পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধবন্দীদের বিধিমালা

৩৯৬০-[১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা সে সকল লোকেদেরকে দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন, যাদের শিকল পরিহিত অবস্থায় জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, শিকল পরিহিত অবস্থায় জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। (বুখারী)[1]

بَابُ حُكْمِ الْاُسَرَاءِ

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «عَجِبَ اللَّهُ مِنْ قَوْمٍ يُدْخَلُونَ الْجَنَّةَ فِي السَّلَاسِلِ» . وَفِي رِوَايَةٍ: «يُقَادُونَ إِلى الجنَّةِ بالسلاسل» . رَوَاهُ البُخَارِيّ

عن أبي هريرة عن النبي صلى الله عليه وسلم قال: «عجب الله من قوم يدخلون الجنة في السلاسل» . وفي رواية: «يقادون إلى الجنة بالسلاسل» . رواه البخاري

ব্যাখ্যা: (يُدْخَلُوْنَ الْجَنَّةَ فِى السَّلَاسِلِ) অর্থাৎ- তাদেরকে বন্দী অবস্থায় বলপূর্বক, অনিচ্ছায় শিকল এবং রশিতে করে পাকড়াও করা হবে। অতঃপর তারা ইসলামী ভূখণ্ডে প্রবেশ করবে এবং আল্লাহ তাদেরকে ঈমান দান করবেন, ফলে তারা এর বিনিময়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর ব্যক্তি হিসেবে ইসলামের সান্নিধ্যে আসার কারণে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

একমতে বলা হয়েছে, (السَّلَاسِلِ) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যা তারা প্রত্যাখ্যান করে, অর্থাৎ নিজেদের হত্যাকরণ, স্ত্রী ও সন্তানদের বন্দীকরণ, বাড়ী-ঘর ধ্বংসকরণ এবং ঐ সকল বিষয় যা ব্যক্তিকে ইসলামে প্রবেশে বাধ্য করে, যা জান্নাতে প্রবেশের কারণ। আর (السَّلَاسِلِ) দ্বারা সত্যকে আকর্ষণ করাও উদ্দেশ্য হতে পারে, বিশেষ করে যার দ্বারা তিনি তাঁর বান্দাদেরকে পথভ্রষ্টতা থেকে হিদায়াতের দিকে টানবেন, প্রকৃতির গর্তে অবতরণ করা থেকে সুউচ্চ মর্যাদার মাধ্যমে জান্নাতুল মা‘ওয়ার দিকে আরোহণ করতে। আমি (গ্রন্থকার) বলব, এভাবে (السَّلَاسِلِ)-এর অর্থের মাঝে আছে অন্তরের অপছন্দনীয়তা, অর্থাৎ দারিদ্র্যতা, অসুস্থতা, উদাসীনতা, সকল শরীরিক বিপদসমূহ, আত্মিক সুখের অনুপস্থিতি। কেননা এটা আত্মিক উন্নত অবস্থার দিকে এবং পরকালীন উচ্চস্থানের দিকে টানে, আর এ দিকেরই অন্তর্ভুক্ত হলো সন্তানাদির লেখা-পড়াকে অপছন্দ করা।

জামিউস্ সগীরে আছে, আমাদের প্রভু এমন সম্প্রদায়ের কারণে আশ্চর্যান্বিত হন যাদেরকে শিকলসমূহে করে জান্নাতের দিকে হাকিয়ে নেয়া হবে। ত্ববারানী-এর বর্ণনাতে আবূ উমামাহ্ ও আবূ নু‘আয়ম থেকে বর্ণিত, তারা আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, ‘‘আমি এমন সম্প্রদায়ের কারণে আশ্চর্যান্বিত হই যাদেরকে শিকলে করে জান্নাতের দিকে হাকিয়ে নেয়া হয়, অথচ তারা তা অপছন্দ করে।’’ (মিরকাতুল মাফাতীহ)

ইবনুল জাওযী বলেনঃ এর অর্থ হলো তাদেরকে বন্দী করা হবে, বেঁধে নিয়ে আসা হবে। অতঃপর তারা যখন ইসলামের বিশুদ্ধতা জানতে পারবে তখন স্বেচ্ছায় তারা ইসলামে প্রবেশ করবে, অতঃপর জান্নাতে প্রবেশ করবে। সুতরাং এক্ষেত্রে বন্দী ও কয়েদী হওয়ার ব্যাপারে বাধ্য করাই প্রথম কারণ, বাধ্য করার ব্যাপারে যেন ধারাবাহিকতা প্রয়োগ করা হয়েছে, যা জান্নাতে প্রবেশের কারণ। এখানে উদ্ভূত বিষয়কে তার কারণের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে।

ত্বীবী বলেনঃ ‘শিকল দ্বারা’ এখানে ঐ আকর্ষণ উদ্দেশ্য হওয়ার সম্ভাবনা রাখছে, যাকে হিদয়াতের প্রতি আল্লাহ আকর্ষণ করবেন, যিনি তাঁর বান্দাদেরকে মুক্তি দিতে পথভ্রষ্টতা থেকে হিদায়াতের দিকে, প্রবৃত্তির গর্তে অবতরণ করা থেকে মর্যাদাসমূহে আরোহণ করার দিকে টেনে আনবেন। তবে আ-লি ‘ইমরান-এর তাফসীরে হাদীসটি ঐ দিকে নির্দেশনা করছে যে, গলায় শিকল পরানো বিষয়টি তার বাস্তবতার উপর প্রমাণ বহন করছে।

আর ইব্রাহীম হারবী এ শব্দটির প্রকৃত অর্থ গ্রহণ করা থেকে বিরত থেকেছেন, অর্থাৎ তাদেরকে জোর করে ইসলামের দিকে পরিচালনা করা হবে, আর এটা তাদের জান্নাতে প্রবেশের কারণ হবে। সেখানে কোনো শিকল থাকবে এমন নয়। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩০১০)


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
পুনঃনিরীক্ষণঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১৯: জিহাদ (كتاب الجهاد) 19. Jihad

পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধবন্দীদের বিধিমালা

৩৯৬১-[২] সালামাহ্ ইবনুল আক্ওয়া’ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (নাজদ এলাকায়) এক সফরে ছিলেন। তখন মুশরিকদের একজন গুপ্তচর (রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে) এসে সাহাবীগণের সঙ্গে বসে কথাবার্তা বলে সরে পড়ল। এতদশ্রবণে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, লোকটিকে খুঁজে বের করে হত্যা কর। বর্ণনাকারী বলেন, আমি তাকে (গুপ্তচরকে) হত্যা করলাম এবং তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার সঙ্গে থাকা মাল আমাকে দান করলেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]

بَابُ حُكْمِ الْاُسَرَاءِ

وَعَنْ سَلَمَةَ بْنِ الْأَكْوَعِ قَالَ أَتَى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَيْنٌ مِنَ الْمُشْرِكِينَ وَهُوَ فِي سَفَرٍ فَجَلَسَ عِنْدَ أَصْحَابِهِ يَتَحَدَّثُ ثُمَّ انْفَتَلَ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اطْلُبُوهُ وَاقْتُلُوهُ» . فَقَتَلْتُهُ فنفَّلَني سلبَه

وعن سلمة بن الأكوع قال أتى النبي صلى الله عليه وسلم عين من المشركين وهو في سفر فجلس عند أصحابه يتحدث ثم انفتل فقال النبي صلى الله عليه وسلم: «اطلبوه واقتلوه» . فقتلته فنفلني سلبه

ব্যাখ্যা: কাযী বলেনঃ عَيْنٌ (চোখ) বলতে এখানে গুপ্তচর উদ্দেশ্য। একে এ নামে নামকরণ করার কারণ হলো গুপ্তচরের কাজ চোখের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, অথবা দর্শনের প্রতি তার অধিক গুরুত্ব দেয়ার কারণে, দর্শনে তার নিবিষ্ট হওয়ার কারণে যেন তার সমস্ত শরীর চোখে পরিণত হয়েছে।

(سَلَبَه) অর্থাৎ তার উপর যে কাপড়, অস্ত্র আছে তা উদ্দেশ্য। এ নামে একে নামকরণ করার কারণ হলো, তা ব্যক্তি থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়। ইবনুল হুমাম বলেনঃ এভাবে তার বাহন, তার উপর গদি, যন্ত্র স্বরূপ যা আছে, তার সাথে প্রাণীর উপর আরও যা সম্পদ আছে এবং তার অনুরূপ স্বর্ণ, রৌপ্য থেকে আরও যা আছে।

ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ (فَنَفَّلَنِىْ) অর্থাৎ- তিনি আমাকে অতিরিক্ত দান করলেন, নফল বা অতিরিক্ত বলতে ঐ দান গনীমাতের যে সম্পদের মাধ্যমে তাকে বিশেষিত করা হয় এবং তার নির্দিষ্ট অংশের উপর বেশি দেয়া হয়। শারহুস্ সুন্নাতে আছে- অত্র হাদীসে এ প্রমাণ রয়েছে যে, নিরাপত্তা ছাড়া বিধর্মী রাষ্ট্র থেকে যে ব্যক্তি ইসলামী রাষ্ট্রে প্রবেশ করবে তাকে হত্যা করা বৈধ। আর মুসলিম রাষ্ট্রে আশ্রয়প্রাপ্ত কাফিরদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি কাফিরদের পক্ষে গুপ্তচর বৃদ্ধি করবে, তার তরফ থেকে এ ধরনের আচরণ অঙ্গীকার ভঙ্গের শামিল, তাই তাকে হত্যা করতে হবে। আর এ ধরনের কাজ কোনো মুসলিম ব্যক্তি করলে তাকে হত্যা করা বৈধ হবে না বরং তাকে ধমক দিতে হবে, অতঃপর যদি অবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞতার দাবী করে এবং এ ধরনের কাজ পূর্বে তাদের থেকে সংঘটিত না হয়ে থাকে, তাহলে এ ধরনের ব্যক্তি থেকে পাশ কাটিয়ে যেতে হবে। এটা ইমাম শাফি‘ঈ-এর উক্তি।

অত্র হাদীসে আরও প্রমাণ আছে যে, নিহত ব্যক্তির সঙ্গের সম্পত্তি হত্যাকারীর প্রাপ্য। ইবনুল হুমাম বলেনঃ নফল দান বলতে ইমাম কর্তৃক যোদ্ধাকে তার অংশের অধিক দান করা, অতিরিক্ত দানের মাধ্যমে যুদ্ধের প্রতি উৎসাহিত করা ইমামের জন্য মুস্তাহাব। সুতরাং ইমাম বলবে, ‘‘যে ব্যক্তি কাফির যোদ্ধাকে হত্যা করবে তার সঙ্গের সামগ্রী হত্যাকারীর জন্য।’’ অথবা সৈন্যবাহিনীকে বলবে, আমি গনীমাতের সম্পদ তোমাদের জন্য এক-পঞ্চমাংশত পৃথক করার পর অবশিষ্ট সম্পদের অর্ধেক অথবা এক-চতুর্থাংশ তোমাদের জন্য নির্ধারণ করলাম। (মিরকাতুল মাফাতীহ)

মুসলিমে ‘ইকরামার বর্ণনাতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘‘অতঃপর সে লোকটি’’ উটটি বেঁধে লোকেদের সাথে খাদ্য খেতে এগিয়ে গেল এবং তাকাতাকি করতে থাকল। আর দুপুরে আমাদের মাঝে দুর্বলতা ছিল তা অবলোকন করে হঠাৎ লোকটি দ্রুতবেগে চলে যেতে থাকল।’’

নববী বলেনঃ অত্র হাদীসে কাফিরশত্রু গুপ্তচরকে হত্যা করার বৈধতা রয়েছে। আর এতে সকলে একমত।

কুরতুবী বলেনঃ অত্র হাদীসে সৈন্যবাহিনী গনীমাতের সম্পদ যা লাভ করেছে তার সমস্তই তাদের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছা ইমাম তা দান করার অধিকার রাখেন, এ প্রমাণ আছে। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩০৫১)


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
পুনঃনিরীক্ষণঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১৯: জিহাদ (كتاب الجهاد) 19. Jihad

পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধবন্দীদের বিধিমালা

৩৯৬২-[৩] উক্ত রাবী [সালামাহ্ ইবনুল আক্ওয়া’ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ’হাওয়াযিন’ গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম। (যুদ্ধরত অবস্থায়) একদিন আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে দুপুরে খাবার খাচ্ছিলাম, তখন একজন (অপরিচিত) লোক একটি লালবর্ণের উটে সওয়ার হয়ে সেখানে আসলো এবং উটটি এক জায়গায় বসিয়ে এদিক-সেদিক দেখতে লাগল। আমাদের মধ্যে কিছুটা দুর্বলতা ছিল এবং আমাদের সওয়ারীও ছিল কম, তাই কেউ ছিল পদাতিক। অতঃপর লোকটি সন্তর্পণে স্বীয় উটের কাছে এসে দ্রুতগতিতে উটটি হাঁকাতে লাগল।

বর্ণনাকারী [সালামাহ্(রাঃ)] বলেন, তার এরূপ অবস্থা দেখে আমিও তৎক্ষণাৎ তার পিছু ছুটলাম। অবশেষে তার উটের লাগাম ধরে ফেললাম এবং তরবারির আঘাতে তাকে হত্যা করলাম। অতঃপর আমি তার উটসহ যা কিছু মাল ছিল সমস্ত কিছু নিয়ে এলাম। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও অন্যান্য লোকজন আমার দিকে এগিয়ে আসলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, লোকটিকে কে হত্যা করেছে? তখন লোকেরা বলল, আক্ওয়া’-এর পুত্র (সালামাহ্)। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ঐ নিহত লোকটির সমস্ত মাল-সামান সেই পাবে। (বুখারী, মুসলিম)[1]

بَابُ حُكْمِ الْاُسَرَاءِ

وَعَنْهُ قَالَ: غَزَوْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ هَوَازِنَ فَبَيْنَا نَحْنُ نَتَضَحَّى مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذْ جَاءَ رَجُلٌ عَلَى جَمَلٍ أَحْمَرَ فَأَنَاخَهُ وَجَعَلَ يَنْظُرُ وَفِينَا ضَعْفَةٌ وَرِقَّةٌ مِنَ الظَّهْرِ وَبَعْضُنَا مُشَاةٌ إِذْ خَرَجَ يَشْتَدُّ فَأَتَى جَمَلَهُ فَأَثَارَهُ فَاشْتَدَّ بِهِ الْجَمَلُ فَخَرَجْتُ أَشْتَدُّ حَتَّى أَخَذْتُ بِخِطَامِ الْجَمَلِ فَأَنَخْتُهُ ثُمَّ اخْتَرَطْتُ سَيْفِي فَضَرَبْتُ رَأْسَ الرَّجُلِ ثُمَّ جِئْتُ بِالْجَمَلِ أَقُودُهُ وَعَلَيْهِ رَحْلُهُ وَسِلَاحُهُ فَاسْتَقْبَلَنِي رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالنَّاسُ فَقَالَ: «مَنْ قَتَلَ الرَّجُلَ؟» قَالُوا: ابْنُ الْأَكْوَعِ فَقَالَ: «لَهُ سَلَبُهُ أَجْمَعُ»

وعنه قال: غزونا مع رسول الله صلى الله عليه وسلم هوازن فبينا نحن نتضحى مع رسول الله صلى الله عليه وسلم إذ جاء رجل على جمل أحمر فأناخه وجعل ينظر وفينا ضعفة ورقة من الظهر وبعضنا مشاة إذ خرج يشتد فأتى جمله فأثاره فاشتد به الجمل فخرجت أشتد حتى أخذت بخطام الجمل فأنخته ثم اخترطت سيفي فضربت رأس الرجل ثم جئت بالجمل أقوده وعليه رحله وسلاحه فاستقبلني رسول الله صلى الله عليه وسلم والناس فقال: «من قتل الرجل؟» قالوا: ابن الأكوع فقال: «له سلبه أجمع»

ব্যাখ্যা: (هَوَازِنُ) তীর নিক্ষেপে প্রসিদ্ধ এমন একটি গোত্র যাদের তীর সাধারণত লক্ষ্যভ্রষ্ট হতো না। তারা হুনায়নে ছিল, আর তা ত্বায়িফের নিকটে ‘আরাফার পেছনে একটি উপত্যকা।

একমতে বলা হয়েছে, তার মাঝে এবং মক্কার মাঝে তিন মাইল দূরত্ব ছিল। অত্র এলাকার দিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভ্রমণ ছিল শাও্ওয়ালের ছয় রাত্রি অতিবাহিত হওয়ার পর রোজ শনিবার। তখন তিনি মক্কা বিজয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

(فَبَيْنَا نَحْنُ نَتَضَحّٰى) ‘‘যখন আমরা দুপুরের খাবার খাচ্ছিলাম।’’ نَتَضَحّٰى শব্দটি الضَّحَاءِ থেকে গৃহীত যার অর্থ দিনের প্রথম প্রহরের পরবর্তী সময়। নিহায়াহ্ গ্রন্থকার বলেনঃ এ ক্ষেত্রে মূল হলো ‘আরবরা ভ্রমণ থেকে প্রস্থানের ক্ষেত্রে যখন তারা পথ চলত তখন তারা এমন ভূখণ্ডের পাশ দিয়ে পথ অতিক্রম করত যেখানে ঘাস থাকত তখন তাদের কেউ বলত, তোমরা উটের প্রতি দয়া কর। যাতে এ চারণভূমি থেকে খেতে পারে, অতএব «التَّضْحِيَةُ» শব্দটি অনুগ্রহ প্রদর্শনের অর্থে করা হয়েছে, উদ্দেশ্য যাতে উট পরিতৃপ্ত অবস্থায় বাড়ী ফিরতে পারে। এরপর এ শব্দটির প্রয়োগ বিসত্মৃতি লাভ করে। এমনকি বলা হলো, অর্থাৎ যে ব্যক্তি উটকে বাড়ী নিয়ে আসার সময় তথা الضُّحٰى -এর সময় খেত তার ক্ষেত্রে هُوَ يَتَضَحّٰى উক্তি প্রয়োগ হতে থাকল, অর্থাৎ যে এ সময় খায়। একমতে বলা হয়েছে, এর অর্থ হলো «نُصَلِّي الضُّحٰى» অর্থাৎ- আমরা যুহার সালাত আদায় করছিলাম। (মিরকাতুল মাফাতীহ)

(فَاسْتَقْبَلَنِىْ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ وَالنَّاسُ) উল্লেখিত হাদীসাংশে সৈন্য বাহিনীকে অভ্যর্থনা জানানো এবং যে ব্যক্তি ভালো কাজ করবে তার গুণকীর্তন করার প্রমাণ আছে। মুসলিমদের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়নি এবং তাদের থেকে নিরাপত্তাও লাভ করেনি এমন কাফির গুপ্তচরকে হত্যা করা বৈধ। আর এটা সকল মুসলিমদের ঐকমত্যে।

নাসায়ী-এর বর্ণনাতে আছে, ‘‘নিশ্চয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ লোকটিকে অনুসন্ধান করা ও হত্যা করার ব্যাপারে তাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন।’’ আর চুক্তিতে আবদ্ধ ও নিরাপত্তাপ্রাপ্ত কাফির গুপ্তচরের ব্যাপারে মালিক ও আওযা‘ঈ বলেন, এ ব্যক্তি চুক্তি ভঙ্গকারীতে পরিণত হবে, অতঃপর মুসলিম চাইলে তাকে দাসে পরিণত করবে অথবা তাকে হত্যা করাও বৈধ হবে।

জুমহূর বিদ্বানগণ বলেন, এর মাধ্যমে তার অঙ্গীকার ভঙ্গ হবে না। আর মুসলিম গুপ্তচরের ব্যাপারে শাফি‘ঈ, আওযা‘ঈ, আবূ হানীফাহ্, কতিপয় মালিকী মতাবলম্বী এবং জুমহূর বিদ্বানগণ বলেনঃ ইমাম প্রহার করা, আটক করা এবং অনুরূপ যা কিছু মনে করেন তার মাধ্যমে তাকে ধমক দিবেন, তবে তাকে হত্যা করা বৈধ হবে না। (শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৭৫৪)


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
পুনঃনিরীক্ষণঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১৯: জিহাদ (كتاب الجهاد) 19. Jihad

পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধবন্দীদের বিধিমালা

৩৯৬৩-[৪] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন সা’দ ইবনু মু’আয (রাঃ)-এর ফায়সালা মেনে নেয়ার শর্তে (ইয়াহূদী) বানূ কুরয়যাহ্ গোত্র দুর্গ থেকে বের হয়ে আসলো, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সা’দ ইবনু মু’আয -কে আনার জন্য) লোক পাঠালেন। এমতাবস্থায় সা’দ একটি গাধার পিঠে সওয়ার হয়ে আসলেন। যখন তিনি কাছে আসলেন, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত লোকেদের উদ্দেশে বললেন, তোমাদের নেতার দিকে গমন কর। তখন সা’দ এসে বসলেন।

অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সা’দ (রাঃ)-এর প্রতি দৃষ্টিপাত করে) বললেন, এরা তোমার ফায়সালা মেনে নেয়ার শর্তে দুর্গ খুলে বের হয়ে এসেছে। সুতরাং তুমি তাদের সম্পর্কে ফায়সালা দাও। তখন সা’দ বললেন, এদের ব্যাপারে আমার ফায়সালা হচ্ছে, যুদ্ধ করতে সক্ষমদেরকে হত্যা করা হোক এবং নারী ও শিশুদেরকে বন্দী করা হোক। অতঃপর এ রায় শুনে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলে উঠলেন, তাদের ব্যাপারে তুমি বাদশাহর (আল্লাহর) ফায়সালা মুতাবিক বিচার করেছ। অপর এক বর্ণনাতে আছে, তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও হুকুম অনুসারেই রায় দিয়েছ। (বুখারী, মুসলিম)[1]

بَابُ حُكْمِ الْاُسَرَاءِ

وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: لَمَّا نَزَلَتْ بَنُو قُرَيْظَةَ عَلَى حُكْمِ سَعْدِ بْنِ مُعَاذٍ بَعَثَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِليه فَجَاءَ عَلَى حِمَارٍ فَلَمَّا دَنَا قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «قُومُوا إِلَى سَيِّدِكُمْ» فَجَاءَ فَجَلَسَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ هَؤُلَاءِ نَزَلُوا عَلَى حُكْمِكَ» . قَالَ: فَإِنِّي أَحْكُمُ أَنْ تَقْتُلَ الْمُقَاتِلَةُ وَأَنْ تُسْبَى الذُّرِّيَّةُ. قَالَ: «لَقَدْ حَكَمْتَ فِيهِمْ بحُكْمِ المَلِكِ» . وَفِي رِوَايَة: «بِحكم الله»

وعن أبي سعيد الخدري قال: لما نزلت بنو قريظة على حكم سعد بن معاذ بعث رسول الله صلى الله عليه وسلم إليه فجاء على حمار فلما دنا قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: «قوموا إلى سيدكم» فجاء فجلس فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: «إن هؤلاء نزلوا على حكمك» . قال: فإني أحكم أن تقتل المقاتلة وأن تسبى الذرية. قال: «لقد حكمت فيهم بحكم الملك» . وفي رواية: «بحكم الله»

ব্যাখ্যা: ফাতহুল বারীতে আছে, «فَلَمَّا دَنَا مِنَ الْمَسْجِدِ» এখানে মসজিদ বলতে ঐ জায়গা উদ্দেশ্য যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বানূ কুরয়যাহ্-এর অবরোধের দিনগুলোতে তাদের এলাকাতে সালাত আদায়ের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। এর দ্বারা মদীনাতে অবস্থিত মসজিদে নববী উদ্দেশ্য নয়।

 (قُوْمُوْا إِلٰى سَيِّدِكُمْ) দীর্ঘ হাদীসের মাঝে ‘আলকামাহ্ বিন ওয়াক্কাস -এর সানাদে মুসনাদে আহমাদ কর্তৃক ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর মুসনাদে এসেছে, ‘‘আবূ সা‘ঈদ বলেনঃ অতঃপর সা‘দ যখন আগমন করল তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা তোমাদের সাইয়িদ (নেতার)-এর দিকে এগিয়ে যাও, অতঃপর তাকে নামাও।’’

