পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
জিহাদের আভিধানিক অর্থ : ’জিহাদ’ শব্দটি ’আরবী ’জাহাদা’ শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ ’দুই পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক ক্রিয়া’। ’আরবদের কাছে শাব্দিকভাবে ’জিহাদ’-এর অর্থ হলো ’কোনো কাজ বা মত প্রকাশ করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা বা কঠোর সাধনা করা’। তাছাড়াও ’জিহাদ’ শব্দটি আভিধানিক দিক থেকে আরো অন্যান্য অর্থেও ব্যবহৃত হয়। যেমন :
১ اَلْجَدُّ ’’আল জাদ্দু’’ বা প্রচেষ্টা ব্যয় করা।
২. اَلطَّاقَةُ ’’আত্ব ত্বা-কাতু’’ বা কঠোর সাধনা করা।
৩. اَلسَّعْىُ ’’আস্ সা’ইউ’’ বা চেষ্টা করা।
৪. اَلْمُشَقَّةُ ’’আল মুশাক্কাতু’’ বা কষ্ট বহন করা।
৫. بَذْلُ القُوَّةِ ’’বাযলুল ক্যুওয়াহ্’’ বা শক্তি ব্যয় করা।
৬. اَلنِّهايَةُ والغَايَةُ ’’আন্ নিহায়াতু ওয়াল গায়াহ’’ বা শেষ পর্যায়ে পৌঁছা।
৭. اَلْاَرْضُ الصُّلْبَةْ ’’আল আরদুস্ সুলবাহ্’’ বা শক্তভূমি।
৮. اَلْكِفَاحْ ’’আল কিফা-হ’’ বা সংগ্রাম করা।
মোটকথা, শাব্দিক অর্থে ’জিহাদ’-এর সংজ্ঞা হলো, অন্তত দু’টি পক্ষের মধ্যে সর্বাত্মক চেষ্টা ও সক্ষমতার প্রকাশ ঘটানো।
শাব্দিক অর্থ মোতাবেক, এই সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সশস্ত্র কিংবা নিরস্ত্র উভয়ই হতে পারে; অর্থ ব্যয় করেও হতে পারে, ব্যয় না করেও হতে পারে। একইভাবে, দু’টো পরস্পরবিরোধী প্রবৃত্তির মধ্যেও পরস্পরকে দমানোর জিহাদ (সর্বাত্মক প্রচেষ্টা) হতে পারে। এই জিহাদ (সর্বাত্মক প্রচেষ্টা) কেবল কথার মাধ্যমেও হতে পারে, অথবা কোনো একটি কাজ না করা বা কোনো একটি বিশেষ কথা না বলার মাধ্যমেও হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, কোনো ব্যক্তিকে যদি তার পিতামাতা আদেশ করে আল্লাহকে অমান্য করার জন্য আর সেই ব্যক্তি যদি পিতামাতার নির্দেশ অমান্য করে ও সবর অবলম্বন করে, তবে তা-ও জিহাদ। আবার কোনো ব্যক্তি যদি প্রবৃত্তির তাড়নাকে অগ্রাহ্য করে হারাম কাজ থেকে বিরত থাকার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, তবে তা-ও জিহাদ।
’জিহাদ’ শব্দের এই শাব্দিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী মুসলিমদের জিহাদের প্রতিপক্ষ হতে পারে নিজের প্রবৃত্তি, শায়ত্বন, দখলদার কিংবা কাফির শক্তি। পাশাপাশি, এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী জিহাদ হতে পারে আল্লাহর পথেও (জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ)। তাই এই জিহাদ হতে পারে আল্লাহকে খুশি করার জন্য, আবার হতে পারে শায়ত্বনকে খুশি করার জন্যও। যেমন : কাফিরদের জিহাদ হলো শায়ত্বনকে খুশি করার জন্য। কাফির পিতারা তাদের মু’মিন সন্তানদের সত্য বিশ্বাসকে পরিত্যাগ করানোর জন্য যেসব কাজ করতো, সেগুলোকে কুরআনে জিহাদ বলা হয়েছে :
﴿وَإِنْ جَاهَدَاكَ عَلٰى أَنْ تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِه عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ﴾
’’তোমার পিতামাতা যদি জিহাদ (সর্বাত্মক প্রচেষ্টা) করে যে, তুমি আমার সাথে এমন কিছু শরীক কর যে সম্বন্ধে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তবে তাদেরকে অমান্য কর।’’ (সূরা লুকমান ৩১ : ১৫)
জিহাদের পারিভাষিক সংজ্ঞা : হানাফী মাযহাবের আইন গ্রন্থ ’বাদাউস্ সানায়ী’-হতে জানা যায়, জিহাদের শাব্দিক অর্থ চেষ্টা করা। শার’ঈ অর্থে জিহাদ হলো নফস্, অর্থ ইত্যাদি সবকিছু দিয়ে যুদ্ধের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ও শক্তি খাটানো।’ অপর হানাফী গ্রন্থ شرح الوقاية-এর গ্রন্থকার বলেনঃ
اَلْجِهَادُ هُوَ الدُّعَاءُ إِلَى الدِّيْنِ الْحَقِ وَالْقِتَالُ مَنْ لَمْ يَقْبَلْهُ.
অর্থাৎ جِهَاد হচ্ছে সত্য দ্বীনের প্রতি আহবান করা এবং তা অগ্রাহ্যকারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা।
শাফি’ঈ মাযহাবের আইনগ্রন্থ ’আল ইকনা’-তে বলা হয়েছে, ’জিহাদ হলো আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করা।’ আল-শিরাজী তাঁর ’আল মুহাজাব’-এ বলেন, ’জিহাদ হলো ক্বিতাল (যুদ্ধ)’।
সহীহুল বুখারীর ব্যাখ্যাকার ইমাম ইবন হাজার (রহঃ) ’ফাতহুল বারী’-তে বলেন, জিহাদ এর শার্’ঈ অর্থ হলো: وَشَرْعًا بَذْل الْجَهْد فِي قِتَال الْكُفَّار অর্থাৎ- ’’কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা-সংগ্রাম করা’’।
মালিকী মাযহাবের আইনগ্রন্থ ’মানহুল জালীল’-এ জিহাদকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এভাবে -
قِتَالُ مُسْلِمٍ كَافِرًا غَيْرَ ذِي عَهْدٍ لِإِعْلَاءِ كَلِمَةِ اللّٰهِ
’আল্লাহর কালিমাকে সর্বোচ্চে করার জন্য কাফিরদের (যাদের সঙ্গে মুসলিমদের চুক্তি নেই) সঙ্গে মুসলিমদের লড়াই .....।’
হাম্বালী মাযহাবের আইনগ্রন্থ ’আল মুগনী’-তে ইবনু কুদামাহ্ও ভিন্ন কোনো সংজ্ঞা দেননি। ’কিতাবুল জিহাদ’ অধ্যায়ে তিনি বলেন, যা কিছুই যুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত সেটা ফরযই ’আইন বা ফরযই কিফায়াহ্ যা-ই হোক না কেন, অথবা এটা মু’মিনদেরকে শত্রু থেকে রক্ষা করা হোক বা সীমান্ত রক্ষা হোক- সবকিছুই জিহাদের অন্তর্ভুক্ত। তিনি আরো বলেন, ’শত্রুরা এলে সীমান্তরক্ষীদের ওপর জিহাদ করা ফরযই ’আইন হয়ে যায়। যদি শত্রুদের আগমন স্পষ্ট হয়ে যায়, তাহলে আমীরের নির্দেশ ছাড়া সীমান্তরক্ষীরা তাদেরকে মোকাবেলা না করে আসতে পারবে না। কারণ একমাত্র আমীরই যুদ্ধের ব্যাপারে নির্দেশ দিতে পারেন।’
এছাড়া সহীহুল বুখারী, সহীহ মুসলিম, মিশকাতসহ সকল হাদীস গ্রন্থে ’কিতাবুল জিহাদ’ অধ্যায়ে কেবল সশস্ত্র যুদ্ধ বিষয়ক হাদীসই স্থান পেয়েছে।
কুরআন ও হাদীসে জিহাদ শব্দের ব্যবহার : মক্কায় সশস্ত্র যুদ্ধের অনুমতি ছিল না, তাই মাক্কী সূরাহ্সমূহে ’জিহাদ’ শব্দটি শার্’ঈ অর্থে ব্যবহৃত হয়নি; বরং শাব্দিক অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন: সূরা লুকমানের ১৫নং আয়াত, যা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। এরূপ আরো উদাহরণ হলো:
﴿وَمَنْ جَاهَدَ فَإِنَّمَا يُجَاهِدُ لِنَفْسِه إِنَّ اللّٰهَ لَغَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ﴾
’’আর যে ব্যক্তি সাধনা (জিহাদ) করে, সে তো নিজেরই জন্য সাধনা করে। আল্লাহ্ তো বিশ্বজগত থেকে অমুখাপেক্ষী।’’ (সূরা আল ’আনকাবূত ২৯ : ৬)
﴿وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حُسْنًا وَإِنْ جَاهَدَاكَ لِتُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ﴾
’’আমি মানুষকে স্বীয় মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করতে আদেশ দিয়েছি, তবে তারা যদি তোমার ওপর চাপ (জিহাদ) দেয়, আমার সাথে এমন কিছু শরীক করতে যে সম্বন্ধে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, এক্ষেত্রে তুমি তাদের আনুগত্য করবে না।’’ (সূরা আল ’আন্কাবুত ২৯ : ৮)
﴿وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ﴾
’’আর যারা আমার উদ্দেশে কষ্ট সহ্য (জিহাদ) করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করব। নিশ্চয় আল্লাহ নেককারদের সাথে আছেন।’’ (সূরা আল ’আন্কাবূত ২৯ : ৬৯)
﴿فَلَا تُطِعِ الْكَافِرِينَ وَجَاهِدْهُمْ بِه جِهَادًا كَبِيرًا﴾
’’অতএব আপনি কাফিরদের আনুগত্য করবেন না এবং তাদের সঙ্গে কুরআনের সাহায্যে কঠোর সংগ্রাম (জিহাদ) চালিয়ে যান।’’ (সূরা আল ফুরকান ২৫ : ৫২)
মদীনায় অবতীর্ণ ২৬টি আয়াতে জিহাদের বিষয়টি এসেছে এবং এগুলোর অধিকাংশই সুস্পষ্টভাবে ’যুদ্ধ’ (ক্বিতাল) অর্থ বহন করে। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ
﴿لَا يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ غَيْرُ أُولِي الضَّرَرِ وَالْمُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فَضَّلَ اللهُ الْمُجَاهِدِينَ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ عَلَى الْقَاعِدِينَ دَرَجَةً وَكُلًّا وَعَدَ اللهُ الْحُسْنٰى وَفَضَّلَ اللهُ الْمُجَاهِدِينَ عَلَى الْقَاعِدِينَ أَجْرًا عَظِيمًا﴾
’’সমান নয় সেসব মু’মিন যারা বিনা ওযরে ঘরে বসে থাকে এবং ওই সব মু’মিন যারা আল্লাহর পথে নিজেদের জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করে। যারা স্বীয় জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছেন তাদের ওপর যারা ঘরে বসে থাকে। আর প্রত্যেককেই আল্লাহ কল্যাণের ওয়া’দা করেছেন। আল্লাহ মুজাহিদীনদের মহান পুরস্কারের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন যারা ঘরে বসে থাকে তাদের ওপর।’’
(সূরা আন্ নিসা ৪ : ৯৫)
এই আয়াতে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে যে, জিহাদ মানে যুদ্ধের জন্য বের হওয়া এবং ঘরে থাকার চেয়ে সেটা উত্তম।
﴿انْفِرُوا خِفَافًا وَثِقَالًا وَجَاهِدُوا بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ فِي سَبِيلِ اللهِ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ﴾
’’তোমরা অভিযানে বের হয়ে পড়, হালকা অথবা ভারী অবস্থায়; এবং জিহাদ করো আল্লাহর পথে নিজেদের মাল দিয়ে এবং নিজেদের জান দিয়ে। এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যদি তোমরা জানতে।’’
(সূরা আত্ তওবা্ ৯ : ৪১)
ঐতিহাসিক তাবূক যুদ্ধের সময় প্রেক্ষাপটে এই আয়াত নাযিল হয়। তাবূক যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল খেজুর কাটার মৌসুমে। তখন গরমও ছিল খুব বেশি। তাই কেউ কেউ ক্ষেত-খামার, ধন-সম্পদ নষ্ট হয়ে যাওয়ার অজুহাতে, কেউ পারিবারিক কাজের অজুহাতে, কেউ বা অসুস্থতার বাহানা তুলে যুদ্ধে না যাওয়ার অনুমতি চাইলো। আল্লাহ তখন এই আয়াত নাযিল করে তাদের প্রার্থনা বাতিল করে দিলেন এবং ইচ্ছুক-অনিচ্ছুক, খুশি-অখুশি, সশস্ত্র-নিরস্ত্র, ধনী-গরিব সবার জন্য যে কোনো অবস্থায় যুদ্ধে যাওয়া ফরয করে দিলেন। এখানে ’জিহাদ’ শব্দটি পরিষ্কারভাবে ’যুদ্ধ’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
একই অর্থ রয়েছে এই সূরার ৮৮ নম্বর আয়াতে, ’’কিন্তু রসূল ও যারা তাঁর সঙ্গে ঈমান এনেছে, তারা জিহাদ করেছে নিজেদের মাল ও নিজেদের জান দিয়ে, তাদেরই জন্য রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ এবং তারাই প্রকৃত সফলকাম।’’ (সূরা আত্ তওবা্ ৯ : ৮৮)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শত শত হাদীসে ’জিহাদ’-কে শার’ঈ অর্থে অর্থাৎ যুদ্ধ ও যুদ্ধের উপায়-উপকরণ অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন : আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
مَثَلُ الْمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللّٰهِ كَمَثَلِ الصَّائِمِ الْقَائِمِ الْقَانِتِ بِآيَاتِ اللّٰهِ لَا يَفْتُرُ مِنْ صِيَامٍ وَلَا صَلَاةٍ حَتّٰى يَرْجِعَ الْمُجَاهِدُ فِي سَبِيلِ اللّٰهِ تَعَالٰى.
আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদের তুলনা ওইরূপ সায়িম (রোযাদার), যে সালাতে দাঁড়িয়ে আল্লাহর আয়াত তিলাওয়াত করে যাচ্ছে, যে তার সওম ও সালাত আদায়ে বিন্দুমাত্র ক্লান্তি প্রকাশ করে না; (সে এরূপ সাওয়াব পেতেই থাকবে) যতক্ষণ না আল্লাহ তা’আলার রাস্তায় মুজাহিদ ফিরে আসে।
(বুখারী হাঃ ২৭৮৭, মুসলিম হাঃ ৪৯৭৭)
এ হাদীসে পরিষ্কারভাবেই ’মুজাহিদ’ বলতে যোদ্ধাকে বোঝানো হয়েছে- যে যোদ্ধা ’যতক্ষণ না ফিরে আসে’ ততক্ষণ পর্যন্ত হাদীসে বর্ণিত সাওয়াবসমূহ পেতেই থাকে। অন্য হাদীসে ’আবদুল্লাহ বিন হুবশী বলেন,
قِيلَ فَأَيُّ الْجِهَادِ أَفْضَلُ قَالَ مَنْ جَاهَدَ الْمُشْرِكِينَ بِمَالِه وَنَفْسِه قِيلَ فَأَيُّ الْقَتْلِ أَشْرَفُ قَالَ مَنْ أُهَرِيقَ دَمُه وَعُقِرَ جَوَادُه
লোকেরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলো, ’কোনো জিহাদ উত্তম?’ তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জবাব দেন, জীবন ও সম্পদ দিয়ে মুশরিকদের বিরুদ্ধে লড়াই করা। আবার জিজ্ঞেস করা হলো, কী ধরনের মৃত্যুবরণ করা উত্তম? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জবাব দিলেন, ওই ব্যক্তি যার রক্ত প্রবাহিত করা হয় এবং সাথে তার সওয়ারী ঘোড়ার পাও কেটে ফেলা হয়। (আবূ দাঊদ, হাঃ ১৪৫১; নাসিরুদ্দীন আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন)
আরেক হাদীসে ইবনু ’আব্বাস বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
لَمَّا أُصِيبَ إِخْوَانُكُمْ بِأُحُدٍ جَعَلَ اللَّهُ أَرْوَاحَهُمْ فِي جَوْفِ طَيْرٍ خُضْرٍ تَرِدُ أَنْهَارَ الْجَنَّةِ تَأْكُلُ مِنْ ثِمَارِهَا وَتَأْوِي إِلٰى قَنَادِيلَ مِنْ ذَهَبٍ مُعَلَّقَةٍ فِي ظِلِّ الْعَرْشِ فَلَمَّا وَجَدُوا طِيبَ مَأْكَلِهِمْ وَمَشْرَبِهِمْ وَمَقِيلِهِمْ قَالُوا مَنْ يُبَلِّغُ إِخْوَانَنَا عَنَّا أَنَّا أَحْيَاءٌ فِي الْجَنَّةِ نُرْزَقُ لِئَلَّا يَزْهَدُوا فِي الْجِهَادِ وَلَا يَنْكُلُوا عِنْدَ الْحَرْبِ فَقَالَ اللَّهُ سُبْحَانَه أَنَا أُبَلِّغُهُمْ عَنْكُمْ
যখন উহুদ যুদ্ধে তোমাদের ভাইয়েরা নিহত হলো, আল্লাহ তাদের রূহগুলোকে সবুজ পাখির পেটের ভিতরে ভিতরে স্থাপন করে মুক্ত করে দেন। তাঁরা জান্নাতের ঝরণা ও উদ্যানসমূহ থেকে নিজেদের রিযক আহরণ করেন, অতঃপর তাঁরা সেই আলোকধারায় ফিরে আসেন, যা তাঁদের জন্য আল্লাহর ’আরশের নিচে টাঙিয়ে দেয়া হয়েছে। যখন তাঁরা নিজেদের আনন্দ ও শান্তিময় জীবন প্রত্যক্ষ করলেন, তখন বললেন, ’আমাদের আত্মীয়-স্বজনরা পৃথিবীতে আমাদের মৃত্যুতে শোকার্ত; আমাদের অবস্থা সম্পর্কে কি কেউ তাদের জানিয়ে দিতে পারে, যাতে তারা আমাদের জন্য দুঃখ না করে এবং তারাও যাতে জিহাদে (অংশগ্রহণের) চেষ্টা করে।’ তখন আল্লাহ তা’আলা বললেন, ’তোমাদের এ সংবাদ তাদেরকে পৌঁছে দিচ্ছি।’ এরই প্রেক্ষিতে সূরা আ-লি ’ইমরান-এ নাযিল হয় :
﴿وَلَا تَحْسَبَنَّ ٱلَّذِينَ قُتِلُواْ فِى سَبِيلِ ٱللّٰهِ أَمْوَاتاً بَلْ أَحْيَاءٌ عِندَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ﴾
’’আর যারা আল্লার পথে শহীদ হয়, তাদেরকে তুমি মৃত মনে করো না। বরং তারা নিজেদের পালনকর্তার নিকট জীবিত ও জীবিকাপ্রাপ্ত’’- (সূরা আ-লি ’ইমরন ৩ : ১৬৯)। (আবূ দাঊদ, হাঃ ২৫২২)
প্রকৃতপক্ষে সশস্ত্র যুদ্ধে অর্থাৎ জিহাদে মৃত্যুবরণ করা খোদ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এরই একান্ত বাসনা ছিল :
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِه لَوْلَا أَنَّ رِجَالًا مِنْ الْمُؤْمِنِينَ لَا تَطِيبُ أَنْفُسُهُمْ أَنْ يَتَخَلَّفُوا عَنِّي وَلَا أَجِدُ مَا أَحْمِلُهُمْ عَلَيْهِ مَا تَخَلَّفْتُ عَنْ سَرِيَّةٍ تَغْزُو فِي سَبِيلِ اللّٰهِ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِه لَوَدِدْتُ أَنِّي أُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللّٰهِ ثُمَّ أُحْيَا ثُمَّ أُقْتَلُ ثُمَّ أُحْيَا ثُمَّ أُقْتَلُ ثُمَّ أُحْيَا ثُمَّ أُقْتَلُ.
সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, যদি কিছু মু’মিন এমন না হতো যারা আমার সাথে জিহাদে অংশগ্রহণ না করাকে আদৌ পছন্দ করবে না, অথচ তাদের সবাইকে আমি সওয়ারী দিতে পারছি না, এই অবস্থা না হলে আল্লাহর পথে যুদ্ধরত কোনো ক্ষুদ্র সেনাদল হতেও দূরে থাকতাম না। সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, আমার কাছে অত্যন্ত পছন্দনীয় হলো, আমি আল্লাহর পথে নিহত হই, অতঃপর জীবন লাভ করি। আবার নিহত হই আবার জীবন লাভ করি এবং আবার নিহত হই তারপর আবার জীবন লাভ করি। আবার নিহত হই। (বুখারী হাঃ ২৭৯৭, মুসলিম হাঃ ৪৯৬৭)
৩৭৮৭-[১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং তার রসূলের প্রতি ঈমান আনে, সালাত কায়িম করবে, রমাযানের সিয়াম পালন করবে, আল্লাহর পথে জিহাদ করবে বা স্বীয় জন্মভূমিতে অবস্থান করে- তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো আল্লাহর ওপর হক ও দায়িত্ব হয়ে যায়। অতঃপর লোকেরা (সাহাবায়ে কিরাম) বললেন, আমরা কি জনগণের মাঝে এ সুসংবাদ জানিয়ে দিব না? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের জন্য আল্লাহ তা’আলা জান্নাতে একশ’ মর্যাদা প্রস্তুত করে রেখেছে। প্রতি দু’ শ্রেণীর মর্যাদার মাঝে দূরত্বের পরিমাণ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্বের সমান। সুতরাং তোমরা যখন আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবে, তখন তার নিকট (জান্নাতুল) ফিরদাওস প্রার্থনা করবে। কেননা তা জান্নাতের মধ্যম ও সর্বোত্তম জান্নাত। তার উপরিভাগে আল্লাহর ’আরশ এবং সেখান থেকে জান্নাতের ঝর্ণাসমূহ প্রবাহিত হয়। (বুখারী)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَصَامَ رَمَضَانَ كَانَ حَقًّا عَلَى اللَّهِ أَنْ يُدْخِلَهُ الْجَنَّةَ جَاهَدَ فِي سهل اللَّهِ أَوْ جَلَسَ فِي أَرْضِهِ الَّتِي وُلِدَ فِيهَا» . قَالُوا: أفَلا نُبشِّرُ النَّاسَ؟ قَالَ: «إِنَّ فِي الْجَنَّةِ مِائَةَ دَرَجَةٍ أَعَدَّهَا اللَّهُ لِلْمُجَاهِدِينَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ مَا بَيْنَ الدَّرَجَتَيْنِ كَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ فَإِذَا سَأَلْتُمُ اللَّهَ فَاسْأَلُوهُ الْفِرْدَوْسَ فَإِنَّهُ أَوْسَطُ الْجَنَّةِ وَأَعْلَى الْجَنَّةِ وَفَوْقَهُ عَرْشُ الرَّحْمَنِ وَمِنْهُ تُفَجَّرُ أنهارُ الجنَّةِ» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: ‘‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি ঈমান আনবে, সালাত কায়িম করবে এবং সিয়াম পালন করবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন’’ এ বাক্যে ইসলামের রুকন ও সালাত এবং সিয়ামের মতো বাহ্যিক ‘আমল হওয়া সত্ত্বেও হজ্জ/হজ ও যাকাতের কথা আলোচনা না করার কারণ :
ইবনু বাত্ত্বল বলেনঃ ‘‘যাকাত ও হজে/হজ্জের আলোচনা না করার কারণ হচ্ছে তা তখনও ফরয হয়নি’’। ইমাম ইবনু হাজার আল ‘আস্ক্বালানী বলেনঃ বরং বর্ণনাকারীদের কোনো একজনের কাছ থেকে এর উল্লেখ বাদ পড়ে গেছে। কেননা তিরমিযীতে মু‘আয বিন জাবাল -এর হাদীসে হজে/হজ্জের কথা উল্লেখ রয়েছে এবং তিনি উক্ত হাদীসে বলেছেনঃ ‘‘আমি জানি না (আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যাকাতের উল্লেখ করেছেন কিনা’’। তাছাড়া উক্ত হাদীসটি ইসলামের রুকনসমূহ বর্ণনা প্রসঙ্গে নয়। সুতরাং যদি তা সংরক্ষিত হয়ে থাকে তাহলে হাদীসে যা উল্লেখ রয়েছে (সালাত ও সিয়াম) তাতেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত, যেহেতু এ ‘আমল অধিকাংশ সময় বার বার করা হয়ে থাকে। আর যাকাত তো কেবল তার ওপরই ফরয, যে শর্তানুসারে নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক। আর হজ্জ/হজ তো বিলম্ব করার অবকাশের সাথে জীবনে মাত্র একবার আদায় করা ওয়াজিব।
(ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৭৯০)
(جَاهَدَ فِي سَبِيلِ اللّٰهِ أَوْ جَلَسَ فِي أَرْضِهِ الَّتِي وُلِدَ فِيهَا) ‘‘(আল্লাহ তা‘আলা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন) চাই সে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করুক কিংবা তার মাতৃভূমিতে বসে থাকুক, যেখানে সে জন্মলাভ করেছে’’ এ বাক্যে ঐ ব্যক্তির জন্য সান্তনা ও আশার বাণী রয়েছে যে জিহাদ থেকে বঞ্চিত হয়েছে, এই মর্মে যে, সে তার ‘আমলের প্রতিদান থেকে বঞ্চিত হবে না। বরং তার ঈমান ও অন্যান্য আবশ্যকীয় ফরযসমূহ দৃঢ়ভাবে পালনের সাওয়াব তাকে জান্নাতে পৌঁছে দিবে, যদিও জান্নাতে মুজাহিদদের মর্যাদার তুলনায় তার মর্যাদা কম হবে। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৭৯০)
‘‘তারা বললঃ আমরা কি মানুষকে সুসংবাদ দিব না?’’ তিরমিযীর বর্ণনামতে মু‘আয বিন জাবাল এবং ত্ববারানীর বর্ণনামতে আবুদ্ দারদা এ কথা বলেছিলেন। তিরমিযীর বর্ণনায় রয়েছে, মু‘আয বিন জাবাল বলেন, আমি বললামঃ
ألا أخبر بهذا الناس ؟ فقال رسول الله ﷺ ذر الناس يعملون فإن الجنة مائة درجة
‘‘অর্থাৎ- আমি কি মানুষকে এ সংবাদ দিব না? তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ মানুষকে (চলমান গতিতে) ‘আমল করতে দাও। কেননা জান্নাতে রয়েছে একশত মর্যাদার স্তর।’’ (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৭৯০)
(مَا بَيْنَ الدَّرَجَتَيْنِ كَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ) ‘‘দু’টি স্তরের মাঝে ব্যবধান আকাশ ও জমিনের মাঝের ব্যবধানের ন্যায়’’। একটি হাদীসের বর্ণনায় আছে, আকাশ ও জমিনের মাঝে দূরত্ব পাঁচশত বছরের রাস্তা। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
‘আল্লামা ইবনু হাজার আল ‘আসক্বালানী তার ফাতহুল বারীতে উল্লেখ করেন যে, ইমাম তিরমিযী মুহাম্মাদ বিন জুহাদাহ এর সূত্রে বর্ণনা করেন: ‘‘প্রত্যেক দুই স্তরের মাঝে একশত বছরের ব্যবধান’’। আর একই সূত্রে ত্ববারানী বর্ণনা করেন যে, উভয়ের মাঝে পাঁচশত বছরের ব্যবধান। আর উভয় বর্ণনা যদি বিশুদ্ধ হয়ে থাকে তাহলে দূরত্বের পরিমাণে বছর সংখ্যার ভিন্নতা ভ্রমণের গতির ভিন্নতার কারণে। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৭৯০)
‘‘কেননা তা (জান্নাতুল ফিরদাওস) হচ্ছে জান্নাতসমূহের মধ্যে সবচাইতে মধ্যম এবং সর্বোচ্চ জান্নাত’’ বাক্যে ‘আওসাতুল জান্নাহ্’ তথা ‘মধ্যম জান্নাত’ এর অর্থ হলো সর্বোত্তম জান্নাত। যেমন : আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে ইরশাদ করেন : ‘‘আর অনুরূপভাবে আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি উত্তম জাতি হিসেবে। (সূরা আল বাকারা ২ : ১৪৩)
আর ‘‘ওয়া আ‘লাহা’’ তথা ‘সর্বোচ্চ জান্নাত’ এ অংশকে পূর্বের অংশের সাথে (আতফ) মিলানো হয়েছে তাকীদ বা অর্থকে শক্তিশালী করার জন্য। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৭৯০)
ইমাম ইবনু হিব্বান বলেনঃ ‘‘আওসাত বলতে (জান্নাতুল ফিরদাওসের) প্রশস্ততা এবং আ‘লা বলতে তার উপরে অবস্থিত হওয়া বুঝানো হয়েছে।’’ (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৭৯০)
‘‘আর সেখান থেকে জান্নাতের নহরসমূহ প্রবাহিত হয়’’, অর্থাৎ- জান্নাতুল ফিরদাওস থেকে জান্নাতের চারটি নহর প্রবাহিত হয়। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৭৯০)
জান্নাতের চারটি নহর হচ্ছে পানি, দুধ, শরাব (মদ) ও মধুর নহর। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
জান্নাতুল ফিরদাওস এমন এক বাগান যেখানে সকল প্রকার নি‘আমাতের সমাহার ঘটেছে। আলোচ্য হাদীসে মুজাহিদীনদের মর্যাদা বা ফাযীলাতের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। হাদীসটিতে জান্নাতের বড়ত্ব এবং তন্মধ্যে বিশেষভাবে জান্নাতুল ফিরদাওসের মহত্ব বর্ণনা করা হয়েছে। উক্ত হাদীসে এ বিষয়েও ইঙ্গিত রয়েছে যে, মুজাহিদের মর্যাদা মুজাহিদ ব্যতীত অন্যরাও তাদের একনিষ্ঠ নিয়্যাত কিংবা নেক ‘আমল দ্বারা কখনো কখনো লাভ করতে সক্ষম হবে। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘‘জান্নাতুল ফিরদাওস মুজাহিদীনদের জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে’’ এ কথার ঘোষণা দেয়ার পরও সকলকেই জান্নাতুল ফিরদাওস লাভের জন্য প্রার্থনা করতে বলেছেন। (আল্লাহই সর্বাপেক্ষা অধিক জানেন)। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৭৯০)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৭৮৮-[২] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর পথে মুজাহিদদের তুলনা ঐরূপ সায়িমের (রোযাদারের) ও সালাত আদায়রত অবস্থায় তিলাওয়াতকারীর ন্যায়, যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদের ঘরে ফিরে না আসা পর্যন্ত সিয়াম পালনে ও সালাত আদায়ে নিমগ্ন থাকে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَثَلُ الْمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ الصَّائِمِ الْقَائِمِ الْقَانِتِ بِآيَاتِ اللَّهِ لَا يَفْتُرُ مِنْ صِيَامٍ وَلَا صَلَاةٍ حَتَّى يَرْجِعَ الْمُجَاهِدُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ»
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে আল্লাহর কালিমাকে বিজয়ী করার জন্য যারা জিহাদ করে, তাদের মর্যাদা ও তাদের কাজের মহত্ব বর্ণনা করা হয়েছে। এ হাদীসে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী ব্যক্তির সাদৃশ্য দেয়া হয়েছে এমন এক ব্যক্তির সাথে; যে অবিরত সালাত, সিয়াম ও কুরআন তিলাওয়াতে মগ্ন থাকে এবং কখনোই ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত হয় না।
(مَثَلُ الْمُجَاهِدِ فِى سَبِيلِ اللّٰهِ كَمَثَلِ الصَّائِمِ الْقَائِمِ الْقَانِتِ بِاٰيَاتِ اللّٰهِ) এ বাক্যে মুজাহিদের সাদৃশ্য দেয়া হয়েছে সিয়াম পালনকারী, ক্বিয়ামকারী এবং আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠকারীর সাথে্। মুয়াত্ত্বা মালিক ও ইবনু হিব্বান-এর বর্ণনানুসারে ‘‘তার সাদৃশ্য সর্বদায় সিয়াম এবং ক্বিয়ামকারীর সাথে, যে উক্ত মুজাহিদের জিহাদের ময়দান থেকে প্রত্যাবর্তন করা পর্যন্ত অবিরত সালাত ও সিয়াম পালনে মগ্ন থাকে; কখনোই ক্লান্ত হয় না।’’ মুসনাদে আহমাদ ও মুসনাদুল বায্যারে নু‘মান বিন বাশীর থেকে মারফূ‘ সূত্রে বর্ণিত, ‘‘আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদের দৃষ্টান্ত দিনে সিয়াম পালনকারী এবং রাতভর ক্বিয়াম তথা সালাত আদায়কারী ব্যক্তির সাথে।’’ (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৭৮৭)
‘আল কায়িম’ তথা ক্বিয়ামকারী বলতে দাঁড়ানো অবস্থায় সালাত আদায়কারী ব্যক্তি উদ্দেশ্য; বসা অবস্থায় সালাত আদায়কারী নয়। ‘আল কানিত বি আয়াতিল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহর আয়াতসমূহ তিলাওয়াতকারী বা পাঠকারী। কারো মতে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে সালাতে কুরআন তিলাওয়াতকারী ব্যক্তি। নিহায়াহ্ গ্রন্থকার বলেনঃ ‘‘কুনূত শব্দটি হাদীসে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। যথা : আনুগত্য, খুশূ তথা বিনয়-নম্রতা, সালাত, দু‘আ, ‘ইবাদাত, ক্বিয়াম, দীর্ঘ ক্বিয়াম ও নিরবতা।’’ (মিরকাতুল মাফাতীহ)
আলোচ্য হাদীসে অবিরত সিয়াম এবং ক্বিয়ামকারীকে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীর সাথে তুলনা করা হয়েছে প্রত্যেক স্থিরতা ও নড়াচড়ায় সাওয়াব লাভের দিক থেকে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি সর্বদা সিয়াম ও ক্বিয়াম করে এবং একটি মুহূর্তও ‘ইবাদাত করতে ক্লান্তি অনুভব করে না, তার সাওয়াব চলমান থাকে। ঠিক তেমনিভাবে মুজাহিদের একটি মুহূর্তও নষ্ট হয় না; বরং সদা-সর্বদাই সাওয়াব অর্জিত হতে থাকে। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৭৮৭)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৭৮৯-[৩] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ তা’আলার পথে বের হয় তথা দায়িত্বগ্রহণ করে, এই মুজাহিদ আমার ও আমার রসূলের প্রতি ঈমান ও বিশ্বাসের সত্যতা স্বীকারের তাকীদেই স্বীয় ঘর হতে আমার পথে বের হয়েছে, তাকে আমি অবশ্যই পরিপূর্ণ সাওয়াব দান করবো অথবা গনীমাতের মালসহ ঘরে ফিরিয়ে আনবো অথবা তাকে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করাব। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «انْتَدَبَ اللَّهُ لِمَنْ خَرَجَ فِي سَبِيلِهِ لَا يُخْرِجُهُ إِلَّا إِيمَانٌ بِي وَتَصْدِيقٌ بِرُسُلِي أَنْ أَرْجِعَهُ بِمَا نَالَ مِنْ أَجْرٍ وَغَنِيمَةٍ أَوْ أُدْخِلَهُ الْجَنَّةَ»
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে ঈমান ও ইখলাসের সাথে জিহাদের উদ্দেশে বের হওয়ার ফযীলত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে, যার ভাবার্থ হচ্ছে- যে ব্যক্তি কেবলমাত্র আল্লাহর প্রতি ঈমান ও রসূলের রিসালাতকে সত্যায়ন করা অবস্থায় জিহাদের উদ্দেশে বের হবে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে শাহাদাতের মর্যাদা প্রদানপূর্বক জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, অথবা নেকী ও গনীমাতের সম্পদ সহকারে তাকে নিজ আবাসস্থলে ফিরিয়ে দিবেন।
(انْتَدَبَ اللهُ لِمَنْ خَرَجَ فِي سَبِيلِه) এ বাক্যে ‘ইন্তাদাবাল্লাহু’ অর্থ হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলা জিম্মাদারী বা দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, ডাকে সাড়া দিয়েছেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
অর্থাৎ- যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের উদ্দেশে বের হয়েছে আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য (তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর কিংবা নেকী ও গনীমাতের সম্পদ সহকারে বাড়ি ফিরিয়ে দেয়ার) দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
(لَا يُخْرِجُه إِلَّا إِيمَانٌ بِي وَتَصْدِيقٌ بِرُسُلِي) অর্থাৎ- আমার প্রতি ঈমান এবং আমার রসূলগণের বিশ্বাস ছাড়া অন্য কিছু তাকে (জিহাদের উদ্দেশে) বের করেনি। এ বাক্যে ‘রসূল’ শব্দের বহুবচন তথা ‘রুসুল’ শব্দ ব্যবহার করার কারণ দু’টি হতে পারে। (ক) এতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, রসূলগণের মধ্যে কোনো একজনের প্রতি বিশ্বাস করা সকলের প্রতি বিশ্বাস করার শামিল। (খ) অথবা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মানার্থে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে (‘আরবী ভাষার রীতি অনুসারে কোনো একক ব্যক্তির সম্মানার্থে বহুবচন শব্দ ব্যবহার করা হয়ে থাকে), কেননা তিনি সকল নাবী রসূলদের স্থলাভিষিক্ত। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
(أَنْ أُرْجِعَه بِمَا نَالَ مِنْ أَجْرٍ أَوْ غَنِيمَةٍ أَوْ أُدْخِلَهُ الْجَنَّةَ) অর্থাৎ- আল্লাহ তা‘আলা মুজাহিদের জন্য এ দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন যে, তাকে অর্জিত নেকী কিংবা গনীমাত সহকারে ফিরিয়ে দিবেন, অথবা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। জিহাদের জন্য বহির্গমনকারীর জন্য আল্লাহ তা‘আলা এ জিম্মাদারী গ্রহণ করেছেন যে, সে সকল অবস্থায় কল্যাণ হাসিল করবে। এ ক্ষেত্রে সে নিম্নোক্ত তিনটি অবস্থার কোনো এক অবস্থায় কল্যাণপ্রাপ্ত হবে। সেগুলো হলো:
১. হয় সে শাহাদাতের মর্যাদা লাভে ধন্য হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে।
২. অথবা আল্লাহর কাছ থেকে সাওয়াব বা নেকী হাসিল করে প্রত্যাবর্তন করবে।
৩. কিংবা সাওয়াব হাসিলের পাশাপাশি গনীমাতের সম্পদসহ ফিরে আসবে।
(শারহে মুসলিম ১৩শ খন্ড, হাঃ ১৮৭৬)
‘‘আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন’’ এ কথার দু’টি অর্থ হতে পারে।
১. নিহত হওয়ার চিহ্ন বা নিদর্শন সহকারে তাকে (সরাসরি) জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আর এ মর্যাদা শহীদদের জন্য বিশেষিত, যেমনিভাবে শাহাদাত বরণের পর রিযকপ্রাপ্ত হওয়া তাদের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ অর্থাৎ- ‘‘আর যারা আল্লাহর পথে জীবন দিয়েছে, তাদেরকে তুমি মৃত মনে করো না, বরং তারা তাদের রবের নিকট জীবিত। তাদেরকে রিযক দেয়া হয়’’। (সূরা আ-লি ‘ইমরান ৩ : ১৬৯)
২. পুনরুত্থানের পর আল্লাহ তা‘আলা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আর এক্ষেত্রে খাস করে শহীদদের জান্নাতে প্রবেশ করানোর কথা বলার কারণ হচ্ছে তার শাহাদাত বরণ করাই তার সকল গুনাহের কাফ্ফারা-যদিও গুনাহের পরিমাণ অধিক হয়- তবে সেই গুনাহ ব্যতীত, যা দলীল দ্বারা সাব্যস্ত। আর তার যে জিহাদের জন্য বের হয়ে আর ফিরে আসলো না; বরং শাহাদাত বরণ করল, তার অর্জিত নেকীর সাথে তার কৃত পাপের তুলনাই চলে না। আবূ কাতাদাহ কর্তৃক বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদীসটি উল্লেখিত ব্যাখ্যাটি সমর্থন করে।
قال جاء رجل إلى رسول الله ﷺ فقال : يا رسول الله أرأيت إن قتلت في سبيل الله صابرا محتسبا مقبلا غير مدبر أيكفر الله عني خطاياي قال رسول الله ﷺ نعم فلما ولى الرجل ناداه رسول الله ﷺ أو أمر به فنودي له فقال رسول الله ﷺ كيف قلت فأعاد عليه قوله فقال رسول الله ﷺ نعم إلا الدين كذلك قال لي جبريل عليه السلام
অর্থাৎ- আবূ কাতাদাহ বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রসূল! আপনার মতামত কি? আমি ধৈর্যধারণ করে, সাওয়াবের আশায়, সম্মুখগামী হয়ে এবং পৃষ্ঠপ্রদর্শন না করে যদি আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হই, তাহলে আল্লাহ কি আমার গুনাহসমূহ মিটিয়ে দিবেন? আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘‘হ্যাঁ’’। লোকটি যখন চলে গেল আল্লাহর রসূল তাকে ডাকলেন, অথবা ডেকে আনতে কাউকে আদেশ দিলেন, অতঃপর ডেকে আনা হলো। তখন তিনি বললেন, তুমি কিভাবে (কথাটি) বলেছিলে? লোকটি আবার তার কথা পুনরাবৃত্তি করল। তখন আল্লাহর রসূল বললেনঃ ‘‘হ্যাঁ (অর্থাৎ তা সকল গুনাহের কাফফারা হবে), তবে ঋণ ব্যতীত। জিবরীল (আঃ) আমাকে এমনটিই বললেন’’- (নাসায়ী, হাঃ ৩১৫৬, আলবানীর মতে হাদীসটি সহীহ)। (মুনতাকাল আখবার হাঃ ১০১০)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৭৯০-[৪] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সেই মহান সত্তার শপথ, যার হাতে আমার জীবন, যদি কিছু সংখ্যক মু’মিন আমার সাথে জিহাদে অংশগ্রহণ করতে না পারার ফলে তাদের মন দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে এবং আমিও তাদের জন্য প্রয়োজনীয় বাহন সরবরাহ করতে পারছি না। যদি এরূপ সংকটাপন্ন না দেখা দিত, তবে আমি আল্লাহর পথে জিহাদের উদ্দেশে প্রেরিত প্রতিটি সেনাবাহিনীর সাথে অবশ্য গমন করতাম, কোনোটি হতে পিছনে থাকতাম না। যার হাতে আমার প্রাণ, সেই মহান সত্তার কসম করে বলছি, আমার কাছে অত্যন্ত প্রিয় বস্তু হলো- আমি আল্লাহর পথে শহীদ হই, অতঃপর আমাকে পুনরায় জীবিত করা হলে আমি আবার যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়ে যাই, এবং পুনরায় আমাকে জীবিত করা হোক এবং আবার যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হই, আবার জীবিত করা হোক, আবার শহীদ হই, পুনরায় জীবিত করা হোক, পুনরায় শহীদ হই। (বুখারী, মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْلَا أَنَّ رِجَالًا مِنَ الْمُسْلِمِينَ لَا تَطِيبُ أَنْفُسُهُمْ أَنْ يَتَخَلَّفُوا عَنِّي وَلَا أَجِدُ مَا أَحْمِلُهُمْ عَلَيْهِ مَا تَخَلَّفْتُ عَنْ سَرِيَّةٍ تَغْزُو فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوَدِدْتُ أنْ أُقتَلَ فِي سَبِيل الله ثمَّ أُحْيى ثمَّ أُقتَلُ ثمَّ أُحْيى ثمَّ أُقتَلُ ثمَّ أُحْيى ثمَّ أقتل»
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসটিতে জিহাদে অংশগ্রহণ করা এবং আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাত বরণ করার ফযীলত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এ হাদীসটিতে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে জিহাদে অংশগ্রহণের জন্য তীব্র আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেছেন এবং শাহাদাত লাভে ধন্য হওয়ার জন্য কামনা পোষণ করেছেন।
আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী: ‘‘মু’মিনদের মধ্যে একদল লোক আমার কাছ থেকে (যুদ্ধ যেতে না পেরে সে) অনুপস্থিত থাকার কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হবে, আর আমিও এমন (অধিক) বাহন পাচ্ছি না, যাতে তাদের আরোহণ করাবো- অবস্থা যদি এমন না হত, তাহলে আমি কোনো একটি সারিয়া থেকেও অনুপস্থিত থাকতাম না যেটি আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে’’ এ বাক্যে মু’মিনদের কিছু লোক বলতে দরিদ্র লোকেদের বুঝানো হয়েছে, যারা অর্থের অভাবে সওয়ারী বা বাহন সংগ্রহ করতে না পারার কারণে জিহাদের ময়দান থেকে অনুপস্থিত থাকে। সারিয়া হচ্ছে অল্পসংখ্যক সৈন্যের ছো্ট বাহিনী। (মিরকাতুল মাফাতীহ ৩২৫)
সওয়ারী এবং সফরের অন্যান্য পাথেয় না থাকায় তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণে অক্ষম ছিল। এদিকে সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতার কারণে আল্লাহর নাবীও তাদেরকে বাহন দিতে সক্ষম ছিলেন না। হুমাম-এর বর্ণনায় স্পষ্ট ভাষায় রয়েছে, ‘‘কিন্তু আমার প্রশস্ততা বা সামর্থ্যও নেই যে, তাদেরকে সওয়ারী দিব। আর তাদেরও সামর্থ্য নেই যে, তারা আমার অনুসরণ করে পিছু পিছু আসবে। আর আমার (যুদ্ধে চলে যাওয়ার) পর তাদের মানসিক অবস্থাও ভালো থাকবে না।’’ (ফাত-ল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৭৯৭)
অত্র হাদীসে ‘‘আল্লাহর রাস্তায় নিহত হই, আবার জীবিত হই, আবার নিহত হই’’ এ কথাটি আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার বলেছেন। আর শেষবার শুধু বলেছেন ‘‘নিহত হই’’, কিন্তু এরপর ‘‘আবার জীবিত হই’’ কথাটির পুনরাবৃত্তি করেননি। এখান থেকে শাহাদাত বরণের গুরুত্ব ও এর মর্যাদার প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
ইমাম নববী বলেনঃ এ হাদীসে সুন্দর নিয়্যাতের উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, এ হাদীসে আরো রয়েছে উম্মাতের প্রতি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দয়া ও সহানুভূতির বর্ণনা। এ হাদীস অনুসারে আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাত কামনা মুস্তাহাব এবং এ কথা বলা জায়িয যে, আমি অমুক কল্যাণ লাভের আশা পোষণ করি বা আকাঙ্ক্ষা করি- যদিও জানা থাকে যে, তা অর্জন অসম্ভব। এ হাদীস থেকে আরো বুঝা যায় যে, কখনো কখনো কতিপয় কল্যাণকর কাজ পরিহার করতে হয় অধিক প্রাধান্যযোগ্য কল্যাণকর কাজের জন্য, অথবা কোনো ক্ষতিকে প্রতিহত করার জন্য। সাধারণত যা অর্জন করা বা লাভ করা সম্ভব নয়, এমন জিনিসের আশা-আকাঙ্ক্ষা করাও উক্ত হাদীস অনুসারে জায়িয। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৭৯৭)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৭৯১-[৫] সাহল ইবনু সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর পথে এক দিনের সীমান্ত পাহারা দেয়া, দুনিয়া ও দুনিয়াতে যা কিছু আছে (তার থেকে) সর্বাপেক্ষা উত্তম। (বুখারী, মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «رِبَاطُ يَوْمٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا عَلَيْهَا»
ব্যাখ্যা : উল্লেখিত হাদীসে মুসলিমদের সংরক্ষণের জন্য আল্লাহর রাস্তায় পাহাড়াদারের দায়িত্ব পালনের ফযীলত বর্ণনা করা হয়েছে। «رباط» ‘রিবাত্ব’ শব্দের অর্থ হচ্ছে পাহাড়া দেয়া। নিহায়াহ্ গ্রন্থকার বলেনঃ মূলত রিবাত্ব হচ্ছে শত্রুপক্ষের সাথে জিহাদের উদ্দেশে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে, ঘোড়া লালন-পালন ও বেঁধে রাখার মাধ্যমে এবং তা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ও অনড় থাকা। (তুহফাতুল আহওয়াযী হাঃ ১৬৬৪)
যে স্থান দিয়ে শত্রুপক্ষের আক্রমণের সম্ভাবনা রয়েছে, তা প্রতিহত করার জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে উক্ত স্থানে অবস্থান নেয়াটাই হচ্ছে ‘রিবাত্ব’। ‘‘দুনিয়া এবং তার উপর যা কিছু আছে তা থেকে উত্তম’’ এ কথা দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে, এর প্রতিদান দুনিয়া এবং তাতে যা আছে, সব কিছু থেকে উত্তম। অর্থাৎ- দুনিয়ার যত সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা হয়েছে তার প্রতিদানের তুলনায়ও আল্লাহর রাস্তায় একদিন পাহাড়া দেয়ার প্রতিদান অধিক। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৭৯২-[৬] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর পথে একটি সকাল বা একটি বিকাল অতিবাহিত করা, দুনিয়া ও তার সমুদয় সমস্ত সম্পদ হতে সর্বোত্তম। (বুখারী, মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَغَدْوَةٌ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوْ رَوْحَةٌ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا»
ব্যাখ্যা: আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে সময় ব্যয় করার অত্যধিক ফাযীলাতের বর্ণনা দিতে গিয়েই আলোচ্য হাদীসটির অবতারণা। উক্ত হাদীসে আল্লাহর রাস্তায় একটি সকাল বা একটি বিকাল অতিবাহিত করার অফুরন্ত নেকীর কথা আলোচনা করা হয়েছে।
(لَغَدْوَةٌ فِي سَبِيلِ اللّٰهِ أَوْ رَوْحَةٌ خَيْرٌ مِنْ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا) এ বাক্যে ‘‘গদ্ওয়াতুন’’ শব্দটি ‘‘গাইন’’ বর্ণে ফাতহাহ্ দিয়ে পড়তে হবে। এর অর্থ হচ্ছে দিনের শুরু অংশে সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলতে শুরু করার পূর্ব সময় পর্যন্ত কোথাও ভ্রমণ করা। আর ‘‘রওহাতুন’’ অর্থ হচ্ছে সূর্য ঢলার পর থেকে দিনের শেষ ভাগ পর্যন্ত ভ্রমণ বা সফর করা।
এক সকাল আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করলে হাদীসে উল্লেখিত নেকী অর্জিত হবে, অনুরূপ এক বিকাল ব্যয় করলেও তা অর্জিত হবে। আর এ কথা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, এ নেকী অর্জিত হওয়া শুধুমাত্র কোনো ভূখণ্ডে অবস্থানের সাথে বিশেষিত নয়; বরং যুদ্ধের ময়দানের দিকে যাওয়ার পথে প্রত্যেক সকাল ও বিকাল কাটানোর বিনিময়ে এই নেকী অর্জিত হবে এবং যুদ্ধের ময়দানেও একইভাবে এই নেকী অর্জিত হবে। কেননা উপরোল্লিখিত সকল অবস্থায় সকাল ও বিকালের সময় ব্যয় করা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা সকাল ও বিকাল বলে বিবেচিত হবে।
হাদীসের ভাবার্থ হচ্ছে, ‘‘নিশ্চয় আল্লাহর রাস্তায় সকাল ও বিকেলের সময় ব্যয় করার ফযীলত এবং তার সাওয়াব কেউ দুনিয়ার সকল নি‘আমাত বা ধন-সম্পদের মালিক হওয়ার পর তা ভোগ করার সুযোগ থাকলেও তার চেয়েও উত্তম। কেননা দুনিয়ার এ সকল ভোগ্যসামগ্রী ক্ষণস্থায়ী, আর পরকালীন প্রতিদান স্থায়ী- যা কখনোই বিলীন হবে না।’’ (শারহে মুসলিম, খন্ড ১৩, হাঃ ১৮৮১)
সুতরাং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের কাজে একটি সকাল বা বিকাল ব্যয় করার মর্যাদার সাথে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ভোগ-বিলাসের কোনো তুলনা নেই।
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৭৯৩-[৭] সালমান ফারিসী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহর পথে একদিন বা একরাত সীমানা পাহারা দেয়া, একমাসের সওম পালন ও সালাত আদায় করা হতে উত্তম। আর ঐ প্রহরী যদি এ অবস্থায় মারা যায়, তবে তার কৃতকর্মের এ পুণ্য ’আমলের সাওয়াব অবিরত পেতে থাকবে, তার জন্য সর্বক্ষণ রিযক (জান্নাত হতে) আসতে থাকবে এবং সে কবরের কঠিন পরীক্ষা হতে মুক্তি পাবে। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَن سلمانَ الفارسيِّ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «رِبَاطُ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ خَيْرٌ مِنْ صِيَامِ شَهْرٍ وَقِيَامِهِ وَإِنْ مَاتَ جَرَى عَلَيْهِ عَمَلُهُ الَّذِي كَانَ يَعْمَلُهُ وَأُجْرِيَ عَلَيْهِ رِزْقُهُ وَأَمِنَ الْفَتَّانَ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যা : আলোচ্য হাদীসটিতে আল্লাহর রাস্তায় একদিন একরাত পাহাড়া দেয়ার ফযীলত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। "رباط" রিবাত্ব এর পরিচয় দিতে গিয়ে ইমাম সুয়ূত্বী বলেন, ‘‘মুসলিম ও কাফিরদের মাঝে কোনো এক স্থানে মুসলিমদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পাহাড়া দেয়ার কাজে নিয়োজিত হওয়াই রিবাত্ব।’’ (মিরকাতুল মাফাতীহ)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী, ‘‘যদি সে মারা যায় তাহলে তার ঐ ‘আমলের সাওয়াব জারী বা চলমান থাকবে, যা সে করত’’ এ কথাটি আল্লাহর রাস্তায় পাহাড়া দেয়ার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তির স্পষ্ট ফযীলত ও মর্যাদার বর্ণনা। আর মৃত্যুর পরেও ‘আমল চলমান বা জারী থাকার ফযীলত শুধুমাত্র তার সাথেই বিশেষিত, যাতে অন্য কোনো ব্যক্তি অংশীদার নয়। সহীহ মুসলিম ব্যতীত অন্যান্য হাদীসগ্রন্থের বর্ণনায় এ কথা স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, ‘‘প্রত্যেক মৃত ব্যক্তির ‘আমলের পরিসমাপ্তি ঘটে, তবে রিবাত্বকারী ব্যতীত (অর্থাৎ তার ‘আমলের সাওয়াব চলমান থাকে)। কেননা তার ‘আমল কিয়ামত পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে থাকে।’’
হাদীসের বাণী, ‘‘তার রিযক জারী রাখা হবে’’ এটি শহীদদের ব্যাপারে অবতীর্ণ আল্লাহর নিম্নোক্ত উক্তিটির অনুরূপ : ‘‘যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়েছে তাদেরকে কখনো মৃত মনে করো না। বরং তারা তাদের রবের নিকট জীবিত এবং তাদের রিযক দেয়া হচ্ছে’’- (সূরা আ-লি ‘ইমরান ৩ : ১৬৯)।
‘‘সে ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকবে’’ এ কথার অর্থ হচ্ছে সে কবরের যাবতীয় ফিতনা তথা পরীক্ষা বা শাস্তি থেকে নিরাপদ থাকবে।’’ (শারহে মুসলিম ১৩ খন্ড, হাঃ ১৯১৩)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৭৯৪-[৮] আবূ ’আবস্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর পথে যে বান্দার পদদ্বয় ধূলায় ধূসরিত হয়, জাহান্নামের আগুন তার পদদ্বয় স্পর্শ করবে না। (বুখারী)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَن أبي عَبْسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا اغْبَرَّتْ قَدَمَا عَبْدٍ فِي سَبِيلِ الله فَتَمَسهُ النَّار» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতে গিয়ে পায়ে যে ধূলোবালি লেগে যায়, এর বিনিময়েও যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীর জন্য রয়েছে মর্যাদা ও সম্মান। এ সংক্রান্ত ফযীলত সম্পর্কেই আলোচ্য হাদীসটি উল্লেখ করা হয়েছে।
‘‘আল্লাহর রাস্তায় কোনো বান্দার দুই পা ধূলোমলিন হলে জাহান্নামের আগুন তাকে স্পর্শ করবে না’’ এ বাক্যে ‘‘আল্লাহর রাস্তা’’ বলতে বুঝানো হয়েছে ‘ইলম অর্জন, জামা‘আতে সালাত আদায়ের জন্য যাওয়া, অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া, জানাযায় উপস্থিত হওয়া ইত্যাদি। তবে ব্যবহারিক অর্থে এ ক্ষেত্রে জিহাদের পথ উদ্দেশ্য। আবার কারো কারো মতে এ ক্ষেত্রে হজে/হজ্জের জন্য পথ চলা উদ্দেশ্য। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
জিহাদে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তির শরীরে উল্লেখিত ধূলোবালির উপস্থিতি থাকলে জাহান্নামের আগুনের স্পর্শ অস্তিত্বহীন হবে- অর্থাৎ স্পর্শ করতে পারবে না। এ কথার মাধ্যমে আল্লাহর রাস্তায় অর্থ ও শ্রম ব্যয় করার অত্যধিক মর্যাদার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। কেননা পায়ে ধূলোর স্পর্শ লাগার কারণে যদি তার জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম হয়ে যায়, তাহলে যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় প্রাণপন চেষ্টা চালিয়ে যাবে এবং নিজের সমুদয় শক্তি সামর্থ্য এ পথে ব্যয় করবে তার মর্যাদা কতই না উঁচু। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৮১১)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৭৯৫-[৯] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কাফির ও তার (মুসলিম মুজাহিদের) হত্যাকারী কক্ষনো জাহান্নামে একত্রিত হবে না। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا يَجْتَمِعُ كَافِرٌ وَقَاتِلُهُ فِي النَّارِ أبدا» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: উক্ত হাদীসে জিহাদের ময়দানে কোনো কাফিরকে হত্যার ফযীলত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। হাদীসে উল্লেখিত ফযীলতটি যুদ্ধের ময়দানে কাফিরের হত্যাকারীর সাথে বিশেষিত। আর এটিকে তার গুনাহসমূহের কাফফারা হিসেবে গণ্য করা হবে, ফলে জাহান্নামের আগুনে তাকে শাস্তি দেয়া হবে না। (শারহে মুসলিম খন্ড ১৩, হাঃ ১৮৯১)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী : ‘‘জাহান্নামের আগুনে কাফির এবং তার হত্যাকারী কখনই একত্রিত হবে না’’ এ কথা থেকে এটাও বুঝা যায় যে, যদি হত্যাকারী ব্যক্তি (অন্য কোনো কারণে) শাস্তি পাওয়ার যোগ্য হয়েও থাকে, তবে তাকে জাহান্নামের অগ্নি ভিন্ন অন্য শাস্তি দেয়া হবে। যেমন প্রথম অবস্থায় তাকে জান্নাতে প্রবেশরুদ্ধ করে আ‘রাফে আবদ্ধ রাখা হতে পারে। তবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। অথবা তাকে জাহান্নামের আগুনে শাস্তি দেয়া হলেও কাফিরদের শাস্তির জায়গা ব্যতীত অন্য স্থানে শাস্তি দেয়া হবে- এ ক্ষেত্রে তারা উভয়ে একই স্থানে একত্রিত হবে না। [আল্লাহই এ ব্যাপারে সর্বাধিক অবগত আছেন] (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৪৯২)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৭৯৬-[১০] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম জীবনযাপন করে ঐ ব্যক্তি, যে আল্লাহর পথে স্বীয় ঘোড়ার লাগাম ধরে তার পিঠের উপর বসে অপেক্ষারত থাকে। যখনই কোনো ভয়ভীতির সংকেত শুনতে পায়, তৎক্ষণাৎ সে দ্রুতবেগে তার দিকে ধাবিত হয় এবং তাকে হত্যা করে বা মৃত্যু সম্ভাবনাময় স্থানে খুঁজতে থাকে। আর ঐ ব্যক্তির জীবন (সর্বোত্তম) কিছু বকরীর একটি পাল বা ছোট একটি বকরীর পাল নিয়ে কোনো পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থান নেয় বা কোনো সমতল ভূমিতে বকরী চরায় এবং শেষ নিঃশ্বাস থাকা তথা মৃত্যু পর্যন্ত সালাত কায়িম করে, যাকাত আদায় করে এবং সর্বদা স্বীয় প্রতিপালকের ’ইবাদাতে মশগুল থাকে। এসব মানুষেরাই সর্বোত্তম জীবন যাপনের অধিকারী হয়ে থাকে। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مِنْ خَيْرِ مَعَاشِ النَّاسِ لَهُمْ رَجُلٌ مُمْسِكٌ عِنَانَ فَرَسِهِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يَطِيرُ عَلَى مَتْنِهِ كُلَّمَا سَمِعَ هَيْعَةً أَوْ فَزْعَةً طَارَ عَلَيْهِ يَبْتَغِي الْقَتْلَ وَالْمَوْتَ مَظَانَّهُ أَوْ رَجُلٌ فِي غُنَيْمَةٍ فِي رَأْسِ شَعَفَةٍ مِنْ هَذِهِ الشَّعَفِ أَوْ بَطْنِ وَادٍ مِنْ هَذِهِ الْأَوْدِيَةِ يُقِيمُ الصَّلَاةَ وَيُؤْتِي الزَّكَاةَ وَيَعْبُدُ الله حَتَّى يَأْتِيَهُ الْيَقِينُ لَيْسَ مِنَ النَّاسِ إِلَّا فِي خير» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে দুই শ্রেণীর ব্যক্তিকে কল্যাণের উপর অধিষ্ঠিত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে প্রথম শ্রেণী জিহাদে অংশগ্রহণের জন্য সদা প্রস্তুত থাকে এবং শাহাদাতের কামনায় ছুটে যায় ময়দানে।
আর অপর শ্রেণী জিহাদে অংশগ্রহণে যদিও অপারগ, কিন্তু আল্লাহর ‘ইবাদাত উপাসনা থেকে কখনো বিমুখ থাকে না; বরং সদা ‘ইবাদাতে মশগুল থাকে। এ দুই শ্রেণীর ব্যক্তিই কল্যাণের উপর রয়েছে বলে হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে।
(خَيْرِ مَعَاشِ النَّاسِ) দ্বারা মানুষের জীবনযাত্রার মধ্যে জীবনযাপনের সর্বোত্তম অবস্থা বুঝানো হয়েছে।
(يَطِيرُ عَلَى مَتْنِه) অর্থাৎ উক্ত ঘোড়ার পিঠের উপর সওয়ার হয়ে খুব দ্রুত বেগে এগিয়ে যায়।
(كُلَّمَا سَمِعَ هَيْعَةً أَوْ فَزْعَةً طَارَ عَلَيْهِ) অর্থাৎ যখনই সাহায্যের আবেদন বা ভয়ঙ্কর আওয়াজ শুনতে পায়, তখনই তার ঘোড়ার উপর সওয়ার হয়ে দ্রুত গতিতে যুদ্ধের জন্য এগিয়ে যায়। هَيْعَةً শব্দ দ্বারা শত্রুবাহিনীর উপস্থিতির কারণে যে (সাহায্যের আকুতি সম্বলিত) শব্দ বা আওয়াজ (মানুষের মুখ থেকে) বেরিয়ে আসে তাই বুঝানো হয়। আর فَزْعَةً অর্থ ভয়ঙ্কর আওয়াজ বা শত্রুর দিকে ছুটে যাওয়া।
(يَبْتَغِى الْقَتْلَ وَالْمَوْتَ مَظَانَّه) এ বাক্যে বুঝানো হয়েছে যে, ঐ ব্যক্তির শাহাদাত লাভের অত্যধিক আকাঙ্ক্ষা থাকার কারণে সে জিহাদের ময়দানে সব জায়গায় এই কামনাই করবে। হাদীসের এ অংশে জিহাদের মর্যাদা এবং সেক্ষেত্রে শাহাদাত বরণের প্রতি আকাঙ্ক্ষার ফযীলত বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রথম ব্যক্তি জিহাদের ময়দানে ঝাপিয়ে পড়ার জন্য সদা প্রস্তুত। আর এ শ্রেণীর মানুষ কল্যাণের উপর অধিষ্ঠিত। দ্বিতীয় শ্রেণীর ব্যক্তি হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে তার মেষপাল নিয়ে নির্জনে পাহাড়ের উচ্চ শৃঙ্গে অথবা কোনো সমতল ভূমিতে অবস্থানরত অবস্থায় আল্লাহর ‘ইবাদাতে মগ্ন থাকে। সেও কল্যাণের উপর রয়েছে।
এখানে غُنَيْمَةٍ শব্দটি ‘গানাম’ এর তাসগীর। এর অর্থ কিছু বকরী বা একপাল বকরী। আর شَعَفَةٍ এর অর্থ হলো أعلى الجبل তথা ‘পাহাড়ের চূড়া বা শীর্ষস্থান’। (শারহে মুসলিম ১৩শ খন্ড, হাঃ ১২৫, ১৮৮৯)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৭৯৭-[১১] যায়দ ইবনু খালিদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোনো মুজাহিদকে যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহ করে দিল, সে যেন নিজেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করল। আর যে ব্যক্তি কোনো মুজাহিদের অবর্তমানে তার পরিবার-পরিজনের তত্ত্বাবধান করল, সেও যেন স্বয়ং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করল। (বুখারী, মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَن زيد بن خالدٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ جَهَّزَ غَازِيًا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَقَدْ غَزَا وَمَنْ خَلَفَ غَازِيًا فِي أَهْلِهِ فقد غزا»
ব্যাখ্যা: আল্লাহর রাস্তার জিহাদ করার জন্য কোনো মুজাহিদের সরঞ্জাম প্রস্তুত করে দিয়ে তাকে যুদ্ধের জন্য সহায়তা করা এবং কোনো মুজাহিদের জিহাদের ময়দানে থাকাকালীন সময়ে তার পরিবারের ন্যায়সঙ্গত দেখাশোনা করার মর্যাদা ও ফযীলত আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করার সমপরিমাণ।
فقد غزا ‘‘সে স্বয়ং যেন জিহাদ করল বা যুদ্ধ করল’’ এ কথার অর্থ স্পষ্ট করতে গিয়ে ইমাম ইবনু হিব্বান বলেনঃ ‘‘এর অর্থ হচ্ছে, সাওয়াব বা নেকীর দিক থেকে (যোদ্ধাকে প্রস্তুতকারী বা তার পরিবারের দেখাশোনার দায়িত্ব পালনকারী) ব্যক্তি স্বয়ং জিহাদকারী ব্যক্তির সমান, যদিও সে প্রকৃতপক্ষে জিহাদে অংশগ্রহণ করেনি।’’ (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৮৪৩)
হাদীসে উল্লেখিত এই প্রতিদান বা সাওয়াব প্রত্যেক স্তরের জিহাদের জন্যই প্রযোজ্য- চাই তা পরিমাণে কম হোক বা বেশী। আর প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির জন্যও এ সাওয়াব রয়েছে, যে ঐ যোদ্ধার পরিবারের প্রয়োজনগুলো মিটিয়ে দিবে, তাদের জন্য নিজের সম্পদ থেকে খরচ করবে এবং তাদের সার্বিক ব্যাপারে সাহায্য করবে। আর এ ক্ষেত্রে তার কর্মের কম বেশীর কারণে সাওয়াবের কম বেশী হবে।
আলোচ্য হাদীসে ঐ সকল ব্যক্তির প্রতি ইহসান বা সদাচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে, যারা মুসলিম উম্মাহর জন্য কোনো কল্যাণকর কাজে নিয়োজিত অথবা যারা মুসলিম উম্মাহর কোনো অতিব গুরুত্বপূর্ণ কাজ আঞ্জাম দিতে ব্যস্ত। (শারহে মুসলিম ১৩শ খন্ড, হাঃ ৩৭৯৭)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৭৯৮-[১২] বুরায়দাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ঘরে অবস্থানকারী পুরুষগণের নিকট মুজাহিদের সহধর্মিণীদের সম্মান ও মর্যাদা তাদের মাতৃসম। যদি ঘরে অবস্থানকারী কোনো ব্যক্তি কোনো মুজাহিদের পরিবারের তত্ত্বাবধানে থেকে তাদের ব্যাপারে খিয়ানাত করে, তবে খিয়ানাতকারীকে কিয়ামতের দিন আটকিয়ে মুজাহিদকে বলা হবে তুমি তার নেক ’আমল যত পরিমাণ ইচ্ছা আদায় করে নাও। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এবার তোমাদের কি ধারণা? (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ بُرَيْدَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «حُرْمَةُ نِسَاءِ الْمُجَاهِدِينَ عَلَى الْقَاعِدِينَ كَحُرْمَةِ أُمَّهَاتِهِمْ وَمَا مِنْ رَجُلٍ مِنَ الْقَاعِدِينَ يَخْلُفُ رَجُلًا مِنَ الْمُجَاهِدِينَ فِي أَهْلِهِ فَيَخُونُهُ فِيهِمْ إِلَّا وُقِفَ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فيأخذُ مِنْ عَمَلِهِ مَا شَاءَ فَمَا ظَنُّكُمْ؟» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: উক্ত হাদীসটিতে মুজাহিদগণের স্ত্রীদের সম্মান এবং তাদের অবর্তমানে তাদের পরিবারের ব্যাপারে খিয়ানাতকারীদের ভয়াবহতার কথা আলোকপাত করা হয়েছে।
(حُرْمَةُ نِسَاءِ الْمُجَاهِدِينَ عَلَى الْقَاعِدِينَ كَحُرْمَةِ أُمَّهَاتِهِم) ‘‘মুজাহিদগণের স্ত্রীগণ যারা যুদ্ধ থেকে অনুপস্থিত রয়েছে তাদের ওপর নিজেদের মায়ের মতো হারাম’’ এ বাক্যে মুজাহিদগণের স্ত্রীদের সাথে কোনো অনৈতিক কাজ করা থেকে বিরত থাকার প্রতি সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে এবং তাদের অধিকারসমূহ আদায়ে যত্নবান হওয়ার জন্য যুদ্ধ থেকে অনুপস্থিত ব্যক্তিদের প্রতি দায়িত্বারোপ করা হয়েছে।
যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে অনুপস্থিত ব্যক্তি যদি কোনো মুজাহিদের পরিবারের দায়িত্ব নেয়, অতঃপর পরিবারের খিয়ানাত করে, তাহলে কিয়ামতের দিন উক্ত মুজাহিদ দাঁড়াবে এবং তার ‘আমল নিয়ে নিবে। এখানে মুজাহিদের পরিবার বলতে বুঝানো হয়েছে তার স্ত্রী, কন্যা ও বাড়িতে বসবাসরত অন্যান্য নিকটাত্মীয়কে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
(فَيَأْخُذُ مِنْ عَمَلِه مَا شَاءَ فَمَا ظَنُّكُم) তথা ‘‘সে তার ‘আমল থেকে যা ইচ্ছা নিয়ে নিবে, অতএব এ ব্যাপারে তোমাদের ধারণা কি?’’ এ কথার অর্থ হচ্ছে, তোমরা ঐ মুজাহিদের উক্ত খিয়ানাতকারীর নেক ‘আমল থেকে ইচ্ছামত নিয়ে নেয়ার আগ্রহ ও আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে কি ধারণা করছ? আর এ ক্ষেত্রে অধিকহারে নিয়ে নেয়া সম্পর্কেই বা তোমাদের কি ধারণা রয়েছে? অর্থাৎ- যদি সম্ভব হয় তাহলে তার কোনো নেক ‘আমলই বাকী রাখবে না; বরং সব ‘আমল ছিনিয়ে নিবে (আল্লাহই সর্বাধিক অবগত)। (শারহে মুসলিম ১৩শ খন্ড, হাঃ ১৩৯, ১৮৯৭)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৭৯৯-[১৩] আবূ মাস্’ঊদ আল আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি স্বীয় উষ্ট্রীর নাকে লাগামসহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এনে বলল, এ উষ্ট্রী আল্লাহর পথে দান করলাম। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে বললেন, তোমাকে তার বিনিময়ে কিয়ামতের দিনে সাতশত লাগামসহ উষ্ট্রী প্রদান করা হবে। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَن أبي مَسْعُود الْأنْصَارِيّ قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ بِنَاقَةٍ مَخْطُومَةٍ فَقَالَ: هَذِهِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَكَ بِهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ سَبْعمِائة نَاقَة كلهَا مخطومة» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধের সরঞ্জাম বা পাথেয় দান করার ফযীলত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। খিতাম পরিহিত একটি উট নিয়ে একজন সাহাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে তা আল্লাহর রাস্তায় সাদাকা করলে তিনি এর ফযীলত বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘‘এর বিনিময়ে তোমাকে কিয়ামতের দিন সাতশত খিতাম পরিহিত উটনী দেয়া হবে’’। এখান থেকে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য দান করার ফযীলত প্রমাণিত হয়।
(نَاقَةٍ مَخْطُومَةٍ) তথা খিতাম পরিহিত উটনী বলতে এমন উটনী বুঝানো হয়েছে, যাকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় আটকে রাখা হয়েছে। সেটি হলো কোনো একটি রশির একদিকে বৃত্তের মতো বানিয়ে, অতঃপর অপর পার্শ্বকে ঐ পার্শ্বের বৃত্তের সাথে আটকিয়ে কোনো উটনীকে মাথায় আটকিয়ে রাখা বা বেঁধে রাখা। এ প্রক্রিয়াটিকেই খিতাম বলা হয়। তবে এটি লিযাম নয়। কারণ লিযাম হচ্ছে নাকের ভিতর দিয়ে রশি ঢুকিয়ে আটকানো বা বাঁধা। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৮০০-[১৪] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুযায়ল গোত্রের বানী লিহ্ইয়ান-এর বিরুদ্ধে একদল সেনা পাঠিয়ে বললেন, প্রত্যেক গোত্রের প্রতি দু’জনের মধ্যে হতে একজন অভিযানে যেতে প্রস্তুত হও, পুণ্যলাভ তোমাদের উভয়কে দেয়া হবে। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَعَثَ بَعْثًا إِلَى بَنِي لِحْيَانَ مِنْ هُذَيْلٍ فَقَالَ: «لينبعثْ مِنْ كلِّ رجلينِ أحدُهما والأجرُ بَينهمَا» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: (لِيَنْبَعِثْ مِنْ كُلِّ رَجُلَيْنِ أَحَدُهُمَا) অর্থাৎ- প্রতি দুই ব্যক্তির মধ্যে একজন যেন শত্রুর সাথে যুদ্ধের জন্য বের হয় আর অপরজন যেন তার অপর সাথীর দায়িত্ব এবং সকল কল্যাণকর দিক খেয়াল করার জন্য নিজ এলাকায় অবস্থান করে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
সকল ‘উলামায়ে কিরাম এ ব্যাপারে একমত যে, বানী লিহইয়ান তৎকালীন সময়ে কাফির সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল, ফলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য সেনাদল পাঠিয়েছিলেন। প্রত্যেক দুই ব্যক্তির মধ্যে একজন বের হওয়ার নির্দেশ দেয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে, গোত্রের অর্ধেক সংখ্যক লোক জিহাদের উদ্দেশে বের হওয়া।
(وَالأَجْرُ بَيْنَهُمَا) অর্থাৎ- যুদ্ধের সাওয়াব উভয়ের জন্য সমান। জিহাদে অংশগ্রহণের সাওয়াবে যুদ্ধ থেকে অনুপস্থিত ব্যক্তি তখনই অংশীদার হবে, যখন সে মুজাহিদের পরিবারের যথাযথভাবে দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করবে, যেমনটি আমরা পূর্বেই অবগত হয়েছি। (শারহে মুসলিম ১৩শ খন্ড, হাঃ ১৩৭, ১৮৯৬; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৮০১-[১৫] জাবির ইবনু সামুরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয় এ দীন (ইসলামী জীবন বিধান) সর্বদা সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং একদল মুসলিম কিয়ামত দিবস পর্যন্ত এই দীনের জন্য সংগ্রাম করতে থাকবে। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَنْ يَبْرَحَ هَذَا الدِّينُ قَائِمًا يُقَاتِلُ عَلَيْهِ عِصَابَةٌ مِنَ الْمُسْلِمِينَ حَتَّى تقوم السَّاعَة» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: উক্ত হাদীসে কিয়ামতের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত জিহাদের মাধ্যমে দীন প্রতিষ্ঠিত থাকার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। আর এ কথাও স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, মুসলিমদের একটি দল কিয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত জিহাদ করে যাবে। এ হাদীসের ভাবার্থ হলো পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠ কখনই জিহাদ থেকে মুক্ত থাকবে না। যদি কোনো স্থানে জিহাদ নাও চালু থাকে তাহলে অন্য কোথাও না কোথাও ঠিকই চালু থাকবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
ইমাম ত্বীবী বলেনঃ ‘‘এখানে এ অর্থও লুক্কায়িত রয়েছে যে, তারা দীন-ইসলামের শত্রুদের সাথে যুদ্ধে জয়ী হতে থাকবে। অর্থাৎ মুসলিমদের এ দলটির জিহাদ করার কারণে দীন সদা-সর্বদা বিজয়ী ও প্রতিষ্ঠিত থাকবে। আর আমার ধারণামতে সিরিয়ার সাহায্যপ্রাপ্ত দলটিই হচ্ছে সেই দল। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
হাদীসে বর্ণিত (حَتّٰى تَقُومَ السَّاعَةُ) তথা ‘‘কিয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত’’ এ কথা বলতে বুঝানো হয়েছে কিয়ামতের নিকটবর্তী সময় পর্যন্ত। আর সে সময়টি হচ্ছে বিশেষ বাতাস প্রবাহিত হওয়ার সময় পর্যন্ত। (শারহে মুসলিম ১৩শ খন্ড, হাঃ ১৯২২)
আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী উল্লেখিত দলটি সম্পর্কে হাদীসশাস্ত্রে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী ইমাম বুখারী (রহঃ) বলেনঃ ‘‘তারা হচ্ছে আহলুল ‘ইলম তথা ওয়াহীর জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিবর্গ’’। আর ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ) বলেন, এ দল যদি আহলুল হাদীস না হন, তাহলে আমি জানি না যে, তারা কারা। (অর্থাৎ তাঁর মতে এ দল হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস চর্চাকারী এবং ‘আমলে বাস্তবায়নকারী দল)। (শারহে মুসলিম ১৩শ খন্ড, হাঃ ১৯২২)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৮০২-[১৬] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো ব্যক্তি যদি আল্লাহর পথে আহত হয়, তবে আল্লাহই প্রকৃতপক্ষে জানেন যে, কে তার পথে হতাহত হয়েছে। কিয়ামতের দিনে সে এরূপ অবস্থায় আগমন করবে যে, তার ক্ষতস্থান হতে রক্ত প্রবাহিত হয়ে বের হতে থাকবে এবং তার বর্ণ রক্তের মতো হবে আর তার সুগন্ধি হবে মিশকের সুঘ্রাণের ন্যায়। (বুখারী, মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يُكَلَّمُ أَحَدٌ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَنْ يُكَلَّمُ فِي سَبِيلِهِ إِلَّا جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَجُرْحُهُ يَثْعَبُ دَمًا اللَّوْنُ لَوْنُ الدَّمِ والريحُ ريحُ المسكِ»
ব্যাখ্যা: উপরোক্ত হাদীসে ঐ ব্যক্তির কিয়ামতের দিন মর্যাদাবান হওয়ার সুসংবাদ রয়েছে, যে দুনিয়াতে থাকাবস্থায় আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম করতে গিয়ে নিজ শরীরে কোনো আঘাত পেয়েছে। উক্ত ক্ষতস্থান থেকে কিয়ামতের দিন রক্তক্ষরণ হবে এবং তার সুগন্ধি হবে মৃগ নাভীর মতো। পরোক্ষভাবে এখানে উক্ত মুজাহিদের মর্যাদার কথা আলোচনা করা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী : (لَا يُكْلَمُ أَحَدٌ فِىْ سَبِيلِ اللّٰهِ) এ কথার অর্থ হলো যে কোনো ব্যক্তি যদি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতে গিয়ে উক্ত আঘাত পায় তাহলে সে উল্লেখিত মর্যাদার অধিকারী হবে। এ ক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তি উক্ত আঘাতে মারা যাক বা বেঁচে থাকুকু উভয় ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য হবে। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৬৫৭)
হাদীসে উল্লেখিত বাণী, (وَاللّٰهُ أَعْلَمُ بِمَنْ يُكْلَمُ فِىْ سَبِيلِه) তথা ‘‘আল্লাহই অধিক অবগত আছেন ঐ ব্যক্তির ব্যাপারে, যে কেবল তার রাস্তায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে’’ এ কথার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইমাম নববী বলেন, ‘‘এটা যুদ্ধক্ষেত্রে ইখলাস তথা আল্লাহর জন্য ‘আমলের একনিষ্ঠতা নিশ্চিত করার জন্য সতর্কবাণী। কেননা হাদীসে বর্ণিত ফাযীলাতের হকদার কেবল ঐ ব্যক্তিই হবে, যে একনিষ্ঠভাবে এ কাজ করেছে এবং আল্লাহর কালিমাকে সুউচ্চ করার জন্যই যুদ্ধ করেছে’’। (তুহফাতুল আহ্ওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৬৫৭)
ইমাম নববী-এর মতে, কিয়ামতের দিন মুজাহিদের ক্ষতস্থান থেকে রক্তক্ষরণের কারণ বা রহস্য হচ্ছে, মুজাহিদ ব্যক্তির সাথে তার আল্লাহর আনুগত্যের কাজে নিজেকে আত্মনিয়োগ করার এবং উক্ত কাজের ফযীলত অর্জনের সাক্ষী বা প্রমাণ রাখা। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৬৫৭)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৮০৩-[১৭] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশের পরে পুনরায় দুনিয়ায় ফিরে আসতে চাইবে না যদিও সে পার্থিব যাবতীয় সম্পদ প্রাপ্তির সুযোগ পায়। অবশ্য শহীদ ব্যক্তি দুনিয়ায় ফিরে আসতে চাইবে এ উদ্দেশে যে, দুনিয়ায় এসে সে পুনরায় দশবার শাহাদাত লাভের প্রত্যাশা করে এ সদিচ্ছার কারণে, সে জান্নাতে শাহীদের যে মর্যাদা তা প্রত্যক্ষ করবে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا مِنْ أَحَدٍ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ يُحِبُّ أَنْ يُرْجَعَ إِلَى الدُّنْيَا وَلَهُ مَا فِي الْأَرْضِ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا الشَّهِيدُ يَتَمَنَّى أَنْ يُرْجَعَ إِلَى الدُّنْيَا فَيُقْتَلَ عَشْرَ مَرَّاتٍ لِمَا يَرَى مِنَ الْكَرَامَةِ»
ব্যাখ্যা: জান্নাতে প্রবেশের পর পুনরায় দুনিয়াতে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা এক অবাক বিস্ময়। পার্থিব ভোগ-উপকরণের তুলনায় বহুগুণ বেশী নি‘আমাত পাওয়া সত্ত্বেও কেবল আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাত বরণকারীগণই পুনরায় দুনিয়ায় ফিরে এসে আবারো আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করবেন। কারণ তারা আল্লাহর কাছে শহীদ হওয়ার যে মর্যাদা অর্জন করেছেন তা অতুলনীয় এবং অনন্য, যা অন্য কেউ অর্জন করতে সক্ষম হয়নি।
ইবনু বাত্ত্বল বলেনঃ ‘‘এ হাদীসটি শাহাদাতের ফাযীলাতের বর্ণনার ক্ষেত্রে সর্বোৎকৃষ্ট ও সর্বোচ্চ মানের হাদীস। নেক ‘আমলগুলোর মধ্যে জিহাদ ব্যতীত আর এমন কোনো ‘আমল নেই যাতে বান্দা তার নিজের জীবন বিসর্জন দেয়। আর এজন্যই তার সাওয়াবও মহান ও ব্যাপক’’। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৮১৭)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৮০৪-[১৮] মাসরূক (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’আব্দুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ)-কে এ আয়াতের মর্মার্থ জিজ্ঞেস করলাম, ’’যারা আল্লাহর পথে শহীদ হয়েছে, তাদেরকে তোমরা মৃত মনে করো না; বরং তারা জীবিত এবং তারা তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে রিযকপ্রাপ্ত’’- (সূরা আ-লি ’ইমরান ৩ : ১৬৯)। জবাবে তিনি বলেন, আমরা এ আয়াত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছিলেন যে, শহীদগণের রূহ সবুজ পাখির পেটে অবস্থান করে এবং তোমাদের সাথে ’আর্শে ফানুস ঝুলিয়ে দেয়া হয়। অতঃপর তারা জান্নাতে মনের ইচ্ছানুসারে উড়ে বেড়াবে, অতঃপর আবার ঐ ফানুসে ফিরে আসবে।
এমতাবস্থায় তাদের প্রতিপালক তাদের সম্মুখে বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলবেন, তোমাদের কোনো কিছুর আকাঙ্ক্ষা আছে কি? তারা বলবে, আর কিসের আকাঙ্ক্ষা করব? (আমরা পরিপূর্ণ নি’আমাতে আছি) কেননা আমরা জান্নাতের যথেচ্ছাভাবে ভ্রমণ করছি। এভাবে তিনি তাদেরকে তিনবার জিজ্ঞেস করেন, তারাও একই উত্তর পুনরাবৃত্তি করলেন। যখন তারা বুঝতে পারবে যে, তাদের উদ্দেশে একই কথা বার বার জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, তখন তারা বলবে, হে আমার রব্! আমাদের রূহকে পুনরায় আমাদের পার্থিব দেহে ফিরিয়ে দাও, যাতে পুনরায় আমরা তোমার পথে লড়াই করে শাহাদাত লাভ করতে পারি। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা যখন তাদের অন্তরের ইচ্ছা বুঝতে পারেন, এদের আর কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই, তখন ঐ অবস্থায় তাদের চিরস্থায়ীভাবে রেখে দেন। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ مَسْرُوقٍ قَالَ: سَأَلْنَا عَبْدَ اللَّهِ بْنَ مسعودٍ عَنْ هَذِهِ الْآيَةِ: (وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِنْدَ ربِّهم يُرزقون)
الْآيَةَ قَالَ: إِنَّا قَدْ سَأَلْنَا عَنْ ذَلِكَ فَقَالَ: أَرْوَاحُهُمْ فِي أَجْوَافِ طَيْرٍ خُضْرٍ لَهَا قَنَادِيلُ مُعَلَّقَةٌ بِالْعَرْشِ تَسْرَحُ مِنَ الْجَنَّةِ حَيْثُ شَاءَتْ ثُمَّ تَأْوِي إِلَى تِلْكَ الْقَنَادِيلِ فَاطَّلَعَ إِلَيْهِمْ رَبُّهُمُ اطِّلَاعَةً فَقَالَ: هَلْ تَشْتَهُونَ شَيْئًا؟ قَالُوا: أَيَّ شَيْءٍ نَشْتَهِي وَنَحْنُ نَسْرَحُ مِنَ الْجنَّة حيثُ شِئْنَا ففعلَ ذلكَ بهِمْ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ فَلَمَّا رَأَوْا أَنَّهُمْ لَنْ يُتْرَكُوا مِنْ أَنْ يَسْأَلُوا قَالُوا: يَا رَبُّ نُرِيدُ أَنْ تُرَدَّ أَرْوَاحُنَا فِي أَجْسَادِنَا حَتَّى نُقْتَلَ فِي سبيلِكَ مرَّةً أُخرى فَلَمَّا رَأَى أَنْ لَيْسَ لَهُمْ حَاجَةٌ تُرِكُوا . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে শাহীদের মৃত্যু পরবর্তী এবং কিয়ামতের পূর্ববর্তী সময়ে মর্যাদাবান হওয়ার প্রমাণ রয়েছে। মৃত্যুর পরপরই তাদের আত্মা সবুজ পাখীর ভিতরে সঞ্চারিত করা হবে এবং সে জান্নাতে অবাধে ঘুরে বেড়াবে। এ মর্যাদা কেবল আল্লাহর রাস্তায় শাহীদের জন্যই।
হাদীসের বাণী, «أرواحهم في أجواف طير خضر لها قناديل معلقة بالعرش تسرح من الجنة حيث شاءت ثم تأوي إلى تلك القناديل» এ উক্তিটিতে এ কথার প্রমাণ রয়েছে যে, জান্নাত পূর্ব থেকেই আল্লাহ কর্তৃক সৃষ্ট, যার অস্তিত্ব এখন বিদ্যমান। এটিই আহলুস্ সুন্নাহ্ ওয়াল জামা‘আতের ‘আকীদা। এটা সেই জান্নাত, যেখান থেকে আদম (আঃ)-কে বের করা হয়েছিল। এটাই সেই জান্নাত, যেথায় পরকালে মু’মিনদের পুরস্কৃত করা হবে এবং নি‘আমাতসমূহ প্রদান করা হবে। এ ব্যাপারে আহলুস্ সুন্নাহর ইজমা সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু মু’তাজিলা ও একদল বিদ্‘আতী সম্প্রদায়ের মতে, জান্নাত বর্তমানে অস্তিত্বহীন, কিয়ামতের পুনরুত্থানের পর তাকে অস্তিত্বে আনা হবে। তারা আরো বলে যে, আদম (আঃ)-কে যে জান্নাত থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল, তা অন্য এক জান্নাত। অথচ কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলীলসমূহের আলোকে আহলুস্ সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের মতটিই অধিকতর শক্তিশালী হিসেবে প্রমাণিত হয়।
কাযী ‘ইয়ায বলেনঃ ‘‘এ হাদীস প্রমাণ করে যে, রূহসমূহ কখনও শেষ হয়ে যায় না; বরং আপন অবস্থায় বাকী থাকে, অতঃপর সৎকর্মশীল হলে পুরস্কৃত করা হবে আর পাপী হলে শাস্তি দেয়া হবে। (শারহে মুসলিম ১৩শ খন্ড, হাঃ ১৮৮৭)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৮০৫-[১৯] আবূ কাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কিরামের মাঝে দাঁড়িয়ে খুৎবা দিলেন, সর্বোত্তম ’আমল হলো আল্লাহর পথে জিহাদ করা ও আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা। তখন জনৈক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনার কি অভিমত, আমি যদি আল্লাহর পথে লড়াই করে মৃত্যুবরণ করি, তবে কি আমার যাবতীয় অপরাধ ক্ষমা করা হবে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হ্যাঁ, তুমি যদি দৃঢ়ভাবে সাওয়াবের প্রত্যাশায় যুদ্ধের মাঠ থেকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন না করে আক্রমণে অগ্রসর হয়ে নিহত হও। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপর ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি যেন কি প্রশ্ন করেছ? সে বলল, আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমি যদি আল্লাহর পথে শহীদ হই তবে কি আমার সমস্ত পাপ-মার্জনা মাফ করে দেয়া হবে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হ্যাঁ, অবশ্যই ঋণগ্রস্ত হওয়া ব্যতীত তুমি যদি সাহসিকতার সাথে সাওয়াবের আশায় শত্রুর আক্রমণে অগ্রগামী অবস্থায় শহীদ হও। জিবরীল (আঃ) আমাকে এরূপেই বললেন। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
عَن أَبِي قَتَادَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَامَ فِيهِمْ فَذَكَرَ لَهُمْ أَنَّ الْجِهَادَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْإِيمَانَ بِاللَّهِ أَفْضَلُ الْأَعْمَالِ فَقَامَ رَجُلٌ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَرَأَيْتَ إِنْ قُتِلْتُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يُكَفَّرُ عَنَى خَطَايَايَ؟ فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «نِعْمَ إِنْ قُتِلْتَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَأَنْتَ صَابِرٌ مُحْتَسِبٌ مُقْبِلٌّ غَيْرُ مُدْبِرٍ» . ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «كَيْفَ قُلْتَ؟» فَقَالَ: أَرَأَيْتَ إِنْ قُتِلْتُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَيُكَفَّرُ عَنِّي خَطَايَايَ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «نَعَمْ وَأَنْتَ صَابِرٌ مُحْتَسِبٌ مُقْبِلٌ غَيْرُ مُدْبِرٍ إِلَّا الدَّيْنَ فَإِنَّ جِبْرِيلَ قَالَ لِي ذَلِكَ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসেও আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের মর্যাদা আলোচনা করা হয়েছে। এখানে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করাকে সর্বোকৃষ্ট ‘আমল হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
আলোচ্য হাদীসে বর্ণিত উক্তি, (مُقْبِلٌ غَيْرُ مُدْبِرٍ) বলতে বুঝানো হয়েছে ঐ ব্যক্তিকে যে সদা সর্বদা জিহাদের জন্য অগ্রগামী ছিল এবং কখনই পিছু হটেনি। আর যে একবার সামনে আগ্রসর হয় আর অন্যসময় পিছু হটে, তার ক্ষেত্রে এ মর্যাদা বা সাওয়াব প্রযোজ্য হবে না। আর ‘মুহতাসিব’ বলতে বুঝানো হয়েছে ঐ ব্যক্তিকে যে মুখলিস তথা আল্লাহর জন্য স্বীয় কর্মকে একনিষ্ঠ করে এবং তাতে আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরীক করে না। (শারহে মুসলিম ১৩শ খন্ড, হাঃ ১৮৮৫)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৮০৬-[২০] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আমর ইবনুল ’আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর পথে শহীদ হলে শুধুমাত্র ঋণ ব্যতীত সকল কিছু ক্ষমা করে দেয়া হয়। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الْقَتْلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يُكَفِّرُ كُلَّ شَيْءٍ إِلَّا الدّين» . رَوَاهُ مُسلم
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৮০৭-[২১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা ঐ দু’ ব্যক্তির প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশে হেসে থাকেন। যারা একজন অপরজনকে হত্যা করে, অথচ তারা জান্নাতী। তন্মধ্যে এক ব্যক্তি আল্লাহর পথে জিহাদ করে শহীদ হয়, আর হত্যাকারীকে (ঈমান আনার জন্য) আল্লাহ তা’আলা সুযোগ দান করেন, অতঃপর (সে ঈমান এনে) শাহাদাত লাভ করেন (অর্থাৎ- উভয়েই জান্নাতপ্রাপ্ত হয়)। (বুখারী, মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: يَضْحَكُ اللَّهُ تَعَالَى إِلَى رَجُلَيْنِ يَقْتُلُ أَحَدُهُمَا الْآخَرَ يَدْخُلَانِ الْجَنَّةَ: يُقَاتِلُ هَذَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيُقْتَلُ ثُمَّ يَتُوبُ اللَّهُ على الْقَاتِل فيستشهد
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৮০৮-[২২] সাহল ইবনু হুনায়ফ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সাথে শাহাদাতের মনোষ্কামনা করে; আল্লাহ তা’আলা তাকে শাহীদের মর্যাদায় উন্নীত করেন, যদিও সে স্বীয় বিছানায় মৃত্যুবরণ করে। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَن سهل بن حنيف قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ سَأَلَ اللَّهَ الشَّهَادَةَ بِصِدْقٍ بَلَّغَهُ اللَّهُ مَنَازِلَ الشُّهَدَاءِ وَإِنْ مَاتَ عَلَى فِرَاشِهِ. رَوَاهُ مُسلم
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৮০৯-[২৩] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রুবাইয়্যা’ বিনুত বারা (রাঃ)-এর কন্যা হারিসাহ্ ইবনু সুরাকাহ্-এর মা। একদিন তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর নবী! তার পুত্র হারিসাহ্ যে বাদ্রের যুদ্ধে এক অজ্ঞাত ব্যক্তির তীর নিক্ষেপে নিহত হয়, সে ব্যাপারে জানতে চাইলেন যে, হারিসাহ্ জান্নাতী হবে কিনা? যদি সে জান্নাতে প্রবেশ করে, তবে আমি ধৈর্যধারণ করব, অন্যথায় তার জন্য আমার আত্মার কান্না রোধ করতে পারব না। এটা শুনে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, হে হারিসার মা! জান্নাতে অসংখ্য বাগান রয়েছে, আর তোমার ছেলে তো জান্নাতুল ফিরদাওসের উচ্চাসনে স্থান পেয়েছে। (বুখারী)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَن أنسٍ أَنَّ الرُّبَيِّعَ بِنْتَ الْبَرَاءِ وَهِيَ أَمُّ حَارِثَةَ بْنِ سُرَاقَةَ أَتَتِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَلَا تُحَدِّثُنِي عنْ حَارِثَةَ وَكَانَ قُتِلَ يَوْمَ بَدْرٍ أَصَابَهُ سَهْمٌ غَرْبٌ فَإِنْ كَانَ فِي الْجَنَّةِ صَبَرْتُ وَإِنْ كَانَ غَيْرُ ذَلِكَ اجْتَهَدْتُ عَلَيْهِ فِي الْبُكَاءِ فَقَالَ: «يَا أَمَّ حَارِثَةَ إِنَّهَا جِنَانٌ فِي الْجَنَّةِ وَإِنَّ ابْنَكِ أَصَابَ الْفِرْدَوْسَ الْأَعْلَى» . رَوَاهُ البخاريُّ
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৮১০-[২৪] উক্ত রাবী [আনাস (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবীগণসহ রওয়ানা হয়ে মুশরিকদের পূর্বেই বদর প্রান্তরে পৌঁছে গেলেন। অতঃপর মুশরিকরাও সেখানে এসে গেল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সাহাবীগণের উদ্দেশে) ঘোষণা করলেন, তোমরা আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সমবিস্তৃত এমন এক জান্নাতের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও। এটা শুনে ’উমায়র ইবনুল হুমাম বলে উঠল, বাহ! বাহ! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এরূপ বললে? সে বলল, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আল্লাহর কসম! আমার অন্য কোনো উদ্দেশ্য নয়; শুধুমাত্র জান্নাতে প্রবেশের আকাঙ্ক্ষায় এরূপ বলেছি যেন আমি তার অধিবাসী হই। তদুত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, তুমি নিশ্চয় জান্নাতের অধিবাসী হবে। রাবী বলেন যে, এরপরে ঐ সাহাবী তার তীরের থলি হতে কয়েকটি খেজুর বের করে খেতে লাগলেন এবং পরক্ষনেই বলে উঠলেন, এ খেজুরগুলো খেয়ে শেষ করা পর্যন্ত বেঁচে থাকাও অনেক দীর্ঘ জীবন! এটা বলে সে সব খেজুর ছুঁড়ে দিয়ে শত্রুর মুকাবিলায় যুদ্ধ করতে করতে শাহাদাত বরণ করল। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْهُ قَالَ: انْطَلَقَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَصْحَابُهُ حَتَّى سَبَقُوا الْمُشْرِكِينَ إِلَى بَدْرٍ وَجَاءَ الْمُشْرِكُونَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «قُومُوا إِلَى جَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ» . قَالَ عُمَيْرُ بْنُ الْحُمَامِ: بَخْ بَخْ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَا يَحْمِلُكَ عَلَى قَوْلِكَ: بَخْ بَخْ؟ قَالَ: لَا وَاللَّهِ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِلَّا رَجَاءَ أَنْ أَكُونَ مِنْ أَهْلِهَا قَالَ: «فَإِنَّكَ مِنْ أَهْلِهَا» قَالَ: فَأَخْرَجَ تَمَرَاتٍ مِنْ قَرْنِهِ فَجَعَلَ يَأْكُلُ مِنْهُنَّ ثُمَّ قَالَ: لَئِنْ أَنَا حَيِيتُ حَتَّى آكل تمراتي إِنَّهَا الْحَيَاة طَوِيلَةٌ قَالَ: فَرَمَى بِمَا كَانَ مَعَهُ مِنَ التَّمْرِ ثُمَّ قَاتَلَهُمْ حَتَّى قُتِلَ. رَوَاهُ مُسْلِمٌ
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৮১১-[২৫] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের মধ্যকার কাকে তোমরা শহীদ বলে মনে কর? সাহাবীগণ সমস্বরে বলে উঠল, যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে নিহত হয়, সেই শহীদ। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, তাহলে তো আমার উম্মাতের মধ্যে শাহীদের সংখ্যা খুবই নগণ্য হবে। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে মৃত্যুবরণ করে, সে শহীদ; যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে নিয়োজিত থেকে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করে সেও শহীদ এবং যে ব্যক্তি প্লেগরোগে মৃত্যুবরণ করে, সেও শহীদ। আর যে ব্যক্তি পেটের পীড়ায় মৃত্যুবরণ করে, সেও শহীদ। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا تَعُدُّونَ الشَّهِيدَ فِيكُمْ؟» قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَنْ قُتِلَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَهُوَ شَهِيدٌ قَالَ: إِنَّ شُهَدَاءَ أُمَّتِي إِذًا لِقَلِيلٌ: مَنْ قُتِلَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَهُوَ شَهِيدٌ وَمَنْ مَاتَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَهُوَ شَهِيدٌ وَمَنْ مَاتَ فِي الطَّاعُونِ فَهُوَ شَهِيدٌ وَمَنْ مَاتَ فِي الْبَطْنِ فهوَ شهيدٌ . رَوَاهُ مُسلم
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৮১২-[২৬] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর পথে মুজাহিদগণ সংখ্যায় বেশি হোক বা কম হোক যদি জিহাদে জয়ী হয়ে গনীমাতের মালসহ নিরাপদে বাড়ী ফিরে আসে, তবে তারা জিহাদের সাওয়াবের দুই-তৃতীয়াংশ দুনিয়াতেই লাভ করল। আর যে কোনো ক্ষুদ্র দল বা বৃহৎ দল যদি তারা গনীমাত লাভে বঞ্চিত হয় এবং জান-মালের ক্ষতিসাধন হয় অথবা শহীদ হয় বা আহত হয়, তবে তারা পরিপূর্ণ সাওয়াবের অধিকারী হবে। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا مِنْ غَازِيَة أَو سَرِيَّة تغزو فتغتنم وَتَسْلَمُ إِلَّا كَانُوا قَدْ تَعَجَّلُوا ثُلُثَيْ أُجُورِهِمْ وَمَا مِنْ غَازِيَةٍ أَوْ سَرِيَّةٍ تَخْفُقُ وَتُصَابُ إِلَّا تمّ أُجُورهم» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে ছোট বা বড় যুদ্ধদলের দু’টি অবস্থায় ভিন্ন ভিন্ন মর্যাদার অধিকারী হওয়ার বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে। মূলত এ হাদীসটিও আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের ফযীলত সংক্রান্ত।
‘গাযিয়াহ্ বা সারিয়্যাহ্’ বলতে এখানে উদ্দেশ্য হলো যুদ্ধের জামা‘আত- যারা সংঘবদ্ধভাবে যুদ্ধ করে থাকে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৪৯৪)
কাযী ‘ইয়ায বলেনঃ ‘‘যে ব্যক্তি কাফিরদের সাথে লড়াই করে নিরাপদে গনীমাত নিয়ে ফিরে আসে, সে দুই-তৃতীয়াংশ প্রতিদান নিয়ে ফিরে আসে। [এক] যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে নিরাপদে ফিরে আসা, [দুই] গনীমাত লাভ। আর এ দু’টিই পার্থিব প্রতিদান। আর [তৃতীয়] যে প্রতিদান বা পুরস্কার বাকী আছে, উক্ত মুজাহিদ তা পরকালে পাবে। কারণ সে আল্লাহর শত্রুদের সাথে লড়াই করার ইচ্ছা করেছিল।
হাদীসে বর্ণিত تخفق শব্দটির অর্থ হলো, যে ব্যক্তি যুদ্ধ করেছে কিন্তু গনীমাত পায়নি।
কাযী ‘ইয়ায (রহঃ)-এর মতে হাদীসের শেষাংশে বর্ণিত কথাটির অর্থ হলো, যে ব্যক্তি নিজে যুদ্ধ করল এবং শহীদ হলো বা আহত হলো, কিন্তু গনীমাত পেল না, ঐ ব্যক্তির প্রতিদান পূর্ণরূপে বাকী থাকল। সে পূর্ণরূপে পরকালে এর ফল ভোগ করবে।’’ (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৮১৩-[২৭] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি জিহাদে অংশগ্রহণ করেনি এবং জিহাদের নিয়্যাত না করে মৃত্যুবরণ করে, সে প্রকৃতপক্ষে মুনাফিক হয়েই মৃত্যুবরণ করল। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ مَاتَ وَلَمْ يَغْزُو وَلَمْ يُحَدِّثْ بِهِ نَفْسَهُ مَاتَ عَلَى شُعْبَةٍ نفاق» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: এ হাদীসটির ব্যাপারে ‘আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহঃ) বলেনঃ ‘‘আমরা মনে করি এ বিধানটি বিশেষভাবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগের জন্য খাস ছিল। অন্যান্য ‘উলামায়ে কিরাম বলেছেন যে, এ বিধানটি ‘আম্ তথা শুধু রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগের সাথেই খাস নয়; বরং এ যুগেও যদি কারো মধ্যে এরূপ সমস্যা থাকে তবে তার হুকুমও একই। (শারহে মুসলিম ১৩শ খন্ড, হাঃ ১৯১০)
(وَلَمْ يُحَدِّثْ بِهِ نَفْسَه) এ বাক্যের ভাবার্থ হলো, যে ব্যক্তি মনে মনেও জিহাদের দৃঢ় সংকল্প করেনি বা এ কথাও বলেনি যে, হায়! যদি মুজাহিদ হতাম! আবার কারো মতে এ বাক্যের অর্থ হলো সে কখনই জিহাদের জন্য বের হওয়ার ইচ্ছা করেনি। আর জিহাদের উদ্দেশে বের হওয়ার ইচ্ছার বাহ্যিক বহিঃপ্রকাশ হলো যুদ্ধের সরঞ্জাম প্রস্তুত করা। এ দিকে ইঙ্গিত করে মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন, অর্থাৎ- ‘‘তারা (জিহাদের উদ্দেশে) বের হতে চাইলে নিশ্চয় তারা এর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করত, কিন্তু তাদের অভিযাত্রা আল্লাহর মনঃপূত ছিল না, সুতরাং তিনি তাদেরকে বিরত রাখেন এবং তাদেরকে বলা হয়, যারা বসে আছে তোমরা তাদের সাথে বসে থাক’’- (সূরা আত্ তাওবাহ্ ৯ : ৪৬)।
(مَاتَ عَلٰى شُعْبَةٍ مِنْ نِفَاقٍ) অর্থাৎ বিশেষ এক প্রকারের নিফাকের উপর সে মৃত্যুবরণ করবে। যে ব্যক্তি এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে সে জিহাদ থেকে অনুপস্থিত মুনাফিকদের সাথে অধিক সাদৃশ্যশীল। আর যে ব্যক্তি যে জাতির সাথে সাদৃশ্যশীল সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। বলা হয়ে থাকে : এটি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগের সাথে খাস বা বিশেষিত। তবে স্পষ্ট এবং অধিকতর সঠিক কথা হলো এটি সর্বযুগের জন্য প্রযোজ্য। আর প্রতিটি মু’মিনের জন্য কর্তব্য হলো জিহাদের নিয়্যাত রাখা- চাই সেটি (অবস্থাভেদে) ফারযে কিফায়াহ্ হোক বা ফারযে ‘আইন হোক। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৮১৪-[২৮] আবূ মূসা আল আশ্’আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করল, এমন কেউ যদি গনীমাতের ধন-মালের লাভের প্রত্যাশায় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে, কেউ সুনাম সুখ্যাতি (তথা মুজাহিদ নাম) অর্জনের প্রত্যাশায় যুদ্ধ করে, আর কেউ আছে বীরত্ব প্রদর্শনের (তথা যোদ্ধা হওয়ার) অহমিকায় যুদ্ধ করে- এদের মধ্যে কোন্ ব্যক্তি সর্বোত্তম? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, যে ব্যক্তি শুধুমাত্র আল্লাহর বাণী-বিধান (ইসলাম) প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করে, সে-ই শুধু আল্লাহর পথে জিহাদ করে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَن أبي مُوسَى قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: الرَّجُلُ يُقَاتِلُ لِلْمَغْنَمِ وَالرَّجُلُ يُقَاتِلُ لِلذِّكْرِ وَالرَّجُلُ يُقَاتِلُ لِيُرَى مَكَانُهُ فَمَنْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ؟ قَالَ: «مَنْ قَاتَلَ لِتَكُونَ كَلِمَةُ اللَّهِ هِيَ الْعُلْيَا فَهُوَ فِي سَبِيلِ الله»
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে স্পষ্টভাবে যোদ্ধাদের নিয়্যাতের ভিন্নতা বর্ণনা করা হয়েছে এবং সত্যিকারার্থে কে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী? তারও সুস্পষ্ট বর্ণনা এ হাদীসে রয়েছে।
(الرَّجُلُ يُقَاتِلُ لِلذِّكْرِ) এ কথার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, ঐ ব্যক্তি যে কেবল এই প্রত্যাশায় জিহাদ করে যে, মানুষ তাকে নিয়ে আলোচনা করবে, যার ফলে তার প্রসিদ্ধতা বৃদ্ধি পাবে। এটি মূলত আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।
(وَالرَّجُلُ يُقَاتِلُ لِيُرَى مَكَانُه) এখানে বলা হয়েছে যে, সে লড়াই করে তার স্থান দেখানোর জন্য। আর অপর বর্ণনায় এসেছে, সে লড়াই করে লোক দেখানোর জন্য। যাই হোক এখানে মূলত উদ্দেশ্য হলো রিয়া তথা লোকদেখানো ‘আমল- যাতে আল্লাহকে খুশী করার কোনো ইচ্ছে নেই। আর ইসলামে এরূপ করা নিন্দনীয়। অন্য বর্ণনায় আছে ‘‘যে ব্যক্তি নিজের জন্য বা নিজের পরিবারের জন্য অথবা গোত্রের জন্য কিংবা সাথীর জন্য যুদ্ধ করে (সেও মূলত আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে না)। মানসূর-এর বর্ণনায় এসেছে, ‘যে ব্যক্তি নিজের ক্রোধ বা ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণে যুদ্ধ করে (সেও প্রকৃত মুজাহিদ নয়)। উল্লেখিত সকল কারণেই জিহাদ করা নিষেধ। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৮১০)
প্রকৃতপক্ষে কে আল্লাহর রাস্তায় সত্যিকারে জিহাদ করছে? এ প্রশ্নের জবাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর তাওহীদের বাণীকে তথা তাঁর একত্ববাদকে পৃথিবীতে সুউচ্চ আসনে আসীন করানোর জন্য যুদ্ধ করবে সেই প্রকৃত মুজাহিদ বা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী।
(مَنْ قَاتَلَ لِتَكُونَ كَلِمَةُ اللّٰهِ هِيَ الْعُلْيَا فَهُوَ فِي سَبِيلِ اللّٰهِ) এ কথার ভাবার্থ হলো, যে ব্যক্তি আল্লাহর বাণীকে উঁচু করার জন্য যুদ্ধ না করে অন্য উদ্দেশে যুদ্ধ করবে সে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী বলে গণ্য হবে না। যেমন আবূ দাঊদ ও নাসায়ীতে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যক্তি এসে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করল, কোনো ব্যক্তি সুনাম-সুখ্যাতি ও প্রতিদানের আশায় যুদ্ধ করল, তার কি প্রতিদান রয়েছে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘‘কিছুই না’’। প্রশ্নকারী একই প্রশ্ন তিনবার করলে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, কিছুই না। এরপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ «إن الله لا يقبل من العمل إلا ما كان خالصا وابتغي به وجهه»
অর্থাৎ- নিশ্চয় আল্লাহ সে ‘আমল গ্রহণ করবেন না, যাতে ইখলাস ও আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রত্যাশা করা হয়নি। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৮১০)
(كَلِمَةُ اللّٰهِ) তথা ‘আল্লাহর কালিমাহ্’ বলতে কালিমাতুত্ তাওহীদকে বুঝানো হয়েছে, আর তা হলো لا إله إلا الله তথা ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য মা‘বূদ নেই। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৮১৫-[২৯] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবূক যুদ্ধ হতে ফিরে যখন মদীনার সন্নিকটবর্তী হলেন তখন বললেন, এমন কিছু সংখ্যক লোক মদীনায় রয়ে গেছে। তোমরা সফরে যে সকল ভূমি বা উপত্যকায় যেখানে যেখানে গমন করেছ, তারা সর্বাবস্থায় তোমাদের সঙ্গে ছিল।
অপর বর্ণনায় রয়েছে, তারা তোমাদের সাথে সাওয়াব লাভে শরীক ছিল। উপস্থিত সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! তারা মদীনায় অবস্থান করে আমাদের সাথে কিভাবে শরীক হয়েছে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, হ্যাঁ, তারা মদীনাতেই অবস্থানরত; তাদের (শারীরিক ও আর্থিক) অসামর্থ্যই (অপারগতা) তোমাদের সাথে যেতে বিরত রেখেছে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ أَنَسٍ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَجَعَ مِنْ غَزْوَةِ تَبُوكَ فَدَنَا مِنَ الْمَدِينَةِ فَقَالَ: «إِنَّ بِالْمَدِينَةِ أَقْوَامًا مَا سِرْتُمْ مَسِيرًا وَلَا قَطَعْتُمْ وَادِيًا إِلَّا كَانُوا مَعَكُمْ» . وَفِي رِوَايَةٍ: «إِلَّا شَرِكُوكُمْ فِي الْأَجْرِ» . قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَهُمْ بِالْمَدِينَةِ؟ قَالَ: «وهُم بالمدينةِ حَبسهم الْعذر» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসটিতে কোনো ভালো কাজের জন্য নিয়্যাত করার ফযীলত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ বা অন্য কোনো ভালো কাজের নিয়্যাত করার পর কোনো ওযরের কারণে যদি সে কাজটি না করতে পারে, তারপরও নিয়্যাত অনুসারে সে সাওয়াব পেয়ে যাবে। আর যদি কল্যাণকর কাজটি ছুটে যাওয়ার কারণে বেশী বেশী আফসোস করে এবং যোদ্ধাদের সাথে যাওয়ার ও তাদের মতো লড়াই করার আকাঙ্ক্ষা করে, তাহলে তার সাওয়াব সেই হারে বৃদ্ধি করা হবে। (শারহে মুসলিম ১৩শ খন্ড, হাঃ ১৯১১)
(إِنَّ بِالْمَدِينَةِ أَقْوَامًا) এ বাক্যে বুঝানো হয়েছে, মদীনায় এমন কিছু লোক আছে যারা মনে মনে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের উদ্দেশে বের হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে, কিন্ত প্রয়োজন বা অপারগতা তাদেরকে আটকে রেখেছে, ফলে মুজাহিদগণের সাথে তারা স্বশরীরে অংশগ্রহণ করতে পারছে না।
হাদীসে ‘ওয়াদী’ তথা উপত্যকার কথা বিশেষভাবে বলার কারণ হলো তা অতিক্রম করা বেশী কষ্টসাধ্য। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ এ হাদীস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, যারা সমস্যার কারণে যুদ্ধে যেতে পারছে না, তারাও প্রতিদানের দিক থেকে মুজাহিদদের সাথে অংশীদার হবে। তবে তারা প্রতিদান বা সাওয়াবের পরিমাণের দিক থেকে সমান হবে না। এ কথা বুঝা যায় নিমেণাক্ত কুরআনের আয়াত থেকে : অর্থাৎ- ‘‘অক্ষম নয় এমন বসে-থাকা মু’মিনরা আর জান-মাল দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদকারীগণ সমান নয়; নিজেদের ধন-প্রাণ দ্বারা জিহাদকারীদেরকে বসে-থাকা লোকেদের উপর আল্লাহ মর্যাদা দিয়েছেন। আল্লাহ সকলের জন্যই কল্যাণের ওয়াদা করেছেন এবং মুজাহিদদেরকে বসে-থাকা লোকেদের তুলনায় আল্লাহ মহাপুরস্কার দিয়ে মর্যাদা দান করেছেন।’’ (সূরা আন্ নিসা ৪ : ৯৫)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৮১৬-[৩০] আর ইমাম মুসলিম-এর হাদীসটি জাবির (রাঃ)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَرَوَاهُ مُسلم عَن جَابر
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৮১৭-[৩১] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হয়ে জিহাদে অংশগ্রহণের অনুমতি চাইল। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মাতা-পিতা কি জীবিত আছে? উত্তরে সে বলল, হ্যাঁ। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, যাও তাদের (খিদমাতের) মধ্যে জিহাদ কর। (বুখারী, মুসলিম)[1]
অন্য বর্ণনায় আছে, তুমি তোমার মাতা-পিতার নিকট ফিরে যাও এবং সর্বদা তাদের সাথে সদাচরণ কর।
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاسْتَأْذَنَهُ فِي الْجِهَادِ فَقَالَ: «أَحَي والدك؟» قَالَ: نَعَمْ قَالَ: «فَفِيهِمَا فَجَاهِدْ» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ. وَفِي رِوَايَةٍ: «فَارْجِعْ إِلَى وَالِدَيْكَ فَأَحْسِنْ صُحْبَتَهُمَا»
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে পিতামাতার খিদমাত ও তাদেরকে সন্তুষ্টকরণের প্রতি গুরুত্ব দিতে গিয়ে নফল জিহাদের উপর তাদের সাথে সদাচরনকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।
(فَفِيهِمَا فَجَاهِدْ) এ বাক্যে পিতামাতার সাথে লড়াই বা যুদ্ধ করতে আদেশ করা হয়নি; বরং তাদের সাথে সদাচরণ ও খিদমাত করতে গিয়ে যে কষ্ট-ক্লেশের সম্মুখীন হতে হয়, তাকেই হাদীসে জিহাদ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ জিহাদের কষ্টটা শারীরিক ও সম্পদ ব্যয় উভয় মাধ্যমেই হয়ে থাকে। আর প্রত্যেক যে সকল কাজ আত্মাকে ক্লান্ত করে ফেলে তাকে জিহাদ বলে। এই অর্থে পিতামাতার সাথে সদাচরণ করা হলো সবচেয়ে বড় জিহাদ। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩০০৪)
‘শারহেস্ সুন্নাহ্’ নামক গ্রন্থের ভাষ্যমতে, নফল জিহাদের ক্ষেত্রে মুসলিম পিতামাতার অনুমতি ব্যতীত বের হওয়া যাবে না। কিন্তু জিহাদ যদি ফারযে ‘আইন হয়ে যায় তাহলে তাদের অনুমতি ছাড়াই বের হতে হবে। এ ক্ষেত্রে তাদের অবাধ্য হওয়াই জরুরী। আর পিতামাতা যদি কাফির হয় তাহলে সেক্ষেত্রে জিহাদ নফল হোক বা ফরয- তাদের অনুমতি ছাড়াই বের হওয়া যাবে। অনুরূপভাবে মুসলিম পিতামাতার অনুমতি ছাড়া বা তারা যদি অপছন্দ করে তাহলে নফল, সিয়াম, হজ্জ/হজ, ‘উমরাহ্, যিয়ারত ইত্যাদি পালন করবে না। ইমাম ইবনু হুমাম বলেন, ‘‘ঐ ব্যক্তির ওপর ফরয ছিল পিতামাতা উভয়ের আনুগত্য করা, কিন্তু জিহাদ করা ফরয ছিল না’’।
