পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
اللباس (আল লিবা-স) শব্দটি باب سمع (বা-বি সামি’আ)-এর মাসদার। এটি পেশের সাথেও ব্যবহার করা হয়। যার অর্থ পোশাক। আর باب ضرب (বা-বি যরাবা) থেকে لبسا (লাবসান) লামের উপর যবর যোগে আসে। যার অর্থ সংমিশ্রণ করা। মহান আল্লাহ বলেনঃ
وَلَا تَلْبِسُوا الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُوا الْحَقَّ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ
’’আর তোমরা হককে বাতিলের সাথে মিশ্রিত করো না এবং জেনে-বুঝে হককে গোপন করো না’’- (সূরাহ্ আল বাকারাহ্ ০২ : ৪২)।
বিভিন্ন কারণে ইসলামে কতিপয় পোশাক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সেগুলো হল- ১. পুরুষের জন্য রেশমের পোশাক ও স্বর্ণমিশ্রিত পোশাক। ২. পুরুষের জন্য মহিলাদের পোশাক। ৩. মহিলাদের জন্য পুরুষের পোশাক। ৪. খ্যাতি ও বড়াই প্রকাশক পোশাক। ৫. ভিন্ন ধর্মীয় পোশাক। ৬. আঁটসাঁট পোশাক ইত্যাদি। [সম্পাদক]
৪৩০৪-[১] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিবারাহ্ কাপড় পরিধান করতে অধিক পছন্দ করতেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوْلُ
عَن أنسٍ قَالَ: كَانَ أَحَبُّ الثِّيَابِ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَلْبَسَهَا الْحِبَرَةُ
ব্যাখ্যাঃ (حِبَرَ) বলা হয় সবুজ অথবা লাল ডোরাযুক্ত ইয়ামান দেশে বুনানো অতীব উন্নত সূতী কাপড়কে। ‘আরব জাতির জন্য এটা অত্যন্ত সম্মানী এবং আনন্দদায়ক পোশাক। কেউ কেউ বলেছেন, জান্নাতীদের এই সবুজ রঙের সম্মানিত ‘হিবারাহ্’ পোশাক পরানো হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ فَهُمْ فِي رَوْضَةٍ يُحْبَرُونَ ‘‘তাদেরকে মনোরম উদ্যানে হিবারাহ্ পোশাক পরিয়ে সম্মানিত ও আনন্দিত করা হবে।’’ (সূরাহ্ আর্ রূম ৩০ : ১৫)
ত্ববারানী, ইবনুস্ সুন্নী, আবূ নু‘আয়ম (রহিমাহুমুল্লাহ) প্রমুখ মুহাদ্দিসের বর্ণনা মতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এজন্যই সবুজ রং পছন্দ করতেন।
‘আল্লামা জাযরী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হিবারাহ্ পরিধান করা মুস্তাহাব, এ হাদীস তার দলীল। এতে এও প্রমাণিত যে নকশা বা ডোরাযুক্ত কাপড় পরা বৈধ। হাফিয ইবনু হাজার ‘আসকালানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ তবে সালাতে নকশাদার কাপড় পরা মাকরূহ।
এই নকশাদার হিবারাহ্ পোশাকটি কামীস না চাদর ছিল তা নিয়ে অনেকের অনেক কথা, তবে এটা চাদর ছিল বলেই বেশি মতামত রয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৮১২; শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২০৭৯; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৭৮৮)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪৩০৫-[২] মুগীরাহ্ ইবনু শু’বাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোম দেশীয় আঁটসাট আস্তিনবিশিষ্ট জুব্বা পরিধান করেছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوْلُ
وَعَنِ الْمُغِيرَةِ بْنِ شُعْبَةَ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَبِسَ جُبَّةً رُومِيَّةً ضَيِّقَةَ الْكُمَّيْنِ
ব্যাখ্যাঃ আগের যুগে জুব্বা দ্বৈত কাপড়ে তৈরি করা হতো। দুই কাপড়ের মাঝে কটন বা তুলা দেয়া হতো। তবে যদি পশমী কাপড়ের জুব্বা হতো একক কাপড়েই তৈরি হতো।
অত্র হাদীসে রোমীয় জুব্বার কথা উল্লেখ হয়েছে। কিন্তু সহীহায়নের বর্ণনাসহ অধিকাংশ বর্ণনায় শামী জুব্বার কথা উল্লেখ আছে। এ দু’প্রকারের বর্ণনার মধ্যে মূলত কোন বৈপরীত্য নেই, কেননা শাম রাজ্যটি ঐ সময় মহারাষ্ট্র রোমের অধীনেই ছিল। অতএব নাম দু’টি হলেও মূলত একই রাজা বা বাদশাহর একই রাজ্য ছিল।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই জুব্বার আস্তিন ছিল আঁটসাঁট বা টাইট, এটা এক সফরের ঘটনা। এর বিস্তারিত ব্বিরণ সহীহুল বুখারীতে মুগীরাহ্ ইবনু শু‘বাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, আমি এক সফরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে পানি আছে? আমি বললাম, হ্যাঁ, তখন তিনি তার বাহন থেকে অবতরণ করলেন এবং (স্বীয় প্রাকৃতিক প্রয়োজনের জন্য) চলতে চলতে রাতের আঁধারে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। (প্রয়োজন সেরে) যখন ফিরে এলেন আমি তার নিকট পানির পাত্র থেকে পানি ঢালতে লাগলাম, তিনি তার মুখমন্ডলে-লী ধৌত করলেন এবং দু’হাত ধৌত করলেন, এ সময় তার শরীরে শামী পশমী জুব্বা ছিল। তিনি (ধৌত করার জন্য) হাত দু’টি বের করতে চেষ্টা করলেন কিন্তু (আস্তিন আঁটসাট হওয়ার কারণে) হাত দু’টি বের করতে পারলেন না, ফলে জুব্বার নিচ দিয়ে তা বের করলেন। অন্য বর্ণনায় এসেছে, শরীরের নীচ দিয়ে বের করলেন। সহীহ মুসলিমে একটু বর্ধিত এসেছে যে, তিনি জুব্বাটা খুলে দু’কাঁধের উপর রাখলেন এবং দু’হাত ধৌত করলেন......।
মুওয়াত্ত্বা মালিক, আহমাদ, আবূ দাঊদ প্রভৃতি গ্রন্থের বর্ণনায় এসেছে এটা তাবূকের যুদ্ধের (সময়ের) ঘটনা, আর তা ফজরের সালাতের সময় ঘটেছিল। (সহীহ মুসলিম ১ম খন্ড, ২৩০ পৃঃ)
এ হাদীস থেকে প্রমাণিত যে, সুস্পষ্ট কোন নাপাকী দৃশ্যপটে না থাকলে কাফিরদের তৈরি পোশাকে সালাত আদায় বৈধ। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোমী জুব্বা পরিধান করেছেন, আর ঐ সময় রোম ছিল সম্পূর্ণ কাফির রাজ্য। ইমাম কুরতুবী এটাও বলেন যে, পশুর মৃত্যুর কারণে তার পশম নাপাক হয় না, কেননা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জুব্বাটি শামীয় ছিল, আর শামী জুব্বা পশমের তৈরি হয়।
পশমের তৈরি জুব্বা বা পোশাক পরিধান নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ) অন্য পোশাক থাকতে পশমের পোশাক পরিধান করা মাকরূহ বলেছেন। কেননা এতে দরবেশী ভাব প্রকাশ পায়, অথচ ‘আমল বা দরবেশী গোপন রাখাই উত্তম। ইবনু বাত্ত্বল (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ পশমের কাপড়ইে যে শুধু দরবেশী ভাব প্রকাশ হয় এমনটিই নয়, বরং সূতী বা অন্যান্য কাপড়েও প্রকাশ পেতে পারে। হাসান বাসরী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আমি সত্তরজন বদরী সাহাবীকে পশমের কাপড় পরিধানরত দেখেছি।
এ হাদীসের ভিত্তিতে অনেকে নিজ আবাসনে নয় বরং সফরে আঁটসাট আস্তিন রাখা মুস্তাহাব মনে করেন। সাহাবীগণের সাধারণ জামার আস্তিনগুলো স্বাভাবিক এক বিঘত পরিমাণ ছিল। অবশ্য অতি প্রশস্ত আস্তিন ঠিক নয়, কেউ কেউ এটাকে বিদ্‘আতের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। (মিরক্বাতুল; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৭৬৮)
উপরে উল্লেখিত হয়েছে, এটি যুদ্ধের সফরের ঘটনা, মূলত যুদ্ধের সময় টাইট পোশাক পরাই অধিক সহায়ক। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪৩০৬-[৩] আবূ বুরদাহ্ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, ’আয়িশাহ্ (রাঃ) একখানা তালিযুক্ত চাদর ও একখানা মোটা কাপড়ের ইযার (লুঙ্গি বা তহবন্দ) আমাদেরকে দেখিয়ে বললেনঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দু’টি কাপড় পরিহিত অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوْلُ
وَعَنْ أَبِي بُرْدَةَ قَالَ: أَخْرَجَتْ إِلَيْنَا عَائِشَةُ كِسَاءً مُلَبَّدًا وَإِزَارًا غَلِيظًا فَقَالَتْ: قُبِضَ رُوحُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي هذَيْن
ব্যাখ্যাঃ (مُلَبَّدًا) শব্দের অর্থ জোড়াযুক্ত, একত্রিকৃত, তালিযুক্ত ইত্যাদি। অর্থাৎ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চাদরটি ছিল তালিযুক্ত। এখানে إِزَارً বা লুঙ্গির কথা এসেছে কিন্তু কোন কোন সংকলনে رِدَاءٌ বা চাদর শব্দ এসেছে, কিন্তু তা সঠিক নয়। কেননা رِدَاءٌ বা চাদর তো ওটাই যা দিয়ে শরীরে উপরের অংশ আবৃত করা হয়।
উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর বর্ণনা ‘‘এই দু’টি বস্ত্রের মধ্যে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রূহ কবয করা হয়েছে’’, এর দ্বারা তিনি মূলত বুঝাতে চেয়েছেন তার ঐ দু‘আ কবূলের কথা, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দু‘আ করতেন,
اَللّٰهُمَّ اَحْيِيْنِىْ مِسْكِيْنًا وَاَمِتْنِىْ مِسْكِيْنًا
‘‘হে আল্লাহ! আমাকে মিসকীন হালাতে বাঁচিয়ে রাখ এবং মিসকীন অবস্থায়ই মৃত্যু দিও।’’ (হাকিম ফিল মুস্তাদরিক ৪/৩২২)
শায়খায়নের বর্ণনায় আছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি তালিযুক্ত চাদর ছিল। তিনি তা পরিধান করতেন আর বলতেন, আমি একজন দাস মাত্র, তাই দাসের পোশাকই পরিধান করি। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এটা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দুনিয়াবিমুখ এবং তার সম্পদ থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখার একটি দৃষ্টান্ত, যাতে উম্মাত তাঁর এই আদর্শ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে এবং তারই অনুসরণ করতে পারে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩১০৮)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪৩০৭-[৪] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বিছানায় শয়ন করতেন, তা ছিল চামড়ার তৈরি। আর ভিতরে ভর্তি ছিল খেজুর গাছের আঁশ। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوْلُ
وَعَن عَائِشَة قَالَتْ: كَانَ فِرَاشُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الَّذِي يَنَامُ عَلَيْهِ أَدَمًا حَشْوُهُ لِيف
ব্যাখ্যাঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পোশাক যেমন ছিল সাদাসিধে ঠিক তার বিছানাপত্রও ছিল অতীব সাধারণ ও সাদাসিধে। তিনি এমন বিছানায় বা তোষকে শয়ন করতেন যার কভার ছিল দাবাগতকৃত শক্ত চামড়া দ্বারা তৈরি, আর এর ভিতরে ভরতি ছিল খেজুর গাছের আঁশ। মূলত এটা কোন মতে আরামদায়ক ও বিলাসবহুল ছিল না। এমনকি তিনি কখনো কখনো খেজুর পাতার তৈরি খালি পাটি বা চাটাইর উপর শুতেন, এতে তার দেহের মধ্যে চাটাই বা মাদুরের দাগ পরে যেত।
ইমাম বায়হাক্বী উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) প্রমুখাৎ বর্ণনা করেন, একদিন এক মহিলা আমার নিকট এসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিছানা দেখলেন যা ছিল মোটা ও শক্ত আবরণযুক্ত। এটা দেখে তিনি আমার নিকট রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য নরম পশমের বিছানা পাঠিয়ে দিলেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা দেখে বললেন, এটা তাকে ফেরত দাও, আল্লাহর কসম! যদি আমি চাইতাম তাহলে স্বর্ণ-রৌপ্যের পাহাড় আল্লাহ আমাকে দিতেন- (বায়হাক্বী)। (ফাতহুল বারী ১১শ খন্ড, হাঃ ৬৪৫৬; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪৩০৮-[৫] উক্ত রাবী [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে গিদ্দা বা বালিশে হেলান দিতেন তা ছিল চামড়ার এবং ভিতরে ছিল আঁশ। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوْلُ
وَعَنْهَا قَالَتْ: كَانَ وِسَادُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الَّذِي يَتَّكِئُ عَلَيْهِ مَنْ أَدَمٍ حشْوُهُ ليفٌ. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীসের ব্যাখ্যা পূর্বের হাদীসের ব্যাখ্যানুরূপ। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বালিশের খোল ছিল দাবাগতকৃত শক্ত চামড়ার তৈরি এবং ভিতরে ছিল খেজুর গাছের আঁশ ভরা। (শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২০৮২)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪৩০৯-[৬] উক্ত রাবী [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ একদিন আমরা গ্রীষ্মের দুপুরে আমাদের ঘরে বসা ছিলাম। এমন সময় জনৈক ব্যক্তি আবূ বকর (রাঃ)-কে বলে উঠল, ঐ যে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (চাদর দ্বারা) মাথা ঢেকে এদিকে আগমন করছেন। (বুখারী)[1]
الْفَصْلُ الْأَوْلُ
وعنها قَالَت: بَينا نَحْنُ جُلُوسٌ فِي بَيْتِنَا فِي حَرِّ الظَّهِيرَةِ قَالَ قَائِلٌ لِأَبِي بَكْرٍ: هَذَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُقْبِلًا مُتَقَنِّعًا. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ এটি মূলত হিজরতের আলোচনা সম্বলিত বড় একটি হাদীসের অংশ বিশেষ।
এ ঘটনা হিজরতের পূর্বে মক্কায় ঘটেছিল। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বিপ্রহরে রৌদ্রত্তাপের মধ্যে চাদর কিংবা রুমাল দিয়ে মাথা ঢেকে আবূ বকর (রাঃ)-এর বাড়ীর দিকে যাচ্ছিলেন। এ সুসংবাদ আবূ বকরকে দেয়ার জন্য লোকটি আবূ বকর-এর বাড়ীতে গিয়ে জোরে বলতে লাগলেন এই দেখ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথা ঢেকে তোমার বাড়ীর দিকে আগমন করছেন! ক্ষরত্তাপের দেশ আরবের লোকেরা রোদের কারণে মাথা ঢেকে চলাচল করত, ছাতা ব্যবহারে তারা তেমন অভ্যস্ত নয়। আজও তাদের মধ্যে এ অভ্যাস পরিলক্ষিত হয়, তারা মাথায় ছাতার পরিবর্তে রুমাল ব্যবহার করে থাকেন।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাথা ঢেকে চলা কি রোদের কারণে ছিল না অন্য কোন কারণে? তা নিয়ে ব্যাখ্যাকারগণ বিভিন্ন কথা বলেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, তিনি ‘আরবের প্রথানুযায়ী রোদের উত্তাপ থেকে রক্ষার জন্যই চাদর বা রূমাল দ্বারা মাথা ঢেকে নিয়েছিলেন। কেউ কেউ বলেছেন, তিনি মূলত হিজরতের গোপন কথা আবূ বকরের নিকট বলার জন্য যাচ্ছিলেন, তাই লোকচক্ষু থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্য চাদর দ্বারা মাথা ঢেকে নিয়েছিলেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৮০৭; ‘আওনুল মা‘বূদ ৪১৩৮)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪৩১০-[৭] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেছেনঃ এক বিছানা পুরুষের জন্য, অপরটি তার স্ত্রীর জন্য এবং তৃতীয় বিছানা মেহমানের জন্য। আর চতুর্থখানা শয়তানের জন্য। (মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوْلُ
وَعَنْ جَابِرٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَهُ: «فِرَاشٌ لِلرَّجُلِ وَفِرَاشٌ لِامْرَأَتِهِ وَالثَّالِثُ للضيف وَالرَّابِع للشَّيْطَان» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ একটি পরিবারের একজন পুরুষের জন্য একটি বিছানাই যথেষ্ট। দু’টি বিছানা হলে দ্বিতীয়টি তার স্ত্রীর জন্য ধরা হবে, আর তৃতীয়টি হলে তা হবে মেহমান-অতিথিদের জন্য। কিন্তু চতুর্থটি নিষ্প্রয়োজন। নিষ্প্রয়োজন কাজ অপচয়, অপচয়কারী শয়তানের ভাই; সুতরাং চতুর্থ বিছানাটি মূলত শয়তানেরই বিছানা হয়ে যায়। অত্র হাদীসে সেই দিকেই ইশারা করা হয়েছে। অবশ্য জনসংখ্যা বা পরিবারের সদস্য যদি বেশি থাকে যাদের শয়নের জন্য তিনের অধিক বিছানার প্রয়োজন হয় তাহলে সেটা যে শয়তানের বিছানা হবে এমনটি নয়। স্ত্রীর জন্য আলাদা বিছানা তৈরি করা কোনই দোষের নয়, কেননা স্বামী-স্ত্রী প্রত্যেকেই অসুস্থতা বা অন্য কোন অনিবার্য কারণে পৃথক বিছানার মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েন।
উপরে বর্ণিত হাদীসের ভিত্তিতে কেউ কেউ স্ত্রীর সাথে এক বিছানায় শয়ন করা স্বামীর জন্য আবশ্যক নয় বলে মনে করেন, কিন্তু এটি অত্যন্ত দুর্বল কথা। কেননা স্ত্রীর সাথে শয়ন করা যদিও ওয়াজিব নয় কিন্তু আরো অন্যান্য হাদীসের দলীল দ্বারা প্রমাণিত যে, ওযর ছাড়া স্ত্রীর সাথে একই বিছানায় শয়ন করা উত্তম। কেননা এ বিষয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুস্পষ্ট ‘আমল রয়েছে। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) উত্তম হওয়ার প্রমাণ দিতে গিয়ে বলেন, স্ত্রীর প্রতি প্রবৃত্তির আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও রাত্রিতে তাহাজ্জুদের জন্য দণ্ডায়মান হওয়া কষ্টকরই বটে। বান্দা যখন স্ত্রীর পার্শ ছেড়ে তাহাজ্জুদে দণ্ডায়মান হয় আল্লাহ তখন ভীষণ খুশী হন। তিনি মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাদের) ডেকে বলেন, আমার বান্দার দিকে লক্ষ্য কর, সে তার পরিবার ছেড়ে আমার কাছে যা রয়েছে তার প্রতি উৎসাহিত হয়ে সালাতে দাঁড়িয়েছে.......। (মুসনাদে আহমাদ ১/৪১২)
অতএব এ প্রশংসা পেতে নিশ্চয় তাকে স্ত্রীর পার্শ্ব থেকে উঠে তাহাজ্জুদে দাঁড়াতে হবে, তাহলে স্ত্রীর পাশে এক বিছানায় শয়ন কি উত্তম নয়?
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ; শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২০৮৫; ‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪১৩৮)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪৩১১-[৮] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি অহংকারবশতঃ টাখনুর নিচে ইযার (লুঙ্গি) ঝুলায়, আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন তার দিকে দৃষ্টিপাত করবেন না। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوْلُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا يَنْظُرُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِلَى مَنْ جَرَّ إزَاره بطرا»
ব্যাখ্যাঃ ‘‘আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দিকে তাকাবেন না’’ এর অর্থ হলো রহমাতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না, অর্থাৎ কিয়ামতের দিন তার প্রতি দয়াপ্রদর্শন করবেন না, তাকে ক্ষমা করবেন না, পাক করবেন না। এটা ঐ ব্যক্তির জন্য যে গিরার নীচে কাপড় পরিধান করা হালাল বা বৈধ মনে করে এবং তাতে সে সীমালঙ্ঘন করে। অহংকার ও আত্মপ্রসাদে শারী‘আতের বিধানকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে থাকে। তবে ভুলক্রমে অথবা অসাবধানতার কারণে কাপড় টাখনুর নিচে গেলে এই হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হবে না।
ইবনুল মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হাদীসের বর্ণনায় বুঝা যায় গিরার নীচে কাপড় ঝুলিয়ে পরা অহংকার বা গর্ব ভরে না হলে তা হারাম নয়, তবে মাকরূহ। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৭৮৮)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪৩১২-[৯] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি অহংকারবশতঃ পরিধেয় কাপড় টাখনুর নিচে ঝুলাবে, আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন তার দিকে দৃষ্টিপাত করবেন না। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوْلُ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ جَرَّ ثَوْبَهُ خُيَلَاءَ لَمْ يَنْظُرِ اللَّهُ إِلَيْهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ»
ব্যাখ্যাঃ এ হাদীসের ব্যাখ্যা পূর্বের হাদীসের ব্যাখ্যানুরূপ। তবে পূর্বের হাদীসে লুঙ্গির উল্লেখ হয়েছে আর অত্র হাদীসে কাপড়ের কথা উল্লেখ হয়েছে। সুতরাং লুঙ্গি, চাদর, জুব্বা যাই হোক না কেন যদি তা পরিধান করে অহংকার-গর্ব ভরে মাটিতে হেঁচড়িয়ে চলে তাহলে ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ তার প্রতি রহমাতের দৃষ্টি নিবদ্ধ করবেন না। অর্থাৎ তার প্রতি ভ্রূক্ষেপ করবেন না।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ المخيلة- البطر- الكبر- الزهؤ- التبخير শব্দগুলো হাদীসে ব্যবহার হয়েছে এর প্রত্যেকটির অর্থ কাছা-কাছি, প্রত্যেকটি শব্দ অহংকার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৭৮৪; শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২০৮৫; ‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪০৮১)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪৩১৩-[১০] উক্ত রাবী [’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জনৈক ব্যক্তি অহংকারবশতঃ তার ইযার (লুঙ্গি) হেঁচড়িয়ে যাচ্ছিল, এমতাবস্থায় তাকে জমিনে ধসিয়ে দেয়া হলো। সে কিয়ামত পর্যন্ত যমীনের ভেতর তলিয়ে যেতে থাকবে। (বুখারী)[1]
الْفَصْلُ الْأَوْلُ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «بَيْنَمَا رَجُلٌ يَجُرُّ إِزَارَهُ مِنَ الْخُيَلَاءِ خُسِفَ بِهِ فَهُوَ يَتَجَلْجَلُ فِي الْأَرْضِ إِلى يومِ الْقِيَامَة» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ এটি অহংকার গর্ব ভরে চলার পরিণতির একটি বাস্তব দৃষ্টান্ত।
মুল্লা ‘আলী কারী (রহিমাহুল্লাহ) উল্লেখ করেন, যে ব্যক্তি গর্ব ভরে লুঙ্গি হেঁচড়িয়ে চলার কারণে জমিনে গিয়েছিল এবং কিয়ামত পর্যন্ত মাটির ভিতরে দাবতে থাকবে সম্ববত সে এই উম্মাতেরই এক লোক হবে, কিংবা হতে পারে পূর্ব জামানার কোন উম্মাতের কোন এক ব্যক্তি। ইমাম বুখারী এজন্যই হয়তো এটি বানী ইসরাঈলের আলোচনায় এনেছেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৪৮৫)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪৩১৪-[১১] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ টাখনুর নিচে ইযারের যে অংশ থাকবে তা জাহান্নামে। (অর্থাৎ- কিয়দংশের জন্য সারা শরীরই আগুনে প্রজ্জ্বলিত হবে।) (বুখারী)[1]
الْفَصْلُ الْأَوْلُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا أَسْفَلَ مِنَ الْكَعْبَيْنِ مِنَ الْإِزَارِ فِي النَّارِ» . رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ
ব্যাখ্যাঃ হাদীসের মর্মকথা হলো গর্ব অহংকারবশত কাপড় টাখনুর নীচে ঝুলিয়ে পরিধান করলেই শুধুমাত্র এ ধমকি প্রযোজ্য হবে। ‘আল্লামা খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ ধরনের পোশাক পরিধানকারীর দু’টি দিক রয়েছে। প্রথমতঃ যদি পায়ের টাখনুর নীচে কাপড় পরিধান করে তাহলে এ কাজের পরিণতি হিসেবে পরিধানকারী নিজেই জাহান্নামে যাবে। দ্বিতীয়তঃ তার এ কাজটি জাহান্নামীদের কাজে পরিগণিত হবে।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ লুঙ্গি, জামা, পায়জামা ও পাগড়ী- এ জাতীয় পোশাক ঝুলিয়ে টাখনুর নীচে অহংকারবশতঃ পরিধান করা বৈধ নয়।
ইমাম শাফি‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ অহংকারবশতঃ টাখনুর নীচে ঝুলিয়ে কাপড় পরিধান করা হারাম। অপরদিকে নারীদের কাপড় ঝুলিয়ে রাখা সর্বসম্মতিক্রমে জায়িয। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয়েছে যে, নারীদের কাপড়ের আচল ঝুলিয়ে পরিধান করা বিধেয়। পুরুষের জামা, কাপড় ও লুঙ্গিসহ যাবতীয় পোশাক ‘নিসফে সাক’’ পর্যন্ত পরিধান করা সুন্নাতসম্মত। তবে টাখনু পর্যন্ত কাপড় পরিধান করা জায়িয। মোটকথা বিনা প্রয়োজনে পোশাক টাখনুর নীচে ঝুলিয়ে পরা মাকরূহ বা অপছন্দনীয়। আর অহঙ্কারবশতঃ পরা হারাম।
সুনান ইবনু মাজাহতে হাসান সনদে ইবনু ‘আব্বাস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাটো হাতা বিশিষ্ট এবং নাতিদীর্ঘ জামা পরিধান করতেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৭৮৭)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪৩১৫-[১২] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন ব্যক্তিকে তার বাম হাতে খেতে, একখানা জুতা পরে চলাফেরা করতে, ইশতিমালে সম্মা অবস্থায় চাদর পরিধান করতে এবং লজ্জাস্থান উন্মুক্ত রেখে একই কাপড়ে ইজত্বিবা করতে নিষেধ করেছেন। (মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوْلُ
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَأْكُلَ الرَّجُلُ بِشِمَالِهِ أَو يمشي فِي نعل وَاحِد وَأَن يشْتَمل الصماء أَو يجتني فِي ثَوْبٍ وَاحِدٍ كَاشِفًا عَنْ فَرْجِهِ. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ বাম হাতে খানাপিনা করা নিষেধ। কেউ এটা হারাম পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা বলে মন্তব্য করেছেন। সহীহ হাদীসে এসেছে, শয়তান বাম হাতে খায় এবং পান করে, সুতরাং বাম হাতে খানাপিনা যে শয়তানী কাজ এতে কোন সন্দেহ নেই। মু’মিনকে অবশ্যই শয়তানী কর্মকাণ্ড পরিহার করে চলতে হবে।
একপায়ে জুতা পরিধান করে চলা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। ভদ্রতা এবং শিষ্টাচার পরিপন্থী তো বটেই।
‘আল্লামা নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এতে মানুষের স্বাভাবিক আকৃতির বিকৃতি ঘটে। এটা ভদ্রতা এবং গাম্ভীর্যতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। পা উচু নীচুর ফলে শরীরের ভারসাম্যতা বিনষ্ট হয়, এতে চলাচল হয় কষ্টকর, এমনকি চলতে কখনো কখনো হোঁচট খেতে হয়।
(اشتمال الصماء) হলো উপর থেকে একটি কাপড় ঝুলিয়ে দিয়ে শরীর এভাবে ঢেকে দেয়া বা পেঁচিয়ে রাখা যে, কোন জায়গা দিয়ে হাত বের করার সুযোগ না থাকা। যেন সে এই কাপড়ের মধ্যে আবদ্ধ। ‘সম্মা’ নিষেধের কারণ হলো যে, এতে পাথরের ন্যায় এর সকল ছিদ্রপথ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে এ পোশাক সালাত আদায় ও অন্যান্য স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।
ইমাম ইবনুল হুমাম (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ‘সম্মা’ সালাতে সম্পূর্ণভাবে মাকরূহ। যেহেতু এটা এক কাপড়ে মাথাসহ সমস্ত শরীর আবৃত্ত করে রাখা, হাত বের করার কোন সুযোগ না থাকা। সুতরাং সালাতের প্রতিবদ্ধক হিসাবে তা মাকরূহ বা অপছন্দনীয়।
‘আল্লামা নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ফুকাহাদের মতে ‘সম্মা’ হলো মাত্র একটি কাপড় পরিধান করা যা ছাড়া অন্য কোন কাপড় না থাকা এবং দু’ কাঁধের এক কাঁধের উপর তা তুলে রাখা। এতে লজ্জাস্থানের কিছু অংশ প্রকাশ পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। বিধায় এটি হারাম।
মোটকথা নিশ্চিত যদি লজ্জাস্থান প্রকাশ হয় তবে তা হারাম, আর যদি প্রকাশের সম্ভাবনা থাকে হয় তবে মাকরূহ।
‘ইহ্তিবা’ বলা হয় এক কাপড় পরে নিতম্বের উপর বসা এবং দুই পায়ের নলা খাড়া রেখে পায়ের নলায় হাত অথবা কোন কাপড় দিয়ে একত্রিত করে রাখা। এতে লজ্জাস্থান প্রকাশ পেয়ে যায়, সুতরাং তা নিষেধ। আর যদি লজ্জাস্থান প্রকাশ না পায় তবে নিষেধ নয়।
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ; শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২০৯৯/৭০)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪৩১৬-[১৩], ৪৩১৭-[১৪], ৪৩১৮-[১৫], ৪৩১৯-[১৬] ’উমার, আনাস, ইবনুয্ যুবায়র ও আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি দুনিয়াতে রেশমী পোশাক পরিধান করবে, সে পরকালে তা পরতে পারবে না (তথা বঞ্চিত হবে)। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوْلُ
وَعَنْ عُمَرَ وَأَنَسٍ وَابْنِ الزُّبَيْرِ وَأَبِي أُمَامَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ أَجْمَعِينَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ لَبِسَ الْحَرِيرَ فِي الدُّنْيَا لَمْ يَلْبَسْهُ فِي الْآخِرَة»
ব্যাখ্যাঃ এ হাদীসের আংশিক ব্যাখ্যা পূর্বের ৪৩১৬ নং হাদীসে অতিবাহিত হয়েছে।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদীসটি বর্ণনায় একাধিক সাহাবীর নাম এসেছে। এর কারণ সম্ভবত এই যে, এদের সকলেরই পৃথক পৃথক সনদে একই মতনে হাদীসটির বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু গ্রন্থকার সকলের একই বর্ণনা আলাদা আলাদা নামে উল্লেখ না করে সনদের শেষ নামটি উল্লেখ পূর্বক বর্ণনাটি সংকলন করেছেন।
রেশমী বস্ত্র শুধু পরিধানই যে নিষেধ তা নয়, বরং তার ব্যবহার অন্যান্য কাজেও নিষেধ অত্র হাদীস দ্বারা তাও স্পষ্ট। স্বণ-রৌপ্যের পাত্রে খানা পনা হারাম হওয়ার কারণ হলো এটা আল্লাহদ্রোহী অহংকারী রাজা বাদশাহদের কাজ যা আল্লাহ পছন্দ করেন না। এ সব পাত্রে কিয়ামতের দিন জান্নাতীদের খাওয়ানো হবে।
পুরুষের জন্য রেশমী পোশাক পরিধান করা বৈধ নয়। এটা জান্নাতীদের পোশাক। ‘দুনিয়াতে যে রেশমী পোশাক পরিধান করবে সে পরকালে তা পরতে পারবে না’, এর অর্থ হলো সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। এ বিধান অবশ্য তার জন্য যিনি এটাকে হালাল জেনে পরিধান করবেন। পক্ষান্তরে কেউ যদি ঘটনাক্রমে পরিধান করেন অথবা হারাম জেনেই পরিধান করেছেন কিংবা রেশমী কাপড় পরিধান যে হারাম তা তিনি না জেনে পরিধান করেন তার জন্য এই ধমকি প্রযোজ্য নয়।
‘আল্লামা সুয়ূত্বী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ অধিকাংশ মুহাদ্দিসের ব্যাখ্যা হলো, যারা রেশমী পোশাক পরিধান করবে তারা السابقين الفائزين অর্থাৎ প্রথম সফলকামীদের অন্তর্ভুক্ত হবে না। বরং জাহান্নামে দ হওয়ার পর সেখান থেকে মুক্তি পেয়ে পরবর্তীতে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (মুসনাদে আহমাদ ৬/৩২৪)
মুসনাদে আহমাদ প্রভৃতি গ্রন্থে এর পোষকতায় জুওয়াইরিয়াহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত একটি হাদীস রয়েছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি দুনিয়ায় রেশমী পোশাক পরিধান করবে আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন তাকে আগুনের পোশাক পরিধান করাবেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৮৩২)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪৩১৭-[১৪]. দেখুন পূর্বের (৪৩১৬) নং হাদীস।
الْفَصْلُ الْأَوْلُ
وَعَنْ عُمَرَ وَأَنَسٍ وَابْنِ الزُّبَيْرِ وَأَبِي أُمَامَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ أَجْمَعِينَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ لَبِسَ الْحَرِيرَ فِي الدُّنْيَا لَمْ يَلْبَسْهُ فِي الْآخِرَة»
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪৩১৮-[১৫]. দেখুন ৪৩১৬ নং হাদীস।
الْفَصْلُ الْأَوْلُ
وَعَنْ عُمَرَ وَأَنَسٍ وَابْنِ الزُّبَيْرِ وَأَبِي أُمَامَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ أَجْمَعِينَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ لَبِسَ الْحَرِيرَ فِي الدُّنْيَا لَمْ يَلْبَسْهُ فِي الْآخِرَة»
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪৩১৯-[১৬]. দেখুন হাদীস নং ৪৩১৬।
الْفَصْلُ الْأَوْلُ
وَعَنْ عُمَرَ وَأَنَسٍ وَابْنِ الزُّبَيْرِ وَأَبِي أُمَامَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ أَجْمَعِينَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ لَبِسَ الْحَرِيرَ فِي الدُّنْيَا لَمْ يَلْبَسْهُ فِي الْآخِرَة»
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪৩২০-[১৭] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সেই ব্যক্তিই দুনিয়াতে রেশমী পোশাক পরিধান করে থাকে, আখিরাতে যার ভাগে তা থাকবে না। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوْلُ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّمَا يَلْبَسُ الْحَرِيرَ فِي الدُّنْيَا مَنْ لَا خَلَاقَ لَهُ فِي الْآخِرَة»
ব্যাখ্যাঃ এ হাদীসের ব্যাখ্যায় ‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এতে দু’টি দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। প্রথমতঃ ‘আখিরাতে তার জন্য কোন অংশ নেই’ এর অর্থ হলো পরকালে জান্নাতে। আল্লাহ তা‘আলার নি‘আমাতরাজিতে তার কোন প্রাপ্যতা নেই। দ্বিতীয়তঃ আখিরাতের বিষয়ের প্রতি বিশ্বাসে তার কোন অংশ নেই। তিনি আরো বলেন, এ কথাটি তার জান্নাতে প্রবেশের অযোগ্যতা প্রমাণ করে।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ কখনো এ কথার মর্মার্থে বলা হয়ে থাকে যে, যার আখিরাতে কোন প্রাপ্যতা নেই সেই দুনিয়াতে রেশমী কাপড় পরিধান করে থাকে। আবার এমনটিও বলা হয় যে, যার কোন দীন ধর্ম নেই সেই দুনিয়াতে রেশমী কাপড় পরিধান করে।
প্রথমটি কাফিরদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ হয়। আর দ্বিতীয়টি কাফির মুসলিম সকলকে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। অর্থাৎ- কাফিরের ক্ষেত্রে কথাটি প্রায়োগিক। কিন্তু ঈমানদারদের ব্যাপারে এটি হলো কঠোরতা প্রদর্শনই শুধু।
অথবা মু’মিনরা শুরুতেই জান্নাতে যাবে না বরং রেশমী কাপড় পরিধানের শাস্তি ভোগ করে, তারপর জান্নাতে যাবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২০৬৮; ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৮৩৫)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪৩২১-[১৮] হুযায়ফাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে সোনা-রূপার পাত্রে পান এবং আহার করতে, মিহি ও মোটা রেশমী কাপড় পরিধান করতে এবং তার উপরে বসতে নিষেধ করেছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوْلُ
وَعَنْ حُذَيْفَةَ قَالَ: نَهَانَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ نَشْرَبَ فِي آنِيَةِ الْفِضَّةِ وَالذَّهَبِ وَأَنْ نَأْكُلَ فِيهَا وَعَنْ لُبْسِ الْحَرِيرِ وَالدِّيبَاجِ وَأَنْ نَجْلِسَ عَلَيْهِ
ব্যাখ্যাঃ স্বর্ণ-রূপার পাত্রে খানাপিনা নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত বিস্তারিত ব্বিরণ খানাপিনার অধ্যায়ে রয়েছে।
এখানে রেশমী বস্ত্র পরিধানের বিষয় আলোচিত হলো :
ফাতাওয়ায়ে কাযীখানে উল্লেখ রয়েছে যুদ্ধের সময় হোক বা অন্য সময়, নিরেট রেশমী তথা সম্পূর্ণ রেশমী কাপড় পরিধান হারাম। যে রেশমী পরিধান করবে সেই পাপী। ইমাম আবূ ইউসুফ ও মুহাম্মাদ (রহিমাহুমাল্লাহ) বলেনঃ যুদ্ধের সময় রেশমী কাপড় পরিধানে কোন অসুবিধা নেই। যদি কাপড়ের লম্বা দিকের সূতা রেশমী না হয় প্রস্থ্যের সুতা রেশমী হয় তাহলে এ ধরনের পোশাক যুদ্ধের বাহিরে পরিধান করা মাকরূহ, যুদ্ধের সময় বৈধ। আর যে কাপড়ে লম্বা দিকের সূতা রেশমী এবং প্রস্থ্যের দিকে রেশমীহীন তা সর্বাবস্থায় পরিধান বৈধ। ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ রেশমী কাপড় বিছানো এবং এতে ঘুমাতে কোন অসুবিধা নেই। অনুরূপভাবে রেশমী কাপড়ের বালিশ, পর্দা, গিলাফ ইত্যাদি ব্যবহার বৈধ, যদি এতে কোন ধরনের মূর্তির নকশা না থাকে।
অপরদিকে ইমাম আবূ ইউসুফ ও মুহাম্মাদ এগুলোকেও মাকরূহ বলেছেন।
মোটকথা তাদের উভয়ের নিকট হাদীসে ব্যবহৃত নিষেধটা হারাম পর্যায়ের। আর আবূ হানীফাহ্ (রহিমাহুল্লাহ)-এর নিকট মাকরূহে তানযীহি পর্যায়ের।
এই রেশমী বস্ত্র শিশুদেরও পরিধান করানো যাবে না। আর এ নিষেধাজ্ঞা নারীদের জন্য নয়, কেবল পুরুষদের জন্য প্রযোজ্য।
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৮৩৭, তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৮৭৮)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪৩২২-[১৯] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে একখানা লালবর্ণের রেশমী চাদর হাদিয়া দেয়া হলো। তিনি তা আমার কাছে পাঠিয়ে দিলেন। আমি তা পরিধান করলাম, তখন আমি তাঁর চেহারায় ক্রোধের চিহ্ন দেখতে পেলাম। অতঃপর তিনি আমাকে বললেনঃ আমি তা তোমার নিকটে তোমার পরিধানের জন্য পাঠাইনি; বরং আমি তা তোমার কাছে এ উদ্দেশে পাঠিয়েছি যে, তুমি তা খন্ড করে মহিলাদের জন্য উড়না বানিয়ে তাদের দিয়ে দিবে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوْلُ
وَعَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: أُهْدِيَتْ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم حُلّة سِيَرَاءَ فَبَعَثَ بِهَا إِلَيَّ فَلَبِسْتُهَا فَعَرَفْتُ الْغَضَبَ فِي وَجْهِهِ فَقَالَ: «إِنِّي لَمْ أَبْعَثْ بِهَا إِلَيْكَ لِتَلْبَسَهَا إِنَّمَا بَعَثْتُ بِهَا إِلَيْكَ لِتُشَقِّقَهَا خُمُراً بَين النساءِ»
ব্যাখ্যাঃ ‘হুল্লাহ’ বলা হয় চাদর ও লুঙ্গিকে, এটা গায়ের ও পরনের উভয় কাপড়কেই বুঝায়।
রেশমী সূতা যেহেতু পুরুষের জন্য পরিধান বৈধ নয়, তাই তিনি নারীদের ওড়নার কাজে ব্যবহারের জন্য ‘আলী (রাঃ)-এর কাছে প্রদান করেন। তিনি তা বুঝতে না পেরে নিজেই পরিধান করা শুরু করে দেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা দর্শনে ভীষণভাবে রাগান্বিত হন, এমন কি রাগের চিহ্ন তার চেহারার মধ্যে ফুটে উঠে।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রাগ আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ। কেননা রেশমী পোশাক পরিধানে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন যার ফলে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও অসন্তুষ্ট হয়েছেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে একসেট পোশাক হাদিয়া দেয়া হলে তিনি তা ‘আলী (রাঃ)-কে দিয়ে দেন। যা ছিল রেশমী কাপড় মিশ্রিত লুঙ্গি ও চাদর। কেউ কেউ বলেন, ঐ পোশাক নিরেট রেশমী কাপড়ের ছিল। অথচ নিরেট রেশমী কাপড় পরিধান করা হারাম। তবে রেশমী মিশ্রিত কাপড় পরিধান সংক্রান্ত আলোচনা ইতিপূর্বে হয়েছে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত পোশাক পরিহিত অবস্থায় তাকে দেখে রাগান্বিত হন। কেননা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মূলত এ পোশাক পরিধান করার জন্য ‘আলী (রাঃ)-এর নিকট পাঠাননি। আর ঐ পোশাকের অধিকাংশই রেশমী বা সিল্কের। যা পরিধান করা হারাম। অথবা ‘আলী (রাঃ) এটাকে মুত্তাক্বীদের পোশাক বহির্ভূত মনে করেননি। তাই তিনি তা পরিধান করেছেন। এটা টুকরো টুকরো করে মহিলাদের মাঝে বণ্টন করতেই পাঠানো হয়েছিল। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, ফাতিমাদের মাঝে (بيت الفواطم অর্থাৎ ফাতিমা বিনতু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ফাতিমা বিনতু আসাদ ইবনু হাশিম যিনি হলেন ‘আলী, জা‘ফার, ‘আক্বীল ও ত্বালিব -এর মা এবং ফাতিমা যিনি আসমা বিনতু হামযাহ্-এর মা, এটা মূলত সকল ফাতিমাদের বাড়ীতে তাদের মাঝে) বণ্টনের জন্যই প্রেরণ করেছিলেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫৮৪০; শারহুন নাসায়ী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ৫৩১৩)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪৩২৩-[২০] ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রেশমী কাপড় পরতে নিষেধ করেছেন। তবে এ পরিমাণ অতঃপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মধ্যমা ও শাহাদাত অঙ্গুলিদ্বয়কে একত্রে মিলিয়ে উপর দিকে উঠিয়ে ইশারা করলেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوْلُ
وَعَنْ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ لُبْسِ الْحَرِيرِ إِلَّا هَكَذَا وَرَفَعَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إصبعيه: الْوُسْطَى والسبابة وضمهما
ব্যাখ্যাঃ পূর্বে উল্লেখ হয়েছে রেশমী বস্ত্র পরিধান করা নিষেধ।
অত্র হাদীসে তা থেকে ইসতিসনা করে দুই এক আঙ্গুল পরিমাণকে ছাড় দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ কোন কাপড়ের মধ্যে যদি দুই এক আঙ্গুল পরিমাণ রেশমীর অংশ থাকে তবে তা অনুমোদিত। একজন পুরুষ এতটুকু রেশমী কাপড় পরিধান করতে পারবেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন্ দু’টি আঙ্গুলের পরিমাণ বৈধ করেছেন সেটাও স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ, ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৮২৯, শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২০৬৯/১২)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪৩২৪-[২১] মুসলিম-এর এক রিওয়ায়াতে আছে- একদিন ’উমার (রাঃ) সিরিয়ার জাবিয়াহ্ নামক শহরে এক ভাষণে বলেছেনঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই, তিন অথবা চার আঙ্গুলের অধিক পরিমাণ রেশমী কাপড় পরিধান করতে নিষেধ করেছেন।[1]
الْفَصْلُ الْأَوْلُ
وَفِي رِوَايَةٍ لِمُسْلِمٍ: أَنَّهُ خَطَبَ بِالْجَابِيَةِ فَقَالَ: نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ لُبْسِ الْحَرِيرِ إِلَّا مَوْضِعَ إِصْبَعَيْنِ أَوْ ثَلَاث أَو أَربع
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীসে পূর্ব বর্ণিত হাদীসের চেয়ে একটু বেশি রেশমী বস্ত্র পরিধানের অনুমতি প্রদত্ত হয়েছে। অর্থাৎ দুই থেকে চার আঙ্গুল পরিমাণ রেশমী বস্ত্র পুরুষের জন্য অনুমোদিত। হানাফী মাযহাবে এ হাদীসের ভিত্তিতে চার আঙ্গুল পরিমাণ রেশমী কাপড় পরিধান অনুমোদন করে, যেমন কাপড়ের পাড় কিংবা ঝালর, চার আঙ্গুল পরিমাণ হলে তা বৈধ। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪০৩৮)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪৩২৫-[২২] আসমা বিনতু আবূ বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন তিনি সূচীকর্ম খচিত এমন একটি জুব্বা বের করলেন, যা রেশম দ্বারা নকশী করা ছিল এবং তার গলা ও বুকের পট্টিগুলো রেশম দ্বারা জড়ানো ছিল। আর তিনি বলেনঃ তা ছিল রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জুব্বা। তা ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর নিকটই ছিল, তাঁর ইন্তিকালের পর আমিই তা হস্তগত করেছি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা পরিধান করতেন, এখন আমরা তাকে ধুয়ে উক্ত পানি দ্বারা রোগীদের রোগমুক্তি কামনা করি। (মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوْلُ
وَعَن أسماءَ بنت أبي بكر: أَنَّهَا أَخْرَجَتْ جُبَّةَ طَيَالِسَةٍ كِسْرَوَانِيَّةٍ لَهَا لِبْنَةُ ديباجٍ وفُرجَيْها مكفوفَين بالديباجِ وَقَالَت: هَذِه جبَّةُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَتْ عِنْدَ عَائِشَةَ فَلَمَّا قُبِضَتْ قَبَضْتُهَا وَكَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَلْبَسُهَا فَنَحْنُ نَغْسِلُهَا للمَرضى نستشفي بهَا. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ (طَيَالِسَةٍ) শব্দটি বহুবচন, একবচনে طَيْلَسَانٍ। অর্থ- মুত্তাক্বী ব্যক্তিদের পরিধেয় সবুজ রংয়ের পোশাক বিশেষ। কেউ কেউ বলেন, এটা অনারব বুজুর্গ ব্যক্তিদের কালো রংয়ের পোশাক। যে পোশাকের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে রয়েছে পশম। ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এটা হলো কালো পশমী জুব্বা। যার পকেটের উপরে নকশাদার রেশমী ফিতা ছিল।
ব্যাখ্যাকার বলেনঃ রেশমী কাপড়ের ফিতা দিয়ে গম্বুজের মতো উঁচু করে পোশাকে নকশা বানানো। অর্থাৎ কাপড়ের উপর থেকে নীচ পর্যন্ত প্রত্যেক টুকরার এক পাশে রেশমী কাপড় দিয়ে সেলাই দেয়া। সামনে এবং পিছনের দিক থেকে আলাদা আলাদা রেশমী কাপড় দিয়ে সেলাইকৃত। কেউ কেউ বলেন, রেশমী কাপড় দিয়ে জামার পকেট ও হাতার পার্শ্বদেশ সেলাই করা এবং গম্বুজের মতো উঁচু করে কাপড়ে নকশা করা।
উক্ত হাদীস ও ‘ইমরান ইবনু হুসায়ন থেকে বর্ণিত, পরস্পর বিরোধী উভয়ের সামঞ্জস্য বিধানে বলা যায় যে, (وَلَا أَلْبَسُ الْقَمِيصَ الْمُكَفَّفَ بِالْحَرِيرِ) অর্থাৎ ‘রেশমী দ্বারা সেলাইকৃত জামা আমি পরিধান করব না।’ কিছুটা সৌন্দর্য ও বিলাসিতা থাকায়, উক্ত পোশাককে অপছন্দ করেছেন। অপর রেশমী কাপড় মিশ্রিত জুব্বাতে এমনটি ছিল না, তাই তিনি সেটি পরিধান করেছিলেন।
ইমাম কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ রেশমী কাপড় দ্বারা সেলাইকৃত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জুব্বাটি দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, যার মধ্যে চার আঙ্গুলের কম রেশমী কাপড় ছিল, যা পরিধান হারাম নয়। অবশ্য পরিমাণের বিষয়টি অস্পষ্ট ও অনির্ধারিত, প্রকৃত অবস্থা আল্লাহই ভালো জানেন।
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪০৫০)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪৩২৬-[২৩] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবায়র ও ’আবদুর রহমান ইবনু ’আওফ (রাঃ)-কে তাদের উভয়ের চর্মরোগের দরুন রেশমী কাপড় পরিধানের অনুমতি দিয়েছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوْلُ
وَعَن أنسٍ قَالَ: رَخَّصَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِلزُّبَيْرِ وَعَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَوْفٍ فِي لبس الْحَرِير لحكة بهما
وَفِي رِوَايَة لمُسلم قَالَ: إنَّهُمَا شكوا من الْقمل فَرخص لَهما فِي قمص الْحَرِير
ব্যাখ্যাঃ ‘আবদুর রহমান ইবনু ‘আওফ এবং যুবায়র (রাঃ)-কে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রেশমী কাপড় পরিধান করতে অনুমতি প্রদান করেছেন চুলকানী বা চর্মরোগের কারণে। কিন্তু মুসলিম-এর বর্ণনায় এসেছে, তারা দু’জন উকুনের অভিযোগ করলে তিনি তার প্রতিকারের জন্য রেশমী জামা পরিধানের অনুমতি প্রদান করেন। বস্তুত উকুনের কারণে শরীরে চুলকানী হয়ে থাকে, তাই চুলকানীর কারণে কিংবা উকুনের কারণে রেশমী কাপড় পরার অনুমতি প্রদান কোনটি কোনটির বিরোধী কথা নয়।
ইবনুল মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীস প্রমাণ করে, চর্ম রোগের কারণে রেশমী বস্ত্র পরিধান করা বৈধ। অন্যান্যরা বলেছেন, চর্মরোগ কিংবা উকুনের কারণে রেশমী বস্ত্র ব্যবহার তো বিনা ইখতিলাফে জায়িয, অন্য যে কোন ওযরের কারণেই তা পরিধান বৈধ। ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ প্রয়োজন মুহূর্তে এবং প্রয়োজন পরিমাণই কেবল বৈধ তা যেভাবেই হোক না কেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৮৩৯; তুহ্ফাতুল আহ্ওযাযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৭২২)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪৩২৭-[২৪] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর ইবনুল ’আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার পরনে কমলা বা কুসম্ব রংয়ের দু’খানা কাপড় দেখতে পেলেন, তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ মূলতঃ এটা কাফিরদের পোশাক। কাজেই তা পরো না। অপর এক রিওয়ায়াতে আছে, আমি বললামঃ আমি কি তাকে ধৌত করে ফেলব? তিনি বললেনঃ বরং এ দু’টিকে পুড়িয়ে ফেলো। (মুসলিম)[1]নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আহলে বায়তের মানাকিব অধ্যায়ে ’আয়িশাহ্ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস অচিরেই আমরা বর্ণনা করব।
الْفَصْلُ الْأَوْلُ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ قَالَ: رَأَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى ثَوْبَيْنِ مُعَصْفَرَيْنِ فَقَالَ: «إِنَّ هَذِهِ من ثِيَاب الْكفَّار فَلَا تلبسها»
وَفِي رِوَايَة: قلت: أغسلهما؟ قَالَ: «بل احرقها» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
وَسَنَذْكُرُ حَدِيثَ عَائِشَةَ: خَرَجَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ذَاتَ غَدَاةٍ فِي «بَابِ مَنَاقِبِ أَهْلِ بَيْتِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم»
ব্যাখ্যাঃ ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর ইবনুল ‘আস (রাঃ) কুসম্ব রং দ্বারা রঙিন দু’টি কাপড় পরিধান করেছিলেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এটা পরিধান করতে নিষেধ করেন এবং তা জ্বালিয়ে ফেলতে বলেন। এর কারণ হলো এগুলো মুশরিক হিন্দু সাধু সন্ন্যাসীদের ধর্মীয় পোশাক। বৌদ্ধ-ভিক্ষু বৈরাগী-সন্ন্যাসীরাও গেরুয়া কিংবা কুসম্ব রঙের বিশেষ এক জোড়া পোশাক পরিধান করে থাকে। বর্তমানেও তাদের এ রকম পোশাক পরিলক্ষিত হয়। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্ভবত তাদের সাথে সাদৃশ্যশীল এই পোশাক দেখেই উক্ত সাহাবীকে তা পরিধান করতে নিষেধ করেছেন, এমনকি তার নমুনাও যেন বাকী না থাকে তাই তা জ্বালিয়ে ফেলতে বলেছেন।
সাহাবী উক্ত কাপড় ধৌত করে পরিধানের অনুমতি চাইলেও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অনুমতি প্রদান করেননি। কেননা ধুয়ে ফেললে গন্ধ দূর হলেও রং দূর হয় না। অথবা ঐ কাপড় দু’খানা বিশেষ ডিজাইনে তৈরি ছিল যা কাফির মুশরিকদের ধর্মীয় প্রতীক বহন করছিল। তাই মুসলিমদের ঐ কাপড় পরিধান করা আদৌ সঙ্গত নয়। অতএব তিনি জ্বালিয়ে সমূলে ধ্বংস করার নির্দেশ প্রদান করেন।
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ; শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড; হাঃ ২০৭৬/২৪)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩২৮-[২৫] উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে কামীস (কুর্তা) ছিল সর্বাধিক প্রিয় পোশাক। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
عَن أم سَلمَة قَالَتْ: كَانَ أَحَبُّ الثِّيَابِ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْقَمِيصَ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ القميص ‘কামীস’ শব্দটি ‘আরবী ব্যাকরণের মূলনীতির ভিত্তিতে ص বর্ণে যবর এবং পেশ উভয় নিয়মে পাঠ সিদ্ধ। কামীস এর অর্থ জামা, যা দুই হাতা বা আস্তিন ও পকেটযুক্ত সেলাইকৃত হয়ে থাকে, কোন কোন এলাকায় একে কুর্তা বলে অভিহিত করা হয়।
শরীর আবৃত রাখার জন্য অল্প কাপড়ে, অল্প খরচে এটি একটি উত্তম পোশাক। সে যুগে চাদর বা অন্যান্য পোশাকের চেয়ে শরীর ঢাকার জন্য এটি ছিল একটি ভদ্র এবং শালীন পোশাক। এ জন্য তা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে প্রিয় পোশাক ছিল।
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪০২০; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৭৬২)
আজকের যুগের লম্বা পাঞ্জাবী, কাবলী সেট, এপ্রোণ ইত্যাদি শালীন পোশাকগুলোকে কামীসের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩২৯-[২৬] আসমা বিনতু ইয়াযীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জামার আস্তিন হাতের কব্জি পর্যন্ত ছিল। [তিরমিযী, আবূ দাঊদ; আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হাদীসটি হাসান গরীব][1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَن أسماءَ بنت يزِيد قَالَتْ: كَانَ كُمُّ قَمِيصِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى الرُّصْغِ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ
হাদীসটির য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘শাহ্র ইবনু হাওশাব’’ নামে একজন রাবী আছে। যে তার দুর্বল মুখস্থ শক্তির কারণে য‘ঈফ। বিস্তারিত দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ৫/৪৭৪ পৃঃ, ২৪৫৮ নং হাদীসের আলোচনা দ্রঃ।
ব্যাখ্যাঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কামীসের আস্তিন বা হাতা ছিল হাতের কব্জি পর্যন্ত। رصغ শব্দের অর্থ হাতের কব্জি। এ শব্দ কোন বর্ণনায় ص এর পরিবর্তে س অক্ষর দ্বারা পঠিত হয়েছে, উভয় পঠনে অর্থ একই।
এ হাদীসের ভিত্তিতে ‘আল্লামা জুযরী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ সুন্নাত হলো জামার আস্তিন হতে হবে কব্জি পর্যন্ত, তা অতিক্রম করা চলবে না। কামীস ছাড়া জুব্বা, কোট ইত্যাদি পোশাকের ক্ষেত্রে মুহাক্কিক ফুকাহাদের মত হলো সেটাও অঙ্গুলির মাথা অতিক্রম করতে পারবে না। অবশ্য আবুশ্ শায়খ ইবনু হিব্বান উক্ত সনদে উল্লেখ করেছেন, كَانَ يَدُ قَمِيصِ رَسُولِ اللهِ - صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - أَسْفَلَ مِنَ الرُّسْغِ অর্থাৎ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কামীসের হাতা ছিল কব্জির নীচ পর্যন্ত।
তিনি মুসলিম ইবনু ইয়াসার-এর সূত্রে আরেকটি হাদীস উল্লেখ করেছেন, তাতে উল্লেখ আছে,
كَانَ رَسُولُ اللهِ - صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- يَلْبَسُ قَمِيصًا فَوْقَ الْكَعْبَيْنِ مُسْتَوِيَ الْكُمَّيْنِ لِأَطْرَافِ أَصَابِعِه
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি জামা পরিধান করতেন যার বহর পায়ের গিরার উপর পর্যন্ত ছিল আর দুই হাতার ঝুল ছিল আঙ্গুলের মাথা পর্যন্ত। সুতরাং আস্তিনের পরিমাপ কব্জি পর্যন্তই হতে হবে এমনটি নয় বরং কেউ ইচ্ছা করলে আঙ্গুলের মাথা পর্যন্ত তৈরি করতে পারবেন।
রইল বিভিন্ন রকম বর্ণনা। এ প্রেক্ষিতে মুহাদ্দিসগণের মতামত হলো রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একাধিক জামা ছিল, যার কোনটির আস্তিন বা হাতা ছিল হাতে কব্জি পর্যন্ত, কোনটির ছিল আঙ্গুলের মাথা পর্যন্ত, কোনটি ছিল ঢোলাঢিলা, কোনটি ছিল আঁটসাট। সুতরাং কোন বর্ণনা কোন বর্ণনার বিপরীত নয়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪০২২)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৩০-[২৭] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই জামা পরতেন, তখন ডানদিক হতে শুরু করতেন। (তিরমিযী)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا لَبِسَ قَمِيصًا بَدَأَ بميامنه. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যবহারিক কাজ-কর্ম ও গৃহস্থলী কাজ-কর্ম ডানদিক থেকে শুরু করতেন। তিনি চিরুনি করা, জুতা পরা, জামা পায়জামা ইত্যাদি পোশাক পরতেও ডানদিক থেকে শুরু করতেন। খুলতেও তিনি ডান দিক থেকে শুরু করতেন, অর্থাৎ জামা পরার সময়ও ডান হাত আস্তিনে আগে প্রবেশ করাতেন, খোলার সময়ও ডান হাত আগে বের করতেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৭৬৫)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৩১-[২৮] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেন, মু’মিনের ইযার (লুঙ্গি, পেন্ট ও পায়জামা) পায়ের অর্ধনলা পর্যন্ত থাকা চাই, তবে তার নিচে টাখনু বা গিরার উপর পর্যন্ত হওয়ার মধ্যে কোন দোষ নেই। কিন্তু টাখনুর নিচে যা যাবে তা জাহান্নামে যাবে। এ কথাটি তিনি তিনবার বলেছেন। তিনি আরো বলেছেনঃ যে ব্যক্তি অহংকারবশতঃ ইযার হেঁচড়িয়ে চলে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা তার প্রতি দৃষ্টি করবেন না। (আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «إِزْرَةُ الْمُؤْمِنِ إِلَى أَنْصَافِ سَاقَيْهِ لَا جُنَاحَ عَلَيْهِ فِيمَا بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْكَعْبَيْنِ مَا أَسْفَلَ مِنْ ذَلِكَ فَفِي النَّارِ» قَالَ ذَلِكَ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ «وَلَا يَنْظُرُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِلَى مَنْ جَرَّ إِزَارَهُ بَطَرًا» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যাঃ মু’মিনের লুঙ্গি বা পাজামার ঝুল নিস্ফ সাক অর্থাৎ পায়ের নলার মাঝামাঝি পর্যন্ত হবে এবং তার চুড়ান্ত সীমা হবে পায়ের গিট বা গিরা পর্যন্ত। এর মাঝে যে কোন জায়গায় ঝুল পড়লে তাতে কোন দোষ নেই। এর নীচে গেলে অর্থাৎ কাপড়ের ঝুল গিরার নিচে গেলে তা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। ইতিপূর্বে এ বিষয়ের পূর্ণ ব্বিরণ অতিবাহিত হয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪০৮৯)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৩২-[২৯] সালিম (রহঃ) তাঁর পিতা [ইবনু ’উমার (রাঃ)] হতে বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ইযার, জামা ও পাগড়ীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সুতরাং যে ব্যক্তি অহংকারবশতঃ তার কোন একটিকে হিঁচড়িয়ে চলবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা তার দিকে তাকাবেন না। (আবূ দাঊদ, নাসায়ী ও ইবনু মাজাহ)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَن سَالم عَنْ أَبِيهِ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الْإِسْبَالُ فِي الْإِزَارِ وَالْقَمِيصِ وَالْعِمَامَةِ مِنْ جَرَّ مِنْهَا شَيْئًا خُيَلَاءَ لَمْ يَنْظُرِ اللَّهُ إِلَيْهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيّ وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যাঃ এ হাদীসের ব্যাখ্যাও ইতিপূর্বে হয়ে গেছে। অবশ্য সেখানে শুধু ইযার বা পায়জামা-লুঙ্গির কথা উল্লেখ হয়েছে। অত্র হাদীসে জামা ও পাগড়ীর কথা উল্লেখ হয়েছে, অর্থাৎ জামা অথবা পাগড়ীও যদি পায়ের গিরার নিচে চলে যায় তবে তার হুকুম অনুরূপ। সে ব্যক্তির প্রতি আল্লাহ কিয়ামতের দিন রহমাতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না বা তার প্রতি রহম করবেন না। আর পায়ের ঐ অংশ জাহান্নামে যাবে অর্থাৎ সে স্বয়ং নিজেই জাহান্নামে যাবে। পূর্বে আলোচনা হয়েছে অবশ্য এই ঝুলানো অহংকার গর্বের সাথে হলে তার জন্য এই শাস্তি, অথবা এভাবে পোশাক পরায় যদি সে অভ্যস্ত হয়ে পরে তাহলে; অন্যথায় ভুলক্রমে হলে, অথবা অজান্তে হলে, কিংবা ঘটনাক্রমে হলে তার জন্য এ শাস্তি প্রযোজ্য হবে না। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; শারহুন নাসায়ী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ৫৩৪৯)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৩৩-[৩০] আবূ কাবশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীদের টুপি ছিল চ্যাপটা। (তিরমিযী এবং তিনি বলেছেনঃ এ হাদীসটি মুনকার।)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَن أبي كبشةَ قَالَ: كَانَ كِمَامُ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بُطْحًا. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حديثٌ مُنكر
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘আবূ সা‘ঈদ’’ তার নাম ‘আবদুল্লাহ ইবনু বুসর, হাদীস বিশারদদের নিকট তিনি একজন য‘ঈফ রাবী। দেখুন- তিরমিযী ১৭৮২ নং হাদীসের আলোচনা এবং তুহফাতুল আহওয়াযী ৫/৩৯০-৩৯২ নং পৃঃ, ১৭৮২ নং হাদীসের আলোচনা দ্রঃ।
ব্যাখ্যাঃ كمام শব্দটি كمة এর বহুবচন, এর অর্থ টুপি। এ শব্দটির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মিরক্বাতুল মাফাতীহ গ্রন্থকার বলেন, وهى القلنسوة المدؤرة গোলাকার টুপি বিশেষ, যা মাথাকে আবৃত করে রাখে।
بطحا শব্দের অর্থ সমতল বা প্রশস্ত ভূমি। এখানে টুপির চওড়া বা প্রশস্ত ছাদকে বুঝানো হয়েছে যা উঁচু হয়ে থাকে না, বরং সমতল বা চ্যাপ্টা হয়ে মাথার সাথে লেগে থাকে। কেউ কেউ বলেছেন, كمام শব্দটি كم এর বহুবচন, যেমন قفاف এর অর্থ উঁচু টিলা, অনুরূপ كمام এর অর্থ উঁচু টুপি।
بطحا এর অর্থ প্রশস্ত, ভারতীয় এবং রুমী টুপিগুলো যেমন সংকীর্ণ এমনটি নয়। বরং এর প্রশস্ততা প্রায় এক বিঘত পরিমাণ। [ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) হাদীসটি মুনকার বলায় বিস্তারিত ব্যাখ্যা পরিহার করা হলো।] [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৩৪-[৩১] উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইযার সম্পর্কে আলোচনা করলেন, তখন আমি জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রসূল! এ ব্যাপারে মহিলাদের বিধান কী? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ এক বিঘত পরিমাণ ঝুলাতে পারবে। তখন উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) বললেনঃ এমতাবস্থায় তার অঙ্গ (পা) খুলে যাবে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তবে এক হাত তার অধিক যেন না হয়। (মালিক, আবূ দাঊদ, নাসায়ী ও ইবনু মাজাহ)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَن أم سَلمَة قَالَتْ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حِينَ ذَكَرَ الْإِزَارَ: فَالْمَرْأَةُ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: «تُرْخِي شِبْرًا» فَقَالَتْ: إِذًا تَنْكَشِفُ عَنْهَا قَالَ: «فَذِرَاعًا لَا تَزِيدُ عَلَيْهِ» . رَوَاهُ مَالِكٌ وَأَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যাঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু’মিনকে ইযার বা লুঙ্গি ও পায়জামা ঝুলানোর পরিমাণ সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন যে, তা হবে নিসফে সাক বা পায়ের নলার আধাআধি পর্যন্ত। উক্ত কথার প্রেক্ষিতে উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) প্রশ্ন রাখেন, হে আল্লাহর রসূল! মহিলাদের ব্যাপারে কি ঐ একই হুকুম বা তাদের বিধান কি? উত্তরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তারা নিসফে সাক থেকে আরো এক বিঘত কাপড় ছেড়ে দিবে যাতে নিচের বাকী অংশ ঢেকে নেয়।
উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) আবার বললেন, হে আল্লাহর রসূল! তাহলে তো তাদের পা বেরিয়ে থাকবে। অর্থাৎ চলার সময় তার পা উন্মুক্ত হয়ে যাবে, তখন কেমন হবে? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে এক হাত পরিমাণ ঝুলিয়ে দিবে, এর বেশি নয়। এ পরিমাণ হলো লোকবিশেষ, আর এই ঝুল যাতে মাটি পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং পুরো পা দু’খানা ঢেকে থাকে।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চেয়ে বেশি ঝুলাতে নিষেধ করেছেন, যাতে কাপড় একেবারে মাটির সাথে হেঁচড়িয়ে ময়লা বা কর্দমাক্ত হয়ে না যায় এবং চলার সময় পা পেঁচিয়ে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি না হয়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৭৩১)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৩৫-[৩২] আর তিরমিযী ও নাসায়ীর এক রিওয়ায়াতে ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) বললেন, এমতাবস্থায় তাদের পা খুলে যাবে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তবে তারা এক হাত পরিমাণ ঝুলাতে পারবে। তার অধিক যেন না হয়।[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَفِي رِوَايَةِ التِّرْمِذِيِّ وَالنَّسَائِيِّ عَنِ ابْنِ عُمَرَ فَقَالَتْ: إِذًا تَنْكَشِفُ أَقْدَامُهُنَّ قَالَ: «فَيُرْخِينَ ذِرَاعًا لَا يزدن عَلَيْهِ»
ব্যাখ্যাঃ উপরোল্লিখিত হাদীসটি ইমাম তিরমিযী এবং ইমাম নাসায়ী স্ব স্ব গ্রন্থে ইবনু ‘উমার-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) প্রশ্ন করলেন যে, নিসফে সাক থেকে এক বিঘত কাপড়ে মহিলাদের চলার পথে পায়ের খানিকটা প্রকাশ পেয়ে যাবে তখন কেমন হবে? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উত্তরে বললেন, তাহলে এক হাত পর্যন্ত কাপড় ঝুলাবে, এর বেশি নয়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৩৬-[৩৩] মু’আবিয়াহ্ ইবনু ক্বুররাহ্ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, একদিন আমি মুযায়নাহ্ গোত্রের একদল লোকের সঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে গেলাম। তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে বায়’আত করল। সে সময় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর (জামার) বুতাম খোলা ছিল। তখন আমি আমার হাতখানা তাঁর জামার ভিতরে ঢুকালাম এবং মোহরে নুবুওয়াতটি স্পর্শ করলাম। (আবূ দাঊদ)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ قُرَّةَ عَنْ أَبِيهِ قَالَ: أَتَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي رَهْطٍ مِنْ مُزَيْنَةَ فَبَايَعُوهُ وَإِنَّهُ لَمُطْلَقُ الْأَزْرَارِ فَأَدْخَلْتُ يَدِي فِي جَيْبِ قَمِيصِهِ فَمَسِسْتُ الْخَاتم. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ বর্ণনাকারী মু‘আবিয়াহ্-এর পিতা কুররাহ্ ইবনু আইয়্যাস হলো ‘আরবের প্রসিদ্ধ মুযায়নাহ্ বা মুযার গোত্রের লোক। তিনি পরবর্তীতে ইরাকের বাসরাহ্ নগরীতে বাস করতেন। তিনি একটি প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আগমন করেছিলেন, সেই সময়ের ঘটনা এখানে বর্ণনা করেছেন।
‘কামূস’ গ্রন্থকারের মতে رهط শব্দের অর্থ দল। এর সংখ্যা হলো তিন থেকে দশ। কেউ কেউ বলেছেন, এর সর্বোচ্চ সংখ্যা হলো চল্লিশ। মুযায়নাহ্ গোত্রের যারা এসেছিলেন, তারা সকলেই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট বায়‘আত করলেন। এর মধ্যে বর্ণনাকারী কুররাহ্ ইবনু আইয়্যাসও ছিলেন।
এক বর্ণনায় এসেছে, মুযায়নাহ্ গোত্রের এক দল লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আগমন করেছিলেন, তাদের সংখ্যা ছিল চারশত। বিভিন্ন সময় আগমনের কারণে তাদের সংখ্যায় বিভিন্ন রকম ছিল। অত্র হাদীসসহ আরো বেশ কিছু হাদীসে দেখা যায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জামার বুতাম খোলা ছিল এবং গলা ছিল খোলা, ফলে গলার মধ্য দিয়ে সহজেই হাত ঢুকানো যেত।
এমনকি কিছু হাদীসে তো দেখা যায় তার জামার বুতামই ছিল না। আসলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবহাওয়ার তারতম্যের কারণে অবস্থা ভেদে কখনো বুতাম খোলা রাখতেন আবার কখনো আটকিয়ে রাখতেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৩৭-[৩৪] সামুরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা সাদা কাপড় পরিধান করো। কেননা তা অতি পবিত্র ও অধিক পছন্দনীয় আর তোমাদের মৃতদেরকে সাদা কাপড়ে কাফন পরাও। (আহমাদ, তিরমিযী, নাসায়ী ও ইবনু মাজাহ)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَن سَمُرَة أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الْبَسُوا الثِّيَابَ الْبِيضَ فَإِنَّهَا أَطْهَرُ وَأَطْيَبُ وَكَفِّنُوا فِيهَا مَوْتَاكُمْ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَالنَّسَائِيُّ وَابْنُ مَاجَه
ব্যাখ্যাঃ সাদা কাপড় ময়লা ও অপরিচ্ছন্নতা থেকে সবসময় পবিত্র এবং পরিচ্ছন্ন থাকে। ‘আল্লামা ত্বীবী বলেনঃ সাদা কাপড়ে ময়লা লাগলে সহজেই তা পরিলক্ষিত হয় ফলে মানুষ তা দ্রুত এবং বেশি বেশি ধৌত করে রাখে। যা অন্য কোন রঙিন কাপড়ের বেলায় হয় না। আবার রঙের ভিতরেও অপবিত্রতা থাকতে পারে, কিন্তু রংবিহীন সাদা কাপড় তা থেকে মুক্ত। অথবা এটা পরলে মানুষের মন অহংকার গর্ব থেকে মুক্ত থাকে যা সকল আত্মিক পবিত্রতার মূল কথা।
সাদা কাপড়ে মৃতদের কাফন দেয়া নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ, সুতরাং সাদা কাপড়ে কাফন দেয়া বিশ্বজনীন সুন্নাত বা রীতি-বিধান। সাদা কাপড়কে অধিক পবিত্র এবং উত্তম বলার কারণ হলো এটা আল্লাহর ফিতরাহ্ বা প্রকৃতির রঙের উপর বিদ্যমান।
এই ফিতরাহ্ বা প্রকৃতির উপর থাকার জন্যই আল্লাহর নির্দেশ। সুতরাং ফিতরাহ্ বা প্রকৃতির সেই সাদা রঙের কাপড়ে কাফন দেয়ার জন্যই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ। এতে এদিকেও ইশারা রয়েছে যে, জীবিত মৃত্যু প্রত্যেকেই আল্লাহর কাছে মূল ফিতরাতী বেশেই যেন ফিরে যায়। তাকেই সাদার সাথে সাদৃশ্য দেয়া হয়েছে। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো তাওহীদ। প্রত্যেক মানুষ ফিতরাতের উপর জন্মগ্রহণ করে অর্থাৎ শিশু জন্মগতভাবে সে তাওহীদের উপরই জন্ম নেয় পরবর্তীতে পিতা-মাতা তাকে হয় ইয়াহূদী বানায়, না হয় খ্রিষ্টান। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৮১০)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৩৮-[৩৫] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই পাগড়ী বাঁধতেন, তখন শামলা উভয় কাঁধের মধ্য দিয়ে (পিছনের দিকে) ঝুলিয়ে দিতেন। (তিরমিযী; আর তিনি বলেছেনঃ এ হাদীসটি হাসান ও গরীব।)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا اعْتَمَّ سَدَلَ عِمَامَتَهُ بَيْنَ كَتِفَيْهِ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ
ব্যাখ্যাঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন পাগড়ী বাঁধতেন তখন তার পাগড়ীর দুই প্রান্ত দুই কাঁধের উপর দিয়ে পিছনে ঝুলিয়ে রাখতেন। কোন কোন বর্ণনায় দেখা যায় সামনের দিকে এবং পিছনের দিকে ঝুলিয়ে রাখতেন। ইবনুল জাওযী ‘আল ওয়াফা’ গ্রন্থে আবূ মা‘শার-এর সূত্রে ইবনু ‘আবদুস্ সালাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি ইবনু ‘উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিভাবে পাগড়ী বাঁধতেন? উত্তরে তিনি বলেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মাথায় পাগড়ীর প্যাঁচ ঘুরিয়ে পিছন দিক থেকে সাজিয়ে তুলতেন এবং তার প্রান্ত দেশ দুই কাঁধের উপর ফেলে রাখতেন।
তিরমিযীর বর্ণনায় রয়েছে, তার পূত্র নাফি‘ (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ইবনু ‘উমারও এমনিভাবে পাগড়ী বাঁধতেন। ‘উবায়দুল্লাহ বলেন, আমি কাসিম ইবনু মুহাম্মাদ, সালিম প্রমুখকে উক্ত নিয়মেই পাগড়ী বাঁধতে দেখেছি। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৭৩৬)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৩৯-[৩৬] ’আবদুর রহমান ইবনু ’আওফ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার পাগড়ী বেঁধে দিলেন এবং তার একদিক আমার সামনে অপরদিক পিছনে ঝুলিয়ে দিলেন। (আবূ দাঊদ)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَوْفٍ قَالَ: عَمَّمَنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَسَدَلَهَا بَيْنَ يَدَيَّ وَمِنْ خَلْفِي. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘সুলায়মান ইবনু খর্রাবূয’’ নামের এক বর্ণনাকারী, তাকরীরের মধ্যে ইবনু হাজার আল ‘আস্ক্বালানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ সে মাজহূল। ইমাম যাহাবী বলেনঃ তাকে চেনা যায় না। আল জারহু ওয়াত্ তা‘দীল (জাওয়ামিউল কালিম সফ্টওয়্যার)। এ ছাড়াও আরেকজন বর্ণনাকারী আছে শায়খুন মিন আহলিল মদীনাহ্। যার পরিচয় জানা যায়নি। দেখুন- তুহফাতুল আহওয়াযী ৫/৩৩৭ পৃঃ, ১৭৩৬ নং হাদীসের আলোচনা দ্রঃ।
ব্যাখ্যাঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক সময়ই সাহাবীদের মাথায় নিজ হাতে পাগড়ী বেঁধে দিতেন। ‘আবদুর রহমান ইবনু ‘আওফকে তিনি নিজ হাতে পাগড়ী বেঁধে দেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার মাথায় পাগড়ী বেঁধে পাগড়ীর একপ্রান্ত সামনের দিকে এবং অপরপ্রান্ত পিছনের দিকে ঝুলিয়ে দিতেন।
মীরাক (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আবূ দাঊদ, মুসান্নাফ প্রমুখ মুহাদ্দিস মদীনার শায়খ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমি ‘আবদুর রহমান ইবনু ‘আওফ-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার মাথায় পাগড়ী বেঁধে দেন, তিনি পাগড়ীর একপ্রান্ত আমার সামনের দিকে এবং অপরপ্রান্ত পিছনের দিকে ঝুলিয়ে দেন।
ইবনু আবূ শায়বাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘মুসান্নাফ’ গ্রন্থে ‘আলী (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মাথায় পাগড়ী পরিয়ে দেন এবং তার দুই প্রান্ত কাঁধের উপর ঝুলিয়ে দেন।
সীরাত গ্রন্থসমূহে বিশুদ্ধ বর্ণনায় উল্লেখ আছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কখনো পাগড়ীর প্রান্ত দুই কাঁধের উপর ঝুলিয়ে রাখতেন আবার কখনো প্রান্তদেশ ঝুলানো ছাড়াই পাগড়ী পরিধান করতেন। এ কথা থেকে জানা যায় যে, এসব কাজের সবই সুন্নাত। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ১৭৮১)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৪০-[৩৭] রুকানাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমাদের ও মুশরিকদের মধ্যে পার্থক্য হলো টুপির উপরে পাগড়ী বাঁধা। অর্থাৎ- আমরা টুপির উপর পাগড়ী বাঁধি আর তারা টুপি ছাড়া পাগড়ী বাঁধে। (তিরমিযী, তিনি বলেছেনঃ এ হাদীসটি গরীব এবং তার সানাদটিও মজবুত নয়।)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَن ركَانَة عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «فَرْقُ مَا بَيْنَنَا وَبَيْنَ الْمُشْرِكِينَ الْعَمَائِمُ عَلَى الْقَلَانِسِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ وَإِسْنَاده لَيْسَ بالقائم
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘আবূ জা‘ফার ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু রুকানাহ্’’ নামে একজন বর্ণনাকারী। যিনি মাজহূল, এছাড়াও তিনি তার পিতা থেকে তিনিও মাজহূল। বিস্তারিত দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ৬০৭২। আবুল হাসান আল ‘আসকালানী নামের বর্ণনাকারীও মাজহূল। তিরমিযী ১৭৮৪ নং হাদীসের আলোচনা।
ব্যাখ্যাঃ (عَمَائِمٌ) ‘‘আমায়িম’’ শব্দটি ‘ইমামাহ্’ শব্দের বহুবচন। এ হাদীসে ‘আমায়িম’ দ্বারা ‘ইমামাহ্ বা পাগড়ী পরিধান করাকে বুঝানো হয়েছে। আল ‘আযীযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, মুসলিমরা টুপি পরিধান করে এবং তার উপরে পাগড়ী পরিধান করে। শুধু টুপি পরিধান করা মুশরিকদের বেশ-ভূষা। ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) উল্লেখ করেছেন যে, এ হাদীসের মর্মার্থ হলো, আমরা টুপির উপর পাগড়ী পরতাম আর মুশরিকরা শুধু টুপি পরেই তুষ্ট থাকতো। তবে এ হাদীসটি যেহেতু সানাদ ও অর্থের দিক দিয়ে গ্রহণযোগ্য নয় সেহেতু এটির ব্যাখ্যায় বেশি কথা না বলে এ কথা বলাই যথেষ্ট যে, হাফিয ইবনুল কইয়িম (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘‘যাদুল মা‘আদ’’ গ্রন্থে বলেছেন,
وكان يلبَسُها ويلْبَسُ تحتها القَلَنسُوة. وكان يلبَس القلنسُوة بغير عمامة، ويلبَسُ العِمامة بغير قلنسُوة
‘‘রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাগড়ী পরিধান করতেন এবং তার নীচে টুপি পরতেন। তিনি পাগড়ী ছাড়া শুধু টুপিও পরতেন, আবার টুপি ছাড়া শুধু পাগড়ীও পরতেন।’’
ইমাম সুয়ূত্বী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘‘জামি‘ আস্ সগীর’’-এ ত্ববারানীর সূত্রে ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি সাদা টুপি পরতেন। আল ‘আযীযী-এর মতে, এ বর্ণনাটির সানাদ হাসান। রওয়ানী ও ইবনু আসাকির ইবনু ‘আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন যে,
كان يلبس القلانس تحت العمائم وبغير العمائم، ويلبس العمائم بغير قلانس، وكان يلبس القلانس اليمانية، وهن البيض المضربة ويلبس القلانس ذوات الاَذان في الحرب، وكان ربما نزع قلنسوته فجعلها سترة بين يديه وهو يصلي.
