ণনা এই ব্যাখ্যাকে সমর্থন করে। (নাবাবী ব্যাখ্যাগ্রন্থ ১৫/১৩২-১৩৩, অনুচ্ছেদ- মূসা আলায়হিস সালাম -এর মর্যাদা)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭১১-[১৪] উবাই ইবনু কা’ব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: যে বালকটিকে খাযির আলায়হিস সালাম হত্যা করেছিলেন, সে ছিল জন্মগত কাফির। যদি সে বেঁচে থাকত, তাহলে সে তার পিতামাতাকে অবাধ্যতা ও কুফরের মধ্যে ফেলে দিত (অথচ তাঁরা ছিলেন ঈমানদার)। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنْ أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ الْغُلَامَ الَّذِي قَتَلَهُ الْخَضِرُ طُبِعَ كَافِرًا وَلَوْ عَاشَ لَأَرْهَقَ أَبَوَيْهِ طُغْيَانًا وَكُفْرًا» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (لم اجدہ) و مسلم (29 / 2661)، (6766) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: (الْخَضِرُ) (খাযির); মূসা আলায়হিস সালাম -কে যার কাছে গিয়ে জ্ঞান আহরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। কুরআনের সূরা কাহফে বিস্তারিত ঘটনার বিবরণ রয়েছে।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, জুমহুর ‘উলামার মতে খাযির আলায়হিস সালাম জীবিত এবং আমাদের মাঝে বিদ্যমান। বিশেষ করে সূফী ও বুযুর্গদের নিকট। তাদের থেকে খাযির আলায়হিস সালাম -কে দেখার ঘটনা, তার সাথে মিলিত হওয়া, তার থেকে জ্ঞান আহরণ করা এবং প্রশ্ন ও উত্তর প্রদান এবং তার উপস্থিতির কথা অসংখ্য। শায়খ ইবনুস্ সলাহ বিষয়টি স্পষ্ট বলেছেন। প্রজ্ঞাবান ‘আলিমদের মাঝে খাযিরের জীবিত থাকার ব্যাপারটি অস্বীকারকারীর সংখ্যা নগণ্য। মুফাসসির হিম্ইয়ারী এবং আবূ আমির বলেন, তিনি নবী ছিলেন। তবে রাসূল ছিলেন কিনা এ ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। কুশায়রী বলেন, অনেকের মতে তিনি ওয়ালী। যারা বলেন তিনি নবী ছিলেন, তাদের দলীল কুরআনের আয়াত যেখানে খাযির বলেছেন: (وَ مَا فَعَلۡتُهٗ عَنۡ اَمۡرِیۡ) অর্থাৎ “আমি নিজ মতে এটা করিনি"- (সূরাহ আল কাহফ ১৮ : ৮২)।
এ আয়াত থেকে বুঝা যায়, তাঁর প্রতি ওয়াহী অবতীর্ণ হত। তাছাড়া তিনি মূসা আলায়হিস সালাম থেকে অধিক জ্ঞানী। আর কোন ওয়ালী নবী থেকে জ্ঞানী হওয়া অসম্ভব। যাদের মতে তিনি নবী নন, তারা এর উত্তর দেন এভাবে যে, হতে পারে তার কাছে আল্লাহ তা'আলা কোন কোন ইলহামের পদ্ধতিতে ওয়াহী পাঠাতেন, যেমন মূসা আলায়হিস সালাম -এর মায়ের কাছে ইলহামের মাধ্যমে প্রেরণ করা হয়েছিল। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,
اِذۡ اَوۡحَیۡنَاۤ اِلٰۤی اُمِّکَ مَا یُوۡحٰۤی ﴿ۙ۳۸﴾ اَنِ اقۡذِفِیۡهِ ﴿ۘ۳۹﴾ “যখন আমি তোমার মাতাকে নির্দেশ দিয়েছিলাম যা নির্দেশ দেয়ার ছিল। তা এই যে, তুমি (মূসাকে) সিন্দুকে রাখ”- (সূরা ত্বা-হা- ২০: ৩৮-৩৯)। আমি (ইমাম নবাবী) বলি, মূসা আলায়হিস সালাম -এর মায়ের প্রতি যে ওয়াহী প্রত্যাদেশ হয়েছিল তা কেবল সন্তানের মুক্তির কৌশল সম্পৃক্ত। অপরদিকে সন্তানের বিষয়টি ইলহামের মাধ্যমে কোন ওয়ালীর হাওলা করা বিশুদ্ধ হবে না। কেননা ইলহামের উপর নির্ভর করে কোন ওয়ালীর জন্য একটি পবিত্র আত্মাকে এই বলে হত্যা করে ফেলা ঠিক হতে পারে না যে, সে স্বভাবজাত কাফির। (নাবাবী ব্যাখ্যাগ্রন্থ- অধ্যায়: মর্যাদা, অনুচ্ছেদ: খাযির আলায়হিস সালাম -এর মর্যাদা)
(طُبِعَ كَافِرًا) অর্থাৎ তাকে কুফরীর প্রকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে; তাই সে সব সময় কুফর পছন্দ করবে। অতএব এ হাদীস (كُلُّ مَوْلُودٍ يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ) অর্থাৎ প্রত্যেক সন্তান ইসলামী স্বভাবজাতের উপর জন্ম নেয়- (বুখারী, মুসলিম)। হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। কেননা এখানে ইসলামী স্বভাবজাত দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ইসলাম গ্রহণের যোগ্যতা। জন্মগত কেউ দুর্ভাগা হওয়ার সাথে এটা সাংঘর্ষিক নয়। প্রসিদ্ধ হাদীসে রয়েছে, প্রত্যেক সন্তানের মাঝে যখন আত্মা ফুঁকা হয়, তখনই সে সৌভাগ্যবান নাকি হতভাগা লিখে দেয়া হয়- (বুখারী, মুসলিম)।
(وَلَوْ عَاشَ لَأَرْهَقَ أَبَوَيْهِ طُغْيَانًا وَكُفْرًا) “যদি সে জীবিত থাকত তবে তার পিতা-মাতাকে কুফরী ও গোমরাহীতে বাধ্য করত।” অর্থাৎ এই সন্তান বড় হওয়ার বয়স পেলে পিতা-মাতাকে কুফরী করতে বাধ্য করত এবং উভয়ের পথভ্রষ্ট হওয়ার কারণ হত। মোটকথা, সন্তানটিকে হত্যা করার কারণ দুটো। একটি কারণ- স্বভাবজাত কাফির হয়ে জন্মগ্রহণ, দ্বিতীয়ত- জীবিত থাকলে পাপী ও অন্যকে ভ্ৰষ্টকারী হওয়া।
ইমাম নবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, যখন তার পিতা-মাতা মু'মিন ছিলেন তখন সেও মু'মিন। অতএব তাকে হত্যা করা বৈধ হয় কিভাবে? তাই এর ব্যাখ্যা জরুরী। এর ব্যাখ্যা এই হতে পারে যে, এই বাচ্চা যদি প্রাপ্তবয়স্ক হত তবে কাফির হত এবং জীবিত থাকলে পিতা-মাতার ওপর চড়াও হত এবং তাদের নি'আমাতের কুফরী করত ও তাদের অবাধ্য হত। অথবা এমনও হতে পারে যে, পিতা-মাতাকে সে তার অনুসরণে বাধ্য করত, যার ফলে তারা পথভ্রষ্ট হত। ইবনু মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, যদি বলা হয়, ভবিষ্যতে কেউ কাফির হওয়ার আশঙ্কায় বর্তমানে তাকে হত্যা করা বৈধ নয়। অতএব খাযির তাকে ভবিষ্যতের আশঙ্কায় কিভাবে হত্যা করলেন? আমি (ইবনুল মালিক) বলি, হয়তো এটা তাদের শারী'আতে বৈধ ছিল। আমি (নবাবী) বলি, আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক খাযির-এর কাজের স্বীকৃতি দেয়া এবং মূসা আলায়হিস সালাম তার কাজের স্বীকৃতি দেয়ার কারণে বৈধতার বিষয়টি স্পষ্ট। বরং আমাদের শারী'আতেও এটা বৈধ হওয়ার প্রমাণ বহন করে, যদি কারো বেলায় নিশ্চিত জানা যায় যে, সে কুফরী স্বভাব নিয়ে জন্মেছে, যেমন শারী'আত প্রণেতা এখানে এই কাজের স্বীকৃতি দিলেন। তবে খাযির নুবুওয়্যাত ও ওয়াহী দ্বারা পরিচালিত ছিলেন বলে তার কাজটি শারী'আতের ভিত্তিতে হয়েছে। কোন ওয়ালীর জন্য আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান বা ইলমে লাদুন্নী অথবা অদৃশ্য ইলহামের ভিত্তিতে এমন বড় ঘটনা ঘটানোর কোন সুযোগ নেই। (নবাবী ব্যাখ্যাগ্রন্থ- অধ্যায়: মর্যাদা, অনুচ্ছেদ: খাযির আলায়হিস সালাম -এর মর্যাদা)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭১২-[১৫] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: খাযিরকে খাযির নামে আখ্যায়িত করার কারণ হলো এই যে, একদিন তিনি একটি শুকনো সাদা জায়গায় বসেছিলেন। তাঁর উঠে যাওয়ার পরই হঠাৎ ঐ স্থানটি সবুজের সমারোহে পরিপূর্ণ হয়ে গেল (সে ঘটনা হতে তার নাম ’খাযির হয়ে গেল)। (বুখারী)
الفصل الاول (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّمَا سُمِّيَ الْخَضِرُ لِأَنَّهُ جَلَسَ عَلَى فَرْوَةٍ بَيْضَاءَ فَإِذَا هِيَ تَهْتَزُّ من خَلْفِه خضراء» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
رواہ البخاری (3402) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (فَرْوَةٍ)-এর বিভিন্ন অর্থ রয়েছে, সাদা বা শুকনো ঘাস, শুকনা ভূমি যেখানে কোন শস্য নেই, ভুমির ঐ খণ্ড যেখানে শুকনো ঘাস রয়েছে। অতএব হাদীসের মর্ম হলো, সাদা শুকনো ঘাস অথবা ঘাস পাতা নেই শুকনো সাদা ভূমিতে খাযির আলায়হিস সালাম বসলে সেই জায়গায় সবুজ তাজা ঘাস উৎপাদিত হয়ে যেত এবং তা নড়াচড়া করত। এটাই খাযির আলায়হিস সালামের নাম খাযির হওয়ার কারণ। কেননা খাযির অর্থ সবুজ। এ থেকে বুঝা গেল খাযির আলায়হিস সালাম-এর মূল নাম অন্য কিছু। ফাতহুল বারীতে লিখেন, খাযির আলায়হিস সালাম-এর নাম, তাঁর পিতার নাম, তাঁর বংশ, তিনি নবী হওয়ার বিষয়, তার জীবিত থাকার বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। এরপর তিনি এগুলো নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। (বিস্তারিত দেখুন- ফাতহুল বারী হা, ৪/৪৩৩)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭১৩-[১৬] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: মৃত্যুর মালাক (ফেরেশতা) মূসা ইবনু ইমরান (আঃ)-এর কাছে এসে বললেন, আপনার প্রভুর ডাকে সাড়া দিন। তখন মূসা আলায়হিস সালাম মৃত্যুর ফেরেশতার চোখের উপর চপেটাঘাত করলেন। ফলে তার চোখ উপড়ে গেল। তিনি বলেন, অতঃপর মালাক (ফেরেশতা) আল্লাহ তা’আলার কাছে ফিরে গিয়ে বললেন, আপনি আমাকে আপনার এমন এক বান্দার কাছে পাঠিয়েছেন, যে মরতে চায় না। এমনকি সে আমার চোখ উপড়িয়ে ফেলেছে।
তিনি (সা.) বলেছেন: তখন আল্লাহ তা’আলা তার চোখ ফিরিয়ে দিলেন এবং বললেন, তুমি পুনরায় আমার সেই বান্দার কাছে যাও এবং বল, তুমি কি বেঁচে থাকতে চাও? যদি তুমি বেঁচে থাকতে চাও, তাহলে একটি ষাড়ের পিঠে হাত রাখ এবং তোমার হাত তার যতগুলো লোম ঢেকে ফেলবে, প্রতিটি লোমের বদলে তোমাকে এক এক বছর আয়ু দান করা হবে। তা শুনে মূসা আলায়হিস সালাম প্রশ্ন করলেন, আচ্ছা, তারপর কি হবে? মালাক (ফেরেশতা) বললেন, অতঃপর তোমাকে মরতে হবে। তখন মূসা ’আলায়হিস সালাম বললেন, তাহলে কাছাকাছি সময়ে এখনই তা হোক। (এরপর তিনি দু’আ করলেন,) হে প্রভু! আপনি আমাকে পবিত্র ভূমি (বায়তুল মাক্বদিস) হতে একটি ঢিল নিক্ষেপের দূরত্ব পর্যন্ত কাছে পৌছিয়ে দিন। (অর্থাৎ তথায় যেন আমাকে দাফন করা হয়) রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আল্লাহর শপথ! যদি আমি সেখানে উপস্থিত থাকতাম, তবে পথ পার্শ্বে লাল বালুর টিলার কাছে তাঁর কবর আমি তোমাদেরকে দেখিয়ে দিতাম। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: جَاءَ مَلَكُ الْمَوْتِ إِلَى مُوسَى ابْنِ عِمْرَانَ فَقَالَ لَهُ: أَجِبْ رَبَّكَ . قَالَ: «فَلَطَمَ مُوسَى عَيْنَ مَلَكَ الْمَوْتِ فَفَقَأَهَا» قَالَ: فَرَجَعَ الْمَلَكُ إِلَى اللَّهِ فَقَالَ: إِنَّكَ أَرْسَلْتَنِي إِلَى عَبْدٍ لَكَ لَا يُرِيدُ الْمَوْتَ وَقَدْ فَقَأَ عَيْنِي قَالَ: فَرَدَّ اللَّهُ إِلَيْهِ عَيْنَهُ وَقَالَ: ارْجِعْ إِلَى عَبْدِي فَقُلْ: الْحَيَاةَ تُرِيدُ؟ فَإِنْ كُنْتَ تُرِيدُ الْحَيَاةَ فَضَعْ يَدَكَ عَلَى مَتْنِ ثَوْرٍ فَمَا تَوَارَتْ يَدُكَ مِنْ شَعْرِهِ فَإِنَّكَ تَعِيشُ بِهَا سَنَةً قَالَ: ثُمَّ مَهْ؟ قَالَ: ثُمَّ تَمُوتُ. قَالَ: فَالْآنَ مِنْ قَرِيبٍ رَبِّ أَدْنِنِي مِنَ الْأَرْضِ الْمُقَدَّسَةِ رَمْيَةً بِحَجَرٍ . قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «وَاللَّهِ لَوْ أَنِّي عِنْدَهُ لَأَرَيْتُكُمْ قَبْرَهُ إِلَى جَنْبِ الطَّرِيقِ عِنْدَ الْكَثِيبِ الْأَحْمَرِ» . مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (1339) و مسلم (158 ، 157 / 2372)، (6148) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: (جِبْ رَبَّكَ) তুমি তোমার রবের ডাকে সাড়া দাও। অর্থাৎ মৃত্যুকে বরণ করার মাধ্যমে তোমার প্রতিপালকের ডাকে সাড়া দাও, আমি তোমার প্রাণ নিতে এসেছি।
(فَلَطَمَ مُوسَى عَيْنَ مَلَكَ الْمَوْتِ فَفَقَأَهَا) “মূসা আলায়হিস সালাম মালাকুল মাওতের চোখে চড় মেরে অন্ধ করে দেন।” বলা হয়, মালাক (ফেরেশতা) কখনো কখনো মানুষের আকার ধারণ করেন। তাদের এই আকার ধারণ মানুষের জন্য পোশাক পরিধানের মতো। মূসা আলায়হিস সালাম-এর চড় মালাকের বাহ্যিক ধারণকৃত চোখে প্রভাব ফেলেছিল। মালাকের মৌলিক চোখে নয়। কেননা মালায়িকার (ফেরেশতাদের) মৌলিক চোখে চড় ইত্যাদি আঘাত করতে পারে না।
(ثُمَّ مَهْ؟) مه শব্দটি মূলত ما ইসতিফহামিয়্যাহ্ এবং সাকতার ه মিলে ঘটিত। যার অর্থ: তারপর কী? অর্থাৎ এই জীবন পাওয়ার পর আবার জীবন নাকি মৃত্যু? মালাক বললেন, তারপর তুমি মারা যাবে। তখন। মূসা আলায়হিস সালাম বলেন, (فَالْآنَ مِنْ قَرِيبٍ) অর্থাৎ তাহলে নিকটবর্তী সময়েই। অর্থাৎ পরে যখন মরতেই হবে তাহলে এই অবস্থায় মৃত্যুকে আমি পছন্দ করলাম। (মিরকাতুল মাফাতীহ, নাবাবী ব্যাখ্যাগ্রন্থ)
কোন কোন নাস্তিক ও ধর্মবিদ্বেষী এ হাদীসকে অস্বীকার করেছে এবং এর কল্পনাকে অস্বীকার করেছে। তারা বলে, মূসার জন্য মালাকুল মাওতের চোখ অন্ধ করা কিভাবে বৈধ হয়? ‘উলামারা এর কয়েকটি উত্তর দিয়ে থাকেন।
[এক] এটা অসম্ভব নয় যে, মূসা আলায়হিস সালাম আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এই চড় মারার অনুমতি নিয়েছিলেন এবং এটা ছিল যাকে চড় মারা হয়েছে তার জন্য পরীক্ষা। আর আল্লাহ তা'আলা তার সৃষ্টির বেলায় যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন এবং যা দিয়ে ইচ্ছা তা দিয়ে পরীক্ষা করতে পারেন।
[দুই] এটা রূপক অর্থে ব্যবহৃত। অর্থাৎ মূসা আলায়হিস সালাম মালাকুল মাওতের সাথে বাহাস ও বিতর্ক করেছেন এবং দলীল প্রমাণে। মালাকের (ফেরেশতার) ওপর জয়লাভ করেছেন। যেমন কেউ কাউকে দলীল প্রমাণে হারিয়ে দিলে বলা হয়ে থাকে, অমুক অমুকের চোখ অন্ধ করে দিয়েছে। এভাবে তুমি কোন জিনিসে ত্রুটি প্রবেশ করিয়ে দিলে বলতে পারো, ‘আমি জিনিসটিকে কানা করে দিয়েছি। তবে এই ব্যাখ্যা দুর্বল। কেননা এ হাদীসেই রাসূল (সা.) বলেছেন, (فرد اللَّه عينه) “অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তার চক্ষু ফিরিয়ে দিলেন”। যদি বলা হয়, আল্লাহ তা'আলা চক্ষু ফিরিয়ে দিয়েছেন, অর্থাৎ- দলীল প্রমাণ ফিরিয়ে দিয়েছেন, তবে এটা খুবই দুর্বল ব্যাখ্যা।
