পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী বলেনঃ যাকাত ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ। এটা শারী’আতের একটি শক্তিশালী বিষয়। যে ব্যক্তি যাকাতের ফারযিয়্যাতকে অমান্য করবে সে কাফির হয়ে যাবে। যাকাতের লাগবী অর্থ বৃদ্ধি, বারাকাত ও পবিত্র করা। যাকাত আদায় করলে মাল বৃদ্ধি পায় ও মাল পবিত্র হয়। আর যাকাত আদায়কারী গুনাহ থেকে পবিত্র হয়। আর যাকাতের শার’ঈ অর্থ হলো নিসাব পূর্ণ সম্পদে এক বৎসর অতিবাহিত হলে তা ফকীর, মিসকীন ও অন্যান্যদের মাঝে নির্ধারিত পন্থায় আদায় করা। অতঃপর যাকাতের রুকন, কারণ হিকমাত ও শর্ত রয়েছে। তা ফরয হওয়ার কারণ হলো মালের মালিক হওয়া। যাকাতের শর্ত হলো (মালের ক্ষেত্রে) নিসাব পরিমাণ হওয়া, বৎসর পূর্ণ হওয়া এবং (ব্যক্তির ক্ষেত্রে) বালেগ ও স্বাধীন হওয়া। হিকমাত হলো দুনিয়ার কর্তব্য পালন হওয়া এবং আখিরাতের সাওয়াব ও দরজা অর্জন হওয়া। আর গুনাহ হতে পবিত্র হওয়া এবং কৃপণতার দায় থেকে বাঁচা।
প্রকাশ থাকে যে, অধিকাংশ ’উলামাদের মতে যাকাত হিজরতের পর ফরয হয়। তারা দ্বিতীয় হিজরীতে ফরয হওয়ার মত ব্যক্ত করেন। কেউ কেউ বলেন, হিজরতের পূর্বে ফরয হয়েছে।
১৭৭২-[১] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু’আয ইবনু জাবাল (রাঃ)-কে ইয়ামানে পাঠাবার সময় বললেন, মু’আয! তুমি আহলে কিতাবদের (ইয়াহূদী ও খৃস্টান) নিকট যাচ্ছো। প্রথমতঃ তাদেরকে এ লক্ষ্যে দীনের প্রতি আহবান করবে, এক আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রসূল। যদি তারা এটা মেনে নেয় তাহলে তাদের সামনে এই ঘোষণা দেবে যে, নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা তাদের ওপর দিনরাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) ফরয করেছেন। তারা এটা মেনে নিলে তাদেরকে জানাবে, নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা তাদের ওপর যাকাত ফরয করেছেন। তাদের ধনীদের কাছ থেকে তা গ্রহণ করে তাদের গরীবদের মধ্যে বণ্টন করা হবে। যদি তারা এ হুকুমের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে তাহলে তুমি (তাদের) ভাল ভাল মাল গ্রহণ থেকে বিরত থাকবে, মাযলূমের ফরিয়াদ হতে বাঁচার চেষ্টা করবে। কেননা মাযলূমের ফরিয়াদ আর আল্লাহ তা’আলার মধ্যে কোন আড়াল থাকে না। (বুখারী, মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَعَثَ مُعَاذًا إِلَى الْيَمَنِ فَقَالَ: «إِنَّك تَأتي قوما من أهل الْكتاب. فَادْعُهُمْ إِلَى شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ. فَإِنْ هُمْ أطاعوا لذَلِك. فَأَعْلِمْهُمْ أَنَّ اللَّهَ قَدْ فَرَضَ عَلَيْهِمْ خَمْسَ صَلَوَاتٍ فِي الْيَوْمِ وَاللَّيْلَةِ. فَإِنْ هم أطاعوا لذَلِك فأعلمهم أَن الله قد فرض عَلَيْهِم صَدَقَة تُؤْخَذ من أغنيائهم فَترد فِي فُقَرَائِهِمْ. فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوا لِذَلِكَ. فَإِيَّاكَ وَكَرَائِمَ أَمْوَالِهِمْ وَاتَّقِ دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ فَإِنَّهُ لَيْسَ بَيْنَهَا وَبَين الله حجاب»
ব্যাখ্যা : রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু‘আয ইবনু জাবালকে ইয়ামানে বিদায়ী হাজ্জের (হজ্জের/হজের) পূর্বে ১০ হিঃ প্রেরণ করেন। ইবনু ‘আবদুল বার (রহঃ) তার ‘‘ইসতিয়াব’’ গ্রন্থে বলেছেন, তিনি মু‘আযকে ইয়ামানের জুনদ প্রদেশে ক্বাযীরূপে এ দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেন যে, তিনি মানুষদেরকে কুরআন, ইসলামের নিদর্শনাবলী শিক্ষা দিবেন এবং যাকাত আদায়কারীদের থেকে যাকাত গ্রহণ করবেন। আর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঁচ ব্যক্তির মাঝে ইয়ামানের দায়িত্ব বণ্টন করে দেন। তারা হলেন খালিদ বিন সা‘ঈদকে ‘সান্আ’র, মুহাজির বিন আবী উমাইয়্যাহ্-কে ‘কিনদার’, যিয়াদ বিন লাবিদকে ‘হাযরা মাওত’-এর, মু‘আযকে ‘জুনদ’-এর আর আবূ মূসাকে ‘যুবায়দ’, যুম্‘আহ্ আদন ও সাহিল’-এর দায়িত্ব। ইবনু হাজার বলেন, জুনদ-এ অদ্যাবধি মু‘আয-এর একটি প্রসিদ্ধ মাসজিদ রয়েছে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু‘আযকে মানুষদের সর্বপ্রথম শাহাদাতাইনের দিকে দা‘ওয়াত প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন, কারণ তা হলো দীনের মৌলিক বিষয় যা ব্যতীত দীনের অন্যান্য বিষয় শুদ্ধ হবে না।
অতএব যদি কারো ব্যাপারে নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, সে নাস্তিক তাহলে তাকে উভয়টির শাহাদাহ্ দিতে হবে। আর যদি আস্তিক হয় তাহলে তাকে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রিসালাতের শাহাদাহ্ দিয়ে উভয়টির মাঝে সমন্বয় করতে হবে। সেখানে আহলে কিতাবরা বসবাস করত। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদেরকে প্রথমে তাওহীদের দিকে আহবান করতে বলেন। এটি গ্রহণ করলে তারপর দিন-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করতে বলেন। অতঃপর তাদেরকে যাকাত ফারযের (ফরযের/ফরজের) কথা অবহিত করতে বলেন। আর যাকাত আদায়ের সময় যুলম করতে নিষেধ করেন। কারণ মাযলূমের দু‘আ তাড়াতাড়ি আল্লাহর কাছে কবূল হয়। যদিও সে পাপী হয়, কেননা তার পাপ তার নিজের উপর বর্তাবে।
শাহাদাতায়নের ব্যতীত শারী‘আতের অন্যান্য বিধানগুলোর ক্ষেত্রে কাফিররাও সম্বন্ধিত কিনা এ ব্যাপারে মতবিরোধ রয়েছে। এ হাদীসের আলোকে কেউ কেউ বলেছেন, তারা অন্যান্য বিধানের ক্ষেত্রে সম্বন্ধিত নয়। কারণ এখানে প্রথমত তাদের শুধুমাত্র ঈমানের দিকে দাওয়াতের নির্দেশ এসেছে। অতপর ঈমান গ্রহণ করলে অন্যান্য বিধানের দিকে দা‘ওয়াতের নির্দেশ এসেছে। তবে অধিকাংশদের মতে, তারা বিশ্বাস স্থাপন এবং কার্যে প্রতিফলন উভয় দিক থেকে শরীয়াতের বিভিন্ন বিধানের ক্ষেত্রে সম্বন্ধিত। হাদীসে বলা হয়েছে, ধনীদের থেকে যাকাতের মাল গ্রহণ করে তা তাদের দরিদ্রের মাঝে বিতরণ করবে ‘‘এ উক্তির আলোকে উলামাগণ মতবিরোধ করেছেন যে, এক এলাকার যাকাতের সম্পদ অন্য এলাকায়/দেশে স্থানান্তর করা যাবে কি না? এ হাদীসের আলোকে কেউ কেউ বলেছেন, স্থানান্তর করা যাবে না। যেহেতু হাদীসে ইয়ামানবাসীদের উদ্দেশে এটি বলা হয়েছে যে, তাদের যারা ধনী তাদের থেকে নিয়ে সে এলাকার দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করবে। আবূ হানীফা, ইমাম বুখারীসহ আরো অনেকের মতে স্থানান্তর করা যাবে। ইমাম মালেক, শাফেয়ী এবং আব্দুর রহমান মুবারকপুরীর মতে তা স্থানান্তর করা যাবে না। তবে যদি সে এলাকা যাকাত গ্রহণ করার মত কেউ না থাকে। কিংবা স্থানান্তর করাতে অধিক কল্যাণ নিহিত থাকে তাহলে করা যাবে।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
১৭৭৩-[২] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি সোনা রূপার (নিসাব পরিমাণ) মালিক হবে অথচ তার হক (যাকাত) আদায় করবে না তার জন্য কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন (তা দিয়ে) আগুনের পাত বানানো হবে। এগুলোকে জাহান্নামের আগুনে এমনভাবে গরম করা হবে যেন তা আগুনেরই পাত। সে পাত দিয়ে তার পাঁজর, কপাল ও পিঠে দাগ দেয়া হবে। তারপর এ পাত পৃথক করা হবে। আবার আগুনে উত্তপ্ত করে তার শরীরে লাগানো হবে। আর লাগানোর সময়ের মেয়াদ হবে পঞ্চাশ হাজার বছর। (এ অবস্থা চলবে) বান্দার (জান্নাত জাহান্নামের) ফায়সালা হওয়া পর্যন্ত।
তারপর তাকে নেয়া হবে জান্নাত অথবা জাহান্নামে। সাহাবীগণ আরয করলেন, হে আল্লাহর রসূল! উটের বিষয়টি (যাকাত না দেবার পরিণাম) কি? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ উটের মালিক যদি এর হক (যাকাত) আদায় না করে- যেদিন উটকে পানি খাওয়ানো হবে সেদিন তাকে দুহানোও তার একটা হক- কিয়ামতের দিন ওই ব্যক্তিকে সমতল ভূমিতে উটের সামনে মুখের উপর উপুড় করে। তার সবগুলো উট গুণে গুণে (আনা হবে) মোটা তাজা একটি বাচ্চাও কম হবে না। এসব উট মালিককে নিজেদের পায়ের নীচে ফেলে পিষতে থাকবে, দাঁত দিয়ে কামড়াবে। এ উটগুলো চলে গেলে, আবার আর একদল উট আসবে। যেদিন এমন ঘটবে, সে দিনের মেয়াদ হবে পঞ্চাশ হাজার বছর। এমনকি বান্দার হিসাব-নিকাশ শেষ হয়ে যাবে। তারপর ঐ ব্যক্তি জান্নাত অথবা জাহান্নামের দিকে অগ্রসর হবে।
সাহাবীগণ আরয করলেন, হে আল্লাহর রসূল! গরু-ছাগলের যাকাত আদায় না করলে (মালিকদের) কি অবস্থা হবে? তিনি বললেন, যে ব্যক্তি গরু-ছাগলের মালিক হয়ে এর হক (যাকাত) আদায় করে না কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন তাকে সমতল ভূমিতে উপুড় করে ফেলা হবে। তার সব গরু ও ছাগলকে (ওখানে আনা হবে) একটুও কম-বেশি হবে না। গরু-ছাগলের শিং বাঁকা কিংবা ভঙ্গ হবে না। শিং ছাড়াও কোনটা হবে না। এসব গরু ছাগল শিং দিয়ে মালিককে গুতো মারতে থাকবে, খুর দিয়ে পিষবে। এভাবে একদলের পর আর একদল আসবে। এ সময়ের মেয়াদও হবে পঞ্চাশ হাজার বছর। এর মধ্যে বান্দার হিসাব-নিকাশ হয়ে যাবে। তারপর ঐ ব্যক্তি জান্নাত অথবা জাহান্নামে তার গন্তব্য দেখতে পাবে।
সাহাবীগণ আরয করলেন, হে আল্লাহর রসূল! ঘোড়ার অবস্থা কি হবে? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ঘোড়া তিন প্রকারের। প্রথমতঃ যা মানুষের জন্য গুনাহের কারণ হয়। দ্বিতীয়তঃ যা মানুষের জন্য পর্দা। আর তৃতীয়তঃ মানুষের জন্য সাওয়াবের কারণ।
গুনাহের কারণ ঘোড়া হলো ঐ মালিকের, যেগুলোকে সে মুসলিমদের ওপর তার গৌরব, অহংকার ও শৌর্যবীর্য দেখাবার জন্য পালন করে। আর যেগুলো মালিক-এর জন্য পর্দা হবে, সেগুলো ঐ ঘোড়া, যে সবের ঘোড়ার মালিক আল্লাহর পথে লালন পালন করে। সেগুলোর পিঠ ও গর্দানের ব্যাপারে আল্লাহর হক ভুলে যায় না। মানুষের জন্য সাওয়াবের কারণ ঘোড়া ব্যক্তির যে মালিক আল্লাহর পথের মুসলিমদের জন্য তা’ পালে। এদেরকে সবুজ মাঠে রাখে। এসব ঘোড়া যখন আসে ও চারণ ভূমিতে সবুজ ঘাস খায়, তখন ওই (ঘাসের সংখ্যার সমান) সাওয়াব তার মালিক-এর জন্য লিখা হয়। এমনকি এদের গোবর ও পেশাবের পরিমাণও তার জন্য সাওয়াব হিসেবে লিখা হয়। সেই ঘোড়া রশি ছিঁড়ে যদি এক বা দু’টি ময়দান দৌড়ে ফিরে, তখন আল্লাহ তা’আলা এদের কদমের চিহ্ন ও গোবরের (যা দৌড়াবার সময় করে) সমান সাওয়াব তার জন্য লিখে দেন। এসব ঘোড়াকে পানি পান করাবার জন্য নদীর কাছে নেয়া হয়, আর এরা নদী হতে পানি পান করে, তাহলে আল্লাহ তা’আলা ঘোড়াগুলোর পান করা পানির পরিমাণ সাওয়াব ওই ব্যক্তির জন্য লিখে দেন। যদি মালিক-এর পানি পান করাবার ইচ্ছা নাও থাকে। সাহাবীগণ আরয করলেন, হে আল্লাহর রসূল! গাধার ব্যাপারে কি হুকুম? তিনি বললেন গাধার ব্যাপারে আমার ওপর কোন হুকুম নাযিল হয়নি। সকল নেক কাজের ব্যাপারে এ আয়াতটিই যথেষ্ট ’’যে ব্যক্তি এক কণা পরিমাণ নেক ’আমল করবে তা সে দেখতে পাবে। আর যে ব্যক্তি এক কণা পরিমাণ বদ ’আমল করবে তাও সে দেখতে পাবে’’- (সূরাহ্ আয্ যিলযাল ৯৯: ৭-৮)। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا مِنْ صَاحِبِ ذَهَبٍ وَلَا فِضَّةٍ لَا يُؤَدِّي مِنْهَا حَقَّهَا إِلَّا إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ صُفِّحَتْ لَهُ صَفَائِحُ مِنْ نَارٍ فَأُحْمِيَ عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ فَيُكْوَى بِهَا جَنْبُهُ وجبينه وظهره كلما بردت أُعِيدَتْ لَهُ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ حَتَّى يُقْضَى بَيْنَ الْعِبَادِ فَيُرَى سَبِيلُهُ إِمَّا إِلَى الْجَنَّةِ وَإِمَّا إِلَى النَّارِ» قِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ فَالْإِبِلُ؟ قَالَ: «وَلَا صَاحِبُ إِبِلٍ لَا يُؤَدِّي مِنْهَا حَقَّهَا وَمِنْ حَقِّهَا حَلْبُهَا يَوْمَ وِرْدِهَا إِلَّا إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ بُطِحَ لَهَا بِقَاعٍ قَرْقَرٍ أَوْفَرَ مَا كَانَت لَا يفقد مِنْهَا فصيلا وَاحِدًا تَطَؤُهُ بِأَخْفَافِهَا وَتَعَضُّهُ بِأَفْوَاهِهَا كُلَّمَا مَرَّ عَلَيْهِ أولاها رد عَلَيْهِ أخراها فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ حَتَّى يُقْضَى بَيْنَ الْعِبَادِ فَيُرَى سَبِيلُهُ إِمَّا إِلَى الْجَنَّةِ وَإِمَّا إِلَى النَّار» قيل: يَا رَسُول الله فَالْبَقَرُ وَالْغَنَمُ؟ قَالَ: «وَلَا صَاحِبُ بَقْرٍ وَلَا غَنَمٍ لَا يُؤَدِّي مِنْهَا حَقَّهَا إِلَّا إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ بُطِحَ لَهَا بِقَاعٍ قَرْقَرٍ لَا يَفْقِدُ مِنْهَا شَيْئًا لَيْسَ فِيهَا عَقْصَاءُ وَلَا جَلْحَاءُ وَلَا عَضْبَاءُ تَنْطِحُهُ بِقُرُونِهَا وَتَطَؤُهُ بِأَظْلَافِهَا كُلَّمَا مَرَّ عَلَيْهِ أُولَاهَا رُدَّ عَلَيْهِ أُخْرَاهَا فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ حَتَّى يُقْضَى بَيْنَ الْعِبَادِ فَيُرَى سَبِيلُهُ إِمَّا إِلَى الْجَنَّةِ وَإِمَّا إِلَى النَّارِ» . قِيلَ: يَا رَسُول الله فالخيل؟ قَالَ: الْخَيل ثَلَاثَةٌ: هِيَ لِرَجُلٍ وِزْرٌ وَهِيَ لِرَجُلٍ سِتْرٌ وَهِيَ لِرَجُلٍ أَجْرٌ. فَأَمَّا الَّتِي هِيَ لَهُ وِزْرٌ فَرَجُلٌ رَبَطَهَا رِيَاءً وَفَخْرًا وَنِوَاءً عَلَى أَهْلِ الْإِسْلَامِ فَهِيَ لَهُ وِزْرٌ. وَأَمَّا الَّتِي لَهُ سِتْرٌ فَرَجُلٌ رَبَطَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ ثُمَّ لَمْ يَنْسَ حَقَّ اللَّهِ فِي ظُهُورِهَا وَلَا رِقَابِهَا فَهِيَ لَهُ سِتْرٌ. وَأَمَّا الَّتِي هِيَ لَهُ أَجْرٌ فَرَجُلٌ رَبَطَهَا فِي سَبِيلِ الله لأهل الْإِسْلَام فِي مرج أَو رَوْضَة فَمَا أَكَلَتْ مِنْ ذَلِكَ الْمَرْجِ أَوِ الرَّوْضَةِ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا كُتِبَ لَهُ عَدَدَ مَا أَكَلَتْ حَسَنَاتٌ وَكُتِبَ لَهُ عَدَدَ أَرْوَاثِهَا وَأَبْوَالِهَا حَسَنَاتٌ وَلَا تَقْطَعُ طِوَلَهَا فَاسْتَنَّتْ شَرَفًا أَوْ شَرَفَيْنِ إِلَّا كَتَبَ اللَّهُ لَهُ عَدَدَ آثَارِهَا وأوراثها حَسَنَاتٍ وَلَا مَرَّ بِهَا صَاحِبُهَا عَلَى نَهْرٍ فَشَرِبَتْ مِنْهُ وَلَا يُرِيدُ أَنْ يَسْقِيَهَا إِلَّا كَتَبَ اللَّهُ لَهُ عَدَدَ مَا شَرِبَتْ حَسَنَاتٍ قِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ فَالْحُمُرُ؟ قَالَ: مَا أُنْزِلَ عَلَيَّ فِي الْحُمُرِ شَيْءٌ إِلَّا هَذِهِ الْآيَةُ الْفَاذَّةُ الْجَامِعَةُ (فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ)
الزلزلة. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা : উক্ত হাদীস হতে প্রমাণ হয় যে, স্বর্ণ ও রূপা যাকাত আদায় না করে জমা করে রাখলে, উক্ত মাল জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করে মালিক-এর ললাটে, পার্শ্বদেশসমূহ এবং পৃষ্ঠদেশসমূহে দাগ দেয়া হবে। অন্যান্য অঙ্গ থেকে এ তিনটি অঙ্গকে উল্লেখ করার কারণ হল, চেহারায় দাগ দিলে অধিক কদর্য দেখায় আর পার্শ্বদেশ এবং পিঠে দাগ দিলে অধিক ব্যথা অনুভূত হয়। আবার কেউ কেউ বলেছেন, কারণ একজন ভিক্ষুক কোন কৃপণের নিকট চাইলে সর্বপ্রথম তার চেহারায় বিরক্তি, অপছন্দের ভাব পরিস্ফুটিত হয়, তার কপালে ভাজ পড়ে। আবার তাই চাইলে তার থেকে পার্শ্বদেশ পরিবর্তন করে। পুনরায় চাইতে গেলে সে তাকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে চলে যায়। এজন্য এ তিনটি অঙ্গের উল্লেখ করা হয়েছে।
সূরাহ্ আত্ তাওবাহ্-এ ৩৪ ও ৩৫ নং আয়াতে এরই বর্ণনা করা হয়েছে। আয়াতের অর্থঃ ‘‘হে মু’মিনগণ! অধিকাংশ ‘আলিম ও ধর্মযাজকগণ মানুষের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে। আর তারা আল্লাহর রাস্তা হতে (মানুষকে) বাধা দেয়।
যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করে আর তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, (হে নাবী!) আপনি তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক এক শাস্তির সুসংবাদ শুনিয়ে দিন।
যেদিন জাহান্নামের আগুনে ঐগুলোকে উত্তপ্ত করা হবে। অতঃপর তা দ্বারা তাদের ললাটসমূহে, পার্শ্বদেশসমূহ এবং পৃষ্ঠদেশসমূহে দাগ দেয়া হবে, (আর বলা হবে) এটা হচ্ছে ওটাই যা তোমরা নিজেদের জন্যে সঞ্চয় করে রেখেছিলে, সুতরাং এখন নিজেদের সঞ্চয়ের স্বাদ গ্রহণ করো।’
এভাবে ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) পর্যন্ত তার ‘আযাব হতে থাকবে। অতঃপর হয় তার রাস্তা জান্নাত না হয় জাহান্নাম। এভাবে অন্য মালেও একই হুকুম জারি হবে।
হাদীসে ক্বিয়ামাতের (কিয়ামতের) দিনকে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান বলা হয়েছে যা মূলত কাফিরদের ওপর। আর পাপীদের ওপর তাদের পাপানুপাতে দীর্ঘায়িত হবে। কিন্তু পরিপূর্ণ মু’মিনদের জন্য দিনটি ফাজরের (ফজরের) দুই রাক্‘আত সালাতের মতো দীর্ঘ মনে হবে। অর্থাৎ তাদের জন্য নির্দিষ্ট দিনটি কঠিন হবে না যেমনটি কাফিরদের জন্য।
আলওয়ালী আল ‘ইরাক্বী বলেন, مَرَجٌ হল উদ্ভিদ বা ঘাস বিশিষ্ট সেই প্রশস্ত ভূখন্ড যেখানে চতুষ্পদ জন্তু চরে বেড়ায় ইচ্ছামত যাতায়াত করতে পারে। আর رَوْضَةٌ (বাগান) হল অধিক পানি বিশিষ্ট স্থান যেখানে পর্যাপ্ত পানি থাকায় গোলাপ ফুলসহ আরো নানা ধরনের উদ্ভিদ উৎপন্ন হয়। উভয়টির মাঝে পার্থক্য হল মারাজকে চতুষ্পদ জন্তু চরার জন্য প্রস্ত্তত করা হয় আর رَوْضَةٌ কে মানুষের বিনোদনের জন্য প্রস্ত্তত করা হয়।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
১৭৭৪-[৩] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তিকে আল্লাহ তা’আলা ধন-সম্পদ দান করেছেন, অথচ সে ঐ ধন-সম্পদের যাকাত আদায় করেনি, সে ধন-সম্পদকে কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন টাকমাথা সাপে পরিণত হবে। এ সাপের দু’ চোখের উপর দু’টি কালো দাগ থাকবে (অর্থাৎ বিষাক্ত সাপ)। এরপর ঐ সাপ গলার মালা হয়ে ব্যক্তির দু’ চোয়াল আঁকড়ে ধরে বলবে, আমিই তোমার সম্পদ, আমি তোমার সংরক্ষিত ধন-সম্পদ। এরপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন, অর্থাৎ ’’যারা কৃপণতা করে, তারা যেন মনে না করে এটা তাদের জন্য উত্তম বরং তা তাদের জন্য মন্দ। কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন অচিরেই যা নিয়ে তারা কৃপণতা করছে তা তাদের গলার বেড়ী করে পরিয়ে দেয়া হবে’’- (সূরাহ্ আ-লি ’ইমরান ৩: ১৮০) আয়াতের শেষ পর্যন্ত। (বুখারী)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ آتَاهُ اللَّهُ مَالًا فَلَمْ يُؤَدِّ زَكَاتَهُ مُثِّلَ لَهُ مَالُهُ شُجَاعًا أَقْرَعَ لَهُ زَبِيبَتَانِ يُطَوَّقُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَأْخُذ بِلِهْزِمَتَيْهِ - يَعْنِي بشدقيه - يَقُولُ: أَنَا مَالُكَ أَنَا كَنْزُكَ . ثُمَّ تَلَا هَذِه الْآيَة: (وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ من فَضله)
إِلَى آخر الْآيَة. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: যাদের আল্লাহ তা‘আলা সম্পদ দিয়েছেন অথচ যাকাত আদায় করে না, ক্বিয়ামাতের (কিয়ামতের) দিবস উক্ত সম্পদ বিষধর সাপে পরিণত হবে। সূরাহ্ আ-লি ‘ইমরান-এর ১৮০ নং আয়াতে এরই অর্থ বহন করে। বাদর (বদর) আদ দিমামীনী বলেন, شُجَاعٌ হল পুরুষ সর্প। কেউ কেউ বলেছেন, শুজা' মরুভূমির এমন সাপ যা লেজের ওপর দন্ডায়মান হয়ে অশ্বারোহী এবং পদাতিক ব্যক্তিকে আক্রমণ করে। আবার কখনো কখনো তা অশ্বারোহীর মাথা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। উক্ত সাপের মাথায় টাক পড়া থাকবে বয়স দীর্ঘ হওয়ার কারণে। কেউ বলেন, তার মাথায় চুল থাকবে না। আর চরম বিষের কারণে মাথার চামড়া বিলীন হয়ে যাবে। তার মাথায় দু’টি নোকতা থাকবে যা মালিকের গলায় পেঁচিয়ে দেয়া হবে। সে তাকে আঁকড়ে ধরে বলবে, ‘‘আমি তোমার মাল। এ কথা বলার উপকারিতা হল তার অনুশোচনা এবং শাস্তি বৃদ্ধি করা, যেহেতু যে বিষয়ের যে কল্যাণের আশা করত তা তার নিকট অকল্যাণ হিসেবে এসেছে। তাই তার অনুশোচনা, চিন্তা বৃদ্ধি পাবে।
মুসলিমের বর্ণনায় রয়েছে, সে সাপ থেকে পলায়নরত অবস্থায় যেখানেই যাবে সেখানেই সাপ তার পিছু নিবে। অবশেষে যখন সে দেখবে যে সাপ তার পিছু ছাড়বে না তখন সে তার মুখে হাত প্রবেশ করাবে। ফলে সাপ তার হাতকে চাবাবে যেমনটি উট চাবায়। আর ইবনু হিব্বান-এর বর্ণনায় রয়েছে, হাত থেকে শুরু করে শরীর চিবাবে।
সূরাহ্ আ-লি ‘ইমরান এর ১৮০ নং এবং সূরাহ্ আত্ তাওবাহ্-এর ৩৪ নং আয়াতের মাঝে কোন প্রকার বৈপরীত্য নেই, কারণ এটি খুব করে সম্ভব যে আল্লাহ তার কিছু প্রকারের সম্পদকে বেড়ি বানিয়ে গলায় পরাবেন আর কয়েক প্রকার দিকে দাগ দিবেন। অথবা একবার এই প্রকারের শান্তিত দিবেন আর একবার সেই প্রকারের শাস্তি দিবেন।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
১৭৭৫-[৪] আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তির উট, গরু ও ছাগল থাকবে, আর সে এসবের হক (যাকাত) আদায় করবে না। কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন এসব জন্তু খুব তরতাজা মোটাসোটা করে আনা হবে এবং তারা তাদের পা দিয়ে তাকে পিষবে। তাদের শিং দিয়ে গুতোবে। শেষ দলটি পিষে চলে যাবার পর আবার প্রথম দলটি আসবে হিসাব-নিকাশ হওয়া পর্যন্ত (এভাবে চলতে থাকবে)। (বুখারী, মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
عَنْ أَبِي ذَرٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَا مِنْ رَجُلٍ يَكُونُ لَهُ إِبِلٌ أَوْ بَقَرٌ أَوْ غَنَمٌ لَا يُؤَدِّي حَقَّهَا إِلَّا أَتَى بِهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ أعظم مَا يكون وَأَسْمَنَهُ تَطَؤُهُ بِأَخْفَافِهَا وَتَنْطِحُهُ بِقُرُونِهَا كُلَّمَا جَازَتْ أُخْرَاهَا رُدَّتْ عَلَيْهِ أُولَاهَا حَتَّى يُقْضَى بَيْنَ النَّاس»
ব্যাখ্যা: যে ব্যক্তির গরু বা ছাগল আছে যার যাকাত আদায় করে না তা নিয়ে ক্বিয়ামাতের (কিয়ামতের) দিবসে বেশী বড় ও মোটা হয়ে তার মালিক-কে পায়ের খুর দিয়ে আঘাত করতে থাকবে। যখন অতিক্রম শেষ হবে তখন আবারো প্রথম হতে খুরের আঘাত আরম্ভ করা হবে।
এরূপ শাস্তি ক্বিয়ামাতের (কিয়ামতের) দিবস বিচার হওয়ার আগ পর্যন্ত চলতে থাকবে। خُفٌّ (খুফ) বলা হয় উটের খুরকে। ظِلْفٌ (যিলফ) বলা হয় গরু, ছাগল এবং হরিণের খুরকে। حَافِرٌ (হা-ফির) বলা হয় ঘোড়া, গাধা এবং খচ্চরের খুরকে। قُرْنٌ (কুরন) বলা হয় গরু এবং ছাগলের খুরকে। আর মানুষের পায়ের পাতাকে বলা হয় قَدَمٌ (ক্বাদাম)।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
১৭৭৬-[৫] জারীর ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যাকাত আদায়কারী যখন তোমাদের নিকট যাকাত আদায় করতে আসে তখন যেন তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে (যাকাত উসূল করে) ফিরে যায়। আর তোমরাও যেন সন্তুষ্ট ও খুশী থাকো। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ جَرِيرِ بْنِ عَبْدُ اللَّهِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «إِذا أَتَاكُمُ الْمُصَدِّقُ فَلْيَصْدُرْ عَنْكُمْ وَهُوَ عَنْكُمْ رَاضٍ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: উক্ত হাদীস হতে প্রমাণ হয় যে, যাকাত আদায়কারীকে যাকাত আদায় করার ব্যাপারে পূর্ণ সাহায্য করতে হবে ও তার সাথে ভাল ব্যবহার করতে হবে। যাতে সে তাদের কাছ থেকে সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে যায়। আর আবূ দাঊদ-এর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলা হলো, হে আল্লাহর রসূল! যদিও আদায়কারীরা যুলম করে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, হ্যাঁ, যদিও তারা যুলম করে তবুও তাদেরকে খুশি করে বিদায় দাও।
ক্বাযী ‘আয়ায বলেন, মূলত রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাধ্যমে নেতার আনুগত্য এবং তার বিরোধিতা না করার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেন, হাদীসের উদ্দেশ্য হল, সৌভাগ্যের ওয়াসিয়্যাত করা, নেতার আনুগত্য করা, তার প্রতি সদ্ব্যবহার করা, মুসলিমদের ঐক্য ধরে রাখা এবং তাদের পারস্পরিক বিষয়ের সংশোধন করা।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
১৭৭৭-[৬] ’আবদুল্লাহ ইবনু আবূ আওফা (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোন ক্বওম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে তাদের যাকাত নিয়ে এলে তিনি বলতেন, ’’আল্ল-হুম্মা স-ল্লি ’আলা- আ-লি ফুলা-ন’’ (অর্থাৎ হে আল্লাহ! অমুকের ওপর রহমত বর্ষণ করো)। আমার পিতাও যখন তার নিকট যাকাত নিয়ে এলেন তিনি বললেন, ’’আল্ল-হুম্মা সল্লি ’আলা- আ-লি আবী আওফা’’ (অর্থাৎ হে আল্লাহ! আবূ আওফা ও তার বংশধরদের ওপর রহমত বর্ষণ করো)। (বুখারী, মুসলিম)[1]
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, যখন কোন ব্যক্তি তার নিজের যাকাত নিয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসতেন, তিনি বলতেন, اَللّهُمَّ صَلِّ عَلَيْهِ ’’হে আল্লাহ! এ ব্যক্তির ওপর রহমত বর্ষণ করো।’’
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ عَبْدُ اللَّهِ بْنِ أَبِي أَوْفَى رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا أَتَاهُ قَوْمٌ بِصَدَقَتِهِمْ قَالَ: «اللَّهُمَّ صلى على آل فلَان» . فَأَتَاهُ أبي بِصَدَقَتِهِ فَقَالَ: «اللَّهُمَّ صلى الله على آل أبي أوفى»
وَفِي رِوَايَة: إِذا أَتَى الرجل النَّبِي بِصَدَقَتِهِ قَالَ: «اللَّهُمَّ صلي عَلَيْهِ»
ব্যাখ্যা: নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে কোন ক্বওম বা ব্যক্তি যাকাত বা সদাক্বাহ্ (সাদাকা) নিয়ে এলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদের জন্য দু‘আ করতেন। যেমন- বর্ণিত হাদীসে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আবূ আওফা-এর পরিবারের জন্য দু‘আ করেছিলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দু‘আ করতেন সূরাহ্ আত্ তাওবার ১০৩ নং আয়াতের উপর ‘আমল করার জন্য সেখানে আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ ‘‘তুমি তাদের মাল হতে যাকাত গ্রহণ কর এবং তাদের জন্য দু‘আ কর। কেননা তোমার দু‘আ তাদের অন্তরের প্রশান্তি।’’
হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, সদাক্বার মাল গ্রহীতার জন্য মুস্তাহাব হল সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দাতার জন্য দু‘আ করা। আহলে যাহের সহ আরো অনেক সূরা আত্ তাওবার ১০৩ নং আয়াতের আলোকে বলেছেন যে দু‘আ করা ওয়াজিব। তবে এ আবশ্যকতাটি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য নির্দিষ্ট।
হাদীস থেকে আরো প্রমাণিত হয় যে, নাবীগণ ব্যতীত স্বতন্ত্রভাবে অন্য কোন ব্যক্তির صلاة (সালাত) শব্দের মাধ্যমে দু‘আ করা বৈধ এবং সদাক্বাহ্ (সাদাকা) গ্রহীতা সদাক্বাদাতার জন্য এ দু‘আ করতে পারে। এটি ইমাম আহমাদ (রহঃ)-এর অভিমত। তাদের ভাষ্যমতে এখানে صلاة দ্বারা উদ্দেশ্য দু‘আ, বারাকাত কামনা, সম্মান বা মর্যাদা কামনা নয়। ইমাম বুখারী (রহঃ) ও সাধারণভাবে তা বৈধ বলে মনে করেন। আর ইমাম মালিক, শাফি‘ঈ আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) বলেন, নাবী-রসূলগণ ব্যতীত অন্য কারো জন্য স্বতন্ত্রভাবে সালাত আদায় করা বৈধ নয় তবে তাবি‘ঈন বা নাবী-রসূলগণের পরে সকলের উপরে কারো নাম আসলে সেক্ষেত্রে তাদের সালাত আদায় করা জায়িয।
ইমাম ইবনুল ক্বইয়্যূম (রহঃ) বলেন, পছন্দনীয় অভিমত হল, নাবীগণ ফেরেশতাগণ, নাবী-পত্নীগণ, নাবী-বংশধর, সন্তান-সন্ততি এবং আনুগত্যশীল ব্যক্তিদের ওপর সাধারণভাবে সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) আদায় করা যায়। আর নাবীগণ ব্যতীত অন্য কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে তা অপছন্দনীয়। বিষয়টির সারাংশ হল আল্লাহ এবং আল্লারহ রাসূলের ক্ষেত্রে যে কোন মুসলিম ব্যক্তির জন্য صلاة শব্দের মাধ্যমে দু‘আ করা বৈধ। যেমনটি বিভিন্ন হাদীসে এসেছে। আর আল্লাহ এবং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত অন্য কারো ক্ষেত্রে স্বতন্ত্রভাবে কারো জন্য صلاة শব্দের মাধ্যমে দু‘আ করা বৈধ নয়। তবে তাব্‘আন (অনুসৃত) জায়িয।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
১৭৭৮-[৭] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাকাত আদায়ের জন্য ’উমার (রাঃ)-কে পাঠালেন। কেউ এসে খবর দিলো যে, ইবনু জামিল, খালিদ ইবনু ওয়ালীদ আর ’আব্বাস (রাঃ)যাকাত দিতে অস্বীকার করেছে। (এ কথা শুনে) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ইবনু জামিল এজন্য যাকাত দিতে অস্বীকার করেছেন যে, (প্রথম দিকে) গরীব ছিল। এরপর আল্লাহ ও তাঁর রসূল তাকে সম্পদশালী করেছেন। আর খালিদ ইবনু ওয়ালীদ-এর ব্যাপার হলো, তোমরা তার ওপর যুলম্ করছ। সে তো তার যুদ্ধসামগ্রী আল্লাহর পথে ওয়াকফ করে দিয়েছে (কাজেই তোমরা তার শুধু এ বছরই নয় বরং) এ রকম (আগামী বছর)ও। এরপর থাকে ’আব্বাস-এর বিষয়। তার এ বছরের যাকাত এবং এর সমপরিমাণ আমার দায়িত্বে। অতঃপর তিনি বললেন, হে ’উমার! তুমি কি জানো না কোন ব্যক্তির চাচা তার পিতার মতই। (বুখারী, মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
عَن أَبِي هُرَيْرَةَ. قَالَ: بَعَثَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عُمَرَ عَلَى الصَّدَقَةِ. فَقِيلَ: مَنَعَ ابْنُ جَمِيلٍ وَخَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ وَالْعَبَّاسُ. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا يَنْقِمُ ابْنُ جَمِيلٍ إِلَّا أَنَّهُ كَانَ فَقِيرًا فَأَغْنَاهُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ. وَأَمَّا خَالِدٌ فَإِنَّكُمْ تَظْلِمُونَ خَالِدًا. قَدِ احْتَبَسَ أَدْرَاعَهُ وَأَعْتُدَهُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ. وَأَمَّا الْعَبَّاسُ فَهِيَ عَلَيَّ. وَمِثْلُهَا مَعَهَا» . ثُمَّ قَالَ: «يَا عُمَرُ أَمَا شَعَرْتَ أَن عَم الرجل صنوا أَبِيه؟»
ব্যাখ্যা: রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘উমার (রাঃ)-কে আমেল হিসেবে ফরয যাকাত আদায় করতে পাঠান। তাঁকে বলা হলো যে, ইবনু জামিল, খালিদ ইবনু ওয়ালীদ এবং ‘আব্বাস যাকাত আদায় করতে অস্বীকার করেছেন। অথচ তারা সাহাবী।
ইবনু জামিল-এর ক্ষেত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সে গরীব ছিল পরে আল্লাহ তাকে ধনী বানিয়েছেন ফলে এর প্রতিশোধ গ্রহণকল্পে সে যাকাত দিতে অস্বীকার করেছে। কিন্তু এটি প্রতিশোধ গ্রহণ করার মত কোন বিষয় নয়। অথবা সে মূলত কোন প্রকার অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেনি। তাই তার উচিত আল্লাহ তা‘আলা তাকে যা দিয়েছেন তার যাকাত দেয়া এবং নি‘আমাতের অস্বীকৃতি জ্ঞাপন না করা।
খালিদ-এর ক্ষেত্রে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘‘সে তার বর্মসমূহ এবং যুদ্ধাস্ত্রগুলো আল্লাহর পথে জমা করে রেখেছে।’’ কয়েকভাবে এ উক্তির ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
প্রথমতঃ যাকাত আদায়কারীগণ খালিদ-এর জমাকৃত বর্ম এবং যুদ্ধাস্ত্রের অর্থের যাকাত চাইলে এই ধারণায় যে তা ব্যবসার জন্য গচ্ছিত আছে যাতে যাকাত আবশ্যক। কিন্তু খালিদ তাদের বললেন, এতে তো যাকাত আবশ্যক নয়। তাই তারা এ ব্যাপারে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট অভিযোগ করলে তিনি বললেন, তোমরাতো তার প্রতি অবিচার করেছো। কারণ সে তো তা জমা করে আল্লাহর রাস্তায় ওয়াকফ করে দিয়েছে। ফলে তাতে যাকাত আবশ্যক হয় না।
দ্বিতীয়তঃ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খালিদ-এর পক্ষ থেকে ওজর পেশ করেছেন এবং প্রত্যুত্তর করেছেন যে, খালিদ-এর ওপর যাকাত আবশ্যক হলে সে তা দিতে অস্বীকার করবে না। কেননা সে তো আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় তার বর্ম এবং অস্ত্রগুলো আল্লাহর পথে জমা দিয়ে দিয়েছে যা তার প্রতি আবশ্যক ছিল না।
ফলে কিভাবে সে ফরয সদাক্বাহ্ (সাদাকা) প্রদানে অস্বীকৃতি জানাবে।
আর ‘আব্বাস (রাঃ)-এর ক্ষেত্রে তিনি বলেছেন, ‘‘তার যাকাতের জামিন আমি এবং তার সাথে তার সমপরিমাণ এর অর্থ কয়েকটি হতে পারে।’’
প্রথমতঃ ‘আব্বাস (রাঃ)-এর প্রয়োজনের তাকিদে তিনি তার দু’ বছরের যাকাত বিলম্বিত করে নিজে তা আদায়ের দায়িত্ব নিয়েছেন। যেমনটি আবূ ‘উবায়দাহ্ বলেছেন।
দ্বিতীয়তঃ ‘আব্বাস (রাঃ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট বর্তমান এবং আগামী দু’ বছরের অগ্রিম সদাক্বাহ্/যাকাত প্রদান করেছেন। ফলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘আব্বাস-এর দুই বছরের সদাক্বাহ্ (সাদাকা) যা আমার কাছে রয়েছে আমি তা দিয়ে দিব।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
১৭৭৯-[৮] আবূ হুমায়দ আস্ সা’ইদী (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আযদ গোত্রের ইবনুল লুত্বিয়াহ্ নামক ব্যক্তিকে যাকাত আদায় করার জন্য কর্মকর্তা নিযুক্ত করলেন। সে (যাকাত উসূল করে) মদীনায় ফিরে এসে (মুসলিমদের নিকট) বলতে লাগল, এ পরিমাণ সম্পদ তোমাদের (যাকাত হিসেবে উসূল হয়েছে, তোমরা এর হকদার)। আর এ পরিমাণ সম্পদ তুহফা হিসেবে আমাকে দেয়া হয়েছে (এটা আমার হক)। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (এসব কথা শুনে) লোকদের উদ্দেশে হামদ ও সানা পড়ে খুতবাহ্ দিলেন। তিনি (খুতবায়) বললেন, তোমাদের কিছু লোককে আমি ওসব কাজের জন্য নিয়োগ দিয়েছি যেসব কাজের জন্য আল্লাহ আমাকে হাকিম বানিয়েছেন। এখন তোমাদের এক ব্যক্তি এসে বলছে, এটা (যাকাত) তোমাদের জন্য, আর এটা হাদিয়্যাহ্। এ হাদিয়্যাহ্ আমাকে দেয়া হয়েছে। তাকে জিজ্ঞেস করো, সে ব্যক্তি তার পিতা অথবা মাতার বাড়ীতে বসে রইল না কেন? তখন সে দেখতো (তুহফা দানকারীরা) তাকে তার বাড়ীতেই তুহফা পৌঁছে দিয়ে যেত কিনা?
ঐ মহান সত্তার কসম! যাঁর হাতে আমার জীবন। তোমাদের যে ব্যক্তি যে কোন জিনিস তদ্রূপ করবে তা কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন তার গর্দানের উপর বহন করে নিয়ে আসবে। যদি তা উট হয় তাহলে তার আওয়াজ উটের আওয়াজ হবে। যদি তা গরু হয় তাহলে তার আওয়াজ গরুর আওয়াজ হবে। যদি তা বকরী হয় তাহলে বকরীর আওয়াজ হবে। (অর্থাৎ দুনিয়ায় কোন জিনিস অন্যায়ভাবে গ্রহণ করলে, তা কিয়ামতের দিন তার ঘাড়ে সওয়ার হয়ে কথা বলতে থাকবে)। এরপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দু’ হাত এতো উপরে উঠালেন যে, আমরা তার বগলের নীচের শুভ্রতা দেখতে পেলাম। এরপর তিনি বললেন, হে আল্লাহ! আমি মানুষের কাছে কি তা পৌঁছে দিয়েছি? হে আল্লাহ! আমি (তোমার কথা) কি মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছি? (বুখারী, মুসলিম)[1]
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী, ’’তাকে জিজ্ঞেস করো, সে ব্যক্তি তার পিতা-মাতার বাড়ীতে বসে থাকল না কেন? তখন সে দেখত তুহফা তার বাড়ীতে পৌঁছে দিয়ে যায় কিনা?’’ এ সম্পর্কে খাত্ত্বাবী (রহঃ) বলেন, এ বাণী এ কথারই দলীল যে, কোন হারাম কাজের জন্য যে জিনিসকে উপায় বা ওয়াসিলা বানানো হয় সে উপায়ে বা ওয়াসিলাও হারাম। আরো বলা যায়, কোন একটি ব্যাপারকে অন্য কোন ব্যাপারের সাথে (যেমন- বেচাকেনা, বিয়ে-শাদী ইত্যাদি) সম্পর্কিত করলে দেখতে হবে, সে ব্যাপারগুলোর কোন পৃথক পৃথক হুকুম এদের এক সাথে সম্পর্কিত হুকুমের সদৃশ কি-না। হলে তা জায়িয। আর না হলে না জায়িয। (শারহুস্ সুন্নাহ্)
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
عَن أبي حميد السَّاعِدِيّ: اسْتَعْمَلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَجُلًا مِنَ الأزد يُقَال لَهُ ابْن اللتبية الأتبية عَلَى الصَّدَقَةِ فَلَمَّا قَدِمَ قَالَ: هَذَا لَكُمْ وَهَذَا أُهْدِيَ لِي فَخَطَبَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَحَمِدَ اللَّهَ وَأثْنى عَلَيْهِ وَقَالَ: أَمَّا بَعْدُ فَإِنِّي أَسْتَعْمِلُ رِجَالًا مِنْكُمْ عَلَى أُمُور مِمَّا ولاني الله فَيَأْتِي أحدكُم فَيَقُول: هَذَا لكم وَهَذَا هَدِيَّةٌ أُهْدِيَتْ لِي فَهَلَّا جَلَسَ فِي بَيْتِ أَبِيهِ أَوْ بَيْتِ أُمِّهِ فَيَنْظُرُ أَيُهْدَى لَهُ أَمْ لَا؟ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا يَأْخُذُ أَحَدٌ مِنْهُ شَيْئًا إِلَّا جَاءَ بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَحْمِلُهُ عَلَى رَقَبَتِهِ إِنْ كَانَ بَعِيرًا لَهُ رُغَاءٌ أَوْ بَقْرًا لَهُ خُوَارٌ أَوْ شَاة تَيْعر ثمَّ رفع يَدَيْهِ حَتَّى رَأينَا عفرتي إِبِطَيْهِ ثُمَّ قَالَ: «اللَّهُمَّ هَلْ بَلَّغْتُ اللَّهُمَّ هَل بلغت» . . قَالَ الْخَطَّابِيُّ: وَفِي قَوْلِهِ: «هَلَّا جَلَسَ فِي بَيْتِ أُمِّهِ أَوْ أَبِيهِ فَيَنْظُرُ أَيُهْدَى إِلَيْهِ أَمْ لَا؟» دَلِيلٌ عَلَى أَنَّ كُلَّ أَمْرٍ يُتَذَرَّعُ بِهِ إِلَى مَحْظُورٍ فَهُوَ مَحْظُورٌ وَكُلُّ دخل فِي الْعُقُودِ يُنْظَرُ هَلْ يَكُونُ حُكْمُهُ عِنْدَ الِانْفِرَادِ كَحُكْمِهِ عِنْدَ الِاقْتِرَانِ أَمْ لَا؟ هَكَذَا فِي شرح السّنة
ব্যাখ্যা: উক্ত হাদীস হতে বুঝা যায় যে, যাকাত আদায় করার সময় কোন প্রকার হাদিয়্যাহ্ গ্রহণ করা জায়িয নয়। প্রকৃতপক্ষে এ হুকুম সকল লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যারা এরূপ হাদিয়্যাহ্ বা ঘুষ গ্রহণ করবে ক্বিয়ামাতের (কিয়ামতের) দিনে উক্ত হাদিয়্যার মাল কাঁধে করে বহন করবে। উক্ত লোকটি কে ছিলেন তা নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, ইয়ামানের আযদ গোত্রের। আবার কেউ কেউ বলেন, আসাদ গোত্রের। কোন কোন বর্ণনায় আছে, বানী আসাদ। কেউ কেউ বলেন, উক্ত গোত্রের নাম আযদও বলা হয় এবং আসাদও বলা হয়। কেউ কেউ বলেন, তার নাম ইবনু লুতবিয়্যাহ্। হাফিয ইবনু হাজার বলেন যে, আমি তার নাম সম্পর্কে অবহিত হয়নি।
এ হাদীস থেকে কতগুলো উপকারিতা পাওয়া যায়। যথাঃ ১. ইমাম নাবাবী বলেন, হাদীস থেকে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, যাকাত আদায়কারীদের গ্রহণকৃত উপঢৌকন হারাম এবং তা আমানাতের খিয়ানত।
২. যাকাত আদায়কারী আমানতদার ব্যক্তিকে আত্মসমালোচনা করতে হবে। কেননা এটি তার আমানাতকে সঠিক ভাবে পৌঁছাতে সাহায্য করবে।
৩. যাকাত আদায়কারীদেরকে প্রদত্ত উপঢৌকনসমূহ বায়তুল মালের অন্তর্ভুক্ত হবে। যাকাত আদায়কারী তার স্বত্বাধিকারী হবে না যদি না নেতা সন্তুষ্ট চিত্তে তা তাকে দেন।
৪. কোন ব্যক্তি পক্ষপাতমূলকভাবে কোন সম্পদ গ্রহণের জন্য যে সব পথ অবলম্বন করে তা বাতিল।
৫. যে ব্যক্তি কোন ব্যাখ্যা জানতে পারবে যা কেউ গ্রহণ করলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাহলে তার ভুলটি মানুষদের মাঝে বর্ণনা করে দিবে, যাতে তারা এর দ্বারা প্রতারিত হওয়া থেকে সতর্ক হতে পারে।
৬. ভুলকারীকে ধমক/শাসন করা বৈধ এবং নেতৃত্ব, আমানাত রক্ষার ক্ষেত্রে উত্তম ব্যক্তির বিদ্যমানে তার চেয়ে নিচু স্তরের লোক নিয়োগ দেয়া বৈধ।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
১৭৮০-[৯] ’আদী ইবনু ’উমায়রাহ্ (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি তোমাদের কাউকে কোন কাজের জন্য (যাকাত ইত্যাদি উসূল করার জন্য) নিয়োগ করলে, সে যদি একটি সূঁচ সমান অথবা এর চেয়ে ছোট বড় কোন জিনিস গোপন করে তা খিয়ানাত হবে। কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন তা (লাঞ্ছনা সহকারে) আনা হবে। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ عَدِيِّ بْنِ عُمَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنِ اسْتَعْمَلْنَاهُ مِنْكُم على عمل فَكَتَمَنَا مِخْيَطًا فَمَا فَوْقَهُ كَانَ غُلُولًا يَأْتِي بِهِ يَوْم الْقِيَامَة» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: যাকাত আদায়কারীদের উচিত হবে যে, আদায়কৃত সকল মাল ছোট হোক আর বড় হোক আদায় করে দিবে। যদি কিছু গোপন করে তবে তা হবে খিয়ানাত ও হারাম।
অত্র হাদীসে যাকাত আদায়কারীদের আমানাত রক্ষার উপর উৎসাহিত করা হয়েছে এবং নগণ্য বস্ত্ত হলেও তার খিয়ানাত করা থেকে সতর্ক করা হয়েছে। আর মুসলিমরা সকলেই একমত যে, আমানাতের খিয়ানাত করা হারাম যা কাবীরা গুনাহও বটে। আর কেউ যদি তা করে তাহলে তাকে তা ফেরত দিতে হবে।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
১৭৮১-[১০] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন এ আয়াত, وَالَّذِيْنَ يَكْنِزُوْنَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ অর্থাৎ ’’যেসব লোক সোনা-রূপা জমা করে রাখে’’- (সূরাহ্ আত্ তওবা্ ৯: ৩৪) আয়াতের শেষ পর্যন্ত নাযিল হল তখন সাহাবীগণ চিন্তিত হয়ে পড়ল। ’উমার (রাঃ) বলেন, আমি তোমাদের এ দুশ্চিন্তা নিরসন করে দিচ্ছি। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গেলেন। তাঁকে বললেন, হে আল্লাহর নবী! এ আয়াত তো আপনার সাথীদের জন্য ভারি বোঝা হয়েছে। (এ কথা শুনে) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল্লাহ তা’আলা (সকল ব্যয় নির্বাহের পর) অবশিষ্ট মাল পবিত্র করার ব্যবস্থা স্বরূপ তোমাদের ওপর যাকাত ফরয করেছেন। আল্লাহ তা’আলা এজন্যই ওয়ারিস ঠিক করে দিয়েছেন। এরপর তিনি এ বাক্য উল্লেখ করলেন, যেন তোমাদের পরবর্তীরা যাতে এ মালের মালিক হয়ে যায়। ’আব্বাস (রাঃ)বলেন, এ কথা শুনে ’উমার (রাঃ) ’আল্ল-হু আকবার’ বলে উঠলেন। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ’উমার (রাঃ) কে বললেন, আমি কি তোমাকে মানুষের সবচেয়ে উত্তম গচ্ছিত বস্তু সম্পর্কে অবহিত করব না? তা হলো চরিত্রবান স্ত্রী। স্বামী যখন তার প্রতি দৃষ্টিপাত করবে খুশী হয়ে যাবে, তাকে কোন হুকুম করলে পালন করবে, সে ঘরে না থাকলে তার ধন-সম্পদের সুরক্ষা করবে। (আবূ দাঊদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِى
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: لَمَّا نَزَلَتْ (وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ)
كَبُرَ ذَلِكَ عَلَى الْمُسْلِمِينَ. فَقَالَ عُمَرُ أَنَا أُفَرِّجُ عَنْكُمْ فَانْطَلَقَ. فَقَالَ: يَا نَبِيَّ اللَّهِ قد كبر على أَصْحَابك هَذِه الْآيَة. فَقَالَ نَبِيُّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ اللَّهَ لم يفْرض الزَّكَاة إِلَّا ليطيب بهَا مَا بَقِيَ مِنْ أَمْوَالِكُمْ وَإِنَّمَا فَرَضَ الْمَوَارِيثَ وَذكر كلمة لتَكون لمن بعدكم» قَالَ فَكَبَّرَ عُمَرُ. ثُمَّ قَالَ لَهُ: «أَلَا أُخْبِرُكَ بِخَيْرِ مَا يَكْنِزُ الْمَرْءُ الْمَرْأَةُ الصَّالِحَةُ إِذَا نَظَرَ إِلَيْهَا سَرَّتْهُ وَإِذَا أَمَرَهَا أَطَاعَتْهُ وَإِذَا غَابَ عَنْهَا حفظته» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ যখন সূরাহ্ আত্ তাওবাহ্-র যাকাত সম্পর্কে ৩৪ নং আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন ‘উমার (রাঃ) বলেনঃ হে আল্লাহর নাবী! এ আয়াতটি মুসলিমদের ওপর খুবই বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল্লাহ তা‘আলা যাকাতের সম্পদ পবিত্র করার জন্য ফরয করেছেন। আর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ উত্তম ধনভান্ডার হলো সতীনারী যে স্বামীর আনুগত্য করে।
ক্বাযী ‘আয়ায বলেন, যখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের বললেন, যে মালের যাকাত আদায় করলে তা জমা করা/গচ্ছিত রাখায় কোন সমস্যা নেই এবং দেখলেন যে, তারা এতে খুশি হয়েছেন তখন তার থেকে বিরত রাখার এর চেয়ে অধিক উত্তম এবং স্থায়ী বিষয়ের সংবাদ দিলেন। আর তা হল একজন সত্বী সুন্দরী রমণী। কারণ স্বর্ণ/অর্থ সম্পদ মানুষের সাথে কিছু সময়ের জন্য থাকে কিন্তু একজন রমণী তার দুনিয়ার জীবনের সাথী যার দিকে দৃষ্টিপাত করলে সে তোমাকে আনন্দিত করে, প্রয়োজনের সময় তুমি তার মাধ্যমে তোমার যৌনবৃত্তি পূর্ণ কর, কোন গোপন বিষয়ে তার সাথে পরামর্শ করলে সে তোমার গোপনীয়তা সংরক্ষণ করে, প্রয়োজনীয় মুহূর্তে তার সাহায্য চাইলে সে তোমার আনুগত্য করে। যখন তুমি তার থেকে অনুপস্থিত থাকো তখন সে তোমার সম্পদ সংরক্ষণ করে পরিবারের যত্ন নেয়। আর এত কিছু না হলেও সে তোমার একটি সন্তান জন্ম দেয় যে জীবতাবস্থায় তোমার সহকারী এবং মৃত্যুর পরে তোমার খলীফা হবে। অতএব, তার অনেক ফযীলত রয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
১৭৮২-[১১] জাবির (রাঃ) ইবনু ’আতীক (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কাছে একটি ছোট কাফিলা (যাকাত আদায়কারী প্রশাসক) আসবেন। এরা লোকদের কাছে অযাচিত বিবেচিত হবে। তাই যখন তারা তোমাদের কাছে আসবে তখন স্বাগত জানাবে। তাদের কাছে যাকাতের মাল এনে জমা করবে। যদি তারা যাকাত উসূলে ইনসাফ করে তা তাদের উপকার করবে। আর যদি যুলম করে তাহলে তার পরিণাম ভোগ করবে। তোমরা যাকাত উসূলকারীদেরকে সন্তুষ্ট রাখবে। তোমাদের সকল সম্পদের যাকাত আদায় করাই হবে তাদের সন্তুষ্টির কারণ। যাকাত আদায়কারীদের উচিত হবে তোমাদের জন্য দু’আ করা। (আবূ দাঊদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِى
عَن جَابِرِ بْنِ عَتِيكٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «سَيَأْتِيكُمْ رُكَيْبٌ مُبَغَّضُونَ فَإِذا جاؤكم فَرَحِّبُوا بِهِمْ وَخَلُّوا بَيْنَهُمْ وَبَيْنَ مَا يَبْتَغُونَ فَإِنْ عَدَلُوا فَلِأَنْفُسِهِمْ وَإِنْ ظَلَمُوا فَعَلَيْهِمْ وَأَرْضُوهُمْ فَإِنَّ تَمَامَ زَكَاتِكُمْ رِضَاهُمْ وَلْيَدْعُوا لَكُمْ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: উক্ত হাদীসের অর্থ হল, কিছু যাকাত আদায়কারীদের চরিত্র ভাল হবে না। তারা অহংকারী হবে। তাদের সাথে তোমরা ভাল ব্যবহার করবে। তাদের প্রয়োজন মিটাতে সাহায্য করবে। তারা ইনসাফ করলে তাদেরই কল্যাণ। আর যুলম করলে তাদের ওপর পাপ বর্তাবে। তোমরা যাকাত প্রদান করে তাদেরকে খুশি করে বিদায় দিবে, যাতে তারা তোমাদের জন্য দু‘আ করে।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
১৭৮৩-[১২] জারীর ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (একবার) গ্রাম্য ’আরবদের কিছু লোক রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হলেন। তারা জানান যে, যাকাত আদায়কারী কিছু লোক তাদের কাছে যায় এবং তারা তাদের ওপর যুলম করে। (এ কথা শুনে) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাদেরকে খুশী রাখো। তোমাদের সাথে যুলম করলেও তাদের খুশী করো। (আবূ দাঊদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِى
عَن جَرِيرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ: جَاءَ نَاسٌ يَعْنِي مِنَ الْأَعْرَابِ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالُوا: إِنَّ نَاسًا مِنَ المصدقين يَأْتُونَا فيظلمونا قَالَ: فَقَالَ: «أَرْضُوا مُصَدِّقِيكُمْ وَإِنْ ظُلِمْتُمْ» رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যা: এ হাদীস থেকেও বুঝা যায় যে, যাকাত আদায়কারীগণ যদি মালদারদের উপর যুলম করে তবুও তাদের সাথে ভাল আচরণ করতে হবে। কারণ তাদের সন্তুষ্টির উপর যাকাত আদায়ের পূর্ণতা বহন করে। আর তাদের যুলমের জন্য তারাই দায়ী হবে।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উক্তি ‘‘তোমরা তোমাদের যাকাত আদায়কারীদের সন্তুষ্ট করবে যদিও তোমরা অত্যারিত হত’’ এর অর্থ যদি তোমাদের বিশ্বাস এটি হয় যে, তোমরা সম্পদের ভালবাসার কারণে অত্যাচারিত। তাঁর উদ্দেশ্য এটি নয় যে, তোমরা বাস্তবিক অত্যাচারিত হলেও তাদেরকে সন্তুষ্ট করা আবশ্যক বরং উদ্দেশ্য হল তাদেরকে সন্তুষ্ট করা মুস্তাহাব যদি তারা বাস্তবিক অত্যাচারিত হয়। যেহেতু রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তাদের সন্তুষ্টিই তোমাদের যাকাতে পূর্ণতা।
আল্লামা সিনদী বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানেন যে, যাকাত আদায়কারী কর্মচারীগণ অত্যাচার করবে না। কিন্তু সম্পদের মালিকগণ সম্পদের প্রতি আসক্তির কারণে সম্পদ গ্রহণ করাকে যুলম মনে করে। ফলে তাদের যা বলার বলেছেন। ফলে এ হাদীসে যাকাত আদায়কারী কর্মচারীদের অত্যাচারের স্বীকৃতি, মানুষের সেই অত্যাচারের উপর ধৈর্যধারণ করতে হবে এ বিষয়ের স্বীকৃতি কিংবা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত পরিমাণ যাকাতের অতিরিক্ত যাকাত দিতে হবে এ ধরনের কোন বিষয় নেই।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
১৭৮৪-[১৩] বাশীর ইবনুল খাসাসিয়্যাহ্ (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সবিনয়ে জানালাম যে, যাকাত আদায়কারীরা যাকাতের ব্যাপারে আমাদের উপর বাড়াবাড়ি করে। (এ অবস্থায়) পরিমাণের চেয়ে যে মাল তারা বেশী নেয়, আমরা কি তা গোপন রাখতে পারি? তিনি বললেন, না। (আবূ দাঊদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِى
وَعَنْ بَشِيرِ بْنِ الْخَصَاصِيَّةِ قَالَ: قُلْنَا: أَنَّ أَهْلَ الصَّدَقَةِ يَعْتَدُونَ عَلَيْنَا أَفَنَكْتُمُ مِنْ أَمْوَالِنَا بِقَدْرِ مَا يَعْتَدُونَ؟ قَالَ: «لَا» رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: যাকাত আদায়কারীরা যদি সীমালঙ্ঘন করে তবুও যাকাতের মাল গোপন করা ঠিক নয়। অর্থাৎ যদি আমরা জানতে পারি যে, তারা পাঁচটি উটে দু’টি ছাগল নিবে। অথচ তাদের হক হলো একটি ছাগল। সুতরাং আমাদের দশটি উট থাকলে পাঁচটি উট গোপন করব। মোটকথা এরূপ জায়িয নয়। কারণ কিচু মাল গোপন করা আমানাতের খিয়ানাত করা। আর খিয়ানাত হল একটি মিথ্যা এবং চক্রান্তমূলক কর্ম যা হারাম। তাই তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদের অনুমতি দেননি।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
১৭৮৫-[১৪] রাফি’ ইবনু খাদীজ (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে প্রশাসক যথাযথভাবে যাকাত উসূল করে সে গাযীর মতো যতক্ষণ না সে গৃহে প্রত্যাবর্তন করে। (আবূ দাঊদ ও (তিরমিযী)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِى
وَعَن رَافع بن خديح قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْعَامِلُ عَلَى الصَّدَقَةِ بِالْحَقِّ كَالْغَازِي فِي سَبِيلِ اللَّهِ حَتَّى يَرْجِعَ إِلَى بَيْتِهِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالتِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: উক্ত হাদীস থেকে প্রমাণ হয় যে, হকভাবে যাকাত আদায় করা জিহাদে শরীক হওয়ার ন্যায় নেকীর কাজ। যতক্ষণ না ঐ যাকাত আদায়কারী স্বীয় বাড়ীতে ফিরে আসে ততক্ষণ সে নেকী পেতেই থাকে। যেমনিভাবে জিহাদকারীর ব্যাপারে প্রমাণ আছে।
হকভাবে যাকাত আদায় করার অর্থ হলো, নিষ্ঠা এবং সাওয়াবের আশায় সে কর্ম করা অথবা আদায়কৃত যাকাতের মালের মধ্যে খিয়ানাত না করা, সম্পদের মালিকদের উপর অত্যাচার না করা কম বেশি সম্পদ গ্রহণের মাধ্যমে।
এ হাদীসের ব্যাখ্যায় তিরমিযীর ভাষ্যকার ইবনুল আরাবী (রহঃ) বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা মহান দাতা। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোন মুজাহিদের বাহন প্রস্ত্তত করে দিল সে জিহাদে অংশগ্রহণকারীর সমান নেকীর অধিকারী হল, আর যে উত্তম ভাবে মুজাহিদের পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণ করল সেও মুজাহিদের সমপরিমাণ নেকী পেল। আর সদাক্বাহ্/যাকাত সংগ্রাহক মুজাহিদের প্রতিনিধি। কেননা সে আল্লাহর রাস্তায় মাল একত্রিত করে। অতএব সে তার কর্মে ও নিয়্যাতে গাজী।
নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয়ই মাদানীয় কিছু লোক রয়েছে যারা (মদীনায় অবস্থান করেও) জিহাদের উদ্দেশে তোমরা সেখানেই গিয়েছে তোমাদের সাথে থেকেছে। কারণ ওযর তাদেরকে বন্দী করে রেখেছে। এটি যদি এদের অবস্থা হয় তাহলে যে ব্যক্তিকে গাজীর কাজ, তার প্রতিনিধিত্ব এবং সে আল্লাহর পথে যে মাল খরচ করে তার একত্রিতকরণ জিহাদের যাওয়া থেকে বিরত রাখে তার বিষয়টি কেমন হতে পারে। জিহাদ করা যেমন আবশ্যক তেমনি যাকাতের সম্পদ সংগ্রহ করাও আবশ্যক। এক্ষেত্রে তারা দু’জন নিয়্যাত এবং কর্মে পরস্পরের অংশীদার। তাই নেকীর ক্ষেত্রেও উভয়ে সমান হবে।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
১৭৮৬-[১৫] ’আমর ইবনু শু’আয়ব (রহঃ) তাঁর পিতার মাধ্যমে তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ যাকাত উসূলকারীর কাছে চতুষ্পদ পশুকে টেনে আনবে না। কিংবা চতুষ্পদ পশুর মালিকগণও দূরে সরে থাকবে না। এসব পশুর যাকাত তাদের অবস্থানে বসেই উসূল করবে। (আবূ দাঊদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِى
وَعَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا جَلَبَ وَلَا جَنَبَ وَلَا تُؤْخَذُ صَدَقَاتُهُمْ إِلَّا فِي دُورِهِمْ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যা: যাকাত আদায়কারী যেন যাকাত আদায় করার সময় এক স্থানে বসে না থাকে। বরং লোকদের বাড়ী বাড়ী যেয়ে যাকাত আদায় করে। আবার মালওয়ালারা তাদের জানোয়ার (ছাগল, গরু ও উট) দূরে না নিয়ে গিয়ে আপন গৃহে অবস্থান করবে। যাতে যাকাত আদায়কারীদের কষ্ট না হয়। মোটকথা যাকাত সংগ্রাহক মানুষের গৃহে গিয়ে যাকাত সংগ্রহ করবে এবং যাকাত আদায়ের কাজে একে অপরকে সাহায্য করবে।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
১৭৮৭-[১৬] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন ধন-সম্পদ লাভ করবে, এক বছর অতিবাহিত হবার আগে এ ধন-সম্পদের উপর তাকে যাকাত দিতে হবে না। (তিরমিযী; একদল লোক বলেছেন, এ হাদীসটির সানাদ ইবনু ’উমার (রাঃ) পর্যন্ত পৌঁছেছে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত নয়।)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِى
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنِ اسْتَفَادَ مَالًا فَلَا زَكَاة فِيهِ حَتَّى يحول عيه الْحَوْلُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَذَكَرَ جَمَاعَةٌ أَنَّهُمْ وَقَفُوهُ على ابْن عمر
ব্যাখ্যা: ইবনু মালিক বলেনঃ এ হাদীস হতে বুঝা যায়, যে ব্যক্তি কোন মাল অর্জন করল আর তার নিকট ঐ মালেরই নিসাব পরিমাণ মাল আছে, যেমন- তার ৮০টি ছাগল আছে। যার উপর ছয় মাস অতিবাহিত হয়েছে। অতঃপর তার আরো ৪১টি ছাগল জমা হলো ক্রয়ের মাধ্যমে হোক বা ওয়ারিসী সূত্রে হোক, তাহলে পরের ৪১টি ছাগলের উপর যাকাত ওয়াজিব হবে না যতক্ষণ না ক্রয়ের সময় বা ওয়ারিসী সূত্রে পাওয়ার সময় থেকে একটি বৎসর পূর্ণ হবে। আর এটি ইমাম শাফি‘ঈ ও ইমাম আহমাদের মত।
পক্ষান্তরে ইমাম আবূ হানীফাহ্ ও ইমাম মালিক-এর নিকট পরের মাল আগের মালের হিসাবের সঙ্গে একই হিসেবে গণ্য হবে। যেমন- বাচ্চা মায়ের অনুগামী হয়। সুতরাং এক বৎসর পূর্ণ হলে ৮০টির উপর ২টি ছাগল ওয়াজিব হবে। আর এটি আহলে হাদীসদের অভিমত। কারণ এক প্রকারের মাল হলে পরের মাল আগের মালের সাথে যোগ করতে হবে।
কোন বস্ত্তর বৃদ্ধি কয়েক ধরনের হয়ে থাকে। হয় লভ্যাংশের মাধ্যমে তার বৃদ্ধি ঘটবে অথবা প্রাপ্ত কোন উপঢৌকন, মীরাসের সম্পত্তি এবং যাকাত দেয়া হয় না এমন ক্রয়কৃত মালের মাধ্যমে বৃদ্ধি ঘটবে। অথবা চতুষ্পদ জন্তুর প্রসবকৃত বাচ্চার মাধ্যমে বৃদ্ধি ঘটবে। বর্ধিত এই সম্পত্তিগুলো মূল মালের সাথে মিলানো এবং তার গণনার ক্ষেত্রে ‘আলিমদের মাঝে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়েছে।
লভ্যাংশের মাধ্যমে বর্ধিত সম্পত্তির ক্ষেত্রে হুকুম হলো যদি মূল মাল নিসাব পরিমাণ হয় তাহলে লভ্যাংশের মাধ্যমে বর্ধিত মালকে মূল মালের সাথে মিলিয়ে তার বছর অনুপাতে যাকাত দিতে হবে। (অর্থাৎ কারো নিকট পাঁচলক্ষ টাকা থেকে বছর শুরু হল, অতঃপর সাত মাস পর পঞ্চাশ হাজার টাকা লভ্যাংশ তার সাথে যোগ হল। তাই বছর শেষে সব টাকা হিসাব করে একসাথে যাকাত দিতে হবে। লভ্যাংশের মাধ্যমে বর্ধিত টাকার জন্য নতুনভাবে বছর গণনা করা যাবে না) আর যদি মূল মাল নিসাব পরিমাণ না হয় তাহলে লভ্যাংশের মাধ্যমে বর্ধিত মালের কোন যাকাত দেয়া লাগবে না।
চতুষ্পদ জন্তুর প্রসবকৃত বাচ্চার মাধ্যমে বর্ধিত হুকুম লভ্যাংশেল মাধ্যমে বর্ধিত হুকুমের ন্যায়।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