সুনানে আবূ দাঊদে বর্ণিত হয়েছে, আবূ সা‘ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, এক ব্যক্তি ইয়ামান থেকে হিজরত করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসলেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘ইয়ামানে কি তোমার কেউ রয়েছে? সে বলল, আমার পিতা মাতা আছে। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তারা কি তোমাকে অনুমতি দিয়েছে? সে বলল, না। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ফিরে গিয়ে তাদের অনুমতি নাও। যদি তারা তোমাকে অনুমতি দেয় তবে জিহাদ কর, নইলে তাদের সেবা কর। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৩৮১৮-[৩২] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের দিন বললেনঃ মক্কা বিজয়ের পরে আর হিজরত নেই (ফরয নয়), শুধু জিহাদ ও নিয়্যাত ব্যতীত। অতঃপর যখনই তোমাদেরকে জিহাদের জন্য আহবান করা হবে, তখনই তোমরা যুদ্ধ করার জন্য বের হয়ে যাবে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ يَوْم الْفَتْح: ( «اهجرة بَعْدَ الْفَتْحِ وَلَكِنْ جِهَادٌ وَنِيَّةٌ وَإِذَا اسْتُنْفِرْتُمْ فانفروا»
ব্যাখ্যা: (لَا هِجْرَةَ بَعْدَ الْفَتْحِ) তথা ‘মক্কা বিজয়ের পর থেকে আর কোনো হিজরত নেই’, এ কথার ব্যাখ্যায় আহলুল ‘ইলমগণ বলেন, কিয়ামত পর্যন্ত দারুল হার্ব থেকে দারুল ইসলামের উদ্দেশে হিজরত করার বিধান বাকী থাকবে। এ হাদীসটির ব্যাখ্যায় মূলত দু’টি কথা বলা হয়েছে:
প্রথম কথা: মক্কা বিজয়ের পর মক্কা থেকে আর কোনো হিজরত নেই। কারণ তা তখনই দারুল ইসলামে পরিণত হয়ে গেছে। আর হিজরত মূলত দারুল হার্ব থেকে দারুল ইসলামের দিকে হয়ে থাকে। আর এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মু’জিযা যে, দারুল ইসলামে অবস্থান করতে হবে- এখান থেকে হিজরত করা যাবে না।
দ্বিতীয় কথা: মক্কা বিজয়ের পর থেকে এ শহরের প্রতি সম্মান প্রদর্শনপূর্বক সেখান থেকে হিজরত করে অন্য কোথাও যাওয়া যাবে না- যেমনিভাবে বিজয়ের পূর্বেও মক্কা সম্মানিত ছিল। মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ অর্থাৎ- ‘‘তোমাদের মধ্যে যারা মক্কা বিজয়ের পূর্বে ব্যয় করেছে এবং যুদ্ধ করেছে তারা মর্যাদাগত দিক থেকে অধিক মর্যাদার অধিকারী, তারা তাদের সমান নয় যারা মক্কা বিজয়ের পর ব্যয় করেছে এবং যুদ্ধ করেছে’’- (সূরা আল হাদীদ ৫৭ : ১০)।
(وَلَكِنْ جِهَادٌ وَنِيَّةٌ) তথা ‘কিন্তু জিহাদ এবং নিয়্যাত বাকী থাকবে’, এ কথার অর্থ হলো, হিজরতের যে ফযীলত বর্ণিত হয়েছে তা অর্জনের সঠিক উপায় হলো জিহাদ ও সকল কাজে সঠিক ও সুন্দর নিয়্যাত করা। (শারহে মুসলিম ৯ম খন্ড, হাঃ ১৩৫৩)
(وَإِذَا اسْتُنْفِرْتُمْ فَانْفِرُوا) অর্থাৎ- যখন ইমাম তথা মুসলিম নেতা তোমাদেরকে যুদ্ধের জন্য ডাকবে তখন তার ডাকে সাড়া দিয়ে বের হওয়া তোমাদের জন্য ওয়াজিব। ইমাম যুদ্ধের জন্য যাকে নির্ধারণ করবেন তার জন্য মুজাহিদ কাফেলায় যোগদান করা ফারযে ‘আইন হয়ে যায়। এ রকমই বর্ণিত হয়েছে ‘ইরশাদুস্ সাবি’ গ্রন্থে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৪৭৭)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮১৯-[৩৩] ’ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার উম্মাতের মধ্যে সর্বদা একটি দল সত্যের উপর অটল-অবিচল থেকে শত্রুর মুকাবিলায় সংগ্রাম করতে থাকবে এবং তাদের বিরুদ্ধবাদীদের ওপর বিজয়ী হবে। এমনিভাবে উম্মাতের শেষ দল মাসীহ দাজ্জালের (সত্য-মিথ্যার আন্দোলনে) সাথেও লড়াই-সংগ্রাম করতে থাকবে। (আবূ দাঊদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
عَنْ عِمْرَانَ بْنِ حُصَيْنٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي يُقَاتِلُونَ عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ عَلَى مَنْ نَاوَأَهُمْ حَتَّى يُقَاتِلَ آخِرُهُمُ الْمَسِيحَ الدَّجَّالَ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসটিতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি ভবিষ্যদ্বাণীর বর্ণনা বিদ্যমান। আর তা হলো এই উম্মাতের একটি দল সর্বযুগেই হাকের উপর অটল অবিচল থেকে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে যাবে এবং তারা বিজয়ী হবে।
(ظَاهِرِينَ عَلٰى مَنْ نَاوَأَهُمْ) অর্থাৎ তারা ঐ সকল লোকেদের ওপর বিজয়ী হবে, যারা তাদের শত্রুতা করবে। অন্য কথায়, যারা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করবে, তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী এ দলটি বিজয়ী হবে। (‘আওনুল মা‘বূদ খন্ড ৫, হাঃ ২৪৮১)
হাদীসের বাণী «حَتَّى يُقَاتِلَ آخِرُهُمُ الْمَسِيحَ الدَّجَّالَ» তথা ‘এমনকি তাদের সর্বশেষ দলটি দাজ্জালের সাথে যুদ্ধ করবে’, এখানে সর্বশেষ যুদ্ধদল বলতে মাহদী, ‘ঈসা (আঃ) ও তাদের অনুসারীগণ উদ্দেশ্য। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
‘ঈসা (আঃ) আসমান হতে অবতরণের পর বায়তুল মুকাদ্দাসের নিকট মুসলিমরা যখন তাকে (দাজ্জালকে) আটকে রাখবে তখন ‘ঈসা (আঃ) তাকে হত্যা করবেন। আর মুসলিমদের মাঝে মাহদীও উপস্থিত থাকবেন। দাজ্জালকে হত্যা করার পর আর জিহাদ থাকবে না।
ইয়া’জূজ- মা’জূজ-এর সাথে শক্তিতে মুসলিমরা পেরে উঠবে না। পরবর্তীতে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকেও ধ্বংস করে দিবেন। ফলে যতদিন ‘ঈসা (আঃ) পৃথিবীতে জীবিত থাকবেন ততদিন পৃথিবীতে কোনো কাফির থাকবে না। মিরকাতুল মাফাতীহে অনুরূপ বর্ণনাই পাওয়া যায়। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৪৮১)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮২০-[৩৪] আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি নিজে জিহাদে অংশগ্রহণ করল না, মুজাহিদদের যুদ্ধাস্ত্রের ব্যবস্থাও করল না এবং কোনো মুজাহিদের অবর্তমানে তার পরিবার-পরিজনের তত্ত্বাবধান (দেখাশোনা) করল না, আল্লাহ তা’আলা তাকে কিয়ামতের পূর্বে (দুনিয়াতেই) কঠিন বিপদাপদে নিপতিত করবেন। (আবূ দাঊদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْ أَبِي أُمَامَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ لَمْ يَغْزُ وَلَمْ يُجَهِّزْ غَازِيًا أَوْ يَخْلُفْ غَازِيًا فِي أَهْلِهِ بِخَيْرٍ أَصَابَهُ اللَّهُ بِقَارِعَةٍ قَبْلَ يَوْمِ الْقِيَامَةِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিহাদ থেকে সর্বদিক থেকে বিমুখ ব্যক্তির জন্য ভয়াবহ সতর্কবাণী উল্লেখ করেছেন। উক্ত ব্যক্তির জন্য কিয়ামতের পূর্বেই আল্লাহর পক্ষ থেকে ভয়ঙ্কর ‘আযাবের সতর্কবাণী রয়েছে এ হাদীসে।
হাদীসে বর্ণিত শব্দ (مَنْ لَمْ يَغْز) বলে হাকীকী তথা প্রকৃত যুদ্ধকে বুঝানো হয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
(أَصَابَهُ اللّٰهُ بِقَارِعَةٍ) এ বাক্যের ভাবার্থ হলো, ধ্বংসাত্মক দুর্যোগ দিয়ে আল্লাহ তাকে ধ্বংস করে দিবেন। ‘আরবী শব্দ কা-রি‘আহ্ হলো এমন শাস্তি বা দণ্ডের আদেশ যা হঠাৎ করে চলে আসে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫০০)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮২১-[৩৫] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা মুশরিকদের সাথে তোমাদের জান, মাল ও জবান দ্বারা জিহাদ কর। (আবূ দাঊদ, নাসায়ী ও দারিমী)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْ أَنَسٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «جَاهِدُوا الْمُشْرِكِينَ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ وَأَلْسِنَتِكُمْ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ والدارمي
ব্যাখ্যা: ‘‘তোমরা মুশরিকদের সাথে জিহাদ কর’’ এ কথার ব্যাখ্যায় ‘সুবুলুস্ সালাম’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, এ হাদীসটি নফসের সাথে জিহাদ করা ওয়াজিব হওয়ার দলীল। আর নাফসের সাথে জিহাদ করা মানে হলো জিহাদের উদ্দেশে বের হওয়া এবং কাফিরদের সাথে মুখোমুখী হওয়া। আর মাল দ্বারা জিহাদ বলতে যুদ্ধের জন্য যে খরচাদি হয় তা এবং অস্ত্র ক্রয়ের খরচাদি উদ্দেশ্য। আর জিহবা দ্বারা জিহাদ বলতে, কাফিরদেরকে আল্লাহর পথে আহবান ও তাদের বিরুদ্ধে মজবুত দলীল পেশ করা এবং তাদেরকে ধমক দেয়া ইত্যাদিকে বুঝানো হয়েছে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫০১)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮২২-[৩৬] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা (পরিচিত-অপরিচিত সকলের প্রতি নিয়মিত) সালাম প্রতিষ্ঠা কর, (অনাহারকে) আহার করাও এবং শত্রুর মস্তক অবনত কর (আঘাত হানো), তাহলে তোমাদেরকে জান্নাতের উত্তরাধিকারী করা হবে। (তিরমিযী; তিনি বলেন, হাদীসটি গরীব)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَفْشُوا السَّلَامَ وَأَطْعِمُوا الطَّعَامَ وَاضْرِبُوا الْهَامَ تُوَرَّثُوا الْجِنَانَ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حديثٌ غَرِيب
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে বেশী বেশী সালাম বিনিময়, ক্ষুধার্তকে খাবার খাওয়ানো এবং কাফিরদের নির্মূল করণার্থে জিহাদে অংশগ্রহণকে জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানেও আমরা জিহাদে অংশগ্রহণের ফযীলত সম্পর্কে জানতে পারি।
আরবী শব্দ ‘হাম’ হচ্ছে ‘হাম্মাহ’ এর বহুবচন, যার অর্থ মাথা। হাদীসে মাথায় আঘাত করার অর্থ হলো কাফিরদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদ করা। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮২৩-[৩৬] ফাযালাহ্ ইবনু ’উবায়দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রত্যেক লোকের মৃত্যুর সাথে সাথে তার ’আমলের সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু যে লোক আল্লাহর পথে (কোনো কাজে) নিয়োজিত থাকাবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তার ’আমল নিঃশেষ হয় না, কিয়ামত পর্যন্ত তার ’আমল বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং সে কবরের কঠিন ’আযাব হতে নিরাপত্তা লাভ করবে। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَن فَضالَةَ بنِ عُبيدٍ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «كُلُّ مَيِّتٍ يُخْتَمُ عَلَى عَمَلِهِ إِلَّا الَّذِي مَاتَ مُرَابِطًا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَإِنَّهُ يُنَمَّى لَهُ عَمَلُهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَيَأْمَنُ فتْنَة الْقَبْر» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: উল্লেখিত হাদীসটি থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহর রাস্তায় শত্রুবাহিনীর কবল থেকে মুসলিমদের রক্ষা করার জন্য পাহারারত মুজাহিদ মারা গেলে তার ‘আমল স্বাভাবিকভাবে মৃত ব্যক্তির ‘আমলের মতো বন্ধ হয়ে যায় না; বরং তার ‘আমল জারী থাকে এবং কিয়ামত পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। শুধু তাই নয়, কবরের শাস্তি থেকেও সে নিরাপদ থাকে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী, (كُلُّ مَيِّتٍ يُخْتَمُ عَلٰى عَمَلِه) অর্থাৎ- প্রত্যেক ব্যক্তির ‘আমলনামা তার মৃত্যুর সাথে সাথে বন্ধ হয়ে যায় এবং আর লেখা হয় না। কিন্তু মুসলিমদের পাহারাদানের কাজে নিয়োজিত অবস্থায় কেউ মারা গেলে তার ব্যাপারটি আলাদা। তার নেকী মৃত্যুর পরেও কিয়ামত পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৪৯৭)
(فَإِنَّه يُنْمٰى لَه عَمَلُه إِلٰى يَوْمِ الْقِيَامَةِ) অর্থাৎ- তার ‘আমল কিয়ামত পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে থাকবে। প্রত্যেক সময়ে তার সাথে নতুন করে ‘আমল মিলিত হবে। আর এ নেকী বৃদ্ধির সময় কিয়ামত পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করার কারণ হলো ঐ ব্যক্তি নিজেকে এমন কাজে উৎসর্গ করেছে, যার ফল মুসলিমরা যুগ যুগ ধরে ভোগ করছে। সে তাদের শত্রু মুশরিকদেরকে প্রতিহত করে দীনকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়াস চালিয়েছিল।
(وَيَأْمَنُ فِتْنَةَ الْقَبْرِ) অর্থাৎ সে কবরের ফিতনাহ্ থেকে নিরাপদ থাকবে। বলা হয়েছে যে, এ ব্যক্তি ঐ সকল লোকেদের থেকে ভিন্ন, যাদের কথা সহীহ মুসলিমে আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে মারফূ‘ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, ‘যখন কোনো মানুষ মারা যায় তখন তার ‘আমল বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি বিষয় ব্যতীত। ১. সদাকায়ে জারিয়াহ্, ২. উপকারী ‘ইলম ও ৩. সৎ সন্তান- যে তার পিতা-মাতার জন্য দু‘আ করে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮২৪-[৩৭] আর দারিমী হাদীসটি ’উকবা ইবনু ’আমির (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন।[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَرَوَاهُ الدَّارمِيّ عَن عقبَة بن عَامر
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮২৫-[৩৮] মু’আয ইবনু জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে লোক অতি অল্প সময় আল্লাহর পথে জিহাদ করে শহীদ হয়েছে, তার জন্য জান্নাত নির্ধারিত হয়ে যায়। যে লোক (শত্রুর আঘাতে) আল্লাহর পথে হতাহত বা ক্ষত-বিক্ষতের দরুন কাতর হয়েছে- সে কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় উপস্থিত হবে যে, উক্ত ক্ষতস্থান (দুনিয়ার তুলনায়) সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠবে, রক্তের রং হবে জাফরানের এবং তা হতে মিশ্কের সুগন্ধি বিচ্ছুরিত হতে থাকবে। আর আল্লাহর পথে জিহাদরত থাকাবস্থায় যে ব্যক্তির শরীরে ফোঁড়া-ঠোসা পরিলক্ষিত হবে, কিয়ামতের দিন উক্ত ফোঁড়ার উপরে শহীদগণের সীলমোহর থাকবে। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ, নাসায়ী)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَن معاذِ بن جبلٍ أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَنْ قَاتَلَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَوَاقَ نَاقَةٍ فَقَدْ وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ وَمَنْ جُرِحَ جُرْحًا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوْ نُكِبَ نَكْبَةً فَإِنَّهَا تَجِيءُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كَأَغْزَرِ مَا كَانَتْ لَوْنُهَا الزَّعْفَرَانُ وَرِيحُهَا الْمِسْكُ وَمَنْ خَرَجَ بِهِ خُرَاجٌ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَإِنَّ عَلَيْهِ طَابَعُ الشُّهَدَاءِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ
ব্যাখ্যা: আল্লাহর রাস্তায় কিছু সময় জিহাদ করার প্রতিদান হলো জান্নাত। তাছাড়া এ পথে কেউ আঘাতপ্রাপ্ত বা আহত হলে তারও রয়েছে বিশেষ মর্যাদা। আলোচ্য হাদীসে এ বিষয়েই আলোকপাত করা হয়েছে।
‘‘যে আল্লাহর রাস্তায় হাদীসে উল্লেখিত সময়টুকু জিহাদ করবে, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে’’। আর এ সময়টি বুঝাতে এখানে বলা হয়েছে, ‘‘ফাওয়াকু নাকাহ’’ যার অর্থ উটের দুইবার দুধ দোহনের মধ্যবর্তী সময়কে। অর্থাৎ একবার দুধ দোহনের পর পুনরায় স্তনে দুধ আসতে যে সময় লাগে তাকেই ‘‘ফাওয়াকু নাকাহ’’ বলে। আবার কারো মতে উট দোহন করা হয় সকাল ও সন্ধ্যায়। অতএব এখানে সকাল ও সন্ধ্যার মধ্যবর্তী সময়কে বুঝানো হয়েছে। আবার কেউ বলেন, দুধ দোহনের সময় একবার বাটে টান দেয়ার পর পুনরায় টান দেয়ার পূর্ব পর্যন্ত সময়কে ‘‘ফাওয়াকু নাকাহ’’ বলা হয়েছে। আর এই তৃতীয় উদ্দেশ্যটিই এ ক্ষেত্রে বেশী উপযোগী। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় এক মুহূর্ত সময় যুদ্ধ করবে তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
نكبة ও جرح শব্দ দু’টির অর্থ একই। কারো কারো মতে, কাফিরদের পক্ষ থেকে যে ক্ষত হয় তাকে বলে جرح; আর نكبة বলা হয় ঐ ক্ষতকে যা বাহন থেকে পড়ে গিয়ে বা নিজের অস্ত্রের আঘাতে হয়ে থাকে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
মুল্লা ‘আলী কারী (রহঃ) বলেনঃ দুনিয়াতে তার যে ক্ষত হয়েছিল পরকালে সে এর চেয়ে বেশী ক্ষত নিয়ে উপস্থিত হবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
خراج শব্দের অর্থ ফোঁড়া। অর্থাৎ তার শরীরে যদি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের উদ্দেশে বের হওয়ার পর কোনো যখম বা ফোঁড়া বের হয় তাহলে সেটাও তার জন্য মর্যাদার কারণ হবে। এটাকে শহীদদের স্ট্যাম্প বলে হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫৩৮)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮২৬-[৩৯] খুরয়ম ইবনু ফাতিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে কিছু ব্যয় (দান) করবে, তার জন্য এর বিনিময়ে সাতশত গুণ সাওয়াব প্রদান করা হবে। (তিরমিযী, নাসায়ী)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَن خُرَيمِ بن فاتِكٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ أَنْفَقَ نَفَقَةً فِي سَبِيلِ اللَّهِ كُتبَ لَهُ بسبعمائةِ ضعف» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে আল্লাহর রাস্তায় অর্থ-সম্পদ ব্যয় করার ব্যাপক ফযীলত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। আর সে ঘোষণা হলো, কেউ আল্লাহর রাস্তায় কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ব্যয় করলে তার সাতশ’গুণ বেশী সাওয়াব লিখা হবে।
(أَنْفَقَ نَفَقَةً فِىْ سَبِيلِ اللّٰهِ) এ বাক্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বুঝাতে চেয়েছেন যে, কম হোক বা বেশী, আল্লাহর রাস্তায় যে কোনো পরিমাণের অর্থ ব্যয় করলেই হাদীসে বর্ণিত সাওয়াব অর্জিত হবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
(كُتبَ لَه بِسَبْعِ مِائَةِ ضِعْفٍ) এ বাক্যে বর্ণিত নেকীর পরিমাণটি সর্বোচ্চ নয়; বরং সর্বনিম্ন প্রতিশ্রুত সীমা। এরপরে আল্লাহ যাকে চাইবেন আরো বৃদ্ধি করে দিবেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ অর্থাৎ- ‘‘যারা আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে তাদের উদাহরণ এমন একটি শস্যদানার সাথে, যা থেকে সাতটি শীষ বের হয়েছে, প্রত্যেকটি শীষে একশত শস্যদানা রয়েছে। আর আল্লাহ যাকে চান তাকে আরো বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহ সুপ্রশস্ত এবং মহাজ্ঞানী’’। (সূরা আল বাকারা ২ : ২৬১)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮২৭-[৪০] আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর পথে সর্বোত্তম দান হলো তাঁবুর ছায়ার ব্যবস্থা করা এবং আল্লাহর পথে যুদ্ধরত সৈনিকের সেবা-শশ্রুষার জন্য গোলাম দান করা অথবা আল্লাহর পথে পূর্ণ বয়স্কা (বাচ্চা প্রজননকারী অথবা সৈনিকের আরোহণের জন্য) উষ্ট্রী দান করা। (তিরমিযী)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْ أَبِي أُمَامَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَفْضَلُ الصَّدَقَاتِ ظِلُّ فُسْطَاطٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَمِنْحَةُ خَادِمٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوْ طَرُوقَةُ فَحْلٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে তিনটি উৎকৃষ্ট ও সর্বোত্তম সাদাকা বা দান সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। নিম্নে সেগুলো তুলে ধরা হলো :
(এক) আল্লাহর রাস্তায় যারা কাজ করে তাদের অবস্থানস্থলকে ছায়াঘেরা করার জন্য ছোট বা বড় তাঁবু সাদাকা হিসেবে দেয়া, যা সফরে থাকাকালীন সময়ে বিশেষ সময়ে বিশ্রাম নেয়া বা রাত্রিযাপন করার জন্য স্থাপন করা হয়। فُسْطَاطٍ ‘‘ফুসত্বাত্ব’’ বলা হয় এমন তাঁবুকে, যার চারপাশে বেষ্টনী দেয়া হয় না; বরং স্থানটিকে ছায়াবিশিষ্ট করার জন্য শুধুমাত্র উপরে ছাউনি দেয়া হয়। তাহযীব গ্রন্থে বলা হয়েছে, পশমের তৈরি ঘরকে ‘‘ফুস্ত্বাত্ব’’ বলা হয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
(দুই) আল্লাহর রাস্তায় কারো খিদমাতের জন্য খাদেম বা সেবক দান করা।
(وَمِنْحَةُ خَادِمٍ فِىْ سَبِيلِ اللّٰهِ) এর অর্থ হলো আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়া কোনো ব্যক্তিকে কোনো খাদেমের মালিক বানিয়ে দেয়া বা খাদেম ধার দেয়া। এখান থেকে বুঝা যায় যে, নিজে কারো খিদমাত করাটা আরো বেশী উত্তম ও অধিক সাওয়াব অর্জনের মাধ্যম। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
(তিন) আল্লাহর রাস্তায় কোনো মুজাহিদকে সফর করার জন্য বাহন দান করা।
(طَرُوْقَةُ فَحْلٍ فِىْ سَبِيلِ اللّٰهِ) অর্থ হলো আল্লাহর রাস্তায় সওয়ারী বা বাহন দান করা। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮২৮-[৪১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে লোক আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে ক্রন্দন করে, তার জন্য জাহান্নামে প্রবেশ করা অসম্ভব, যেমনিভাবে দোহনকৃত দুধ পুনরায় স্তনে প্রবেশ করানো অসম্ভব। আর কোনো বান্দার শরীরে লেগে থাকা ধূলাবালু এবং জাহান্নামের ধোঁয়া কস্মিনকালেও মিলিত হতে পারে না।
ইমাম নাসায়ী (রহঃ) অপর হাদীসে অতিরিক্ত বর্ণনা করেন যে, কোনো মুসলিমের নাকের অভ্যন্তরে আল্লাহর পথে ধূলাবালু ও জাহান্নামের ধোঁয়া কক্ষনো একত্রিত হবে না। নাসায়ীর অন্য এক বর্ণনায় আছে, (সেটা) কোনো বান্দার নাকে কক্ষনো একত্রিত হতে পারে না। অনুরূপ কোনো বান্দার হৃদয়ে ঈমান ও কৃপণতা কক্ষনো একত্রিত হতে পারে না।[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَلِجُ النَّارَ مَنْ بَكَى مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ حَتَّى يَعُودَ اللَّبَنُ فِي الضَّرْعِ وَلَا يَجْتَمِعَ عَلَى عَبْدٍ غُبَارٌ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَدُخَانُ جَهَنَّمَ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَزَادَ النَّسَائِيُّ فِي أُخْرَى: «فِي مَنْخِرَيْ مُسْلِمٍ أَبَدًا» وَفِي أُخْرَى: «فِي جَوْفِ عَبْدٍ أَبَدًا وَلَا يَجْتَمِعُ الشُّحُّ وَالْإِيمَانُ فِي قَلْبِ عَبْدٍ أَبَدًا»
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসটিতে আল্লাহর রাস্তায় অটল থেকে জিহাদ করার ফযীলত বর্ণনা করা হয়েছে।
(لَا يَلِجُ النَّارَ مَنْ بَكٰى مِنْ خَشْيَةِ اللّٰهِ حَتّٰى) এর অর্থ হলো ঐ ব্যক্তি জাহান্নামে প্রবেশ করবে না যে আল্লাহর ভয়ে কেঁদেছে। মূলত আল্লাহর ভয়ে কাঁদা বলতে আল্লাহর বিধি-বিধান যথাযথ পালন করা এবং তাঁর নাফরমানী থেকে বিরত থাকা উদ্দেশ্য। আর প্রকৃতপক্ষে যে এরূপ করে সেই আল্লাহর ভয়ে কাঁদে। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৬৩৩)
(حَتّٰى يَعُوْدَ اللَّبَنُ فِى الضَّرْعِ) এ বাক্যে দোহনকৃত দুধ পুনরায় উট বা গাভীর স্তনে ফিরে যাওয়া অসম্ভব হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে উপমা পেশ করা হয়েছে যে, আল্লাহর ভয়ে যে কাঁদে তার জাহান্নামে প্রবেশ করাও তদ্রূপ অসম্ভব। আর এ বাক্যটি কুরআনের নিমেণাক্ত আয়াতের অনুরূপ : অর্থাৎ- ‘‘আর তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না উট সুঁইয়ের ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করে। আর এভাবেই আমি পাপীদের প্রতিদান দেই’’- (সূরা আল আ‘রাফ ৭ : ৪০)। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৬৩৩)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮২৯-[৪২] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জাহান্নামের আগুন কক্ষনো দু’টি চক্ষুকে স্পর্শ করবে না। একটি চক্ষু, যা আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে ক্রন্দনরত হয়। অপর চক্ষু, যা আল্লাহর পথে (কোনো কাজে বা সীমান্ত) পাহারা দেয় বিনিদ্রা অবস্থায়। (তিরমিযী)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: عَيْنَانِ لَا تَمَسُّهُمَا النَّارُ: عَيْنٌ بَكَتْ مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ وَعَيْنٌ بَاتَتْ تَحْرُسُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ
ব্যাখ্যা: এ হাদীসে পূর্বোল্লিখিত হাদীসের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে এবং তার সাথে আরেকটি বিষয় বাড়িয়ে বলা হয়েছে। মূলত এখানে আল্লাহর রাস্তায় পাহাড়াদানের ফযীলত বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, দু’টি চোখ কখনও জাহান্নামে যাবে না, (এক) যে চোখ আল্লাহর ভয়ে কাঁদবে, (দুই) যে চোখ রাত জেগে আল্লাহর রাস্তায় মুসলিমদের পাহাড়াদানের কাজে নিয়োজিত থাকবে।
হাদীসে ‘চোখ’ শব্দ ব্যবহার করে মূলত ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে। আংশিক বস্তুর কথা উল্লেখ করে সম্পূর্ণ বস্তুকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ- চোখ বলতে ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে। আর ‘‘জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না’’ এ কথা বলে বুঝানো হয়েছে যে, সে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাবে। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৬৩৯)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৩০-[৪৩] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জনৈক সাহাবী পাহাড়ের সংকীর্ণ পথ অতিক্রমকালে সুমিষ্ট পানির এক ঝর্ণা দেখে মুগ্ধ হয়ে তিনি আনন্দে আতিশয্যে বলে ফেললেন যে, কতই না উত্তম হতো আমি যদি লোকালয় ছেড়ে এ পাহাড়ে বসবাস করতে পারতাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট সাহাবীর এ আকাঙ্ক্ষার প্রসঙ্গে কথা উঠলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, (সাবধান) ঐরূপ কামনা করো না। কেননা তোমাদের কারও আল্লাহর পথে অবস্থান (জিহাদে শামিল থাকা) স্বীয় বাড়ীতে সত্তর বছরের সালাত আদায় অপেক্ষা সর্বোত্তম। তোমরা কি এটা প্রত্যাশা কর না যে, আল্লাহ তা’আলা তোমাদের গুনাহ মাফ করে দেন এবং পরিশেষে জান্নাতে প্রবেশ করান? তোমরা আল্লাহর পথে জিহাদ কর। কোনো ব্যক্তি আল্লাহর পথে উষ্ট্রী দোহনের বিরতির ন্যায়ও যদি কিছু সময় যুদ্ধ করে, তার জন্য জান্নাত নির্ধারিত হয়ে যায়। (তিরমিযী)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَن أبي هريرةَ قَالَ: مَرَّ رَجُلٍ مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِشِعْبٍ فِيهِ عُيَيْنَةٌ مِنْ مَاءٍ عَذْبَةٌ فَأَعْجَبَتْهُ فَقَالَ: لَوِ اعْتَزَلْتُ النَّاسَ فَأَقَمْتُ فِي هَذَا الشِّعْبِ فَذَكَرَ ذَلِكَ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «لَا تَفْعَلْ فَإِنَّ مَقَامَ أَحَدِكُمْ فِي سَبِيلِ الله أفضل من صلَاته سَبْعِينَ عَامًا أَلَا تُحِبُّونَ أَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ وَيُدْخِلَكُمُ الْجَنَّةَ؟ اغْزُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ مَنْ قَاتَلَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَوَاقَ نَاقَةٍ وَجَبت لَهُ الْجنَّة» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: উক্ত হাদীসটি থেকে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের ফাযীলাতের পরিমাণ সম্পর্কে কিছুটা অনুমান করা যায়।
شِعْبٍ বলা হয় দু’পাহাড়ের মধ্যবর্তী গিরিপথকে।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী : ‘‘তুমি সেখানে থেকো না’’ এর দ্বারা তিনি সাহাবীকে সেখানে থাকতে নিষেধ করেছিলেন। কারণ জিহাদ করা ফরয, আর ফরয ছেড়ে নফল ‘ইবাদাতের জন্য নিজেকে আলাদা রাখা অবাধ্যতার শামিল।
ইবনুল মালিক ত্বীবী (রহঃ)-এর কথা নকল করে বলেন, ‘‘উক্ত সাহাবী জিহাদ শেষ করে সেখানে থাকার ইচ্ছা পোষণ করেছিল, ঠিক সেভাবে যেভাবে আবেদ সাধকগণ নির্জনতা অবলম্বন করে থাকেন।
সত্তর বছর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সময়ের আধিক্য বুঝানো; কোনো সময়কে সীমাবদ্ধ করা উদ্দেশ্য নয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৩১-[৪৪] ’উসমান (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর পথে একদিনের সীমান্ত পাহারা দেয়া, অন্য সকল পুণ্যকর্মের তুলনায় এক হাজার দিনের চেয়ে উত্তম। (তিরমিযী, নাসায়ী)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْ عُثْمَانَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «رِبَاطُ يَوْمٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ يَوْمٍ فِيمَا سِوَاهُ مِنَ الْمَنَازِلِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে একদিন ‘‘রিবাত্ব’’ তথা মুসলিম সেনাদের পাহাড়ায় নিয়োজিত থাকার ফযীলত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে এবং এটাকে হাজার দিন অপেক্ষা উত্তম বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
(مِنَ الْمَنَازِلِ) এ বাক্যের ব্যাখ্যায় মুল্লা ‘আলী কারী বলেনঃ ‘‘এ কথার দ্বারা যুদ্ধ ক্ষেত্রে মুজাহিদদেরকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এর আকলী ও নকলী দলীল বিদ্যমান রয়েছে। আর এটা রিবাত্বের অন্য আরেকটি তাফসীর তথা ‘‘সালাতের জন্য মসজিদে অপেক্ষা করাও রিবাত্ব’’ এ অর্থ নিতেও বাধা সৃষ্টি করে না। এখানে رِبَاطُ ‘রিবাত্ব’ বলতে জিহাদে আকবার তথা ময়দানের বড় জিহাদকে বুঝানো হয়েছে। আর অন্য হাদীসে এক সালাতের পর অন্য সালাতের জন্য অপেক্ষা করাকে রিবাত্ব বলার অর্থ হলো তা জিহাদে আসগার। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৬৬৭)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৩২-[৪৫] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার সামনে সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশকারী এমন তিন শ্রেণীর লোককে উপস্থিত করা হয়েছে। তন্মধ্যে একদল হলো শহীদ; দ্বিতীয় দল হলো সর্বদা হারাম পরিহার করে চলে এবং কোনো অবস্থায় কারও কাছে সহযোগিতার হাত বাড়ায় না; তৃতীয় দল হলো যে চাকর উত্তমরূপে আল্লাহর ’ইবাদাত করে ও মালিকের কল্যাণ সাধনে নিয়োজিত থাকে। (তিরমিযী)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: عَرَضَ عَلَيَّ أَوَّلُ ثَلَاثَةٍ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ: شَهِيدٌ وَعَفِيفٌ مُتَعَفِّفٌ وَعَبَدٌ أَحْسَنَ عبادةَ اللَّهِ ونصح لمواليه . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: আলোচনাধীন হাদীসটিতে তিন প্রকার ব্যক্তির কথা আলোচনা করা হয়েছে, যারা সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাদের একজন হলো আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করতে গিয়ে শহীদ ব্যক্তি। সুতরাং এ হাদীসটিও জিহাদের ফযীলত সম্পর্কে সুস্পষ্ট বর্ণনা বহন করে।
হাদীসে বর্ণিত উক্তি (أَوَّلُ ثَلَاثَةٍ يَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ) এখানে তিন প্রকারের সকল লোককে বুঝানো হয়েছে।
শাহীদের পরিচয় দিতে গিয়ে ‘আল্লামা সুয়ূত্বী (রহঃ) বলেনঃ শহীদকে শহীদ (সাক্ষী বা উপস্থিত ব্যক্তি) বলার কারণ হলো, সে মূলত জীবিত। তার রূহটা যেন হাজির। এটাও বলা হয়ে থাকে যে, আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর ফেরেশতামন্ডলী তার জন্য জান্নাতের সাক্ষ্য প্রদান করবেন। আরো বলা হয় যে, সে কিয়ামতের দিন রসূলগণের পক্ষে দীন উম্মাতের নিকট পৌঁছে দিয়েছেন মর্মে সাক্ষ্য দিবে। আবার কেউ বলেন, জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর জন্য ঈমান তার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে।
হাদীসে বর্ণিত বাণী (وَعَفِيْفٌ مُتَعَفِّفٌ) বলতে ঐ ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যে অন্যের কাছে কোনো কিছু চাওয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখে এবং অতিরিক্ত খাবার, পোশাক-পরিচ্ছদ ও অন্যান্য ভোগ-সামগ্রী থেকে নিজেকে দূরে রাখে এবং অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকে। কারো মতে, যা তার জন্য উচিত বা উপযোগী নয় তা থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ ও সংযত রাখে। আর নিজের আত্মা ও কুপ্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে যথাযথভাবে ধৈর্যধারণ করে।
(وَعَبَدٌ أَحْسَنَ عِبَادَةَ اللّٰهِ) এ বাক্যে ঐ বান্দাকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে, যে ‘ইবাদাতের শর্তাবলী ও রুকনসমূহ সঠিকভাবে আদায় করে। ‘আল্লামা তীবী (রহঃ) বলেনঃ তার ‘ইবাদাতকে ইখলাসের সাথে পালন করে, যেমনটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ «الإحسان أن تعبد الله كأنك تراه فإن لم تكن تراه فإنه يراك» অর্থাৎ- তুমি এমনভাবে আল্লাহর ‘ইবাদাত কর যেন তুমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছ। আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও তবে জেনে রাখ তিনি তোমাকে দেখতে পাচ্ছেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৩৩-[৪৬] ’আব্দুল্লাহ ইবনু হুবাশী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সর্বোত্তম ’আমলের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, দীর্ঘ ক্বিয়ামের সালাত আদায়। আবার জিজ্ঞেস করা হলো, কোন্ দান সর্বোত্তম? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, অভাবগ্রস্ত অবস্থায় দানের প্রয়াস। আবার জিজ্ঞেস করা হলো, কোন্ হিজরত সর্বোত্তম? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, আল্লাহ তা’আলা যা নিষেধ করেছেন তা বর্জন করা। আবার জিজ্ঞেস করা হলো, কোন্ জিহাদ সর্বোত্তম? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, মুশরিকদের বিরুদ্ধে জান ও মাল দ্বারা জিহাদ করা। অতঃপর জিজ্ঞেস করা হলো, কোন্ ধরনের মৃত্যু (শহীদ হওয়া) উত্তম? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, যার রক্ত প্রবাহিত হয়েছে এবং তার সওয়ারীর পাও কেটে ফেলা হয়েছে। (আবূ দাঊদ)[1]
নাসায়ী-এর বর্ণনায় আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট থেকে সর্বোত্তম ’আমলের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, সন্দেহ সংশয়মুক্ত ঈমান, গনীমাতে প্রাপ্ত মালে চুরি বা আত্মসাৎমুক্ত জিহাদ এবং মাকবুল (গ্রহণযোগ্য) হজ্জ/হজ। আবার জিজ্ঞেস করা হলো, কোন্ সালাত সর্বোত্তম? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, দীর্ঘ কুনূত। অতঃপর অন্যান্য বর্ণনায় তারা (আবূ দাঊদ ও নাসায়ী) উভয়ে ঐকমত্যে আছেন।
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَن عبدِ الله بنِ حُبَشيٍّ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سُئِلَ أَيُّ الْأَعْمَالِ أَفْضَلُ؟ قَالَ: «طُولُ الْقِيَامِ» قِيلَ: فَأَيُّ الصَّدَقَةِ أَفْضَلُ؟ قَالَ: «جُهْدُ الْمُقِلِّ» قِيلَ: فَأَيُّ الْهِجْرَةِ أَفْضَلُ؟ قَالَ: «مَنْ هَجَرَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ» قِيلَ: فَأَيُّ الْجِهَادِ أَفْضَلُ؟ قَالَ: «مَنْ جَاهَدَ الْمُشْرِكِينَ بِمَالِهِ وَنَفْسِهِ» . قِيلَ: فَأَيُّ الْقَتْلِ أَشْرَفُ؟ قَالَ: «مَنْ أُهْرِيقَ دَمُهُ وَعُقِرَ جَوَادُهُ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
وَفِي رِوَايَةِ للنسائي: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سُئِلَ: أيُّ الأعمالِ أفضلُ؟ قَالَ: «إِيمانٌ لَا شكَّ فِيهِ وَجِهَادٌ لَا غُلُولَ فِيهِ وَحَجَّةٌ مَبْرُورَةٌ» . قِيلَ: فَأَيُّ الصَّلَاةِ أَفْضَلُ؟ قَالَ: «طُولُ الْقُنُوتِ» . ثمَّ اتفقَا فِي الْبَاقِي
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে বেশ কিছু ‘আমলকে সর্বোত্তম ‘আমল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। তন্মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে এমন জিহাদ, যাতে মুজাহিদ ব্যক্তি গনীমাতের মাল চুরি করেনি; বরং নিজের জান ও মাল দিয়ে জিহাদে অংশগ্রহণ করে। সুতরাং এ হাদীসটিতেও জিহাদের ফযীলত আলোচনা করা হয়েছে।
কারো মতে হাদীসে বর্ণিত শব্দ ‘‘মুক্বিল’’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ঐ দরিদ্র ব্যক্তি, যে ক্ষুধায় ধৈর্য ধরতে পারে। এও বলা হয় যে, মুক্বিল দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ধনী হৃদয়। যেমনটি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীসে এসেছে: «أفضل الصدقة ما كان عن ظهر غنى» অর্থাৎ- সর্বোত্তম সাদাকা হচ্ছে যা ধনী হওয়ার প্রাক্কালে করা হয়।
হাদীসের বাণী «طول القنوت» বলতে বুঝানো হয়েছে লম্বা ক্বিয়াম বিশিষ্ট সালাতকে। কেউ কেউ বলেন, এর দ্বারা যে কোনো সালাত উদ্দেশ্য। কারো মতে এখানে রাতের সালাত তথা ক্বিয়ামুল্ লায়ল উদ্দেশ্য। আর এটাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ‘আমলের সাথে বেশী সামঞ্জস্যপূর্ণ। (নাসায়ী হাঃ ২৫২৫)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৩৪-[৪৭] মিকদাম ইবনু মা’দীকারিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শাহীদের জন্য আল্লাহর নিকট ছয়টি পুরস্কার সুরক্ষিত রয়েছে। ১- যুদ্ধরত অবস্থায় তার রক্তের ফোঁটা মাটিতে ঝরা মাত্রই তাকে ক্ষমা করে দেয়া হয় এবং তাকে জান্নাতের আবাসস্থল দেখানো হয়। ২- তাকে কবরের ’আযাব হতে নিষ্কৃতি দেয়া হয়। ৩- হাশরের ময়দানের মহাভীতি হতে দূরে রাখা হয়। ৪- (কিয়ামতের দিন) সম্মানজনকভাবে তার মাথায় ইয়াকূতের মুকুট পরানো হবে, যার মধ্যে খচিত একটি ইয়াকূত দুনিয়া ও তার সমস্ত ধন-সম্পদ হতে উত্তম। ৫- সুন্দর বড় বড় চক্ষুবিশিষ্ট বাহাত্তর জন হূরকে তার সঙ্গিনীরূপে দেয়া হবে। ৬- তার নিকটাত্মীয়দের মধ্যে সত্তরজনের সুপারিশ কবুল করা হবে। (তিরমিযী, ইবনু মাজাহ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنِ الْمِقْدَامِ بْنِ مَعْدِي كَرِبَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لِلشَّهِيدِ عِنْدَ اللَّهِ سِتُّ خِصَالٍ: يُغْفَرُ لَهُ فِي أوَّلِ دفعةٍ وَيَرَى مَقْعَدَهُ مِنَ الْجَنَّةِ وَيُجَارُ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَيَأْمَنُ مِنَ الْفَزَعِ الْأَكْبَرِ وَيُوضَعُ عَلَى رَأْسِهِ تَاجُ الْوَقَارِ الْيَاقُوتَةُ مِنْهَا خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا ويزوَّجُ ثنتينِ وَسَبْعِينَ زَوْجَةً مِنَ الْحُورِ الْعِينِ وَيُشَفَّعُ فِي سَبْعِينَ مِنْ أَقْرِبَائِهِ . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসটিতে শহীদদের সাওয়াব তথা মর্যাদা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। অত্র হাদীসে শহীদদের ছয়টি মর্যাদার কথা আলোচনা করা হয়েছে, যেগুলো শহীদ ব্যতীত অন্য কেউ একত্রে পাবে না।
(يُغْفَرُ لَه فِىْ اَوَّلِ دَفْعَةٍ) ‘আল্লামা মুনযিরী (রহঃ) এ বাক্যের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেনঃ শাহীদের রক্ত থেকে প্রথম ফোঁটা প্রবাহিত হওয়ার সাথে সাথেই তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।
(وَيَأْمَنُ مِنَ الْفَزَعِ الْأَكْبَرِ) অর্থাৎ- সে ফাযাউল আকবার হতে নিরাপদ থাকবে।
মুল্লা ‘আলী কারী বলেনঃ নিম্নোক্ত কুরআনের আয়াতেও এ কথার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, ফাযাউল আকবার তাদেরকে চিন্তায় ফেলবে না। (সূরা আল আম্বিয়া ২১ : ১০৩)
‘‘আল ফাযাউল আকবার’’ বলতে জাহান্নামকে বুঝানো হয়েছে, আবার কারো মতে জাহান্নামের সামনে পেশ করাকে বুঝানো হয়েছে। বলা হয়েছে, এটা সেই সময়, যখন জাহান্নামীদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপের নির্দেশ দেয়া হবে। আবার কারো মতে, এটা সেই সময় যখন মৃত্যুকে যাবাহ করা হবে, আর কাফিররা মৃত্যুর পরিসমাপ্তি দেখে জাহান্নাম থেকে মুক্তির ব্যাপারে হতাশ হয়ে যাবে। কারো মতে এটা হচ্ছে সেই সময় যখন কাফিরদের ওপর আগুন চেপে আসবে। আবার কারো মতে আল ফাযাউল আকবার বলতে শিঙ্গার শেষ ফুঁৎকারের সময়কে বুঝানো হয়েছে। কুরআনে এসেছে, অর্থাৎ- ‘‘এবং যেদিন শিঙ্গায় ফুঁৎকার দেয়া হবে, সেদিন আকাশমন্ডলীর ও পৃথিবীর সকলেই ভীত-বিহবল হয়ে পড়বে, তবে আল্লাহ যাদেরকে চাইবেন তারা ব্যতীত এবং সকলেই তাঁর নিকট বিনীত অবস্থায় আসবে’’- (সূরা আন্ নামল ২৭ : ৮৭)। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৬৬১)
‘‘হূর’’ হলো জান্নাতের মহিলাগণ, যারা হবে খুবই সাদা এবং খুব কালো চোখ বিশিষ্ট।
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৩৫-[৪৮] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি জিহাদের কোনো চিহ্ন (নমুনা) ছাড়া মৃত্যুবরণ করল, সে কিয়ামতের দিন ত্রুটিযুক্ত অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে। (তিরমিযী, ইবনু মাজাহ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ لَقِيَ اللَّهَ بِغَيْرِ أَثَرٍ مِنْ جِهَادٍ لَقِيَ اللَّهَ وَفِيهِ ثُلْمَةٌ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: উল্লেখিত হাদীসটিতে জিহাদের গুরুত্ব বুঝানো হয়েছে। হাদীসটির মূল বক্তব্য হচ্ছে, যদি কারো জিহাদের কোনো আলামাত বা চিহ্ন নিজের সাথে না নিয়েই মৃত্যুবরণ করে, অর্থাৎ জিহাদের সাথে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত না থাকে, তাহলে সে আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করল যে, তার মাঝে ত্রুটি রয়েছে।
মুল্লা ‘আলী কারী (রহঃ) বলেনঃ أثر (আসার) হলো ঐ জিনিস, যা কোনো কিছু থেকে অবশিষ্ট থাকে। আর সেই অবশিষ্ট জিনিস দেখে সেই জিনিসটির অবস্থা জানা যায়।
কাযী ইয়ায (রহঃ) বলেনঃ এখানে উদ্দেশ্য হলো আলামাত বা চিহ্ন। অর্থাৎ- মুজাহিদ ব্যক্তির শরীরে যুদ্ধের যে কোনো আলামাত থাকলে সে এ সতর্কবাণীর উদ্দেশ্য হবে না। সেটা ক্ষত হোক বা ক্লান্তি হোক বা পথের ধূলা হোক কিংবা টাকা-পয়সা খরচ করা হোক অথবা অস্ত্রের আঘাত হোক।
যুদ্ধ হতে পারে শত্রুদের সাথে আবার হতে পারে নফসের সাথে বা শায়ত্বনের সাথে। অনুরূপভাবে জিহাদের চিহ্ন বা আলামাতও বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ অর্থাৎ- ‘‘তাদের চেহারায় তাদের নিদর্শন হলো সিজদার চিহ্ন বা আলামাত’’- (সূরা আল ফাত্হ ৪৮ : ২৯)। কেউ বলেনঃ এ হাদীসটির বিধান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগের সাথে খাস ছিল। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৬৬৬)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৩৬-[৪৯] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পিঁপড়ার দংশনে তোমরা যেরূপ ব্যথাতুর হও, শহীদের হত্যার ব্যথাও অনুরূপ অনুভূত হয়। (তিরমিযী, নাসায়ী, দারিমী; ইমাম তিরমিযী বলেন, হাদীসটি হাসান গরীব)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الشَّهِيدُ لَا يَجِدُ أَلَمَ الْقَتْلِ إِلَّا كَمَا يَجِدُ أَحَدُكُمْ أَلَمَ الْقَرْصَةِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَالنَّسَائِيُّ وَالدَّارِمِيُّ وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ
ব্যাখ্যা: শাহীদের মৃত্যু কষ্টের পরিমাণ উল্লেখ করে আলোচ্য হাদীসটিতে মুজাহিদদেরকে জিহাদের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে।
(أَلَمَ الْقَرْصَةِ) অর্থ হলো পিঁপড়ার একবার কামড় দেয়ার মতো কষ্ট। আবার কারো মতে নখ দিয়ে একবার চিমটি কাটার মতো কষ্ট। শহীদ ব্যক্তিও এত সামান্য পরিমাণ মৃত্যুকষ্ট অনুভব করে। খুবায়ব -এর কবিতায় এমনটিই বর্ণিত হয়েছে:
ولست أبالي حين أقتل مسلما على أي شق كان لله مصرع
وذلك في ذات الإله وإن يشأ يبارك على أوصال شلو ممزع
অর্থাৎ- ‘‘আমি কোনো কিছুরই পরোয়া করব না যখন আমাকে মুসলিম অবস্থায় হত্যা করা হবে। আল্লাহর রাহে যেভাবেই আমাকে ক্ষত-বিক্ষত করা হোক না কেন, সেটা কেবলমাত্র আল্লাহর জন্যই। তিনি চাইলে আমার দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করা প্রত্যেকটি অঙ্গের বিনিময়ে বরকত দান করবেন’’।
খুবায়ব ছিলেন ইসলামের ইতিহাসে প্রথম ক্রুশবিদ্ধ ব্যক্তি। ঘটনাটি হলো, খুবায়ব বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তাকে বন্দী করে মক্কায় নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি বদর যুদ্ধে হারিসকে কাফির অবস্থায় হত্যা করেছিলেন, ফলে তার ছেলেরা প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তাকে কিনে নেয়। এমতাবস্থায় তারা তাকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করে- (তিরমিযী, নাসায়ী, দারিমী)। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৩৭-[৫০] আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর নিকট দু’টি ফোঁটা এবং দু’টি দাগের (চিহ্নের) চেয়ে পছন্দনীয় অন্য কিছুই নয়। ফোঁটা দু’টির একটি হলো আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দনরত অশ্রুর ফোঁটা, অপরটি হলো আল্লাহর পথে প্রবাহিত রক্তের ফোঁটা। আর দাগ দু’টির একটি আল্লাহর পথে (জিহাদে) আহত হওয়ার দাগ, অপরটি ফরয ’ইবাদাতসমূহের কোনো একটি আদায়ের দাগ। (তিরমিযী; তিনি বলেন, হাদীসটি হাসান গরীব)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْ أَبِي أُمَامَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لَيْسَ شَيْءٌ أَحَبَّ إِلَى اللَّهِ مِنْ قَطْرَتَيْنِ وَأَثَرَيْنِ: قَطْرَةِ دُمُوعٍ مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ وَقَطْرَةِ دَمٍ يُهْرَاقُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَأَمَّا الْأَثَرَانِ: فَأَثَرٌ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَأَثَرٌ فِي فَرِيضَةٍ مِنْ فَرَائِضِ اللَّهِ تَعَالَى . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতে গিয়ে শরীরের এক ফোঁটা রক্ত প্রবাহিত হওয়ার বিশেষ মর্যাদার কথা আলোচনা করা হয়েছে।
এ হাদীসে ‘‘আল্লাহর রাস্তায়’’ কথাটি ‘আম্ তথা ব্যাপকার্থবোধক। অর্থাৎ এখানে জিহাদ ছাড়া অন্যান্য কল্যাণকার কাজও উদ্দেশে হতে পারে, যা আল্লাহর জন্য করা হয়। এই হাদীসে চোখের পানি বুঝাতে বহুবচন ব্যবহার করার কারণ হলো তা সাধারণত পরিমাণে বেশী হয়। আর তার তুলনায় রক্তের পরিমাণ কম হয়। ইমাম ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ ‘‘চোখের পানির ফোঁটা’’ বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। আর রক্তের ফোঁটা বুঝাতে একবচন ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে বুঝানো হয়েছে যে, আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদের এক ফোঁটা রক্তের দাম অনেক ফোঁটা চোখের পানি অপেক্ষা বেশী।
আল্লাহর রাস্তায় আলামাত বা চিহ্ন হতে পারে মসজিদের দিকে যাওয়ার কারণে ধূলোমলিন হওয়া, হতে পারে যুদ্ধের ময়দানে প্রাপ্ত ক্ষত বা আঘাত এবং ‘ইলম অন্বেষণের কাজে বের হওয়ার ফলে কোনো চিহ্ন বা আলামাত।
(وَأَثَرٌ فِىْ فَرِيضَةٍ مِنْ فَرَائِضِ اللّٰهِ تَعَالٰى) তথা ‘‘আল্লাহর কোনো ফরয বিধান পালনে কোনো আলামাত বা চিহ্ন’’ এ বাক্যে বুঝানো হয়েছে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় উযূ করার কারণে হাত-পা ফেঁটে যাওয়া বা উযূর ভিজা অংশ অবশিষ্ট থাকা। কিংবা খুব গরমে সিজদা করার কারণে কপাল পুড়ে দাগ হয়ে যাওয়া। অথবা সিয়াম পালনের কারণে মুখে দুর্গন্ধ হওয়া বা হজে/হজ্জের সফরের কারণে পা ধূলোমলিন হওয়া। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৬৬৯)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৩৮-[৫১] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হজ্জ/হজ অথবা ’উমরাহ্ অথবা আল্লাহর পথে জিহাদের উদ্দেশ্য ছাড়া নৌযান সফরে বের হয়ো না। কেননা সমুদ্রের নিম্নভূমিতে আগুনের স্তর রয়েছে এবং আগুনের স্তরের নিচেও সমুদ্র অবস্থিত। (আবূ দাঊদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تَرْكَبِ الْبَحْرَ إِلَّا حَاجًّا أَوْ مُعْتَمِرًا أَوْ غَازِيًا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَإِنَّ تَحْتَ الْبَحْرِ نَارًا وَتَحْتَ النَّارِ بَحْرًا» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যা: সাধারণত সমুদ্র পথে ভ্রমণ করতে উল্লেখিত হাদীসটিতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে হজ্জ/হজ, ‘উমরাহ্ ও আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের উদ্দেশ্য ভ্রমণ করা যাবে বলে এ হাদীসে প্রমাণ রয়েছে। এখানেও আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করার গুরুত্ব ফুটে উঠেছে।
(لَا تَرْكَبِ الْبَحْرَ إِلَّا حَاجًّا أَوْ مُعْتَمِرًا أَوْ غَازِيًا فِىْ سَبِيلِ اللّٰهِ) তথা ‘‘হজ্জ/হজ, ‘উমরাহ্ ও আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছাড়া সমুদ্রপথে ভ্রমণ করো না’’ হাদীসের এ অংশটুকুতে তাদের কথার খন্ডন রয়েছে, যারা বলেন, হজ্জ/হজ ফরয হওয়ার ক্ষেত্রে সমুদ্রপথ পাড়ি দেয়া একটি সমস্যা বা বাধা। অর্থাৎ- সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে হলে হজ্জ/হজ ফরয হয় না। তবে সঠিক কথা হলো, বেশীরভাগ পথ যদি নিরাপদ হয়, তাহলে হজ্জ/হজ ফরয হয়ে যাবে। আর ব্যতিক্রম হলে হজ্জ/হজ করা ব্যক্তির ইচ্ছাধীন থাকবে। বিশিষ্ট ফাকীহ আবূ লায়স সহ অন্যান্যরাও এ মত পোষণ করেছেন।
ইমাম খত্ত্বাবী বলেনঃ ‘‘যে ব্যক্তি হজ্জ/হজ করার জন্য সমুদ্রপথ ছাড়া অন্য কোনো পথ পাবে না, তার জন্য সমুদ্র পথে সফর করে হজ্জ/হজ করাই ফরয। অন্যান্য ফাকীহগণও এ মত পোষণ করেছেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ) বলেনঃ ‘‘আমার কাছে এটা স্পষ্ট নয় যে, হজ্জ/হজ আবশ্যকীয়। কেননা মুহাদ্দিসগণ এ হাদীসের সানাদকে য‘ঈফ বলেছেন। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৪৮৬)
ইমাম খত্ত্বাবী বলেনঃ সমুদ্রের সার্বিক বিষয়াদি বর্ণনা করাই এ হাদীসের উদ্দেশ্য, কারণ তাতে সফরকারী ব্যক্তি খুব দ্রুতই বিপদ আপদের সম্মুখীন হতে পারে। কোনো সময়ই সে ধ্বংস থেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করতে পারে না। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৪৮৬)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৩৯-[৫২] উম্মু হারাম (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নৌযানে সফরকালীন মাথার চক্করের ফলে বমি (ইত্যাদি সমস্যা) হলে একজন শাহীদের ন্যায় সাওয়াবের অধিকারী হবে, আর সমুদ্রে ডুবে মৃত্যুবরণ করলে দু’জন শাহীদের সমপরিমাণ সাওয়াব অর্জিত হবে। (আবূ দাঊদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَن أم حرَام عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الْمَائِدُ فِي الْبَحْرِ الَّذِي يُصِيبُهُ الْقَيْءُ لَهُ أَجْرُ شَهِيدٍ وَالْغَرِيقُ لَهُ أَجْرُ شَهِيدَيْنِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: হাদীসের বাণী (الْمَائِدُ فِى الْبَحْرِ الَّذِىْ يُصِيبُهُ الْقَيْءُ) অর্থাৎ- যখন সমুদ্রের বাতাসে তার মাথা এপাশে ওপাশে নড়াচড়া করে ও নূয়ে পড়ে আর ঢেউয়ের তালে নৌযান এদিকে ওদিকে নড়াচড়া করে।
মুযহির বলেনঃ ‘‘যে ব্যক্তি সমুদ্রে আরোহণ করে আক্রান্ত হয়ে মারা যাবে সে একজন শাহীদের সমান প্রতিদান পাবে। কারণ তার সমুদ্রে সফরটা ছিল আল্লাহর আনুগত্যের ভিত্তিতে। যেমন ব্যক্তি সমুদ্র পথে সফর করে থাকে যুদ্ধের জন্য, হজে/হজ্জের জন্য, ‘ইলম অর্জনের জন্য এবং ব্যবসার জন্য- যদি তার আর কোনো রাস্তা না থাকে। কিন্তু যদি সে শুধু তার মাল বৃদ্ধির জন্য সফর করে তাহলে এ মর্যাদা পাবে না। তাছাড়া খাবারের জন্যও যদি সফর করে তবুও শাহীদের মর্যাদা পাবে’’।
আলোচ্য ব্যক্তি শাহীদের মর্যাদা লাভের কারণ দু’টি, একটি হলো তার আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের কারণে, আর অপরটি হলো ডুবে মারা যাওয়ার কারণে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৪০-[৫৩] আবূ মালিক আল আশ্’আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে লোক আল্লাহর পথে (জিহাদে) বের হয়ে যায়, এমতাবস্থায় সে যদি মৃত্যুবরণ করে অথবা তাকে হত্যা করা হয়, অথবা সে ঘোড়া বা উট থেকে পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণ করে, অথবা কোনো বিষধর জন্তু-জানোয়ার তাকে দংশন করে কিংবা নিজ বিছানায় মৃত্যুবরণ করে- সে শহীদ বলে সাব্যস্ত হবে এবং তার জন্য জান্নাত অপরিহার্য হয়ে যায়। (আবূ দাঊদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَن أبي مالكٍ الأشعريّ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَنْ فَصَلَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَمَاتَ أَوْ قُتِلَ أَوْ وَقَصَهُ فَرَسُهُ أَوْ بَعِيرُهُ أَوْ لَدْغَتْهُ هَامَّةٌ أَو مَاتَ فِي فِرَاشِهِ بِأَيِّ حَتْفٍ شَاءَ اللَّهُ فَإِنَّهُ شَهِيدٌ وَإِن لَهُ الْجنَّة» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: কোনো ব্যক্তি যদি গাজী তথা বিজয়ী বীর অবস্থায় যে কোনো ভাবে মারা যায়, তাহলে তার কিরূপ মর্যাদা ও প্রতিদান রয়েছে, আলোচ্য হাদীসে এ ব্যাপারেই আলোচনা করা হয়েছে।
(مَنْ فَصَلَ فِىْ سَبِيلِ اللّٰهِ) এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ঐ ব্যক্তি, যে তার নিজ বসবাসের গৃহ হতে বের হয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের উদ্দেশে রওয়ানা হলো। এ মর্মে আল্লাহ তা‘আলার বাণী : অর্থাৎ- ‘‘যখন ত্বালূত্ব সৈন্যবাহিনী নিয়ে বের হয়েছিল’’- (সূরা আল বাকারা ২ : ২৪৯)। এখানে (ফাসালা) শব্দের অর্থ বের হলো।
(قُتِلَ أَوْ وَقَصَه فَرَسُه) এ অংশের অর্থ সম্পর্কে ইমাম মুযহির বলেনঃ অর্থাৎ- ঘোড়া বা উট তাকে ফেলে দিল ও তার ঘাড় ভেঙ্গে দিল।
‘‘তার জন্য রয়েছে জান্নাত’’ অর্থাৎ- শহীদ ও সৎকর্মশীলদের সাথে সঙ্গী হয়ে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
ইমাম ত্বীবী বলেনঃ সে আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় লড়াই করার কারণে জান্নাত লাভ করবে। কারণ মহান আল্লাহ বলেন, ‘‘নিশ্চয় আল্লাহ মু’মিনদের নিকট থেকে তাদের প্রাণ ও তাদের ধন-সম্পদসমূহকে ক্রয় করে নিয়েছেন যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত’’- (সূরা আত্ তাওবাহ্ ৯ : ১১১)। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৪১-[৫৪] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মুজাহিদের (জিহাদ শেষে স্বীয়) ঘরে ফিরে আসাও জিহাদের সমতুল্য। (আবূ দাঊদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «قَفْلَةٌ كغزوة» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে জিহাদের ফযীলত বর্ণনা করতে গিয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, যুদ্ধের ময়দান থেকে ফিরে আসাটাও যেন আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের মতই।
قَفْلَةٌ (কফলাহ্) শব্দের অর্থ হলো (যুদ্ধের) সফর থেকে ফিরে আসা। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৪৮৪)
নিহায়াহ্ গ্রন্থের ভাষ্য অনুযায়ী যুদ্ধের ময়দান থেকে ফিরে আসাটাও যুদ্ধের অন্তর্ভুক্ত। এর কয়েকটি দিক রয়েছে।
১. মুজাহিদ ব্যক্তির জিহাদের ময়দান থেকে পরিবারের নিকট ফিরে আসাটাও জিহাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণ হলো, এতে তার অন্তর পরিতৃপ্ত হয়, তার ভিতরে শক্তি তৈরি হয় এবং তার পরিবারের নিকট ফিরে এলে তাদের জন্য হিফাযাতকারী হয়। এর দৃষ্টান্ত হলো একজন হাজী হজে/হজ্জের সফরে যাওয়া এবং সফর থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত আল্লাহর জিম্মায় থাকে।
২. শত্রুদের সাথে সাক্ষাৎ না করে এবং ময়দানে উপস্থিত না হয়েই মুজাহিদ ফিরে আসে। তার এরূপ পলায়নের কারণ দু’টি হতে পারে। এক. তাকে ময়দানে দেখে শত্রু ভয়ে পলায়ন না করে; বরং শত্রু তাদের দলের সাথে মিলিত হলে পরে সুযোগ বুঝে তাদের ওপর আক্রমণ করে। সে মূলত এ কৌশল অবলম্বনের জন্যই পলায়ন করে। দুই. নিজে পলায়ন করে নিরাপদ স্থানে আসার পর শত্রু তাকে তাড়িয়ে আসলে তার ওপর আক্রমণ করে ধ্বংস করে দেয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৪২-[৫৫] উক্ত রাবী [’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মুজাহিদ (জিহাদ থেকে) গাযী হয়ে ফিরে আসা পূর্ণ সাওয়াবের অধিকারী হবে। আর জিহাদের জন্য ধন-সম্পদ দানকারী জিহাদে শামিল হওয়া ও দান করা উভয়ের (দু’টি) সাওয়াবের অধিকারী হবে। (আবূ দাঊদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لِلْغَازِي أَجْرُهُ وَلِلْجَاعِلِ أَجْرُهُ وَأَجْرُ الْغَازِي» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসেও আল্লাহর রাস্তায় ইসলামের শত্রুদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার এবং যুদ্ধে সার্বিক সহায়তা প্রদানের ফযীলত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
(لِلْغَازِىْ أَجْرُه) এ বাক্যে বুঝানো হয়েছে যে, জিহাদের ময়দানে স্বশরীরে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীর জন্য রয়েছে নির্ধারিত সাওয়াব বা প্রতিদান।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী (وَلِلْجَاعِلِ أَجْرُه وَأَجْرُ الْغَازِ) অর্থাৎ- যে যোদ্ধাকে সাহায্য করবে তার জন্য রয়েছে তার নিজের সাওয়াব এবং যোদ্ধার সাওয়াব’’ এ বাক্যে ‘‘জা‘ইল’’ হচ্ছে ঐ ব্যক্তি, যে যোদ্ধাকে সহায়তা করে। তার রসদ তথা যুদ্ধের সরঞ্জামাদি প্রস্তুত করার জন্য অর্থ ব্যয় করে। যুদ্ধের যাবতীয় উপায়-উপকরণ প্রস্তুত করে দেয়। ঐ ব্যক্তি উক্ত যোদ্ধার সমপরিমাণ সাওয়াব লাভ করবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
ইবনুল মালিক বলেন, ‘‘জা‘ইল বলা হয় ঐ ব্যক্তিকে, যে যোদ্ধাকে যুদ্ধের সরঞ্জামাদি প্রস্তুত করে দেয়’’। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫২৩)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৪৩-[৫৬] আবূ আইয়ূব আল আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, শীঘ্রই তোমাদের হাতে বহু বড় বড় জনপদ বিজিত হবে এবং বহু সৈন্য-সামন্তের সমাবেশ ঘটবে। আর তোমাদের প্রতি বাধ্যতামূলক নির্দেশ থাকবে যে, তোমাদের প্রত্যেক গোষ্ঠী ও সম্প্রদায় হতে সাহায্যার্থে উক্ত সেনাবাহিনীতে লোক পাঠাতেই হবে। তোমাদের মাঝে এমনও ব্যক্তি হবে, এরূপ সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণে অনিচ্ছা প্রকাশ করতঃ স্বীয় বংশ ত্যাগ করে চলে যাবে। অতঃপর তারা এমন গোত্রের সন্ধানে থাকবে, যাদের নিকট নিজেকে অর্থের বিনিময়ে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হবার জন্য মনোবাঞ্ছনা পেশ করবে। এমতাবস্থায় তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, সাবধান! অর্থের বিনিময়ে এরূপ জিহাদকারী তার শরীরের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত ভাড়াটিয়া মজুরের যোগ্য মাত্র। (আবূ দাঊদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَن أبي أَيُّوب سَمِعَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «سَتُفْتَحُ عَلَيْكُمُ الْأَمْصَارُ وَسَتَكُونُ جُنُودٌ مُجَنَّدَةٌ يُقْطَعُ عَلَيْكُمْ فِيهَا بُعُوثٌ فَيَكْرَهُ الرَّجُلُ الْبَعْثَ فَيَتَخَلَّصُ مَنْ قَوْمِهِ ثُمَّ يَتَصَفَّحُ الْقَبَائِلَ يَعْرِضُ نَفْسَهُ عَلَيْهِمْ مَنْ أَكْفِيهِ بَعْثَ كَذَا أَلَا وَذَلِكَ الْأَجِيرُ إِلَى آخِرِ قَطْرَةٍ مِنْ دَمِهِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে জিহাদে বের হওয়ার গুরুত্ব আলোচনা করা হয়েছে। প্রত্যেকটি কওম তথা জনগোষ্ঠী থেকে নির্দিষ্ট কিছু লোক আবশ্যকীয়ভাবে জিহাদের জন্য বের হতে হবে।
بُعُوْثٌ এর অর্থ হলো সৈন্যদল। এখানে বুঝানো হয়েছে যে, তাদের জন্য প্রতিটি সম্প্রদায় থেকে জিহাদের জন্য সৈন্যদল প্রেরণ করা আবশ্যক হবে।
মুযহির (রহঃ) বলেনঃ অর্থাৎ- ইসলাম যখন চারপাশে ছড়িয়ে পড়বে তখন কাফিররা চতুর্দিক থেকে শত্রু হিসেবে আসে, তখন তাদেরকে প্রতিহত করার জন্য মুসলিম শাসক কর্তৃক নির্দেশের অনুসরণার্থে চতুর্দিক হতে মুসলিম সৈন্যদল তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য।
(فَيَكْرَهُ الرَّجُلُ الْبَعْثَ) এখানে বলা হয়েছে যে, একদল লোক কোনরূপ পারিশ্রমিক ছাড়া যুদ্ধে যেতে তখন অপছন্দ করবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
এ বাক্যের ব্যাখ্যা হলো, এক শ্রেণীর লোক যুদ্ধে যাওয়ার ভয়ে তার নিজ সম্প্রদায়ের লোকেদের থেকে পৃথক হয়ে অন্য কোনো সম্প্রদায়ের সাথে এ মর্মে চুক্তি করতে চায় যে, তারা তাকে কোনো সম্পদ দিবে আর সে তাদের সহায়তা করবে।
হাদীসের শেষাংশে বলা হয়েছে, (أَلَا وَذٰلِكَ الْأَجِيْرُ إِلٰى اٰخِرِ قَطْرَةٍ مِنْ دَمِه) এ কথার উদ্দেশ্য হলো, ঐ ব্যক্তি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত একজন শ্রমিক হিসেবেই পরিগণিত হবে; যোদ্ধা বা মুজাহিদ হিসেবে নয়। এ সম্পর্কে ইমাম খত্ত্বাবী বলেন, ‘‘আলোচ্য হাদীসের এ কথাটি থেকে প্রতীয়মান হয় যে, জিহাদে যাওয়ার জন্য কোনো পারিশ্রমিক বা পার্থিব কোনো প্রতিদানের চুক্তি করা জায়িয নেই; বরং হারাম’’। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫২২)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৪৪-[৫৭] ইয়া’লা ইবনু উমাইয়্যাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলের উদ্দেশে (তাবূকের) যুদ্ধে অংশগ্রহণের ঘোষণা দিলেন। তখন আমি বয়োবৃদ্ধ, আর আমার দেখাশোনা করার মতো একজন গোলামও ছিল না। সুতরাং আমি একজন খাদিম সংগ্রহ করলাম, যে আমার খিদমাতের জন্য যথেষ্ট হয়। অতঃপর আমি একজনকে পেয়ে গেলাম, যাকে তিন দীনার (স্বর্ণমুদ্রার) পারিশ্রমিকের বিনিময়ে নির্ধারণ করলাম। অতঃপর যখন গনীমাতের মাল আসলো তখন আমি তার একাংশ প্রদানের ইচ্ছা করলাম (কিন্তু দ্বিধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে) আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হয়ে এতদসম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তদুত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, এ যুদ্ধে অংশগ্রহণের ফলে ঐ ব্যক্তি দুনিয়া ও আখিরাতে নির্দিষ্ট (উল্লেখিত) দীনার ছাড়া আর কোনো কিছু প্রাপ্তির অধিকার রাখে না। (আবূ দাঊদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَن يَعْلى بن أُميَّةَ قَالَ: أَذِنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بالغزو وَأَن شَيْخٌ كَبِيرٌ لَيْسَ لِي خَادِمٌ فَالْتَمَسْتُ أَجِيرًا يَكْفِينِي فَوَجَدْتُ رَجُلًا سَمَّيْتُ لَهُ ثَلَاثَةَ دَنَانِيرَ فَلَمَّا حَضَرَتْ غَنِيمَةٌ أَرَدْتُ أَنْ أُجْرِيَ لَهُ سَهْمَهُ فَجِئْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَذَكَرَتْ لَهُ فَقَالَ: «مَا أَجِدُ لَهُ فِي غَزْوَتِهِ هَذِهِ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ إِلَّا دَنَانِيرَهُ الَّتِي تسمى» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: আলোচনাধীন হাদীসটিতে পূর্বোল্লিখিত হাদীসের বিষয়বস্তু আরো পরিষ্কারভাবে বর্ণিত হয়েছে। এ হাদীসের স্পষ্ট বক্তব্য হলো, যে ব্যক্তি পার্থিব কোনো প্রতিদানের জন্য বা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে জিহাদ করবে, সে তার এই জিহাদের কোনো প্রতিদান পরকালে পাবে না।
হাদীসের বাণী (شَيْخٌ كَبِيرٌ لَيْسَ لِىْ خَادِمٌ) এর ভাবার্থ হলো, আমি খুবই বার্ধক্যে উপনীত হয়েছি ফলে জিহাদে অংশগ্রহণ করার মতো ক্ষমতা নেই এবং আমার এমন কোনো খাদিমও নেই যে, আমাকে জিহাদের ময়দানে সাহায্য করবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
আর উপরোল্লিখিত কারণে উক্ত সাহাবী একজন শ্রমিক খোঁজ করল, যে টাকার বিনিময়ে তার পক্ষ থেকে ময়দানে যুদ্ধ করবে। পরবর্তীতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ ঘটনা বলার পর তিনি জানিয়ে দিলেন যে, ঐ শ্রমিক উল্লেখিত পার্থিক মজুরী বা পারিশ্রমিক ছাড়া পরকালীন কোনো প্রতিদান পাবে না।
শারহেস্ সুন্নাহ্ গ্রন্থে এ ব্যাপারে একটি মতভেদপূর্ণ মাসআলাহ্ উল্লেখ করা হয়েছে। সেটি হলো, কোনো শ্রমিক যুদ্ধের ময়দানে কাজ করলে তার কাজের বিনিময়ে এবং পশু সংরক্ষণ করার বিনিময়ে যুদ্ধলব্ধ গনীমাতের মাল থেকে কোনো অংশ পাবে কিনা?
ইমাম শাফি‘ঈ, ইসহক ও আওযা‘ঈসহ আরো কতক ‘উলামায়ে কিরামের মতে, সে যুদ্ধ করুক বা না করুক গনীমাতের মাল থেকে সে কোনো অংশ পাবে না। কারণ সে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে এ কাজ করেছে আর সে তো পারিশ্রমিক পেয়েই যাবে। ইমাম মালিক ও আহমাদ বিন হাম্বল বলেনঃ সরাসরি যুদ্ধ না করলেও মুজাহিদদের সাথে যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত থাকার কারণে সে গনীমাতের অংশ পাবে।
আবার কারো কারো মতে, গনীমাতের অংশ এবং পারিশ্রমিক উভয়টির যে কোনো একটি নেয়ার তার ইখতিয়ার থাকবে, সে যে কোনো একটি গ্রহণ করতে পারবে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫২৪)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৪৫-[৫৮] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন জনৈক ব্যক্তি এসে বলল, হে আল্লাহর রসূল! কোনো লোক যদি আল্লাহর পথে জিহাদে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে এবং দুনিয়ার ধন-সম্পদ (গনীমাত) প্রাপ্তির লোভও রাখে (তবে তার কি কোনো সাওয়াব মিলবে)? তদুত্তরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তার কোনো সাওয়াব নেই। (আবূ দাঊদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَجُلًا قَالَ: يَا رسولَ الله رجلٌ يُرِيدُ الْجِهَادَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَهُوَ يَبْتَغِي عَرَضاً من عرَضِ الدُّنْيَا فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا أجر لَهُ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসটিতেও পার্থিব ভোগ্য সামগ্রী বা সুনাম সুখ্যাতি অর্জনের উদ্দেশে জিহাদে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তির পরকালীন প্রতিদান নষ্ট হয়ে যাওয়ার সতর্কবাণী তুলে ধরা হয়েছে।
হাদীসের উক্তি (مِنْ عَرَضِ الدُّنْيَا) অর্থাৎ- সে দুনিয়ার সম্পদ থেকে পারিশ্রমিক বা বিনিময়ের আশা করে, অথবা পার্থিব সুনাম-সুখ্যাতি অর্জনের মাধ্যমে সমাজে প্রভাব বিস্তার করতে চায়। এ উদ্দেশে জিহাদ করলে সে কোনো পরকালীন প্রতিদান পাবে না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী: لَا أَجْرَ لَه তথা ‘‘তার জন্য কোনো প্রতিদান নেই’’ এ বাক্যের উদ্দেশ্য হলো, সে যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যুদ্ধ না করে তাহলে পরকালে তার জন্য কোনো পুরস্কার বা প্রতিদান নেই। আর যদি কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশে যুদ্ধ করে এবং গনীমাত লাভেরও আশা করে, তাহলে সে নিঃসন্দেহে এর প্রতিদান পরকালে পাবে। তবে যে ব্যক্তি গনীমাতের আশা না করে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে যুদ্ধ করবে তার তুলনায় ঐ ব্যক্তির প্রতিদান বা সাওয়াব কম হবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ অর্থাৎ- ‘‘তোমাদের মধ্যে কেউ দুনিয়া কামনা করে (গনীমাতের আশা করে) এবং কেউ শুধু পরকাল কামনা করে’’- (সূরা আ-লি ‘ইমরান ৩ : ১৫২)। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৪৬-[৫৯] মু’আয ইবনু জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জিহাদ দু’ প্রকারের হয়ে থাকে। যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের প্রত্যাশায় জিহাদ করে, ইমামের (নেতার) আনুগত্য প্রদর্শনের সাথে সাথে স্বীয় ধন-সম্পদ খরচ করে, সহচরদের সাথে সদাচরণ করে এবং অনিয়ম-বিশৃঙ্খলা হতে দূরে থেকে জিহাদে শরীক হয়- তাহলে ঐ ব্যক্তির নিদ্রা-জাগরণ সবই সাওয়াবে পরিণত হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি অহংকার, বীরত্ব প্রকাশ ও সুনাম-সুখ্যাতি লাভের জন্য জিহাদ করে, আর ইমামের আনুগত্যের খিলাফ করে এবং জমিনে অনিয়ম-অরাজকতা সৃষ্টি করে, সে জিহাদ থেকে ন্যূনতম সাওয়াব নিয়েও ফিরবে না। (মালিক, আবূ দাঊদ, নাসায়ী)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَنْ مُعَاذٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْغَزْوُ غَزْوَانِ فَأَمَّا مَنِ ابْتَغَى وَجْهَ اللَّهِ وَأَطَاعَ الْإِمَامَ وَأَنْفَقَ الْكَرِيمَةَ وَيَاسَرَ الشَّرِيكَ واجتنبَ الْفساد فَإِن نَومه ونهبه أَجْرٌ كُلُّهُ. وَأَمَّا مَنْ غَزَا فَخْرًا وَرِيَاءً وَسُمْعَةً وَعَصَى الْإِمَامَ وَأَفْسَدَ فِي الْأَرْضِ فَإِنَّهُ لَمْ يَرْجِعْ بِالْكَفَافِ» . رَوَاهُ مَالِكٌ وَأَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে অংশগ্রহণকারীদের অবস্থার ভিন্নতা বর্ণনা করা হয়েছে। তাছাড়া এখানে লোক দেখানোর জন্য বা পার্থিব কোনো মর্যাদা লাভের উদ্দেশে যুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে এবং এর কঠিন পরিণতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
হাদীসের প্রথমাংশে বর্ণিত উক্তি (اَلْغَزْوُ غَزْوَانِ) তথা ‘‘যুদ্ধ দুই প্রকারের’’, এ বাক্যের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কাযী ইয়ায বলেনঃ ‘‘এখানে যুদ্ধের দু’টি প্রকারের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে: একটি হচ্ছে ফরয তথা আবশ্যকীয় এবং অপরটি নফল তথা ঐচ্ছিক। কিন্তু পরবর্তী বাক্যে এ আলোচনা থেকে সরে গিয়ে যোদ্ধা বা মুজাহিদদের অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে’’। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
(وَأَنْفَقَ الْكَرِيْمَةَ) তথা ‘‘সে উত্তম বস্তু আল্লাহর রাস্তায় খরচ করেছে’’ এখানে ‘‘কারীমাহ্’’ বলতে প্রতিটি বস্তুর সর্বোৎকৃষ্ট অংশকে বুঝানো হয়েছে। মুল্লা ‘আলী কারী বলেনঃ এখানে ঐ ব্যক্তি উদ্দেশ্য যে তার সম্পদের মধ্য হতে উৎকৃষ্ট অংশ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে এবং নিজে স্বশরীরে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।
(وَاجْتَنَبَ الْفَسَادَ) এখানে উদ্দেশ্য হলো, সে যুদ্ধের ময়দানে হত্যা করা ও কোনো কিছু বিনষ্ট করার ক্ষেত্রে শারী‘আতে বর্ণিত সীমা অতিক্রম করে না। আর এমন কোনো কাজ করে না, যার কারণে দাঙ্গা-হাঙ্গামা বা ফাসাদ সৃষ্টি হবে। কারণ মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ অর্থাৎ- ‘‘তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না’’। (সূরা আল বাকারা ২ : ৬০)
এর ভাবার্থ হলো, কেউ যদি উপরোল্লিখিত ত্রুটিগুলো থেকে যুদ্ধের ময়দানে মুক্ত থাকতে না পারে, তাহলে সে সেখান থেকে সমান সমান তথা নেকী অর্জন করেনি এবং পাপও হয়নি এমন অবস্থায়ও ফিরে আসতে পারবে না। বরং সে জিহাদের কোনো প্রতিদান তো পাবেই না, উল্টো গুনাহ উপার্জন করে ফিরবে। কারণ কোনো ক্ষেত্রে যদি আনুগত্য পুরোপুরি করা না যায়, তাহলে সেটা অবাধ্যতায় পরিণত হয়। আর আল্লাহর অবাধ্য ব্যক্তি নিঃসন্দেহে পাপী। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫১২)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৪৭-[৬০] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল! আমাকে জিহাদ সম্পর্কে অবহিত করুন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, হে ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আমর! তুমি যদি ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের প্রত্যাশায় জিহাদ কর, তবে আল্লাহ তা’আলা তোমাকে কিয়ামতের দিন ধৈর্যশীল ও সাওয়াব অর্জনকারীরূপে উঠাবেন। পক্ষান্তরে তুমি যদি সুনাম-সুখ্যাতি ও অহংকারবশে জিহাদ কর, তবে আল্লাহ তা’আলা তোমাকে লোক দেখানো ও অহংকারকারীরূপে চিহ্নিত করে উঠাবেন। হে ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আমর! তুমি উত্তমরূপে জেনে নাও, তুমি যে অভিপ্রায় ও উদ্দেশে জিহাদ কর অথবা নিহত হও; আল্লাহ তা’আলা তোমাকে ঐরূপে উত্থিত করবেন। (আবূ দাঊদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَن عبد الله بن عَمْرو أَنَّهُ قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَخْبِرْنِي عَنِ الْجِهَادِ فَقَالَ: «يَا عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عَمْرٍو إِنْ قَاتَلْتَ صَابِرًا مُحْتَسِبًا بَعَثَكَ اللَّهُ صَابِرًا مُحْتَسِبًا وَإِنْ قَاتَلْتَ مُرَائِيًا مُكَاثِرًا بَعَثَكَ اللَّهُ مُرَائِيًا مُكَاثِرًا يَا عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عَمْرٍو عَلَى أَيِّ حَالٍ قَاتَلْتَ أَوْ قُتِلْتَ بَعَثَكَ اللَّهُ عَلَى تِلْكَ الْحَالِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যা: এ হাদীসেও পূর্বোল্লিখিত হাদীসের ধারাবাহিকতায় মুজাহিদদের উদ্দেশ্যগত পার্থক্যের কারণে তাদের প্রতিদানের ভিন্নতার কথা আলোচনা করা হয়েছে।
হাদীসে বর্ণিত দু’টি শব্দ (صَابِرًا مُحْتَسِبًا) বলতে বুঝানো হয়েছে, মুজাহিদ যেন তার প্রতিদান আল্লাহর নিকট থেকেই কামনা করে। মুল্লা ‘আলী কারী বলেনঃ এখানো উদ্দেশ্য হলো, ‘‘তুমি যুদ্ধ করবে কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য’’। এ শব্দ দু’টি অবস্থাগত দিক থেকে সমার্থবোধক। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫১৬)
(وَإِنْ قَاتَلْتَ مُرَائِيًا مُكَاثِرًا) বাক্যে مُرَائِيًا বলতে লোক দেখানোর জন্য জিহাদ করা এবং مكاثرا বলতে সম্পদের লোভে যুদ্ধ করাকে বুঝানো হয়েছে। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ ‘তাকাসুর’ বলা হয় সম্পদের আধিক্যের প্রতিযোগিতা করা এবং তা নিয়ে গর্ব-অহংকার করাকে। আর ‘তাকাসুর’ কখনো সম্পদের মাধ্যমে করা হয়, আবার কখনো সন্তান-সন্ততির মাধ্যমেও করা হয়। যেমন কুরআনের বাণী : অর্থাৎ- ‘‘আর ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে আধিক্যের প্রতিযোগিতা মাত্র’’। (সূরা আল হাদীদ ৫৭ : ২০)
সুতরাং কেউ জিহাদ করে গনীমাতের মাধ্যমে অনেক সম্পদের মালিক হয়ে তা নিয়ে মানুষের মাঝে গর্ব করার জন্য এবং প্রভাব বিস্তার করার জন্য; আবার অনেকেই জিহাদ করে আল্লাহর তাওহীদের কালিমাহ্ ও তাঁর দীনকে জমিনে সুউচ্চ ও সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৪৮-[৬১] ’উকবা ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি যদি কোনো লোককে কোনো দায়িত্বে নিযুক্ত করি আর সে উক্ত দায়িত্ব পালনে গাফলতি (অবহেলা) করে, তবে কি তোমরা তাকে পদচ্যুত করে তার স্থলে এমন কোনো লোককে নিযুক্ত করতে সক্ষম, যে আমার নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করবে। (আবূ দাঊদ)[1]
আর ফাযালাহ্-এর হাদীস ’সে ব্যক্তিই প্রকৃত মুজাহিদ যে তার নাফসের সাথে জিহাদ করে’ কিতাবুল ঈমানের মধ্যে বর্ণিত আছে।
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
وَعَن عقبَة بن مَالك عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «أعجزتم إِذا بعثت رجلا فَم يَمْضِ لِأَمْرِي أَنْ تَجْعَلُوا مَكَانَهُ مَنْ يَمْضِي لِأَمْرِي؟» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
وَذَكَرَ حَدِيثَ فَضَالَةَ: «وَالْمُجَاهِدُ مَنْ جَاهَدَ نَفْسَهُ» . فِي «كِتَابِ الْإِيمَانِ»
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম উম্মাহর উদ্দেশে এ কথা বলেন যে, যদি আমার প্রেরিত আমীর তোমাদের কাছে গিয়ে নিজ দায়িত্ব তথা আমার দেয়া ফায়সালা বাস্তবায়ন না করে তাহলে তোমরা তাকে অপসারণ করো এবং তার জায়গায় এমন কাউকে আমীর হিসেবে নিযুক্ত কর, যে এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারবে।
(أَنْ تَجْعَلُوْا مَكَانَه مَنْ يَمْضِىْ لِأَمْرِىْ؟) এর ব্যাখ্যায় ‘আল্লামা ত্বীবী বলেনঃ এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলছেন, ‘‘আমি যদি কোনো আমীর নিযুক্ত করে তোমাদের নিকট প্রেরণ করি, আর সে যদি তোমাদের নিকট গিয়ে নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করে, তাহলে তোমরা তাকে অপসারণ করে তার জায়গায় অন্যকে নিযুক্ত কর। অথবা, আমি যদি কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য তোমাদের নিকট কাউকে প্রেরণ করি, আর সে যদি ঐ সিদ্ধান্তের অবাধ্য হয়, তাহলে তোমরা তাকে অপসারণ কর।
ইবনুল মালিক বলেনঃ এর অর্থ হলো, ‘‘তোমরা তাকে অপসারণ করে তার স্থলে এমন কাউকে নিযুক্ত কর, যে আমার আদেশের প্রতি বশ্যতা স্বীকার করবে’’। সুতরাং যদি কোনো আমীর তার প্রজাদের ওপর জুলুম-অত্যাচার করে এবং তাদের অধিকার সংরক্ষণ না করে, তাহলে উক্ত আমীরকে তারা অপসারণ করবে এবং তার স্থলে অন্যকে বসাবে।
কারো মতে, যদি তাকে অপসারণ করতে গেলে ফিতনা বা রক্তপাতের আশংকা থাকে এবং যদি ঐ নেতা শুধুমাত্র সম্পদের ক্ষেত্রে যালিম হয়, তাহলে তাকে অপসারণ করা বৈধ হবে না। আর যদি সে অত্যাচারী নেতা অধিকহারে রক্তপাত ঘটায় এবং তাকে হত্যা করলে রক্তপাত কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে তাকে এবং তার সহযোগীদেরকে জাতীয় স্বার্থে হত্যা করাও বৈধ। আর যদি উক্ত নেতাকে অপসারণ করলে রক্তপাত বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তবে তাকে হত্যা না করে অপসারণ করতে হবে। সেক্ষেত্রে তাকে হত্যা করা বৈধ হবে না। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৪৯-[৬২] আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে এক যুদ্ধাভিযানে বের হই, তখন জনৈক ব্যক্তি এক সংকীর্ণ পথ অতিক্রমকালে সেখানে এক পানির কূপ ও টাটকা শাক-সবজি দেখতে পেয়ে লোকটির মনে একান্ত আকাঙ্ক্ষা হলো যে, যদি আমি দুনিয়ার মোহ-মায়া জলাঞ্জলি দিয়ে তথায় অবস্থান করতে পারতাম, তা কতই না উত্তম হতো! তাই এতদসম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট অনুমতি চাইলে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, শোন! আমি ইয়াহূদী বা খৃষ্টান ধর্মের ন্যায় (বৈরাগ্যবাদের বিধান নিয়ে) আবির্ভূত হইনি; বরং আমাকে সহজ সরল দীন (একত্ববাদের বিধান) দিয়ে পাঠানো হয়েছে। সেই মহান আল্লাহর শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! আল্লাহর পথে একটি সকাল বা একটি সন্ধ্যা নিজেকে নিয়োজিত রাখা দুনিয়া ও তার সমদুয় ধন-সম্পদ হতে উত্তম। আর নিশ্চয় যুদ্ধের মাঠে কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ষাট বছর সালাত আদায়ের চেয়ে উত্তম। (আহমাদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّانِىْ
عَن أبي أُمامةَ قَالَ: خَرَجْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي سَرِيَّةٍ فَمَرَّ رَجُلٌ بِغَارٍ فِيهِ شَيْءٌ مِنْ مَاءٍ وَبَقْلٍ فَحَدَّثَ نَفْسَهُ بِأَنْ يُقِيمَ فِيهِ وَيَتَخَلَّى مِنَ الدُّنْيَا فَاسْتَأْذَنَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي ذَلِكَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنِّي لَمْ أُبْعَثْ بِالْيَهُودِيَّةِ وَلَا بِالنَّصْرَانِيَّةِ وَلَكَنِّي بُعِثْتُ بِالْحَنِيفِيَّةِ السَّمْحَةِ وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَغَدْوَةٌ أَوْ رَوْحَةٌ فِي سَبِيلِ اللَّهِ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا وَلَمَقَامُ أَحَدِكُمْ فِي الصَّفِّ خَيْرٌ مِنْ صَلَاتِهِ سِتِّينَ سَنَةً» . رَوَاهُ أَحْمد
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের ফযীলত বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন যে, এক সকাল এবং এক সন্ধ্যা আল্লাহর জিহাদের কাজে ব্যয় করা এ পৃথিবী এবং তার মাঝে যা কিছু আছে সব কিছু অপেক্ষা উত্তম।
হাদীসে বর্ণিত শব্দ سَرِيَّةٍ (সারিয়্যাহ্) বলতে এমন সৈন্যদলকে বুঝায়, যাদের সংখ্যা সর্বোচ্চ ৪০০ জন পর্যন্ত পৌঁছে। অন্য বর্ণনা মতে, নয়জন বা তার চেয়ে কম সংখ্যক সৈন্য হলে তাকে সারিয়্যাহ্ বলে, আর তিন থেকে চারজন হলে তাকে طليعة (ত্বলী‘আহ্) বলা হয়।
আবার অন্য একটি বর্ণনা সূত্রে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনায়স -কে একাই সারিয়্যাহ্ হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন, যা এই মতের বিরোধী।
গয্ওয়া ও সারিয়্যাহ্ এর পার্থক্য আলোচনা করতে গিয়ে রওযাতুল আহবার নামক গ্রন্থে সাইয়্যিদ জামালুদ্দীন (রহঃ) বলেনঃ মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় غزوة (গয্ওয়া) বলা হয় ঐ যুদ্ধকে, যাতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বশরীরে উপস্থিত ছিলেন, আর যেটিতে স্বশরীরে উপস্থিত ছিলেন না তাকে سرية (সারিয়্যাহ্) ও بعث (বি‘স) বলে।
তবে উপরোল্লিখিত হাদীসে এ মতেরও বিরোধিতা লক্ষ্য করা যায়, যেখানে আবূ উমামাহ্ বলেন, ‘‘আমরা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সারিয়াতে বের হয়েছিলাম’’। মোটকথা ছোট যুদ্ধদলকে আক্ষরিক অর্থে সারিয়্যাহ্ বলা হয়, আর বড় সৈন্যদল হলে তাকেই গয্ওয়া বলা হয়।
(وَلَكَنِّىْ بُعِثْتُ بِالْحَنِيفِيَّةِ السَّمْحَةِ) এ বাক্যে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলছেন যে, ‘‘আমি প্রেরিত হয়েছি একনিষ্ঠ সরল ও সঠিক পথ নিয়ে’’। এখানে الحنيفية (হানিফিয়্যাহ্) বলতে বুঝানো হয়েছে বক্রতামুক্ত সহজ সরল তাওহীদের পথকে। আর السمحة (আস্ সাম্হাহ্) বলতে বুঝায় এমন সহজ ও সরল পথকে যাতে কোনো সংকীর্ণতা বা কাঠিন্যতা নেই। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৫০-[৬৩] ’উবাদাহ্ ইবনুস্ সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে উট বাঁধার রশি প্রাপ্তির আশায় জিহাদ করে, সে তার নিয়্যাত অনুযায়ী তা-ই পাবে। (নাসায়ী)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ غَزَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَمْ يَنْوِ إِلَّا عِقَالًا فَلَهُ مَا نَوَى» . رَوَاهُ النَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসটি মানুষের নিয়্যাত অনুসারে কর্মফল পাওয়ার একটি দলীল। কেউ যদি কেবলমাত্র গনীমাতের সম্পদ অর্জনের জন্য জিহাদ করে তাহলে সে কেবল ঐ গনীমাতের সম্পদই পাবে- পরকালে তার জন্য কোনো প্রতিদান নেই।
হাদীসের বাণী (وَلَمْ يَنْوِ إِلَّا عِقَالًا) তথা ‘‘সে কেবলমাত্র একটি রশি পাওয়ার নিয়্যাত করেছে’’ এর উদ্দেশ্য হলো সে দুনিয়াবী কোনো তুচ্ছ প্রতিদানের আশা করেছে অর্থাৎ- শুধু গনীমাতের মাল পাওয়ার ইচ্ছা করেছে। এ বাক্যে عقال (‘ইকাল) অর্থ হলো এমন একটি রশি, যা উটকে পলায়ন করা থেকে বিরত রাখার জন্য তার হাঁতে বেঁধে রাখার কাজে ব্যবহার করা হয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
(فَلَه مَا نَوٰى) বলতে বুঝানো হয়েছে, সে কোনো পরকালীন প্রতিদান পাবে না। এর ব্যাখ্যায় ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ এ কথা বলার উদ্দেশ্য হলো মুজাহিদ ব্যক্তি যেন কোনরূপ গনীমাত লাভের প্রত্যাশা পরিত্যাগ করে কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে যুদ্ধ করে। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ «وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوٰى» অর্থাৎ- ‘‘প্রত্যেকেই স্বীয় নিয়্যাতানুসারেই কর্মফল পাবে’’- (সহীহুল বুখারী হাঃ ১)। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৫১-[৬৪] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহকে রব্ (প্রতিপালক) হিসেবে, ইসলামকে দীন (জীবন বিধান) হিসেবে এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে রসূল (উত্তম আদর্শ) হিসেবে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করে নিয়েছে, তার জন্য জান্নাত অপরিহার্য হয়ে গেছে। এটা শুনে আবূ সা’ঈদ অত্যন্ত আনন্দ আতিশয্যে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! এ মাহাত্ম্যপূর্ণ কথাগুলো পুনরায় বলুন! তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পুনরায় তা বললেন। অতঃপর আরো বললেন, আরও একটি উত্তম কাজ রয়েছে যা আল্লাহ তা’আলা বান্দাকে জান্নাতে একশত গুণের উচ্চাসনে মর্যাদা দিবেন, প্রতিটি মর্যাদা বা স্তরের মাঝে দূরত্ব হলো আকাশমন্ডলী ও দুনিয়ার মধ্যকার সমপরিমাণ। তিনি [আবূ সা’ঈদ (রাঃ)] জিজ্ঞেস করলেন, সেই (দ্বিতীয়) কাজটি কী, হে আল্লাহর রসূল? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ আল্লাহর পথে জিহাদ, আল্লাহর পথে জিহাদ, আল্লাহর পথে জিহাদ। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسلم قَالَ: «من رَضِي بِاللَّه رَبًّا وَالْإِسْلَام دِينًا وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ» . فَعَجِبَ لَهَا أَبُو سَعِيدٍ فَقَالَ: أَعِدْهَا عَلَيَّ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَأَعَادَهَا عَلَيْهِ ثُمَّ قَالَ: «وَأُخْرَى يَرْفَعُ اللَّهُ بِهَا الْعَبْدَ مِائَةَ دَرَجَةٍ فِي الْجَنَّةِ مَا بَيْنَ كُلِّ دَرَجَتَيْنِ كَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ» . قَالَ: وَمَا هِيَ يَا رَسُولَ الله؟ قَالَ: «الْجِهَاد فِي سَبِيل الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ الله» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: আলোচনাধীন হাদীসটির ভাষ্য অনুযায়ী আল্লাহকে রব্ হিসেবে, ইসলামকে জীবনবিধান হিসেবে এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সত্যিকারার্থে রসূল হিসেবে মেনে নেয়ার প্রতিদান উল্লেখ করা হয়েছে, আর তা হলো ঐ ব্যক্তির জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে। উক্ত হাদীসের শেষাংশে জিহাদের ফযীলত সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়েছে।
হাদীসের বক্তব্য (مَنْ رَضِىَ بِاللّٰهِ رَبًّا) তথা ‘‘যে আল্লাহকে রব্ হিসেবে মেনে নিবে’’ এখানে উদ্দেশ্য হলো ঐ ব্যক্তি আল্লাহর সকল ফায়সালার উপর সন্তুষ্ট থাকবে এবং ধৈর্যধারণ করবে। অর্থাৎ- আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত তাকদীরের ভালো-মন্দ মেনে নিবে এবং কল্যাণ-অকল্যাণ, সুসময়-দুঃসময় সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে।
(وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ) অর্থ হলো ‘‘তার জন্য জান্নাত অবধারিত বা সুনিশ্চিত হয়ে যাবে’’। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
(وَأُخْرٰى يَرْفَعُ اللّٰهُ بِهَا الْعَبْدَ مِائَةَ دَرَجَةٍ فِى الْجَنَّةِ) তথা ‘‘অন্য একটি কাজ রয়েছে যা দ্বারা আল্লাহ জান্নাতে বান্দার একশত স্তর বা মর্যাদা দিবেন’’ এ বাক্যের উদ্দেশ্য বর্ণনায় কাযী ইয়ায বলেনঃ এ বাক্যটির বাহ্যিক অর্থ উদ্দেশ্য হওয়া সম্ভবপর। এখানে درجة বলতে এমন স্তরসমূহকে বুঝানো হয়েছে যেগুলো একটি অপরটির চেয়ে অনেক উঁচু। আবার এ অর্থও নেয়া যেতে পারে যে, উঁচু মর্যাদা বলতে জান্নাতের নি‘আমাত ও অনুগ্রহের আধিক্য বুঝানো হয়েছে। তাদেরকে এই মর্যাদা দেয়া হবে তাদের কৎকর্ম ও সম্মানের কারণে এবং প্রত্যেকটি মর্যাদা বা স্তরের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি করা হবে আসমান ও জমিনের দূরতেবর মতো। (শারহে মুসলিম ১৩শ খন্ড, হাঃ ১৮৮৪)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৫২-[৬৫] আবূ মূসা আল আশ্’আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জান্নাতের দরজাসমূহ তরবারির ছায়ায় ঘেরা। এটা শুনে জীর্ণশীর্ণ জনৈক ব্যক্তি তাকে (আবূ মূসা আল আশ্’আরী -কে) জিজ্ঞেস করল, আপনি কি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এরূপ বলতে শুনেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। অতঃপর লোকটি উঠে স্বীয় সঙ্গীদের নিকট গিয়ে তাদেরকে সালাম করলেন এবং নিজের তরবারির খাপ খুলে ভেঙ্গে ফেলে দিয়ে উন্মু্ক্ত তরবারি নিয়ে শত্রুর মুকাবিলায় অগ্রসর হলেন এবং অবশেষে বহু শত্রু হত্যা করে নিজে শাহাদাত লাভ করলেন। (মুসলিম)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ أَبِي مُوسَى قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ أَبْوَابَ الْجَنَّةِ تَحْتَ ظِلَالِ السُّيُوفِ» فَقَامَ رَجُلٌ رَثُّ الْهَيْئَةِ فَقَالَ: يَا أَبَا مُوسَى أَنْتَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ هَذَا؟ قَالَ: نَعَمْ فَرَجَعَ إِلَى أَصْحَابِهِ فَقَالَ: أَقْرَأُ عَلَيْكُمُ السَّلَامَ ثُمَّ كَسَرَ جَفْنَ سَيْفِهِ فَأَلْقَاهُ ثُمَّ مَشَى بِسَيْفِهِ إِلَى الْعَدُوِّ فَضَرَبَ بِهِ حَتَّى قُتِلَ. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: পূর্বোল্লিখিত হাদীসটিতে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ বা যুদ্ধ করাকে জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ (إِنَّ أَبْوَابَ الْجَنَّةِ تَحْتَ ظِلَالِ السُّيُوفِ) তথা ‘‘নিশ্চয় জান্নাতের দরজাসমূহ তারবারির ছায়ার নীচে অবস্থিত’’, ‘উলামায়ে কিরাম এ বাক্যের ভাবার্থ নির্ণয় করে বলেন, নিশ্চয় জান্নাত লাভের সঠিক পথ বা উপায় হলো আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে স্বশরীরে উপস্থিত হওয়া। (শারহে মুসলিম ১৩শ খন্ড, হাঃ ১৯০২)
(فَقَامَ رَجُلٌ رَثُّ الْهَيْئَةِ) তথা ‘‘অতঃপর একজন লোক জীর্ণশীর্ণ অবস্থায় দাঁড়াল’’, অর্থাৎ ঐ লোকটিকে অত্যন্ত দরিদ্র মনে হচ্ছিল এবং তার মাথার চুলগুলো এলোমেলো ছিল। ফলে তাকে খুবই হুমড়াচোমড়া মনে হচ্ছিল। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৫৩-[৬৬] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণের উদ্দেশে বললেন, তোমাদের ভাইয়েরা যখন উহুদের যুদ্ধে শহীদ হয়, তখন আল্লাহ তা’আলা তাদের রূহগুলোকে (জান্নাতের) সবুজ পাখির অভ্যন্তরে স্থাপন করেন। আর এ পাখিগুলো জান্নাতের নহরসমূহে বিচরণ করে, জান্নাতের ফল-ফলাদি খায় এবং ’আরশের ছায়ায় স্বর্ণের ফানুসে ঝুলন্তরূপে অবস্থান করে। অতঃপর তারা যখন এরূপ সুমিষ্ট পানীয়, সুস্বাদু খাদ্য ও আরামদায়ক মনোমুগ্ধকর বিশ্রামাগার লাভ করবে, তখন তারা স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে বলে উঠবে, এমন কে আছে যে আমাদেরকে ভাইদের নিকট সুসংবাদ পৌঁছিয়ে দেবে, আমরা যে জান্নাতে জীবিত অবস্থান করছি তারা যাতে জান্নাত লাভে অবহেলিত না হয় এবং জিহাদের মাঠে পৃষ্ঠপ্রদর্শন না করে। এমতাবস্থায় তাদের এ আকাঙ্ক্ষার উত্তরে আল্লাহ তা’আলা বলেন, আমি তোমাদের পক্ষ হতে তাদের নিকট সুসংবাদ পৌঁছিয়ে দেব। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা এ আয়াত নাযিল করেন, ’’যারা আল্লাহর পথে শহীদ হয়েছে তাদেরকে তোমরা মৃত মনে করো না; বরং তারা তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে রিযকপ্রাপ্ত হয়’’- (সূরা আ-লি ’ইমরান ৩ : ১৬৯)। (আবূ দাঊদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسلم قَالَ لِأَصْحَابِهِ: إِنَّهُ لَمَّا أُصِيبَ إِخْوَانُكُمْ يَوْمَ أُحُدٍ جَعَلَ اللَّهُ أَرْوَاحَهُمْ فِي جَوْفِ طَيْرٍ خُضْرٍ تَرِدُ أَنْهَارَ الْجَنَّةِ تَأْكُلُ مِنْ ثِمَارِهَا وَتَأْوِي إِلَى قَنَادِيلَ مِنْ ذَهَبٍ مُعَلَّقَةٍ فِي ظلِّ العرْشِ فلمَّا وجَدوا طِيبَ مأكَلِهِم ومشرَبِهمْ ومَقِيلهِم قَالُوا: مَنْ يُبلِّغُ إِخْوانَنا عنَا أَنَّنا أَحْيَاءٌ فِي الْجَنَّةِ لِئَلَّا يَزْهَدُوا فِي الْجَنَّةِ وَلَا يَنكُلوا عندَ الحربِ فَقَالَ اللَّهُ تَعَالَى: أَنا أبلغكم عَنْكُمْ فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى: (وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ)
إِلَى أخر الْآيَات)
رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে উহুদ যুদ্ধে শহীদদের আত্মার অবস্থা বর্ণনা করে সকল মুসলিমদের জিহাদের প্রতি এবং শাহাদাতের কামনা করার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে।
(إِنَّه لَمَّا أُصِيْبَ إِخْوَانُكُمْ يَوْمَ أُحُدٍ) এ বাক্যে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতে চেয়েছেন যে, যখন তোমাদের মুসলিম ভাইয়েরা উহুদের যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেছিল। এ বাক্যের অর্থ হলো, তারা যখন শাহাদাতের সৌভাগ্য লাভ করেছিল। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫১৭)
(جَعَلَ اللّٰهُ أَرْوَاحَهُمْ فِىْ جَوْفِ طَيْرٍ خُضْرٍ) অর্থাৎ- সবুজ রঙের পাখীর পেটের ভিতর তাদের অন্তরসমূহ স্থাপন করা হয়েছে, ফলে তা সজিবতা ফিরে পেয়েছে এবং জান্নাতে এদিক ওদিক ঘুরাফেরার সক্ষমতা লাভ করেছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
(فَلَمَّا وَجَدُوْا طِيْبَ مأكَلِهِمْ وَمَشْرَبِهِمْ ومَقِيْلِهِمْ) তথা যখন তারা তাদের উত্তম পানাহারের ব্যবস্থা এবং উৎকৃষ্ট আবাসস্থল পেয়ে গেল তখন তারা দুনিয়ায় জীবিত ভাইদের কাছে এ সংবাদ পাঠানোর আকাঙ্ক্ষা করল যে, তারা জান্নাতে জীবিত অবস্থায় রয়েছে। যাতে করে অন্যরা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে উৎসাহিত হয়। ‘মাক্বীল’ শব্দের অর্থ হলো ঐ জায়গা যেখানে দ্বিপ্রহরের সময় বিশ্রাম নেয়া হয়।
(وَلَا يَنْكُلُوْا عِنْدَ الْحَرْبِ) এর অর্থ হলো, তারা যেন আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ বা জিহাদ করার ক্ষেত্রে কাপুরুষতা প্রদর্শন না করে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫১৭)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৫৪-[৬৭] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দুনিয়ার মু’মিনগণ তিন ভাগে বিভক্ত- (১) যারা আল্লাহ ও তার রসূলের ওপর দৃঢ়চিত্তে ঈমান আনে, অতঃপর কোনো সন্দেহ-সংশয় পোষণ করে না এবং নিজেদের জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে। (২) যাদের হাত থেকে প্রতিটি মুসলিমের স্বীয় জান-মালের নিরাপত্তা লাভ করে। (৩) দুনিয়ার মোহ ও লালসা যার অন্তরে জাগ্রত হয়, অতঃপর আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের প্রত্যাশায় তা পরিহার করে। (আহমাদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيُّ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: الْمُؤْمِنُونَ فِي الدُّنْيَا عَلَى ثَلَاثَةِ أَجْزَاءٍ: الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالَّذِي يأمنه النَّاس على النَّاسُ عَلَى أَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ ثُمَّ الَّذِي إِذَا أَشْرَفَ عَلَى طَمَعٍ تَرَكَهُ لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ . رَوَاهُ أَحْمد
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে মু’মিনদেরকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে এবং প্রত্যেক প্রকারের মু’মিনদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন গুণাবলী আলোচনা করা হয়েছে। তাদের প্রথম সারির মু’মিন হলো যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি ঈমান আনার পাশাপাশি নিজেদের জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করে।
(اَلْمُؤْمِنُونَ فِى الدُّنْيَا عَلٰى ثَلَاثَةِ أَجْزَاءٍ) এ বাক্যের ব্যাখ্যায় ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ أجزاء (আজ্যা) বলা হয় নির্দিষ্ট কোনো বস্তুর বিভিন্ন অংশ বা ভাগকে। তবে বন্ধুত্ব ও সহানুভূতি বহিঃপ্রকাশের দিক থেকে সকল মু’মিন একটি মাত্র আত্মার মতো। যেন সকলে মিলে একটি সিসেঢালা প্রাচীর।
(الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا بِاللّٰهِ وَرَسُوْلِه ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوْا) তথা ‘‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি ঈমান এনেছে এবং কোনরূপ সন্দেহ পোষণ করেনি’’ এ বাক্যে ‘‘কোনো সন্দেহ পোষণ করেনি’’ এর অর্থ হলো, তারা তাদের ঈমান অনুসারে ‘আমল করেছে এবং আল্লাহ ও রসূলের কোনো আদেশ বা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চলেনি। কেননা যারা আল্লাহকে দেয়া প্রতিশ্রুতি যথাযথভাবে পূর্ণ করে তারাই প্রকৃত মু’মিনদের অন্তর্ভুক্ত। ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ ‘‘কোনো সন্দেহ পোষণ করেনি’’ এ কথার ব্যাখ্যা হলো নিম্নোক্ত কুরআনের আয়াত : অর্থাৎ- ‘‘নিশ্চয় যারা বলে আমাদের রব্ হলেন আল্লাহ, অতঃপর তারা এ কথার উপর অটল অবিচল থাকে....’’- (সূরা ফুস্সিলাত ৪১ : ৩০)।
(الَّذِىْ إِذَا أَشْرَفَ عَلٰى طَمَعٍ تَرَكَه لِلّٰهِ عَزَّ وَجَلَّ) এখানে ত্বমা‘ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কুপ্রবৃত্তি- যেদিকে সাধারণত মানুষ অধিকহারে ধাবিত হয়। আর এই কুপ্রবৃত্তি তাকে হাকের অনুসরণ থেকে সদা বিরত রাখার জন্য প্রাণপণ অপচেষ্টা চালায়।
মহান আল্লাহ তা‘আলা এ মর্মে উল্লেখ করেন : অর্থাৎ- ‘‘আর যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করে এবং কুপ্রবৃত্তি হতে নিজেকে দূরে রাখে, জান্নাতই হলো তার বাসস্থান।’’ (সূরা আন্ না-যি‘আ-ত ৭৯ : ৪০-৪১)
উল্লেখিত হাদীসে ত্বমা‘ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো পার্থিব সম্মান ও সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়া এবং আল্লাহর কথা ভুলে যাওয়া। মূলত এসব বৈধ হলেও তা থেকে দূরে থাকাই পূর্ণ মু’মিনের পরিচয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৫৫-[৬৮] ’আব্দুর রহমান ইবনু আবূ ’আমীরহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো মুসলিমকে আল্লাহ মৃত্যু দান করার পরে আবার তোমাদের মধ্যে (দুনিয়ায়) ফিরে আসতে চাইবে না, যদিও দুনিয়া ও তার সমুদয় ধন-সম্পদের পরিমাণ তাকে দেয়া হয়, একমাত্র শাহাদাতবরণ ব্যতীত। ইবনু আবূ ’আমীরহ্ বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দুনিয়ার সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ সমৃদ্ধ গ্রাম ও নগরের অধিবাসীর মালিক হওয়া অপেক্ষা আল্লাহর পথে শহীদ হওয়া আমার নিকট সর্বোত্তম। (নাসায়ী)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَن عبدِ الرَّحمنِ بن أبي عَميرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَا مِنْ نَفْسٍ مُسْلِمَةٍ يَقْبِضُهَا رَبُّهَا تُحِبُّ أَنْ تَرْجِعَ إِلَيْكُمْ وَأَنَّ لَهَا الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا غير الشَّهِيد» قَالَ ابْن عَمِيرَةَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَأَنْ أُقْتَلَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ يَكُونَ لِي أَهْلُ الْوَبَرِ وَالْمَدَرِ» . رَوَاهُ النَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: আলোচনাধীন হাদীসে শাহীদের মর্যাদা আলোচনা করা হয়েছে। আল্লাহর রাস্তায় শহীদ ব্যক্তিই কেবল অফুরন্ত নি‘আমাত লাভের পরও পুনরায় দুনিয়াতে ফিরে এসে আবার শাহাদাতের সৌভাগ্য লাভের ইচ্ছা পোষণ করবে; অথচ সেখানে সে দুনিয়া ও তার মধ্যে যা কিছু আছে সবকিছুর তুলনায় বেশী নি‘আমাত পাবে।
(مَا مِنْ نَفْسٍ مُسْلِمَةٍ يَقْبِضُهَا رَبُّهَا) এ বাক্যে বুঝা যাচ্ছে যে, আল্লাহ তা‘আলা নিজে মানুষের মৃত্যু ঘটান। এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে কতিপয় ‘উলামায়ে কিরাম বলেন, প্রকৃতপক্ষে মহান আল্লাহই আত্মাসমূহের মৃত্যু ঘটান, আর রূপকার্থে মালাকুল মাওত (ফেরেশতা) মৃত্যু ঘটায়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
