৪০৬৯

পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ

৪০৬৯-[৬] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, লোকেরা জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রসূল! এখানে এমন কিছুসংখ্যক লোক বাস করে যারা শির্কের নিকটবর্তী, তারা অনেক সময় আমাদের কাছে গোশত নিয়ে আসে। কিন্তু আমরা জানি না, তারা তাতে ’বিসমিল্লা-হ’ পড়ে (যাবাহ করে) কি-না। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এমতাবস্থায় তোমরা নিজেরা আল্লাহর নাম নাও এবং খাও। (বুখারী)[1]

الْفَصْلُ الْأَوَّلُ

وَعَن عَائِشَة قَالَت: قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ هُنَا أَقْوَامًا حَدِيثٌ عَهْدُهُمْ بِشِرْكٍ يَأْتُونَنَا بِلُحْمَانٍ لَا نَدْرِي أَيَذْكُرُونَ اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهَا أَمْ لَا؟ قَالَ: «اذْكُرُوا أَنْتُم اسمَ اللَّهِ وكلوا» . رَوَاهُ البُخَارِيّ

وعن عائشة قالت: قالوا: يا رسول الله إن هنا أقواما حديث عهدهم بشرك يأتوننا بلحمان لا ندري أيذكرون اسم الله عليها أم لا؟ قال: «اذكروا أنتم اسم الله وكلوا» . رواه البخاري

ব্যাখ্যাঃ ‘আল্লামা ইবনুত্ তীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ যাবাহ করতে ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ যদি অজান্তে ছাড়া পড়ে যায় তাহলে এ ব্যাপারে কোন জবাবদিহিতা নেই। এর বিপরীত যদি হয় তবে যাবাহ বিশুদ্ধ হবে না। আর কোন প্রাণী যাবাহ করার সময় ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলা হয়েছে কিনা এমন সন্দেহ থাকলেও উক্ত প্রাণীর গোশত খাওয়া বৈধতারই চাহিদা রাখে। কারণ যাবাহকারী ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলে যাবাহ করে তখন তার যাবাহ করাটা বিশুদ্ধ হয়। আর মুসলিমদের বাজারে যাবাহকৃত যে গোশত পাওয়া যায় তা থেকে উপকার গ্রহণ করা যাবে। ‘আরবের মুসলিমরা যা যাবাহ করে থাকে তার হুকুমও অনুরূপ। কেননা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলে থাকে। ইবনু হায্ম (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ মুসলিম যা যাবাহ করে তা ভক্ষণ করা যাবে এবং এ ধারণাই পোষণ করতে হবে যে, সে ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলেছে। কারণ নেতিবাচক কিছু প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত মুসলিমদের ব্যাপারে উত্তম ধারণা পোষণ করতে হবে। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, ৭২৬ পৃষ্ঠা)

হাদীসে বলা হয়েছে, ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেছেনঃ জাহিলী যুগের লোকেরা আমাদের নিকট কিছু গোশত নিয়ে আসত, আমরা জানি না যাবাহ করার সময় ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলেছে কিনা? আমরা কি তা খাব? তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, سموا الله وكلوا তোমরা ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বল ও খাও।

ইমাম ইবনুল মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ কথার অর্থ এই নয় যে, তোমাদের এখন (খাওয়ার সময়) ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলা, যাবাহকারীর ‘‘বিসমিল্লা-হ’’র বলার স্থলাভিষিক্ত হয়ে যাবে, বরং উক্ত হাদীসে খাওয়ার সময় ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলা মুস্তাহাব বা উত্তম। এটাই বর্ণনা করা হয়েছে। আর যাবাহ করার সময় আল্লাহর নাম উল্লেখ করা হয়েছে কিনা এটা জানা না যায়, তবুও উক্ত খাদ্য খাওয়া শুদ্ধ হবে যখন যাবাহকারী এমন ব্যক্তি হবে যাদের যাবাহকৃত জন্তু খাওয়া সঠিক। আর এ বিষয়টি মুসলিমদের অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে হবে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৮২৬)