[তিন] মূসা আলায়হিস সালাম বুঝতে পারেননি যে, ইনি মালাক এবং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে প্রেরিত। তিনি ভেবেছেন এই লোক নিজের পক্ষ থেকে এসেছে। তাই তিনি তাকে প্রতিহত করতে চেয়েছেন। আর প্রতিহত করতে গিয়ে চক্ষু জখম হয়ে অন্ধ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত পৌঁছেছে। তিনি চোখ অন্ধ করে দিতে চেয়েছেন এমন নয়। চড় মারার বর্ণনা এটাকে সমর্থন করে। ইমাম আবু বাকর, ইবনু খুযায়মাহ এবং অন্যরা এই উত্তর দেন। মারি এবং কাযী ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) এই মত পছন্দ করেন। তারা বলেন, হাদীসে কোথাও এমন কথা নেই যে, তিনি আঘাত দিয়ে চোখ নষ্ট করে দেয়ার উদ্দেশে এমনটি করেছেন। যদি বলা হয়, ফেরেশতা যখন দ্বিতীয়বার আসলেন, তখন তো মূসা স্বীকার করেছেন ইনি মালাকুল মাওত? উত্তর: দ্বিতীয়বার ফেরেশতা এমন নিদর্শন নিয়ে এসেছেন যার দ্বারা মূসা আলায়হিস সালাম বুঝতে পেরেছেন ইনি মালাকুল মাওত। যার ফলে এবার তিনি নিজেকে মালাকের সামনে সোপর্দ করে দিয়েছেন। কিন্তু প্রথমে চিনতে না পারার কারণে সোপর্দ করেননি। (নাবাবী ব্যাখ্যাগ্রন্থ- অধ্যায়: মর্যাদা, অনুচ্ছেদ: মূসা আলায়হিস সালাম -এর ফযীলত)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭১৪-[১৭] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: (মি’রাজের রাতে) নবী গণকে আমার সামনে উপস্থিত করা হয়। তন্মধ্যে মূসা আলায়হিস সালাম-কে দেখলাম, তিনি মাঝারি ধরনের পুরুষ। মনে হচ্ছিল তিনি যেন শানুয়াহ্ গোত্রেরই একজন লোকে। আর ’ঈসা ইবনু মারইয়াম আলায়হিস সালাম-কেও দেখলাম, আমি যে সকল লোকেদেরকে দেখেছি, তাদের মাঝে তিনি উরওয়াহ্ ইবনু মাস’উদ-এর ঘনিষ্ঠ সদৃশ। আর আমি ইবরাহীম আলায়হিস সালাম-কে দেখেছি। তাঁকে দেখলাম, তিনি অনেকটা তোমাদের বন্ধুর সদৃশ অর্থাৎ তিনি [নবী (সা.)] নিজেই। আর জিবরীল আলায়হিস সালাম-কে দেখলাম, তিনি হলেন আমার দেখা লোকেদের মধ্যে দিহইয়া ইবনু খলীফার সদৃশ। (মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنْ جَابِرٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «عُرِضَ عَلَيَّ الْأَنْبِيَاءُ فَإِذَا مُوسَى ضَرْبٌ مِنَ الرِّجَالِ كَأَنَّهُ مِنْ رِجَالِ شَنوءَةَ ورأيتُ عِيسَى بن مَرْيَم فإِذا أقربُ مَن رأيتُ بِهِ شَبَهًا عُرْوَةُ بْنُ مَسْعُودٍ وَرَأَيْتُ إِبْرَاهِيمَ فَإِذَا أَقْرَبُ مَنْ رَأَيْتُ بِهِ شَبَهًا صَاحِبُكُمْ - يَعْنِي نَفْسَهُ - وَرَأَيْتُ جِبْرِيلَ فَإِذَا أَقْرَبُ مَنْ رَأَيْتُ بِهِ شَبَهًا دِحْيَةُ بْنُ خَلِيفَةَ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
رواہ مسلم (271 / 167)، (423) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (شَنوءَةَ) শব্দটির (ش) অক্ষরে যবর এবং (ن) অক্ষরে পেশ দিয়ে উচ্চারণ। ইয়ামানের একটি গ্রামের নাম শানূয়াহ’র দিকে সম্পৃক্ত করে গ্রামটির নামকরণ করা হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনু কা'ব ইবনু ‘আবদুল্লাহ ইবনু মালিক ইবনু নাসর ইবনু আযদ-এর দিকে লক্ষ্য করে শানুয়াহ’র ব্যক্তিদের মতো বলা হয়েছে। দাউদী বলেন, আদ গোত্রের লোক লম্বা হিসেবে প্রসিদ্ধ। (ফাতহুল বারী হা, ৬/৪২৯)
(عُرْوَةُ بْنُ مَسْعُودٍ) উরওয়াহ্ ইবনু মাস্'উদ। ইনি প্রসিদ্ধ সাহাবী আবদুল্লাহ মাস্'উদ-এর ভাই নন। কেননা ইনি হলেন ‘উরওয়াহ্ ইবনু মাস'উদ আস্ সাকাফী। আর ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাস্'ঊদ এ হলেন হুযলী।
(شَبَهًا صَاحِبُكُمْ) “তোমাদের সঙ্গীর সাদৃশ্য”। এর দ্বারা রাসূল (সা.) নিজেকে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ ইবরাহীম আলায়হিস সালাম -এর গঠন ও আকৃতি রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর সাথে অধিক সাদৃশ্য। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭১৫-[১৮] ইবনু আব্বাস (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: যে রাতে আমার মি’রাজ হয়েছে, সে রাত্রে আমি মূসা আলায়হিস সালাম -কে দেখেছি, তিনি শ্যামবর্ণ, লম্বাকার এবং কোঁকড়ানো চুলবিশিষ্ট লোক। দেখতে ’শানুয়াহ্’ গোত্রের লোকেদের একজন বলে মনে হয়। আর ’ঈসা আলায়হিস সালাম -কে দেখেছি মধ্যম গড়নের লাল-সাদা সংমিশ্রিত বর্ণের, মাথার চুলগুলো সোজা। অতঃপর আমি দেখতে পেয়েছি জাহান্নামের দারোগা মালিক এবং দাজ্জালকেও ঐ সকল নিদর্শনগুলোর মধ্যে, যেগুলো আল্লাহর তা’আলা আমাকে দেখিয়েছেন। অতএব তার সাথে তোমার যে সাক্ষাৎ ঘটবে, তাতে তুমি কোন সন্দেহ পোষণ করো না। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «رَأَيْتُ لَيْلَةَ أُسْرِيَ بِي مُوسَى رَجُلًا آدَمَ طُوَالًا جَعْدًا كَأَنَّهُ شنُوءَة وَرَأَيْت رَجُلًا مَرْبُوعَ الْخَلْقِ إِلَى الْحُمْرَةِ وَالْبَيَاضِ سَبْطَ الرَّأْسِ وَرَأَيْتُ مَالِكًا خَازِنَ النَّارِ وَالدَّجَّالَ فِي آيَاتٍ أَرَاهُنَّ اللَّهُ إِيَّاهُ فَلَا تَكُنْ فِي مرية من لِقَائِه» . مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (3239) و مسلم (267 / 165)، (419) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: (مُوسَى رَجُلًا آدَمَ طُوَالًا جَعْدًا) উপরের হাদীসে মূসা আলায়হিস সালাম-কে শানূয়াহ্ গোত্রের মানুষদের সাথে সাদৃশ্য রূপ দেখানো হয়েছে। এ হাদীসে তা অনেকটা স্পষ্ট করে দেয়া হলো। অথাৎ মূসা আলায়হিস সালাম-এর গায়ের রং ছিল বাদামী এবং তার চুল ছিল কিছুটা কোকড়া এবং তিনি লম্বা ছিলেন।
(وَرَأَيْت رَجُلًا مَرْبُوعَ الْخَلْقِ) এখানে ‘ঈসা আলায়হিস সালাম-এর শারীরিক কাঠামোর কথা বলা হয়েছে। উপরের হাদীসে তাকে ‘উরওয়াহ্ ইবনু মাস'ঊদ (রাঃ)-এর সাথে উপমা দেয়া হয়েছে। এই হাদীসে সাদৃশ্যের দিকটি স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ তিনি ছিলেন মধ্যম গঠনের লোক। না অধিক লম্বা ছিলেন, না খাটো। এ ধরনের মানুষকে ‘আরবীতে ‘মারবূ’ বা ‘রবাআহ' বলা হয়। হাদীসে উভয় শব্দই ব্যবহৃত হয়েছে। আর শরীরের রংয়ের দিক থেকে তিনি ছিলেন সাদা ও লাল মিশ্রিত। যাকে ফর্সা ও সুন্দর বলতে পারি। অর্থাৎ তার রং ধবধবে ফ্যাকাসে সাদা ছিল না। বরং সাদার মাঝে লালিমার প্রতিভাত ছিল। আর তার চুল ছিল সোজা। অর্থাৎ মূসা আলায়হিস সালাম-এর মতো তাঁর চুল কোকড়া ছিল না।
(وَالدَّجَّالَ فِي آيَاتٍ) “আর দাজ্জালকে দেখেছেন কতিপয় নিদর্শনসহ।” অর্থাৎ দাজ্জালকে পাঠানো হয়েছে মানুষের ঈমান পরীক্ষার জন্য। আর এ কারণেই তাকে এমন কিছু ক্ষমতা দেয়া হয়েছে যা অস্বাভাবিক। আর এই অস্বাভাবিক কর্মগুলোকেই হাদীসে আয়াত বা নিদর্শন বলা হয়েছে। দাজ্জালকে দেখার সময় রাসূল (সা.) তার কতিপয় নিদর্শনও দেখেছেন।
তবে বাক্যটির আরেকটি উদ্দেশ্য এই হতে পারে যে, রাসূল (সা.) মি'রাজের রাতে আল্লাহ তা'আলার কতিপয় নিদর্শন দেখেছেন। নিদর্শন দর্শনের সাথে সাথে দাজ্জালকেও দর্শন করেছেন। তখন ‘আয়াত’ বা নিদর্শন দ্বারা দাজ্জালের নিদর্শন বা অস্বাভাবিক কর্ম উদ্দেশ্য হবে না, বরং আল্লাহ তা'আলার অন্যান্য নিদর্শন উদ্দেশ্য হবে, যার কথা আয়াতে ইঙ্গিত করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন -
(لَقَدۡ رَاٰی مِنۡ اٰیٰتِ رَبِّهِ الۡکُبۡرٰی) “নিশ্চয় সে তার পালনকর্তার মহান নিদর্শনাবলী অবলোকন করেছে।” (সূরা আন্ নাজম ৫৩ : ১৮)।
মি'রাজের রাত মূসা আলায়হিস সালাম-সহ অন্যান্য নিদর্শনের সাক্ষাতের ব্যাপারে রাসূল (সা.) এর মনে যেন কোন সন্দেহের প্রশ্রয় না পায় সেদিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ করছেন
(وَ لَقَدۡ اٰتَیۡنَا مُوۡسَی الۡکِتٰبَ فَلَا تَکُنۡ فِیۡ مِرۡیَۃٍ مِّنۡ لِّقَآئِهٖ) “আমি মূসাকে কিতাব দিয়েছি, অতএব আপনি তার সাথে সাক্ষাতের বিষয়ে সন্দিহান হবেন না”- (সূরাহ্ আস্ সাজদাহ্ ৩২ : ২৩)। (ইমাম নবাবী ব্যাখ্যাগ্রন্থ, অধ্যায়: ইসরা)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭১৬-[১৯] আবু হুরায়রাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আমার মি’রাজের রাত্রিতে আমি মূসা আলায়হিস সালাম-এর সাক্ষাৎ পেয়েছি। বর্ণনাকারী বলেন, নবী (সা.) তার আকৃতি বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, তিনি হালকা গড়নের কিছুটা কোঁকড়ানো চুলবিশিষ্ট, দেখতে যেন ’শানূয়াহ’ গোত্রের একজন লোক। তিনি আরো বলেছেন, আমি ’ঈসা আলায়হিস সালাম-এর সাক্ষাৎও পেয়েছি। তিনি ছিলেন মাঝারি গড়নের লালবর্ণবিশিষ্ট। মনে হয় যেন তিনি এইমাত্র হাম্মামখানা (গোসলখানা) হতে বের হয়েছেন। আর আমি ইবরাহীম আলায়হিস সালাম-কেও দেখেছি। তাঁর বংশধরদের মধ্যে আমিই সকলের তুলনায় বেশি তার সদৃশ। তিনি (সা.) বলেন, অতঃপর আমার সামনে দুটি পোয়ালা আনা হলো। একটিতে দুধ এবং অপরটিতে ছিল মদ। আমাকে বলা হলো, আপনি দুটির যেটি ইচ্ছা তুলে নিন। তখন আমি দুধের পেয়ালাটি তুলে নিলাম এবং তা পান করলাম। অতঃপর আমাকে বলা হলো, আপনাকে ফিতরাতের (সৃষ্ট স্বভাবের) পথ প্রদর্শন করা হয়েছে। জেনে রাখুন! আপনি যদি মদের পাত্রটি নিতেন, আপনার উম্মত পথভ্রষ্ট হয়ে যেত। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَيْلَةً أُسْرِيَ بِي لَقِيتُ مُوسَى - فَنَعَتَهُ -: فَإِذَا رَجُلٌ مُضْطَرِبٌ رَجِلُ الشَّعْرِ كَأَنَّهُ مِنْ رِجَالِ شَنُوءَةَ وَلَقِيتُ عِيسَى رَبْعَةً أَحْمَرَ كَأَنَّمَا خَرَجَ مِنْ دِيمَاسٍ - يَعْنِي الْحَمَّامَ - وَرَأَيْتُ إِبْرَاهِيمَ وَأَنَا أَشْبَهُ وَلَدِهِ بِهِ قَالَ: فَأُتِيتُ بِإِنَاءَيْنِ: أَحَدُهُمَا لَبَنٌ وَالْآخَرُ فِيهِ خَمْرٌ. فَقِيلَ لِي: خُذْ أَيَّهُمَا شِئْتَ. فَأَخَذْتُ اللَّبَنَ فَشَرِبْتُهُ فَقِيلَ لِي: هُدِيتَ الْفِطْرَةَ أَمَا إِنَّكَ لَوْ أَخَذْتَ الْخَمْرَ غَوَتْ أمتك . مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (3394) و مسلم (272 / 168)، (424) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: (دِيمَاسٍ) শব্দটির (د) হরফে যের এবং যবর দিয়ে পড়া যায়। অর্থ: গোসলখানা, গর্ত, চুলা। তবে এখানে শব্দটি গোসলখানা অর্থে এসেছে বলে বর্ণনাকারী নিজেই বলে দিয়েছেন। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সা.) এখানে ‘দীমাস’ বলে গোসলখানা উদ্দেশ্য নিয়েছেন। “গোসল থেকে বের হয়েছেন বলে মনে হচ্ছে” দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, চেহারার উজ্জ্বলতা ও সজীবতা। গোসল থেকে বের হলে যেমন চেহারায় পানি থাকে তেমনি ‘ঈসা আলায়হিস সালাম-এর চেহারা ঘামের কারণে ভিজা ছিল অথবা চেহারার সৌন্দর্য ও উজ্জ্বলতা পানি টপকানোর মতো ঝলমল করছি।
(وَأَنَا أَشْبَهُ وَلَدِهِ بِهِ) “তার সন্তানদের মাঝে আমি অধিক সাদৃশ্য”। অর্থাৎ ইবরাহীম আলায়হিস সালাম সন্তানাদির মাঝে যার সাথে তাঁর সর্বাধিক সাদৃশ্যতা রয়েছে তিনি আমি। এখানে ইবরাহীম আলায়হিস সালাম-এর সন্তানাদি বলে তাঁর পুত্র ইসমাঈল আলায়হিস সালাম-এর বংশধরের সন্তান অথবা যে কোন সন্তান হতে পারে। ইবরাহীম আলায়হিস সালাম-এর সাথে রাসূল (সা.)-এর সাদৃশ্যতা বাহ্যিক আকৃতি এবং আত্মিক উভয় দিক থেকে হতে পারে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
(هُدِيتَ الْفِطْرَةَ) অর্থাৎ মালায়িকাহ্ (ফেরেশতারা) রাসূল (সা.) -কে বলেছেন, আল্লাহ আপনাকে স্বভাবজাতের দিকে পথপ্রদর্শন করেছেন। আবার বাক্যটি দু'আ অর্থে হতে পারে। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা আপনাকে স্বভাবজাতের দিকে পথ নির্দেশ করুন।
কাযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, ফিতরাত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মানুষের ঐ মৌলিক স্বভাব যার ওপর আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন। ফিতরাতের বৈশিষ্ট্য হলো ঐ সকল জিনিস থেকে বিমুখ থাকা যাতে ধ্বংস রয়েছে। যেমন মদ যা জ্ঞানকে বিপর্যস্ত করে। কল্যাণের দিকে আহ্বানকারী জ্ঞান নষ্ট করে এমন বস্তু পান করতে বারণ করা একটি স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। সাথে সাথে যার মাঝে কল্যাণ রয়েছে এবং যা সর্বোত্তম খাদ্য তার দিকে ঝুকা স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। স্বভাবজাত এই বৈশিষ্ট্যের আলোকে রাসূল (সা.) মদ গ্রহণ না করে দুধ গ্রহণ করেছেন।
(غَوَتْ أمتك) “তোমার উম্মাত ভ্রষ্ট হয়ে যেত” এটাও এক ধরনের ভ্রষ্টতা যা মদ পান করলে মানুষ সেই ভ্রষ্টতায় পতিত হয়। কেননা তিনি মদ পান করলে তার উম্মত মদ পান করত এবং এর ক্ষতির শিকার হত। “মদ গ্রহণ করলে আপনি ভ্রষ্ট হতেন”’ না বলে আপনার উম্মাত ভ্রষ্ট হয়ে যেত বলার কারণ হলো, তিনি মাসূম ও আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক পরিচালিত। তাই তাঁর ভ্রষ্ট হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই এবং ভ্রষ্টতাকে তার দিকে সম্পৃক্ত করা মানায় না। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭১৭-[২০] ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর সাথে মক্কাহ্ এবং মদীনার মধ্যবর্তী স্থানে ভ্রমণে ছিলাম। এ সময় আমরা একটি উপত্যকা অতিক্রম করছিলাম। তিনি প্রশ্ন করলেন, এটা কোন্ উপত্যকা? লোকেরা বলল, এটা ’আযরক’ উপত্যকা। তিনি বললেন, আমি যেন (মূসা আলায়হিস সালাম-এর) গায়ের রং ও মাথার চুলের কিছু বর্ণনা দিলেন এবং বললেন, তিনি যেন উভয় কানের মধ্যে অঙ্গুলি রেখে উঁচু আওয়াজে তালবিয়া পড়তে পড়তে এ উপত্যকা অতিক্রম করে আল্লাহর (ঘরের) দিকে ছুটে যাচ্ছেন। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর আমারা আরো কিছু দূর সামনে অগ্রসর হয়ে একটি গিরিপথে
এসে উপস্থিত হলাম। তিনি প্রশ্ন করলেন, এটা কোন গিরিপথ? লোকেরা বলল, এটা ’হারশা অথবা বলল ’লিফত। তখন তিনি বললেন, আমি যেন ইউনুস আলায়হিস সালাম-কে এমন অবস্থায় দেখতে পেয়েছি যে, তিনি একটি লালবর্ণের উষ্ট্রীর উপর সওয়ার, তার দেহে পরিহিত একটি পশমি জুব্বা, উষ্ট্রীর লাগাম খেজুর পাতার তৈরি, তিনি ’তালবিয়াহ’ উচ্চারণ করতে করতে এ ময়দান অতিক্রম করছেন। (মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَن ابنِ عبَّاسٍ قَالَ: سِرْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَيْنَ مَكَّةَ وَالْمَدِينَةِ فَمَرَرْنَا بِوَادٍ فَقَالَ: «أَيُّ وَادٍ هَذَا؟» . فَقَالُوا: وَادِي الْأَزْرَقِ. قَالَ: «كَأَنِّي أَنْظُرُ إِلَى مُوسَى» فَذَكَرَ مِنْ لَوْنِهِ وَشَعْرِهِ شَيْئًا وَاضِعًا أُصْبُعَيْهِ فِي أُذُنَيْهِ لَهُ جُؤَارٌ إِلَى اللَّهِ بِالتَّلْبِيَةِ مَارًّا بِهَذَا الْوَادِي . قَالَ: ثُمَّ سِرْنَا حَتَّى أَتَيْنَا عَلَى ثَنِيَّةٍ. فَقَالَ: «أَيُّ ثَنِيَّةٍ هَذِهِ؟» قَالُوا: هَرْشَى - أَوْ لِفْتُ -. فَقَالَ: «كَأَنِّي أَنْظُرُ إِلَى يُونُسَ عَلَى نَاقَةٍ حَمْرَاءَ عَلَيْهِ جُبَّةُ صُوفٍ خِطَامُ نَاقَتِهِ خُلْبَةٌ مَارًّا بِهَذَا الْوَادِي مُلَبِّيًا» رَوَاهُ مُسلم
رواہ مسلم (268 / 166)، (420) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (وَادِي الْأَزْرَقِ) আযরক উপত্যকা। হারামায়ন তথা মক্কাহ্ ও মদীনার মধ্যবর্তী একটি জায়গার নাম। যারকা বা নীলাভ রঙের কারণে জায়গাটিকে আযরক উপত্যকা বলা হয়। তবে নির্দিষ্ট কোন লোকের দিকে সম্পৃক্ত করেও নামকরণ করা হয়েছে বলে বলা হয়ে থাকে।