(لَأَنْ أُقْتَلَ فِىْ سَبِيلِ اللّٰهِ أَحَبُّ إِلَىَّ مِنْ أَنْ يَّكُوْنَ لِىْ أَهْلُ الْوَبَرِ وَالْمَدَرِ) এ বাক্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলছেন: ‘‘নিশ্চয় আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাত বরণ করা আমার নিকট আহলুল ওয়াবার ও আহলুল মাদার অপেক্ষা উত্তম’’। الوبر (আল ওয়াবার) শব্দের অর্থ পশম। এখানে أهل الوبر (আহলুল ওয়াবার) বলতে মরুভূমিতে বসবাসকারী বা যাযাবরদের উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে, কারণ তাদের তাঁবুগুলো সাধারণত পশমের তৈরি হয়ে থাকে। আর المدر أهل (আহলুল মাদার) বলতে গ্রাম ও শহরে বসবাসকারীদের উদ্দেশ্য করা হয়েছে। মোটকথা এখানে আহলুল ওয়াবার ও আহলুল মাদার বলতে দুনিয়া এবং তার মাঝে যত কিছু আছে সব কিছু উদ্দেশ্য। সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথার উদ্দেশ্য হলো, দুনিয়া এবং তার মাঝে থাকা সবকিছু অপেক্ষা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে শাহাদাত বরণ করা তার নিকট অধিক উত্তম। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৫৬-[৬৯] হাসনা বিনতু মু’আবিয়াহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার চাচা (হারিস) আমাকে হাদীস বর্ণনা করেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলাম, কারা জান্নাতে প্রবেশ করবে? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ নবীগণ, শহীদগণ ও সদ্যপ্রসূত শিশু এবং জীবন্ত কবরস্থ (কন্যা সন্তান) জান্নাতে প্রবেশ করবে। (আবূ দাঊদ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ حَسْنَاءَ بِنْتِ مُعَاوِيَةَ قَالَتْ: حَدَّثَنَا عَمِّي قَالَ: قَلْتُ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ فِي الْجَنَّةِ؟ قَالَ: «النَّبِيُّ فِي الْجَنَّةِ وَالشَّهِيدُ فِي الْجَنَّةِ وَالْمَوْلُودُ فِي الْجَنَّةِ وَالْوَئِيدُ فِي الْجنَّة» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে বিশেষ শ্রেণীর কিছু মানুষকে জান্নাতী বলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা দিয়েছেন। তাদের মধ্যে নাবীদের পরে সর্বপ্রথম জান্নাতী হলো আল্লাহর রাস্তায় শহীদগণ। সুতরাং এ হাদীসে শহীদদের সৌভাগ্যের কথা আলোচনা করা হয়েছে।
হাদীসে ‘‘শহীদ’’ শব্দের আরো একটি ব্যাখ্যা করা হয় আর তা হলো এখানে ‘শহীদ’ বলতে সাধারণ মু’মিনরাও উদ্দেশ্য হতে পারে। কেননা আল্লাহ আ‘আলা বলেনঃ অর্থাৎ- ‘‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলগণের প্রতি ঈমান এনেছে, তারাই তাদের রবে্র নিকট সিদ্দীক ও শুহাদা’’- (সূরা আল হাদীদ ৫৭ : ১৯)। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
(وَالْمَوْلُوْدُ فِى الْجَنَّةِ) এর ব্যাখ্যায় ইমাম খত্ত্বাবী বলেনঃ ‘‘মাওলূদ’’ বলা হয় ঐ নবজাতক শিশুকে, যে ভূমিষ্ট হওয়ার আগেই মাতৃগর্ভ থেকে পড়ে গেছে- যার কোনো পাপ নেই।
হাদীসের শেষ বাক্য (وَالْوَئِيْدُ فِى الْجنَّةِ) অর্থাৎ- ‘‘ওয়ায়ীদ ও জান্নাতী’’, ইমাম খত্ত্বাবী (রহঃ) এর ব্যাখ্যা করে বলেন, এখানে الوئيد (ওয়ায়ীদ) অর্থ হলো ঐ নবজাতক শিশু, যাকে জীবিত অবস্থায় মাটিতে পুঁতে দেয়া হয়েছে। জাহিলী যুগের পথভ্রষ্ট মানুষেরা সমাজে লজ্জা ও অপমানের ভয়ে তাদের কন্যা সন্তানদের মাটিতে পুঁতে দিত। আবার তাদের কেউ কেউ অভাবের কারণে পুত্র সন্তানদেরও পুঁতে দিত। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫১৭)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৫৭-[৭০] ’আলী, আবুদ্ দারদা, আবূ হুরায়রাহ্, আবূ উমামাহ্, ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার, ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আমর, জাবির ইবনু ’আব্দুল্লাহ ও ’ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ) সকলেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি (ওযরবশত জিহাদে যেতে না পেরে) আল্লাহর পথে খরচের জন্য অর্থ, সম্পদ পাঠিয়ে দিয়ে সে নিজ বাড়িতে অবস্থান করে। এতে প্রতি দিরহামের (মুদ্রার) খরচের বিনিময়ে সাতশত গুণ সাওয়াব অর্জিত হবে, পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি স্বয়ং আল্লাহর উদ্দেশে জিহাদ করল এবং তাতে অর্থ ব্যয় করল, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের প্রত্যাশায় তার প্রতিটি দিরহাম খরচের পরিবর্তে সাতলক্ষ দিরহামের সাওয়াব অর্জিত হবে। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন, ’’আর আল্লাহ তা’আলা যাকে ইচ্ছা করেন, বহুগুণ বাড়িয়ে দেন’’- (সূরা আল বাকারা ২ : ২৬১)। (ইবনু মাজাহ)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَنْ عَلِيٍّ وَأَبِي الدَّرْدَاءِ وَأَبِي هُرَيْرَةَ وَأَبِي أُمَامَةَ وَعَبْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ وَعَبْدُ اللَّهِ بْنُ عَمْرٍو وَجَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ وَعِمْرَانَ بْنِ حُصَيْنٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ أَجْمَعِينَ كُلُّهُمْ يُحَدِّثُ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: «مَنْ أَرْسَلَ نَفَقَةً فِي سبيلِ الله وأقامَ فِي بيتِه فلَه بكلِّ دِرْهَمٍ سَبْعُمِائَةِ دِرْهَمٍ وَمَنْ غَزَا بِنَفْسِهِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَأَنْفَقَ فِي وَجْهِهِ ذَلِكَ فَلَهُ بِكُلِّ دِرْهَمٍ سَبْعُمِائَةِ أَلْفِ دِرْهَمٍ» . ثُمَّ تَلَا هذهِ الآيةَ: (واللَّهُ يُضاعفُ لمنْ يشاءُ)
رَوَاهُ ابنُ مَاجَه
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে স্বশরীরে অংশগ্রহণ এবং খরচ করার ফযীলত বর্ণনা করা হয়েছে।
(فَلَه بِكُلِّ دِرْهَمٍ سَبْعُمِائَةِ دِرْهَمٍ) এ বাক্যে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য ব্যয়কৃত অর্থের সাতশ’ গুণ বেশী নেকী হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এ নেকীর এই পরিমাণ কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত থেকেও পাওয়া যায়। মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ অর্থাৎ- ‘‘যারা আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের সম্পদ ব্যায় করে তাদের উদাহরণ এমন একটি শস্যদানার মতো যা সাতটি শীষ উৎপন্ন করে যার প্রত্যেকটিতে একশত করে শস্যদানা রয়েছে। আর আল্লাহ যাকে চান তাকে আরো বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহ সুপ্রশস্ত এবং মহাজ্ঞানী’’- (সূরা আল বাকারা ২ : ২৬১)। আর দ্বিতীয় ব্যক্তির প্রতিদান সাত হাজার গুণ বেশী হওয়ার কারণ হলো, সে স্বশরীরে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে এবং শারীরিক কষ্ট ও আর্থিত ব্যয় দু’টোই একত্রিত হয়েছে, ফলে তার প্রতিদানও বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৫৮-[৭১] ফাযালাহ্ ইবনু ’উবায়দ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ’উমার ইবনুল খত্ত্বাব (রাঃ) থেকে জেনেছি। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে, শাহাদাত বরণ চারভাবে হয়ঃ প্রথমতঃ প্রকৃত মু’মিন ব্যক্তি তেজোদীপ্ত ঈমান নিয়ে সত্যনিষ্ঠার সাথে শত্রুর মুকাবিলায় লড়াই করতে করতে শহীদ হয়ে গেল এবং তিনি এমন মর্যাদার উচ্চাসনের অধিকারী হবে যে, কিয়ামতের দিন যার প্রতি মানুষ এমনভাবে মাথা তুলে তাকাবে যে, এটা বলতে বলতে তিনি এত উঁচু মাথা উঠালেন যাতে মাথার টুপি নীচে পড়ে গেল। তিনি (ফাযালাহ্) এ কথা দ্বারা ’উমার -এর টুপি নাকি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর টুপি পড়ে যাবার উল্লেখ করেছেন তা আমার জানা নেই।
দ্বিতীয়তঃ এমন পূর্ণ মু’মিন ব্যক্তি যে শত্রুর সম্মুখীন হয়ে দৃঢ়তার সাথে যুদ্ধ করল বটে, কিন্তু বীরত্বের অভাবে বা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে শত্রুর মুকাবিলায় তার শরীরে কাঁটা গাছের কাঁটা বিঁধে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে, এমতাবস্থায় হঠাৎ এক ব্যক্তির তীরের আঘাতে সে মৃত্যুবরণ করল, এ ব্যক্তিই দ্বিতীয় শ্রেণীর। তৃতীয়তঃ এমন মু’মিন ব্যক্তি, যে জীবনে পাপ-পুণ্যের সাথে সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে, অতঃপর পরে যথার্থ বীরের ন্যায় জিহাদে অংশগ্রহণ করেছে এবং পরিশেষে স্বীয় ঈমানের বলে সত্যনিষ্ঠার শহীদ হয়েছে, এ ব্যক্তি হলো তৃতীয় শ্রেণীর। চতুর্থতঃ ঐ মু’মিন ব্যক্তি, যে জীবনে অনেক অনাচার-অরাজকতা করেছে, অতঃপর সে জিহাদে অংশগ্রহণ করে আল্লাহ তা’আলার সাথে কৃত অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়ে শাহাদাত বরণ করে, এ ব্যক্তি হলো চতুর্থ পর্যায়ের শহীদ। (তিরমিযী; তিনি বলেন, হাদীসটি হাসান গরীব)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَن فَضالةَ بنِ عُبيد قَالَ: سمِعْتُ عمَرَ بن الْخطاب يَقُولُ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: الشُّهَدَاءُ أَرْبَعَةٌ: رَجُلٌ مُؤْمِنٌ جَيِّدُ الْإِيمَانِ لَقِيَ الْعَدُوَّ فَصَدَقَ اللَّهَ حَتَّى قُتِلَ فَذَلِكَ الَّذِي يَرْفَعُ النَّاسُ إِلَيْهِ أَعْيُنَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ هَكَذَا وَرَفَعَ رَأْسَهُ حَتَّى سَقَطَتْ قَلَنْسُوَتُهُ فَمَا أَدْرِي أَقَلَنْسُوَةَ عُمَرَ أَرَادَ أَمْ قَلَنْسُوَةَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ قَالَ: «وَرَجُلٌ مُؤْمِنٌ جَيِّدُ الْإِيمَانِ لَقِيَ الْعَدُوَّ كَأَنَّمَا ضَرَبَ جِلْدَهُ بِشَوْكٍ طَلْحٍ مِنَ الْجُبْنِ أَتَاهُ سَهْمٌ غَرْبٌ فَقَتَلَهُ فَهُوَ فِي الدَّرَجَةِ الثَّانِيَةِ وَرَجُلٌ مُؤْمِنٌ خَلَطَ عَمَلًا صَالِحًا وَآخَرَ سَيِّئًا لَقِيَ الْعَدُوَّ فَصَدَقَ اللَّهَ حَتَّى قُتِلَ فَذَلِكَ فِي الدَّرَجَةِ الثَّالِثَةِ وَرَجُلٌ مُؤْمِنٌ أَسْرَفَ عَلَى نَفْسِهِ لَقِيَ الْعَدُوَّ فَصَدَقَ اللَّهَ حَتَّى قُتِلَ فَذَاكَ فِي الدَّرَجَةِ الرَّابِعَةِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে ঈমান ও ‘আমলের ভিত্তিতে শহীদদেরকে চারটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। তবে তাদের সকলেই জান্নাতী; যদিও জান্নাতে তাদের স্তর বা মর্যাদার ব্যবধান থাকবে।
(الشُّهَدَاءُ أَرْبَعَةٌ) এ কথার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ‘‘শহীদগণ চার প্রকারের বা চার শ্রণীর’’ এটিও উদ্দেশ্য হতে পারে, আবার চারজন নির্দিষ্ট শহীদও উদ্দেশ্য হতে পারে। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ৩৮৫৮)
হাদীসে বারংবার বর্ণিত শব্দ (فَصَدَقَ اللّٰهَ) এর অর্থ হলো আল্লাহর সাথে তার যে বীরত্বের অঙ্গীকার ছিল তা পূর্ণ করেছে, অর্থাৎ কাপুরুষতা প্রদর্শন করেনি। সুতরাং সে মহান আল্লাহর সাথে যে শাহাদাতের অঙ্গীকার করেছিল তা পূর্ণ করেছে।
(حَتّٰى قُتِلَ) অর্থাৎ- সে শাহাদাত বরণ করে। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ মহান আল্লাহ তা‘আলা মুজাহিদদের গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, তারা সাওয়াবের আশায় ধৈর্য সহকারে যুদ্ধ করবে। সুতরাং হাদীসে উল্লেখিত ব্যক্তি ধৈর্য সহকারে সাওয়াবের প্রত্যাশী হয়ে আমরণ যুদ্ধ করে আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকারকে স্বীয় কর্মের মাধ্যমে পূর্ণ করেছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
এ হাদীস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, শক্তিশালী ও সাহসী মু’মিন আল্লাহর নিকট দুর্বল ও কাপুরুষ মু’মিনের তুলনায় বেশী প্রিয়। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৬৪৪)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৫৯-[৭২] ’উতবাহ্ ইবনু ’আব্দুস্ সুলামী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জিহাদে নিহত ব্যক্তি তিন শ্রেণীর হয়ে থাকে।
১- সেই প্রকৃত মু’মিন ব্যক্তি, যে নিজের জান ও মাল দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে, শত্রুর মুকাবিলায় বীরদর্পে লড়াই করে, পরিশেষে শাহাদাত বরণ করে। এদের ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এ ব্যক্তিই পরীক্ষিত শহীদ। সুতরাং ’আরশের নিচে আল্লাহর তাঁবুতে তাদেরই স্থান হবে। আর নবী-রসূলগণের মর্যাদা যে সমস্ত শাহীদের ওপর নাবূওয়াতের মর্যাদা ব্যতীত অধিক অন্য কোনো কিছু হবে না।
২- সেই মু’মিন ব্যক্তি, যে পাপ-পুণ্যের জীবন অতিবাহিত করেছে, আর নিজের জান ও মাল দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করতে করতে শাহাদাত লাভ করেছে। তার ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সে পাপরাশি মোচনকারী শাহাদাত লাভ; যা তার অন্যায় ও অপরাধসমূহ মুছে দেয়। মূলত তরবারি হলো সকল গুনাহ মোচনকারী, ফলে সে জান্নাতের যে কোনো দরজা দিয়ে ইচ্ছা অনায়াসে প্রবেশ করবে।
৩- মুনাফিক (মুসলিম) নিজের জান ও মাল দ্বারা জিহাদ করে, এমনকি শত্রু মুকাবিলায় যুদ্ধ করে মৃত্যুবরণও করে; কিন্তু সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। কেননা তরবারি (মুনাফিকের) নিফাক দূরীভূত করতে পারে না। (দারিমী)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَن عُتبةَ بن عبدٍ السَّلَميِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: الْقَتْلَى ثَلَاثَة: مُؤمن جَاهد نَفسه وَمَالِهِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَإِذَا لَقِيَ الْعَدُوَّ قَاتَلَ حَتَّى يُقْتَلَ قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِيهِ: «فَذَلِكَ الشَّهِيدُ الْمُمْتَحَنُ فِي خَيْمَةِ اللَّهِ تَحْتَ عَرْشِهِ لَا يَفْضُلُهُ النَّبِيُّونَ إِلَّا بِدَرَجَةِ النُّبُوَّةِ وَمُؤْمِنٌ خَلَطَ عَمَلًا صَالِحًا وَآخَرَ سَيِّئًا جَاهَدَ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ إِذَا لَقِيَ الْعَدُوَّ قَاتَلَ حَتَّى يُقْتَلَ» قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِيهِ: «مُمَصْمِصَةٌ مَحَتْ ذُنُوبَهُ وَخَطَايَاهُ إِنَّ السَّيْفَ مَحَّاءٌ لِلْخَطَايَا وَأُدْخِلَ مِنْ أَيِّ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ شَاءَ وَمُنَافِقٌ جَاهَدَ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ فَإِذَا لَقِيَ الْعَدُوَّ قَاتَلَ حَتَّى يُقْتَلَ فَذَاكَ فِي النَّارِ إِنَّ السيفَ لَا يمحُو النِّفاقَ» . رَوَاهُ الدارميُّ
ব্যাখ্যা: পূর্বোল্লিখিত হাদীসে জান্নাতী শহীদদের শ্রেণীবিভাগ আলোচনা করা হয়েছে। আর এ হাদীসে নিহত ব্যক্তিদের শ্রেণীবিভাগ আলোচনা করা হয়েছে।
প্রথম প্রকার হলো মু’মিন, যে ‘আমলের দিক থেকে পূর্ণ নেক ‘আমলকারী। নিজের জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করার কারণে সে জান্নাতী হবে এবং জান্নাতে নাবীদের স্তরের সাথে শুধুমাত্র নাবূওয়াতের কারণে সামান্য পার্থক্য ব্যতীত অন্য কোনো পার্থক্য থাকবে না। আর নাবীগণের সাথে তাদের এই পার্থক্যের কারণ হলো, আম্বিয়াগণ তাদের উম্মাতকে আনুগত্য ও ‘ইবাদাতের সার্বিক দিকনির্দেশনা দেন আর তারা তা পালন করে, ফলে আম্বিয়াগণ বেশী মর্যাদার অধিকারী হবেন।
(مُمَصْمِصَةٌ مَحَتْ ذُنُوْبَه وَخَطَايَاهُ) তথা তার শাহাদাত বরণ তার সকল গুনাহসমূহকে মিটিয়ে দিবে। এখানে ممصمصة শব্দটিকে স্ত্রীলিঙ্গে আনার কারণ হলো এর দ্বারা উদ্দেশ্য শাহাদাত বরণ করা। আর ‘আরবী ‘‘শাহাদাহ্’’ শব্দটি স্ত্রী লিঙ্গের জন্য ব্যবহৃত হয়।
হাদীসের শেষাংশে বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে নিহত হওয়া সত্ত্বেও মুনাফিক জাহান্নামী হবে, কারণ তরবারি নিফাকের মতো পাপকে মিটিয়ে দিতে অক্ষম; যদিও তরবারি গুনাহসমূহকে মিটিয়ে দেয়। তবে আল্লাহ তা‘আলা কখনো কখনো পাপী ও পথভ্রষ্ট লোকেদের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজ আঞ্জাম দেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ «وَإِنَّ اللّٰهَ لَيُؤَيِّدُ هٰذَا الدِّينَ بِالرَّجُلِ الْفَاجِرِ» অর্থাৎ- ‘‘নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা পাপী ব্যক্তিদের মাধ্যমে তাঁর দীনকে শক্তিশালী করেন’’- (সহীহুল বুখারী হাঃ ৩০৬২)। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ তৃতীয় অনুচ্ছেদ
৩৮৬০-[৭৩] ইবনু ’আয়িয (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক ব্যক্তির জানাযায় শরীক হলেন। যখন সালাত আদায়ের উদ্দেশে লাশ রাখা হলো, তখন ’উমার ইবনুল খত্ত্বাব বলেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনি এ ব্যক্তির জানাযার সালাত আদায় করাবেন না, কেননা লোকটি খারাপ ছিল। এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকেদের প্রতি লক্ষ্য করে বললেন, তোমাদের মধ্যে কেউ কি এ ব্যক্তিকে কোনো ইসলামী ’আমল করতে দেখেছ? জনৈক ব্যক্তি উঠে বলল, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রসূল! সে আল্লাহর পথে এক রাত (সীমান্ত) পাহারা দিয়েছিল। এটা শুনে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার জানাযার সালাত আদায় করলেন এবং তাকে কবরে নিজ হাতে তার উপর মাটি দিলেন। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উক্ত ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে বললেন, সঙ্গী-সাথীদের ধারণা তুমি জাহান্নামের অধিবাসী। আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমি জান্নাতের অধিবাসী। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরো বলেন, হে ’উমার! মানুষের ’আমলের ব্যাপারে তোমাকে জিজ্ঞেস করা হবে না। তোমাকে তো ফিত্বরাতের (স্বভাব-ধর্ম ইসলামের কর্মের) ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হবে। (বায়হাক্বী- শু’আবুল ঈমান)[1]
اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ
وَعَن ابْن عائذٍ قَالَ: خَرَجَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي جِنَازَةِ رَجُلٍ فَلَمَّا وُضِعَ قَالَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: لَا تُصَلِّ عَلَيْهِ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَإِنَّهُ رَجُلٌ فَاجِرٌ فَالْتَفَتَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى النَّاسِ فَقَالَ: «هَلْ رَآهُ أَحَدٌ مِنْكُمْ عَلَى عَمَلِ الْإِسْلَامِ؟» فَقَالَ رَجُلٌ: نَعَمْ يَا رَسُولَ اللَّهِ حَرَسَ لَيْلَةً فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَصَلَّى عَلَيْهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَحَثَا عَلَيْهِ التُّرَابَ وَقَالَ: «أَصْحَابُكَ يَظُنُّونَ أَنَّكَ مِنْ أَهْلِ النَّارِ وَأَنَا أَشْهَدُ أَنَّكَ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ» وَقَالَ: «يَا عُمَرُ إِنَّكَ لَا تُسْأَلُ عَنْ أَعْمَالِ النَّاسِ وَلَكِنْ تُسْأَلُ عَنِ الْفِطْرَةِ» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي «شُعَبِ الْإِيمَانِ»
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে পরোক্ষভাবে আল্লাহর রাস্তায় মুসলিমদের পাহাড়া দেয়ার ‘আমলটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হয়েছে এবং যে ব্যক্তির ব্যাপারে ‘উমার খারাপ ধারণা রাখতেন কেবলমাত্র একরাত এই পাহাড়াদানের কাজে নিয়োজিত থাকায় আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জানাযা আদায় করলেন এবং তাকে জান্নাতী বলে ঘোষণা দিলেন।
‘উমার -এর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে উক্ত পাপী ব্যক্তির জানাযার সালাত আদায় করতে নিষেধ করার কারণ ছিল, যাতে সকল মুনাফিক ও পাপিষ্ঠরা তাদের কৃতকর্মের ব্যাপারে সতর্ক হয়ে যায় এবং এটা যেন তাদের জন্য ধমকস্বরূপ হয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
(وَحَثَا عَلَيْهِ التُّرَابَ) এ বাক্যের ভাবার্থ হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পবিত্র হাত দিয়ে ঐ ব্যক্তির কবরে এক বা দু’বার মাটি দিলেন, যাতে লোকেরা তার সৎকাজটির প্রতি উৎসাহিত হয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
(وَلٰكِنْ تُسْأَلُ عَنِ الْفِطْرَةِ) এ বাক্যটি প্রমাণ করে যে, উল্লেখিত ব্যক্তিটি ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের উপরই অধিষ্ঠিত ছিল। এখানে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘উমার -কে মানুষের বিশ্বাসের উপর নির্ভর করতে নির্দেশনা দিয়েছেন, কারণ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের প্রতি অতি দয়ালু ও মেহেরবান।
‘আল্লামা ত্বীবী বলেনঃ ফিত্বরাহ্ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ইসলাম ও সৎ ‘আমল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ
كُلُّ مَوْلُودٍ يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِه أَوْ يُنَصِّرَانِه أَوْ يُمَجِّسَانِه
অর্থাৎ- ‘‘প্রত্যেক নবজাতক শিশুই ফিত্বরাহ্-এর উপর জন্মলাভ করে, অতঃপর তার বাবা-মা- ই তাকে ইয়াহূদী, নাসারা কিংবা অগ্নিপূজক বানায়’’। (সহীহুল বুখারী, হাঃ ১৩৮৫)
হাদীসের উক্তিটির ভাবার্থ হলো, হে ‘উমার! তুমি এ অবস্থায় মৃত ব্যক্তির খারাপ ‘আমল সম্পর্কে আলোচনা করবে না; বরং তার ভালো কাজগুলো আলোচনা করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যত্র বলেছেনঃ ‘‘তোমরা তোমাদের মৃতদের ভালো দিকগুলো স্মরণ কর’’। সুতরাং মৃতদের ভালো গুণাবলীসমূহ বর্ণনা করার প্রতি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘উমার -কে উৎসাহিত করেছেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৬১-[১] ’উকবা ইবনু ’আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মসজিদে নববীর মিম্বারে দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ তোমরা শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযানে সাধ্যমতো শক্তি সঞ্চয় কর। মনে রাখ, প্রকৃত শক্তি হলো তীর নিক্ষেপ করা। শোন! প্রকৃত শক্তি হলো তীর নিক্ষেপ করা। শোন! প্রকৃত শক্তি হলো তীর নিক্ষেপ করা। (মুসলিম)[1]
بَابُ إِعْدَادِ اٰلَةِ الْجِهَادِ
عَن عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ عَلَى الْمِنْبَرِ يَقُول: (وَأَعدُّوا لَهُ مَا استطَعْتُمْ منْ قُوَّةٍ)
أَلَا إِنَّ الْقُوَّةَ الرَّمْيُ أَلَا إِنَّ الْقُوَّةَ الرَّمْيُ أَلَا إِنَّ الْقُوَّةَ الرَّمْيُ)
رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যা: উপরোল্লিখিত হাদীসে যুদ্ধের জন্য সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করাকে আবশ্যককারী কুরআনের আয়াতটি বর্ণনা করতঃ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, শক্তি হচ্ছে নিক্ষেপণ বস্তু।
وَأَعِدُّوْا لَهٗ مَا اسْتطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ এ অংশের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, যে সকল জিনিস দ্বারা যুদ্ধে আত্মরক্ষা করা যায় এবং অধিক শক্তিশালী হওয়া যায়, উল্লেখিত আয়াতে এ জাতীয় সকল উপকরণ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রাখার আদেশ দেয়া হয়েছে। যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় সবিকছুই এ আয়াতের বিধানের আওতাধীন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উক্তি (أَلَا إِنَّ الْقُوَّةَ الرَّمْىُ) তথা ‘‘জেনে রাখ! শক্তি হচ্ছে নিক্ষেপণ বস্তু’’, এর দ্বারা তিনি মূলত যুদ্ধের প্রতি উৎসাহিত করেছেন। এতে বুঝানো হয়েছে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করার লক্ষ্যে যুদ্ধের যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। অনুরূপভাবে যুদ্ধের পূর্বপ্রস্তুতিস্বরূপ ঘোড়াদৌড় প্রতিযোগিতা করা, শরীর চর্চা করা, প্রশিক্ষণ দেয়া এবং নেয়া সব কিছুই এর অন্তর্ভুক্ত। (শারহে মুসলিম ১৩শ খন্ড, হাঃ ১৯১৭)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৬২-[২] উক্ত রাবী [’উকবা ইবনু ’আমির (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, শীঘ্রই রোম সাম্রাজ্য তোমাদের হাতে পরাজিত হবে এবং তোমাদের সাহায্যের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। অতএব তোমাদের কেউ যেন তীর নিক্ষেপে অক্ষমতা প্রকাশ না করে। (মুসলিম)[1]
بَابُ إِعْدَادِ اٰلَةِ الْجِهَادِ
وَعَنْهُ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «سَتُفْتَحُ عَلَيْكُمُ الرُّومُ وَيَكْفِيكُمُ اللَّهُ فَلَا يَعْجِزْ أَحَدُكُمْ أَنْ يَلْهُوَ بِأَسْهُمِهِ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি ভবিষ্যদ্বাণী উল্লেখ করা হয়েছে যে, মুসলিমরা রূম (রোম) সাম্রাজ্য জয় করবে। আর বাস্তবেই পরবর্তীতে মুসলিমরা তা জয় করেছিল।
(سَتُفْتَحُ عَلَيْكُمُ الرُّوْمُ) এ বাক্যের ভাবার্থ হলো আল্লাহ প্রদত্ত বিজয় ও সাহায্যের মাধ্যমে তোমরা অচিরেই রূম জয় করেব।
(فَلَا يَعْجِزْ أَحَدُكُمْ أَنْ يَلْهُوَ بِأَسْهُمِه) এ বাক্যে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সেই সময় তোমাদের কেউ যেন তীর-ধনুক বা অস্ত্র নিয়ে জিহাদের ময়দানে উক্ত শত্রুদের সাথে জিহাদ করতে অপারগ হয়ে না যায়। মুযহির (রহঃ) বলেনঃ এর ভাবার্থ হলো, রুমের অধিকাংশ সৈন্য তিরন্দাজ, অতএব তোমরাও তীর চালনা শিখে নিও, যাতে তোমরা তাদেরকে পরাজিত করতে পার। আর তোমরা অবশ্যই তাদেরকে পরাজিত করতে পারবে। আর আল্লাহ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তোমাদের দ্বারা রূমবাসীদের প্রতিহত করবেনই। অতএব তোমরা যখন রূম বিজয় করবে তখন তীর চালনো ছেড়ে দিও না; বরং অন্যদেরও তীর চালানোর প্রশিক্ষণ দিবে। তোমরা এমন মনে করবে না যে, আমরা রূম বিজয় করে ফেলেছি, অতএব এখন তো আর তীরের কোনো প্রয়োজন নেই; বরং তোমরা তীর চালানো ধরে রাখবে, কারণ এটা তোমাদের সব সময় প্রয়োজন হবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৬৩-[৩] উক্ত রাবী [’উকবা ইবনু ’আমির (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, যে ব্যক্তি তীরন্দাজী শিক্ষা গ্রহণ করে তা পরিহার (চর্চা না) করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়, অথবা সে নাফরমানি করল। (মুসলিম)[1]
بَابُ إِعْدَادِ اٰلَةِ الْجِهَادِ
وَعَنْهُ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم يقولُ: «مَنْ علِمَ الرَّميَ ثمَّ تَرَكَهُ فَلَيْسَ مِنَّا أَوْ قَدْ عَصَى» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে জিহাদের জন্য সব সময় প্রস্তুত থাকার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে এবং কেউ তীর নিক্ষেপ করা শিক্ষা করার পর পুনরায় তা ভুলে গেলে তার নিন্দা করা হয়েছে।
(مَنْ علِمَ الرَّمْىَ ثُمَّ تَرَكَه) এর ভাবার্থ হলো, কেউ তীর নিক্ষেপণ শিক্ষা করার পর তা ভুলে গেলে তার জন্য ইসলামে কঠিন ধমক ও সতর্কবাণী পেশ করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তির বিনা কারণে এ শিক্ষা ভুলে যাওয়া ইসলামে খুবই অপছন্দনীয় বিষয়। (শারহে মুসলিম ১৩শ খন্ড, হাঃ ১৯১৯)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা (فَلَيْسَ مِنَّا) তথা ‘‘সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়’’, অর্থাৎ সে আমাদের দলের মধ্যে শামিল হবে না। তীর নিক্ষেপ না শিখার চেয়ে অনেক বেশী ভয়ংকর হলো তা শিখার পর ভুলে যাওয়া। কারণ যে তা শিখেনি সে ঐ দলের অন্তর্ভুক্ত হয়নি। কিন্তু যে শিখেছে সে (রসূল ও সাহাবীদের) তাদের দলে প্রবেশ করেছে, অতঃপর ভুলে গিয়ে সে যেন ঐ মহান ব্যক্তিদের দলের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করছে এবং প্রাপ্ত নি‘আমাত অস্বীকার করছে। তাই তার এ অন্যায় খুবই ভয়ঙ্কর। এজন্যই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা বলেছেন যে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৬৪-[৪] সালামাহ্ ইবনুল আক্ওয়া’ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’আসলাম’ সম্প্রদায়ের একদল লোকের কাছে আসলেন, তখন তারা বাজারের মধ্যে তীর নিক্ষেপ প্রতিযোগিতা করছিল। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদের লক্ষ্য করে বললেন, হে ইসমা’ঈল-এর বংশধর! তোমরা তীরন্দাজ হও। কেননা তোমাদের পিতামহ (ইসমা’ঈল (আঃ)) তীরন্দাজ ছিলেন। আমি অমুক দলের পক্ষে আছি। কিন্তু অপর পক্ষ থেকে তীর চালনা বন্ধ করে দিল। তখন (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমাদের কি হলো? তারা বলল, আমরা কিরূপে তীর ছুঁড়তে পারি, আপনি যে অমুক দলের সঙ্গে রয়েছেন? এবার তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আচ্ছা তোমরা তীর নিক্ষেপ করতে থাক, আমি তোমাদের সকলের সাথেই আছি। (বুখারী)[1]
بَابُ إِعْدَادِ اٰلَةِ الْجِهَادِ
وَعَن سلَمةَ بنِ الأكوَعِ قَالَ: خَرَجَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى قَوْمٍ مِنْ أَسْلَمَ يَتَنَاضَلُونَ بِالسُّوقِ فَقَالَ: «ارْمُوا بَنِي إِسْمَاعِيلَ فَإِنَّ أَبَاكُمْ كَانَ رَامِيًا وَأَنَا مَعَ بَنِي فُلَانٍ» لِأَحَدِ الْفَرِيقَيْنِ فَأَمْسَكُوا بِأَيْدِيهِمْ فَقَالَ: «مَا لَكُمْ؟» قَالُوا: وَكَيْفَ نَرْمِي وَأَنْتَ مَعَ بَنِي فُلَانٍ؟ قَالَ: «ارْمُوا وَأَنا مَعكُمْ كلكُمْ» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: এ হাদীসটিতেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তীর নিক্ষেপের প্রশিক্ষণ নেয়ার প্রতি উৎসাহিত করেছেন।
(يَتَنَاضَلُوْنَ بِالسُّوْقِ) অর্থাৎ- তারা ‘সূক’ নামক স্থানে তীর নিক্ষেপের প্রতিযোগিতা করছিল। মূলত السوق শব্দের অর্থ হলো বাজার। কিন্তু হাদীসে বর্ণিত السوق শব্দটি সম্পর্কে ইবনু মালিক বলেন, ‘‘এটি একটি জায়গার নাম’’। মুল্লা ‘আলী কারী বলেনঃ তখন তারা পায়ে হেঁটে চলছিল; কোনো সওয়ারীতে আরোহী অবস্থায় ছিল না।
(وَكَيْفَ نَرْمِىْ وَأَنْتَ مَعَ بَنِىْ فُلَانٍ؟) এ বাক্যে তারা বলছে যে, আমরা কিভাবে তীর নিক্ষেপ করব, অথচ আপনি সাহায্য-সহযোগিতার দিক থেকে অমুক গোত্রের সাথে সাহায্য-সহযোগিতার দিক থেকে আছেন? অর্থাৎ- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিপক্ষে অবস্থান নেয়াটি তারা কষ্টকর মনে করলেন। তখন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি তোমাদের সকলেরই সাথে আছে, অতএব তোমরা তীর নিক্ষেপ কর। আর এটি ছিল একটি প্রতিযোগিতা। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৬৫-[৫] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ ত্বলহাহ্ (উহুদ যুদ্ধে) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে একই ঢালের আড়ালে আত্মরক্ষা করছিলেন। আর আবূ ত্বলহাহ্ একজন সুতীক্ষ্ণ তীরন্দাজ ছিলেন। যখন তিনি তীর নিক্ষেপ করতেন তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথা উঁচু করে তীরের লক্ষ্যস্থল প্রত্যক্ষ করতেন। (বুখারী)[1]
بَابُ إِعْدَادِ اٰلَةِ الْجِهَادِ
وَعَن أنسٍ قَالَ: كَانَ أَبُو طَلْحَةَ يَتَتَرَّسُ مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِتُرْسٍ وَاحِدٍ وَكَانَ أَبُو طَلْحَةَ حَسَنَ الرَّمْيِ فَكَانَ إِذَا رَمَى تَشَرَّفَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَيَنْظُرُ إِلَى مَوضِع نبله. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: এ হাদীসটিতেও তীর নিক্ষেপ করার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কাজে খুবই আগ্রহী ছিলেন তার বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে।
(كَانَ أَبُوْ طَلْحَةَ يَتَتَرَّسُ مَعَ النَّبِىِّ ﷺ بِتُرْسٍ وَاحِدٍ) অর্থাৎ, আবূ ত্বলহাহ্ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে একই ঢালের নীচে আড়াল হয়েছিলেন। সাধারণত যে ব্যক্তি তীর নিক্ষেপ করে তাকে শত্রুদের থেকে আড়াল করে রাখার জন্য অন্য একজন সৈন্যের প্রয়োজন হয়, কারণ তীর নিক্ষেপ করার সময় তার দুই হাতই ব্যস্ত থাকে। এ কারণেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ঢাল দ্বারা আবূ ত্বলহাকে আড়াল করে রেখেছিলেন। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ১৯০২)
(فَكَانَ إِذَا رَمٰى تَشَرَّفَ النَّبِىُّ ﷺ) অর্থাৎ- যখন আবূ ত্বলহাহ্ তীর নিক্ষেপ করত তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব মনোযোগ সহকারে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখতেন। ‘‘ইস্তিশরাফ’’ বলা হয় চোখের ভ্রম্নতে হাত রেখে কোনো কিছু দেখাকে। যেমন সূর্য দেখার সময় আমরা ভ্রম্নতে হাত রেখে দেখি। এভাবে দেখলে কোনো বস্তু খুব সুন্দর ও পরিষ্কারভাবে দৃষ্টিগোচর হয়। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত মনোযোগের সাথে আবূ ত্বলহার তীর নিক্ষেপ দেখছিলেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৬৬-[৬] উক্ত রাবী [আনাস (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (যুদ্ধাস্ত্রের) ঘোড়ার কপালের মধ্যে বরকত ও কল্যাণ নিহিত। (বুখারী)[1]
بَابُ إِعْدَادِ اٰلَةِ الْجِهَادِ
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: (الْبَرَكَةُ فِي نَوَاصِي الْخَيل)
ব্যাখ্যা: আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের ক্ষেত্রে বাহন হিসেবে ঘোড়ার ব্যবহারের জুড়ি নেই। ঘোড়ার মধ্যে কল্যাণ রয়েছে বলে সুসংবাদপ্রদান পূর্বক রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উল্লেখিত উক্তিটি করেছেন।
(اَلْبَرَكَةُ فِىْ نَوَاصِى الْخَيْلِ) তথা ‘‘ঘোড়ার কপালে কল্যাণ আছে’’ বলতে শুধুমাত্র ঘোড়ার কপাল উদ্দেশ্য নয়; বরং ঘোড়ার জাত বা পূর্ণ ঘোড়াই উদ্দেশ্য। যেমন ‘আরবরা বলে থাকে, فلان مبارك الناصية অর্থাৎ- অমুকের কপাল অনেক বরকতময়, যার ভাবার্থ হলো অমুক ব্যক্তি বরকতময়। সুতরাং আলোচ্য উক্তিটির ভাবার্থ হলো, ঘোড়ার মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে। কারণ ঘোড়ার মাধ্যমে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা হয়- যাতে ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণ নিহিত রয়েছে। মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ অর্থাৎ- ‘‘তোমরা কাফিরদের মুকাবিলা করার জন্য যথাসাধ্য শক্তি ও সদা সজ্জিত অশ্ববাহিনী প্রস্তুত রাখবে, যা দ্বারা আল্লাহর শত্রু ও তোমাদের শত্রুদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করবে, এছাড়া অন্যান্যদেরকেও, যাদেরকে তোমরা জান না; কিন্তু আল্লাহ জানেন’’- (সূরা আল আনফাল ৮ : ৬০)। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৬৭-[৭] জারীর ইবনু ’আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখতে পেলাম যে, তিনি স্বহস্তে ঘোড়ার কপালের কেশরাজি মুছছিলেন এবং বলছিলেন, কিয়ামত পর্যন্ত ঘোড়ার কপালে কল্যাণ নিহিত রয়েছে। আর তা হলো (আখিরাতে) পুরস্কার ও (দুনিয়াতে) গনীমাতের মাল। (মুসলিম)[1]
بَابُ إِعْدَادِ اٰلَةِ الْجِهَادِ
وَعَن جَرِيرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ: رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَلْوِي نَاصِيَةَ فرسٍ بأصبعِه ويقولُ: الْخَيْلُ مَعْقُودٌ بِنَوَاصِيهَا الْخَيْرُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ: الأجْرُ والغَنيمةُ . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসেও পূর্বোল্লিখিত হাদীসের অনুরূপ বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, আর তা হলো ঘোড়ার মধ্যে কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এটি পার্থিব ও পরকালীন কল্যাণ লাভের মাধ্যম। পার্থিব কল্যাণ হলো যুদ্ধলব্ধ সম্পদ তথা গনীমাত, আর পরকালীন কল্যাণ হলো জিহাদের সাওয়াব বা প্রতিদান।
(يَلْوِىْ نَاصِيَةَ فَرَسٍ بِأِصْبِعِه) এ অংশে বলা হয়েছে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি ঘোড়ার কপালের চুলগুচ্ছতে মৃদুভাবে হাত ঘুরাচ্ছিলেন। ইমাম নববী বলেনঃ ‘‘এখানে ‘নাসিয়্যাহ্’ বলতে ঘোড়ার কপালের উপর থাকা কেশগুচ্ছ উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
(اَلْخَيْلُ مَعْقُوْدٌ بِنَوَاصِيْهَا الْخَيْرُ) তথা ‘‘ঘোড়ার কপালে কল্যাণ বেঁধে দেয়া হয়েছে’’, এ বাক্যের ব্যাখ্যায় ইমাম খত্ত্বাবী বলেনঃ এখানে ‘নাসিয়্যাহ্’ বলতে ইঙ্গিতমূলকভাবে সম্পূর্ণ ঘোড়াকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ- ঘোড়ার মধ্যে কল্যাণ রয়েছে। যেমন ‘আরবরা বলে থাকে, (فلان مبارك الناصية) অর্থাৎ- অমুকের কপাল অনেক বরকতময়, যার ভাবার্থ হলো অমুক ব্যক্তি বরকতময়। সুতরাং আলোচ্য উক্তিটির ভাবার্থ হলো ঘোড়ার মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে। কারণ ঘোড়ার মাধ্যমে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা হয়- যাতে ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এখানে الْخَيْرُ তথা কল্যাণ বলতে গনীমাতের মাল এবং পরকালীন প্রতিদান উদ্দেশ্য। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
‘‘ঘোড়ার কপালে কল্যাণ বেঁধে দেয়া হয়েছে’’ এ বাক্যের ভাবার্থ সম্পর্কে ‘আল্লামা সিন্দী (রহঃ) বলেনঃ ‘‘অর্থাৎ ঘোড়ার মধ্যে অবশ্যই কল্যাণ নিহিত রয়েছে। আর এ কল্যাণ যেন ঘোড়ার সাথে বেঁধে দেয়া হয়েছে এরূপ বুঝায়। এ কথার উদ্দেশ্য হলো, ঘোড়া তার মালিকের জন্য কল্যাণ অর্জনের উপকরণসমূহের একটি। (নাসায়ী ৩য় খন্ড, হাঃ ৩৫৭৪)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৬৮-[৮] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে লোক আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে এবং তার প্রতিশ্রুতির উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রেখে আল্লাহর পথে জিহাদের উদ্দেশে ঘোড়া লালন-পালন করে, কিয়ামতের দিন তার তৃপ্তিদায়ক খাদ্য ও প্রস্রাব-পায়খানা ঐ লোকের ’আমলের পাল্লায় ওযন করা হবে। (বুখারী)[1]
بَابُ إِعْدَادِ اٰلَةِ الْجِهَادِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنِ احْتَبَسَ فَرَسًا فِي سَبِيل الله إِيمَانًا وتصْديقاً بوَعْدِه فإِنَّ شِبَعَه ورِيَّه ورَوْثَه وبَوْلَه فِي مِيزَانه يَوْم الْقِيَامَة» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: (مَنِ احْتَبَسَ فَرَسًا فِىْ سَبِيلِ اللهِ) যে আল্লাহর পথে ঘোড়া আটকিয়ে রাখলো, অর্থাৎ যুদ্ধ হতে পারে এই আশংকায় যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য ঘোড়া পালন করল। ‘আল্লামা তূরিবিশতী বলেন, সীমান্তে কোনো হামলা হতে পারে এই আশংকায় তা দমন করার জন্য যে ব্যক্তি ঘোড়া প্রতিপালন করল।
(إِيْمَانًا وَتَصْدِيْقًا بِوَعْدِه) আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রেখে এবং তাঁর ওয়া‘দাকে সত্য জেনে, অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে, তাঁর নির্দেশ পালনার্থে এবং তার কৃত ওয়া‘দা সত্য এটা বিশ্বাস করে। মোটকথা ঘোড়া প্রতিপালন করেছে আল্লাহর নির্দেশ পালন করার জন্য এবং সাওয়াবের আশায়। কেননা আল্লাহ ওয়া‘দা করেছেন যে, তাঁর পথে জিহাদের উদ্দেশে ঘোড়া প্রতিপালন করার জন্য সাওয়াব প্রদান করা হবে। তাই যিনি এ নিয়্যাতে ঘোড়া প্রতিপালন করল সে যেন বলল, তুমি যে ওয়া‘দা করেছ আমি তোমার সে ওয়া‘দাকে বিশ্বাস করি। (মিরকাতুল মাফাতীহ ৭ম খন্ড, ৩৯৩ পৃঃ)
(فإِنَّ شَبْعَه وَرِيَّه وَرَوْثَه وَبَوْلَه فِىْ مِيْزَانِه يَوْمَ الْقِيَامَةِ) ক্বিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তির পাল্লায় ঘোড়ার খাদ্য, পানীয়, গোবর ও পেশাব ওজন করা হবে, অর্থাৎ উল্লেখিত বস্তুসমূহের সাওয়াব তার নেকীর পাল্লায় রাখা হবে। মুহাল্লাব বলেনঃ অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, মুসলিমদের শত্রুর মুকাবালা করার উদ্দেশে ঘোড়া ওয়াক্ফ করা বৈধ। ইবনু আবূ জামরাহ্ বলেনঃ অত্র হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, হাদীসে বর্ণিত কর্ম সম্পাদনকারীর পক্ষ থেকে তা গ্রহণ করা হবে। তাই তা মীযানের পাল্লায় রাখা হবে। ইমাম ইবনু মাজাহ মারফূ‘ সূত্রে তামীম্ আদ্ দারী থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে যুদ্ধ করার জন্য ঘোড়া পালন করে এবং নিজ হাতে তার খাবার খাওয়ায় এর প্রতিটি দানার বিনিময়ে তার একটি করে সাওয়াব অর্জিত হবে। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৮৫৩)
‘আল্লামা সিন্দী বলেনঃ অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, মানুষের ‘আমলসমূহ যে রকম ওযন হবে তেমনি ঐ কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট বস্তুসমূহও ওযন করা হবে। (শারহেন্ নাসায়ী ৩য় খন্ড, হাঃ ৫৭৭)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৬৯-[৯] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোড়ার মধ্যে ’শিকাল’ হওয়া ভালো দৃষ্টিতে দেখতেন না। ’শিকাল’ ঐ ঘোড়াকে বলা হয়, যার পিছনের ডান পায়ে এবং সামনের বাম পায়ে শ্বেতবর্ণ থাকে। অথবা সামনের ডান পায়ে এবং পিছনের বাম পায়ে। (মুসলিম)[1]
بَابُ إِعْدَادِ اٰلَةِ الْجِهَادِ
وَعَنْهُ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم يكرَهُ الشَّكالَ فِي الْخَيْلِ وَالشِّكَالُ: أَنْ يَكُونَ الْفَرَسُ فِي رِجْلِهِ الْيُمْنَى بَيَاضٌ وَفِي يَدِهِ الْيُسْرَى أَوْ فِي يدِه اليُمنى ورِجلِه اليُسرى. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: (كَانَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ يَكْرَهُ الشِّكَالَ فِى الْخَيْلِ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিকাল ঘোড়া অপছন্দ করতেন, শিকাল বলা হয় ঐ ঘোড়াকে যার সামনের ডান পা ও পিছনের বাম পা, অথবা সামনের বাম পা ও পিছনের ডান পা সাদা রঙের।
ইমাম নববী বলেনঃ এটি শিকালের ব্যাখ্যাসমূহের মধ্য হতে একটি ব্যাখ্যা। আবূ ‘উবায়দ ও জুমহূর ভাষাবিদগণের মতে শিকাল ঐ ঘোড়াকে বলা হয় যার তিনটি পা শ্বেতবর্ণ এবং এক পা ভিন্ন বর্ণের। একে শিকাল বলা হয় এজন্য যে, ঘোড়ার তিন পা বেঁধে এক পা খোলা রাখা হয় যাতে ঘোড়া পালাতে না পারে। আর তিন পা শ্বেতবর্ণ ঘোড়া ঐ বন্দি ঘোড়ার সদৃশ, তাই তাকে শিকাল বলা হয়। আবার কখনো এক পা শ্বেত বর্ণের এবং তিন পা ভিন্ন বর্ণের হয়ে থাকে তাকেও শিকাল বলা হয়। ইবনু দুরায়দ বলেনঃ একসাইটের পা শ্বেতবর্ণ ও অন্যসাইটের পা অন্য বর্ণের হলে তাকে শিকাল বলা হয়। আবূ ‘আমর আল মাওয বলেনঃ ঘোড়ার ডানদিকের সামনের ও পিছনের পা শ্বেতবর্ণ হলে অথবা বামদিকের সামনের ও পিছনের পা শ্বেত বর্ণের হলে তাকে শিকাল বলা হয়। ‘আলিমগণ বলেন, শিকাল অপছন্দ হওয়ার কারণ তা বন্দি ঘোড়ার ন্যায়। এও বলা হয়ে থাকে যে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এ ধরনের ঘোড়া তেজী হয় না। তাই তা অপছন্দনীয়। কিছু ‘আলিম বলেছেন, শিকাল ঘোড়ার কপাল যদি শ্বেতবর্ণ হয় তাহলে তার অপছন্দনীয়তা দূর হয়ে যায়। কারণ তাতে শিকালের সাদৃশ্যতা বিদূরিত হয়ে গেছে। (শারহে মুসলিম ১৩ খন্ড, হাঃ ১৮৭৫)
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৭০-[১০] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’হাফ্ইয়া’ হতে ’সানিয়্যাতুল বিদা’ নামক স্থান পর্যন্ত দূরত্বের মাঝে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ঘোড়াসমূহের ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা করেছেন। আর এ স্থান দু’টির মধ্যকার ব্যবধান হলো ছয় মাইল। আর প্রশিক্ষণবিহীন ঘোড়াসমূহের ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা করেছেন ’সানিয়্যাতুল বিদা’ হতে ’বানী যুরইক’-এর মসজিদ পর্যন্ত, এ জায়গা দু’টির মধ্যকার ব্যবধান হলো এক মাইল। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ إِعْدَادِ اٰلَةِ الْجِهَادِ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سابَقَ بينَ الخيلِ الَّتِي أُضمِرَتْ منَ الحَفْياءِ وَأَمَدُهَا ثَنِيَّةُ الْوَدَاعِ وَبَيْنَهُمَا سِتَّةُ أَمْيَالٍ وَسَابَقَ بَيْنَ الْخَيْلِ الَّتِي لَمْ تَضْمُرُ مِنَ الثِّنْيَةِ إِلَى مَسْجِد بني زُرَيْق وَبَينهمَا ميل
ব্যাখ্যা: (سَابَقَ بَيْنَ الْخَيْلِ الَّتِىْ أُضْمِرَتْ) যে ঘোড়া ইযমার করানো হয়েছে সেই ঘোড়ার মাঝে প্রতিযোগিতা করিয়েছেন।
ইমাম সুয়ূত্বী বলেনঃ ইযমার বলা হয় ঐ পদ্ধতিকে যে পদ্ধতিতে ঘোড়াকে প্রথমে খাইয়ে মোটা করা হয়, অতঃপর ঘোড়া মোটা ও শক্তিশালী হয়ে গেলে তার খাবার পরিমাণ কমিয়ে দেয়া হয়। এরপর ঐ ঘোড়াকে একটি ঘরে প্রবেশ করিয়ে তার গা চট দ্বারা ঢেকে দেয়া হয় যাতে গরম হয়ে ঘর্মাক্ত হয়, এরপর তার ঘাম শুকিয়ে তার মাংস কমে যায় এবং অধিক দৌড়াতে সক্ষম হয়। আল্লামা তূরিবিশতী বলেন, উপরিউক্ত পদ্ধতিতে ঘোড়াকে শক্তিশালী করতে চল্লিশদিন সময় লাগে। (মিরকাতুল মাফাতীহ ৭ম খন্ড, পৃঃ ৩৯৪)
(مِنَ الْحَفْيَاءِ وَأَمَدُهَا ثَنِيَّةُ الْوَدَاعِ وَبَيْنَهُمَا سِتَّةُ أَمْيَالٍ) হাফ্ইয়া হতে সানিয়্যাতুল বিদা‘ পর্যন্ত উভয়ের মাঝের দূরত্ব ছয় মাইল। হাফিয ইবনু হাজার বলেনঃ হাফ্ইয়া মদীনার বাহিরে একটি স্থানের নাম- (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫৭২)। ‘আল্লামা সিন্দী বলেনঃ হাফ্ইয়া-কে হাইফাও বলা হয়- (শারহেন্ নাসায়ী ৩য় খন্ড, হাঃ ৩৫৮৫)।
ثَنِيَّةُ বলা হয় উঁচু টিলাকে। মদীনার নিকটবর্তী এই টিলাকে ثَنِيَّةُ الْوَدَاعِ এজন্য বলা হয় যে, মদীনাবাসী যখন কাউকে বিদায় জানায় তখন তারা বিদায়ীকে বিদায় জানানোর জন্য এ টিলা পর্যন্ত তার পশ্চাতে এসে থাকে।
(إِلٰى مَسْجِدِ بَنِىْ زُرَيْقٍ) বানী যুরায়ক-এর মসজিদ পর্যন্ত। যুরায়ক এক ব্যক্তির নাম- (মিরকাতুল মাফাতীহ ৭ম খন্ড, পৃঃ ৩৯৪)। এতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নামে মসজিদের নামকরণ করা বৈধ। ইমাম কুরতুবী বলেনঃ এতে কোনো মতভেদ নেই যে, ঘোড়া অথবা প্রাণীর মধ্যে প্রতিযোগিতা করা বৈধ। অনুরূপ তীর নিক্ষেপ ও অস্ত্র ব্যবহারের পদ্ধতি সংক্রান্ত প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত করা বৈধ। কেননা এতে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ ও নিয়ম-কানুন শিখা যায়- (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫৭২)।
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৭১-[১১] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ’আযবা নামক একটি উষ্ট্রী ছিল। দৌড় প্রতিযোগিতায় কোনো উটই তাকে পরাজিত করতে পারত না। একবার জনৈক গ্রাম্য ’আরব একটি উটের পিঠে আরোহণ করে এলো এবং তাকে পিছনে ফেলে দিল। এটা মুসলিমদের জন্য বেদনাদায়ক হলো। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, দুনিয়াতে কোনো কিছুই সমুন্নত হয় না; আল্লাহ তা’আলার চিরন্তন সত্য কথা হলো তাকে (কোনো সময়) অবনত করে দেন। (বুখারী)[1]
بَابُ إِعْدَادِ اٰلَةِ الْجِهَادِ
وَعَن أنسٍ قَالَ: كَانَتْ نَاقَةٌ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تُسَمَّى الْعَضْبَاءَ وَكَانَتْ لَا تُسْبَقُ فَجَاءَ أَعْرَابِيٌّ عَلَى قَعُودٍ لَهُ فَسَبَقَهَا فَاشْتَدَّ ذَلِكَ عَلَى الْمُسْلِمِينَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ حَقًّا عَلَى اللَّهِ أَنْ لَا يَرْتَفِعَ شَيْءٌ مِنَ الدُّنْيَا إِلَّا وضَعه» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: (كَانَتْ نَاقَةٌ لِرَسُوْلِ اللّٰهِ ﷺ تُسَمَّى الْعَضْبَاءَ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি উটনী ছিল, যার নাম ছিল ‘আযবা, মূলত ‘আযবা বলা হয় এমন উটকে যার কান ফাটা, কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ উটনীর কান ফাটা ছিল না। বরং এ উটনীর নাম ছিল ‘আযবা।
(كَانَتْ لَا تُسْبَقُ) ‘‘তা প্রতিযোগিতায় পরাজিত হত না’’ অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ উট এত দ্রুতগামী ছিল যে, কোনো উট প্রতিযোগিতায় তাকে পিছে ফেলতে পারত না।
(فَجَاءَ أَعْرَابِىٌّ عَلٰى قَعُوْدٍ لَه فَسَبَقَهَا) এক বেদুঈন তার ক‘ঊদ নিয়ে আসলো আর তা প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হলো। অর্থাৎ এ ক‘ঊদটি প্রতিযোগিতায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আযবা উটনী পিছে ফেলে দিয়ে তা বিজয়ী হয়ে গেল। قَعُوْدٍ (ক‘ঊদ) বলা হয় ঐ পুরুষ উটকে যার বয়স দুই বৎসর থেকে ছয় বৎসরের মধ্যে এবং যার বয়স ছয় বৎসরের বেশী হয়ে তাকে جمل (জামাল) বলা হয়। তেমনিভাবে قَعُوْدٌ ঐ উটকে বলা হয় যা বাহন হওয়ার উপযোগী এবং মাদী উটের উপর সওয়ার হতে সক্ষম। (‘আওনুল মা‘বূদ ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৭৯৪)
জাওহারী বলেনঃ সওয়ার হওয়ার উপযোগী স্বল্প বয়সের উটকে قَعُوْدٌ বলা হয়। কমপক্ষে তার বয়স দুই বৎসর এবং ছয় বৎসর বয়সে উপনীত হলে তাকে جمل বলা হয়। আযহারী বলেনঃ একমাত্র পুরুষ উটকেই قَعُوْدٌ বলা হয়। মাদী উটকে বলা হয় قَلُوصٌ (কলূস)। (ফাতহুল বারী ৮ম খন্ড, হাঃ ২৮৭২)
(فَاشْتَدَّ ذٰلِكَ عَلَى الْمُسْلِمِيْنَ) বিষয়টি মুসলিমদের নিকট কষ্টকর মনে হলো, অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উটের এ পরাজয় মুসলিমদের হৃদয়ে কষ্টের কারণ হলো।
(إِنَّ حَقًّا عَلَى اللّٰهِ أَنْ لَّا يَرْتَفِعَ شَيْءٌ مِنَ الدُّنْيَا إِلَّا وَضَعَه) আল্লাহর কর্তব্য হলো দুনিয়াতে কোনো বস্তু বেশী মর্যাদাবান হলে তার মর্যাদা কমিয়ে দেয়া অর্থাৎ দুনিয়াতে কোনো বস্তুর মর্যাদা বেশী বেড়ে গেলে তার মর্যাদা কমিয়ে দেয়া আল্লাহ তা‘আলার স্থায়ী বিধান। (মিরকাতুল মাফাতীহ ৭ম খন্ড, পৃঃ ৩৯৫)
হাদীসের শিক্ষা:
১. প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণের উদ্দেশে ঘোড়া পালন করা বৈধ।
২. বিনয় প্রকাশের প্রতি উৎসাহ প্রদান।
৩. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তম চরিত্র এবং তাঁর বিনয় প্রকাশ।
৪. সাহাবীদের অন্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মর্যাদা।
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৭২-[১২] ’উকবা ইবনু ’আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা একটি তীরের বিনিময়ে তিন (শ্রেণীর) লোককে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। ১- তীর প্রস্তুতকারী, যে সাওয়াবের নিয়্যাতে তা প্রস্তুত করে। ২- তীর নিক্ষেপকারী ও ৩- তীর দানকারী। সুতরাং তোমরা তীর নিক্ষেপ ও সওয়ারীর (যুদ্ধযানের) প্রশিক্ষণ গ্রহণ কর। তবে তীর নিক্ষেপের প্রশিক্ষণ আমার নিকট তোমাদের সওয়ারীতে আরোহণ অপেক্ষা অধিক পছন্দনীয়। তিনটি খেলা ছাড়া সকল প্রকারের খেলা যা লোকেরা খেলে থাকে তা অন্যায় ও বাতিল। ১- ধনুকের সাহায্যে তীর নিক্ষেপ করা। ২- ঘোড়ার প্রশিক্ষণ ও ৩- স্ত্রীর সঙ্গে আমোদণ্ডপ্রমোদ করা। এগুলো শারী’আতে বৈধ ও স্বীকৃত। (তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ)[1]
আর আবূ দাঊদ ও দারিমী অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন, যে ব্যক্তি তীর নিক্ষেপের শিক্ষা গ্রহণ করার পর অবহেলা বা অনীহা প্রকাশ করে তা বর্জন করে, প্রকৃতপক্ষে সে আল্লাহর একটি নি’আমাত পরিহার করল। অথবা বলেছেন, সে আল্লাহর নি’আমাতের অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল।
عَن عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يُدْخِلُ بِالسَّهْمِ الْوَاحِدِ ثَلَاثَةَ نَفَرٍ الْجَنَّةَ: صَانِعَهُ يَحْتَسِبُ فِي صَنْعَتِهِ الْخَيْرَ وَالرَّامِيَ بِهِ وَمُنَبِّلَهُ فَارْمُوا وَارْكَبُوا وَأَنْ تَرْمُوا أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ تَرْكَبُوا كُلُّ شَيْءٍ يَلْهُو بِهِ الرَّجُلُ بَاطِلٌ إِلَّا رَمْيَهُ بِقَوْسِهِ وَتَأْدِيبَهُ فَرَسَهُ وَمُلَاعَبَتَهُ امْرَأَتَهُ فَإِنَّهُنَّ مِنَ الْحَقِّ . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ وَزَادَ أَبُو دَاوُد والدارمي: «ومَنْ تركَ الرَّميَ بعدَ مَا عَلِمَهُ رَغْبَةً عَنْهُ فَإِنَّهُ نِعْمَةٌ تَرَكَهَا» . أَوْ قَالَ: «كفرها»
ব্যাখ্যা: (صَانِعَه يَحْتَسِبُ فِىْ صَنْعَتِهِ الْخَيْرَ) তা প্রস্তুতকারী যে তা প্রস্তুত করার মাধ্যমে কল্যাণের আশা করে, অর্থাৎ যে তীরের কারণে তিন শ্রেণীর লোক জান্নাতে যাবে তার মধ্যে এক শ্রেণীর লোক তারা যারা তীর তৈরি করে এবং এর দ্বারা কল্যাণের তথা সাওয়াবের আশা করে।
(الرَّامِىَ بِه) তা নিক্ষেপকারী, অর্থাৎ তীর নিক্ষেপকারী যিনি তার তীর নিক্ষেপের দ্বারা সাওয়াবের আশা করে তিনিও জান্নাতে যাবেন।
(وَمُنَبِّلَه) তাকে তীর প্রদানকারী অর্থাৎ যিনি তীর নিক্ষেপকারীর হাতে তীর তুলে দেন সাওয়াবের প্রত্যাশায় তিনিও জান্নাতে প্রবেশ করবেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ ৭ম খন্ড, পৃঃ ৩৯৫)
(ارْمُوْا وَارْكَبُوْا) তোমরা তীর নিক্ষেপ কর এবং (বাহনে) আরোহণ কর, শুধুমাত্র পায়ে হেঁটে তীর নিক্ষেপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং বাহনে আরোহণ করেও তীর নিক্ষেপ করবে। অর্থাৎ তোমরা যেমন তীর নিক্ষেপ করা শিখবে অনুরূপভাবে বাহনে আরোহণ করাও শিখবে যাতে বাহনে আরোহণ করে তীর নিক্ষেপ করতে পার।
ত্বীবী (রহ) বলেনঃ وَارْكَبُوْا দ্বারা উদ্দেশ্য বাহনে আরোহণ করে বর্শা নিক্ষেপ করা। অতএব হাদীসের পরবর্তী অংশ। (وَأَنْ تَرْمُوْا أَحَبُّ إِلَىَّ مِنْ أَنْ تَرْكَبُوْا) বর্শা নিক্ষেপ করার চাইতে তীর নিক্ষেপ করা আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়। তবে হাদীসের প্রকাশমান অর্থ হলো তীর নিক্ষেপের প্রশিক্ষণ, বাহনে আরোহণের প্রশিক্ষণের চাইতে উত্তম। কেননা বাহনে আরোহণের প্রশিক্ষণের মধ্যে অহংকারিতা রয়েছে বিপরীতে শুধুমাত্র তীর নিক্ষেপের মধ্যে এ অহংকার নেই অথচ এর উপকারিতা ব্যাপক।
(মিরকাতুল মাফাতীহ ৭ম খন্ড, পৃঃ ৩৯৬; তুহফাতুল আহ্ওযাযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৬৩৭)
(كُلُّ شَيْءٍ يَلْهُوْ بِهِ الرَّجُلُ بَاطِلٌ إِلَّا) হাদীসে উল্লেখিত তিন প্রকার খেল-তামাশা বৈধ। তাছাড়া যত প্রকার খেলা আছে তা সবই বাতিল। অর্থাৎ তাতে কোনো সাওয়াব নেই। পক্ষান্তরে তীর নিক্ষেপ করা, যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার উদ্দেশে ঘোড়দৌড় শিক্ষা এবং স্ত্রীর সাথে খেল-তামাশা করার মধ্যে পূর্ণ সাওয়াব বিদ্যমান।
(مَنْ تَرَكَ الرَّمْىَ بَعْدَ مَا عَلِمَه رَغْبَةً عَنْهُ) যে ব্যক্তি তীর চালনা শিখার পর তা হতে বিমুখ হয়ে তা পরিত্যাগ করল, অর্থাৎ এ বিদ্যার প্রতি অমনোযোগী হয়ে তা ছেড়ে দিল।
(فَإِنَّه نِعْمَةٌ تَرَكَهَا) সে একটি নি‘আমাত ছেড়ে দিল অথবা সে এ নি‘আমাতের প্রতি অকৃতজ্ঞ হলো। আল্লাহর দেয়া নি‘আমাতকে অবহেলা করল। (মিরকাতুল মাফাতীহ ৭ম খন্ড, পৃঃ ৩৯৬)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৭৩-[১৩] আবূ নাজীহ আস্ সুলামী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যে লোক আল্লাহর পথে তীর নিক্ষেপের মাধ্যমে (কোনো শত্রুর উপর) আঘাত হানলো, তার জন্য জান্নাতে বিশেষ মর্যাদা নির্ধারিত রয়েছে। আর যে লোক আল্লাহর পথে তীর নিক্ষেপ করল (শত্রুর গায়ে বিদ্ধ হোক বা না হোক) তার জন্য একটি গোলাম মুক্তি করার সমপরিমাণ সাওয়াব রয়েছে। আর যে লোক ইসলামের কাজে নিয়োজিত থেকে বার্ধক্যে পৌঁছেছে, কিয়ামতের দিন তার জন্য তা উজ্জ্বল নূরে পরিণত হবে। (বায়হাক্বী- শু’আবুল ঈমান)[1]
আবূ দাঊদ এ হাদীসটির শুধুমাত্র প্রথম অংশটি, নাসায়ী প্রথম ও দ্বিতীয় অংশটি এবং তিরমিযী দ্বিতীয় ও তৃতীয় অংশটি বর্ণনা করেছেন। তবে বায়হাক্বী ও তিরমিযীর বর্ণনার মধ্যে ’’ইসলামে’’ এর স্থলে ’’আল্লাহর পথে’’ বর্ণিত হয়েছে।
وَعَن أبي نَجِيحٍ السُّلَميِّ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَنْ بَلَغَ بِسَهْمٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَهُوَ لَهُ دَرَجَةٌ فِي الْجَنَّةِ وَمَنْ رَمَى بِسَهْمٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَهُوَ لَهُ عِدْلُ مُحَرِّرٍ وَمَنْ شَابَ شَيْبَةً فِي الْإِسْلَامِ كَانَتْ لَهُ نُورًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي شُعَبِ الْإِيمَانِ. وَرَوَى أَبُو دَاوُدَ الْفَصْلَ الْأَوَّلَ وَالنَّسَائِيُّ الْأَوَّلَ وَالثَّانِيَ وَالتِّرْمِذِيُّ الثَّانِيَ وَالثَّالِثَ وَفِي رِوَايَتِهِمَا: «مَنْ شَابَ شَيْبَةً فِي سَبِيلِ الله» بدَلَ «فِي الْإِسْلَام»
ব্যাখ্যা: (مَنْ بَلَغَ بِسَهْمٍ فِىْ سَبِيلِ اللّٰهِ) যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে একটি তীর পৌঁছালো, তা তার জন্য জান্নাতের মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে কাফিরের প্রতি তীর নিক্ষেপ করে এবং উক্ত তীর কাফিরের শরীরে আঘাত করে, এর বিনিময়ে আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতে উক্ত তীর নিক্ষেপকারীর মর্যাদা বাড়িয়ে দিবেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৩৯৬০; শারহেন্ নাসায়ী ৩য় খন্ড, হাঃ ৩১৪৬)
(وَمَنْ رَمٰى بِسَهْمٍ فِىْ سَبِيلِ اللّٰهِ فَهُوَ لَه عِدْلُ مُحَرِّرٍ) আর যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে তীর নিক্ষেপ করল তা তার জন্য একটি দাসমুক্ত করার সাওয়াবের সমান বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ- আল্লাহর পথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে তীর নিক্ষেপ করার পর তা যদি কাফিরের শরীরে আঘাত করতে ব্যর্থ হয় তাহলেও আল্লাহ তা‘আলা তাকে সাওয়াব থেকে বঞ্চিত করবেন না। বরং তাকে একটি গোলাম মুক্ত করার সমান সাওয়াব দিবেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৬৩৮; শারহেন্ নাসায়ী ৩য় খন্ড, হাঃ ৩১৪৩)
(مَنْ شَابَ شَيْبَةً فِى الْإِسْلَامِ كَانَتْ لَه نُوْرًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ) যে ব্যক্তি ইসলামে অটলে থেকে (বৃদ্ধ হলো) চুল ও দাড়ি শুভ্র হলো কিয়ামতের দিবসে তার এই শুভ্রতা আলোকময় হবে, অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি ইসলামে অটল থেকে বার্ধক্য উপনীত হলে চাই সে জিহাদে অংশগ্রহণ করুক আর নাই করুক হাদীসৈ বর্ণিত মর্যাদা তার প্রাপ্য। এতে সাদা চুল বা দাড়ি উঠিয়ে ফেলতে নিষেধের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে এবং এ শুভ্রতাকে অপছন্দ না করে তাকে স্বাগত জানানোর প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৭৪-[১৪] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তীরন্দাজী অথবা উট কিংবা ঘোড়দৌড়ের প্রতিযোগিতা ছাড়া অন্য কোনো প্রতিযোগিতার আয়োজন করা জায়িয নয়। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ, নাসায়ী)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا سَبَقَ إِلَّا فِي نَصْلٍ أَوْ خُفٍّ أَوْ حَافِرٍ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: (لَا سَبَقَ إِلَّا فِىْ نَصْلٍ) প্রতিযোগিতা করা বৈধ নয় তীরন্দাজী উট ও ঘোড়দৌড় ব্যতীত। অর্থাৎ- হাদীসে বর্ণিত তিন প্রকারের বস্তুর মধ্যে প্রতিযোগিতা বৈধ। ইবনু মালিক (রহঃ) বলেনঃ প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করে তাতে জিতে গিয়ে মাল গ্রহণ করা বৈধ নয় হাদীসে উল্লেখিত তিন প্রকার প্রতিযোগিতা ব্যতীত। (মিরকাতুল মাফাতীহ ৫ম খন্ড, পৃঃ ৩৯৮; শারহেন্ নাসায়ী ৩য় খন্ড, হাঃ ৩৫৮৭)
ইমাম খত্ত্বাবী বলেনঃ হাদীসে উল্লেখিত প্রতিযোগিতা এজন্য বৈধ তাতে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্ততি এবং জিহাদের জন্য উৎসাহ প্রদান রয়েছে। কিন্তু যে প্রতিযোগিতায় যুদ্ধের প্রস্ততি নেই তাতে অংশগ্রহণ করে মাল গ্রহণ করা নিষিদ্ধ জুয়ার অন্তর্ভুক্ত। তাই তা বৈধ নয়- (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫৭১)। সা‘ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব -এর অভিমতও এটাই- (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৭০০)।
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৭৫-[১৫] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে লোক ঘোড়দৌড়ের প্রতিযোগিতায় দু’টি ঘোড়ার মধ্যে আরেকটি ঘোড়া সংযোজন করে। এমতাবস্থায় যদি এ বিশ্বাস থাকে যে, তার ঘোড়া আগে যেতে পারবেই, তখন তাতে কোনো কল্যাণ নেই। আর যদি এ বিশ্বাস না থাকে যে, তার ঘোড়া আগে যেতে পারবে, তখন তাতে কোনো অপরাধ নয়। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
আর আবূ দাঊদ-এর বর্ণনাতে আছে, যে লোক প্রতিযোগিতায় দুই ঘোড়ার মধ্যে আরেকটি ঘোড়া প্রবেশ করায়, অথচ তা আগে যাবে কিনা কোনো আস্থা নেই, তখন তা জুয়া হবে না। আর যে লোক এ বিশ্বাসে তার ঘোড়া প্রবেশ করায় যে, তা নিশ্চিত আগে যাবেই, তখন তা জুয়া হবে তথা তা হারাম।
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ أَدْخَلَ فَرَسًا بَيْنَ فَرَسَيْنِ فَإِنْ كَانَ يُؤْمَنُ أَنْ يَسْبِقَ فَلَا خَيْرَ فِيهِ وَإِنْ كَانَ لَا يُؤْمَنُ أَنْ يَسْبِقَ فَلَا بَأْسَ بِهِ» . رَوَاهُ فِي شَرْحِ السُّنَّةِ وَفِي رِوَايَةِ أَبِي دَاوُدَ: قَالَ: «مَنْ أَدْخَلَ فَرَسًا بَيْنَ فَرَسَيْنِ يَعْنِي وَهُوَ لَا يَأْمَنُ أَنْ يَسْبِقَ فَلَيْسَ بِقِمَارٍ وَمَنْ أَدْخَلَ فَرَسًا بَيْنَ فَرَسَيْنِ وَقَدْ أَمِنَ أَنْ يَسْبِقَ فَهُوَ قمار»
ব্যাখ্যা: (مَنْ أَدْخَلَ فَرَسًا بَيْنَ فَرَسَيْنِ) যে ব্যক্তি ঘোড়ার মাঝে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে প্রবেশ করালো। অর্থাৎ দুই ব্যক্তি পরস্পরের ঘোড়ার মাঝে প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করল এভাবে যে, উভয়েই নির্দিষ্ট পরিমাণে মাল জমা করলো। অতঃপর উভয়ে শর্ত করলো যে, যদি আমার ঘোড়া প্রতিযোগিতায় বিজয় লাভ করে তাহলে সমুদয় মাল আমার তোমার কিছুই নেই। আর যদি তোমার ঘোড়া বিজয় লাভ করে তাহলে সমস্ত মাল তোমার আমার কিছুই নেই। এ শর্তে প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করা বৈধ নয়। কেননা এটি জুয়া। এ অবস্থায় তৃতীয় কোনো ব্যক্তি যদি তার নিজস্ব ঘোড়া নিয়ে এসে এ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে তাহলে হাদীসে বর্ণিত পরবর্তী শর্তসাপেক্ষে তা বৈধ এবং ঐ তৃতীয় ব্যক্তিকে বলা হয় মুহাল্লিল। কেননা তার অংশ গ্রহণ করার কারণে এ প্রতিযোগিতা বৈধ বলে গণ্য হবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ ৭ম খন্ড, পৃঃ ৩৯৯; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫৭৬)
শর্তটি নিম্নরূপ- (إِنْ كَانَ يُؤْمِنُ أَنْ يُسْبِقَ فَلَا خَيْرَ فِيهِ) যদি যে নিশ্চিত হয় যে, তার ঘোড়া পরাজিত হবে না তাহলে এতে কোনো কল্যাণ নেই। অর্থাৎ সে জানে তার ঘোড়াটি অন্য দু’জনের ঘোড়ার চেয়ে অধিক দ্রুতগামী, ফলে সে নিশ্চিতভাবে জানে যে তার ঘোড়া অবশ্যই জয়লাভ করবে তাহলে তার জন্য এ প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করা বৈধ নয়।
(وَإِنْ كَانَ لَا يُؤْمِنُ أَنْ يَسْبِقَ فَلَا بَأْسَ بِه) আর সে যদি তার ঘোড়া অপরাজিত হওয়ার ক্ষেত্রে নিশ্চিত না হয় তাতে কোনো ক্ষতি নেই। অর্থাৎ সে নিশ্চিত নয় যে, তার ঘোড়াটি অন্য দু’জনের ঘোড়ার চাইতে অধিক দ্রুতগামী। বরং সে মনে করে যে, তাঁর ঘোড়া বিজয়ও লাভ করতে পারে অথবা পরাজয়ও হতে পারে এমনটি হলে তার জন্য প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করা বৈধ এবং তার অংশগ্রহণের ফলে এ প্রতিযোগিতাও বৈধ। সে যদি বিজয় লাভ করে তাহলে তার জন্য উভয়ের মাল নেয়া বৈধ। (প্রাগুক্ত)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৭৬-[১৬] ’ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ’জালাব’ (টানা বা হাঁকা) ও ’জানাব’ (পার্শ্ব বা পিছন থেকে হাঁকা-হাঁকি করে ঘোড়াটিকে তাড়াতে থাকা) বৈধ নয় (অর্থাৎ- কোনো লোকের দ্বারা ঘোড়াকে হাঁকিয়ে নেয়া ও ঘোড়া ক্লান্ত হয়ে পড়লে অতিরিক্ত ঘোড়া সাথে রাখা)। ইয়াহ্ইয়া অত্র হাদীসে বৃদ্ধি করে বলেছেন, ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায়। (আবূ দাঊদ, নাসায়ী)[1]
وَعَنْ عِمْرَانَ بْنِ حُصَيْنٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا جَلَبَ وَلَا جَنَبَ» . زَادَ يَحْيَى فِي حَدِيثِهِ: «فِي الرِّهَانِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ وَرَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ مَعَ زِيَادَة فِي بَاب «الْغَضَب»
ব্যাখ্যা: (لَا جَلَبَ وَلَا جَنَبَ فِى الرِّهَانِ) ঘোড়া প্রতিযোগিতার মধ্যে ঘোড়ার উপরে চিৎকার করা বৈধ নয়, ঘোড়ার পাশে অন্য ঘোড়া রাখাও বৈধ নয়। ইমাম মালিক বলেনঃ جَلَبَ এর অর্থ হলো ঘোড়ার উপরে চড়ে চিৎকার করা যাতে ঘোড়া দ্রুত দৌড়ায়।
নিহায়াহ্ গ্রন্থকার বলেনঃ প্রতিযোগিতার মধ্যে جَلَبَ এর অর্থ হলো কোনো প্রতিযোগিতার ঘোড়ার পিছনে অন্য কোনো লোক রাখবে চিৎকার করার জন্য যাতে ঘোড়া দ্রুত দৌড়ায়। আর جَنَبَ এর অর্থ হলো প্রতিযোগিতার স্বীয় ঘোড়ার পাশে আরেকটি ঘোড়া রাখবে যখন তার স্বীয় ঘোড়াটি দুর্বল হয়ে যাবে তখন সে পাশের ঘোড়ার উপর আরোহণ করবে। ইসলামে প্রতিযোগিতার জন্য এরূপ করা বৈধ নয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ ৭ম খন্ড, পৃঃ ৩৯৯; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫৭৮)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৭৭-[১৭] আবূ কাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সে ঘোড়াই সর্বোত্তম, যে ঘোড়ার সারা দেহ কালো এবং কপালে ও নাকের দিকে কিছুটা সাদা চিহ্ন আছে। অতঃপর সেটাও উত্তম, যে ঘোড়ার কপালে সামান্য সাদা চিহ্নসহ পায়ের দিকেও সাদা থাকে, কিন্তু ডান পা যেন সাদা বর্ণের না হয়। অতঃপর যদি জমকালো কালো বর্ণের ঘোড়া না হয়, তবে উক্ত চিহ্নসহ খয়েরী রংয়ের ঘোড়াই উত্তম। (তিরমিযী, দারিমী)[1]
وَعَن أبي قَتَادَة عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «خَيْرُ الْخَيْلِ الْأَدْهَمُ الْأَقْرَحُ الْأَرْثَمُ ثُمَّ الْأَقْرَحُ الْمُحَجَّلُ طُلُقُ الْيَمِينِ فَإِنْ لَمْ يَكُنْ أَدْهَمَ فَكُمَيْتٌ عَلَى هَذِهِ الشِّيَةِ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَالدَّارِمِيُّ
ব্যাখ্যা: (خَيْرُ الْخَيْلِ الْأَدْهَمُ الْأَقْرَحُ الْأَرْثَمُ) কালো রং-এর ঘোড়া সর্বোত্তম যার কপাল ও উপরের ঠোট সাদা।
তূরিবিশ্তী বলেনঃ কালো কুচকুচে রং-কে বলা হয় أَدْهَمُ। আর যে ঘোড়ার চেহারা অল্প সাদা তাকে বলা হয় أَقْرَحُ। যে ঘোড়ার উপরের ঠোট সাদা তাকে বলা হয় الْأَرْثَمُ। আবার এও বলা হয় যে ঘোড়ার নাক সাদা তাকে বলা হয় الْأَرْثَمُ।
(الْأَقْرَحُ الْمُحَجَّلُ طُلُقُ الْيَمِينِ) ডান পা ব্যতীত অন্য পাগুলো সাদা বর্ণের ঘোড়া। كُمَيْتٌ লাল-কালো বর্ণের মিশ্রিত ঘোড়া। (মিরকাতুল মাফাতীহ ৭ম খন্ড, পৃঃ ৪০০)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৭৮-[১৮] আবূ ওয়াহব আল জুশামী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয় তোমরা এমন ঘোড়া বাছাই করবে যা খয়েরী রংয়ের এবং কপাল ও হাত-পা কিছুটা সাদা অথবা লালবর্ণের, যার কপাল মিশকালো ও হাত-পা সাদা। (আবূ দাঊদ, নাসায়ী)[1]
وَعَنْ أَبِي وَهَبٍ الْجُشَمِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «عَلَيْكُمْ بِكُلِّ كُمَيْتٍ أَغَرَّ مُحَجَّلٍ أَوْ أَشْقَرَ أَغَرَّ مُحَجَّلٍ أَوْ أَدْهَمَ أَغَرَّ مُحَجَّلٍ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: (أَغَرَّ) যে ঘোড়ার কপাল সাদা বর্ণের তাকে أَغَرَّ বলা হয়। مُحَجَّلٍ বলা হয় ঐ ঘোড়াকে যার পাগুলো সাদা বর্ণের। (عَلَيْكُمْ بِكُلِّ كُمَيْتٍ أَغَرَّ مُحَجَّلٍ) ঐ লাল-কালো বর্ণের মিশ্রিত ঘোড়া গ্রহণ করবে যার কপাল ও পাগুলো সাদা বর্ণের।
(أَشْقَرَ) ‘‘লাল বর্ণ’’। ত্বীবী বলেন, كُمَيْت ও أَشْقَرَ এ দুই এর মধ্যে পার্থক্য হলো, যে ঘোড়ার লাল বর্ণ কালো বর্ণের উপর প্রাধান্য পায় তাকে বলা হয় أَشْقَرَ। আর যে ঘোড়ার ঝুটি ও লেজ কালো বর্ণের তাকে বলা كُمَيْت (أَدْهَمَ) কালো বর্ণ। (أَدْهَمَ أَغَرَّ مُحَجَّلٍ) অর্থাৎ- যে ঘোড়া কালো বর্ণের কিন্তু তার কপাল ও পাগুলো সাদা। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫৪০; মিরকাতুল মাফাতীহ ৭ম খন্ড, পৃঃ ৪০১)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৭৯-[১৯] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ লাল রংয়ের ঘোড়ার মধ্যেই কল্যাণ ও বরকত রয়েছে। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يُمْنُ الْخَيْلِ فِي الشُّقْرِ» . رَوَاهُ الترمذيُّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (يُمْنُ الْخَيْلِ فِى الشُّقْرِ) ‘‘লাল ঘোড়ার মধ্যেই বরকত আছে’’।
মুখতারুস্ সিহ্তাহ্-এর লেখক বলেন, الشُّقْرِ (আশকার) অর্থ রং। যে মানুষের চামড়া লাল-সাদা রং-এ মিশ্রিত ঐ মানুষকে বলা হয় الشُّقْرِ। আর ঘোড়া যদি ঝুটি ও তার লেজসহ সম্পূর্ণ লাল রং-এর হয় তাকে বলা হয় আশকার। আর ঝুটি ও লেজ যদি কালো হয় তাকে বলা হয় كُمَيْت (কুমায়ত)। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৬৯৫)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৮০-[২০] ’উতবাহ্ ইবনু ’আব্দুস সুলামী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ তোমরা ঘোড়ার কপালের ও ঘাড়ের চুল এবং লেজের চুল কেটো না। কেননা লেজ হলো তার পাখা এবং ঘাড়ের চুল হলো উষ্ণতা রক্ষার উপকরণ, আর তার কপালের চুলের মধ্যে কল্যাণ নিহিত রয়েছে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن عُتبةَ بن عبدٍ السُّلميِّ أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «لَا تَقُصُّوا نَوَاصِيَ الْخَيْلِ وَلَا مَعَارِفَهَا وَلَا أَذْنَابَهَا فَإِنَّ أَذْنَابَهَا مَذَابُّهَا وَمَعَارِفَهَا دِفاءُها وَنَوَاصِيهَا مَعْقُودٌ فِيهَا الْخَيْرُ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যা: (نَوَاصِىَ الْخَيْلِ) ঘোড়ার কপালের লোমকে বলা হয় نَوَاصِى। আর ঘাড়ের লোমকে বলা হয় (أَذْنَابَهَا مَعَارِفَ مَذَابُّهَا) লেজ তার পাখা, যা দ্বারা সে পোকা মাকড়, মাশা-মাছি তাড়ায়। অর্থাৎ মানুষ যেমন পাখা দ্বারা বাতাস করে এবং তা দ্বারা কোনো কিছু তাড়ায়, অনুরূপ ঘোড়া তার লেজ দ্বারা তার ওপর পতিত পোকা-মাকড় মশা-মাছি তাড়ায়।
(وَمَعَارِفَهَا دِفَاءُهَا) ঘাড়ের ঝুটি তার কাপড় যা দ্বারা সে তাপ ও শীত নিবারণ করে। মানুষ যেমন রোদ্রের তাপ থেকে বাঁচার জন্য মাথার উপর ছাতা অথবা কাপড় ব্যবহার করে এবং শীত নিবারণের জন্য জামা কাপড় পরিধান করে ঘোড়ার কাঁধের ঝুটিও তেমন গরম ও শীত নিবারণের জন্য সহায়ক। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা কাটতে বারণ করেছেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ ৭ম খন্ড, পৃঃ ৪০১; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ২৫৩৯)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৮১-[২১] আবূ ওয়াহব আল জুশামী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা ঘোড়াগুলোকে (যুদ্ধাভিযানের জন্য) সযত্নে বেঁধে রাখ এবং সেগুলোর মাথা ও নিতম্বের উপর হাত বুলাও। অথবা তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, তাদের গলায় মালা পরাও; কিন্তু গলায় ধনুকের তূণের মালা বেঁধো না। (আবূ দাঊদ, নাসায়ী)[1]
وَعَنْ أَبِي وَهَبٍ الْجُشَمِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ارْتَبِطُوا الْخَيْلَ وامسحُوا بنواصيها وأعجازِها أَو قَالَ: كفالِها وَقَلِّدُوهَا وَلَا تُقَلِّدُوهَا الْأَوْتَارَ . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: (وَامْسَحُوْا بِنَوَاصِيْهَا وَأَعْجَازِهَا) ‘‘তার কপালের ঝুটি এবং পশ্চাদেশ মুছে দাও।’’ ইবনু মালিক বলেনঃ মুছে দেয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য ধূলা-বালি থেকে ঘোড়া পরিষ্কার রাখা এবং তার সতেজতা নিরীক্ষণ করা।
(وَقَلِّدُوْهَا وَلَا تُقَلِّدُوْهَا الْأَوْتَارَ) ‘‘তার গলায় মালা পড়াও কিন্তু ধনুকের তূনের মালা পড়াবে না।’’ কেননা কোনো কোনো সময় ঘোড়া গাছের পাতা খেয়ে থাকে অথবা গাছের সাথে তার কাঁধ চুলকায়, ফলে ধনুকের শক্ত ছিলা তার গলায় পেঁচিয়ে ফাঁস লেগে যেতে পারে। অথবা জাহিলী যুগে লোকেরা ঘোড়ার গলায় ধনুকের ছিলা বেঁধে দিত যাতে চোখ লাগা থেকে রক্ষা পায়। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা বাঁধতে নিষেধ করেছেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ ৭ম খন্ড ৪০২ পৃঃ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫৫০)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৮২-[২২] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন একজন নির্দেশপ্রাপ্ত বান্দা। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের (আহলে বায়তের) জন্য তিনটি কাজ ব্যতীত অন্য কোনো বিষয়ে বিশেষ কোনো নির্দেশ দেননি। আর তা হলো তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমরা যেন পূর্ণাঙ্গরূপে উযূ করি, আমরা যেন সাদাকা না খাই এবং ঘোড়া-গাধার মিলনে প্রজনন না ঘটাই। (তিরমিযী, নাসায়ী)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَبْدًا مَأْمُورًا مَا اخْتَصَّنَا دُونَ النَّاسِ بِشَيْءٍ إِلَّا بِثَلَاثٍ: أَمَرَنَا أَنْ نُسْبِغَ الْوُضُوءَ وَأَنْ لَا نَأْكُلَ الصَّدَقَةَ وَأَنْ لَا نَنْزِيَ حمارا على فرس. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: (كَانَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ عَبْدًا مَأْمُوْرًا) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশপ্রাপ্ত বান্দা ছিলেন অর্থাৎ আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রিসালাতের দায়িত্ব প্রচারে আদিষ্ট ছিলেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ ‘‘হে রসূল! তোমার প্রতি তোমার রবের পক্ষ থেকে যা নাযিল করা হয়েছে তা প্রচার কর’’- (সূরা আল মায়িদাহ্ ৫ : ৬৭)।
(মিরকাতুল মাফাতীহ ৭ম খন্ড, পৃঃ ৪০২)
(مَا اخْتَصَّنَا دُوْنَ النَّاسِ بِشَيْءٍ) ‘‘তিনি আমাদের জন্য বিশেষ কোনো নির্দেশ দেননি’’ এর দ্বারা আহলুল বায়ত। অর্থাৎ- তিনি আহলে বায়তগণের জন্য বিশেষ কোনো নির্দেশ দেননি।
(إِلَّا بِثَلَاثٍ) তবে আমাদেরকে পরিপূর্ণভাবে উযূ করার তিনটি নির্দেশ দিয়েছেন। কাযী ‘ইয়ায বলেনঃ এ নির্দেশ দ্বারা ওয়াজিব উদ্দেশ্য। নতুবা এতে কোনো বিশেষ নির্দেশনা পাওয়া যাবে না। কেননা পূর্ণভাবে উযূ করা সকলের জন্যই মুস্তাহাব, অতএব আহলে বায়তগণের জন্য এ নির্দেশনা অন্যান্য লোকেদের চাইতে ভিন্ন নির্দেশ তা হলো পূর্ণভাবে উযূ করা তাদের জন্য ওয়াজিব।
(وَأَنْ لَا نَأْكُلَ الصَّدَقَةَ) ‘‘আমরা যেন সাদাকা ভক্ষণ না করি’’ আহলে বায়তগণের জন্য সাদাকা ভক্ষণ করা হারাম। যদিও উম্মাতের অন্যান্য লোকেদের মধ্যে যারা দরিদ্র তাদের জন্য সাদাকা ভক্ষণ করা হালাল। অতএব এক্ষেত্রেও আহলে বায়তগণের বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে।
(وَأَنْ لَا نَنْزِىَ حِمَارًا عَلٰى فَرَسٍ) আমরা যেন গাধা দ্বারা ঘোড়াকে পাল না দেই। ঘোড়াকে গাধা দিয়ে পাল দেয়া সাধারণ করা হয় উৎকৃষ্ট বস্তুর পরিবর্তে নিকৃষ্ট বস্তু গ্রহণ করা হয়। গাধা যুদ্ধ ক্ষেত্রে শত্রুর মোকাবিলার জন্য অনুপযোগী। কেননা এর দ্বারা পিছুটান করে পুনরায় আক্রমণ করা যায় না যা ঘোড়া দ্বারা করা সম্ভব। এজন্যই গাধাতে গনীমাতের কোনো অংশ নেই। যেমনটি ঘোড়ার জন্য রয়েছে। সাদাকা না খাওয়ার হুকুমের সাথে গাধা দ্বারা ঘোড়ার পাল না দেয়ার হুকুমকে সংযুক্ত করা হয়েছে। অতএব আহলে বায়তগণের জন্য যেরূপভাবে সাদাকা খাওয়া হারাম অনুরূপ গাধা দ্বারা ঘোড়ার পাল দেয়াও হারাম যদিও তা সর্বসাধারণের জন্য মাকরূহ।
অত্র হাদীসে শী‘আদের ঐ দাবীর কঠোর প্রতিবাদ রয়েছে যাতে দাবী করা হয়ে থাকে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহলে বায়তগণকে বিশেষ ‘ইলম শিক্ষা দান করেছেন যা অন্যদের দেননি। (মিরকাতুল মাফাতীহ ৭ম খন্ড, পৃঃ ৪০৩; তুহফাতুল আহওয়াজী ৫ম খন্ড, হাঃ ৮০৩)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৮৩-[২৩] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে একটি খচ্চর হাদিয়া (উপহার) দেয়া হলে তিনি তার উপর আরোহণ করলেন। তখন ’আলী(রাঃ) বললেন, (হে আল্লাহর রসূল!) আমরা যদি গাধাকে ঘোড়ীর সঙ্গে মিলন (প্রজনন) করাতাম, তবে এ ধরনের খচ্চর আমরাও লাভ করতাম। এতদশ্রবণে রসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, নির্বোধ লোকেরাই এ ধরনের কাজ করে থাকে। (আবূ দাঊদ, নাসায়ী)[1]
وَعَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: أُهْدِيَتْ رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم بغلةٌ فركِبَهَا فَقَالَ عَلِيٌّ: لَوْ حَمَلْنَا الْحَمِيرَ عَلَى الْخَيْلِ فَكَانَتْ لَنَا مِثْلُ هَذِهِ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّمَا يَفْعَلُ ذَلِكَ الَّذِينَ لَا يعلمُونَ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: (إِنَّمَا يَفْعَلُ ذٰلِكَ الَّذِيْنَ لَا يَعْلَمُوْنَ) এটাতো শুধু তারাই করে যারা জানে না। অর্থাৎ- যারা জানে না যে, ঘোড়াকে ঘোড়া দ্বারা পাল দেয়া উত্তম তারাই এ কাজ করে থাকে তথা ঘোড়াকে গাধা দ্বারা পাল দেয়া অথবা যারা শারী‘আতের বিধাব জানে না তারাই এরূপ করে থাকে।
আল্লামা ত্বীবী বলেনঃ যারা এর মাকরূহ হওয়া অবহিত নয় এবং এর কারণ অবহিত নয় তারাই এরূপ করে।
মুযহির মনে করেন যে, ঘোড়াকে গাধা দ্বারা পাল দেয়া মাকরূহ। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খচ্চরের উপর আরোহণ করেছেন এবং আল্লাহ তা‘আলা খচ্চরকে তার বান্দাদের জন্য নি‘আমাত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ত্বীবী বলেনঃ হতে পারে যে, ঘোড়াকে গাধা দ্বারা পাল দেয়া হারাম কিন্তু এ পাল দেয়ার ফলে যে খচ্চবের জন্ম হয় তাতে আরোহণ করা বৈধ। যেমন ছবি অংকন করা হারাম কিন্তু অঙ্কিত ছবির উপর বসা বৈধ। (মিরকাতুল মাফাতীহ ৭ম খন্ড, পৃঃ ৪০৩)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৮৪-[২৪] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তরবারির বাঁটের উপরিভাগে রৌপ্যখচিত ছিল। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ, নাসায়ী ও দারিমী)[1]
وَعَن أنسٍ قَالَ: كَانَتْ قَبِيعَةُ سَيْفِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ فِضَّةٍ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ والدارمي
ব্যাখ্যা: ‘‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তরবারির বাঁটে রূপা সংযুক্ত ছিল।’’ নিহায়াহ্-এর গ্রন্থকার বলেন, قَبِيعَةُ বলা হয় তরবারির বাঁটের অগ্রভাগকে। কামূস-এর লেখক বলেনঃ তরবারির হাতলের যে অংশে রূপা অথবা লোহা থাকে সে অংশকে قَبِيعَةُ বলা হয়। মোটকথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তরবারির হাতলে রূপা ছিল।
অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, অল্প পরিমাণ রূপা দ্বারা তরবারি সজ্জিত করা বৈধ। তবে স্বর্ণ দ্বারা সজ্জিত করা বৈধ নয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৮৫-[২৫] হূদ ইবনু ’আব্দুল্লাহ ইবনু সা’দ তার দাদা অথবা নানা মাযীদাহ্ হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের দিন যখন মক্কায় প্রবেশ করছেন তখন তাঁর তরবারির বাঁটের মধ্যে স্বর্ণ ও রৌপ্যখচিত ছিল। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ هُودِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ سَعْدٍ عَن جدِّهِ مِزيدةَ قَالَ: دَخَلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ الْفَتْحِ وَعَلَى سَيْفِهِ ذَهَبٌ وَفِضَّةٌ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيث غَرِيب
ব্যাখ্যা: (وَعَلٰى سَيْفِه ذَهَبٌ وَفِضَّةٌ) ‘‘তাঁর তরবারি স্বর্ণ ও রৌপ্য খচিত ছিল’’ এ হাদীসটি যদিও প্রমাণ করে যে, তরবারি স্বর্ণ খচিত করা বৈধ। তবে অত্র হাদীসটি দলীলযোগ্য নয়।
তূরিবিশতী বলেনঃ মাযীদাহ্ বর্ণিত এ হাদীসটি দ্বারা দলীল প্রতিষ্ঠিত হয় না, কেননা এ হাদীসের গ্রহণযোগ্য কোনো সানাদ নেই। ‘‘ইসতী‘আব’’ গ্রন্থের লেখক অত্র হাদীসটি উল্লেখ করার পর বলেনঃ এ হাদীসটির সানাদ শক্তিশালী নয়। অতএব তরবারি স্বর্ণখচিত করা বৈধ নয়। (তুহ্ফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৬৯০; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৮৬-[২৬] সায়িব ইবনু ইয়াযীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদ যুদ্ধের দিন দু’টি বর্ম পরিধান করেছিলেন। অবশ্য একটির উপর আরেকটি পরিধান করেছিলেন। (আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَن السَّائِب بْنِ يَزِيدَ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ عَلَيْهِ يَوْمَ أُحُدٍ دِرْعَانِ قَدْ ظَاهَرَ بَيْنَهُمَا. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ
ব্যাখ্যা: উহুদ যুদ্ধের দিনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গায়ে দু’টি বর্ম ছিল, যা দ্বারা তিনি নিজেকে রক্ষা করার জন্য সহযোগিতা নিয়েছিলেন। অর্থাৎ- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদের দিন একটি বর্মের উপর আরেক বর্ম পরিধান করেছিলেন। এতে প্রমাণ মিলে নিজেকে সংরক্ষণ করার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ ব্যবহার করা বৈধ। আর তা তাওয়াক্কুলের বিরোধী নয় এবং নিজেকে আল্লাহ নির্ধারিত তাকদীরের কাছে সমর্পণ করারও বিরোধী নয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৮৭-[২৭] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বড় পতাকাটি ছিল কালো বর্ণের এবং ছোট পতাকাটি ছিল সাদা বর্ণের। (তিরমিযী, ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ
قَالَ: كَانَتْ رَايَةُ نَبِيِّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَوْدَاءَ وَلِوَاؤُهُ أبيضَ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছোট পতাকা ছিল কালো রং-এর আর বড় পতাকা ছিল সাদা বর্ণের। তূরিবিশতী বলেনঃ (رَايَةُ) ঐ পতাকাকে বলা হয় যা যুদ্ধের সর্বাধিনায়কের নিকট থাকে যাকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। আর (لِوَاء) বলা হয় আমীরের সেই পতাকাকে যা আমীরের সাথে থাকে।
সহীহ মুসলিম-এর ভাষ্যকার বলেনঃ (رَايَةُ) বলা হয় ছোট পতাকাকে আর (لِوَاء) বলা হয় বড় পতাকাকে। এ ব্যাখ্যাকে ঐ হাদীস সমর্থন করে যাতে বলা হয়েছে, আমার হাতে থাকবে প্রশংসার পতাকা। আদম (আঃ) এবং অন্যরা কিয়ামতের দিন আমার পতাকা তলে থাকবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ ৭ম খন্ড, পৃঃ ৪০৫)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৮৮-[২৮] মূসা ইবনু ’উবায়দাহ্ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন মুহাম্মাদ ইবনু কাসিম-এর মুক্তকৃত গোলাম আমাকে বারা ইবনু ’আযিব (রাঃ)-এর নিকট রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পতাকার (বর্ণের) ব্যাপারে জিজ্ঞেস করার জন্য পাঠিয়েছিলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, তা চতুষ্কোণ বিশিষ্ট কৃষ্ণ (কালো) বর্ণের যা নামিরাহ্ চাদর দ্বারা তৈরি ছিল। (আহমাদ, তিরমিযী, আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ مُوسَى بْنِ عُبَيْدَةَ مَوْلَى مُحَمَّدِ بْنِ الْقَاسِمِ قَالَ: بَعَثَنِي مُحَمَّدُ بْنُ الْقَاسِمِ إِلَى الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ يَسْأَلُهُ عَنْ رَايَةِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: كَانَتْ سَوْدَاءَ مُرَبَّعَةً مِنْ نَمِرَةٍ. رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (كَانَتْ سَوْدَاءَ مُرَبَّعَةً مِنْ نَمِرَةٍ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পতাকা ছিল চার কোণ বিশিষ্ট কালো বর্ণের যা নামিরাহ্ চাদর দ্বারা তৈরি ছিল। কাযী ‘ইয়ায বলেনঃ (سَوْدَاءَ) ‘‘কালো বর্ণের’’ এর দ্বারা উদ্দেশ্য উক্ত পতাকাতে কালো রং এর অংশ বেশী ছিল, দূর থেকে তাকে কালো রং এর দেখাতো তবে তা একেবারে খাঁটি কালো রং-এর ছিল না। কেননা হাদীসের পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে, (مِنْ نَمِرَةٍ) নামিরাহ্ দ্বারা তৈরি। নামিরাহ্ বলা হয় ঐ পশমী চাদরকে যার মধ্যে সাদা কালো ডোরা থাকে। আর এজন্যই একে নামিরাহ্ বলা হয়। কারণ নামিরাহ্ অর্থ নেকড়ে বাঘ যার গায়ে কালো ও সাদা ডোরা বিদ্যমান। নেকড়ের সদৃশ বলেই এ চাদরের নামকরণ করা হয়েছে নামিরাহ্। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫৮৮; তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৬৮০)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৮৯-[২৯] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন অবস্থায় মক্কায় প্রবেশ করেছেন যে, তার বড় পতাকাটি সাদা বর্ণের ছিল। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَنْ جَابِرٌ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دَخَلَ مَكَّةَ وَلِوَاؤُهُ أَبْيَضُ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ
ব্যাখ্যা: মক্কা প্রবেশের দিন তার পতাকা ছিল সাদা। পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে যে, (لِوَاء) বলা হয় বড় পতাকাকে অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের দিন তিনি যখন সেখানে প্রবেশ করেন তখন তার বড় পতাকাটি ছিল সাদা বর্ণের। তবে এ বর্ণনাটি সঠিক নয়। কেননা ইয়াহ্ইয়া ইবনু আদাম এককভাবে এটি বর্ণনা করেছেন। শরীক-এর অন্যান্য একাধিক ছাত্র বর্ণনা করেছেন যে, (أَنَّ النَّبِىَّ ﷺ دَخَلَ مَكَّةَ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের দিন যখন তিনি সেখানে প্রবেশ করেন তখন তার মাথায় কালো পাগড়ী ছিল। আর এ বর্ণনাটিই সঠিক ও সংরক্ষিত। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৬৭৯)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৯০-[৩০] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নারীদের পরে (জিহাদরত) ঘোড়ার চেয়ে অন্য কোনো জিনিস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট সর্বাধিক প্রিয় ছিল না। (নাসায়ী)[1]
عَن أنسٍ قَالَ: لَمْ يَكُنْ شَيْءٌ أَحَبَّ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَعْدَ النِّسَاءِ من الْخَيل. رَوَاهُ النَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: (أَحَبَّ إِلٰى رَسُوْلِ اللّٰهِ ﷺ بَعْدَ النِّسَاءِ) নারীদের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট অধিক প্রিয় বস্তু ছিল ঘোড়া।
‘আল্লামা ত্বীবী বলেনঃ অত্র হাদীসে ঘোড়ার উল্লেখ দ্বারা উদ্দেশ্য শত্রুর মোকাবিলায় আল্লাহর পথে জিহাদের জন্য তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ঘোড়া পছন্দ করতেন। নারীর সাথে ঘোড়ার উল্লেখ দ্বারা তার চরিত্রের পূর্ণতা বুঝানো উদ্দেশ্য। যেহেতু অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সুগন্ধি এবং নারীদেরকে আমার প্রিয় বস্তু বানানো হয়েছে। এতে এ সন্দেহ জাগ্রত হতে পারে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উন্নত চরিত্রে কাজ পরিত্যাগ করে শুধুমাত্র নারীদের নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। এ সন্দেহ দূর করার জন্য তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ঘোষণা দিলেন যে, নারীগণ তাঁর নিকট প্রিয় হওয়া সত্ত্বেও তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রগামী এবং স্বয়ং যুদ্ধ করতে যত্নশীল। আর যুদ্ধে অংশ করার অর্থ নারীদের সাথে ব্যস্ত না থেকে তাদের পরিত্যাগ করার জন্য যে ধৈর্যের প্রয়োজন সে ধৈর্যের চরম পরাকাষ্ঠা তিনি দেখিয়েছেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাস্ত্রের প্রস্তুতিকরণ
৩৮৯১-[৩১] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে ’আরবীয় একটি ধনুক ছিল। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দেখতে পেলেন অপর লোকের হাতে একটি পারস্যের (ইরানের) প্রস্তুতকৃত ধনুক। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমার হাতে এটা কি? তা ফেলে দাও (ব্যবহার করো না)। তোমাদের এ ধরনের ’আরবীয় ধনুক এবং উন্নতমানের বর্শা ব্যবহার করা উচিত। কেননা এর মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা তোমাদেরকে (দীনের পথে) সাহায্য করবেন এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন দেশে-শহরে-নগরে প্রতিষ্ঠিত করবেন। (ইবনু মাজাহ)[1]
وَعَن عَليّ قَالَ: كَانَتْ بِيَدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَوْسٌ عَرَبِيَّةٌ فَرَأَى رَجُلًا بِيَدِهِ قَوْسٌ فَارِسِيَّةٌ قَالَ: «مَا هَذِهِ؟ أَلْقِهَا وَعَلَيْكُمْ بِهَذِهِ وَأَشْبَاهِهَا وَرِمَاحِ الْقَنَا فَإِنَّهَا يُؤَيِّدُ اللَّهُ لَكُمْ بِهَا فِي الدِّينِ وَيُمَكِّنُ لَكُمْ فِي البلادِ» . رَوَاهُ ابْن مَاجَه
ব্যাখ্যা: (وَعَلَيْكُمْ بِهٰذِه وَأَشْبَاهِهَا وَرِمَاحِ) তোমাদের কর্তব্য এই ‘আরবীয় ধনুক এবং অনুরূপ ধনুক ব্যবহার করা। আল্লাহ তোমাদেরকে এ ধনুক দ্বারা দীন প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করছেন এবং তোমাদের দেশে স্থায়ী করে দিবেন।
ত্বীবী (রহ) বলেনঃ হয়ত বা সাহাবী মনে করেছিলেন ‘আরবীয় ধনুকের চাইতে ফরামী ধনুক অধিক মজবুত এবং এর দ্বারা নিক্ষিপ্ত তীর অনেক দূর পর্যন্ত নিক্ষেপ করা যাবে তাই তিনি ‘আরবীয় ধনুকের উপর ফরামী ধনুককে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এ ধারণাকে অমূলক বলে তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং বলেন, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা‘আলাই তোমাদেরকে তোমাদের দীন রক্ষার জন্য সাহায্য করে থাকেন এবং তোমাদের দেশে তিনিই তোমাদেরকে বসবাস করার জন্য সুযোগ করে দেন। তোমাদের শক্তি অথবা প্রস্ত্ততির জন্য তোমরা সাহায্যপ্রাপ্ত হও না। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৮৯২-[১] কা’ব ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবূকের যুদ্ধে বৃহস্পতিবার রওয়ানা হয়েছিলেন। মূলত তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বৃহস্পতিবার সফরে বের হওয়া পছন্দ করতেন। (বুখারী)[1]
بَابُ اٰدَابِ السَّفَرِ
عَن كَعْب بْنِ مَالِكٍ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَرَجَ يَوْمَ الْخَمِيسِ فِي غَزْوَةِ تَبُوكَ وَكَانَ يُحِبُّ أَنْ يَخْرُجَ يَوْمَ الْخَمِيسِ. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: (وَكَانَ يُحِبُّ أَنْ يَّخْرُجَ يَوْمَ الْخَمِيْسِ) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যুদ্ধের জন্য বৃহস্পতিবার রওয়ানা হওয়া পছন্দ করতেন। ‘আল্লামা তূরিবিশতী বলেনঃ যুদ্ধে রওয়ানা হওয়ার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক বৃহস্পতিবার বেছে নেয়ার বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে-
(১) এ দিনটি বরকতময় দিন। এ দিনে বান্দার ‘আমলসমূহ আল্লাহর নিকট উপস্থাপন করা হয়। আর যুদ্ধের সফর আল্লাহর পথে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। তাই তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পছন্দ করতেন এ দিনে আল্লাহর নিকট তার কোনো সৎ ‘আমল উপস্থাপন করা হোক তাই তিনি বৃপস্পতিবার সফর করতেন। (২) এ দিনটি সপ্তাহের সংখ্যা পূর্ণকারী দিন। (৩) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সুন্দর নাম দ্বারা ফাল গ্রহণ করা পছন্দ করতেন।
(الْخَمِيْسُ) শব্দের অর্থ সৈন্যবাহিনী, কেননা যে বাহিনী ৫টি উপদলের সমন্বয়ে গঠিত তাকে (الْخَمِيْسِ) তথা সেনাবাহিনী বলা হয়। তাইতো তিনি এ নামটিকে উত্তম জাল হিসেবে মনে করতেন। এতে আল্লাহ তা‘আলা তাকে সংরক্ষণ করবেন এবং তার সেনাদলকে স্বীয় বেষ্টনীতে রাখবেন।
কাযী ‘ইয়ায আরো বলেন যে, خَمِيْس কে তিনি উত্তম কাল হিসেবে এজন্য গণ্য করতেন যে, এ দিনে তিনি তার শত্রু বাহিনীর ওপর বিজয় লাভ করবেন যাকে خَمِيْسِ বলা হয় অথবা এতে তিনি গনীমাতের এক-পঞ্চমাংশত তথা খুমূস অর্জনে সক্ষম হবেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
হাফিয ইবনু হাজার বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৃহস্পতিবার সফরে বের হতে পছন্দ করতেন, এর অর্থ এটা নয় যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শুধুমাত্র বৃহস্পতিবারেই সফর করতেন বরং তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অন্য দিনেও সফর করতেন। যেমন বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কোনো কোনো সফরে শনিবারেও বের হয়েছেন। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ২৯৫০; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬০২)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৮৯৩-[২] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একাকী সফরের বিপদাশঙ্কার ব্যাপারে আমি যা জানি, তা যদি লোকেরা জানতো, তবে কোনো আরোহীই (মুসাফির) রাতে একাকী সফরে বের হত না। (বুখারী)[1]
بَابُ اٰدَابِ السَّفَرِ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَوْ يَعْلَمُ النَّاسُ مَا فِي الْوَحْدَةِ مَا أَعْلَمُ مَا سَارَ رَاكِبٌ بِلَيْلٍ وَحْدَهُ» . رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ
ব্যাখ্যা: (لَوْ يَعْلَمُ النَّاسُ مَا فِى الْوَحْدَةِ مَا أَعْلَمُ) মানুষ যদি জানতো একাকীত্বের মধ্যে কি ক্ষতি রয়েছে আমি যা জানি তাহলে কোনো আরোহী রাতে একাকী ভ্রমণ করত না।
‘আল্লামা মুযহির বলেনঃ এককীত্বের মধ্যে ধর্মীয় ক্ষতি রয়েছে; কেননা তার সাথে জামা‘আতে সালাত আদায় করার কেউ নেই, আর দুনিয়াবী ক্ষতিও রয়েছে, কারণ প্রয়োজনে তাকে সহযোগিতা করার কেউ নেই।
ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ হাদীসের প্রকাশমান অর্থানুযায়ী বলা উচিত ছিল কেউ একাকী ভ্রমণ করত না। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো আরোহী রাতে একাকী ভ্রমণ করত না। রাতের কথা এজন্য বলা হয়েছে, কেননা রাতে ক্ষতির আশংকা অধিক। আর আরোহী এজন্য বলা হয়েছে, যাতে এ ধারণা করা না হয় যে, আরোহী তো একা নয় কারণ তার সাথে বাহন আছে। এতে এ ইঙ্গিতও রয়েছে যে, আরোহীর একাকী ভ্রমণের মধ্যে যদি ক্ষতির আশঙ্কা থাকে তাহলে পদব্রজে একাকী ভ্রমণ করার মধ্যে ক্ষতির সম্ভাবনা আরো অধিক। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
ইবনু হাজার বলেনঃ (مَا أَعْلَمُ) আমি যা জানি এর দ্বারা উদ্দেশ্য যে বিপদের কথা আমি জানি অর্থাৎ- একাকী ভ্রমণ করলে যে ধরনের বিপদ আসতে পারে- এ সম্পর্কে আমি যা জানি তা যদি ‘‘লোকেরা জানতো তাহলে কেউই একাকী ভ্রমণ করতো না’’। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৯৯৮)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৮৯৪-[৩] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো কাফিলার সাথে যদি কুকুর কিংবা ঘণ্টা থাকে, তাহলে সেই কাফিলার সাথে মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) থাকে না। (মুসলিম)[1]
بَابُ اٰدَابِ السَّفَرِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تَصْحَبُ الْمَلَائِكَةُ رُفْقَةً فِيهَا كَلْبٌ وَلَا جَرَسٌ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যা: (لَا تَصْحَبُ الْمَلَائِكَةُ رُفْقَةً) ঐ জামা‘আতের সঙ্গে মালাক (ফেরেশতা) থাকে না, অর্থাৎ রহমাতের মালাক থাকে না। এখানে সম্মানিত লেখকও সংরক্ষণকারী মালাক উদ্দেশ্য নয়। কারণ তারা সর্বদাই মানুষের সঙ্গে থাকেন এবং ‘আমলনামা লিপিবদ্ধ করেন।
(فِيهَا كَلْبٌ وَلَا جَرَسٌ) যে দলের সাথে কুকুর অথবা ঘণ্টি থাকে। এখানে ‘কুকুর’ দ্বারা এমন কুকুর উদ্দেশ্য যা শিকারী অথবা পাহারা দেয়ার কুকুর নয়। কারণ এ জাতীয় কুকুর সঙ্গে রাখা বৈধ।
ইমাম নববী বলেনঃ মালাক সঙ্গে না থাকার হিকমাত এই যে, ‘ঘণ্টি’ নিষিদ্ধ নাকূসের সমতুল্য যা কাফির সম্প্রদায় ব্যবহার করে থাকে। অথবা এর আওয়াজ অপছন্দনীয় তাই মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) তাদের সঙ্গী হয় না। (মিরকাতুল মাফাতীহ; শারহে মুসলিম ১৪ খন্ড, হাঃ ২১১৩)
এটাও বলা হয় যে, যেহেতু বিনা প্রয়োজনে কুকুর পালন করা নিষিদ্ধ, তাই যে ব্যক্তি তা সঙ্গে রাখবে শাস্তি স্বরূপ রহমাতের মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ)-কে তাদের সঙ্গ দেয়া থেকে বিরত রাখা হবে। ফলে তারা রহমাতের মালাক সঙ্গে থাকার বরকত এবং তাদের দু‘আ ও আল্লাহর আনুগত্য করতে সহযোগিতা পাওয়া হতে বঞ্চিত হবে। অথবা কুকুর নাপাক আর মালায়িকাহ্ পবিত্র তাই নাপাকের সঙ্গী হওয়া থেকে পবিত্র মালায়িকাহ্ বিরত থাকবে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫৫২)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৮৯৫-[৪] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ঘণ্টি (বা এ জাতীয় ঝুমঝুমি শব্দ) হলো শায়ত্বনের বাদ্যযন্ত্র। (মুসলিম)[1]
بَابُ اٰدَابِ السَّفَرِ
وَعَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الْجَرَسُ مَزَامِيرُ الشَّيْطَانِ» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যা: ‘‘ঘণ্টা শায়ত্বনের বাঁশী’’। ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ جَرَسُ শব্দটি একবচন হওয়া সত্ত্বেও এর খবর বহুবচন আনা হয়েছে এজন্য যে, এর আওয়াজ অবিচ্ছিন্ন যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ তা নাড়াচাড়া করে। ঘণ্টার আওয়াজকে শায়ত্বনের সাথে সম্পৃক্ত করার কারণ এই যে, আওয়াজ মানুষকে আল্লাহর জিকির এবং তার সম্পর্কে চিন্তা করা থেকে ব্যস্ত রাখে। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫৫৩)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৮৯৬-[৫] আবূ বাশীর আল আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে কোনো এক সফরে ছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজনকে পাঠিয়ে কাফিলার মধ্যে এ ঘোষণা দিতে বললেন যে, কারো উটের গলায় যেন ধনুকের ছিলার মালা অবশিষ্ট না থাকে। অথবা বলেছেন, মালা থাকলে যেন তা কেটে ফেলা হয়। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ اٰدَابِ السَّفَرِ
وَعَن أبي بشيرٍ الأنصاريِّ: أَنَّهُ كَانَ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي بَعْضِ أَسْفَارِهِ فَأَرْسَلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَسُولًا: «لَا تبقين فِي رَقَبَة بِغَيْر قِلَادَةٌ مِنْ وَتَرٍ أَوْ قِلَادَةٌ إِلَّا قُطِعَتْ»
ব্যাখ্যা: (لَا تَبْقَيَنَّ فِىْ رَقَبَةِ بِغَيْرِ قِلَادَةٌ مِنْ وَتَرٍ أَوْ قِلَادَةٌ إِلَّا قُطِعَتْ) কোনো উটের গলায় যেন ধনুকের ছিলার মালা অবশিষ্ট না থাকে। কারী বলেন, উটের গলার মালা কেটে ফেলার নির্দেশ এজন্য দেয়া হয়েছে যে, তাতে ঘণ্টা ঝুলানো থাকতো। আর তা শায়ত্বনের বাঁশি যা রহমাতের মালাক (ফেরেশতা) সঙ্গী হতে বাধা প্রদানকারী। শারহুস্ সুন্নাতে উল্লেখ আছে যে, মালিক (রহঃ)-এর ব্যাখ্যায় বলেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধনুকের ছিলা দ্বারা তৈরি মালা কেটে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন এজন্য যে, তা চোখ লাগা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ঝুলানো হত। ‘আরবের লোকেরা এ ধরনের কাজ করত এবং মনে করত যে, তা বালা-মুসীবাত হতে রক্ষা করবে। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ধরনের মালা পড়াতে নিষেধ করেছেন। আর তাদেরকে অবহিত করেছেন যে, এ ধরনের কাজ আল্লাহর কোনো ফায়সালাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। আবার কেউ বলেছেন যে, ধনুকের ছিলা দ্বারা দেয়া মালাকে কেটে ফেলতে নির্দেশ দেয়ার কারণ এই যে, মালাতে তারা ঘণ্টা ঝুলাতো, তাই এ ধরনের মালা পড়ানোকেই নিষেধ করেছেন।