‘‘রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাগড়ীর নিচে টুপি পরিধান করেতেন আবার পাগড়ী ছাড়াও টুপি পরিধান করেতেন। আবার টুপি ছাড়াও পাগড়ী পরিধান করতেন। তিনি সাদা রঙের ইয়ামানী মুদারী টুপি পরিধান করতেন। আর তিনি যুদ্ধের মধ্যে বিশেষ টুপি পরিধান করতেন। অনেক সময় তিনি সালাত আদায়ের জন্য মাথা থেকে টুপি খুলে সেটিকে নিজের সামনে সুতরাহ্ হিসেবে ব্যবহার করতেন।’’ (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪০৭৪)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৪১-[৩৮] আবূ মূসা আল আশ্’আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ স্বর্ণ ও রেশমের ব্যবহার আমার উম্মাতের নারীদের জন্য হালাল এবং পুরুষদের জন্য হারাম করা হয়েছে। (তিরমিযী ও নাসায়ী। ইমাম তিরমিযী বলেছেনঃ এ হাদীসটি হাসান সহীহ।)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَنْ أَبِي مُوسَى الْأَشْعَرِيِّ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «أُحِلَّ الذَّهَبُ وَالْحَرِيرُ لِلْإِنَاثِ مِنْ أُمَّتِي وَحُرِّمَ عَلَى ذُكُورِهَا» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَالنَّسَائِيّ وَقَالَ التِّرْمِذِيّ: هَذَا صَحِيح
ব্যাখ্যাঃ রেশমের কাপড় ও স্বর্ণ উম্মাতে মুহাম্মাদীর পুরুষদের জন্য হারাম- এ কথা পুরুষ শিশুদেরকেও এ হুকুমের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে। যদিও শিশুরা তাদের অন্তর্ভুক্ত নয় যাদের ওপর শারী‘আতের হুকুম মানার আবশ্যকতা রয়েছে। মূলত শিশুদেরকে যারা এসব পরিধান করাবে তাদের ক্ষেত্রে এ হারামের হুকুম প্রযোজ্য হবে। (অর্থাৎ শিশুরা যেহেতু অবুঝ সেহেতু যে সকল বুঝমান ব্যক্তিরা শিশুদেরকে রেশমের কাপড় ও স্বর্ণ পরিধান করাবে তারা এই হারামে পতিত হওয়ার গুনাহে লিপ্ত হবে।) অত্র হাদীসে স্বর্ণ দ্বারা স্বর্ণের গহনা বা অলঙ্কার উদ্দেশ্য। স্বর্ণের ও রৌপ্যের পাত্র পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্য হারাম। এমনিভাবে রূপার গহনা শুধু নারীদের জন্য জায়িয। তবে আংটিসহ কিছু ক্ষেত্রে পুরুষের জন্যও রূপা ব্যবহার করা জায়িয। হাদীসে উল্লেখিত দু’টি বস্তু অর্থাৎ রেশমের কাপড় ও স্বর্ণ পরিধান করা উম্মাতে মুহাম্মাদীর নারীদের জন্য হালাল করা হয়েছে।
বুখারী ও মুসলিমে ‘উমার , আনাস , ইবনুয্ যুবায়র ও আবূ উমামাহ্ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, مَنْ لَبِسَ الْحَرِيرَ فِي الدُّنْيَا لَمْ يَلْبَسْهُ فِي الْآخِرَةِ
‘‘যে ব্যক্তি দুনিয়ায় রেশমের কাপড় পরিধান করবে সে ব্যক্তি আখিরাতে তা পরিধান করতে পারবে না (তথা নি‘আমাত থেকে বঞ্চিত)।’’
মুসনাদে আহমাদ, আবূ দাঊদ, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ ও ইবনু হিব্বানে ‘আলী (রাঃ)-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন রেশমের কাপড় তার ডান হাতে নিলেন এবং স্বর্ণ তার বাম হাতে রাখলেন। তারপর তিনি বললেন, إِنَّ هَذَيْنِ حَرَامٌ عَلَى ذُكُورِ أُمَّتِى ‘‘এই দু’টি বস্তু আমার উম্মাতের পুরুষের জন্য হারাম’’।
বুখারী ও মুসলিমে ইবনু ‘উমার থেকে বর্ণিত হাদীসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِنَّمَا يَلْبَسُ الْحَرِيرَ فِي الدُّنْيَا مَنْ لَا خَلَاقَ لَهٗ فِي الْآخِرَةِ ‘‘যে ব্যক্তি দুনিয়াতে রেশমের কাপড় পরিধান করবে তার জন্য আখিরাতের নি‘আমাতের কোন অংশ থাকবে না।’’ (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৭২০)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৪২-[৩৯] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই কোন নতুন কাপড় পরিধান করতেন, তখন তাঁর নাম পাগড়ী, জামা, চাদর (ইত্যাদি) উল্লেখ করে এ দু’আ পড়তেন- ’’আল্ল-হুম্মা লাকাল হামদু কামা- কাসাওতানীহি আস্আলুকা খায়রাহূ ওয়া খয়রা মা- সুনি’আ লাহূ ওয়া আ’ঊযুবিকা মিন শাররিহী ওয়া শাররি মা- সুনি’আ লাহূ’’ অর্থাৎ- হে আল্লাহ! সমস্ত প্রশংসা তোমারই, তুমিই এ কাপড়টি আমাকে পরিধান করিয়েছ। আমি তোমার কাছে তার কল্যাণ কামনা করছি এবং যে উদ্দেশে তা প্রস্তুত করা হয়েছে তারও কল্যাণ কামনা করছি এবং তার অনিষ্ট হতে আশ্রয় চাই এবং যে উদ্দেশে তা প্রস্তুত করা হয়েছে তার অনিষ্ট হতে আশ্রয় চাই। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا اسْتَجَدَّ ثَوْبًا سَمَّاهُ بِاسْمِهِ عِمَامَةً أَوْ قَمِيصًا أَوْ رِدَاءً ثُمَّ يَقُولُ «اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ كَمَا كسوتَنيه أَسأَلك خَيره وخيرَ مَا صُنِعَ لَهُ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهِ وَشَرِّ مَا صُنِعَ لَهُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যাঃ ইবনু হিব্বান আনাস (রাঃ) থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন, আনাস (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নতুন পোশাক পরিধান করতেন তখন জুমু‘আহ বার তা পরিধান করতেন। এ হাদীস দ্বারা যদিও বুঝা যায় যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন নতুন কাপড় পরিধান করার ক্ষেত্রে জুমু‘আহ বারকে নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু হাদীসটি গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় নতুন কাপড় পরিধানের কোন নির্দিষ্ট দিন বা ক্ষণ নির্ধারণ করা প্রমাণিত নয়। অত্র হাদীসে পাগড়ী, কামীস ও চাদর- এ তিনটি কাপড়ের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে উদাহরণ স্বরূপ। মূলত এগুলো ছাড়াও অন্যান্য কাপড় যেমন লুঙ্গি, সেলওয়ার, মোজা ইত্যাদি কাপড়ও সাধারণভাবে এ হাদীস দ্বারা উদ্দেশ্য।
পোশাকের কল্যাণ হচ্ছে এর স্থায়িত্ব, পরিচ্ছন্নতা এবং জরুরী প্রয়োজনে তা পরিধান করার উপযোযী থাকা। যে সকল জরুরী উদ্দেশে এই কাপড় তৈরি করা হয়েছে তা হলো দীর্ঘ সময় গরম ও ঠাণ্ডা থেকে রক্ষা পাওয়া এবং গোপন অঙ্গ ঢেকে রাখা। এ সকল কাপড় পরিধানের ক্ষেত্রে কল্যাণ কামনা করার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, এসব কাপড় যেন সেসব কাঙিক্ষত উদ্দেশে পৌঁছার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয় যেসব উদ্দেশ্যের জন্য কাপড় তৈরি করা হয়েছে। যেমন- আল্লাহর ‘ইবাদাত ও আনুগত্য করতে সাহায্য নেয়া। অত্র হাদীসে যে পোশাকের অকল্যাণ থেকে আশ্রয় চেয়ে বলা হয়েছে তার অর্থ হলো পোশাক হারাম হওয়া, অপবিত্র হওয়া, দীর্ঘস্থায়ী না হওয়া অথবা সেসব কাপড় গুনাহ, অকল্যাণ, গর্ব-অহংকার, আশ্চর্যান্বিত হওয়া ও ধোঁকাবাজির কারণ থেকে সেসব কাপড় মুক্ত থাকা।
অত্র হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, নতুন পোশাক পরিধান করার সময় আল্লাহর প্রশংসা করা মুস্তাহাব।
ইমাম হাকিম তাঁর ‘‘আল মুসতাদরাকে’’ ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন, ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেনঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَا اشْتَرٰى عَبْدٌ ثَوْبًا بِدِينَارٍ أَوْ بِنِصْفِ دِينَارٍ فَحَمِدَ اللهَ إِلَّا لَمْ يَبْلُغْ رُكْبَتَيْهِ حَتّٰى يَغْفِرَ اللهُ لَهٗ.
‘‘কোন বান্দা যখন এক দীনার বা অর্ধ দীনারের বিনিময়ে কোন কাপড় ক্রয় করে, অতঃপর আল্লাহর প্রশংসা জ্ঞাপন করে, তাহলে তার দুই হাঁটু পর্যন্ত কাপড় পৌঁছার পূর্বেই তাকে মাফ করে দেন।’’ (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৭৬৭)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৪৩-[৪০] মু’আয ইবনু আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি খাবার খাওয়ার পর এ দু’আ, ’’আলহামদু লিল্লা-হিল্লাযী আত্ব’আমানী হা-যাত্ব ত্ব’আ-মা ওয়ারাযাকানীহি মিন গয়রি হাওলিম্ মিন্নী ওয়ালা- ক্যুওয়াহ্’’ পড়ে তার অতীতের সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যায়। অর্থাৎ- সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই যিনি আমাকে এ খাদ্য খাইয়েছেন এবং আমার শক্তি সামর্থ্য ব্যতিরেকেই তিনি তা আমাকে দান করেছেন। (তিরমিযী)[1]
আর আবূ দাঊদ অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন, যে ব্যক্তি নতুন কাপড় পরিধান করে এ দু’আ, ’’আলহামদু লিল্লা-হিল্লাযী কাসা-নী হা-যা- ওয়ারাযাকানীহি মিন গয়রি হাওলিম্ মিন্নী ওয়ালা- ক্যুওয়াহ্’’ (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমার কৌশল ও ক্ষমতা প্রয়োগ ব্যতীতই আমাকে এ কাপড়ের ব্যবস্থা করে পরালেন) পড়ে তার আগের ও পরের সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যায়।
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَن معاذِ بن أَنَسٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: مَنْ أَكَلَ طَعَامًا ثُمَّ قَالَ: الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَطْعَمَنِي هَذَا الطَّعَامَ وَرَزَقَنِيهِ مِنْ غَيْرِ حَوْلٍ مِنِّي وَلَا قُوَّةٍ غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَزَادَ أَبُو دَاوُدَ: وَمَنْ لَبِسَ ثَوْبًا فَقَالَ: الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي كَسَانِي هَذَا وَرَزَقَنِيهِ مِنْ غَيْرِ حَوْلٍ مِنِّي وَلَا قُوَّةٍ غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَا تَأَخَّرَ
ব্যাখ্যাঃ এ হাদীসে প্রথমাংশের শেষে (وَمَا تَأَخَّرَ) ‘ওয়ামা- তাআখখারা’ অর্থাৎ ‘‘যা পরবর্তীতে হবে’’ বাক্যাংশটি আছে কিনা তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ইমাম আবূ দাঊদ তাঁর সুনানে এই অংশসহ হাদীসটি উল্লেখ করছেন বলে কিছু সংস্করণে পাওয়া যায় আবার কিছু সংস্করণে পাওয়া যায় না। তবে মিশকাত প্রণেতা সে অংশটুকু ছাড়াই হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। কারী বলেন, ত্বীবী বলেছেনঃ তিরমিযী ও আবূ দাঊদে ‘ওয়ামা- তাআখখারা’ বাক্যাংশটি নেই। যদিও মিশকাতের কিছু সংস্করণে ‘ওয়ামা- তাআখখারা’ বাক্যাংশ যোগ করা হয়েছে এ ধারণায় যে, হাদীসের পরের অংশের শেষে ‘ওয়ামা- তাআখখারা’ বাক্যাংশটি আছে। অতএব এখানেও আছে মনে হয়। উল্লেখ্য যে, হাদীসের পরবর্তী অংশ তথা (غُفِرَ لَهٗ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِه..... وَمَنْ لَبِسَ ثَوْبًا) অংশের শেষে ‘ওয়ামা- তাআখখারা’ বাক্যাংশটি সকল সংস্করণে রয়েছে। এ নিয়ে কোন বিতর্ক নেই। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪০১৮)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৪৪-[৪১] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে লক্ষ্য করে বললেনঃ হে ’আয়িশাহ্! যদি তুমি (ইহকাল ও পরকালে) আমার সান্নিধ্য লাভের ইচ্ছা রাখো, তবে দুনিয়ার সম্পদ থেকে এ পরিমাণই নিজের জন্য যথেষ্ট মনে করো, যে পরিমাণ একজন মুসাফিরের পাথেয় হিসেবে যথেষ্ট হয় এবং ধনাঢ্য ব্যক্তিদের সাহচর্য হতে বেঁচে থাকো, আর তালি না লাগানো পর্যন্ত কোন কাপড়কে পুরাতন (ব্যবহারে অনুপযোগী) ধারণা করো না। (তিরমিযী)[1]
ইমাম তিরমিযী বলেছেনঃ এ হাদীসটি গরীব। কেননা আমরা হাদীসটি সালিহ ইবনু হাসসান ব্যতীত অন্য কোন সূত্রে অবহিত হইনি। আর মুহাম্মাদ ইবনু ইসমা’ঈল (বুখারী) বলেছেনঃ সালিহ ইবনু হাসসান মুনকারুল হাদীস।
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ قَالَ لِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَا عَائِشَةُ إِذَا أَرَدْتِ اللُّحُوقَ بِي فَلْيَكْفِكِ مِنَ الدُّنْيَا كَزَادِ الرَّاكِبِ وَإِيَّاكِ وَمُجَالَسَةَ الْأَغْنِيَاءِ وَلَا تَسْتَخْلِقِي ثَوْبًا حَتَّى تُرَقِّعِيهِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ لَا نَعْرِفُهُ إِلَّا مِنْ حَدِيثِ صَالِحِ بْنِ حَسَّانَ قَالَ مُحَمَّدُ بْنُ إِسْمَاعِيلَ: صَالِحُ بْنُ حَسَّانَ مُنكر الحَدِيث
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, ‘‘সলিহ ইবনু হাস্সান’’ নামক বর্ণনাকারী খুবই দুর্বল। দেখুন- য‘ঈফাহ্ ১২৯৩।
ব্যাখ্যাঃ ইমাম তিরমিযী নিজেই তাঁর জামি‘ কিতাবে এ হাদীসটি উল্লেখ করে হাদীসটির একটি অংশ (وَإِيَّاكِ وَمُجَالَسَةَ الْأَغْنِيَاءِ) এর ব্যাখ্যায় সহীহ মুসলিমের একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন। হাদীসটি হলো : আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
إِذَا نَظَرَ أَحَدُكُمْ إِلٰى مَنْ فُضِّلَ عَلَيْهِ فِى الْمَالِ وَالْخَلْقِ فَلْيَنْظُرْ إِلٰى مَنْ هُوَ أَسْفَلَ مِنْهُ مِمَّنْ فُضِّلَ عَلَيْهِ
‘‘তোমাদের কারো দৃষ্টি যদি এমন ব্যক্তির ওপর নিপতিত হয়, যাকে সম্পদে ও দৈহিক গঠনে বেশি মর্যাদা দেয়া হয়েছে তাহলে সে যেন তার চেয়ে অধিক সম্পদশালীকে বাদ দিয়ে এমন ব্যক্তির দিকে তাকায়, যে তার চেয়ে হীন অবস্থায় রয়েছে।’’ (সহীহ মুসলিম হাঃ ৭৬১৭)
জামি‘ আত্ তিরমিযীতে হাদীসটি উল্লেখের পর ‘আওন ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রহিমাহুল্লাহ)-এর উক্তি উল্লেখ করেছেন, ‘আওন ইবনু ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উতবাহ্ বলেন,
صَحِبْتُ الأَغْنِيَاءَ فَلَمْ أَرَ أَحَدًا أَكْثَرَ هَمًّا مِنِّي أَرٰى دَابَّةً خَيْرًا مِنْ دَابَّتِي وَثَوْبًا خَيْرًا مِنْ ثَوْبِي وَصَحِبْتُ الْفُقَرَاءَ فَاسْتَرَحْتُ
‘‘আমি ধনীদের সাথে উঠা-বসা করেছি। আমি নিজের চেয়ে বেশী বিষণ্ণ অন্য কাউকে অনুভব করি না। (আমার ভারাক্রান্ত হৃদয় হওয়ার কারণ এই যে,) আমি তাদের বাহনকে আমার বাহনের চেয়ে উত্তম দেখতে পাই এবং তাদের কাপড়কে আমার কাপড়ের চেয়ে উত্তম দেখতে পাই। আর আমি গরীব লোকেদের সাথে মেলামেশা করে অনেক বেশী শান্তি অনুভব করেছি।’’
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রিয়তমা স্ত্রী ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে উদ্দেশ্য করে বলেন, হে ‘আয়িশাহ্! তুমি যদি জান্নাতে আমার সাথে আমার মর্যাদার স্তরে থাকতে চাও তাহলে দুনিয়ায় সহজ-সরল বিষয় নিয়েই সন্তুষ্ট থাকো। কারণ নিশ্চয় তুমি শেষ পরিণতির দিকে চলতে থাকা একজন পথিক মাত্র। আর তুমি ধনীরা যেখানে থাকে, উঠাবসা করে সেখান থেকে দূরে থাকবে অর্থাৎ তাদের সাহচার্য থেকে সতর্ক থাকবে। আর তোমার কোন পরিধেয় কাপড় পুরাতন হলে সাথে সাথে ফেলে দিবে না। বরং সেটি সেলাই করে পরিধান করবে।
শারহুস্ সুন্নাহতে বর্ণিত হয়েছে, আনাস ইবনু মালিক বলেন,
رَأَيْتُ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ ؓ وَهُوَ يَوْمَئِذٍ أَمِيرُ الْمُؤْمِنِينَ وَقَدْ رَقَعَ ثَوْبَهُ بِرِقَاعٍ ثَلَاثٍ لَبَّدَ بَعْضَهَا فَوْقَ بَعْضٍ وَقِيلَ خَطَبَ عُمَرُ ؓ وَهُوَ خَلِيفَةٌ وَعَلَيْهِ إِزَارٌ فِيهِ اثْنَا عَشْرَة رُقْعَةً انْتَهٰى.
আমি ‘উমার ইবনুল খত্ত্বাব (রাঃ)-কে দেখলাম, তিনি আমীরুল মু’মিনীন থাকাকালীন তাঁর কাপড়ে তিনটি তালি লাগিয়ে পরিধান করতে দেখেছি। তালিগুলোর কতিপয় তালি অন্যটির লাগানো হয়েছিল। আর এও বলা হয়েছে যে, একদিন খলীফাহ্ ‘উমার (রাঃ) খুত্ববাহ্ দিচ্ছিলেন, এমতাবস্থায় তাঁর কাপড়ে বারোটি তালি ছিল। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৭৮১)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৪৫-[৪২] আবূ উমামাহ্ ইয়াস ইবনু সা’লাবাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা কি শুনছ না? তোমরা কি শুনছ না? (অর্থাৎ- মনোনিবেশে শুনার জন্য) সাদাসিধে জীবন-যাপন করাই ঈমানের অঙ্গ, সাদাসিধে জীবন-যাপন করাই ঈমানের অঙ্গ। (আবূ দাঊদ)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
عَن أبي أُمَامَة
إِياس بن ثعلبةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَلَا تَسْمَعُونَ؟ أَلَا تَسْمَعُونَ أَنَّ الْبَذَاذَةَ مِنَ الْإِيمَانِ أَنَّ الْبَذَاذَةَ مِنَ الْإِيمَانِ؟» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ ‘‘তোমরা কি শুনছ’’ বাক্যাংশটি একাধিকবার বলা দ্বারা এর পরের কথার উপর জোর দেয়া উদ্দেশ্য। ‘‘আল বাযাযাহ্’’ অর্থ হলো খারাপ গঠন বা আকৃতি এবং কাপড়ের জীর্ণতা। তবে এখানে বাযাযাহ্ দ্বারা পোশাক-পরিচ্ছদে নম্রতা প্রকাশকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ জরাজীর্ণ পোশাক পরিধান করার মাধ্যমে নম্রতা প্রকাশ ঈমানের অঙ্গ। কেউ যদি চায় কখনো কখনো বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ এবং গোপনীয়তা রক্ষার উদ্দেশে সুন্দর নয় এমন পোশাক পরিধান করবে তাহলে সেটা করা যেতে পারে। এটাই ‘বাযাযাহ্’ দ্বারা উদ্দেশ্য। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪১৫৭)
যদিও উত্তম হচ্ছে আল্লাহ তাঁর বান্দাকে যে নি‘আমাত দিয়েছেন তা প্রকাশ করা। এজন্যই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إن الله يحب إذا أنعم على عبد نعمة يحب أن يرى أثر نعمته على عبده
‘‘যখন আল্লাহ তা‘আলা তার কোন বান্দাকে নি‘আমাত প্রদান করেন তখন তিনি তার নি‘আমাতের আলামাত তাঁর বান্দার ওপর দেখতে ভালোবাসেন।’’
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৪৬-[৪৩] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি দুনিয়াতে সুনামের পোশাক পরিধান করবে, আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন তাকে অপমানের পোশাক পরাবেন। (আহমাদ, আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ لَبِسَ ثَوْبَ شهرةٍ منَ الدُّنْيَا أَلْبَسَهُ اللَّهُ ثَوْبَ مَذَلَّةٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» . رَوَاهُ أَحْمد وَأَبُو دَاوُد وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যাঃ ইবনুল আসীর বলেনঃ "شُهْرَةٍ" শুহরাহ্ অর্থ হচ্ছে কোন জিনিস প্রকাশ হওয়া। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে সে এমন তার পোশাকের রং অন্যান্য মানুষের পোশাকের রঙের চেয়ে ভিন্ন হওয়ার কারণে তার পোশাক মানুষের মধ্যে প্রসিদ্ধ হয়ে যায়। মানুষ তার পোশাকের দিকে তাদের চোখ তুলে তাকায় এবং সেও মানুষের সামনে দম্ভ ভরে চলে। এমন কথাই আছে নায়লুল আওত্বারে। এ হাদীস উল্লেখিত ‘অপমানের পোশাক’ দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে, সে ব্যক্তি যেমন এমন কাপড় পরিধান করেছে যে কাপড় পরার কারণে সে দুনিয়ায় মানুষের মাঝে সম্মানিত হয়েছে এবং উচ্চ মর্যাদা পেয়েছে। তার বদলে কিয়ামতের দিন তাকে এমন কাপড় পরানো হবে যা তার অপমানের কারণ হবে। এ হাদীস দ্বারা প্রমাণ হয় যে, খ্যাতি প্রকাশ করে এমন পোশাক পরিধান করা হারাম। এ হাদীস দ্বারা শুধু দামী ও উৎকৃষ্ট পোশাকই উদ্দেশ্য নয়, বরং এর দ্বারা সেসব পোশাকও উদ্দেশ্য, যেগুলো সমাজের দরিদ্র শ্রেণীর পরিধেয় পোশাকের বিপরীতে পরা হয় মানুষকে দেখানোর উদ্দেশে। অতঃপর মানুষ তার ঐ পোশাক দেখে অবাক হয়। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪০২৪)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৪৭-[৪৪] উক্ত রাবী [’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য গ্রহণ করবে, সে তাদেরই অন্তরভুক্ত (হয়ে যাবে)। (আহমাদ ও আবূ দাঊদ)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ» . رَوَاهُ أَحْمد وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ ‘‘যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য গ্রহণ করবে’’-এর অর্থে আল মানাভী ও আলকামী বলেনঃ যে প্রকাশ্যে তাদের বেশ-ভূষা গ্রহণ করলো, পোশাক-পরিচ্ছদে তাদের জীবনাচার ও সংস্কৃতি এবং জীবনযাপনে তাদের কিছু কাজকর্ম গ্রহণ করলো। কারী বলেনঃ এর অর্থ হলো, যে তার নিজের পোশাক বা অন্য কিছুতে কাফির, ফাসিক, পাপিষ্ঠ, সূফী ইত্যাদি জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে। কারী বলেন, ‘‘সে তাদের অন্তর্ভুক্ত’’- এ বাক্যাংশ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সাদৃশ্য অবলম্বনকারীরা গুনাহ ও কল্যাণে সাদৃশ্য অবলম্বনকৃতদের অংশীদার হবে। আল কারী বলেনঃ যে ব্যক্তি নেককার ব্যক্তিদের সাথে সাদৃশ্য রাখে তারা সম্মানিত হবে যেভাবে নেককাররা সম্মানিত হন। আর যারা ফাসিকদের সাথে সাদৃশ্য রাখে তারা সম্মানিত হবে না। তবে তাদের ওপর যদি সম্মানিতদের নিদর্শন পরিয়ে দেয়া হয় তাহলে তারা সম্মানিত হবে কিন্তু বাস্তবে সে সম্মানের যোগ্য নয়।
শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ্ (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘‘আস্ সিরাত আল মুসতাকিম’’ গ্রন্থে বলেন, ইমাম আহমাদ (রহিমাহুল্লাহ)-সহ অনেকেই এ হাদীস দ্বারা দলীল দেন যে, কাফির-মুশরিকদের সাদৃশ্য অবলম্বন করা হারাম। যেমনটা আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَإِنَّه مِنْهُمْ ‘‘আর তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে নিশ্চয় তাদেরই একজন।’’ (সূরাহ্ আল-মায়িদাহ্ ৫ : ৫১)
এ কথার সম্পূরক কথা বলেছেন ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর । তিনি বলেন,
من بنى بأرض المشركين وصنع نيروزهم ومهرجانهم وتشبه بهم حتى يموت حشر معهم يوم القيامة
‘‘কেউ যদি মুশরিকদের দেশে বাড়ি নির্মাণ করে, তাদের নওরোয ও মেলায় অংশগ্রহণ করে এবং মৃত্যু পর্যন্ত তাদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করে তাহলে তাকে কিয়ামতের দিন তাদের (মুশরিকদের) সাথেই হাশর করা হবে।’’
মুসলিম যদি মুশরিকদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করে তাহলে সেটা তাকে কুফরীর দিকে নিয়ে যায়। তবে কেউ যদি সব কিছুতে মুশরিকদের সাধে সাদৃশ্য অবলম্বন না করে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের সাদৃশ্য অবলম্বন করে তাহলে যতটুকুতে সে সাদৃশ্য অবলম্বন করেছে ততটুকু দায়ই তার ওপর বর্তাবে। হোক সেটা কুফরী বা কোন সাধারণ গুনাহ কিংবা তাদের কোন নিদর্শন। এ হাদীস দ্বারা ‘আলিমগণ দলীল দিয়েছেন যে, অমুসলিমদের বেশ-ভূষার যে কোন কিছুই গ্রহণ করা মাকরূহ বা অপছন্দনীয়। তিরমিযীতে বর্ণিত অন্য হাদীসে এসেছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَشَبَّهَ بِغَيْرِنَا ‘‘ঐ ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয় যে, আমাদের ছাড়া অন্যদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করে’’।
এ বিষয়ে পরিপূর্ণ কথা রয়েছে শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ্ (রহিমাহুল্লাহ)-এর লেখা ‘‘আস্ সিরাত আল মুসতাকিম’’ গ্রন্থে ‘আল্লামা আল মানবী (রহিমাহুল্লাহ)-এর লেখা ‘‘ফাতহুল কদীর’’ গ্রন্থে এবং কাযী বাশীরুদ্দীন আল কান্নূজী (রহিমাহুল্লাহ)-এর গ্রন্থাবলীতে। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৪৮-[৪৫] সুওয়াইদ ইবনু ওয়াহ্ব (রহঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একজন সাহাবীর পুত্রের সূত্রে তার পিতা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সৌন্দর্যের পোশাক পরিহার করে। আল্লাহ তা’আলা তাকে মর্যাদার পোশাক পরিধান করাবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশে বিবাহ করবে, আল্লাহ তা’আলা তাকে রাজকীয় মুকুট পরিধান করাবেন। (আবূ দাঊদ)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَنْ سُوَيْدِ بْنِ وَهْبٍ عَنْ رَجُلٍ مِنْ أَبْنَاءِ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ أَبِيهِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ تَرَكَ لُبْسَ ثوبِ جمالٍ وَهُوَ يقدرُ عَلَيْهِ وَفِي رَاوِيه: تَوَاضُعًا كَسَاهُ اللَّهُ حُلَّةَ الْكَرَامَةِ وَمَنْ تَزَوَّجَ لِلَّهِ تَوَجَّهُ اللَّهُ تَاجَ الْمُلْكِ . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘সুওয়াইদ ইবনু ওয়াহ্ব’’ এবং তিনি যার কাছে থেকে বর্ণনা করেছেন উভয়েই মাজহূল। দেখুন- য‘ঈফুল জামি‘ ৫৮২২।‘আর জারহু ওয়াত্ তা‘দীল। (জাওয়ামিউল কালিম সফ্টওয়্যার)
ব্যাখ্যাঃ এই অর্থে একটি হাদীস হাসান সনদে তিরমিযী, মুসনাদে আহমাদ, মুসতাদরাক হাকিম, সুনানে বায়হাক্বী এবং ‘ত্ববারানী’র ‘‘কাবীরে’’ বর্ণিত হয়েছে। সে হাদীসটির মূলপাঠ হলো :
مَنْ تَرَكَ اللِّبَاسَ تَوَاضُعًا لِلّٰهِ وَهُوَ يَقْدِرُ عَلَيْهِ دَعَاهُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلٰى رُءُوسِ الْخَلَائِقِ حَتّٰى يُخَيِّرَهٗ مِنْ أَيِّ حُلَلِ الْإِيمَانِ شَاءَ يَلْبَسُهَا
‘‘কেউ যদি সুন্দর বা দামী পোশাক পরিধান করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও শুধু আল্লাহর প্রতি বিনয় প্রকাশ করণার্থে ঐ পোশাক পরিধান না করে তাহলে আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন সকল সৃষ্টির সামনে ডেকে ঈমানদারদের যে পোশাক পরিধান করানো হবে সেই পোশাকের মধ্য থেকে যে কোন পোশাক পরিধান করার জন্য বেছে নেয়ার সুযোগ প্রদান করবেন।’’
হাদীসের শেষ অংশের ব্যাখ্যা হচ্ছে : যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিবাহ করলো অথবা যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের কন্যাকে বিবাহ দিল কিংবা যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোন বস্তুর জোড়া দান করলো। আর মিরকাত গ্রন্থকারের মত অনুযায়ী যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের মর্যাদা থেকে নিচে নেমে এসে তার চেয়ে কম মর্যাদাসম্পন্ন কাউকে (যেমন- ইয়াতীম, মিসকীন) বিবাহ করলো অথবা নিজের দীনদারী সুরক্ষা ও বংশধারা সংরক্ষণ করার উদ্দেশে বিবাহ করলো তাহলে আল্লাহ তার মর্যাদার নিদর্শন স্বরূপ জান্নাতে তাকে তাজ পরাবেন এবং রাজত্ব দান করবেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
মুনযিরী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ বিষয়ে ‘আলিমগণ মতানৈক্য করেছেন। তাদের একদল বলেছেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে তিনি হলুদ রং দ্বারা তার দাড়িতে খিযাব লাগাতেন। অন্যরা বলেছেন যে, তার পোশাককে হলুদ করতেন এবং হলুদ রংয়ের পোশাক পরতেন। শাওকানী তাঁর ‘‘নায়লুল আওত্বার’’ গ্রন্থে বলেছেন, আবূ দাঊদ ও নাসায়ী কর্তৃক বর্ণিত বর্ণনার শেষে উল্লেখিত বাড়তি অংশ পূর্বোক্ত দ্বিতীয় মতটিকে শক্তিশালী করে। বাড়তি অংশ বলতে তিনি মূলত বুঝিয়েছেন ‘‘তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কখনো তার পুরো পোশাককে এমনকি পাগড়ীকে পর্যন্ত হলুদ রং দ্বারা রঙিন করতেন’’-এই অংশটুকু। এ অংশটুকু ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিমের বর্ণনায় নেই। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪০৬০)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৪৯-[৪৬] আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) পোশাক সংক্রান্ত হাদীসটি এই একই সূত্রে মু’আয ইবনু আনাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন।)
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَرَوَى التِّرْمِذِيُّ مِنْهُ عَنْ مُعَاذِ بْنِ أَنَسٍ حَدِيث اللبَاس
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৫০-[৪৭] ’আমর ইবনু শু’আয়ব (রহঃ) তাঁর পিতা হতে, তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা এটা পছন্দ করেন যে, তিনি যে নি’আমাত বান্দাকে দান করেছেন, তার নিদর্শন যেন তার উপর প্রকাশ পায়। (তিরমিযী)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ أَنْ يُرَى أَثَرَ نِعْمَتِهِ على عَبده» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ এখানে আল্লাহর নি‘আমাত বলতে বান্দাকে দেয়া তার ইহসান, অনুগ্রহ ও মর্যাদা বুঝানো হয়েছে। আল্লাহর দেয়া এসব নি‘আমাত প্রকাশ করার অর্থ হচ্ছে হচ্ছে সে সবের শুকরিয়া আদায় করা আর এসব নি‘আমাত গোপন করার অর্থ হচ্ছে সেসব অস্বীকার করা। মুযহির বলেনঃ আল্লাহ তা‘আলা যখন তার কোন বান্দাকে তার পক্ষ থেকে দুনিয়ার কোন নি‘আমাত দান করেন, অতঃপর আল্লাহর পক্ষ থেকে তার প্রতি প্রদত্ত নি‘আমাত প্রকাশ করণার্থে তার মর্যাদা ও অবস্থানের সাথে প্রযোজ্য কোন পোশাক পরিধান করে এবং যাকাত-সাদাকা প্রত্যাশীরা যেন চিনতে পারে সেজন্য তার প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত নি‘আমাত প্রকাশ করে। একইভাবে ‘আলিমগণও তাদের নিকটে থাকা জ্ঞান প্রকাশ করবে যাতে সাধারণ মানুষ তাদের থেকে জ্ঞান অর্জন করে উপকার লাভ করতে পারে। মোটকথা হচ্ছে, যাকে যে নি‘আমাত প্রদান করা হয়েছে সে অনুযায়ী পোশাক-পরিচ্ছদ ব্যবহার করা আল্লাহ পছন্দ করেন। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৮১৯)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৫১-[৪৮] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে বেড়াতে এসে এলোমেলো বিশিষ্ট এক লোককে দেখতে পেলেন তার মাথার চুলগুলো ছিল বিক্ষিপ্ত। তখন তিনি বললেনঃ এ লোকটি কি এমন কোন জিনিসই পায় না যা দ্বারা সে নিজের মাথার চুলগুলো পরিপাটি করে নিতে পারে? আরেক ব্যক্তিকে দেখলেন, তার পরনে রয়েছে ময়লা জামা। তার সম্পর্কে বললেনঃ এ লোকটি কি এমন কিছু পায় না, যা দ্বারা সে নিজের কাপড় ধুয়ে নিতে পারে? (আহমাদ ও নাসায়ী)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: أَتَانَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ زَائِرًا فَرَأَى رَجُلًا شَعِثًا قد تفرق شعرُه فَقَالَ: «مَا كَانَ يَجِدُ هَذَا مَا يُسَكِّنُ بِهِ رَأْسَهُ؟» وَرَأى رجلا عَلَيْهِ ثيابٌ وسِخةٌ فَقَالَ: «مَا كَانَ يَجِدُ هَذَا مَا يَغْسِلُ بِهِ ثَوْبَهُ؟» . رَوَاهُ أَحْمد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীসে কাপড় ধোয়ার উপাদান হিসেবে সাবান, পটাশ বা শুধু পানির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মাথার চুল ধুয়ে পরিষ্কার করা এবং তেল দিয়ে মাথা আঁচড়ানো ইত্যাদি মুস্তাহাব। এ হাদীস দ্বারা আরো প্রমাণিত হয় যে, শরীর ও কাপড়ের উপর লেগে থাকা প্রকাশ্য ময়লা থেকে পরিষ্কার করা কর্তব্য। ইমাম শাফি‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, যার পোশাক পরিষ্কার থাকে তার দুশ্চিন্তা কম হয়। এ হাদীসে পোশাক ধোয়ার আদেশ রয়েছে। যদিও তা শুধু পানি দ্বারা হোক না কেন। একই কথা বলেছেন ‘আল্লামা আল ‘আযীযী তাঁর ‘‘আস্ সিরাজ আল্ মুনীর’’ গ্রন্থে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪০৫৮)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৫২-[৪৯] আবুল আহওয়াস (রহঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একদিন আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এলাম। সে সময় আমার পরনে ছিল সাদাসিধে কাপড়। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তোমার সম্পদ আছে কি? আমি বললামঃ হ্যাঁ, আছে। এবার জিজ্ঞেস করলেন : কী সম্পদ আছে? আমি বললামঃ সব রকম মাল আছে- আল্লাহ তা’আলা আমাকে উট, গরু, ছাগল, ঘোড়া, গোলাম প্রভৃতি দান করেছেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আল্লাহ তা’আলা যখন তোমাকে সম্পদ দান করেছেন, তখন আল্লাহ প্রদত্ত নি’আমাত ও তাঁর অনুগ্রহের নিদর্শন তোমার মধ্যে দৃশ্যমান হওয়া উচিত। (আহমাদ, নাসায়ী; আর এটা শারহুস্ সুন্নায় মাসাবীহের শব্দে বর্ণিত হয়েছে।)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَن أبي الأحوصِ عَن أبيهِ قَالَ: أَتَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَعَلَى ثَوْبٌ دُونٌ فَقَالَ لِي: «أَلَكَ مَالٌ؟» قُلْتُ: نَعَمْ. قَالَ: «مِنْ أَيِّ الْمَالِ؟» قُلْتُ: مِنْ كُلِّ الْمَالِ قَدْ أَعْطَانِي اللَّهُ منَ الإِبلِ وَالْبَقر وَالْخَيْلِ وَالرَّقِيقِ. قَالَ: «فَإِذَا آتَاكَ اللَّهُ مَالًا فَلْيُرَ أَثَرُ نِعْمَةِ اللَّهِ عَلَيْكَ وَكَرَامَتِهِ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالنَّسَائِيُّ وَفِي شَرْحِ السُّنَّةِ بِلَفْظِ الْمَصَابِيحِ
ব্যাখ্যাঃ হাদীসে উল্লেখিত লোকটির পরনে যে পোশাক ছিল তা তার মান-মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। হাদীসে ‘‘কী সম্পদ আছে?’’-এই জিজ্ঞাসার উদ্দেশ্য হলো কী কী সম্পদ আছে তা জানা। ‘রক্বীক’ বলতে দাস-দাসী বুঝানো হয়েছে। এ হাদীস দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, তুমি ধনী এবং আল্লাহ তোমাকে অনেক নি‘আমাত দিয়েছেন সেটা মানুষকে জানানোর জন্য উত্তম পোশাক পরিধান করবে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪০৫৯; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ২০০৬)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৫৩-[৫০] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদিন জনৈক ব্যক্তি লাল বর্ণের দু’টি কাপড় পরে বিদায়কালে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সালাম করল। কিন্তু তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার সালামের জবাব দিলেন না। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: مَرَّ رَجُلٌ وَعَلَيْهِ ثَوْبَانِ أَحْمَرَانِ فَسَلَّمَ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَمْ يَرُدَّ عَلَيْهِ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘আবূ ইয়াহ্ইয়া আল কত্তবান’’ নামে একজন য‘ঈফ বর্ণনাকারী আছে। দেখুন- তুহফাতুল আহওয়াযী ৮ম খন্ড, ৭৫ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ যারা লাল পোশাক পরিধান করাকে মাকরূহ মনে করেন তারা এ হাদীস দ্বারা প্রমাণ পেশ করেন। তবে যারা লাল পোশাক পরিধান করাকে মুবাহ (বৈধ) মনে করেন তারা এর উত্তরে বলেন, লাল পোশাক পরিধান করা মাকরূহ হওয়ার পক্ষ পেশ করা হাদীস য‘ঈফ, যা দ্বারা দলীল সাব্যস্ত করা সঠিক নয়। পুরুষদের জন্য লাল পোশাক পরিধান করার বৈধতার হাদীস পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, শারী‘আয় নিষিদ্ধ এমন কাজে লিপ্ত কোন ব্যক্তির সালামের উত্তর না দেয়া জায়িয। এই উদ্দেশে যে, সে যেন বুঝাতে পারে সে অন্যায় বা গুনাহের কাজ করছে বিধায় তার সালামের উত্তর দেয়া হয়নি। ইবনু রাসলান বলেনঃ গুনাহে লিপ্ত কোন ব্যক্তির সালামের উত্তরে এ কথা বলা মুস্তাহাব যে, আমি তোমার সালামের উত্তর দেইনি, কারণ তুমি গুনাহের কাজে লিপ্ত আছো। একইভাবে বিদ্‘আতীদের এবং প্রকাশ্যে গুনাহকারীদের ধমক দেয়ার উদ্দেশে তাদেরকে সালাম না দেয়া মুস্তাহাব। এজন্য কা‘ব ইবনু মালিক আবূ কতাদাহ্ -কে সালাম দেয়ার প্রসঙ্গে বলেন,
فَسَلَّمْتُ عَلَيْهِ فَوَاللهِ مَا رَدَّ عَلَىَّ السَّلاَمَ
অর্থাৎ- ‘‘আমি তাকে সালাম দিলাম কিন্তু আল্লাহর কসম তিনি আমার সালামের উত্তর দেননি’’- (সহীহ মুসলিম হাঃ ৭১৯২)। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪০৬৫; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৮০৭)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৫৪-[৫১] ’ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ) হতে বর্ণিত। আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি অত্যধিক লাল বর্ণের গদির উপর আরোহণ করি না, হলুদ রঙের কাপড় পরিধান করি না এবং রেশমযুক্ত জামাও পরিধান করি না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরো বলেন, জেনে রাখো! পুরুষদের আতর তাই যাতে খোশবু আছে, রং নেই। পক্ষান্তরে নারীদের আতর তাই যাতে রং আছে, কিন্তু সুঘ্রাণ ছড়ায় না। (আবূ দাঊদ)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَنْ عِمْرَانَ بْنِ حُصَيْنٍ أَنَّ نَبِيَّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا أَرْكَبُ الْأُرْجُوَانَ وَلَا أَلْبَسُ الْمُعَصْفَرَ وَلَا أَلْبَسُ الْقَمِيصَ الْمُكَفَّفَ بِالْحَرِيرِ» وَقَالَ: «أَلَا وَطِيبُ الرِّجَالِ رِيحٌ لَا لَوْنَ لَهُ وَطِيبُ النِّسَاءِ لَوْنٌ لَا ريح لَهُ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ পুরুষের জন্য রংহীন সুঘ্রাণযুক্ত; যেমন মিশ্ক, আতর, কাফূর, উদ ইত্যাদি বৈধ এবং নারীদের জন্য সুঘ্রাণহীন রং যেমন যা‘ফরান, খালূক, মেহেদী ইত্যাদি ব্যবহার করা বৈধ। ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেছেন,
طِيبُ الرِّجَالِ مَا ظَهَرَ رِيحُهٗ وَخَفِيَ لَوْنُهٗ وَطِيبُ النِّسَاءِ مَا ظَهَرَ لَوْنُهٗ وَخَفِيَ رِيحُهٗ
‘‘পুরুষের জন্য সর্বোত্তম সুগন্ধি হচ্ছে ঐ জিনিস যার ঘ্রাণ প্রকাশ পায় কিন্তু রং অপ্রকাশ্য থাকে। আর নারীর জন্য সর্বোত্তম সুগন্ধি হচ্ছে ঐ জিনিস যার রং প্রকাশ পায় কিন্তু ঘ্রাণ অপ্রকাশ্য থাকে।’’ (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪০৪৪)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৫৫-[৫২] আবূ রায়হানাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দশটি কাজ করা থেকে নিষেধ করেছেন। যথা- ১. দাঁত চিকন করা, ২. শরীরে উল্কি লাগানো, ৩. (সৌন্দর্য বিকশিতের জন্য) মুখ পশম উঠানো, ৪. কাপড়ের আবরণ ব্যতীত দু’জন পুরুষের একই চাদরের নিচে শয়ন করা, ৫. কাপড়ের আবরণ ছাড়া দু’জন মহিলার একই চাদরে শয়ন করা, ৬. অনারবদের ন্যায় জামার নিচে রেশম ব্যবহার করা, ৭. অথবা অনারবদের ন্যায় জামার কাঁধে রেশম ব্যবহার করা, ৮. ছিনতাই করা। ৯. চিতাবাঘের চামড়ার গদির উপর সওয়ার হওয়া এবং ১০. আংটি ব্যবহার করা, তবে শাসকের জন্য তা পরিধান বৈধ। (আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَن أبي ريحانةَ قَالَ: نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ عَشْرٍ: عَنِ الْوَشْرِ وَالْوَشْمِ وَالنَّتْفِ وَعَنْ مُكَامَعَةِ الرَّجُلِ الرَّجُلَ بِغَيْرِ شِعَارٍ وَمُكَامَعَةِ الْمَرْأَةِ الْمَرْأَةَ بِغَيْرِ شِعَارٍ وَأَنْ يَجْعَلَ الرَّجُلُ فِي أَسْفَلِ ثِيَابِهِ حَرِيرًا مِثْلَ الْأَعَاجِمِ أَوْ يجعلَ على مَنْكِبَيْه حَرِير مِثْلَ الْأَعَاجِمِ وَعَنِ النُّهْبَى وَعَنْ رُكُوبِ النُّمُورِ وَلُبُوسِ الْخَاتَمِ إِلَّا لِذِي سُلْطَانٍ . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ হলো এর সনদে ‘‘আবূ আমির’’ নামের একজন বর্ণনাকারী আছে। যার নাম ‘আবদুল্লাহ ইবনু জাবির। তাকে কেউ বিশ্বস্ত বলেনি। বিস্তারিত দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ৬৫৩৯।
ব্যাখ্যাঃ (الْوَشْرِ) ‘‘আল ওয়াশ্র’’ বলা হয় দাঁতকে ধারালো করা, দাঁতের মাথাগুলো চিকন করা যা মহিলারা বেশি করে থাকে। এরূপ করতে নিষেধ করা হয়েছে এজন্য যে, এর মধ্যে প্রতারণা রয়েছে এবং এর দ্বারা আল্লাহর সৃষ্টিকে পরিবর্তন করা হয়। (الْوَشْمِ) ‘‘আল ওয়াশ্ম’’ বলা হয়ে সুই দ্বারা মানবদেহের চামড়া ফুটো করে রক্ত বের করা। তারপর সেই স্থানে কাজল বা অন্য কিছু দিয়ে রঙিন করা যার মাধ্যমে আল্লাহ তার দেহে যে রং দিয়ে তাকে বানিয়েছেন তা পরিবর্তন করা। এটিকে বর্তমানে উল্কি আঁকার সাথে তুলনা করা যেতে পারে। (النَّتْفِ) ‘‘আন্ নাত্ফ’’ বলতে বুঝানো হয় নারীদের চেহারায় কোন অনাকাঙিক্ষত কোন লোম থাকলে তা তুলে ফেলা অথবা দাড়ি তুলে ফেলা বা দাড়ির সাদা চুলগুলো তুলে ফেলা। অথবা বিপদাপদে অধৈর্য হয়ে চুল ছেঁড়া।
দু’জন পুরুষের মাঝে কোন আবরণ ছাড়াই এক কাপড়ের নিচে শোয়া বলতে ইবনুল ‘আরাবী বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যাদেরকে বিবাহ করা হারাম এমন দু’জন উলঙ্গ হয়ে একই কাপড়ের নিচে শোয়া। চার আঙ্গুল পরিমাণ রেশম পরার বৈধতার প্রমাণ পাওয়া যায় বিধায় এর বেশি রেশমী কাপড় পরিধান করা পুরুষদের জন্য নিষেধ। যারা অনারব তারা তাদের পোশাকের নিচে রেশমের কাপড় পরতো। সম্ভবত তারা অহংকার ও গর্ববশতঃ তাদের পোশাকের সৌন্দর্যের উপরেও রেশমী কাপড় পরতো। মুযহির বলেনঃ পোশাকের উপরে বা নিচে সকল ক্ষেত্রে পুরুষের জন্য রেশমী কাপড় পরিধান করা হারাম। আর অনারব মূর্খদের অভ্যাস ছিল তারা তাদের পোশাকের নিচে তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আরামের জন্য ছোট রেশমী কাপড় পরিধান করতো। চার আঙ্গুলের বেশি পরিমাণ রেশমী কাপড় কোন ব্যাজ বা চিহ্ন হিসেবে জামার কাঁধে ব্যবহার করাও নিষেধ।
শাসক ছাড়া অন্য কারও পক্ষ আংটি পরিধান করা সম্পর্কে হাফিয ইবনু হাজার ‘আসকালানী তাঁর ‘ফাতহুল বারী’ গ্রন্থে লিখেছেন : ‘‘আবূ রায়হানা-এর এ হাদীস বর্ণনা করার পর ইমাম তাহাভী বলেন, অনেকে মত প্রকাশ করেছেন যে, শাসক ছাড়া অন্য কারও জন্য আংটি পরিধান করা মাকরূহ। অন্যদল ‘আলিম আবার তাদের এই মতের বিরোধিতা করে আংটি পরাকে বৈধ বলেছেন। এদের দলীল হচ্ছে : আনাস থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাঁর আংটি খুলে ফেলে দিলেন তখন তার দেখাদেখি সাহাবীগণও তাদের আংটি খুলে ফেলে দিলেন। এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে যে ব্যক্তি শাসক বা প্রশাসক নন এমন ব্যক্তিও আংটি পরতেন। অতঃপর তিনি অনেক সাহাবী ও তাবি‘ঈর কথা উল্লেখ করলেন যারা আংটি পরিধান করতেন অথচ তারা শাসক ছিলেন না।’’ এ হাদীসে সুলতান বা শাসক বলতে এমন ব্যক্তিকেও বুঝানো হয়েছে যিনি কোন বিষয়ে ক্ষমতা রাখেন যে ক্ষমতা প্রকাশ করার জন্য সীলযুক্ত আংটি প্রয়োজন। শুধু সর্বোচচ ক্ষমতাধর যেমন রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী ইত্যাদি বুঝানো হচ্ছে না। এখানে আংটি দ্বারা এমন আংটিকে বুঝানো হয়েছে যা সীল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যদিও মাঝে মাঝে এটি এমনি এমনিও পরা হয়। কেউ যদি সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য রূপার আংটি পরে যা সীল দেয়ার কাজে ব্যবহার করা হয় না তাহলে সেই আংটি এ হাদীসের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে না। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪০৪৫)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৫৬-[৫৩] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে স্বর্ণের আংটি, রেশমের জামা পরিধান এবং গদি ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ, নাসায়ী ও ইবনু মাজাহ)[1]
আবূ দাঊদ-এর অপর এক রিওয়ায়াতে বলেনঃ ’’আমাকে উর্জুওয়ান (অত্যধিক লাল বর্ণের) গদি ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন।’’
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَن عَليّ قَالَ: نَهَانِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ خَاتَمِ الذَّهَبِ وَعَنْ لُبْسِ الْقَسِّيِّ وَالْمَيَاثِرِ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ وَفِي رِوَايَة لأبي دَاوُد قَالَ: نهى عَن مياثر الأرجوان
ব্যাখ্যাঃ স্বর্ণের আংটি পরা পুরুষদের জন্য হারাম, নারীদের জন্য হারাম নয়। কারণ নারীদের জন্য স্বর্ণ ব্যবহার হালাল কিন্তু পুরুষদের জন্য হারাম। কিসসী পোশাক বলতে মূলত রেশমী সূতা দ্বারা সেলাই করা কাপড়কে বুঝায়। (قَسِّىِّ) কিসসী মূলত মিসরের একটি অঞ্চলের নাম। ঐ স্থান থেকে এ কাপড়গুলো আনা হয় বিধায় এগুলো কিস্সী কাপড় নামে প্রসিদ্ধ হয়েছে। হাদীসে উল্লেখিত ‘‘আল মায়াসির’’ হলো ‘‘আল মীসারাহ্’’ শব্দের বহুবচন। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে আরোহী ব্যক্তি তার বসার গদির উপরে ব্যবহার করে এমন এক ধরনের ছোট বালিশ। এটি যদি রেশমী কাপড় দ্বারা তৈরি করা হয় তাহলে তা ব্যবহার করা নিষেধ। সাধারণভাবে এ ধরনের বালিশ ব্যবহার করা বিলাসিতা ও সৌখিনতার নামান্তর। তাই হয়তো এগুলো হালকাভাবে নিষেধ করা হয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৫৭-[৫৪] মু’আবিয়াহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা রেশমী কাপড় এবং চিতাবাঘের (চামড়ায় তৈরি) গদির উপর সওয়ার হয়ো না। (আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَنْ مُعَاوِيَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تَرْكَبُوا الْخَزَّ وَلَا النِّمَارَ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যাঃ (خَزَّ) ‘‘খায’’ বলতে আরোহণকৃত পশুর পিঠে রাখা জীন বা গদিকে বুঝানো হয় যার আবরণের কাপড় পশম দ্বারা বয়ন করা হয়। যদি এখানে ‘খায’ দ্বারা পশম বলতে তৈরিকৃত কাপড়কে বুঝানো হয় তাহলে তা ব্যবহার করা বৈধ। কারণ তা সাহাবী ও তাবি‘ঈগণ পরিধান করেছেন। তবে এতে যদি অহংকার ও গর্ব প্রকাশার্থে বুতাম ও অন্যান্য উপাদান থাকে যা অনারবরা ব্যবহার করে তাহলে তা তানযীহী নিষেধাজ্ঞার হুকুম রাখে। আর যদি ‘খায’ দ্বারা অন্য এক ধরনের কাপড় যা রেশমী কাপড়ের সংমিশ্রণে তৈরি করা হয়, তাহলে তা হারাম। তখন তাহরীমী নিষেধাজ্ঞার হুকুম রাখে। আর (نِمَارَ) ‘‘নিমার’’ শব্দটি ‘নামিরা’-এর বহুবচন। এটির মূল অর্থ চিতাবাঘ (যে বাঘের গায়ে ডোড়াকাটা দাগ থাকে) হলেও এখানে এর দ্বারা চিতাবাঘকে না বুঝিয়ে এর গায়ের চামড়া ব্যবহার করার কথা বুঝিয়েছে। এই চামড়ায় তৈরি কিছুতে বসা নিষেধ করা হয়েছে এজন্য যে, এতে বসলে বিলাসিতাভাব ও অহংকার চলে আসতে পারে অথবা এটি অহংকারীদের সংস্কৃতি। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৫৮-[৫৫] বারা’ ইবনু ’আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লাল বর্ণের গদি ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ: أَنَّ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ الْمِيثَرَةِ الْحَمْرَاءِ. رَوَاهُ فِي شرح السّنة
ব্যাখ্যাঃ ‘‘আল মীসারাহ্’’ বলতে মূলত চতুষ্পদ প্রাণীর চামড়াকে বুঝানো হয়। এখানে লাল চামড়া দ্বারা তৈরি গদির কথা বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে পূর্বে আলোচনা অতিবাহিত হয়েছে। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৫৯-[৫৬] আবূ রিমসাহ্ আত্ তায়মী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এলাম, তখন তিনি সবুজ বর্ণের দু’টি কাপড় পরিহিত অবস্থায় ছিলেন। সে সময় তাঁর চুলে (কিয়দংশে) বার্ধক্য প্রকাশ পাচ্ছিল। তবে তাঁর বার্ধক্য চিহ্ন ছিল লাল আভায়। (তিরমিযী)[1]
আর আবূ দাঊদ-এর বর্ণনায় আছে, তিনি ছিলেন বাবরি চুলবিশিষ্ট এবং তা ছিল মেহেদীতে রঞ্জিত।
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَن أبي رِمْثةَ التيميِّ قَالَ: أَتَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَعَلَيْهِ ثَوْبَانِ أَخْضَرَانِ وَلَهُ شَعَرٌ قَدْ عَلَاهُ الشَّيْبُ وَشَيْبُهُ أَحْمَرُ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَفِي رِوَايَةٍ لِأَبِي دَاوُدَ: وَهُوَ ذُو وَفْرَةٍ وَبِهَا رَدْعٌ من حناء
ব্যাখ্যাঃ (ثَوْبَانِ أَخْضَرَانِ) দ্বারা সবুজ রঙে রঞ্জিত কাপড়কে বুঝানো হয়েছে। আর জান্নাতের অধিবাসীদের অধিকাংশের পোশাকও হবে এই রঙের। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ
عَالِيَهُمْ ثِيَابُ سُنْدُسٍ خُضْرٌ
‘‘তাদের আবরণ হবে চিকন সবুজ রেশম’’- (সূরাহ্ আদ্ দাহর/আল ইনসান ৭৬ : ২১)। চোখে দেখার জন্য সবুজ রং সর্বাধিক উপকারী এবং দর্শকদের চোখে তা খুবই সুন্দর। আল ইসাম বলেন, এখানে দুটি কাপড় দ্বারা লুঙ্গি ও চাদর বুঝানো হয়েছে। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৮১২)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৬০-[৫৭] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ ছিলেন। তখন তিনি উসামাহ্ (রাঃ)-এর উপর ভর দিয়ে বাইরে এলেন। সে সময় তাঁর গায়ে একটি ক্বিত্বরি (ইয়ামান দেশীয়) চাদর ছিল, যা তিনি উভয় কাঁধে জড়িয়ে পরেছিলেন এবং (এমতাবস্থায়) তিনি লোকেদেরকে নিয়ে সালাত আদায় করলেন। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَنْ أَنَسٍ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ شَاكِيًا فَخَرَجَ يَتَوَكَّأُ عَلَى أُسَامَةَ وَعَلَيْهِ ثَوْبُ قِطْرٍ قَدْ تَوَشَّحَ بِهِ فَصَلَّى بهم. رَوَاهُ فِي شرح السّنة
ব্যাখ্যাঃ ক্বিত্বরি কাপড় বলতে এক ধরনের ইয়ামানী কাপড় বুঝানো হয়েছে যা ডোরা কাটা ডিজাইনের। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কাপড়টি চাদরের মতো করে দুই কাঁধের উপর রাখেন। কেউ কেউ বলেছেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) চাদরটি ডান হাতের নিচ দিয়ে এনে বাম কাঁধের উপর রাখেন যেভাবে ইহরাম পরিধানকারীরা রাখেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৬১-[৫৮] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ব্যবহারের দু’টি ক্বিত্বরি মোটা কাপড় ছিল। যখন তিনি (তা পরিধান করে) বসতেন এবং ঘর্মাক্ত হতেন, তখন কাপড় দু’টি তাঁর উপরে ভারী হয়ে যেত। (এমনি সময়) সিরিয়া হতে জনৈক ইয়াহূদীর কিছু কাপড় এলো। তখন আমি বললামঃ আপনি যদি কাউকে তার কাছে পাঠিয়ে সাধ্যমত দু’টি কাপড় ক্রয় করতেন মূল্য পরিশোধের শর্তে, তাহলে কতই না ভালো হত! অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এক ব্যক্তিকে তার (ইয়াহূদীর) নিকট পাঠালেন। তখন সে (ইয়াহূদী) বলল : আমি তোমার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছি, তুমি আমার মালটি আত্মসাৎ করতে চেয়েছ। (ইয়াহূদী বাহ্যত কথাটি প্রেরিত লোকটিকে বললেও প্রকৃতপক্ষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কেই উদ্দেশ্য করে বলেছিল। লোকটি এসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে উক্তিটি জানাল।) তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সে (ইয়াহূদী) মিথ্যা বলেছে। সে নিশ্চিতভাবে জানে যে, আমি তাদের সকলের চেয়ে অধিক আল্লাহভীরু এবং আমানাত রক্ষাকারী। (তিরমিযী ও নাসায়ী)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: كَانَ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثَوْبَانِ قِطْرِيَّانِ غَلِيظَانِ وَكَانَ إِذا قعد فرق ثَقُلَا عَلَيْهِ فَقَدِمَ بَزٌّ مِنَ الشَّامِ لِفُلَانٍ الْيَهُودِيِّ. فَقُلْتُ: لَوْ بَعَثْتَ إِلَيْهِ فَاشْتَرَيْتَ مِنْهُ ثَوْبَيْنِ إِلَى الْمَيْسَرَةِ فَأَرْسَلَ إِلَيْهِ فَقَالَ: قَدْ عَلِمْتُ مَا تُرِيدُ إِنَّمَا تُرِيدُ أَنْ تَذْهَبَ بِمَالِي فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «كَذَبَ قَدْ عَلِمَ أَنِّي مِنْ أَتْقَاهُمْ وآداهُم للأمانة» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যাঃ হাদীসের শেষের অংশে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ঐ ইয়াহূদী মিথ্যা বলেছে। কারণ সে তাদের ধর্মীয় গ্রন্থ তাওরাতের মাধ্যমে জানে যে, আমি মানুষের মাঝে সবচেয়ে তাকওয়াবান মানুষ। এটা জানার পরেও সে হিংসার বশবর্তী হয়ে এরূপ বলেছে। তারা সবকিছু পরিষ্কারভাবে জানত, যেমনটা আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَعْرِفُونَهচ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَاءَهُمْ
‘‘যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তারা তাঁকে (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে সেভাবেই চেনে যেভাবে তারা তাদের সন্তানদের চেনে’’- (সূরাহ্ আল বাকারাহ্ ২ : ১৪৬)। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৬২-[৫৯] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর ইবনুল ’আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এমন অবস্থায় দেখতে পেলেন যে, তখন আমার পরনে ছিল (গোলাপী রঙের) একটি কাপড়। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, এটা কী? তাঁর এ প্রশ্ন হতে আমি বুঝতে পারলাম যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এটাকে অপছন্দ করেছেন। সুতরাং আমি তৎক্ষণাৎ ফিরে এলাম এবং কাপড়খানাকে জ্বালিয়ে ফেললাম। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তোমার কাপড়টি কী করেছ? বললাম, তাকে জ্বালিয়ে ফেলেছি। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তুমি কেন তা তোমার পরিবারের কোন মহিলাকে পরিধান করালে না? কেননা তা মহিলাদের ব্যবহারে কোন দোষ নেই। (আবূ দাঊদ)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ قَالَ: رَآنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَعَلَى ثَوْبٌ مَصْبُوغٌ بِعُصْفُرٍ مُوَرَّدًا فَقَالَ: «مَا هَذَا؟» فَعَرَفْتُ مَا كَرِهَ فَانْطَلَقْتُ فَأَحْرَقْتُهُ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا صَنَعْتَ بِثَوْبِكَ؟» قُلْتُ: أَحْرَقْتُهُ قَالَ: «أَفَلَا كَسَوْتَهُ بَعْضَ أَهْلِكَ؟ فَإِنَّهُ لَا بَأْسَ بِهِ لِلنِّسَاءِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘ইসমা‘ঈল ইবনু ‘আইয়্যাশ’’ নামের বর্ণনাকারী। তার ব্যাপারে অনেক কথা আছে। মুনযিরী বলেনঃ (فيه مقال)। আরও একজন বর্ণনাকারী আছে যার নাম ‘‘শুরাহবীল ইবনু মুসলিম’’, ইয়াহ্ইয়া ইবনু মা‘ঈন তাকে য‘ঈফ বলেছেন। দেখুন- ‘আওনুল মা‘বূদ ১১/৮০ পৃঃ, ৪০৬৮ নং হাদীসের পর্যালোচনা।
ব্যাখ্যাঃ এ হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত হয় যে, হলুদ রং দ্বারা রঞ্জিত জামা পরিধান করা নারীদের জন্য জায়িয কিন্তু পুরুষের জন্য জায়িয নয়। এ হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনুল কইয়্যিম (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহ গ্রন্থে ‘আলী ইবনু আবূ ত্বালিব (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্বিসসী কাপড়, যা‘ফরান দ্বারা রঞ্জিত হলুদ-লাল কাপড় পরতে, স্বর্ণের আংটি (সীল) ব্যবহার করতে এবং রুকূ‘তে কুরআন তিলাওয়াত করতে নিষেধ করেছেন।
‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রাঃ) কর্তৃক সহীহ মুসলিমেই হাদীস বর্ণিত হয়েছে যেখানে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রাঃ)-এর গায়ে হলুদ রং দ্বারা লাল রং করা দু’টি কাপড় দেখতে পান। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এগুলো কাফিরদের পোশাক। এগুলো তুমি পরবে না।
‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রাঃ) কর্তৃক সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, তিনি বলেন, ‘‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার গায়ে দু’টি আসফার দ্বারা (লাল) রঙ করা কাপড় (লুঙ্গি ও চাদর) দেখতে পান। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ তোমার আম্মা কি তোমাকে এ কাপড় পরতে নির্দেশ দিয়েছেন? আমি বললামঃ আমি কি কাপড় দু’টি ধুয়ে নেব? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ না, বরং কাপড় দু’টি পুড়িয়ে ফেল।’’ এ হাদীসগুলো প্রমাণ করে যে, লাল রঙের কাপড় পরিধান করা হারাম। যদিও লাল রঙের কাপড় পরিধানের বৈধতার পক্ষও কিছু বর্ণনা এসেছে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪০৬৪)
উপরের হাদীসগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে মুসলিম ফকীহগণ বিভিন্ন মত পোষণ করেছেন। এ বিষয়ে ‘আল্লামা নাবাবী বলেনঃ হলুদ রং দ্বারা রঞ্জিত পোশাকের বিষয়ে ‘উলামায়ে কিরাম বিভিন্ন মত পোষণ করেছেন। সাহাবী, তাবি‘ঈ ও পরবর্তী যুগের অধিকাংশ ‘আলিম এরূপ পোশাক জায়িয ও মুবাহ বলেছেন। ইমাম শাফি‘ঈ, আবূ হানীফাহ্ ও মালিক (রহিমাহুল্লাহ)-এর এ মত। তবে ইমাম মালিক বলেছেনঃ অন্য রঙের পোশাক উত্তম।
অন্য বর্ণনায় তিনি বলেনঃ বাড়িতে বা প্রাঙ্গণে এ পোশাক পরা জায়িয, কিন্তু সমাবেশ বা অনুষ্ঠানে এরূপ পোশাক ব্যবহার মাকরূহ। কোন কোন ‘আলিম বলেছেনঃ এগুলো ব্যবহার করা মাকরূহ তানযীহী বা অনুচিত। নিষেধাজ্ঞা জ্ঞাপক হাদীসগুলোকে তাঁরা এ অর্থে গ্রহণ করেছেন। কারো মতে কাপড় বোনার পরে রং করলে তা নিষিদ্ধ হবে। কারো মতে শুধু হজ্জ ও ‘উমরার সময়ে তা নিষিদ্ধ।
এ হাদীস দ্বারা আরও সাব্যস্ত হয় যে, কোন কাপড়, পোশাক বা ব্যবহার্য সামগ্রী কোন একটি নির্দিষ্ট গ্রম্নপের লোকেদের জন্য নিষিদ্ধ হলেও অন্য কোন গ্রম্নপের লোকেদের জন্য তা ব্যবহার জায়িয হলে সেগুলো ধ্বংস না করে তাদেরকে দিয়ে দেয়া উচিত। এ হাদীসে দেখা যায় এই নির্দিষ্ট রঙের কাপড় পুরুষদের জন্য হারাম হলেও নারীদের জন্য হারাম নয়। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৬৩-[৬০] হিলাল ইবনু ’আমির (রহঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মিনায় একটি খচ্চরের উপরে বসে খুত্ববাহ্ (ভাষণ) দান করতে দেখেছি। সে সময় তাঁর গায়ে ছিল লাল বর্ণের চাদর, আর ’আলী (রাঃ) তাঁর সম্মুখে দাঁড়িয়ে লোকেদেরকে তাঁর বক্তব্য শুনাচ্ছিলেন (শুনার ব্যবস্থা করছিলেন)। (আবূ দাঊদ)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَن هلالِ بن عَامر عَن أَبِيه قَالَ: رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِمِنًى يَخْطُبُ عَلَى بَغْلَةٍ وَعَلَيْهِ بُرْدٌ أَحْمَرُ وَعَلِيٌّ أَمَامَهُ يُعَبِّرُ عَنْهُ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যাঃ এ হাদীসে দেখা যাচ্ছে, ‘আলী (রাঃ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বক্তব্য স্বীয় গলায় উচ্চৈঃস্বরে পুনরাবৃত্তি করছেন যাতে বহু মানুষের সমাবেশে উপস্থিত সবার কাছে বক্তব্য পৌঁছে। এর দ্বারা প্রমাণ হয় যে, বক্তার বক্তব্যকে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে, যেমন আধুনিক যুগে মাইক, সাউন্ড সিস্টেম ইত্যাদি। এ হাদীসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গায়ে লাল চাদর ছিল বলে যারা লাল কাপড় পরাকে বৈধ মনে করেন তারা এই হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করেন; যেমন- শাফি‘ঈ, মালিকীগণ। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪০৬৯)
এ সম্পর্কে বিস্তারিত ও সিদ্ধান্তমূলক আলোচনা পূর্বের হাদীসের ব্যাখ্যায় করা হয়েছে। তাই এখানে আর আলোচনার পুনরাবৃত্তি করা হলো না।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৬৪-[৬১] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য একটি কালো বর্ণের চাদর তৈরি করা হলো। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তা পরিধান করলেন। যখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাতে ঘর্মাক্ত হয়ে উঠলেন এবং পশমের দুর্গন্ধ পেলেন, তখন তা খুলে ফেললেন। (আবূ দাঊদ)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَن عَائِشَة قَالَتْ: صُنِعَتْ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بُرْدَةٌ سَوْدَاءُ فَلَبِسَهَا فَلَمَّا عَرِقَ فِيهَا وَجَدَ ريح الصُّوف فقذفها. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ এ হাদীস দ্বারা বুঝা গেলো যে, ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য কালো পশমের কাপড় দিয়ে একটি পোশাক বানিয়ে পরতে দিলে তিনি তা পরলেন। কিন্তু পরবর্তীতে পোশাকটি ঘামে ভিজে গেলে সেটা থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছিল। তাই তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সেটি খুলে ফেললেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুগন্ধি পছন্দ করতেন কিন্তু দুর্গন্ধ অপছন্দ করতেন। এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হলো কালো কাপড় পরিধান বৈধ এবং মাকরূহ নয়। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪০৭০)
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা পরেছিলেন কিন্তু ঘামের কারণে তা ভিজে গেলে ভেড়ার পশমের দুর্গন্ধ বের হলে দুর্গন্ধের কারণে তা খুলে ফেলেন। অন্য কোন কারণে নয়।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৬৫-[৬২] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এলাম, সে সময় তিনি একটি চাদর দ্বারা ইহতিবা অবস্থায় বসে ছিলেন। আর তার ঝালর তাঁর দু’ পায়ের উপর পড়েছিল। (আবূ দাঊদ)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: أَتَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ مُحْتَبٍ بِشَمْلَةٍ قَدْ وَقَعَ هُدْبها على قَدَمَيْهِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘উবায়দাহ্ আবূ খিদাশ’’ নামের বর্ণনাকারীকে চেনা যায় না; তাহক্বীক মুসনাদে আহমাদ- শু‘আয়ব আরনাউত্বব : ২০৬৫৪।
ব্যাখ্যাঃ এ হাদীসে هُدْب ‘‘হুদ্ব’’ বা ঝালর বলতে পোশাকের পাড়কে বুঝানো হচ্ছে যা সাধারণত পোশাকের নিচের দিকে ঝুলে থাকে। এ রকম পাড়যুক্ত ঢিলেঢালা পোশাক পরা জায়িয। ইহতিবা এক ধরনের বসার পদ্ধতি। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহতিবা করে বসেছিলেন; এ কথার অর্থ হলো তিনি সমান স্থানে বসে দুই হাঁটু উপরের দিকে দাঁড়া করিয়ে রাখেন। তারপর তার কাপড়ের ঝালর দুই হাঁটুর পিছন দিয়ে দুই হাত দিয়ে ঝালরের দুই মাথা ধরে রাখেন, যাতে মনে হয় তিনি কিছুতে হেলান দিয়ে বসে আছেন। যখন ‘আরবরা কোন কিছুর সাথে হেলান না দিয়ে বসে তখন এভাবে বসে। কারও মতে ইহতিবা হচ্ছে, দুই হাঁটুকে পেটের সাথে লাগিয়ে একটি কাপড় দিয়ে পিঠ ও হাঁটু পেঁচিয়ে দুই হাত দিয়ে হাঁটু জড়িয়ে বসা। অন্য হাদীসে ইহতিবা করে বসার ব্যাপারে যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তা কেউ যদি একটি কাপড় পরে বসে তাহলে তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কারণ কেউ যদি এক কাপড়ে ইহতিবা করে বসে তখন তার কাপড়ের উপর দিয়ে লজ্জাস্থান দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই এটি নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু কেউ যদি লজ্জাস্থানকে অন্য কোন কাপড় দ্বারা ঢেকে তারপর ইহতিবা করে বসে তাহলে কোন সমস্যা নেই। কারণ তখন লজ্জাস্থান দেখা যাওয়ার যে আশঙ্কায় এরূপ বসতে নিষেধ করা হয়েছে সেই আশঙ্কা দূরীভূত হয়ে গিয়েছে। তাই আর কোন বাধা নেই। এ হাদীস দ্বারা ঝালরযুক্ত কাপড় পরিধান করার বৈধতা প্রমাণিত হয়। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪০৭১) [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৬৬-[৬৩] দিহ্ইয়াহ্ ইবনু খলীফাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে কতকগুলো ক্বিবত্বী (মিসরীয়) কাপড় আনা হলো। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তা হতে একটি কাপড় আমাকে প্রদান করে বললেনঃ এটাকে দু’ খন্ড করে নাও। এক খন্ড কেটে জামা তৈরি করো এবং অপর খণ্ডটি ওড়না হিসেবে ব্যবহারের জন্য তোমার স্ত্রীকে দিও। যখন তিনি ফিরে যেতে লাগলেন, তখন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমার স্ত্রীকে এ নির্দেশও দেবে, যেন সে তার নিচে অন্য আরেকখানা কাপড় এমনভাবে লাগিয়ে নেয়, যাতে শরীর না দেখা যায়। (আবূ দাঊদ)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَن دِحيةَ بن خليفةَ قَالَ: أَتَى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِقَبَاطِيَّ فَأَعْطَانِي مِنْهَا قُبْطِيَّةً فَقَالَ: «اصْدَعْهَا صَدْعَيْنِ فَاقْطَعْ أَحَدَهُمَا قَمِيصًا وَأَعْطِ الْآخَرَ امْرَأَتَكَ تَخْتَمِرُ بِهِ» . فَلَمَّا أَدْبَرَ قَالَ: «وَأْمُرِ امْرَأَتَكَ أَنْ تَجْعَلَ تَحْتَهُ ثَوْبًا لَا يَصِفُهَا» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, ‘আল্লামা মুনযিরী বলেনঃ এর সনদে আছে ‘আবদুল্লাহ ইবনু লাহী‘আহ্, যার হাদীস দ্বারা দলীল গ্রহণ করা যায় না। দেখুন- ‘আওনুল মা‘বূদ শার্হু আবী দাঊদ ১১/১১৭ পৃঃ, ৪১১৬ নং হাদীসের ব্যাখ্যা।
ব্যাখ্যাঃ (قَبَاطِيَّ) ‘কবা-ত্বিয়্যা’ হচ্ছে এক ধরনের পাতলা কাপড় যা মিসর থেকে আনা হতো। এ হাদীসের শেষে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিহ্ইয়াহ্ কলবী (রাঃ)-এর স্ত্রীর জন্য নির্দেশনা দিয়ে বলেন, তোমার স্ত্রীকে এটা পরতে বলবে তবে এর নীচে অন্য আরেকটি কাপড় দিয়ে নিতে বলবে। কারণ এ কাপড়টি অনেক পাতলা। এটি পরিধান করলে শরীরের চামড়া ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দেখা যায়।
হাদীসটি দ্বারা আরও একটি বিষয় প্রমাণিত হয় যে, মহিলাদের জন্য এমন কাপড় পরা বৈধ নয় যে কাপড় পরলে শরীরের চামড়া ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দেখা যায়। তারা এমন কাপড় ব্যবহার করবে যাতে শরীরের কোন অঙ্গ দেখা না যায়। যদি পাতলা কাপড় পরতেই চায় তাহলে এর নীচে অন্য কাপড় পরে নিতে হবে, যাতে করে তার শরীরের চামড়া দেখা না যায়। আর যদি পরিধেয় বস্ত্র পুরু হয় তাহলে তার নীচে আর কিছু পরার দরকার নেই। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৬৭-[৬৪] উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কাছে এলেন। সে সময় তিনি (উম্মু সালামাহ্) ওড়না পরিহিতা অবস্থায় ছিলেন। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ কাপড় দ্বারা এক প্যাঁচই যথেষ্ট, দু’ প্যাঁচ দেয়ার প্রয়োজন নেই। (আবূ দাঊদ)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَنْ أُمِّ سَلَمَةَ إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دَخَلَ عَلَيْهَا وَهِيَ تَخْتَمِرُ فَقَالَ: «ليَّةً لَا ليَّتينِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে, ‘‘ওয়াহ্ব মাওলা আবী আহমাদ’’ নামের বর্ণনাকারী যার পরিচয় পাওয়া যায় না। তাহক্বীক মুসনাদে আহমাদ- শু‘আয়ব আরনাউত্বব : ২৬৫৬৫।
ব্যাখ্যাঃ হাদীসে ব্যবহৃত (تَخْتَمِرُ) ‘তাখতামির’ শব্দটি ‘ইখতিমার’ শব্দমূল থেকে এসেছে। ইখতিমার এসেছে ‘খিমার’ শব্দ থেকে। ‘খিমার’ বলা হয় ঐ কাপড়কে যা দ্বারা মাথা ও চেহারা ঢেকে রাখা হয়। মদকে আরবীতে খামর বলা হয় এজন্যই যে, এটি পান করলে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ পায়, ঢেকে যায়। অন্যান্য হাদীসে তাখমীরুল ইনা-ই এসেছে যার অর্থ পাত্র ঢেকে রাখা। উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) খিমারটি তার মাথায় দুইবার প্যাঁচ দিয়ে রেখেছিলেন। তাই দেখে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দুইবার প্যাচ দিতে নিষেধ করেছেন। কারণ দুইবার প্যাঁচ দিলে পুরুষের পাগড়ীর সাথে সাদৃশ্য হয়ে যায়। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪১১১)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৬৮-[৬৫] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মুখ দিয়ে যাচ্ছিলাম। সে সময় আমার ইযার ঝুলানো ছিল। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে বললেনঃ হে ’আবদুল্লাহ! তোমার ইযার উঠিয়ে নাও। তখনই আমি তা উঠিয়ে নিলাম। অতঃপর বললেনঃ আরো উঠাও। আমি আরো উঠালাম। এরপর হতে আমি সর্বদা তা উপরে বাঁধতে চেষ্টা করতাম। কেউ কেউ জিজ্ঞেস করল, কতটুকু উপরে উঠাতে হবে তিনি বললেন, দু’ পায়ের অর্ধ নলা পর্যন্ত। (মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الثَّالِثُ
عَن ابنِ عمَرِ قَالَ: مَرَرْتُ بِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَفِي إِزَارِي اسْتِرْخَاءٌ فَقَالَ: «يَا عَبْدَ اللَّهِ ارْفَعْ إِزَارَكَ» فَرَفَعْتُهُ ثُمَّ قَالَ: «زِدْ» فَزِدْتُ فَمَا زِلْتُ أَتَحَرَّاهَا بَعْدُ فَقَالَ: بَعْضُ الْقَوْمِ: إِلَى أَيْنَ؟ قَالَ: «إِلَى أَنْصَافِ السَّاقَيْنِ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ পুরুষের জন্য পায়ের টাখনুর নীচে ঝুলিয়ে কাপড় পরিধান করা নিষেধ। আবূ সা‘ঈদ আল খুদরী বলেন,
إِزْرَةُ الْمُؤْمِنِ إِلٰى أَنْصَافِ سَاقَيْهِ لَا جُنَاحَ عَلَيْهِ مَا بَيْنَهٗ وَبَيْنَ الْكَعْبَيْنِ وَمَا أَسْفَلَ مِنْ الْكَعْبَيْنِ فِي النَّارِ
‘‘মু’মিনের লুঙ্গি বা ইযার হবে তার নলার মাঝামাঝি পর্যন্ত। তবে নলা এবং টাখনুর মাঝে হলেও সমস্যা নেই। এর নীচে হলে পরেই তা জাহান্নামে যাবে।’’ (সুনান ইবনু মাজাহ হাঃ ৩৫৭৩)
এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় নলার মাঝামাঝি কাপড় পরা পুরুষের জন্য মুস্তাহাব। মধ্য নলা থেকে টাখনু পর্যন্ত কাপড় পরা মাকরূহ হওয়া ছাড়াই জায়িয। টাখনুর নিচে কাপড় নামিয়ে পরা সাধারণভবে নিষিদ্ধতার যদি অহংকারবশত টাখনুর নীচে নামিয়ে পরে তাহলে তা স্পষ্ট হারাম। যে হাদীসগুলোতে বলা হয়েছে যে, টাখনুর নীচের অংশ জাহান্নামে যাবে। সেগুলোর উদ্দেশ্য হলো, অহংকারবশত টাখনুর নীচে কাপড় ঝুলিয়ে পরলে সে অংশটুকু জাহান্নামে যাবে। কাযী বলেনঃ ‘আলিমগণ বলেছেন, সার্বিকভাবে পোশাকের ক্ষেত্রে প্রয়োজন ও প্রচলনের অতিরিক্ত লম্বা ও প্রশস্ত পোশাক পরিধান করা মাকরূহ। (শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২০৮৬/৪৩)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৬৯-[৬৬] উক্ত রাবী [’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ)] হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি অহংকারবশতঃ কাপড় হেঁচড়িয়ে চলে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা তার দিকে তাকাবেন না। তখন আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) বললেনঃ হে আল্লাহর রসূল! অসাবধানতাবশতঃ অনেক সময় আমার লুঙ্গি টাখনুর নিচে ঝুলে যায়। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে লক্ষ্য করে বললেনঃ যারা অহংকারবশতঃ কাপড় ঝুলায় আপনি তাদের অন্তরভুক্ত নন। (বুখারী)[1]
الْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ جَرَّ ثَوْبَهُ خُيَلَاءَ لَمْ يَنْظُرِ اللَّهُ إِلَيْهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» . فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِزَارِي يَسْتَرْخِي إِلَّا أَنْ أَتَعَاهَدَهُ. فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّكَ لَسْتَ مِمَّنْ يَفْعَلُهُ خُيَلَاءَ» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ পুরুষের জন্য লুঙ্গি, পায়জামা, প্যান্ট ইত্যাদি টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে পরার ব্যাপারে এ হাদীসটি দিয়ে অনেকে দলীল পেশ করেন যে, অহংকারবশতঃ না হলে টাখনুর নিচে কাপড় পরা যাবে। তাই এ বিষয়টি বিস্তারিত বলার প্রয়োজন রয়েছে।
লুঙ্গি, পায়জামা, প্যান্ট ইত্যাদি কাপড় যদি টাখনুর সামান্য নিচে ঝুলিয়ে পরিধান করা হয় এবং তাঁর উদ্দেশ্য হয় অহংকার করা, তবে তাঁর শাস্তি হলো কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর দিকে রহমাতের দৃষ্টি দিবেন না, তাঁর সাথে কথা বলবেন না, তাকে পবিত্র করবেন না এবং তাঁর জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। যদিও এ হাদীসে শুধু তাকানোর কথা আছে তবে অন্য হাদীসে বাকীগুলোর কথা এসেছে। আর যদি অহংকারের সাথে নয় বরং সাধারণভাবে কাপড় ঝুলিয়ে পরে, তবে তাঁর শাস্তি হলো, তাঁর টাখনুদ্বয়কে জাহান্নামের আগুনে পোড়ানো হবে। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ
ثَلاَثَةٌ لاَ يُكَلّمُهُمُ اللّٰهُ يَوْمَ الْقِياَمَةِ وَلاَ يَنْظُرُ إلَيْهِمْ وَلاَ يُزَكّيْهِمْ وَلَهُمْ عَذاَبٌ ألِيْم : المُسْبِلُ وَالمَنَّانُ وَالْمُنْفِقُ سِـلْعَتَهٗ بـاِلْحَلِفِ الكـاَذِبِ.
‘‘কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তা‘আলা তিন ব্যক্তির সাথে কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না, তাদেরকে পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। সেই তিনি ব্যক্তি হলো : (১) পায়ের টাখনুর নীচে কাপড় ঝুলিয়ে পরিধানকারী, (২) দান করে খোটাদানকারী এবং (৩) মিথ্যা শপথ করে পণ্য বিক্রয়কারী। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ হাদীসেই বলেনঃ إلَيْهِ يَوْمَ الْقِياَمَـةِ خُيَلَاءَ لَمْ يَنْظُرِالله مَنْ جَرَّ ثَوْبَهٗ ‘‘যে ব্যক্তি অহংকারবশতঃ কাপড় ঝুলিয়ে পরিধান করবে কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তাঁর দিকে রহমাতের দৃষ্টিপাত করবেন না’’ এ বিধান ঐ ব্যক্তির জন্য যে অহংকারবশতঃ কাপড় ঝুলিয়ে পরে।
আর যে ব্যক্তি অহংকারের উদ্দেশ্য ছাড়া কাপড় ঝুলিয়ে পরবে তাঁর ব্যাপারে হাদীসে এসেছে, আবূ হুরায়রা বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ (مَا أَسْفَلَ الْكعبين مِنَ الْإِزَارِ فَفِى النَّارِ) ‘‘যে টাখনুদ্বয়ের নীচে কাপড় ঝুলিয়ে পরা হবে তা আগুনের মধ্যে জ্বলবে’’ এ হাদীসে জাহান্নামের আগুনে টাখনু জ্বলার ব্যাপারে অহঙ্কারের কথা উলেখ নেই।
আবূ সা‘ঈদ আল খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ
إِزْرَةُ الْمُؤْمِنِ إِلَى نِصْفِ السَّاقِ وَلا حَرَجَ أَوْ لا جُنَاحَ فِيمَا بَيْنَهٗ وَبَيْنَ الْكَعْبَيْنِ ومَا كَانَ أَسْفَلَ مِنَ الْكَعْبَيْنِ فَهُوَ فِي النَّارِ وَمَنْ جَرَّ إِزَارَهُ بَطَرًا لَمْ يَنْظُرِ اللهُ إِلَيْهِ يَوْمَ الْقِياَمَةِ
‘‘মু’মিন ব্যক্তির কাপড় অর্ধ নলা পর্যন্ত, এতে কোন অসুবিধা নেই’’ (হাঁটু থেকে পায়ের তলার মধ্যভাগকে নলা বলা হয়)। অন্য বর্ণনায় তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এরূপ বলেনঃ ‘‘পায়ের টাখনু এবং হাঁটুর মধ্যবর্তী স্থানে কাপড় পরিধান করাতে কোন অসুবিধা নেই যে টাখনুর নীচে কাপড় পরিধান করা হবে তা জাহান্নামে যাবে, আর যে ব্যক্তি অহংকারবশতঃ কাপড় ঝুলিয়ে পরবে, কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তাঁর দিকে দৃষ্টিপাত করবেন না।’’
অনেকে কাপড় ঝুলিয়ে পরিধান করে এবং যুক্তি দেখায় যে, আমি তো অহংকারবশতঃ কাপড় টাখনুর নীচে ঝুলিয়ে পরিনি, সুতরাং এতে তেমন অসুবিধা নেই। উল্লেখিত হাদীসগুলো থেকে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, এ ব্যক্তির যুক্তি সম্পূর্ণ অসাড়।
অতএব অহংকারের উদ্দেশ্য ব্যতীত এমনিই সাধারণভাবে কাপড় টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে পরলেই জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হবে। আর তাঁর সাথে যদি অহংকারযুক্ত হয় তবে তাঁর শাস্তি আরও কঠিন, তা হলো আল্লাহ তাঁর সাথে কথা বলবেন না, তাঁর দিকে তাকাবেন না, তাকে পবিত্র করবেন না এবং তাঁর জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। ইমাম ইবনু ‘আবদুল বার্ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, অহংকার ছাড়াও টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে কাপড় পরা নিন্দনীয়।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এটি মাকরূহ। মূল সুন্নাহ্ হলো অর্ধ নলা পর্যন্ত পরা। কিন্তু কেউ যদি চায় তাহলে সে টাখনু পর্যন্ত নামিয়ে পরতে পারে। কিন্তু অহংকার করে হলে পুরুষের জন্য টাখনুর নীচে কাপড় ঝুলিয়ে পরা হারাম। আর অহংকার ছাড়া হলে ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ)-এর মতে তা মাকরূহ। আবূ বকর এই নিষেধাজ্ঞা ও শাস্তির হুমকির মধ্যে পড়বেন না। কারণ তিনি ইচ্ছা করে এমনটা করতেন না।
আবূ বকর (রাঃ)-এর হাদীস দ্বারা যারা দলীল পেশ করতে চায় দু’দিক থেকে তাদের যুক্তি খন্ডন : প্রথম কথা : আবূ বকর (রাঃ) বলেছেন, ‘‘আমার কাপড়ের এক পার্শ্ব (অনিচ্ছাকৃত) ঝুলে পড়ে কিন্তু আমি তা বারবার উঠিয়ে নেয়ার চেষ্টা করি।’’ অতএব তিনি তো ইচ্ছাকৃত এ কাজ করতেন না। বরং তাঁর শরীর অধিক ক্ষীণ হওয়ার কারণে অনিচ্ছাকৃত কাপড় ঝুলে যেত। তাছাড়া তিনি তা উঠিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতেন। কিন্তু যারা কাপড় ঝুলিয়ে পরে এবং ধারণা করে যে তারা অহংকার করে না, তারা তো ইচ্ছাকৃত এ কাজ করে। অতএব তাদের ক্ষেত্রে আমরা বলব, অহংকারের উদ্দেশ্য ব্যতীত ইচ্ছাকৃত কাপড় ঝুলিয়ে পরলে তার টাখনু জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে। যেমনটি আবূ হুরায়রার হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। আর যদি অহংকারবশতঃ হয় তবে তার শাস্তি হচ্ছে, আল্লাহ তাঁর সাথে কথা বলবেন না, তাঁর দিকে তাকাবেন না, তাকে পবিত্র করবেন না এবং তাঁর জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
দ্বিতীয় কথা : নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই আবূ বকর (রাঃ)-কে পরিশুদ্ধ করেছেন এবং সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি সেই সকল লোকেদের অন্তর্ভুক্ত নন, যারা অহংকারবশতঃ এ কাজ করে থাকে। অতএব বর্তমানে যারা টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে কাপড় পরে তারা কি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ থেকে এরূপ সচ্চরিত্রের সানাদ ও তাঁর সাক্ষ্য লাভ করেছে? কিন্তু শয়তান প্রবৃত্তির অনুসারী লোকেদেরকে কুরআন-সুন্নাহ্ থেকে সামঞ্জস্যপূর্ণ উক্তিসমূহকে খেয়াল-খুশির উপর ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ করে। তখন তারা বিভ্রান্ত হয়। আল্লাহ যাকে ইচছা সঠিক পথে পরিচালিত করে থাকেন। মোটকথা কোন অজুহাত ছাড়া কোন পুরুষের জন্য টাখনুর নিচে লুঙ্গি, পায়জামা, প্যান্ট ইত্যাদি পরা বৈধ নয়। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৭০-[৬৭] ’ইকরিমাহ্ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)-কে এভাবে লুঙ্গি পরিধান করতে দেখেছি যে, তিনি তাঁর লুঙ্গি সম্মুখের অংশ পায়ের পাতার উপর ঝুলিয়ে রেখেছেন এবং পিছনের অংশ উপরে উঠিয়ে রেখেছেন। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ আপনি এভাবে লুঙ্গি পরেছেন কেন? তিনি বললেনঃ আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এভাবে লুঙ্গি পরিধান করতে দেখেছি। (আবূ দাঊদ)[1]
الْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَن عِكْرِمَة قَالَ: رأيتُ ابنَ عَبَّاس يَأْتَزِرُ فَيَضَعُ حَاشِيَةَ إِزَارِهِ مِنْ مُقَدَّمِهِ عَلَى ظَهْرِ قَدَمِهِ وَيَرْفَعُ مِنْ مُؤَخَّرِهِ قُلْتُ لِمَ تَأْتَزِرُ هَذِهِ الْإِزْرَةَ؟ قَالَ: رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يأتزرها. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর ছাত্র ‘ইকরিমাহ্ যখন ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-কে সামনের দিকে ইযার ঝুলানো দেখে এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন, তখন ইবনু ‘আব্বাস বলেছিলেন যে, তুমি আমাকে যেভাবে ইযার পরতে দেখেছো সেভাবেই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও লুঙ্গি পরতেন। আমি তাকে এভাবেই লুঙ্গি পরতে দেখেছি। তিনি যখন লুঙ্গি পরতেন তখন লুঙ্গির সামনের অংশ পায়ের সামনে দিয়ে কিছুটা ঝুলিয়ে দিতেন এবং পেছনের দিকটা উঠিয়ে রাখতেন যাতে তা টাখনুর নিচ পর্যন্ত না যায়। তবে সামনের দিকে এতটা ঝুলিয়ে রাখতেন না যে, টাখনুর নিচে চলে যায়। বরং তিনি এতটুকু ঝুলাতেন যাতে তা টাখনু বরাবর হতো। এ হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, অত্র হাদীসে বর্ণিত পদ্ধতিতে লুঙ্গি পরা হারামের অন্তর্ভুক্ত হবে না। ইমাম সুয়ূত্বী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘‘আল জামি‘উস্ সগীর’’ গ্রন্থে বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ইযার সামনের দিক দিয়ে কিছুটা ঝুলিয়ে দিতেন আর পেছনের দিক দিয়ে উঠিয়ে রাখতেন। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪০৯২)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৭১-[৬৮] ’উবাদাহ্ ইবনুস্ সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা পাগড়ী বাঁধবে। কেননা তা মালায়িকাহ্’র (ফেরেশতাদের) প্রতীক। আর তা পিছনে (পিঠের উপর) ছেড়ে দাও। (বায়হাক্বী- শু’আবুল ঈমান)[1]
الْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ عُبَادَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «عَلَيْكُمْ بالعمائم فَإِنَّهَا سيماء الْمَلَائِكَة وأخوها خلف ظهوركم» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيّ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ এর সনদে আছে ‘‘আহওয়াস ইবনু হাকীম’’ নামের একজন বর্ণনাকারী; যিনি য‘ঈফ। বিস্তারিত দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ২/১১৯ পৃঃ, হাঃ ৬৬৯।
ব্যাখ্যাঃ পাগড়ী পরা সম্পর্কে অনেক সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। যেহেতু এ হাদীসটি সহীহ নয় সেহেতু এর বেশি ব্যাখ্যা নিঃষ্প্রয়োজন। তবুও এতটুকু করা যেতে পারে যেমনটা কেউ কেউ বলেছেন যে, বদরের যুদ্ধের দিন যে মালায়িকাহ্ রণক্ষেত্রে এসেছিলেন বলে কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত হয়েছে তারা হলুদ রঙের পাগড়ী পরেছিলেন। যদিও কুরআনের সূরাহ্ আ-লি ‘ইমরান-এর ১২৫ নং আয়াতে মালায়িকাহ্’র যে বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে তাতে কোন পোশাক বা রঙের কথা বলা হয়নি। শুধু বলা হয়েছে, يُمْدِدْكُمْ رَبُّكُمْ بِخَمْسَةِ آلَافٍ مِنَ الْمَلَائِكَةِ مُسَوِّمِينَ অর্থাৎ ‘‘তবে তোমাদের রব পাঁচ হাজার চিহ্নিত মালাক (ফেরেশতা) দ্বারা তোমদেরকে সাহায্য করবেন’’। এখানে শুধু ‘‘চিহ্নিত’’ বলা হয়েছে। কিন্তু কী দ্বারা চিহ্নিত তা বলা হয়নি। তবে এ আয়াতের তাফসীরে অনেক কথা এসেছে যার মধ্যে একটি হচ্ছে, তারা হলুদ পাগড়ী দ্বারা চিহ্নিত ছিলেন। মোটকথা এ হাদীসের ব্যাখ্যায় কোন কিছুই নিশ্চিত করে কেউ বলেননি। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৭২-[৬৯] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন আসমা বিনতু আবূ বকর (রাঃ) পাতলা কাপড় পরিহিত অবস্থায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গেলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন এবং বললেনঃ হে আসমা! মহিলা যখন বালেগা হয়, তখন তার শরীরের কোন অঙ্গ দৃষ্ট হওয়া উচিত নয়, তবে কেবলমাত্র এটা এবং এটা এ বলে তিনি তাঁর মুখ এবং তাঁর দু’ হাতের তালুর দিকে ইঙ্গিত করলেন। (আবূ দাঊদ)[1]
الْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ عَائِشَةَ أَنَّ أَسْمَاءَ بِنْتَ أَبِي بَكْرٍ دَخَلْتُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَعَلَيْهَا ثِيَاب رقاق فَأَعْرض عَنهُ وَقَالَ: «يَا أَسْمَاءُ إِنَّ الْمَرْأَةَ إِذَا بَلَغَتِ الْمَحِيضَ لَنْ يَصْلُحَ أَنْ يُرَى مِنْهَا إِلَّا هَذَا وَهَذَا» . وَأَشَارَ إِلَى وَجْهِهِ وَكَفَّيْهِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ এ হাদীস দ্বারা অনেকে দলীল পেশ করেন যে, নারীর জন্য মাহরাম নন এমন পুরুষের সামনেও নারী তার চেহারা ও দুই হাত খোলা রাখতে পারবে। কিন্তু এ হাদীস সানাদগতভাবে এবং মাতানগতভাবে বিশুদ্ধ নয়। সনদের দিক থেকে সমস্যা হলো : এ সনদে ইনক্বিতা‘ বা বিচ্ছিন্নতা আছে। খালিদ ইবনু দুরায়ক ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর কাছ থেকে শুনেননি। তাছাড়া বর্ণনাকারী সা‘ঈদ ইবনু বাশীর দুর্বল (য‘ঈফ)। এ দুটি ছাড়া আরও সমস্যা আছে। মতনের দিক থেকে সমস্যা হলো : এ বর্ণনায় বলা হচ্ছে. আসমা (রাঃ) প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় পাতলা কাপড় পরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে এসেছেন। যা কখনোই সম্ভব নয়। এ ঘটনা যখন ঘটেছে তখন আসমা (রাঃ)-এর বয়স সাতাশ-এর উপরো ছিল। কারণ মদীনায় হিজরতের বছর তার বয়স ছিল সাতাশ। তিনি ছিলেন হিজরতের পর মদীনায় জন্মগ্রহণকারী প্রথম শিশু ‘আবদুল্লাহ ইবনুয্ যুবায়র -এর মা। এ বয়সের একজন মুসলিম মহিলা পাতলা কাপড় পরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে আসবেন যা দেখে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুখ ফিরিয়ে নিবেন তা কি সম্ভব? কখনো নয়। তাই মতনের দিকে গভীরভাবে তাকালেও বুঝা যায় যে, এ বর্ণনাটি গ্রহণযোগ্য নয়। তাই চেহারা ও দুই হাতের কব্জি পর্যন্ত খোলা রাখার যে কথা এ হাদীসে বলা হয়েছে তা ‘আমলযোগ্য নয়।
উল্লেখ্য যে, মাহরাম নন এমন পুরুষের সামনে মুসলিম নারীদের মুখমণ্ডলে ও দুই হাতের কব্জি পর্যন্ত খোলা রাখার ব্যাপারে ইসলামের বিধান কী- তা জানা জরুরী। তাই নিম্নে কুরআন, হাদীস, সাহাবীগণ ও সালফে সলিহীন-এর উক্তির আলোকে নাতিদীর্ঘ আলোচনা উপস্থাপন করা হলো, যাতে করে এ বিষয়ে বিভ্রান্তির অপনোদন ঘটে।
চেহারা পর্দার অংশ নয় মর্মে কিছু বক্তব্য আছে ঠিকই। কিন্তু নানা মত ও যুক্তি পর্যালোচনার পর অগ্রাধিকার প্রাপ্ত মত ও সকল ‘আলিমের সিদ্ধান্ত হলো, হিজাব যেমন অপরিহার্য, ঠিক তেমনি নিকাব তথা মুখ ঢাকাও অত্যাবশ্যক। দু’টিকে পৃথক ভাবার সুযোগ নেই। কারণ শারী‘আতে দু’টো পৃথক কোন বিষয় নয়। যখন হিজাব শব্দটি আসে তখন তার শার‘ঈ অর্থ এটাই বুঝা যায়, নারী মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে রাখবে। কুরআনে মাজীদের সূরাহ্ আল-আহযাবে মুসলিম নারীদেরকে স্পষ্টভাবে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে, ঘর থেকে বাইরে বের হবার সময় যেন তারা নিজেদের শরীরে লম্বা ও প্রশস্ত ঝুলিয়ে নেয়। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন :
يٰاَيُّهَا النَّبِىُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ ذٰلِكَ أَدْنٰى أَنْ يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ
‘‘হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে ও মু’মিনদের নারীগণকে বল, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না।’’ (সূরাহ্ আল আহযাব ৩৩ : ৫৯)
পর্দা বিষয়ে এ আয়াত অত্যন্ত পরিষ্কার ও স্পষ্ট। কারণ, এ আয়াত থেকে জানা যায়, পর্দার নির্দেশের মধ্যে মুখমণ্ডলেও অন্তর্ভুক্ত। তাছাড়া এ আয়াতে রসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পুতঃপবিত্র সহধর্মিণীগণও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কন্যাগণের সঙ্গে মুসলিম মহিলাদেরও সম্বোধন করা হয়েছে। এ আয়াতে ‘জালাবীব’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যা ‘জিলবাব’ শব্দের বহুবচন। ‘আরবী অভিধানের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘‘লিসানুল ‘আরাব’’ এ লেখা হয়েছে, ‘জিলবাব’ ঐ চাদরকে বলা হয় যা মহিলারা নিজেদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢাকার জন্য ব্যবহার করে। (লিসানুল ‘আরাব ১/২৭৩ পৃঃ)
মুফাসসিরগণের বক্তব্য দেখলেও জানা যায়, ‘জিলবাব’ এমন কাপড়কে বলে যা দ্বারা মহিলারা নিজেদের শরীর ঢাকেন। ‘জিলবাব’ অর্থ বড় চাদর, যা দ্বারা মুখমণ্ডলে ও পূর্ণ দেহ আবৃত করা যায়। (কুরতুবী, আল-জামি‘ লি আহকামিল কুরআন : ১৪/২৪৩)
‘আল্লামা আলূসী (রহিমাহুল্লাহ) ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আব্বাস (রাঃ)-এর বরাত দিয়ে লিখেন, ‘জিলবাব’ সেই চাদরকে বলে যা মহিলারা দেহের ওপর থেকে নীচ পর্যন্ত উড়িয়ে ছেড়ে দেয়। (রুহুল মা‘আনী : ২২/৮৮)
‘আল্লামা ইবন হাযম (রহিমাহুল্লাহ) লিখেন : ‘আরবী ভাষায় ‘জিলবাব’ এমন কাপড়কে বলা হয় যা সারা শরীর আচ্ছাদন করে। যে কাপড় সমস্ত শরীর ঢাকে না, সে কাপড়ের ক্ষেত্রে ‘জিলবাব’ শব্দটির প্রয়োগ সঠিক ও শুদ্ধ নয়। (আল-মুহাল্লা : ৩/২১৭)
তাই শত শত বছর যাবৎ মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র যে দীনদার নারীগণ নিকাব ও হিজাব পরিধান করে আসছেন তাঁরা এই জিলবাব ধারণের বিধানই পালন করছেন।
কোন কোন সাহাবী সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তাঁরা পর্দা হিসেবে ‘জিলবাব’ ব্যবহারের নিয়ম-পদ্ধতিও বর্ণনা করেছেন। ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আব্বাস (রাঃ) মুখমন্ডলের উপর ‘জিলবাব’ ফেলার যে পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন তা হলো, ‘মুসলিম মহিলারা নিজেদের চাদর দ্বারা নিজ নিজ মাথা ও মুখমণ্ডলে ঢেকে বের হবে। তারা কেবল একটি চোখ খোলা রাখতে পারে’। (শাওকানী, ফাতহুল কদীর : ৭/৩০৭)
সূরাহ্ আল আহযাবের উল্লেখিত আয়াতের তাফসীর করতে গিয়ে সকল মুফাসসির মুখমণ্ডলে ঢাকা হিজাবের অত্যাবশ্যক অংশ গণ্য করেছেন। আবূ বকর আর্ রাযী ও আল জাস্সাস আল হানাফী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয়, যুবতী মহিলারা ঘর থেকে বাইরে বেরোনোর সময় বেগানা পুরুষের দৃষ্টি থেকে তাদের মুখমণ্ডলে আবশ্যিকভাবে ঢেকে রাখবে, যাতে দুষ্ট প্রকৃতির লোক তাদেরকে বিরক্ত করতে না পারে। (আহকামুল কুরআন : ৩/৩৭১)
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) স্বীয় গ্রন্থ ‘আল মিনহাজ’-এ লিখেছেন, যদি ফিতনার আশঙ্কা থাকে তাহলে কোন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের জন্য কোন প্রাপ্তবয়স্কা নারীর মুখমণ্ডলে ও হাত দেখা জায়িয নেই। ‘আল্লামা রামালী (রহিমাহুল্লাহ) ‘আল মিনহাজ’ গ্রন্থের ব্যাখ্যায় এ মতের উপর ‘আলিমগণের ইজমা’র কথা বর্ণনা করেছেন। তিনি এও লিখেছেন, সঠিক মতানুযায়ী ফিতনার আশঙ্কা না থাকলেও প্রাপ্তবয়স্কা নারীকে দেখা হারাম। এর দ্বারা বুঝা যায়, মুখমণ্ডলে খোলা অবস্থায় মহিলাদের বাইরে বের হওয়া জায়িয নেই। কারণ, সে অবস্থায় পুরুষ তাদেরকে দেখবে এবং দেখার মাধ্যমে ফিতনা সৃষ্টি হবে। (নিহায়াতুল মিনহাজ ইলা শারহিল মিনহাজ : ৬/১৮৮)
শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ্ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ পরপুরুষ দেখতে পারে এমনভাবে মহিলাদের মুখমণ্ডলে খোলা রাখা জায়িয নেই। স্বামী, পিতা, ভাই প্রমুখের উচিত ‘সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধে’র অংশ হিসেবে তাদেরকে এমন কাজ থেকে বিরত রাখতে সচেষ্ট হওয়া। অধীনস্থ নারীদের পর্দাহীনতা থেকে বিরত না রাখাও দায়িত্বশীল পুরুষদের জবাবদিহিতামূলক অপরাধ। এজন্য তাদেরকে শাস্তিও দেয়া যেতে পারে। (মাজমূ‘ ফাতাওয়া : ২৪/৩৮২)
হাফিয ইবনুল কইয়্যিম (রহিমাহুল্লাহ) লিখেন, স্বাধীন নারী মুখমণ্ডলে ও হাতের কব্জি পর্যন্ত খোলা রেখে সালাত আদায় করতে পারে (এই শর্তে যে, সেখানে কোন বেগানা পুরুষ থাকবে না)। তবে এ অবস্থায় সে বাজারে এবং পুরুষের ভীড়ের মধ্যে যেতে পারবে না। (ই‘লাম আল মুওয়াককিঈন : ২/৮০)
‘আল্লামা সুয়ূত্বী আশ্ শাফিঈ‘ (রহিমাহুল্লাহ) উল্লেখিত আয়াতের তাফসীর করতে গিয়ে লিখেন, হিজাবের আয়াত সব নারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। মাথা ও মুখমণ্ডলে ঢাকা যে ওয়াজিব তা এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয়। (‘আওনুল মা‘বুদ : ১১/১৫৪)
শুধু পবিত্র কুরআনের তাফসীর নয় চেহারা আবৃত রাখার বিধান সহীহ হাদীস দ্বারাও প্রমাণিত। ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ
وَلَا تَنْتَقِبْ الْمَرْأَةُ الْمُحْرِمَةُ لَا تَلْبَسْ الْقُفَّازَيْنِ
‘‘ইহরাম গ্রহণকারী নারী যেন নিকাব ও হাতমোজা পরিধান না করে।’’ (সহীহুল বুখারী হাঃ ১৮৩৮)
এ হাদীস থেকে বোঝা যায়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে মেয়েরা তাদের হাত ও চেহারা ঢাকতেন। এ কারণে ইহরামের সময় নিকাব ও হাত মোজা না পরার আদেশ করতে হয়েছে।
‘আয়িশাহ্ (রাঃ) হজ্জ অবস্থায় মহিলা সাহাবীদের পর্দার যে ব্বিরণ দিয়েছেন তা থেকে অনুমান করা যায় পর্দা রক্ষায় তাঁরা কতটা আন্তরিক ছিলেন। তাঁরা স্বাভাবিক অবস্থায় তো বটেই ইহরাম অবস্থায় যখন মুখ ঢাকতে নিষেধ করা হয়েছে সেখানেও পরপুরুষের সামনে থেকে নিজেদের চেহারা আড়াল করেছেন। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেন,
كَانَ الرُّكْبَانُ يَمُرُّونَ بِنَا وَنَحْنُ مَعَ رَسُولِ اللهِ -صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- مُحْرِمَاتٌ فَإِذَا حَاذَوْا بِنَا سَدَلَتْ إِحْدَانَا جِلْبَابَهَا مِنْ رَأْسِهَا إِلٰى وَجْهِهَا فَإِذَا جَاوَزُونَا كَشَفْنَاهُ.
‘‘আমরা ইহরাম অবস্থায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে ছিলাম। তখন আরোহীরা আমাদের সঙ্গে পথ চলছিলেন। যখন তারা আমাদের মুখোমুখি হতেন তখন আমাদের সঙ্গীনীরা তাদের বড় চাদর মাথা থেকে চেহারায় ঝুলিয়ে দিতেন। তারা আমাদের অতিক্রম করে চলে যাবার পরই আমরা তা উন্মুক্ত করতাম।’’ (সুনান আবূ দাঊদ হাঃ ৫৩৮১, বায়হাক্বী হাঃ ৩৩)
আসমা’ বিনতু আবী বকর (রাঃ) বলেনঃ আমরা পুরুষদের থেকে আমাদের চেহারা আবৃত রাখতাম। (মুস্তাদরাক হাকিম হাঃ ১৬৬৪)
ফাতিমা বিনতুল মুনযির (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ‘‘আমরা আসমা বিনতু আবূ বকর (রাঃ)-এর সঙ্গে ইহরাম অবস্থায় থাকাকালে আমাদের চেহারা ঢেকে রাখতাম।’’ (ইমাম মালিক মুওয়াত্ত্বা হাঃ ১/৩২৮, হাকিম মুসতাদরাক : ১/৪৫৪)
এ ব্বিরণ থেকে জানা গেল, মুখমন্ডলের পর্দার বিষয়টি ইজমা’র ভিত্তিতে স্থির হয়েছে। কোন মাযহাবের কোন উল্লেখযোগ্য ‘আলিম এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেননি। শায়খ ইবনু বায (রহিমাহুল্লাহ), শায়খ ইবনু উসায়মীন ও শায়খ ইবনু জিবরীনও একই ফাতাওয়া দিয়েছেন। (দেখুন- রিসালাতুন ফিল-হিজাবি ওয়াস-সুফূর : ১৯; ফাতাওয়া উলামাইল বালাদিল হারাম : ১১৬৯)
মুফতী মুহাম্মদ শাফী ‘উসমানী (রহিমাহুল্লাহ) লিখেছেন, ‘‘ইমাম চতুষ্টয়ের মধ্য থেকে ইমাম মালিক, ইমাম শাফি’ঈ ও ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বাল (রহিমাহুমুল্লাহ) তিনজনই মুখমণ্ডলে ও হাতের কব্জি খোলা রাখার মোটেই অনুমতি দেননি ফিতনার আশঙ্কা থাকুক বা না থাকুক। ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) ফিতনার আশঙ্কা যদি না না থাকলে খোলা রাখার অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে এই শর্ত পূরণ হবার নয়, তাই হানাফী ফকীহগণ পরপুরুষের সামনে মুখমণ্ডলে ও হাতের কব্জি খোলা রাখার অনুমতি দেননি।’’ (মা‘আরিফুল কুরআন : ৭/২১৪)
তেমনি এটাও সঙ্গত নয় যে, মহিলাদের সারা শরীর ঢাকা থাকবে আর মুখমণ্ডলে থাকবে খোলা। অথচ মানুষের প্রথম দৃষ্টিটিই পড়ে মুখের উপর। তারপর সেখান থেকেই অন্তরে খারাপ বাসনার সৃষ্টি হয়। পবিত্র কুরআনে নারীদের হিজাব এবং তদসংক্রান্ত প্রায় আটটি আয়াত আছে। সেগুলো থেকেও এ কথা জানা যায়, শারী‘আতের দাবী কেবল শরীর ঢাকা নয়, বরং মুখমণ্ডলে ঢাকাও জরুরী।
আধুনিককালের প্রখ্যাত ‘আলিম ও ফকীহগণও একই মত পোষণ করেন। আরব বিশ্বের সমকালীন সকল ‘আলিম ও মুফতীদের মতও এই যে, মহিলাদের জন্য মুখমণ্ডলে ঢাকা একান্ত আবশ্যক। তাদের মধ্যে শায়খ ‘আবদুর রহমান ইবন সা‘দী, মুহাম্মাদ ইবনু ইবরাহীম আল আশ্ শায়খ, মুহাম্মাদ আল আমীন আশ্ শানকীতী, শায়খ ‘আবদুল ‘আযীয বিন ‘আবদুল্লাহ ইবনু বায, শায়খ আবূ বকর জাবির আল জাযায়িরী, শায়খ মুহাম্মাদ ইবনু গুনায়মীন, শায়খ ‘আবদুল্লাহ ইবনু জিবরীন, শায়খ সালিহ আল ফাওযান, শায়খ বকর ইবনু ‘আবদুল্লাহ আবূ যায়দ, মুহাম্মাদ ইবনু আহমাদ ইসমা‘ঈল আল মাকদাম, আবূ ইসহক আল হুওয়ায়তী, মুসতাফা আল ‘আদাবী, মুহাম্মাদ হাসসান ও আরো অনেকের নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। স্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং ফকীহগণের চূড়ান্ত ফাতাওয়াসমূহ থাকার পরও কোন ‘আলিম নিকাবকে অস্বীকার করতে পারেন না।
পরপুরুষের সামনে নারীর মুখমণ্ডলে প্রদর্শন বৈধতার পক্ষের প্রবক্তাগণ প্রমাণের জন্য পূর্বোক্ত সূরাহ্ নূরের ৩১ নং আয়াত তুলে ধরেন। তাদের বক্তব্য, ‘সাধারণত প্রকাশমান সৌন্দর্য’ এর ব্যাখ্যায় ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আব্বাস ও ‘আবদুল্লাহ ইবন মাস্‘ঊদ থেকে বর্ণনা করা হয় যে, এ দ্বারা করতল ও চেহারা উদ্দেশ্য। অথচ ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাস্‘ঊদ -এর ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ আলাদা। আর ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আব্বাস (রাঃ)-এর উদ্ধৃত উক্তি আলোচ্য দাবীর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। কেননা একাধিক সহীহ সনদে ইবন মাস্‘ঊদ থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, আয়াতের আলোচ্য অংশ ‘ইল্লা মা যাহারা মিনহা’-এর অর্থ ‘কাপড়’। (দেখুন- ত্ববারী, জামি‘উল বায়ান : ১৭/২৫৬-২৫৮; ইবন আবী শায়বাহ্, আল-মুসান্নাফ : ৯/২৮০)
এ অংশের ব্যাখ্যায় প্রখ্যাত মুফাস্সির ইবন কাসীর (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ‘আয়াতের অর্থ, পরপুরুষের সামনে নারী তার কোন ধরনের সৌন্দর্য প্রকাশ করবে না। তবে যা আবৃত রাখা সম্ভব নয় তার কথা আলাদা। এর দৃষ্টান্ত দিয়ে ইবনু মাস্‘ঊদ বলেছেন,
كَالرِّدَاءِ وَالثِّيَابِ يَعْنِي عَلٰى مَا كان يتعاطاه نِسَاءُ الْعَرَبِ مِنَ الْمِقْنَعَةِ الَّتِي تُجَلِّلُ ثِيَابَهَا وَمَا يَبْدُو مِنْ أَسَافِلِ الثِّيَابِ. فَلَا حَرَجَ عليها فيه لأن هذا لا يمكنها إخفاؤ.
আরবের নারীগণ যে বড় চাদরে তাদের পরনের কাপড় ঢেকে বের হতেন এবং কাপড়ের নীচের অংশ, যা চলার সময় চাদরের নীচ দিয়ে প্রকাশিত হয়ে যেত তা যেহেতু ঢেকে রাখা সম্ভব নয় তাই এতে কোন দোষ নেই। (তাফসীরে ইবন কাসীর : ৬/৪১)
‘হাসান বসরী, মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন, ইবনুল জাওযী, ইবরাহীম নাখ‘ঈ (রহিমাহুমুল্লাহ) প্রমুখ মনীষীও অনুরূপ ব্যাখ্যা করেছেন।’ (তাফসীরুল কুরআনিল ‘আযীম : ৩/৩১২)
পবিত্র কুরআনের শব্দ ও বাক্য, আলোচ্য বিষয়ের হাদীস ও আসার এবং উসূলে ফিকহের নীতি ও বিধান ইত্যাদি বিবেচনায় ইবন মাস্‘ঊদ (রাঃ)-এর ব্যাখ্যাই অগ্রগণ্য। কারণ সূরাহ্ আল আহযাব-এর ৫৯ নম্বর আয়াতে জিলবাবের একাংশ চেহারার উপর নামিয়ে মুখমণ্ডলে আবৃত রাখার আদেশ করা হয়েছে। তা সূরাহ্ আন্ নূর-এর আলোচ্য আয়াতে ইবনু মাস্‘ঊদ -এর ব্যাখ্যাকেই প্রতিষ্ঠিত করে। তাছাড়া সহীহ হাদীসসমূহে নারীদের চেহারা ঢেকে রাখার যে নির্দেশ ও ব্বিরণ দেখা যায় তাও তাঁর ব্যাখ্যাকে সমর্থন করে।
তদুপরি যারা মুখ খোলার পক্ষে বলেছেন প্রথমত তাদের মতটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মত নয় আর দ্বিতীয়ত তাঁরা সবাই এর জন্য নিরাপদ ও ফিতনামুক্ত হওয়ার শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। আর বলাবাহুল্য যে, বর্তমান যুগে ফিতনার বিস্তার সর্বত্র। মানুষের মধ্যে দীনদারী ও আল্লাহভীতি হ্রাস পেয়েছে। লজ্জা ও লজ্জাবনত মানুষের সংখ্যা কমে গেছে। ফিতনার প্রতি আহবানকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। সাজসজ্জার নানা উপায় ও উপকরণ আবিষ্কৃত হওয়ায় ফিতনার মাত্রা আরও বেড়ে গেছে। তাই মুসলিম নারীর উচিত মাহরাম ছাড়া অন্য কারও সামনে চেহারা ও দুই হাত উন্মুক্ত না রাখা। আল্লাহই অধিক জানেন।
(‘ইসলাম হাউজ’ থেকে প্রকাশিত আলী হাসান তৈয়ব লিখিত ও ড. মোহাম্মদ মানজুরে ইলাহী সম্পাদিত ‘‘মুখমণ্ডলে ঢাকা কি হিজাবের অংশ নয়?’’ শীর্ষক প্রবন্ধ দ্রষ্টব্য।)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৭৩-[৭০] আবূ মাত্বর (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন ’আলী (রাঃ) তিন দিরহাম দিয়ে একটি কাপড় কিনলেন। যখন তিনি তা পরিধান করলেন, তখন এ দু’আটি পড়লেন- اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ الَّذِىْ رَزَقَنِىْ مِنَ الْرَيَاشِ مَا اَتَجَمَّلُ بِهٖ فِـىْ النَّاسِ وَاُوَارِىْ بِهٖ عَوْرَتِـىْ। অর্থাৎ- ’’সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি আমাকে পোশাক দান করেছেন, আমি এর দ্বারা লোক সমাজে নিজের সৌন্দর্য প্রকাশ করার প্রয়াস পাব এবং আমার সতর আবৃত করব।’’ অতঃপর তিনি বললেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এরূপ বলতে শুনেছি। (আহমাদ)[1]
الْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ أَبِي مَطَرٍ قَالَ: إِنْ عَلِيًّا اشْتَرَى ثَوْبًا بِثَلَاثَةِ دَرَاهِمَ فَلَمَّا لَبِسَهُ قَالَ: «الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي رَزَقَنِي مِنَ الرِّيَاشِ مَا أَتَجَمَّلُ بِهِ فِي الناسِ وأُواري بِهِ عورتي» ثُمَّ قَالَ: هَكَذَا سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُول. رَوَاهُ أَحْمد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘আবূ মাত্বর’’ নামে একজন বর্ণনাকারী। যিনি বাসরার অধিবাসী। তিনি সকলের ঐকমত্যে অপরিচিত। আরও একজন বর্ণনাকারীর নাম ‘‘মুখতার ইবনু নাফি‘ আত্ তাম্মার’’ তিনি একজন য‘ঈফ বর্ণনাকারী। বিস্তারিত দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ১৩/৫৬১ পৃঃ, হাঃ ৬২৬৩।
ব্যাখ্যাঃ পোশাক পরিধানের সময় কোন্ দু‘আ পড়তে হবে- সে সম্পর্কে একাধিক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এ হাদীসটির সানাদ সহীহ না হওয়ায় এটি না পড়ে বরং সহীহ বর্ণনায় যে দু‘আগুলো এসেছে সেগুলো পড়া উচিত। আবূ সা‘ঈদ আল খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নতুন কাপড় পরতেন, তখন পাগড়ী, জামা কিংবা চাদর তার নাম নিয়ে এ দু‘আ পড়তেন,
اَللّٰهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ ، أَنْتَ كَسَوْتَنِيهِ ، أَسْأَلُكَ مِنْ خَيْرِه وَخَيْرِ مَا صُنِعَ لَهٗ ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّه وَشَرِّ مَا صُنِعَ لَهٗ.