ইমাম খত্ত্বাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ হাদীসটি এটাই দলীল বহন করে যে, কোন প্রাণী যাবাহ করার সময় ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলা ওয়াজিব নয়। ইমাম মুনযিরী অনুরূপ ব্যক্ত করেছেন।

তিনি বলেনঃ যাবাহ করার সময় ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলা ছেড়ে দেয়ার বিষয়ে লোকেরা মতভেদ করেছেন।

১. ইমাম শাফি‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ)-এর মতে : তাসমিয়া বা ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলা মুস্তাহাব, ওয়াজিব নয়। তা ইচ্ছা বা অনিচ্ছাকৃতভাবে ছাড়ুক যাবাহ হালাল হয়ে যাবে। আর এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন ইমাম মালিক ও আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রহিমাহুল্লাহ)।

২. সুফ্ইয়ান সাওরী, ইসহক ইবনু রহওয়াইহ ও আসহাবে রায় (রহিমাহুল্লাহ)-গণের মতে, যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলা ছেড়ে দেয় তাহলে যাবাহ হালাল। আর যদি ইচ্ছাকৃতভাবে তা ত্যাগ করে তাহলে হালাল হবে না।

৩. ইবনু সাওর ও দাঊদ (রহিমাহুল্লাহ) এর মতে, ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক, ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ ছাড়া প্রত্যেক যাবাহই হালাল নয়। একই অর্থে বর্ণনা করেছেন ইমাম ইবনু সীরীন ও শা‘বী (রহিমাহুল্লাহ)।

ইমাম মুনযিরী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ ইমাম বুখারী এবং ইবনু মাজাহ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং আরো অনেকে বলেছেনঃ এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, যাবাহ করার সময় ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলা ওয়াজিব নয়। এটা এজন্য যে, যেহেতু চতুষ্পদ প্রাণী মূলত হারাম যতক্ষণ পর্যন্ত নিশ্চিভাবে যাবাহ না করা হয় বা রক্ত প্রবাহিত না করা হয়। আর সন্দেহযুক্ত বিষয় কখনো বৈধ হয় না। অতঃপর ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলা যদি যাবাহ করার শর্ত হত, তাহলে অন্যত্র থেকে যাবাহকৃত পশুর গোশত সুধারণা করে খাওয়া বৈধ হওয়ার জন্য যথেষ্ট হত না। যেমনটি যথেষ্ট হত না যদি যাবাহকৃত জন্তুর যাবাহের উপর সন্দেহ পোষণ করা হয়। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫খন্ড, হাঃ ২৮২৬)

মিরক্বাতুল মাফাতীহ গ্রন্থকার বলেছেনঃ শারহুস্ সুন্নাহ্ নামক গ্রন্থে এসেছে যে, যারা ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলা শর্ত মনে করেন না, তারা এ হাদীসটি দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন। কেননা ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলা যদি খাবার বৈধ হওয়ার শর্ত হত, তাহলে মৌলিকভাবে মূল খাবারের উপর সন্দেহ হতো, আর এ কারণে উক্ত খাবার খাওয়া নিষিদ্ধ হত। যেমন যাবাহ করার ক্ষেত্রে ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ না বলার সন্দেহের কারণে উক্ত খাবার নিষিদ্ধ হয়।

অনুরূপভাবে যারা ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলা শর্ত মনে করেন, তারা আল্লাহ তা‘আলার এই বাণী দ্বারা দলীল গ্রহণ করেন, وَلَا تَأْكُلُوا مِمَّا لَمْ يُذْكَرِ اسْمُ اللهِ عَلَيْهِ অর্থাৎ ‘‘যে জন্তুর ওপর আল্লাহর নাম নেয়া হয়নি, তোমরা তা ভক্ষণ করো না’’- (সূরাহ্ আল আন্‘আম ৬ : ১২১)। আর এ আয়াতে কারীমার পরবর্তী অংশে বলা হচ্ছে وَإِنَّه لَفِسْقٌ অর্থাৎ নিশ্চয় এটা (‘‘বিসমিল্লা-হ’’ ছাড়া যাবাহ করা জন্তু খাওয়া) গুনাহ বা গর্হিত কাজ।