ইমাম নববী বলেনঃ মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান এবং আরো অনেকে বলেছেন, এর অর্থ হলো তোমরা ধনুকের ছিলার মালা উটের গলায় পড়াবে না যাতে তা তার গলায় পেঁচিয়ে গিয়ে ফাঁসী না লাগে। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩০০৫; শারহে মুসলিম ১৪ খন্ড, হাঃ ২১১৫; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫৪৯)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৮৯৭-[৬] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা যখন শস্য-শ্যামল মৌসুমে সফর করবে, তখন জমিন হতে উটকে তার হক প্রদান করবে। আর যখন শুষ্ক মৌসুমে সফর করবে, তখন দ্রুতগতিতে চলবে। আর যদি রাতে কোথাও বিরতি নিতে হয়, তখন যান চলাচলের পথ হতে সরে অবস্থান নিবে। কেননা তা রাতে জন্তু-জানোয়ারের চলাচলের পথ ও বিষাক্ত প্রাণীর আবাসস্থল।
অপর এক বর্ণনায় আছে, তোমরা যখন শুষ্ক মৌসুমে সফর করবে, তখন (সওয়ারী দুর্বল ও ক্লান্ত হওয়ার আগেই) দ্রুত সফর শেষ করবে। (মুসলিম)[1]
بَابُ اٰدَابِ السَّفَرِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا سَافَرْتُمْ فِي الْخِصْبِ فَأَعْطُوا الْإِبِلَ حَقَّهَا مِنَ الْأَرْضِ وَإِذَا سَافَرْتُمْ فِي السَّنَةِ فَأَسْرِعُوا عَلَيْهَا السَّيْرَ وَإِذَا عَرَّسْتُمْ بِاللَّيْلِ فَاجْتَنِبُوا الطَّرِيقَ فَإِنَّهَا طُرُقُ الدَّوَابِّ وَمَأْوَى الْهَوَامِّ بِاللَّيْلِ» . وَفِي رِوَايَةٍ: «إِذَا سَافَرْتُمْ فِي السَّنَةِ فَبَادِرُوا بِهَا نِقْيَهَا» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যা: (إِذَا سَافَرْتُمْ فِى الْخِصْبِ فَأَعْطُوا الْإِبِلَ حَقَّهَا مِنَ الْأَرْضِ) যখন তোমরা উর্বর জমিনের উপর দিয়ে সফর করবে তখন তোমরা তোমাদের উটকে ঐ জমিনের প্রাপ্য হক প্রদান করবে। অর্থাৎ- উর্বর জমিনের উপর দিয়ে উট নিয়ে সফর করার সময় কিছুক্ষণের জন্য উটকে উর্বর জমিনে ছেড়ে দিবে যাতে তার লতা-পাতা ও ঘাস খেতে পারে।
(وَإِذَا سَافَرْتُمْ فِى السَّنَةِ فَأَسْرِعُوْا عَلَيْهَا السَّيْرَ) যখন অনুর্বর জমিনের উপর দিয়ে সফর করবে তখন তোমরা উক্ত এলাকা দ্রুত অতিক্রম করবে, অর্থাৎ অনাবৃষ্টির কারণে জমিনে লতা-পতা না থাকলে অথবা জমিন অনুর্বর হওয়ার কারণে তাতে গাছ-পালা ও ঘাস না থাকলে তোমরা দ্রুত ঐ এলাকা ছেড়ে চলে আসবে। যাতে তোমাদের উট দুর্বল হওয়ার পূর্বেই তোমরা তোমাদের আবাসে পৌঁছতে সক্ষম হও।
(فَاجْتَنِبُوا الطَّرِيْقَ فَإِنَّهَا طُرُقُ الدَّوَابِّ) তোমরা রাস্তায় অবতরণ করা থেকে বিরত থাকবে, কেননা রাতের বেলায় তা কীট-পতঙ্গের রাস্তা এবং তাদের আবাস। ইমাম নববী বলেনঃ শেষ রাতে বিশ্রামের জন্য বাহন থেকে অবতরণ করাকে (تَعْرِيسُ) বলা হয়। এটাও বলা হয় যে, বিশ্রামের জন্য অবতরণ করাকেই (تَعْرِيسُ) বলা হয়। তা দিন বা রাতের যে কোনো অংশেই হোক না কেন। মোটকথা হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাস্তা অবতরণ করা থেকে বারণ করেছেন। তার কারণ এই যে, কীট-পতঙ্গ ও বিষাক্ত এবং হিংস্র প্রাণী রাতের বেলা রাস্তায় চলা-ফেরা করে থাকে রাস্তা ভ্রমণকারীদের থেকে পরে যাওয়া দ্রব্য আহার করার জন্য। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাস্তা অবতরণ না করে রাস্তা ছেড়ে অবতরণ করতে বলেছেন যাতে মানুষ বিষাক্ত হিংস্র প্রাণীর আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে পারে।
(فَبَادِرُوْا بِهَا نِقْيَهَا) উটের মগজ তরতাজা থাকতেই তোমরা দ্রুত তা অতিক্রম কর। উটের শক্তি ও সক্ষমতা থাকতেই তোমরা অনুর্বর জমিন অতিক্রম কর। (মিরকাতুল মাফাতীহ; শারহে মুসলিম ১৩ খন্ড, হাঃ ১৯২৬; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫৬৬; তুহফাতুল আহওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৮৫৮)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৮৯৮-[৭] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমরা কোনো এক সফরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলাম। এমন সময় জনৈক ব্যক্তি একটি দুর্বল উষ্ট্রীতে সওয়ারী হয়ে সেখানে উপস্থিত হলো এবং তাকে ডানে-বামে ঘুরাতে লাগল। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত সঙ্গীদেরকে উদ্দেশে বললেন, তোমাদের যার কাছেই একটি অতিরিক্ত সওয়ারী আছে, সে যেন যার কাছে সওয়ারী নেই তাকে দান করে দেয়। আর যার কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্য-সামগ্রী আছে, সেও যেন তা ঐ ব্যক্তিকে দিয়ে দেয় যার কাছে কোনো আহার্য নেই। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বিভিন্ন বিষয়ের ব্যাপারে এমনভাবে বর্ণনা করতে লাগলেন যে, আমরা মনে করলাম প্রয়োজনাতিরিক্ত জিনিসের উপর আমাদের কারো কোনো প্রকার অধিকার নেই। (মুসলিম)[1]
بَابُ اٰدَابِ السَّفَرِ
وَعَن أبي سعيد الْخُدْرِيّ قَالَ: بَيْنَمَا نَحْنُ فِي سَفَرٍ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذ جَاءَهُ رَجُلٌ عَلَى رَاحِلَةٍ فَجَعَلَ يَضْرِبُ يَمِينًا وَشِمَالًا فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ كَانَ مَعَهُ فَضْلُ ظَهْرٌ فَلْيَعُدْ بِهِ عَلَى مَنْ لَا ظَهْرَ لَهُ وَمَنْ كَانَ لَهُ فَضْلُ زَادٍ فَلْيَعُدْ بِهِ عَلَى مَنْ لَا زَادَ لَهُ» قَالَ: فَذَكَرَ مِنْ أَصْنَافِ الْمَالِ حَتَّى رَأَيْنَا أَنَّهُ لَا حَقَّ لأحدٍ منا فِي فضل. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: (مَنْ كَانَ مَعَه فَضْلُ ظَهْرٍ فَلْيَعُدْ بِه عَلٰى مَنْ لَا ظَهْرَ لَه) যার অতিরিক্ত বাহন আছে, সে তার অতিরিক্ত বাহনটি তাকে দিয়ে দেয় যার বাহন নেই।
(فَذَكَرَ مِنْ أَصْنَافِ الْمَالِ حَتّٰى رَأَيْنَا أَنَّه لَا حَقَّ لِأَحَدٍ مِنَّا فِىْ فَضْلٍ) তিনি বিভিন্ন মালের কথা উল্লেখ করে অতিরিক্ত মাল দান করতে বললেন এতে আমাদের ধারণা হলো যে, অতিরিক্ত মালে আমাদের কোনো অধিকার নেই। অর্থাৎ তিনি বিভিন্ন প্রকারে মালের নাম উল্লেখপূর্বক সকল প্রকার মালের প্রয়োজনের অতিরিক্ত অংশ দান করার আদেশ করলেন। তাতে আমাদের মনে ধারণা জন্মালো যে, আমাদের কারো জন্যই প্রয়োজনের অতিরিক্ত মাল রাখার কোনো অধিকার নেই। অত্র হাদীসে মুখাপেক্ষী ব্যক্তিকে সাহায্য সহযোগিতার জন্য উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি সফরের অবস্থায় মালের মুখাপেক্ষী হলে তাকে তার প্রয়োজন মিটানোর জন্য দান করা জরুরী যদিও সে স্বদেশে ধনী হোক না কেন। এমতাবস্থায় তাকে যাকাতের মাল দেয়াও বৈধ এবং তার জন্য তা গ্রহণ করাও বৈধ। (মিরকাতুল মাফাতীহ; শারহে মুসলিম ১২ খন্ড, হাঃ ১৭২৮)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৮৯৯-[৮] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সফর হলো ’আযাবের একটি অংশ মাত্র; যা তোমাদেরকে নিদ্রা, পানাহার হতে বিরত রাখে। সুতরাং যখনই কারো সফরের প্রয়োজন পূরণ হয়ে যায়, তখনই সে যেন অবিলম্বে পরিবার-পরিজনের নিকট ফিরে আসে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ اٰدَابِ السَّفَرِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «السَّفَرُ قِطْعَةٌ مِنَ الْعَذَابِ يَمْنَعُ أَحَدَكُمْ نَوْمَهُ وَطَعَامَهُ وَشَرَابه فَإِذا قضى نهمه من وَجهه فليعجل إِلَى أَهله»
ব্যাখ্যা: (اَلسَّفَرُ قِطْعَةٌ مِنَ الْعَذَابِ) ‘‘সফর আযাবের একটি অংশ’’। ইমাম নববী বলেনঃ সফরকে আযাবের অংশ বলার কারণ এই যে, তাতে কষ্ট ক্লান্তি, রোদ ও ঠাণ্ডা সহ্য করার অসুবিধা ভোগ করা এবং ভয় আতঙ্ক সর্বোপরি স্বজনদের পরিত্যাগ করে অসহনীয় অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়, যা প্রকৃতপক্ষেই ‘আযাব।
(فَإِذَا قَضٰى نَهْمَتَه مِنْ وَجْهِه فَلْيُعَجِّلْ إِلٰى أَهْلِه) মুসাফির যখন তার সফরের প্রয়োজন মিটাবে সে যেন দ্রুত তার স্বীয় পরিবারের নিকট ফিরে আসে।
ইমামা খত্ত্বাবী বলেনঃ অত্র হাদীসে আবাসে অবস্থান করার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। যাতে জুমু‘আহ্ ও জামা‘আত না ছুটে যায় এবং পরিবার-পরিজন ও নিকটবর্তীদের হক বিনষ্ট না হয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ; শারহে মুসলিম ১৩ খন্ড, হাঃ ১৯২৭)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৯০০-[৯] ’আব্দুল্লাহ ইবনু জা’ফার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই সফর হতে ফিরে আসতেন, তখন তাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য স্বীয় পরিবারস্থ ছেলে-মেয়েদেরকে উপস্থিত করা হতো। একদিন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সফর হতে আসলেন, তখন তিনি আমাকে তার সামনে বসিয়ে দিলেন। অতঃপর ফাতিমা (রাঃ)-এর পুত্রদ্বয়ের কোনো একজনকে আনা হলে তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে নিজের পিছনে বসালেন। তিনি (’আব্দুল্লাহ) বলেন, আমরা এমন অবস্থায় মদীনায় প্রবেশ করলাম যে, (আমরা) এক সওয়ারীতে তিনজন আরোহী ছিলাম। (মুসলিম)[1]
بَابُ اٰدَابِ السَّفَرِ
وَعَن عبدِ اللَّهِ بنِ جعفرٍ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا قَدِمَ مَنْ سَفَرٍ تُلُقِّيَ بِصِبْيَانِ أَهْلِ بَيْتِهِ وَإِنَّهُ قَدِمَ مَنْ سَفَرٍ فَسُبِقَ بِي إِلَيْهِ فَحَمَلَنِي بَيْنَ يَدَيْهِ ثُمَّ جِيءَ بِأَحَدِ ابْنَيْ فَاطِمَةَ فَأَرْدَفَهُ خَلْفَهُ قَالَ: فَأُدْخِلْنَا المدينةَ ثلاثةَ على دَابَّة. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: (تُلُقِّىَ بِصِبْيَانِ أَهْلِ بَيْتِه) তাঁকে পরিবারের শিশুদের দ্বারা স্বাগতম জানানো হত। ইমাম নববী বলেনঃ আগত মুসাফিরকে শিশুদের দ্বারা স্বাগতম জানানো সুন্নাত। আর আগমনকারী ব্যক্তির জন্য সুন্নাত হলো ঐ শিশুদেরকে স্বীয় বাহনে উঠিয়ে নিয়ে আসা যারা মুসাফিরকে স্বাগতম জানাতে যায়। (শারহে মুসলিম ১৫শ খন্ড, হাঃ ২৪২৮)
আল্লামা মুনযিরী বলেনঃ অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, বাহনের পিছনে যাত্রী উঠানো বৈধ এবং একই প্রাণীর উপরে তিনজন আরোহণ করা বৈধ যদি তা ঐ পশুর জন্য কষ্টকর না হয়। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫৬৩)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৯০১-[১০] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন তিনি এবং আবূ ত্বলহাহ্ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে (খায়বার অভিযান শেষে মদীনায়) ফিরে আসেন। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে তখন একই সওয়ারীতে তাঁর পিছনে সফিয়্যাহ্ (রাঃ) বসা ছিলেন। (বুখারী)[1]
بَابُ اٰدَابِ السَّفَرِ
وَعَن أنسٍ: أَنَّهُ أَقْبَلَ هُوَ وَأَبُو طَلْحَةَ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَفِيَّةُ مُرْدِفَهَا عَلَى رَاحِلَته. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার সাহাবীগণের এ আগমন ছিল খায়বার থেকে। ‘শারহুস্ সুন্নাহ্’তে আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, আমরা খায়বার হতে আগমন করলাম। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো এক স্ত্রী তার বাহনের পিছনে ছিলেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, স্বীয় বাহনের পিছনে নিজের স্ত্রীকে বহন করা কোনো দোষণীয় বিষয় নয়। অবশ্যই স্ত্রীকে পর্দা করিয়ে নিতে হবে। (সম্পাদক)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৯০২-[১১] উক্ত রাবী [আনাস (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের বেলায় বাড়ী ফিরতেন না, বরং তিনি সকালে কিংবা সন্ধ্যায় ঘরে প্রবেশ করতেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ اٰدَابِ السَّفَرِ
وَعَنْهُ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يَطْرُقُ أَهْلَهُ لَيْلًا وَكَانَ لَا يَدْخُلُ إِلَّا غُدْوَةً أَوْ عَشِيَّةً
ব্যাখ্যা: (كَانَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ لَا يَطْرُقُ أَهْلَه لَيْلًا) ‘‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সফর থেকে আগমন করে) রাতের বেলা তার পরিবারের নিকট যেতেন না।’’ ইমাম নববী বলেনঃ যে ব্যক্তি দীর্ঘ সফর শেষে বাড়ী ফিরবে তার জন্য এটা অপছন্দনীয় যে, সে হঠাৎ করে রাতের বেলা তার স্ত্রীর নিকট গমন করবে। তবে যার সফর নিকটবর্তী কোনো জায়গায় হয় এবং তার স্ত্রী আশা করে যে, তার স্বামী রাতেই ফিরে আসবে তার জন্য রাতের বেলা স্ত্রীর নিকট প্রবেশ করতে কোনো ক্ষতি নেই। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৭১২)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৯০৩-[১২] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের মধ্যে কেউ যখন দীর্ঘদিন সফরে থাকার দরুন পরিবারবর্গ হতে দূরে থাকে, তখন সে যেন রাতের বেলায় পরিবারের কাছে (ঘরে) প্রবেশ না করে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ اٰدَابِ السَّفَرِ
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «إِذا طَال أَحَدُكُمُ الْغَيْبَةَ فَلَا يَطْرُقْ أَهْلَهُ لَيْلًا»
ব্যাখ্যা: রাতের বেলা স্ত্রীর নিকট মুসাফির ব্যক্তি কেন প্রবেশ করবে না, এর কারণ পরবর্তী হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৯০৪-[১৩] উক্ত রাবী [জাবির (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (সফর হতে ফিরে) যখন তুমি রাতে ঘরে প্রবেশ করতে ইচ্ছা করবে, তখন তুমি স্বীয় স্ত্রীর কাছে যেয়ো না। যতক্ষণ না স্বামী-সংস্রবহীনা স্ত্রী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হতে পারে এবং অবিন্যস্ত মাথায় চিরুনী দিয়ে পরিপাটি হতে পারে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ اٰدَابِ السَّفَرِ
وَعَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِذَا دَخَلْتَ لَيْلًا فَلَا تَدَخُلْ عَلَى أهلك حَتَّى تستحد المغيبة وتمتشط الشعثة»
ব্যাখ্যা: (فَلَا تَدَخُلْ عَلٰى اَهْلِكَ حَتّٰى تَسْتَحِدَّ الْمَغِيْبَةَ وَتَمْتَشِطَ الشِّعْثَةَ) ‘‘সফর থেকে আগমন করে রাতের বেলায়’’ তোমার স্ত্রীর নিকট যাবে না যতক্ষণ না সে ক্ষক্ষারকার্য সম্পদান করে এবং এলোমেলো চুল পরিপাটি না করে। তূরিবিশতী বলেনঃ ক্ষক্ষŠরকার্য দ্বারা উদ্দেশ্য লজ্জাস্থানের লোম পরিষ্কার করা তা যেভাবেই হোক। অর্থাৎ স্ত্রী যেন স্বামীকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন অবস্থায় স্বাগতম জানাতে পারে, এজন্যই হঠাৎ করে রাতের বেলা স্ত্রীর নিকট যেতে নিষেধ করা হয়েছে। অতএব স্ত্রী যদি স্বামীর আগমনের কথা আগে থেকেই জানতে পারে তাহলে স্ত্রীর নিকট রাতের বেলা প্রবেশ করতে সমস্যা নেই। কেননা নিষেধ করার কারণ বিদূরিত হয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ ৭ম খন্ড, ৬১৬ পৃঃ ৬১৬; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭৭৫)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৯০৫-[১৪] উক্ত রাবী [জাবির (রাঃ)] হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সফর হতে মদীনায় ফিরে আসলেন, তখন একটি উট অথবা গরু যাবাহ করে খাওয়ালেন। (বুখারী)[1]
بَابُ اٰدَابِ السَّفَرِ
وَعَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمَّا قَدِمَ الْمَدِينَةَ نَحَرَ جَزُورًا أَوْ بَقَرَةً. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: ‘‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় আগমন করলেন তখন তিনি একটি উট যাবাহ করলেন।’’ অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হিজরত করে মদীনায় আগমন করলেন অথবা কোনো যুদ্ধ শেষে মদীনায় এসে উপস্থিত হলেন তখন তিনি উট যাবাহ করলেন। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ সফর থেকে আগমন করার পর সাক্ষাৎ করতে আসা লোকজনদের জন্য মেহমানদারী করা সুন্নাত। ইবনুল মালিক বলেনঃ আগমনের পর মেহমানদারী করা সুন্নাত। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
ইবনু বাত্ত্বল বলেনঃ ইমাম বা সরদার সফর থেকে আগমন করার পর তার সঙ্গীদের জন্য খাবারের আয়োজন করা সালাফদের নিকট মুস্তাহাব। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩০৮৯)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৯০৬-[১৫] কা’ব ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফর হতে দিনের পূর্বাহ্নেই ফিরে আসতেন। আর যখনই আসতেন, তখন সর্বপ্রথম মসজিদে প্রবেশ করে দু’ রাক্’আত নফল সালাত আদায় করতেন। অতঃপর সাক্ষাৎপ্রার্থী লোকেদের জন্য কিছু সময় অবস্থান করতেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ اٰدَابِ السَّفَرِ
وَعَنْ كَعْبِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ: كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يَقْدَمُ مِنْ سَفَرٍ إِلَّا نَهَارًا فِي الضُّحَى فَإِذَا قَدِمَ بَدَأَ بِالْمَسْجِدِ فَصَلَّى فِيهِ رَكْعَتَيْنِ ثمَّ جلس فِيهِ للنَّاس
ব্যাখ্যা: (فَإِذَا قَدِمَ بَدَأَ بِالْمَسْجِدِ فَصَلّٰى فِيهِ رَكْعَتَيْنِ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফর থেকে ফিরে এসে প্রথমে মসজিদে প্রবেশ করতেন এবং দুই রাক্‘আত সালাত আদায় করতেন। অর্থাৎ তিনি প্রথমে বাড়ীতে প্রবেশ না করে মসজিদে প্রবেশ করতেন, অতঃপর তাহিয়্যাতুল মসজিদ দুই রাক্‘আত সালাত আদায় করার পর বসতেন।
(جَلَسَ فِيهِ لِلنَّاسِ) অতঃপর তাতেই লোকেদের জন্য বসতেন, অর্থাৎ লোকেদের সাথে কথা বলার জন্য এবং তাদের প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য মসজিদেই বসতেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭৭৮)
পরিচ্ছেদঃ ২. প্রথম অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৯০৭-[১৬] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক সফরে আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে ছিলাম। সফর হতে মদীনায় ফিরে আসার পর তিনি আমাকে বললেন- যাও, মসজিদে গিয়ে দু’ রাক্’আত সালাত আদায় করে নাও। (বুখারী)[1]
بَابُ اٰدَابِ السَّفَرِ
وَعَن جَابر قَالَ: كُنْتُ مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي سَفَرٍ فَلَمَّا قَدِمْنَا الْمَدِينَةَ قَالَ لِي: «ادْخُلِ الْمَسْجِدَ فَصَلِّ فِيهِ رَكْعَتَيْنِ» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: فَلَمَّا قَدِمْنَا الْمَدِينَةَ قَالَ لِىْ : اُدْخُلِ الْمَسْجِدَ فَصَلِّ فِيهِ رَكْعَتَيْنِ (জাবির বলেন) আমরা যখন মদীনায় আগমন করলাম, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন মসজিদে প্রবেশ করে সেখানে দুই রাক্‘আত সালাত আদায় করো। অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, মুসাফিরের জন্য বাড়ীতে প্রবেশ করার আগে মসজিদে প্রবেশ করে দুই রাক্‘আত সালাত আদায় করা মুস্তাহাব। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৯০৮-[১৭] সখর ইবনু ওয়াদা’আহ্ আল গামিদী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’আ করেনঃ হে আল্লাহ! আমার উম্মাতকে ভোরে বরকত ও প্রাচুর্য দান কর। রাবী বলেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখনই কোনো ছোট বা বড় সেনাদল পাঠাতেন, তখন তা দিনের প্রথমাংশেই পাঠাতেন। বর্ণনাকারী সখর একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। সুতরাং তিনিও তার ব্যবসা-বাণিজ্যের মালামাল দিনের প্রথমভাগেই পাঠাতেন। ফলে তিনি প্রচুর ধনবান ও সম্পদশালী হয়েছিলেন। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ ও দারিমী)[1]
عَن صخْرِ بن وَداعةَ الغامِديِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اللَّهُمَّ بَارِكْ لِأُمَّتِي فِي بُكُورِهَا» وَكَانَ إِذا بعثَ سريَّةً أوْ جَيْشًا بَعَثَهُمْ مِنْ أَوَّلِ النَّهَارِ وَكَانَ صَخْرٌ تَاجِرًا فَكَانَ يَبْعَثُ تِجَارَتَهُ أَوَّلَ النَّهَارِ فَأَثْرَى وَكَثُرَ مالُه. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد والدارمي
ব্যাখ্যা: فَلَمَّا قَدِمْنَا الْمَدِينَةَ قَالَ لِىْ : اُدْخُلِ الْمَسْجِدَ فَصَلِّ فِيهِ رَكْعَتَيْنِ (জাবির বলেন) আমরা যখন মদীনায় আগমন করলাম, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন মসজিদে প্রবেশ করে সেখানে দুই রাক্‘আত সালাত আদায় করো। অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, মুসাফিরের জন্য বাড়ীতে প্রবেশ করার আগে মসজিদে প্রবেশ করে দুই রাক্‘আত সালাত আদায় করা মুস্তাহাব। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৯০৯-[১৮] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা রাতে সফরে বের হও। কেননা রাতের বেলায় জমিন সংকুচিত হয়। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «عَلَيْكُمْ بِالدُّلْجَةِ فَإِنَّ الْأَرْضَ تُطوَى بالليلِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: ‘‘তোমরা রাতে ভ্রমণ কর, কেননা রাতে জমিনকে সংকুচিত করা হয়’’। ‘আল্লামা মুযহির (রহ) বলেনঃ এর অর্থ হলো তোমরা শুধু দিনে ভ্রমণ করেই তুষ্ট থেকো না বরং রাত্রেও সফর করবে। কেননা রাত্রের সফর সহজ। কারণ ভ্রমণকারী ধারণা করে যে, সে অল্প রাস্তা অতিক্রম করেছে, প্রকৃতপক্ষে সে অল্প সময়ে অনেক রাস্তা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫৬৮)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৯১০-[১৯] ’আমর ইবনু শু’আয়ব তার পিতার মাধ্যমে তার দাদা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একজন আরোহী (সফরকারী) এক শায়ত্বন, দু’জন আরোহী দুই শায়ত্বন, কিন্তু তিনজন হলো একটি পরিপূর্ণ জামা’আত। (মালিক, তিরমিযী, আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
وَعَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الرَّاكِبُ شَيْطَانٌ وَالرَّاكِبَانِ شَيْطَانَانِ وَالثَّلَاثَةُ رَكبٌ» . رَوَاهُ مالكٌ وَالتِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: (الرَّاكِبُ شَيْطَانٌ) ‘‘একা ভ্রমণকারী আরোহী শায়ত্বন’’। ‘আল্লামা মুযহির (রহঃ) বলেনঃ অর্থাৎ- একা একা ভ্রমণ করা নিষিদ্ধ। অনুরূপভাবে দু’জন ভ্রমণকারী দু’টো শায়ত্বন। আর যে ব্যক্তি নিষিদ্ধ কাজ করে সে শায়ত্বনের আনুগত্য করে। আর যে ব্যক্তি শায়ত্বনের আনুগত্য করে সে যেন নিজেই একটি শায়ত্বন। এজন্যই একা ভ্রমণকারীকে শায়ত্বন বলা হয়েছে।
ইমাম খত্ত্বাবী বলেনঃ একা ভ্রমণকারী ব্যক্তি যদি সফরে মারা যায় তাহলে তার নিকট এমন কোনো ব্যক্তি উপস্থিত পাওয়া যাবে না যে, তাকে গোসল দেয়াবে এবং দাফন করবে। আর তার নিকট এমন ব্যক্তিও পাওয়া যাবে না যার নিকট তার মাল সম্পর্কে ওয়াসিয়্যাত করতে পারে এবং সফরে তার রেখে যাওয়া মাল তার পরিবারের নিকট পৌঁছিয়ে দিতে পারে এবং তার সংবাদ তার পরিবারের নিকট পৌঁছাতে পারে। আর যদি সফরে তিনজন একত্রে থাকে তাহলে পরস্পরে তাদের কাজে সহযোগিতা করতে পারবে এবং জামা‘আত সহকারে সালাত আদায় করতে পারবে এতে করে তারা জামা‘আতে সালাত আদায় করার সাওয়াবও সংরক্ষণ করতে সক্ষম হবে। তাইতো তিনজনের কমে সফর করতে নিষেধ করা হয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬০৪; তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৬৭৪)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৯১১-[২০] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তিনজন লোক যখন সফরে বের হবে, তখন তারা যেন একজনকে আমীর (নেতা) নির্বাচন করে নেয়। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيُّ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِذَا كَانَ ثَلَاثَةٌ فِي سَفَرٍ فَلْيُؤَمِّرُوا أحدهم» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (فَلْيُؤَمِّرُوْا أَحَدَهُمْ) তাদের একজনকে আমীর বানিয়ে নিবে, অর্থাৎ- যখন জামা‘আতবদ্ধভাবে সফর করবে (যার নিম্নসংখ্যা তিনজন) তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি উত্তম তাকে আমীর নিযুক্ত করবে।
‘শারহেস্ সুন্নাহ্’তে উল্লেখ করা হয়েছে এ নির্দেশ দেয়ার কারণ এই যে, যাতে তারা সম্মিলিতভাবে কাজ করতে পারে এবং তাদের মধ্যে কোনো ধরনের মতভেদ সৃষ্টি না হতে পারে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
ইমাম খত্ত্বাবী বলেনঃ অত্র হাদীসে এ প্রমাণ পাওয়া যায় যে, যদি দু’জন ব্যক্তি তৃতীয় কোনো এক ব্যক্তিকে তাদের দু’জনের মধ্যে কোনো বিষয়ে ফায়সালা করার জন্য শালিস নিযুক্ত করে এবং ঐ তৃতীয় ব্যক্তি ন্যায়সঙ্গতভাবে ফায়সালা করে তাহলে তার ফায়সালা কার্যকারী করা যাবে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬০৬)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৯১২-[২১] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সর্বোত্তম সফরসঙ্গী চারজন। উত্তম (ক্ষুদ্র) সৈন্যবাহিনী চারশত জন, উত্তম (বৃহৎ) সৈন্যবাহিনী চারহাজার জন। আর বারো হাজারের কোনো সৈন্য বাহিনী স্বল্প সংখ্যার কারণে কক্ষনো বিজিত হয় না। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ ও দারিমী; ইমাম তিরমিযী বলেন, হাদীসটি গরীব)[1]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «خَيْرُ الصَّحَابَةِ أَرْبَعَةٌ وَخَيْرُ السَّرَايَا أَرْبَعُمِائَةٍ وَخَيْرُ الْجُيُوشِ أَرْبَعَةُ آلَافٍ وَلَنْ يُغْلَبَ اثْنَا عَشَرَ أَلْفًا مِنْ قِلَّةٍ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ وَالدَّارِمِيُّ وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ: هَذَا حَدِيث غَرِيب
ব্যাখ্যা: (خَيْرُ الصَّحَابَةِ أَرْبَعَةٌ) ‘‘চারজনের দল উত্তম দল’’ অর্থাৎ তিনজনের বেশী লোক যে দলে থাকে সে দল উত্তম দল।
আবূ হামিদ বলেনঃ মুসাফির ব্যক্তি কখনো বাহন ও প্রয়োজন মুক্ত হয় না। মুসাফির যদি মাত্রা তিন হয় আর বাহনও সংরক্ষণ করতে হয় এবং প্রয়োজনও মিটাতে হয় তাহলে একজন প্রয়োজন মিটাতে গেলে এবং একজন বাহন সংরক্ষণে নিয়োজিত থাকলে মুসাফির একাকী হয়ে যাবে যার সাথে কোনো সঙ্গী থাকবে না ফলে সে আশংকামুক্ত থাকতে পারবে না এবং সঙ্গী না থাকার কারণে অন্তরের সংকীর্ণতা থেকেও মুক্ত থাকবে না।
মুযহির (রহ) বলেনঃ সঙ্গী যদি তিনজন না হয়ে চারজন হয় তবে তা উত্তম। কেননা সফরসঙ্গী সর্বসাকূল্যে তিনজন হলে তাদের মধ্যে একজন যদি অসুস্থ হয়ে পরে এবং সে তার কোনো এক সফরসঙ্গীকে তার ওয়াসী (ওয়াসিয়্যাত বাস্তবায়নকারী) নিযুক্ত করতে চায় তাহলে তার এই ওয়াসিয়্যাত সম্পর্কে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য একজন মাত্র লোক বাকী থাকলো যা ওয়াসিয়্যাতের ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। আর যদি চারজন থাকে তাহলে তার ওয়াসিয়্যাতের সাক্ষী হওয়ার জন্য দু’জন লোক বাকী থাকলো। যা সাক্ষী হওয়ার জন্য যথেষ্ট। সফরসঙ্গী যখন অধিক হয় পরস্পরে সহযোগিতা করাও সহজ হয়। অনুরূপ অধিক সংখ্যক লোকের একত্রে সালাত আদায় করাও অধিক উত্তম।
(وَلَنْ يُغْلَبَ اثْنَا عَشَرَ أَلْفًا مِنْ قِلَّةٍ) বারো হাজার সৈন্যের দল সংখ্যাল্পতার জন্য পরাজয় বরণ করবে না, অর্থাৎ যে সৈন্য দলের সংখ্যা বারো হাজার হয় ঐ সেনা দল যদি পরাজয় বরণ করে তাহলে সে পরাজয়টা সংখ্যাল্পতার জন্য হবে না, অন্য কোনো কারণে হবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬০৮)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৯১৩-[২২] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে কাফিলার পিছনে থাকতেন, যেন তিনি দুর্বল সওয়ারীকে দ্রুত হাঁকিয়ে নিতে পারেন এবং অসমর্থ সওয়ারীকে নিজের সওয়ারীতে বসিয়ে নিতে পারেন এবং সর্বোপরি পুরো কাফিলার জন্য দু’আ করতে থাকতেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَخَلَّفُ فِي الْمَسِيرِ فَيُزْجِي الضَّعِيفَ وَيُرْدِفُ ويدْعو لَهُم. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (كَانَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ يَتَخَلَّفُ فِى الْمَسِيرِ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভ্রমণে পিছনে থেকে যেতেন, অর্থাৎ- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ভ্রমণে বের হতেন তখন তিনি তার সঙ্গীদের থেকে পিছনে থেকে যেতেন নম্রতার বহিঃপ্রকাশের জন্য এবং তাদের সহযোগিতা করার জন্য।
(فَيُزْجِى الضَّعِيفَ) দুর্বলকে পরিচালনা করতেন, অর্থাৎ- যার বাহন দুর্বল হয়ে পরতো তার বাহনকে পরিচালনা করতেন অন্যান্য সফর সঙ্গীদের সাথে মিলিত হওয়ার জন্য।
(وَيُرْدِفُ) তার বাহনের পিছনে চড়াতেন, অর্থাৎ- পদব্রজের কোনো ব্যক্তি দুর্বল হয়ে পড়লে তাকে স্বীয় বাহনের পিছনে উঠিয়ে নিতেন।
(وَيَدْعُوْ لَهُمْ) তাদের জন্য দু‘আ করতেন, অর্থাৎ- তাদের সকলের জন্য দু‘আ করতেন, অথবা দুর্বলদের সহযোগিতা করতেন ও অন্যদের জন্য দু‘আ করতেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬৩৬)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৯১৪-[২৩] আবূ সা’লাবাহ্ আল খুশানী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাহাবীগণ যখন সফরে কোথাও অবতরণ করতেন, তখন তাঁরা পাহাড়ের সংকীর্ণপথ ও পাহাড়ী এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে অবস্থান করতেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের এভাবে সংকীর্ণপথ ও পাহাড়ী এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে অবস্থান করা মূলত শায়ত্বনের কাজ। রাবী বলেন, এরপর হতে লোকেরা যখনই কোনো জায়গায় অবতরণ করত, তখন তারা পরস্পর এমনভাবে মিলেমিশে অবস্থান করত যে, একখানা কাপড় তাদের উপর জড়িয়ে দিলে সকলেই আবৃত হতো। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن أبي ثعلبَةَ الخُشَنيِّ قَالَ: كَانَ النَّاسُ إِذَا نَزَلُوا مَنْزِلًا تَفَرَّقُوا فِي الشِّعَابِ وَالْأَوْدِيَةِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ تَفَرُّقَكُمْ فِي هَذِهِ الشِّعَابِ وَالْأَوْدِيَةِ إِنَّمَا ذَلِكُمْ مِنَ الشَّيْطَانِ» . فَلَمْ يَنْزِلُوا بَعْدَ ذَلِكَ مَنْزِلًا إِلَّا انْضَمَّ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ حَتَّى يُقَالَ: لَوْ بُسِطَ عَلَيْهِمْ ثوبٌ لعمَّهم. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (إِنَّمَا ذٰلِكُمْ مِنَ الشَّيْطَانِ) তোমাদের এ কাজ শায়ত্বনের পক্ষ থেকে অর্থাৎ তোমাদের বিচ্ছিন্নতা শায়ত্বনের পক্ষ থেকে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদেরকে ভয় দেখানোর জন্য এবং তার শত্রুদের তাদের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেয়ার জন্য। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬২৫)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৯১৫-[২৪] ’আব্দুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বদর যুদ্ধের দিন আমাদের প্রতি তিনজনের জন্যে একটি উটের ব্যবস্থা ছিল, এমনিভাবে আবূ লুবাবাহ্ ও ’আলী ইবনু আবূ ত্বালিব (রাঃ) ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আরোহী। রাবী বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পায়ে হাঁটার পালা আসতো তখন তারা বলতেন, আপনার হাঁটার পালায় আমরাই হাঁটব। উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, আমি কি তোমাদের তুলনায় বেশী শক্তিশালী নই আর সাওয়াব প্রত্যাশাকারী হিসেবে আমি তোমাদের চেয়ে বেশী মুখাপেক্ষী। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: كُنَّا يَوْمَ بَدْرٍ كُلَّ ثَلَاثَةٍ عَلَى بَعِيرٍ فَكَانَ أَبُو لُبَابَةَ وَعَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ زَمِيلَيْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: فَكَانَتْ إِذَا جَاءَتْ عُقْبَةُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَا: نَحْنُ نَمْشِي عَنْكَ قَالَ: «مَا أَنْتُمَا بِأَقْوَى مِنِّي وَمَا أَنَا بِأَغْنَى عَنِ الْأَجْرِ مِنْكُمَا» . رَوَاهُ فِي شرح السّنة
ব্যাখ্যা: (مَا أَنْتُمَا بِأَقْوٰى مِنِّىْ وَمَا أَنَا بِأَغْنٰى عَنِ الْأَجْرِ مِنْكُمَا) দুনিয়াতে তোমরা আমার চাইতে অধিক শক্তিশালী নও এবং আমিও তোমাদের চেয়ে সাওয়াব হতে অমুখাপেক্ষী নই। অর্থাৎ- দুনিয়াতে তোমরা আমাকে পরিত্যাগ করে অধিক লাভবান হতে পারবে না, যেহেতু তোমরা আমার চাইতে অধিক শক্তিশালী নও। আর তোমাদের মাধ্যমে যে সাওয়াব অর্জন করবে। পরকালে আমি সে সাওয়াব হতে অমুখাপেক্ষী নই। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেন, নাবী অত্র হাদীসে তার নম্রতা এবং তার সঙ্গীদের প্রতি সহানুভূতির চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৯১৬-[২৫] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা নিজেদের জন্তু-জানোয়ারের পিঠকে মিম্বার বানিয়ে নিয়ো না। আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে এজন্য তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যেন তোমাদেরকে তারা যথাস্থানে পৌঁছে দেয়, যেখানে তোমরা অক্লান্ত কষ্ট ব্যতীত পৌঁছতে সক্ষম নও। আর আল্লাহ তা’আলা জমিনকেও তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন; সুতরাং তার উপরে তোমাদের অবস্থানের মাধ্যমে প্রয়োজন পূর্ণ করে নাও। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا تَتَّخِذُوا ظُهُورَ دَوَابِّكُمْ مَنَابِرَ فَإِنَّ اللَّهَ تَعَالَى إِنَّمَا سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُبَلِّغَكُمْ إِلَى بَلَدٍ لَمْ تَكُونُوا بَالِغِيهِ إِلَّا بِشِقِّ الْأَنْفُسِ وَجَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ فَعَلَيْهَا فَاقْضُوا حَاجَاتِكُمْ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যা: (لَا تَتَّخِذُوْا ظُهُوْرَ دَوَابِّكُمْ مَنَابِرَ) পশুর পিঠকে তোমরা মিম্বার বানাবে না। অর্থাৎ তোমরা পশু থামিয়ে তার পিঠে বসে বেচাকেনা বা এ জাতীয় কোনো কথা বলবে না। বরং তোমরা পশুর পিঠ থেকে নেমে তোমাদের প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে পুনরায় তার পিঠে আরোহণ করবে। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ এখানে مَنَابِرَ শব্দ দ্বারা দাঁড়ানোর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। কেননা ‘আরবের লোকেরা যখন ভাষণ দিত তখন মিম্বাবের উপর দাঁড়াতো। আর ক্বিয়াম অর্থাৎ দাঁড়ানো দ্বারা উদ্দেশ্য থামানো।
ইমাম খত্ত্বাবী বলেনঃ এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বাহনের উপর দাঁড়িয়ে ভাষণ দিয়েছেন। এ থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, এমন কোনো প্রয়োজন যদি দেখা দেয় যা জমিনে দাঁড়িয়ে অর্জন করা সম্ভব নয় তাহলে পশুর পিঠের উপর দাঁড়ানো বৈধ। অতএব বিনা প্রয়োজনে পশুর পিঠের উপর দাঁড়িয়ে থেকে তাকে কষ্ট দেয়া অবৈধ।
(وَجَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ فَعَلَيْهَا فَاقْضُوا حَاجَاتِكُمْ) আল্লাহ জমিনকে তোমাদের জন্য বিছানা ও অবস্থানের জায়গা বানিয়ে দিয়েছেন, অতএব তাতেই তোমাদের প্রয়োজনীয় কাজ সম্পাদন কর। ‘আল্লামা ত্বীবী বলেন, আল্লাহ তা‘আলা জমিনকে যেহেতু অবস্থানের জায়গা বানিয়েছেন আর পশুকে বানিয়েছেন বাহন; অতএব জমিনেই তোমরা তোমাদের প্রয়োজনীয় কাজ কর পশুর পিঠে নয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫৬৪)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৯১৭-[২৬] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা যখন কোনো স্থানে অবতরণ করতাম, তখন জন্তু-জানোয়ারের পিঠ হতে সবকিছু নামিয়ে সালাত আদায় করতাম। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن أنسٍ قَالَ: كُنَّا إِذَا نَزَلْنَا مَنْزِلًا لَا نُسَبِّحُ حَتَّى نحُلَّ الرِّحالَ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (كُنَّا إِذَا نَزَلْنَا مَنْزِلًا لَا نُسَبِّحُ حَتّٰى نحُلَّ) আনাস বলেন, আমরা যখন কোনো স্থানে অবতরণ করতাম পশুর পিঠ থেকে বোঝা নামানোর আগে সালাত আদায় করতাম না। ‘আল্লামা ত্বীবী বলেনঃ এখানে তাসবীহ দ্বারা উদ্দেশ্য চাশ্তের সালাত। অর্থাৎ সাহাবীগণ সালাতের প্রতি যত্নবান হওয়া সত্ত্বেও বাহনের পিঠ থেকে মাল-পত্র নামিয়ে তাকে পরিত্রাণ দেয়ার আগে সালাত আদায় করতেন না। এটা ছিল পশুর প্রতি সাহাবীদের দরদ ও সহানুভূতি প্রদর্শনের বহিঃপ্রকাশ। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
ইমাম খত্ত্বাবী বলেনঃ হাদীসের অর্থ হলো, আমরা বাহনের পিঠ থেকে মালপত্র নামানোর আগে চাশ্তের সালাত আদায় করতাম না। কোনো কোনো ‘আলিমের মতে আরোহী নিজে খাওয়ার আগে বাহনের পশুকে আগে ঘাস পানি ইত্যাদি খাওয়ানো মুস্তাহাব। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, পৃঃ ৫২)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৯১৮-[২৭] বুরায়দাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পায়ে হেঁটে পথ চলছিলেন, তখন এক ব্যক্তি একটি গাধাসহ সেখানে উপস্থিত হয়ে বলল, হে আল্লাহর রসূল! আপনি এতে আরোহণ করুন! এই বলে সে পিছনে সরে গেল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, না; এরূপ হবে না। তুমিই তোমার সওয়ারের সামনে বসার বেশী হকদার। তবে যদি তুমি এ অধিকার আমার জন্য দাও (দিতে পারো)। তখন লোকটি বলল, আমি তা আপনাকে প্রদান করলাম। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরোহণ করলেন। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن بُرَيْدَة قَالَ: بَيْنَمَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَمْشِي إِذا جَاءَهُ رَجُلٌ مَعَهُ حِمَارٌ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ ارْكَبْ وَتَأَخَّرَ الرَّجُلُ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا أَنْتَ أَحَقُّ بِصَدْرِ دَابَّتِكَ إِلَّا أَنْ تَجْعَلَهُ لِي» . قَالَ: جَعَلْتُهُ لَكَ فَرَكِبَ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যা: (أَنْتَ أَحَقُّ بِصَدْرِ دَابَّتِكَ إِلَّا أَنْ تَجْعَلَه لِىْ) তুমি তোমার পশুর অগ্রভাগের অধিক হকদার যতক্ষণ সে অধিকার আমার জন ছেড়ে না দাও। এখানে صَدْرِ শব্দ দ্বারা পশুর পিঠের সে অংশ উদ্দেশ্য যা তার ঘাড়ের সঙ্গে মিলিত। অর্থাৎ আমি সামনের দিকে আরোহণ করব আর তুমি আমার পিছনে থাকবে তা হবে না। কেননা পশু যেহেতু তোমার, কাজেই তার সামনে বসার অধিকারও তোমারই। তবে সে অধিকার যদি ছেড়ে দাও তবে ভিন্ন কথা।
(قَالَ : جَعَلْتُه لَكَ فَرَكِبَ) লোকটি বলল, এ অধিকার আমি আপনাকে দিলাম; অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সামনে আরোহণ করলেন। অর্থাৎ লোকটি যখন তার অধিকার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য ছেড়ে দিলেন তখন তিনি ঐ পশুর সম্মুখভাগে আরোহণ করলেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৯১৯-[২৮] সা’ঈদ ইবনু আবূ হিন্দ (রহঃ) আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এক প্রকারের উট শায়ত্বনের জন্য হয় এবং একপ্রকারের ঘরও শায়ত্বনের জন্য হয়। মূলত শায়ত্বনের উট হলো যা আমি দেখেছি; তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ খুব স্বাস্থ্যসম্মত উত্তম উট সঙ্গে নিয়ে সফরে বের হয়, কিন্তু নিজেও তাতে আরোহণ করে না এবং সে তার এমন ভাইয়ের নিকট দিয়ে পথ অতিক্রম করে যার নিকট সওয়ারী নেই, আর তাকে আরোহণও করায় না। আর শায়ত্বনের ঘর, আমি তা দেখিনি। রাবী সা’ঈদ বলেন, আমার ধারণা, তাই শায়ত্বনের ঘর ঐ সমস্ত ’হাওদা’ই (আসন) হবে, যা লোকেরা মূল্যবান রেশমী কাপড় দ্বারা ঢেকে রাখে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ سَعِيدِ بْنِ أَبِي هِنْدٍ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «تَكُونُ إِبِلٌ لِلشَّيَاطِينِ وَبُيُوتٌ لِلشَّيَاطِينِ» . فَأَمَّا إِبِلُ الشَّيَاطِينِ فَقَدْ رَأَيْتُهَا: يَخْرُجُ أَحَدُكُمْ بِنَجِيبَاتٍ مَعَهُ قَدْ أَسْمَنَهَا فَلَا يَعْلُو بَعِيرًا مِنْهَا وَيَمُرُّ بِأَخِيهِ قَدِ انْقَطَعَ بِهِ فَلَا يَحْمِلُهُ وَأَمَّا بُيُوتُ الشَّيَاطِينِ فَلَمْ أَرَهَا كَانَ سَعِيدٌ يَقُولُ: لَا أُرَاهَا إِلَّا هَذِهِ الْأَقْفَاصَ الَّتِي يَسْتُرُ النَّاسُ بِالدِّيبَاجِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যা: (تَكُوْنُ إِبِلٌ لِلشَّيَاطِينِ) ‘‘এক প্রকারের উট শায়ত্বনের জন্য’’ এর দ্বারা এমন উট উদ্দেশ্য যা পালন করা হয় অহংকার প্রদর্শন ও মাল বৃদ্ধির জন্য। এর দ্বারা শারী‘আতসম্মত কোনো কাজ সম্পাদন করা উদ্দেশ্য নয় এবং এমন কোনো কাজেও ব্যবহার করা হয় না যা দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যায়।
(وَبُيُوْتٌ لِلشَّيَاطِيْنِ) ঘর হবে শায়ত্বনের জন্য। অর্থাৎ- ঐ অতিরিক্ত ঘর যা প্রয়োজনহীন অথবা যা বানানো হয়েছে হারাম উপায়ে অর্জিত মাল দ্বারা অথবা যে ঘর নির্মাণ করা হয়েছে শুধুমাত্র সুনাম ও সুখ্যাতি অর্জনের জন্য।
(فَلَا يَعْلُوْ بَعِيرًا مِنْهَا) সে ঐ উটগুলোর কোনটিতে আরোহণ করে না, অর্থাৎ উটগুলোকে শুধুমাত্র সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যই লালন পালন করে, তাতে সে নিজেও আরোহণ করে না।
(وَيَمُرُّ بِأَخِيْهِ قَدِ انْقَطَعَ بِه فَلَا يَحْمِلُه) সে তার এমন ভাইয়ের নিকট দিয়ে অতিক্রম করে যে পথ চলতে দুর্বল হয়ে পড়েছে, কিন্তু সে তার ঐ দুর্বল ভাইকে তাতে আরোহণ করায় না।
পশু সৃষ্টিই করা হয়েছে তার উপর আরোহণের মাধ্যমে তা দ্বারা উপকৃত হওয়ার জন্য। অতএব সে যখন তার দুর্বল কোনো ভাইকে তাতে আরোহণ করায় না যে পথ চলতে অক্ষম এতে সে উক্ত উটকে উপকার সাধন হতে বিরত রাখার মাধ্যমে শায়ত্বনের আনুগত্য করল। সুতরাং তা যেন শায়ত্বনের জন্যই। কাযী ‘ইয়ায বলেনঃ শায়ত্বনের উট দ্বারা উদ্দেশ্য যে উট তার সঙ্গী নির্ধারণ করেছেন। অর্থাৎ- ‘‘সেই মোটাসোটা উত্তম উট’’ যে ব্যক্তি সফরে তা নিজের সাথে রাখে কিন্তু নিজেও সে উটে আরোহণ করে না এবং প্রয়োজনের সময় অন্যকেও তার উপর আরোহণ করায় না। আর শায়ত্বনের জন্য ঘর দ্বারা উদ্দেশ্য সেই হাওদাজ যা রেশমের কাপড় দ্বারা তৈরি যা দাম্ভিক লোকেরা সফরে সঙ্গে নিয়ে যায়। এ ব্যাখ্যা করেছেন তাবি‘ঈগণ। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫৬৫)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৯২০-[২৯] সাহল ইবনু মু’আয তার পিতা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে কোনো এক জিহাদে ছিলাম। পথিমধ্যে এক বিসত্মীর্ণ এলাকা জুড়ে লোকেরা অবস্থান করে যান চলাচল বন্ধ করে রেখেছিল। এতদশ্রবণে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক ব্যক্তির মাধ্যমে ঘোষণা দিলেন, যে ব্যক্তি অন্যের অবস্থান বা যান চলাচল সংকীর্ণ বা বন্ধ করে, তার কোনো জিহাদ নেই। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن سهلِ بن مُعاذٍ عَن أبيهِ قَالَ: غَزَوْنَا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَضَيَّقَ النَّاسُ الْمُنَازِلَ وَقَطَعُوا الطَّرِيقَ فَبَعَثَ نَبِيُّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُنَادِيًا يُنادي فِي النَّاسِ: «أَنَّ مَنْ ضَيَّقَ مَنْزِلًا أَوْ قَطَعَ طَرِيقًا فَلَا جِهَادَ لَهُ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (أَنَّ مَنْ ضَيَّقَ مَنْزِلًا أَوْ قَطَعَ طَرِيْقًا فَلَا جِهَادَ لَه) অবশ্যই যে ব্যক্তি অবতরণস্থল সংকীর্ণ করে ফেলল অথবা চলার রাস্তা বিচ্ছিন্ন করে দিল তার কোনো জিহাদ নেই। অর্থাৎ বিশ্রামের জন্য অবতরণের ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি নিজের প্রয়োজনের চেয়ে বেশী জায়গা নিয়ে অন্যের অবতরণের স্থানকে সংকীর্ণ করে ফেললো অথবা মানুষের চলাচলের রাস্তায় অবতরণ করে তাদের চলার পথে বিঘ্ন ঘটালো তার জিহাদ নেই, অর্থাৎ সে ব্যক্তি জিহাদের পূর্ণ সাওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে মানুষের ক্ষতি করার কারণে। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬২৬)
পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৯২১-[৩০] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সফর শেষে ফিরে আসার পর কোনো ব্যক্তির নিজ পরিবারে প্রবেশ করার উত্তম সময় হলো রাতের প্রথমভাগে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ جَابِرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّ أَحْسَنَ مَا دَخَلَ الرَّجُلُ أَهْلَهُ إِذَا قَدِمَ مِنْ سفرٍ أوَّلُ الليلِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা : তূরিবিশতী এবং কাযী ‘ইয়ায বলেনঃ অত্র হাদীস এবং পূর্বে বর্ণিত হাদীস ‘‘যখন কোনো ব্যক্তি দীর্ঘদিন সফর শেষে বাড়ী ফিরে সে যেন রাতে প্রবেশ না করে’’, হাদীসদ্বয়ের মধ্যে বৈপরীত্য প্রকাশমান। এ দুই হাদীসের মধ্যে সামঞ্জস্য এই যে, রাতে প্রবেশ নিষিদ্ধ দ্বারা উদ্দেশ্য স্ত্রীকে সময় না দিয়ে তার সাথে নির্জনে মিলিত হবে না এবং প্রয়োজন মিটানোর চেষ্টা করবে না। বাড়ীতে প্রবেশ করা ও স্ত্রীর সাথে দেখা করা নিষিদ্ধ নয়। আর অত্র হাদীসে প্রথম রাতে প্রবেশ করা উত্তম বলার কারণ এই যে, মুসাফির ব্যক্তি যখন অনেক দূরের সফর থেকে বাড়ী ফিরে আসে তখন স্বাভাবিকভাবেই সে তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হওয়ার জন্য উৎসুক হয়ে থাকে। তাই সে যখন প্রথম রাতে বাড়ীতে ফিরে এসে তার প্রয়োজন মিটানোর সুযোগ পায় তখন তার শরীর হালকা হয় এবং মন প্রশান্তি লাভ করে, ফলে সে ভালোভাবে ঘুমাতে পারে। তাই প্রথম রাতে প্রবেশ করাকে উত্তম বলা হয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭৭৪)
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৯২২-[৩১] আবূ কাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিয়ম ছিল সফরের সময় যখন রাতের শেষাংশে বিশ্রাম করতেন তখন ডান কাতে শুইতেন। আর যখন ফজরের পূর্ব মুহূর্তে বিশ্রাম করতেন, তখন ডান হাতের বাহু জমিনে খাড়া করে রেখে তালুতে মাথা রাখতেন। (মুসলিম)[1]
عَن أبي قتادةَ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا كَانَ فِي سَفَرٍ فَعَرَّسَ بِلَيْلٍ اضْطَجَعَ عَلَى يَمِينِهِ وَإِذَا عَرَّسَ قُبَيْلَ الصُّبْحِ نَصَبَ ذِرَاعَهُ وَوَضَعَ رَأْسَهُ عَلَى كَفِّهِ. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের সফরে রাস্তায় বিশ্রামের জন্য অবতরণ করলেন রাত যদি বেশী থাকতো তাহলে ডান কাতে শুয়ে পড়তেন যাতে শরীর পূর্ণ বিশ্রাম নিতে পারে। আর ফযর উদয় হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে অবতরণ করলে ডান বাহু খাড়া করে হাতের তালুর উপর ভর করে কাত হতেন যাতে ঘুম তার উপর প্রবল না হয়ে যায়। কেননা এতে সালাত ছুটে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৯২৩-[৩২] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’আব্দুল্লাহ ইবনু রওয়াহাহ্ (রাঃ)-কে একটি সৈন্যদলে (নেতা নিযুক্ত করে) পাঠালেন। সে সময় ছিল জুমু’আর দিন। তাঁর সঙ্গীরা ভোরেই রওয়ানা হয়ে গেল, কিন্তু ইবনু রওয়াহাহ্ বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে জুমু’আর সালাত আদায় করে পরে সঙ্গীদের সাথে গিয়ে মিলিত হব। অতঃপর যখন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে জুমু’আর সালাত আদায় করলেন, তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ’আব্দুল্লাহকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাকে তোমার সঙ্গীদের সাথে ভোরে যেতে কিসে বিরত রেখেছে? তখন তিনি বললেন, আমি আপনার সাথে জুমু’আর সালাত আদায় করে পরে গিয়ে সঙ্গীদের সাথে মিলিত হবো, এ কারণে যাইনি। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তুমি যদি পৃথিবীর সমুদয় সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় কর, তবুও তোমার সঙ্গীদের সাথে ভোরে রওয়ানা হওয়ার মর্যাদা ও ফযীলত অর্জন করতে সক্ষম হবে না। (তিরমিযী)[1]
وَعَن ابْن عَبَّاس قَالَ: بَعَثَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ رَوَاحَةَ فِي سَرِيَّةٍ فَوَافَقَ ذَلِكَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ فَغَدَا أَصْحَابُهُ وَقَالَ: أَتَخَلَّفُ وأُصلّي مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثُمَّ أَلْحَقُهُمْ فَلَمَّا صَلَّى مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَآهُ فَقَالَ: «مَا مَنَعَكَ أَنْ تَغْدُوَ مَعَ أَصْحَابِكَ؟» فَقَالَ: أَرَدْتُ أَنْ أُصَلِّيَ مَعَكَ ثُمَّ أَلْحَقُهُمْ فَقَالَ: «لَوْ أَنْفَقْتَ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا مَا أدركْتَ فضلَ غدْوَتهمْ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: (لَوْ أَنْفَقْتَ مَا فِى الْأَرْضِ جَمِيْعًا مَا أَدْرَكْتَ فَضْلَ غَدْوَتِهْمْ) তুমি যদি পৃথিবীর সমস্ত সম্পদও ব্যয় কর তাহলে তাদের সাথে সকাল বেলা রওয়ানা হয়ে যাওয়ার মর্যাদা অর্জন করতে পারবে না। অর্থাৎ জিহাদে যাওয়ার ফযীলত জুমু‘আর সালাত আদায় করার চাইতে অনেক বেশী।
‘আল্লামা ত্বীবী বলেনঃ হাদীসের প্রকাশমান অর্থের দিকে লক্ষ্য করলে এটা বলা সঙ্গত যে, তাদের সকাল বেলা জিহাদের জন্য রওয়ানা হয়ে যাওয়াটা তোমার এ জুমু‘আর সালাতের চাইতেও উত্তম। রসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা না বলে হাদীসে উল্লেখিত বাক্য বলেছেন আধিক্য বুঝানোর জন্য। অর্থাৎ তিনি যা বললেন তার অর্থ হলো কোনো কল্যাণময় কাজই জিহাদে যাওয়ার সমকক্ষ নয়। কেননা জিহাদে যেতে বিলম্ব করলে অনেক কল্যাণ ছুটে যাওয়ার ভয় রয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহওয়াযী ২য় খন্ড, হাঃ ৫২৭)
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৯২৪-[৩৩] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে সফরের সাথে চিতাবাঘের চামড়া থাকে, তাদের সাথে রহমতের মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) থাকে না।’ (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تَصْحَبُ الْمَلَائِكَةُ رُفْقَةً فِيهَا جِلْدُ نَمِرٍ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যা: (لَا تَصْحَبُ الْمَلَائِكَةُ رُفْقَةً فِيْهَا جِلْدُ نَمِرٍ) যে সফরকারী দলের সাথে চিতা বাঘের চামড়া থাকে ঐ দলের সাথ রহমাতের মালাক (ফেরেশতা) সঙ্গী হয় না। চিতা বাঘের চামড়া ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। কেননা এতে অহংকার ও সৌন্দর্যের প্রতিযোগিতা প্রকাশ পায়। অনুরূপ এটা অহংকারকারী বাদশাদের পোষাক। কারো মতেই বাঘের চামড়া দাবাগাত দ্বারা পবিত্র হয় না। সম্ভবত এর কারণ এই যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রের বাঘের চামড়া মৃত বাঘ থেকেই সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। কেননা তা শিকার করা কঠিন বিষয়। মোট কথা তা অপবিত্র। তাই যারা বাঘের চামড়া দ্বারা কোনো ধরনের পোষাক তৈরি করে বা তা ব্যবহার করে তাদের সাথে রহমাতের মালাক থাকে না। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
অত্র হাদীসের শিক্ষা: বাঘের চামড়া ব্যবহার করা মাকরূহ তথা নাজায়িয। বাড়ীতে বাঘের চামড়া রাখা নিন্দনীয়। কেননা বাঘের চামড়া ব্যবহারকারী মুসাফিরদের সাথে রহমাতের মালাক থাকে না এটা প্রমাণ করে যে, ঘরেও যদি তা পাওয়া যায় তাহলে মালাক ঐ ঘরে প্রবেশ করবে না। আর এটা এজন্য যে, তা ব্যবহার করা জায়িয নয়। (‘আওনুল মা‘বূদ ৭ম খন্ড, হাঃ ৪১২৬)
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সফরের নিয়ম-শৃঙ্খলা
৩৯২৫-[৩৪] সাহল ইবনু সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ খাদেমই হলো সফরের নেতা। সুতরাং যে ব্যক্তি সঙ্গীদের খিদমাতে অগ্রণী ভূমিকা রাখে; আল্লাহর পথে শাহাদাত বরণ ছাড়া অন্য কোনো ’আমল দ্বারা কেউ উক্ত ব্যক্তির সমপর্যায়ের উচ্চ মর্যাদা লাভে সমর্থ হবে না। (বায়হাক্বী- শু’আবুল ঈমান)[1]
وَعَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «سَيِّدُ الْقَوْمِ فِي السَّفَرِ خَادِمُهُمْ فَمَنْ سَبَقَهُمْ بِخِدْمَةٍ لَمْ يَسْبِقُوهُ بِعَمَلٍ إِلَّا الشَّهَادَةَ» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيّ فِي «شعب الْإِيمَان»
ব্যাখ্যা: (سَيِّدُ الْقَوْمِ فِى السَّفَرِ خَادِمُهُمْ) খাদেম হলো সফরের নেতা। ‘আল্লামা ত্বীবী বলেনঃ এর দু’টি অর্থ হতে পারে-
(১) নেতার এরূপই হওয়া উচিত। অর্থাৎ যিনি নেতা হবেন তিনি সফরে তার সঙ্গীদের খাদেম, কেননা তার কর্তব্য হলো তার সঙ্গীদের কল্যাণের দিকে খেয়াল রাখা এবং প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল বিষয়ের উপর লক্ষ্য রাখা।
(২) সফরে যিনি খাদেম তিনিই প্রকৃতপক্ষে নেতা যদিও প্রকাশ্যে তিনি তাদের মধ্যে মর্যাদায় ছোট।
(فَمَنْ سَبَقَهُمْ بِخِدْمَةٍ لَمْ يَسْبِقُوْهُ بِعَمَلٍ إِلَّا الشَّهَادَةَ) অতএব সফরে যে ব্যক্তি খিদমাতে অগ্রগামী হবে কেউই তাকে কোনো কাজের মাধ্যমে অতিক্রম করতে করতে পারবে না শাহাদাত ব্যতীত। অর্থাৎ সাওয়াবে এত বেশী অগ্রগামী হবে যে, একমাত্র আল্লাহর পথে শহীদ হওয়া ছাড়া কেউ তার সাওয়াব অতিক্রম করতে পারবে না। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - কাফির রাষ্ট্রপ্রধানদের নিকট পত্র প্রেরণ ও ইসলামের প্রতি আহবান
৩৯২৬-[১] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের দিকে আহবান জানিয়ে দিহ্ইয়াতুল কালবী (রাঃ)-এর মাধ্যমে এ নির্দেশ দিয়ে (রোম সম্রাট) কায়সারের নামে পত্র প্রেরণ করেন, তা যেন অবশ্যই বাসরার (বর্তমানে ইরাকের) রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে অর্পণ করেন। আর সে যেন তা কায়সারের নিকট পৌঁছে দেয়। পত্রে লিখেছিলেন,
পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি,
আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ হতে রোমের রাষ্ট্রপ্রধান হিরাকল (হিরাক্লিয়াস)-এর প্রতি। যারা হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়েছে, হিদায়াতের অনুসরণ করেছে তাদের ওপর শান্তি বর্ষণ হোক! আমি তোমার নিকট ইসলামের দা’ওয়াত পেশ করছি, ইসলামে প্রবেশ কর, শান্তিতে থাকবে। পুনরায় বলছি, ইসলাম কবুল কর, তবে আল্লাহ তোমাকে দ্বিগুণ পুরস্কার (সাওয়াব) দান করবেন। আর যদি ইসলাম হতে বিমুখ হও, তাহলে সমস্ত প্রজাবৃন্দের পাপের বোঝাও তোমার ওপর ন্যস্ত হবে।
হে কিতাবধারীগণ! তোমরা এমন এক মৌলিক বাক্যের দিকে এসো, যাতে আমরা ও তোমরা সমবিশ্বাসী। আর তাই আমাদের সকলের ওপর কর্তব্য হলো এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ’ইবাদাত করব না এবং তাঁর সাথে অন্য কিছুকে শরীক স্থাপন করব না এবং আমরা পরস্পর একে অন্যকে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে রব্ হিসেবে মেনে নিবো না। অতঃপর যদি তারা এ কথাগুলো মেনে না নেয়, তবে বলে দাও তোমরা সাক্ষী থাকো যে, আমরা মুসলিম। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
আর মুসলিম-এর এক বর্ণনার মধ্যে তিনটি বাক্যের পরিবর্তন হয়েছে। যেমন- আল্লাহর রসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষে হতে (অর্থাৎ- ’আবদুল্লাহ’ শব্দ নেই), ইয়ারীসাইয়িন (’হামযা’-এর স্থলে ’ইয়া’) এবং (’’দা-’ইয়াতিল ইসলা-ম’’-এর স্থলে) ’’দি’আ-ইয়াতিল ইসলা-ম’’ রয়েছে (এছাড়া তেমন একটা পার্থক্য নেই)।
بَابُ الْكِتَابِ إِلَى الْكُفَّارِ وَدُعَائِهِمْ إِلَى الْإِسْلَامِ
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَتَبَ إِلَى قَيْصَرَ يَدْعُوهُ إِلَى الْإِسْلَامِ وَبَعَثَ بِكِتَابِهِ إِلَيْهِ دِحْيَةَ الْكَلْبِيَّ وَأَمَرَهُ أَنْ يَدْفَعَهُ إِلَى عَظِيمِ بُصْرَى لِيَدْفَعَهُ إِلَى قَيْصَرَ فَإِذَا فِيهِ: بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ مِنْ مُحَمَّدٍ عَبْدِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ إِلَى هِرَقْلَ عَظِيمِ الرُّومِ سَلَامٌ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى أَمَّا بَعْدُ فَإِنِّي أدْعوكَ بداعيَةِ الْإِسْلَامِ أَسْلِمْ تَسْلَمْ وَأَسْلِمْ يُؤْتِكَ اللَّهُ أَجَرَكَ مَرَّتَيْنِ وَإِنْ تَوَلَّيْتَ فَعَلَيْكَ إِثْمُ الْأَرِيسِيِّينَ وَ (يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَن لَا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَقُولُوا: اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ)
مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ. وَفِي رِوَايَةٍ لِمُسْلِمٍ قَالَ:
مِنْ محمَّدٍ رسولِ اللَّهِ وَقَالَ: «إِثمُ اليريسيِّينَ» وَقَالَ: «بِدِعَايَةِ الْإِسْلَام»
ব্যাখ্যা: (وَإِنْ تَوَلَّيْتَ فَعَلَيْكَ إِثْمُ الْأَرِيسِيِّيْنَ) ‘‘যদি তুমি মুখ ফিরিয়ে নাও তাহলে আরীসিয়্যিনদের গুনাহ তোমার ওপর বর্তাবে।’’ অর্থাৎ তুমি ইসলাম গ্রহণ করতে বিমুখ হও তাহলে তুমি নিজে তো গুনাহগার হবেই। সেই সাথে তোমার যারা অনুসারী তাদের গুনাহসমূহও তোমার ওপর বর্তাবে। এ থেকে এটাও বুঝা যায় যে, তোমার ইসলাম গ্রহণ করার কারণে যদি তোমার অনুসারীগণ ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে এর সাওয়াবও তুমি অর্জন করবে। ‘আল্লামা নববী বলেনঃ (أَرِيسِيِّيْنَ) বলতে কাদের বুঝানো হয় এতে অনেক মতভেদ রয়েছে। তবে বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধ মত এই যে, তারা হলো রোমের কৃষক সম্প্রদায়। এদের উল্লেখ করার মাধ্যমে সকল অনুসারীদের বুঝানো হয়েছে। কেননা সংখ্যায় তারাই ছিল বেশী। আর আনুগত্যের বেলায়ও তারাই অগ্রগামী। বাদশাহ ইসলাম গ্রহণ করলে তারাও ইসলাম গ্রহণ করবে। আর বাদশাহ ইসলাম গ্রহণ করা হতে বিরত থাকলে তারাও তা থেকে বিরত থাকবে। (শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৭৭৩)
وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِنْ دُوْنِ اللهِ ‘‘আমাদের মাঝে কেউই যেন আল্লাহকে বাদ দিয়ে একে অপরকে রব্ বানিয়ে না নেয়।’’ অর্থাৎ- আমরা এটা বলব না যে, ‘উযায়র আল্লাহর পুত্র, মাসীহ (‘ঈসা (আঃ)) আল্লাহর পুত্র, ইয়াহূদী ‘আলিমগণ যে সমস্ত হালাল হারামের নতুন নতুন বিধান চালু করেছে আমরা তার আনুগত্য করব না। কেননা তারা সকলেই আমাদের মতই মানুষ। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ১ম খন্ড, হাঃ ৭)
অত্র হাদীসের শিক্ষা:
(১) কুরআনের দু’ একটি আয়াত নাপাক ব্যক্তিও পাঠ করতে পারে।
(২) কুরআনের কিছু অংশ অমুসলিমদের নিকট প্রেরণ করা বৈধ।
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - কাফির রাষ্ট্রপ্রধানদের নিকট পত্র প্রেরণ ও ইসলামের প্রতি আহবান
৩৯২৭-[২] উক্ত রাবী [ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (পারস্য বা ইরানের শাসনকর্তার উদ্দেশে) ’আব্দুল্লাহ ইবনু হুযাফাহ্ আস্ সাহমী -এর মাধ্যমে কিস্রার নিকট লিখিত একটি পত্র পাঠিয়ে এ নির্দেশ দিলেন যে, তিনি যেন তা বাহরাইনের শাসনকর্তার হাতে দেন আর তিনি (বাহরাইনের শাসক) যেন তা কিসরার নিকট পৌঁছে দেন। অতঃপর তিনি পত্রটি কিসরার নিকট পৌঁছালেন। যখন সে (কিসরা) তা পাঠ করল তখন (রাগস্বরে) পত্রটি ছিঁড়ে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে ফেলল। রাবী ইবনুল মুসাইয়্যাব (রহঃ) বলেন, তার এ ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের ফলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের প্রতি বদ্দু’আ করলেন যে, আল্লাহ তা’আলা যেন তাদেরকে একেবারে খন্ড-বিখন্ড, টুকরা-টুকরা করে ফেলে। (বুখারী)[1]
بَابُ الْكِتَابِ إِلَى الْكُفَّارِ وَدُعَائِهِمْ إِلَى الْإِسْلَامِ
وَعَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَعَثَ بِكِتَابِهِ إِلَى كِسْرَى مَعَ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ حُذَافَةَ السَّهْمِيِّ فَأَمَرَهُ أَنْ يَدْفَعَهُ إِلَى عَظِيمِ الْبَحْرَيْنِ فَدَفَعَهُ عَظِيمُ الْبَحْرَيْنِ إِلَى كِسْرَى فَلَمَّا قَرَأَ مَزَّقَهُ قَالَ ابْنُ الْمُسَيَّبِ: فَدَعَا عَلَيْهِمْ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يُمَزَّقُوا كُلَّ مُمَزَّقٍ. رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ
ব্যাখ্যা: (فَدَعَا عَلَيْهِمْ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ أَنْ يُمَزِّقُوْا كُلَّ مُمَزَّقٍ) রসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জন্য বদ্দু‘আ করলেন এ বলে যে, তাদেরকে যেন ছিন্নভিন্ন করে দেয়া হয়।
তূরিবিশতী বলেনঃ এর অর্থ হলো তাদের মধ্যে যেন সকল প্রকার বিভেদ সৃষ্টি করে দেয়া হয়। যে ব্যক্তি রসূলের চিঠি ছিঁড়ে ফেলেছিল তার নাম আব্রাবীয ইবনু হুরমুয। তাকে তার পুত্র আনূশিরওয়ান হত্যা করেছিল। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - কাফির রাষ্ট্রপ্রধানদের নিকট পত্র প্রেরণ ও ইসলামের প্রতি আহবান
৩৯২৮-[৩] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিসরা, কায়সার, নাজাশী এবং অন্যান্য প্রত্যেক ক্ষমতাধর শাসনকর্তাদের নিকট পত্র পাঠিয়ে আল্লাহর (জীবন বিধানের) দিকে আহবান করেন। রাবী বলেন, যে নাজাশীর মৃত্যুতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাযার সালাত আদায় করেছিলেন, প্রকৃতপক্ষে তিনি এ নাজাশী নন। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْكِتَابِ إِلَى الْكُفَّارِ وَدُعَائِهِمْ إِلَى الْإِسْلَامِ
وَعَنْ أَنَسٍ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَتَبَ إِلَى كِسْرَى وَإِلَى قَيْصَرَ وَإِلَى النَّجَاشِيِّ وَإِلَى كُلِّ جَبَّارٍ يَدْعُوهُمْ إِلَى اللَّهِ وَلَيْسَ بِالنَّجَاشِيِّ الَّذِي صَلَّى عَلَيْهِ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যা: (وَإِلَى النَّجَاشِىِّ) নাজাশীর নিকটও চিঠি পাঠান, তার নাম ছিল আসহামাহ্ হাবাশার বাদশাহ।
(وَإِلٰى كُلِّ جَبَّارٍ يَدْعُوهُمْ إِلَى اللّٰهِ) তিনি প্রত্যেক অহংকারী অমুসলিম শাসকের নিকট চিঠি লিখে আল্লাহর দীন ইসলাম কবুল করার দা‘ওয়াত দেন। তিনি অন্য আর যাদের চিঠি লিখেন তাদের মধ্যে মুকাওকিস যিনি মিসর ও ইস্কান্দারিয়ার বাদশাহ ছিলেন, মুনযির ইবনু সারী যিনি ‘উমানের (ওমানের) শাসনকর্তা, ইয়ামামার শাসনকর্তা, আল হারিস ইবনু আবূ শিম্র জারবা ও আবরূহের অধিবাসী এবং উকায়দির তাদের অন্তর্ভুক্ত।
(وَلَيْسَ بِالنَّجَاشِىِّ الَّذِىْ صَلّٰى عَلَيْهِ النَّبِىُّ ﷺ) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যে নাজাশীর নিকট চিঠি লিখেন, তিনি সে নাজাশী নন যার সালাতুল জানাযা আদায় করেছিলেন। অতএব আসহামাহ্ এবং যার জানাযা তিনি আদায় করেছিলেন এ দু’ নাজাশী দু’জন পৃথক ব্যক্তি। তবে তারা উভয়েই ইসলাম গ্রহণ করেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
উল্লেখ্য যে, নাজাশী হাবাশার বাদশার উপাধি, তা কোনো ব্যক্তির নাম নয়। যেমন কিসরা পারস্যের বাদশার উপাধি, কায়সার রূমের বাদশার উপাধি, ফির্‘আওন ক্বিবত্বী বাদশাহর উপাধি। আলা ‘আযীয মিসরের বাদশাহর উপাধি। (শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৭৭৪; তুহফাতুল আহওয়াজী ৭ম খন্ড, হাঃ ২৭১৬)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - কাফির রাষ্ট্রপ্রধানদের নিকট পত্র প্রেরণ ও ইসলামের প্রতি আহবান
৩৯২৯-[৪] সুলায়মান ইবনু বুরায়দাহ্ তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই কোনো বৃহৎ অথবা ক্ষুদ্র সৈন্যবাহিনীর ওপর কাউকে আমীর (নেতা) নিয়োজিত করতেন, তখন তাকে বিশেষভাবে উপদেশ দিতেন, সে যেন আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে তাকওয়া অবলম্বন করে এবং সফরসঙ্গী মুসলিম সৈন্যদের সাথে সদাচরণ করে। অতঃপর বলতেন, আল্লাহর নাম নিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদে রওয়ানা হও এবং যারা আল্লাহর প্রতি কুফরী (বিদ্রোহ) করে, তাদের সাথে লড়াই কর, জিহাদে যাও। সাবধান! গনীমাতের মালে খিয়ানাত করো না। যখন তুমি কোনো মুশরিক শত্রুর সম্মুখীন হবে, তখন তাদেরকে তিনটি বিষয়ের প্রতি আহবান করবে। যদি তারা কোনো একটি মেনে নেয়, তুমি তখন তার গ্রহণযোগ্যতার স্বীকৃতি নিবে এবং তাদের ওপর আক্রমণ করা হতে বিরত থাকবে।
ক) প্রথমে তাদেরকে ইসলামের প্রতি আহবান করবে, যদি তারা তা গ্রহণ করে, তখন তুমি তার স্বীকৃতি নিবে এবং তাদের ওপর আক্রমণ করা হতে বিরত থাকবে। অতঃপর তাদের স্বদেশ (দারুল হার্ব) হতে মুহাজিরীনদের আবাসভূমিতে (দারুল ইসলামে) চলে আসতে বলবে এবং এটাও জানিয়ে দেবে যে, যদি তারা হিজরত করে, তখন তারাও মুহাজিরীনদের ন্যায় সুযোগ-সুবিধা পাবে, আর মুহাজিরীনদের ন্যায় দায়-দায়িত্ব তাদের ওপর অর্পিত হবে। কিন্তু তারা যদি স্বদেশ ত্যাগ করতে অস্বীকার করে, তখন তাদেরকে জানিয়ে দিবে যে, তাদের সাথে সেরূপ আচরণই করা হবে, যেরূপ আচরণ অন্যান্য গ্রাম্য মুসলিমদের সাথে করা হবে। অর্থাৎ আল্লাহর সেই বিধান তাদের ওপর কার্যকর করা হবে যা সকল মুসলিমের ওপর কার্যকর করা হয়ে থাকে। কিন্তু গনীমাতের মাল ও ফাই (বিনা যুদ্ধলব্ধ মাল) হতে তারা সাধারণত কোনো অংশ পাবে না। তবে এ ধন-সম্পদের অংশীদার তারা তখনই পাবে, যখন তারা মুসলিমদের সাথে সম্মিলিতভাবে জিহাদে শরীক হবে।
খ) আর যদি তারা তাতে (ইসলাম কবুল করতে) অস্বীকার করে, তখন তাদের ওপর জিয্ইয়াহ্ (কর) ধার্য কর। যদি তারা তা মেনে নেয়, তখন তুমিও তা গ্রহণ কর এবং তাদের ওপর আক্রমণ করা হতে বিরত থাক।
গ) তবে তারা যদি তাতেও অস্বীকার করে, তখন আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখে তাদের সাথে যুদ্ধ কর। আর যদি তুমি কোনো দুর্গবাসীদের অবরোধ কর এবং তারা তোমার সাথে আল্লাহ ও তার রসূলের দায়িত্বের উপর কোনো চুক্তিবদ্ধ হতে চায়, তখন তুমি তাদের সাথে আল্লাহ ও তার রসূলের দায়িত্বে কোনো চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ো না; বরং তুমি ও তোমার সঙ্গীদের নিজ দায়িত্বে চুক্তিবদ্ধ হতে পারো। কেননা কোনো কারণে যদি উক্ত চুক্তি ভঙ্গ করতে বাধ্য হও, তখন আল্লাহ ও তার রসূলের নামে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করার চেয়ে তোমার ও তোমার সঙ্গীদের কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করা অনেক সহজসাধ্য। আর যদি তুমি কোনো দূর্গ অবরোধ কর এবং তারা তোমার নিকট আল্লাহর বিধানানুসারে ফায়সালার শর্তে অবরোধ তুলে নিতে আবেদন জানায়, তখন আল্লাহর বিধানের শর্তে তাদেরকে অব্যাহতি দিয়ো না; বরং তোমার সঙ্গীদের দায়িত্বে অব্যাহতি দিবে। কেননা তুমি তো জানো না, আল্লাহর বিধান (ফায়সালা) সঠিকভাবে তাদের ব্যাপারে প্রয়োগ করতে পারবে কিনা। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْكِتَابِ إِلَى الْكُفَّارِ وَدُعَائِهِمْ إِلَى الْإِسْلَامِ
وَعَن سليمانَ بنِ بُريدةَ عَنْ أَبِيهِ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا أَمَّرَ أَمِيرًا عَلَى جَيْشٍ أَوْ سَرِيَّةٍ أَوْصَاهُ فِي خَاصَّتِهِ بِتَقْوَى اللَّهِ وَمَنْ مَعَهُ مِنَ الْمُسْلِمِينَ خَيْرًا ثُمَّ قَالَ: اغْزُوَا بسمِ اللَّهِ قَاتَلُوا مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ اغْزُوَا فَلَا تَغُلُّوا وَلَا تَغْدِرُوا وَلَا تَمْثُلُوا وَلَا تَقْتُلُوا وَلِيدًا وَإِذَا لَقِيتَ عَدُوَّكَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ فَادْعُهُمْ إِلَى ثَلَاثِ خِصَالٍ أَوْ خِلَالٍ فَأَيَّتَهُنَّ مَا أَجَابُوكَ فَاقْبَلْ مِنْهُمْ وَكُفَّ عَنْهُمْ ثُمَّ ادْعُهُمْ إِلَى الْإِسْلَامِ فَإِنْ أَجَابُوكَ فَاقْبَلْ مِنْهُمْ وَكُفَّ عَنْهُمْ ثُمَّ ادْعُهُمْ إِلَى التَّحَوُّلِ مِنْ دَارِهِمْ إِلَى دَارِ الْمُهَاجِرِينَ وَأَخْبِرْهُمْ أَنَّهُمْ إِنْ فَعَلُوا ذَلِكَ فَلَهُمْ مَا لِلْمُهَاجِرِينَ وَعَلَيْهِمْ مَا عَلَى الْمُهَاجِرِينَ فَإِنْ أَبَوْا أَنْ يَتَحَوَّلُوا مِنْهَا فَأَخْبِرْهُمْ أَنَّهُمْ يَكُونُونَ كَأَعْرَابِ الْمُسْلِمِينَ يُجْرَى عَلَيْهِمْ حُكْمُ الله الَّذِي يُجْرَى عَلَيْهِمْ حُكْمُ اللَّهِ الَّذِي يُجْرَى عَلَى الْمُؤْمِنِينَ وَلَا يَكُونُ لَهُمْ فِي الْغَنِيمَةِ وَالْفَيْءِ شَيْءٌ إِلَّا أَنْ يُجَاهِدُوا مَعَ الْمُسْلِمِينَ فَإِنْ هم أَبَوا فعلهم الْجِزْيَةَ فَإِنْ هُمْ أَجَابُوكَ فَاقْبَلْ مِنْهُمْ وَكُفَّ عَنْهُمْ فَإِنْ هُمْ أَبَوْا فَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ وَقَاتِلْهُمْ وَإِذَا حَاصَرْتَ أَهْلَ حِصْنٍ فَأَرَادُوكَ أَنْ تَجْعَلَ لَهُمْ ذِمَّةَ اللَّهِ وَذِمَّةَ نَبِيِّهِ فَلَا تَجْعَلْ لَهُمْ ذِمَّةَ اللَّهِ وَلَا ذِمَّةَ نَبِيِّهِ وَلَكِنِ اجْعَلْ لَهُمْ ذِمَّتَكَ وَذِمَّةَ أَصْحَابِكَ فَإِنَّكُمْ أَنْ تُخْفِرُوا ذِمَمَكُمْ وَذِمَمَ أَصْحَابِكُمْ أَهْوَنُ مِنْ أَنْ تُخْفِرُوا ذِمَّةَ اللَّهِ وَذِمَّةَ رَسُولِهِ وَإِنْ حَاصَرْتَ أَهْلَ حِصْنٍ فَأَرَادُوكَ أَنْ تُنْزِلَهُمْ عَلَى حُكْمِ اللَّهِ فَلَا تُنْزِلْهُمْ عَلَى حُكْمِ اللَّهِ وَلَكِنْ أَنْزِلْهُمْ عَلَى حُكْمِكَ فَإِنَّكَ لَا تَدْرِي: أَتُصِيبُ حُكْمَ اللَّهِ فِيهِمْ أَمْ لَا؟ . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
ব্যাখ্যা: (اُغْزُوْا فَلَا تَغُلُّوْا) তোমরা যুদ্ধ কর তবে খিয়ানাত করো না। অর্থাৎ গনীমাতের মাল সংরক্ষণ করবে। আমীরের অনুমতি ব্যতীত তা থেকে গ্রহণ করবে না।
(وَلَا تَغْدِرُوْا) বিশ্বাসঘাতকতা করো না। অর্থাৎ- ওয়া‘দা দেয়ার পর তা ভঙ্গ করো না। এও বলা হয়ে থাকে যে, (لَا تَغْدِرُوْا) দ্বারা উদ্দেশ্য ইসলামের দিকে আহবান করার পূর্বে তাদের সাথে যুদ্ধ করবে না।
(وَلَا تَمْثُلُوْا) অঙ্গহানী করো না। ফায়িক গ্রন্থে (لَا تَمْثُلُوْا) এর অর্থ করা হয়েছে, তোমরা তাদের চেহারায় কালিমা লেপন করবে না এবং নাক কাটবে না।
(وَلَا تَقْتُلُوْا وَلِيْدًا) ছোট শিশু হত্যা করো না। ইবনুল হুমাম বলেনঃ পাগল এবং শিশু যদি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে তাহলে তাদের হত্যা করা যাবে। অনুরূপভাবে রাজপুত্র এবং নির্বোধ বাদশাহও হত্যা করা যাবে। কেননা এতে তাদের শক্তি নির্মূল হবে।
(إِنْ فَعَلُوْا ذٰلِكَ فَلَهُمْ مَا لِلْمُهَاجِرِيْنَ وَعَلَيْهِمْ مَا عَلَى الْمُهَاجِرِيْنَ) তারা যদি তা (হিজরত) করে তাহলে তাদের তাই প্রাপ্য যা মুহাজিরগণের প্রাপ্য এবং তাদের ওপর সে দায়িত্ব যে দায়িত্ব মুহাজিরদের। অর্থাৎ- মুশরিকরা যদি ইসলাম গ্রহণ করার পর কাফিরদের এলাকা ছেড়ে মুসলিম দেশে হিজরত করে চলে আসে তাহলে তারা মুহাজিরদের মতই সাওয়াব পাবে এবং ফাই তথা গনীমাতের মালে মুহাজিরদের মতই প্রাপ্য থাকবে। আর এ প্রাপ্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যামানায় অব্যাহত ছিল। মুহাজিরগণ যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশে জিহাদের জন্য বেড়িয়ে পড়ত তখন থেকেই তিনি তাদের যাবতীয় ব্যয় বহন করতেন। তাদের সংখ্যা শত্রুদের তুলনায় যথেষ্ট হোক বা না হোক। আমীরের নির্দেশ মাত্র তাদের জিহাদে যাওয়া ওয়াজিব ছিল। কিন্তু যারা মুহাজির ছিলেন না তাদের ক্ষেত্রে তখনই যুদ্ধে যাওয়া ওয়াজিব হত যখন শত্রুর মুকাবিলা করার মতো যথেষ্ট সংখ্যক লোক না থাকত। وَعَلَيْهِمْ দ্বারা উদ্দেশ্য এটাই।
(وَلٰكِنْ أَنْزِلْهُمْ عَلٰى حُكْمِكَ فَإِنَّكَ لَا تَدْرِىْ : أَتُصِيْبُ حُكْمَ اللّٰهِ فِيْهِمْ أَمْ لَا؟) তুমি তাদেরকে তোমার ফায়সালা অনুযায়ী আত্মসমর্পণ করার সুযোগ দিবে। কেননা তোমার জানা নেই যে, তাদের ব্যাপারে তোমার ফায়সালা আল্লাহর ফায়সালা অনুযায়ী হবে কিনা? ইমাম নববী বলেন, আল্লাহর ফায়াসালা অনুযায়ী আত্মসমর্পণের সুযোগ না দেয়ার নিষেধাজ্ঞা হারামের জন্য নয়। বরং এ নিষেধাজ্ঞা তানযীহের জন্য তথা এরূপ করা মাকরূহ। যারা বলেন যে, সকল মুজতাহিদের সিদ্ধান্ত সঠিক নয় বরং মতভেদের ক্ষেত্রে একজন মুজতাহিদদের সিদ্ধান্ত সঠিক অত্র হাদীস তাদের পক্ষে দলীল। (মিরকাতুল মাফাতীহ; শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, ১৭৩১; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬০৯; তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৬১৭)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - কাফির রাষ্ট্রপ্রধানদের নিকট পত্র প্রেরণ ও ইসলামের প্রতি আহবান
৩৯৩০-[৫] ’আব্দুল্লাহ ইবনু আবূ আওফা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো এক অভিযানে শত্রুর মুকাবিলায় অপেক্ষা করতে লাগলেন। অতঃপর সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে গেলে, তখন তিনি লোকেদের উদ্দেশে দাঁড়িয়ে বললেন, হে লোক সকল! তোমরা শত্রুর মুকাবিলার আকাঙ্ক্ষা করো না; বরং আল্লাহর নিকট নিরাপত্তা লাভের প্রার্থনা কর। তবে শত্রুর মুকাবিলা সংঘটিত হয়ে গেলে ধৈর্যধারণ করতে থাক। আর জেনে রাখ! তরবারির ছায়াতলেই জান্নাত অবস্থিত। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ দু’আ করলেন, হে আল্লাহ! তুমি কিতাব (আল কুরআন) অবতরণকারী, মেঘমালা পরিচালনাকারী এবং শত্রুবাহিনী দমনকারী! তুমি তাদের দমন কর এবং তাদের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য (জয়যুক্ত) কর। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ الْكِتَابِ إِلَى الْكُفَّارِ وَدُعَائِهِمْ إِلَى الْإِسْلَامِ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي أوفى: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي بَعْضِ أَيَّامِهِ الَّتِي لَقِيَ فِيهَا الْعَدُوَّ انْتَظَرَ حَتَّى مَالَتِ الشَّمْسُ ثُمَّ قَامَ فِي النَّاسِ فَقَالَ: «يَا أَيُّهَا النَّاسُ لَا تَتَمَنَّوْا لِقَاءَ الْعَدُوِّ وَاسْأَلُوا اللَّهَ الْعَافِيَةَ فَإِذَا لَقِيتُمْ فَاصْبِرُوا وَاعْلَمُوا أَنَّ الْجَنَّةَ تَحْتَ ظِلَالِ السُّيُوفِ» ثُمَّ قَالَ: «اللَّهُمَّ مُنْزِلَ الْكِتَابِ وَمُجْرِيَ السَّحَابِ وهازم الْأَحْزَاب واهزمهم وَانْصُرْنَا عَلَيْهِم»
ব্যাখ্যা: (يَا أَيُّهَا النَّاسُ! لَا تَتَمَنَّوْا لِقَاءَ الْعَدُوِّ وَاسْأَلُوا اللّٰهَ الْعَافِيَةَ) হে লোক সকল! তোমরা শত্রুর সাক্ষাতের আকাঙ্ক্ষা করো না বরং আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা চাও, অর্থাৎ শত্রুর অনিষ্ট হতে আল্লাহর নিকট নিরাপত্তা কামনা কর।
(فَإِذَا لَقِيْتُمْ فَاصْبِرُوْا) যদি তাদের সাক্ষাৎ ঘটেই যায় তাহলে তোমরা ধৈর্য ধারণ কর। অর্থাৎ যদি শত্রুর মুকাবিলা করতেই হয় তাহলে যে বিপদ ও অনিষ্টের মুখোমুখি তোমাদের হতে হবে তাতে তোমরা অধৈর্য হবে না, বরং ধৈর্য সহকারে তাদের মুকাবিলা করবে। ইমাম নববী বলেনঃ শত্রুর সাক্ষাতের আকাঙ্ক্ষা করতে নিষেধ করার কারণ এই যে, এতে অহংকার ও নিজের ওপর নির্ভরতা এবং শক্তি সামর্থ্যের উপর দৃঢ়তা প্রকাশ পায়, যার কোনটিই বৈধ নয়।
(أَنَّ الْجَنَّةَ تَحْتَ ظِلَالِ السُّيُوْفِ) জান্নাত তরবারির ছায়াতলে অর্থাৎ- মুজাহিদ ব্যক্তির ওপরে শত্রুর তরবারি উত্তোলন তার জান্নাতে যাওয়ার কারণ। নিহায়াহ্-এর গ্রন্থকার বলেন, এর দ্বারা যুদ্ধে শত্রুর তরবারির আঘাতের নিকটবর্তী হওয়ার ইঙ্গিত করা হয়েছে যাতে জিহাদের ময়দানে শত্রুর তরবারি তার উপরে উঠে এবং তার ছায়া তার উপর পতিত হয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ; শারহে মুসলিম ১২ খন্ড, হাঃ ১৭৪২; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬২৮)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - কাফির রাষ্ট্রপ্রধানদের নিকট পত্র প্রেরণ ও ইসলামের প্রতি আহবান
৩৯৩১-[৬] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আমাদেরকে নিয়ে কোনো গোত্রের বিরুদ্ধে জিহাদে যেতেন, তখন ভোর অবধি আক্রমণ করতেন না। আর ভোর হলে আযানের আওয়াজের অপেক্ষায় থাকতেন, আর যদি আযান শুনতে পেতেন, তখন আক্রমণ করা হতে বিরত থাকতেন। আর আযান না শুনলে আক্রমণ করতেন। রাবী বলেন, আমরা খায়বারের যুদ্ধের জন্য বের হলাম এবং রাতের বেলায় তথায় গিয়ে পৌঁছলাম। যখন ভোর হলো এবং আযান শোনা গেল না তখন আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সওয়ার হলেন এবং আমি ও ত্বলহা এর পিছনে সওয়ার হলাম। আমার পায়ের সাথে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পা মুবারক স্পর্শ করছিল।
(আনাস বলেন) এমন সময় খায়বারের অধিবাসীরা (ক্ষেত-খামারে কাজের উদ্দেশে) কাসেত্ম, কোদাল ও ঝুড়ি ইত্যাদি নিয়ে এগিয়ে এলো এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখতে পেয়ে উচ্চস্বরে বলে উঠল, এই যে মুহাম্মাদ! আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ ও তাঁর পঞ্চবাহিনী (সম্পূর্ণ দল) নিয়ে এসে পড়েছে। অতঃপর দৌড়িয়ে দুর্গের ভিতরে আশ্রয় গ্রহণ করল। তিনি (আনাস ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাদের এরূপ অবস্থা প্রত্যক্ষ করলেন, তখন বলে উঠলেন- আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, খায়বারের ধ্বংস নিশ্চিত। এভাবে আমরা যখন কোনো জাতির আঙিনায় অবতীর্ণ হই, তখন যেই জাতিকে পূর্বাহ্নে সতর্ক করা হয়েছে তাদের সকাল দুর্ভাগ্যজনকভাবে খারাপ হয়ে থাকে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ الْكِتَابِ إِلَى الْكُفَّارِ وَدُعَائِهِمْ إِلَى الْإِسْلَامِ
وَعَنْ أَنَسٍ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ إِذَا غَزَا بِنَا قَوْمًا لَمْ يَكُنْ يَغْزُو بِنَا حَتَّى يُصْبِحَ وَيَنْظُرَ إِلَيْهِمْ فَإِنْ سَمِعَ أَذَانًا كَفَّ عَنْهُمْ وَإِنْ لَمْ يَسْمَعْ أَذَانًا أَغَارَ عَلَيْهِمْ قَالَ: فَخَرَجْنَا إِلَى خَيْبَرَ فَانْتَهَيْنَا إِلَيْهِمْ لَيْلًا فَلَمَّا أَصْبَحَ وَلَمْ يسمَعْ أذاناً رِكبَ ورَكِبْتُ خلفَ أبي طلحةَ وَإِنَّ قَدَمِي لَتَمَسُّ قَدِمَ نَبِيُّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: فَخَرَجُوا إِلَيْنَا بَمَكَاتِلِهِمْ ومساحيهم فَلَمَّا رأى النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالُوا: مُحَمَّدٌ واللَّهِ محمّدٌ والخميسُ فلَجؤوا إِلَى الْحِصْنِ فَلَمَّا رَآهُمْ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ خَرِبَتْ خَيْبَرُ إِنَّا إِذَا نَزَلْنَا بِسَاحَةِ قومٍ فساءَ صباحُ المُنْذَرينَ»
ব্যাখ্যা: (فَإِنْ سَمِعَ أَذَانًا كَفَّ عَنْهُمْ) যদি আযান শুনতে পেতেন তাহলে তাদের থেকে বিরত থাকতেন, অর্থাৎ সালাতের প্রতি আহবান শুনতে পেলে তিনি তাদের ওপর অক্রমণ করা এবং মাল নেয়া থেকে বিরত থাকতেন।
(وَإِنْ لَمْ يَسْمَعْ أَذَانًا أَغَارَ عَلَيْهِمْ) আর আযান না শুনতে পেলে তাদের ওপর আক্রমণ করতেন।
কাযী ‘ইয়ায বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আক্রমণ করার ক্ষেত্রে নিশ্চিত হতেন এবং সতর্কতা অলম্বন করতেন এজন্য যে, ঐ জনপদে কোনো মু’মিন থাকতে পারে। আর হঠাৎ করে কোনো জনপদে আক্রমণ করলে মু’মিনদের অজান্তে তাদের ওপর আক্রমণ হতে পারে। ইমাম খত্ত্বাবী বলেনঃ আযান দীন ইসলামের একটি প্রতীক যা পরিত্যাগ করা অবৈধ। কোনো জনপদের লোকজন আযান পরিত্যাগের ব্যাপারে একমত হলে মুসলিম শাসকের জন্য বৈধ তাদের ওপর আক্রমণ করা।
(إِنَّا إِذَا نَزَلْنَا بِسَاحَةِ قَوْمٍ فَسَآءَ صَبَاحُ المُنْذَرِيْنَ) আমরা যখন কোনো জনপদের আঙ্গিনায় অবতরণ করি তখন ঐ জনপদের কাফির সম্প্রদায়ের সকাল খারাপই হয়। অর্থাৎ- মুসলিম সম্প্রদায় অথবা নাবীগণ যখন কোনো জনপদে আগমন করে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তখন ঐ জনপদের লোকেদের অকল্যাণ হয়। কেননা সতর্ক করা সত্ত্বেও ইসলাম গ্রহণ না করার ফলে আল্লাহর পক্ষ থেকে হত্যা ও আক্রমণের শাস্তি তাদের ওপর এসে উপস্থিত হয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - কাফির রাষ্ট্রপ্রধানদের নিকট পত্র প্রেরণ ও ইসলামের প্রতি আহবান
৩৯৩২-[৭] নু’মান ইবনু মুকররিন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি অসংখ্য জিহাদে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে শরীক ছিলাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যদি দিনের প্রথমভাগে আক্রমণ না করতেন, তবে (দুপুর গড়িয়ে) মৃদু বাতাস প্রবাহিত হওয়া ও সালাতের ওয়াক্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করে যুদ্ধ শুরু করতেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْكِتَابِ إِلَى الْكُفَّارِ وَدُعَائِهِمْ إِلَى الْإِسْلَامِ
وَعَن النُّعْمَانِ بْنِ مُقَرِّنٍ قَالَ: شَهِدْتُ الْقِتَالَ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَكَانَ إِذَا لَمْ يُقَاتِلْ أَوَّلَ النَّهَارِ انْتَظَرَ حَتَّى تهب الْأَرْوَاح وتحضر الصَّلَاة. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: (اِنْتَظَرَ حَتّٰى تَهَبُّ الْأَرْوَاحُ وَتَحْضُرُ الصَّلَاةُ) ‘‘তিনি অপেক্ষা করতেন বায়ু প্রবাহের এবং সালাতের সময়ের।’’ অর্থাৎ- তিনি দিনের প্রথম ভাগে যুদ্ধ শুরু না করে থাকলে দুপুরে যুদ্ধ শুরু না করে সূর্য ঢলে গিয়ে সালাতের সময় হলে এবং বায়ু প্রবাহিত হলে তখন যুদ্ধ শুরু করতেন। কারণ কাফিরগণ সূর্যের ‘ইবাদাত করে থাকে। যখন সূর্য ঢলে যায় এবং বায়ু প্রবাহিত হয় তখন সূর্যের তেজ অনেকটা কমে যায় এবং তা অস্তমিত হওয়ার দিকে ঝুকে পড়ে। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য ঢলে গিয়ে সালাতের সময় হওয়ার অপেক্ষা করতেন। যেহেতু এ সময়টা আল্লাহর ‘ইবাদাতকারীদের সময় এবং সাজদাকারীর দু‘আ কবূলের সময়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - কাফির রাষ্ট্রপ্রধানদের নিকট পত্র প্রেরণ ও ইসলামের প্রতি আহবান
৩৯৩৩-[৮] নু’মান ইবনু মুকররিন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে জিহাদে শরীক ছিলাম এবং তাঁকে দেখেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দিনের প্রথমভাগে কোনো যুদ্ধে লড়াই শুরু করতে না পারলে অপেক্ষা করতেন সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়া এবং মৃদু বাতাস প্রবাহিত হওয়া, আর আল্লাহর সাহায্য অবতীর্ণের সময় হওয়া পর্যন্ত। (আবূ দাঊদ)[1]
عَن النُّعْمَان بن مقرن قَالَ: شَهِدْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَكَانَ إِذَا لَمْ يُقَاتِلْ أَوَّلَ النَّهَارِ انْتَظَرَ حَتَّى تَزُولَ الشَّمْسُ وَتَهُبَّ الرِّيَاحُ وينزِلَ النَّصرُ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (وَيَنْزِلَ النَّصْرُ) ‘‘এবং সাহায্য অবতীর্ণ হয়’’ অর্থাৎ- বিজয়ের বায়ু প্রবাহিত হয়। অথবা মুজাহিদগণ সালাতের মধ্যে আল্লাহর সমীপে বিজয়ের জন্য আবেদন করার ফলে বিজয় অবতরণ হয়, অর্থাৎ বিজয়ের সময় আসে। (মিরকাতুল মাফাতীহ ৭ম খন্ড, পৃঃ ৪৪২)
হাদীসের প্রকাশমান অর্থ এই যে, সূর্য ঢলে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতেন যাতে সালাতের সময় হয় আর তখন দু‘আ কবুল হওয়ার আশা করা যায়।
অনুরূপভাব সূর্য ঢলে যাওয়ার পর বায়ু প্রবাহিত হয় যা বিজয়ের বায়ু যেমনটি ঘটেছিল খন্দাকের যুদ্ধে। ফলে এই সময়ের বায়ু বিজয়ের বলে পরিগণিত হয়েছে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬৫২)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - কাফির রাষ্ট্রপ্রধানদের নিকট পত্র প্রেরণ ও ইসলামের প্রতি আহবান
৩৯৩৪-[৯] কাতাদাহ সূত্রে নু’মান ইবনু মুকররিন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে জিহাদে অংশগ্রহণ করেছি। আমি তাঁকে দেখতাম, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ফজরের সময় হলে সূর্য উদিত হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ হতে বিরত থাকতেন। যখন সূর্য উদিত হয়ে যেত, তখন যুদ্ধ শুরু করতেন। আবার মধ্যাহ্ন হলে যুদ্ধ বন্ধ রাখতেন, যতক্ষণ না সূর্য পশ্চিমাকাশে হেলে পড়ত। আবার সূর্য যখন পশ্চিমাকাশে হেলে পড়ত, তখন (যুহরের সালাত আদায় করে) ’আসরের ওয়াক্ত পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতেন। অতঃপর ’আসরের সালাতের জন্য বিরতি দিতেন এবং সালাত শেষে পুনরায় যুদ্ধ শুরু করতেন। (রাবী কাতাদাহ বলেন) সাহাবায়ে কিরামগণ বলতেন, সে সময় আল্লাহর পক্ষ হতে বিজয়ের বাতাস প্রবাহিত হতো। আর মু’মিনগণ তাদের সালাতে নিজেদের সৈন্যদলের জন্য দু’আ করতেন। (তিরমিযী)[1]
وَعَن قتادةَ عَنِ النُّعْمَانِ بْنِ مُقَرِّنٍ قَالَ: غَزَوْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَكَانَ إِذَا طَلَعَ الْفَجْرُ أَمْسَكَ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ فَإِذَا طَلَعَتْ قَاتَلَ فَإِذَا انْتَصَفَ النَّهَارُ أَمْسَكَ حَتَّى تَزُولَ الشَّمْسُ فَإِذَا زَالَتِ الشَّمْسُ قَاتَلَ حَتَّى الْعَصْرِ ثُمَّ أَمْسَكَ حَتَّى يُصَلَّى الْعَصْرُ ثُمَّ يُقَاتِلُ قَالَ قَتَادَةُ: كَانَ يُقَالُ: عِنْدَ ذَلِكَ تُهِيجُ رِيَاحُ النَّصْرِ وَيَدْعُو الْمُؤْمِنُونَ لِجُيُوشِهِمْ فِي صلَاتهم. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: (كَانَ يُقَالُ : عِنْدَ ذٰلِكَ تَهِيجُ رِيَاحُ النَّصْرِ) বলা হয়েছে, এ সময় বিজয়ের বায়ু প্রবাহিত হয়। অর্থাৎ- সাহাবীগণ বলতেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য ঢলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার হিকমাত এই যে, সূর্য ঢলার পর থেকে বিজয়ের বায়ু প্রবাহিত হয়। সাহাবীদের এ কথা সমর্থন করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ বাণী «نُصِرْتُ بِالصَّبَا» পূবালী বায়ু দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে।
(وَيَدْعُو الْمُؤْمِنُونَ لِجُيُوشِهِمْ فِىْ صلَاتِهِمْ) আর মুসলিমগণ সালাতের মধ্যে তাদের সেনাবাহিনীর বিজয়ের জন্য দু‘আ করতেন। অর্থাৎ- তারা সালাত শেষে অথবা সালাতের ভিতরেই ইসলামী বাহিনীর বিজয়ের জন্য প্রার্থনা করতেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৬১২)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - কাফির রাষ্ট্রপ্রধানদের নিকট পত্র প্রেরণ ও ইসলামের প্রতি আহবান
৩৯৩৫-[১০] ’ইসামুল মুযানী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে এক অভিযানে সৈন্যদলের সাথে পাঠিয়ে উপদেশ দিলেন যে, যখন তোমরা কোনো অঞ্চলে মসজিদ দেখবে কিংবা আযান শুনবে, তখন সে অঞ্চলে কাউকেও হত্যা করবে না (সাবধানতা অবলম্বন করবে)। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن عصامٍ المزنيِّ قَالَ بَعَثَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي سَرِيَّةٍ فَقَالَ: «إِذَا رَأَيْتُمْ مَسْجِدًا أَوْ سَمِعْتُمْ مُؤَذِّنًا فَلَا تَقْتُلُوا أَحَدًا» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: ইসলামী প্রতীকের কোনো আলামত সম্পর্কে যখন নিশ্চিত অবহিত হতে পারবে তা কর্মগতই হোক অথবা বক্তব্যগতই হোক তখন তোমরা কাউকেই হত্যা করবে না যতক্ষণ যতক্ষণ পর্যন্ত মু’মিনদের মধ্যে থেকে কাফিরদেরকে সুস্পষ্টভাবে পৃথক না করা যায়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
ইমাম শাওকানী বলেনঃ অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, কোনো এলাকায় মসজিদ থাকাটাই প্রমাণ করে যে, ঐ অঞ্চলের লোক মুসলিম। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬৩২)
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - কাফির রাষ্ট্রপ্রধানদের নিকট পত্র প্রেরণ ও ইসলামের প্রতি আহবান
৩৯৩৬-[১১] আবূ ওয়ায়িল হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুসলিম সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রাঃ)-এর পক্ষ হতে এক যুদ্ধাভিযানে পারস্যবাসীদের (ইরানীদের) নিকট পত্র লিখে পাঠালেন- বিসমিল্লা-হির রহমা-নির রহীম, মুসলিম সেনাপতি রুস্থাম ও মিহরান-এর প্রতি। সত্য সঠিক পথের অনুসরণকারীদের প্রতি সালাম। অতঃপর জেনে রাখ! আমরা তোমাদেরকে ইসলামের প্রতি আহবান করছি। যদি তোমরা অস্বীকার কর, তাহলে নতি স্বীকার করে স্বহস্তে জিয্ইয়াহ্ আদায় কর। আর যদি তা আদায় করতেও অস্বীকার কর, তবে জেনে রেখ! আমার সঙ্গে এমন এক সৈন্যবাহিনী রয়েছে, যারা আল্লাহর পথে নির্দ্বিধায় জীবন দানকে তেমনি ভালোবাসে যেমনি পারস্যবাসী মদ্যপানকে ভালোবেসে থাকে। সত্য সরল অনুসারীদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
عَن أبي وائلٍ قَالَ: كَتَبَ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ إِلَى أَهْلِ فَارِسَ: بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ مِنْ خَالِدِ بْنِ الْوَلِيدِ إِلَى رُسْتَمَ وَمِهْرَانَ فِي مَلَأِ فَارِسَ. سَلَامٌ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى. أَمَّا بَعْدُ فَإِنَّا نَدْعُوكُمْ إِلَى الْإِسْلَامِ فَإِنْ أَبَيْتُمْ فَأَعْطُوا الْجِزْيَةَ عَنْ يَدٍ وَأَنْتُمْ صَاغِرُونَ فَإِنْ أَبَيْتُمْ فَإِنَّ مَعِيَ قَوْمًا يُحِبُّونَ الْقَتْلَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَا يُحِبُّ فَارِسُ الْخَمْرَ وَالسَّلَامُ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى. رَوَاهُ فِي شَرْحِ السّنة 0
ব্যাখ্যা: (إِلٰى رُسْتَمَ وَمِهْرَانَ فِىْ مَلَأِ فَارِسَ) পারস্যের নেতৃবৃন্দের মধ্যে হতে রুস্তম ও মিহরানের প্রতি مَلَأِ এমন মর্যাদাপূর্ণ ও নেতৃস্থানীয় লোকেদের বলা হয় যাদের কথামত সমাজের লোকজন উঠে বসে।
(فَإِنْ أَبَيْتُمْ فَإِنَّ مَعِيَ قَوْمًا يُحِبُّونَ الْقَتْلَ) (فِي سَبِيلِ اللّٰهِ كَمَا يُحِبُّ) (فَارِسُ) (الْخَمْرَ) তোমরা যদি ইসলাম গ্রহণ অথবা জিয্ইয়াহ্ প্রদান করতে অস্বীকার কর তাহলে জেনে রাখ যে, আমার সাথে এমন একদল লোক রয়েছে যারা মৃত্যুকে তেমন ভালোবাসে পারসস্যের লোকেরা যে রকম মদ ভালোবাসে। অর্থাৎ পানীয় হিসেবে মদ বিস্বাদ হলেও তা পান করার পর যে মজা পায় সে কারণে মদ্যপ-মদ ভালোবাসে, তেমনিভাবে নিহত হওয়া যদিও বাহ্যিক দৃষ্টিতে অপছন্দনীয় ও কষ্টকর তথাপি মু’মিনগণ নিহত হতে ভালোবাসে এজন্য যে, যুদ্ধের ময়দানে প্রাণ দেয়া সাময়িকভাবে কষ্টকর কিন্তু এর পরিণাম অত্যন্ত সুস্বাদু এবং স্থায়ী। আল্লামা ত্বীবী বলেনঃ তোমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও, এ কথা না বলো, আমার সাথে এমন একদল লোক রয়েছে যারা মৃত্যুকে ভালোবাসে এ কথা বলার অর্থ হলো আমার সঙ্গীগণ সাহসী বীর, তারা যুদ্ধে পারঙ্গম মৃত্যুকে তারা পরোয়া করে না। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাভিযানে হত্যার বর্ণনা
৩৯৩৭-[১] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উহুদের দিন জনৈক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলেন। আচ্ছা বলুন! আমি যদি এ যুদ্ধে মারা যাই, তবে আমার অবস্থান কোথায় হবে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, জান্নাতে। এমতাবস্থায় তিনি নিজের হাতের খেজুরগুলো (যা খাচ্ছিলেন) ছুঁড়ে ফেলে দিলেন, অতঃপর জিহাদের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ে শাহাদাত বরণ করলেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ الْقِتَالِ فِى الْجِهَادِ
عَن جَابر قَالَ: قَالَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ أُحُدٍ: أَرَأَيْتَ إِنْ قُتِلْتُ فَأَيْنَ أَنَا؟ قَالَ: «فِي الْجنَّة» فَألْقى ثَمَرَات فِي يَده ثمَّ قَاتل حَتَّى قتل
ব্যাখ্যা: হাদীসের শিক্ষণীয় বিষয়, শহীদ ব্যক্তির জন্য জান্নাত প্রমাণিত। কল্যাণের ব্যাপারে দ্রুত অগ্রগামী হওয়া, অন্তরের আনুকূল্যতা ঠিক রাখতে গিয়ে কল্যাণ থেকে বিমুখ হওয়া যাবে না। (শারহে মুসলিম ১৩শ খন্ড, হাঃ ১৮৯৯)
(فَأَيْنَ أَنَا) অর্থাৎ- অতঃপর আমি কি জান্নাতে থাকব নাকি জাহান্নামে? (قَالَ : «فِى الْجنَّة» فَألْقٰى ثَمَرَات فِىْ يَدِه) তিনি বলেন, জান্নাতে। অতঃপর সে নিজ হাতের খেজুরসমূহ ফেলে দিল। অর্থাৎ শাহাদাত বরণ করে জান্নাতে প্রবেশের সৌভাগ্যের দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার জন্য হাতের খেজুর ফেলে দিয়ে যুদ্ধে বের হলেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাভিযানে হত্যার বর্ণনা
৩৯৩৮-[২] কা’ব ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যথারীতি অভ্যাস ছিল, তিনি কোনো নির্দিষ্ট যুদ্ধাভিযানে যাওয়ার সংকল্প করলে তা মনের মধ্যে লুকিয়ে রেখে অন্যদিকে ইঙ্গিত করতেন। কিন্তু তাবূক যুদ্ধে যাওয়ার সময় প্রচণ্ড গরমের মৌসুমে সফর, দুর্গম মরুপথ এবং শত্রু সংখ্যার বিশালতার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমদের সম্মুখে ব্যাপারটি স্পষ্ট করে ব্যক্ত করলেন, যাতে তারা এ দুর্গম অভিযানের জন্য পরিপূর্ণরূপে প্রস্তুতি নিতে পারে (মনোবল না হারায়)। তাই তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) স্বীয় লক্ষ্যস্থল সাহাবীদেরকে জানিয়ে দিলেন। (বুখারী)[1]
بَابُ الْقِتَالِ فِى الْجِهَادِ
وَعَن كَعْب بن مالكٍ قَالَ: لَمْ يَكُنْ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُرِيدُ غَزْوَةً إِلَّا وَرَّى بِغَيْرِهَا حَتَّى كَانَتْ تِلْكَ الْغَزْوَةُ يَعْنِي غَزْوَةَ تَبُوكَ غَزَاهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي حَرٍّ شَدِيدٍ وَاسْتَقْبَلَ سَفَرًا بَعِيدًا وَمَفَازًا وَعَدُوًّا كَثِيرًا فَجَلَّى لِلْمُسْلِمِينَ أَمْرَهُمْ لِيَتَأَهَّبُوا أُهْبَةَ غَزْوِهِمْ فَأَخْبَرَهُمْ بِوَجْهِهِ الَّذِي يُرِيدُ. رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ
ব্যাখ্যা: (أُهْبَةَ غَزْوِهِمْ) কুশমীহানী (রহঃ)-এর বর্ণনাতে «أُهْبَةَ عَدُوِّهُم» এসেছে। أُهْبَةَ বলতে ঐ বস্তুকে বোঝায়, সফর এবং যুদ্ধের জন্য লোকেরা যার মুখাপেক্ষী হয়। (ফাতহুল বারী ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৪১৮)
(إِلَّا وَرّٰى بِغَيْرِهَا) নিহায়াহ্ গ্রন্থে আছে- অন্য কিছুর মাধ্যমে মূল বিষয়টিকে আড়াল করে নিতেন, ঐ ব্যাপারে ইঙ্গিত দিতেন বিষয়টিকে সংশয়মুক্ত করে দিতেন যে, তিনি অন্য কিছুর ইচ্ছা করছেন। ইবনুল মালিক বলেন, অর্থাৎ তিনি অন্য কিছুর মাধ্যমে মূল বিষয় আড়াল করে নিতেন, তিনি প্রকাশ করতেন যে, তিনি অন্য কিছুর উদ্দেশ্য করছেন, এতে স্বীয় সঙ্কল্পে দৃঢ়তা শত্রু পক্ষের উদাসীনতা এবং ঐ বিষয় সম্পর্কে গুপ্তচরের অবহিত হওয়া এবং সে ব্যাপারে শত্রুদেরকে সংবাদ দেয়া থেকে নিরাপদ থাকা যেত। উদাহরণ স্বরূপ তিনি মক্কায় যুদ্ধের ইচ্ছা করলেন, কিন্তু তিনি মানুষকে খায়বারের অবস্থা, তার পথসমূহের ধরণ সম্পর্কে প্রশ্ন করলেন। আমি অমুক স্থানের অধিবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ইচ্ছা করছি এ কথা স্পষ্ট বলতেন না, কেননা এক স্থানের অধিবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মনস্থ করে ভিন্ন কথা বলা স্পষ্ট মিথ্যা, এটা বৈধ নয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাভিযানে হত্যার বর্ণনা
৩৯৩৯-[৩] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যুদ্ধ হলো ছল-কৌশল। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ الْقِتَالِ فِى الْجِهَادِ
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «الْحَرْب خدعة»
ব্যাখ্যা: (خَدْعَةٌ) ‘‘খা’’ বর্ণে, যবর অথবা পেশ দিয়ে আর উভয় ক্ষেত্রে ‘‘দাল’’ বর্ণে সাকিন দিয়ে অথবা ‘‘খা’’ অক্ষরকে পেশ আর ‘‘দাল’’ অক্ষরকে যবর দিয়ে পড়া যায়।
নববী (রহঃ) বলেনঃ ‘আরবী ভাষাবিদগণ এ কথার উপর একমত হয়েছে যে, প্রথম উচ্চারণটি সর্বাধিক স্পষ্ট, এমনকি সা‘লাব বলেন, আমাদের কাছে সংবাদ পৌঁছেছে যে, এটা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভাষা। এ ব্যাপারে আবূ যার হারবী এবং কায়যায দৃঢ়তা প্রকাশ করেছেন, আর দ্বিতীয় উচ্চারণটিকে সংরক্ষণ করা হয়েছে (অধিক প্রসিদ্ধ) এভাবে আসীলী এর বর্ণনাতে আছে। এক কথায় শব্দটির বিভিন্ন উচ্চারণ আছে। মুনযিরী অন্য একটি উচ্চারণ বর্ণনা করেছেন তা হলো خَدْعَةٌ শব্দটি خادع এর বহুবচন তখন এর অর্থ হবে যোদ্ধারা ধোঁকার গুণে গুণান্বিত। যেন তিনি বলেছেন, যোদ্ধারা ধোঁকায় পতিত।
নববী (রহঃ) বলেনঃ যুদ্ধে কাফিরদেরকে ধোঁকা দেয়া বৈধ হওয়ার ব্যাপারে সকলে একমত যেভাবেই তা সম্ভব হোক। তবে এতে অঙ্গীকার অথবা নিরাপত্তা ভঙ্গের কারণ থাকলে তা বৈধ হবে না।
ইবনুল ‘আরবী বলেনঃ যুদ্ধে ধোঁকা প্রদান ইঙ্গিত করা ও ওঁৎ পেতে থাকার মাধ্যমে এবং অনুরূপ কিছুর মাধ্যমে সংঘটিত হয়।
ইবনুল মুনীর বলেনঃ যুদ্ধের অর্থ হলো ধোঁকা দেয়া অর্থাৎ উত্তম যুদ্ধ হলো ধোঁকা দেয়া, কেননা এতে পরস্পর অভিমুখী হওয়ার বিপদ ছাড়াই অর্থাৎ লোক ক্ষয় না করে বিজয় অর্জিত হয়।
ওয়াকিদী উল্লেখ করেনঃ (اَلْحَرْبَ خَدْعَةٌ) ‘যুদ্ধ ধোঁকা দান’ এ কথাটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রথম খন্দাকের যুদ্ধে বলেছেন। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩০৩০)
মিরকাতুল মাফাতীহে অত্র হাদীসের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে- ধোঁকা দান দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- যুদ্ধের বিষয় একটি ধোঁকা দানের মাধ্যমে শেষ হয়, যুদ্ধের দ্বারা ধোঁকায় পতিত ব্যক্তিকে ধোঁকা দেয়া হয়, অতঃপর তার পা পিচ্ছিল খায়, এমতাবস্থায় সে এর কোনো সংশোধনী পায় না এবং অব্যাহতির সুযোগ পায় না। হাদীস দ্বারা যেন ব্যক্তিকে এ ব্যাপারে সতর্ক করা হলো।
শারহে মুসলিমে আছে, হাদীসে তিনটি বিষয়ে মিথ্যা বলার বৈধতা বিশুদ্ধভাবে সাব্যস্ত হয়েছে, তিনটির একটি হলো- যুদ্ধে মিথ্যা বলা। ত্ববারী বলেনঃ যুদ্ধে মিথ্যা বলা বৈধ বলতে দু’ ধরনের অর্থের সম্ভাবনা রাখে, এমন কথা বলা যা প্রকৃত মিথ্যা নয়, কেননা প্রকৃত মিথ্যা অবৈধ। প্রকৃত মিথ্যা বলা বৈধ, তবে ইঙ্গিতের উপর সীমাবদ্ধ থাকা উত্তম। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞাত। (শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৭৩৯)
দ্রঃ ‘আওনুল মা‘বূদ [৫ম খন্ড, হাঃ ২৬৩৪] এবং তুহফাতুল আহওয়াযী [৫ম খন্ড, হাঃ ১৬৭৫]।
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাভিযানে হত্যার বর্ণনা
৩৯৪০-[৪] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই কোনো যুদ্ধাভিযানে বের হতেন তখন উম্মু সুলায়ম (রাঃ) (আনাস (রাঃ)-এর মা) এবং অন্যান্য আনসারী মহিলাগণ জিহাদে শামিল থাকতেন। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এ সমস্ত মহিলাগণ সৈন্যদেরকে পানি পান করাতেন এবং আহতদের সেবা-শুশ্রূষা করতেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْقِتَالِ فِى الْجِهَادِ
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَغْزُو بِأُمِّ سُلَيْمٍ وَنِسْوَةٍ مِنَ الْأَنْصَارِ مَعَهُ إِذَا غَزَا يَسْقِينَ الْمَاءَ وَيُدَاوِينَ الْجَرْحَى. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: নববী (রহঃ) বলেনঃ উপরোক্ত হাদীসে সেবা-শুশ্রুষা তাদের মাহরাম ও তাদের স্বামীদের জন্য ছিল। আর যে চিকিৎসা তারা ছাড়া অন্যদের জন্য ছিল তাতে ক্ষতস্থান ছাড়া অন্যস্থানে হাতের স্পর্শ হতো না। ইবনুল হুমাম বলেন, চিকিৎসা এবং পানি পান করানোর জন্য যুদ্ধে বৃদ্ধ মহিলাদের নিয়ে যাওয়া উত্তম। আর যদি সহবাসের প্রয়োজন থাকে, তাহলে স্বাধীনা নারীকে না নিয়ে দাসীদের নিয়ে যাওয়া উত্তম। তারা সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে না, কেননা এতে মুসলিমদের দুর্বলতা প্রকাশ পায়। তবে একান্ত প্রয়োজন হলে ভিন্ন কথা। যেমন উম্মু সুলায়ম (রাঃ) হুনায়নের যুদ্ধের দিন যুদ্ধ করেছিলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এ যুদ্ধকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। যেমন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, «لَمُقَامُهَا خَيْرٌ مِنْ مُقَامِ فُلَانٍ» অর্থাৎ- ‘‘তার অবস্থান অমুকের অবস্থান অপেক্ষা উত্তম।’’ কতক পরাজিতদেরকে উদ্দেশ্য করছেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