১৭৮৮-[১৭] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (একবার) এক বছর পরিপূর্ণ হবার আগে নিজের যাকাত দিতে পারা যাবে কিনা ’আব্বাস (রাঃ)তা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাকে অনুমতি দিলেন। (আবূ দাঊদ, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, দারিমী)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِى
وَعَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: أَنَّ الْعَبَّاسَ سَأَلَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي تَعْجِيل صَدَقَة قَبْلَ أَنْ تَحِلَّ: فَرَخَّصَ لَهُ فِي ذَلِكَ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالتِّرْمِذِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ وَالدَّارِمِيُّ
ব্যাখ্যা: উক্ত হাদীস প্রমাণ করে যে, বৎসর পূর্ণ হওয়ার আগে যাকাত আদায় করা জায়িয। এটি ইমাম শাফি‘ঈ, ইমাম আহমাদ ও ইমাম আবূ হানীফার মত। আর এটিই আহলে হাদীসদের মত। তবে ইমাম মালিক-এর নিকট জায়িয নয়।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
১৭৮৯-[১৮] ’আমর ইবনু শু’আয়ব (রহঃ) তাঁর পিতার মাধ্যমে তার দাদা হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (একদিন) লোকজনকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, সাবধান! যে ব্যক্তি কোন ইয়াতীমের অভিভাবক হবে, (আর সে ইয়াতীমের যাকাত দেবার মতো ধন-সম্পদ হবে) সে যেন এ ধন-সম্পদকে ফেলে না রেখে ব্যবসায়ে খাটায়। কারণ ব্যবসা করা ছাড়া মাল আটকে রাখলে যাকাত দিতে দিতে তা শেষ হয়ে যাবে। (তিরমিযী; তিনি বলেন, এ হাদীসের সানাদের ব্যাপারে কথা আছে। কারণ এর একজন বর্ণনাকারী দুর্বল।)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِى
وَعَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَطَبَ النَّاسَ فَقَالَ: «أَلَا مَنْ وَلِيَ يَتِيمًا لَهُ مَالٌ فَلْيَتَّجِرْ فِيهِ وَلَا يَتْرُكْهُ حَتَّى تَأْكُلَهُ الصَّدَقَةُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: فِي إِسْنَادِهِ مقَال: لِأَن الْمثنى بن الصَّباح ضَعِيف
ব্যাখ্যা: শিশুর সম্পদে যাকাত ওয়াজিব কিনা এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ইমাম মালিক, শাফি‘ঈ ও আহমাদ (রহঃ)-এর মতে শিশুর সম্পদে যাকাত ওয়াজিব যা এ হাদীস থেকে প্রতীয়মান। ইমাম আবু হানীফার মতে, শিশুর সম্পদে যাকাত ওয়াজিব নয়। যদিও তার মতে শিশুর ফসল ফলফলাদিতে উশর আবশ্যক এবং তার সদাক্বাতুল ফিতর ওয়াজিব হবে। তার দলীল হল তিন ব্যক্তি থেকে কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। তন্মধ্যে একজন হল শিশু যতক্ষণ সে প্রাপ্ত বয়সে না পৌঁছে।
ইবনু কুদামাহ্ (রহঃ) বলেন, শিশু এবং পাগলের সম্পদে যাকাত আবশ্যক। যেহেতু তাদের মাঝে স্বাধীনতা, ইসলাম এবং পূর্ণ মালিকানা এ তিনটি শর্তই বিদ্যমান। এটিই সাহাবীদের মধ্যে ‘আলী, ইবনু ‘উমার, ‘আয়িশাহ্, হাসান, ‘উমার এবং জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) আর অন্যদের মধ্যে জাবির ইবনু জায়দ, ইবনু সীরিন, ‘আত্বা, মুজাহিদ, রবী‘আহ্, মালিক, শাফি‘ঈ (রহঃ) সহ আরো অনেকের অভিমত। যদিও এক্ষেত্রে ইবনু মাস্‘ঊদ (রাঃ) হতে সামান্য ভিন্নমত বর্ণিত হয়েছে কিন্তু সে আসারের সানাদ বিশুদ্ধ নয়। এ বিষয়ে তিরমিযীর ভাষ্যকার ‘আবদুর রহমান মুবারকপূরী বলেন, কোন একজন সাহাবী থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে এ কথা বর্ণিত হয়নি যে, শিশুর মালে যাকাত আবশ্যক নয়।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
১৭৯০-[১৯] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তিকালের পর আবূ বকর সিদ্দীক্ব (রাঃ)খলীফাহ্ হন তখন ’আরাবের কিছু লোক যাকাত প্রদান করতে অস্বীকৃতি জানায়। (আবূ বকর তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন শুনে) ’উমার (রাঃ) আবূ বকর (রাঃ)-কে বললেন, আপনি কিভাবে যুদ্ধ করবেন? অথচ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ’’আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, মানুষ যে পর্যন্ত ’লা- ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ’ (অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া সত্যিকার কোন ইলাহ নেই- এ কথার) ঘোষণা না দিবে ততক্ষণ তাদের সাথে যুদ্ধ করবে, যে ব্যক্তি ’’লা- ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ’’ বলল সে নিজের ধন-সম্পদ ও জীবন আমার থেকে নিরাপদ করে নিলো। তবে ইসলামের কারণে হলে ভিন্ন কথা। আর এর হিসাব আল্লাহর কাছে। তখন আবূ বকর (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম যে ব্যক্তি সালাত ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করবে, আমি অবশ্য অবশ্যই তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। কারণ নিঃসন্দেহে যাকাত সম্পদের হক। আল্লাহর কসম! তারা (যাকাত অস্বীকারকারীরা) যদি আমাকে একটি ছাগলের বাচ্চাও দিতে অস্বীকার করে যা তারা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময় দিত, তাহলেও আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। (তখন) ’উমার (রাঃ) বললেন, আল্লাহর শপথ! যুদ্ধের এ সিদ্ধান্ত আল্লাহর তরফ থেকে আবূ বকর-এর অন্তর্চক্ষু খুলে দেয়া ছাড়া আর কিছু বলে আমি মনে করি না। (বুখারী, মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِى
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: لَمَّا تُوُفِّيَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَاسْتُخْلِفَ أَبُو بَكْرٍ وَكَفَرَ مَنْ كَفَرَ مِنَ الْعَرَبِ قَالَ عُمَرُ: يَا أَبَا بَكْرٍ كَيْفَ تُقَاتِلُ النَّاسَ وَقَدْ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَقُولُوا: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ فَمَنْ قَالَ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ عَصَمَ مِنِّي مَالَهُ وَنَفْسَهُ إِلَّا بِحَقِّهِ وَحِسَابُهُ على الله . قَالَ أَبُو بَكْرٍ: وَاللَّهِ لَأُقَاتِلَنَّ مَنْ فَرَّقَ بَيْنَ الصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ فَإِنَّ الزَّكَاةَ حَقُّ الْمَالِ وَاللَّهِ لَوْ مَنَعُونِي عَنَاقًا كَانُوا يُؤَدُّونَهَا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَقَاتَلْتُهُمْ عَلَى مَنْعِهَا. قَالَ عُمَرُ: فَوَاللَّهِ مَا هُوَ إِلَّا أَن رَأَيْت أَن قد شرح الله صَدْرَ أَبِي بَكْرٍ لِلْقِتَالِ فَعَرَفْتُ أَنَّهُ الْحَقُّ
ব্যাখ্যা: রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওফাতের পর মুসায়লামাহ্-এর অনুসারী ইয়ামামাহবাসী ও অন্যকিছু সংখ্যক ‘আরবরা মুরতাদ হয়ে যায়। তখন আবূ বাকর সিদ্দীক্ব (রহঃ) সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন খালিদ ইবনু ওয়ালীদ-এর নেতৃত্বে। অবশেষে মুসায়লামাহ্-কে হত্যা করা হয়। অপর একটি দল যাকাত দিতে অস্বীকার করে। ফলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। আর এদের সংখ্যা ছিল অনেক। ফাতহুল বারীতে উল্লেখ হয়েছে যে, ক্বাযী ‘আয়ায (রহঃ) বলেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মৃত্যুর পর মুরতাদরা তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একদল মূর্তিপূজা আরম্ভ করে। আরেকদল মুসায়লামাহ্ ও আসওয়াদ আল আনাসীর অনুসরণ করে। ৩য় দলটি ইসলামের উপর থাকে কিন্তু যাকাত দিতে অস্বীকার করে। তারা যাকাতের বিষয়টি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগের সাথে নির্দিষ্ট বলে তা‘বীল করে। আবূ বাকর (রাঃ) তাদের সাথে প্রথমেই যুদ্ধ করেননি বরং তাদেরকে তাদের ভুলপথ হতে ফিরে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে যাকাত দিতে বলেছেন। এরপরও যখন তারা তা অস্বীকার করে যুদ্ধের প্রস্ত্ততি নিয়েছে তখন তিনি তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছেন।
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
১৭৯১-[২০] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন তোমাদের ধন-সম্পদ বিষধর সাপের রূপ ধারণ করবে। মালিক এর থেকে পালিয়ে থাকবে, আর সে মালিককে খুঁজতে থাকবে। পরিশেষে সে মালিককে পেয়ে যাবে এবং তার আঙ্গুলগুলোকে লুকমা বানিয়ে মুখে পুরবে। (আহমাদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَكُونُ كَنْزُ أَحَدِكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ شُجَاعًا أَقْرَعَ يَفِرُّ مِنْهُ صَاحِبُهُ وَهُوَ يَطْلُبُهُ حَتَّى يُلْقِمَهُ أَصَابِعه» . رَوَاهُ أَحْمد
ব্যাখ্যা: গচ্ছিত সম্পদ যার যাকাত আদায় করা হয় না তা সাপে পরিণত হবে। আর তার মালিক-এর দু’ গালে ও হাতে দংশন করতে থাকবে, কারণ সে হাত দ্বারা মাল অর্জন করেছিল।
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
১৭৯২-[২১] ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি তার মালের যাকাত আদায় করবে না, কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন আল্লাহ তা’আলা তার গলায় সাপ লটকিয়ে দেবেন। তারপর তিনি কুরআন থেকে এ অর্থের আয়াত তিলাওয়াত করলেন, অর্থাৎ ’’যারা আল্লাহর দেয়া মাল ব্যয়ে কৃপণতা করে, তারা যেন মনে না করে এ কাজ তাদের জন্য কল্যাণকর হয়েছে’’- (সূরাহ্ আ-লি ’ইমরান ৩: ১৮০) আয়াতের শেষ পর্যন্ত। (তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَا مِنْ رَجُلٍ لَا يُؤَدِّي زَكَاةَ مَالِهِ إِلَّا جَعَلَ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِي عُنُقِهِ شُجَاعًا» ثُمَّ قَرَأَ عَلَيْنَا مِصْدَاقَهُ مِنْ كِتَابِ اللَّهِ: (وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يبلخون بِمَا آتَاهُم الله من فَضله)
الْآيَة. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَالنَّسَائِيّ وَابْن مَاجَه
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
১৭৯৩-[২২] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে ধন-সম্পদের সাথে যাকাত মিশে যাবে নিশ্চয় তা তাকে ধ্বংস করে ছাড়বে। শাফি’ঈ, বুখারী, হুমায়দী; হুমায়দী বেশী এমন বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম বুখারী বলেছেন, মালের উপর যাকাত ওয়াজিব হবার পর তোমরা যদি তা আদায় না করো তাহলে এ যাকাত সম্পদের সাথে মিশে যায়। তাই হারাম মাল হালাল মালকে ধ্বংস করে দেয়। যেসব সম্মানিত ব্যক্তিগণ এ কথা বলেন যে, যাকাত মূল মালের সাথে সম্পর্কিত। তারা এ হাদীসকে তাদের স্বপক্ষে দলীল মনে করেন। (মুনতাক্বা’)[1]
শু’আবুল ঈমানে ইমাম বায়হাক্বী এ হাদীসটিকে ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল হতে ’আয়িশাহ্ (রাঃ) পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করেছেন। বস্তুত ইমাম আহমাদ (রহঃ) এ হাদীসের শব্দ خَالَطَتْ ’’কোন ব্যক্তির যাকাত গ্রহণের’’ ব্যাপারে এ ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, কেউ ধনী ও সম্পদশালী হওয়া সত্ত্বেও যদি যাকাত গ্রহণ করে। প্রকৃতপক্ষে যাকাত ফকীর-মিসকীন ও অন্যান্যদের হক।
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَا خَالَطَتِ الزَّكَاةُ مَالًا قَطُّ إِلَّا أَهْلَكَتْهُ» . رَوَاهُ الشَّافِعِيُّ وَالْبُخَارِيُّ فِي تَارِيخِهِ وَالْحُمَيْدِيُّ وَزَادَ قَالَ: يَكُونُ قَدْ وَجَبَ عَلَيْكَ صَدَقَةٌ فَلَا تُخْرِجْهَا فَيُهْلِكُ الْحَرَامُ الْحَلَالَ. وَقَدِ احْتَجَّ بِهِ من يرى تعلق الزَّكَاةِ بِالْعَيْنِ هَكَذَا فِي الْمُنْتَقَى
وَرَوَى الْبَيْهَقِيُّ فِي شُعَبِ الْإِيمَانِ عَنْ أَحْمَدَ بْنِ حَنْبَلٍ بِإِسْنَادِهِ إِلَى عَائِشَةَ. وَقَالَ أَحْمَدُ فِي «خَالَطَتْ» : تَفْسِيرُهُ أَنَّ الرَّجُلَ يَأْخُذُ الزَّكَاةَ وَهُوَ مُوسِرٌ أَو غَنِي وَإِنَّمَا هِيَ للْفُقَرَاء
ব্যাখ্যা: নিসাব সমপরিমাণ মাল যার হবে যদি সে যাকাত আদায় না করে, তাহলে এর মাধ্যমে যাকাত তার মূল মালের সাথে মিশ্রিত হবে। এ হাদীসের ব্যাখ্যায় মুনযিরী বলেন, এ হাদীসের ২টি অর্থ হতে পারে একটি হলো- যে মালের যাকাত বের করা হয় না, উক্ত যাকাত মালকে ধ্বংস করে ফেলে। এ হাদীসটিকে ‘উমারের মারফূ' হাদীসের সহায়ক যেখানে এসেছে যে, জলে-স্থলে মাল নষ্ট হয় যাকাত না দেয়ার কারণে। তবে উক্ত হাদীসটি দুর্বল। ২য় অর্থ যে ব্যক্তি যাকাত গ্রহণ করে অথচ সে ধনী, অতঃপর যখন তা নিজের মালের সাথে রাখে তা মালকে নষ্ট করে ফেলে। ইমাম আহমাদ এরূপ ব্যাখ্যা করেছেন। হাদীসে ধ্বংস করার অর্থ হল, তা বিভিন্ন বিপদাপদের মাধ্যমে কমে যাওয়া বা তা পর্যাপ্ত হলেও তার দ্বারা উপকৃত হওয়ার মাধ্যমে বারাকাত হ্রাস পাওয়া। ফলে তা ধ্বংসপ্রাপ্ত সম্পদের মতই হয়ে পড়ে।
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - যেসব জিনিসের যাকাত দিতে হয়
১৭৯৪-[১] আবূ সা’ঈদ আল্ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পাঁচ ওয়াসাকের কম খেজুর যাকাত থাকলে ওয়াজিব হয় না। পাঁচ উকিয়ার কম রূপায় যাকাত বাধ্যতামূলক নয়। কিংবা পাঁচটির কম উট থাকলেও যাকাত ওয়াজিব হয় না। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَجِبُ فِيْهِ الزَّكَاةُ
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَيْسَ فِيمَا دُونَ خَمْسَةِ أَوْسُقٍ مِنَ التَّمْرِ صَدَقَةٌ وَلَيْسَ فِيمَا دُونَ خَمْسِ أَوَاقٍ مِنَ الْوَرِقِ صَدَقَةٌ وَلَيْسَ فِيمَا دُونَ خَمْسِ ذَوْدٍ من الْإِبِل صَدَقَة»
ব্যাখ্যা: পাঁচ ওয়াসাক্বের কম খেজুরে যাকাত ফরয হয় না। পুরা পাঁচ ওয়াসাক্ব বা বেশী হলে উক্ত খেজুরে যাকাত ফরয হয়। ষাট সা'-এ এক ওয়াসাক্ব হয়। আর পাঁচ ওয়াসাকে তিনশত সা' হয়। আর সা'-এর পরিমাণ আড়াই কেজি। পাঁচ ওয়াসাকে ২০ মণ হয়।
আর পাঁচ উটের কমে যাকাত নেই। চার মুদে এক সা' হয়। মুদ এক রিতিল ও এক তৃতীয়াংশ রিতিলে হয়। সুতরাং এক পাঁচ রিতিল ও এক তৃতীয় রিতিলে হয়। আধা সেরে এক রিতিল হয়। যার পরিমাণ একশত ২৮ দিরহাম, আর প্রত্যেক দশক সাত মিসকাল।
নিশ্চয়ই হাদীসটি যে সব সম্পদে যাকাত ওয়াজিব হয় সেগুলোর নিসাব বর্ণনার ক্ষেত্রে একটি মৌলিক হাদীস। যেসব সম্পদে যাকাত ওয়াজিব হয় এ বিষয়ে ইমাম মালিক (রহঃ) বলেন, তিন প্রকার সম্পদে যাকাত দিতে হবে।
১. শস্যাদি, ২. নগদ অর্থ বা মুদ্রা, ও ৩. চতুষ্পদ জন্তু।
আর ইমাম ইবনুল ক্বাইয়্যিম বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চার প্রকার সম্পদে যাকাত নির্ধারণ করেছেন। যথাঃ
১. শস্যাদি, ২. চতুষ্পদ জন্তু, তথা উট, গরু, ছাগল, ৩. স্বর্ণ- রৌপ্য ও ৪. ব্যবসায় সম্পদ।
অত্র হাদীসে তিন প্রকার সম্পদের যাকাতের নিসাব বিবৃত হয়েছে।
প্রথম প্রকারঃ শস্যাদি ও ফলমূল। এর যাকাতে নিসাব হল তা পাঁচ ওয়াসাক্ব পরিমাণ হতে হবে। আর পাঁচ ওয়াসাক্বের সমান প্রায় ঊনিশ মণের মতো।
এটিই সকল ‘উলামাদের অভিমত। শুধুমাত্র ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) ব্যতীত। তার মতে জমিন থেকে উদগত ফসলের ক্ষেত্রে নিসাব শর্তটি প্রযোজ্য নয়। বরং এক্ষেত্রে উশর তথা এক-দশমাংশ এবং নিসফে উশর প্রযোজ্য যেমনটি ইবনু ‘উমার (রাঃ)-এর হাদীসে এসেছে যে, যে সকল ফসল আসমানের বৃষ্টি, ঝরণা বা নহরের বৃষ্টি দ্বারা এবং নালার পাশের ভূমিতে যাতে সেচ প্রয়োজন হয় না উৎপন্ন হয় তাতে এক দশমাংশ। আর যে সকল ফসল সেচের মাধ্যমে উৎপন্ন হয় তাতে নিসফে উশর আবশ্যক। এ হাদীসের আলোকে তিনি তার মতটি ব্যক্ত করেছেন। তবে সঠিক অভিমত হল অধিকাংশ উলামাগণ যেটি পোষণ করেছেন তথা যে কোন ধরনের জমিন থেকে উৎপাদিত ফসল, শস্যাদি এবং ফলমূলের যাকাতের ক্ষেত্রে নেসাব অবশ্যই শর্ত। আর তা হল পাঁচ ওয়াসাক্ব। এক্ষেত্রে নিসাবের হাদীস এবং উশরের হাদীসের মাঝে সমন্নয় হল নিসাব বা নিসাবের অধিক পরিমাণ ফসল উশর বা নিসফে উশর প্রযোজ্য হবে। কিন্তু নিসাবের কম ফসলে কোন প্রকার যাকাত আবশ্যক হবে না। আর শাক সবজি এবং কিছু ফলমূলের ক্ষেত্রে যাকাত ওয়াজিব নয়।
দ্বিতীয় প্রকারঃ নগদ অর্থ বা মুদ্রা তথা রৌপ্য ও স্বর্ণ। রৌপ্যের যাকাতে নিসাব হল পাঁচ উকিয়্যাহ্। এক উক্বিয়্যাহ্ সমান চল্লিশ দিরহাম। আর পাঁচ উক্বিয়্যাহ্ সমান দুইশত দিরহাম। অর্থাৎ কারো অধিকারে দুইশত দিরহাম বা তার অধিক দিরহাম থাকেল তার উপর যাকাত ওয়াজিব হবে। উপমহাদেশে যার পরিমাণ প্রায় সাড়ে বায়ান্ন তোলা। (বর্তমান মুদ্রার ক্ষেত্রে দিরহামের মূল্যের অনুপাতে যাকাতের নিসাব নির্ধারিত হবে। অর্থাৎ দুইশত দিরহামের যে বাজার মূল্য হয় তার উপর নির্ভর করে কাগজী মুদ্রার নিসাব নির্ধারিত হবে। আর স্বর্ণের যাকাতের নিসাবের ক্ষেত্রে যতগুলো হাদীস এসেছে তার সবগুলোই দুর্বল শুধুমাত্র আবু দাঊদে বর্ণিত ‘আলী (রাঃ)-এর হাদীসটি ব্যতীত, সেটিকে ইমাম নাবাবী, হাফিয ইবনে হাজার আসক্বালানী সহ কেউ কেউ হাসান বলেছেন। আবার কেউ কেউ তা দুর্বলও বলেছেন।
হাদীসটি হল, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন তুমি দুইশত দিরহামের মালিক হবে এবং তাতে একবছর অতিবাহিত হবে তখন তাতে পাচ দিরহাম ওয়াজিব হবে। আর যখন তুমি বিশ মিসক্বাল স্বর্ণ মুদ্রার মালিক হবে তখন তাতে তুমি বিশ দিনার আবশ্যক হবে। এ হাদীসটি যদিও দুর্বল হয় তারপরেও উম্মাতের উলামাগণ একমত পোষণ করেছেন যে, স্বর্ণ মুদ্রার যাকাতে নিসাব হল কুড়ি মিসক্বাল যা উপমহাদেশের হিসেবে প্রায় সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ।
তৃতীয় প্রকারঃ উট। উটের যাকাতের নিসাব হল পাঁচটি উট। অর্থাৎ কারো যদি পাঁচটির কম উট থাকে তাহলে তাকে তার উপর যাকাত ওয়াজিব হবে না। আর পাঁচটি উট থাকলে একটি ছাগল যাকাত দিতে হবে।
বিঃদ্রঃ জাহিলিয়্যাতের যুগে কতগুলো পরিমাপ ছিল। অতঃপর ইসলামের আগমন ঘটলে সেগুলোকে আগের অবস্থায় স্থির রাখা হয়। ওজনগুলো হল :
১. أُوْقِيَّةُ (উক্বিয়্যাহ্) : যার পরিমাণ চল্লিশ দিরহাম।
২. رِطْلٌ (রিতল) : যার সমান কারো উক্বিয়্যাহ্ তথা চারশত আশি দিরহাম।
৩. نَشُّ (নাশ) : যার পরিমাণ বিশ দিরহাম।
৪. نَوَاةٌ (নাওয়া-ত) : যার পরিমাণ পাঁচ দিরহাম।
৫. مِثْقَالُ (মিসক্বা-ল) : যার পরিমাণ এক হাররা ব্যতীত বাইশ ক্বিরাত।
৬. دِرْهَمُ (দিরহাম) : যার পরিমাণ পনের ক্বিরাত।
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - যেসব জিনিসের যাকাত দিতে হয়
১৭৯৫-[২] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ গোলাম ও ঘোড়ার জন্য মালিক মুসলিমকে যাকাত দিতে হবে না। আর এক বর্ণনায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ গোলামের যাকাত দেয়া কোন মুসলিমের জন্য ওয়াজিব নয়। তবে সদাক্বায়ে ফিতর দেয়া ওয়াজিব। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَجِبُ فِيْهِ الزَّكَاةُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَيْسَ عَلَى الْمُسْلِمِ صَدَقَةٌ فِي عَبْدِهِ وَلَا فِي فَرَسِهِ» . وَفِي رِوَايَةٍ قَالَ: «لَيْسَ فِي عَبْدِهِ صَدَقَةٌ إِلَّا صَدَقَةُ الْفِطْرِ»
ব্যাখ্যা: এ হাদীস হতে বুঝা যায় যে, মুসলিমদের গোলামে ও ঘোড়াতে যাকাত নেই। তবে গোলামের ওপর যাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হয়। তবে ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-এর মতে ঘোড়ায় যাকাত ওয়াজিব হয়। যে সব দাস এবং ঘোড়া বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয় তাতে কোন যাকাত নেই। তবে যদি তা ব্যবসার উদ্দেশে ক্রয়-বিক্রয় হয় তাহলে তার মূল্যে যাকাত ফরয হবে। এ বিষয়ে ইমাম নাবাবী (রহঃ) পূর্ব-পরের প্রায় সকল ‘উলামাগণের ঐকমত্য বর্ণনা করেছেন। তবে ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) ঘোড়ার ক্ষেত্রে যাকাত ওয়াজিবের মত পোষণ করেছেন। আর দাসের ক্ষেত্রে সদাক্বাতুল ফিতর আবশ্যক হবে যার তার পক্ষ থেকে তার মুনিব আদায় করবে।
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - যেসব জিনিসের যাকাত দিতে হয়
১৭৯৬-[৩] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ বকর সিদ্দীক্ব (রাঃ)যখন তাঁকে বাহরাইনের শাসনকর্তা নিয়োগ দিয়ে পাঠান তখন এ নির্দেশনামাটি লিখে দিয়েছিলেন, বিস্মিল্লা-হির রহমা-নির রহীম। এ চিঠি ফরয সদাক্বাহ্ (সাদাকা) অর্থাৎ যাকাত সম্পর্কে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটি মুসলিমদের ওপর ফরয করেছেন এবং এটিকে জারী করার জন্য আল্লাহ তা’আলা তাঁর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে নির্দেশ দিয়েছেন। এ প্রেক্ষিতে মুসলিম কোন ব্যক্তির কাছে নিয়মানুযায়ী যাকাত চাওয়া হলে সে যেন তা আদায় করে। আর কোন ব্যক্তির নিকট নিয়ম ভেঙে বেশী যাকাত চাওয়া হলে সে যেন (বেশী যাকাত) না দেয়। চব্বিশ ও চব্বিশের কম উটের যাকাত হবে বকরী। প্রতি পাঁচ উটে একটি বকরী দিতে হবে। (পাঁচটি উটের কম হলে যাকাত দিতে হবে না)। পাঁচ থেকে নয় পর্যন্ত উটে একটি বকরী। দশ থেকে চৌদ্দটি হলে দু’টি বকরী। পনের হতে ঊনিশে তিনটি বকরী। আর বিশ থেকে চব্বিশ পর্যন্ত চারটি বকরী। উটের সংখ্যা পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশ পর্যন্ত এক বছরের একটি মাদি উট (বিনতে মাখায) যাকাত দিতে হবে। উটের সংখ্যা ছত্রিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ হলে একটি দু’ বছরের মাদি উট (বিনতু লাবুন) যাকাত দিতে হবে। ছেচল্লিশ থেকে ষাট পর্যন্ত উটে নরের সাথে মিলনের যোগ্য একটি তিন বছরের মাদী উট (হিক্কাহ) দিতে হবে। উটের সংখ্যা একষট্টি থেকে পঁচাত্তর পর্যন্ত পৌঁছালে চার পেরিয়ে পাঁচ বছরে পা দিয়েছে এমন একটি মাদী উট (জাযা’আহ্) দিতে হবে। উটের সংখ্যা ছিয়াত্তর থেকে নব্বই পর্যন্ত পৌঁছে গেলে দু’টি দু’ বছরের উটনী (বিনতু লাবুন) যাকাত লাগবে। একানব্বই হতে একশত বিশ পর্যন্ত উটে তিন বছর বয়সী নরের সাথে মিলনের যোগ্য দু’টি উট (হিক্কাতানে)। একশ’ বিশ ছাড়ালে প্রতি চল্লিশ উটে দু’ বছরের একটি মাদি উট (বিনতু লাবুন) ও পঞ্চাশটি করে বাড়লে পুরা তিন বছর বয়সী উট যাকাত দিতে হবে। যার নিকট শুধু চারটি উট আছে তার যাকাত লাগবে না। অবশ্য মালিক চাইলে, নফল সদাক্বাহ্ (সাদাকা) কিছু দিতে পারে।
উটের সংখ্যা পাঁচ হলে একটি বকরী যাকাত দিতে হবে। আর চার বছরের মাদী উট নিসাবে পৌঁছে গেলে (৬১-৭৫) এবং তা তার নিকট না থাকলে, তিন বছর বয়সী উট (অর্থাৎ একষট্টি থেকে পঁচাত্তর পর্যন্ত উটের সংখ্যার যাকাত) দিতে হবে। এর সাথে বাড়তি দু’টি বকরী দিবে যদি সহজসাধ্য হয়। অথবা বিশ দিরহাম দিয়ে দিবে। চার বছর পার হয়ে ও পাঁচ বছরে পদার্পণ করা উটের যাকাত দিতে হবে। কিন্তু তার তিন বছর বয়সী মাদী উট থাকলে সেটাই যাকাত হিসেবে গ্রহণ করা হবে। কিন্তু যাকাত গ্রহণকারী প্রদানকারীকে বিশ দিরহাম অথবা দু’টি বকরী ফেরত দিবে। কোন ব্যক্তির নিকট দু’ বছরের উট থাকলে তার যাকাত দিতে হবে। যদি তার কাছে না থেকে এক বছরের উট থাকে। তবে তা থেকে এক বছরের উটই যাকাত হিসেবে গ্রহণ করা হবে। যাকাত আদায়কারী এর সাথে আরো বিশ দিরহাম অথবা দু’টি বকরী আদায় করবে। যে ব্যক্তির যাকাত হিসেবে একটি এক বছরের উট ওয়াজিব কিন্তু তার কাছে তা’ নেই। বরং দু’ বছরের উট আছে। তাহলে তার থেকে দু’ বছরের বকরীই যাকাত হিসেবে নিতে হবে। কিন্তু যাকাত উসূলকারী তাকে দু’টি বকরী অথবা বিশ দিরহাম ফেরত দেবেন। যাকাত দেবার জন্য এক বছরের পরিবর্তে দু’বছরের উট (ইবনু লাবুন) থাকে, তার থেকে তাই গ্রহণ করতে হবে। তবে এ অবস্থায় অন্য কিছু ওয়াজিব হবে না।
আর পালিত বকরীর ক্ষেত্রে বকরীর সংখ্যা চল্লিশ হতে শুরু করে একশত বিশ পর্যন্ত হলে একটি বকরী যাকাত দিতে হবে। একশ’ বিশ হতে দু’শ পর্যন্ত দু’টি বকরী। আর দু’শ হতে তিনশ’ বকরীর জন্য তিনটি বকরী। তিনশ’র বেশী হলে, প্রত্যেক একশ’টির জন্য একটি বকরী যাকাত দিতে হবে। যার নিকট পালিত বকরী চল্লিশ থেকে একটিও কম হবে। তার উপর যাকাত ওয়াজিব নয়। তবে মালিক ইচ্ছা করলে নফল সদাক্বাহ্ (সাদাকা) হিসেবে কিছু দিতে পারে। যাকাতের মাল যেন (উট, গরু, ছাগল) অতি বৃদ্ধ, ত্রুটিযুক্ত না হয়। যাকাত উসূলকারী গ্রহণ করতে চাইলে জায়িয। বিভিন্ন পশুকে এক জায়গায় একত্র না করা উচিত। যাকাত দেবার ভয়ে পশুকে পৃথক পৃথক করে রাখাও ঠিক নয়। যদি যাকাতের নিসাবে দু’ ব্যক্তি যৌথভাবে শরীক হয়, তাহলে সমানভাবে ভাগ করে নেয়া উচিত। আর রূপার ক্ষেত্রে চল্লিশ ভাগের একভাগ যাকাত ওয়াজিব। কোন ব্যক্তি একশত নব্বই দিরহামের মালিক হলে (যা নিসাব হিসেবে গণ্য নয়) তার উপর কিছু ফরয হবে না। তবে নফল সদাক্বাহ্ (সাদাকা) হিসেবে কিছু দিতে পারে। (বুখারী)[1]
بَابُ مَا يَجِبُ فِيْهِ الزَّكَاةُ
وَعَن أنس بن مَالك: أَن أَبَا بكر رَضِي الله عَنهُ كَتَبَ لَهُ هَذَا الْكِتَابَ لَمَّا وَجَّهَهُ إِلَى الْبَحْرِينِ: بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ هَذِهِ فَرِيضَةُ الصَّدَقَةِ الَّتِي فَرَضَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى الْمُسْلِمِينَ وَالَّتِي أَمَرَ اللَّهُ عز وَجل بهَا رَسُوله فَمن سَأَلَهَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ عَلَى وَجْهِهَا فَلْيُعْطِهَا وَمَنْ سُئِلَ فَوْقَهَا فَلَا يُعْطِ: فِي أَرْبَعٍ وَعِشْرِينَ مِنَ الْإِبِل فَمَا دونهَا خَمْسٍ شَاةٌ. فَإِذَا بَلَغَتْ خَمْسًا وَعِشْرِينَ إِلَى خَمْسٍ وَثَلَاثِينَ فَفِيهَا بِنْتُ مَخَاضٍ أُنْثَى فَإِذَا بلغت سِتا وَثَلَاثِينَ فَفِيهَا بنت لبون أُنْثَى. فَإِذا بلغت سِتَّة وَأَرْبَعين إِلَى سِتِّينَ فَفِيهَا حِقَّةٌ طَرُوقَةُ الْجَمَلِ فَإِذَا بَلَغَتْ وَاحِدَةً وَسِتِّينَ فَفِيهَا جَذَعَة. فَإِذا بلغت سِتا وَسبعين فَفِيهَا بِنْتَا لَبُونٍ. فَإِذَا بَلَغَتْ إِحْدَى وَتِسْعِينَ إِلَى عِشْرِينَ وَمِائَةٍ فَفِيهَا حِقَّتَانِ طَرُوقَتَا الْجَمَلِ. فَإِذَا زَادَتْ عَلَى عِشْرِينَ وَمِائَةٍ فَفِي كُلِّ أَرْبَعِينَ بِنْتُ لَبُونٍ وَفِي كُلِّ خَمْسِينَ حِقَّةٌ. وَمَنْ لَمْ يَكُنْ مَعَهُ إِلَّا أَرْبَعٌ مِنَ الْإِبِلِ فَلَيْسَ فِيهَا صَدَقَةٌ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ رَبُّهَا. فَإِذَا بَلَغَتْ خَمْسًا فَفِيهَا شَاةٌ وَمَنْ بَلَغَتْ عِنْدَهُ مِنَ الْإِبِلِ صَدَقَةَ الْجَذَعَةِ وَلَيْسَتْ عِنْده جَذَعَة وَعِنْده حقة فَإِنَّهَا تقبل مِنْهُ الْحِقَّةُ وَيُجْعَلُ مَعَهَا شَاتَيْنِ إِنِ اسْتَيْسَرَتَا لَهُ أَوْ عِشْرِينَ دِرْهَمًا. وَمَنْ بَلَغَتْ عِنْدَهُ صَدَقَةَ الْحِقَّةِ وَلَيْسَتْ عِنْدَهُ الْحِقَّةُ وَعِنْدَهُ الْجَذَعَةُ فَإِنَّهَا تُقْبَلُ مِنْهُ الْجَذَعَةُ وَيُعْطِيهِ الْمُصَدِّقُ عِشْرِينَ دِرْهَمًا أَوْ شَاتَيْنِ. وَمَنْ بَلَغَتْ عِنْدَهُ صَدَقَةَ الْحِقَّةِ وَلَيْسَت إِلَّا عِنْده بِنْتُ لَبُونٍ فَإِنَّهَا تُقْبَلُ مِنْهُ بِنْتُ لَبُونٍ وَيُعْطِي مَعهَا شَاتَيْنِ أَوْ عِشْرِينَ دِرْهَمًا. وَمَنْ بَلَغَتْ صَدَقَتُهُ بنت لبون وَعِنْده حقة فَإِنَّهَا تقبل مِنْهُ الْحِقَّةُ وَيُعْطِيهِ الْمُصَدِّقُ عِشْرِينَ دِرْهَمًا أَوْ شَاتَيْنِ. وَمَنْ بَلَغَتْ صَدَقَتُهُ بَنْتَ لِبَوْنٍ وَلَيْسَتْ عِنْدَهُ وَعِنْدَهُ بِنْتُ مَخَاضٍ فَإِنَّهَا تُقْبَلُ مِنْهُ بِنْتُ مَخَاضٍ وَيُعْطَى مَعَهَا عِشْرِينَ دِرْهَمًا أَوْ شَاتَيْنِ. وَمَنْ بَلَغَتْ صَدَقَتُهُ بَنْتَ مَخَاضٍ وَلَيْسَتْ عِنْدَهُ وَعِنْدَهُ بِنْتُ لَبُونٍ فَإِنَّهَا تُقْبَلُ مِنْهُ وَيُعْطِيهِ الْمُصَدِّقُ عِشْرِينَ دِرْهَمًا أَوْ شَاتَيْنِ. فَإِنْ لَمْ تَكُنْ عِنْدَهُ بِنْتُ مَخَاضٍ عَلَى وَجْهِهَا وَعِنْدَهُ ابْن لَبُونٍ فَإِنَّهُ يُقْبَلُ مِنْهُ وَلَيْسَ مَعَهُ شَيْءٌ. وَفِي صَدَقَةِ الْغَنَمِ فِي سَائِمَتِهَا إِذَا كَانَتْ أَرْبَعِينَ فَفِيهَا شَاة إِلَى عشْرين وَمِائَة شَاة فَإِن زَادَتْ عَلَى عِشْرِينَ وَمِائَةٍ إِلَى مِائَتَيْنِ فَفِيهَا شَاتَان. فَإِن زَادَتْ عَلَى مِائَتَيْنِ إِلَى ثَلَاثِمِائَةٍ فَفِيهَا ثَلَاثُ شِيَاهٍ. فَإِذَا زَادَتْ عَلَى ثَلَاثِمِائَةٍ فَفِي كُلِّ مِائَةٍ شَاةٌ. فَإِذَا كَانَتْ سَائِمَةُ الرَّجُلِ نَاقِصَةً مِنْ أَرْبَعِينَ شَاةً وَاحِدَةً فَلَيْسَ فِيهَا صَدَقَةٌ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ رَبُّهَا. وَلَا تُخْرَجَ فِي الصَّدَقَة هرمة وَلَا ذَات عور وَلَا تَيْسٌ إِلَّا مَا شَاءَ الْمُصَدِّقُ. وَلَا يجمع بَين متفرق وَلَا يفرق بَين مُجْتَمع خَشْيَةَ الصَّدَقَةِ وَمَا كَانَ مِنْ خَلِيطَيْنِ فَإِنَّهُمَا يَتَرَاجَعَانِ بَيْنَهُمَا بِالسَّوِيَّةِ. وَفِي الرِّقَةِ رُبُعُ الْعُشْرِ فَإِنْ لَمْ تَكُنْ إِلَّا تِسْعِينَ وَمِائَةً فَلَيْسَ فِيهَا شَيْءٌ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ رَبُّهَا. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: আবূ বাকর (রহঃ) বাহরাইনে পত্র পাঠান। যার মধ্যে যাকাতের বর্ণনা ছিল। যার মধ্যে ছিল ২৪টি উট বা তার কমে থাকলে প্রত্যেক একটি উটে একটি করে ছাগল যাকাত আদায় করতে হবে। আর ২৫টি উট হলে ৩৫টি পর্যন্ত পূর্ণ এক বৎসরের একটি মেয়ে উট যাকাত দিবে। আর ৩৬ হতে ৪৫ পর্যন্ত ২ বৎসরের একটি মেয়ে উট আদায় করবে। আর ৪৬টি উট হতে ৬০ পর্যন্ত- এর মধ্যে ৩ বৎসরের একটি উট প্রদান করবে। আর ৬১ হতে ৭৫ পর্যন্ত চার বৎসরের একটি উট প্রদান করবে। আর ৭৬ হতে ৯০ পর্যন্ত দু’ বৎসরের দু’টি মেয়ে উট প্রদান করবে। আর প্রত্যেক ৫০টি ৩ বৎসরের একটি উট প্রদান করবে। আর যার চারটি মাত্র উট আছে তার মধ্যে যাকাত নেই।
প্রকাশ থাকে যে, যাকাতের মধ্যে বুড়া বা কানা অথবা ত্রুটিযুক্ত পশু দেয়া জায়িয নয়। আর যাকাতের ভয়ে শারীকী দু’জনের পশু পৃথক করা যাবে না অথবা দু’জনের আলাদা করা পশুকে এক স্থানে জমা করা যাবে না।
অত্র হাদীসে উটের ক্ষেত্রে কতগুলো পরিভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। যথাঃ
১. بِنْتُ مَخَاضٍ (বিনতু মাখায) বলা হয় সেই উটশাবককে যেটির বয়স এক বছর পূর্ণ হয়ে দ্বিতীয় বছরে পদার্পণ করেছে।
২. بِنْتَ لَبُوْنٍ (বিনতু লাবুন) সে উষ্ট্রিকে বলা হয় যেটির বয়স দুই বছর পূর্ণ হয়ে তিন বছরে পদার্পণ করেছে।
৩. حِقَّةٌ (হিক্কাহ্) সেই উষ্ট্রিকে বলা হয় যেটির বয়স তিন বছর পূর্ণ হয়ে চার বছরে পদার্পণ করেছে এবং গর্ভধারণের উপযোগী হয়েছে।
৪. جَذَعَةُ (জাযা‘আহ্) বলা হয় সেই উষ্ট্রিকে যেটির বয়স চার বছর পূর্ণ হয়ে পঞ্চম বছরে পদার্পণ করেছে।
* উট, গরু এবং ছাগলের যাকাতের ক্ষেত্রে শর্ত হল বছর অধিকাংশ সময় চারণভূমিতে চারণশীল হতে হবে। অতএব গৃহপালিত এবং কাজের জন্য পালিত পশুতে কোন যাকাত নেই যেমনটি ইবনু কুদামাহ (রহঃ) বলেছেন, এবং এটিই অধিকাংশ ‘উলামাদের অভিমত। যদিও কেউ কেউ ভিন্নমত পোষণ করেছেন।
* রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উক্তি যাকাতের ভয়ে পৃথক প্রাণীকে একত্রিত বা একত্রিত প্রাণীকে পৃথক করা যাবে না এর অর্থ প্রতিটি পশুর মালিক এবং যাকাত আদায়কারী উভয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
মালিকের ক্ষেত্রে এর রূপটি হল এক ব্যক্তির চল্লিশটি ছাগল রয়েছে। যখন যাকাত আদায়কারী আসল তখন সে তার প্রাণীগুলোকে অপর এক ব্যক্তির চল্লিশটি ছাগলের সাথে মিশ্রিত করে ফেলল, যাতে উভয়ের পশুতে একটি ছাগল যাকাত লাগে এবং একটি থেকে যায়। যেহেতু আলাদা আলাদা থাকলে একটি করে উভয়ের দু’টি ছাগল যাকাত লাগত। তাই এ থেকে নিষেধ করা হয়েছে। এটি পৃথককে একত্রিত করার ক্ষেত্রে। মালিকের একত্রিত প্রাণীকে পৃথক করার রূপটি হল, দুই ব্যক্তির একত্রে চল্লিশটি ছাগল রয়েছে উভয়ের বিশটি করে। যখন যাকাত আদায়কারী আসলো তখন তারা উভয়ের প্রাণীগুলোকে আলাদা আলাদা করে নিল যাতে নিসাব পরিমাণ না হয় তাতে যাকাত না লাগে। তাই এরূপ করতে নিষেধ করা হয়েছে।
আর যাকাত আদায়কারীর ক্ষেত্রে পৃথক প্রাণীকে একত্রিত করার রূপটি হল, দুই ব্যক্তির পৃথকভাবে ২০ টি করে চল্লিশটি ছাগল রয়েছে। অতঃপর যাকাত আদায়কারী এসে তাদের উভয়ে প্রাণীগুলোকে একত্রিত করল যাতে তা নিসাব পরিমাণ হয়ে যায় এবং একটি ছাগল গ্রহণ করতে পারে। ফলে এ থেকে তাকে নিষেধ করা হয়েছে। আবার একত্রিত প্রাণীকে পৃথক করার রূপটি হল, তিন ব্যক্তির ৪০ টি করে একত্রে একশত বিশটি প্রাণী রয়েছে যাতে মাত্র একটি ছাগল যাকাত লাগে। অতঃপর যাকাত আদায়কারী এসে তাদের প্রাণীগুলোকে পৃথক করে ছাগল আলাদা করে ফেলল যাতে করে তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে একটি করে ছাগল আদায় করা যায়। তাই এই কাজ থেকে নিষেধ করা হয়েছে।
* চতুষ্পদ জন্তুর যাকাতের ক্ষেত্রে দুই বা ততোধিক ব্যক্তির প্রাণীর মিশ্রণ প্রভাব ফেলে যা অন্য কোন ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে না। অর্থাৎ দুই ব্যক্তি বিশটি করে মোট ৪০ টি ছাগল একত্রে মিশ্রিত থাকলে তাতে একটি ছাগল যাকাত লাগে যদিও পৃথকভাবে তাদের প্রাণীর সংখ্যা নিসাবে পৌঁছেনি কিন্তু যেহেতু মিশ্রিত রয়েছে তাই তাতে যাকাত ফরয হচ্ছে। কিন্তু এই মিশ্রণটি চতুষ্পদ জন্তুর প্রাণী ব্যতীত অন্য কোন যাকাতের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে না যতক্ষণ না প্রত্যেক ব্যক্তির সম্পদ পৃথকভাবে নিসাব পরিমাণ না হবে। আর চতুষ্পদ প্রাণীর মিশ্রণের ক্ষেত্রে প্রত্যেক অংশীদারের প্রাণী সংখ্যানুপাতে সমানভাবে যাকাতের হিসাবটি নিজেদের মাঝে করে নিবে।
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - যেসব জিনিসের যাকাত দিতে হয়
১৭৯৭-[৪] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে স্থান আকাশের অথবা প্রবাহিত কূপের পানিতে সিক্ত হয় অথবা যা নালার পানিতে তরতাজা হয়, তাতে ’উশর’ (দশভাগের একভাগ) আদায় করতে হবে। আর যে সব ফসল সেচের মাধ্যমে উৎপাদিত হয় তাতে নিসফে উশর (বিশ ভাগের এক ভাগ) আদায় করতে হবে। (বুখারী)[1]
بَابُ مَا يَجِبُ فِيْهِ الزَّكَاةُ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «فِيمَا سَقَتِ السَّمَاءُ وَالْعُيُونُ أَوْ كَانَ عَثَرِيًّا الْعُشْرُ. وَمَا سقِِي بالنضح نصف الْعشْر» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: যে জমিনের ফসল উৎপন্ন হয় বৃষ্টির পানিতে এবং নদীর বা খালের পানিতে অথবা বিনা পানি দেয়াতে, তার মধ্যে এক দশমাংশ ‘উশর ফরয হয় আর পানি ছেঁচে দিলে বিশভাগে একভাগ ‘উশর আদায় করতে হয়। ‘উশর সেই জমিনের ফসলেও দিতে হবে যার কৌস বা খাজনা সরকারকে দিতে হয়। তবে এ সকল ক্ষেত্রে শর্ত উৎপাদিত ফসল, শস্য বা ফল নিসাব পরিমাণ হতে হবে। আর তা হল পাঁচ ওয়াসাক্ব বা প্রায় ১৯ মণ। যদি কোন ফসল বা শস্য বৃষ্টির পানি এবং সেঁচের পানির উভয়টির মাধ্যমে উৎপাদিত হয়, তাহলে যেটির পরিমাণ বেশি হবে তার আলোকে ‘উশর বের করবে। আর যদি উভয়টি সমান হয় অর্থাৎ কোন ফসল উৎপাদনে দুইবার বৃষ্টির পানি এবং দুইবার সেঁচের পানি লাগে তাহলে তাতে আহলে ‘ইলমদের মতানুসারে দশভাগের তিন চতুর্থাংশ ‘উশর লাগবে।
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - যেসব জিনিসের যাকাত দিতে হয়
১৭৯৮-[৫] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন জানোয়ার (যেমন- ঘোড়া, গরু, মহিষ ইত্যাদি) কাউকে আহত করলে তা মাফ। কূপ খনন করতে কেউ মারা গেলে তাতে মালিকের ওপর ক্ষতিপূরণ মাফ। তেমনি খনি খনন করতে কেউ মারা গেলেও মালিকের দোষ মাফ। আর রিকাযে এক-পঞ্চমাংশ অংশ দেয়া ওয়াজিব। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَجِبُ فِيْهِ الزَّكَاةُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «العجماء جرحها جَبَّار والبشر جَبَّار والمعدن جَبَّار وَفِي الرِّكَاز الْخمس»
ব্যাখ্যা: পশু যদি কাউকে আহত করে তাহলে তার মালিক-এর উপর ক্ষতিপূরণ দেয়া লাগবে না। কূয়া খননের সময় কেউ মারা গেলে মালিককে ক্ষতিপূরণ দেয়া লাগে না। আর স্বর্ণ-রৌপ্যের খনিতে কাজ করায় মারা গেলে মালিককে ক্ষতিপূরণ দিতে হয় না। জাহিলী যুগের গচ্ছিত সম্পদে ৫ ভাগ যাকাত ওয়াজিব হয়।
হানাফী মাযহাব অনুসারে খনি হতে উঠানো সকল জিনিসকে রিকায বলা হয়, যার মধ্যে পাঁচ ভাগের এক ভাগ যাকাত আদায় করা ওয়াজিব। ইমাম হুমাম (রহঃ) বলেনঃ রিকায খনি ও ধন-ভান্ডার উভয়কেই বুঝায়। আর ইমাম মালিক, শাফি‘ঈ, আহমাদ এবং জমহূর ‘উলামাতের মত যে, রিকায জাহিলী যুগের মাটির নিচে দাফন করা মালকে বুঝানো হয়েছে। খনিকে বুঝানো হয়নি। খনির মধ্যে খুমুস বের করতে হয় না। বরং তাতে যাকাত বের করতে হয়।
কোন জানোয়ার/চতুষ্পদ জন্তুর দিনের বেলা একাকী থাকাবস্থায় কারো কোন ক্ষতি করলে তার কোন যামানাত বা ক্ষতিপূরণ নেই- এ ব্যাপারে সকল ‘উলামা একমত। তবে প্রাণীর সাথে কোন লোক থাকাবস্থায় যদি সে প্রাণী কারো কোন ক্ষতি করে তাহলে এ ক্ষেত্রে ‘উলামাদের মতভেদ রয়েছে। ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) বলেন, আহলে যাহিরগণের মতে কোন অবস্থাতে কোন প্রকার ক্ষতিপূরণ লাগবে না। তবে চালকের বিষয়টিকে হানাফীদের কেউ কেউ এর থেকে আলাদা করেছেন। আর ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ)-এর মতে এ ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ লাগবে।
আর যদি রাত্রিতে প্রাণী কারো কোন ক্ষতিসাধন করে তাহলে জমহুর ‘উলামাগণের মতে এক্ষেত্রে মালিকের ক্ষতিপূরণ লাগবে। কারণ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, রাত্রিতে চতুষ্পদজন্তু সংরক্ষণের দায়িত্ব মালিকের।
* কূয়ার ক্ষেত্রে বিষয়টি হল বিরাণ ভূমিতে মালিকানামুক্ত কোন কূপে যদি কোন মানুষ বা অন্য কিছু পড়ে মারা যায় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে এর কোন ক্ষতিপূরণ নেই। অনুরূপ যদি কেউ তার অধিনস্ত ভূমিতে কূপ খনন করে এবং তাতে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বা কূপ খননের শ্রমিকের ওপর মাটি ধসে সে মারা যায় তাহলে এ ক্ষেত্রেও কোন প্রকার ক্ষতিপূরণ নেই। তবে যদি কোন মুসলিমদের পথে বা পূর্ব অনুমতি ছাড়াই অন্যের ভূমিতে কেউ কূপ খনন করে আর তাতে যে কোন ভাবে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে এর ক্ষতিপূরণ তাকে দিতে হবে।
* (مَعْدِن) (মা‘দিন) বলা হয় মাটির নিচে স্বর্ণ, রৌপ্য, লোহা, কয়লা, তৈল, হীরা প্রভৃতি যেসব খনিজ পদার্থ লুকায়িত থাকে, তার খনিকে সেই খনি খনন করতে গিয়ে কেউ যদি তাতে পতিত হয়ে মারা যায় বা খনি ধসে মারা যায় তাহলে তার কোন ক্ষতিপূরণ নেই। তবে তাতে যাকাত অবশ্যই আবশ্যক হবে। খনির ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের বিধানগুলো কুয়ার বিধানগুলোর ন্যায়।
* (رِكَازُ) (রিকায) বলা হয় জমিনের অভ্যন্তরে গচ্ছিত সম্পদকে। যদি সে গচ্ছিত রাখা সম্পদ কোন মুসলিমের হয়ে থাকে যা কোন চিহ্নের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় তাহলে তা لُقَطَةُ বা কুড়িয়ে পাওয়ার বিধানের অন্তর্গত হবে। অর্থাৎ তা একবছর যাবৎ প্রচার করতে হবে। আর যদি সে গচ্ছিত রাখা সম্পদ কোন অমুসলিমের হয় যা তাদের কোন চিহ্নের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় তাহলে তাতে خُمُسُ (খুমুস) বা এক পঞ্চমাংশ আবশ্যক। মা‘দিন এবং রিকায একই শ্রেণীভুক্ত না আলাদা এ বিষয়ে ‘উলামাগণ মতবিরোধ করেছেন।
হানাফী মাযহাবের মতে উভয়ইটি একই শ্রেণীভুক্ত এবং তাতে এক-পঞ্চমাংশ আবশ্যক। অন্যরা বলেছেন, দু’টি আলাদা এবং উভয়টির বিধানও আলাদা। অর্থাৎ রিকাযের ক্ষেত্রে এক-পঞ্চমাংশ আবশ্যক আর মা‘দিনের ক্ষেত্রে যাকাত দিতে হবে। দ্বিতীয় অভিমতই সঠিক যা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অত্র হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। যেখানে তিনি দু’টির মাঝে পার্থক্য সূচনা করেছেন। রিকায বিষয়ক কতগুলো মাস্আলাহ্ হলঃ
* রিকায বা গচ্ছিত রাখা সম্পদের কম বেশির মাঝে কোন পার্থক্য নেই। অর্থাৎ কম বেশি যাই হোক তাতে এক-পঞ্চমাংশ যাকাত ওয়াজিব। এ ক্ষেত্রে নিসাবের শর্ত নেই।
* এতে এক বছর পূর্ণ হওয়ার কোন শর্ত নেই। বরং তা সাথে সাথে আদায় করতে হবে।
* স্বর্ণ, রৌপ্যসহ সকল পুঁতে রাখা সম্পদে এক-পঞ্চমাংশ আবশ্যক। তবে এ এক-পঞ্চমাংশের ব্যয়খাত নিয়ে ‘উলামাদের মতভেদ আছে। ইমাম মালিক, আবূ হানীফা, আহমাদ (রহঃ) এবং জমহুরের মতে এর ব্যয়খাতটি ফাইয়ের এক-পঞ্চমাংশের ব্যয়খাতের ন্যায়। আর এটি সঠিক অভিমত। ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ)-এর মতে এর ব্যয়খাতটি যাকাতের ব্যয়খাতের অন্তর্গত।
* ইবনু কুদামাহ্ (রহঃ) বলেছেন, মুসলিম, যিম্মী, স্বাধীন ব্যক্তি, দাস, মুকাতাব দাস, ছোট, বড়, বুদ্ধিমান ও পাগল যেই পুতে রাখা সম্পদ পাবে তাকেই এক-পঞ্চমাংশ দিতে হবে। তবে যদি দাস পায় তাহলে অবশিষ্ট চার-পঞ্চমাংশের মালিক হবে তার মনিব। আর যদি মুকাতাব গোলাম পায় তাহলে অবশিষ্টাংশের মালিক সেই হবে। কেননা এটি তার উপার্জনের অন্তর্গত। এটিই অধিকাংশ ‘উলামাদের অভিমত।
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব জিনিসের যাকাত দিতে হয়
১৭৯৯-[৬] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি ঘোড়া ও গোলামের যাকাত মাফ করে দিয়েছি। তোমরা চল্লিশ দিরহাম রূপায় এক দিরহাম রূপা যাকাত আদায় করো (যদি রূপার নিসাবের পরিমাণ দু’শ দিরহাম হয়)। কারণ একশ’ নব্বই দিরহাম পর্যন্ত বা দু’শ দিরহামের কম রূপার যাকাত ফরয হয় না। দু’শ দিরহাম রূপা হলে পাঁচ দিরহাম যাকাত দিতে হবে। তিরমিযী, আবূ দাঊদ; আবূ দাঊদ হারিসুল আ’ওয়ার হতে ’আলীর এ বর্ণনাটি নকল করেছেন যে, যুহায়র বলেছেন, ’আলী (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বরাতে বলেছেন, চল্লিশ দিরহামে এক দিরহাম (চল্লিশ ভাগের এক ভাগ) আদায় করো। আর দু’শ দিরহাম পূর্ণ না হলে কোন কিছু আদায় করা ওয়াজিব নয়। দু’শ দিরহাম পুরা হলে তার মধ্যে পাঁচ দিরহাম যাকাত ওয়াজিব হবে। আর যখন দু’শত দিরহামের বেশী হবে, তখন এতে এ হিসেবে যাকাত ওয়াজিব হবে।
আর বকরীর নিসাব প্রত্যেক চল্লিশটিতে একটি বকরীর যাকাত ওয়াজিব। একশ’ বিশটি বকরী পর্যন্ত চলবে। সংখ্যায় এর চেয়ে একটি বেড়ে গেলে দু’শ পর্যন্ত দু’টি বকরী যাকাত হবে। আবার দু’শ হতে একটি বৃদ্ধি পেলে, তিনশ’ পর্যন্ত তিনটি বকরী যাকাত হবে। আর তিনশ’ হতে বেশী হলে (অর্থাৎ চারশ’ হলে) প্রত্যেক একশ’ বকরীতে একটি করে বকরী যাকাত দেয়া ওয়াজিব। যদি কারো নিকট নিসাব সংখ্যক বকরী না থাকে অর্থাৎ উনচল্লিশটি থাকে তাহলে যাকাত দিতে হবে না। আর গরুর যাকাতের নিসাব হলো, প্রত্যেক ত্রিশটি গরুতে এক বছরের একটি গরু, আর চল্লিশটি গরু হলে দু’বছর বয়সের একটি গরু যাকাত হিসেবে দেয়া ওয়াজিব। চাষাবাদ ও আরোহণের কাজে ব্যবহৃত গরুর কোন যাকাত নেই।[1]
عَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: قَدْ عَفَوْتُ عَنِ الْخَيْلِ وَالرَّقِيقِ فَهَاتُوا صَدَقَةً الرِّقَةِ: مِنْ كُلِّ أَرْبَعِينَ دِرْهَمًا دِرْهَمٌ وَلَيْسَ فِي تِسْعِينَ وَمِائَةٍ شَيْءٌ فَإِذَا بَلَغَتْ مِائَتَيْنِ فَفِيهَا خَمْسَةُ دَرَاهِمَ . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ
وَفِي رِوَايَةٍ لأبي دَاوُد عَن الْحَارِث عَنْ عَلِيٍّ قَالَ زُهَيْرٌ أَحْسَبُهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: هَاتُوا رُبْعَ الْعُشْرِ مِنْ كُلِّ أَرْبَعِينَ دِرْهَمًا دِرْهَمٌ وَلَيْسَ عَلَيْكُمْ شَيْءٌ حَتَّى تَتِمَّ مِائَتَيْ دِرْهَمٍ. فَإِذَا كَانَتْ مِائَتَيْ دِرْهَمٍ فَفِيهَا خَمْسَةُ دَرَاهِمَ. فَمَا زَادَ فَعَلَى حِسَابِ ذَلِكَ. وَفِي الْغَنَمِ فِي كُلِّ أَرْبَعِينَ شَاةً شَاةٌ إِلَى عِشْرِينَ وَمِائَة ز فَإِن زَادَت وَاحِدَة فشاتان إِلَى مِائَتَيْنِ. فَإِن زَادَتْ فَثَلَاثُ شِيَاهٍ إِلَى ثَلَاثِمِائَةٍ فَإِذَا زَادَتْ على ثَلَاث مائَة فَفِي كُلِّ مِائَةٍ شَاةٌ. فَإِنْ لَمْ تَكُنْ إِلَّا تِسْعٌ وَثَلَاثُونَ فَلَيْسَ عَلَيْكَ فِيهَا شَيْءٌ
وَفِي الْبَقَرِ: فِي كُلِّ ثَلَاثِينَ تَبِيعٌ وَفِي الْأَرْبَعين مُسِنَّة وَلَيْسَ على العوامل شَيْء
ব্যাখ্যা: ঘোড়া ও গোলামে যাকাত নেই, যদি ব্যবসায়ের জন্য না হয়। আর প্রতি ৪০ দিরহামে এক দিরহাম যাকাত ধার্য হয় যদি ২০০ দিরহাম জমা হয়। আর দু’শত দিরহাম হলে পাঁচ দিরহাম ওয়াজিব হয়। তবে হানাফী মাযহাবে ঘোড়ায় যাকাত ফরয হবে। তারা এ হাদীসের উত্তর দেন যে, এখানে আরোহণের ও জিহাদের ঘোড়ার কথা বলা হয়েছে। বাকী ঘোড়াতে যাকাত ফরয হবে।
৩০টি গরুতে এক বৎসরের একটি বাচ্চা বাছুর যাকাত ফরয হয়। আর ৪০টি হলে ২ বৎসরের একটি বাচ্চা বাছুর ওয়াজিব হয়। ২ বৎসরের বাছুর নর হোক বা নারী হোক তাতে কোন অসুবিধা নেই।
রৌপ্যের নিসাব হল দুইশত দিরহাম। অর্থাৎ একশত নব্বই দিরহাম হলেও তাতে কোন যাকাত লাগবে না। তবে নিসাবের উপর যে পরিমাণই বেশি হোক সেই বর্ধিত অংশে যাকাত ওয়াজিব হবে। অর্থাৎ যদি দুইশত দিরহামের উপর এক দিরহাম বেশি হয় তাহলে তাতেও চল্লিশ ভাগের একভাগ যাকাত দিতে হবে। ফসলাদি, শস্যাদি এবং ফলমূলের ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য। অর্থাৎ পাচ ওয়াসাক্বের বেশি যতটুকুই বেশি হোক না কেন তাতে হিসাব করে যাকাত দিতে হবে। নগদ মুদ্রাও একই শ্রেণীভুক্ত। অর্থাৎ নগদ মুদ্রার ক্ষেত্রে নিসাবের অতিরিক্ত যে পরিমাণ হবে তাতে হিসাব করে যাকাত দিতে হবে। তবে চতুষ্পদ জন্তুর ক্ষেত্রে তা ভিন্ন। কেননা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ক্ষেত্রে কতগুলো স্তর করে দিয়েছেন এবং সেই স্তরের মধ্যবর্তীগুলোর ক্ষেত্রে আবশ্যক করেননি যতক্ষণ না পরবর্তী স্তরে পৌঁছে। যদিও রৌপ্যের মাস্আলার ক্ষেত্রে ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) বিপরীত মত পেশ করেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব জিনিসের যাকাত দিতে হয়
১৮০০-[৭] মু’আয (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে প্রশাসক বানিয়ে ইয়ামানে পাঠাবার সময় এ হুকুম দিয়েছিলেন, প্রত্যেক ত্রিশটি গরুতে এক বছর বয়সী একটি গরু এবং প্রত্যেক চল্লিশটি গরুতে দু’ বছর বয়সী একটি গরু যাকাত হিসেবে উসূল করবে। (আবূ দাঊদ, তিরমিযী, নাসায়ী, দারিমী)[1]
وَعَنْ مُعَاذٍ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمَّا وَجَّهَهُ إِلَى الْيَمَنِ أَمْرَهُ أَنْ يَأْخُذَ مِنْ الْبَقَرَة: مِنْ كُلِّ ثَلَاثِينَ تَبِيعًا أَوْ تَبِيعَةً وَمِنْ كل أَرْبَعِينَ مُسِنَّةً. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالتِّرْمِذِيُّ وَالنَّسَائِيُّ والدارمي
ব্যাখ্যা: চল্লিশটিতে মুসিন্নার (দুই বছরে পূর্ণ করে তৃতীয় বছরে পদার্পণ করেছে এমন বকনা গরু) বিষয়টি এ হাদীসে বর্ণিত হলেও এক্ষেত্রে কমবয়স্কা পুরুষ গরু দেয়া বৈধ যেমনটি পূর্ববর্তী ইবনু ‘আব্বাস-এর হাদীসে এসেছে। যদিও এ বিষয়ে ‘উলামাগণ মতবিরোধ করেছেন। আর ত্রিশের পর থেকে প্রতি দশকের মধ্যে কোন যাকাত আবশ্যক হবে না যতক্ষণ না তা পরবর্তী দশকে পৌঁছে।
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব জিনিসের যাকাত দিতে হয়
১৮০১-[৮] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (নিসাবের চেয়ে) বেশী যাকাত গ্রহণকারী যাকাত অস্বীকারকারীর সমান (অর্থাৎ যাকাত না দেয়া যেমন গুনাহ, তেমনি পরিমাণের চেয়ে বেশী যাকাত উসূল করাও গুনাহ)। (আবূ দাঊদ, তিরমিযী)[1]
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْمُعْتَدِي فِي الصَّدَقَةِ كَمَانِعِهَا» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالتِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসে সীমালঙ্ঘনকারীর ক্ষেত্রটি যাকাত দাতার ক্ষেত্রে হতে পারে। আবার যাকাত আদায়কারীর ক্ষেত্রেও হতে পারে। যাকাত দাতার ক্ষেত্রে রূপটি হলঃ সে যাকাত ব্যয়ের খাত ভিন্ন অন্য খাতে তা ব্যয় করার মাধ্যমে সীমালঙ্ঘন করলে। অথবা সে তার পরিবারের জন্য কিছুই অবশিষ্ট রাখলে না বা যাকাত আদায়কারীর নিকট কিছু অংশ গোপন রাখল বা যাকাতের এমন বর্ণনা দিল যাতে আদায়কারী তার থেকে কম নিল, ফলে এর মাধ্যমে সীমালঙ্ঘন করে যাকাত প্রদানে বাধাদানকারীর যে পাপ হয় তদানুরূপ কিছু পাপে সে জড়িয়ে পড়ল। আর যাকাত গ্রহণকারীর ক্ষেত্রে এর রূপটি হল, সে মালিকের থেকে বেশি বা উত্তম যাকাত গ্রহণ করবে। কেননা যখন সে একবছর এরূপ করবে তখন পরবর্তী বছর মালিক যাকাত প্রদানে বিরত থাকবে। ফলে এরূপ করাটি যাকাত না দেয়ার একটি কারণ হয়ে যায়। যার ফলে যাকাত গ্রহণকারী/আদায়কারী যাকাত প্রদানে বাধা প্রদান করার পাপে অংশীদার হয়ে যাবে।
‘আবদুর রহমান মুবারকপূরী (রহঃ) বলেন, সদাক্বার ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করার দ্বারা উদ্দেশ্য হল যাকাত গ্রহণকারীর যাকাত গ্রহণে সীমালঙ্ঘন করা যাকাত প্রদানকারীর নয়।
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব জিনিসের যাকাত দিতে হয়
১৮০২-[৯] আবূ সা’ঈদ আল্ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শস্য ও খেজুর পাঁচ ওয়াসাক পরিমাণ না হওয়া পর্যন্ত যাকাত ওয়াজিব হবে না। (নাসায়ী)[1]
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَيْسَ فِي حَبٍّ وَلَا تَمْرٍ صَدَقَةٌ حَتَّى يَبْلُغَ خَمْسَةَ أَوْسُقٍ» . رَوَاهُ النَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: পাঁচ ওয়াসাকের নিচে দানা জাতীয় ফসল বা খেজুর হলে তাতে যাকাত ফরয হয় না। এ হাদীস হতে দানা জাতীয় ফসল বলতে অনেকেই বলেন যে, জাফরান, তুলা, ফুল, খিরাই, কাঁকুড়, তরিতরকারী এরূপ জিনিসে যাকাত নেই। তবে কেউ কেউ অন্যরূপ এ হাদীস থেকে মত পোষণ করেছিল।
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব জিনিসের যাকাত দিতে হয়
১৮০৩-[১০] মূসা ইবনু ত্বলহাহ্ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাদের কাছে মু’আয-এর ওই চিঠি বিদ্যমান আছে, যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কাছে পাঠিয়েছিলেন। বস্তুত মু’আয (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ’গম’ ’যব’ ’আঙ্গুর’ ও ’খেজুরের’ যাকাত উসূল করতে আদেশ করেছেন। (এ হাদীসটি মুরসাল, শারহে সুন্নাতে বর্ণনা করা হয়েছে)[1]
وَعَنْ مُوسَى بْنِ طَلْحَةَ قَالَ: عِنْدَنَا كِتَابُ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: إِنَّمَا أَمَرَهُ أَنْ يَأْخُذَ الصَّدَقَةَ مِنَ الْحِنْطَةِ وَالشَّعِيرِ وَالزَّبِيبِ وَالتَّمْرِ. مُرْسل رَوَاهُ فِي شرح السّنة
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব জিনিসের যাকাত দিতে হয়
১৮০৪-[১১] ’আত্তাব ইবনু আসীদ (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আঙ্গুরের যাকাতের ব্যাপারে বলেছেন, আঙ্গুরের ব্যাপারে এভাবে আন্দাজ অনুমান করতে হবে যেভাবে খেজুরের ব্যাপারে শুকিয়ে গেলে করা হয়। তারপর আঙ্গুর শুকিয়ে গেলে তার যাকাত আদায় করা হবে। যেভাবে খেজুরের যাকাত আদায় করা হয়। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَتَّابِ بْنِ أَسِيدٍ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ فِي زَكَاةِ الْكُرُومِ: «إِنَّهَا تُخْرَصُ كَمَا تُخْرَصُ النَّخْلُ ثُمَّ تُؤَدَّى زَكَاتُهُ زَبِيبًا كَمَا تُؤَدَّى زَكَاةُ النَّخْلِ تَمْرًا» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: গাছের আঙ্গুর অনুমান করে ঘরের কিসমিস দ্বারা যাকাত আদায় করা জায়িয আছে। যেমন- গাছের খেজুরকে অনুমান করে ঘরের শুকনা খেজুর দ্বারা যাকাত দেয়া জায়িয আছে।
اَلْخَرْصُ (আল খর্স) বলা হয় খেজুর গাছের তাজা খেজুর শুকানো খেজুরের উপর ভিত্তি করে অনুমান করা এবং গাছে থাকা আঙ্গুরকে কিসমিসের উপর ভিত্তি করে অনুমান করা। আল্লামা সিনদী (রহঃ) বলেছেন, اَلْخَرْصُ (আল খরস) হল গাছে বিদ্যমান তাজা খেজুরকে শুকনো খেজুরের ভিত্তিতে পরিমাণ নির্ধারণ করা এবং গাছে থাকা আঙ্গুরকে কিসমিসের ভিত্তিতে পরিমাণ নির্ধারণ করা যাতে তার উশরের পরিমাণ জানা যায়। অতঃপর পরিমাণকারী এবং মালিকের মাঝে ছেড়ে দিবে পরে ফল কর্তনের সময় মালিকের থেকে তা গ্রহণ করা হবে।
اَلْخَرْصُ (আল খর্স) বা অনুমান করে যাকাত আদায়ের উপকারিতা হল, ফলের মালিকের তা থেকে গ্রহণের প্রশস্ততা দান, তার পাকাগুলো বিক্রি করা, পরিবার, প্রতিবেশী এবং দারিদ্রের অগ্রাধিকার দেয়া। কেননা তাদের এ থেকে বিরত রাখলে তা তাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে যায়। আল আমির আল ইয়ামানী (রহঃ) বলে, খর্সের উপকারিতা হল, মালিকের খিয়ানাত হতে নিরাপদ হওয়া। খাত্ত্বাবী (রহঃ) বলেন, খর্স বা অনুমানটি হবে সেই সময় যখন ফলের পরিপক্কতা প্রকাশ পাবে খাওয়া এবং ধ্বংস হওয়ার পূর্বেই যাতে তার থেকে সদাক্বার পরিমাণ জানা যায়। ফলে শুকানোর পর সে পরিমাণ শুকনা খেজুর বা কিসমিস আদায় করা যায়।
এই হাদীসটি আঙ্গুর এবং খেজুরের যাকাতের ক্ষেত্রে অনুমানের বৈধতার সুস্পষ্ট দলীল। এর পক্ষে মত ব্যক্ত করেছেন ‘উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ), সাহল বিন আবী হাসমাহ্, মারওয়ান আল ক্বাসিম বিন মুহাম্মাদ, যুহরী সহ আরো অনেক আহলে ‘ইলমগণ।
যদিও ইমাম আবূ হানীফাহ্ এবং তার দুই সাথি اَلْخَرْصُ (আল খর্স) এর বিষয়টি বাতিল বলে এর স্বপক্ষের হাদীসগুলো বিভিন্ন যুক্তিতে খন্ডন করার চেষ্টা করেছেন।
তবে অনুমান করে যাকাত আদায়ের পদ্ধতিটি ওয়াজিব, মুস্তাহাব, নাকি জায়িয বা বৈধ এ নিয়ে ‘উলামাদের মতভেদ রয়েছে। জমহূরের মতে তা মুস্তাহাব।
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব জিনিসের যাকাত দিতে হয়
১৮০৫-[১২] সাহল ইবনু আবূ হাস্মাহ্ (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায়ই বলতেন, তোমরা যখন (আঙ্গুর অথবা খেজুরের যাকাত আন্দাজ অনুমান করবে) তখন এর দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ে নিবে, আর এক-তৃতীয়াংশ ছেড়ে দিবে। যদি এক-তৃতীয়াংশ দিতে না পার তাহলে অন্ততঃ এক-চতুর্থাংশ দিবে। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ, নাসায়ী)[1]
وَعَنْ سَهْلِ بْنِ أَبِي حَثْمَةَ حَدَّثَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَقُولُ: «إِذَا خَرَصْتُمْ فَخُذُوا وَدَعُوا الثُّلُثَ فَإِنْ لَمْ تَدَعُوا الثُّلُثَ فَدَعُوا الرُّبُعَ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: গাছের ফল অনুমান করার সময় তিন ভাগের এক ভাগ অথবা ৪ ভাগের এক ভাগ ছেড়ে যাকাতের মাল নির্ধারণ করবে।
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব জিনিসের যাকাত দিতে হয়
১৮০৬-[১৩] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’আবদুল্লাহ ইবনু রওয়াহাকে (খায়বারের) ইয়াহূদীদের কাছে পাঠাতেন। তিনি সেখানে গিয়ে খেজুরের পরিমাণ অনুমান করতেন। তখন তা’ মিষ্টি হত, কিন্তু খাবার উপযুক্ত হত না। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يبْعَث عبد الله ابْن رَوَاحَةَ إِلَى يَهُودٍ فَيَخْرُصُ النَّخْلَ حِينَ يَطِيبُ قَبْلَ أَنْ يُؤْكَلَ مِنْهُ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যা: ৭ম হিজরীতে খায়বার বিজয়ের পর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আবদুল্লাহ ইবনু রওয়াহাকে খায়বারের ইয়াহূদীদের নিকট প্রেরণ করতেন। গাছের খেজুর অনুমান করার জন্য যখন গাছের খেজুর খাওয়ার উপযুক্ত হত। অতঃপর যখন ত্বায়িফ বিজয় হয় আর সেখানে প্রচুর আঙ্গুর হতো তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) খেজুর অনুমানের ন্যায় আঙ্গুর অনুমান করতে তাকে আদেশ করেন।
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব জিনিসের যাকাত দিতে হয়
১৮০৭-[১৪] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মধুর যাকাত সম্পর্কে বলেছেন, প্রত্যেক দশ মশকে এক মশক মধু যাকাত দেয়া ওয়াজিব। (তিরমিযী; তিনি [ইমাম তিরমিযী] বলেন, এ হাদীসের সানাদের ব্যাপারে কথাবার্তা আছে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে উদ্ধৃত এ সম্পর্কিত অধিকাংশ হাদীস সহীহ নয়।)[1]
