৫৫৭৫

পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ - হাওযে কাওসার ও শাফাআতের বর্ণনা

৫৫৭৫-[১০] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। একদিন নবী (সা.) -এর কাছে কিছু গোশত আনা হলো এবং তাঁর জন্য বাজুর (রান) গোশতটিই পেশ করা হলো। মূলত তিনি (সা.) এ গোশত (খেতে) খুব পছন্দ করতেন। কাজেই তিনি তা থেকে দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেলেন। তারপর বললেন, কিয়ামতের দিন আমি হব সকল মানুষের সরদার, যেদিন মানবমণ্ডলী রাব্বুল আলামীনের সামনে দণ্ডায়মান হবে এবং সূর্য থাকবে (মাথার) খুব কাছে। হতাশা ও দুশ্চিন্তায় মানুষ এমন এক করুণ অবস্থায় পৌছবে, যা সহ্য করার শক্তি তাদের থাকবে না। তখন তারা (পরস্পরে) বলাবলি করবে, তোমরা কি এমন কোন ব্যক্তিকে খোঁজ করে পাও না, যিনি তোমাদের প্রভুর কাছে তোমাদের জন্য সুপারিশ করবেন?
তখন তারা আদম ’আলায়হিস সালাম-এর কাছে আসবে। এরপর বর্ণনাকারী আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)- এর শাফা’আত সম্পর্কীয় হাদীসটি (পূর্বে বর্ণিত হয়েছে) বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেন, তখন আমি ’আরশের নিচে যাব এবং আমার প্রভুর উদ্দেশ্যে সিজদায় লুটিয়ে পড়ব। তখন আল্লাহ তা’আলা তাঁর হামদ ও সানার এমন কিছু উত্তম বাক্য আমার হৃদয়ে ঢেলে দেবেন যা আমার পূর্বে কারো জন্য উন্মুক্ত করেননি।
অতঃপর আল্লাহ তা’আলা বলবেন, হে মুহাম্মাদ। আপনার মাথা উঠান। আপনি প্রার্থনা করুন, যা চাবেন তা দেয়া হবে। সুপারিশ করুন, আপনার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে। নবী (সা.) বলেন, তখন আমি মাথা উঠাব এবং বলব, হে আমার প্রভু! আমার উম্মত, হে আমার প্রভু! আমার উম্মত, হে আমার প্রভু! আমার উম্মত। তখন আমাকে বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! আপনার উম্মতের যাদের কাছ থেকে কোন বিচার নেয়া হবে না তাদেরকে আপনি জান্নাতের দরজাসমূহের ডানদিকের দরজা দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দিন এবং তারা সে সকল দরজা ছাড়াও অন্যান্য দরজা দিয়ে অপরাপর লোকেদের সাথে প্রবেশ করারও অধিকার রাখে। অতঃপর নবী (সা.) বলেন, সেই সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ! জান্নাতের দরজাসমূহের উভয় পাটের দূরত্ব, যেমন মক্কাহ্ ও হিজ্বর নামক স্থানের মাঝের দূরত্ব পরিমাণ। (বুখারী ও মুসলিম)

الفصل الاول (بَاب الْحَوْض والشفاعة )

وَعَنْهُ قَالَ أَتَى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِلَحْمٍ فَرُفِعَ إِلَيْهِ الذِّرَاعُ وَكَانَتْ تُعْجِبُهُ فَنَهَسَ مِنْهَا نَهْسَةً ثُمَّ قَالَ: «أَنَا سَيِّدُ النَّاسِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَوْمَ يَقُومَ النَّاسُ لِرَبِّ الْعَالمين وتدنو الشَّمْس فَيبلغ مِنَ الْغَمِّ وَالْكَرْبِ مَا لَا يُطِيقُونَ فَيَقُولُ النَّاس أَلا تنْظرُون من يشفع لكم إِلَى ربكُم؟ فَيَأْتُونَ آدَمَ» . وَذَكَرَ حَدِيثَ الشَّفَاعَةِ وَقَالَ: «فَأَنْطَلِقُ فَآتِي تَحْتَ الْعَرْشِ فَأَقَعُ سَاجِدًا لِرَبِّي ثُمَّ يَفْتَحُ اللَّهُ عَلَيَّ مِنْ مَحَامِدِهِ وَحُسْنِ الثَّنَاءِ عَلَيْهِ شَيْئًا لَمْ يَفْتَحْهُ عَلَى أَحَدٍ قَبْلِي ثُمَّ قَالَ يَا مُحَمَّدُ ارْفَعْ رَأْسَكَ وَسَلْ تُعْطَهْ وَاشْفَعْ تُشَفَّعْ فَأَرْفَعُ رَأْسِي فَأَقُولُ أُمَّتِي يارب أمتِي يارب فَيُقَالُ يَا مُحَمَّدُ أَدْخِلْ مِنْ أُمَّتِكَ مَنْ لَا حِسَابَ عَلَيْهِمْ مِنَ الْبَابِ الْأَيْمَنِ مِنْ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ وَهُمْ شُرَكَاءُ النَّاسِ فِيمَا سِوَى ذَلِكَ مِنَ الْأَبْوَابِ» . ثُمَّ قَالَ: «وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنَّ مَا بَيْنَ الْمِصْرَاعَيْنِ مِنْ مَصَارِيعِ الْجَنَّةِ كَمَا بَيْنَ مَكَّةَ وَهَجَرَ» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ

متفق علیہ ، رواہ البخاری (4712) و مسلم (327 / 194)، (480) ۔
(مُتَّفق عَلَيْهِ)

وعنه قال أتى النبي صلى الله عليه وسلم بلحم فرفع إليه الذراع وكانت تعجبه فنهس منها نهسة ثم قال: «أنا سيد الناس يوم القيامة يوم يقوم الناس لرب العالمين وتدنو الشمس فيبلغ من الغم والكرب ما لا يطيقون فيقول الناس ألا تنظرون من يشفع لكم إلى ربكم؟ فيأتون آدم» . وذكر حديث الشفاعة وقال: «فأنطلق فآتي تحت العرش فأقع ساجدا لربي ثم يفتح الله علي من محامده وحسن الثناء عليه شيئا لم يفتحه على أحد قبلي ثم قال يا محمد ارفع رأسك وسل تعطه واشفع تشفع فأرفع رأسي فأقول أمتي يارب أمتي يارب فيقال يا محمد أدخل من أمتك من لا حساب عليهم من الباب الأيمن من أبواب الجنة وهم شركاء الناس فيما سوى ذلك من الأبواب» . ثم قال: «والذي نفسي بيده إن ما بين المصراعين من مصاريع الجنة كما بين مكة وهجر» . متفق عليه

ব্যাখ্যা: একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর নিকট কিছু ভুনা গোশত আনা হলো, রাসূলুল্লাহ (সা.) বকরীর সামনের রানের গোশত বেশি পছন্দ করতেন বলে তার সামনে বকরীর সামনের একখানা রান তুলে ধরা হলো।
(فَنَهَسَ مِنْهَا) তিনি (সা.) তা থেকে দাঁত দিয়ে কেটে কেটে বা টুকরা টুকরা করে খেতে লাগলেন। (نَهَس) শব্দটি (نَهَش) ও পড়া যায়। কাযী ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, অধিকাংশ বর্ণনায় নুকতাবিহিন শীন অক্ষর যোগে পঠিত হয়েছে, কিন্তু ইবনু হামান-এর বর্ণনায় নুকতাসহ ‘শীন’ যোগে পঠিত হয়েছে। এর অর্থ দাঁতের কিনারা দিয়ে ধরা বা মাড়ির দাঁতে কামড়ানো।
রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর বাণী: (أنَاسَيِّدُالنَّسِ) “আমি মানবজাতির সর্দার”-এর অর্থ আমি নবী এবং তাদের উম্মতসহ সকলের সর্দার। যেহেতু কিয়ামতের দিন সকলেই আমার শাফা'আতের মুখাপেক্ষী হবে।
এটা আল্লাহর নিকট আমার কারামতের কারণেই হবে। মানুষ যখন নিরুপায় হয়ে যাবে তখন আমার কাছে আসবে শাফাআতের জন্য, আর আমিই সর্বপ্রথম শাফা'আত করব। যেমন অন্য হাদীসে এসেছে, “আমি কিয়ামত দিবসে আদম সন্তানের সর্দার হব এতে আমার কোন গর্ব নেই। আর আমার হাতেই থাকবে প্রশংসার পতাকা তাতে আমার কোন গর্ব নেই। কোন নবীই আমার পতাকার নীচে আশ্রয় নেয়া ছাড়া থাকবে না।
আমি প্রথম ব্যক্তি যার জন্য সর্বপ্রথম জমিন বিদীর্ণ হবে, এতে আমার কোন গর্ব নেই। আমিই সর্বপ্রথম শাফা'আতকারী হব এবং প্রথম ব্যক্তি হব যার শাফা'আত কবুল করা হবে এতেও আমার কোন গর্ব নেই।” (আহমাদ হা, ৪৩০৮, তিরমিযী হা. ৩৬১৫)