(لَقَدْ حَكَمْتَ فِيهِمْ بحُكْمِ المَلِكِ) বুখারীতে «حَكَمْتَ فِيهِ بِحُكْمِ اللّٰهِ» এসেছে। মুহাম্মাদ বিন সালিহ-এর বর্ণনাতে «لَقَدْ حَكَمْتَ فِيهِمُ الْيَوْمَ بِحُكْمِ اللّٰهِ الَّذِي حَكَمَ بِه مِنْ فَوْقِ سَبْعِ سماوات» অর্থাৎ ‘‘আজ তুমি তাদের ব্যাপারে আল্লাহর ঐ ফায়সালা অনুযায়ী ফায়সালা দিয়েছ যার মাধ্যমে তিনি সাত আকাশের উপর থেকে ফায়সালা দিয়েছেন’’ উল্লেখ আছে।

ইবনু ‘আয়িয-এর কাছে জাবির-এর হাদীসে আছে, ‘‘অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, হে সা‘দ! তুমি তাদের ব্যাপারে ফায়সালা দাও, তখন সা‘দ বলল, ফায়সালা দেয়ার ব্যাপারে আল্লাহ ও তাঁর রসূলই বেশি অধিকার রাখেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তাদের ব্যাপারে ফায়সালা দিতে আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে নির্দেশ দিয়েছেন।’’ আর ‘আলকামাহ্ বিন ওয়াক্কাস-এর মুরসাল সানাদে ইবনু ইসহক-এর বর্ণনাতে আছে, «لَقَدْ حَكَمْتَ فِيهِمْ بِحُكْمِ اللّٰهِ مِنْ فَوْقِ سَبْعَةِ» ‘‘নিঃসন্দেহে তুমি তাদের মাঝে সাত আকাশের উপর থেকে আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী ফায়সালা দিয়েছ। আল্লাহর ফায়সালা অনুযায়ী ফায়সালা দিয়েছ।’’

(ফাতহুল বারী ৭ম খন্ড, হাঃ ৪১২১)

নববী বলেনঃ «قُومُوا إِلٰى سَيِّدِكُمْ أَوْ خَيْرِكُمْ» হাদীসাংশে মর্যাদার অধিকারীকে মর্যাদা দান করা এবং তারা যখন আগমন করবে তখন তাদের জন্য দাঁড়িয়ে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করার প্রমাণ আছে। এভাবে দাঁড়ানো মুস্তাহাব হওয়া সম্পর্কে জুমহূর বিদ্বানগণ প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন।

কাযী বলেনঃ এটা নিষিদ্ধ দণ্ডায়মানের অন্তর্ভুক্ত নয়। নিষেধাজ্ঞা কেবল ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে যে বসে থাকাবস্থায় তার কাছে মানুষেরা দাঁড়ায় এবং তার বসে থাকা পর্যন্ত তারা দাঁড়িয়েই থাকে।

শারহে মুসলিম প্রণেতা বলেনঃ আমি বলব, সম্মানিত আগমনকারীর জন্য দাঁড়ানো মুস্তাহাব। এ ব্যাপারে অনেক হাদীস এসেছে। এ সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে স্পষ্ট কোনো কিছু বিশুদ্ধ সাব্যস্ত হয়নি। এ ব্যাপারে বিদ্বানদের আলোচনাসহ প্রতিটি বিষয়কে একটি অংশে একত্রিত করেছি। এ সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা যে সন্দেহে সৃষ্টি করেছে সে সম্পর্কে আমি তাতে উত্তর দিয়েছি আর আল্লাহ সর্বজ্ঞাত। (শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৭৬৮)


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
পুনঃনিরীক্ষণঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১৯: জিহাদ (كتاب الجهاد) 19. Jihad

পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধবন্দীদের বিধিমালা

৩৯৬৪-[৫] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (৬ষ্ঠ হিজরীতে) একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজ্দ গোত্রের অভিমুখে একদল অশ্বারোহী সৈন্য পাঠালেন। তারা বানী হানীফাহ্ গোত্রীয় ইয়ামামাবাসীদের সরদার সুমামাহ্ ইবনু উসাল নামে এক ব্যক্তিকে ধরে আনল। অতঃপর তারা তাকে মসজিদে নববীর একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিকট এসে জিজ্ঞেস করলেন, হে সুমামাহ্! তুমি কি মনে করছ? সে বলল, হে মুহাম্মাদ! আমি কল্যাণ কামনা করছি, যদি আপনি আমাকে হত্যা করেন তবে একজন খুনীকে হত্যা করবেন। আর যদি আমার প্রতি অনুগ্রহ করেন, তবে অবশ্যই একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকেই অনুগ্রহ করবেন। আর যদি ধন-সম্পদের অভিলাষী হন, তাও চাইতে পারেন, তাও প্রদান করা হবে। এমতাবস্থায় তার কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে রেখে চলে গেলেন। আবার পরদিন এসেও তাকে অনুরূপভাবে জিজ্ঞেস করলেন, হে সুমামাহ্! তুমি কি প্রত্যাশা করছ? সে বলল, আমি তাই প্রত্যাশা করি যা আপনাকে পূর্বে বলেছি।

যদি আমার প্রতি দয়া করেন, তবে একজন কৃতজ্ঞকেই দয়া করবেন। আর যদি আমাকে হত্যা করেন, তবে একজন খুনীকেই হত্যা করলেন। আর যদি ধন-সম্পদ চান, তবে তাও আপনাকে দেয়া হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে তৃতীয় দিন আসলেন আজও তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে সুমামাহ্! তুমি কি প্রত্যাশা করছ? সে বলল, আমি তাই প্রত্যাশা করি যা আপনাকে পূর্বেই বলেছি। যদি আমার প্রতি অনুগ্রহপরায়ণ হন, তবে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির প্রতিই অনুকম্পা করবেন। আর যদি আমাকে হত্যা করেন, তবে একজন খুনীকেই হত্যা করবেন। আর যদি ধন-সম্পদ চান, তবে আপনাকে তাই দেয়া হবে।

এবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা সুমামাকে ছেড়ে দাও। অতঃপর সে মসজিদের নিকটেই একটি খেজুর বাগানে প্রবেশ করল এবং গোসল করে মসজিদে প্রবেশ করল এবং ঘোষণা করল, ’’আশ্হাদু আল্লা- ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়া আশ্হাদু আন্না মুহাম্মাদান ’আবদুহূ ওয়া রসূলুহ’’। অতঃপর সে অকপটে বলে উঠল, হে মুহাম্মাদ! আল্লাহর কসম! পৃথিবীর বুকে আপনার চেহারা অপেক্ষা আর কারো চেহারা আমার নিকট এত অধিক ঘৃণিত ছিল না। কিন্তু এখন আপনার চেহারা আমার কাছে সকলের চেয়ে প্রিয় হয়ে গেছে। আল্লাহর কসম! আপনার দীনের (ধর্মের) অপেক্ষা অধিক ঘৃণিত দীন আমার নিকট কোনটি ছিল না। কিন্তু এখন আপনার দীনই আমার কাছে সর্বাধিক প্রিয় দীন।

আল্লাহর কসম! আপনার শহরের চেয়ে অধিক ঘৃণ্য শহর আমার নিকট আর কোনটি ছিল না, কিন্তু আপনার শহর আমার নিকট সর্বোত্তম হয়ে গেছে। আপনার অশ্বারোহীগণ আমাকে এমন সময় ধরে এনেছে, যখন আমি ’উমরাহ্ পালন করার উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছিলাম। এখন আপনি আমাকে কি করতে হুকুম দেন? তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে (ইসলাম গ্রহণের) সুসংবাদ এবং ’উমরাহ্ পালনের আদেশ দিলেন। এরপর যখন সে মক্কায় পৌঁছল, তখন জনৈক ব্যক্তি তাকে বলল, তুমি কী ধর্মত্যাগী বেদীন হয়ে গেছ? উত্তরে সে বলল, তা হবে কেন? বরং আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ইসলাম গ্রহণ করেছি। আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুমতি ছাড়া ইয়ামামাহ্ হতে তোমাদের নিকট গমের একটি দানাও পৌঁছবে না। (মুসলিম; বুখারীতে সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণিত হয়েছে)[1]

بَابُ حُكْمِ الْاُسَرَاءِ

وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: بَعَثَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَيْلًا قِبَلَ نَجْدٍ فَجَاءَتْ بِرَجُلٍ مِنْ بَنِي حَنِيفَةَ يُقَالُ لَهُ: ثُمَامَةُ بْنُ أُثَالٍ سَيِّدُ أَهْلِ الْيَمَامَةِ فَرَبَطُوهُ بِسَارِيَةٍ مِنْ سَوَارِي الْمَسْجِدِ فَخَرَجَ إِلَيْهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «مَاذَا عِنْدَكَ يَا ثُمَامَةُ؟» فَقَالَ: عنْدي يَا مُحَمَّد خير إِن نقْتل تَقْتُلْ ذَا دَمٍ وَإِنْ تُنْعِمْ تُنْعِمْ عَلَى شَاكِرٍ وَإِنْ كُنْتُ تُرِيدُ الْمَالَ فَسَلْ تُعْطَ مِنْهُ مَا شِئْتَ فَتَرَكَهُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَتَّى كَانَ الْغَدُ فَقَالَ لَهُ: «مَا عِنْدَكَ يَا ثُمَامَةُ؟» فَقَالَ: عِنْدِي مَا قُلْتُ لَكَ: إِنْ تُنْعِمْ تُنْعِمْ عَلَى شَاكِرٍ وَإِنْ تَقْتُلْ تَقْتُلْ ذَا دَمٍ وَإِنْ كنتَ تريدُ المالَ فسَلْ تعط مِنْهُ مَا شِئْتَ. فَتَرَكَهُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَتَّى كَانَ بَعْدَ الْغَدِ فَقَالَ لَهُ: «مَا عِنْدَكَ يَا ثُمَامَةُ؟» فَقَالَ: عِنْدِي مَا قُلْتُ لَكَ: إِنْ تُنْعِمْ تُنْعِمْ عَلَى شَاكِرٍ وَإِنْ تَقْتُلْ تَقْتُلْ ذَا دَمٍ وَإِنْ كُنْتَ تُرِيدُ الْمَالَ فَسَلْ تُعْطَ مِنْهُ مَا شِئْتَ. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَطْلَقُوا ثُمَامَةَ» فَانْطَلَقَ إِلَى نَخْلٍ قَرِيبٍ مِنَ الْمَسْجِدِ فَاغْتَسَلَ ثُمَّ دَخَلَ الْمَسْجِدَ فَقَالَ: أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَن مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ يَا مُحَمَّدُ وَاللَّهِ مَا كَانَ عَلَى وَجْهِ الْأَرْضِ وَجْهٌ أَبْغَضُ إِلَيَّ مِنْ وَجْهِكَ فَقَدْ أَصْبَحَ وَجْهُكَ أَحَبَّ الْوُجُوهِ كُلِّهَا إِلَيَّ وَاللَّهِ مَا كَانَ مِنْ دِينٍ أَبْغَضَ إِلَيَّ مِنْ دِينِكَ فَأَصْبَحَ دِينُكَ أَحَبَّ الدِّينِ كُلِّهِ إِلَيَّ وَوَاللَّهِ مَا كَانَ مِنْ بَلَدٌ أَبْغَضَ إِلَيَّ مِنْ بَلَدِكَ فَأَصْبَحَ بَلَدُكَ أَحَبَّ الْبِلَادِ كُلِّهَا إِلَيَّ. وَإِنَّ خَيْلَكَ أَخَذَتْنِي وَأَنَا أُرِيدَ الْعُمْرَةَ فَمَاذَا تَرَى؟ فَبَشَّرَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَمَرَهُ أَنْ يَعْتَمِرَ فَلَمَّا قَدِمَ مَكَّةَ قَالَ لَهُ قَائِلٌ: أَصَبَوْتَ؟ فَقَالَ: لَا وَلَكِنَّى أَسْلَمْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَاللَّهِ لَا يَأْتِيكُمْ مِنَ الْيَمَامَةِ حَبَّةُ حِنْطَةٍ حَتَّى يَأْذَنَ فِيهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. رَوَاهُ مُسلم وَاخْتَصَرَهُ البُخَارِيّ

