৬০। নিঃশঙ্ক ও নৈরাশ্যবোধ একজন মুসলিমকে ইসলামী মিল্লাত থেকে বের করে দেয়। আহলে ক্বিবলার জন্য সত্য পথ তো এতদুভয়ের মাঝামাঝি থাকার মধ্যেই নিহিত।
৬১। কোনো মানুষ শুধু তা অস্বীকার করলেই ঈমান থেকে বের হয়ে যাবে, যা স্বীকার করে সে তাতে প্রবেশ করেছে[1]।
৬২। আর ঈমান হচ্ছে, মুখে স্বীকৃতি দেওয়া এবং অন্তর দিয়ে সত্যায়ণ করা[2]
৬৩। শরী‘আত এবং তার ব্যাখ্যায় যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বিশুদ্ধভাবে প্রাপ্ত হয়েছে, তা সবই হক্ব বা সত্য।
[1] এ সীমাবদ্ধতার বিষয়টি বিশুদ্ধ নয়, বরং কথাটি ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। কারণ, কাফির শাহাদাতাইন (তথা লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহ ও মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ, এ) দু’টির সাক্ষ্য দিলেই ইসলামে প্রবেশ করবে, যদি সে সেটা মুখে উচ্চারণ না করতে পারে। কিন্তু যদি উচ্চারণ করতে পারে তবে (শাহাদাতাইনের সাথে সাথে) এমন কিছু থেকেও তাকে তাওবাহ করতে হবে যা (করলে বা বিশ্বাস করলে) তার কাফির হওয়াকে আবশ্যক করে তোলে। তাছাড়া অস্বীকার করা ছাড়াও এমন বেশ কিছু কারণ রয়েছে যা কোনো মানুষকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দেয়, আলিমগণ সেগুলো তাদের গ্রন্থে মুরতাদ তথা দ্বীন ত্যাগের বিধান আলোচনায় বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। যেমন,
ইসলামের বদনামী করা, ইসলামের প্রতি অপবাদ দেওয়া, ইসলাম সম্পর্কে কোনো খারাপ মন্তব্য করা, অথবা ইসলামের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে কোনো অশোভন কথা বলা, কিংবা আল্লাহ, তাঁর রাসূল বা তাঁর কিতাব অথবা তাঁর দেওয়া শরী‘আতের কোনো সামান্যতম বিধান নিয়েও ঠাট্টা-উপহাস করা। কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿قُلۡ أَبِٱللَّهِ وَءَايَٰتِهِۦ وَرَسُولِهِۦ كُنتُمۡ تَسۡتَهۡزِءُونَ ٦٥ لَا تَعۡتَذِرُواْ قَدۡ كَفَرۡتُم بَعۡدَ إِيمَٰنِكُمۡۚ﴾ [التوبة: ٦٥، ٦٦]
“বলুন, ‘তোমরা কি আল্লাহ্, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলকে বিদ্রূপ করছিলে?’ ‘তোমরা ওজর পেশ করো না। তোমরা তো ঈমান আনার পর কুফুরী করেছ।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৬৫-৬৬] [ই.বা.]