কিন্তু যারা খাওয়ার সময় ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলা শর্তযুক্ত মনে করেন না, তারা উল্লেখিত সূরাহ্ আন্‘আম-এর ১২১ নং আয়াতের ব্যাখ্যা এভাবে করেছেন যে, উক্ত আয়াতে কারীমা দ্বারা বুঝানো হচ্ছে যে, যে সমস্ত জন্তু আল্লাহর নাম ছাড়া অন্য কিছুর তথা ‘‘গায়রুল্লাহর’’ নামে যাবাহ করা হয়েছে।

তারা তাদের এই মতামতের স্বপক্ষে দলীল হিসেবে সূরাহ্ আন্‘আম-এর ১৪৫ নং আয়াত উপস্থাপন করেছেন, যেখানে বলা হচ্ছে, أَوْ فِسْقًا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللهِ بِه অর্থাৎ যা কিছু গায়রুল্লাহর নামে যাবাহ করা হয় তা গুনাহ বা পাপাচারী কাজ।

উল্লেখ্য অত্র আয়াতে কারীমাতে গায়রুল্লাহর নামে যাবাহ করাকেই فسق বা পাপাচারিতা বুঝানো হচ্ছে।

অতএব পরিশেষে, উক্ত আয়াত দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ পরিত্যাগ করা হারাম। আর হাদীস দ্বারা ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ উচ্চারণ করতে ভুলে যাওয়া বিশেষভাবে বুঝানো হয়েছে।

আর দীনদার ব্যক্তির ওপর কর্তব্য হলো, যে জন্তুর ওপর আল্লাহর নাম নেয়া হয়নি, সেটা ভক্ষণ না করা। কেননা কুরআন মাজীদে এ ব্যাপারে মহা কঠিনতা আরোপ করা হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহূ ওয়া তা‘আলা আল কুরআনুল মাজীদের সূরাহ্ আন্‘আম-এর ১২১ নং আয়াতে ঘোষণা করেন যে,

وَإِنْ أَطَعْتُمُوهُمْ إِنَّكُمْ لَمُشْرِكُونَ

অর্থাৎ যদি তোমরা তাদের আনুগত্য কর তবে তোমরা মুশরিক হয়ে যাবে।

যদিও আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে মৃত জন্তুর ব্যাপারে তথাপি العبرة بِعُمُومِ اللَّفْظِ لَا بِخُصُوصِ السَّبَبِ অর্থাৎ অবতীর্ণের বিশেষত্বে নয় বরং শাব্দিক অর্থের ব্যাপকতার ভিত্তিতেই উপদেশ গৃহীত হবে। এই উসূল বা নিয়মের ভিত্তিতে এ আয়াতটি এখানে প্রযোজ্য।

‘‘বিসমিল্লা-হ’’ বলার নিয়ম বা পদ্ধতি :

‘‘বিসমিল্লা-হ’’ অবশ্যই মুখে উচ্চারণ করে পড়তে হবে। মনে মনে পড়লে হবে না বা শারী‘আতসম্মত নয়। কেননা শারী‘আতের প্রত্যেকটি ‘ইবাদাত জিকর, চাই তা ওয়াজিব হোক বা নফল হোক, তা ততক্ষণ গ্রহণযোগ্য হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত সেটা মুখ থেকে স্পষ্টরূপে উচ্চারিত না হবে। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)

একজন মুসলিম মু’মিন ব্যক্তির জন্য অধিক সতর্কতা ও সাবধানতার কাজ হলো সে অবশ্যই যাবাহ ও খাওয়ার সময় ‘‘বিসমিল্লা-হ’’ উচ্চারণ করবে। (আল্লাহ তা‘আলাই সর্ববিষয়ে সর্বাধিকজ্ঞাত) [সম্পাদক]


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
পুনঃনিরীক্ষণঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-২০: শিকার ও যাবাহ প্রসঙ্গে (كتاب الصيد والذبائح)