(وَاضِعًا أُصْبُعَيْهِ فِي أُذُنَيْهِ) “তার দুই আঙ্গুল তার দুই কানে রাখা ছিল।” এটা মূসা আলায়হিস সালাম-এর অবস্থার বিবরণ। অর্থাৎ রাসূল (সা.) যখন মূসা আলায়হিস সালাম-কে দেখেন তখন মূসা আলায়হিস সালাম-এর দুই হাত তার কানের মধ্যে রাখা ছিল।
(لَهُ جُؤَارٌ إِلَى اللَّهِ بِالتَّلْبِيَةِ) অর্থাৎ এই উপত্যকা দিয়ে মূসা হেঁটে যাওয়ার সময় তার তালবিয়াহ্ পাঠের ক্রন্দন শুনা যাচ্ছিল। ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, তালবিয়াহ্ পাঠের আওয়াজ শুনা যাচ্ছিল। উভয় অর্থের মাঝে কোন বৈপরীত্য নেই।
(هَرْشَى - أَوْ لِفْتُ) হারশা বা লিফত ঐ গিরিপথের নাম, যে গিরিপথের কথা রাসূল (সা.) জিজ্ঞেস করছিলেন, (أَيُّ ثَنِيَّةٍ هَذِهِ؟) অর্থাৎ এটা কোন গিরিপথ? এই গিরিপথও মক্কাহ্ মদীনার মাঝে অবস্থিত। গিরিপথটি হারশা বা লিফত এটি বর্ণনাকারীর সন্দেহ হতে পারে অথবা দুটোই তার নাম হতে পারে।
(مَارًّا بِهَذَا الْوَادِي مُلَبِّيًا) ব্যাকরণে (مرا) ও (ملبيا) শব্দ দুটো হাল। উভয় শব্দ দ্বারা ইউনুস আলায়হিস সালাম-এর অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ রাসূল (সা.) ইউনুস আলায়হিস সালাম-এর লাল উষ্ট্রির উপরে উষ্ট্রির লাগাম ধরে ঐ উপত্যকা চলছিলেন আর তালবিয়া পাঠ করছিলেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, যদি বলা হয়, তারা কিভাবে হজ্ করছিল এবং তালবিয়াহ্ পাঠ করছিল, অথচ তারা মৃত এবং আখিরাতের জীবন ‘আমলের জীবন নয়? এর কয়েকটি উত্তর হতে পারে:
[এক] তারা শহীদদের ন্যায়, বরং আরো শ্রেষ্ঠ। আর শহীদগণ আল্লাহ তা'আলার নিকট জীবিত। অতএব তারা হজ করা, সালাত আদায় করা এবং সাধ্যমত আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভের কাজ করা অস্বাভাবিক নয়, যদিও তারা ইহকালীন জীবনের আলোকে মৃত্যুবরণ করেছে এবং তাদের সময় শেষ হয়ে গেছে।
[দুই] তালবিয়াহ্ হচ্ছে দু'আ যা আখিরাতের ‘আমলের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা'আলা বলেন, (دَعۡوٰىهُمۡ فِیۡهَا سُبۡحٰنَکَ اللّٰهُمَّ وَ تَحِیَّتُهُمۡ فِیۡهَا سَلٰمٌ ۚ وَ اٰخِرُ دَعۡوٰىهُمۡ اَنِ الۡحَمۡدُ لِلّٰهِ رَبِّ الۡعٰلَمِیۡنَ)
“সেখানে তাদের প্রার্থনা হলো, পবিত্র তোমার সত্তা হে আল্লাহ। আর শুভেচ্ছা হলো সালাম আর তাদের প্রার্থনার সমাপ্তি হয় সমস্ত প্রশংসা বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহর জন্য বলে।” (সূরা ইউনুস ১০ : ১০)
[তিন] এই ঘটনার মি'রাজের রাতের ঘটনা নাও হতে পারে, বরং এটি হয়তো রাসূল (সা.) -এর অন্য কোন দিনের স্বপ্নের ঘটনা। আর নবীদের স্বপ্ন সত্য। যেমন ইবনু উমার (রাঃ)-এর বর্ণনায় রয়েছে, রাসূল (সা.) বলেন, (بَيْنَمَا أَنَا نَائِمٌ رَأَيْتُنِي أَطُوفُ بِالْكَعْبَةِ) অর্থাৎ একদিন আমি ঘুমে আমাকে দেখছি, আমি কা'বাহ্ ত্বওয়াফ করছি...। (সহীহ মুসলিম অধ্যায়: ঈমান, অনুচ্ছেদ: মাসীহ ও দাজ্জালের আলোচনা, হা. ১৭১)
[চার] তারা জীবিত অবস্থায় এমন করতেন। জীবিত অবস্থায় তারা কিভাবে হজ্ করতেন এবং তালবিয়া পাঠ করতেন তা রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে দেখানো হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর কথা “আমি যেন মূসাকে দেখছি” এই অর্থের প্রতি ইঙ্গিত করে। (নাবাবী ব্যাখ্যাগ্রন্থ- অধ্যায়: ঈমান, অনুচ্ছেদ: ইসরার আলোচনা)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭১৮-[২১] আবু হুরায়রাহ (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: দাউদ আলায়হিস সালাম এর জন্য যাবূর কিতাব তিলাওয়াত করা সহজ করে দেয়া হয়েছিল। এমনকি তিনি তার বাহনের উপর গদি বাধবার আদেশ করতেন। তখন তার উপর গদি বাঁধা হত। অথচ বাহনের পশুর উপর গদি বাঁধা শেষ হওয়ার পূর্বেই তিনি যাবূর কিতাব পরিপূর্ণভাবে তিলাওয়াত শেষ করে ফেলতেন। আর তিনি নিজ হাতের উপার্জন ছাড়া কিছুই খেতেন না। (বুখারী)
الفصل الاول (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «خُفِّفَ عَلَى دَاوُدَ الْقُرْآنُ فَكَانَ يَأْمُرُ بِدَوَابِّهِ فَتُسَرَّحَ فَيَقْرَأُ الْقُرْآنَ قَبْلَ أَنْ تُسَرَّحَ دَوَابُّهُ وَلَا يَأْكُلُ إِلَّا مِنْ عملِ يدَيهِ» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
رواہ البخاری (3417) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (خُفِّفَ عَلَى دَاوُدَ الْقُرْآنُ) “দাউদের জন্য কুরআন সহজ করে দেয়া হয়েছিল। এখানে “কুরআন' শব্দটি শাব্দিক অর্থে এসেছে, যার অর্থ পঠিত বস্তু। দাউদ আলায়হিস সালাম-এর কুরআন দ্বারা তার ওপর নাযিলকৃত কিতাব যাবূর উদ্দেশ্য। নিহায়ায় বলেন, এখানে 'কুরআন' শব্দটি সমবেত করার অর্থে এসেছে। আর কুরআনকে কুরআন বলার কারণ হলো, কুরআনে ঘটনাবলী, আদেশ, নিষেধ, প্রতিশ্রুতি, ধমকি, আয়াত ও সূরাহ্ সমবেত করা হয়েছে।
তুরিবিশতী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, কুরআন দ্বারা যাবূর উদ্দেশ্য। আর যাবূরকে কুরআন বলে আখ্যায়িত করার কারণ হলো কুরআনের সাথে তাকে তুলনা করা। কেননা পাঠ্যবস্তু হিসেবে দুটোই অলৌকিক।
হাদীস থেকে বুঝা যায়, আল্লাহ তা'আলা তার কোন বান্দার জন্য চাইলে সময়কে গুটিয়ে দেন, যেমন কারো জন্য চাইলে স্থানকে গুটিয়ে দেন, তবে এটা সবার দ্বারা বুঝা সম্ভব নয়। মোটকথা, এটি দাউদ আলায়হিস সালাম এর একটি অলৌকিক নিদর্শন। তবে এখানে মতভেদ হলো আল্লাহ তা'আলা দাউদ আলায়হিস সালাম-এর জন্য সময়কে প্রশস্ত করে দিলেন, নাকি সময়কে আপন জায়গায় বহাল রেখে তার যবানকে দ্রুত করে দিলেন? প্রথম মতটি অধিক প্রকাশ্য। মি'রাজের রাতে নবী (সা.) -এর বেলায় এই অর্থ পূর্ণাঙ্গরূপে প্রকাশ পেয়েছিল। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭১৯-[২২] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ (রাঃ)] নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: দু’জন মহিলা এবং তাদের সঙ্গে তাদের দু’টি শিশু সন্তানও ছিল। এমন সময় আকস্মাৎ একটি বাঘ এসে তাদের একজনের শিশুটি নিয়ে গেল। তখন সাথের অন্য মহিলাটি বলল, বাঘে তোমার শিশুটি নিয়েছে। দ্বিতীয় মহিলাটি বলল, বাঘে নিয়েছে তোমার শিশু। অতঃপর উভয় মহিলা দাউদ আলায়হিস সালাম-এর কাছে এর মীমাংসার জন্য বিচারপ্রার্থী হলো। তখন দাউদ আলায়হিস সালাম শিশুটির ব্যাপারে বয়স্ক মহিলাটির পক্ষে রায় দিলেন। এরপর মহিলা দু’জন বের হয়ে দাউদ আলায়হিস সালাম-এর পুত্র সুলায়মান ’আলায়হিস সালাম-এর সামনে দিয়ে যাচ্ছিল এবং তারা উভয়ে তাকে সংশ্লিষ্ট মামলার রায়ের বর্ণনা শুনাল। তখন সুলায়মান আলায়হিস সালাম উপস্থিত লোকজনকে বললেন, তোমরা আমার কাছে একখানা চাকু নিয়ে আস। আমি শিশুটিকে কেটে দ্বিখণ্ডিত করে তাদের মধ্যে ভাগ করে দেব। এ কথা শুনে অল্প বয়স্কা মহিলাটি বলে উঠল, এ কাজ করবেন না। আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া করুন। (আমি মেনে নিয়েছি) শিশুটি তারই। তখন তিনি সেই অল্পবয়স্ক মহিলাটির পক্ষেই রায় দিয়ে দিলেন। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: كَانَتِ امْرَأَتَانِ مَعَهُمَا ابْنَاهُمَا جَاءَ الذِّئْبُ فَذَهَبَ بِابْنِ إِحْدَاهُمَا فَقَالَتْ صَاحِبَتُهَا: إِنَّمَا ذَهَبَ بابنك. وَقَالَت الْأُخْرَى: إِنَّمَا ذهب بابنك فتحاكما إِلَى دَاوُدَ فَقَضَى بِهِ لِلْكُبْرَى فَخَرَجَتَا عَلَى سُلَيْمَانَ بْنِ دَاوُدَ فَأَخْبَرَتَاهُ فَقَالَ: ائْتُونِي بِالسِّكِّينِ أَشُقُّهُ بَيْنَكُمَا. فَقَالَتِ الصُّغْرَى: لَا تَفْعَلُ يَرْحَمُكَ اللَّهُ هُوَ ابْنُهَا فَقَضَى بِهِ لِلصُّغْرَى مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (3427) و مسلم (20 / 1720)، (4495) ۔
(مُتَّفق عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: উভয়ে সন্তানটির দাবীর কারণ এই হতে পারে যে, সন্তান দুটো সদৃশ্য ছিল। অথবা একজন মিথ্যা বলেছে। নিজের ছেলে হারিয়ে যাওয়ায় সে অন্যের সন্তান দিয়ে সেই শোক নিবারণ করতে চাচ্ছিল। অন্য কোন খারাপ উদ্দেশ্য বা ষড়যন্ত্রের কারণেও করতে পারে।
(فَقَضَى بِهِ لِلْكُبْرَى) দাউদ 'আলায়হিস সালাম বাচ্চাটির ফয়সালা বড়জনের জন্য করার কারণ এই হতে পারে যে, বাচ্চাটি বড় জনের কাছে ছিল। এমতাবস্থায় অন্যজনের কাছে কোন সুস্পষ্ট প্রমাণ না থাকায় যার কাছে ছিল তার জন্য ফয়সালা করেন। কেননা কোন ধরনের প্রমাণ না থাকলে ব্যক্তির কাছে থাকার বস্তুটি তার বলে একটি প্রমাণ। যদিও প্রমাণটি দুর্বল। তারপরও এর চেয়ে শক্তিশালী দলীল না থাকলে এটিই কার্যকর হয়। আবার এমনও হতে পারে যে, বাচ্চাটি বড়জনের সাথে অধিক সদৃশ্য ছিল। তাই অন্য দলীল না থাকাবস্থায় কিয়াফার (চিহ্ন অনুসরণ সংক্রান্ত) জ্ঞানের আলোকে দাউদ আলায়হিস সালাম বাচ্চাটিকে বড়জনের বলে ফয়সালা করেন।
(فَقَضَى بِهِ لِلصُّغْرَى) সন্তানটি কার এই প্রমাণ কারো কাছে না থাকায় সুলায়মান আলায়হিস সালাম কৌশল ও বুদ্ধিমত্তার আশ্রয় নিয়ে বিচার করেন। ছোটজন যখন বাচ্চাটি দ্বিখণ্ডিত হওয়াতে রাজি হয়নি বরং দ্বিখণ্ডিত হয়ে অনিবার্য মরণ থেকে অন্যজনের হাতে থেকে বাচ্চার বেঁচে থাকা পছন্দ করল। সুলায়মান আলায়হিস সালাম বাচ্চার প্রতি তার স্নেহ মমতার প্রকাশ দেখে বুঝতে পারলেন বাচ্চাটি মূলত ছোটজনের। বড়জনের কাছ থেকে এমন নিদর্শন পাননি, বরং হতে পারে শত্রুতার ছাপ পরিলক্ষিত হয়েছে।
মিরকাত প্রণেতা বলেন, উভয়ের সমাধান সঠিক; কেননা উভয় জনই মুজতাহিদ ও ইজতিহাদের আলোকে এই ফয়সালা দিয়েছেন। তবে যেসব আকার ইঙ্গিতের আলোকে সুলায়মান আলায়হিস সালাম সমাধান দিয়েছেন তা অধিক শক্তিশালী। বিষয়টি এমনও হতে পারে যে, অবস্থার আকার ইঙ্গিত তাদের শারী'আতে দলীলের পর্যায়ভুক্ত ছিল। তাই একজনের হাতে থাকলেও আকার ইঙ্গিতে অন্যের বুঝতে পারায় সুলায়মান আলায়হি তার জন্য ফয়সালা করেন।
ইমাম নবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, দাউদ আলায়হিস সালাম বাচ্চাটিকে বড় মেয়ের জন্য ফয়সালার কারণ এই হতে পারে যে, তিনি বাচ্চা ও তার মাঝে সাদৃশ্যতা দেখেছেন, অথবা বাচ্চাটি তার হাতে ছিল। কিন্তু সুলায়মান আলায়হিস সালাম কৌশল ও বুদ্ধিমত্তার আলোকে সমস্যাটির গভীরে প্রবেশ করেছেন এবং বাচ্চার প্রতি উভয়ের মমতার পরীক্ষা করতে চেয়েছেন; যাতে রহস্যটি উদঘাটিত আসে। বাস্তবে বাচ্চাকে দ্বিখণ্ডিত করা উদ্দেশ্য ছিল না। অতঃপর যখন বিষয়টি তার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল, তিনি বাচ্চাটিকে ছোটজনের বলে ফয়সালা করেন। যদি বলা হয়, সুলায়মান আলায়হিস সালাম তার পিতা নবী (সা.) দাউদ 'আলায়হিস সালাম-এর দেয়া ফয়সালা কিভাবে ভঙ্গ করলেন? এর কয়েকটি উত্তর হতে পারে:
[এক] দাউদ আলায়হিস সালাম-এর ফয়সালাটি চূড়ান্ত ছিল না। [দুই] দাউদ আলায়হিস সালাম-এর ফয়সালাটি একটি ফাতাওয়া হিসেবে ছিল, বিচারের ফয়সালা হিসেবে নয়। [তিন] হয়তো তাঁর শরী'আতে ফয়সালা ভঙ্গের নীতি ছিল, যদি ফয়সালাটি আরেক বিচারকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয় এবং বিচারক পূর্ববর্তী ফয়সালার বিপরীত ফয়সালাকে উত্তম বলে মনে করে থাকেন।
(নবাবী ব্যাখ্যাগ্রন্থ, অধ্যায়: বিচারকার্য, অনুচ্ছেদ: দুই মুজতাহিদের মতানৈক্য)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭২০-[২৩] উক্ত রাবী [আবু হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: একদিন সুলায়মান ’আলায়হিস সালাম (কসম করে) বললেন, অবশ্যই আমি আজ রাত্রে আমার নব্বইজন স্ত্রীর নিকটে গমন করব, অন্য এক বর্ণনায় আছে, একশত স্ত্রীর কাছে গমন করব। আর প্রত্যেক স্ত্রী একজন করে অশ্বারোহী মুজাহিদ গর্ভে ধারণ করবে এবং এরা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবে। তখন মালাক (ফেরেশতা) তাঁকে বললেন, ’ইনশা-আল্লা-হ’ বলুন! কিন্তু সুলায়মান আলায়হিস সালাম তা বলতে ভুলে যান। অতঃপর তিনি সমস্ত স্ত্রীদের কাছে গমন করলেন, কিন্তু একজন স্ত্রী ছাড়া তাদের আর কেউই গর্ভধারণ করল না। সেও অর্ধ অঙ্গের একটি সন্তান। [নবী (সা.) বলেন] সেই মহান সত্তার শপথ, যার হাতে আমার মুহাম্মাদ -এর প্রাণ! যদি তিনি ইনশা-আল্লা-হ বলতেন, তাহলে (সবগুলো সন্তানই জন্ম নিত এবং) তারা সকলেই অশ্বারোহী হয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করতে। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: قَالَ سُلَيْمَانُ: لَأَطُوفَنَّ اللَّيْلَةَ عَلَى تِسْعِينَ امْرَأَةٍ - وَفِي رِوَايَةٍ: بِمِائَةِ امْرَأَةٍ - كُلُّهُنَّ تَأْتِي بِفَارِسٍ يُجَاهِدُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ. فَقَالَ لَهُ الْمَلَكُ: قُلْ إِنْ شَاءَ اللَّهُ. فَلَمْ يَقُلْ وَنَسِيَ فَطَافَ عَلَيْهِنَّ فَلَمْ تحملْ منهنَّ إِلا امرأةٌ واحدةٌ جاءتْ بشقِّ رَجُلٍ وَأَيْمُ الَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَوْ قَالَ: إِنْ شَاءَ اللَّهُ لَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ الله فُرْسَانًا أجمعونَ . مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (2819) و مسلم (25 / 1654)، (4286) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: (لَأَطُوفَنَّ) শাব্দিক অর্থ আমি প্রদক্ষিণ করব, ঘুরব। স্ত্রীদের কাছে প্রদক্ষিণ বলে সহবাসের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
(وَفِي رِوَايَةٍ: بِمِائَةِ امْرَأَةٍ) “একটি বর্ণনায় একশো স্ত্রীর কথা রয়েছে।” স্ত্রীদের সংখ্যা বর্ণনার ক্ষেত্রে হাদীসটি মুযতারাব। বিভিন্ন বর্ণনায় বিভিন্ন সংখ্যা কথা বলা হয়েছে। নব্বই ও একশোর বর্ণনা ছাড়াও কোন কোন বর্ণনায় ষাট, কোন বর্ণনায় সত্তর, আবার কোন বর্ণনায় নিরান্নব্বই সংখ্যার কথা রয়েছে। আবার বুখারীর বর্ণনায় সংখ্যা ছাড়া (على نِسَائِ) বলা হয়েছে। ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, সংখ্যা বর্ণনার এ ভিন্নতা পরস্পর সাংঘর্ষিক নয়। কেননা ছোট সংখ্যা উল্লেখের দ্বারা বড় সংখ্যা নাকচ করা হয় না। এটা হলো সংখ্যার বিপরীত মর্ম। আর সংখ্যার ক্ষেত্রে বিপরীত গ্রহণযোগ্য না হওয়া জামহুর উসূলবিদদের মতামত। এখানে নবীদের শক্তি ও ক্ষমতার বিশেষত্ব বর্ণনা করা হয়েছে। একই রাতে এত জন নারীর সাথে সহবাস করার শক্তি ও সামর্থ্য কেবল নবীর বৈশিষ্ট্য হতে পারে। (নাবাবী ব্যাখ্যাগ্রন্থ- অধ্যায়: শপথ, অনুচ্ছেদ: শপথে ইসতিসনা)