‘আল্লামাহ্ ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, (وْمَ يَقُومَ النَّاسُ لِرَبِّ الْعَالمين) বাক্যটি পূর্বে উল্লেখিত (يَوْمَ الْقِيَامَةِ) বাক্য থেকে বদল হয়েছে।
ইবনুল মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, সম্ভবত কোন প্রশ্নকারীর প্রশ্ন- কিয়ামত কি? এর উত্তরে বলা হয়েছে- “যেদিন সমস্ত মানুষ বিশ্ব প্রতিপালক (আল্লাহ)-এর সমীপে দণ্ডায়মান হবে। (يَوْمَ) শব্দটি উহ্য (اعْنِىْ) ক্রিয়া থেকে কর্ম হিসেবে (نَصَبْ) হয়েছে।
(وتدنو الشَّمْس....) “সূর্য মানুষের নিকটে পৌছে যাবে"-এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, মানুষ সূর্যের প্রচণ্ড তাপের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী দাঁড়ানোর ফলে অধৈর্য ও অস্থির হয়ে যাবে, উপরন্ত ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে। এহেন পরিস্থিতিতে মানুষের মধ্য থেকে একে অপরকে বলবে, চিন্তা কর অথবা খুঁজে দেখ তো আমাদের এই দুঃসহ অবস্থা থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করার মতো কোন লোক পাওয়া যায় কিনা? অতঃপর লোকেরা আদম আলায়হিস সালাম-এর নিকট আসবে। এরপর বর্ণনকারী আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) শাফা'আতের দীর্ঘ হাদীস বর্ণনা করেন যা ইতোপূর্বে অতিবাহিত হয়েছে। অর্থাৎ বিভিন্ন নবীদের কাছে যাওয়া এবং তাদের নিকট সুপারিশের আবেদন করা। অবশেষে লোকেরা মুহাম্মাদ (সা.) -এর নিকট যাবে, তিনি তাদের আবেদনে সাড়া দিয়ে আল্লাহর আরশের নীচে গিয়ে সিজদায় পড়ে যাবেন। এ সিজদায় আল্লাহ তা'আলা খুশি হবেন, ফলে তার অন্তরে এমন সব প্রশংসার বাণী ও ভাষা উদয় করে দিবেন যা কাউকে দেয়া হয়নি। আল্লাহর নবী সেই বাক্যগুলো দিয়ে যখন আল্লাহর প্রশংসা করবেন তখন আল্লাহ তা'আলা তার মাথা উঠাতে বলবেন এবং চাহিদা পূরণ করা ও শাফা'আত কবুল করার ওয়াদা করবেন। এ সময় তিনি (সা.) মাথা উঠিয়ে “ইয়া রব্বী উম্মতী’ ‘ইয়া রব্বী উম্মতী’ বলে তিনবার আল্লাহকে আহ্বান জানাবেন।

‘আল্লামাহ্ মুল্লা আলী ক্বারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, তিনবার করে ‘ইয়া রব্বী উম্মতী' বলা তাগিদ হিসেবে অথবা মুবালাগাহ্ হিসেবে অথবা পাপীদের স্তরের প্রতি ইশারা করে বলবেন। এ আহ্বানের পরে আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বলবেন, তোমার উম্মতের যাদের কোন হিসাব-নিকাশ নেই এবং তারা জান্নাতে সবগুলো দরজা দিয়ে প্রবেশের অধিকার রাখে এতদসত্ত্বেও তাদের ডানদিকের দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করাও, এটা তাদের জন্য খাস। এরা কখনো আল্লাহর সাথে শরীক করেনি অবৈধ ঝাড়-ফুক করেনি এবং কোন কিছুকে অশুভ লক্ষণ মনে করেনি। নবী জান্নাতের দরজার পরিধি বর্ণনা করেন যে, তার একপাট থেকে অন্যপাটের ব্যবধান মক্কাহ্ থেকে হিজর পর্যন্ত। হিজর হলো বাহরাইনের একটি প্রসিদ্ধ জনপদ। কেউ কেউ বলেছেন, এটা মদীনার একটি গ্রাম বা জনপদ। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ, শারহুন নাবাবী ৩য় খণ্ড, হা. ৩২৭, তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খণ্ড ২৮৩ পৃ., হা. ১৮৩৭)


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
পুনঃনিরীক্ষণঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-২৮: সৃষ্টির সূচনা ও কিয়ামতের বিভিন্ন অবস্থা (كتاب أَحْوَال الْقِيَامَة وبدء الْخلق)