وعن أبي هريرة قال: بعث رسول الله صلى الله عليه وسلم خيلا قبل نجد فجاءت برجل من بني حنيفة يقال له: ثمامة بن أثال سيد أهل اليمامة فربطوه بسارية من سواري المسجد فخرج إليه رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال: «ماذا عندك يا ثمامة؟» فقال: عندي يا محمد خير إن نقتل تقتل ذا دم وإن تنعم تنعم على شاكر وإن كنت تريد المال فسل تعط منه ما شئت فتركه رسول الله صلى الله عليه وسلم حتى كان الغد فقال له: «ما عندك يا ثمامة؟» فقال: عندي ما قلت لك: إن تنعم تنعم على شاكر وإن تقتل تقتل ذا دم وإن كنت تريد المال فسل تعط منه ما شئت. فتركه رسول الله صلى الله عليه وسلم حتى كان بعد الغد فقال له: «ما عندك يا ثمامة؟» فقال: عندي ما قلت لك: إن تنعم تنعم على شاكر وإن تقتل تقتل ذا دم وإن كنت تريد المال فسل تعط منه ما شئت. فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: «أطلقوا ثمامة» فانطلق إلى نخل قريب من المسجد فاغتسل ثم دخل المسجد فقال: أشهد أن لا إله إلا الله وأشهد أن محمدا عبده ورسوله يا محمد والله ما كان على وجه الأرض وجه أبغض إلي من وجهك فقد أصبح وجهك أحب الوجوه كلها إلي والله ما كان من دين أبغض إلي من دينك فأصبح دينك أحب الدين كله إلي ووالله ما كان من بلد أبغض إلي من بلدك فأصبح بلدك أحب البلاد كلها إلي. وإن خيلك أخذتني وأنا أريد العمرة فماذا ترى؟ فبشره رسول الله صلى الله عليه وسلم وأمره أن يعتمر فلما قدم مكة قال له قائل: أصبوت؟ فقال: لا ولكنى أسلمت مع رسول الله صلى الله عليه وسلم والله لا يأتيكم من اليمامة حبة حنطة حتى يأذن فيها رسول الله صلى الله عليه وسلم. رواه مسلم واختصره البخاري

ব্যাখ্যা: ثُمَامَةُ (সুমামাহ্) প্রথম দিনে তার উক্তির। (إِنْ تَقْتُلْ تَقْتُلْ ذَا دَمٍ) অর্থাৎ- ‘‘আপনি যদি আমাকে হত্যা করেন তাহলে একজন খুনীকেই হত্যা করবেন।’’ এ অংশকে অগ্রবর্তী করা এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে এ অংশকে বাক্যের অপর অংশদ্বয়ের মাঝে নিয়ে আসাটা এমন এক কৌশলী পদ্ধতি যা সুমামার বিচক্ষণতার দিকে নির্দেশ করছে, কেননা সুমামাহ্ প্রথম দিনে যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রাগ অবলোকন করলেন, তখন তাকে সান্তবনা স্বরূপ হত্যার বিষয়টি অগ্রবর্তী করলেন। অতঃপর সে যখন দেখল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে হত্যা করল না, তখন সে নিজের ওপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুগ্রহ করার আশা করল। অতঃপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে তার এ (إِنْ تَقْتُلْ) উক্তিকে পিছিয়ে আনলেন। (ফাতহুল বারী ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৩৭২)

قَالَ لَه قَائِلٌ، أَصَبَوْتَ؟ الصَّبْوُ (সব্উ) বলতে বায়হাক্বী-এর তাজুল মাসাদীরে আছে- অজ্ঞতার দিকে ধাবমান হওয়া। নিহায়াহ্ গ্রন্থে আছে, ব্যক্তি যখন এক ধর্ম থেকে আরেক ধর্মের দিকে বেরিয়ে যায় তখন ‘আরবীতে (صَبَأَ فُلَانٌ) বলা হয়।

(فَقَالَ : لَا وَلٰكِنّٰى أَسْلَمْتُ مَعَ رَسُوْلِ اللّٰهِ ﷺ) অর্থাৎ- ‘‘অতঃপর তিনি বলেন, না, ‘‘আমি ধর্মত্যাগ করিনি’’ বরং আমি আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ইসলাম গ্রহণ করেছি।’’ অতঃপর আপনি যদি বলেন, কিভাবে সুমামাহ্ না বলল? অথচ সে শির্ক হতে তাওহীদের দিকে বের হয়েছে। আমি (মিরকাতুল মাফাতীহ প্রণেতা) বলবঃ এটা বিজ্ঞতাপূর্ণ পদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত, যেন সে বলেছে, আমি দীন হতে বের হইনি। কেননা তোমরা এমন কোনো দীনের উপর নও যে, আমি তা থেকে বের হয়ে যাব, বরং আমি আল্লাহর দীনে প্রত্যাবর্তন করেছি এবং আল্লাহর রসূলের সাথে ইসলাম গ্রহণ করেছি। অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্ব থেকে ইসলামের সাথে সম্পর্কিত, আর আমি নতুন করে সম্পৃক্ত হলোম।

নববী বলেনঃ ذا دم শব্দটির দু’টি অর্থ হতে পারে- (১) খুনী, অর্থাৎ আমার ওপর হত্যার অভিযোগ আছে। (২) আমার রক্ত মূল্যবান। অর্থাৎ আমাকে হত্যা করা হলে এ হত্যার পরিশোধ নেয়ার লোক আছে। তবে প্রথম অর্থটিই অধিক গ্রহণযোগ্য। তিনি আরো বলেনঃ এ হাদীসে বন্দীকে বেঁধে রাখা, তাকে আটকিয়ে রাখা এবং কাফিরকে মসজিদে প্রবেশ করানো বৈধ হওয়ার প্রমাণ আছে। এতে আরও আছে- কাফির ব্যক্তি যখন ইসলাম গ্রহণের ইচ্ছা করবে তখন ঐ ব্যাপারে তাড়াতাড়ি করতে হবে, গোসলের জন্য বিলম্ব করা যাবে না। আর কারো জন্য বৈধ হবে না তাকে তা বিলম্বকরণে অনুমতি দেয়া। আমাদের মাযহাব (মিরকাতুল মাফাতীহ প্রণেতা) হলো, শির্কে থাকালীন সময়ে এ ব্যক্তির দেহে অপবিত্রতা থাকলে তার গোসল করা আবশ্যক। পূর্বে এ কারণে গোসল করুক বা না করুক উভয় সমান। আমাদের কতক সাথীবর্গ বলেন, ইসলাম গ্রহণের পূর্বে সে গোসল করে থাকলে তা তার জন্য যথেষ্ট হবে, আর তার দেহে জানাবাত (স্বপ্ন দোষ হওয়া, স্ত্রী সহবাস করা) না থাকলে তার গোসল করা মুস্তাহাব।

আহমাদ ও অন্যান্যগণ বলেনঃ তার ওপর গোসল করা আবশ্যক। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বারংবার তিনদিন প্রশ্ন করাতে বন্দীদের থেকে যাদের ইসলাম গ্রহণের আশা করা যায় তাদের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন ও নিজ হৃদয়ের নম্রতা প্রকাশ রয়েছে, ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রে যাদের অনুসরণ করবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)

فَقَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ : أَطْلَقُوْا ثُمَامَةَ ইবনু ইসহক-এর বর্ণনাতে আছে- قَالَ قَدْ عَفَوْتُ عَنْكَ يَا ثُمَامَةُ وأعتقتك তিনি বলেছেন, হে সুমামাহ্! আমি তোমার প্রতি ক্ষমাপ্রদর্শন করেছি এবং তোমাদেরকে স্বাধীন করে দিয়েছি। ইবনু ইসহক তার বর্ণনাতে আরেকটু বৃদ্ধি করে বলেন, সুমামাহ্ যখন বন্দীদশায় ছিলেন তখন সেবকরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরিবারে খাদ্য দুধ যা ছিল সকল কিছু একত্র করল কিন্তু ঐ খাদ্য সুমামার পেটের কিছুই হলো না। অতঃপর সুমামাহ্ যখন ইসলাম গ্রহণ করল তখন তার কাছে তারা খাদ্য আনলে সুমামাহ্ অল্প খেল। অতঃপর এ দেখে তারা আশ্চর্যান্বিত হলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘‘নিশ্চয় কাফির সাত পেটে খায় আর মু’মিন এক পেটে খায়।’’

(فَبَشَّرَه) ‘‘অতঃপর তিনি সুমামাকে সুসংবাদ দিলেন।’’ অর্থাৎ ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ সম্পর্কে অথবা তাকে জান্নাত, তার গুনাহ মোচন সম্পর্কে সুসংবাদ দিলেন। সুমামার অত্র হাদীসে অনেকগুলো উপকারিতা আছে, সেগুলোর মাঝে ফাতহুল বারীতে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো- অপরাধীর ক্ষমার বিষয়টি বড় করে দেখা। কেননা সুমামাহ্ বলেছে, এক মুহূর্তেই সুমামার ক্রোধ ভালোবাসাতে পরিণত হয়েছে। দয়াপ্রদর্শন ক্রোধ দূর করে, ভালোবাসা প্রতিষ্ঠিত করে। নিঃসন্দেহে কাফির ব্যক্তি যখন কল্যাণকর কাজের ইচ্ছা করবে, অতঃপর ইসলাম গ্রহণ করবে, তখন ঐ কল্যাণজনক কাজে অটল থাকা তার জন্য শারী‘আতসম্মত। এতে আরো আছে, কাফির রাষ্ট্রের দিকে সৈন্যবাহিনী পাঠানো এবং তাদের মাঝে যাকে পাওয়া যাবে তাকে বন্দী করা, তাকে বন্দী দশার উপর রেখে দেয়া এবং তাকে হত্যা করার ক্ষেত্রে ইমামের স্বাধীনতা রয়েছে। (ফাতহুল বারী ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৩৭২)

ইমাম শাফি‘ঈ-এর মাযহাব হলো, মুসলিম ব্যক্তির অনুমতিক্রমে কাফির ব্যক্তিকে মসজিদে প্রবেশ করতে দেয়া বৈধ। সে কিতাবধারী কাফির হোক অথবা অন্যান্য কাফির হোক। ‘উমার বিন ‘আবদুল ‘আযীয, কাতাদাহ এবং মালিক বলেন, তা বৈধ নয়। আবূ হানীফাহ্ বলেনঃ আহলে কিতাব বা কিতাবধারীদের ক্ষেত্রে বৈধ, অন্যদের জন্য বৈধ নয়। সকল ক্ষেত্রে আমাদের (মিরকাতুল মাফাতীহ প্রণেতা) দলীল এ হাদীসটি এবং মহান আল্লাহর এ বাণী ‘‘নিঃসন্দেহে মুশরিকরা অপবিত্র, সুতরাং তারা যেন মসজিদে হারামের নিকটবর্তী না হয়’’- (সূরা আত্ তাওবাহ্ ৯ : ২৮)। অতএব মুশরিকদের মসজিদে প্রবেশের নিষিদ্ধের বিষয়টি মসজিদে প্রবেশের সাথে নির্দিষ্ট। আমরা বলব, মুশরিক ব্যক্তির হারামে প্রবেশ করার সুযোগ নেই। [আর আল্লাহ সর্বজ্ঞাত’ (শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৭৬৪)


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
পুনঃনিরীক্ষণঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১৯: জিহাদ (كتاب الجهاد) 19. Jihad

পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধবন্দীদের বিধিমালা

৩৯৬৫-[৬] জুবায়র ইবনু মুত্ব’ইম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদর যুদ্ধে বন্দীদের ব্যাপারে বলেছেন, আজ যদি মুত্ব’ইম ইবনু ’আদী জীবিত থাকত এবং এ সমস্ত দুর্গন্ধময় লোকেদের ব্যাপারে আমার কাছে সুপারিশ করতেন, তাহলে আমি তার সুবাদে তাদেরকে ছেড়ে দিতাম। (বুখারী)[1]

بَابُ حُكْمِ الْاُسَرَاءِ

وَعَن جُبَير بن مطعم أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ فِي أُسَارَى بَدْرٍ: «لَوْ كَانَ الْمُطْعِمُ بْنُ عَدِيٍّ حَيًّا ثُمَّ كَلَّمَنِي فِي هَؤُلَاءِ النَّتْنَى لتركتهم لَهُ» . رَوَاهُ البُخَارِيّ

وعن جبير بن مطعم أن النبي صلى الله عليه وسلم قال في أسارى بدر: «لو كان المطعم بن عدي حيا ثم كلمني في هؤلاء النتنى لتركتهم له» . رواه البخاري