(فَقَالَ لَهُ الْمَلَكُ) “মালাক (ফেরেশতা) তাকে বলল।” মালাক বলতে ডান কাঁধে নিয়োজিত মালাক হতে পারেন, আবার জিবরীল হতে পারেন, আবার অন্য কোন মালাকও হতে পারেন।
(فَلَمْ يَقُلْ وَنَسِيَ) “তিনি বলেননি, আর ভুলে গেছেন” এর দ্বারা বুঝা যায় তিনি মালাকের (ফেরেশতার) নির্দেশের সাথে সাথে তৎক্ষণাৎ ‘ইনশা-আল্লা-হ' না বললেও পরে বলার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু পরে ভুলে গেছেন। অথবা মন থেকে ‘ইনশা-আল্ল-হ’র স্বীকারোক্তিকে তিনি যথেষ্ট মনে করেছেন। কিন্তু অন্তর ও মুখ দিয়ে ‘ইনশা-আল্ল-হ' বলাটাই হলো পূর্ণাঙ্গ ‘ইনশা-আল্ল-হ', যা উচ্চ স্তরের ব্যক্তির জন্য বাঞ্ছনীয়। কিন্তু সর্বোচ্চ স্তরের মানুষের নবীর ক্ষেত্রে এই পদস্খলন হওয়ায় আল্লাহ তাকে পরীক্ষার সম্মুখীন করেছেন।
(بشقِّ رَجُلٍ) অর্থাৎ অর্ধেক বাচ্চা, বা অসম্পন্ন বাচ্চা। সম্পন্ন বাচ্চা না হওয়াকে অর্ধ বাচ্চা বলে ব্যক্ত করা হয়েছে।
হাদীস থেকে প্রমাণিত যে, কোন কাজ করার ইচ্ছা করলে কাজের শুরুতে ‘ইনশা-আল্লা-হ’ বলা মুসতাহাব। অর্থাৎ ‘ইনশা-আল্ল-হ আমি এ কাজটি করব' এমন বলা। এর উদ্দেশ্য হলো কাজের মাঝে আল্লাহর নামের বরকত লাভ এবং কাজটি সহজ হওয়ার প্রার্থনা। এই নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেন, (وَ لَا تَقُوۡلَنَّ لِشَایۡءٍ اِنِّیۡ فَاعِلٌ ذٰلِکَ غَدًا ﴿ۙ۲۳﴾ اِلَّاۤ اَنۡ یَّشَآءَ اللّٰهُ.. ﴿۲۴﴾) “আপনি কোন কাজের বিষয়ে বলবেন না যে, সেটি আমি আগামীকাল করব। আল্লাহ ইচ্ছা করলে বলা ব্যতিরেকে..."- (সূরাহ্ আল কাহফ ১৮ : ২৩-২৪)। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭২১-[২৪] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: যাকারিয়া আলায়হিস সালাম ছুতোর (কাঠ) মিস্ত্রি ছিলেন। (মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «كَانَ زَكَرِيَّاء نجارا» . رَوَاهُ مُسلم
رواہ مسلم (169 / 2379)، (6162) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: (نجارا) কাঠমিস্ত্রী। অর্থাৎ তিনি কাঠ কাটতেন এবং তা দিয়ে বস্তু তৈরি করে নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন। মুল্লা ‘আলী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এই হাদীস এবং পূর্বে বর্ণিত দাউদ আলায়হিস সালাম-এর কর্মের হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, উপার্জন করা নবীদের সুন্নাত। এটা আল্লাহ তা'আলার ওপর ভরসার পরিপন্থী নয়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭২২-[২৫] উক্ত রাবী [আবু হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আমি দুনিয়া এবং আখিরাতে ’ঈসা ইবনু মারইয়াম আলায়হিস সালাম -এর সবচেয়ে বেশি কাছাকাছি। নবীগণ পরস্পরে ’আল্লাতী ভাই’, তাঁদের মা ভিন্ন ভিন্ন এবং তাঁদের দীন অভিন্ন। আর আমার ও তাঁর মাঝখানে কোন নবী নেই। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَنَا أَوْلَى النَّاسِ بِعِيسَى بن مَرْيَمَ فِي الْأُولَى وَالْآخِرَةِ الْأَنْبِيَاءُ أُخْوَةٌ مِنْ عَلَّاتٍ وَأُمَّهَاتُهُمْ شَتَّى وَدِينُهُمْ وَاحِدٌ وَلَيْسَ بَيْنَنَا نَبِي» . مُتَّفق عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (3442 ۔ 3443) و مسلم (145 / 2365)، (6130) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: (أَنَا أَوْلَى النَّاسِ بِعِيسَى بن مَرْيَمَ فِي الْأُولَى وَالْآخِرَةِ) অর্থাৎ আমি দুনিয়া ও আখিরাতে ‘ঈসার অধিক নিকটবর্তী। ইবনু হাজার (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, কেননা ‘ঈসা আলায়হিস সালাম তাঁর আগমনের সুসংবাদ দিয়েছেন। এই হাদীস এবং কুরআনের আয়াত- (اِنَّ اَوۡلَی النَّاسِ بِاِبۡرٰهِیۡمَ لَلَّذِیۡنَ اتَّبَعُوۡهُ وَ هٰذَا النَّبِیُّ) “নিশ্চয় মানুষদের মধ্যে ইবরাহীমের সর্বাধিক ঘনিষ্ঠতম তারা যারা তার অনুসরণ করেছে, আর এই নবী”- (সূরাহ আলি ‘ইমরান ৩ : ৬৮)। উভয়ের মাঝে কোন বিরোধ নেই। কেননা কুরআনের আয়াতে রাসূল (সা.) ইবরাহীম আলায়হিস সালাম এর অনুসারী হিসেবে অধিক ঘনিষ্ঠ বলা হয়েছে। আর হাদীসে রাসূল (সা.) -এর অনুসৃত হিসেবে 'ঈসা আলায়হিস সালাম এর অধিক নিকটতম বলা হয়েছে। সঠিক কথা, উভয়ের মাঝে কোন বৈপরীত্য নেই; তাই আয়াত ও হাদীসের মাঝে সমন্বয়ের প্রয়োজন নেই। রাসূল (সা.) ইবরাহীম আলায়হিস সালাম-এর যেমন সর্বাধিক ঘনিষ্ঠ, তেমনিভাবে “ঈসা আলায়হিস সালাম-এরও সর্বাধিক ঘনিষ্ঠ। মানুষের মাঝে কেউই ইবরাহীম আলায়হিস সালাম ও ‘ঈসা আলায়হিস সালাম-এর সাথে রাসূল (সা.)
-এর চেয়ে ঘনিষ্ঠ নয়। আবার ইবরাহীম অনুসৃত হওয়ার দিক থেকে রাসূল (সা.) -এর অধিক ঘনিষ্ঠ এবং সময়ের দিক থেকে ‘ঈসা আলায়হিস সালাম রাসূল (সা.) -এরও অধিক ঘনিষ্ঠ। (ফাতহুল বারী হা. ৬/৪৯৮)।
(الْأَنْبِيَاءُ أُخْوَةٌ مِنْ عَلَّاتٍ وَأُمَّهَاتُهُمْ شَتَّى) বা ‘আল্লাতি ভাই’ বলা হয় পিতৃ-সম্পর্কের ভাইয়ের। একই পিতা ও ভিন্ন মাতা তথা বৈমাত্রেয় ভাইদেরকে আল্লাতি ভাই বলা হয়। এখানে নবীদেরকে একই পিতা ও ভিন্ন মাতার ছেলে বলার অর্থ হলো, সব নবীকে পাঠানোর চূড়ান্ত লক্ষ্য একটা। আর তা হলো, সৃষ্টিকে স্রষ্টার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া, তাদেরকে সঠিক পথের দিশা দেয়া, তাদের জীবন ও আখিরাত সুন্দর করা; এসব মৌলিক বিষয়ে সকল নবীর দাওয়াত এক। যদিও শরী'আতের শাখা-প্রশাখার দিক থেকে একজন অপরজন থেকে ভিন্ন। তাই নবী (সা.) সকল নবীর মৌলিক ও সবার মাঝে বিদ্যমান বিষয়কে পিতার সাথে তুলনা করে সেদিকে সম্পৃক্ত করেছেন। আর যুগ ও কালের চাহিদা মোতাবেক তাদের মাঝে ভিন্ন ভিন্ন। বিধানাবলীকে মায়ের সাথে তুলনা করেছেন। এটাই হলো রাসূল (সা.) -এর উক্তি তাদের মাতা ভিন্ন ভিন্ন” এর মর্ম। কেননা তাদের যুগ ও কালের ভিন্নতার আলোকে অনেক বিধান ভিন্ন। তবে তাদেরকে পাঠানোর মূল উদ্দেশ্য সর্বযুগে এক। এদিকে ইঙ্গিত করে রাসূল (সা.) বলেন, “তাদের দীন এক”। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭২৩-[২৬] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: প্রতিটি আদম সন্তান জন্মলাভকালে শয়তান অঙ্গুলি দ্বারা তার পার্শ্বস্থলে খোঁচা দেয় ’ঈসা ইবনু মারইয়াম আলায়হিস সালাম ছাড়া। শয়তান তাঁকে খোঁচা দিতে গেলে, তখন শুধু তাঁর আবরণে খোঁচা দিতে সক্ষম হয় (তার শরীরে আঘাত করতে পারেনি।)। (বুখারী ও মুসলিম)
الفصل الاول (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «كُلُّ بَنِي آدَمَ يَطْعَنُ الشَّيْطَانُ فِي جَنْبَيْهِ بِإِصْبَعَيْهِ حِينَ يُوَلَدُ غَيْرَ عِيسَى بْنِ مَرْيَمَ ذَهَبَ يَطْعَنُ فَطَعَنَ فِي الْحِجَابِ» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (3286) و مسلم (147 / 2366)، (6133) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: (يَطْعَنُ) অর্থ: আঘাত করা। এখানে উদ্দেশ্য হলো শয়তানের স্পর্শ করা এবং আক্রান্ত করা।
(حِينَ يُوَلَدُ) জন্মের সময়। অর্থাৎ জন্মের প্রথম দিন তথা বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় শয়তান এ কাজটি করে। তবে ‘ঈসা আলায়হিস সালাম শয়তানের এই আক্রমণ থেকে মুক্ত থাকেন। তার নানী হান্নার দু'আয় আল্লাহ তা'আলা তাঁকে মুক্ত রাখেন। হান্না তার মেয়ে মারইয়াম তথা ‘ঈসা আলায়হিস সালাম-এর মায়ের জন্য দু'আ করে বলেছিলেন, এই (وَ اِنِّیۡ سَمَّیۡتُهَا مَرۡیَمَ وَ اِنِّیۡۤ اُعِیۡذُهَا بِکَ وَ ذُرِّیَّتَهَا مِنَ الشَّیۡطٰنِ الرَّجِیۡمِ) “আর আমি তার নাম রাখলাম মারইয়াম। আর আমি তাকে ও তার সন্তানদেরকে তোমার আশ্রয়ে সমপর্ণ করছি অভিশপ্ত শয়তানের কবল থেকে।” (সূরাহ্ আ-লি ‘ইমরান ৩ : ৩৬)।
(فَطَعَنَ فِي الْحِجَابِ) “অতএব সে পর্দায় আঘাত করে।” অর্থাৎ শয়তান যখন ‘ঈসা আলায়হিস সালাম-কে আঘাত ও খোঁচা দিতে ব্যর্থ হয় তখন সে তার মায়ের উদরের আবরণে আঘাত করে। এই আঘাত ‘ঈসা আলায়হিস সালাম-কে স্পর্শ করেনি। এর দ্বারা বুঝা যায়, শয়তানের স্পর্শকরণ প্রকৃত অর্থে। বর্ণনাকারী এখানে কেবল ‘ঈসা আলায়হিস সালাম-এর কথা উল্লেখ করেছেন। অথচ মূল হাদীসে মারইয়াম ও তার ছেলের কথা রয়েছে। অর্থাৎ মারইয়াম এবং ঈসা দু'জনই জন্মের সময় শয়তানের এই খোচা থেকে মুক্ত ছিলেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭২৪-[২৭] আবু মূসা (রাঃ) নবী (সা.) - হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: পুরুষদের মাঝে অনেকেই কামিল হয়েছেন, কিন্তু নারীদের মধ্যে ’ইমরান-এর মেয়ে মারইয়াম এবং ফির’আওন-এর স্ত্রী আসিয়াহ্ ছাড়া আর কেউই কামিল হননি। তিনি আরো বলেছেন, সকল নারীর ওপর ’আয়িশাহ্ (রাঃ) -এর সম্মান এমন, যেমন সর্ব রকমের খাদ্য সামগ্রীর উপর ’সারীদের সম্মান। (বুখারী ও মুসলিম)
মুফাখারাহ্ ও ’আসাবিয়্যাহ্ অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, আনাস (রাঃ)-এর হাদীস (يَا خَيْرَ الْبَرِيَّةِ) আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)-এর হাদীস (أَيُّ النَّاسِ أَكْرَمُ) আর ইবনু উমার (রাঃ)-এর হাদীস (الْكَرِيم بن الْكَرِيمِ)।
الفصل الاول (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنْ أَبِي مُوسَى عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «كَمُلَ مِنَ الرِّجَالِ كَثِيرٌ وَلَمْ يَكْمُلْ مِنَ النساءِ إِلا مريمُ بنتُ عِمْرَانَ وَآسِيَةُ امْرَأَةُ فِرْعَوْنَ وَفَضْلُ عَائِشَةَ عَلَى النِّسَاءِ كَفَضْلِ الثَّرِيدِ عَلَى سَائِرِ الطَّعَامِ» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ وَذَكَرَ حَدِيثَ أَنَسٍ: «يَا خَيْرَ الْبَرِيَّةِ» . وَحَدِيثَ أَبِي هُرَيْرَةَ: «أَيُّ النَّاسِ أَكْرَمُ» وَحَدِيثُ ابْن عمر: الْكَرِيم بن الْكَرِيمِ: «. فِي» بَابِ الْمُفَاخَرَةِ وَالْعَصَبِيَّةِ
متفق علیہ ، رواہ البخاری (3411)و مسلم (70 / 2431)، (6272) 0 حدیث ’’ خیر البریۃ ‘‘ تقدم (4896) و ’’ ای الناس ، اکرم ‘‘ تقدم (4893) و ’’ الکریم بن اکریم ‘‘ تقدم (4894) ۔
(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
ব্যাখ্যা: (كَمُلَ مِنَ الرِّجَالِ كَثِيرٌ) অর্থাৎ পুরুষ জাতির মাঝে অনেকে পরিপূর্ণ হয়েছে। এমনকি তাদের মাঝে রাসূল, নবী, খলীফাহ্, উলামাহ্ ও ওয়ালী হয়েছেন।
(وَلَمْ يَكْمُلْ مِنَ النساءِ إِلا مريمُ بنتُ عِمْرَانَ وَآسِيَةُ امْرَأَةُ فِرْعَوْنَ) “আর নারীদের মধ্যে মারইয়াম ও ফির'আওন-এর স্ত্রী ‘আসিয়াহ্ ছাড়া কেউ পরিপূর্ণ হয়নি।” পরিপূর্ণতাকে এই দুজনের মাঝে সীমাবদ্ধ করার কারণে নারীদের মাঝে তারা নবী ছিলেন বলে দলীল দেয়া হয়। কেননা নবীরা হচ্ছেন মানুষের মাঝে সর্বাধিক পরিপূর্ণ। তারপর ওয়ালী, তারপর সিদ্দীক, তারপর শহীদ। যদি তারা নবী হন তবে পরিপূর্ণতাকে তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার অর্থ এই হবে যে, নারীদের মাঝে ওয়ালী, সিদ্দীক, শহীদ নেই। তবে কিরমানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, পূর্ণাঙ্গে উপনীত হওয়ার দ্বারা তারা নবী হওয়া আবশ্যক হয় না। যে ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ বলা হয়েছে সে ক্ষেত্রে চূড়ান্ত পরিপূর্ণ হতে পারে। অতএব তারা পূর্ণাঙ্গ পৌছেছেন দ্বারা উদ্দেশ্য হবে নারীদের সকল শ্রেষ্ঠ গুণে তাদের স্তরে কেউ পৌছেনি।
(كَفَضْلِ الثَّرِيدِ عَلَى سَائِرِ الطَّعَامِ) “যেমন সারীদের শ্রেষ্ঠত্ব সকল খাবারের উপর”। রুটিকে গোশত বা তার ঝোলের সাথে ভিজিয়ে যে খাবার তৈরি করা হয় সেটাকে সারীদ। তূরিবিশতী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, সারীদের সাথে ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে তুলনা করার কারণ হলো, সারীদ আরবের শ্রেষ্ঠ খাবার। সারীদকে তারা সবচেয়ে তপ্তময় খাবার মনে করে এবং সারীদের পরিতৃপ্তি অন্য খাবারে হয় না। তবে ঐ সারীদের প্রশংসা করেন যা গোশত দিয়ে তৈরি। বর্ণনায় রয়েছে, “খাবারের সরদার গোশত”। তাই ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে যেন নারীদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছে, যেমন সকল খাবারের উপর গোশতের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। সারীদের সাথে তুলনা দেয়ার রহস্য হলো, গোশতের সাথে সারীদের মাঝে খাদ্য, স্বাদ, শক্তি, খেতে সহজসাধ্য, চাবাতে কষ্ট কম, দ্রুত গলায় প্রবেশসহ খাবারের সকল উত্তম গুণাবলি সারীদে রয়েছে। ঠিক তদ্রুপ ‘আয়িশাহ (রাঃ)-কে সুন্দর আকৃতি, সুন্দর চরিত্র, কথার মাঝে মাধুরতা, ভাষায় সাহিত্য, শ্রেষ্ঠ প্রতিভা, সঠিক রায়, বুদ্ধিতে বিচক্ষণতা, স্বামীর প্রতি ভালোবাসাসহ নারীর যাবতীয় শ্রেষ্ঠ গুণাবলি দেয়া হয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
‘আয়িশাহ্, খাদীজাহ্, এবং ফাত্বিমাহ্ (রাঃ) -গণের মাঝে কে শ্রেষ্ঠ এ নিয়ে ‘আলিমরা মতানৈক্য করেছেন। আকমাল (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, ইমাম আবু হানীফাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, নিশ্চয় ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) খাদীজাহ্ (রাঃ) -এর পর পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নারী। ইবনু হাজার (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, ফাত্বিমাহ্ (রাঃ) ‘আয়িশাহ্ এবং খাদীজাহ্ (রাঃ) থেকে সর্বসম্মতিক্রমে উত্তম। তারপর খাদীজাহ্ (রাঃ), তারপর ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)। বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে -
(خَيْرُ نِسَائِهَا مَرْيَمُ ابْنَةُ عِمْرَانَ وَخَيْرُ نِسَائِهَا خَدِيْجَةُ) “পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নারী মারইয়াম ইবনু ইমরান এবং পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নারী খাদীজাহ্”- (সহীহুল বুখারী হা. ৩৪৩২ ও ৩৮১৫, সহীহ মুসলিম হা. ২৪৩০)।
