পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
হারামের বাইরে মুহরিম ছাড়া অন্যদের জন্য শিকার করা হালাল। আর ভক্ষণযোগ্য প্রাণী কেবল শিকারীর জন্য শিকার করা বৈধ। আল্লাহ সুবহানাহূ ওয়া তা’আলা বলেন: (وَإِذَا حَلَلْتُمْ فَاصْطَادُوا) ’’...যখন তোমরা ইহরাম মুক্ত হবে তখন শিকার করতে পার...’’- (সূরাহ্ আল মায়িদাহ্ ৫ : ২)। আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন, (وَحُرِّمَ عَلَيْكُمْ صَيْدُ الْبَرِّ مَا دُمْتُمْ حُرُمًا) ’’...তোমরা যতক্ষণ ইহরামে থাকবে ততক্ষণ স্থলে শিকার তোমাদের জন্য হারাম...’’- (সূরাহ্ আল মায়িদাহ্ ৫ : ৯৬)।
এখানে আমর বা নির্দেশসূচক শব্দ দ্বারা মুস্তাহাব উদ্দেশ্য, কেননা তা (শিকার করা একটি উপার্জন এবং এর দ্বারা সৃষ্টিকুলের উপকার হয়, অতএব তা) বৈধ। আসলে এখানে মূল বিষয় হলো আল্লাহ তা’আলার কথা: (وَمَا عَلَّمْتُمْ مِنَ الْجَوَارِحِ مُكَلِّبِينَ تُعَلِّمُونَهُنَّ مِمَّا عَلَّمَكُمُ اللهُ) ’’...শিকারী পশু-পাখি যাদেরকে তোমরা শিকার শিখিয়েছ আল্লাহ তোমাদেরকে যা শিখিয়েছেন তা থেকে তোমরা তাদেরকে শিখিয়ে থাক...’’- (সূরাহ্ আল মায়িদাহ্ ৫ : ৪)। অর্থাৎ তোমরা যে সকল প্রাণীকে শিকার করার উপর প্রশিক্ষণ দিয়েছ যথাক্রমে কোন হিংস্র প্রাণী, পাখি, কুকুর, চিতাবাঘ, বাজ পাখিসহ অন্যান্য প্রাণী যদি শিকার করে তোমাদের জন্য বহন করে নিয়ে আসে তবে তা থেকে তোমরা খেতে পার। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
৪০৬৪-[১] ’আদী ইবনু হাতিম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছেনঃ যখন তুমি তোমার কুকুরকে (শিকারের প্রতি) লেলিয়ে দেবে, তখন আল্লাহর নাম নেবে। যদি সে শিকার ধরে তোমার জন্য রেখে দেয়, আর তুমিও শিকারকৃত জানোয়ারটিকে জীবিত অবস্থায় পেয়ে যাও, তাহলে তুমি তাকে যাবাহ করে দাও। আর যদি তুমি তাকে এমন অবস্থায় পাও যে, সে তাকে মেরে ফেলেছে, কিন্তু সে তার কোন অংশ খায়নি, তখন তুমি তা খেতে পার। আর যদি সে কিছু খেয়ে থাকে, তবে তুমি তা’ খাবে না। কেননা (তখন এটাই বুঝতে হবে যে,) সে এটা নিজের জন্য শিকার করেছে। আর যদি তুমি তোমার নিজের কুকুরের সঙ্গে অন্যের কুকুর দেখতে পাও যে, তারা শিকার ধরে তাকে মেরে ফেলেছে, তখন তা খেতে পারবে না। কেননা তুমি অবগত নও যে, তাদের উভয়ের মধ্যে কে শিকার ধরেছে বা মেরেছে। আর যখন তুমি তোমার তীর নিক্ষেপ করবে তখন আল্লাহর নাম নেবে, অতঃপর যদি (উক্ত শিকার) ন্যূনতম একদিন তোমার নিকট অদৃশ্য থাকে (এবং তুমি তাকে মৃত অবস্থায় পাও) এবং তার গায়ে একমাত্র তোমার তীরের চিহ্ন ব্যতীত অন্য কিছুর আঘাত না পাও, তখন ইচ্ছা করলে তাকে খেতে পার। কিন্তু যদি তুমি তাকে পানিতে ডুবন্ত অবস্থায় পেয়ে থাকো, তখন তাকে আর খেতে পারবে না। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوَّلُ
عَن عدِيِّ بنِ حاتِمٍ قَالَ: قَالَ لِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا أَرْسَلْتَ كَلْبَكَ فَاذْكُرِ اسْمَ اللَّهِ فَإِنْ أَمْسَكَ عَلَيْكَ فَأَدْرَكْتَهُ حَيًّا فَاذْبَحْهُ وَإِنْ أَدْرَكْتَهُ قَدْ قَتَلَ وَلَمْ يَأْكُلْ مِنْهُ فَكُلْهُ وَإِنْ أَكَلَ فَلَا تَأْكُلْ فَإِنَّمَا أَمْسَكَ عَلَى نَفْسِهِ فَإِنْ وَجَدْتَ مَعَ كَلْبِكَ كَلْبًا غَيْرَهُ وَقَدْ قَتَلَ فَلَا تَأْكُلْ فَإِنَّكَ لَا تَدْرِي أَيُّهُمَا قَتَلَ. وَإِذَا رَمَيْتَ بِسَهْمِكَ فَاذْكُرِ اسْمَ اللَّهِ فَإِنْ غَابَ عَنْكَ يَوْمًا فَلَمْ تَجِدْ فِيهِ إِلَّا أَثَرَ سَهْمِكَ فَكُلْ إِنْ شِئْتَ وَإِنْ وَجَدْتَهُ غَرِيقًا فِي الْمَاءِ فَلَا تأكُلْ»
ব্যাখ্যাঃ তিরমিযী, নাসায়ী ও ত্বহাবীতে সা‘ঈদ ইবনু জুবায়র (রহিমাহুল্লাহ)-এর সূত্রে ‘আদী ইবনু হাতিম হতে বর্ণিত রয়েছে যে, যখন শিকারকৃত প্রাণী তীর দ্বারা আঘাত পাবে ও অন্য কোন হিংস্র প্রাণীর যদি চিহ্ন না পাও। আর এ মর্মে নিশ্চিত হবে যে, তোমার ছোঁড়া তীর দ্বারাই প্রাণীটি হত্যা হয়েছে, তবে তা খেতে পারবে। অন্যথায় তা খাবে না। আর জখমকৃত প্রাণী যদি পানিতে পরে যায় তবে তা খাবে না, কারণ তখন সন্দেহের সৃষ্টি হবে প্রাণীটি তীরের আঘাতে মারা গেছে, নাকি পানিতে ডোবার কারণে মারা গেছে। যদি এ মর্মে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, উক্ত প্রাণী তীরের আঘাতে জখম (রক্তক্ষরণ) হয়েছে এবং মারা গেছে, অতঃপর পানিতে পরেছে, তাহলে উক্ত প্রাণী খাওয়া হালাল।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ যখন শিকারকৃত প্রাণী পানিতে ডুবন্ত অবস্থায় পাওয়া যাবে তখন তা খাওয়া সর্বসম্মতিক্রমে হারাম হবে। আর উল্লেখিত হাদীসে শিকারীর কুকুর পাঠানোর সময় ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলার নির্দেশ সম্পর্কে ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ শিকারীর জন্য কোন প্রাণী প্রেরণ করার সময়, পশু যাবাহ করার সময় এবং কুরবানী করার সময় ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলতে হবে। ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলা ওয়াজিব না সুন্নাত- এ সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। ইমাম শাফি‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ)-সহ একদল ‘উলামার মতে ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলা সুন্নাত, স্বেচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বর্জন করলে যাবাহকৃত ও শিকারকৃত প্রাণী হালাল হবে। আর এটাই ইমাম মালিক ও আহমাদ (রহিমাহুমাল্লাহ)-এর বর্ণনা। আহলুয্ যাহিরী বলেনঃ স্বেচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বর্জন করলে উক্ত প্রাণীর গোশত খাওয়া বৈধ নয়। এটা ইবনু সীরীন ও আবূ সাওর-এর বর্ণনা। ইমাম আবূ হানীফাহ্, মালিক, সুফ্ইয়ান সাওরী ও জামহূর ‘উলামা বলেনঃ ভুলবশতঃ ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বর্জন করলে উক্ত প্রাণী ভক্ষণ বৈধ আর ইচ্ছাকৃতভাবে ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বর্জন করলে বৈধ নয়। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫৪৮৪; শারহুন নাবাবী ১৩শ খন্ড, হাঃ [১৯২৯]-২)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪০৬৫-[২] উক্ত রাবী [’আদী ইবনু হাতিম (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রসূল! আমরা প্রশিক্ষিত কুকুর (শিকারের প্রতি) ছেড়ে থাকি। (এ ব্যাপারে কি বিধান?) তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যদি কুকুর শিকার ধরে তোমার জন্য রেখে দেয়, তবে তা খেতে পার। আমি জিজ্ঞেস করলাম, যদি তারা শিকারকে মেরে ফেলে। আমি পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম, আমরা তো (কখনো কখনো তীর-বর্শার ফলক নিক্ষেপ করেও শিকার) করি। (তার বিধান কি?) তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যা তীরের ধারে ক্ষত করে সেটা খাও। আর যা তীরের চোট লেগে মরে যায় তা খাবে না। কেননা তা প্রহারে মৃত। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْهُ قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّا نُرْسِلُ الْكِلَابَ الْمُعَلَّمَةَ قَالَ: «كُلْ مَا أَمْسَكْنَ عَلَيْكَ» قُلْتُ: وَإِنْ قَتَلْنَ؟ قَالَ: «وَإِنْ قَتَلْنَ» قُلْتُ: إِنَّا نَرْمِي بِالْمِعْرَاضِ. قَالَ: «كُلُّ مَا خزق وَمَا أصَاب بعرضه فَقتله فَإِنَّهُ وقيذ فَلَا تَأْكُل»
ব্যাখ্যাঃ (معراض) হলো ভারি কাঠ কিংবা লাঠি যার প্রান্তে থাকে লোহা, এটা কখনও লোহা ছাড়া অন্য কিছুও হয়ে থাকে। আর এটাই তার সঠিক ব্যাখ্যা। কারো মতে এটি এমন কাঠ, যার দুই পার্শ্ব পাতলা বা ধারালো এবং মাঝ বরাবর মোটা, যখন শিকারের জন্য নিক্ষেপ করা হয় তখন সোজা ছুটে যায়। ইমাম শাফি‘ঈ, মালিক, আবূ হানীফাহ্ ও আহমাদ (রহিমাহুল্লাহ)-সহ জামহূর ‘উলামার মতে পালকহীন তীরের ধারালো অংশের আঘাতে শিকারীর প্রাণী যদি মারা যায় তবে তা ভক্ষণ করা হালাল, আর যদি মোটা অংশের আঘাতে মারা যায় তবে উক্ত প্রাণী ভক্ষণ করা হালাল নয়। তবে মাকহূল, আওযা‘ঈসহ সিরিয়ার ফকীহদের মতে উক্ত প্রাণীর গোশত সর্বাবস্থায় হালাল। আর অধিকাংশ ‘উলামাসহ ইবনু আবী লায়লা (রহিমাহুল্লাহ)-এর মতে বন্দুকের গুলিতে মারা যাওয়া প্রাণী ভক্ষণ হালাল। সা‘ঈদ ইবনু মুসায়্যাব (রহিমাহুল্লাহ) হতেও অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘উলামার মতে বন্দুকের গুলির আঘাতে মারা যাওয়া প্রাণী (‘বিসমিল্লা-হ’র সাথে যাবাহ করা ছাড়া) কোনক্রমেই হালাল নয়।
আর শিকারীর জন্য প্রেরণকৃত প্রাণী যদি তার শিকারকৃত প্রাণীর কিছু অংশ খেয়ে ফেলে তাহলে অবশিষ্ট অংশ ভক্ষণ করা হারাম। আর এটাই অধিকাংশ ‘উলামার মত। তাদের মধ্যে ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস, আবূ হুরায়রা, ‘আত্বা, সা‘ঈদ ইবনুয্ যুবায়র, হাসান বাসরী, শা‘বী, নাখ‘ঈ, ‘ইকরামাহ্, কতাদাহ্সহ ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) ও তার অনুসারীগণ, আহমাদ, ইসহকব, সাওর (রহিমাহুল্লাহ) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অপরদিকে সা‘দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস, সালমান আল ফারিসী, ইবনু ‘উমার (রাঃ) ও মালিক (রহিমাহুল্লাহ)-এর মতে উক্ত প্রাণীর গোশত হালাল, তবে ইমাম শাফি‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ)-এর মতে এ কথাটি অত্যন্ত দুর্বল। (শারহুন নাবাবী ১৩শ খন্ড, হাঃ [১৯২৯]-২)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪০৬৬-[৩] আবূ সা’লাবাহ্ আল খুশানী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর নবী! আমরা আহলে কিতাবের (অর্থাৎ- ইয়াহূদী-নাসারাদের) এলাকায় বাস করি। সুতরাং আমরা কি তাদের পাত্রে খেতে পারি এবং এমন ভূমিতে বাস করি যেখানে শিকার পাওয়া যায়। আমি আমার তীর-ধনুক দ্বারা এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও অপ্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর দ্বারাও শিকার করি। অতএব আমার জন্যে কোনটি (খাওয়া) সঠিক হবে? তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আহলে কিতাবের পাত্র সম্পর্কে তুমি যা বললে, যদি তোমরা তাদের পাত্র ছাড়া অন্য পাত্র পাও, তখন আর তাতে খেয়ো না। আর যদি না পাও, তখন তাকে ধুয়ে নাও, তারপর তাতে খাও। আর তুমি তীর-ধনুক দ্বারা যা শিকার করবে, যদি ছাড়ার সময় ’’বিসমিল্লা-হ’’ পড়ে থাকো, তবে তা খেতে পার। আর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর দ্বারা যা শিকার করবে, যদি ’’বিসমিল্লা-হ’’ পড়ে ছেড়ে থাক তবে তা খাও। কিন্তু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নয় এমন কুকুর দ্বারা যা শিকার করবে, যদি যাবাহ করার সুযোগ পাও, তখন তাকে (যাবাহ করে) খাও। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَن أبي ثَعْلَبَة الْخُشَنِي قَالَ: قُلْتُ: يَا نَبِيَّ اللَّهِ إِنَّا بِأَرْضِ قوم أهل كتاب أَفَنَأْكَلُ فِي آنِيَتِهِمْ وَبِأَرْضِ صَيْدٍ أَصِيدُ بِقَوْسِي وَبِكَلْبِي الَّذِي لَيْسَ بِمُعَلَّمٍ وَبِكَلْبِي الْمُعَلَّمِ فَمَا يصلح؟ قَالَ: «أما ذَكَرْتَ مِنْ آنِيَةِ أَهْلِ الْكِتَابِ فَإِنْ وَجَدْتُمْ غَيْرَهَا فَلَا تَأْكُلُوا فِيهَا وَإِنْ لَمْ تَجِدُوا فاغسلوها وَكُلُوا فِيهَا وَمَا صِدْتَ بِقَوْسِكَ فَذَكَرْتَ اسْمَ اللَّهِ فَكُلْ وَمَا صِدْتَ بِكَلْبِكَ الْمُعَلَّمِ فَذَكَرْتَ اسْمَ اللَّهِ فَكُلْ وَمَا صِدْتَ بِكَلْبِكَ غَيْرِ معلم فأدركت ذَكَاته فَكل»
ব্যাখ্যাঃ ‘আল্লামা নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ সা‘লাবাহ্ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে উল্লেখিত পাত্র দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, যে পাত্রে শুকরের গোশত পাকানো হয় এবং মদ প্রস্তুত করা হয়।
যেমন আবূ দাঊদ-এর বর্ণনায় রয়েছে, আমরা আহলে কিতাবদের মাঝে থাকি আর তারা তাদের পাতিলে শুকরের গোশত রান্না করত এবং তাদের পাত্রে মদ তৈরি করত। ‘আল্লামা ইবনু হাযম (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ দু’টি শর্ত ছাড়া আহলে কিতাবদের পাত্র ব্যবহার করা বৈধ নয়।
১. তাদের পাত্র ছাড়া অন্য কোনও পাত্র না পাওয়া। ২. পাত্র ধৌত করা।
এ দু’টি শর্ত পালনের সাথে আহলে কিতাবদের পাত্র ব্যবহার করা যাবে।
কেউ কেউ বলেছেন উল্লেখিত হাদীসটি ফকীহদের বক্তব্যের বিপরীত। তাদের বক্তব্য হলো : মুশরিকদের পাত্র ধৌত করার পর তা ব্যবহার করা বৈধ, এতে কোন অপছন্দনীয়তার কিছু নেই, উক্ত পাত্র ছাড়া অন্য কোন পাত্র থাকুক বা না থাকুক। পক্ষান্তরে এ হাদীসটি মুশরিকদের পাত্র ব্যতীত অন্য পাত্র পাওয়া গেলে মুশরিকদের পাত্র ব্যবহার করাটা মাকরূহ প্রমাণ করে এবং এ অপছন্দনীয়তা দূর করার জন্য পাত্র ধৌত করাও যথেষ্ট নয়। তাদের পাত্র ধৌত করে ব্যবহার করা তখনই বৈধ হবে যখন অন্য কোন পাত্র না পাওয়া যাবে। এখানে ফিকাহবিদদের কথার উদ্দেশ্য হলো কাফিরদের ব্যবহৃত সেই পাত্র যা কোন নাপাকীর কাজে ব্যবহার হয়নি, এমন পাত্র ধৌত করার পূর্বে ব্যবহার করা মাকরূহ। যদি ধৌত করে ব্যবহার করা হয় তাতে অপছন্দনীয়তার কিছুই থাকবে না। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫৪৭৮; শারহুন নাবাবী ১৩শ খন্ড, হাঃ [১৯৩০]-৮)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪০৬৭-[৪] উক্ত রাবী [আবূ সা’লাবাহ্ আল খুশানী (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যদি তুমি শিকারের প্রতি তোমার তীর নিক্ষেপ করো এবং তা তোমার দৃষ্টির অগোচর হয়ে যায়, আর পরে তাকে পাও, তখন তাতে দুর্গন্ধ না হওয়া পর্যন্ত খেতে পার। (মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا رَمَيْتَ بِسَهْمِكَ فَغَابَ عَنْكَ فَأَدْرَكْتَهُ فَكُلْ مَا لَمْ يُنْتِنْ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যাঃ এখানে দুর্গন্ধযুক্ত প্রাণী বা পচন ধরা শিকারীর গোশত খাওয়া নিষেধ দ্বারা হারাম উদ্দেশ্য নয়। তবে যদি ক্ষতির আশঙ্কা প্রকট থাকে তবে তা হারাম হতে পারে। আমাদের কিছু কিছু ‘উলামা বলেন, পচন ধরা দুর্গন্ধযুক্ত গোশত খাওয়া সর্বাস্থায় হারাম, এ মতটি অত্যন্ত দুর্বল। (শারহুন নাবাবী ১৩শ খন্ড, হাঃ ১৯৩১)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪০৬৮-[৫] উক্ত রাবী [আবূ সা’লাবাহ্ আল খুশানী (রাঃ)] হতে বর্ণিত যে, যে ব্যক্তি তিনদিন পর তার শিকার পায়, সে ব্যক্তি সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তা দুর্গন্ধময় না হওয়া পর্যন্ত খেতে পারে। (মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ فِي الَّذِي يُدْرِكُ صَيْدَهُ بَعْدَ ثَلَاثٍ: «فكله مَا لم ينتن» . رَوَاهُ مُسلم
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪০৬৯-[৬] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, লোকেরা জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রসূল! এখানে এমন কিছুসংখ্যক লোক বাস করে যারা শির্কের নিকটবর্তী, তারা অনেক সময় আমাদের কাছে মাংস নিয়ে আসে। কিন্তু আমরা জানি না, তারা তাতে ’বিসমিল্লা-হ’ পড়ে (যাবাহ করে) কি-না। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এমতাবস্থায় তোমরা নিজেরা আল্লাহর নাম নাও এবং খাও। (বুখারী)[1]
الْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَن عَائِشَة قَالَت: قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ هُنَا أَقْوَامًا حَدِيثٌ عَهْدُهُمْ بِشِرْكٍ يَأْتُونَنَا بِلُحْمَانٍ لَا نَدْرِي أَيَذْكُرُونَ اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهَا أَمْ لَا؟ قَالَ: «اذْكُرُوا أَنْتُم اسمَ اللَّهِ وكلوا» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ ‘আল্লামা ইবনুত্ তীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ যাবাহ করতে ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ যদি অজান্তে ছাড়া পড়ে যায় তাহলে এ ব্যাপারে কোন জবাবদিহিতা নেই। এর বিপরীত যদি হয় তবে যাবাহ বিশুদ্ধ হবে না। আর কোন প্রাণী যাবাহ করার সময় ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলা হয়েছে কিনা এমন সন্দেহ থাকলেও উক্ত প্রাণীর গোশত খাওয়া বৈধতারই চাহিদা রাখে। কারণ যাবাহকারী ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলে যাবাহ করে তখন তার যাবাহ করাটা বিশুদ্ধ হয়। আর মুসলিমদের বাজারে যাবাহকৃত যে গোশত পাওয়া যায় তা থেকে উপকার গ্রহণ করা যাবে। ‘আরবের মুসলিমরা যা যাবাহ করে থাকে তার হুকুমও অনুরূপ। কেননা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলে থাকে। ইবনু হায্ম (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ মুসলিম যা যাবাহ করে তা ভক্ষণ করা যাবে এবং এ ধারণাই পোষণ করতে হবে যে, সে ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলেছে। কারণ নেতিবাচক কিছু প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত মুসলিমদের ব্যাপারে উত্তম ধারণা পোষণ করতে হবে। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, ৭২৬ পৃষ্ঠা)
হাদীসে বলা হয়েছে, ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেছেনঃ জাহিলী যুগের লোকেরা আমাদের নিকট কিছু গোশত নিয়ে আসত, আমরা জানি না যাবাহ করার সময় ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলেছে কিনা? আমরা কি তা খাব? তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, سموا الله وكلوا তোমরা ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বল ও খাও।
ইমাম ইবনুল মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ কথার অর্থ এই নয় যে, তোমাদের এখন (খাওয়ার সময়) ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলা, যাবাহকারীর ‘‘বিসমিল্লা-হ’’র বলার স্থলাভিষিক্ত হয়ে যাবে, বরং উক্ত হাদীসে খাওয়ার সময় ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলা মুস্তাহাব বা উত্তম। এটাই বর্ণনা করা হয়েছে। আর যাবাহ করার সময় আল্লাহর নাম উল্লেখ করা হয়েছে কিনা এটা জানা না যায়, তবুও উক্ত খাদ্য খাওয়া শুদ্ধ হবে যখন যাবাহকারী এমন ব্যক্তি হবে যাদের যাবাহকৃত জন্তু খাওয়া সঠিক। আর এ বিষয়টি মুসলিমদের অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে হবে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৮২৬)
ইমাম খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসটি এটাই দলীল বহন করে যে, কোন প্রাণী যাবাহ করার সময় ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলা ওয়াজিব নয়। ইমাম মুনযিরী অনুরূপ ব্যক্ত করেছেন।
তিনি বলেনঃ যাবাহ করার সময় ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলা ছেড়ে দেয়ার বিষয়ে লোকেরা মতভেদ করেছেন।
১. ইমাম শাফি‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ)-এর মতে : তাসমিয়া বা ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলা মুস্তাহাব, ওয়াজিব নয়। তা ইচ্ছা বা অনিচ্ছাকৃতভাবে ছাড়ুক যাবাহ হালাল হয়ে যাবে। আর এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন ইমাম মালিক ও আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রহিমাহুল্লাহ)।
২. সুফ্ইয়ান সাওরী, ইসহক ইবনু রহওয়াইহ ও আসহাবে রায় (রহিমাহুল্লাহ)-গণের মতে, যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলা ছেড়ে দেয় তাহলে যাবাহ হালাল। আর যদি ইচ্ছাকৃতভাবে তা ত্যাগ করে তাহলে হালাল হবে না।
৩. ইবনু সাওর ও দাঊদ (রহিমাহুল্লাহ) এর মতে, ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক, ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ ছাড়া প্রত্যেক যাবাহই হালাল নয়। একই অর্থে বর্ণনা করেছেন ইমাম ইবনু সীরীন ও শা‘বী (রহিমাহুল্লাহ)।
ইমাম মুনযিরী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ইমাম বুখারী এবং ইবনু মাজাহ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং আরো অনেকে বলেছেনঃ এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, যাবাহ করার সময় ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলা ওয়াজিব নয়। এটা এজন্য যে, যেহেতু চতুষ্পদ প্রাণী মূলত হারাম যতক্ষণ পর্যন্ত নিশ্চিভাবে যাবাহ না করা হয় বা রক্ত প্রবাহিত না করা হয়। আর সন্দেহযুক্ত বিষয় কখনো বৈধ হয় না। অতঃপর ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলা যদি যাবাহ করার শর্ত হত, তাহলে অন্যত্র থেকে যাবাহকৃত পশুর গোশত সুধারণা করে খাওয়া বৈধ হওয়ার জন্য যথেষ্ট হত না। যেমনটি যথেষ্ট হত না যদি যাবাহকৃত জন্তুর যাবাহের উপর সন্দেহ পোষণ করা হয়। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫খন্ড, হাঃ ২৮২৬)
মিরক্বাতুল মাফাতীহ গ্রন্থকার বলেছেনঃ শারহুস্ সুন্নাহ্ নামক গ্রন্থে এসেছে যে, যারা ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলা শর্ত মনে করেন না, তারা এ হাদীসটি দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন। কেননা ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলা যদি খাবার বৈধ হওয়ার শর্ত হত, তাহলে মৌলিকভাবে মূল খাবারের উপর সন্দেহ হতো, আর এ কারণে উক্ত খাবার খাওয়া নিষিদ্ধ হত। যেমন যাবাহ করার ক্ষেত্রে ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ না বলার সন্দেহের কারণে উক্ত খাবার নিষিদ্ধ হয়।
অনুরূপভাবে যারা ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলা শর্ত মনে করেন, তারা আল্লাহ তা‘আলার এই বাণী দ্বারা দলীল গ্রহণ করেন, وَلَا تَأْكُلُوا مِمَّا لَمْ يُذْكَرِ اسْمُ اللهِ عَلَيْهِ অর্থাৎ ‘‘যে জন্তুর ওপর আল্লাহর নাম নেয়া হয়নি, তোমরা তা ভক্ষণ করো না’’- (সূরাহ্ আল আন্‘আম ৬ : ১২১)। আর এ আয়াতে কারীমার পরবর্তী অংশে বলা হচ্ছে وَإِنَّه لَفِسْقٌ অর্থাৎ নিশ্চয় এটা (‘‘বিসমিল্লা-হ’’ ছাড়া যাবাহ করা জন্তু খাওয়া) গুনাহ বা গর্হিত কাজ।
কিন্তু যারা খাওয়ার সময় ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলা শর্তযুক্ত মনে করেন না, তারা উল্লেখিত সূরাহ্ আন্‘আম-এর ১২১ নং আয়াতের ব্যাখ্যা এভাবে করেছেন যে, উক্ত আয়াতে কারীমা দ্বারা বুঝানো হচ্ছে যে, যে সমস্ত জন্তু আল্লাহর নাম ছাড়া অন্য কিছুর তথা ‘‘গায়রুল্লাহর’’ নামে যাবাহ করা হয়েছে।
তারা তাদের এই মতামতের স্বপক্ষে দলীল হিসেবে সূরাহ্ আন্‘আম-এর ১৪৫ নং আয়াত উপস্থাপন করেছেন, যেখানে বলা হচ্ছে, أَوْ فِسْقًا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللهِ بِه অর্থাৎ যা কিছু গায়রুল্লাহর নামে যাবাহ করা হয় তা গুনাহ বা পাপাচারী কাজ।
উল্লেখ্য অত্র আয়াতে কারীমাতে গায়রুল্লাহর নামে যাবাহ করাকেই فسق বা পাপাচারিতা বুঝানো হচ্ছে।
অতএব পরিশেষে, উক্ত আয়াত দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ পরিত্যাগ করা হারাম। আর হাদীস দ্বারা ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ উচ্চারণ করতে ভুলে যাওয়া বিশেষভাবে বুঝানো হয়েছে।
আর দীনদার ব্যক্তির ওপর কর্তব্য হলো, যে জন্তুর ওপর আল্লাহর নাম নেয়া হয়নি, সেটা ভক্ষণ না করা। কেননা কুরআন মাজীদে এ ব্যাপারে মহা কঠিনতা আরোপ করা হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহূ ওয়া তা‘আলা আল কুরআনুল মাজীদের সূরাহ্ আন্‘আম-এর ১২১ নং আয়াতে ঘোষণা করেন যে,
وَإِنْ أَطَعْتُمُوهُمْ إِنَّكُمْ لَمُشْرِكُونَ
অর্থাৎ যদি তোমরা তাদের আনুগত্য কর তবে তোমরা মুশরিক হয়ে যাবে।
যদিও আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে মৃত জন্তুর ব্যাপারে তথাপি العبرة بِعُمُومِ اللَّفْظِ لَا بِخُصُوصِ السَّبَبِ অর্থাৎ অবতীর্ণের বিশেষত্বে নয় বরং শাব্দিক অর্থের ব্যাপকতার ভিত্তিতেই উপদেশ গৃহীত হবে। এই উসূল বা নিয়মের ভিত্তিতে এ আয়াতটি এখানে প্রযোজ্য।
‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলার নিয়ম বা পদ্ধতি :
‘‘বিসমিল্লা-হ’’ অবশ্যই মুখে উচ্চারণ করে পড়তে হবে। মনে মনে পড়লে হবে না বা শারী‘আতসম্মত নয়। কেননা শারী‘আতের প্রত্যেকটি ‘ইবাদাত জিকর, চাই তা ওয়াজিব হোক বা নফল হোক, তা ততক্ষণ গ্রহণযোগ্য হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত সেটা মুখ থেকে স্পষ্টরূপে উচ্চারিত না হবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
একজন মুসলিম মু’মিন ব্যক্তির জন্য অধিক সতর্কতা ও সাবধানতার কাজ হলো সে অবশ্যই যাবাহ ও খাওয়ার সময় ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ উচ্চারণ করবে। (আল্লাহ তা‘আলাই সর্ববিষয়ে সর্বাধিকজ্ঞাত) [সম্পাদক]
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪০৭০-[৭] আবুত্ব তুফায়ল (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন ’আলী -কে জিজ্ঞেস করা হলো, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাদেরকে (অর্থাৎ- আহলে বায়তকে) স্বতন্ত্রভাবে কিছু বলেছেন কি? উত্তরে তিনি বললেনঃ তিনি (রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এমন কোন বিষয়ে আমাদেরকে স্বতন্ত্র রাখেননি, যাতে অন্য লোক অন্তরভুক্ত হয়নি। তবে আমার তলোয়ারের এ খাপের ভিতরে যা আছে। অতঃপর তিনি খাপের ভিতর হতে এক খন্ড লিখিত কাগজ বের করলেন তাতে লিখা ছিল, সে ব্যক্তির ওপর আল্লাহর লা’নাত যে গায়রুল্লাহর নামে যাবাহ করে। আর সে ব্যক্তির ওপরও আল্লাহর লা’নাত যে জমিনের সীমানা পরিবর্তন করে। আল্লাহর লা’নাত ঐ ব্যক্তির ওপর, যে নিজের পিতাকে অভিসম্পাত দেয় এবং আল্লাহর লা’নাত সে ব্যক্তির ওপর, যে কোন বিদ্’আতীকে আশ্রয় দেয়। (মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَن أبي الطُّفَيْل قَالَ: سُئِلَ عَليّ: هَلْ خَصَّكُمْ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِشَيْءٍ؟ فَقَالَ: مَا خَصَّنَا بِشَيْءٍ لَمْ يَعُمَّ بِهِ النَّاسَ إِلَّا مَا فِي قِرَابِ سَيْفِي هَذَا فَأَخْرَجَ صَحِيفَةً فِيهَا: «لَعَنَ اللَّهُ مَنْ ذَبَحَ لِغَيْرِ اللَّهِ وَلَعَنَ اللَّهُ مَنْ سَرَقَ مَنَارَ الْأَرْضِ وَفِي رِوَايَةٍ مَنْ غَيَّرَ مَنَارَ الْأَرْضِ وَلَعَنَ اللَّهُ مَنْ لَعَنَ وَالِدَهُ وَلَعَنَ اللَّهُ مَنْ آوَى مُحْدِثًا» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যাঃ উপরোক্ত হাদীসটি বর্ণনা করেছেন বিখ্যাত সাহাবী আবুত্ব তুফায়ল (রাঃ)। এটি তাঁর কুনিয়াতি নাম, তার মূল নাম عامر بن وائلة الليسي (‘আমির ইবনু ওয়ায়িলাহ্ আল লায়সী)। যিনি বিশ্বনবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সকল সাহাবীদের মধ্যে সর্বশেষ মৃত্যুবরণ করেন।
তিনি বিশ্বনবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশাতে তাঁকে আট বছর পেয়েছিলেন। তিনি ১০২ বছর বয়সে মক্কাতে মৃত্যুবরণ করেন।
আলোচ্য হাদীসে আবুত্ব তুফায়ল (রাঃ) বলেন যে, ‘আলী (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলো রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি আপনাদের তথা আহলে বায়তেরা রসূলের (রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরিবারের) জন্য কোন কিছু বিশেষভাবে রেখে গেছেন? বা কোন বিশেষ নিদর্শন বা সুন্নাত রেখে গেছেন?