ব্যাখ্যা: (فِىْ هَؤُلَاءِ النَّتْنٰى) ‘‘এ সকল দুর্গন্ধময় লোকেদের ব্যাপারে’’। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ কাফিরদেরকে দুর্গন্ধময় বলে সাব্যস্ত করেছেন। এটা মূলত তাদের অপবিত্র থাকার কারণে, যা তাদের কুফরী থেকে অর্জিত।

(لَتَرَكْتُهُمْ لَه) অর্থাৎ- ‘‘অবশ্যই তার কারণে তাদেরকে ছেড়ে দিতাম’’। কাযী বলেনঃ সে হলো মুত্ব‘ইম বিন ‘আদী বিন নাওফাল বিন ‘আব্দ মানাফ, আল্লাহর রসূলের দাদার চাচাতো ভাই। আল্লাহর রসূলের প্রতি তার সমর্থন ও সহযোগিতা ছিল। কেননা আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ত্বায়িফ থেকে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন তখন তার কাছে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং সে তাঁর থেকে মুশরিকদের তাড়িয়ে দিয়েছিল। তাই তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন যে, মুত্ব‘ইম বিন ‘আদী যদি জীবিত থাকত, তাহলে ঐ ব্যাপারে সুপারিশের ক্ষেত্রে মুত্ব‘ইম যথেষ্ট হত। আরও সম্ভাবনা রাখছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাধ্যমে মুত্ব‘ইম-এর ছেলে জুবায়র-এর অন্তরের স্বাচ্ছন্দ্যতা ও ইসলামে তার ভালোবাসা উদ্দেশ্য করেছেন। অত্র হাদীসে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবস্থার বড়ত্ব বর্ণনা ও এ সকল কাফিরদের অবস্থার তুচ্ছতা বর্ণনা সম্পর্কে উপস্থাপন করা হয়েছে এমনভাবে যে, তাঁর প্রতি মুশরিকের সহযোগিতা থাকা সত্ত্বেও তাদেরকে কোনো ব্যাপারে ছাড় দিতে পরোয়া করেন না।

একমতে বলা হয়েছে, অত্র হাদীসে উত্তম প্রতিদানের বর্ণনা এবং কৌশল ধার্য করার বৈধতা রয়েছে। ইবনুল হুমাম বলেনঃ অত্র হাদীস দ্বারা ইমাম শাফি‘ঈ-এর মাযহাব অনুযায়ী অনুগ্রহ করা বৈধ হওয়ার উপর প্রমাণ গ্রহণ করা হয়েছে যা অন্যান্য ইমামদের মতের বিপরীত।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংবাদ দিয়েছেন যে, মুত্ব‘ইম বিন ‘আদী যদি তাঁর কাছে কাফির বন্দীদের ব্যাপারে আবেদন করত, নিঃসন্দেহে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদেরকে মুক্তি দান করতেন। এ কথাটি উহ্য অবস্থার উপর প্রয়োগ করা থেকে যুদ্ধবন্দী কাফিরদের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করা শারী‘আতসম্মতভাবে বৈধ প্রমাণিত হচ্ছে। যার সাথে তাকে সম্পর্কিত করা হয়েছে তা সংঘটিত না হওয়ার কারণে শারী‘আতসম্মতভাবে তা সংঘটিত হওয়ার বৈধতাকে অস্বীকার করছে না, আর এটাই এখানে উদ্দেশ্য। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩১৩৯)

খত্ত্বাবী বলেনঃ অত্র হাদীসে কোনো মুক্তিপণ ছাড়া বন্দীকে ছেড়ে দেয়া এবং তার ওপর অনুগ্রহ করার প্রমাণ আছে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬৮৬)


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
পুনঃনিরীক্ষণঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১৯: জিহাদ (كتاب الجهاد) 19. Jihad

পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধবন্দীদের বিধিমালা

৩৯৬৬-[৭] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন মক্কার আশিজন অস্ত্রধারী ঘাতক দল তান্’ঈম পাহাড়ের আড়াল হতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবীগণের ওপর অতর্কিত আক্রমণ করার জন্য নিচে নেমে অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বিনা মুকাবিলায় বন্দী করে ফেললেন এবং পরে তাদেরকে জীবিত ছেড়ে দিলেন।

অপর সূত্রে বর্ণিত আছে, তাদেরকে মুক্ত করে দিলেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা আয়াত নাযিল করেন, অর্থাৎ- ’’আল্লাহ সে মহান সত্তা, যিনি মক্কার অদূরে তাদের (কাফিরদের) হাত তোমাদের ওপর হতে এবং তোমাদের হাত তাদের ওপর হতে বিরত রেখেছেন। (মুসলিম)[1]

بَابُ حُكْمِ الْاُسَرَاءِ

وَعَن أنسٍ: أَنَّ ثَمَانِينَ رَجُلًا مِنْ أَهْلِ مَكَّةَ هَبَطُوا عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ جَبَلِ التَّنْعِيمِ مُتَسَلِّحِينَ يُرِيدُونَ غِرَّةَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَصْحَابِهِ فَأَخَذَهُمْ سِلْمًا فَاسْتَحْيَاهُمْ. وَفِي رِوَايَةٍ: فَأَعْتَقَهُمْ فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى (وَهُوَ الَّذِي كَفَّ أَيْدِيَهُمْ عَنْكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ عَنْهُمْ ببطنِ مكةَ)
رَوَاهُ مُسلم

وعن أنس: أن ثمانين رجلا من أهل مكة هبطوا على رسول الله صلى الله عليه وسلم من جبل التنعيم متسلحين يريدون غرة النبي صلى الله عليه وسلم وأصحابه فأخذهم سلما فاستحياهم. وفي رواية: فأعتقهم فأنزل الله تعالى (وهو الذي كف أيديهم عنكم وأيديكم عنهم ببطن مكة) رواه مسلم

ব্যাখ্যা: (مِنْ جَبَلِ التَّنْعِيْمِ) কামূসে আছে- তান্‘ঈম মক্কা থেকে তিন অথবা চার মাইল দূরে অবস্থিত একটি স্থান, বায়তুল্লাহর পথে হিল্ অঞ্চলের সীমানার নিকটবর্তী স্থান, এ নামে একে নামকরণ করার কারণ হলো এর ডান পাশে আছে নু‘আয়ম পর্বত, বাম পাশে আছে না‘ইম পর্বত আর উপত্যকার নাম না‘মান।

(فَأَخَذَهُمْ سِلْمًا) হুমায়দী বলেনঃ এর অর্থ হলো, الصُّلْحُ বা সন্ধি করা। কাযী বলেনঃ سِلْمًا শব্দটিকে সীন ও লাম বর্ণে যবর দিয়ে سَلَمًا পড়া যায় এবং ‘সীন’ বর্ণে যের এবং লাম বর্ণে সাকিন দিয়ে سِلْمًا-ও পড়া যায়। এ ক্ষেত্রে (فَأَخَذَهُمْ سَلَمًا) বাক্যাংশটির অর্থ তিনি তাদেরকে বন্দী করলেন। খত্ত্বাবী বলেনঃ উক্ত পঠন রীতিতে سَلَمًا শব্দ থেকে উদ্দেশ্য আত্মসমর্পণ, আনুগত্য। যেমন মহান আল্লাহর বাণী, ‘‘আর তারা তোমাদের কাছে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব পাঠায়’’- (সূরা আন্ নিসা ৪ : ১০)।

ইবনুল আসীর বলেনঃ ঘটনার সাথে এটা সর্বাধিক মিল। কেননা তাদেরকে সন্ধির মাধ্যমে গ্রেপ্তার করা হয়নি, তাদেরকে কেবল দাপটের মাধ্যমে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা অপারগ হয়ে নিজেদেরকে সোপর্দ করেছে।

وَأَيْدِيَكُمْ عَنْهُمْ بِبَطْنِ مَكَّةَ ত্বীবী বলেনঃ মুসলিমদের ওপর মুশরিকদের হঠাৎ আক্রমণ করার ইচ্ছা করার পর তাদেরকে শাস্তি প্রদান করা থেকে মুসলিমদেরকে বিরত রাখা এবং তাদের আক্রমণ হতে মুসলিমদের নিরাপদে রাখা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলীর অন্তর্ভুক্ত। যদি আল্লাহ তাদের অন্তরে তাদের প্রতি দয়া, অনুকম্পা সৃষ্টি না করতেন তাহলে নিরাপত্তা অর্জন হতো না।

আমি (মিরকাতুল মাফাতীহ প্রণেতা) বলবঃ একে মহান আল্লাহর ‘‘অতঃপর তোমরা তাদেরকে হত্যা করনি বরং আল্লাহ তাদেরকে হত্যা করেছেন’’- (সূরা আল আনফাল ৮ : ১৭) এ বাণীর সাথে তুলনাকরণ সর্বাধিক সামঞ্জস্যশীল। বায়যাভী তাঁর তাফসীরে বলেনঃ ওটা হলো- ‘ইকরিমাহ্ বিন আবূ জাহাল পাঁচশত লোক নিয়ে হুদায়বিয়ার উদ্দেশে বের হলে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খালিদ বিন ওয়ালীদকে সৈন্যবাহিনী দিয়ে প্রেরণ করলেন, অতঃপর তিনি তাদেরকে পরাস্ত করে মক্কার প্রাচীর বেষ্টনী এক জায়গাতে প্রবেশ করান, অতঃপর ফিরে আসেন।

সা‘ঈদ ইবনু জুবায়র বলেনঃ ইবনু জারীর এবং ইবনু আবূ হাতিম একে ইবনু আবূ আবযা থেকে বর্ণনা করেছেন। আমি (মিরকাতুল মাফাতীহ প্রণেতা) বলবঃ এটাই মহান আল্লাহর بِبَطْنِ مَكَّةَ এ বাণীর সাথে উপযোগী। একমতে বলা হয়েছে, এ আয়াত দ্বারা মক্কা বিজয় উদ্দেশ্য। আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) এ আয়াত দ্বারা প্রমাণ গ্রহণ করেছেন যে, মক্কা বলপূর্বক বিজয় করা হয়েছে। বায়যাভী বলেনঃ এটা দুর্বল, কেননা সূরাটি এর পূর্বে অবতীর্ণ করা হয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
পুনঃনিরীক্ষণঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১৯: জিহাদ (كتاب الجهاد) 19. Jihad

পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধবন্দীদের বিধিমালা

৩৯৬৭-[৮] কাতাদাহ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আনাস ইবনু মালিক আবূ ত্বলহাহ্ সূত্রে আমাদের নিকট বর্ণনা করেন, বদর যুদ্ধ শেষে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ২৪ জন কুরায়শ নেতার লাশ (কূপে ফেলার) ব্যাপারে নির্দেশ দেন। অতঃপর বদর প্রান্তরে একটি নোংরা দুর্গন্ধময় কূপে তাদের লাশ ফেলা হলো। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন কোনো গোত্রের ওপর বিজয় লাভ করতেন, তখন সে যুদ্ধস্থলে তিনরাত অবস্থান করতেন। বদর প্রান্তেও তৃতীয় দিনে তাঁর নির্দেশে সওয়ারীর গদি বাঁধা হলো। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একদিকে কিছু পথ পায়ে হেঁটে চললেন, সাহাবীগণও তাঁর পশ্চাদানুসরণ করলেন।

পথিমধ্যে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ঐ কূপের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং তাতে নিক্ষিপ্ত কুরায়শ সরদারদের মৃতদেহ ও তাদের বাপ-দাদার নাম ধরে উচ্চস্বরে ডাকতে লাগলেন, হে অমুকের পুত্র অমুক! হে অমুকের পুত্র অমুক! তোমরা কি এখন বুঝতে পেরেছ, আল্লাহ ও তার রসূলের কথা মেনে চললে তোমরা খুশি হতে পারতে? আমাদের রব আমাদের সঙ্গে (বিজয়ের) যে ওয়া’দাহ্ করেছিলেন, আমরা তা সঠিকভাবে পরিপূর্ণরূপে পেয়েছি। তোমরাও কি এখন তোমাদের রবের ঘোষণা (কুফরীর পরিণাম ভয়াবহ দুরাবস্থা) সঠিকভাবে প্রত্যক্ষ করেছ? তখন ’উমার (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি আত্মাবিহীন লাশের সাথে কী কথা বলছেন? জবাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে মহান সত্ত্বার কসম, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! আমি যা বলছি তা তোমরা তাদের অপেক্ষা বেশি শুনতে পাচ্ছ না।