সহীহ হাদীসে রয়েছে, (فَاطِمَةُ سَيِّدَةُ نِسَاءِ أَهْلِ الْجَنَّةِ) “ফাতিমা জান্নাতের নারীদের সরদার”- (ইমাম বুখারী তা'লীক স্বরূপ হাদীসটি উল্লেখ করেছেন, অধ্যায়: মর্যাদা, অনুচ্ছেদ: ফাত্বিমাহ্ (রাঃ) -এর মর্যাদা)। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(وَذَكَرَ حَدِيثَ أَنَسٍ) এই ইবারতে লেখক কয়েকটি বর্ণনার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। ইতোমধ্যে উদ্দেশ্য হলো, উপরোল্লিখিত হাদীসে কয়েকজন কামিল বা পূর্ণাঙ্গ নারীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ কোন পুরুষের নাম না নিয়ে কেবল বলা হয়েছে, (كَمُلَ مِنَ الرِّجَالِ كَثِيرٌ) অর্থাৎ “পুরুষ জাতির মাঝে অনেকে পরিপূর্ণ হয়েছে, তবে কোন কোন পূর্ণাঙ্গ মানুষের নাম রাসূলুল্লাহ (সা.) অন্যত্র নিয়েছেন। যেমন আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে, একদিন এক ব্যক্তি এসে রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে বলল, (يَا خَيْرَ الْبَرِيَّةِ) অর্থাৎ, হে সৃষ্টির সেরা ব্যক্তি! তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, সৃষ্টির সেরা হলেন ইবরাহীম আলায়হিস সালাম।
এভাবে আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, কোন মানুষ সর্বাধিক সম্মানী? তিনি (সা.) বললেন, মানুষের মাঝে যে সর্বাধিক মুত্তাকী সেই আল্লাহর কাছে সর্বাধিক সম্মানী। প্রশ্নকারীরা বললেন, এটা আমাদের উদ্দেশ্য নয়, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, সর্বাধিক সম্মানী ব্যক্তি হলেন আল্লাহ তা'আলার নবী ইউসুফ; আল্লাহ তা'আলার নবীর পুত্র, সেই নবী আল্লাহর নবীর পুত্র, সেই নবী আল্লাহ তা'আলার বন্ধুর পুত্র। অনুরূপ ইবনু উমার (রাঃ)-এর হাদীসে রয়েছে, সম্মানী, সম্মানীর পুত্র, সম্মানীর পুত্র, সম্মানীর পুত্র, ইউসুফ ইয়াকূব-এর পুত্র, ইয়াকূব ইসহাক-এর পুত্র, ইসহাক ইবরাহীম-এর পুত্র। এসব বর্ণনা মুখারামাহ্ এবং আসাবিয়্যাহ্ অনুচ্ছেদে রয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭২৫-[২৮] আবু রযীন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! সৃষ্টিকুল সৃষ্টির আগে আমাদের প্রভু কোথায় ছিলেন? তিনি (সা.) বললেন, ’আমা-এর মধ্যে ছিলেন। তার নীচেও শূন্য ছিল এবং উপরেও শূন্য ছিল। আর তিনি তাঁর ’আরশকে পানির উপরেই সৃষ্টি করেছেন। (তিরমিযী)
তিনি [ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ)] বলেন, ঊর্ধ্বতন বর্ণনাকরীদের অন্যতম ইয়াযীদ ইবনু হারূন বলেছেন, ’আমা- অর্থ যার সাথে অন্য কোন বস্তু নেই।
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَالْبَعْض يُحسنهُ) عَن أبي رزين قَالَ: قلت: يَا رَسُول الله أَيْن رَبُّنَا قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَ خَلْقَهُ؟ قَالَ: «كَانَ فِي عَمَاءٍ مَا تَحْتَهُ هَوَاءٌ وَمَا فَوْقَهُ هَوَاءٌ وَخَلَقَ عَرْشَهُ عَلَى الْمَاءِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: قَالَ يَزِيدُ بْنُ هَارُونَ: الْعَمَاءُ: أَيْ لَيْسَ مَعَه شَيْء
اسنادہ حسن ، رواہ الترمذی (3109) * وکیع بن عدس : حسن الحدیث وثقہ الجمھور ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: (كَانَ فِي عَمَاءٍ) শব্দের অর্থ মেঘ। এই হিসেবে হাদীসের ভাষ্যানুযায়ী আল্লাহ তা'আলা মাখলুক সৃষ্টির আগে মেঘে ছিলেন। তবে ‘উলামারা বলেন, এখানে (في) অর্থ (على) অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা মেঘের উপর ছিলেন। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী- (ءَاَمِنۡتُمۡ مَّنۡ فِی السَّمَآءِ) “যিনি আসমানে রয়েছেন”- (সূরাহ্ আল মুলক ৬৭ : ১৬)। অর্থাৎ যিনি আসমানের উপর রয়েছেন।
‘আল্লামাহ্ মুবারকপূরী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, কোন কোন বর্ণনায় (عماء) এর স্থলে (عمى) শব্দ রয়েছে। যার অর্থ: শূন্যতা। এই বিবরণ শুদ্ধ হলে বর্ণিত হাদীসের অর্থ এবং বুখারীর ঐ হাদীসের অর্থ একই, যে হাদীসে বলা হয়েছে- (كان اللَّه ولم يكن شيء غيره وكان عرشه على الماء) “আল্লাহ ছিলেন, তিনি ছাড়া অন্য কিছু ছিল না, তার আরশ পানির উপর ছিল।” আর (عماء) বর্ণনা শুদ্ধ হলে কোন ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। বরং আমরা হাদীসকে বিশ্বাস করি এবং এর অবস্থা বা বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করি না। (তুহফাতুল আহওয়াযী হা. ৮/৪২০)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭২৬-[২৯] ’আব্বাস ইবনু ’আবদুল মুত্ত্বালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন তিনি একদল লোকসহ মুহাসসাব উপত্যকায় বসেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) -ও তাদের মাঝে উপবিষ্ট ছিলেন। এমন সময় একখণ্ড মেঘ তাদের ওপর দিয়ে অতিক্রম করল। লোকেরা তার দিকে তাকাল, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমরা এটাকে কি নামে আখ্যায়িত কর? তারা বলল, ’সাহাবা। তিনি (সা.) বললেন, এবং ’মুযন’ও বল? লোকেরা বলল, ’মুন’ও বলা হয়।
তিনি বললেন, তাকে ’আনান’ও বল? লোকেরা বলল, ’আনান’ও বলা হয়। অতঃপর তিনি (সা.) বললেন, তোমরা কি জান, আকাশ ও জমিনের মধ্যবর্তী দূরত্ব কত? লোকেরা বলল, আমরা জানি না। তিনি (সা.) বললেন, উভয়টির মাঝখানে একাত্তর, বাহাত্তর অথবা তেহাত্তর বছরের দূরত্ব। আর সেই আকাশ হতে তার পরের আকাশের দূরত্বও অনুরূপ। এভাবে তিনি সাত আকাশ পর্যন্ত গণনা করলেন। তারপর বললেন, সপ্তম আসমানের উপর রয়েছে একটি সমুদ্র। তার উপর ও নিচের পানির স্তরের মধ্যবর্তী দূরত্ব যেমন দূরত্ব দুই আকাশের মাঝখানে রয়েছে। অতঃপর সে সমুদ্রের উপরে আছে আটটি বিশেষ আকারের পাঠা (অনুরূপ আকৃতির ফেরেশতা) এবং তাদের পায়ের খুর ও কোমরের মাঝখানে দূরত্ব হলো দুই আকাশের মধ্যবর্তী দূরত্বের মতো। অতঃপর তাদের পিঠের উপর রয়েছে ’আরশ। তার নীচ ও উপরের মধ্যবর্তী দূরত্ব হলো দুই আকাশের মধ্যবর্তী দূরত্বের মতো। অতঃপর তার উপরেই রয়েছেন আল্লাহ তা’আলা। (তিরমিযী ও আবু দাউদ)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَن العبَّاس بن عبد الْمطلب زعم أَنَّهُ كَانَ جَالِسًا فِي الْبَطْحَاءِ فِي عِصَابَةٍ وَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جَالِسٌ فِيهِمْ فَمَرَّتْ سَحَابَةٌ فَنَظَرُوا إِلَيْهَا فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا تُسَمُّونَ هَذِهِ؟» . قَالُوا: السَّحَابَ. قَالَ: «وَالْمُزْنَ؟» قَالُوا: وَالْمُزْنَ. قَالَ: «وَالْعَنَانَ؟» قَالُوا: وَالْعَنَانَ. قَالَ: «هَلْ تَدْرُونَ مَا بعد مابين السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ؟ » قَالُوا: لَا نَدْرِي. قَالَ: «إِنَّ بُعْدَ مَا بَيْنَهُمَا إِمَّا وَاحِدَةٌ وَإِمَّا اثْنَتَانِ أَوْ ثَلَاثٌ وَسَبْعُونَ سَنَةً وَالسَّمَاءُ الَّتِي فَوْقَهَا كَذَلِكَ» حَتَّى عَدَّ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ. ثُمَّ «فَوْقَ السَّمَاء السَّابِعَة بَحر بَين أَعْلَاهُ وأسفله مَا بَيْنَ سَمَاءٍ إِلَى سَمَاءٍ ثُمَّ فَوْقَ ذَلِكَ ثَمَانِيَة أَو عَال بَيْنَ أَظْلَافِهِنَّ وَوُرُكِهِنَّ مِثْلُ مَا بَيْنَ سَمَاءٍ إِلَى سَمَاءٍ ثُمَّ عَلَى ظُهُورِهِنَّ الْعَرْشُ بَيْنَ أَسْفَلِهِ وَأَعْلَاهُ مَا بَيْنَ سَمَاءٍ إِلَى سَمَاءٍ ثُمَّ اللَّهُ فَوْقَ ذَلِكَ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُد
اسنادہ ضعیف ، رواہ الترمذی (3320 وقال : حسن غریب) و ابوداؤد (4723) [و ابن ماجہ (193)] * سماک اختلط ولم یحدث بہ قبل اختلاطہ و عبداللہ بن عمیرۃ لایعرف لہ سماع من الاحنف کما قال البخاری رحمہ اللہ ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: (السَّحَابَ. الْمُزْنَ. الْعَنَانَ) সাহাবা, মুযন ও ‘আনান- এসবগুলো মেঘের নাম। তবে (الْمُزْنَ) মেঘ বা মেঘের সাদা অংশকে বলা হয়। এখানে প্রশ্নের উদ্দেশ্য জানতে চাওয়া নয়। বরং সম্বোধিত ব্যক্তির কাছ থেকে এগুলোর এই নামের স্বীকৃতি নেয়া। প্রথমে জানা বিষয়ে প্রশ্ন করে ধীরে ধীরে অজানা বিষয়ের দিকে যাওয়া এবং সৃষ্টি থেকে স্রষ্টার দিকে যাওয়ার জন্য এভাবে প্রশ্নের মাধ্যমে জানার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি উদ্দেশ্য।
(إِنَّ بُعْدَ مَا بَيْنَهُمَا إِمَّا وَاحِدَةٌ وَإِمَّا اثْنَتَانِ أَوْ ثَلَاثٌ وَسَبْعُونَ سَنَةً) অর্থাৎ আসমান ও জমিনের দূরত্ব সত্তর বা একাত্তর বা বাহাত্তর বছরের রাস্তা। ৭১ বা ৭২ বা ৭৩ এটা বর্ণনাকারীর সন্দেহ হতে পারে। অর্থাৎ রাসূল (সা.) এই তিনটির যে কোন একটি বলেছেন। আবার প্রকার বর্ণনার জন্য হতে পারে। অর্থাৎ জমিনের উঁচু স্থান ও নিম্নস্থানের পার্থক্যের ভিত্তিতে দূরত্বের এই পার্থক্য হতে পারে। এর আলোকে ‘আল্লামাহ্ ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) যা বলেন সেটার বিশুদ্ধতা প্রকাশ পায়। তিনি বলেন, সত্তর দ্বারা উদ্দেশ্য আধিক্য বুঝানো। নির্ধারিত দূরত্ব নয়; কেননা আসমান জমিনের মাঝে পাঁচশত বছরের দূরত্বের কথা বর্ণিত হয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
ইবনু হাজার (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, উভয় বর্ণনার মতভেদের মাঝে সমন্বয় হলো, ধীর গতিতে চলা যেমন হেঁটে চলার ক্ষেত্রে পাচশত বছরের রাস্তা এবং দ্রুত চলার বেলায় সত্তর বছরের রাস্তা। সত্তরের উপরের অতিরিক্ত সংখ্যার উল্লেখ না থাকলে আমরা সত্তর দ্বারা অধিক দূরত্ব বুঝানো হয়েছে বলে ধরে নিলে পাঁচশত বছরের বর্ণনার সাথে সাংঘর্ষিক হত না। (ফাতহুল বারী হা. ১৩/৪১৩)
(حَتَّى عَدَّ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ) “এমনকি রাসূল (সা.) সাতটি আসমানের গণনা করেন।” অর্থাৎ আসমান ও জমিনের মধ্যে যে পরিমাণ দূরত্ব সেই পরিমাণ দূরত্ব একটি আসমান থেকে অপর আসমান পর্যন্ত। এভাবে সাতটি আসমান। প্রতিটির দূরত্ব অপরটি থেকে জমিন ও আসমানের দূরত্বের সমপরিমাণ।
(بَين أَعْلَاهُ وأسفله) এটি সপ্তম আসমানের উপর অবস্থিত সাগরের গভীরতার বিবরণ। অর্থাৎ সাগরের উপর ও নিচের মধ্যে আসমান ও জমিনের দূরত্ব বা গভীরতা রয়েছে।
( ثَمَانِيَة أَو عَال) أَو عَال শব্দটি (وَعْلٌ) এর বহুবচন। যার অর্থ মাদী হরিণ, মাদী ছাগল বা পাহাড়ী ছাগল। পরবর্তীতে ছাগলের নিতম্ব ও ক্ষুরের বিবরণ তাদের বড়ত্ব ও বিশালতার পরিমাপ সম্পর্কে কিছুটা হলেও আচ
করা যায়। কারো কারো মতে, আট ছাগল দ্বারা মূলত এই আকৃতির মালাক (ফেরেশতা) উদ্দেশ্য। কেননা পরবর্তী বাক্য (عَلَى ظُهُورِهِنَّ الْعَرْشُ) “তাদের পিঠের উপর ‘আরশ” এই অর্থকে সমর্থন করে। আর কুরআনে রয়েছে, (اَلَّذِیۡنَ یَحۡمِلُوۡنَ الۡعَرۡشَ وَ مَنۡ حَوۡلَهٗ یُسَبِّحُوۡنَ بِحَمۡدِ رَبِّهِمۡ) “যারা ‘আরশ বহন করে এবং যারা তার চারপাশে আছে, তারা তাদের পালনকর্তার সপ্রশংস পবিত্রতা বর্ণনা করে”- (সূরাহ আল গাফির ৪০ : ৭)।
(ثُمَّ اللَّهُ فَوْقَ ذَلِكَ) “তারপর আল্লাহ তার ওপর রয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা ‘আরশের উপর রয়েছেন এই বিষয়টি কুরআন হাদীসের অগণিত দলীল দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত। যেখানে ব্যাখ্যার কোন সুযোগ নেই। অন্যান্য দলীলের মতো এটিও একটি স্পষ্ট দলীল। তবে আল্লাহ তা'আলার সিফাতের ব্যাপারে যতটুকু বিবরণ কুরআন হাদীসে রয়েছে আমাদেরকে ততটুকুই অবিকল সেভাবে বিশ্বাস করতে হবে। এর বাহিরে চিন্তা করে কিছু বলার আমাদের কোন সুযোগ নেই। আমরা স্পষ্ট ও অকাট্যভাবে জানতে পারি যে, আল্লাহ তা'আলা ‘আরশের উপর রয়েছেন। আমাদেরকে এতটুকু বিশ্বাস করতে হবে। কিন্তু কিভাবে রয়েছেন, কোন অবস্থায় রয়েছেন এসব চিন্তা করা না আমাদের জন্য বৈধ, আর না আমরা চিন্তা করে কোন সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারব। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭২৭-[৩০] জুবায়র ইবনু মুত্বইম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন একজন গ্রাম্য বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর কাছে এসে বলল, লোকেরা অসহনীয় দুঃখে নিপতিত হয়েছে। পরিবার-পরিজন ক্ষুধার্ত, ধন হ্রাস পেয়েছে এবং গবাদি পশুসমূহ মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে। অতএব আল্লাহর কাছে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করুন। আমরা আপনাকে আল্লাহর কাছে ওয়াসীলাহ্ বানিয়েছি এবং আল্লাহকে আপনার কাছে শাফা’আতকারী হিসেবে সাব্যস্ত করেছি। তার কথা শুনে নবী (সা.) বললেন, আল্লাহ তা’আলা খুবই পবিত্র। আল্লাহ তা’আলা মহাপবিত্র। তিনি এ বাক্যটি বারংবার উচ্চারণ করতে থাকলেন, এমনকি তার চেহারা মুবারকের রং পরিবর্তন হতে দেখে উপস্থিত সাহাবায়ি কিরামের মুখমণ্ডলসমূহও বিবর্ণ হয়ে গেল। অতঃপর তিনি বললেন, আফসোস তোমার প্রতি! তুমি জেনে রাখ, আল্লাহ তা’আলার শান ও সম্মান তা হতে অতি মহান ও বিরাট। আক্ষেপ তোমার প্রতি। তুমি কি আল্লাহর জাত ও সত্তা সম্পর্কে অবগত আছ? তাঁর ’আরশ সমস্ত আকাশমণ্ডলীকে এভাবে বেষ্টন করে রেখেছে। এ কথা বলে তিনি (সা.) নিজ অঙ্গুলি দ্বারা একটি গুম্বজের ন্যায় গোলাকৃতি বস্তু দেখিয়ে বললেন, আল্লাহর আরশ সমস্ত আকাশমণ্ডলীকে অনুরূপভাবে ঘেরাও করে রাখা সত্ত্বেও আল্লাহর বিরাটত্বের চাপে তা এমনভাবে কড়মড় শব্দ করে, যেমন- কোন বাহনের গদি কড়মড় শব্দ করতে থাকে। (আবু দাউদ)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنْ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمٍ قَالَ: أَتَى رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَعْرَابِيٌّ فَقَالَ: جَهِدَتِ الْأَنْفُسُ وَجَاعَ الْعِيَالُ وَنُهِكَتِ الْأَمْوَالُ وَهَلَكَتِ الْأَنْعَام فَاسْتَسْقِ اللَّهَ لَنَا فَإِنَّا نَسْتَشْفِعُ بِكَ عَلَى الله نستشفع بِاللَّهِ عَلَيْكَ. فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «سُبْحَانَ اللَّهِ سُبْحَانَ اللَّهِ» . فَمَا زَالَ يسبّح حَتَّى عُرف ذَلِك فِي وُجُوه أَصْحَابه ثُمَّ قَالَ: «وَيْحَكَ إِنَّهُ لَا يُسْتَشْفَعُ بِاللَّهِ عَلَى أَحَدٍ شَأْنُ اللَّهِ أَعْظَمُ مِنْ ذَلِكَ وَيْحَكَ أَتَدْرِي مَا اللَّهُ؟ إِنَّ عَرْشَهُ عَلَى سَمَاوَاتِهِ لَهَكَذَا» وَقَالَ بِأَصَابِعِهِ مَثْلَ الْقُبَّةِ عَلَيْهِ «وإِنه ليئط أطيط الرحل بالراكب» رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