‘‘হে আল্লাহ! তোমারই নিমিত্তে সমস্ত প্রশংসা, তুমি আমাকে এই (নতুন কাপড়) পরালে, আমি তোমার নিকট এর কল্যাণ এবং এটি যার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে তার কল্যাণ প্রার্থনা করছি। আর এর অকল্যাণ এবং যার জন্য এটি প্রস্তুত করা হয়েছে তার অকল্যাণ থেকে আমি তোমার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।
[সুনান আবূ দাঊদ হাঃ ৪০২৩, ইমাম ইবনুল কইয়িম (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘‘যাদুল মা‘আদ’’ গ্রন্থে এবং শায়খ আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর সহীহ সুনান আবূ দাঊদ-এ এটিকে সহীহ বলেছেন।]
আর নতুন-পুরাতন যে কোন পোশাক পরিধানের সময় পড়ার দু‘আ হচ্ছে :
الْحَمْدُ لِلّٰهِ الَّذِىْ كَسَانِي هٰذَا الثَّوْبَ وَرَزَقَنِيهِ مِنْ غَيْرِ حَوْلٍ مِنِّي وَلَا قُوَّةٍ
‘‘সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাকে এ (কাপড়) পরিধান করিয়েছেন এবং আমার কোন শক্তি ও ক্ষমতা ছাড়াই আমাকে দান করেছেন।’’ (সুনান আবূ দাঊদ হাঃ ৪০২৩; আলবানী : সহীহ)
পোশাক পরিধানের ক্ষেত্রে এ দু’টি দু‘আই গ্রহণযোগ্য সনদে বর্ণিত হয়েছে। এ হাদীসে উল্লেখিত দু‘আটি সহ অন্যান্য দু‘আগুলো গ্রহণযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয়নি বিধায় তা ‘আমলযোগ্য নয়। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৭৪-[৭১] আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন ’উমার ইবনুল খত্ত্বাব(রাঃ) নতুন কাপড় পরিধান করলেন এবং এ দু’আটি পড়লেন- الْحَمْدُ لِلّٰهِ الَّذِىْ كَسَانِيْ مَا أُوَارِيْ بِه عَوْرَتِيْ وَأَتَجَمَّلُ بِه فِيْ حَيَاتِيْ। অর্থাৎ- ’’সমস্ত প্রশংসা ঐ আল্লাহর জন্য যিনি আমাকে পোশাকটি পরিধান করিয়েছেন, যার দ্বারা আমি সতর আবৃত করতে পারি এবং যা দ্বারা আমি সৌন্দর্য গ্রহণ করতে পারি।’’ অতঃপর তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি নতুন কাপড় পরিধান করে উক্ত দু’আটি পাঠ করে এবং ব্যবহৃত পুরাতন কাপড়খানা সাদাকা করে দেয়, সে জীবনে এবং মরণে (উভয় অবস্থায়) আল্লাহর আশ্রয়ে, আল্লাহর হিফাযাতে এবং আল্লাহর আচ্ছাদনে অবস্থান করবে। (আহমাদ, তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ; আর ইমাম তিরমিযী বলেছেনঃ উক্ত হাদীসটি গরীব।)[1]
الْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَن أبي أُمامةَ قَالَ: لَبِسَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ ثَوْبًا جَدِيدًا فَقَالَ: الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي كَسَانِي مَا أُوَارِي بِهِ عَوْرَتِي وَأَتَجَمَّلُ بِهِ فِي حَيَاتِي ثُمَّ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: مَنْ لَبِسَ ثَوْبًا جَدِيدًا فَقَالَ: الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي كَسَانِي مَا أُوَارِي بِهِ عَوْرَتِي وَأَتَجَمَّلُ بِهِ فِي حَيَاتِي ثُمَّ عَمَدَ إِلَى الثَّوْبِ الَّذِي أَخْلَقَ فَتَصَدَّقَ بِهِ كَانَ فِي كَنَفِ اللَّهِ وَفِي حِفْظِ اللَّهِ وَفِي سِتْرِ اللَّهِ حَيًّا وَمَيِّتًا . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এ সনদে আছে ‘‘আবুল ‘আলা’’ নামের একজন বর্ণনাকারী। যিনি শাম (সিরিয়া) দেশের অধিবাসী। তিনি একজন অপরিচিত (মাজহূল) রাবী। দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ১০/১৭৮ পৃঃ, হাঃ ৪৬৪৯।
ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীসে পোশাক পরিধানের দু‘আ সম্পর্কে আলোচনা এসেছে। পোশাক পরিধানের ক্ষেত্রে বর্ণিত গ্রহণযোগ্য দু’টি দু‘আ উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই এখানে পুনরুল্লেখ করা হলো না। তাছাড়া এ হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ায় এটি ‘আমলযোগ্য নয়। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৭৫-[৭২] ’আলকামাহ্ ইবনু আবূ ’আলকামাহ্ (রহঃ) তাঁর মাতা হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, একদিন হাফসাহ্ বিনতু ’আবদুর রহমান (রাঃ) একটি খুব পাতলা ওড়না পরিহিত অবস্থায় ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর নিকট গেলেন। তখন ’আয়িশাহ্ (রাঃ) উক্ত পাতলা ওড়নাখানা ছিঁড়ে ফেললেন এবং তাকে একটি মোটা ওড়না পরিয়ে দিলেন। (মালিক)[1]
الْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ عَلْقَمَةَ بْنِ أَبِي عَلْقَمَةَ عَنْ أُمِّهِ قَالَتْ: دَخَلَتْ حَفْصَةُ بِنْتُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ عَلَى عَائِشَةَ وَعَلَيْهَا خِمَارٌ رَقِيقٌ فَشَقَّتْهُ عَائِشَةُ وَكَسَتْهَا خمارا كثيفا. رَوَاهُ مَالك
ব্যাখ্যাঃ (خِمَارٌ) ‘খিমার’ বলা হয় ঐ কাপড়কে যা দ্বারা মহিলারা তাদের মাথা ঢাকে। আমাদের দেশীয় ভাষায় যাকে বলে ওড়না। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) হাফসাহ্ বিনতু ‘আবদুর রহমান (রাঃ)-এর পাতলা ওড়নাটা ছিঁড়ে ফেললেন এজন্য যে, সে যেন ওটা আর ব্যবহার করতে না পারে। আর তিনি শুধু ছিঁড়েই ফেলেননি উপরন্তু তিনি তাকে একটি মোটা কাপড়ের ওড়না উপহার দিলেন। কারণ মোটা কাপড়ের ওড়না পর্দা করার জন্য বেশি কার্যকর ও উপযোগী। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৭৬-[৭৩] ’আবদুল ওয়াহিদ ইবনু আয়মান (রহঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি এক সময় ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর কাছে গেলাম। দেখলাম, তিনি পাঁচ দিরহাম মূল্যের মোটা সূতার একটি কামীস পরিধান করে আছেন। তিনি বললেনঃ আমার এ দাসীটাকে একটু চোখ তুলে দেখ, বাড়িতেও সে এটা ব্যবহার করতে অস্বীকার করে। অথচ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে আমার ঐ রকমই একটি কামীস ছিল, মদীনার কোন মেয়েকে যখনই (বিয়ে শাদীতে) সাজানো হত, তখন লোক পাঠিয়ে আমার নিকট হতে তা সাময়িকভাবে নিয়ে যেত। (বুখারী)[1]
الْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ عَبْدِ الْوَاحِدِ بْنِ أَيْمَنَ عَنْ أَبِيهِ قَالَ: دَخَلَتْ عَلَى عَائِشَةَ وَعَلَيْهَا دِرْعٌ قِطْرِيٌّ ثَمَنُ خَمْسَةِ دَرَاهِمَ فَقَالَتْ: ارْفَعْ بَصَرَكَ إِلَى جَارِيَتِي انْظُرْ إِلَيْهَا فَإِنَّهَا تُزْهَى أَنْ تَلْبَسَهُ فِي البيتِ وَقد كَانَ لِي مِنْهَا دِرْعٌ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَمَا كَانَتِ امْرَأَةٌ تُقَيَّنُ بِالْمَدِينَةِ إِلَّا أَرْسَلَتْ إِلَيَّ تَسْتَعِيرُهُ. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তৎকালে ‘আরবে বিয়ে উপলক্ষ্য এরূপ পোশাক ধার দেয়া-নেয়ার প্রচলন ছিল। ইসলাম এ পদ্ধতিকে নিষেধ করেনি। বিয়ে উপলক্ষ্য কারও কোন বিশেষ পোশাক বা অলংকার ধার দেয়া-নেয়া বৈধ। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) তার বোন আসমা (রাঃ)-এর নিকট থেকে একটি গলার হার ধার নিয়েছিলেন যে ঘটনা সহীহুল বুখারীতেই উল্লেখিত হয়েছে। এ হাদীস দ্বারা মা ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর উদারতা, বিনয় ও পরোপকারিতা ইত্যাদি গুণাবলীর প্রকাশ ঘটেছে। (ফাতহুল বারী ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬২৭-২৬২৮)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৭৭-[৭৪] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিয়্যাহস্বরূপ প্রাপ্ত একটি রেশমী কাবা (আলখেল্লা) পরিধান করলেন। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অতিসত্বর তা খুলে ফেললেন এবং ’উমার (রাঃ)-এর কাছে পাঠিয়ে দিলেন। তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রসূল! আপনি এত দ্রুত তা খুলে ফেললেন? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ (এইমাত্র) জিবরীল (আ.) আমাকে তা পরিধান করতে নিষেধ করেছেন। পরে ’উমার (রাঃ) কাঁদতে কাঁদতে এসে বললেনঃ হে আল্লাহর রসূল! আপনি একটি জিনিস অপছন্দ করলেন আর তা আমাকে প্রদান করলেন। সুতরাং আমার অবস্থা কী হবে? তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ প্রকৃতপক্ষ আমি তা তোমাকে পরিধান করার উদ্দেশে দেইনি; বরং দিয়েছি যাতে তুমি তা বিক্রি করে উপকৃত হও। ’উমার (রাঃ) দু’ হাজার দিরহামের বিনিময়ে তা বিক্রি করলেন। (মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: لَبِسَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمًا قَبَاءَ دِيبَاجٍ أُهْدِيَ لَهُ ثُمَّ أَوْشَكَ أَنْ نَزَعَهُ فَأَرْسَلَ بِهِ إِلَى عُمَرَ فَقِيلَ: قَدْ أَوْشَكَ مَا انْتَزَعْتَهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «نهاني عَنهُ جبريلُ» فَجَاءَ عُمَرُ يَبْكِي فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ كرهتَ أَمْرًا وَأَعْطَيْتَنِيهِ فَمَا لِي؟ فَقَالَ: «إِنِّي لَمْ أُعْطِكَهُ تَلْبَسُهُ إِنَّمَا أَعْطَيْتُكَهُ تَبِيعُهُ» . فَبَاعَهُ بِأَلْفَيْ دِرْهَم. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, কোন পোশাক বা বস্তু যদি নির্দিষ্ট কারও জন্য হারাম হয় তাহলে সে তা বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করতে পারবে। এটি জায়িয। এ হাদীসেই দেখা যাচ্ছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘উমার (রাঃ)-কে রেশমের তৈরি জামাটি পরতে না দিয়ে তাকে তা বিক্রি করে দিতে বললেন। যেহেতু রেশমী কাপড় পরা মহিলাদের জন্য জায়িয। মহিলারা চাইলে তা কিনে পরতে পারবে। এ হাদীস দ্বারা আরও প্রমাণ হয় যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের প্রথমযুগে রেশমী কাপড়ের তৈরি পোশাক পরতেন। তারপর যখন তা হারাম হওয়ার বিধান অবতীর্ণ হলো তখন থেকে তিনি তা পরা বাদ দিয়ে দিলেন। (শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২০৭০/১৬)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৭৮-[৭৫] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু রেশমের তৈরি কাপড় পরতে নিষেধ করেছেন। তবে (চার আঙ্গুল পরিমাণ) রেশমের ঝালর অথবা কাপড়ে নকশা হিসেবে ব্যবহারে কোন দোষ নেই। (আবূ দাঊদ)[1]
الْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: إِنَّمَا نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ ثَوْبِ الْمُصْمَتِ مِنَ الْحَرِيرِ فَأَمَّا الْعَلَمُ وَسَدَى الثَّوْبِ فَلَا بَأْسَ بِهِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ ইবনু রসলান বলেন, (الثَّوْبُ الْمُصْمَتِ مِنَ الْحَرِيرِ) অর্থ হচ্ছে নিরেট রেশমের তৈরি কাপড়। যে কাপড়ে অন্য কোন উপাদান নেই। কিন্তু ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ‘‘আস্ সাওবুল মুসমাত মিনাল হারীর’’ হলো যে কাপড়ের শুধু লম্বার দিকের ঝালর বা প্রস্তের দিকের ঝালর রেশমী সূতায় তৈরি। মূলকথা হলো লম্বার দিকের ঝালর যদি রেশমের হয় কিন্তু প্রস্তের দিকের ঝালর রেশমী সূতার না হয়ে অন্য কোন সূতা বা পশমের হয় তাহলে কোন সমস্যা নেই। কারণ প্রস্তের দিকের ঝালর ছাড়া কাপড় পূর্ণতা পায় না। এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, যদি সামান্য কিছু রেশমী ঝালর হিসেবে কাপড়ে ব্যবহার করা হয় তা পুরুষের জন্য হারাম হবে না। এটি সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘উলামার মত। তারা চার আঙ্গুল পরিমাণ রেশম ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন। তবে সাহাবীগণের মধ্যে কেউ কেউ যেমন ইবনু ‘উমার (রাঃ) আবার তাবি‘ঈদের মধ্য থেকে কেউ কেউ যেমন ইবনু সীরীন প্রমুখ এই সামান্য রেশমী ব্যবহারও পুরুষের জন্য হারাম মনে করেন। তারা দলীল দেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্বিস্সী কাপড় পরতে নিষেধ করেছেন। কিস্সী কাপড় হলো যে কাপড়ের সাথে রেশমীর সংমিশ্রণ রয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা ইতিপূর্বে হয়ে গেছে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪০৫১)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৭৯-[৭৬] আবূ রজা’ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন ’ইমরান ইবনু হুসায়ন রেশমী বর্ডারের কাপড় পরিহিত অবস্থায় আমাদের সম্মুখে এলেন এবং বললেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা যাকে কোন নি’আমাত দান করেন, তখন আল্লাহ তা’আলা চান যে, যেন সে নি’আমাতের নিদর্শন বান্দার মধ্যে পরিলক্ষিত হয়। (আহমাদ)[1]
الْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ أَبِي رَجَاءٍ قَالَ: خَرَجَ عَلَيْنَا عِمْرَانُ بْنُ حُصَيْنٍ وَعَلَيْهِ مِطْرَفٌ مِنْ خَزٍّ وَقَالَ: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِ نِعْمَةً فَإِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ أَنْ يَرَى أَثَرَ نِعْمَتِهِ عَلَى عَبده» . رَوَاهُ أَحْمد
ব্যাখ্যাঃ আল্লাহর প্রদত্ত নি‘আমাতের প্রকাশ অনেকভাবে ঘটানো যায়। যাকে আল্লাহ অর্থ-সম্পদ দিয়েছেন সে তা আল্লাহর রাস্তায়, সৃষ্টির কল্যাণে ও গরীব-মিসকীনদের দান করে তার প্রতি প্রদত্ত নি‘আমাতের প্রকাশ ঘটাবে। কখনই সে তার সম্পদ অপচয় করে তার প্রকাশ ঘটাবে না। আল্লাহ যাকে সুন্দর কাপড় পরার সামর্থ্য দিয়েছেন সে তার সামর্থ অনুযায়ী সুন্দর কাপড় পরবে। সে ইচ্ছা করে ছেঁড়া কাপড় পরে চলাফেরা না না। যার সুন্দর পোশাক পরার সামর্থ্য আছে কিন্তু ছেঁড়া পোশাক পরে তাহলে মনে করা হবে যে সে প্রসিদ্ধি পাওয়ার জন্য এমনটা করছে। তবে তার উদ্দেশ্য যদি ভালো হয়, যেমন- সে এজন্য দরিদ্রদের পোশাক পরেছে যেন সে দরিদ্রদের কষ্ট অনুভব করতে পারে কিংবা তাদের প্রতি সহমর্মিতা জানাতে পারে অথবা অন্তরে যেন অহঙ্কার না আসে সে ব্যবস্থা করতে পারে- এ ধরনের ভালো উদ্দেশ্য হলে সমস্যা নেই। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৮০-[৭৭] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মনে যা চায় তা খাও এবং যা ইচ্ছা হয় পরিধান করো, যে পর্যন্ত না তুমি দু’টির মধ্যে পতিত হও- অপব্যয় ও অহংকার। (বুখারী হাদীসটি তাঁর কিতাবের শিরোনামে বর্ণনা করেছেন।)[1]
الْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: كُلْ مَا شِئْتَ وَالْبَسْ مَا شِئْتَ مَا أَخْطَأَتْكَ اثْنَتَانِ: سَرَفٌ وَمَخِيلَةٌ. رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ فِي تَرْجَمَة بَاب
ব্যাখ্যাঃ এ মাওকূফ হাদীসে যা ইচ্ছা খাওয়ার ও যা ইচ্ছা পরার যে আদেশ দেয়া হয়েছে তা অনুমতি অর্থে ব্যবহৃত হবে। তবে খাওয়া ও পোশাক পরার ক্ষেত্রে কোন ধরনের অপচয়, অপব্যয় করা বৈধ নয়। ব্যয় করার ক্ষেত্রে অপব্যয় না করার নির্দেশনা দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَالَّذِينَ إِذَا أَنْفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذٰلِكَ قَوَامًا
‘‘আর তারা যখন ব্যয় করে তখন অপব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না। বরং মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে।’’ (সূরাহ্ আল ফুরকান ২৫ : ৬৭)
খাওয়া ও পোশাক পরার ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে যেন এসব ক্ষেত্রে অহংকার চলে না আসে। অপচয় ও অহংকার থেকে মুক্ত থেকে প্রয়োজন অনুয়ায়ী খাওয়া ও পোশাক পরা বৈধ এবং জরুরী। তবে ইসলামে খাওয়া ও পরিধানের ক্ষেত্রে কিছু বিধি-বিধান রয়েছে যা কুরআন ও হাদীসের অন্যান্য বর্ণনায় বর্ণিত হয়েছে। প্রত্যেক মুসলিমের জন্য সেগুলো মেনে খাওয়া ও পরিধান করা উচিত। [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৮১-[৭৮] ’আমর ইবনু শু’আয়ব (রহঃ) তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা খাও, পান করো, দান-সাদাকা করো এবং পরিধান করো যে পর্যন্ত না অপব্যয় ও অহংকারে পতিত হও। (আহমাদ, নাসায়ী ও ইবনু মাজাহ)[1]
الْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «كُلُوا وَاشْرَبُوا وَتَصَدَّقُوا وَالْبَسُوا مَا لم يُخالطْ إِسْرَافٌ وَلَا مَخِيلَةٌ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالنَّسَائِيُّ وَابْنُ مَاجَه
ব্যাখ্যাঃ এ হাদীসে বর্ণিত বিষয়েই আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّه لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ
‘‘আর তোমরা খাও এবং পান করো কিন্তু অপব্যয় করো না। নিশ্চয় তিনি (আল্লাহ) অপব্যয়কারীদের ভালোবাসেন না।’’ (সূরাহ্ আল আ‘রাফ ৭ : ৩১)
‘ইসরাফ’ বলা হয় মূলত যে কোন কাজ বা কথার ক্ষেত্রে নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করা। সাধারণত অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে এ পরিভাষাটির ব্যবহার সর্বাধিক। আর ‘মাখীলাহ্’ অর্থ হলো অহংকার।
এ হাদীসটি কোন মানুষের জীবন পরিচালনার জন্য খুবই শিক্ষণীয়। এখানে অপব্যয় থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। কারণ অপব্যয় শারীরিকভাবে ও জীবন উপকরণের ক্ষেত্রে মানুষকে ক্ষতি করে। আর এখানে অহংকার থেকে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ অহংকার মানুষের আত্মাকে নষ্ট করে দেয় যদিও অহংকার কিছু সময়ের জন্য ভালো লাগে। এগুলোর মাধ্যমে দুনিয়ায় মানুষের ক্ষক্ষাভের পাত্র হতে হয় আর এগুলো পরকালের জন্য গুনাহের বোঝা ভারি করে। তাই খাওয়া, পান করা, দান করা, পোশাক পরিধান করা- সকল ক্ষেত্রে অপচয়, অপব্যয় ও অহংকার বর্জন আবশ্যক। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, ‘লিবাস’ অধ্যায়)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৪৩৮২-[৭৯] আবুদ্ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যা পরিধান করে তোমরা কবরে এবং মসজিদে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে, তন্মধ্যে সর্বোত্তম হলো সাদা কাপড়। (ইবনু মাজাহ)[1]
الْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ أَحْسَنَ مَا زُرْتُمُ اللَّهَ فِي قُبُورِكُمْ وَمَسَاجِدِكُمُ الْبَيَاضُ» . رَوَاهُ ابْن مَاجَه
হাদীসটি মাওযূ‘ বা বানোয়াট হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘যারওয়ান ইবনু সালিম আল গিফারী’’ নামক একজন বর্ণনাকারী। ইনি মাতরূকুল হাদীস। দেখুন- মিরক্বাতুল মাকাতীহ শার্হু মিশকাতুল মাসাবীহ ১৩/৮২ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ এ বর্ণনাটি বানোয়াট (জাল) হওয়ায় এর কোন ব্যাখ্যা প্রয়োজন নেই। কবরে দাফনের জন্য সাদা কাপড় ব্যবহার করার আদেশ সম্বলিত একাধিক সহীহ হাদীস অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে। যেমন,
الْبَسُوا مِنْ ثِيَابِكُمْ الْبَيَاضَ فَإِنَّهَا مِنْ خَيْرِ ثِيَابِكُمْ وَكَفِّنُوا فِيهَا مَوْتَاكُمْ
‘‘তোমরা সাদা কাপড়ের পোশাক পরিধান করো। কারণ তা উত্তম পোশাক এবং তোমরা এ সাদা কাপড়েই মৃতদের কাফন করো।’’ (মুসনাদে আহমাদ হাঃ ২২১৯) [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - আংটির বর্ণনা
৪৩৮৩-[১] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বর্ণের আংটি তৈরি করলেন। অপর এক রিওয়ায়াতে আছে, তিনি তা ডান হাতে পরলেন। অতঃপর তা খুলে ফেলে দিলেন এবং পরে রূপার আংটি তৈরি করালেন। তাতে অঙ্কিত ছিল مُحَمَّدٌ رَّسُوْلُ اللهِ ’’মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ’’ এবং বললেনঃ কেউ যেন তার আংটি আমার আংটির নকশার অনুরূপ অঙ্কিত না করে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তা পরতেন, তার নকশা হাতের তালুর দিকে রাখতেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْخَاتَمِ
عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: اتَّخَذَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَاتَمًا مِنْ ذَهَبٍ وَفِي رِوَايَةٍ: وَجَعَلَهُ فِي يَدِهِ الْيُمْنَى ثُمَّ أَلْقَاهُ ثُمَّ اتَّخَذَ خَاتَمًا مِنْ الْوَرق نُقِشَ فِيهِ: مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ وَقَالَ: «لَا يَنْقُشَنَّ أَحَدٌ عَلَى نَقْشِ خَاتَمِي هَذَا» . وَكَانَ إِذَا لَبِسَهُ جَعَلَ فَصَّهُ مِمَّا يَلِي بَطْنَ كَفه
ব্যাখ্যাঃ হাসান এবং হুসায়ন (রাঃ) হতে বর্ণিত : আংটির উপর আল্লাহ তা‘আলার জিকর খোদাই করাতে কোন দোষ নেই। ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ এটা জামহূর ‘উলামারও কথা এবং তিনি, ইবনু সীরীনসহ অন্যান্য ‘উলামার সূত্রে তা মাকরূহ হওয়ার বর্ণনা করেছেন। তবে ইবনু সীরীন (রহিমাহুল্লাহ)-এর বিশুদ্ধ বর্ণনায় রয়েছে, আংটিতে حسبى الله হাসবিয়াল্ল-হু (আল্লাহ তা‘আলাই আমার জন্য যথেষ্ট) বা অনুরূপ বাক্য খোদাই করাতে কোন দোষ নেই।
সুতরাং ‘‘আংটিতে আল্লাহর জিকর খোদাই করা মাকরূহ’’, এ দলীল মজবুত নয়। তবে আল্লাহর জিকর খোদাইকৃত আংটি পরিধান করা ঋতুবতী মহিলা, অপবিত্র ব্যক্তি ও প্রকৃতির ডাকে সাড়া দানকারী ব্যক্তির জন্য অবশ্যই তা মাকরূহ। এসব থেকে নিরাপদ হলে উল্লেখিত আংটি হাতে পরা মোটেও মাকরূহ নয়। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৮৭৭)
আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আংটির মতো নকশা অন্য কারো আংটিতে করতে নিষেধ করার কারণ হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার আংটিতে ‘‘মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ’’ খোদাই করেছেন অনারব বা অন্যান্য বাদশাদের কাছে পাঠানো চিঠিতে মোহর বা সিল হিসেবে ব্যবহার করার জন্য। অতএব এ নকশা অন্য কেউ করলে তা অবশ্যই বিপর্যয়ের কারণ হবে। (শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২০৯১)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - আংটির বর্ণনা
৪৩৮৪-[২] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রেশম ও হলুদ রঙের কাপড় পরিধান ও স্বর্ণের আংটি ব্যবহার করতে এবং কুরআনের কোন অংশ রুকূ’ অবস্থায় পাঠ করতে নিষেধ করেছেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْخَاتَمِ
وَعَنْ عَلِيٍّ قَالَ: نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ لُبْسِ الْقَسِّيِّ وَالْمُعَصْفَرِ وَعَنْ تَخْتُّمِ الذَّهَبِ وَعَنْ قِرَاءَةِ الْقُرْآنِ فِي الرُّكُوعِ. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ হলুদ রংয়ের কাপড় পরিধান করার ব্যাপারে ‘উলামার মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। সাহাবী, তাবি‘ঈ এবং তাঁদের পরবর্তী বিদ্বানগণ এ ধরনের কাপড় পরিধান করা বৈধ বলেছেন। আর ইমাম শাফি‘ঈ, আবূ হানীফাহ্ ও ইমাম মালিক (রহিমাহুমুল্লাহ) এটাই বলেছেন। তবে ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ এ ধরনের পোশাক ছাড়া অন্যান্য পোশাক পরিধান করা উত্তম। অপর বর্ণনায় রয়েছে, তিনি হলুদ রংয়ের পোশাক বাড়িতে কিংবা বাড়ির আঙ্গিনায় পরিধান করা বৈধ বলেছেন এবং বাড়ির বাহিরে বা বাজারে পরিধান করা মাকরূহ বলেছেন। ‘উলামার একটি জামা‘আত বলেছেন, এ মাকরূহ বলতে মাকরূহে তানযীহি উদ্দেশ্য। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করা দ্বারা মাকরূহে তানযীহি অর্থ গ্রহণ করেছেন। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লাল পোশাক পরেছেন মর্মে প্রমাণ পাওয়া যায়। বুখারী মুসলিমে ইবনু ‘উমার (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হলুদ রংয়ের পোশাক পরিধান করতে দেখেছি। (শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২০৭৮)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - আংটির বর্ণনা
৪৩৮৫-[৩] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক ব্যক্তির হাতে একটি স্বর্ণের আংটি দেখতে পেলেন। তখনই তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার হাত হতে তা খুলে ফেলে দিলেন এবং বললেনঃ তোমাদের কেউ কি জ্বলন্ত অঙ্গার নিয়ে নিজ হাতে রাখতে চায়? (এটা বলে) অতঃপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চলে গেলে লোকেরা তাকে বলল, তুমি তোমার আংটিটি তুলে নাও এবং তা হতে (অন্য কোনভাবে) উপকৃত হও। তখন সে বলল, আল্লাহর কসম! আমি তা কখনো তুলে নেব না, যা স্বয়ং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফেলে দিয়েছেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْخَاتَمِ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأَى خَاتَمًا مِنْ ذَهَبٍ فِي يَدِ رَجُلٍ فَنَزَعَهُ فَطَرَحَهُ فَقَالَ: «يَعْمِدُ أَحَدُكُمْ إِلَى جَمْرَةٍ مِنْ نَارٍ فَيَجْعَلُهَا فِي يَدِهِ؟» فَقِيلَ لِلرَّجُلِ بَعْدَمَا ذَهَبَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: خُذْ خَاتَمَكَ انْتَفِعْ بِهِ. قَالَ: لَا وَاللَّهِ لَا آخُذُهُ أَبَدًا وَقَدْ طَرَحَهُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ আলোচ্য হাদীসে আংটিওয়ালা লোকটির কথা; যখন তার সাথীরা তাকে বলেছিল আংটি উঠিয়ে নাও। তখন তিনি বলেছিলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা ফেলে দিয়েছেন তা আমি আর নেব না। এতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ পালন ও নিষেধাজ্ঞামূলক কথাবলী বর্জনের উপর দৃঢ় প্রত্যয় প্রমাণিত হয়। আর দুর্বল ব্যাখ্যার মাধ্যমে নিষিদ্ধ কোন কিছুর অনুমোদন অনুসন্ধান না করার প্রতি দৃঢ় প্রত্যয় প্রকাশ করা বুঝায়। তবে আংটিওয়ালা ব্যক্তি যদি আংটিটি উঠিয়ে নিতেন এবং বিক্রি কিংবা যার এটার প্রয়োজন রয়েছে তাকে সাদাকা করে দিতেন তাতে দোষের কিছু ছিল না। কেননা আংটিটি পরিবর্তন করে অন্যান্য কিছু বানানো যাবে না বা এর দ্বারা অন্য কোন উপকার নেয়া যাবে না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন কিছুই বলেননি। বরং তিনি তা পরিধান করতে নিষেধ করেছেন। অতএব উক্ত আংটি দ্বারা অন্য কাজ যেমন- আংটি থেকে মহিলাদের অলংকার ও তা বিক্রি করে অন্য যে কোন কাজ করা বৈধ। (শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২০৯০)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - আংটির বর্ণনা
৪৩৮৬-[৪] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পারস্যের রাজা কিসরা এবং রোম সম্রাট কায়সার এবং নাজাশীর নিকট পত্র লিখার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন, তখন তাঁকে বলা হলো, তারা এমন লিপি গ্রহণ করে না যা মোহর বা সীলযুক্ত নয়। অতঃপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি আংটি তৈরি করালেন, তার গোল চাক্কিটি ছিল রূপার। তাতে খোদাই করা ছিল ’’মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ’’। (মুসলিম)[1]
আর বুখারী’র রিওয়ায়াতে আছে, আংটির লেখাটি তিন পংক্তিতে ছিল। মুহাম্মাদ এক পংক্তিতে, রসূল এক পংক্তি এবং আল্লাহ এক পংক্তি।
بَابُ الْخَاتَمِ
وَعَنْ أَنَسٍ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَرَادَ أَنْ يَكْتُبَ إِلَى كِسْرَى وَقَيْصَرَ وَالنَّجَاشِيِّ فَقِيلَ: إِنَّهُمْ لَا يَقْبَلُونَ كِتَابًا إِلَّا بِخَاتَمٍ فَصَاغَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَاتَمًا حَلْقَةَ فِضَّةٍ نُقِشَ فِيهِ: مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ. رَوَاهُ مُسْلِمٌ. وَفِي رِوَايَةٍ لِلْبُخَارِيِّ: كَانَ نَقْشُ الْخَاتَمِ ثَلَاثَةَ أَسْطُرٍ: مُحَمَّدٌ سَطْرٌ ورسولُ الله سطر وَالله سطر
ব্যাখ্যাঃ আহমাদ আবূ দাঊদ ও নাসায়ীতে আবূ রায়হানাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাদশা ছাড়া অন্যকে আংটি পরিধান করতে নিষেধ করেছেন। একদল ‘উলামা বাদশা ব্যতীত অন্য কারো আংটি পরিধান করা মাকরূহ বলেছেন। তবে অন্যান্য ‘উলামা তাদের বিরোধিতা করেছেন এবং তারা বাদশা ছাড়া অন্যদের জন্য আংটি পরিধান করা বৈধ বলেছেন। তাদের দলীল : আনাস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস ‘‘নিশ্চয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তার আংটি ফেলে দিলেন, তখন সাহাবী তাদের আংটি ফেলে দিলেন।’’ এ হাদীস প্রমাণ করে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে সহাবায়ি কিরামগণ আংটি পরিধান করতেন। অথচ তাঁরা কোন বাদশা ছিলেন না। এরপরও সহাবায়ে কিরামগণ ও তাবি‘ঈনদের একদল বিদ্বান বর্ণনা করেছেন যে, তারা কোন বাদশা না হয়েও আংটি পরিধান করতেন। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৮৭৫)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - আংটির বর্ণনা
৪৩৮৭-[৫] উক্ত রাবী [আনাস (রাঃ)] হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি রূপার আংটি ছিল এবং তার নগিনা (নাম অঙ্কিত স্থানটি)-ও ছিল রূপার। (বুখারী)[1]
بَابُ الْخَاتَمِ
وَعَنْهُ أَنَّ نَبِيَّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ خَاتَمُهُ مِنْ فِضَّةٍ وَكَانَ فَصُّهُ مِنْهُ. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ আলোচ্য হাদীসে উল্লেখিত বাক্যটি (وَكَانَ فَصُّهٗ مِنْهُ) অর্থাৎ আংটির পাথর আংটির তৈরির উপাদান থেকেই বানানো। এ বাক্যটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীসটির সাথে বৈপরীত্য নয়। সহীহ মুসলিমে আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আংটি ছিল রৌপ্যের আর তার পাথর ছিল হাবশী। উভয় বর্ণনার মাঝে বৈপরীত্য এজন্য নেই, কারণ হয়তো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধিক আংটি পরিধান করতেন। আর হাবশী অর্থ হাবশার কোন অঞ্চলের পাথর হতে পারে অথবা হাবশী রংয়ের পাথর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আংটিতে ব্যবহার করতেন। অথবা হাবশা হতে নিয়ে আশা পাথর হতে পারে। অথবা আংটির পাথরটির গুণাবলী, রং, কিংবা নকশার জন্য কোনভাবে তা হাবশীর সাথে সম্পর্কযুক্ত হতে পারে। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৮৭০)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - আংটির বর্ণনা
৪৩৮৮-[৬] উক্ত রাবী [আনাস (রাঃ)] হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ডান হাতে রূপার আংটি পরিধান করেছেন। এর মধ্যে হাবশী তথা আকীক পাথরের নগিনা সংযোজিত ছিল। আর তিনি নগিনাটি হাতের তালুর দিকেই রাখতেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْخَاتَمِ
وَعَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَبِسَ خَاتَمَ فِضَّةٍ فِي يَمِينِهِ فِيهِ فَصٌّ حَبَشِيٌّ كَانَ يَجْعَلُ فَصَّهُ مِمَّا يَلِي كَفه
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - আংটির বর্ণনা
৪৩৮৯-[৭] উক্ত রাবী [আনাস (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আংটি এ আঙ্গুলে পরিধান করতেন, এ বলে তিনি বাম হাতের কনিষ্ঠা অঙ্গুলির দিকে ইঙ্গিত করলেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْخَاتَمِ
وَعَنْهُ قَالَ: كَانَ خَاتَمُ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي هَذِهِ وَأَشَارَ إِلَى الْخِنْصِرِ منْ يَده الْيُسْرَى. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ মুসলিমগণ বিদ্বানগণ এ মর্মে একমত রয়েছেন যে, পুরুষদের আংটি কনিষ্ট অঙ্গুলিতে পরা সুন্নাত, আর নারীরা তা যে কোন অঙ্গুলিতে পারে।
পুরুষদের কনিষ্ঠ অঙ্গুলিতে পড়া সুন্নাত, আর নারীদের যে কোন অঙ্গুলিতে পরিধানে হিকমাত হলো কনিষ্ঠ অঙ্গুলি হাতের এক প্রান্তে থাকায় তাতে আংটি পরিধানে বাড়তি কোন ঝামেলা পোহাতে হয় না, অন্যান্য অঙ্গুলি তার ব্যতিক্রম। আলোচ্য হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, পুরুষের মধ্যমা অঙ্গুলিতে আংটি পরিধান করা মাকরূহ।
তবে এর দ্বারা মাকরূহে তানযীহী উদ্দেশ্য। অর্থাৎ মধ্যমা আঙ্গুলে আংটি পরিধান করা যাবে তবে পরিধান না করাই ভালো। আর ডান কিংবা বাম হাতে আংটি পরিধানের ব্যাপারে উভয়ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ হাদীস বর্ণিত রয়েছে। ফকীহবিদগণ এ মর্মে একমত রয়েছেন যে, আংটি ডান কিংবা বাম উভয় হাতেই পরিধান করা বৈধ। কোন হাতেই পরিধান করা মাকরূহ নয়। (শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২০৯৫)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - আংটির বর্ণনা
৪৩৯০-[৮] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে মধ্যমা ও তর্জনী, এ দু’ আঙ্গুলে আংটি পরতে নিষেধ করেছেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْخَاتَمِ
وَعَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: نَهَانِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم إِن أَتَخَتَّمَ فِي إِصْبَعِي هَذِهِ أَوْ هَذِهِ قَالَ: فَأَوْمَأَ إِلَى الْوُسْطَى وَالَّتِي تَلِيهَا. رَوَاهُ مُسْلِمٌ
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আংটির বর্ণনা
৪৩৯১-[৯] ’আবদুল্লাহ ইবনু জা’ফার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ডান হাতে আংটি পরতেন। (ইবনু মাজাহ)[1]
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ جَعْفَرٍ قَالَ: كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَخَتَّمُ فِي يَمِينه. رَوَاهُ ابْن مَاجَه
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আংটির বর্ণনা
৪৩৯২-[১০] আর এ হাদীস আবূ দাঊদ ও নাসায়ী ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন।
وَرَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ عَن عَليّ
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আংটির বর্ণনা
৪৩৯৩-[১১] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাম হাতে আংটি পরতেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يتختم فِي يسَاره. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ কেউ কেউ বাম হাতে আংটি পরিধানের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। আংটি যখন বাম হাতে পরিধানের বৈধতা থাকবে, তখন ডান হাতে পরিধান করা আরো অগ্রগণ্য হবে। উসামাহ্ ইবনু যায়দ (রাঃ)-এর সূত্র নাফি‘ (রহিমাহুল্লাহ)-এর বর্ণনায় ডান হাতে পরিধানের কথা রয়েছে। আর নাফি‘-এর সূত্রে ‘আবদুল ‘আযীয ইবনু উবাই রওয়াদ-এর বর্ণনায় বাম হাতে পরিধানের কথা রয়েছে। হাফিয ‘আসকালানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ নাফি‘ কর্তৃক বর্ণিত বাম হাতে আংটি পরিধানের বর্ণনাটি শায ও উক্ত হাদীসের বর্ণনাকারীর সংখ্যাও কম এবং তাদের মুখস্থশক্তিও ডান হাতে আংটি পরিধানের বর্ণিত হাদীসের রাবীদের মুখস্থশক্তির তুলনায় অনেকটাই দুর্বল। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪২২৩)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আংটির বর্ণনা
৪৩৯৪-[১২] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ডান হাতে রেশম এবং বাম হাতে স্বর্ণ নিয়ে বললেনঃ এ বস্তু দু’টি (দুনিয়াতে) আমার উম্মাতের পুরুষদের জন্য হারাম। (আহমাদ, আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
وَعَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَخَذَ حَرِيرًا فَجَعَلَهُ فِي يَمِينِهِ وَأَخَذَ ذَهَبًا فَجَعَلَهُ فِي شِمَالِهِ ثُمَّ قَالَ: «إِنَّ هَذَيْنِ حَرَامٌ عَلَى ذُكُورِ أُمتي» . رَوَاهُ أَحْمد وَأَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যাঃ আলোচ্য হাদীসটি জামহূর ‘উলামার সমর্থনে দলীল : রেশমী কাপড় ও স্বর্ণ পুরুষদের জন্য হারাম এবং মহিলাদের জন্য তা বৈধ। আর এ মতের সমর্থনে তিরমিযীতে আবূ মূসা আল আশ্‘আরী (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রেশমের পোশাক পরিধান করা এবং স্বর্ণ ব্যবহার করা আমার উম্মাতের পুরুষদের জন্য হারাম করা হয়েছে এবং মহিলাদের জন্য হালাল করা হয়েছে । (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪০৫৩)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আংটির বর্ণনা
৪৩৯৫-[১৩] মু’আবিয়াহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিতা বাঘের চামড়ার তৈরি গদিতে সওয়ার হতে এবং পুরুষদেরকে স্বর্ণ ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। তবে কর্তিত মিহিন অংশবিশেষ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন। (আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
وَعَن مُعَاوِيَةُ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ رُكُوبِ النُّمُورِ وَعَنْ لُبْسِ الذَّهَبِ إِلَّا مُقَطَّعًا. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ
ব্যাখ্যাঃ উল্লেখিত হাদীসটি স্বর্ণের আংটি পরিধান করা ঘৃণিত হওয়ার উপর প্রমাণ করে। আর এটা হারাম হওয়ার ব্যাপারে বুখারী ও মুসলিমসহ অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ স্বর্ণের আংটি মহিলাদের জন্য বৈধ এবং পুরুষদের জন্য হারাম- এ ব্যাপারে সকল বিদ্বানদের ঐকমত্য রয়েছে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪২১৮)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আংটির বর্ণনা
৪৩৯৬-[১৪] বুরয়দাহ্ হতে বর্ণিত। একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাঁসার তৈরি আংটি পরিহিত এক ব্যক্তিকে বললেনঃ কি ব্যাপার! আমি যে তোমার নিকট হতে মূর্তির গন্ধ পাচ্ছি? তখন সে আংটিটি খুলে ফেলে দিলো। অতঃপর সে লোহার তৈরি একটি আংটি পরে এলো। এবার তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ কি ব্যাপার! আমি যে তোমাকে জাহান্নামীদের অলঙ্কার পরিহিত অবস্থায় দেখছি। এবারও সে আংটিটি খুলে ফেলে দিলো। অতঃপর সে বলল : হে আল্লাহর রসূল! তবে আমি কিসের আংটি পরব? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, রূপার দ্বারা। কিন্তু তার পরিমাণ যেন এক মিসকাল হতে কম হয়। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
ইমাম মুহয়িইউস্ সুন্নাহ্ বলেনঃ সাহল ইবনু সা’দ (রাঃ) হতে নারীদের মোহর সংক্রান্ত অধ্যায়ে একটি সহীহ হাদীস বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে বলেছেনঃ বিবির মোহর আদায়ের জন্য কোন জিনিস খোঁজ করে দেখো। যদি কিছুই না পাও, অন্তত লোহার একটি আংটি হলেও নিয়ে আসো।
وَعَنْ بُرَيْدَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لِرَجُلٍ عَلَيْهِ خَاتَمٌ مِنْ شَبَهٍ: «مَا لِي أَجِدُ مِنْكَ رِيحَ الْأَصْنَامِ؟» فَطَرَحَهُ ثُمَّ جَاءَ وَعَلَيْهِ خَاتَمٌ مِنْ حَدِيدٍ فَقَالَ: «مَا لِي أَرَى عَلَيْكَ حِلْيَةَ أَهْلِ النَّارِ؟» فَطَرَحَهُ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مِنْ أَيِّ شَيْءٍ أَتَّخِذُهُ؟ قَالَ: «مِنْ وَرِقٍ وَلَا تُتِمَّهُ مِثْقَالا» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘আবদুল্লাহ ইবনু মুসলিম’’ য‘ঈফ রাবী। ‘আওনুল মা‘বূদ ১১/১৯১, হাঃ ৪২২৩, তুহফাতুল আহওয়াযী ৫/৩৯৫, হাঃ ১৭৮৫।
ব্যাখ্যাঃ বিশুদ্ধ সনদে আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বরং তোমরা রৌপ্য দ্বারা আংটি বানিয়ে তা ব্যবহার কর। হাদীসটি আবূ দাঊদ বর্ণনা করেছেন এবং এর সানাদ সহীহ। উল্লেখিত হাদীসটি পুরুষের জন্য রৌপ্য ব্যবহার করা বৈধতার উপর প্রমাণ করে। রৌপ্য ব্যবহার করা পুরুষের জন্য হারাম- এ বিষয়টি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত নয়। পুরুষের জন্য স্বর্ণ ও রেশমের কাপড় ব্যবহার করা হারাম- এ মর্মে একাধিক মুতাওয়াতির হাদীস বর্ণিত রয়েছে। সুতরাং রৌপ্যের ব্যবহার দলীল ছাড়া হারাম করা যাবে না। আর এটার ব্যবহার হারাম হওয়ার বিষয়টি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত নয়। (‘আওনূল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ১৭৮৩)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আংটির বর্ণনা
৪৩৯৭-[১৫] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দশটি অভ্যাসকে (কাজকে) পছন্দ করতেন না- ১. সুগন্ধি (যা’ফরান ইত্যাদি দ্বারা প্রস্তুতকৃত) হলুদ রং, ২. (কালো খিযাব লাগিয়ে) বার্ধক্যের ছাপ লুকানোর, ৩. ইযার (লুঙ্গি) ঝুলিয়ে পরা, ৪. স্বর্ণের আংটি ব্যবহার করা, ৫. পরপুরুষের সম্মুখে স্বীয় সাজ-সৌন্দর্য প্রকাশ করা, ৬. গুটি খেলা করা, ৭. সূরাহ্ আল ফালাক ও সূরাহ্ আন্ নাস ব্যতীত অন্য কিছু দ্বারা ঝাড়ফুঁক করা, ৮. তা’বীয গলায় বাঁধা, ৯. অপাত্রে বীর্য প্রবাহিত করা (যিনা-ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া) এবং ১০. শিশু সন্তানের অনিষ্ট করা (অর্থাৎ- পুনরায় গর্ভধারণের জন্য, যার দরুন দুপোষ্য শিশুর খাদ্য দুধের অপ্রতুলতা দেখা যায়) অবশ্য রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে হারাম বলেননি। (আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
وَعَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَكْرَهُ عَشْرَ خِلَالٍ: الصُّفْرَةَ يَعْنِي الخلوق وتغييرَ الشيب وجر الأزرار وَالتَّخَتُّمَ بِالذَّهَبِ وَالتَّبَرُّجَ بِالزِّينَةِ لِغَيْرِ مَحِلِّهَا وَالضَّرْبَ بِالْكِعَابِ وَالرُّقَى إِلَّا بِالْمُعَوِّذَاتِ وَعَقْدَ التَّمَائِمِ وَعَزْلَ الْمَاءِ لِغَيْرِ مَحِلِّهِ وَفَسَادَ الصَّبِيِّ غَيْرَ مُحَرِّمِهِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
হাদীসটি মুনকার য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘কাসিম ইবনু হাস্সান’’। ইমাম বুখারী বলেনঃ এই রাবী মুনকারুল হাদীস। তাকে চেনা যায় না। অন্য একজন বর্ণনাকারী হলেন, ‘আবদুর রহমান ইবনু হারমালাহ্’। এই রাবীর সম্পর্কে ইমাম বুখারী বলেনঃ তার হাদীস সহীহ নয়। যাহাবী ইবনু মাস্‘ঊদ-এর ছাত্রদের মধ্যে ‘‘আবদুর রহমান ইবনু হারমালাহ্’’ নামে কেউ আছে মর্মে আমি অবগত নই। আল জারহু ওয়াত্ তা‘দীল। (জাওয়ামিউল কালিম সফ্টওয়্যার)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আংটির বর্ণনা
৪৩৯৮-[১৬] ইবনুয্ যুবায়র(রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন তাদের আযাদকৃত এক দাসী যুবায়রের একটি কন্যাকে নিয়ে ’উমার ইবনুল খত্ত্বাব-এর নিকট গেল। সে সময় মেয়েটির পায়ে ঝুমঝুমি বাঁধা ছিল। তখন ’উমার (রাঃ) ঝুমঝুমটি কেটে ফেললেন এবং বললেনঃ আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, প্রত্যেক বাজনার সাথে শয়তান থাকে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن ابنِ الزبيرِ: أَنَّ مَوْلَاةً لَهُمْ ذَهَبَتْ بِابْنَةِ الزُّبَيْرِ إِلَى عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ وَفِي رِجْلِهَا أَجْرَاسٌ فَقَطَعَهَا عمر وَقَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَعَ كُلِّ جَرَسٍ شَيْطَانٌ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘মাওলাতুন লাহুম’’, যার পরিচয় জানা যায় না আর আমির ইবনু ‘আবদুল্লাহ ইবনু খুবায়র ‘উমার -এর যুগ পাননি। বিস্তারিত দেখুন- ‘আওনুল মা‘বুদ ১১/১৯৭ পৃঃ, হাঃ ৪২৩০।
ব্যাখ্যাঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শত্রুর মাঝে শত্রুর অজান্তেই ঢুকে পড়া পছন্দ করেন যাতে হঠাৎ করে শত্রুর অঞ্চলে প্রবেশ করতে পারেন। এর ফলে তিনি চতুষ্পদ প্রাণীর গলায় ঝুমঝুমি ঝুলানো অপছন্দ করতেন। এখানে جَرَسٌ বা ঝুমঝুমি শব্দটি ব্যাপকতার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, অতএব ছোট বড় সব ধরনের ঝুমঝুমি চতুষ্পদ প্রাণীর কানে, গর্দানে কিংবা যেখানেই হোক না কেন, আর ঝুমঝুমি পিতল, লোহা, স্বর্ণ কিংবা রৌপ্য যে বস্তু থেকে তৈরি হোক না কেন সর্বক্ষেত্রেই তা নিষিদ্ধ। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪২২৬)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আংটির বর্ণনা
৪৩৯৯-[১৭] ’আবদুর রহমান ইবনু হাইয়্যান আল আনসারীর আযাদকৃত দাসী বুনানাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন তিনি (দাসী) ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর নিকট উপস্থিত ছিলেন। এমন সময় ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর নিকট একটি ছোট মেয়ে আনা হলো, তার পরনে ছিল ঝুমঝুমি এবং তা বাজছিল। (ঐ মেয়েটিকে যে মহিলা এনেছিল, তাকে লক্ষ্য করে) ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বললেনঃ তার ঝুমঝুমি কেটে না ফেলা পর্যন্ত তুমি তাকে নিয়ে ঢুকো না। আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে ঘরে বাদ্য থাকে সে ঘরে মালাক (ফেরেশতা) প্রবেশ করেন না। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ بُنَانَةَ مَوْلَاةِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ حَيَّانَ الْأنْصَارِيّ كانتْ عندَ عائشةَ إِذْ دُخِلَتْ عَلَيْهَا بِجَارِيَةٍ وَعَلَيْهَا جَلَاجِلُ يُصَوِّتْنَ فَقَالَتْ: لَا تُدْخِلُنَّهَا عَلَيَّ إِلَّا أَنْ تُقَطِّعُنَّ جَلَاجِلَهَا سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «لَا تَدْخُلُ الْمَلَائِكَةُ بَيْتًا فِيهِ أَجْرَاس» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে সহীহ মুসলিমে বর্ণিত রয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা‘আলার মালাক (ফেরেশতা) কখনো সে দলের সঙ্গি হয় না যে দলে কুকুর ও ঝুমঝুমি জাতীয় কিছু থাকে। আলোচ্য হাদীসে উল্লেখিত ঝুমঝুমি বলতে আওয়াজ সম্পন্ন সে সকল বস্তু বুঝানো হয় যা চতুষ্পদ প্রাণীর গলায় ও শিশুদের পায়ে ঝুলানো হয়। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪২২৭)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আংটির বর্ণনা
৪৪০০-[১৮] ’আবদুর রহমান ইবনু ত্বরাফাহ্ (রহঃ) হতে বর্ণিত। কুলাবের যুদ্ধে তার দাদা ’আরফাজাহ্ ইবনু আস’আদ-এর নাক কাটা গিয়েছিল। তিনি রূপার দ্বারা একটি নাক তৈরি করেছিলেন। ফলে তাতে দুর্গন্ধ দেখা দিলো। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে স্বর্ণের নাক তৈরি করতে নির্দেশ করলেন। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
وَعَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ طَرَفَةَ أَنَّ جَدَّهُ عَرفجةَ بن أسعد قُطِعَ أَنْفُهُ يَوْمَ الْكُلَابِ فَاتَّخَذَ أَنْفًا مِنْ وَرِقٍ فَأَنْتَنَ عَلَيْهِ فَأَمَرَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَتَّخِذَ أَنْفًا مِنْ ذَهَبٍ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যাঃ উল্লেখিত হাদীসের উপর ভিত্তি করেই ‘উলামাগণ প্রয়োজনে স্বর্ণ দিয়ে নাক বানিয়ে নেয়া ও স্বর্ণ দ্বারা দাঁত বাঁধাই করা বৈধ করেছেন। তাহযীবুত্ তাহযীবে একাধিক বিদ্বান থেকে বর্ণিত রয়েছে, নিশ্চয় তারা তাদের নড়ে যাওয়া বা ভেঙ্গে যাওয়া দাঁতগুলোকে স্বর্ণ দ্বারা বাঁধাই করেছিলেন এবং আলোচ্য হাদীসটিই তারই প্রমাণ। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৭৭০)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আংটির বর্ণনা
৪৪০১-[১৯] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি তার কোন প্রিয়জনকে আগুনের কড়া পরানো পছন্দ করে, সে যেন তাকে স্বর্ণের কড়া পরায় এবং যে ব্যক্তি তার কোন প্রিয়জনকে আগুনের হার পরানো পছন্দ করে, সেও যেন তাকে স্বর্ণের হার পরায়। আর যে ব্যক্তি তার কোন প্রিয়জনকে আগুনের বালা পরানো পছন্দ করে, সে যেন তাকে সোনার বালা পরায়। তবে তোমরা রূপা ব্যবহার করতে পারো, এতে নিষেধাজ্ঞা নেই। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ أَحَبَّ أَنْ يُحَلِّقَ حَبِيبَهُ حَلَقَةً مِنْ نَارٍ فَلْيُحَلِّقْهُ حَلَقَةً مِنْ ذَهَبٍ وَمَنْ أَحَبَّ أَنْ يُطَوِّقَ حَبِيبَهُ طَوْقًا مِنْ نَارٍ فَلْيُطَوِّقْهُ طَوْقًا مِنْ ذَهَبٍ وَمَنْ أَحَبَّ أَنْ يُسَوِّرَ حَبِيبَهُ سِوَارًا مِنْ نَار فليسوره مِنْ ذَهَبٍ وَلَكِنْ عَلَيْكُمْ بِالْفِضَّةِ فَالْعَبُوا بِهَا» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ ইবনুল মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এখানে কোন বস্তু নিয়ে খেলা করা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, কোন বস্তু যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে ব্যবহার করা। অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী (فَالْعَبُوا بِهَا) বা তা দ্বারা তোমরা খেলা কর। এর উদ্দেশ্য হলো রৌপ্যকে তোমরা যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে ব্যবহার করতে পার। আর পুরুষদের জন্য শুধু আংটি এবং বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্র এটা দ্বারা তৈরি করা যাবে। ‘আল্লামা শাওকানী (রহিমাহুল্লাহ) এ হাদীস থেকে দলীল গ্রহণ করেছেন যে, পুরুষের জন্যও রৌপ্য ব্যবহার করা বৈধ। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪২৩১)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আংটির বর্ণনা
৪৪০২-[২০] আসমা বিনতু ইয়াযীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে নারী গলায় সোনার হার পরিধান করল, কিয়ামতের দিন তার গলায় অনুরূপ আগুনের হার পরিধান করানো হবে। আর যে নারী স্বীয় কানের মধ্যে সোনার বালি পরিধান করবে, কিয়ামতের দিন তার কানে তার অনুরূপ আগুনের বালি পরানো হবে। (আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
وَعَن أَسْمَاءَ بِنْتِ يَزِيدَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «أَيُّمَا امْرَأَةٍ تَقَلَّدَتْ قِلَادَةً مِنْ ذَهَبٍ قُلِّدَتْ فِي عُنُقِهَا مِثْلُهَا مِنَ النَّارِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَأَيُّمَا امْرَأَةٍ جَعَلَتْ فِي أُذُنِهَا خُرْصًا مِنْ ذَهَبٍ جَعَلَ اللَّهُ فِي أُذُنِهَا مِثْلَهُ مِنَ النَّارِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيّ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘মাহমূদ ইবনু ‘আমর’’ নামক ব্যক্তি, যিনি য‘ঈফ। তাহক্বীক মুসনাদে আহমাদ- শু‘আয়ব আরনাউত্বব : ২৭৬১৮।
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - আংটির বর্ণনা
৪৪০৩-[২১] হুযায়ফাহ্ (রাঃ)-এর ভগ্নি হতে বর্ণিত। একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ হে মহিলা সম্প্রদায়! তোমাদের জন্য এটা কি যথেষ্ট নয় যে, তোমরা কেবলমাত্র রূপার দ্বারা অলঙ্কার তৈরি করবে? সাবধান! তোমাদের যে মহিলা সোনার অলঙ্কার প্রস্তুত করবে এবং তা বেগানা পুরুষদের মধ্যে প্রকাশ করে বেড়াবে, তজ্জন্য তাকে কঠোর শাস্তি দেয়া হবে। (আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
وَعَن أُخْت لِحُذَيْفَة أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «يَا مَعْشَرَ النِّسَاءِ أَمَا لَكُنَّ فِي الْفِضَّةِ مَا تُحَلَّيْنَ بِهِ؟ أَمَا إِنَّهُ لَيْسَ مِنْكُنَّ امْرَأَةٌ تُحَلَّى ذَهَبًا تُظْهِرُهُ إِلَّا عُذِّبَتْ بِهِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘রিব্‘ঈ ইবনু হিরাশ’’-এর স্ত্রীর পরিচয় পাওয়া যায় না। দেখুন- তাহক্বীক মুসনাদে আহমাদ ২৩৪২৮, তাহক্বীক দারিমী- হুসায়ন সুলায়ম আসাদ : ২৬৪৫।
ব্যাখ্যাঃ নারীদের জন্য স্বর্ণ ব্যবহার তখনই নিন্দনীয় যখন তা বেগানা মানুষের সামনে প্রকাশ করবে ও তা’ পরিধানের মাধ্যমে আত্ম-অহংকার প্রকাশ করবে। আর এক্ষেত্রে রৌপ্য স্বর্ণের মতই। মূল কথা হলো, নারীদের অলংকার লোকচক্ষুর সামনে প্রকাশ না করার প্রতি এটা একটি ধমক। নারীদের স্বর্ণের অলংকার পড়ে তা মানুষের সামনে প্রকাশ করলে এটা পরিধান করাই হারাম। এ কারণে সূয়ূত্বী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী, ‘‘নিশ্চয় স্বর্ণ এবং রৌপ্য এ দু’টি আমার উম্মাতের পুরুষদের জন্য হারাম করা হয়েছে এবং নারীদের জন্য হালাল করা হয়েছে।’’ (শারহুন নাসায়ী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ৫১৫২)
পরিচ্ছেদঃ ১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - আংটির বর্ণনা
৪৪০৪-[২২] ’উকবাহ্ ইবনু ’আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অলঙ্কার ও রেশমী কাপড় ব্যবহারকারীদেরকে এ বলে নিষেধ করতেন যে, যদি তোমরা জান্নাতের অলঙ্কার ও তার রেশম পরিধান করাকে পছন্দ করো, তবে এগুলো দুনিয়াতে পরিধান করো না। (নাসায়ী)[1]
عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كانَ يمنعُ أهلَ الْحِلْيَةَ وَالْحَرِيرَ وَيَقُولُ: «إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ حِلْيَةَ الْجَنَّةِ وَحَرِيرَهَا فَلَا تَلْبَسُوهَا فِي الدُّنْيَا» . رَوَاهُ النَّسَائِيّ
ব্যাখ্যাঃ ব্যাপারটা ঠিক সে রকম যেমনটা আবূ মূসা আল আশ্‘আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত রয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘‘যে ব্যক্তি আখিরাতকে ভালোবাসবে সে দুনিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং যে ব্যক্তি দুনিয়াকে (দুনিয়ার লোভ, লালসা-বিলাশ) ভালোবাসবে সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অতএব তোমরা চিরস্থায়ী (আখিরাত)-কে অস্থায়ী (দুনিয়া) বস্তুর উপর অগ্রাধিকার দাও।
আলোচ্য হাদীসটির ব্যাপারে ইমাম বাগাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘‘উল্লেখিত হাদীসটি আবূ মূসা আল আশ্‘আরী (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস, ‘‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, স্বর্ণ এবং রেশম পরিধান করা আমার উম্মাতের নারীদের জন্য তা হালাল করা হয়েছে’’ দ্বারা রহিত করা হয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - আংটির বর্ণনা
৪৪০৫-[২৩] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি আংটি (মোহর) প্রস্তুত করলেন এবং তা পরলেন। পরে (সাহাবীদের উদ্দেশে) বললেনঃ এ আংটিটি আজ আমাকে তোমাদের হতে গাফিল (অমনোযোগী) করে রেখেছে। ফলে আমি কখনো আংটির দিকে তাকাই আবার কখনো তোমাদের দিকে। এ কথা বলে তিনি আংটিটি খুলে ফেললেন। (নাসায়ী)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اتَّخَذَ خَاتَمًا فَلَبِسَهُ قَالَ: «شَغَلَنِي هَذَا عَنْكُمْ مُنْذُ الْيَوْمَ إِلَيْهِ نَظْرَةٌ وإِليكم نظرة» ثمَّ أَلْقَاهُ. رَوَاهُ النَّسَائِيّ
ব্যাখ্যাঃ ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) শারহু মুসলিমে উল্লেখ করেছেন যে, রৌপ্যের আংটি পুরুষদের জন্য বৈধ- এ ব্যাপারে সকল বিদ্বানদের ঐকমত্য রয়েছে। তবে সিরিয়ার পূর্ববর্তী কতিপয় ‘উলামা বাদশাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য আংটি পরিধান করা মাকরূহ বলেছেন এবং এ দাবির স্বপক্ষে তারা একটি আসার (সাহাবীদের কথা) উল্লেখ করেছেন, যা শায (বিরল) এবং প্রত্যাখ্যাত। কেননা আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, নিশ্চয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তার হাতের আংটি ফেলে দিলেন তখন সাহাবীগণও তাদের আংটি ফেলে দিলেন। এ থেকে বুঝা যায় যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যামানাতেই সাহাবীগণ বাদশা না হয়েও আংটি পরিধান করতেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - আংটির বর্ণনা
৪৪০৬-[২৪] ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, শিশু ছেলেদেরকে স্বর্ণের কোন কিছু পরিধান করানো আমি নাজায়িয মনে করি। কেননা আমার কাছে এ হাদীস পৌঁছেছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বর্ণের আংটি ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং আমি এটা বয়স্ক পুরুষ এবং বালক উভয়ের জন্যও নাজায়িয মনে করি। (মুওয়াত্ত্বা)[1]
وَعَن مَالك قَالَ: أَنا أكره ن يُلْبَسَ الْغِلْمَانُ شَيْئًا مِنَ الذَّهَبِ لِأَنَّهُ بَلَغَنِي أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نهى عَن التختمِ بالذهبِ فَأَنا أكره لِلرِّجَالِ الْكَبِيرِ مِنْهُمْ وَالصَّغِيرِ. رَوَاهُ فِي الْمُوَطَّأِ
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - পাদুকা সম্পর্কীয় বর্ণনা
৪৪০৭-[১] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এমন স্যান্ডেল (জুতা) পরিধান করতে দেখেছি, যাতে পশম ছিল না। (বুখারী)[1]
الْفَصْلُ الْأَوَّلُ
عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَلْبَسُ النِّعَالَ الَّتِي ليسَ فِيهَا شعرٌ. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ ইমাম খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) ইবনু ‘উমার (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস, ‘‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চামড়ার জুতা পরিধান করা ও ওটার প্রতি ভালোবাসা থেকে সর্বাবস্থায় তা পরিধান করা বৈধতার দলীল গ্রহণ করেছেন। আর আহমাদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন যে, তিনি বাশির ইবনু খাসাসিয়্যাহ্-এর বর্ণিত হাদীসের কারণে কবরস্থানে জুতা পরিধান করে আসা অপছন্দ করতেন। উক্ত হাদীসে রয়েছে তিনি [বাশির ইবনু খাসাসিয়্যাহ্ (রাঃ)] বলেনঃ আমি একবার জুতা পড়ে কবরস্থানে যাচ্ছিলাম হঠাৎ আমার পেছন থেকে ডেকে বললো, ‘‘হে চামড়ার জুতা পরিহিত ব্যক্তি! এ জায়গায় আসলে জুতা খুলতে হয়। এ হাদীসটি আহমাদ ও আবূ দাঊদ বর্ণনা করেছেন, আর হাকিম এটাকে বিশুদ্ধ বলেছেন। আর এ থেকে উল্লেখিত দলীলও গ্রহণ করেছেন। ইমাম ত্বহাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ ‘‘জুতায় নাপাকি থাকলে তা কবরস্থানে খুলে ফেলা বৈধ। অবশ্য হাদীসে বর্ণিত রয়েছে যে, মৃত ব্যক্তিকে যখন কবর দিয়ে লোকজন প্রত্যাবর্তন করে তখন মৃতব্যক্তি লোকজনদের পায়ের জুতার আওয়াজ শুনতে পায়। আর এ হাদীস প্রমাণ করে যে, কবরস্থানে জুতা পরিধান করে যাওয়া বৈধ।
তিনি আরো বলেন, ‘‘আনাস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস দ্বারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মসজিদে জুতা পরিধান করে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। আর মসজিদে জুতা পরিধান করে প্রবেশ করা বৈধ হলে কবরস্থানে এটা বৈধ হওয়া তো আরো অগ্রগণ্য। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৮৫১)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - পাদুকা সম্পর্কীয় বর্ণনা
৪৪০৮-[২] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্যান্ডেলে দু’টি ফিতা ছিল। (বুখারী)[1]
الْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: إِنَّ نَعْلَ النَّبِيِّ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسلم كَانَ لَهَا قبالان
ব্যাখ্যাঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্যান্ডেলের দু’টি ফিতা ছিল যা পায়ের দুই অঙ্গুলির মাঝে আটকিয়ে রাখতেন। পায়ের দুই অঙ্গুলি বলতে মধ্যম ও তার সাথে মিলিত অঙ্গুলিকে বুঝানো হয়েছে।
আল জাযুরী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্যান্ডেলের দু’টি ফিতা ছিল, একটি বৃদ্ধাঙ্গুলি ও মধ্যমা অঙ্গুলির মাঝে আটকিয়ে রাখতেন এবং দু’টি ফিতার অপর দুই প্রান্ত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পায়ের পিঠের বেল্টের সঙ্গে আটকিয়ে রাখতেন। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪১৩০)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - পাদুকা সম্পর্কীয় বর্ণনা
৪৪০৯-[৩] জাবির ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কোন এক যুদ্ধে বলতে শুনেছি, তোমরা জুতা বেশি বেশি ব্যবহার করো। কেননা যে মানুষ জুতা ব্যবহার করে, সে যেন বাহনের উপরেই থাকে। (মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي غَزْوَةٍ غَزَاهَا يَقُولُ: «اسْتَكْثِرُوا مِنَ النِّعَالِ فَإِنَّ الرَّجُلَ لَا يَزَالُ رَاكِبًا مَا انتعَلَ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ নিশ্চয় জুতা পরে পথ চলা সওয়ারীর রাস্তায় কাঁটা বা কষ্টদায়ক বস্তু হতে পা নিরাপদ থাকে। আলোচ্য হাদীসের ভাষ্য থেকে বুঝা যায় যে, মুসাফির ব্যক্তিকে জুতা পরিধান কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস সম্পর্কে সতর্ক করা মুস্তাহাব এবং আমীর কিংবা নেতার জন্য তার অনুসারীদের কল্যাণের নাসীহাত করা মুস্তাহাব। (শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২০৯৬)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - পাদুকা সম্পর্কীয় বর্ণনা
৪৪১০-[৪] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যখন জুতা পরিধান করে, সে যেন ডান পা হতে আরম্ভ করে, আর যখন খুলবে, তখন যেন বাম পা হতে শুরু করে। যাতে জুতা পরার সময় ডান পা প্রথমে হয় এবং খোলার সময় শেষে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا انْتَعَلَ أَحَدُكُمْ فَلْيَبْدَأْ بِالْيُمْنَى وَإِذَا نَزَعَ فَلْيَبْدَأْ بِالشِّمَالِ لِتَكُنِ الْيُمْنَى أَوَّلَهُمَا تُنْعَلُ وَآخِرَهُمَا تُنْزَعُ»
ব্যাখ্যাঃ উল্লেখিত হাদীসের তিনটি ফিকহী মাসআলাহ্ রয়েছে :
১. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সৌন্দর্যপূর্ণ প্রতিটি কাজে যথাক্রমে- জুতা, মোজা ও জামা পরিধান করা এবং মাথা মুন্ডানো ও মাথা আঁচড়ানো, গোফ ছাঁটা ও বগলের লোম উঠানো, মিসওয়াক করা ও সুরমা লাগানো, নখ কাটা, উযূ করা, গোসল করা, তায়াম্মুম করা, মসজিদে প্রবেশ করা, পায়খানা থেকে বের হওয়া, দান-খয়রাত করা ও ভালো কিছু গ্রহণ করা ইত্যাদি এসব কাজে ডান দিক থেকে করা মুস্তাহাব।
২. উপরিউক্ত কাজের বিপরীত কার্যপ্রণালী যথাক্রমে : জুতা, মোজা ও জামা কাপড় খোলা, মসজিদ থেকে বের হওয়া, পায়খানায় প্রবেশ করা, ইস্তিঞ্জা করা, লিঙ্গ স্পর্শ করাসহ নানাবিধ নিম্নপর্যায়ের কাজগুলোর ক্ষেত্রে বাম দিক থেকে শুরু করা মুস্তাহাব।
৩. এক জুতা কিংবা এক মোজা পরিধান করে পথ চলা মাকরূহ। যার দলীলে উল্লেখিত হাদীসসহ আরো একাধিক হাদীস। (শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২০৯৭)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - পাদুকা সম্পর্কীয় বর্ণনা
৪৪১১-[৫] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যেন এক পায়ে জুতা পরে না চলে। হয় উভয় পা খালি রাখবে নয় উভয় পায়ে জুতা পরবে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَمْشِي أَحَدُكُمْ فِي نعلٍ واحدةٍ ليُحفيهُما جَمِيعًا أَو لينعلهما جَمِيعًا»
ব্যাখ্যাঃ খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ আলোচ্য হাদীসে একপায়ে জুতা পরে চলা নিষেধ হওয়ার হিকমাত হলো শারী‘আতে জুতা পরিধান করার বিধান এসেছে, পা-কে জমিনের অনিষ্টতা থেকে বেঁচে রাখার জন্য। যখন এক পা খালি থাকবে তখন পথ চলা ব্যক্তি এক পা জমিনের অনিষ্টতা থেকে নিরাপদ রাখতে পারবে অন্যটি নয়। কেউ কেউ বলেন, এক পায়ে জুতা পরে চলার কারণে ব্যক্তি তাঁর নিজ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রতি সুবিচার করতে পারে না তথা যথাযথ যত্ন নিতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলাই অধিক জানেন। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪১৩২)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - পাদুকা সম্পর্কীয় বর্ণনা
৪৪১২-[৬] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যদি কারো জুতার ফিতা ছিঁড়ে যায়, সে যেন একখানা জুতা পরে না চলে, যতক্ষণ না অপর জুতার ফিতা ঠিক করে নেয় এবং একখানা কাপড় দ্বারা ইহ্তিবা অবস্থায় না বসে এবং এক কাপড়ে যেন গোটা শরীর জড়িয়ে না রাখে। (মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا انْقَطَعَ شِسْعُ نَعْلِهِ فَلَا يَمْشِ فِي نَعْلٍ وَاحِدَةٍ حَتَّى يُصْلِحَ شِسْعَهُ وَلَا يَمْشِ فِي خُفٍّ وَاحِدٍ وَلَا يأكلْ بِشمَالِهِ وَلَا يجتبي بِالثَّوْبِ الْوَاحِدِ وَلَا يَلْتَحِفِ الصَّمَّاءَ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - পাদুকা সম্পর্কীয় বর্ণনা
৪৪১৩-[৭] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্যান্ডেলে দু’টি ফিতা ছিল এবং প্রত্যেকটি ফিতা ছিল দু’ ভাগ। (তিরমিযী)[1]
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: كَانَ لِنَعْلِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قِبَالَانِ مُثَنًّى شراكهما. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - পাদুকা সম্পর্কীয় বর্ণনা
৪৪১৪-[৮] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে জুতা পরিধান করতে নিষেধ করেছেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَنْتَعِلَ الرَّجُلُ قَائِمًا. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ ‘আল্লামা খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে জুতা পড়তে নিষেধ করেছেন । এর কারণ হলো, বসে জুতা পরিধান করা অনেক সহজ। অন্যদিকে দাঁড়িয়ে জুতা পরিধান করা উল্টে পড়ে যাওয়ার কারণও হতে পারে এবং শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করতে ব্যর্থ হবে। এজন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসে জুতা পরিধান করার নির্দেশ দিয়েছেন যাতে নিরাপদে তা পরিধানে হাতের সাহায্য গ্রহণ করা যায়। আল্লাহ অধিক জানেন। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪১৩১)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - পাদুকা সম্পর্কীয় বর্ণনা
৪৪১৫-[৯] ইমাম তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ হাদীসটি আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন।[1]
وَرَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - পাদুকা সম্পর্কীয় বর্ণনা
৪৪১৬-[১০] কাসিম ইবনু মুহাম্মাদ (রহিমাহুল্লাহ) ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কখনো একখানা জুতা পরিধান করে চলেছেন। অপর এক বর্ণনায় আছে, ’আয়িশাহ্ (রাঃ) নিজেই একখানা জুতা পরিহিতা অবস্থায় চলেছেন। (তিরমিযী)[1]ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসটি (’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে মাওকূফ সূত্রে বর্ণিত) অধিক সহীহ।
وَعَن القاسمِ بن محمَّدٍ عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: رُبَّمَا مَشَى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي نَعْلٍ وَاحِدَةٍ وَفِي رِوَايَةٍ: أَنَّهَا مَشَتْ بِنَعْلٍ وَاحِدَةٍ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا أصحُّ
হাদীসটি মুনকার য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘লায়স’’ নামের রাবী’’, যিনি য‘ঈফ। দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ৩৪৮।
ব্যাখ্যাঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোন কোন সময় এক জুতা পরিধান করে চলা, এটা বিশেষ কোন প্রয়োজনে অথবা বৈধতা বুঝানোর জন্য মাত্র। কারণ এক জুতা পরিাধান করে চলার প্রতি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিষেধাজ্ঞা হারাম বুঝানোর জন্য নয়। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৭৭৮)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - পাদুকা সম্পর্কীয় বর্ণনা
৪৪১৭-[১১] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কেউ যখন বসে, তখন সুন্নাত হলো স্বীয় জুতা খুলে বসবে এবং নিজের এক পার্শ্বে তা রেখে দেবে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن ابنِ عبَّاسٍ قَالَ: مِنَ السُّنَّةِ إِذَا جَلَسَ الرَّجُلُ أَنْ يَخْلَعَ نَعْلَيْهِ فَيَضَعَهُمَا بِجَنْبِهِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘আবূ নাহীক’’ নামক একজন রাবী। যার আসল নাম পরিচয় জানা যায়নি। ‘আওনুল মা‘বূদ ১১/১৩২ পৃঃ, হাঃ ৪১৩৮।
ব্যাখ্যাঃ ‘‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় জুতাদ্বয় খুলে তার বামপার্শ্বে রাখতেন’’ ডান পার্শ্বে রাখতেন না ডান পার্শ্বের সম্মানে। সামনে রাখতেন না ক্বিবলার সম্মানে এবং পিছনে রাখতেন চুরি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় না। মুল্লা ‘আলী কারী (রহিমাহুল্লাহ) অনুরূপ বর্ণনাই করেছেন। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪১৩৪)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - পাদুকা সম্পর্কীয় বর্ণনা
৪৪১৮-[১২] ইবনু বুরয়দাহ্ (রহঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন। (হাবশার রাজা) নাজাশী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে দু’খানা সাদাসিধে কালো মোজা হাদিয়া দিয়েছিলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তা পরিধান করেছেন। (ইবনু মাজাহ) [1]
আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) ইবনু বুরয়দাহ্ হতে তিনি তাঁর পিতা হতে অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন, অতঃপর তিনি উযূ করেন এবং ঐ মোজাদ্বয়ের উপর মাসেহ করেন।
وَعَنِ ابْنِ بُرَيْدَةَ عَنْ أَبِيهِ أَنَّ النَّجَاشِيَّ أَهْدَى إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خُفَّيْنِ أَسْوَدَيْنِ سَاذَجَيْنِ فَلَبِسَهُمَا. رَوَاهُ ابْنُ مَاجَهْ. وَزَادَ التِّرْمِذِيُّ عَنِ ابْنِ بُرَيْدَةَ عَنْ أَبِيهِ: ثمَّ تَوَضَّأ وَمسح عَلَيْهِمَا
هَذَا الْبَاب خَال من الْفَصْل الثَّالِث
-
[এ অধ্যায়ে তৃতীয় অনুচ্ছেদ নেই]
ব্যাখ্যাঃ আলোচ্য হাদীসে (سَاذَجَيْنِ) বলতে এমন মোজা বুঝানো হয়েছে, যা নকশা করা নয় এবং এক কালারের ও লোম থেকে মুক্ত। ইবন হিব্বানে রয়েছে যে, নাজাশী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বরাবর একটি চিঠি লিখেছিলেন তাতে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, হে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)! আমি আপনার সাথে আপনার নিজ সম্প্রদায়ের যে আপনার দীনের উপর রয়েছে, তাকে আমি আপনার সঙ্গে বিবাহ দিলাম। যার নাম উম্মু হাববীবাহ্ বিনতু আবী সুফ্ইয়ান এবং আমি আপনাকে সামগ্রিক কিছু উপঢৌকন, যথাক্রমে- জামা, কুর্তা ও রুমাল এবং দু’টি সাদাসিধে মোজা পাঠিয়ে দিলাম। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা পরিধান করলেন এবং উযূ করে দু’ মোজার উপর মাসেহ করলেন। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৮২০)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪১৯-[১] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ঋতুবতী অবস্থায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাথা চিরুনি করে দিতাম। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ التَّرَجُّلِ
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: كُنْتُ أُرَجِّلُ رَأْسَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَنَا حَائِض
ব্যাখ্যাঃ (أرجل) আরবী শব্দ (التَّرْجِيْل) থেকে নির্গত, যার অর্থ হলো : চিরুনি করা, চুলে তেল ব্যবহার করা। অতএব এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, ই‘তিকাফরত ব্যক্তির জন্য পরিচ্ছন্নতা অর্জন, সুগন্ধি ব্যবহার, গোসল, চুল কামানো ও সাজ-সজ্জা অবলম্বন করা জায়িয। চুল চিরুনি করার উপর ভিত্তি করে এগুলোর বৈধতা প্রমাণিত হয়। জামহূর ‘উলামার মতে ই‘তিকাফ অবস্থায় ই‘তিকাফরত ব্যক্তির জন্য কেবল ঐসব বিষয় মাকরূহ যা মসজিদে ই‘তিকাফ ছাড়া অবস্থায় মাকরূহ। কেবল ই‘তিকাফের কারণে মসজিদের ভিতর কোন কিছু মাকরূহ হয় না।
ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ) থেকে পাওয়া যায় যে, ই‘তিকাফরত ব্যক্তির জন্য নিজ পেশার কাজ কর্ম করা মাকরূহ, এমনকি পেশাগত শিক্ষা করানোও।
এ হাদীস থেকে আরো প্রমাণিত হয় যে, কেউ যদি তার শরীরের কিছু অংশ মসজিদ থেকে বের করে, তবে তার ই‘তিকাফ নষ্ট হবে না। ই‘তিকাফ বিশুদ্ধতায় এতে দোষের কিছু নেই।
খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীস থেকে এই ফিকহী মাসআলাহ্ বের হয় যে, ই‘তিকাফরত ব্যক্তির জন্য পায়খানা বা প্রসাবের প্রয়োজন ছাড়া মসজিদ থেকে বের হওয়া জায়িয নয়। এ হাদীস থেকে ই‘তিকাফরত ব্যক্তির জন্য চিরুনি করা ও ময়লা পরিষ্কার করার বৈধতা পাওয়া যায়। হাদীস থেকে আরো বুঝা যায় যে, হায়য বা ঋতুবতী মহিলার শরীর পাক, নাপাক নয়। অর্থাৎ শরীরের বাহ্যিক অংশ নাপাক নয়। কেননা ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) ঋতুগ্রস্ত অবস্থায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চুল চিরুনি করে দিতেন বলে হাদীসে বলা হচ্ছে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২৪৬৬)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪২০-[২] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পাঁচটি জিনিস ফিতরাত- ১. খতনা করা, ২. নাভির নিম্নের অবাঞ্ছিত লোম পরিষ্কার করা, ৩. গোঁফ কাটা, ৪. নখ কাটা, ৫. বগলের লোম উপড়িয়ে ফেলা। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ التَّرَجُّلِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: الْفِطْرَةُ خَمْسٌ: الْخِتَانُ وَالِاسْتِحْدَادُ وَقَصُّ الشَّارِبِ وَتَقْلِيمُ الْأَظْفَارِ ونتفُ الإِبطِ
ব্যাখ্যাঃ (الْفِطْرَةُ خَمْسٌ) ফিতরাহ্ অর্থাৎ ইসলামের ফিতরাত পাঁচটি। ফিতরাত বলা হয় মানুষের ঐ স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যকে, যে বৈশিষ্ট্যের উপর তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। কাযী এবং অন্যরা বলেনঃ হাদীসে যে ফিতরাতের কথা বলা হয়েছে এর ব্যাখ্যা পুরাতন সুন্নাত দিয়ে দেয়া হয়ে থাকে। অর্থাৎ এ বৈশিষ্ট্যগুলো এমন পুরাতন সুন্নাত যা সব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গ্রহণ করেছেন এবং সকলের শারী‘আত এ ব্যাপারে একমত। এগুলো যেন এমন বৈশিষ্ট্য, যার উপর মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। ‘আল্লামা সুয়ূত্বী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ‘ফিতরাত’ শব্দের যত ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে তন্মধ্যে এ ব্যাখ্যাটি সর্বোত্তম। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
এখানে যে পাঁচটি ফিতরাত তথা স্বভাবজাত সুন্নাত বা বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে তার একটি হলো :
(الْخِتَانُ) ‘খিতান’ এর অর্থ হলো খৎনা করা। খৎনা কাকে বলে তা সকলেরই জানা। খৎনা সকল নবীদেরই পুরাতন সুন্নাত। আমাদের জন্যও খৎনা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত, এতে কারো দ্বিমত নেই। তবে এ সুন্নাতটির গুরুত্ব ও পর্যায় নিয়ে ‘উলামার মাঝে কিছুটা দ্বিমত লক্ষ্য করা যায়। ইমাম শাফি‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ)-সহ অনেক ‘আলিমের নিকট খৎনা করা সুন্নাতটি ওয়াজিব। অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কর্ম হিসেবে এটি সুন্নাত বা তাঁর পালিত একটি নিয়ম হলেও এ সুন্নাতটি আদায় করা সকলের ওপর ওয়াজিব। অপরদিকে ইমাম মালিকসহ অধিকাংশ ‘আলিমদের মতে খৎনার হুকুম সুন্নাত। (শারহুন নাবাবী ৩য় খন্ড, হাঃ ২৫৭/৪৯)
ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহিমাহুল্লাহ)-সহ অনেকেই খৎনা করাকে সুন্নাত বললেও এর গুরুত্ব সকলের নিকট ওয়াজিব পর্যায়ের। কেননা খৎনা করা ইসলামের এক বিশেষ নিদর্শন বলে গণ্য। তাই এর গুরুত্ব অপরিসীম। বাহ্যিক নাপাকি থেকে পবিত্রতা রক্ষার ক্ষেত্রেও খৎনার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
পুরুষের ক্ষেত্রে খৎনা করা যেমন সুন্নাত, মহিলার ক্ষেত্রেও সুন্নাত। তবে মহিলার ক্ষেত্রে খৎনার গুরুত্ব পুরুষের মতো নয়। মহিলার ক্ষেত্রে খৎনার বিধান নিয়ে ‘উলামায়ে কিরাম জায়িয, মুস্তাহাব, সুন্নাত, ওয়াজিবের মতানৈক্য করে থাকেন। তবে বিশুদ্ধ মত হলো, মহিলাদের ক্ষেত্রেও তা সুন্নাত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ الْخِتَانُ سُنَّةٌ لِلرِّجَالِ مَكْرُمَةٌ لِلنِّسَاءِ ‘‘খৎনা পুরুষের জন্য সুন্নাত, মহিলাদের জন্য সম্মানের পরিচায়ক’’। ইমাম আহমাদ হাসান সনদে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(الِاسْتِحْدَادُ) স্বভাবজাত সুন্নাতের আরেকটি সুন্নাত হলো ‘ইসতিহদাদ’। ‘ইসতিহদাদ’ এর শাব্দিক অর্থ হলো ‘হাদীদ’ বা লৌহ বিশেষের ব্যবহার। এর দ্বারা ক্ষুর দ্বারা নাভির নিচের পশম কাটা উদ্দেশ্য। ক্ষুর দ্বারা নাভির নিচের লোম পরিষ্কার করা সুন্নাত। এর দ্বারা এই স্থানকে আবর্জনামুক্ত ও পরিষ্কার রাখা উদ্দেশ্য। ক্ষুর দ্বারা নাভির নিচের লোমকে চেঁছে ফেলা বা কামিয়ে ফেলা উত্তম। তবে কাঁচি দিয়ে ছাঁটা বা উপড়িয়ে ফেলা অথব চুনা ব্যবহারের মাধ্যমে লোম তুলে ফেলাও বৈধ। নাভির নিচের লোম বলতে পুরুষের লজ্জাস্থানের উপর ও তার আশপাশে যত লোম রয়েছে সবই এর অন্তর্ভুক্ত। এভাবে মহিলার লজ্জাস্থানের আশপাশে যত লোম রয়েছে সবই এর অন্তর্ভুক্ত। লজ্জাস্থানের সামনের রাস্তা ও পিছনের রাস্তার আশপাশের সকল লোম কামিয়ে নেয়া বা কর্তন করে নেয়া এ বিধানের অন্তর্ভুক্ত। (শারহুন নাবাবী ৩য় খন্ড, হাঃ ২৫৭/৪৯)
(قَصُّ الشَّارِبِ) অর্থাৎ গোঁফ কর্তন করা। অর্থাৎ উপরের ঠোটের উপর গজানো পশমকে একেবারে মূল থেকে না ছেঁটে কেটে নেয়া সুন্নাত। তবে গোঁফ কর্তনের বেলায় হাদীসে বিভিন্ন ধরনের শব্দ ব্যববহার করা হয়েছে। কাটা, ছাটা, কামানো, ছোট করা সব ধরনের শব্দই গোঁফ কর্তনের নির্দেশে ব্যবহার করা হয়েছে। তাই ‘উলামা এ ব্যাপারে মতানৈক্য পোষণ করেন। কারো মতে কাটা সুন্নাত, আবার কারো মতে ছাটা সুন্নাত, আবার কারো মতে উভয়টার অবকাশ রয়েছে। ইমাম তাবারী এ ব্যাপারে উভয় মতামত আলোচনা করে বলেন, সুন্নাতে উভয়টিরই অবকাশ পাওয়া যায়। তাই কোন বিরোধ নেই। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪১৯৪)
(تَقْلِيمُ الْأَظْفَارِ) নখ কর্তন করা। স্বভাবজাত সুনণাতের আরেকটি হলো হাত ও পায়ের নখ কেটে নেয়া। ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর শারহু মুসলিমে লিখেন, নখ কাটার বেলায় মুস্তাহাব হলো, প্রথমে হাতের নখ কাটা এবং পরে পায়ের নখ কাটা। হাতের মধ্যে আবার প্রথমে ডান হাতের শাহাদাত অঙ্গুলির নখ, এরপর মধ্যমা, এরপর অনামিকা, এরপর কনিষ্ঠা, এরপর বৃদ্ধাঙ্গুলির নখ কাটবে। তারপর বাম হাতের প্রথমে কনিষ্ঠা, এরপর অনামিকা- এই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষে বৃদ্ধাঙ্গুলিতে আসবে। এরপর ডান পায়ের কনিষ্ঠা থেকে শুরু করে ধারাবাহিকভাবে বাম পায়ের কনিষ্ঠায় গিয়ে শেষ করবে। (শারহুন নাবাবী ৩য় খন্ড, হাঃ ২৫৭/৪৯)
এভাবে কেউ নখ কাটার মুস্তাহাব পদ্ধতি এবং মুস্তাহাব সময় বৃহস্পতিবারের কথা উল্লেখ করেন। মুল্লা ‘আলী কারী (রহিমাহুল্লাহ) এগুলো বর্ণনার পর বলেনঃ বৃহস্পতিবারে নখ কাটার ব্যাপারে কোন হাদীস নেই। বরং যেভাবেই প্রয়োজন পড়বে কাটবে। অনুরূপভাবে নখ কাটার পদ্ধতি ও তার বার নির্ধারণের বেলায় কিছুই প্রমাণিত নয়। নখ কাটার ধারাবাহিকতার ক্ষেত্রে ‘আলী বা অন্যদের দিকে যা সম্পৃক্ত করা তার সবই বাতিল। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(نتفُ الإِبطِ) বগলের পশম উপড়িয়ে ফেলা। বগলের পশম উপড়িয়ে ফেলা সবার ঐকমত্যে সুন্নাত। যে ব্যক্তি উপড়িয়ে ফেলতে সক্ষম তার জন্য এটাই উত্তম। তবে কামিয়ে ফেললে বা চুনা দ্বারা তুলে নিলেও সুন্নাত আদায় হয়ে যাবে। ইউনুস ইবনু ‘আবদুল আ‘লা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি শাফি‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ)-এর কাছে গেলাম। তখন তার কাছে সজ্জাকারী ব্যক্তি ছিল যে তার বগলের লোম কামিয়ে দিচ্ছে। শাফি‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ) তখন বললেন, আমি জানি, সুন্নাত হলো উপড়িয়ে ফেলা। কিন্তু ব্যথার কারণে আমি তা করতে সক্ষম নই। (শারহুন নাবাবী ৩য় খন্ড, হাঃ ২৫৭/৪৯)
উল্লেখ্য যে, এ হাদীসে ফিতরাত বা স্বভাবজাত সুন্নাত পাঁচটির কথা বলা হয়েছে। আবার অন্য হাদীসে বলা হয়েছে-
عَشْرٌ مِنَ الْفِطْرَةِ قَصُّ الشَّارِبِ وَإِعْفَاءُ اللِّحْيَةِ وَالسِّوَاكُ وَالاِسْتِنْشَاقُ بِالْمَاءِ وَقَصُّ الأَظْفَارِ وَغَسْلُ الْبَرَاجِمِ وَنَتْفُ الإِبِطِ وَحَلْقُ الْعَانَةِ وَانْتِقَاصُ الْمَاءِ
‘‘দশটি বিষয় ফিতরাতের অন্তর্ভুক্ত। গোঁফ ছাঁটা, দাড়ি ছেড়ে দেয়া, মিসওয়াক করা, নাকে (উযূ করার সময়) পানি নেয়া, নখ কাটা, আঙ্গুলের জোড়া বা গাট ধৌত করা, বগলের লোম উপড়ে ফেলা, নাভির নিচের লোম কর্তন করা, পানি দিয়ে ইসতিঞ্জা করা।’’
এখানে দশটি ফিতরাতের কথা উল্লেখ করে নয়টি বলার পর বর্ণনাকারী বলেনঃ আমি দশ নাম্বারটি ভুলে গেছি। তবে তা কুলি করা হতে পারে।
আমরা লক্ষ্য করলে দেখব যে, এ হাদীসে অতিরিক্ত যে ফিতরাতের কথা বলা হয়েছে যা উপরের হাদীসে নেই সেগুলো হলো : দাড়ি ছেড়ে দেয়া, মিসওয়াক করা, নাকে (উযূতে) পানি নেয়া, আঙ্গুলের জোড়া বা গাট ধৌত করা, ইসতিঞ্জা করা। বর্ণনাকারীর সন্দেহমূলক আরেকটি হলো কুলি করা। আবার উপরের হাদীসে খৎনা করার কথা বলা হয়েছে যা এ হাদীসে নেই। অতএব দুই হাদীস মিলিয়ে মোট এগারটি ফিতরাত বা স্বভাবজাত সুন্নাতের কথা বলা হলো। তবে একটি হাদীসে পাঁচটি, আবার অপর হাদীসে দশটি বলার কারণ বা উভয় হাদীসের মধ্যে বাহ্যিক বিরোধ নিরসন করার উপায় কি?