তন্মধ্যে আরও রয়েছে, মূর্তি বা বেদী পূজা করা, অথবা প্রয়োজন পূরণার্থে মৃতদেরকে আহ্বান করা, তাদের কাছে প্রার্থনা করা, তাদের দ্বারা উদ্ধার কামনা করা, তাদের কাছে সাহায্য-সহযোগিতা চাওয়া ইত্যাদি। কারণ, এসব কিছু ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ এর কালেমার পরিপন্থী কাজ। কারণ, এ কালেমা প্রমাণ করে যে ইবাদত কেবলমাত্র আল্লাহ তা‘আলারই ঐকান্তিক হক বা অধিকার। আর ইবাদতের প্রকারসমূহের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, দো‘আ, উদ্ধারপ্রার্থনা, রুকূ, সাজদাহ, জবাই, মান্নত ইত্যাদি। সুতরাং যে কেউ এগুলো থেকে সামান্যতম কিছুও আল্লাহ ব্যতীত মূর্তি, বেদী, ফিরিশতা, জিন্ন, কবরবাসী ইত্যাদি এবং কোনো সৃষ্টির কারোর জন্য নিবেদন করবে সে অবশ্যই আল্লাহর সাথে শির্ক করলো, সে ব্যক্তি কালেমা ‘লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ যথাযথভাবে বাস্তবায়ণ করেনি।
উপরে বর্ণিত মাসআলাগুলোর প্রত্যেকটিই এমন যে যার ব্যত্যয় ঘটলে আলেমগণের ঐকমত্যের ভিত্তিতে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে। অথচ এগুলোর কোনোটিই অস্বীকার করার মাসআলা নয়। (অর্থাৎ এগুলো দীনের কোনো অঙ্গকে অস্বীকার করার মাধ্যমে সংঘটিত হয়নি) আর এগুলো যে মানুষকে দ্বীন থেকে বের করে দেয় তার সপক্ষে কুরআন ও সুন্নাহর দলীল খুবই জানা বিষয়। এছাড়া আরও অনেক অনেক মাসআলা রয়েছে যেগুলো করলে মুসলিম কাফির হয়ে যায়, অথচ সেগুলো অস্বীকার করার মত মাসআলা নয়, (অর্থাৎ এগুলো দ্বীনের কোনো অঙ্গকে অস্বীকার করার বিষয় নয়) তারপরও আলেমগণ সেগুলো মুরতাদ বা দীনত্যাগকারীর বিধানের বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন। যদি দেখার ইচ্ছা হয় তো সেখানে দেখা যেতে পারে। আর আল্লাহই হচ্ছেন তাওফীকদাতা। [ই.বা.]
[2] এ সংজ্ঞায় কিছু দৃষ্টি আকর্ষণী ও ঘাটতি রয়েছে। বরং বিশুদ্ধ কথা, যার উপর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদা তা হচ্ছে, ঈমান, কথা, কাজ ও বিশ্বাসের নাম, যাতে আনুগত্যের মাধ্যমে বৃদ্ধি লাভ ঘটে এবং অবাধ্যতার মাধ্যমে ঘাটতি হয়। এ কথার উপর কুরআন ও সুন্নাহর দলীল-প্রমাণাদি অগণিত অসংখ্য। এ কিতাবের বিখ্যাত ব্যাখ্যাকার ইবন আবিল ইয্য আল-হানাফী অনেকগুলো উল্লেখ করেছেন। যদি প্রয়োজন মনে কর তো সেখানে দেখে নাও। ঈমানকে আমলের গণ্ডির বাইরে রাখা মূলত: মুরজিয়া সম্প্রদায়ের মত। আহলে সুন্নাত ও তাদের মধ্যকার মতভেদ কেবল শব্দগত বিরোধে সীমাবদ্ধ নয়, রবং সেটা যেমন শব্দগত বিরোধ তেমনি তা অর্থগত বিরোধও। কারণ, এ মতভেদের ওপর অনেক বিধান নির্ভর করছে, যারা আহলে সুন্নাত এবং মুরজিয়া উভয় সম্প্রদায়ের কথা-বার্তা নিয়ে চিন্তা করবে তারা সেটা সহজেই জানতে পারবে। [ই.বা.]