‘আওনুল মা‘বূদে অত্র হাদীসের ব্যাখ্যায় খত্ত্বাবী বলেন, এ হাদীসে দয়া ও খিদমাত গ্রহণ স্বরূপ মহিলাদের নিয়ে যুদ্ধে বেরিয়ে যাওয়া বৈধ হওয়ার ব্যাপারে প্রমাণ রয়েছে। (‘আওনুল মা‘বূদে ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫২৮)
অত্র হাদীসের ব্যাখ্যায় তুফহাতুল আহওয়াযীতে আছে, আমরা সম্প্রদায়কে পানি পান করাতাম, তাদের সেবা করতাম, নিহত ও আহতদেরকে মদীনাতে ফিরিয়ে আনতাম। আহমাদ, মুসলিম এবং ইবনু মাজাতে উম্মু ‘আতিয়্যার হাদীসে এসেছে, উম্মু ‘আতিয়্যাহ্ বলেন, আমি আল্লাহর রসূলের সাথে সাতটি যুদ্ধে উপস্থিত ছিলাম, আমি যোদ্ধাদের পেছনে তাদের মাল-পত্রের কাছে থাকতাম, তাদের জন্য খাদ্য তৈরি করতাম, আহতদের চিকিৎসা করতাম, পক্ষাঘাত ব্যক্তিদের পরিচালনা করতাম। এ সকল হাদীসে ঐ ব্যাপারে প্রমাণ রয়েছে যে, এ সকল কল্যাণকর কাজের জন্য মহিলাদের যুদ্ধে নিয়ে যাওয়া বৈধ, জিহাদ মহিলাদের ওপর আবশ্যক নয়। আহমাদ ও বুখারীতে ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর হাদীস এ ব্যাপারে প্রমাণ বহন করছে। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমরা দেখতে পাচ্ছি জিহাদ সর্বোত্তম ‘আমল। এখন আমরা কি জিহাদ করবো না? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তোমাদের জন্য সর্বোত্তম জিহাদ হলো কবুল হজ্জ/হজ।
ইবনু বাত্ত্বল বলেন, ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর হাদীস ঐ কথার উপর প্রমাণ বহন করছে যে, নারীদের ওপর জিহাদ ফরয নয়, তবে «أَفْضَلُ الْجِهَادِ حَجٌّ مَبْرُورٌ» ‘‘সর্বোত্তম জিহাদ কবুল হজ্জ/হজ’’ তাঁর এ উক্তিতে তা নেই। বুখারীর এক বর্ণনাতে এসেছে (جِهَادُكُنَّ الْحَجُّ) ‘তোমাদের জিহাদ হজ্জ/হজ’, তবে তা প্রমাণ করছে না যে, জিহাদে তাদের স্বেচ্ছাসেবক হওয়ার অধিকার নেই। জিহাদ তাদের জন্য এ কারণে আবশ্যক নয় যে, এতে তাদের পর্দা বিনষ্ট হয়, পর পুরুষদের সংস্পর্শতা লাভ হয়। এ কারণে জিহাদ অপেক্ষা হজ্জ/হজ তাদের জন্য উত্তম। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৫৭৫)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাভিযানে হত্যার বর্ণনা
৩৯৪১-[৫] উম্মু ’আত্বিয়্যাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে সাতটি জিহাদে অংশগ্রহণ করেছি। মুজাহিদগণ যখন ময়দানে যুদ্ধরত থাকতেন, তখন আমি তাঁবুতে তাদের যুদ্ধাস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ করতাম, খাবার তৈরি করতাম এবং আহত সৈন্যদের পরিচর্যা ও রোগীর সেবা-শুশ্রূষা করতাম। (মুসলিম)[1]
بَابُ الْقِتَالِ فِى الْجِهَادِ
وَعَن أُمِّ عطيَّةَ قَالَتْ: غَزَوْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَبْعَ غَزَوَاتٍ أَخْلُفُهُمْ فِي رِحَالِهِمْ فَأَصْنَعُ لَهُمُ الطَّعَامَ وَأُدَاوِي الْجَرْحَى وَأَقُومُ عَلَى المرضى. رَوَاهُ مُسلم
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাভিযানে হত্যার বর্ণনা
৩৯৪২-[৬] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিহাদে মহিলা ও শিশুদেরকে হত্যা করা হতে বিরত থাকতে বলেছেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ الْقِتَالِ فِى الْجِهَادِ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ قَالَ: نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ قَتْلِ النِّسَاءِ وَالصِّبْيَانِ
ব্যাখ্যা: ইবনুল হুমাম বলেনঃ বুখারী, মুসলিম, আবূ দাঊদ, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ ‘আবদুল্লাহ বিন ‘উমার থেকে বর্ণনা করেন, (যুদ্ধের ময়দানে) জনৈক মহিলাকে নিহতবস্থায় পাওয়া গেলে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলা ও শিশুদেরকে হত্যা করতে নিষেধ করলেন। তিনি আরো বলেন, আমি মনে করি মহিলা ও শিশুদেরকে হত্যা করা হারাম হওয়া সর্বজনস্বীকৃত। আবূ বাকর হতে বর্ণিত, তিনি যখন আবূ সুফ্ইয়ান-এর পুত্র ইয়াযীদকে শামে পাঠালেন তখন তাকে উপদেশ দিয়ে বললেনঃ ‘‘তোমরা শিশু, মহিলা ও বৃদ্ধদেরকে হত্যা করবে না’’। তিনি বলেন, তবে আমরা যাদের কথা বলেছি তাদের মধ্য হতে যারা যুদ্ধ করবে তাদের হত্যা করা হবে। নিঃসন্দেহে যেমন পাগল, শিশু, মহিলা, বৃদ্ধ ও পাদরীদেরকে হত্যা করা যাবে না, তবে বাচ্চা এবং পাগলকে যুদ্ধের অবস্থাতে পাওয়া গেলে তাদের হত্যা করা হবে। আর মহিলা, পাদরী এবং তাদের অনুরূপরা যখন যুদ্ধ করবে তখন তাদেরকে বন্দির পর হত্যা করা হবে, আর রাণী মহিলাকে হত্যা করা হবে যদিও সে যুদ্ধ না করে থাকে। এভাবে বাচ্চা রাজা ও নির্বোধ রাজাকে হত্যা করা হবে, কেননা বাদশার হত্যাতে তাদের আগ্রহের ভাঙ্গন রয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
ইমাম নববী বলেনঃ মহিলা ও শিশুরা যখন যুদ্ধে না জড়াবে তখন তাদেরকে হত্যা করা হারাম হওয়ার ব্যাপারে বিদ্বানগণ একমত। তবে তারা যদি যুদ্ধ করে তাহলে জুমহূর বিদ্বানদের মত হলো- তাদেরকে হত্যা করা হবে, আর কাফির বৃদ্ধরা যদি যুদ্ধের ব্যাপারে কৌশল এঁটে থাকে তাহলে তাদেরকেও হত্যা করা হবে অন্যথায় তাদের এবং পাদরীদের ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। মালিক এবং আবূ হানীফাহ্ বলেন, তাদেরকে হত্যা করা যাবে না। আর শাফি‘ঈ এর মাযহাবে সর্বাধিক বিশুদ্ধ মত হলো- তাদেরকে হত্যা করা হবে। (শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৭৪৪)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাভিযানে হত্যার বর্ণনা
৩৯৪৩-[৭] সা’ব ইবনু জাসসামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো, যদি কোনো মুশরিক পরিবারের ওপর রাতে অতর্কিত আক্রমণকালে মহিলা ও শিশুগণ সেই আক্রমণের শিকার হয়ে আহত বা নিহত হয়- তাদের ব্যাপারে আপনি কি বলেন? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তারাও তাদের অন্তর্ভুক্ত। অপর এক বর্ণনায় আছে, তারাও তাদের পিতা-মাতাদের অন্তর্ভুক্ত। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ الْقِتَالِ فِى الْجِهَادِ
وَعَن الصَّعبِ بنِ جِثَّامةَ قَالَ: سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عنْ أهلِ الدَّارِ يَبِيتُونَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ فَيُصَابَ مِنْ نِسَائِهِمْ وَذَرَارِيِّهِمْ قَالَ: «هُمْ مِنْهُمْ» . وَفِي رِوَايَةٍ: «هُمْ مِنْ آبائِهم»
ব্যাখ্যা: মুসলিমের শারহ-তে আছে, হাদীসে ذَرَارِيِ বলতে মহিলা এবং শিশু বুঝায়। এখানে উদ্দেশ্য শিশু এবং বাচ্চা ছেলে হোক বা মেয়ে হোক। (قَالَ : «هُمْ مِنْهُمْ») মহিলা এবং বাচ্চারা পুরুষদেরই অন্তর্ভুক্ত অর্থাৎ- মহিলা এবং বাচ্চাদেরকে যখন আলাদা করা সম্ভব হবে না তখন তারা পুরুষদের হুকুমের আওতাভুক্ত। সুতরাং হত্যা না করার বিষয়টি শনাক্ত করার উপর নির্ভরশীল। একমতে বলা হয়েছে, মহিলা ও শিশুদেরকে দাস বানানো উদ্দেশ্য। কাযী বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দ্বারা তাদেরকে বন্দি করা ও দাস বানানো বৈধতা উদ্দেশ্য করেছেন। যেমন বলা যায় যদি তারা দিনে যোদ্ধাদের কাছে এসে প্রকাশ্যে তাদের সাথে যুদ্ধ করে অথবা হত্যার ইচ্ছা ও উদ্দেশ্য ছাড়াই রাত্রের অন্ধকারে তাদেরকে হত্যা করা হয়ে থাকে তাহলে ক্ষতিপূরণ নেই এবং হত্যা করাতে কোনো দোষ নেই। কেননা তারাও কাফির, তাদেরকে হত্যা করা থেকে বিরত থাকা কেবল ঐ সময় আবশ্যক যখন তা সহজসাধ্য হয়, আর এ কারণেই তারা যদি তাদের মহিলা ও সন্তানদের মাধ্যমে আত্মরক্ষার পথ অবলম্বন করে তাহলে তাদের ব্যাপারে কোনো পরোওয়া করা হবে না।
ইবনুল হুমাম বলেনঃ তাদেরকে তীর নিক্ষেপ করাতে কোনো দোষ নেই, যদিও তাদের মাঝে কোনো মুসলিম বন্দি অথবা ব্যবসায়ী থাকে, বরং যদি তারা মুসলিম বন্দী ও মুসলিম শিশুদের মাধ্যমে আত্মরক্ষা করে, আর তাদেরকে তীর নিক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকলে মুসলিমরা পরাজিত হবে এ কথা বুঝতে পারে অথবা এ কথা বুঝতে না পারে উভয় সমান। তবে মুসলিম বন্দী ও শিশুদেরকে লক্ষ্যবস্তু করা যাবে না। কিন্তু এ অবস্থায় তাদেরকে তীর নিক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকলে মুসলিমদের পরাজয় হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে তাদেরকে লক্ষ্যবস্তু বানানো যাবে। এটা হামান বিন যিয়্যাদণ্ডএর উক্তি। এরপরও যদি তারা তীর নিক্ষেপ করে আর এতে কোনো মুসলিম তীরবিদ্ধ হয় তাহলে এক্ষেত্রে হামান বিন যিয়্যাদণ্ডএর মতে দিয়াত এবং কাফফারাহ্ লাগবে। আর শাফি‘ঈ-এর মতে কাফফারা লাগবে এক্ষেত্রে একমত। আর দিয়াতের ক্ষেত্রে দু’ মত। মুহাম্মাদ বলেনঃ ইমাম যখন কোনো দেশ জয় করবে এবং তার জানা থাকবে যে, তাতে মুসলিম অথবা যিম্মি আছে, তাহলে তাদের কাউকে এ সম্ভাবনার কারণে হত্যা করা বৈধ হবে না যে, ঐ লোকটি মুসলিম অথবা যিম্মি।
আর কাফির বৃদ্ধদের মাঝে যদি রণকৌশল সম্পর্কে অভিমত পেশকারী কোনো ব্যক্তি থাকে তাহলে তাদেরকে হত্যা করা হবে, অন্যথায় তাদের ব্যাপারে এবং পাদরীদের ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। মালিক ও আবূ হানীফাহ্ বলেন, তাদেরকে হত্যা করা হবে না, শাফি‘ঈ-এর মাযহাবে সর্বাধিক বিশুদ্ধ হলো তাদেরকে হত্যা করা হবে। এ হাদীসে পাওয়া যায় যে, দুনিয়াতে কাফিরদের সন্তানদের হুকুম তাদের পিতৃপুরুষদের হুকুমের মতো। পক্ষান্তরে যখন তারা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পূর্বে মারা যাবে তখন পরকালীন বিষয়ে তাদের ব্যাপারে তিনটি মত। বিশুদ্ধ মত হলো- নিঃসন্দেহে তারা জান্নাতে থাকবে, দ্বিতীয়ঃ জাহান্নামে। তৃতীয়ঃ তাদের বিষয়ে কোনো ব্যাপারে দৃঢ়তা প্রকাশ করা যাবে না। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
ইবনু বাত্ত্বল এবং অন্যান্য ‘আলিমগণ বলেনঃ এ ব্যাপারে সকল বিদ্বানগণ একমত যে, মহিলা ও শিশুদেরকে হত্যা করা যাবে না। মহিলাদেরকে হত্যা না করা মূলত তাদের দুর্বলতার কারণে, আর শিশুদেরকে হত্যা না করা মূলত কুফরী কর্মের পাপ লিপিবদ্ধের বয়সে উপনীত না হওয়ার কারণে। তাদেরকে অবশিষ্ট রেখে সার্বিক উপকার লাভের কারণে, হয় দাস বানানোর মাধ্যমে অথবা যার ব্যাপারে মুক্তিপণ দেয়া বৈধ তার ব্যাপারে মুক্তিপণ দেয়ার মাধ্যমে। হাযিমী সা‘ব ইবনু জাস্সামাহ্-এর হাদীসের বাহ্যিকতার উপর ভিত্তি করে মহিলা ও শিশুদেরকে হত্যা করা বৈধ হওয়ার ব্যাপারে মত প্রকাশ করেছেন, তিনি দাবী করেছেন সা‘ব-এর হাদীস নিষেধাজ্ঞার হাদীসসমূহের রহিতকারী। তার এ বক্তব্য গরীব। যতক্ষণ পর্যন্ত খাস হাদীস বর্ণিত না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত ‘আমে্র প্রতি ‘আমল করা বৈধ হওয়ার দলীল অত্র হাদীস। কেননা সাহাবীগণ মুশরিকদের হত্যা করার উপর প্রমাণ বহনকারী ‘আম্ তথা ব্যাপক দলীলসমূহ অবলম্বন করেছেন, অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মহিলা ও শিশুদেরকে হত্যা করা সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেন তখন তারা এ ব্যাপকতাকে খাস হাদীস দ্বারা নির্দিষ্ট করেছেন। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩০১২)
শারহে মুসলিমে আছে, হাদীসটি রাত্রিতে আক্রমণ করা বৈধ হওয়া এবং যাদের কাছে দা‘ওয়াত পৌঁছেছে তাদেরকে না জানিয়ে তাদের ওপর আক্রমণ করা বৈধ হওয়ার উপর প্রমাণ আছে। (শারহে মুসলিম ১২তম খন্ড, হাঃ ১৭৪৫)
আওনুল মা‘বূদে আছে, কুসতুলানী বলেনঃ তাদেরকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা উদ্দেশ্য নয়, বরং যখন তাদেরকে হত্যা করা ছাড়া পুরুষদেরকে হত্যা করা সম্ভব হবে না তখন তাদেরকে হত্যা করতে হবে অন্যথায় মহিলা এবং শিশুদেরকে হত্যা করা সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞাজনিত স্পষ্ট হাদীসসমূহের মাঝে সমন্বয় সাধনে মহিলা ও শিশুদেরকে হত্যার পন্থা বর্জন করা সম্ভব হলে তাদেরকে হত্যা করা হতে বিরত থাকতে হবে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬৬৯)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাভিযানে হত্যার বর্ণনা
৩৯৪৪-[৮] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বানী নাযীর সম্প্রদায়ের খেজুর বাগান কেটে ফেলতে ও জ্বালিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। এতদসম্পর্কে (প্রখ্যাত ইসলামী কবি) হাসসান ইবনুস্ সাবিত কবিতা আবৃত্তি করেন যার দুই চরণ-
’’বানী লুয়াই সম্প্রদায়ের সম্মানিত নেতৃবর্গের পক্ষে বুওয়াইরাহ্-এর সর্বত্র প্রজ্জ্বলিত আগুন বরই সুখপ্রদ হয়েছে।’’ আর উক্ত ঘটনার প্রেক্ষাপটে কুরআনের এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়, ’’যে সমস্ত খেজুর গাছসমূহ তোমরা কেটে ফেলেছ বা যেগুলো তাদের কা--র উপর স্থির রেখে দিয়েছ, তা তো আল্লাহর সম্মতিক্রমেই করেছ’’- (সূরা আল হাশ্র ৫৯ : ৫)। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ الْقِتَالِ فِى الْجِهَادِ
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَطَعَ نَخْلَ بني النَّضيرِ وحرَّقَ وَلها يقولُ حسَّانٌ:
وَهَانَ عَلَى سَرَاةِ بَنِي لُؤَيٍّ حَرِيقٌ بِالْبُوَيْرَةِ مُستَطيرُ
وَفِي ذَلِكَ نَزَلَتْ (مَا قَطَعْتُمْ مِنْ لِينَةٍ أَوْ تَرَكْتُمُوهَا قَائِمَةً عَلَى أُصُولِهَا فَبِإِذْنِ اللَّهِ)
ব্যাখ্যা: مَا قَطَعْتُمْ مِنْ لِينَةٍ أَوْ تَرَكْتُمُوْهَا قَائِمَةً عَلٰى اُصُوْلِهَا فَبِإِذْنِ اللهِ এ ব্যাপারে বর্ণনা করা হয়েছে, নিশ্চয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাদের খেজুর বাগান কাটতে নির্দেশ করলেন তখন তারা বললঃ হে মুহাম্মাদ! তুমি জমিনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে নিষেধ করতে এখন খেজুর বৃক্ষ কাটা ও তা জালিয়ে দেয়ার কারণ কি? তখন অত্র আয়াত অবতীর্ণ হয়, কাফিরদের ক্রোধ বৃদ্ধি করার উদ্দেশে। তাদের ঘর-বাড়ী ধ্বংস করা, তাদের বৃক্ষসমূহ কর্তন করা বৈধ হওয়ার ব্যাপারে দলীল গ্রহণ করা হয়েছে এ ঘটনা থেকেই। নববী বলেনঃ কুরআনে উল্লেখিত لِينَةٍ দ্বারা ‘আজ্ওয়া ছাড়া সকল প্রকার খেজুর বৃক্ষ উদ্দেশ্য।
অত্র হাদীসে কাফিরদের বৃক্ষ কাটা ও জ্বালিয়ে দেয়ার বৈধতা প্রমাণ করে। এটি জুমহূরের মত। একমতে বলা হয়েছে, বৈধ হবে না। ইবনুল হুমাম বলেনঃ এটা বৈধ হবে, কেননা উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর শত্রুদের ধ্বংস করা এবং তাদের আগ্রহ ভেঙ্গে দেয়া, আর এ পন্থার মাধ্যমে তা অর্জন হয়। সুতরাং তারা তাদের সম্ভাব্যতা অনুযায়ী জ্বালিয়ে দিবে, বৃক্ষ কেটে দিবে, শস্য নষ্ট করবে। তবে এটা ঐ সময় করা হবে যখন এ পন্থা ছাড়া অন্য পন্থায় তাদের পাকড়াওয়ের ব্যাপারে প্রবল ধারণা না জাগবে। আর বাহ্যিক দিক যদি এমন হয় যে, তারা পরাজিত হবে এবং মুসলিমদের বিজয় সুনিশ্চিত তখন এ ধরনের কাজ করা মাকরূহ, কেননা তা অপ্রয়োজনীয় স্থানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির নামান্তর, আর প্রয়োজন ছাড়া তা বৈধ করা হয়নি। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
আওযা‘ঈ এবং আবূ সাওর একে মাকরূহ মনে করেছেন, আর তারা উভয়ে প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন যে, আবূ বাকর এমন কাজ না করতে তার সৈন্যবাহিনীকে উপদেশ দিয়েছেন। এর উত্তরে বলা হয়েছে : আবূ বাকর তা অবশিষ্ট রাখাকে কল্যাণজনক মনে করেছিলেন বিধায় তা অবশিষ্ট রাখতে উপদেশ দিয়েছিলেন, কেননা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন নিশ্চয় তা মুসলিমদের হবে ফলে তিনি তা তাদের জন্য অবশিষ্ট রাখার ইচ্ছা করেছেন। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬১২)
ইমাম আহমাদ বলেনঃ যুদ্ধ যদি এমন স্থানে হয় যা থেকে যোদ্ধারা মুক্তি পেতে পারে না অর্থাৎ- সৈন্যবাহিনী কখনো আগুন জ্বালানো এবং বিনাশ সাধনের মুখাপেক্ষক্ষ হয়, এমতাবস্থায় তারা তা থেকে বাঁচতে পারে না তখন এটা বৈধ।। পক্ষান্তরে প্রয়োজনহীনভাবে আগুন জ্বালানো যাবে না, এভাবে যখন তা তাদের জন্য খুবই ক্ষতিকর হবে তখন তা ধ্বংস করা যাবে না। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৫৫২)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাভিযানে হত্যার বর্ণনা
৩৯৪৫-[৯] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আওন হতে বর্ণিত। নাফি’ [ইবনু ’উমার (রাঃ)-এর মুক্ত দাস] তাঁকে লিখে জানান, ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’উমার(রাঃ) তাঁকে বলেছেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বানী মুসত্বালিক-এর ওপর অতর্কিতভাবে আক্রমণ করেন, যখন তারা মুরয়সী’ নামক স্থানে নিজেদের গবাদিপশু নিয়ে বিভোর ছিল। ফলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদের মধ্যে যুদ্ধ করার সক্ষম লোকেদেরকে হত্যা করেন এবং নারী ও শিশু-কিশোরদেরকে বন্দী করলেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ الْقِتَالِ فِى الْجِهَادِ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَوْنٍ: أَنَّ نَافِعًا كَتَبَ إِلَيْهِ يُخْبِرُهُ أَنَّ ابْنَ عمر أخبرهُ أَن ابْن عمر أَخْبَرَهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَغَارَ عَلَى بَنِي الْمُصْطَلِقِ غَارِّينِ فِي نَعَمِهِمْ بِالْمُرَيْسِيعِ فَقتل الْمُقَاتلَة وسبى الذُّرِّيَّة
ব্যাখ্যা: (الْمُقَاتِلَةَ) এর দ্বারা এখানে ঐ ব্যক্তি উদ্দেশ্য যে ব্যক্তি যুদ্ধ করার উপযুক্ত। আর সে হলো জ্ঞানবান প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি। (الذُّرِّيَّةَ) এ শব্দ দ্বারা মহিলা ও শিশু উদ্দেশ্য। ইবনুল মালিক বলেনঃ অত্র হাদীসে কাফিরদের উদাসীন থাকাবস্থায় তাদেরকে হত্যা করা, তাদের সম্পদ গ্রাস করা বৈধ হওয়ার ব্যাপারে দলীল আছে।
ইবনুল হুমাম বলেনঃ বুখারী, মুসলিমে ইবনু ‘আওন থেকে বর্ণিত আছে : আমি নাফি‘র কাছে পত্র লিখলাম, এমতাবস্থায় আমি তাকে যুদ্ধের পূর্বে মানুষকে ইসলামের দিকে দা‘ওয়াত দেয়ার ব্যাপারে প্রশ্ন করি তখন তিনি আমার কাছে লিখলেন, এটা কেবল ইসলামের সূচনালগ্নে ছিল। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বানু মুস্ত্বালিকে আক্রমণ করেছিলেন এমতাবস্থায় যে, তারা উদাসীন ছিল, তাদের প্রাণীগুলো পানি পান করছিল, এ আক্রমণে তিনি যোদ্ধদেরকে হত্যা করলেন, মহিলা ও শিশুদেরকে বন্দী করলেন, সেদিন তিনি জুওয়াইবিয়্যাহ্ বিনতু হারিস-কে লাভ করেন। ইবনু ‘উমার এ ব্যাপারে আমার কাছে হাদীস বর্ণনা করেছেন, আর তিনি ঐ বাহিনীতে ছিলেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
শারহে মুসলিমে আছে- যে সকল কাফিরদের কাছে ইসলামের দা‘ওয়াত পৌঁছেছে আক্রমণের ব্যাপারে তাদেরকে সতর্ক না করেই তাদের ওপর আক্রমণ চালানো বৈধ হওয়ার ব্যাপারে তিনটি মত। এ কথা মা‘যূরী এবং কাযী বর্ণনা করেন।
একটি হলো- সতর্ক করা আবশ্যক। এ মতটি মালিক এবং অন্যান্যদের মত, এবং এটা দুর্বল মত।। দ্বিতীয়, সতর্ক করা আবশ্যক নয়, আর এটা তার অপেক্ষাও দুর্বল অথবা বাতিল। তৃতীয়, যদি তাদের কাছে দা‘ওয়াত পৌঁছে না থাকে তাহলে আবশ্যক আর পৌঁছে থাকলে আবশ্যক নয়, তবে মুস্তাহাব। আর এটাই বিশুদ্ধ মত, এ মত পোষণ করেছেন ইবনু ‘উমার-এর গোলাম নাফি‘, হাসান বাসরী, সাওরী, লায়স, শাফি‘ঈ, আবূ সাওর, ইবনুল মুনযির ও জুমহূর। ইবনুল মুনযির বলেনঃ এটা অধিকাংশ বিদ্বানদের উক্তি, বিশুদ্ধ হাদীসসমূহ এ অভিমতকেই সমর্থন করে।
অত্র হাদীস প্রমাণ করে, ‘আরবদেরকে দাস বানানো বৈধ, কেননা বানু মুসত্বালিক খুযা‘আহ্ গোত্রের অন্তর্গত ‘আরব বংশোদ্ভূত। এটা ইমাম শাফি‘ঈ-এর নতুন মত, আর এটাই সঠিক। আরও এ মত পোষণ করেছেন ইমাম মালিক, তাঁর সকল সাথীবর্গ, আবূ হানীফাহ্, আওযা‘ঈ এবং জুমহূর বিদ্বানগণ। বিদ্বানদের একটি দল বলেনঃ তাদের দাস বানানো যাবে না এটা ইমাম শাফি‘ঈ-এর প্রবীণ মত। (শারহে মুসলিম ১২তম খন্ড, হাঃ ১৭৩০; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬৩০)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাভিযানে হত্যার বর্ণনা
৩৯৪৬-[১০] আবূ উসায়দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বদরের যুদ্ধের দিন যখন আমরা সারিবদ্ধ হয়ে কুরায়শদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলাম এবং তারাও আমাদের মুকাবিলায় সারিবদ্ধ হয়েছিল, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে নির্দেশ দিলেন, যখন তারা তোমাদের খুব সন্নিকটবর্তী হবে তখনই তাদের ওপর তীর নিক্ষেপ করবে।
অপর এক বর্ণনায় আছে, যখনই তারা তোমাদের খুব কাছাকাছি এসে যাবে, তখনই তীর ছুঁড়তে থাকবে এবং কিছু তীর সংরক্ষিত রাখবে। (বুখারী)[1]
মিশকাত গ্রন্থকার বলেন, মূল মাসাবীহ গ্রন্থে সা’দ -এর হাদীস যার প্রথম বাক্য ’’তোমরা কি সাহায্যপ্রাপ্ত?’’ তা আমি ’’ফাকীরদের ফযীলত’’ অধ্যায়ে এবং অপর একটি হাদীস বারা হতে বর্ণিত, ’’রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সময় একটি দল পাঠিয়েছিলেন’’ হাদীসটি আমি ইনশা-আল্লা-হ ’’মু’জিযা’’র অধ্যায়ে বর্ণনা করব।
بَابُ الْقِتَالِ فِى الْجِهَادِ
وَعَن أبي أَسِيدٍ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَنَا يَوْمَ بَدْرٍ حِينَ صَفَفَنَا لِقُرَيْشٍ وَصَفُّوا لَنَا: «إِذَا أَكْثَبُوكُمْ فَعَلَيْكُمْ بِالنَّبْلِ» . وَفِي رِوَايَةٍ: «إِذَا أَكْثَبُوكُمْ فَارْمُوهُمْ وَاسْتَبْقُوا نَبْلَكُمْ» . رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ
وَحَدِيث سعد: «هُوَ تُنْصَرُونَ» سَنَذْكُرُهُ فِي بَابِ «فَضْلِ الْفُقَرَاءِ» . وَحَدِيثُ الْبَرَاءِ: بَعَثَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَهْطًا فِي بَابِ «الْمُعْجِزَاتِ» إِنْ شَاءَ اللَّهُ تَعَالَى
ব্যাখ্যা: (إِذَا أَكْثَبُوْكُمْ) অর্থাৎ- তারা যখন তোমাদের এ পরিমাণ কাছাকাছি হয় যে, তোমাদের তীরগুলো তাদের কাছে পৌঁছবে। বুখারীর অন্য বর্ণনাতে আছে, (إِذَا أَكْثَبُوْكُمْ فَارْمُوْهُمْ) অর্থাৎ- তোমরা তীর নিক্ষেপে তাড়াতাড়ি করবে না এবং দূর থেকেও নিক্ষেপ করবে না, কেননা কখনো তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
আবূ দাঊদ-এর বর্ণনাতে এসেছে «يَعْنِي غَشَوْكُمْ» অর্থাৎ ‘‘তারা যখন তোমাদেরকে ঘিড়ে নিবে।’’ আর এটা উদ্দেশের সাথে, সর্বাধিক সাদৃশ্যপূর্ণ। একে সমর্থন করছে ইবনু ইসহক-এর বর্ণনা, ‘‘নিঃসন্দেহে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদেরকে নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, তারা যখন তোমাদের নিকটবর্তী হবে তখন তীর দ্বারা তাদেরকে তোমাদের থেকে সরিয়ে দিবে। ইবনু ফারিস বলেনঃ অর্থাৎ- তারা যখন তোমাদের কাছাকাছি হবে এবং তোমাদেরকে তাদের ব্যাপারে সক্ষম করে দিবে তখন তোমরা তাদেরকে তীর নিক্ষেপ করবে।
(فَارْمُوْهُمْ وَاسْتَبْقُوْا نَبْلَكُمْ) অর্থাৎ তিনি অবশিষ্টতার অনুসন্ধান করেছেন। দাঊদী বলেন, (ارْمُوْهُمْ) এর অর্থ হলো, তোমরা প্রস্তর নিক্ষেপ কর, কেননা তা যখন দলের মাঝে নিক্ষেপ করা হবে তখন তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে না। তিনি বলেন, (اسْتَبْقُوْا نَبْلَكُمْ) এর অর্থ হলো- পারস্পরিক সংঘাত সৃষ্টি হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তীর নিক্ষেপ না করে তা সংরক্ষণ কর। এভাবে তিনি বলেন এবং অন্য কেউ বলেন, অর্থাৎ তোমাদের কিছু তীর তাদেরকে নিক্ষেপ করবে, সমস্ত তীর না। আমার কাছে যা স্পষ্ট হচ্ছে তা হলো নিঃসন্দেহে (اسْتَبْقُوْا نَبْلَكُمْ) তাঁর এ উক্তির অর্থ তার (ارْمُوْهُمْ) এ উক্তির সাথে সম্পর্কিত নয়। এটা কেবল মুশরিক বা মুসলিমদের নিকটবর্তী না হওয়া পর্যন্ত তীর নিক্ষেপ বিলম্ব করার ব্যাপারে নির্দেশের মাধ্যমে উদ্দেশ্যকে বর্ণনা করে দেয়ার মত। অর্থাৎ- তারা যখন দূরে থাকবে তখন অধিকাংশ তীর তাদের কাছে পৌঁছবে না। অতএব তারা যখন এমন অবস্থাতে পরিণত হবে যে অবস্থাতে অধিকাংশ তীর নিক্ষেপ করা হলে তীর তাদের কাছে পৌঁছা সম্ভব তখন নিক্ষেপ করবে। (ফাতহুল বারী ৭ম খন্ড, হাঃ ৩৯৮৪)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাভিযানে হত্যার বর্ণনা
৩৯৪৭-[১১] ’আব্দুর রহমান ইবনু ’আওফ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বদর যুদ্ধে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে রাতের প্রহরেই প্রস্তুত করেছেন। (তিরমিযী)[1]
عَن عبدِ الرَّحمنِ بن عَوفٍ قَالَ: عَبَّأَنَا النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ببدر لَيْلًا. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: (بِبَدْرٍ لَيْلًا) অর্থাৎ- কাতারগুলো সোজা করলেন এবং আমাদের প্রত্যেককে এমন স্থানে দাঁড় করালেন রাতে তার জন্য যা উপযোগী হবে, যাতে দিনের জন্যও তা উপযোগী হয়। (তুহফাতুল আহওযায়ী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৬৭৭)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাভিযানে হত্যার বর্ণনা
৩৯৪৮-[১২] মুহাল্লাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (খন্দকের যুদ্ধের সময়) শত্রুরা যদি রাতের বেলায় তোমাদের ওপর আক্রমণ করে, তখন তোমাদের সাংকেতিক ধ্বনি হবেحٰمٓ لَا ينْصَرُوْنَ ’হা-মীম্ লা- ইউনসারূন’। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن الْمُهلب أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِنْ بَيَّتَكُمُ الْعَدُوُّ فَلْيَكُنْ شِعَارُكُمْ: حم لَا ينْصرُونَ . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (أَنَّ رَسُوْلَ اللّٰهِ ﷺ قَالَ) আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খন্দাকের যুদ্ধে এটা বলেছেন- এ তথ্যটি সাইয়িদ জামালুদ্দীন উল্লেখ করেছেন, (فَلْيَكُنْ شِعَارُكُمْ)। কাযী বলেন, অর্থাৎ- এ কথাটি তোমাদের প্রতীক যার মাধ্যমে তোমরা তোমাদের সাথীবর্গকে চিনবে, মূলত (شِعَارُ) বলতে ঐ প্রতীক, ব্যক্তি তার বন্ধুকে চেনার জন্য যা স্থাপন করে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
আবূ দাঊদে মাজহূলের শব্দ কর্তৃক بُيِّتُّمْ এসেছে, ‘‘তোমরা যদি রাতে আক্রান্ত হও’’ অর্থাৎ শত্রুরা যদি রাতে তোমাদের হত্যার উদ্দেশে আক্রমণ করে এবং তোমরা শত্রুর সাথে মিশ্রিত হয়ে যাও।
ইবনুল আসীর বলেন, রাতে কাউকে না জানিয়ে কোনো উদ্দেশ্য করা এবং হঠাৎ পাকড়াও করাকে تَبْيِِيْتٌ বলা হয়। (‘আওনুল মা‘বূদে ৫ম খন্ড, হাঃ ২৫৯৪)
(حٰمٓ لَا ينْصَرُوْنَ) খত্ত্বাবী বলেনঃ এর উদ্দেশ্য হলো সংবাদ দেয়া, যদি এ অংশটি দু‘আ অর্থে ব্যবহৃত হত তাহলে অবশ্যই তা (لَا ينْصَرُوْا) এভাবে জযম বিশিষ্ট হত, এটা দ্বারা কেবল সংবাদ প্রদান উদ্দেশ্য, যেন ব্যক্তি বলল, (والله إنهم لا ينصرون) আল্লাহর শপথ নিঃ ন্দেহে তাদেরকে বিজয় দেয়া হবে না।
‘আবদুল্লাহ বিন ‘আব্বাস হতে বর্ণনা করা হয়েছে, নিশ্চয় তিনি বলেন, (حٰمٓ) আল্লাহর নামসমূহ থেকে একটি নাম, যেন ব্যক্তি আল্লাহর শপথ করে বলল, (إنهم لا ينصرون) নিঃসন্দেহে তাদেরকে বিজয় দেয়া হবে না।
নিহায়াহ্ গ্রন্থকার বলেন, এর অর্থ হলো, (اللهم لا ينصرون) হে আল্লাহ! তাদেরকে বিজয় দেয়া হবে না। এর দ্বারা সংবাদ প্রদান উদ্দেশ্য দু‘আ উদ্দেশ্য নয়। একমতে বলা হয়েছে : নিশ্চয় ঐ সূরাগুলো যার শুরুতে (حٰمٓ) আছে তা এমন সূরা যার বিশেষ মর্যাদা আছে। সুতরাং তিনি এটা বুঝালেন যে, এ বাক্য উল্লেখ করা হয়েছে তার বিশেষ মর্যাদার কারণে যাতে তা দ্বারা আল্লাহর সাহায্য কামনার মাধ্যমে বিজয় অর্জন করা যায়। (‘আওনুল মা‘বূদ হাঃ ২৫৯৪)
মিরকাতুল মাফাতীহতে আরও বলা হয়েছে, (لا ينصرون) এমন একটি বাক্য যেন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, তোমরা (حٰمٓ) বল। তখন প্রতি উত্তরে বলা হয়েছে, যখন আমরা এটা বলব তখন কি হবে? তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, (لا ينصرون) তাদেরকে সাহায্য করা হবে না। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাভিযানে হত্যার বর্ণনা
৩৯৪৯-[১৩] সামুরাহ্ ইবনু জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুহাজিরদের সাংকেতিত চিহ্ন ছিল ’আবদুল্লাহ’ আর আনসারদের সংকেত ছিল ’আব্দুর রহমান’। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن سَمُرةَ بن جُندبٍ قَالَ: كَانَ شِعَارُ الْمُهَاجِرِينَ: عَبْدَ اللَّهِ وَشِعَارُ الْأَنْصَار: عبدُ الرَّحمنِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসে মুহাজিরদের উভয়ের প্রতীকী চিহ্নের মাঝে পার্থক্য করার উদ্দেশ্য তাদের উভয়ের মর্যাদার ভিন্নতা প্রকাশ করা, সম্ভবত এটা অন্য কোনো যুদ্ধে ছিল। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
‘আওনুল মা‘বূদে আছে- যুদ্ধে তাদের ঐ প্রতীকী চিহ্ন পার্থক্য করার উদ্দেশ্য যাতে করে কে মুহাজির আর কে আনসার তা সহজেই বুঝতে পারা যায়। (আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড হাঃ ২৫৯২)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাভিযানে হত্যার বর্ণনা
৩৯৫০-[১৪] সালামাহ্ ইবনুল আক্ওয়া’ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময় আবূ বকর (রাঃ)-এর নেতৃত্বে এক অভিযানে শত্রুর ওপর রাতের বেলায় আক্রমণ করি, তখন আমাদের সংকেত ছিল ’আমিত আমিত’ অর্থাৎ- (হে আল্লাহ!) শত্রুদেরকে ধ্বংস কর (মৃত্যু দাও)। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ سَلَمَةَ بْنِ الْأَكْوَعِ قَالَ: غَزَوْنَا مَعَ أبي بكر زمن النَّبِي صلى الله عَلَيْهِ وَسلم فبيَّتْناهُم نَقْتُلُهُمْ وَكَانَ شِعَارُنَا تِلْكَ اللَّيْلَةَ: أَمِتْ أَمِتْ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (كَانَ شِعَارُنَا تِلْكَ اللَّيْلَةَ : أَمِتْ أَمِتْ) অর্থাৎ- ঐ রাতে আমাদের প্রতীকী চিহ্ন ছিল (أَمِتْ أَمِتْ) গুরুত্বারোপের জন্য শব্দটি বারংবার উল্লেখ করা হয়েছে। অথবা উদ্দেশ্য হলো- এ শব্দটি ঐ শব্দের অন্তর্ভুক্ত যা বারংবার উল্লেখ করা হয়। একমতে বলা হয়েছে, সম্বোধিত সত্বা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। কেননা তিনি মৃত্যুদানকারী, সুতরাং অর্থ হলো- হে সাহায্যকারী! তুমি মৃত্যু দাও’’।
আর শারহুস্ সুন্নাতে আছে, ‘‘হে সাহায্যপ্রাপ্ত ব্যক্তি! তুমি হত্যাযজ্ঞ চালাও, এ ক্ষেত্রে সম্বোধিত ব্যক্তি যোদ্ধা’’। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাভিযানে হত্যার বর্ণনা
৩৯৫১-[১৫] কয়স ইবনু ’উববাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণ যুদ্ধের সময় হৈ-হুলেস্নাড় বা হট্টগোল করাটা অপছন্দ করতেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن قيسِ بنِ عُبادٍ قَالَ: كَانَ أَصْحَابُ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَكْرَهُونَ الصَّوْتَ عِنْدَ الْقِتَالِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (يَكْرَهُوْنَ الصَّوْتَ) ‘‘তারা আওয়াজ অপছন্দ করত।’’ আল্লাহর জিকির ছাড়া তারা সাধারণ আওয়াজ অপছন্দ করতেন। মুযহির বলেনঃ যোদ্ধাদের অভ্যাস তাদের আওয়াজ উঁচু করা, হয় নিজেদের বড়ত্ব প্রকাশ করার জন্য অথবা আওয়াজের আধিক্যতার মাধ্যমে নিজেদের আধিক্যতা প্রকাশ করার জন্য অথবা শত্রুদেরকে ভয় দেখানোর জন্য অথবা ‘‘আমি যুদ্ধ অনুসন্ধানকারী বীর’’ এ কথা বলার মাধ্যমে বীরত্ব প্রকাশের জন্য। সাহাবীগণ এ ধরনের কিছু বলে আওয়াজ উঁচু করাকে অপছন্দ করতেন, কেননা এ ধরনের আওয়াজ দ্বারা সুউচ্চ আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায় না, বরং তারা তাকবীর ধ্বনি দ্বারা আওয়াজ উঁচু করত, কেননা এতে ইহকাল ও পরকালের সফলতা আছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
নায়ল গ্রন্থকার বলেনঃ অত্র হাদীসে এ প্রমাণ আছে যে, যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আওয়াজ উঁচু করা, বেশি হৈচৈ করা, চিৎকার করা মাকরূহ। সম্ভবত তাদের অপছন্দ করার কারণ এজন্য যে, ঐ সময়ে আওয়াজ করা কখনো ভয় ও ব্যর্থতার ইঙ্গিত বহন করে যা চুপ থাকার বিপরীত। কেননা চুপ থাকা দৃঢ়তার প্রতি নির্দেশক, বীরত্বের বাঁধন। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬৫৩)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাভিযানে হত্যার বর্ণনা
৩৯৫২-[১৬] সামুরাহ্ ইবনু জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা যুদ্ধের মাঠে বয়োঃবৃদ্ধ মুশরিকদেরকে হত্যা কর এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের অর্থাৎ শিশু-কিশোরদের হত্যা করো না (জীবিত রাখ)। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن سَمُرَة بن جُنْدُبٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «اقْتُلُوا شُيُوخَ الْمُشْرِكِينَ وَاسْتَحْيُوا شَرْخَهُمْ» أَيْ صِبْيَانَهُمْ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (اُقْتُلُوْا شُيُوْخَ الْمُشْرِكِيْنَ) বাক্য দ্বারা শিশুদের বিপরীত ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে। দুর্বল বৃদ্ধকে হত্যা করা যাবে না, তবে যখন সে পরামর্শদাতা হবে তখন ভিন্ন কথা।
(اسْتَحْيُوْا شَرْخَهُمْ) ‘‘তাদের শিশুদেরকে জীবিত রাখবে’’। নিহায়াহ্ গ্রন্থে যা আছে, তা একে সমর্থন করছে। «الشَّرْخُ» বলতে ঐ সকল শিশু যারা প্রাপ্ত বয়সে পৌঁছেনি, আর «اسْتِحْيَاءِ» এর ব্যাখ্যা হলো দাস বানানোর স্বার্থে তাদের জীবিত রাখা। সুতরাং এটা রূপক অর্থ- আর তাদেরকে অবশিষ্ট রাখা থেকে উদ্দেশ্য হলো- তাদেরকে দাস বানানো ও তাদের দ্বারা সেবা নেয়া উদ্দেশ্য।
আবূ ‘উবায়দ বলেন, «الشُّيُوخِ» দ্বারা তাদের মাঝে ধৈর্যের অধিকারী ব্যক্তি, যুদ্ধ করতে সক্ষম এমন ব্যক্তি উদ্দেশ্য করেছেন, এমন বৃদ্ধদেরকে উদ্দেশ্য করা হয়নি, যাদেরকে বন্দী করলে তাদের মাধ্যমে সেবা করার উপকার লাভ করা যায় না।
হাদীসে ব্যবহৃত «الشَّرْخُ» শব্দ দ্বারা ধৈর্যের অধিকারী ঐ সকল যুবক উদ্দেশ্য, যারা কর্তৃত্ব ও সেবা করার উপযোগী। আবূ বাকর বলেন, «الشَّرْخُ» বলা হয় যৌবনের সূচনাকে। বিদ্বানগণ এ হাদীসটির যে বিশ্লেষণ করে থাকে তার মাঝে এটাই সর্বোত্তম বিশ্লেষণ। যাতে হাদীসটি এ অধ্যায়ে আনাস-এর যে হাদীস আছে তার বিরোধিতা না করে আর তার থেকে যা বর্ণনা করা হয়েছে তা হলো, «لَا تَقْتُلُوا شَيْخًا فَانِيًا» ‘‘তোমরা দুর্বল বৃদ্ধকে হত্যা করো না’’।
(شُيُوْخَ الْمُشْرِكِيْنَ) অর্থাৎ বীরত্বের অধিকারী, যুদ্ধে পারদর্শী শক্তিশালী পুরুষ, ঐ সকল দুর্বল পুরুষ নয়, যারা প্রাপ্তবয়স্ক হয়নি। সুতরাং শিশুদেরকে হত্যা করা ও মহিলাদেরকে হত্যা করা হারাম। (মিরকাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৫৮৩)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাভিযানে হত্যার বর্ণনা
৩৯৫৩-[১৭] ’উরওয়াহ্ [ইবনুয্ যুবায়র] (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উসামাহ্ (ইবনু যায়দ) আমাকে বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নির্দেশ দিয়েছেনঃ ’উবনা’ বস্তির ওপর প্রত্যুষে অতর্কিত আক্রমণ কর এবং তাদের সব কিছু (ঘরবাড়ি ও গাছপালা) জ্বালিয়ে দাও। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن عُروَةَ قَالَ: حدَّثني أسامةُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ عَهِدَ إِلَيْهِ قَالَ: «أَغِرْ عَلَى أُبْنَى صباحا وَحرق» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (عَلَى أُبْنَىْ) আসকালান ও রামলার মাঝামাঝি ফিলিসত্মীনের একটি স্থান।
তূরিবিশতী বলেনঃ জুহায়নাহ্ শহরের একটি স্থান। ইবনুল হুমাম বলেনঃ একমতে বলা হয়েছে, নিশ্চয় তা একটি গোত্রের নাম।
(صَبَاحًا) অর্থাৎ তাদের উদাসীন থাকার অবস্থায় হঠাৎ করে, অসতর্ক থাকাবস্থায়।
(وَحَرِّقْ) অন্য বর্ননায় (ثُمَّ حَرِّقْ) এসেছে, অর্থাৎ তাদের শস্য, তাদের বৃক্ষ ও তাদের ঘর-বাড়ী জ্বালিয়ে দাও।
ইবনুল হুমাম বলেনঃ ইমাম যখন যুদ্ধ ময়দান হতে ফিরে আসার ইচ্ছা করবে আর তার সাথে যোদ্ধাদের চতুস্পদ জন্তু থাকবে। এমতাবস্থায় শত্রু থেকে অর্জিত চতুস্পদ জন্তু ইসলামী দেশে নিয়ে আসতে সক্ষম না হলে সেগুলো যাবাহ করবে, অতঃপর সেগুলো জ্বালিয়ে দিবে সেগুলো হত্যা করবে না। তা জ্বালিয়ে দেয়া হবে কেবল কাফিরদের উপকার লাভের পথকে বন্ধ করে দেয়ার জন্য। আর তা বিল্ডিং নষ্টকরণের মতো, আর এ মহৎ উদ্দেশে জ্বালিয়ে দেয়া যাবাহের পূর্বে জালিয়ে দেয়ার বিপরীত, কেননা তা নিষেধ করা হয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬১৩)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাভিযানে হত্যার বর্ণনা
৩৯৫৪-[১৮] আবূ উসায়দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শত্রুরা যখন তোমাদের খুব সন্নিকটবর্তী চলে আসে তখন তাদের ওপর তীর বর্ষণ কর। আর তারা তোমাদের ওপর ঝাপিয়ে না পড়া পর্যন্ত তরবারি উন্মুক্ত করো না। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي أُسَيْدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ بَدْرٍ: «إِذَا أَكْثَبُوكُمْ فَارْمُوهُمْ وَلَا تَسُلُّوا السُّيُوفَ حَتَّى يَغْشَوْكُمْ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যা: (حَتّٰى يَغْشَوْكُمْ) অর্থাৎ তারা যতক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের নিকটবর্তী না হয়, যাতে তোমাদের তরবারি তাদের নাগালে পেতে পারে। (আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬৬১)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাভিযানে হত্যার বর্ণনা
৩৯৫৫-[১৯] রবাহ ইবনুর্ রবী’ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা কোনো এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলাম। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বহু সংখ্যক লোকেদেরকে এক জায়গায় জড়ো হতে দেখে জনৈক ব্যক্তিকে লোকেদের ভিড় করার কারণ জানতে পাঠালে লোকটি এসে বলল, একজন মহিলার লাশকে কেন্দ্র করে লোকেরা জড়ো হয়েছে। এ কথা শুনে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এ মহিলাটি তো এমন নয় যে, সে আমাদের বিরুদ্ধে লড়বে। বর্ণনাকারী বলেন, এ সেনাদলের অগ্রাধিনায়ক ছিলেন খালিদ ইবনু ওয়ালীদ। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জনৈক ব্যক্তিকে এই বলে পাঠালেন- খালিদকে বলে দাও! কোনো মহিলা এবং চাকরদেরকে হত্যা করো না। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن رَبَاح بن الرَّبيعِ قَالَ: كُنَّا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي غزوةٍ فَرَأى الناسَ مجتمعينَ عَلَى شَيْءٍ فَبَعَثَ رَجُلًا فَقَالَ: «انْظُرُوا عَلَى من اجْتمع هَؤُلَاءِ؟» فَقَالَ: عَلَى امْرَأَةٍ قَتِيلٍ فَقَالَ: «مَا كَانَتْ هَذِهِ لِتُقَاتِلَ» وَعَلَى الْمُقَدِّمَةِ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ فَبَعَثَ رَجُلًا فَقَالَ: قُلْ لِخَالِدٍ: لَا تَقْتُلِ امْرَأَة وَلَا عسيفا . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (عَسِيْفًا) অর্থাৎ কর্মচারী, খিদমাতে নিয়োজিত ব্যক্তি, আর এর চিহ্ন হলো অস্ত্রমুক্ত থাকা। হাদীসটি অন্য শব্দেও এসেছে, অতঃপর তিনি বলেন, فَقَالَ : مَا كَانَتْ هٰذِه لِتُقَاتِلَ সাবধান, এ মহিলাটি এমন নয় যে, যুদ্ধ করবে? (মিরকাতুল মাফাতীহ)
খত্ত্বাবী বলেনঃ হাদীসটিতে ঐ ব্যাপারে প্রমাণ আছে যে, মহিলা যখন যুদ্ধ করবে তখন তাকে হত্যা করতে হবে, আপনি কি লক্ষ্য করছেন না যে, মহিলাকে হত্যা করা হারাম হওয়ার ক্ষেত্রে যে কারণটি তিনি উল্লেখ করেছেন তা হলো মহিলা যুদ্ধ করে না, সুতরাং যখন সে যুদ্ধ করবে তখন তা মহিলাকে হত্যা করা বৈধ হওয়ার উপর প্রমাণ বহন করবে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬৬৬)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাভিযানে হত্যার বর্ণনা
৩৯৫৬-[২০] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা আল্লাহর নামে, আল্লাহর সাহায্যে এবং তাঁর রসূলের দীনের উপর রওয়ানা হয়ে যাও। সাবধান! বয়োঃবৃদ্ধ, ছোট শিশু, বালক-বালিকা এবং কোনো মহিলাকে হত্যা করো না। গনীমাতের মালে খিয়ানাত করো না এবং গনীমাতের সমস্ত মাল আমীরের (নেতার) নিকট একত্রিত করবে, পরস্পর সৌহার্দ্যপূর্ণ থাকবে এবং সদাচরণ করবে। নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদেরকে ভালোবাসেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَنَسٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «انْطَلِقُوا بِاسْمِ اللَّهِ وَبِاللَّهِ وعَلى ملِّة رسولِ الله لَا تقْتُلوا شَيْخًا فَانِيًا وَلَا طِفْلًا صَغِيرًا وَلَا امْرَأَةً وَلَا تَغُلُّوا وَضُمُّوا غَنَائِمَكُمْ وَأَصْلِحُوا وَأَحْسِنُوا فَإِنَّ اللَّهَ يحبُّ المحسنينَ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: «الشَّيْخِ الْفَانِي» (অতিবৃদ্ধ) ‘যাকে হত্যা করা হবে না’ এমন ব্যক্তি দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ঐ ব্যক্তি যে যুদ্ধ করার ব্যাপারে ক্ষমতা রাখে না, দু’দল একত্রিত হওয়ার সময় শেস্নাগান দিতে পারে না, গর্ভবতীকরণে সক্ষম নয়, কেননা সক্ষম ব্যক্তির মাধ্যমে সন্তান উৎপাদন হয়। অতঃপর মুসলিমদের বিরুদ্ধে যোদ্ধাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এটা যাখীরাহ্ গ্রন্থকার উল্লেখ করেছেন।
শায়খ আবূ বাকর الرَّازِيُّ فِي كِتَابِ الْمُرْتَدِّ فِي شَرْحِ الطَّحَاوِيِّ (আর্ রাযী কিতাবুল মুরতাদ্দি ফী শার্হিত্ব ত্বহাবী)-তে একটু বেশি উল্লেখ করেছেন যে, বৃদ্ধ যখন পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী হবে তখন আমরা তাকে হত্যা করব আর তার মতো ঐ ব্যক্তিকে হত্যা করব যে পূর্ণ জ্ঞান থাকাবস্থায় মুরতাদ হয়ে যাবে। আর যাকে আমরা হত্যা করব না সে হলো ঐ বৃদ্ধ ব্যক্তি, যে ভালো-মন্দের পার্থক্যকারী জ্ঞানীদের সীমা বহির্ভূত। তখন এ ব্যক্তি পাগলের স্তরে থাকবে, বিধায় আমরা তাকে হত্যা করব না। এমন পাগল যখন মুরতাদ হয়ে যাবে তাকেও আমরা হত্যা করব না। ডান হাত যার কর্তিত, যার হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কর্তিত তাকেও আমরা হত্যা করব না।
সীয়ারে কাবীরে উল্লেখ আছে, খ্রীষ্টান ধর্মযাজককে তার গীর্জাতে হত্যা করা যাবে না। আর ইয়াহূদীদের গির্জাসমূহের ঐ সকল অধিবাসীদেরও হত্যা করা যাবে না যারা মানুষের সাথে উঠা-বসা করে না। তবে তারা যদি মানুষের সাথে উঠা-বসা করে তাহলে তাদেরকে হত্যা করতে হবে, যেমন খ্রীষ্টান ধর্মযাজকরা। মালিক তার মুয়াত্ত্বাতে ইয়াহ্য়া বিন সা‘ঈদ থেকে বর্ণনা করেন যে, আবূ বাকর শামের (সিরিয়ার) দিকে সৈন্যবাহিনী পাঠালেন, তখন আবূ বাকর ইয়াযীদ বিন আবূ সুফ্ইয়ান-এর সাথী হয়ে বাড়ী থেকে বের হয়ে তাকে বললেন, ‘‘নিশ্চয় আমি তোমাকে দশটি বিষয়ের ব্যাপারে উপদেশ দিচ্ছি- তুমি শিশু, মহিলা, অতিবৃদ্ধ হত্যা করবে না, ফলদার বৃক্ষ কাটবে না, বকরী হত্যা করবে না, গাভী হত্যা করবে না, তবে খাওয়ার উদ্দেশে যাবাহ করতে পার, কোনো কিছু জ্বালিয়ে দিবে না, আবাদ ভূমিকে নষ্ট করবে না, মা ও সন্তানের মাঝে বিচ্ছিন্ন করবে না, কাপুরুষতার পথ অবলম্বন করবে না ও আত্মাসাৎ করবে না।’’ (মিরকাতুল মাফাতীহ)
‘আওনুল মা‘বূদে (৫ম খন্ড, হাঃ ২৬১১) আছে, (وَلَا اِمْرَأَةً) অর্থাৎ- মহিলা যখন যোদ্ধা অথবা রাণী না হবে।
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাভিযানে হত্যার বর্ণনা
৩৯৫৭-[২১] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বদর যুদ্ধের দিন (মুশরিকদের পক্ষে) ’উতবাহ্ ইবনু রবী’আহ্ সর্বপ্রথম সম্মুখে অগ্রসর হলেন। অতঃপর তার অনুসরণ করে পিছু নিল তার পুত্র (ওয়ালীদ) ও তার ভাই (শায়বাহ্)। অতঃপর সে পরস্পর যুদ্ধের জন্য ঘোষণা দিল, কে আছ যে আমাদের মুকাবিলা করবে? তার আহবানে সাড়া দিয়ে কয়েকজন আনসারী যুবক এগিয়ে গেল। ’উতবাহ্ জিজ্ঞেস করল, তোমরা কারা? যুবকেরা তাদের পরিচয় দিল। তখন ’উতবাহ্ বলল, তোমাদের সাথে মুকাবিলা করা আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই; বরং আমরা তো আমাদের চাচাত ভাইদেরকে চাই। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে হামযাহ্! তুমি যাও, হে ’আলী! তুমি যাও এবং হে ’উবায়দাহ্ ইবনু হারিস! তুমি যাও। অতঃপর হামযাহ্ ’উতবার দিকে অগ্রসর হয়ে তাকে হত্যা করলেন। আর আমি শায়বার ওপর ঝাপিয়ে পড়ে তাকে হত্যা করলাম। আর ’উবায়দাহ্ ও ওয়ালীদ-এর মধ্যে পাল্টাপাল্টি আক্রমণ চলতে লাগল এবং পরস্পরের মধ্যে মারাত্মকভাবে হতাহত হতে লাগল। অতঃপর ’আলী বলেন, এ অবস্থা দেখে আমরা তৎক্ষণাৎ ওয়ালীদণ্ডএর ওপর আক্রমণ করে তাকে হত্যা করলাম এবং ’উবায়দাহ্-কে আহত অবস্থায় উঠিয়ে নিয়ে এলাম। (আহমাদ, আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: لَمَّا كَانَ يَوْمُ بَدْرٍ تَقَدَّمَ عُتْبَةُ بْنُ رَبِيعَةَ وَتَبِعَهُ ابْنُهُ وَأَخُوهُ فَنَادَى: مَنْ يُبَارِزُ؟ فَانْتُدِبَ لَهُ شبابٌ مِنَ الْأَنْصَارِ فَقَالَ: مَنْ أَنْتُمْ؟ فَأَخْبَرُوهُ فَقَالَ: لَا حَاجَةَ لَنَا فِيكُمْ إِنَّمَا أَرَدْنَا بَنِي عَمِّنَا فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «قُمْ يَا حَمْزَةُ قُمْ يَا عَلِيُّ قُمْ يَا عُبَيْدَةُ بْنَ الْحَارِثِ» . فَأَقْبَلَ حَمْزَةُ إِلى عتبةَ وَأَقْبَلْتُ إِلَى شَيْبَةَ وَاخْتَلَفَ بَيْنَ عُبَيْدَةَ وَالْوَلِيدِ ضَرْبَتَانِ فَأَثْخَنَ كُلُّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا صَاحِبَهُ ثُمَّ مِلْنَا عَلَى الْوَلِيدِ فَقَتَلْنَاهُ وَاحْتَمَلْنَا عُبَيْدَةَ. رَوَاهُ أَحْمد وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: শারহুস্ সুন্নাহ্তে আছে, অত্র হাদীসে কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পরস্পর কুস্তির বৈধতা আছে। ইমাম যখন অনুমতি দিবে তখন কুস্তি বৈধ হওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্বানগণ মতানৈক্য করেননি। যখন কুস্তি ইমামের অনুমতিক্রমে না হবে তখন তা বৈধ হওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্বানগণ মতানৈক্য করেছেন। একদল তা বৈধ সাব্যস্ত করেছেন, আর ইমাম মালিক ও শাফি‘ঈ এ মত সমর্থন করেছেন। কেননা আনসারীরা যুদ্ধ ক্ষেত্রের দিকে বেরিয়ে গিয়েছিল, আর যখন একজন তার সাথীর ক্ষেত্রে অক্ষম হয়েছিল তখন হামযাহ্, ‘আলী এবং ‘উবায়দাহ্ (রাঃ) এগিয়ে এসেছিল। এ ব্যাপারে উক্তি করেছেন শাফি‘ঈ, আহমাদ ও ইসহক। আওযা‘ঈ বলেন, কুস্তিতে কেউ কাউকে সাহায্য করবে না, কেননা কুস্তি এমনই হয়ে থাকে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
খত্ত্বাবী বলেনঃ হাদীসের সারমর্ম হলো, নিঃসন্দেহে কুস্তি ইমামের অনুমতি ও বিনা অনুমতি- উভয় অবস্থাতে বৈধ হওয়ার উপরে হাদীসটি প্রমাণ বহন করছে। কেননা হামযাহ্ এবং ‘আলী -এর কুস্তি অনুমতিসাপেক্ষে ছিল, আর আনসারীরা বের হয়ে এসেছিল, এমতাবস্থায় তাদের জন্য কোনো অনুমতি ছিল না। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাজ অস্বীকার করেননি। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬৬২)
পরিচ্ছেদঃ ৪. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাভিযানে হত্যার বর্ণনা
৩৯৫৮-[২২] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে একটি সৈন্যবাহিনীতে পাঠালেন। কিন্তু আমাদের সাথীরা পালিয়ে গেল, ফলে আমরা মদীনায় ফিরে এসে আত্মগোপন করলাম। আর আমরা (মনে মনে) বলতে লাগলাম, আমরা ধ্বংস হয়ে গেছি। অতঃপর আমরা বললাম, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমরা তো যুদ্ধ হতে পলায়নকারী। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, না, এরূপ নয়, বরং তোমরা তো পুনঃআক্রমণকারী। আমি তোমাদের দলে (পেছনে) রয়েছি। (তিরমিযী)[1]
আবূ দাঊদ-এর বর্ণনাও অনুরূপ। অবশ্য সেখানে হাদীসের শেষ বাক্য হলো, ’’না তোমরা পলায়নকারী নও; বরং পুনঃআক্রমণকারী।’’ বর্ণনাকারী বলেন, আমরা তাঁর নিকটে গেলাম এবং তাঁর হাত চুমু দিলাম। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আমিই মুসলিমদের পশ্চাতের দল। গ্রন্থকার বলেন, শীঘ্রই আমরা উমাইয়্যাহ্ ইবনু ’আব্দুল্লাহ-এর বর্ণিত হাদীস যার শুরু হলো, ’’তারা বিজয় প্রত্যাশা করছিল’’। আর আবুদ্ দারদা-এর বর্ণিত হাদীস যার শুরু ’’তোমরা আমাকে তোমাদের দুর্বলদের মধ্যে সন্ধান কর’’ ইনশা-আল্লা-হ ’’ফাকীর-গরীবদের মর্যাদা’’ অধ্যায়ে বর্ণনা করব।
وَعَن ابنِ عُمر قَالَ: بَعَثَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي سَرِيَّةٍ فَحَاصَ النَّاسُ حَيْصَةً فَأَتَيْنَا الْمَدِينَةَ فَاخْتَفَيْنَا بِهَا وَقُلْنَا: هَلَكْنَا ثُمَّ أَتَيْنَا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقُلْنَا: يَا رَسُول الله نَحن الفارون. قَالَ: «بَلْ أَنْتُمُ الْعَكَّارُونَ وَأَنَا فِئَتُكُمْ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ. وَفِي رِوَايَةِ أَبِي دَاوُدَ نَحْوَهُ وَقَالَ: «لَا بَلْ أَنْتُمُ الْعَكَّارُونَ» قَالَ: فَدَنَوْنَا فَقَبَّلْنَا يَده فَقَالَ: «أَنا فِئَة من الْمُسْلِمِينَ»
وَسَنَذْكُرُ حَدِيثَ أُمَيَّةَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ: كَانَ يَسْتَفْتِحُ وَحَدِيثُ أَبِي الدَّرْدَاءِ «ابْغُونِي فِي ضُعَفَائِكُمْ» فِي بَابِ «فَضْلِ الْفُقَرَاءِ» إِنْ شَاءَ اللَّهُ تَعَالَى
ব্যাখ্যা: (فَحَاصَ النَّاسُ حَيْصَةً) কাযী বলেনঃ অর্থাৎ ‘‘তারা এড়িয়ে গেল’’। তবে ইবনু ‘উমার যদি النَّاسُ দ্বারা মুসলিম বাহিনীর শত্রুদের উদ্দেশ্য করে থাকেন, তাহলে এখানে حَيْصَةً দ্বারা উদ্দেশ্য হবে আক্রমণ করা, অর্থাৎ তারা একযোগে আমাদের ওপর আক্রমণ করল, চক্কর দিল। অতঃপর আমরা তাদের সাথে পরাজিত হলোম। আর যদি السرية উদ্দেশ্য করেন তাহলে حَيْصَةً দ্বারা উদ্দেশ্য হবে প্রত্যাবর্তন করা, অর্থাৎ- তারা মদীনাতে আশ্রয় গ্রহণের উদ্দেশে শত্রুদের থেকে ফিরে গেল, তথা পলায়ন করল। আর এ অর্থেই মহান আল্লাহর বাণী, ‘‘আর তা থেকে তারা কোনো পলায়নস্থল পাবে না।’’ (সূরা আন্ নিসা ৪ : ১২১)
জাওহারী-এর উক্তি «حَاصَ عَنْهُ» অর্থাৎ- সে তা থেকে সরে গেল। বন্ধুদেরকে বলা হয় «حَاصُوا عَنِ الْأَعْدَاءِ» অর্থাৎ- শত্রুদের থেকে সরে যাও। আর শত্রুদেরকে বলা হয়, তোমরা পরাজয় বরণ কর।
আর ফায়িক গ্রন্থে আছে, «فَحَاصَ حَيْصَةً» অর্থাৎ- অতঃপর সে পরাজয় বরণ করল। এক বর্ণনাতে আছে, «فَحَاضَ» আর তা হলো সরে যাওয়া, ঢালুতে অবতরণ করা। নিহায়াহ্ গ্রন্থকার বলেনঃ«فَحَاصَ الْمُسْلِمُونَ حَيْصَةً» অর্থাৎ- তারা পলায়নের উদ্দেশে প্রদক্ষক্ষণ করল।
(هَلَكْنَا) অর্থাৎ- আমরা পলায়নের মাধ্যমে অবাধ্যতা প্রকাশ করেছি, অতএব আমরা ধ্বংস হয়ে গিয়েছি। এটা তাদের থেকে এ ধারণাবশত যে, সাধারণত যুদ্ধ থেকে পালায়ন করা কবীরা গুনাহের আওতাভুক্ত। (الْعَكَّارُوْنَ) অর্থাৎ- যুদ্ধের দিকে বারংবার প্রত্যাবর্তনকারী, তার আশে-পাশে চলাফেরাকারী। অনুরূপভাবে নিহায়াতে আছে, এর অর্থ হলো- যুদ্ধের দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।
(وَأَنَا فِئَتُكُمْ) নিহায়াহ্ গ্রন্থে আছে, الْفِئَةُ বলতে মূলত মানুষের দল, যে দল সৈন্যবাহিনীর পেছনে থাকে। অতঃপর তাদের ওপর যদি কোনো ভয় থাকে অথবা পরাজয়ের আশঙ্কা থাকে তাহলে তারা তার কাছে আশ্রয় নেয়।
ফায়িক গ্রন্থে আছে- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী (أَنَا فِئَتُكُمْ) এক্ষেত্রে মহান আল্লাহর বাণীর (أَوْ مُتَحَيِّزًا إِلَى فِئَةٍ) অর্থাৎ- ‘‘অথবা নিজ দলে আশ্রয় গ্রহণ করার লক্ষ্যক্ষ্য’’- (সূরা আল আনফাল ৮ : ১৬) এ দিকে গিয়েছে। এর মাধ্যমে পলায়নের ক্ষেত্রে তিনি তাদের আপত্তিকে সহজ করেন, অর্থাৎ- তোমরা আমার কাছে আশ্রয় নিয়েছ, সুতরাং তোমাদের কোনো ত্রুটি নেই।
শারহুস্ সুন্নাহ্তে আছে, ‘আবদুল্লাহ বিন মাস্‘ঊদ বলেনঃ যে ব্যক্তি তিনজনের মোকাবেলা করা থেকে পলায়ন করবে তাহলে সে পলায়ন করেনি। আর যে ব্যক্তি দু’জনের বিরুদ্ধে লড়াই করা থেকে পলায়ন করবে, তাহলে সুনিশ্চিত সে পলায়ন করেছে। আর যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করা কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং যে ব্যক্তি দু’জনের মোকাবেলা করা থেকে পলায়ন করবে তার জন্য পলায়নের সময় ইঙ্গিতের মাধ্যমে সালাত আদায় করা বৈধ নয়, কেননা সে অবাধ্য, যেমন চোর অবাধ্য। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
(الْعَكَّارُوْنَ) অর্থাৎ- তোমরা যুদ্ধের দিকে প্রত্যাবর্তনকারী, তার পাশে প্রদক্ষক্ষণকারী, যখন আপনি কোনো কিছুর আশে-পাশে প্রদক্ষক্ষণ করবেন, সেখান থেকে চলে যাওয়ার পর পুনরায় সেখানে ফিরে আসবেন তখন ‘আরবীতে বলা হবে «عكرت على الشيئ»। আসমা‘ঈ বলেন, আমি এক বেদুঈনকে দেখলাম সে তার কাপড় থেকে উকুন বের করছে, অতঃপর বুরগূছ হত্যা করে উকুনটিকে ছেড়ে দিচ্ছে। সুতরাং আমি বললাম, আপনি এমন করছেন কেন? তখন বেদুঈন বলল, আমি অশ্বারোহীকে হত্যা করছি, অতঃপর পদাতিক বাহিনীর পর ঘুরে আক্রমণ করব। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬৪৪)
(بَعَثَنَا رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ فِىْ سَرِيَّةٍ) নিহায়াহ্ গ্রন্থকার বলেন, السَّرِيَّةُ বলতে সৈন্যবাহিনীর একটি অংশকে বুঝায় যা সংখ্যায় সর্বোচ্চ চারশত। যে অংশটিকে শত্রুর কাছে পাঠানো হয়। এর বহুবচন হলো السَّرَايَا একে এ নামে নামকরণ করা হয়েছে, কেননা এরা সৈন্যবাহীর সারাংশ, তাদের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গের অন্তর্ভুক্ত, উৎকৃষ্ট নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের অন্তর্ভুক্ত।
(هَلَكْنَا) অর্থাৎ যুদ্ধ হতে পলায়ন করে আমরা কবীরা গুনাহ করার ফলে ধ্বংস হয়ে গেছি। আবূ দাঊদ-এর বর্ণনাতে আছে- অতঃপর লোকেরা পালিয়ে গেল, আর যারা পালিয়েছিল তাদের মাঝে আমি একজন। এরপর আমরা যখন মদীনায় প্রবেশ করলাম তখন বললাম, আমরা কি করব? আমরা তো যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করেছি, আমরা গজবে পতিত হয়েছি। অতঃপর আমরা বললাম, আমরা মদীনাতে আত্মগোপন করে থাকব, ফলে কেউ আমাদেরকে দেখবে না। তিনি বলেন, এরপর আমরা মদীনায় প্রবেশ করে বললাম, যদি আমরা আমাদের নিজেদেরকে আল্লাহর রসূলের সামনে উপস্থাপন করি, আর যদি আমাদের তাওবাহ্ করার সুযোগ থাকে তাহলে আমরা সেখানে অবস্থান করব আর এছাড়া অন্য কিছু হয় তাহলে আমরা চলে যাব। তিনি বলেন, অতঃপর আমরা আল্লাহর রসূলের অপেক্ষায় ফজরের সালাতের পূর্বে বসলাম, অতঃপর তিনি বেরিয়ে এলে আমরা তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, আমরা পলায়নকারী..... শেষ পর্যন্ত। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫ম খন্ড, হাঃ ১৭১৬)
পরিচ্ছেদঃ ৪. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধাভিযানে হত্যার বর্ণনা
৩৯৫৯-[২৩-] সাওবান ইবনু ইয়াযীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ত্বায়িফবাসীদের ওপর আক্রমণকালে মিনজানীক (কামান) স্থাপন করেছেন। (তিরমিযী মুরসালরূপে বর্ণনা করেছেন)[1]
عَنْ ثَوْبَانَ بْنِ يَزِيدَ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَصَبَ الْمَنْجَنِيقَ عَلَى أَهْلِ الطائفِ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ مُرْسلا
ব্যাখ্যা: (الْمِنْجَنِيْقَ) এমন এক যন্ত্র যার মাধ্যমে পাথর নিক্ষেপ করা হয়। (عَلَى اَهْلِ الطَّائِفِ) অর্থাৎ- উপত্যকায় অবস্থিত সাক্বীফ গোত্রের শহর যার সর্বপ্রথম শহর লুকায়ম, শেষ শহর রাহত। একে ত্বায়িফ নামকরণ করার কারণ হলো এ এলাকাটি নূহ (আঃ)-এর প্লাবনে পানির উপর ভেসে ছিল। অথবা জিবরীল (আঃ) একে সহ বায়তুল্লাহ ত্বওয়াফ করেছেন অথবা এটা শামদেশে (সিরিয়ায়) ছিল। অতঃপর ইবরাহীম (আঃ)-এর দু‘আতে আল্লাহ তা‘আলা হিজাযে স্থানান্তর করেন। কামূস-এ এভাবেই আছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধবন্দীদের বিধিমালা
৩৯৬০-[১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা সে সকল লোকেদেরকে দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন, যাদের শিকল পরিহিত অবস্থায় জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, শিকল পরিহিত অবস্থায় জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। (বুখারী)[1]
بَابُ حُكْمِ الْاُسَرَاءِ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «عَجِبَ اللَّهُ مِنْ قَوْمٍ يُدْخَلُونَ الْجَنَّةَ فِي السَّلَاسِلِ» . وَفِي رِوَايَةٍ: «يُقَادُونَ إِلى الجنَّةِ بالسلاسل» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: (يُدْخَلُوْنَ الْجَنَّةَ فِى السَّلَاسِلِ) অর্থাৎ- তাদেরকে বন্দী অবস্থায় বলপূর্বক, অনিচ্ছায় শিকল এবং রশিতে করে পাকড়াও করা হবে। অতঃপর তারা ইসলামী ভূখণ্ডে প্রবেশ করবে এবং আল্লাহ তাদেরকে ঈমান দান করবেন, ফলে তারা এর বিনিময়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর ব্যক্তি হিসেবে ইসলামের সান্নিধ্যে আসার কারণে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
একমতে বলা হয়েছে, (السَّلَاسِلِ) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যা তারা প্রত্যাখ্যান করে, অর্থাৎ নিজেদের হত্যাকরণ, স্ত্রী ও সন্তানদের বন্দীকরণ, বাড়ী-ঘর ধ্বংসকরণ এবং ঐ সকল বিষয় যা ব্যক্তিকে ইসলামে প্রবেশে বাধ্য করে, যা জান্নাতে প্রবেশের কারণ। আর (السَّلَاسِلِ) দ্বারা সত্যকে আকর্ষণ করাও উদ্দেশ্য হতে পারে, বিশেষ করে যার দ্বারা তিনি তাঁর বান্দাদেরকে পথভ্রষ্টতা থেকে হিদায়াতের দিকে টানবেন, প্রকৃতির গর্তে অবতরণ করা থেকে সুউচ্চ মর্যাদার মাধ্যমে জান্নাতুল মা‘ওয়ার দিকে আরোহণ করতে। আমি (গ্রন্থকার) বলব, এভাবে (السَّلَاسِلِ)-এর অর্থের মাঝে আছে অন্তরের অপছন্দনীয়তা, অর্থাৎ দারিদ্র্যতা, অসুস্থতা, উদাসীনতা, সকল শরীরিক বিপদসমূহ, আত্মিক সুখের অনুপস্থিতি। কেননা এটা আত্মিক উন্নত অবস্থার দিকে এবং পরকালীন উচ্চস্থানের দিকে টানে, আর এ দিকেরই অন্তর্ভুক্ত হলো সন্তানাদির লেখা-পড়াকে অপছন্দ করা।
জামিউস্ সগীরে আছে, আমাদের প্রভু এমন সম্প্রদায়ের কারণে আশ্চর্যান্বিত হন যাদেরকে শিকলসমূহে করে জান্নাতের দিকে হাকিয়ে নেয়া হবে। ত্ববারানী-এর বর্ণনাতে আবূ উমামাহ্ ও আবূ নু‘আয়ম থেকে বর্ণিত, তারা আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, ‘‘আমি এমন সম্প্রদায়ের কারণে আশ্চর্যান্বিত হই যাদেরকে শিকলে করে জান্নাতের দিকে হাকিয়ে নেয়া হয়, অথচ তারা তা অপছন্দ করে।’’ (মিরকাতুল মাফাতীহ)
ইবনুল জাওযী বলেনঃ এর অর্থ হলো তাদেরকে বন্দী করা হবে, বেঁধে নিয়ে আসা হবে। অতঃপর তারা যখন ইসলামের বিশুদ্ধতা জানতে পারবে তখন স্বেচ্ছায় তারা ইসলামে প্রবেশ করবে, অতঃপর জান্নাতে প্রবেশ করবে। সুতরাং এক্ষেত্রে বন্দী ও কয়েদী হওয়ার ব্যাপারে বাধ্য করাই প্রথম কারণ, বাধ্য করার ব্যাপারে যেন ধারাবাহিকতা প্রয়োগ করা হয়েছে, যা জান্নাতে প্রবেশের কারণ। এখানে উদ্ভূত বিষয়কে তার কারণের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে।
ত্বীবী বলেনঃ ‘শিকল দ্বারা’ এখানে ঐ আকর্ষণ উদ্দেশ্য হওয়ার সম্ভাবনা রাখছে, যাকে হিদয়াতের প্রতি আল্লাহ আকর্ষণ করবেন, যিনি তাঁর বান্দাদেরকে মুক্তি দিতে পথভ্রষ্টতা থেকে হিদায়াতের দিকে, প্রবৃত্তির গর্তে অবতরণ করা থেকে মর্যাদাসমূহে আরোহণ করার দিকে টেনে আনবেন। তবে আ-লি ‘ইমরান-এর তাফসীরে হাদীসটি ঐ দিকে নির্দেশনা করছে যে, গলায় শিকল পরানো বিষয়টি তার বাস্তবতার উপর প্রমাণ বহন করছে।
আর ইব্রাহীম হারবী এ শব্দটির প্রকৃত অর্থ গ্রহণ করা থেকে বিরত থেকেছেন, অর্থাৎ তাদেরকে জোর করে ইসলামের দিকে পরিচালনা করা হবে, আর এটা তাদের জান্নাতে প্রবেশের কারণ হবে। সেখানে কোনো শিকল থাকবে এমন নয়। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩০১০)
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধবন্দীদের বিধিমালা
৩৯৬১-[২] সালামাহ্ ইবনুল আক্ওয়া’ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (নাজদ এলাকায়) এক সফরে ছিলেন। তখন মুশরিকদের একজন গুপ্তচর (রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে) এসে সাহাবীগণের সঙ্গে বসে কথাবার্তা বলে সরে পড়ল। এতদশ্রবণে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, লোকটিকে খুঁজে বের করে হত্যা কর। বর্ণনাকারী বলেন, আমি তাকে (গুপ্তচরকে) হত্যা করলাম এবং তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার সঙ্গে থাকা মাল আমাকে দান করলেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ حُكْمِ الْاُسَرَاءِ
وَعَنْ سَلَمَةَ بْنِ الْأَكْوَعِ قَالَ أَتَى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَيْنٌ مِنَ الْمُشْرِكِينَ وَهُوَ فِي سَفَرٍ فَجَلَسَ عِنْدَ أَصْحَابِهِ يَتَحَدَّثُ ثُمَّ انْفَتَلَ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اطْلُبُوهُ وَاقْتُلُوهُ» . فَقَتَلْتُهُ فنفَّلَني سلبَه
ব্যাখ্যা: কাযী বলেনঃ عَيْنٌ (চোখ) বলতে এখানে গুপ্তচর উদ্দেশ্য। একে এ নামে নামকরণ করার কারণ হলো গুপ্তচরের কাজ চোখের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, অথবা দর্শনের প্রতি তার অধিক গুরুত্ব দেয়ার কারণে, দর্শনে তার নিবিষ্ট হওয়ার কারণে যেন তার সমস্ত শরীর চোখে পরিণত হয়েছে।
(سَلَبَه) অর্থাৎ তার উপর যে কাপড়, অস্ত্র আছে তা উদ্দেশ্য। এ নামে একে নামকরণ করার কারণ হলো, তা ব্যক্তি থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়। ইবনুল হুমাম বলেনঃ এভাবে তার বাহন, তার উপর গদি, যন্ত্র স্বরূপ যা আছে, তার সাথে প্রাণীর উপর আরও যা সম্পদ আছে এবং তার অনুরূপ স্বর্ণ, রৌপ্য থেকে আরও যা আছে।
ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ (فَنَفَّلَنِىْ) অর্থাৎ- তিনি আমাকে অতিরিক্ত দান করলেন, নফল বা অতিরিক্ত বলতে ঐ দান গনীমাতের যে সম্পদের মাধ্যমে তাকে বিশেষিত করা হয় এবং তার নির্দিষ্ট অংশের উপর বেশি দেয়া হয়। শারহুস্ সুন্নাতে আছে- অত্র হাদীসে এ প্রমাণ রয়েছে যে, নিরাপত্তা ছাড়া বিধর্মী রাষ্ট্র থেকে যে ব্যক্তি ইসলামী রাষ্ট্রে প্রবেশ করবে তাকে হত্যা করা বৈধ। আর মুসলিম রাষ্ট্রে আশ্রয়প্রাপ্ত কাফিরদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি কাফিরদের পক্ষে গুপ্তচর বৃদ্ধি করবে, তার তরফ থেকে এ ধরনের আচরণ অঙ্গীকার ভঙ্গের শামিল, তাই তাকে হত্যা করতে হবে। আর এ ধরনের কাজ কোনো মুসলিম ব্যক্তি করলে তাকে হত্যা করা বৈধ হবে না বরং তাকে ধমক দিতে হবে, অতঃপর যদি অবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞতার দাবী করে এবং এ ধরনের কাজ পূর্বে তাদের থেকে সংঘটিত না হয়ে থাকে, তাহলে এ ধরনের ব্যক্তি থেকে পাশ কাটিয়ে যেতে হবে। এটা ইমাম শাফি‘ঈ-এর উক্তি।
অত্র হাদীসে আরও প্রমাণ আছে যে, নিহত ব্যক্তির সঙ্গের সম্পত্তি হত্যাকারীর প্রাপ্য। ইবনুল হুমাম বলেনঃ নফল দান বলতে ইমাম কর্তৃক যোদ্ধাকে তার অংশের অধিক দান করা, অতিরিক্ত দানের মাধ্যমে যুদ্ধের প্রতি উৎসাহিত করা ইমামের জন্য মুস্তাহাব। সুতরাং ইমাম বলবে, ‘‘যে ব্যক্তি কাফির যোদ্ধাকে হত্যা করবে তার সঙ্গের সামগ্রী হত্যাকারীর জন্য।’’ অথবা সৈন্যবাহিনীকে বলবে, আমি গনীমাতের সম্পদ তোমাদের জন্য এক-পঞ্চমাংশত পৃথক করার পর অবশিষ্ট সম্পদের অর্ধেক অথবা এক-চতুর্থাংশ তোমাদের জন্য নির্ধারণ করলাম। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
মুসলিমে ‘ইকরামার বর্ণনাতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘‘অতঃপর সে লোকটি’’ উটটি বেঁধে লোকেদের সাথে খাদ্য খেতে এগিয়ে গেল এবং তাকাতাকি করতে থাকল। আর দুপুরে আমাদের মাঝে দুর্বলতা ছিল তা অবলোকন করে হঠাৎ লোকটি দ্রুতবেগে চলে যেতে থাকল।’’
নববী বলেনঃ অত্র হাদীসে কাফিরশত্রু গুপ্তচরকে হত্যা করার বৈধতা রয়েছে। আর এতে সকলে একমত।
কুরতুবী বলেনঃ অত্র হাদীসে সৈন্যবাহিনী গনীমাতের সম্পদ যা লাভ করেছে তার সমস্তই তাদের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছা ইমাম তা দান করার অধিকার রাখেন, এ প্রমাণ আছে। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩০৫১)
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধবন্দীদের বিধিমালা
৩৯৬২-[৩] উক্ত রাবী [সালামাহ্ ইবনুল আক্ওয়া’ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ’হাওয়াযিন’ গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম। (যুদ্ধরত অবস্থায়) একদিন আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে দুপুরে খাবার খাচ্ছিলাম, তখন একজন (অপরিচিত) লোক একটি লালবর্ণের উটে সওয়ার হয়ে সেখানে আসলো এবং উটটি এক জায়গায় বসিয়ে এদিক-সেদিক দেখতে লাগল। আমাদের মধ্যে কিছুটা দুর্বলতা ছিল এবং আমাদের সওয়ারীও ছিল কম, তাই কেউ ছিল পদাতিক। অতঃপর লোকটি সন্তর্পণে স্বীয় উটের কাছে এসে দ্রুতগতিতে উটটি হাঁকাতে লাগল।
বর্ণনাকারী [সালামাহ্(রাঃ)] বলেন, তার এরূপ অবস্থা দেখে আমিও তৎক্ষণাৎ তার পিছু ছুটলাম। অবশেষে তার উটের লাগাম ধরে ফেললাম এবং তরবারির আঘাতে তাকে হত্যা করলাম। অতঃপর আমি তার উটসহ যা কিছু মাল ছিল সমস্ত কিছু নিয়ে এলাম। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও অন্যান্য লোকজন আমার দিকে এগিয়ে আসলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, লোকটিকে কে হত্যা করেছে? তখন লোকেরা বলল, আক্ওয়া’-এর পুত্র (সালামাহ্)। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ঐ নিহত লোকটির সমস্ত মাল-সামান সেই পাবে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ حُكْمِ الْاُسَرَاءِ
وَعَنْهُ قَالَ: غَزَوْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ هَوَازِنَ فَبَيْنَا نَحْنُ نَتَضَحَّى مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذْ جَاءَ رَجُلٌ عَلَى جَمَلٍ أَحْمَرَ فَأَنَاخَهُ وَجَعَلَ يَنْظُرُ وَفِينَا ضَعْفَةٌ وَرِقَّةٌ مِنَ الظَّهْرِ وَبَعْضُنَا مُشَاةٌ إِذْ خَرَجَ يَشْتَدُّ فَأَتَى جَمَلَهُ فَأَثَارَهُ فَاشْتَدَّ بِهِ الْجَمَلُ فَخَرَجْتُ أَشْتَدُّ حَتَّى أَخَذْتُ بِخِطَامِ الْجَمَلِ فَأَنَخْتُهُ ثُمَّ اخْتَرَطْتُ سَيْفِي فَضَرَبْتُ رَأْسَ الرَّجُلِ ثُمَّ جِئْتُ بِالْجَمَلِ أَقُودُهُ وَعَلَيْهِ رَحْلُهُ وَسِلَاحُهُ فَاسْتَقْبَلَنِي رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالنَّاسُ فَقَالَ: «مَنْ قَتَلَ الرَّجُلَ؟» قَالُوا: ابْنُ الْأَكْوَعِ فَقَالَ: «لَهُ سَلَبُهُ أَجْمَعُ»
ব্যাখ্যা: (هَوَازِنُ) তীর নিক্ষেপে প্রসিদ্ধ এমন একটি গোত্র যাদের তীর সাধারণত লক্ষ্যভ্রষ্ট হতো না। তারা হুনায়নে ছিল, আর তা ত্বায়িফের নিকটে ‘আরাফার পেছনে একটি উপত্যকা।
একমতে বলা হয়েছে, তার মাঝে এবং মক্কার মাঝে তিন মাইল দূরত্ব ছিল। অত্র এলাকার দিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভ্রমণ ছিল শাও্ওয়ালের ছয় রাত্রি অতিবাহিত হওয়ার পর রোজ শনিবার। তখন তিনি মক্কা বিজয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
(فَبَيْنَا نَحْنُ نَتَضَحّٰى) ‘‘যখন আমরা দুপুরের খাবার খাচ্ছিলাম।’’ نَتَضَحّٰى শব্দটি الضَّحَاءِ থেকে গৃহীত যার অর্থ দিনের প্রথম প্রহরের পরবর্তী সময়। নিহায়াহ্ গ্রন্থকার বলেনঃ এ ক্ষেত্রে মূল হলো ‘আরবরা ভ্রমণ থেকে প্রস্থানের ক্ষেত্রে যখন তারা পথ চলত তখন তারা এমন ভূখণ্ডের পাশ দিয়ে পথ অতিক্রম করত যেখানে ঘাস থাকত তখন তাদের কেউ বলত, তোমরা উটের প্রতি দয়া কর। যাতে এ চারণভূমি থেকে খেতে পারে, অতএব «التَّضْحِيَةُ» শব্দটি অনুগ্রহ প্রদর্শনের অর্থে করা হয়েছে, উদ্দেশ্য যাতে উট পরিতৃপ্ত অবস্থায় বাড়ী ফিরতে পারে। এরপর এ শব্দটির প্রয়োগ বিসত্মৃতি লাভ করে। এমনকি বলা হলো, অর্থাৎ যে ব্যক্তি উটকে বাড়ী নিয়ে আসার সময় তথা الضُّحٰى -এর সময় খেত তার ক্ষেত্রে هُوَ يَتَضَحّٰى উক্তি প্রয়োগ হতে থাকল, অর্থাৎ যে এ সময় খায়। একমতে বলা হয়েছে, এর অর্থ হলো «نُصَلِّي الضُّحٰى» অর্থাৎ- আমরা যুহার সালাত আদায় করছিলাম। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
(فَاسْتَقْبَلَنِىْ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ وَالنَّاسُ) উল্লেখিত হাদীসাংশে সৈন্য বাহিনীকে অভ্যর্থনা জানানো এবং যে ব্যক্তি ভালো কাজ করবে তার গুণকীর্তন করার প্রমাণ আছে। মুসলিমদের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়নি এবং তাদের থেকে নিরাপত্তাও লাভ করেনি এমন কাফির গুপ্তচরকে হত্যা করা বৈধ। আর এটা সকল মুসলিমদের ঐকমত্যে।
নাসায়ী-এর বর্ণনাতে আছে, ‘‘নিশ্চয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ লোকটিকে অনুসন্ধান করা ও হত্যা করার ব্যাপারে তাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন।’’ আর চুক্তিতে আবদ্ধ ও নিরাপত্তাপ্রাপ্ত কাফির গুপ্তচরের ব্যাপারে মালিক ও আওযা‘ঈ বলেন, এ ব্যক্তি চুক্তি ভঙ্গকারীতে পরিণত হবে, অতঃপর মুসলিম চাইলে তাকে দাসে পরিণত করবে অথবা তাকে হত্যা করাও বৈধ হবে।
জুমহূর বিদ্বানগণ বলেন, এর মাধ্যমে তার অঙ্গীকার ভঙ্গ হবে না। আর মুসলিম গুপ্তচরের ব্যাপারে শাফি‘ঈ, আওযা‘ঈ, আবূ হানীফাহ্, কতিপয় মালিকী মতাবলম্বী এবং জুমহূর বিদ্বানগণ বলেনঃ ইমাম প্রহার করা, আটক করা এবং অনুরূপ যা কিছু মনে করেন তার মাধ্যমে তাকে ধমক দিবেন, তবে তাকে হত্যা করা বৈধ হবে না। (শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৭৫৪)
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধবন্দীদের বিধিমালা
৩৯৬৩-[৪] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন সা’দ ইবনু মু’আয (রাঃ)-এর ফায়সালা মেনে নেয়ার শর্তে (ইয়াহূদী) বানূ কুরয়যাহ্ গোত্র দুর্গ থেকে বের হয়ে আসলো, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সা’দ ইবনু মু’আয -কে আনার জন্য) লোক পাঠালেন। এমতাবস্থায় সা’দ একটি গাধার পিঠে সওয়ার হয়ে আসলেন। যখন তিনি কাছে আসলেন, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত লোকেদের উদ্দেশে বললেন, তোমাদের নেতার দিকে গমন কর। তখন সা’দ এসে বসলেন।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সা’দ (রাঃ)-এর প্রতি দৃষ্টিপাত করে) বললেন, এরা তোমার ফায়সালা মেনে নেয়ার শর্তে দুর্গ খুলে বের হয়ে এসেছে। সুতরাং তুমি তাদের সম্পর্কে ফায়সালা দাও। তখন সা’দ বললেন, এদের ব্যাপারে আমার ফায়সালা হচ্ছে, যুদ্ধ করতে সক্ষমদেরকে হত্যা করা হোক এবং নারী ও শিশুদেরকে বন্দী করা হোক। অতঃপর এ রায় শুনে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলে উঠলেন, তাদের ব্যাপারে তুমি বাদশাহর (আল্লাহর) ফায়সালা মুতাবিক বিচার করেছ। অপর এক বর্ণনাতে আছে, তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও হুকুম অনুসারেই রায় দিয়েছ। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ حُكْمِ الْاُسَرَاءِ
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: لَمَّا نَزَلَتْ بَنُو قُرَيْظَةَ عَلَى حُكْمِ سَعْدِ بْنِ مُعَاذٍ بَعَثَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِليه فَجَاءَ عَلَى حِمَارٍ فَلَمَّا دَنَا قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «قُومُوا إِلَى سَيِّدِكُمْ» فَجَاءَ فَجَلَسَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ هَؤُلَاءِ نَزَلُوا عَلَى حُكْمِكَ» . قَالَ: فَإِنِّي أَحْكُمُ أَنْ تَقْتُلَ الْمُقَاتِلَةُ وَأَنْ تُسْبَى الذُّرِّيَّةُ. قَالَ: «لَقَدْ حَكَمْتَ فِيهِمْ بحُكْمِ المَلِكِ» . وَفِي رِوَايَة: «بِحكم الله»
ব্যাখ্যা: ফাতহুল বারীতে আছে, «فَلَمَّا دَنَا مِنَ الْمَسْجِدِ» এখানে মসজিদ বলতে ঐ জায়গা উদ্দেশ্য যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বানূ কুরয়যাহ্-এর অবরোধের দিনগুলোতে তাদের এলাকাতে সালাত আদায়ের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। এর দ্বারা মদীনাতে অবস্থিত মসজিদে নববী উদ্দেশ্য নয়।
(قُوْمُوْا إِلٰى سَيِّدِكُمْ) দীর্ঘ হাদীসের মাঝে ‘আলকামাহ্ বিন ওয়াক্কাস -এর সানাদে মুসনাদে আহমাদ কর্তৃক ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর মুসনাদে এসেছে, ‘‘আবূ সা‘ঈদ বলেনঃ অতঃপর সা‘দ যখন আগমন করল তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা তোমাদের সাইয়িদ (নেতার)-এর দিকে এগিয়ে যাও, অতঃপর তাকে নামাও।’’
(لَقَدْ حَكَمْتَ فِيهِمْ بحُكْمِ المَلِكِ) বুখারীতে «حَكَمْتَ فِيهِ بِحُكْمِ اللّٰهِ» এসেছে। মুহাম্মাদ বিন সালিহ-এর বর্ণনাতে «لَقَدْ حَكَمْتَ فِيهِمُ الْيَوْمَ بِحُكْمِ اللّٰهِ الَّذِي حَكَمَ بِه مِنْ فَوْقِ سَبْعِ سماوات» অর্থাৎ ‘‘আজ তুমি তাদের ব্যাপারে আল্লাহর ঐ ফায়সালা অনুযায়ী ফায়সালা দিয়েছ যার মাধ্যমে তিনি সাত আকাশের উপর থেকে ফায়সালা দিয়েছেন’’ উল্লেখ আছে।
ইবনু ‘আয়িয-এর কাছে জাবির-এর হাদীসে আছে, ‘‘অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, হে সা‘দ! তুমি তাদের ব্যাপারে ফায়সালা দাও, তখন সা‘দ বলল, ফায়সালা দেয়ার ব্যাপারে আল্লাহ ও তাঁর রসূলই বেশি অধিকার রাখেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তাদের ব্যাপারে ফায়সালা দিতে আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে নির্দেশ দিয়েছেন।’’ আর ‘আলকামাহ্ বিন ওয়াক্কাস-এর মুরসাল সানাদে ইবনু ইসহক-এর বর্ণনাতে আছে, «لَقَدْ حَكَمْتَ فِيهِمْ بِحُكْمِ اللّٰهِ مِنْ فَوْقِ سَبْعَةِ» ‘‘নিঃসন্দেহে তুমি তাদের মাঝে সাত আকাশের উপর থেকে আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী ফায়সালা দিয়েছ। আল্লাহর ফায়সালা অনুযায়ী ফায়সালা দিয়েছ।’’
(ফাতহুল বারী ৭ম খন্ড, হাঃ ৪১২১)
নববী বলেনঃ «قُومُوا إِلٰى سَيِّدِكُمْ أَوْ خَيْرِكُمْ» হাদীসাংশে মর্যাদার অধিকারীকে মর্যাদা দান করা এবং তারা যখন আগমন করবে তখন তাদের জন্য দাঁড়িয়ে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করার প্রমাণ আছে। এভাবে দাঁড়ানো মুস্তাহাব হওয়া সম্পর্কে জুমহূর বিদ্বানগণ প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন।
কাযী বলেনঃ এটা নিষিদ্ধ দণ্ডায়মানের অন্তর্ভুক্ত নয়। নিষেধাজ্ঞা কেবল ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে যে বসে থাকাবস্থায় তার কাছে মানুষেরা দাঁড়ায় এবং তার বসে থাকা পর্যন্ত তারা দাঁড়িয়েই থাকে।
শারহে মুসলিম প্রণেতা বলেনঃ আমি বলব, সম্মানিত আগমনকারীর জন্য দাঁড়ানো মুস্তাহাব। এ ব্যাপারে অনেক হাদীস এসেছে। এ সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে স্পষ্ট কোনো কিছু বিশুদ্ধ সাব্যস্ত হয়নি। এ ব্যাপারে বিদ্বানদের আলোচনাসহ প্রতিটি বিষয়কে একটি অংশে একত্রিত করেছি। এ সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা যে সন্দেহে সৃষ্টি করেছে সে সম্পর্কে আমি তাতে উত্তর দিয়েছি আর আল্লাহ সর্বজ্ঞাত। (শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৭৬৮)
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধবন্দীদের বিধিমালা
৩৯৬৪-[৫] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (৬ষ্ঠ হিজরীতে) একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজ্দ গোত্রের অভিমুখে একদল অশ্বারোহী সৈন্য পাঠালেন। তারা বানী হানীফাহ্ গোত্রীয় ইয়ামামাবাসীদের সরদার সুমামাহ্ ইবনু উসাল নামে এক ব্যক্তিকে ধরে আনল। অতঃপর তারা তাকে মসজিদে নববীর একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিকট এসে জিজ্ঞেস করলেন, হে সুমামাহ্! তুমি কি মনে করছ? সে বলল, হে মুহাম্মাদ! আমি কল্যাণ কামনা করছি, যদি আপনি আমাকে হত্যা করেন তবে একজন খুনীকে হত্যা করবেন। আর যদি আমার প্রতি অনুগ্রহ করেন, তবে অবশ্যই একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকেই অনুগ্রহ করবেন। আর যদি ধন-সম্পদের অভিলাষী হন, তাও চাইতে পারেন, তাও প্রদান করা হবে। এমতাবস্থায় তার কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে রেখে চলে গেলেন। আবার পরদিন এসেও তাকে অনুরূপভাবে জিজ্ঞেস করলেন, হে সুমামাহ্! তুমি কি প্রত্যাশা করছ? সে বলল, আমি তাই প্রত্যাশা করি যা আপনাকে পূর্বে বলেছি।
যদি আমার প্রতি দয়া করেন, তবে একজন কৃতজ্ঞকেই দয়া করবেন। আর যদি আমাকে হত্যা করেন, তবে একজন খুনীকেই হত্যা করলেন। আর যদি ধন-সম্পদ চান, তবে তাও আপনাকে দেয়া হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে তৃতীয় দিন আসলেন আজও তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে সুমামাহ্! তুমি কি প্রত্যাশা করছ? সে বলল, আমি তাই প্রত্যাশা করি যা আপনাকে পূর্বেই বলেছি। যদি আমার প্রতি অনুগ্রহপরায়ণ হন, তবে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির প্রতিই অনুকম্পা করবেন। আর যদি আমাকে হত্যা করেন, তবে একজন খুনীকেই হত্যা করবেন। আর যদি ধন-সম্পদ চান, তবে আপনাকে তাই দেয়া হবে।
এবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা সুমামাকে ছেড়ে দাও। অতঃপর সে মসজিদের নিকটেই একটি খেজুর বাগানে প্রবেশ করল এবং গোসল করে মসজিদে প্রবেশ করল এবং ঘোষণা করল, ’’আশ্হাদু আল্লা- ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়া আশ্হাদু আন্না মুহাম্মাদান ’আবদুহূ ওয়া রসূলুহ’’। অতঃপর সে অকপটে বলে উঠল, হে মুহাম্মাদ! আল্লাহর কসম! পৃথিবীর বুকে আপনার চেহারা অপেক্ষা আর কারো চেহারা আমার নিকট এত অধিক ঘৃণিত ছিল না। কিন্তু এখন আপনার চেহারা আমার কাছে সকলের চেয়ে প্রিয় হয়ে গেছে। আল্লাহর কসম! আপনার দীনের (ধর্মের) অপেক্ষা অধিক ঘৃণিত দীন আমার নিকট কোনটি ছিল না। কিন্তু এখন আপনার দীনই আমার কাছে সর্বাধিক প্রিয় দীন।
আল্লাহর কসম! আপনার শহরের চেয়ে অধিক ঘৃণ্য শহর আমার নিকট আর কোনটি ছিল না, কিন্তু আপনার শহর আমার নিকট সর্বোত্তম হয়ে গেছে। আপনার অশ্বারোহীগণ আমাকে এমন সময় ধরে এনেছে, যখন আমি ’উমরাহ্ পালন করার উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছিলাম। এখন আপনি আমাকে কি করতে হুকুম দেন? তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে (ইসলাম গ্রহণের) সুসংবাদ এবং ’উমরাহ্ পালনের আদেশ দিলেন। এরপর যখন সে মক্কায় পৌঁছল, তখন জনৈক ব্যক্তি তাকে বলল, তুমি কী ধর্মত্যাগী বেদীন হয়ে গেছ? উত্তরে সে বলল, তা হবে কেন? বরং আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ইসলাম গ্রহণ করেছি। আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুমতি ছাড়া ইয়ামামাহ্ হতে তোমাদের নিকট গমের একটি দানাও পৌঁছবে না। (মুসলিম; বুখারীতে সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণিত হয়েছে)[1]
بَابُ حُكْمِ الْاُسَرَاءِ
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: بَعَثَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَيْلًا قِبَلَ نَجْدٍ فَجَاءَتْ بِرَجُلٍ مِنْ بَنِي حَنِيفَةَ يُقَالُ لَهُ: ثُمَامَةُ بْنُ أُثَالٍ سَيِّدُ أَهْلِ الْيَمَامَةِ فَرَبَطُوهُ بِسَارِيَةٍ مِنْ سَوَارِي الْمَسْجِدِ فَخَرَجَ إِلَيْهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «مَاذَا عِنْدَكَ يَا ثُمَامَةُ؟» فَقَالَ: عنْدي يَا مُحَمَّد خير إِن نقْتل تَقْتُلْ ذَا دَمٍ وَإِنْ تُنْعِمْ تُنْعِمْ عَلَى شَاكِرٍ وَإِنْ كُنْتُ تُرِيدُ الْمَالَ فَسَلْ تُعْطَ مِنْهُ مَا شِئْتَ فَتَرَكَهُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَتَّى كَانَ الْغَدُ فَقَالَ لَهُ: «مَا عِنْدَكَ يَا ثُمَامَةُ؟» فَقَالَ: عِنْدِي مَا قُلْتُ لَكَ: إِنْ تُنْعِمْ تُنْعِمْ عَلَى شَاكِرٍ وَإِنْ تَقْتُلْ تَقْتُلْ ذَا دَمٍ وَإِنْ كنتَ تريدُ المالَ فسَلْ تعط مِنْهُ مَا شِئْتَ. فَتَرَكَهُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَتَّى كَانَ بَعْدَ الْغَدِ فَقَالَ لَهُ: «مَا عِنْدَكَ يَا ثُمَامَةُ؟» فَقَالَ: عِنْدِي مَا قُلْتُ لَكَ: إِنْ تُنْعِمْ تُنْعِمْ عَلَى شَاكِرٍ وَإِنْ تَقْتُلْ تَقْتُلْ ذَا دَمٍ وَإِنْ كُنْتَ تُرِيدُ الْمَالَ فَسَلْ تُعْطَ مِنْهُ مَا شِئْتَ. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَطْلَقُوا ثُمَامَةَ» فَانْطَلَقَ إِلَى نَخْلٍ قَرِيبٍ مِنَ الْمَسْجِدِ فَاغْتَسَلَ ثُمَّ دَخَلَ الْمَسْجِدَ فَقَالَ: أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَن مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ يَا مُحَمَّدُ وَاللَّهِ مَا كَانَ عَلَى وَجْهِ الْأَرْضِ وَجْهٌ أَبْغَضُ إِلَيَّ مِنْ وَجْهِكَ فَقَدْ أَصْبَحَ وَجْهُكَ أَحَبَّ الْوُجُوهِ كُلِّهَا إِلَيَّ وَاللَّهِ مَا كَانَ مِنْ دِينٍ أَبْغَضَ إِلَيَّ مِنْ دِينِكَ فَأَصْبَحَ دِينُكَ أَحَبَّ الدِّينِ كُلِّهِ إِلَيَّ وَوَاللَّهِ مَا كَانَ مِنْ بَلَدٌ أَبْغَضَ إِلَيَّ مِنْ بَلَدِكَ فَأَصْبَحَ بَلَدُكَ أَحَبَّ الْبِلَادِ كُلِّهَا إِلَيَّ. وَإِنَّ خَيْلَكَ أَخَذَتْنِي وَأَنَا أُرِيدَ الْعُمْرَةَ فَمَاذَا تَرَى؟ فَبَشَّرَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَمَرَهُ أَنْ يَعْتَمِرَ فَلَمَّا قَدِمَ مَكَّةَ قَالَ لَهُ قَائِلٌ: أَصَبَوْتَ؟ فَقَالَ: لَا وَلَكِنَّى أَسْلَمْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَاللَّهِ لَا يَأْتِيكُمْ مِنَ الْيَمَامَةِ حَبَّةُ حِنْطَةٍ حَتَّى يَأْذَنَ فِيهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. رَوَاهُ مُسلم وَاخْتَصَرَهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: ثُمَامَةُ (সুমামাহ্) প্রথম দিনে তার উক্তির। (إِنْ تَقْتُلْ تَقْتُلْ ذَا دَمٍ) অর্থাৎ- ‘‘আপনি যদি আমাকে হত্যা করেন তাহলে একজন খুনীকেই হত্যা করবেন।’’ এ অংশকে অগ্রবর্তী করা এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে এ অংশকে বাক্যের অপর অংশদ্বয়ের মাঝে নিয়ে আসাটা এমন এক কৌশলী পদ্ধতি যা সুমামার বিচক্ষণতার দিকে নির্দেশ করছে, কেননা সুমামাহ্ প্রথম দিনে যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রাগ অবলোকন করলেন, তখন তাকে সান্তবনা স্বরূপ হত্যার বিষয়টি অগ্রবর্তী করলেন। অতঃপর সে যখন দেখল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে হত্যা করল না, তখন সে নিজের ওপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুগ্রহ করার আশা করল। অতঃপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে তার এ (إِنْ تَقْتُلْ) উক্তিকে পিছিয়ে আনলেন। (ফাতহুল বারী ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৩৭২)
قَالَ لَه قَائِلٌ، أَصَبَوْتَ؟ الصَّبْوُ (সব্উ) বলতে বায়হাক্বী-এর তাজুল মাসাদীরে আছে- অজ্ঞতার দিকে ধাবমান হওয়া। নিহায়াহ্ গ্রন্থে আছে, ব্যক্তি যখন এক ধর্ম থেকে আরেক ধর্মের দিকে বেরিয়ে যায় তখন ‘আরবীতে (صَبَأَ فُلَانٌ) বলা হয়।
(فَقَالَ : لَا وَلٰكِنّٰى أَسْلَمْتُ مَعَ رَسُوْلِ اللّٰهِ ﷺ) অর্থাৎ- ‘‘অতঃপর তিনি বলেন, না, ‘‘আমি ধর্মত্যাগ করিনি’’ বরং আমি আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ইসলাম গ্রহণ করেছি।’’ অতঃপর আপনি যদি বলেন, কিভাবে সুমামাহ্ না বলল? অথচ সে শির্ক হতে তাওহীদের দিকে বের হয়েছে। আমি (মিরকাতুল মাফাতীহ প্রণেতা) বলবঃ এটা বিজ্ঞতাপূর্ণ পদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত, যেন সে বলেছে, আমি দীন হতে বের হইনি। কেননা তোমরা এমন কোনো দীনের উপর নও যে, আমি তা থেকে বের হয়ে যাব, বরং আমি আল্লাহর দীনে প্রত্যাবর্তন করেছি এবং আল্লাহর রসূলের সাথে ইসলাম গ্রহণ করেছি। অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্ব থেকে ইসলামের সাথে সম্পর্কিত, আর আমি নতুন করে সম্পৃক্ত হলোম।
নববী বলেনঃ ذا دم শব্দটির দু’টি অর্থ হতে পারে- (১) খুনী, অর্থাৎ আমার ওপর হত্যার অভিযোগ আছে। (২) আমার রক্ত মূল্যবান। অর্থাৎ আমাকে হত্যা করা হলে এ হত্যার পরিশোধ নেয়ার লোক আছে। তবে প্রথম অর্থটিই অধিক গ্রহণযোগ্য। তিনি আরো বলেনঃ এ হাদীসে বন্দীকে বেঁধে রাখা, তাকে আটকিয়ে রাখা এবং কাফিরকে মসজিদে প্রবেশ করানো বৈধ হওয়ার প্রমাণ আছে। এতে আরও আছে- কাফির ব্যক্তি যখন ইসলাম গ্রহণের ইচ্ছা করবে তখন ঐ ব্যাপারে তাড়াতাড়ি করতে হবে, গোসলের জন্য বিলম্ব করা যাবে না। আর কারো জন্য বৈধ হবে না তাকে তা বিলম্বকরণে অনুমতি দেয়া। আমাদের মাযহাব (মিরকাতুল মাফাতীহ প্রণেতা) হলো, শির্কে থাকালীন সময়ে এ ব্যক্তির দেহে অপবিত্রতা থাকলে তার গোসল করা আবশ্যক। পূর্বে এ কারণে গোসল করুক বা না করুক উভয় সমান। আমাদের কতক সাথীবর্গ বলেন, ইসলাম গ্রহণের পূর্বে সে গোসল করে থাকলে তা তার জন্য যথেষ্ট হবে, আর তার দেহে জানাবাত (স্বপ্ন দোষ হওয়া, স্ত্রী সহবাস করা) না থাকলে তার গোসল করা মুস্তাহাব।
আহমাদ ও অন্যান্যগণ বলেনঃ তার ওপর গোসল করা আবশ্যক। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বারংবার তিনদিন প্রশ্ন করাতে বন্দীদের থেকে যাদের ইসলাম গ্রহণের আশা করা যায় তাদের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন ও নিজ হৃদয়ের নম্রতা প্রকাশ রয়েছে, ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রে যাদের অনুসরণ করবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
فَقَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ : أَطْلَقُوْا ثُمَامَةَ ইবনু ইসহক-এর বর্ণনাতে আছে- قَالَ قَدْ عَفَوْتُ عَنْكَ يَا ثُمَامَةُ وأعتقتك তিনি বলেছেন, হে সুমামাহ্! আমি তোমার প্রতি ক্ষমাপ্রদর্শন করেছি এবং তোমাদেরকে স্বাধীন করে দিয়েছি। ইবনু ইসহক তার বর্ণনাতে আরেকটু বৃদ্ধি করে বলেন, সুমামাহ্ যখন বন্দীদশায় ছিলেন তখন সেবকরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরিবারে খাদ্য দুধ যা ছিল সকল কিছু একত্র করল কিন্তু ঐ খাদ্য সুমামার পেটের কিছুই হলো না। অতঃপর সুমামাহ্ যখন ইসলাম গ্রহণ করল তখন তার কাছে তারা খাদ্য আনলে সুমামাহ্ অল্প খেল। অতঃপর এ দেখে তারা আশ্চর্যান্বিত হলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘‘নিশ্চয় কাফির সাত পেটে খায় আর মু’মিন এক পেটে খায়।’’
(فَبَشَّرَه) ‘‘অতঃপর তিনি সুমামাকে সুসংবাদ দিলেন।’’ অর্থাৎ ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ সম্পর্কে অথবা তাকে জান্নাত, তার গুনাহ মোচন সম্পর্কে সুসংবাদ দিলেন। সুমামার অত্র হাদীসে অনেকগুলো উপকারিতা আছে, সেগুলোর মাঝে ফাতহুল বারীতে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো- অপরাধীর ক্ষমার বিষয়টি বড় করে দেখা। কেননা সুমামাহ্ বলেছে, এক মুহূর্তেই সুমামার ক্রোধ ভালোবাসাতে পরিণত হয়েছে। দয়াপ্রদর্শন ক্রোধ দূর করে, ভালোবাসা প্রতিষ্ঠিত করে। নিঃসন্দেহে কাফির ব্যক্তি যখন কল্যাণকর কাজের ইচ্ছা করবে, অতঃপর ইসলাম গ্রহণ করবে, তখন ঐ কল্যাণজনক কাজে অটল থাকা তার জন্য শারী‘আতসম্মত। এতে আরো আছে, কাফির রাষ্ট্রের দিকে সৈন্যবাহিনী পাঠানো এবং তাদের মাঝে যাকে পাওয়া যাবে তাকে বন্দী করা, তাকে বন্দী দশার উপর রেখে দেয়া এবং তাকে হত্যা করার ক্ষেত্রে ইমামের স্বাধীনতা রয়েছে। (ফাতহুল বারী ৮ম খন্ড, হাঃ ৪৩৭২)
ইমাম শাফি‘ঈ-এর মাযহাব হলো, মুসলিম ব্যক্তির অনুমতিক্রমে কাফির ব্যক্তিকে মসজিদে প্রবেশ করতে দেয়া বৈধ। সে কিতাবধারী কাফির হোক অথবা অন্যান্য কাফির হোক। ‘উমার বিন ‘আবদুল ‘আযীয, কাতাদাহ এবং মালিক বলেন, তা বৈধ নয়। আবূ হানীফাহ্ বলেনঃ আহলে কিতাব বা কিতাবধারীদের ক্ষেত্রে বৈধ, অন্যদের জন্য বৈধ নয়। সকল ক্ষেত্রে আমাদের (মিরকাতুল মাফাতীহ প্রণেতা) দলীল এ হাদীসটি এবং মহান আল্লাহর এ বাণী ‘‘নিঃসন্দেহে মুশরিকরা অপবিত্র, সুতরাং তারা যেন মসজিদে হারামের নিকটবর্তী না হয়’’- (সূরা আত্ তাওবাহ্ ৯ : ২৮)। অতএব মুশরিকদের মসজিদে প্রবেশের নিষিদ্ধের বিষয়টি মসজিদে প্রবেশের সাথে নির্দিষ্ট। আমরা বলব, মুশরিক ব্যক্তির হারামে প্রবেশ করার সুযোগ নেই। [আর আল্লাহ সর্বজ্ঞাত’ (শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৭৬৪)
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধবন্দীদের বিধিমালা
৩৯৬৫-[৬] জুবায়র ইবনু মুত্ব’ইম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদর যুদ্ধে বন্দীদের ব্যাপারে বলেছেন, আজ যদি মুত্ব’ইম ইবনু ’আদী জীবিত থাকত এবং এ সমস্ত দুর্গন্ধময় লোকেদের ব্যাপারে আমার কাছে সুপারিশ করতেন, তাহলে আমি তার সুবাদে তাদেরকে ছেড়ে দিতাম। (বুখারী)[1]
بَابُ حُكْمِ الْاُسَرَاءِ
وَعَن جُبَير بن مطعم أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ فِي أُسَارَى بَدْرٍ: «لَوْ كَانَ الْمُطْعِمُ بْنُ عَدِيٍّ حَيًّا ثُمَّ كَلَّمَنِي فِي هَؤُلَاءِ النَّتْنَى لتركتهم لَهُ» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: (فِىْ هَؤُلَاءِ النَّتْنٰى) ‘‘এ সকল দুর্গন্ধময় লোকেদের ব্যাপারে’’। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ কাফিরদেরকে দুর্গন্ধময় বলে সাব্যস্ত করেছেন। এটা মূলত তাদের অপবিত্র থাকার কারণে, যা তাদের কুফরী থেকে অর্জিত।
(لَتَرَكْتُهُمْ لَه) অর্থাৎ- ‘‘অবশ্যই তার কারণে তাদেরকে ছেড়ে দিতাম’’। কাযী বলেনঃ সে হলো মুত্ব‘ইম বিন ‘আদী বিন নাওফাল বিন ‘আব্দ মানাফ, আল্লাহর রসূলের দাদার চাচাতো ভাই। আল্লাহর রসূলের প্রতি তার সমর্থন ও সহযোগিতা ছিল। কেননা আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ত্বায়িফ থেকে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন তখন তার কাছে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং সে তাঁর থেকে মুশরিকদের তাড়িয়ে দিয়েছিল। তাই তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন যে, মুত্ব‘ইম বিন ‘আদী যদি জীবিত থাকত, তাহলে ঐ ব্যাপারে সুপারিশের ক্ষেত্রে মুত্ব‘ইম যথেষ্ট হত। আরও সম্ভাবনা রাখছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাধ্যমে মুত্ব‘ইম-এর ছেলে জুবায়র-এর অন্তরের স্বাচ্ছন্দ্যতা ও ইসলামে তার ভালোবাসা উদ্দেশ্য করেছেন। অত্র হাদীসে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবস্থার বড়ত্ব বর্ণনা ও এ সকল কাফিরদের অবস্থার তুচ্ছতা বর্ণনা সম্পর্কে উপস্থাপন করা হয়েছে এমনভাবে যে, তাঁর প্রতি মুশরিকের সহযোগিতা থাকা সত্ত্বেও তাদেরকে কোনো ব্যাপারে ছাড় দিতে পরোয়া করেন না।
একমতে বলা হয়েছে, অত্র হাদীসে উত্তম প্রতিদানের বর্ণনা এবং কৌশল ধার্য করার বৈধতা রয়েছে। ইবনুল হুমাম বলেনঃ অত্র হাদীস দ্বারা ইমাম শাফি‘ঈ-এর মাযহাব অনুযায়ী অনুগ্রহ করা বৈধ হওয়ার উপর প্রমাণ গ্রহণ করা হয়েছে যা অন্যান্য ইমামদের মতের বিপরীত।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংবাদ দিয়েছেন যে, মুত্ব‘ইম বিন ‘আদী যদি তাঁর কাছে কাফির বন্দীদের ব্যাপারে আবেদন করত, নিঃসন্দেহে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদেরকে মুক্তি দান করতেন। এ কথাটি উহ্য অবস্থার উপর প্রয়োগ করা থেকে যুদ্ধবন্দী কাফিরদের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করা শারী‘আতসম্মতভাবে বৈধ প্রমাণিত হচ্ছে। যার সাথে তাকে সম্পর্কিত করা হয়েছে তা সংঘটিত না হওয়ার কারণে শারী‘আতসম্মতভাবে তা সংঘটিত হওয়ার বৈধতাকে অস্বীকার করছে না, আর এটাই এখানে উদ্দেশ্য। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩১৩৯)
খত্ত্বাবী বলেনঃ অত্র হাদীসে কোনো মুক্তিপণ ছাড়া বন্দীকে ছেড়ে দেয়া এবং তার ওপর অনুগ্রহ করার প্রমাণ আছে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬৮৬)
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধবন্দীদের বিধিমালা
৩৯৬৬-[৭] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন মক্কার আশিজন অস্ত্রধারী ঘাতক দল তান্’ঈম পাহাড়ের আড়াল হতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবীগণের ওপর অতর্কিত আক্রমণ করার জন্য নিচে নেমে অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বিনা মুকাবিলায় বন্দী করে ফেললেন এবং পরে তাদেরকে জীবিত ছেড়ে দিলেন।
অপর সূত্রে বর্ণিত আছে, তাদেরকে মুক্ত করে দিলেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা আয়াত নাযিল করেন, অর্থাৎ- ’’আল্লাহ সে মহান সত্তা, যিনি মক্কার অদূরে তাদের (কাফিরদের) হাত তোমাদের ওপর হতে এবং তোমাদের হাত তাদের ওপর হতে বিরত রেখেছেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ حُكْمِ الْاُسَرَاءِ
وَعَن أنسٍ: أَنَّ ثَمَانِينَ رَجُلًا مِنْ أَهْلِ مَكَّةَ هَبَطُوا عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ جَبَلِ التَّنْعِيمِ مُتَسَلِّحِينَ يُرِيدُونَ غِرَّةَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَصْحَابِهِ فَأَخَذَهُمْ سِلْمًا فَاسْتَحْيَاهُمْ. وَفِي رِوَايَةٍ: فَأَعْتَقَهُمْ فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى (وَهُوَ الَّذِي كَفَّ أَيْدِيَهُمْ عَنْكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ عَنْهُمْ ببطنِ مكةَ)
رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: (مِنْ جَبَلِ التَّنْعِيْمِ) কামূসে আছে- তান্‘ঈম মক্কা থেকে তিন অথবা চার মাইল দূরে অবস্থিত একটি স্থান, বায়তুল্লাহর পথে হিল্ অঞ্চলের সীমানার নিকটবর্তী স্থান, এ নামে একে নামকরণ করার কারণ হলো এর ডান পাশে আছে নু‘আয়ম পর্বত, বাম পাশে আছে না‘ইম পর্বত আর উপত্যকার নাম না‘মান।
(فَأَخَذَهُمْ سِلْمًا) হুমায়দী বলেনঃ এর অর্থ হলো, الصُّلْحُ বা সন্ধি করা। কাযী বলেনঃ سِلْمًا শব্দটিকে সীন ও লাম বর্ণে যবর দিয়ে سَلَمًا পড়া যায় এবং ‘সীন’ বর্ণে যের এবং লাম বর্ণে সাকিন দিয়ে سِلْمًا-ও পড়া যায়। এ ক্ষেত্রে (فَأَخَذَهُمْ سَلَمًا) বাক্যাংশটির অর্থ তিনি তাদেরকে বন্দী করলেন। খত্ত্বাবী বলেনঃ উক্ত পঠন রীতিতে سَلَمًا শব্দ থেকে উদ্দেশ্য আত্মসমর্পণ, আনুগত্য। যেমন মহান আল্লাহর বাণী, ‘‘আর তারা তোমাদের কাছে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব পাঠায়’’- (সূরা আন্ নিসা ৪ : ১০)।
ইবনুল আসীর বলেনঃ ঘটনার সাথে এটা সর্বাধিক মিল। কেননা তাদেরকে সন্ধির মাধ্যমে গ্রেপ্তার করা হয়নি, তাদেরকে কেবল দাপটের মাধ্যমে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা অপারগ হয়ে নিজেদেরকে সোপর্দ করেছে।
وَأَيْدِيَكُمْ عَنْهُمْ بِبَطْنِ مَكَّةَ ত্বীবী বলেনঃ মুসলিমদের ওপর মুশরিকদের হঠাৎ আক্রমণ করার ইচ্ছা করার পর তাদেরকে শাস্তি প্রদান করা থেকে মুসলিমদেরকে বিরত রাখা এবং তাদের আক্রমণ হতে মুসলিমদের নিরাপদে রাখা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলীর অন্তর্ভুক্ত। যদি আল্লাহ তাদের অন্তরে তাদের প্রতি দয়া, অনুকম্পা সৃষ্টি না করতেন তাহলে নিরাপত্তা অর্জন হতো না।
আমি (মিরকাতুল মাফাতীহ প্রণেতা) বলবঃ একে মহান আল্লাহর ‘‘অতঃপর তোমরা তাদেরকে হত্যা করনি বরং আল্লাহ তাদেরকে হত্যা করেছেন’’- (সূরা আল আনফাল ৮ : ১৭) এ বাণীর সাথে তুলনাকরণ সর্বাধিক সামঞ্জস্যশীল। বায়যাভী তাঁর তাফসীরে বলেনঃ ওটা হলো- ‘ইকরিমাহ্ বিন আবূ জাহাল পাঁচশত লোক নিয়ে হুদায়বিয়ার উদ্দেশে বের হলে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খালিদ বিন ওয়ালীদকে সৈন্যবাহিনী দিয়ে প্রেরণ করলেন, অতঃপর তিনি তাদেরকে পরাস্ত করে মক্কার প্রাচীর বেষ্টনী এক জায়গাতে প্রবেশ করান, অতঃপর ফিরে আসেন।
সা‘ঈদ ইবনু জুবায়র বলেনঃ ইবনু জারীর এবং ইবনু আবূ হাতিম একে ইবনু আবূ আবযা থেকে বর্ণনা করেছেন। আমি (মিরকাতুল মাফাতীহ প্রণেতা) বলবঃ এটাই মহান আল্লাহর بِبَطْنِ مَكَّةَ এ বাণীর সাথে উপযোগী। একমতে বলা হয়েছে, এ আয়াত দ্বারা মক্কা বিজয় উদ্দেশ্য। আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) এ আয়াত দ্বারা প্রমাণ গ্রহণ করেছেন যে, মক্কা বলপূর্বক বিজয় করা হয়েছে। বায়যাভী বলেনঃ এটা দুর্বল, কেননা সূরাটি এর পূর্বে অবতীর্ণ করা হয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধবন্দীদের বিধিমালা
৩৯৬৭-[৮] কাতাদাহ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আনাস ইবনু মালিক আবূ ত্বলহাহ্ সূত্রে আমাদের নিকট বর্ণনা করেন, বদর যুদ্ধ শেষে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ২৪ জন কুরায়শ নেতার লাশ (কূপে ফেলার) ব্যাপারে নির্দেশ দেন। অতঃপর বদর প্রান্তরে একটি নোংরা দুর্গন্ধময় কূপে তাদের লাশ ফেলা হলো। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন কোনো গোত্রের ওপর বিজয় লাভ করতেন, তখন সে যুদ্ধস্থলে তিনরাত অবস্থান করতেন। বদর প্রান্তেও তৃতীয় দিনে তাঁর নির্দেশে সওয়ারীর গদি বাঁধা হলো। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একদিকে কিছু পথ পায়ে হেঁটে চললেন, সাহাবীগণও তাঁর পশ্চাদানুসরণ করলেন।
পথিমধ্যে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ঐ কূপের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং তাতে নিক্ষিপ্ত কুরায়শ সরদারদের মৃতদেহ ও তাদের বাপ-দাদার নাম ধরে উচ্চস্বরে ডাকতে লাগলেন, হে অমুকের পুত্র অমুক! হে অমুকের পুত্র অমুক! তোমরা কি এখন বুঝতে পেরেছ, আল্লাহ ও তার রসূলের কথা মেনে চললে তোমরা খুশি হতে পারতে? আমাদের রব আমাদের সঙ্গে (বিজয়ের) যে ওয়া’দাহ্ করেছিলেন, আমরা তা সঠিকভাবে পরিপূর্ণরূপে পেয়েছি। তোমরাও কি এখন তোমাদের রবের ঘোষণা (কুফরীর পরিণাম ভয়াবহ দুরাবস্থা) সঠিকভাবে প্রত্যক্ষ করেছ? তখন ’উমার (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি আত্মাবিহীন লাশের সাথে কী কথা বলছেন? জবাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে মহান সত্ত্বার কসম, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! আমি যা বলছি তা তোমরা তাদের অপেক্ষা বেশি শুনতে পাচ্ছ না।
অপর এক বর্ণনাতে আছে, তোমরা তাদের অপেক্ষা অধিক শুনতে পাওনি। তবে পার্থক্য এই যে, তারা জবাব দিতে পারে না। (বুখারী, মুসলিম)[1]
বুখারীর বর্ণনায় অতিরিক্ত রয়েছে যে, বর্ণনাকারী কাতাদাহ বলেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথাগুলো শুনার জন্য আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে জীবিত করে দিয়েছিলেন যেন তারা ভৎর্সনা, লাঞ্ছনা, অপমান, অনুশোচনা ও লজ্জা অনুভব করতে পারে।
بَابُ حُكْمِ الْاُسَرَاءِ
وَعَنْ قَتَادَةَ قَالَ: ذَكَرَ لَنَا أَنَسُ بْنُ مَالِكٍ عَنْ أَبِي طَلْحَةَ أَنَّ نَبِيَّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَرَ يَوْمَ بَدْرٍ بِأَرْبَعَةٍ وَعِشْرِينَ رَجُلًا مِنْ صَنَادِيدِ قُرَيْشٍ فَقَذَفُوا فِي طَوِيٍّ مِنْ أَطْوَاءِ بَدْرٍ خَبِيثٍ مُخْبِثٍ وَكَانَ ذَا ظهرَ عَلَى قَوْمٍ أَقَامَ بِالْعَرْصَةِ ثَلَاثَ لَيَالٍ فَلَمَّا كَانَ بِبَدْرٍ الْيَوْمَ الثَّالِثَ أَمَرَ بِرَاحِلَتِهِ فَشَدَّ عَلَيْهَا رَحْلَهَا ثُمَّ مَشَى وَاتَّبَعَهُ أَصْحَابُهُ حَتَّى قَامَ عَلَى شَفَةِ الرَّكِيِّ فَجَعَلَ يُنَادِيهِمْ بِأَسْمَائِهِمْ وأسماءِ آبائِهم: «يَا فُلَانَ بْنَ فُلَانٍ وَيَا فُلَانُ بْنَ فُلَانٍ أَيَسُرُّكُمْ أَنَّكُمْ أَطَعْتُمُ اللَّهَ وَرَسُولَهُ؟ فَإِنَّا قَدْ وَجَدْنَا مَا وَعَدَنَا رَبُّنَا حَقًّا فَهَلْ وَجدتمْ مَا وعدَكم رَبُّكُمْ حَقًّا؟» فَقَالَ عُمَرُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا تُكَلِّمَ مِنْ أَجْسَادٍ لَا أَرْوَاحَ لَهَا؟ قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ مَا أَنْتُمْ بِأَسْمَعَ لِمَا أَقُولُ مِنْهُمْ» . وَفِي رِوَايَةٍ: «مَا أَنْتُمْ بِأَسْمَعَ مِنْهُمْ وَلَكِنْ لَا يُجِيبُونَ» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ. وَزَادَ الْبُخَارِيُّ: قَالَ قَتَادَةُ: أَحْيَاهُمُ اللَّهُ حَتَّى أَسْمَعَهُمْ قولَه توْبيخاً وتصغيرا ونقمة وحسرة وندما
ব্যাখ্যা: (فِىْ طَوِىٍّ) অর্থাৎ কূপে সুদৃঢ় পাথর দ্বারা প্রলেপ দেয়া। অর্থাৎ কূপের কিনারা পাথর দিয়ে উঁচু করে বাঁধাই করা। তূরিবিশ্তী বলেনঃ الْقَلِيبِ الْبِئْرِ (প্রলেপ দেয়া) এবং বি’রে طَوِىٍّ ( প্রলেপহীন) এর মাঝে সামঞ্জস্য বিধান করা যেতে পারে?