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم فِي الْعَمَل: «فِي كُلِّ عَشْرَةِ أَزُقٍّ زِقٌّ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: فِي إِسْنَادِهِ مَقَالٌ وَلَا يَصِحُّ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي هَذَا الْبَاب كثير شَيْء
ব্যাখ্যা: মধুর পরিমাপ দশ পাত্র হলে এক পাত্র যাকাত দিবে।
উক্ত হাদীস প্রমাণ করে যে, মধুতে যাকাত আছে। তবে এ বিষয়ে ইমামদের মধ্যে ইখতিলাফ আছে। ইমাম মালিক, ইমাম শাফি‘ঈ, ইবনু আবী লায়লা ও ইবনু হাযম (রহঃ)-এর নিকট মধুতে যাকাত নেই। আর এ বিষয়ে হাদীসগুলো দুর্বল। ইমাম আবূ হানীফাহ্, ইমাম আবূ ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহঃ)-এর নিকট মধুতে যাকাত ওয়াজিব হয়।
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব জিনিসের যাকাত দিতে হয়
১৮০৮-[১৫] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস’ঊদ (রাঃ) এর স্ত্রী যায়নাব (রাঃ)বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে বললেন, হে মেয়েরা! তোমাদের মালের যাকাত আদায় করো, অলংকার হলেও। কেননা কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন তোমাদের বেশিরভাগই জাহান্নামী হবে। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ زَيْنَبَ امْرَأَةِ عَبْدِ اللَّهِ قَالَتْ: خَطَبَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «يَا مَعْشَرَ النِّسَاءِ تَصَدَّقْنَ وَلَوْ مِنْ حُلِيِّكُنَّ فَإِنَّكُنَّ أَكْثَرُ أَهْلِ جَهَنَّمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: উক্ত হাদীসে মহিলাদের সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করতে বলা হয়েছে, যদিও সোনা ও রূপার অলঙ্কার থেকে হয়। ইমাম আত্ তিরমিযীও উক্ত হাদীস থেকে তাই বুঝেছেন।
তিনি অধ্যায় রচনা করেছেনঃ (অলঙ্কারে যাকাত ওয়াজিবের অধ্যায়)
কারণ এখানে ‘আমর-এর সিগা ব্যবহার করা হয়েছে। আর ‘আমরের সিগা ওয়াজিবের জন্য ব্যবহার হয়। আর লেখকও তাই বুঝেছেন।
দ্বিতীয় মত যে, ‘আমরের সিগা নুদুবের বা মুস্তাহাবের অর্থে আসে ফল যাকাত দেয়ার ক্ষেত্রে। কারণ এ হাদীসে শুধুমাত্র মহিলাদেরকে খিতাব করা হয়েছে। সেখানে যাদের উপর যাকাত ফরয তারা সকলেই হাযির ছিল না। পক্ষান্তরে অনেকে এ মত ব্যক্ত করেছেন যে, এ হাদীসটি শুধুমাত্র অলঙ্কার বুঝায় না বরং অন্য সম্পদও বুঝায়। আবার অনেকের মতে এখানে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাদেরকে বিশেষ করে নফল যাকাতের কিষয়টি বুঝিয়েছেন। হানাফী মাযহাব মতে উক্ত হাদীস অলঙ্কারে যাকাত ওয়াজিব বুঝায়।
ইমাম নাবাবী (রহঃ) এটাকে নফল সদাক্বাহ্ (সাদাকা) বলে ব্যক্ত করেছেন।
মোটকথা ‘উলামাদের মধ্যে অলঙ্কারে যাকাত ওয়াজিব কি-না তা নিয়ে মতবিরোধ আছে। ইমাম আবূ হানীফার মতে ওয়াজিব হবে। আর এ মত হলো ‘উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ), সা‘ঈদ ইবনু মুসাইয়্যিব, ‘আতবা ও অন্যান্যদের। আর এটা ইমাম আহমাদ ও ইমাম শাফি‘ঈর একটা মত। আর ইমাম মালিক, ইমাম আহমাদ, ইমাম শাফি‘ঈর প্রসিদ্ধ মত যে, অলঙ্কারের যাকাত ফরয নয়। আর এটা ‘আয়িশাহ্, আনাস, ইবনু ‘উমার ও ‘আম্মার-এর মত। আল্লামা ‘উবায়দুল্লাহ রহমানী বলেনঃ উত্তম মত হলো সোনা-রূপার অলঙ্কারে যাকাত ওয়াজিব। দলীল হলোঃ
وَالَّذِيْنَ يَكْنِزُوْنَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنْفِقُوْنَهَا
‘‘আর যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তুমি (হে মুহাম্মাদ!) তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক এক শাস্তির সুসংবাদ শুনিয়ে দাও।’’ (সূরাহ্ আত্ তাওবাহ্ ৯ : ৩৪)
আর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীসঃ পাঁচ উকিয়্যাহ্ রৌপ্যের নিচে যাকাত ওয়াজিব নয়। অতঃপর যখন দু’শত দিরহাম (পাঁচ উকিয়্যাহ্) হবে তখন তার মধ্যে যাকাত ফরয হবে। আর যে হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, ‘‘অলঙ্কারের যাকাত নেই’’। উক্ত হাদীস সহীহ নয়।
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব জিনিসের যাকাত দিতে হয়
১৮০৯-[১৬] ’আমর ইবনু শু’আয়ব তার পিতা হতে, তার পিতা তার দাদা হতে বর্ণনা করেছেন। (একদিন) দু’জন মহিলা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হলেন। উভয়ের হাতে সোনার চুড়ি পরাছিল। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা কি এগুলোর যাকাত দিয়েছ? তারা বলল, ’জ্বি না’। তিনি বললেন, তোমরা কি চাও আল্লাহ তা’আলা (কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন) তোমাদেরকে দু’টি আগুনের বালা পরাবেন? তারা বলল, ’না’। তখন তিনি বললেন, তাহলে এ সোনার যাকাত দিয়ে দাও। (তিরমিযী; তিনি বলেছেন, এ হাদীসটি এভাবে মুসান্না ইবনু সব্বাহ (রহঃ) ’আমর ইবনু শু’আয়ব থেকে বর্ণনা করেছেন। আর মুসান্না ইবনু সব্বাহ এবং ইবনু লাহী’আহ্-কে [যিনি এ হাদীসের আর একজন বর্ণনাকারীর ব্যাপারে] দুর্বল মনে করা হয়। আর এ বিষয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কোন সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়নি।)[1]
وَعَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ: أَنَّ امْرَأَتَيْنِ أَتَتَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَفِي أَيْدِيهِمَا سِوَارَانِ مِنْ ذَهَبٍ فَقَالَ لَهُمَا: «تُؤَدِّيَانِ زَكَاتَهُ؟» قَالَتَا: لَا. فَقَالَ لَهُمَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَتُحِبَّانِ أَنْ يُسَوِّرَكُمَا اللَّهُ بِسِوَارَيْنِ مِنْ نَارٍ؟» قَالَتَا: لَا. قَالَ: «فَأَدِّيَا زَكَاتَهُ» رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيث قد رَوَاهُ الْمُثَنَّى بْنُ الصَّبَّاحِ عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ نَحْوَ هَذَا وَالْمُثَنَّى بْنُ الصَّبَّاحِ وَابْنُ لَهِيعَةَ يُضَعَّفَانِ فِي الْحَدِيثِ وَلَا يَصِحُّ فِي هَذَا الْبَابِ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شَيْء
ব্যাখ্যা: এ হাদীস হতে অলঙ্কারের মধ্যে যাকাত ওয়াজিব প্রমাণ হয়।
তবে ইমাম আত্ তিরমিযী ইবনু লাহী‘আহ্-এর সানাদে নকল করেছেন কিন্তু সে সানাদ য‘ঈফ।
ইমাম আত্ তিরমিযী বলেনঃ মুসান্না ইবনু সব্বাহ-ও দুর্বল। এ অধ্যায়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কোন সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়নি। ইবনুল মুলকিন বলেনঃ ইমাম আবূ দাঊদ উক্ত হাদীস সহীহ সানাদে বর্ণনা করেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব জিনিসের যাকাত দিতে হয়
১৮১০-[১৭] উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি সোনার আওযাহ (এক রকম অলংকারের নাম) পরতাম। আমি একদিন বললাম, হে আল্লাহর রসূল! এ সোনার অলংকারও কি সঞ্চিত মাল গণ্য হবে (যে ব্যাপারে কুরআনে ভয় দেখানো হয়েছে)? তিনি বললেন, যে জিনিসে নিসাব পূর্ণ হয় এবং এর যাকাত দিয়ে দেয়া হয়, তা পবিত্র হয়ে যায়। তখন তা সঞ্চিত ধন-সম্পদের মধ্যে গণ্য নয়। (মালিক, আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أُمِّ سَلَمَةَ قَالَتْ: كُنْتُ أَلْبَسُ أَوْضَاحًا مِنْ ذَهَبٍ فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَكَنْزٌ هُوَ؟ فَقَالَ: «مَا بلغ أَن يُؤدى زَكَاتُهُ فَزُكِّيَ فَلَيْسَ بِكَنْزٍ» . رَوَاهُ مَالِكٌ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: রূপার তৈরি একপ্রকার অলংকারকে আওযাহ বলা হয়। উক্ত হাদীস হতে বুঝা যায় যে, অলংকারে যাকাত আছে। তবে শর্ত হলো উক্ত অলংকার নিসাব সমপরিমাণ হওয়া। আর নিসাব হলো দু’শত দিরহাম। সুতরাং উক্ত মালে যাকাত দিলে কান্য-এর (শাস্তির) আওতায় যাবে না।
জ্ঞাতব্যঃ যে অলংকারে যাকাত ওয়াজিব হয় তার নিসাবের ক্ষেত্রে ওযন ধর্তব্য। অতএব যদি কেউ কিছু অলংকারের মালিক হয় যার মূল্য দুইশত দিরহাম কিন্তু পরিমাণ দুইশত দিরহামের কম তাহলে তার ওপর যাকাত আবশ্যক নয়। যদি তার ওযন দুইশত দিরহাম হয় তাহলে তাতে যাকাত আবশ্যক হবে যদিও তা মূল্যের ক্ষেত্রে দুইশত দিরহামের কম হয়। যেহেতু রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘পাঁচ উক্বিয়্যার কম রূপাতে যাকাত নেই।’’ তবে যদি অলংকারাদি ব্যবসার জন্য হয় তাহলে তার নিসাবের ক্ষেত্রে মূল্য ধর্তব্য। অর্থাৎ যখন স্বর্ণ, রৌপ্যের দ্বারা তার মূল্য দুইশত দিরহামের সমপরিমাণ হবে তখন তাতে যাকাত ওয়াজিব হবে। কারণ এর যাকাতটি মূল্যের সাথে সংশ্লিষ্ট। আর যে অলংকারাদি ব্যবসার উদ্দেশে ব্যবহার হয় না তার যাকাতটি স্বয়ং সে দ্রব্যের ক্ষেত্রে। ফলে তার মূল্যের ক্ষেত্রটি বিবেচিত হলেও তার ওযনটিই মূলত এ ক্ষেত্রে তার নিসাব।
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব জিনিসের যাকাত দিতে হয়
১৮১১-[১৮] সামুরাহ্ ইবনু জুনদুব (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে ব্যবসায়ের জন্য তৈরি করা মালপত্রের যাকাত আদায়ের হুকুম দিতেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ سَمُرَةَ بْنِ جُنْدُبٍ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَأْمُرُنَا أَنْ نُخْرِجَ الصَّدَقَةَ مِنَ الَّذِي نُعِدُّ لِلْبَيْعِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব জিনিসের যাকাত দিতে হয়
১৮১২-[১৯] রবী’আহ্ ইবনু আবূ ’আবদুর রহমান (রহঃ) একাধিক সাহাবী হতে বর্ণনা করেছেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিলাল ইবনু হারিস আল মুযানীকে ’ফারা’-তে অবস্থিত ক্বাবালিয়াহ্ নামক স্থানের খনি জায়গীর দিয়েছিলেন। সেসব খনি হতে এখন পর্যন্ত কেবল যাকাতই উসূল করা হয়। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ رَبِيعَةَ بْنِ أَبِي عَبْدِ الرَّحْمَنِ عَنْ غَيْرِ وَاحِدٍ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَقْطَعَ لِبِلَالِ بْنِ الْحَارِثِ الْمُزَنِيِّ معادن الْقبلية وَهِيَ مِنْ نَاحِيَةِ الْفُرْعِ فَتِلْكَ الْمَعَادِنُ لَا تُؤْخَذُ مِنْهَا إِلَّا الزَّكَاةُ إِلَى الْيَوْمِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
পরিচ্ছেদঃ ১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব জিনিসের যাকাত দিতে হয়
১৮১৩-[২০] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তরি-তরকারী ও দান করে দেয়া গাছপালার কোন যাকাত নেই। পাঁচ ওয়াসাকে চেয়ে কম পরিমাণ শস্যে যাকাত নেই, কাজে-কর্মে ব্যবহার্য জানোয়ারের যাকাত নেই, ’জাবহাহ্’তেও যাকাত নেই। সাকর (রহঃ) বলেন, ’জাবহাহ্’ হচ্ছে ঘোড়া, খচ্চর ও গোলাম। (দারাকুত্বনী)[1]
عَنْ عَلِيٍّ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَيْسَ فِي الْخَضْرَاوَاتِ صَدَقَةٌ وَلَا فِي الْعَرَايَا صَدَقَةٌ وَلَا فِي أَقَلَّ مِنْ خَمْسَةِ أَوْسُقٍ صَدَقَةٌ وَلَا فِي الْعَوَامِلِ صَدَقَةٌ وَلَا فِي الْجَبْهَةِ صَدَقَةٌ» . قَالَ الصَّقْرُ: الْجَبْهَةُ الْخَيل وَالْبِغَال وَالْعَبِيد. رَوَاهُ الدَّارَقُطْنِيّ
ব্যাখ্যা: উক্ত হাদীস থেকে প্রমাণ হয় যে, তরি-তরকারীর মধ্যে, দান করা জিনিসের মধ্যে পাঁচ ওয়াসাকের নিচে যাকাত নেই। আর গোলাম ও ঘোড়ার মধ্যে যাকাত নেই। ষাট সা‘তে এক ওয়াসাক হয়। আর পাঁচ ওয়াসাকে তিনশত সা' হয়। তবে ইমাম আবূ হানীফার মতে যাকাত সকল প্রকার মালের মধ্যে ওয়াজিব হয় যা জমিন হতে বের হয়। চাই সেটা ফসল থেকে হোক বা ফলমূল থেকে হোক, শাক-সবজী থেকে হোক। আর এটা দাঊদ জাহরী-এর মত। তারা দলীল পেশ করেন আল্লাহর বাণী হতেঃ
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً
‘‘তুমি ওদের মাল হতে যাকাত নাও।’’ (সূরাহ্ আত্ তাওবাহ্ ৯ : ১০৩)
আল্লাহর বাণীঃ
وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُمْ مِنَ الْأَرْضِ
‘‘যা কিছু আমি জমিন থেকে উৎপন্ন করেছি।’’ (সূরাহ্ আল বাক্বারাহ্ ২ : ২৬৭)
আরো আল্লাহর বাণীঃ
وَاتُوْا حَقَّهٗ يَوْمَ حَصَادِه
‘‘ফসল কাটার দিন তার হক আদায় করো।’’ (সূরাহ্ আল আন্‘আম ৬ : ১৪১)
আর তারা উল্লেখিত হাদীসের মধ্যে তরি-তরকারী থেকে উদ্দেশ্য ফুল ও ফল বলে উল্লেখ করেন।
পরিচ্ছেদঃ ১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব জিনিসের যাকাত দিতে হয়
১৮১৪-[২১] ত্বাউস (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার (ইয়ামানের শাসক) মু’আয ইবনু জাবাল (রাঃ)-এর নিকট (যাকাত উসূল করার জন্য) ওয়াক্বাস গাভী আনা হয়েছিল। তিনি (তা দেখে) বললেন, এসবের থেকে (যাকাত উসূলের জন্য) আমাকে আদেশ দেয়া হয়নি। (দারাকুত্বনী, শাফি’ঈ; ইমাম শাফি’ঈ বলেন, ’ওয়াক্বাস’ এসব জানোয়ারকে বলা হয়, যা প্রাথমিকভাবে যাকাতের নিসাবের সীমায় পৌঁছেনি।)[1]
وَعَنْ طَاوُسٍ أَنَّ مُعَاذَ بْنَ جَبَلٍ أَتَى بِوَقَصِ الْبَقَرِ فَقَالَ: لَمْ يَأْمُرْنِي فِيهِ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِشَيْءٍ. رَوَاهُ الدَّارَقُطْنِيُّ وَالشَّافِعِيُّ وَقَالَ: الْوَقَصُ مَا لَمْ يَبْلُغِ الْفَرِيضَةَ
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - ফিত্বরার বর্ণনা
সূরাহ্ আল আ’লা- এর ১৪-১৫ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনু ’উমার (রাঃ), ’আমর বিন ’আওফ (রাঃ) বলেছেন যে, قَدْ أَفْلَحَ مَنْ تَزَكّى এর زكاة দ্বারা উদ্দেশ্য زكاة الفطر (যাকাতুল ফিতর)। বাক্যাংশটি শুদ্ধরূপ হল صدقة الفطر (সদাক্বাতুল ফিতর)। আর এভাবেই সকল হাদীস সংকলনকারীগণ অধ্যায় রচনা করেছেন। তবে কোন কোন হানাফী লেখক সদাক্বাতুল ফিতর বলেছেন, যা সমাজে فِطْرَةٌ (ফিত্বরাহ্) হিসেবে প্রসিদ্ধ। এটি হয় জনসাধারণের ভুল বা এটি ফকীহদের নতুন একটি পরিভাষা যা তার মূল অর্থ ভিন্ন অন্য অর্থে ব্যবহৃত। কারণ ফিত্বরাহ্ শব্দের অর্থ স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য। সদাক্বাতুল ফিতর ফরয হয়েছে ২য় হিজরীর রমাযান মাসে ঈদের ২ দিন পূর্বে। সদাক্বাতুল ফিতরের হুকুম নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। ইমাম শাফি’ঈ, মালিক এবং আহমাদ (রহঃ)-এর মতে তা ফরয। ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-এর মতে তা ওয়াজিব। আর এক দলের মতে তা সুন্নাত। তবে সঠিক বক্তব্য হল আহলে ’ইলমগণ যার উপর একমত তথা সদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব। যদিও তারা তার ফরয নামকরণের বিষয়ে মতবিরোধ করেছেন। কিন্তু তা পরিত্যাগ করা অবশ্যই অবৈধ।
১৮১৫-[১] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমদের প্রত্যেক গোলাম, আযাদ, পুরুষ, নারী, ছোট-বড় সকলের জন্য এক সা’ খেজুর’, অথবা এক সা’ যব সদাক্বায়ে ফিত্বর ফরয করে দিয়েছেন। এ ’সদাক্বায়ে ফিত্বর’ ঈদুল ফিত্বরের সালাতে বের হবার আগেই আদায় করতে হুকুম দিয়েছেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ صَدَقَةِ الْفِطْرِ
عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: فَرَضَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ زَكَاةَ الْفِطْرِ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ عَلَى الْعَبْدِ وَالْحُرِّ وَالذَّكَرِ وَالْأُنْثَى وَالصَّغِيرِ وَالْكَبِيرِ مِنَ الْمُسْلِمِينَ وَأَمَرَ بِهَا أَنْ تُؤَدَّى قَبْلَ خُرُوجِ النَّاس إِلَى الصَّلَاة
ব্যাখ্যা: যাকাতুল ফিত্বর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরয করেছেন। এক সা' খেজুর অথবা এক সা‘ যব। গোলাম, আযাদ, নর-নারীর ওপর, ছোট ও বড় সকল মুসলিমদের ওপর।
উক্ত হাদীস হতে বুঝা যায় যে, ফিত্বরাহ্ ফরয ওয়াজিব নয়। ইমাম আবূ হানীফার মতে সেটা ওয়াজিব, ফরয নয়। ইমাম শাফি‘ঈ, ইমাম মালিক, ইমাম আহমাদও আহলে যাহিরীদের নিকট সেটা ফরয। তারা সূরাহ্ আল বাক্বারাহ্’র ৪৩ নং আয়াতঃ ‘‘তোমরা যাকাত দাও’’ হতে দলীল গ্রহণ করেন। যার পরিমাপ হিজাযী মাপে পাঁচ রিতিল ও এক রিতিলের এক-তৃতীয়াংশ।
আমাদের দেশে বর্তমান পরিমাপ আড়াই কেজি। এ পরিমাপ বর্ণনা করেছেন ইমাম মালিক, ইমাম শাফি‘ঈ ও ইমাম আহমাদ এবং ইমাম আবূ হানীফার শাগরেদ ইমাম ও আবূ ইউসুফ। আর অর্ধ সা‘র কোন সহীহ হাদীস নেই।
প্রকাশ থাকে যে, গোলামের ওপর ফিত্বরাহ্ ফরয মানে মালিকের ওপর ফরয।
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - ফিত্বরার বর্ণনা
১৮১৬-[২] আবূ সা’ঈদ আল্ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা (রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময়) খাবার জিনিসের এক সা’ অথবা এক সা’ যব অথবা খেজুর অথবা এক সা’ পনির অথবা এক সা’ আঙ্গুর ’সদাক্বায়ে ফিতর’ আদায় করতাম। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ صَدَقَةِ الْفِطْرِ
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: كُنَّا نُخْرِجُ زَكَاةَ الْفِطْرِ صَاعًا مِنْ طَعَامٍ أَو صَاعا من شعير أَو صَاعا من تَمْرٍ أَوْ صَاعًا مَنْ أَقِطٍ أَوْ صَاعًا من زبيب
ব্যাখ্যা: আবূ সা‘ঈদ (রাঃ) এর হাদীস হতে বুঝা যায় যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগেও এক সা' ফিত্বরাহ্ আদায় করা হত খাদ্যদ্রব্য হতে। সহীহুল বুখারীর বর্ণনায় আছে, আমরা সেটা আদায় করতাম নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যামানায়। বুখারীর অন্য বর্ণনায় আছে যে, আমরা সেটা বের করতাম নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কালে। আমরা যাকাতুল ফিত্বর বের করতাম আর আমাদের মধ্যে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন। আর এ কথা অসম্ভব যে, মু‘আবিয়ার কথায় লোকেরা আধা সা' গম ফিত্বরাহ্ দিতো। তাহলে আবূ সা‘ঈদ আল খুদরী ও অন্যান্যরা মু‘আবিয়ার বিরোধিতা করতো। ক্বিয়াস করে অর্ধ সা' মেনে নিয়েছেন এ কথা ঠিক নয়।
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ফিত্বরার বর্ণনা
১৮১৭-[৩] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। একবার তিনি রমাযানের শেষ দিকে লোকদের উদ্দেশে বললেন, তোমরা তোমাদের সিয়ামের সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দাও। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের প্রত্যেক মুসলিম, স্বাধীন-অধীন, গোলাম-বাঁদী, পুরুষ-মহিলা, ছোট-বড় সকলের পক্ষে ’এক সা’ খেজুর ও যব অথবা ’এক সা’-এর অর্ধেক গম সদাক্বাতুল ফিত্বর ফরয করে দিয়েছেন। (আবূ দাঊদ, নাসায়ী)[1]
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: فِي آخِرِ رَمَضَانَ أخرجُوا صَدَقَة صومكم. فرض رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ هَذِهِ الصَّدَقَةَ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ أَوْ شَعِيرٍ أَوْ نِصْفَ صَاعٍ مِنْ قَمْحٍ عَلَى كُلِّ حُرٍّ أَوْ مَمْلُوكٍ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى صَغِيرٍ أَوْ كَبِيرٍ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: ইবনু ‘আব্বাস-এর এ হাদীসে অর্ধ সা‘ গমের কথা বলা হয়েছে। উক্ত হাদীস আবূ দাঊদ ও নাসায়ীতে বর্ণিত হয়েছে। আর এটিই ইমাম আবূ হানীফার মত।
তবে তিন ইমাম এর বিরোধিতা করেছেন।
আসলে হাদীসটি মুনক্বাতি' যা ইবনু তুরকামানী স্বীকার করেছেন। উক্ত হাদীস হাসান ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে রিওয়ায়াত করেছেন। তবে ‘উলামাগণ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে হাসান-এর শ্রবণের প্রমাণ নিয়ে কথা উঠিয়েছেন যা সহীহ হাদীসের খিলাফ।
হাসান-এর সেমা বা শ্রবণ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে প্রমাণ বা সাবিত নেই বলে দৃঢ়তার সাথে ব্যক্ত করেছেন ইমাম নাসায়ী, ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল, ইবনুল মাদানী, আবূ হাতিম, বাহয ইবনু আসাদ ও বাযযার।
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ফিত্বরার বর্ণনা
১৮১৮-[৪] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সওমকে অযথা কথা, খারাপ আলাপ-আলোচনা থেকে পবিত্র করার ও গরীব মিসকীনকে খাদ্যবস্তু দেবার উদ্দেশে সদাক্বায়ে ফিত্বর ফরয করে দিয়েছেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: فَرَضَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ زَكَاةَ الْفِطْرِ طُهْرَ الصِّيَامِ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ وَطُعْمَةً لِلْمَسَاكِينِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: যাকাতুল ফিত্বরের নির্ধারণের উদ্দেশ্য সিয়ামকে পবিত্র করা বেহুদা ও অশ্লীল কাজ ও কর্ম হতে। আর এতে রয়েছে মিসকীনদের খাদ্যের উৎস। এ হাদীস থেকে অনেকেই দলীল গ্রহণ করেন যে, ফিত্বরাহ্ একস্থান থেকে অন্যস্থানে পাঠানো মুবাহ, যেমন যাকাতের ক্ষেত্রে জায়িয আছে। কেউ বলেন, যাকাতের মতো ফিত্বরাও আট শ্রেণীদের মধ্যে বণ্টন করা যাবে। কারণ আল্লাহ তা‘আলা সকলের উদ্দেশে বলেন যে, ‘‘নিশ্চয়ই সদাক্বাহ্সমূহ ফকীর.....’’- (সূরাহ্ আত্ তাওবাহ্ ৯ : ২৬০)।
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ফিত্বরার বর্ণনা
১৮১৯-[৫] ’আমর ইবনু শু’আয়ব তার পিতা ও তার দাদা পরম্পরায় বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (একবার) মক্কায় অলি-গলিতে ঘোষণা করিয়ে দিলেন, জেনে রেখ, প্রত্যেক মুসলিম নারী-পুরুষ, আযাদ গোলাম, ছোট-বড়, সকলের ওপর দু’ ’মুদ’ গম বা এছাড়া অন্য কিছু বা এক সা’ খাবার সদাক্বায়ে ফিতর দেয়া বাধ্যতামূলক। (তিরমিযী)[1]
عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَعَثَ مُنَادِيًا فِي فِجَاجِ مَكَّةَ: «أَلَا إِنَّ صَدَقَةَ الْفِطْرِ وَاجِبَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى حُرٍّ أَوْ عَبْدٍ صَغِيرٍ أَوْ كَبِيرٍ مُدَّانِ مِنْ قَمْحٍ أَوْ سِوَاهُ أَوْ صَاع من طَعَام» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: উল্লেখিত হাদীস থেকে প্রমাণ হয় যে, সদাক্বাতুল ফিতর ওয়াজিব সকল মুসলিম নর-নারীর, গোলাম-আযাদ ও ছোট-বড়দের ওপর। গমের দু’মুদ গম। অথবা এক সা' খাদ্যদ্রব্য থেকে হতে পারে, তবে হাদীসটির সানাদ বিশুদ্ধ নয়। আর এটিই ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-এর মত।
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ফিত্বরার বর্ণনা
১৮২০-[৬] ’আবদুল্লাহ ইবনু সা’লাবাহ্ অথবা সা’লাবাহ্ ইবনু ’আবদুল্লাহ ইবনু আবূ সু’আয়র তার পিতা হতে বর্ণনা করেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এক সা’ গম প্রত্যেক দু’ ব্যক্তির পক্ষ হতে। ছোট কিংবা বড়, আযাদ গোলাম, পুরুষ অথবা নারী। তোমাদের মধ্যে যে ধনী তাকে আল্লাহ এর দ্বারা পবিত্র করবেন। কিন্তু যে গরীব তাকে আল্লাহ ফেরত দেবেন, যা সে দিয়েছিল তার চেয়ে অধিক। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ ثَعْلَبَةَ أَوْ ثَعْلَبَةَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي صُعَيْرٍ عَنْ أَبِيهِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «صَاعٌ مِنْ بُرٍّ أَوْ قَمْحٍ عَنْ كُلِّ اثْنَيْنِ صَغِيرٍ أَوْ كَبِيرٍ حُرٍّ أَوْ عَبْدٍ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى. أَمَّا غَنِيُّكُمْ فَيُزَكِّيهِ اللَّهُ. وَأَمَّا فَقِيرُكُمْ فَيَرُدُّ عَلَيْهِ أَكْثَرَ مَا أعطَاهُ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: উক্ত হাদীস হতে বুঝা যায় যাকাতুল ফিত্বর ধনী-গরীব সকলকেই দিতে হবে। এর মাধ্যমে আল্লাহ ধনীদের পবিত্র করবেন আর সেটা আদায়ের পর গরীবদের আবার কয়েকগুণ বেশী ফিরিয়ে দিবেন। সুতরাং যারা ফিত্বরাহ্ আদায়ের জন্য নিসাব নির্ধারণ করেন তাদের মাযহাব ঠিক নয়। আর উক্ত হাদীসে গমে আধা সা' দেয়ার বিরুদ্ধে বর্ণনা করছে। তবে হাদীসটি মুযতারিব (ইখতেলাফপূর্ণ)।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - যাকাত যাদের জন্য হালাল নয়
১৮২১-[১] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন পথে পড়ে থাকা একটি খেজুরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ এ খেজুর যাকাত বা সদাক্বাহ্ (সাদাকা) হবার সন্দেহ না থাকলে আমি উঠিয়ে খেয়ে নিতাম। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابٌ مِمَّنْ لَا تَحِلُّ لَهُ الصَّدَقَةُ
عَنْ أَنَسٍ قَالَ: مَرَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِتَمْرَةٍ فِي الطَّرِيقِ فَقَالَ: «لَوْلَا أَنِّي أَخَافُ أَنْ تَكُونَ مِنَ الصَّدَقَةِ لأكلتها»
ব্যাখ্যা: রাস্তায় পড়ে থাকা খেজুর বা অনুরূপ বস্ত্ত যা লুকতাহ বলে সেটা ব্যবহার করা জায়িয। তবে সেটা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য দেয়া ঠিক নয়। এ জন্য যে, সেটা সদাক্বাহ্ (সাদাকা) এর হতে পারে। আর সদাক্বার মাল রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য হারাম ছিল। পরহেযগারিতার দিক থেকে সেটি বর্জন করা তাঁর জন্য উত্তম। আর এরূপ বর্ণনা সহীহুল বুখারীতেও উল্লেখ আছে। এর থেকে প্রমাণ হয় যে, সদাক্বার অল্প বস্ত্তও তাঁর জন্য হারাম ছিল।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - যাকাত যাদের জন্য হালাল নয়
১৮২২-[২] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাতি হাসান ইবনু ’আলী (রাঃ) সদাক্বার খেজুর হতে একটি খেজুর উঠিয়ে মুখে পুরলেন। (তা দেখে) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, খেজুরটি মুখ থেকে বের করে ফেলো, বের করে ফেলো। (তিনি এ কথাটি এভাবে বললেন যেন হাসান তা মুখ থেকে বের করে ফেলে দেয়)। তারপর তিনি তাঁকে বললেন, তুমি কি জানো না যে, আমরা (বানী হাশিম) সদাক্বার মাল খেতে পারি না। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابٌ مِمَّنْ لَا تَحِلُّ لَهُ الصَّدَقَةُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: أَخَذَ الْحَسَنُ بْنُ عَلِيٍّ تَمْرَةً مِنْ تَمْرِ الصَّدَقَةِ فَجَعَلَهَا فِي فِيهِ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «كِخْ كِخْ» لِيَطْرَحَهَا ثُمَّ قَالَ: «أما شَعرت أَنا لَا نَأْكُل الصَّدَقَة؟»
ব্যাখ্যা: হাসান ইবনু ‘আলী (রাঃ) ফাত্বিমার ছেলে। সদাক্বার খেজুর মুখে দেয়ায় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফেলতে ইশারা করলেন। কারণ সদাক্বার মাল ‘আলি মুহাম্মাদ-এর ওপর হারাম ছিল। আর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসানকে বলেন, আমরা সদাক্বাহ্ (সাদাকা) এর মাল খাই না। কিসমিস শব্দটি দু’বার তাকিদের জন্য ব্যবহার আর তা ইসমে ফে‘ল।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - যাকাত যাদের জন্য হালাল নয়
১৮২৩-[৩] ’আবদুল মুত্ত্বালিব ইবনু রবী’আহ্ (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এ সদাক্বাহ্ (সাদাকা) অর্থাৎ যাকাত মানুষের সম্পদের ময়লা ব্যতীত কিছু নয়। তাই এটা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য এবং তাঁর বংশধরদের জন্যও হালাল নয়। (মুসলিম)[1]
بَابٌ مِمَّنْ لَا تَحِلُّ لَهُ الصَّدَقَةُ
وَعَنْ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ بْنِ رَبِيعَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «إِن هَذِهِ الصَّدَقَاتِ إِنَّمَا هِيَ أَوْسَاخُ النَّاسِ وَإِنَّهَا لَا تَحِلُّ لِمُحَمَّدٍ وَلَا لِآلِ مُحَمَّدٍ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: হাদীসটির মধ্যে একটি ক্বিসসা আছে। সর্বপ্রকার যাকাত বা সদাক্বার মাল মানুষের ময়লা। যে কারণে সেটা বানী তামীম-এর ওপর হারাম ছিল। যেমন আল্লাহ তা‘আলা সূরাহ্ আত্ তাওবার ১০৩ নং আয়াতে বলেছেনঃ ‘‘তুমি তাদের মাল থেকে যাকাত গ্রহণ কর এবং তাদেরকে পবিত্র কর।’’
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - যাকাত যাদের জন্য হালাল নয়
১৮২৪-[৪] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট কোন খাবার এলে তিনি জিজ্ঞেস করতেন, এটা হাদিয়্যাহ্ না সদাক্বাহ্ (সাদাকা)? ’সদাক্বাহ্ (সাদাকা)’ বলা হলে তিনি তাঁর সাথীদেরকে বলতেন, তোমরা খাও। তিনি নিজে খেতেন না। আর ’হাদিয়্যাহ্’ বলা হলে তিনি তাঁর হাত বাড়াতেন ও সাহাবীদেরকে সাথে নিয়ে খেতেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابٌ مِمَّنْ لَا تَحِلُّ لَهُ الصَّدَقَةُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا أُتِيَ بِطَعَامٍ سَأَلَ عَنْهُ: «أَهَدْيَةٌ أَمْ صَدَقَةٌ؟» فَإِنْ قِيلَ: صَدَقَةٌ: قَالَ لِأَصْحَابِهِ: «كُلُوا» وَلَمْ يَأْكُلْ وَإِنْ قِيلَ: هَدِيَّةٌ ضَرَبَ بِيَدِهِ فَأَكَلَ مَعَهم
ব্যাখ্যা: রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট কোন খাদ্য এলে জিজ্ঞেস করতেন যে, সেটা হাদিয়্যাহ্ না সদাক্বাহ্ (সাদাকা)? সেটা সদাক্বাহ্ (সাদাকা) হলে সাথীদের খেতে বলতেন। তিনি খেতেন না, কারণ সদাক্বাহ্ তাঁর ওপর হারাম ছিল। আর হাদিয়্যাহ্ হলে সেটা হাত বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি খেতেন। সদাক্বাহ্ (সাদাকা) ফকীর ও মিসকীনদের ওপর খরচ করা হয়।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - যাকাত যাদের জন্য হালাল নয়
১৮২৫-[৫] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বারীরাহ্ (ক্রীতদাসীর) ব্যাপারে তিনটি নির্দেশনা দেয়া হয়। (প্রথম) সে স্বাধীন হবে, তার স্বামীর সাথে বিবাহ সম্পর্ক বহাল রাখা বা না রাখার ক্ষেত্রে তার স্বাধীনতা থাকবে। (দ্বিতীয়) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ মীরাসের অধিকার তারই থাকবে, যে তাকে আযাদ করেছে। (তৃতীয়) [একদিন] রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে এলেন। তখন মাংস (মাংস/গোসত) রান্না করা হচ্ছিল। ঘরে বানানো রুটি ও তরকারী তাঁর সামনে আনা হলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি একটি পাতিলে মাংস দেখলাম। বলা হলো, জি হ্যাঁ। তবে এ মাংস বারীরাকে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দেয়া হয়েছে, আপনি তো সদাক্বাহ্ (সাদাকা) খান না। এ কথা শুনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ মাংস বারীরার জন্য সদাক্বাহ্ (সাদাকা) হলে আমাদের জন্য হাদিয়্যাহ্। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابٌ مِمَّنْ لَا تَحِلُّ لَهُ الصَّدَقَةُ
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: كَانَ فِي بَرِيرَةَ ثَلَاثُ سُنَنٍ: إِحْدَى السُّنَنِ أَنَّهَا عُتِقَتْ فَخُيِّرَتْ فِي زَوْجِهَا وَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْوَلَاءُ لِمَنْ أَعْتَقَ» . وَدَخَلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالْبُرْمَةُ تَفُورُ بِلَحْمٍ فَقُرِّبَ إِلَيْهِ خُبْزٌ وَأُدْمٌ مِنْ أُدْمِ الْبَيْتِ فَقَالَ: «أَلَمْ أَرَ بُرْمَةً فِيهَا لَحْمٌ؟» قَالُوا: بَلَى وَلَكِنَّ ذَلِكَ لَحْمٌ تُصُدِّقَ بِهِ عَلَى بَرِيرَةَ وَأَنْتَ لَا تَأْكُلُ الصَّدَقَةَ قَالَ: «هُوَ عَلَيْهَا صَدَقَةٌ وَلنَا هَدِيَّة»
ব্যাখ্যা: ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর দাসী বারীরার মধ্যে শারী‘আতের তিনটি সুন্নাত পাওয়া যায়। একটি হলো ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) তাকে আযাদ করেছেন। আর তাকে তার স্বামীর ব্যাপারে ইখতিয়ার দেয়া হয়েছিল।
দ্বিতীয় হল রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, দাস-দাসীর ওলার মাল আযাদকারী হকদার হয়।
তৃতীয় হল রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারীরার সদাক্বার পাকানো গোশ্ত (গোশত/গোস্ত/গোসত) খান। আর বলেনঃ এটা তার জন্য সদাক্বাহ্ (সাদাকা) আর আমার জন্য হাদিয়্যাহ্।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - যাকাত যাদের জন্য হালাল নয়
১৮২৬-[৬] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিয়্যাহ্ গ্রহণ করতেন এবং বিনিময়ে তিনি তাকেও (হাদিয়্যাহ্) দিতেন। (বুখারী)[1]
بَابٌ مِمَّنْ لَا تَحِلُّ لَهُ الصَّدَقَةُ
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُقَبِّلُ الْهَدِيَّة ويثيب عَلَيْهَا. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিয়্যাহ্ গ্রহণ করতেন। তিনি সদাক্বাহ্ (সাদাকা) খেতেন না। তিনি হাদিয়্যাহ্ গ্রহণ করতেন এবং তার উপর বদলা দিতেন। ইমাম খাত্ত্বাবী মা‘আলিম কিতাবে বলেছেনঃ রসূলের হাদিয়্যাহ্ কবূল করাটাও এক প্রকার বদান্যতা ও সৎচরিত্রের অংশ যাতে অন্তরের মধ্যে মুহা্ব্বত সৃষ্টি হয়। আর অন্য হাদীসে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ পরস্পর হাদিয়্যাহ্ দাও তাহলে মুহাব্বতও সৃষ্টি হবে।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - যাকাত যাদের জন্য হালাল নয়
১৮২৭-[৭] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমাকে যদি বকরীর একটি খুরের জন্যও দা’ওয়াত দেয়া হয় আমি তা গ্রহণ করব। আর আমার কাছে যদি হাদিয়্যাহ্ হিসেবে ছাগলের একটি বাহুও আসে আমি তাও গ্রহণ করব। (বুখারী)[1]
بَابٌ مِمَّنْ لَا تَحِلُّ لَهُ الصَّدَقَةُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَوْ دُعِيتُ إِلَى كُرَاعٍ لَأَجَبْتُ وَلَوْ أُهْدِيَ إِلَيَّ ذِرَاع لقبلت» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিয়্যাহ্ কবূল করতেন; তা সামান্য বস্ত্ত হলেও। এমনকি গরুর বা উটের খুর হলেও কবূল করতেন। দা‘ওয়াত দানকারীর সাথে ভালোবাসা ও মুহাব্বাত গভীর করার জন্য। আর হাদিয়্যাহ্ কবূল না করা অভক্তির ও মুহাব্বাতের উপর প্রমাণ করে। সুতরাং দা‘ওয়াত কবূল করা মুস্তাহাব, যদি সামান্য হয়।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - যাকাত যাদের জন্য হালাল নয়
১৮২৮-[৮] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সে ব্যক্তি মিসকীন নয়, যে লোকের কাছে হাত পাতে। আর তারা তাকে এক বা দু’ মুষ্টি অথবা একটি কি দু’টি খেজুর দান করে। বরং মিসকীন ওই ব্যক্তি যে কপর্দকহীন। কিন্তু তার বাহ্যিক বেশভূষার কারণে মানুষেরা বুঝতে পারে না সে মুখাপেক্ষী। তাকে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দেয়া যায়। আর সেও কোন কিছুর জন্য লোকদের কাছে হাত বাড়াতে পারে না। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابٌ مِمَّنْ لَا تَحِلُّ لَهُ الصَّدَقَةُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَيْسَ الْمِسْكِينُ الَّذِي يَطُوفُ عَلَى النَّاسِ تَرُدُّهُ اللُّقْمَةُ وَاللُّقْمَتَانِ وَالتَّمْرَةُ وَالتَّمْرَتَانِ وَلَكِنَّ الْمِسْكِينَ الَّذِي لَا يَجِدُ غِنًى يُغْنِيهِ وَلَا يُفْطَنُ بِهِ فَيُتَصَدَّقَ عَلَيْهِ وَلَا يَقُومُ فَيَسْأَلَ النَّاس»
ব্যাখ্যা: যারা মানুষের দ্বারে দ্বারে চেয়ে বেড়ায়, এক লোকমা বা দু’ লোকমার জন্য, তারা আসলে মিসকীন নয়। আসল মিসকীন ওরাই যাদের সঙ্গতি নেই। তাদের অভাবের কথা জানা যায় না এবং মানুষের কাছে চায় না। এরাই আসল মিসকীন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ ‘‘তারা লোকের কাছে ব্যাকুলভাবে ভিক্ষা চায় না’’- (সূরাহ্ আল বাক্বারাহ্ ২ : ২৭৩)।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যাকাত যাদের জন্য হালাল নয়
১৮২৯-[৯] আবূ রাফি’ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বানী মাখযূম-এর এক ব্যক্তিকে যাকাত আদায়কারী করে পাঠালেন। যাবার সময় সে ব্যক্তি আবূ রাফি’কে বলল, আপনিও আমার সাথে চলুন। এতে কিছু অংশ আপনিও পেয়ে যাবেন। আবূ রাফি’ বললেন, না, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস না করে আমি যেতে পারি না। তাই তিনি তাঁর কাছে গেলেন। তাঁকে তার সাথে যাবার অনুমতি চাইলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সদাক্বাহ্ (সাদাকা) আমাদের (বানী হাশিমের) জন্য হালাল নয়। আর কোন গোত্রের দাস তাদের মধ্যেই গণ্য (তুমি তো আমাদেরই দাস)। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ, নাসায়ী)[1]
عَنْ أَبِي رَافِعٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَعَثَ رَجُلًا مِنْ بَنِي مَخْزُومٍ عَلَى الصَّدَقَةِ فَقَالَ لِأَبِي رَافِعٍ: اصْحَبْنِي كَيْمَا تُصِيبُ مِنْهَا. فَقَالَ: لَا حَتَّى أَتَى رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَسْأَلَهُ. فَانْطَلَقَ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَسَأَلَهُ فَقَالَ: «إِنَّ الصَّدَقَةَ لَا تَحِلُّ لَنَا وَإِنَّ مَوَالِيَ الْقَوْمِ مِنْ أَنْفُسِهِمْ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: সাহাবী আবূ রাফি' বলেন, জনৈককে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাকাত আদায়ের দায়িত্ব প্রদান করেন। তিনি তখন আবূ রাফি‘কে বলেন, তুমি আমার সঙ্গে থাকো। তোমারও গনীমাতের মাল অর্জন হবে।
তিনি বললেন, না, যতক্ষণ না নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হবে। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, যাকাত-সদাক্বাহ্ (সাদাকা) আমার জন্য হালাল নয়। আর কোন ক্বওমের গোলাম এ ক্বওমের ন্যায় একই হুকুমের আওতায় থাকে। হাদীসটিকে ইমাম আত্ তিরমিযী সহীহ বলেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যাকাত যাদের জন্য হালাল নয়
১৮৩০-[১০] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যাকাতের মাল ধনীদের জন্য হালাল নয়, সুস্থ সবলদের (খেটে খেতে সক্ষম) জন্যও নয়। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ, দারিমী)[1]
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تَحِلُّ الصَّدَقَةُ لِغَنِيٍّ وَلَا لِذِي مِرَّةٍ سَوِيٍّ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد والدارمي
ব্যাখ্যা: উক্ত হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, ধনী বা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী সকল ব্যক্তির জন্য যাকাত গ্রহণ করা জায়িয নয়। আর এ বিষয়ে ‘উলামাদের মধ্যে কোন ইখতিলাফে নেই। তবে ইখতিলাফ হলো কি পরিমাপ মাল থাকলে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) নেয়া নিষেধ। হানাফী পুস্তকে উল্লিখিত যে, তিন প্রকারের মধ্যে যাকাত নেয়া জায়িয নয়। ১ম হলো যার কাছে নিসাব পরিমাপ মাল আছে যার ওপর যাকাত ফরয হয়েছে। ২য় প্রকার হলো এমন ধনী যার ওপর যাকাত হারাম আর যার ওপর ফিত্বরাহ্ ও কুরবানী ওয়াজিব। ৩য় প্রকার হলো ঐ ধনী যার ওপর ভিক্ষা করা হারাম। যেমন তার কাছে এক দিনের খাদ্য আছে ও কাপড়ও আছে। আর ইমাম আহমাদ-এর কাছে যার দিরহাম আছে তার ভিক্ষা করা জায়িয নয়।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যাকাত যাদের জন্য হালাল নয়
১৮৩১-[১১] এ হাদীসটিকে আহমাদ, নাসায়ী ও ইবনু মাজাহ আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন।[1]
وَرَوَاهُ أَحْمَدُ وَالنَّسَائِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ عَنْ أَبِي هُرَيْرَة
ব্যাখ্যা: উক্ত হাদীস থেকেও বুঝা যায় যে, যুবক ও সুস্বাস্থ্য ব্যক্তির জন্য যাকাত গ্রহণ করা জায়িয নয়। হানাফী মাযহাব অনুসারে যাকাত গ্রহণ হালাল হওয়ার মাধ্যম হলো অভাব ও প্রয়োজন। তবে যাকাত আদায়কারী অথবা মুজাহিদের জন্য। অথবা যদি কেউ নিজ মাল দিয়ে কোন গোলাম খরিদ করে আযাদ করার জন্য। অথবা কারোর যদি প্রতিবেশি মিসকীন থাকে, অতঃপর তার ওপর সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করে বা মিসকীন ব্যক্তি যদি হাদিয়্যাহ্ দেয় তবে গ্রহণ করতে পারে।
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যাকাত যাদের জন্য হালাল নয়
১৮৩২-[১২] ’উবায়দুল্লাহ ইবনু ’আদী ইবনু খিয়ার (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাদেরকে দু’ ব্যক্তি জানিয়েছেন যে, বিদায় হাজ্জে মানুষের মধ্যে যাকাতের মাল বণ্টন করার সময় তারা উভয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে উপস্থিত ছিলেন। তারা এ মালের কিছু অংশ নেবার জন্য আগ্রহ দেখান। দু’জন বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (যাকাত নেবার আগ্রহ দেখে) আমাদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত চোখ বুলালেন। আমাদেরকে সুস্থ সবল দেখে বললেন, তোমরা যাকাত নিতে চাইলে আমি দিতে পারি। (কিন্তু মনে রাখবে,) সদাক্বাহ্ (সাদাকা) ও যাকাতের সম্পদে ধনীদের কোন অংশ নেই। আর সুস্থ সবল এবং পরিশ্রম করতে সক্ষম লোকদের জন্য সদাক্বাহ্ ও যাকাত নয়। (আবূ দাঊদ, নাসায়ী)[1]
وَعَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ عَدِيِّ بْنِ الْخِيَارِ قَالَ: أَخْبَرَنِي رَجُلَانِ أَنَّهُمَا أَتَيَا النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ فِي حَجَّةِ الْوَدَاعِ وَهُوَ يُقَسِّمُ الصَّدَقَةَ فَسَأَلَاهُ مِنْهَا فَرَفَعَ فِينَا النَّظَرَ وَخَفَضَهُ فَرَآنَا جَلْدَيْنِ فَقَالَ: «إِنْ شِئْتُمَا أَعْطَيْتُكُمَا وَلَا حَظَّ فِيهَا لِغَنِيٍّ وَلَا لِقَوِيٍّ مكتسب» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যাকাত যাদের জন্য হালাল নয়
১৮৩৩-[১৩] ’আত্বা ইবনু ইয়াসার মুরসাল পদ্ধতিতে বর্ণনা করেছেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ধনী লোকের জন্য যাকাতের মাল হালাল নয়। তবে পাঁচ অবস্থায় (১) আল্লাহর পথে জিহাদকারী ধনী [যখন কাছে যুদ্ধ সরঞ্জাম নেই] (২) যাকাত আদায়ে নিযুক্ত ধনী, (৩) জরিমানার হুকুমপ্রাপ্ত ধনী [যা তাকে পরিশোধ করতে হবে। অথচ ঐ সময় এ পরিমাণ সম্পদ তার নেই], (৪) নিজ মালের পরিবর্তে যাকাতের মাল ক্রয়কারী ধনী, (৫) আর ওই ধনীর জন্যও হালাল, যার প্রতিবেশী যাকাতের মাল পেয়ে প্রতিবেশী ধনী ব্যক্তিকে কিছু তোহফা দিয়েছে। (মালিক, আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَطَاءِ بْنِ يَسَارٍ مُرْسَلًا قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: لَا تَحِلُّ الصَّدَقَةُ لِغَنِيٍّ إِلَّا لِخَمْسَةٍ: لِغَازٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوْ لِعَامِلٍ عَلَيْهَا أَوْ لِغَارِمٍ أَوْ لِرَجُلٍ اشْتَرَاهَا بِمَالِهِ أَوْ لِرَجُلٍ كَانَ لَهُ جَارٌ مِسْكِينٌ فَتَصَدَّقَ عَلَى الْمِسْكِينِ فَأَهْدَى الْمِسْكِين للغني . رَوَاهُ مَالك وَأَبُو دَاوُد
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যাকাত যাদের জন্য হালাল নয়
১৮৩৪-[১৪] আবূ দাঊদ-এর এক বর্ণনায় আবূ সা’ঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে। অথবা ইবনুস্ সাবীল অর্থাৎ বিপদগ্রস্ত মুসাফির ধনীও।[1]
وَفِي رِوَايَةٍ لِأَبِي دَاوُدَ عَنْ أَبِي سَعِيدٍ: «أوابن السَّبِيل»
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যাকাত যাদের জন্য হালাল নয়
১৮৩৫-[১৫] যিয়াদ ইবনু হারিস আস সুদায়ী (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গেলাম। তাঁর হাতে আমি বায়’আত গ্রহণ করলাম। এরপর যিয়াদ একটি বড় হাদীস বর্ণনা করতে গিয়ে বললেন, এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে তাঁকে বলতে লাগলেন, আমাকে যাকাতের মাল থেকে কিছু দান করুন। তিনি বললেন, আল্লাহ যাকাত (বণ্টন করার ব্যাপারে কাকে দেয়া যাবে) তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বা অন্য কাউকে কোন হুকুম দিতে রাজী হননি, বরং তিনি নিজে তা আটভাগে ভাগ করেছেন। তুমি যদি এ (আট) ভাগের কোন ভাগে পড়ো আমি তোমাকেও যাকাত দিব। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ زِيَادِ بْنِ الْحَارِثِ الصُّدَائِيِّ قَالَ: أَتَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَبَايَعْتُهُ فَذَكَرَ حَدِيثًا طَوِيلًا فَأَتَاهُ رَجُلٌ فَقَالَ: أَعْطِنِي مِنَ الصَّدَقَةِ. فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ اللَّهَ لَمْ يَرْضَ بِحُكْمِ نَبِيٍّ وَلَا غَيْرِهِ فِي الصَّدَقَاتِ حَتَّى حَكَمَ فِيهَا هُوَ فَجَزَّأَهَا ثَمَانِيَةَ أَجْزَاءٍ فَإِنْ كُنْتَ مِنْ تِلْكَ الْأَجْزَاء أَعطيتك» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: যাকাত গ্রহণ করতে পারে আট শ্রেণীর লোক, যাদের নাম আল কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। সূরাহ্ আত্ তাওবাহ্’র ৬০ নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।
আর এ হাদীস থেকে প্রমাণ হয় যে, যাকাত শুধু এক প্রকার লোকদের দিলে হবে না। বরং অন্য প্রকারের মধ্যেও বণ্টন করতে হবে। আর এটাই ইমাম শাফি‘ঈর ও ‘ইকরিমার মত। পক্ষান্তরে ইমাম আবূ হানীফাহ্, ইমাম মালিক ও ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল এর মত যে, যাকাত যদি কোন এক শ্রেণীকে দেয়, তবে তা জায়িয হবে। এমনকি এক ব্যক্তিকে যদি দেয় তবুও জায়িয হবে। আর এ মত হলো হুযায়ফাহ্, ইবনু ‘আব্বাস এবং ‘উমারের। ইমাম শাফি‘ঈর উক্তি হলে অন্য সম্প্রদায় খাকতে শুধু এক প্রকারের মধ্যে বণ্টন জায়িয নয়।
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - যাকাত যাদের জন্য হালাল নয়
১৮৩৬-[১৬] যায়দ ইবনু আসলাম (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (একদিন) আমীরুল মু’মিনীন ’উমার ফারূক (রাঃ)দুধ পান করলেন। তা তার খুব ভাল লাগলো। দুধ পরিবেশনকারীকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এ দুধ তুমি কোত্থেকে এনেছ? সে একটি কূয়ার নাম উল্লেখ করে বলল, ওখানে গিয়ে দেখি যাকাতের অনেক উটকে, পানি পান করানো হচ্ছে। উটের মালিকগণ দুধ দোহন করলে এর থেকে সামান্য দুধ নিয়ে আমি আমার মশকে ঢেলে নিয়েছি। এ সে দুধ। এ কথা শুনামাত্র ’উমার (রাঃ) নিজের মুখে হাত ঢুকিয়ে বমি করে দিলেন। (মালিক, বায়হাক্বী)[1]
عَنْ زَيْدِ بْنِ أَسْلَمَ قَالَ: شَرِبَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ لَبَنًا فَأَعْجَبَهُ فَسَأَلَ الَّذِي سَقَاهُ: مِنْ أَيْنَ هَذَا اللَّبَنُ؟ فَأَخْبَرَهُ أَنَّهُ وَرَدَ عَلَى مَاءٍ قَدْ سَمَّاهُ فَإِذَا نَعَمٌ مِنْ نَعَمِ الصَّدَقَةِ وَهُمْ يَسْقُونَ فَحَلَبُوا مِنْ أَلْبَانِهَا فَجَعَلْتُهُ فِي سِقَائِي فَهُوَ هَذَا: فَأدْخل عمر يَده فاستقاءه. رَوَاهُ مَالِكٌ وَالْبَيْهَقِيُّ فِي شُعَبِ الْإِيمَانِ
ব্যাখ্যা: উক্ত হাদীসে ‘উমার (রাঃ)-এর দীনদারীর আলামত পরিষ্কার হয়ে যায় যে, হারাম সন্দেহে তিনি সদাক্বার উটের কি-না সন্দেহে মুখের ভিতরে হাত দিয়ে বমি করে দুধ তুলে ফেলেন। তবে হাদীসটি মুনক্বাতি'। আর এরূপ ঘটনা আবূ বাকর থেকেও বর্ণিত হয়েছে। তিনি গোলামের দেয়া দুধ পান করার পর সদাক্বাহ্ (সাদাকা) বুঝতে পেরে বমি করেন এবং সব তুলে ফেলেন।
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যার জন্য কিছু চাওয়া হালাল নয় এবং যার জন্য হালাল
১৮৩৭-[১] ক্ববীসাহ্ ইবনু মুখারিক্ব (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ঋণগ্রস্ত হয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলাম। তার কাছে ঋণ আদায়ের জন্য কিছু চাইলাম। তিনি বললেন, অপেক্ষা করো। আমার কাছে যাকাতের মাল আসা পর্যন্ত আসলে তোমাকে কিছু দেবার জন্য বলে দেব। তারপর তিনি বললেন, ক্ববীসাহ্! শুধু তিন ধরনের ব্যক্তির জন্য কিছু চাওয়া জায়িয। প্রথমতঃ যে ব্যক্তি অপরের ঋণের যামিনদার। তবে বেশী চাইতে পারবে না। বরং যতটুকু ঋণ শোধের জন্য প্রয়োজন শুধু ততটুকু চাইবে। এরপর আর চাইবে না। দ্বিতীয়তঃ ওই ব্যক্তি যে বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে (দুর্ভিক্ষ প্লাবন ইত্যাদিতে)। তার সব ধন-সম্পদ ধ্বংস হয়েছে। তারও (শুধু খাবার ও পোশাকের জন্য) ততটুকু যাতে প্রয়োজন মিটে যায়। তার জীবনের জন্য অবলম্বন হয়ে যায়। তৃতীয়তঃ ওই ব্যক্তি (যে ধনী, কিন্তু তার এমন কোন কঠিন প্রয়োজন হয়ে পড়েছে যা মহল্লাবাসী জানে। যেমন ঘরের সব মালপত্র চুরি হয়ে গেছে অথবা অন্য কোন দুর্ঘটনার কারণে মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছে)। (মহল্লার) তিনজন বুদ্ধিমান সচেতন লোক এ ব্যাপারে সাক্ষ্য দিবে যে, সত্যিই এ ব্যক্তি মুখাপেক্ষী। তার জন্যও সেই পরিমাণ (সাহায্য) চাওয়া জায়িয, যাতে তার প্রয়োজন মিটে। অথবা তিনি বলেছেন এর দ্বারা তার মুখাপেক্ষিতা ও প্রয়োজন দূর হয়, তার জীবনে একটি অবলম্বন আসে। হে ক্ববীসাহ্! এ তিন প্রকারের ’চাওয়া’ ছাড়া হালাল নয়। আর হারাম পন্থায় প্রাপ্ত মাল খাওয়া তার জন্য হারাম। (মুসলিম)[1]
بَاب مَنْ لَا تَحِلُّ لَهُ الْمَسْأَلَةُ وَمَنْ تَحِلُّ لَه
عَن قبيصَة بن مُخَارق الْهِلَالِي قَالَ: تَحَمَّلْتُ حَمَالَةً فَأَتَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَسْأَلُهُ فِيهَا. فَقَالَ: «أَقِمْ حَتَّى تَأْتِينَا الصَّدَقَة فنأمر لَك بهَا» . قَالَ ثُمَّ قَالَ: «يَا قَبِيصَةُ إِنَّ الْمَسْأَلَةَ لَا تَحِلُّ إِلَّا لِأَحَدِ ثَلَاثَةٍ رَجُلٍ تَحَمَّلَ حَمَالَةً فَحَلَّتْ لَهُ الْمَسْأَلَةُ حَتَّى يُصِيبَهَا ثُمَّ يُمْسِكُ وَرَجُلٍ أَصَابَتْهُ جَائِحَةٌ اجْتَاحَتْ مَالَهُ فَحَلَّتْ لَهُ الْمَسْأَلَةُ حَتَّى يُصِيبَ قِوَامًا مِنْ عَيْشٍ أَوْ قَالَ سِدَادًا مِنْ عَيْشٍ وَرَجُلٍ أَصَابَتْهُ فَاقَةٌ حَتَّى يقوم ثَلَاثَة من ذَوي الحجى مِنْ قَوْمِهِ. لَقَدْ أَصَابَتْ فُلَانًا فَاقَةٌ فَحَلَّتْ لَهُ الْمَسْأَلَةُ حَتَّى يُصِيبَ قِوَامًا مِنْ عَيْشٍ أَوْ قَالَ سِدَادًا مِنْ عَيْشٍ فَمَا سِوَاهُنَّ من الْمَسْأَلَة يَا قبيصَة سحتا يأكلها صَاحبهَا سحتا» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: মানুষের নিকট ভিক্ষাবৃত্তি করা বা চাওয়া হারাম হওয়ার ব্যাপারে এ হাদীসটি একটি বিশেষ দলীল। আর যে তিন প্রকার ব্যক্তির জন্য চাওয়া বৈধ বলে হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে, তারা হলোঃ
১। যে ব্যক্তি কোন দেনার যামিন হয়েছে, যতক্ষণ না সে তা পরিশোধ করবে ততক্ষণ তার জন্য ভিক্ষাবৃত্তি করা বা চাওয়া বৈধ।
২। যে ব্যক্তির ওপর কোন বিপদ এসে তার সম্পদ ধ্বংস হয়ে গেছে, যতক্ষণ না তার প্রয়োজন মিটাবার ব্যবস্থা হবে ততক্ষণ সে ভিক্ষাবৃত্তি করতে বা চাইতে পারবে।
৩। যে ব্যক্তি অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়েছে এবং তার প্রতিবেশীদের থেকে তিনজন ব্যক্তি (সৎ ও বিবেক সম্পন্ন) ঐ ব্যক্তির ব্যাপারে সাক্ষ্য দিবে, তার জন্য ভিক্ষাবৃত্তি করা বা চাওয়া বৈধ যতক্ষণ না সে জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করতে পারবে।
আল্লামা খাত্ত্বাবী বলেন, অত্র হাদীসের মধ্যে অনেক জানার বিষয় এবং উপকারিতা রয়েছে। আর তা হলো যাদের জন্য ভিক্ষাবৃত্তি করা বা চাওয়া জায়িয তাদেরকে তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। এক প্রকার হলো ধনী ব্যক্তি আর দু’প্রকারের দরিদ্র ব্যক্তি। অতঃপর দরিদ্র ব্যক্তিদেরকে আবার দু’ ভাগে ভাগ করা হয়েছেঃ
১। মূলত দরিদ্র, কিন্তু গোপন রাখে।
২। প্রকাশ্যে তা বুঝা যায়।
হাদীসটির মাঝে আরো একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, প্রত্যেকেই তার প্রয়োজন মিটানো পর্যন্ত ভিক্ষাবৃত্তি করতে বা চাইতে পারবে তার অতিরিক্ত নয়। হাদীসের বাহ্যিক বিধান হলো যে, উপরে উল্লেখিত তিন প্রকারের ব্যক্তি ছাড়া অন্যদের জন্য ভিক্ষাবৃত্তি করা বা চাওয়া হারাম।
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যার জন্য কিছু চাওয়া হালাল নয় এবং যার জন্য হালাল
১৮৩৮-[২] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে নিজের সম্পদ বৃদ্ধি করার উদ্দেশে মানুষের কাছে চেয়ে বেড়ায়, সে নিশ্চয় (জাহান্নামের) আগুন কামনা করে। (এটা জানার পর) সে কম বা অধিক চাইতে থাকুক। (মুসলিম)[1]
بَاب مَنْ لَا تَحِلُّ لَهُ الْمَسْأَلَةُ وَمَنْ تَحِلُّ لَه
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ سَأَلَ النَّاسَ أَمْوَالَهُمْ تَكَثُّرًا فَإِنَّمَا يَسْأَلُ جمرا. فليستقل أَو ليستكثر» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ বৃদ্ধির জন্য মানুষের নিকট ভিক্ষাবৃত্তি করে বা চায়, সে যেন জাহান্নামের অঙ্গার কামনা করে। অর্থাৎ তার এই ভিক্ষাবৃত্তি করা বা চাওয়াটা জাহান্নামের আগুন দ্বারা শাস্তির কারণ হবে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘‘যারা ইয়াতীমদের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে, নিশ্চয়ই তারা নিজের উদরে অগ্নি ব্যতীত কিছুই ভক্ষণ করে না।’’ (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪ : ১৩)
এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সম্পদ বৃদ্ধির জন্য ভিক্ষাবৃত্তি করা বা চাওয়ার পরিণাম জানার পর চাই সে বেশি করুক অথবা কম করুক। এ কথাটি তিনি ভীতি প্রদর্শনমূলক, অর্থাৎ ‘‘আযাব গযবের কথা শোনার পর চাই সে ঈমান আনুক অথবা কুফরী করুক।’’ (সূরাহ্ আল কাহফ ১৮ : ২৯)
‘সুবুলুস সালাম’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, এটা হচ্ছেঃ (اعملوا ما شئتم) এর মত, অর্থাৎ যা ইচ্ছে তাই কর। যা প্রমাণ করে সম্পদের বৃদ্ধির জন্য ভিক্ষাবৃত্তি করা বা চাওয়া পরিষ্কার হারাম।
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যার জন্য কিছু চাওয়া হালাল নয় এবং যার জন্য হালাল
১৮৩৯-[৩] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি সর্বদা মানুষের কাছে হাত পাততে থাকে কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন সে এমনভাবে উঠবে যে, তখন তার মুখমণ্ডল ে মাংস (মাংস/গোসত) থাকবে না। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَاب مَنْ لَا تَحِلُّ لَهُ الْمَسْأَلَةُ وَمَنْ تَحِلُّ لَه
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَسْأَلُ النَّاسَ حَتَّى يَأْتِيَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لَيْسَ فِي وَجْهِهِ مُزْعَةُ لحم»
ব্যাখ্যা: খাত্ত্বাবী বলেন, হাদীসটির ব্যাখ্যায় কয়েকটি দিক রয়েছে-
১। ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) দিবসে মান-সম্মানহীন এবং অপমানিত অবস্থায় উঠবে।
২। তার চেহারায় এমন শাস্তি দেয়া হবে যে, শাস্তির কারণে চেহারার গোশ্ত খসে পড়ে যাবে।
৩। ঐ ব্যক্তিকে গোশ্তবিহীন অবস্থায় ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) দিবসে উঠানো হবে। যাতে তাকে উক্ত কাজের অপরাধী বলে বুঝা যাবে।
উল্লেখিত তিনটি উক্তির মধ্যে প্রথমটির সমর্থন করে হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী বলেন, এই মর্মে ত্ববারানী এবং বাযযারে বর্ণিত হয়েছে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন কোন ধনী ব্যক্তি তার নিকট সম্পদ থাকা অবস্থাতেও মানুষের কাছে ভিক্ষাবৃত্তি করবে বা চাইবে, তাকে সম্মানিত করে সৃষ্টি করার পরেও আল্লাহর নিকটে তার কোন মর্যাদা থাকবে না। ইমাম বুখারী বলেন, এ হাদীসটি ঐ ব্যক্তির জন্য ভীতি প্রদর্শনমূলক যে সম্পদকে বৃদ্ধি করার জন্য ভিক্ষাবৃত্তি করে বা মানুষের নিকট চেয়ে বেড়ায়।
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যার জন্য কিছু চাওয়া হালাল নয় এবং যার জন্য হালাল
১৮৪০-[৪] মু’আবিয়াহ্ (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিছু চাইতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করো না। আল্লাহর কসম! তোমাদের যে ব্যক্তিই আমার কাছে (অতিরঞ্জিত করে) কিছু চায় (তখন) আমি তাকে কিছু দিয়ে দেই। (তবে) আমি তা দেয়া খারাপ মনে করি। ফলে এটা কি করে সম্ভব যে, আমি তাকে যা কিছুই দিই তাতে বারাকাত হবে? (মুসলিম)[1]
بَاب مَنْ لَا تَحِلُّ لَهُ الْمَسْأَلَةُ وَمَنْ تَحِلُّ لَه
