ইমেইল পাঠাতে লগইন করুন

স্পাম প্রতিরোধে এই ফিচারটি শুধুমাত্র লগইনকৃত ব্যবহারকারীদের জন্য।

লগইন সাইনআপ
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আকীদা ঈমানের বিষয়াবলী ইমাম আবু জা‘ফর আহমাদ আত-ত্বহাবী রহ.
ঈমান ও মুমিন

৬৪। ঈমান এক। আর ঈমানদার ব্যক্তিরা সে মৌলিক দিক থেকে সবাই সমান[1], তবে তাদের মধ্যে মর্যাদার পার্থক্য হয়ে থাকে আল্লাহর ভয়, তাক্বওয়া, কৃ-প্রবৃত্তির বিরুদ্ধাচরণ এবং উত্তম বস্তুকে আকড়ে ধরার মাধ্যমে।

৬৫। সব মুমিন ব্যক্তিই দয়াময় আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ওলী বা বন্ধু। আর তাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বেশি সম্মানিত সেই ব্যক্তি যে তাঁর অধিক অনুগত এবং কুরআনের বেশী অনুসারী।

৬৬। আর ঈমান (এর বিস্তারিত রূপ) হচ্ছেঃ আল্লাহ, তাঁর মালায়েকা (ফিরিশতা), তাঁর গ্রন্থসমূহ, তাঁর রাসূলগণ, শেষ দিবস এবং তাক্বদীরের ভাল মন্দ, মিষ্টি ও তিক্ত, সবই আল্লাহর তরফ থেকে (তাঁরই অনুমতিতে) ঘটে থাকে এ ঈমান (স্বীকৃতি) রাখা।

৬৭। আর আমরা উল্লিখিত বিষয় সবগুলোর ওপর ঈমান (দৃঢ়ভাবে স্বীকৃতি) পোষণ করি। আমরা রাসূলদের মধ্যে (ঈমানের ক্ষেত্রে) কোনো তারতম্য করি না। তাঁরা যে সকল বিধি-বিধান নিয়ে এসেছিলেন তা সবই সত্য বলে স্বীকার করি।

৬৮। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মাতের মধ্যে যারা (শির্ক ব্যতীত অপরাপর) কবীরা গুনাহ করবে তারা তাওবা নাও করলেও জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে না- যদি তারা তাওহীদ তথা একত্ববাদী হয়ে মারা গিয়ে থাকে। যখন তারা ঈমানদার অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে তখন তারা আল্লাহর ইচ্ছা ও বিচারের ওপর নির্ভরশীল হবে। যদি তিনি চান তাদেরকে ক্ষমা করবেন এবং নিজ গুণে তাদের ত্রুটিসমূহ মার্জনা করবেন। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কুরআনুল কারীমে বলেন,

﴿وَيَغۡفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَآءُۚ﴾ [النساء: ٤٨] 

‘‘শির্ক ব্যতীত অন্যান্য সব অপরাধ তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন।’’ [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৪৮]

আর যদি তিনি চান, তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করাবেন এবং তাও হবে তার ন্যায়বিচার। অতঃপর আল্লাহপাক তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে এবং তাঁর (অনুমতিপ্রাপ্ত) সুপারিশকারীদের সুপারিশের ফলে তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে নিবেন এবং জান্নাতে প্রেরণ করবেন।

এর কারণ হলো, আল্লাহ তাআলা তাঁর মা‘রিফাতের অধিকারী (স্বীকারকারী) নেককার বান্দাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন। তাদেরকে ইহকাল ও পরকালের তাঁর অস্বীকারকারীদের ন্যায় করেন নি, যারা তাঁর হিদায়াতের পথ থেকে অকৃতকার্য হয়েছে। তারা তাঁর বন্ধুত্ব লাভ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। হে ইসলাম ও মুসলিমদের  অভিভাবক মহান আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে ইসলামের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা আপনার সাথে সাক্ষাৎ করি।

৬৯। আর আমরা প্রত্যেক সৎ ও পাপী মুসলিমের পিছনে সালাত আদায় করা এবং প্রত্যেক মৃত মুসলিমের জন্য জানাযার সালাত আদায় করার পক্ষে মত প্রদান করি।

৭০। আমরা তাদের কাউকে জান্নাতী ও জাহান্নামী বলে আখ্যায়িত করব না এবং তাদের কারও বিরুদ্ধে আমরা কুফুরী ও শির্ক অথবা নিফাকের সাক্ষ্য প্রদান করব না, যতক্ষণ না এগুলির কোনো একটি তাদের মধ্যে প্রকাশ্যে দৃষ্টিগোচর হয়। তাদের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার আমরা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেই।