বস্তুতঃ ঈমান ও আমলের সম্পর্ক বীজ ও বৃক্ষের ন্যায়। বৃক্ষ যেমন বীজের পরিচয় বহন করে, তেমনি আমল ঈমানের পরিচয় বহন করে। আকীদা ও আমলের একটিকে অপরটি থেকে বাদ দিয়ে ঈমানের কল্পনাই করা যায় না। তাই মুহাদ্দিসগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত এই যে, ঈমান হচ্ছে তিনটি বস্তুর সমন্বয়: (১) অন্তরের বিশ্বাস, (২) মূখের স্বীকৃতি এবং (৩) আরকানসহ আহকামের বাস্তবায়ন। -অনুবাদক।
৬৪। ঈমান এক। আর ঈমানদার ব্যক্তিরা সে মৌলিক দিক থেকে সবাই সমান[1], তবে তাদের মধ্যে মর্যাদার পার্থক্য হয়ে থাকে আল্লাহর ভয়, তাক্বওয়া, কৃ-প্রবৃত্তির বিরুদ্ধাচরণ এবং উত্তম বস্তুকে আকড়ে ধরার মাধ্যমে।
৬৫। সব মুমিন ব্যক্তিই দয়াময় আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ওলী বা বন্ধু। আর তাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বেশি সম্মানিত সেই ব্যক্তি যে তাঁর অধিক অনুগত এবং কুরআনের বেশী অনুসারী।
৬৬। আর ঈমান (এর বিস্তারিত রূপ) হচ্ছেঃ আল্লাহ, তাঁর মালায়েকা (ফিরিশতা), তাঁর গ্রন্থসমূহ, তাঁর রাসূলগণ, শেষ দিবস এবং তাক্বদীরের ভাল মন্দ, মিষ্টি ও তিক্ত, সবই আল্লাহর তরফ থেকে (তাঁরই অনুমতিতে) ঘটে থাকে এ ঈমান (স্বীকৃতি) রাখা।
৬৭। আর আমরা উল্লিখিত বিষয় সবগুলোর ওপর ঈমান (দৃঢ়ভাবে স্বীকৃতি) পোষণ করি। আমরা রাসূলদের মধ্যে (ঈমানের ক্ষেত্রে) কোনো তারতম্য করি না। তাঁরা যে সকল বিধি-বিধান নিয়ে এসেছিলেন তা সবই সত্য বলে স্বীকার করি।
৬৮। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মাতের মধ্যে যারা (শির্ক ব্যতীত অপরাপর) কবীরা গুনাহ করবে তারা তাওবা নাও করলেও জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে না- যদি তারা তাওহীদ তথা একত্ববাদী হয়ে মারা গিয়ে থাকে। যখন তারা ঈমানদার অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে তখন তারা আল্লাহর ইচ্ছা ও বিচারের ওপর নির্ভরশীল হবে। যদি তিনি চান তাদেরকে ক্ষমা করবেন এবং নিজ গুণে তাদের ত্রুটিসমূহ মার্জনা করবেন। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কুরআনুল কারীমে বলেন,
﴿وَيَغۡفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَآءُۚ﴾ [النساء: ٤٨]
‘‘শির্ক ব্যতীত অন্যান্য সব অপরাধ তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন।’’ [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৪৮]
আর যদি তিনি চান, তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করাবেন এবং তাও হবে তার ন্যায়বিচার। অতঃপর আল্লাহপাক তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে এবং তাঁর (অনুমতিপ্রাপ্ত) সুপারিশকারীদের সুপারিশের ফলে তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে নিবেন এবং জান্নাতে প্রেরণ করবেন।
এর কারণ হলো, আল্লাহ তাআলা তাঁর মা‘রিফাতের অধিকারী (স্বীকারকারী) নেককার বান্দাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন। তাদেরকে ইহকাল ও পরকালের তাঁর অস্বীকারকারীদের ন্যায় করেন নি, যারা তাঁর হিদায়াতের পথ থেকে অকৃতকার্য হয়েছে। তারা তাঁর বন্ধুত্ব লাভ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। হে ইসলাম ও মুসলিমদের অভিভাবক মহান আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে ইসলামের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা আপনার সাথে সাক্ষাৎ করি।
৬৯। আর আমরা প্রত্যেক সৎ ও পাপী মুসলিমের পিছনে সালাত আদায় করা এবং প্রত্যেক মৃত মুসলিমের জন্য জানাযার সালাত আদায় করার পক্ষে মত প্রদান করি।