আমি (মিরকাতুল মাফাতীহ প্রণেতা) বলবঃ বর্ণনাকারী হয়ত একটি শব্দকে অপর শব্দের সমার্থবোধক শব্দ হিসেবে প্রয়োগ করেছেন। এমতাবস্থায় বর্ণনাকারী জানত না যে, উভয় শব্দের মাঝে পার্থক্য আছে। আরও সম্ভাবনা রাখছে যে, সাহাবী ধারণা করেছেন যে, কূপটি প্রলেপ দেয়া ছিল অথচ কূপটি প্রলেপহীন ছিল। আরও সম্ভাবনা রয়েছে যে, তাদের কতককে প্রলেপ দেয়া কূপে আর কতককে প্রলেপ ছাড়া কূপে নিক্ষেপ করা হয়েছিল।
(فَإِنَّا قَدْ وَجَدْنَا مَا وَعَدَنَا رَبُّنَا حَقًّا) ‘‘নিঃসন্দেহে আমাদের প্রভু আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আমরা তা সত্য হিসেবে পেয়েছি।’’ অর্থাৎ- তোমাদের ওপর আমাদের বিজয়ের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আমরা তা পেয়েছি।
(فَهَلْ وَجَدْتُّمْ مَا وَعَدَكُمْ رَبُّكُمْ حَقًّا؟) তোমাদের প্রতিপালক তোমাদেরকে শাস্তির যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এটা তাদেরকে তিরস্কারস্বরূপ প্রশ্ন। মুযহির বলেনঃ তোমরা আল্লাহর শাস্তির দিকে পৌঁছার পর কি মুসলিম হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করছ।
ত্বীবী বলেনঃ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য যা তোমাদের হাত ছাড়া হয়েছে তার জন্য কি তোমরা হতাশাগ্রস্ত হচ্ছ, চিন্তিত হচ্ছ? নাকি হচ্ছ না? আর তোমাদের প্রতি আমাদের উক্তি স্মরণ করছ? তা হলো- নিশ্চয় আল্লাহ তার দীনকে সকল দীনের উপর বিজয় দান করবেন, তাঁর ওয়ালীদের সাহায্য করবেন, তাঁর শত্রুদেরকে লাঞ্ছিত করবেন। নিঃসন্দেহে আমাদের প্রভু আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আমরা তা সত্য হিসেবে পেয়েছি।
(يَا رَسُوْلَ اللّٰهِ! مَا تُكَلِّمَ مِنْ أَجْسَادٍ لَا أَرْوَاحَ لَهَا؟) অর্থাৎ- ‘‘হে আল্লাহর রসূল! আপনি এমন দেহের সাথে কথা বলছেন যাতে কোনো আত্মা নেই, সুতরাং তা কিভাবে আপনাকে উত্তর দিবে?’’ (مَا أَنْتُمْ بِأَسْمَعَ لِمَا أَقُولُ مِنْهُمْ) অর্থাৎ- ‘‘আমি যা বলছি তা তোমরা তাদের অপেক্ষা বেশি শুনতে পাও না।’’ অন্য বর্ণনাতে আছে, (مَا أَنْتُمْ بِأَسْمَعَ مِنْهُمْ وَلٰكِنْ لَا يُجِيْبُوْنَ) অর্থাৎ- ‘‘তোমরা তাদের অপেক্ষা বেশি শুনতে পাও না তবে তারা উত্তর দেয় না।’’
নববী (রহঃ)-এর শারহে মুসলিম আছে, মাযিরী বলেনঃ একমতে বলা হয়েছে, এ হাদীসের বাহ্যিকতার প্রতি ‘আমল করলে মৃত ব্যক্তি শুনতে পায়- এ কথা প্রমাণিত হয়, তবে এতে দৃষ্টি নিবন্ধনের বিষয় আছে। কেননা এ হাদীসের বাহ্যিক দিক এ লোকেদের ব্যাপারে খাস। তবে কাযী এ মতকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, কূপে নিক্ষক্ষপিত নিহত কাফিরদের শ্রবণ করাতে ঐ অবস্থার উপর চাপিয়ে দিতে হবে যে অবস্থার উপর কবরের শাস্তিও প্রতিহত করার কেউ নেই। এমন ফিতনার হাদীসগুলো সম্পর্কে মৃতদের শ্রবণ করাকে চাপিয়ে দেয়া হয়। আর তা হলো তাদেরকে জীবিত করার মাধ্যমে তাদের অংশসমূহের প্রতি ওয়াহী করার মাধ্যমে, ওয়াহী সম্পর্কে তারা অনুভব করে এবং ঐ সময়ে শুনতে পায় যে সময়কে আল্লাহ উদ্দেশ্য করেন।
মাযিরী বলেনঃ এটাই পছন্দনীয়। ইবনুল হুমাম হিদায়ার শারহতে বলেনঃ জেনে রাখা উচিত যে, হানাফী মাশায়েখদের অধিকাংশ ঐ মতের উপর আছে যে, ঈমান পর্বে তারা যা স্পষ্ট করেছে সে আলোকে মৃত ব্যক্তি শুনতে পায় না। যদি কোনো ব্যক্তি শপথ করে তার সাথে কথা বলবে না। অতঃপর সে মারা যাওয়ার পর তার সাথে কথা বললে শপথ ভঙ্গ হবে না, কেননা শপথ সংঘটিত হয় যে ব্যক্তি কথা বুঝে তার উত্তর প্রদান অনুসারে অথচ মৃত ব্যক্তির অবস্থা এরূপ নয়।
আমি (মিরকাতুল মাফাতীহ প্রণেতা) বলবঃ এটা তাদের তরফ থেকে ঐ কথার উপর নির্ভরশীল যে, ঈমানের নির্ভরতা জনসাধারণ যা বুঝে তার উপর। সুতরাং এ থেকে বাস্তব শ্রবণ না করা আবশ্যক হয়ে পড়ছে না। যেমন তারা ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে বলেছে, যে ব্যক্তি শপথ করে যে, গোশ্ত/গোশত খাবে না। অতঃপর সে মাছ খেল যদিও আল্লাহ মাছকে টাটকা গোশত বলে নামকরণ করেছেন। তিনি বলেন, তারা কখনো এ হাদীস সম্পর্কে উত্তর প্রদান করেছে যে, এ হাদীসটি ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে প্রত্যাখ্যাত। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেন, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি করে এ কথা বলবেন। অথচ আল্লাহ তা‘আলা বলেন,(وَمَا أَنْتَ بِمُسْمِعٍ مَنْ فِي الْقُبُورِ) অর্থাৎ- ‘‘তুমি কবরস্থদেরকে শুনাতে পারবে না’’- (সূরা আল ফা-ত্বির ৩৫ : ২২)। (إِنَّكَ لَا تُسْمِعُ الْمَوْتٰى) ‘‘নিঃসন্দেহে তুমি মৃতকেও শুনাতে পারবে না।’’ (সূরা আন্ নামল ২৭ : ৮০)
আমি (মিরকাতুল মাফাতীহ প্রণেতা) বলবঃ হাদীসটি মুত্তাফাক ‘আলাইহ্। এ হাদীসটি প্রত্যাখ্যান করা ঠিক হবে না। বিশেষ করে এর মাঝে ও কুরআনের মাঝে কোনো বৈপরীত্য নেই। কেননা ‘মৃত’ বলতে কাফিররা উদ্দেশ্য আর ‘‘শুনাতে পারবে না’’ কথাটি উপকৃত না হওয়া উদ্দেশ্যর উপর প্রতিষ্ঠিত সাধারণ শ্রবণের উপর নয়, যেমন মহান আল্লাহর বাণী- ‘‘তারা বধির, বোবা, অন্ধ; সুতরাং তারা বুঝবে না’’- (সূরা আল বাকারা ২ : ১৮) অথবা শ্রবণের পর ধারাবাহিক উত্তর না পাওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত। ‘‘তুমি মৃতদেরকে শুনাতে পারবে না’’- (সূরা আন্ নামল, ২৭ : ৮০)। মহান আল্লাহর এ বাণীর ক্ষেত্রে বায়যাভী (রহঃ) বলেন, যখন তাদেরকে সত্য থেকে বাধা দেয়া হয়েছে তখন তাদের উপমা হলো তাদের চেতনা। ‘‘নিশ্চয় আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে শোনান’’- (সূরা আল ফা-ত্বির ৩৫ : ২২)। অর্থাৎ- তার হিদায়াত শোনান, অতঃপর তাকে তাঁর আয়াত বুঝার জন্য, তাঁর উপদেশ কর্তৃক উপদেশ গ্রহণের তাওফীক দেন। ‘‘আর আপনি কবরস্থদেরকে শুনাতে পারবেন না’’- (সূরা আল ফা-ত্বির ৩৫ : ২২)। আয়াতটি ‘‘নিঃসন্দেহে আপনি যাকে ভালোবাসেন তাকে পথপ্রদর্শন করতে পারবেন না, তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে পথপ্রদর্শন করতে পারেন’’- (সূরা আল কাসাস ২৮ : ৫৬) এ আয়াতের শ্রেণীভুক্ত। অতঃপর তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বক্তব্যটি একটি মু‘জিযাহ্ ও কাফিরদের ওপর পরিতাপ বৃদ্ধিকরণ স্বরূপ। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
(بِأَرْبَعَةٍ وَعِشْرِينَ رَجُلًا مِنْ صَنَادِيدَ) صَنَادِيدَ শব্দটি এর বহুবচন, এর অর্থ- বীর নেতা। সা‘ঈদ বিন বাশীর থেকে ইবনু ‘আয়িযে এসেছে, তিদিন কাতাদাহ থেকে বর্ণনা করেন, (بِبِضْعَةٍ وَعِشْرِينَ) এ বর্ণনা (أربعة وعشرين) বর্ণনার বিপরীত নয়। কেননা الْبِضْعَ শব্দকে চারের উপরেও প্রয়োগ করা হয়। বারা-এর হাদীসে আছে যে, বদর যুদ্ধে নিহত কাফিরদের সংখ্যা সত্তরজন ছিল। কালীবে বা কূপে যাদেরকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল তারা ছিল তাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ, অতঃপর কুরায়শদের কিছু। আর অবশিষ্ট নিহতদেরকে অন্যান্য কূপে নিক্ষেপ করলেন। ওয়াকিদী বর্ণনা করেন, উল্লেখিত কূপ এক কাফির ব্যক্তি খনন করেছিল। সুতরাং রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সকল কাফিরকে ঐ কূপে নিক্ষেপ করাই উপযুক্ত মনে করেছেন। (ফাতহুল বারী ৭ম খন্ড, হাঃ ৩৯৭৬; শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ২৮৭৫)
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধবন্দীদের বিধিমালা
৩৯৬৮-[৯] মারওয়ান (ইবনু হাকাম) ও মিসওয়ার ইবনু মাখরামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। হাওয়াযিন গোত্রের লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করার পর যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট তাদের প্রতিনিধি দল এসে সম্পদ এবং বন্দীদের ফেরত চাইল, তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, বন্দী অথবা ধন-সম্পদণ্ড এ দু’টির যে কোনো একটি গ্রহণ করতে পার। এমতাবস্থায় তারা বলল, আমরা আমাদের বন্দীদেরকে ফিরে পেতে চাই। এতদশ্রবণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণের উদ্দেশে দাঁড়িয়ে প্রথমে আল্লাহ তা’আলার হামদ ও যথাযথ প্রশংসা করে বললেন, শোন! তোমাদের যে সমস্ত ভাইয়েরা (হাওয়াযিনবাসীরা) কুফরী হতে প্রত্যাবর্তন করে তাওবার মাধ্যমে আমাদের নিকট এসেছে, আর আমি তাদের বন্দীদেরকে ফেরত দেয়া উত্তম মনে করি। অতএব, তোমাদের মধ্যে যারা স্বেচ্ছায় সন্তুষ্টিচিত্তে তাদের বন্দীদেরকে ফেরত দিতে চায়, তারা যেন ফেরত দিয়ে দেয়।
আর তোমাদের মধ্যে যারা স্বীয় অংশ সংরক্ষণ করতে চায় (স্বেচ্ছায় ফেরত দিতে সম্মত নয়) তারা যেন এ অঙ্গীকারের উপর ফেরত দেয় যে, পরবর্তীতে আল্লাহ তা’আলা আমাকে যে ’ফাই’ (যুদ্ধলব্ধ মাল) সর্বপ্রথম দান করবেন, তা হতে আমি তাদেরকে তা পরিশোধ করব। এ কথা শুনে উপস্থিত জনতা সমস্বরে বলে উঠল, হে আল্লাহর রসূল! আমরা স্বেচ্ছায় সন্তুষ্টচিত্তে (শর্তহীনভাবে) তাদেরকে মুক্তি দিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ বিরাট জনসমুদ্রের মধ্যে তোমাদের কে অনুমতি দিল আর কে দিল না, তা আমি সঠিকভাবে জানতে পারছি না। অতএব তোমরা স্বীয় অবস্থানে ফিরে যাও এবং তোমাদের দলের নেতারা এসে যেন তোমাদের মতামত আমার নিকট পৌঁছে দেয়। অতঃপর এ নির্দেশে সকলে নিজ নিজ অবস্থানে ফিরে গেল এবং স্বীয় দলপতির সাথে আলোচনাসাপেক্ষে নিজেদের মতামত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে জানাল যে, তারা স্বেচ্ছায় সন্তুষ্টচিত্তে (নিঃশর্তভাবে) মুক্তি দিতে অনুমতি দিয়েছে। (বুখারী)[1]
بَابُ حُكْمِ الْاُسَرَاءِ
وَعَنْ مَرْوَانَ وَالْمِسْوَرِ بْنِ مَخْرَمَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَامَ حِينَ جَاءَهُ وَفد من هَوَازِنَ مُسْلِمِينَ فَسَأَلُوهُ أَنْ يَرُدَّ إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ وَسَبْيَهُمْ فَقَالَ: فَاخْتَارُوا إِحْدَى الطَّائِفَتَيْنِ: إِمَّا السَّبْيَ وَإِمَّا الْمَالَ . قَالُوا: فَإِنَّا نَخْتَارُ سَبْيَنَا. فَقَامَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَثْنَى عَلَى اللَّهِ بِمَا هُوَ أَهْلُهُ ثُمَّ قَالَ: «أمَّا بعدُ فإِنَّ إِخْوانَكم قدْ جاؤوا تَائِبِينَ وَإِنِّي قَدْ رَأَيْتُ أَنْ أَرُدَّ إِلَيْهِمْ سَبْيَهُمْ فَمَنْ أَحَبَّ مِنْكُمْ أَنْ يُطَيِّبَ ذَلِكَ فَلْيَفْعَلْ وَمَنْ أَحَبَّ مِنْكُمْ أَنْ يَكُونَ عَلَى حظِّه حَتَّى نُعطِيَه إِيَّاهُ منْ أوَّلِ مَا يَفِيءُ اللَّهُ عَلَيْنَا فَلْيَفْعَلْ» فَقَالَ النَّاسُ: قَدْ طَيَّبْنَا ذَلِكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّا لَا نَدْرِي مَنْ أَذِنَ مِنْكُمْ مِمَّنْ لَمْ يَأْذَنْ فَارْجِعُوا حَتَّى يَرْفَعَ إِلَيْنَا عُرَفَاؤُكُمْ أَمْرَكُمْ» . فَرَجَعَ النَّاسُ فَكَلَّمَهُمْ عُرَفَاؤُهُمْ ثُمَّ رَجَعُوا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَخْبَرُوهُ أَنَّهُمْ قد طيَّبوا وأَذنوا. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: মুযহির বলেনঃ আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বন্দীদেরকে প্রতিনিধি দলের হাতে ফেরত দেয়ার ক্ষেত্রে সাহাবীদের কাছে অনুমতি চেয়েছেন, কেননা তাদের সম্পদ ও বন্দী যোদ্ধাদের মালিকানায় পরিণত হয়েছে, আর তারা যার মালিক হয়েছে তা তাদের অনুমতি ছাড়া দেয়া বৈধ হবে না। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
ইবনু বাত্ত্বল বলেনঃ প্রতিনিধি ছিল হাওয়াযিন গোত্রের দূত। তারা তাদের বন্দীদের ফেরত নেয়ার ক্ষেত্রে প্রতিনিধি দলকে মধ্যস্থাতাকারী বানিয়ে ছিল, আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবী এবং প্রতিনিধি দলের মাঝে মধ্যস্থতাকারী।
খত্ত্বাবী বলেনঃ অত্র হাদীসে প্রতিনিধি নিয়োগকারীর পক্ষে প্রতিনিধির স্বীকারোক্তি গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ আছে। কেননা অত্র হাদীসে নেতাগণ প্রতিনিধিদের স্তরে। আবূ ইউসুফও এ মত পোষণ করেছেন; আবূ হানীফাহ্ এবং মুহাম্মাদ একে শাসকের সাথে শর্তারোপ করেছেন। মালিক, শাফি‘ঈ এবং ইবনু আবূ লায়লা বলেনঃ প্রতিনিধি নিয়োগদাতার পক্ষে প্রতিনিধির স্বীকারোক্তি বিশুদ্ধ হবে না। হাদীসে বৈধতার কোনো প্রমাণ নেই, কেননা হাদীসে বর্ণিত নেতাগণ প্রতিনিধি নন, বরং তারা আমীরদের মতো। [আল্লাহ সর্বজ্ঞাত]
অত্র হাদীসে ‘‘পরিশেষে আল্লাহ সর্বপ্রথম আমাদেরকে যা দান করবেন তা থেকে তা পরিশোধ করব।’’ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ উক্তির কারণে অনির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ধার নেয়ার ব্যাপারে দলীল গ্রহণ করা হয়েছে।
তবে এ মাসআলাতে প্রসিদ্ধ মতানৈক্য আছে। (ফাতহুল বারী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ২৩০৭)
সারাংশ হলো- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিজের মালিকানাতে যা বরাদ্ধ ছিল তা ফেরত দেয়ার মাধ্যমে তিনি তাদের আবেদনে সাড়া দিলেন। আর «أَحَبَّ الكلام أصدقه» বলতে সত্য কথা, সত্য প্রতিশ্রুতি সর্বাধিক প্রিয়। সুতরাং যা তিনি মানুষকে বলেন তা সত্য এবং তিনি যা মানুষকে প্রতিশ্রুতি দেন তা পূর্ণ করা তার ওপর আবশ্যক। দাস মুক্তি পর্বে বুখারীর শব্দ- অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন,إن معى من ترون وأحب الحديث إلى أصدقه، فاختاروا إحدى الطائفتين إما المال وإما السبى وقد كنت إستأنيت بهم অর্থাৎ- ‘‘নিঃসন্দেহে আমার সাথে ঐ সকল বন্দীই আছে যাদেরকে তোমরা দেখছ, আমার কাছে সর্বাধিক প্রিয় কথা হলো সত্য কথা। অতঃপর তোমরা দু’টি অংশের একটি নির্বাচন কর, হয় সম্পদ না হয় বন্দী। আর তাদের ব্যাপারে আমি বিলম্ব করেছি।’’ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ত্বায়িফ থেকে এসেছেন তখন দশ রাত্রির অধিক তাদের জন্য অপেক্ষা করেছেন..... আল হাদীস।
আর তাঁর «إستأنيت بهم» এ উক্তির অর্থ- আমি বন্দীর বণ্টনের বিষয় পিছিয়ে দিয়েছি যাতে হাওয়াযিন প্রতিনিধি উপস্থিত হয়। কিন্তু তারা উপস্থিত হতে বিলম্ব করল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বন্দীদেরকে বণ্টন করা বাদ রেখে ত্বায়িফের অভিমুখী হয়ে ত্বায়িফ নগরীকে ঘেরাও করলেন। অতঃপর সেখান থেকে জিয়িরানাহ্-এর দিকে ফিরে আসলেন, অতঃপর সেখানে গনীমাতসমূহ বণ্টন করলেন। আর তাঁর কাছে হাওয়াযিন প্রতিনিধি আসলো, পরে তিনি তাদের নিকটে বর্ণনা করলেন তিনি তাদের জন্য দশ রাত্রির অধিক অপেক্ষা করেছেন, এভাবে গায়াতুল মাকসূদে সংক্ষিপ্তভাবে আছে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬৯০)
পরিচ্ছেদঃ ৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - যুদ্ধবন্দীদের বিধিমালা
৩৯৬৯-[১০] ’ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বানী সাক্বীফ ছিল বানী ’উকায়ল-এর মিত্র গোত্র। একদিন বানী সাক্বীফ-এর লোকেরা অন্যায়ভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দু’জন সাহাবীকে বন্দী করল। বন্দীর প্রতিশোধ স্বরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণ বানী ’উকায়ল-এর এক ব্যক্তিকে সুযোগ পেয়ে বন্দী করে মদীনার অদূরে ’হাররাহ্’ নামক মরু প্রান্তরে ফেলে রাখলেন। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার সম্মুখ দিয়ে যাচ্ছিলেন, এমতাবস্থায় সে চিৎকার দিয়ে বলল, হে মুহাম্মাদ! হে মুহাম্মাদ! কি অপরাধে আমাকে বন্দী করা হয়েছে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমার মিত্র গোত্র সাক্বীফ গোত্রের অপরাধে।
এটা বলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সম্মুখে অগ্রসর হলেন। লোকটি আবারও হে মুহাম্মাদ! হে মুহাম্মাদ! বলে তাকে আহবান করতে লাগল। এতে তাঁর মনে দয়ার উদ্রেক হলো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিরে এসে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি হয়েছে? লোকটি বলল, আমি মুসলিম হয়েছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এ স্বীকারোক্তি তুমি যদি তোমার স্বাধীনতা ও কর্তৃত্ব থাকাকালীন সময়ে বলতে, তবে তুমি পূর্ণরূপে সাফল্য লাভ করতে। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ঐ দু’জন মুসলিম বন্দীর বিনিময়ে ছেড়ে দিলেন, যাদেরকে বানী সাক্বীফ বন্দী করে রেখেছিল। (মুসলিম)[1]
بَابُ حُكْمِ الْاُسَرَاءِ
وَعَن عمرَان بن حُصَيْن قَالَ: كَانَت ثَقِيفٌ حَلِيفًا لِبَنِي عُقَيْلٍ فَأَسَرَتْ ثَقِيفٌ رَجُلَيْنِ مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَسَرَ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَجُلًا مِنْ بَنِي عُقَيْلٍ فَأَوْثَقُوهُ فَطَرَحُوهُ فِي الْحَرَّةِ فَمَرَّ بِهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَنَادَاهُ: يَا مُحَمَّدُ يَا مُحَمَّدُ فِيمَ أُخِذْتُ؟ قَالَ: «بِجَرِيرَةِ حُلَفَائِكُمْ ثَقِيفٍ» فَتَرَكَهُ وَمَضَى فَنَادَاهُ: يَا مُحَمَّدُ يَا مُحَمَّدُ فَرَحِمَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم فرجعَ فَقَالَ: «مَا شَأْنُكَ؟» قَالَ: إِنِّي مُسْلِمٌ. فَقَالَ: «لَوْ قُلْتَهَا وَأَنْتَ تَمْلِكُ أَمْرَكَ أَفْلَحْتَ كُلَّ الْفَلَاحِ» . قَالَ: فَفَدَاهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بالرجلينِ اللَّذينِ أسرَتْهُما ثقيفٌ. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: (فَأَسَرَتْ ثَقِيفٌ رَجُلَيْنِ مِنْ أَصْحَابِ رَسُوْلِ اللّٰهِ ﷺ) অন্য নুসখাতে আছে, ‘‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত দু’জন লোক’’ এর পরিবর্তে আল্লাহর রসূলের সাহাবীগণ ‘আক্বীল বংশের একজন লোককে আটক করল। তাদের নিয়ম ছিল মিত্রের অপরাধের কারণে মিত্রের কাউকে পাকড়াও করা। সুতরাং তাদের নিয়ম অনুযায়ী তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ কাজ করলেন। ইবনুল মালিক একে উল্লেখ করেছেন।
(قَالَ : بِجَرِيرَةِ حُلَفَائِكُمْ ثَقِيْفٍ) তোমাদের মিত্র সাক্বীফ গোত্রের অপরাধের কারণে। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাক্বীফ গোত্রের মাঝে পারস্পরিক সন্ধি চুক্তি ছিল। অতঃপর সাক্বীফ গোত্র যখন তাদের সন্ধি ভঙ্গ করল এবং বানূ ‘আক্বীল তা অসমীচীন মনে করল না। অথচ বানূ ‘আক্বীল সাক্বীফ গোত্রের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ ছিল, চুক্তিভঙ্গের ক্ষেত্রে তারা সাক্বীফ গোত্রের মতো সাব্যস্ত হলো। সুতরাং সাহাবীগণ ‘আক্বীল গোত্রের লোকটিকে সাক্বীফ গোত্রের অপরাধের কারণে পাকড়াও করল।
একমতে বলা হয়েছে, এর অর্থ হলো- তোমাকে পাকড়াও করা হয়েছে যাতে তোমার মাধ্যমে আমরা তোমার মিত্র সাক্বীফ গোত্রের অপরাধ প্রতিহত করতে পারি। এর উপর প্রমাণ বহন করছে যে, পরবর্তীতে সাক্বীফ গোত্রের আটক করা ঐ দু’ মুসলিম ব্যক্তির মুক্তিপণ হিসেবে বানূ ‘আক্বীল গোত্রের লোকটিকে উপস্থাপন করা হয়েছিল।
(أَفْلَحْتَ كُلَّ الْفَلَاحِ) অর্থাৎ- দুনিয়াতে দাসত্ব হতে মুক্তির মাধ্যমে, পরকালে জাহান্নাম থেকে মুক্তির মাধ্যমে তুমি সফল হতে।
ইবনুল মালিক বলেনঃ এতে ঐ ব্যাপারে প্রমাণ আছে যে, কাফির ব্যক্তি যখন বন্দীত্বে পতিত হয়, অতঃপর দাবী করে যে, সে ইতিপূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছে তাহলে প্রমাণ ছাড়া তার ঐ কথা গ্রহণ করা হবে না। আর যদি বন্দী হওয়ার পর ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে তাকে হত্যা করা হারাম এবং তাকে দাস বানানো বৈধ। আর যদি বন্দী হওয়ার পর জিয্ইয়াহ্ দিতে সম্মত হয় তাহলেও তাকে হত্যা করা হারাম হওয়ার ক্ষেত্রে মতানৈক্য আছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
(لَوْ قُلْتَهَا وَأَنْتَ تَمْلِكُ أَمْرَكَ أَفْلَحْتَ كُلَّ الْفَلَاحِ) এর অর্থ হলো- বন্দী হওয়ার পূর্বে তুমি যখন তোমার বিষয়ের মালিক ছিলে তখন যদি তোমার ইসলাম গ্রহণের কথা বলতে তাহলে পূর্ণরূপে সফলকাম হতে। কেননা তুমি যদি বন্দী হওয়ার পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করতে তাহলে তোমাকে বন্দী করা বৈধ হতো না, কেননা তুমি মুসলিম হওয়ার কারণে বন্দী হওয়া থেকে নিরাপদ থাকা ও মালিক হওয়ার সুযোগ গ্রহণের মাধ্যমে সফলকাম হতে। পক্ষান্তরে যখন বন্দী হওয়ার পর ইসলাম গ্রহণের কথা বললে তখন তোমাকে হত্যা করার সুযোগ রহিত হয়ে যাবে। আর দাস বানানো, অনুগ্রহ করা ও মুক্তিপণ দেয়ার ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাধীনতা স্থায়ী থাকবে।
অত্র হাদীসে মুক্তিপণ দেয়ার বৈধতা রয়েছে, আর বন্দী ব্যক্তির ইসলাম গ্রহণ বন্দী থেকে যোদ্ধাদের অধিকার রহিত করবে না, বন্দী হওয়ার পূর্বে যদি ইসলাম গ্রহণ করে তার হুকুমের বিপরীত। (শারহে মুসলিম ১১শ খন্ড, হাঃ ১৬৪১)
অত্র হাদীসের সাথে সামঞ্জস্যশীল আবূ দাঊদ-এর «قال : نأخذك بجريرة خلفائك» এ হাদীসাংশের ব্যাখ্যায় ‘আওনুল মা‘বূদে যা এসেছে তা হলো- ইমাম খত্ত্বাবী বলেনঃ বিদ্বানগণ এর বিশ্লেষণে মতানৈক্য করেছেন। অতঃপর তাদের কতকে বলেছেন, এটা ঐ কথার উপর প্রমাণ বহন করছে যে, তারা বানূ ‘আক্বীলের সাথে ঐ কথার উপর চুক্তিবদ্ধ হয়েছে যে, তারা মুসলিমদের এবং তাদের কোনো মিত্রের মুকাবেলা করবে না। অতঃপর তাদের মিত্ররা চুক্তি ভঙ্গ করেছে। এমতাবস্থায় বানূ ‘আকীল তার অসম্মতি জানায়নি, ফলে বানূ সাক্বীফের অপরাধের কারণে বানূ ‘আক্বীলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যরা বলেন, এটা কাফির ব্যক্তি তার কোনো অঙ্গীকার নেই, তাকে গ্রেপ্তার করা, বন্দী করা এবং হত্যা করা সবই বৈধ। (‘আওনুল মা‘বূদ ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৩০৬)
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধবন্দীদের বিধিমালা
৩৯৭০-[১১] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কার কাফিরগণ যখন বদরে তাদের বন্দীদের মুক্তির জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট মুক্তিপণ পাঠাল, তখন (রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কন্যা) যায়নাব (রাঃ) তার স্বামী আবুল ’আস-এর মুক্তির জন্যও কিছু মাল পাঠালেন। তন্মধ্যে একটি হার ছিল যার মালিক ছিলেন খাদীজাহ্ (রাঃ)। আবুল ’আস-এর সাথে যায়নাব-এর বিয়ের সময় বিবি খাদীজাহ্ উপহার স্বরূপ হারটি যায়নাব (রাঃ)-কে দিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হারটি দেখে (বিবি খাদীজার স্মৃতিচারণে) অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন এবং সাহাবীগণকে বললেন, যদি তোমরা সমীচীন মনে কর তাহলে যায়নাবের কয়েদি (আবুল ’আস)-কে ছেড়ে দাও এবং যায়নাব যে সমস্ত ধন-সম্পদ পাঠিয়েছে তাও তাকে ফেরত দিয়ে দাও। এতে সাহাবীগণ সম্মতি প্রকাশ করলে, আবুল ’আস মুক্ত হয়ে গেল।
অবশ্য তাকে মুক্তি দেয়ার সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিকট হতে এ অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে, যায়নাবকে মদীনায় তাঁর নিকট আসার পথে যেন বাধা সৃষ্টি না করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়দ ইবনু হারিসাহ্ ও একজন আনসারীকে মক্কায় পাঠালেন এবং তাদেরকে বলে দিলেন, তোমরা মক্কার অনতিদূরে (প্রায় আট কিলোমিটার দূরে তান্’ঈম-এর নিকটবর্তী) ’’ইয়া’জাজ’’ নামক স্থানে অবস্থান করবে। যায়নাব সে পর্যন্ত এসে পৌঁছলে তোমরা উভয়ে তার সঙ্গী হবে এবং তাকে মদীনায় নিয়ে আসবে। (আহমাদ, আবূ দাঊদ)[1]
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: لَمَّا بَعَثَ أَهْلُ مَكَّةَ فِي فِدَاءِ أُسَرَائِهِمْ بَعَثَتْ زَيْنَبُ فِي فِدَاءِ أَبِي الْعَاصِ بِمَالٍ وَبَعَثَتْ فِيهِ بِقِلَادَةٍ لَهَا كَانَتْ عِنْدَ خَدِيجَةَ أَدْخَلَتْهَا بِهَا عَلَى أَبِي الْعَاصِ فَلَمَّا رَآهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَقَّ لَهَا رِقَّةً شَدِيدَةً وَقَالَ: «إِنْ رَأَيْتُمْ أَنْ تُطْلِقُوا لَهَا أَسِيرَهَا وَتَرُدُّوا عَلَيْهَا الَّذِي لَهَا» فَقَالُوا: نَعَمْ وَكَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَخَذَ عَلَيْهِ أَنْ يُخَلِّيَ سَبِيلَ زَيْنَبَ إِلَيْهِ وَبَعَثَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ زَيْدَ بْنَ حَارِثَةَ وَرَجُلًا مِنَ الْأَنْصَارِ فَقَالَ: «كونا ببطنِ يأحج حَتَّى تَمُرَّ بِكُمَا زَيْنَبُ فَتَصْحَبَاهَا حَتَّى تَأْتِيَا بهَا» . رَوَاهُ أَحْمد وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (لَمَّا بَعَثَ أَهْلُ مَكَّةَ فِىْ فِدَاءِ أُسَرَائِهِمْ) অর্থাৎ- বদরের দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাদের ওপর বিজয় লাভ করলেন, অতঃপর তাদের কতককে হত্যা করলেন এবং কতককে বন্দী করলেন, আর তাদের থেকে মুক্তিপণ দাবী করলেন।
(رَقَّ لَهَا رِقَّةً شَدِيْدَةً) অর্থাৎ- যায়নাব-এর দূরত্ব ও একাকীত্বের কারণে তার প্রতি সদয় হলেন। খাদীজার যুগ ও তার সঙ্গীর কথা স্মরণ করলেন, কেননা হারটি খাদীজার গলায় ছিল।
(وَكَانَ النَّبِىُّ ﷺ أَخَذَ عَلَيْهِ أَنْ يُخَلِّىَ سَبِيلَ زَيْنَبَ إِلَيْهِ) অর্থাৎ- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবুল ‘আস-এর কাছ থেকে যায়নাব-কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পাঠাতে এবং মদীনাতে হিজরত করার ব্যাপারে তাকে অনুমতি দিতে অঙ্গীকার গ্রহণ করলেন। কাযী বলেনঃ যায়নাব ছিল আবুল ‘আস-এর অধীনে, নবূওয়াতের পূর্বে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়নাব-কে আবুল ‘আস-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন।
(بِبَطْنِ يَأْجَجَ) তান্‘ঈম-এর কাছাকাছি একটি স্থান। একমতে বলা হয়েছে, মসজিদে ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর সামনে একটি স্থান। কাযী বলেনঃ হারাম অঞ্চলের আশ-পাশের উপত্যকাসমূহের অন্তর্ভুক্ত একটি উপত্যকা। আর উপত্যকা বলতে জমিনের নীচ স্থান। সীবাওয়াইহি বলেনঃ এটি মক্কার একটি স্থান।
(فَتَصْحَبَاهَا حَتّٰى تَأْتِيَا بهَا) অর্থাৎ- তাকে মদীনাতে সঙ্গে করে নিয়ে আসবে। আশরাফ বলেনঃ অত্র হাদীসে প্রমাণ আছে- কোনো মুক্তিপণ গ্রহণ ছাড়াই বন্দীর প্রতি দয়া করা বৈধ। আর ঐ ব্যাপারে প্রমাণ আছে যে, ফিতনার আশঙ্কা না থাকলে গায়র মাহরাম মহিলার সাথে পথে দুই বা ততোধিক পুরুষ প্রেরণ করার অধিকার ইমামে আ‘যামের আছে। কারী বলেনঃ আমি বলব, মহিলার সাথে মাহরাম পুরুষ থাকা অথবা নির্ভরযোগ্য মহিলা থাকা বৈধ হওয়ার কারণে দলীল গ্রহণের বিষয়টি বিতর্কিত। আর এটা মাহরাম ছাড়া সফর করা নিষিদ্ধ হওয়ার পূর্বের ঘটনা।
ইসাবাহ্ গ্রন্থে আছে, আবুল ‘আস হলো- রবী‘ বিন ‘আবদুল ‘উয্যা বিন ‘আব্দ শামস্ বিন ‘আব্দ মানাফ। তার মা হালাহ্ বিনতু খুওয়াইলিদ। আল্লাহর রসূলের কন্যা যায়নাব ছিল আবুল ‘আস বিন রবী‘-এর অধীনে। অতঃপর তিনি হিজরত করলেন আর আবুল ‘আস তার দীনের উপর থেকে গেল। ঐকমত্য পোষণ করা হয়েছে যে, আবুল ‘আস ব্যবসার উদ্দেশে শামের দিকে বের হলো, অতঃপর যখন সে মদীনার নিকটবর্তী হলো তখন কতিপয় মুসলিম তার দিকে বেরিয়ে যেতে, অতঃপর তার সাথে যা আছে তা গ্রহণ করতে এবং তাকে হত্যা করতে ইচ্ছা করল। অতঃপর এ সংবাদ যায়নাব-এর কাছে পৌঁছলে যায়নাব বলল, হে আল্লাহর রসূল! মুসলিম অঙ্গীকার কি এক অঙ্গীকার নয়? আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ। তখন যায়নাব বললেন, আমি সাক্ষ্য দিলাম যে, আমি আবুল ‘আসকে আশ্রয় দিয়েছি। অতঃপর আল্লাহর রসূলের সাহাবীগণ তার কাছে গিয়ে তাকে বলল, হে আবুল ‘আস! তুমি কুরায়শ বংশের সম্মানিত স্থানে অবস্থান করছ, তুমি আল্লাহর রসূলের চাচাতো ভাই এখন তোমার কি ইসলাম গ্রহণের চিন্তা-ভাবনা আছে? ইসলাম গ্রহণ করলে তুমি মক্কাবাসীদের সম্পদ থেকে তোমার সাথে যা আছে তুমি তা গনীমাত হিসেবে লাভ করবে। আবুল ‘আস বলল, তোমরা যে ব্যাপারে আমাকে আদেশ করছ তা কতই না নিকৃষ্ট, তুচ্ছ বস্তুর কারণে আমার দীনকে বর্জন করতে, এ বলে আবুল ‘আস চলতে থাকল। পরিশেষে মক্কাতে আগমন করে প্রত্যেক অধিকারীর কাছে তার অধিকার পৌঁছিয়ে দিল। অতঃপর দাঁড়িয়ে বলল, হে মক্কাবাসী! আমি কি আমার দায়িত্ব পূর্ণ করেছি। তারা বলল, হে আল্লাহর রসূল! হ্যাঁ। তখন আবুল ‘আস বলল, নিঃসন্দেহে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া ‘ইবাদাত পাওয়ার যোগ্য কেউ নেই, আর মুহাম্মাদ আল্লাহর রসূল! অতঃপর তিনি হিজরত করে মদীনায় আগমন করলে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম বিবাহ অনুযায়ী যায়নাব-কে তার কাছে ফিরিয়ে দিলেন (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধবন্দীদের বিধিমালা
৩৯৭১-[১২] উক্ত রাবী [’আয়িশাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদর যুদ্ধে যখন কুরায়শদেরকে বন্দী করলেন, তখন ’উকবা ইবনু আবূ মু’আয়ত্ব ও নযর ইবনু হারিস-কে হত্যা করেন। আর আবূ ’আয্যাতুল জুমাহী-কে মুক্তিপণ ব্যতীত এমনিই ছেড়ে দেন। (শারহুস্ সুন্নাহ্, শাফি’ঈ, ইবনু ইসহক-এর ’সীরাত’ গ্রন্থে)[1]
وَعَنْهَا: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمَّا أَسَرَ أَهْلَ بَدْرٍ قَتَلَ عُقْبَةَ بْنَ أَبِي مُعَيْطٍ وَالنَّضْرَ بْنَ الْحَارِثِ وَمَنَّ عَلَى أَبِي عَزَّةَ الْجُمَحِيِّ. رَوَاهُ فِي شَرْحِ السّنة وَالشَّافِعِيّ وَابْن إِسْحَاق فِي «السِّيرَة»
ব্যাখ্যা: (قَتَلَ عُقْبَةَ بْنَ أَبِىْ مُعَيْطٍ وَالنَّضْرَ بْنَ الْحَارِثِ) হিদায়াতে আছে- বন্দীদের ক্ষেত্রে ইমামের ইখতিয়ার আছে- চাইলে তাদেরকে হত্যা করবে। ইবনুল হুমাম বলেনঃ যখন তারা ইসলাম গ্রহণ করবে না, যেহেতু তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বন্দী হত্যা করেছেন, তাই ‘উকবা বিন আবূ মু‘আয়ত এবং অন্যান্যকে তাঁর হত্যাকরণে কোনো সন্দেহ নেই। কেননা তাদের হত্যাকরণের মাধ্যমে তাদের থেকে সংঘটিত বিশৃঙ্খলার মূলোৎপাটিত হয়েছে। আর যদি চান তাহলে তাদেরকে দাস বানাবেন। কেননা এতে মুসলিমদের কল্যাণ বৃদ্ধির সাথে সাথে তাদের অকল্যাণ প্রতিহতকরণ রয়েছে।
এজন্যই আমরা বলেছি, কোনো যোদ্ধার জন্য কোনো বন্দীকে নিজে নিজে হত্যা করার অধিকার নেই। কেননা এ ক্ষেত্রে সিন্ধান্ত গ্রহণ করার অধিকার ইমামের। তিনি যদি চান তাহলে তাদেরকে মুসলিমদের নিরাপত্তা স্বরূপ স্বাধীন অবস্থায় ছেড়ে দিবে। ‘উমার বড় দলের ক্ষেত্রে এটা করেছেন, তবে ‘আরবের মুশরিক এবং মুরতাদ যখন বন্দী হয় তখন তাদের বিষয় আলাদা। কেননা তাদের থেকে কোনো ট্যাক্স গ্রহণ করা হবে না এবং তাদেরকে দাস বানানো বৈধ হবে না। বরং হয় ইসলাম গ্রহণ, নতুবা তরবারি। অতঃপর বন্দীরা যদি বন্দীত্বের পর ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে আমরা তাদেরকে হত্যা করব না। তবে তাদেরকে দাস বানানো বৈধ। তবে যদি গ্রেপ্তারের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করে থাকে তবে ভিন্ন কথা, তখন তাদেরকে দাস বানানো যাবে না, তারা স্বাধীনে পরিণত হবে। কেননা এটা তাদের মাঝে মালিকত্বের কারণ সংঘটিত হওয়ার পূর্বে ইসলাম গ্রহণ।
(وَمَنَّ عَلٰى اَبِىْ عَزَّةَ الْجُمَحِىىِّ) অর্থাৎ- মুক্তিদানের মাধ্যমে আবূ আয্যা আল জুমাহী-কে অনুগ্রহ করলেন। মিরকাতে বিগত হয়েছে, এ হুকুম রহিত। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধবন্দীদের বিধিমালা
৩৯৭২-[১৩] ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ’উকবা ইবনু আবূ মু’আয়ত্ব-কে হত্যা করার নির্দেশ দিলেন তখন সে বলে উঠল, (আমাকে হত্যা করা হলে) আমার ছোট ছোট সন্তান-সন্ততিদের কি উপায় হবে? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আগুন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمَّا أَرَادَ قَتْلَ عُقْبَةَ بْنَ أَبِي مُعَيْطٍ قَالَ: مَنْ لِلصِّبْيَةِ؟ قَالَ: «النَّار» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (مَنْ لِلصِّبْيَةِ؟) অর্থাৎ- ‘‘আমার বাচ্চাদের দায়িত্ব কে নিবে?’’ তাদের লালন-পালন ও ভরণ-পোষণের দায়িত্ব কে নিবে? অথচ তুমি তাদের দায়িত্বশীলকে হত্যা করছ।
قَالَ : النَّارُ দু’টি উদ্দেশের সম্ভাবনা রাখছে। ১. আগুন যদি জমিন হওয়ার উপযোগী হয় তাহলে তাই। ২. বিজ্ঞপদ্বতিতে উত্তর প্রদান, অর্থাৎ- তোমার জন্য আগুন। অর্থাৎ- তুমি তোমার নিজের বিষয়ে গুরুত্ব দাও এবং আগুন থেকে তোমার জন্য যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে সেজন্য গুরুত্ব দাও। সন্তানদের বিষয়ে চিন্তা পরিত্যাগ কর, কেননা তাদের দায়িত্বশীল ঐ আল্লাহ যার ওপর আছে জমিনে বিচরণকারী প্রতিটি প্রাণীর রিযক্বের দায়িত্ব। এটাই এখানে উদ্দেশ্য। একে ত্বীবী বর্ণনা করেছেন। তবে সর্বাধিক প্রকাশমান হলো- প্রথমটিই লক্ষ্য। কেননা এ দ্বিতীয় অর্থটি যদি উদ্দেশ্য করা হত তাহলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অবশ্যই বলতেন, আল্লাহ। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধবন্দীদের বিধিমালা
৩৯৭৩-[১৪] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জিবরীল (আঃ) এসে আমাকে বললেন, আপনার সাহাবীগণকে (বদরের বন্দীদের ব্যাপারে) এ অধিকার দিয়ে দিন, তারা ইচ্ছা করলে বন্দীদেরকে হত্যা করতে পারবে, আর যদি মুক্তিপণ স্বরূপ ধন-সম্পদের বিনিময়ে তাদেরকে ছেড়ে দিতে চায়, তাও পারবে। কিন্তু মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিলে, আগামীতে কাফিরদের সমপরিমাণ (৭০ জন) নিজেদের মধ্য হতে শহীদ হবে। অতঃপর সাহাবীগণ বললেন, মুক্তিপণ আমরা গ্রহণ করলাম এবং আমাদের মধ্য হতে (আগামীতে সমপরিমাণ) শহীদ হবে। (তিরমিযী; তিনি বলেন, হাদীসটি গরীব)[1]
وَعَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَنَّ جِبْرِيلَ هَبَطَ عَلَيْهِ فَقَالَ لَهُ: خَيِّرْهُمْ يَعْنِي أَصْحَابَكَ فِي أُسارى بدر: القتلَ والفداءَ عَلَى أَنْ يُقْتَلَ مِنْهُمْ قَابِلًا مِثْلُهُمْ قَالُوا الْفِدَاءَ وَيُقْتَلَ مِنَّا. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيث غَرِيب
ব্যাখ্যা: (اَلْقَتْلَ وَالْفِدَاء) অর্থাৎ- তোমরা বন্দীদেরকে হত্যাও করতে পার অথবা মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়েও দিতে পার। অর্থাৎ (قَابِلًا) অর্থাৎ- আগত আগামী বছরে আর আগামী বছর বলতে যে বছরে উহুদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। (مِثْلُهُمْ) অর্থাৎ- কাফিরদের থেকে যে সংখ্যা মুক্তি দেয়া হবে, তত সংখ্যায় আগামী যুদ্ধে মুসলিমদের মধ্য হতে শহীদ হবে আর পূর্বে বদর যুদ্ধে কাফিরদের সত্তরজনকে হত্যা এবং সত্তরজনকে বন্দী করা হয়েছিল।
(وَيُقْتَلَ مِنَّا) অর্থাৎ- আগামী বছর আমাদের থেকে তাদের অনুরূপ হত্যা করা হবে। অর্থাৎ- আমাদের পছন্দ হলো- তাদের থেকে মুক্তিপণ গ্রহণ করা, আর আমাদের মধ্য হতে কতক নিহত (শহীদ) হওয়া। অতঃপর মুসলিমরা বদরের দিন কাফিরদের থেকে যতজনকে মুক্তি দিয়েছিল উহুদের দিন মুসলিমদের থেকে সে পরিমাণ হত্যা করা হয়। আর বদরের দিন কাফিরদের সত্তরজনকে হত্যা করা হয় এবং সত্তরজনকে বন্দী করা হয়।
মুসলিম এবং তিরমিযী ‘আবদুল্লাহ বিন ‘আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন, তিনি ‘উমার থেকে বর্ণনা করেন যে, তারা বদরের দিন যখন বন্দীদেরকে বন্দী করল, তখন আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ বাকর ও ‘উমার -কে বললেন, ‘‘তোমরা এ সকল বন্দীদের ব্যাপারে কী অভিমত পেশ কর?’’ তখন আবূ বাকর বললেন, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! এরা চাচাতো ভাই এবং নিকটত্মীয়! আমি তাদের থেকে আপনার কর্তৃক মুক্তিপণ গ্রহণের বিষয়টি ভাবছি, ফলে তা কাফিরদের বিরুদ্ধে আমাদের পক্ষে শক্তি স্বরূপ হবে। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের তাওফীক দিবেন, এ আশা করা যায়। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে খত্ত্বাব-এর ছেলে! আপনি কী ভাবছেন? আমি বললাম, না, আল্লাহর শপথ! হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আবূ বাকর যা ভেবেছে আমি তা ভাবিনি। তবে আপনি আমাদেরকে সুযোগ দিবেন, এ কথা ভাবছি যাতে তাদের গর্দান উড়িয়ে দিতে পারি। কেননা এরা কুফরীর মূল নেতা। অতঃপর আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ বাকর যা বলেছেন তা ইচ্ছা করলেন, আমি যা বলেছি তা ইচ্ছা করেননি। এদের হত্যা করা হলে কুফ্র নির্মূল হবে। যখন পরবর্তী দিন আসলো তখন আমি দেখলাম আবূ বাকর এবং আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসে কাঁদছেন। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমাকে সংবাদ দিন কোন্ জিনিসের কারণে আপনি এবং আপনার সাথী কাঁদছেন? তখন উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আমি ঐ জন্য কাঁদছি যা তোমার সাথীবর্গের সম্মুখীন হয়েছে বন্দীদের থেকে তারা মুক্তিপণ গ্রহণ করার কারণে। তারা ঐ বৃক্ষটি অপেক্ষা অতি নিকটে তাদের শাস্তির সম্মুখীন হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা আয়াতটির শেষ পর্যন্ত অবতীর্ণ করেন।
বায়যাভী বলেনঃ আয়াতটি ঐ ব্যাপারে প্রমাণ বহনকারী যে, নাবীগণ মুজতাহিদ, কখনো তাদের ভুল হয়ে থাকে তবে ভুলের উপর তারা স্থির থাকেন না। আল্লাহ তা‘আলার বাণী, ‘‘আল্লাহর তরফ থেকে যদি কোনো সিদ্ধান্ত গত না হতো’’- (সূরা আল আনফাল ৮ : ৬৮), অর্থাৎ- আল্লাহ তা‘আলার তরফ থেকে যদি লাওহে মাহফূযে কোনো সিদ্ধান্তের প্রমাণ গত না হতো, আর তা হলো ইজতিহাদের ক্ষেত্রে ভুলকারীকে শাস্তি না দেয়া, অথবা বদরের যোদ্ধাদেরকে শাস্তি না দেয়া, অথবা এমন সম্প্রদায়কে যাদের নিকটে এ সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা স্পষ্ট করা হয়নি, অথবা যে মুক্তিপণ তারা গ্রহণ করেছে তা অচিরেই তাদের জন্য হালাল হয়ে যাবে। আয়াতে ব্যবহৃত لَمَسَّكُمْ অর্থ- তোমরা যে মুক্তিপণ গ্রহণ করেছ সে কারণে তোমাদেরকে মহাশাস্তি গ্রাস করত। আয়াত ও হাদীসের মাঝে সমন্বয় সাধনে এ বলাও সম্ভব যে, প্রথমত বন্দীদের থেকে মুক্তিপণ গ্রহণ করার ঐচ্ছিকতা সাধারণভাবে স্বীকৃত ছিল। অতঃপর পরবর্তীতে তা শর্তসাপেক্ষে ঐচ্ছিকতায় পরিণত হয়। [আল্লাহ সর্বজ্ঞাত] (মিরকাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৫৬৭)
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধবন্দীদের বিধিমালা
৩৯৭৪-[১৫] ’আত্বিয়্যাতুল কুরাযী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমিও বানী কুরায়যার বন্দীদের মধ্যে ছিলাম। আমাদেরকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মুখে উপস্থিত করা হলো। সাহাবীগণ বন্দীদের সতর খুলে দেখেন। যার গুপ্তাঙ্গের লোম উঠেছে তাকে হত্যা করা হয়, আর যার লোম প্রকাশ পায়নি তাকে হত্যা করা হয়নি। ফলে তাঁরা আমার সতর খুলে দেখলেন যে, আমার গুপ্তাঙ্গের লোম উঠেনি। তাই আমাকে হত্যা না করে বন্দীদের মধ্যে রেখে দিলেন। (আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ, দারিমী)[1]
عَن عَطِيَّة القَرظِي قَالَ: كنتُ فِي سَبي قُرَيْظَةَ عُرِضْنَا عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَكَانُوا يَنْظُرُونَ فَمَنْ أَنْبَتَ الشَّعَرَ قُتِلَ وَمَنْ لَمْ يُنْبِتْ لَمْ يُقْتَلْ فَكَشَفُوا عَانَتِي فَوَجَدُوهَا لَمْ تُنْبِتْ فَجَعَلُونِي فِي السَّبْيِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَابْن مَاجَه. والدارمي
ব্যাখ্যা: (فَمَنْ أَنْبَتَ الشَّعَرَ قُتِلَ) অর্থাৎ- যার নাভির নীচে চুল গজিয়েছে তাকে হত্যা করা হয়েছে, কেননা নাভির নীচে চুল গজানো প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আলামাত। সুতরাং সে যোদ্ধাদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
(وَمَنْ لَمْ يُنْبِتْ لَمْ يُقْتَلْ) কেননা এ ধরনের মানুষ শিশুদের অন্তর্ভুক্ত। এ অর্থটি তাদের কাছে সংশয়পূর্ণ হচ্ছে যারা মুসলিম এবং কাফিরদের মাঝে পার্থক্য করে থাকে আর এটা ঐ সময় যখন নাভীর নীচে চুল গজানোকে কাফিরদের ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে নির্ধারণ করে থাকে আর মুসলিমদের ক্ষেত্রে তা বিবেচনা করা হয় না। কারণ কাফিরদের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া বয়সের দৃষ্টিকোণ থেকে জানা যায় না, আর তাদের কথাও গ্রহণ করা সম্ভব নয়, কেননা তারা নিজেদের থেকে হত্যার বিধান প্রতিহত করার উদ্দেশে ঐ ব্যাপারে তারা মিথ্যা বলবে। আর এজন্যই তাদের সংবাদ গ্রহণযোগ্য নয়। পক্ষান্তরে মুসলিম এবং তাদের সন্তানদের বয়সের পরিমাণ সম্পর্কে জানা সম্ভব, কেননা তাদের জন্মের সময় সংরক্ষিত। তাদের জন্মের সময়ের তারিখ দেয়া আছে, জানা আছে। এ ব্যাপারে তাদের সংবাদ গ্রহণযোগ্য। এ কারণেই মুশরিকদের ক্ষেত্রে চুল গজানোকে বিবেচনা করা হয়েছে। [আল্লাহ সর্বাধিক জ্ঞাত] এ উক্তিটি খত্ত্বাবীর।
তূরিবিশ্তী বলেনঃ কেবল মুশরিকদের ক্ষেত্রে নাভীর নীচে চুল গজানোকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার জন্য বিবেচনা করা হয়েছে এটা মূলত জরুরী হিসেবে। এমতাস্থায় যদি কাফিরদেরকে তাদের বয়সের পরিমাণ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয় তাহলে তারা সত্য বলবে না, কেননা এতে তারা ধ্বংস দেখছে। (আওনুল মা‘বূদ ৯ম খন্ড, হাঃ ৪৩৯৫; তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৫৮৪; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধবন্দীদের বিধিমালা
৩৯৭৫-[১৬] ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুদায়বিয়ার দিন সন্ধিচুক্তি হওয়ার পূর্বে কুরায়শদের কিছুসংখ্যক গোলাম মক্কা হতে মদীনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটে চলে আসলো। পরে তাদের মালিকেরা তাঁর (রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর) নিকট লিখে পাঠাল, হে মুহাম্মাদ! আল্লাহর কসম! তারা তোমার দীনের (ধর্মের) প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যায়নি; বরং তারা দাসত্বের শৃঙ্খলাবদ্ধ হতে মুক্তি প্রাপ্তির উদ্দেশে আমাদের নিকট হতে পালিয়েছে। কয়েকজন সাহাবীও (অনুরূপ) বললেন, হে আল্লাহর রসূল! তাদের মালিকেরা সত্যই বলেছে, কাজেই তাদেরকে তাদের মালিকের নিকট ফেরত পাঠিয়ে দিন। এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হয়ে বললেন, হে কুরায়শগণ! আমি লক্ষ্য করছি, তোমরা তোমাদের আভিজাত্যের অহমিকা তথা গোঁড়ামি এখনও ছাড়নি, যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহ তা’আলা তোমাদের এই গোঁড়ামির দরুন ঘাড়ে আঘাত হানার জন্য কাউকে পাঠাবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা তা ছাড়বেও না। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) গোলামদেরকে ফেরত পাঠাতে স্পষ্ট ভাষায় অস্বীকৃতি জানিয়ে ঘোষণা দিলেন, তারা সকলেই আল্লাহর মুক্তকৃত বান্দা। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: خَرَجَ عِبْدَانٌ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَعْنِي الْحُدَيْبِيَةَ قَبْلَ الصُّلْحِ فَكَتَبَ إِلَيْهِ مَوَالِيهِمْ قَالُوا: يَا مُحَمَّدُ وَاللَّهِ مَا خَرَجُوا إِلَيْكَ رَغْبَةً فِي دِينِكَ وَإِنَّمَا خَرَجُوا هَرَبًا مِنَ الرِّقِّ. فَقَالَ نَاسٌ: صَدَقُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ رُدَّهُمْ إِلَيْهِمْ فَغَضِبَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَالَ: «مَا أَرَاكُم تنتهونَ يَا مَعْشَرَ قُرَيْشٍ حَتَّى يَبْعَثَ اللَّهُ عَلَيْكُمْ مَنْ يَضْرِبُ رِقَابَكُمْ عَلَى هَذَا» . وَأَبَى أَنْ يَرُدَّهُمْ وَقَالَ: «هُمْ عُتَقَاءَ اللَّهِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (فَغَضِبَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ) তূরিবিশ্তী বলেনঃ আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবল এ কারণে রাগ করেছেন যে, তারা তাদের ব্যাপারে ধারণার বশবর্তী হয়ে শারী‘আতের হুকুমের বিরোধিতা করেছে এবং তারা তাদের মুশরিক বন্ধুদের দাবী অনুপাতে মুশরিক বন্ধুদের প্রতি সাক্ষ্য দিয়েছে যে, তারা দাসত্ব থেকে পলায়নের উদ্দেশে মক্কা থেকে বেরিয়ে এসেছে, ইসলামের প্রতি আগ্রহী হয়ে নয়। তাদের মাঝে শারী‘আতের হুকুম ছিল, তারা ইসলামের রজ্জুতে আশ্রয় নিয়ে কাফির দেশ হতে বের হওয়ার দ্বারা স্বাধীনে পরিণত হয়েছে, তাদেরকে কাফিরদের কাছে ফেরত দেয়া বৈধ হবে না। তাদের বন্ধুদের প্রতি তাদের সাহায্য করা যেন শত্রুদের পক্ষে সাহায্য করা।
(مَا أَرَاكُمْ تَنْتَهُوْنَ يَا مَعْشَرَ! قُرَيْشٍ) ত্বীবী বলেনঃ এতে বিরাট ধমক রয়েছে যেমন তাদের বিরত থাকা সম্পর্কে অবগতিকে অস্বীকার করেছেন এবং তাদের বিরত না হওয়ার স্থায়িত্বকে উদ্দেশ্য করেছেন। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬৯৭; মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৫. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - যুদ্ধবন্দীদের বিধিমালা
৩৯৭৬-[১৭] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খালিদ ইবনু ওয়ালীদ -কে বানী জাযীমাহ্-এর বিরুদ্ধে অভিযানে পাঠালেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের আহবান জানালেন। কিন্তু তারা ’’আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি’’ সঠিকভাবে বাক্যটি উচ্চারণ না করে ’’আমরা স্বীয় ধর্ম ত্যাগ করেছি’’ এ বাক্যটি উচ্চারণ করতে থাকে। এমতাবস্থায় খালিদ তাদেরকে হত্যা ও বন্দী করতে লাগলেন এবং বন্দীদেরকে আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন। একদিন তিনি আমাদের প্রত্যেককে স্বীয় বন্দীদেরকে হত্যার নির্দেশ দিলেন। আমি (বর্ণনাকারী) বললাম, আল্লাহর কসম! আমি আমার বন্দীকে হত্যা করব না এবং আমার সাথীরাও কেউ তাদের বন্দীকে হত্যা করবে না। অতঃপর ঘটনাটি আদ্যোপান্ত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট বর্ণনা করলাম। এতদশ্রবণে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর দু’ হাত উপরে উঠিয়ে বললেন, হে আল্লাহ! খালিদ-এর কৃত অপরাধ হতে আমি তোমার নিকট আমার দায়মুক্তি ঘোষণা করছি। এভাবে দু’বার বললেন। (বুখারী)[1]
عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: بَعَثَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَالِدَ بْنَ الْوَلِيدِ إِلَى بَنِي جَذِيمَةَ فَدَعَاهُمْ إِلَى الْإِسْلَامِ فَلَمْ يُحْسِنُوا أَنْ يَقُولُوا: أَسْلَمْنَا فَجَعَلُوا يَقُولُونَ: صَبَأْنَا صَبَأْنَا فجعلَ خالدٌ يقتلُ ويأسِرُ وَدَفَعَ إِلَى كُلِّ رَجُلٍ مِنَّا أَسِيرَهُ حَتَّى إِذَا كَانَ يَوْمٌ أَمَرَ خَالِدٌ أَنْ يَقْتُلَ كُلُّ رَجُلٍ مِنَّا أَسِيرَهُ فَقُلْتُ: وَاللَّهِ لَا أَقْتُلُ أَسِيرِي وَلَا يَقْتُلُ رَجُلٌ مِنْ أَصْحَابِي أسيره حَتَّى قدمنَا إِلَى النَّبِي صلى الله عَلَيْهِ وَسلم فذكرناهُ فَرَفَعَ يَدَيْهِ فَقَالَ: «اللَّهُمَّ أَنِّي أَبْرَأُ إِلَيْكَ مِمَّا صنعَ خالدٌ» مرَّتينِ. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: (وَدَفَعَ إِلٰى كُلِّ رَجُلٍ مِنَّا أَسِيْرَه حَتّٰى إِذَا كَانَ يَوْمٌ) ত্বীবী বলেনঃ অর্থাৎ- তিনি আমাদের কাছে বন্দী হস্থান্তর করলেন এবং তাকে ঐ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে নির্দেশ দিলেন যেদিন তিনি বন্দীকে হত্যার ব্যাপারে আমাদেরকে নির্দেশ দিবেন। অতঃপর তিনি বন্দীদের হত্যার ব্যাপারে আমাদেরকে নির্দেশ করলেন।
(حَتّٰى قَدِمْنَا إِلَى النَّبِى ﷺ) ত্বীবী বলেনঃ এখানে ভাষ্য গোপন আছে- আর তা হলো আমাদের কোনো ব্যক্তি তার বন্দীকে হত্যা করবে না। বরং সে তাকে ঐ পর্যন্ত সংরক্ষণ করবে যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা আল্লাহর রসূলের কাছে আগমন না করব। অতঃপর আগমন করা পর্যন্ত আমরা সংরক্ষণ করেছি।
(اَللّٰهُمَّ أَنِّىْ أَبْرَأُ إِلَيْكَ مِمَّا صَنَعَ خَالِدٌ) খত্ত্বাবী বলেনঃ আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবল বন্দীদের صَبَأْنَا উক্তি থেকে কি উদ্দেশে তা স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত তাদের ক্ষেত্রে খালিদ-এর ধীরস্থিরতা বর্জন এবং তাড়াতাড়ি করাকে অপছন্দ করলেন। কেননা الصَّبَأَ এর অর্থ এক ধর্ম থেকে অন্য ধর্মের দিকে বের হয়ে যাওয়া- এ কারণে মুশরিকরা আল্লাহর রসূলকে ‘সবী’ বলে ডাকত। আর এটা মূলত তার নিজ ধর্মের বিরোধিতা করার কারণে। অতএব তাদের صَبَأْنَا উক্তি থেকে এ উদ্দেশ্য হওয়ার সম্ভাবনা রাখছে যে, আমরা আমাদের দীন হতে ইসলাম ছাড়া অন্য দীন ইয়াহূদী, অথবা খ্রীষ্টান অথবা অন্য কোনো ধর্মের দিকে বের হয়ে গেছি। এ উক্তি যেহেতু ইসলাম ধর্মের দিকে স্থানান্তর হওয়ার ক্ষেত্রে স্পষ্ট নয়, তাই খালিদ তাদের হত্যা করার নির্দেশ দিলেন। কেননা ইসলাম গ্রহণ করার কারণে রক্তপাত বন্ধ হওয়ার শর্তসমূহ পাওয়া যায়নি। আরও সম্ভাবনা রাখছে যে, খালিদ ধারণা করেছে, তারা আনুগত্যের প্রতি অবজ্ঞা করে ‘ইসলাম’ শব্দ উচ্চারণ করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
খত্ত্বাবী বলেনঃ খালিদ মুজতাহিদ হওয়ায় খালিদের কর্মের কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে শাস্তি দেননি। এ সত্ত্বেও তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) খালিদ-এর কর্ম থেকে মুক্ত হওয়ার ব্যাপারে আল্লাহর কাছে দু‘আ করার হিকমাত হলো এ কথা জানিয়ে দেয়া যে, তিনি খালিদকে এ কাজ করার অনুমতি দেননি। আর তিনি তা করেছেন এ আশঙ্কায় যে, কেউ ধারণা করতে পারে যে, খালিদ -এর বন্দী হত্যা করায় তাঁর অনুমতি রয়েছে। আর পরবর্তীতে অন্য যে কেউ এমন কাজে যাতে তিরস্কৃত হয়।
ইবনুল বাত্ত্বল বলেনঃ মুজতাহিদ ব্যক্তির ফতোয়া যদি বিদ্বান দলের ফতোয়ার বিপরীত হয়- এ ক্ষেত্রে যদিও মুজতাহিদ ব্যক্তি হতে পাপ রহিত হয়ে যায় তথাপিও অনেকের কাছে ভুলকারী ব্যক্তির জরিমানা আবশ্যক। এটা মতানৈক্যপূর্ণ। আর যা স্পষ্ট তা হলো- কোনো কাজ থেকে নিজেকে মুক্তি দাবী করা ঐ কাজের কর্তার পাপকে আবশ্যক করে না। জরিমানাকেও আশ্যক করে না, কেননা ভুলকারী ব্যক্তির পাপ মার্জনা করা হয় যদিও তার কাজ প্রশংসিত না হয়। (ফাতহুল বারী ১৩শ খন্ড, হাঃ ৭১৮৯)
পরিচ্ছেদঃ ৬. প্রথম অনুচ্ছেদ - নিরাপত্তা (আশ্রয়) প্রদান
৩৯৭৭-[১] উম্মু হানী বিনতু আবূ ত্বালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি মক্কা বিজয়ের বৎসর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে দেখলাম তিনি গোসল করছেন এবং তার কন্যা ফাত্বিমাহ্ একটি চাদর দিয়ে তাঁকে আড়াল করে রাখছেন। আমি তাকে সালাম করলাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, কে এই মহিলা? উত্তরে বললাম, আমি আবূ ত্বালিব-এর কন্যা উম্মু হানী। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, হে উম্মু হানী! তোমার আগমন কল্যাণ হোক। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) গোসল শেষ করে এক বস্ত্রে সর্বাঙ্গ আচ্ছাদিত করে সালাত আদায় করতে দাঁড়ালেন এবং আট রাক্’আত সালাত আদায় করলেন।
অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সালাত আদায় শেষ করলে, আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল! আমার ভাই ’আলী এমন একজন লোককে হত্যা করতে চায় যাকে আমি আশ্রয় দিয়েছি। সে হলো, হুবায়রাহ্-এর পুত্র অমুক। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে উম্মু হানী! তুমি যাকে নিরাপত্তা দান করেছ, আমিও তাকে নিরাপত্তা দান করলাম। উম্মু হানী (রাঃ) বলেন, এটা ছিল পূর্বাহ্নের (চাশ্তের) সালাত। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
আর তিরমিযী-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, উম্মু হানী (রাঃ) বলেন, আমি আমার স্বামীর পক্ষের দু’জন নিকটাত্মীয়কে আশ্রয় দিয়েছি। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয় তুমি যাকে আশ্রয় দিয়েছ, আমরাও তাকে আশ্রয় দান করলাম।
بَابُ الْاَمَانِ
عَن أم هَانِئ بنت أَي طالبٍ قالتْ: ذهبتُ إِلى رسولِ الله عَامَ الْفَتْحِ فَوَجَدْتُهُ يَغْتَسِلُ وَفَاطِمَةُ ابْنَتُهُ تَسْتُرُهُ بِثَوْبٍ فَسَلَّمْتُ فَقَالَ: «مَنْ هَذِهِ؟» فَقُلْتُ: أَنَا أُمُّ هَانِئٍ بِنْتُ أَبِي طَالِبٍ فَقَالَ: «مَرْحَبًا بِأُمِّ هَانِئٍ» فَلَمَّا فَرَغَ مِنْ غُسْلِهِ قَامَ فَصَلَّى ثَمَانِيَ رَكَعَاتٍ مُلْتَحِفًا فِي ثَوْبٍ ثُمَّ انْصَرَفَ فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ زَعَمَ ابْنُ أُمِّي عَلِيٌّ أَنَّهُ قَاتِلٌ رَجُلًا أَجَرْتُهُ فُلَانَ بْنَ هُبَيْرَةَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «قَدْ أَجَرْنَا مَنْ أَجَرْتِ يَا أم هَانِئ» قَالَت أُمَّ هَانِئٍ وَذَلِكَ ضُحًى. مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ. وَفِي رِوَايَةٍ لِلتِّرْمِذِيِّ: قَالَتْ: أَجَرْتُ رَجُلَيْنِ مِنْ أَحْمَائِي فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «قد أمنا من أمنت»
ব্যাখ্যা: ইবনুল মুনযির বলেনঃ মহিলা কর্তৃক নিরাপত্তা দান বৈধ হওয়ার ক্ষেত্রে সকল বিদ্বানগণ একমত। তবে ঐ উক্তি ছাড়া যা ‘আবদুল মালিক, অর্থাৎ- ইমাম মালিক-এর সাথী ইবনুল মাজিশূন যা বর্ণনা করেছেন তা ছাড়া। ইবনুল মাজিশূন বলেনঃ নিরাপত্তার বিষয় ইমামের কাছে। এর বিরোধী যা বর্ণিত হয়েছে তা তিনি বিশেষ ব্যাপার বলে আখ্যায়িত করেছেন। ইবনুল মুনযির বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উক্তি «يَسْعٰى بِذِمَّتِهِمْ أَدْنَاهُمْ» অর্থাৎ- তাদের যিম্মাদারিত্ব তাদের সর্বনিম্ন ব্যক্তিকেও পরিব্যপ্ত করবে। এতে এ কথকের উদাসিনতার উপর প্রমাণ আছে।
ইবনুল মাজিশূন-এর উক্তির মতো উক্তি সাহনূন থেকে এসেছে, তিনি বলেনঃ তা ইমাম পর্যন্ত, যদি তিনি তা বৈধতা দেন তাহলে তা বৈধ আর যদি তিনি তাকে ফিরিয়ে দেন তাহলে তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩১৭১)
‘আওনুল মা‘বূদে আছে, «صلى سبحة الضحى ثمانى ركعات» নববী বলেনঃ যুহার সালাতের হাদীসের মধ্যে এটাই সর্বাধিক স্পষ্ট যা সহীহাতে আছে। তিনি বলেন, এর দ্বারা চাশ্তের সালাত উদ্দেশ্য। এর দ্বারা অত্র হাদীসের মাধ্যমে দলীল গ্রহণের ক্ষেত্রে কাযী ‘ইয়ায ও অন্যান্যের অবস্থান প্রতিহত হচ্ছে। আর তাদের বক্তব্য এই যে, উম্মু হানী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সালাতের সময় সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন তার নিয়্যাত সম্পর্কে নয়। সুতরাং সম্ভবত ঐ সালাতটি মক্কা বিজয়ের ব্যাপারে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় স্বরূপ ছিল, আবূ দাঊদের এ হাদীসের সানাদ বুখারীর শর্তে বিশুদ্ধ।
আহমাদ ইবনু সালিহ বলেনঃ এর উদ্দেশ্য হলো- আহমাদ বিন সালিহ এবং আহমাদ বিন ‘আমর-এর শব্দের ভিন্নতা উল্লেখ করা। আহমাদ বিন সালিহ তার শব্দ سبحة الضحى উল্লেখ করেছেন, অর্থাৎ- তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মক্কা বিজয়ের দিন চাশ্তের আট রাক্‘আত সালাত আদায় করেছেন। ইবনুস্ সার্হ এটা উল্লেখ করেননি। বরং তিনি বলেছেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মক্কা বিজয়ের দিন আট রাক্‘আত সালাত আদায় করেছেন। (‘আওনুল মা‘বূদ ৩য় খন্ড, হাঃ ১২৮৬)
(ذَهَبْتُ إِلٰى رَسُوْلِ اللهِ عَامَ الْفَتْحِ فَوَجَدْتُه يَغْتَسِلُ وَفَاطِمَةُ ابْنَتُه تَسْتُرُه بِثَوْبٍ) অর্থাৎ- আমি মক্কা বিজয়ের বছর আল্লাহর রসূলের কাছে গেলাম, অতঃপর তাকে গোসলরত অবস্থায় পেলাম আর তাঁর কন্যা তাঁকে কাপড় দ্বারা আড়াল করছিল। এতে মাহরাম নারীর উপস্থিতিতে পুরুষের গোসল বৈধ হওয়ার দলীল রয়েছে, তবে শর্ত এই যে, ঐ পুরুষ ও মহিলার মাঝে কাপড় বা অন্য কিছুর পর্দা থাকতে হবে। (শারহে মুসলিম ৪র্থ খন্ড, হাঃ ৩৩৬)
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নিরাপত্তা (আশ্রয়) প্রদান
৩৯৭৮-[২] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একজন নারীও তার (কাফির) গোত্রের জন্য নিরাপত্তা লাভ করতে পারে। অর্থাৎ- সে মুসলিমদের পক্ষে আশ্রয় দিতে পারে। (তিরমিযী)[1]
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّ الْمَرْأَةَ لَتَأْخُذُ لِلْقَوْمِ» يَعْنِي تُجيرُ على الْمُسلمين. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: («إِنَّ الْمَرْأَةَ لَتَأْخُذُ لِلْقَوْمِ» يَعْنِىْ تُجِيْرُ عَلَى الْمُسْلِمِيْنَ) অর্থাৎ- একজন মহিলাও স্বীয় সম্প্রদায়ের জন্য নিরাপত্তা নিতে পারে, এক কথায় মুসলিম নারীর পক্ষে সম্প্রদায়ের জন্য নিরাপত্তা গ্রহণ বৈধ। ইবনুল হুমাম বলেনঃ আবূ দাঊদ স্বীয় সানাদে ‘আয়িশাহ্ সিদ্দীকা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ «إِنْ كَانَتِ الْمَرْأَةُ لَتُجِيرُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ» অর্থাৎ- ‘‘নিঃসন্দেহে মহিলা মু’মিনদের ব্যাপারে নিরাপত্তা গ্রহণ করতে পারে।’’
ইমাম তিরমিযী ‘‘মহিলা কর্তৃক নিরাপত্তা দান’’ এ সম্পর্কে একটি অধ্যায় বেঁধেছেন। তিনি বলেন, আমাদের কাছে ইয়াহ্ইয়া বিন আকসাম হাদীস বর্ণনা করেছেন, হাদীসটি তিনি আবূ হুরায়রাহ্ পর্যন্ত পৌঁছিয়েছেন, আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ «إِنَّ الْمَرْأَةَ لَتَأْخُذُ لِلْقَوْمِ» ‘‘নিশ্চয় মহিলা সম্প্রদায়ের জন্য নিরাপত্তা নিতে পারে।’’ অর্থাৎ- মুসলিমদের ওপর স্বীয় সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তিকে নিরাপত্তা দিবে। তিনি বলেন, এটি হাসান, গরীব হাদীস। তিনি তার ‘ইলালুল কুবরা’ গ্রন্থে বলেন, আমি মুহাম্মাদ বিন ইসমা‘ঈল-কে এ হাদীস সম্পর্কে প্রশ্ন করেছি। উত্তরে তিনি বলেছেন, এটা বিশুদ্ধ হাদীস। অত্র অধ্যায়ের হাদীসসমূহের অন্তর্ভুক্ত আল্লাহর রসূলের কন্যা যায়নাব কর্তৃক আবুল ‘আস-কে নিরাপত্তা দানের হাদীস। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «أَلَا وَإِنَّه يُجِيرُ عَلَى الْمُسْلِمِينَ أَدْنَاهُمْ» অর্থাৎ- ‘‘জেনে রাখ অবশ্যই সর্বনিম্ন ব্যক্তি মুসলিমদের ওপর নিরাপত্তা দান করবেন।’’ ত্ববারানী একে দীর্ঘাকারে বর্ণনা করেছেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
ইমাম তিরমিযী অন্য সানাদে একটি হাদীস এনেছেন যা ‘আক্বীল বিন আবূ ত্বালিব-এর গোলাম আবূ মুররাহ্ উম্মু হানী থেকে বর্ণনা করেন, উম্মু হানী বলেন, আমি আমার শ্বশুর বংশীয় দু’জন লোককে আশ্রয় দিয়েছি। অতঃপর আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘‘তুমি যাকে নিরাপত্তা দান করেছ আমরাও তাকে নিরাপত্তা দান করেছি।’’ আবূ ‘ঈসা বলেন, এটি হাসান সহীহ হাদীস। এর উপরে বিদ্বানগণের ‘আমল রয়েছে। তারা মহিলা কর্তৃক নিরাপত্তা দানকে বৈধ ঘোষণা দিয়েছেন। আর তা আহমাদ, ইসহক-এর উক্তি। তারা উভয়ে মহিলা ও দাস উভয়ের নিরাপত্তা দানকে বৈধ ঘোষণা করেছেন। ‘উমার থেকে বর্ণনা করা হয়েছে, তিনি দাস কর্তৃক নিরাপত্তা দানকে বৈধ ঘোষণা করেছেন। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৫৭৯)
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নিরাপত্তা (আশ্রয়) প্রদান
৩৯৭৯-[৩] ’আমর ইবনুল হামিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ কোনো ব্যক্তিকে কেউ যদি নিরাপত্তা দান করার পর তাকে হত্যা করে, কিয়ামতের দিন উক্ত আশ্রয় দানকারীকে বিশ্বাসঘাতকতার পতাকা প্রদান করা হবে। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
وَعَنْ عَمْرِو بْنِ الْحَمِقِ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم يَقُول: «من أَمَّنَ رَجُلًا عَلَى نَفْسِهِ فَقَتَلَهُ أُعْطِيَ لِوَاءَ الْغَدْرِ يَوْمَ الْقَيَامَةِ» . رَوَاهُ فِي شَرْحِ السُّنَّةِ
ব্যাখ্যা: (فَقَتَلَه أُعْطِىَ لِوَاءَ الْغَدْرِ يَوْمَ الْقَيَامَةِ) হাদীসের এ অংশ উপস্থিত লোকেদের সামনে তাকে অপমানিত করার ইঙ্গিত রয়েছে। শারহে ইবনুল হুমামে আছে- সাধারণত বিশ্বাসঘাতকতা হারাম। যেমন বুখারীতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে এসেছে যা ‘আবদুল্লাহ বিন ‘আমর ইবনুল ‘আস কর্তৃক বর্ণিত। চারটি বৈশিষ্ট্য যার মাঝে থাকবে সে খাঁটি মুনাফিক। যে ব্যক্তি কথা বলার সময় মিথ্যা বলবে, যখন ওয়া‘দা করবে তখন তা ভঙ্গ করবে, যখন কোনো চুক্তি করবে তখন তাতে বিশ্বাসঘাতকতা করবে, আর যখন ঝগড়া করবে তখন সত্য থেকে অসত্যের দিকে ফিরে যাবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নিরাপত্তা (আশ্রয়) প্রদান
৩৯৮০-[৪] সুলায়ম ইবনু ’আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মু’আবিয়াহ্ ও রোমীয়দের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল, কিন্তু উক্ত মেয়াদ উত্তীর্ণের পূর্বেই মু’আবিয়াহ্ রোমীয়দের দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন। কেননা চুক্তির মেয়াদ শেষ হতেই যেন তাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালাতে পারে। ঠিক সে সময়ই জনৈক ব্যক্তি ’আরবী অথবা তুর্কী ঘোড়ার উপর সওয়ার হয়ে বলতে বলতে আসছিলেন, ’আল্লা-হু আকবার’ ’আল্লা-হু আকবার’ চুক্তির মর্যাদা রক্ষা করতে হবে, বিশ্বাসঘাতকতা করা যাবে না। তিনি নিকটে আসলে লোকেরা তাকিয়ে দেখলেন, তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিশিষ্ট সাহাবী ’আমর ইবনু ’আবাসাহ্।
অতঃপর মু’আবিয়াহ্ তাকে কথাগুলো বলার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো সম্প্রদায়ের সাথে সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করে, তবে সে যেন তা ভঙ্গ না করে এবং শক্তও না করে, যে পর্যন্ত না মেয়াদ অতিবাহিত হয় অথবা পূর্বাহ্নে তাদেরকে স্পষ্টভাবে চুক্তি ভঙ্গের সংবাদ না দেয়। বর্ণনাকারী বলেন, এ কথা শুনে মু’আবিয়াহ্ (রাঃ) নিজের লোকেদেরকে নিয়ে ফিরে আসলেন। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ سُلَيْمِ بْنِ عَامِرٍ قَالَ: كَانَ بَيْنَ مُعَاوِيَةَ وَبَيْنَ الرُّومِ عَهْدٌ وَكَانَ يَسِيرُ نَحْوَ بِلَادِهِمْ حَتَّى إِذَا انْقَضَى الْعَهْدُ أَغَارَ عَلَيْهِمْ فَجَاءَ رَجُلٌ عَلَى فَرَسٍ أَوْ بِرْذَوْنٍ وَهُوَ يَقُولُ: اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ وَفَاءٌ لَا غدر فَنظر فَإِذا هُوَ عَمْرو ابْن عَبَسَةَ فَسَأَلَهُ مُعَاوِيَةُ عَنْ ذَلِكَ فَقَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُول: «مَنْ كَانَ بَيْنَهُ وَبَيْنَ قَوْمٍ عَهْدٌ فَلَا يَحُلَّنَّ عَهْدًا وَلَا يَشُدَّنَّهُ حَتَّى يُمْضِيَ أَمَدَهُ أَوْ يَنْبِذَ إِلَيْهِمْ عَلَى سَوَاءٍ» . قَالَ: فَرَجَعَ مُعَاوِيَة بِالنَّاسِ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (فَجَاءَ رَجُلٌ عَلٰى فَرَسٍ أَوْ بِرْذَوْنٍ) ত্বীবী বলেন, الفَرَسٍ দ্বারা এখানে ‘আরবীয় ঘোড়া উদ্দেশ্য। আর بِرْذَوْنٍ দ্বারা তুর্কী ঘোড়া উদ্দেশ্য।
(وَكَانَ يَسِيْرُ نَحْوَ بِلَادِهِمْ) অর্থাৎ- চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় রোম দেশের কাছাকাছি হয়ে থাকার জন্য চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বেই মু‘আবিয়াহ্ তাদের দিকে অগ্রসর হন।
(وَهُوَ يَقُولُ : اَللّٰهُ أَكْبَرُ اَللّٰهُ أَكْبَرُ وَفَاءٌ لَا غَدْرَ) অর্থাৎ- তোমাদের থেকে চুক্তি যেন পূর্ণতা লাভ করে, কোনো প্রকার যেন বিশ্বাসঘাতকতা সৃষ্টি না হয়। অর্থাৎ- আল্লাহ প্রেমী ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উম্মাত কর্তৃক বিশ্বাসঘাতকতায় জড়িত হওয়া অসম্ভব। শারহুস্ সুন্নাহতে আছে- ‘আমর বিন ‘আবাসাহ্ এটা কেবল এজন্য অপছন্দ করেছেন যে, মু‘আবিয়াহ্ যখন তাদের সাথে নির্দিষ্ট এক সময় পর্যন্ত সন্ধি করলেন তখন তিনি নিজ দেশে অবস্থান করছিলেন। তাই রোম দেশের দিকে তার অগ্রসর হওয়াটা চুক্তির নির্দিষ্ট সময় সম্পন্ন হওয়ার পর সংঘটিত হতে হবে। যেমন চুক্তিতে উল্লেখিত সময় শেষ হওয়ার আগে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা যাবে না, তেমনি সময় শেষ হওয়ার আগে যুদ্ধের জন্য অগ্রসরও হওয়া যাবে না। যেহেতু মু‘আবিয়াহ্-এর সফর সন্ধির অন্তর্ভুক্ত দীনগুলোতে সংঘটিত হয়েছে, তাই ‘আমর একে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে গণ্য করেছেন। পক্ষান্তরে সন্ধিকারী যদি সন্ধি ভঙ্গ করে তাদের থেকে খিয়ানাত প্রকাশ পায় তাহলে প্রতিপক্ষের অধিকার আছে তাদের উদাসীন অবস্থায় তাদের ওপর আক্রমণ করা।
(وَلَا يَشُدَّنَّه) অর্থাৎ- এ বাক্যাংশ দ্বারা চুক্তি পরিবর্তন না করার ব্যাপারে আধিক্যতা উদ্দেশ্য করেছেন, চুক্তি রক্ষার ক্ষেত্রে আধিক্যতা ও গুরুত্ব প্রদানে কোনো বাধা নেই। অর্থাৎ- কোনক্রমেই চুক্তি পরিবর্তন করবে না এবং তা ভঙ্গ করবে না।
(أَوْ يَنْبِذَ إِلَيْهِمْ) অর্থাৎ- প্রতিপক্ষকে প্রকাশ্য বলে দিবে যে, সে প্রতিপক্ষ থেকে খিয়ানাতের আশঙ্কায় চুক্তি ভঙ্গ করেছে। যাতে তার প্রতিপক্ষ তার সাথে চুক্তিভঙ্গের ক্ষেত্রে সমান হতে পারে। এটা যেন তার থেকে বিশ্বাসঘাতকতা স্বরূপ না হয়। আর এটা মূলত মহান আল্লাহর এ বাণীর কারণে, অর্থাৎ- ‘‘আর আপনি যদি কোনো সম্প্রদায়ের কাছ থেকে বিশ্বাসঘাতকতার আশংকা করেন তাহলে তাদের সাথে সম্পাদিত চুক্তি একইভাবে তাদের দিকে ছেড়ে দিন’’- (সূরা আল আনফাল ৮ : ৫৮)। মুযহির বলেনঃ সে তাদেরকে জানিয়ে দিবে যে, সন্ধি উঠে গেছে। তখন উভয় দল ঐ জ্ঞানের ক্ষেত্রে সমান। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৫৮০; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭৫৫)
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নিরাপত্তা (আশ্রয়) প্রদান
৩৯৮১-[৫] আবূ রাফি’ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন কুরায়শরা আমাকে মদীনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটে পাঠিয়েছিল। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখামাত্রই ইসলামের মহানুভবতা আমার অন্তরে গেঁথে গেল। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহর কসম, আমি আর তাদের (কুরায়শদের) কাছে কখনো ফিরে যাব না। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আমি চুক্তি ভঙ্গ করি না এবং কোনো দূতকেও বন্দী করি না। তবে তুমি এখন চলে যাও। তোমার অন্তরে বর্তমানে ইসলাম গ্রহণের যে আগ্রহ আছে তা যদি চলে যাওয়ার পরও এ অবস্থায় (ইসলাম) জাগরুক থাকে, তখন তুমি চলে এসো। আবূ রাফি’ (রাঃ) বলেন, আমি চলে গেলাম। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে ইসলাম গ্রহণ করলাম। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن أبي رافعٍ قَالَ: بعثَني قُرَيْشٌ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَمَّا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أُلْقِيَ فِي قَلْبِيَ الْإِسْلَامُ فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي وَاللَّهِ لَا أَرْجِعُ إِلَيْهِمْ أَبَدًا قَالَ: «إِنِّي لَا أَخِيسُ بِالْعَهْدِ وَلَا أَحْبِسُ الْبُرُدَ وَلَكِنِ ارْجِعْ فَإِنْ كَانَ فِي نَفْسِكَ الَّذِي فِي نَفْسِكَ الْآنَ فَارْجِعْ» . قَالَ: فَذَهَبْتُ ثُمَّ أَتَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم فَأسْلمت. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (فَلَمَّا رَأَيْتُ رَسُوْلَ اللّٰهِ ﷺ أُلْقِىَ فِىْ قَلْبِىَ الْإِسْلَامُ) অর্থাৎ- তাঁকে দেখামাত্র আমার অন্তরে ইসলামের প্রতি সত্যায়ন এবং ইসলামের প্রতি ভালোবাসা গেঁথে গেল। ত্বীবী বলেনঃ অত্র হাদীসাংশে এ কথা বিদ্যমান যে, অন্তরে ইসলাম প্রবেশ তাঁকে দর্শনের পর বিলম্বিত হয়নি। উল্লেখিত উক্তি আবূ রাফি‘-এর বিচক্ষণতা ও ধূর্ততা ও সঠিক দৃষ্টির প্রমাণ বহন করে। আর আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ মু‘জিযা দ্বারা সন্নিবেশিত করা হয়েছে যে, অনড় দৃষ্টি নিক্ষেপকারী তাঁর দিকে দৃষ্টি দিলেই ঈমান আনত।
«فارجع ثم أسلم» অর্থাৎ- অতঃপর কাফিরদের কাছ থেকে আমাদের কাছে ফিরে আসবে। এরপর ইসলাম গ্রহণ করবে। কেননা এখন যদি তোমার ইসলাম মেনে নিয়ে তোমাকে তাদের কাছে ফিরিয়ে না দেই তাহলে অবশ্যই আমি বিশ্বাসঘাতকতা করে ফেলব- এটা ইবনুল মালিক বলেছেন। এতে আছে ইসলাম গ্রহণ করাতে বিশ্বাসঘাতকতা হয় না। বরং এ থেকে উদ্দেশ্য হলো যখন তাকে আটক করা আপত্তিকর তখন সে ইসলাম গ্রহণ না করে কাফিরদের কাছে ফিরে যাবে, কেননা এ পন্থাই সর্বাধিক উপযুক্ত। অতঃপর সে সঠিক পন্থায় সত্যের দিকে ফিরে আসবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
অত্র হাদীস থেকে বুঝা যায়, দূতদেরকে হত্যা করা যাবে না, আটকও করা যাবে না। (সম্পাদক)
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নিরাপত্তা (আশ্রয়) প্রদান
৩৯৮২-[৬] নু’আয়ম ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একদিন (নাবূওয়াতের মিথ্যা দাবিদার) মুসায়লিমাহ্ কায্যাব-এর পক্ষ হতে দু’জন ব্যক্তি তাঁর নিকট আসলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদেরকে বললেন, আল্লাহর কসম! দূতকে হত্যা করার যদি বিধান থাকত, তাহলে এখনই আমি তোমাদের শিরশ্ছেদ করতাম। (আহমাদ, আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ نُعَيْمِ بْنِ مَسْعُودٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لِرَجُلَيْنِ جَاءَا مِنْ عِنْدِ مُسَيْلِمَةَ: «أَمَّا وَاللَّهِ لَوْلَا أَنَّ الرُّسُلَ لَا تُقْتَلُ لَضَرَبْتُ أَعْنَاقَكُمَا» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (أَنَّ رَسُوْلَ اللّٰهِ ﷺ قَالَ لِرَجُلَيْنِ) তাদের দু’ ব্যক্তির একজন হলো- ‘আবদুল্লাহ বিন নাওয়াহাহ্। দ্বিতীয় জন হলো ইবনু উসাল। (مِنْ عِنْدِ مُسَيْلِمَةَ) মুসায়লিমাহ্ হলো নাবূওয়্যাতের দাবীতে প্রসিদ্ধ মিথ্যাবাদী।
(وَاللّٰهِ لَوْلَا أَنَّ الرُّسُلَ لَا تُقْتَلُ) তূরিবিশতী বলেনঃ ওটা এ কারণে যে, তারা যেভাবে চিঠি পৌঁছিয়ে দেয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত অনুরূপ চিঠির জওয়াব পৌঁছিয়ে দেয়াও তাদের দায়িত্ব। তাই তাদের ওপর আবশ্যক হয়ে গেছে উভয় বিষয়কে সম্পন্ন করা। তাদের আটক বা হত্যা করা হলে তারা তাদের লক্ষ্য প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে বিশ্বাসঘাতকতার চিহ্নে চিহ্নিত হয়ে যাবে অথচ আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের মাঝে এ থেকে সর্বাধিক দূরে ছিলেন। তাছাড়া দূতদের আসা যাওয়ার মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কল্যাণ রয়েছে। যখনই তাদেরকে বন্দী করা, অপছন্দনীয় উদ্দেশ্য নিয়ে তাদের সম্মুখীন হওয়া বৈধ ঘোষণা করা হবে তখন তা বিরোধী দু’টি দলের মাঝে যোগাযোগের উপায় রোধ হয়ে যাবে। আর এতে রয়েছে ফিতনা এবং বিশৃঙ্খলা, যা জ্ঞানবান ব্যক্তির কাছে গোপনীয় নয়।
(لَضَرَبْتُ أَعْنَاقَكُمَا) এটা তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদেরকে কেবল এজন্য বলেছেন যে, তারা তাঁর উপস্থিতিতে বলেছে, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুসায়লিমাহ্ আল্লাহর রসূল। একমতে বলা হয়েছে, দূতদেরকে হত্যা করা বৈধ না হওয়ার বিধান আল্লাহ তা‘আলার অর্থাৎ- ‘‘আর মুশরিকদের কেউ যদি আপনার কাছে আশ্রয় চায় তাহলে আপনি তাকে আশ্রয় দিন’’- (সূরা আত্ তাওবাহ্ ৯ : ৫); এ বাণী থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
আবূ দাঊদ-এর বর্ণনায় আছে, মুসায়লিমাহ্-এর দূতদ্বয়কে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি বল? তারা জওয়াবে বলল, «نَقُولُ كَمَا قَالَ» অর্থাৎ- আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসায়লিমার দূতদ্বয়কে মুসায়লিমাহ্ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে দূতদ্বয় বলল, মুসায়লিমাহ্ যেমন বলে আমরাও তেমন বলি। অর্থাৎ- মুসায়লিমাহ্ আল্লাহর রসূল। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপস্থিতিতে এটা বলা দূতদ্বয়ের তরফ থেকে কুফরী ও ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাওয়া।
মুসনাদে আহমাদে আছে- নু‘আয়ম বিন মাস্‘ঊদ আল আশজা‘ঈ থেকে বর্ণিত, নিশ্চয় তিনি বলেন, মিথ্যুক মুসায়লিমার পত্র যখন পাঠ করা হয়েছে তখন আমি তা শুনেছি, সে সময় আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রেরিত দূতদ্বয়কে বললেন, ‘‘তোমরা কি বল?’’ দূতদ্বয় বলল, আমরা ঐ রকম বলি যেমন মুসায়লিমাহ্ বলেছে। অতঃপর আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘‘আল্লাহর শপথ! দূতদেরকে হত্যা করা যায় না। এমনটি যদি না হতো তাহলে অবশ্যই আমি তোমাদের গর্দানকে উড়িয়ে দিতাম।’’ অত্র হাদীসে ঐ ব্যাপারে প্রমাণ আছে যে, কাফিরদের থেকে প্রেরিত দূতদেরকে হত্যা করা হারাম। যদিও তারা ইমামের উপস্থিতিতে কুফরীর বাক্য উচ্চারণ করে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭৫৮)
পরিচ্ছেদঃ ৬. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - নিরাপত্তা (আশ্রয়) প্রদান
৩৯৮৩-[৭] ’আমর ইবনু শু’আয়ব তার পিতার মাধ্যমে তার দাদা হতে বর্ণনা করেন। একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর খুৎবায় বললেনঃ তোমরা জাহিলিয়্যাত যুগের সন্ধি বা কসমসমূহ রক্ষা করে চল। কেননা, ইসলাম চুক্তিকে আরো শক্তিশালী করে। আর ইসলাম কবূলের পর নতুন করে কোনো প্রকার চুক্তি করো না। (তিরমিযী)[1]
হাদীসটি হুসায়ন ইবনু যাক্ওয়ান-এর সানাদে ’আমর হতে বর্ণনা করেন। অতঃপর বলেন, হাদীসটি হাসান।
আর ’আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটি ’’সমগ্র মুসলিমের খুন (প্রাণ) এক সমান’’ কিসাস পর্বে বর্ণিত হয়েছে।
وَعَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ فِي خطْبَة: «أَوْفوا بِحلف الْجَاهِلِيَّة فَإِنَّهُ لَا يزِيد يَعْنِي الْإِسْلَامَ إِلَّا شِدَّةً وَلَا تُحْدِثُوا حَلِفًا فِي الإِسلامِ» . رَوَاهُ الترمذيُّ من طريقِ ابنِ ذَكْوَانَ عَنْ عَمْرٍو وَقَالَ: حَسَنٌ
وَذَكَرَ حَدِيثَ عليٍّ: «المسلمونَ تَتَكَافَأ» فِي «كتاب الْقصاص»
ব্যাখ্যা: (أَوْفُوْا بِحَلْفِ الْجَاهِلِيَّةِ) জাহিলী যুগে পারস্পারিক সহযোগিতার উপর শপথ চুক্তি বিদ্যমান ছিল, যা আল্লাহ তা‘আলার ‘‘তোমরা চুক্তিসমূহ পূর্ণ কর’’- (সূরা আল মায়িদাহ্ ৫ : ১); এ বাণীর দ্বারা জানা যায়। তবে তা আল্লাহ তা‘আলার অর্থাৎ- ‘‘আর তোমরা পুণ্য ও আল্লাহ ভীরুতার ব্যাপারে পরস্পর পরস্পরকে সহযোগিতা কর, পাপ ও সীমালঙ্ঘনতার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না’’- (সূরা আল মায়িদাহ্ ৫ : ২); এ বাণীর সাথে শর্তযুক্ত। «إِلَّا شِدَّةً» কেননা ইসলাম চুক্তি অপেক্ষাও শক্তিশালী। সুতরাং যে ব্যক্তি শক্তিশালী রক্ষাকারীকে আঁকড়িয়ে ধরবে সে দুর্বল রক্ষাকারী থেকে আলাদা থাকবে, অমুখাপেক্ষী থাকবে।
নিহায়াহ্ গ্রন্থে আছে, حَلْفِ-এর আসল হলো- পরস্পর সহযোগিতা ও একমতের উপর চুক্তি করা। অতঃপর জাহিলী যুগে গোত্রসমূহের মাঝে ফিতনা ও হত্যার উপর যে শপথ ছিল ঐ সম্পর্কে ইসলামে আল্লাহর রসূলের «لَا حَلِفَ فِي الْإِسْلَامِ» অর্থাৎ- ‘‘ইসলামে কোনো শপথ নেই’’ এ বাণীর মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছে।
পক্ষান্তরে জাহিলী যুগে যে শপথ নির্যাতিতকে সাহায্য করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক ঠিক রাখা এবং অনুরূপ ভালো কাজের উপর ছিল। ঐ শপথ সম্পর্কেই আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম «أَيُّمَا حَلِفٍ كَانَ فِي الْجَاهِلِيَّةِ لَمْ يَزِدْهُ الْإِسْلَامُ إِلَّا شِدَّةً» অর্থাৎ- ‘‘জাহিলী যুগে যে শপথ ছিল ইসলাম কেবল তার গুরুত্বকেই বৃদ্ধি করেছে’’ এ বাণী উপস্থাপন করেছেন।
(وَلَا تُحْدِثُوْا حَلِفًا فِى الْإِسْلَامِ) ‘‘নতুন করে কোনো সহযোগিতা চুক্তি করো না’’ অর্থাৎ- কেননা পারস্পারিক সহযোগিতা আবশ্যক হওয়ার ক্ষেত্রে ইসলাম যথেষ্ট।
ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ حَلِفًا শব্দটি অনির্দিষ্ট যা দু’টি দিকের সম্ভাবনা রাখছে, দু’টির একটি শব্দটি দ্বারা জাত বুঝানো উদ্দেশ্য। তখন (لَا تُحْدِثُوْا حَلِفًا) এর অর্থ হবে, তোমরা যে কোনো ধরনের শপথ করবে না। অপর দিকটি হলো- শ্রেণী বুঝানো উদ্দেশ্য।
আমি (মিরকাতুল মাফাতীহ প্রণেতা) বলবঃ দ্বিতীয় দিকটি স্পষ্ট। আর একে সমর্থন করছে মুযহির-এর উক্তি, অর্থাৎ- তোমরা যদি জাহিলী যুগে কতক কতককে সাহায্য করার এবং কতক কতক থেকে উত্তরাধিকারী হওয়ার শপথ করে থাক, অতঃপর যদি তোমরা ইসলাম গ্রহণ করে থাক, তাহলে তোমরা তা পূর্ণ করবে। কেননা ইসলাম তোমাদেরকে তা পূর্ণ করার ব্যাপারে উৎসাহিত করে, তবে তোমাদের কতক থেকে উত্তরাধিকারী হওয়ার ক্ষেত্রে ইসলামে নতুন করে চুক্তি করো না।
ইবনুল হুমাম বলেনঃ যখন কোনো ব্যক্তি কোনো স্বাধীন ব্যক্তিকে এবং কোনো মহিলা স্বাধীন মহিলাকে অথবা কাফিরকে, অথবা একটি দলকে অথবা দূর্গ বা শহরের অধিবাসীকে নিরাপত্তা দিবে তাদের নিরাপত্তাদান বিশুদ্ধ বলে বিবোচিত হবে। কোনো মুসলিম ব্যক্তির পক্ষে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা বৈধ হবে না। এ ব্যাপারে মূল হলো এ হাদীসটি। একে আবূ দাঊদ সংকলন করেছেন, যা ‘আমর বিন শু‘আয়ব তার পিতার মাধ্যমে তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন, তার দাদা বলেন, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
«الْمُسْلِمُونَ تَتَكَافَأُ دِمَاؤُهُمْ» তথা মুসলিমদের রক্ত পরস্পর সমান হবে।
অর্থাৎ- উচুশ্রেণীর ব্যক্তির দিয়াত নীচু শ্রেণীর ব্যক্তির দিয়াতের অপেক্ষা বেশি হবে না, তাদের সর্বাধিক নিম্নশ্রেণীর ব্যক্তি নিরাপত্তাদানের ক্ষেত্রে বিশ্বাসঘাতকতা করলে তা তাদের ওপর শ্রেণীর ব্যক্তির ওপরও বর্তাবে।
আর ইবনু মাজার শব্দ আর তাদের সর্বশেষ ব্যক্তি তাদের ওপর নিরাপত্তা দান করবে। এমতাবস্থায় তারা অন্যদের ওপর একটি হাত স্বরূপ, অর্থাৎ- তাদের সত্বা অন্যদের সহকারে ক্ষমতার দিক থেকে একটি যন্ত্র স্বরূপ, তাদের পারস্পারিক সহযোগিতার দিক থেকে একটি অঙ্গ স্বরূপ। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৬. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - নিরাপত্তা (আশ্রয়) প্রদান
৩৯৮৪-[৮] ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন ইবনু নাও্ওয়াহাহ্ ও ইবনু উসাল নামক দুই ব্যক্তি মুসায়লিমাহ্ কায্যাব-এর দূত হয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি যে আল্লাহর রসূল, তোমরা কি তা সাক্ষ্য দাও? তারা উভয়ে বলল, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুসায়লিমাহ্ আল্লাহর রসূল। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বরং আমি আল্লাহ ও তার রসূলের প্রতি ঈমান এনেছি। তারপর বললেন, যদি কোনো দূতকে হত্যা করা আমার বিধান থাকত, তাহলে অবশ্যই আমি তোমাদেরকে হত্যা করতাম। ’আবদুল্লাহ বলেন, তখন হতে এ বিধি-বিধানই প্রচলিত রয়েছে যে, কোনো দূতকে হত্যা করা যায় না। (আহমাদ)[1]
عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: جَاءَ ابْنُ النَّوَّاحَةِ وَابْنُ أُثَالٍ رَسُولَا مُسَيْلِمَةَ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ لَهُمَا: «أَتَشْهَدَانِ أَنِّي رَسُولُ اللَّهِ؟» فَقَالَا: نَشْهَدُ أَنَّ مُسَيْلِمَةَ رَسُولَ اللَّهِ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «آمَنْتُ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَلَوْ كُنْتُ قَاتِلًا رَسُولًا لَقَتَلْتُكُمَا» . قَالَ عَبْدُ اللَّهِ: فَمَضَتِ السُّنَّةُ أَنَّ الرَّسول لَا يُقتَلُ. رَوَاهُ أَحْمد
ব্যাখ্যা: (فَقَالَ لَهُمَا : أَتَشْهَدَانِ أَنِّىْ رَسُوْلُ اللّٰهِ؟) আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেন তাদের মুসলিম হওয়ার সম্ভাবনা সত্ত্বেও এর মাধ্যমে তাদেরকে ইসলামের দিকে দা‘ওয়াত দেয়ার ইচ্ছা করেছেন।
(نَشْهَدُ أَنَّ مُسَيْلِمَةَ رَسُوْلَ اللّٰهِ) এর দ্বারা তারা উভয়ে উদ্দেশ্য করেছে যে, তারা মুসায়লিমার অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত, অন্য কারো অনুসারী নয়। ত্বীবী বলেনঃ এটা এমন এক উত্তর যা প্রশ্নের অনুকূল নয়, প্রকৃত বিষয়ের অনুকূল নয়। কেননা আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর (أَتَشْهَدَانِ أَنِّىْ رَسُوْلُ اللّٰهِ؟) এ উক্তি দ্বারা উদ্দেশ্য করেছেন যে, আমি রিসালাতের দাবী করেছি এবং মু‘জিযাহ্ দ্বারা তা সত্যায়ন করেছি। সুতরাং এ ব্যাপারে তোমরা স্বীকৃতি দাও। অতঃপর তাদের উক্তি, «نَشْهَدُ إِلَخْ» এ অর্থকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, কেননা তারা মু‘জিযার মাধ্যমে রিসালাত প্রমাণিত হওয়াকে অস্বীকার করেছে, তাই তাদের উত্তর ছিল নির্বোধীয় নিয়ম-নীতির অন্তর্ভুক্ত।
(فَقَالَ النَّبِىُّ ﷺ : «اٰمَنْتُ بِاللّٰهِ وَرُسُلِه) বাহ্যিকভাবে বুঝা যাচ্ছে এ সম্বন্ধ দ্বারা জাত উদ্দেশ্য। অন্য কপিতে وَرَسُوْلِه উক্তি একে সমর্থন করছে। ত্বীবী বলেন, এতে পূর্বোক্ত অর্থের দিকে ইঙ্গিত রয়েছে। যেখানে তিনি বলেননি, آمَنْتُ بِاللّٰهِ وَبِي আমি আল্লাহ ও আমার প্রতি ঈমান এনেছি। বরং বলেছেন وَرَسُوْلِه অর্থাৎ- যে ব্যক্তি রিসালাতের দাবী করবে এবং মু‘জিযাহ্ দ্বারা তা প্রমাণিত করবে, সে যেই হোক না কেন। এটা লেখকের কথা, অর্থাৎ- অন্যথায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে পরে যে রিসালাতের দাবী করবে তার পক্ষে তা বৈধ হবে না। এ কারণে আমাদের কতিপয় (আহনাফ) বিদ্বান বলেছেন, ‘‘যে ব্যক্তি রিসালাতের দাবীকারীকে বলবে মু‘জিযাহ্ প্রকাশ করুন, নিঃসন্দেহে সে কুফরী করবে’’। অতঃপর ত্বীবী বলেনঃ তারা যেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক মুসায়লিমাকে রিসালাতে শরীক করার প্রত্যাশা করেছে। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং সকল রসূলদের প্রতি ঈমান আনার কথা বলে দূতদ্বয়ের আশাকে নাকচ করে দিয়েছেন। অর্থাৎ- কোনো মতেই তাদের দাবী রিসালাতের অর্থের অন্তর্ভুক্ত নয়। সুতরাং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা বিজ্ঞপূর্ণ নিয়ম-নীতির অন্তর্ভুক্ত। রিসালাতে মুসায়লিমার অংশ থাকার ব্যাপারে তাদের আশাবাদী হওয়া ভাবার স্থান রয়েছে, কেননা যদি তারা ওটা উদ্দেশ্য করত, তাহলে অবশ্যই তারা আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রিসালাতকেও স্বীকৃতি দিত। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞাত। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
গনীমাত হলো ঐ সম্পদ যা মুশরিকদের সাথে যুদ্ধের মাধ্যমে (তাদের নিকট থেকে) অর্জিত হয়। এটা নফল থেকে ’আম বা ব্যাপক, আর ফাই হলো গনীমাত থেকে ’আম্। কেননা আহলে শির্ক থেকে মুসলিমদের হাতে অর্জিত সকল সম্পদই গনীমাত। আবূ বকর আর্ রাযী (রহঃ) বলেন, গনীমাত ফাই, জিয্ইয়াহ্ও ফাই, সন্ধি চুক্তিবদ্ধের সম্পদও ফাই, জমির খিরাজ বা খাজনাও ফাই; কেননা এর প্রত্যেকটি মুশরিকদের নিকট থেকে আল্লাহ তা’আলা মুসলিমদের হাতে সমর্পণ করেছেন। ’আল্লামা ত্বীবী উল্লেখ করেছেন, ফুকাহাগণের অনেকের মতে মুশরিকদের নিকট থেকে যে মালই গ্রহণ বৈধ সেটাই ’ফাই’।
’আল্লামা ইবনুল হুমাম (রহঃ) বলেনঃ যুদ্ধের মাধ্যমে মুশরিকদের নিকট থেকে যা নেয়া হয় তাকে গনীমাত বলা হয়। আর যুদ্ধ ছাড়া যা অর্জিত হয় যেমন জিয্ইয়াহ্, খিরাজ ইত্যাদি তাকে ’ফাই’ বলা হয়।
৩৯৮৫-[১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমাদের পূর্বে কারো জন্য গনীমাতের মাল (ভোগ করা) জায়িয ছিল না। আল্লাহ তা’আলা আমাদের দুর্বলতা ও অক্ষমতা দেখে তা আমাদের জন্য জায়িয করে দিয়েছেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ قِسْمَةِ الْغَنَائِمِ وَالْغُلُوْلِ فِيْهَا
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «فَلَمْ تَحِلَّ الْغَنَائِمُ لِأَحَدٍ مِنْ قَبْلِنَا ذَلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ رَأَى ضعفنا وعجزنا فطيها لنا»
ব্যাখ্যা: এ হাদীসটি তৃতীয় অনুচ্ছেদে উল্লেখিত আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত ৪০৩০ নং হাদীসের অংশ বা সংক্ষিপ্ত রূপ। আরো প্রয়োজনীয় কিছু কথা এখানে আলোচিত হলো পূর্বকালের মু’মিনদের যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বা গনীমাতের মাল গ্রহণ করা বৈধ ছিল না। যুদ্ধে বিজয় হলে তারা গনীমাতের সম্পদগুলো একত্রিত করে রাখতো, অতঃপর আসমান থেকে আগুন এসে তা জ্বালিয়ে দিতো। এতে তারা বুঝে নিতো যে, তাদের যুদ্ধ আল্লাহ কবুল করেছেন। এ উম্মাত দুর্বল ও অক্ষম, তাই আল্লাহ তা‘আলা অনুগ্রহ করে তাদের জন্য গনীমাতের মাল বৈধ এবং পবিত্র করে দিয়েছেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩১২৪; শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৭৪৭)
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৩৯৮৬-[২] আবূ কাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুনায়ন অভিযানে আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে অংশগ্রহণ করলাম। যখন আমরা শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ছিলাম, তখন (যুদ্ধের প্রথম দিকে) মুসলিমদের বিশৃঙ্খলার দরুন পরাজয়ের লক্ষণ দেখা দিল। এমন সময় আমি দেখলাম, এক মুশরিক জনৈক মুসলিম সৈন্যের উপর চড়ে বসেছে, তৎক্ষণাৎ আমি পিছন থেকে তার গর্দানে তরবারি মেরে তার লৌহবর্ম কেটে ফেললাম। তখন সে আমাকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরল, আমি যেন তা হতে মৃত্যুর গন্ধ পেলাম। ক্ষণিক পরেই সে আমাকে ছেড়ে দিল।
এরপর আমি ’উমার ইবনুল খত্ত্বাব (রাঃ)-এর সাক্ষাৎ পেলাম এবং তাকে জিজ্ঞেস করলাম, লোকজনের (যুদ্ধের) অবস্থা কোন্ পর্যায়ে? তিনি বলেন, সবকিছু আল্লাহর হুকুম। অতঃপর মুসলিমগণ পুনরায় (বিজয় বেশে) ফিরে আসলেন। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক জায়গায় বসে ঘোষণা করলেন, আজ তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কাফিরদের মধ্যে যাকে হত্যা করেছে এবং ঐ হত্যার সাক্ষ্য-প্রমাণ রয়েছে, সেই উক্ত নিহত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সবকিছু পাবে। আবূ কাতাদাহ(রাঃ) বলেন, আমি দাঁড়িয়ে বললাম, কেউ কি আমার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে? এ কথাটি বলে আমি বসে পড়লাম।
অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্বের ন্যায় ঘোষণা করলেন, আর আমিও দাঁড়িয়ে বললাম, কেউ কি আমার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে? এ কথা বলে আমি আবারও বসে পড়লাম। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবারও পূর্বের ন্যায় ঘোষণা করলেন, আর আমি এবারও পূর্বের ন্যায় একই কথার পুনরাবৃত্তি করলাম। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবূ কাতাদাহ! তোমার কি হয়েছে (বারবার উঠছ এবং কি যেন বলে বসছ কেন)? তখন আমি ঘটনার আদ্যোপান্ত খুলে বললাম, এমন সময় জনৈক ব্যক্তি বলে উঠল, আবূ কাতাদাহ সত্য কথাই বলেছেন এবং সেই নিহত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সমস্ত মালামাল আমার আয়ত্বেই আছে, আপনি তাকে অন্য কিছুর বিনিময়ে সন্তুষ্ট করে দিন (আর আমিই তা ভোগ করব)।
এ কথা শুনে আবূ বকর সিদ্দীক বলে উঠলেন, আল্লাহর কসম! তা কক্ষনো হতে পারে না। আল্লাহর সিংহসমূহের একটি সিংহ যে আল্লাহ ও তার রসূলের পক্ষে যুদ্ধ করেছে, তাকে বঞ্চিত করে তার প্রাপ্য তথা নিহত ব্যক্তির পরিত্যক্ত মাল তোমাকে দেয়া হবে, এটা কক্ষনো হতে পারে না। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আবূ বকর যথার্থই বলেছেন। তুমি ঐ নিহত ব্যক্তির পরিত্যক্ত মাল আবূ কাতাদাহ (রাঃ)-কে দিয়ে দাও। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশে তখন সে সমুদয় মাল আমাকে দিয়ে দিল। আবূ কাতাদাহ বলেন, ঐ মাল বিক্রি করে আমি বানূ সালামার একটি খেজুরের বাগান ক্রয় করলাম। আর ইসলাম গ্রহণের পর এটাই আমার অর্জিত প্রথম সম্পত্তি। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ قِسْمَةِ الْغَنَائِمِ وَالْغُلُوْلِ فِيْهَا
وَعَن أبي قتادةَ قَالَ: خَرَجْنَا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَامَ حُنَيْنٍ فَلَمَّا الْتَقَيْنَا كَانَتْ لِلْمُسْلِمِينَ جَوْلَةٌ فَرَأَيْتُ رَجُلًا مِنَ الْمُشْرِكِينَ قَدْ عَلَا رَجُلًا مِنَ الْمُسْلِمِينَ فَضَرَبْتُهُ مِنْ وَرَائِهِ عَلَى حَبْلِ عَاتِقِهِ بِالسَّيْفِ فَقَطَعْتُ الدِّرْعَ وَأَقْبَلَ عَلَيَّ فَضَمَّنِي ضَمَّةً وَجَدْتُ مِنْهَا رِيحَ الْمَوْتِ ثُمَّ أَدْرَكَهُ الْمَوْتُ فَأَرْسَلَنِي فَلَحِقْتُ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ فَقُلْتُ: مَا بَالُ النَّاسِ؟ قَالَ: أَمْرُ اللَّهِ ثُمَّ رَجَعُوا وَجَلَسَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «مَنْ قَتَلَ قَتِيلًا لَهُ عَلَيْهِ بَيِّنَةٌ فَلَهُ سَلَبُهُ» فَقُلْتُ: مَنْ يَشْهَدُ لِي؟ ثُمَّ جَلَسْتُ ثُمَّ قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِثْلَهُ فَقُمْتُ فَقَالَ: «مَا لَكَ يَا أَبَا قَتَادَةَ؟» فَأَخْبَرْتُهُ فَقَالَ رَجُلٌ: صَدَقَ وَسَلَبُهُ عِنْدِي فَأَرْضِهِ مِنِّي فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ: لَا هَا اللَّهِ إِذاً لَا يعمدُ أَسَدٍ مِنْ أُسْدِ اللَّهِ يُقَاتِلُ عَنِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ فَيُعْطِيكَ سَلَبَهُ. فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «صَدَقَ فأعطه» فأعطانيه فاتبعت بِهِ مَخْرَفًا فِي بَنِي سَلِمَةَ فَإِنَّهُ لَأَوَّلُ مالٍ تأثَّلْتُه فِي الإِسلامِ
ব্যাখ্যা: হুনায়ন মক্কা ও ত্বায়িফের মাঝখানে একটি স্থান। ৮ম হিজরী সনে মক্কা বিজয়ের ১৯ দিন পরে ৬ই শাও্ওয়াল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুনায়নের উদ্দেশে রওনা হন। এ যুদ্ধে মুসলিমদের সৈন্য সংখ্যা ছিল ১২০০০। যুদ্ধের শুরুতে মুসলিমদের কিছুটা বিপর্যয় ঘটে, অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাদের চূড়ান্ত বিজয়ের মধ্য দিয়ে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটান।
جَوْلَةٌ শব্দের অর্থ هَزِيمَةٌ পরাজয় হওয়া। মুল্লা ‘আলী আল কারী (রহঃ) বলেনঃ الجَوْلَةٌ এর অর্থ হলো هَزِيمَةٌ قَلِيلَةٌ সামান্য পরাজয়, কিছুটা পরাজয়, পরাজয় পরাজয় ভাব হওয়া। الْجَوَلَانُ فِي الْحَرْبِ যুদ্ধের ময়দানে ঘূর্ণায়ন, যুদ্ধের ময়দানে নিজ অবস্থানস্থল থেকে সরে পড়া।
‘আল্লামা তূরিবিশতী (রহঃ) বলেনঃ এ যুদ্ধে প্রথম দিকে মুসলিমগণ ক্ষণিকের জন্য বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিলেন, এ কথাটি সাহাবীগণ هَزِيمَة ‘পরাজয় বরণ’ শব্দ দ্বারা প্রকাশ করা অপছন্দ করেছেন, তাই তারা جَوْلَةٌ শব্দে তা প্রকাশ করেছেন। কেননা এ শব্দটির অর্থও পরাজয় তবে তা স্থায়ী এবং দীর্ঘ সময়ব্যাপী নয়। বর্ণনাকারী আবূ কাতাদাহ (রহঃ)-এর কথা : ‘আমি তার লৌহবর্ম কেটে ফেললাম, অতঃপর সে আমার দিকে ফিরে আসলো এবং আমাকে এমনভাবে চেপে ধরলো যে, আমি মৃত্যুর গন্ধ পেলাম।’ এটি একটি কিনায়া শব্দ দ্বারা اسْتِعَارَةٌ করা হয়েছে, এখানে শব্দের রূপক অর্থ বা পরোক্ষ অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে; সুতরাং তার কথার অর্থ হলো : আমি মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম, আমার প্রাণ বের হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়ে গিয়েছিল। এরপর আমার আঘাতের কারণে সে যখন নিসেত্মজ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো, তখন আমাকে ছেড়ে দিল।
যুদ্ধের বিধান হলো, যে কোনো কাফিরকে হত্যা করবে, সে প্রমাণসাপেক্ষে নিহত ব্যক্তির সঙ্গে থাকা অস্ত্র-শস্ত্র ও অন্যান্য যাবতীয় সামগ্রীর অধিকারী হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ কাতাদাহ-এর জন্য একাধিকবার সাক্ষ্য চান, একজন তার সাক্ষ্য প্রদান করে বলেন, হে আল্লাহর রসূল! আবূ কাতাদাহ তাকে হত্যা করেছে, আর ঐ নিহত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সামগ্রী আমার কাছেই রয়েছে। আপনি আমার পক্ষ থেকে তাকে বুঝিয়ে অথবা কিছু দিয়ে সন্তুষ্ট করে দিন, এ সম্পদ আমিই ভোগ করি। আবূ বাকর বললেন, না তা হবে না। সে আল্লাহর সিংহ, সে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষে যুদ্ধ করেছে। সুতরাং তার হাতে নিহত ব্যক্তির সম্পদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাকে দিতে পারেন না। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আবূ বাকর ঠিকই বলেছেন। এরপর তিনি ঐ সম্পদ ফেরত দিলেন।
ইমাম নববী (রহঃ) বলেনঃ এ হাদীসের ভিত্তিতে ইমাম শাফি‘ঈ, লায়স প্রমুখ ইমাম ও ফাকীহ বলেন, নিহত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পদ পেতে হলে তার পক্ষে সাক্ষীর প্রয়োজন, নিজে নিজে হত্যার দাবী করলেই যথেষ্ট হবে না। কিন্তু ইমাম মালিক (রহঃ) বলেন, হত্যাকারীর একক দাবীর ভিত্তিতেই তাকে পরিত্যক্ত সম্পদ দেয়া হবে। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজনের কথার ভিত্তিতেই তাকে দিয়েছেন, তাকে শপথও করাননি। ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ) আরো বলেন, নিহত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পদের হকদার হত্যাকারী, এ হাদীস তারও দলীল।
ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) বলেনঃ ইমাম যদি তাকে নফল হিসেবে প্রদান করেন তবেই সে হকদার হবে অন্যথায় নয়। ‘আল্লামা নববী (রহঃ) বলেন, এ ব্যাপারে ফাকীহগণ মতবিরোধ করেছেন; ইমাম মালিক, আহমাদ, আওযা‘ঈ, সাওরী প্রমুখসহ আরো কতিপয় ইমাম ও ফাকীহ বলেন, সেনাদলের আমীর যুদ্ধের পূর্বে বলুন অথবা না বলুন হত্যাকারী নিহত ব্যক্তির সম্পদ পাবেন। তারা বলেন, এটা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শাশ্বত ফতোয়া এবং শারী‘আতের সুসাব্যস্ত বিধানের খবর। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘যে কাউকে হত্যা করবে তার জন্যই নিহতের পরিত্যক্ত সম্পদ।’’ পক্ষান্তরে ইমাম আবূ হানীফাহ্ ও শাফি‘ঈ (রহঃ) বলেনঃ সেনাদলের আমীর বা ইমামের পূর্বানুমতি ছাড়া হত্যাকারী নিহত ব্যক্তির সম্পদ পাবে না। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী হাঃ ৪৩২১; তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৫৬২; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭১৪)
[বর্তমানে ইসলামী যুদ্ধ তেমন একটা নেই বললেই চলে; উপরোক্ত রাষ্ট্রের বেতনভোগী সৈন্যরা যুদ্ধ করে থাকে, তারা এই গনীমাতের অংশ পাবে কিনা, এ নিয়ে অনেক কথা। সুতরাং এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা পরিহার করা হলো।] -সম্পাদক
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৩৯৮৭-[৩] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (মুজাহিদ) ব্যক্তি ও তার ঘোড়ার জন্য গনীমাতের মাল তিন ভাগে বণ্টন করেছেন। ব্যক্তির জন্য এক-তৃতীয়াংশ এবং ঘোড়ার জন্য দুই-তৃতীয়াংশ। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ قِسْمَةِ الْغَنَائِمِ وَالْغُلُوْلِ فِيْهَا
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَسْهَمَ لِلرَّجُلِ وَلِفَرَسِهِ ثَلَاثَةَ أَسْهُمٍ: سَهْمًا لَهُ وَسَهْمَيْنِ لِفَرَسِهِ
ব্যাখ্যা: ইমাম মুযহির বলেনঃ হাদীসের মূল ‘আরবী ইবারতে لَه শব্দের ‘লাম’ অক্ষরটি تَمْلِيك ‘মালিকানা’ এর অর্থ প্রদান করেছে। আর لِفَرَسِه এর ‘লাম’ বর্ণটি سَبب ‘কারণ’ এর অর্থ প্রদান করেছে। সুতরাং অধিক অংশ তার ঘোড়ার কারণে। মূল কথা ঘোড় সওয়ারী যোদ্ধা নিজের এবং ঘোড়ার অংশসহ মোট তিন অংশ পাবে, আর পদাতিক পাবে এক অংশ (তার নিজের)। অত্র হাদীসের ভিত্তিতে ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস সহ তাবি‘ঈ হাসান বাসরী, মুজাহিদ, ইবনু সীরীন, ‘উমার ইবনু ‘আবদুল আযীয, ফাকীহ ও ইমামদের মধ্যে ইমাম মালিক, শাফি‘ঈ, আহমাদ, ইসহক, আওযা‘ঈ, আবূ ইউসুফ, মুহাম্মাদ সহ বহু সংখ্যক ইমাম ও ফাকীহ এই মতই পোষণ করেন যে, ঘোড় সওয়ারের জন্য তিন ভাগ, পদাতিকের জন্য এক ভাগ। পক্ষান্তরে ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) বলেন, ঘোড় সওয়ারীর জন্য দুই ভাগ মাত্র। এক অংশ নিজের এক অংশ ঘোড়ার- এই মোট দুই অংশ। [এখানেও বিস্তারিত আলোচনা পরিহার করা হলো]
(মিরকাতুল মাফাতীহ; শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৭৬২; ফাতহুল বারী ৫ম খন্ড, হাঃ ২০৬৩; তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৫৫৪; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭৩০)
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৩৯৮৮-[৪] ইয়াযীদ ইবনু হুরমুয হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন (খারিজী নেতা) নাজদাতুল হারূরী ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট পত্র লিখে জানতে চাইল, যদি কোনো নারী বা গোলাম জিহাদে অংশগ্রহণ করে তারা গনীমাতের মালে অংশ পাবে কিনা? তখন ইবনু ’আব্বাস ইয়াযীদকে বললেন, তাকে লিখে দাও, তাদের কোনো নির্ধারিত অংশ নেই। তবে ইমাম তাদেরকে সামান্য কিছু মাল দিতে পারেন।
অপর এক বর্ণনায় আছে, ইবনু ’আব্বাস তাকে লিখে পাঠিয়েছেন যে, তুমি আমার কাছে জানতে চেয়েছ যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিহাদে নারীদেরকে সঙ্গে নিয়েছেন কিনা এবং তাদেরকে গনীমাতের মালের অংশ দিতেন কিনা? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নারীদেরকে সঙ্গে নিতেন এ উদ্দেশে যে, তারা অসুস্থ ও আহত মুজাহিদদের পরিচর্যা ও সেবা-শুশ্রূষা করবেন, এতে তাদেরকে গনীমাত হতে সামান্য কিছু দেয়া হতো, নিয়মিত অংশাধিকার দেননি। (মুসলিম)[1]
بَابُ قِسْمَةِ الْغَنَائِمِ وَالْغُلُوْلِ فِيْهَا
وَعَنْ يَزِيدَ بْنِ هُرْمُزَ قَالَ: كَتَبَ نَجْدَةُ الْحَرُورِيُّ إِلَى ابْنِ عَبَّاسٍ يَسْأَلُهُ عَنِ الْعَبْدِ وَالْمَرْأَة يحْضرَانِ لمغنم هلْ يُقسَمُ لَهما؟ فَقَالَ ليزيدَ: اكْتُبْ إِلَيْهِ أَنَّهُ لَيْسَ لَهُمَا سَهْمٌ إِلَّا أَنْ يُحْذَيَا. وَفِي رِوَايَةٍ: كَتَبَ إِلَيْهِ ابْنُ عَبَّاسٍ: إِنَّكَ كَتَبْتَ إِلَيَّ تَسْأَلُنِي: هَلْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَغْزُو بِالنِّسَاءِ؟ وَهَلْ كَانَ يَضْرِبُ لَهُنَّ بِسَهْمٍ؟ فَقَدْ كَانَ يَغْزُو بِهِنَّ يُدَاوِينَ الْمَرْضَى وَيُحْذَيْنَ مِنَ الْغَنِيمَةِ وَأَمَّا السَّهْمُ فَلَمْ يَضْرِبْ لَهُنَّ بِسَهْمٍ. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: নাজদাতুল হারুরী হলো (ইরাকের) খারিজী সম্প্রদায়ের সর্দার। হারূরী ইরাকের কুফা নগরীর সন্নিকটে একটি গ্রাম। এখানেই খারিজী ভ্রান্ত দলের উদ্ভব হয়। তারা খলীফাতুল মুসলিমীন ‘আলী -এর দল ত্যাগ করে ভিন্নদল ও মতবাদ কায়িম করে এবং এই হারূরী নামক স্থানে সমবেত হয়।
শিশু, নারী এবং দাস-দাসীরা যদি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে তাদের সৈনিকদের মতো নির্ধারিত হিস্যা বা অংশ নেই, তবে তারা رضخ (কিছু পরিমাণ সম্পদ) অনুদান পাবে। খারিজী সর্দার ইবনু ‘আব্বাসকে পত্র পাঠিয়ে জানতে চান যে, নারীরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারবে কিনা? যদি কোনো নারী ও কৃতদাস যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে তবে তাদের গনীমাতের কোনো অংশ আছে কিনা? ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস ইরাকের গভর্নর ইয়াযীদকে পত্র লিখে জানালেন যে, তুমি তাকে জানিয়ে দাও যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের সেবা শুশ্রুষা করার জন্য যুদ্ধে নিতেন, কিন্তু তাদের গনীমাতের নির্দিষ্ট কোনো অংশ দেয়া হতো না। (মিরকাতুল মাফাতীহ; শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৮২২ পৃঃ নং ১৬০; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭২৪)
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৩৯৮৯-[৫] সালামাহ্ ইবনুল আক্ওয়া’ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় গোলাম রবাহ-কে উট ইত্যাদির তত্ত্বাবধানে (মদীনার বাইরে) পাঠালেন, আমিও তার সাথে ছিলাম। ভোর হতে না হতেই আকস্মিক আক্রমণ করে (গাত্ফান গোত্রের অন্যতম দলনেতা) ’আব্দুর রহমান ফাযারী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উটগুলো লুট করে নিয়ে গেল। (সালামাহ্ বলেন) আমি একটি উচ্চ টিলার উপরে উঠে মদীনার দিকে মুখ করে তিনবার উচ্চস্বরে ’ইয়া সবাহাহ্’ (বিপদ সংকেত) বলে চিৎকার করলাম। অতঃপর আমি লুণ্ঠনকারী শত্রুদলের প্রতি তীর নিক্ষেপ করতে করতে তাদেরকে ধাওয়া করলাম। আর ছন্দ আবৃত্তি করতে থাকলাম- ’আমি আক্ওয়া’-এর স্বনামধন্য পুত্র, আজ মাতৃদুগ্ধ স্মরণের দিন’।
অবশেষে আমি তাদের প্রতি অবিরাম তীর নিক্ষেপ করতে করতে অগ্রসর হতে লাগলাম এবং লুণ্ঠিত উটগুলো আমার পশ্চাতে ফেলে রেখে পুনরায় তীর নিক্ষেপ করতে করতে তাদের পিছনে ছুটলাম। পরিশেষে (আমার আক্রমণে তারা অতিষ্ঠ হয়ে) শরীরের বোঝা লাঘবের নিমিত্তে ত্রিশটির অধিক চাদর, কম্বল ও ত্রিশটি বর্শা শরীর হতে ফেলে দ্রুত পালিয়ে গেল। অতঃপর আমি প্রতিটি চাদর কম্বল ও বর্শার উপরে পাথর চাপা দিয়ে এই চিহ্ন রেখে গেলাম যেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাথীরা এ কথা বুঝতে পারেন যে, এ সমস্ত জিনিসগুলো আমিই শত্রুদের নিকট হতে করায়ত্ব করেছি। এতক্ষণে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাথীদেরকে দেখতে পেলাম।
এমন সময়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘোড়সওয়ার আবূ কাতাদাহ ’আব্দুর রহমান ফাযারীকে সম্মুখে পেয়ে হত্যা করে ফেললেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উৎসাহের সাথে বললেন, আবূ কাতাদাহ হলো আমাদের ঘোড়সওয়ারীদের মধ্যে উত্তম, আর পদাতিকের মধ্যে সর্বোত্তম হলো সালামাহ্ ইবনুল আক্ওয়া’। সালামাহ্ বলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দু’-তৃতীয়াংশ দিলেন। এক অংশ অশ্বারোহীর এবং আরেক অংশ পদাতিকের। অতঃপর মদীনায় প্রত্যাবর্তনকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তার ’আযবা নামক উটের উপরে তার পিছনে বসিয়ে নিলেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ قِسْمَةِ الْغَنَائِمِ وَالْغُلُوْلِ فِيْهَا
وَعَنْ سَلَمَةَ بْنِ الْأَكْوَعِ قَالَ: بَعَثَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِظَهْرِهِ مَعَ رَبَاحٍ غُلَامِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَنَا مَعَهُ فَلَمَّا أَصْبَحْنَا إِذَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ الْفَزَارِيُّ قَدْ أَغَارَ عَلَى ظَهْرِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقُمْتُ عَلَى أَكَمَةٍ فَاسْتَقْبَلْتُ الْمَدِينَةَ فَنَادَيْتُ ثَلَاثًا يَا صَبَاحَاهْ ثُمَّ خَرَجْتُ فِي آثَارِ الْقَوْمِ أَرْمِيهِمْ بِالنَّبْلِ وَأَرْتَجِزُ وَأَقُولُ:
أَنَا ابْنُ الْأَكْوَعْ وَالْيَوْمُ يَوْمُ الرُّضَّعْ
فَمَا زِلْتُ أَرْمِيهِمْ وَأَعْقِرُ بِهِمْ حَتَّى مَا خلَقَ اللَّهُ مِنْ بَعِيرٍ مِنْ ظَهْرِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَّا خَلَّفْتُهُ وَرَاءَ ظَهْرِي ثُمَّ اتَّبَعْتُهُمْ أَرْمِيهِمْ حَتَّى أَلْقَوْا أَكْثَرَ مِنْ ثَلَاثِينَ بُرْدَةً وَثَلَاثِينَ رُمْحًا يَسْتَخِفُّونَ وَلَا يَطْرَحُونَ شَيْئًا إِلَّا جَعَلْتُ عَلَيْهِ آرَامًا مِنَ الْحِجَارَةِ يَعْرِفُهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَصْحَابُهُ حَتَّى رَأَيْتُ فَوَارِسَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَحِقَ أَبُو قَتَادَةَ فَارِسُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِعَبْدِ الرَّحْمَنِ فَقَتَلَهُ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «خَيْرُ فُرْسَانِنَا الْيَوْمَ أَبُو قَتَادَةَ وَخَيْرُ رَجَّالَتِنَا سَلَمَةُ» . قَالَ: ثُمَّ أَعْطَانِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَهْمَيْنِ: سَهْمَ الْفَارِسِ وَسَهْمَ الرَّاجِلِ فَجَمَعَهُمَا إِلَيَّ جَمِيعًا ثُمَّ أَرْدَفَنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَرَاءَهُ عَلَى الْعَضْبَاءِ رَاجِعَيْنِ إِلَى الْمَدِينَةِ. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: অত্র হাদীসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো সালামাহ্ ইবনুল আক্ওয়া‘-কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’ভাবে অংশ দিয়েছেন, অশ্বারোহী হিসেবে এবং পদাতিক হিসেবে। যদিও সে পদাতিক ছিল, কেননা গনীমাত অর্জনে তার ভূমিকা ছিল মুখ্য। (মিরকাতুল মাফাতীহ ৭ম খন্ড, ৫০৪ পৃঃ)
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৩৯৯০-[৬] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধে প্রেরিত কোনো কোনো সৈন্যকে বিশেষভাবে সাধারণ সৈন্যদের অংশ অপেক্ষা নফল স্বরূপ অতিরিক্ত কিছু গনীমাত দিতেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ قِسْمَةِ الْغَنَائِمِ وَالْغُلُوْلِ فِيْهَا
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يُنَفِّلُ بَعْضَ مَنْ يَبْعَثُ مِنَ السَّرَايَا لِأَنْفُسِهِمْ خَاصَّةً سِوَى قِسْمَةِ عَامَّةِ الْجَيْشِ
ব্যাখ্যা: গনীমাত বণ্টনের সাধারণ নীতির পরও ইমাম বা আমীর কোনো সৈনিককে নফল হিসেবে অতিরিক্ত সম্পদ দিতে পারেন। এরূপ দেয়ার প্রমাণে অত্র হাদীসটি দলীল হতে পারে। (বিস্তারিত দেখুন- ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩১৩৫; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭৪৩)
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৩৯৯১-[৭] উক্ত রাবী [ইবনু ’উমার (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গনীমাতের পঞ্চমাংশ হতে আমরা যা পেতাম তা ব্যতীত নফল স্বরূপ অতিরিক্ত কিছু আমাদের দিয়েছেন। সেই নফল থেকে আমার ভাগে একটি ’শারিফ’ পড়েছিল। ’শারিফ’ বলা হয় বয়স্ক বড় উটকে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ قِسْمَةِ الْغَنَائِمِ وَالْغُلُوْلِ فِيْهَا
وَعَنْهُ قَالَ: نَفَّلَنَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم نَفَلًا سِوَى نَصِيبِنَا مِنَ الْخُمُسِ فَأَصَابَنِي شَارِفٌ والشارف: المسن الْكَبِير
ব্যাখ্যা: নফল বলা হয় ‘ফরয’ বা নির্ধারিত অংশের অতিরিক্তকে। এখানে যুদ্ধলব্ধ সম্পদে সৈনিকদের নির্ধারিত হিস্যা বা অংশের অতিরিক্ত সম্পদকে নফল বলা হয়েছে।