তিনি [‘আলী (রাঃ)] বললেনঃ না, আমাদের জন্য তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বিশেষভাবে কিছু রেখে যাননি বরং সকলের জন্য ব্যাপকভাবে যা রেখেছেন আমাদের জন্যও তাই রেখেছেন। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
তবে যা কিছু তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) রেখেছেন قراب سيفيى (ক্বিরাবু সাইফিয়্যি) এর মাঝে। এখানে قراب سيفيى (ক্বিরাবু সাইফিয়্যি) এর ব্যাখ্যায় শারহুন নাবাবী এর লেখক বলেছেন,
قِرَابُ سَيْفِي هُوَ بِكَسْرِ الْقَافِ وَهُوَ وِعَاءٌ مِنْ جِلْدٍ أَلْطَفُ مِنَ الْجِرَابِ يَدْخُلُ فِيهِ السَّيْفُ بِغِمْدِه وَمَا خَفَّ مِنَ الْآلَةِ
অর্থাৎ قراب سيفى হলো, চামড়ার তৈরি একটি পাত্র যা মোজার চেয়ে পাতলা, যার মধ্যে কোষবদ্ধ তরবারি ও হালকা পাতলা কোন যন্ত্রপাতি রাখা হয়। (শারহুন নাবাবী, ১৩শ খন্ড, হাঃ ১৯৭৮)
মিরক্বাত গ্রন্থকার বলেনঃ সম্ভবত উক্ত তরবারিটি ذو الفقار ‘‘জুলফিকার’’ নামক তরবারি, যা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আলী (রাঃ)-কে প্রদান করেছিলেন।
অতঃপর ‘আলী (রাঃ) উক্ত কোষবদ্ধ তরবারি রাখার খাপ থেকে একটি صحيفة সহীফাহ্ বা পত্র বের করলেন, যাতে লেখা ছিল,
لَعَنَ اللهُ مَنْ ذَبَحَ لِغَيْرِ اللهِ، وَلَعَنَ اللهُ مَنْ سَرَقَ مَنَارَ الْأَرْضِ
অর্থাৎ ঐ ব্যক্তির ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত যে গায়রুল্লাহর (আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো) নামে পশু যাবাহ করে। আল্লাহর অভিসম্পাত ঐ ব্যক্তির ওপর নিপতিত হোক যে জমিনের উঁচু স্তম্ভসমূহ (আইল) চুরি করে।
অত্র হাদীসে উল্লেখিত منار (মানার) শব্দটা منارة (মানারাহ্) শব্দের বহুবচন; যার অর্থ হলো বিভিন্ন জমির মাঝে উঁচু উঁচু ঐ চিহ্নসমূহ যা দ্বারা জমিনের সীমানা নির্ধারণ করা হয়। [সম্পাদক]
ইমাম ইবনুল মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ অর্থাৎ যে ব্যক্তি প্রতিবেশীর অধিকারভুক্ত জমিনের দখলদারিত্ব নিতে চায়।
ইমাম তূরিবিশতী ও অন্যান্যগণ বলেনঃ ‘মানার’ হলো জমিনের মাঝে একটি নিশানা বা একটি সীমানা। আর এটা এজন্য যে, এটা দ্বারা নিজ মালিকানা বা রাস্তার সীমানা বরাবর বা পরিবর্তন করার জন্য অন্যায়ভাবে দখল করা। কেননা অন্য একটি বর্ণনায় আছে, مَنْ غَيَّرَ مَنَارَ الْأَرْضِ অর্থাৎ যে ব্যক্তি জমিনের সীমানা পরিবর্তন করল। অর্থাৎ সীমানার চিহ্ন উঠিয়ে ফেলল এবং তা নিজের জায়গাতে স্থাপন করল অথবা নিজের স্থান থেকে উঠিয়ে অন্য স্থানে স্থাপন করল। উদ্দেশ্য হলো : যাতে একজন প্রতিবেশী অন্য প্রতিবেশীর জায়গা থেকে কিছু অংশ কর্তন করে না নিতে পারে।
উপরোল্লিখিত হাদীসের পরবর্তী অংশে বলা হচ্ছে وَلَعَنَ اللهُ مَنْ لَعَنَ وَالِدَهٗ আল্লাহ তা‘আলা তার ওপর অভিসম্পাত করেন, যে তার পিতার ওপর অভিসম্পাত করে।
পিতাকে অভিসম্পাত করা দু’ রকমভাবে হয়ে থাকে, ১. স্পষ্টভাবে অভিশাপ করা, ২. কারণগতভাবে। আর এটা এ রকম যে, কেউ অন্য কারো বাবাকে গালি দিল, অতঃপর সেও তার বাবাকে গালি দিল বা অভিশাপ দিল। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ
وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللهِ فَيَسُبُّوا اللهَ عَدْوًا بِغَيْرِ عِلْمٍ
‘‘আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদের তারা ডাকে বা আরাধনা করে তাদের তোমরা মন্দ বলো না বা গালি দিও না। তাহলে তারাও ধৃষ্টতা করে অজ্ঞতাবশতঃ আল্লাহকে মন্দ বলবে বা গালি দিবে।’’ (সূরাহ্ আল আন্‘আম ৬ : ১০৮)
সুতরাং অন্যদের থেকে গাল-মন্দ পাওয়া থেকে বাঁচার জন্য সাবধানতাবশত তার কারণগুলো সংঘটিত করা হতে নিষেধ করা হচ্ছে।
অত্র হাদীসের শেষাংশে বলা হচ্ছে, (وَلَعَنَ اللهُ مَنْ آوَى مُحْدِثًا) অর্থাৎ আল্লাহ তার ওপর অভিসম্পাত করুন, যে কোন অন্যায় সম্পাদনকারী বা অনিষ্টতাকারীকে আশ্রয় প্রদান করল। উল্লেখিত হাদীসে محدثا (মুহদিসান) শব্দের ব্যাখ্যা হলো যে ব্যক্তি কারো ওপর বড় ধরনের কোন অনিষ্টতা বা অপরাধ সংঘটিত করে, অথবা ইসলামের মধ্যে কোন বিদ্‘আত বা নতুন কিছু আবিষ্কার করে।
أوى তথা তাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়ার অর্থ হলো, তাকে তার বিরোধী প্রতিপক্ষ বা যাদের ওপর অন্যায় করেছে তাদের থেকে আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়া। আর প্রতিপক্ষর বিচারের সম্মুখীন হওয়া থেকে তাকে সহায়তা বা পৃষ্ঠপোষকতা করা এবং তার ও প্রতিপক্ষর মাঝে বিচার করা, ক্বিসাস নেয়া বা শাস্তি দেয়ার ক্ষেত্রে বাধা প্রদান করা।
অনুরূপভাবে যারা ইসলাম ধ্বংসাত্মক কাজ করবে এবং এদের যারা শাস্তির সম্মুখীন হওয়া থেকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবে বা রক্ষা করবে, তার এই নিকৃষ্ট স্বভাব পরিবর্তন করার নিমিত্তে তাকে পাকড়াও থেকে বিরত রাখার ক্ষেত্রে যে তাকে সহায়তা করবে সেও বর্ণিত অভিশপ্তের অন্তর্ভুক্ত হবে- (হাদীসটি মুসলিম, আহমাদ ও নাসায়ীতে বর্ণিত হয়েছে)। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪০৭১-[৮] রাফি’ ’ইবনু খদীজ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রসূল! আগামীকাল আমরা শত্রুর মোকাবিলা করব অথচ আমাদের সাথে কোন ছুরি নেই। এমতাবস্থায় আমরা কি বাঁশের ছিলকা দ্বারা যাবাহ করতে পারব? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ যে জিনিস রক্ত প্রবাহিত করে এবং যাতে আল্লাহর নাম নেয়া হয়েছে, তা খেতে পার। তবে দাঁত ও নখ দ্বারা যাবাহ করবে না। এ সম্পর্কে আমি তোমাকে অবহিত করছি। বস্ত্ততঃ দাঁত হলো হাড়বিশেষ (তাতে ধার নেই), আর নখ হলো হাবশীদের ছুরি (অর্থাৎ- তারা নখ দ্বারা যাবাহ করে)।
বর্ণনাকারী বলেন, এক সময় গনীমাতের মালে কিছুসংখ্যক উট ও বকরি আমাদের হাতে আসে এবং তা হতে একটি উট পালিয়ে যায়। এমতাবস্থায় জনৈক ব্যক্তি তার প্রতি তীর নিক্ষেপ করে, তাকে আটকে ফেলল। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ নিশ্চয় এ উটটির মধ্যে বন্য পশুর পালানোর স্বভাবের মতো স্বভাব রয়েছে। সুতরাং যখন এদের কোন একটি তোমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন তার সাথে এরূপ আচরণই করবে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَن رَافع بن خديج قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّا لَاقُوا الْعَدُوَّ غَدًا وَلَيْسَتْ مَعَنَا مُدًى أَفَنَذْبَحُ بِالْقَصَبِ؟ قَالَ: مَا أَنْهَرَ الدَّمَ وَذُكِرَ اسْمُ اللَّهِ فَكُلْ لَيْسَ السِّنَّ وَالظُّفُرَ وَسَأُحَدِّثُكَ عَنْهُ: أَمَّا السِّنُّ فَعَظْمٌ وَأَمَّا الظُّفُرُ فَمُدَى الْحَبَشِ وَأَصَبْنَا نَهْبَ إِبِلٍ وَغَنَمٍ فَنَدَّ مِنْهَا بِعِيرٌ فَرَمَاهُ رَجُلٌ بِسَهْمٍ فَحَبَسَهُ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ لِهَذِهِ الْإِبِلِ أَوَابِدَ كَأَوَابِدِ الْوَحْشِ فَإِذَا غَلَبَكُمْ مِنْهَا شَيْءٌ فَافْعَلُوا بِهِ هَكَذَا»
ব্যাখ্যাঃ হাদীসে বর্ণিত (إِنَّا لَاقُوا الْعَدُوَّ غَدًا) এর মর্মার্থ হলো- আমরা আগামীকাল বা ভবিষ্যতে কাফির শত্রুদের সাথে মুখোমুখি হব।
(أَفَنَذْبَحُ بِالْقَصَبِ) নিহায়াহ্ গ্রন্থকার বলেনঃ প্রত্যেক চওড়া বিশিষ্ট হাড়কে কসব বলা হয়।
(مَا أَنْهَرَ الدَّمَ) ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এর উদ্দেশ্য হলো, যা প্রচুর পরিমাণে রক্ত প্রবাহিত করে, যা উপমীয় নদীতে পানি প্রবাহিত হওয়ার মতো।
(لَيْسَ السِّنَّ وَالظُّفُرَ) অধিকাংশ ব্যাখ্যাকারগণ এর মর্মার্থ এভাবে উল্লেখ করেছেন যে, নখ ও দাঁত ব্যতীত। কেননা উভয়টি দ্বারা যাবাহ করা সম্ভব নয়।
আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিষেধের কারণ হলো যে, সেটা জীনদের খাবার।
ইমাম সুয়ূত্বী ও ইমাম নাবাবী (রহিমাহুমাল্লাহ) এ মতামত দিয়েছেন।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) সহীহ মুসলিম-এর ব্যাখ্যা গ্রন্থে বলেনঃ আমাদের অনুসারীরা বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী (أَمَّا السِّنُّ فَعَظْمٌ) দ্বারা বুঝতে পেরেছি হাড্ডি দ্বারা যাবাহ করা অবৈধ।
ইমাম শাফি‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ) ও তাঁর অনুসারীরা এই মতের পক্ষ। জামহূর ‘উলামাও এই মতের পক্ষ গিয়েছেন।
ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ দাঁত ও হাড্ডি দ্বারা একত্রে যাবাহ বৈধ নয় বরং আলাদা আলাদা বৈধ আছে।
ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ)-এর সবচেয়ে প্রসিদ্ধ মত হলো- হাড্ডি দ্বারা বৈধ, দাঁত দ্বারা নয়।
(وَأَمَّا الظُّفُرُ فَمُدَى الْحَبَشِ) এর তাৎপর্য হলো- হাবশীরা তাদের নখকে ছুরির সমতুল্য মনে করে, নখ দ্বারা যাবাহ করত। তাই আমাদের তাদের সাদৃশ্য গ্রহণ করা যাবে না, যেহেতু তারা অমুসলিম ছিল। আর আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে সাদৃশ্য গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন।
আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী (إِنَّ لِهٰذِهِ الْإِبِلِ أَوَابِدَ) ‘‘নিশ্চয় এ উটটির মধ্যে বন্য পশুর স্বভাব রয়েছে।’’
ইমাম তূরিবিশতী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ পলায়নের স্বভাব সকল উটেরই রয়েছে। আর ইমাম ত্বীবী বলেনঃ কিছু সংখ্যক উটের এই স্বভাব রয়েছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
‘উলামাগণ বলেনঃ অত্র হাদীসে এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, যাবাহ করার ক্ষেত্রে যা কর্তন করে ও রক্ত প্রবাহিত করে তা শর্ত করা হয়েছে। আর রক্ত প্রবাহিত ব্যতীত শুধু থেতলে দিয়ে মস্তিষ্কে আঘাত করাই যথেষ্ট হবে না।
কতিপয় ‘আলিমগণ বলেনঃ যাবাহ করা ও রক্ত প্রবাহিতকে শর্তকরণের রহস্য হলো, হালাল গোশত ও চর্বিকে পৃথককরণ উভয়টির হারাম হতে। আর এটাও অবহিত করা যে, মৃত প্রাণী রক্ত প্রবাহিত না হওয়ার কারণে হারাম।
অত্র হাদীসের মাধ্যমে এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, প্রত্যেক ধারালো বস্তু যা কর্তন করে তা দ্বারা যাবাহ করা বৈধ। তবে নখ, দাঁত ও সমস্ত হাড্ডি ব্যতীত। ধারালো বস্তুর অন্তর্ভুক্ত হলো- তরবারি, ছুরি, বল্লমের অগ্রভাগ, পাথর, কাঠ, কাঁচ, বাঁশের ছিলকা, চিনামাটির পাত্র, তামা, পিতল ইত্যাদি। এগুলো দ্বারা যাবাহ করা বৈধ। আর হাদীসে বর্ণিত নখ বলতে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর নখ হতে পারে, চাই তা একত্রে হোক বা পৃথক হোক তা দ্বারা যাবাহ করা অবৈধ।
অপরপক্ষ হাদীসে বর্ণিত দাঁত বলতে মানুষসহ অন্যান্য প্রাণী হতে পারে, চায় তা একত্রে হোক অথবা পৃথক হোক পবিত্র হোক বা অপবিত্র হোক তা দ্বারা যাবাহ করা সম্পূর্ণ অবৈধ। (শারহুন নাবাবী ১৩শ খন্ড, হাঃ ১৯৬৮)
(أَمَّا السِّنُّ فَعَظْمٌ) অর্থাৎ প্রত্যেক হাড্ডি দ্বারা যাবাহ করা অবৈধ। তবে দাঁত হলো হাড্ডি।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আল্লাহর নবী বলেছেন যে, তোমরা হাড্ডি দ্বারা যাবাহ করবে না, কেননা সেটা রক্ত দ্বারা অপবিত্র হয়। আর আমি তোমাদেরকে হাড্ডি দ্বারা ইস্তিঞ্জা করতে নিষেধ করেছি যাতে তা অপবিত্র না হয়, যেহেতু এটা জীনদের খাবার।
অত্র হাদীসের মাধ্যমে এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, কোনভাবেই দাঁত ও নখ দ্বারা যাবাহ করা যাবে না।
এ হাদীসে এটাও বুঝা যাচ্ছে যে, হাড্ডি দ্বারাও যাবাহ করা যাবে না। সুতরাং যে কোন হাড্ডি দ্বারা যাবাহ করা হারাম, নাজায়িয।
(وَأَمَّا الظُّفُرُ فَمُدَى الْحَبَشِ) ইবনু সলাহ বলেনঃ হাবশীরা কাফির, তাই আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাদৃশ্য গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। ইমাম নাবাবীও অনুরূপ মত প্রকাশ করেছেন।
কেউ কেউ বলেনঃ উভয়টি দ্বারা যাবাহ নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ হলো, তা দ্বারা প্রাণীর কষ্ট হয় এবং প্রাণীকে শুধু শ্বাসরুদ্ধ করা হয়, যা যাবাহ করার কোন পদ্ধতিতে পড়ে না।
অত্র হাদীস থেকে প্রমাণিত যে, প্রত্যেক ধারালো বস্তু যা রক্ত প্রবাহিত করে তা দ্বারা যাবাহ করা বৈধ। আর ধারালো বস্তুর অন্তর্ভুক্ত হলো ছুরি, পাথর, কাঠ, কাঁচ, বাঁশের ছিলকা ইত্যাদি।
আর এটাও প্রমাণিত হলো যে, গৃহপালিত প্রাণী যখন পলায়ন করবে ও জংলী মনোভাব প্রকাশ করবে, যার কারণে তাকে যাবাহ করা সম্ভব হচ্ছে না, তখন তার পূর্ণ শরীর যাবাহের হুকুমে পড়ে যাবে। যেমনটি শিকারী প্রাণীর ক্ষেত্রে করা হয়। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৮১৮)
‘আবদুর রহমান মুবারকপূরী ‘‘শারহুস্ সুন্নাহ্’’য় বলেনঃ অত্র হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, গৃহপালিত প্রাণী যখন জংলী ভাব প্রকাশ করবে ও পলায়ন করবে। যার কারণে তার যাবাহ করার জায়গায় কর্তন সম্ভব হচ্ছে না, তখন তার পূর্ণ শরীর যাবাহ করার স্থান হিসেবে পরিগণিত হবে, ঐ শিকারীর মতো, যাকে যাবাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
অনুরূপভাবে যদি কোন কূপে কোন উট উল্টে পড়ে যায়, যার গলায় যাবাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। তখন তার শরীরের যে কোন জায়গায় আঘাত করার দ্বারা মারা গেলে তা হালাল হিসেবে গণ্য হবে। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৪৯২)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪০৭২-[৯] কা’ব ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, তার এক পাল বকরী ছিল, যা সাল্’ই পাহাড়ী এলাকায় চরত। এক সময় আমাদের এক দাসী দেখতে পেল যে, আমাদের পালের একটি বকরী মরণাপন্ন হয়ে পড়েছে। তখন সে একখন্ড পাথর ভেঙ্গে নিলো এবং তার দ্বারা বকরীটিকে যাবাহ করে দিলো। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে তা খাওয়ার অনুমতি দিলেন। (বুখারী)[1]
الْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَن كعبِ بنِ مَالك أَنه كانَ لَهُ غَنَمٌ تُرْعَى بِسَلْعٍ فَأَبْصَرَتْ جَارِيَةٌ لَنَا بِشَاةٍ مِنْ غَنَمِنَا مَوْتًا فَكَسَرَتْ حَجَرًا فَذَبَحَتْهَا بِهِ فَسَأَلَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأمره بأكلها. رَوَاهُ البُخَارِيّ
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪০৭৩-[১০] শাদ্দাদ ইবনু আওস (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা প্রত্যেক জিনিসের প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং যখন তোমরা কোন ব্যক্তিকে (ক্বিসাস ইত্যাদিতে) হত্যা করবে, তখন তাকে উত্তম পদ্ধতিতে হত্যা করবে। আর যখন কোন প্রাণীকে যাবাহ করবে, তখন তাকে উত্তমরূপেই যাবাহ করবে। তোমরা অবশ্যই ছুরি ধার দিয়ে নেবে এবং যাবাহকৃত পশুকে শান্তি দেবে। (মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ شَدَّادِ بْنِ أَوْسٍ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّ اللَّهَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى كَتَبَ الْإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ فَإِذَا قَتَلْتُمْ فَأَحْسِنُوا الْقِتْلَةَ وَإِذَا ذَبَحْتُمْ فَأَحْسِنُوا الذَّبْحَ وَلْيُحِدَّ أَحَدُكُمْ شَفْرَتَهُ وَلْيُرِحْ ذَبِيحَتَهُ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ (إِنَّ اللهَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى كَتَبَ الْإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ) ব্যাখ্যাকার বলেনঃ আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের ওপর প্রত্যেক বস্তুর ক্ষেত্রে অনুগ্রহ করা আবশ্যক করেছেন। চায় তা জীবিত বা মৃত মানুষ ও প্রাণী হোক।
এ বাক্য দ্বারা এই ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশ্ববাসীর জন্য রহমত স্বরূপ। আর চরিত্রকে পূর্ণাঙ্গতা দেয়ার জন্য তাকে প্রেরণ করা হয়েছে এবং তার উম্মাতের জন্য তার অনুসরণের মাধ্যমে এই গুণের একটি অংশ রয়েছে।
ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ অত্র হাদীসে নির্দেশসূচক বাক্য ব্যবহার করে ইহসান তথা দয়া ও অনুগ্রহ করার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হলেও এখানে দয়া ও অনুগ্রহ করা মুস্তাহাব।
আর اِحْسَانٌ অর্থ অনুগ্রহ করা। অনুগ্রহ করা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- পশুকে আরাম ও শান্তি দেয়া। ধারালো ছুরি দ্বারা ও দ্রুত ছুরি চালানোর মাধ্যমে যাবাহ করা।
(وَلْيُحِدَّ أَحَدُكُمْ شَفْرَتَهٗ) অর্থাৎ তোমরা অবশ্যই ছুরি ধার করে নিবে। যাবাহকৃত পশুর সামনে ছুরি ধার না করা মুস্তাহাব বা কাম্য এবং কোন পশুকে অপর কোন পশুর সামনে যাবাহ না করাই ভালো এবং পশুকে কসাইখানায় না নিয়ে যাওয়াই ভালো।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ অত্র হাদীসটি ব্যাপক অর্থবোধক তথা দয়া ও অনুগ্রহ যে কোন পশু যাবাহ করার ক্ষেত্রে হতে পারে এবং মানুষকে ক্বিসাস ও শাস্তি দেয়ার ক্ষেত্রেও হতে পারে।
আমাদের ‘আলিমগণ বলেনঃ পশুর জান বের হওয়ার পূর্বে চামড়া ছাড়ানো অপছন্দনীয় কাজ। কেননা অত্র হাদীস দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, সব ধরনের কষ্ট প্রদানে ও শাস্তিদানে কোন উপকার নেই। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
(وَلْيُرِحْ ذَبِيحَتَهٗ) এবং যাবাহকৃত পশুকে শান্তি দিবে। ইবনুল মালিক বলেনঃ যাবাহকৃত পশুকে আত্মা বের না হওয়া পর্যন্ত রেখে দিবে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৮১১)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪০৭৪-[১১] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি শুনেছি, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন জানোয়ার বা অন্য কোন প্রাণীকে হত্যা করার জন্য আবদ্ধ করে রাখতে নিষেধ করতেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَنْهَى أَنْ تُصْبَرَ بهيمةٌ أَو غيرُها للْقَتْل
ব্যাখ্যাঃ ‘‘শারহুস্ সুন্নাহ্’’তে বলা হয়েছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কথার দ্বারা বুঝাতে চেয়েছেন যে, কোন প্রাণীকে আটকিয়ে রেখে তীর নিক্ষেপ করা যাতে সে মারা যায়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪০৭৫-[১২] উক্ত রাবী [’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ)] হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন ব্যক্তির ওপর লা’নাত করেছেন, যে কোন জিবন্ত প্রাণীকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَعَنَ مَنِ اتَّخَذَ شَيْئًا فِيهِ الرُّوحُ غَرَضًا
ব্যাখ্যাঃ ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী لَعَنَ اللهُ مَنْ فَعَلَ هٰذَا অর্থাৎ যে ব্যক্তি কোন প্রাণীকে নিশানা বানিয়ে হত্যা করবে, আল্লাহ তা‘আলা তার ওপর অভিশাপ করেছেন। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, অত্র হাদীসে নিষেধটি হারামের অন্তর্ভুক্ত। কেননা এভাবে প্রাণীর কষ্ট হয়। তার আত্মার বিনাশ সাধন হয়, সম্পদের ক্ষতি হয়, আর যদি যাবাহযোগ্য প্রাণী হয় তাহলে যাবাহ করা হাতছাড়া হয়ে যায়। আর যদি যাবাহযোগ্য প্রাণী না হয়, তাহলে তার উপকার হাতছাড়া হয়। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪০৭৬-[১৩] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে জিনিসের মধ্যে প্রাণ আছে, তোমরা তাকে লক্ষ্যবস্তু করো না। (মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا تَتَّخِذُوا شَيْئًا فِيهِ الرُّوحُ غَرَضًا» . رَوَاهُ مُسلم
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪০৭৭-[১৪] জাবির ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (কোন পশুর) মুখমণ্ডল ে আঘাত করতে এবং চেহারায় দাগ দিতে নিষেধ করেছেন। (মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الضَّرْبِ فِي الْوَجْهِ وَعَنِ الْوَسْمِ فِي الْوَجْه. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ চেহারায় আঘাত করা প্রত্যেক মর্যাদাবান প্রাণীর ক্ষেত্রে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন- মানুষ, গাধা, ঘোড়া, উট, খচ্চর, বকরী ইত্যাদি। তবে মানুষের ক্ষেত্রে আরো কঠিন। কেননা চেহারা সকল সৌন্দর্যের মিলনস্থল। পাশপাশি তা কোমল ও হালকা। যেখানে আঘাতের দাগ প্রকাশিত হয়। এমনকি কখনো চেহারাকে বিকৃত করে দেয় আবার কখনো কতিপয় ইন্দ্রিয়কে ক্ষতি করে ফেলে। তিনি বলেন, অপরপক্ষ চেহারায় দাগ দেয়া সর্বসম্মতিক্রমে নিষিদ্ধ। আর মানুষ ছাড়া কোন প্রাণীর চেহারা ব্যতীত যে কোন স্থানে দাগ দেয়া শাফি‘ঈ মাযহাবের নিকট কোন মতভেদ ছাড়া জায়িয। তবে যাকাত ও জিয্ইয়ার উটের ক্ষেত্রে মুস্তাহাব। এ ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে মুস্তাহাবও নয় এবং নিষেধও নয়। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৭১০)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪০৭৮-[১৫] উক্ত রাবী [জাবির (রাঃ)] হতে বর্ণিত। একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে দিয়ে একটি গাধা অতিক্রম করছিল। তিনি দেখলেন, তার মুখমণ্ডল ে দাগ দেয়া রয়েছে। তখন তিনি বললেনঃ সে ব্যক্তির ওপর আল্লাহর লা’নাত যে তার মুখমণ্ডল ে দাগ দিয়েছে। (মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرَّ عَلَيْهِ حِمَارٌ وَقَدْ وُسِمَ فِي وَجْهِهِ قَالَ: «لَعَنَ اللَّهُ الَّذِي وَسَمَهُ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যাঃ চেহারায় দাগ দেয়া সর্বসম্মতিক্রমে নিষিদ্ধ। যা হাদীস থেকে প্রমাণিত। আর মানুষকে দাগ দেয়া হারাম তার মর্যাদার কারণে। কেননা তাকে দাগ দেয়া নিস্প্রয়োজন। সুতরাং এভাবে তাকে কষ্ট প্রদান করা বৈধ নয়।