৭০। আমরা তাদের কাউকে জান্নাতী ও জাহান্নামী বলে আখ্যায়িত করব না এবং তাদের কারও বিরুদ্ধে আমরা কুফুরী ও শির্ক অথবা নিফাকের সাক্ষ্য প্রদান করব না, যতক্ষণ না এগুলির কোনো একটি তাদের মধ্যে প্রকাশ্যে দৃষ্টিগোচর হয়। তাদের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার আমরা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেই।
৭১। আমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতদের কারও বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করার পক্ষে মত দেই না, যদি না এমন কেউ হয় যার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা ওয়াজিব[2]।
৭২। আমীর ও শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাকে আমরা জায়েয মনে করি না, যদিও তারা অত্যাচার করে। আমরা তাদের অভিশাপ দিব না এবং আনুগত্য হতে হাত গুটিয়ে নিব না। তাদের আনুগত্য আল্লাহর আনুগত্যের সাপেক্ষে ফরয, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর অবাধ্যচরণের আদেশ দেয়। আমরা তাদের মঙ্গল ও কল্যাণের জন্য দো‘আ করব।
৭৩। আমরা সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের অনুসরণ করব[3]। আমরা জামাআত হতে বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং জামা‘আতের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা হতে বিরত থাকব।
৭৪। আমরা ন্যায়পরায়ণ ও আমানতদার ব্যক্তিদেরকে ভালোবাসব এবং অন্যায়কারী ও আমানতের খিয়ানতকারীদের সাথে শত্রুতা পোষণ করব।
৭৫। যে সব বিষয়ে আমাদের জ্ঞান অস্পষ্ট সে সব বিষয়ে আমরা বলব, ‘‘আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অধিক জানেন।’’
৭৬। সফরে ও গৃহে অবস্থানকালে আমরা হাদীসের নিয়মানুসারে মোজার উপরে মাসেহ করার পক্ষে মত প্রদান করি।
৭৭। মুসলিম শাসক ভালো হোক কিংবা মন্দ হোক- তার অনুগামী হয়ে হজ করা এবং জিহাদ করা কিয়ামাত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। এ দু’টি জিনিসকে কোনো কিছুই বাতিল কিংবা ব্যাহত করতে পারবে না।
৭৮। আমরা কিরামান-কাতিবীন (সম্মানিত লেখকবৃন্দ) ফেরেশ্তাদের ওপর ঈমান রাখি, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে আমাদের ওপর পর্যবেক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করেছেন।
৭৯। আমরা মালাকুল মাউতের (মৃত্যুর ফিরিশতার) ওপরও ঈমান রাখি। তাকে সৃষ্টিকুলের রূহসমূহ কবয করার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।
৮০। আমরা শাস্তিযোগ্য ব্যক্তিদের জন্য কবরের আযাবের প্রতি ঈমান রাখি এবং এও ঈমান রাখি যে, কবরের মুনকার ও নাকীর (দুই ফিরিশতা) মৃত ব্যক্তির রব, দীন, ও নবী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমের নিকট থেকে বহু হাদীস ও উক্তি বর্ণিত হয়েছে।
৮১। কবর জান্নাতের বাগিচাসমূহের অন্যতম অথবা তা জাহান্নামের গহ্বরসমূহের অন্যতম।
৮২। আমরা পুনরুত্থান, কিয়ামাত দিবসে আমলের প্রতিফল, (আল্লাহর সমীপে) পেশ করা, হিসাব নিকাশ, আমলনামা পাঠ, সওয়াব, (প্রতিদান) শাস্তি, পুলসিরাত এবং মীযান এসবের উপর ঈমান রাখি।
৮৩। (আরও ঈমান রাখি যে,) জান্নাত ও জাহান্নাম পূর্ব হতে সৃষ্ট হয়ে আছে। এ দু’টি কোনো দিন লয় প্রাপ্ত হবে না এবং ক্ষয় প্রাপ্তও হবে না। আল্লাহ তা‘আলা জান্নাত ও জাহান্নামকে অন্যান্য সৃষ্টির পূর্বে সৃষ্টি করেছেন এবং উভয়ের জন্য বাসিন্দা সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা স্বীয় অনুগ্রহে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং যাকে ইচ্ছা জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। আর তা হবে তার ন্যায় বিচার। প্রত্যেকেই সেই কাজ করবে যা তার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে এবং যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেখানেই সে যাবে।