اسنادہ ضعیف ، رواہ ابوداؤد (4726) * محمد بن اسحاق مدلس و عنعن و جبیر بن محمد : مستور ، لم یوثقہ غیر ابن حبان ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: (وَجَاعَ الْعِيَالُ) “এবং পরিবার ক্ষুধার্ত। (عَيَالُ) শব্দের ‘আইন হরফে যবর। মানুষ তার পরিবারে যার দায়িত্ব ও খরচ বহন করে সেই তাই পরিবার। যেমন স্ত্রী, সন্তানাদি এবং দাস।
(وَنُهِكَتِ الْأَمْوَالُ) অর্থাৎ সম্পদ হ্রাস পেয়েছে। এখানে সম্পদ বলতে বৃষ্টির পানিতে বেড়ে উঠে এমন সম্পদ। অনাবৃষ্টির কারণে তা ধ্বংস হয়েছে।
(الْأَنْعَام) “আন্'আম” দ্বারা উট, গরু, ও ছাগল- এই তিন শ্রেণির প্রাণী উদ্দেশ্য।
(نَسْتَشْفِعُ بِكَ عَلَى الله نستشفع بِاللَّهِ عَلَيْكَ) অর্থাৎ আপনার ব্যক্তিত্ব, মর্যাদা ও সম্মানের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর কাছে সুপারিশ কামনা করছি। আপনি আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবেন যেন তিনি আপনাকে আমাদের সহযোগিতা করার তাওফীক দেন। রাসূল (সা.) এর কাছে এভাবে সুপারিশ চাওয়া থেকে তাকে আল্লাহ তা'আলার ক্ষমতায় সমকক্ষ করার সন্দেহ সৃষ্টি হয়। অথচ আল্লাহ তা'আলা পূর্ণাঙ্গরূপে শিরকমুক্ত।
আল্লাহ তা'আলার ক্ষমতায় রাসূল (সা.) -এর কোন ধরনের অংশীদারিত্ব নেই। আল্লাহ তা'আলা বলেন- (لَیۡسَ لَکَ مِنَ الۡاَمۡرِ شَیۡءٌ اَوۡ یَتُوۡبَ عَلَیۡهِمۡ) “হয় আল্লাহ তাদের ক্ষমা করবেন কিংবা তাদেরকে ‘আযাব দেবেন। এ ব্যাপারে আপনার কোন করণীয় নেই”- (সূরাহ্ আ-লি ইমরান ৩ : ১২৮)।
অন্যত্র বলেন (مَنۡ ذَا الَّذِیۡ یَشۡفَعُ عِنۡدَهٗۤ اِلَّا بِاِذۡنِهٖ) “কে আছ এমন, যে তার কাছে তাঁরই অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করবে?” (সূরা আল বাকারাহ্ ২ : ২৫৫); নবী (সা.)-এর কাছে এভাবে বলা বিরাট বড় অপরাধ মনে হয়, তাই তিনি এর উপর আপত্তি তুলেন এবং এভাবে তার প্রতি সুপারিশের সম্পৃক্ততায় অবাক হন। তাই রাসূল (সা.): বলেন, সুবহা-নাল্ল-হ। গুরুত্ব ও আশ্চর্যবোধ প্রকাশ করতে বারংবার ‘সুবহা-নাল্ল-হ শব্দটি উচ্চারণ করেন। এমনকি তার চেহারায় পরিবর্তন প্রকাশ পায়। বারংবার এই তাসবীহ উচ্চারণ দেখে সাহাবীরা রাসূল (সা.) -এর রাগ উপলব্ধি করেন। রাসূল (সা.) -এর রাগ দেখে সাহাবীরা শঙ্কিত হন এবং তাদের চেহারায় বিবর্ণতার নিদর্শন ফুটে উঠে। ভয়ের নিদর্শন সাহাবীদের চেহারায় ফুটে উঠলে রাসূল (সা.) তাদের প্রতি নমনীয় হন এবং তাসবীহ বন্ধ করে তাদের দিকে মনোনিবেশ করে উপদেশ দেন।
(وَيْحَكَ) শব্দটি (ويلك) অর্থে আসে। তবে প্রথম শব্দটি পদস্খলনের ক্ষেত্রে মমতা প্রকাশ অর্থে ব্যবহার হয়। আর দ্বিতীয় শব্দটি ধ্বংসের জন্য দু'আ হিসেবে ব্যবহার হয়। এখানে প্রথম অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, অর্থাৎ যে উদ্দেশে উদাসীন অজ্ঞ উক্তিকারী ব্যক্তি।
(لَا يُسْتَشْفَعُ بِاللَّهِ عَلَى أَحَدٍ شَأْنُ اللَّهِ أَعْظَمُ مِنْ ذَلِكَ) “আল্লাহর মাধ্যমে কারো কাছে সুপারিশ কামনা করা যায় না। আল্লাহর শান তার চেয়ে বড়।” (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
অর্থাৎ সুপারিশ কামনা সৃষ্টির কাছে হতে পারে। কাউকে সুপারিশ করার আবেদন করা যেতে পারে। যেমন নবী (সা.) দুনিয়ার জীবনের সুপারিশ করতেন। যেমন তাঁর কাছে দু'আ চাওয়া এবং আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক তাঁর দু'আ কবুল করা। এভাবে আখিরাতে যখন মানুষ বিচারের অপেক্ষায় থাকবে তখন তার কাছে সুপারিশ করার আবেদন করা হবে এবং তিনি সুপারিশ করবেন। এভাবে জাহান্নাম থেকে বের করার জন্য তিনি সুপারিশ করবেন। আর রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর কয়েক ধরনের সুপারিশ রয়েছে। মোটকথা, সুপারিশ ছোট বড়র কাছে করার নিয়ম রয়েছে। বড় ছোটর কাছে সুপারিশ করার নিয়ম নেই। তাই আল্লাহর মাধ্যমে সৃষ্টির কাছে সুপারিশ অনেক মারাত্মক কথা এবং বিরাট বিষয়। তাই রাসূলুল্লাহ (সা.) এই ধরনের উক্তিকে বিশাল মনে করেন এবং অবাক হয়ে বার বার তাসবীহ পড়তে থাকেন।
(وإِنه ليئط أطيط الرحل بالراكب) অর্থাৎ অতিরিক্ত ভারি আরোহীর ফলে বাহন যেমন শব্দ করে, ‘আরশের বিশালতার কারণেও মালায়িকা (ফেরেশতারাগণ)-ও ঠিক তেমনি হয়রান হয়ে যায়।
এ খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আরশের বিশালতা বুঝাতে বাহ্যত একটি ধারণা দেয়ার জন্য এমন বলা হয়েছে। নতুবা আল্লাহ তা'আলার সিফাতের বিবরণ দেয়া নিষিদ্ধ; এখানে আল্লাহর গুণাবলি উল্লেখ দ্বারা গুণাবলি পর্যালোচনা করা উদ্দেশ্য নয় এবং উক্ত অবস্থার সীমাবদ্ধতা বর্ণনা করাও উদ্দেশ্য নয় বরং আল্লাহ তা'আলা বড়ত্ব বুঝাতে মানুষের মেধার ধারণ ক্ষমতা মোতাবেক এমন উপমা দেয়া। প্রশ্নকারী যাতে আল্লাহ তা'আলার বড়ত্ব ও মহত্ব সহজেই উপলব্ধি করতে পারে। অর্থাৎ যার ‘আরশের বিশালতা এই তা কিভাবে কারো কাছে সুপারিশের মাধ্যম বানানো। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭২৮-[৩১] জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: আমাকে এ অনুমতি দেয়া হয়েছে যে, আমি আল্লাহ তা’আলার ’আরশ বহনকারী মালায়িকার (ফেরেশতাদের) মধ্য হতে একজন মালাক (ফেরেশতার) অবস্থা প্রকাশ করব। সেই মালাকের কানের লতি হতে তার ঘাড়ের মধ্যবর্তী দূরত্ব সাতশত বছরের পথ। (আবু দাউদ)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «أُذِنَ لِي أَنْ أُحَدِّثَ عَنْ مَلَكٍ مِنْ مَلَائِكَةِ اللَّهِ مِنْ حَمَلَةِ الْعَرْشِ أَنَّ مَا بَيْنَ شحمة أُذُنَيْهِ إِلَى عَاتِقَيْهِ مَسِيرَةُ سَبْعِمِائَةِ عَامٍ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
اسنادہ صحیح ، رواہ ابوداؤد (4727) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: হাদীসে ‘আরশ বহনকারী মালায়িকাহ্’র বিশালতা বর্ণনা করা হয়েছে। যাদের কানের লতি থেকে কাঁধের দূরত্ব এই; তাদের শরীরের বিশালতা চিন্তার বাহিরে। আর এমন ফেরেশতারা যে ‘আরশ বহন করতে হিমশিম খাচ্ছে সেই ‘আরশের বিশালতার কল্পনা করা দুষ্কর। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭২৯-[৩২] যুরারাহ্ ইবনু আওফা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) একদিন জিবরীল আলায়হিস সালাম-কে প্রশ্ন করলেন, তুমি কি তোমার প্রভুকে দেখেছ? এ কথা শুনে জিবরীল আলায়হিস সালাম কেঁপে উঠে বললেন, হে মুহাম্মাদ! আমার ও তার মাঝখানে সত্তরটি নূরের পর্দা রয়েছে। যদি আমি তার কোন একটির কাছাকাছি হই, তবে আমি পুড়ে যাব। (এরূপ ’মাসাবীহ’ কিতাবে বর্ণিত)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَن زُرَارَة بن أوفى أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لِجِبْرِيلَ: هَلْ رَأَيْتَ رَبَّكَ؟ فَانْتَفَضَ جِبْرِيلُ وَقَالَ: يَا مُحَمَّدُ إِنَّ بَيْنِي وَبَيْنَهُ سَبْعِينَ حِجَابًا مِنْ نُورٍ لَوْ دَنَوْتُ مِنْ بَعْضِهَا لاحترقت «. هَكَذَا فِي» المصابيح
اسنادہ ضعیف ، و ذکرہ البغوی فی مصابیح السنۃ (4 / 30) [و ابو الشیخ فی العظمۃ (2 / 677 ۔ 678) و الدارمی (فی الرد علی المریسی ص 172)] * السند صحیح الی زرارۃ رحمہ اللہ و لکنہ : مرسل ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: (فَانْتَفَضَ جِبْرِيلُ) “জিবরীল কেঁপে উঠেন” জিবরীলের কাছে এই প্রশ্নটাই বিশাল মনে হয়। এমন উক্তি শুনে তিনি আল্লাহ তা'আলার মর্যাদার ভয়ে কাঁপতে থাকেন। বলা হয়, এ হাদীস থেকে প্রমাণিত যে, কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তা'আলাকে দেখা যাবে। কেননা পরকালীন জগতে আল্লাহ তা'আলাকে দেখা অসম্ভব হলে রাসূল (সা.) জিবরীল আলায়হিস সালাম -কে লক্ষ করে এমন প্রশ্ন করতেন না।
(سَبْعِينَ حِجَابًا مِنْ نُورٍ) নূরের সত্তর পর্দা। কারো মতে সত্তর পর্দার দূরত্ব দ্বারা আল্লাহ তা'আলার মর্যাদার পূর্ণাঙ্গতা ও জিবরীল তথা সৃষ্টির গুণের অপূর্ণতা বুঝানো হয়েছে। তবে এ জাতীয় ব্যাপারে সালাফদের মতাদর্শ হলো, হাদীসকে বাহ্যিক অর্থে বিশ্বাস করে তার বিবরণ ও অবস্থা আল্লাহ তা'আলার জ্ঞানের উপর ছেড়ে দেয়া। তাই আমরা পর্দার হাকীকত ও তত্ত্বের পিছনে না পড়ে এবং কোন ধরনের ব্যাখ্যা ছাড়াই সরল অর্থে বিশ্বাস করব।
(لَوْ دَنَوْتُ مِنْ بَعْضِهَا لاحترقت) অর্থাৎ নূরের এসব পর্দার কোন একটির কাছে গেলে আমি পুড়ে যাব। কোন কোন বর্ণনায়, এক আঙ্গুল পরিমাণ কাছে চলে গেলে এমন হবে বলে বর্ণিত হয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭৩০-[৩৩] আর আবূ নু’আয়ম তার হিলইয়াহ’ গ্রন্থে আনাস (রাঃ)-এর সূত্রে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তবে জিবরীল আলায়হিস সালাম-এর কেঁপে উঠার কথাটি সেই বর্ণনায় উল্লেখ নেই।
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَرَوَاهُ أَبُو نُعَيْمٍ فِي «الْحِلْيَةِ» عَنْ أَنَسٍ إِلَّا أَنه لم يذكر: «فانتفض جِبْرِيل»
اسنادہ ضعیف ، رواہ ابو نعیم فی حلیۃ الاولیاء (5 / 55) * فیہ ابو مسلم قائد الاعمش : ضعیف و الاعمش مدلس و عنعن ان صح السند الیہ ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: তবারানী তাঁর আওসাতে হাদীসটি (فَانْتَفَضَ جِبْرِيلُ) “জিবরীল কেঁপে উঠলেন” এ বাক্য ছাড়াই বর্ণনা করেছেন। তবারানীর বর্ণনা হলো,
(عن أنس بن مالك عن النبي صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قال سألت جبريل عليه السلام هل ترى ربك قال إن بيني و بينه سبعين حجابامن نور لورأيت أدناهالاحترقت) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেন: আমি জিবরীল আলায়হিস সালামকে প্রশ্ন করলাম, তুমি কি তোমার রবকে দেখেছো? তিনি বললেন, আমার ও তার মাঝে সত্তরটি আলোর পর্দা রয়েছে। আমি তার একেবারে কাছেরটিতে গেলে পুড়ে যাবো। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭৩১-[৩৪] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আল্লাহ তা’আলা যেদিন ইসরাফীল আলায়হিস সালাম-কে সৃষ্টি করেছেন, তিনি তখন হতে নিজের দুই পায়ের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছেন। চক্ষু তুলেও দেখেন না। তার এবং তার প্রভুর মাঝখানে সত্তরটি নূরের পর্দা রয়েছে। তিনি তার যে কোন একটি পর্দার কাছাকাছি হলে তখনই তা তাঁকে জ্বালিয়ে ফেলবে। (তিরমিযী এবং তিনি বলেছেন, হাদীসটি সহীহ)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ اللَّهَ خَلَقَ إِسْرَافِيلَ مُنْذُ يَوْمَ خَلْقَهُ صَافًّا قَدَمَيْهِ لَا يَرْفَعُ بَصَرَهُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ الرَّبِّ تَبَارَكَ وَتَعَالَى سَبْعُونَ نورا مَا مِنْهَا من نورٍ يدنو مِنْهُ إِلاّ احْتَرَقَ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَصَححهُ
ضعیف ، رواہ الترمذی (لم اجدہ) [و رواہ الطبرانی فی الکبیر (11 / 379 ۔ 380 ح 12061) و البیھقی فی شعب الایمان (157 ، نسخۃ محققۃ : 155) و فی السند محمد بن عبد الرحمن بن ابی لیلی ضعیف مشھور ضعفہ جمھور المحدثین و فی السند علۃ أخری] ۔
(ضَعِيف)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭৩২-[৩৫] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী (সা.) বলেছেন: আল্লাহ তা’আলা যখন আদম আলায়হিস সালাম ও তাঁর বংশধরকে সৃষ্টি করলেন, তখন মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) বললেন, হে প্রভু! তুমি এমন এক সষ্টিজীব সৃষ্টি করেছ, যারা খাওয়া-দাওয়া ও পানাহার করবে, বিবাহ-শাদি করবে এবং যানবাহনে আরোহণ করবে। অতএব তাদেরকে দুনিয়া তথা পার্থিব সম্পদ দিয়ে দাও এবং আমাদেরকে পরকাল প্রদান কর। আল্লাহ তা’আলা বললেন, আমি যাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছি এবং তার মধ্যে আমার রূহ ফুঁকেছি, তাকে ঐ বস্তুর সমান করব না যাকে كُنْ (হয়ে যাও) শব্দ দ্বারা সৃষ্টি করেছি। (বায়হাকী’র শুআবুল ঈমান)
اَلْفصْلُ الثَّنِفْ (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنْ جَابِرٌ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لَمَّا خَلَقَ اللَّهُ آدَمَ وَذُرِّيَّتَهُ قَالَتِ: الْمَلَائِكَةُ: يَا رَبِّ خَلَقْتَهُمْ يَأْكُلُونَ وَيَشْرَبُونَ وَيَنْكِحُونَ وَيَرْكَبُونَ فَاجْعَلْ لَهُمُ الدُّنْيَا وَلَنَا الْآخِرَةَ. قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: لَا أَجْعَلُ مَنْ خَلَقْتُهُ بيديَّ ونفخت فِيهِ مِنْ رُوحِي كَمَنْ قُلْتُ لَهُ: كُنْ فَكَانَ «. رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي» شُعَبِ الْإِيمَانِ
اسنادہ ضعیف ، رواہ البیھقی فی شعب الایمان (149 ، نسخۃ محققۃ : 147) * ھشام بن عمار اختلط و الانصاری لم اعرفہ وجاء تصریحہ فی روایۃ جنید بن حکیم و لا یدری من ھو ؟ و عبد ربہ بن صالح القرشی وثقہ ابن حبان وحدہ فھو مجھول الحال ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: হাদীসে ইসরাফীল 'আলায়হিস সালাম-এর দাঁড়িয়ে থাকার অবস্থার বিবরণ দেয়া হয়েছে। ইসরাফীল আলায়হিস সালাম-কে সৃষ্টির সময়ই দু পা জড়ো তথা এক পায়ের সাথে আরেক পা মিলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার মতো করে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর তিনি এভাবে কোনদিন না হেলে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। কোন সময় শিঙ্গায় ফুঁকারের নির্দেশ এসে যায় সেই অপেক্ষায় এমনভাবে রয়েছেন যে, উপরের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সুযোগ পাচ্ছেন না। আল্লাহর মর্যাদা ও ভয় তার চোখ অবনমিত করে রেখেছে।
(سَبْعُوْنَ نُوْرًا) “সত্তরটি আলো” অর্থাৎ জিবরীল ও আল্লাহ তা'আলার মাঝে যেমন সত্তরটি নূরের পর্দা রয়েছে, ঠিক তেমনি ইসরাফীল ও আল্লাহ তা'আলার মাঝেও অনুরূপ পর্দা রয়েছে। যদি কোন পর্দার নিকটে ইসরাফীল যান বলে ধরে নেয়া হয়, তবে তিনিও জিবরীল-এর মতো জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাবেন। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা ও ইসরাফীল-এর মাঝে নূরের যে আবরণ রয়েছে সেই নূরের দিপ্তিও ইসরাফীল-এর চোখ ধারণ করতে অক্ষম।