ইমাম বাগাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ দাগ দেয়া স্পষ্টভাবে হারাম। কেননা আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাগ প্রদানকারীকে অভিশাপ দিয়েছেন। আর অভিশাপের দাবী হলো হারাম। আর মানুষ ছাড়া অন্য কোন প্রাণীর চেহারা ব্যতীত যে কোন স্থানে দাগ দেয়া শাফি‘ঈ মাযহাবের নিকটে কোন মতভেদ ছাড়া জায়িয। তবে যাকাত ও জিয্ইয়ার উটের ক্ষেত্রে মুস্তাহাব। এছাড়া অন্য ক্ষেত্রে মুস্তাহাবও নয় এবং নিষেধও নয়। (শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২১১৭)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪০৭৯-[১৬] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন ভোরে আমি ’আবদুল্লাহ ইবনু আবূ ত্বলহাহ্-কে মিষ্টিমুখ করানোর জন্য রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে নিয়ে এলাম। তখন আমি তাঁকে এমন অবস্থায় পেলাম যে, তাঁর হাতে ছিল একখানা দাগ লাগানোর যন্ত্র। তা দ্বারা তিনি সাদাকা-যাকাতের উটগুলো দাগাচ্ছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَن أنس قَالَ: غَدَوْتُ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِعَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي طَلْحَةَ لِيُحَنِّكَهُ فَوَافَيْتُهُ فِي يَدِهِ الْمِيسَمُ يَسِمُ إِبِلَ الصَّدَقَة
ব্যাখ্যাঃ মুহাল্লিব (রহিমাহুল্লাহ) ও অন্যান্যরা বলেনঃ অত্র হাদীস থেকে প্রমাণিত যে, রাষ্ট্রপ্রধান কেবলমাত্র দাগ দেয়ার যন্ত্রটি ধরতে পারবে অন্য কোন মানুষ তার মতো ধরতে পারবে না এবং সেটা আংটি বা সিল মোহরের ন্যায়।
এটা প্রমাণিত যে, রাষ্ট্রপ্রধান যাকাতের মালগুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখবে এবং নিজেও দেখাশুনার দায়িত্ব নিবে। এছাড়াও মুসলিমদের সার্বিক বিষয়েও খেয়াল রাখবে।
আর এটাও প্রমাণিত যে, প্রয়োজনে প্রাণীকে ব্যথা বা কষ্ট দেয়া বৈধ।
এবং এটাও প্রমাণিত যে, নবজাতক শিশুকে বারাকাত হাসিলের জন্য সৎ ব্যক্তিদের নিকটে নিয়ে যাওয়া।
এবং এটাও প্রমাণিত যে, বণ্টনের ক্ষেত্রে বিলম্ব করা জায়িয। কেননা যদি বণ্টন দ্রুত করা হয় তাহলে প্রাণীগুলো দাগ দেয়া থেকে অমুখাপেক্ষী হয়ে যাচ্ছে।
এবং এটাও প্রমাণিত যে, পেশাগত কাজ সরাসরি নিজেই করা অন্যকে দিয়ে না করা, অধিক সাওয়াবের আশায় এবং অহংকার-অহমিকা দূর করতে। (ফাতহুল বারী ৩য় খন্ড, হাঃ ১৫০২)
ব্যাখ্যাকার বলেনঃ মানুষকে দাগ দেয়া হারাম।
পক্ষান্তরে মানুষ ব্যতীত অন্য প্রাণীর ক্ষেত্রে চেহারায় দাগ দেয়া নিষেধ। আর যাকাত ও জিয্ইয়ার উটের ক্ষেত্রে চেহারা ব্যতীত দাগ দেয়া মুস্তাহাব। আর অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রে জায়িয।
যদি দাগ দিতে হয় তাহলে বকরীর কানে দাগ দেয়া মুস্তাহাব। আর উট ও গরুর উরুর মূলে, কেননা সেটি শক্ত জায়গা। তাই সেখানে কষ্ট কম হবে এবং চুল হালকা থাকে। আর দাগ প্রকাশ পাবে।
* দাগ দেয়ার উপকারিতা : কতিপয় প্রাণীকে কতিপয় প্রাণী থেকে পার্থক্য করা।
আর জিয্ইয়ার প্রাণীর ক্ষেত্রে جِزْيَةٌ (জিয্ইয়াহ্) অথবা صَغَارٌ (অপমান) লেখা মুস্তাহাব। আর যাকাতের প্রাণীর ক্ষেত্রে زَكَاةٌ (যাকাত) অথবা صَدَقَةٌ (সাদাকা) লেখা মুস্তাহাব।
ইমাম শাফি‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ) ও তার অনুসারীরা বলেনঃ বকরীর দাগ দেয়ার যন্ত্রটি গরুর দাগ দেয়ার যন্ত্রটির চেয়ে হালকা হওয়া মুস্তাহাব। আর গরুর দাগ দেয়ার যন্ত্রটি উটের দাগ দেয়ার যন্ত্রটির চেয়ে হালকা হওয়া মুস্তাহাব। (শারহুন নাবাবী ১৪ খন্ড, হাঃ ২১১৯)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৪০৮০-[১৭] হিশাম ইবনু যায়দ (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি আনাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গেলাম, তখন তিনি পশুর আস্তাবলে ছিলেন। আমি তাঁকে দেখলাম, তিনি ছাগল-বকরীগুলোকে দাগ দিচ্ছেন। (হিশাম বলেন,) আমার ধারণা, আনাস বলেছেনঃ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ পশুগুলোর কানের মধ্যেই দাগ দিয়েছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
الْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ هِشَامِ بْنِ زَيْدٍ عَنْ أَنَسٍ قَالَ: دَخَلْتُ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ فِي مِرْبَدٍ فَرَأَيْتُهُ يَسِمُ شَاءَ حسبته قَالَ: فِي آذانها
ব্যাখ্যাঃ হাদীসে উল্লেখিত শব্দ (مِرْبَدٍ) সম্পর্কে ইবনু মালিক বলেনঃ এর অর্থ হলো এমন স্থান যেখানে উট, গরু, ছাগল ইত্যাদি আটকে রাখা হয়। ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ (مِرْبَدٍ) হলো এমন স্থান যেখানে উট আটকে রাখা হয়। আর তা মেষপালের খোয়াড়ের মতো। অন্যদিকে (شَاءَ) শব্দটি বকরি, খাশি তথা মাদী ছাগল ও নর ছাগল উভয়কেই বুঝায়। তাই হাদীসে উল্লেখিত শব্দ (شَاءَ) দ্বারা বকরী বা খাশি যে কোনটিই উদ্দেশ্য হতে পারে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
হাদীসে (في اذانها) শব্দ দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চেহারায় দাগ দেননি। বরং কানে দাগ দিয়েছেন। আর এর থেকে এটাও বুঝা যায় যে, কান চেহারার অন্তর্ভুক্ত নয়।
এ হাদীসকেই জামহূর ‘উলামা দলীল হিসেবে গ্রহণ করে বলেছেন যে, চতুষ্পদ জন্তুকে দাগ দেয়া বৈধ। কিন্তু আহনাফগণ এ ব্যাপারে মতানৈক্য করেছেন আগুন দিয়ে শাস্তি দেয়া হতে নিষেধ করার হাদীসকে কেন্দ্র করে। তারা বলেন, এ হাদীসটির হুকুম ব্যাপক। অর্থাৎ কোন প্রাণীকেই আগুন দিয়ে শাস্তি বা কষ্ট দেয়া বৈধ না। অতএব পশুকে দাগ দেয়া যাবে না। আবার তাদের কেউ কেউ দাবী করেছেন যে, আগুন দিয়ে পশুকে দাগ দেয়ার হাদীস মানসুখ হয়েছে। কিন্তু জামহূরগণ চতুষ্পদ জন্তুকে দাগ দেয়া বৈধ বলেছেন এ হাদীসকে খাস হিসেবে ধরে নিয়ে। অর্থাৎ কোন কিছুই আগুন দিয়ে শাস্তি দেয়া বা কষ্ট দেয়া বৈধ না। তবে প্রয়োজনে চতুষ্পদ জন্তুকে লোহা বা এ জাতীয় কিছু দ্বারা দাগ দেয়া বৈধ। والله أعلم (আল্লাহই ভালো জানেন)। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫৫৪২)
এ দাগ দেয়া প্রসঙ্গে আরেকটি হাদীস গত হয়েছে। তাতে রয়েছে, মানুষকে দাগ দেয়া হারাম। আর মানুষ ছাড়া অন্যান্য প্রাণীকে দাগ দেয়া বৈধ। তবে চেহারায় দাগ দেয়া বৈধ নয়। আর যাকাত এবং ট্যাক্সের পশুতে মুখে ছাড়া অন্য জায়গায় দাগ দেয়া মুস্তাহাব। যদি দাগ দেয়ার প্রয়োজনই হয় তাহলে মেষপাল বা এ জাতীয় প্রাণীর কানে দাগ দেয়া মুস্তাহাব। পক্ষান্তরে প্রয়োজনে উট, গরু এগুলোর রানের মাঝে দাগ দেয়া মুস্তাহাব। কারণ এটা শক্ত জায়গা। তাতে ব্যথা কম হয়। লোম কম থাকে এবং তাতে দাগও ভালোভাবে দেখা যায়। এসব পশুকে দাগ দেয়ার উপকারিতা হলো একটি পশুকে আরেকটি পশু থেকে যাতে পার্থক্য করা যায়। আর মুস্তাহাব হলো ট্যাক্সের পশুর সাথে ট্যাক্স আর যাকাতের পশুর সাথে যাকাত বা সাদাকা লেখা।
ইমাম শাফি‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ) ও তার অনুসারীগণ বলেনঃ মুস্তাহাব হলো যেন মেষপালের দাগ দেয়ার যন্ত্রটি গরুকে দাগ দেয়ার যন্ত্রের থেকে হালকা হয়। আর গরুটি যেন উটের থেকে হালকা হয়। ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ যাকাত ও ট্যাক্সের পশুকে দাগ দেয়া মুস্তাহাব। এটা আমাদের মত এবং সকল সাহাবী ও জামহূর ‘আলিমদের মত। ইবনু সাববাগ ও অন্যান্যরা এ বিষয়টিকে সাহাবীদের ইজমা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। (শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ১১১)
খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসই দলীল যে, কান চেহারার অন্তর্ভুক্ত না। কেননা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য হাদীসে চেহারায় দাগ দিতে ও তাতে প্রহার করতে নিষেধ করেছেন। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫৬০)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪০৮১-[১৮] ’আদী ইবনু হাতিম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রসূল! যদি আমাদের কেউ শিকার করে খাওয়ার মতো কোন পশু পেয়ে যায় আর তার সঙ্গে ছুরি না থাকে, তখন সে হালকা ধরনের পাথর কিংবা ধারালো কোন কাঠ দ্বারা তাকে যাবাহ করতে পারবে কি? তিনি বললেন, ইচ্ছামত যে কোন জিনিস দ্বারাই রক্ত প্রবাহিত করে দাও এবং আল্লাহর নাম উচ্চারণ করো। (আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
عَنْ عَدِيِّ بْنِ حَاتِمٍ قَالَ: قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَرَأَيْتَ أَحَدُنَا أَصَابَ صَيْدًا وَلَيْسَ مَعَهُ سِكِّينٌ أَيَذْبَحُ بِالْمَرْوَةِ وَشِقَّةِ الْعَصَا؟ فَقَالَ: «أَمْرِرِ الدَّمَ بِمَ شِئْتَ وَاذْكُرِ اسْمَ اللَّهِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যাঃ মিরক্বাতুল মাফাতীহ প্রণেতা উল্লেখ করেছেন যে, হাদীসে উল্লেখিত শব্দ (الْمَرْوَةِ) হলো, একেবারে পাতলা সাদা পাথর। যাকে ছুরির মতো বানানো যায় এবং তা দিয়ে যাবাহ করা যায়। (الدَّمَ) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো প্রবহমান রক্ত। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
মুল্লা ‘আলী কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ (الْمَرْوَةِ) হলো সাদা পাথর। আর (شِقَّةِ الْعَصَا) দ্বারা বুঝানো হয়েছে এমন জিনিসকে যা শক্ত এবং ধারালো হয়। অতএব পশুর শরীরে আঘাত করে রক্ত বের করা যায় এমন কোন জিনিস দিয়ে রক্ত বের করলে এবং আল্লাহর নাম নিলেই যথেষ্ট হবে। তখন তা খেতে কোন সমস্যা নেই। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৮২১)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪০৮২-[১৯] আবুল ’উশারা তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রসূল! গলা গ্রীবা ব্যতীত অন্য কোন স্থানে কি যাবাহ করা যায় না? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ যদি তুমি তার উরুর মধ্যেও ক্ষত করে দাও তাও তোমার জন্য যথেষ্ট হবে। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ ও দারিমী)[1]
তবে ইমাম আবূ দাঊদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ এটা ঐ জানোয়ারের ব্যাপারে বলা হয়েছে, যা কোন খাদে পড়ে গিয়েছে। আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ এটা অস্বাভাবিক অবস্থায় জরুরী ভিত্তিতে যাবাহ করার বিধান।
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَن أبي العُشَراءِ عَنْ أَبِيهِ أَنَّهُ قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَمَا تَكُونُ الذَّكَاةُ إِلَّا فِي الْحَلْقِ وَاللَّبَّةِ؟ فَقَالَ: «لَوْ طَعَنْتَ فِي فَخِذِهَا لَأَجْزَأَ عَنْكَ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ وَالدَّارِمِيُّ وَقَالَ أَبُو دَاوُدَ: وَهَذِهِ ذَكَاةُ الْمُتَرَدِّي وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ: هَذَا فِي الضَّرُورَة
এ হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ হলো হাদীসটির ‘‘আবুল ‘উশারা’’ একজন অপরিচিত ব্যক্তি। ইমাম তিরমিযী বলেন, আমি আবুল ‘উশারাকে তার পিতার থেকে সহীহ হাদীসটি ব্যতীত অন্য কোন হাদীস বর্ণনা করেছেন মর্মে অবগত নই। তিনি আরো বলেন, আবুল ‘উশারা-এর আসল নাম কি- এ ব্যাপারে মুহাদ্দিসগণ মতভেদ করেছেন। কেউ বলেন তার নাম উসামাহ্ ইবনু ক্বিহত্বিম বলা হয়, তার নাম উত্বারিদ। তাকে তার দাদার দিকে নিসবাত (সম্পর্কিত) হয়েছে। (তিরমিযী ১৪৮১ নং হাঃ দ্রঃ)
ব্যাখ্যাঃ উক্ত হাদীসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসাকারীর উত্তরে বলেছেনঃ যদি তুমি পশুর রানে আঘাত কর সেটিই তোমার জন্য যাবাহ হিসেবে যথেষ্ট হয়ে যাবে।
এ কথার প্রতিপাদ্য বিষয় হলো মারাত্মক প্রয়োজনের সময় শরীরের যে কোন জায়গায় জখম করলেই তা যাবাহ করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায় কণ্ঠনালীর মাঝে যাবাহ করতে হবে। আর স্বভাবিকভাবে যাবাহ করার ক্ষেত্রে গলার রগগুলো কাটতে হবে। কারণ সেটিই হলো জান বের হওয়ার স্থান। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
তুহফাতুল আহ্ওয়াযীতে বলা হয়েছে, হাদীস বিশারদগণ বলেনঃ বিশেষ প্রয়োজনে যখম করার দ্বারাই যাবাহ করা যথেষ্ট হয়ে যাবে। যেমন কোন পশু কূপে বা গর্তে পড়ে গেলে তাকে জখম করলেই যাবাহ করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট হয়ে যাবে।
ইমাম আবূ দাঊদ (রহিমাহুল্লাহ) হাদীসটি বর্ণনা করার পর বলেন, জখম করাটা যাবাহ করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট হবে শুধুমাত্র কূপে বা গর্তে পড়া পশু অথবা পলায়নকারী পশু বা বন্য পশুর ব্যাপারে, অন্য ক্ষেত্রে তা সঠিক হবে না। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৪৮১)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪০৮৩-[২০] ’আদী ইবনু হাতিম (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে কুকুর অথবা বাজপাখি-কে শিকার ধরার জন্য তুমি শিক্ষা দিয়েছ, অতঃপর তাকে ’বিসমিল্লাহ’ বলে ছেড়ে দিয়েছ, যদি সে শিকারটিকে তোমার জন্য ধরে রাখে, তবে তুমি তা খেতে পার। (রাবী বলেন,) আমি জিজ্ঞেস করলাম, যদি সে শিকারটিকে মেরে ফেলে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ যখন সে শিকারটিকে মেরে ফেলেছে এবং তার কিছুই খায়নি (তখন তা খাওয়া যায়)। কেননা সে তা তোমার জন্যই শিকার করেছে। (আবূ দাঊদ)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَن عدي بن حَاتِم أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَا عَلَّمْتَ مِنْ كَلْبٍ أَوْ بَازٍ ثُمَّ أَرْسَلْتَهُ وَذَكَرْتَ اسْمَ اللَّهِ فَكُلْ مِمَّا أَمْسَكَ عَلَيْكَ» . قُلْتُ: وَإِنْ قَتَلَ؟ قَالَ: «إِذَا قَتَلَهُ وَلَمْ يَأْكُلْ مِنْهُ شَيْئًا فَإِنَّمَا أَمْسَكَهُ عَلَيْكَ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ মুল্লা ‘আলী কারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হাদীসে শুধুমাত্র দু’টি প্রাণীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে উপমা হিসেবে অথবা অধিকাংশের বিবেচনায়। কেননা অধিকাংশ সময় সাধারণত এ দুই ধরনের প্রাণী দিয়েই শিকার করা হয়ে থাকে।
ইমাম আবূ দাঊদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ বাজ পাখি শিকার করে যদি সেই শিকারকৃত প্রাণী হতে কিছু খেয়ে ফেলে তাতে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু যদি কুকুর শিকারকৃত প্রাণী হতে কিছু খেয়ে ফেলে তাহলে সেই শিকারকৃত প্রাণী খাওয়া মাকরূহ। তবে যদি কুকুর শিকার করে রক্ত পান করে তাহলে তা খেতে কোন সমস্যা নেই। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৮৪৮)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪০৮৪-[২১] উক্ত রাবী (’আদী ইবনু হাতিম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললামঃ হে আল্লাহর রসূল! আমি কোন শিকারের প্রতি তীর ছুঁড়ি এবং পরের দিন আমার তীরসহ শিকারটিকে পাই। (এমতাবস্থায় তার হুকুম কি?) তিনি বললেন, যদি তোমার এ দৃঢ় বিশ্বাস হয় যে, তোমার তীরই তাকে মেরেছে এবং অন্য কোন হিংস্র জানোয়ারের দ্বারা আঘাতের চিহ্ন তাতে না দেখো, তখন তুমি তা খেতে পারো। (আবূ দাঊদ)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَنْهُ قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَرْمِي الصَّيْدَ فَأَجِدُ فِيهِ مِنَ الْغَدِ سَهْمِي قَالَ: «إِذَا عَلِمْتَ أَنَّ سَهْمَكَ قَتَلَهُ وَلَمْ تَرَ فِيهِ أَثَرَ سَبُعٍ فَكُلْ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যাঃ ইবনুল মালিক এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেনঃ যদি তুমি ঐ প্রাণীর মাঝে কোন হিংস্র প্রাণীর আক্রমণের চিহ্ন দেখতে পাও তাহলে সেটি খাবে না। কেননা তখন সেই প্রাণীকে হত্যা করার নিশ্চিত কারণ জানা যায় না। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৪৬৮; মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
অত্র হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম আবূ দাঊদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আবূ সা‘লাবাহ্ আল খুশানী থেকে আরো একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাতে রয়েছে, আবূ সা‘লাবাহ্ বললেনঃ হে আল্লাহর রসূল! আমাকে আমার তীর ও ধনুক সম্পর্কে বলুন? (অর্থাৎ তীর ও ধনুক দিয়ে আমি যা শিকার করি তা খেতে পারব কিনা?) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমার ধনুক তোমার জন্য যা শিকার করে তা তুমি খেয়ে নাও। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরো বললেনঃ তা যাবাহ করা হোক না হোক। সা‘লাবাহ্ বললেন, তীর লাগার পর সেই প্রাণী যদি আমার থেকে আড়াল হয়ে যায় (তাহলেও কি খেতে পারব)? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার থেকে আড়াল হয়ে গেলেও তুমি তা খেতে পার। যতক্ষণ না সেই শিকারকৃত প্রাণী থেকে দুর্গন্ধ বের হয়। আর যতক্ষণ না তোমার তীর ব্যতীত অন্য কোন কিছুর আঘাত তাতে না পাওয়া যায়।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪০৮৫-[২২] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাদেরকে মাজূসীর কুকুরের শিকারকৃত জানোয়ার খেতে নিষেধ করা হয়েছে। (তিরমিযী)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَن جابرٍ قَالَ: نُهِينَا عَنْ صَيْدِ كَلْبِ الْمَجُوسِ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ হরো, এর সনদে ‘‘হাজ্জাজ ইবনু আরত্বাত’’ নামে একজন মুদাল্লিস বর্ণনাকারী আছে, যে عَن (‘আন) দ্বারা হাদীস বর্ণনা করেছে।
ব্যাখ্যাঃ এ হাদীসের মাঝে দলীল রয়েছে, কোন কাফির যদি কোন প্রাণী যাবাহ করে তাহলে তার যাবাহকৃত প্রাণী খাওয়া বৈধ না। অনুরূপভাবে যদি সে কোন প্রাণী পাঠিয়ে পশু শিকার করে তাহলেও তা খাওয়া বৈধ না।
শারহুস্ সুন্নাহয় আছে, যদি কোন মুসলিম অগ্নিপূজকের কুকুর নিয়ে শিকার করে তাহলে সেই শিকারকৃত প্রাণী খাওয়া বৈধ। কিন্তু যদি কোন অগ্নিপূজক মুসলিম ব্যক্তির কুকুর নিয়ে শিকার করে তাহলে সেই শিকারকৃত প্রাণী খাওয়া বৈধ হবে না। তবে যদি মুসলিম ব্যক্তি তা জীবিত অবস্থায় পায় তারপর তা যাবাহ করে তাহলে তা খাওয়া বৈধ। আর যদি কোন মুসলিম এবং অগ্নিপূজক উভয়ে অংশীদার হয়ে একটি কুকুর পাঠায় অথবা তীর নিক্ষেপ করে এবং সেই কুকুর বা তীর কোন প্রাণী শিকার করে এবং তাকে হত্যা করে ফেলে তাহলে তা খাওয়া হারাম।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ যাবাহকারীর জন্য শর্ত হলো তাকে মুসলিম হতে হবে অথবা কিতাবী হতে হবে। যাবাহকৃত প্রাণীর গোশত ছাড়া অন্য যে কোন হালাল খাবার যে কোন কাফির থেকে খাওয়া যাবে। আর কিতাবধারীর যাবাহকৃত প্রাণী খাওয়ার জন্য শর্ত হলো তাকে অবশ্যই আল্লাহর নামে যাবাহ করতে হবে। এমনকি যদি তারা আল্লাহর নাম না নিয়ে মাসিহ (আ.) অথবা ‘উযায়র (আ.)-এর নামে যাবাহ করে তাও বৈধ হবে না।
আর কাফির বলতে বুঝানো হয়েছে যাদেরকে কোন কিতাব দেয়া হয়নি। যেমন- অগ্নিপূজক, মূর্তিপূজক ইত্যাদি। কারণ তাদের কোন তাওহীদ নেই। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৪৬৬)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪০৮৬-[২৩] আবূ সা’লাবাহ্ আল খুশানী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললামঃ হে আল্লাহর রসূল! আমরা ভ্রাম্যমাণ লোক। প্রায়শ ইয়াহূদী, নাসারা এবং মাজূসীদের অগ্নি জনপদ দিয়ে যেতে হয়, তখন আমরা তাদের বাসন-কোষণ ব্যতীত অন্য কিছু পাই না। তিনি বললেন, যদি তোমরা তাদের পাত্র ব্যতীত অন্য কোন পাত্র না পাও, তখন তা খুব উত্তমরূপে পানি দ্বারা ধৌত করে নাও। অতঃপর তাতে খাও এবং পান করো। (তিরমিযী)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَن أبي ثَعْلَبَة الْخُشَنِي قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّا أَهْلُ سفر تمر الْيَهُود وَالنَّصَارَى وَالْمَجُوسِ فَلَا نَجِدُ غَيْرَ آنِيَتِهِمْ قَالَ: «فَإِنْ لَمْ تَجِدُوا غَيْرَهَا فَاغْسِلُوهَا بِالْمَاءِ ثُمَّ كلوا فِيهَا وَاشْرَبُوا» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বারমাবী বলেনঃ উল্লেখিত হাদীস থেকে বাহ্যিকভাবে বুঝা যায়, পাত্র ধৌত করার পরেও ব্যবহার করা যাবে না যদি তাদের পাত্র ছাড়া অন্য পাত্র পাওয়া যায়। আর ফকীহগণ বলেনঃ তাদের পাত্র ধৌত করার পর কোন ধরনের অপছন্দ ছাড়াই তা ব্যবহার করা জায়িয, চাই অন্য পাত্র পাওয়া যাক বা না পাওয়া যাক। সুতরাং তাদের মতে হাদীসে যে সব পাত্র ব্যবহার করার ব্যাপারে অপছন্দনীয়তা এসেছে তা হলো ঐসব পাত্র যেগুলোতে তারা শুকরের গোশত পাকায় এবং মদ পান করে। আর সেগুলো ধৌত করার আগে ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ স্বভাবতই তাতে ময়লা বা অপবিত্রতা লেগে থাকে।