এর উত্তরে ‘উলামায়ে কিরাম বলেনঃ স্বভাবজাত সুন্নাত পাঁচটি বা দশটির ভিতর সীমাবদ্ধ নয়। বরং স্বভাবজাত বেশকিছু সুন্নাতের মধ্যে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদীসে পাঁচটির কথা বলেছেন, আরেক হাদীসে দশটির কথা বলেছেন। আর সীমাবদ্ধ নয় বলেই বর্ণনায় (مِنَ الْفِطْرَةِ) শব্দটি এসেছে। যার অর্থ হলো, ফিতরাতের মধ্য থেকে এগুলো হলো উল্লেখযোগ্য। (শারহুন নাবাবী ৩য় খন্ড, হাঃ ২৫৭/৪৯)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪২১-[৩] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা মুশরিকদের বিপরীত করো। অর্থাৎ- দাড়ি বাড়াও এবং গোঁফ খাটো করো। অপর এক বর্ণনায় আছে, গোঁফ ছেঁটে নাও এবং দাড়ি লম্বা করো। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ التَّرَجُّلِ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: خَالِفُوا الْمُشْرِكِينَ: أَوْفِرُوا اللِّحَى وَأَحْفُوا الشَّوَارِبَ . وَفِي رِوَايَةٍ: «أنهكوا الشَّوَارِب وأعفوا اللحى»
ব্যাখ্যাঃ (خَالِفُوا الْمُشْرِكِينَ) মুশরিকদের বিরোধিতা করো। আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে সহীহ মুসলিম-এর ব্বিরণে রয়েছে, خالفوا المجوس অর্থাৎ অগ্নিপূজকদের বিরোধিতা করো। ইবনু ‘উমার (রাঃ)-এর হাদীসের উদ্দেশ্য এটাই। কেননা তাদের অনেকে দাড়ি কেটে ফেলতো আবার অনেকে কামিয়ে ফেলতো এবং গোঁফ ছেড়ে দিতো। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৮৯২)
(أَوْفِرُوا اللِّحٰى) অর্থাৎ দাড়িকে পরিপূর্ণরূপে বৃদ্ধি করো। ইবনু ‘উমার (রাঃ)-এর বর্ণনায় দাড়ি বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে أوفِروا، وفِّروا، أعفوا শব্দ বর্ণিত হয়েছে। আবার আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে সহীহ মুসলিম-এর ব্বিরণে أَرْخُوا،أرْجِئُوا، أوفُوا শব্দ এসেছে।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ সব বর্ণনা মিলে পাঁচ ধরনের শব্দ এসেছে। সব বর্ণনারই মর্ম এক। অর্থাৎ দাড়িকে তার আপন গতিতে লম্বা হতে দেয়া এবং বৃদ্ধি ও পরিপূর্ণ করা। হাদীসের শব্দ এটাই দাবী করে। আমাদের ইমামগণের অনেকে এবং অন্যান্য অনেকেই এ মত পোষণ করেন। (শারহুন নাবাবী ৩য় খন্ড, হাঃ ২৫৯/৫২)
দাড়ির বেলায় এসব হাদীসের আলোকে অনেক ‘আলিমের মতে দাড়ি কোন অবস্থায় কাটা বৈধ নয়। বরং তাকে তার আপন গতিতে বাড়তে দিতে হবে। আবার অনেক ‘আলিম মনে করেন, দাড়ি অধিক লম্বা হলে এক মুষ্টির অতিরিক্তটুকু কাটা বৈধ রয়েছে। সহীহুল বুখারীর হাদীসে রয়েছে-
وَكَانَ ابْنُ عُمَرَ إِذَا حَجَّ أَوِ اعْتَمَرَ ، قَبَضَ عَلى لِحْيَتِه ، فَمَا فَضَلَ ، أَخَذَهٗ
‘‘আর ইবনু ‘উমার (রাঃ) যখন হজ্জ বা ‘উমরাহ্ করতেন, তিনি তাঁর দাড়িকে মুঠ দিয়ে ধরতেন, মুষ্টির অতিরিক্ত যা হত তা কেটে ফেলতেন।’’
ফাতহুল বারীতে ইমাম ত্ববারীর বরাতে লিখেন, একদল ‘আলিম হাদীসের বাহ্যিক অর্থের উপর মত দিয়েছেন। তাই তারা মনে করেন, দাড়ির পার্শ্ব থেকে বা তার লম্বা থেকে যে কোন কিছু কাটা মাকরূহ। আবার আরেক দল মনে করেন, এক মুষ্টির উপরে হলে অতিরিক্তটুকু কাটা জায়িয। তাদের দলীল ইবনু ‘উমার (রাঃ)-এর কর্ম। তিনি অতিরিক্তটুকু কেটেছেন। ‘উমার (রাঃ)-ও এক ব্যক্তির বেলায় এমনটি করেছেন বলে তারা বর্ণনা করেন। আবূ হুরায়রা (রাঃ)-ও এমনটি করেছেন বলে ব্বিরণ দেন। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৮৯২)
(أَحْفُوا الشَّوَارِبَ) গোঁফ কর্তন করো।أَحْفُوا শব্দের অর্থ কর্তন করা। গোঁফ কর্তনের বেলায় পরবর্তী যে শব্দটি ব্যবহার হয়েছে সেটি (أنهكوا) কাটার ক্ষেত্রে মুবালাগাহ্ বা আধিক্য করা। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
গোঁফের কাটা সুন্নাত নাকি হলক তথা কামিয়ে নেয়া সুন্নাত তা আমরা উপরের হাদীসের ব্যাখ্যায় জেনেছি।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪২২-[৪] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাদের জন্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে গোঁফ ছাঁটা, নখ কাটা এবং বগলের লোম উপড়িয়ে ফেলা আর নাভির নিচের লোম মুড়ানোর ব্যাপারে যেন আমরা চল্লিশ দিনের অধিক ছেড়ে না রাখি। (মুসলিম)[1]
بَابُ التَّرَجُّلِ
وَعَن أَنس قَالَ: وُقِّتَ لَنَا فِي قَصِّ الشَّارِبِ وَتَقْلِيمِ الْأَظْفَارِ وَنَتْفِ الْإِبِطِ وَحَلْقِ الْعَانَةِ أَنْ لَا تُتْرَكَ أَكثر من أَرْبَعِينَ لَيْلَة. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ (وُقِّتَ لَنَا) অর্থাৎ আমাদের জন্য সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে বা সময় নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এটি মারফূ‘ হাদীসের অন্তর্ভুক্ত। যেমন বলা হয়, أُمِرْنَا بِكَذأ। অর্থাৎ আমাদেরকে এই নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়া সহীহ মুসলিম ছাড়া অন্য কিতাবের বর্ণনায় এসেছে, (وَقَّتَ لَنَا رَسُولُ اللهِ -صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ) অর্থাৎ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। (শারহুন নাবাবী ৩য় খন্ড, হাঃ ২৫৮/৫১)
উল্লেখিত হাদীসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোঁফ, নখ, বগলের নিচের পশম ও নাভির নিচের পশম কাটার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মেয়াদ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যার সর্বোচ্চ মেয়াদ হলো চল্লিশ দিন। ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ‘‘আমরা যেন চল্লিশ রাতের বেশি না ছাড়ি’’ এর অর্থ হলো, আমরা এগুলো কাটা এমনভাবে ছেড়ে দিব না যে চল্লিশ দিন পার হয়ে যায়। (শারহুন নাবাবী ৩য় খন্ড, হাঃ ২৫৮/৫১)
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হাদীসের উদ্দেশ্য এই নয় যে, এগুলো কাটতে চল্লিশ দিন নিতে হবে, বরং চল্লিশ দিন পার না করাটা হাদীসের উদ্দেশ্য। এর ভিতর যে কোন দিন এগুলো কেটে নেয়া যায়। এগুলোর বৃদ্ধির অবস্থার ভিত্তিতে তা কেটে নিবে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নখ ও গোঁফ প্রতি জুমু‘আর দিন কেটে নিতেন বলে বিবরণ পাওয়া যায়। শারহুস্ সুন্নাহয় তা উল্লেখের পর বলেন, এই বর্ণনা থেকে বুঝা যায় যে, নাভীর নিচের লোম কাটা ও বগলের পশম উপড়াতে দেরী করতেন। আর বাহ্যত এটাই বুঝা যায়; কেননা এগুলো এক সপ্তাহে লম্বা হয় না। কোন কোন বর্ণনায় ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি জুমু‘আর দিন গোঁফ ও নখ কেটে নিতেন, আর নাভীর নিচের পশম বিশ দিনে কাটতেন এবং বগলের পশম চল্লিশ দিনে উপড়াতেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪২৩-[৫] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ইয়াহূদী এবং নাসারাগণ দাড়ি চুলে খিযাব লাগায় না। সুতরাং তোমরা তাদের বিপরীত করো (অর্থাৎ- খিযাব লাগাও)। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ التَّرَجُّلِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى لَا يَصبِغون فخالفوهم»
ব্যাখ্যাঃ (لا يصبغون) আরবী শব্দ صِبْغٌ صَبْغٌ থেকে নির্গত। যার অর্থ রঙ করা বা খিযাব লাগানো। তারা রঙ করে না। অর্থাৎ তারা তাদের দাড়িতে খিযাব ব্যবহার করে না। অতএব তোমরা তাদের বিরোধিতা করো অর্থাৎ মেহেদীর খিযাব ব্যবহার করো। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
দাড়ি সাদা হয়ে গেলে খিযাব তথা রঙ দিয়ে তা পরিবর্তন করতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উৎসাহিত করেছেন। ফাতহুল বারীতে ইমাম আহমাদ-এর বরাতে হাসান সনদে আবূ উমামাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন- ‘‘রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন আনসারী কিছু বৃদ্ধ লোকের সামনে বের হন, যাদের দাড়ি সাদা হয়ে গিয়েছিল। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বলেন, হে আনসারের দল! তোমরা দাড়িকে লাল করো, হলুদ করো এবং আহলে কিতাবদের বিরোধিতা করো’’। ইমাম ত্ববারানী তাঁর ‘আওসাত্ব’ কিতাবে আনাস (রাঃ) থেকে এমন হাদীস বর্ণনা করেন। আর ‘কাবীরে’ ‘উতবাহ্ ইবনু ‘আবদুল মালিক থেকে বর্ণনা করেন- ‘‘রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনারবদের বিরোধিতা করতে চুল পরিবর্তন করার নির্দেশ দেন। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৮৯৯)
বর্ণিত হাদীসসমূহের আলোকে আমরা দেখছি যে, চুল বা দাঁড়িতে শুভ্রতা প্রকাশ পেলে খিযাব বা রঙ দ্বারা তা পরিবর্তন করতে উৎসাহিত করেছেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তবে খিযাবের ক্ষেত্রে যে কোন রঙের খিযাব ব্যবহার বৈধ নাকি এর মাঝে কিছুটা ব্যতিক্রম রয়েছে- এ নিয়ে ‘উলামায়ে কিরাম দ্বিমত পোষণ করেন। উপরোক্ত হাদীসসমূহে খিযাবের কোন ধরণকে পৃথক করা হয়নি। এসব হাদীসের আলোকে যে কোন খিযাবই বৈধ বলে মত প্রকাশ করেছেন একদল ‘আলিম। ‘আল্লামা ইবনু হাজার (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ যারা কালো খিযাব ব্যবহারের অনুমতি দেন তারা এ হাদীসগুলো দলীল হিসেবে গ্রহণ করেন। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৮৯৯)
পরবর্তী হাদীসে আমরা দেখতে পাই যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খিযাব দ্বারা চুল বা দাড়িকে পরিবর্তন করতে বলেছেন, যা কালো খিযাব পরিহার করতে বলেছেন। তাই ‘উলামায়ে কিরামের অনেকেই মনে করেন, চুলে কালো খিযাব ছাড়া অন্য খিযাব ব্যবহার করা বৈধ। কালো খিযাব ব্যবহার করা বৈধ নয়। যেসব হাদীসে খিযাব ব্যবহারের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে বা অনুমতি প্রদান করা হয়েছে তা কালো ছাড়া অন্য রঙের বেলায়। ‘আল্লামা ইবনু হাজার (রহিমাহুল্লাহ) উপরের হাদীসের ব্যাখ্যায় লিখেন, ‘‘খিযাব ব্যবহারের অনুমোদন কালো ছাড়া অন্য রঙের বেলায় নির্ধারিত। কেননা ইমাম মুসলিম জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘তোমরা তা পরিবর্তন করো তবে কালো পরিহার করো’’। এছাড়াও আবূ দাঊদে ইবনু ‘আব্বাস থেকে মারফূ‘ সনদে বর্ণিত, যা ইবনু হিব্বান সহীহ বলেছেন,
يكون قوم في آخر الزمان يخضبون بالسواد كحواصل الحمام لا يريحون رائحة الجنة
‘‘শেষ যামানায় এমন এক সম্প্রদায় হবে, যারা কবুতরের বুকের ন্যায় (কালো) খিযাব ব্যবহার করবে, তারা জান্নাতের ঘ্রাণ পাবে না’’। হাদীসের সানাদ শক্তিশালী। তবে হাদীসটি মারফূ‘ নাকি মাওক্বূফ- এ নিয়ে ইখতিলাফ রয়েছে। মাওক্বুফ হওয়াকে প্রাধান্য দিলেও তা মারফূ‘ এর হুকুমে; কেননা যুক্তির আলোকে এসব কথা বলা যায় না। তাই ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) কালো খিযাব ব্যবহার মাকরূহ তাহরীমী হওয়ার মতকে পছন্দ করেন।’’ (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৮৯৯)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪২৪-[৬] জাবির ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন (আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর পিতা) আবূ ক্বুহাফাকে (মুসলিম বানানোর জন্য) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মুখে উপস্থিত করা হলো। সে সময় তাঁর মাথার চুল ও দাড়ি সুগামার (কাশফুলের) মতো একেবারে সাদা ছিল। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ কোন কিছুর দ্বারা তার চুল দাড়ির শুভ্রতাকে পরিবর্তন করে দাও। তবে কালো রং ব্যবহার করো না। (মুসলিম)[1]
بَابُ التَّرَجُّلِ
وَعَن جَابر قَالَ: أُتِيَ بِأَبِي قُحَافَةَ يَوْمَ فَتْحِ مَكَّةَ وَرَأْسُهُ وَلِحْيَتُهُ كَالثُّغَامَةِ بَيَاضًا فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «غَيِّرُوا هَذَا بِشَيْءٍ وَاجْتَنِبُوا السَّواد» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ বর্ণিত হাদীসটি কালো খিযাব ব্যবহার হারাম হওয়ার স্বপক্ষের দলীল। ইমাম মুসলিম (রহিমাহুল্লাহ) হাদীসটি বর্ণনা করতে অনুচ্ছেদটি এভাবে রচনা করেন, ‘লাল বা হলুদ দিয়ে চুল খিযাব করা মুস্তাহাব এবং কালো দিয়ে খিযাব করা হারাম অনুচ্ছেদ’। ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আমাদের মাযহাব হলো, মহিলা ও পুরুষের জন্য চুলের শুভ্রতায় হলুদ ও লাল খিযাব ব্যবহার মুস্তাহাব। আর আমাদের মাযহাবের বিশুদ্ধ মতে কালো খিযাব ব্যবহার হারাম। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪১৯৯) উপরোল্লিখিত হাদীসে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪২৫-[৭] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ যে সমস্ত ব্যাপারে কোন নির্দেশ (বা ওয়াহী) নাযিল হয়নি, সেসব বিষয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহলে কিতাবদের সাথে সামঞ্জস্য স্থাপন করাকে পছন্দ করতেন। তৎকালের আহলে কিতাবগণ তাদের মাথার চুলকে সোজা ছেড়ে রাখত। আর মুশরিকরা সিঁথি কেটে চুলগুলোকে দু’ভাগ করত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনিই সোজাসুজি পিছনের দিকে ঝুলিয়ে রাখতেন (সিঁথি কাটত না)। অবশ্য পরে তিনি সিঁথি কেটেছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ التَّرَجُّلِ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُحِبُّ مُوَافَقَةَ أَهْلِ الْكِتَابِ فِيمَا لَمْ يُؤْمَرْ فِيهِ وَكَانَ أَهْلُ الْكِتَابِ يَسْدُلُونَ أَشْعَارَهُمْ وَكَانَ الْمُشْرِكُونَ يَفْرِقُونَ رؤوسهم فَسَدَلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَاصِيَتَهُ ثمَّ فرق بعدُ
ব্যাখ্যাঃ (يُحِبُّ مُوَافَقَةَ أَهْلِ الْكِتَابِ فِيمَا لَمْ يُؤْمَرْ فِيهِ) অর্থাৎ যেসব বিষয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে কোন ওয়াহী নাযিল হয়নি সেসব বিষয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহলে কিতাবদের সাথে ঐকমত্য পোষণ ভালোবাসতেন।
বিভিন্ন বিষয়ে আহলে কিতাবদের সাথে বিরোধিতা করার কথা বিভিন্ন হাদীসে এসেছে। ইতোপূর্বে খিযাবের হাদীসে আমরা দেখেছি যে, আহলে কিতাবদের বিরোধিতা করতেই খিযাব করতে বলেছেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তাই ওয়াহী না আসা বিষয়ে আহলে কিতাবদের সাথে ঐকমত্য পোষণের ব্যাখ্যায় ইমাম নাবাবী, কাযী ‘ইয়ায-এর বরাতে বলেনঃ যেসব বিষয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে কোন ওয়াহী আসেনি সেসব বিষয়ে আহলে কিতাবদের সাথে ঐকমত্যের ব্যাখ্যায় ‘উলামারা ইখতিলাফ করেন। কেউ কেউ বলেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ কাজটি ইসলামের সূচনালগ্নে আহলে কিতাবদের মনকে আকৃষ্ট করা এবং মূর্তি পূজার বিরোধিতায় তাদের সাথে তাঁর ঐকমত্য দেখানোর জন্য ছিল। পরবর্তীতে যখন আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে আকৃষ্ট করা থেকে অমুখাপেক্ষী করে দেন এবং ইসলামকে সব দীনের উপর জয় দান করেন, তখন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে বিরোধিতার ঘোষণা দেন। যেমন চুলে খিযাবের বিষয়। আবার কেউ কেউ বলেন, এমনও হতে পারে যে, যেসব বিষয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে কোন ওয়াহী অবতীর্ণ হয়নি, সেসব বিষয়ে তাঁকে আহলে কিতাবদের শারী‘আতের অনুসরণ করতে বলা হয়েছিল। আর এটা নিশ্চয় তাদের শারী‘আতের ঐসব বিষয়ে যেগুলোকে তারা পরিবর্তন করেনি। (শারহুন নাবাবী হাঃ ২৩৩৬, অধ্যায় : রসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চুলের সিফাত)
(يَسْدُلُونَ أَشْعَارَهُمْ) তারা তাদের চুলকে ছেড়ে দিত। চুলকে ছেড়ে দেয়া বলতে, চুলকে দুই ভাগে ভাগ করে ডান দিকে এক ভাগ এবং বাম দিকে এক ভাগ না করেই তাকে স্বাভাবিক অবস্থায় মাথার আশপাশে ছেড়ে দেয়া।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ)-এর শারহু মুসলিমে রয়েছে, ‘উলামায়ে কিরাম বলেনঃ চুলের ক্ষেত্রে ‘সাদল’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, চুলকে কপালের উপর ছেড়ে দেয়া এবং তাকে বাটির মতো বানিয়ে ফেলা। আর ‘ফারক’ তথা সিঁথি হলো চুলকে একে অপর থেকে পৃথক করা। কেউ কেউ বলেন, ‘সাদল’ হচ্ছে, চুলকে দ্বিখন্ড- বণ্টন না করে পিছন দিকে ছেড়ে দেয়া। আর ‘ফারক’ বা সিঁথি হলো তাকে দ্বিখন্ড- ভাগ করা।
(فَسَدَلَ النَّبِىُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَاصِيَتَهٗ) তাই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুলে ‘সাদল’ করতেন। অর্থাৎ মদীনায় এসে আহলে কিতাবদের সাথে ঐকমত্য পোষণ করতে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাদ্ল করেন।
(ثُمَّ فَرَّقَ بَعْدُ) এরপর সিঁথি করেন। অর্থাৎ মদীনার আসার পর কিছুকাল যাওয়ার পর সিঁথি করেন। ইবনুল মালিক বলেনঃ জিবরীল এসে তাকে সিঁথি করার নির্দেশ দেন। তাই তিনি সিঁথি করেন এবং মুসলিমরাও তাদের মাথা সিঁথি করতেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
উল্লেখ্য যে, চুলে ‘সাদ্ল’ তথা সিঁথি না করে ছেড়ে দেয়া অথবা ‘ফার্ক’ তথা সিঁথি করা কোনটি শার‘ঈ দিক নির্দেশনা হিসেবে ছিল না। তাই রসূলের সিঁথির ‘আমলের মাধ্যমে ‘সাদল’-এর হুকুম রহিত হয়ে গেছে এমন নয়।
ফাতহুল বারীতে রয়েছে, ‘সাদল’ মানসূখ বা রহিত হলে সব সহাবা বা অধিকাংশরা তা ছেড়ে সিঁথি করতেন। আর সাহাবীদের থেকে বর্ণিত যে, তাদের কেউ কেউ সিঁথি করতেন, কেউ কেউ সিঁথি করতেন না। অথচ কেউ কাউকে দোষারোপ করতেন না। আর সহীহ বর্ণনায় রয়েছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চুল বাবরী ছিল, তাতে সিঁথি হলে তিনি তা সিঁথি করতেন, না হলে ছেড়ে দিতেন। অতএব বিশুদ্ধ মত হলো, সিঁথি মুস্তাহাব, ওয়াজিব নয়। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৯১৭)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪২৬-[৮] নাফি’ (রহিমাহুল্লাহ) ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কাযা’ হতে নিষেধ করতে শুনেছি। নাফি’-কে জিজ্ঞেস করা হলো, কাযা’ কি? তিনি বললেনঃ বালকদের মাথার কিছু চুল মুড়িয়ে ফেলা এবং কিছু চুল রেখে দেয়া। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
কেউ কেউ কাযা’-এর ব্যাখ্যাটি মূল হাদীসের সাথেই সংযোগ বা সংযুক্ত করেছেন।
بَابُ التَّرَجُّلِ
وَعَنْ نَافِعٍ عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَنْهَى عَنِ الْقَزَعِ. قِيلَ لِنَافِعٍ: مَا الْقَزَعُ؟ قَالَ: يُحْلَقُ بعضُ رَأس الصبيِّ وَيتْرك البعضُ
وَألْحق بَعضهم التَّفْسِير بِالْحَدِيثِ
ব্যাখ্যাঃ (القزع) কাযা‘ অর্থাৎ মাথার চুলের কিছু অংশ কামানো আর কিছু অংশ রেখে দেয়া। কেউ কেউ বলেন, মাথার বিভিন্ন অংশ থেকে কামিয়ে নেয়া হচ্ছে কাযা‘। ইমাম নাবাবী বলেনঃ প্রথম অর্থটিই এখানে উদ্দেশ্য; কেননা প্রথম অর্থটি হাদীসের বর্ণনাকারীর ব্যাখ্যা। বর্ণনাকারীর ব্যাখ্যা হাদীসের বাহ্যিক অর্থের বিরোধ নয়। তাই এই অর্থ নেয়া আবশ্যক।
কাযা' অর্থাৎ মাথার কিছু চুল কামানো ও কিছু রেখে দেয়া। এক অংশের চুল কামানো এবং অন্য অংশ রেখে দেয়া মাকরূহ হওয়ার বেলায় উলামারা একমত। তবে মাথার চিকিৎসা ইত্যাদির জন্য হলে মাকরূহ নয়। আর এখানে মাকরূহ বলতে মাকরূহ তানযীহি। ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) এ আলোচনার পর বলেনঃ আমাদের মাযহাব মোতাবেক পুরুষ-মহিলা সবার জন্যই কাযা’ মাকরূহ; কেননা হাদীসটি ব্যাপক। ‘উলামায়ে কিরাম বলেনঃ কাযা‘ মাকরূহ হওয়া বা নিষেধের রহস্য হলো, এতে আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্টিকে কদাকার করে দেয়া হয়। কেউ কেউ বলেন, এটা ইতর শয়তানের কষ্ট দেয়ার কারণ। আবার কেউ কেউ বলেন, এটা ইয়াহূদীদের বেশ; তাই মাকরূহ। (শারহুন নাবাবী পৃঃ ৯১/৯২৭, লিবাস অধ্যায়, কাযা‘ মাকরূহ অনুচ্ছেদ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪২৭-[৯] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন একটি ছেলেকে দেখতে পেলেন, যার মাথার চুলের কিছু অংশ মুড়ানো হয়েছে আর কিছু অংশ রেখে দেয়া হয়েছে। তখন তিনি তাদেরকে এরূপ করতে নিষেধ করলেন এবং বললেনঃ পুরা মাথা মুড়িয়ে ফেলো অথবা পুরা মাথায় চুল রেখে দাও। (মুসলিম)[1]
بَابُ التَّرَجُّلِ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأَى صَبِيًّا قَدْ حُلِقَ بَعْضُ رَأْسِهِ وَتُرِكَ بَعْضُهُ فَنَهَاهُمْ عَنْ ذَلِكَ وَقَالَ: «احْلِقُوا كُلَّهُ أَوِ اتْرُكُوا كُلَّهُ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যাঃ বর্ণিত হাদীসটি উপরের হাদীসের ব্যাখ্যারূপে গ্রহণ করা যায়। অর্থাৎ মাথার কিছু অংশের চুল রেখে দেয়া এবং কিছু কামিয়ে ফেলা কাযা‘ এবং তা নিষিদ্ধ।
احْلِقُوا كُلَّهٗ أَوِ اتْرُكُوا كُلَّهٗ তার পুরো কামাও বা পুরোই ছেড়ে দাও। অর্থাৎ মাথার পুরো চুল কামিয়ে নাও অথবা পুরো চুল ছেড়ে দাও। কিছু কামাবে আর কিছু রাখবে এমনটি করবে না। মুল্লা ‘আলী কারী বলেনঃ হাদীসের এ অংশে ইঙ্গিত হলো হজ্জ এবং ‘উমরাহ্ ছাড়াও মাথার চুল হলক তথা সম্পূর্ণ কামানো বৈধ। কামানো ও রেখে দেয়ার মাঝে ব্যক্তি ইচ্ছাধীন। তবে উত্তম হলো, হজ্জ ও ‘উমরাহ্ ছাড়া না কামানো বেলায়। কেননা না কামানোই ছিল রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ‘আমল ও তার সাহাবীদের ‘আমল। আর ‘আলী (রাঃ) কামানোর বেলায় একাই তাদের থেকে ব্যতিক্রম ছিলেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
ইমাম শাওকানী ‘নায়লুল আওত্বার’-এ লিখেন, হাদীসে তাদের মতের প্রত্যাখ্যান রয়েছে যারা বলেনঃ মাথার চুল কামিয়ে নেয়া মাকরূহ। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪১১৯)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪২৮-[১০] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীর সাদৃশ্য গ্রহণকারী পুরুষ এবং পুরুষের সাদৃশ্য গ্রহণকারিণী নারীদের ওপর অভিসম্পাত করেছেন এবং বলেছেনঃ তাদেরকে তোমাদের ঘর হতে বের করে দাও। (বুখারী)[1]
بَابُ التَّرَجُّلِ
وَعَن ابْن عَبَّاس قَالَ: لعن الله الْمُخَنَّثِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالْمُتَرَجِّلَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَقَالَ: «أخرجوهم من بُيُوتكُمْ» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ (الْمُخَنَّثِينَ) শব্দটির ‘নূন’ হরফে তাশদীদ সহকারে যবর বা যের দিয়ে দু’ভাবেই উচ্চারণ করা যায়। তবে যবর দিয়ে পড়া অধিক প্রসিদ্ধ। এর অর্থ হলো নারীদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বনকারী। এই সাদৃশ্য অবলম্বন অবয়ব, পোশাক, খিযাব, আওয়াজ, আকৃতি, কথা বলা এবং যে কোন চাল-চলনে হতে পারে। এ কর্মটি নিষেধ। কেননা এতে আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি ঘটানো হয়।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ মুখান্নাস অর্থাৎ নারীর সাদৃশ্য অবলম্বনকারী ব্যক্তি দুই প্রকারের। এক : যে সৃষ্টিগতভাবে কিছুটা নারী প্রকৃতির। সে কৃত্রিমভাবে নারীর সাদৃশ্যতা অবলম্বন করেনি। এতে কোন দোষ, গোনাহ নেই। কেননা সে অপারগ। দুই : যে কৃত্রিমভাবে চাল-চলন, কথা-বার্তা এবং অবয়ব ইত্যাদিতে নারীর আকৃতি অবলম্বন করে, সে ব্যক্তির এ কাজ দোষণীয় যার অভিশাপ হাদীসে এসেছে। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৭৮৫)
(الْمُتَرَجِّلَاتِ) ‘জিম’ অক্ষরে তাশদীদ ও যের দিয়ে উচ্চারিত। অর্থাৎ পুরুষের সাথে চাল চলন, আকার আকৃতি, হাঁটা চলা এবং উচ্চ আওয়াজ ইত্যাদিতে সাদৃশ্য অবলম্বনকারিণী নারী। এ বৈশিষ্ট্যের নারী পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বন করা পুরুষ নারীর সাদৃশ্য অবলম্বনের মতই দোষণীয়। তবে জ্ঞান ও বিচক্ষণতায় নারী পুরুষের সাদৃশ্য হওয়া দোষণীয় নয়। বরং তা প্রশংসিত। যেমন বর্ণনায় রয়েছে- ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) পুরুষের মতো রায় তথা অভিমতের অধিকারিণী ছিলেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৭৮৫)
(أخرجوهم من بيوتكم) তাদেরকে তোমাদের ঘর থেকে বের করে দাও। অর্থাৎ তোমাদের এলাকা ও শহর থেকে বের করে দাও। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
সহীহুল বুখারীর বর্ণনায় আরো রয়েছে-
قال فأخرج النبي صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فلانا وأخرج عمر فلانا অর্থ- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অমুককে বের করে দেন এবং ‘উমার অমুককে বের করে দেন। ‘আনজাশা’ নামক এক কালো দাস নারীদের বেশভূষা অবলম্বনের কারণে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এলাকা থেকে বের করে দেন বলে বর্ণনায় রয়েছে। ‘উমার (রাঃ) যাকে বের করেন তার নাম কোন বর্ণনায় আসেনি। তবে কোন কোন বর্ণনায় فلانا এর স্থলে فلانة শব্দ এসেছে। অর্থাৎ তিনি কোন এক নারীকে পুরুষের বেশ অবলম্বনের কারণে বের করেছিলেন। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৮৮৬)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪২৯-[১১] উক্ত রাবী [’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর লা’নাত সে পুরুষদের ওপর যারা নারী সাদৃশ্য ধারণ করে এবং সে সকল নারীদের ওপর যারা পুরুষ সাদৃশ্য ধারণ করে। (বুখারী)[1]
بَابُ التَّرَجُّلِ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَعَنَ اللَّهُ الْمُتَشَبِّهِينَ مِنَ الرِّجَالِ بِالنِّسَاءِ والمتشبِّهات من النِّسَاء بِالرِّجَالِ» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ বর্ণিত হাদীস ও উপরোক্ত হাদীসের মর্ম একই। উভয় হাদীসে কেবল শব্দের ভিন্নতার মাঝে কম-বেশি হয়েছে। হাদীসটি উপরোক্ত হাদীসের অর্থকে পরিষ্কার করে দিচ্ছে।
‘আল্লামা ইবনু হাজার বলেনঃ নিষিদ্ধ সাদৃশ্য হলো কথাবার্তা ও চাল-চলনে। তবে পোশাকের ডিজাইন বিভিন্ন দেশের রীতি অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। কোন কোন সম্প্রদায়ে পুরুষ ও মহিলার পোশাকের মাঝে কোন পার্থক্য নেই। তবে মহিলারা হিজাব ও পর্দার মাধ্যমে পুরুষ থেকে আলাদা হবে।
আমার সাদৃশ্যতার এই তিরস্কার ঐ ব্যক্তির ক্ষেত্রে যে ইচ্ছা করে এমনটি করে। তবে যে পুরুষ সৃষ্টিগতভাবেই চাল চলনে নারী সাদৃশ্য বা যে নারী পুরুষ সাদৃশ্য তাকে ধীরে ধীরে তাদের অভ্যাস পরিবর্তন করার নির্দেশ দেয়া যাবে। যদি সে তা ছাড়তে চেষ্টা না করে ঐ রীতির উপরেই থাকাকেই আঁকড়ে ধরে তবে সেও এই তিরস্কারের অন্তর্ভুক্ত হবে, বিশেষ করে সে যদি এতে সন্তুষ্ট থাকে। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৮৮৫)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৩০-[১২] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সে নারীর ওপর আল্লাহর লা’নাত যে অন্য নারীর মাথায় কৃত্রিম চুল মিশ্রিত করে কিংবা নিজ মাথায় কৃত্রিম চুল মিশ্রিত করায় এবং যে অন্যের গায়ে উল্কি করে অথবা নিজের গায়ে উল্কি করায়। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ التَّرَجُّلِ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَعَنَ اللَّهُ الْوَاصِلَةَ وَالْمُسْتَوْصِلَةَ والواشمة والمستوشمة»
ব্যাখ্যাঃ (الْوَاصِلَةَ وَالْمُسْتَوْصِلَةَ) হলো ঐ নারী যে মহিলার চুলকে অন্যের চুলের সাথে সংযোগ করে দেয়। আর (المستوشمة) হচ্ছে যে নারী তার চুলকে অন্যের চুলের সাথে সংযোগ করে দেয়াকে কামনা করে। মোটকথা, যে মহিলা চুল সংযোগ করে এবং যে সংযোগ করে দেয়ার কাজে লিপ্ত থাকে উভয়ের ওপরই অভিশাপ।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হাদীসগুলো এ কথার ওপর স্পষ্ট যে, চুলের সংযোগ হারাম এবং যে কোন ধরনের চুলের সংযোগকারিণী ও সংযোগকামিনী উভয়ের ওপর অভিশাপ রয়েছে। এটাই বাহ্যিক নির্বাচিত মত। তবে আমাদের ইমামগণ এর বিস্তর ব্যাখ্যা করেন এবং বলেন, যদি মহিলা তার চুলের সাথে অন্য মানুষের চুল মিলায় তবে তা হারাম হওয়ার বেলায় কোন দ্বিমত নেই। চাই কোন নারীর চুল সংযুক্ত করুক বা কোন পুরুষের চুল, স্বামী বা তার মাহরাম ব্যক্তির চুল বা অন্য কারো চুল- এতে কোন দ্বিমত নেই। কেননা এগুলো হারাম হওয়ার হাদীসগুলো শর্তহীন ও ব্যাপক। এছাড়া মানুষের সম্মানের কারণে তার চুল বা যে কোন অঙ্গ দ্বারা উপকৃত হওয়া হারাম। বরং তার চোখ, নখ ও সমস্ত অঙ্গ দাফন করে দেয়া হবে। এরপর ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ)-এর বরাতে বলেনঃ ‘উলামাগণ এ মাসআলায় মতানৈক্য করেন। ইমাম মালিক, ইমাম ত্ববারী এবং অনেকে বা অধিকাংশরা বলেনঃ যে কোন বস্তু দিয়ে চুলের সংযোগ নিষিদ্ধ। চাই মহিলা তা চুল দ্বারা সংযোগ করুক বা পশম দ্বারা বা কোন কাপড়ের টুকরো দ্বারা। তারা ইমাম মুসলিম কর্তৃক জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাকে তার মাথায় কোন কিছু সংযুক্ত করার কারণে ধমকি দেন। লায়স ইবনু সা‘দ বলেন, নিষেধ কেবল চুলের সাথে নির্ধারিত। পশম বা কাপড়ের টুকরোর সাথে নয়।
কাযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ তবে চুলে রেশমের রঙিন সুঁতা বাঁধা এবং এ জাতীয় যা চুলের সাদৃশ্য নয় তা নিষেধ নয়। কেননা এটা সংযোগ নয় এবং তা সংযোগের উদ্দেশ্যেরও অন্তর্ভুক্ত নয়। বরং এটা কেবল সৌন্দর্য ও রূপচর্চার জন্য।
কাযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ বর্ণিত হাদীসে চুলের সংযোগকে কাবীরাহ্ গুনাহের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ কর্মে লিপ্ত ব্যক্তিকে অভিশাপ দেয়া হয়েছে। হাদীসে এও রয়েছে যে, হারাম কাজে সহযোগিতাকারী হারামে লিপ্ত ব্যক্তির সাথে পাপে শরীক, যেমন ‘ইবাদাতে সহযোগিতাকারী ব্যক্তি ‘ইবাদাতের সাওয়াবে শরীক।
(والواشمة والمستوشمة) الواشمة আরবী শব্দ وَشْمٌ থেকে ব্যুৎপত্তি। যার অর্থ : উল্কি আঁকা। অতএব الواشمة হলো ঐ মহিলা যে কাউকে উল্কি এঁকে দেয়, আর والمستوشمة ঐ মহিলা উল্কি আঁকার আবেদন করে তথা উল্কি আঁকিয়ে নেয়। চুলের সংযোগের মতোই উভয়ের ওপর আল্লাহর অভিশাপ রয়েছে। তাই এ কর্মও হারাম।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এটা হারাম যে করে তার জন্য, যে করিয়ে নেয় তার জন্য এবং যে এটার আবেদন করে তার জন্য। অনেক সময় ছোট শিশুর বেলায় এমনটি করা হয়। তার ক্ষেত্রে যে করিয়ে দিয়েছে সে গুনাহগার হবে। ছোট বাচ্চা শারী‘আতের দায়বদ্ধতা মুক্ত হওয়ায় গুনাহগার হবে না। (শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, ২১২৪/১১৯)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৩১-[১৩] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ তা’আলা লা’নাত করেন এমন সব নারীর ওপর যারা অপরের অঙ্গে উল্কি করে এবং নিজের অঙ্গেও করায়, যারা (ভ্রু বা কপাল) চুল উপড়িয়ে ফেলে এবং তারা সৌন্দর্যের জন্য দাঁত সরু ও তার ফাঁক বড় করে আল্লাহর সৃষ্টিকে বদলিয়ে দেয়। এ সময় জনৈকা মহিলা ইবনু মাস্’ঊদ -এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করল, আমি শুনতে পেলাম, আপনি নাকি এমন এমন নারীদের ওপর লা’নাত করেছেন? উত্তরে তিনি বললেন, আমি কেন তাদের ওপর লা’নাত করব না, যাদের ওপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লা’নাত করেছেন আর আল্লাহর কিতাবেও রয়েছে। মহিলাটি বলল, আমি তো সম্পূর্ণ কুরআন পড়েছি, কিন্তু তার মধ্যে কোথাও তো তা পেলাম না, যা আপনি বলছেন। তখন ইবনু মাস্’ঊদ(রাঃ) বললেনঃ যদি তুমি কুরআন পড়তে, তাহলে তুমি অবশ্যই (মনোযোগ দিয়ে) তা পেতে। আচ্ছা তুমি কি তা এ আয়াত পড়নি? وَمَآ اٰتٰكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوْهُ وَمَا نَهٰكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوْا.। অর্থাৎ- ’’রসূল তোমাদেরকে যা কিছু দেন তা তোমরা মেনে নাও, আর যা হতে নিষেধ করেন, তা হতে বিরত থাকো।’’ এটা শুনে মহিলাটি বলল : হ্যাঁ, এটা তো পড়েছি। তখন ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) বললেনঃ আল্লাহর রসূল এ সমস্ত কাজ হতেও নিষেধ করেছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ التَّرَجُّلِ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: لَعَنَ اللَّهُ الْوَاشِمَاتِ وَالْمُسْتَوْشِمَاتِ وَالْمُتَنَمِّصَاتِ وَالْمُتَفَلِّجَاتِ لِلْحُسْنِ الْمُغَيِّرَاتِ خَلْقَ اللَّهِ فَجَاءَتْهُ امْرَأَةٌ فَقَالَتْ: إِنَّهُ بَلَغَنِي أَنَّكَ لَعَنْتَ كَيْتَ وَكَيْتَ فَقَالَ: مَا لِي لَا أَلْعَنُ مَنْ لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمَنْ هُوَ فِي كِتَابِ اللَّهِ فَقَالَتْ: لَقَدْ قَرَأْتُ مَا بَيْنَ اللَّوْحَيْنِ فَمَا وجدت فِيهِ مَا نقُول قَالَ: لَئِنْ كُنْتِ قَرَأْتِيهِ لَقَدْ وَجَدْتِيهِ أَمَا قَرَأت: (مَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا)
؟ قَالَت: بلَى قَالَ: فإِنه قد نهى عَنهُ
ব্যাখ্যাঃ (الْمُتَنَمِّصَاتِ) এর অর্থ হলো ঐ সব মহিলা যারা চেহারার চুল উপড়ানোর আবেদন করে বা উপড়িয়ে নেয়। এখানে উদ্দেশ্য হলো ভ্রু প্লাক করা। ভ্রু প্লাক তথা ভ্রুর কিছু চুল উপড়িয়ে ভ্রুকে চিকন করিয়ে নেয়া এবং করে দেয়া উভয়টি হারাম। এর উপরে আল্লাহ তা‘আলার অভিশাপ। হ্যাঁ তবে যদি মহিলার দাড়ি বা গোঁফ গজিয়ে যায় তবে তা উপড়িয়ে নেয়া হারাম নয়।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ বরং এটা আমাদের মাযহাবে মুস্তাহাব। চেহারার চুল উপড়ানোর নিষেধাজ্ঞা ভ্রু ও চেহারার আশপাশের পশমের সাথে নির্দিষ্ট।
(الْمُتَفَلِّجَاتِ) অর্থ হলো দাঁতের মাঝে দূরত্ব বা ফাঁক সৃষ্টিকামী নারী। অর্থাৎ রেত বা এ জাতীয় কিছু দিয়ে দাঁতকে ঘষে যে নারী দুই দাঁতের মাঝে ফাঁক সৃষ্টি করে দাঁতকে ভিন্ন আকৃতিতে নিয়ে আসে তার ওপর আল্লাহর অভিশাপ। সাধারণত বৃদ্ধা বা বৃদ্ধার কাছাকাছি বয়সে পৌঁছে যাওয়া নারীরা এমনটি করে থাকে, দাঁতের সৌন্দর্য প্রকাশের মাধ্যমে নিজের শৈশব প্রকাশের জন্য। কেননা দাঁতের মাঝে এই সূক্ষ্ম ফাঁক ছোট মেয়েদের হয়ে থাকে। অতএব মহিলা যখন বৃদ্ধা হয় এবং তার বয়স বৃদ্ধি হয় এবং নিঃসঙ্গতা অনুভব করে তখন রেত দিয়ে ঘষে; যাতে দাঁত চিকন ও দেখতে সুন্দর হয় এবং তাকে কমবয়সী ধারণা করা হয়। এসব হাদীসের ভিত্তিতে এমন কর্ম হারাম, যে করবে এবং যে করিয়ে নিবে উভয়ের জন্য। কেননা এতে আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্টির পরিবর্তন রয়েছে। এছাড়া এতে ধোঁকা ও প্রতারণা রয়েছে। (শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, ৪৮৮৬)
(وَمَنْ هُوَ فِي كِتَابِ اللهِ) এবং যার ওপর লা‘নাত আল্লাহর কিতাব তথা কুরআনে রয়েছে। অর্থাৎ কুরআনের অভ্যন্তরে এদের লা‘নাতের কথা উল্লেখ রয়েছে। বাহ্যত প্রকাশ্যভাবে কুরআনের কোথায়ও এই সিফাতের নারীদের লা‘নাতের কথা উল্লেখ না থাকায় মহিলার কাছে সেটি অস্পষ্ট ছিল। যার দরুন সে ইবনু মাস্‘ঊদ (রাঃ)-এর কাছে প্রশ্ন করেছি, আমি তো কিতাবুল্লাহর দুই কভারের মাঝে যা আছে তা পড়েছি, অর্থাৎ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়েছি, কোথায়ও এদেরকে লা‘নাতের কথা পাইনি। তখন ইবনু মাস্‘ঊদ বলেন, لئن كنت قرأتيه لقد وجدتيه তুমি যদি চিন্তা ও গভীর মনোযোগসহ কুরআন পড়তে তবে অবশ্যই তা পেতে। তারপর তিনি কুরআনের যে আয়াত থেকে এগুলোর নিষেধাজ্ঞা বুঝা যায় তা পাঠ করলেন।
(فَإِنَّهٗ قَدْ نَهٰى عَنهُ) তিনি তথা রসূল তো এ থেকে নিষেধ করেছেন। মর্ম হলো, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নিষিদ্ধ বস্তু থেকে বিরত থাকতে বান্দা যখন নির্দেশিত, আবার তিনি এই সকল বস্তু থেকে নিষেধ করেছেন এ হাদীস ও অন্যান্য হাদীসে, অতএব রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক যত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তার নিষেধাজ্ঞা যেন কুরআনেই রয়েছে। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এখানে ইঙ্গিত হলো, এসব কাজে জড়িত নারীর ওপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অভিশাপ আল্লাহ তা‘আলার অভিশাপের ন্যায়। অতএব এগুলো থেকে বিরত থাকা অত্যন্ত জরুরী। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৩২-[১৪] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বদনযর লাগা সত্য এবং তিনি অঙ্গে উল্কি উৎকীর্ণ করতে নিষেধ করেছেন। (বুখারী)[1]
بَابُ التَّرَجُّلِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْعَيْنُ حَقٌّ» وَنَهَى عَن الوشم. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ الْعَيْنُ حَقٌّ চোখ লাগা সত্য। অর্থাৎ অনেক সময় কেউ কোন বস্তু বা ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে তার সৌন্দর্য ইত্যাদি দেখে আশ্চর্য হয়। আশ্চর্য হয়ে তাকানোর কারণে তার চোখের প্রভাব সেই ব্যক্তি বা বস্তুর উপর পড়ে। অনেক মানুষের এই তাকানো সেই ব্যক্তি বা বস্তুর ক্ষতি সাধন করে। চোখের প্রভাবে এই ক্ষতি বা বদনযরের ব্যাপারটি সত্য এ কথাটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ হাদীসে আমাদেরকে জানাচ্ছেন ।
সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘আলিম হাদীসের বাহ্যিক অর্থই গ্রহণ করেছেন এবং তারা বলেছেনঃ চোখের প্রভাব সত্য। তবে বিষয়টি বাহ্যত যুক্তি বিরোধ হওয়ার কারণে কেউ কেউ এটাকে অস্বীকার করেন। তবে শারী‘আতে প্রমাণিত বিষয় কেবল যুক্তিবিরোধ হওয়ার কারণে তা অস্বীকারের কোন সুযোগ নেই। শারী‘আতে কোনকিছু ঘটার খবর দিলে তা বিশ্বাস করা অপরিহার্য এবং তা মিথ্যা আখ্যায়িত করা জায়িয নয়। শারী‘আহ্ কর্তৃক প্রমাণিত এ বিষয়টি অস্বীকার এবং মিথ্যা আখ্যায়িত করা এবং শারী‘আহ্ আখিরাতের ব্যাপারে যে সংবাদ দিয়েছে তা অস্বীকার করার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই?