وَعَنْ مُعَاوِيَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تُلْحِفُوا فِي الْمَسْأَلَةِ فوَاللَّه لَا يسألني أحدق مِنْكُمِ شَيْئًا فَتُخْرِجَ لَهُ مَسْأَلَتُهُ مِنِّي شَيْئًا وَأَنَا لَهُ كَارِهٌ فَيُبَارَكَ لَهُ فِيمَا أَعْطَيْتُهُ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় রয়েছে, মু‘আবিয়াহ্ (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে, আমি সম্পদের দায়িত্বশীল, আমি আমার মনের সন্তুষ্টিচিত্তে যাকে দান করি তার সেই সম্পদে বারাকাত দেয়া হয়। আর যদি ভিক্ষাবৃত্তি করা বা চাওয়ার কারণে এবং আমার মনের না রাযী অবস্থায় প্রদান করি, তা হচ্ছে ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে খাবার খেল অথচ পরিতৃপ্ত হলো না। আল্লামা নাবাবী বলেছেন, ‘উলামায়ে কিরাম সকলেই একমত যে, বিনা প্রয়োজনে ভিক্ষাবৃত্তি করা বা চাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ।
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যার জন্য কিছু চাওয়া হালাল নয় এবং যার জন্য হালাল
১৮৪১-[৫] যুবায়র ইবনুল ’আও্ওয়াম (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ এক আঁটি লাকড়ি রশি দিয়ে বেঁধে পিঠে বহন করে এবং তা বিক্রি করে। আল্লাহ তা’আলা এ কাজের দ্বারা তার ইযযত সম্মান বহাল রাখেন (যা ভিক্ষা করার মাধ্যমে চলে যায়)। এ কাজ মানুষের কাছে হাত পাতা অপেক্ষা তার জন্য অনেক উত্তম। মানুষ তাকে কিছু দিতে পারে আবার নাও দিতে পারে। (বুখারী)[1]
بَاب مَنْ لَا تَحِلُّ لَهُ الْمَسْأَلَةُ وَمَنْ تَحِلُّ لَه
وَعَنِ الزُّبَيْرِ بْنِ الْعَوَّامِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَأَنْ يَأْخُذَ أَحَدُكُمْ حَبْلَهُ فَيَأْتِيَ بِحُزْمَةِ حَطَبٍ عَلَى ظَهْرِهِ فَيَبِيعَهَا فَيَكُفَّ اللَّهُ بِهَا وَجْهَهُ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَسْأَلَ النَّاسَ أَعْطَوْهُ أَوْ مَنَعُوهُ» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসে মানবমন্ডলীকে অনুপ্রাণিত করা হয়েছে অন্যের নিকট ভিক্ষাবৃত্তি করা বা চাওয়া থেকে বিরত এবং পবিত্র থাকার ব্যাপারে যদিও সে জীবিকা নির্বাহের জন্য পরীক্ষায় পড়ে যায় এবং তাতে তার কষ্টও হয়। কারণ হলো, ভিক্ষাবৃত্তি করা বা চাওয়া এবং ভিক্ষাবৃত্তি করা বা চাওয়ার পর না পাওয়া উভয়টিই অত্যন্ত লজ্জার কাজ। এ হাদীসে নিজের হাতে উপার্জন করার ফাযীলাতের প্রতিও ইঙ্গিত করা হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যার জন্য কিছু চাওয়া হালাল নয় এবং যার জন্য হালাল
১৮৪২-[৬] হাকীম ইবনু হিযাম (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে চাইলাম। তিনি আমাকে কিছু দিলেন। আমি পুনরায় চাইলে তিনি আবার দিলেন। তারপর তিনি আমাকে বললেন, হে হাকীম! এ মাল সবুজ সতেজ ও মিষ্ট (অর্থাৎ দেখতে সুন্দর, হৃদয়কে তৃপ্তি দেয়)। তাই যে ব্যক্তি এ মাল হাত না পেতে ও লোভ-লালসা ছাড়া পায় তাতে বারাকাত দান করা হয়। আর যে ব্যক্তি তা হাত পেতে লোভ লালসা দিয়ে অর্জন করে তাতে বারাকাত দেয়া হয় না। তার অবস্থা ওই ব্যক্তির মতো, যে খাবার খায় কিন্তু পেট ভরে না। (মনে রাখবে) উপরের হাত অর্থাৎ দানকারীর হাত নীচের হাত (দান গ্রহণকারীর হাত) হতে অনেক উত্তম। হাকীম (রাঃ)বলেন, আমি (তখন) বললাম, হে আল্লাহর রসূল! ওই সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্যের বাণী দিয়ে পাঠিয়েছেন। আজ থেকে আমি মৃত্যু পর্যন্ত কারো মাল থেকে কিছু কামনা করব না। মৃত্যু পর্যন্ত কখনো কারো কাছে কিছু চাইব না। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَاب مَنْ لَا تَحِلُّ لَهُ الْمَسْأَلَةُ وَمَنْ تَحِلُّ لَه
وَعَنْ حَكِيمِ بْنِ حِزَامٍ قَالَ: سَأَلَتْ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَعْطَانِي ثُمَّ سَأَلْتُهُ فَأَعْطَانِي ثُمَّ قَالَ لِي: «يَا حَكِيمُ إِنَّ هَذَا الْمَالَ خَضِرٌ حُلْوٌ فَمَنْ أَخَذَهُ بِسَخَاوَةِ نَفْسٍ بُورِكَ لَهُ فِيهِ وَمَنْ أَخَذَهُ بِإِشْرَافِ نَفْسٍ لَمْ يُبَارَكْ لَهُ فِيهِ. وَكَانَ كَالَّذِي يَأْكُلُ وَلَا يَشْبَعُ وَالْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنَ الْيَدِ السُّفْلَى» . قَالَ حَكِيمٌ: فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ لَا أَرْزَأُ أَحَدًا بَعْدَكَ شَيْئًا حَتَّى أُفَارِقَ الدُّنْيَا
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসে মাল-সম্পদকে অথবা দুনিয়াকে সবুজ এবং মিষ্টি কোন জিনিসের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। সবুজ জিনিস মানুষের দৃষ্টি কুড়ায় অন্যদিকে মিষ্টিদ্রব্য মানুষের মন জুড়ায়। তাই মানুষ মাত্রই দুনিয়া এবং সম্পদের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই আকৃষ্ট হয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন, অর্থাৎ ‘‘মাল-সম্পদ এবং সন্তান-সন্ততি মানুষের জন্য পার্থিব জীবনের সৌন্দর্যতা স্বরূপ’’- (সূরাহ্ আল কাহফ ১৮ : ৪৬)।
হাদীসে মাল-সম্পদকে সবুজ এবং মিষ্টি দ্রব্যের সঙ্গে তুলনা করার কারণ হলো, কোন জিনিসের উল্লেখিত দু’টো বৈশিষ্ট্য অস্থায়ী যা দীর্ঘদিন টিকে থাকে না। অনুরূপ মানুষের মাল, যদি শারী‘আতে বর্ণিত পন্থা মোতাবেক অর্জিত না হয় তা টিকে থাকে না। অতঃপর বলা হয়েছে, উপরের হাত নীচের হাত অপেক্ষা উত্তম। অর্থাৎ দানকারীর হাত দান গ্রহণকারী তথা সাওয়ালকারীর (যিনি ভিক্ষাবৃত্তি করে বা চায়) হাত অপেক্ষা উত্তম। যা এই হাদীসের পরের (১৮৪৩-[৭]) নং হাদীসে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যার জন্য কিছু চাওয়া হালাল নয় এবং যার জন্য হালাল
১৮৪৩-[৭] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বারের উপর দাঁড়িয়ে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) এবং (মানুষের কাছে) হাত পাতা হতে বিরত থাকার বিষয় উল্লেখ করে। তিনি বলেন, উপরের হাত নীচের হাত অপেক্ষা উত্তম। উপরের হাত দাতা আর নীচের হাত গ্রহীতা (ভিক্ষুক)। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَاب مَنْ لَا تَحِلُّ لَهُ الْمَسْأَلَةُ وَمَنْ تَحِلُّ لَه
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ وَهُوَ عَلَى الْمِنْبَرِ وَهُوَ يَذْكُرُ الصَّدَقَةَ وَالتَّعَفُّفَ عَنِ الْمَسْأَلَةِ: «الْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنَ الْيَدِ السُّفْلَى وَالْيَد الْعليا هِيَ المنفقة وَالْيَد السُّفْلى هِيَ السائلة»
ব্যাখ্যা: হাদীসটিতে বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি ভিক্ষাবৃত্তি করা বা চাওয়া থেকে বেঁচে থাকবে আল্লাহ তাকে তার সে উপায় করে দেন এবং যে অন্যের মুখাপেক্ষী হতে চায় না আল্লাহ তারও ব্যবস্থা করে দেন। আর যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করতে চায় আল্লাহ তার তাওফীক দেন এবং ধৈর্য অপেক্ষা উত্তম ও প্রশস্ততার দান কাউকে দেয়া হয়নি।
আল্লামা রাজী বলেন, ধৈর্য মানুষের জন্য এমন একটি বিষয় যে, কাউকে কোন জিনিস দেয়া হলে তা যদি কমও হয় ধৈর্যের কারণে তা স্থায়িত্ব হয়। আর যদি ধৈর্য না থাকে তাহলে প্রাপ্ত জিনিস অনেক হলেও তা টিকে থাকে না। মুল্লা ‘আলী ক্বারী বলেন, ধৈর্যের স্থান অনেক ঊর্ধ্বে আর তা এজন্য যে, ধৈর্যই মানুষের চারিত্রিক উন্নত গুণাবলীর ও অবস্থার একমাত্র সোপান। এজন্যই সবর বা ধৈর্যকে আল্লাহ তা‘আলা সালাতের উপরে প্রাধান্য দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ বলেছেন, ‘‘তোমরা সাহায্য প্রার্থনা কর সবর এবং সালাতের দ্বারা’’- (সূরাহ্ আল বাক্বারাহ্ ২ : ৪৫)।
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যার জন্য কিছু চাওয়া হালাল নয় এবং যার জন্য হালাল
১৮৪৪-[৮] আবূ সা’ঈদ আল্ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (একদিন) কিছু আনসার ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট কিছু চাইলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদেরকে কিছু দিলেন তারা আবার চাইলে তিনি আবারো দিলেন। এমনকি তাঁর কাছে যা ছিল তা শেষ হয়ে গেল। তারপর তিনি বললেন, আমার কাছে যে সম্পদ আসবে তা আমি তোমাদেরকে না দিয়ে বাঁচিয়ে রেখে ধনের স্তুপ বানিয়ে রাখব না। মনে রাখবে, যে ব্যক্তি মানুষের কাছে চাওয়া হতে বিরত থাকে, আল্লাহ তা’আলা তাঁকে মানুষের মুখাপেক্ষী হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখেন, তাকে মানুষের মুখাপেক্ষী করেন না। আর যে ব্যক্তি অপরের সম্পদের অমুখাপেক্ষী হয়, আল্লাহ তাকে অমুখাপেক্ষী করেন। যে ব্যক্তি সবরের প্রত্যাশী হয়; আল্লাহ তাকে ধৈর্যধারণের শক্তি দান করেন। মনে রাখবে, সবরের চেয়ে বেশী উত্তম ও প্রশস্ত আর কোন কিছু দান করা হয়নি। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَاب مَنْ لَا تَحِلُّ لَهُ الْمَسْأَلَةُ وَمَنْ تَحِلُّ لَه
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: إِنَّ أُنَاسًا مِنَ الْأَنْصَارِ سَأَلُوا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَعْطَاهُمْ ثُمَّ سَأَلُوهُ فَأَعْطَاهُمْ حَتَّى نَفِدَ مَا عِنْدَهُ. فَقَالَ: «مَا يَكُونُ عِنْدِي مِنْ خَيْرٍ فَلَنْ أَدَّخِرَهُ عَنْكُمْ وَمَنْ يَسْتَعِفَّ يُعِفَّهُ اللَّهُ وَمَنْ يَسْتَغْنِ يُغْنِهِ اللَّهُ وَمَنْ يَتَصَبَّرْ يُصَبِّرْهُ اللَّهُ وَمَا أُعْطِيَ أَحَدٌ عَطَاءً هُوَ خَيْرٌ وَأَوْسَعُ مِنَ الصَّبْرِ»
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যার জন্য কিছু চাওয়া হালাল নয় এবং যার জন্য হালাল
১৮৪৫-[৯] ’উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে (যাকাত উসূল করার বিনিময়ে) কিছু দিতে চাইলে আমি নিবেদন করতাম, এটা যে আমার চেয়ে বেশী অভাবী তাকে দিন। (এ কথার জবাবে) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলতেন, (প্রয়োজন থাকলে) এটাকে তোমার মালের সাথে শামিল করে নাও। (আর যদি প্রয়োজনের বেশী হয়) তাহলে তুমি নিজে তা আল্লাহর পথে দান করে দাও। তিনি (আরো বলেন, লোভ লালসা ও হাত না পেতে) যে জিনিস তুমি লাভ করবে, তা গ্রহণ করবে। আর যা এভাবে আসবে না তার পিছে লেগে থেক না। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَاب مَنْ لَا تَحِلُّ لَهُ الْمَسْأَلَةُ وَمَنْ تَحِلُّ لَه
وَعَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ قَالَ: كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُعْطِينِي الْعَطَاءَ فَأَقُولُ: أَعْطِهِ أَفْقَرَ إِلَيْهِ مِنِّي. فَقَالَ: «خُذْهُ فَتَمَوَّلْهُ وَتَصَدَّقْ بِهِ فَمَا جَاءَكَ مِنْ هَذَا الْمَالِ وَأَنْتَ غَيْرُ مُشْرِفٍ وَلَا سَائِلٍ فَخذه. ومالا فَلَا تتبعه نَفسك»
ব্যাখ্যা: কোন ব্যক্তিকে কেউ যদি কোন কিছু দান করে তা গ্রহণ করা আবশ্যক কি-না, এই ব্যাপারে ‘উলামায়ে কিরাম মতবিরোধ করেছেন। ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেন, ঐ দান যদি রাষ্ট্রপ্রধানের পক্ষ থেকে না হয়ে সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে হয় তা গ্রহণ করা মুস্তাহাব। আর যদি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিশেষ করে যালিম সরকার কর্তৃক হয় তাহলে একদল এটাকে হারাম বলেছেন। আরেকটি দল (‘আলিমদের) বৈধ বলেছেন, আবার কেউ মাকরূহ বলেছেন। ভিন্ন আরেকটি দল বলেছেন, যে কোন ব্যক্তির দানকে গ্রহণ করা ওয়াজিব।
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যার জন্য কিছু চাওয়া হালাল নয় এবং যার জন্য হালাল
১৮৪৬-[১০] সামুরাহ্ ইবনু জুনদুব (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পরের কাছে হাত পাতা একটি রোগ, যার দ্বারা মানুষ নিজের মুখকে রোগাক্রান্ত করে। যে ব্যক্তি (নিজের মান সম্মান) অক্ষুণ্ণ রাখতে চায় সে যেন (হাত পাততে) লজ্জা অনুভব করে, মান ইযযত রক্ষা করে। আর যে ব্যক্তি (মান ইযযত) অক্ষুণ্ণ রাখতে চায় না সে মানুষের কাছে হাত পেতে নিজের মান সম্মানকে ভূলুণ্ঠিত করতে পারে। তবে মানুষ রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের কাছে হাত পাততে পারে। অথবা এমন সময়ে (কারো কাছে) কিছু চাইবে যা চাওয়া খুবই প্রয়োজন। (আবূ দাঊদ, তিরমিযী, নাসায়ী)[1]
عَنْ سَمُرَةَ بْنِ جُنْدُبٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْمَسَائِلُ كُدُوحٌ يَكْدَحُ بِهَا الرَّجُلُ وَجْهَهُ فَمَنْ شَاءَ أَبْقَى عَلَى وَجْهِهِ وَمَنْ شَاءَ تَرَكَهُ إِلَّا أَنْ يَسْأَلَ الرَّجُلُ ذَا سُلْطَانٍ أَوْ فِي أَمْرٍ لَا يَجِدُ مِنْهُ بُدًّا» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالتِّرْمِذِيّ وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: হাদীসে সাওয়ালকারীর (যিনি ভিক্ষাবৃত্তি করে বা চায়) শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তবে রাষ্ট্রপ্রধানের নিকট সাওয়ালকারী এবং যে ব্যক্তির সাওয়াল করা ব্যতীত জীবিকা নির্বাহের অন্য কোন উপায় থাকবে না সে ঐ শাস্তির আওতামুক্ত থাকবে। রাষ্ট্রপ্রধানের নিকট বায়তুল মাল তথা রাষ্ট্রীয় সম্পদ থেকে সাধারণ কোন মানুষ সাওয়াল করতে পারে যে মালে সাধারণ মানুষের অধিকার রয়েছে। বিশেষ করে কারোর একান্ত প্রয়োজন হলে তার জন্য রাষ্ট্রপ্রধানের নিকট সাওয়াল করা সম্পূর্ণ বৈধ হবে।
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যার জন্য কিছু চাওয়া হালাল নয় এবং যার জন্য হালাল
১৮৪৭-[১১] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি স্বাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও মানুষের নিকট হাত পাতে, তাকে কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন এ অবস্থায় উঠানো হবে যে, এ অভ্যাস তার মুখের উপর ’খুমূশ’ ’খুদূশ’ অথবা ’কুদূহ’রূপে প্রকাশ পাবে। নিবেদন করা হলো, হে আল্লাহর রসূল! কি পরিমাণ সম্পদ তাকে অমুখাপেক্ষী করবে? তিনি বললেন, পঞ্চাশ দিরহাম অথবা এ মূল্যের সোনা। (আবূ দাঊদ, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ, দারিমী)[1]
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «من سَأَلَ النَّاسَ وَلَهُ مَا يُغْنِيهِ جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَمَسْأَلَتُهُ فِي وَجْهِهِ خُمُوشٌ أَوْ خُدُوشٌ أَوْ كُدُوحٌ» . قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا يُغْنِيهِ؟ قَالَ: «خَمْسُونَ دِرْهَمًا أَوْ قِيمَتُهَا مِنَ الذَّهَبِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالتِّرْمِذِيُّ وَالنَّسَائِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ والدارمي
ব্যাখ্যা: এ হাদীস দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, যার নিকট ৫০ দিরহাম অথবা সমপরিমাণ মূল্যের স্বর্ণ থাকবে তার জন্য সাওয়াল (ভিক্ষাবৃত্তি করা বা চাওয়া) করা হারাম। অন্যান্য হাদীসে এর কমের কথা আছে, যেমন পরের দু’টোর একটিতে রয়েছে যার নিকট দু’বেলা খাবার পরিমাণ ব্যবস্থা আছে, অপরদিকে রয়েছে যার নিকট উক্বিয়্যাহ্ (৪০ দিরহাম) অথবা তার সমপরিমাণ সম্বল আছে তার জন্য অন্যের কাছে চাওয়া বৈধ নয়। শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী তার গ্রন্থ ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’তে বলেন, উল্লেখিত হাদীসগুলোর মাঝে কোন বিরোধ নেই। কারণ মানুষ বিভিন্ন শ্রেণী বা পেশার হয়ে থাকে। যেমনঃ কেউ ব্যবসায়ী হয়ে থাকে কেউবা চাষাবাদ করে আবার কেউ দিনমজুরীর কাজ করে। এই প্রেক্ষিতে ব্যবসায়ীর জন্য ব্যবসা করার মতো পণ্যের প্রয়োজন হয়, চাষীর জন্য চাষাবাদের উপকরণের দরকার হয়। অনুরূপ দিনমজুরের জন্য দু’বেলার খাবারই যথেষ্ট হয়। সুতরাং সময়ের ব্যবধান এবং মানুষের শ্রেণীর পার্থক্যের কারণে ৫০ বা ৪০ দিরহাম অথবা দু’বেলার খাবারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যার জন্য কিছু চাওয়া হালাল নয় এবং যার জন্য হালাল
১৮৪৮-[১২] সাহল ইবনু হানযালিয়্যাহ্ (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অমুখাপেক্ষী থাকার মতো সম্পদের মালিক হয়েও যে ব্যক্তি মানুষের কাছে হাত পাতে, সে মূলত বেশী আগুন চায়। এ হাদীসের এক বর্ণনাকারী নুফায়লী অন্য এক স্থানে বর্ণনা করেছেন যে, রসূলের কাছে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল কি পরিমাণ সম্পদ থাকলে অন্য কারো কাছে কিছু চাওয়া সমীচীন হবে না। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, সকাল সন্ধ্যার পরিমাণ খাদ্য মওজুদ থাকলে। নুফায়লী অন্য এক স্থানে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বরাতে এভাবে বর্ণনা করেছেন যে, তার কাছে একদিন অথবা একদিন এক রাতের পরিমাণ খাদ্য মওজুদ থাকলে। অথবা বর্ণনাকারীর সন্দেহ, তিনি শুধু একদিনের কথা বলেছেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ سَهْلِ بْنِ الْحَنْظَلِيَّةِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ سَأَلَ وَعِنْدَهُ مَا يُغْنِيهِ فَإِنَّمَا يَسْتَكْثِرُ مِنَ النَّارِ» . قَالَ النُّفَيْلِيُّ. وَهُوَ أَحَدُ رُوَاتِهِ فِي مَوْضِعٍ آخر: وَمَا الْغنى الَّذِي لَا يَنْبَغِي مَعَهُ الْمَسْأَلَةُ؟ قَالَ: «قَدْرُ مَا يُغَدِّيهِ وَيُعَشِّيهِ» . وَقَالَ فِي مَوْضِعٍ آخَرَ: «أَنْ يَكُونَ لَهُ شِبَعُ يَوْمٍ أَوْ لَيْلَةٍ وَيَوْمٍ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: যে ব্যক্তি প্রয়োজন ছাড়াই মানুষের থেকে ভিক্ষাবৃত্তি করে সম্পদ একত্রিত করে সে যেন তার নিজের জন্য জাহান্নামের আগুন একত্রিত করল। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রশ্ন ধরা হল, কি পরিমাণ সম্পদ থাকলে তার জন্য ভিক্ষাবৃত্তি করা বৈধ নয়? উত্তরে তিনি বললেন, সকাল-সন্ধ্যার খাবার। অর্থাৎ যার নিকট একদিনের সকাল-সন্ধ্যার খাবার থাকবে তার জন্য ভিক্ষাবৃত্তি করা বৈধ নয়। ইমাম খাত্ত্বাবী (রহঃ) তাঁর ‘‘মা‘আলিম’’ গ্রন্থে বলেন, এর ব্যাখ্যায় মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, হাদীসের বাহ্যিক অর্থে বুঝা যায় যার একদিনের সকাল-সন্ধ্যার খাবার থাকবে তার জন্য ভিক্ষাবৃত্তি বৈধ নয়। আবার কেউ কেউ বলেছেন, ভিক্ষাবৃত্তি সেই ব্যক্তির জন্য অবৈধ যার নিকট দীর্ঘদিনের খাবার মওজুদ রয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেছেন, বরং এটি পঞ্চাশ দিরহাম এবং উক্বিয়্যার হাদীস দ্বারা মানসূখ হয়ে গেছে।
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যার জন্য কিছু চাওয়া হালাল নয় এবং যার জন্য হালাল
১৮৪৯-[১৩] ’আত্বা ইবনু ইয়াসার বানী আসাদ গোত্রের এক ব্যক্তি হতে বর্ণনা করেছেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের যে ব্যক্তি এক উক্বিয়্যাহ্ পরিমাণ (অর্থাৎ চল্লিশ দিরহাম) অথবা এর সমমূল্যের (সোনা ইত্যাদি) মালিক হবার পরও মানুষের কাছে হাত পাতে, সে যেন বিনা প্রয়োজনে (মানুষের কাছে) হাত পাতলো। (মালিক, আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
وَعَنْ عَطَاءِ بْنِ يَسَارٍ عَنْ رَجُلٍ مِنْ بَنِي أَسَدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ سَأَلَ مِنْكُمْ وَلَهُ أُوقِيَّةٌ أَوْ عَدْلُهَا فَقَدْ سَأَلَ إِلْحَافًا» . رَوَاهُ مَالك وَأَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যার জন্য কিছু চাওয়া হালাল নয় এবং যার জন্য হালাল
১৮৫০-[১৪] হুবশী ইবনু জুনাদাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কারো কাছে কিছু চাওয়া ধনী, সুস্থ সবল ও সুস্থ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সম্পন্ন লোকের জন্য হালাল নয়। তবে ওই ফকিরের জন্য তা হালাল, যে ক্ষুধা পিপাসার কারণে মাটিতে পড়ে গেছে। এভাবে ওই ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জন্যও হাত পাতা হালাল যে ভারী ঋণের বোঝায় জর্জরিত। মনে রাখবে যে ব্যক্তি শুধু সম্পত্তি বাড়াবার জন্য মানুষের কাছে ঋণ চায়, তার এ চাওয়া কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন আহতের চিহ্নরূপে তার মুখে ভেসে উঠবে। তাছাড়াও জাহান্নামে তার খাদ্য হিসেবে গরম পাথর দেয়া হবে। অতএব যার ইচ্ছা সে কম হাত পাতুক অথবা বেশী বেশী হাত পাতুক। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ حُبْشِيِّ بْنِ جُنَادَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ الْمَسْأَلَةَ لَا تَحِلُّ لِغَنِيٍّ وَلَا لِذِي مِرَّةٍ سَوِيٍّ إِلَّا لِذِي فَقْرٍ مُدْقِعٍ أَوْ غُرْمٍ مُفْظِعٍ وَمَنْ سَأَلَ النَّاسَ لِيُثْرِيَ بِهِ مَالَهُ: كَانَ خُمُوشًا فِي وَجْهِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَرَضْفًا يَأْكُلُهُ مِنْ جَهَنَّمَ فَمَنْ شَاءَ فَلْيَقُلْ وَمَنْ شَاءَ فليكثر . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: হাদীসে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি কঠিন অভাব অথবা দেনা পরিশোধের জন্য নয় বরং নিজের সম্পদকে বৃদ্ধি করার জন্য মানুষের নিকট সাওয়াল (ভিক্ষাবৃত্তি বা চাইবে) করবে তাকে হাদীসে বর্ণিত শাস্তি প্রদান করা হবে। এ শাস্তির কথা জানার পর যার ইচ্ছে হয় সাওয়াল কম করা সে কম করে করবে আর যার ইচ্ছে হয় বেশি সাওয়াল করার সে বেশি করবে। (সাওয়ালের অনুপাতে তার শাস্তি হবে)। এর দৃষ্টান্ত যেমন আল্লাহর বাণী, অর্থাৎ ‘‘যার ইচ্ছে হয় সে ঈমান আনবে আর যার ইচ্ছে হয় সে কুফরী করবে। আমি সীমালঙ্ঘনকারীদের জন্য প্রস্ত্তত রেখেছি আগুন’’- (সূরাহ্ আল কাহফ ১৮ : ২৯)।
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যার জন্য কিছু চাওয়া হালাল নয় এবং যার জন্য হালাল
১৮৫১-[৫] আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আনসারের এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে তাঁর কাছে কিছু চাইলেন। তিনি বললেন, ’তোমার ঘরে কি কোন জিনিস নেই?’ লোকটি বলল, একটি কমদামী কম্বল আছে। এটার একাংশ আমি গায়ে দেই, আর অপর অংশ বিছিয়ে নিই। এছাড়া কাঠের একটি পেয়ালা আছে। এ দিয়ে আমি পানি পান করি।’ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ দু’টো জিনিস আমার কাছে নিয়ে এসো। লোকটি এ জিনিস দু’টি নবীর কাছে নিয়ে এলো। জিনিসটি নিজের হাতে নিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ দু’টি কে কিনবে? এক ব্যক্তি বলল, আমি এক দিরহামের বিনিময়ে কিনতে প্রস্তুত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এক দিরহামের বেশী দিয়ে কে কিনতে চাও? এ কথাটি তিনি ’দু’ কি তিনবার’ বললেন। (এ সময়) এক ব্যক্তি দু’ দিরহাম বললে তিনি দু’ দিরহাম নিয়ে আনসারীকে দিয়ে দিলেন। অতঃপর তাকে বললেন, এ এক দিরহাম দিয়ে খাদ্য কিনে পরিবারের লোকজনকে দিবে। দ্বিতীয় দিরহামটি দিয়ে একটি কুঠার কিনে আমার কাছে আসবে। সে ব্যক্তি কুঠার কিনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলো। তিনি নিজ হাতে কুঠারের একটি মজবুত হাতল লাগিয়ে দিয়ে তাকে বললেন, এটা দিয়ে লাকড়ী কেটে বিক্রি করবে। এরপর আমি এখানে তোমাকে পনের দিন যেন দেখতে না পাই। লোকটি চলে গেল। বন থেকে লাকড়ী কেটে জমা করে (বাজারে) এনে বিক্রি করতে লাগল। (কিছু দিন পর) সে যখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ফিরে এলো তখন সে দশ দিরহামের মালিক। এ দিরহামের কিছু দিয়ে সে কিছু কাপড়-চোপড় কিনল আর কিছু দিয়ে খাদ্যশস্য কিনল। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (তার অবস্থার এ পরিবর্তন দেখে) বললেন, কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন ভিক্ষাবৃত্তি তোমার চেহারায় ক্ষত চিহ্ন হয়ে ওঠার চেয়ে এ অবস্থা কি উত্তম নয়?
(মনে রাখবে), শুধু তিন ধরনের লোক হাত পাততে পারে, ভিক্ষা করতে পারে। প্রথমতঃ ফকীর যাকে কপর্দকহীনতা মাটিতে শুইয়ে দিয়েছে। দ্বিতীয়তঃ ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি যে ভারী ঋণে লাঞ্ছিত হবার পর্যায়ে। তৃতীয়তঃ রক্তপণ আদায়কারী, যা তার যিম্মায় আছে (অথচ তার সামর্থ্য নেই)। (আবূ দাঊদ; ইবনু মাজাহ এ হাদীসটি ’ইলা- ইয়াওমিল ক্বিয়া-মাহ্’ পর্যন্ত বর্ণনা করেছেন।)[1]
وَعَن أنس بن مَالك: أَنَّ رَجُلًا مِنَ الْأَنْصَارِ أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَسْأَلُهُ فَقَالَ: «أَمَا فِي بَيْتك شَيْء؟» قَالَ بَلَى حِلْسٌ نَلْبَسُ بَعْضَهُ وَنَبْسُطُ بَعْضَهُ وَقَعْبٌ نَشْرَبُ فِيهِ مِنَ الْمَاءِ. قَالَ: «ائْتِنِي بِهِمَا» قَالَ فَأَتَاهُ بِهِمَا فَأَخَذَهُمَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِيَدِهِ وَقَالَ: «مَنْ يَشْتَرِي هَذَيْنِ؟» قَالَ رَجُلٌ أَنَا آخُذُهُمَا بِدِرْهَمٍ قَالَ: «مَنْ يَزِيدُ عَلَى دِرْهَمٍ؟» مَرَّتَيْنِ أَوْ ثَلَاثًا قَالَ رجل أَنا آخذهما بِدِرْهَمَيْنِ فَأَعْطَاهُمَا إِيَّاه وَأخذ الدِّرْهَمَيْنِ فَأَعْطَاهُمَا الْأَنْصَارِيُّ وَقَالَ: «اشْتَرِ بِأَحَدِهِمَا طَعَامًا فانبذه إِلَى أهلك واشتر بِالْآخرِ قدومًا فأتني بِهِ» . فَأَتَاهُ بِهِ فَشَدَّ فِيهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عُودًا بِيَدِهِ ثُمَّ قَالَ لَهُ اذْهَبْ فَاحْتَطِبْ وَبِعْ وَلَا أَرَيَنَّكَ خَمْسَةَ عَشَرَ يَوْمًا . فَذهب الرجل يحتطب وَيبِيع فجَاء وَقَدْ أَصَابَ عَشَرَةَ دَرَاهِمَ فَاشْتَرَى بِبَعْضِهَا ثَوْبًا وَبِبَعْضِهَا طَعَامًا فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «هَذَا خَيْرٌ لَكَ مِنْ أَنْ تَجِيءَ الْمَسْأَلَةُ نُكْتَةً فِي وَجْهِكَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّ الْمَسْأَلَةَ لَا تَصْلُحُ إِلَّا لِثَلَاثَةٍ لِذِي فَقْرٍ مُدْقِعٍ أَوْ لِذِي غُرْمٍ مُفْظِعٍ أَوْ لِذِي دَمٍ مُوجِعٍ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَرَوَى ابْن مَاجَه إِلَى قَوْله: «يَوْم الْقِيَامَة»
ব্যাখ্যা: এ হাদীস দ্বারা কয়েকটি বিষয় সাব্যস্ত হয়-
১। ডাকের মাধ্যমে কোন জিনিস বিক্রয়ের সময় যে মূল্য বেশি দিবে তার নিকট বিক্রয় করা জায়িয। এ ধরনের বিক্রয় একজনের দাম করার উপরে অন্যজনের দাম করার (যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ) অন্তর্ভুক্ত হবে না।
২। বৈধ পন্থায় নিজের হাতে রোজগার করে জীবিকা নির্বাহ করা সওয়াল করার (ভিক্ষাবৃত্তি বা চাওয়ার) চেয়ে উত্তম।
৩। হাদীসে বর্ণিত তিন প্রকারের ব্যক্তি ছাড়া সওয়াল করা জায়িয নয়।
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যার জন্য কিছু চাওয়া হালাল নয় এবং যার জন্য হালাল
১৮৫২-[১৬] ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কঠিন অভাবে জর্জরিত, সে মানুষের সামনে প্রয়োজন পূরণের ইচ্ছা প্রকাশ করলে এ অভাব দূর হবে না। আর যে ব্যক্তি তার অভাবের কথা শুধু আল্লাহর কাছে বলে, আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট। হয় তাকে তাড়াতাড়ি মৃত্যু দিয়ে অভাব থেকে মুক্তি দিবেন অথবা তাকে কিছু দিনের মধ্যে ধনী বানিয়ে দেবেন। (আবূ দাঊদ, তিরমিযী)[1]
وَعَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ أَصَابَتْهُ فَاقَةٌ فَأَنْزَلَهَا بِالنَّاسِ لَمْ تُسَدَّ فَاقَتُهُ. وَمَنْ أَنْزَلَهَا بِاللَّه أوشك الله لَهُ بالغنى إِمَّا بِمَوْتٍ عَاجِلٍ أَوْ غِنًى آجِلٍ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالتِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: যে ব্যক্তি অভাবে পতিত হওয়ার পর তা মানুষের নিকট তুলে ধরবে বা মানুষের ওপরে ভরসা করবে, তার অভাব কোনদিনই দূর করা হবে না বরং অভাবের উপরই বিদ্যমান থাকবে। আর যদি কোন সময় কোন অভাব থেকে মুক্ত করা হয়, মানুষের ওপর নির্ভর করার কারণে তার চেয়েও কঠিন অভাবে তাকে পেয়ে বসবে। আর যে ব্যক্তি অভাবের বিষয়টি আল্লাহর নিকট তুলে ধরবে আল্লাহ তাকে অবশ্যই অভাব মুক্ত করবেন দ্রুত তার মৃত্যুর দ্বারা অথবা সম্পদ দ্বারা। যেমন আল্লাহ বলেছেন, অর্থাৎ ‘‘তারা যদি দরিদ্র হয় তাহলে আল্লাহ স্বীয় প্রাচুর্য দ্বারা তাদেরকে অভাব মুক্ত করে দিবেন’’- (সূরাহ্ আন্ নূর ২৪ : ৩২)।
পরিচ্ছেদঃ ৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - যার জন্য কিছু চাওয়া হালাল নয় এবং যার জন্য হালাল
১৮৫৩-[১৭] ইবনু ফিরাসী (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (আমার পিতা) ফিরাসী (রাঃ)বলেছেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আরয করলাম, হে আল্লাহর রসূল! আমি কি মানুষের কাছে হাত পাততে পারি? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না। (বরং সর্বাবস্থায়) আল্লাহর ওপর ভরসা করবে। তবে (কোন কঠিন প্রয়োজনে) কিছু চাওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়লে নেক মানুষের নিকট চাইবে। (আবূ দাঊদ, নাসায়ী)[1]
عَنِ ابْنِ الْفِرَاسِيِّ أَنَّ الْفِرَاسِيَّ قَالَ: قُلْتُ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَسْأَلُ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا وَإِن كنت لابد فسل الصَّالِحين» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: হাদীসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রশ্নকারীকে বলেন, কারো নিকট যদি তোমকে একান্ত চাইতেই হয়, তাহলে নেক বা সৎ মানুষের নিকট চাবে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি মানুষের মাঝে তুলনামূলক উত্তম এবং তোমার প্রয়োজন মেটাতে মনের দিক থেকে সক্ষম। কারণ এই যে, সৎ মানুষ সাওয়ালকারীকে বঞ্চিত করে না এবং সে যা দেয় তা মনের সন্তুষ্টিচিত্তে হালাল বস্ত্ত থেকে দেয়। উপরন্তু সে তোমার জন্য দু‘আ করবে যা কবূল করা হবে।
পরিচ্ছেদঃ ৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - যার জন্য কিছু চাওয়া হালাল নয় এবং যার জন্য হালাল
১৮৫৪-[১৮] ইবনুস্ সা’ইদী (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’উমার (রাঃ) আমাকে যাকাত আদায়কারী নিযুক্ত করলেন। আমি যাকাত আদায়ের কাজ শেষ করলাম। যাকাতের মাল ’উমারের কাছে পৌঁছিয়ে দিলে তিনি আমাকে যাকাত আদায়ের বিনিময় গ্রহণ করতে বললেন। (এ কথা শুনে) আমি বললাম, এ কাজ শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য আমি করেছি। তাই এ কাজের বিনিময় আল্লাহর যিম্মায়। ’উমার (রাঃ) বললেন, তোমাকে যা দেয়া হচ্ছে গ্রহণ করো। কারণ আমিও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময় যাকাত আদায় করেছি। তিনি এর বিনিময় দিতে চাইলে আমিও এ কথাই বলেছিলাম, যা আজ তুমি বলছ। (তখন) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছিলেন, যখন কোন জিনিস চাওয়া ছাড়া তোমাকে দেয়া হবে, তা গ্রহণ করে খাবে। (আর খাবার পর যা তোমার নিকট বেঁচে থাকবে) তা আল্লাহর পথে খরচ করবে। (মুসলিম, আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن ابْن السَّاعِدِيّ الْمَالِكِي أَنه قَالَ: استعملني عمر بن الْخطاب رَضِي الله عَنْهُم عَلَى الصَّدَقَةِ فَلَمَّا فَرَغْتُ مِنْهَا وَأَدَّيْتُهَا إِلَيْهِ أَمَرَ لِي بِعُمَالَةٍ فَقُلْتُ إِنَّمَا عَمِلْتُ لِلَّهِ وَأجْرِي على الله فَقَالَ خُذْ مَا أُعْطِيتَ فَإِنِّي قَدْ عَمِلْتُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَعَمَّلَنِي فَقُلْتُ مِثْلَ قَوْلِكَ فَقَالَ لِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا أُعْطِيتَ شَيْئا من غير أَن تسْأَل فَكل وَتصدق» . رَوَاهُ مُسلم وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: হাদীসের শেষাংশে বলা হয়েছেঃ সাওয়াল করা (ভিক্ষাবৃত্তি করা বা চাওয়া) ব্যতীত তোমাকে কোন জিনিস দেয়া হলে তা খাবে এবং দান করবে। অর্থাৎ তা গ্রহণ করবে প্রত্যাখ্যান করবে না এবং নিজে খাওয়া ও সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করার ব্যাপারে যা ইচ্ছা তাই করবে। আরো বলা হয়েছে যে, তুমি তোমার দরিদ্রাবস্থায় খাবে এবং ধনাঢ্যাবস্থায় সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করে দিবে। মুনযিরী বলেছেন, দীন এবং দুনিয়াবীর ব্যাপারে যে একজন মুসলিমের কোন প্রকার দায়িত্ব পালন করে তার মজুরী বা পারিশ্রমিক গ্রহণ করা জায়িয আছে। অনুরূপ ব্যাখ্যা আল্লামা শাওকানীও করেছেন। ইমাম ইবনু তায়মিয়্যাহ্ বলেনঃ কোন ব্যক্তি যদি বিনা শর্তে এবং বিনিময় না নেয়ার উদ্দেশে কোন কাজ করে, অতঃপর তাকে ঐ কাজের প্রেক্ষক্ষতে কোন জিনিস দেয়া হয় তা ঐ ব্যক্তিকে অত্যন্ত আনন্দ প্রদান করে, অর্থাৎ ঐ ব্যক্তি প্রাপ্ত জিনিসে আনন্দবোধ করে।
পরিচ্ছেদঃ ৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - যার জন্য কিছু চাওয়া হালাল নয় এবং যার জন্য হালাল
১৮৫৫-[১৯] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি ’আরাফার দিন এক ব্যক্তিকে লোকজনের কাছে হাত পেতে কিছু চাইতে শুনলেন। তিনি তাকে বললেন, আজকের এই দিনে এই জায়গায় তুমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে হাত পাতছো? তারপর তিনি তাকে চাবুক দিয়ে মারলেন। (রযীন)
وَعَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّهُ سَمِعَ يَوْمَ عَرَفَةَ رَجُلًا يَسْأَلُ النَّاسَ فَقَالَ: أَفِي هَذَا الْيَوْمِ: وَفِي هَذَا الْمَكَانِ تسْأَل من يغر الله؟ فخفقه بِالدرةِ. رَوَاهُ رزين
ব্যাখ্যা: হাদীসে বর্ণিত আজকের এই দিনে এবং এই সময়ের দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, দু‘আ কবূলের সময় এবং এই স্থানে আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যের কাছে তুচ্ছ জিনিস যেমন দুপুরের অথবা রাতের একটু খাবারের জন্য সওয়াল করছ (ভিক্ষাবৃত্তি করা বা চাওয়া)? আল্লামা ত্বীবী বলেছেন, আজ এই দিনে এবং এই স্থানে অর্থাৎ ‘আরাফার দিনে ও স্থানে আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যের নিকট কোন কিছু সওয়াল করা মোটেই ঠিক নয়।
পরিচ্ছেদঃ ৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - যার জন্য কিছু চাওয়া হালাল নয় এবং যার জন্য হালাল
১৮৫৬-[২০] ’উমার ফারূক (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি লোকদেরকে উদ্দেশ করে বলেন, হে লোকেরা! মনে রাখবে লোভ লালসা এক রকমের মুখাপেক্ষিতা। আর মানুষ থেকে অমুখাপেক্ষী থাকা, ধনী হবার লক্ষণ। মানুষ যখন অন্যের কাছে কোন কিছু আশা করা ত্যাগ করে, তখন সে স্বনির্ভর হয়। (রযীন)
وَعَن عمر رَضِي الله عَنهُ قَالَ: تَعْلَمُنَّ أَيُّهَا النَّاسُ أَنَّ الطَّمَعَ فَقْرٌ وَأَنَّ الْإِيَاسَ غِنًى وَأَنَّ الْمَرْءَ إِذَا يَئِسَ عَن شَيْء اسْتغنى عَنهُ. رَوَاهُ رزين
ব্যাখ্যা: ইমাম আহমাদ, বায়হাক্বী এবং হাকিম হাদীসটিকে এভাবে বর্ণনা করেছেন যে, একজন ব্যক্তি আল্লাহর নাবীর নিকট এসে বলছে, হে আল্লাহর রসূল! আমাকে আপনি ওয়াসিয়্যাত করুন। অতঃপর আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ ব্যক্তিকে বলেন, অন্যের হাতে যা আছে তা থেকে তুমি নিরাশা থাকবে অর্থাৎ অন্যের সম্পদের লোভ করবে না। কারণ লোভ বা লালসা হচ্ছে দরিদ্রের প্রতীক।
পরিচ্ছেদঃ ৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - যার জন্য কিছু চাওয়া হালাল নয় এবং যার জন্য হালাল
১৮৫৭-[২১] সাওবান (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার বলেছেন, যে আমার সাথে এ ওয়া’দা করবে যে, সে কারো কাছে ভিক্ষার হাত বাড়াবে না। আমি তার জন্য জান্নাতের ওয়া’দা করতে পারি। সাওবান বলেন, আমি। ফলে তিনি কারো কাছে কোন কিছু চাইতেন না (বস্তুতঃ সাওবান যত অভাবেই থাকুক, কারো কাছে আর কোনদিন হাত পাতেননি।)। (আবূ দাঊদ, নাসায়ী)[1]
وَعَنْ ثَوْبَانَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ يَكْفُلُ لِي أَنْ لَا يَسْأَلَ النَّاسَ شَيْئًا فَأَتَكَفَّلَ لَهُ بِالْجَنَّةِ؟» فَقَالَ ثَوْبَانُ: أَنَا فَكَانَ لَا يَسْأَلُ أَحَدًا شَيْئا. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতের যিম্মাদার হবেন, সাওবান এ কথা শুনে তিনি কোন দিন কারো নিকট কিছুই চাননি। এমনকি তিনি যখন কোন প্রাণীর উপর আরোহিত অবস্থায় থাকতেন আর তার হাত থেকে চাবুক নীচে পড়ে যেত, তখন কোন ব্যক্তিকে চাবুকটি উঠিয়ে দিতেও বলতেন না। যেমন পরের (১৮৫৮ নং) হাদীসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ধরনের সহযোগিতামূলক কিছু চাইতেও নিষেধ করেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - যার জন্য কিছু চাওয়া হালাল নয় এবং যার জন্য হালাল
১৮৫৮-[২২] আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (একদিন) ডেকে এনে আমার ওপর শর্তারোপ করে বললেন, তুমি কারো কাছে কোন কিছুর জন্য হাত পাতবে না। আমি বললাম, আচ্ছা। তারপর তিনি বললেন, এমনকি তোমার হাতের লাঠিটাও যদি পড়ে যায় কাউকে উঠিয়ে দিতে বলবে না। বরং তুমি নিজে নেমে তা উঠিয়ে নেবে। (আহমাদ)[1]
وَعَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ: دَعَانِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ يَشْتَرِطُ عَلَيَّ: «أَنْ لَا تَسْأَلَ النَّاسَ شَيْئًا» قُلْتُ: نَعَمْ. قَالَ: «وَلَا سَوْطَكَ إِنْ سَقَطَ مِنْكَ حَتَّى تنزل إِلَيْهِ فتأخذه» . رَوَاهُ أَحْمَدُ
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - দানের মর্যাদা ও কৃপণতার পরিণাম
১৮৫৯-[১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার কাছে যদি উহুদ পাহাড় সমান সোনাও থাকে, ঋণের অংশ বাদে তা তিনদিন আমার কাছে জমা না থাকলেই আমি খুশী হব। (বুখারী)[1]
بَابُ الْإِنْفَاقِ وَكَرَاهِيَةِ الْإِمْسَاكِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَوْ كَانَ لِي مِثْلُ أُحُدٍ ذَهَبًا لَسَرَّنِي أَنْ لَا يَمُرَّ عَلَيَّ ثَلَاثُ لَيَالٍ وَعِنْدِي مِنْهُ شَيْءٌ إِلَّا شَيْءٌ أَرْصُدُهُ لِدَيْنٍ» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: মুল্লা ‘আলী ক্বারী এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, (لِدَيْنٍ) দেনার জন্য অর্থাৎ আমার ওপরে যে সকল দেনা থাকে তা পরিশোধ করার জন্য। কেননা দান করার আগে দেনা পরিশোধ করতে হয়। অথচ অনেক মানুষ তাদের অজ্ঞতার কারণে সাধারণ দান এবং মীরাস আদায় করে থাকে কিন্তু তাদের ওপরে যে দেনা থাকে তা পরিশোধ করে না, যা হচ্ছে মানুষের হক।
অত্র হাদীসে কল্যাণকর ব্যাপারে দান করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একান্ত প্রয়োজন ছাড়া আগামী দিনের জন্য দুনিয়ার কোন জিনিস জমা করে রাখতে পছন্দ করতেন না। বিশেষ করে দেনা পরিশোধের কথা এবং আমানাত আদায় করার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - দানের মর্যাদা ও কৃপণতার পরিণাম
১৮৬০-[২] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রতিদিন ভোরে (আকাশ থেকে) দু’জন মালাক (ফেরেশতা) নেমে আসে। এদের একজন দু’আ করে, ’হে আল্লাহ! দানশীলকে তুমি বিনিময় দাও। আর দ্বিতীয় মালাক এ বদ্দু’আ করে, হে আল্লাহ! কৃপণকে ক্ষতিগ্রস্ত করো। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ الْإِنْفَاقِ وَكَرَاهِيَةِ الْإِمْسَاكِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَا مِنْ يَوْمٍ يُصْبِحُ الْعِبَادُ فِيهِ إِلَّا مَلَكَانِ يَنْزِلَانِ فَيَقُولُ أَحَدُهُمَا: اللَّهُمَّ أطع مُنْفِقًا خَلَفًا وَيَقُولُ الْآخَرُ: اللَّهُمَّ أَعْطِ مُمْسِكًا تلفا
ব্যাখ্যা: দানকারী ব্যক্তির জন্য মালাক (ফেরেশতা) দু‘আ করে আল্লাহর নিকটে দানের প্রতিদান প্রদানের ব্যাপারে দুনিয়াতে এবং আখিরাতে। যেমন আল্লাহ বলেছেনঃ অর্থাৎ ‘‘তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে তিনি তার প্রতিদান দিবেন’’- (সূরাহ্ সাবা- ৩৪ : ৩৯)। হাফিয ইবনু হাজার বলেন, কল্যাণকর ব্যাপারে খরচকারীর সার্বিক বিষয় সহজ হওয়ার প্রতিশ্রুতিমূলক হলো এ আয়াতটি।
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - দানের মর্যাদা ও কৃপণতার পরিণাম
১৮৬১-[৩] আসমা (বিনতু আবূ বকর) (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (আল্লাহর রাস্তায়) খরচ কর। কিন্তু গুণে গুণে খরচ করো না। তাহলে আল্লাহ তোমাকে গুণে গুণে (নেকী) দিবেন। তোমার জমা করে রেখ না। তাহলে আল্লাহ তা’আলা জমা করে রাখবেন। সামর্থ্য অনুযায়ী আল্লাহর পথে খরচ করো। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ الْإِنْفَاقِ وَكَرَاهِيَةِ الْإِمْسَاكِ
وَعَنْ أَسْمَاءَ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَنَفِقِي وَلَا تُحْصِي فَيُحْصِيَ اللَّهُ عَلَيْكِ وَلَا تُوعِي فَيُوعِيَ اللَّهُ عَلَيْكِ ارْضَخِي مَا اسْتَطَعْتِ»
ব্যাখ্যা: হাদীসের ব্যাখ্যায় আল্লামা খাত্ত্বাবী বলেন, তুমি হিসাব বা গণনা করবে না অর্থাৎ তুমি সম্পদকে কোন পাত্রের ভিতরে গোপন করে রেখে দিবে না বরং তা আল্লাহর রাস্তায় দান করতে থাকবে। কারণ এই যে, রিয্কবের ব্যবস্থার সম্পর্ক হচ্ছে খরচের সঙ্গে।
আল্লামা নাবাবী বলেছেন, হাদীসে মানুষকে উৎসাহিত করা হয়েছে আনুগত্যমূলক কাজে খরচ করার ব্যাপারে এবং নিষেধ করা হয়েছে খরচ না করা ও কৃপণতা থেকে।
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - দানের মর্যাদা ও কৃপণতার পরিণাম
১৮৬২-[৪] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা বলেন, হে আদম সন্তান! ধন-সম্পদ দান করো, তোমাকেও দান করা হবে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ الْإِنْفَاقِ وَكَرَاهِيَةِ الْإِمْسَاكِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: أَنْفِقْ يَا ابْن آدم أنْفق عَلَيْك
ব্যাখ্যা: আল্লাহ বলেন, ‘‘বল- আমার প্রতিপালকই তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছে রিযক্ব (রিজিক/রিযিক) প্রশস্ত করেন, আর যার জন্য ইচ্ছে সীমিত করেন। তোমরা যা কিছু (সৎ কাজে) ব্যয় কর, তিনি তার বিনিময় দেবেন। তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ রিযক্বদাতা’’- (সূরাহ্ সাবা- ৩৪ : ৩৯)। এ হাদীসটি একটি বড় হাদীসের অংশ বিশেষ যা ইমাম বুখারী ও মুসলিম পূর্ণাঙ্গ রিওয়ায়াত করেছেন এবং হাদীসে কুদসী।
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - দানের মর্যাদা ও কৃপণতার পরিণাম
১৮৬৩-[৫] আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (মহান আল্লাহ বলেনঃ) হে আদম সন্তান! প্রয়োজনের অতিরিক্ত যে সম্পদ তোমার কাছে আছে তা খরচ করা তোমার জন্য (দুনিয়া ও আখিরাতে) কল্যাণকর। আর তা খরচ না করা হবে অকল্যাণকর। প্রয়োজন পরিমাণ ধন-সম্পদ (জমা করায়) দোষ নেই। তোমার প্রয়োজনের অতিরিক্ত ধন-সম্পদ ব্যয়ের কাজ নিজ পরিবার-পরিজন থেকে শুরু করো। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْإِنْفَاقِ وَكَرَاهِيَةِ الْإِمْسَاكِ
وَعَنْ أَبِي أُمَامَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَا ابْنَ آدَمَ إِنْ تَبْذُلِ الْفَضْلَ خَيْرٌ لَكَ وَإِنْ تُمْسِكْهُ شَرٌّ لَكَ وَلَا تُلَامُ عَلَى كَفَافٍ وَابْدَأْ بِمن تعول» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: ইমাম নাবাবী বলেনঃ হাদীসটির অর্থ হচ্ছে, তোমার এবং তোমার পরিবার-পরিজনের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় খরচ করলেই তোমার কল্যাণ হবে। আর যদি তা খরচ না করে তোমার নিকট রেখে দাও তাহলে তা তোমার জন্য ক্ষতির কারণ হবে।
যেখানে খরচ করা ওয়াজিব সেখানে খরচ না করলে শাস্তির হকদার হবে। আর যেখানে ওয়াজিব নয় কিন্তু মুস্তাহাব সেখানে খরচ না করলে সাওয়াব থেকে এবং পরকালীন কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হবে যা তার জন্য মূলত অকল্যাণকরই হবে।
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - দানের মর্যাদা ও কৃপণতার পরিণাম
১৮৬৪-[৬] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কৃপণ ও দানশীল ব্যক্তির দৃষ্টান্ত এমন দু’ব্যক্তির মতো যাদের শরীরে দু’টি লোহার পোশাক রয়েছে। আর (এটার কারণে) এ দু’জনের হাত তাদের সিনা হতে গর্দান পর্যন্ত লটকে আছে। এ অবস্থায় দানশীল ব্যক্তি যখন দান করতে চায় তখন তার বেড়ি সম্প্রসারিত হয়। এমনকি তাঁর হাতের আঙ্গুল পর্যন্ত আবৃত করে ফেলে এবং তার চিহ্ন মিটে যায়। কৃপণ ব্যক্তি দান করতে চাইলে তার বেড়ি সংকুচিত হয়ে এর প্রত্যেকটি কড়া নিজ নিজ স্থানে একটা আরেকটার সাথে আটকে যায়। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ الْإِنْفَاقِ وَكَرَاهِيَةِ الْإِمْسَاكِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَثَلُ الْبَخِيلِ وَالْمُتَصَدِّقِ كَمَثَلِ رَجُلَيْنِ عَلَيْهِمَا جُنَّتَانِ مِنْ حَدِيدٍ قَدِ اضْطُرَّتْ أَيْدِيهِمَا إِلَى ثُدُيِّهِمَا وَتَرَاقِيهِمَا فَجَعَلَ الْمُتَصَدِّقُ كُلَّمَا تَصَدَّقَ بِصَدقَة انبسطت عَنهُ الْبَخِيلُ كُلَّمَا هَمَّ بِصَدَقَةٍ قَلَصَتْ وَأَخَذَتْ كُلُّ حَلقَة بمكانها»
ব্যাখ্যা: হাদীসের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, দান করলে দানকারীর পাপ রাশীকে মোচন করে দেয় যেমন মাটি পর্যন্ত ঝুলিয়ে কাপড় পরিধানকারীর ঝুলন্ত অংশ তার চলার পদচিহ্ন মুছে ফেলে।
হাফিয ইবনু হাজার ফাতহুল বারীতে বলেছেন, এটা এমন একটি দৃষ্টান্ত যা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দানকারী এবং কৃপণের ব্যাপারে পেশ করেছেন। এ দু’জনের দৃষ্টান্ত হলো ঐ দুই ব্যক্তির ন্যায় যে দু’জন তাদের শরীরকে শত্রুর আঘাত থেকে হিফাযাতের জন্য লোহার বর্ম পরিধানের উদ্দেশে বর্মের ভিতর দিয়ে মাথা ঢুকিয়ে দিল। অতঃপর দানকারী যেন পরিপূর্ণ একটি বর্ম পরিধান করতঃ তার সম্পূর্ণ শরীর ঢেকে নিল। পক্ষান্তরে কৃপণ ব্যক্তি যখন পরিধান করার ইচ্ছে করে তখন তা তার গলায় এবং বক্ষক্ষ আটকে যায় তখন আর সে সম্পূর্ণ শরীর ঢাকতে পারে না।
হাদীসের সার-সংক্ষেপ ব্যাখ্যা এই যে, দানকারী যখন দান করার ইচ্ছা করে তখন তার অন্তর প্রসার হয়ে যায় এবং সে মনে আনন্দবোধ করে। অন্যদিকে কৃপণ ব্যক্তি যখন মনে মনে দান করার চিন্তা করে তখন তার অন্তর সংকীর্ণ হয়ে যায়। অতঃপর সে তার হাতকে গুটিয়ে নেয় দান করা থেকে।
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - দানের মর্যাদা ও কৃপণতার পরিণাম
১৮৬৫-[৭] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যুলম থেকে বেঁচে থাকবে, কারণ কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন যুলম অন্ধকারের ন্যায় গ্রাস করবে। আর কৃপণতা হতে বেঁচে থাকবে, কারণ কৃপণতা তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে ধ্বংস করেছে। এ কৃপণতাই তাদেরকে প্ররোচিত করেছে রক্তপাতের জন্য এবং হারাম কাজকে হালাল করার দিকে। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْإِنْفَاقِ وَكَرَاهِيَةِ الْإِمْسَاكِ
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: اتَّقُوا الظُّلْمَ فَإِنَّ الظُّلْمَ ظُلُمَاتٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَاتَّقُوا الشُّحَّ فَإِنَّ الشُّحَّ أَهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ: حَمَلَهُمْ عَلَى أَنْ سَفَكُوا دِمَاءَهُمْ وَاسْتَحَلُّوا مَحَارِمهمْ . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: হাদীসে কৃপণতা থেকে বেঁচে থাকতে বলা হয়েছে এবং এর পরিণামের কথাও বলে দেয়া হয়েছে। এর ব্যাখ্যায় আল্লামা ত্বীবী বলেন, এই কৃপণতা হচ্ছে হাদীসে বর্ণিত পরিণামের কারণ। কেননা কৃপণতা না করে ধন-সম্পদ খরচ করলে মানুষের সঙ্গে সু-সম্পর্ক গড়ে উঠে। পক্ষান্তরে কৃপণতা সম্পর্কে ছিন্ন করে, যা পরবর্তীতে হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করতঃ মানুষের মাঝে রক্তপাত ঘটিয়ে এবং হারামকে হালাল করার যেমনঃ ব্যভিচার, কারোর সম্মানহানী এবং অন্যায়ভাবে কারোর সম্পদ লোভে নেয়ার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে।
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - দানের মর্যাদা ও কৃপণতার পরিণাম
১৮৬৬-[৮] হারিসাহ্ ইবনু ওয়াহ্ব (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা সদাক্বাহ্ (সাদাকা) কর, কেননা এমন সময় আসবে যখন একলোক তার সদাক্বার মাল নিয়ে বের হবে কিন্তু তা গ্রহণ করার লোক পাওয়া যাবে না। বরং প্রত্যেক ব্যক্তিই বলবে, গতকাল তুমি যদি এ মাল নিয়ে আসতে, আমি গ্রহণ করতাম। আজ এ সদাক্বার আমার কোনই প্রয়োজন নেই। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ الْإِنْفَاقِ وَكَرَاهِيَةِ الْإِمْسَاكِ
وَعَنْ حَارِثَةَ بْنِ وَهْبٌ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: تصدقوا فَإِنَّهُ يَأْتِي عَلَيْكُمْ زَمَانٌ يَمْشِي الرَّجُلُ بِصَدَقَتِهِ فَلَا يَجِدُ مَنْ يَقْبَلُهَا يَقُولُ الرَّجُلُ: لَوْ جِئْت بهَا بِالْأَمْسِ لَقَبِلْتُهَا فَأَمَّا الْيَوْمَ فَلَا حَاجَةَ لِي بهَا
ব্যাখ্যা: ইমাম নাবাবী বলেন, শেষ যামানায় সম্পদের ব্যাপকতা, জমিনের ধন-ভান্ডারের প্রকাশ এবং পৃথিবীতে অজস্র বারাকাতের প্রেক্ষক্ষতে দান গ্রহণ করার জন্য কাউকে পাওয়া যাবে না। আর এটা ঘটবে ক্বিয়ামাতের (কিয়ামতের) পূর্বক্ষণে ইমাম মাহদী এবং ‘ঈসা (আঃ) এর আবির্ভাবের পর মানুষ যখন ফিৎনায় পতিত হয়ে নিজকে নিয়ে ব্যাস্ত থাকবে তখন কেউ মাল-সম্পদের দিকে খেয়াল করবে না। অথবা এটা ঘটবে মাহদী ‘ঈসা (আঃ) এর অবতরণের পর যখন ন্যায় ও নিরাপদে অবস্থান করবে তখন প্রত্যেকের নিকট যে সম্পদ থাকবে সেটাকেই সে যথেষ্ঠ মনে করবে।
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - দানের মর্যাদা ও কৃপণতার পরিণাম
১৮৬৭-[৯] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি আরয করল, হে আল্লাহর রসূল! কোন দান মর্যাদার দিক দিয়ে সবচেয়ে বড়। তিনি বললেন, তুমি যখন সুস্থ-সবল থাকো এবং সম্পদের প্রতি আগ্রহ পোষণ করো, দারিদ্রের ভয় কর, ধন-সম্পদের মালিক হতে চাও, তখনকার দান সবচেয়ে বড়। তাই প্রাণ ওষ্ঠাগত হবার সময় পর্যন্ত দান করার অপেক্ষা করবে না। কারণ তখন তুমি বলতে থাকবে, এ মাল অমুকের, এ মাল অমুকের এবং এ মাল অমুকের। অথচ ততক্ষণে মালের মালিক অমুক হয়েই গেছে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ الْإِنْفَاقِ وَكَرَاهِيَةِ الْإِمْسَاكِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيُّ الصَّدَقَةِ أَعْظَمُ أَجْرًا؟ قَالَ: أَنْ تَصَدَّقَ وَأَنْتَ صَحِيحٌ شَحِيحٌ تَخْشَى الْفَقْرَ وَتَأْمُلُ الْغِنَى وَلَا تُمْهِلَ حَتَّى إِذَا بَلَغَتِ الْحُلْقُومَ قُلْتَ: لِفُلَانٍ كَذَا وَلِفُلَانٍ كَذَا وَقَدْ كَانَ لِفُلَانٍ
ব্যাখ্যা: হাদীসের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা হচ্ছে, একজন মানুষ যখন সুস্থ এবং স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে, মাল সম্পদের প্রতি প্রবল লোভ-লালসা থাকে তখনকার দান হচ্ছে বেশি ফাযীলাতপূর্ণ। কারণ হচ্ছে, মানুষের ধনের সম্পর্ক থাকে তার মনের মুকুটের সঙ্গে; তাই ঐ সময় ধনকে দানের উদ্দেশে তার ধন-ভান্ডার থেকে বের করাতে হলে মনের সঙ্গে সংগ্রাম করতে হয়। আল্লামা খাত্ত্বাবী বলেন, হাদীসের অর্থ হচ্ছে যে, মানুষ যখন সুস্থ থাকে তার লোভও তখন বেশি থাকে। ঐ সময় সে যদি তার লোভকে সংবরণ করে দান করে তাহলে তার নিয়্যাত সঠিক বলে গণ্য হবে এবং তার ঐ দানে নেকীও বেশি হবে। পক্ষান্তরে সে যখন তার মৃত্যুর আভাস বুঝতে পাবে, বাঁচার আশা ছেড়ে দেবে এবং সম্পদ হাত ছাড়া হয়ে যাবে তখন তার দানে সে পূর্ণ নেকী লাভ করতে পারবে না। হাফিয ইবনু হাজার (রহঃ) বলেন, হাদীসের নির্দেশ হলো তুমি তোমার জীবদ্দশায় এবং সুস্থ অবস্থায় দান করবে। আর এই দান তোমার মৃত্যুর পর অথবা অসুস্থ অবস্থায় দান করার চেয়ে উত্তম বলে গণ্য হবে।
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - দানের মর্যাদা ও কৃপণতার পরিণাম
১৮৬৮-[১০] আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গেলাম। এ সময় তিনি কা’বার ছায়ায় বসেছিলেন। আমাকে দেখে তিনি বললেন, খানায়ে কা’বার ’রবের’ কসম! ঐসব লোক ক্ষতিগ্রস্ত। আমি আরয করলাম, আমার মাতা-পিতা আপনার জন্য কুরবান হোক, এসব লোক কারা? তিনি বললেন, যাদের ধন-সম্পদ বেশী তারা। তবে তারা এর মধ্যে গণ্য নয়, যারা এরূপ করে, এরূপ করে, এরূপ করে অর্থাৎ নিজের আগে পিছে, ডানে-বামে নিজের মাল খরচ করে। এমন লোকের সংখ্যা কম। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ الْإِنْفَاقِ وَكَرَاهِيَةِ الْإِمْسَاكِ
وَعَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ: انْتَهَيْتُ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ جَالِسٌ فِي ظِلِّ الْكَعْبَةِ فَلَمَّا رَآنِي قَالَ: «هُمُ الْأَخْسَرُونَ وَرَبِّ الْكَعْبَةِ» فَقُلْتُ: فَدَاكَ أَبِي وَأُمِّي مَنْ هُمْ؟ قَالَ: هُمُ الْأَكْثَرُونَ أَمْوَالًا إِلَّا مَنْ قَالَ: هَكَذَا وَهَكَذَا وَهَكَذَا مِنْ بَين يَدَيْهِ وَمن خَلفه وعني مينه وَعَن شِمَاله وَقَلِيل مَا هم
ব্যাখ্যা: ইবনুল মালিক বলেছেন, (এ হাদীসের ব্যাখ্যায়) চতুস্পার্শ্বে যে সকল অভাবী লোকজন থাকে তাদের মাঝে দান করলে সার্বিক নিরাপত্তা লাভ করা যায়। অর্থাৎ এ ধরনের দানকারীর কোন ক্ষতি হবে না বরং সে নিশ্চয়ই সফলকাম হবে।
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - দানের মর্যাদা ও কৃপণতার পরিণাম
১৮৬৯-[১১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দানশীল ব্যক্তি আল্লাহর নিকটবর্তী, জান্নাতের নিকটবর্তী, জনগণের নিকটবর্তী (সকলের কাছেই দানশীল ব্যক্তি প্রিয়) এবং জাহান্নাম থেকে দূরবর্তী। কিন্তু কৃপণ ব্যক্তি (যে অর্জিত ধনের হক আদায় করে না) সে আল্লাহর থেকে দূরে, জান্নাত হতে দূরে, জনগণ থেকে দূরে এবং জাহান্নামের নিকটবর্তী। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলার নিকট আবিদ কৃপণ অপেক্ষা জাহিল দাতা অধিক প্রিয়। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «السَّخِيُّ قَرِيبٌ مِنَ اللَّهِ قَرِيبٌ مِنَ الْجَنَّةِ قَرِيبٌ مِنَ النَّاسِ بَعِيدٌ مِنَ النَّارِ. وَالْبَخِيلُ بَعِيدٌ مِنَ اللَّهِ بَعِيدٌ مِنَ الْجَنَّةِ بَعِيدٌ مِنَ النَّاسِ قَرِيبٌ مِنَ النَّارِ. وَلَجَاهِلٌ سَخِيٌّ أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنْ عَابِدٍ بَخِيلٍ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: হাদীসের শব্দ (سخى) দানকারীর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ দান করার কারণে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যমে দানকারী জান্নাত লাভ করতে সক্ষম হয়। আর (بخيل) অর্থাৎ কৃপণ এখানে ঐ ব্যক্তিকে বলা হয়েছেঃ যাকাত আদায়কারী হলো (سخى) আর যে তা আদায় করে না সে হলো কৃপণ।
হাদীসের শেষাংশে ‘জাহিল’ শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য যে ‘আবিদ এর বিপরীত। অর্থাৎ যে ব্যক্তি ফরযসমুহ যথারীতি আদায় করে কিন্তু নফল ‘ইবাদাত তেমন একটি করে না অথচ সে দানকারী এই ব্যক্তি আল্লাহর নিকট ঐ ব্যক্তি থেকে উত্তম যে নফল ‘ইবাদাতকারী বটে কিন্তু সে অত্যন্ত কৃপণ।
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - দানের মর্যাদা ও কৃপণতার পরিণাম
১৮৭০-[১২] আবূ সা’ঈদ আল্ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সুস্থ অবস্থায় আল্লাহর পথে কোন ব্যক্তির এক দিরহাম ব্যয় মৃত্যুর সময়ে একশত দিরহাম ব্যয় অপেক্ষা উত্তম। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَأَنْ يَتَصَدَّقَ الْمَرْءُ فِي حَيَاتِهِ بِدِرْهَمٍ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَتَصَدَّقَ بِمِائَةٍ عِنْدِ مَوته» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: হাদীসের ভাষা এক দিরহাম এবং একশত দিরহাম দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে কম এবং বেশি। অর্থাৎ স্বাভাবিক জীবনে সামান্য দান করা, যখন শায়ত্বন (শয়তান) মানুষকে দরিদ্র হয়ে যাওয়ার ভীতিপ্রদর্শন করে এবং খরচ করতে মন কষ্ট পায় এটা অনেক উত্তম মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে অনেক দান করার চেয়েও।