আর ফকীহদের উদ্দেশ্য হলো তাদের সেসব পাত্র যেগুলো সাধারণত তারা অপবিত্রতার ক্ষেত্রে ব্যবহার করে না।
ইমাম নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ইমাম বুখারী ও মুসলিম কোন ধরনের পরিস্থিতি বা শর্ত উল্লেখ করা ছাড়াই এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। কিন্তু ইমাম আবূ দাঊদ একটি পরিস্থিতি উল্লেখ করে শর্তসাপেক্ষে বর্ণনা করেছেন। আর তা হলো সাহাবী রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললেন, আমরা আহলে কিতাবীদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করি আর তারা তো তাদের পাত্রে শুকর পাকায়, মদ পান করে (তাহলে কি আমরা তা ব্যবহার করতে পারি)? তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি তাদের পাত্র ভিন্ন অন্য পাত্র পাও তাহলে তাদের পাত্রে খেয়ো না। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৪৬৪)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪০৮৭-[২৪] কবীসাহ্ ইবনু হুল্ব তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নাসারাদের খাদ্যদ্রব্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। অপর এক রিওয়ায়াত আছে, জনৈক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করল, এমন কিছু খাদ্য আছে যাতে আমি সংকোচবোধ করি। উত্তরে তিনি বললেন, খাদ্যের ব্যাপারে তোমার অন্তরে কোন প্রকারের দ্বিধা-সংকোচ থাকা উচিত নয়, অন্যথায় তুমি এতে নাসারাদের সদৃশ হয়ে যাবে। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَنْ قَبِيصَةَ بْنِ هُلْبٍ عَنْ أَبِيهِ قَالَ: سَأَلْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ طَعَامِ النَّصَارَى وَفِي رِوَايَةٍ: سَأَلَهُ رَجُلٌ فَقَالَ: إِنَّ مِنَ الطَّعَامِ طَعَامًا أَتَحَرَّجُ مِنْهُ فَقَالَ: «لَا يَتَخَلَّجَنَّ فِي صَدْرِكَ شَيْءٌ ضَارَعْتَ فِيهِ النَّصْرَانِيَّة» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ এ হাদীসে (لَا يَتَخَلَّجَنَّ فِي صَدْرِكَ شَيْءٌ) এ বাক্যটির ব্যাপারে তূরিবিশতী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ যেসব খাবারের ব্যাপারে আল্লাহ নিষেধ করেননি সেগুলোর ব্যাপারে তোমার অন্তরে যেন কোন সংশয় সৃষ্টি না হয়। কেননা যেগুলোর ব্যাপারে নিষেধ করা হয়নি সেগুলো হালাল।
(ضَارَعْتَ فِيهِ النَّصْرَانِيَّة) অর্থাৎ খাবারের ব্যাপারে সন্দেহ করার কারণে খৃষ্ট ধর্মের অনুসারীদের সাথে সাদৃশ্য রাখা হবে। কেননা তাদের কারো অন্তরে যদি কোন খাবারের ব্যাপারে সংশয় সৃষ্টি হত তাহলে তারা এটা হারাম অথবা মাকরূহ ইত্যাদি বলে হুকুম লাগাতো। এজন্যই এ হাদীসে খাবারের ব্যাপারে সন্দেহ করতে নিষেধ করা হয়েছে।
খাবারের ব্যাপারে সন্দেহ সৃষ্টি হওয়ার বিষয়টি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে যিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি হলেন, ‘আদী ইবনু হাতিম। তিনি ইসলাম গ্রহণের আগে খৃষ্ট ধর্মের অনুসারী ছিলেন। আর এজন্যই তার অন্তরে এ ধরনের সংশয় সৃষ্টি হত।
ইমাম ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ তোমার অন্তরে যেন খাবারের ব্যাপারে কোন সংকীর্ণতা এবং সংশয় প্রবেশ করতে না পারে। কারণ তুমি একনিষ্ঠ সঠিক দীনের উপর রয়েছ। সুতরাং তুমি যদি খাবারের ব্যাপারে নিজেকে কাঠিন্যতায় ফেলে দাও তাহলে তুমি এ ক্ষেত্রে খ্রিষ্টানদের পাদ্রীর সাথে সাদৃশ্য রাখলে। কেননা এটাই তাদের চরিত্র ও অভ্যাস। যে বিষয়টি পবিত্র কুরআন খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছে। যেমন : وَرَهْبَانِيَّةً ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَاهَا عَلَيْهِمْ ‘‘আর বৈরাগ্যবাদ- তা তারা নিজেরাই নতুনভাবে চালু করেছে যে বিষয়ে আমরা তাদেরকে আদেশ করিনি’’- (সূরাহ্ আল হাদীদ ৫৭ : ২৭)। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৫৬৫)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪০৮৮-[২৫] আবুদ্ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুজাসসামাহ্ খেতে নিষেধ করেছেন। আর তা হলো, পশু বা পাখিকে বেঁধে রেখে দূর হতে তীর নিক্ষেপ করে হত্যা করা। (তিরমিযী)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ قَالَ: نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ أَكْلِ الْمُجَثَّمَةِ وهيَ الَّتِي تُصْبَرُ بالنَّبلِ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ হাদীসে উল্লেখিত শব্দ (الْمُجَثَّمَةِ) ‘মুজাসসামাহ্’ সম্পর্কে নিহায়াহ্ গ্রন্থে বলা হয়েছে, (الْمُجَثَّمَةِ) হলো এমন প্রাণী যাকে আটকিয়ে রেখে তীর মেরে হত্যা করা হয়। আর এটা পাখি, খরগোশ এ জাতীয় প্রাণীর ক্ষেত্রেই বেশিরভাগ হয়ে থাকে।
(وهيَ الَّتِي تُصْبَرُ بالنَّبلِ) এ বাক্যটি মূলত ব্যবহার করা হয়েছে (الْمُجَثَّمَةِ) শব্দের ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য। আর এ ব্যাখ্যা দিয়েছেন হাদীসের একজন রাবী। বাক্যটি দ্বারা তিনি বুঝিয়েছেন। (الْمُجَثَّمَةُ) হলো যাকে আটকিয়ে রেখে তীর মেরে হত্যা করা হয়। আর সেই প্রাণী মৃত্যুবরণ না করা পর্যন্ত সেভাবেই রেখে দেয়া হয়। এ ধরনের কাজ থেকেই হাদীসে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা এভাবে হত্যা করাটা শারী‘আহ্গতভাবে কোন যাবাহ হয় না। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৪৭৩)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪০৮৯-[২৬] ’ইরবায ইবনু সারিয়াহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বারের দিন সর্বপ্রকার তীক্ষ্ণ দন্তধারী হিংস্র জন্তু, নখ ও থাবা দ্বারা শিকারী পাখি, গৃহপালিত গাধার মাংস এবং মুজাস্সামাহ্ ও খলীসাহ্ খেতে নিষেধ করেছেন। আর তিনি গর্ভবতী (দাসী)-এর সাথে তার গর্ভ খালাস হওয়া পর্যন্ত সঙ্গম করতেও নিষেধ করেছেন। মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াহ্ইয়া বলেন : আবূ ’আসিমকে জিজ্ঞেস করা হলো, ’মুজাস্সামাহ্’ কি? তিনি বললেন, পাখি অথবা অন্য কোন প্রাণীকে বেঁধে তার প্রতি তীর নিক্ষেপ করা। আর খলীসাহ্ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, বাঘ অথবা হিংস্র পশু হতে যে ধৃত জন্তু কোন ব্যক্তি ছিনিয়ে নেয়; কিন্তু যাবাহ করার পূর্বেই তা তার হাতের মধ্যে মারা যায়। (তিরমিযী)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَنِ الْعِرْبَاضِ بْنِ سَارِيَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى يَوْمَ خَيْبَرَ عَنْ كُلِّ ذِي نَابٍ مِنَ السِّبَاعِ وَعَنْ كُلِّ ذِي مِخْلَبٍ مِنَ الطَّيْرِ وَعَنْ لُحُومِ الْحُمُرِ الْأَهْلِيَّةِ وَعَنِ الْمُجَثَّمَةِ وَعَنِ الْخَلِيسَةِ وَأَنْ تُوطَأَ الْحَبَالَى حَتَّى يَضَعْنَ مَا فِي بُطُونِهِنَّ قَالَ مُحَمَّدُ بْنُ يَحْيَى: سُئِلَ أَبُو عَاصِمٍ عَنِ الْمُجَثَّمَةِ فَقَالَ: أَنْ يُنْصَبَ الطَّيْرُ أَوِ الشَّيْءُ فَيُرْمَى وَسُئِلَ عَنِ الْخَلِيسَةِ فَقَالَ: الذِّئْبُ أَوِ السَّبُعُ يُدْرِكُهُ الرَّجُلُ فَيَأْخُذُ مِنْهُ فَيَمُوتُ فِي يَدِهِ قَبْلَ أَنْ يذكيها. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যাঃ হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে (نَهٰى يَوْمَ خَيْبَرَ) অর্থাৎ খায়বারের দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন। খায়বারের দিন বলতে তিনটি উদ্দেশ্য হতে পারে,
১. যে বছর খায়বার বিজয় হয়েছে সেই বছর। ২. খায়বার বিজয় হওয়ার সময়। ৩. খায়বার যুদ্ধ চলাকালীন কোন একদিন।
(عَنْ كُلِّ ذِي نَابٍ مِنَ السِّبَاعِ) বলে চতুষ্পদ হিংস্র প্রাণী খাওয়া হতে নিষেধ করা হয়েছে। সেগুলো হলো যেমন, সিংহ, বাঘ, চিতাবাঘ, ভল্লুক, বানর, শুকর ইত্যাদি।
শারহুস্ সুন্নাহ গ্রন্থে বলা হয়েছে (ذِي نَابٍ) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যেসব প্রাণীকে দাঁতওয়ালা হিসেবে গণ্য করা হয় এবং যেগুলো মানুষ ও তাদের ধন-সম্পদের উপর দাঁত দিয়ে আক্রমণ করতে পারে, যেমন- নেকড়ে বাঘ, কুকুর ইত্যাদি। আর (ذِي مِخْلَبٍ) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যেসব প্রাণী নখ দিয়ে কেটে ছিড়ে খায়। যেমন- ঈগল, বাজপাখি, শুকর ইত্যাদি।
(الْخَلِيسَةِ) হলো হিংস্র প্রাণীর মুখ থেকে কেড়ে নেয়া শিকার। যেটা যাবাহ করার আগেই মারা যায়।
(أَنْ تُوطَأَ الْحَبَالَى حَتّٰى يَضَعْنَ مَا فِي بُطُونِهِنَّ) এ অংশের মাধ্যমে গর্ভবর্তী মহিলা গর্ভপাত না করা পর্যন্ত তার সাথে সহবাস করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। এর দ্বারা আপন স্ত্রী উদ্দেশ্য নয় বরং এর উদ্দেশ্য ভিন্ন। আর তা হলো যেমন কেউ গর্ভবতী দাসী পেল তাহলে সেই দাসী গর্ভপাত না করা পর্যন্ত তার সাথে সেই ব্যক্তি সহবাস করতে পারবে না। অনুরূপভাবে যদি কোন মহিলা যিনা করার কারণে গর্ভধারণ করে আর সেই গর্ভাবস্থায় যদি কোন ব্যক্তি তাকে বিবাহ করে তাহলে গর্ভপাত না হওয়া পর্যন্ত তার সাথে সহবাস করতে পারবে না।
আহনাফের কতিপয় ‘আলিম বলেনঃ যদি কোন ব্যক্তি যুদ্ধে বন্দি হিসেবে গর্ভবতী দাসী পায় তাহলে তার জন্য সেই দাসীর সাথে সহবাস করা বৈধ হবে না। যতক্ষণ না সেই দাসী গর্ভপাত করে। আর যদি গর্ভবতী না হয় তাহলে সেই দাসীর হায়য হওয়ার পর যখন রক্ত বন্ধ হবে তখন থেকে তার সাথে সহবাস করতে পারবে। তিবি বলেন, (الْخَلِيسَةُ) হলো যে প্রাণীকে নেকড়ে অথবা কোন হিংস্র প্রাণীর মুখ থেকে নেয়া হয়েছে এবং তাকে যাবাহ করার আগেই মারা গেছে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৪৭৪)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪০৯০-[২৭] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস ও আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শারীতবাতে শয়তান হতে নিষেধ করেছেন। (বর্ণনাকারী) ইবনু ’ঈসা অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন যে, (তার অর্থ হলো,) কোন প্রাণীকে এমনভাবে যাবাহ করা যে, তার শুধু চামড়া কাটা হয়, কিন্তু তার রগ বা শিরা না কেটে এমনিই ফেলে রাখা হয়, অবশেষে এ অবস্থায় তা মরে যায়। (আবূ দাঊদ)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ وَأَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ شَرِيطَةِ الشَّيْطَانِ. زَادَ ابْنُ عِيسَى: هِيَ الذَّبِيحَةُ يُقْطَعُ مِنْهَا الْجِلْدُ وَلَا تُفْرَى الْأَوْدَاجُ ثُمَّ تُتْرَكُ حَتَّى تَمُوتَ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ হলো এর সনদে ‘‘আমর ইবনু ‘আবদুল্লাহ’’ নামে একজন বর্ণনাকারী আছেন। যিনি হাদীস বর্ণনায় য‘ঈফ। ইমাম যাহাবী তাকে য‘ঈফ বলেছেন। দেখুন- য‘ঈফ আবূ দাঊদ ৪৯১।
ব্যাখ্যাঃ হাদীসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (شَرِيطَةِ الشَّيْطَانِ) থেকে নিষেধ করেছেন। নিহায়াহ্ গ্রন্থাকার (شَرِيطَةِ الشَّيْطَانِ) সম্পর্কে চমৎকার আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, (شَرِيطَةِ الشَّيْطَانِ) হলো, এমন পদ্ধতিতে যাবাহকৃত পশু যার রগ কাটা হয় না এবং ভালোভাবে যাবাহও করা হয় না। আর জাহিলী যুগের লোকেরা পশুর গলার কিছু অংশ কাটত এবং সেই প্রাণী না মারা যাওয়া পর্যন্ত এভাবেই রেখে দিত।
মিরক্বাতুল মাফাতীহ গ্রন্থকার বলেনঃ জাহিলী যুগের লোকেরা চতুষ্পদ জন্তুর গলার কিছু অংশ কাটত এবং তারা এটাকেই যাবাহ মনে করত।
এ ধরনের কাজকে (شَرِيطَةِ الشَّيْطَانِ) বলে শয়তানের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে এজন্য যে, এ ধরনের খারাপ কাজে শয়তানই তাদেরকে উৎসাহিত করেছিল।
(الْأَوْدَاجُ) হলো গলার রগসমূহ যেগুলো যাবাহ করার সময় কাটা হয়। অতএব, বিষয়টি হলো জাহিলী যুগের লোকেরা পশুর চামড়া কাটতো। কিন্তু রগ কাটতো না এ অবস্থায় সেই পশুর সব রক্ত বের হয়ে যেত। আর এ পদ্ধতিকেই তারা পশু যাবাহ করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট মনে করত। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৮২৩)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪০৯১-[২৮] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মায়ের যাবাহ পেটের ভিতরের বাচ্চারও যাবাহ। (আবূ দাঊদ, দারিমী)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَنْ جَابِرٌ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «ذَكَاةُ الْجَنِينِ ذَكَاةُ أُمِّهِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد والدارمي
ব্যাখ্যাঃ উক্ত হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, (ذَكَاةُ الْجَنِينِ ذَكَاةُ أُمِّه) অর্থাৎ ভ্রূণকে যাবাহ করা হলে, তার মাকে যাবাহ করা। তালখিস গ্রন্থে বলা হয়েছে, যে যাবাহ দ্বারা মা হালাল হয়ে যাবে সেই যাবাহ দ্বারাই তার ভ্রূণও হালাল হয়ে যাবে ভ্রূণ তার মায়ের অনুসারী হওয়ার কারণে। কেননা ভ্রূণ তার মায়ের একটি অংশ। সুতরাং তার মাকে যাবাহ করার দ্বারা তার পুরা অঙ্কন যাবাহ হয়ে যাবে।
ইবনুল মুনযির (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ কোন সাহাবী অথবা কোন ‘আলিম এটা বলেননি যে, যাবাহ করা ছাড়া ভ্রূণ খাওয়া যাবে। তবে ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আলাদাভাবে যাবাহ করার ছাড়া ভ্রূণ খাওয়া যাবে না।
মুনযিরী (রহিমাহুল্লাহ) উল্লেখ করেছেন যে, কিছু আহনাফের মতে, মাকে যাবাহ করাটা তার ভ্রুণের জন্য যথেষ্ট নয়। বরং ভ্রূণ বের হওয়ার পর তাকে নতুন করে আলাদাভাবে যাবাহ করতে হবে। তবে এ হাদীসের তাফসীরে ইমামদের থেকে যে উক্তিটি সংরক্ষিত তা হলো ভ্রূণ যাবাহ হয়ে যাবে তার মাকে যাবাহ করা দ্বারাই। অর্থাৎ আলাদাভাবে ভ্রূণকে আবার যাবাহ করার প্রয়োজন নেই।
ইবনুল মুনযির (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ কোন সাহাবী, কোন তাবি‘ঈ অথবা কোন ‘আলিম থেকে এ মত বর্ণিত হয়নি যে, ভ্রূণ নতুন করে আলাদাভাবে যাবাহ করা ছাড়া খাওয়া যাবে না। তবে শুধুমাত্র ইমাম আবূ হানীফাহ্ বলেন, ভ্রূণকে আলাদাভাবে যাবাহ করতে হবে। ইবনুল মুনযির (রহিমাহুল্লাহ) আরো বলেনঃ ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহিমাহুল্লাহ)-এর অনুসারীগণ তার এ কথার উপর একমত হয়েছেন বলে আমি মনে করি না।
এ বিষয়ে ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে একটি হাদীস বর্ণিত আছে, আর তা হলো (ذَكَاة الْجَنِين ذَكَاة أُمّه أَشْعَرَ أَوْ لَمْ يُشْعِر) অর্থাৎ ভ্রুণের মাকে যাবাহ করার দ্বারাই ভ্রুণের যাবাহ করা হয়ে যাবে। ইমাম দারাকুত্বনী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসের দু’টি ত্রুটি রয়েছে।
১. হাদীসটি মাওকূফ।
২. এ হাদীসটি ইসাম ইবনু ইউসুফ মুবারক ইবনু মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করেছেন।
আর ইমাম বুখারী, মুবারক ইবনু মুজাহিদকে দুর্বল বলেছেন। কিন্তু ইমাম আবূ হাতিম আর্ রাজী বলেনঃ আমি তার এ হাদীসের ব্যাপারে কোন সমস্যা দেখছি না। অর্থাৎ সে দুর্বল হলেও তার এ হাদীস ঠিক আছে। আর তার হাদীসের কিছু শব্দ এই আছে যে, (فَإِنَّ ذَكَاته ذَكَاة أُمّه)। সুতরাং এ অংশটুকুই এ সকল লোকেদের এ ব্যাখ্যাকে বাতিল করে যারা বলে ভ্রূণকেও তার মায়ের মতো যাবাহ করতে হবে, এছাড়া খাওয়া যাবে না।
শায়খ শামসুদ্দীন ইবনুল কইয়্যূম (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ তাদের এ ব্যাখ্যা (ভ্রূণকে তার মায়ের মতো যাবাহ করা ছাড়া খাওয়া যাবে না) বাতিল কয়েকটি কারণে,
১. হাদীসের পূর্বাপরের আলোচনা সেই ব্যাখ্যাকে প্রত্যাখ্যান করে। কেননা সাহাবীগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করেছিল সেই ধরনের ভ্রূণ সম্পর্কে যা ছাগল বা এ জাতীয় প্রাণীর পেটে পাওয়া যায়। যদি পাওয়া যায় তাহলে তারা সেটা খাবে নাকি ফেলে দিবে? তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা খাওয়ার ব্যাপারে ফায়সালা দিলেন। ভ্রূণ মৃত হওয়ার কারণে তা খেতে তাদের যে সংশয় সৃষ্টি হয়েছিল তা তিনি দূর করে দিলেন। কেননা তার মাকে যাবাহ করার দ্বারাই তার যাবাহ হয়ে গেছে। তা ছাড়াও ভ্রূণ তার মায়েরই একটি অংশ হাত, কলিজা ও মাথার ন্যায়। আর যাবাহকৃত প্রাণীর প্রতিটি অঙ্গ আলাদা আলাদাভাবে যাবাহ করার প্রয়োজন হয় না। সুতরাং ভ্রূণ যতক্ষণ তার মায়ের গর্ভে থাকবে ততক্ষণ সেটি তার অংশ হিসেবেই গণ্য হবে। যাবাহের ক্ষেত্রে ভ্রুণের জন্য আলাদা কোন হুকুম হবে না। অতএব, যখন মাকে যাবাহ করা হবে তখন সেই যাবাহ তার প্রতিটি অংশের জন্য যথেষ্ট হবে। আর তার অংশের মধ্যে ভ্রূণও রয়েছে।
তাই এটাই হলো স্পষ্ট ক্বিয়াস বা নীতিমালা যেহেতু এ মাসআলাহ্ সম্পর্কে স্পষ্ট কোন দলীল নেই।
২. উত্তর অবশ্যই প্রশ্ন অনুপাতে হতে হবে। সাহাবীগণ এক্ষেত্রে যাবাহ করার পদ্ধতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেননি যে, তার উত্তরে বলা হবে ভ্রূণকে যাবাহ করতে হবে যেমনিভাবে মাকে যাবাহ করা হয়। বরং তারা জিজ্ঞেস করেছিলেন ভ্রূণ খাওয়া সম্পর্কে যা তারা যাবাহ করার পর কখনো কখনো পেটে পায়। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা হালাল হিসেবে খাওয়ার অনুমতি দিলেন এবং তার মায়ের যাবাহকেই তার ভ্রুণের যাবাহ হিসেবে গণ্য করলেন। তাই ভ্রূণকে আলাদা হিসেবে যাবাহ করার প্রয়োজন নেই।
৩. সকল মানুষদের মাঝে সাহাবীগণই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উদ্দেশ্য সবচেয়ে ভালো বুঝতেন। তারা এ হাদীস থেকে বুঝেছেন যে, মাকে যাবাহ করার দ্বারাই ভ্রুণের যাবাহ হয়ে যাবে। আলাদাভাবে তাকে যাবাহ করতে হবে না। বরং তা যাবাহ করা ছাড়াই খাওয়া যাবে। ‘আবদুল্লাহ ইবনু কা‘ব ইবনু মালিক বলেনঃ সাহাবীগণ বলতেন, যদি গর্ভে থাকা ভ্রূণ সম্পর্কে জানা যায় তাহলে তার মাকে যাবাহ করার দ্বারাই তার ভ্রুণের যাবাহ হয়ে যায়। এ ব্যাপারে সকলের মত এটাই ছিল।
ইবনুল মুনযির (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ভ্রূণ যাবাহ করা ছাড়া খাওয়াই লোকেরা বৈধ হিসেবে দেখত। আর এ ব্যাপারে কেউ ভিন্ন মত পোষণ করেছেন বলে আমরা জানি না। কিন্তু যখন নু‘মান ইবনু সাবিত (ইমাম আবূ হানীফাহ্) আসলেন তখন তিনি বললেনঃ ভ্রূণ আলাদাভাবে যাবাহ করা ছাড়া খাওয়া যাবে না। কারণ একটি প্রাণী যাবাহ করাটা দু’টি প্রাণী যাবাহ করার স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না।
৪. শারী‘আতে এটা স্বীকৃত যে, বিভিন্ন পশুকে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে যাবাহ করা হয়ে থাকে। যেমন শিকারী পশুকে যে কোন স্থানে আঘাত করে রক্ত বের করার মাধ্যমেও যাবাহ করা হয়ে যায়। আর এটা জানা কথা যে, মাকে যাবাহ করা ছাড়া তার ভ্রূণকে যাবাহ করা অসম্ভব। তাই এ ক্ষেত্রে মাকে যাবাহ করার দ্বারাই তার ভ্রূণও যাবাহ হয়ে যাবে। তার জন্য আলাদাভাবে যাবাহের প্রয়োজন নেই।
৫. হাদীসের বাক্য (ذَكَاة الْجَنِين ذَكَاة أُمّه) অর্থাৎ মাকে যাবাহ করার অর্থ তার ভ্রুনকে যাবাহ করা। এ বাক্যটি ঠিক এই বাক্যের মতো যেটা বলা হয় (غِذَاء الْجَنِين غِذَاء أُمّه) অর্থাৎ ভ্রুণের খাবার হলো তার মায়ের খাবার। সুতরাং এ বাক্য থেকে যেটা বুঝা যায় তা হলো, ভ্রুণের জন্য আলাদা খাবারের প্রয়োজন নেই। ঠিক (ذَكَاة الْجَنِين ذَكَاة أُمّه) বাক্য দ্বারা বুঝা যায় যে, ভ্রুণের জন্য আলাদাভাবে যাবাহের প্রয়োজন নেই।
৬. ভ্রূণকে তার মায়ের মতো যাবাহ করা হবে যদি তা জীবিত অবস্থায় বের হয়। আর তখন তাকে আলাদাভাবে যাবাহ করা ছাড়া খাওয়া যাবে না।
কিন্তু কথা হলো সাহাবীগণ তো রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ জীবিত ভ্রূণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেননি এবং তাদেরকে সেই উত্তরও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেননি। আর তাদের প্রশ্ন থেকেও এটা বুঝা যায় না এবং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উত্তরটা সেই ধরনের জীবিত ভ্রূণ সম্পর্কেও না।
সাহাবীগণ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলেছিলেন আমরা গরু, ছাগল যাবাহ করি। আর কখনো তাতে আমরা ভ্রূণ পাই। আমরা তা খাব নাকি ফেলে দিব? তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের উত্তরে বললেন, যদি তোমাদের ইচ্ছা হয় তাহলে খেতে পার। কেননা তার যাবাহ করাটা হলো তার মাকে যাবাহ করাই। তারা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন তা খাওয়া সম্পর্কে যে, সেটা তাদের জন্য খাওয়া হালাল হবে কিনা?