৮৪। ভালো ও মন্দ উভয়ই বান্দার জন্য নির্দিষ্ট করে লেখা হয়েছে।
৮৫। ‘‘সামর্থ্য’’- (যা প্রত্যেক কর্মের জন্য অপরিহার্য। আর তা) দু’ধরণের- (১) যে সামর্থ্য বান্দার কর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট (কর্ম বাস্তবায়িত করার সময় থাকা অপরিহার্য) যেমন কাজটির তাওফীক (যথাযথভাবে সম্পন্ন করার সুযোগ) তা কোনো সৃষ্টির গুণ হতে পারে না, (বরং তা কেবল আল্লাহর হাতে আর তাঁরই গুণ) এ ধরনের সামর্থ্য কেবল কার্য সম্পাদনের সময়েই অর্জিত হয়। পক্ষান্তরে (২) যে ‘‘সামর্থ্য’’ বলতে বুঝায় বান্দার সুস্থতা, সচ্ছলতা, সক্ষমতা, অঙ্গ প্রতঙ্গের নিরাপত্তা, তা অবশ্যই কর্মের পূর্বেই থাকা প্রয়োজন। আর এটার সাথেই তাকলীফ (তথা বান্দার জন্য আল্লাহর নির্দেশনা) সম্পৃক্ত। (অর্থাৎ এটা থাকলেই আল্লাহর আদেশ-নিষেধ তার উপর প্রযোজ্য হয় নতুবা নয়)। আর এটা যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
﴿لَا يُكَلِّفُ ٱللَّهُ نَفۡسًا إِلَّا وُسۡعَهَاۚ﴾ [البقرة: ٢٨٦]
‘‘তিনি কাউকে তার সামর্থ্যের উর্ধ্বে দায়িত্ব দেন না।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৮৬]
৮৬। বান্দাদের যাবতীয় কর্ম আল্লাহর সৃষ্টি এবং তা বান্দাদের উপার্জন।
৮৭। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের উপর তাদের সামর্থ্যের অধিক দায়িত্বভার ন্যস্ত করেন না। আর তারাও ততটুকুই দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা রাখে যতটুকু বোঝা আল্লাহ তাদের উপর চাপিয়ে থাকেন[4]। আর এটাই হচ্ছে
«لا حول ولا قوة إلا بالله»
‘‘আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো সৎ কর্ম করা এবং অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকার ক্ষমতা কারও নেই।’’ এ বাণীর তাফসীর বা ব্যাখ্যা।
এর অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সাহায্য ছাড়া কারো কোনো অপরাধ থেকে বাঁচার এবং নড়া-চড়া করার ক্ষমতা নেই। অনুরূপভাবে, আল্লাহ তা‘আলার তাওফীক ছাড়া আল্লাহর আনুগত্য বরণ করার এবং তার উপরে দৃঢ় থাকার সাধ্য কারও নেই।
[2] আর তা ওয়াজিব হয় তিনটি কারণে। এক. বিবাহিত লোকের ব্যভিচারের কারণে, দ্বিতীয়. কোনো সম্মানিত মানুষকে হত্যা করার কারণে, তিন. দীন ইসলাম পরিত্যাগ করে কাফির হওয়ার কারণে যেমনটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। [দেখুন: সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৮৭৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬৭৬] –সম্পাদক।
[3] সুন্নাত এর অর্থ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত, আর জামা‘আত অর্থ, যে পথের ওপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম চলে গেছেন সে পথে চলাচলকারী লোকসকল। সকল সাধারণ মুসলিমই এর অংশ। এর দ্বারা কোনো দল বুঝানো হয় নি। -সম্পাদক।
[4] এটা সঠিক নয়। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা তার বান্দাদেরকে যতটুকু তাকলীফ (দায়-দায়িত্ব বা নির্দেশনা) দিয়েছেন তারা তার চেয়েও বেশি ক্ষমতা রাখেন। বরং মহান আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি দয়াপরবশ হয়েছেন এবং তাদের প্রতি সহজ করে দিয়েছেন, তিনি তাদের ওপর তাদের দীনে কোনো সমস্যা রাখেন নি। এসবই হচ্ছে তার রহমত ও দয়ার বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহই তাওফীকের মালিক।