অপর এক বর্ণনাতে আছে, তোমরা তাদের অপেক্ষা অধিক শুনতে পাওনি। তবে পার্থক্য এই যে, তারা জবাব দিতে পারে না। (বুখারী, মুসলিম)[1]

বুখারীর বর্ণনায় অতিরিক্ত রয়েছে যে, বর্ণনাকারী কাতাদাহ বলেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথাগুলো শুনার জন্য আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে জীবিত করে দিয়েছিলেন যেন তারা ভৎর্সনা, লাঞ্ছনা, অপমান, অনুশোচনা ও লজ্জা অনুভব করতে পারে।

بَابُ حُكْمِ الْاُسَرَاءِ

وَعَنْ قَتَادَةَ قَالَ: ذَكَرَ لَنَا أَنَسُ بْنُ مَالِكٍ عَنْ أَبِي طَلْحَةَ أَنَّ نَبِيَّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَرَ يَوْمَ بَدْرٍ بِأَرْبَعَةٍ وَعِشْرِينَ رَجُلًا مِنْ صَنَادِيدِ قُرَيْشٍ فَقَذَفُوا فِي طَوِيٍّ مِنْ أَطْوَاءِ بَدْرٍ خَبِيثٍ مُخْبِثٍ وَكَانَ ذَا ظهرَ عَلَى قَوْمٍ أَقَامَ بِالْعَرْصَةِ ثَلَاثَ لَيَالٍ فَلَمَّا كَانَ بِبَدْرٍ الْيَوْمَ الثَّالِثَ أَمَرَ بِرَاحِلَتِهِ فَشَدَّ عَلَيْهَا رَحْلَهَا ثُمَّ مَشَى وَاتَّبَعَهُ أَصْحَابُهُ حَتَّى قَامَ عَلَى شَفَةِ الرَّكِيِّ فَجَعَلَ يُنَادِيهِمْ بِأَسْمَائِهِمْ وأسماءِ آبائِهم: «يَا فُلَانَ بْنَ فُلَانٍ وَيَا فُلَانُ بْنَ فُلَانٍ أَيَسُرُّكُمْ أَنَّكُمْ أَطَعْتُمُ اللَّهَ وَرَسُولَهُ؟ فَإِنَّا قَدْ وَجَدْنَا مَا وَعَدَنَا رَبُّنَا حَقًّا فَهَلْ وَجدتمْ مَا وعدَكم رَبُّكُمْ حَقًّا؟» فَقَالَ عُمَرُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا تُكَلِّمَ مِنْ أَجْسَادٍ لَا أَرْوَاحَ لَهَا؟ قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ مَا أَنْتُمْ بِأَسْمَعَ لِمَا أَقُولُ مِنْهُمْ» . وَفِي رِوَايَةٍ: «مَا أَنْتُمْ بِأَسْمَعَ مِنْهُمْ وَلَكِنْ لَا يُجِيبُونَ» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ. وَزَادَ الْبُخَارِيُّ: قَالَ قَتَادَةُ: أَحْيَاهُمُ اللَّهُ حَتَّى أَسْمَعَهُمْ قولَه توْبيخاً وتصغيرا ونقمة وحسرة وندما

وعن قتادة قال: ذكر لنا أنس بن مالك عن أبي طلحة أن نبي الله صلى الله عليه وسلم أمر يوم بدر بأربعة وعشرين رجلا من صناديد قريش فقذفوا في طوي من أطواء بدر خبيث مخبث وكان ذا ظهر على قوم أقام بالعرصة ثلاث ليال فلما كان ببدر اليوم الثالث أمر براحلته فشد عليها رحلها ثم مشى واتبعه أصحابه حتى قام على شفة الركي فجعل يناديهم بأسمائهم وأسماء آبائهم: «يا فلان بن فلان ويا فلان بن فلان أيسركم أنكم أطعتم الله ورسوله؟ فإنا قد وجدنا ما وعدنا ربنا حقا فهل وجدتم ما وعدكم ربكم حقا؟» فقال عمر: يا رسول الله ما تكلم من أجساد لا أرواح لها؟ قال النبي صلى الله عليه وسلم: «والذي نفس محمد بيده ما أنتم بأسمع لما أقول منهم» . وفي رواية: «ما أنتم بأسمع منهم ولكن لا يجيبون» . متفق عليه. وزاد البخاري: قال قتادة: أحياهم الله حتى أسمعهم قوله توبيخا وتصغيرا ونقمة وحسرة وندما

ব্যাখ্যা: (فِىْ طَوِىٍّ) অর্থাৎ কূপে সুদৃঢ় পাথর দ্বারা প্রলেপ দেয়া। অর্থাৎ কূপের কিনারা পাথর দিয়ে উঁচু করে বাঁধাই করা। তূরিবিশ্তী বলেনঃ الْقَلِيبِ الْبِئْرِ (প্রলেপ দেয়া) এবং বি’রে طَوِىٍّ ( প্রলেপহীন) এর মাঝে সামঞ্জস্য বিধান করা যেতে পারে?

আমি (মিরকাতুল মাফাতীহ প্রণেতা) বলবঃ বর্ণনাকারী হয়ত একটি শব্দকে অপর শব্দের সমার্থবোধক শব্দ হিসেবে প্রয়োগ করেছেন। এমতাবস্থায় বর্ণনাকারী জানত না যে, উভয় শব্দের মাঝে পার্থক্য আছে। আরও সম্ভাবনা রাখছে যে, সাহাবী ধারণা করেছেন যে, কূপটি প্রলেপ দেয়া ছিল অথচ কূপটি প্রলেপহীন ছিল। আরও সম্ভাবনা রয়েছে যে, তাদের কতককে প্রলেপ দেয়া কূপে আর কতককে প্রলেপ ছাড়া কূপে নিক্ষেপ করা হয়েছিল।

(فَإِنَّا قَدْ وَجَدْنَا مَا وَعَدَنَا رَبُّنَا حَقًّا) ‘‘নিঃসন্দেহে আমাদের প্রভু আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আমরা তা সত্য হিসেবে পেয়েছি।’’ অর্থাৎ- তোমাদের ওপর আমাদের বিজয়ের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আমরা তা পেয়েছি।

(فَهَلْ وَجَدْتُّمْ مَا وَعَدَكُمْ رَبُّكُمْ حَقًّا؟) তোমাদের প্রতিপালক তোমাদেরকে শাস্তির যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এটা তাদেরকে তিরস্কারস্বরূপ প্রশ্ন। মুযহির বলেনঃ তোমরা আল্লাহর শাস্তির দিকে পৌঁছার পর কি মুসলিম হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করছ।

ত্বীবী বলেনঃ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য যা তোমাদের হাত ছাড়া হয়েছে তার জন্য কি তোমরা হতাশাগ্রস্ত হচ্ছ, চিন্তিত হচ্ছ? নাকি হচ্ছ না? আর তোমাদের প্রতি আমাদের উক্তি স্মরণ করছ? তা হলো- নিশ্চয় আল্লাহ তার দীনকে সকল দীনের উপর বিজয় দান করবেন, তাঁর ওয়ালীদের সাহায্য করবেন, তাঁর শত্রুদেরকে লাঞ্ছিত করবেন। নিঃসন্দেহে আমাদের প্রভু আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আমরা তা সত্য হিসেবে পেয়েছি।

(يَا رَسُوْلَ اللّٰهِ! مَا تُكَلِّمَ مِنْ أَجْسَادٍ لَا أَرْوَاحَ لَهَا؟) অর্থাৎ- ‘‘হে আল্লাহর রসূল! আপনি এমন দেহের সাথে কথা বলছেন যাতে কোনো আত্মা নেই, সুতরাং তা কিভাবে আপনাকে উত্তর দিবে?’’ (مَا أَنْتُمْ بِأَسْمَعَ لِمَا أَقُولُ مِنْهُمْ) অর্থাৎ- ‘‘আমি যা বলছি তা তোমরা তাদের অপেক্ষা বেশি শুনতে পাও না।’’ অন্য বর্ণনাতে আছে, (مَا أَنْتُمْ بِأَسْمَعَ مِنْهُمْ وَلٰكِنْ لَا يُجِيْبُوْنَ) অর্থাৎ- ‘‘তোমরা তাদের অপেক্ষা বেশি শুনতে পাও না তবে তারা উত্তর দেয় না।’’

নববী (রহঃ)-এর শারহে মুসলিম আছে, মাযিরী বলেনঃ একমতে বলা হয়েছে, এ হাদীসের বাহ্যিকতার প্রতি ‘আমল করলে মৃত ব্যক্তি শুনতে পায়- এ কথা প্রমাণিত হয়, তবে এতে দৃষ্টি নিবন্ধনের বিষয় আছে। কেননা এ হাদীসের বাহ্যিক দিক এ লোকেদের ব্যাপারে খাস। তবে কাযী এ মতকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, কূপে নিক্ষক্ষপিত নিহত কাফিরদের শ্রবণ করাতে ঐ অবস্থার উপর চাপিয়ে দিতে হবে যে অবস্থার উপর কবরের শাস্তিও প্রতিহত করার কেউ নেই। এমন ফিতনার হাদীসগুলো সম্পর্কে মৃতদের শ্রবণ করাকে চাপিয়ে দেয়া হয়। আর তা হলো তাদেরকে জীবিত করার মাধ্যমে তাদের অংশসমূহের প্রতি ওয়াহী করার মাধ্যমে, ওয়াহী সম্পর্কে তারা অনুভব করে এবং ঐ সময়ে শুনতে পায় যে সময়কে আল্লাহ উদ্দেশ্য করেন।

মাযিরী বলেনঃ এটাই পছন্দনীয়। ইবনুল হুমাম হিদায়ার শারহতে বলেনঃ জেনে রাখা উচিত যে, হানাফী মাশায়েখদের অধিকাংশ ঐ মতের উপর আছে যে, ঈমান পর্বে তারা যা স্পষ্ট করেছে সে আলোকে মৃত ব্যক্তি শুনতে পায় না। যদি কোনো ব্যক্তি শপথ করে তার সাথে কথা বলবে না। অতঃপর সে মারা যাওয়ার পর তার সাথে কথা বললে শপথ ভঙ্গ হবে না, কেননা শপথ সংঘটিত হয় যে ব্যক্তি কথা বুঝে তার উত্তর প্রদান অনুসারে অথচ মৃত ব্যক্তির অবস্থা এরূপ নয়।

আমি (মিরকাতুল মাফাতীহ প্রণেতা) বলবঃ এটা তাদের তরফ থেকে ঐ কথার উপর নির্ভরশীল যে, ঈমানের নির্ভরতা জনসাধারণ যা বুঝে তার উপর। সুতরাং এ থেকে বাস্তব শ্রবণ না করা আবশ্যক হয়ে পড়ছে না। যেমন তারা ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে বলেছে, যে ব্যক্তি শপথ করে যে, গোশ্ত/গোশত খাবে না। অতঃপর সে মাছ খেল যদিও আল্লাহ মাছকে টাটকা গোশত বলে নামকরণ করেছেন। তিনি বলেন, তারা কখনো এ হাদীস সম্পর্কে উত্তর প্রদান করেছে যে, এ হাদীসটি ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে প্রত্যাখ্যাত। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেন, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি করে এ কথা বলবেন। অথচ আল্লাহ তা‘আলা বলেন,(وَمَا أَنْتَ بِمُسْمِعٍ مَنْ فِي الْقُبُورِ) অর্থাৎ- ‘‘তুমি কবরস্থদেরকে শুনাতে পারবে না’’- (সূরা আল ফা-ত্বির ৩৫ : ২২)। (إِنَّكَ لَا تُسْمِعُ الْمَوْتٰى) ‘‘নিঃসন্দেহে তুমি মৃতকেও শুনাতে পারবে না।’’ (সূরা আন্ নামল ২৭ : ৮০)

