৬০। নিঃশঙ্ক ও নৈরাশ্যবোধ একজন মুসলিমকে ইসলামী মিল্লাত থেকে বের করে দেয়। আহলে ক্বিবলার জন্য সত্য পথ তো এতদুভয়ের মাঝামাঝি থাকার মধ্যেই নিহিত।
৬১। কোনো মানুষ শুধু তা অস্বীকার করলেই ঈমান থেকে বের হয়ে যাবে, যা স্বীকার করে সে তাতে প্রবেশ করেছে[1]।
৬২। আর ঈমান হচ্ছে, মুখে স্বীকৃতি দেওয়া এবং অন্তর দিয়ে সত্যায়ণ করা[2]
৬৩। শরী‘আত এবং তার ব্যাখ্যায় যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বিশুদ্ধভাবে প্রাপ্ত হয়েছে, তা সবই হক্ব বা সত্য।
[1] এ সীমাবদ্ধতার বিষয়টি বিশুদ্ধ নয়, বরং কথাটি ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। কারণ, কাফির শাহাদাতাইন (তথা লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহ ও মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ, এ) দু’টির সাক্ষ্য দিলেই ইসলামে প্রবেশ করবে, যদি সে সেটা মুখে উচ্চারণ না করতে পারে। কিন্তু যদি উচ্চারণ করতে পারে তবে (শাহাদাতাইনের সাথে সাথে) এমন কিছু থেকেও তাকে তাওবাহ করতে হবে যা (করলে বা বিশ্বাস করলে) তার কাফির হওয়াকে আবশ্যক করে তোলে। তাছাড়া অস্বীকার করা ছাড়াও এমন বেশ কিছু কারণ রয়েছে যা কোনো মানুষকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দেয়, আলিমগণ সেগুলো তাদের গ্রন্থে মুরতাদ তথা দ্বীন ত্যাগের বিধান আলোচনায় বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। যেমন,
ইসলামের বদনামী করা, ইসলামের প্রতি অপবাদ দেওয়া, ইসলাম সম্পর্কে কোনো খারাপ মন্তব্য করা, অথবা ইসলামের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে কোনো অশোভন কথা বলা, কিংবা আল্লাহ, তাঁর রাসূল বা তাঁর কিতাব অথবা তাঁর দেওয়া শরী‘আতের কোনো সামান্যতম বিধান নিয়েও ঠাট্টা-উপহাস করা। কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿قُلۡ أَبِٱللَّهِ وَءَايَٰتِهِۦ وَرَسُولِهِۦ كُنتُمۡ تَسۡتَهۡزِءُونَ ٦٥ لَا تَعۡتَذِرُواْ قَدۡ كَفَرۡتُم بَعۡدَ إِيمَٰنِكُمۡۚ﴾ [التوبة: ٦٥، ٦٦]
“বলুন, ‘তোমরা কি আল্লাহ্, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলকে বিদ্রূপ করছিলে?’ ‘তোমরা ওজর পেশ করো না। তোমরা তো ঈমান আনার পর কুফুরী করেছ।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৬৫-৬৬] [ই.বা.]