৮৮। পৃথিবীতে যা কিছু সংঘটিত হয়, তা আল্লাহর ইচ্ছা, তাঁর জ্ঞান, তাঁর ফায়সালা এবং তাঁর বিধান অনুসারেই হয়ে থাকে। তাঁর ইচ্ছা সমস্ত ইচ্ছার উপরে। তাঁর ফায়সালা সমস্ত কৌশলের ঊর্ধ্বে। যা ইচ্ছা তিনি তাই করেন। তিনি কখনও অত্যাচার করেন না। তিনি সর্ব প্রকার কলুষ ও কালিমা হতে পবিত্র এবং সব রকমের দোষ ত্রুটি হতে বিমুক্ত। তিনি যা করেন সে সম্পর্কে তিনি জিজ্ঞাসিত হবেন না। পক্ষান্তরে, অন্য সবই স্বীয় কর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ২৩]
৮৯। জীবিত ব্যক্তিদের দো‘আ এবং দান খয়রাত দ্বারা মৃত বক্তিরা উপকৃত হয়ে থাকে।
৯০। আল্লাহ তা‘আলা দো‘আ কবুল করেন এবং বান্দাদের প্রয়োজন মিটিয়ে থাকেন।
৯১। আল্লাহ তা‘আলা সব কিছুরই মালিক এবং তাঁর মালিক কেউ নয়। মুহুর্তের জন্যও কারো পক্ষে আল্লাহর অমুখাপেক্ষী হওয়া সম্ভব নয়। যে ব্যক্তি মুহুর্তের জন্য আল্লাহর অমুখাপেক্ষী হতে চাবে, সে কাফির হয়ে যাবে এবং লাঞ্ছিত হবে।
৯২। আল্লাহ তা‘আলা ক্রুদ্ধ এবং রুষ্ট হন, তবে তা মাখলুকের ন্যায় নয়।
৯৩। আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণকে ভালোবাসি, তবে তাদের কারও ভালোবাসার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করি না এবং তাদের কারও থেকে বিমুক্তি ঘোষণা করি না। তাদের সাথে যারা বিদ্বেষ পোষণ করে অথবা যারা তাদেরকে অসম্মানজনকভাবে স্মরণ করে আমরা তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করি। আমরা তাদেরকে শুধু কল্যাণের সাথেই স্মরণ করি। তাদের সঙ্গে মহব্বত রাখা দীন ও ঈমান এবং ইহসানের অংশ। আর তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা, কুফুরী, মুনাফিকী এবং সীমালংঘন করার পর্যায়ভুক্ত।
৯৪। আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পর সর্বপ্রথম আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর খেলাফতকে স্বীকৃতি দেই। অতঃপর পর্যায়েক্রমে উমর ইবন খাত্তাব, উসমান ও আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমকে খলীফা বলে স্বীকার করি। তারাই ছিলেন সুপথগামী খলীফা ও হিদায়াতপ্রাপ্ত নেতা।
৯৫। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে দশজন সাহাবীর নাম উল্লেখ করে তাদের সম্পর্কে জান্নাতের সুসংবাদ দান করেছেন, আমরা তাদের জন্য জান্নাতের সাক্ষ্য প্রদান করি। কারণ, এ সম্পর্কে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুসংবাদ দান করেছেন এবং তাঁর উক্তি সত্য। তাঁরা হলেনঃ (১) আবু বকর (২) উমর (৩) উসমান (৪) আলী (৫) তালহা (৬) যুবাইর (৭) সা‘দ (৮) সা‘ঈদ (৯) আবদুর রহমান ইবন আউফ এবং (১০) আমীনুল উম্মাহ (জাতির বিশ্বাসভাজন) আবু ওবায়দা ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম (আল্লাহ তাদের সবার ওপর সন্তুষ্ট হোন)
৯৬। যে ব্যক্তি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী ও তাঁর পবিত্র স্ত্রীগণ ও সম্মানিত বংশধরদের সম্পর্কে ভালো মন্তব্য করে সে মুনাফিকী থেকে নিষ্কৃতি পায়।
৯৭। পূর্বে গত হওয়া সালাফে সালেহীন (নেককার পূর্বসূরী) আলেমগণ এবং তাঁদের যথাযথ পদাঙ্ক অনুসারী কল্যাণের অধিকারী হাদীসবিদগণ ও ফিকহের জ্ঞানের অধিকারী গবেষকগণকে আমরা যথাযথ সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করি। আর যারা এদের সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করে তারা সঠিক পথের পথিক নয়।