আমি (মিরকাতুল মাফাতীহ প্রণেতা) বলবঃ হাদীসটি মুত্তাফাক ‘আলাইহ্। এ হাদীসটি প্রত্যাখ্যান করা ঠিক হবে না। বিশেষ করে এর মাঝে ও কুরআনের মাঝে কোনো বৈপরীত্য নেই। কেননা ‘মৃত’ বলতে কাফিররা উদ্দেশ্য আর ‘‘শুনাতে পারবে না’’ কথাটি উপকৃত না হওয়া উদ্দেশ্যর উপর প্রতিষ্ঠিত সাধারণ শ্রবণের উপর নয়, যেমন মহান আল্লাহর বাণী- ‘‘তারা বধির, বোবা, অন্ধ; সুতরাং তারা বুঝবে না’’- (সূরা আল বাকারা ২ : ১৮) অথবা শ্রবণের পর ধারাবাহিক উত্তর না পাওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত। ‘‘তুমি মৃতদেরকে শুনাতে পারবে না’’- (সূরা আন্ নামল, ২৭ : ৮০)। মহান আল্লাহর এ বাণীর ক্ষেত্রে বায়যাভী (রহঃ) বলেন, যখন তাদেরকে সত্য থেকে বাধা দেয়া হয়েছে তখন তাদের উপমা হলো তাদের চেতনা। ‘‘নিশ্চয় আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে শোনান’’- (সূরা আল ফা-ত্বির ৩৫ : ২২)। অর্থাৎ- তার হিদায়াত শোনান, অতঃপর তাকে তাঁর আয়াত বুঝার জন্য, তাঁর উপদেশ কর্তৃক উপদেশ গ্রহণের তাওফীক দেন। ‘‘আর আপনি কবরস্থদেরকে শুনাতে পারবেন না’’- (সূরা আল ফা-ত্বির ৩৫ : ২২)। আয়াতটি ‘‘নিঃসন্দেহে আপনি যাকে ভালোবাসেন তাকে পথপ্রদর্শন করতে পারবেন না, তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে পথপ্রদর্শন করতে পারেন’’- (সূরা আল কাসাস ২৮ : ৫৬) এ আয়াতের শ্রেণীভুক্ত। অতঃপর তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বক্তব্যটি একটি মু‘জিযাহ্ ও কাফিরদের ওপর পরিতাপ বৃদ্ধিকরণ স্বরূপ। (মিরকাতুল মাফাতীহ)

(بِأَرْبَعَةٍ وَعِشْرِينَ رَجُلًا مِنْ صَنَادِيدَ) صَنَادِيدَ শব্দটি এর বহুবচন, এর অর্থ- বীর নেতা। সা‘ঈদ বিন বাশীর থেকে ইবনু ‘আয়িযে এসেছে, তিদিন কাতাদাহ থেকে বর্ণনা করেন, (بِبِضْعَةٍ وَعِشْرِينَ) এ বর্ণনা (أربعة وعشرين) বর্ণনার বিপরীত নয়। কেননা الْبِضْعَ শব্দকে চারের উপরেও প্রয়োগ করা হয়। বারা-এর হাদীসে আছে যে,  বদর যুদ্ধে নিহত কাফিরদের সংখ্যা সত্তরজন ছিল। কালীবে বা কূপে যাদেরকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল তারা ছিল তাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ, অতঃপর কুরায়শদের কিছু। আর অবশিষ্ট নিহতদেরকে অন্যান্য কূপে নিক্ষেপ করলেন। ওয়াকিদী বর্ণনা করেন, উল্লেখিত কূপ এক কাফির ব্যক্তি খনন করেছিল। সুতরাং রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সকল কাফিরকে ঐ কূপে নিক্ষেপ করাই উপযুক্ত মনে করেছেন। (ফাতহুল বারী ৭ম খন্ড, হাঃ ৩৯৭৬; শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ২৮৭৫)


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ কাতাদাহ (রহঃ)
পুনঃনিরীক্ষণঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১৯: জিহাদ (كتاب الجهاد) 19. Jihad

পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধবন্দীদের বিধিমালা

৩৯৬৮-[৯] মারওয়ান (ইবনু হাকাম) ও মিসওয়ার ইবনু মাখরামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। হাওয়াযিন গোত্রের লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করার পর যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট তাদের প্রতিনিধি দল এসে সম্পদ এবং বন্দীদের ফেরত চাইল, তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, বন্দী অথবা ধন-সম্পদণ্ড এ দু’টির যে কোনো একটি গ্রহণ করতে পার। এমতাবস্থায় তারা বলল, আমরা আমাদের বন্দীদেরকে ফিরে পেতে চাই। এতদশ্রবণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণের উদ্দেশে দাঁড়িয়ে প্রথমে আল্লাহ তা’আলার হামদ ও যথাযথ প্রশংসা করে বললেন, শোন! তোমাদের যে সমস্ত ভাইয়েরা (হাওয়াযিনবাসীরা) কুফরী হতে প্রত্যাবর্তন করে তাওবার মাধ্যমে আমাদের নিকট এসেছে, আর আমি তাদের বন্দীদেরকে ফেরত দেয়া উত্তম মনে করি। অতএব, তোমাদের মধ্যে যারা স্বেচ্ছায় সন্তুষ্টিচিত্তে তাদের বন্দীদেরকে ফেরত দিতে চায়, তারা যেন ফেরত দিয়ে দেয়।

আর তোমাদের মধ্যে যারা স্বীয় অংশ সংরক্ষণ করতে চায় (স্বেচ্ছায় ফেরত দিতে সম্মত নয়) তারা যেন এ অঙ্গীকারের উপর ফেরত দেয় যে, পরবর্তীতে আল্লাহ তা’আলা আমাকে যে ’ফাই’ (যুদ্ধলব্ধ মাল) সর্বপ্রথম দান করবেন, তা হতে আমি তাদেরকে তা পরিশোধ করব। এ কথা শুনে উপস্থিত জনতা সমস্বরে বলে উঠল, হে আল্লাহর রসূল! আমরা স্বেচ্ছায় সন্তুষ্টচিত্তে (শর্তহীনভাবে) তাদেরকে মুক্তি দিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ বিরাট জনসমুদ্রের মধ্যে তোমাদের কে অনুমতি দিল আর কে দিল না, তা আমি সঠিকভাবে জানতে পারছি না। অতএব তোমরা স্বীয় অবস্থানে ফিরে যাও এবং তোমাদের দলের নেতারা এসে যেন তোমাদের মতামত আমার নিকট পৌঁছে দেয়। অতঃপর এ নির্দেশে সকলে নিজ নিজ অবস্থানে ফিরে গেল এবং স্বীয় দলপতির সাথে আলোচনাসাপেক্ষে নিজেদের মতামত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে জানাল যে, তারা স্বেচ্ছায় সন্তুষ্টচিত্তে (নিঃশর্তভাবে) মুক্তি দিতে অনুমতি দিয়েছে। (বুখারী)[1]

بَابُ حُكْمِ الْاُسَرَاءِ

وَعَنْ مَرْوَانَ وَالْمِسْوَرِ بْنِ مَخْرَمَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَامَ حِينَ جَاءَهُ وَفد من هَوَازِنَ مُسْلِمِينَ فَسَأَلُوهُ أَنْ يَرُدَّ إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ وَسَبْيَهُمْ فَقَالَ: فَاخْتَارُوا إِحْدَى الطَّائِفَتَيْنِ: إِمَّا السَّبْيَ وَإِمَّا الْمَالَ . قَالُوا: فَإِنَّا نَخْتَارُ سَبْيَنَا. فَقَامَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَثْنَى عَلَى اللَّهِ بِمَا هُوَ أَهْلُهُ ثُمَّ قَالَ: «أمَّا بعدُ فإِنَّ إِخْوانَكم قدْ جاؤوا تَائِبِينَ وَإِنِّي قَدْ رَأَيْتُ أَنْ أَرُدَّ إِلَيْهِمْ سَبْيَهُمْ فَمَنْ أَحَبَّ مِنْكُمْ أَنْ يُطَيِّبَ ذَلِكَ فَلْيَفْعَلْ وَمَنْ أَحَبَّ مِنْكُمْ أَنْ يَكُونَ عَلَى حظِّه حَتَّى نُعطِيَه إِيَّاهُ منْ أوَّلِ مَا يَفِيءُ اللَّهُ عَلَيْنَا فَلْيَفْعَلْ» فَقَالَ النَّاسُ: قَدْ طَيَّبْنَا ذَلِكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّا لَا نَدْرِي مَنْ أَذِنَ مِنْكُمْ مِمَّنْ لَمْ يَأْذَنْ فَارْجِعُوا حَتَّى يَرْفَعَ إِلَيْنَا عُرَفَاؤُكُمْ أَمْرَكُمْ» . فَرَجَعَ النَّاسُ فَكَلَّمَهُمْ عُرَفَاؤُهُمْ ثُمَّ رَجَعُوا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَخْبَرُوهُ أَنَّهُمْ قد طيَّبوا وأَذنوا. رَوَاهُ البُخَارِيّ

وعن مروان والمسور بن مخرمة أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قام حين جاءه وفد من هوازن مسلمين فسألوه أن يرد إليهم أموالهم وسبيهم فقال: فاختاروا إحدى الطائفتين: إما السبي وإما المال . قالوا: فإنا نختار سبينا. فقام رسول الله صلى الله عليه وسلم فأثنى على الله بما هو أهله ثم قال: «أما بعد فإن إخوانكم قد جاؤوا تائبين وإني قد رأيت أن أرد إليهم سبيهم فمن أحب منكم أن يطيب ذلك فليفعل ومن أحب منكم أن يكون على حظه حتى نعطيه إياه من أول ما يفيء الله علينا فليفعل» فقال الناس: قد طيبنا ذلك يا رسول الله فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: «إنا لا ندري من أذن منكم ممن لم يأذن فارجعوا حتى يرفع إلينا عرفاؤكم أمركم» . فرجع الناس فكلمهم عرفاؤهم ثم رجعوا إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم فأخبروه أنهم قد طيبوا وأذنوا. رواه البخاري

ব্যাখ্যা: মুযহির বলেনঃ আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বন্দীদেরকে প্রতিনিধি দলের হাতে ফেরত দেয়ার ক্ষেত্রে সাহাবীদের কাছে অনুমতি চেয়েছেন, কেননা তাদের সম্পদ ও বন্দী যোদ্ধাদের মালিকানায় পরিণত হয়েছে, আর তারা যার মালিক হয়েছে তা তাদের অনুমতি ছাড়া দেয়া বৈধ হবে না। (মিরকাতুল মাফাতীহ)

ইবনু বাত্ত্বল বলেনঃ প্রতিনিধি ছিল হাওয়াযিন গোত্রের দূত। তারা তাদের বন্দীদের ফেরত নেয়ার ক্ষেত্রে প্রতিনিধি দলকে মধ্যস্থাতাকারী বানিয়ে ছিল, আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবী এবং প্রতিনিধি দলের মাঝে মধ্যস্থতাকারী।

খত্ত্বাবী বলেনঃ অত্র হাদীসে প্রতিনিধি নিয়োগকারীর পক্ষে প্রতিনিধির স্বীকারোক্তি গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ আছে। কেননা অত্র হাদীসে নেতাগণ প্রতিনিধিদের স্তরে। আবূ ইউসুফও এ মত পোষণ করেছেন; আবূ হানীফাহ্ এবং মুহাম্মাদ একে শাসকের সাথে শর্তারোপ করেছেন। মালিক, শাফি‘ঈ এবং ইবনু আবূ লায়লা বলেনঃ প্রতিনিধি নিয়োগদাতার পক্ষে প্রতিনিধির স্বীকারোক্তি বিশুদ্ধ হবে না। হাদীসে বৈধতার কোনো প্রমাণ নেই, কেননা হাদীসে বর্ণিত নেতাগণ প্রতিনিধি নন, বরং তারা আমীরদের মতো। [আল্লাহ সর্বজ্ঞাত]

অত্র হাদীসে ‘‘পরিশেষে আল্লাহ সর্বপ্রথম আমাদেরকে যা দান করবেন তা থেকে তা পরিশোধ করব।’’ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ উক্তির কারণে অনির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ধার নেয়ার ব্যাপারে দলীল গ্রহণ করা হয়েছে।

তবে এ মাসআলাতে প্রসিদ্ধ মতানৈক্য আছে। (ফাতহুল বারী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২৩০৭)