সৈনিকদের প্রাপ্য নির্ধারিত অংশ পাওয়ার পরও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নফল বা অতিরিক্ত কিছু অংশ দিতেন। নির্ধারিত অংশের অতিরিক্ত কিছু দেয়া আমির বা ইমামের ইখতিয়ার, তিনি যাকে উপযুক্ত মনে করবেন যতটুকু মনে করবেন দিবেন। এটা সৈনিকের অধিকার নয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ; শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৭৫০)
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৩৯৯২-[৮] উক্ত রাবী [ইবনু ’উমার (রাঃ)] হতে বর্ণিত। একদিন তাঁর (ইবনু ’উমার -এর) একটি ঘোড়া কোথাও চলে গেলে শত্রুরা (রোমকরা) তাকে ধরে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে মুসলিম বাহিনী ঐ শত্রুদেরকে পরাজিত করে, অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময়ে সেই হারানো ঘোড়াটি ইবনু ’উমার (রাঃ)-কে ফেরত দেয়া হয়।
অপর এক বর্ণনায় আছে, তাঁর (ইবনু ’উমার (রাঃ)-এর) একটি গোলাম পালিয়ে রোম দেশে চলে যায়। পরবর্তীতে মুসলিমরা তাদের বিরুদ্ধে বিজয়ী হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময়ের পরে খালিদ ইবনু ওয়ালীদ উক্ত গোলাম ইবনু ’উমার (রাঃ)-কে ফিরিয়ে দেন। (বুখারী)[1]
بَابُ قِسْمَةِ الْغَنَائِمِ وَالْغُلُوْلِ فِيْهَا
وَعَنْهُ قَالَ: ذَهَبَتْ فَرَسٌ لَهُ فَأَخَذَهَا الْعَدُوُّ فَظَهَرَ عَلَيْهِمُ الْمُسْلِمُونَ فَرُدَّ عَلَيْهِ فِي زَمَنِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. وَفِي رِوَايَةٍ: أَبَقَ عَبْدٌ لَهُ فَلَحِقَ بِالرُّومِ فَظَهَرَ عَلَيْهِمُ الْمُسْلِمُونَ فَرَدَّ عَلَيْهِ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ بَعْدَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ
ব্যাখ্যা: ইবনু মালিক (রহ) বলেনঃ পলাতক গোলামের কেউ মালিক হবে না, কেউ যদি তাকে পায় অথবা বন্দী করে তবে তার কর্তব্য হলো মালিককে ফেরত দেয়া। বিজিত এলাকায় তাকে গনীমাত হিসেবে পেলে গনীমাতের সম্পদ হিসেবে তা বণ্টন হবে না বরং মালিক ফেরত পাবে। যেমনটি ইবনু ‘উমারকে ফেরত দেয়া হয়েছিল।
ইবনুল হুমাম (রহঃ) বলেনঃ কোনো মুসলিম অথবা যিম্মির মুসলিম গোলাম যদি পালিয়ে দারুল হার্বে প্রবেশ করে, আর তারা এটাকে ধরে নেয়, তবে ইমাম আবূ হানীফার মতে তারা এর মালিক হবে না, কিন্তু আবূ ইউসুফ ও মুহাম্মাদ (রহঃ)-এর মতে তারা এর মালিক হবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩০৬৭)
* গোলামের প্রচলন বর্তমানে নেই, তাই বিস্তারিত ব্যাখ্যা বর্জন করা হলো। (সম্পাদক)
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৩৯৯৩-[৯] জুবায়র ইবনু মুত্ব’ইম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি ও ’উসমান ইবনু ’আফফান (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গিয়ে বললাম, আপনি খায়বারের পঞ্চমাংশ হতে বানী মুত্ত্বালিবকে (স্বীয় আপনজন হিসেবে) মাল দিলেন, কিন্তু আমাদেরকে (বানী নাওফাল ও ’আব্দ শামস্-কে) বঞ্চিত করলেন। অথচ আমরা ও তারা আপনার নিকট একই মান-মর্যাদার অধিকারী। উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, অবশ্যই বানী হাশিম ও বানী মুত্ত্বালিব এক ও অভিন্ন। বর্ণনাকারী (জুবায়র) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বানী ’আব্দ শামস্ ও বানী নাওফাল-কে তা হতে কিছু দেননি। (বুখারী)[1]
بَابُ قِسْمَةِ الْغَنَائِمِ وَالْغُلُوْلِ فِيْهَا
وَعَن جُبيرِ بن مُطعمٍ قَالَ: مَشَيْتُ أَنَا وَعُثْمَانُ بْنُ عَفَّانَ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقُلْنَا: أَعْطَيْتَ بَنِي الْمُطَّلِبِ مِنْ خُمُسِ خَيْبَرَ وَتَرَكْتَنَا وَنَحْنُ بِمَنْزِلَةٍ وَاحِدَةٍ مِنْكَ؟ فَقَالَ: «إِنَّمَا بَنُو هَاشِمٍ وَبَنُو المطلبِ وَاحِدٌ» . قَالَ جُبَيْرٌ: وَلَمْ يَقْسِمِ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِبَنِي عَبْدِ شَمْسٍ وَبَنِي نوفلٍ شَيْئا. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: জুবায়র ইবনু মুত্ব‘ইম সম্ভ্রান্ত কুরায়শ বংশের লোক ছিলেন! তার উপনাম ছিল আবূ মুহাম্মাদ আল্ কারশী আন্ নাওফালী। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বারের গনীমাত থেকে সাহাবীদের প্রচুর সম্পদ প্রদান করেন। বানী মুত্ত্বালিবদের খুমুস (এক-পঞ্চমাংশত) থেকে সম্পদ প্রদান করলে জুবায়র ইবনু মুত্ব‘ইম এবং ‘উসমান বললেন, হে আল্লাহর রসূল! বংশ মর্যাদার দিক থেকে আমরা তো আপনার নিকট বানী মুত্ত্বালিব-এর সাথে একই অবস্থানে, আপনি বানী মুত্ত্বালিব-কে খুমুস থেকে সম্পদ দিলেন আর আমাদের বাদ দিলেন? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, বানু হাশিম এবং বানী মুত্ত্বালিব একই, এই বলে তিনি এক হাতের অঙ্গুলি অন্য হাতের অঙ্গুলির মধ্যে প্রবেশ করালেন।
হাশিম, মুত্ত্বালিব, ‘আব্দ শামস্ ও নাওফাল- এ চারজনই ‘আব্দ মানাফ-এর পুত্র। জুবায়র নাওফাল-এর বংশধর, ‘উসমান ‘আব্দে শামস্-এর বংশধর, আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বানু হাশিম-এর বংশধর। ‘আব্দে মানাফ হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চতুর্থ পর্যায়ের দাদা। সুতরাং সকলেই মূলে এক বংশ। ইসলামের প্রাথমিককালে কুরায়শগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খানদান বানী হাশিম-এর বিরুদ্ধে একত্র হয়ে শি‘আবে আবী ত্বালিব নামক স্থানে অন্তরীণ করে রাখে। এ সময় বানু মুত্ত্বালিব তাদের প্রতি দয়াপ্রদর্শন করেন এবং তাদের দুর্দশায় এগিয়ে আসেন। বানী নাওফাল ও বানী ‘আব্দ শামস্ মানাফ-এর বংশধর হলেও হাশিমী ও মুত্ত্বালিবীদের সাথে সহযোগিতা করেনি, তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত খান্দান দু’টিকে নিজের নিকটতম আত্মীয়দের মধ্যে ধরেননি এবং তাদের জন্য অংশ নির্ধারণ করেননি। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৩৯৯৪-[১০] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা যে কোনো জনবসতিতে (যুদ্ধবিগ্রহ ব্যতীত) আধিপত্য বিস্তার কর, সেখানের সম্পদে সকলের সাথে তোমাদের অংশের অধিকার রয়েছে। আর যে জনবসতির অধিবাসীগণ আল্লাহ ও তার রসূলের অবাধ্য হয়, তখন তোমরা যুদ্ধের মাধ্যমে তা জয়ী হও। আর সেখানের সম্পদে আল্লাহ ও তার রসূলের এক-পঞ্চমাংশ রয়েছে এবং অবশিষ্ট তোমাদেরই জন্য। (মুসলিম)[1]
بَابُ قِسْمَةِ الْغَنَائِمِ وَالْغُلُوْلِ فِيْهَا
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَيُّمَا قَرْيَةٍ أَتَيْتُمُوهَا وأقمتمْ فِيهَا فَسَهْمُكُمْ فِيهَا وَأَيُّمَا قَرْيَةٍ عَصَتِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَإِنَّ خُمُسَهَا لِلَّهِ وَلِرَسُولِهِ ثُمَّ هِيَ لَكُمْ» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: সে সমস্ত এলাকার অমুসলিম মুসলিম বাহিনীর সাথে যুদ্ধ না করে আত্মসমর্পণ করবে এবং বশ্যতা স্বীকার করে কোনো সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ হবে তাদের সম্পদ হলো ফাই, সকলের তাতে হক রয়েছে। পক্ষান্তরে যুদ্ধের মাধ্যমে পদানত অমুসলিম এলাকা থেকে প্রাপ্ত সম্পদ হলো গনীমাত; এর এক-পঞ্চমাংশত আল্লাহ ও তার রসূলের জন্য, অবশিষ্ট সম্পদ কেবলমাত্র উক্ত অভিযানে অংশগ্রহণকারী সৈনিকদের মধ্যেই বণ্টিত হবে। অবশ্য ইমাম শাফি‘ঈ বিনা যুদ্ধে প্রাপ্ত সম্পদ ‘ফাই’ এর মধ্যেও খুমুস নির্ধারণের পক্ষপাতি। (মিরকাতুল মাফাতীহ; শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৭৫৬; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ৩০৩৪)
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৩৯৯৫-[১১] খাওলাহ্ আল আনসারিয়্যাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ এমন কিছু লোক রয়েছে যারা আল্লাহ প্রদত্ত মাল অন্যায়ভাবে গ্রাস করতে চায়! জেনে রাখ, এ শ্রেণীর লোকেদের জন্য কিয়ামতের দিন জাহান্নামের আগুন অবধারিত রয়েছে। (বুখারী)[1]
بَابُ قِسْمَةِ الْغَنَائِمِ وَالْغُلُوْلِ فِيْهَا
وَعَن خوْلَةَ الْأَنْصَارِيَّةِ قَالَتْ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «إِنَّ رِجَالًا يَتَخَوَّضُونَ فِي مَالِ اللَّهِ بِغَيْرِ حَقٍّ فَلَهُمُ النَّارُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» . رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: (مَالِ اللّٰهِ) ‘আল্লাহর মাল’ বলতে গনীমাতের মাল, ‘ফাই’-এর মাল এবং যাকাতের মাল।
(يَتَخَوَّضُوْنَ) এর অর্থ তারা অনধিকার প্রবেশ করে, অনধিকার চর্চা করে ইত্যাদি। উদ্দেশ্য হলো গনীমাতের মালের উপর অনাধিকার চর্চা করা এবং তা খরচ করা।
তাদের জন্য জাহান্নামের আগুন। যদি তারা এটাকে হালাল মনে করে খরচ করে থাকে তবে তারা চির জাহান্নামী। আর যদি তা না করে তবে আল্লাহর ইচ্ছা মোতাবিক নির্দিষ্ট দিন পর্যন্ত জাহান্নাম ভোগ করবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৩৯৯৬-[১২] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে দাঁড়িয়ে গনীমাত খিয়ানাত করা যে, মারাত্মক অপরাধ এবং তার পরিণাম ফল যে, খুব ভয়াবহ- এ সম্পর্কে নাসীহাত করার পর সতর্ক বাণী উচ্চারণ করে বলেন, কিয়ামতের দিন আমি যেন তোমাদের কাউকেও এ অবস্থায় দেখতে না পাই, সে স্বীয় কাঁধের উপর চিৎকাররত একটি উটসহ উপস্থিত হয়ে বলতে থাকবে, হে আল্লাহর রসূল! আমাকে রক্ষা করুন! আর আমি বলব, আজ আমার কিছু করার নেই। আমি তো আল্লাহর বিধান আগেই (দুনিয়াতে) জানিয়ে দিয়েছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরো বললেন, আমি তোমাদের কাউকে কিয়ামতের দিন এ অবস্থায় দেখতে না পাই যে, সে স্বীয় কাঁধের উপর চিৎকাররত একটি বকরী বহন করে আসবে, আর আমাকে বলবে, হে আল্লাহর রসূল! আমাকে রক্ষা করুন।
আমি বলব, আমার কিছু করার নেই। আমি তো আল্লাহর বিধান আগেই জানিয়ে দিয়েছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরো বললেন, আমি তোমাদের কাউকে কিয়ামতের দিন এ অবস্থায় দেখতে না পাই যে, সে স্বীয় কাঁধের উপর চিৎকাররত একটি মানুষকে বহন করে আসবে, আর আমাকে বলবে, হে আল্লাহর রসূল! আমাকে রক্ষা করুন। আমি বলব, আমার কিছু করার নেই। আমি তো আল্লাহর বিধান আগেই জানিয়ে দিয়েছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরো বললেন, আমি তোমাদের কাউকে কিয়ামতের দিন এ অবস্থায় দেখতে না পাই যে, সে স্বীয় কাঁধের উপর এলোমেলো বিশিষ্ট কাপড়-চোপড় বহন করে আসবে, আর আমাকে বলবে, হে আল্লাহর রসূল! আমাকে রক্ষা করুন।
আমি বলব, আমার কিছু করার নেই। আমি তো আল্লাহর বিধান আগেই জানিয়ে দিয়েছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরো বললেন, আমি তোমাদের কাউকে কিয়ামতের দিন এ অবস্থায় দেখতে না পাই যে, সে স্বীয় কাঁধের উপর জড়ো সম্পদ বহন করে আসবে, আর আমাকে বলবে, হে আল্লাহর রসূল! আমাকে রক্ষা করুন। আমি বলব, আমার কিছু করার নেই। আমি তো আল্লাহর বিধান আগেই জানিয়ে দিয়েছি। (বুখারী, মুসলিম; তবে শব্দবিন্যাস মুসলিম-এর, আর এটাই বিস্তৃত ও পূর্ণাঙ্গ হাদীস)[1]
بَابُ قِسْمَةِ الْغَنَائِمِ وَالْغُلُوْلِ فِيْهَا
وَعَن أبي هُرَيْرَة قَالَ: قَامَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ذَاتَ يَوْمٍ فَذَكَرَ الْغُلُولَ فَعَظَّمَهُ وَعَظَّمَ أَمْرَهُ ثُمَّ قَالَ: لَا أُلْفِيَنَّ أَحَدَكُمْ يَجِيءُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى رَقَبَتِهِ بَعِيرٌ لَهُ رُغَاءٌ يَقُولُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَغِثْنِي فَأَقُولُ: لَا أَمْلِكُ لَكَ شَيْئًا قَدْ أَبْلَغْتُكَ. لَا أُلْفِيَنَّ أَحَدَكُمْ يَجِيءُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى رَقَبَتِهِ فُرْسٌ لَهُ حَمْحَمَةٌ فَيَقُولُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَغِثْنِي فَأَقُولُ: لَا أَمْلِكُ لَكَ شَيْئًا قَدْ أَبْلَغْتُكَ لَا أُلْفِيَنَّ أَحَدَكُمْ يَجِيءُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى رَقَبَتِهِ شَاةٌ لَهَا ثُغَاءٌ يَقُولُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَغِثْنِي فَأَقُولُ: لَا أَمْلِكُ لَكَ شَيْئًا قَدْ أَبْلَغْتُكَ لَا أُلْفِيَنَّ أَحَدَكُمْ يَجِيءُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى رَقَبَتِهِ نَفْسٌ لَهَا صِيَاحٌ فَيَقُولُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَغِثْنِي فَأَقُولُ: لَا أَمْلِكُ لَكَ شَيْئًا قَدْ أَبْلَغْتُكَ لَا أُلْفِيَنَّ أَحَدَكُمْ يَجِيءُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى رَقَبَتِهِ رِقَاعٌ تَخْفُقُ فَيَقُولُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَغِثْنِي فَأَقُولُ: لَا أَمْلِكُ لَكَ شَيْئًا قَدْ أَبْلَغْتُكَ لَا أُلْفِيَنَّ أَحَدَكُمْ يَجِيءُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى رَقَبَتِهِ صَامِتٌ فَيَقُولُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَغِثْنِي فَأَقُولُ: لَا أَمْلِكُ لَكَ شَيْئا قد أبلغتك . وَهَذَا لفظ مُسلم وَهُوَ أتم
ব্যাখ্যা: الْغُلُولَ ‘গুলূল’ শব্দের অর্থ الْخِيَانَةُ فِي الْغَنِيمَةِ গনীমাতের মাল খিয়ানাত করা, আত্মসাৎ করা, চুরি করা। কেউ কেউ বলেছেন, (يَتَخَوَّضُوْنَ) ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়, অর্থাৎ সকল চোরাই বা আত্মসাৎকৃত সম্পদই الْغُلُولَ। মোট কথা হারাম পন্থায় সংগৃহীত অর্থই গুলূল।
কিয়ামত দিবসে প্রত্যেকেই তার আত্মাসাৎকৃত বস্তু ঘাড়ে নিয়ে উঠবে। সেটি যদি কোনো প্রাণী হয় তাহলে বিকট চিৎকার করতে থাকবে, আর যদি অন্য কোনো জড় বস্তু হয় তবে সেটাও তার ঘাড়ে ভীষণভাবে চেপে বসবে, ফলে সে চিৎকার করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে সাহায্যপ্রার্থী হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবাইকে বলবেন, আমি আজ তোমাদের কিছুই করতে পারব না। আমি তো আল্লাহর বিধান পূর্বেই জানিয়ে দিয়েছি, অর্থাৎ আত্মসাতের পরিণতির কথা তোমাদেরকে পূর্বেই জানিয়ে দিয়েছি, তোমরা সে কথা কানে নাওনি, তাই আজ আমি তোমাদের পক্ষে কোনো সুপারিশ করতে পারব না। (মিরকাতুল মাফাতীহ ৭ম খন্ড, ৫১৬ পৃঃ)
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৩৯৯৭-[১৩] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি (বানী দুবার গোত্রীয়) মিদ্’আম নামক একটি গোলাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হাদিয়া স্বরূপ দেন। এক যুদ্ধে সে সওয়ারীর উপর হতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাওদা বা গদি নামাচ্ছিল। অকস্মাৎ কোথা থেকে একটি অজ্ঞাত তীর এসে তার গায়ে বিধঁল এবং এটাই তাকে হত্যা করে ফেলল; তখন লোকেরা বলে উঠল, তার জন্য জান্নাত মুবারক হোক। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কক্ষনো না। সেই মহান সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ। খায়বার যুদ্ধে গনীমাতের মাল হতে বণ্টন ব্যতিরেকে যে চাদরটি সে আত্মসাৎ করেছে, তা তার উপর অগ্নিরূপে দগ্ধ করবে। এ কথা শুনে এক ব্যক্তির জুতার একটি কিংবা দু’টি ফিতা যা অন্যের অগোচরে লুকিয়ে রেখেছিল, তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এনে পেশ করল। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এই একটি ফিতা বা দু’টি ফিতার কারণেও জাহান্নামের প্রজ্জ্বলিত আগুন হবে। (বুখারী, মুসলিম)[1]
بَابُ قِسْمَةِ الْغَنَائِمِ وَالْغُلُوْلِ فِيْهَا
وَعَنْهُ قَالَ: أَهْدَى رَجُلٌ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ غُلَامًا يُقَالُ لَهُ: مِدْعَمٌ فَبَيْنَمَا مِدْعَمٌ يَحُطُّ رَحْلًا لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسلم إِذْ أَصَابَهُ سهم عاثر فَقَتَلَهُ فَقَالَ النَّاسُ: هَنِيئًا لَهُ الْجَنَّةُ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «كَلَّا وَالَّذِي نَفسِي بِيَدِهِ إِن الثملة الَّتِي أَخَذَهَا يَوْمَ خَيْبَرَ مِنَ الْمَغَانِمِ لَمْ تُصِبْهَا الْمَقَاسِمُ لَتَشْتَعِلُ عَلَيْهِ نَارًا» . فَلَمَّا سَمِعَ ذَلِك النَّاس جَاءَ رجل بشرك أَوْ شِرَاكَيْنِ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «شِرَاكٌ مِنْ نَارٍ أَوْ شِرَاكَانِ من نارٍ»
ব্যাখ্যা: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুসলিম গোলাম মিদ্‘আম আল্লাহর রাস্তায় বের হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতরত অবস্থায় (শত্রুদের) তীরবিদ্ধ হয়ে শাহাদাৎ বরণ করেন। সাহাবীগণ তার মৃত্যুকে সৌভাগ্যের মৃত্যু মনে করেন এবং তার জন্য জান্নাত নির্ধারিত বলে উল্লেখ করেন। কিন্তু সে খায়বারের গনীমাতের মাল বণ্টনের আগেই সামান্য একখানা চাদর গ্রহণ করায় আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণের দাবী প্রত্যাখ্যান করে বলেন, আল্লাহর শপথ! কক্ষনো নয়, সে খায়বারের গনীমাত থেকে বণ্টন ছাড়াই যে চাদরখানা হস্তগত করেছে সেটা আগুন হয়ে তাকে দগ্ধ করবে।
অন্য বর্ণনায় রয়েছে, «إِنِّي رَأَيْتُهُ فِي النَّارِ» ‘আমি তাকে জাহান্নামে দেখছি’। সামান্য একখানা চাদর আত্মসাতের কারণে তার (আল্লাহর নাবীর) খিদমাত এবং (আল্লাহর রাস্তায় জীবন দিয়ে) শহীদ হওয়াও তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করতে পারেনি।
আত্মসাৎকৃত বস্তুটিই আগুন হবে অথবা ঐ আত্মসাৎকৃত বস্তুটি তার জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ১১শ খন্ড, হাঃ ৬৭০৭)
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৩৯৯৮-[১৪] ’আব্দুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কারকারাহ্ নামক জনৈক ব্যক্তি যুদ্ধে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আসবাবপত্র রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। সে (যুদ্ধে) নিহত হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে জাহান্নামী। এটা শুনে লোকেরা তার মাল-সামানের সন্ধান করতে গিয়ে দেখতে পেল যে, সে গনীমাতের মাল হতে একটি জুববা (পোশাক) খিয়ানাত করেছে। (বুখারী)[1]
بَابُ قِسْمَةِ الْغَنَائِمِ وَالْغُلُوْلِ فِيْهَا
وَعَن عبدِ الله بنِ عَمْروٍ قَالَ: كَانَ عَلَى ثَقَلِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَجُلٌ يُقَالُ لَهُ كَرْكَرَةُ فَمَاتَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «هُوَ فِي النَّارِ» فَذَهَبُوا يَنْظُرُونَ فَوَجَدُوا عَبَاءَةً قد غلها. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আসবাবপত্র রক্ষণাবেক্ষণকারী নিশ্চয় বিশস্ত ব্যক্তিই ছিলেন। সাহাবী তো বটেই, উপরন্ত তার খাদিম। তিনি গনীমাতের সম্পদ থেকে একটি ‘আবা অর্থাৎ জুববা, অথবা চাদর আত্মসাতের কারণে জাহান্নামী হয়েছেন! তাহলে বিশাল বিশাল সম্পদ আত্মসাৎকারী সাধারণ মানুষের কি উপায় হতে পারে? (সম্পাদক)
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৩৯৯৯-[১৫] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যুদ্ধ চলাকালে আমরা মধু ও আঙ্গুর ইত্যাদি পেতাম, কিন্তু তা বায়তুল মালে (সরকারী কোষাগারে) জমা না দিয়ে নিজেরা ভোগ করতাম। (বুখারী)[1]
بَابُ قِسْمَةِ الْغَنَائِمِ وَالْغُلُوْلِ فِيْهَا
وَعَن ابْن عمر قَالَ: كُنَّا نُصِيبُ فِي مَغَازِينَا الْعَسَلَ وَالْعِنَبَ فنأكله وَلَا نرفعُه رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: যুদ্ধের ময়দানে সৈনিকেরা খাদ্যদ্রব্য ফলমূল গনীমাত হিসেবে যা অর্জন করবে তা বায়তুল মালে জমা দানের পূর্বেই আমীরের অনুমতি ছাড়া খেলে তা কোনো পাপ হবে না। খাওয়ার পর অবশিষ্ট যা থাকে তা অবশ্যই বায়তুল মালে জমা দিতে হবে। সাহাবীগণ যুদ্ধের ময়দানে অর্জিত মধু, আঙ্গুর ইত্যাদি বণ্টনের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট জমা না দিয়েই খেতেন। ফুকাহাদের সর্বসম্মত মত হলো মুজাহিদগণ দারুল হার্বে অবস্থানকালে গনীমাতের সম্পদ ‘খাদ্যদ্রব্য, ফলমূল’ বায়তুল মালে জমা দানের পূর্বেই প্রয়োজন মতো খেয়ে নিতে পারবে। তবে ব্যক্তিগতভাবে জমা রাখা বা সংরক্ষণ করা অথবা বাড়ীতে নিয়ে যাওয়া যাবে না। (মিরকাতুল মাফাতীহ ৭ম খন্ড, ৫১৯ পৃঃ; ফাতহুল বারী ৬ষষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩১৫৪)
পরিচ্ছেদঃ ৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০০০-[১৬] ’আব্দুল্লাহ ইবনু মুগাফফাল (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, খায়বার যুদ্ধের দিন আমি একটি চর্বিভর্তি থলি পেয়ে উঠিয়ে নিলাম আর (মনে মনে) বলতে লাগলাম, আজ আমি এটা হতে অন্য কাউকেও ভাগ দেব না। এমন সময় পাশে তাকিয়ে দেখি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার দিকে চেয়ে মৃদু হাসছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
এ সম্পর্কে আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ আছে, ’’শাসনকর্তাদের (কর্মচারীদের) মজুরি’’ অধ্যায়ে।
بَابُ قِسْمَةِ الْغَنَائِمِ وَالْغُلُوْلِ فِيْهَا
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مُغَفَّلٍ قَالَ: أَصَبْتُ جِرَابًا مِنْ شَحْمٍ يَوْمَ خَيْبَرَ فَالْتَزَمْتُهُ فَقُلْتُ: لَا أُعْطِي الْيَوْمَ أَحَدًا مِنْ هَذَا شَيْئًا فَالْتَفَتُّ فَإِذَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يبتسم إِلَيّ. مُتَّفق عَلَيْهِ. وَذكر الحَدِيث أَبِي هُرَيْرَةَ «مَا أُعْطِيكُمْ» فِي بَابِ «رِزْقِ الْوُلَاة»
ব্যাখ্যা: ‘আবদুল্লাহ ইবনু মুগাফফাল ছিলেন একজন জলীলুল কাদ্র সাহাবী, আহলে সুফ্ফার অন্যতম সদস্য। ‘উমার দশজন সাহাবীকে বাসরায় শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন তিনি তাদের অন্যতম ছিলেন।
তিনি খায়বারের যুদ্ধে চর্বিভর্তি একটি থলি তুলে নিয়ে প্রকাশ্যে অথবা মনে মনে বলেন, এটা আমি নিয়ে নিবো, এ থেকে কাউকে কিছুই দেবো না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কথা শুনে মুচকি মুচকি হাসলেন এবং তাকে কিছুই বললেন না।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ তিনি ঐ দিনে থলির প্রতি এত বেশী মুহতাজ ছিলেন যে, সেটা ছাড়া তার চলতই না। তার এই অধিক প্রয়োজনীয়তার কথা বুঝেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিষেধ করেননি, বরং মৃদু হাসি দিয়েছেন।
ইবনুল মালিক (রহঃ) বলেনঃ এ হাদীস থেকে প্রমাণিত যে, ইসলামী যোদ্ধারা গনীমাতের মাল থেকে (খাদ্যদ্রব্য যা রয়েছে তা থেকে) প্রয়োজন পরিমাণ অর্থাৎ ক্ষুধা নিবারণ হয় এ পরিমাণ খাদ্য নিতে পারবে। অনুরূপ শরীরে মালিশের জন্য অথবা জ্বালানীর জন্য তৈল বা তৈল জাতীয় দ্রব্যও গ্রহণ করতে পারবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩১৫৩; শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৭৭২)
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০০১-[১৭] আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা আমাকে সমস্ত নবীগণের ওপর শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী করেছেন অথবা বলেন, আমার উম্মাতকে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী করেছেন অন্য সকল উম্মাতের ওপরে এবং আমাদের জন্য গনীমাতের মাল হালাল করেছেন। (তিরমিযী)[1]
عَنْ أَبِي أُمَامَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِنَّ اللَّهَ فَضَّلَنِي عَلَى الْأَنْبِيَاءِ أَوْ قَالَ: فَضَّلَ أُمَّتِي عَلَى الْأُمَمِ وأحلَّ لنا الْغَنَائِم . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সকল নাবী ও রসূলের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব মর্যাদা দান করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘আদম (আঃ) এবং তাঁর পরে যত নাবী ও রসূল রয়েছেন কিয়ামতের দিন তারা সকলেই আমার পতাকাতলে সমবেত হবেন।’’ তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সর্বপ্রথম জান্নাতের দরজা খুলবেন।
রাবী বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হয় তো এ কথাও বলেছেন, আমার উম্মাতকে সকল উম্মাতের ওপর মর্যাদা দেয়া হয়েছে। সেটা এভাবে যে, আল্লাহর বাণী: ‘‘তোমরাই হলো শ্রেষ্ঠ উম্মাত’’- (সূরা আ-লি ‘ইমরান ৩ : ১১০)। কেউ কেউ বলেছেন, এ উম্মাতের শ্রেষ্ঠত্ব (মুহাম্মাদ) শ্রেষ্ঠ রসূলের কারণে।
পূর্বে কোনো জাতির জন্য গনীমাতের মাল ভক্ষণ করা বৈধ ছিল না। উম্মাতে মুহাম্মাদীর জন্য এটা হালাল করা হয়েছে, এটা এ উম্মাতের বিশেষত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের কারণে হয়েছে।
পূর্বের এক হাদীসে উল্লেখ হয়েছে, আমাদের দুর্বলতা এবং অক্ষমতার কারণেই আল্লাহ তা‘আলা আমাদের জন্য গনীমাতের মাল বৈধ করে দিয়েছেন। উভয় হাদীসের দ্বন্দ্ব সমাধানে বলা হয়েছে, উম্মাতের শ্রেষ্ঠত্ব এবং বিশেষত্ব তাদের দুর্বলতা ও অক্ষমতার কারণেই, সুতরাং এ শ্রেষ্ঠত্বের কারণে গনীমাতের মালও গ্রহণ তার জন্য বৈধ করা হয়েছে। অতএব দুই বর্ণনায় কোনো বিরোধ নেই। (মিরকাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৫৫৩)
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০০২-[১৮] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেদিন তথা হুনায়ন-এর যুদ্ধের দিন ঘোষণা করেন, যে কেউ কোনো কাফিরকে হত্যা করবে সে নিহত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সমস্ত মালের অধিকারী হবে। (বর্ণনাকারী বলেন) আবূ ত্বলহাহ্ সেদিন একাই বিশজন কাফিরকে হত্যা করেছেন এবং তিনি তাদের সমস্ত মাল-সামানের অধিকারী হয়েছেন বা তাদের সমস্ত মাল গ্রহণ করেছেন। (দারিমী)[1]
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسلم: يَوْمئِذٍ يَوْمَ حُنَيْنٍ: «مَنْ قَتَلَ كَافِرًا فَلَهُ سَلَبُهُ» فَقَتَلَ أَبُو طَلْحَةَ يَوْمَئِذٍ عِشْرِينَ رَجُلًا وَأَخَذَ أسلابهم. رَوَاهُ الدَّارمِيّ
ব্যাখ্যা: আবূ ত্বলহাহ্ হলো আনাস (রাঃ)-এর মা উম্মু সুলায়ম-এর স্বামী। তিনি হুনায়নের যুদ্ধে বিশজন কাফিরকে হত্যা করেছিলেন, ফলে তিনি বিশজনের পরিত্যক্ত সম্পদই পেয়েছিলেন। এটা তার গনীমাতের অংশ ছাড়াই অর্জিত হয়েছিল। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭১৫)
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০০৩-[১৯] ’আওফ ইবনু মালিক আল আশজা’ঈ ও খালিদ ইবনু ওয়ালীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেনঃ হত্যাকৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সমস্ত মালের অধিকারী হবে হত্যাকারী মুজাহিদ এবং উক্ত মাল-সামান হতে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এক-পঞ্চমাংশ বের করেননি। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَوْفِ بْنِ مَالِكٍ الْأَشْجَعِيِّ وَخَالِدِ بْنِ الْوَلِيدِ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَضَى فِي السَّلَبِ لِلْقَاتِلِ. وَلَمْ يُخَمِّسِ السَلَب. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: যুদ্ধে শত্রুপক্ষ থেকে অর্জিত সম্পদই গনীমাত। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘোষণা ‘‘নিহত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পদ হত্যাকারী পাবে’’ মোতাবেক তিনি কোনো নিহত ব্যক্তির সম্পদকে (হত্যাকারীর হাতে সমর্পণ না করে) সাধারণ গনীমাতের মালের অন্তর্ভুক্ত করেননি, আর তা পঞ্চম অংশে ভাগ না করে সর্বসাকূল্য হত্যাকারীকে দিয়ে দিয়েছেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭১৮)
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০০৪-[২০] ’আব্দুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বদরের যুদ্ধের দিন আবূ জাহাল-এর তরবারি পুরস্কার স্বরূপ দিয়েছেন। বর্ণনাকারী বলেন, তিনিই (ইবনু মাস্’ঊদ) আবূ জাহাল-কে হত্যা করেছেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: نَفَّلَنِي رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ بَدْرٍ سَيْفَ أَبِي جَهْلٍ وَكَانَ قَتَلَهُ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: গনীমাতের সুনির্ধারিত অংশ ছাড়াই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ জাহাল-এর তরবারিখানা ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাস্‘ঊদ -কে প্রদান করেন। এটা তাকে দেন নফল বা অতিরিক্ত হিসেবে। বদরের যুদ্ধে দুই আনসারী ছেলে মা‘আয ও মু‘আওয়ায আবূ জাহিলকে আঘাত করে অশ্বপৃষ্ঠ থেকে ভূপাতিত করেন, অতঃপর ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ তার শিরোচ্ছেদ করেন। বিস্তারিত বিবরণ ৪০২৮ নং হাদীসে দেখুন। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭১৯)
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০০৫-[২১] আবুল লাহম-এর আযাদকৃত গোলাম ’উমায়র (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আমার মুনীবের সাথে খায়বার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম। আমার মালিকগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে আমার ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা করে অনুমতি নিয়েছেন এবং আমি যে গোলাম এটাও তাঁকে জানিয়েছেন। অতঃপর আমাকে মুজাহিদদের সঙ্গে থাকার নির্দেশ দিলেন। পরে আমাকে আমার তরবারি ঝুলিয়ে দেয়া হলো। কিন্তু আমার (শারীরিক গঠন খাটো হওয়ার কারণে) তরবারি হিঁচড়ে টেনে চলতাম। তিনি আমাকে ঘরের (তৈজসপত্র জাতীয়) কিছু মাল দেয়ার হুকুম করলেন। বর্ণনাকারী (’উমায়র ) বলেন, আমি ঝাড়-ফুঁকের মাধ্যমে কিছু চিকিৎসা করতাম এবং তা দ্বারা পাগল-মাতালের ঝাড়-ফুঁক করতাম। সুতরাং আমি ঝাড়-ফুঁকের সেই মন্ত্রগুলো (দু’আগুলো) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে পড়ে শুনালে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার কিছু বাদ দেয়ার আর কিয়দংশ পাঠের অনুমতি দিয়েছেন। (তিরমিযী ও আবূ দাঊদ; অবশ্য আবূ দাঊদে [বর্ণনা শেষ হয়েছে الْمَتَاعِ] শব্দের নিকট] সেখানে ’মন্ত্রের’ কথাটি উল্লেখ নেই। (তিরমিযী, আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عُمَيْرٍ مَوْلَى آبِي اللَّحْمِ قَالَ: شَهِدْتُ خَيْبَر مَعَ ساداتي فَكَلَّمُوا فِي رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَكَلَّمُوهُ أَنِّي مَمْلُوكٌ فَأَمَرَنِي فَقُلِّدْتُ سَيْفًا فَإِذَا أَنَا أَجُرُّهُ فَأَمَرَ لِي بِشَيْءٍ مِنْ خُرْثِيِّ الْمَتَاعِ وَعَرَضْتُ عَلَيْهِ رُقْيَةً كَنْتُ أَرْقِي بِهَا الْمَجَانِينَ فَأَمَرَنِي بِطَرْحِ بَعْضِهَا وَحَبْسِ بَعْضِهَا. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ إِلَّا أَنَّ رِوَايَتَهُ انتهتْ عِنْد قَوْله: الْمَتَاع
ব্যাখ্যা: কৃতদাস বা গোলাম যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করলে তার জন্য গনীমাতের নির্ধারিত হিস্যা বা অংশ নেই, তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কিছু দিতেন। আবূ লাহম-এর গোলাম ‘উমায়র-কেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বারের যুদ্ধলব্ধ মাল থেকে কিছু দিয়েছেন।
কুরআন-হাদীসের বাক্য দ্বারা ঝাড়-ফুঁক করা বৈধ। কুরআন ও সহীহ হাদীসের বাইরে বিকৃত অর্থ অথবা দুর্বোধ্য বাক্য দ্বারা ঝাড় ফুঁক করা বৈধ নয়।
‘উমায়র কিছু বাক্য দ্বারা জিনে ধরা পাগলকে ঝাড়-ফুঁক করে চিকিৎসা করতেন। ঐ বাক্যগুলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট পেশ করলে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপত্তিকর শব্দ বা বাক্যাংশ বাদ দিতে বলেছেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭২৭; তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৫৫৭)
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০০৬-[২২] মুজাম্মা’ ইবনু জারিয়াহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুদায়বিয়ার সন্ধিতে যেসব সাহাবী উপস্থিত ছিলেন, খায়বার যুদ্ধের মালে গনীমাত তাদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা ১৮ (আঠারো) ভাগে বণ্টন করেন। সৈন্য সংখ্যা ছিল পনেরশ’। তন্মধ্যে অশ্বারোহী ছিলেন তিনশত’। অতএব অশ্বারোহীদেরকে দু’ভাগে এবং পদাতিকগণকে একভাগ হিসেবে প্রদান করেন। (আবূ দাঊদ)[1]
ইমাম আবূ দাঊদ বলেনঃ ’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ)-এর এ হাদীসটি অধিক গ্রহণযোগ্য। এ হাদীস বর্ণনাকারী ভুলক্রমে অশ্বারোহী সৈন্যের সংখ্যা তিনশ’ বলেছেন, অথচ তারা ছিলেন মাত্র দু’শ।
وَعَن محمع بن جاريةَ قَالَ: قُسِمَتْ خَيْبَرُ عَلَى أَهْلِ الْحُدَيْبِيَةِ فَقَسَمَهَا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثَمَانِيَةَ عَشَرَ سَهْمًا وَكَانَ الْجَيْشُ أَلْفًا وَخَمْسَمِائَةٍ فِيهِمْ ثَلَاثُمِائَةِ فَارِسٍ فَأُعْطِيَ الْفَارِسُ سَهْمَيْنِ وَالرَّاجِلُ سَهْمًا رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَقَالَ: حَدِيثُ ابْنِ عُمَرَ أصح فَالْعَمَل عَلَيْهِ وَأَتَى الْوَهْمُ فِي حَدِيثِ مُجَمِّعٍ أَنَّهُ قَالَ: أَنَّهُ قَالَ: ثَلَاثُمِائَةِ فَارِسٍ وَإِنَّمَا كَانُوا مِائَتَيْ فَارس
ব্যাখ্যা: প্রথম অনুচ্ছেদে উল্লেখিত বুখারী-মুসলিমের সহীহ হাদীস ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার থেকে বর্ণিত হয়েছে (হাদীস নং ৩৯৮৭) অত্র হাদীসের খেলাফ। ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) ও হানাফীগণ ছাড়া সকলেই উক্ত সহীহ হাদীসের পক্ষে ঘোড় সওয়ারদের জন্য তিন ভাগ এবং পদাতিকদের এক ভাগ বা এক অংশ বলে মনে করেন।
মুজাম্মা‘ বিন জারিয়াহ্ কর্তৃক বর্ণিত অত্র হাদীসটি আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) ও তার অনুসারীদের পক্ষে প্রামাণ্য দলীল। কিন্তু হাদীসটি দুর্বল। ইমাম আবূ দাঊদ হাদীসটি বর্ণনা করে নিজেই বলেছেন, ‘‘ইবনু উমার-এর হাদীসটি অধিক সহীহ, আর অধিকাংশ ইমামের ‘আমলও তদনুযায়ী। পক্ষান্তরে মুজাম্মা‘-এর বর্ণিত হাদীসটির মধ্যে ভুল আছে, কেননা তিনি বলেছেন, অশ্বারোহী সৈন্য ছিলেন তিনশত, অথচ তারা ছিলেন মাত্র দুইশত। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭৩৩)
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০০৭-[২৩] হাবীব ইবনু মাসলামাহ্ আল ফিহরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কোনো এক যুদ্ধে উপস্থিত ছিলাম। যারা যাওয়ার পথে যুদ্ধ করে বিজয়ী হয়েছে, তাদেরকে গনীমাতের এক-চতুর্থাংশ এবং যারা ফেরার পথে যুদ্ধ করে, তাদেরকে এক-তৃতীয়াংশ নফল স্বরূপ প্রদান করেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن حبيب بن مسلَمةَ الفِهْريِّ قَالَ شَهِدْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نفل الرّبع فِي البدأة وَالثلث فِي الرجمة. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: এ হাদীসের ব্যাখ্যায় ইবনুল মালিক (রহঃ) বলেনঃ মুজাহিদরা অভিযানে বের হওয়ার পরে যদি কোনো অগ্রদলে মূলদল পৌঁছার আগেই শত্রু বাহিনীর মুখোমুখি হয়ে পড়ে এবং যুদ্ধে বিজয়ী হয় তাহলে তাদের জন্য গনীমাতের এক-চতুর্থাংশ রয়েছে (নফল বা অতিরিক্ত হিসেবে)। আর অন্য সকল সৈন্যের জন্য রয়েছে চার ভাগের তিন ভাগ, যাতে তারাও সাধারণ সৈনিক হিসেবে অংশ পাবে। আর যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে মূল সৈন্য দলের কোনো ক্ষুদ্র অংশ যদি শত্রুর মোকাবিলা করে বিজয় অর্জন করে তাহলে তারা গনীমাতের সাধারণ অংশের সাথে সাথে অতিরিক্ত কষ্টের কারণে অতিরিক্ত এক-তৃতীয়াংশ লাভ করবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ ৭ম খন্ড, ৫২৫ পৃঃ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭৪৬)
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০০৮-[২৪] উক্ত রাবী [হাবীব ইবনু মাসলামাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধলব্ধ মালের এক-পঞ্চমাংশ বের করার পর অবশিষ্ট এক-চতুর্থাংশ এবং যুদ্ধ হতে ফেরার সময় এক-পঞ্চমাংশ বের করার পর এক-তৃতীয়াংশ নফল স্বরূপ প্রদান করেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يُنَفِّلُ الرُّبُعَ بَعْدَ الْخُمُسِ وَالثُّلُثَ بَعْدَ الْخُمُسِ إِذَا قَفَلَ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যা: এ হাদীসটি পূর্বের হাদীসটির ব্যাখ্যা স্বরূপ, অর্থাৎ পূর্বদল ও পশ্চাৎদল যারা মূলবাহিনী ছাড়াই যুদ্ধে বিজয়ী হবে তারা গনীমাতের পঞ্চমাংশতের সাধারণ অংশের সাথে সাথে অতিরিক্ত হিসেবে আরো এক-চতুর্থাংশ এবং এক-তৃতীয়াংশ লাভ করবে। ইবনুল মালিকও এমনটিই বলেছেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ ৭ম খন্ড, ৫২৫ পৃঃ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭৪৬)
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০০৯-[২৫] আবুল জুওয়াইরিয়্যাহ্ আল জারমী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি মু’আবিয়াহ্ (রাঃ)-এর শাসনামলে রোমকদের সাথে যুদ্ধে স্বর্ণমুদ্রা ভর্তি লালবর্ণের একটি কলস লাভ করি। তখন আমাদের সেনাপতি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণের একজন বানী সুলায়ম গোত্রীয় মা’ন ইবনু ইয়াযীদ। অতএব আমি উক্ত মুদ্রার কলসটি তাঁর নিকট নিয়ে এলাম। তখন তিনি উক্ত মুদ্রাগুলো সমস্ত মুসলিমদের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন এবং তাদের প্রত্যেককে যে পরিমাণ দিলেন আমাকেও সে পরিমাণই দিলেন। অতঃপর বললেনঃ আমি যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এমনটি বলতে না শুনতাম যে, ’’খুমুস (এক-পঞ্চমাংশ) বের করার পরই নফল দিতে হয়, তবে আমি তোমাকে তা হতে অবশ্যই নফল স্বরূপ দিতাম’’। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ أَبِي الْجُوَيْرِيَّةِ الْجَرْمِيِّ قَالَ: أَصَبْتُ بِأَرْضِ الرُّومِ جَرَّةً حَمْرَاءَ فِيهَا دَنَانِيرُ فِي إِمْرَةِ مُعَاوِيَةَ وَعَلَيْنَا رَجُلٍ مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ بَنِي سُلَيْمٍ يُقَالُ لَهُ: مَعْنُ بْنُ يَزِيدَ فَأَتَيْتُهُ بِهَا فَقَسَمَهَا بَيْنَ الْمُسْلِمِينَ وَأَعْطَانِي مِنْهَا مِثْلَ مَا أَعْطَى رَجُلًا مِنْهُمْ ثُمَّ قَالَ: لَوْلَا أَنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «لَا نَفَلَ إِلَّا بَعْدَ الْخُمُسِ» لَأَعْطَيْتُكَ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে মা‘ন ইবনু ইয়াযীদ আবূ জুওয়াইরিয়্যাহ্ আল্ জারমী-কে অন্য সকলের মতো অংশ দিয়েছেন। যদিও তিনি এককভাবে উক্ত কলস পেয়েছেন। মা‘ন ইবনু ইয়াযীদ বণ্টনের পর বললেন যে, আমি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি ‘‘এক-পঞ্চমাংশতের পর নফল বা অতিরিক্ত হিসেবে দেয়া হয়’’ তথা- তিনি বুঝাতে চাইলেন নফল বা অতিরিক্ত পঞ্চমাংশত থেকে হয়ে থাকে, তন্মধ্যে চারটি অংশ যোদ্ধাদের মাঝে যথানিয়মে বণ্টিত হয়। আর বাকী এক অংশ থেকে ইমাম বা রাষ্ট্রপ্রধান চাইলে অতিরিক্তি হিসেবে কাউকে দিতে পারেন। আর তা হয়ে থাকে যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ। তবে যে সম্পদ ফাই হিসেবে অর্জিত হয় তাতে কোনো নফল থাকে না। তাই তো মা‘ন ইবনু ইয়াযীদ আবূ জুয়াইরিয়্যাহ্-কে ফাই হিসেবে অর্জিত সম্পদ সকলের মতো অংশ দিয়েছেন, অতিরিক্ত কিছুই দেননি।
আর আমাদের কতিপয় ব্যাখ্যাকার বলেন যে, হাদীসের বর্ণনাকারী মনে করেন, পাঁচ ভাগ করার পরে এক পঞ্চমাংশত থেকে নফল বা অতিরিক্ত হিসেবে দেয়া হয়ে থাকে। আর তা ইমামের ইখতিয়ারে থাকে। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭৫০)
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০১০-[২৬] আবূ মূসা আল আশ্’আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন খায়বার জয় করেছেন, তখন আমরা (হাবশাহ্ হতে) আগমন করেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) খায়বারের গনীমাত হতে আমাদেরকেও দিয়েছেন। অথবা (আবূ মূসা ) বলেছেনঃ উক্ত গনীমাত হতে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদেরকেও দিয়েছেন। তবে যারা খায়বার যুদ্ধে উপস্থিত ছিল না আমাদের ব্যতীত এমন আর কাউকেও গনীমাত হতে অংশ দেননি। অবশ্য যারা যুদ্ধের সময় তাঁর সাথে অংশগ্রহণ করেছিল শুধু তাদেরকে দিয়েছেন। এছাড়া অনুপস্থিতদের মধ্যে যারা আমাদের নৌকায় ছিলেন, অর্থাৎ- জা’ফার ইবনু আবূ ত্বালিব এবং তাঁর সহযোদ্ধা মুজাহিদদের সাথে গনীমাতের অংশ প্রদান করেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن أبي مُوسَى الأشعريِّ قَالَ: قَدِمْنَا فَوَافَقْنَا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حِينَ افْتَتَحَ خَيْبَرَ فَأَسْهَمَ لَنَا أَوْ قَالَ: فَأَعْطَانَا مِنْهَا وَمَا قَسَمَ لِأَحَدٍ غَابَ عَنْ فَتْحِ خَيْبَرَ مِنْهَا شَيْئًا إِلَّا لمَنْ شهِدَ معَه إِلَّا أَصْحَابَ سَفِينَتِنَا جَعْفَرًا وَأَصْحَابَهُ أَسْهَمَ لَهُمْ مَعَهم. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: খায়বার বিজয়ে যারা অংশগ্রহণ করেননি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের গনীমাতের অংশ প্রদান করেননি। তবে হাবাশাহ্ হিজরত থেকে সদ্য ফেরা দলটিকে অংশ প্রদান করা হয়েছিল। এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন জা‘ফার ইবনু আবূ ত্বালিব, বর্ণনাকারী আবূ মূসা আল আশ্‘আরীও তাদের একজন ছিলেন। তারা নৌকা যোগে লোহিত সাগর পারি দিয়ে মদীনায় পৌঁছলেন। এদেরকে আসহাবুস্ সাফীনাহ্ বলা হয়। তারা যখন ফিরে আসেন তখনই খায়বার বিজয় হচ্ছিল, কিন্তু যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার সুযোগ তাদের হয়নি। তথাপি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধাদের সাথে তাদেরও গনীমাতের অংশ প্রদান করেন।
মক্কায় কাফিরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে কতিপয় মুসলিম আল্লাহর রসূলের অনুমতিক্রমে আফ্রিকা মহাদেশের হাবাশায় হিজরত করেন। এদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর নির্দেশক্রমে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন এবং একটি ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়া পত্তন করেন। দীর্ঘদিন নির্বাসন জীবনের পর হাবাশায় হিজরতকারী দলটি যখন ইসলামের শৌর্যবীর্যের এবং একের পর এক বিজয়ের খবর পেলেন তখন তারা মদীনায় ফিরে এলেন। ঘটনাক্রমে এই সময়েই খায়বার বিজয় চলছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের আগমনে ভীষণ খুশী হয়ে পড়েন এবং (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে) খায়বার বিজয়ে অংশগ্রহণকারীদের সাথে তাদেরকেও গনীমাতের অংশ প্রদান করেন।
কাযী ‘ইয়ায (রহঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের গনীমাতের অংশ দেন এজন্য যে, তারা গনীমাতের উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব অর্জনের পূর্বেই সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। এটা ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ)-এর একটি মতও বটে। তিনি বলেন, কেউ যদি যুদ্ধ শেষে গনীমাত বণ্টনের পূর্বে শরীক হয় তাহলে সেও গনীমাতের অংশ পাবে। ইবনু ত্বীন (রহঃ) বলেছেন, যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈন্যদের অনুমতিক্রমেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের গনীমাত প্রদান করেছিলেন। ‘আল্লামা খত্ত্বাবী-এর মত হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিজের জন্য নির্ধারিত এক-পঞ্চমাংশত থেকে তাদের দিয়েছিলেন।
এটাও সম্ভব যে, সর্বসাকুল্য গনীমাত থেকে বণ্টন ছাড়াই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কিছু দিয়েছিলেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড হাঃ ২৭২২)
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০১১-[২৭] ইয়াযীদ ইবনু খালিদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জনৈক সাহাবী খায়বারের যুদ্ধের দিন মৃত্যুবরণ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এ সংবাদ পৌঁছলে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তোমরা তোমাদের সহযোদ্ধার জানাযা আদায় করে নাও। এ নির্দেশ শুনে উপস্থিত লোকজনের মুখমণ্ডল বিবর্ণ আকার ধারণ করল। এমতাবস্থায় তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তোমাদের এ সঙ্গী আল্লাহর পথে (গনীমাতের মাল) খিয়ানাত করেছে। (বর্ণনাকারী বলেন) অতঃপর আমরা তার আসবাবপত্র তল্লাশি করলাম, তখন তাতে ইয়াহূদীদের একটি হার পেলাম, যার মূল্য দুই দিরহামের মূল্যমানও ছিল না। (মালিক, আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
وَعَنْ يَزِيدَ بْنِ خَالِدٍ: أَنِّ رَجُلًا مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تُوُفِّيَ يَوْمَ خَيْبَرَ فَذَكَرُوا لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «صَلُّوا عَلَى صَاحِبِكُمْ» فَتَغَيَّرَتْ وُجُوهُ النَّاسِ لِذَلِكَ فَقَالَ: «إِنَّ صَاحِبَكُمْ غَلَّ فِي سَبِيلِ اللَّهِ» فَفَتَّشْنَا مَتَاعَهُ فَوَجَدْنَا خَرَزًا مِنْ خَرَزِ يَهُودَ لَا يُسَاوِي دِرْهَمَيْنِ. رَوَاهُ مَالك وَأَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: হাদীসে বর্ণিত মৃত ব্যক্তির নাম সঠিকভাবে জানা যায়নি। তার মৃত্যু সংবাদ যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানানো হলো তখন তিনি উপস্থিত ব্যক্তিদেরকে তার জানাযার সালাত আদায়ের জন্য নির্দেশ করলেন, নিজে জানাযা আদায় করলেন না। মূল কারণ না জেনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অস্বীকৃতিতে সাহাবীগণ ভীত হয়ে গেলো, ফলে তাদের চেহারা বিবর্ণ হয়ে উঠলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মানসিক অবস্থা উপলদ্ধি করতে পেরে বললেন, তোমাদের এ সাথী তো আল্লাহর রাস্তায় গনীমাতের মাল খিয়ানাত করেছে।
এই খিয়ানাতের কারণে তার জানাযার সালাত আদায় করতে আল্লাহর রসূল বিরত হয়েছিল। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭০৭)
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০১২-[২৮] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই গনীমাতের মাল লাভ করতেন তখন বিলাল (রাঃ)-কে সকলের উদ্দেশে ঘোষণা করার জন্য নির্দেশ করতেন, আর লোকেরা তাদের স্ব-স্ব গনীমাত নিয়ে জমা করতো। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সমস্ত মাল হতে (বায়তুল মালের) এক-পঞ্চমাংশ বের করতেন এবং অবশিষ্টগুলো লোকেদের মধ্যে বণ্টন করে দিতেন। একদিন এক ব্যক্তি খুমুস (এক-পঞ্চমাংশ) বের করার এবং সমস্ত মাল বণ্টন করে দেয়ার পর পশমের একটি লাগাম নিয়ে এসে বললঃ হে আল্লাহর রসূল! এটাও কি গনীমাতের মাল বলে বিবেচ্য হবে, যা আমি পেয়েছিলাম। তার কথা শুনে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেনঃ বিলাল যে ইতোঃপূর্বে তিনবার ঘোষণা করেছিল, তখন এটা আনলে না কেন? সে বিভিন্ন (দুর্বল) ওযর পেশ করল। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ যাও! তুমি এটা নিয়ে যাও, কিয়ামতের দিন এ রশি নিয়েই তুমি উপস্থিত হবে। আমি তোমার নিকট হতে এটা গ্রহণ করব না। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن عبدِ الله بنِ عَمْروٍ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا أَصَابَ غَنِيمَةً أَمَرَ بِلَالًا فَنَادَى فِي النَّاسِ فَيَجِيئُونَ بِغَنَائِمِهِمْ فَيُخَمِّسُهُ وَيُقَسِّمُهُ فَجَاءَ رَجُلٌ يَوْمًا بَعْدَ ذَلِكَ بِزِمَامٍ مِنْ شَعَرٍ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ هَذَا فِيمَا كُنَّا أَصَبْنَاهُ مِنَ الْغَنِيمَةِ قَالَ: «أَسْمَعْتَ بِلَالًا نَادَى ثَلَاثًا؟» قَالَ: نَعَمْ قَالَ: «فَمَا مَنَعَكَ أَنْ تَجِيءَ بِهِ؟» فَاعْتَذَرَ قَالَ: «كُنْ أَنْتَ تَجِيءُ بِهِ يومَ القيامةِ فلنْ أقبلَه عَنْك» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: লোকটি বিলম্বে গনীমাতের সম্পদ জমা দিতে আসলে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা গ্রহণ করলেন না, এর কারণ হলো তার নিকটের ঐ বস্তুটি সমগ্র মুজাহিদের অর্জিত গনীমাতের একটি অংশ এবং ওটাতে রয়েছে তাদের সকলের অংশ ওটা ছাড়াই সমগ্র গনীমাতের মাল বণ্টন হয়ে গেছে, এখন ঐ একটি বস্তু কিভাবে বণ্টন করবেন? তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এখন ওটা তোমার হাতেই থাক, কিয়ামতের দিন তুমি নিজে ওর জওয়াবদিহী করবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ; আফ্লাতুল কায়সার অনূদিত মিশকাত ৮ম খন্ড, ১০১ পৃঃ)
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০১৩-[২৯] ’আমর ইবনু শু’আয়ব তাঁর পিতার মাধ্যমে তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আবূ বকর ও ’উমার (রাঃ) গনীমাতে খিয়ানাতকারীর সমস্ত মাল জ্বালিয়ে দেন এবং তাকে প্রহার করেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ حَرَّقُوا مَتَاعَ الْغَالِّ وضربوه. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: কারো মালের মধ্যে খিয়ানাতের মাল পাওয়া গেলে ইমাম সমীচীন মনে করলে তার খিয়ানাতের মাল জ্বালিয়ে দিতে পারেন। অবশ্যই এটা বিশেষ অবস্থায়।
কতিপয় আহলে ‘ইলম তথা বিদ্বান যেমন হাসান বাসরী (রহঃ) এ মত পোষণ করেছেন যে, তার সম্পদ জ্বালিয়ে দেয়া হবে। তবে যদি ঐ খিয়ানাতের সম্পদের মধ্যে জীব-জন্তু অথবা কুরআনের নুসখা থাকে তাহলে তা জ্বালানো যাবে না। আহমাদ, ইসহক প্রমুখ ইমাম ও ফাকীহ বলেন, কোনো সম্পদই পোড়ানো যাবে না; কেননা এগুলো গনীমাতের মাল, যাতে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈনিকদের অংশ রয়েছে। তাদের অংশ তাদের হাতে ফেরত দেয়া উচিত। সে যদি ওটা নষ্ট করে তবে জরিমানা দিতে হবে। তবে ইমাম মালিক, শাফি‘ঈ এবং আবূ হানীফাহ্-এর সাথীদের মত হলো এ হাদীস ধমকি ও শাসনমূলক, ওয়াজিব হিসেবে নয়।
ইমাম বুখারী (রহঃ) বলেন, এ হাদীস ছাড়া এতদসম্পর্কীয় অন্য হাদীস এসেছে, যেখানে জ্বালিয়ে দেয়ার নির্দেশ নেই। শারহেস্ সুন্নাহ্ গ্রন্থে রয়েছে, মাতানের দিক থেকে অর্থাৎ মূল বক্তব্যে হাদীসটি গরীব।
হাফিয শামসুদ্দীন ইবনুল কইয়িম (রহঃ) বলেন, এ হাদীসের ইল্লাত বা ত্রুটি হলো এটি যুহায়র ইবনু মুহাম্মাদ ‘আমর ইবনু শু‘আয়ব থেকে বর্ণনা করেছেন; এ যুহায়র হলো য‘ঈফ। ইমাম বায়হাক্বী (রহঃ) বলেন, যুহায়র মাজহূল বা অপরিচিত ব্যক্তি। সুতরাং হাদীসটি সানাদের দিক থেকেও য‘ঈফ। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭১২)
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০১৪-[৩০] সামুরাহ্ ইবনু জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি খিয়ানাতকারীর বিষয়াদি গোপন করে, সেও তার অনুরূপ (অপরাধী)। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ سَمُرَةَ بْنِ جُنْدَبٍ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَنْ يَكْتُمُ غَالًّا فَإِنَّهُ مِثْلُهُ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: রাষ্ট্রীয় সম্পদ কাউকে খিয়ানাত করতে দেখলে তার উচিত আমীর কিংবা ইমাম বা দায়িত্বশীলদের নিকট প্রকাশ করা। যদি তা না করে তবে পাপের ক্ষেত্রে সেও খিয়ানাতকারীর অংশীদার হবে। ‘আল্লামা মুনযিরী এ হাদীসের উপর নিরবতা অবলম্বন করেছেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭১৩)
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০১৫-[৩১] আবূ সা’ঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গনীমাতের মাল বণ্টনের পূর্বে কেনা-বেচা করতে নিষেধ করেছেন। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ: نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَن شري الْمغنم حَتَّى تقسم. رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: কাযী ‘ইয়ায (রহঃ) বলেনঃ গনীমাতের মাল বণ্টনের আগে বিক্রয় নিষেধ, এর কারণ হলো ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য মালিকানা সত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে হয়, গনীমাতের সম্পদ বণ্টনের আগে যেহেতু মালিকানাই প্রতিষ্ঠিত হয় না, সুতরাং তা কিভাবে বিক্রয় শুদ্ধ হবে? ইবনুল মালিক (রহঃ) বলেন, এমনকি কেউ যদি গনীমাতের বণ্টনের আগে তার অংশ বিক্রয় করে তবু- ঐ ক্রয় বিক্রয় শুদ্ধ হবে না। কেননা বণ্টনের পূর্ব পর্যন্ত তার অংশ মাজহূল বা অজ্ঞাত থাকে। অজ্ঞাত বস্তুর ক্রয়-বিক্রয়ও শুদ্ধ হয় না। (মিরকাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৫৬৩)
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০১৬-[৩২] আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ গনীমাতের মাল বণ্টনের পূর্বে (কিয়দংশও) বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। (দারিমী)[1]
وَعَنْ أَبِي أُمَامَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: نَهْيٌ أَنْ تُبَاعَ السِّهَامُ حَتَّى تُقْسَمَ. رَوَاهُ الدَّارمِيّ
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০১৭-[৩৩] খাওলাহ্ বিনতু কায়স (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ অবশ্যই এ (যুদ্ধলব্ধ) মাল দুনিয়াতে মোহনীয় ও আকর্ষণীয়। তবে যে ব্যক্তি তা ন্যায়সঙ্গতভাবে অর্জন করে তাতে তার বরকত হয়। আবার এমন অনেক লোকও আছে, যে আল্লাহ ও তাঁর রসূল-এর সম্পদের যথোপযুক্ত ব্যবহার করে না তথা খিয়ানাত করে, তার জন্য কিয়ামতের দিন জাহান্নামের আগুন ছাড়া আর কিছুই নেই। (তিরমিযী)[1]
وَعَن خولةَ بنتِ قيسٍ: قَالَتْ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «إِنَّ هَذِهِ الْمَالَ خَضِرَةٌ حُلْوَةٌ فَمَنْ أَصَابَهُ بِحَقِّهِ بُورِكَ لَهُ فِيهِ وَرُبَّ متخوض فَمَا شَاءَتْ بِهِ نَفْسُهُ مِنْ مَالِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ لَيْسَ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِلَّا النَّارُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: দুনিয়ার মাল-ধনকে সুমিষ্ট, শ্যামল, চাক-চিক্যময় বস্তুর সাথে তুলনা করা হয়েছে। সবুজ-শ্যামল বস্তু মানুষের কাছে আকর্ষণীয় ও লোভনীয় হয় ঠিক তদ্রূপ দুনিয়ার মাল-সম্পদও লোভনীয় বস্তু। মিষ্টি যেমন মানুষের কাছে লোভনীয় সুস্বাদু, দুনিয়ার সম্পদও তাই। ‘আরবেরা নি‘আমাতসমূহকে সবুজ বস্তু বলে থাকে। অথবা এটা দ্রুত হাত থেকে চলে যাওয়ার কারণে একে خَضِرَةٌ ‘সবুজ’ বলা হয়েছে। কষ্টক্লেশে সৎ পথে তা উপার্জন করলে আল্লাহ তাতে বরকত দান করেন। পক্ষান্তরে অন্যায়ভাবে উপার্জন করলে (যেমন গনীমাতের সম্পদ যথেচ্ছা গ্রহণ) ও তা ব্যয় করলে বা তসরূপ করলে কিয়ামতের দিন তার পরিণতি হবে জাহান্নামের আগুন। (মিরকাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহওয়াযী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ২৩৭৪)
ইমাম গাযালী (রহঃ) বলেনঃ দুনিয়ার সম্পদ হলো ঐ স্বর্গের ন্যায় যার মুখে রয়েছে বিষাক্ত জৈব-লালা এবং উপকারী প্রতিষেধক লালা। একজন সচেতন ব্যক্তি তার অনিষ্টতা থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করবে এবং তাকে এড়িয়ে চলবে, আর ওটাতে যে উপকারী প্রতিষেধক রয়েছে তা কিভাবে সংগ্রহ করা যায় সেটা জানবে। পক্ষান্তরে একজন নির্বোধ ব্যক্তি তার ক্ষতির মুখোমুখিই হবে শুধু।
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০১৮-[৩৪] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদর যুদ্ধের দিন যুলফাকার নামক তরবারি নিজের জন্য গনীমাত হতে নফল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। (আহমাদ, ইবনু মাজাহ্)[1]
ইমাম তিরমিযী অতিরিক্ত এটাও বর্ণনা করেছেন যে, এটা হলো সেই তরবারি যা তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উহুদ যুদ্ধের দিন স্বপ্নে দেখেছেন।
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَنَفَّلَ سيفَه ذَا الفَقارِ يومَ بدْرٍ رَوَاهُ أَحْمد وَابْن مَاجَهْ وَزَادَ التِّرْمِذِيُّ وَهُوَ الَّذِي رَأَى فِيهِ الرُّؤْيَا يَوْم أحد
ব্যাখ্যা: (ذُوْا الْفَقَارِ) যুলফাকার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তরবারির নাম। ذُوْ অর্থ : বিশিষ্ট, অধিকারী, فَقَارِ মেরুদণ্ড। মেরুদণ্ড যেমন ছোট ছোট জোড়া হাড়ের দ্বারা গঠিত হয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঐ তরবারিখানা মেরুদণ্ডের হাড়ের ন্যায় জোড়া চিহ্ন বিশিষ্ট ছিল। এর জন্য তার নাম রাখা হয়েছিল ‘যুলফাকার।’ বাংলা কবিতায় তাকে যুলফাকারও বলা হয়েছে।
কথিত আছে, এটা ‘আস ইবনু মুনাবিবহ্-এর তরবারি ছিল, সে বদর যুদ্ধে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এসে কাফির অবস্থায় ‘আলীর হাতে নিহত হয়, অতঃপর তার ঐ তরবারিখানা গনীমাতের মাল হিসেবে জমা হয় এবং নফল হিসেবে তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো এক সময় এটা ‘আলী -এর হাতে তুলে দেন। ‘আলী এই তরবারি নিয়ে উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং এর পূর্ণ হক আদায় করেন।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্বপ্নের ঘটনা যা আহমাদ, হায়সামী প্রমুখ বর্ণনা করেছেন তা সহীহ নয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৫৬১)
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০১৯-[৩৫] রুওয়াইফি’ ইবনু সাবিত (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, সে যেন মুসলিমদের গনীমাতে প্রাপ্ত সওয়ারীর উপরে আরোহণ না করে, এমনকি আরোহণ করে একেবারে দুর্বল ও অচল করে, পরে তা ফেরত দেয়। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে, সে যেন মুসলিমদের গনীমাতের মাল থেকে পোশাক পরিধান না করে, এমনকি পোশাক পরে একেবারে পুরাতন ও জীর্ণ করে, পরে তা ফেরত দেয়। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن رويفع بْنِ ثَابِتٍ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلَا يَرْكَبْ دَابَّةً مِنْ فَيْءِ الْمُسْلِمِينَ حَتَّى إِذَا أَعْجَفَهَا رَدَّهَا فِيهِ وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلَا يَلْبَسْ ثَوْبًا مِنْ فَيْءِ الْمُسلمين حَتَّى إِذا أخلقه ردهَا فِيهِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: এখানে الْفَيْء দ্বারা গনীমাত উদ্দেশ্য। আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসে বিশ্বাসী মু’মিনের জন্য বৈধ নয় যে, সে প্রয়োজন ছাড়া গনীমাতের সম্পদ কোনো উট অথবা ঘোড়া নিয়ে নিবে, আর তাতে আরোহণ করে করে দুর্বল কৃশকায় করে ফেলবে, অতঃপর ফেরত দিবে। অনুরূপ গনীমাতের সম্পদ থেকে কোনো পরিধেয় বস্ত্র নিয়ে পরিধান করে তা পুরাতন করে ফেরতও দিবে না। মানবিক প্রয়োজনে এগুলো ব্যবহারের দরকার হলে তবে তা বিধিমত ব্যবহার করবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ ৭ম খন্ড, ৫৩৩ পৃঃ)
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০২০-[৩৬] মুহাম্মাদ ইবনু আবুল মুজালিদ (রহঃ) ’আবদুল্লাহ ইবনু আবূ আওফা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি সাহাবীগণকে জিজ্ঞেস করলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে আপনারা কি খাদ্যজাত দ্রব্যের এক-পঞ্চমাংশ বায়তুল মালে (সরকারী কোষাগারে) জমা করতেন? তারা বললেনঃ খায়বার যুদ্ধে আমরা খাদ্যদ্রব্য লাভ করি, অতঃপর লোকেরা এসে যার যার প্রয়োজন অনুপাতে নিয়ে যেত। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ مُحَمَّدِ بْنِ أَبِي الْمُجَالِدِ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي أَوْفَى قَالَ: قُلْتُ: هَلْ كُنْتُمْ تُخَمِّسُونَ الطَّعَامَ فِي عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ قَالَ: أَصَبْنَا طَعَامًا يَوْمَ خَيْبَرَ فَكَانَ الرَّجُلُ يَجِيءُ فَيَأْخُذُ مِنْهُ مقدارَ مَا يكفيهِ ثمَّ ينْصَرف. وَرَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: এ হাদীসের ব্যাখ্যা সামনে আসছে। নিজের খাদ্য চাহিদা বা ক্ষুধা মিটানো পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করা বৈধ।
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০২১-[৩৭] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে একটি সৈন্যবাহিনী গনীমাতের মাল হতে কিছু খাদ্যদ্রব্য ও মধু পেয়েছিল, অথচ তাদের থেকে ’খুমুস’ (এক-পঞ্চমাংশ) নেয়া হয়নি। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن ابنِ عُمَرَ: أَنَّ جَيْشًا غَنِمُوا فِي زَمَنِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ طَعَامًا وَعَسَلًا فَلَمْ يُؤخذْ منهمُ الْخمس. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে খাদ্যদ্রব্য এবং মধু এগুলোর খুমুস নেয়া হতো না। খাদ্যদ্রব্য দ্বারা বিভিন্ন প্রকার শস্যদানা, খেজুর, যব ইত্যাদি বুঝানো হয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬৯৮)
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০২২-[৩৮] ’আবদুর রহমান ইবনু খালিদ-এর গোলাম কাসিম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জনৈক সাহাবী হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেনঃ যুদ্ধের সময় আমরা উটের গোশ্ত/মাংস খেতাম, কিন্তু তা বণ্টন করতাম না। এমনকি যখন আমরা যুদ্ধ শেষে নিজেদের তাঁবুতে ফিরে আসতাম, তখন আমাদের খাদ্যভাণ্ডারগুলো উক্ত মাংসে পরিপূর্ণ থাকত। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنِ الْقَاسِمِ مَوْلَى عَبْدِ الرَّحْمَنِ عَنْ بَعْضِ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: كنَّا نأكلُ الجَزورَ فِي الغزْوِ وَلَا نُقَسِّمُهُ حَتَّى إِذَا كُنَّا لَنَرْجِعُ إِلَى رِحَالِنَا وأخْرِجَتُنا مِنْهُ مَمْلُوءَة. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা : এটাও পূর্বের হাদীসের ব্যাখ্যানুরূপ। গনীমাতের সম্পদ থেকে উটের মতো একটি বড় খাদ্য প্রাণীও যুদ্ধের ময়দানে যাবাহ করে সৈন্যরা বায়তুল মালের খুমুস বণ্টন না করেই প্রয়োজন মতো পেট ভরে খেতেন, অনেকে গোশত পাত্রে তুলে সেনা ছাওনী বা তাঁবুতে নিয়ে যেতেন।
দারুল হার্ব থেকে পাওয়া খাদ্য সামগ্রীর বিষয়ে ফাকীহগণ মতবিরোধ করেছেন।
সুফ্ইয়ান সাওরী (রহঃ) বলেনঃ যা কিছুই পাওয়া যাক না কেন তাই ইমামের নিকট জমা দিতে হবে, তা না দিয়ে নিজেরা ইচ্ছামত ভক্ষণ বা ব্যবহার করা যাবে না। ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-এর মতও এটাই। ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ)-এর দু’টি মতের একটি এর পক্ষেই। কিন্তু তার দ্বিতীয় মতটি হলো দারুল হার্ব এ কিছু পাওয়া গেলে সেটা তার বা তাদের, এটা তারা নিয়ে নিতে পারবে। ইমাম আওযা‘ঈও এমনি মত প্রকাশ করেছেন। তবে তিনি আরো বলেছেন, ঐ সম্পদ সে বিক্রি করতে পারবে না, সে শুধু খেতে পারবে। যদি বিক্রি করে তবে ওটার মূল্য মুসলিমদের গনীমাতের ভা-ারে জমা দিতে হবে। ইমাম মালিক (রহঃ) বলেন, অল্প পরিমাণ খাদ্য বস্তু যেমন গোশত, রুটি ইত্যাদি নেয়া বা পরিবারের লোকেদের খাওয়ানোর অনুমতি আছে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭০৩, মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০২৩-[৩৯] ’উবাদাহ্ ইবনুস্ সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা গনীমাতে প্রাপ্ত সুঁচ-সুতা পর্যন্ত জমা দিয়ে দাও। সাবধান! গনীমাতের মালে খিয়ানাত করা হতে বিরত থাকো। কেননা তা কিয়ামতের দিন খিয়ানাতকারীর জন্য লাঞ্ছনা-অপমান ভোগের কারণ হবে। (দারিমী)[1]
وَعَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَقُولُ: «أَدُّوا الْخِيَاطَ وَالْمِخْيَطَ وَإِيَّاكُمْ وَالْغُلُولَ فَإِنَّهُ عَارٌ عَلَى أَهْلِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» . رَوَاهُ الدَّارِمِيُّ
ব্যাখ্যা: সুঁই এবং সুতার মতো একটি ক্ষুদ্র বস্তুও গনীমাতের সম্পদ নিজের কাছে রাখা যাবে না বরং তা গনীমাতের ভা-ারে জমা দিতে হবে। অন্যথায় এই ক্ষুদ্র এবং তুচ্ছ বস্তুটিই কিয়ামতের দিন অপমানের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। যেমন পূর্বে আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)-এর ৩৯৯৬ নং হাদীসে অতিবাহিত হয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০২৪-[৪০] আর নাসায়ী হাদীসটি ’আমর ইবনু শু’আয়ব (রহঃ)-এর মাধ্যমে তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন।[1]
وَرَوَاهُ النَّسَائِيُّ عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০২৫-[৪১] ’আমর ইবনু শু’আয়ব তাঁর পিতার মাধ্যমে তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন। একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি উটের কাছে গিয়ে তার কুঁজের চুলের গোস্বা ধরে বললেনঃ হে লোক সকল! এ সমস্ত গনীমাতের মালে আমি মালিক নই। এমনকি এ চুলের গোস্বারও আমি মালিক নই। তিনি তাঁর অঙ্গুলি উঠিয়ে বললেনঃ শুধু এক-পঞ্চমাংশ রয়েছে। আর সে এক-পঞ্চমাংশও তোমাদের মাঝে বণ্টন করা হবে। সুতরাং সুঁচ-সুতা থাকলেও তা জমা দিয়ে দাও। এটা শুনে জনৈক ব্যক্তি একগুচ্ছ পশম হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে বললঃ হে আল্লাহর রসূল! আমি তো আমার সওয়ারীর গদির নিচের কম্বলটি সেলাই করার জন্য এটা নিয়েছি। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ অবশ্যই এটার মধ্যে আমার ও বানী ’আবদুল মুত্ত্বালিব-এর যে পরিমাণ অংশ রয়েছে, তা তোমাকে দান করলাম। এটা শুনে লোকটি বলে উঠল, এই একগুচ্ছ পশমের অবস্থা যদি এ পর্যায়ে পৌঁছে, তখন তো আর আমার এটার কোনই প্রয়োজন নেই। এ বলে সে পশম গুচ্ছটি ছুঁড়ে ফেলে দিলো। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ قَالَ: دَنَا النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ بَعِيرٍ فَأَخَذَ وَبَرَةً مِنْ سَنَامِهِ ثُمَّ قَالَ: «يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّهُ لَيْسَ لِي مِنْ هَذَا الْفَيْءِ شَيْءٌ وَلَا هَذَا وَرَفَعَ إِصْبَعَهُ إِلَّا الْخُمُسَ وَالْخُمُسُ مَرْدُودٌ عَلَيْكُمْ فَأَدُّوا الْخِيَاطَ وَالْمِخْيَطَ» فَقَامَ رَجُلٌ فِي يَدِهِ كُبَّةٌ شَعَرٍ فَقَالَ: أَخَذْتُ هَذِهِ لِأُصْلِحَ بِهَا بَرْدَعَةً فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَمَّا مَا كانَ لي ولبني عبدِ المطلبِ فهوَ لكَ» . فَقَالَ: أمّا إِذا بَلَغَتْ مَا أَرَى فَلَا أَرَبَ لِي فِيهَا ونبَذَها. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: ইমাম খত্ত্বাবী (রহঃ) বলেনঃ এ গনীমাতের মাল কম হোক আর বেশি হোক সবই গনীমাতের ভা-ারে জমা দিতে হবে এবং সেটা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বণ্টন হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও ইচ্ছা করে কাউকে বণ্টনবিহীন কোনো কিছু প্রদান করেননি এবং কেউ নিজেও (ছোট বড় যাই হোক বণ্টনবিহীন) গ্রহণ করবে না। তবে খাদ্য হলে সেটা স্বতন্ত্র কথা, ক্ষুধা নিবারণের জন্য প্রয়োজন মতো সেখান থেকে নেয়ার অনুমতি আছে। আল্লাহর রসূল সাহাবীর এক টুকরা সুতা গ্রহণ যা দিয়ে ছালা সেলাই হবে মাত্র, তাও অনুমোদন করেননি। এমনকি তিনি এ কথাও বললেন যে, আমার এবং বানী ‘আবদুল মুত্ত্বালিব-এর অধিকার তোমাকে না হয় ছেড়ে দিলাম কিন্তু অন্যান্য যোদ্ধাদের অংশ তোমাকে কে দান করবে? আর আমি তো তাদের অংশ তোমাকে দিতে পারি না! (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৬৯১)
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০২৬-[৪২] ’আমর ইবনু ’আবাসাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গনীমাতের একটি উটকে (সুতরাহ্ হিসেবে) সামনে রেখে আমাদেরকে নিয়ে সালাত আদায় করলেন। সালাম ফিরিয়ে উটটির পাঁজরের চুলগুচ্ছ ধরে বললেনঃ গনীমাতের এ সম্পদ হতে এক-পঞ্চমাংশ ব্যতীত এ চুলগুচ্ছ পরিমাণও রাখার অধিকার তোমাদের কারো নেই। আর সে এক-পঞ্চমাংশও তোমাদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن عمْرو بن عَبَسةَ قَالَ: صَلَّى بِنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى بَعِيرٍ مِنَ الْمَغْنَمِ فَلَمَّا سَلَّمَ أَخَذَ وَبَرَةً مِنْ جَنْبِ الْبَعِيرِ ثُمَّ قَالَ: «وَلَا يَحِلُّ لِي مِنْ غَنَائِمِكُمْ مِثْلُ هَذَا إِلَّا الْخُمُسُ وَالْخُمُسُ مَرْدُودٌ فِيكُمْ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: উটকে সামনে রেখে সালাত আদায়ের কারণ হলো উটকে সুতরাহ্ বানানো। পশম ধরে দেখানোর উদ্দেশ্য হলো পশমের মতো সামান্য বস্তুও বণ্টনবিহীন আমার জন্য হালাল নয়। গনীমাতের চার অংশ তোমাদেরই মাত্র এক অংশ আমি পাবো, তাও আমি ওটা তোমাদের মধ্যেই বণ্টন করে দেই।
‘আল্লামা শাওকানী (রহঃ) বলেনঃ ইমাম পাঁচ ভাগের এক অংশ নিবে বাকী পাঁচ ভাগের চার অংশ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বণ্টন করে দিবে। ইমামের পাঁচ ভাগের এক অংশও তার নিজের একার নয় বরং ওটা কিতাবুল্লাহর বিধান মোতাবেক মুসলিমদের মাঝে বণ্টন করা ওয়াজিব। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭৫২)
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০২৭-[৪৩] জুবায়র ইবনু মুত্ব’ইম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নিকটাত্মীয়ের অংশটি বানী হাশিম ও বানী মুত্ত্বালিব-এর মধ্যে বিতরণ করলেন, তখন আমি ও ’উসমান ইবনু আফফান(রাঃ) তাঁর নিকট গিয়ে বললাম: হে আল্লাহর রসূল! আমরা আমাদের বানী হাশিম-এর ভাইদের সামাজিক সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকার করছি না। কেননা আল্লাহ তা’আলা আপনাকে তাদের মধ্যেই সৃষ্টি করেছেন। তবুও (অনুগ্রহপূর্বক) বলুন, আপনি তো আমাদের মুত্ত্বালিবী ভাইদেরকেও দিলেন, আর আমাদের (বানী ’আব্দ শামস্ ও বানী নাওফালকে) বাদ দিয়েছেন, অথচ সম্পর্কের দিক হতে (জাত-গোত্রে) আমরা উভয়ে একই। উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ প্রকৃতপক্ষে বানী হাশিম ও বানী মুত্ত্বালিব এক ও অভিন্ন- এটা বলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উভয় হাতের অঙ্গুলিসমূহ একটি আরেকটির মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেখালেন। (শাফি’ঈ)[1]
আবূ দাঊদ ও নাসায়ী’র বর্ণনাও অনুরূপ। তবে তাতে উল্লেখ আছে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ আমরা এবং বানী মুত্ত্বালিব ইসলাম পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে অভিন্ন ও একাত্মরূপে রয়েছি- এই বলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হাতের অঙ্গুলিসমূহ পরস্পরের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেখালেন।
وَعَن جُبير بنُ مُطعِمٍ قَالَ: لَمَّا قَسَمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَهْمَ ذَوِي الْقُرْبَى بَيْنَ بَنِي هَاشِمٍ وَبَنِي الْمُطَّلِبِ أَتَيْتُهُ أَنَا وَعُثْمَانُ بْنُ عَفَّانَ فَقُلْنَا: يَا رَسُولَ اللَّهِ هَؤُلَاءِ إِخْوَانُنَا مِنْ بَنِي هَاشِمٍ لَا نُنْكِرُ فَضْلَهُمْ لِمَكَانِكَ الَّذِي وضعكَ اللَّهُ مِنْهُمْ أَرَأَيْتَ إِخْوَانَنَا مِنْ بَنِي الْمُطَّلِبِ أَعْطَيْتَهُمْ وَتَرَكْتَنَا وَإِنَّمَا قَرَابَتُنَا وَقَرَابَتُهُمْ وَاحِدَةً فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّمَا بَنُو هَاشِمٍ وَبَنُو الْمُطَّلِبِ شَيْءٌ وَاحِدٌ هَكَذَا» . وَشَبَّكَ بَيْنَ أَصَابِعِهِ. رَوَاهُ الشَّافِعِيُّ وَفِي رِوَايَةِ أَبِي دَاوُدَ وَالنَّسَائِيِّ نَحْوُهُ وَفِيهِ: «إِنَّا وَبَنُو الْمُطَّلِبِ لَا نَفْتَرِقُ فِي جَاهِلِيَّةٍ وَلَا إِسْلَامٍ وَإِنَّمَا نَحْنُ وَهُمْ شَيْءٌ وَاحِدٌ» وَشَبَّكَ بَيْنَ أَصَابِعه
এ হাদীসের ব্যাখ্যা প্রথম অনুচ্ছেদ ৩৯৯৩ নং হাদীসের ব্যাখ্যায় দেখুন।
পরিচ্ছেদঃ ৭. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০২৮-[৪৪] ’আবদুর রহমান ইবনু ’আওফ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বদর যুদ্ধের দিন সৈনিকদের কাতারে দাঁড়িয়ে আমার ডানে-বামে তাকিয়ে দেখি যে, আমি দু’জন কমবয়সী আনসার যুবকের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি। তখন আমি মনে মনে এ আকাঙ্ক্ষা পোষণ করলামঃ আহা! কতই না উত্তম হত, যদি আমি এ দু’জনের চেয়ে বীর যোদ্ধার মাঝখানে দাঁড়াতাম। এমন সময় তাদের একজন আমাকে খোঁচা মেরে বলল, চাচাজান! আপনি কি আবূ জাহালকে চিনেন? আমি বললামঃ হ্যাঁ, চিনি, তবে বৎস! তাকে তোমার কি প্রয়োজন? সে বলল, আমি শুনেছি সে না-কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে গালি দেয়। আল্লাহর কসম! আমি যদি তাকে দেখতে পাই, তবে আমাদের মধ্যে (তথা আমার ও আবূ জাহাল-এর মধ্যে) একজনের নির্ধারিত মৃত্যু না ঘটা পর্যন্ত আমরা উভয়ে পরস্পর হতে বিচ্ছিন্ন হব না।
’আবদুর রহমান বলেনঃ তার এ কথা শুনে আমি অত্যন্ত আশ্চর্যান্বিত হলাম। ঠিক এমনি সময়ে অপর তরুণটিও আমাকে অনুরূপ খোঁচা মেরে একই কথার পুনরাবৃত্তি করল। আমাদের কথা-বার্তা শেষ না হতেই হঠাৎ দেখতে পেলাম আবূ জাহাল লোকেদের মাঝে ঘুরাফেরা করছে। তখন আমি তরুণদেরকে বললামঃ তোমরা উভয়ে যার ব্যাপারে আমার কাছে জানতে চাচ্ছ, ঐ হলো সে ব্যক্তি। আমার কথা শুনামাত্রই তারা উভয়ে তলোয়ার হাতে দ্রুতবেগে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে হত্যা করে ফেলল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ছুটে এসে ঘটনাটি তাঁকে জানাল। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যে কে তাকে হত্যা করেছ? তারা উভয়েই বললঃ আমিই তাকে হত্যা করেছি।
এবার তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেনঃ আচ্ছা! তাকে হত্যা করার পর তোমরা কি স্বীয় তলোয়ার মুছে ফেলেছ? তারা বলল, না। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদের তলোয়ার দেখে বললেনঃ তোমরা উভয়েই তাকে হত্যা করেছ। এই বলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ঘোষণা দিলেন, তার (আবূ জাহাল-এর) পরিত্যক্ত মালের অধিকারী হবে মু’আয ইবনু ’আমর ইবনুল জামূহ। এ তরুণদ্বয় ছিলেন মু’আয ইবনু ’আমর ইবনুল জামূহ ও মু’আয ইবনু ’আফরা (রাঃ)। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَوْفٍ قَالَ: إِنِّي وَاقِفٌ فِي الصَّفِّ يَوْمَ بَدْرٍ فَنَظَرْتُ عَنْ يَمِينِي وَعَنْ شِمَالِي فَإِذَا بِغُلَامَيْنِ مِنَ الْأَنْصَارِ حَدِيثَة أسنانها فتمنيت أَنْ أَكُونَ بَيْنَ أَضْلَعَ مِنْهُمَا فَغَمَزَنِي أَحَدُهُمَا فَقَالَ: يَا عَمِّ هَلْ تَعْرِفُ أَبَا جَهْلٍ؟ قُلْتُ: نَعَمْ فَمَا حَاجَتُكَ إِلَيْهِ يَا ابْنَ أَخِي؟ قَالَ: أُخْبِرْتُ أَنَّهُ يَسُبُّ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَئِنْ رَأَيْتُهُ لَا يُفَارِقُ سَوَادِي سَوَادَهُ حَتَّى يَمُوتَ الْأَعْجَلُ مِنَّا فَتَعَجَّبْتُ لِذَلِكَ قَالَ: وَغَمَزَنِي الْآخَرُ فَقَالَ لِي مِثْلَهَا فَلَمْ أَنْشَبْ أَنْ نَظَرْتُ إِلَى أَبِي جَهْلٍ يَجُولُ فِي النَّاسِ فَقُلْتُ: أَلَا تَرَيَانِ؟ هَذَا صَاحِبُكُمَا الَّذِي تَسْأَلَانِي عَنْهُ قَالَ: فابتدراه بسيفهما فَضَرَبَاهُ حَتَّى قَتَلَاهُ ثُمَّ انْصَرَفَا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فأخبراهُ فَقَالَ: «أَيُّكُمَا قَتَلَهُ؟» فَقَالَ كُلُّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا: أَنَا قَتله فَقَالَ: «هلْ مسحتُما سيفَيكما؟» فَقَالَا: لَا فَنَظَرَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى السَّيْفَيْنِ فَقَالَ: «كِلَاكُمَا قَتَلَهُ» . وَقَضَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِسَلَبِهِ لِمُعَاذِ بن عَمْرِو بن الْجَمُوحِ وَالرَّجُلَانِ: مُعَاذُ بْنُ عَمْرِو بْنِ الْجَمُوحِ ومعاذ بن عفراء
ব্যাখ্যা: আবূ জাহাল-কে হত্যায় তিনজন অংশগ্রহণ করেন। তারা হলেন, মা‘আয ও মু‘আওয়ায এবং ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাস্‘ঊদ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ জাহাল-এর পরিত্যক্ত সম্পদ মা‘আযকে প্রদান করেন। কেননা তিনিই সর্বাগ্রে আবূ জাহলকে তরবারি মেরে ঘায়েল করেন। পরে মু‘আওয়াযও তার সাথে অংশ নেন, অর্থাৎ তরবারি মারেন। এবং উভয়ে মিলে তাকে ধরাশয়ী করে ফেলেন। কিন্তু তখনও জান বের হয়নি এমন সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আবূ জাহাল-এর খবর কে আনতে পারে? তখন ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাস্‘ঊদ দৌড়ে গিয়ে দেখেন সে অচেতন হয়ে পড়ে আছে, তখনই তিনি লাফ দিয়ে গিয়ে তার বুকের উপর বসে দেহ থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। তারা দু’জনই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে তাকে হত্যার দাবী করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উভয়কেই বলেন, তোমরা দু’জনই হত্যা করেছ। অগ্রগামিতা এবং ভূমিকা একজনের চেয়ে অন্য জনের বেশি হওয়া এবং সাওয়াব কম বেশি সত্ত্বেও রসূলুল্লাহ তাদের উৎসাহিত করা এবং মনঃতৃপ্তি বা অন্তরে প্রশান্তিদানের জন্য বলেছেন, তোমরা দু’জনই হত্যা করেছ। এরা দু’জন মাতৃশরীক বৈপিত্রেয় ভাই ছিলেন, তাদের মা ছিলেন আফরা, এ জন্য কোনো কোনো সময়, বলা হয় আফরার দুই পুত্র।
এ হাদীস থেকে শিক্ষা হলো বয়সে ছোট এবং শারীরিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিকে তুচ্ছ জ্ঞান করতে নেই, কারণ তার দ্বারাও বড় বড় কাজ সংঘটিত হতে পারে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৭. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০২৯-[৪৫] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বদর যুদ্ধের শেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আবূ জাহাল-এর অবস্থাটি আমাদেরকে কে জানাতে পারবে? এ ঘোষণা শুনামাত্রই ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) চলে গেলেন এবং গিয়ে দেখলেন যে, ’আফরা-এর দু’ পুত্র তাকে এমনভাবে আঘাত করেছে যে, সে নিস্তেজ অবস্থায় পড়ে আছে। (আনাস (রাঃ) বলেন) অতঃপর ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) তার দাঁড়ি টেনে ধরে বললেনঃ তুমিই কি আবূ জাহাল? আবূ জাহাল বলল, তোমরা এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছ, এতে আনন্দোল্লাস বা কৃতিত্বের কী আছে?
অন্য এক সূত্রে বর্ণিত আছে, আবূ জাহাল (আক্ষেপ ও অনুশোচনা ভরে) বলল, আমাকে যদি চাষীর ছেলেরা ব্যতীত অন্য কেউ হত্যা করত (তবে সান্তবনা পেতাম)। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ بَدْرٍ: «مَنْ يَنْظُرُ لَنَا مَا صَنَعَ أَبُو جَهْلٍ؟» فَانْطَلَقَ ابْنُ مَسْعُودٍ فَوَجَدَهُ قَدْ ضَرَبَهُ ابْنَا عَفْرَاءَ حَتَّى بَرَدَ قَالَ: فَأَخَذَ بِلِحْيَتِهِ فَقَالَ: أَنْتَ أَبُو جَهْلٍ فَقَالَ: وَهَلْ فَوْقَ رَجُلٍ قَتَلْتُمُوهُ. وَفِي رِوَايَةٍ: قَالَ: فَلَوْ غَيْرُ أَكَّارٍ قتلني
ব্যাখ্যা: আবূ জাহাল-এর হত্যা কাহিনী বিস্তারিতভাবে হাদীসের বিধৃত হয়েছে। পুনরায় তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা নিঃপ্রয়োজন। ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাস্‘ঊদ আবূ জাহাল-এর বুকের উপর বসে দাঁড়ি ধরে জিজ্ঞেস করলেন, তুই কি আবূ জাহল? তখন সে আক্ষেপ করে বলল, (فَلَوْ غَيْرُ أَكَّارٍ قَتَلَنِىْ) হায়! আমাকে চাষীরা ব্যতীত অন্যরা যদি হত্যা করত!
أَكَّارٍ শব্দের অর্থ কৃষক বা চাষী। মদীনার আনসারগণ সাধারণত কৃষিজীবী ছিলেন; আর মক্কার লোকেরা ছিল ব্যবসায়ী। সেই হেতু মক্কার লোকেরা মদীনার লোকদের তাচ্ছিল্যের নজরে দেখতো। আবূ জাহলের দুঃখ হলো মক্কার কোনো লোক তাকে হত্যা না করে মদীনার চাষীর ছেলেরা তাকে হত্যা করলো। মৃত্যুকালে এটা ছিল তার ভীষণ অনুতাপ ও আক্ষেপ! (মিরকাতুল মাফাতীহ; শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৮০০)
পরিচ্ছেদঃ ৭. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০৩০-[৪৬] সা’দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদল লোককে (হুনায়ন যুদ্ধের গনীমাত) বণ্টন করছিলেন, আর সেখানে আমি বসা ছিলাম। কিন্তু তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদের মধ্যে এমন একজনকে (জুআইল-কে) দিলেন না। অথচ আমার অনুমান, সে লোকটিই ছিল তাদের মধ্যে সর্বোত্তম ও যোগ্য ব্যক্তি। আমি দাঁড়িয়ে বললামঃ (হে আল্লাহর রসূল!) আপনি অমুককে এই মাল থেকে বঞ্চিত করার কারণ কি? আল্লাহর কসম! আমি তো তাকে মু’মিন হিসেবেই জানি। উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ বরং মুসলিম (বলো)। এভাবে সা’দ কথাটি তিনবার পুনরাবৃত্তি করলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-ও তিনবার তাকে অনুরূপ উত্তর দিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ (শুনো!) আমি অবশ্যই ব্যক্তি বিশেষকে দান করি, যদিও অন্য লোক আমার নিকট অধিক প্রিয় হয়ে থাকে। এ আশঙ্কায় এরূপ করি, যেন আল্লাহ তা’আলা তাকে উপুড় করে জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ না করে ফেলেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
বুখারী ও মুসলিম-এর অপর বর্ণনাতে আছে- ইমাম যুহরী (রহঃ) বলেছেনঃ আমরা মনে করি ’ইসলাম’ হলো মুখে কালিমাহ্ উচ্চারণের মাধ্যমে স্বীকৃতি দেয়া, আর ’ঈমান’ হলো নেক ’আমল (বাস্তবায়ন) করা।
وَعَنْ سَعْدِ بْنِ أَبِي وَقَّاصٍ قَالَ: أَعْطَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَهْطًا وَأَنَا جَالِسٌ فَتَرَكَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم مِنْهُم رَجُلًا وَهُوَ أَعْجَبُهُمْ إِلَيَّ فَقُمْتُ فَقُلْتُ: مَا لَكَ عَنْ فُلَانٍ؟ وَاللَّهِ إِنِّي لَأُرَاهُ مُؤْمِنًا فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أوْ مُسلما» ذكرَ سَعْدٌ ثَلَاثًا وَأَجَابَهُ بِمِثْلِ ذَلِكَ ثُمَّ قَالَ: «إِنِّي لَأُعْطِي الرَّجُلَ وَغَيْرُهُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْهُ خَشْيَةَ أَنْ يُكَبَّ فِي النَّارِ عَلَى وَجْهِهِ» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ. وَفِي رِوَايَةٍ لَهُمَا: قَالَ الزُّهْرِيُّ: فترى: أَن الْإِسْلَام الْكَلِمَة وَالْإِيمَان الْعَمَل الصَّالح
ব্যাখ্যা: সা‘দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস যে সাহাবী সম্পর্কে মু‘মিন হওয়ার সাক্ষ্য দান করেন, তার নাম হলো জুআয়ল ইবনু আমির আয্ যুমায়রী।
ঈমানের সম্পর্ক হবে অন্তরের সাথে আর ইসলামের সম্পর্ক হলো বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এর সাথে অর্থাৎ আ‘মাল বিল আরকানের সাথে। কলব বা অন্তরের বিশ্বাস হলো অদৃশ্য বস্তু; এর ‘ইলম একমাত্র আল্লাহর নিকটই রয়েছে। সুতরাং মানুষ সেই বিষয়ে জানতে পারে না এবং তার উপর হুকুমও লাগাতে পারে না। তার বাহ্যিক অবস্থা বা কর্মকা--র ভিত্তিতে মুসলিম বলাই শ্রেয়। পবিত্র কুরআনুল কারীমেও এর ভিত্তি রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ ‘‘মরুবাসীরা বলে, আমরা ঈমান এনেছি বা বিশ্বাস স্থাপন করেছি, (আপনি তাদের) বলুন, তোমরা বিশ্বাস স্থাপন করনি; বরং বলো, আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি অর্থাৎ বশ্যতা স্বীকার করেছি।’’ (সূরা আল হুজুরাত ৪৯ : ১৪)
দ্বিতীয় আরেকটি বিষয় হলো : মু’মিনের সাক্ষ্য দান সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দান করলেন না, তার কারণ হলো যেহেতু তাদের ঈমান মযবুত, সুতরাং তাদের কিছু না দিলেও তারা ঈমান থেকে বিচ্যুত হবে না অথবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর কোনো অভিযোগ তুলবে না। পক্ষান্তরে যাদের দান করেছেন তাদের অন্তরে ঈমানের প্রতি ভালোবাসা ও মহববত গাঢ় ও দৃঢ় করার জন্য করেছেন। আর তারা যাতে ঈমান ও ইসলামের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে কুফরীতে ফিরে না যায় বরং ঈমানের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৭. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০৩১-[৪৭] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদর যুদ্ধের দিন দাঁড়িয়ে বললেনঃ ’উসমান (ইবনু ’আফফান) আল্লাহ ও তাঁর রসূল-এর উদ্দেশে বের হয়েছে, সুতরাং তার পক্ষ হতে আমি বায়’আত করছি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জন্যও এ গনীমাতের একাংশ রেখেছেন। অথচ বদর যুদ্ধে অনুপস্থিত আর কাউকে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) গনীমাতের ভাগ দেননি। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَامَ يَعْنِي يَوْمَ بَدْرٍ فَقَالَ: «إِنَّ عُثْمَانَ انْطَلَقَ فِي حَاجَةِ اللَّهِ وَحَاجَةِ رَسُولِهِ وَإِنِّي أُبَايِعُ لَهُ» فَضَرَبَ لَهُ رسولُ الله بِسَهْمٍ وَلَمْ يَضْرِبْ بِشَيْءٍ لِأَحَدٍ غَابَ غَيْرَهُ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: ‘উসমান ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কন্যা রুকাইয়্যার স্বামী। বদর যুদ্ধের সময় নাবী নন্দীনী রুকাইয়্যাহ্ ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার সেবা-শুশ্রুষার এমন কোনো লোক ছিল না যাকে রেখে ‘উসমান যুদ্ধে যোগদান করবেন। এ অবস্থা দেখে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই তাকে যুদ্ধে যাওয়া থেকে বারণ করেন। যুদ্ধের জন্য সবাই যখন রসূলুল্লাহর হাতে হাত রেখে বায়‘আত করতে লাগলেন তখন আল্লাহর নাবী নিজের ডান হাতকে বাম হাতের মধ্যে রেখে বললেন, এটা ‘উসমান-এর বায়‘আত।
‘উসমান যেহেতু আল্লাহর রসূলের হুকুম পালন করেছেন, সুতরাং তার বাড়ীতে অবস্থানও আল্লাহর রাস্তায় বলে বিবেচনা করা হয়েছে। আর বদরের গনীমাতে তাকে অংশ দান করা হয়েছে। এটা তার একান্ত বিশেষত্বের কারণে করা হয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৭. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০৩২-[৪৮] রাফি’ ইবনু খাদীজ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গনীমাতের মাল বণ্টনে দশটি বকরী একটি উটের সমপরিমাণ গণ্য করতেন। (নাসায়ী)[1]
وَعَن رافعِ بن خديجٍ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَجْعَلُ فِي قَسْمِ الْمَغَانِمِ عَشْرًا مِنَ الشّاءِ بِبَعِير. رَوَاهُ النَّسَائِيّ
ব্যাখ্যা: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গনীমাতের মাল বণ্টনে একটি উট দশটি বকরীর সমান ধরে বণ্টন করতেন। এটা মূল্যের বিবেচনায় না গোশতের বিবেচনায় তা উল্লেখ নেই। কুরবানীর ক্ষেত্রেও এমনটি বলা হয়েছে, সেই ভিত্তিতে কেউ কেউ গোশতের বিবেচনায় এই সমতার কথা উল্লেখ করেছেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৭. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০৩৩-[৪৯] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এক নবী জিহাদে যাওয়ার প্রাক্কালে গোত্রের লোকেদের উদ্দেশে এ নির্দেশ দিলেন, যে সদ্য বিয়ে করেছে কিন্তু এখনও বাসর শয্যা যাপন করেনি, বরং সে বাসর যাপনের প্রত্যাশী, সে যেন আমার সাথে জিহাদে না যায়। আর ঐ ব্যক্তিও যেন আমার সাথে না যায়, যে ঘরের ভিত্তি স্থাপন করেছে, কিন্তু এখনও ছাদ উঠায়নি। আর এমন ব্যক্তিও যাবে না, যে বকরী বা উষ্ট্রী ক্রয় করেছে তার বাচ্চা প্রসবের অপেক্ষায় আছে। অতঃপর তিনি জিহাদে বের হয়ে যখন (প্রতিপক্ষ) জনপদের নিকটবর্তী হলেন, তখন ’আসর সালাতের সময় হলো অথবা সালাতের সময় প্রায় শেষ হয়ে এলো।
এমতাবস্থায় তিনি সূর্যকে লক্ষ্য করে বললেনঃ ’তুমি নির্দেশপ্রাপ্ত’ আর ’আমি নির্দেশিত’- এই বলে তিনি দু’আ করলেনঃ হে আল্লাহ! তুমি তাকে (সূর্যকে) আমাদের জন্য থামিয়ে দাও। অতঃপর আল্লাহর হুকুমে বিজয় লাভ হওয়া পর্যন্ত সূর্যের গতি স্থগিত হয়ে গেল। অতঃপর গনীমাতের মালসমূহ এক জায়গায় স্তূপ করলেন। আর তা জ্বালাবার জন্য আগুন এসেও তাকে গ্রাস করল না। তখন তিনি বললেনঃ নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে কেউ খিয়ানাত করেছ। সুতরাং তোমাদের মধ্যকার প্রত্যেক গোত্রের একজন করে আমার সাথে শপথ করতে হবে। ফলে শপথ করতে গিয়ে জনৈক ব্যক্তির হাত নবীর হাতের সাথে জড়িয়ে গেল। অতঃপর নবী বললেনঃ অবশ্যই তোমার গোত্রের কেউ খিয়ানাত করেছে। পরিশেষে তারা গাভীর মাথার মতো স্বর্ণের একটি মাথা এনে স্তূপের মধ্যে রাখল। আর তখনই আগুন এসে সমস্ত মালগুলো গ্রাস করে ফেলল।
অপর এক বর্ণনায় রয়েছে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ আমাদের পূর্বে কোনো উম্মাতের জন্য গনীমাতের মাল ভোগ করা হালাল ছিল না। আল্লাহ তা’আলা আমাদের জন্য গনীমাত হালাল করে দিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি আমাদের দুর্বলতা ও অক্ষমতা দেখেই আমাদের জন্য তা ভোগ করা হালাল করে দিয়েছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: غَزَا نَبِيٌّ مِنَ الْأَنْبِيَاءِ فَقَالَ لِقَوْمِهِ: لَا يَتْبَعُنِي رَجُلٌ مَلَكَ بُضْعَ امْرَأَةٍ وَهُوَ يُرِيدُ أَنْ يَبْنِيَ بِهَا وَلَمَّا يَبْنِ بِهَا وَلَا أَحَدٌ بَنَى بُيُوتًا وَلَمْ يَرْفَعْ سُقُوفَهَا وَلَا رَجُلٌ اشْتَرَى غَنَمًا أَوْ خَلِفَاتٍ وَهُوَ يَنْتَظِرُ وِلَادَهَا فَغَزَا فَدَنَا مِنَ الْقَرْيَةِ صَلَاةَ الْعَصْرِ أَوْ قَرِيبًا مِنْ ذَلِكَ فَقَالَ لِلشَّمْسِ: إِنَّكِ مَأْمُورَةٌ وَأَنَا مَأْمُورٌ اللَّهُمَّ احْبِسْهَا عَلَيْنَا فَحُبِسَتْ حَتَّى فَتَحَ اللَّهُ عَلَيْهِ فَجَمَعَ الْغَنَائِمَ فَجَاءَتْ يَعْنِي النَّارَ لِتَأْكُلَهَا فَلَمْ تَطْعَمْهَا فَقَالَ: إِنَّ فِيكُمْ غُلُولًا فَلْيُبَايِعْنِي مِنْ كُلِّ قَبِيلَةٍ رَجُلٌ فَلَزِقَتْ يدُ رجلٍ بيدِه فَقَالَ: فيكُم الغُلولُ فجاؤوا بِرَأْسٍ مِثْلِ رَأْسِ بَقَرَةٍ مِنَ الذَّهَبِ فَوَضَعَهَا فَجَاءَتِ النَّارُ فَأَكَلَتْهَا . زَادَ فِي رِوَايَةٍ: «فَلَمْ تَحِلَّ الْغَنَائِمُ لِأَحَدٍ قَبْلَنَا ثُمَّ أَحَلَّ اللَّهُ لَنَا الْغَنَائِمَ رَأَى ضَعْفَنَا وَعَجْزَنَا فَأَحَلَّهَا لَنَا»
ব্যাখ্যা: যে নাবী এই জিহাদে অংশগ্রহণ করেছিলেন তিনি হলেন মূসা (আঃ)-এর খাদিম বা সাথী ইউসা ইবনু নূন।
বাসরহীন নব বিবাহিত, বসতহীন নব ভবন নির্মাতা প্রভৃতি ব্যক্তিদের যুদ্ধে না নেয়ার কারণ তারা স্বতস্ফূর্তভাবে এবং দৃঢ়চিত্তে যুদ্ধ করতে পারবে না, ফলে যে কল্যাণ ছিল তা তিরোহিত হবে।
ইমাম নববী (রহঃ) বলেনঃ গুরুত্বপূর্ণ কার্যের দায়িত্বভার দাম্পত্য সম্পর্ক থেকে মুক্ত দৃঢ় ব্যক্তির হাতেই দেয়া উচিত। যাদের চিত্ত ঘর-বাড়ী ও স্ত্রী-পুত্রের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত তাদের যুদ্ধ চেতনা দুর্বল, তাই তিনি তাদের যুদ্ধে যাওয়ার জন্য অনুমতি প্রদান করেননি।
সূর্যের গতি থেমে যাওয়া একটি অলৌকিক ঘটনা। আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্যও দু’বার সূর্য থেমে গিয়েছিল।
পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, পূর্ব জাতির জন্য গনীমাতের সম্পদ ব্যবহার বৈধ ছিল না। আকাশ থেকে আগুন এসে ওটা জ্বালিয়ে দিতো। এতে বুঝা যেতো তাদের এটি কবুল হয়েছে। আর যদি ওটা থেকে আত্মসাৎ করা হতো তবে আগুন আসতো না। তখন অনুসন্ধান করে যে নিয়েছে সে নিজে ওটা জমা দিলে অথবা তার নিকট থেকে ফিরিয়ে এনে গনীমাতের অন্যান্য মালের সাথে জমা করলে আগুন এসে তা জ্বালিয়ে দিতো। (মিরকাতুল মাফাতীহ; শারহে মুসলিম ১২শ খন্ড, হাঃ ১৭৪৭)
পরিচ্ছেদঃ ৭. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - গনীমাতের সম্পদ বণ্টন এবং তা আত্মসাৎ করা
৪০৩৪-[৫০] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’উমার(রাঃ) আমাকে বলেছেন যে, খায়বার যুদ্ধের দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কয়েকজন সাহাবী এসে নিহত মুসলিমদের বর্ণনা করতে গিয়ে বললেন, অমুক অমুক শহীদ হয়েছে। পরিশেষে তারা আরো একজন সম্পর্কেও বললেন, অমুকও শহীদ হয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ কক্ষনো না। গনীমাতের মাল হতে একটি কম্বল অথবা বলেছেন একটি জুববা খিয়ানাতের দায়ে আমি তাকে জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ হতে দেখছি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে ইবনুল খত্ত্বাব! যাও, লোকেদেরকে তিনবার ঘোষণা শুনিয়ে দাও, মু’মিন ছাড়া কেউ জান্নাতে যাবে না। ’উমার বলেনঃ আমিও এ ঘোষণা তিনবার প্রচার করলাম যে, মু’মিন ছাড়া কেউ জান্নাতের অধিকারী হবে না (জান্নাতে প্রবেশ করবে না)। (মুসলিম)[1]
وَعَن ابْن عَبَّاس قَالَ: حَدثنِي عمر قَالَ: لَمَّا كَانَ يَوْمَ خَيْبَرَ أَقْبَلَ نَفَرٌ مِنْ صَحَابَةِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالُوا: فُلَانٌ شَهِيدٌ وَفُلَانٌ شَهِيدٌ حَتَّى مَرُّوا عَلَى رَجُلٍ فَقَالُوا: فُلَانٌ شَهِيدٌ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «كَلَّا إِنِّي رَأَيْتُهُ فِي النَّارِ فِي بُرْدَةٍ غَلَّهَا أَوْ عَبَاءَةٍ» ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَا ابْنَ الْخَطَّابِ اذْهَبْ فَنَادِ فِي النَّاسِ: أَنَّهُ لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ إِلَّا الْمُؤْمِنُونَ ثَلَاثًا قَالَ: فَخَرَجْتُ فَنَادَيْتُ: أَلَا إِنَّهُ لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ إِلَّا الْمُؤْمِنُونَ ثَلَاثًا. رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: এ হাদীসের ব্যাখ্যাও পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে। গনীমাতের একখানা চাদর অথবা জুববা খিয়ানাতের কারণে আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে শহীদ হওয়ার পরও জাহান্নামে যেতে হয়েছে।
আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথাও ঘোষণা দিতে বলেন, ‘‘মু’মিন ছাড়া জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’’ এখানে মু’মিন বলতে আদনা (ন্যূনতম) মু’মিনও একবার জান্নাতে যাবেই, আর প্রথম পর্যায়েই জান্নাতে প্রবেশের জন্য কামিল মু’মিন হতে হবে।
ইবনুল মালিক (রহঃ) বলেনঃ পরিভাষায় মু’মিন হলো যিনি মুহাম্মাদের প্রতি এবং তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যা নিয়ে এসেছেন তার প্রতি ঈমান আনা বা বিশ্বাস স্থাপন করা। যে গনীমাতের সম্পদ আত্মসাৎ করলো সে যেন তার আনিত বিধানকে বিশ্বাস করলো না। নাবী ধমকী হিসেবে তাদের মু‘মিন বলেননি। (মিরকাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৫৭৪)
পরিচ্ছেদঃ ৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - জিয্ইয়াহ্-এর বর্ণনা
৪০৩৫-[১] বাজালাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আহনাফ ইবনু কায়স-এর চাচা জায ইবনু মু’আবিয়াহ্ এর সহযোগী (সচিব) ছিলাম। তখন ’উমার ইবনুল খত্ত্বাব (রাঃ)-এর মৃত্যুর এক বৎসর পূর্বে আমাদের নিকট পত্রযোগে তাঁর নির্দেশ আসলো যে, অগ্নিপূজকদের (মাজূসীদের) পারস্পরিক বিবাহ বন্ধনে মাহরাম (রক্ত সম্পর্কীয়) থাকলে তাদের মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ করে দাও। ’উমার (রাঃ) প্রথমদিকে অগ্নিপূজকদের নিকট হতে জিয্ইয়াহ্ গ্রহণ করেননি। পরবর্তীতে ’আবদুর রহমান ইবনু ’আওফ(রাঃ) যখন সাক্ষ্য দিলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’হাজার’ নামক জায়গার অগ্নিপূজকদের নিকট হতে জিয্ইয়াহ্ আদায় করেছেন, তখন তিনিও গ্রহণ করতে লাগলেন। (বুখারী)[1]
বুখারী’র অপর এক বর্ণনাতে বুরয়দাহ্ হতে বর্ণিত, ’’তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন কোনো ব্যক্তিকে কোনো সৈন্যবাহিনীর প্রধান নিযুক্ত করতেন’’ হাদীসটি ’’কাফিরদের নিকট পত্র প্রেরণ’’ অধ্যায়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
بَابُ الْجِزْيَةِ
عَن بَجالَةَ قَالَ: كُنْتُ كَاتِبًا لِجَزْءِ بْنِ مُعَاوِيَةَ عَمِّ الْأَحْنَفِ فَأَتَانَا كِتَابُ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَبْلَ مَوْتِهِ بِسَنَةٍ: فَرِّقُوا بَيْنَ كُلِّ ذِي مَحْرَمٍ مِنَ الْمَجُوسِ وَلَمْ يَكُنْ عُمَرُ أَخَذَ الْجِزْيَةَ مِنَ الْمَجُوسِ حَتَّى شَهِدَ عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ عَوْفٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَخَذَهَا مِنْ مَجُوسِ هجَرَ. رَوَاهُ البُخَارِيّ
وذُكرَ حديثُ بُريدةَ: إِذَا أَمَّرَ أَمِيرًا عَلَى جَيْشٍ فِي «بَابِ الْكتاب إِلى الْكفَّار»
ব্যাখ্যা: (فَرِّقُوْا بَيْنَ كُلِّ ذِىْ مَحْرَمٍ مِنَ الْمَجُوْسِ) মাজূসীদের মধ্যকার মাহরামদের পৃথক করে দাও। অর্থাৎ ইসলামের বিধানানুযায়ী যাদের মধ্যে বিবাহ করা হারাম- এ রকম কোনো বিবাহ মাজূসীদের মধ্যে হয়ে থাকলে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ করে দাও। যেমন- মা, বোন, কন্যা ইত্যাদি। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
খত্ত্বাবী (রহঃ) বলেনঃ ‘উমার মাজূসীদের মধ্যকার মাহরামের মাঝের বিয়ে বিচ্ছেদ করার উদ্দেশ্য হলো তারা যেন এ ধরনের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ না হয় এবং তাদেরকে এ ধরনের কাজে বাধা প্রদান করা হয়। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩১৫৬)
(أَنَّ رَسُوْلَ اللّٰهِ ﷺ أَخَذَهَا مِنْ مَجُوْسِ هجَرَ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘হাজার’ অঞ্চলের মাজূসীদের নিকট থেকে জিয্ইয়াহ্ নিয়েছিলেন। হাজার বাহরায়ন-এর রাজধানীর নাম। ইবনুল হুমাম বলেনঃ হাজার বাহরায়নের একটি শহরের নাম। ‘আল্লামা ত্বীবী বলেনঃ হাজার ইয়ামানের একটি শহরের নাম যা বাহরায়নের নিকটবর্তী। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
অধিকাংশ ‘আলিমগণের মতে মাজূসীগণ আহলে কিতাব নয় তা সত্ত্বেও তাদের কাছ থেকে জিয্ইয়াহ্ গ্রহণ করা হয়ে থাকে হাদীসের দলীলের ভিত্তিতে, যেমন নাকি ইয়াহূদী ও নাসারাদের থেকে জিয্ইয়াহ্ নেয়া হয়ে থাকে কুরআনের দলীলের ভিত্তিতে। এটাও বলা হয়ে থাকে যে, তারা আহলে কিতাব। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ৩০৪১)
ইমাম মালিক, আওযা‘ঈ এবং তাদের সমমনাদের মতে সকল কাফিরের নিকট থেকে জিয্ইয়াহ্ গ্রহণ করা বৈধ। অত্র হাদীস তাদের দলীল। ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-এর মতে ‘আরব মুশরিক ও মাজূসী ব্যতীত অন্য সকল কাফিরদের থেকে জিয্ইয়াহ্ গ্রহণ করা বৈধ।
ইমাম শাফি‘ঈ-এর মতে শুধুমাত্র আহলে কিতাব এবং মাজূসীদের নিকট থেকে জিয্ইয়াহ্ গ্রহণ করা বৈধ। তারা চাই ‘আরবী হোক অথবা অনারবী হোক। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৫৮৬)
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিয্ইয়াহ্-এর বর্ণনা
৪০৩৬-[২] মু’আয ইবনু জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাঁকে ইয়ামানে (শাসনকর্তা নিযুক্ত করে) পাঠালেন, তখন প্রত্যেক (অমুসলিম) প্রাপ্তবয়স্ক হতে এক দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) অথবা তার সমপরিমাণ ইয়ামানের তৈরি মু’আফিরী কাপড় আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। (আবূ দাঊদ)[1]
عَنْ مُعَاذٍ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمَّا وَجَّهَهُ إِلَى الْيَمَنِ أَمْرَهُ أَنْ يَأْخُذَ مِنْ كُلِّ حَالِمٍ يَعْنِي مُحْتَلِمٍ دِينَارًا أَوْ عَدْلَهُ مِنَ الْمَعَافِرِيِّ: ثِيَابٌ تَكُونُ بِالْيمن. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (أَمْرَه أَنْ يَأْخُذَ مِنْ كُلِّ حَالِمٍ يَعْنِىْ مُحْتَلِمٍ دِيْنَارًا أَوْ عَدْلَه مِنَ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু‘আয -কে নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি যেন প্রত্যেক বালেগের নিকট থেকে এক দীনার অথবা তার সমমূল্যের মা‘আফিরী কাপড় জিয্ইয়াহ্ হিসেবে গ্রহণ করে।
‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ অত্র হাদীসের অর্থ থেকে বুঝা যায় যে, বালেগ পুরুষ ব্যতীত অন্য কারো নিকট থেকে জিয্ইয়াহ্ নেয়া যাবে না। ইবনুল হুমাম বলেনঃ নারী, শিশু ও পাগলের উপর সর্বসম্মতক্রমে জিয্ইয়াহ্ নেই। অনুরূপভাবে অন্ধ, বিকলাঙ্গ এবং উপার্জনে অক্ষম বৃদ্ধের ওপরও কোনো জিয্ইয়াহ্ নেই। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
(دِيْنَارًا أَوْ عَدْلَه) এক দীনার অথবা তার সমপরিমাণ। তূরিবিশতী বলেনঃ عَدْلَه আইন বর্ণে যবার দিয়ে এর অর্থ তার সমপরিমাণ অন্য কোনো বস্তু। মুখতাসারুল নিহায়াহ্-এর গ্রন্থকার বলেন, আইনবর্গ যবার অথবা যের দিয়ে عَدْلٌ ও عِدْلَ উভয়টির অর্থ সমপরিমাণ। এও বলা হয়ে থাকে যে, আইন বর্ণে যবার দিয়ে عَدْلٌ বলা হয় তখন যখন সমজাতীয় বস্তু পরিমাণে সমান হয়। আর আইন বর্ণে যের দিয়ে عِدْلٌ বলা হয় তখন যখন ভিন্ন জাতীয় বস্তু পরিমাণে সমান হয়।
খত্ত্বাবী বলেনঃ عَدْلَه অর্থাৎ এক দীনার সমমূল্যের কাপড়। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ৩০৩৬)
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিয্ইয়াহ্-এর বর্ণনা
৪০৩৭-[৩] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একই দেশে (বিপরীতমুখী) দু’ ক্বিবলা (কিবলা/কেবলা)র লোক বসবাস করা সঙ্গত নয় এবং কোনো মুসলিম থেকে জিয্ইয়াহ্ নেয়া হবে না। (আহমাদ, তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)[1]
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تَصْلُحُ قِبْلَتَانِ فِي أَرْضٍ وَاحِدَةٍ وَلَيْسَ عَلَى الْمُسْلِمِ جِزْيَةٌ» . رَوَاهُ أَحْمد وَالتِّرْمِذِيّ وَأَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (لَا تَصْلُحُ قِبْلَتَانِ فِى اَرْضٍ وَاحِدَةٍ) ‘‘একই ভূখণ্ডে দু’ ক্বিবলাহ্ একত্রে হওয়া সম্ভব নয়।’’ তূরিবিশতী বলেনঃ একই ভূখণ্ডে দু’ ধর্মের লোক বিজয়ী হতে পারে না। মুসলিমের জন্য এটা বৈধ নয় যে, সে কাফিরদের মাঝে বসবাস করবে। কেননা কোনো মুসলিম যদি তা করে তাহলে সে নিজেকে মুসলিম দেশে যিম্মির মতো করে ফেললো। আর মুসলিমের জন্য এটা বৈধ নয় যে, সে এ ধরনের যিল্লাতি নিয়ে বসবাস করবে। আবার কোনো অমুসলিম মুসলিম দেশে জিয্ইয়াহ্ ব্যতীত বসবাস করতে পারবে না। সেই সাথে তাকে স্বীয় ধর্ম প্রচার করার সুযোগ দেয়া যাবে না। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৩য় খন্ড, হাঃ ৬৩৩; মিরকাতুল মাফাতীহ)
(لَيْسَ عَلَى الْمُسْلِمِ جِزْيَةٌ) ‘‘মুসলিমের ওপর জিয্ইয়াহ্ নেই’’ এর দ্বারা উদ্দেশ্য সে ভূমি, যে ভূমি বিজয় করা হয়েছে সন্ধি চুক্তির মাধ্যমে এবং তার অধিবাসীদের ওপর করারোপ করা হয়েছে এই শর্তে যে, নির্ধারিত করের বিনিময়ে তারা উক্ত ভূমির মালিক থেকে যাবে। তবে যদি তারা ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে তাদের ভূমির উপর থেকে কর রহিত হয়ে যাবে এবং ব্যক্তির ওপর থেকে জিয্ইয়াহ্ রহিত হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে যদি কোনো ভূমি যুদ্ধ করে বিজয় করা হয় অথবা জমির মালিকানা মুসলিমদের হবে- এই শর্তে সন্ধি চুক্তি করা হয় এবং ঐ ভূমিতে অমুসলিমগণ বাস করবে কর দেয়ার বিনিময়ে তাহলে এ কর অব্যাহত থাকবে তা কোনভাবেই রহিত হবে না যদিও তার অধিবাসীগণ পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ অথবা মৃত্যুবরণ করে।
ইবনুল হুমাম বলেনঃ যে যিম্মির উপর জিয্ইয়াহ্ ধার্য আছে সে যদি বৎসর পূর্ণ হওয়ার পরও ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে তার থেকে জিয্ইয়াহ্ রহিত হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে সে যদি বৎসরের মাঝখানে ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে তার জিয্ইয়াহ্ রহিত হয়ে যাবে। তবে ইমাম শাফি‘ঈ-এর মতে তার ওপর ঐ বৎসরের কর থেকে যাবে। সে বৎসরের মাঝখানে ইসলাম গ্রহণ করুক অথবা বৎসরের শেষে ইসলাম গ্রহণ করুক। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
ইমাম খত্ত্বাবী বলেনঃ মুসলিমদের ওপর জিয্ইয়াহ্ নেই- এর দু’টি ব্যাখ্যা হতে পারে :
১. এখানে জিয্ইয়াহ্ অর্থ ভূমিকর। অর্থাৎ যদি কোনো ইয়াহূদীর আয়ত্তে এমন ভূমি থাকে যার ওপর কর ধার্য আছে সে যদি ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে তার ওপর থেকে জিয্ইয়াহ্ রহিত হয়ে যাবে এবং ঐ ভূমির করও রহিত হয়ে যাবে। এটাই সুফ্ইয়ান সাওরী এবং ইমাম শাফি‘ঈ-এর অভিমত।
২. যে যিম্মি বৎসরের কিয়দংশ পার হয়ে যাওয়ার পর ইসলাম গ্রহণ করে তার নিকট থেকে বৎসরের ঐ অংশের জিয্ইয়াহ্ আদায় করা হবে না। যেমন কোনো মুসলিম যদি বৎসরের কিছু অংশ চলে যাওয়ার পর তার পশুপাল বিক্রি করে তাহলে তার নিকট থেকে ঐ বৎসরের পশুর যাকাত আদায় করা হবে না। কেননা বৎসর পূর্ণ হওয়ার পর পশুতে যাকাত ওয়াজিব হয়। আর সে পশু বিক্রি করেছে বৎসর পূর্ণ হওয়ার আগেই। তাই তার ওপর ঐ পশুতে যাকাত ওয়াজিব হয়নি। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ৩০৫১)
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিয্ইয়াহ্-এর বর্ণনা
৪০৩৮-[৪] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রাঃ)-কে দূমাহ্-এর শাসক উকায়দির-এর বিরুদ্ধে অভিযানে পাঠালে, তারা তাঁকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসেন। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার খুন মাফ করে দিলেন এবং জিয্ইয়াহ্ আদায়ের শর্তে তার সাথে চুক্তিবদ্ধ হন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن أنس قَالَ: بَعَثَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَالِدَ بْنَ الْوَلِيدِ إِلَى أُكَيْدِرِ دُومَةَ فَأَخَذُوهُ فَأَتَوْا بِهِ فَحَقَنَ لَهُ دَمَهُ وَصَالَحَهُ على الْجِزْيَة. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (أُكَيْدِرِ دُوْمَةَ) ‘‘দূমাহ্ অঞ্চলের উকাইদির’’ দূমাহ্ শামের কোনো শহর অথবা কোনো দুর্গের নাম যা তাবূকের নিকটবর্তী এলাকায় অবস্থিত। উকাইদির দূমাহ্ অঞ্চলের বাদশাহর নাম। তিনি হলেন উকাইদির ইবনু ‘আব্দুল মালিক আল কিন্দী। তিনি খৃষ্টান ধর্মের অনুসারী ছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বিরুদ্ধে সেনাদল প্রেরণ করেছিলেন। এই সেনাদলের মুহাজিরদের নেতৃত্বে ছিলেন আবূ বাকর আর গ্রাম্য লোকেদের নেতৃত্বে ছিলেন খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ। এ সেনাদলটি চাঁদনী রাতে দুর্গের নিকট পৌঁছে।