৯৮। আমরা কোনো ওলীকে কোনো নবীর ওপর প্রাধান্য দেই না বরং আমরা বলি, যে কোনো একজন রাসূল সকল ওলী থেকে শ্রেষ্ঠ।
৯৯। ওলীদের কারামত সম্পর্কে যে খবরাখবর আমাদের নিকট পৌঁছেছে এবং যা বিশ্বস্ত বর্ণনার মাধ্যমে পরিবেশিত হয়েছে আমরা তার উপর ঈমান রাখি।
১০০। আমরা কিয়ামাতের নিম্নলিখিত নিদর্শনাবলীর প্রতি ঈমান রাখি: দাজ্জালের আবির্ভাব, আসমান থেকে ঈসা আলাইহিস সালামের অবতরণ। আর আমরা পশ্চিম গগনে সূর্যোদয় এবং দাব্বাতুল আরদ নামক প্রাণীর স্বীয় স্থান হতে আবির্ভাবের ওপরও ঈমান রাখি।
১০১। আমরা কোনো ভবিষ্যৎ বক্তা অথবা কোনো জ্যোতিষীকে সত্য বলে বিশ্বাস করি না এবং ঐ বক্তিকেও সত্য বলে মনে করি না, যে আল্লাহর কিতাব, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ ও উম্মতের ইজমার বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখে।
১০২। আমরা (মুসলিম জাতির) ঐক্যকে সত্য ও সঠিক বলে মনে করি এবং তা হতে বিচ্ছিন্নতাকে বক্রতা ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে মনে করি।
১০৩। নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে আল্লাহর দীন এক ও অভিন্ন। তা হচ্ছে ইসলাম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿إِنَّ ٱلدِّينَ عِندَ ٱللَّهِ ٱلۡإِسۡلَٰمُۗ﴾ [ال عمران: ١٩]
‘‘নিশ্চয় আল্লাহর নিকট একমাত্র দীন হচ্ছে ইসলাম।’’ [সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯]
অন্যত্র তিনি আরও বলেন,
﴿وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗا﴾ [المائدة: ٣]
‘‘এবং আমি ইসলামকে তোমাদের দীন হিসাবে মনোনীত করলাম”। [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৩]
১০৪। ইসলাম মধ্যপন্থী দীন। (নবী-রাসূল, সৎকর্মশীল ব্যক্তিবর্গ ও শরীয়তের বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে) বাড়াবাড়ি ও কমতির মাঝামাঝি তার অবস্থান, (আল্লাহর সত্তা, নাম ও গুণাবলী সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে সেগুলোতে তাশবীহ তথা) সাদৃশ্য স্থাপন কিংবা (সে নাম ও গুণগুলোকে তা‘তীল তথা) অর্থহীন করার মাঝে তার অবস্থান, (সৃষ্টিকুলের তাকদীরের ব্যাপারে তাদেরকে জবর তথা) ক্ষমতাহীন বাধ্য ও (কাদর তথা) নির্ধারণহীন মুক্ত এ দু’য়ের মাঝে তার অবস্থান। অনুরূপ (আল্লাহর ভয় ও ক্ষমার ব্যাপারে) নিশ্চিন্ততা ও নৈরাশ্যের মধ্যবর্তীতে তার অবস্থান।
১০৫। এগুলোই হচ্ছে আমাদের দীন এবং আমাদের আকীদা বা মৌলিক বিশ্বাস। প্রকাশ্যে এবং অন্তরে তাই আমরা ধারণ করি। উপরে যা আমরা উল্লেখ করলাম এবং বর্ণনা করলাম যারাই তার কোনো কিছুর বিরোধিতা করে, তাদের সঙ্গে আমাদের কোনোই সম্পর্ক নেই।
আমরা আল্লাহ তা‘আলার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে ঈমানের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখেন এবং আমাদের জীবনাবসান ঈমানের সাথে করেন। আর তিনি যেন আমাদেরকে রক্ষা করেন বিভিন্ন প্রবৃত্তিপরায়ণতা ও বিবিধ মতামতের অনুসরণ থেকে এবং মুশাব্বিহা, মু‘তাযিলা, জাহমিয়া, জাবরিয়া, ক্বাদরিয়া প্রভৃতি বাতিল মতবাদসমূহ থেকে। যারা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের বিরুদ্ধাচরণ করেছে এবং যারা বিভ্রান্ত মত ও পথের পক্ষ নিয়েছে আমরা তাদের থেকে আমাদের সম্পর্কহীনতার কথা ঘোষণা করছি। তারা আমাদের মতে পথভ্রষ্ট ও নিকৃষ্ট।
আল্লাহর নিকটেই যাবতীয় ভ্রান্তি হতে নিরাপত্তা এবং সৎপথে চলার তাওফীক কামনা করছি।