(فَاجْعَلْ لَهُمُ الدُّنْيَا وَلَنَا الْآخِرَةَ) অর্থাৎ দুনিয়াকে তাদের জন্য স্থায়ীভাবে করে দাও আর আখিরাতের নিআমাতকে কেবল আমাদের জন্য নির্ধারিত করে দাও; কেননা আমরা দুনিয়ার নি'আমাত থেকে বঞ্চিত ছিলাম। কিন্তু মানুষ দুনিয়ার নি'আমাত ভোগ করেছে। আমরা ভোগ করিনি। তাই এর বদলে আখিরাতের পুরো নি'আমাত আমাদের জন্য করে দাও।
(لَا أَجْعَلُ مَنْ خَلَقْتُهُ بيديَّ) “অর্থাৎ যে মানুষকে আমি আমার হাতে বানিয়েছি, আমি যার মাঝে আত্মা ফুঁকেছি, তোমাদের আবেদনে তাদেরকে আখিরাতের নি'আমাত থেকে বঞ্চিত করতে পারি না।
ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, অর্থাৎ যাকে আমি আমার নিজ হাতে বানিয়েছি, যাকে বানানোর দায়িত্ব অন্য কারো হাতে অর্পণ করিনি, যার মাঝে আমি নিজে আত্মা ফুঁকেছি তার মর্যাদা ও যাদেরকে কেবল নির্দেশ দিয়ে বানিয়েছি তাদের মর্যাদা সমান হতে পারে না। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭৩৩-[৩৬] আবু হুরায়রাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: (কামিল) মুমিন আল্লাহর কাছে কোন কোন মালাক (ফেরেশতা) হতে অধিক মর্যাদাসম্পন্ন। (ইবনু মাজাহ)
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْمُؤْمِنُ أَكْرَمُ عَلَى اللَّهِ مِنْ بَعْضِ مَلَائِكَتِهِ» . رَوَاهُ ابْنُ مَاجَهْ
اسنادہ ضعیف جذا ، رواہ ابن ماجہ (3947) * فیہ ابو المھزم : متروک ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: পূর্ণাঙ্গ মু'মিন অর্থাৎ নবী ও ওলী বিশিষ্ট মালাক এবং সাধারণ মালাক ও নির্বাচিত মালাক থেকে উত্তম। ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, মু'মিন দ্বারা সাধারণ মুমিন উদ্দেশ্য এবং মালাক (ফেরেশতা) দ্বারা সাধারণ মালাক উদ্দেশ্য। মুহয়িউস্ সুন্নাহ (রহিমাহুল্লাহ) (وَ لَقَدۡ کَرَّمۡنَا بَنِیۡۤ اٰدَمَ) “আমি আদম সন্তানকে সম্মানিত করেছি”- (সূরাহ আল ইসরা ১৭ : ৭০); এর তাফসীরে বলেন, উত্তম হচ্ছে এটা বলা যে, সাধারণ মু'মিন সাধারণ মালাক থেকে উত্তম এবং বিশেষ মু'মিন বিশেষ মালাক থেকে উত্তম। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন (اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ ۙ اُولٰٓئِکَ هُمۡ خَیۡرُ الۡبَرِیَّۃِ) “যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তারাই সৃষ্টির সেরা।” (সূরা আল বাইয়িনাহ্ ৯৮ : ৭)
আহলুস্ সুন্নাহর ‘উলামাগণ এই আয়াত দিয়ে মালায়িকার (ফেরেশতাদের) ওপর মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের দলীল দিয়ে থাকেন। আর এটা স্পষ্ট যে, বিশেষ মু'মিন দ্বারা নবী ও রাসূল উদ্দেশ্য এবং বিশেষ মালাক দ্বারা জিবরীল, মীকাঈল ও ইসরাফীল উদ্দেশ্য। আবার সাধারণ মু'মিন দ্বারা পূর্ণাঙ্গ মু'মিন যেমন ওলী, খলীফাহ্ এবং ‘আলিমগণ উদ্দেশ্য। আর সাধারণ মালাক দ্বারা সকল মালাক উদ্দেশ্য। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭৩৪-[৩৭] আবু হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.) আমার হাত ধরে বললেন, আল্লাহ তা’আলা জমিন সৃষ্টি করেছেন শনিবারে, পাহাড়-পর্বত সৃষ্টি করেছেন রবিবারে, গাছ-গাছালি সৃষ্টি করেছেন সোমবারে, খারাপ জিনিসসমূহ বানিয়েছেন মঙ্গলবারে, আলো বা জ্যোতি সৃষ্টি করেছেন বুধবারে, জীবজন্তু ও প্রাণিজগৎকে সৃষ্টি করে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছেন বৃহস্পতিবারে, আর আদম আলায়হিস সালামকে সৃষ্টি করেছেন জুমু’আর দিন ’আসরের সময়ের পরে। মূলত এটাই সর্বশেষ সৃষ্টি, দিনের শেষ সময়েই সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ ’আসর ও রাত্রির মধ্যবর্তী সময়ে। (মুসলিম)
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنْهُ قَالَ: أَخَذَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِيَدَيَّ فَقَالَ: «خلق الله الْبَريَّة يَوْمَ السَّبْتِ وَخَلَقَ فِيهَا الْجِبَالَ يَوْمَ الْأَحَدِ وَخلق الشّجر يَوْم الِاثْنَيْنِ وَخلق الْمَكْرُوه يَوْمَ الثُّلَاثَاءِ وَخَلَقَ النُّورَ يَوْمَ الْأَرْبِعَاءِ وَبَثَّ فِيهَا الدَّوَابَّ يَوْمَ الْخَمِيسِ وَخَلَقَ آدَمَ بَعْدَ الْعَصْرِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فِي آخِرِ الْخَلْقِ وَآخِرِ سَاعَةٍ مِنَ النَّهَارِ فِيمَا بَيْنَ الْعَصْرِ إِلى اللَّيْل» . رَوَاهُ مُسلم
رواہ مسلم (27 / 2789)، (7054) ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: শায়খ সালিহ আল উসায়মীন (রহিমাহুল্লাহ) ‘রিয়াদুস সালিহীন’-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলেন, এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেছেন। তবে ‘উলামারা হাদীসটির উপর আপত্তি তুলেছেন। তাই হাদীসটি সহীহ নয়। নবী (সা.) থেকে সহীহ সূত্রে হাদীসটি বর্ণিত হয়নি। কেননা এটা কুরআনের বিপরীত। আর যা কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক তা অগ্রহণযোগ্য। কেননা যারা বর্ণনাকারী তারা মানুষ, তাদের ভুল হতে পারে আবার শুদ্ধ হতে পারে। অপরদিকে কুরআনে কোন ভুল নেই। কুরআন সম্পূর্ণ নির্ভুল এবং তাওয়াতুরের মাধ্যমে বর্ণিত। কুরআনের সাথে কোন হাদীসের বৈপরীত্য দেখা দিলে কুরআন সেই হাদীসটি সহীহ নয় বলে ফয়সালা করে। কেননা রাবীগণ নবী (সা.) থেকে সরাসরি হাদীসগুলো শুনেননি। তারা অন্যের সূত্রে শুনেছেন এবং তা রাসূল (সা.) পর্যন্ত পৌছিয়েছেন। আর এভাবে তাদের কখনো কখনো ভুল হয়ে যায়। কিন্তু কুরআনে কোন ভুল নেই। আহলে ইলমগণ ইমাম মুসলিম (রহিমাহুল্লাহ)-এর এ হাদীসটির উপর আপত্তি তুলেন। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কেননা মানবজাতি সকলেই মানুষ। ইমাম মুসলিম (রহিমাহুল্লাহ) যেমন মানুষ অন্যরাও মানুষ। সবারই ভুল শুদ্ধ রয়েছে। তাই এই হাদীস নিয়ে আমাদের আলোচনার প্রয়োজন নেই। (শারহু রিয়াদিস সালিহীন- অনুচ্ছেদ: দাজ্জালের হাদীস ও কিয়ামতের আলামাতসমূহ)
ইবনু কাসীর (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমের গরীবের অন্তর্ভুক্ত। আলী ইবনুল মাদীনী, বুখারী এবং হাদীসের অন্যান্য হাফিযরা হাদীসটির ব্যাপারে কথা বলেছেন। তারা এটাকে কা'ব-এর কথা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আবু হুরায়রাহ্ (রাঃ) কা'ব আহবার থেকে এটা শুনেছেন এবং কোন কোন বর্ণনাকারী রাসূল (সা.)-এর দিকে সম্পৃক্ত করে দিয়েছেন। (ইবনু কাসীর ১/২১৫)
কুরআনের সাথে হাদীসটি সাংঘর্ষিক; কেননা কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় আসমান জমিনসহ পুরো জগতকে ছয় দিনে বানানোর কথা বলা হয়েছে। আবার দুই দিনে জমিন, আরো দুই দিনে জমিনের যাবতীয় বস্তুসহ মোট চার দিনের পৃথিবী ও তাতে বিদ্যমান বস্তু সৃষ্টি করা হয়েছে। তারপর দুই দিনে সাত আসমান সৃষ্টি করা হয়েছে। অতএব বর্ণিত হাদীসটি আসমান জমিনের বানানোর দিন ও বিবরণ সবদিক দিয়েই কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
দ্র. সনদগত দিক থেকে হাদীসটি সহীহ। আর এ হাদীসের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, হাদীসে ত্রুটি থাকতে পারে, কিন্তু কুরআন ত্রুটিমুক্ত। তবে হাদীসের উপর ভিত্তি করে আমভাবে সহীহ মুসলিমের সব হাদীসে ত্রুটিযুক্ত মনে করা ঠিক নয়।
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭৩৫-[৩৮] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আল্লাহর নবী (সা.) -তাঁর সাহাবীগণসহ বসা ছিলেন। এমন সময় একখণ্ড মেঘ তাদের ওপর দিয়ে অতিক্রম করল। তখন আল্লাহর নবী (সা.) প্রশ্ন করলেন, তোমরা কি জাননা, এটা কি? তারা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, এটা ’আনান, এটা জমিন সেচনকারী। একে আল্লাহ তা’আলা এমন এমন সম্প্রদায়ের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যান, যারা তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করে না এবং তাঁকে ডাকেও না। অতঃপর তিনি (সা.) বললেন, তোমরা কি জানো তোমাদের মাথার উপরে কি? তারা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, এটা রকী’ (প্রথম আসমান) যা সুরক্ষিত ছাদ এবং স্থিরিকৃত। অতঃপর তিনি (সা.) প্রশ্ন করলেন, তোমরা কি জানো, তোমাদের এবং আকাশের মাঝখানের দূরত্ব কত? তারা বললেন, আল্লাহ ও তার রাসূলই অধিক জানেন। তিনি (সা.) বললেন, পাঁচশত বছরের দূরত্ব। অতঃপর প্রশ্ন করলেন, তোমরা কি জানো, তার উপরে কি আছে? তারা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অধিক জ্ঞাত। তিনি (সা.) বললেন, দু’খানা আকাশ রয়েছে, সেই দু’খানার মাঝখানের দূরত্ব হলো পাঁচশত বছরের পথ।
এভাবে তিনি (সা.) আকাশের সংখ্যা সাতখানা বর্ণনা করলেন এবং প্রত্যেক দুই আকাশের মাঝখানের দূরত্ব, আকাশ ও জমিনের দূরত্বের সমান (অর্থাৎ পাঁচশত বছরের রাস্তা)। অতঃপর তিনি (সা.) প্রশ্ন করলেন, তোমরা কি জানো, তার উপরে কি আছে? তারা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অধিক জানেন। তিনি (সা.) বললেন, তার উপরে রয়েছে আল্লাহর আরশ, ’আরশ ও আকাশের মাঝখানের ব্যবধান হলো দুই আসমানের মধ্যে দূরত্বের সমান। অতঃপর তিনি (সা.) বললেন, তোমরা কি জানো, তোমাদের নীচে কী? তারা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অধিক জানেন। তিনি (সা.) বললেন, জমিন। এরপর তিনি (সা.) প্রশ্ন করলেন, তোমরা কি জানো তার নীচে কি? তারা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অধিক জানেন।
তিনি (সা.) বললেন, তার নিচে আরেক জমিন এবং উভয় জমিনের মাঝখানের দূরত্ব হলো, পাঁচশত বছর। এমনকি তিনি (সা.) জমিনের সংখ্যা সাতখানা বর্ণনা করে বললেন, প্রত্যেক দুই জমিনের মাঝখানে পাঁচশত বছরের দূরত্ব। অতঃপর তিনি (সা.) বললেন, সেই মহান সত্তার কসম যার হাতে মুহাম্মাদ -এর প্রাণ। যদি তোমরা একখানা রশি নীচে জমিনের দিকে ঝুলিয়ে দাও, তা অবশ্যই আল্লাহর কাছে গিয়ে পৌছবে। অতঃপর তিনি (সা.) কুরআনের এ আয়াতটি পাঠ করলেন- (هُوَ الۡاَوَّلُ وَ الۡاٰخِرُ وَ الظَّاهِرُ وَ الۡبَاطِنُ ۚ وَ هُوَ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمٌ) “তিনি প্রথম, তিনি শেষ, তিনি প্রকাশ্য, তিনি গোপন”- (সূরাহ আল হাদীদ ৫৭ : ৩)। (আহমাদ ও তিরমিযী)
ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) এ আয়াতটি পাঠ করে এ কথাটি বুঝাতে চেয়েছেন যে, ’কাছে পৌছবে’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহর জ্ঞান, কুদরত ও ক্ষমতায় গিয়ে পৌঁছাবে। কারণ আল্লাহর জ্ঞান, তাঁর ক্ষমতা এবং রাজত্ব সর্বস্থান বেষ্টিত এবং তিনি ’আরশের উপরেই বিরাজমান। যেমন, তাঁর পবিত্র কিতাবে এভাবেই স্বীয় পরিচিতি দান করেছেন।
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنْهُ قَالَ: بَيْنَمَا نَبِيُّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جَالِسٌ وَأَصْحَابُهُ إِذْ أَتَى عَلَيْهِمْ سَحَابٌ فَقَالَ نَبِيُّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «هَلْ تَدْرُونَ مَا هَذَا؟» . قَالُوا: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ: «هَذِهِ الْعَنَانُ هَذِهِ رَوَايَا الْأَرْضِ يَسُوقُهَا اللَّهُ إِلَى قَوْمٍ لَا يَشْكُرُونَهُ وَلَا يَدعُونَهُ» . ثمَّ قَالَ: «هَل تَدْرُونَ من فَوْقَكُمْ؟» قَالُوا: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ: «فَإِنَّهَا الرَّقِيعُ سَقْفٌ مَحْفُوظٌ وَمَوْجٌ مَكْفُوفٌ» . ثُمَّ قَالَ: «هَلْ تَدْرُونَ مَا بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهَا؟» قَالُوا: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ: «بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهَا خَمْسُمِائَةِ عَامٍ» ثُمَّ قَالَ: «هَلْ تَدْرُونَ مَا فَوْقَ ذَلِكَ؟» . قَالُوا: اللَّهُ ورسولُه أعلمُ. قَالَ: «سماءانِ بُعْدُ مَا بَيْنَهُمَا خَمْسُمِائَةِ سَنَةٍ» . ثُمَّ قَالَ كَذَلِكَ حَتَّى عَدَّ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ «مَا بَيْنَ كُلِّ سَمَاءَيْنِ مَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ» . ثُمَّ قَالَ: «هَلْ تَدْرُونَ مَا فَوْقَ ذَلِكَ؟» قَالُوا: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ: «إِنَّ فَوْقَ ذَلِكَ الْعَرْشُ وَبَيْنَهُ وَبَيْنَ السَّمَاءِ بُعْدُ مَا بَيْنَ السَّماءين» . ثُمَّ قَالَ: «هَلْ تَدْرُونَ مَا تَحْتَ ذَلِكَ؟» . قَالُوا: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ: «إِنَّ تَحْتَهَا أَرْضًا أُخْرَى بَيْنَهُمَا مَسِيرَةُ خَمْسِمِائَةِ سَنَةٍ» . حَتَّى عدَّ سَبْعَ أَرضين بَين كلَّ أَرضين مسيرَة خَمْسمِائَة سنة قَالَ: «وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَوْ أَنَّكُمْ دَلَّيْتُمْ بِحَبْلٍ إِلَى الْأَرْضِ السُّفْلَى لَهَبَطَ عَلَى اللَّهِ» ثُمَّ قَرَأَ (هُوَ الْأَوَّلُ وَالْآخِرُ وَالظَّاهِرُ وَالْبَاطِنُ وَهُوَ بِكُلِّ شيءٍ عليم) رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ. وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ: قِرَاءَةُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْآيَةَ تَدُلُّ على أَنه أَرَادَ الهبط عَلَى عِلْمِ اللَّهِ وَقُدْرَتِهِ وَسُلْطَانِهِ وَعِلْمُ اللَّهِ وَقُدْرَتُهُ وَسُلْطَانُهُ فِي كُلِّ مَكَانٍ وَهُوَ عَلَى الْعَرْش كَمَا وصف نَفسه فِي كِتَابه
اسنادہ ضعیف ، رواہ احمد (1 / 206 ۔ 207 ح 1770) ۔ و الترمذی (3298 وقال : غریب) * الحسن البصری مدلس و عنعن و لبعض الحدیث شواھد ۔
(ضَعِيف)
ব্যাখ্যা: روايا (هَذِهِ رَوَايَا الْأَرْضِ) শব্দটি (رواية)-এর বহুবচন। যার অর্থ পানি বহনকারী উট। উটের উপর রাখা পানির পাত্রকে (رواية) বলা হয়। আকাশের মেঘকে পানির পাত্রের সাথে তুলনা করা হয়েছে। উটের উপর যেমন পাত্র থাকে এবং উট তা বহন করে নিয়ে যায়, আকাশের মেঘও পৃথিবীর পিঠে থাকা পানির পাত্র। পৃথিবী এই মেঘকে বহন করে রয়েছে এবং আল্লাহর হুকুম তাকে এক জায়গা থেকে অপর জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে।
(يَسُوقُهَا اللَّهُ إِلَى قَوْمٍ لَا يَشْكُرُونَهُ وَلَا يَدعُونَهُ) অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তাকে ঐ সম্প্রদায়ের কাছে নিয়ে যান যারা তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না এবং তার কাছে দু'আ করে না, আল্লাহকে স্মরণ করে না, আল্লাহর ইবাদাত করে না। বরং কুফরী করে এবং বৃষ্টিকে নক্ষত্রের দিকে সম্পৃক্ত করে বলে অমুক নক্ষত্রের কারণে বৃষ্টি হয়েছে। এমনকি মূর্তিপূজা করে। অথচ আল্লাহ তা'আলা তার রহমত ও দয়াকে ব্যাপকভাবে বিস্তার করেন এবং অন্যান্য মাখলুক ও প্রাণীর এই অকৃতজ্ঞ লোকটির কাছে বৃষ্টি নিয়ে যান এবং তারও রিযকের ব্যবস্থা করেন।
(فَإِنَّهَا الرَّقِيعُ) এটি দুনিয়ার আসমানের নাম। কারো কারো মতে সব আসমানেরই এই নাম। পরবর্তীতে এই আসমানের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ এই আসমান সংরক্ষিত ছাদের ন্যায়। আল্লাহ তা'আলা তাকে জমিনে পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করেছেন। খুঁটি ছাড়া তা দাঁড়িয়ে রয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهَا خَمْسُمِائَةِ عَامٍ) তোমাদের মাঝে অর্থাৎ জমিন ও প্রথম আসমানের মাঝে পাঁচশত বছরের দূরত্ব। এভাবে এক আসমান থেকে অপর আসমানের দূরত্বও পাঁচশত বছরের রাস্তা। এ সংক্রান্ত হাদীস ইতোপূর্বে ব্যাখ্যাসহ অতিক্রান্ত হয়েছে। একই বিষয়কে বিভিন্ন হাদীসে বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ হাদীসে আসমানের সাথে সাতটি জমিন এবং প্রতিটি জমিনের পরস্পরের মধ্যকার দূরত্ব দুই আসমানের মধ্যকার দূরত্বের সমপরিমাণ।
(لَوْ أَنَّكُمْ دَلَّيْتُمْ بِحَبْلٍ إِلَى الْأَرْضِ السُّفْلَى لَهَبَطَ عَلَى اللَّهِ) অর্থাৎ যদি তোমরা সর্বনিম্নের জমিনে একটি রশি ঝুলিয়ে দাও তবে তা আল্লাহ তা'আলার কাছে গিয়ে পৌছবে। আল্লাহ তা'আলার কাছে গিয়ে পড়বে’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, রশি যত দূরত্বই যাক না কেন আল্লাহ তা'আলার জ্ঞান ও রাজত্বের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। উপরে যেমন তার রাজত্ব, নিচেও তাঁরই রাজত্ব। লেখক ইমাম তিরমিযীর বরাতে হাদীসের এই ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন। হাদীস বর্ণনার পর বর্ণিত আয়াত পাঠ করাই হাদীসের এই মর্ম নিশ্চিত করে বলে তিনি আখ্যা দেন। আল্লাহ তা'আলার রাজত্ব ও ক্ষমতার বিবরণ দেয়ার পর প্রমাণ স্বরূপ রাসূলুল্লাহ (সা.) পাঠ করেন-
(هُوَ الْأَوَّلُ وَالْآخِرُ وَالظَّاهِرُ وَالْبَاطِنُ وَهُوَ بِكُلِّ شيءٍ عليم)
(الْأَوَّلُ) অর্থাৎ তিনি প্রথম অনাদি, তাঁর শুরু নেই।
(الْآخِرُ) অর্থাৎ তিনি শেষ ও সর্বদা বিদ্যমান তার কোন সমাপ্তি নেই।
(الظَّاهِرُ) অর্থাৎ তিনি প্রকাশ্য, তথা তার গুণাবলি সর্বত্র প্রকাশমান।
(الْبَاطِنُ) অর্থাৎ তিনি গোপন, তথা সত্তাগতভাবে তিনি আমাদের পৌছবে।
(وَهُوَ بِكُلِّ شيءٍ عليم) তিনি সর্ববিষয়ে জ্ঞানী। আসমান ও জমিনের সিফাত বর্ণনার পর রাসূল (সা.) বললেন, নিম্ন আসমানে একটি রশি ঝুলিয়ে দিলেও তা আল্লাহ তা'আর কাছে পৌছবে, অর্থাৎ তার জ্ঞানের বাহিরে যাবে না। এই কথা বুঝতেই রাসূল (সা.) এ আয়াতটি পাঠ করেন। আল্লাহ তা'আলার জ্ঞানের বর্ণনা রয়েছে, (وَهُوَ بِكُلِّ شيءٍ عليم)-এর মাঝে। তাঁর কুদরতের বর্ণনা করা হয়েছে, (الْأَوَّلُ وَالْآخِرُ)-এর মাঝে। অর্থাৎ তিনি শুরু এবং সব জিনিসের উৎপত্তি তাঁর থেকে। তিনি সবকিছুকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে এনেছেন। এভাবে সব কিছুর সমাপ্তি তার কাছে গিয়ে হবে। তার কোন সমাপ্তি নেই। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, کُلُّ مَنۡ عَلَیۡهَا فَانٍ ﴿ۚۖ۲۶﴾ وَّ یَبۡقٰی وَجۡهُ رَبِّکَ ذُو الۡجَلٰلِ وَ الۡاِکۡرَامِ ﴿ۚ۲۷﴾ “ভূপৃষ্ঠের সবকিছুই ধ্বংসশীল। একমাত্র আপনার মহিমাময় ও মহানুভব পালনকর্তার সত্তা ছাড়া।” (সূরা আর রহমান ৫৫: ২৬-২৭)
এভাবে আল্লাহ তা'আলার ক্ষমতা ও রাজত্ব বুঝাতে বলা হয়েছে, (وَالظَّاهِرُ وَالْبَاطِنُ) অর্থাৎ তিনি জয়ী, কেউ তার ওপর জয়লাভ করতে পারে না। সকল সৃষ্টির মাঝে তারই ক্ষমতার দাপট প্রকাশমান। তার ওপর কেউ নেই যে, তাকে বারণ করতে পারে। সৃষ্টিজগতের উপরে যেমন তার ক্ষমতা। অভ্যন্তরেও তারই ক্ষমতা। তিনি ছাড়া কারো কোন আশ্রয়স্থল নেই। সবার শেষ ঠিকানা তিনি। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭৩৬-[৩৯] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন আদম আলায়হিস সালাম ছিলেন দৈর্ঘ্যে ষাট হাত লম্বা এবং পার্শ্বে ছিলেন সাত হাত চওড়া।
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «كَانَ طُولُ آدَمَ سِتِّينَ ذِرَاعًا فِي سبع أَذْرع عرضا»
اسنادہ ضعیف ، رواہ احمد (2 / 535 ح 10926) * فیہ علی بن زید بن جدعان : ضعیف مشھور
ব্যাখ্যা: সহীহুল বুখারীর হাদীসে (নং. ৩৩২৬) রয়েছে خَلَقَ اللهُ آدَمَ وَطُولُهُ سِتُّونَ ذِرَاعًا ... فَكُلُّ مَنْ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ عَلَى صُورَةِ آدَمَ، فَلَمْ يَزَلِ الْخَلْقُ يَنْقُصُ حَتَّى الآنَ
আল্লাহ তা'আলা আদম আলায়হিস সালাম-কে সৃষ্টি করেছেন। তাঁর দৈর্ঘ্য ছিল ষাট হাত। ...যারা জান্নাতে প্রবেশ করবেন তারা আদম 'আলায়হিস সালাম-এর আকৃতিবিশিষ্ট হবেন। তবে আদম সন্তানদের দেহের দৈর্ঘ্য সর্বদা কমতে কমতে বর্তমান পরিমাপ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
অর্থাৎ প্রথম মানুষের দৈর্ঘ্য বর্তমান সময়ের হাতের তুলনায় ষাট হাত ছিল। পরবর্তীতে তা ছোট হতে হতে এই পরিমাণে আসে। জান্নাতে মানুষ তার পিতার সেই ষাট হাত দৈর্ঘ্য ও সাত হাত প্রস্থের আকৃতি নিয়ে যাবে। হাদীসের ব্যাখ্যায় ইবনু হাজার (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, ষাট হাত দ্বারা তিনি তার নিজ হাতের ষাট হতে পারেন, আবার যাদের সামনে রাসূল (সা.) এ হাদীসটি বলেছেন তাদের সময়কার মানুষের হাতের সমপরিমাণ হতে পারে। তবে প্রথম মত অধিক প্রকাশ্য; কেননা মানুষের যিরা' বা হাত তার কনুইয়ের তুলনায় হয়ে থাকে। যদি আদম প্রচলিত হাতে ষাট হাত হন তবে শরীরের দৈর্ঘ্যের তুলনায় তার হাত ছোট হয়ে যাবে। (ফাতহুল বারী হা. ৬/৩৬৬)
ইবনু হাজার (রহিমাহুল্লাহ)-এর মতটি অনেকে গ্রহণ করলেও প্রকৃতপক্ষে এই মত গ্রহণ সম্ভব নয়। কেননা মানুষ নিজ হাতে ষাট হাত হলে তার হাত যতই দীর্ঘ হবে তার শরীরের অঙ্গের মাঝে দূরত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকবে। তখন তার হাতকে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে পৌছানো সম্ভব হবে না। মানুষ হাত দিয়ে তার পুরো শরীরের নাগাল পায়, তাই আল্লাহ তা'আলা সকল মানুষকে নিজ হাতের সাড়ে তিন হাত করে সৃষ্টি করেছেন।
তাই আদম যতই লম্বা হন না কেন নিজ হাতে সাড়ে তিন হাত হওয়াই আল্লাহর সৃষ্টির মাহাত্মের সাথে সামঞ্জস্য। তাই এখানে ষাট হাত বলতে মানুষের কাছে পরিচিত হাতে ষাট হওয়া আবশ্যক। (সম্পাদকীয়)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭৩৭-[৪০] আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! নবীদের মধ্যে সর্বপ্রথম নবী কে ছিলেন? তিনি (সা.) বললেন, আদম আলায়হিস সালাম। আমি বললাম, তিনি কি ’নবী ছিলেন? বললেন, হ্যা, তিনি এমন নবী ছিলেন যার সাথে কথাবার্তা বলা হয়েছে। আমি আবার প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! ’রাসূল’ কতজন ছিলেন? বললেন, তিনশত দশজনেরও কিছু বেশি এর বিরাট দল।
আবু উমামাহ্ (রহিমাহুল্লাহ)-এর বর্ণনায় আছে, আবূ যার (রাঃ) বলেন, আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! নবীদের পূর্ণ সংখ্যা কত? বললেন, এক লক্ষ চব্বিশ হাজার। তন্মধ্যে রাসূল’ ছিলেন, তিনশত পনের এক বিরাট জামা’আত বা কাফেলা।
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيُّ الْأَنْبِيَاءِ كَانَ أَوَّلَ؟ قَالَ: «آدَمُ» . قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَنَبِيٌّ كَانَ؟ قَالَ: «نَعَمْ نَبِيٌّ مُكَلَّمٌ» . قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ كم المُرْسَلُونَ؟ قَالَ: «ثَلَاثمِائَة وبضع عشر جماً غفيراً» وَفِي رِوَايَة عَنْ أَبِي أُمَامَةَ قَالَ أَبُو ذَرٍّ: قَلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ كَمْ وَفَاءُ عِدَّةِ الْأَنْبِيَاءِ؟ قَالَ: «مِائَةُ أَلْفٍ وَأَرْبَعَةٌ وَعِشْرُونَ أَلْفًا الرُّسُلُ مِنْ ذَلِكَ ثَلَاثُمِائَةٍ وَخَمْسَةَ عَشَرَ جَمًّا غَفِيرًا»
اسنادہ ضعیف ، رواہ احمد (5 / 178 ح 21879) * فیہ عبید بن خشخاش لین و ابو عمر الدمشقی : ضعیف ۔ 0 روایۃ ابی امامۃ : سندہ ضعیف جدًا ، رواھا احمد (5 / 265 ، 266 ح 22644) فیہ علی بن یزید الالھانی ضعیف جدًا و معان بن رفاعۃ ضعیف
ব্যাখ্যা: (نَعَمْ نَبِيٌّ مُكَلَّمٌ) অর্থাৎ কেবল নবী ছিলেন এমন নয়; বরং সহীফাহপ্রাপ্ত নবী ছিলেন। আল্লাহ তাঁর ওপর সহীফাহ্ অবতীর্ণ করেছেন।
(كم المُرْسَلُونَ) “রাসূল কতজন?” হাদীস থেকে বুঝা যায়, নবী ও রাসূলের মাঝে পার্থক্য রয়েছে। পার্থক্য হলো, ঐ সকল নবীদের কে রাসূল বলা হয় যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে। অপরদিকে কেবল নবী যার ওপর কিতাব নাযিল হয়নি। তাদেরকে পূর্বে শারী'আত মোতাবেক দাওয়াতের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নবী ও রাসূলের মাঝে প্রসিদ্ধ পার্থক্য, রাসূল যাকে তাবলীগের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর নবী ব্যাপক, নির্দেশ দেয়া হতে পারে আবার নাও হতে পারে।
(ثَلَاثمِائَة وبضع عشر جماً غفيراً) “তিনশত দশ জনের একটি বিরাট দল” নবী (সা.) রাসূলদের সংখ্যা অস্পষ্ট রেখেছেন; যাতে কেউ নিশ্চিত সংখ্যা না বলে। কারণ নিশ্চিত সংখ্যা বললে কম বেশ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
(كَمْ وَفَاءُ عِدَّةِ الْأَنْبِيَاءِ) অর্থাৎ নবীদের পূর্ণ সংখ্যা কত? নবীদের পূর্ণ সংখ্যা এক লক্ষ চব্বিশ হাজার। মুল্লা আলী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এ হাদীসে নবী ও রাসূলের সংখ্যা যদিও নির্ধারিত, কিন্তু এটা নিশ্চিত ও অকাট্য নয়; তাই নবী ও রাসূলদের ওপর নির্ধারিত সংখ্যায় সীমাবদ্ধ না করে মোট সংখ্যা হিসেবে ঈমান রাখতে হবে যেন কোন নবী বাদ না পড়েন এবং নবী নন এমন কেউ নবীদের ওপর ঈমানের আওতায় না ঢুকেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সৃষ্টির সূচনা ও নবী-রাসূলদের আলোচনা
৫৭৩৮-[৪১] ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: খবর শুনা চাক্ষুষ দেখার মতো নয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মূসা আলায়হিস সালাম-এর সম্প্রদায় গরুর বাছুর পূজা করা সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা মূসা আলায়হিস সালাম-কে যে সংবাদ দিয়েছেন, এতে তিনি হাতে সংরক্ষিত তাওরাতের তখতাটি ফেলে দেননি, কিন্তু যখন তাদের মধ্যে গিয়ে চাক্ষুষ তাদের কর্মকাণ্ড স্বচক্ষে দেখলেন, তখন তখতাটি ছুঁড়ে ফেললেন, ফলে তা ভেঙ্গে গেল। [উপরোক্ত হাদীস তিনটি ইমাম আহমাদ (রহিমাহুল্লাহ) রিওয়ায়াত: করেছেন]
اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (بَاب بدءالخلق وَذِكْرِ الْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ)
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَيْسَ الْخَبَرُ كَالْمُعَايَنَةِ إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى أَخْبَرَ مُوسَى بِمَا صَنَعَ قَوْمُهُ فِي الْعِجْلِ فَلَمْ يُلْقِ الْأَلْوَاحَ فَلَمَّا عَايَنَ مَا صَنَعُوا أَلْقَى الْأَلْوَاحَ فَانْكَسَرَتْ. رَوَى الْأَحَادِيث الثَّلَاثَة أَحْمد
صحیح ، رواہ احمد (1 / 271 ح 2447 و 1 / 215 ح 1842) [و صححہ ابن حبان (الموارد : 2087 ۔ 2088) و الحاکم (2 / 321 ح 3250 ، 2 / 380 ح 3435) علی شرط الشیخین و وافقہ الذھبی و سندہ صحیح] * ھشیم بن بشیر عنعن و لکن تابعہ ابو عوانۃ و بہ صح الحدیث ۔
(صَحِيح)
ব্যাখ্যা: শোনা খবর ও স্বচক্ষে দেখা এক হয় না। এটি একটি চরম বাস্তবতা। এই বাস্তবতা সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, এমনকি নবী হলেও। আবার শোনা খবরটি দেখার মতো নিশ্চিত হলেও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির ক্ষেত্রে পার্থক্য হয়ে যায়। এটি দেখাতেই হয়তো রাসূলুল্লাহ (সা.) এই বাস্তব বিষয়টি বলার পর মূসা আলায়হিস সালাম-এর ঘটনা টেনে এনেছেন এবং শোনা ও দেখার মাঝে পার্থক্যটি তুলে ধরেছেন। কারণ মূসা আলায়হিস সালাম-কে যখন আল্লাহ তা'আলা বললেন- فَاِنَّا قَدۡ فَتَنَّا قَوۡمَکَ مِنۡۢ بَعۡدِکَ وَ اَضَلَّهُمُ السَّامِرِیُّ “তুমি চলে আসার পর আমি তোমার সম্প্রদায়কে পরীক্ষায় ফেলেছি এবং সামিরী তাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে। (সূরাহ্ ত্বা-হা- ২০ : ৮৫)” আল্লাহ তা'আলার দেয়া খবরটি নিশ্চয় দেখার মতোই নিশ্চিত, বরং আরো বেশি। তারপরও মূসা আলায়হিস সালাম রাগ করে তাওরাতের পাণ্ডুলিপি ফেলে দেননি। কিন্তু যখন সম্প্রদায়ের কাছে গিয়ে নিজ চোখে তাদের ভ্রষ্টতা অবলোকন করলেন তখন তিনি রাগে উত্তেজিত হয়ে গেলেন এবং তখতাটি ছুড়ে মারলেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন –
وَ لَمَّا رَجَعَ مُوۡسٰۤی اِلٰی قَوۡمِهٖ غَضۡبَانَ اَسِفًا ۙ قَالَ بِئۡسَمَا خَلَفۡتُمُوۡنِیۡ مِنۡۢ بَعۡدِیۡ ۚ اَعَجِلۡتُمۡ اَمۡرَ رَبِّکُمۡ ۚ وَ اَلۡقَی الۡاَلۡوَاحَ وَ اَخَذَ بِرَاۡسِ اَخِیۡهِ یَجُرُّهٗۤ اِلَیۡهِ ؕ قَالَ ابۡنَ اُمَّ اِنَّ الۡقَوۡمَ اسۡتَضۡعَفُوۡنِیۡ وَ کَادُوۡا یَقۡتُلُوۡنَنِیۡ ۫ۖ فَلَا تُشۡمِتۡ بِیَ الۡاَعۡدَآءَ وَ لَا تَجۡعَلۡنِیۡ مَعَ الۡقَوۡمِ الظّٰلِمِیۡنَ
“তারপর যখন মূসা নিজ সম্প্রদায়ে ফিরে এলেন রাগান্বিত ও অনুতপ্ত অবস্থায়, তখন বললেন, আমার অনুপস্থিতিতে তোমরা আমার কি নিকৃষ্ট প্রতিনিধিত্বটাই না করেছ। তোমরা নিজ পরোয়ারদিগারের হুকুম থেকে কি তাড়াহুড়া করে ফেললে এবং সে তখতাগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিলেন এবং নিজের ভাইয়ের মাথার চুল চেপে ধরে নিজের দিকে টানতে লাগলেন।” (সূরাহ্ আল-আরাফ- ৭ : ১৫০)
এতে প্রমাণিত হলো নিজ চোখে কোন ঘটনা অবলোকনে যে প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব সৃষ্টি হয় শোনা খবরে তা হয় না। (সম্পাদকীয়)