তবে প্রকৃতিবাদী অনেকেই হাদীসে বর্ণিত চোখের প্রভাবের বিষয়টি প্রমাণ করেন। তারা বলেনঃ দৃষ্টিদানকারীর চোখে একটি বিষাক্ত শক্তি (এসিড) রয়েছে যা তাকানো ব্যক্তির চোখ থেকে উৎসারিত হয় এবং সেটি গিয়ে যার দিকে তাকায় তার ক্ষতি সাধন করে। তারা বলেন, এটি অসম্ভব কিছু নয়। যেমন সাপ বিচ্ছুর চোখ থেকে উৎসারিত বিষাক্ত শক্তি দংশিত ব্যক্তিকে আক্রান্ত করে, যার ফলে সে মারা যায়। যদিও তা আমাদের অনুভূতির বাহিরে। এভাবেই মানুষের চোখের প্রভাব প্রকাশ পায়।
আহলুস্ সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের মত হলো, নিশ্চয় বদনযরকারী ব্যক্তি তাকানোর সময় তার চোখ আল্লাহ তা‘আলারই হুকুমে অন্য কারো ক্ষতি করে বা তাকে ধ্বংস করে। এক ব্যক্তি আরেক ব্যক্তির সাথে সাক্ষাতের সময় আল্লাহ তা‘আলা এই ক্ষতি সৃষ্টি করে দেন। যে কোন রূপে আল্লাহ তা‘আলা তা পৌঁছাতে পারেন। এই হলো এ বিষয়ের ‘আক্বীদাগত দিক। যার সারসংক্ষেপ ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ)-এর আলোচনা থেকে তুলে ধরা হয়েছে। এরপর ইমাম নাবাবী বদনযরের মাসায়িলগত দিক আলোচনা করতে গিয়ে বলেনঃ সংক্ষেপ বদনযরের ফিকহী দিক হলো,
যদি কেউ বদনযরে আক্রান্ত হয় তবে এ থেকে পরিত্রাণের জন্য শারী‘আত উযূর নির্দেশ দিয়েছে। যেমন সাহল ইবনু হুনায়ফ-এর হাদীসে রয়েছে, তিনি যখন বদনযরে আক্রান্ত হন তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদনযরকারীকে উযূর নির্দেশ দেন। ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘মুওয়াত্ত্বা’য় এ হাদীস বর্ণনা করেন। ‘উলামাদের কাছে বদনযরকারীর উযূর নিয়ম হলো, একটি পাত্রে পানি নিয়ে আসবে, পাত্রটি জমিনে রাখা যাবে না, এই পাত্র থেকে এক আজল পানি নিবে এবং কুলি করবে, তার কুলির পানি পাত্রে নিক্ষেপ করবে, এরপর পাত্র থেকে পানি নিয়ে তার চেহারা ধৌত করবে, এরপর বাম হাতে পানি নিয়ে ডান হাতের আঙ্গুলসহ তালু ধৌত করবে, এরপর ডান হাত দিয়ে পানি নিয়ে বাম হাতের কনুই ধৌত করবে। কনুই ও তালুর মধ্যবর্তী স্থান ধৌত করবে না। এরপর ডান পা এরপর বাম পা হাতের নিয়মে ধৌত করবে। সবই পাত্রের ভিতরে হবে। এরপর লুঙ্গির ভিতরের কোমরের ডান পার্শব ধৌত করবে। কেউ কেউ মনে করেন, লুঙ্গির ভিতর বলে লজ্জাস্থানের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। তবে জামহূরের মতো যা আমরা উল্লেখ করেছি। এটা পুরা হয়ে গেলে এই পানি আক্রান্ত ব্যক্তির মাথার উপর পিছন থেকে ঢালবে।
এ কাজের মর্মের কারণ বর্ণনা বা দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে অবগত হওয়া সম্ভব নয়। আর মানুষের বুদ্ধির এ সামর্থ্যও নেই যে, শারী‘আতের সব রহস্য সম্পর্কে সে অবগত হতে পারে। অতএব এর মর্ম কেবল যুক্তি বহির্ভূত বলে প্রত্যাহার করা যাবে না। (শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২১৮৭)
(وَنَهٰى عَن الوشم) অর্থাৎ আর তিনি الوشم তথা উল্কি আঁকা থেকে নিষেধ করেন। ইতোপূর্বে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তাই পুনারাবৃত্তির প্রয়োজন নেই।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৩৩-[১৫] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে চুল বাঁধা অবস্থায় দেখেছি। (বুখারী)[1]
بَابُ التَّرَجُّلِ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: لَقَدْ رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُلَبِّدًا. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ (مُلَبِّدًا) ‘ب’ হরফে তাশদীদসহ যের ও যবর উভয়ভাবে উচ্চারিত। আরবী শব্দ تَلْبِيْدٌ থেকে উদ্গত। যার অর্থ হলো, আঠালো কোন বস্তু চুলে লাগিয়ে তাতে জট বাঁধানো। অর্থাৎ চুলে আঠালো বস্তুর প্রলেপ দেয়া। এতে মাথা উঁকুন থেকে রক্ষা পায়। কেউ কেউ বলেন, সফরের সময় আঠালো বস্তু দ্বারা মাথার চুলকে কেশরের মতো করে নেয়া। মুল্লা ‘আলী কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হাদীস থেকে ইহরামের অবস্থার বাহিরে চুলে আঠালো বস্তু দিয়ে জট বাঁধানো বা চুল এটে সেঁটে রাখার বৈধতার প্রমাণ মিলে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৩৪-[১৬] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরুষদেরকে যা’ফরানী রং ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ التَّرَجُّلِ
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَتَزَعْفَرَ الرَّجُلُ
ব্যাখ্যাঃ হাদীসের মর্ম হলো, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরুষের জন্য যা‘ফরান ব্যবহার করতে নিষেধ করেন। এ নিষেধাজ্ঞার ভিতর শরীরে ব্যবহার বা কাপড়ে ব্যবহার উভয়ই অন্তর্ভুক্ত। কেননা এটা মেয়েদের অভ্যাস। তবে রঙের পরিমাণ অল্প হলে তার অনুমতি রয়েছে। কেননা কোন কোন সাহাবীকে এই রঙে দেখলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বারণ করেননি।
মুল্লা ‘আলী কারী (রহিমাহুল্লাহ) ‘শারহুস্ সুন্নাহ্’ কিতাবের বরাতে বলেনঃ আবূ ‘ঈসা বলেনঃ পুরুষের জন্য জাফরান ব্যবহার নিষেধের মর্ম হলো যা‘ফরানের সুগন্ধি ব্যবহার করা। আর যা‘ফরান নিষেধ হলো বেশি পরিমাণে ব্যবহার করা। কিন্তু যদি তা অল্প হয়, তবে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহিত সাহাবীর ক্ষেত্রে এর ছাড় দিয়েছেন বলে বর্ণিত হয়েছে। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আবদুর রাহমান ইবনু ‘আওফ-এর পরনে যা‘ফরান লাগানো পোশাক দেখে কোন আপত্তি করেননি। এরপর তিনি বলেন, আমি বলি, হয়ত বৈবাহিক অনুষ্ঠানাদির কারণে তার কাপড়ে অনিচ্ছায় কিছু যা‘ফরান রঙ লেগে গিয়েছিল। তাই তা সেই নিষেধের আওতাভুক্ত হয়নি যাতে কম বেশি সবই অন্তর্ভুক্ত হয়। এছাড়া রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এই নিষেধটিও ব্যাপক যেখানে বলা হয়েছে إِنَّ طِيبَ الرَّجُلِ مَا وُجِدَ رِيحُهٗ وَلَمْ يَظْهَرْ لَوْنُهٗ অর্থাৎ- ‘‘নিশ্চয় পুরুষের সুগন্ধি হচ্ছে, যার সুগন্ধি প্রকাশ পায় কিন্তু রঙ প্রকাশ পাওয়া যায় না’’। এছাড়া ইবনু শিহাব-এর যে বর্ণনা রয়েছে যেখানে বলা হয়েছে, ‘‘রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহাবা যা‘ফরান মিশ্রিত সুগন্ধি ব্যবহার করতেন, এতে তারা কোন সমস্যা দেখতেন না।’’ এরও উদ্দেশ্য কিছু কিছু সহাবা নিতে হবে। অর্থাৎ যাদের কাছে নিষেধাজ্ঞার খবর পৌঁছেনি তারা তা ব্যবহার করতেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
মোটকথা, বর্ণিত হাদীসটিতে আমরা পুরুষের জন্য যা‘ফরান রঙ ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা দেখতে পাচ্ছি। আবার কোন কোন ঘটনা থেকে এর কিছুটা অনুমোদন রয়েছে বলে বুঝা যায়। হাদীসের উভয় ধারার সামঞ্জস্য বিধানে কেউ কেউ বলেন, নিষেধাজ্ঞার হাদীসগুলো রঙ বেশি হওয়ার ক্ষেত্রে। আর যেসব হাদীস থেকে অনুমোদন রয়েছে বলে অনুমিত হয় এ সকল হাদীস হচ্ছে, অল্প হওয়ার ক্ষেত্রে। এ মতের সার হলো, যা‘ফরান রং পরিমাণে বেশি ব্যবহার জায়িয নেই। তবে অল্প বা অতি সামান্য হলে কোন সমস্যা নেই।
তবে নিষেধাজ্ঞার হাদীসগুলোতে কমবেশির সাথে পার্থক্য না থাকায় অনেক ‘আলিমের মত হলো, যা‘ফরান কম হোক বেশি হোক তা সাধারণভাবে নিষিদ্ধ। যেসব ঘটনা থেকে এর অনুমোদন বুঝা যায় তা হয় অনিচ্ছায় ছিল অথবা ব্যবহারটি নিষেধ না জানার কারণে ছিল। তাই এসব ঘটনা দিয়ে স্পষ্ট সাধারণভাবে নিষেধের হাদীসের মধ্যে পার্থক্য করার কোন যুক্তি নেই। তাই যা‘ফরান অস্পষ্ট কাপড়ে হোক, শরীর হোক পুরুষের জন্য তা ব্যবহার হারাম।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৩৫-[১৭] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সর্বোত্তম সুগন্ধি যা আমি পেতাম, তা আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গায়ে লাগাতাম। এমনকি আমি তাঁর মাথায় ও দাড়িতে সুগন্ধির চমক দেখতে পেতাম। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ التَّرَجُّلِ
وَعَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: كُنْتُ أُطَيِّبُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِأَطْيَبِ مَا نَجِدُ حَتَّى أَجِدَ وَبِيصَ الطِّيبِ فِي رَأْسِهِ ولحيته
ব্যাখ্যাঃ (وَبِيصَ) শব্দের অর্থ চমক, জ্যোতি, উজ্জ্বলতা। অর্থাৎ ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিজের নাগালের ভিতরের সবচেয়ে ভালো ও উন্নতমানের সুগন্ধি লাগিয়ে দিতেন। এমনকি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাথা ও দাড়িতে সেই সুগন্ধির দ্যুতি ফুটে উঠত। অর্থাৎ মাথার চুল ও দাড়ি সুগন্ধির কারণে ঝলমল করত।
এখানে একটি প্রশ্ন হয় যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীসের আলোকে পুরুষের সুগন্ধি এমন হওয়া চাই, যার রঙ নেই। অতএব বর্ণিত হাদীসে বাহ্যত সেই হাদীসের বিরোধ। এর জবাবে ‘উলামায়ে কিরাম বলেনঃ হাদীসের মর্ম হলো সুগন্ধি এমন হতো যার রং লাল ও হলুদের মতো সৌন্দর্য ও শোভা প্রকাশ করত। রং দেখা যেত এমন কথা বলা হয়নি। অতএব উভয়ের হাদীসের মাঝে কোন বিরোধ সৃষ্টি হবে না। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
উল্লেখ্য যে, রং প্রকাশ পাওয়া ও সুগন্ধির কারণে ঝলমলে বা জ্যোতি প্রকাশ পাওয়া এক নয়। যেমন কেউ সুগন্ধি তেল ব্যবহার করলে আমরা কোন রং বা কালার দেখতে পাই না। তবে তার কারণে চুলে বা দাড়িতে এর ঝলমলে ভাব ফুটে উঠে।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৩৬-[১৮] নাফি’ (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন ইবনু ’উমার (রাঃ) (ঘরের মধ্যে) ধুনচি ব্যবহার করতেন, তখন খোশবুদার কাঠের (চন্দন, আগর ইত্যাদি) অবিমিশ্র ধুনি জ্বালাতেন আর কখনো তার সাথে কর্পূর ঢেলে দিতেন এবং বলতেন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে ধুনি ব্যবহার করতেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ التَّرَجُّلِ
وَعَنْ نَافِعٍ قَالَ: كَانَ ابْنُ عُمَرَ إِذَا اسْتَجْمَرَ اسْتَجْمَرَ بِأَلُوَّةٍ غَيْرِ مُطَرَّاةٍ وَبِكَافُورٍ يَطْرَحُهُ مَعَ الْأَلُوَّةِ ثُمَّ قَالَ: هَكَذَا كَانَ يَسْتَجْمِرُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ (اسْتَجْمَرَ) ধুনচি দ্বারা ধুন দিয়ে সুগন্ধি ব্যবহারকে ‘ইসতিজমার’ বলা হয়। আর ألوة হচ্ছে সুগন্ধি কাঠ যা জ্বালিয়ে ধুন দেয়া হয়। সুগন্ধি কাঠ জ্বালিয়ে তার ধোয়ার মাধ্যমে ঘর, কাপড়, শরীর ইত্যাদি সুগন্ধময় করার নাম ‘ইসতিজমার’। হাদীসের মর্ম হলো, ইবনু ‘উমার সুগন্ধি কাঠের ধূপের মাধ্যমে যখন সুগন্ধ ব্যবহার করতেন তখন এ সুগন্ধি কাঠের সাথে অন্য কোন সুগন্ধির মিশ্রণ করতেন না বা সেই কাঠে কর্পূর ঢালতেন না।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হলো যে, পুরুষের জন্য সুগন্ধি ব্যবহার সুন্নাত, যেমন তা মহিলাদের জন্য সুন্নাত। তবে পুরুষের ক্ষেত্রে সুন্নাত হলো ঐ সুগন্ধি যার সুবাস ছড়ায় কিন্তু রং প্রকাশ পায় না। আর মেয়েরা যখন ঘর থেকে মসজিদ বা অন্য কোথায় যাওয়ার জন্য বের হতে চাইবে তখন তার জন্য সুবাস ছড়ায় এমন যে কোন সুগন্ধি ব্যবহার নিষিদ্ধ। আবার পুরুষের জন্য সুগন্ধি ব্যবহারের গুরুত্ব জুমু‘আহ্, ঈদ, আলোচনার মাহফিল, স্ত্রীর নিকট গমন এবং মুসলিমদের সমাবেশের সময় অধিক। (শারহুন নাবাবী ১৫শ খন্ড, হাঃ ২২৫৪)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৩৭-[১৯] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের গোঁফ কাটতেন অথবা বলেছেনঃ তা ছাঁটতেন। আল্লাহর বন্ধু ’ইব্রাহীম (আ.)-ও এরূপ করতেন। (তিরমিযী)[1]
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُصُّ أَوْ يَأْخُذُ مِنْ شَارِبِهِ وَكَانَ إِبْرَاهِيمُ خَلِيلُ الرَّحْمَنِ صَلَوَاتُ الرَّحْمَنِ عَلَيْهِ يَفْعَله. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোঁফ কর্তন বা মুণ্ডন করতেন। এটি বর্ণনাকারীর সন্দেহ। তবে আমরা অন্যান্য হাদীসে দেখেছি যে, গোঁফের বেলায় কর্তন ছিল রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ‘আমল। তবে কর্তন বা মুণ্ডন যাই হোক এটি ইবরাহীম (আ.) করতেন বলে হাদীসে উল্লেখ রয়েছে। গোঁফ কর্তন ইবরাহীম (আ.)-এর কর্ম বলে উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হলো, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ক্ষেত্রে তাঁর পিতা ইবরাহীম (আ.)-এর অনুকরণ করতেন। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৭৬০)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৩৮-[২০] যায়দ ইবনু আরকাম (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি গোঁফ ছাঁটে না, সে আমাদের অন্তরভুক্ত নয়। (আহমাদ, তিরমিযী ও নাসায়ী)
وَعَنْ زَيْدِ بْنِ أَرْقَمَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ لَمْ يَأْخُذ شَارِبِهِ فَلَيْسَ مِنَّا» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَالنَّسَائِيُّ
ব্যাখ্যাঃ مَنْ لَمْ يَأْخُذ شَارِبِه فَلَيْسَ مِنَّا অর্থ- যে গোঁফ কর্তন করল না সে আমাদের মধ্য থেকে নয়। এ জাতীয় বাক্য বলে সাধারণত ‘আমাদের দলভুক্ত নয়’ উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। তবে কেবল গোঁফ কর্তন না করার ক্ষেত্রে কেউ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উম্মাত থেকে বা মুসলিমদের দল থেকে বের হয় না; তাই ‘উলামায়ে কিরাম এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেনঃ আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়, অর্থাৎ এই কর্মে সে আমাদের মোতাবিক নয়, অথবা এর অর্থ : আমাদের পদ্ধতির যারা পরিপূর্ণ অনুসারী সে তাদের মধ্য থেকে নয়। আবার ধমকি স্বরূপও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনটি বলতে পারেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
‘আল্লামা মুবারকপূরী (রহিমাহুল্লাহ) গোঁফ কর্তনের পরিমাণের ক্ষেত্রে যে মতভেদ উল্লেখ করেন তার সারাংশ হলো, সালাফের অনেকের নিকট গোঁফ একেবারে মূল বা জড় থেকে কাটা এবং মুণ্ডন করে নেয়া উত্তম। তারা তাদের মতের পক্ষ গোঁফ কর্তনের বেলায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস انهكوا الشوارب এবং أحْفُوا الشَّوَارِبَ দিয়ে দলীল পেশ করেন। উভয় শব্দের অর্থ হলো কর্তনে মুবালাগাহ্ বা আধিক্যতা অবলম্বন করা। আর অধিক আধিক্যতা মু-নের মধ্য দিয়ে অর্জন হবে। অপরদিকে ইমাম মালিকসহ অনেকে মুণ্ডন ও একেবারে জড় থেকে কাটা বারণ করেন। তাদের মতে গোঁফ কাচি দিয়ে কেটে ছোট করাটাই সুন্নাত। আবার ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) একদল ‘আলিম থেকে উভয় মতের অবকাশ বর্ণনা করেন। অর্থাৎ গোঁফ কর্তন বা মুণ্ডন উভয়টারই সুযোগ রয়েছে। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৭৬০)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৩৯-[২১] ’আমর ইবনু শু’আয়ব (রহঃ) তাঁর পিতা হতে, তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন : নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় দাড়ির প্রস্থ এবং দৈর্ঘ্য হতে ছেঁটে নিতেন। (তিরমিযী এবং তিনি বলেছেনঃ এ হাদীসটি গরীব)[1]
وَعَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَأْخُذُ مِنْ لِحْيَتِهِ مِنْ عَرْضِهَا وَطُولِهَا. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ
হাদীসটি মাওযূ‘ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘উমার ইবনু হারূন আল বালখী’’। তাঁর ব্যাপারে ইবনু মা‘ঈন বলেনঃ মিথ্যুক, খবীস। সলিহ জাযরাহ্ বলেনঃ সে কায্যাব বা মিথ্যুক। বিস্তারিত দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ১/৪৫৭ পৃঃ, হাঃ ২৮৮।
ব্যাখ্যাঃ (هٰذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ) হাদীসটি দুর্বল। কেননা এর ভিত্তি হলো ‘উমার ইবনু হারূন-এর ওপর। আর মুহাদ্দিসীনে কিরামের মতে তিনি পরিত্যাজ্য। ‘আল্লামা ইবনু হাজার ফাতহুল বারীতে এ হাদীসটি উল্লেখের পর বলেন, হাদীসটি ইমাম তিরমিযী বর্ণনা করেন এবং এর সম্পর্কে বুখারীর মত বর্ণনা করেন যে, ইমাম বুখারী ‘উমার ইবনু হারূন-এর বর্ণনার ক্ষেত্রে বলেন, তার এ হাদীস ছাড়া আমি অন্য কোন মুনকার হাদীস পাইনি। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৭৬০)
দাড়ি একমুষ্টি পার হলে তা কাটা বৈধ অবৈধের আলোচনা অধ্যায়ের শুরুতে করা হয়েছে। ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বিশুদ্ধভাবে প্রমাণের ভিত্তিতে অধিকাংশ ‘আলিম তা কাটা বৈধ মনে করেন। আবার রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এক মুষ্টির উপরে কাটা প্রমাণিত নয় বলে অনেকে তা বৈধ মনে করেন না। বর্ণিত হাদীসটি বিশুদ্ধ হলে এই মতভেদের মীমাংসা হয়ে যেত। কিন্তু হাদীসটি বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় এ হাদীস দিয়ে কেউই দাড়ি এক মুষ্টির উপর হলে কর্তন জায়িয প্রমাণ করেন না। বরং যারা বৈধ হওয়ার পক্ষ তারা ইবনু ‘উমার -এর কর্ম দিয়ে দলীল পেশ করেন। তাই দাড়ি না কাটার মাঝেই অধিক সতর্কতা এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৪০-[২২] ইয়া’লা ইবনু মুররাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার (শরীরে অথবা কাপড়ের) উপরে খালুক (যা’ফরান দ্বারা তৈরি) সুগন্ধি দেখতে পেলেন। তখন বললেনঃ তোমার কি স্ত্রী আছে? সে বলল : না। তখন তিনি বললেনঃ তা ধুয়ে ফেলো, আবারো ধুয়ে ফেলো, আবারো ধুয়ে ফেলো। অতঃপর আর কখনো তা ব্যবহার করো না। (তিরমিযী ও নাসায়ী)[1]
وَعَن يعلى بن
مرّة أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأَى عَلَيْهِ خَلُوقًا فَقَالَ: «أَلَكَ امْرَأَةٌ؟» قَالَ: لَا قَالَ: «فَاغْسِلْهُ ثُمَّ اغْسِلْهُ ثُمَّ اغْسِلْهُ ثُمَّ لَا تعد» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَالنَّسَائِيّ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘আবূ হাফস্ ইবনু ‘উমার’’, যিনি অপরিচিত। আল জারহু ওয়াত্ তাদীল তাহযীবুল কামাল (৩২/৩০০)।
ব্যাখ্যাঃ (خَلُوقًا) এক ধরনের সুগন্ধি যাতে রং রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, এক ধরনের সুগন্ধি যাতে হলুদ রং রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, এটি একটি প্রসিদ্ধ রং যা যা‘ফরান ইত্যাদি থেকে তৈরী হয়ে থাকে।
أَلَكَ امْرَأَةٌ؟ তোমার কি স্ত্রী আছে? হাদীসের এ অংশ থেকে অনেকে বিবাহিত ব্যক্তির জন্য রং যুক্ত সুগন্ধি ব্যবহারের বৈধতা দিয়ে থাকেন। আবার কেউ কেউ এর আলোকে অল্প ব্যবহারের অনুমতি দেন, যা ইতোপূর্বে আলোচনা হয়েছে। তবে পুরুষের জন্য লাল বা যা‘ফরান ব্যাপকভাবে নিষেধের হাদীসের আলোকে যারা সর্বাবস্থায় পুরুষের জন্য এই রং অবৈধ বলে মনে করেন, তাদের মতে হাদীসের ব্যাখ্যা হলো, অর্থাৎ তোমার স্ত্রী থাকে এবং স্ত্রীর শরীর বা কাপড় থেকে তোমার শরীরে বা কাপড়ে তোমার অনিচ্ছায় কিছু রং লেগে যায় তবে এতে তুমি অপারগ। মুল্লা ‘আলী কারী (রহিমাহুল্লাহ) এ ব্যাখ্যা উল্লেখ করে বলেনঃ এটাই হাদীসের বাহ্যত মত। পূর্বের হাদীস ও সামনের হাদীস থেকে এই মতই সঠিক বলে বুঝা যায়।
(فَاغْسِلْهُ ثُمَّ اغْسِلْهُ ثُمَّ اغْسِلْهُ) তিনবার ধোয়ার কথা তাকিদ বা গুরুত্ব বুঝানোর উদ্দেশে বলেছেন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনবারের কমে রং না যাওয়াটাই স্বাভাবিক মনে করে এমন নির্দেশ দেয়া হতে পারে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৪১-[২৩] আবূ মূসা আল আশ্’আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে (পুরুষের) গায়ে খলূক রঙের সামান্য পরিমাণও লেগে আছে, আল্লাহ তা’আলা এমন ব্যক্তির সালাত কবুল করেন না। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي مُوسَى قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَقْبَلُ اللَّهُ صَلَاةَ رَجُلٍ فِي جَسَدِهِ شَيْءٌ مِنْ خَلُوقٍ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘আবূ জা‘ফার আর্ রাযী’’ নামক একজন বর্ণনাকারী, যিনি য‘ঈফ রাবী। দেখুন- তুহফা ৮/৮১ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ হাদীসটি থেকে লাল বা হলুদ রঙের সুগন্ধি ব্যবহারের উপর কঠোরতা অনুমিত হয়। হাদীসটি ঐ সব ‘আলিমের পক্ষ দলীল যারা বলেন, এ রং কম হোক বেশি হোক সর্বাবস্থায় নিষিদ্ধ। মুল্লা ‘আলী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হাদীসের শব্দ (شَيْءٌ مِنْ خَلُوقٍ) কম বেশি সবকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং তাদের কথার প্রত্যাখ্যান হয় যারা বলেন, নিষেধাজ্ঞাটি বেশি ব্যবহারের সাথে সংশ্লিষ্ট, কম ব্যবহারে অসুবিধা নেই।
(لَا يَقْبَلُ اللهُ صَلَاةَ) কোন সালাত কবুল করবেন না, অর্থাৎ সালাতের পরিপূর্ণ সাওয়াব পাওয়া যাবে না; কেননা এতে নারীদের সাথে সাদৃশ্য রয়েছে। ইবনুল মালিক বলেনঃ সালাত কবুল করবেন না বলে এ ধরনের রং বিশিষ্ট সুগন্ধি ব্যবহারের উপর কঠোরতা আরোপ করা ও ধমকি দেয়া উদ্দেশ্য। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪১৭৪)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৪২-[২৪] ’আম্মার ইবনু ইয়াসির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি কোন এক সফর হতে নিজ পরিবারের মধ্যে ফিরে এলাম। সফরকালে আমার উভয় হাত ফেটে গিয়েছিল। সুতরাং আমার পরিবারের লোকেরা তথায় যা’ফরান মিশ্রিত খলূক (সুগন্ধি) লাগিয়ে দিয়েছিল। ভোর বেলায় আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে উপস্থিত হয়ে তাঁকে সালাম করলাম, কিন্তু তিনি আমার সালামের জবাব দিলেন না এবং বললেনঃ তুমি যাও! তোমা হতে তা ধুয়ে ফেলো। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَمَّارِ بْنِ يَاسِرٍ قَالَ: قَدِمْتُ عَلَى أَهْلِي مِنْ سَفَرٍ وَقَدْ تَشَقَّقَتْ يَدَايَ فَخَلَّقُونِي بِزَعْفَرَانٍ فَغَدَوْتُ عَلَى النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَسَلَّمْتُ عَلَيْهِ فَلَمْ يَرُدَّ عَلَيَّ وَقَالَ: «اذْهَبْ فَاغْسِلْ هَذَا عَنْكَ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যাঃ (وَقَدْ تَشَقَّقَتْ يَدَايَ) আমার হাত ফেটে গেছে। হাত ফাটা বলতে শুষ্ক বাতাস ও অধিক পানি ব্যবহারের কারণে সাধারণত যা ফেটে থাকে, যেমন শীতকালে হয়ে থাকে।
(خَلَّقُونِي) তারা আমাকে ‘খলূক’ তথা যা‘ফরান মিশ্রিত সুগন্ধি লাগিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ আমার হাতের ফেটে যাওয়া স্থানে চিকিৎসার কারণে তারা এই সুগন্ধি লাগিয়েছে।
(فَلَمْ يَرُدَّ عَلَيَّ) অর্থাৎ তিনি আমার সালামের উত্তর দিলেন না। সালামের উত্তর না দেয়ার কারণ হলো, যা‘ফরান মিশ্রিত সুগন্ধি দেখে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রাগ। মুল্লা ‘আলী কারী বলেনঃ যারা ‘খলূক’ তথা যা‘ফরান মিশ্রিত সুগন্ধি অল্প ব্যবহারের অনুমোদন দেন, এ হাদীসটি তাদের মতো প্রত্যাখ্যানের বেলায় সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট। তবে বর্ণিত সহাবা ওযরের কারণে তা ব্যবহার করেছিলেন। ওযর থাকা সত্ত্বেও তা ধৌত করে ফেলে দেয়ার নির্দেশের কারণ এও হতে পারে যে, হয়ত রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে তার ওযরটি স্পষ্ট হয়নি অথবা ওযরটি এমন সাধারণ ছিল, যার কারণে ‘খালুক’ ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে না। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪১৭২)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৪৩-[২৫] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পুরুষদের সুগন্ধি তাই যার গন্ধ ছড়ায় হয় আর রং ভাসে না। আর মহিলাদের সুগন্ধির রং উজ্জ্বল এবং গন্ধ ছড়ায় হয় না। (তিরমিযী ও নাসায়ী)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «طِيبُ الرِّجَالِ مَا ظَهَرَ رِيحُهُ وَخَفِيَ لَوْنُهُ وَطِيبُ النِّسَاءِ مَا ظَهَرَ لَوْنُهُ وَخَفِيَ رِيحُهُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَالنَّسَائِيُّ
ব্যাখ্যাঃ (طِيبُ الرِّجَالِ مَا ظَهَرَ رِيحُهٗ) ‘ত্বীব’ শব্দটি মাসদার হিসেবে সুগন্ধি ব্যবহার করা অর্থে হতে পারে, আবার স্বয়ং সুগন্ধি যা ব্যবহার করা হয় তা হতে পারে। আর সুবাস প্রকাশিত বলতে, যেমন : গোলাপ জল, মিশক, আম্বর ও কর্পুর ইত্যাদি।
(مَا ظَهَرَ رِيحُهٗ وَخَفِيَ لَوْنُهٗ) যার রং প্রকাশিত কিন্তু সুগন্ধি প্রকাশিত নয়। অর্থাৎ রং দেখা যায়, কিন্তু সুবাস ছড়ায় না, যেমন : মেহেদী, যা‘ফরান ইত্যাদি। শারহুস্ সুন্নাহয় লিখেন, মেয়েদের সুবাস ছড়ায় না এমন রঙের ব্যবহারের নিষেধটি ফুকাহায়ে কিরাম ঘর থেকে বের হওয়ার সময়ে নিয়েছেন বলেই মনে হয়। কেননা মহিলা যখন ঘরে স্বামীর কাছে থাকে তখন তার জন্য যে কোন সুগন্ধি ব্যবহার বৈধ। মহিলাদের জন্য সুবাস ছড়ানো সুগন্ধির ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞাটি কেবল ঘর হতে বের হওয়ার সাথে সংশ্লিষ্টের ব্যাপারটি অন্য হাদীস দ্বারাও সমর্থিত। যেমন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- أَيُّمَا امْرَأَةٍ أَصَابَتْ بَخُورًا فَلاَ تَشْهَدْ مَعَنَا الْعِشَاءَ الآخِرَةَ ‘‘যে মহিলাই ‘বাখূর’ (সুগন্ধি কাঠের ধুন থেকে গৃহীত সুগন্ধি) ব্যবহার করবে, সে যেন ‘ইশার সালাতে আমাদের সাথে উপস্থিত না হয়।’’ (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৪৪-[২৬] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এক প্রকারের বিশেষ সুগন্ধি ছিল, তিনি তা হতে সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن أنس قَالَ: كَانَتْ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سُكَّةٌ يَتَطَيَّبُ مِنْهَا. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যাঃ (سُكَّةٌ) শব্দটি ‘সীন’ অক্ষরে পেশ ও ‘কফ’ হরফে তাশদীদ এবং যবর দিয়ে উচ্চারিত, যা এক প্রকারের মূল্যবান সুগন্ধি। কেউ কেউ বলেন, মিশক থেকে গৃহীত সুগন্ধি। কেউ কেউ বলেন, এটি হলো বিভিন্ন প্রকারের সুগন্ধি থেকে নেয়া খামীর। নিহায়ায় বলেনঃ এটি একটি পরিচিত সুগন্ধি যা অন্য সুগন্ধির সাথে মিশ্রিত করে ব্যবহার করা হয়।
ইবনু হাজার (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এটি কয়েকটি সুগন্ধি মিলিয়ে বানানো সুগন্ধির নাম। আবার কেউ কেউ বলেন, এখানে ‘সুক্কাহ’ বলে বিশেষ কোন সুগন্ধি বুঝানো হয়নি, বরং সুগন্ধি পাত্র বুঝানো হয়েছে; কেননা সুগন্ধি হলে বলা দরকার ছিল (يَتَطَيَّبُ مِنْهَا) অর্থাৎ তিনি এর মাধ্যমে সুগন্ধি গ্রহণ করতেন। অথচ হাদীসের শব্দ হলো (يَتَطَيَّبُ مِنْهَا) অর্থাৎ তার থেকে সুগন্ধি গ্রহণ করেন। এ থেকে বুঝা যায় এটি সুগন্ধির পাত্র ছিল। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৪৫-[২৭] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথায় খুব বেশি তেল ব্যবহার করতেন এবং দাড়ি আঁচড়াতেন। আর প্রায়শ মাথায় একখানা কাপড় রাখতেন। দেখতে তা প্রায় তেলিদের কাপড়ের ন্যায় মনে হত। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
وَعَنْهُ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم يُكثر دهن رَأسه وتسريحَ لحيته وَيُكْثِرُ الْقِنَاعَ كَأَنَّ ثَوْبَهُ ثَوْبُ زَيَّاتٍ. رَوَاهُ فِي شرح السّنة
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার করণ, এর সনদে আছে ‘‘ইয়াযীদ ইবনু আবান আর্ রুকাশী’’ নামক বর্ণনাকারী। ইমাম যাহাবী তাকে য‘ঈফ বলেছেন, আর ইমাম নাসায়ী ও অন্য একজন তাকে মাতরূক বলেছেন। বিস্তারিত দেখুন- য‘ঈফাহ্ ২৪৫৬।
ব্যাখ্যাঃ (يُكْثِرُ دُهْنَ رَأْسِه) অর্থাৎ মাথায় তেল বেশি বেশি লাগাতেন। মাথায় তেল বেশি লাগানোর মাধ্যমে মূলত চুলকে পরিপাটি করে রাখা ও চুলের যত্ন নেয়া উদ্দেশ্য।
(تَسْرِيْحَ) শব্দের অর্থ চিরুনি করা, আঁচড়ানো। অর্থাৎ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দাড়িকে চিরুনি করে পরিপাটি রাখতে অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন।
(يُكْثِرُ الْقِنَاعَ) القناع শব্দের অর্থ ওড়না। তবে এখানে উদ্দেশ্য কাপড়ের টুকরো। অর্থাৎ মাথায় তেল বেশি ব্যবহারের কারণে তেল যাতে পাগড়ীতে না লাগে, তাই পাগড়ীর নিচে একটি কাপড়ের টুকরো থাকতো। পাগড়ী বা টুপিকে তেল থেকে মুক্ত রাখতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ধরনের কাপড়ের টুকরোর ব্যবহার বেশি করতেন।
(كَأَنَّ ثَوْبَهٗ ثَوْبُ زَيَّاتٍ) তাঁর কাপড় যেন তেল বিক্রেতার কাপড়। তেল বিক্রেতার কাপড়ের সাথে তুলনা করার উদ্দেশ্য হলো, তেল বিক্রেতার কাপড়ে যেমন তেল লেগে থাকে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তেল অধিক ব্যবহারের কারণে তার কাপড়েও তেল লেগে থাকতে দেখা যেত। তবে এখানে কাপড় বলতে মাথায় রাখা সেই কাপড়ের টুকরোটিই উদ্দেশ্য। কেননা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শরীরের কাপড় তৈলাক্ত হওয়া থেকে মুক্ত রাখতেই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনটি করতেন এবং তিনি কাপড় শরীরের পরিচ্ছন্নতার দিকে সচেতন থাকতেন। অথচ তেল বিক্রেতার কাপড়ের ন্যায় কাপড়ে তেল থাকা কাপড় ময়লাযুক্ত থাকার প্রমাণ বহন করে, যা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চরিত্রের বিপরীত। তাছাড়া বর্ণিত হাদীসেই কাপড়কে তৈলাক্ত হওয়া থেকে মুক্ত রাখার জন্য অতিরিক্ত কাপড়ের টুকরোর অধিক ব্যবহারই এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, তেল বিক্রেতার কাপড়ের ন্যায় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই কাপড়ের টুকরোটি দেখা যেত। অন্য কাপড় নয়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৪৬-[২৮] উম্মু হানী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (মক্কা বিজয়ের দিন) একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে আসলেন, এ সময় তাঁর মাথার চুলে চারটি জুলফি ছিল। (আহমাদ, আবূ দাঊদ, তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَن أم هَانِئ قَالَتْ: قَدِمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَيْنَا بِمَكَّةَ قَدْمَةً وَلَهُ أَرْبَعُ غَدَائِرَ. رَوَاهُ أَحْمَدُ وَأَبُو دَاوُدَ وَالتِّرْمِذِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ
ব্যাখ্যাঃ (قَدْمَةً) ব্যাকরণের দিক থেকে শব্দটি "قدم" ক্রিয়া এর মাফঊলে মুত্বলাক। অর্থাৎ আমাদের মাঝে একবার আসেন। হিজরত করে মদীনায় যাওয়ার পর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চার বার মক্কায় এসেছিলেন বলে বর্ণনায় পাওয়া যায়। তবে কোন কোন বর্ণনার আলোকে বুঝা যায়, এ আগমনটি ছিল মক্কা বিজয়ের সময়ের আগমন।
(غَدَائِرَ) কোন কোন বর্ণনার শব্দ "ضفائر"। এর অর্থ হলো, চুলের কিছু অংশকে অন্য কিছু অংশের ভিতর প্রবেশ করানো। এর মাধ্যমে চুলকে খোপা বা বেনী আকারে করা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো, চুলের ভিতর ময়লা বা ধূলা-বালু প্রবেশ করতে না দেয়া। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৭৮২)
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চুল লম্বা থাকায় ধূলা-বালি প্রবেশ না করার জন্য হয়ত রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার চুলকে চারটি গুচ্ছ বা বেনী আকার করে রাখতেন।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৪৭-[২৯] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি যখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাথায় সিঁথি কাটতাম, তাঁর মাথার মধ্যস্থল হতে সিঁথি কাটতাম এবং মাথার সম্মুখের চুল উভয় চক্ষুর মাঝামাঝি স্থান বরাবর হতে (উভয় পার্শ্বে) ছেড়ে দিতাম। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن عَائِشَة قَالَتْ: إِذَا فَرَقْتُ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأْسَهُ صَدَّعْتُ فَرْقَهُ عَنْ يَافُوخِهِ وَأَرْسَلْتُ نَاصِيَتَهُ بَيْنَ عَيْنَيْهِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যাঃ "يافوخ" শব্দের অর্থ মাথার তালু বা চাঁদি। হাদীসটি ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চুলের সিঁথির বর্ণনা দিচ্ছেন। অর্থাৎ সিঁথির এক মাথা তালু আরেক মাথা কপাল। সিঁথিটি তালু থেকে শুরু করে দুই চোখের মাঝখানে কপাল পর্যন্ত এসে শেষ হতো। আর এই লম্বা সিঁথির দুই পাশে চুল থাকতো। একভাগ চুল সিঁথির ডান পার্শ্বে এবং আরেক ভাগ সিঁথির বাম পার্শ্বে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪১৮৫)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৪৮-[৩০] ’আবদুল্লাহ ইবনু মুগাফফাল (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (প্রত্যহ) মাথা আঁচড়াতে নিষেধ করেছেন। তবে একদিন পর একদিন (অনুমতি রয়েছে)। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
وَعَن عبد الله بن مغفَّل قَالَ: نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ التَّرَجُّلِ إِلَّا غِبًّا. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যাঃ (غِبًّا) বলতে দেরী করা বুঝানো হয়ে থাকে। অতএব হাদীসের মর্ম হলো, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথার চুলে চিরুনি ঘন ঘন করতে নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ ঘন ঘন চুল চিরুনি করা নিষেধ। তবে দেরিতে দেরিতে করতে সমস্যা নেই।
দেরী বিষয়টি আপেক্ষিক। কর্ম ও ব্যক্তি ভেদে কম-বেশ হতে পারে। যেমন, সাক্ষাতের ক্ষেত্রে দেরী কয়েক দিন মাঝে রেখে সাক্ষাত বুঝানো হয়ে থাকে। হাসান বাসরী থেকে বর্ণনা করা হয়, দেরিতে সাক্ষাত বলতে সপ্তাহে একবার সাক্ষাত। ইমাম আহমাদ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে দেরীতে চিরুনি বলতে যে ব্যাখ্যা বর্ণনা করা হয় তা হলো একদিন চিরুনি করবে এবং একদিন বাদ দিবে। অর্থাৎ প্রতিদিন না করে একদিন মাঝে রেখে চিরুনি করবে। কেউ কেউ বলেন, এক সময় করবে এক সময় বাদ দিবে।
হাদীসটিতে মূলত চুল চিরুনির কর্মে প্রতিদিন ব্যস্ত থাকতে নিষেধ করা হয়েছে; কেননা এটা এক ধরনের বিলাসিতা। আর অধিক বিলাসিতার নিষেধ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। যেমন সামনের হাদীসেই এর নিষেধাজ্ঞা আসছে। (‘আওনুল মা‘বূদ হাঃ ৭ম খন্ড, ৪৪৪৮)
চুল চিরুনি করা বা চুলের যত্ন নেয়া নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাত এবং তার নির্দেশ। অতএব এখানে নিষেধের অর্থ এটাই যে, চুলের যত্ন নিতে গিয়ে বা চিরুনি করতে গিয়ে চুলের পিছে পড়ে যাওয়া এবং চুল নিয়েই ব্যস্ত থাকা ঠিক নয়। এভাবেই উভয় হাদীসের মাঝে বিরোধ নিরসন হয়ে যাবে।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৪৯-[৩১] ’আবদুল্লাহ ইবনু বুরয়দাহ্ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন জনৈক ব্যক্তি ফাযালাহ্ ইবনু ’উবায়দ (রাঃ)-কে বলল : কি হলো? আমি আপনাকে এ রকম এলোমোলো চুলে দেখছি কেন? উত্তরে ফাযালাহ্ বললেনঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে অত্যধিক বিলাসী হতে নিষেধ করেছেন। ঐ লোকটি আবার জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা! কি ব্যাপার? আমি আপনার পায়ে জুতা দেখছি না কেন? জবাবে তিনি বললেনঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে কখনো কখনো খালি পায়ে চলতে আদেশ করেছেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ بُرَيْدَةَ قَالَ: قَالَ رَجُلٌ لِفَضَالَةَ بْنِ عُبَيْدٍ: مَا لِي أَرَاكَ شَعِثًا؟ قَالَ: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَنْهَانَا عَنْ كَثِيرٍ مِنَ الإِرفاه قَالَ: مَالِي لَا أَرَى عَلَيْكَ حِذَاءً؟ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْمُرُنَا أَنْ نحتفي أَحْيَانًا. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ (شَعِثًا) অর্থাৎ এলোমেলো বা জট বেঁধে যাওয়া। চুলকে চিরুনি না করা বা চুলের যত্ন না নেয়ার কারণে চুলের মধ্যে ধূলা-বালু লেগে জট বেঁধে যাওয়া বা এলোমেলো হয়ে যাওয়া উদ্দেশ্য। ফাযালাহ্ ইবনু ‘উবায়দ (রাঃ)-এর চুল এলোমেলো দেখে হয়ত উক্ত ব্যক্তি প্রশ্ন করেছিলেন। এর উত্তরে ফাযালাহ্ (রাঃ) বলেন, ‘‘রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে অধিক বিলাসিতা ও প্রাচুর্যতায় লিপ্ত থাকতে নিষেধ করেছেন’’। অধিক প্রাচুর্যতা ও বিলাসিতা থেকে নিষেধ করেছেন শব্দ থেকে বুঝা যায় যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসব কর্মে অর্থাৎ : চুলে তেল লাগানোর ক্ষেত্রে, চুল চিরুনি করার বেলায় প্রাচুর্যতা বা আধিক্য বা সীমা ছাড়িয়ে যাওয়াকে অপছন্দ করতেন। কেননা এটি অনারব তথা কাফিরদের অভ্যাস। এ সবকিছুর ক্ষেত্রে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মধ্যপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দেন।
তবে পবিত্রতা বা পরিচ্ছন্নতা অবলম্বন করা এ হাদীসের অন্তর্ভুক্ত নয়; কেননা তা দীনের অংশ। হাফিয বলেনঃ হাদীসে অধিক প্রাচুর্যতা বলার মাঝে ইঙ্গিত রয়েছে যে, মধ্যম ও স্বাভাবিক প্রাচুর্যতা তিরস্কারের অন্তর্ভুক্ত নয়। এভাবেই উভয় হাদীসের মাঝে অর্থাৎ চুলের যত্ন নিতে উৎসাহমূলক হাদীস এবং নিরুৎসাহিত হাদীসের মাঝে সামঞ্জস্য হয়ে যায়। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪১৫৬)
(نَحْتَفِىْ) ‘আরবী শব্দ ‘ইহতিফা’ থেকে নির্গত। অর্থাৎ খালি পায়ে চলা। অর্থাৎ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে নির্দেশ দেন মাঝে মাঝে খালি পায়ে চলতে। মাঝে মাঝে খালি পায়ে চলতে নির্দেশ দেয়ার কারণ হলো, এতে বিনয় সৃষ্টি হয় এবং আত্ম-অহংকার দূর হয়ে যায়। এছাড়া মাঝে মাঝে খালি পায়ে চললে প্রয়োজন বা অপারগ অবস্থার সম্মুখীন হলে খালি পায়ে চলা যাবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৫০-[৩২] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তির চুল আছে, সে যেন তা যত্ন নেয়া রাখে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ كَانَ لَهُ شعرٌ فليُكرمه» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ (فَلْيُكْرِمْهُ) অর্থাৎ সে যেন তার অর্থাৎ চুলের সম্মান করে। চুলের সম্মান বলতে চুলের যত্ন নেয়া। অর্থাৎ চুলের সৌন্দর্য বর্ধন করা, ধোয়ার মাধ্যমে চুল পরিচ্ছন্ন রাখা, তেল ব্যবহার করা এবং তাকে এলোমেলো না রাখা। কেননা পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যতা পছন্দনীয় বস্তু। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
ইমাম মুনযিরী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হাদীসটি বাহ্যত উপরের হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক, যে হাদীসে ঘন ঘন চুল চিরুনি করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং যে হাদীসে জীর্ণতার কথা বলা হয়েছে, যদি জীর্ণতার হাদীসকে বিশুদ্ধ ধরা হয়। অতএব উভয় হাদীসের মাঝে এভাবে সামঞ্জস্য হতে পারে যে, ঘন ঘন চিরুনি না করার হাদীস ঐ ব্যক্তির জন্য যে অসুস্থ বা অধিক ঠাণ্ডার কারণে নিয়মিত চুল চিরুনি করতে কষ্ট হয়। অতএব যেটা তার জন্য কষ্টদায়ক সেটার জন্য নিজের ওপর কষ্ট চাপিয়ে নেয়ার প্রয়োজন নেই। বরং মাঝে মাঝে চিরুনি করলেই চলে। আবার এও হতে পারে যে, আবূ কতাদাহ্ দিনে দু’বার মাথায় তেল দেয়াকে সুন্নাত মনে করে নিতে পারেন এবং সুন্নাতের উপর ‘আমল করতে দিনে দু’বার মাথায় তেল দেয়া জরুরী মনে করতেন। তাই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জানিয়ে দিলেন যে, সুন্নাত হলো মাঝে মাঝে বাদ দেয়া। বিশেষ করে চুলের যত্ন ও চিরুনি যাকে তার কর্মব্যস্ততা থেকে ফিরিয়ে রাখে, তাকে এ কথা জন্য জানিয়ে দেয়া উদ্দেশ্য যে, চুল বারবার চিরুনি করা কোন জরুরী বিষয় নয়। বরং এটি বৈধ। যে চায় করতে পারে। যে চায় না করতেই হবে এমন নয়।
শামসুদ্দীন ইবনুল কইয়্যিম (রহিমাহুল্লাহ) এ হাদীসের ব্যাখ্যায় মুনযির-এর এই বক্তব্য পুরোটা উল্লেখ করেন। এরপর বলেন, এই আমরা এ ধরনের সামঞ্জস্য বিধানের প্রয়োজন দেখি না। বরং সঠিক কথা হলো, চুলের যত্ন নেয়ার হাদীস এবং ঘন ঘন চিরুনি না করার হাদীসের মাঝে কোন ধরনের সংঘর্ষ নেই। কেননা বান্দা চুলের যত্ন নিতে নির্দেশিত। আর বিলাসিতায় আধিক্যতা অবলম্বনে নিষিদ্ধ। তাই সে চুলের যত্ন নিবে তবে বিলাসিতা ও চুল নিয়ে মত্ত থাকাকে তার অভ্যাস বানাবে না। বরং মাঝে মাঝে বাদ দিয়ে চিরুনি করবে। উভয় হাদীসের এভাবে অর্থ নেয়াই উত্তম। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪১৫৯)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৫১-[৩৩] আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বার্ধক্যকে পরিবর্তন করার জন্য সবচেয়ে উত্তম বস্তু হলো মেহেদী ও কাতাম (ঘাস)। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
وَعَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ أَحْسَنَ مَا غُيِّرَ بِهِ الشَّيْبُ الْحِنَّاءُ وَالْكَتَمُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যাঃ (الْحِنَّاءُ وَالْكَتَمُ) ‘হিন্না’ অর্থাৎ মেহেদী। আর كتم শব্দটির ‘ت’ হরফে তাশদীদ অর্থাৎ ‘কাত্তামুন’ এবং তাকে সাকিন করে ‘কাতমুন’ পড়া যায়। তবে ‘কাতমুন’ উচ্চারণই প্রসিদ্ধ বলে উল্লেখ করেন হাদীসের ব্যখ্যাকারগণ। এটি একটি উদ্ভিদ যা রঞ্জকের কাজে ব্যবহৃত হয়। তবে এর দ্বারা কোন রং হয় এ নিয়ে ব্যাখ্যাকারগণদের নিকট বিভিন্ন মতামত পাওয়া যায়। সম্ভবত এই উদ্ভিদের বিভিন্ন প্রকার রয়েছে যার একেকটি একেক রং ধারণ করে বলেই বিভিন্ন মতামতের সৃষ্টি হয়েছে। এই রঞ্জক পদার্থের রং লাল, সবুজ, কালো, লাল সবুজের মাঝামাঝি কালচে রং হয় বলে বিভিন্ন মত রয়েছে। তবে কালো রঙের খিযাব ব্যবহারে আপত্তি রয়েছে বলে আমরা দেখে এসেছি এবং সামনে দেখব। অথচ এ হাদীসে ‘কাতমুন’ দ্বারা চুলের শুভ্রতা পরিবর্তনকে সবচেয়ে ভালো বলা হয়েছে। তাই এখানে কাতমুন দ্বারা সবুজ বা কালচে রঙ ধারণকারী উদ্ভিদ উদ্দেশ্য নিতে হবে। তবে যারা মনে করেন এর রং কালো হয় তাদের কেউ কেউ এ হাদীস দ্বারা কালো খিযাবের বৈধতা দিয়ে থাকেন। আবার কেউ কেউ বলেন, কেবল ‘কাতমুন’ এর রং নিরেট কালো হলেও তাকে মেহেদীর সাথে মিশালে তার রঙটি নিরেট কালো থেকে সরে লাল কালচে রং ধারণ করে। আর হাদীসে মেহেদী এবং কাতাম উভয়টি মিশ্রিত করে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। আর উভয়টি মিশ্রিত করলে রং নিরেট কালো হয় না। আর নিরেট কালো ব্যতীত অন্য কোন রঞ্জক দ্বারা চুল রং করা নিষিদ্ধ নয়। বরং এর প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, কাতাম বলতে তাকে ‘ওসমাহ্’ উদ্ভিদের সাথে মিশ্রিত করে ব্যবহার। উভয়টি মিশালে রং পুরো কালো হয় বরং লাল কালচে হয়। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪২০১; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
খিযাব দ্বারা চুলের শুভ্রতা পরিবর্তনের আরো আলোচনা প্রথম অনুচ্ছেদে করা হয়েছে। বিধায় এখানে আর দীর্ঘ করার প্রয়োজন নেই।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৫২-[৩৪] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শেষ যামানায় এমন এক সম্প্রদায়ের আবির্ভূত হবে, যারা কবুতরের বক্ষের ন্যায় এ কালো খিযাব ব্যবহার করবে, ফলে তারা জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না। (আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «يَكُونُ قَوْمٌ فِي آخِرِ الزَّمَانِ يَخْضِبُونَ بِهَذَا السَّوَادِ كَحَوَاصِلِ الْحَمَامِ لَا يَجِدُونَ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ
ব্যাখ্যাঃ (كَحَوَاصِلِ الْحَمَامِ) অর্থ কবুতের পাকস্থলীর ন্যায়। তবে এখানে পাকস্থলী বলতে পাকস্থলীর উপরের অংশ তথা বুক বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ কবুতরের বুক যেমন কালো হয় তারা কালো রঞ্জক দিয়ে খিযাব করে চুল ও দাড়িকে তেমন করবে। আবার সব কবুতরের বুক কালো হয় না। তাই এখানে সব কবুতর উদ্দেশ্য নয়। অর্থাৎ কিছু কিছু কবুতরের বুক, যেমন কালো চিকচিকে থাকে তারা এমন কালো রঞ্জক ব্যবহার করবে। কালো খিযাব ব্যবহারের ক্ষেত্রে যারা শক্ত আপত্তি আরোপ করে হারাম বলেন- এ হাদীসটি তাদের স্বপক্ষের একটি দলীল। তবে যারা বৈধতার পক্ষ মত দেন, তারা এ হাদীসটি রহিত মনে করেন। আবার অনেকেই হাদীসটির দুর্বলতা প্রকাশ করেছেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন, কালো খিযাবের হারাম হওয়ার ক্ষেত্রে এ হাদীসটি অকাট্য প্রমাণ বহন করে না; কেননা এই হাদীসে শেষ যামানার একদল লোক এই বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হবে বলে জানা যাচ্ছে। তবে তারা জান্নাতের সুগন্ধি না পাওয়া কেবল এ কারণেই বলে হাদীসটি স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে না। বরং হাদীসটিতে শেষ যামানার একদল যারা জান্নাতের ঘ্রাণ পাবে না, তাদের এই সিফাত থাকবে বলে বলা হচ্ছে। এ কারণে তারা জাহান্নামে যাবে এর উল্লেখ নেই।
(لَا يَجِدُونَ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ) ‘তারা জান্নাতের সুঘ্রাণ পাবে না।’ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, জান্নাতের সুঘ্রাণ পাঁচশত বছরের দূরত্বের পথ থেকে পাওয়া যায়। অতএব কেবল এই গুনাহর কারণে জান্নাতের ঘ্রাণ না পাওয়ার বিষয়টি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধমকের স্বরে বলেছেন বলে মনে করেন মুহাদ্দিসীনে কিরাম। অথবা হাদীসটি ঐ ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যে এর ব্যবহারকে বৈধ মনে করবে। অথবা জান্নাতে যাওয়ার পূর্বে কবরে থাকা অবস্থায় সে সুঘ্রাণ পাবে না। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪২০৮; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৫৩-[৩৫] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিবতি চামড়ার তৈরি জুতা পরিধান করতেন এবং ওয়ার্স ঘাস ও যা’ফরান দ্বারা নিজের দাড়িকে হলুদ রঙে রঞ্জিত করতেন। ইবনু ’উমার -ও অনুরূপ করতেন। (নাসায়ী)[1]
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَلْبَسُ النِّعَالَ السِّبْتِيَّةَ وَيَصْفِرُّ لِحْيَتَهُ بِالْوَرْسِ وَالزَّعْفَرَانِ وَكَانَ ابْنُ عُمَرَ يَفْعَلُ ذَلِك. رَوَاهُ النَّسَائِيّ
ব্যাখ্যাঃ (السِّبْتِيَّةَ) হলো ঐ চামড়া যা পাকানোর সময় লোম তুলে ফেলা হয়। অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পশম তুলে ফেলা চামড়ার স্যান্ডেল ব্যবহার করতেন।
(بِالْوَرْسِ) ‘ওয়ার্স’ হচ্ছে একটি হলুদ রঞ্জক উদ্ভিদ। এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দাড়িতে খিযাব লাগাতেন। ইবনু ‘উমার আরেকটি বর্ণনায় রয়েছে, ‘‘আমি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হলুদ রং দ্বারা খিযাব করতে দেখেছি।
অপরদিকে আনাস (রাঃ)-এর বর্ণনা মতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো খিযাব ব্যবহার করেননি। উভয় বর্ণনার বাহ্যিক বিরোধ সমাধান করতে মুহাদ্দিসীনে কিরাম বলেনঃ আনাস (রাঃ)-এর বর্ণনায় খিযাব ব্যবহার নাকচ করাটি অধিকাংশ দাঁড়ির দিকে লক্ষ্য করে হয়ত তিনি বলেছেন। কেননা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতি অল্প কয়েকটি দাড়ি বা চুল সাদা হয়েছিল। তাই তাতে খিযাবের কোন প্রয়োজন ছিল না। সেই গুটি কয়েক সাদা চুলে তিনি খিযাব ব্যবহার করলে সেটার কথাই ইবনু ‘উমার বলেছেন। আবার অধিকাংশ চুল যা কালো ছিল সেগুলোতে খিযাব লাগাননি বিধায় আনাস তা নাকচ করেছেন। ইবনু ‘উমার এবং আবূ রামসাহ্ (রাঃ) থেকে খিযাব লাগানোর বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় আনাস (রাঃ)-এর বিবরণে এই মর্মই নিতে হবে। অথবা যারা বলছেন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খিযাব ব্যবহার করেননি তাদের কথার উদ্দেশ্য হবে খিযাব ব্যবহার রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিয়মিত অভ্যাস ছিল না। আর যা বলছেন যারা করেছেন তাদের কথার মর্ম হবে মাঝে মাঝে ব্যবহার করেছেন এর বৈধতা বুঝাবার জন্য। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪২০৬; ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৫৭২)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৫৪-[৩৬] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট দিয়ে এমন এক ব্যক্তি অতিক্রম করল যে মেহেদীর দ্বারা খিযাব লাগিয়েছিল। তাকে দেখে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ এটা কতই না চমৎকার! বর্ণনাকারী বলেন, তারপর আরেক ব্যক্তি অতিক্রম করল সে মেহেদী ও কাতাম ঘাস উভয়টি দ্বারা খিযাব করেছিল। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে দেখে বললেন, এটা আরো তো উত্তম। অতঃপর আরেক ব্যক্তি অতিক্রম করল, সে হলুদ রং দ্বারা খিযাব লাগিয়েছিল। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে দেখে বললেনঃ এটা সর্বাপেক্ষা উত্তম। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: مَرَّ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَجُلٌ قَدْ خَضَبَ بِالْحِنَّاءِ فَقَالَ: «مَا أَحْسَنَ هَذَا» . قَالَ: فَمَرَّ آخَرُ قَدْ خَضَبَ بِالْحِنَّاءِ وَالْكَتَمِ فَقَالَ: «هَذَا أَحْسَنُ مِنْ هَذَا» ثُمَّ مَرَّ آخَرُ قَدْ خَضَبَ بِالصُّفْرَةِ فَقَالَ: «هَذَا أَحْسَنُ مِنْ هَذَا كُله» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘হুমায়দ ইবনু ওয়াহ্ব’’ নামের বর্ণনাকারী। যিনি য‘ঈফুল হাদীস। ইমাম বুখারী তাকে মুনকারুল হাদীস বলেছেন। দেখুন- তাহযীবুল কামাল (১৫৪৩ নং)।
ব্যাখ্যাঃ مَا أَحْسَنَ هٰذَا আশ্চর্যবোধক ক্রিয়া। সৌন্দর্যের আধিক্যতা বুঝাতে ব্যবহার করেছেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। হাদীস থেকে কেবল মেহেদী দ্বারা খিযাব করার সৌন্দর্যের প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে এর চেয়ে মেহেদীর সাথে কাতাম মিশ্রিত করে খিযাব করলে তা আরো বেশি সুন্দর। এ হাদীস দ্বারা তাদের প্রত্যাখ্যান হয় যারা মনে করেন মেহেদীর সাথে কাতাম মিশালে রং কালো বর্ণ ধারণ করে। অথচ নিরেট কালো খিযাবের ব্যবহার হাদীসে নিষেধ রয়েছে। আর এখানে মেহেদীর সাথে কাতাম মিশানো খিযাবের প্রশংসা করেছেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এ দ্বারা বুঝা যায় যে, মেহেদী ও কাতাম মিশালে রং নিরেট কালো হয় না। বরং লালের মাঝে কালচে ভাব আসে।
হাদীসটি থেকে হলুদ খিযাব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে সবচেয়ে পছন্দ লাগে বলে প্রমাণিত হয়।
(‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪২০৭; ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৫৭২)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৫৫-[৩৭] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা (খিযাব দ্বারা) বার্ধক্যকে পরিবর্তন করে দাও এবং ইয়াহূদীদের সাদৃশ্য গ্রহণ করো না (অর্থাৎ- তারা দাড়ি চুলে খিযাব ব্যবহার করে না)। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «غَيِّرُوا الشَّيْبَ وَلَا تشبَّهوا باليهودِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনায় রয়েছে- إِنَّ الْيَهُودَ وَالنَّصَارٰى لاَ يَصْبُغُونَ فَخَالِفُوهُمْ ‘‘নিশ্চয় ইয়াহূদ এবং নাসারারা (খ্রিস্টানেরা) রঞ্জক ব্যবহার করে না। অতএব তোমরা তাদের বিরোধিতা কর।’’
তুহফাতুল আহ্ওয়াযীতে নায়লুল আওত্বার-এর বরাতে লিখেন, এ হাদীসটি প্রমাণ করে যে, রঞ্জক ব্যবহার ও শুভ্রতা পরিবর্তন বৈধ হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে নাসারা ও ইয়াহূদীদের বিরোধিতা। এর মাধ্যমে খিযাব ব্যবহার মুস্তাহাব হওয়ার দিকটিও গুরুত্ব পায়। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহলে কিতাবদের অনেক বেশি বিরোধিতা করতেন এবং এর নির্দেশ দিতেন। সালাফরাও এ সুন্নাতের অনেক গুরুত্ব দিতেন। এজন্যই ঐতিহাসিকদেরকে তুমি দেখবে যে, তারা তাদের চরিত লিখার সময় বলেন, তিনি খিযাব ব্যবহার করতেন এবং তিনি খিযাব ব্যবহার করতেন না। ইবনুল জাওযী লিখেন : সহাবা ও তাবি‘ঈনদের এক দল খিযাব লাগাতেন। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রহিমাহুল্লাহ) যদি এমন কোন লোককে দেখতেন যে, তার দাড়িতে খিযাব লাগিয়েছে তখন বলতেন, আমি এমন এক লোক দেখছি যে একটি মরে যাওয়া সুন্নাত জীবিত করছে এবং তিনি তা দেখে আনন্দিত হতেন। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৭৫২)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৫৬-[৩৮],৪৪৫৭-[৩৯] আর নাসায়ী ইবনু ’উমার ও যুবায়র (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন।
وَرَوَاهُ النَّسَائِيّ عَن ابْن عمر وَالزُّبَيْر
ব্যাখ্যাঃ ইমাম আহমাদ যুবায়র (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। এভাবে তিনি এবং ইবনু হিব্বান আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকেও বর্ণনা করেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৫৭-[৩৯]. দেখুন পূর্বের হাদীস।
وَرَوَاهُ النَّسَائِيّ عَن ابْن عمر وَالزُّبَيْر
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৫৮-[৪০] ’আমর ইবনু শু’আয়ব (রহঃ) তাঁর পিতা থেকে, তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা সাদা চুলগুলো উপড়িয়ে ফেলো না। কেননা এটা মুসলিমদের জন্য নূর। বস্তুতঃ ইসলামের মধ্যে থাকা অবস্থায় যে ব্যক্তির একটি পশম সাদা হবে, এটার ওয়াসীলায় আল্লাহ তা’আলা তার জন্য একটি নেকি লিপিবদ্ধ করবেন এবং তার একটি গুনাহ মুছে ফেলবেন এবং তার একটি দরজা বুলন্দ করবেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تَنْتِفُوا الشَّيْبَ فَإِنَّهُ نُورُ الْمُسْلِمِ مَنْ شَابَ شَيْبَةً فِي الْإِسْلَامِ كَتَبَ اللَّهُ لَهُ بِهَا حَسَنَةً وَكَفَّرَ عَنْهُ بِهَا خَطِيئَةً وَرَفَعَهُ بِهَا دَرَجَةً» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যাঃ (لَا تَنْتِفُوا الشَّيْبَ) শুভ্রতা উপড়ে ফেলো না অর্থাৎ কোন চুল সাদা হলে তা উপড়ে তুলে ফেলো না। চুল সাদা হওয়ার ফাযীলাত হলো, একটি চুল সাদা হলে একটি নেকী লেখা হয়, একটি গুনাহ মাফ করা হয় এবং একটি মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়। এই হলো চুল শুভ্র হওয়ার ফাযীলাত। সাদা চুল উপড়িয়ে এই ফাযীলাত থেকে বঞ্চিত হতে নিষেধ করেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তবে দীনী অন্য কল্যাণের স্বার্থে তার সাদা রঙকে কালো রং ছাড়া অন্য রঙ দিয়ে রঞ্জক করা নিষেধ নয় বরং ভালো। এতে দুশমনের কাছে মুসলিমদের শক্তি প্রকাশ পায়। ইবনু ‘আরাবী বলেনঃ সাদা চুল উপড়ানো নিষেধ, কিন্তু তার খিযাব নিষেধ নয়; কেননা উপড়ানোর মাঝে সৃষ্টি কাঠামোকে তার মূল থেকে তুলে ফেলা হচ্ছে, কিন্তু খিযাবের বেলায় এমন নয়।
মুনযিরী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হাদীসটি তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ বর্ণনা করেন এবং ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, হাদীসটি হাসান। এছাড়া ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহ গ্রন্থে কতাদাহ্-এর সূত্রে আনাস ইবনু মালিক থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেনঃ আমরা অপছন্দ করতাম যে, কোন ব্যক্তি তার মাথা বা দাড়ি থেকে শুভ্র চুলটি তুলে ফেলে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪১৯৮)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৫৯-[৪১] কা’ব ইবনু মুররাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে থেকে বৃদ্ধ হয়েছে, তার এ বার্ধক্য কিয়ামতের দিন তার জন্য নূর হবে। (তিরমিযী ও নাসায়ী)[1]
وَعَنْ كَعْبِ بْنِ مُرَّةَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ شَابَ شَيْبَةً فِي الْإِسْلَامِ كَانَتْ لَهُ نُورًا يَوْمَ القيامةِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যাঃ হাদীসে চুলের শুভ্রতার আরেকটি ফাযীলাত বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ কিয়ামতের কঠিন অন্ধকারে এই চুল তার জন্য আলো হবে এবং সেই অন্ধকার থেকে মুক্তি দিবে। হাদীস বিশারদ ‘আল্লামা মানবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ চুল নিজেই তার জন্য আলো হবে এবং সে এর দ্বারা পথ প্রদর্শিত হবে। চুলের এই শুভ্রতা যদিও বান্দার নিজের কামাই বা উপার্জনের বিষয় নয় তবুও যখন তার এই শুভ্রের আধিক্য জিহাদ, আল্লাহর ভয় ইত্যাদির কারণে হবে তখন তার নিজের চেষ্টার ফসল বলেই গণ্য হবে। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৬৩৪)
শুভ্রতার ফাযীলাতের কারণ এও হতে পারে যে, চুলের শুভ্রতার বয়স পর্যন্ত দীর্ঘকাল সে আল্লাহ তা‘আলার ‘ইবাদাতে লিপ্ত রয়েছে দেখে আল্লাহ তা‘আলা তাকে বোনাস স্বরূপ এ মর্যাদা দান করছেন।
চুলের শুভ্রতার ফাযীলাতের আলোকে সহাবা ও তাবি‘ঈনদের একদল খিযাব পরিহার করতেন। অপরদিকে কালো ছাড়া অন্য খিযাব ব্যবহারের প্রতি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উৎসাহ প্রদানের দিকে লক্ষ্য করে অন্যরা তা ব্যবহার করতেন।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৬০-[৪২] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এবং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একই পাত্র হতে গোসল করতাম। তখন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাথার চুল জুম্মার উপরে এবং ওয়াফরার নিচে ছিল। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: كُنْتُ أَغْتَسِلُ أَنَا وَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ إِنَاءٍ وَاحِدٍ وَكَانَ لَهُ شَعْرٌ فَوْقَ الْجُمَّةِ وَدُونَ الوفرة. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যাঃ হাদীসটিতে দুটি জিনিসের বিবরণ দিয়েছেন ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)। এক : একই পাত্র থেকে তার ও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গোসলের ব্যাপারটি। দুই : রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চুলের বিবরণ।
একই পাত্র থেকে গোসল বলতে একই সময়ে উভয়ে একই পাত্র থেকে গোসল করেছেন বলে বুঝানো হয়েছে। হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, মহিলার গোসলের পর অবশিষ্ট পানি দিয়ে পুরুষের গোসল, অনুরূপ পুরুষের গোসলের অবশিষ্ট পানি দিয়ে মহিলার গোসল করতে কোন সমস্যা নেই। এটাই জামহূর ‘আলিমের মত। পক্ষান্তরে কেউ কেউ পুরুষের গোসলের অতিরিক্ত পানি দিয়ে মহিলার জন্য পবিত্রতা অর্জনে অসুবিধা মনে না করলেও মহিলার পবিত্রতা অর্জনের পর অবশিষ্ট পানি দিয়ে পুরুষের জন্য পবিত্রতা অর্জন মাকরূহ মনে করেন।
হাদীসের দ্বিতীয় অংশতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চুলের বিবরণ দেয়া হয়েছে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চুল জুম্মাহ্ ও ওয়াফরাহ্ এর মাঝামাঝি থাকত বলে বিবরণ দিচ্ছেন ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)। জুম্মাহ্ হলো চুলের এমন পরিমাণ যা মাথা থেকে কাঁধ পর্যন্ত নেমে যায়। আর ওয়াফরাহ হলো যা কানের লতি পর্যন্ত হয়। জুম্মাহ্ ও ওয়াফরাহ্ এর মাঝামাঝি চুলকে ‘আরবীতে লিম্মাহ্ বলা হয়। তাই কোন কোন বর্ণনায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লিম্মাহ্ওয়ালা চুলের অধিকারী ছিলেন বলে বলা হয়েছে। উভয় বর্ণনার উদ্দেশ্য একই। তবে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বড় জুম্মাহ্ চুলের অধিকারী ছিলেন বলেও বর্ণনায় পাওয়া যায়।
বিভিন্ন প্রকার চুলের বিবরণের মাঝে সামঞ্জস্য করতে মুহাদ্দিসীনে কিরাম বলেন, এসব হাদীস পরস্পর বিরোধী নয়। কেননা চুলের বিভিন্ন অবস্থা হতে পারে। এক সময় কাটতে দেরী হয়েছে। তাই চুল জুম্মায় পরিণত হয়েছে। এ অবস্থা যিনি দেখেছেন তিনি তা বর্ণনা করেছেন। আরেক সময় চুল কেটেছেন তখন তা ছোট হয়েছে। কাটার নিকটবর্তী সময়ে যিনি দেখেছেন তিনি এ অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন। এভাবেই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চুলের বিভিন্ন বর্ণনা এসেছে। মোটকথা, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চুল লম্বা ছিল। আমরা যাকে বাবরি বলে থাকি। তবে কোন সময় তা অধিক লম্বা হয়ে কাঁধ পর্যন্ত চলে যেত, আবার কোন সময় কানের লতি পর্যন্ত থাকত এবং কোন কোন সময় এর মাঝামাঝি থাকত। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৬১-[৪৩] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীদের মধ্যে ইবনুল হানযালিয়্যাহ্ (রাঃ) নামক জনৈক ব্যক্তি হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ খুরয়ম আল আসাদী লোকটি ভালো, তবে যদি তার মাথার চুল খুব লম্বা না হত এবং পরনের লুঙ্গি না ঝুলাত (টাখনু গিরার নিচ পর্যন্ত)। পরে খুরয়ম-এর কাছে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ কথাগুলো পৌঁছলে তিনি ছুরি নিয়ে চুলকে দু’ কানের লতি পর্যন্ত কেটে ফেললেন এবং লুঙ্গিকে অর্ধ গোড়ালি পর্যন্ত উঠিয়ে নিলেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن ابنِ الحنظليَّةِ رَجُلٌ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «نِعْمَ الرَّجُلُ خُرَيْمٌ الْأَسْدِيُّ لَوْلَا طُولُ جُمَّتِه وإسبال إزراه» فَبَلَغَ ذَلِكَ خُرَيْمًا فَأَخَذَ شَفْرَةً فَقَطَعَ بِهَا جمته إِلَى أُذُنَيْهِ وَرفع إزراه إِلَى أَنْصَاف سَاقيه. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘কায়স ইবনু বিশ্র আত্ তাগলূবী’’ নামক বর্ণনাকারী তার পিতার থেকে বর্ণনা করেছেন। অথচ তার পিতাকে চেনা যায় না। দেখুন- তাহক্বীক রিয়াযুস্ সলিহীন ৮০২, ১/৩৩২।
ব্যাখ্যাঃ (نِعْمَ الرَّجُلُ خُرَيْمٌ) খুরয়ম কতই না ভালো লোক। কারো অধিক প্রশংসায় এমন বাক্য ব্যবহার হয়। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুরয়ম (রাঃ)-এর প্রশংসামূলক ক্রিয়া দ্বারা প্রশংসার পর তার মাঝের দু’টি আপত্তিকর দিক তুলে ধরলেন। অর্থাৎ তার জুম্মাহ্ লম্বা ও লুঙ্গি লটকিয়ে পরার অভ্যাস না থাকলে সে অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিল। হাদীসের এ অংশ থেকে চুলকে লম্বা করে জুম্মায় পরিণত করা এবং লুঙ্গি ঝুলিয়ে পরা অপছন্দ কর্ম বলে প্রমাণিত হয়। লুঙ্গি বা পাজামা ইত্যাদি টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে পরা হারাম। বিভিন্ন হাদীসের মাধ্যমে তা প্রমাণিত। অতএব রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এ কাজটি অপছন্দ করা স্বাভাবিক। কিন্তু চুল লম্বা হওয়া বিশেষ তা জুম্মাহ্ পরিমাণ হলে তা মন্দ নয়। নির্ধারিত পরিমাণের পর তা কেটে ফেলতে হবে বলেও কোন দলীল নেই। বরং আমরা ইতোপূর্বে দেখলাম যে, এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চুলের সুন্নাত। এ প্রশ্নের জবাবে ‘উলামায়ে কিরাম বলেনঃ হতে পারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার লম্বা চুলের গর্ব টের পেয়েছেন। দীর্ঘ জুম্মাহ্ চুল দ্বারা হয়ত তিনি বড়াই করতেন বলে রসূল তার এ চুল অপছন্দ করেন। চুলের সাথে লুঙ্গি ঝুলিয়ে পরার কথা বলা এদিকে ইঙ্গিত বহন করে। অহংকারবশত লুঙ্গি টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে পরা আরবদের রীতি ছিল।
হাদীস থেকে এ কথাও প্রমাণিত হয় যে, বদনামের উদ্দেশ্য ছাড়া যদি কারো অদৃশ্যে তার কোন দোষ এভাবে বলা হয় যে, সে শুনলে তা অপছন্দ করবে না বরং দোষণীয় কাজটি ছেড়ে দিবে, এমন হলে উক্ত দোষের বিবরণ দেয়া গীবতের অন্তর্ভুক্ত হবে না। খুরয়ম -এর কাছেও রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ বাণী যাওয়ার সাথে সাথে তিনি তার পূর্বোক্ত ‘আমল থেকে ফিরে আসেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৬২-[৪৪] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার মাথার সম্মুখভাগে এক গুচ্ছ লম্বা চুল ছিল। আমার আম্মা আমাকে বললেনঃ আমি যেন তা না কাটি। কেননা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (অনেক সময় স্নেহপরবশ হয়ে) তাকে ধরে সোজা করতেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن أنسٍ قَالَ: كَانَتْ لِي ذُؤَابَةٌ فَقَالَتْ لِي أُمِّي: لَا أَجُزُّهَا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَمُدُّهَا وَيَأْخُذُهَا. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে ‘‘মায়মূন ইবনু ‘আবদুল্লাহ’’ নামক বর্ণনাকারীকে চেনা যায় না (مجهول الحال)। (তাকরীবুত্ তাহযীব)