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জন্য তা খাওয়ার ফায়সালা দিলেন এবং ভ্রূণ মৃত হওয়ার কারণে তাদের মাঝে যে সংশয় সৃষ্টি হয়েছিল তা তিনি দূর করে দিলেন। এ কথা বলার মাধ্যমে যে, ভ্রুণের যাবাহ হয়ে যাবে তার মাকে যাবাহ করার দ্বারাই।
আর এটা স্পষ্ট যে, যদি (ذَكَاة الْجَنِين ذَكَاة أُمّه) এর অর্থ করা হয় ‘‘তোমরা ভ্রূণকে যাবাহ কর যেভাবে তার মাকে যাবাহ করতে হয়।’’ তাহলে প্রশ্ন আর উত্তরের সাথে মিল থাকে না। সুতরাং যদি ভ্রূণকে আলাদাভাবে যাবাহ করার প্রয়োজন হত, তাহলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, যদি ভ্রূণ জীবিত বের হয় তাহলে তোমরা তা যাবাহ করে খেতে পার। আর তাকে যাবাহ করার পদ্ধতি হলো তার মাকে যাবাহ করার মতোই।
কিন্তু বর্ণিত হাদীস ভ্রূণকে আলাদাভাবে যাবাহ করার কথা প্রমাণ করে না। والله أعلم (আল্লাহ এ ব্যপারে অধিক অবগত) (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৮৬৫)
মিরকাতের লেখক বলেনঃ শারহুস্ সুন্নাহ গ্রন্থে রয়েছে, এ হাদীসেই প্রমাণ রয়েছে যে, যদি কেউ কোন প্রাণী যাবাহ করে আর তাতে কোন মৃত ভ্রূণ পাওয়া যায় তাহলে তা খাওয়া হালাল। আর এটা হলো অধিকাংশ বিদ্বান সাহাবীগণের মত এবং তাদের পরবর্তী ‘আলিমদের মতও।
ইমাম শাফি‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ)-ও এ মত পোষণ করেছেন। তবে তাদের কেউ কেউ ভ্রুণের মাঝে জীবন পাওয়াকে শর্ত করেছেন। যদি ভ্রূণ জীবিত অবস্থায় বের হয় তাহলে তাকে যাবাহ করতে হবে।
যায়নুল ‘আরব বলেনঃ যদি মাকে যাবাহ করার পরেই ভ্রূণ নাড়াচাড়া না করে তাহলে তা খাওয়া যাবে। কিন্তু যদি দীর্ঘ সময় নড়াচাড়া করার পর বন্ধ করে দেয় তাহলে তা খাওয়া হারাম। যদি ভ্রুণের কিছু অংশ বের হয়ে যায় আর সেই সময় তার মাকে যাবাহ করা হয় পরিপূর্ণভাবে ভ্রূণ বের হওয়ার আগেই তবুও তা খাওয়া বৈধ হবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪০৯২-[২৯] আর তিরমিযী আবূ সা’ঈদ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন।
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَرَوَاهُ التِّرْمِذِيّ عَن أبي سعيد
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪০৯৩-[৩০] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল! আমরা উষ্ট্রী, গাভী এবং বকরী যাবাহ করে কোন সময় তাদের পেটের ভেতর বাচ্চা পাই। এখন আমরা কি তাকে ফেলে দেব, নাকি খেতে পারব? তিনি বলেন, যদি ইচ্ছা হয় খেতে পার। কেননা তার যাবাহ মায়ের যাবাহের অনুরূপ। (আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَن أبي سعيدٍ الخدريِّ قَالَ: قُلْنَا: يَا رَسُولَ اللَّهِ نَنْحَرُ النَّاقَةَ ونذبح الْبَقَرَة وَالشَّاة فنجد فِي بَطنهَا جَنِينا أَنُلْقِيهِ أَمْ نَأْكُلُهُ؟ قَالَ: «كُلُوهُ إِنْ شِئْتُمْ فَإِنَّ ذَكَاتَهُ ذَكَاةُ أُمِّهِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَابْن مَاجَه
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪০৯৪-[৩১] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর ইবনুল ’আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি না-হক চড়ুই কিংবা তদপেক্ষা ছোট পাখি হত্যা করবে, (কিয়ামতের দিন) আল্লাহ তা’আলা তাকে তার হত্যার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবেন। জিজ্ঞেস করা হলো- হে আল্লাহর রসূল! তার হক কি? তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে যাবাহ করে খাবে এবং তার মাথা কেটে ফেলে দেবে না। (আহমাদ, নাসায়ী ও দারিমী)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ قَتَلَ عُصْفُورًا فَمَا فَوْقَهَا بِغَيْرِ حَقِّهَا سَأَلَهُ اللَّهُ عَنْ قَتْلِهِ» قِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا حَقُّهَا؟ قَالَ: «أَنْ يَذْبَحَهَا فَيَأْكُلَهَا وَلَا يَقْطَعَ رَأْسَهَا فَيَرْمِيَ بِهَا» . رَوَاهُ أَحْمد وَالنَّسَائِيّ والدرامي
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ তার সানাদ দুর্বল (য‘ঈফ)। এর কারণ হলো, ‘‘সুহায়ব’’ নামক বর্ণনাকারীর অবস্থা জানা যায় না। দেখুন- বায়ানুল ওয়া হামওয়াল ইহাম ফী কিতাবিল আহকাম ৪/৫৯০ পৃঃ, হাঃ ২১৩২।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪০৯৫-[৩২] আবূ ওয়াক্বিদ আল লায়সী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমন করলেন। তখন মদীনাবাসীরা জীবিত উটের কুঁজ এবং দুম্বার পাছার বাড়তি মাংস কেটে খেত। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, জীবিত জানোয়ার হতে যা কেটে নেয়া হয় তা মৃত, তা খাওয়া যাবে না। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
الْفَصْلُ الثَّانِي
عَن أبي وَافد اللَّيْثِيّ قَالَ: قَدِمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَدِينَةَ وَهُمْ يَجُبُّونَ أَسْنِمَةَ الْإِبِلِ وَيَقْطَعُونَ أَلْيَاتِ الْغَنَمِ فَقَالَ: «مَا يُقْطَعُ مِنَ الْبَهِيمَةِ وَهِيَ حَيَّةٌ فَهِيَ مَيْتَةٌ لَا تُؤْكَلُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُد
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৪০৯৬-[৩৩] ’আত্বা ইবনু ইয়াসার (রহঃ) বানী হারিসাহ্ গোত্রীয় জনৈক ব্যক্তি হতে বর্ণনা করেন, সে উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে কোন এক সমভূমিতে তার প্রসবাসন্ন উষ্ট্রী চরাচ্ছিল, হঠাৎ সে দেখতে পেল উষ্ট্রীটি প্রায় মরণাপন্ন অবস্থায় পৌঁছেছে। কিন্তু তাকে যাবাহ করার জন্য কিছুই না পেয়ে সে একটি পেরেক নিলো এবং তা দ্বারা তার কণ্ঠনালী ফুটো করে দিলো। ফলে তার রক্ত প্রবাহিত হয়ে গেল। অতঃপর ঘটনাটি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অবহিত করলে তিনি তাকে তা খাবার আদেশ দিলেন। (আবূ দাঊদ ও মালিক)[1]
অবশ্য মালিক-এর অপর এক রিওয়ায়াতে আছে, বর্ণনাকারী বলেনঃ সে উষ্ট্রীকে একখানা ধারালো কাঠ দ্বারা যাবাহ করল।
الْفَصْلُ الثَّالِثُ
عَنْ عَطَاءِ بْنِ يَسَارٍ عَنْ رَجُلٍ مِنْ بَنِي حَارِثَةَ أَنَّهُ كَانَ يَرْعَى لِقْحَةً بِشِعْبٍ مِنْ شِعَابِ أُحُدٍ فَرَأَى بِهَا الْمَوْتَ فَلَمْ يَجِدْ مَا يَنْحَرُهَا بِهِ فَأَخَذَ وَتِدًا فَوَجَأَ بِهِ فِي لَبَّتِهَا حَتَّى أَهْرَاقَ دَمَهَا ثُمَّ أَخْبَرَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَمَرَهُ بِأَكْلِهَا. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَمَالِكٌ وَفِي رِوَايَته: قَالَ: فذكاها بشظاظ
ব্যাখ্যাঃ ইবনু ওয়াহ্ব (রহিমাহুল্লাহ) মালিক (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণনা করেছেন; প্রত্যেক ঐ বস্তু যা চিনামাটির তৈরি অথবা হাড় কিংবা শিং জাতীয় বস্তুসহ যেগুলো দ্বারা রক্ত প্রবাহিত করা যায় সেগুলো বস্তু দ্বারা যাবাহ করা জায়িয। ইবনু হাবীর (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হাড়ের টুকরা ধারালো হোক বা না হোক যদি তা দ্বারা গোশত কর্তন ও রক্ত প্রবাহিত হয়। এ বস্তু দ্বারা যাবাহ বিশুদ্ধ। কাযী আবুল হাসান তাঁর কিতাবে উল্লেখ করেছেন, দাঁত কিংবা নখ দ্বারা যাবাহ বিশুদ্ধ নয়। তবে আমাদের কিছু ‘উলামা মাশায়খবৃন্দ বলেছেন, নখ কিংবা দাঁত দ্বারা যাবাহ করা মাকরূহ তবে হাড় দ্বারা বৈধ। (আল মুনতাকা ৪র্থ খন্ড, হাঃ ৯৭১)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৪০৯৭-[৩৪] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সামুদ্রিক প্রাণী (যেগুলো খাওয়া হালাল) সেগুলোকে আল্লাহ তা’আলা আদম সন্তানের জন্য যাবাহ করেছেন। (দারাকুত্বনী)[1]
الْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «مَا من دَابَّة إِلَّا وَقَدْ ذَكَّاهَا اللَّهُ لِبَنِي آدَمَ» . رَوَاهُ الدَّارَقُطْنِيّ
এ হাদীসটির সনদে ‘‘হামযাহ্’’ নামের বর্ণনাকারী মাতরূক, হাদীস তৈরি করার অভিযোগে অভিযুক্ত। তার প্রসিদ্ধ নাম হামযাহ্ ইবনু আবূ হামযাহ্ আল জু‘ফী।
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - কুকুর সম্পর্কে বর্ণনা
৪০৯৮-[১] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি গবাদিপশু পাহারাদানকারী কিংবা শিকারী কুকুর ছাড়া অন্য কোন কুকুর পোষে, প্রতিদিন তার ’আমল হতে দু’ ক্বীরাত্ব পরিমাণ হ্রাস পাবে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ ذِكْرِ الْكَلْبِ
عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «مَنِ اقْتَنَى كَلْبًا إِلَّا كَلْبَ مَاشِيَةٍ أَوْ ضَارٍ نَقَصَ مِنْ عَمَلِهِ كُلَّ يَوْمٍ قِيرَاطَانِ»
ব্যাখ্যাঃ কুকুর পালন করলে নেকী কমে যাওয়ার কারণ নিয়ে ‘উলামার মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। কারো মতে বাড়ীতে কুকুর থাকলে মালাক (ফেরেশতা) না প্রবেশ করার কারণে নেকী কমে যাবে। কেউ কেউ বলেছেন, কুকুর প্রতিপালনের কারণে পথ চলা ব্যক্তিদের যে ক্ষতি পৌঁছে তার কারণে নেকী কমবে। আবার কারো মতে, এটি কুকুর পালনকারীর শাস্তিস্বরূপ, কারণ শিকারী কিংবা সেচন কাজে ব্যবহার ছাড়া কুকুর প্রতিপালন নিষেধ, এটি অমান্য করার কারণে তার ‘আমল থেকে নেকী কমতে থাকবে। আল্লাহই ভালো জানেন। (শারহুন নাবাবী ১০ম খন্ড, হাঃ ১৫৭৪/৫০)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - কুকুর সম্পর্কে বর্ণনা
৪০৯৯-[২] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি গবাদিপশু পাহারাদানকারী কিংবা শিকারের জন্য নিয়োজিত অথবা খেত-খামারের ফসলাদি রক্ষণাবেক্ষণকারী কুকুর ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশে কুকুর পালে, প্রতিদিন তার ’আমলের সাওয়াব হতে এক ক্বীরাত্ব পরিমাণ কমে যাবে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ ذِكْرِ الْكَلْبِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم: «من اتَّخَذَ كَلْبًا إِلَّا كَلْبَ مَاشِيَةٍ أَوْ صَيْدٍ أَو زرعٍ انتقَصَ منْ أجرِه كلَّ يومٍ قِيرَاط»
ব্যাখ্যাঃ মুসলিম ও নাসায়ীর বর্ণনায় আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত রয়েছে যে, যে ব্যক্তি এমন কুকুর পালবে যা শিকারী কিংবা সেচন কাজ অথবা পাহারার জন্য ব্যবহার করা হয় না। এ কুকুর পালনে প্রতিদিন দুই ক্বীরাত্ব করে নেকী কমে যাবে। এছাড়া আবূ হাযিম থেকে বর্ণিত রয়েছে যে, বাড়ীওয়ালা তার বাড়ীতে কুকুর বেঁধে রাখবে যা শিকারী কিংবা পাহারাদার নয় তাহলে পালনেওয়ালার ‘আমল থেকে প্রতিদিন দুই ক্বীরাত্ব নেকী কমতে থাকবে।
আলোচ্য হাদীসে প্রতীয়মান হয় যে, শিকারী ও পাহারার জন্য কুকুর গ্রহণ করা বৈধ। ক্ষেত খামারের ক্ষেত্রেই অনুরূপ বিধান প্রযোজ্য। কেননা কুকুর এ সকল ক্ষেত্রে রক্ষণশীল বেশি। এছাড়া অন্য কোন কাজের জন্য কুকুর প্রতিপালন করা অপছন্দনীয়।
উল্লেখিত হাদীসে কুকুর প্রতিপালনের এক ক্বীরাত্ব নেকী কমে যাওয়ার কথা রয়েছে। আবার অন্য বর্ণনায় দুই ক্বীরাত্ব নেকী কমে যাওয়ার কথা রয়েছে। এর কারণ হলো, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে এক ক্বীরাত্ব কমে যাওয়ার কথা বলেছেন, প্রথম রাবী এটা শ্রবণ করে হুবহু তিনি বর্ণনা করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরবর্তীতে দুই ক্বীরাত্ব কমে যাওয়ার কথা বলেছেন, দ্বিতীয় রাবী তা শ্রবণ করেই বর্ণনা করেছেন। আবার কারো মতে দু’টি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে দু’টি বিধান অবতীর্ণ হয়েছে। দুই ক্বীরাত্ব কমে যাওয়া কুকুর দ্বারা ক্ষতির আধিক্য উদ্দেশ্য, অর্থাৎ যে কুকুর দ্বারা মানুষের ক্ষতি বেশি সে কুকুর প্রতিপালনে দুই ক্বীরাত্ব নেকী কমবে। আর যে কুকুর দ্বারা মানুষের ক্ষতি কম হয় তা প্রতিপালনে এক ক্বীরাত্ব নেকী কমবে। কেউ কেউ বলেছেন, মদীনাহ্ আশ্ শারীফায় হলে কুকুর প্রতিপালন করলে দুই ক্বীরাত্ব কমবে আর মদীনার বাইরে হলে এক ক্বীরাত্ব কমবে। (ফাতহুল বারী ৫ম খন্ড, হাঃ ২৩২২)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - কুকুর সম্পর্কে বর্ণনা
৪১০০-[৩] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে (মদীনার) সমস্ত কুকুর মেরে ফেলার জন্য নির্দেশ দিলেন। ফলে মফস্বল হতে যে মহিলাটি কুকুরসহ আগমন করত, আমরা তাকেও হত্যা করতাম। অতঃপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল কুকুর বধ করতে নিষেধ করেন এবং বললেন, তোমরা কেবলমাত্র ঐ সমস্ত কুকুর বধ করো, যেগুলো মিশমিশে কালো এবং দু’ চোখের উপরিভাগে দু’টি সাদা ফোঁটার চিহ্ন আছে। কেননা তা শয়তান। (মুসলিম)[1]
بَابُ ذِكْرِ الْكَلْبِ
وَعَن جَابر قَالَ: أَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِقَتْلِ الْكِلَابِ حَتَّى إِنَّ الْمَرْأَةَ تَقْدَمُ منَ البادِيةِ بكلبِها فتقتلَه ثُمَّ نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ قَتْلِهَا وَقَالَ: «عَلَيْكُمْ بِالْأَسْوَدِ الْبَهِيمِ ذِي النقطتين فَإِنَّهُ شَيْطَان» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ এখানে কালো কুকুর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, যে কুকুরের শরীরে কোন ধরনের সাদা বর্ণ নেই। কোন কোন ‘উলামা এ বৈশিষ্ট্যধারী কুকুর শিকারীর কাজে ব্যবহার করতেও অনিহা প্রকাশ করেছেন, হাদীসে কুকুরকে শয়তানের সাথে তুলনা করার কারণ হলো, কালো বর্ণের কুকুরগুলো সর্বনিকৃষ্ট, এগুলোর অনিষ্টতা বেশি ও উপকার অতি নগণ্য।
শারহুস্ সুন্নাহ্য় রয়েছে কুকুর হত্যার নির্দেশ দ্বারা মদীনার কুকুর উদ্দেশ্য, কারণ মদীনাতুল মুনাওয়ারায় মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) ওয়াহী দ্বারা বেষ্টন করে রাখে, আর যে বাড়ীতে কুকুর থাকে সে বাড়ীতে তো মালাক (ফেরেশতা) প্রবেশ করে না। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৪৮৬)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - কুকুর সম্পর্কে বর্ণনা
৪১০১-[৪] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিকারী কুকুর কিংবা মেষ-দুম্বা পাহারাদানকারী কুকুর অথবা গবাদিপশু পাহারায় নিয়োজিত কুকুর ছাড়া অন্যান্য সব কুকুর বধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ ذِكْرِ الْكَلْبِ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَرَ بِقَتْلِ الْكِلَابِ إِلَّا كَلْبَ صيدٍ أَو كلب غنم أَو مَاشِيَة
ব্যাখ্যাঃ ইমাম আল হারামায়ন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রাথমিক পর্যায়ে সকল কুকুর হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তারপর এটা রহিত করা হয়। অতঃপর গাঢ় কালো কুকুর ব্যতীত অন্যান্য কুকুর হত্যা করতে নিষেধ করা হয়েছে। অতঃপর শারী‘আহ্ এ মর্মে স্বীকৃতি দেয় যে, যে সকল কুকুরের মাঝে কোন ক্ষতির আশংকা নেই সে সব কুকুর মারা নিষেধ, চাই তা কালো হোক বা না হোক।
আর কুকুর প্রতিপালনের যে বিষয়টা রয়েছে আমাদের সিদ্ধান্ত হলো, বিনা প্রয়োজনে কুকুর পালন করা হারাম। তবে শিকারী, ক্ষেত খামার পাহারা বা সেচন কাজের জন্য কুকুর পালন করা জায়িয।
এছাড়া বাড়ী পাহারা বা প্রহরী কিংবা এ জাতীয় কাজে কুকুর প্রতিপালন করা যাবে কিনা- এ বাপারে দু’টি দিক রয়েছে।
১. হাদীসগুলোর বাহ্যিক দিক বিবেচনায় ক্ষেতের, পাহারা, সেচন কাজে ব্যবহৃত কুকুর ও শিকারী কুকুর- এ তিনটি ছাড়া কোন কাজের জন্য কুকুর প্রতিপালন জায়িয নেই।
২. হাদীসে উল্লেখিত তিনটি বিষয়ের উপর ক্বিয়াস করে কারণ বিবেচনায় জায়িয। অর্থাৎ প্রয়োজন থাকলে জায়িয এবং এটাই বিশুদ্ধ। (শারহুন নাবাবী ১০ম খন্ড, হাঃ ১৫৭১/৪৬)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - কুকুর সম্পর্কে বর্ণনা
৪১০২-[৫] ’আবদুল্লাহ ইবনু মুগাফফাল (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যদি কুকুর (আল্লাহর সৃষ্ট) সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে একটি সম্প্রদায় না হত, তবে আমি সমুদয় কুকুর বধ করার নির্দেশ দিতাম। তবে যেগুলো মিশমিশে কালো তোমরা সেগুলো বধ করো। (আবূ দাঊদ ও দারিমী)[1]
আর তিরমিযী ও নাসায়ী এ কথাগুলো বর্ধিত বর্ণনা করেছেন, যে পরিবারের লোকেরা শিকারী কুকুর, ক্ষেত-খামার পাহারাদানকারী কুকুর কিংবা মেষ-দুম্বা রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিত কুকুর ভিন্ন অন্য কোন প্রকারের কুকুর পুষবে, তাদের ’আমল হতে প্রত্যহ এক ক্বীরাত্ব পরিমাণ হ্রাস পাবে।
عَن عبد الله بنِ مُغفَّلٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَوْلَا أَنَّ الْكِلَابَ أُمَّةٌ مِنَ الْأُمَمِ لَأَمَرْتُ بِقَتْلِهَا كُلِّهَا فَاقْتُلُوا مِنْهَا كُلَّ أَسْوَدَ بَهِيمٍ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالدَّارِمِيُّ وَزَادَ التِّرْمِذِيُّ وَالنَّسَائِيُّ: «وَمَا مِنْ أَهْلِ بَيْتٍ يَرْتَبِطُونَ كَلْبًا إِلَّا نَقَصَ مِنْ عَمَلِهِمْ كُلَّ يَوْمٍ قِيرَاطٌ إِلَّا كَلْبَ صَيْدٍ أَوْ كَلْبَ حَرْثٍ أَوْ كَلْبَ غنم»
ব্যাখ্যাঃ ‘আল্লামা ত্বীবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আলোচ্য হাদীসটি আল্লাহ তা‘আলার কথার দিকে ইঙ্গিত করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘ভূপৃষ্ঠে চলমান প্রতিটি জীব এবং বায়ুমণ্ডলে দু’ ডানার সাহায্যে উড়ন্ত প্রতিটি পাখিই তোমাদের মতই এক ও একটি জাতি।’’ (সূরাহ্ আল আন্‘আম ৬ : ৩৮)
অর্থাৎ তারা সৃজনশীল ও তাসবীহ তাহলীলে তোমাদের মতই। ‘আল্লামা খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আলোচ্য বক্তব্য দ্বারা উদ্দেশ্য হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাতিকে নিঃশেষ করা পছন্দ করেন না; কেননা পৃথিবীর প্রতিটি সৃষ্টিকুলের মাঝে আল্লাহ তা‘আলার কোন না কোন হিকমাত রয়েছে এবং রয়েছে আত্মশুদ্ধির উপমা। তিনি বলেন, ব্যাপারটা যদি এমন হয় যে, যদি কুকুর হত্যা ছাড়া কোন পথ খোলা না থাকে তাহলে গাঢ় কালো ক্ষতিকারক কুকুরগুলো হত্যা কর এবং অবশিষ্টগুলো ছেড়ে দাও যাতে তোমরা পাহারার কাজে নিয়োজিত করার মাধ্যমে উপকার গ্রহণ করতে পার। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৮৪২)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - কুকুর সম্পর্কে বর্ণনা
৪১০৩-[৬] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পশুদের পরস্পরের মধ্যে লড়াই করাতে নিষেধ করেছেন। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ التَّحْرِيشِ بَيْنَ الْبَهَائِمِ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ
হাদীসটির সানাদ য‘ঈফ, সনদে আছে ‘‘আবূ ইয়াহ্ইয়া আল ক্যুআত’’ নামক একজন য‘ঈফ রাবী। এছাড়াও হাদীসটির সানাদ মুত্তাসিল না মুরসাল, এ বিষয়েও মতভেদ আছে। য‘ঈফ আবূ দাঊদ ২/৩১৬ পৃঃ, হাঃ ৫৬। সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ৬৮৭৮, মুসনাদে আবূ ইয়া‘লা ২৫০৯, আল মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ১০৯৬০, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২০২৭৭।
ব্যাখ্যাঃ চতুষ্পদ প্রাণীর মাঝে লড়াই বাধিয়ে দেয়া, তাদের একে অপরের উপর উত্তেজিত করা। যেমন- উট, ষাড় ও মোরগের মাঝে লড়াই বেধে দেয়া হয়। এটা নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ হলো, এটা প্রাণীদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর এবং ক্ষতির কারণ। এতে কোন উপকারিতা নেই বরং অনর্থক একটি বিষয় বিধায় এটা নিষিদ্ধ। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৭০৮)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১০৪-[১] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তীক্ষ্ণ দাঁতধারী যে কোন হিংস্র জন্তু খাওয়া হারাম। (মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَحِلُّ أَكْلُهُ وَمَا يَحْرُمُ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «كُلُّ ذِي نَابٍ منَ السِّباعِ فأكلُه حرامٌ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ আলোচ্য হাদীসটির উপর সকল বিদ্বানদের ‘আমল রয়েছে এবং এটাই যথোপযুক্ত। অন্যদিকে যারা বলেন, হিংস্র প্রাণীর মধ্যে যেগুলো বড় দাঁত ও নখ বিশিষ্ট প্রাণী সেগুলো ভক্ষণ করা বৈধ। তাদের দলীল হলো কুরআন মাজীদের আয়াত, যেমন- আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ ‘‘হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি বলুন ওয়াহীর মাধ্যমে আমার কাছে যে বিধান পাঠানো হয়েছে তাতে কোন আহারকারীর জন্য কোন বস্তু হারাম করা হয়েছে এমন কিছু আমি পাইনি।’’ (সূরাহ্ আল আন্‘আম ৬ : ১৪৫)
এর জবাবে অবশ্যই বলা যায় যে, আলোচ্য আয়াতে কারীমাটি মাক্কী তথা মক্কায় অবতীর্ণ। আর হারাম করা প্রসঙ্গে যে হাদীসগুলো রয়েছে সবগুলো হাদীসই হিজরতের পরবর্তী সময়ের। ‘আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, শাফি‘ঈ, আহমাদ ও ইসহক (রহিমাহুমুল্লাহ) প্রমুখগণের কথা এটাই, ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহিমাহুল্লাহ)-ও এমনটাই বলেছেন। ইবনুল ‘আরাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ)-এর প্রসিদ্ধ মত হলো তা মাকরূহ। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৪৭৯)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১০৫-[২] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কোন তীক্ষ দাঁতবিশিষ্ট হিংস্র জানোয়ার এবং ধারালো পাঞ্জাবিশিষ্ট পাখি খেতে নিষেধ করেছেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَحِلُّ أَكْلُهُ وَمَا يَحْرُمُ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ كُلِّ ذِي نَابٍ مِنَ السِّبَاعِ وَكُلِّ ذِي مِخْلَبٍ مِنَ الطَّيْرِ. رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যাঃ মৃত দুর্গন্ধযুক্ত প্রাণীর গোশত খাওয়া নিষিদ্ধ, এটা দ্বারা হারাম উদ্দেশ্য নয়। তবে ক্ষতির আশংকা প্রকট থাকলে তা হারাম হতে পারে। আমাদের কতিপয় ‘উলামা বলেন, মৃত প্রাণীর দুর্গন্ধযুক্ত গোশত খাওয়া সর্বাবস্থায় হারাম। তবে এ মতটি দুর্বল। (শারহুন নাবাবী ১৩শ খন্ড, হাঃ ১৯৩৪)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১০৬-[৩] আবূ সা’লাবাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গৃহপালিত গাধার মাংস হারাম বলে ঘোষণা করেছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَحِلُّ أَكْلُهُ وَمَا يَحْرُمُ
وَعَن أبي ثَعلبةَ قَالَ: حَرَّمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لُحُومَ الْحُمُرِ الْأَهْلِيَّةِ
ব্যাখ্যাঃ অধিকাংশ ‘উলামা এ মাস্আলার ব্যাপারে মতবিরোধ করেছেন। জামহূর সহাবায়ে কিরাম, তাবি‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ) ও তাদের পরবর্তী ‘উলামা উল্লেখিত স্পষ্ট হাদীসগুলোর ভিত্তিতে গৃহপালিত গাধার গোশত খাওয়া হারাম বলেছেন। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, এটা হারাম নয়। ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ) হতে তিনটি বর্ণনা রয়েছে। তন্মধ্যে প্রসিদ্ধ মত হলো, গৃহপালিত গাধার গোশত মাকরূহে তানযীহী। দ্বিতীয় মত অনুযায়ী হারাম। তৃতীয় মত অনুযায়ী জায়িয। তবে হারাম হওয়াটাই সঠিক। যেমনটা সহাবায়ে কিরামগণ স্পষ্ট একাধিক হাদীসের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। (শারহুন নাবাবী ১৩শ খন্ড, হাঃ ১৯৩৬/২৩)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১০৭-[৪] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বারের (যুদ্ধের) দিন গৃহপালিত গাধার মাংস হারাম করেছেন এবং ঘোড়ার মাংস সম্পর্কে অনুমতি দিয়েছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَحِلُّ أَكْلُهُ وَمَا يَحْرُمُ
وَعَنْ جَابِرٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى يَوْمَ خَيْبَرَ عَنْ لُحُومِ الْحُمُرِ الْأَهْلِيَّةِ وَأَذِنَ فِي لُحُومِ الْخَيْلِ
ব্যাখ্যাঃ ঘোড়ার গোশত খাওয়ার বৈধতার ব্যাপারে ‘উলামার মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। জামহূর সালাফ এবং তাদের পরবর্তী ‘উলামার মতে তা বৈধ এতে কোন কারাহিয়্যাত বা অপছন্দনীয়তা নেই। আর এটাই ‘আবদুল্লাহ ইবনুয্ যুবায়র, ফাজালাহ্ ইবনু ‘উবায়দ, আনাস ইবনু মালিক, আসমা বিনতু আবূ বকর, সুওয়াইদ ইবনু গাফলাহ্, ‘আলকামাহ্, আসওয়াদ, ‘আত্বা, শুরাইহ, সা‘ঈদ ইবনু যুবায়র, হাসান বাসরী, ইবরাহীম নাখ‘ঈ, হাম্মাদ ইবনু সুলায়মান, আহমাদ, ইসহক, আবূ সুর, আবূ ইউসুফ, মুহাম্মাদ দাঊদ (রহিমাহুমুল্লাহ)-সহ জামহূর মুহাদ্দিসগণের বক্তব্য। তবে ‘উলামার একদল এটাকে মাকরূহ মনে করেন তাদের মধ্যে ইবনু ‘আব্বাস, হাকাম, মালিক ও আবূ হানীফাহ্ (রহিমাহুমুল্লাহ) রয়েছেন। আবূ হানীফাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ঘোড়ার গোশত খাওয়াতে পাপ হবে, তবে তিনি হারাম উল্লেখ করেননি। তারা দলীল দিয়েছেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ তোমাদের আরোহণের জন্য ও শোভার জন্য তিনি সৃষ্টি করেছেন ঘোড়া, খচ্চর, গাধা। এখানে খাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়নি। এছাড়াও তারা খালিদ ইবনু ওয়ালীদ বর্ণিত একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোড়া, খচ্চর ও গাধার গোশত এবং প্রত্যেক দাঁতধারী হিংস্র প্রাণীর গোশত খেতে নিষেধ করেছেন- (আবূ দাঊদ)। সকল মুহাদ্দিসের মতে এ হাদীসটি য‘ঈফ। আবার কারো মতে হাদীসটি মানসূখ। (শারহুন নাবাবী ১৩শ খন্ড, হাঃ ১৯৪১)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১০৮-[৫] আবূ কতাদাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন তিনি একটি বন্য গাধা দেখতে পেয়ে তৎক্ষণাৎই তাকে হত্যা করে ফেললেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমাদের কাছে তার (বন্য গাধার) মাংসের কিছু অবশিষ্ট আছে কি? আবূ কতাদাহ্ বললেনঃ আমাদের কাছে তার একখানা পা আছে। অতঃপর তিনি তা নিলেন এবং খেলেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَحِلُّ أَكْلُهُ وَمَا يَحْرُمُ
وَعَن أبي قتادةَ أَنَّهُ رَأَى حِمَارًا وَحْشِيًّا فَعَقَرَهُ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «هَلْ مَعَكُمْ مِنْ لَحْمِهِ شَيْءٌ؟» قَالَ: مَعَنَا رِجْلُهُ فَأَخَذَهَا فَأَكَلَهَا