তখন উকাইদির তার স্ত্রীর সাথে দুর্গের ছাদে ছিলেন। কোনো কারণে তিনি তার ভাই এবং স্বীয় পরিবারের লোকেদের সাথে নীচে নেমে আসলে মুসলিম বাহিনী তাকে ধরে নিয়ে যায় এবং তার ভাইকে হত্যা করে ফেলে।
(فَحَقَنَ لَه دَمَه) ‘‘তার রক্ত নিষেধ করলেন।’’ অর্থাৎ তাকে হত্যা করতে নিষেধ করে তার রক্ত সংরক্ষণ করলেন।
(وَصَالَحَه عَلَى الْجِزْيَةٌ) ‘‘জিয্ইয়াহ্ প্রদানের শর্তে তার সাথে সন্ধি চুক্তি করেন।’’ ফলে পরবর্তীতে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তিনি একজন উত্তম মুসলিমে পরিণত হন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
খত্ত্বাবী বলেনঃ দূমার উকাইদির এক ‘আরব ব্যক্তি ছিলেন। তাকে গাসসানও বলা হয়।
অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, ‘আরবদের নিকট থেকেও জিয্ইয়াহ্ গ্রহণ করা বৈধ। যেমনটি অনারবদের নিকট থেকে তা গ্রহণ করা বৈধ। ইমাম আবূ ইউসুফ-এর মতে ‘আরবদের নিকট থেকে জিয্ইয়াহ্ গ্রহণ করা বৈধ নয়। ইমাম মালিক, আওযা‘ঈ ও শাফি‘ঈ-এর মতে ‘আরব ও অনারব জিয্ইয়ার ক্ষেত্রে সবাই সমান। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ৩০৩৫)
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিয্ইয়াহ্-এর বর্ণনা
৪০৩৯-[৫] হারব ইবনু ’উবায়দুল্লাহ (রহঃ) তাঁর নানার মাধ্যমে তিনি তাঁর বাবা হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ইয়াহূদী ও নাসারাগণ (খ্রীষ্টানেরা) দশমাংশ ’উশূর (কর) আদায় করতে বাধ্য থাকবে, কিন্তু মুসলিমের ওপর ’উশূর নেই। (আহমাদ ও আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ حَرْبِ بْنِ عُبَيْدِ اللَّهِ عَنْ جَدِّهِ أبي أُمِّه عَنْ أَبِيهِ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّمَا الْعُشُورُ عَلَى الْيَهُودِ وَالنَّصَارَى وَلَيْسَ عَلَى الْمُسْلِمِينَ عُشُورٌ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَأَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যা: (لَيْسَ عَلَى الْمُسْلِمِيْنَ عُشُوْرٌ) মুসলিমদের ওপর ‘উশূর নেই। ইবনুল মালিক (রহঃ) বলেনঃ এখানে عُشُوْرٌ দ্বারা উদ্দেশ্য ব্যবসায়ী মালের উপর ধার্য কর। জমিনে উৎপাদিত শস্যের ‘উশূর উদ্দেশ্য নয়। খত্ত্বাবী (রহঃ) বলেনঃ মুসলিমদের নিকট থেকে ফসলের ‘উশূর ব্যতীত ব্যবসায়ী মালের কোনো কর নেই। ইয়াহূদী, নাসারাদের ওপর ‘উশূর প্রযোজ্য। এর দ্বারা উদ্দেশ্য তাদের সাথে যে শর্তের ভিত্তিতে সন্ধি চুক্তি হয়েছে সে চুক্তি অনুযায়ী জিয্ইয়াহ্ এবং ব্যবসায়ী মালেও কর দিবে। যদি সন্ধির সময়ে এ ধরনের চুক্তি না হয়ে থাকে তাহলে জিয্ইয়াহ্ ব্যতীত কোনো কর দিবে না। ইমাম শাফি‘ঈ-এর মতানুসারে ইয়াহূদী ও নাসারাদের জমিনে উৎপাদিত ফসলে তাদের কোনো ‘উশূর নেই। ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-এর মতে তারা যদি তাদের দেশে মুসলিম ব্যবসায়ীদের থেকে কর নিয়ে থাকে তাহলে আমরাও তাদের কাছ থেকে কর তথা ‘উশূর নিবো। আর তারা যদি তা না নিয়ে থাকে তাহলে আমরাও নিবো না। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ৩০৪৪)
পরিচ্ছেদঃ ৮. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - জিয্ইয়াহ্-এর বর্ণনা
৪০৪০-[৬] ’উকবা ইবনু ’আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রসূল! (যুদ্ধাভিযানে) আমরা কখনো কখনো এমন জনপদের উপর দিয়ে যাই যারা আমাদের আতিথেয়তা করে না, এমনকি তাদের ওপর আমাদের জন্য যতটুকু সহানুভূতি করা কর্তব্য তারা তাও পালনে অনীহা করে। আর আমরাও জোরপূর্বক তাদের নিকট হতে কিছু আদায় করি না। উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ (তোমাদের সংকটাপন্ন অবস্থায়) যদি তারা স্বেচ্ছায় আদায় না করে, তবে তোমরা (প্রয়োজন অনুপাতে) জোরপূর্বক আদায় করতে পার। (তিরমিযী)[1]
وَعَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّا نَمَرُّ بِقَوْمٍ فَلَا هُمْ يُضَيِّفُونَا وَلَا هُمْ يُؤَدُّونَ مَا لنا عَلَيْهِم منَ الحقِّ وَلَا نَحْنُ نَأْخُذُ مِنْهُمْ. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنْ أَبَوْا إِلَّا أنْ تأخُذوا كُرهاً فَخُذُوا» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
ব্যাখ্যা: (إِنْ أَبَوْا إِلَّا أنْ تَأخُذُوْا كُرْهًا فَخُذُوْا) ‘‘বাধ্য না করলে যদি তারা তোমাদের প্রাপ্য দিতে অস্বীকার করে তাহলে তাদেরকে বাধ্য করো।’’ অর্থাৎ তোমাদের যে অধিকার রয়েছে তাদের ওপর, যেমন : মেহমানদারী করা, নগদে অথবা বাকীতে পণ্য বিক্রয় করা তারা যদি এর কোনটাই না করে তাহলে বলপূর্বক তোমরা তাদের কাছ থেকে অধিকার আদায় করে নিবে। ইবনুল মালিক উল্লেখ করেছেন যে, মুহীউস্ সুন্নাহ্’য় বলা হয়ে থাকে যে, মুসলিমদের এই পথ অতিক্রম ছিল যিম্মিদের নিকট দিয়ে। আর তাদের ওপর শর্ত ছিল যে, কোনো মুসলিম বাহিনী তাদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করলে তাদের কর্তব্য ঐ মুসলিম বাহিনীর মেহমানদারী করা। যদি কারো ওপর এরূপ শর্ত না থাকে এবং মুসলিম বাহিনীও কারো সাহায্য নিতে বাধ্য না হয় তাহলে অন্যের মাল বলপূর্বক নেয়া অবৈধ। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
খত্ত্বাবী (রহঃ) বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে যখন বায়তুল মাল ছিল না তখন মুসলিম বাহিনীকে সহযোগিতা করা এবং তাদের মেহমানদারী করা সকলের কর্তব্য ছিল। অতঃপর যখন বায়তুল মাল প্রতিষ্ঠিত হয় তখন আর মুসলিমদের মালের মধ্যে অন্যের কোনো অধিকার নেই। ইবনু বাত্ত্বল বলেনঃ ইসলামের প্রথম যুগে এ ধরনের সহযোগিতা বাধ্যতামূলক ছিল। পরবর্তীতে তা রহিত হয়ে গিয়েছে। ইমাম নববী বলেনঃ ইমাম আহমাদ এবং লায়স অত্র হাদীসের বাহ্যিক অর্থই গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ মেহমানের মেহমানদারী করা বাড়ীওয়ালার কর্তব্য। স্বেচ্ছায় মেহমানদারী না করলে মেহমান বলপূর্বক তার হক আদায় করে নিবে।
জুমহূর ‘আলিমগণ এ হাদীসের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ না করে তারা এর ব্যাখ্যা করেছেন বিভিন্নভাবে :
১. মুসলিম বাহিনী যদি কারো সহযোগিতা নিতে বাধ্য হয় তাহলে তাদের মেহমানদারী করা ওয়াজিব, নচেৎ নয়।
২. হাদীসের অর্থ হলো তারা যদি তোমাদের মেহমানদারী না করে তাহলে তাদের সম্মানহানীমূলক কথা অন্যের কাছে বলতে পারো।
৩. এটা ইসলামের প্রাথমিক যুগের অবস্থা, পরবর্তীতে তা রহিত হয়ে গেছে।
(তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৫৮৯)
পরিচ্ছেদঃ ৮. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - জিয্ইয়াহ্-এর বর্ণনা
৪০৪১-[৭] আসলাম (রহঃ) হতে বর্ণিত। ’উমার ইবনুল খত্ত্বাব (রাঃ) স্বর্ণের মালিকগণের ওপর চার দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) এবং রৌপ্যের মালিকগণের ওপর চল্লিশ দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) জিয্ইয়াহ্ নির্ধারণ করেছেন। এছাড়াও তিনদিন মুসলিমদের আতিথেয়তা করাও তাদের ওপর বাধ্যতামূলক করেছেন। (মালিক)[1]
عَنْ أَسْلَمَ أَنَّ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ ضَرَبَ الْجِزْيَةَ عَلَى أَهْلِ الذَّهَبِ أربعةَ دنانيرَ وعَلى أهلِ الوَرِقِ أَرْبَعِينَ دِرْهَمًا مَعَ ذَلِكَ أَرْزَاقُ الْمُسْلِمِينَ وَضِيَافَةُ ثلاثةِ أيامٍ. رَوَاهُ مَالك
ব্যাখ্যা: (مَعَ ذٰلِكَ أَرْزَاقُ الْمُسْلِمِيْنَ وَضِيَافَةُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ) এর সাথে অতিরিক্ত মুসলিমদের খাদ্যের ব্যবস্থা করা এবং তিন দিনের মেহমানদারী করা। অর্থাৎ জিয্ইয়ার অতিরিক্ত শর্তযুক্ত করা। শারহুস্ সুন্নাতে উল্লেখ আছে যে, যিম্মীদের থেকে ১ দীনারেরও অধিক জিয্ইয়াহ্ নেয়া এবং মুসলিম যাত্রী দলের জন্য মেহমানদারীর শর্তে সন্ধিচুক্তি করা বৈধ। তবে মেহমান এবং তাদের ঘোড়ার সংখ্যা উল্লেখ করতে হবে এবং লোকেদের খাদ্যমান এবং পশুর জন্য খাবারের প্রকারও উল্লেখ থাকা আবশ্যক। তবে ধনী ও মধ্যম শ্রেণীর যিম্মীদের জন্য মেহমানের সংখ্যার পরিমাণের মধ্যে পার্থক্য করা যাবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - সন্ধি স্থাপন
الصلح দ্বারা উদ্দেশ্য المصالحة অর্থাৎ পরস্পর দু’ দলের মধ্যে সন্ধি স্থাপন। ইবনুল হুমাম বলেনঃ ইমাম যদি মনে করেন যে, শত্রুপক্ষের মালের বিনিময়ে অথবা মাল ব্যতিরেকেই সন্ধি করার মধ্যে কল্যাণ নিহিত আছে তাহলে তিনি সন্ধি করতে পারেন। কেননা আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ ’’তারা যদি শান্তির (সন্ধির) দিকে ঝুঁকে পড়ে তাহলে তুমি সেদিকে ঝুঁকে পড়ো।’’ (সূরা আল আনফাল ৮ : ৬১)
যদিও আয়াতে কল্যাণের কথা উল্লেখ নেই তথাপি ফাকীহগণ একমত যে, মুসলিমদের কল্যাণ আছে বলে ইমামের নিকট সাব্যস্ত হলে তবেই শুধুমাত্র সন্ধি করা বৈধ। আর যদি সন্ধির মধ্যে কোনো কল্যাণ পরিলক্ষিত না হয় তাহলে সন্ধি করা বৈধ নয়।
৪০৪২-[১] মিস্ওয়ার ইবনু মাখরামাহ্ ও মারওয়ান ইবনুল হাকাম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তাঁরা উভয়ে বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুদায়বিয়াহ্-এর বৎসর এক হাজারেরও অধিক সাহাবীসহ মদীনাহ্ হতে (মক্কাভিমুখে) রওয়ানা হলেন এবং যুল হুলায়ফাহ্ নামক স্থানে এসে কুরবানীর পশুর গলায় চামড়ার মালা পরালেন এবং পশুর গলার পাশে ধারালো অস্ত্র দ্বারা হালকা জখম করে উক্ত স্থানে রক্ত মেখে দিলেন আর সেখান হতে ’উমরার ইহরাম বেঁধে অগ্রসর হলেন। পথিমধ্যে তাঁর উষ্ট্রী এক উপত্যকায় বসে পড়ল, যেখান দিয়ে মক্কায় যাতায়াত করে। তখন লোকেরা হাল-হাল বলে উষ্ট্রীকে উঠাতে চেষ্টা করল, কিন্তু উষ্ট্রীকে উঠাতে ব্যর্থ হলো। তারা বলতে লাগল, ’কস্ওয়া’ (উষ্ট্রীর নাম) জিদ করেছে, ’কস্ওয়া’ জিদ করেছে। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ’কস্ওয়া’ জিদ করেনি এবং এটা তার স্বভাবজাতও নয়; বরং যিনি হাতিকে আটকিয়েছিলেন, তিনি একেও আটকিয়েছেন। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ সে সত্তার কসম, যার হাতে আমার জীবন! আল্লাহর পবিত্র স্থানের মর্যাদা রক্ষার্থে তারা (কুরায়শরা) আমার নিকট সম্মানপ্রদর্শনের লক্ষ্যÿ্য যে কোনো শর্তারোপ করতে চাইবে, আমি তা গ্রহণ করে নিব।
অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উষ্ট্রীকে ধমকের স্বরে উঠতে বললে তা সঙ্গে সঙ্গেই উঠে দাঁড়াল (দ্রুত চলতে লাগল)। এবার তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মক্কার সরাসরি পথ হতে সরে ভিন্নপথে সম্মুখপানে অগ্রসর হতে লাগলেন। অবশেষে হুদায়বিয়ার প্রান্তে স্বল্প পানির কূপের নিকট এসে অবতরণ করলেন। লোকেরা তা হতে অল্প অল্প করে পানি তুলে নিলেও কিছুক্ষণ পরেই তা শেষ হয়ে গেল এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে পিপাসার অভিযোগ করল। এমতাবস্থায় তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) স্বীয় থলি হতে একটি তীর বের করে বললেন, একে কূপটির মধ্যে ফেলে দাও। (বর্ণনাকারী বলেন) আল্লাহর কসম! তীর নিক্ষেপমাত্রই কূপের পানি পরিপূর্ণ হয়ে উপচে পড়তে লাগল। ফলে তারা সকলে উক্ত স্থান ত্যাগ করা পর্যন্ত তা হতে আত্মতৃপ্তির সাথে পানি পান করল। তারা যখন পানি পান করা ইত্যাদিতে মশগুল ঠিক তখন খুযা’ঈ গোত্রপতি বুদায়ল ইবনু ওয়ারাকা স্বীয় খুযা’আহ্ গোত্রের কতিপয় লোকজনসহ সেখানে উপস্থিত হলো। সে চলে গেলে ’উরওয়াহ্ ইবনু মাস্’ঊদ আসলো।
(পরবর্তী ঘটনা) ব্যাখ্যা করে বর্ণনাকারী বলেন, পরিশেষে সুহায়ল ইবনু ’আমর এসে উপস্থিত হলো। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (’আলী -কে) বললেনঃ ’’লিখো, এটা আল্লাহর রসূল, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ থেকে সম্পাদিত সন্ধিপত্র।’’ এ কথা শুনে সুহায়ল বলে উঠল, আল্লাহর কসম! যদি আমরা আপনাকে আল্লাহর রসূল বলে জানতাম, তাহলে কক্ষনো আপনাকে বায়তুল্লাহ যিয়ারত করা হতে বাধা সৃষ্টি করতাম না এবং আপনার সাথে যুদ্ধও করতাম না, বরং আপনি এভাবে লিখুন ’’আবদুল্লাহ-এর পুত্র মুহাম্মাদণ্ডএর পক্ষ হতে’’। তার কথা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল্লাহর কসম! আমি নিশ্চয় আল্লাহর রসূল, যদিও তোমরা আমাকে অস্বীকার করো। আচ্ছা! (হে ’আলী!) মুহাম্মাদ ইবনু ’আবদুল্লাহ লিখো। সন্ধিপত্র লেখা হচ্ছিল, তখন সুহায়ল বলে উঠল, অন্যান্য শর্তাবলীর সাথে এটাও লেখা হোক যে, যদি আমাদের কোনো লোক (মক্কা হতে) আপনার নিকট যায় তাকে অবশ্যই মক্কায় ফেরত পাঠিয়ে দিতে হবে, যদিও সে আপনার দীনে (ধর্মে) বিশ্বাসী হয়।
বর্ণনাকারী বলেনঃ সন্ধিপত্র লেখা শেষ হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণের উদ্দেশে বললেনঃ উঠো, তোমরা তোমাদের সাথে নিয়ে আসা পশু কুরবানী করে দাও এবং তারপর মাথা মুড়িয়ে ফেলো (তথা ইহরাম হতে হালাল হয়ে যাও)। এরপর কতিপয় মু’মিনাহ্ মহিলা হিজরত করে তার নিকট আসলো, তখন আল্লাহ তা’আলা এ আয়াত নাযিল করলেন, অর্থাৎ- ’’হে মু’মিনগণ! কোনো মু’মিন মুসলিম নারী হিজরত করে তোমাদের নিকট আসলে তাদেরকে ভালোভাবে পরীক্ষা করে নাও।’’ এ আয়াত দ্বারা সে সকল মুসলিম রমণীদেরকে ফেরত পাঠাতে আল্লাহ নিষেধ করে নির্দেশ দিলেন যে, তাদের মোহর ফেরত দাও। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় ফিরে আসলেন। এ সময় আবূ বাসীর নামে কুরায়শের এক ব্যক্তি মুসলিম হয়ে (মক্কা হতে মদীনায়) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসলো। অন্যদিকে কুরায়শরাও তার সন্ধানে মদীনায় দু’জন লোক পাঠাল। (সন্ধির শর্তানুযায়ী) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ বাসীরকে তাদের কাছে সোপর্দ করলেন।
তারা আবূ বাসীরকে সঙ্গে নিয়ে রওয়ানা হলো। ’’যুলহুলায়ফাহ্’’ নামক স্থানে পৌঁছে নিজেদের খাদ্য (খেজুর) খাওয়ার জন্য সওয়ারীর হতে নামলো, তখন আবূ বাসীর তাদের একজনকে বললঃ হে অমুক! আল্লাহর কসম! তোমার তরবারি তো দেখছি খুবই আকর্ষণীয় এবং মূল্যবান? আমাকে একটু দাও দেখি, ভালো করে দেখে নেই? লোকটি তরবারিটি আবূ বাসীর-এর হাতে দিলো, সে তাকে ভালোভাবে ধরে তা দ্বারা তাকে এমনভাবে আঘাত করল যে, সে সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যুবরণ করল। আর অপর লোকটি পালিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে মদীনায় এসে মসজিদে নববীতে আশ্রয় নিলো। তাকে দেখেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ লোকটি দেখে মনে হচ্ছে ভীত-সন্ত্রস্ত।
সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গিয়ে বললঃ আল্লাহর কসম! আমার সঙ্গীকে হত্যা করা হয়েছে, সুযোগ পেলে হয়ত আমাকেও হত্যা করত। এখন আমাকে বাঁচান! লোকটির পিছনে আবূ বাসীরও এসে সমুপস্থিত হলো। তাকে দেখে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আক্ষেপের সাথে বললেনঃ ’’তার মায়ের প্রতি আক্ষেপ! সে তো যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দিতে চায়। যদি তার সাথে আরও লোকজন থাকতো। যখন সে এ কথা শুনলো, তখন আবূ বাসীর বুঝতে পারল যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে পুনরায় কাফিরদের নিকট ফেরত পাঠিয়ে দেবেন। এটা বুঝে সে নীরবে সেখান হতে বের হয়ে সোজা সাগরের উপকূলের দিকে চলে গেল এবং সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করল।
বর্ণনাকারী বলেনঃ ইতোমধ্যে সুহায়ল-এর পুত্র আবূ জান্দাল বন্দীমুক্ত হয়ে আবূ বাসীর-এর সাথে মিলিত হলেন। এভাবে মক্কার কুরায়শদের নিকট হতে কোনো মুসলিম পালিয়ে আসতে সক্ষম হলে সেও সরাসরি গিয়ে আবূ বাসীর ও তার সঙ্গীদের সাথে একত্রিত হত। এভাবে ক্রমাগত সেখানে একটি গেরিলা বাহিনী গড়ে উঠল। আল্লাহর কসম, যখনই তারা শুনতে পেত যে, কুরায়শদের কোনো তেজারতি কাফিলা সিরিয়ার অভিমুখে রওয়ানা হয়েছে, তখনই তারা উক্ত কাফিলার ওপর অতর্কিত হামলা চালাত এবং তাদেরকে হত্যা করে তাদের মাল-সম্পদ সবকিছু ছিনিয়ে নিয়ে যেত। এমতাবস্থায় অতিষ্ঠ হয়ে কুরায়শগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এ প্রস্তাব পাঠাল যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যেন আত্মীয়তার সহানুভূতি ও আল্লাহর ওয়াস্তে আবূ বাসীর ও তার সঙ্গীদেরকে লুটতরাজ হতে বিরত রাখেন এবং সত্বর আবূ বাসীর-কে সেখান হতে ফিরিয়ে আনেন। সাথে সাথে এটাও জানিয়ে দিলো যে, এখন হতে মক্কার কোনো মুসলিম মদীনায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসলে তাকে আর ফেরত দিতে হবে না। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ বাসীর ও তার সাথীদেরকে আনতে লোক পাঠালেন (তখন তারা সবাই মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলেন)। (বুখারী)[1]
بَابُ الصُّلْحِ
عَنِ الْمِسْوَرِ بْنِ مَخْرَمَةَ وَمَرْوَانَ بْنِ الْحَكَمِ قَالَا: خَرَجَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَامَ الْحُدَيْبِيَةِ فِي بِضْعَ عَشْرَةَ مِائَةً مِنْ أَصْحَابِهِ فَلَمَّا أَتَى ذَا الْحُلَيْفَةِ قَلَّدَ الْهَدْيَ وَأَشْعَرَ وَأَحْرَمَ مِنْهَا بِعُمْرَةٍ وَسَارَ حَتَّى إِذَا كَانَ بِالثَّنِيَّةِ الَّتِي يُهْبَطُ عَلَيْهِمْ مِنْهَا بَرَكَتْ بِهِ رَاحِلَتُهُ فَقَالَ النَّاسُ: حَلْ حَلْ خَلَأَتِ القَصْواءُ خلأت الْقَصْوَاء فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا خَلَأَتِ الْقَصْوَاءُ وَمَا ذَاكَ لَهَا بِخُلُقٍ وَلَكِنْ حَبَسَهَا حَابِسُ الْفِيلِ» ثُمَّ قَالَ: «وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا يَسْأَلُونِي خُطَّةً يُعَظِّمُونَ فِيهَا حُرُمَاتِ اللَّهِ إِلَّا أَعْطَيْتُهُمْ إِيَّاهَا» ثُمَّ زَجَرَهَا فَوَثَبَتْ فَعَدَلَ عَنْهُمْ حَتَّى نَزَلَ بِأَقْصَى الْحُدَيْبِيَةِ عَلَى ثَمَدٍ قَلِيلِ الْمَاءِ يَتَبَرَّضُهُ النَّاسُ تَبَرُّضًا فَلَمْ يَلْبَثْهُ النَّاسُ حَتَّى نَزَحُوهُ وَشُكِيَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْعَطَشَ فَانْتَزَعَ سَهْمًا مِنْ كِنَانَتِهِ ثُمَّ أَمَرَهُمْ أَنْ يَجْعَلُوهُ فِيهِ فو الله مَا زَالَ يَجِيشُ لَهُمْ بِالرِّيِّ حَتَّى صَدَرُوا عَنْهُ فَبَيْنَا هُمْ كَذَلِكَ إِذْ جَاءَ بُدَيْلُ بْنُ وَرْقَاءَ الخزاعيُّ فِي نفَرٍ منْ خُزَاعَةَ ثُمَّ أَتَاهُ عُرْوَةُ بْنُ مَسْعُودٍ وَسَاقَ الْحَدِيثَ إِلَى أَنْ قَالَ: إِذْ جَاءَ سُهَيْلُ بْنُ عَمْرٍو فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: اكْتُبْ: هَذَا مَا قَاضَى عَلَيْهِ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ . فَقَالَ سُهَيْلٌ: وَاللَّهِ لَوْ كُنَّا نَعْلَمُ أَنَّكَ رَسُولُ اللَّهِ مَا صَدَدْنَاكَ عَنِ الْبَيْتِ وَلَا قَاتَلْنَاكَ وَلَكِنِ اكْتُبْ: مُحَمَّدَ بْنَ عَبْدِ اللَّهِ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: وَاللَّهِ إِنِّي لَرَسُولُ اللَّهِ وَإِنْ كَذَّبْتُمُونِي اكْتُبْ: مُحَمَّدَ بْنَ عَبْدِ اللَّهِ فَقَالَ سُهَيْلٌ: وَعَلَى أَنْ لَا يَأْتِيَكَ مِنَّا رَجُلٌ وَإِنْ كانَ على دينِكَ إِلاَّ ردَدْتَه علينا فَلَمَّا فَرَغَ مِنْ قَضِيَّةِ الْكِتَابِ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِأَصْحَابِهِ: «قُومُوا فَانْحَرُوا ثُمَّ احْلِقُوا» ثُمَّ جَاءَ نِسْوَةٌ مُؤْمِنَاتٌ فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى: (يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذا جاءكُم المؤمناتُ مهاجِراتٌ)
الْآيَةَ. فَنَهَاهُمُ اللَّهُ تَعَالَى أَنْ يَرُدُّوهُنَّ وَأَمَرَهُمْ أَنْ يَرُدُّوا الصَّدَاقَ ثُمَّ رَجَعَ إِلَى الْمَدِينَةِ فَجَاءَهُ أَبُو بَصِيرٍ رَجُلٌ مِنْ قُرَيْشٍ وَهُوَ مُسْلِمٌ فَأَرْسَلُوا فِي طَلَبِهِ رَجُلَيْنِ فَدَفَعَهُ إِلَى الرَّجُلَيْنِ فَخَرَجَا بِهِ حَتَّى إِذَا بَلَغَا ذَا الْحُلَيْفَةِ نَزَلُوا يَأْكُلُونَ مِنْ تَمْرٍ لَهُمْ فَقَالَ أَبُو بَصِيرٍ لِأَحَدِ الرَّجُلَيْنِ: وَاللَّهِ إِنِّي لَأَرَى سَيْفَكَ هَذَا يَا فُلَانُ جَيِّدًا أَرِنِي أَنْظُرْ إِلَيْهِ فَأَمْكَنَهُ مِنْهُ فَضَرَبَهُ حَتَّى بَرَدَ وَفَرَّ الْآخَرُ حَتَّى أَتَى الْمَدِينَةَ فَدَخَلَ الْمَسْجِدَ يَعْدُو فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَقَدْ رأى هَذَا ذُعراً» فَقَالَ: قُتِلَ واللَّهِ صَحَابِيّ وَإِنِّي لَمَقْتُولٌ فَجَاءَ أَبُو بَصِيرٍ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «وَيْلَ أُمِّهِ مِسْعَرَ حَرْبٍ لَوْ كَانَ لَهُ أَحَدٌ» فَلَمَّا سَمِعَ ذَلِكَ عَرَفَ أَنَّهُ سَيَرُدُّهُ إِلَيْهِمْ فَخَرَجَ حَتَّى أَتَى سِيفَ الْبَحْرِ قَالَ: وَانْفَلَتَ أَبُو جَنْدَلِ بْنُ سُهَيْلٍ فَلَحِقَ بِأَبِي بَصِيرٍ فَجَعَلَ لَا يَخْرُجُ مِنْ قُرَيْشٍ رَجُلٌ قَدْ أَسْلَمَ إِلَّا لَحِقَ بِأَبِي بَصِيرٍ حَتَّى اجْتَمَعَتْ مِنْهُمْ عِصَابَةٌ فو الله مَا يَسْمَعُونَ بِعِيرٍ خَرَجَتْ لِقُرَيْشٍ إِلَى الشَّامِ إِلَّا اعْتَرَضُوا لَهَا فَقَتَلُوهُمْ وَأَخَذُوا أَمْوَالَهُمْ فَأَرْسَلَتْ قُرَيْشٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تُنَاشِدُهُ اللَّهَ وَالرَّحِمَ لَمَّا أَرْسَلَ إِلَيْهِمْ فَمَنْ أَتَاهُ فَهُوَ آمِنٌ فَأَرْسَلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم إِلَيْهِم. رَوَاهُ البُخَارِيّ
ব্যাখ্যা: (عَامَ الْحُدَيْبِيَةِ) ‘‘হুদায়বিয়ার বৎসর’’। মুহিববুত্ব ত্ববারী (রহঃ) বলেনঃ হুদায়বিয়াহ্ মক্কার নিকটবর্তী একটি গ্রামের নাম। যার অধিকাংশ এলাকা হারামের অন্তর্ভুক্ত। আর তা মক্কা থেকে নয় মাইল দূরে অবস্থিত। তবে এর কিছু অংশ হারামের বাহিরে। তাই বুখারীর এক বর্ণনায় বলা হয়েছে, হুদায়বিয়াহ্ হারামের বাহিরে অবস্থিত। এ জায়গাকে বৎসরের সাথে সম্বন্ধ করার কারণ এই যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ঐ বৎসর মক্কায় প্রবেশে বাধা প্রদান করা হলে তিনি হুদায়বিয়াতে তার সঙ্গীদেরকে নিয়ে অবস্থান করেছিলেন এবং মক্কার মুশরিকদের সাথে সন্ধি চুক্তি করেছিলেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ, ফাতহুল বারী ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭৩১, ২৭৩২)
(وَأَحْرَمَ مِنْهَا بِعُمْرَةٍ) সেখানে তিনি ‘উমরাহ্ সম্পাদনের জন্য ইহরাম বাঁধলেন। অর্থাৎ যুল্হুলায়ফাতে পৌঁছানোর পর কুরবানীর পশুর গলায় মালা পড়িয়ে তার চুঁচের ডান অথবা বামপাশে আঘাত করে রক্ত বের করলেন যাতে লোকেরা বুঝতে পারে যে, পশুটি কুরবানীর জন্য নির্ধারিত। অতঃপর তিনি ‘উমরাহ্ পালনের নিমিত্তে ইহরাম বাঁধলেন তথা ‘উমরার নিয়্যাত করলেন।
(خَلَأَتِ الْقَصْوَاءُ) কস্ওয়া উটনীটি কোনো কারণ ছাড়াই বসে পড়েছে অর্থাৎ উটনীটি অসুস্থ বা দুর্বল না হওয়া সত্ত্বেও বসে পড়েছে।
(وَمَا ذَاكَ لَهَا بِخُلُقٍ) ‘‘এটা তার অভ্যাস নয়।’’ অর্থাৎ কস্ওয়া উটনী কখনো অসুস্থতা দুর্বল না হলে বসে পড়ে না।
(وَلٰكِنْ حَبَسَهَا حَابِسُ الْفِيْلِ) বরং হসত্মী বাহিনীকে বাধা দানকারী তাকে বাধাদান করেছেন। অর্থাৎ কা‘বাহ্ ঘর ধ্বংস করতে ইচ্ছুক আবরাহার হসত্মী বাহিনী যিনি থামিয়ে দিয়েছিলেন সেই মহান আল্লাহ তা‘আলাই এ উটনীটিকে থামিয়ে দিয়েছেন। তাই উটনীটি বসে পড়েছে যা তার অভ্যাসের বিপরীত।
(لَا يَسْأَلُوْنِىْ خُطَّةً يُعَظِّمُوْنَ فِيْهَا حُرُمَاتِ اللّٰهِ إِلَّا أَعْطَيْتُهُمْ) ‘‘তারা যদি এমন কোনো পরিকল্পনা উপস্থাপন করে যা দ্বারা আল্লাহর মর্যাদাসম্পন্ন বস্তুকে মর্যাদা দেয়া হয় তাহলে আমি তাদের সে পরিকল্পনা গ্রহণ করবো।’’ কাযী ‘ইয়ায বলেনঃ এর অর্থ হলো এই যে, মক্কাবাসীগণ যদি আমার নিকট এমন কোনো বিষয় উপস্থাপন করে যার মাধ্যমে তারা আল্লাহর দেয়া মর্যাদা পূর্ণ বিষয়ের যেমন ইহরাম ও মুহরিমের মর্যাদা প্রদানের ইচ্ছা পোষণ করে তাহলে আমি তাদের সে বিষয় মেনে নিবো। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
সুহায়লী বলেনঃ (إِلَّا أَعْطَيْتُهُمْ إِيَّاهَا) হাদীসের এই বাক্য বর্ণনার ক্ষেত্রে কোনো বর্ণনাতেই إِنْ شَاءَ اللّٰهُ تَعَالٰى শব্দের উল্লেখ নেই। অথচ ভবিষ্যতের কোনো কাজ করার ক্ষেত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম إِنْ شَاءَ اللّٰهُ تَعَالٰى বলতে নির্দেশিত। অতঃপর তিনি এর জবাব দিয়েছেন এই বলে যে, যেহেতু এ ক্ষেত্রে এমন কোনো কাজ করা আবশ্যক ছিল, তাই তিনি إِنْ شَاءَ اللّٰهُ تَعَالٰى বলেননি। কিন্তু তার এ জবাব সমালোচনামুক্ত নয়। কেননা আল্লাহ তা‘আলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে পূর্বেই জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি মক্কাতে প্রবেশ করবেন এই বলে যে, «تَدْخُلُنَّ الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ إِنْ شَاءَ اللّٰهُ آمِنِين» ‘‘আল্লাহ চাহে তো তুমি অবশ্যই মসজিদে হারামে নিরাপদে প্রবেশ করবে’’ এখানে তিনি নিশ্চিত প্রবেশ করবেন- এ কথা বলার পরেও বলেছেনঃ إِنْ شَاءَ اللّٰهُ تَعَالٰى অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সর্বাবস্থায় إِنْ شَاءَ اللّٰهُ تَعَالٰى বলা শিক্ষা দিয়েছেন। অতএব জবাব এই যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম إِنْ شَاءَ اللّٰهُ تَعَالٰى বলেছিলেন কিন্তু বর্ণনাকারীগণ তা বর্ণনা করেননি। অথবা এই ঘটনা ঘটেছিল إِنْ شَاءَ اللّٰهُ تَعَالٰى বলার নির্দেশ দেয়ার আগে। যদিও যে সূরাতে এই নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা মাক্কী সূরাহ তবুও এটা বিচিত্র নয় যে, এ নির্দেশ সম্বলিত আয়াত পরে নাযিল হয়েছে যা অনেক সূরার ক্ষেত্রেই বিদ্যমান। (ফাতহুল বারী ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭৩১, ২৭৩২)
(وَاللّٰهِ لَوْ كُنَّا نَعْلَمُ أَنَّكَ رَسُوْلُ اللّٰهِ مَا صَدَدْنَاكَ عَنِ الْبَيْتِ) ‘‘আল্লাহর কসম! আমরা যদি জানতাম আপনি আল্লাহর রসূল তাহলে আমরা আপনাকে বায়তুল্লাহ ত্বওয়াফ করতে বাধা দিতাম না।’’ অর্থাৎ আমরা যদি এটা জানতাম যে, প্রকৃতপক্ষেই আপনি আল্লাহর রসূল তাহলে ‘উমরার উদ্দেশে বায়তুল্লাহর ত্বওয়াফ করতে আমরা আপনাকে কোনো প্রকার বাধা দিতাম না। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
(وَيْلُ أُمِّه) ‘‘তার মায়ের সর্বনাশ হোক।’’ এটি এমন এক শব্দ যা দ্বারা তিরস্কার করা হয়। তবে ‘আরবরা কারো প্রশংসা জ্ঞাপনের জন্যও এ শব্দটি প্রয়োগ করে থাকে। তখন এর প্রকৃত অর্থ উদ্দেশ্য নেয়া হয় না। বাদীউয্ যামান বলেনঃ ‘আরবগণ تَرِبَتْ يَمِينُه শব্দটি কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ব্যবহার করে থাকে। অনুরূপভাবে তারা (وَيْلُ أُمِّه) শব্দটি ব্যবহার করে থাকে কিন্তু তার প্রকৃত অর্থ অর্থাৎ তিরস্কারের উদ্দেশ্য নয়। অনুরূপ الْوَيْل শব্দটি শাস্তি, যুদ্ধ এবং ধমক দেয়ার উদ্দেশেও ব্যবহার হয়ে থাকে। (ফাতহুল বারী ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭৩১, ২৭৩২)
(مِسْعَرُ حَرْبٍ لَوْ كَانَ لَه أَحَدٌ) তার সাথে কেউ থাকলে সে তো যুদ্ধ শুরু করে দিবে। খত্ত্বাবী বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেন তার এ বিশেষণ বর্ণনা করেছেন যে, এ লোকটিকে যদি কেউ সাহায্য সহযোগিতা করার জন্য এগিয়ে আসে তাহলে অবশ্যই যুদ্ধ বাধিয়ে দিবে। এতে তার প্রতি পালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে যাতে তাকে কাফিরদের নিকট ফিরিয়ে না দিতে হয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ, ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭৬২)
(فَلَمَّا سَمِعَ ذٰلِكَ عَرَفَ أَنَّه سَيَرُدُّه إِلَيْهِمْ) আবূ বাসীর যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উক্ত বক্তব্য শুনলেন তখন তিনি বুঝতে পারলেন যে, তিনি তাকে তাদের কাছেই ফেরত পাঠাবেন।
কাযী ‘ইয়ায বলেনঃ আবূ বাসীর তা বুঝতে পেরেছিলেন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বক্তব্য (مِسْعَرُ حَرْبٍ لَوْ كَانَ لَه أَحَدٌ) থেকে। কেননা তার এ বক্তব্য এটা বুঝায় যে, তিনি তাকে আশ্রয় দিবেন না এবং সাহায্যও করবেন না। মুশরিকদের কবল থেকে তার মুক্তির একটি পথ আর তা হলো তার কোনো সহযোগীকে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা।
(حَتّٰى اَجْتَمَعَتْ مِنْهُمْ عِصَابَةٌ) এমনি করে পালিয়ে যাওয়া একদল লোক একত্র হলো, عِصَابَةٌ শব্দটি ৪০ জন পর্যন্ত লোকের দলকে বুঝায়। তবে এ হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, عِصَابَةٌ ৪০-এর অধিক লোক বুঝানোর জন্যও ব্যবহার হয়ে থাকে। কেননা ইবনু ইসহক-এর বর্ণনানুযায়ী আবূ বাসীর-এর সাথে যারা মিলিত হয়েছিল তাদের সংখ্যা ছিল ৭০ জনের মতো। সুহায়লী মনে করেন যে, তাদের সংখ্যা তিনশতে পৌঁছেছিল। (ফাতহুল বারী ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭৩১, ২৭৩২; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭৬২)
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - সন্ধি স্থাপন
৪০৪৩-[২] বারা ইবনু ’আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুদায়বিয়ার দিন তিনটি শর্তের উপর মুশরিকদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন- [১] মক্কার কোনো মুশরিক (ইসলাম গ্রহণ করে) তাঁর নিকট (মদীনায়) এসে পড়লে তাকে কুরায়শদের নিকট ফেরত দিতে হবে। আর মদীনাহ্ হতে কোনো মুসলিম (মুরতাদ হয়ে) তাদের নিকট চলে গেলে তাকে মুসলিমদের নিকট ফেরত দিতে হবে না, [২] আগামী বৎসর মুসলিমরা শুধুমাত্র তিনদিনের জন্য মক্কায় আসতে পারবে, [৩] মক্কায় প্রবেশের সময় যুদ্ধাস্ত্র তরবারি এবং তীর, ধনুক ইত্যাদি কোষবদ্ধ রাখতে হবে। সন্ধিপত্র সম্পাদিত হওয়ার পরক্ষণেই (সুহায়ল ইবনু ’আমর-এর পুত্র) আবূ জান্দাল হাত পায়ে শৃঙ্খলাবস্থায় সেখানে এসে উপস্থিত হলো। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সন্ধিপত্রের শর্তানুযায়ী) তাকে মুশরিকদের নিকট ফেরত দেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الصُّلْحِ
وَعَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ قَالَ: صَالَحَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمُشْرِكِينَ يَوْمَ الْحُدَيْبِيَةِ عَلَى ثَلَاثَةِ أَشْيَاءَ: عَلَى أَنَّ مَنْ أَتَاهُ مِنَ الْمُشْرِكِينَ رَدَّهُ إِلَيْهِمْ وَمَنْ أَتَاهُمْ مِنَ الْمُسْلِمِينَ لَمْ يَرُدُّوهُ وَعَلَى أَنْ يَدْخُلَهَا مِنْ قَابِلٍ وَيُقِيمَ بِهَا ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ وَلَا يَدْخُلَهَا إِلَّا بِجُلُبَّانِ السِّلَاحِ وَالسَّيْفِ وَالْقَوْسِ وَنَحْوِهِ فَجَاءَ أَبُو جَنْدَلٍ يَحْجِلُ فِي قُيُودِهِ فَرده إِلَيْهِم
ব্যাখ্যা: (وَلَا يَدْخُلَهَا إِلَّا بِجُلُبَّانِ السِّلَاحِ وَالسَّيْفِ) মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় প্রবেশকালে কোষবদ্ধ তরবারি সাথে রাখতে পারবে। جُلُبَّانِ বলা হয় চামড়ার এমন থলেকে যার মধ্যে কোষবদ্ধ তরবারি চাবুক এবং বিভিন্ন যন্ত্রপাতি রাখা হয়। অতঃপর তা হাওদাজের পিছনের কাঠের সাথে ঝুলিয়ে দেয়া হয়। মোট কথা হচ্ছে, ‘আরবদের এটা অভ্যাস ছিল যে, তারা কখনো তরবারি ব্যতীত সফর করতো না। চাই যুদ্ধাবস্থায় হোক আর নাই হোক। তাই তৃতীয় শর্তারোপ করা হয় যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় প্রবেশকালে তরবারি তো সাথে রাখতে পারবেন তবে তা থাকবে কোষবদ্ধ। তরবারি কোষমুক্ত রাখতে পারবে না।
ইবনুল মালিক বলেনঃ তৃতীয় শর্তের উদ্দেশ্য হলো মুসলিমগণ মক্কাতে তরবারি কোষমুক্ত অবস্থায় প্রবেশ করবে না যা যুদ্ধের প্রস্ত্ততি বুঝায়। আর তারা এ শর্তারোপ এজন্য করে যাতে বুঝা যায় যে, মক্কাবাসী ও মুসলিমগণের মধ্যে কোনো যুদ্ধ নেই। যাতে এ ধারণা না জন্মে যে, তারা মক্কাতে বলপূর্বক প্রবেশ করতে পেরেছে। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সকল শর্ত মেনে চুক্তি সম্পাদনের কারণ ছিল মুসলিমগণের মাঝে তখনো দুর্বলতা ছিল। কারী বলেনঃ ইবনু মালিক-এর এ ব্যাখ্যা ভুল। কেননা মুসলিমদের মাঝে তখন দুর্বলতা ছিল না। কেননা মুসলিমদের সংখ্যা তখন দুই হাজারের কাছাকাছি ছিল। আর তারা সবাই ‘আরবের সাহসী বীর। আর বদরে মাত্র ৩১৩ জন ‘আরবযোদ্ধা মক্কাবাসী ১০০০ মুশরিকের বিরুদ্ধে জয়লাভ করে। বরং এ শর্ত মেনে সন্ধি করার কারণ ছিল এই যে, মুসলিমগণ তখন ইহরাম অবস্থায় হারাম অঞ্চলে ছিলেন। যে অবস্থায় ঐ স্থানে যুদ্ধ করা যায় না। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হারাম এলাকার মর্যাদা রক্ষার্থে সন্ধি চুক্তির শর্তগুলো মুসলিমদের প্রতিকূলে হলেও তা মেনে চুক্তি করেছিলেন সুদূরপ্রসারী কল্যাণের জন্য। যা পরবর্তীতে সঠিক বলে প্রমাণিত হয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ, ‘আওনুল মা‘বূদ ৩য় খন্ড, হাঃ ১৮২৯)
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - সন্ধি স্থাপন
৪০৪৪-[৩] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। কুরায়শগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সন্ধি করল এবং তারা তাতে এ শর্তারোপ করল, যদি তোমাদের (মুসলিমদের) কোনো লোক আমাদের কাছে (মক্কায়) আসে, তবে তাকে আমরা তোমাদের নিকট ফেরত দেব না। আর আমাদের (কুরায়শদের) কোনো লোক (মদীনায়) চলে গেলে তোমরা তাকে আমাদের নিকট ফেরত দিতে বাধ্য থাকবে। এটা শুনে সাহাবীগণ (ক্রোধান্বিত হয়ে) বলে উঠলেন : হে আল্লাহর রসূল! আপনি কি এ শর্তও লিখতে বলছেন? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দৃঢ়কণ্ঠে জবাব দিলেন : হ্যাঁ। কেননা আমাদের নিকট হতে যে ব্যক্তি (স্বেচ্ছায়) তাদের নিকট চলে যাবে, তাকে আল্লাহ তা’আলা স্বীয় রহমত হতে বঞ্চিত করবেন। আর তাদের কোনো ব্যক্তি যদি আমাদের নিকট চলে আসে, আশা করা যায় (তাকে ফেরত দেয়ার দরুন) আল্লাহ তা’আলা শীঘ্রই তার মুক্তির একটা পথ বের করে দেবেন। (মুসলিম)[1]
بَابُ الصُّلْحِ
وَعَن أنس: أَنَّ قُرَيْشًا صَالَحُوا النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاشْتَرَطُوا عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّ مَنْ جَاءَنَا مِنْكُمْ لَمْ نَرُدَّهُ عَلَيْكُمْ وَمَنْ جَاءَكُمْ مِنَّا رَدَدْتُمُوهُ عَلَيْنَا فَقَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَنَكْتُبُ هَذَا؟ قَالَ: «نَعَمْ إِنه من ذهبَ منَّا إِليهم فَأَبْعَدَهُ اللَّهُ وَمَنْ جَاءَنَا مِنْهُمْ سَيَجْعَلُ اللَّهُ لَهُ فرجا ومخرجاً» . رَوَاهُ مُسلم
ব্যাখ্যা: (إِنَّه مَنْ ذَهَبَ مِنَّا إِلَيْهِمْ فَأَبْعَدَهُ اللّٰهُ وَمَنْ جَاءَنَا مِنْهُمْ سَيَجْعَلُ اللّٰهُ لَه فَرَجًا وَمَخْرَجًا) আমাদের মধ্য থেকে যারা তাদের কাছে যাবে আল্লাহ তা‘আলা তাকে তার রহমাত থেকে বঞ্চিত করবেন। আর যে ব্যক্তি তাদের মধ্য থেকে ইসলাম গ্রহণ করে আমাদের কাছে আসবে আর শর্তানুযায়ী যদি আমরা তাকে তাদের কাছে ফিরিয়ে দেই তাহলেও আল্লাহ তা‘আলা তার মুক্তির ব্যবস্থা করবেন।
ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ (إِنَّه مَنْ ذَهَبَ) ‘‘যে ব্যক্তি আমাদের কাছ থেকে তাদের কাছে চলে যাবে’’ এ বাক্যটি পূর্বে উল্লেখিত نعم শব্দের ব্যাখ্যা। অর্থাৎ সন্ধি চুক্তির এ শর্ত ‘‘মুসলিমদের মধ্য থেকে কেউ যদি মদীনাহ্ থেকে পালিয়ে মক্কা গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে তাহলে মুশরিকগণ তাকে মুসলিমদের কাছে ফেরত পাঠাবে না। পক্ষান্তরে মুশরিকদের মধ্য থেকে কেউ যদি ইসলাম গ্রহণ করে মদীনায় পালিয়ে আসে তাহলে মুসলিমগণ তাকে মক্কায় ফেরত পাঠাতে বাধ্য থাকবে।’’ এ শর্ত শুনার পর মুসলিমগণ বলেছিলেন, আমরা এমন শর্ত লিখবো যা মুসলিমদের স্বার্থের প্রতিকূলে এবং তা একটি অসম চুক্তি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেনঃ হ্যাঁ, তা লিখো এবং কেন লিখতে রাজী হলেন তার ব্যাখ্যা দিলেন এই বলে যে, আমাদের মধ্য থেকে যারা চলে যাবে.....। সহীহুল বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে, উপরে বর্ণিত শর্তানুসারে চুক্তি হতে যাচ্ছে এমন কথা শুনে ‘উমার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে তাকে বললেনঃ আপনি কী সত্য নাবী নন? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হ্যাঁ (আমি সত্য নাবী)। ‘উমার বললেনঃ আমরা কি সত্যের উপর আর আমাদের শত্রুগণ বাতিলের উপর নয়? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হ্যাঁ (তোমার কথা সঠিক) ‘উমার তখন বললেনঃ তাহলে আমাদের এ সঠিক ধর্মকে এত নীচে নামাচ্ছেন কেন? কেন এ অসম চুক্তি করছেন? তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমি আল্লাহর রসূল, আমি তার অবাধ্য হতে পারি না। আর তিনি অবশ্যই আমাকে সাহায্য করবেন। ‘উমার আবার বললেনঃ আপনি কি আমাদের বলতেন না যে, আমরা অতি সত্বরই বায়তুল্লাহতে যাবো এবং আমরা তা ত্বওয়াফ করবো? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ হ্যাঁ, তবে আমি কি বলেছি যে, এবারই সেখানে যাবো? তখন ‘উমার বললেনঃ না, আপনি তা বলেননি। এবার রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি অবশ্যই বায়তুল্লাহতে যাবে এবং তা ত্বওয়াফ করবে। অতঃপর ‘উমার আবূ বাকর -এর কাছে গিয়ে সে প্রশ্নগুলো করলেন যে প্রশ্ন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে করেছিলেন। আবূ বাকর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মতই জবাব দিলেন। ‘আলিমগণ বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ‘উমারের এ প্রশ্ন দীনের প্রতি সন্দেহের কারণে ছিল না বরং তার কাছে যে বিষয়টি অস্পষ্ট ছিল তা প্রকাশ করার উদ্দেশেই ছিল এ প্রশ্ন। আর ‘উমার-এর প্রশ্নের উত্তরে আবূ বাকর যা বলেছিলেন তা ছিল আবূ বাকর -এর মহান মর্যাদা ও তার গভীর জ্ঞানের প্রমাণ। এমনকি সকল বিষয়েই তার মর্যাদা অন্যের চাইতে বেশী। কারণ এখানে প্রমাণ পাওয়া যায় ‘উমার যা অনুধাবন করতে পারেননি আবূ বাকর তা অনুধান করতে পেরেছিলেন। তাই তার জবাব রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জবাবের মতই ছিল। তবে এখানে একটা প্রশ্ন থেকে যায়, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ‘উমার -এর প্রশ্নের উত্তরে বললেনঃ আমি আল্লাহর রসূল, আমি তার অবাধ্য হতে পারি না এবং অবশ্যই তিনি আমাকে সাহায্য করবেন। এরপরও ‘উমার কেন আবূ বাকর -এর কাছে গিয়ে তাকে প্রশ্ন করলেন? এর জবাব এই যে, আবূ বাকর -এর নিকট এ বিষয়ে কি জ্ঞান আছে তা জানার জন্য তিনি তাকে প্রশ্ন করেছিলেন। ‘‘আমি আল্লাহর রসূল, আমি তাঁর অবাধ্য হতে পারি না’’ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ বক্তব্যে স্পষ্ট জানা যায় যে, হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি আল্লাহর নির্দেশেই হয়েছিল। মুসলিমদের দুর্বলতার কারণে নয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ৯. প্রথম অনুচ্ছেদ - সন্ধি স্থাপন
৪০৪৫-[৪] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের বায়’আত গ্রহণকালে কুরআন মাজীদের এ আয়াতের আলোকে পরীÿা করতেন- অর্থাৎ- ’’হে নবী! যখন মু’মিন রমণীগণ আপনার কাছে বায়’আত করতে আসে....’’- তাদের মধ্যে যে রমণী আয়াতে উল্লেখিত শর্তাবলী মেনে চলার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হত তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে বলতেনঃ আমি তোমাকে মুখে কথার মাধ্যমে বায়’আত করে নিয়েছি। আল্লাহর কসম! বায়’আত গ্রহণকালে তাঁর হাত কোনো রমণীর হাত স্পর্শ করেনি। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الصُّلْحِ
وَعَن عَائِشَة قَالَتْ فِي بَيْعَةِ النِّسَاءِ: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَمْتَحِنُهُنَّ بِهَذِهِ الْآيَة: (يَا أيُّها النبيُّ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم إِذا جاءكَ المؤمناتُ يبايِعنَكَ)
فَمَنْ أَقَرَّتْ بِهَذَا الشَّرْطِ مِنْهُنَّ قَالَ لَهَا: «قَدْ بَايَعْتُكِ» كَلَامًا يُكَلِّمُهَا بِهِ وَاللَّهِ مَا مَسَّتْ يَدُهُ يَدَ امْرَأَةٍ قَطُّ فِي الْمُبَايَعَةِ
ব্যাখ্যা: (إِنَّ رَسُوْلَ اللّٰهِ ﷺ كَانَ يَمْتَحِنُهُنَّ) অবশ্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু’মিনাহ্ মহিলাদের পরীক্ষা নিতেন। ইবনু ‘আব্বাস বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক মু’মিনাহ্ মহিলাদের পরীক্ষা ছিল এরূপ : তিনি তাদেরকে শপথ করতে বলতেন, তারা তাদের স্বামীদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করেন না। মুসলিম কোনো পুরুষের প্রতি তাদের কোনো আকর্ষণ নেই, কোনো ভূমির বিপরীতে অন্য কোনো ভূমির প্রতি আগ্রহ নেই, স্বীয় আবাস ছেড়ে যাওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। একমাত্র ইসলামের আকর্ষণে এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি ভালোবাসার কারণে দেশত্যাগ করেছেন। তারা যদি এসব বিষয়ে শপথ করে তা মেনে নিতো তাহলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে ফেরত পাঠাতেন না। বরং উক্ত মহিলার স্বামীকে তার মুহরানা ফিরিয়ে দিতেন এবং তারা যা ব্যয় করেছে তাও ফিরিয়ে দিতেন।
(فَمَنْ أَقَرَّتْ بِهٰذَا الشَّرْطِ مِنْهُنَّ قَالَ لَهَا : قَدْ بَايَعْتُكِ) যে সকল মহিলা আয়াতে বর্ণিত শর্ত মেনে নিতো তাকে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলতেন, তোমার বায়‘আত আমি গ্রহণ করেছি। বায়‘আত গ্রহণের জন্য তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কোনো মহিলার হাত ধরতেন না। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
হাদীসের শিক্ষা: ১. মহিলাদের বায়‘আত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের সাথে শুধুমাত্র কথায় বায়‘আত গ্রহণ করা হয়। তাদের হাত বায়‘আত গ্রহণকারী ইমামের হাতের সাথে স্পর্শ করবে না।
২. পুরুষের বায়‘আত গ্রহণ করার ক্ষেত্রে ইমাম তাদের হাত ধরবেন।
৩. প্রয়োজনে অপরিচিত মহিলার সাথে কথা বলা এবং তাদের কথা শ্রবণ করা বৈধ।
৪. মহিলাদের কণ্ঠস্বর আওরাতের (পর্দার) অন্তর্ভুক্ত নয়।
৫. বিনা প্রয়োজনে মাহরাম নয় এমন মহিলার শরীর স্পর্শ করা বৈধ নয়। (শারহে মুসলিম ১৩শ খন্ড, হাঃ ১৮৬৬)
পরিচ্ছেদঃ ৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সন্ধি স্থাপন
৪০৪৬-[৫] মিস্ওয়ার ও মারওয়ান (রাঃ) হতে বর্ণিত। তারা (কুরায়শরা) মুসলিমদের সাথে (হুদায়বিয়াহ্-তে) দশ বৎসরের জন্য যুদ্ধ স্থগিত রাখতে সন্ধিপত্র করেছিল, যেন জনসাধারণ নিশ্চিন্তে এবং নিরাপদে থাকতে পারে। তাতে এটাও উল্লেখ ছিল যে, আমরা পরস্পরের বিরুদ্ধাচরণ করব না এবং পরস্পরের মধ্যে গোপনে বা প্রকাশ্যে কেউ চুরি বা বিশ্বাসঘাতকতার আশ্রয় নেব না। (আবূ দাঊদ)[1]
عَن المِسْوَرِ وَمَرْوَانَ: أَنَّهُمُ اصْطَلَحُوا عَلَى وَضْعِ الْحَرْبِ عَشْرَ سِنِينَ يَأْمَنُ فِيهَا النَّاسُ وَعَلَى أَنَّ بَيْنَنَا عَيْبَةً مَكْفُوفَةً وَأَنَّهُ لَا إِسْلَالَ وَلَا إِغْلَالَ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (اصْطَلَحُوْا عَلٰى وَضْعِ الْحَرْبِ عَشْرَ سِنِيْنَ) ‘তারা দশ বছর যুদ্ধ নয়’ চুক্তি করেছিল। অর্থাৎ মক্কার মুশরিকগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে হুদায়বিয়াতে দশবছরের জন্য যুদ্ধ নয় চুক্তি করেছিল। এ চুক্তিতে বানূ বাকর মক্কার কুরায়শদের পক্ষ গ্রহণ করে। আর খুযা‘আহ্ গোত্র নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ নেয়। চুক্তির পর সতের বা আঠার মাস অতিবাহিত না হতেই বানূ বাকর যারা কুরায়শদের পক্ষ নিয়েছিল তারা খুযা‘আহ্ গোত্রের ওপর আক্রমণ চালায় যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষাবলম্বন করেছিল। আর যুদ্ধে কুরায়শগণ খুযা‘আদের বিরুদ্ধে বাকর গোত্রকে সাহায্য করে এই ভেবে যে, রাতের বেলার আক্রমণে কে কাকে সাহায্য করেছে কেউ তা দেখতে পাবে না। তাই তারা বানূ বাকরকে অস্ত্র এবং বাহন দিয়ে সাহায্য করে। এদিকে খুযা‘আহ্ গোত্রের পক্ষ থেকে ‘আমর ইবনু মালিক এ সংবাদ নিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে চলে গিয়ে তাকে বিষয়টি অবহিত করলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আমরকে বলেনঃ হে ‘আমর! তোমাকে সাহায্য করা হবে। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমদের মক্কা আক্রমণ করার জন্য প্রস্ত্ততি নিতে বললেন এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন তিনি যেন বিষয়টি মক্কার কাফিরদের থেকে আড়াল করে রাখেন। এভাবেই মক্কা বিজয়ের ঘটনা ঘটে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
(وَعَلٰى اَنَّ بَيْنَنَا عَيْبَةً مَكْفُوْفَةً) চুক্তির মধ্যে এও ছিল যে, আমাদের দরজা বন্ধ থাকবে। ইমাম শাওকানী ‘নায়লুল আওত্বার’-এ বলেনঃ অর্থাৎ ইতোপূর্বে আমাদের মাঝে যুদ্ধের যে সমস্ত কারণ রয়েছে সেজন্য আমরা কেউ কাউকে দোষারোপ করবো না। বরং আমাদের মাঝে যে চুক্তি হয়েছে তা সংরক্ষণ করবো।
(لَا إِسْلَالَ وَلَا إِغْلَالَ) ‘‘চুরিও হবে না এবং খিয়ানাতও হবে না।’’ অর্থাৎ লোকজন একে অপর থেকে জান ও মালের নিরাপত্তা লাভ করবে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল প্রকার অনিষ্ট থেকে। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৭৬৩)
পরিচ্ছেদঃ ৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সন্ধি স্থাপন
৪০৪৭-[৬] সফ্ওয়ান ইবনু সুলায়ম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কিছু সংখ্যক সাহাবীর সন্তানদের হতে বর্ণনা করেন। তারা তাঁদের পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোনো লোকের ওপর অন্যায়-জুলুম করে যার সাথে তার সন্ধি হয়েছে, অথবা তার কোনো ক্ষতি সাধন করে, অথবা সাধ্যাতীত তাকে কষ্ট দেয়, অথবা তার কাছ থেকে জোরপূর্বক কোনো কিছু আদায় করে, কিয়ামতের দিন আমিই তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করব। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ صَفْوَانَ بْنِ سُلَيْمٍ عَنْ عِدَّةٍ مِنْ أَبْنَاءِ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ آبَائِهِمْ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «أَلَا مَنْ ظَلَمَ مُعَاهِدًا أَوِ انْتَقَصَهُ أَوْ كَلَّفَهُ فَوْقَ طَاقَتِهِ أَوْ أَخَذَ مِنْهُ شَيْئًا بِغَيْرِ طِيبِ نَفْسٍ فَأَنَا حَجِيجُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যা: (مَنْ ظَلَمَ مُعَاهِدًا) ‘‘যে ব্যক্তি অঙ্গীকারাবদ্ধ ব্যক্তির প্রতি জুলুম করবে’’। অর্থাৎ যিম্মী অথবা ইসলামী রাষ্ট্রে নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে এমন ব্যক্তির ওপর জুলুম করবে।
(أَوِ انْتَقَصَه أَوْ كَلَّفَه) ‘‘অথবা সাধ্যের চেয়ে বেশী কষ্ট চাপিয়ে দিবে।’’ অর্থাৎ জিয্ইয়াহ্ অথবা কর আদায়ের ক্ষেত্রে জুলুম করবে এভাবে যে, যার ওপর জিয্ইয়াহ্ ওয়াজিব নয় তার জিয্ইয়াহ্ আদায় করবে অথবা যা ওয়াজিব তার চাইতে অধিক আদায় করবে।
(أَنَا حَجِيجُه يَوْمَ الْقِيَامَةِ) কিয়ামত দিবসে আমি তার বিরুদ্ধে লড়বো। অর্থাৎ বিচার দিবসে আমি মাযলূমের পক্ষ নিয়ে যালিমের বিরুদ্ধে দলীল প্রমাণ উপস্থাপন করবো। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মাবূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ৩০৫০)
পরিচ্ছেদঃ ৯. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - সন্ধি স্থাপন
৪০৪৮-[৭] উমায়মাহ্ বিনতু রুকয়কাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কিছু সংখ্যক মহিলার সাথে আমিও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে বায়’আত করলাম। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদেরকে বলেছেনঃ আমি তোমাদের নিকট হতে এমন কিছু বিষয়ের শপথ নিলাম, যা পালনে তোমরা সক্ষম। আমি বললামঃ আল্লাহ ও তাঁর রসূল আমাদের জন্য আমাদের নিজেদের চেয়ে অধিক দয়াময়। অতঃপর আমি বললামঃ হে আল্লাহর রসূল! আমাদেরকে বায়’আত করে নিন। অর্থাৎ- (পুরুষদের ন্যায়) আমাদের হাতে হাত ধরে বায়’আত গ্রহণ করুন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ শুনো, আমার মুখের বাণী (কথা) দ্বারা একশত মহিলার বায়’আত গ্রহণ করা, একজন মহিলার বায়’আত গ্রহণ করার অনুরূপ। (তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ্ ও মুয়াত্ত্বা মালিক)[1]
وَعَن أُميمةَ بنت رقيقَة قَالَتْ: بَايَعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي نِسْوَةٍ فَقَالَ لَنَا: «فِيمَا اسْتَطَعْتُنَّ وَأَطَقْتُنَّ» قُلْتُ: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَرْحَمُ بِنَا مِنَّا بِأَنْفُسِنَا قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ بَايِعْنَا تَعْنِي صَافِحْنَا قَالَ: «إِنَّمَا قَوْلِي لِمِائَةِ امْرَأَةٍ كَقَوْلِي لِامْرَأَةٍ وَاحِدَةٍ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَالنَّسَائِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ وَمَالِكٌ فِي الْمُوَطَّأ
ব্যাখ্যা: (فَقَالَ لَنَا : «فِيْمَا اسْتَطَعْتُنَّ وَأَطَقْتُنَّ») তিনি আমাদের বললেনঃ সাধ্যানুযায়ী তোমরা যা পারো অর্থাৎ তোমরা যে শর্তের উপর বায়‘আত করলে সাধ্যানুযায়ী তা পালন করবে।
(قُلْتُ : اللّٰهُ وَرَسُوْلُه أَرْحَمُ بِنَا مِنَّا بِأَنْفُسِنَا) আমরা আমাদের নাফসে্র প্রতি যত না দয়াশীল আল্লাহ ও তাঁর রসূল আমাদের প্রতি তার চাইতে অধিক দয়াশীল। অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর রসূল আমাদের স্বার্থের দিকে আমাদের চাইতে অধিক লক্ষ্য রাখেন। আর এটা এজন্য যে, তিনি ও তাঁর রসূল আমাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু।
(يَا رَسُوْلَ اللّٰهِ! بَايِعْنَا) হে আল্লাহর রসূল! আপনি আমাদের বায়‘আত নিন। অর্থাৎ আপনি কথার মাধ্যমে তো আমাদের অঙ্গীকার নিয়েছেন। এবার আমাদের হাতে হাত রেখে অঙ্গীকার নিন যেরূপ পুরুষদের হাতে হাত রেখে অঙ্গীকার নিয়ে থাকেন।
(إِنَّمَا قَوْلِىْ لِمِائَةِ امْرَأَةٍ كَقَوْلِىْ لِامْرَأَةٍ وَاحِدَةٍ) একশত মহিলার সাথে আমার কথা বলা এক মহিলার সাথে কথা বলার মতই। অর্থাৎ যেহেতু আমি মহিলাদের নিকট থেকে অঙ্গীকার নেয়ার ক্ষেত্রে তাদের হাত স্পর্শ করি না শুধু কথা বলার মাধ্যমে তার কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়ে থাকি, তাই তাদের একজনের সাথে যেমন কথা বলি অনুরূপ একশত জনের সাথেও শুধুমাত্র কথাই বলি। কোনো মহিলার হাতের সাথে হাত মিলিয়ে অঙ্গীকার গ্রহণ করি না। (মিরকাতুল মাফাতীহ; তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাঃ ১৫৯৭)
পরিচ্ছেদঃ ৯. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - সন্ধি স্থাপন
৪০৪৯-[৮] বারা ইবনু ’আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুলক’দাহ্ মাসে ’উমরার উদ্দেশে (মদীনাহ্ হতে) রওয়ানা হলেন। কিন্তু মক্কাবাসীরা তাকে মক্কা প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করল। পরিশেষে তাদের সাথে এ চুক্তি সম্পাদিত হলো যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আগামী বৎসর তিনদিনের জন্য মক্কায় প্রবেশ করতে পারবেন। অতঃপর যখন সন্ধিপত্র লেখা হচ্ছিল তখন লেখা হলো, ’’এটা সেই সন্ধিপত্র যা আল্লাহর প্রেরিত রসূল মুহাম্মাদ এর পক্ষ হতে সম্পাদিত’’। তখন মক্কাবাসীরা আপত্তি করে বসল : ’’আমরা তো আপনাকে আল্লাহর রসূল হিসেবে স্বীকার করি না। যদি আমরা আপনাকে আল্লাহর রসূল হিসেবে বিশ্বাস করতাম, তাহলে আপনাকে তো বাধাই দিতাম না; বরং আপনি হলেন ’’আবদুল্লাহ-এর পুত্র মুহাম্মাদ’’। জবাবে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আমি আল্লাহর রসূল ও ’আবদুল্লাহ-এর পুত্র মুহাম্মাদ! অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ’আলী ইবনু আবূ ত্বালিব -কে বললেনঃ ’’রসূলুল্লাহ’’ শব্দটি মুছে ফেলো।
’আলী বললেনঃ আল্লাহর কসম! আপনার এ নাম আমি কক্ষনো মুছব না। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজেই কাগজ নিয়ে লিখে দিলেন ’’এটা ’আবদুল্লাহ-এর পুত্র মুহাম্মাদ এর পক্ষ হতে সন্ধিপত্র’’। অথচ তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ভালোভাবে লেখতেও জানতেন না। তাতে উল্লেখ ছিল, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যুদ্ধাস্ত্রসহ মক্কায় প্রবেশ করতে পারবেন না। কেবলমাত্র তরবারি কোষবদ্ধ রাখতে পারবেন। আর (মক্কা হতে) তাঁর কোনো আপনজন তাঁর অনুগমন করলে তাকে (মক্কার) বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হবে না এবং যদি তাঁর কোনো সঙ্গী মক্কায় থেকে যেতে চায়, তাকেও তিনি বাধা দিতে পারবেন না। অতঃপর পরবর্তী বৎসর যখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মক্কায় প্রবেশ করলেন এবং নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে গেল তখন তারা ’আলী -এর নিকট এসে বললঃ তোমার সাথীকে আমাদের এখান থেকে প্রস্থান করতে বলো। কেননা নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সকল সাহাবীসহ) মক্কা হতে বের হয়ে গেলেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
عَن الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ قَالَ: اعْتَمَرَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي ذِي الْقَعْدَةِ فَأَبَى أَهْلُ مَكَّةَ أَنْ يَدَعُوهُ يَدْخُلُ مَكَّةَ حَتَّى قَاضَاهُمْ عَلَى أَنْ يَدْخُلَ يَعْنِي مِنَ الْعَامِ الْمُقْبِلِ يُقِيمُ بِهَا ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ فَلَمَّا كَتَبُوا الْكِتَابَ كَتَبُوا: هَذَا مَا قَاضَى عَلَيْهِ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ. قَالُوا: لَا نُقِرُّ بِهَا فَلَوْ نَعْلَمُ أَنَّكَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا منعناك وَلَكِنْ أَنْتَ مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ فَقَالَ: «أَنَا رَسُولُ اللَّهِ وَأَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ» . ثُمَّ قَالَ لِعَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ: امْحُ: رَسُولَ اللَّهِ قَالَ: لَا وَاللَّهِ لَا أَمْحُوكَ أَبَدًا فَأَخَذَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَيْسَ يُحْسِنُ يَكْتُبُ فَكَتَبَ: هَذَا مَا قَاضَى عَلَيْهِ مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ: لَا يُدْخِلُ مَكَّةَ بِالسِّلَاحِ إِلَّا السَّيْفَ فِي الْقِرَابِ وَأَنْ لَا يَخْرُجَ مِنْ أَهْلِهَا بِأَحَدٍ إِنْ أَرَادَ أَنْ يَتْبَعَهُ وَأَنْ لَا يَمْنَعَ مِنْ أَصْحَابِهِ أَحَدًا إِنْ أَرَادَ أَنْ يُقِيمَ بِهَا فَلَمَّا دَخَلَهَا وَمَضَى الْأَجَلُ أَتَوْا عَلِيًّا فَقَالُوا: قُلْ لِصَاحِبِكَ: اخْرُجْ عَنَّا فَقَدْ مَضَى الْأَجَلُ فَخَرَجَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
ব্যাখ্যা: (رَسُوْلُ اللّٰهِ) ‘রসূলুল্লাহ’ শব্দটি মুছে ফেলো। অর্থাৎ مُحَمَّدُ رَّسُوْلُ اللّٰهِ বাক্য থেকে مُحَمَّدُ শব্দ রেখে দিয়ে رَسُوْلُ اللّٰهِ শব্দটি মুছে ফেলো।
(كَتَبُوْا : هٰذَا مَا قَاضٰى عَلَيْهِ مُحَمَّدٌ رَسُوْلُ اللّٰهِ) অতঃপর তিনি লিখলেন, এটা সেই চুক্তিপত্র যার ফায়সালা করেছেন আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। অত্র হাদীসে উল্লেখিত শব্দ (فَأَخَذَ فَكَتَبَ) তিনি তা নিলেন এবং লিখলেন সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং লিখেছেন। তবে এ অর্থ গ্রহণ করতে কোনো বাধা নেই যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশ করেছেন আর লেখক তা লিখেছেন। অর্থাৎ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আলী -কে رَسُوْلُ اللّٰهِ শব্দ মুছে ফেলতে বললেন, আর ‘আলী তা মুছে ফেলতে অস্বীকার করলেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা নিজের হাতে নিয়ে নেন এবং স্বয়ং رَسُوْلُ اللّٰهِ শব্দ নিজ হাতে মুছে দেন। অতঃপর তিনি ‘আলী -কে নির্দেশ দিলে ‘আলী লিখলেন।
(فَلَمَّا دَخَلَهَا) অতঃপর তিনি যখন সেখানে প্রবেশ করলেন, অর্থাৎ চুক্তি অনুযায়ী যখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পরবর্তী বৎসর মক্কাতে প্রবেশ করলেন।
(وَمَضَى الْأَجَلُ) এবং নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হয়ে গেলো। অর্থাৎ চুক্তির শর্তানুযায়ী তিন দিন চলে যাওয়ার উপক্রম হলো (فَخَرَجَ النَّبِىُّ ﷺ) তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেরিয়ে গেলেন অর্থাৎ নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই অথবা নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার মুহূর্তে তিনি মক্কা থেকে বেরিয়ে গেলেন। অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুক্তির শর্ত রক্ষা করেছেন তা ভঙ্গ করেননি। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - ‘আরব ভূখণ্ড হতে ইয়াহূদীদের বিতাড়ন
৪০৫০-[১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমরা মসজিদে নববীতে বসে ছিলাম। এমন সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হয়ে এসে বললেনঃ ইয়াহূদী জনপদে চলো। সুতরাং আমরা তাঁর সঙ্গে রওয়ানা হলাম এবং তাদের শিক্ষালয়ে উপস্থিত হলাম। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে বললেনঃ হে ইয়াহূদী জাতি! তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো, তবেই নিরাপত্তা বা আশ্রয় লাভ করবে। জেনে রাখো, সারা বিশ্বের ভূখণ্ড আল্লাহ ও তাঁর রসূল-এর একচ্ছত্র অধিকারে। আমি তোমাদেরকে এ ভূখণ্ড (’আরব উপদ্বীপ) হতে বহিষ্কার করার সংকল্প করেছি। অতএব তোমরা কোনো জিনিস বিক্রি করতে চাইলে তা বিক্রি করতে পারো (সুযোগ দেয়া হলো)। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ إِخْرَاجِ الْيَهُوْدِ مِنْ جَزِيْرَةِ الْعَرَبِ
عَن أبي هُرَيْرَة قَالَ: بَيْنَا نَحْنُ فِي الْمَسْجِدِ خَرَجَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «انْطَلِقُوا إِلَى يهود» فخرجنا مَعَه حَتَّى جِئْنَا بَيت الْمدَارِس فَقَامَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «يَا مَعْشَرَ يَهُودَ أَسْلِمُوا تَسْلَمُوا اعْلَمُوا أَنَّ الْأَرْضَ لِلَّهِ وَلِرَسُولِهِ وَأَنِّي أُرِيدُ أَنْ أُجْلِيَكُمْ مِنْ هَذِهِ الْأَرْضِ. فَمَنْ وَجَدَ مِنْكُمْ بِمَالِهِ شَيْئا فليبعه»
ব্যাখ্যা: (جِئْنَا بَيْتَ الْمِدْرَاسِ) অতঃপর আমরা যখন বায়তুল মিদরাসে আসলাম। কাযী ‘ইয়ায বলেনঃ الْمِدْرَاسِ এর দু’টি অর্থ হতে পারে-
১. শিক্ষক যিনি পাঠ দান করেন অর্থাৎ আমরা যখন আহলে কিতাবদের পাঠদানকারী শিক্ষকের বাড়ীতে আসলাম। ২. পাঠশালা, অর্থাৎ এমন জায়গা যেখানে আহলে কিতাবগণ তাদের কিতাবসমূহ পাঠ করে থাকে এবং তা শিক্ষা করে।
(فَقَامَ النَّبِىِّ ﷺ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে দাঁড়ালেন। অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান থেমে গেলেন এবং বসে না পড়ে দাঁড়িয়েই থাকলেন।
(فَقَالَ : يَا مَعْشَرَ يَهُوْدَ أَسْلِمُوْا تَسْلَمُوا) অতঃপর তিনি বললেন, হে ইয়াহূদী সম্প্রদায়! তোমরা ইসলাম গ্রহণে করো তাহলে নিরাপত্তা লাভ করবে। অর্থাৎ ইসলাম গ্রহণ করলে দুনিয়ার অপমান এবং পরকালের শাস্তি থেকে রক্ষা পাবে।
ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ تَسْلَمُوا শব্দটি যদিও সর্বপ্রকার অনিষ্ট থেকে নিরাপত্তা লাভ করা বুঝায় তথাপি এখানে নির্দিষ্ট অর্থ উদ্দেশ্য যা অবস্থার প্রেক্ষাপট দ্বারা বুঝা যায়। অর্থাৎ তোমরা ইসলাম গ্রহণ করলে নির্বাসনের কষ্ট থেকে রেহাই পাবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ৩০০১)
(اِعْلَمُوْا أَنَّ الْأَرْضَ لِلّٰهِ وَلِرَسُوْلِه) জেনে রাখবে, এ জমিন আল্লাহ ও তাঁর রসূলের। অর্থাৎ এ জমিন প্রকৃতপক্ষেই আল্লাহর তিনি তার মালিক। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘‘জমিন একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার, তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা তাকে তার উত্তরাধিকার প্রদান করেন’’- (সূরা আল আ‘রাফ ৭ : ১২৮)। আর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে জমিনের মালিক।
(وَأَنِّىْ أُرِيْدُ أَنْ أُجْلِيَكُمْ مِنْ هٰذِهِ الْأَرْضِ) আমি তোমাদের অত্র এলাকা থেকে নির্বাসনে পাঠানোর ইচ্ছা করেছি অর্থাৎ আমি ‘আরব উপদ্বীপ থেকে বের করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আর এখানে ইয়াহূদী থেকে উদ্দেশ্য বানী নাযীর-কে বহিষ্কার এবং বানী নাযীর-কে হত্যা করার পর মদীনাহ্ ও তার আশেপাশের অবস্থিত ইয়াহূদীগণ উদ্দেশ্য। কেননা অত্র হাদীসের বর্ণনাকারী আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) ৬ষ্ঠ হিজরীর শেষ দিকে ইসলাম গ্রহণ করেন। আর বানী নাযীর-কে বহিষ্কার করা হয় ৪র্থ হিজরীতে এবং বানূ কুরায়যাহ্-কে হত্যা করা হয় ৫ম হিজরীতে। অতএব আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে উল্লেখিত ইয়াহূদী দ্বারা উদ্দেশ্য তারাই যারা আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) ইসলাম গ্রহণের সময় মদীনাহ্ ও তার আশেপাশে অবস্থিত ছিল। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ৩০০১)
(فَمَنْ وَجَدَ مِنْكُمْ بِمَالِه شَيْئًا فَلْيَبِعْهُ) অতএব তোমাদের মধ্যে যাদের মাল আছে তারা যেন তা বিক্রয় করে ফেলে। অর্থাৎ যে সমস্ত মাল বহন করে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় যেমন ঘর-বাড়ী ও বৃক্ষসমূহ ইত্যাদি। সেগুলো যেন তারা বিক্রয় করে ফেলে। ইমাম খত্ত্বাবী বলেনঃ অত্র হাদীস দ্বারা ইমাম বুখারী দলীল পেশ করেছেন যে, কোনো ব্যক্তিকে কিছু বিক্রয় করতে বাধ্য করা হলে সে ক্রয়-বিক্রয় বৈধ। তবে অত্র হাদীসে ইয়াহূদীদের বিক্রয়টি নিরুপায় ব্যক্তির বিক্রয়ের সাথে অধিক সাদৃশ্য রাখে। কেননা বাধ্য তো তাকে বলা যায় যে বিক্রয় করতে না চাইলেও তা বিক্রয়ে বাধ্য করা হয়। আর এখানে ইয়াহূদীরা যদি বিক্রয় না করে তা ফেলে যেতো তাহলে তাদেরকে তা বিক্রয় করতে বাধ্য করা হতো না। অতএব নিরুপায় বিক্রয় বৈধ আর বাধ্য করা হলে সে বিক্রয় বৈধ নয়।
ইমাম নববী বলেনঃ ইমাম মালিক ও শাফি‘ঈ এবং অন্যান্য ইমামগণের মতে ‘আরব উপদ্বীপ থেকে কাফিরদের বহিষ্কার করা ওয়াজিব। অতএব তাদেরকে ‘আরব উপদ্বীপে বসবাস করতে দেয়া নাজায়িয। তবে ইমাম শাফি‘ঈ এ হুকুমকে শুধুমাত্র হিজাযের জন্য খাস মনে করেন। কিন্তু তারা এ অঞ্চলে যাতায়াত করতে পারবে মক্কা ছাড়া। মক্কাতে কোনো কাফিরকে প্রবেশ করার সুযোগ দেয়া যাবে না কোনো অবস্থাতেই না। গোপনে তারা মক্কায় প্রবেশ করলে বহিষ্কার করা ওয়াজিব। এমনকি কেউ গোপনে প্রবেশ করে সেখানে মারা যাওয়ার পর দাফন করা হলে তার লাশ কবর থেকে উত্তোলন করে মক্কার বাহিরে নিয়ে দাফন করতে হবে যতক্ষণ পর্যন্ত লাশের মধ্যে কোনো পরিবর্তন বা পঁচন না ধরে। পক্ষান্তরে ইমাম আবূ হানীফাহ্ হারাম অঞ্চলে কাফিরদের প্রবেশ বৈধ মনে করেন। জুমহূর ‘আলিমদের দলীল হলো আল্লাহর বাণী : ‘‘মুশরিকগণ তো নাপাক, অতএব তারা মসজিদে হারামের নিকটবর্তী হতে পারবে না’’- (সূরা আত্ তাওবাহ্ ৯ : ২৮)। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - ‘আরব ভূখণ্ড হতে ইয়াহূদীদের বিতাড়ন
৪০৫১-[২] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন ’উমার খুৎবা দানকালে দাঁড়িয়ে বললেনঃ অবশ্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বারের ইয়াহূদীদের সাথে চুক্তির শর্তানুযায়ী তাদের খামারে কাজ করার সুযোগ দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন : আল্লাহ তা’আলা যতদিন তোমাদের এখানে রাখেন, আমরাও তোমাদেরকে রাখব। (’উমার বলেন) এখন আমি তাদেরকে বহিষ্কার করার দৃঢ়সংকল্প করেছি। অবশেষে ’উমার যখন এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন, তখন এ সংবাদ পেয়ে আবুল হুকায়ক গোত্রের এক ইয়াহূদী এসে বললঃ হে আমীরুল মু’মিনীন! আপনি কি আমাদেরকে বহিষ্কার করবেন? অথচ আপনি জানেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে এখানে অবস্থানের অনুমতি দিয়েছেন এবং মালের বিনিময়ে আমাদের কাজ করিয়েছেন।
উত্তরে ’উমার বললেনঃ তুমি কি মনে করো যে, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সে কথাটি ভুলে গেছি? তোমাকে যখন খায়বার হতে বিতাড়িত করা হবে তখন তোমার উটগুলো তোমাকে নিয়ে রাতের পর রাত ছুটতে থাকবে, এমতাবস্থায় তোমার অবস্থা কিরূপ হবে? লোকটি বললঃ তা তো আবুল কাসিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাস্যোস্পদ উক্তি ছিল। এবার ’উমার ক্রোধান্বিত হয়ে বললেনঃ হে আল্লাহর শত্রু! সাবধান! নিঃসন্দেহে তুমি মিথ্যা বলছ। অতঃপর ’উমার তাদেরকে খায়বার হতে বিতাড়িত করলেন এবং তিনি উট ও অন্যান্য আসবাবপত্র যেমন- উটের পিঠে বসার পালান ও রশি ইত্যাদির দ্বারা তাদের ফল-ফলাদির মূল্য পরিশোধ করে দেন। (বুখারী)[1]
بَابُ إِخْرَاجِ الْيَهُوْدِ مِنْ جَزِيْرَةِ الْعَرَبِ
وَعَن ابْن عمر قَالَ: قَامَ عُمَرُ خَطِيبًا فَقَالَ: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ عَامَلَ يَهُودَ خَيْبَرَ عَلَى أَمْوَالِهِمْ وَقَالَ: «نُقِرُّكُمْ مَا أَقَرَّكُمُ اللَّهُ» . وَقَدْ رَأَيْتُ إِجْلَاءَهُمْ فَلَمَّا أَجْمَعَ عُمَرُ عَلَى ذَلِكَ أَتَاهُ أَحَدُ بَنِي أَبِي الحُقَيقِ فَقَالَ: يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ أَتُخْرِجُنَا وَقَدْ أَقَرَّنَا مُحَمَّدٌ وَعَامَلَنَا عَلَى الْأَمْوَالِ؟ فَقَالَ عُمَرُ: أَظْنَنْتَ أَنِّي نَسِيتُ قَوْلُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «كَيْفَ بِكَ إِذَا أُخْرِجْتَ مِنْ خَيْبَرَ تَعْدُو بِكَ قَلُوصُكَ لَيْلَةً بَعْدَ لَيْلَةٍ؟» فَقَالَ: هَذِهِ كَانَتْ هُزَيْلَةً مِنْ أَبِي الْقَاسِمِ فَقَالَ كَذَبْتَ يَا عَدُوَّ اللَّهِ فَأَجْلَاهُمْ عُمَرُ وَأَعْطَاهُمْ قِيمَةَ مَا كَانَ لَهُمْ مِنَ الثَّمَرِ مَالًا وَإِبِلًا وَعُرُوضًا مِنْ أَقْتَابٍ وَحِبَالٍ وَغَيْرِ ذَلِكَ. رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ
ব্যাখ্যা: (نُقِرُّكُمْ مَا أَقَرَّكُمُ اللّٰهُ) আমরা তোমাদের (খায়বারে) ততদিন থাকতে দিবো যতদিন আল্লাহ তোমাদের থাকতে দেন। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা যতদিন তোমাদের বহিষ্কার করার নির্দেশ না দেন ততদিন আমরা তোমাদের সেখানে থাকতে দিবো। ইবনুল মালিক (রহঃ) বলেনঃ এর অর্থ হলো যতদিন তোমরা জিয্ইয়াহ্ দিতে থাকবে ততদিন আমরা তোমাদের সেখানে থাকতে দিবো।
(وَقَدْ رَأَيْتُ إِجْلَاءَهُمْ) আমি তাদের বহিষ্কার করা মনস্থ করেছি। অর্থাৎ তাদেরকে বহিষ্কার করার মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে বলে আমি মনে করি। এ বক্তব্যটি ‘উমার -এর।
(أَتَاهُ أَحَدُ بَنِىْ أَبِى الْحُقَيْقِ) ‘উমার -এর নিকট আবুল হুকায়ক-এর সন্তানদের মধ্য থেকে কোনো একজন আগমন করলো। অর্থাৎ তাদের নেতা অথবা তাদের মধ্যে বয়সে বড় একজন ‘উমার -এর নিকট এসে বললো :
(يَا أَمِيْرَ الْمُؤْمِنِيْنَ أَتُخْرِجُنَا وَقَدْ أَقَرَّنَا مُحَمَّدٌ وَعَامَلَنَا عَلَى الْأَمْوَالِ؟) হে আমীরুল মু’মিনীন! আপনি আমাদের বহিষ্কার করতে চান অথচ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বসবাস করার অনুমতি দিয়েছেন এবং মালের বিনিময়ে আমাদের কাজ করিয়েছেন। অর্থাৎ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের স্বীয় গৃহে থাকার বিষয়টি মেনে নিয়েছেন এবং আমাদেরকে তার জমিনে শ্রমিক নিয়োগ করেছেন। অথচ আপনি আমাদের বহিষ্কার করতে চাচ্ছেন।
(فَقَالَ عُمَرُ : أَظْنَنْتَ أَنِّىْ نَسِيْتُ قَوْلُ رَسُوْلِ اللّٰهِ ﷺ) ‘উমার বললেনঃ তুমি কি মনে করো আমি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সে কথাটি ভুলে গিয়েছি।
(كَيْفَ بِكَ إِذَا أُخْرِجْتَ مِنْ خَيْبَرَ) তোমার কি অবস্থা হবে যখন তোমাকে খায়বার থেকে বের করে দেয়া হবে? অর্থাৎ তোমাদেরকে খায়বার থেকে বহিষ্কার করা হবে, এটা তো রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এরই কথা। আর আমি তা ভুলিনি।
(فَقَالَ : هٰذِه كَانَتْ هُزَيْلَةً مِنْ أَبِى الْقَاسِمِ) তখন ইয়াহূদীবর্গ বললো : এটা তো আবুল কাসিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঠাট্টামূলক কথা ছিল। অর্থাৎ তিনি আমাদেরকে বহিষ্কার করার উদ্দেশে এ কথা বলেননি। বরং তা বলেছিলেন হাসি তামাশামূলকভাবে।
(فَقَالَ كَذَبْتَ يَا عَدُوَّ اللّٰهِ) তখন ‘উমার বললেনঃ হে আল্লাহর দুশমন! তুমি মিথ্যা বলছো। অর্থাৎ তোমার দাবী রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঠাট্টামূলকভাবে বলেছিলেন। বাস্তবে তা সত্য নয়। বরং তিনি সঠিক কথাই বলেছিলেন। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, তোমাদেরকে খায়বার থেকে বহিষ্কার করা হবে। (فَأَجْلَاهُمْ عُمَرُ) অতঃপর ‘উমার তাদেরকে বহিষ্কার করে দিলেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - ‘আরব ভূখণ্ড হতে ইয়াহূদীদের বিতাড়ন
৪০৫২-[৩] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকালের সময় তিনটি বিষয়ে ওয়াসিয়্যাত করে যান। [১] ’আরব উপদ্বীপ হতে মুশরিকদেরকে (বিধর্মীদেরকে) বহিষ্কার করবে, [২] প্রতিনিধি বা দূতকে আমি যেভাবে আতিথেয়তা করি, তোমরাও অনুরূপভাবে করবে। ইবনু ’আব্বাস বলেনঃ তৃতীয়টির ব্যাপারে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজেই নীরব রয়েছেন, অথবা তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, অতএব তা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ إِخْرَاجِ الْيَهُوْدِ مِنْ جَزِيْرَةِ الْعَرَبِ
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسلم أَوْصَى بِثَلَاثَةٍ: قَالَ: «أَخْرِجُوا الْمُشْرِكِينَ مِنْ جَزِيرَةِ الْعَرَبِ وَأَجِيزُوا الْوَفْدَ بِنَحْوِ مَا كُنْتُ أُجِيزُهُمْ» . قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ: وَسَكَتَ عَن الثَّالِثَة أَو قَالَ: فأنسيتها
ব্যাখ্যা: (وَأَجِيْزُوا الْوَفْدَ بِنَحْوِ مَا كُنْتُ أُجِيْزُهُمْ) ‘‘সাক্ষাৎ করতে আসা প্রতিনিধি দলকে মেহমানদারী করবে যেভাবে আমি মেহমানদারী করতাম।’’ অর্থাৎ সাক্ষাৎপ্রার্থী প্রতিনিধি দল যতদিন অবস্থান করবে ততদিন পর্যন্ত তাদের যা প্রয়োজন তা প্রদান করবে।
ইমাম নাববী বলেনঃ ‘আলিমগণ বলেন, প্রতিনিধি দলকে উপঢৌকন দেয়া এবং তাদের মেহমানদারী করার নির্দেশ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদান করেছেন তাদের মনোতুষ্টি এবং অন্যদের হৃদয় আকৃষ্ট করার এবং সফরে সাহায্য করার জন্য।
কাযী ‘ইয়ায বলেনঃ আলিমগণ বলেন যে, প্রতিনিধি দল মুসলিম অথবা কাফির যেই হোক না কেন তাদের মেহমানদারী করতে হবে। (শারহে মুসলিম ১১শ খন্ড, হাঃ ১৬৩৭)
তূরিবিশতী (রহঃ) বলেনঃ প্রতিনিধি দলের মেহমানদারী করার নির্দেশ প্রদান এজন্য করেছেন যে, প্রতিনিধি দল স্বীয় গোত্রের বার্তাবাহক। তাকে আকৃষ্ট করার মাধ্যমে তার গোত্রের হৃদয় আকৃষ্ট হবে এবং অসন্তুষ্ট হলে তার গোত্র অসন্তুষ্ট হবে। আর প্রতিনিধি দল আসে ইমামের নিকট, তাই তার কর্তব্য হলো আল্লাহর দেয়া সম্পদ জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করা। আর প্রতিনিধি দলের সম্মান ও মেহমানদারীর মধ্যে জনগণের কল্যাণ নিহিত।
(وَسَكَتَ عَنِ الثَّالِثَةِ) তৃতীয় বিষয় থেকে তিনি নীরব থেকেছেন। অর্থাৎ ইবনু ‘আব্বাস বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বক্তব্যের শুরুতে যদিও বলেছিলেন আমি তোমাদেরকে তিনটি বিষয়ে উপদেশ দিচ্ছি কিন্তু তৃতীয় বিষয়টি তিনি আর বলেননি। অথবা ইবনু ‘আব্বাস বলেছেন, তৃতীয় বিষয়টি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো বলেছিলেন কিন্তু আমাকে তা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ আমার তা স্মরণ নেই।
ইমাম নববী বলেনঃ কাযী ‘ইয়ায বলেছেন, হতে পারে যে, তৃতীয় বিষয়টি ছিল এই ‘‘আমার কবরকে তোমার পূজার সামগ্রী তথা পূজার স্থানে পরিণত করো না।’’
এ বিষয়টি ইমাম মালিক তার মুয়াত্ত্বা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন ইয়াহূদীদের বহিষ্কারের বিষয়ের সাথে আর ঐ হাদীসটির বর্ণনাকারী হলেন ‘উমার। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ - ‘আরব ভূখণ্ড হতে ইয়াহূদীদের বিতাড়ন
৪০৫৩-[৪] জাবির ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। ’উমার ইবনুল খত্ত্বাব আমাকে বলেছেন, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ নিশ্চয় আমি ’আরব ভূখণ্ড হতে ইয়াহূদী ও নাসারাদেরকে বহিষ্কার করব। এমনকি মুসলিম ছাড়া আর কাউকে এখানে রাখব না। (মুসলিম)[1]
অপর এক বর্ণনাতে আছে, ইনশা-আল্লা-হ আমি যদি বেঁচে থাকি নিশ্চয় ’আরব ভূখণ্ড হতে ইয়াহূদী ও নাসারাদেরকে বের করে দেব।
بَابُ إِخْرَاجِ الْيَهُوْدِ مِنْ جَزِيْرَةِ الْعَرَبِ
وَعَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ: أَخْبَرَنِي عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «لأخرِجنَّ اليهودَ والنصَارى من جزيرةِ الْعَرَب حَتَّى لَا أَدَعَ فِيهَا إِلَّا مُسْلِمًا» . رَوَاهُ مُسْلِمٌ وَفِي رِوَايَةٍ: «لَئِنْ عِشْتُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ لَأُخْرِجَنَّ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى مِنْ جَزِيرَةِ الْعَرَبِ»
الْفَصْلُ الثَّانِي
لَيْسَ فِيهِ إِلَّا حَدِيثُ ابْنِ عَبَّاسٍ «لَا تَكُونُ قِبْلَتَانِ» وَقَدْ مَرَّ فِي بَاب الْجِزْيَة
ব্যাখ্যা: (حَتّٰى لَا أَدَعَ فِيهَا إِلَّا مُسْلِمًا) ‘‘সেখানে মুসলিম ব্যতীত অন্য কাউকে থাকতে দিবো না।’’ অর্থাৎ ‘আরব উপদ্বীপ একমাত্র মুসলিমদের আবাসভূমি। সেখানে কোনো অমুসলিম থাকবে না।
অন্য এক বর্ণনায় আছে, (لَئِنْ عِشْتُ إِنْ شَاءَ اللّٰهُ لَأُخْرِجَنَّ الْيَهُوْدَ وَالنَّصَارٰى مِنْ جَزِيْرَةِ الْعَرَبِ)
আমি যদি বেঁচে থাকি তাহলে আল্লাহ চাহে তো ‘আরব উপদ্বীপ থেকে সকল ইয়াহূদী নাসারাদের বহিষ্কার করে দিবো। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ‘আরব ভূখণ্ড হতে ইয়াহূদীদের বিতাড়ন
দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
لَيْسَ فِيْهِ إِلَّا حَدِيثُ ابْنِ عَبَّاسٍ «لَا تَكُوْنُ قِبْلَتَانِ» وَقَدْ مَرَّ فِىْ بَابِ الْجِزْيَةِ.
এ অধ্যায়ে ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, ’’দুই ক্বিবলা (কিবলা/কেবলা)র জনগণ একত্রে থাকতে পারে না’’- এ হাদীসটি ছাড়া অন্য কোনো হাদীস বর্ণিত হয়নি। আর উক্ত হাদীসটি পূর্বোল্লিখিত ’জিয্ইয়াহ্’ অধ্যায়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
৪০৫৪-[৫] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। ’উমার ইবনুল খত্ত্বাব (রাঃ) হিজায (’আরব ভূখণ্ড) হতে ইয়াহূদী ও নাসারাদেরকে বিতাড়িত করেছেন। প্রকৃত বিষয় হলো- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন খায়বার বিজয় করেন তখন সেখানকার ইয়াহূদীদেরকে তথা হতে বহিষ্কার করতে চেয়েছিলেন। কেননা তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যে জায়গা জয় করেন, তখন সে জায়গা আল্লাহ, তাঁর রসূল ও সমস্ত মুসলিমের অধিকারে চলে আসে। তখন ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আবেদন করল, তাদেরকে এ শর্তে সেখানে বহাল রাখা হোক যে, তারা নিজেদের কায়িক শ্রমের বিনিময়ে ফল-ফসলাদির অর্ধেক গ্রহণ করবে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হ্যাঁ, তবে যতদিন আমরা চাইব ততদিন তোমাদেরকে বহাল রাখব। ফলে তারা সেখানে থেকে গেল। পরিশেষে ’উমার তাঁর খিলাফাতকালে তাদেরকে তায়মা ও আরীহা-এর দিকে বিতাড়িত করেছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
عَنِ ابْنِ عُمَرَ: أَنَّ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا أَجْلَى الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى مِنْ أَرْضِ الْحِجَازِ وَكَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمَّا ظَهَرَ عَلَى أَهْلِ خَيْبَرَ أَرَادَ أَنْ يُخْرِجَ الْيَهُودَ مِنْهَا وَكَانَتِ الْأَرْضُ لَمَّا ظُهِرَ عَلَيْهَا لِلَّهِ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُسْلِمِينَ فَسَأَلَ الْيَهُودُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَتْرُكَهُمْ عَلَى أَنْ يَكْفُوا الْعَمَلَ وَلَهُمْ نِصْفُ الثَّمَرِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «نُقِرُّكُمْ على ذَلِك مَا شِئْنَا» فَأُقِرُّوا حَتَّى أَجْلَاهُمْ عُمَرُ فِي إِمارته إِلى تَيماءَ وأريحاء
ব্যাখ্যা: (أَجْلَى الْيَهُوْدَ وَالنَّصَارٰى مِنْ أَرْضِ الْحِجَازِ) ‘উমার ইয়াহূদী এবং নাসারাদের হিজাযের ভূমি থেকে বহিষ্কার করেন।
(أَجْلَاهُمْ عُمَرُ فِى اِمَارَتِه إِلٰى تَيْمَاءَ وَأَرِيْحَاءَ) ‘উমার তাদেরকে তাঁর খিলাফাতকালে খায়বার থেকে বহিষ্কার করে তায়মা এবং আরীহাতে পাঠিয়ে দেন। তায়মা এবং আরীহা ‘আরব উপদ্বীপেরই অংশ। অতএব রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী ইয়াহূদী নাসারাদের ‘আরব উপদ্বীপ থেকে বহিষ্কার করবো। বাক্যে ‘আরব উপদ্বীপ দ্বারা হিজায উদ্দেশ্য। এজন্যই ‘উমার তাদেরকে হিজায থেকে বের করে ‘আরব উপদ্বীপের অন্তর্গত তায়মাও আরীহাতে প্রেরণ করেন। (শারহে মুসলিম ১০ম খন্ড, হাঃ ১৫৫১)
পরিচ্ছেদঃ ১১. প্রথম অনুচ্ছেদ - ফাই (বিনাযুদ্ধে প্রাপ্ত শত্রুদের সম্পদ)-এর বর্ণনা
আল্ মুগরিব গ্রন্থকার বলেনঃ ফাই বলা হয় ঐ সম্পদকে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর কোনো ভূমি যখন মুসলিমদের অধিকারে চলে যায় তখন এ ভূমিতে বসবাসকারী কাফিরদের কাছ থেকে যা গ্রহণ করা হয় তাই হলো ফাই।
মাফাতীহ গ্রন্থকার বলেনঃ যুদ্ধ না করেই মুসলিমগণ কাফিরদের নিকট থেকে যে সম্পদ অর্জন করে তাকে ফাই বলা হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশাতে তিনি স্বীয় ইচ্ছা মতো ফাই এর মাল ব্যয় করার অধিকারী ছিলেন। তা থেকে নিজ পরিবারের জন্য ব্যয় করতেন। সেনাবাহিনী প্রস্তুত, মেহমানের মেহমানদারী করা এবং প্রতিনিধি দলের লোকেদের সম্মানার্থে ব্যয় নির্বাহ এ মাল থেকেই করতেন। পরবর্তীতে তা ’উমার বায়তুল মালের অন্তর্ভুক্ত করে মুসলিমদের কল্যাণে ব্যয় করতেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
৪০৫৫-[১] মালিক ইবনু আওস ইবনুল হাদাসান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’উমার বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা এ ’ফাই’টি বিশেষভাবে তাঁর রসূল-এর জন্য খাস করে দিয়েছেন, যাতে অন্য কারো অধিকার নেই। অতঃপর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করলেন-(مَا أَفَاءَ اللهُ عَلٰى رَسُوْلِه مِنْهُمْ) অর্থাৎ- ’’আল্লাহ তা’আলা তাঁর রসূলকে ’ফাই’ হিসেবে (বিনাযুদ্ধে) যা কিছু দিয়েছেন তার জন্য ঘোড়া বা সেনাবাহিনী পরিচালনা করতে হয়নি; বরং আল্লাহ তা’আলা তার রসূলগণকে যার বিরুদ্ধে ইচ্ছা করেন বিজয় দান করেন। নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা সবকিছুর উপরই সর্বশক্তিমান।’’ সুতরাং এ মাল-সম্পদ ছিল রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য নির্ধারিত। তাই তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উক্ত মাল-সম্পদ হতে পরিবার-পরিজনের জন্য পূর্ণ এক বৎসরের খোরপোষ আদায় করতেন এবং অবশিষ্ট যা থাকত তা সাদাকার খাতে তথা রাষ্ট্রীয় জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করতেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْفَيْءِ
عَن مالكِ بن أوْسِ بنِ الحَدَثانِ قَالَ: قَالَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: إِنَّ اللَّهَ قَدْ خَصَّ رَسُولَهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي هَذَا الْفَيْءِ بِشَيْءٍ لَمْ عطه أحدا غيرَه ثُمَّ قَرَأَ (مَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْهُم)
إِلى قولِه (قديرٌ)
فكانتْ هَذِه خَالِصَة لرَسُول اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُنْفِقُ عَلَى أَهْلِهِ نَفَقَةَ سَنَتِهِمْ مِنْ هَذَا الْمَالِ. ثُمَّ يَأْخُذُ مَا بَقِيَ فَيَجْعَلُهُ مَجْعَلَ مَالِ اللَّهِ
ব্যাখ্যা: (فَكَانَتْ هٰذِه خَالِصَةٌ لِرَسُوْلِ اللّٰهِ ﷺ) (ফাই এর) এ মাল রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য নির্ধারিত ছিল। অর্থাৎ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরে ইমামদের জন্য তা স্বেচ্ছায় ব্যয় করার অধিকার নেই, যেরূপ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য ছিল। বরং ইমামদের কর্তব্য তা তারা ব্যয় করবে দরিদ্র মুহাজির, আনসার এবং তাদের অনুসারীদের মধ্যে এবং মুসলিমদের কল্যাণে।
(يُنْفِقُ عَلٰى اَهْلِه) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা থেকে তাঁর স্ত্রী, সন্তানাদি এবং তাঁর পরিবারের অন্তর্ভুক্ত সকলের জন্য ব্যয় করতেন।
(نَفَقَةَ سَنَتِهِمْ) তাদের এক বৎসরের প্রয়োজনীয় ব্যয় তা থেকে জমা রাখতেন। ইমাম সুয়ূত্বী বলেনঃ অত্র হাদীস ঐ হাদীসের বিরোধী নয় যাতে বলা হয়েছে যে, «أَنَّه كَانَ لَا يَدَّخِرُ شَيْئًا لِغَدٍ» তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আগামীকালের জন্য কিছু জমা রাখতেন না। কেননা ادخار বলা হয় ঐ মালকে যা নিজের জন্য জমানো হয়। আর এখানে বলা হয়েছে তার পরিবারের লোকজনদের জন্য। অর্থাৎ তিনি নিজের জন্য জমা করেননি।
ইমাম নববী বলেনঃ অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, এক বৎসরের প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী জমা রাখা বৈধ। আর তা তাওয়াক্কুল বিরোধী নয়। ‘উলামাগণ এ বিষয়ে একমত যে, স্বীয় উপার্জন থেকে এক বৎসরের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য-দ্রব্য জমা রাখা বৈধ। আর যদি বাজার থেকে ক্রয় করতে হয় এবং বাজারে খাদ্যের সঙ্কট থাকে তাহলে তা বৈধ নয়। বরং তখন দৈনন্দিন খরচের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য ক্রয় করবে।
(فَيَجْعَلُه مَجْعَلَ مَالِ اللّٰهِ) অবশিষ্ট মাল আল্লাহর মাল হিসেবে রেখে দিতেন। অর্থাৎ স্বীয় পরিবারের জন্য ব্যয়ের নিমিত্তে রেখে দেয়া মালের পর অবশিষ্ট মাল তিনি মুসলিমদের কল্যাণে ব্যয় করতেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১১. প্রথম অনুচ্ছেদ - ফাই (বিনাযুদ্ধে প্রাপ্ত শত্রুদের সম্পদ)-এর বর্ণনা
৪০৫৬-[২] ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বানী নাযীর-এর সম্পদসমূহ সে সমস্ত সম্পদের মধ্যে গণ্য, যা আল্লাহ তা’আলা তাঁর রসূলকে ’ফাই’ হিসেবে দান করেছেন, তা অর্জন করতে মুসলিমেরা ঘোড়াও দৌড়ায়নি এবং সেনাবাহিনীও পরিচালনা করতে হয়নি। সুতরাং তা ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য খাসভাবে নির্ধারিত। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ সম্পদ হতে তাঁর পরিবার-পরিজনের জন্য এক বৎসরের খোরপোষে ব্যয় করতেন, অবশিষ্ট যা থাকত তা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধাস্ত্র ও সওয়ারী প্রভৃতি ক্রয় করার কাজে ব্যয় করতেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
بَابُ الْفَيْءِ
وَعَن عمر قَالَ: كَانَتْ أَمْوَالُ بَنِي النَّضِيرِ مِمَّا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ مِمَّا لَمْ يُوجِفِ الْمُسْلِمُونَ عَلَيْهِ بِخَيْلٍ وَلَا رِكَابٍ فَكَانَتْ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَالِصَة يُنْفِقُ عَلَى أَهْلِهِ نَفَقَةَ سَنَتِهِمْ ثُمَّ يَجْعَلُ مَا بَقِيَ فِي السِّلَاحِ وَالْكُرَاعِ عُدَّةً فِي سَبِيل الله
ব্যাখ্যা: (ثُمَّ يَجْعَلُ مَا بَقِىَ فِى السِّلَاحِ وَالْكُرَاعِ) তার পরিবারের খরচের জন্য রাখার পর অবশিষ্ট যা থাকতো তা দ্বারা তিনি অস্ত্র ও পশু ক্রয় করতেন আল্লাহর পথে জিহাদের জন্য প্রস্ত্ততি হিসেবে। মুগরিব গ্রন্থকার বলেন, ইমাম মুহাম্মাদ (রহঃ) বলেনঃ الْكُرَاعِ দ্বারা উদ্দেশ্য ঘোড়া, গাধা ও খচ্চর। ইবনুল হুমাম বলেনঃ উল্লেখিত বাক্যের অর্থ হলো- অবশিষ্ট মাল ব্যয় করা। বিষয়টি তার প্রতি ন্যস্ত ছিল। তা তিনি মুসলিমদের কল্যাণে যেভাবে ইচ্ছা ব্যয় করতেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ফাই (বিনাযুদ্ধে প্রাপ্ত শত্রুদের সম্পদ)-এর বর্ণনা
৪০৫৭-[৩] ’আওফ ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট যখনই কোনো ’ফাই’-এর ধন-সম্পদ আসতো, তখন তিনি অবিলম্বে সেদিনই তা বণ্টন করে দিতেন। অবশ্য বণ্টনের মধ্যে এ নিয়ম-নীতি অবলম্বন করতেন যে, যার পরিবার-পরিজন আছে তাকে দু’ভাগ এবং অবিবাহিতের জন্য একভাগ দিতেন। একদিন আমাকে ডেকে ’ফাই’-এর দু’ভাগ দিলেন। কেননা আমি বিবাহিত ছিলাম। আমার পরে ’আম্মার ইবনু ইয়াসির (রাঃ)-কে ডেকে তাকে দেয়া হলো একভাগ (কারণ তিনি ছিলেন অবিবাহিত)। (আবূ দাঊদ)[1]
عَن عوفِ بْنِ مَالِكٍ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ إِذَا أَتَاهُ الْفَيْءُ قَسَمَهُ فِي يَوْمِهِ فَأَعْطَى الْآهِلَ حَظَّيْنِ وَأَعْطَى الْأَعْزَبَ حَظًّا فَدُعِيتُ فَأَعْطَانِي حَظَّيْنِ وَكَانَ لِي أَهْلٌ ثُمَّ دُعِيَ بَعْدِي عَمَّارُ بْنُ يَاسِرٍ فَأُعْطِيَ حَظًّا وَاحِدًا. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (أَنَّ رَسُوْلَ اللّٰهِ ﷺ كَانَ إِذَا أَتَاهُ الْفَيْءُ قَسَمَه فِىْ يَوْمِه) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অভ্যাস এই ছিল যে, যখন তাঁর নিকট ‘ফাই-এর মাল আসতো তিনি তা সেদিনই বণ্টন করতেন। অর্থাৎ ‘ফাই’ এর মাল থেকে নিজ পরিবারের জন্য খরচের পরিমাণ মাল রাখার পর অবশিষ্ট মাল সাথে সাথেই বণ্টন করতেন বিলম্ব না করে।
(فَأَعْطٰى الْاٰهِلَ حَظَّيْنِ) পরিবারওয়ালাকে দু’ বণ্টন দিতেন। اٰهِلٌ ঐ ব্যক্তিকে বলা হয় যিনি বিবাহিত অর্থাৎ পরিবার আছে। ইমাম শাওকানী নায়লুল আওত্বারে বলেনঃ অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, বায়তুল মাল থেকে ভাতা দেয়ার ক্ষেত্রে গ্রহীতার পরিবারের লোক সংখ্যার বিষয়টি খেয়াল রাখা প্রয়োজন। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৯৫১)
পরিচ্ছেদঃ ১১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ফাই (বিনাযুদ্ধে প্রাপ্ত শত্রুদের সম্পদ)-এর বর্ণনা
৪০৫৮-[৪] ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখেছি, তাঁর কাছে ’ফাই’-এর ধন-সম্পদ আসলে সর্বপ্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত গোলামদেরকে দিতেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَوَّلُ مَا جَاءَهُ شيءٌ بدَأَ بالمحرَّرينَ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (بَدَأَ بِالْمُحَرَّرِيْنَ) ‘ফাই’ বণ্টনের ক্ষেত্রে মুহাররার দ্বারা শুরু করতেন। খত্ত্বাবী (রহঃ) বলেনঃ মুহাররার দ্বারা উদ্দেশ্য মুক্ত গোলাম। কারো কারো মতে তারা হলো মুকাতাব। অর্থাৎ যাদের মুক্ত করার জন্য তাদের মনীবগণ তাদের সাথে নির্দিষ্ট পরিমাণের অর্থ প্রদানের চুক্তি করেছেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
কাযী শাওকানী বলেনঃ অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, ‘ফাই’ এর মাল বণ্টনের ক্ষেত্রে মুক্ত গোলাম বা মুকাতাবদের অগ্রাধিকার দেয়া মুস্তাহাব। (‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৯৪৯)
পরিচ্ছেদঃ ১১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ফাই (বিনাযুদ্ধে প্রাপ্ত শত্রুদের সম্পদ)-এর বর্ণনা
৪০৫৯-[৫] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট (’ফাই’ হতে) মুক্তা জাতীয় মূল্যবান রঙিন পাথরভর্তি একটি থলি আসলো, যা তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) স্বাধীনা ও মুক্তকৃতা বাঁদীদের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন। ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেন, আমার পিতা [আবূ বকর (রাঃ)]-ও তাঁর খিলাফাতকালে স্বাধীনা ও গোলামের মাঝে বণ্টন করে দিতেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَنْ عَائِشَةَ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَتَى بطبية فِيهَا خَرَزٌ فَقَسَمَهَا لِلْحُرَّةِ وَالْأَمَةِ قَالَتْ عَائِشَةُ: كَانَ أَبِي يَقْسِمُ لِلْحُرِّ وَالْعَبْدِ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যা: (أَتٰى بِطَبْيَةٍ فِيْهَا خَرَزٌ) তার নিকট হরিণের পশমী চামড়ার ছোট থলে নিয়ে আসা হলো যাতে পুতি বা মুক্তার দানা ছিল।
(فَقَسَمَهَا لِلْحُرَّةِ وَالْأَمَةِ) তিনি তা আযাদ ও দাসীদের মাধ্যমে বণ্টন করলেন। অর্থাৎ তখন যারা তার নিকট উপস্থিত ছিল। আযাদ বা দাসী তাদের মাঝে তা বণ্টন করলেন।
(كَانَ أَبِىْ يَقْسِمُ لِلْحُرِّ وَالْعَبْدِ) আমার বাবাও তা আযাদ দাসদের মধ্যে বন্টন করতেন। দাস-দাসী বলতে উদ্দেশ্য মুক্ত গোলাম অথবা মুকাতাব গোলাম উদ্দেশ্য। কেননা পূর্ণাঙ্গ দাসদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব তাদের মনীবদের ওপর। বায়তুল মালের উপর তাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ, ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৯৫০)
পরিচ্ছেদঃ ১১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ফাই (বিনাযুদ্ধে প্রাপ্ত শত্রুদের সম্পদ)-এর বর্ণনা
৪০৬০-[৬] মালিক ইবনু আওস ইবনুল হাদাসান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন ’উমার ইবনুল খত্ত্বাব (রাঃ) ’ফাই’ সম্পর্কে আলোচনাকালে বললেনঃ এ ’ফাই’-এর মধ্যে আমার অধিকার তোমাদের চেয়ে বেশি নয় এবং তোমাদের কেউই অন্য কারো চেয়ে বেশি হকদার নয়। তবে আমরা সকলেই আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বণ্টন নিয়ম-নীতি অনুযায়ী আমাদের স্ব-স্ব মর্যাদায় পার্থক্য রয়েছে। সুতরাং কোনো ব্যক্তি (ইসলাম গ্রহণ আগে হওয়ায়) প্রথম সারির প্রবীণ মুসলিম। আবার কেউ আছে অনেক জিহাদে তার শ্রম-সাধনা ও কুরবানীর অবদান রয়েছে। আবার কেউ এমনও আছে যার পরিবার-পরিজনের লোক সংখ্যা বেশি। আর এমন লোকও আছে যার প্রাপ্তির তুলনায় প্রয়োজন অত্যধিক। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعَن مالكِ بن أوسِ بن الحدَثانِ قَالَ: ذكر عمر بن الْخطاب يَوْمًا الْفَيْءَ فَقَالَ: مَا أَنَا أَحَقُّ بِهَذَا الْفَيْءِ مِنْكُمْ وَمَا أَحَدٌ مِنَّا بِأَحَقَّ بِهِ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا أَنَّا عَلَى مَنَازِلِنَا مِنْ كِتَابِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ وَقَسْمِ رَسُولِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَالرَّجُلُ وَقِدَمُهُ وَالرَّجُلُ وَبَلَاؤُهُ وَالرَّجُلُ وَعِيَالُهُ وَالرَّجُلُ وَحَاجَتُهُ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যা: (مَا أَنَا أَحَقُّ بِهٰذَا الْفَيْءِ مِنْكُمْ) ‘ফাই’ এর মালে আমি তোমাদের চাইতে অধিক হকদার নই। অর্থাৎ আমি খলীফাহ্ হওয়া সত্ত্বেও ‘ফাই’ এর মালের প্রাপ্যের ক্ষেত্রে আমার হক তোমাদের মতই। আমি রসূলের মতো ব্যক্তিগতভাবে আমার পরিবারের জন্য তা থেকে কিছু ব্যয় করার অধিকার রাখি না। যেমনটি রসূলের অধিকার ছিল।
(إِلَّا أَنَّا عَلٰى مَنَازِلِنَا مِنْ كِتَابِ اللّٰهِ) আমরা সবাই আল্লাহর কিতাবে বর্ণিত স্তর অনুযায়ী ওটাতে অধিকার রাখি। আর তা হলো দরিদ্র মুহাজির, দরিদ্র আনসার, অতঃপর সকল মুসলিম। তূরিবিশতী বলেনঃ ‘উমার -এর অভিমত এই যে, ‘ফাই’ এর মালে খুমুস অর্থাৎ পঞ্চমাংশত নেই। বরং ‘ফাই’ এর সম্পূর্ণ মালই বায়তুল মালের। আর তা মুসলিমদের কল্যাণ অনুসারে ব্যয় করা হবে। তবে মুসলিমদের মর্যাদা অনুযায়ী ওটাতে অধিকারে তারতম্য রয়েছে।
(فَالرَّجُلُ وَقِدَمُه) অতএব কোনো ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণে অগ্রবর্তী হলে তার অধিকার অগ্রবর্তীর কারণে।
(وَالرَّجُلُ وَبَلَاؤُه) কোনো ব্যক্তি ইসলামের জন্য তার শ্রম দেয়া ও প্রচেষ্টায় অগ্রগামীতার কারণে তার অধিকার।
(وَالرَّجُلُ وَعِيَالُه) কোনো ব্যক্তির তার পরিবারের লোক সংখ্যার অধিকারের কারণে তার হক এবং (وَالرَّجُلُ وَحَاجَتُه) কোনো ব্যক্তির প্রয়োজন অনুসারে বায়তুল মালে তথা খায়বারের মালে তার হক রয়েছে। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৯৪৮)
পরিচ্ছেদঃ ১১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ফাই (বিনাযুদ্ধে প্রাপ্ত শত্রুদের সম্পদ)-এর বর্ণনা
৪০৬১-[৭] উক্ত রাবী (মালিক ইবনু আওস ইবনুল হাদাসান) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন ’উমার (রাঃ) إِنَّما الصَّدَقاتُ للفقراءِ অর্থাৎ- ’’নিশ্চয় সাদাকা গরীব ও মিসকীনের জন্য’’ শেষ পর্যন্ত পাঠ করে বললেনঃ যাকাত কেবলমাত্র এ আয়াতে বর্ণিত খাতসমূহের জন্যই সুনির্ধারিত। অতঃপর وَاعْلَمُوْا أَنَّ مَا غَنِمْتُمْ مِنْ شَيْءٍ অর্থাৎ- ’নিশ্চয় গনীমাত যা তোমরা অর্জন কর’ শেষ পর্যন্ত এ আয়াতটি পাঠ করে বললেনঃ গনীমাতের খুমুস তথা এক-পঞ্চমাংশত, যা এ আয়াতের মধ্যে উল্লেখ রয়েছে, এটা কেবলমাত্র নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটাত্মীয়দেরই প্রাপ্য অধিকার। তারপর তিনি পাঠ করলেনمَا أَفَاءَ اللهُ عَلٰى رَسُوْلِه অর্থাৎ- ’এবং যা আল্লাহ তা’আলা তোমাদের বিনা যুদ্ধে দান করেন’ শেষ পর্যন্ত। অতঃপর পাঠ করলেন وَالَّذِيْنَ جَاؤُوْا مِنْ بَعْدِهِمْ অর্থা- ’এবং যারা পরে এসেছে’ শেষ পর্যন্ত। এ আয়াতগুলো শুধুমাত্র মুসলিমদের অধিকারভুক্ত করা হয়েছে। অতএব আমি যদি বেঁচে থাকি তাহলে ’সার্বি হিম্ইয়ার’ নামক দূরবর্তী স্থানে যে রাখাল বসবাস করে, তার কাছেও তার ন্যায্য প্রাপ্য অংশ পৌঁছে যাবে। অথচ এ সম্পদ অর্জন করতে তার কপালের ঘাম ঝরাতে হবে না। (শারহুস্ সুন্নাহ্)[1]
وَعَنْهُ قَالَ: قَرَأَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنهُ: (إِنَّما الصَّدَقاتُ للفقراءِ والمساكينِ)
حَتَّى بَلَغَ (عَلِيمٌ حَكِيمٌ)
فَقَالَ: هَذِهِ لِهَؤُلَاءِ. ثُمَّ قَرَأَ (وَاعْلَمُوا أَنَّ مَا غَنِمْتُمْ مِنْ شيءٍ فإنَّ للَّهِ خُمُسَه وللرَّسولِ)
حَتَّى بلغَ (وابنِ السَّبِيلِ)
ثُمَّ قَالَ: هَذِهِ لِهَؤُلَاءِ. ثُمَّ قَرَأَ (مَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْ أَهْلِ الْقرى)
حَتَّى بلغَ (للفقراءِ)
ثمَّ قرأَ (والذينَ جاؤوا منْ بعدِهِم)
ثُمَّ قَالَ: هَذِهِ اسْتَوْعَبَتِ الْمُسْلِمِينَ عَامَّةً فَلَئِنْ عِشْتُ فَلَيَأْتِيَنَّ الرَّاعِيَ وَهُوَ بِسَرْوِ حِمْيَرَ نَصِيبُهُ مِنْهَا لَمْ يَعْرَقْ فِيهَا جَبِينُهُ. رَوَاهُ فِي شرح السّنة
ব্যাখ্যা: ‘উমার (রাঃ)-এর মতানুসারে যাকাত ও ‘উশূরের মাল বণ্টিত হবে কুরআনে বর্ণিত আট শ্রেণীর মধ্যে তাতে অন্য কারো অধিকার নেই। আর গনীমাতের মাল এক-পঞ্চমাংশত বায়তুল মালের তথা আল্লাহর রসূলের জন্য। তিনি তা ব্যয় করবেন তার ইচ্ছানুযায়ী। তারপর খলীফাগণ ব্যয় করবে মুসলিমদের কল্যাণে। আর ‘ফাই’ এর মাল পুরাটাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হক। তিনি তাঁর ইচ্ছানুযায়ী তা ব্যয় করবেন। অতঃপর খলীফাগণ তা ব্যয় করবে মুসলিমদের কল্যাণে। তাতে খুমুস বা এক-পঞ্চমাংশত নেই। এটাই সকল ‘উলামাগণের অভিমত। তবে ইমাম শাফি‘ঈ-এর মতে তার এক-পঞ্চমাংশত বায়তুল মালের আর বাকী চার অংশ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য নির্ধারিত। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
পরিচ্ছেদঃ ১১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ফাই (বিনাযুদ্ধে প্রাপ্ত শত্রুদের সম্পদ)-এর বর্ণনা
৪০৬২-[৮] উক্ত রাবী (মালিক ইবনু আওস ইবনুল হাদাসান) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (’আলী ও ’আব্বাস (রাঃ)-এর মধ্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর [মীরাস] পরিত্যক্ত সম্পদ নিয়ে বিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে ’উমার -এর নিকট তার মীমাংসা জানতে চাইলে) ’উমার এভাবে দলীল পেশ করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট তাঁর ব্যক্তিগত তিনটি ভূখণ্ড ছিল, তা হলো- বানী নাযীর (হতে প্রাপ্ত ভূমি), খায়বার ও ফাদাক। তবে বানী নাযীর-এর ভূমির আয় হতে নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যয়-নির্বাহ করতেন। আর ’ফাদাক’ ভূমির আয় মেহমান মুসাফিরদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। কিন্তু খায়বারের আয়কে তিনভাগে ভাগ করে নিয়েছিলেন- দু’ভাগ মুসলিম জনসাধারণের জন্য এবং একভাগ নিজের পরিবার-পরিজনের খোরপোষে খরচ করতেন। এরপরও পরিবারের খরচ মিটিয়ে যদি কিছু অবশিষ্ট থাকত তা দরিদ্র মুহাজিরীনদের মাঝে বিতরণ করে দিতেন। (আবূ দাঊদ)[1]
وَعنهُ قَالَ: كانَ فِيمَا احتجَّ فيهِ عُمَرُ أَنْ قَالَ: كَانَتْ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثَلَاثُ صَفَايَا بَنُو النَّضِيرِ وخيبرُ وفَدَكُ فَأَمَّا بَنُو النَّضِيرِ فَكَانَتْ حَبْسًا لِنَوَائِبِهِ وَأَمَّا فَدَكُ فَكَانَتْ حَبْسًا لِأَبْنَاءِ السَّبِيلِ وَأَمَّا خَيْبَرُ فَجَزَّأَهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثَلَاثَةٌ أَجزَاء: جزأين بينَ المسلمينَ وجزءً نَفَقَةً لِأَهْلِهِ فَمَا فَضُلَ عَنْ نَفَقَةِ أَهْلِهِ جَعَلَهُ بَيْنَ فُقَرَاءِ الْمُهَاجِرِينَ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ
ব্যাখ্যা: (كَانَتْ لِرَسُوْلِ اللّٰهِ ﷺ ثَلَاثُ صَفَايَا) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য তিনটি বস্তু নির্ধারিত ছিল।
খত্ত্বাবী (রহঃ) বলেনঃ الصَّفِيُّ সেই বস্তু, গনীমাতের মাল বণ্টন করার পূর্বে ইমাম তা থেকে যা নিজের জন্য নিয়ে থাকে যেমন দাস-দাসী, ঘোড়া, তরবারি ইত্যাদি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গনীমাতের মাল এক-পঞ্চমাংশত নির্ধারিত থাকা সত্ত্বেও তা বণ্টনের পূর্বে তিনি তা থেকে তার ইচ্ছানুযায়ী কোনো কিছু নির্বাচন করতে পারতেন তার নিজের জন্য। এটা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য খাস ছিল। তার পরবর্তীতে কোনো ইমামের জন্য তা বৈধ নয়।
(فَأَمَّا بَنُو النَّضِيْرِ فَكَانَتْ حَبْسًا لِنَوَائِبِه) বানূ নাযীর থেকে অর্জিত মাল তার প্রয়োজন মিটানোর জন্য নির্দিষ্টভাবে আবদ্ধ ছিল। অর্থাৎ মেহমান, প্রতিনিধি দল অস্ত্র ও পশু ক্রয়ের নিমিত্তে তা আবদ্ধ ছিল।
(وَأَمَّا فَدَكُ فَكَانَتْ حَبْسًا لِأَبْنَاءِ السَّبِيْلِ) ফাদাকের মাল ছিল পথিকদের জন্য। অর্থাৎ ফাদাক থেকে অর্জিত মাল পথিকদের প্রয়োজন মিটানোর জন্য নির্দিষ্টভাবে গচ্ছিত ছিল।
(جُزْئَيْنِ بَيْنَ الْمُسْلِمِيْنَ وَجُزْءً نَفَقَةً لِأَهْلِه) খায়বারের মালের দু’ অংশ ছিল মুসলিমদের জন্য আর এক অংশ ছিল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরিবারের খরচ মিটানোর জন্য। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বারের মালকে তিন ভাগে ভাগ করার কারণ এই যে, খায়বার অঞ্চলে অনেক গ্রাম ছিল, তার কিছু অংশ বলপূর্বক অর্থাৎ যুদ্ধ করে বিজয় করা হয়। যাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য ছিল এক-পঞ্চমাংশত। আর কিছু বিনাযুদ্ধে সন্ধির মাধ্যমে বিজিত ছিল। আর তা ছিল ফাই যা রসূলের জন্য খাস। অতএব ন্যায়সঙ্গত বণ্টনের দাবী অনুযায়ী তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সমস্ত মালকে তিন ভাগ করেন। এক ভাগ তাঁর নিজের জন্য। আর দু’ ভাগ মুসলিম বাহিনীর জন্য। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৯৬৫)
পরিচ্ছেদঃ ১১.তৃতীয় অনুচ্ছেদ - ফাই (বিনাযুদ্ধে প্রাপ্ত শত্রুদের সম্পদ)-এর বর্ণনা
৪০৬৩-[৯] মুগীরাহ্ [ইবনু যিয়াদ মুসিলী] (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’উমার ইবনু ’আবদুল ’আযীয (রহঃ) খলীফাহ্ নিযুক্ত হয়েই মারওয়ান-এর সন্তান-সন্ততিদের উদ্দেশে বললেনঃ নিশ্চয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাদাক ভূমির আয় নিজের পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করতেন। এছাড়া বানী হাশিম-এর শিশু-কিশোরের জন্যও তা হতে ব্যয় করতেন এবং তাদের অবিবাহিতদের বিবাহ-শাদিতে ব্যয় করতেন। তখন ফাতিমা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট চাইলেন যে, উক্ত ফাদাক ভূমি তাঁকে দেয়া হোক, কিন্তু তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তা দিতে অস্বীকার করলেন। ফলে তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশায় অনুরূপভাবেই পরিচালিত হয়ে আসছিল। অতঃপর আবূ বকর যখন খলীফাহ্ নিযুক্ত হলেন, তিনিও তাতে সেই নিয়ম-নীতিই অবলম্বন করলেন, যে নীতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্তে পর্যন্ত অবলম্বন করেছিলেন।
পরিশেষে এ অবস্থায় রেখে তিনিও ইন্তেকাল করলেন। অতঃপর যখন ’উমার ইবনুল খত্ত্বাব খলীফাহ্ নিযুক্ত হলেন, তখন তিনিও তার মধ্যে সে অনুরূপ নীতি অবলম্বন করলেন- যা তাঁর পূর্বসূরী দু’জন [নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবূ বকর (রাঃ)] অবলম্বন করেছিলেন। এরূপ অবস্থায় রেখে তিনিও ইন্তেকাল করলেন। পরে (’উসমান -এর খিলাফাতকালে) মারওয়ান উক্ত ’ফাদাক’ ভূমিকে নিজের ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত করল। অতঃপর যখন ’উমার ইবনু ’আবদুল ’আযীয (রহঃ) খলীফাহ্ নিযুক্ত হলেন, তখন তিনি এতদসম্পর্কে বললেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা স্বীয় কন্যা ফাত্বিমাহ্ -কে দেননি, অতএব আমি দেখছি কোনো অবস্থাতেই তার মধ্যে আমারও ব্যক্তিগত কোনো অধিকার নেই। সুতরাং তিনি উপস্থিত (মারওয়ান ও ’উমাইয়াহ্-এর) বংশধরদের উদ্দেশে বললেন, আমি তোমাদেরকে সাক্ষ্য করে ঘোষণা করছি যে, আমি ’ফাদাক’ পুনরায় ঐ অবস্থায় ফেরত দিয়ে দিলাম, যে অবস্থায় তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ বকর এবং ’উমার -এর সময়ে ছিল। (আবূ দাঊদ)[1]
عَن المغيرةِ قَالَ: إِنَّ عمَرَ بنَ عبد العزيزِ جَمَعَ بَنِي مَرْوَانَ حِينَ اسْتُخْلِفَ فَقَالَ: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَتْ لَهُ فَدَكُ فَكَانَ يُنْفِقُ مِنْهَا وَيَعُودُ مِنْهَا عَلَى صَغِيرِ بَنِي هَاشِمٍ وَيُزَوِّجُ مِنْهَا أَيِّمَهُمْ وَإِنَّ فَاطِمَةَ سَأَلَتْهُ أَنْ يَجْعَلَهَا لَهَا فَأَبَى فَكَانَتْ كَذَلِكَ فِي حَيَاةَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي حَيَاتِهِ حَتَّى مَضَى لسبيلِه فَلَمَّا وُلّيَ أَبُو بكرٍ علم فِيهَا بِمَا عَمِلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي حَيَاتِهِ حَتَّى مَضَى لِسَبِيلِهِ فَلَمَّا أَنْ وُلِّيَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ عَمِلَ فِيهَا بِمِثْلِ مَا عَمِلَا حَتَّى مَضَى لِسَبِيلِهِ ثُمَّ اقْتَطَعَهَا مَرْوَانُ ثُمَّ صَارَتْ لِعُمَرَ بْنِ عَبْدِ الْعَزِيزِ فَرَأَيْتُ أَمْرًا مَنَعَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاطِمَةَ لَيْسَ لِي بِحَقٍّ وَإِنِّي أُشْهِدُكُمْ أَنِّي رَدَدْتُهَا عَلَى مَا كَانَتْ. يَعْنِي عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَبِي بَكْرٍ وعمَرَ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
ব্যাখ্যা: (وَيَعُوْدُ مِنْهَا عَلٰى صَغِيْرِ بَنِىْ هَاشِمٍ) ফাদাকের অর্জিত মাল থেকে বানী হাশিমদের ইয়াতীমদের জন্য ব্যয় করতেন। অর্থাৎ বানী হাশিম-এর ছোট বাচ্চাদের জন্য সে মাল থেকে ব্যয় করতেন। আর যখন তাদের দেয়া মাল শেষ হয়ে যেতো তারা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে ফিরে আসলে তিনি আবার তা থেকেই তাদের দান করতেন।
(وَيُزَوِّجُ مِنْهَا أَيِّمَهُمْ) এ মাল দ্বারা স্বামীহীনদের বিবাহ দিতেন। অর্থাৎ কারো বিবাহের প্রয়োজন হলেই ঐ মাল থেকে বিবাহের ব্যয় মিটাতেন তথা বিবাহের ব্যবস্থা করতেন।
(حَتّٰى مَضٰى لِسَبِيْلِه) এভাবেই তিনি তার পথে চলে যান।
ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ উক্ত বাক্য দ্বারা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মৃত্যুর ইঙ্গিত করা হয়েছে। অর্থাৎ তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ঐ মাল উপরে বর্ণিত পন্থায় ব্যয় করা হতো।
(ثُمَّ اقْتَطَعَهَا مَرْوَانُ) অতঃপর মারওয়ান ইবনুল হাকাম তা বিভিন্ন অংশে বণ্টন করেন। অর্থাৎ ‘উসমান -এর খিলাফাতকালে মারওয়ান ফাদাকের ভূমি বিভিন্ন ভাগে বণ্টন করে এক ভাগ তার নিজের জন্য রাখেন। আর অন্যান্য অংশ তার অনুসারীদের মাঝে বণ্টন করেন।
(ثُمَّ صَارَتْ لِعُمَرَ بْنِ عَبْدِ الْعَزِيزِ) অতঃপর খিলাফাতের দায়িত্ব অথবা ফাদাকের কর্তৃত্ব ‘উমার ইবনু ‘আবদুল ‘আযীয-এর নিকট ফিরে আসে।
(فَرَأَيْتُ أَمْرًا مَنَعَه رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ فَاطِمَةَ) অতঃপর আমি দেখলাম ফাদাক এমন একটা ভূমি যা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কন্যা ফাতিমা (রাঃ)-কেও দেননি। অর্থাৎ ফাদাকের ভূমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কারো মাঝে বণ্টন না করে তা সাধারণ মুসলিমদের কল্যাণের জন্য রেখেছিলেন।
(لَيْسَ لِىْ بِحَقٍّ) তাতে আমার কোনো অধিকার নেই। অর্থাৎ উক্ত ভূমিতে কারো কোনো ব্যক্তিগত অধিকার নেই। যদিও তিনি খলীফাহ্ হোন না কেন।
(وَإِنِّىْ أُشْهِدُكُمْ أَنِّىْ رَدَدْتُهَا عَلٰى مَا كَانَتْ) আমি সাক্ষী রাখছি যে, আমি ঐ ভূমি পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দিলাম। অর্থাৎ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আবূ বাকর এবং ‘উমার -এর খিলাফাতকালে উক্ত ভূমি থেকে অর্জিত সম্পদ যেভাবে ব্যয় করা হতো এখনও তা সেভাবেই ব্যয় করা হবে। এতে কারো ব্যক্তিগত কোনো অধিকার নেই। (মিরকাতুল মাফাতীহ; ‘আওনুল মা‘বূদ ৫ম খন্ড, হাঃ ২৯৭০)