ব্যাখ্যাঃ (ذُؤَابَةٌ) অর্থাৎ চুলের গুচ্ছ। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এ গুচ্ছ নিয়ে তার সাথে রসিকতা করতেন। এগুলো নিয়ে খেলা করতেন। রসূলের হাত লাগা তার মায়ের কাছে অত্যন্ত ভালো লাগত বলেই তার মা তাকে তা কাটতে দিতেন না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি তাদের ভালোবাসা, নবীজির ছোয়া পাওয়াকে তাদের ভালো লাগার প্রমাণ এই হাদীসটি। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৬৩-[৪৫] ’আবদুল্লাহ ইবনু জা’ফার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জা’ফারের সন্তানদেরকে (জা’ফার -এর শাহাদাতের জন্য) শোক প্রকাশের তিনদিন সময় দিলেন। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদের কাছে এলেন এবং বললেনঃ আজকের পর হতে তোমরা আর আমার ভাইয়ের জন্য কান্নাকাটি করবে না। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আমার ভাইয়ের সন্তানদেরকে আমার কাছে ডেকে আনো। সে মতে আমাদেরকে আনা হলো। যেন আমরা কতকগুলো পাখির ছানা। অতঃপর বললেনঃ নাপিত ডেকে আনো। তিনি তাকে নির্দেশ দিলেন, সে আমাদের মাথা মুড়িয়ে দিলো। (আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
وَعَن عبدِ الله بن جَعْفَرٍ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمْهَلَ آلَ جَعْفَرٍ ثَلَاثًا ثُمَّ أَتَاهُمْ فَقَالَ: «لَا تَبْكُوا عَلَى أَخِي بَعْدِ الْيَوْمِ» . ثُمَّ قَالَ: «ادْعُوا لِي بَنِي أَخِي» . فَجِيءَ بِنَا كَأَنَّا أَفْرُخٌ فَقَالَ: «ادْعُوا لِي الْحَلَّاقَ» فَأَمَرَهُ فَحَلَقَ رؤوسنا. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যাঃ (أَمْهَلَ آلَ جَعْفَرٍ ثَلَاثًا) জা‘ফার (রাঃ) হলেন রসূলুল্লাহ এর চাচাতো ভাই আবূ ত্বালিব-এর পুত্র। মুতা‘ যুদ্ধে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তার শাহাদাতের পর তার পরিবারে শোক নেমে আসে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সবাইকে তিনদিন শোক পালনের অবকাশ দিলেন। স্বামীর জন্য স্ত্রী ব্যতীত অন্যদের জন্য তিনদিন শোক পালন করার অনুমোদন রয়েছে। তিনদিনের বেশি শোক পালন করা বৈধ নয়। বিভিন্ন হাদীস দ্বারা বিষয়টি প্রমাণিত। তাই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জা‘ফার-এর পরিবারকে তিনদিন পর্যন্ত শোক পালনের অবকাশ দেন।
لَا تَبْكُوا عَلَى أَخِي بَعْدَ الْيَوْمِ আজকের পর আর আমার ভাইয়ের ওপর কেঁদো না। অর্থাৎ আজ তৃতীয় দিনের পর আর কাঁদা যাবে না। মুল্লা ‘আলী কারী বলেনঃ এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, কারো মৃত্যুতে তিনদিনের বেশি ক্রন্দন করা, চিন্তা করা, শোক প্রকাশ করা যাবে না। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
উল্লেখ্য যে, তিনদিনের বেশি ক্রন্দন বা চিন্তা করা যাবে না বলতে শোক পালনের উদ্দেশে এগুলো করা যাবে না বা ইচ্ছাকৃত শোক পালনকে কার্যকর রাখার জন্য এগুলো করা যাবে না। তবে মানুষের ইচ্ছার বাহিরে মন থেকে আপনিতেই যে দুঃখ বা কান্না বা চোখের পানি এসে যায় তা নিষেধের অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা এটা মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। যেমন মৃত্যুর পর কান্নাকাটি করতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন। আবার অনেকের মৃত্যুতে তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু বয়ে গেছে। আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত-
أَنَّ النَّبِىَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَعٰى جَعْفَرًا وَزَيْدًا قَبْلَ أَنْ يَجِيءَ خَبَرُهُمْ وَعَيْنَاهُ تَذْرِفَانِ
‘‘জা‘ফার ও যায়দ-এর খবর আসার আগেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মৃত্যুর খবর দেন, এমতাবস্থায় তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়াচ্ছিল।’’ (বুখারী হাঃ ৩৬৩০)
(كَأَنَّا أَفْرُخٌ) আমরা যেন পাখির বাচ্চা। "فَرْخٌ" হলো পাখির ছোট বাচ্চা। বহুবচন "أَفْرُخ"। পাখির বাচ্চার সাথে তাদেরকে তুলনা করার কারণ হলো তাদের চুলগুলো হয়ত পাখির প্রথম উদ্গত নরম চুলের ন্যায় ছিল। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪১৮৮)
(فَحَلَقَ رُؤُوْسَنَا) অর্থাৎ সে তাদের মাথা কামিয়ে দিলেন। মাথা কামাই করে ফেলার দুই কারণ হতে পারে। এক : শোক পালন অবস্থায় চুল এলোমেলো থাকে, তিনদিনের মাথায় মাথা কামিয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের শোকের নিদর্শন মিটিয়ে দিতে চাইলেন। কেননা তিনদিনের পর শোক পালন বৈধ নয়, যেমন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে নিষেধ দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন, চুল পুরো কামাই করার চেয়ে ছেড়ে দেয়া ভালো হওয়া সত্ত্বেও রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের চুল কামানোর কারণ হলো, তাদের মাতা আসমা স্বামীর শোকে বিভোর থাকায় তিনি বাচ্চার চুলের যত্ন নিতে পারছিলেন না। এতে তাদের চুলে ময়লা বা উঁকুন যেন না হয়ে যায় সে কারণেই রসূল তাদের ওপর দয়াশীল হয়ে তাদের চুল কামিয়ে দেন। ইবনুল মালিক বলেনঃ এ হাদীস থেকে প্রমাণিত যে, অভিভাবকের জন্য বাচ্চার চুল কামানো ও খৎনার ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ ঠিক আছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৬৪-[৪৬] উম্মু ’আত্বিয়্যাহ্ আল আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। জনৈকা নারী মদীনায় (মেয়েদের) খৎনা করত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ খৎনা স্থানের মাংস খুব বেশি কেটো না। কেননা তা নারীর জন্য অত্যধিক তৃপ্তিদায়ক এবং স্বামীর কাছে খুবই প্রিয়। (আবূ দাঊদ; আর তিনি বলেছেনঃ হাদীসটি য’ঈফ। তার বর্ণনাকারী অপরিচিত।)[1]
وَعَن أُمِّ عطيَّةَ الأنصاريَّةِ: أنَّ امْرَأَة كَانَت تختن بِالْمَدِينَةِ. فَقَالَ لَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تُنْهِكِي فَإِنَّ ذَلِكَ أَحْظَى لِلْمَرْأَةِ وَأَحَبُّ إِلَى الْبَعْلِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَقَالَ: هَذَا الْحَدِيثُ ضَعِيفٌ وَرَاوِيه مَجْهُول
ব্যাখ্যাঃ পুরুষের যেমন খৎনা রয়েছে ঠিক তেমনি মেয়েদেরও খৎনা রয়েছে। তবে পুরুষের জন্য খৎনা করা জরুরী। কিন্তু মেয়েদের জন্য তা জরুরী নয়। অধ্যায়ের শুরুতে ফিতরাত বা স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
এ হাদীসে মেয়েদের খৎনার বিষয়ে একটি দিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। হাদীসে যে দিক নির্দেশনাটি দেয়া হয়েছে তা হচ্ছে, মেয়েদের খৎনার ক্ষেত্রে খৎনার স্থানকে অধিক বা গভীর করে না কাটা। "إنهاك" শব্দের অর্থ হলো খৎনার জায়গা কাটতে আধিক্য অবলম্বন করা বা একেবারে মূল থেকে পুরোটা কেটে ফেলা। এভাবে কাটতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারণ করেন। বরং মেয়েদের খৎনার ক্ষেত্রে অল্প কেটে খৎনা করতে হবে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে- أَشِمِّي ولا تَنْهكي অর্থাৎ ‘ইশমাম’ অর্থ সুগন্ধি গ্রহণ। এখানে অল্প কাটাকে সুগন্ধি গ্রহণের সাথে তুলনা করা হয়েছে। অর্থাৎ কোন রকম একটু কেটে নিবে, যাতে কাটার আংশটি পাওয়া যায়। গভীর বা গাঢ় করে কাটবে না। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫২৬২)
মেয়েদের খৎনার ক্ষেত্রে গভীর বা গাঢ় করে না কাটার একটি হিকমাত বা রহস্যও হাদীসে উল্লেখ করা হয়। আর সেই রহস্য হলো, অল্প কাটা স্ত্রীর জন্য উপকারী এবং স্বামীর জন্য স্বাদ ও ভালো লাগার কারণ। খৎনা করতে অধিক গাঢ় করে কাটলে স্বামী স্ত্রী উভয়ের জন্য মিলনের স্বাদ উপভোগে কিছুটা ঘাটতি হবে।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৬৫-[৪৭] কারীমাহ্ বিনতু হুমাম (রহঃ) হতে বর্ণিত। একদিন জনৈকা মহিলা মেহেদী দ্বারা (খিযাব) ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করল। উত্তরে তিনি বললেনঃ তা ব্যবহারে কোন দোষ নেই, তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে তা ব্যবহারকে পছন্দ করি না। কেননা আমার প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার গন্ধ পছন্দ করতেন না। (আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
وَعَنْ كَرِيمَةَ بِنْتِ هَمَّامٍ: أَنَّ امْرَأَةً سَأَلَتْ عائشةَ عَنْ خِضَابِ الْحِنَّاءِ فَقَالَتْ: لَا بَأْسَ وَلَكِنِّي أَكْرَهُهُ كَانَ حَبِيبِي يَكْرَهُ رِيحَهُ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘কারীমাহ্ বিনতু হুমাম’’, তার এ হাদীসটি য‘ঈফ। দেখুন- শার্হু সুনান আবূ দাঊদ, আবুল মুহসিন ‘আববাদ ১/২ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ (لَا بَأْسَ) অসুবিধা নেই। কেননা মেহেদী বৈধ। এতে কোন দ্বিমত নেই।
(وَلَكِنِّي أَكْرَهُهٗ) তবে আমি তা অপছন্দ করি। এটা ছিল ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর ব্যক্তিগত অপছন্দ। শার‘ঈ কোন কারণে নয়। অপছন্দের কারণটি তিনি পরবর্তীতে উল্লেখ করে দিয়েছেন।
(كَانَ حَبِيبِي يَكْرَهٗ رِيحَهٗ) আমার বন্ধু তার গন্ধ অপছন্দ করতেন। তথা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেহেদীর গন্ধ অপছন্দ করতেন বলে ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) তা অপছন্দ করতেন।
পরবর্তী হাদীসে আমরা দেখব যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেয়েদের হাতে মেহেদী লাগানোকে অপছন্দ করতেন না। বরং না লাগানোকেই অপছন্দ করতেন। তাই এখানে অপছন্দ করতেন বলতে মেয়েদের জন্য মাথায় মেহেদী লাগিয়ে রাখাকে অপছন্দ করতেন। তাই ইমাম আবূ দাউদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) এ কথার দ্বারা মাথার চুলের খিযাব করা উদ্দেশ্য নিয়েছেন’। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪১৬০)
উল্লেখ্য যে, মেহেদীকে সুগন্ধি বস্তু হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে ইমাম শাফি‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ) এ হাদীসের আলোকে বলেনঃ মেহেদী সুগন্ধি বস্তু নয়। কেননা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুগন্ধি পছন্দ করতেন। এখানে এই সম্ভাবনা রয়েছে যে, এটি বিশেষ কোন প্রকারের মেহেদী ছিল। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হয়ত এই প্রকারটিকেই অপছন্দ করতেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৬৬-[৪৮] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন (আবূ সুফ্ইয়ান-এর স্ত্রী) হিন্দা বিনতু ’উতবাহ্ বললেনঃ হে আল্লাহর নবী! আপনি আমাকে বায়’আত করিয়ে নিন। তখন তিনি বললেনঃ আমি ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাকে বায়’আত করব না, যতক্ষণ না তুমি তোমার দু’ হাতের তালু পরিবর্তন করে নেবে। কেননা তোমার হাতের তালুদ্বয়কে যেন হিংস্র জন্তুর থাবার ন্যায় দেখাচ্ছে। (আবূ দাঊদ)
وَعَن عائشةَ أَنَّ هِنْدًا بِنْتَ عُتْبَةَ قَالَتْ: يَا نَبِيَّ اللَّهِ بَايِعْنِي فَقَالَ: «لَا أُبَايِعُكِ حَتَّى تُغَيِّرِي كَفَّيْكِ فَكَأَنَّهُمَا كَفَّا سَبُعٍ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যাঃ (لَا أُبَايِعُكِ حَتّٰى تُغَيِّرِي كَفَّيْكِ) অর্থ- মেহেদী দ্বারা হাত রঞ্জন করে পরিবর্তন না করা পর্যন্ত আমি বায়‘আত করব না। হাদীসের এই অংশ থেকে বুঝা যায় মেয়েরা তাদের হাতে মেহেদী না লাগিয়ে হাতকে ছেলেদের মত সাদা রেখে দেয়া রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে অপছন্দ ছিল।
(فَكَأَنَّهُمَا كَفَّا سَبُعٍ) অর্থাৎ এ দ্বয় হিংস্র প্রাণীর হাত। মেহেদী থেকে খালি হাতকে প্রাণীর হাতের সাথে উপমা দিয়ে অপছন্দের দিকটি তুলে ধরেছেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। অর্থাৎ অপছন্দনীয় বা মাকরূহ হওয়ার ক্ষেত্রে তা প্রাণীর হাতের সদৃশ। কেননা মেহেদী না লাগালে তা ছেলেদের হাতের মতো দেখাবে যা অপছন্দনীয়, যেমন প্রাণীর হাত অপছন্দনীয়। হাদীসের এ অংশ থেকে ছেলেদের জন্য হাতে মেহেদী ব্যবহার অপছন্দ বা মাকরূহ- এ কথাটিও প্রমাণ হয়ে যায়। কেননা ছেলেদের হাত মেয়েদের হাতের বিপরীত হবে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, ৪১৬১; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৬৭-[৪৯] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন জনৈকা মহিলা হাতে চিঠি নিয়ে পর্দার আড়াল হতে হাত বের করে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দিকে ইশারা করল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের হাতটি গুটিয়ে ফেলে বললেনঃ আমি বুঝতে পারলাম না, এটা কি কোন পুরুষের হাত না কোন নারীর? তখন মহিলাটি বলল : এটা মহিলার হাত। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ যদি তুমি নারী হতে তাহলে অবশ্যই মেহেদীর দ্বারা তোমার হাতের নখগুলো পরিবর্তন করে নিতে। (আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
وَعَنْهَا قَالَتْ: أَوَمَتِ امْرَأَةٌ مِنْ وَرَاءِ سِتْرٍ بِيَدِهَا كِتَابٌ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَبَضَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَدَهُ فَقَالَ: «مَا أَدْرِي أَيَدُ رَجُلٍ أَمْ يَدُ امْرَأَةٍ؟» قَالَتْ: بَلْ يَدُ امْرَأَةٍ قَالَ: «لَوْ كُنْتِ امْرَأَةً لَغَيَّرْتِ أَظْفَارَكِ» يَعْنِي الْحِنَّاء. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যাঃ (فَقَبَضَ النَّبِىُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَدَهٗ) অতএব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিজের হাত গুটিয়ে নিলেন। অর্থাৎ তিনি মেয়েটির হাত থেকে চিঠিটি নেয়ার জন্য হাত বাড়ালেন না এবং চিঠিটি ধরলেন না।
مَا أَدْرِي أَيَدُ رَجُلٍ أَمْ يَدُ امْرَأَةٍ؟ অর্থ- আমি জানি না এটা পুরুষের হাত নাকি নারীর হাত। হাতে মেহেদী না থাকার কারণে পর্দার আড়াল থেকে কেবল হাত দেখে নারী না পুরুষের হাত বুঝা কষ্টকর হচ্ছিল। অথবা নবীজি বুঝেও মেহেদীর প্রতি উৎসাহিত করতে এমনটি বলতে পারেন।
لَوْ كُنْتِ امْرَأَةً لَغَيَّرْتِ أَظْفَارَكِ অর্থ- তুমি মেয়ে হলে অবশ্যই তোমার নখ পরিবর্তন করতে। অর্থাৎ মেহেদী দিয়ে তা রঙিন করতে। পরবর্তী বাক্যে ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) পরিবর্তন করার ব্যাখ্যা দিয়ে দেন (يَعْنِي الْحِنَّاء) বলে। অর্থাৎ মেহেদী দ্বারা পরিবর্তন।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৬৮-[৫০] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সে নারীর ওপর লা’নাত, যে অন্যের মাথায় কৃত্রিম চুল মিশ্রিত করে এবং যে নিজের মাথায় কৃত্রিম চুল লাগায় এবং যে অন্য নারীর চুল উপড়ায় অথবা নিজের ভ্রু উপড়ায়। আর যে নারী কোন ব্যাধি ব্যতীত অপরের সঙ্গে উল্কি উৎকীর্ণ করে অথবা নিজের অঙ্গেও করায়। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن ابنِ عبَّاسٍ قَالَ: لُعِنَتِ الْوَاصِلَةُ وَالْمُسْتَوْصِلَةُ وَالنَّامِصَةُ وَالْمُتَنَمِّصَةُ وَالْوَاشِمَةُ والمشتوشمة من غير دَاء. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ (لُعِنَتِ الْوَاصِلَةُ) অর্থ- যে তার চুলকে অন্যের চুলে সাথে মিলায় তাকে অভিশাপ দেয়া হয়েছে। অভিশাপ দিয়েছেন আল্লাহ তা‘আলা অথবা রসূলের যবান দ্বারা তাদের ওপর অভিশাপ দেয়া হয়েছে। অভিশাপের কারণ হলো, এতে মিথ্যা ও প্রতারণার রূপ রয়েছে। পূর্বে এই মর্মের আরো হাদীস অতিবাহিত হয়েছে। সেখানে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৬৯-[৫১] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন পুরুষের ওপর লা’নাত করেছেন যে নারীর পোশাক পরিধান করে এবং এমন নারীর ওপর যে পুরুষের পোশাক পরিধান করে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الرَّجُلَ يَلْبَسُ لِبْسَةَ الْمَرْأَةِ وَالْمَرْأَةَ تَلْبَسُ لِبْسَةَ الرَّجُلِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ (لِبْسَةَ الْمَرْأَةِ) অর্থ- মহিলার পরিধেয় বস্তু। (لِبْسَةَ الرَّجُلِ) পুরুষের পরিধেয় বস্তু।
পোশাক পরিধানের ক্ষেত্রে যে বিধান বা নীতিমালা রয়েছে তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি মৌলিক নীতিমালা হলো, মহিলা পুরুষের পোশাক না পরা এবং পুরুষ মহিলার পোশাক না পরা। পুরুষের জন্য মহিলার পোশাকের সদৃশ্য পোশাক নিষিদ্ধ এবং মহিলার জন্য পুরুষের পোশাকের সাদৃশ্য পোশাক নিষিদ্ধ। বিভিন্ন হাদীসে এর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বর্ণিত হাদীসটি এর একটি স্পষ্ট দলীল। যে সব কর্মের উপর অভিশাপ দেয়া হয় তার নিষেধাজ্ঞাটি কঠিন হয়ে থাকে। তাই পুরুষের জন্য মহিলার পরিধেয় পোশাক পরে বা যে কোনভাবে তাদের অবয়ব অবলম্বন করা হারাম। ঠিক তদ্রম্নপ মহিলাদের জন্য পুরুষদের পোশাক পরা বা পুরুষদের অবয়ব অবলম্বন করা হারাম। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৭০-[৫২] আবূ মুলায়কাহ্ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে বলা হলো, জনৈকা মহিলা (পুরুষদের ন্যায়) জুতা পরিধান করেছিল। ’আয়িশাহ্ (রাঃ) তাকে বললেনঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন সব মহিলাদের ওপর লা’নাত করেছেন : যারা পুরুষদের বেশ ধারণ করে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنِ ابْنِ أَبِي مُلَيْكَةَ قَالَ: قِيلَ لِعَائِشَةَ: إِنَّ امْرَأَةً تَلْبَسُ النَّعْلَ قَالَتْ: لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الرَّجُلَةَ مِنَ النِّسَاء. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ (النَّعْلَ) শব্দের অর্থ পাদুকা, জুতা, স্যান্ডেল ইত্যাদি। পুরুষ মহিলা উভয়েই জুতা ব্যবহার করতে পারে। তবে পুরুষের জন্য তৈরি জুতা মেয়েদের জন্য পরিধান করা জায়িয নেই। আবার মেয়েদের জন্য নির্ধারিত জুতা পুরুষের জন্য পরিধান করা জায়িয নেই। জুতার কারণে বর্ণিত মহিলাকে লা‘নাত বা অভিশাপ দেয়ার কারণ হলো সেটি নিশ্চয় পুরুষ সদৃশ্য জুতা। হাদীসের পরবর্তী অংশ তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা রয়েছে।
(الرَّجُلَةَ مِنَ النِّسَاء) অর্থ হলো, নারীদের মধ্যে যারা পুরুষের অবয়ব, আকৃতি বা পুরুষ ভাব অবলম্বন করে এবং নিজেকে পুরুষের অবয়বে প্রকাশ করতে চায়। হাদীসের এই অংশ থেকে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, হাদীসে নারীদের জন্য যে পাদুকার ব্যাপারে অভিশাপের কথা বলা হয়েছে যা পুরুষ সাদৃশ্য বা যে জুতা পুরুষের ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত। অতএব সাধারণ জুতা যা পুরুষ সাদৃশ্য নয় তা মেয়েদের জন্য নিষেধ নয়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৭১-[৫৩] সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাধারণ নিয়ম ছিল যে, যখন তিনি কোন সফরে বের হতেন, তখন ঘরের সকলের নিকট হতে বিদায় নিয়ে সর্বশেষ বিদায় নিতেন ফাতিমা (রাঃ) হতে। আর যখন তিনি ফিরে আসতেন, তখন সর্বপ্রথম সাক্ষাৎ করতেন ফাতিমা (রাঃ)-এর সাথে। এভাবে একবার তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এক অভিযান থেকে ফিরে এসে ফাতিমা (রাঃ)-এর ঘরের দিকে অগ্রসর হয়ে দেখলেন, একখানা চট অথবা পর্দা তার ঘরের দরজায় ঝুলানো রয়েছে। আর হাসান ও হুসায়ন তাদের উভয়ের হাতে পরিহিতি রয়েছে দু’খানা রূপার বালা। এটা দেখে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরের দরজা পর্যন্ত এলেন, কিন্তু ভিতরে প্রবেশ করলেন না। ফলে ফাতিমা (রাঃ) বুঝতে পারলেন যে, এগুলো দেখার কারণে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গৃহে প্রবেশ করেননি।
অতঃপর ফাতিমা (রাঃ) পর্দাখানা ছিঁড়ে ফেললেন এবং ছেলেদের হাত হতে বালা দু’খানা খুলে নিলেন এবং ভেঙ্গে ফেললেন। বালকদ্বয় ভাঙ্গা বালা দু’টি নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট চলে গেল। তখন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বালা দু’খানা তাদের নিকট হতে নিয়ে নিলেন এবং বললেনঃ হে সাওবান! এ অলঙ্কার দু’টি নিয়ে যাও এবং অমুক পরিবারস্থ লোকেদেরকে দিয়ে আসো। আর তারা হলো (হাসান ও হুসায়ন-এর দিকে ইঙ্গিত করে) আমার পরিবার-পরিজন। তারা পার্থিব জীবনে সুখন্ডসম্ভার ভোগ করবে, আমি তা পছন্দ করি না। (অতঃপর বললেনঃ) হে সাওবান! যাও ফাতিমার জন্য ’আসবের (বিশেষ পুঁতির) একটি হার এবং হাতির দাঁতের তৈরি দু’টি বালা কিনে নিয়ে আসো। (আহমাদ ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ ثَوْبَانَ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا سَافَرَ كَانَ آخِرُ عَهْدِهِ بِإِنْسَانٍ مِنْ أَهْلِهِ فَاطِمَةَ وَأَوَّلُ مَنْ يَدْخُلُ عَلَيْهَا فَاطِمَةَ فَقَدِمَ مِنْ غَزَاةٍ وَقَدْ عَلَّقَتْ مَسْحًا أَوْ سِتْرًا عَلَى بَابِهَا وَحَلَّتِ الْحَسَنَ وَالْحُسَيْنَ قُلْبَيْنِ مِنْ فِضَّةٍ فَقَدِمَ فَلَمْ يَدْخُلْ فَظَنَّتْ أَنَّ مَا مَنَعَهُ أَنْ يَدْخُلَ مَا رَأَى فَهَتَكَتِ السِّتْرَ وَفَكَّتِ الْقُلْبَيْنِ عَنِ الصَّبِيَّيْنِ وَقَطَعَتْهُ مِنْهُمَا فَانْطَلَقَا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَبْكِيَانِ فَأَخَذَهُ مِنْهُمَا فَقَالَ: «يَا ثَوْبَانُ اذْهَبْ بِهَذَا إِلَى فُلَانٍ إِنَّ هَؤُلَاءِ أَهْلِي أَكْرَهُ أَنْ يَأْكُلُوا طَيِّبَاتِهِمْ فِي حَيَاتِهِمُ الدُّنْيَا. يَا ثَوْبَانُ اشْتَرِ لِفَاطِمَةَ قِلَادَةً مِنْ عَصْبٍ وَسُوَارَيْنِ مِنْ عَاجٍ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَأَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘হুমায়দ আশ্ শামী’’ ও ‘‘সুলায়মান আল মামবাহী’’ নামের দু’জন অপরিচিত রাবী। ইয়াহ্ইয়া ইবনু মা‘ঈন বলেনঃ আমি তাদেরকে চিনি না। বিস্তারিত দেখুন- ‘আওনুল মা‘বূদ ১১/১৮২, হাঃ ৪৪৭১।
ব্যাখ্যাঃ (آخِرُ عَهْدِه بِإِنْسَانٍ مِنْ أَهْلِه فَاطِمَةَ) অর্থ- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অভ্যাস ছিল, সফরে যাওয়ার সময় পরিবারের অর্থাৎ তার স্ত্রী ও মেয়েদের মাঝে সর্বশেষ যার সাথে কথা বলতেন, ওয়াসিয়্যাত করতেন, নির্দেশ দিতেন এবং বিদায় নিতেন তিনি হলেন ফাতিমা (রাঃ)। আবার সফর থেকে ফিরে এসে সর্বপ্রথম যার কাছে যেতেন তিনি ফাতিমা (রাঃ)। মোটকথা, যাওয়ার সময় সর্বশেষে ফাতিমা (রাঃ) এবং আসার পর সর্বপ্রথম ফাতিমা (রাঃ)-এর সাথে দেখা করতেন।
(وَقَدْ عَلَّقَتْ مَسْحًا أَوْ سِتْرًا عَلٰى بَابِهَا) অর্থ- একদিন এক যুদ্ধ থেকে এসে পেলেন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পশমের মসৃন মোলায়েম কাপড় বা পর্দা ঝুলিয়েছেন। "مسح" মীম হরফে যের দিয়ে পঠিত। অর্থাৎ পশমী কাপড়। অর্থাৎ সাধারণ পর্দা বা পশমী দামী পর্দা দরজায় ঝুলিয়েছেন। দরজায় পর্দা ঝুলানো কোন অবৈধ বা অপছন্দনীয় জিনিস নয়। বরং পর্দার জন্য তা ঝুলানো প্রশংসনীয় বিষয়। তারপরও রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্দা দেখে রাগ করে ঘরে না আসার কারণ হলো, সেই পর্দাটি নিশ্চয় কেবল পর্দার জন্য ছিল না। বরং সৌন্দর্য বা কিছুটা জাগতিক চাকচিক্য অবলম্বনের জন্য ছিল। এটি ছিল রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রাগের একটি কারণ। আরেকটি কারণ যা তারপর উল্লেখ করা হচ্ছে তা হলো, হাসান ও হুসায়ন-কে রূপার চুড়ি পরানো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাগের কারণ না বললেও ফাতিমা (রাঃ) তা বুঝে নিলেন। কেননা পিতার মন মেজাজ বা মানসিক অবস্থা নিশ্চয় তার জানা ছিল। প্রতিবারের মতো এবার তার কাছে না আসার কারণ তিনি সহজেই টের পেয়ে গেলেন। টের পেয়েই পর্দা তুলে ফেললেন এবং ছেলেদের হাত থেকে চুড়ি খুলে ফেললেন।
(فَانْطَلَقَا إِلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَبْكِيَانِ) অর্থ- তারা দু’জন রসূলের কাছে কেঁদে কেঁদে গেল। পছন্দের কোন জিনিস বাচ্চাদের কাছে দিয়ে আবার তা নিয়ে নিলে স্বাভাবিকত বাচ্চাদের এই অবস্থাই হয়। তাই তারা কাঁদছে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের হাত থেকে তা নিয়ে নিলেন। তা নিয়ে নেয়ার পর আবার তাদের মন ও ফাতিমা (রাঃ) মনোরঞ্জনের জন্য রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাওবানকে নির্দেশ দিলেন-
(يَا ثَوْبَانُ اذْهَبْ بِهٰذَا إِلٰى فُلَانٍ) হে সাওবান! তুমি তাদেরকে অমুকের কাছে নিয়ে যাও। অমুকের কাছে কেন নিয়ে যাবে তা বলার আগেই রসূল তাদের কাছ থেকে এগুলো নিয়ে নেয়া বা পর্দা ঝুলানোর কারণে তা করার কারণটিও বলে দিলেন। রসূলের কথায় ফাতিমা-এর ধারণা একেবারেই সঠিক বলে প্রমাণিত হলো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (إِنَّ هَؤُلَاءِ أَهْلِي أَكْرَهٗ أَنْ يَأْكُلُوا طَيِّبَاتِهِمْ فِي حَيَاتِهِمُ الدُّنْيَا) অর্থ- এরা আমার পরিবার। তারা দুনিয়ার জীবনে তাদের আরাম ভোগ করে নেয়া আমি অপছন্দ করি। অর্থাৎ দুনিয়ার জীবন ভোগের নয়। আমি তাদের সব ভোগ ও আরাম-আয়েশ আখিরাতের জন্য রেখে দিয়ে দুনিয়ার দারিদ্র্যতার জীবন পছন্দ করি। দুনিয়ার জীবনে কষ্ট করে যেন তারা আখিরাতে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদা লাভ করতে পারে। জান্নাতের উচ্চ স্বাদ গ্রহণ করতে পারে। তারা যেন তাদের সদৃশ্য না হয় যাদের বেলায় আল্লাহ তা‘আলা বলেছেনঃ
أَذْهَبْتُمْ طَيِّبَاتِكُمْ فِي حَيَاتِكُمُ الدُّنْيَا وَاسْتَمْتَعْتُم
‘‘তোমরা তোমাদের পার্থিব জীবনেই তোমাদের অংশের নি‘আমাতগুলো নিঃশেষ করেছ আর তা ভোগ করেছ।’’ (সূরাহ্ ত্ব-হা- ২০ : ৪৬)
এরপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ (اشْتَرِ لِفَاطِمَةَ قِلَادَةً مِنْ عَصْبٍ وَسُوَارَيْنِ مِنْ عَاجٍ) অর্থ- ফাতিমার জন্য একটি কাপড়ের মালা ও হাতির দাঁতের দুটি চুড়ি কিনে দাও। খত্ত্বাবী বলেনঃ এখানে "عصب" অর্থ ইয়ামেনী চাদর না হয়ে আর কি হতে পারে তা আমার জানা নেই। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
চুড়ি মেয়েদের পরিধেয় বস্তু। ফাতিমা হয়ত ছেলেদের জন্য তা পরিধানে বাধা নেই মনে করে পরিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাগ করায় তিনি তা কেটে ফেলেছিলেন। পিতার রাগের কারণে এটি করলে মানুষ হিসেবে তার মনে কিছুটা কষ্ট আসতে পারা অসম্ভব নয়। কষ্ট আসুক বা না আসুক তবু এটি একটি কষ্ট পাওয়ার কারণ। তাই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মনোরঞ্জনের জন্য সাথে সাথে একটি মালা ও দুটি চুড়ি কিনে দেয়ার ব্যবস্থা করলেন। তবে এটি ছিল সাধারণ। আগের মতো জাঁকজমক বা দুনিয়া বিলাসীদের মতো নয়।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৭২-[৫৪] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা ইসমিদ সুরমা লাগাও। কেননা তা দৃষ্টিশক্তি প্রখর করে এবং পলকের চুল অধিক জন্মায়। বর্ণনাকারী ইবনু ’আব্বাস(রাঃ) বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি সুরমাদানি ছিল, তিনি প্রত্যেক রাত্রে তা হতে এ চোখে তিনবার, ঐ চোখে তিনবার সুরমার শলাকা লাগাতেন। (তিরমিযী)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «اكْتَحِلُوا بِالْإِثْمِدِ فَإِنَّهُ يَجْلُو الْبَصَرَ وَيُنْبِتُ الشَّعْرَ» . وَزَعَمَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَتْ لَهُ مُكْحُلَةٌ يَكْتَحِلُ بِهَا كُلَّ لَيْلَةٍ ثَلَاثَةً فِي هَذِهِ وَثَلَاثَةً فِي هَذِه. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ (اكْتَحِلُوا بِالْإِثْمِدِ) তোমরা ইসমিদের সুরমা লাগাও। "إثمد" শব্দটির ‘হামযা’ ও ‘মীম’ হরফে যের দিয়ে ইসমিদ। আবার ‘মীম’ হরফে পেশ দিয়ে ইসমুদও পড়া যায়। ইসমিদ বা ইসমুদ এক জাতের পাথর যা থেকে সুরমা তৈরি হয়। কেউ কেউ বলেন, সুরমা বলে আমরা যেটাকে জানি সেটাই ইসমুদ। তবে বাহ্যত বুঝা যায়, এটি সুরমার বিশেষ একটি প্রকার। যেমন আবূ দাঊদে ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর সূত্রে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে- وَإِنَّ خَيْرَ أَكْحَالِكُمُ الإِثْمِدُ ‘‘আর তোমাদের সুরমাসমূহের মাঝে সর্বধিক উত্তম হলো ইসমিদ।’’
তিরমিযীর বর্ণনার শব্দ- وخير ما اكتحلتم به الإثمد ‘‘আর তোমরা যা দিয়ে সুরমা ব্যবহার করো তন্মধ্যে উত্তম হচ্ছে ইসমিদ।’’ (তিরমিযী হাঃ ২০৪৮)
তিরমিযীর বর্ণনাটি আমরা সামনেই দেখব। এসব বর্ণনা থেকে বুঝা যায় যে, ইসমিদ হচ্ছে সুরমার একটি প্রকার এবং তা সবচেয়ে ভালো মানের সুরমা।
(فَإِنَّهٗ يَجْلُو الْبَصَرَ) কেননা তা দৃষ্টি প্রকাশ করে। এটি সুরমা ব্যবহারের একটি উপকার। দৃষ্টি প্রকাশ করে অর্থাৎ দৃষ্টিকে সুন্দর এবং চোখের জ্যোতি বাড়ায় এবং চোখের মধ্যে মাথা থেকে নেমে আসা ময়লা পরিষ্কার করে। এর মাধ্যমে মূলত দৃষ্টিকে স্বচছ রাখে।
(وَيُنْبِتُ الشَّعْرَ) আর চুল গজায়। এটি সুরমা ব্যবহারের দ্বিতীয় উপকার। এখানে চুল বলতে চোখের চুল তথা চোখের পাপড়ি উদ্দেশ্য।
(وَزَعَمَ) "زعم" এর শাব্দিক অর্থ ধারণা করা। তবে অনেক সময় শব্দটি নিশ্চিত কথার ওপর প্রয়োগ হয়। এখানে এই অর্থই উদ্দেশ্য। এখানে রসূলের সুরমা ব্যবহারের রীতির ধারণাকারী বা কথাটির প্রবক্তা হলেন ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)। বিভিন্ন বর্ণনা থেকেও তা প্রমাণিত হয়। তবে কেউ কেউ বলেন, এ কথার প্রবক্তা হলেন হাদীসটির বর্ণনাকারী ইমাম তিরমিযীর শায়খ মুহাম্মাদ ইবনু হুমায়দ। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(ثَلَاثَةً فِي هٰذِه وَثَلَاثَةً فِي هٰذِه) তিনবার এ চোখে তিনবার ওই চোখে। অর্থাৎ ডান চোখে তিনবার এবং বাম চোখে তিনবার। প্রতি রাতে এ চোখে তিনবার আর ও চোখে তিনবারের অর্থ এই নয় যে, রাতে তিন সময়ে সুরমা লাগাতেন। বরং উদ্দেশ্য হলো, সুরমা ব্যবহারের সময় সুরমার ব্যবহারে কাঠি বা শলা তিন বার চোখে লাগাতেন এবং প্রতিবার শলায় সুরমা নিতেন। যেমন কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে- مَنِ اكْتَحَلَ فَلْيُوتِرْ অর্থাৎ যে সুরমা ব্যবহার করবে সে যেন বিজোড় করে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৭৫৭)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৭৩-[৫৫] উক্ত রাবী [’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাত্রে শোয়ার পূর্বে প্রত্যেক চোখে তিন তিন শলাকা ইসমিদ সুরমা লাগাতেন। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরো বলেছেনঃ যে সব জিনিস দ্বারা তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো তন্মধ্যে সবচেয়ে উত্তম-লাদূদ, সাঊত, শিঙ্গা লাগানো এবং জোলাপ নেয়া। যে সব সুরমা তোমরা ব্যবহার করো তার মধ্যে ইসমিদ সর্বোত্তম। তাতে চোখের দৃষ্টিশক্তি সতেজ হয় এবং চোখের পলকের চুল অধিক জন্মায়। আর শিঙ্গা লাগানোর জন্য উত্তম দিন হলো চাঁদের সতের, ঊনিশ ও একুশ তারিখ। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যখন মি’রাজ হয়েছিল, তখন তিনি মালায়িকাহ্’র (ফেরেশতাদের) যে দলের নিকট দিয়ে অতিক্রম করেছিলেন, তাঁরা প্রত্যেকেই বলেছিলেন যে, আপনি অবশ্যই শিঙ্গা লাগাবেন। (তিরমিযী; এবং তিনি বলেছেনঃ এ হাদীসটি হাসান ও গরীব।)[1]
وَعَنْهُ قَالَ: كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَكْتَحِلُ قَبْلَ أَنْ يَنَامَ بِالْإِثْمِدِ ثَلَاثًا فِي كُلِّ عَيْنٍ قَالَ: وَقَالَ: «إِنَّ خَيْرَ مَا تَدَاوَيْتُمْ بِهِ اللَّدُودُ وَالسَّعُوطُ وَالْحِجَامَةُ وَالْمَشِيُّ وَخَيْرَ مَا اكْتَحَلْتُمْ بِهِ الْإِثْمِدُ فَإِنَّهُ يَجْلُو الْبَصَرَ وَيُنْبِتُ الشَّعْرَ وَإِنَّ خَيْرَ مَا تَحْتَجِمُونَ فِيهِ يَوْمُ سَبْعَ عَشْرَةَ وَيَوْمُ تِسْعَ عَشْرَةَ وَيَوْمُ إِحْدَى وَعِشْرِينَ» وَإِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَيْثُ عُرِجَ بِهِ مَا مَرَّ عَلَى مَلَأٍ مِنَ الْمَلَائِكَةِ إِلَّا قَالُوا: عَلَيْكَ بِالْحِجَامَةِ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ
ব্যাখ্যাঃ (اللَّدُودُ) মুখের পার্শ্ব দিয়ে যে ঔষধ সেবন করানো হয় তাকে ‘লাদূদ’ বলা হয়। সম্ভবত এটি সে সময়কার বিশেষ এক প্রকার উত্তম ঔষধ, যা ঐভাবে (ফোঁটা ফোঁটা করে মুখের ঔষধ) সেবন করানো হত।
(السَّعُوطُ) ড্রপ দিয়ে (ফোঁটা ফোঁটা করে নাকের ঔষধ) নাকে ব্যবহারের ঔষধ। সে সময়কার উত্তম ঔষধের মাঝে এটিকে গণ্য করা হয়েছে।
(الْحِجَامَةُ) রক্তমোক্ষণ চিকিৎসা। শিঙ্গা ব্যবহারের মাধ্যমে শরীরের বিষাক্ত রক্ত উঠানোর মাধ্যমে এই চিকিৎসা গ্রহণ করা হয়ে থাকে। আধুনিক কালে এর নতুন প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়েছে।
(الْمَشِيُّ) শব্দটির ‘মীম’ হরফে যবর, ‘শিন’ অক্ষরে যের এবং পরবর্তীতে ‘ইয়া’ তাশদীদযুক্ত। পেট নামানোর কাজে ব্যবহৃত যে কোন ঔষধকেই ‘মাশিয়্যু’ বলা হয়। শব্দটি (الْمَشِيُّ) থেকে উদগত। যার অর্থ চলাফেরা। তুরিবিশতী বলেনঃ পেট নামানোর কাজে ব্যবহৃত ঔষধকে ‘মাশিয়্যু’ বলার কারণ হলো, এই ঔষধ সেবনকারী বাথরুমে যাওয়া আসা বেড়ে যায়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
এই চারটি চিকিৎসাকে সর্বোত্তম চিকিৎসা বলে আখ্যায়িত করেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এগুলোই হয়ত সে সময়কার সবচেয়ে ভালো চিকিৎসা ছিল।
(وَإِنَّ خَيْرَ مَا تَحْتَجِمُونَ فِيهِ يَوْمُ سَبْعَ عَشْرَةَ وَيَوْمُ تِسْعَ عَشْرَةَ وَيَوْمُ إِحْدٰى وَعِشْرِينَ) শিঙ্গা লাগিয়ে চিকিৎসার ক্ষেত্রে কোন কোন হাদীসে কিছু তারিখকে উত্তম বলা হয়েছে। যেমন বর্ণিত হাদীসে চান্দ্র মাসের ১৭, ১৯, ২১ তারিখে হিজামাহ্ উত্তম বলা হয়েছে। কোন হাদীসে সপ্তাহের কিছু দিনে শিঙ্গা লাগাতে উৎসাহিত করা হয়েছে আবার কিছু দিনে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। যেমন সোমবার ও মঙ্গলবারে উৎসাহিত করা হয়েছে এবং অন্যদিন নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
তবে নির্ধারিত তারিখ বা নির্ধারিত দিনে হিজামাহ্ সম্পর্কে যত হাদীসে বর্ণিত হয়েছে তার সবই দুর্বল বলে মত দিয়েছেন মুহাদ্দিসীনে কিরাম। মুহাদ্দিসীনে কিরাম বলেনঃ নির্ধারিত দিনে হিজামার প্রতি উৎসাহিত বা নিরুৎসাহিতের ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ কিছু নেই।
(حَيْثُ عُرِجَ بِه) অর্থাৎ মি‘রাজ রজনীতে যখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আকাশে চড়ানো হচ্ছিল, তখন যখনই তিনি মালায়িকাহ্’র (ফেরেশতাগণের) দল অতিক্রম করেছেন, মালায়িকাহ্ তাকে বলেছে- (عَلَيْكَ بِالْحِجَامَةِ) তোমার জন্য হিজামা জরুরী বা তুমি হিজামাকে আঁকড়ে ধরো। হাদীসটি সহীহ হলে হিজামার গুরুত্ব আরো অনেক বেশি বেড়ে যেত। তবে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজামাহ্ দ্বারা চিকিৎসা করেছেন তা বিভিন্ন সহীহ হাদীসের মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত এবং উপকার ও গুরুত্বও প্রমাণিত।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৭৪-[৫৬] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরুষদের এবং মহিলাদেরকে গোসলের জন্য হাম্মামে (গোসলখানায়) প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন। অবশ্য পরে কেবলমাত্র পুরুষদেরকে ইযারসহ প্রবেশ করার অনুমতি দিয়েছেন। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى الرِّجَالَ وَالنِّسَاءَ عَنْ دُخُولِ الْحَمَّامَاتِ ثُمَّ رَخَّصَ لِلرِّجَالِ أَنْ يَدْخُلُوا بِالْمَيَازِرِ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘আবূ ‘উযরাহ্’’ নামক একজন রাবী, যিনি অপরিচিত। দেখুন- তাহক্বীকে মুসনাদে আহমাদ- শু‘আয়ব আরনাউত্বব : ২৫০৫০।
ব্যাখ্যাঃ (نَهٰى الرِّجَالَ وَالنِّسَاءَ عَنْ دُخُولِ الْحَمَّامَاتِ) অর্থাৎ পুরুষ ও মহিলাকে হাম্মামসমূহে প্রবেশ করতে নিষেধ করেন।
হাম্মাম অর্থ গোসলখানা। মূলত গরম পানি দিয়ে গোসলের ব্যবস্থা করে রাখার স্থানকে হাম্মাম বলা হয়। বহুবচন হাম্মামাত। যে হাম্মামে গোসল করতে পুরুষ ও মহিলাকে সাধারণভাবে নিষেধ করা হয়েছিল তা মূলত ঐসব গোসলখানা, যেখানে সম্মিলিতভাবে সবাই মিলে গোসলের ব্যবস্থা করা হয়।
সতর বা শরীরের যে অংশ ঢাকা জরুরী তা ঢেকে রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরয। সতরের বিষয়টির দিকটিকেই লক্ষ্য করে গোসলের জন্য হাম্মাম তথা সমবেত গোসলস্থলে প্রবেশ করতে বারণ করেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
(ثُمَّ رَخَّصَ لِلرِّجَالِ أَنْ يَدْخُلُوا بِالْمَيَازِرِ) অর্থ- পরবর্তীতে পুরুষের জন্য লুঙ্গি নিয়ে প্রবেশের অনুমোদন দেন।
মেয়েদের তুলনায় পুরুষের সতরের অংশ কম। লুঙ্গি পরে সতরের বিধান রক্ষা করে পুরুষের জন্য সমবেত গোসলখানায় গোসল করা সম্ভব। কিন্তু মেয়েদের জন্য তা সম্ভব নয়; তাই মেয়েদের ক্ষেত্রে সম্মিলিত গোসলের স্থানে প্রবেশ করার নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে। মুযহির (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ মেয়েদেরকে হাম্মামে প্রবেশ করে গোসলের অনুমোদন দেয়া হয়নি; কেননা তাদের সমস্ত শরীর সতর এবং বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া তা বের করা জায়িয নয়। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৮০২; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৭৫-[৫৭] আবুল মালীহ (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার হিমস্ অধিবাসিনীর কয়েকজন মহিলা ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর খিদমাতে উপস্থিত হলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কোথা হতে এসেছ? তারা বলল, সিরিয়া হতে। তখন ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বললেনঃ সম্ভবত তোমরা ঐ এলাকার অধিবাসিনী, যেখানকার মহিলারা গোসলখানায় প্রবেশ করে? তারা বলল, হ্যাঁ। তখন ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বললেনঃ আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে নারী তার স্বামীর ঘর ব্যতীত অন্য কোথাও তার স্বীয় কাপড় খোলে, সে যেন তার ও তার প্রভুর মধ্যে পর্দা ছিঁড়ে ফেলে। অপর এক বর্ণনায় আছে, নিজ ঘর ব্যতীত অন্য কোথাও কাপড় খুললে সে যেন তার ও মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর মধ্যকার পর্দা নষ্ট করে দিলো। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي الْمَلِيحِ قَالَ: قَدِمَ عَلَى عَائِشَةَ نِسْوَةٌ مِنْ أَهْلِ حِمْصٍ فَقَالَتْ: مَنْ أَيْنَ أنتنَّ؟ قلنَ: من الشَّامِ فَلَعَلَّكُنَّ مِنَ الْكُورَةِ الَّتِي تَدْخُلُ نِسَاؤُهَا الْحَمَّامَاتِ؟ قُلْنَ: بَلَى قَالَتْ: فَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «لَا تَخْلَعُ امْرَأَةٌ ثِيَابَهَا فِي غَيْرِ بَيْتِ زَوْجِهَا إِلَّا هَتَكَتِ السِّتْرَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ رَبِّهَا» . وَفِي رِوَايَةٍ: «فِي غيرِ بيتِها إِلا هتكت سترهَا بَيْنَهَا وَبَيْنَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ (حِمْصٍ) শব্দটির ‘হা’ হরফে যের এবং ‘মীম’ হরফে সাকিন দিয়ে উচ্চারিত। শাম তথা সিরিয়ার একটি শহরের নাম।
(الْكُورَةِ) ‘কাফ’ হরফে পেশ দিয়ে উচ্চারণ অর্থাৎ কূরা। কূরা সেখানকার একটি অঞ্চল বা এক প্রান্তের নাম, যে অঞ্চল বা প্রান্তের মেয়েরা পুরুষ মহিলা সম্মিলিত গোসলখানায় প্রবেশ করত। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪০০৫)
(إِلَّا هَتَكَتِ السِّتْرَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ رَبِّهَا) তবে সে তার ও তার রবের মধ্যকার পর্দা ছিঁড়ে দিয়েছে। অর্থাৎ যে মহিলা স্বামী ছাড়া অন্যের কাছে নিজের সতর খুলল সে লজ্জা ও শিষ্টাচারের পর্দাকে ভূলুন্ঠিত করেছে, যার রক্ষার নির্দেশ দিয়েছিলেন তাকে তার রব্।
(بَيْنَهَا وَبَيْنَ اللهِ) তার ও আল্লাহর মধ্যকার পর্দা। আল্লাহ ও তার মধ্যকার পর্দা ভূলুন্ঠিত হওয়ার কারণ হলো সে আল্লাহর পক্ষ থেকে পর্দা রক্ষা করতে নির্দেশিত। তার সতরকে স্বামী ছাড়া সকলের দৃষ্টি থেকে হিফাযাত করতে নির্দেশিত। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এর কারণ হলো, আল্লাহ তা‘আলা পোশাক অবতীর্ণ করেছেন, যা দিয়ে তারা তাদের লজ্জাস্থান ঢাকবে। এটা হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতির পোশাক। অতএব যখন তারা আল্লাহকে ভয় করলো না এবং তাদের লজ্জাস্থান খুলে দিল, তখন তারা আল্লাহ ও তাদের মধ্যকার পর্দাকেই ভূলুন্ঠিত করলো। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪০০৫)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৭৬-[৫৮] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শীঘ্রই অনারব দেশ তোমাদের দখলে আসবে এবং সেখানে তোমরা এমন কিছু ঘর পাবে যাকে হাম্মাম বলা হয়। সে সমস্ত হাম্মামে তোমাদের পুরুষেরা যেন লুঙ্গি পরিহিত অবস্থা ব্যতীত প্রবেশ না করে, আর মহিলাদের যেন তা হতে বিরত রাখে। তবে রুগ্ন এবং হায়য-নিফাস হতে পবিত্রতা অর্জনকারী মহিলাদের বাধা দেবে না। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: سَتُفْتَحُ لَكُمْ أَرْضُ الْعَجَمِ وَسَتَجِدُونَ فِيهَا بُيُوتًا يُقَالُ لَهَا: الْحَمَّامَاتُ فَلَا يَدْخُلَنَّهَا الرِّجَالُ إِلَّا بِالْأُزُرِ وَامْنَعُوهَا النِّسَاءَ إِلَّا مَرِيضَةً أَوْ نُفَسَاءَ . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘আবদুর রাহমান ইবনু যিয়াদ ইবনু আন্‘উম আল ইফরিক্বী’’, যিনি একজন য‘ঈফ রাবী। বিস্তারিত দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ১৪/৭২৮ পৃঃ, হাঃ ৬৮১৯।
ব্যাখ্যাঃ পূর্বেই বলা হয়েছে যে, হাদীসে নিষিদ্ধ হাম্মাম তথা গোসলখানা বলতে সবাই মিলে একত্রে গোসলের সমবেশস্থলকে বুঝানো হয়েছে। যেমন বর্তমানকালে বিভিন্ন সুইমিংপুল ইত্যাদিতে পুরুষ মহিলা সমবেত হয়ে আড্ডা দিয়ে গোসল দেয়, সাঁতার কাটে। এসব গোসলখানা বা সুইমিংপুলে পুরুষদের জন্য লুঙ্গি বা এমন কাপড় দ্বারা শরীর আবৃত করে গোসলে প্রবেশ জায়িয হবে যার মাধ্যমে শরীরের সতরের অংশ কাপড় ভিজলেও প্রকাশ পায় না। কিন্তু মহিলাদের এসব গোসলখানায় প্রবেশ জায়িয নেই। মহিলাদের এসব গোসলখানায় প্রবেশ থেকে বারণ করতে পুরুষদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তবে হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেয়েদের দু’টি বিশেষ অবস্থার কথা তুলে ধরেছেন, যে অবস্থায় তারা এসব হাম্মামে প্রবেশ করতে পারে। অর্থাৎ যখন তার জন্য গোসল জরুরী হয়ে পড়বে এবং এখানে প্রবেশ ছাড়া কোন উপায় নেই, সেই অপারগ অবস্থায় মহিলা এসব গোসলখানায় প্রবেশ করতে পারে। তবে এক্ষেত্রেও সে একাকি প্রবেশ করবে অথবা সতর ঢাকা অবস্থায় প্রবেশ করবে। কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হাদীসে প্রমাণ হলো, মেয়েদের জন্য প্রয়োজন ছাড়া এসব গোসলখানায় প্রবেশ জায়িয নেই। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৭৭-[৫৯] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ইযার (লুঙ্গি) ব্যতীত গোসলখানায় প্রবেশ না করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও কিয়ামতের দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার সহধর্মিণীকে গোসলখানায় প্রবেশ না করায় এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন এমন খাবার মাজলিসে না বসে, যেখানে মদ পরিবেশন করা হয়। (তিরমিযী ও নাসায়ী)[1]
وَعَنْ جَابِرٌ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلَا يَدخلِ الحمّامَ بِغَيْر إِزارٍ وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلَا يدْخل حَلِيلَتَهُ الْحَمَّامَ وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلَا يَجْلِسُ عَلَى مَائِدَةٍ تُدَارُ عَلَيْهَا الْخمر» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যাঃ হাদীসে ঈমানদার ব্যক্তির তিনটি গুণাবলী উল্লেখ করা হয়েছে। এই তিনটি গুণাবলী উল্লেখের মাধ্যমে মূলত ঈমানদার ব্যক্তিকে তিনটি জিনিস পরিহারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে এবং আখিরাতের দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সে এই তিন কাজ করবে না।
প্রথম : সে লুঙ্গি অর্থাৎ সতর ঢাকার আবরণ ছাড়া গোসলখানায় প্রবেশ করবে না। এ সংক্রান্ত আরো বিবরণ আমরা উপরে দেখে এসেছি।
দ্বিতীয় : সে তার হালীলাহ্ তথা তার স্ত্রীকে এসব গোসলখানায় প্রবেশ করতে দিবে না। মেয়েদের এসব গোসলখানায় প্রবেশ যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি তার স্বামীর দায়িত্ব হলো তার স্ত্রীকে এমন জায়গায় প্রবেশ করতে বাধা দেয়া। স্বামী তার স্ত্রীকে বারণ না করলে স্বামীও গোনাহগার হবে।
তৃতীয় : যে কর্মটি হাদীসে নিষেধ করা হয়েছে তা হলো, এমন খাবারের টেবিলে খেতে না বসা যেখানে মদ পরিবেশন করা হয়। মদপানকে কুরআন ও হাদীসে কঠিনভাবে হারাম করা হয়েছে। হারাম বা গোনাহের কাজে জড়িত হওয়া যেমন অপরাধ, তেমনি তার প্রতি সমর্থন বা তা ঘৃণা না করাও একটি অপরাধ।
অতএব যে টেবিলে মদ পরিবেশন হয় সেই টেবিলে বসে খাওয়া ঈমানদার ব্যক্তির আত্মমর্যাদার বিপরীত। সে হয়ত মদ পানে বাধা দিবে নতুবা এখান থেকে উঠে চলে যাবে। কোনটিই না করলে মদপানে তার সমর্থন বা অন্তত ঘৃণা নেই তা প্রমাণিত হয়। তাই হাদীসে তা নিষেধ করা হয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৭৮-[৬০] সাবিত (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আনাস (রাঃ)-কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিযাব লাগানো সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। জবাবে তিনি বললেনঃ যদি আমি তাঁর মাথার সাদা চুলগুলো গুণে দেখতে চাইতাম, তবে অনায়াসে গুণতে পারতাম (অর্থাৎ- এমন অধিক পরিমাণে সাদা হয়নি)। তিনি বললেনঃ অতএব তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) খিযাব লাগাননি। অপর এক বর্ণনায় এ কথাটি বর্ধিত আছে যে, আবূ বকর(রাঃ) মেহেদী ও কাতাম ঘাস মিশ্রিত খিযাব লাগিয়েছেন। আর ’উমার(রাঃ) নিরেট মেহেদীর খিযাব লাগিয়েছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
عَن ثابتٍ قَالَ: سُئِلَ أَنَسٌ عَنْ خِضَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: لَوْ شِئْتَ أَنْ أَعُدَّ شَمَطَاتٍ كُنَّ فِي رَأْسِهِ فَعَلْتُ قَالَ: وَلَمْ يَخْتَضِبْ زَادَ فِي رِوَايَةٍ: وَقَدِ اخْتَضَبَ أَبُو بَكْرٍ بِالْحِنَّاءِ وَالْكَتَمِ وَاخْتَضَبَ عُمَرُ بِالْحِنَّاءِ بحتا
ব্যাখ্যাঃ (سُئِلَ أَنَسٌ عَنْ خِضَابِ النَّبِىِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ) তিনি বলেন, আনাস (রাঃ)-কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিযাব সম্পর্কে তথা তিনি করতেন, কি করতেন না, সে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ
(لَوْ شِئْتَ أَنْ أَعُدَّ شَمَطَاتٍ كُنَّ فِي رَأْسِهِ فَعَلْتُ) যদি আমি তাঁর মাথায় কালো চুলের সাথে মিশে থাকা পাকা চুল গণনা করতে চাইতাম তাহলে গণনা করতে পারতাম। তিনি এর দ্বারা সংখ্যায় খুব কম তা বুঝাতে চেয়েছেন।
(قَالَ: وَلَمْ يَخْتَضِبْ) তিনি স্পষ্ট উত্তর দেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনই মাথায় খিযাব লাগান নেই। [আনাস (রাঃ)] অপর এক বর্ণনায় বলেনঃ আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) মেহেদী এবং কাতাম দিয়ে খিযাব লাগাতেন- (বুখারী ও মুসলিম)। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ : কিতাবুল লিবাস)
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৭৯-[৬১] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নিজের দাড়িতে হলুদ রং দ্বারা হলদে করতেন, এমনকি তাতে তাঁর কাপড় হলদে হয়ে যেত। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি হলুদ রং ব্যবহার করেন কেন? উত্তরে তিনি বললেনঃ আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এটা ব্যবহার করতে দেখেছি। বস্তুতঃ তাঁর কাছে এ রঙের চেয়ে অন্য কোন রং অধিক প্রিয় ছিল না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর সমস্ত কাপড় এমনকি পাগড়ীও এ রঙে রঞ্জিত করতেন। (আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّهُ كَانَ يَصْفِّرُ لِحْيَتَهُ بِالصُّفْرَةِ حَتَّى تَمْتَلِئَ ثِيَابُهُ مِنَ الصُّفْرَةِ فَقِيلَ لَهُ: لِمَ تُصْبِغُ بِالصُّفْرَةِ؟ قَالَ: أَنِّي رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصْبُغُ بِهَا وَلَمْ يَكُنْ شَيْءٌ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْهَا وَقد كَانَ يصْبغ ثِيَابَهُ كُلَّهَا حَتَّى عِمَامَتَهُ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যাঃ ইবনু ‘উমার (রাঃ) صُفْرَةٌ ‘সুফরাহ্’ (তথা ‘আরশ এক ধরনের লতা জাতীয় গাছ যার রং যা‘ফরানের মতো) দ্বারা তার দাড়িকে রং করতেন ফলে তার কাপড় সুফরার রঙে ভরে যেত। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো : আপনি কেন সুফরাহ্ দিয়ে দাড়ি রং করেন? তিনি উত্তর দিলেন : আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এটা দ্বারা দাড়ি রং করতে দেখেছি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট দাড়ি রং করার জন্য তা (সুফরাহ্) ছিল খুবই প্রিয়।
(وَقد كَانَ يصْبغ ثِيَابَهُ كُلَّهَا) ইবনু ‘উমার (রাঃ) সুফরাহ্ ব্যবহারের ফলে কাপড় রং পাগড়ী রঙিন হয়ে যেত। তিনি সুফরাহ্ দিয়ে কাপড় রং পাগড়ী রঙিয়ে তা পরিধান করতেন তা উদ্দেশ্য নয়। কেননা অপর হাদীসে সুফরাহ্ বা যা‘ফরান দিয়ে রং করে কাপড় পরিধান করতে নিষেধ করা হয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৮০-[৬২] ’উসমান ইবনু ’আবদুল্লাহ ইবনু মাওহাব (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি (একবার) উম্মু সালামাহ্ (রাঃ)-এর নিকট গেলাম। তখন তিনি আমাদের সম্মুখে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কয়েক গাছি চুল বের করে আনলেন যা (মেহেদী দ্বারা) খিযাব করা ছিল। (বুখারী)[1]
وَعَن عُثْمَانَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَوْهَبٍ قَالَ: دَخَلْتُ عَلَى أُمِّ سَلَمَةَ فَأَخْرَجَتْ إِلَيْنَا شَعْرًا مِنْ شَعْرِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مخضوبا. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ ‘উসমান ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আমি উম্মু সালামাহ্ (রাঃ)-এর গৃহে প্রবশে করি, অতঃপর তিনি আমাদেরকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিযাব করা একটি চুল বের করে দেখান। ইবনু মাজাহ ও আহমাদ উক্ত হাদীসে বৃদ্ধি করে বলেন, মেহেদী এবং কাতাম দ্বারা চুলটি খিযাব করা ছিল। কিন্তু পূর্বে উল্লেখিত আনাস (রাঃ)-এর হাদীসে রয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো খিযাব করতেন না। অতএব উভয় হাদীসের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করা যায় এভাবে :
তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অধিকাংশ অবস্থার দিকে বিবেচনা করে বলেছেন, তিনি খিযাব করতেন না। আর যে হাদীসে খিযাবের কথা বলেছেন যেটা স্বল্পতার ক্ষেত্রে বিবেচনা করা এবং এটাও হতে পারে যে, একটি বাস্তবতার উপর ভিত্তি করে বলা হয়েছে আর অন্যটি রূপক অর্থে বলা হয়েছে।
বাস্তবতা হলো : মাথার চুলের রং পরিবর্তনের কারণ হলো মাথা ব্যথার কারণে মেহেদী ব্যবহার করা অথবা অতিরিক্ত সুগন্ধি ব্যবহার করা। যার ফলে খিযাব মনে হতো। আর রূপক অর্থে বার্ধক্যের শুরুতে চুল লালচে হয়ে যায় যা খিযাবের মতো দেখায়। আমার নিকট গ্রহণযোগ্য মত হচ্ছে খিযাব না করাটা বার্ধক্যের কারণে মাথায় খিযাব লাগানোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আর করাটা দাড়িতে কোন কোন চুল পেকে গেলে সে ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আল্লাহই এ ব্যাপারে ভালো জানেন।
এই মর্মে ইমাম বুখারী (রহিমাহুল্লাহ) ইসমা‘ঈলীর সুত্রে বর্ণনা করেন : উম্মু সালামাহ্ (রাঃ)-এর নিকট নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দাড়ির একটি চুল ছিল, যাতে মেহেদী এবং কাতামের চিহ্ন ছিল। অতএব এ হাদীসটি উপরোক্ত সম্ভাবনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। যেমনটি শামায়িল অধ্যায়ে আবূ হুরায়রা কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল : নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি খিযাব করতেন? তিনি উত্তর দেন, হ্যাঁ। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৮১-[৬৩] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এক হিজড়াকে আনা হলো, সে তার হাতে এবং পায়ে মেহেদী লাগিয়ে রেখেছিল। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, এটার এ অবস্থা কেন? সাহাবীগণ বললেনঃ সে নারীদের বেশ ধারণ করেছে। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে শহর হতে বের করে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। সুতরাং তাকে শহরের বাইরে নাক্বী’ নামক স্থানে নির্বাসিত করা হলো। অতঃপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রসূল! আমরা কি তাকে কতল করে দেব? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ সালাত আদায়কারী ব্যক্তিদেরকে কতল করতে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: أَتَى رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِمُخَنَّثٍ قَدْ خَضَبَ يَدَيْهِ وَرِجْلَيْهِ بِالْحِنَّاءِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا بَالُ هَذَا؟» قَالُوا: يَتَشَبَّهُ بِالنِّسَاءِ فَأَمَرَ بِهِ فَنُفِيَ إِلَى النَّقِيعِ. فَقيل: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَلَا تَقْتُلُهُ؟ فَقَالَ: «إِنِّي نُهِيتُ عَنْ قَتْلِ الْمُصَلِّينَ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যাঃ আবূ হুরায়রা বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট একজন মুখান্নাস তথা হিজড়া ব্যক্তিকে আনা হলে তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ এ লোকটির কি হয়েছে? সাহাবীগণ বললেনঃ সে মহিলাদের সাথে সামঞ্জস্য রাখে, কথাবার্তায়, কাজকর্মে এবং চলাফেরায় এমনকি মেহেদী ব্যবহারেও। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে বের করে দিতে বললেন। এরপর তাকে নাক্বী‘ নামক স্থানে নিয়ে যাওয়া হলো। বলা হলো : হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমরা কি তাকে হত্যা করব? অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আমাকে মুসল্লী তথা মু’মিনদেরকে হত্যা করতে নিষেধ করা হয়েছে। এ হাদীস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সালাত পরিত্যাগকারীকে হত্যা করা যাবে। এটা ইমাম শাফি‘ঈ-এর অনুসারীদেরও মতো। কেননা মুসল্লী বা সালাত আদায়কারী তাকেই বলা যাবে যে অধিকাংশ সময় সালাত আদায় করে থাকে, যদিও এক বা দুই বার সালাত ছুটে যায়। যারা শুধু এক দু’বার সালাত আদায় করে তাদেরকে সাধারণত মুসল্লী বলা হয় না। অতএব তাদেরকে হত্যা করা যাবে, যেহেতু তারা ইসলামের সবচেয়ে বড় নিদর্শনকে পরিত্যাগ করেছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৮২-[৬৪] ওয়ালীদ ইবনু ’উকবাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কা জয় করলেন, তখন মক্কাবাসীরা তাদের ছোট ছোট বাচ্চাদেরকে তাঁর খিদমাতে আনতে শুরু করে আর তিনি তাদের জন্য বারাকাতের দু’আ করতেন এবং তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। (বর্ণনাকারী) ওয়ালীদ বলেন, আমাকেও তাঁর খিদমাতে আনা হলো, সে সময় আমার গায়ে খলূক সুগন্ধি মাখা ছিল। সে (রঙিন) খলূক সুগন্ধির দরুন তিনি আমাকে স্পর্শ করেননি। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن الوليدِ بن عقبةَ قَالَ: لَمَّا فَتَحَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَكَّةَ جَعَلَ أَهْلُ مَكَّةَ يَأْتُونَهُ بصبيانهم فيدعو لَهُم بِالْبركَةِ وَيمْسَح رؤوسهم فَجِيءَ بِي إِلَيْهِ وَأَنَا مُخَلَّقٌ فَلَمْ يَمَسَّنِي من أجل الخَلوق. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি মুনকার য‘ঈফ হওয়ার কারণ হলো এর সনদে আছে ‘‘আবদুল্লাহ আল হামদানী’’, আর ইনিই হলেন আবূ মূসা। ইনি একজন অপরিচিত বর্ণনাকারী। দেখুন- তাহক্বীক মুসনাদে আহমাদ- শু‘আয়ব আরনাউত্বব : ১৬৪২৬।
ব্যাখ্যাঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কা বিজয় করেন তখন মক্কাবাসীরা তাদের শিশুদেরকে তাঁর নিকট আনতে শুরু করল এবং তিনি তাদের শিশুদের জন্য অথবা শিশুদের কারণে মক্কাহ্বাসীদের জন্য বারাকাতের দু‘আ করলেন ও তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। বর্ণনাকারী ওয়ালীদ বলেনঃ আমাকেও তার নিকট আনা হলো, খলূক তথা যা‘ফরান মিশ্রিত সুগন্ধি মাখানো অবস্থায়, ফলে তিনি খলূকের কারণে আমাকে স্পর্শ করলেন না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকলেন। কেননা এটা ছিল মহিলাদের সুগন্ধি। যাতে স্পর্শ করার ফলে মহিলাদের সাদৃশ্য অনুকরণ করা না হয়। কেননা পুরুষদের জন্য মহিলাদের সাদৃশ্য ধারণ করা হারাম। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৮৩-[৬৫] আবূ কতাদাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললেনঃ আমার চুল ঘাড় পর্যন্ত পৌঁছেছে। সুতরাং আমি কি তা আঁচড়িয়ে রাখতে পারি? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হ্যাঁ এবং তাকে সযত্নে রাখো। বর্ণনাকারী বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হ্যাঁ এবং তাকে যত্ন করো বলার কারণে আবূ কতাদাহ্ দৈনিক দু’বার তাতে তেল মালিশ করতেন। (মালিক)[1]
وَعَنْ أَبِي قَتَادَةَ أَنَّهُ قَالَ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ لِي جُمَّةً أَفَأُرَجِّلُهَا؟ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «نَعَمْ وَأَكْرِمْهَا» قَالَ: فَكَانَ أَبُو قَتَادَةَ رُبَّمَا دَهَنَهَا فِي الْيَوْمِ مَرَّتَيْنِ مِنْ أَجْلِ قَوْلُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «نِعْمَ وَأَكْرمهَا» . رَوَاهُ مَالك
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সানাদ বিচ্ছিন্ন এবং এর মতনে উল্টাপাল্টা (ইযত্বিরাব) রয়েছে। এর ইনকিত্বা‘ তথা বিচ্ছিন্নতা হলো, নাসায়ীতে ২/২৯২ এসেছে, ইবনু মিকদাম বাহ্যিকভাবে বিশুদ্ধ কিন্তু সে সূক্ষ্মভাবে তাদলীস করত। বিস্তারিত দেখুন- গয়াতুল মিন্নাহ ফী ইতমামি তামামিল মিন্নাহ ১/৫৪।
ব্যাখ্যাঃ আবূ কতাদাহ্ (রাঃ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলেন, আমার জুম্মা তথা কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুল আছে। আমি কি তা চিরুণী দিয়ে আঁচড়াবো এবং ছেড়ে রাখব? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হ্যাঁ, তাকে চিরুণী কর এবং তেল দিয়ে ভালোভাবে যত্ন কর। বর্ণনাকারী বলেন, তাই আবূ কতাদাহ্ -এর এ কথার প্রেক্ষিতে ‘‘হ্যাঁ তাকে যত্ন কর’’। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৮৪-[৬৬] হাজ্জাজ ইবনু হাসসান (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা (শিশুকালে) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)-এর নিকট গেলাম। আমার ভগ্নি মুগীরাহ্ সেদিনকার ঘটনাটি আমাকে (এভাবে) বর্ণনা করেছেন যে, তুমি তখন ছোট বাচ্চা ছিলে। তোমার চুলের দু’টি বেণি অথবা দু’টি গুচ্ছ ছিল। তখন আনাস (রাঃ) তোমার মাথার উপরে হাত ফিরিয়ে তোমার জন্য বারাকাতের দু’আ করলেন এবং বললেনঃ তার এ বেণি দু’টি কেটে ফেলো অথবা বলেছেনঃ মুড়িয়ে ফেলো। কেননা এটা ইয়াহূদীদের আচরণ। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن الحجاح بْنِ حَسَّانَ قَالَ دَخَلْنَا عَلَى أَنَسِ بْنِ مَالك فَحَدَّثَتْنِي أُخْتِي الْمُغِيرَةُ قَالَتْ: وَأَنْتَ يَوْمَئِذٍ غُلَامٌ وَلَكَ قَرْنَانِ أَوْ قُصَّتَانِ فَمَسَحَ رَأْسَكَ وَبَرَّكَ عَلَيْكَ وَقَالَ: «احْلِقُوا هَذَيْنِ أَوْ قُصُّوهُمَا فَإِنَّ هَذَا زِيُّ الْيَهُود» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে মুগীরাহ্ বিনতু হাস্সান (حسّن) নামে একজন বর্ণনাকারী আছে, যে মাকবূলাহ্ (مقبولة)। তার ব্যাপারে ইমাম মুনযিরী (রহিমাহুল্লাহ) চুপ থেকেছেন। আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাতে ৯০০ নং-এ বলেছেনঃ সানাদ য‘ঈফ। হাফিয ইবনু হাজার আল ‘আসকালানী (রহিমাহুল্লাহ) ‘‘আত্ তাকরীবে’’ তাকে মাকবূলাহ্ বলেছেন।
ব্যাখ্যাঃ (دَخَلْنَا) আমি ও আমার পরিবার প্রবেশ করলাম। (فَحَدَّثَتْنِي أُخْتِي الْمُغِيرَةُ) অতঃপর আমাকে বোন মুগীরাহ্ হাদীস বর্ণনা করলেন। (وَأَنْتَ يَوْمَئِذٍ) যখন তুমি আনাস (রাঃ)-এর নিকট গিয়েছিলেন। (غُلَامٌ) ছোট ছেলে। (وَلَكَ قَرْنَانِ) তখন তোমার মাথায় চুলের দু’টি বেনী ছিল। (أَوْ قُصَّتَانِ) অথবা কপালের উপর চুলের দু’টি বেনী ছিল। কোন কোন বর্ণনাকারী (أَوْ) ‘আও’ বলে সন্দেহ পোষণ করেছেন। (فَمَسَحَ) অতঃপর আনাস ইবনু মালিক মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
এক্ষেত্রে ‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী কারী (রহিমাহুল্লাহ) ভুল করে ضمير-কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দিকে ফিরিয়েছেন। এটা তার স্পষ্ট ভুল ধারণ। (وَبَرَّكَ عَلَيْكَ থ والله اعلم) তোমার বারাকাতের জন্য দু‘আ করলেন এবং বললেন, তোমার চুলের এই বেনী দু’টিকে চেছে ফেল অথবা কেটে ফেল, কেননা এটা ইয়াহূদীদের নিদর্শন এবং তাদের সন্তানদের মাথায় চুল রাখার অভ্যাস। সুতরাং এর বৈপরীত্য আনয়ন কর।
শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ্ (রহিমাহুল্লাহ) ‘সিরাতুল মুসতাকিম’ গ্রন্থে বলেনঃ চুল বেনী করে শিং তৈরি করা নিষেধ হওয়ার কারণ হলো এটা ইয়াহূদীদের একটা নিদর্শন। অতএব এ কারণে ইসলাম এটাকে অপছন্দ করেছে। আর এ থেকে এটাও জানা যায় যে, ইয়াহূদীদের সকল কাজের বিরোধিতা করা উচিত। এমনকি চুল রাখার ক্ষেত্রেও। তবে কপালের উপরিভাগে যদি একগুচ্ছ চুল রাখা হয় এটাতে কোন সমস্যা নেই। কেননা এটাতে ইয়াহূদীদের সামঞ্জস্যতা নেই। এছাড়া হাদীস থেকে আরো জানা যাচ্ছে যে, মাথার চুল রঙ করা ইয়াহূদীদের কাজ, ইসলামের সুন্নাত নয়। অতএব বাচ্চাদেরকে এ থেকে বিরত রাখা এবং তাদের মাথা মুণ্ডন করা উচিত। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪১৯৩)
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৮৫-[৬৭] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীলোকের মাথা মুড়িয়ে ফেলতে নিষেধ করেছেন। (নাসায়ী)[1]
وَعَنْ عَلِيٍّ قَالَ: نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ تَحْلِقَ الْمَرْأَةُ رَأْسَهَا. رَوَاهُ النَّسَائِيُّ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ- এর সনদে উল্টাপাল্টা (ইযত্বিরাব) আছে। এই উল্টাপাল্টা করেছে ‘হুমাম’ নামের বর্ণনাকারী। বিস্তারিত দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ৬৭৮ নং, ২/১২৪ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাদের মাথার চুল মুড়িয়ে ফেলতে নিষেধ করেছেন। কেননা পুরুষদের দাড়ি থাকলে যেমন সুন্দর লাগে তেমনি মেয়েদের মাথায় লম্বা চুল থাকলে সুন্দর লাগে। সুতরাং মেয়েদের কোন অবস্থাতেই চুল মুণ্ডন করা জায়িয নেই। এমনকি হজ্জ ও ‘উমরাহ্ থেকে হালাল হওয়ার ক্ষেত্রেও না। বরং তারা এক্ষেত্রে তাকসীর বা চুলের অগ্রভাগ থেকে সামান্য অংশ কর্তন করবে। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৩য় খন্ড, হাঃ ৯১৪)