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - দানের মর্যাদা ও কৃপণতার পরিণাম
১৮৭১-[১৩] আবুদ্ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি মৃত্যুর দুয়ারে এসে দান সদাক্বাহ্ (সাদাকা) অথবা গোলাম আযাদ করে তার দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির মতো, যে কাউকে পেট ভরা অবস্থায় (তুহফা, হাদিয়্যাহ্, খাবার) দান করে। (তিরমিযী, নাসায়ী, দারিমী; ইমাম তিরমিযী এ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।)[1]
وَعَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَثَلُ الَّذِي يَتَصَدَّقُ عِنْدَ مَوْتِهِ أَوْ يُعْتِقُ كَالَّذِي يُهْدِي إِذَا شَبِعَ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالنَّسَائِيُّ والدارمي وَالتِّرْمِذِيّ وَصحح
ব্যাখ্যা: আল্লামা ত্বীবী বলেছেন, সময়মত দান না করে অসময় অর্থাৎ বিলম্বে দান করার দৃষ্টান্ত হলো ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে খাওয়ার সময় নিজকে প্রাধান্য দিয়ে একাকী খায়, অন্য কাউকে সঙ্গে নেয় না, অতঃপর তার পেট যখন ভর্তি হয়ে যায় আর খেতে পারে না তখন অন্যকে দিয়ে দেয়। অথচ প্রশংশিত হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে নিজের উপর অন্যকে অধিক ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন, অর্থাৎ ‘‘তাঁরা (আনসারগণ) অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের উপরে তাঁদেরকে (মুহাজিরগণকে) প্রাধান্য দেয়।’’ (সূরাহ্ আল হাশর- ৫৯ : ৯)
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - দানের মর্যাদা ও কৃপণতার পরিণাম
১৮৭২-[১৪] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মু’মিনের মধ্যে দু’টি স্বভাব একত্রে জমা হতে পারে না, কৃপণতা এবং অসদাচরণ। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: خصلتان لَا تجتمعان فِي مُؤْمِنٍ: الْبُخْلُ وَسُوءُ الْخُلُقِ . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ
ব্যাখ্যা: প্রকৃত মু’মিনের জন্য এটা প্রযোজ্য নয় যে, এক সাথে তার ভিতরে এ ধরনের দু’টো জিনিস থাকবে (কৃপণতা ও খারাপ চরিত্র)। আল্লামা তুবরিশতী বলেছেন, একই সঙ্গে এ ধরনের দু’টো অভ্যাস পরিপূর্ণভাবে থাকা বাঞ্চনীয় নয়। আর যদিও থাকে তার প্রতি তার সম্মতি থাকা ঠিক হবে না। অর্থাৎ কোন সময় যদিও সে কৃপণতা করে আবার সময়ে সে তা থেকে মুক্ত থাকে, অনুরূপ কোন সময় তার দ্বারা খারাপ কিছু ঘটে গেলে পরক্ষণে তা থেকে আবার বিরত থাকে এবং অনুশোচিত হয়।
এ সম্পর্কে অন্য হাদীসে বলা হয়েছে, যে কোন ব্যক্তির মাঝে কৃপণতা এবং ঈমান একত্রিত হয় না। অথবা কৃপণতা এমন এক চরিত্র যা দিয়েই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে আর এর স্থান হলো মানুষের অন্তর। সুতরাং কিছুটা হলেও মানুষের মাঝে এ ধরনের চরিত্র বিদ্যমান থাকবে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, অর্থাৎ ‘‘এবং মনের মধ্যে কৃপণতার প্রলোভন বিদ্যমান আছে।’’ (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪ : ১২৮)
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - দানের মর্যাদা ও কৃপণতার পরিণাম
১৮৭৩-[১৫] আবূ বকর সিদ্দীক্ব (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেঃ ধোঁকাবাজ, কৃপণ এবং দান করে খোঁটা দানকারী জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ أَبِي بَكْرٍ الصِّدِّيقِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ خِبٌّ وَلَا بَخِيلٌ وَلَا منان» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, হাদীসে উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গ যে সকল কারণে জান্নাতে যেতে পারবে না এরা হচ্ছেঃ যতক্ষণ পর্যন্ত তারা ঐ সকল কারণসমূহ থেকে পবিত্র না হবে ততক্ষণ তারা জান্নাতে যেতে পারবে না। আর সেই পবিত্র হওয়া তাওবার মাধ্যমে দুনিয়াতেই হতে পারে অথবা শাস্তি ভোগ করার দ্বারাও হতে পারে অথবা ক্ষমার বদৌলতেও হতে পারে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, অর্থাৎ ‘‘আর তাদের অন্তরে যা কিছু ঈর্ষা ও বিদ্বেষ রয়েছে আমি দূর করে দেব।’’ (সূরাহ্ আল আ‘রাফ ৭ : ৪৩)
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - দানের মর্যাদা ও কৃপণতার পরিণাম
১৮৭৪-[১৬] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মানুষের মধ্যে যেসব স্বভাব পাওয়া যায় তার মধ্যে দু’টো স্বভাব সবচেয়ে গর্হিত। একটি হলো চিত্ত অস্থিরকারী কৃপণতা, আর দ্বিতীয়টি হলো ভীতিকর কাপুরুষতা। (আবূ দাঊদ)[1]
আর আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসটি (لَا يَجْتَمِعُ الشُّحُّ وَالْإِيمَانُ) জিহাদ অধ্যায়ে আমরা বর্ণনা করব।
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «شَرُّ مَا فِي الرَّجُلِ شُحٌّ هَالِعٌ وَجُبْنٌ خَالِعٌ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
وَسَنَذْكُرُ حَدِيثَ أَبِي هُرَيْرَةَ: «لَا يَجْتَمِعُ الشُّحُّ وَالْإِيمَانُ» فِي كِتَابِ الْجِهَاد إِن شَاءَ الله تَعَالَى
পরিচ্ছেদঃ ৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - দানের মর্যাদা ও কৃপণতার পরিণাম
১৮৭৫-[১৭] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের কেউ কেউ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের মধ্যে কে আপনার সাথে প্রথমে মিলিত হবেন (অর্থাৎ আপনার মৃত্যুর পর কে প্রথম মৃত্যুবরণ করবে)? তিনি বললেন, যার হাত সবচেয়ে বেশী লম্বা। [’আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ কথা শুনার পর] তাঁর স্ত্রীগণ বাঁশ অথবা কঞ্চির টুকরা দিয়ে নিজেদের হাত মাপতে লাগলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী সাওদা (রাঃ)-এর হাত সবচেয়ে লম্বা ছিল। কিন্তু এরপর আমরা জানতে পারলাম, হাত লম্বা অর্থ দান সদাক্বাহ্ (সাদাকা) বেশী করে করা। আর আমাদের মধ্যে যিনি সবার আগে তাঁর সাথে মিলিত হলেন তিনি যায়নাব। দান সদাক্বাহ্ (সাদাকা) তিনি খুবই ভালবাসতেন।
বুখারী, মুসলিমের এক বর্ণনায় ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি (স্ত্রীদের প্রশ্নের জবাবে) বলেন, তোমাদের মধ্যে যার হাত লম্বা সে আমার সাথে সকলের আগে মিলিত হবে। ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেন, (এ কথা শুনে) স্ত্রীগণ মেপে দেখতে লাগলেন, কার হাত বেশী লম্বা। প্রকৃতপক্ষে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে লম্বা হাত ছিল যায়নাব-এর। কেননা তিনি নিজ হাতে সব কাজ করতেন এবং বেশী বেশী দান সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করতেন।[1]
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا أَنَّ بَعْضُ أَزْوَاجِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قُلْنَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَيُّنَا أَسْرَعُ بِكَ لُحُوقًا؟ قَالَ: أَطْوَلُكُنَّ يَدًا فَأَخَذُوا قَصَبَةً يَذْرَعُونَهَا فَكَانَت سَوْدَة أَطْوَلهنَّ يدا فَعلمنَا بعد أَنما كَانَت طُولُ يَدِهَا الصَّدَقَةَ وَكَانَتْ أَسْرَعَنَا لُحُوقًا بِهِ زَيْنَبُ وَكَانَتْ تُحِبُّ الصَّدَقَةَ. رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ. وَفِي رِوَايَةِ مُسْلِمٍ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «أَسْرَعكُنَّ لُحُوقا بَين أَطْوَلكُنَّ يَدًا» . قَالَتْ: فَكَانَتْ أَطْوَلَنَا يَدًا زَيْنَبُ؟ لِأَنَّهَا كَانَت تعْمل بِيَدِهَا وَتَتَصَدَّق
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম নাবাবী বলেছেনঃ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীগণ এখানে হাত লম্বার মূল অর্থ উদ্দেশ্য করেছেন, অর্থাৎ শারীরিক গঠনের দিক থেকে যিনি সবচেয়ে লম্বা। আর সাওদা (রাঃ) সবচেয়ে লম্বা ছিলেন। অন্যদিকে যায়নাব (রাঃ) দান-খয়রাত এবং ভালো কর্মের দিক থেকে তাঁর হাত লম্বা ছিল। এতে তাঁরা বুঝতে পারলেন যে, এখানে লম্বা হাত দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে দানকারীর হাত।
বিঃ দ্রঃ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পর তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে যায়নাব (রাঃ)-ই প্রথমে মৃত্যুবরণ করেন। যদিও ইমাম বুখারী (রহঃ) সাওদা (রাঃ)-এর কথা উল্লেখ করেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - দানের মর্যাদা ও কৃপণতার পরিণাম
১৮৭৬-[১৮] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (বনী ইসরাঈলের) এক ব্যক্তি বলল, আমি (আজ রাতে) আল্লাহর পথে কিছু মাল খরচ করব। তাই সে কিছু মাল নিয়ে বের হলো এবং সে মাল (তার অজান্তে) এক চোরকে দিয়ে দিল। (কোনভাবে এ কথা জানতে পেরে) ভোরে লোকেরা বলাবলি করতে লাগল, আজ রাতে একজন চোরকে সদাক্বার মাল দেয়া হয়েছে। (সদাক্বাহ্ দানকারী এ কথা জানতে পেরে) বলতে লাগল, হে আল্লাহ! সদাক্বার মাল একজন চোরকে (দেয়া সত্ত্বেও) সব প্রশংসা তোমার। তারপর সে বলল, (আজ রাতেও) আবার সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দেব। তাই সে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দেবার উদ্দেশে আবারও সদাক্বার মাল নিয়ে বের হলো। (এবার এ সদাক্বাহ্ ভুলবশতঃ) একজন ব্যভিচারিণীকে দিয়ে দিলো। সকালে লোকেরা বলাবলি করতে লাগল, আজও তো সদাক্বার মাল একজন ব্যভিচারিণীকে দেয়া হয়েছে। (এ কথা জানতে পেরে) লোকটি বলল, হে আল্লাহ! একজন ব্যভিচারিণীকে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দিবার জন্য সব প্রশংসা তোমার। এরপর সে বলল, (আজ রাতেও) আমি সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দিব। সে আবারও কিছু মাল নিয়ে বের হলো। (এবারও ভুলবশতঃ) সে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) সে একজন ধনীকে দিয়ে দিলো। সকালে লোকেরা (এ নিয়ে) বলাবলি করতে লাগল, আজ রাতে একজন ধনী ব্যক্তিকে সদাক্বার মাল দেয়া হয়েছে। এ কথা শুনে সে ব্যক্তি বলতে লাগল, হে আল্লাহ! সব প্রশংসাই তোমার যদিও সদাক্বার মাল চোর, ব্যভিচারিণী ও ধনী ব্যক্তি পেয়ে গেছে। স্বপ্নে তাকে বলা হলো, সদাক্বার যে মাল তুমি চোরকে দিয়েছ, তা দিয়ে সম্ভবতঃ সে চুরি করা হতে বিরত থাকবে। তুমি ব্যভিচারিণীকে যা দিয়েছ তা দিয়ে সম্ভবত সে ব্যভিচার হতে ফিরবে। যে মাল তুমি ধনীকে দিয়েছ, সম্ভবত সে এ দান হতে শিক্ষাগ্রহণ করবে এবং আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা থেকে খরচ করবে। (বুখারী, মুসলিম; এ হাদীসের ভাষা হলো বুখারীর)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: قَالَ رَجُلٌ: لَأَتَصَدَّقَنَّ بِصَدَقَةٍ فَخَرَجَ بِصَدَقَتِهِ فَوَضَعَهَا فِي يَدِ سَارِقٍ فَأَصْبَحُوا يَتَحَدَّثُونَ تصدق عَلَى سَارِقٍ فَقَالَ اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ عَلَى سَارِقٍ لَأَتَصَدَّقَنَّ بِصَدَقَةٍ فَخَرَجَ بِصَدَقَتِهِ فَوَضَعَهَا فِي يَدي زَانِيَةٍ فَأَصْبَحُوا يَتَحَدَّثُونَ تُصُدِّقَ اللَّيْلَةَ عَلَى زَانِيَةٍ فَقَالَ اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ عَلَى زَانِيَةٍ لَأَتَصَدَّقَنَّ بِصَدقَة فَخرج بِصَدَقَتِهِ فوضعها فِي يَدي غَنِي فَأَصْبحُوا يتحدثون تصدق عَلَى غَنِيٍّ فَقَالَ اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ عَلَى سَارِق وعَلى زَانِيَة وعَلى غَنِي فَأُتِيَ فَقِيلَ لَهُ أَمَّا صَدَقَتُكَ عَلَى سَارِقٍ فَلَعَلَّهُ أَنْ يَسْتَعِفَّ عَنْ سَرِقَتِهِ وَأَمَّا الزَّانِيَةُ فَلَعَلَّهَا أَنْ تَسْتَعِفَّ عَنْ زِنَاهَا وَأَمَّا الْغَنِيُّ فَلَعَلَّهُ يَعْتَبِرُ فَيُنْفِقَ مِمَّا أَعْطَاهُ اللَّهُ . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ وَلَفظه للْبُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: যে লোকটি বলেছিল, ‘আমি দান করব’; লোকটি ছিল বানী ইসরাঈলের মধ্যকার। এই হাদীসের দ্বারা একটি বিষয় প্রতীয়মান হয় যে, পূর্বেকার উম্মাতের দীন-শারী‘আত আমাদের জন্যেও প্রযোজ্য যতক্ষণ না তা রহিত করা হবে। হাদীসের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, বানী ইসরাঈলের মাঝে কেবলমাত্র ভাল লোকের ভিতরে দান করা সীমাবদ্ধ ছিল। এজন্য হাদীসে বর্ণিত ব্যক্তিদের মাঝে দান করার কারণে তারা আশ্চর্যবোধ করেছিল। এ হাদীস দ্বারা আরো একটি বিষয় সম্পর্কে জানা যাচ্ছে যে, দানকারীর নিয়্যাত সৎ এবং ভালো হলে তার নফল দান কবূল করে নেয়া হয়, যদিও যথাস্থানে তার দান না করা হয়ে থাকে।
পরিচ্ছেদঃ ৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - দানের মর্যাদা ও কৃপণতার পরিণাম
১৮৭৭-[১৯] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেছেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এক ব্যক্তি এক বিরাণ মাঠে দাঁড়িয়ে ছিল। এমন সময় মেঘমালার মধ্যে সে একটি আওয়াজ শুনতে পেল। কেউ মেঘমালাকে বলছে, ’অমুক ব্যক্তির বাগানে পানি বর্ষণ করো।’ মেঘমালাটি সেদিকে সরে গিয়ে একটি কংকরময় ভূমিতে পানি বর্ষণ করতে লাগল। তখন দেখা গেল, ওখানকার নালাগুলোর একটি সব পানি নিজের মধ্যে পুরে নিচ্ছে। তারপর ও ব্যক্তি ওই পানির পেছনে চলতে থাকল (যেন দেখতে পায় এসব পানি যার বাগানে গিয়ে পৌঁছে সে ব্যক্তি কে?) হঠাৎ করে সে এক লোককে দেখতে পেল, যে নিজের ক্ষেতে দাঁড়িয়ে সেচনী দিয়ে (বাগানে) পানি দিচ্ছে। সে লোকটিকে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর বান্দা! তোমার নাম কি? সে ব্যক্তি বলল, আমার নাম অমুক।
এ ব্যক্তি ওই নামই বলল, যে নাম সে মেঘমালা থেকে শুনেছিল। তারপর বাগানের লোকটি জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর বান্দা! তুমি আমাকে নাম জিজ্ঞেস করছ কেন? সে বলল, এজন্য জিজ্ঞেস করছি যে, এ পানি যে মেঘমালার সে মেঘমালা থেকে আমি একটি আওয়াজ শুনেছি। কেউ বলছিল, অমুকের বাগানে পানি বর্ষণ করো। আর সেটি তোমার নাম। (এখন বলো), তুমি এ বাগান দিয়ে কি করেছ (যার দরুন তুমি এতো বড়ো মর্যাদায় অভিসিক্ত হয়েছ)। বাগানওয়ালা লোকটি বলল, ’’যেহেতু তুমি জিজ্ঞেস করছ, তাই আমি বলছি, এ বাগানে যা উৎপাদিত হয় আমি তার প্রতি লক্ষ্য রাখি। তারপর তা হতে এক-তৃতীয়াংশ আল্লাহর পথে খরচ করি, এক-তৃতীয়াংশ আমি ও আমার পরিবার খাই, অবশিষ্ট এক-তৃতীয়াংশ এ বাগানেই লাগাই। (মুসলিম)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «بَيْنَا رَجُلٌ بِفَلَاةٍ مِنَ الْأَرْضِ فَسَمِعَ صَوْتًا فِي سَحَابَةٍ اسْقِ حَدِيقَةَ فُلَانٍ فَتَنَحَّى ذَلِكَ السَّحَابُ فَأَفْرَغَ مَاءَهُ فِي حَرَّةٍ فَإِذَا شَرْجَةٌ مِنْ تِلْكَ الشِّرَاجِ قَدِ اسْتَوْعَبَتْ ذَلِكَ الْمَاءَ كُلَّهُ فَتَتَبَّعَ الْمَاءَ فَإِذَا رَجُلٌ قَائِمٌ فِي حَدِيقَتِهِ يُحَوِّلُ الْمَاءَ بِمِسْحَاتِهِ فَقَالَ لَهُ يَا عَبْدَ اللَّهِ مَا اسْمُكَ فَقَالَ لَهُ يَا عَبْدَ اللَّهِ لِمَ تَسْأَلُنِي عَنِ اسْمِي فَقَالَ إِنِّي سَمِعْتُ صَوْتًا فِي السَّحَابِ الَّذِي هَذَا مَاؤُهُ يَقُول اسْقِ حَدِيقَةَ فُلَانٍ لِاسْمِكَ فَمَا تَصْنَعُ فِيهَا قَالَ أما إِذْ قُلْتَ هَذَا فَإِنِّي أَنْظُرُ إِلَى مَا يَخْرُجُ مِنْهَا فَأَتَصَدَّقُ بِثُلُثِهِ وَآكُلُ أَنَا وَعِيَالِي ثُلُثًا وأرد فِيهَا ثلثه» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: দান করা, মিসকীন ও পথিকদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, নিজ রোযগার থেকে খাওয়া এবং তা থেকে পরিবারের জন্য খরচ করার ফাযীলাতের কথা অত্র হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - দানের মর্যাদা ও কৃপণতার পরিণাম
১৮৭৮-[২০] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেছেন। বনী ইসরাঈলের তিন ব্যক্তির একজন কুষ্ঠরোগী, একজন টাকমাথা ও তৃতীয়জন অন্ধ ছিল। আল্লাহ তা’আলা এ তিন ব্যক্তিকে পরীক্ষা করতে চাইলেন। তিনি তাদের কাছে একজন মালাক (ফেরেশতা) পাঠালেন। মালাক (প্রথমে) কুষ্ঠ রোগীর কাছে এলেন। তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ জিনিস তোমার কাছে বেশী প্রিয়? সে বলল, সুন্দর রং ও সুন্দর ত্বক। আর এ কুষ্ঠ রোগ থেকে আরোগ্য যার জন্য লোকেরা আমাকে ঘৃণা করে। (এ কথা শুনে) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, ফেরেশতা কুষ্ঠ রোগীর গায়ে হাত বুলালেন। তার রোগ ভাল হয়ে গেল। তাকে উত্তম রং ও উত্তম ত্বক দান করা হলো। তারপর মালাক তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এখন কোন সম্পদ তোমার কাছে বেশী প্রিয়? সে ব্যক্তি জবাবে উট অথবা গরুর কথা বলল। (হাদীস বর্ণনাকারী একব্যক্তি) ইসহাক্বের সন্দেহ করেছেন, ’গরুর’ কথা কুষ্ঠ রোগী বলেছিল অথবা টাকমাথাওয়ালা। (মোটকথা) এদের একজন উট চেয়েছিল। আর দ্বিতীয়জন চেয়েছিল গরু। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ এ লোকটিকে একটি দশ মাসের গর্ভবতী উট দান করা হলো। তারপর মালাক দু’আ করলেন, ’আল্লাহ তোমার ধন-সম্পদে প্রবৃদ্ধি দিন।’
তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, এরপর মালাক গেলেন টাকওয়ালার কাছে। জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ জিনিস তোমার কাছে প্রিয়তর? সে বলল, সুন্দর চুল। সেই সাথে এ টাক থেকে মুক্তি, যার জন্য লোকেরা আমাকে ঘৃণা করে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, মালাক তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে তার টাক ভাল হয়ে গেল। তাকে সুন্দর চুল দান করা হলো। এরপর মালাক তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এখন তোমার কাছে কোন্ ধন-সম্পদ অধিক প্রিয়? সে বলল, ’গরু’। তাকে একটি গর্ভবতী গাভী দেয়া হলো। মালাক বললেন, আল্লাহ তোমার ধন-সম্পদে বারাকাত দিন।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এরপর মালাক অন্ধের কাছে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে কোন্ জিনিস খুব প্রিয়? অন্ধ লোকটি বলল, আল্লাহ তা’আলা আমাকে আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলে আমি তা দিয়ে লোকজনকে দেখতে পাব। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, (তখন) মালাক তার চোখের উপর হাত বুলিয়ে দিলে আল্লাহ তাকে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলেন। তারপর মালাক জানতে চাইলেন, এখন তার কাছে কোন্ ধন-সম্পদ অত্যন্ত প্রিয়। সে বলল, ভেড়া-ছাগল তাকে একটি গর্ভবতী বকরী দান করা হলো।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, (কিছু দিন পর) কুষ্ঠ রোগী ও টাকওয়ালা অনেক উট ও গাভী এবং অন্ধ লোকটি অনেক ছাগলের মালিক হয়ে গেল। এমনকি উটে একটি ময়দান, গরুতে একটি ময়দান এবং ছাগলে একটি ময়দান ভরে গেল।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, (এরপর ওই) মালাক আবার ওই কুষ্ঠ রোগীকে পরীক্ষা করার জন্য আগের রূপ ধরে এলেন। বললেন, আমি একজন মিসকীন লোক। সফরে আমার সব সম্পদ শেষ হয়ে গেছে, তাই আজ (আমার গন্তব্যে) পৌঁছা সম্ভব হচ্ছে না। আল্লাহর রহমতে আমি তোমার কাছে সে আল্লাহর কসম দিয়ে একটি উট চাইছি, যিনি তোমার গায়ের রং ও চামড়া সুন্দর করে দিয়েছেন। তুমি আমাকে একটি উট দিলে আমি সফর শেষে গন্তব্যে পৌঁছতে পারি। কুষ্ঠ রোগীটি বলল, আমার অনেক দায়-দায়িত্ব মিসকীনরূপী, অর্থাৎ সে বাহানা করে মিসকীনটিকে (ফেরেশতাকে) এড়িয়ে যেতে চাইল। বলল, তুমি কোন উট পাবে না। মালাক বললেন, আমি তোমাকে যেন চিনেছি, তুমি কি সে কুষ্ঠ রোগী নও, যাকে লোকেরা ঘৃণা করত? তুমি মুখাপেক্ষী ও গরীব ছিলে। আল্লাহ তোমাকে (উত্তম রং ও রূপ দিয়ে) সুস্থতা দান করেছেন, মাল দিয়েছেন। কুষ্ঠরোগী বলল, তোমার কথা ঠিক নয়। এসব অর্থ-সম্পদ আমি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। মালাক বললেন, যদি তুমি মিথ্যা বলে থাকো তাহলে আল্লাহ তোমাকে তোমার সে অবস্থায় ফিরিয়ে দিন যে অবস্থায় তুমি প্রথমে ছিলে।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তারপর মালাক টাকওয়ালার কাছে স্বরূপে আবির্ভূত হলেন। আগের লোকটিকে যা বলেছিলেন তাকে তেমনটি বললেন। টাকওয়ালাও ওই জবাবই দিলো যে জবাব কুষ্ঠ রোগীটি দিয়েছিল। তারপর মালাক বললেন, তুমি মিথ্যা বলে থাকলে আল্লাহ তোমাকে যেন পূর্ব অবস্থা ফিরিয়ে দেন।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, (এরপর) মালাক অন্ধ লোকটির কাছে আবির্ভূত হলেন। তাকে বললেন, আমি একজন মিসকীন ও পথিক। আমার সফরের সব মালসামান শেষ। গন্তব্যে পৌঁছার জন্য আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কিছুই নেই। আমি তোমার কাছে ওই আল্লাহর দোহাই দিয়ে একটি বকরী চাই যিনি তোমাকে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন এবং অনেক বকরীর মালিক করেছেন। তাহলে আমি গন্তব্যে পৌঁছতে পারি। মালাকের কথা শুনেই লোকটি বলল, আমি অন্ধ ছিলাম, আল্লাহ আমাকে আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। তুমি যত চাও নিয়ে যাও, আর যা ইচ্ছা রেখে যাও। আল্লাহর কসম! (তুমি যা নিবে) তা ফেরত দেবার মতো কষ্ট আমি তোমাকে দেব না। (অন্ধের এ জবাব শুনে) মালাক বললেন, তোমার মাল তোমার কাছে থাকুক, তাতে আমার কোন প্রয়োজন নেই। তোমাকে শুধু পরীক্ষা করা হচ্ছিল (তুমি কামিয়াব হয়েছ)। আল্লাহ তোমার ওপর সন্তুষ্ট। আর তোমার অপর দু’ সাথীর ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন। (বুখারী)[1]
وَعَن أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّهُ سَمِعَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «إِنَّ ثَلَاثَة فِي بَنِي إِسْرَائِيلَ أَبْرَصَ وَأَقْرَعَ وَأَعْمَى فَأَرَادَ اللَّهُ أَنْ يَبْتَلِيَهُمْ فَبَعَثَ إِلَيْهِمْ مَلَكًا فَأَتَى الْأَبْرَصَ فَقَالَ أَيُّ شَيْءٍ أَحَبُّ إِلَيْكَ قَالَ لَوْنٌ حَسَنٌ وَجِلْدٌ حَسَنٌ وَيَذْهَبُ عَنِّي الَّذِي قَدْ قَذِرَنِي النَّاسُ» قَالَ: «فَمَسَحَهُ فَذَهَبَ عَنْهُ قَذَرُهُ وَأُعْطِيَ لَوْنًا حَسَنًا وَجِلْدًا حَسَنًا قَالَ فَأَيُّ الْمَالِ أَحَبُّ إِلَيْكَ قَالَ الْإِبِلُ - أَوْ قَالَ الْبَقر شكّ إِسْحَق - إِلَّا أَنَّ الْأَبْرَصَ أَوِ الْأَقْرَعَ قَالَ أَحَدُهُمَا الْإِبِلُ وَقَالَ الْآخَرُ الْبَقَرُ قَالَ فَأُعْطِيَ نَاقَةً عُشَرَاءَ فَقَالَ بَارَكَ اللَّهُ لَكَ فِيهَا» قَالَ: «فَأتى الْأَقْرَع فَقَالَ أَي شَيْء أحب إِلَيْك قَالَ شَعَرٌ حَسَنٌ وَيَذْهَبُ عَنِّي هَذَا الَّذِي قَدْ قَذِرَنِي النَّاسُ» . قَالَ: فَمَسَحَهُ فَذَهَبَ عَنْهُ وَأُعْطِيَ شَعَرًا حَسَنًا قَالَ فَأَيُّ الْمَالِ أَحَبُّ إِلَيْكَ قَالَ الْبَقَرُ فَأُعْطِيَ بَقَرَةً حَامِلًا قَالَ: «بَارَكَ اللَّهُ لَكَ فِيهَا» قَالَ: «فَأَتَى الْأَعْمَى فَقَالَ أَيُّ شَيْءٍ أَحَبُّ إِلَيْكَ قَالَ أَنْ يَرُدَّ اللَّهُ إِلَيَّ بَصَرِي فَأُبْصِرَ بِهِ النَّاسَ» . قَالَ: «فَمَسَحَهُ فَرَدَّ اللَّهُ إِلَيْهِ بَصَرَهُ قَالَ فَأَيُّ الْمَالِ أَحَبُّ إِلَيْكَ قَالَ الْغَنَمُ فَأُعْطِيَ شَاة والدا فأنتج هَذَانِ وَولد هَذَا قَالَ فَكَانَ لِهَذَا وَادٍ مِنِ الْإِبِلِ وَلِهَذَا وَادٍ مِنَ الْبَقَرِ وَلِهَذَا وَادٍ مِنَ الْغَنَمِ» . قَالَ: «ثُمَّ إِنَّهُ أَتَى الْأَبْرَصَ فِي صُورَتِهِ وَهَيْئَتِهِ فَقَالَ رَجُلٌ مِسْكِينٌ قَدِ انْقَطَعَتْ بِيَ الْحِبَالُ فِي سَفَرِي فَلَا بَلَاغَ لِيَ الْيَوْمَ إِلَّا بِاللَّهِ ثُمَّ بِكَ أَسْأَلُكَ بِالَّذِي أَعْطَاكَ اللَّوْنَ الْحسن وَالْجَلد الْحسن وَالْمَال بَعِيرًا أتبلغ عَلَيْهِ فِي سَفَرِي فَقَالَ الْحُقُوق كَثِيرَة فَقَالَ لَهُ كَأَنِّي أَعْرِفُكَ أَلَمْ تَكُنْ أَبْرَصَ يَقْذَرُكَ النَّاسُ فَقِيرًا فَأَعْطَاكَ اللَّهُ مَالًا فَقَالَ إِنَّمَا وَرِثْتُ هَذَا الْمَالَ كَابِرًا عَنْ كَابِرٍ فَقَالَ إِنْ كُنْتَ كَاذِبًا فَصَيَّرَكَ اللَّهُ إِلَى مَا كُنْتَ» . قَالَ: «وَأَتَى الْأَقْرَعَ فِي صُورَتِهِ فَقَالَ لَهُ مِثْلَ مَا قَالَ لِهَذَا وَرَدَّ عَلَيْهِ مِثْلَ مَا رَدَّ عَلَى هَذَا فَقَالَ إِنْ كُنْتَ كَاذِبًا فَصَيَّرَكَ اللَّهُ إِلَى مَا كُنْتَ» . قَالَ: «وَأَتَى الْأَعْمَى فِي صُورَتِهِ وَهَيْئَتِهِ فَقَالَ رَجُلٌ مِسْكِينٌ وَابْنُ سَبِيلٍ انْقَطَعَتْ بِيَ الْحِبَالُ فِي سَفَرِي فَلَا بَلَاغَ لِيَ الْيَوْمَ إِلَّا بِاللَّهِ ثُمَّ بِكَ أَسْأَلُكَ بِالَّذِي رَدَّ عَلَيْكَ بَصَرَكَ شَاةً أَتَبَلَّغُ بِهَا فِي سَفَرِي فَقَالَ قَدْ كُنْتُ أَعْمَى فَرَدَّ اللَّهُ إِلَيَّ بَصَرِي فَخُذْ مَا شِئْتَ وَدَعْ مَا شِئْتَ فَوَاللَّهِ لَا أجهدك الْيَوْم شَيْئا أَخَذْتَهُ لِلَّهِ فَقَالَ أَمْسِكْ مَالَكَ فَإِنَّمَا ابْتُلِيتُمْ فقد رَضِي عَنْك وَسخط على صاحبيك»
ব্যাখ্যা: এ হাদীস দ্বারা আল্লাহর নি‘আমাতের অকৃতজ্ঞ ব্যক্তিকে ভীতিপ্রদর্শন তার শুকরিয়া জ্ঞাপনের প্রতি অনুপ্রেরণা, নি‘আমাতের স্বীকারোক্তি এবং সে জন্য আল্লাহর প্রশংসা করতে বলা হয়েছে। অতঃপর দানের ফাযীলাত, অসহায় ব্যক্তিদের প্রতি সদয় হওয়া এবং কৃপণতার ব্যাপারে সতর্কতামূলক বিষয় নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - দানের মর্যাদা ও কৃপণতার পরিণাম
১৮৭৯-[২১] উম্মু বুজায়দ (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট নিবেদন করলাম, হে আল্লাহর রসূল! মিসকীন আমার দরজায় এসে দাঁড়ালে (এবং আমার কাছে কিছু চায়) তখন আমি খুবই লজ্জা পাই, কারণ তাকে দেবার মতো আমার ঘরে কিছু পাই না। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তার হাতে কিছু দিও, যদি তা আগুনে ঝলসানো একটি খুরও হয়। (আহমাদ, আবূ দাঊদ, তিরমিযী)[1]
وَعَن أم بجيد قَالَتْ: قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ الْمِسْكِينَ لِيَقِفُ عَلَى بَابِي حَتَّى أَسْتَحْيِيَ فَلَا أَجِدُ فِي بَيْتِي مَا أَدْفَعُ فِي يَدِهِ. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «ادْفَعِي فِي يَدِهِ وَلَوْ ظِلْفًا مُحْرَقًا» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَأَبُو دَاوُد وَالتِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: হাদীসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিসকীনকে খালি হাতে ফেরত না দিয়ে একটি পোড়া খোর হলেও দিতে বলেছেন। এর অর্থ হচ্ছে সামান্য কিছু হলেও দিতে বলেছেন। কেউ এ ব্যাপারে বলেছেন যে, পোড়া খোরও তাদের নিকট মূল্যায়িত ছিল। আল্লামা বাজী বলেছেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ হাদীস দ্বারা মিসকীনকে মুক্ত হস্তে ফেরত না দিয়ে সামান্য কিছু হলেও (যেমন পোড়া খোর) হাতে দিয়ে বিদায় করতে মানুষদেরকে অনুপ্রাণিত করেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - দানের মর্যাদা ও কৃপণতার পরিণাম
১৮৮০-[২২] ’উসমান (রাঃ)-এর আযাদকৃত গোলাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (একবার) উম্মুল মু’মিনীন উম্মু সালামাহ্ (রাঃ)-এর কাছে (রান্না করা) কিছু মাংসের টুকরা তুহফা হিসেবে এলো। এর মাংস (মাংস/গোসত) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খুব প্রিয় (খাবার) ছিল। তাই উম্মু সালামাহ্ তাঁর সেবিকাকে বললেন, এ মাংস (মাংস/গোসত) ঘরে রেখে দাও। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা হয়ত খাবেন। সেবিকা তা রেখে দিলো। এ সময়ে একজন ভিক্ষুক দরজায় দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে বলল, হে অন্তঃপুরবাসিনী! আল্লাহর পথে কিছু খরচ করো, আল্লাহ তোমাদের ধন-সম্পদে বারাকাত দেবেন। ঘরের লোকেরা বলল, আল্লাহ তোমাকে বারাকাত দান করুন (অর্থাৎ মাফ করো)। ভিক্ষুকটি (এ কথা শুনে) চলে গেল।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে ফিরে এসে বললেন, উম্মু সালামাহ্! তোমার কাছে খাবার আছে? উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) জবাব দিলেন, হ্যাঁ আছে। (এরপর) তিনি সেবিকাকে বললেন, যাও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য মাংস (মাংস/গোসত) নিয়ে এসো। সেবিকা আনতে গেল। কিন্তু সে তাদের কাছে গিয়ে হতবাক। (সে দেখল), তাদের মধ্যে একটি সাদা হাড় ছাড়া আর কিছু নেই। (এ অবস্থা দেখে) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা ভিক্ষুককে কিছুই দাওনি। তাই এ মাংস খন্ডই সাদা হাড় হয়ে গেছে। (বায়হাক্বী; এ বর্ণনাটি দালায়িলুন নুবূওয়্যাত গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন।)
وَعَن مولى لعُثْمَان رَضِي الله عَنهُ قَالَ: أُهْدِيَ لِأُمِّ سَلَمَةَ بُضْعَةٌ مِنْ لَحْمٍ وَكَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُعْجِبُهُ اللَّحْمُ فَقَالَتْ لِلْخَادِمِ: ضَعِيهِ فِي الْبَيْتِ لَعَلَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْكُلُهُ فَوَضَعَتْهُ فِي كَوَّةِ الْبَيْتِ. وَجَاءَ سَائِلٌ فَقَامَ عَلَى الْبَابِ فَقَالَ: تَصَدَّقُوا بَارَكَ اللَّهُ فِيكُمْ. فَقَالُوا: بَارَكَ اللَّهُ فِيكَ. فَذَهَبَ السَّائِلُ فَدَخَلَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «يَا أَمَّ سَلَمَةَ هَلْ عِنْدَكُمْ شَيْءٌ أَطْعَمُهُ؟» . فَقَالَتْ: نَعَمْ. قَالَتْ لِلْخَادِمِ: اذْهَبِي فَأَتَى رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِذَلِكِ اللَّحْمِ. فَذَهَبَتْ فَلَمْ تَجِدْ فِي الْكَوَّةِ إِلَّا قِطْعَةَ مَرْوَةٍ فَقَالَ النَّبِي صلى الله عَلَيْهِ وَسلم: «فَإِن ذَلِك اللَّحْمَ عَادَ مَرْوَةً لِمَا لَمْ تُعْطُوهُ السَّائِلَ» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيّ فِي دَلَائِل النُّبُوَّة
পরিচ্ছেদঃ ৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - দানের মর্যাদা ও কৃপণতার পরিণাম
১৮৮১-[২৩] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মর্যাদার দিক দিয়ে নিকৃষ্টতম ব্যক্তিকে আমি কি তোমাদেরকে চিনাব? সাহাবীগণ নিবেদন করলেন, জী হ্যাঁ, আল্লাহর রসূল! অবশ্যই। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যে ব্যক্তির কাছে আল্লাহর কসম দিয়ে কেউ কিছু চায়, আর সে তাকে কিছু দেয় না (সে সবচেয়ে নিকৃষ্ট)। (আহমাদ)[1]
وَعَن ابْن عَبَّاس رَضِي الله عَنْهُمَا قَالَتْ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِشَرِّ النَّاسِ مَنْزِلًا؟ قِيلَ: نَعَمْ قَالَ: الَّذِي يُسْأَلُ بِاللَّهِ وَلَا يُعْطِي بِهِ . رَوَاهُ أَحْمد
ব্যাখ্যা: এ হাদীসের ব্যাখ্যায় হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী বলেছেন, যখন কোন সওয়ালকারী একজন ধনবান ব্যক্তিকে তার দিকে আকৃষ্ট করে কিছু পাওয়ার জন্য আল্লাহর কসম করে আল্লাহর নামে কিছু চাইবে এবং ধনবান ব্যক্তি সওয়ালকারীর দুরাবস্থার কথা জানে আর সে দান করতে সক্ষম, এরপরও ঐ ব্যক্তিকে কিছু না দিলে সে হবে সবচেয়ে মন্দ ব্যক্তি। এখানে একটি বিষয় জেনে রাখা প্রয়োজন তা হলো সাওয়ালকারীকে কিছু না দেয়া যেমন ঠিক নয়, অনুরূপ আল্লাহর নাম নিয়ে কিছু চাওয়াও সঠিক নয়।
পরিচ্ছেদঃ ৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - দানের মর্যাদা ও কৃপণতার পরিণাম
১৮৮২-[২৪] আবূ যার গিফারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। (একবার) তিনি ’উসমানের কাছে আসার অনুমতি চাইলেন। তিনি তাঁকে অনুমতি দিলেন। তাঁর হাতে ছিল একটি লাঠি। ’উসমান (রাঃ) (ওখানে উপস্থিত) কা’বকে বললেন, কা’ব! ’আবদুর রহমান ইবনু ’আওফ (রাঃ) অনেক ধন-সম্পদ রেখে ইন্তিকাল করেছেন। এ ব্যাপারে তোমার কী অভিমত? কা’ব (রাঃ) বললেন, তিনি যদি এসবে আল্লাহর হক (যাকাত) আদায় করে থাকেন, তাহলে কোন অসুবিধা নেই। (এ কথা শুনেই) আবূ যার (রাঃ) হাতের লাঠি কা’ব-এর দিকে উঠিয়ে মারলেন এবং বললেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, (উহুদের) পাহাড় পরিমাণ সোনাও যদি আমার থাকে, আর আমি তা আল্লাহর পথে খরচ করি এবং তা কবূলও হয়, তারপরও আমি পছন্দ করব না আমার পরে ছয় উক্বিয়্যাহ্ (অর্থাৎ দু’শত চল্লিশ দিরহাম) আমার ঘরে সঞ্চিত থাকুক। এবার আবূ যার (রাঃ) (’উসমান (রাঃ কে উদ্দেশ করে বললেন,) আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, হে ’উসমান! আপনি কী রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ কথা শুনেননি? এ কথা তিনি তিনবার বললেন। ’উসমান (রাঃ) বললেন, হ্যাঁ শুনেছি। (আহমাদ)[1]
وَعَنْ أَبِي ذَرٍّ أَنَّهُ اسْتَأْذَنَ عَلَى عُثْمَانَ فَأَذِنَ لَهُ وَبِيَدِهِ عَصَاهُ فَقَالَ عُثْمَانُ: يَا كَعْبُ إِنَّ عَبْدَ الرَّحْمَنِ تُوُفِّيَ وَتَرَكَ مَالًا فَمَا تَرَى فِيهِ؟ فَقَالَ: إِنْ كَانَ يَصِلُ فِيهِ حَقَّ اللَّهِ فَلَا بَأْسَ عَلَيْهِ. فَرَفَعَ أَبُو ذَرٍّ عَصَاهُ فَضَرَبَ كَعْبًا وَقَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَا أُحِبُّ لَوْ أَنَّ لِي هَذَا الْجَبَلَ ذَهَبًا أُنْفِقُهُ وَيُتَقَبَّلُ مِنِّي أَذَرُ خَلْفِي مِنْهُ سِتَّ أَوَاقِيَّ» . أَنْشُدُكَ بِاللَّهِ يَا عُثْمَانُ أَسَمِعْتَهُ؟ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ. قَالَ: نعم. رَوَاهُ أَحْمد
ব্যাখ্যা: আবূ যার (রাঃ) সাহাবীদের মধ্যে দরিদ্র এবং দুনিয়া বিমুখ ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর মতাদর্শ ছিল যে, সম্পদ জমা করে নিজের কাছে রেখে না দিয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সবই আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে দিতে হবে। এজন্যই তিনি কা‘ব (রাঃ)-কে প্রহার করেন। অথচ যে সম্পদের যাকাত প্রদান করা হয় তা كنز (কান্য)-এর (জমা করে রাখার) অন্তর্ভুক্ত নয় এবং এর জন্য কোন ভীতিও প্রদর্শন করা হয়নি।
পরিচ্ছেদঃ ৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - দানের মর্যাদা ও কৃপণতার পরিণাম
১৮৮৩-[২৫] ’উক্ববাহ্ ইবনু হারিস (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (একদিন) আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পেছনে ’আসরের সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) আদায় করলাম। সালাম ফিরার মাত্রই তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং মানুষের ঘাড় টপকিয়ে নিজের কোন স্ত্রীর হুজরার দিকে চলে গেলেন। তাঁর এ ব্যস্ততা দেখে সাহাবীগণ ঘাবড়ে গেলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হুজরা হতে বেরিয়ে এলেন এবং সাহাবীগণকে তাঁর এ তাড়াহুড়ার জন্য বিস্মিত দেখে বললেন, আমার মনে পড়ল ঘরে কিছু সোনা রয়ে গেছে। এগুলো আমাকে (আল্লাহর নৈকট্য থেকে) দূরে রাখুক আমি পছন্দ করিনি। তাই তা বিলি-বণ্টন করে দিতে আমি বলে এসেছি। (বুখারী; বুখারীর অপর বর্ণনায় এসেছে, তিনি [নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বলেছেনঃ আমি যাকাত হিসেবে পাওয়া একটি সোনার পোটলা ঘরে রেখে এসেছি। আমি চাইনি তা একরাত আমার কাছে থাকুক।)[1]
وَعَنْ عُقْبَةَ بْنِ الْحَارِثِ قَالَ: صَلَّيْتُ وَرَاءَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالْمَدِينَةِ الْعَصْرَ فَسَلَّمَ ثُمَّ قَامَ مُسْرِعًا فَتَخَطَّى رِقَابَ النَّاسِ إِلَى بَعْضِ حُجَرِ نِسَائِهِ فَفَزِعَ النَّاسُ مِنْ سُرْعَتِهِ فَخَرَجَ عَلَيْهِمْ فَرَأَى أَنَّهُمْ قَدْ عَجِبُوا مِنْ سُرْعَتِهِ قَالَ: «ذَكَرْتُ شَيْئًا مِنْ تِبْرٍ عِنْدَنَا فَكَرِهْتُ أَنْ يَحْبِسَنِي فَأَمَرْتُ بِقِسْمَتِهِ» . رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ. وَفِي رِوَايَةٍ لَهُ قَالَ: «كُنْتُ خَلَّفْتُ فِي الْبَيْتِ تِبْرًا مِنَ الصَّدَقَةِ فَكَرِهْتُ أَنْ أبيته»
ব্যাখ্যা: সালাম ফিরানোর পর সালাতের স্থানে বসে থাকা ওয়াজিব নয়, একজন মুসল্লী সালামের পর প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক সেখান থেকে প্রস্থান করতে পারবে। সালাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, এমন কোন বিষয়ের স্মরণ করলে (বিশেষ প্রয়োজনে) সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) বাতিল হয় না। বিশেষ করে কোন ভাল জিনিসের যদি ইচ্ছে পোষণ করে তাহলে সালাতের কোন ক্ষতি করে না। হাদীসটি থেকে আরো জানা যাচ্ছে যে, ভাল কাজ দ্রুত সম্পাদন করতে হয়। কারণ এই যে, কোন আপদ-বিপদের কারণে পরে সেই কাজটি নাও হতে পারে অথবা কাজটি করার পূর্বেই আর মৃত্যুও ঘটতে পারে। আর দ্রুত সম্পাদন করতে পারলেই যিম্মাদারী থেকে মুক্ত হওয়া যায়, আল্লাহ বেশি সন্তুষ্টি হন এবং পাপ মোচনের জন্য বেশি কার্যকরী হয়।
পরিচ্ছেদঃ ৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - দানের মর্যাদা ও কৃপণতার পরিণাম
১৮৮৪-[২৬] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে আমার কাছে (’আরাবে তখনকার প্রচলিত) ছয় কি সাতটি দীনার রক্ষিত ছিল। (মৃত্যু শয্যায় থাকাকালে) তিনি আমাকে তা বণ্টন করে দেবার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু তাঁর রোগের তীব্রতার কারণে আমি ব্যস্ত থাকাতে ভুলে গেছলাম। তিনি আমাকে পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, ঐ ছয় কি সাতটি দীনার তুমি কি করেছ? আমি বললাম, এখনো বণ্টন করা হয়নি। আল্লাহর কসম! আপনার রোগযন্ত্রণা আমাকে ব্যস্ত রেখেছে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন দীনারগুলো চেয়ে নিয়ে নিজের হাতে রেখে বললেন, এ কথা কি ভাবা যায় যে, আল্লাহর নবী আল্লাহর সাথে মিলিত হবেন অথচ সে সময় তাঁর হাতে এ দীনারগুলো থেকে যাবে! (আহমাদ)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: كَانَ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عِنْدِي فِي مَرضه سِتَّةُ دَنَانِيرَ أَوْ سَبْعَةٌ فَأَمَرَنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ أُفَرِّقَهَا فَشَغَلَنِي وَجَعُ نَبِيُّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثُمَّ سَأَلَنِي عَنْهَا: «مَا فَعَلَتِ السِّتَّةُ أَوِ السَّبْعَة؟» قلت: لَا وَالله لقد كَانَ شَغَلَنِي وَجَعُكَ فَدَعَا بِهَا ثُمَّ وَضَعَهَا فِي كَفِّهِ فَقَالَ: «مَا ظَنُّ نَبِيِّ اللَّهِ لَوْ لَقِيَ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ وَهَذِهِ عِنْدَهُ؟» . رَوَاهُ أَحْمد
ব্যাখ্যা: আল্লাহর নাবীর নিকট দুনিয়ার সামগ্রী ছিল একান্তই তুচ্ছ বিষয়। সুতরাং দুনিয়ার কোন সামগ্রী অর্থ-সম্পদ তাঁর নিকট থাকবে আর সে অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হবে এটা ছিল তাঁর নিকটে নিতান্তই অপছন্দের।
পরিচ্ছেদঃ ৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - দানের মর্যাদা ও কৃপণতার পরিণাম
১৮৮৫-[২৭] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (একদিন) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিলাল-এর নিকট এলেন। তখন তাঁর কাছে খেজুরের বড় স্তূপ। তিনি বিলালকে জিজ্ঞেস করলেন, বিলাল এসব কী? বিলাল বললেন, এসব আমি (ভবিষ্যতের জন্য) জমা করে রেখেছি। (এ কথা শুনে) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ কাল কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন এতে তুমি জাহান্নামের তাপ অনুভবকে কী ভয় করছ না? বিলাল! এসব তুমি দান করে দাও। ’আরশের মালিক-এর কাছে ভূখা নাঙা থাকার ভয় করো না।[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دَخَلَ عَلَى بِلَالٍ وَعِنْدَهُ صُبْرَةٌ مِنْ تَمْرٍ فَقَالَ: «مَا هَذَا يَا بِلَالُ؟» قَالَ: شَيْءٌ ادَّخَرْتُهُ لِغَدٍ. فَقَالَ: «أَمَا تَخْشَى أَنْ تَرَى لَهُ غَدًا بخارا فِي نَار جَهَنَّمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَنْفِقْ بِلَالُ وَلَا تَخْشَ من ذِي الْعَرْش إقلالا»
ব্যাখ্যা: পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততি এবং অসহায় ও দুর্বল ব্যক্তিদের জন্য কিছু সম্পদ আগামী দিনের জন্য সঞ্চয় করে রাখা একদম নাজায়িয নয়। কিন্তু অত্র হাদীসে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করীম বিলাল (রাঃ)-কে সবটুকু খরচের নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে বিলাল (রাঃ) মানাবীয় গুণাবলীর সর্বোচ্য স্তরে পৌঁছতে পারে।
পরিচ্ছেদঃ ৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - দানের মর্যাদা ও কৃপণতার পরিণাম
১৮৮৬-[২৮] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জান্নাতে ’সাখাওয়াত’ (দানশীলতা নামে) একটি বৃক্ষ আছে। (দুনিয়াতে) যে ব্যক্তি দানশীল হবে, সে (আখিরাতে) এ বৃক্ষের ডাল আঁকড়ে ধরবে। আর সে ডাল তাকে জান্নাতে প্রবেশ না করানো পর্যন্ত ছাড়বে না। জাহান্নামেও ’বুখালাত’ (কৃপণতা নামে) একটি গাছ আছে। যে ব্যক্তি (দুনিয়াতে) কৃপণ হবে, সে (আখিরাতে) সে গাছের ডাল আঁকড়ে ধরবে। এ ডাল তাকে জাহান্নামে পৌঁছানো না পর্যন্ত ছেড়ে দেবে না। (এ দু’টি বর্ণনা ইমাম বায়হাক্বী শু’আবুল ঈমানে উদ্ধৃত করেছেন)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «السَّخَاءُ شَجَرَةٌ فِي الْجَنَّةِ فَمَنْ كَانَ سَخِيًّا أَخَذَ بِغُصْنٍ مِنْهَا فَلَمْ يَتْرُكْهُ الْغُصْنُ حَتَّى يُدْخِلَهُ الْجَنَّةَ. وَالشُّحُّ شَجَرَةٌ فِي النَّارِ فَمَنْ كَانَ شَحِيحًا أَخَذَ بِغُصْنٍ مِنْهَا فَلَمْ يَتْرُكْهُ الْغُصْنُ حَتَّى يُدْخِلَهُ النَّارَ» . رَوَاهُمَا الْبَيْهَقِيُّ فِي شعب الْإِيمَان
ব্যাখ্যা: হাদীসের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, দানশীলতা সবল ঈমানের প্রমাণ করে। আর তা এজন্য যে, দানকারী বিশ্বাস পোষণ করে যে, রিযক্বের মালিক একমাত্র আল্লাহ। আর যে এই মূলনীতিতে বিশ্বাসী আল্লাহ তাকে জান্নাতে পৌঁছিয়ে দেন। অন্যদিকে কৃপণতা হচ্ছে দুর্বল ঈমানের পরিচায়ক, রিযক্বের মালিক আল্লাহ এ ব্যাপারে আস্থাবান না হওয়ার কারণে, আর আস্থাশীল না হওয়াটাই তাকে অবমাননাকর স্থলে নিয়ে যায়। অত্রএব, হাদীসে দান ও দানকারীর ফাযীলাত বর্ণনা এবং কৃপণতা ও কৃপণের দোষারোপ করা হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - দানের মর্যাদা ও কৃপণতার পরিণাম
১৮৮৭-[২৯] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর পথে খরচ করার ব্যাপারে তাড়াতাড়ি করবে (অর্থাৎ মৃত্যু অথবা রোগ-শোক হবার আগে)। কারণ দান সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করলে বালা-মুসীবাত বৃদ্ধি পায় না (অর্থাৎ দান সদাক্বায় বালা-মুসীবাত দূর হয়)। (রযীন)[1]
وَعَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «بَادِرُوا بِالصَّدَقَةِ فَإِنَّ الْبَلَاءَ لَا يَتَخَطَّاهَا» . رَوَاهُ رَزِينٌ
ব্যাখ্যা: আল্লামা ত্বীবী বলেছেনঃ দান-খয়রাতকে দানকারীর জন্য পর্দা বা আড় স্বরূপ করে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ দানের কারণে দানকারীর নিকট বিপদাপদ পৌঁছতে পারে না, দান তা প্রতিরোধ করে।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৮৮৮-[১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি বৈধভাবে অর্জিত সম্পদ থেকে একটি খেজুর সমান সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করে এবং আল্লাহ তা’আলা বৈধ ব্যতীত কোন কিছু কবূল করেন না। তাই বৈধ সম্পদ থেকে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করলে আল্লাহ তা’আলা তা’ ডান হাতে কবূল করেন। অতঃপর এ সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দানকারীর জন্য এভাবে লালন-পালন করেন যেভাবে তোমরা ঘোড়ার বাছুর লালন-পালন করে থাকে। এমনকি এ সদাক্বাহ্ (সাদাকা) অথবা এর সাওয়াব একসময় পাহাড়ের মতো হয়ে যায়। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ فَضْلِ الصَّدَقَةِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ تَصَدَّقَ بِعَدْلِ تَمْرَةٍ مِنْ كَسْبٍ طَيِّبٍ وَلَا يَقْبَلُ اللَّهُ إِلَّا الطَّيِّبَ فَإِنَّ اللَّهَ يَتَقَبَّلُهَا بِيَمِينِهِ ثُمَّ يُرَبِّيهَا لِصَاحِبِهَا كَمَا يُرَبِّي أَحَدُكُمْ فَلُوَّهُ حَتَّى تَكُونَ مِثْلَ الْجَبَل»
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসটিতে কবূল করা হবে না দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সাওয়াব দেয়া হবে না।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৮৮৯-[২] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দান সদাক্বাহ্ (সাদাকা) ধন-সম্পদ কমায় না। যে ব্যক্তি কারো অপরাধ ক্ষমা করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। আর যে শুধু আল্লাহরই জন্য বিনয় প্রকাশ করে আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ فَضْلِ الصَّدَقَةِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا نقصت صَدَقَة من مَال شَيْئا وَمَا زَادَ اللَّهُ عَبْدًا بِعَفْوٍ إِلَّا عِزًّا وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلَّا رَفَعَهُ اللَّهُ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: (مَا نقصت صَدَقَة) ‘সদাক্বাহ্ (সাদাকা) ব্যক্তির সম্পদে কোন ঘাটতি আনে না’ এর অর্থ হচ্ছে সদাক্বার কারণে সম্পদের কোনই কমতি আসে না বরং তা আরো বৃদ্ধি পায় এভাবে যে, দুনিয়াতে অদৃশ্য বারাকাত ও পূর্ণ বিনিময় দেয়া এবং আখিরাতে পূর্ণ সাওয়াব দানের মাধ্যমে তার ঘাটতি পূর্ণ করে দেয়া হয়।
(وَمَا زَادَ اللّهُ عَبْدًا بِعَفْوٍ إِلَّا عِزًّا) প্রথমতঃ অর্থাৎ যদি কোন ব্যক্তি অপর কোন ব্যক্তিকে অত্যাচার করে এবং অত্যাচারিত ব্যক্তি যালিমের নিকট থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তাকে তিনি মাফ করে দেন তাহলে স্বয়ং আল্লাহ তার (মাযলূমের) গুনাহ মাফ করে দেন এবং এর জন্য তাকে দুনিয়ায় সম্মান বাড়িয়ে দেন। কেননা যিনি ক্ষমাকারী হিসেবে পরিচিত হন এবং তার অন্তকরণে নিজের সম্পর্কে এক দৃঢ় আত্মবিশ্বাস জন্মে।
দ্বিতীয়তঃ আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে সাওয়াব এবং বিনিময় পাওয়ার মাধ্যমে আখিরাতে তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
তৃতীয়তঃ অথবা আল্লাহ তা‘আলা তাকে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে মর্যাদা দান করবেন।
(وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلّهِ) এর অর্থ হলো ব্যক্তি তার নিজেকে তার স্বীয় মর্যাদা যার সে হকদার সে মারতাবা বা মর্যাদা থেকে শুধু মহান আল্লাহকে খুশি করার উদ্দেশ্যেই নীচে নামিয়ে রাখে।
(إِلَّا رَفَعَهُ اللّهُ) অর্থাৎ ব্যক্তির অবস্থা যখন উপরোক্ত অবস্থা হয় তখন আল্লাহ তা‘আলা তার সম্মানকে বাড়িয়ে দেন। দুনিয়াতে তার বিনয়ীতার জন্য মানব মনে তার প্রতি এর দূরবিনীত মহাববত পয়দা করে দেন এবং আখিরাতে তার জন্য অফুরন্ত সাওয়াব নির্ধারণ করে।
আল্লামা ত্বীবী বলেন, ‘মানুষের সৃষ্টিগত একটি অভ্যাস হলো কৃপণতা এবং ক্রোধ ও প্রতিশোধপ্রবণ হয়ে ওঠা, এ সবই শায়ত্বনী কর্মকান্ডের অন্তর্গত। তাই যাতে করে ঐ মানুষটি তার এই খারাপ অভ্যাস থেকে পুরোপুরি বিরত থেকে বদান্যতা ও সৌহার্দ্যের গুণে গুণান্বিত হয় সে লক্ষ্যে অত্র হাদীসে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বাগ্রে তাকে ‘সদাক্বাহ্ (সাদাকা)’ করার প্রতি উৎসাহ জুগিয়েছেন।
দ্বিতীয়তঃ তাকে ক্ষমার প্রতি উৎসাহিত করেছেন যাতে করে সে সহনশীলতা এবং স্থির চিন্তার মাধ্যমে সম্মানিত হতে পারে।
তৃতীয়তঃ তাকে বিনয়ী হওয়ার প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন যাতে করে মহান আল্লাহ উভয় জগতে তার মর্যাদাকে সমুন্নত করেন।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৮৯০-[৩] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি নিজের ধন-সম্পদ হতে কোন জিনিস এক জোড়া (দু’ গুণ) আল্লাহর পথে সন্তুষ্টির জন্য সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করবে, জান্নাতের সবগুলো দরজা দিয়ে তাকে সাদর সম্ভাষণ জানানো হবে। আর জান্নাতের অনেক (আটটি) দরজা আছে। যে ব্যক্তি সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) আদায়কারী হবে, তাকে ’বাবুস্ সালাত’ হতে ডাকা হবে। যে আল্লাহর পথে জিহাদ করবে, তাকে ডাকা হবে ’বাবুল জিহাদ’ হতে। দান সদাক্বাকারীকে ডাকা হবে ’বাবুস্ সদাক্বাহ্’ দিয়ে। যে ব্যক্তি সায়িম (রোযাদার) হবে, তাকে ’বাবুর রাইয়্যান’ দিয়ে ডাকা হবে। এ কথা শুনে আবূ বকর (রাঃ) জানতে চাইলেন, যে ব্যক্তিকে এসব দরজার কোন একটি দিয়ে ডাকা হবে তাকে কি অন্য সকল দরজা দিয়ে ডাকার প্রয়োজন হবে? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হ্যাঁ! (হবে) আর আমি আশা করি তুমি তাদেরই একজন হবে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ فَضْلِ الصَّدَقَةِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ أَنْفَقَ زَوْجَيْنِ مِنْ شَيْءٍ مِنَ الْأَشْيَاءِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ دُعِيَ مِنْ أَبْوَاب الْجنَّة واللجنة أَبْوَابٌ فَمَنْ كَانَ مِنْ أَهْلِ الصَّلَاةِ دُعِيَ مِنْ بَابِ الصَّلَاةِ وَمَنْ كَانَ مِنْ أَهْلِ الْجِهَاد دعِي من بَاب الْجِهَاد وَمن كَانَ مَنْ أَهْلِ الصَّدَقَةِ دُعِيَ مِنْ بَابِ الصَّدَقَةِ وَمَنْ كَانَ مِنْ أَهْلِ الصِّيَامِ دُعِيَ مِنْ بَابِ الرَّيَّانِ» . فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ: مَا عَلَى مَنْ دُعِيَ مِنْ تِلْكَ الْأَبْوَابِ مِنْ ضَرُورَةٍ فَهَلْ يُدْعَى أَحَدٌ مِنْ تِلْكَ الْأَبْوَابِ كُلِّهَا؟ قَالَ: «نعم وَأَرْجُو أَن تكون مِنْهُم»
ব্যাখ্যা: (مَنْ أَنْفَقَ زَوْجَيْنِ) অর্থাৎ দু’টি জিনিস। হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, (الزوج) শব্দটি যেমনিভাবে একটি জিনিস বুঝাতে ব্যবহৃত হয় ঠিক তেমনিভাবে দু’টির ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়। তবে অত্র হাদীসে একটি বিষয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।
‘মাজমা‘উল বিহার’ গ্রন্থ প্রণেতা বলেন, الزوج خلاف الفرد তথা ‘আরাবীতে زوج (যুগল) বলতে فرد (একক) এর বিপরীত জিনিসকে বলা হয় এবং অত্র হাদীসে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উদ্দেশ্য হলো প্রতিটি জিনিসের জোড়া যদি তা দিরহাম হয় তাহলে দু’টি দিরহাম যদি দীনার হয় তাহলে দু’টি দীনার আর যদি তরবারি হয় তাহলে দু’টি তরবারি ইত্যাদি।
কোন কোন বিদ্বান এই প্রসঙ্গে এ কথাও বলেছেন যে, হাদীসের দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে বারবার খরচ করা একের পর এক খরচ করা, কেননা কেউ যদি একবার খরচ করার পর আরেকবার খরচ করেন তাহলে তা জোড়া হয়ে যায়।
ক্বাযী ‘আয়ায বলেন, ‘আল্লামা আবূ ইসমা‘ঈল আল হুরবী বলেছেন, অত্র হাদীসে জোড়া দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যুগল সেটা হতে পারে দু’টি ঘোড়া অথবা দু’টি দাস অথবা দু’টি উট।
ইবনু ‘আরাফাহ্ বলেন, প্রতিটি জিনিস তাকে যদি তার সাথীর সাথে মিলিয়ে দেয়া যায় তাহলে তা যুগলে রূপ নেয়। যেমনঃ বলা হয়ে থাকে ‘আমি উটের মাঝে যুগল সৃষ্টি করেছি’। যখন একটি উটের সাথে আরো একটি উটকে মিলিয়ে দেয়া হয় তথন এ কথা বলা হয়। তিনি আরো বলেন, زوج তথা যুগল শব্দটি প্রকার বুঝাতেও ব্যবহৃত হয়। যেমনঃ আল্লাহ তা‘আলার বাণীঃ وَكُنْتُمْ أَزْوَاجًا ثَلَاثَةً
‘‘আর তোমরা হবে তিন অংশে বিভক্ত।’’ (সূরাহ্ আল ওয়াক্বি‘আহ্ ৫৬ : ৭)
তবে অত্র হাদীসে زوج দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, দান-সদাক্বাকে একটির মাধ্যমে অপরটিকে সংশ্লিষ্ট করে জোড় বানানো এবং বেশী বেশী সদাক্বার প্রতি উৎসাহিত করা। (فِي سَبِيلِ اللّهِ) অর্থাৎ আল্লাহর নিকট থেকে বিনিময় পাওয়ার আশায়। سَبِيلِ اللّهِ বা আল্লাহর রাস্তা বলতে ‘জিহাদসহ সকল প্রকার ‘ইবাদাতকে বুঝা যায়। কোন কোন বিদ্বান বলেছেন, سَبِيلِ اللّهِ দ্বারা শুধুমাত্র জিহাদকেই বুঝানো হয়। তবে প্রথম মতই সর্বাধিক সহীহ যেমনটি মত পোষণ করেছেন কাযী ‘আয়ায (রহঃ)।
(فَمَنْ كَانَ مِنْ أَهْلِ الصَّلَاةِ) অর্থাৎ সমুদয় ফরয অদায় করতঃ নফলও অদায় করেছেন এমন বান্দা।
(دُعِيَ مِنْ بَابِ الصَّدَقَةِ) অর্থাৎ বলা হবে, হে আল্লাহর বান্দা! তুমি এ দরজা দিয়ে প্রবেশ কর। হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, ‘অত্র হাদীসের অর্থ হলো, যদি আসলেই বান্দা ঐ ‘আমল করে থাকে তাহলে তাকে সে দরজা দিয়েই আহবান করা হবে যেমন অপর একটি সহীহ হাদীসে এসেছে, যা ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল ও ইবনু আবী শায়বাহ্ সহীহ সানাদে বর্ণনা করেছেন।
আল্লামা সিনদী (রহঃ) সহীহ মুসলিমের টীকায় বলেন, ‘রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা (فَمَنْ كَانَ مِنْ أَهْلِ الصَّلَاةِ) হাদীসের শেষ পর্যন্ত এ বর্ণনা থেকে বুঝা যায়, যারা আল্লাহর পথে দু’টি জিনিস ব্যয় করবেন তাদেরকে জান্নাতে আহবান করা হবে একটি দরজা দিয়ে আর সে দরজাটি হলো যেটি আল্লাহর পথে ব্যয় করার প্রেক্ষক্ষতে প্রাধান্য পেয়েছে। অপরদিকে আল্লাহর পথে খরচ করার সম্মান স্বরূপ খরচকারীকে আহবান করে জান্নাতে প্রবেশ করানো। যদি তা না হয় তাহলে হাদীসের সঠিক মর্মার্থ প্রকাশ হবে না যেহেতু এখানে ব্যক্তি তার ‘আমলের উপর ভিত্তি রেখেই তো জান্নাতে যেতে পারছে। তবে বিষয়টি একটু বিস্তারিত বিবরণের দাবীদার যা নিম্নে আসছে। আর তা হলো, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা (فَمَنْ كَانَ مِنْ أَهْلِ الصَّلَاةِ) এখান থেকে শেষ পর্যন্ত কথার সাথে আবূ বাকর (রাঃ)-এর প্রশ্নের মিল রয়েছে।
অপরদিকে আহবানকে প্রত্যেক দরজা দিয়ে আহবান হিসেবে গ্রহণ আর (فَمَنْ كَانَ مِنْ أَهْلِ الصَّلَاةِ) যারা মুসল্লী হবেন তাকে সালাতের দরজা দিয়ে ডাকা হবে আর যারা মুজাহিদ হবেন তাদেরকে জিহাদের দরজা দিয়ে ডাকা হবে ইত্যাদি শেষ পর্যন্ত কথাগুলোকে منفق زوجين তথা দু’টি যুগল খরচকারী থেকে পৃথক করে এ কথা বলা যে, এগুলো হলো জান্নাতের দরজা এবং তার অধিবাসীদের বিবরণ মাত্র। এ ব্যাখ্যা ভুল ব্যাখ্যা।
আল্লামা সিনদী (রহঃ) যা বলতে চেয়েছেন তার সার-সংক্ষেপ হলো, অত্র হাদীসে (المنفق في سبيل الله) তথা আল্লাহর পথে দু’টি জিনিস খরচকারীকে أبواب الجنة তথা জান্নাতের সকল দরজা নিয়ে ডাকার কথা বর্ণিত হয়েছে এবং অন্য রিওয়ায়াতে তথা আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)-এর রিওয়ায়াতে সহীহুল বুখারী এবং মুসলিমে আছে প্রত্যেক শ্রেণীভুক্ত ‘আমলকারীকে ঐ শ্রেণীর দরজা দিয়ে ডাকা হবে তার মানে এক দরজা দিয়ে ডাকা হবে। এক রিওয়ায়াতে আসলো সব দরজার কথা আর অন্য রিওয়ায়াতে আসলো এক দরজার কথা, অতএব বাহ্যিক দৃষ্টিতে রিওয়ায়াত দু’টি পরস্পর সাংঘর্ষিক। তাই এ সংঘর্ষ পূর্ণ রিওয়ায়াতের সমাধাকল্পে তিনি বলেন,
১। এখানে বিরোধটি হয়েছে কোন রাবীর ভুলের কারণে
২। এখানে মূলত দু’টি বৈঠকে দু’রকম ঘটনার প্রেক্ষক্ষতে আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’রকম কথা বলেছেন। যা তাকে ওয়াহীর মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রথমবার এক দরজার কথা আর দ্বিতীয়বার সব দরজার কথা। (আল্লাহই ভাল জানেন)
(وَمَنْ كَانَ مِنْ أَهْلِ الْجِهَاد) অর্থাৎ যার উপর জিহাদের ‘আমল প্রাধান্য পাবে।
(وَمن كَانَ مَنْ أَهْلِ الصَّدَقَةِ) অর্থাৎ সদাক্বাহ্ (সাদাকা) বেশী বেশী প্রদানকারী।
(وَمَنْ كَانَ مِنْ أَهْلِ الصِّيَامِ) অর্থাৎ যার ক্ষেত্রে সাওমের ‘আমলটি প্রাধান্য পাবে। তাকে রাইয়্যান নামক দরজা দিয়ে আহবান করা হবে।
রাইয়্যান হলো জান্নাতের একটি দরজার নাম যা শুধুমাত্র সায়িমদের (রোযাদারদের) জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যার অর্থ হলো পিপাসা মিটে তৃপ্ত হওয়া। দরজাটি সায়িমদের জন্য হওয়াটা বেশ উপযুক্ত, কেননা তারা দুনিয়াতে সিয়ামের মাধ্যমে নিজেদেরকে পিপাসার্ত রাখতো, তাই রাইয়্যান নামক দরজা দিয়ে প্রবেশ করার মাধ্যমে পিপাসার কষ্ট থেকে চিরতরে মুক্তি লাভ করবেন।
হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, হাদীসখানার মধ্যে জান্নাতের দরজাসূমহের চারটি দরজার কথা বর্ণিত হয়েছে অথচ আরেকটি সহীহ হাদীসের মাধ্যমে জান্নাতের দরজা আটটি সাব্যস্ত আছে। অতএব আর বাকী চারটি তাহলে কোথায়? এর উত্তরে তিনি বলেন, একটি হলো হাজ্জের (হজ্জের/হজের) দরজা। অপর তিনটির একটি হলো (الكاظمين الغيظ والعافين عن الناس) তথা রাগ সংবরণকারীর এবং মানুষকে ক্ষমাকারীর দরজা যেটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে।
দ্বিতীয় আরেকটি দরজার নাম হলো ‘বাবুল আয়মান’ আর তা হলো আল্লাহর ওপর ভরসাকারীদের দরজা।
তৃতীয় আরেকটি দরজা আছে সম্ভবত সেটি হচ্ছে (ذكر) যিকরকারীদের দরজা এবং সেটি ‘ইলমের দরজা হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। এটিও সম্ভাবনা রয়েছে যে, এখানে ডাকার জন্য যে দরজার কথা বলা হয়েছে মূলত সেগুলো জান্নাতের অভ্যন্তরেই রয়েছে। কেননা জান্নাত হলো আটটি অপরদিকে জান্নাতে প্রবেশের সৎ ‘আমল আটটির অনেক বেশী।
ক্বাযী ‘আয়ায (রহঃ) আলোচনা করেছেন যে, বাকী জান্নাতগুলোর কথা বর্ণিত হয়েছে অপর একটি হাদীসে-
১। তাওবাকারীদের জন্য ২। ক্রোধ সংবরণকারীদের জন্য এবং মানুষকে ক্ষমাকারীদের জন্য ৩। আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট এমন ব্যক্তিদের জন্য। অতএব, পূর্বোক্ত চারটি এবং এ তিনটি মিলে হলো সর্বমোট সাতটি আর আট নম্বরটি এসেছে ‘বাবুল আয়মান’ নামে ঐ ৭০ হাজার ব্যক্তিদের জন্য যারা বিনা হিসাবে জান্নাতে যাবে।
(مَا عَلى مَنْ دُعِيَ مِنْ تِلْكَ الْأَبْوَابِ مِنْ ضَرُورَةٍ) অর্থাৎ জরুরী এবং প্রয়োজন নয় যে, যাকে একটি দরজা দিয়ে আহবান করা হলো সবগুলো দরজার মধ্যে জান্নাতে প্রবেশের উদ্দেশে। আবূ বাকর (রাঃ)-এর কথাটি পরবর্তী প্রশ্নের কথার পটভূমি।
(فَهَلْ يُدْعى أَحَدٌ مِنْ تِلْكَ الْأَبْوَابِ) অর্থাৎ আমি এ কথা জানার পরেও এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলাম কারণ একটি দরজা দিয়ে আহবান করার তার জান্নাতে যাওয়ার উদ্দেশ্য ও আশা পূর্ণ হওয়ার পরে আর কোন দরজা দিয়ে ডাকার কোন প্রয়োজন নেই।
(قَالَ: نعم) অর্থাৎ তারপরও রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বললেন, হ্যাঁ একটি দল এমন হবে যাদেরকে জান্নাতের প্রতিটি দরজা দিয়ে আহবান করা হবে। তাদের সম্মান এবং অতিরিক্ত মর্যাদার কারণে এই প্রেক্ষক্ষতে যে, কল্যাণের সালাত (সালাত/নামায/নামাজ), সওম, জিহাদসহ কল্যাণের প্রতিটি স্তরে তাদের অধিক ‘আমল রয়েছে। হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, সব দরজা দিয়ে ডাকা হবে এমন ব্যক্তির সংখ্যা কমই হবে উক্ত হাদীসে এ দিকে ইঙ্গিত রয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৮৯১-[৪] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন সাহাবীগণকে উদ্দেশ্য করে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের কে আজ সওম রেখেছ? আবূ বকর (রাঃ) উত্তর দিলেন, আমি। তিনি বললেন, আজ কে জানাযার সাথে গিয়েছ? আবূ বকর (রাঃ) বললেন, আমি। তিনি বললেন, তোমাদের কে আজ মিসকীনকে খাবার দিয়েছ? আবূ বকর (রাঃ) জবাবে বললেন, আমি। তিনি বললেন, আজ তোমাদের কে অসুস্থকে দেখতে গিয়েছ? আবূ বকর (রাঃ) বললেন, আমি। এ কথা শুনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ (শুনে রাখো) যে ব্যক্তির মধ্যে এতো গুণের সমাহার, সে জান্নাতে প্রবেশ করবেই। (মুসলিম)[1]
بَابُ فَضْلِ الصَّدَقَةِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ أَصْبَحَ مِنْكُمُ الْيَوْمَ صَائِمًا؟» قَالَ أَبُو بكر: أَنا قَالَ: «فن تَبِعَ مِنْكُمُ الْيَوْمَ جِنَازَةً؟» قَالَ أَبُو بَكْرٍ: أَنَا. قَالَ: «فَمَنْ أَطْعَمَ مِنْكُمُ الْيَوْمَ مِسْكِينًا؟» قَالَ أَبُو بَكْرٍ: أَنَا. قَالَ: «فَمَنْ عَادَ مِنْكُمُ الْيَوْمَ مَرِيضًا؟» . قَالَ أَبُو بَكْرٍ: أَنَا. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا اجْتَمَعْنَ فِي امْرِئٍ إِلَّا دَخَلَ الْجَنَّةَ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: (قَالَ أَبُو بكر: أَنا) আল্লামা ত্বীবী (রহঃ)-এর মতামতের সারসংক্ষেপ এই যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপর এক হাদীসে যেটি জাবির (রাঃ)-এর সাথে সংশ্লিষ্ট সেখানে তিনি তাকে (أَنا) তথা প্রশ্নের জবাবে ‘আমি’ ‘আমি’ বলে উত্তর দিতে নিষেধ করেছেন, তবে অত্র হাদীসে আবূ বাকর (রাঃ) প্রশ্নের উত্তরে আমি তথা (أَنا) শব্দ ব্যবহার করেছেন তাহলে কি আবূ বাকর (রাঃ) ভুল করলেন? উত্তর হলো না তিনি ভুল করেননি। তিনি নিজের অহমিকা প্রদর্শনার্থে (أَنا) বা আমি বলেননি যা ছিল নিষিদ্ধ বরং উপস্থিত লোকদের মাঝে যেন নির্দিষ্টভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারেন সেজন্যই কেবল (أَنا) বা আমি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।
(مَا اجْتَمَعْنَ) অর্থাৎ উপরোক্ত চারটি বৈশিষ্ট্য একই দিনে যার অর্জন হবে।
(فِي امْرِئٍ إِلَّا دَخَلَ الْجَنَّةَ) অর্থাৎ তিনি জান্নাতে প্রবেশ করবেন বিনা হিসাবে। নতুবা শুধু ঈমানই জান্নাতে প্রবেশের জন্য যথেষ্ট ছিল। অথবা অর্থটা এমন হবে যে, তিনি যে কোন দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেন।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৮৯২-[৫] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হে মুসলিম মহিলারা! তোমরা এক প্রতিবেশী আর এক প্রতিবেশীকে তুহফা দেয়া ছোট করে দেখো না। তা বকরীর খুর হলেও। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ فَضْلِ الصَّدَقَةِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَا نِسَاءَ الْمُسْلِمَاتِ لَا تَحْقِرَنَّ جَارَةٌ لِجَارَتِهَا وَلَوْ فِرْسِنَ شَاةٍ»
ব্যাখ্যা: (لَا تَحْقِرَنَّ) যেন তুচ্ছ মনে না করে যদিও একটি কম গোশ্ত (গোশত/গোস্ত/গোসত) বিশিষ্ট হাড্ডি হাদিয়্যাহ্ দেয়। মূলত এ কথার মাধ্যমে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিয়্যাহ্ দেয়ার প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। কারণ কিছু না দেয়ার চেয়ে অল্প কিছু দেয়া নিঃসন্দেহে উত্তম।
আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) এর মূল্যবান মতামতের সারসংক্ষেপঃ
এখানে মূলত নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরস্পর হাদিয়্যাহ্ দেয়ার মাধ্যমে মহব্বত, সম্প্রীতি বৃদ্ধি করতে বলেছেন যদিও সেটি নগণ্য কোন জিনিসের মাধ্যমে হয় এবং ধনী গরীবের মধ্যে কোনরূপ পার্থক্য করবে না। হাদীসটিতে নারী জাতিকে উদ্দেশ্য করে বলার কারণ হলো তারা বিদ্বেষপরায়ণতা ও মহাব্বতের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৮৯৩-[৬] জাবির (রাঃ) ও হুযায়ফাহ্ (রাঃ) একত্রে বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রত্যেক নেক কাজই সদাক্বাহ্ (সাদাকা)। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ فَضْلِ الصَّدَقَةِ
وَعَنْ جَابِرٍ وَحُذَيْفَةَ قَالَا: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «كُلُّ مَعْرُوف صَدَقَة»
ব্যাখ্যা: (كُلُّ مَعْرُوْف صَدَقَة) অর্থাৎ প্রতিটি ভাল কাজের কারণে সদাক্বার সম সাওয়াব বা বিনিময় পাওয়া যাবে। ভাল কাজের সংজ্ঞায় ইমাম রাগিব (রহঃ) বলেছেনঃ ভাল কাজ ঐ সব কাজগুলোকে বলে যার সুন্দর হওয়ার দিকটি শারী‘আত এবং বিবেক উভয়টির মাধ্যমেই পরিস্ফুটিত হয়। অপচয়, অপব্যয় থেকে নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষিতে মধ্যমপন্থা অবলম্বনও সৎ কাজ হিসেবে পরিগণিত হয়।
ইবনু আবী জামরাহ্ (রহঃ) বলেন, শারী‘আতের দলীলসমূহের মাধ্যমে যেসব কাজ সৎ কাজ হিসেবে স্বীকৃত সেগুলোই সৎ কাজ যদিও বিবেক সেটা অনুধাবন না করতে পারে এবং তিনি আরো বলেন, হাদীসখানাতে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো বিনিময়। সুতরাং কেউ যদি ভাল কাজ করার সময় সাওয়াবের নিয়্যাত করে থাকে তাহলে তাকে প্রতিদান দেয়া হবে আর যদি নিয়্যাত না করে তাহলে সাওয়াব হবে কি না এ ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে এবং তিনি আরো বলেন, এ কথা থেকে আমরা আরো ইঙ্গিত পাই যে, সদাক্বাহ্ (সাদাকা) বলতে প্রচলিত যে চিত্র আমরা দেখি তা ছাড়াও সদাক্বার অন্যান্য বহুদিক রয়েছে অর্থাৎ বিষয়টি একটু ব্যাপক।
ইবনু বাত্তাল (রহঃ) বলেন, হাদীসটি প্রমাণ করে যাবতীয় কল্যাণকর কাজ যা কোন ব্যক্তি সম্পন্ন করে এগুলো তার জন্য সদাক্বার সমপরিমাণ সাওয়াব বহন করে। অপর একটি হাদীসে অতিরিক্ত এসেছে অকল্যাণকর কাজ থেকে বিরত থাকাও সদাক্বাহ্ (সাদাকা) হিসেবে গণ্য হবে।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৮৯৪-[৭] আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা কোন নেক কাজকে ছোট ভেবো না, যদিও তা তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিখুশী মুখে সাক্ষাৎ করা হয়। (মুসলিম)[1]
بَابُ فَضْلِ الصَّدَقَةِ
وَعَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تَحْقِرَنَّ مِنَ الْمَعْرُوفِ شَيْئًا وَلَوْ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ بِوَجْهٍ طليق» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: (شَيْئًا وَلَوْ أَنْ تَلْقى أَخَاكَ بِوَجْهٍ طليق) অর্থাৎ হাস্যোজ্জ্বল চেহারা নিয়ে তথা ভাল কাজ কম হোক বা বেশী তা করে যাও যদিও তা এমন হয় যে, তুমি তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ কর। কেননা হাসিমুখে সাক্ষাৎ করাটা ভাইয়ের অন্তকরণে আনন্দ পৌঁছায়। আর অপর কোন মুসলিমের অন্তরে আনন্দ পৌঁছানো এটা নিঃসন্দেহে একটি সৎ কাজ।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৮৯৫-[৮] আবূ মূসা আল আশ্’আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (আল্লাহর নি’আমাতের শুকরিয়া হিসেবে) প্রত্যেক মুসলিমেরই সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দেয়া উচিত। সাহাবীগণ আরয করলেন, যদি কারো কাছে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করার মতো কিছু না থাকে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ উচিত হবে কাজ করে নিজ হাতে উপার্জন করা। তাহলে নিজেও উপকৃত হতে পারবে, আবার দান সদাক্বাও করতে পারবে। সাহাবীগণ বললেন, যদি সে ব্যক্তি সামর্থ্যবান না হয়; অথবা বলেছেন, নিজ হাতে কাজকর্ম করতে না পারে? তিনি বললেন, সে যেন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত পরমুখাপেক্ষী লোকে সাহায্য করে। সাহাবীগণ আরয করলেন, যদি এটিও সে না করতে পারে? তিনি বললেন, তাহলে সে যেন ভাল কাজের নির্দেশ দেয়। সাহাবীগণ পুনঃ জানতে চাইলেন, যদি এটিও সে না পারে? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাহলে সে মন্দ কাজ হতে ফিরে থাকবে। এটাই তার জন্য সদাক্বাহ্ (সাদাকা)। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ فَضْلِ الصَّدَقَةِ
وَعَنْ أَبِي مُوسَى الْأَشْعَرِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ صَدَقَةٌ» . قَالُوا: فَإِنْ لَمْ يَجِدْ؟ قَالَ: «فَلْيَعْمَلْ بِيَدَيْهِ فَيَنْفَعَ نَفْسَهُ وَيَتَصَدَّقَ» . قَالُوا: فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ؟ أَوْ لَمْ يَفْعَلْ؟ قَالَ: «فيعين ذَا الْحَاجَةِ الْمَلْهُوفَ» . قَالُوا: فَإِنْ لَمْ يَفْعَلْهُ؟ قَالَ: «فيأمر بِالْخَيرِ» . قَالُوا: فَإِن لمي فعل؟ قَالَ: «فَيمسك عَن الشَّرّ فَإِنَّهُ لَهُ صَدَقَة»
ব্যাখ্যা: (عَلى كُلِّ مُسْلِمٍ صَدَقَةٌ) প্রতিটি মুসলিমের ওপর সদাক্বাহ্ (সাদাকা) রয়েছে। এখানে সকল ‘উলামাদের ঐকমত্যে ওয়াজিব সদাক্বাহ্ (সাদাকা) তথা যাকাতের কথা বলা হয়নি। বরং মুসলিমের উত্তম চরিত্রের সহায়ক হিসেবে সাধারণ দান-খয়রাতের কথা বলা হয়েছে। আল্লামা কুসতুলানী (রহঃ) এমনটাই মনে করেন। ইমাম নাবাবী (রহঃ) একই মত পোষণ করেন। তবে ইমাম হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী একটু বেশী করে বলেন, যে, হাদীসটি ওয়াজিব এবং মুস্তাহাব দু’টি ক্ষেত্রেই ব্যবহারের উপযুক্ত।
(قَالُوا: فَإِنْ لَمْ يَجِدْ؟) অর্থাৎ সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দেয়ার মতো কোন সম্পদ যদি ব্যক্তির কাছে না থাকে? এ প্রশ্নের উত্তরে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যদি কোন সম্পদই না থাকে তাহলে মাযলূমকে সহায়তা করা, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করা ইত্যাদি সদাক্বাহ্ (সাদাকা) হিসেবে গণ্য হবে।
(فيأمر بِالْخَيرِ) সৎ কাজের আদেশ অসৎ কাজের নিষেধ এ কথার অন্তর্ভুক্ত হবে। হাদীসখানার সার সংক্ষেপ হলো, নিশ্চয় সৃষ্টিজীবের প্রতি দয়াপ্রবণ হওয়া ইসলামের এক গুরুত্বপূর্ণ সৎ কাজ হিসেবে চিহ্নিত। তা হতে পারে অর্জিত সম্পদ সৃষ্টিজীবের খিদমাতে ব্যবহারের মাধ্যমে, এটা হলো প্রথম পর্যায়ের দয়ার অন্তর্ভুক্ত।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৮৯৬-[৯] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মানুষের উচিত শরীরের প্রতি জোড়ার জন্য প্রতিদিন সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দেয়া। দু’ ব্যক্তির মধ্যে ন্যায়বিচার করাও সদাক্বাহ্ (সাদাকা), কোন ব্যক্তিকে অথবা তার আসবাবপত্র নিজের বাহনে উঠিয়ে নেয়াও সদাক্বাহ্ (সাদাকা), কারো সাথে ভাল কথা বলা, সালাতের দিকে যাবার প্রতিটি কদম, এসবই এমনকি চলাচলের পথ থেকে কষ্টদায়ক কিছু সরিয়ে দেয়াও সদাক্বাহ্ (সাদাকা)। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ فَضْلِ الصَّدَقَةِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: كُلُّ سُلَامَى مِنَ النَّاسِ عَلَيْهِ صَدَقَةٌ: كُلَّ يَوْمٍ تَطْلُعُ فِيهِ الشَّمْسُ يَعْدِلُ بَيْنَ الِاثْنَيْنِ صَدَقَةٌ وَيُعِينُ الرَّجُلَ عَلَى دَابَّتِهِ فَيَحْمِلُ عَلَيْهَا أَوْ يَرْفَعُ عَلَيْهَا مَتَاعَهُ صَدَقَةٌ والكلمة الطّيبَة صَدَقَة وكل خطْوَة تخطوها إِلَى الصَّلَاةِ صَدَقَةٌ وَيُمِيطُ الْأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ صَدَقَة
ব্যাখ্যা: (كُلُّ سُلَامى) অর্থাৎ শরীরের ৩৬০টি জোড়ার প্রত্যেকটির জন্য সদাক্বাহ্ (সাদাকা) অপরিহার্য।
হাদীসটির অর্থঃ আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়ার্থে মানুষের প্রতিটি জোড়ার জন্য সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দিতে হয় কারণ আল্লাহ তা‘আলা মানুষের হাড়ের মধ্যে জোড়া স্থাপন করে তার আঙ্গুল, হাত, পা-গুলোকে গুটিয়ে রাখতে সক্ষম করে তুলেছেন আবার সে ইচ্ছা করলে তা সম্প্রসারিত করতে, হাঁটতে, বসতে ও শুয়ে থাকতে পারছে। এটি নিঃসন্দেহে আল্লাহর এক মহান নি‘আমাত। যার শুকরিয়া আদায় করা বান্দার একান্ত দায়িত্ব। কারণ আল্লাহ জোড়া সৃষ্টি না করলে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো কাঠ, লোহা সাদৃশ্য হয়ে যেত যার দ্বারা সে স্বাভাবিকভাবে কোন কাজই সম্পাদন করতে পারতো না। অত্র হাদীসে বলা হয়েছে, প্রত্যেক জোড়ার উপরে দায়িত্ব হলো সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দেয়া এ কথাটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত। বস্ত্তত সদাক্বাহ্ (সাদাকা), জোড়ার মালিক মানুষের ওপরই ওয়াজিব হতে পারে।
(بَيْنَ الِاثْنَيْنِ) অর্থাৎ দু’জন বিবাদকারীর মাঝে মীমাংসা করে দিলে (صَدَقَةٌ) সদাক্বার সম সাওয়াব হবে। (الكلمة الطّيبَة) অর্থাৎ সাধারণভাবে ভাল কথা সর্বদাই অথবা মানুষের সাথে ভাল কথা সদাক্বাহ সম সাওয়াব বয়ে আনে। (الْأَذى) কোন কাটা, হাড়, পাথর, ঢিলা এ জাতীয় বস্ত্ত যা মানুষকে চলাচলে কষ্ট দেয়।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৮৯৭-[১০] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আদম সন্তানের প্রত্যেককে তিনশ’ ষাটটি জোড়া দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ অবস্থায় যে ব্যক্তি ’আল্ল-হু আকবার’, ’আলহামদুলিল্লা-হ’, ’লা- ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ’, ’সুবহা-নাল্ল-হ’ বলবে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, মানুষের পথ হতে পাথর, কাঁটা কিংবা হাড্ডি সরিয়ে দেবে অথবা ভাল কাজের হুকুম করবে, খারাপ কাজে বাধা দেবে, আর এসব কাজ তিনশ’ ষাটটি জোড়ার সংখ্যা অনুসারে করবে, সে ব্যক্তি নিজকে সেদিন থেকে জাহান্নাম হতে বাঁচিয়ে চলতে থাকল। (মুসলিম)[1]
بَابُ فَضْلِ الصَّدَقَةِ
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «خَلَقَ كُلَّ إِنْسَانٍ مِنْ بَنِي آدَمَ عَلَى سِتِّينَ وَثَلَاثِمِائَةِ مَفْصِلٍ فَمَنْ كَبَّرَ اللَّهَ وَحَمِدَ اللَّهَ وَهَلَّلَ اللَّهَ وَسَبَّحَ اللَّهَ وَاسْتَغْفَرَ اللَّهَ وَعَزَلَ حَجَرًا عَنْ طَرِيقِ النَّاسِ أَوْ شَوْكَةً أَوْ عَظْمًا أَوْ أَمَرَ بِمَعْرُوفٍ أَوْ نَهَى عَنْ مُنْكَرٍ عَدَدَ تِلْكَ السِّتِّينَ وَالثَّلَاثِمِائَةِ فَإِنَّهُ يَمْشِي يَوْمَئِذٍ وَقَدْ زَحْزَحَ نَفْسَهُ عَنِ النَّارِ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: (فَمَنْ كَبَّرَ اللّهَ) আল্লামা মুল্লা ‘আলী ক্বারী হানাফী (রহঃ) বলেন, ‘আল্ল-হু আকবার’ বলল। (حَمِدَ اللّهَ) অর্থাৎ ‘লা- ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ’ বললো। (سَبَّحَ اللّهَ) অর্থাৎ সুবহা-নাল্ল-হ বললো।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৮৯৮-[১১] আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রত্যেক ’তাসবীহ’ অর্থাৎ সুবহা-নাল্ল-হ বলা সদাক্বাহ্ (সাদাকা), প্রত্যেক ’তাকবীর’ অর্থাৎ আল্ল-হু আকবার বলা সদাক্বাহ্ (সাদাকা), প্রত্যেক ’তাহমীদ’ বা আলহাম্দুলিল্লা-হ বলা সদাক্বাহ্ (সাদাকা)। প্রত্যেক ’তাহলীল’ বা ’লা- ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ’ বলা সদাক্বাহ্ (সাদাকা)। নেককাজের নির্দেশ দেয়া, খারাপ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখা সদাক্বাহ্ (সাদাকা)। নিজের স্ত্রী অথবা দাসীর সাথে সহবাস করাও সদাক্বাহ্ (সাদাকা)। সাহাবীগণ আরয করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কেউ যদি নিজের কামভাব চরিতার্থ করে তাতেও কি সে সাওয়াব পাবে? উত্তরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমাকে বলো, কোন ব্যক্তি যদি হারাম উপায়ে কামভাব চরিতার্থ করে তাহলে সেকি গুনাহগার হবে না? ঠিক এভাবেই হালাল উপায়ে (স্ত্রী অথবা দাসীর সাথে) কামভাব চরিতার্থকারী সাওয়াব পাবে। (মুসলিম)[1]
بَابُ فَضْلِ الصَّدَقَةِ
وَعَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ بِكُلِّ تَسْبِيحَةٍ صَدَقَةً وَكُلُّ تَكْبِيرَةٍ صَدَقَةٌ وَكُلُّ تَحْمِيدَةٍ صَدَقَةٌ وَكُلُّ تَهْلِيلَةٍ صَدَقَةٌ وَأَمْرٌ بِالْمَعْرُوفِ صَدَقَةٌ وَنَهْيٌ عَنِ الْمُنْكَرِ صَدَقَةٌ وَفِي بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ» قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيَأْتِي أَحَدُنَا شَهْوَتَهُ وَيَكُونُ لَهُ فِيهَا أَجْرٌ؟ قَالَ: «أَرَأَيْتُمْ لَوْ وَضَعَهَا فِي حَرَامٍ أَكَانَ عَلَيْهِ فِيهِ وِزْرٌ؟ فَكَذَلِكَ إِذَا وَضَعَهَا فِي الْحَلَالِ كَانَ لَهُ أجر» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: (وَفِي بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ) শব্দটি স্ত্রী সহবাস এবং লজ্জাস্থান দু’টির ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হতে পারে। যেমনটি বলেছেন ইমাম নাবাবী (রহঃ)। (وَفِي) তথা স্ত্রী সহবাসের মধ্যে বলা হয়েছে, এ কথা বলা হয়নি যে, সরাসরি স্ত্রী সহবাস করার মাধ্যমে। এ কথা বুঝা যায় যে, স্ত্রী সহবাস করা সদাক্বাহ্ (সাদাকা) নয় বরং স্ত্রী সহবাসের মাধমে নিজেকে পরনারী থেকে সংবরণ করার প্রেক্ষিতে সদাক্বার সাওয়াব হবে। বস্ত্তত স্ত্রীর হক আদায় করা, সৎ সন্তান কামনা করা এগুলো সদাক্বাহ্ (সাদাকা) হিসেবে পরিগণিত।
(إِذَا وَضَعَهَا فِي الْحَلَالِ) অর্থাৎ হারাম থেকে বিরত থেকেছে অথচ মানুষের অন্তর হারামের দিকেই ঝুকে যায় এবং হারাম কাজ করেই হালালের চেয়ে বেশী স্বাদ পেয়ে থাকে। কেননা প্রতিটি নতুন জিনিসের রয়েছে নতুন স্বাদ, অভ্যাসগত কারণে আত্মা সেদিকে বেশী ধাবিত, শায়ত্বন (শয়তান) তার জন্য সহযোগিতায় সর্বাধিক অগ্রগামী এবং পরিশ্রমটাও অনেক কম হয়।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৮৯৯-[১২] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রচুর দুধ দানকারী উট, প্রচুর দুধ দানকারী বকরী কাউকে দুধ পান করার জন্য ধার দেয়াও উত্তম সদাক্বাহ্ (সাদাকা)। যা সকাল এবং বিকালে পাত্র ভরে দুধ দেয়। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ فَضْلِ الصَّدَقَةِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «نِعْمَ الصَّدَقَةُ اللِّقْحَةُ الصَّفِيُّ مِنْحَةً وَالشَّاةُ الصَّفِيُّ مِنْحَةً تَغْدُو بِإِنَاءٍ وَتَرُوحُ بِآخَرَ»
ব্যাখ্যা: (نِعْمَ الصَّدَقَةُ) কোন বর্ণনাতে نِعْمَ الصَّدَقَةُ এর পরিবর্তে نعم المنيحة উল্লেখ আছে। আবূ ‘উবায়দাহ্ (রহঃ) বলেন, منيحة শব্দটি ‘আরবদের নিকটে দু’ অর্থে ব্যবহৃত হয়।
১। কোন ব্যক্তি তার সাথীকে যে কোন ধরনের দান করলো। ফলে দানকৃত বিষয়টি সাথীর জন্য হয়ে গেল।
২। সরাসরি বস্ত্তটি তাকে দিল না তবে বস্ত্তর মাধ্যমে সাময়িকের জন্য উপকার অর্জন করে নিতে দিল।
যেমনঃ কোন ব্যক্তি তার সাথীকে একটি উট অথবা একটি ছাগল দিল দুধ খাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট একটি সময় বেধে দিয়ে। সময় ফুরিয়ে গেলে আবার ফিরিয়ে নিয়ে নিল। অতএব হাদীসে منيحة দ্বারা উদ্দেশ্য, দুধালো কোন পশুকে কারো উপকার হাসিলের জন্য দিয়ে দেয়া পরবর্তীতে আবার ফেরত নেয়া।
আল্লামা ইবনুত্ ত্বীন বলেন, যেসব রাবী বর্ণনাতে صدقة শব্দ উল্লেখ করেছেন তারা শাব্দিক নয় বরং অর্থগতভাবে রিওয়ায়াত করেছেন। কেননা, منيحة যেমন দান صدقة-ও এক প্রকার দান।
হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, منيحة এবং صدقة শব্দ দু’টির একটি দিয়ে আরেকটি বুঝা যায় না। কারণ, প্রত্যেক সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দান কিন্তু প্রত্যেক দান সদাক্বাহ্ (সাদাকা) নয়। আর সদাক্বাকে মানীহার জন্য ব্যবহার করা রূপক। যদি منيحة সদাক্বাহ্ (সাদাকা) হয়ে থাকে তাহলে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) তো নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য হালাল ছিল না। বরং সেটা ছিল হিবা ও হাদিয়্যার মতো কিছু।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৯০০-[১৩] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন মুসলিম যে গাছ লাগায় অথবা ফসল ফলায় অতঃপর কোন মানুষ অথবা পশু, পাখী (মালিক-এর বিনানুমতিতে) এর থেকে কিছু খেয়ে ফেলে, তাহলে (এ ক্ষতি) মালিক-এর জন্য সদাক্বাহ্ (সাদাকা) গণ্য হবে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ فَضْلِ الصَّدَقَةِ
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَغْرِسُ غَرْسًا أَوْ يَزْرَعُ زَرْعًا فَيَأْكُلُ مِنْهُ إِنْسَانٌ أَوْ طَيْرٌ أَوْ بَهِيمَةٌ إِلَّا كَانَت لَهُ صَدَقَة»
ব্যাখ্যা: (مَا مِنْ مُسْلِمٍ) এ কথা বলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মূলত কাফিরদেকে সাওয়াবের আওতামুক্ত করেছেন এবং হাদীসে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দ্বারা আখিরাতের সাওয়াব উদ্দেশ্য আর এ বিষয়টি মুসলিমের জন্য নির্দিষ্ট কাফিরের জন্য নয়। সুতরাং কাফির যদি সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করে অথবা কোন প্রকার কল্যাণকর কাজ করে থাকে এর বিনিময়ে ক্বিয়ামাতে কোন নেকী সে পাবে না। হ্যাঁ তবে যা কিছু কাফিরের শস্যক্ষেত্র থেকে প্রাণীকূল খেয়েছে এর জন্য দুনিয়াতেই তাকে বিনিময় দেয়া হয় যেমন এ বিষয়টি দলীল দ্বারা প্রমাণিত। অপরদিকে যারা বলেন, এ ভাল কাজগুলো করার কারণে অখিরাতে তার ‘আযাব হালকা করা হবে তাদের এ কথার পক্ষে কোনই দলীল প্রমাণ নেই। সুতরাং এ জাতীয় কথা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
ক্বাযী ‘আয়ায (রহঃ) বলেছেন, সকল বিজ্ঞ ‘আলিম এ ব্যাপারে একমত যে, নিশ্চয় কাফিরের জন্য তার ভালকাজ কোনই উপকার দিবে না, না কোন নি‘আমাত প্রাপ্ত করা, না কোন শাস্তি রহিত করা। তাদের একে অন্যের তুলনায় পাপ অনুপাতে শাস্তি প্রাপ্তির দিক দিয়ে বেশ কঠিন হবে।
অপরদিকে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল মারফূ‘ সূত্রে আবূ আইয়ূব (রাঃ)-এর মাধ্যমে এবং অপর একটি হাদীসে যথক্রমে ما من رجل তথা যে কোন ব্যক্তি এবং ما من عبد যে কোন বান্দার কথা উল্লেখ আছে এ বর্ণনা দু’টির مطلق তথা শর্তহীন অর্থকে مقيد তথা শর্তযুক্ত অর্থাৎ رجل এবং عبد-এর ব্যাখ্যা হিসেবে এ হাদীসটি নিতে হবে যে হাদীসে مسلم উল্লেখ আছে। এখানে مسلم বলে জাতি উদ্দেশ্য। সুতরাং পুরুষ নারী সকলেই এর অন্তর্ভুক্ত হবে।
আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেন, হাদীসটিতে مسلم শব্দটি অনির্দিষ্টভাবে আসায় এদিকে ইঙ্গিত বহন করে যে, যে কোন মুসলিম তিনি স্বাধীন হোন অথবা দাস হোন আনুগত্যশীল হোন আর পাপী হোন তিনি যদি হাদীস মোতাবেক ‘আমল করেন তাহলে হাদীসে বর্ণিত সাওয়াবের হকদার হবেন। অত্র হাদীস থেকে এ বিষয়টি বুঝা যায় যে, শস্য উৎপাদনের বিষয়টি মানুষের সাথে সম্পৃক্ত করা বৈধ।
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে মারফূ‘ সূত্রে বর্ণিত হাদীসটি যেখানে বলা হয়েছে, (لَا يَقُلْ أَحَدُكُمْ زَرَعْتُ، وَلكِنْ لِيَقُلْ حَرَثْتُ) অর্থাৎ তোমাদের কেউ যেন زرعت তথা আমি উৎপাদন করেছি বা চাষাবাদ করেছি এ কথা না বলে বরং حَرَثْتُ তথা আমি রোপন করেছি এ কথা বলে, غير قوى তথা শক্তিশালী নয় এবং زرع উৎপাদন করাকে যে, মানুষের প্রতি সম্পৃক্ত করা যাবে এ সম্পর্কে মহান আল্লাহর বাণীই প্রমাণ দেয় যেখানে তিনি বলেছেন, أَأَنْتُمْ تَزْرَعُوْنَهٗ أَمْ نَحْنُ الزَّارِعُوْنَ
‘‘তোমরা কি ফসল উৎপাদন করো নাকি আমিই উৎপাদন করি?’’ (সূরাহ্ আল ওয়াক্বি‘আহ্ ৫৬ : ৬৪)
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৯০১-[১৪] মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে, যা চুরি হয়ে যায় তাও তার জন্য সদাক্বাহ্ (সাদাকা)।[1]
بَابُ فَضْلِ الصَّدَقَةِ
وَفِي رِوَايَةٍ لِمُسْلِمٍ عَنْ جَابِرٍ: «وَمَا سُرِقَ مِنْهُ لَهُ صَدَقَة»
ব্যাখ্যা: মুসলিম ব্যক্তির সম্পদ যে কোন ভাবেই খাওয়া হোক না কেন তাতে তার জন্য সাওয়াব নির্ধারিত রয়েছে। হাদীসখানার মধ্যে সম্পদের ক্ষতির ক্ষেত্রে ধৈর্যের মাধ্যমে তাকে সান্ত্বনার বাণীও দেয়া হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৯০২-[১৫] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (একবার) একটি পতিতা মহিলাকে মাফ করে দেয়া হলো। (কারণ) মহিলাটি একবার একটি কুকুরের কাছ দিয়ে যাবার সময় দেখল সে পিপাসায় কাতর হয়ে একটি কূপের পাশে দাঁড়িয়ে জিহবা বের করে হাঁপাচ্ছে। পিপাসায় সে মরার উপক্রম। মহিলাটি (এ করুণ অবস্থা দেখে) নিজের মোজা খুলে ওড়নার সাথে বেঁধে (কূপ হতে) পানি উঠিয়ে কুকুরটিকে পান করাল। এ কাজের জন্য তাকে মাফ করে দেয়া হলো। (এ কথা শুনে) সাহাবীগণ আরয করলেন, পশু-পাখির সাথে ভাল ব্যবহার করার মধ্যেও কি আমাদের জন্য সাওয়াব আছে? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হ্যাঁ। প্রত্যেকটা প্রাণীর সাথে ভাল ব্যবহার করার মধ্যেও সাওয়াব আছে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ فَضْلِ الصَّدَقَةِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «غُفِرَ لِامْرَأَةٍ مُومِسَةٍ مَرَّتْ بِكَلْبٍ عَلَى رَأْسِ رَكِيٍّ يَلْهَثُ كَادَ يَقْتُلُهُ الْعَطَشُ فَنَزَعَتْ خُفَّهَا فَأَوْثَقَتْهُ بِخِمَارِهَا فَنَزَعَتْ لَهُ مِنَ الْمَاءِ فَغُفِرَ لَهَا بِذَلِكَ» . قِيلَ: إِنَّ لَنَا فِي الْبَهَائِمِ أَجْرًا؟ قَالَ: «فِي كُلِّ ذَاتِ كبد رطبَة أجر»
ব্যাখ্যা: (لِامْرَأَةٍ) মহিলাটির নাম উল্লেখ করা হয়নি সহীহুল বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনায় পুরুষ ব্যক্তির উল্লেখ রয়েছে এতে বুঝা যায় এগুলো মূলত দু’টি ঘটনা।
(مُوْمِسَةٍ) বানী ইসরাঈলের যিনাকারিণী মহিলা।
(كَادَ يَقْتُلُهُ الْعَطَشُ) পিপাসার কারণে মৃত্যুর কাছাকাছি চলে গিয়েছিল।
হাদীসটি থেকে বুঝা যায় যে, আল্লাহ তা‘আলা তার বিশেষ রহমাতের মাধ্যমে কিছু ভাল কাজের কারণে বান্দার কাবীরাহ্ (কবিরা) গুনাহ মার্জনা করে থাকেন বিনা তাওবাতে।
(لَنَا فِي الْبَهَائِمِ) প্রাণীকূলের প্রতি দয়াপরবশ হওয়াতে। (فِي كُلِّ ذَاتِ كبد) অর্থাৎ প্রত্যেক বস্ত্ত যাকে জীবনী শক্তি ফিরিয়ে দেয়ার জন্য তিনি পান করিয়েছেন। তার জন্য যে সমূহ সাওয়াব পাবেন।
আল্লামা দাওয়ার্দী (রহঃ) বলেন, প্রত্যেক জীবিত কলিজাকে রক্ষায় যারা পান করালেন তবে তা সমস্ত প্রাণীর ক্ষেত্রে عام বা ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আবূ ‘আবদুল মালিক (রহঃ) বলেন, আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা (فِي كُلِّ كبد) এ কথাটি কিছু বস্ত্তর জন্য নির্দিষ্ট যে প্রাণীগুলো দ্বারা কোন ক্ষতি হয় না।
কেননা যেগুলোকে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হত্যা করার আদেশ দিয়েছেন যেমনঃ কাক, চিল এগুলোকে পানি পান করিয়ে সতেজ করে তাদের অনিষ্টকে বৃদ্ধি করা যাবে না।
ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেন, হাদীসটি নির্দিষ্ট কিছু পশু প্রাণীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যেগুলো হত্যার ব্যাপারে আদেশ দেয়া হয়নি। সুতরাং পানি পান করিয়ে যাওয়ার সাওয়াব হাসিল হবে এবং ইহসানের তরীকায় তাদের একটু রিযক্বের ব্যবস্থা হলো।
আল্লামা ইবনুত্ তীন (রহঃ) বলেন, হাদীসটিকে ব্যাপক অর্থে নিতে কোন সমস্যা নেই। অত্র হাদীসে মানুষ ও মানবতার প্রতি দয়া প্রদর্শনের ইঙ্গিত রয়েছে, কেননা একটি কুকুরকে পানি পান করিয়ে যদি ক্ষমা পাওয়া যায় তাহলে মানুষের ক্ষেত্রে সেটা তো নিঃসন্দেহে এক বিশাল সাওয়াবের কাজ হবে। অত্র হাদীস দিয়ে দলীল গ্রহণ করে তিনি আরো বলেন, যখন সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দেয়ার জন্য কোন মুসলিম পাওয়া যাবে না সে মুহূর্তে মুশরিকদেরকেও নফল সদাক্বাহ্ (সাদাকা) প্রদান জায়িয।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৯০৩-[১৬] ইবনু ’উমার (রাঃ) ও আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তাঁরা উভয়ে বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শুধু একটি বিড়ালকে বেঁধে রেখে ক্ষুধায় কষ্ট দিয়ে হত্যা করার কারণে একজন মহিলাকে শাস্তি দেয়া হয়েছিল। মহিলাটি বিড়ালটিকে না খাবার দাবার দিত, না ছেড়ে দিত। বিড়ালটি মাটির নীচের কিছু (ইঁদুর ইত্যাদি) খেত। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ فَضْلِ الصَّدَقَةِ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ وَأَبِي هُرَيْرَةَ قَالَا: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «عُذِّبَتِ امْرَأَةٌ فِي هِرَّةٍ أَمْسَكَتْهَا حَتَّى مَاتَتْ مِنَ الْجُوعِ فَلَمْ تَكُنْ تُطْعِمُهَا وَلَا تُرْسِلُهَا فَتَأْكُلَ مِنْ خَشَاشِ الْأَرْضِ»
ব্যাখ্যা: (امْرَأَةٌ) হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, আমি এ মহিলার নামটি জানতে পারিনি। তবে অপর এক বর্ণনায় এসেছে, সে মহিলাটি হচ্ছে হিম্ইয়ার গোত্রভুক্ত। অন্য রিওয়ায়াতে আছে, সে বানী ইসরাঈলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে এ দু’ বর্ণনায় কোন বৈপরীত্য নেই। কারণ হিম্ইয়ার গোত্রের একটি দাস ইয়াহূদী হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং তাকে বানী ইসরাঈলের সাথে সম্পৃক্ত করা এ দৃষ্টিকোণ থেকে ঠিক আছে আবর হিম্ইয়ার গোত্রের দিকেও সম্পৃক্ত করা ঠিক হবে কারণ হিম্ইয়ার তার গোত্রের নাম।
আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেন, অত্র হাদীসে الْأَرْضِ তথা পৃথিবীর উল্লেখ করাটা আল কুরআনের আয়াত وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ অর্থাৎ ‘‘ভূপৃষ্ঠে বিচরণশীল এমন কোন জীব নেই’’- (সূরাহ্ আল আন্‘আম ৬ : ৩৮)-এর মতো। এখানে الْأَرْضِ ব্যবহার করা হয়েছে ব্যাপকতা বুঝানোর জন্য। তারপর হাদীসের বাহ্যিক অর্থ থেকে বুঝা যায়, বিড়ালটিকে আটকে রেখে হত্যা করার দরুন মহিলাটিকে শাস্তি দেয়া হলো। এ মহিলাটি কি মু’মিনাহ্ ছিল নাকি কাফিরাহ্ ছিল এ ব্যাপারে যথেষ্ট মতবিরোধ রয়েছে।
আল্লামা কুরতুবী ও ক্বাযী ‘আয়ায (রহঃ) বলেন, সম্ভবত সে কাফিরাহ্ ছিল তাই কুফরীর কারণে তাকে শাস্তি দেয়া হলো আর বিড়ালের ওপর যুলম করার কারণে তার শাস্তি আরো বৃদ্ধি করা হলো। এ শাস্তির সে উপযুক্ত হলো কারণ সে মু’মিনা ছিল না যাতে করে কাবীরাহ্ (কবিরা) গুনাহ থেকে বিরত থাকার প্রেক্ষিতে তার ছোট গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেয়া হবে। আর এটাও সম্ভাবনা রয়েছে যে, সে মুসলিমা ছিল কিন্তু বিড়ালের ওপর যুলম করার কারণে তাকে শাস্তি দেয়া হলো।
ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেন, সঠিক কথা হলো সে মু’মিনা ছিল আর হাদীসের বাহ্যিক দিক থেকে বুঝা যায় বিড়ালের কারণে তাকে শাস্তি দেয়া হয়েছে আর এ গুনাহটি কোন সগীরাহ্ গুনাহ নয় বরং এর উপর إصرار তথা অটল থাকার প্রেক্ষক্ষতে তা কাবীরাহ্ (কবিরা) গুনাহের রূপ নিয়েছে। তবে হাদীসের মধ্যে তার চিরস্থায়ী জাহান্নামী হওয়ার কথা বলা হয়নি।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৯০৪-[১৭] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (একদিন) এক ব্যক্তি পথচলা অবস্থায় সামনে দেখে একটি গাছের ডাল পথের উপর পড়ে আছে। সে ভাবল, আমি মুসলিমদের চলার পথ থেকে ডালটিকে সরিয়ে দেব, যাতে তাদের কষ্ট না হয়। এ কারণে এ লোকটিকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হলো। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ فَضْلِ الصَّدَقَةِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَرَّ رَجُلٌ بِغُصْنِ شَجَرَةٍ عَلَى ظَهْرِ طَرِيقٍ فَقَالَ: لِأُنَحِّيَنَّ هَذَا عَنْ طَرِيقِ الْمُسلمين لَا يؤذيهم فَأدْخل الْجنَّة
ব্যাখ্যা: আল্লামা ত্বীবী বলেনঃ শুধুমাত্র সৎ নিয়্যাতের কারণে তাকে জান্নাতের অধিকাসী করা হলো। হাদীসটি থেকে বুঝা যায়, মানুষের চলাচল করতে অসুবিধা সৃষ্টি করে এমন কষ্টদায়ক জিনিস রাস্তা থেকে সরিয়ে ফেলাতে অনেক সাওয়াব রয়েছে। হাদীসটি থেকে অল্প কাজ করে বেশী কল্যাণ লাভ করারও প্রমাণ পাওয়া যায়।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৯০৫-[১৮] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি এক ব্যক্তিকে দেখলাম জান্নাতে একটি গাছের নীচে স্বাচ্ছন্দে হাঁটছে। সে এমন একটি গাছ রাস্তার মধ্য থেকে কেটে ফেলে দিয়েছিল যা মানুষকে কষ্ট দিত। (মুসলিম)[1]
بَابُ فَضْلِ الصَّدَقَةِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَقَدْ رَأَيْتُ رَجُلًا يَتَقَلَّبُ فِي الْجَنَّةِ فِي شَجَرَةٍ قَطَعَهَا مِنْ ظَهْرِ الطَّرِيقِ كَانَتْ تُؤْذِي النَّاس» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: মুল্লা ‘আলী কারী হানাফী (রহঃ) বলেন, কোন কষ্টদায়ক জিনিস রাস্তায় থাকলে প্রয়োজনবোধে তাকে ধ্বংস করাও জায়িয।
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৯০৬-[১৯] আবূ বারযাহ্ (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর নবী! আমাকে এমন কিছু শিক্ষা দান করুন, যাতে আমি (পরকালে) উপকৃত হই। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ মুসলিমদের চলাচলের পথে কষ্টদায়ক কোন কিছু পেলে তা ফেলে দিবে। (মুসলিম)[1]
ইমাম মুসলিম বলেন, ’আদী ইবনু হাতিম-এর বর্ণনা (জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচ) ইনশাআল্লাহ আমি ’’আলা-মা-তুন্ নুবুওয়্যাহ্’’ অধ্যায়ে উল্লেখ করব।
بَابُ فَضْلِ الصَّدَقَةِ
وَعَنْ أَبِي بَرْزَةَ قَالَ: قُلْتُ: يَا نَبِيَّ اللَّهِ عَلِّمْنِي شَيْئًا أَنْتَفِعْ بِهِ قَالَ: «اعْزِلِ الْأَذَى عَنْ طَرِيقِ الْمُسْلِمِينَ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
وَسَنَذْكُرُ حَدِيث عدي ابْن حَاتِمٍ: «اتَّقُوا النَّارَ» فِي بَابِ عَلَامَاتِ النُّبُوَّةِ
ব্যাখ্যা: عن الطريق অত্র হাদীসে বলা হয়েছে إماطة الأذى তথা রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্ত্ত সরিয়ে ফেলতে এবং বলা হয়েছে, এ কাজ করা ঈমানের সর্বনিম্ন শাখা আর সর্বনিম্ন শাখার এত বড় সাওয়াব উল্লেখ করে অন্যান্য শাখার প্রতি আরো বেশী যত্নবান হওয়ার প্রতি আহবান জানানো হয়েছে।
(اتَّقُوا النَّارَ) জাহান্নাম থেকে বাঁচার চেষ্টা অব্যাহত রাখ যদিও খেজুরের একটু সিলকা দিয়ে হোক। যদিও তাও না পাও তাহলে অপর মুসলিম ভাইয়ের সাথে একটি ভাল কথা বলে হলেও জাহান্নাম থেকে বাঁচো।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৯০৭-[২০] ’আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমন করার পর আমি তাঁর কাছে গেলাম। তাঁর ’চেহারা মুবারাক’ দেখেই আমি চিনতে পেরেছি এ কোন মিথ্যাবাদীর চেহারা হতে পারে না। সর্বপ্রথম তিনি যে কথা বলেছিলেন তা ছিল, ’’হে লোকেরা! তোমরা পরস্পর সালাম বিনিময় করো, ক্ষুধার্তকে খাবার দাও, আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সদাচরণ করো, রাতের বেলা যখন লোকেরা ঘুমিয়ে থাকবে, তখন তাহাজ্জুদের সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) আদায় কর, তাহলে প্রশান্তচিত্তে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, দারিমী)[1]
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ سَلَامٍ قَالَ: لَمَّا قَدِمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَدِينَةَ جِئْتُ فَلَمَّا تَبَيَّنْتُ وَجْهَهُ عَرَفْتُ أَنَّ وَجْهَهُ لَيْسَ بِوَجْهِ كَذَّابٍ. فَكَانَ أَوَّلُ مَا قَالَ: «أَيُّهَا النَّاسُ أَفْشُوا السَّلَامَ وَأَطْعِمُوا الطَّعَامَ وَصِلُوا الْأَرْحَامَ وَصَلُّوا بِاللَّيْلِ وَالنَّاسُ نِيَامٌ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ بِسَلام» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَابْن مَاجَه والدارمي
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসে (أَيُّهَا النَّاسُ) ‘হে মানব সকল’ বলে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, নির্বিশেষে সকল মানুষকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। ‘তোমরা সালামের প্রসার ঘটাও’ মানে হচ্ছে তোমরা শুধু পরিচিত জনকেই সালাম দিবে না, অপরিচিত জনকেও সালাম দিবে। খাদ্য খাওয়ানো দ্বারা মূলত যাকাতের আবশ্যক দান ব্যতীত অন্যান্য দান, যেমন- সাধারণ দান, উপহার প্রদান, মেহমানদারি করানো ইত্যাদি বুঝানো হয়েছে। আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার অর্থ হচ্ছে বংশগত দিক থেকে নিকটাত্মীয়দের সাথে উত্তম ব্যবহার করা এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল, নমনীয় হওয়া ও তাদের সাথে কোমল আচরণ করা। রাতে যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাকে তখন নফল সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) আদায় করার আদেশ এজন্য দেয়া হয়েছে যে, এ সময়টি সাধারণত অমনোযোগিতার সময়। এ সময়ে যারা জেগে থেকে সালাত আদায় করবে তারা অধিক সাওয়াবের অধিকারী হবে এবং লোক দেখানো (রিয়া) বা লোক শুনানো (সুম্‘আহ্) (কোন ‘আমল মানুষকে দেখানো বা শুনানোর জন্য করা হলে তা গোপন শির্কে রূপান্তরিত হয়, এরূপ ‘আমল অবশ্যই বর্জনীয়) থেকে মুক্ত থাকবে। এ কর্মসমূহ যারা সম্পাদন করবে তারা কোনরূপ কষ্ট বা অপছন্দনীয় কাজ থেকে নিরাপদ থাকবে কিংবা জান্নাতে প্রবেশের সময় মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) তাদেরকে সালাম দিবেন।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৯০৮-[২১] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রহমানের ’ইবাদাত করো, খাবার দাও, মুসলিমদেরকে সালাম দাও; তোমরা সহজে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (তিরমিযী, ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اعْبُدُوا الرَّحْمَنَ وَأَطْعِمُوا الطَّعَامَ وَأَفْشُوا السَّلَامَ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ بِسَلام» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: বর্ণিত কর্মসমূহ যদি তোমরা সম্পাদন করো এবং এ কর্মের উপরই মৃত্যুবরণ করো তাহলে তোমরা নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে। তখন তোমাদের কোন ভয় থাকবে না এবং তোমরা দুশ্চিন্তাগ্রস্তও হবে না।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৯০৯-[২২] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অবশ্য অবশ্য সদাক্বাহ্ (সাদাকা) আল্লাহ তা’আলার ক্রোধকে ঠান্ডা করে, আর খারাপ মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ الصَّدَقَةَ لَتُطْفِئُ غَضَبَ الرَّبِّ وَتَدْفَعُ مِيتَةَ السَّوْءِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ
ব্যাখ্যা: যে ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্য হয় সে যদি দান করে তাহলে তার দান তার প্রতি আল্লাহর যে রাগ ছিল তা প্রশমিত করে বা মিটিয়ে দেয়। তাছাড়া আল্লাহর রাস্তায় দান মন্দ/খারাপ মৃত্যু রোধ করে। মন্দ মৃত্যু বলতে কয়েক ধরনের মৃত্যু হতে পারে। যেমন- (এক) মৃত্যুর সময় খারাপ অবস্থার সৃষ্টি হওয়া, যা ঐ ব্যক্তিকে মৃত্যু যন্ত্রণার কারণে আল্লাহ প্রদত্ত নি‘আমাতের অস্বীকার ও আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফিল করে দেয়; (দুই) হঠাৎ মৃত্যু; (তিন) এমন সকল মৃত্যু যা ব্যক্তিকে আল্লাহর থেকে দূরে সরিয়ে খারাপ সমাপ্তির দিকে নিয়ে যায়।
কেউ কেউ বলেন, দানকারী ব্যক্তিকে মৃত্যুকালীন ফিতনাহ্ থেকে রক্ষা করবে অথবা দান-এর কারণে দানকারী মৃত্যুর পূর্বে তাওবাহ্ করার সুযোগ পাবে, যদিও সে গুনাহের উপর দৃঢ় সংকল্পকৃত ও অবাধ্য হোক না কেন।
অথবা সে যে কোন ধরনের ধ্বংস, যেমন- পানিতে ডোবা কিংবা আগুনে পোড়া হতে নিরাপদ থেকে মৃত্যুবরণ করবে। হাফিয ইরাক্বী বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ঐ ধরনের মৃত্যু যা থেকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর নিকট আশ্রয় চেয়েছেন। যেমন- পানিতে ডুবে, আগুনে পুড়ে, গর্তে পরে মারা যাওয়া কিংবা যে কোনভাবে ধ্বংস হওয়া। অথবা মৃত্যুর সময়ে শায়ত্বনের (শয়তানের) প্রভাবে মোহাবিষ্ট হওয়া, কিংবা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ থেকে পলায়নরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা ইত্যাদি।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৯১০-[২৩] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রতিটি ভাল কাজই সদাক্বাহ্ (সাদাকা), আর তোমার নিজের কোন ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ এবং কোন ভাইয়ের পাত্রে নিজের বালতি থেকে পানি ঢেলে দেয়াও ভাল কাজের অন্তর্ভুক্ত। (আহমাদ, তিরমিযী)[1]
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ
: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «كُلُّ مَعْرُوفٍ صَدَقَةٌ وَإِنَّ مِنَ الْمَعْرُوفِ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ بِوَجْهٍ طَلْقٍ وَأَنْ تُفْرِغَ مِنْ دَلْوِكَ فِي إِنَاءِ أَخِيكَ» . رَوَاهُ أَحْمد وَالتِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: মা‘রূফ (مَعْرُوْفِ) বলতে প্রত্যেক ঐ কাজকে বুঝায় যা ইসলামী শারী‘আত সুন্দর বলে স্বীকৃতি দিয়েছে অথবা মানববুদ্ধি (‘আকল) দ্বারা যা ভালো বলে স্বীকৃত। তবে মানববুদ্ধি দ্বারা স্বীকৃত কর্মগুলো তখনই মা‘রূফ হবে যখন সেগুলো শারী‘আতের সাথে সাংঘর্ষিক না হবে। সদাক্বাহ্ (সাদাকা) বলা হয় ঐ দানকে যা ব্যক্তি তার সম্পদ থেকে আল্লাহর নৈকট্য পাওয়ার উদ্দেশে দান করে। হাদীসে বর্ণিত ‘‘প্রত্যেক সৎ কাজই একটা দান’’ কথা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, প্রত্যেক সৎ কাজই সম্পদ বা অর্থ দান করার স্থলাভিষিক্ত। সদাক্বার মতো প্রত্যেক সৎ কাজও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উপায়।
আল্ মা‘রূফ (الْمَعْرُوْفِ) ও আস্ সদাক্বাহ্ (সাদাকা) (الصَّدَقَةُ) পরিভাষা দু’টি শাব্দিকভাবে ভিন্ন ভিন্ন হলেও অর্থের দিক থেকে কাছাকাছি। তবে এ দু’টি শব্দ দ্বারাই উদ্দিষ্ট কাজ একই। আল-কুরআনে শব্দ দু’টি ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন- আল্লাহ বলেন,
لَا خَيْرَ فِىْ كَثِيْرٍ مِّنْ نَجْوهُمْ إِلَّا مَنْ أَمَرَ بِصَدَقَةٍ أَوْ مَعْرُوْفٍ
‘‘তাদের অধিকাংশ গোপন পরামর্শে কোন কল্যাণ নেই, তবে কল্যাণ আছে যে নির্দেশ দেয় দান-খয়রাত অথবা সৎ কাজে।’’ (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪ : ১১৪)
আর পরিভাষা দু’টি অত্র হাদীসে একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এ হাদীসে ‘‘ভাই’’ বলতে ‘‘মুসলিম ভাই’’ বুঝানো হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৯১১-[২৪] আবূ যার গিফারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমার ভাইয়ের সামনে হাসি মুখে আগমন করা সদাক্বাহ্ (সাদাকা), নেক কাজ নির্দেশ, খারাপ কথাবার্তা হতে বিরত থাকা তোমার জন্য সদাক্বাহ্ (সাদাকা), পথহারা প্রান্তরে কোন মানুষকে পথ বলে দেয়া, কোন অন্ধ বা দুর্বল দৃষ্টিশক্তির মানুষকে সাহায্য করা সদাক্বাহ্ (সাদাকা), পথের কাঁটা বা হাড় সরিয়ে দেয়া, নিজের বালতি থেকে অন্য কোন ভাইয়ের বালতিতে পানি দিয়ে ভরে দেয়া তোমার জন্য সদাক্বাহ্ (সাদাকা)। (তিরমিযী; তিনি বলেন, এ হাদীসটি গরীব)[1]
وَعَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «تَبَسُّمُكَ فِي وَجْهِ أَخِيك صَدَقَة وأمرك بِالْمَعْرُوفِ صَدَقَة ن وَنَهْيُكَ عَنِ الْمُنْكَرِ صَدَقَةٌ وَإِرْشَادُكَ الرَّجُلَ فِي أَرْضِ الضَّلَالِ لَكَ صَدَقَةٌ وَنَصْرُكَ الرَّجُلَ الرَّدِيءَ الْبَصَرِ لَكَ صَدَقَةٌ وَإِمَاطَتُكَ الْحَجَرَ وَالشَّوْكَ وَالْعَظْمَ عَن الطَّرِيقِ لَكَ صَدَقَةٌ وَإِفْرَاغُكَ مِنْ دَلْوِكَ فِي دَلْوِ أَخِيكَ لَكَ صَدَقَةٌ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ
ব্যাখ্যা: তাবাসসুম (تَبَسُّمٌ) বা মুচকি হাসি ঐ হাসিকে বলে যে হাসিতে দাঁত দেখা যায় কিন্তু কোন আওয়াজ হয় না। যে হাসিতে হালকা আওয়াজ হয় যা নিকটবর্তী লোকজন শুধু শুনতে পায় সে হাসিকে সাধারণ হাসি বলে। আর যে হাসির আওয়াজ এতটা জোরে হয় যে দূরবর্তী লোকজনও শুনতে পায় সে হাসিকে কহকহ্ (قهقهة) বা অট্টহাসি বলে।
কোন দীনী ভাই-এর সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করলে সেরূপ সাওয়াব পাবে যেরূপ সাওয়াব পাওয়া যেত তাকে কিছু দান করলে। মা‘রূফ ঐ কাজকে বলে যে কাজকে শারী‘আত ও মানববুদ্ধি সুন্দর বলে মনে করে। আর মুনকার ঐ কাজকে বলে যে কাজকে শারী‘আত ও মানববুদ্ধি সুন্দর বলে মনে করে না বরং খারাপ মনে করে।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৯১২-[২৫] সা’দ ইবনু ’উবাদাহ্ (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসূল! উম্মু সা’দ (অর্থাৎ আমার মা) মৃত্যুবরণ করেছেন, তাঁর মাগফিরাতের জন্য কোন্ ধরনের দান সদাক্বাহ্ (সাদাকা) উত্তম? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ’’পানি’’, (এ কথা শুনে) সা’দ কূপ খনন করলেন এবং বললেন, এ কূপ উম্মু সা’দ (রাঃ)-এর জন্য সদাক্বাহ্ (সাদাকা)। (আবূ দাঊদ, নাসায়ী)[1]
وَعَنْ سَعْدِ بْنِ عُبَادَةَ قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ أُمَّ سَعْدٍ مَاتَتْ فَأَيُّ الصَّدَقَةِ أَفْضَلُ؟ قَالَ: «الْمَاءُ» . فَحَفَرَ بِئْرًا وَقَالَ: هَذِهِ لأم سعد. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: সা‘দ (রাঃ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলেন, আমার মায়ের নিকট সাওয়াব পৌঁছানোর জন্য সবচেয়ে উত্তম দান কোনটি? রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বললেন যে, পানি। আহমাদ, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ্ ও ইবনু হিব্বান-এর বর্ণনায় রয়েছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘পানি পান করানো’’। কেননা ঐ সময় মদীনায় পানির স্বল্পতা ছিল। তবে পানি এমন একটি বস্ত্ত যা স্বাভাবিকভাবেই সর্বদা সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বস্ত্ত হিসেবে পরিগণিত হয়। আল্লামা মুল্লা ‘আলী ক্বারী (রহঃ) বলেন, নিশ্চয় পানি দান করাই সর্বোত্তম। কারণ দীনী ও পার্থিব উভয় ক্ষেত্রের কর্মে সবচেয়ে উপকারী বস্ত্ত হলো পানি। বিশেষ করে উষ্ণ/শুষ্ক বা উচ্চ তাপমাত্রার দেশসমূহে।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৯১৩-[২৬] আবূ সা’ঈদ আল্ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে মুসলিম কোন একজন উলঙ্গ মুসলিমকে কাপড় পরাবে, আল্লাহ তা’আলা তাকে কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন জান্নাতের সবুজ পোশাক পরিধান করাবেন। যে মুসলিম কোন ক্ষুধার্ত মুসলিমকে খাবার দেবে, আল্লাহ তা’আলা তাকে জান্নাতের ফল-ফলাদি খাওয়াবেন। আর যে মুসলিম কোন পিপাসার্ত মুসলিমের পিপাসা মেটাবে, আল্লাহ তা’আলা তাকে ’রাহীকুল মাখতূমে’র পানীয় দিয়ে পরিতৃপ্ত করাবেন। (আবূ দাঊদ, তিরমিযী)[1]
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَيُّمَا مُسْلِمٍ كَسَا مُسْلِمًا ثَوْبًا عَلَى عُرْيٍ كَسَاهُ اللَّهُ مِنْ خُضْرِ الْجَنَّةِ وَأَيُّمَا مُسْلِمٍ أَطْعَمَ مُسْلِمًا عَلَى جُوعٍ أَطْعَمَهُ اللَّهُ مِنْ ثِمَارِ الْجَنَّةِ. وَأَيُّمَا مُسلم سقا مُسْلِمًا عَلَى ظَمَأٍ سَقَاهُ اللَّهُ مِنَ الرَّحِيقِ الْمَخْتُوم» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالتِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: যে মুসলিম ব্যক্তি অন্য কোন মুসলিমকে তার পিপাসায় পানি পান করাবে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে জান্নাতে মিসকের সুগন্ধি দ্বারা মুখ বন্ধ করা বোতল থেকে পূর্ণভাবে জান্নাতী মদ পান করাবেন। আল্লামা মুল্লা ‘আলী ক্বারী (রহঃ) বলেন, আর্ রাহীক্ব (الرَّحِيْق) অর্থ হচ্ছে মদের শ্রেষ্ঠাংশ এবং নির্ভেজাল পানীয় যাতে কোন ভেজাল থাকবে না। আর আল্ মাখতূম (الْمَخْتُوْم) অর্থ হলো এমন বোতল যার ছিল এমনভাবে লাগানো যা খুবই সুরক্ষিত এবং যার নিকটে তার অধিকারী/হকদার ব্যতীত কেউ পৌঁছতে পারে না। আল্লামা আল্ মা'নাবী (রহঃ) বলেন, এ হাদীস দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, হাদীসে বর্ণিত কাজগুলো যারা করবে তাদেরকে জান্নাতে ঐ জিনিসের সর্বোত্তমটি প্রতিদান হিসেবে দেয়া হবে। কারণ স্বাভাবিকভাবে জান্নাতের সবাইকেই তো ঐসব বস্ত্ত দেয়া হবে। ঐসব কর্মশীলদের সর্বোত্তমটি দেয়ার মাধ্যমে বিশেষ মর্যাদা দেয়া হবে। এ হাদীসের মধ্যে এ ব্যাপারে উৎসাহ দেয়া হয়েছে যে, সৎকর্মের মধ্যে বৈচিত্রতা অবলম্বন করা উচিত। অর্থাৎ বিভিন্ন ধরনের সৎকর্ম সম্পাদন করা উচিত এবং যারা ঐ সব বস্ত্তর মুখাপেক্ষী, অর্থাৎ যাদের ঐ সবে চাহিদা রয়েছে তাদেরকে তা দেয়া উচিত। এ হাদীস দ্বারা আরো প্রমাণ হয় যে, ঐ সব কর্মের প্রতিদান একই জাতের বস্ত্ত দ্বারা দেয়া হবে।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৯১৪-[২৭] ফাত্বিমাহ্ বিনতু কুবায়স (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয়ই সম্পদে যাকাত ছাড়াও (গরীবের) আরো অন্যান্য হক প্রতিষ্ঠিত আছে। তারপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন, ’’তোমরা নিজেদের মুখ পূর্ব দিকে কর কিংবা পশ্চিম দিকে এতে কোন পুণ্য (কল্যাণ) নেই’’- (সূরাহ্ আল বাক্বারাহ্ ২: ১৭৭) আয়াতের শেষ পর্যন্ত। (তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, দারিমী)[1]
وَعَن فَاطِمَة بنت قبيس قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ فِي الْمَالِ لَحَقًّا سِوَى الزَّكَاةِ» ثُمَّ تَلَا: (لَيْسَ الْبَرَّ أَنْ تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قبل الْمشرق وَالْمغْرب)
الْآيَة. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَابْن مَاجَه والدارمي
ব্যাখ্যা: আল্লামা আল্ মা'নাবী (রহঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী ‘‘যাকাত ছাড়াও ব্যক্তির সম্পদে অপর ব্যক্তির অধিকার রয়েছে’’। যেমন- বন্দি-মুক্ত করা, নিরুপায় ব্যক্তিকে খাদ্য খাওয়ানো। এগুলো হলো যাকাতের বাইরের আবশ্যক দায়িত্ব। আল্লামা মুল্লা ‘আলী ক্বারী (রহঃ) বলেন, এ হাদীসের মর্মার্থ হলো ভিক্ষুক এবং ঋণপ্রত্যাশীকে মাহরূম না করা এবং কেউ যদি বাড়ির দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসপত্র যেমন- হাড়ি-পাতিল, আগুন, পানি, লবন ইত্যাদি চায় তাহলে তাকে তা দেয়া উচিত।
হাদীসে বর্ণিত কথার প্রমাণ হিসেবে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআনের যে আয়াতটি তিলাওয়াত করেন সেটি হলো- ‘‘পূর্ব এবং পশ্চিম দিকে তোমাদের মুখ ফিরানোতে কোন পুণ্য নেই; কিন্তু পুণ্য আছে- কেউ আল্লাহ, পরকাল, ফেরেশতাগণ, সমস্ত কিতাব এবং নাবীগণে ইমান আনয়ন করলে এবং আল্লাহর ভালোবাসায় আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন, অভাবগ্রস্ত, পর্যটক, সাহায্যপ্রার্থীগণকে এবং দাসমুক্তির জন্য অর্থ দান করলে, সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) ক্বায়িম করলে ও যাকাত প্রদান করলে এবং প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা পূরণ করলে, অর্থ-সংকটে, দুঃখ-কষ্টে ও সংগ্রাম-সংকটে ধৈর্য ধারণ করলে’’। (সূরাহ্ আল বাক্বারাহ্ ২ : ১৭৭)
ত্বীবী বলেন, এ আয়াত দ্বারা দলীল পেশ করার কারণ হলো, এ আয়াতে সম্পদ ব্যয় করার কথাও বলা হয়েছে এবং পরক্ষণেই যাকাত প্রদানের কথা বলা হয়েছে। যা প্রমাণ করে যে, ব্যক্তির সম্পদে যাকাত ছাড়াও অন্য ব্যক্তির অন্য অধিকার রয়েছে। বলা হয়, হক বা অধিকার দু’ ধরনের। (এক) ঐ সমস্ত অধিকার যেগুলো প্রদান আল্লাহ তার বান্দাদের ওপর আবশ্যক বিধান করেছেন। (দুই) ঐ সমস্ত অধিকার যেগুলো বান্দা তার কৃপণতা থেকে বাঁচার জন্য এবং আত্মশুদ্ধির জন্য নিজের ওপর আবশ্যক করে নিয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৯১৫-[২৮] মহিলা সাহাবী বুহায়সাহ্ (রাঃ)তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁর পিতা আরয করলেন, হে আল্লাহর রসূল! এটা কোন্ জিনিস যা দিতে অস্বীকার করা হালাল নয়? তিনি বললেন, ’পানি’। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর নবী! কোন্ জিনিস দিতে নিষেধ করা হালাল নয়? তিনি বললেন, ’লবণ’। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর নবী! আর কোন্ জিনিস নিষেধ করা হালাল নয়? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সর্বপ্রকার কল্যাণের কাজই তোমার জন্য কল্যাণকর। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ بُهَيْسَةَ عَنْ أَبِيهَا قَالَتْ: قَالَ: يَا رَسُول الله مَا لشَيْء الَّذِي لَا يَحِلُّ مَنْعُهُ؟ قَالَ: «الْمَاءُ» . قَالَ: يَا نَبِيَّ اللَّهِ مَا الشَّيْءُ الَّذِي لَا يَحِلُّ مَنْعُهُ؟ قَالَ: «الْمِلْحُ» . قَالَ: يَا نَبِيَّ الله مَا لاشيء الَّذِي لَا يَحِلُّ مَنْعُهُ؟ قَالَ: «أَنْ تَفْعَلَ الْخَيْر خير لَك» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: পানি প্রার্থনাকারীকে তা দিতে তখনই নিষেধ করা যাবে না যখন পানির মালিকের পানির প্রয়োজন থাকবে না। কারো মতে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, পানি হলো এমন নগণ্য জিনিস যা প্রার্থনাকারীকে ও প্রতিবেশীকে দেয়া থেকে বিরত থাকা উচিত নয়। লবণ প্রার্থনাকারীকে তা দিতে বিরত থাকা যাবে না এজন্য যে, এ জিনিসটি মানুষের খুবই প্রয়োজন এবং প্রথাগতভাবেই মানুষ এটা আদান-প্রদান করে। ইমাম আশ্ শাওকানী বলেন, মূলত যেসব জিনিস দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় সেসব জিনিস এই একই হুকুমের অন্তর্ভুক্ত।