৭১। আমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতদের কারও বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করার পক্ষে মত দেই না, যদি না এমন কেউ হয় যার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা ওয়াজিব[2]।

৭২। আমীর ও শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাকে আমরা জায়েয মনে করি না, যদিও তারা অত্যাচার করে। আমরা তাদের অভিশাপ দিব না এবং আনুগত্য হতে হাত গুটিয়ে নিব না। তাদের আনুগত্য আল্লাহর আনুগত্যের সাপেক্ষে ফরয, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর অবাধ্যচরণের আদেশ দেয়। আমরা তাদের মঙ্গল ও কল্যাণের জন্য দো‘আ করব।

৭৩। আমরা সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের অনুসরণ করব[3]। আমরা জামাআত হতে বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং জামা‘আতের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা হতে বিরত থাকব।

৭৪। আমরা ন্যায়পরায়ণ ও আমানতদার ব্যক্তিদেরকে ভালোবাসব এবং অন্যায়কারী ও আমানতের খিয়ানতকারীদের সাথে শত্রুতা পোষণ করব।

৭৫। যে সব বিষয়ে আমাদের জ্ঞান অস্পষ্ট সে সব বিষয়ে আমরা বলব, ‘‘আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অধিক জানেন।’’

৭৬। সফরে ও গৃহে অবস্থানকালে আমরা হাদীসের নিয়মানুসারে মোজার উপরে মাসেহ করার পক্ষে মত প্রদান করি।

৭৭। মুসলিম শাসক ভালো হোক কিংবা মন্দ হোক- তার অনুগামী হয়ে হজ করা এবং জিহাদ করা কিয়ামাত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। এ দু’টি জিনিসকে কোনো কিছুই বাতিল কিংবা ব্যাহত করতে পারবে না।

৭৮। আমরা কিরামান-কাতিবীন (সম্মানিত লেখকবৃন্দ) ফেরেশ্তাদের ওপর ঈমান রাখি, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে আমাদের ওপর পর্যবেক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করেছেন।

৭৯। আমরা মালাকুল মাউতের (মৃত্যুর ফিরিশতার) ওপরও ঈমান রাখি। তাকে সৃষ্টিকুলের রূহসমূহ কবয করার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।

৮০। আমরা শাস্তিযোগ্য ব্যক্তিদের জন্য কবরের আযাবের প্রতি ঈমান রাখি এবং এও ঈমান রাখি যে, কবরের মুনকার ও নাকীর (দুই ফিরিশতা) মৃত ব্যক্তির রব, দীন, ও নবী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমের নিকট থেকে বহু হাদীস ও উক্তি বর্ণিত হয়েছে।

৮১। কবর জান্নাতের বাগিচাসমূহের অন্যতম অথবা তা জাহান্নামের গহ্বরসমূহের অন্যতম।

৮২। আমরা পুনরুত্থান, কিয়ামাত দিবসে আমলের প্রতিফল, (আল্লাহর সমীপে) পেশ করা, হিসাব নিকাশ, আমলনামা পাঠ, সওয়াব, (প্রতিদান) শাস্তি, পুলসিরাত এবং মীযান এসবের উপর ঈমান রাখি।

৮৩। (আরও ঈমান রাখি যে,) জান্নাত ও জাহান্নাম পূর্ব হতে সৃষ্ট হয়ে আছে। এ দু’টি কোনো দিন লয় প্রাপ্ত হবে না এবং ক্ষয় প্রাপ্তও হবে না। আল্লাহ তা‘আলা জান্নাত ও জাহান্নামকে অন্যান্য সৃষ্টির পূর্বে সৃষ্টি করেছেন এবং উভয়ের জন্য বাসিন্দা সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা স্বীয় অনুগ্রহে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং যাকে ইচ্ছা জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। আর তা হবে তার ন্যায় বিচার। প্রত্যেকেই সেই কাজ করবে যা তার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে এবং যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেখানেই সে যাবে।