তন্মধ্যে আরও রয়েছে, মূর্তি বা বেদী পূজা করা, অথবা প্রয়োজন পূরণার্থে মৃতদেরকে আহ্বান করা, তাদের কাছে প্রার্থনা করা, তাদের দ্বারা উদ্ধার কামনা করা, তাদের কাছে সাহায্য-সহযোগিতা চাওয়া ইত্যাদি। কারণ, এসব কিছু ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ এর কালেমার পরিপন্থী কাজ। কারণ, এ কালেমা প্রমাণ করে যে ইবাদত কেবলমাত্র আল্লাহ তা‘আলারই ঐকান্তিক হক বা অধিকার। আর ইবাদতের প্রকারসমূহের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, দো‘আ, উদ্ধারপ্রার্থনা, রুকূ, সাজদাহ, জবাই, মান্নত ইত্যাদি। সুতরাং যে কেউ এগুলো থেকে সামান্যতম কিছুও আল্লাহ ব্যতীত মূর্তি, বেদী, ফিরিশতা, জিন্ন, কবরবাসী ইত্যাদি এবং কোনো সৃষ্টির কারোর জন্য নিবেদন করবে সে অবশ্যই আল্লাহর সাথে শির্ক করলো, সে ব্যক্তি কালেমা ‘লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ যথাযথভাবে বাস্তবায়ণ করেনি।
উপরে বর্ণিত মাসআলাগুলোর প্রত্যেকটিই এমন যে যার ব্যত্যয় ঘটলে আলেমগণের ঐকমত্যের ভিত্তিতে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে। অথচ এগুলোর কোনোটিই অস্বীকার করার মাসআলা নয়। (অর্থাৎ এগুলো দীনের কোনো অঙ্গকে অস্বীকার করার মাধ্যমে সংঘটিত হয়নি) আর এগুলো যে মানুষকে দ্বীন থেকে বের করে দেয় তার সপক্ষে কুরআন ও সুন্নাহর দলীল খুবই জানা বিষয়। এছাড়া আরও অনেক অনেক মাসআলা রয়েছে যেগুলো করলে মুসলিম কাফির হয়ে যায়, অথচ সেগুলো অস্বীকার করার মত মাসআলা নয়, (অর্থাৎ এগুলো দ্বীনের কোনো অঙ্গকে অস্বীকার করার বিষয় নয়) তারপরও আলেমগণ সেগুলো মুরতাদ বা দীনত্যাগকারীর বিধানের বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন। যদি দেখার ইচ্ছা হয় তো সেখানে দেখা যেতে পারে। আর আল্লাহই হচ্ছেন তাওফীকদাতা। [ই.বা.]
[2] এ সংজ্ঞায় কিছু দৃষ্টি আকর্ষণী ও ঘাটতি রয়েছে। বরং বিশুদ্ধ কথা, যার উপর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদা তা হচ্ছে, ঈমান, কথা, কাজ ও বিশ্বাসের নাম, যাতে আনুগত্যের মাধ্যমে বৃদ্ধি লাভ ঘটে এবং অবাধ্যতার মাধ্যমে ঘাটতি হয়। এ কথার উপর কুরআন ও সুন্নাহর দলীল-প্রমাণাদি অগণিত অসংখ্য। এ কিতাবের বিখ্যাত ব্যাখ্যাকার ইবন আবিল ইয্য আল-হানাফী অনেকগুলো উল্লেখ করেছেন। যদি প্রয়োজন মনে কর তো সেখানে দেখে নাও। ঈমানকে আমলের গণ্ডির বাইরে রাখা মূলত: মুরজিয়া সম্প্রদায়ের মত। আহলে সুন্নাত ও তাদের মধ্যকার মতভেদ কেবল শব্দগত বিরোধে সীমাবদ্ধ নয়, রবং সেটা যেমন শব্দগত বিরোধ তেমনি তা অর্থগত বিরোধও। কারণ, এ মতভেদের ওপর অনেক বিধান নির্ভর করছে, যারা আহলে সুন্নাত এবং মুরজিয়া উভয় সম্প্রদায়ের কথা-বার্তা নিয়ে চিন্তা করবে তারা সেটা সহজেই জানতে পারবে। [ই.বা.]
বস্তুতঃ ঈমান ও আমলের সম্পর্ক বীজ ও বৃক্ষের ন্যায়। বৃক্ষ যেমন বীজের পরিচয় বহন করে, তেমনি আমল ঈমানের পরিচয় বহন করে। আকীদা ও আমলের একটিকে অপরটি থেকে বাদ দিয়ে ঈমানের কল্পনাই করা যায় না। তাই মুহাদ্দিসগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত এই যে, ঈমান হচ্ছে তিনটি বস্তুর সমন্বয়: (১) অন্তরের বিশ্বাস, (২) মূখের স্বীকৃতি এবং (৩) আরকানসহ আহকামের বাস্তবায়ন। -অনুবাদক।