ব্যাখ্যাঃ অপর বর্ণনায় রয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কাছে উক্ত প্রাণীর কিছু অংশ আছে কি? তারা বলল, আমাদের কাছে এটার পা আছে। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা গ্রহণ করলেন এবং খেয়ে নিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের অন্তরে বৈধতার স্বচ্ছ ধারণা দেয়ার জন্যই তা খেয়ে নিয়েছিলেন। যেহেতু তাদের মাঝে জংলী গাধার গোশত খাওয়া বৈধ কিনা- এ ব্যাপারে মতপার্থক্য ছিল। তাই তাদের সন্দেহ ও সংশয় দূর করার জন্যই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা করেছিলেন। (শারহুন নাবাবী ৮ম খন্ড, হাঃ ১১৯৬/৫৮)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১০৯-[৬] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমরা ’মাররুয যহ্রান’ নামক স্থানে একটি খরগোশকে ধাওয়া করলাম। অবশেষে আমি তাকে ধরে ফেললাম এবং আবূ ত্বলহাহ্’র নিকট নিয়ে এলাম। তিনি তাকে যাবাহ করলেন এবং তার পাছা ও ঊরু দু’খানা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে পাঠালেন, তিনি তা গ্রহণ করলেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَحِلُّ أَكْلُهُ وَمَا يَحْرُمُ
وَعَن أنس قَالَ: أَنْفَجْنَا أَرْنَبًا بِمَرِّ الظَّهْرَانِ فَأَخَذْتُهَا فَأَتَيْتُ بهَا أَبَا طلحةَ فذبحها وَبَعَثَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بوَرِكِها وفخذْيها فقبِله
ব্যাখ্যাঃ আলোচ্য হাদীসে খরগোশ খাওয়া বৈধতার প্রমাণ পাওয়া যায়। আর এটাই সকল ‘উলামার মত। তবে সাহাবীদের মধ্য হতে ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ), তাবি‘ঈনদের মধ্য হতে ‘ইকরামাহ্ (রহিমাহুল্লাহ)। আর ফকীহদের মধ্য হতে মুহাম্মাদ ইবনু আবূ লায়লা (রহিমাহুল্লাহ) এটাকে মাকরূহ বলেছেন। আর খুযায়মাহ্ ইবনু জুয (রহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করেছেন; তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললাম, খরগোশের ব্যাপারে আপনি কি বলেন, তা হালাল নাকি হারাম। তিনি (রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আমি তা খাই না এবং হারামও করি না। আমি বললাম, আপনি যা হারাম করেননি তা কি আমি খেতে পারি? তিনি বললেন, আমি জানি যে, এটা (খরগোশ) রক্ত প্রবাহিত করে (অর্থাৎ শিকার করে)। এ হাদীসটি নিতান্তই দুর্বল। যদি সহীহ হয়ে থাকে তবুও এ হাদীস খরগোশ খাওয়া মাকরূহ এটা প্রমাণ করে না। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫৫৩৫)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১১০-[৭] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দব্ব আমি খাইও না এবং তাকে হারামও বলি না। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَحِلُّ أَكْلُهُ وَمَا يَحْرُمُ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الضَّبُّ لَسْتُ آكُلُهُ وَلَا أُحَرِّمُهُ»
ব্যাখ্যাঃ আলোচ্য হাদীস থেকে এটাই প্রমাণিত হয়, যা ইমাম মুসলিম ও অন্যান্য ‘উলামা উল্লেখ করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দব্বের ব্যাপারে বলেছেন, আমি এটা খাই না হারামও করি না। অপর বর্ণনায় রয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা খাও, কারণ এটা হালাল। কিন্তু এটা (দব্ব) আমার খাদ্যের মধ্য নেই (অর্থাৎ আমার অঞ্চলে এটা খাওয়া হয় না)। অপর বর্ণনায় রয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দব্ব ভুনার পাত্র থেকে হাত উঠে নিলেন। অতঃপর তাঁকে বলা হলো হে আল্লাহর রসূল! এটা কি হারাম? তিনি বললেন, না, তবে আমার অঞ্চলে এর প্রচলন নেই। কাজেই আমি এটার ব্যাপারে অনাগ্রহী তথা অভ্যস্ত নই। অতঃপর তারা সকলেই খেয়ে নিলেন, তিনি (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তা প্রত্যক্ষ করলেন।
সকল ‘উলামার ঐকমত্য রয়েছে যে, দব্ব হালাল মাকরূহ নয়। তবে ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহিমাহুল্লাহ)-এর অনুসারীদের দৃষ্টিতে তা মাকরূহ। কাযী ‘ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) একদল ‘উলামা থেকে বর্ণনা করেছেন, তারা বলেছেন, এটা হারাম। তাদের কোন মত বিশুদ্ধ বলে আমার মনে হয় না। যদি বিশুদ্ধও হয় তারপরও কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা গৃহীত দলীল এবং তা হালাল হওয়ার ব্যাপারে সাহাবীদের ঐকমত্য পূর্ব হতেই রয়েছে। (শারহুন নাবাবী ১৩শ খন্ড, হাঃ ১৯৪৩/৩৯)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১১১-[৮] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। খালিদ ইবনু ওয়ালীদ তাঁকে বলেছেনঃ একদিন তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে মায়মূনাহ্ (রাঃ)-এর ঘরে প্রবেশ করলেন। মায়মূনাহ্ হলেন খালিদ ও ইবনু ’আব্বাস-এর খালা। এ সময় খালিদ দেখতে পেলেন, মায়মূনার কাছে রয়েছে ভাজা দব্ব। অতঃপর তিনি (মায়মূনাহ্) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মুখে দব্ব পেশ করলেন। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাত গুটিয়ে নিলেন। এ সময় খালিদ জিজ্ঞেস করলেন : হে আল্লাহর রসূল! দব্ব (খাওয়া) কি হারাম? তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ না। তবে আমাদের এলাকায় এ জীব নেই। তাই এটার প্রতি আমার ঘৃণাবোধ হয়। খালিদ বলেনঃ অতঃপর আমি তাকে নিজের দিকে টেনে নিলাম এবং তা খেতে লাগলাম, আর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَحِلُّ أَكْلُهُ وَمَا يَحْرُمُ
وَعَن ابنِ عبَّاسٍ: أَنَّ خَالِدَ بْنَ الْوَلِيدِ أَخْبَرَهُ أَنَّهُ دَخَلَ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى مَيْمُونَةَ وَهِيَ خَالَتُهُ وَخَالَةُ ابْنِ عَبَّاسٍ فَوَجَدَ عِنْدَهَا ضَبًّا مَحْنُوذًا فَقَدَّمَتِ الضَّبَّ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَرَفَعَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَدَهُ عَنِ الضَّبِّ فَقَالَ خَالِدٌ: أَحْرَامٌ الضَّبُّ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: «لَا وَلَكِنْ لَمْ يَكُنْ بِأَرْضِ قَوْمِي فَأَجِدُنِي أَعَافُهُ» قَالَ خَالِدٌ: فَاجْتَرَرْتُهُ فَأَكَلْتُهُ وَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَنْظُرُ إِلَيّ
ব্যাখ্যাঃ ইমাম ত্বহাবী (রহিমাহুল্লাহ) ‘‘মা‘আনী আল আসার’’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, একদল ‘উলামা দব্ব খাওয়া মাকরূহ বলেছেন। তাদের মধ্যে ইমাম আবূ হানীফাহ্, আবূ ইউসুফ ও মুহাম্মাদ ইবনু আল হাসান (রহিমাহুল্লাহ) রয়েছে। তিনি আরো বলেন, ইমাম মুহাম্মাদ (রহিমাহুল্লাহ) ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর বর্ণনায় রয়েছে যে, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দব্ব হাদিয়া দেয়া হলো তিনি তা খেলেন না। অতঃপর একজন ভিক্ষুক এসে দাঁড়ালে ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) তাকে দব্ব হতে কিছু দেয়ার ইচ্ছা করলেন, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে বললেন, তুমি কি এটা তাকে দিবে যা তুমি খেলে না? ইমাম ত্বহাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আলোচ্য হাদীসটি দব্ব মাকরূহ হওয়ার দলীল নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তম খাদ্য ভক্ষণের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্যের ইচ্ছা করতেন। যেমন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পুরাতন বা নিম্নমানের খেজুর দান করতে নিষেধ করেছেন। আবূ দাঊদের বর্ণনায় রয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দব্ব খাওয়া থেকে নিষেধ করেছেন। এ হাদীসের ব্যাপারে ‘আল্লামা খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসটির সানাদ বিশুদ্ধ নয়। ইবন হায্ম (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসে দুর্বল ও অপরিচিত রাবীগণ রয়েছে।
বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসটি ইসমা‘ঈল ইবনু ‘আইয়্যাশ এককভাবে বর্ণনা করেছেন এবং এটা দলীলযোগ্য নয়। ইবনুল জাওযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, এ হাদীসটি বিশুদ্ধ নয়। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫৫৩৭)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১১২-[৯] আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মুরগীর মাংস খেতে দেখেছি। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَحِلُّ أَكْلُهُ وَمَا يَحْرُمُ
وَعَن أبي مُوسَى قَالَ: رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْكُلُ لَحْمَ الدَّجَاجِ
ব্যাখ্যাঃ আলোচ্য হাদীসে মুরগী গৃহপালিত কিংবা জংলী বা জঙ্গলে বাস করে এই মুরগীসহ সকল মুরগী খাওয়া বৈধ। আর এ মর্মে সকল ‘উলামার ঐকমত্য রয়েছে। তবে কোন ‘উলামা বলেছেন, যে সকল মুরগী নাপাক খায় এগুলো খাওয়া বৈধ নয়। আবূ মূসা (রাঃ)-এর বর্ণনায় স্পষ্টত প্রমাণিত হয় তাতেও কোন সমস্যা নেই। ইবনু আবূ শায়বাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) সহীহ সনদে ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি (ইবনু ‘উমার) যে সকল মুরগী নাপাক খায় এগুলোকে তিনদিন আবদ্ধ করে রাখতেন এরপর খেতেন। ইমাম মালিক এবং আল লায়স (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, নাপাক খায় সেই মুরগীও খাওয়াতেও কোন সমস্যা নেই। বায়হাক্বীর বর্ণনায় আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাপাক খায় এরূপ প্রাণী খাওয়া এবং তার দুধ পান করতে ও তাতে আরোহণ করতে নিষেধ করেছেন। ইবনু আবূ শায়বাহ্ হাসান সূত্রে এমনটিই বর্ণনা করেছেন। ইমাম শাফি‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, যদি নাপাক খাওয়ার কারণে প্রাণীর গোশত কোন পরিবর্তন হয় তবে তা খাওয়া মাকরূহ, নয়ত মাকরূহ নয়। তবে অধিকাংশ ‘উলামা প্রাধান্য দিয়েছেন যে, এ ধরনের প্রাণীর গোশত খাওয়া মাকরূহ তানযীহী বা বৈধ, তবে না খাওয়াই ভালো। আল্লাহ তা‘আলাই ভালো জানেন। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৮২৭)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১১৩-[১০] ’আবদুল্লাহ ইবনু আবূ আওফা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে সাতটি যুদ্ধে শরীক ছিলাম। তাঁর সাথে আমরা টিড্ডি খেয়েছি। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَحِلُّ أَكْلُهُ وَمَا يَحْرُمُ
وَعَن ابنِ أبي أوْفى قَالَ: غَزَوْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَبْعَ غَزَوَاتٍ كُنَّا نَأْكُلُ مَعَهُ الجرادَ
ব্যাখ্যাঃ ‘আল্লামা নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ টিড্ডি বা ফড়িং খাওয়া বৈধ। এ ব্যাপারে ‘উলামার ঐকমত্য রয়েছে। অতঃপর ইমাম শাফি‘ঈ, আবূ হানীফাহ্, আহমাদ এবং জামহূর ‘উলামা বলেছেন, টিড্ডি বা ফড়িং সর্বাবস্থায় বৈধ। যদিও তা ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মারা পরে থাকে। মুসলিম শিকার করুক কিংবা অগ্নিপূজক শিকার করুক, কিংবা এমনিতে মারা পরুক। অথবা যে কোন কারণে তা মারা পরুক না কেন, সর্বাবস্থায় তা হালাল। (‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৮০৮)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১১৪-[১১] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি খাবত্ব বাহিনীর অভিযানে শরীক ছিলাম। আবূ ’উবায়দাহ্ -কে বাহিনীর আমির নিযুক্ত করা হয়েছিল। (তথায়) আমরা এক সময় ভীষণ ক্ষুধায় পতিত হয়েছিলাম। তখন সমুদ্রের (তীরে) একটি মৃত মাছ উঠে এসেছিল। তার মতো এত বিশালাকার মাছ ইতঃপূর্বে আমরা দেখিনি। তাকে বলা হত, ’আম্বার। আমরা অর্ধ মাস পর্যন্ত তা হতে খেলাম। পরে আবূ ’উবায়দাহ্ তার হাড়সমূহ হতে একখানা হাড় নিয়ে খাড়া করলেন। আর তার নিচে দিয়ে একজন উটে আরোহিত হয়ে অনায়াসে অতিক্রম করল। অতঃপর মদীনায় এসে আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে (বিষয়টি) বর্ণনা করলে তিনি বললেনঃ তোমরা খাও, আল্লাহ তা’আলা তোমাদের জন্য রিজিক হিসেবে তা পাঠিয়েছেন। আর যদি তোমাদের কাছে তার অবশিষ্ট কিছু মওজুদ থাকে, আমাদেরকেও খেতে দাও। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে তার কিছু অংশ পাঠিয়ে দিলাম। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা খেলেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَحِلُّ أَكْلُهُ وَمَا يَحْرُمُ
وَعَن جابرٍ قَالَ: غَزَوْتُ جَيْشَ الْخَبْطِ وَأُمِّرَ عَلَيْنَا أَبُو عُبَيْدَةَ فَجُعْنَا جُوعًا شَدِيدًا فَأَلْقَى الْبَحْرُ حُوتًا مَيِّتًا لَمْ نَرَ مِثْلَهُ يُقَالُ لَهُ: الْعَنْبَرُ فَأَكَلْنَا مِنْهُ نِصْفَ شَهْرٍ فَأَخَذَ أَبُو عُبَيْدَةَ عَظْمًا مِنْ عِظَامِهِ فَمَرَّ الرَّاكِبُ تَحْتَهُ فَلَمَّا قَدِمْنَا ذَكَرْنَا ذَلِكَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «كُلُوا رِزْقًا أَخْرَجَهُ اللَّهُ إِلَيْكُمْ وَأَطْعِمُونَا إِنْ كَانَ مَعَكُمْ» قَالَ: فَأَرْسَلْنَا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْهُ فَأَكله
ব্যাখ্যাঃ এখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উক্ত প্রাণীর (‘আম্বার নামক মাছ) গোশত চাওয়া, এর তা দ্বারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের তা হালাল হওয়ার নিশ্চয়তা প্রদান করেছেন। উক্ত প্রাণী হালাল হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। অথবা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ হতে প্রেরিত খাদ্যের মাধ্যমে বারাকাত কামনা করেছেন।
আলোচ্য হাদীস থেকে এটা প্রমাণিত হয় যে, সামুদ্রিক সকল মৃত প্রাণী খাওয়া বৈধ। চাই সেটা নিজে নিজে মারা যাক কিংবা শিকারীর দ্বারা মারা যাক। আর মাছ খাওয়ার বৈধতার উপর সকল ‘উলামার ঐকমত্য রয়েছে। তবে আমাদের কোন কোন ‘উলামা বলেছেন, ব্যাঙ খাওয়া হারাম, কারণ তা হত্যা করা নিষেধ, এ মর্মে হাদীস রয়েছে। আর এ মতের প্রবক্তা হলেন আবূ বকর সিদ্দীক, ‘উমার এবং ইবনু ‘আব্বাস প্রমুখগণ। ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ) ব্যাঙ সহ সকল সামুদ্রিক প্রাণী খাওয়া বৈধ বলেছেন। ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, মাছ ছাড়া সামুদ্রিক কোন প্রাণী হালাল নয়। (শারহুন নাবাবী ১৩শ খন্ড, হাঃ ১৯৩৫)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১১৫-[১২] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন তোমাদের কারো (খাদ্য গ্রহণের) পাত্রে মাছি পড়ে, তখন গোটা মাছিটিকে তাতে ডুবিয়ে দেবে। অতঃপর তাকে তুলে ফেলে দেবে। কেননা তার ডানদ্বয়ের এক ডানায় নিরাময় এবং অপর ডানায় রোগ থাকে। (বুখারী)[1]
بَابُ مَا يَحِلُّ أَكْلُهُ وَمَا يَحْرُمُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِذَا وَقَعَ الذُّبَابُ فِي إِناءِ أحدِكم فَلْيَغْمِسْهُ كُلَّهُ ثُمَّ لِيَطْرَحْهُ فَإِنَّ فِي أَحَدِ جَنَاحَيْهِ شِفَاءً وَفِي الْآخَرِ دَاءً» . رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ
ব্যাখ্যাঃ আলোচ্য হাদীসটি এ মর্মে দলীল : ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকার জন্য মাছি মারা বৈধ। আর তা ফেলে দিতে হবে খাওয়া যাবে না। আর মাছি পানিতে পরে মারা গেলেও পানি নাপাক হয় না। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা পানিতে ডুবে ধরার নির্দেশ দিয়েছেন। আর এ কথা সকলেই জানা যে, মাছি পানিতে ডুবালে মারা যাবে। বিশেষ করে খাদ্য যদি গরম হয়। যদি মাছি পড়ার কারণে পানীয় খাদ্য নাপাকই হত তাহলে খাদ্য ফেলে দেয়ার নির্দেশ দিতেন। আর এটাই হত সংশোধনের নির্দেশ। আর এ হুকুমটা মাছি জাতীয় সকল প্রাণীর জন্য প্রযোজ্য। যেমন মৌমাছি, মাকড়সা ইত্যাদি। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ৩৮৪০)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১১৬-[১৩] মায়মূনাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, একদিন একটি ইঁদুর ঘিয়ের মধ্যে পড়ে মরে গেল এবং এ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ইঁদুর ও তার আশেপাশের ঘি ফেলে দাও এবং অবশিষ্ট ঘি খাও। (বুখারী)[1]
بَابُ مَا يَحِلُّ أَكْلُهُ وَمَا يَحْرُمُ
وَعَن ميمونةَ أَنَّ فَأْرَةً وَقَعَتْ فِي سَمْنٍ فَمَاتَتْ فَسُئِلَ رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم فَقَالَ: «ألقوها وَمَا حولهَا وكلوه» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ উল্লেখিত হাদীসে এ মর্মে দলীল রয়েছে যে, পানি ব্যতীত তরল জাতীয় খাদ্যে যখন নাপাক পতিত হবে তখন উক্ত খাদ্য নাপাক হয়ে যাবে। চাই তা বেশি হোক বা কম হোক। অন্যদিকে পানির বিধানটা ভিন্ন। পানির পরিমাণ যদি বেশি থাকে আর তাতে যদি নাপাকি থাকে, তাহলে নাপাকির কারণে পানির বৈশিষ্ট্য না বদলানো পর্যন্ত তা নাপাক হবে না। তেলের ব্যাপারে সকল ‘উলামা একমত, যদি তাতে ইঁদুর কিংবা কোন নাপাক বস্তু পতিত হয় তবে তা নাপাক হয়ে যাবে। অধিকাংশ ‘উলামার মতে তা খাওয়া কিংবা বিক্রি কোনটাই বৈধ নয়। পক্ষান্তরে ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, উক্ত তেল বিক্রি করা বৈধ। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৭৯৯)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১১৭-[১৪] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন। তিনি বলেন, তোমরা সব সাপই মারবে। বিশেষ করে পিঠে দু’টি কালো রেখাবিশিষ্ট এবং লেজ কাটা সাপ অবশ্যই মেরে ফেলবে। কেননা এগুলো চক্ষুর জ্যোতি নষ্ট করে এবং গর্ভপাত ঘটায়। ’আবদুল্লাহ বলেন, একদিন আমি একটি সাপ মারার জন্য তার পিছনে ধাওয়া করলাম। এমন সময় আবূ লুবাবাহ্ আমাকে ডেকে বললেন, তাকে মেরো না। আমি বললাম, : রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো সকল সাপ মেরে ফেলতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বললেন, এ নির্দেশের পর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গৃহে বাস করে, যেগুলোকে ’আওয়ামির বলা হয় ঐগুলোকে বধ করতে নিষেধ করেছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَحِلُّ أَكْلُهُ وَمَا يَحْرُمُ
وَعَن ابْن عمر أَنَّهُ سَمِعَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: اقْتُلُوا الْحَيَّاتِ وَاقْتُلُوا ذَا الطُّفْيَتَيْنِ وَالْأَبْتَرَ فَإِنَّهُمَا يَطْمِسَانِ الْبَصَرَ وَيَسْتَسْقِطَانِ الْحَبَلَ قَالَ عَبْدُ اللَّهِ: فَبَيْنَا أَنَا أُطَارِدُ حَيَّةً أَقْتُلَهَا نَادَانِي أَبُو لُبَابَةَ: لَا تَقْتُلْهَا فَقُلْتُ: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَرَ بِقَتْلِ الْحَيَّاتِ. فَقَالَ: إِنَّهُ نَهَى بَعْدَ ذَلِكَ عَنْ ذَوَات الْبيُوت وَهن العوامر
ব্যাখ্যাঃ অপর বর্ণনায় রয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাড়ীতে অবস্থানকারী (সাপরূপী) জিনগুলোকে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, এক আনসারী যুবক তার বাড়ীতে একটি সাপ হত্যা করে, অতঃপর ঘটনাস্থলেই যুবকটিও মারা যায়। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মদীনাতে কতকগুলো জীন ইসলাম গ্রহণ করেছে, যখন তোমরা তাদের কাউকে (সাপরূপে) দেখবে তখন তিনবার ঘোষণা করে দাও। এরপর যদি পুনরায় আত্মপ্রকাশ করে তবে মেরে ফেল। কারণ সে শয়তান। আল মাযিনী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, মদীনার কোন সাপকে পূর্ব সতর্ক করা ছাড়া হত্যা করা যাবে না। যেমন একাধিক হাদীসে তা এসেছে। সতর্ক করার পরও যদি স্থান ত্যাগ না করে তাহলে হত্যা করতে হবে। আর মদীনাহ্ ছাড়া সকল ভূখন্ড, বাড়ী-ঘরে অবস্থিত সাপ কোন সতর্ক ছাড়াই হত্যা করা বৈধ। কেননা সাপ হত্যা করার নির্দেশ সংক্রান্ত অনেক বিশুদ্ধ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। একদল ‘উলামা বলেছেন, সতর্ক করা ছাড়া সাপ হত্যা নিষেধ হওয়ার বিধানটা সকল শহরের সকল বাড়ী ঘরে অবস্থিত সাপের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কতিপয় ‘উলামা বলেছেন, সাপ হত্যার নির্দেশটা বাড়ীতে অবস্থানকারী জীন এবং লেজ কাটা দুই তিলকধারী সাপ ছাড়া সকল সাপের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর লেজকাটা ও দুই তিলকধারী সাপ বাড়ীতে থাকুক বা অন্যস্থানে থাকুক সর্বাবস্থায় সর্বস্থানে তা হত্যা করা আবশ্যক। (শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২২৩৩/১২৮)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১১৮-[১৫] আবূ সায়িব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আবূ সা’ঈদ আল খুদরী -এর নিকট গেলাম। আমরা তার কাছে বসেছিলাম, এমন সময় হঠাৎ তাঁর খাটের নিচে কোন কিছুর নড়াচড়া শুনতে পাই। তাকিয়ে দেখলাম, ঐখানে একটি সাপ। আমি তৎক্ষণাৎ তাকে মারার জন্য উঠে দাঁড়িয়ে গেলাম। সে সময় আবূ সা’ঈদ সালাত আদায় করছিলেন। তিনি আমাকে বসে থাকার জন্য ইঙ্গিত করলেন। আমি অমনি বসে পড়লাম। অতঃপর তিনি সালাত শেষ করে ঘরের একটি কক্ষের দিকে ইশারা করে বললেন, তুমি কি ঐ কক্ষটি দেখছ? আমি বললামঃ জ্বী হ্যাঁ। তখন তিনি বললেনঃ এ কক্ষে আমাদের বংশের এক যুবক থাকত। সে ছিল সদ্য বিবাহিত দম্পতি। তিনি আরো বলেন, উক্ত যুবকটিসহ আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে খন্দাকের যুদ্ধে শরীক হয়েছিলাম। যুবকটি দ্বিপ্রহরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট হতে অনুমতি নিয়ে বাড়িতে চলে যেত। (প্রতিদিনের নিয়মমাফিক) একদিন সে তাঁর নিকট অনুমতি চাইল। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ তুমি তোমার হাতিয়ারখানা সঙ্গে নিয়ে যাও। কেননা আমি বানী কুরায়যার পক্ষ হতে তোমার ওপর আক্রমণের আশঙ্কা করি।
সুতরাং লোকটি নিজের হাতিয়ার সমেত বাড়ির দিকে প্রত্যাবর্তন করল। সে এসে দেখতে পেল, তার স্ত্রী (ঘরের) উভয় দ্বারের মাঝখানে দণ্ডায়মান। তাকে এ অবস্থায় দেখে তার আত্মসম্ভ্রমে আঘাত লাগল। ফলে সে তৎক্ষণাৎ তার দিকে বর্শা ছুড়ার জন্য উদ্যত হলো। তার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে সে (স্ত্রী) বলে উঠল, তুমি তোমার বর্শা গুটিয়ে নাও। ঘরের ভিতরে প্রবেশ করে দেখো, কিসে আমাকে বাহিরে আসতে বাধ্য করেছে। লোকটি গৃহে প্রবেশ করতেই দেখল, প্রকাণ্ড একটি সাপ বিছানার উপর জড়ো হয়ে রয়েছে। তৎক্ষণাৎ সে বর্শা দ্বারা তাকে আক্রমণ করল এবং বর্শার ফলকে তাকে গেঁথে ফেলল। অতঃপর ঘরের বাইরে এনে বর্শাটি মাটিতে গেড়ে রাখল। এ অবস্থায় সাপটি লাফিয়ে তার ওপর আক্রমণ করল। এরপর জানা যায়নি তাদের উভয়ের মধ্যে কে আগে মৃত্যুবরণ করেছে- সেই সাপ না যুবক।
বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর আমরা এসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে ঘটনাটি জানালাম এবং জিজ্ঞেস করলাম, (হে আল্লাহর রসূল!) আল্লাহর কাছে তার জন্য দু’আ করুন, যেন তিনি তাকে আমাদের জন্য জীবিত করে দেন। তিনি বললেন, তোমরা তোমাদের সঙ্গীর জন্য আল্লাহর কাছে মাগফিরাত কামনা করো। অতঃপর তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ সমস্ত গৃহে কিছু ’আওয়ামির (বসবাসকারী জীন) থাকে। অতএব যখনই তোমরা তাদেরকে ঘরের মধ্যে দেখতে পাও, তখনই তাদেরকে ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য তিনবার নির্দেশ দাও। এতে যদি চলে যায়, তবে উত্তম, অন্যথা তাদেরকে মেরে ফেলো। কেননা তা কাফির।
অতঃপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকেদেরকে সম্বোধন করে বললেনঃ যাও, তোমরা তোমাদের সাথিকে দাফন করো। অপর এক রিওয়ায়াতে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মদীনায় বহু জীন আছে। তাদের অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করেছে। সুতরাং যদি তোমরা তাদের কোন একটিকে ঘরের মধ্যে দেখতে পাও, তখন তিনদিন যাবৎ ঘর ছেড়ে চলে যেতে নির্দেশ দাও। আর এরপরও যদি দেখতে পাও, তাকে বধ করে ফেলো। কেননা তা শয়তান।
(মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَحِلُّ أَكْلُهُ وَمَا يَحْرُمُ
وَعَن أبي السَّائِب قَالَ: دَخَلْنَا عَلَى أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ فَبَيْنَمَا نحنُ جلوسٌ إِذ سمعنَا تَحت سَرِيره فَنَظَرْنَا فَإِذَا فِيهِ حَيَّةٌ فَوَثَبْتُ لِأَقْتُلَهَا وَأَبُو سَعِيدٍ يُصَلِّي فَأَشَارَ إِلَيَّ أَنِ اجْلِسْ فَجَلَسْتُ فَلَمَّا انْصَرَفَ أَشَارَ إِلَى بَيْتٍ فِي الدَّارِ فَقَالَ: أَتَرَى هَذَا البيتَ؟ فَقلت: نعم فَقَالَ: كَانَ فِيهِ فَتًى مِنَّا حَدِيثُ عَهْدٍ بِعُرْسٍ قَالَ: فَخَرَجْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى الْخَنْدَقِ فَكَانَ ذَلِكَ الْفَتَى يَسْتَأْذِنُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِأَنْصَافِ النَّهَارِ فَيَرْجِعُ إِلَى أَهْلِهِ فَاسْتَأْذَنَهُ يَوْمًا فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «خُذْ عَلَيْكَ سِلَاحَكَ فَإِنِّي أَخْشَى عَلَيْكَ قُرَيْظَةَ» . فَأَخَذَ الرَّجُلُ سِلَاحَهُ ثُمَّ رَجَعَ فَإِذَا امْرَأَتُهُ بَيْنَ الْبَابَيْنِ قَائِمَةٌ فَأَهْوَى إِلَيْهَا بِالرُّمْحِ لِيَطْعَنَهَا بِهِ وَأَصَابَتْهُ غَيْرَةٌ فَقَالَتْ لَهُ: اكْفُفْ عَلَيْكَ رُمْحَكَ وَادْخُلِ الْبَيْتَ حَتَّى تَنْظُرَ مَا الَّذِي أَخْرَجَنِي فَدَخَلَ فَإِذَا بِحَيَّةٍ عَظِيمَةٍ مُنْطَوِيَةٍ عَلَى الْفِرَاشِ فَأَهْوَى إِلَيْهَا بِالرُّمْحِ فَانْتَظَمَهَا بِهِ ثُمَّ خَرَجَ فَرَكَزَهُ فِي الدَّارِ فَاضْطَرَبَتْ عَلَيْهِ فَمَا يُدْرَى أَيُّهُمَا كَانَ أَسْرَعَ مَوْتًا: الْحَيَّةُ أَمِ الْفَتَى؟ قَالَ: فَجِئْنَا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَذَكَرْنَا ذَلِكَ لَهُ وَقُلْنَا: ادْعُ اللَّهَ يُحْيِيهِ لَنَا فَقَالَ: «اسْتَغْفِرُوا لِصَاحِبِكُمْ» ثُمَّ قَالَ: «إِنَّ لِهَذِهِ الْبُيُوتِ عَوَامِرَ فَإِذَا رأيتُم مِنْهَا شَيْئا فحرِّجوا عَلَيْهَا ثَلَاثًا فإنْ ذَهَبَ وَإِلَّا فَاقْتُلُوهُ فَإِنَّهُ كَافِرٌ» . وَقَالَ لَهُمْ: «اذْهَبُوا فَادْفِنُوا صَاحِبَكُمْ» وَفِي رِوَايَةٍ قَالَ: «إِنَّ بالمدينةِ جِنَّاً قد أَسْلمُوا فَإِذا رأيتُم مِنْهُم شَيْئًا فَآذِنُوهُ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ فَإِنْ بَدَا لَكُمْ بَعْدَ ذَلِكَ فَاقْتُلُوهُ فَإِنَّمَا هُوَ شَيْطَانٌ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা তিনদিন ঘোষণা দাও, এরপর যদি আত্মপ্রকাশ করে তবে হত্যা করে ফেল। ‘উলামাগণ বলেছেন, যখন তিনদিন সতর্ক করার পরে না যাবে তখন মানতে হবে যে, তারা বাড়ীতে অবস্থানকারী জীন নয়। আর জীনদের মধ্য যারা ইসলাম কবুল করেছে তারাও নয়। বরং আত্মপ্রকাশকারী সাপটি শয়তান। সুতরাং সাপ হত্যা করতে আর কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। মুসলিম জীন এবং বাড়ীতে অবস্থানকারী জীন যে সুবিধা পাবে উক্ত সাপের জন্য তা আর থাকবে না। (শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২২৩৬/১৩৯)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১১৯-[১৬] উম্মু শরীক (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গিরগিটি মেরে ফেলার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেনঃ এটা ইব্রা-হীম (আ.)-এর বিরুদ্ধে আগুনে ফুঁক দিয়েছিল। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَحِلُّ أَكْلُهُ وَمَا يَحْرُمُ