৮৪। ভালো ও মন্দ উভয়ই বান্দার জন্য নির্দিষ্ট করে লেখা হয়েছে।

৮৫। ‘‘সামর্থ্য’’- (যা প্রত্যেক কর্মের জন্য অপরিহার্য। আর তা) দু’ধরণের- (১) যে সামর্থ্য বান্দার কর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট (কর্ম বাস্তবায়িত করার সময় থাকা অপরিহার্য) যেমন কাজটির তাওফীক (যথাযথভাবে সম্পন্ন করার সুযোগ) তা কোনো সৃষ্টির গুণ হতে পারে না, (বরং তা কেবল আল্লাহর হাতে আর তাঁরই গুণ) এ ধরনের সামর্থ্য কেবল কার্য সম্পাদনের সময়েই অর্জিত হয়। পক্ষান্তরে (২) যে ‘‘সামর্থ্য’’ বলতে বুঝায় বান্দার সুস্থতা, সচ্ছলতা, সক্ষমতা, অঙ্গ প্রতঙ্গের নিরাপত্তা, তা অবশ্যই কর্মের পূর্বেই থাকা প্রয়োজন। আর এটার সাথেই তাকলীফ (তথা বান্দার জন্য আল্লাহর নির্দেশনা) সম্পৃক্ত। (অর্থাৎ এটা থাকলেই আল্লাহর আদেশ-নিষেধ তার উপর প্রযোজ্য হয় নতুবা নয়)। আর এটা যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿لَا يُكَلِّفُ ٱللَّهُ نَفۡسًا إِلَّا وُسۡعَهَاۚ﴾ [البقرة: ٢٨٦] 

‘‘তিনি কাউকে তার সামর্থ্যের উর্ধ্বে দায়িত্ব দেন না।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৮৬]

৮৬। বান্দাদের যাবতীয় কর্ম আল্লাহর সৃষ্টি এবং তা বান্দাদের উপার্জন।

৮৭। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের উপর তাদের সামর্থ্যের অধিক দায়িত্বভার ন্যস্ত করেন না। আর তারাও ততটুকুই দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা রাখে যতটুকু বোঝা আল্লাহ তাদের উপর চাপিয়ে থাকেন[4]। আর এটাই হচ্ছে

«لا حول ولا قوة إلا بالله»

‘‘আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো সৎ কর্ম করা এবং অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকার ক্ষমতা কারও নেই।’’ এ বাণীর তাফসীর বা ব্যাখ্যা।

এর অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সাহায্য ছাড়া কারো কোনো অপরাধ থেকে বাঁচার এবং নড়া-চড়া করার ক্ষমতা নেই। অনুরূপভাবে, আল্লাহ তা‘আলার তাওফীক ছাড়া আল্লাহর আনুগত্য বরণ করার এবং তার উপরে দৃঢ় থাকার সাধ্য কারও নেই।

[1] কথাটিতে প্রচুর সমস্যা রয়েছে। বরং তা একটি বাতিল কথা। কারণ ঈমানদারগণ সবাই ঈমানের দিক থেকে একই পর্যায়ের নয়। তাদের মধ্যে বড় ধরণের প্রার্থক্য বিদ্যমান। যেমন রাসূলগণের ঈমান অন্যদের ঈমানের মত নয়। অনুরূপ খোলাফায়ে রাশেদীনসহ অন্যান্য সাহাবীগণের ঈমান এবং তাঁরা ব্যতীত অন্যদের ঈমান একরকম নয়। এ তারতম্যের কারণ হচ্ছে আল্লাহ, তাঁর নাম, তাঁর গুণাবলী এবং তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য যে শরী‘আত প্রবর্তন করেছেন বান্দার অন্তরে অবস্থিত সেটার জ্ঞানে তারতম্য থাকা। আর এটাই হচ্ছে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের অভিমত। মুরজিয়া ও তাদের মতের পক্ষের লোকেরা এটার বিরোধিতা করে থাকে। আল্লাহই হচ্ছেন সাহায্যকারী। [ই.বা.]

[2] আর তা ওয়াজিব হয় তিনটি কারণে। এক. বিবাহিত লোকের ব্যভিচারের কারণে, দ্বিতীয়. কোনো সম্মানিত মানুষকে হত্যা করার কারণে, তিন. দীন ইসলাম পরিত্যাগ করে কাফির হওয়ার কারণে যেমনটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। [দেখুন: সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৮৭৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬৭৬] –সম্পাদক।

[3] সুন্নাত এর অর্থ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত, আর জামা‘আত অর্থ, যে পথের ওপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম চলে গেছেন সে পথে চলাচলকারী লোকসকল। সকল সাধারণ মুসলিমই এর অংশ। এর দ্বারা কোনো দল বুঝানো হয় নি। -সম্পাদক।

[4] এটা সঠিক নয়। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা তার বান্দাদেরকে যতটুকু তাকলীফ (দায়-দায়িত্ব বা নির্দেশনা) দিয়েছেন তারা তার চেয়েও বেশি ক্ষমতা রাখেন। বরং মহান আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি দয়াপরবশ হয়েছেন এবং তাদের প্রতি সহজ করে দিয়েছেন, তিনি তাদের ওপর তাদের দীনে কোনো সমস্যা রাখেন নি। এসবই হচ্ছে তার রহমত ও দয়ার বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহই তাওফীকের মালিক।