হাদীসের ভাষ্য থেকে বুঝা যায় যে, পুরুষদের জন্য মাথায় চুল মুণ্ডন করা জায়িয, এতে কোন মতবিরোধ নেই। এটা ‘আলী (রাঃ)-এর সুন্নাত। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাত অনুসরণ করতে আদেশ করে বলেন- তোমাদের উচিত আমার সুন্নাত এবং সঠিক পথ প্রদর্শিত খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাতকে আঁকড়িয়ে ধরা। অথবা আমরা বলতে পারি এটা, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সরাসরি সুন্নাত নয়, কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবীগণ সব সময় চুল মুণ্ডন করতেন না। কেবলমাত্র হজ্জ ও ‘উমরাহ্ শেষ করার পর চুল মুণ্ডন করতেন। সুতরাং মুণ্ডন করার অনুমতি আছে, এটাই গ্রহণযোগ্য মত (আল্লাহ ভালো জানেন)। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৮৬-[৬৮] ’আত্বা ইবনু ইয়াসার (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে ছিলেন। এ সময় দাড়ি চুলে এলোমেলো এক ব্যক্তি এলো, তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাত দ্বারা তার প্রতি ইশারা করলেন, যেন তিনি নির্দেশ দিচ্ছেন যে, সে যেন তার চুল দাড়ি ঠিক করে আসে। লোকটি তাই করল। অতঃপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে ফিরে এলো। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমাদের কেউ শয়তানের মতো এলোমেলো চুলে আসতে, তা অপেক্ষা এখন যে অবস্থায় আছো তা কি উত্তম নয়! (মালিক)[1]
وَعَن عطاءِ بن يسارٍ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الْمَسْجِدِ فَدَخَلَ رَجُلٌ ثَائِرُ الرَّأْسِ وَاللِّحْيَةِ فَأَشَارَ إِلَيْهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِيَدِهِ كَأَنَّهُ يَأْمُرُهُ بِإِصْلَاحِ شَعْرِهِ وَلِحْيَتِهِ فَفَعَلَ ثُمَّ رَجَعَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَلَيْسَ هَذَا خَيْرًا مِنْ أَنْ يَأْتِيَ أَحَدُكُمْ وَهُوَ ثَائِرُ الرَّأْسِ كَأَنَّهُ شَيْطَان» . رَوَاهُ مَالك
ব্যাখ্যাঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনার মসজিদে অবস্থান করছিলেন, এমন সময় এলোকেশী এক লোক মসজিদে প্রবেশ করলেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকটিকে হাতের ইঙ্গিতে মাথার চুল আঁচড়িয়ে ঠিক করতে বললেন। লোকটিকে হাতের ইঙ্গিতে মাথার চুল আঁচড়িয়ে ঠিক করতে বললেন। লোকটি এটা বুঝতে পেরে মসজিদ থেকে বেরিয়ে চুল ঠিক করে আবার তার নিকট ফিরে এলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অথবা সাধারণভাবে সকলের উদ্দেশে বললেনঃ তোমাদের কেউ শয়তানের মতো এলোমেলো চুল নিয়ে প্রবেশ করার চেয়ে এটা উত্তম নয় কি? (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৮৭-[৬৯] [সলিহ ইবনু আবূ হাসসান (রহিমাহুল্লাহ)] সা’ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব (রহিমাহুল্লাহ) হতে শুনেছেন। তিনি [সা’ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব (রহিমাহুল্লাহ)] বলেনঃ নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা পবিত্র, তিনি পবিত্রতাকেই ভালোবাসেন। তিনি পরিচ্ছন্ন, তাই পরিচ্ছন্নতাকেই পছন্দ করেন। তিনি দয়ালুও, তাই দয়া করাকে ভালোবাসেন। তিনি দাতা, তাই দানশীলতাকে পছন্দ করেন। সুতরাং তোমরা নিজেদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখো। রাবী বলেন, সম্ভবতঃ ইবনু মুসাইয়্যাব বলেছেনঃ তোমাদের (ঘর-দুয়ার ও) আঙ্গিনাকে ইয়াহূদীদের মতো (অপরিচ্ছন্ন) রেখো না। বর্ণনাকারী বলেন, ইবনু মুসাইয়্যাব-এর বর্ণিত এ কথাগুলো আমি মুহাজির ইবনু মিসমার-এর কাছে বর্ণনা করলাম। তখন তিনি বললেনঃ অবিকল এ কথাগুলো আমাকে ’আমির ইবনু সা’দ তাঁর পিতার মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেছেন। তবে তিনি নিঃসন্দেহে বলেছেনঃ তোমরা নিজেদের আঙ্গিনাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখো। (তিরমিযী)[1]
وَعَن ابنِ الْمسيب سُمِعَ يَقُولُ: إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ يُحِبُّ الطِّيبَ نَظِيفٌ يُحِبُّ النَّظَافَةَ كَرِيمٌ يُحِبُّ الْكَرَمَ جَوَادٌ يُحِبُّ الْجُودَ فَنَظِّفُوا أُرَاهُ قَالَ: أَفْنِيَتَكُمْ وَلَا تشبَّهوا باليهود
قَالَ: فذكرتُ ذَلِك لمهاجرين مِسْمَارٍ فَقَالَ: حَدَّثَنِيهِ عَامِرُ بْنُ سَعْدٍ عَنْ أَبِيهِ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِثْلَهُ إِلَّا أَنَّهُ قَالَ: «نَظِّفُوا أَفْنِيتَكُمْ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘খালিদ ইবনু ইলইয়াস’’ য‘ঈফ রাবী। তার ব্যাপারে ইবনু হিব্বান বলেনঃ এ রাবী বিশ্বস্ত রাবীদের নিকট থেকে হাদীস জাল করত। কাজেই এ ব্যক্তি হাদীস জালকারী। ইমাম বুখারী বলেনঃ সে মুনকারুল হাদীস কোন কিছুই না। ইমাম নাসায়ী বলেন যে, মাতরূকুল হাদীস। বিস্তারিত দেখুন- তুহফাতুল আহওয়াযী ৮/৬৮, হাঃ ২৭৯৯।
ব্যাখ্যাঃ নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা সকল প্রকার দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত এবং পবিত্র। তিনি পবিত্রতা তথা উত্তম অবস্থা উত্তম কথা, বান্দার সুগন্ধি মাখা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ‘আমল পছন্দ করেন। তিনি পরিষ্কার, তাই পরিষ্কারকে পছন্দ করেন। তিনি দয়ালু, দয়া এবং দান-খয়রাতকে পছন্দ করেন। সুতরাং তোমরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাক।
ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ বাক্যে "ف" (ফা) অব্যয়টি বুঝাচ্ছে এটা উহ্য একটি শর্তের জবাবে ব্যবহৃত হয়েছে। তা হচ্ছে : যখন এটা প্রতীয়মান হলো যে, আল্লাহ পবিত্রতাকে পছন্দ করেন, তখন তোমরা যথাসম্ভব পবিত্রতা বজায় রাখবে এবং তোমাদের বাড়ীর আঙিনাকে পরিষ্কার করে রাখবে। এতে বুঝা যায় যে, প্রকৃতপক্ষই সে মেহমানদারীতে পছন্দ করে। কেননা বাড়ীর আঙিনা পরিষ্কার দেখেই বুঝা যায় তার বাড়ীতে মেহমানের আগমন ঘটেছিল।
সালিহ ইবনু আবূ হাসসান বলেনঃ আমার মনে হয় সা‘ঈদ ইবনু মুসাইয়্যাব বলেছেনঃ তোমাদের বাড়ীর আঙিনা এবং ঘরের দরজা জানালা পরিষ্কার করে রাখবে এবং ইয়াহূদীদের সাথে সামঞ্জস্য রাখবে না। অর্থাৎ কৃপণতাবশতঃ আতর সুগন্ধি ব্যবহার না করে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পবিত্রতা ত্যাগ করে ইয়াহূদীদের মতো হয়ো না। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৭৯৯)
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - চুল আঁচড়ানো
৪৪৮৮-[৭০] ইয়াহ্ইয়া ইবনু সা’ঈদ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি সা’ঈদ ইবনু মুসাইয়্যাব (রহঃ)-কে বলতে শুনেছেন : আল্লাহর বন্ধু ইব্রাহীম খলীল (আ.) -ই প্রথম মানুষ যিনি মেহমানের আতিথেয়তা করেছেন। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি খৎনা করেছেন। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি গোঁফ কেটেছেন। আর তিনিই প্রথম মানুষ যিনি চুল সাদা হতে দেখেছেন। তখন তিনি বলে উঠলেন : হে প্রভু! এটা কি? মহান আল্লাহ তা’আলা বললেনঃ হে ইব্রাহীম! এটা মর্যাদার প্রতীক। তখন ইব্রাহীম (আ.) প্রার্থনা করলেন : হে প্রভু! আমার মর্যাদাকে আরো বৃদ্ধি করে দাও। (মালিক)[1]
وَعَنْ يَحْيَى بْنِ سَعِيدٍ أَنَّهُ سَمِعَ سَعِيدَ بْنَ الْمُسَيَّبِ يَقُولُ: كَانَ إِبْرَاهِيمُ خَلِيلُ الرَّحْمَنِ أوَّلَ النَّاس ضيَّف الضَّيْف وَأَوَّلَ النَّاسِ اخْتَتَنَ وَأَوَّلَ النَّاسِ قَصَّ شَارِبَهُ وَأَوَّلَ النَّاسِ رَأَى الشَّيْبَ فَقَالَ: يَا رَبِّ: مَا هَذَا؟ قَالَ الرَّبُّ تَبَارَكَ وَتَعَالَى: وَقَارٌ يَا إِبْرَاهِيمُ قَالَ: رَبِّ زِدْنِي وَقَارًا. رَوَاهُ مَالك
ব্যাখ্যাঃ ইয়াহ্ইয়া ইবনু সা‘ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব-কে বলতে শুনেছেন : ইবরাহীম খলীলুর রহমান সর্বপ্রথম মেহমানের জন্য মেহমানদারী করেছেন। আর তিনিই মানুষের মধ্যে সর্বপ্রথম খৎনা করেছেন। কেননা ইতিপূর্বে সমস্ত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খৎনা অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেছেন। আর সর্বসাধারণের জন্য তখনো খৎনা করার আদেশ দেয়া হয়নি। যখন থেকে ইবরাহীম (আ.) খৎনা করলেন তখন থেকে এটা সমস্ত মানুষের জন্য সুন্নাত হিসেবে সাব্যস্ত হল। তবে তারা ব্যতীত যারা খৎনা অবস্থায়ই জন্মগ্রহণ করেছে। তিনিই সর্বপ্রথম গোফ কেটে ছোট করেছেন। এটা এ কারণে যে, হতে পারে তার পূর্বের লোকেদের গোফ বেশী লম্বা হতো না। শুধু তাঁরই লম্বা গোফ হয়েছিল, তাই কেটেছেন। অথবা পূর্বের লোকেরা গোফের পূজা করতো না। অথবা এটাও হতে পারে যে, তিনি বেশী করে কেটে ছোট করেছেন যার ফলশ্রুতিতে পরবর্তী লোকেরা তার অনুসরণ করেছে। তিনি প্রথম লোক যিনি মাথায় সাদা চুল দেখেছেন এবং আল্লাহকে প্রশ্ন করেছেন- হে প্রভু! এটা কি? আল্লাহ তা‘আলা জবাব দিলেন, হে ইবরাহীম! এটা মর্যাদার প্রতীক অর্থাৎ সাদা চুল প্রকাশ পাওয়া মানে তার জ্ঞানের পরিপক্কতা আসা এবং সকল কাজে ধিরস্থিরতা আসার যা ধৈর্য, সহিষ্ণুতা এবং ক্ষমার মতো মহৎগুণের সমাবেশ ঘটায়। তিনি আল্লাহ তা‘আলাকে বললেন- হে আল্লাহ! আমার মর্যাদাকে আরো বাড়িয়ে দাও। (ইমাম মুওয়াত্ত্বা হাদীসটি বর্ণনা করেন)
‘আল্লামা সুয়ূত্বী (রহিমাহুল্লাহ) মুওয়াত্ত্বা কিতাবের হাশিয়াতে উল্লেখ করেছেন, ইব্রাহীম (আ.) সর্বপ্রথম মানুষ যিনি তার নখ কর্তন করেছেন এবং প্রথম মানব যিনি চুল আঁচড়িয়েছেন এবং নাভির নীচের লোম পরিষ্কার করে চেছে ফেলেছেন, পায়জামা পরিধান করেছেন, দাড়ির পাকা চুলকে মেহেদী ও কাতামের মাধ্যমে খিযাব করেছেন এবং প্রথম মিম্বারে খুত্ববাহ্ দিয়েছেন এবং সর্বপ্রথম আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছেন এবং সর্বপ্রথম ব্যক্তি যিনি যুদ্ধের ময়দানে সৈন্যবাহিনীকে সুবিন্যস্ত করেছেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - ছবি সম্পর্কে বর্ণনা
৪৪৮৯-[১] আবূ ত্বলহাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) সে ঘরে প্রবেশ করেন না যাতে কুকুর রয়েছে এবং সে ঘরেও না যাতে আছে (প্রাণীর) ছবি। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ التَّصَاوِيرِ
عَن أبي طَلْحَة قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تَدْخُلُ الْمَلَائِكَةُ بَيْتًا فِيهِ كَلْبٌ وَلَا تصاوير»
ব্যাখ্যাঃ (لَا تَدْخُلُ الْمَلَائِكَةُ) মালাক (ফেরেশতা) প্রবেশ করে না অর্থাৎ রহমাতের মালাক হিফাযাতকারী এবং মৃত্যু মালাক নয়, কেননা তারা সার্বক্ষণিক কাজের জন্য আদিষ্ট এবং তারা সর্বদা দায়িত্ব রত থাকেন।
(بَيْتًا فِيهِ كَلْبٌ) যে বাড়ীতে কুকুর আছে। এখানে বাড়ী বলতে বুঝায়, যে জায়গায় মানুষ বসবাস করে, তা ঘর হোক বা তাঁবু হোক অথবা অন্য কিছু। কুকুর বলতে সব ধরনের কুকুর উদ্দেশ্য। কেননা হাদীসের বর্ণনায় অনির্দিষ্টভাবে কুকুর কথাটি এসেছে, তবে ইমাম খত্ত্বাবী এবং একদল ‘আলিমের মতে উক্ত বিধান হতে ঐ সমস্ত কুকুরকে আলাদা করা হয়েছে যাদের থাকার ব্যাপারে শারী‘আতে অনুমতি আছে। তা হচ্ছে শিকারী কুকুর, পশু চারণ এবং কৃষি খামারে নিয়োজিত কুকুর। কিন্তু ইমাম খত্ত্বাবীর নিকট গ্রহণযোগ্য মত হচ্ছে বাড়ীতে যে কোন ধরনের কুকুর রাখা নিষেধ।
(وَلَا تصاوير) এবং মালাক ঐ গৃহেও প্রবেশ করে না যেখানে ছবি আছে। ছবি বলতে সব ধরনের প্রাণীর ছবি উদ্দেশ্য। ইমাম খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ যে ছবির কারণে বাড়ীতে মালাক প্রবেশ করে না, তা হলো যা শখের বশত সংরক্ষণ করা হারাম। আর তা হচ্ছে যে সমস্ত প্রাণীর জীবন আছে এমন প্রাণীর ছবি যার মাথা কেটে দেয়া হয়নি। অথবা যা অবহেলিত হয়নি বিছানা এবং বালিশের স্বভাবে।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আমার নিকট গ্রহণযোগ্য মত হচ্ছে, যে কোন কুকুর এবং ছবি থাকলেই ঘরে মালাক প্রবেশ করবে না। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খাটের নীচে একটি কুকুর ছানা মরে থাকায় জিবরীল (আ.) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘরে প্রবেশ করেনি। অথচ এক্ষেত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওজর ছিল। তিনি জানতেন না। এতদসত্ত্বেও জিবরীল (আ.) গৃহে প্রবেশ করেননি। কারণ ঘরে কুকুর ছিল। ঘরে মালাক প্রবেশ না করার কারণ হচ্ছে কোন প্রাণীর ছবি থাকা। কেননা ছবির মাধ্যমে আল্লাহ ছাড়া অন্যের ‘ইবাদাত করা হয়। আর কুকুর থাকলে মালাকের ঘরে প্রবেশ না করার কারণ হলো- সে অপবিত্র জিনিস খায়। আবার কোন কোন কুকুরকে শয়তান বলা হয়েছে। যেহেতু মালাক হচ্ছে শয়তানের বিপরীত। তাই যারা কুকুর শখ করে পালন করে তাদের শাস্তি হিসেবে তাদের ঘরে মালাক প্রবেশ করে না এবং তাদের জন্য রহমাতের দু‘আ করে না। (ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৯৪৯; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - ছবি সম্পর্কে বর্ণনা
৪৪৯০-[২] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) মায়মূনাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন। একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিন্তিত অবস্থায় ভোর করলেন এবং বললেনঃ জিবরীল (আ.) এ রাত্রে আমার সাথে সাক্ষাৎ করবেন বলে ওয়া’দা করেছিলেন, কিন্তু সাক্ষাৎ করেননি। আল্লাহর কসম! তিনি তো কখনো আমার সাথে কথা দিয়ে খেলাফ করেননি। অতঃপর তাঁর মনে পড়ল ঐ কুকুর ছানাটির কথা, যা তাঁর তাঁবুর নিচে ছিল। তখনই তিনি তাকে ঐখান থেকে বের করে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। এরপর তাকে বের করে দেয়া হলো। অতঃপর কুকুরটি যে জায়গায় বসা ছিল, তিনি সে জায়গায় কিছু পানি নিজ হাতে নিয়ে ছিটিয়ে দিলেন। পরে যখন বিকাল হলো জিবরীল (আ.) তার সাথে সাক্ষাৎ করলেন। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ গত রাত্রে আপনি আমার সাথে সাক্ষাৎ করার ওয়া’দা করেছিলেন। তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, কিন্তু আমরা এমন ঘরে প্রবেশ করি না যে ঘরে কুকুর বা ছবি থাকে। পরের দিন সকালে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমস্ত কুকুর মেরে ফেলার জন্য নির্দেশ দিলেন। এমনকি ছোট ছোট বাগানের কুকুরগুলোকেও মারার হুকুম দিলেন তবে বড় বড় বাগানের কুকুরগুলোকে ছেড়ে দেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ التَّصَاوِيرِ
وَعَن ابنِ عبَّاسٍ عَنْ مَيْمُونَةَ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أصبحَ يَوْمًا واجماً وَقَالَ: «إِنَّ جِبْرِيلَ كَانَ وَعَدَنِي أَنْ يَلْقَانِيَ اللَّيْلَةَ فَلَمْ يَلْقَنِي أَمَ وَاللَّهِ مَا أَخْلَفَنِي» . ثُمَّ وَقَعَ فِي نَفْسِهِ جِرْوُ كَلْبٍ تَحْتَ فُسْطَاطٍ لَهُ فَأَمَرَ بِهِ فَأُخْرِجَ ثُمَّ أَخَذَ بيدِه مَاء فنضحَ مَكَانَهُ فَلَمَّا أَمْسَى لقِيه جِبْرِيلَ فَقَالَ: «لَقَدْ كُنْتَ وَعَدْتَنِي أَنْ تَلْقَانِي الْبَارِحَةَ» . قَالَ: أَجَلْ وَلَكِنَّا لَا نَدْخُلُ بَيْتًا فِيهِ كَلْبٌ وَلَا صُورَةٌ فَأَصْبَحَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَئِذٍ فَأَمَرَ بِقَتْلِ الْكلاب حَتَّى إِنه يَأْمر بقتل الْكَلْب الْحَائِطِ الصَّغِيرِ وَيَتْرُكُ كَلْبَ الْحَائِطِ الْكَبِيرِ. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ (أصبحَ يَوْمًا واجمًا) একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যুষে চিন্তিত, ব্যথিত ও চুপচাপ উপনীত হলেন। সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, তা দেখে মায়মূনাহ্ (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আজকের মতো চিন্তিত অবস্থায় আপনাকে আর কোন দিন দেখিনি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বললেনঃ জিবরীল (আ.) আজ রাতে আমার সাথে দেখা করার ওয়া‘দা করেছিলেন কিন্ত দেখা করেননি। আল্লাহর কসম, তিনি কখনো আমার সঙ্গে ওয়া‘দা ভঙ্গ করেননি।
এ প্রসঙ্গে ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ কোন ব্যক্তি তার সঙ্গী অথবা অন্য কাউকে চিন্তিত ও ব্যথিত হতে দেখলে তার কারণ সম্পর্কে জানতে চাওয়া মুস্তাহাব এবং যথাসম্ভব তাকে সহযোগিতা করা উচিত অথবা তার সাথে ব্যথিত হওয়া উচিত অথবা তার সেই অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার উপায় দেখিয়ে দেয়া এবং আল্লাহ ও রসূলের প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে সতর্ক থাকা। এটা কোন শর্তসাপেক্ষে স্থগিত হয়ে যেতে পারে। অথবা মনে হতে পারে এটা কোন সময়সাপেক্ষ অথচ তা সময়ের সাথে সম্পৃক্ত নয় ইত্যাদি। আর এ হাদীসে আরো শিক্ষণীয় হচ্ছে : যদি মানুষের কোন কাজ বাধাগ্রস্ত হয় তাহলে তার কারণ সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করা, যেমনটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত হাদীসের চিন্তা ভাবনা করে খাটেব নীচ থেকে কুকুরের বাচ্চা বের করেছিলেন। যেমনভাবে আল্লাহ পবিত্র কুরআনের সূরাহ্ আল আ‘রাফ-এ বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُمْ مُبْصِرُونَ
‘‘যারা তাকওয়া অবলম্বন করে শয়তানের স্পর্শে তাদের মনে কুমন্ত্রণা জাগলে তারা আল্লাহ্কে স্মরণ করে, তখন তাদের ঈমান-চক্ষু খুলে যায়।’’ (সূরাহ্ আল আ‘রাফ ৭ : ২০১)
(ثُمَّ وَقَعَ فِي نَفْسِه جِرْوُ كَلْبٍ) অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মনে হলো জিবরীল (আ.)-এর না আসার কারণ হলো এই কুকুরের ছানাটি যা খাটের নীচে মরে ছিল। তখন তিনি উক্ত কুকুর ছানাকে বের করার আদেশ দিলেন এবং তা বের করে আনা হলো। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে পানি নিয়ে উক্ত স্থানে পানি ছিটিয়ে হালকাভাবে ধুয়ে দিলেন। এরপর রাত হলে জিবরীল (আ.) আগমন করলেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আপনি গত রাতে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার ওয়া‘দা করেছিলেন। তিনি বললেন, হ্যাঁ, কিন্তু আমরা সেই ঘরে প্রবেশ করি না যেখানে কুকুর এবং প্রাণীর ছবি থাকে।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পানি দিয়ে নিজ হাতে কুকুরের জায়গাটি পরিষ্কার করেছিলেন। এখান থেকেই একদল ‘আলিম বলেন, কুকুর নাপাক। কারণ হলো স্থানটিতে পানি ছিটানো এবং ধৌত করা। মালিকীগণ বলে থাকেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত স্থানে কুকুরের পেশাব পায়খানার সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বিধায় ধৌত করে ছিলেন।
(فَأَصْبَحَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَئِذٍ فَأَمَرَ بِقَتْلِ الْكلاب) সকাল হলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল স্থানের সকল কুকুরকে মেরে ফেলতে আদেশ দিলেন, এমনকি তিনি ছোট ছোট বাগানের কুকুরগুলোকেও মেরে ফেলতে বললেন যেহেতু ছোট বাগানে পাহারা দেয়ার প্রয়োজন নেই। তবে বড় বড় বাগানের কুকুর ছেড়ে দিতে বলেছেন যেহেতু কুকুর ছাড়া বড় বাগান পাহারা দেয়া কষ্টকর। (শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২১০৫/৮২)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - ছবি সম্পর্কে বর্ণনা
৪৪৯১-[৩] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় গৃহে (প্রাণীর) ছবিযুক্ত কোন জিনিসই রাখতেন না; বরং তা ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলতেন। (বুখারী)[1]
بَابُ التَّصَاوِيرِ
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمْ يَكُنْ يَتْرُكُ فِي بَيْتِهِ شَيْئًا فِيهِ تَصَالِيبُ إِلَّا نَقَضَهُ. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ (لَمْ يَكُنْ يَتْرُكُ فِي بَيْتِه شَيْئًا فِيهِ تَصَالِيبُ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাড়ীতে যে কোন প্রকার ছবি রাখতেন না বরং তা ভেঙে ফেলতেন বা তা নিশ্চিহ্ন করে ফেলতেন। হাদীসে উল্লেখিত تَصَالِيبُ এর অর্থ تَصاوير (ছবিসমূহ)। (إِلَّا نَقَضَهٗ) উহা মুছে ফেলতেন অথবা কেটে বলতেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - ছবি সম্পর্কে বর্ণনা
৪৪৯২-[৪] উক্ত রাবী [’আয়িশাহ্ সিদ্দিকা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। একদিন তিনি একটি গদি (আসন) ক্রয় করলেন। তাতে প্রাণীর অনেকগুলো ছবি ছিল। যখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা দেখলেন, দরজায় দাঁড়িয়ে গেলেন, ঘরে প্রবেশ করলেন না। আমি তাঁর চেহারায় ঘৃণার ভাব দেখতে পেলাম। ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেন, তখন আমি বললামঃ হে আল্লাহর রসূল! আমি (আমার গুনাহের জন্য) আল্লাহ ও তাঁর রসূল-এর কাছে তওবা্ করছি। বলুন তো, আমি কি অপরাধ করেছি? তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ গদিটি কেন? আমি বললামঃ আপনার বসার এবং বিছানা হিসেবে ব্যবহার করার জন্য আমি কিনেছি। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ সমস্ত ছবি যারা তৈরি করেছে, কিয়ামতের দিন তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে এবং তাদেরকে বলা হবে, যা তোমরা বানিয়েছ তাতে জীবন দান করো, অতঃপর বললেন, মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) কখনো এমন ঘরে প্রবেশ করেন না, যে ঘরে (প্রাণীর) ছবি থাকে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ التَّصَاوِيرِ
وَعَنْهَا أَنَّهَا اشْتَرَتْ نُمْرُقَةً فِيهَا تَصَاوِيرُ فَلَمَّا رَآهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَامَ عَلَى الْبَابِ فَلَمْ يَدْخُلْ فَعَرَفْتُ فِي وَجْهِهِ الْكَرَاهِيَةَ قَالَتْ: فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أتوبُ إِلى الله وإِلى رَسُوله مَا أذنبتُ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا بَالُ هَذِهِ النُّمْرُقَةِ؟» قُلْتُ: اشْتَرَيْتُهَا لَكَ لِتَقْعُدَ عَلَيْهَا وَتَوَسَّدَهَا فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ أَصْحَابَ هَذِهِ الصُّوَرِ يُعَذَّبُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَيُقَالُ لَهُمْ: أَحْيُوا مَا خَلَقْتُمْ . وَقَالَ: «إِنَّ الْبَيْتَ الَّذِي فِيهِ الصُّورَةُ لَا تدخله الْمَلَائِكَة»
ব্যাখ্যাঃ ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেন, তিনি ছোট একটি গদি ক্রয় করেছিলেন যাতে প্রাণীর ছবি অংকিত ছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাড়ীতে প্রবেশকালে যখন তা দেখতে পেলেন। তিনি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন প্রবেশ করলেন না।
(فَعَرَفْتُ فِي وَجْهِهِ الْكَرَاهِيَةَ) আমি তার চেহারায় অপছন্দের ছাপ (রাগ) দেখতে পেলাম। অতঃপর আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি তাওবাহ্ করছি এবং আল্লাহ ও তার রসূলের সন্তুষ্টি কামনা করছি। ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এতে ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর উত্তম শিষ্টাচারের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, ফলে অপরাধ বুঝার আগেই তাওবাহ্ করে ফেলেছেন।
(مَا أذنبتُ) আমি বুঝতে পারিনি যে, কিসে গুনাহের কাজ হল? তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ চাদরটি এখানে কেন? আমি বললাম, এটা আপনার জন্য ক্রয় করেছি যাতে আপনি তাতে বসতে পারেন এবং বালিশ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। (‘আয়িশাহ্ (রাঃ) তখনো অপছন্দের সঠিক কারণ জানতে পারেননি, তিনি ধারণা করেছেন সম্ভবত তা বাড়ীর কারুকাজ বর্ধিত করেছে সেজন্য তিনি অপছন্দ করেছেন। মূলত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছবির কারণে রাগ করেছিলেন।’’
(فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: "إِنَّ أَصْحَابَ هٰذِهِ الصُّوَرِ يُعَذَّبُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَيُقَالُ لَهُمْ: أَحْيُوا مَا خَلَقْتُمْ") অতঃপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ নিশ্চয় এ ছবি অঙ্কনকারীদেরকে কিয়ামতের দিন শাস্তি প্রদান করা হবে এবং বলা হবে, তোমরা যা তৈরি করেছ তাকে জীবন দান কর। কেননা তারা ছবি তৈরির মাধ্যমে আল্লাহর সৃষ্টির সামঞ্জস্য বিধান করেছে। ফলে তাদের অক্ষমতা প্রমাণ করতেই আল্লাহ জীবিত করার আদেশ করবেন।
এ হাদীস থেকে বুঝা যায়, ছবি অঙ্কন করা হারাম এবং তা ব্যবহার করাও নিষিদ্ধ। কেননা তাতে কঠিন শাস্তিত রয়েছে এবং দুনিয়ার সাজসজ্জা রয়েছে।
(وَقَالَ: إِنَّ الْبَيْتَ الَّذِىْ فِيهِ الصُّورَةُ) এবং তিনি আরো বলেন, যে বাড়ীতে/ঘরে ছবি থাকে সেই বাড়ীতে/ঘরে মালাক (ফেরেশতা) প্রবেশ করে না। হাদীস থেকে আরো জানা যায় যে, বাড়ীতে যে কোন ধরনের ছবি (যার রূহ আছে এবং যার রূহ নেই) এবং যে কোন স্থানে (প্রবেশদ্বারে বা চলালের রাস্তায় বা ঘরে) সাজিয়ে রাখা নিষেধ। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - ছবি সম্পর্কে বর্ণনা
৪৪৯৩-[৫] উক্ত রাবী [’আয়িশাহ্ সিদ্দিকা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। একদিন তিনি ঘরের জানালায় একটি পর্দা ঝুলিয়ে দিলেন। তাতে ছিল প্রাণীর প্রতিকৃতি। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা ছিঁড়ে ফেললেন। অতঃপর তিনি [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] সে কাপড়ের খন্ড দ্বারা দু’টি বালিশ বানিয়ে নিলেন এবং তা ঘরের মধ্যেই ছিল। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাতে হেলান দিয়ে বসতেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ التَّصَاوِيرِ
وعنها أَنَّهَا كَانَت عَلَى سَهْوَةٍ لَهَا سِتْرًا فِيهِ تَمَاثِيلُ فَهَتَكَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاتَّخَذَتْ مِنْهُ نُمرُقتين فكانتا فِي الْبَيْت يجلسُ عَلَيْهِم
ব্যাখ্যাঃ (أَنَّهَا كَانَت عَلَى سَهْوَةٍ لَهَا سِتْرًا) তিনি তার [‘আয়িশাহ্ (রাঃ)] নিচু জমিতে তৈরি ছোট একটি বাড়ীতে পর্দা লাগিয়ে ছিলেন যাতে প্রাণীর ছবি অংকিত ছিল।
(فَهَتَكَهُ النَّبِىُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ) তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা খুলে ফেললেন এবং ছিঁড়ে ফেলে দিলেন। অতঃপর তিনি [‘আয়িশাহ্ (রাঃ)] তা দ্বারা দু’টি চাদর তৈরি করে বাড়ীতে রেখে দিলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ঐ দু’টিতে বসতেন।
ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ যদি প্রশ্ন করা হয় এ হাদীস এবং পূর্ববর্তী হাদীসের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান কিভাবে সম্ভব? তাহলে এর উত্তর হচ্ছে, হয়তো উক্ত পর্দায় কোন নিষিদ্ধ প্রাণীর ছবি অঙ্কন করা ছিল না তথাপি তিনি ছিঁড়ে ফেলেছেন। যেহেতু এ অধ্যায়ের পরবর্তী হাদীসে এসেছে, আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে পাথর এবং মাটিকে পরিধান করাতে আদেশ দেননি। অথবা যদি প্রাণীর ছবি ধরা হয় তাহলে তা খুলে প্রাণীর মাথা মুছে ফেলে চাদর তৈরি করে ব্যবহার করা যাবে সেই অর্থে প্রয়োজ্য হয়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - ছবি সম্পর্কে বর্ণনা
৪৪৯৪-[৬] উক্ত রাবী [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন এক যুদ্ধে রওয়ানা হয়ে গিয়েছেন। আর আমি (তাঁর অবর্তমানে) একখানা কাপড় নিয়ে পর্দাস্বরূপ ঘরের দরজায় ঝুলিয়ে রেখেছিলাম। যখন তিনি সফর শেষে ফিরে এলেন এবং পর্দাটি দেখলেন, তখন এটা নিয়ে ছিঁড়ে ফেললেন। অতঃপর বললেনঃ নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে এ আদেশ করেননি যে, আমরা ইট ও পাথরকেও যেন কাপড়-চোপড় পরিধান করাই। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ التَّصَاوِيرِ
وَعَنْهَا أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَرَجَ فِي غَزَاةٍ فَأَخَذَتْ نَمَطًا فَسَتَرَتْهُ عَلَى الْبَابِ فَلَمَّا قَدِمَ فَرَأَى النَّمَطَ فَجَذَبَهُ حَتَّى هَتَكَهُ ثُمَّ قَالَ: «إِنَّ اللَّهَ لَمْ يَأْمُرْنَا أَنْ نَكْسُوَ الْحِجَارَةَ وَالطِّينَ»
ব্যাখ্যাঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন একটি ধর্ম যুদ্ধে বের হলে আমি [‘আয়িশাহ্ (রাঃ)] উটের পিঠের পালানে ব্যবহৃত একটি কাপড়কে ঘরের দরজার পর্দা হিসেবে লাগাই। তিনি ফিরে এসে ঘরে প্রবেশ করে উক্ত পর্দার কাপড়টি দেখতে পেয়ে টেনে নামিয়ে ফেলেন এবং বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে আদেশ করেননি যে, আমরা পাথর এবং মাটিকে পরিধান করাই। ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ উক্ত কাপড়টিতে পাখা বিশিষ্ট ঘোড়ার ছবি ছিল, তাই তিনি ছবি নষ্ট করে দিলেন এবং তা দ্বারা বুঝালেন যে, এটা বালিশ বা বসার জন্য ব্যবহার করা বৈধ। আর দেয়ালকে ঢেকে রাখা নিষেধ দ্বারা মাকরূহ বা অপছন্দনীয় কাজ বুঝিয়েছেন যা হারাম নয়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - ছবি সম্পর্কে বর্ণনা
৪৪৯৫-[৭] উক্ত রাবী [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন ’আযাব ভোগ করবে এমন সব লোক যারা আল্লাহর সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্যতা করে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ التَّصَاوِيرِ
وَعَنْهَا عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «أَشَدُّ النَّاسِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ الَّذِينَ يُضَاهُونَ بِخلق الله»
ব্যাখ্যাঃ (أَشَدُّ النَّاسِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ...) কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি দেয়া হবে তাদেরকে যারা আল্লাহর সৃষ্টির সাথে সামঞ্জস্য কোন প্রাণীর ছবি অঙ্কন করে।
কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হাদীসের মর্ম হচ্ছে- তারা এমন কাজ করে যাতে আল্লাহর সৃষ্টি তথা মাখলূকাতের সাথে সামঞ্জস্য বিধান করে, অথবা তাদের ছবি অঙ্কনের মাধ্যমে আল্লাহর কর্মের সাথে সামঞ্জস্য হয়।
ইবনুল মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ যদি তারা এই ‘আক্বীদাহ্ পোষন করে যে, তাদের কর্ম আল্লাহর কর্মের মতই, তাহলে তারা কাফির। তাদের জঘন্য কুফরী কর্মের বৃদ্ধির জন্য শাস্তিও বৃদ্ধি করে দেয়া হবে। নতুবা হাদীসের মর্ম হবে ধমকী প্রদান করা। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - ছবি সম্পর্কে বর্ণনা
৪৪৯৬-[৮] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তা’আলা বলেছেনঃ আমার সৃষ্টির মতো করে যে ব্যক্তি (কোন প্রাণী) সৃষ্টি করতে যায়, তার চেয়ে বড় যালিম আর কে আছে? তারা একটি পিঁপড়া বা শস্যদানা কিংবা একটি যব সৃষ্টি করুক তো দেখি? (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ التَّصَاوِيرِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ ذَهَبَ بِخلق كخلقي فلْيخلقوا ذَرَّةً أَوْ لِيَخْلُقُوا حَبَّةً أَوْ شَعِيرَةً
ব্যাখ্যাঃ (وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ ذَهَبَ بِخلق كخلقي...) তার চেয়ে বড় যালিম আর কেউ নেই, যে তার সৃষ্টি কর্মের মাধ্যমে আল্লাহর কর্মের সাথে সামঞ্জস্য বিধান করে। (যদি তারা তাই মনে করে থাকে) তাহলে তারা যেন ছোট একটি পিপড়া সৃষ্টি করে দেখায় অথবা একটি গম অথবা যব তৈরি করে দেখায়। মূলত এটা তাদের অক্ষমতার বিরুদ্ধে একটি চ্যালেঞ্জ। ইবনু বাত্ত্বল (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ) এ হাদীস থেকে বুঝাতে চেয়েছেন, ছবি বলতে সব ধরনের ছবি অন্তর্ভুক্ত, যার ছায়া আছে এবং যার ছায়া নেই। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৯৫৩)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - ছবি সম্পর্কে বর্ণনা
৪৪৯৭-[৯] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেনঃ (কিয়ামতের দিন) আল্লাহ তা’আলার নিকট সবচেয়ে কঠিন আযাব হবে ছবি প্রস্তুতকারীদের। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ التَّصَاوِيرِ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «أَشَدُّ النَّاسِ عَذَابًا عِنْدَ اللَّهِ المصوِّرون»
ব্যাখ্যাঃ (أَشَدُّ النَّاسِ عَذَابًا عِنْدَ اللهِ المصوِّرون) কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি দেয়া হবে ছবি অঙ্কনকারীদেরকে। ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হাদীসটি সেই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে যারা মূর্তির ছবি অঙ্কন করে এবং তার পূজা করে। তারা কাফির হওয়ার কারণে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হবে। অথবা যারা আল্লাহর সৃষ্টির সাথে সাজস্য বিধান করতে সক্ষম মনে করে অথবা এটাতে বিশ্বাসী হয় তারাও কাফির এবং তাদের শাস্তিও হবে কঠিন। কিন্তু যারা ছবি অঙ্কন করে কিন্তু তাতে উক্ত দু’টি উদ্দেশ্য থাকবে না তারা ফাসিক বা পাপাচারী। এ কারণে তারা কাফির হবে না, যেমনটি অন্যান্য পাপ কাজের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - ছবি সম্পর্কে বর্ণনা
৪৪৯৮-[১০] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, প্রত্যেক ছবি প্রস্তুতকারী জাহান্নামী। সে যতগুলো ছবি তৈরি করেছে (কিয়ামতের দিন) সেগুলোর মধ্যে প্রাণ দান করা হবে এবং জাহান্নামের শাস্তি দেয়া হবে। ইবনু ’আব্বাস বলেন, যদি তোমাকে একান্তই ছবি তৈরি করতে হয়, তাহলে গাছ-গাছড়া এবং এমন জিনিসের ছবি তৈরি কর যার মধ্যে প্রাণ নেই। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ التَّصَاوِيرِ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم يَقُول: «كُلُّ مُصَوِّرٍ فِي النَّارِ يُجْعَلُ لَهُ بِكُلِّ صُورَةٍ صَوَّرَهَا نَفْسًا فَيُعَذِّبُهُ فِي جَهَنَّمَ» . قَالَ ابْن عَبَّاس: فَإِن كنت لابد فَاعِلًا فَاصْنَعِ الشَّجَرَ وَمَا لَا رُوحَ فِيهِ
ব্যাখ্যাঃ (كُلُّ مُصَوِّرٍ فِي النَّارِ يُجْعَلُ لَهُ بِكُلِّ صُورَةٍ) প্রতিটি প্রাণীর ছবি অঙ্কনকারী জাহান্নামী। কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ প্রতিটি অঙ্কনকৃত ছবির মধ্যে জীবন প্রদান করা হবে আর তা তাকে জাহান্নামে শাস্তি দিবে। অথবা প্রতিটি ছবির পরিবর্তে একজন লোক নিয়োগ করা হবে যা তাকে জাহান্নামের শাস্তি দিবে। ইবনু ‘আব্বাস বলেনঃ সে যদি কোন প্রাণীর ছবি কেউ আঁকতেই চায় তাহলে যেন কোন বৃক্ষ অথবা যার প্রাণ নেই এমন জিনিসের ছবি আঁকে।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হাদীস থেকে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, প্রাণীর ছবি অঙ্কন করা হারাম। আর তার ভয়াবহতা কঠিন, তবে কোন বৃক্ষ অথবা যার কোন প্রাণ নেই এমন ছবি অঙ্কন করা হারাম নয়, তা কোন ফলদায়ক বৃক্ষ হোক বা ফলদায়ক না হোক। এটাই অধিকাংশ ‘আলিমের মত কিন্তু মুজাহিদ এ মতের বিরোধী। তার মতে ফলদায়ক বৃক্ষের ছবি অঙ্কন করাও হারাম। (শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২১১১/১০১)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - ছবি সম্পর্কে বর্ণনা
৪৪৯৯-[১১] উক্ত রাবী [’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ যে ব্যক্তি এমন স্বপ্নের কথা বর্ণনা করবে, যা সে দেখেনি, তাকে (কিয়ামতের দিন) দু’টি যবের বীজে গিঁট লাগানোর জন্য বাধ্য করা হবে। অথচ সে কিছুতেই গিঁট লাগাতে পারবে না। আর যে ব্যক্তি অন্য লোকেদের আলোচনা কান পেতে শুনবে, অথচ তারা এ ব্যক্তির শোনাটা পছন্দ করে না অথবা তারা এ ব্যক্তি হতে দূরে থাকতে চায়, কিয়ামতের দিন তার কানে গলিত সীসা ঢেলে দেয়া হবে। আর যে লোক (কোন প্রাণীর) ছবি তৈরি করবে, তাকে শাস্তি দেয়া হবে এবং এগুলোতে প্রাণ দান করার জন্য বাধ্য করা হবে, অথচ সে কিছুতেই প্রাণ ফুঁকতে পারবে না। (বুখারী)[1]
بَابُ التَّصَاوِيرِ
وَعَنْهُ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَنْ تَحَلَّمَ بِحُلْمٍ لَمْ يَرَهُ كُلِّفَ أَنْ يَعْقِدَ بَيْنَ شَعِيرَتَيْنِ وَلَنْ يَفْعَلَ وَمَنِ اسْتَمَعَ إِلَى حَدِيثِ قَوْمٍ وَهُمْ لَهُ كَارِهُونَ أَوْ يَفِرُّونَ مِنْهُ صُبَّ فِي أُذُنَيْهِ الْآنُكُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَمَنْ صَوَّرَ صُورَةً عُذِّبَ وَكُلِّفَ أَنْ يَنْفُخَ فِيهَا وَلَيْسَ بِنَافِخٍ» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ (مَنْ تَحَلَّمَ بِحُلْمٍ لَمْ يَرَهُ كُلِّفَ...) যে ব্যক্তি স্বপ্নে কোন কিছু না দেখেও মিথ্যা স্বপ্নের দাবী করবে তাকে শাস্তি প্রদান করা হবে যতক্ষণ না সে দু’টি যবের দানা একত্রে জোড় লাগাতে সক্ষম হবে। আর বাস্তবে তা করতে সক্ষম হবে না, যার ফলশ্রুতিতে তার শাস্তি অনবরত চলতেই থাকবে।
‘আল্লামা ইবনু হাজার (রহিমাহুল্লাহ) ‘ফাতহুল বারী’ গ্রন্থে তাবারীর বরাতে বলেন, জাগ্রত অবস্থায় মিথ্যা বলার পরিণতি কখনো ভয়াবহ হতে পারে। যেমন কাউকে হত্যা বা শাস্তি প্রয়োগ অথবা কারো মাল চুরির মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান। কিন্তু এর চেয়ে আরো কঠোর শাস্তি হবে যদি স্বপ্নে কোন কিছু না দেখেই আল্লাহর নামে মিথ্যা বানিয়ে বলে। যেহেতু হাদীসে এসেছে, الرُّؤْيَا جُزْءٌ مِنَ النُّبُوَّةِ সত্য স্বপ্ন হচ্ছে নুবুওয়াতের অংশ, আর যা নুবুওয়াতের অংশ তা আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে।
(وَمَنِ اسْتَمَعَ إِلٰى حَدِيثِ قَوْمٍ وَهُمْ لَهٗ كَارِهُونَ) যারা কারো অপছন্দ সত্ত্বেও তাদের কথা শ্রবণ করবে অথবা কেউ তাদের কথা যেন না শুনে সেজন্য দূর গিয়ে কথা বলে তা সত্ত্বেও কেউ যদি সে কথা শুনার চেষ্টা করে কিয়ামতের দিন তাদের কানে শিসা গলিয়ে ঢেলে দেয়া হবে। এই কঠোর শাস্তির বিধান তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে যারা আড়ি পেতে অন্যের কথা শুনে চোগলখোরী করবে এবং ফিতনা ছড়াবে। কিন্তু যারা অন্যের কথায় আড়ি পেতে তাদের চক্রান্ত এবং ফিতনা থেকে মানুষকে সতর্ক রাখার উদ্দেশ্য রাখবে তাদের ক্ষেত্রে কঠোরতা প্রযোজ্য হবে না। এমনিভাবে যারা প্রকাশ্যে কোন কথা বলে আর অন্যেরা সহজেই তা শুনে ফেলে সে ক্ষেত্রে শ্রোতার কোন অপরাধ হবে না। কেননা তারা এক্ষেত্রে কেউ শুনাতে তাদের অপছন্দ করেনি।
(وَمَنْ صَوَّرَ صُورَةً عُذِّبَ وَكُلِّفَ أَنْ يَنْفُخَ فِيهَا) যারা কোন প্রাণীর ছবি অঙ্কন করবে ক্বিয়ামাতে তাদেরকে শাস্তি প্রদান করা হবে এবং ঐ প্রাণীতে জীবন দিতে বলা হবে। না দেয়া পর্যন্ত তাদের শাস্তি চলতেই থাকবে। যদিও তারা সক্ষম হবে না তথাপি তাদেরকে এই আদেশ করা হবে। তাদের অপারগতা প্রমাণ করার জন্য।
এ হাদীসটি তিনটি বিধানকে অন্তর্ভুক্ত করেছে যেগুলো সম্পাদন করা হারাম।
১. স্বপ্নের ব্যাপারে মিথ্যা কথা বানিয়ে বলা
২. যারা অন্যকে শুনিয়ে কথা বলতে অপছন্দ করে তথাপি কেউ তাদের কথা আড়ি পেতে শুনে।
৩. কোন প্রাণীর ছবি অঙ্কন করা। (ফাতহুল বারী ১২শ খন্ড, হাঃ ৭০৪২; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - ছবি সম্পর্কে বর্ণনা
৪৫০০-[১২] বুরয়দাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি দাবা (পাশা/শতরঞ্জ) খেলল, সে যেন তার হাতকে শূকরের রক্ত-মাংস দ্বারা রঞ্জিত করল। (মুসলিম)[1]
بَابُ التَّصَاوِيرِ
وَعَنْ بُرَيْدَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ لَعِبَ بِالنَّرْدَشِيرِ فَكَأَنَّمَا صَبَغَ يَدَهُ فِي لَحْمِ خِنْزِيرٍ وَدَمِهِ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যাঃ (مَنْ لَعِبَ بِالنَّرْدَشِيرِ فَكَأَنَّمَا صَبَغَ...) যে ব্যক্তি নারদাশীর খেলবে সে যেন তার হস্তকে শুকরের রক্ত মাংসে রঞ্জিত করে। অপবিত্র প্রাণীর রক্ত মাংসে হাতকে রঞ্জিত করার কথা নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে যাতে এ খেলায় মানুষের আগ্রহ না থাকে। ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসটি ইমাম শাফি‘ঈ এবং অধিকাংশ (জামহূর) ‘আলিমের মতে নারদ খেলা হারাম হওয়ার স্বপক্ষে দলীল। ইমাম মুনযিরী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ অধিকাংশ ‘আলিমের মতে নারদ খেলা হারাম। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ছবি সম্পর্কে বর্ণনা
৪৫০১-[১৩] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জিবরীল (আ.) আমার কাছে এসে বললেনঃ আমি গত রাতে আপনার কাছে এসেছিলাম, কিন্তু ঘরের ভিতরে প্রবেশ করতে আমাকে যে জিনিস বিরত রেখেছিল তা হলো গৃহদ্বারের ছবিগুলো এবং ঘরের দরজায় একখানা পর্দা ঝুলানো ছিল, তাতে ছিল অনেকগুলো প্রাণীর ছবি। আর ঘরের ভেতরে ছিল একটি কুকুর। সুতরাং ঐ প্রতিকৃতিগুলোর মাথা কেটে ফেলার নির্দেশ দিন, যা ঘরের দরজায় রয়েছে, তা কাটা হলে তখন তা গাছ-গাছড়ার আকৃতি হয়ে যাবে এবং পর্দাটি সম্পর্কে নির্দেশ দিন, তাকে কেটে দু’টি গদি তৈরি করে নেবে, যা বিছানা এবং পায়ের নিচে থাকবে। আর কুকুরটি সম্পর্কে নির্দেশ দিন, যেন এটাকে অবশ্যই ঘর হতে বের করে দেয়া হয়। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাই করলেন। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَتَانِي جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ قَالَ: أَتَيْتُكَ الْبَارِحَةَ فَلَمْ يَمْنَعْنِي أَنْ أَكُونَ دَخَلْتُ إِلَّا أَنَّهُ كَانَ عَلَى الْبَابِ تَمَاثِيلُ وَكَانَ فِي الْبَيْتِ قِرَامُ سِتْرٍ فِيهِ تَمَاثِيلُ وَكَانَ فِي الْبَيْتِ كَلْبٌ فَمُرْ بِرَأْسِ التِّمْثَالِ الَّذِي عَلَى بَابِ الْبَيْتِ فَيُقْطَعْ فَيَصِيرُ كَهَيْئَةِ الشَّجَرَةِ وَمُرْ بِالسِّتْرِ فَلْيُقْطَعْ فَلْيُجْعَلْ وِسَادَتَيْنِ مَنْبُوذَتَيْنِ تُوطَآنِ وَمُرْ بِالْكَلْبِ فَلْيُخْرَجْ . فَفَعَلَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ (أَتَانِي جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ قَالَ: أَتَيْتُكَ الْبَارِحَةَ...) জিবরীল আমার কাছে আগমন করে বললেনঃ আমি গত রাতে আপনার নিকটে এসেছিলাম। বাড়ীতে প্রবেশ মুখে দরজায় পর্দার ছবির কারণে প্রবেশ করতে পারিনি। দরজাতে পাতলা পশমি কাপড়ের রঙিন চাদর টাঙানো ছিল এবং ঘরে কুকুর ছিল। জিবরীল (আ.) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললেনঃ ঘরের পর্দাতে যে প্রাণীর ছবি আছে তার মাথা কেটে ফেলতে বলুন যাতে তা গাছের মতো হয়ে যায়। কেননা গাছ এবং যার প্রাণ নেই এমন ছবি অঙ্কন করা ও তার দ্বারা উপার্জন করা হারাম নয়। গাছ ফলদায়ক হোক বা না হোক এতে কোন পার্থক্য হবে না। ইবনু রাসলান বলেনঃ এটাই সমস্ত ‘আলিমের অভিমত কেবল মুজাহিদ (রহিমাহুল্লাহ) ব্যতিরিকে। তার নিকট ফলদায়ক গাছের ছবি তৈরি করা মাকরূহ, যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ ذَهَبَ يَخْلُقُ خَلْقًا كَخَلْقِي তার চেয়ে অধিক যালিম আর কে আছে যে আমার সৃষ্টির মতো সদৃশ কিছু তৈরি করে।
(وَمُرْ بِالسِّتْرِ فَلْيُقْطَعْ فَلْيُجْعَلْ وِسَادَتَيْنِ...) এবং আদেশকরণ পর্দা দিয়ে যেন ২টি বালিশ বা বিছানার চাদর তৈরি করেন যা বিছানোর কাজে ব্যবহৃত হবে এবং তাতে পদাঘাত এবং বসার মাধ্যমে অপমানিত হবে। ‘আল্লামা কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ পর্দা কেটে ২টি বালিশ বা চাদর তৈরি করার অনুমতি থেকে বুঝা যায় যে, প্রাণীর ছবিযুক্ত কাপড় দিয়ে বিছানা বা বালিশ বানানো জায়িয।
ইমাম খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) ‘‘মা‘আলিমুস্ সুনান’’ গ্রন্থে বলেনঃ এ হাদীসের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, কোন প্রাণীর ছবিযুক্ত কাপড় থেকে যদি মাথা কেটে বা মুছে ফেলে ছবির বিকৃতি ঘটানো যায় তাহলে উক্ত কাপড় ব্যবহারে কোন অসুবিধা নেই। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪১৫৪)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ছবি সম্পর্কে বর্ণনা
৪৫০২-[১৪] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন জাহান্নাম হতে এমন একটি ঘাড় বের হবে যার থাকবে দু’টি চক্ষু যারা দেখবে এবং থাকবে দু’টি কান যারা শুনবে এবং কথা বলার জন্য থাকবে রসনা। বলবে, আমাকে তিন শ্রেণীর লোকের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ১. প্রত্যেক উদ্ধত যালিম, ২. ঐ সকল লোক যারা আল্লাহর সাথে অন্যকে মা’বূদ হিসেবে ডাকে এবং ৩. ছবি অঙ্কনকারীগণ। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَخْرُجُ عُنُقٌ مِنَ النَّارِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لَهَا عَيْنَانِ تُبْصِرَانِ وَأُذُنَانِ تَسْمَعَانِ وَلِسَانٌ يَنْطِقُ يَقُولُ: إِنِّي وُكِّلْتُ بِثَلَاثَةٍ: بِكُلِّ جَبَّارٍ عَنِيدٍ وَكُلِّ مَنْ دَعَا مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آخر وبالمصوِّرين . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ (يَخْرُجُ عُنُقٌ مِنَ النَّارِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ) কিয়ামতের দিন জাহানণাম থেকে একখন্ড আগুন বের হবে যা দেখতে লম্বা গর্দান বিশিষ্ট হবে। তার দু’টি চোখ থাকবে যা দ্বারা দেখবে এবং দু’টি কান থাকবে যা দ্বারা শুনবে এবং জিহবা থাকবে যা কথা বলবে। সে বলবে, আল্লাহ তা‘আলা আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে এই তিন শ্রেণীর লোককে জাহান্নামে প্রবেশ করাব এবং সমস্ত লোকের সামনে শাস্তি প্রদান করব : ১. প্রত্যেক অত্যাচারী সীমালঙ্ঘনকারী বাতিলপন্থী ও ২. প্রত্যেক ঐ সমস্ত ব্যক্তি যারা আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্যকে শরীক করতঃ তাকে আহবান করত ৩. এবং প্রাণীর ছবি অঙ্কনকারী।
এ হাদীসে উক্ত তিন শ্রেণীর লোকের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তির ধমকী এবং নিশ্চিত ভীতি প্রদর্শন।
(মিরক্বাতুল মাফাতীহ, তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৫৭৪)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ছবি সম্পর্কে বর্ণনা
৪৫০৩-[১৫] আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা মদপান করা, জুয়া খেলা এবং ঢোল বাজানো হারাম করেছেন এবং বলেছেনঃ প্রত্যেক নেশা সৃষ্টিকারী বস্তু হারাম। কেউ কেউ বলেছেনঃ কূবাহ্ অর্থ ’’তবলা’’। (বায়হাক্বী- শু’আবুল ঈমান)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى حَرَّمَ الْخَمْرَ وَالْمَيْسِرَ وَالْكُوبَةَ وَقَالَ: كُلُّ مُسْكِرٍ حَرَامٌ . قِيلَ: الْكُوبَةُ الطَّبْلُ. رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي شعب الْإِيمَان
ব্যাখ্যাঃ (إِنَّ اللهَ تَعَالَى حَرَّمَ الْخَمْرَ وَالْمَيْسِرَ وَالْكُوبَةَ) নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা হারাম করেছেন মদ, জুয়া এবং তবলা বাজানোকে এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন- প্রত্যেক নেশা জাতীয় দ্রব্য হারাম। অর্থাৎ যে জিনিসে অধিক পরিমাণে খেলে নেশা হয় তা অল্প খাওয়াও হারাম। হাদীসে ব্যবহৃত كُوبَةَ শব্দের একাধিক অর্থ হতে পারে। কেউ বলেন, নারদ বা গুটি খেলা। কেউ বলেন, ছোট তবলা। আবার ‘কামূস’ গ্রন্থে আছে- তা হলো গুটি খেলা এবং দাবা (পাশা/শতরঞ্জ) খেলা। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ছবি সম্পর্কে বর্ণনা
৪৫০৪-[১৬] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদ, জুয়া, কূবাহ্ ও গুবায়রা হতে নিষেধ করেছেন। গুবায়রা এক প্রকারের মদ যা (আফ্রিকার) হাবশীরা বাজরা হতে প্রস্তুত করত। তা তাদের ভাষায় সুকুর্কাহ্। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَالْكُوبَةِ والغبيراء. الغبيراء: شَرَابٌ يَعْمَلُهُ الْحَبَشَةُ مِنَ الذُّرَةِ يُقَالُ لَهُ: السكركة. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ (أَنَّ النَّبِىَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهٰى عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ) হাদীসটিতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাবাশীদের ভুট্টার তৈরি মদ খেতে এবং জুয়া ও তবলা বা নারদ খেলতে নিষেধ করেছেন। নিহায়াহ্ গ্রন্থে রয়েছে, সুকুরকাহ্ এক প্রকার মদ যা ভুট্টা থেকে তৈরি করা হয়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ছবি সম্পর্কে বর্ণনা
৪৫০৫-[১৭] আবূ মূসা আল আশ্’আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি নারদ খেলল, সে আল্লাহ ও তাঁর রসূল-এর নাফরমানী করল। (আহমাদ ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي مُوسَى الْأَشْعَرِيِّ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ لَعِبَ بِالنَّرْدِ فَقَدْ عَصَى اللَّهَ وَرَسُولَهُ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ (مَنْ لَعِبَ بِالنَّرْدِ فَقَدْ عَصَى اللهَ وَرَسُولَهٗ) যারা নারদ বা গুটি খেলবে তারা আল্লাহ ও তার রসূলের নাফরমানী করবে। যেহেতু এটা এক প্রকার জুয়া খেলা। এটা সর্বসম্মতিক্রমে হারাম যেমনটি ইতিপূর্বে বলা হয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ছবি সম্পর্কে বর্ণনা
৪৫০৬-[১৮] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক ব্যক্তিকে দেখলেন, সে কবুতরের পিছনে দৌড়াচ্ছে (খেলা করছে)। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ এক শয়তান আরেক শয়তানের পিছনে ছুটছে। (আহমাদ, আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ ও বায়হাক্বী- শু’আবুল ঈমান)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأَى رَجُلًا يَتْبَعُ حَمَامَةً فَقَالَ: «شَيْطَانٌ يَتْبَعُ شَيْطَانَةً» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَأَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ وَالْبِيهَقِيُّ فِي شُعَبِ الْإِيمَانِ
ব্যাখ্যাঃ (أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأَى رَجُلًا يَتْبَعُ حَمَامَةً...) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক ব্যক্তিকে দেখলেন সে একটি কবুতরকে অনুসরণ করে তার পিছে পিছে দৌড়িয়ে খেলছে তখন তিনি বললেন, এক শয়তান আরেক শয়তানের অনুসরণ করছে। তাকে শয়তান বলার কারণ হলো, সে সত্য পথ থেকে দূরে রয়েছে এবং কাজে ব্যস্ত রয়েছে যাতে কোন কল্যাণ নেই। আর তা আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করছে এবং এমন কাজে ব্যস্ত রয়েছে যা তাকে দীন ও দুনিয়া অন্বেষণ থেকে অন্যদিকে ফিরিয়ে দিচ্ছে।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ কবুতরকে ডিম এবং বাচ্চা ফুটানোর কাজে অথবা শখের জন্য অথবা চিঠিপত্র বহন করার জন্য পালন করা জায়িয। কিন্তু তা দ্বারা খেলাধূলা করা মাকরূহ। তবে যদি কবুতর উড়িয়ে লটারী দেয়া হয় তবে তার সামর্থ্য গ্রহণ করা হবে না। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ছবি সম্পর্কে বর্ণনা
৪৫০৭-[১৯] সা’ঈদ ইবনু আবুল হাসান (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় তাঁর নিকট এক ব্যক্তি এসে বলল, হে ইবনু ’আব্বাস! আমি এমন ব্যক্তি, হস্তশিল্পই যার পেশা। আমি এ সকল ছবি তৈরি করে থাকি। তখন ইবনু ’আব্বাস(রাঃ) বললেনঃ আমি তোমাকে তাই বর্ণনা করব, যা আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে শুনেছি। তিনি বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ছবি তৈরি করবে, আল্লাহ তা’আলা নিশ্চয় তাকে শাস্তি দেবেন, যে পর্যন্ত না সে তার মধ্যে প্রাণ ফুঁকবে, অথচ সে কস্মিনকালেও এটাকে প্রাণ দিতে পারবে না। এ কথা শুনে লোকটি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে ভীষণভাবে হতাশ হয়ে পড়ল এবং তার মুখমণ্ডলে ফ্যাকাসে হয়ে উঠল। (তার অবস্থা দেখে) ইবনু ’আব্বাস(রাঃ) বললেনঃ আফসোস তোমার প্রতি! যদি তুমি এ পেশা ছাড়া অন্য কিছু করতে না চাও, তাহলে এ সকল গাছ-গাছড়া এবং এমন সব জিনিসের ছবি নির্মাণ করো যার মধ্যে প্রাণ নেই। (বুখারী)[1]
عَنْ سَعِيدِ بْنِ أَبِي الْحَسَنِ قَالَ: كُنْتُ عِنْدَ ابْنِ عَبَّاسٍ إِذْ جَاءَهُ رَجُلٌ فَقَالَ: يَا ابْنَ عَبَّاسٍ إِنِّي رَجُلٌ إِنَّمَا مَعِيشَتِي مِنْ صَنْعَةِ يَدِي وَإِنِّي أَصْنَعُ هَذِهِ التَّصَاوِيرَ فَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ: لَا أُحَدِّثُكَ إِلَّا مَا سَمِعْتُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَمِعْتُهُ يَقُولُ: «مَنْ صَوَّرَ صُورَةً فَإِنَّ اللَّهَ مُعَذِّبُهُ حَتَّى يَنْفُخَ فِيهِ الرُّوحَ وَلَيْسَ بِنَافِخٍ فِيهَا أَبَدًا» . فَرَبَا الرَّجُلُ رَبْوَةً شَدِيدَةً وَاصْفَرَّ وَجْهُهُ فَقَالَ: وَيْحَكَ إِنْ أَبَيْتَ إِلَّا أَنْ تَصْنَعَ فَعَلَيْكَ بِهَذَا الشَّجَرِ وَكُلِّ شَيْءٍ لَيْسَ فِيهِ روح. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ সা‘ঈদ ইবনু আবুল হাসান বলেন, আমি ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট ছিলাম। এমতাবস্থায় তার নিকট এক ব্যক্তি এসে বলল : হে ইবনু ‘আব্বাস! আমি ছবি অঙ্কন করি। তখন ইবনু ‘আব্বাস বললেনঃ আমি তোমাকে এ প্রসঙ্গে সেই হাদীস বলছি যা আমি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট থেকে শুনেছি। আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কোন প্রাণীর ছবি অঙ্কন করবে আল্লাহ তাকে ততক্ষণ পর্যন্ত শাস্তি প্রদান করবেন যতক্ষণ না সে ঐ ছবিগুলোতে প্রাণ দিতে পারে। বাস্তবে সে প্রাণ সোচ্চার করতে সক্ষম হবে না। ফলে তার শাস্তি অনবরত চলতেই থাকবে। এ কথা শুনে লোকটি ভয় পেয়ে গেল এবং তার শ্বাস-প্রশ্বাস দীর্ঘ হয়ে গেল এবং চেহারা হলুদ হয়ে গেল। এমতাবস্থায় দেখে ইবনু ‘আব্বাস তাকে বললেন, তোমার ধ্বংস হোক, যদি তুমি এ কাজ করতেই চাও, তাহলে শুধু গাছ পালার ছবি আঁকবে এবং এমন জিনিসের ছবি আঁকবে যার প্রাণ নেই।
এ হাদীস থেকে জানা যায় প্রাণীর ছবি অঙ্কন করা হারাম এবং এর উপার্জনও হারাম, তবে গাছ এবং যার প্রাণ নেই এমন ছবি অঙ্কন বৈধ। (ফাতহুল বারী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২২২৫; ১০ম খন্ড, হাঃ ৫৯৬৩)
পরিচ্ছেদঃ ৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ছবি সম্পর্কে বর্ণনা
৪৫০৮-[২০] ’আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন (ওফাতের প্রাক্কালে) অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তখন তাঁর সহধর্মিণীদের কেউ (আবিসিনিয়ার) মারিয়্যাহ্ গির্জার কথা উল্লেখ করলেন। (ইসলামের প্রাথমিক যুগে) উম্মু সালামাহ্ ও উম্মু হাবীবাহ্ (রাঃ) হিজরত করে হাবাশাহ্ দেশে গিয়েছিলেন, তাঁরা ঐ গির্জার সৌন্দর্য এবং তাতে যে সকল ছবি ছিল তার বর্ণনা করলেন। (এ কথা শুনে) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথা উঠিয়ে বললেনঃ তারা এমন এক সম্প্রদায়, যখন তাদের মধ্যে নেক বান্দা মারা যেত, তখন তারা ঐ ব্যক্তির কবরের উপরে মসজিদ বানিয়ে নিত। অতঃপর তথায় তারা এ সকল ছবি বানাত, বস্তুতঃ তারা আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: لَمَّا اشْتَكَى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ذَكَرَ بَعْضُ نِسَائِهِ كَنِيسَةً يُقَالُ لَهَا: مَارِيَّةُ وَكَانَتْ أُمُّ سَلمَة وَأم حَبِيبَة أتتا أرضَ الْحَبَشَة فَذَكرنَا مِنْ حُسْنِهَا وَتَصَاوِيرَ فِيهَا فَرَفَعَ رَأْسَهُ فَقَالَ: «أُولَئِكَ إِذَا مَاتَ فِيهِمُ الرَّجُلُ الصَّالِحُ بَنَوْا عَلَى قَبْرِهِ مَسْجِدًا ثُمَّ صَوَّرُوا فِيهِ تِلْكَ الصُّور أُولَئِكَ شرار خلق الله»
ব্যাখ্যাঃ : (لَمَّا اشْتَكَى النَّبِىُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন অসুস্থ হয়ে পড়লেন তখন তার কতিপয় স্ত্রী তার নিকটে ইয়াহূদী খ্রীস্টানদের নবী এবং গির্জার কথা আলোচনা করলেন যেগুলোকে মারিয়া বলা হতো, উম্মু সালামাহ্ এবং উম্মু হাবীবাহ্ হাবাশাহ্ (বর্তমানে ইথিওপিয়া) দেশে যাওয়ায় সেখানকার গির্জার সৌনদর্যতা এবং তার ভিতর মূর্তির ছবি সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথা উঠিয়ে বললেনঃ শোন, তারা এমন লোক যে, তাদের মধ্যে কোন সৎ লোক মারা গেলে তার কবরে মসজিদ (গির্জা) তৈরি করত, এরপর তাতে তাদের মূর্তি অঙ্কন করে রাখত। অর্থাৎ নেককার ব্যক্তিদের স্মরণ রাখার জন্য এবং তাদের মতো ‘ইবাদাতে উদ্বুদ্ধ হওয়ার জন্য ছবি রাখা হয়। যারা এ কাজ করেছে তাদের মৃত্যুর পর শয়তান নতুন প্রজন্মের কাছে তার কর্মকে সুন্দর করে তুলে ধরে এবং বলে তোমাদের পূর্ব পুরুষেরা এই সকল মূর্তির পূজা করত এভাবে তারা মূর্তি পূজায় জড়িয়ে পড়ে।
(أُولٰئِكَ شِرَارُ خَلْقِ اللهِ) এ সমস্ত মূর্তি বা ছবি অঙ্কনকারীরা আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট। কেননা তারা নিজেরা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং অন্যকেও পথভ্রষ্ট করেছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ছবি সম্পর্কে বর্ণনা
৪৫০৯-[২১] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন ’আযাব হবে সে ব্যক্তির যে কোন নবীকে কতল করেছে অথবা কোন নবী যাকে কতল করেছেন। অথবা যে ব্যক্তি তার পিতা বা মাতার মধ্যে কাউকে কতল করেছে। আর ছবি প্রস্তুতকারীদের এবং ঐ ’আলিম যে নিজের ’ইলম হতে উপকৃত হয় না (’আমল করে না)।[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَنْ قَتَلَ نَبِيًّا أَوْ قَتَلَهُ نَبِيٌّ أَوْ قَتَلَ أَحَدَ وَالِدَيْهِ وَالْمُصَوِّرُونَ وعالم لم ينْتَفع بِعِلْمِهِ»
ব্যাখ্যাঃ (إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَنْ قَتَلَ نَبِيًّا...) কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি হবে তাদের যারা নবীকে হত্যা করেছে অথবা যাকে নবী আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধে হত্যা করেছে। যেমনটি অন্য বর্ণনা আছে- اشْتَدَّ غَضَبُ اللهِ عَلَى رَجُلٍ يَقْتُلُهٗ رَسُولُ اللهِ فِي سَبِيلِ اللهِ আল্লাহ তা‘আলা ঐ ব্যক্তির ওপর কঠোর রাগান্বিত হবেন যাকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধে হত্যা করেছে।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ‘ফী সাবীলিল্লা-হ’ দ্বারা তাদেরকে বাদ দেয়া হয়েছে যাদেরকে তিনি হত্যা করেছেন শাস্তি প্রয়োগ অথবা ক্বিসাসের কারণে। কেননা যাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হত্যা করেছেন সেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হত্যা করতে ইচ্ছুক ছিল।’
(أَوْ قَتَلَ أَحَدَ وَالِدَيْهِ) অথবা যে পিতামাতার কোন একজনকে হত্যা করেছে।
(وَالْمُصَوِّرُونَ) এবং ছবি অঙ্কনকারীগণ। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ছবি সম্পর্কে বর্ণনা
৪৫১০-[২২] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলতেন, শতরঞ্জ (দাবা (পাশা/শতরঞ্জ)) খেলা হলো আজমীদের (অনারবদের) জুয়া।[1]
وَعَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّهُ كَانَ يَقُول: الشطرنج هُوَ ميسر الْأَعَاجِم
হাদীসটির সানাদ পাওয়া যায় না। দেখুন- হিদায়াতুর রুআত ইলা তাখরীজি আহাদীসিল মাসাবীহ ওয়াল মিশকাত ৪/২৬৩ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ (الشطرنج هُوَ ميسر الْأَعَاجِم) শতরঞ্জ বা দাবা (পাশা/শতরঞ্জ) খেলা হলো অনাবরদের জুয়া খেলা। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ছবি সম্পর্কে বর্ণনা
৪৫১১-[২৩] ইবনু শিহাব যুহরী (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। আবূ মূসা আল আশ্’আরী (রাঃ) বলেছেনঃ পাপী ব্যক্তিই দাবা (পাশা/শতরঞ্জ) খেলায় লিপ্ত হয়।[1]
وَعَنِ ابْنِ شِهَابٍ أَنَّ أَبَا مُوسَى الْأَشْعَرِيَّ قَالَ: لَا يلْعَب بالشطرنج إِلَّا خاطئ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সানাদ মাওকূফ, কারণ ‘‘ইবনু শিহাব’’ আবূ মূসা-কে পায়নি। দেখুন- হিদায়াতুর্ রুআত ইলা তাখরীজি আহাদীসিল মাসাবীহ ওয়াল মিশকাত ৪/২৬৩ পৃঃ।
ব্যাখ্যাঃ আবূ মূসা আল আশ্‘আরী (রাঃ) বলেন, পাপী ব্যক্তিই দাবা (পাশা/শতরঞ্জ) খেলায় লিপ্ত হয়।
শারহুস্ সুন্নাহ্ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, দাবা (পাশা/শতরঞ্জ) খেলা বৈধ হওয়া স্বপক্ষে মতভেদ রয়েছে। কেউ তাকে কতিপয় শর্তে অনুমতি দিয়েছেন, তা হলো জুয়া হতে পারবে না, দেরীতে সালাত আদায় করতে পারবে না, জিহবাকে অশ্লীল কথাবার্তা থেকে বিরত রাখবে। যদি কোন একটি করে ফেলে তাহলে অভদ্র সাব্যস্ত হবে এবং তার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না। ইমাম শাফি‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ) দাবা (পাশা/শতরঞ্জ) খেলা অপছন্দ করতেন এবং ইমাম হুমাম-এর মতে, মাকরূহে তানযীহী এবং একদল ‘আলিমের মতে তা হারাম। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ছবি সম্পর্কে বর্ণনা
৪৫১২-[২৪] উক্ত রাবী [ইবনু শিহাব যুহরী অথবা আবূ মূসা আল আশ্’আরী (রাঃ)]-কে দাবা (পাশা/শতরঞ্জ) খেলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এটা বাতিল (অবৈধ) কাজ। আর আল্লাহ তা’আলা বাতিল কাজ পছন্দ করেন না। (উপরিউক্ত হাদীস চারটি বায়হাক্বী’র ’’শু’আবুল ঈমানে’’ বর্ণনা করেছেন।)[1]
وَعنهُ أَن سُئِلَ عَنْ لَعِبِ الشَّطْرَنْجِ فَقَالَ: هِيَ مِنَ الْبَاطِلِ وَلَا يُحِبُّ اللَّهُ الْبَاطِلَ. رَوَى الْبَيْهَقِيُّ الْأَحَادِيثَ الْأَرْبَعَةَ فِي شُعَبِ الْإِيمَانِ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘ইবরাহীম ইবনু ইসপদকব’’ নামের একজন বর্ণনাকারী, যার পরিচয় জানা যায়নি। দেখুন- মা‘রিফাতুস্ সুনান ওয়াল আসার লিল বায়হাক্বী দিরাসাতুল ওয়া তাহক্বীক ওয়া তাখরীজ ও তা‘লীক মিন কিতাবিস্ সয়দি ইলা আখিরিল কিতাব, ডক্টরেট থিসিস, ছাত্র : মুহাম্মাদ ইবনু হুসায়ন আল হাযিমী, পৃঃ ১৩৬৬। জামিআতু উম্মিল কুরা।
ব্যাখ্যাঃ ইবনু শিহাব যুহরী অথবা আবূ মূসা আল আশ্‘আরী (রাঃ)-কে দাবা (পাশা/শতরঞ্জ) খেলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন- এটা বাতিল (অবৈধ কাজ) আর আল্লাহ তা‘আলা বাতিল কাজ পছন্দ করেন না। ইমাম মালিক বলেনঃ যারা এই খেলায় অভ্যস্ত, তাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়।
মহান আল্লাহ বলেনঃ ..فَمَاذَا بَعْدَ الْحَقِّ إِلَّا الضَّلَالُ... ‘‘...প্রকৃত সত্যের পর গুমরাহী ছাড়া আর কী থাকতে পারে?...’’ (সূরাহ্ ইউনুস ১০ : ৩২) (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ছবি সম্পর্কে বর্ণনা
৪৫১৩-[২৫] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায়শ এক আনসারীর ঘরে আসা-যাওয়া করতেন। অথচ তাদের নিকটেই অন্য আরেকটি ঘর আছে। এটাতে সে গৃহবাসীর মনঃকষ্ট হলো। তখন তারা বলল : হে আল্লাহর রসূল! আপনি অমুকের ঘরে আসেন, অথচ আমাদের ঘরে আসেন না। উত্তরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যেহেতু তোমাদের ঘরে কুকুর আছে। তখন তারা বলল, তাদের ঘরে তো বিড়াল রয়েছে। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ বিড়াল তো একটি পশু মাত্র। (দারাকুত্বনী)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْتِي دَارَ قَوْمٍ مِنَ الْأَنْصَارِ وَدُونَهُمْ دَارٌ فَشَقَّ ذَلِكَ عَلَيْهِمْ فَقَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ تَأْتِي دَارَ فُلَانٍ وَلَا تَأْتِي دَارَنَا. فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لِأَنَّ فِي دَارِكُمْ كَلْبًا» . قَالُوا: إِنَّ فِي دَارِهِمْ سِنَّوْرًا فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «السِّنَّوْرُ سَبْعٌ» . رَوَاهُ الدَّارَقُطْنِيُّ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, এর সনদে আছে ‘‘ঈসা ইবনুল মুসাইয়্যাব’’ নামের একজন বর্ণনাকারী। ইমাম আবূ দাঊদ, নাসায়ী, ইবনু মা‘ঈন তাকে য‘ঈফ বলেছেন। মুসতাদরাক লিল হাকিম ৬৪৯, সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ১৫১২।
ব্যাখ্যাঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারদের এক বাড়ীতে যাতায়াত করতেন, অথচ এর নিকটেই আরো বাড়ী ছিল তাদের কাছে যেতেন না। এরূপ অবস্থাদৃষ্টে তারা আবেদন করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনি অমুক বাড়ীতে যান কিন্তু আমাদের বাড়ীতে আসেন না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বললেন, কেননা তোমাদের বাড়ীতে কুকুর আছে। তারা বলল, তাদের বাড়ীতে তো বিড়াল আছে? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বললেন, (السِّنَّوْرُ سَبْعٌ) বিড়াল তো হিংস্র প্রাণী।
ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথাটি হয়তো অপছন্দের কারণে বলেছেন অথবা সংবাদ হিসেবে বলেছেন। এভাবে বিড়াল হিংস্র প্রাণী তবে কুকুরের মতো অপবিত্র শয়তান নয়। কুকুর অপবিত্র ও নাপাক জিনিসে যাওয়ার কারণে বাড়ীতে মালাক (ফেরেশতা) প্রবেশ করে না, আবার কোন কোন কুকুরকে শয়তান আখ্যায়িত করা হয়েছে। আর শয়তান হচ্ছে মালাকের বিপরীত। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)