وَعَن أم شريك: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَرَ بِقَتْلِ الْوَزَغِ وَقَالَ: «كَانَ يَنْفُخُ عَلَى إِبْرَاهِيم»
ব্যাখ্যাঃ অপর বর্ণনায় রয়েছে, যে ব্যক্তি প্রথম প্রহারেই গিরগিটি হত্যা করবে তার জন্য ১০০ নেকী তার ‘আমলনামায় লিখা হবে। দ্বিতীয় প্রহারে মারলে তার থেকে কম নেকী পাবে আর তৃতীয় প্রহারে মারলে দ্বিতীয় প্রহারে মারার থেকে কম নেকী পাবে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে প্রথম প্রহারে মারলে ৭০ নেকী পাবে। ‘উলামাগণ এ মর্মে একমত যে, গিরগিটি ক্ষতিকারক প্রাণীর অন্তর্ভুক্ত। وَزَغِ শব্দটির বহুবচন হলো أَوْزَاغٌ وَوِزْغَانٌ ইত্যাদি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ প্রাণীর হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং হত্যার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছেন। কারণ তা মারাত্মক ক্ষতিকারক প্রাণী। (শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২২৩৭/১৪২)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১২০-[১৭] সা’দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাঁকলাস মেরে ফেলার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাকে ক্ষুদ্র ফাসিক বলে অভিহিত করেছেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَحِلُّ أَكْلُهُ وَمَا يَحْرُمُ
وَعَنْ سَعْدِ بْنِ أَبِي وَقَّاصٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَرَ بِقَتْلِ الْوَزَغِ وَسَمَّاهُ فُوَيْسِقًا. رَوَاهُ مُسْلِمٌ
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১২১-[১৮] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি গিরগিটিকে প্রথম আঘাতে বধ করবে, তার জন্য (’আমলনামায়) একশত নেকি লিখা হবে। আর দ্বিতীয় আঘাতে মারলে (তার জন্য) তার চাইতে কম এবং তৃতীয় আঘাতে মারলে (তার জন্য) তা অপেক্ষা কম লিখা হবে। (মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَحِلُّ أَكْلُهُ وَمَا يَحْرُمُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ قَتَلَ وَزَغًا فِي أولَّ ضَرْبَة كتبت لَهُ مِائَةُ حَسَنَةٍ وَفِي الثَّانِيَةِ دُونَ ذَلِكَ وَفِي الثَّالِثَة دون ذَلِك» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ ‘আল্লামা ‘ইয্যুদ্দীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ প্রথম প্রহারে গিরগিটি হত্যার সাওয়াবের আধিক্যের কারণ হলো, হতে পারে প্রথম প্রহারে মারলে প্রাণীর প্রতি ইহসান করা হয়, বিধায় সাওয়াব বেশি। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক বস্তুর প্রতি ইহসান ফরয করেছেন, কাজেই যখন তোমরা হত্যা করবে তখন উত্তমরূপে হত্যা করবে। অথবা ভালো কাজ দ্রুত সমাধার জন্যও সাওয়াব বেশি হতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَسَارِعُوا إِلٰى مَغْفِرَةٍ مِّنْ رَبِّكُمْ ‘‘তোমরা কল্যাণে অগ্রগামী হও’’- (সূরাহ্ আ-লি ‘ইমরান ৩ : ১৩৩)। আর এ উভয় কারণই সাপ কিংবা বিচ্ছুর ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারযোগ্য। কারণ উভয় প্রাণীর মধ্যে বিপর্যয়ের আধিক্য রয়েছে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫২৫৪)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১২২-[১৯] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রা (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একদিন কোন একজন নবীকে একটি পিপীলিকা দংশন করেছিল। ফলে তাঁর নির্দেশে পিপীলিকার গোটা বস্তিটাই আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া হলো। তখন আল্লাহ তা’আলা তাঁকে ওয়াহীর মাধ্যমে (প্রশ্নের সুরে) বললেনঃ মাত্র একটি পিপীলিকাই তোমাকে দংশন করেছিল, আর তুমি তাদের এমন একটি সম্প্রদায়কে জ্বালিয়ে দিলে অথচ এরা সর্বক্ষণ আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করছিল। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ مَا يَحِلُّ أَكْلُهُ وَمَا يَحْرُمُ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: قَرَصَتْ نَمْلَةٌ نَبِيًّا من الأنبياءِ فأمرَ بقربةِ النَّمْلِ فَأُحْرِقَتْ فَأَوْحَى اللَّهُ تَعَالَى إِلَيْهِ: أَنْ قَرَصَتْكَ نَمْلَةٌ أَحْرَقْتَ أُمَّةً مِنَ الْأُمَمِ تُسَبِّحُ؟
ব্যাখ্যাঃ ‘আল্লামা নাবাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ অত্র হাদীস এটাই প্রমাণ করে যে, উক্ত নবীর শারী‘আতে পিপীলিকা হত্যা এবং আগুনে পুড়িয়ে শাস্তি দেয়া বৈধ ছিল। কারণ আলোচ্য হাদীসে হত্যা এবং পুড়িয়ে মারার ব্যাপারে কোন অভিযোগ নেই, বরং এক পিপীলিকার অপরাধে একাধিক পিপীলিকার শাস্তি প্রদানের অভিযোগ করা হয়েছে। অন্যদিকে শর্তসাপেক্ষে ক্বিসাস বা প্রতিশোধ ছাড়া কোন প্রাণী আগুনে জ্বালানো আমাদের শারী‘আতে বৈধ নয়।
আর পিপীলিকা (কারণ ছাড়া) হত্যাও বৈধ নয়। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর বর্ণনায় রয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পিপীলিকা ও মৌমাছি মারতে নিষেধ করেছেন। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩০১৯)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১২৩-[২০] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ঘিয়ের মধ্যে ইঁদুর পড়ে গেলে, যদি তা জমাট হয়, তখন ইঁদুর ও তার আশেপাশের ঘি ফেলে দাও। আর যদি তা তরল হয়, তখন তার কাছেও যেও না। (আহমাদ ও আবূ দাঊদ)[1]
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا وَقَعَتِ الْفَأْرَةُ فِي السَّمْنِ فَإِنْ كَانَ جَامِدًا فَأَلْقُوهَا وَمَا حَوْلَهَا وَإِنْ كَانَ مَائِعًا فَلَا تَقْرَبُوهُ» . رَوَاهُ أَحْمد وَأَبُو دَاوُد
হাদীসটি শায হওয়ার কারণ হলো এর সনদে ‘‘মা‘মার’’ নামক বর্ণনাকারী বিশ্বস্ত হলেও মাঝে মাঝে সনদে ও মতনে এলোমেলো করে ফেলতেন। দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ৪/৪০ পৃঃ, হাঃ ১৫৩২।
ব্যাখ্যাঃ ইবনুল ‘আরাবী (রহিমাহুল্লাহ) অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, এটা জমাটবাঁধা ঘি ছিল। তিনি বলেন, যদি এটা তরল জাতীয় হত, তবে শুধু পতিত ইঁদুরের চতুর পাশ থেকে ফেলে দিলে হবে না। কেননা জীবিত ইঁদুর তার ইচ্ছামত পাত্রের চতুর্দিকে ঘুরতে পারে কাজেই তখন তার চতুস্পার্শ্বে সমস্ত ঘি ফেলে দিতে হবে।
আলোচ্য হাদীস থেকে ইবনুল ‘আরাবী (রহিমাহুল্লাহ) দলীল গ্রহণ করেছেন যে, পানি জাতীয় খাদ্যে নাপাকি পড়লে তা পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত নাপাক হবে না। ইমাম বুখারী (রহিমাহুল্লাহ) এ মতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। মালিকী মাযহাবের ইবনু নাফি‘ (রহিমাহুল্লাহ)-এর মত এটাই। ইমাম আহমাদ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত রয়েছে...... ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-কে ঘিতে ইঁদুর পরে মারা যাওয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলো, তিনি বললেন, ইঁদুর ও তার চারপাশ থেকে ঘি ফেলে দিতে হবে। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, এর প্রভাব সমস্ত ঘিতে পড়েনি? তিনি বললেন, যদি ইঁদুর জীবিত থাকত তবে এটা হত, এটাকে যেখানে পেয়েছ সেখানেই মারা গেছে। এ হাদীসের রাবীগণ শক্তিশালী। (‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৮৩৭)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১২৪-[২১] আর দারিমী এ হাদীসটি ইবনু ’আব্বাস হতে বর্ণনা করেছেন।
وَرَوَاهُ الدَّارمِيّ عَن ابْن عَبَّاس
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১২৫-[২২] সাফীনাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে হুবারা-এর মাংস খেয়েছি। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ سَفِينَةَ قَالَ: أَكَلْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَحْمَ حُبَارَى. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ হলো এর সনদে ‘‘বুরায়হ ইবনু সাফিনাহ্ আল হাশিমী’’ নামক একজন বর্ণনাকারী আছেন। যিনি তার পিতার থেকে অনেক মুনকার হাদীস বর্ণনা করেছেন। দেখুন- মিজানুল ই‘তিদাল ৩/২০১ পৃঃ, হাঃ ৬৪২৬। শারহুস্ সুন্নাহ্ ২৮০৮, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ১৯৮৯০, আল মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ৬৩২১।
ব্যাখ্যাঃ আলোচ্য হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, হুবারা বা বন্য পাখির গোশত হালাল। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৮২৮)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১২৬-[২৩] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাল্লালার মাংস খেতে এবং তার দুধ পান করতে নিষেধ করেছেন। (তিরমিযী)[1]
আর আবূ দাঊদ-এর রিওয়ায়াতের মধ্যে আছে, তিনি (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জাল্লালায় সওয়ার হতেও নিষেধ করেছেন।
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ أَكْلِ الْجَلَّالَةِ وَأَلْبَانِهَا. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَفِي رِوَايَةِ أَبِي دَاوُدَ: قَالَ: نُهِيَ عَنْ ركوبِ الْجَلالَة
ব্যাখ্যাঃ (الْجَلَّالَةِ) ‘জাল্লালাহ্’ হলো যে প্রাণী নাপাক খায়, অর্থাৎ মল খায়। আর এটা গরু, ছাগল, উট, ছাড়াও হাঁস, মুরগীসহ অন্যান্য প্রাণী হতে পারে। মল খেক প্রাণীর গোশত ও দুধ খাওয়া যাবে কিনা- এ ব্যাপারে ‘উলামার মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। আসহাবুর্ রায়, ইমাম শাফি‘ঈ, আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রহিমাহুল্লাহ) এটা মাকরূহ বলেছেন। তারা বলেছেন, এ ধরনের প্রাণী কয়েকদিন আটকে না রেখে খাওয়া বৈধ নয়। কয়েকদিন বেঁধে রাখার ফলে গোশত কোন নাপাকীর চিহ্ন না থাকলে তা খাওয়াতে কোন সমস্যা নেই। অবশ্য একটি হাদীসে বর্ণিত রয়েছে, গরু ৪০ দিন আটকে রেখে নাপাকীর আলামত নষ্ট হয়ে গেলে তা খাওয়াতে কোন দোষ নেই। ইবনু ‘উমার (রাঃ) মুরগী তিনদিন আটকে রাখতেন, এরপর তা যাবাহ করতেন। ইসহক বলেনঃ এ ধরনের প্রাণীগুলো উত্তমরূপে গোসল করানোর পর তার গোশত খাওয়াতে কোন দোষের কিছু নেই। হাসান বাসরী (রহিমাহুল্লাহ) মল খেক প্রাণীর গোশত খাওয়াতে কোন দোষ মনে করতেন না। (‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৭৮১)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১২৭-[২৪] ’আবদুর রহমান ইবনু শিবল (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দব্বের মাংস খেতে নিষেধ করেছেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن عبدِ الرَّحمنِ بنِ شِبْلٍ: أَنَّ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ أَكْلِ لَحْمِ الضَّبِّ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১২৮-[২৫] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিড়াল খেতে এবং তার মূল্য ভোগ করতে নিষেধ করেছেন। (আবূ দাঊদ ও তিরমিযী)[1]
وَعَنْ جَابِرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ أَكْلِ الْهِرَّةِ وَأَكْلِ ثَمَنِهَا. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالتِّرْمِذِيُّ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ হলো, এর সনদে ‘‘উমার ইবনু যায়দ’’ নামের বর্ণনাকারী য‘ঈফ। বিস্তারিত দেখুন- সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৬/৪৭০ পৃঃ, ২৯৭১ নং হাদীসের আলোচনা দ্রঃ, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ১৯৮৫৩, আল মু‘জামুল আওসাত্ব ৪৩৭৬, দারাকুত্বনী ৭৯।
ব্যাখ্যাঃ উল্লেখিত হাদীসে প্রমাণিত হয় যে, বিড়াল খাওয়া কিংবা কেনা বেচা করা উভয় হরাম। এ ক্ষেত্রে গৃহপালিত ও বন্য বিড়ালের মাঝে কোন পার্থক্য নেই। (‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৮০৩)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১২৯-[২৬] উক্ত রাবী [জাবির (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বার যুদ্ধের দিন গৃহপালিত গাধা, খচ্চরের মাংস, প্রত্যেক (তীক্ষ্ণ) দাঁতওয়ালা হিংস্র জানোয়ার এবং পাঞ্জাবিশিষ্ট (শিকারি) পাখি খাওয়া হারাম করেছেন। (তিরমিযী, আর তিনি বলেছেনঃ এ হাদীসটি গরীব)[1]
وَعنهُ حَرَّمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَعْنِي يَوْمَ خَيْبَرَ الْحُمُرَ الْإِنْسِيَّةَ وَلُحُومَ الْبِغَالِ وَكُلَّ ذِي نَابٍ مِنَ السِّبَاعِ وَكُلَّ ذِي مِخْلَبٍ مِنَ الطَّيْرِ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيث غَرِيب
ব্যাখ্যাঃ এখানে এ মর্মে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে, খচ্চরের গোশত খাওয়া হারাম আর অধিকাংশ ‘উলামার মত এটাই এবং এটাই যথার্থ। তবে হাসান বাসরী-এর বিপরীত মত দিয়েছেন। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৪র্থ খন্ড, ১৪৭৮)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১৩০-[২৭] খালিদ ইবনু ওয়ালীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোড়া, খচ্চর এবং গাধার মাংস খেতে নিষেধ করেছেন। (আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
وَعَن خالدِ بْنِ الْوَلِيدِ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ أَكْلِ لُحُومِ الْخَيْلِ والبِغالِ والحميرِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ, মূসা ইবনু হারূন (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ হাদীসটির একজন বর্ণনাকারী ‘সালিহ’-কে তার দাদার পরিচয় ছাড়া চেনা যায় না। আর ইনি একজন য‘ঈফ বর্ণনাকারী। আস্ সুনানুস্ সুগরা ৩/১৯৪ পৃঃ, হাঃ ৪২৫১।
ব্যাখ্যাঃ দারাকুত্বনীতে ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত রয়েছে, সেখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোড়ার গোশত খাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ইমাম ত্বহাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) ঘোড়ার গোশত খাওয়া মাকরূহ বলেছেন, তবে তার ছাত্রদ্বয় ইমাম ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহিমাহুমাল্লাহ)-সহ অন্যান্যরা এটাকে জায়িয বলেছেন। তারা ঘোড়ার গোশত হালাল হওয়ার ব্যাপারে মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন। (‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৭৮৫)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১৩১-[২৮] উক্ত রাবী [খালিদ ইবনু ওয়ালীদ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, খায়বার যুদ্ধের দিন আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে শরীক ছিলাম। (এ সময়) ইয়াহূদীরা এসে এ অভিযোগ করল যে, (যুদ্ধরত) লোকেরা তাদের ফলা-ফলাদির প্রতি ঝুঁকে পড়েছে। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করলেন: সাবধান! সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ এমন লোকেদের মাল-সম্পদ ন্যায্য অধিকার ছাড়া হালাল নয়। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْهُ قَالَ: غَزَوْتُ مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ خَيْبَرَ فَأَتَتِ الْيَهُودُ فَشَكَوْا أَنَّ النَّاسَ قَدْ أَسْرَعُوا إِلَى خَضَائِرِهِمْ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَلَا لَا يَحِلُّ أَمْوَالُ المعاهِدينَ إِلاَّ بحقِّها» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ হলো, এর সনদে ‘‘ইয়াহ্ইয়া ইবনু মিকদার’’ নামে একজন য‘ঈফ বারী আছে। তার ব্যাপারে ইমাম বুখারী বলেন, ‘‘ফীহি নাযরুন’’। ‘‘তাকরীবের’’ মধ্যে ইবনু হিব্বান বলেন, লাইয়্যিনুন বা দুর্বল। বিস্তারিত সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ৮/৩৭৩, হাঃ ৩৯০২।
ব্যাখ্যাঃ আবূ দাঊদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ হাদীসটি মানসূখ। ইমাম আহমাদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসটি মুনকার। ইমাম নাসায়ী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ আলোচ্য হাদীসের পূর্ববর্তী হাদীস অর্থাৎ জাবির (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসটি অধিক বিশুদ্ধ। তাছাড়া এ হাদীস যদি সহীহও হয়ে থাকে তারপরও তা মানসুখ। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোড়ার গোশত খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন আর এ মর্মে দলীলও রয়েছে।
দারাকুত্বনী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসটির সানাদ মুযত্বারাব। ‘আল্লামা ওয়াকিদী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ এ হাদীসটি সহীহ নয়। কারণ খালিদ মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম কবুল করেছেন। ইমাম বুখারী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ খালিদ খায়বারে উপস্থিত ছিলেন না। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ খালিদ খায়বারের উপস্থিত ছিলেন না, কারণ তিনি মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম গ্রহণ করেছেন। (‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৮০২)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১৩২-[২৯] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দু’ প্রকারের মৃত এবং দু’ প্রকারের রক্ত আমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে। সে মৃত দু’টি হলো, মাছ ও টিড্ডি। আর দু’ প্রকারের রক্ত হলো যকৃৎ ও প্লীহা। (আহমাদ, ইবনু মাজাহ ও দারাকুত্বনী)[1]
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أُحِلَّتْ لَنَا مَيْتَتَانِ وَدَمَانِ: الْمَيْتَتَانِ: الْحُوتُ وَالْجَرَادُ وَالدَّمَانِ: الْكَبِدُ وَالطِّحَالُ . رَوَاهُ أحمدُ وابنُ مَاجَه وَالدَّارَقُطْنِيّ
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১৩৩-[৩০] আবুয্ যুবায়র (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি জাবির (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (জাবির) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে মাছ সমুদ্র তীরের দিকে ফেলে দেয় এবং তা হতে (ভাটার সময়) পানি সরে যায়, তা তোমরা খাবে। আর যে মাছ পানিতে মরে ভেসে উঠে তা খেও না। (আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ)[1]
ইমাম মুহয়িইউস্ সুন্নাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ অধিকাংশের মতে এ হাদীসটি জাবির (রাঃ) হতে মাওকূফ হিসেবে বর্ণিত।
وَعَن أبي الزُّبيرِ عَنْ جَابِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «مَا ألقاهُ البحرُ وجزر عَنْهُ الْمَاءُ فَكُلُوهُ وَمَا مَاتَ فِيهِ وَطَفَا فَلَا تَأْكُلُوهُ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ
وَقَالَ مُحْيِي السُّنَّةِ: الْأَكْثَرُونَ عَلَى أَنَّهُ مَوْقُوفٌ على جَابر
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ হলো, এর সনদে একজন বর্ণনাকারী আছেন যার নাম ‘‘ইয়াহ্ইয়া ইবনু সুলায়ম আত্ব ত্বয়িফী’’। ইমাম বায়হাক্বী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, ইয়াহ্ইয়া ইবনু সুলায়ম আত্ব ত্বয়িফী প্রচুর ভুলকারী রাবী এবং তাঁর স্মৃতিশক্তি খারাপ।
ব্যাখ্যাঃ যারা মরে পানির উপরে ভেসে ওঠা মাছ খাওয়া মাকরূহ মনে করেন তারা এ হাদীস দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন। খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ মরার পর পানিতে ভেসে ওঠা মাছ খাওয়া বৈধ। আর এটা আবূ বকর ও আবূ আইয়ূব আল আনসারী -সহ একাধিক সহাবায়ে কিরামগণ থেকে প্রমাণিত।
‘আওনুল মা‘বূদ গ্রন্থকার বলেনঃ মরার পর পানিতে ভেসে ওঠা মাছ খাওয়া যে বৈধ এটা প্রমাণ করবে জাবির কর্তৃক বর্ণিত হাদীস, তিনি [জাবির (রাঃ)] বলেন, আমরা ‘‘জায়শুল খায়ত’’ নামক যুদ্ধে ছিলাম আর আমাদের নেতা ছিল আবূ ‘উবায়দাহ্ (রাঃ)। অতঃপর আমরা চরমভাবে ক্ষুধার্ত হয়ে পড়লাম। সে পরিস্থিতিতে সমুদ্র একটি মরা মাছ কিনারায় ফেলে দিলো। আমরা এমন মাছ ইতোপূর্বে কখনও দেখিনি, যাকে ‘আম্বার বলা হয়ে থাকে। আমরা এ মাছ থেকে অর্ধ মাস যাবৎ খেয়েছি, অতঃপর যখন আমরা মদীনায় ফিরলাম, অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পূর্ণ ঘটনা ব্যক্ত করলাম। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আল্লাহ তোমাদের জন্য যে রিজিক বের করে দিয়েছেন তা তোমরা খাও এবং যদি তোমাদের কাছে কিছু থেকে থাকে তাহলে আমাদেরকেও খাওয়াও। অতঃপর তাদের কেউ উক্ত মাছ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দিল এবং তিনি তা খেয়ে নিলেন- (বুখারী ও মুসলিম)।
আলোচ্য হাদীস প্রমাণ করে যে, সমুদ্রের মরা মাছ চাই তা পানিতে ডুবে মারা যাক অথবা শিকারীর কারণে মারা যাক উভয় অবস্থাতেই তা খাওয়া বৈধ। (‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৮১১)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১৩৪-[৩১] সালমান (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে টিড্ডি (খাওয়া) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো। তিনি বললেনঃ আল্লাহর এমন বহু সৃষ্টজীব জাতি আছে, যা আমি খাইও না এবং হারামও বলি না। (আবূ দাঊদ)[1]
ইমাম মুহয়িইউস্ সুন্নাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ এ হাদীসটি দুর্বল।
وَعَن سلمَان قَالَ: سُئِلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ الْجَرَادِ فَقَالَ: «أَكْثَرُ جُنُودِ اللَّهِ لَا آكُلُهُ وَلَا أُحَرِّمُهُ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدُ وَقَالَ محيي السّنة: ضَعِيف
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ হলো এর সানাদটি মুরসাল। ‘‘সুলায়মান আত্ তামীমী’’ মুরসাল বর্ণনাকারী। বিস্তারিত দেখুন- সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ৪/৪২-৪৩ পৃঃ, হাঃ১৫৩৩।
ব্যাখ্যাঃ উল্লেখিত হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম টিড্ডি খাওয়া থেকে বিরত থাকতেন, যেমন তিনি দব্ব খাওয়া থেকে নিজেকে বিরত রেখেছেন। তারপরও হাদীসটি মুরসাল। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৩৮০৯)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১৩৫-[৩২] যায়দ ইবনু খালিদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মোরগকে গালি দিতে নিষেধ করেছেন এবং বলেছেন, তা সালাতের জন্য আযান দেয়। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
وَعَن زيدِ بن خالدٍ قَالَ: نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ سَبِّ الدِّيكِ وَقَالَ: «إِنَّهُ يُؤَذِّنُ للصَّلاةِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১৩৬-[৩৩] উক্ত রাবী [যায়দ ইবনু খালিদ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা মোরগকে গালি দিয়ো না। কেননা তা সালাতের জন্য সজাগ (আহবান) করে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تَسُبُّوا الدِّيكَ فَإِنَّهُ يُوقِظُ للصلاةِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১৩৭-[৩৪] ’আবদুর রহমান ইবনু আবূ লায়লা (রহিমাহুল্লাহ) আবূ লায়লা হতে বর্ণনা করেছেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যদি তোমাদের গৃহে সাপ দেখা যায়, তখন তাকে লক্ষ্য করে বলো, আমরা তোমাকে নূহ (আ.)এবং সুলায়মান ইবনু দাঊদ (আ.)-এর সাথে কৃত অঙ্গীকারের প্রেক্ষিতে বলছি, আমাদেরকে কষ্ট দেবে না। কিন্তু যদি এর পরেও ফিরে আসে, তখন তাকে মেরে ফেলব।
(তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِي لَيْلَى قَالَ: قَالَ أَبُو لَيْلَى: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِذَا ظَهَرَتِ الْحَيَّةُ فِي الْمَسْكَنِ فَقُولُوا لَهَا: إِنَّا نَسْأَلُكِ بِعَهْدِ نُوحٍ وَبِعَهْدِ سُلَيْمَانَ بْنِ دَاوُدَ أَنْ لَا تُؤْذِينَا فَإِنْ عَادَتْ فَاقْتُلُوهَا . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ
হাদীস য‘ঈফ হওয়ার কারণ হলো হাদীসটির সনদে ‘‘ইবনু আবূ লায়লা’’ নামক একজন য‘ঈফ বারী আছেন। দেখুন- য‘ঈফাহ্ ৪/১৭, হাঃ ১৫০৮।
ব্যাখ্যাঃ এখানে নূহ (আ.)-এর প্রতি অঙ্গীকার বলতে সম্ভবত যখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার তৈরি নৌকায় সকল জাতের প্রাণী উঠাচ্ছিলেন তখন সাপকে বলেছিলেন (لَا تُؤْذِينَا) অর্থাৎ আমাদের কোন কষ্ট দিও না। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৪৮৫)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১৩৮-[৩৫] ’ইকরামাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমার দৃঢ় বিশ্বাস তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি (রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাপ মেরে ফেলার জন্য নির্দেশ দিতেন। তিনি আরো বলেছেনঃ প্রতিশোধ গ্রহণের ভয়ে যে ব্যক্তি তাদেরকে ছেড়ে দেয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
وَعَن عكرمةَ عَن ابنِ عبَّاسٍ قَالَ: لَا أَعْلَمُهُ إِلَّا رَفَعَ الْحَدِيثَ: أَنَّهُ كَانَ يَأْمُرُ بِقَتْلِ الْحَيَّاتِ وَقَالَ: «مَنْ تَرَكَهُنَّ خَشْيَةَ ثَائِرٍ فَلَيْسَ مِنَّا» . رَوَاهُ فِي شَرْحِ السّنة
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১৩৯-[৩৬] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন হতে আমরা তাদের (সাপের) সঙ্গে লড়াই করা আরম্ভ করেছি, তখন হতে আমরা আর কখনও তাদের সাথে আপোষ করিনি। তখন যে ব্যক্তি ভয়ে তাদেরকে ছেড়ে দেয়, সে আমাদের দলের অন্তরভুক্ত নয়। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا سَالَمْنَاهُمْ مُنْذُ حَارَبْنَاهُمْ وَمَنْ تَرَكَ شَيْئًا مِنْهُمْ خِيفَةً فَلَيْسَ منَّا» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যাঃ অর্থাৎ যেদিন থেকে আমাদের ও তাদের (সাপের) মাঝে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। কারণ সাপ এবং মানুষের মাঝে শত্রুতা ও যুদ্ধ অনেক কঠিন। কেননা উভয়ই একে অপরকে হত্যা করার সুযোগ সন্ধানে থাকে। কেউ কেউ বলেন, আদম এবং সাপের মাঝের শত্রুতার ব্যাপারে যা বলা যায়, তা হলো ইবলীস জান্নাতে প্রবেশ করতে চাইলে জান্নাতের প্রহরী তাকে বাধা দেয়। সাপ তাকে মুখে বহন করে জান্নাতে প্রবেশ করায় এবং সে (ইবলীস) আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.)-কে নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়াতে প্ররোচিত করে। অতঃপর তাদের দু’জনকেই জান্নাত থেকে বের করে দেয়। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫২৩৯)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১৪০-[৩৭] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা সমস্ত সাপ মেরে ফেলো। যে ব্যক্তি তাদের পক্ষ হতে প্রতিশোধ গ্রহণের আশঙ্কা রাখে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়। (আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
وَعَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اقْتُلُوا الْحَيَّاتِ كُلَّهُنَّ فَمَنْ خَافَ ثَأْرَهُنَّ فَلَيْسَ مِنِّي» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১৪১-[৩৮] ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি জিজ্ঞেস করলেন : হে আল্লাহর রসূল! আমরা যম্যম্ কূপটি পরিষ্কার করতে ইচ্ছা পোষণ করি। কিন্তু তার মধ্যে জিন্নান (ছোট ছোট সাপ) আছে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেগুলোকে মেরে ফেলার জন্য নির্দেশ দিলেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن العبَّاسِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّا نُرِيدُ أَنْ نَكْنُسَ زَمْزَمَ وَإِنَّ فِيهَا مِنْ هَذِهِ الْجِنَّانِ يَعْنِي الْحَيَّاتِ الصِّغَارِ فَأَمَرَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِقَتْلِهِنَّ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১৪২-[৩৯] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রূপার চুড়ির ন্যায় সাদা বর্ণের ছোট ছোট সাপ ব্যতীত অন্যান্য সকল সাপ মেরে ফেলো। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسلم قَالَ: «اقْتُلُوا الْحَيَّاتِ كُلَّهَا إِلَّا الْجَانَّ الْأَبْيَضَ الَّذِي كَأَنَّهُ قضيب فضَّة» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১৪৩-[৪০] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন তোমাদের কারো খাদ্যপাত্রে মাছি পড়ে, তখন গোটা মাছিটাকে তাতে ডুবিয়ে দেবে। কেননা তার উভয় ডানার এক ডানায় থাকে রোগ জীবাণু এবং অপরটিতে থাকে নিরাময়। আর মাছি প্রথমে রোগ জীবাণুর ডানাটি ডুবায়। সুতরাং গোটা মাছিটি ডুবিয়ে দেবে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا وَقَعَ الذُّبَابُ فِي إِنَاءِ أَحَدِكُمْ فَامْقُلُوهُ فَإِنَّ فِي أَحَدِ جَنَاحَيْهِ دَاءً وَفِي الْآخَرِ شِفَاءً فَإِنَّهُ يَتَّقِي بِجَنَاحِهِ الَّذِي فِيهِ الدَّاءُ فَلْيَغْمِسْهُ كُلَّهُ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১৪৪-[৪১] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ খাদ্যের মধ্যে মাছি পড়লে গোটা মাছিটিকে তার মধ্যে ভালোভাবে ডুবিয়ে পরে তাকে ফেলে দেবে। কেননা মাছির এক ডানায় থাকে বিষ আর অপরটিতে নিরাময়। মাছি (স্বভাবজাত) আগে বিষ প্রয়োগ করে এবং নিরাময়কে সরিয়ে রাখে। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِذَا وَقَعَ الذُّبَابُ فِي الطَّعَامِ فَامْقُلُوهُ فَإِنَّ فِي أَحَدِ جَنَاحَيْهِ سُمًّا وَفِي الْآخَرِ شِفَاءً وَإِنَّهُ يُقَدِّمُ السَّمَّ وَيُؤَخِّرُ الشِّفَاءَ» . رَوَاهُ فِي شرح السّنة
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১৪৫-[৪২] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চার প্রকারের জীবকে বধ করতে নিষেধ করেছেন। পিপীলিকা, মৌমাছি, হুদহুদ ও সুরাদ। (আবূ দাঊদ ও দারিমী)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ قَتْلِ أَرْبَعٍ مِنَ الدَّوَابِّ: النَّمْلَةِ وَالنَّحْلَةِ وَالْهُدْهُدُ وَالصُّرَدُ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالدَّارِمِيُّ
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১৪৬-[৪৩] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মূর্খতার যুগের লোকেরা কোন কোন জিনিস খেতো, আবার কোন কোন জিনিসকে ঘৃণাবশতঃ বর্জন করত। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা স্বীয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে পাঠালেন এবং অবতীর্ণ করলেন নিজের কিতাব (আল কুরআন)। তাতে তিনি হালালকে হালাল এবং হারামকে হারাম বলে ঘোষণা দিলেন। সুতরাং তিনি যা হালাল বলেছেন তা-ই হালাল আর তিনি যা হারাম করেছেন তা-ই হারাম। আর যে বস্তুতে নীরব রয়েছেন তা মার্জনীয়। এ বলে তিনি তিলাওয়াত করলেন- ’’বলে দিন, আমার নিকট যা কিছু ওয়াহী করা হয়েছে তাতে লোকে যা আহার করে তার মধ্যে আমি কিছুই নিষিদ্ধ পাইনি; মৃত, প্রবহমান রক্ত ও শূকরের মাংস ব্যতীত’’- (সূরাহ্ আল আন্’আম ৬ : ১৪৫)। (আবূ দাঊদ)[1]
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: كَانَ أَهْلُ الْجَاهِلِيَّةِ يَأْكُلُونَ أَشْيَاءَ وَيَتْرُكُونَ أَشْيَاءَ تَقَذُّرًا فَبَعَثَ اللَّهُ نَبِيَّهُ وَأَنْزَلَ كِتَابَهُ وَأَحَلَّ حَلَالَهُ وَحَرَّمَ حَرَامَهُ فَمَا أَحَلَّ فَهُوَ حَلَالٌ وَمَا حَرَّمَ فَهُوَ حَرَامٌ وَمَا سَكَتَ عَنْهُ فهوَ عفْوٌ وتَلا (قُلْ لَا أَجِدُ فِيمَا أُوحِيَ إِلَيَّ مُحَرَّمًا عَلَى طَاعِمٍ يَطْعَمُهُ إِلَّا أَنْ يَكُونَ مَيْتَةً أَو دَمًا)
رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১৪৭-[৪৪] যাহিরুল আসলামী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি হাঁড়িতে গাধার মাংস জ্বাল দিচ্ছিলাম, সে সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘোষক ঘোষণা করছিলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদেরকে গাধার মাংস খেতে নিষেধ করেছেন। (বুখারী)[1]
وَعَن زاهرٍ الأسلميِّ قَالَ: إِنِّي لَأُوقِدُ تَحْتَ الْقُدُورِ بِلُحُومِ الْحُمُرِ إِذْ نَادَى مُنَادِي رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَنْهَاكُمْ عَنْ لُحُومِ الْحُمُرِ. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ উপরোল্লিখিত ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল খায়বারের যুদ্ধে। কেননা গৃহপালিত গাধার গোশত খাওয়ার নিষেধাজ্ঞাটা হুদায়বিয়ার দিনে সংঘটিত হয়নি, বরং তা খায়বারে হয়েছে। তা ছাড়া এটা হুদায়বিয়ায় হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। তবে ইমাম বুখারী (রহিমাহুল্লাহ) হাদীসে হুদায়বিয়ার প্রসঙ্গে যা উল্লেখ করেছেন وكان ممن شهد الشجرة অর্থাৎ হুদায়বিয়ার (গাছের নিকট) উপস্থিত ছিলেন। এ কথাটি ঘোষকের ঘোষণা দেয়ার জায়গার সাথে বৈপরীত্যপূর্ণ নয়। কারণ যারা হুদায়বিয়ার বায়‘আতে উপস্থিত ছিলেন তাদের অধিকাংশ সাহাবী রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে খায়বারেও উপস্থিত ছিলেন। (ফাতহুল বারী ৭ম খন্ড, হাঃ ৪১৭৩)
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - যেসব প্রাণী খাওয়া হালাল ও হারাম
৪১৪৮-[৪৫] আবূ সা’লাবাহ্ আল খুশানী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি মারফূ’ সূত্রে (রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে) বর্ণনা করেছেন : জীন জাতি তিন প্রকার। একপ্রকার জিনের ডানা আছে, তারা শূন্যে উড়ে বেড়ায়। দ্বিতীয় প্রকারের জীন সাপ ও কুকুরের আকৃতি ধারণ করে। আর তৃতীয় প্রকারের জীন কোন এক নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করে এবং তথা হতে অন্যত্র চলেও যায়। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
وَعَن أبي ثعلبةَ الخُشَنيَّ يَرْفَعُهُ: «الْجِنُّ ثَلَاثَةُ أَصْنَافٍ صِنْفٌ لَهُمْ أَجْنِحَةٌ يَطِيرُونَ فِي الْهَوَاءِ وَصِنْفٌ حَيَّاتٌ وَكِلَابٌ وَصِنْفٌ يُحلُّونَ ويظعنونَ» . رَوَاهُ فِي شرح السنَّة
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - ‘আক্বীকার বর্ণনা
৪১৪৯-[১] সালমান ইবনু ’আমির আয্ দব্বী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, শিশুর জন্মের সাথে ’আক্বীকাহ্ (অঙ্গাঅঙ্গিভাবে) জড়িত। সুতরাং তার পক্ষ হতে তোমরা রক্ত প্রবাহিত (যাবাহ) করো। আর তার শরীর হতে কষ্ট দূর করে দাও (মাথার চুল কামিয়ে দাও)। (বুখারী)[1]
بَابُ الْعَقِيْقَةِ
عَن سلمانَ بن عامرٍ الضَّبي قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَعَ الْغُلَامِ عَقِيقَةٌ فَأَهْرِيقُوا عَنْهُ دَمًا وأمِيطوا عَنهُ الْأَذَى» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যাঃ হাফিয শাসসুদ্দীন ইবনুল কইয়্যূম (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ যারা বলেন, ‘আক্বীকার ক্ষেত্রে ছেলে মেয়ে উভয়ই সমান। একে অপরের ওপর কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই। আর ছেলে মেয়ে উভয়ের জন্য একটি করে দুম্বা বা ছাগল দ্বারা ‘আক্বীকাহ্ দিতে হবে। তারা আলোচ্য হাদীস থেকে দলীল গ্রহণ করেছেন। অন্যদিকে অধিকাংশ ‘উলামা উম্মু কুরয (রাঃ) বর্ণিত হাদীস ও ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বর্ণিত হাদীস দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন। তাদের বর্ণিত হাদীসে রয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে ছেলে সন্তানের জন্য দু’টি এবং মেয়ে সন্তানের জন্য একটি করে দুম্বা বা ছাগল যাবাহ করার নির্দেশ দিয়েছেন। হাদীসটি বর্ণনা করেছেন তিরমিযী এবং তিনি হাদীসকে হাসান সহীহ বলেছেন। আহমাদে অনুরূপ শব্দে বর্ণিত রয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে কন্যা শিশুর জন্য একটি ও ছেলে শিশুর জন্য দু’টি ছাগল দ্বারা ‘আক্বীকাহ্ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আর অনুরূপ শব্দে ইবনু মাজাহতে বর্ণিত রয়েছে।
জামহূর ‘উলামা বলেছেন, আমরা শারী‘আতে দেখতে পাই যে, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ, সাক্ষী, দীন ও গোলাম আযাদের ব্যাপারে পুরুষের তুলনায় নারীরা অর্ধেক পেয়ে থাকে যেমন আহমাদ ও আবূ দাঊদে বর্ণিত রয়েছে, আবূ উমামাহ্ (রাঃ)-সহ অন্যান্য সাহাবীগণ বর্ণনা করেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, কোন পুরুষ যদি কোন মুসলিম পুরুষকে মুক্ত করে তবে সেও জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। প্রতিটি অঙ্গের বিনিময়ে প্রতিটি অঙ্গ মুক্ত হবে জাহান্নাম থেকে। অন্যদিকে কোন মুসলিম দু’জন মহিলাকে মুক্ত করলে সেও জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে প্রতি দু’টি অঙ্গের বিনিময়ে একটি করে অঙ্গ জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। সুতরাং ‘আক্বীকার হুকুমটাও অনুরূপ হবে এবং নাস বা শার‘ঈ পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য এটারই চাহিদা রাখে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৮৩৬)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - ‘আক্বীকার বর্ণনা
৪১৫০-[২] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে নবজাতক শিশুদেরকে আনা হত, তিনি তাদের কল্যাণের জন্য দু’আ করতেন এবং তাদেরকে তাহ্নিক করতেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْعَقِيْقَةِ
وَعَنْ عَائِشَةَ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يُؤْتَى بِالصِّبْيَانِ فَيُبَرِّكُ عَلَيْهِمْ وَيُحَنِّكُهُمْ. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যাঃ উল্লেখিত হাদীসটি নবজাতক শিশুকে তাহনিক করা সুন্নাত হওয়ার উপর প্রমাণ বহন করে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৫০৯৭)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - ‘আক্বীকার বর্ণনা
৪১৫১-[৩] আসমা বিনতু আবূ বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, তিনি মক্কাতেই ’আবদুল্লাহ ইবনুয্ যুবায়রকে গর্ভে ধারণ করেন। তিনি আরো বলেন, ক্বুবা অবস্থানকালেই তিনি ভূমিষ্ঠ হন। অতঃপর আমি তাকে নিয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে এসে তার কোলে তুলে দিলাম। তিনি খেজুর চেয়ে নিলেন এবং তা চিবিয়ে তার (বাচ্চাটির) মুখে রাখলেন এবং তার তালুতে লাগালেন। অতঃপর তার জন্য বারাকাতের দু’আ করলেন, (মদীনায়) মুসলিমদের মধ্যে সে-ই প্রথম জন্মগ্রহণকারী শিশু। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْعَقِيْقَةِ
وَعَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِي بَكْرٍ أَنَّهَا حَمَلَتْ بِعَبْدِ اللَّهِ بْنِ الزُّبَيْرِ بِمَكَّةَ قَالَتْ: فَوَلَدْتُ بِقُبَاءَ ثُمَّ أَتَيْتُ بِهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَوَضَعْتُهُ فِي حِجْرِهِ ثُمَّ دَعَا بِتَمْرَةٍ فَمَضَغَهَا ثُمَّ تَفَلَ فِي فِيهِ ثُمَّ حَنَّكَهُ ثُمَّ دَعَا لَهُ وبرك عَلَيْهِ فَكَانَ أَوَّلَ مَوْلُودٍ وُلِدَ فِي الْإِسْلَامِ
ব্যাখ্যাঃ মদীনায় হিজরতের পর মুহাজিরদের মধ্যে ইসলামের প্রথম নবজাতক সন্তান হলো, ‘আবদুল্লাহ ইবনু যুবায়র (রাঃ) এবং আনসারদের মধ্যে হিজরতের পর প্রথম নবজাতক শিশু হলো নু‘মান ইবনু বাশির আল আনসারী (রাঃ), তিনি ‘আবদুল্লাহ ইবনুয্ যুবায়র (রাঃ)-এর জন্মের পূর্বে জন্মগ্রহণ করেছেন। (শারহুন নাবাবী ১৪শ খন্ড, হাঃ ২১৪৬/২৬)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ‘আক্বীকার বর্ণনা
৪১৫২-[৪] উম্মু কুর্য (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেনঃ তোমরা পাখিকে তার বাসায় অবস্থান করতে দাও। উম্মু কুর্য বলেন, আমি তাঁকে এমনও বলতে শুনেছি যে, ছেলের পক্ষ হতে দু’টি বকরী এবং মেয়ের পক্ষ হতে একটি বকরী দিতে হয় এবং সেগুলো ছাগ বা ছাগী হওয়ার মধ্যে কোন দোষ নেই। (আবূ দাঊদ, তিরমিযী)[1]
আর নাসায়ী ’’ছেলের পক্ষ থেকে দু’টি ছাগল’’- এ শব্দাবলীতে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং তিরমিযী হাদীসটি সহীহ বলেছেন।
عَن أُمِّ كُرْزٍ قَالَتْ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «أَقِرُّوا الطَّيْرَ عَلَى مَكِنَاتِهَا» . قَالَتْ: وَسَمِعْتُهُ يَقُولُ: «عَنِ الْغُلَامِ شَاتَانِ وَعَنِ الْجَارِيَةِ شَاةٌ وَلَا يَضُرُّكُمْ ذُكْرَانًا كُنَّ أَوْ إِنَاثًا» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وللترمذي وَالنَّسَائِيّ من قَوْله: يَقُول: «عَن الْغُلَام» إِلَّا آخِره وَقَالَ التِّرْمِذِيّ: هَذَا صَحِيح
ব্যাখ্যাঃ জাহিলী জামানার কোন লোক যখন কোন প্রয়োজনে বাহিরে যাওয়ার ইচ্ছা করত তখন পাখির কাছে যেয়ে তাকে তাড়িয়ে দিত, যদি পাখিটি ডানদিকে উড়ে যেত তাহলে ব্যক্তি তার প্রয়োজনে বেড়িয়ে পরতো, আর যদি পাখিটি বাম দিকে উড়াল দিত তাহলে সে বাড়ীতে ফিরে যেত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা নিষেধ করে বলেছেন, তোমরা তাকে তাড়িয়ে দিও না তাকে তার নিজ স্থানে থাকতে দাও। কারণ পাখি কোন ক্ষতি কিংবা উপকার কিছুই করতে পারে না। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৮৩২)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ‘আক্বীকার বর্ণনা
৪১৫৩-[৫] হাসান বাসরী (রহিমাহুল্লাহ) সামুরাহ্ ইবনু জুনদুব হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শিশু ’আক্বীকার সাথে জড়িত থাকে। জন্মের সপ্তম দিন তার পক্ষ হতে পশু যাবাহ করবে এবং তার নাম রাখবে, তার মাথা মুড়াবে। (আহমাদ, তিরমিযী)[1]
তবে আবূ দাঊদ ও নাসায়ী’র রিওয়ায়াত مُرْتَهِنٌ ’’মুরতাহানুন’’-এর পরিবর্তে رَهِينَةٌ ’’রহীনাতুন’’ উল্লেখ রয়েছে। আর আহমাদ ও আবূ দাঊদ-এর রিওয়ায়াতে يُسَمّٰى ’’ইউসাম্মা-’’ (নাম রাখবে)-এর স্থলে يُدْمٰى ’’ইউদ্মা-’’ বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু আবূ দাঊদ বলেনঃ يُسَمّٰى ’’ইউসাম্মা-’’ শব্দটি অধিক সহীহ।
وَعَن الحسنِ عَن سَمُرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْغُلَامُ مُرْتَهَنٌ بِعَقِيقَتِهِ تُذْبَحُ عَنْهُ يَوْمَ السَّابِعِ وَيُسَمَّى وَيُحْلَقُ رَأْسُهُ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ لَكِنْ فِي رِوَايَتِهِمَا «رَهِينَةٌ» بدل «مرتهنٌ» وَفِي رِوَايَة لِأَحْمَد وَأبي دَاوُد: «وَيُدْمَى» مَكَانَ: «وَيُسَمَّى» وَقَالَ أَبُو دَاوُدَ: «وَيُسَمَّى» أصحُّ
ব্যাখ্যাঃ উল্লেখিত হাদীসে এ মর্মে দলীল রয়েছে যে, নবজাতকের ‘আক্বীকাহ্ সপ্তম দিনেই করতে হবে, এর আগে কিংবা পরে কোনটাই শারী‘আতসম্মত নয়। তবে কোন কোন ‘উলামা বলেন যে, দ্বিতীয় সপ্তম কিংবা তৃতীয় সপ্তম দিনে দিলেও যথেষ্ট হবে। বায়হাক্বীতে ‘আবদুল্লাহ ইবনু বুরয়দাহ্ কর্তৃক তার বাবা থেকে বর্ণিত রয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আক্বীকাহ্ যাবাহ করতে হবে সপ্তম দিনে, ১৪ দিনে এবং ২১ দিনে। সুবুলুস্ সালামে তা উল্লেখ রয়েছে।
ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বিদ্বানগণ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, বিদ্বানগণ বলেছেনঃ সপ্তম দিনে ‘আক্বীকাহ্ করাটা মুস্তাহাব। সপ্তম দিনে সম্ভব না হলে ১৪ দিনে দেয়া যাবে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৮৩৫)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ‘আক্বীকার বর্ণনা
৪১৫৪-[৬] মুহাম্মাদ ইবনু ’আলী ইবনু হুসায়ন (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত যে, ’আলী ইবনু আবূ ত্বালিব (রাঃ) বলেছেনঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান এর পক্ষ হতে একটি বকরী দ্বারা ’আক্বীকাহ্ করলেন এবং বললেনঃ হে ফাতিমা! তার মাথাটি মুড়িয়ে দাও আর চুলের ওজন পরিমাণ রূপা সাদাকা করো। (’আলী (রাঃ) বলেনঃ) আমরা তার চুলগুলো ওজন করলাম। তার ওজন এক দিরহাম বা তার চেয়ে কিছু কম ছিল। (তিরমিযী)[1]
আর তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ এ হাদীসটি হাসান এবং গরীব, এটার সনদে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। কেননা মুহাম্মাদ ইবনু ’আলী ইবনু হুসায়ন (রহিমাহুল্লাহ) ’আলী ইবনু আবূ ত্বালিব (রাঃ)-এর সাক্ষাৎ লাভ করেননি।
وَعَنْ مُحَمَّدِ بْنِ عَلِيِّ بْنِ حُسَيْنٍ عَنْ عَليّ بن أبي طَالب قَالَ: عَقَّ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الْحَسَنِ بِشَاةٍ وَقَالَ: «يَا فَاطِمَةُ احْلِقِي رَأْسَهُ وَتَصَدَّقِي بِزِنَةِ شَعْرِهِ فِضَّةً» فَوَزَنَّاهُ فَكَانَ وَزْنُهُ دِرْهَمًا أَوْ بَعْضَ دِرْهَمٍ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ وَإِسْنَادُهُ لَيْسَ بِمُتَّصِلٍ لِأَنَّ مُحَمَّدَ بْنَ عَلِيِّ بْنِ حُسَيْنٍ لَمْ يُدْرِكْ عَلِيَّ بْنَ أَبِي طَالِبٍ
ব্যাখ্যাঃ হাফিয ‘আসকালানী (রহিমাহুল্লাহ) ‘‘আত্ তালযিস’’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ফাতিমা বিনতু রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান ও হুসায়ন (রাঃ)-এর মাথার চুল ওজন করেছিলেন। আর যায়নাব ও উম্মু কুলসূম (রাঃ) ওজন অনুপাতে রৌপ্য মুদ্রা সাদাকা করেছিলেন।
আবূ রাফি' (রাঃ) হতে বর্ণিত, ফাতিমা (রাঃ) যখন হাসান (রাঃ)-কে জন্ম দিলেন তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমার ছেলের মাথার চুল কি রক্ত দ্বারা মালিশ করে দিবো না? তিনি বললেন, না বরং তার চুল মুড়িয়ে ফেলো এবং উক্ত চুল ওজন করে সমপরিমাণ রৌপ্য মুদ্রা সাদাকা কর আহলুস্ সুফফাবাসীদের ওপর। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৫১৯)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ‘আক্বীকার বর্ণনা
৪১৫৫-[৭] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান ও হুসায়ন-এর পক্ষ হতে এক একটি দুম্বা ’আক্বীকাহ্ করেছেন। (আবূ দাঊদ)[1]আর নাসায়ী বর্ণনা করেছেন, দু’ দু’টি বকরী।
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَقَّ عَنِ الْحَسَنِ وَالْحُسَيْنِ كَبْشًا كَبْشًا. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَعِنْدَ النَّسَائِيِّ: كبشين كبشين
ব্যাখ্যাঃ ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ) এ হাদীস থেকে দলীল গ্রহণ করেছেন যে, ছেলে এবং মেয়ে শিশুর পক্ষ হতে একটি করে ছাগল দ্বারা ‘আক্বীকাহ্ করতে হবে। হাফিয (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এ মতের স্বপক্ষে নির্ভরযোগ্য এমন কোন দলীল নেই। ‘ইকরামাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, তাতে দু’টি করে দুম্বা বা ছাগলের কথা বলা হয়েছে। ‘আমর ইবনু শু‘আয়ব হতে অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে।
একাধিক হাদীসে বর্ণিত রয়েছে, ছেলের জন্য দু’টি ছাগল দ্বারা ‘আক্বীকাহ্ দিতে হবে এ মর্মে পূর্ণ দলীল রয়েছে, তা আবূ দাঊদ-এর বর্ণনায় উল্লেখিত হাদীসে নেই। বরং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো, আবূ দাঊদে বর্ণিত হাদীসটি নির্ধারিত সংখ্যার কম (অর্থাৎ দুই ছাগলের পরিবর্তে একটি ছাগল) দ্বারা ‘আক্বীকাহ্ দেয়া বৈধ। কারণ সংখ্যা ‘আক্বীকার জন্য শর্ত নয় অর্থাৎ ছেলের জন্য দু’টি ছাগল দিতেই হবে ব্যাপারটা সেটা নয় বরং তা মুস্তাহাব। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৮৩৮)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ‘আক্বীকার বর্ণনা
৪১৫৬-[৮] ’আমর ইবনু শু’আয়ব (রহঃ) তার পিতার মাধ্যমে তার দাদা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ’আক্বীকাহ্ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল্লাহ তা’আলা ’উকূক (নাফরমানীকে) পছন্দ করেন না। যেন ’আক্বীকাহ্’ শব্দটি ব্যবহার করাকে তিনি পছন্দ করেননি। অতঃপর তিনি বললেনঃ যার কোন সন্তান জন্মায়, আর সে তার পক্ষ হতে কোন পশু যাবাহ করতে চায়, তবে সে যেন অবশ্যই ছেলের পক্ষ হতে দু’টি এবং মেয়ের পক্ষ হতে একটি বকরী যাবাহ করে। (আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
وَعَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ قَالَ: سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الْعَقِيقَةِ فَقَالَ: «لَا يُحِبُّ اللَّهُ الْعُقُوقَ» كَأَنَّهُ كَرِهَ الِاسْمَ وَقَالَ: «مَنْ وُلِدَ لَهُ وَلَدٌ فَأَحَبَّ أَنْ يَنْسِكَ عَنْهُ فَلْيَنْسِكْ عَنِ الْغُلَامِ شَاتَيْنِ وَعَنِ الْجَارِيَةِ شَاةً» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যাঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা ‘‘আল্লাহ عُقُوقٌ ‘উকূক’ বলাটা পছন্দ করেন না’’ এটা দ্বারা ‘আক্বীকার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ‘‘আক্বীকাহ্’’ নামের প্রতি অপছন্দনীয়তাই প্রমাণিত হয়। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ কথা (فَلْيَنْسِكْ) বা ‘সে যেন কুরবানী করে’ এ কথার দ্বারা বুঝা যায় যে, ‘আক্বীকাহ্ শব্দটি পরিবর্তন করে النَّسِيكَةِ ‘‘আন্ নাসিকাহ্’’ শব্দ ব্যবহার করা উত্তম।
অন্যদিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বলা কথা, ছেলের জন্য একটি ‘আক্বীকাহ্ এটা ‘আক্বীকাহ্ শব্দ বলার বৈধতার উপর প্রমাণ করে।
ইমাম শাফি‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ‘আক্বীকাহ্ শব্দটি বাতিল নয়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসাকারীর বলা বাক্য অনুযায়ী ‘আক্বীকাহ্ শব্দটির কারাহিয়াত বা অপছন্দনীয়তা ব্যক্ত করেছেন, সুতরাং উভয় হাদীসের মাঝে কোন বৈপরীত্য নেই। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৮৩৯)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ‘আক্বীকার বর্ণনা
৪১৫৭-[৯] আবূ রাফি’ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ হাসান ইবনু ’আলী (রাঃ)-কে যখন ফাতিমা (রাঃ) প্রসব করলেন, তখন আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তার কানে সালাতের আযানের ন্যায় আযান দিতে দেখেছি। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
আর ইমাম তিরমিযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
وَعَن أبي رافعٍ قَالَ: رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أذَّنَ فِي أُذُنِ الحسنِ ابنِ عليٍّ حِينَ وَلَدَتْهُ فَاطِمَةُ بِالصَّلَاةِ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ. وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ: هَذَا حَيْثُ حسن صَحِيح
আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) প্রথমে হাদীসটিকে হাসান বলেন; আবূ দাঊদ ৫১০৫। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি এটিকে য‘ঈফ বলেছেন; সিলসিলাতুয্ য‘ঈফাহ্ ৬১২১। তিনি বলেন, ...অতএব আমি সদ্য ভূমিষ্ট সন্তানের কানে আযান দেয়ার বিধান সম্পর্কে আমার পূর্ববর্তী বক্তব্য থেকে ফিরে আসলাম। (আলবানী, সিলসিলাতুল হুদাওয়ান্ নূর, অডিও ক্লিপ নং ৬২৩)। এ ব্যাপারে অপর মুহাক্কিক শু‘আয়ব আরনাউত্বব-ও ঐকমত্য পোষণ করেছেন। তাহক্বীক মুসনাদে আহমাদ ২৭২৩০।
ব্যাখ্যাঃ আলোচ্য হাদীসে এ মর্মে দলীল রয়েছে যে, জন্মের পর নবজাতক শিশুর কানে আযান দেয়া সুন্নাত।
তবে ‘উমার ইবনু ‘আবদুল ‘আযীয (রহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে রয়েছে, নবজাতকের ডান কানে আযান ও বাম কানে ইকামাত দিতে হবে। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৫১৪)
কিন্তু ‘আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) ডান কানে আযান ও বাম কানে ইকামাত সংক্রান্ত বর্ণনাটিকে মাওযূ‘ বা জাল বলেছেন। (আয্ য‘ঈফাহ্ ৩২১)
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ‘আক্বীকার বর্ণনা
৪১৫৮-[১০] বুরয়দাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জাহিলী যুগে আমাদের কারো সন্তান জন্ম নিলে সে একটি বকরী যাবাহ করত এবং তার রক্ত নিয়ে শিশুর মাথায় মালিশ করে দিত। কিন্তু ইসলাম আবির্ভাবের পর শিশুর জন্মের সপ্তম দিন আমরা একটি বকরী যাবাহ করি, তার মাথা কামিয়ে ফেলি এবং তার মাথায় যা’ফরান মালিশ করি। (আবূ দাঊদ)[1]
আর ইমাম রযীন অতিরিক্ত এ কথাটিও বর্ণনা করেছেন যে, সেদিন আমরা তার নামও রাখি।
عَن بُريدةَ قَالَ: كُنَّا فِي الْجَاهِلَيَّةِ إِذَا وُلِدَ لِأَحَدِنَا غلامٌ ذَبَحَ شاةٌ ولطَّخَ رأسَه بدمه فَلَمَّا جَاءَ الْإِسْلَامُ كُنَّا نَذْبَحُ الشَّاةَ يَوْمَ السَّابِعِ وَنَحْلِقُ رَأْسَهُ وَنُلَطِّخُهُ بِزَعْفَرَانٍ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَزَاد رزين: ونُسمِّيه
ব্যাখ্যাঃ আলোচ্য হাদীসে দলীল রয়েছে যে, নবজাতকের মাথায় রক্ত মালিশ করাটা জাহিলিয়্যাতের কাজ এবং তা মানসূখ বা রহিত করা হয়েছে।
এ হাদীসে এ মর্মেও দলীল রয়েছে যে, নবজাতকের মাথা মুন্ডানোর পর মাথায় যা‘ফরান কিংবা অন্য যে কোন সুগন্ধি লাগানো মুস্তাহাব। আর যা‘ফরান পবিত্র এবং তাতে কোন নেশাজাতীয় বস্তু নেই। কারণ যাতে নেশা জাতীয় বস্তু থাকে তা সুগন্ধি কিংবা হালাল-পবিত্র বস্তুতে ব্যবহার করা হয় না। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৮৪০)