সর্বশেষে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী, ‘‘যে কোন ভাল কাজ করাই তোমার পক্ষে ভাল’’। এর অর্থ হলোঃ তোমার সুরভিত আত্মা যে কল্যাণকর কাজ করতে চায় তা করা উচিত এবং তা করা থেকে বিরত থাকা বৈধ নয়। আল্লামা আলী ক্বারী (রহঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীর পক্ষে কুরআনী দলীল হচ্ছে- আল্লাহ বলেন, ‘‘কেউ অণু পরিমাণ কাজ করলে সে তা (ক্বিয়ামাতের (কিয়ামতের) দিন) দেখবে’’- (সূরাহ্ আয্ যিলযা-ল ৯৯ : ০৭)। অত্র হাদীসে যে ‘‘বৈধ নয়’’ বলা হয়েছে এর দ্বারা মূলত বুঝাচ্ছে ‘‘উচিত নয়’’।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৯১৬-[২৯] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন অনাবাদী জমি আবাদ করে (অর্থাৎ ফসল উৎপাদনের উপযোগী করে) তার এ কাজে তার জন্য সাওয়াব আছে। যদি এ জমি ক্ষুধার্ত কিছু খায় তাহলে এটাও তার জন্য সদাক্বাহ্ (সাদাকা)। (নাসায়ী, দারিমী)[1]
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «من أحيى أَرْضًا مَيِّتَةً فَلَهُ فِيهَا أَجْرٌ وَمَا أَكَلَتِ الْعَافِيَةُ مِنْهُ فَهُوَ لَهُ صَدَقَةٌ» . رَوَاهُ النَّسَائِيُّ والدارمي
ব্যাখ্যা: যে ব্যক্তি কোন মৃত (পতিত) বা শুষ্ক কিংবা এমন জমি যা থেকে কোন উপকার লাভ করা যায় না, তা সেচ, চাষাবাদ, কৃষি বা রোপনের মাধ্যমে উপকারী জমিতে রূপান্তরিত করে তাহলে তাতে তার জন্য (যে জমিকে কৃষি উপযোগী করল) সাওয়াব রয়েছে। এরপর যদি ঐ জমিতে উৎপন্ন শস্যাদি, ফল-মূল, খাদ্য, তরি-তরকারী ইত্যাদি থেকে কোন মানুষ, পশু কিংবা পাখি কিছু খায় এবং এ খাওয়ার কারণে কৃষক বা জমির মালিক যদি অসন্তুষ্ট না হয় তাহলে ঐসব প্রাণী যা খাবে তা তার জন্য সদাক্বাহ্ (সাদাকা) হিসেবে গণ্য হবে।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৯১৭-[৩০] বারা ইবনু ’আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কাউকে একটি দুগ্ধবতী ছাগী দুধ পানের জন্য দিবে অথবা রূপা (অর্থাৎ টাকা-পয়সা) ধার হিসেবে দেবে অথবা পথহারা কোন ব্যক্তিকে পথ দেখিয়ে দেবে, সে একটি গোলাম স্বাধীন করার মতো সাওয়াব পাবে। (তিরমিযী)[1]
وَعَنِ الْبَرَاءِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ مَنَحَ مِنْحَةَ لَبَنٍ أَو روق أَوْ هَدَى زُقَاقًا كَانَ لَهُ مِثْلَ عِتْقِ رَقَبَة» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: আল জাযারী (রহঃ) বলেন, টাকা-পয়সা দান করার অর্থ হলো টাকা-পয়সা ঋণ দেয়া আর দুধ দান করার অর্থ হলো উটনি বা ছাগল দান করা এ শর্তে যে, ঐ পশুর দুধ থেকে তারা লাভবান হবে এবং প্রয়োজন শেষে মালিককে ঐ পশুগুলো ফেরত দিবে। এ কাজগুলো যে করবে সে একজন দাস মুক্ত করার সাওয়াব পাবে। কাজগুলোর সাথে দাসমুক্তির সাওয়াবের সাদৃশ্য করা হয়েছে এজন্য যে, ঐ কাজগুলো দ্বারা সৃষ্টিজীবের উপকার সাধন করা হয় এবং তাদের প্রতি অনুগ্রহ করা হয়।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৯১৮-[৩১] আবূ জুরাই জাবির ইবনু সুলায়ম (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একবার মদীনায় এলাম, দেখলাম লোকেরা এক ব্যক্তির মতামত ও জ্ঞানবুদ্ধির উপর নির্ভরশীল। সে ব্যক্তি যা বলছে, মানুষ সে অনুযায়ী কাজ করছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? লোকেরা বলল, ইনি আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। বর্ণনাকারী বলেন, আমি (তাঁর খিদমাতে হাযির হয়ে) দু’বার বললাম, ’আলায়কাস্ সালা-ম’। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ’আলায়কাস্ সালা-ম’ বলো না। কারণ ’আলায়কাস্ সালা-ম’ হলো মৃত ব্যক্তির জন্য দু’আ। বরং বলো, ’আস্সালা-মু ’আলায়কা’। এরপর আমি বললাম, আপনি কি আল্লাহর রসূল? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি আল্লাহর রসূল। ওই আল্লাহর, যিনি কোন বিপদ-আপদে তুমি তাঁকে ডাকলে তিনি তা দূর করে দেন। তুমি যদি দুর্ভিক্ষে পতিত হয়ে তাঁকে ডাকো, তাহলে তিনি জমিনে তোমার জন্য সবুজ ফসল ফলিয়ে দেবেন। তৃণ ও প্রাণহীন কোন মরুপ্রান্তরে অথবা ময়দানে যখন থাকো এবং সেখানে তোমার বাহন হারিয়ে গেলে তুমি তাঁকে ডাকো, তিনি তা তোমাকে ফিরিয়ে দেবেন।
জাবির (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, আমাকে কিছু নাসীহাত করুন। তিনি বললেন, কাউকে গালমন্দ করো না। আবূ জুরাই বলেন, এরপর আমি আর কাউকে গালমন্দ করিনি-মুক্ত ব্যক্তিকে, গোলামকে, উট এবং বকরী কাউকেই নয়। (এরপর) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ কোন নেক কাজকে তুচ্ছ মনে করো না। যখন তোমার কোন ভাইয়ের সাথে কথাবার্তা বলবে তখন হাসিমুখে বলবে, এটাও নেক কাজের অংশ। তুমি তোমার পাজামা-লুঙ্গী হাঁটুর নীচ পর্যন্ত উঠিয়ে পড়বে। এতটুকু উঁচুতে ওঠাতে না চাইলে টাখনুদ্বয়ের উপরে রেখে পড়বে। কাপড় টাখনুর নীচে ছেড়ে দেয়া সম্পর্কে সাবধান, কারণ টাখনুর নীচে কাপড় পড়া অহংকারের লক্ষণ। আল্লাহ তা’আলা অহংকার পছন্দ করেন না। কেউ তোমাকে গালি দিলে এবং তোমার এমন কোন দোষের জন্য লজ্জা দিলে যা তোমার মধ্যে আছে বলে সে জানে, তাহলে তুমি (প্রতিশোধ নিতে) তার কোন দোষের জন্য তাকে লজ্জা দেবে না, যা তুমি জানো। কারণ তার গুনাহের ভাগী সে হবে। (আবূ দাঊদ; তিরমিযী এ হাদীসটি প্রথমাংশ অর্থাৎ ’’আস্সালা-ম’’ পর্যন্ত বর্ণনা করেছেন। তিরমিযীর অপর এক বর্ণনায়, ’’ফায়াকূনু লাকা আজরু যা-লিকা, ওয়া ওয়াবা-লুহূ ’আলাইহি’’ [তাহলে এর প্রতিদান তুমি পাবে এবং এর খারাপ পরিণতি তার ওপর বর্তাবে] পর্যন্ত বর্ণনা করেছেন।)[1]
وَعَنْ أَبِي جُرَيٍّ جَابِرِ بْنِ سُلَيْمٍ قَالَ: أَتَيْتُ الْمَدِينَةَ فَرَأَيْتُ رَجُلًا يَصْدُرُ النَّاسُ عَنْ رَأْيِهِ لَا يَقُولُ شَيْئًا إِلَّا صَدَرُوا عَنْهُ قُلْتُ مَنْ هَذَا قَالُوا: هَذَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قُلْتُ: عَلَيْكَ السَّلَامُ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَرَّتَيْنِ قَالَ: «لَا تقل عَلَيْك السَّلَام فَإِن عَلَيْكَ السَّلَامُ تَحِيَّةُ الْمَيِّتِ قُلِ السَّلَامُ عَلَيْكَ» قلت: أَنْت رَسُول الله؟ قَالَ: «أَنا رَسُول الله الَّذِي إِذا أَصَابَكَ ضُرٌّ فَدَعَوْتَهُ كَشَفَهُ عَنْكَ وَإِنْ أَصَابَكَ عَامُ سَنَةٍ فَدَعَوْتَهُ أَنْبَتَهَا لَكَ وَإِذَا كُنْتَ بِأَرْض قفراء أَوْ فَلَاةٍ فَضَلَّتْ رَاحِلَتُكَ فَدَعَوْتَهُ رَدَّهَا عَلَيْكَ» . قُلْتُ: اعْهَدْ إِلَيَّ. قَالَ: «لَا تَسُبَّنَّ أَحَدًا» قَالَ فَمَا سَبَبْتُ بَعْدَهُ حُرًّا وَلَا عَبْدًا وَلَا بَعِيرًا وَلَا شَاةً. قَالَ: «وَلَا تَحْقِرَنَّ شَيْئًا مِنَ الْمَعْرُوفِ وَأَنْ تُكَلِّمَ أَخَاكَ وَأَنْتَ مُنْبَسِطٌ إِلَيْهِ وَجْهُكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنَ الْمَعْرُوفِ وَارْفَعْ إِزَاَرَكَ إِلَى نِصْفِ السَّاقِ فَإِنْ أَبَيْتَ فَإِلَى الْكَعْبَيْنِ وَإِيَّاكَ وَإِسْبَالَ الْإِزَارِ فَإِنَّهَا مِنَ الْمَخِيلَةِ وَإِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمَخِيلَةَ وَإِنِ امْرُؤٌ شَتَمَكَ وَعَيَّرَكَ بِمَا يَعْلَمُ فِيكَ فَلَا تعيره بِمَا تعلم فِيهِ فَإِنَّمَا وَبَالُ ذَلِكَ عَلَيْهِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَرَوَى التِّرْمِذِيُّ مِنْهُ حَدِيثَ السَّلَامِ. وَفِي رِوَايَةٍ: «فَيَكُونَ لَكَ أَجْرُ ذَلِكَ وَوَبَالُهُ عَلَيْهِ»
ব্যাখ্যা: খাত্ত্বাবী (রহঃ) বলেন, ধারণা করা হয় যে, মৃত ব্যক্তিকে সালাম প্রদানের সুন্নাত পদ্ধতি হচ্ছে, ‘‘আলায়কাস্ সালা-ম’’ বলা, যেমনটা সাধারণ মানুষেরা (জাহিলী যুগে) বলতো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ কথা প্রমাণিত যে, তিনি যখন কবরস্থানে প্রবেশ করতেন তখন বলতেনঃ اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ دَارَ قَوْم مُؤْمِنِيْنَ। এ বাক্যে দেখা যাচ্ছে তিনি عَلَيْكُمْ -এর পূর্বে اَلسَّلَامُ শব্দ নিয়ে এসেছেন। যেভাবে জীবিতদের সালাম দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। মূলত সালামের সুন্নাতী পদ্ধতিতে জীবিত ও মৃতদের সালাম প্রদানের কোন ভিন্ন পদ্ধতি নেই।
আল্লামা ইবনুল ক্বইয়্যিম (রহঃ) তার বিখ্যাত গ্রন্থ যাদুল মা‘আদ-এ লিখেছেন, প্রথমে সালাম প্রদানের ক্ষেত্রে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ হচ্ছে ‘‘আসসালা-মু ‘আলায়কুম ওয়া রহমাতুল্ল-হ’’ বলা। তিনি প্রথমে সালামদাতার ক্ষেত্রে ‘‘আলায়কাস সালা-ম’’ বলা অপছন্দ করতেন। অতঃপর ইবনুল ক্বইয়্যিম (রহঃ) আবূ জুরাই (রাঃ)-এর এ হাদীসটি উল্লেখ করে বলেছেন, কিছু লোক এমনটা ধারণা করেছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মৃতদের সালাম দেয়ার ক্ষেত্রেও ‘‘আসসালা-মু’’ শব্দটি প্রথমে এনে ‘‘আসসালা-মু ‘আলায়কুম’’ বলে সালাম দিতেন। তারা আরো ধারণা করেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী, ‘‘আলায়কাস্ সালা-ম’’ হচ্ছে ‘‘মৃতদের সালাম’’ এ বাক্য দ্বারা মৃতদের সালাম দেয়া শার‘ঈ বিধান। তারা এখানে বুঝতে যে ভুল করেছে তার কারণেই এ বৈপরীত্য সৃষ্টি হয়েছে। মূলত রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঐ বক্তব্য তৎকালীন অবস্থা বা প্রচলনকে বুঝিয়েছে, শার‘ঈ বিধান হিসেবে বুঝায়নি।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৯১৯-[৩২] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার সাহাবীগণ (অথবা তাঁর পরিবারবর্গ) একটি বকরী যাবাহ করলেন। (মাংস (মাংস/গোসত) বণ্টনের পর) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, এর আর কী বাকী আছে? ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বললেন, একটি বাহু ছাড়া আর কিছু নেই। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ এর ঐ বাহুটি ছাড়া আর সবই বাকী আছে। (তিরমিযী; তিনি বলেন, এ হাদীসটি সহীহ।)[1]
وَعَن عَائِشَة إِنَّهُمْ ذَبَحُوا شَاةً فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا بَقِيَ مِنْهَا؟» قَالَتْ: مَا بَقِي مِنْهَا إِلَّا كتفها قَالَ: «بَقِي كلهَا غير كتفها» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَصَححهُ
ব্যাখ্যা: রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণ বা তাঁর পরিবারবর্গ একটি ছাগল যাবাহ করার পর সেটির একটি বাহু ছাড়া বাকী সকল গোশ্ত (গোশত/গোস্ত/গোসত) সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করা হয়ে গেলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ছাগলটির কোন অংশ বাকী আছে? উত্তরে ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বললেন, একটি বাহু বাকী আছে, যা সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করা হয়নি। এ উত্তর শুনে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ছাগলটির যা সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করা হয়েছে তাই মূলত আল্লাহর নিকট বাকী (জমা) আছে। আর যা তোমার নিকট জমা আছে অর্থাৎ সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করনি তা আসলে বাকী নেই। এ বক্তব্যের সমর্থনে মহান আল্লাহ তা‘আলার বাণী দেখতে পাওয়া যায় যেখানে আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ
مَا عِنْدَكُمْ يَنْفَدُ وَمَا عِنْدَ اللّهِ بَاقٍ
‘‘তোমাদের নিকট যা আছে তা নিঃশেষ হবে এবং আল্লাহর নিকট যা আছে তা স্থায়ী।’’ (সূরাহ্ আন্ নাহল ১৬ : ৯৬)
আল্ মুনযিরী বলেন, এ হাদীসের অর্থ হলো, সাহাবীগণ ছাগলটির সকল কিছুই দান করেছেন শুধু এর বাহুটি (যা জমা আছে) ছাড়া।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৯২০-[৩৩] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে মুসলিম ব্যক্তি অন্য কোন মুসলিম ব্যক্তিকে কাপড় পরাবে, সে আল্লাহ তা’আলার হিফাযাতে থাকবে যতদিন ওই কাপড়ের একটি টুকরা তাঁর পরনে থাকবে। (আহমাদ, তিরমিযী)[1]
وَعَن ابْن عَبَّاس قَالَ ك سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَا مِنْ مُسْلِمٍ كَسَا مُسْلِمًا ثَوْبًا إِلَّا كَانَ فِي حفظ من الله مادام عَلَيْهِ مِنْهُ خرقَة» . رَوَاهُ أَحْمد وَالتِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: দানকৃত কাপড়ের এক টুকরাও গায়ে থাকার অর্থ হলো কাপড়টি নষ্ট হওয়া পর্যন্ত। হাদীসটিতে বর্ণিত আল্লাহর হিফাযাত বলতে পার্থিব জগতের হিফাযাতকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। পরকালে এর অগণিত ও অপরিমেয় সাওয়াব রয়েছে। হাদীসে মুসলিম ব্যক্তিকে কাপড় পরিধান করানোর কথা বলায় বুঝা যায় কেউ যদি কোন অমুসলিম যিম্মীকে কাপড় পরিধান করায় তাহলে তার জন্য বর্ণিত অঙ্গীকার প্রযোজ্য হবে না।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৯২১-[৩৪] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাম করে বলেন যে, তিন ব্যক্তিকে আল্লাহ ভালবাসেন- (১) যে রাতে উঠে আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, (২) যে ডান হাতে কিছু দান করে এবং গোপন রাখে। বর্ণনাকারী বলেন, আমি মনে করি, তিনি বলেছেন- আপন বাম হাত থেকে (গোপন রাখে) এবং (৩) যে ব্যক্তি সৈন্যদলে থাকাবস্থায় তার সহচরগণ পরাজিত হলেও সে শত্রুর দিকে অগ্রসর হলো (এবং তাদেরকে পরাজিত করল অথবা শাহীদ হলো)। (তিরমিযী; তিনি একে গায়রে মাহফূয বা শায বলেছেন। এর একজন বর্ণনাকারী আবূ বকর ইবনু ’আইয়্যাশ বেশ ভুল করতেন। [কিন্তু অপর সানাদ অনুসারে এটা সহীহ])[1]
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ يَرْفَعُهُ قَالَ: ثَلَاثَةٌ يُحِبُّهُمُ اللَّهُ: رَجُلٌ قَامَ مِنَ اللَّيْلِ يَتْلُوا كِتَابَ اللَّهِ وَرَجُلٌ يَتَصَدَّقُ بِصَدَقَةٍ بِيَمِينِهِ يُخْفِيهَا أُرَاهُ قَالَ: مِنْ شِمَالِهِ وَرَجُلٌ كَانَ فِي سَرِيَّةٍ فَانْهَزَمَ أَصْحَابُهُ فَاسْتَقْبَلَ الْعَدُوَّ . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَيْرُ مَحْفُوظٍ أَحَدُ رُوَاتِهِ أَبُو بكر بن عَيَّاش كثير الْغَلَط
ব্যাখ্যা: যে তিন ব্যক্তিকে আল্লাহ ভালবাসেন তারা হলেন, (এক) ঐ ব্যক্তি যিনি রাতে তাহাজ্জুদের জন্য উঠে সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) আদায় করেন এবং সালাতে ও সালাতের বাইরে কুরআন তিলাওয়াত করেন; (দুই) আল্লাহর অধিক ভালবাসা এবং সন্তুষ্টি পাওয়ার উদ্দেশে লোক দেখানো (রিয়া) ও লোক শুনানো (সুম্‘আহ্)-এর গুনাহের ভয়ে সর্বোচ্চ গোপনীয়তার সাথে এমনভাবে দান করে যে দান ডান হাত করে কিন্তু বাম হাত জানে না। উল্লেখ্য যে, অত্র হাদীস দ্বারা ডান হাত দ্বারা দান-সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করাকে উত্তম শিষ্টাচার হিসেবে বুঝানো হয়েছে। (তিন) ঐ ব্যক্তি যে কোন ছোট সৈন্য বাহিনীর সদস্য হয়ে যুদ্ধ করছে এবং এক পর্যায়ে তার বাকী সৈন্য-সাথীরা পরাজয় বরণ করলেও তিনি আল্লাহর বাণীকে বিজয়ী করতে একাই যুদ্ধ চালিয়ে সামনের শত্রুদের দিকে অগ্রসর হন।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৯২২-[৩৫] আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তিন প্রকার লোককে আল্লাহ ভালবাসেন। তিন প্রকার লোককে অপছন্দ করেন। আল্লাহ ভালবাসেন, ওই ব্যক্তিকে যে এক দল লোকের কাছে এসে আল্লাহর দোহাই দিয়ে চাইল, কোন আত্মীয়তা বা নৈকট্যের দোহাই দিলো না। এ দলটি তাকে কিছু না দিয়ে বিমুখ করল। এরপর এদের মধ্যে এক ব্যক্তি সংগোপনে লোকটিকে কিছু দিলো। আল্লাহ যাকে দান করেছে সে ছাড়া এ দানের কথা আর কেউ জান না। দ্বিতীয় ওই ব্যক্তি যে তার দলের সাথে গোটা রাত অতিবাহিত করল। যখন তাদের সবার কাছে ঘুম প্রিয়তম হলো এবং দলের সকলে ঘুমিয়ে পড়ল। এ সময় ওই ব্যক্তি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার কাছে কান্নাকাটি করল ও কুরআন তিলাওয়াত শুরু করল। মোকাবেলা হলে তার বাহিনী যখন পরাজিত হল তখন সে ব্যক্তি শত্রুর মোকাবেলায় সর্বশক্তি নিয়োগ করল, যতক্ষণ না শাহীদ অথবা বিজয়ী হলো। যে তিন ব্যক্তিকে আল্লাহ অপছন্দ করেন, (তারা হলো) বৃদ্ধ যিনাকারী, অহংকারী ফকীর এবং অত্যাচারী ধনী। (তিরমিযী, নাসায়ী)[1]
وَعَنْ أَبِي ذَرٍّ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «ثَلَاثَةٌ يُحِبُّهُمُ اللَّهُ وَثَلَاثَةٌ يُبْغِضُهُمُ اللَّهُ فَأَمَّا الَّذِينَ يُحِبُّهُمُ اللَّهُ فَرَجُلٌ أَتَى قَوْمًا فَسَأَلَهُمْ بِاللَّه وَلم يسألهم بِقرَابَة بَيْنَهُ وَبَيْنَهُمْ فَمَنَعُوهُ فَتَخَلَّفَ رَجُلٌ بِأَعْيَانِهِمْ فَأَعْطَاهُ سِرًّا لَا يَعْلَمُ بِعَطِيَّتِهِ إِلَّا اللَّهُ وَالَّذِي أَعْطَاهُ وَقَوْمٌ سَارُوا لَيْلَتَهُمْ حَتَّى إِذَا كَانَ النَّوْمُ أَحَبَّ إِلَيْهِمْ مِمَّا يُعْدَلُ بِهِ فَوَضَعُوا رُءُوسَهُمْ فَقَامَ يَتَمَلَّقُنِي وَيَتْلُو آيَاتِي وَرَجُلٌ كَانَ فِي سَرِيَّة فلقي الْعَدو فهزموا وَأَقْبل بِصَدْرِهِ حَتَّى يُقْتَلَ أَوْ يُفْتَحَ لَهُ وَالثَّلَاثَةُ الَّذِينَ يُبْغِضُهُمُ اللَّهُ الشَّيْخُ الزَّانِي وَالْفَقِيرُ الْمُخْتَالُ والغني الظلوم» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: যে তিন ব্যক্তিকে আল্লাহ ভালবাসেন তাদের প্রথমজনের বর্ণনা হাদীসে যেভাবে এসেছে তাতে মনে হতে পারে যে, যে ব্যক্তি চেয়েছে অর্থাৎ ভিক্ষুক-ই ভালবাসা প্রাপ্ত ব্যক্তি। আসলে তা নয়। উদ্দেশ্য হচ্ছে- ঐ ভিক্ষুককে দানকারী ব্যক্তি। তবে ঐ ভিক্ষুক যদি কোন আত্মীয়তার সম্পর্ককে ওয়াসীলা না করে আল্লাহর নামকে ওয়াসীলা করে ভিক্ষা চায় (যেমন- আমাদের সমাজে ভিক্ষুকরা আল্লাহর ওয়াস্তে চায়) তাহলেই দানকারী এ বিশেষ মর্যাদা পাবে। মাফাতীহ গ্রন্থকার বলেন, কেউ যখন আল্লাহর নামে কারো নিকট কিছু চায় তাহলে অন্তত আল্লাহর নামের সম্মানে তাকে দান করা আবশ্যক। যদি কেউ তাকে না দেয় তাহলে সবাই বড় গুনাহের ভাগিদার হবে। তাদের মধ্য থেকে কেউ একজন যদি ঐ ভিক্ষুককে গোপনে দান করে তাহলে দানকারী ব্যক্তি দু’টি মর্যাদার অধিকারী হবেন। (এক) সে আল্লাহ তা‘আলার নামকে সম্মান করল। (দুই) সে গোপনে দান করল। আর গোপনে দান করার পৃথক মর্যাদা রয়েছে।
‘‘আমার আয়াত তিলাওয়াত করে’’-এর অর্থ হলো আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে এবং এর অর্থ সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করে।
‘‘বৃদ্ধ যিনাকারী’’ বলতে যুবক ব্যক্তির সাথে বৃদ্ধা মহিলার যিনা উদ্দেশ্য হতে পারে। আবার অবিবাহিত মেয়ের সাথে বিবাহিত ব্যক্তির ব্যভিচারও উদ্দেশ্য হতে পারে। যেমনটা তিলাওয়াত রহিত করা হয়েছে কিন্তু হুকুম (বিধান) জারি আছে এমন আয়াত ‘‘যখন বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা বা বিবাহিত পুরুষ-নারী যিনা করবে তাদের উভয়কে পাথর মেরে হত্যা করবে’’-এ বর্ণিত হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৯২৩-[৩৬] আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা পৃথিবী সৃষ্টি করার পর তা দুলতে লাগল। তখন পাহাড়গুলো সৃষ্টি করে সেগুলো পৃথিবীর উপর দাঁড় করিয়ে দিলেন। পৃথিবী স্থির হয়ে গেল। পাহাড়ের শক্তি দেখে মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) বিস্মিত হলেন। তারা জিজ্ঞেস করলেন, হে রাব্বুল আলামীন! আপনার সৃষ্টি জগতে পাহাড়ের চেয়ে শক্তিধর জিনিস আর কী আছে? আল্লাহ উত্তর দিলেন, হ্যাঁ, আছে। তা হলো লোহা। মালাকগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে রব! লোহার চেয়ে শক্তিধর কী কিছু আছে? আল্লাহ বললেন, হ্যাঁ, আগুন। মালাকগণ বললেন, পরওয়ারদিগার। আপনার সৃষ্টির মধ্যে আগুনের চেয়েও বেশী শক্তিধর কী? আল্লাহ তা’আলা বললেন, পানি। তারপর মালায়িকাহ্ জিজ্ঞেস করলেন, হে পরওয়ারদিগার! সৃষ্টির মধ্যে বাতাসের চেয়েও শক্তিধর কিছু আছে কী? আল্লাহ তা’আলা বললেন, হ্যাঁ, আছে। (আর তা হলো) আদম সন্তানের দান খায়রাত। ডান হাতে দান (এমনভাবে যে) বাম হাত হতেও গোপন করে থাকে। (তিরমিযী; তিনি বলেন, এ হাদীসটি গরীব।)[1]
মু’আয-এর হাদীস الصَّدَقَةُ تُطْفِئُ الْخَطِيئَةَ (অর্থাৎ দান-সদাক্বাহ্ (সাদাকা) পাপ মিটিয়ে দেয়) ’কিতাবুল ঈমান’-এ উল্লেখ করা হয়েছে।
وَعَن أنس بن مَالك عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَمَّا خَلَقَ اللَّهُ الْأَرْضَ جَعَلَتْ تَمِيدُ فَخَلَقَ الْجِبَالَ فَقَالَ بِهَا عَلَيْهَا فَاسْتَقَرَّتْ فَعَجِبَتِ الْمَلَائِكَةُ مِنْ شِدَّةِ الْجِبَالِ فَقَالُوا يَا رَبِّ هَلْ مِنْ خَلْقِكَ شَيْءٌ أَشَدُّ مِنِ الْجِبَالِ قَالَ نعم الْحَدِيد قَالُوا يَا رَبِّ هَلْ مِنْ خَلْقِكَ شَيْءٌ أَشَدُّ مِنَ الْحَدِيدِ قَالَ نَعَمِ النَّارُ فَقَالُوا يَا رب هَل من خلقك شَيْء أَشد من النَّار قَالَ نعم المَاء قَالُوا يَا رب فَهَل مِنْ خَلْقِكَ شَيْءٌ أَشَدُّ مِنَ الْمَاءِ قَالَ نَعَمِ الرِّيحُ فَقَالُوا يَا رَبِّ هَلْ مِنْ خَلْقِكَ شَيْءٌ أَشَدُّ مِنَ الرِّيحِ قَالَ نَعَمِ ابْن آدم تصدق بِصَدقَة بِيَمِينِهِ يخفيها من شِمَالِهِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ
وَذُكِرَ حَدِيثُ مُعَاذٍ: «الصَّدَقَةُ تُطْفِئُ الْخَطِيئَةَ» . فِي كتاب الْإِيمَان
ব্যাখ্যা: আল্লাহ তা‘আলা যখন সর্বপ্রথম কা‘বার জমিন সৃষ্টি করলেন এবং সেটাকে উত্তপ্ত ও এর চতুস্পার্শে বিস্তৃত করলেন তখন সেটি পানির উপর একটি থালা বা ফলকের মতো হলো। তারপর সে জমিনটি খুব নাড়াচাড়া ও আন্দোলিত হওয়া শুরু করল। এমনকি মালায়িকাহ্ বলে উঠল, এ জমিন দ্বারা মানবজাতি উপকৃত হতে পারবে না। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা পাহাড় সৃষ্টি করে তা জমিনে স্থাপিত করলেন, যাতে করে জমিন তার নিজ স্থানে স্থির হয়, তার স্থান থেকে নাড়াচাড়া না করে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা আল কুরআনে বলেন,
وَأَلْقى فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَنْ تَمِيْدَ بِكُمْ
অর্থাৎ ‘‘এবং তিনি পৃথিবীতে সুদৃঢ় পর্বত স্থাপন করেছেন, যাতে পৃথিবী তোমাদেরকে নিয়ে আন্দোলিত না হয়।’’ (সূরাহ্ আন্ নাহল ১৬ : ১৫)
মালায়িকাহ্ জিজ্ঞেস করলেন, হে রব! তোমার সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে পাহাড়ের থেকে অধিক শক্তিশালী কিছু আছে কি? আল্লাহ উত্তরে বললেন, হ্যাঁ, আছে, লোহা। কারণ লোহা দ্বারা পাথর ভাঙ্গা যায় এবং পাহাড়কে মূলোৎপাটিত বা অপসারণ করা যায়। মালায়িকাহ্ এরপর একই ধরনের প্রশ্ন করলে আল্লাহ উত্তর দিলেন, হ্যাঁ, লোহার থেকে অধিক শক্তিশালী হচ্ছে আগুন। কারণ আগুন লোহাকে গলিয়ে নরম করে ফেলে। আগুন থেকে অধিক শক্তিশালী হলো পানি। কারণ পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়। পানি থেকে অধিক শক্তিশালী হলো বাতাস। কারণ বাতাস পানিকে বিভক্ত করে এবং শুকিয়ে ফেলে। ত্বীবী বলেন, বাতাস পানি ভর্তি মেঘমালাকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যায়।
হাদীসে উল্লিখিত বিভিন্ন পদার্থ ও এমনকি বাতাস হতে যে জিনিসটি অধিক শক্তিশালী তা হলো আদম সন্তানের ঐ দান যা সে ডান হাতে দান করে কিন্তু বাম হাত জানে না। এর কারণ হলো, দানের মধ্যে নিজ ইচ্ছার বিরোধিতা করতে হয়, (অর্থাৎ সাধারণত কোন ব্যক্তি চায় না তারই কষ্টার্জিত সম্পদ নগদ লাভ ছাড়া হাত ছাড়া করতে), নিজ (সম্পদ জমা করার) স্বভাবকে এবং শায়ত্বনকে দমন/পরাভূত করতে হয়। (কারণ মানুষের স্বভাব হলো সম্পদ জমানো এবং গণনা করা, আর শায়ত্বন (শয়তান) তো চায়-ই না যে, মানুষ আল্লাহর রাস্তায় কিছু দান করুক এবং তাঁর প্রিয় বান্দা হয়ে যাক।) উল্লেখ্য যে, এগুলো করা ব্যতীত দান করা সম্ভব হয়ে উঠে না।
দান করা অধিক শক্তিশালী হওয়ার কারণ এও হতে পারে যে, ব্যক্তির দান আল্লাহর রাগকে প্রশমিত করে। আর আল্লাহর রাগের মতো কঠিন-কঠোর কিছুই নেই। যখন আল্লাহ বাতাসের মাধ্যমে কারো উপর শাস্তি পাঠাতে চান এবং তখন কেউ যদি কাউকে কিছু দান করে তাহলে ঐ দানের কারণে ঐ শাস্তি প্রতিহত হবে। তাহলে প্রমাণিত হলো, দান বাতাস থেকেও শক্তিশালী।
পরিচ্ছেদঃ ৬. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৯২৪-[৩৭] আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ যে মুসলিম বান্দা তার ধন-সম্পদ থেকে দু’ দু’টি (জোড়া) আল্লাহর পথে খরচ করে, জান্নাতের সকল প্রহরী তাকে অভ্যর্থনা জানাবে। তাকে তাদের কাছে রক্ষিত জিনিসের দিকে ডাকবে। আবূ যার (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, ’দু’ দু’টি অর্থ কী? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ যদি তাঁর কাছে উট থাকে তাহলে দু’ দু’টি করে উট আর যদি গরু থাকে, তাহলে দু’ দু’টি করে গরু (দান করবে)। (নাসায়ী)[1]
عَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا مِنْ عَبْدٍ مُسْلِمٍ يُنْفِقُ مِنْ كُلِّ مَالٍ لَهُ زَوْجَيْنِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ إِلَّا اسْتَقْبَلَتْهُ حَجَبَةُ الْجَنَّةِ كُلُّهُمْ يَدْعُوهُ إِلَى مَا عِنْدَهُ» . قُلْتُ: وَكَيْفَ ذَلِكَ؟ قَالَ: «إِنْ كَانَتْ إِبِلًا فَبَعِيرَيْنِ وَإِنْ كَانَت بقرة فبقرتين» . رَوَاهُ النَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: হাদীসে ‘‘ফী সাবীলিল্লা-হ’’ বা আল্লাহর পথে বলতে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে দান করাকে বুঝানো হয়েছে। মালায়িকাহ্’র (ফেরেশতাগণের) নিকট রয়েছে মহান ও বড় বড় নি‘আমাত (পুরস্কার) এবং জাঁকজমকপূর্ণ উপহার সামগ্রী।
পরিচ্ছেদঃ ৬. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৯২৫-[৩৮] মারসাদ ইবনু ’আবদুল্লাহ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কিছু সাহাবী আমাকে এ হাদীসটি শুনিয়েছেন যে, তাঁরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ কথা বলতে শুনেছেন, ’’কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন মু’মিনের ছায়া হবে তার দান সদাক্বাহ্ (সাদাকা)।’’ (আহমাদ)[1]
وَعَنْ مَرْثَدِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ: حَدَّثَنِي بَعْضِ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «إِنَّ ظِلَّ الْمُؤْمِنِ يَوْمَ الْقِيَامَة صدقته» . رَوَاهُ أَحْمد
ব্যাখ্যা: মূলত দান ক্বিয়ামাতের (কিয়ামতের) দিন দানকারীকে গরমের কষ্ট থেকে ছায়া দিয়ে রক্ষা করবে। ক্বারী বলেন, হাদীসের প্রকাশ্য অর্থ হলো, ক্বিয়ামাতের (কিয়ামতের) দিন মু’মিন দানকারীর দান তার জন্য ছায়া হবে। যেভাবে সে পৃথিবীতে মানুষকে দান করে ছায়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। তার দান শারীরিক আকৃতি ধারণ করেও দানকারীকে ছায়াও দিতে পারে কিংবা দানের সাওয়াবও শারীরিক আকৃতি লাভ করে দানকারীকে ছায়া দিতে পারে। তবে কেউ যদি তার সম্পদ যেমন কাপড়, চাদর/শামিয়ানা ইত্যাদি দান করে তাহলে বাস্তবেই তা ক্বিয়ামাতের (কিয়ামতের) দিন দানকারীকে ছায়া দিবে, যেমন বর্ণনা বিভিন্ন হাদীসে এসেছে। এ ব্যাখ্যার স্বপক্ষে যেসব হাদীস বর্ণিত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, ‘উক্ববাহ্ ইবনু ‘আমির (রাঃ) থেকে মুসনাদে আহমাদে (খ. ৪, পৃ. ১৪৭) এবং ইবনু খুযায়মাহ্, ইবনু হিব্বান এবং হাকিম (খ. ১, পৃ. ৪২৬) স্ব-স্ব গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, ক্বিয়ামাতের (কিয়ামতের) যখন মানুষের মাঝে বিচার চলবে তখন দানকারী ব্যক্তি তার দানকৃত বস্ত্তর ছায়ার নিচে অবস্থান করবে।
‘আমীর আল্ ইয়ামানী বলেনঃ বাস্তবিক অর্থেই দানকারী দানকৃত বস্ত্তর ছায়ায় অবস্থান করবে। সেদিন দানকৃত বস্ত্তগুলো একত্রিত করা হবে এবং সেগুলো দানকারী থেকে সূর্যের খড়তাপকে প্রতিহত করবে (অর্থাৎ সূর্যের সেদিনের প্রচন্ড তাপ দানকারীর শরীরে লাগবে না)। লেখক বলেন, হাদীসে বর্ণিত ছায়া বাস্তবিকই হবে, প্রতীকী নয়। এটাই নির্ভরযোগ্য মত।
পরিচ্ছেদঃ ৬. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৯২৬-[৩৯] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ’আশূরার দিন নিজের পরিবার পরিজনের জন্য উদারহস্তে খরচ করবে আল্লাহ তা’আলা গোটা বছর উদারহস্তে তাকে দান করবেন। সুফ্ইয়ান সাওরী বলেন, আমরা এর পরীক্ষা করেছি এবং কথার সত্যতার প্রমাণ পেয়েছি। (রযীন)[1]
وَعَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ وَسَّعَ عَلَى عِيَالِهِ فِي النَّفَقَةِ يَوْمَ عَاشُورَاءَ وَسَّعَ اللَّهُ عَلَيْهِ سَائِرَ سَنَتِهِ» . قَالَ سُفْيَانُ: إِنَّا قَدْ جربناه فوجدناه كَذَلِك. رَوَاهُ رزين
ব্যাখ্যা: হাদীসে পরিবার বলতে ব্যক্তির অধীন ঐসব ব্যক্তিবর্গকে বুঝাচ্ছে যাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব ঐ ব্যক্তির ওপর ন্যস্ত।
সুফ্ইয়ান আস্ সাওরী বলেনঃ আমি এবং আমার সঙ্গী-সাথীরা এ হাদীসের সঠিকতা/বিশুদ্ধতা অর্থাৎ ‘আশূরার দিন দান করলে দানকারীর ওপর আল্লাহর দান যে প্রশস্ত হয় তা পরীক্ষা করার উদ্দেশে তা করেছি এবং আমরা এর প্রতিদান পেয়েছি অর্থাৎ আমাদের খাদ্য প্রশস্ত হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৬. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৯২৭-[৪০] এ হাদীসটিকে ইমাম বায়হাক্বী ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ, আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ), আবূ সা’ঈদ ও জাবির (রাঃ) হতে শু’আবুল ঈমানে নকল করেছেন। তিনি এটি দুর্বল বলেও আখ্যায়িত করেছেন।[1]
وَرَوَى الْبَيْهَقِيُّ فِي شُعَبِ الْإِيمَانِ عَنْهُ وَعَنْ أبي هُرَيْرَة وَأبي سعيد وَجَابِر وَضَعفه
ব্যাখ্যা: ‘আশূরার দিন নিজ পরিবারের প্রতি প্রশস্ততার সাথে খরচ করার ব্যাপারে বর্ণিত হাদীস সম্পর্কে ‘আলিমগণ মতানৈক্য করেছেন। ইবনুল জাওযী, ইবনু তায়মিয়্যাহ্, আল ‘উকায়লী, আয্ যারকাশী (রহঃ)-এর মতে হাদীসটি বানোয়াট। তবে বায়হাক্বী (রহঃ)-এর মতে হাদীসটি বহু সূত্রে বর্ণিত হওয়ায় এটি শক্তিশালী হয়ে ‘হাসান’ হয়েছে। লেখক বলেন, আমার মতে নির্ভরযোগ্য মত হচ্ছে ইমাম বাইহাক্বীর মত। কারণ হাদীসটির বহু সূত্র একটি অপরটিকে শক্তিশালী করেছে। য‘ঈফ সানাদগুলো একত্র হয়ে শক্তি অর্জন করেছে। আল্লাহই এ ব্যাপারে অধিক জানেন।
পরিচ্ছেদঃ ৬. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সদাক্বার মর্যাদা
১৯২৮-[৪১] আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ যার (রাঃ) আরয করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমাকে বলুন সদাক্বার সাওয়াব কী? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এর সাওয়াব কয়েক গুণ। বরং আল্লাহর কাছে এর সাওয়াব আরও বেশী। (আহমাদ)[1]
وَعَنْ أَبِي أُمَامَةَ قَالَ: قَالَ أَبُو ذَرٍّ: يَا نَبِيَّ اللَّهِ أَرَأَيْتَ الصَّدَقَةُ مَاذَا هِيَ؟ قَالَ: «أَضْعَافٌ مُضَاعَفَةٌ وَعِنْدَ اللَّهِ الْمَزِيدُ» . رَوَاهُ أَحْمد
ব্যাখ্যা: এখানে ‘সদাক্বাহ্/দান’ বলতে কী এর সাওয়াব কী তা জিজ্ঞেস করা হয়েছে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বললেন, দানের সাওয়াব হলো দানের দশ থেকে সাতশ’ গুণ। আল্লাহর নিকট আরো অধিক রয়েছে। যেমন- আল্লাহ বলেছেন,
لِلَّذِيْنَ أَحْسَنُوا الْحُسْنى وَزِيَادَةٌ
‘‘যারা কল্যাণকর কাজ করে তাদের জন্য আছে কল্যাণ ও আরো অধিক।’’ (সূরাহ্ ইউনুস ১০ : ২৬)
কোন কল্যাণকর কাজের সাওয়াব আল্লাহ দ্বিগুণ প্রদান করেন এবং তার নিকট থেকে মহা পুরস্কারও দেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন,
وَإِنْ تَكُ حَسَنَةً يُضَاعِفْهَا وَيُؤْتِ مِنْ لَّدُنْهُ أَجْرًا عَظِيمًا
‘‘আর কোন পুণ্য কাজ হলে আল্লাহ সেটাকে দ্বিগুণ করেন এবং আল্লাহ তাঁর নিকট হতে মহাপুরস্কার প্রদান করেন।’’ (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪ : ৪০)
অত্র আয়াতে (مِنْ لَّدُنْهُ) অর্থাৎ ‘তাঁর নিকট হতে’ দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে, তিনি নিজ পক্ষ থেকে অতিরিক্তের উপর অতিরিক্ত দেন।
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - উত্তম সদাক্বার বর্ণনা
১৯২৯-[১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) ও হাকীম ইবনু হিযাম (রাঃ)হতে বর্ণিত। উভয়ে বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ উত্তম হলো ওই সদাক্বাহ্ (সাদাকা) যা স্বচ্ছল অবস্থায় দেয়া হয়। আর সদাক্বাহ্/দান শুরু করতে হবে ওই ব্যক্তি হতে যার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব তোমার ওপর বাধ্যতামূলক। (বুখারী; ইমাম মুসলিম এ হাদীসটিকে শুধু হাকীম ইবনু হিযাম থেকে বর্ণনা করেছেন।)[1]
بَابُ أَفْضَلِ الصَّدَقَةِ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ وَحَكِيمِ بْنِ حِزَامٍ قَالَا: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «خَيْرُ الصَّدَقَةِ مَا كَانَ عَنْ ظَهْرِ غِنًى وأبدأ بِمن تعول» . رَوَاهُ البُخَارِيّ وَمُسلم عَن حَكِيم وَحده
ব্যাখ্যা: সর্বোত্তম সদাক্বাহ্ (সাদাকা)/দান কোনটি তা নিয়ে বেশ মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। কারো মতে, ঐ দান সর্বোত্তম যা দান করার পরও বাকী সম্পদের দ্বারা দানকারীর সার্বিক প্রয়োজন পূরণ হয়। কারো মতে, সর্বোত্তম ঐ দান যা ব্যক্তির প্রয়োজনীয় সম্পদ রেখে তারপর দান করা হয়। অর্থাৎ যে সম্পদ দান করা হচ্ছে সে সম্পদের প্রতি যেন দানকারীর কিংবা দানকারীর ওপর ভরণ-পোষণের নির্ভরশীলদের প্রয়োজন না থাকে। ইমাম আল্ কুরতুবী তার আল্ মুফহাম (المفهم) গ্রন্থে বলেন, সর্বোত্তম দান হলো সেটি যেটি দানকারীর নিজের এবং তার পরিবারের অধিকার পূরণ করে দান করা হয় এবং দানকারীকে যেন দান করার পর অন্য কারো নিকট হাত পাততে না হয়।
অত্র হাদীসে স্বচ্ছলতা (غني) বলতে যা বুঝাচ্ছে তা হলো, এতটুকু সম্পদ ব্যক্তির মালিকানায় থাকা যা দ্বারা তার অত্যাবশ্যকীয় চাহিদাগুলো যেমন- অত্যধিক ক্ষুধার সময় খাদ্য, লজ্জাস্থান ঢাকার মতো কাপড় এবং নিজের দুঃখ-কষ্ট দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় বস্ত্ত ইত্যাদি। এমতাবস্থায় এসব প্রয়োজনের উপর অন্যের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেয়া বৈধ নয় বরং হারাম। যদি এ মুহূর্তে ব্যক্তি অন্য কিছুকে অগ্রাধিকার দেয় তাহলে প্রকারন্তরে নিজেকে সে ধ্বংস এবং ক্ষতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যা বৈধ নয়। সকল অবস্থায় ব্যক্তির নিজের অধিকার সংরক্ষণ অগ্রাধিকার পাবে। তবে নিজের প্রয়োজন মিটানোর পর অন্যকে অগ্রাধিকার দেয়া বৈধ হবে।
ব্যক্তির সমস্ত সম্পদ দান করা বৈধ কি-না সে ব্যাপারে ‘আলিমগণ মতানৈক্য করেছেন। ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেন, আমাদের মত হচ্ছে, যে ব্যক্তির ওপর ঋণ নেই এবং তাঁর সঙ্কটকালে বা দরিদ্রাবস্থায় তার ওপর ধৈর্য ধারণ করবে এমন পরিবার রয়েছে সেমতাবস্থায় ঐ ব্যক্তির জন্য তার সমস্ত সম্পদ দান করা মুস্তাহাব (পছন্দনীয়)। তবে উপর্যুক্ত শর্তাবলী পূরণ না করা হলে এরূপ দান মাকরূহ (অপছন্দনীয়)। ইমাম তাবারী (রহঃ) ও অন্যরা বলেন, জমহূরের (অধিকাংশ ‘আলিমের) মত হচ্ছে, কোন ব্যক্তি যদি তার শারীরিক ও মানসিক সুস্থাবস্থায় এবং এমন অবস্থায় থাকে যে, তার ওপর কোন ঋণের বোঝা নেই এমনকি সে দান করার পরবর্তী সময়ে আসন্ন দরিদ্রাবস্থা ও সঙ্কটকালে ধৈর্য ধারণ করতে পারবে এবং তার পরিবারও নেই বা যারা আছে তারা ধৈর্য ধারণ করবে তাহলে উপর্যুক্ত শর্তাবলী পূরণ সাপেক্ষে তার সমস্ত সম্পদ দান করে দেয়া তার জন্য বৈধ। যদি বর্ণিত শর্তাবলীর একটি শর্তও পূরণে ব্যর্থ হয়, তাহলে তার জন্য এরূপ করা মাকরূহ।
কারো কারো মতে, কেউ যদি তার পুরো সম্পদ দান করে দেয় তাহলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। দানকারীকে ফেরত দেয়া হবে। তবে কেউ কেউ বলেছেন, দানকারী যদি সমস্ত সম্পদ দান করে তাহলে তাকে দানকৃত সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ বাদে দুই-তৃতীয়াংশ ফেরত দেয়া হবে। এটি আওযা‘ঈ ও মাকহূল (রহঃ)-এর শর্ত। মাকহূল থেকে অর্ধেকের অতিরিক্ত ফেরত দেয়ারও একটি মত পাওয়া যায়। ইমাম তাবারী বলেন, উপর্যুক্ত মতগুলোর মধ্যে বৈধতার দিক থেকে প্রথম মতটি আমাদের নিকট সঠিক বলে মনে হয়। আর মুস্তাহাব হওয়ার দিক থেকে মোট সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ দান করার মতটি অধিক গ্রহণযোগ্য। কারণ এ মতটির মাধ্যমে আবূ বাকর (রাঃ) কর্তৃক তার সমস্ত সম্পদ দান করার হাদীস ও কা‘ব ইবনু মালিক-এর হাদীস, যে হাদীসে তাকে উদ্দেশ্য করে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, ‘তোমার কিছু সম্পদ তোমার নিকট রাখো। এটাই তোমার জন্য উত্তম, এর মধ্যে সমন্বয় করা সম্ভব।’
অত্র হাদীসের দ্বিতীয়াংশ ‘তুমি দান শুরু করবে তোমার পোষ্যদের দান করার মাধ্যমে’। এর অর্থ হলো, সর্বপ্রথম খরচ বা দান করতে হবে তাদেরকে যাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব দানকারীর ওপর রয়েছে। যদি তাদের দান করার পর অতিরিক্ত কিছু থাকে তাহলে তখন তা অপরিচিতদের মাঝে দান করা যাবে। হাফিয ইবনু হাজার আল্ আসক্বালানী বলেন, এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, অন্যদের দান করার পূর্বে নিজ এবং নিজের পরিবারের ওপর খরচ/দান করতে হবে। এ হাদীস দ্বারা ইসলামী শারী‘আতের একটি মূলনীতি সাব্যস্ত হয় যে, (الابتداء بالأهم فالأهم في الأمور الشرعية) অর্থাৎ শার‘ঈ বিষয়াবলী বা কর্মসমূহের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্পন্ন করতে হবে, তারপরে তৎপরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্পন্ন করতে হবে।
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - উত্তম সদাক্বার বর্ণনা
১৯৩০-[২] আবূ মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন মুসলিম যখন সাওয়াবের প্রত্যাশায় তার পরিবার-পরিজনের জন্য খরচ করে, এ খরচ তার জন্য সদাক্বাহ্ (সাদাকা) হিসেবে গণ্য হয়। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ أَفْضَلِ الصَّدَقَةِ
وَعَنْ أَبِي مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «إِذا أَنْفَقَ الْمُسْلِمُ نَفَقَةً عَلَى أَهْلِهِ وَهُوَ يَحْتَسِبُهَا كَانَت لَهُ صَدَقَة»
ব্যাখ্যা: হাদীসে খরচের পরিমাণ নির্দিষ্ট না করে উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। তাতে বুঝা যায়, যে কোন পরিমাণ খরচ করলেই এ হাদীস তাকে শামিল করবে। হাদীসে পরিবার বলতে স্ত্রী-সন্তান এবং নিকটাত্মীয় অথবা শুধু স্ত্রীকে বুঝানো হয়েছে। ‘সাওয়াবের আশায় খরচ করা’র অর্থ হলো আল্লাহ ঐ ব্যক্তির ওপর তার পোষ্যদের জন্য যে খরচ করার বাধ্য-বাধ্যকতা আরোপ করেছেন তা স্মরণ করে আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত আদেশ পালনের নিয়্যাতে তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশে খরচ করে। হাদীসে বর্ণিত সদাক্বাহ্ (সাদাকা) শব্দটি দ্বারা উদ্দেশ্য সম্পর্কে হাফিয ইবনু হাজার আল্ আসক্বালানী বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ‘সাওয়াব’। এ হাদীস দ্বারা জানা যায় যে, কোন ‘আমল দ্বারা সাওয়াব অর্জিত হওয়ার শর্ত হলো, ‘আমলটি করার পূর্বে অবশ্যই নিয়্যাত করতে হবে। আল-মুহাল্লাব বলেন, ‘পরিবারের ওপর খরচ করা ওয়াজিব (আবশ্যক)’। এ কথার উপর ইজমা সাব্যস্ত হয়েছে। হাদীসে শারী‘আত প্রণেতা সদাক্বাহ্ (সাদাকা) শব্দটি এজন্য ব্যবহার করেছেন যে, মানুষ যেন এটা ধারণা না করে যে, পরিবারের ওপর আবশ্যিক খরচে কোন সাওয়াব নেই। মূলত এতেও সাওয়াব রয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - উত্তম সদাক্বার বর্ণনা
১৯৩১-[৩] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এক রকম দীনার তাই যা তোমরা আল্লাহর পথে খরচ করো। এক রকম দীনার সেটাই যা তুমি গোলাম আযাদ করার জন্য খরচ করো। এসব দীনারের মধ্যে সাওয়াবের দিক দিয়ে সবচেয়ে মর্যাদাবান হলো যা তুমি তোমার পরিবার-পরিজনের জন্য খরচ করো। (মুসলিম)[1]
بَابُ أَفْضَلِ الصَّدَقَةِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «دِينَار أنفقته فِي سَبِيل الله ودينار أنفقته فِي رَقَبَةٍ وَدِينَارٌ تَصَدَّقْتَ بِهِ عَلَى مِسْكِينٍ وَدِينَارٌ أَنْفَقْتَهُ عَلَى أَهْلِكَ أَعْظَمُهَا أَجْرًا الَّذِي أنفقته على أهلك» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: ‘‘ফী সাবীলিল্লা-হ’’ বা ‘আল্লাহর রাস্তা’ দ্বারা বিশেষভাবে যুদ্ধ-জিহাদ কিংবা ব্যাপকভাবে যে কোন কল্যাণকর কাজকে বুঝানো হয়েছে। এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর রাস্তায় বা বন্দি মুক্তি (দাস আযাদ) কিংবা ফকির-মিসকীনদেরকে দান করার চেয়ে নিজ পরিবারের ওপর খরচ করা অধিক ফাযীলাতপূর্ণ। নিজ পরিবারের ওপর খরচ করা সর্বোত্তম।
সাধারণত এর কারণ দু’টি হতে পারে। (এক) নিজ পরিবারের ওপর খরচ করা ফরয। আর ফরয সাধারণত নফলের চেয়ে উত্তম। (দুই) নিজ পরিবারের ওপর খরচ করলে দান করার ও সম্পর্ক রক্ষা করা উভয় সাওয়াবই পাওয়া যায়।
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - উত্তম সদাক্বার বর্ণনা
১৯৩২-[৪] সাওবান (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ উত্তম হলো ওই দীনার যা কোন ব্যক্তি পরিবার-পরিজন লালন-পালনের জন্য খরচ করে। উত্তম দীনার হলো তাই যা কোন মানুষ এমন সব পশু পালনে খরচ করে যেগুলো আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করার জন্য লালিত-পালিত হয়েছে। উত্তম দীনার হলো ওই দীনার যা কোন মানুষ আল্লাহর পথে জিহাদকারী বন্ধুদের জন্য খরচ করে। (মুসলিম)[1]
بَابُ أَفْضَلِ الصَّدَقَةِ
وَعَنْ ثَوْبَانَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَفْضَلُ دِينَارٍ يُنْفِقُهُ الرَّجُلُ دِينَارٌ يُنْفِقُهُ عَلَى عِيَالِهِ وَدِينَارٌ يُنْفِقُهُ عَلَى دَابَّتِهِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَدِينَارٌ يُنْفِقُهُ عَلَى أَصْحَابه فِي سَبِيل الله» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: আল্লামা মুল্লা ‘আলী ক্বারী বলেন, ইবনুল মালিক উল্লেখ করেছেন, ‘হাদীসে বর্ণিত তিন প্রকার খাত অন্য যে কোন খাতের চেয়ে বেশি ফাযীলাতপূর্ণ’। তবে হাদীসে বর্ণিত তিনটি খাতের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় না। কেননা (وَ) ‘এবং’ শব্দ সাধারণত একত্র বুঝানোর জন্য আসে (কোন বিশেষ মর্যাদা বুঝায় না)। তবে কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক যে ধারাবাহিকতা বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লিখিত হয়েছে তার মধ্যে গুঢ় রহস্য বা তাৎপর্য রয়েছে। বিশেষ করে যদি বিষয়টি নির্দিষ্ট করা থাকে তাহলে তো কথাই নেই। যেমন- রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাজ্জে সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মধ্যে সা‘ঈ প্রথম কোন্ পাহাড় থেকে শুরু করবে তার বিধান বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন,
إبدؤا بما بدأ الله تعالى: إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللّهِ
অর্থাৎ তোমরা সেখান থেকেই শুরু করো যেখান থেকে আল্লাহ শুরু করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘‘নিশ্চয়ই সাফা এবং মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত।’’ (সূরাহ্ আল বাক্বারাহ্ ২ : ১৫৮)
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - উত্তম সদাক্বার বর্ণনা
১৯৩৩-[৫] উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (একদিন) আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল! আবূ সালামার ছেলেদের জন্য খরচ করাতে আমার কোন সাওয়াব হবে কি? কারণ তারা তো আমারই ছেলে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাদের জন্য খরচ করো। তাদের জন্য তুমি যা খরচ করবে তার সাওয়াব পাবে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ أَفْضَلِ الصَّدَقَةِ
وَعَنْ أُمِّ سَلَمَةَ قَالَتْ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَلِيَ أَجْرٌ أَنْ أَنْفِقَ عَلَى بَنِي أَبِي سَلَمَةَ؟ إِنَّمَا هُمْ بَنِيَّ فَقَالَ: «أَنَفِقِي عَلَيْهِمْ فَلَكِ أَجْرُ مَا أَنْفَقْتِ عَلَيْهِم»
ব্যাখ্যা: উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) হলেন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী। তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পূর্বে ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আবদুল আসাদ, যিনি আবূ সালামাহ্ নামে পরিচিত তার স্ত্রী ছিলেন। আবূ সালামাহ্ মারা যাওয়ার পর উম্মু সালামাকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহ করেন। আবূ সালামার ঘরে উম্মু সালামার সন্তান ছিল পাঁচ জন। তারা হলেন, সালামাহ্, ‘উমার, মুহাম্মাদ, যায়নাব ও দুররা।
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - উত্তম সদাক্বার বর্ণনা
১৯৩৪-[৬] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ)-এর স্ত্রী যায়নাব (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে রমণীগণ! তোমরা দান খয়রাত করো। তা তোমাদের অলংকারাদি হতে। যায়নাব বলেন, (এ কথা শুনে) আমি ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ-এর কাছে এলাম। তাঁকে বললাম, আপনি রিক্তহস্ত মানুষ। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে দান সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করতে বলেছেন। তাই আপনি তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে জেনে আসুন (আমি যদি আপনাকে ও আপনার সন্তানদের জন্য সদাক্বাহ্ (সাদাকা) হিসেবে খরচ করি তাহলে তা আদায় হবে কিনা?) যদি হয়, তাহলে আমি আপনাকেই সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দিয়ে দেব। আর না হলে আপনি ছাড়া অন্য কাউকে দেব। যায়নাব বলেন, ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) (এ কথা শুনে) আমাকে বললেন, ’’তুমিই যাও’’। তাই আমি নিজেই তাঁর কাছে গেলাম। আমি গিয়ে দেখলাম, তাঁর ঘরের দরজায় আনসারের এক মহিলাও দাঁড়িয়ে আছে। আমার ও তার প্রয়োজন একই।
যায়নাব বলেন, যেহেতু রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ব্যক্তিত্বের কারণে (তাঁর নিকট যাবার সাহস আমাদের হলো না), তাই বিলাল (রাঃ)আমাদের কাছে এলে আমরা তাঁকে বললাম, আপনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গিয়ে খবর দিন যে, দু’জন মহিলা দরজায় আপনার কাছ থেকে জানতে চায়, তারা যদি তাদের (গরীব) স্বামী, অথবা তাদের পোষ্য ইয়াতীম সন্তানদেরকে দান-খয়রাত করে তাতে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) আদায় হবে কিনা? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমাদের পরিচয় দেবেন না। সে মতে বিলাল (রাঃ)রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গেলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন।
(এ কথা শুনে) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তারা কারা? বিলাল (রাঃ)বললেন, একজন আনসার মহিলা, অপরজন যায়নাব। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ যায়নাব? বিলাল বললেন, ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস’ঊদের স্ত্রী। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাদের জন্য দ্বিগুণ সাওয়াব। এক গুণ ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তার হক আদায়ের জন্য, আর এক গুণ দান-খয়রাতের জন্য। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ أَفْضَلِ الصَّدَقَةِ
وَعَنْ زَيْنَبَ امْرَأَةِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «تَصَدَّقْنَ يَا مَعْشَرَ النِّسَاءِ وَلَوْ مِنْ حُلِيِّكُنَّ» قَالَتْ فَرَجَعْتُ إِلَى عَبْدِ اللَّهِ فَقُلْتُ إِنَّكَ رَجُلٌ خَفِيفُ ذَاتِ الْيَدِ وَإِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَدْ أَمَرَنَا بِالصَّدَقَةِ فَأْتِهِ فَاسْأَلْهُ فَإِنْ كَانَ ذَلِك يَجْزِي عني وَإِلَّا صرفتها إِلَى غَيْركُمْ قَالَت فَقَالَ لِي عَبْدُ اللَّهِ بَلِ ائْتِيهِ أَنْتِ قَالَتْ فَانْطَلَقْتُ فَإِذَا امْرَأَةٌ مِنَ الْأَنْصَارِ بِبَابِ رَسُولِ الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم حَاجَتي حَاجَتهَا قَالَتْ وَكَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قد ألقيت عَلَيْهِ المهابة. فَقَالَت فَخَرَجَ عَلَيْنَا بِلَالٌ فَقُلْنَا لَهُ ائْتِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَخْبَرَهُ أَنَّ امْرَأتَيْنِ بِالْبَابِ تسألانك أتجزئ الصَّدَقَة عَنْهُمَا على أَزْوَاجِهِمَا وَعَلَى أَيْتَامٍ فِي حُجُورِهِمَا وَلَا تُخْبِرْهُ مَنْ نَحْنُ. قَالَتْ فَدَخَلَ بِلَالٌ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَسَأَلَهُ فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ هما» . فَقَالَ امْرَأَة من الْأَنْصَار وَزَيْنَب فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَيُّ الزَّيَانِبِ» . قَالَ امْرَأَةُ عَبْدِ اللَّهِ فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَهما أَجْرَانِ أجر الْقَرَابَة وَأجر الصَّدَقَة» . وَاللَّفْظ لمُسلم
ব্যাখ্যা: আল্ মাহা-বাহ্ (المهابة) অর্থ হলো ভয়, ভীতি, সম্মান, ভক্তি, শ্রদ্ধা ইত্যাদি। আল্লাহ তা‘আলা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এমন ভয়ের বা শ্রদ্ধার চেহারা বা অবস্থা দিয়েছিলেন যার কারণে মানুষেরা তাকে ভয় করত এবং শ্রদ্ধা করত। এ কারণেই তার নিকট (অনুমতি ছাড়া বা সহসা) প্রবেশের সাহস সাধারণত কেউ দেখাত না। ত্বীবী বলেন, এ কারণেই সাহাবীগণ যখন তাঁর মাজলিসে বসতেন তখন এতটাই নীরব ও সুশৃঙ্খল থাকতেন যেন তাদের মাথার উপর পাখি বসা আছে। নড়াচড়া করলেই উড়ে যাবে। এটা ছিল রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি আল্লাহর সম্মানের নিদর্শন।
হাদীসের এক পর্যায়ে ঐ মহিলা দু’জনের সাথে বিলাল (রাঃ)-এর দেখা হলে তারা তাকে বলেছিল যে, সে যেন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট তাদের ব্যাপারটি বলার সময় তারা কারা তা না বলে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বিলাল (রাঃ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট তাদের পরিচয় বলেছেন। এর কারণ হলো, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নিকট ঐ দু’ মহিলার পরিচয় জানতে চাইলে বিলাল (রাঃ) তাদের পরিচয় দেন, বিশেষ করে একজনের নাম উল্লেখ করেছেন। ঐ মহিলার নিষেধ করা সত্ত্বেও বিলাল (রাঃ) এ জন্যই বললেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোন কিছু জানতে চান তা তাকে জানানো আবশ্যক। তাই বিলাল (রাঃ) মহিলাদের অনুরোধ রাখতে পারেননি।
ইমাম শাফি‘ঈ, সাওরী, আবূ ইউসুফ, মুহাম্মাদ এবং মালিক ও আহমাদ (রহঃ)-এর একটি মত অনুযায়ী এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, নিজ স্বামীকে যাকাত দেয়া স্ত্রীর জন্য বৈধ। ইমাম আবূ হানীফাহ্, মালিক ও আহমাদের এক মত অনুযায়ী এরূপ করা বৈধ নয়। (লেখক বলেন,) আমার মত হচ্ছে স্ত্রী তার স্বামীকে যাকাত দিতে পারে, এটা বৈধ। কারণ যে সকল মুসলিমদের যাকাত দেয়া যায় স্বামীও তাদের অন্তর্ভুক্ত। স্বামীকে যাকাত দিতে নিষেধাজ্ঞাপক কোন আয়াত বা হাদীস নেই। এমনকি কোন ইজমা বা বিশুদ্ধ ক্বিয়াসও নেই। ইমাম আশ্ শাওকানী বলেন, কেউ যদি স্বামীকে যাকাত দেয়া অবৈধ বলে তাহলে তাকে নিষেধাজ্ঞার দলীল পেশ করতে হবে। ‘আলিমগণ এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, স্বামী তার স্ত্রীকে যাকাত দিতে পারবে না। এটা অবৈধ। কেননা স্ত্রীর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব স্বামীর ওপর ন্যস্ত।
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - উত্তম সদাক্বার বর্ণনা
১৯৩৫-[৭] উম্মুল মু’মিনীন মায়মূনাহ্ বিনতু হারিস (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি (একবার) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি দাসী আযাদ করে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে উল্লেখ করলেন। তিনি বললেন, তুমি যদি এ দাসীটি তোমার মামাকে দিয়ে দিতে, তাহলে বেশী সাওয়াব হত। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ أَفْضَلِ الصَّدَقَةِ
وَعَنْ مَيْمُونَةَ بِنْتِ الْحَارِثِ: أَنَّهَا أَعْتَقَتْ وَلِيدَةً فِي زَمَانِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَذَكَرَتْ ذَلِكَ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «لَوْ أَعْطَيْتِهَا أخوالك كَانَ أعظم لأجرك»
ব্যাখ্যা: ইবনু বাত্ত্বাল বলেন, এ হাদীসের শিক্ষা হলো, গোলাম আযাদ করার চেয়ে আত্মীয়দের দান করা বেশি ফাযীলাতপূর্ণ। এ হাদীস দ্বারা আত্মীয়তার সম্পর্ক ও নিকটাত্মীয়দের প্রতি সদাচরণ করার ফাযীলাত বর্ণিত হয়েছে। মায়ের নিকটাত্মীয়দের প্রতি লক্ষ্য রাখা উচিত। এ হাদীস দ্বারা আরো প্রমাণিত হয় যে, স্ত্রী যদি প্রাপ্তবয়স্কা হয় তাহলে স্বামীর অনুমতি ছাড়াই নিজ সম্পদ থেকে দান করা বৈধ।
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - উত্তম সদাক্বার বর্ণনা
১৯৩৬-[৮] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমার দু’জন প্রতিবেশী আছে। এ দু’জনের মধ্যে কাকে আমি হাদিয়্যাহ্ (উপহার) দেব? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এ দু’জনের যার ঘরের দরজা তোমার বেশী নিকটবর্তী। (বুখারী)[1]
بَابُ أَفْضَلِ الصَّدَقَةِ
وَعَن عَائِشَة قَالَت: يَا رَسُول الله إِن لِي جَارَيْنِ فَإِلَى أَيِّهِمَا أُهْدِي؟ قَالَ: «إِلَى أقربهما مِنْك بَابا» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: যার ঘরে দরজা তোমার অধিক নিকটে তাকে প্রথমে দান করবে। কারণ সবচেয়ে নিকটবর্তী প্রতিবেশী তার প্রতিবেশীর ঘরে উপহার সামগ্রী বা অন্যান্য কী কী বস্ত্ত ঢোকে তা দেখে। তাছাড়া নিকটতম প্রতিবেশীর সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ও আসা-যাওয়া, মেলামেশা বেশি ঘটে এবং তারাই প্রতিবেশীর যে কোন প্রয়োজনে সর্বাগ্রে এগিয়ে আসে। তাই তারাই অপেক্ষাকৃতভাবে বেশি হকদার।
ইবনু আবী জামরাহ্ বলেন, সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশীকে উপহার প্রদান করা মুস্তাহাব। যেহেতু উপহার প্রদানের বিষয়টি ওয়াজিব নয় সেহেতু সেক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা ওয়াজিব নয়। (লেখক বলেন,) এ হাদীস দ্বারা এ কথা বুঝানো উদ্দেশ্য নয় যে, সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশীকেই শুধু উপহার দিতে হবে, অন্য কোন প্রতিবেশীকে দেয়া যাবে না। যেমনটি হাদীসের বাহ্যিক অর্থ দ্বারা বুঝা যায়। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, নিকটতম প্রতিবেশী সর্বাগ্রে উপহার পাওয়ার অথবা অতিরিক্ত অনুগ্রহ পাওয়ার অধিক উপযোগী। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
...الْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ...
অর্থাৎ ‘‘... নিকট প্রতিবেশী ও দূর প্রতিবেশী...-এর সাথে সদ্ব্যবহার করবে।’’ (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪ : ৩৬)
প্রতিবেশী কে? এ প্রশ্নের উত্তরে মতানৈক্য রয়েছে। ‘আলী (রাঃ)-এর মতে, যে ডাক শুনতে পায় সে প্রতিবেশী। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর মতে, প্রতিবেশী হচ্ছে প্রত্যেক দিকে চল্লিশ ঘর পর্যন্ত। ইবনু ওয়াহ্ব ইউনুস থেকে, তিনি ইবনু শিহাব থেকে বর্ণনা করেন যে, প্রতিবেশী হচ্ছে ডান, বাম, পিছন, সামনে চল্লিশ ঘর। এর দ্বারা এটাও বুঝানো হতে পারে যে, প্রতি দিকে দশ ঘর।
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - উত্তম সদাক্বার বর্ণনা
১৯৩৭-[৯] আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা যখন তরকারী রান্না করো, পানি একটু বেশী করে দিও এবং প্রতিবেশীর প্রতি লক্ষ্য রেখ। (মুসলিম)[1]
بَابُ أَفْضَلِ الصَّدَقَةِ
وَعَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا طَبَخْتَ مَرَقَةً فَأكْثر ماءها وتعاهد جيرانك» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তুমি যখন গোশ্ত (গোশত/গোস্ত/গোসত) রান্না করবে তখন তাতে ঝোল একটু বেশি দিবে এবং প্রতিবেশীকে তা থেকে কিছু ঝোল দিবে। তুমি তোমার পাতিলে কম পানি দিও না। যদি কম পানি দাও তাহলে তুমি তোমার প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা করতে পারবে না।
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - উত্তম সদাক্বার বর্ণনা
১৯৩৮-[১০] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসূল! কোন্ সদাক্বাহ্ (সাদাকা) বেশী উত্তম? তিনি বললেন, কম সম্পদশালীর বেশী (কষ্টশ্লিষ্ট করে) সদাক্বাহ্ (সাদাকা)। সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দেয়া শুরু করবে তাদেরকে দিয়ে যাদের দেখাশুনা তোমার দায়িত্ব। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيُّ الصَّدَقَةِ أَفْضَلُ؟ قَالَ: «جُهْدُ الْمُقِلِّ وَابْدَأْ بِمَنْ تَعُولُ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীস ও পূর্বোক্ত ‘স্বচ্ছল অবস্থায় দান করা অধিক উত্তম দান’ হাদীসের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করতে গিয়ে বলা যায় দানের ক্ষেত্রে দানকারী, তার ভরসার দৃঢ়তা ও বিশ্বাসের দুর্বলতার ভিত্তিতে ফাযীলাত বিভিন্ন হয়। ইমাম বায়হাক্বী (রহঃ) বলেন, দানকারীর অসচ্ছল অবস্থা, অভাব-অনটনে ধৈর্য ধারণ করা না করা এবং কম সম্পদে তুষ্ট থাকা না থাকার উপর নির্ভর করে। এ অধ্যায়ে বর্ণিত হাদীসসমূহ সে অর্থই প্রমাণ করে। আল্লামা শাওকানী (রহঃ) উপর্যুক্ত দু’ ধরনের হাদীসের মধ্যকার বৈপরীত্য উল্লেখ করে বলেন, বর্তমান হাদীসের সমর্থনে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَيُؤْثِرُوْنَ عَلى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ
অর্থাৎ ‘‘আর তারা তাদেরকে নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দেয় নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও।’’ (সূরাহ্ আল হাশর ৫৯ : ৯)
পূর্বোক্ত স্বচ্ছল অবস্থায় দান করার হাদীসের সমর্থনে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَلَا تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلى عُنُقِكَ وَلَا تَبْسُطْهَا كُلَّ الْبَسْطِ
অর্থাৎ ‘‘তুমি তোমার হাত তোমার গ্রীবায় আবদি করে রেখ না এবং তা সম্পূর্ণ প্রসারিতও করো না।’’ (সূরাহ্ আল ইসরা/ইসরাঈল ১৭ : ২৯)
এ দু’ হাদীসের মধ্যে সমন্বয়ে বলা যায়, কেউ যদি তার সমস্ত সম্পদ দান করে ফেললে মানুষের কাছে হাত পাততে হবে/ভিক্ষা করে চলতে হবে এমতাবস্থায় তার জন্য স্বচ্ছল অবস্থায় দান করা অধিক উত্তম। আবার কেউ যদি অভাব-অনটনে ধৈর্যধারণ করে তার অতি প্রয়োজনীয় সম্পদ থেকে দান করে তাহলে তা হবে সর্বোত্তম দান।
এমনও হতে পারে যে, স্বচ্ছলতা/ধনাঢ্যতা বলতে অন্তরের ধনাঢ্যতা বুঝানো হয়েছে। যেমনভাবে বুখারী-মুসলিমে আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে এসেছে- ‘‘ধন-সম্পদের আধিক্যই ধনাঢ্যতা নয়, অন্তরের ধনাঢ্যতাই আসল ধনাঢ্যতা।’’ (স্বচ্ছলতা বলতে অন্তরের ধনাঢ্যতা বুঝালে আর কোন বৈপরীত্য থাকে না।)
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - উত্তম সদাক্বার বর্ণনা
১৯৩৯-[১১] সালমান ইবনু ’আমির (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মিসকীনকে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করা এক প্রকার, আর নিকটাত্মীয়ের কাউকে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দেয়া দু’ প্রকার সাওয়াবের কারণ। এক রকম সাওয়াব নিকটাত্মীয়ের হক আদায় এবং অন্য রকম সাওয়াব সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করার জন্য। (আহমাদ, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ ও দারিমী)[1]
وَعَنْ سَلْمَانَ بْنِ عَامِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: الصَّدَقَةُ عَلَى الْمِسْكِينِ صَدَقَةٌ وَهِيَ عَلَى ذِي الرَّحِمِ ثِنْتَانِ: صَدَقَةٌ وَصِلَةٌ . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَالنَّسَائِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ وَالدَّارِمِيُّ
ব্যাখ্যা: এখানে ‘সদাক্বাহ্ (সাদাকা)’ বলতে ফরয ও মুস্তাহাব সকল দানকে বুঝাচ্ছে। এ হাদীস দ্বারা আরো প্রমাণ হয় যে, নিকটাত্মীয়দের যাকাত দেয়া সাধারণভাবে বৈধ। আল্লামা শাওকানী বলেন, এ হাদীস দ্বারা প্রমাণ হয় যে, নিকটাত্মীয় হোক সে ভরণ-পোষণ আবশ্যক এমন ব্যক্তিদের মধ্য থেকে কিংবা অন্যদের মধ্য থেকে, তাদেরকে যাকাত দেয়া বৈধ। কারণ অত্র হাদীসে ‘‘সদাক্বাহ্ (সাদাকা)’’ বলতে নির্দিষ্ট করে নফল সদাক্বাহ্ (সাদাকা) বুঝানো হয়নি। তবে ইবনুল মুনযির থেকে ‘সন্তানদেরকে যাকাত দেয়া যাবে না’ মর্মে ইজমা বর্ণিত হয়েছে।
আত্মীয়দের দান করলে দু’টি সাওয়াব। একটি দানের সাওয়াব অপরটি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার সাওয়াব। এর দ্বারা মূলত আত্মীয়দেরকে দান করার প্রতি উৎসাহ দেয়া হয়েছে এবং এর প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এ হাদীস দ্বারা আরো প্রমাণ হয়, আত্মীয়দেরকে দান করা সর্বোত্তম। কারণ তাতে দু’টি সাওয়াব। আর এ কথা সুস্পষ্ট ও সন্দেহাতীত যে, একটির থেকে দু’টি উত্তম।
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - উত্তম সদাক্বার বর্ণনা
১৯৪০-[১২] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (একদিন) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে এক ব্যক্তি এসে বললো, (হে আল্লাহর রসূল!) আমার কাছে একটি দীনার আছে। (এ কথা শুনে) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ এ দীনারটি তুমি তোমার সন্তানের জন্য খরচ করো। সে বলল, আমার আরো একটি দীনার আছে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ এটি তুমি তোমার পরিবারের জন্য খরচ করো। লোকটি বলল, আমার আরো একটি দীনার আছে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ এটা তোমার খাদিমের জন্য খরচ করো। সে বলল, আমার আরো একটি দীনার আছে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ (এবার) তুমি এ ব্যাপারে বেশী জান (কাকে দেবে)। (আবূ দাঊদ, নাসায়ী)[1]
وَعَن أَي هُرَيْرَةَ قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: عِنْدِي دِينَار فَقَالَ: «أَنْفِقْهُ عَلَى نَفْسِكَ» قَالَ: عِنْدِي آخَرُ قَالَ: «أَنْفِقْهُ عَلَى وَلَدِكَ» قَالَ: عِنْدِي آخَرُ قَالَ: «أَنْفِقْهُ عَلَى أَهْلِكَ» قَالَ: عِنْدِي آخَرُ قَالَ: «أَنْفِقْهُ عَلَى خَادِمِكَ» . قَالَ: عِنْدِي آخَرُ قَالَ: «أَنْت أعلم» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: নিজের ওপর খরচ করার অর্থ হলো ঐ অর্থ দ্বারা নিজের প্রয়োজন পূরণ করো। সন্তানের উপর খরচ করার আদেশ দ্বারা প্রমাণ হয় যে, অস্বচ্ছল সন্তানের প্রয়োজনে খরচ করা পিতার জন্য আবশ্যক। যদি সে সন্তান ছোট হয় তাহলে তো তার ওপর খরচ করা সর্বসম্মতভাবে পিতার জন্য আবশ্যক। আর যদি সন্তান বড় (প্রাপ্তবয়স্ক/উপার্জনক্ষম) হয় তাহলে তার ওপর খরচ করা পিতার জন্য আবশ্যক দায়িত্ব কি-না তা নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে।
ত্বীবী বলেন, স্ত্রীর পূর্বে সন্তানের কথা বলা হয়েছে এজন্য যে, ভরণ-পোষণ প্রাপ্তির প্রয়োজনের দিক থেকে স্ত্রীর থেকে সন্তান বেশি অগ্রগণ্য। কারণ স্ত্রীকে যদি স্বামী ত্বলাক্বও দেয় তাহলেও স্ত্রী অন্য কারো সাথে বিবাহিত হতে পারবে। (সন্তানের এরূপ কোন বিকল্প নেই)
ভরণ-পোষণ প্রদানের ক্ষেত্রে কে অগ্রাধিকার পাবে? স্ত্রী না সন্তান? এ ব্যাপারে বর্ণনার ভিন্নতা রয়েছে। ইমাম শাফি‘ঈ, আবূ দাঊদ ও হাকিম (রহঃ)-এর বর্ণনা মতে সন্তানকে স্ত্রীর ওপর অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। অপরদিকে ইমাম আহমাদ, নাসায়ী, ইবনু হিব্বান (রহঃ)-এর বর্ণনার স্ত্রীকে সন্তানের ওপর অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।
ইবনু হাযম বলেন, ইয়াহইয়া আল্ কাত্তান ও আস্ সাওরীর বর্ণনায় বৈপরীত্য রয়েছে। ইয়াহ্ইয়ার বর্ণনায় স্ত্রীকে সন্তানের ওপর অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। আর সাওরীর বর্ণনায় সন্তানকে স্ত্রীর ওপর অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে যেহেতু দু’ ধরনের বর্ণনাই রয়েছে সেহেতু কোন একটি অগ্রাধিকার না দিয়ে দু’টোকেই সমান্তরালে রাখা উচিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ কথা বিশুদ্ধ সানাদে প্রমাণিত যে, ‘‘তিনি যখন (গুরুত্বপূর্ণ) কথা বলতেন তখন তা তিনবার বলতেন’’। হতে পারে এ ক্ষেত্রেও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার সন্তানকে আরেকবার স্ত্রীকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
লেখক বলেন, সহীহ মুসলিমে জাবির (রাঃ) থেকে যে হাদীস বর্ণিত হয়েছে তাতে দেখা যায়, কোন রকম দ্বিধা ছাড়াই সন্তানের ওপর স্ত্রীকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এ বর্ণনা পূর্বোক্ত বর্ণনা দু’টোর যে কোনটির উপর অগ্রাধিকার পাবে।
অত্র হাদীসের সর্বশেষে ‘‘তুমি অধিক জানো’’ দ্বারা বুঝাচ্ছে যে, তোমার আত্মীয়, প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথীদের মধ্য থেকে তোমার দান পাওয়ার কে বেশি হকদারে সে সম্পর্কে তুমিই অধিক জানো।
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - উত্তম সদাক্বার বর্ণনা
১৯৪১-[১৩] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি কি তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম মানুষ কে তা বলব না? সে হলো ঐ ব্যক্তি, যে আল্লাহর পথে ঘোড়ার লাগাম ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আমি কি তোমাদেরকে ঐ ব্যক্তির মর্যাদার কাছাকাছি লোকের কথা জানাব? ওই ব্যক্তি সেই যে তার কিছু বকরী নিয়ে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে আল্লাহর হক আদায় করতে থাকে। আমি কী তোমাদেরকে খারাপ লোক সম্পর্কে জানাব? সে ঐ ব্যক্তি যার কাছে আল্লাহর কসম দিয়ে দিয়ে চাওয়া হয়। কিন্তু সে তাকে কিছুই দেয় না। (তিরমিযী, নাসায়ী, দারিমী)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِخَيْرِ النَّاسِ؟ رَجُلٌ مُمْسِكٌ بِعِنَانِ فَرَسِهِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ. أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِالَّذِي يَتْلُوهُ؟ رَجُلٌ مُعْتَزِلٌ فِي غُنَيْمَةٍ لَهُ يُؤَدِّي حَقَّ اللَّهِ فِيهَا. أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِشَرِّ النَّاسِ
رَجُلٌ يُسْأَلُ بِاللَّهِ وَلَا يُعْطِي بِهِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَالنَّسَائِيُّ وَالدَّارِمِيّ
ব্যাখ্যা: মু‘তাযিল (مُعْتَزِلٌ) ‘‘পৃথক ব্যক্তি’’ বলতে লোকালয় থেকে দূরে কোন খোলা প্রান্তর কিংবা মরুভূমিতে বসবাসরত ব্যক্তিকে বুঝাচ্ছে। সেখানে সে আল্লাহর হক আদায় করে। মালিক-এর বর্ণনায় রয়েছে, সে সেথায় সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) আদায় করে, যাকাত প্রদান করে, এক আল্লাহর ‘ইবাদাত করে এবং তাঁর সাথে কাউকে অংশীদার স্থাপন করে না। আল-বাজী বলেন, এ ব্যক্তির অবস্থান মুজাহিদের অবস্থানের পরেই। কারণ এ ব্যক্তি ফরয ‘ইবাদাতসমূহ আদায় করে, ‘ইবাদাতের ক্ষেত্রে আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ হয় এবং সকল রকম রিয়া (লোক দেখানো ‘আমল) ও সুম্‘আহ্ (লোক শুনানো ‘আমল) থেকে দূরে থাকে। যেহেতু সে গোপনে, লোকচক্ষুর আড়ালে ‘ইবাদাত করে সেহেতু তার কোন প্রসিদ্ধি হয় না। আর ঐ ব্যক্তি কাউকে কষ্টও দেয় না। তার কথা কেউ বেশি স্মরণও করে না। তবুও তার মর্যাদা মুজাহিদের মর্যাদার সমপর্যায়ে নয়। কারণ মুজাহিদ সকল মুসলিমের পক্ষ থেকে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং কাফিরদের সাথে জিহাদ করে যতক্ষণ না তারা ইসলামে প্রবেশ করে। এতে করে তার কর্মফলের উপকারিতা অন্যদের মাঝেও পৌঁছে অপরদিকে লোকালয় থেকে পৃথক ব্যক্তির কর্মফল থেকে অন্যরা সুফল ভোগ করতে পারে না।
সহীহুল বুখারীতে আবূ সা‘ঈদ আল খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসে দেখা যায়, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হয়, হে আল্লাহর রসূল! সর্বোত্তম ব্যক্তি কে? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ঐ মু’মিন ব্যক্তি, যে তার জান ও সম্পদ নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে। সাহাবীগণ আবার জিজ্ঞেস করলেন, তারপর (সর্বোত্তম ব্যক্তি) কে? উত্তরে তিনি বলেন, ঐ মু’মিন, যে জনপদের মধ্য থেকে কোন জনপদে অবস্থান করে আল্লাহর ব্যাপারে তাক্বওয়া অবলম্বন করে এবং জনগণ তার থেকে কোন ক্ষতির সম্মুখীন হয় না।
আলোচ্য হাদীস দ্বারা জনবিচ্ছিন্ন ও একাকী থাকার ফাযীলাত প্রমাণিত হয়। কারণ এ ব্যক্তি গীবত, অযথা কথা বা এ জাতীয় খারাপ বিষয়াবলী থেকে মুক্ত থাকে।
কিন্তু জমহূর (অধিকাংশ) ‘আলিমগণ মনে করেন, এ ফাযীলাত ঐ ব্যক্তি তখন পাবেন যখন ফিত্নাহ্ (ফিতনা) ছড়িয়ে পড়বে। এ প্রসঙ্গে আত্ তিরমিযীতে মারফূ' সানাদে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘যে মু’মিন ব্যক্তি জনগণের সাথে মেলামেশা করে এবং তাদের দেয়া কষ্টে ধৈর্যধারণ করে সে ব্যক্তি ঐ ব্যক্তি হতে বেশি সাওয়াব পাবেন যে মু’মিন ব্যক্তি মানুষের সাথে মেলামেশা করে না এবং মানুষের দেয়া কষ্টে ধৈর্যধারণ করে না।’’
ইমাম শাফি‘ঈসহ অধিকাংশ ‘আলিম-এর মতে ফিতনাহ থেকে নিরাপদ থাকার আশা করার শর্তে জনপদে মানুষের সাথে মিলেমিশে থাকা সর্বোত্তম। সংসারত্যাগীদের কিছু দলের মতে নির্জনবাস সর্বোত্তম। তারা এ হাদীস দ্বারাই তাদের মতের স্বপক্ষে দলীল পেশ করে। জমহূর ‘আলিমগণ সন্ন্যাসীদের মতের জবাবে বলেন, ফিতনাহ্ ও যুদ্ধের সময় নির্জনবাস বিধেয় এবং তখন বৈধ যখন মানুষ নিরাপদবোধ করে না কিংবা মানুষের নির্যাতনে ধৈর্যধারণ করতে পারে না। নাবীগণ, অধিকাংশ সাহাবী, তাবিঈ, ‘আলিম, জাহিদ, জুমু‘আহ্, জামা‘আত, জানাযা, রোগীর সেবায়, যিকিরের (জিকিরের) বৈঠকে ও অন্যান্য ক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে জনগণের সাথে মেলামেশায় উপকারিতা লাভ করেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - উত্তম সদাক্বার বর্ণনা
১৯৪২-[১৪] উম্মু বুজায়দ (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সাহায্যপ্রার্থীকে কিছু দিয়ে বিদায় করবে। যদি তা আগুনে ঝলসানো একটি খুরও হয়। (মালিক, নাসায়ী, তিরমিযী এবং আবূ দাঊদ এ হাদীসের সমার্থবোধক বর্ণনা করেছেন)[1]
وَعَن أم بحيد قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «رُدُّوا السَّائِلَ وَلَوْ بِظِلْفٍ مُحْرَقٍ» . رَوَاهُ مَالِكٌ وَالنَّسَائِيُّ وَرَوَى التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ مَعْنَاهُُُُُُُ
ব্যাখ্যা: হাদীসটির মর্মার্থ হলো, তোমরা ভিক্ষুককে বঞ্চিত করো না। অর্থাৎ একেবারে খালি হাতে ফেরত দিও না। বরং একটি পোড়া খুর (পশুর পায়েরর নিম্নের খুর) হলে তাকে দাও। অর্থাৎ তুমি তোমার নিকট যা সহজ হয় তাই দাও, সেটা পরিমাণে কম হোক না কেন।
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - উত্তম সদাক্বার বর্ণনা
১৯৪৩-[১৫] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর কসম দিয়ে তোমার কাছে আশ্রয় চায়, তাকে আশ্রয় দেবে। যে তোমার কাছে আল্লাহর কসম দিয়ে চায়, তাকে কিছু দিবে। আর যে ব্যক্তি তোমাকে দা’ওয়াত দেয় তার দা’ওয়াত কবূল করবে। যে তোমার ওপর ইহসান করে, তাকে বিনিময় দিবে। যদি বিনিময় আদায়ের মতো কিছু না থাকে, তার জন্য দু’আ করো যতদিন পর্যন্ত তুমি না বুঝো যে, তার ইহসানের বিনিময় আদায় হয়েছে। (আহমাদ, আবূ দাঊদ, নাসায়ী)[1]
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنِ اسْتَعَاذَ مِنْكُمْ بِاللَّهِ فَأَعِيذُوهُ وَمَنْ سَأَلَ بِاللَّهِ فَأَعْطُوهُ وَمَنْ دَعَاكُمْ فَأَجِيبُوهُ وَمَنْ صَنَعَ إِلَيْكُمْ مَعْرُوفًا فَكَافِئُوهُ فَإِنْ لَمْ تَجِدُوا مَا تُكَافِئُوهُ فَادْعُوا لَهُ حَتَّى تُرَوْا أَنْ قَدْ كَافَأْتُمُوهُ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَأَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: যখন কোন ব্যক্তি আল্লাহর নামে তোমাদের বা অন্য কারো অনিষ্ট/ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য আহবান করে যেমন, কেউ যদি এমন বলে যে, হে অমুক! আল্লাহর নামে তোমার নিকট চাইছি যে, তুমি আমাকে অমুকের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করো। তাহলে তোমরা আল্লাহর নামের সম্মানে তার আহবানে সাড়া দিও এবং তাকে রক্ষা করো। কেউ যদি আল্লাহর নামে কিছু চায় তাহলেও আল্লাহর নামের সম্মানে এবং আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি দয়া করে হলেও তোমরা তাকে কিছু দিও। কেউ যদি তোমাদেরকে দা‘ওয়াত দেয় তাহলে সে দা‘ওয়াত কবূল করবে। বিশেষ করে সেটি যদি ওয়ালীমার দা‘ওয়াত হয় তাহলে সে দা‘ওয়াত কবূল করা ওয়াজিব। অন্য কিছুর দা‘ওয়াত হলে তা কবূল করা মুস্তাহাব। কারো মতে দা‘ওয়াত কবূল করতে যদি কোন শার‘ঈ বাধা না থাকে তাহলে সকল দা‘ওয়াত কবূল করা ওয়াজিব।
আর যদি কেউ কথা বা কাজের মাধ্যমে তোমাদের প্রতি ইহসান/উপকার করে তাহলে তোমরাও ঐ উপকারের সমপরিমাণ অথবা তার থেকেও উত্তম প্রতিদান তাদেরকে দিবে। তোমরা যদি সম্পদ দ্বারা প্রতিদান দিতে না পারো তাহলে উপকারীর জন্য দু‘আ করবে। অর্থাৎ দু‘আ দ্বারা প্রতিদান দিবে। যাতে তোমরা জানতে পারো যে, তোমরা প্রতিদান দিয়েছ। অর্থাৎ তোমরা বারবার দু‘আ করবে এবং তাদের প্রতিদান দেয়ার জন্য তোমরা ততক্ষণ সর্বাত্মক চেষ্টা করবে যতক্ষণ তোমরা জানতে পারবে যে, তোমরা তার হক আদায় করেছ।
‘উসামাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসে জানা যায় যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কারো প্রতি যদি কোন উপকার করা হয় তাহলে উপকার ভোগকারী ব্যক্তি যেন উপকারীকে (جَزَاكَ الله خَيْرًا) ‘‘আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান প্রদান করুন’’। সে যদি এটা বলে তাহলে এটিই হবে সর্বোচ্চ কৃতজ্ঞতা- (আত্ তিরমিযী)। এ হাদীস প্রমাণ করে যে, কেউ যদি উপকারী ব্যক্তিকে একবার (جَزَاكَ الله خَيْرًا) বলেন, তাহলে সে উপকারীর প্রতিদান প্রদান করল যদিও তার হক আরো বেশি থাকে না কেন।
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - উত্তম সদাক্বার বর্ণনা
১৯৪৪-[১৬] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর জাতের দোহাই দিয়ে জান্নাত ছাড়া অন্য কিছু চেয়ো না। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يُسْأَلُ بِوَجْهِ اللَّهِ إِلَّا الْجنَّة» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: ‘‘আল্লাহর নামে জান্নাত ব্যতীত কিছু চাওয়া যায় না’’ এর অর্থ হলো- জান্নাত মানুষের নিকট চাওয়া যায় না। এ বিষয়টির দু’টি দিক রয়েছে, (এক) আল্লাহর নামে মানুষের নিকট কিছু চাওয়া যাবে না। (দুই) আল্লাহর নিকট দুনিয়ার কোন তুচ্ছ জিনিস চাওয়া উচিত না। তার নিকট তার নামে শুধু জান্নাতই চাওয়া উচিত। মূলত এখানে আল্লাহর নিকট বেশি বেশি জান্নাত চাওয়ার প্রতি উৎসাহ দেয়া উদ্দেশ্য। ইমাম ত্বীবী বলেন, তোমরা আল্লাহর নামে মানুষের নিকট কিছু প্রার্থনা করো না। যেমন- কেউ যেন এ কথা না বলে যে, আমাকে আল্লাহর নামে বা আল্লাহর ওয়াস্তে কিছু দাও। কারণ আল্লাহর নাম সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ, যে নাম দ্বারা পৃথিবীর ভোগ্য তুচ্ছ বিষয়াবলী চাওয়া তার নামের মর্যাদার জন্য হানিকর। (উল্লেখ্য যে, জান্নাতের তুলনায় পৃথিবীর সকল কিছুই তুচ্ছ ও নগণ্য।) তাই তোমরা আল্লাহর নামে জান্নাত চাও। আল্লামা মুল্লা ‘আলী ক্বারী বলেন, আল্লাহর নামে জান্নাত ব্যতীত কিছু চাওয়া উচিত নয়। তাই কেউ যখন জান্নাত চাইবে তখন সে এ দু‘আ বলবে, (اَللّهُمَّ إِنَّا نَسْأَلُكَ بِوَجْهِكَ الْكَرِيْمِ أَنْ تُدْخِلَنَا جَنَّةَ النَّعِيْمِ)
(উল্লেখ্য যে, আল্লাহর নামে কেউ যদি কোন মানুষের কাছে কিছু চায় তাহলে তার উচিত তাকে তা দেয়া। কারণ এখানে আল্লাহর নামের মর্যাদা জড়িত। এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে যে, আল্লাহর নামে মানুষের কাছে চাইতে এখানে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহর নিকট চাইতে নিষেধ করা হয়নি, এমনকি অন্য হাদীসে জুতোর ফিতা হারিয়ে গেলেও তা আল্লাহর নিকট চাওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে। তাই সকল কিছুই আল্লাহর নিকট চাইতে হবে তবে আল্লাহর নামে জান্নাত ব্যতীত কিছু চাওয়া উচিত নয়। -অনুবাদক)
পরিচ্ছেদঃ ৭. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - উত্তম সদাক্বার বর্ণনা
১৯৪৫-[১৭] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ ত্বলহাহ্ (রাঃ) মদীনার আনসারদের মধ্যে খেজুর বাগানের মালিক হিসেবে সর্বাধিক সম্পদশালী ছিলেন। আর তার কাছে সবচেয়ে বেশী প্রিয় ছিল মসজিদে নাবাবী সামনের ’বায়রাহা-’ (নামক বাগানটি)। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বাগানটিতে প্রায়ই প্রবেশ করতেন ও এর পবিত্র পানি পান করতেন। আনাস (রাঃ) বলেন, যখন অর্থাৎ ’’তোমরা ততক্ষণ জান্নাতে অবশ্যই পৌঁছতে পারবে না, যে পর্যন্ত তোমাদের প্রিয়তর জিনিস আল্লাহর পথে খরচ না করবে’’- (সূরাহ্ আ-লি ’ইমরান ৩: ৯২) এ আয়াত নাযিল হলো; তখন ত্বলহাহ্ (রাঃ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! যেহেতু আল্লাহ তা’আলা বলেন, অর্থাৎ আমার সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ ’বায়রাহা-’ আল্লাহর নামে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করলাম। আমি আশা করব আমি এর জন্য আল্লাহর কাছে সাওয়াব পাব। হে আল্লাহর রসূল! আপনি তা কবূল করুন। যে কাজে আল্লাহ চান তাতে আপনি তা লাগান। (এ ঘোষণা শুনে) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাবাশ! সাবাশ!! বলে উঠলেন। (তিনি বললেন) এ সম্পদ খুবই কল্যাণকর হবে। তোমার ঘোষণা আমি শুনেছি। এ বাগানটি তুমি তোমার গরীব নিকটাত্মীয়দের মধ্যে বণ্টন করে দাও। আবূ ত্বলহাহ্ (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি তাই করব। অতঃপর আবূ ত্বলহাহ্ (রাঃ) খেজুর বাগানটিকে তাঁর নিকটাত্মীয় ও চাচাতো ভাইদের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]
عَن أنس بن مَالك قَالَ: كَانَ أَبُو طَلْحَة أَكثر أَنْصَارِي بِالْمَدِينَةِ مَالًا مِنْ نَخْلٍ وَكَانَ أَحَبُّ أَمْوَالِهِ إِلَيْهِ بيرحاء وَكَانَت مُسْتَقْبل الْمَسْجِدَ وَكَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَدْخُلُهَا وَيَشْرَبُ مِنْ مَاءٍ فِيهَا طَيِّبٍ قَالَ أنس فَلَمَّا نزلت (لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ)
قَامَ أَبُو طَلْحَة فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَقُول: (لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ)
وَإِنَّ أَحَبَّ مَالِي إِلَيَّ بَيْرَحَاءُ وَإِنَّهَا صَدَقَةٌ لله أَرْجُو بِرَّهَا وَذُخْرَهَا عِنْدَ اللَّهِ فَضَعْهَا يَا رَسُولَ اللَّهِ حَيْثُ أَرَاكَ اللَّهِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «بَخٍ بَخٍ ذَلِكَ مَالٌ رَابِحٌ وَقَدْ سَمِعْتُ مَا قُلْتَ وَإِنَّى أَرَى أَنْ تَجْعَلَهَا فِي الْأَقْرَبِينَ» . فَقَالَ أَبُو طَلْحَةَ أَفْعَلُ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَقَسَّمَهَا أَبُو طَلْحَة فِي أَقَاربه وَفِي بني عَمه
ব্যাখ্যা: এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সৎ ব্যক্তির জন্য বৈধ পন্থায় বৈধ সম্পদের বৃদ্ধি কামনা করা বৈধ। অর্থাৎ বৈধ পন্থার কোন মুসলিম সৎ ব্যক্তি যত ইচ্ছা বৈধ সম্পদের মালিক হতে পারে। ইসলাম এ ক্ষেত্রে বাধা দেয় না।
এ হাদীস দ্বারা আরো প্রমাণ হয় যে, কোন মর্যাদাবান ‘আলিম ব্যক্তির দিকে সম্পদের ভালবাসাকে সমন্বিত করা বৈধ। এর জন্য তার মর্যাদা কমবে না। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘‘অবশ্যই সে (মানুষ) ধন-সম্পদের আসক্তিতে প্রবল’’- (সূরাহ্ আল ‘আ-দিয়া-ত ১০০ : ৮)। আল বাজী বলেন, কোন সৎ (মুসলিম) ব্যক্তির জন্য সম্পদকে ভালবাসা বৈধ। এ ব্যাপারে সূরাহ্ আ-লি ‘ইমরান-এর ১৪ নং আয়াতে বর্ণনা এসেছে।
অত্র হাদীসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ ত্বলহাহ্ (রাঃ)-কে বায়রাহা- কূপটি তার আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে দান করে বণ্টন করে দিতে বলেন এজন্য যে, আত্মীয়দের দান করলে দানের সাওয়াবের সাথে সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখার সাওয়াবও পাওয়া যায়।
এ হাদীস দ্বারা বেশ কিছু বিষয় সাব্যস্ত হয়। যেমন- (এক) যাকাতের নিসাবের উপর অতিরিক্ত নফল দান করা উচিত; তবে তা যেন মোট সম্পদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি না হয়; (দুই) দানের ধরণ, পদ্ধতি এবং আল্লাহর অনুসরণের ক্ষেত্রে সম্মানিত ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শ করা উচিত; (তিন) কোন বিশেষ ও প্রসিদ্ধ স্থান/জমি দান করলে তার সীমানা নির্ধারণ না করলেও সমস্যা নেই; (চার) দানকৃত জিনিস কোন খাতে দান করা হবে তা নির্দিষ্ট না করে দান সম্পন্ন করে তা নির্দিষ্ট করা বৈধ।
পরিচ্ছেদঃ ৭. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - উত্তম সদাক্বার বর্ণনা
১৯৪৬-[১৮] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন ক্ষুধার্ত জীবকে পেট পুরে খাওয়ানো উত্তম সদাক্বার অন্তর্ভুক্ত। (বায়হাক্বী’র শু’আবুল ঈমান)[1]
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَفْضَلُ الصَّدَقَةِ أَنْ تُشْبِعَ كَبِدًا جَائِعًا» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي شُعَبِ الْإِيمَانِ
ব্যাখ্যা: আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেন, অত্র হাদীসে (كَبِدًا) কলিজাকে তার সাথী তথা মানুষের গুণের মাধ্যমে রূপকভাবে গুণান্বিত করা হয়েছে। আর এটা হলো, সামঞ্জস্যপূর্ণ গুণ যা কোন হুকুমের যুক্তিসঙ্গত কারণ হতে পারে। এভাবে ব্যবহারের ফায়দা হলো বিষয়টিকে ব্যাপক অর্থে নিতে পারা যাতে করে তা সকল প্রকার প্রাণীকে অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয় চাই সে প্রাণীটি মানুষ হোক বা অন্য কিছু হোক মু’মিন হোক বা কাফির হোক তার বাকশক্তি থাকুক বা না থাকুক। অর্থাৎ এগুলোর যে কাউকে খাওয়ালেই সাওয়াব অর্জন হতে পারে। আল্লাহই ভাল জনেন।
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - স্বামীর সম্পদ থেকে স্ত্রীর সদাক্বাহ্ করা
১৯৪৭-[১] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন স্ত্রী তার ঘরের কোন খাবার সদাক্বাহ্ (সাদাকা) বা খরচ করে এবং তা যদি বাহুল্য না হয় এ সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করার জন্য সে সাওয়াব পাবে। আর তা কামাই করে আনার জন্য তার স্বামীও সাওয়াব পাবে। রক্ষণাবেক্ষণকারীরও ঠিক সম পরিমাণ সাওয়াব পাবে, কারো সাওয়াব কারো সাওয়াবকে কিছুমাত্র কম করবে না। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ صَدَقَةِ الْمَرْأَةِ مِنْ مَالِ الزَّوْجِ
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «إِذْ أَنْفَقَتِ الْمَرْأَةُ مِنْ طَعَامِ بَيْتِهَا غَيْرَ مُفْسِدَةٍ كَانَ لَهَا أَجْرُهَا بِمَا أَنْفَقَتْ وَلِزَوْجِهَا أَجْرُهُ بِمَا كَسَبَ وَلِلْخَازِنِ مِثْلُ ذَلِكَ لَا يَنْقُصُ بَعْضُهُمْ أَجْرَ بعض شَيْئا»
ব্যাখ্যা: (غَيْرَ مُفْسِدَةٍ) অর্থাৎ সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করতে গিয়ে অপচয় না করে। অর্থাৎ এমন বেশী পরিমাণ সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করবে না যাতে বাহ্যিকভাবে সম্পদের স্বল্পতা পরিলক্ষিত হয়। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, স্ত্রী যদি স্বামীর সম্পদ থেকে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করতে চান তাহলে তাকে স্বামীর নিকট থেকে অনুমতি নিতে হবে চাই অনুমতির বিষয়টি স্পষ্টভাবে হোক অথবা অস্পষ্টভাবে হোক। কোন কোন ‘উলামায়ে কিরাম বলেছেন, বিষয়টি সম্পূর্ণ আহলে হিজায তথা মক্কা-মদীনার অধিবাসীদের চিরাচরিত অভ্যাসের অন্তর্গত। কেননা তাদের অভ্যাস হলো তারা তাদের বিবিগণ এবং খাদিমদেরকে মেহমানদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা, ভিক্ষুক, মিসকীন ও প্রতিবেশীদের খাদ্য খাওয়ানোর বিষয়গুলোতে অনুমতি দিয়ে রাখতেন। সুতরাং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আরবদের এই সুন্দর স্বভাবকে ধারণ করতে গোটা বিশ্ববাসীকে উৎসাহিত করেছেন। স্বামীর বিনা অনুমতিতে তার সম্পদ থেকে স্ত্রী নিজ ইচ্ছামতো কাউকে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করবে এটা অত্র হাদীস দ্বারা স্পষ্টভাবে বুঝা যায় না।
আল্লামা বাগাবী (রহঃ) বলেন, অধিকাংশ ‘উলামায়ে কেরামের বক্তব্য হচ্ছে স্ত্রীর জন্য তার স্বামীর সম্পদ থেকে বিনা অনুমতিতে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করা জায়েয নেই। অনুরূপ খাদিমের ক্ষেত্রেও একই বিধান। আর যে হাদীসটি জায়িযের দলীল তা আহলে হিজাযের তথা মক্কা-মদীনার মানুষের সাধারণ অভ্যাসের বর্ণনা দিচ্ছে যে, তারা তাদের বিবি ও খাদিমদেরকে এ আদেশ দিয়ে রাখতেন বাড়ীতে কোন অভাবী বা মেহমান আসলে বাড়ীতে যা থাকবে তার মাধ্যমে সাধ্যমতো তার আপ্যায়নের ব্যবস্থা করতে। যেমনটিই বলেছেন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ‘তুমি গুণে গুণে দান করিও না তাহলে আল্লাহও তোমাকে গুণে গুণে দান করবেন।’
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীসে (طَعَامِ) তথা খাদ্যের কথা বলেছেন এজন্য যে, খাদ্যবস্ত্ত অন্য মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। তথাপি খাদ্যবস্ত্ত ছাড়া অন্যকিছুর মাধ্যমেও অনুগ্রহ করা যায়। আর এখানে মুখ্য বিষয় হচ্ছে সম্পদের মালিক-এর অনুমতি।
(كَانَ لَهَا أَجْرُهَا بِمَا أَنْفَقَتْ) অর্থাৎ ঐ সম্পদ থেকে খরচ করার কারণে স্ত্রীর সাওয়াব হবে।
(وَلِزَوْجِهَا أَجْرُه بِمَا كَسَبَ) অর্থাৎ সম্পদ উপার্জনের কারণে স্বামীর সাওয়াব হবে।
(لَا يَنْقُصُ بَعْضُهُمْ أَجْرَ بعض) আল্লামা কুস্তুলানী (রহঃ) অর্থাৎ (كزادهم الله مَرَضًا) এর ন্যায় তাকীদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ সাওয়াব তো হবে এবং একজনের সাওয়াব অন্যজনের সাওয়াবে কোন ঘাটতি করবে না।
আল্লামা মুল্লা ‘আলী ক্বারী (রহঃ) বলেন, (شَيْئا) এটি (من النقص) তথা অপরির্পূণতা থেকে অথবা (من الأجر) তথা নেকী হতে কোন কিছুই কমতি করা হবে না এ অর্থে নেয়া যেতে পারে।
এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে এ কথা পরিষ্কারভাবে বলা যে, সাওয়াবের হকদার হওয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে তারা সবাই সমান যদিও সাওয়াবের পরিমাণে একটু কম বেশিও হয়।
হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, ইবনুল আরাবী বলেন, স্ত্রী স্বামীর বাড়ী থেকে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দিতে পারবে কি পারবে না এ বিষয়ে ‘উলামাদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। কোন কোন বিদ্বান তা বৈধ বলে মত পোষণ করেছেন। তবে যদি তা নিতান্তই সামান্য হয় যাতে সম্পদের মধ্যে স্পষ্ট কোন ঘাটতি পরিলক্ষিত হয় না এমন হলে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দিতে অসুবিধা নেই বিনা অনুমতিতে।
ইমাম বুখারী (রহঃ) বলেন, আকার ইঙ্গিতে হলেও সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দেয়ার ক্ষেত্রে স্বামীর অনুমতি থাকা চাই। এটা ‘আরবদের মতো অভ্যাসগত বিষয় হওয়ারও সম্ভাবনা রাখে। তবে হাদীসটিত যে বলা হয়েছে (من غير مفسدة) তথা স্বামীর সম্পদ থেকে স্ত্রী সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দিতে পারবে সম্পদের মধ্যে কোন প্রকার বিপর্যয় সৃষ্টি ব্যতীত এ ব্যাপারে সকল ‘উলামায়ে কিরাম একমত। কোন কোন ‘উলামায়ে কিরাম সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দেয়ার হকদারের ক্ষেত্রে স্ত্রী এবং খাদিমের মধ্যে পার্থক্য করেছেন। সুতরাং তারা বলেন, স্ত্রীর জন্য তার স্বামীর সম্পদে হক আছে সেজন্য সে স্বামীর সম্পদ থেকে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দিতে পারে কিন্তু খাদিমের জন্য তার মনিবের সম্পত্তিতে কোন প্রকার হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই, সুতরাং সে মনিবের সম্পদ থেকে বিনা অনুমতিতে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দিতে পারবে না।
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - স্বামীর সম্পদ থেকে স্ত্রীর সদাক্বাহ্ করা
১৯৪৮-[২] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, স্ত্রী তার স্বামীর অর্জিত ধন-সম্পদ হতে তার অনুমতি ছাড়া দান-খয়রাত করলে এর সাওয়াব (স্ত্রী) অর্ধেক পাবে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ صَدَقَةِ الْمَرْأَةِ مِنْ مَالِ الزَّوْجِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا أَنْفَقَتِ الْمَرْأَةُ مِنْ كَسْبِ زَوْجِهَا مِنْ غَيْرِ أَمْرِهِ فَلَهَا نِصْفُ أَجْرِهِ»
ব্যাখ্যা: (مِنْ غَيْرِ أَمْرِه) সুনির্দিষ্ট কোন অংশের ব্যাপারে স্বামীর আদেশ ছাড়া।
(فَلَهَا نِصْفُ أَجْرِه) বিষয়টি ব্যাখ্যার দাবিদার এভাবে যে, যখন সে স্বামীর সম্পদ থেকে তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত খরচ করবে এবং সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করবে তাহলে এই অতিরিক্ত খরচের জন্য তাকে জরিমানা দিতে হবে। সুতরাং স্বামী বিষয়টি অবগত হয়ে যদি সন্তুষ্ট হোন তাহলে স্ত্রীর খরচা থেকে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) প্রদানের জন্য অর্ধেক নেকী এবং অতিরিক্ত সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দেয়ার জন্য অপর অর্ধেক নেকী স্বামী পাবেন। কেননা অতিরিক্ত সম্পদ হলো স্বামীর হক্ব। ‘আল্লামা মুল্লা ‘আলী ক্বারী (রহঃ) এমন মতামত ব্যক্ত করেছেন। হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী বলেন, উত্তম হলো অর্থটি এভাবে গ্রহণ করা যে, স্ত্রী ঐ সম্পদ থেকে খরচ করেছে যা স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর জন্য নির্দিষ্ট ছিল। সুতরাং সেখান থেকে যদি স্বামীর বিনা অনুমতিতে খরচ করে তাহলে তার অর্ধেক নেকী হবে। এক্ষেত্রে উপার্জনের কারণে অপর অর্ধেক নেকী স্বামীর হবে।
ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেন, (قوله من غير أمره) হাদীসে উল্লেখিত (من غير أمره) তথা স্বামীর বিনা অনুমতিতে এ কথার অর্থ হলো স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর জন্য নির্দিষ্ট সম্পদটুকুর মধ্যে থেকে খরচ করতে হলেও স্বামীর সুস্পষ্ট অনুমতি থাকা চাই। অন্যথায় সাধারণভাবেও যদি কোন অনুমতিই না থাকে সেক্ষেত্রে তো কোন সাওয়াব তো হবেই না বরং পাপ হবে।
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - স্বামীর সম্পদ থেকে স্ত্রীর সদাক্বাহ্ করা
১৯৪৯-[৩] আবূ মূসা আল আশ্’আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে মুসলিম খাদিম বা পাহারাদার, মালিক-এর নির্দেশ অনুসারে কোন পূর্ণ হৃষ্টচিত্তে আমানাতদারীর সাথে ওই ব্যক্তিকে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দেয়, যাকে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দেবার জন্য মালিক বলে দিয়েছে, সে সদাক্বাকারীদের একজন। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ صَدَقَةِ الْمَرْأَةِ مِنْ مَالِ الزَّوْجِ
وَعَنْ أَبِي مُوسَى الْأَشْعَرِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْخَازِنُ الْمُسْلِمُ الْأَمِينُ الَّذِي يُعْطِي مَا أُمِرَ بِهِ كَامِلًا مُوَفَّرًا طَيِّبَةً بِهِ نَفْسُهُ فَيَدْفَعُهُ إِلَى الَّذِي أَمر لَهُ بِهِ أحد المتصدقين»
ব্যাখ্যা: মালিকের ধন ভান্ডার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত মুসলিম ও আমানাতদার খাদিম (খাজাঞ্চী) যাকে মালিকের পক্ষ থেকে যা দান করতে আদেশ দেয়া হয় তা তার প্রবৃত্তি অনুযায়ী কম-বেশি করে দান করে না বরং কৃপণতামুক্ত হয়ে সন্তুষ্টচিত্তে, খুশিমনে পূর্ণভাবে দান করে। হাফিয ইবনু হাজার আল্ আসক্বালানী বলেন, অত্র হাদীসে খাজাঞ্চীকে মুসলিম হওয়ার শর্তারোপ করায় কাফির খাজাঞ্চী এ হাদীসে বর্ণিত সাওয়াব পাবে না। কারণ, কাফিরের সাওয়াবের নিয়্যাত থাকে না। অপরদিকে আমানাতদার হওয়ার শর্তারোপ দ্বারা খিয়ানাতকারী খাজাঞ্চী বাদ পড়ে যায়।
অত্র হাদীসে খাজাঞ্চী যে সাওয়াব পাবে তার জন্য চারটি শর্ত রয়েছে। এ চারটি শর্তের কোন একটি বাদ গেলে সে বর্ণিত সাওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে। শর্ত চারটি হলোঃ (১) মালিক-এর অনুমতি থাকতে হবে; (২) মালিক যা দান করতে আদেশ দিবেন তা থেকে কোন কমতি না করে দান করতে হবে; (৩) দান করার ক্ষেত্রে খুশিমনে দান করতে হবে; কেননা অনেক খাজাঞ্চী/কোষাধ্যক্ষ বা খাদিম আছে যারা মালিক-এর দানের আদেশের প্রতি সন্তুষ্ট হয় না। (৪) মালিক যাকে/যেখানে দান করতে কোষাধ্যক্ষকে আদেশ দিবেন তাকে সেখানেই দান করতে হবে; অন্য কোন গরীব/মিসকীনকে দান করলে হবে না।
উপরোক্ত শর্তসমূহ মেনে কোন খাজাঞ্চী যদি দান করে তাহলে সেও দানকারীদের একজন হবে।
শাইখ যাকারিয়্যা আল্ আনসারী বলেন, খাদিম ও মালের মালিক সাওয়াব পাওয়ার দিকে দিয়ে সমান যদিও তাদের সাওয়াবের পরিমাণে কিছু কম বেশি হতে পারে। সুতরাং মালিক যদি তার খাদিমকে ১০০ দীনার (মুদ্রা) প্রদান করে তার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা কোন ফকীরকে দেয়ার জন্য সে ক্ষেত্রে মালিক-এর সাওয়াব বেশি হবে। অপরদিকে মালিক যদি খাদিমকে একটি আটার ঢিলা বা রুটি দিয়ে বলে এটি দূরবর্তী কোন স্থানের কোন ফকীরকে দিয়ে আসো আর সেখানে পৌঁছতে খাদিমের যাতায়াত ভাড়া এবং যাওয়ার পারিশ্রমিক যদি রুটির মূল্যের চেয়ে বেশি হয় তাহলে এক্ষেত্রে খাদিমের সাওয়াব বেশি হবে। আর যদি রুটির মূল্য তার যাতায়াত ভাড়া বা পারিশ্রমিকের সম পরিমাণ হয় তাহলে তাদের সাওয়াবও সমান হবে।
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - স্বামীর সম্পদ থেকে স্ত্রীর সদাক্বাহ্ করা
১৯৫০-[৪] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এসে বলল, আমার মা আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন। আমার মনে হয় তিনি কথা বলতে পারলে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করতেন। এখন আমি যদি তার পক্ষ থেকে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করি তার সাওয়াব কি তিনি পাবেন? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হ্যাঁ পাবে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ صَدَقَةِ الْمَرْأَةِ مِنْ مَالِ الزَّوْجِ
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: أَنَّ رَجُلًا قَالَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ أُمِّي افْتُلِتَتْ نَفْسَهَا وَأَظُنُّهَا لَوْ تَكَلَّمَتْ تَصَدَّقَتْ فَهَلْ لَهَا أَجْرٌ إِنْ تَصَدَّقت عَنْهَا؟ قَالَ: نعم
ব্যাখ্যা: (رَجُلًا) বলা হয়েছে, এই ব্যক্তি হলেন সা‘দ বিন ‘উবায়দাহ্ (রাঃ)। আল্লামা মুরক্বানী (রহঃ) বলেন, অনেকে দৃঢ়তার সাথেই বলেছেন এ ব্যক্তির নাম সা‘দ বিন ‘উবায়দাহ্ (রাঃ)। তবে আল্লামা বাদরুদ্দীন আয়নী (রহঃ) অন্য মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
(أُمِّي) তার মায়ের নাম ছিল উমায়রা বিনতু মাস্‘ঊদ। (لَوْ تَكَلَّمَتْ) যদি কথা বলতে সক্ষম হতেন। (تَصَدَّقت) তার সম্পদ থেকে কিছু সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করতেন অথবা তার মাল থেকে কাউকে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করার ওয়াসীয়াত করতেন।
হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, অত্র হাদীসের বাহ্যিক অর্থ থেকে বুঝা যায়, তিনি কথা বলতে সক্ষম হননি তাই সদাক্বাহ্ (সাদাকা)ও দেননি। তবে ইমাম মালিক (রহঃ)-এর মুয়াত্ত্বা, সুনানে নাসায়ী এবং মুসতাদারাক হাকিমে সা‘ঈদ বিন ‘আমর বিন শুরাহবিল বিন সা‘ঈদ বিন সা‘দ বিন ‘উবায়দাহ্ তার পিতা তার দাদা থেকে সূত্রে বর্ণিত হাদীসে পাওয়া যায়। তিনি বলেন, একদা সা‘দ বিন ‘উবায়দাহ্ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কোন যুদ্ধে বের হলেন অপর দিকে তার মাতা মদীনায় মৃত্যুশয্যায় শায়িত হলেন তাকে বলা হল আপনি কিছু ওয়াসিয়াত করুন। অতঃপর তিনি বলছেন, কিসের মাধ্যমে ওয়াসিয়াত করবো মাল তো সব সা‘দ-এর মাল। অতঃপর সা‘দ যখন আগমন করলেন তাকে বিষয়টি জানানো হলো অতঃপর সা‘দ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি যদি তার পক্ষ থেকে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করি তাহলে এর সাওয়াব কি তিনি পাবেন? অতঃপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ পাবেন। তখন সা‘দ (রাঃ) বললেন, তাহলে আমি অমুক অমুক বাগান তার নামে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দিলাম। তাহলে এ হাদীসে সা‘দ-এর মায়ের কথা বলার দলীল স্পষ্ট আর কিতাবের হাদীস থেকে বুঝা যায় তিনি কথা বলেননি, অতএব এ দু’টি হাদীসের সমন্বয় নিম্নোক্তভাবে করা সম্ভবঃ
১। কিতাব (মিশকাত) এর হাদীসখানাকে এভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে তিনি সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দেয়ার ব্যাপারে কথা বলেননি যদি বলতেন তাহলে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করতেন তাহলে আমি এখন কি করবো?
২। সা‘দ বিষয়টি সম্পর্কে তথা মহিলাটির কাছ থেকে কি ঘটেছিল তা তিনি আদৌ জানতেন না আর অপরদিকে মুয়াত্ত্বা মালিক-এর কথা বলায় যে হাদীস পাওয়া যাচ্ছে তা বর্ণনা করেছেন সা‘ঈদ বিন ‘উবাদাহ্ অথবা মুরসাল সূত্রে তার ছেলে শুরাহবিল মোটকথা হাদীসের রাবী সা‘ঈদ হোক আর শুরাহবিল হোক কথা বলার ক্ষেত্রে হ্যাঁ সূচক বর্ণনার বর্ণনাকারী আর না সূচক বর্ণনার বর্ণনাকারী এক নয়।
হাদীসটি থেকে বুঝা যায়ঃ
* মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) জায়িয এবং এতে তার সাওয়াব হবে, বিশেষ করে সদাকাটি যখন মৃত ব্যক্তির সন্তান করবেন তখন আরো বেশি পৌঁছবে। অনুরূপভাবে দু‘আও পৌঁছবে। আর অন্য কিছুই মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে করলে তার সাওয়াব সে পায় না শুধুই এ দু’টি ব্যতীত যেমনঃ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنْسَانِ إِلَّا مَا سَعى ‘‘মানুষের জন্য কিছুই নেই তবে যা সে চেষ্টা করে’’- (সূরা আন্ নাজম ৫৩ : ৩৯)। আর সন্তান তার চেষ্টার ফসল। সুতরাং সন্তান এগুলোর কাজ মৃত মা-বাবার পক্ষ থেকে আঞ্জাম দেয়া, তাহলে এর বাবা-মা পাবেন। অবশ্য দু‘আ এবং সদাক্বাহ্ (সাদাকা) ব্যতীত অন্য কিছু পৌঁছায় কিনা সে ব্যাপারে ‘উলামায়ে কিরামের মধ্যে যথেষ্ট মতবিরোধ রয়েছে। হানাফীগণ দু‘আর উপর কিয়াস করে বলেন, হ্যাঁ সদাক্বাহ্ (সাদাকা) এবং দু‘আর মতো অন্যান্য সৎ ‘আমল ও মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছায়। ‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী (রহঃ) বলেন, আমি বলবো এ ব্যাপারে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
* হাদীসটি থেকে আরো বুঝা যায় যিনি বা যারা হঠাৎ মারা গেলেন তাদের পক্ষ থেকে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করা মুস্তাহাব। এ মর্মে ইমাম বুখারী তার সহীহুল বুখারীতে একটি অধ্যায়ও বেঁধেছেন।
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্বামীর সম্পদ থেকে স্ত্রীর সদাক্বাহ্ করা
১৯৫১-[৫] আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বিদায় হাজ্জের (হজ্জের/হজের) ভাষণে বলতে শুনেছি, কোন রমণী যেন তার স্বামীর ঘরের কোন কিছু স্বামীর হুকুম ব্যতীত খরচ না করে। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রসূল! খাদ্য সামগ্রী খরচ করতে পারবে না? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ খাদ্যদ্রব্য আমাদের উত্তম ধন-সম্পদ। (তিরমিযী)[1]
عَنْ أَبِي أُمَامَةَ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ فِي خُطْبَتِهِ عَامَ حُجَّةِ الْوَدَاعِ: «لَا تُنْفِقُ امْرَأَةٌ شَيْئًا مِنْ بَيْتِ زَوْجِهَا إِلَّا بِإِذْنِ زَوْجِهَا» . قِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَلَا الطَّعَامَ؟ قَالَ: «ذَلِكَ أفضل أَمْوَالنَا» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, স্বামীর স্পষ্ট অনুমতি, আদেশ বা ইঙ্গিত বা প্রথা ছাড়া কোন স্ত্রীর স্বামীর সম্পদ থেকে কোন কিছু দান করা বৈধ নয়। এ সম্পর্কিত কথা পূর্বের হাদীসের ব্যাখ্যায় আলোচনা করা হয়েছে। একই অর্থের হাদীস সুনানে বায়হাক্বীতেও রয়েছে। অত্র হাদীসে খাদ্যকে সবচেয়ে উত্তম সম্পদ বলা হয়েছে। যেখানে স্বামীর অনুমতি ছাড়া অন্য কোন সামান্য খাদ্যও দান করা বৈধ নয়- সেখানে সর্বোত্তম খাদ্য দান করা বৈধ হয় কিভাবে?
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - স্বামীর সম্পদ থেকে স্ত্রীর সদাক্বাহ্ করা
১৯৫২-[৬] সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাদের কাছ থেকে বায়’আত গ্রহণ করার সময় একজন মর্যাদাবতী মহিলা উঠে দাঁড়াল। তাকে ’মুযার গোত্রের’ মহিলা মনে হচ্ছিল। সে বলল, হে আল্লাহর নবী! আমাদের সকলে পিতা, সন্তান ও স্বামীর ওপর নির্ভরশীল। তাদের ধন-সম্পদ হতে খরচ করা কী আমাদের জন্য হালাল? তিনি বললেন, পচনশীল মাল খাও এবং তুহফা দাও। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ سَعْدٍ قَالَ: لَمَّا بَايَعَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ النِّسَاءُ قَامَتِ امْرَأَةٌ جَلِيلَةٌ كَأَنَّهَا مِنْ نِسَاءِ مُضَرَ فَقَالَتْ: يَا نَبِيَّ اللَّهِ إِنَّا كَلٌّ عَلَى آبَائِنَا وَأَبْنَائِنَا وَأَزْوَاجِنَا فَمَا يَحِلُّ لَنَا مِنْ أَمْوَالِهِمْ؟ قَالَ: «الرطب تأكلنه وتهدينه» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (جَلِيْلَةٌ) আল্লামা খিত্বাবী (রহঃ) বলেন, এর দু’টি অর্থ হতে পারে শারীরিকভাবে মোটাসোটা অথবা মেধার দিক দিয়ে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন।
পরিচ্ছেদঃ ৮. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - স্বামীর সম্পদ থেকে স্ত্রীর সদাক্বাহ্ করা
১৯৫৩-[৭] আবুল লাহম (রাঃ)-এর আযাদ করা গোলাম ’উমায়র (রাঃ)বলেন, আমার মুনিব আমাকে মাংস (মাংস/গোসত) টুকরা করার হুকুম দিলেন। এমন সময় একজন মিসকীন এলো। আমি তাকে ওখান থেকে কিছু মাংস (মাংস/গোসত) খেতে দিলাম। আমার মুনিব এ কথা জানতে পারলেন। তিনি আমাকে মারলেন। আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলাম। এ ঘটনা তাঁর কাছে বললাম। তিনি আমার মুনিবকে ডেকে পাঠালেন। তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি ’উমায়রকে মেরেছ কেন? তিনি বললেন, সে আমার অনুমতি ছাড়া (মিসকীনকে) খাবার দিয়ে দেয়। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এর সাওয়াব তোমাদের দু’জনেরই হত।
অন্য বর্ণনায় আছে, ’উমায়র বলেছেন, আমি গোলাম। তাই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম আমার মুনিবের ধন-সম্পদ থেকে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করতে পারব কিনা? তিনি বললেন, হ্যাঁ, পারবে। এর সাওয়াব তোমরা দু’জন অর্ধেক অর্ধেক করে পাবে। (মুসলিম)[1]
عَنْ عُمَيْرٍ مَوْلَى آبِي اللَّحْمِ قَالَ: أَمَرَنِي مَوْلَايَ أَنْ أُقَدِّدَ لَحْمًا فَجَاءَنِي مِسْكِينٌ فَأَطْعَمْتُهُ مِنْهُ فَعَلِمَ بِذَلِكَ مَوْلَايَ فَضَرَبَنِي فَأَتَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَذَكَرْتُ ذَلِكَ لَهُ فَدَعَاهُ فَقَالَ: «لِمَ ضَرَبْتَهُ؟» فَقَالَ يُعْطِي طَعَامِي بِغَيْرِ أَنْ آمُرَهُ فَقَالَ: «الْأَجْرُ بَيْنَكُمَا» . وَفِي رِوَايَةٍ قَالَ: كُنْتُ مَمْلُوكًا فَسَأَلْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أأتصدق مِنْ مَالِ مَوَالِيَّ بِشَيْءٍ؟ قَالَ: «نَعَمْ وَالْأَجْرُ بَيْنَكُمَا نِصْفَانِ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যা: فَقَالَ: الْأَجْرُ بَيْنَكُمَا অর্থাৎ তুমি যদি সন্তুষ্ট এবং উদার মনোভাব পোষণ করে থাকো তাহলে তোমার জন্য সাওয়াব রয়েছে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভাষ্য থেকে এটা উদ্দেশ্য নয় যে, তিনি গোলামকে তার মুনিবের সম্পত্তি থেকে মুনিবের বিনা অনুমতিতে যা ইচ্ছা দিয়ে দিবে এর অনুমতি প্রদান করেছেন। আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে গোলামের হাতকে মুক্তভাবে খরচ করার প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন বিষয়টি এমন নয় বরং একটি কাজ যার সঠিকতা স্পষ্ট সেটা গোলামের পক্ষ থেকে তার বিপরীত ঘটে গেলে মালিক তাকে প্রহার বা এ জাতীয় কোন কাজ করা অপছন্দনীয়। সুতরাং রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে মালিককে তার গোলামের প্রতি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টি দিয়ে সাওয়াব লুফে নিতে উৎসাহিত করেছেন। ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেন, হাদীসটির অর্থ এমন হবে যে, ‘উমায়র তিনি কোন কিছুর মাধ্যমে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করলেন আর ধারণা করলেন যে, তার মালিক এ ব্যাপারে সন্তুষ্ট থাকবেন তবে পরে দেখা গেল মালিক সন্তুষ্ট নন। সুতরাং এ সদাক্বাহ’র প্রেক্ষক্ষতে আনুগত্যের নিয়্যাত থাকার কারণে ‘উমায়র, আর সম্পদ অর্জনের কারণে মালিক সাওয়াব পাবেন।
ক্বাযী ‘আয়ায (রহঃ) বলেন, মালিক এবং গোলামের সাওয়াবের দৃষ্টিকোণ থেকে সমান হওয়াও সম্ভব। কেননা সাওয়াব হলো আল্লাহ সুবহানাহূ ওয়াতা‘আলার অনুগ্রহ আর এ অনুগ্রহকে নিয়মের বেড়াজালে বাঁধা যায় না এবং তা ‘আমল অনুপাতেও হয় না। এটা শুধুমাত্র আল্লাহ তা‘আলা বিশেষ অনুগ্রহে তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করেন।
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - দান করে দান ফেরত না নেবার বর্ণনা
১৯৫৪-[১] ’উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এক ব্যক্তিকে আল্লাহর পথে সওয়ার হবার জন্য ঘোড়া দান করলাম। সে এ ঘোড়াটি নষ্ট করে ফেলল। (তখন) আমি ঘোড়াটিকে কিনে নেবার ইচ্ছা করলাম। আমার ধারণা ছিল, সে কম দামে ঘোড়াটি বিক্রি করবে। এ সম্পর্কে আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, তুমি ওটা কিনো না। আর দান করা জিনিস ফেরতও নিও না যদি তা তোমাকে এক দিরহামের বিনিময়েও দেয়। কারণ সদাক্বাহ্ (সাদাকা) দিয়ে ফেরত নেয়া ব্যক্তি ঐ কুকুরের সমতুল্য, যে নিজের বমি নিজে চেটে খায়। অপর এক বর্ণনায় আছে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ দান করা সদাক্বাহ্ (সাদাকা) ফেরত নেয়া ব্যক্তি তারই মতো, যে বমি করে এবং তা চেটে খায়। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ مَنْ لَا يَعُوْدُ فِي الصَّدَقَةِ
عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: حَمَلْتُ عَلَى فَرَسٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَأَضَاعَهُ الَّذِي كَانَ عِنْدَهُ فَأَرَدْتُ أَنْ أَشْتَرِيَهُ وَظَنَنْتُ أَنَّهُ يَبِيعُهُ بِرُخْصٍ فَسَأَلْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «لَا تَشْتَرِهِ وَلَا تَعُدْ فِي صَدَقَتِكَ وَإِنْ أَعْطَاكَهُ بِدِرْهَمٍ فَإِنَّ الْعَائِدَ فِي صَدَقَتِهِ كَالْكَلْبِ يَعُودُ فِي قَيْئِهِ» . وَفِي رِوَايَةٍ: «لَا تَعُدْ فِي صَدَقَتِكَ فَإِنَّ الْعَائِدَ فِي صَدَقَتِهِ كالعائد فِي قيئه»
ব্যাখ্যা: (عَلى فَرَسٍ) অর্থাৎ তাকে আমি সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করলাম যাতে করে সে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারে।
(فِي سَبِيلِ اللّهِ) আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেন, আমি তাকে বোঝা বহনে সক্ষম একটি ঘোড়া দিলাম সদাক্বাহ্ (সাদাকা) হিসেবে আর সে মুজাহিদদের অন্তর্গত ছিল না। বাজীরা (রহঃ) বলেন, আল্লাহর রাস্তায় ঘোড়ার উপর চড়ানোর দু’টি দৃষ্টিকোণ হতে পারে।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতেন যে, ব্যক্তির ভিতরে ঘোড়া চালানোর শক্তি, বুদ্ধি দু’টিই বিদ্যমান, সুতরাং তার জানার প্রেক্ষক্ষতে তিনি তাকে ঘোড়াটি দান করে তাকে মালিক বানিয়ে দেন। সুতরাং সে ঘোড়ার মালিক হয়ে ঘোড়ার ক্ষেত্রে বেচা-কেনা করতেই পারে, যেহেতু ঘোড়ার মালিক সে।
(وَإِنْ أَعْطَاكَه بِدِرْهَمٍ) এর মাধ্যমে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সস্তার চূড়ান্ত পর্যায় বুঝিয়েছেন হয়তো বা সস্তার কারণে উমার (রাঃ) সেটা ক্রয় করতে পারেন কিন্তু রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যতই সস্তা হোক না কেন তুমি সেদিকে দৃষ্টি দিও না বরং তুমি যে সেটা তাকে সদাক্বাহ্ (সাদাকা) হিসেবে দিয়েছো এদিকে দৃষ্টি দাও। ইবনুল মালিক বলেন, এ হাদীসখানার বাহ্যিক অর্থ থেকে এ কথা বুঝা যায় যে, সদাক্বাহকারী পরবর্তী কোন সময় তার সদাক্বাহকৃত বস্ত্ত কিনে নেয়া হারাম। আর অধিকাংশ ‘উলামায়ে কিরাম এটাকে মাকরূহে তানযীহী তথা এর থেকে বিরত থাকা ভাল বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন।
হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, সদাক্বাহকৃত পশুটিকে কমমূল্যে হলেও ক্রয় করাকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদাক্বাহকৃত বস্ত্তর দিকে ফিরে আসার সাথে তুলনা করেছেন যেটা হারাম এটা এভাবে হতে পারে যে, নিশ্চয় সদাক্বার মাধ্যমে তার উদ্দেশ্য ছিল আখিরাতের সাওয়াব কিন্তু সে যখন আবার সেটা ক্রয় করে নিল তাহলে সে যেন এখানে আখিরাতের উপর দুনিয়াকে প্রাধান্য দিল। যদিও এখানে কমমূল্যে পাওয়ার কারণে সেটা সকলেই ক্রয় করতে চায় আর সদাক্বাহকারী তো আরো বেশি উদগ্রীব থাকারই কথা।
ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা (لَا تَشْتَرِه وَلَا تَعُدْ فِي صَدَقَتِكَ) তথা তুমি সেটা ক্রয় করো না এবং তোমার সদাক্বাহকৃত মালের দিকে ফিরে যেও না। এ কথাটির মধ্যে যে نهي তথা নিষেধাজ্ঞা এসেছে তা মূলত نهي تنزيه, نهى تحريمي নয় তথা এমন হারাম নয় যাতে ঈমানের উপর চরম প্রভাব পড়তে পারে। তবে এর থেকে বিরত থাকাই ভাল যে কথা পূর্বেই বলা হয়েছে। সুতরাং যদি কোন ব্যক্তি কাউকে কোন কিছু সদাক্বাহ্ (সাদাকা) করে, যাকাত দেয়, কাফফারাহ্ দেয় অথবা মানৎ করে আর পরবর্তীতে তারই কাছ থেকে সেটা ক্রয় করে তাহলে এটা মাকরূহ তথা অপছন্দনীয় হবে। হ্যাঁ তবে যদি কেউ কাউকে কোন মালের ওয়ারিস বানায় তাহলে সে তার কাছ থেকে কিনলে অথবা সদাক্বাহকৃত ব্যক্তির নিকট থেকে কেউ কিনে নিলে তার পরে তার কাছ থেকে যদি সদাক্বাহকারী ক্রয় করে নেয় তাহলে মাকরূহ হবে না। এটাই জমহূরের তথা অধিকাংশ ‘আলিমদের মত। তবে ‘উলামায়ে কিরামের একটি দল এই نهي তথা নিষেধাজ্ঞাকে تحريم তথা হারাম সদাক্বার অর্থেও নিয়েছেন। ‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী (রহঃ) বলেন, আমি বলবোঃ সুনানে তিরমিযীর ব্যাখ্যায় ‘আল্লামা ‘ইরাক্বী তৃতীয় ব্যক্তির কাছ থেকে ক্রয় করলে مَكْرُوْهٌ তথা হারাম না হয়ে অপছন্দনীয় হওয়ার বিষয়টি বর্ণনা করেছেন। (আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন)
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - দান করে দান ফেরত না নেবার বর্ণনা
১৯৫৫-[২] বুরায়দাহ্ (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে বসেছিলাম। তখন এক মহিলা তাঁর কাছে উপস্থিত হলো। সে নিবেদন করল, হে আল্লাহর রসূল! আমি মা-কে আমার একটি বাঁদী সদাক্বাহ্ (সাদাকা) হিসেবে দান করেছিলাম। আমার মা মৃত্যুবরণ করেছেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমার সাওয়াব তো প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এখন মীরাস (আইন) তোমাকে বাঁদিটি ফেরত দিয়েছে। মহিলাটি আবার বলল, হে আল্লাহর রসূল! আমার মায়ের উপর এক মাসের সিয়াম (ফরয) ছিল। আমি কি তা’ তার পক্ষ থেকে আদায় করে দেব? তিনি বলেন, তার পক্ষ থেকে আদায় করবে। মহিলাটি পুনরায় বলল, আমার মা কখনো হাজ্জ (হজ/হজ্জ) পালন করেননি। আমি কি তার পক্ষে হাজ্জ (হজ/হজ্জ) আদায় করব? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তুমি তার হাজ্জ (হজ/হজ্জ) আদায় করে দাও। (মুসলিম)[1]
بَابُ مَنْ لَا يَعُوْدُ فِي الصَّدَقَةِ
وَعَنْ بُرَيْدَةَ قَالَ: كُنْتُ جَالِسًا عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذْ أَتَتْهُ امْرَأَةٌ فَقَالَت يَا رَسُول الله إِنِّي كنت تَصَدَّقْتُ عَلَى أُمِّي بِجَارِيَةٍ وَإِنَّهَا مَاتَتْ قَالَ: «وَجَبَ أَجَرُكِ وَرَدَّهَا عَلَيْكِ الْمِيرَاثُ» . قَالَتْ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّهُ كَانَ عَلَيْهَا صَوْمُ شَهْرٍ أفأصوم عَنْهَا قَالَ: «صومي عَنْهَا» . قَالَت يَا رَسُول الله إِنَّهَا لَمْ تَحُجَّ قَطُّ أَفَأَحُجُّ عَنْهَا قَالَ: «نعم حجي عَنْهَا» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ আল্লামা মুলা আলী ক্বারী হানাফী (রহঃ) বলেন, এখানে নিসবতটি হয়েছে রূপক অর্থে অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তাকে তোমার নিকট ফিরিয়ে দিবেন মীরাসের মাধ্যমে। ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, হাদিসটি থেকে বুঝা যায় যদি কোন ব্যাক্তি কোন সাদাকাহ করে তারপর সে ঐ ব্যাক্তি তাকে ঐ সম্পদের উত্তরাধিকারী বানায় তাহলে সেখান থেকে তার খরচ করা মাকরুহ হবে না।
ইবনু মালিক (রহঃ) বলেন, অধিকাংশ উলামায়ে কিরাম বলেন, কোন ব্যাক্তি তার নিকট আত্মীয়কে কোন কিছু সাদাকাহ দিলে সে যদি তার ওয়ারিস হয় তাহলে সেটা তার জন্য বৈধ হয়ে যাবে। কেউ কেউ বলেছেন সেটা কোন ফকীরকে দেয়া বাঞ্ছনীয়।
قَالَ: صُوْمِىْ عَنْهَا অর্থাৎ মৃত ব্যক্তি যখন কোন মানতের সিয়াম না রেখে মারা যাবে তাহলে তার অভিভাবক তার পক্ষ থেকে তা আদায় কে দিবে এমনটিই মত দিয়েছেন আসহাবুল হাদীসের অধিকাংশ উলামায়ে কিরাম।
আল্লামা সিনদী (রহঃ) বলেন, (عَلَيْهَا صَوْمُ) এখানে যেহেতু صوم শব্দটি কোন শর্ত ছাড়াই আছে, সুতরাং যে কোন صوم হতে পারে চাই সেটা ফারয (ফরজ) নাফ্ল যাই হোক না কেন।