সারাংশ হলো- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিজের মালিকানাতে যা বরাদ্ধ ছিল তা ফেরত দেয়ার মাধ্যমে তিনি তাদের আবেদনে সাড়া দিলেন। আর «أَحَبَّ الكلام أصدقه» বলতে সত্য কথা, সত্য প্রতিশ্রুতি সর্বাধিক প্রিয়। সুতরাং যা তিনি মানুষকে বলেন তা সত্য এবং তিনি যা মানুষকে প্রতিশ্রুতি দেন তা পূর্ণ করা তার ওপর আবশ্যক। দাস মুক্তি পর্বে বুখারীর শব্দ- অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন,إن معى من ترون وأحب الحديث إلى أصدقه، فاختاروا إحدى الطائفتين إما  المال وإما السبى وقد كنت إستأنيت بهم অর্থাৎ- ‘‘নিঃসন্দেহে আমার সাথে ঐ সকল বন্দীই আছে যাদেরকে তোমরা দেখছ, আমার কাছে সর্বাধিক প্রিয় কথা হলো সত্য কথা। অতঃপর তোমরা দু’টি অংশের একটি নির্বাচন কর, হয় সম্পদ না হয় বন্দী। আর তাদের ব্যাপারে আমি বিলম্ব করেছি।’’ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ত্বায়িফ থেকে এসেছেন তখন দশ রাত্রির অধিক তাদের জন্য অপেক্ষা করেছেন..... আল হাদীস।

আর তাঁর «إستأنيت بهم» এ উক্তির অর্থ- আমি বন্দীর বণ্টনের বিষয় পিছিয়ে দিয়েছি যাতে হাওয়াযিন প্রতিনিধি উপস্থিত হয়। কিন্তু তারা উপস্থিত হতে বিলম্ব করল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বন্দীদেরকে বণ্টন করা বাদ রেখে ত্বায়িফের অভিমুখী হয়ে ত্বায়িফ নগরীকে ঘেরাও করলেন। অতঃপর সেখান থেকে জিয়িরানাহ্-এর দিকে ফিরে আসলেন, অতঃপর সেখানে গনীমাতসমূহ বণ্টন করলেন। আর তাঁর কাছে হাওয়াযিন প্রতিনিধি আসলো, পরে তিনি তাদের নিকটে বর্ণনা করলেন তিনি তাদের জন্য দশ রাত্রির অধিক অপেক্ষা করেছেন, এভাবে গায়াতুল মাকসূদে সংক্ষিপ্তভাবে আছে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬৯০)


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
পুনঃনিরীক্ষণঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১৯: জিহাদ (كتاب الجهاد) 19. Jihad

পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধবন্দীদের বিধিমালা

৩৯৬৯-[১০] ’ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বানী সাক্বীফ ছিল বানী ’উকায়ল-এর মিত্র গোত্র। একদিন বানী সাক্বীফ-এর লোকেরা অন্যায়ভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দু’জন সাহাবীকে বন্দী করল। বন্দীর প্রতিশোধ স্বরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণ বানী ’উকায়ল-এর এক ব্যক্তিকে সুযোগ পেয়ে বন্দী করে মদীনার অদূরে ’হাররাহ্’ নামক মরু প্রান্তরে ফেলে রাখলেন। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার সম্মুখ দিয়ে যাচ্ছিলেন, এমতাবস্থায় সে চিৎকার দিয়ে বলল, হে মুহাম্মাদ! হে মুহাম্মাদ! কি অপরাধে আমাকে বন্দী করা হয়েছে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমার মিত্র গোত্র সাক্বীফ গোত্রের অপরাধে।

এটা বলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সম্মুখে অগ্রসর হলেন। লোকটি আবারও হে মুহাম্মাদ! হে মুহাম্মাদ! বলে তাকে আহবান করতে লাগল। এতে তাঁর মনে দয়ার উদ্রেক হলো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিরে এসে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি হয়েছে? লোকটি বলল, আমি মুসলিম হয়েছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এ স্বীকারোক্তি তুমি যদি তোমার স্বাধীনতা ও কর্তৃত্ব থাকাকালীন সময়ে বলতে, তবে তুমি পূর্ণরূপে সাফল্য লাভ করতে। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ঐ দু’জন মুসলিম বন্দীর বিনিময়ে ছেড়ে দিলেন, যাদেরকে বানী সাক্বীফ বন্দী করে রেখেছিল। (মুসলিম)[1]

بَابُ حُكْمِ الْاُسَرَاءِ

وَعَن عمرَان بن حُصَيْن قَالَ: كَانَت ثَقِيفٌ حَلِيفًا لِبَنِي عُقَيْلٍ فَأَسَرَتْ ثَقِيفٌ رَجُلَيْنِ مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَسَرَ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَجُلًا مِنْ بَنِي عُقَيْلٍ فَأَوْثَقُوهُ فَطَرَحُوهُ فِي الْحَرَّةِ فَمَرَّ بِهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَنَادَاهُ: يَا مُحَمَّدُ يَا مُحَمَّدُ فِيمَ أُخِذْتُ؟ قَالَ: «بِجَرِيرَةِ حُلَفَائِكُمْ ثَقِيفٍ» فَتَرَكَهُ وَمَضَى فَنَادَاهُ: يَا مُحَمَّدُ يَا مُحَمَّدُ فَرَحِمَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم فرجعَ فَقَالَ: «مَا شَأْنُكَ؟» قَالَ: إِنِّي مُسْلِمٌ. فَقَالَ: «لَوْ قُلْتَهَا وَأَنْتَ تَمْلِكُ أَمْرَكَ أَفْلَحْتَ كُلَّ الْفَلَاحِ» . قَالَ: فَفَدَاهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بالرجلينِ اللَّذينِ أسرَتْهُما ثقيفٌ. رَوَاهُ مُسلم

وعن عمران بن حصين قال: كانت ثقيف حليفا لبني عقيل فأسرت ثقيف رجلين من أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم وأسر أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم رجلا من بني عقيل فأوثقوه فطرحوه في الحرة فمر به رسول الله صلى الله عليه وسلم فناداه: يا محمد يا محمد فيم أخذت؟ قال: «بجريرة حلفائكم ثقيف» فتركه ومضى فناداه: يا محمد يا محمد فرحمه رسول الله صلى الله عليه وسلم فرجع فقال: «ما شأنك؟» قال: إني مسلم. فقال: «لو قلتها وأنت تملك أمرك أفلحت كل الفلاح» . قال: ففداه رسول الله صلى الله عليه وسلم بالرجلين اللذين أسرتهما ثقيف. رواه مسلم

ব্যাখ্যা: (فَأَسَرَتْ ثَقِيفٌ رَجُلَيْنِ مِنْ أَصْحَابِ رَسُوْلِ اللّٰهِ ﷺ) অন্য নুসখাতে আছে, ‘‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত দু’জন লোক’’ এর পরিবর্তে আল্লাহর রসূলের সাহাবীগণ ‘আক্বীল বংশের একজন লোককে আটক করল। তাদের নিয়ম ছিল মিত্রের অপরাধের কারণে মিত্রের কাউকে পাকড়াও করা। সুতরাং তাদের নিয়ম অনুযায়ী তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ কাজ করলেন। ইবনুল মালিক একে উল্লেখ করেছেন।

(قَالَ : بِجَرِيرَةِ حُلَفَائِكُمْ ثَقِيْفٍ) তোমাদের মিত্র সাক্বীফ গোত্রের অপরাধের কারণে। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাক্বীফ গোত্রের মাঝে পারস্পরিক সন্ধি চুক্তি ছিল। অতঃপর সাক্বীফ গোত্র যখন তাদের সন্ধি ভঙ্গ করল এবং বানূ ‘আক্বীল তা অসমীচীন মনে করল না। অথচ বানূ ‘আক্বীল সাক্বীফ গোত্রের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ ছিল, চুক্তিভঙ্গের ক্ষেত্রে তারা সাক্বীফ গোত্রের মতো সাব্যস্ত হলো। সুতরাং সাহাবীগণ ‘আক্বীল গোত্রের লোকটিকে সাক্বীফ গোত্রের অপরাধের কারণে পাকড়াও করল।

একমতে বলা হয়েছে, এর অর্থ হলো- তোমাকে পাকড়াও করা হয়েছে যাতে তোমার মাধ্যমে আমরা তোমার মিত্র সাক্বীফ গোত্রের অপরাধ প্রতিহত করতে পারি। এর উপর প্রমাণ বহন করছে যে, পরবর্তীতে সাক্বীফ গোত্রের আটক করা ঐ দু’ মুসলিম ব্যক্তির মুক্তিপণ হিসেবে বানূ ‘আক্বীল গোত্রের লোকটিকে উপস্থাপন করা হয়েছিল।

(أَفْلَحْتَ كُلَّ الْفَلَاحِ) অর্থাৎ- দুনিয়াতে দাসত্ব হতে মুক্তির মাধ্যমে, পরকালে জাহান্নাম থেকে মুক্তির মাধ্যমে তুমি সফল হতে।

ইবনুল মালিক বলেনঃ এতে ঐ ব্যাপারে প্রমাণ আছে যে, কাফির ব্যক্তি যখন বন্দীত্বে পতিত হয়, অতঃপর দাবী করে যে, সে ইতিপূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছে তাহলে প্রমাণ ছাড়া তার ঐ কথা গ্রহণ করা হবে না। আর যদি বন্দী হওয়ার পর ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে তাকে হত্যা করা হারাম এবং তাকে দাস বানানো বৈধ। আর যদি বন্দী হওয়ার পর জিয্ইয়াহ্ দিতে সম্মত হয় তাহলেও তাকে হত্যা করা হারাম হওয়ার ক্ষেত্রে মতানৈক্য আছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)

(لَوْ قُلْتَهَا وَأَنْتَ تَمْلِكُ أَمْرَكَ أَفْلَحْتَ كُلَّ الْفَلَاحِ) এর অর্থ হলো- বন্দী হওয়ার পূর্বে তুমি যখন তোমার বিষয়ের মালিক ছিলে তখন যদি তোমার ইসলাম গ্রহণের কথা বলতে তাহলে পূর্ণরূপে সফলকাম হতে। কেননা তুমি যদি বন্দী হওয়ার পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করতে তাহলে তোমাকে বন্দী করা বৈধ হতো না, কেননা তুমি মুসলিম হওয়ার কারণে বন্দী হওয়া থেকে নিরাপদ থাকা ও মালিক হওয়ার সুযোগ গ্রহণের মাধ্যমে সফলকাম হতে। পক্ষান্তরে যখন বন্দী হওয়ার পর ইসলাম গ্রহণের কথা বললে তখন তোমাকে হত্যা করার সুযোগ রহিত হয়ে যাবে। আর দাস বানানো, অনুগ্রহ করা ও মুক্তিপণ দেয়ার ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাধীনতা স্থায়ী থাকবে।

অত্র হাদীসে মুক্তিপণ দেয়ার বৈধতা রয়েছে, আর বন্দী ব্যক্তির ইসলাম গ্রহণ বন্দী থেকে যোদ্ধাদের অধিকার রহিত করবে না, বন্দী হওয়ার পূর্বে যদি ইসলাম গ্রহণ করে তার হুকুমের বিপরীত। (শারহে মুসলিম ১১শ খন্ড, হাঃ ১৬৪১)

অত্র হাদীসের সাথে সামঞ্জস্যশীল আবূ দাঊদ-এর «قال : نأخذك بجريرة خلفائك» এ হাদীসাংশের ব্যাখ্যায় ‘আওনুল মা‘বূদে যা এসেছে তা হলো- ইমাম খত্ত্বাবী বলেনঃ বিদ্বানগণ এর বিশ্লেষণে মতানৈক্য করেছেন। অতঃপর তাদের কতকে বলেছেন, এটা ঐ কথার উপর প্রমাণ বহন করছে যে, তারা বানূ ‘আক্বীলের সাথে ঐ কথার উপর চুক্তিবদ্ধ হয়েছে যে, তারা মুসলিমদের এবং তাদের কোনো মিত্রের মুকাবেলা করবে না। অতঃপর তাদের মিত্ররা চুক্তি ভঙ্গ করেছে। এমতাবস্থায় বানূ ‘আকীল তার অসম্মতি জানায়নি, ফলে বানূ সাক্বীফের অপরাধের কারণে বানূ ‘আক্বীলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যরা বলেন, এটা কাফির ব্যক্তি তার কোনো অঙ্গীকার নেই, তাকে গ্রেপ্তার করা, বন্দী করা এবং হত্যা করা সবই বৈধ। (‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৩০৬)


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
পুনঃনিরীক্ষণঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১৯: জিহাদ (كتاب الجهاد) 19. Jihad
দেখানো হচ্ছেঃ থেকে ১০ পর্যন্ত, সর্বমোট ১০ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে