সূরা সম্পর্কেঃ
এ সূরাটি সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু আনহু এর সাথে বিশেষভাবে জড়িত। তাঁর মা উম্মে মাকতুম ছিলেন খাদীজা রাদিয়াল্লাহু আনহার পিতা খুওয়াইলিদের সহোদর বোন। তিনি ছিলেন নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের শ্যালক। বংশ মর্যাদার দিক দিয়ে সমাজের সাধারণ শ্রেণীভুক্ত নন বরং অভিজাত বংশীয় ছিলেন। আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু অন্ধ হওয়ার কারণে জানতে পারেননি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্যের সাথে আলোচনারত আছেন। তিনি মজলিসে প্রবেশ করেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আওয়াজ দিতে শুরু করেন এবং বারবার আওয়াজ দেন। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কুরআন এর একটি আয়াতের পাঠ জিজ্ঞাসা করেন এবং সাথে সাথে জওয়াব দিতে পীড়াপীড়ি করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন মক্কার কাফের নেতৃবর্গের সাথে আলোচনায় মশগুল ছিলেন। এই নেতৃবর্গ ছিলেন ওতবা ইবনে রবীয়া, আবু জাহল ইবনে হিশাম এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পিতৃব্য আব্বাস। তিনি তখনও মুসলিম হননি। এরূপ ক্ষেত্রে আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু আনহু এর এভাবে কথা বলা এবং মামুলী প্রশ্ন নিয়ে তাৎক্ষনিক জওয়াবের জন্য পীড়াপীড়ি করা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে বিরক্তিকর ঠেকে। এই বিরক্তির প্রধান কারণ ছিল এই যে, আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু পাক্কা মুসলিম ছিলেন এবং সদা সবৰ্দা মজলিসে উপস্থিত থাকতেন। তিনি এই প্রশ্ন অন্য সময়ও রাখতে পারতেন। তাঁর জওয়াব বিলম্বিত করার মধ্যে কোন ধর্মীয় ক্ষতির আশংকা ছিল না। কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলা নবীর এ বিরক্তি প্রকাশ পছন্দ করলেন না। তিনি আয়াত নাযিল করে তার প্রতিকার করেন। [দেখুন: তিরমিযী: ৩৩২৮, ৩৩৩১, মুয়াত্তা মালেক: ১/২০৩]
সূরা আবাসা [1]
(মক্কায় অবতীর্ণ)
[1] এই সূরাটির শানে নুযুল (অবতীর্ণ হওয়ার কারণ)এর ব্যাপারে সবাই একমত যে, এটি আব্দুল্লাহ বিন উম্মে মাকতূম (রাঃ)-এর শানে অবতীর্ণ হয়েছিল। একদা নবী (সাঃ)-এর নিকট কুরাইশ (কাফের)-দের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গ বসে কথা-বার্তা বলছিল। এমতাবস্থায় হঠাৎ উক্ত আব্দুল্লাহ বিন উম্মে মাকতূম (রাঃ) উপস্থিত হলেন। তিনি একজন অন্ধ মানুষ ছিলেন। আসা মাত্র নবী (সাঃ)-কে দ্বীনের কথা জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন। তিনি তাঁর প্রতি কিছুটা বিরক্তিভাব পোষণ করলেন এবং তার প্রতি অমনোযোগী হলেন। তাই সতর্কতাস্বরূপ এই আয়াতগুলি অবতীর্ণ হল। (তিরমিযী সূরা আবাসার তাফসীর পরিচ্ছেদ, সহীহাহ, আলবানী)
সে* ভ্রকুঞ্চিত করল এবং মুখ ফিরিয়ে নিল। আল-বায়ান
(নবী) মুখ ভার করল আর মুখ ঘুরিয়ে নিল। তাইসিরুল
সে ভ্রু কুঞ্চিত করল এবং মুখ ফিরিয়ে নিলো, মুজিবুর রহমান
The Prophet frowned and turned away Sahih International
*মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)।
১. তিনি ভ্ৰকুঞ্চিত করলেন এবং মুখ ফিরিয়ে নিলেন(১),
(১) عبس শব্দের অর্থ রুষ্টতা অবলম্বন করা এবং চোখে মুখে বিরক্তি প্ৰকাশ করা। تولى শব্দের অর্থ মুখ ফিরিয়ে নেয়া। [জালালাইন]
তাফসীরে জাকারিয়া১। সে ভ্রূ কুঞ্চিত করল এবং মুখ ফিরিয়ে নিল।
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ানকারণ তার কাছে অন্ধ লোকটি* আগমন করেছিল। আল-বায়ান
(কারণ সে যখন কুরায়শ সরদারদের সাথে আলোচনায় রত ছিল তখন) তার কাছে এক অন্ধ ব্যক্তি আসল। তাইসিরুল
যেহেতু তার নিকট এক অন্ধ আগমন করেছিল। মুজিবুর রহমান
Because there came to him the blind man, [interrupting]. Sahih International
* আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতূম
২. কারণ তার কাছে অন্ধ লোকটি আসল।
-
তাফসীরে জাকারিয়া২। যেহেতু তার নিকট অন্ধ লোকটি আগমন করেছিল। [1]
[1] ইবনে উম্মে মাকতূমের আগমনে নবী (সাঃ) এর চেহারায় যে বিরক্তিভাব ফুটে উঠেছিল তাকে عبس শব্দ দ্বারা এবং তাঁর অমনোযোগী হওয়াকে تولى শব্দ দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর কিসে তোমাকে জানাবে যে, সে হয়ত পরিশুদ্ধ হত। আল-বায়ান
(হে নবী!) তুমি কি জান, সে হয়ত পরিশুদ্ধ হত। তাইসিরুল
তুমি কেমন করে জানবে সে হয়তো পরিশুদ্ধ হত, মুজিবুর রহমান
But what would make you perceive, [O Muhammad], that perhaps he might be purified Sahih International
৩. আর কিসে আপনাকে জানাবে যে, —সে হয়ত পরিশুদ্ধ হত,
-
তাফসীরে জাকারিয়া৩। কিসে জানাবে তোমাকে, হয়তো বা সে পরিশুদ্ধ হত। [1]
[1] অর্থাৎ, সেই অন্ধ ব্যক্তি তোমার নিকট থেকে দ্বীনী পথনির্দেশ লাভ করে সৎকর্ম করত যার কারণে তার চরিত্র ও কর্ম সুন্দর হত, তার আভ্যন্তরীণ অবস্থাও শুদ্ধ হয়ে যেত এবং তোমার নসীহত শুনে সে উপকৃত হতে পারত।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানঅথবা উপদেশ গ্রহণ করত, ফলে সে উপদেশ তার উপকারে আসত। আল-বায়ান
কিংবা উপদেশ গ্রহণ করত, ফলে উপদেশ তার উপকারে লাগত। তাইসিরুল
অথবা উপদেশ গ্রহণ করত, ফলে উপদেশ তার উপকারে আসতো। মুজিবুর রহমান
Or be reminded and the remembrance would benefit him? Sahih International
৪. অথবা উপদেশ গ্ৰহণ করত, ফলে সে উপদেশ তার উপকারে আসত।(১)
(১) অর্থাৎ আপনি কি জানেন এই সাহাবী যা জিজ্ঞেস করেছিল তা তাকে শিক্ষা দিলে সে তা দ্বারা পরিশুদ্ধ হতে পারত কিংবা কমপক্ষে আল্লাহ তা’আলাকে স্মরণ করে উপকার লাভ করতে পারত। [দেখুন: মুয়াস্সার; সাদী]
তাফসীরে জাকারিয়া৪। অথবা উপদেশ গ্রহণ করত, ফলে তা তার উপকারে আসত।
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর যে বেপরোয়া হয়েছে, আল-বায়ান
পক্ষান্তরে যে পরোয়া করে না, তাইসিরুল
পক্ষান্তরে যে পরওয়া করেনা – মুজিবুর রহমান
As for he who thinks himself without need, Sahih International
৫. আর যে পরোয়া করে না,
-
তাফসীরে জাকারিয়া৫। পক্ষান্তরে যে লোক বেপরোয়া, [1]
[1] অর্থাৎ বেপরোয়া ঈমান থেকে এবং সেই জ্ঞান থেকে যা তোমার কাছে আল্লাহর তরফ হতে এসেছে। অথবা এ আয়াতের দ্বিতীয় অর্থ হল যে, যে অভাবশূন্য ও ধনী।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানতুমি তার প্রতি মনোযোগ দিচ্ছ। আল-বায়ান
তার প্রতি তুমি মনোযোগ দিচ্ছ। তাইসিরুল
তুমি তার প্রতি মনোযোগ দিয়েছো। মুজিবুর রহমান
To him you give attention. Sahih International
৬. আপনি তার প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন।
-
তাফসীরে জাকারিয়া৬। তুমি তার প্রতি মনোযোগ দিলে। [1]
[1] এতে নবী (সাঃ)-কে অধিক সতর্ক করা হয়েছে যে, বিশুদ্ধচিত্তদেরকে ছেড়ে বৈমুখদের জন্য মনোযোগ ব্যয় করা ঠিক নয়।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানঅথচ সে পরিশুদ্ধ না হলে তোমার কোন দায়িত্ব বর্তাবে না। আল-বায়ান
সে পরিশুদ্ধ না হলে তোমার উপর কোন দোষ নেই। তাইসিরুল
অথচ সে নিজে পরিশুদ্ধ না হলে তোমার কোন দায়িত্ব নেই। মুজিবুর রহমান
And not upon you [is any blame] if he will not be purified. Sahih International
৭. অথচ সে নিজে পরিশুদ্ধ না হলে আপনার কোন দায়িত্ব নেই,
-
তাফসীরে জাকারিয়া৭। অথচ সে পরিশুদ্ধ না হলে তোমার কোন দোষ নেই। [1]
[1] কেননা, তোমার কাজ তো কেবল প্রচার করা। সুতরাং এই শ্রেণীর কাফেরদের পিছনে পড়ার কোন প্রয়োজন নেই।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানপক্ষান্তরে যে তোমার কাছে ছুটে আসল, আল-বায়ান
পক্ষান্তরে যে লোক তোমার কাছে ছুটে আসল। তাইসিরুল
অন্যপক্ষ যে তোমার নিকট ছুটে এলো – মুজিবুর রহমান
But as for he who came to you striving [for knowledge] Sahih International
৮. অপরদিকে যে আপনার কাছে ছুটে এলো,
-
তাফসীরে জাকারিয়া৮। পক্ষান্তরে যে তোমার নিকট ছুটে এল, [1]
[1] এই আশা করে যে, তুমি তাকে মঙ্গলের প্রতি পথ প্রদর্শন করবে এবং ওয়ায-নসীহত দ্বারা উপদেশ প্রদান করবে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর সে ভয়ও করে, আল-বায়ান
আর সে ভয়ও করে, তাইসিরুল
তার সেই সশংক চিত্ত – মুজিবুর রহমান
While he fears [Allah], Sahih International
৯. আর সে সসঙ্কচিত্ত,
-
তাফসীরে জাকারিয়া৯। সভয় মনে, [1]
[1] অর্থাৎ, আল্লাহর ভয়ও তার হৃদয়ে আছে, যার কারণে আশা করা যায় যে, তোমার বাণী তার জন্য উপকারী হবে। আর সে তা গ্রহণ করবে এবং তার উপর আমল করবে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানঅথচ তুমি তার প্রতি উদাসীন হলে। আল-বায়ান
তুমি তার প্রতি অমনোযোগী হলে। তাইসিরুল
তুমি তাকে অবজ্ঞা করলে! মুজিবুর রহমান
From him you are distracted. Sahih International
১০. আপনি তার থেকে উদাসীন হলেন;
-
তাফসীরে জাকারিয়া১০। তুমি তার প্রতি বিমুখ হলে! [1]
[1] অর্থাৎ, এমন লোকের প্রতি কদর করা উচিত, বৈমুখ হওয়া উচিত নয়। এই সমস্ত আয়াত দ্বারা জানা যায় যে, দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে ইতর-বিশেষ করা উচিত নয়। বরং মর্যাদাবান ব্যক্তি হোক চাই অমর্যাদাবান, রাজা হোক চাই ফকীর, সর্দার হোক কিংবা গোলাম, পুরুষ হোক অথবা নারী, ছোট হোক চাই বড় সকলকে একই মর্যাদা দান করা এবং সমষ্টিভাবে সম্বোধন করা উচিত। আল্লাহ তাআলা যাকে চাইবেন নিজের হিকমতানুযায়ী তাকে হিদায়াত দিবেন। (ইবনে কাসীর)
তাফসীরে আহসানুল বায়ানকখনো নয়, নিশ্চয় এটা উপদেশ বাণী। আল-বায়ান
না, এটা মোটেই ঠিক নয়, এটা তো উপদেশ বাণী, তাইসিরুল
না, এই আচরণ অনুচিত, এটাতো উপদেশ বাণী; মুজিবুর রহমান
No! Indeed, these verses are a reminder; Sahih International
১১. কখনো নয়, এটা তো উপদেশ বাণী(১),
(১) অর্থাৎ এমনটি কখনো করবেন না। যে সব লোক আল্লাহকে ভুলে আছে এবং যারা নিজেদের দুনিয়াবী সহায়-সম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তির অহংকারে মত্ত হয়ে আছে, তাদেরকে অযথা গুরুত্ব দিবেন না। ইসলাম, আহি বা কুরআন এমন কিছু নয় যে, যে ব্যক্তি তার থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকে তার সামনে নতজানু হয়ে তা পেশ করতে হবে। বরং সে সত্যের যতটা মুখাপেক্ষী নয় সত্যও তার ততটা মুখাপেক্ষী নয়। বরং তাদেরই ইসলামের মহত্তের সামনে নতজানু হতে হবে। [তাতিম্মাতু আদওয়াউল বায়ান]
তাফসীরে জাকারিয়া১১। কক্ষনো (এরূপ করবে) না।[1] এটা তো উপদেশবাণী;
[1] অর্থাৎ, গরীব-মিসকীন ব্যক্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া আর ধনবান ব্যক্তির প্রতি খাস মনোযোগ দেওয়া ঠিক নয়। এর ভাবার্থ হল যে, আগামীতে যেন পুনর্বার এইরূপ না ঘটে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানকাজেই যে ইচ্ছা করবে, সে তা স্মরণ রাখবে। আল-বায়ান
কাজেই যার ইচ্ছে তা স্মরণে রাখবে, তাইসিরুল
যে ইচ্ছা করবে সে ইহা স্মরণ রাখবে, মুজিবুর রহমান
So whoever wills may remember it. Sahih International
১২. কাজেই যে ইচ্ছে করবে। সে এটা স্মরণ রাখবে,
-
তাফসীরে জাকারিয়া১২। যে ইচ্ছা করবে সে তা স্মরণ রাখবে (ও উপদেশ গ্রহণ করবে)।[1]
[1] অর্থাৎ, যে ব্যক্তি তাতে আগ্রহ রাখে সে যেন তা হতে উপদেশ গ্রহণ করে। তাকে মুখস্থ করে এবং তার প্রতি আমল করে। আর যে তা হতে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং অমনোযোগিতা দেখায় - যেমন কুরাইশদের মর্যাদাবানরা করেছিল - তো তাদের ব্যাপারে চিন্তা করার প্রয়োজন নেই।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানএটা আছে সম্মানিত সহীফাসমূহে।* আল-বায়ান
(এটা লিপিবদ্ধ আছে) মর্যাদাসম্পন্ন কিতাবসমূহে তাইসিরুল
ইহা আছে মর্যাদাময় পত্রসমূহে (লিখিত) – মুজিবুর রহমান
[It is recorded] in honored sheets, Sahih International
*অর্থাৎ লওহে মাহফুজে।
১৩. এটা আছে মর্যাদা সম্পন্ন লিপিসমূহে
-
তাফসীরে জাকারিয়া১৩। সম্মানিত পত্রসমূহে (লওহে মাহফূযে তা লিপিবদ্ধ আছে)। [1]
[1] অর্থাৎ, লওহে মাহ্ফূযে সংরক্ষিত আছে। কেননা, সেখান হতেই কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। অথবা এর মর্মার্থ এই যে, এই সহীফা আল্লাহর নিকটে বড় মর্যাদাপূর্ণ বস্তু। কেননা, তা প্রজ্ঞা ও জ্ঞানে ভরপুর।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানসমুন্নত, পবিত্র, আল-বায়ান
সমুন্নত, পবিত্র। তাইসিরুল
(এবং) উন্নত পুতঃ – মুজিবুর রহমান
Exalted and purified, Sahih International
১৪. যা উন্নত, পবিত্ৰ(১),
(১) مكرمة অর্থ সম্মানিত, মর্যাদাসম্পন্ন। مرفوعة বলে এর মর্যাদা অনেক উচ্চতা বোঝানো হয়েছে। [ইবন কাসীর] আর مطهرة বলে বোঝানো হয়েছে হাসান বসরীর মতে, যাবতীয় নাপাক থেকে পবিত্র। সুদ্দী বলেন, এর অর্থ কাফেররা এটা পাওয়ার অধিকারী নয়। তাদের হাত থেকে পবিত্র। হাসান থেকে অপর বর্ণনায় বলা হয়েছে, এর অর্থ মুশরিকদের উপর নাযিল হওয়া থেকে পবিত্ৰ। [কুরতুবী] ইবন কাসীর বলেন, এর অর্থ এটি বাড়তি-কমতি ও অপবিত্রতা থেকে পবিত্র ও মুক্ত।
তাফসীরে জাকারিয়া১৪। যা উচ্চ মর্যাদাপূর্ণ, পূত-পবিত্র। [1]
[1] مرفوعة অর্থাৎ, আল্লাহর নিকটে মর্যাদাপূর্ণ। অথবা এটা সন্দেহ এবং পরস্পরবিরোধিতা থেকে বহু উচ্চে। مطهرة অর্থাৎ, সেটি একেবারে পূত-পবিত্র। কেননা, তাকে পবিত্র লোক (ফিরিশতা)গণ ছাড়া কেউ স্পর্শ করে না। কিংবা তা কম-বেশী হতে পাক-পবিত্র।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানলেখকদের হাতে, আল-বায়ান
(এমন) লেখকদের হাতে তাইসিরুল
লেখকদের হাতে (সুরক্ষিত)। মুজিবুর রহমান
[Carried] by the hands of messenger-angels, Sahih International
১৫. লেখক বা দূতদের হাতে।(১)
(১) سفرة শব্দটি سافر এর বহুবচন হতে পারে। তখন অর্থ হবে লিপিকার বা লেখক। আর যদি سفرة শব্দটি سفارة থেকে আসে, তখন এর অর্থ দূতগণ। এই শব্দ দ্বারা সাহাবীদেরও উদ্দেশ্য হতে পারে। প্রথমটিই অধিক শুদ্ধ। সহীহ হাদীসে السَّفَرَةُ الْكِرامُ البَرَرَةُ এর তাফসীর ফেরেশতাদেরই উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ ‘কিরাতে বিশেষজ্ঞ কুরআন পাঠক সম্মানিত নেককার দূতদের (ফেরেশতাদের) সাথে থাকবে। আর যে ব্যক্তি বিশেষজ্ঞ নয় কিন্তু কষ্টে সৃষ্টি পড়ে সে দ্বিগুণ সওয়াব পাবে। [বুখারী: ৪৯৩৭, মুসলিম: ৭৯৮] [ইবন কাসীর]
তাফসীরে জাকারিয়া১৫। এমন লিপিকারদের হস্ত দ্বারা (লিপিবদ্ধ)। [1]
[1] سفرة শব্দটি سافر এর বহুবচন। এর মানে দূত। এখানে এ থেকে উদ্দেশ্য হল ফিরিশতাদল। যাঁরা আল্লাহর ওহী তদীয় রসূল পর্যন্ত পৌঁছে থাকেন। অর্থাৎ, আল্লাহ এবং রসূলের মাঝে দূতের কর্ম আঞ্জাম দেন। এই কুরআন এমন দূতগণের হাতে থাকে যাঁরা তা লাওহে মাহ্ফূয থেকে বহন করেন।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানযারা মহাসম্মানিত, অনুগত। আল-বায়ান
(যারা) মহা সম্মানিত পূত-পবিত্র। তাইসিরুল
(ঐ লেখকগণ) মহৎ ও সৎ। মুজিবুর রহমান
Noble and dutiful. Sahih International
১৬. (যারা) মহাসম্মানিত ও নেককার।
-
তাফসীরে জাকারিয়া১৬। (যারা) সম্মানিত ও পুণ্যবান (ফিরিশতা)। [1]
[1] চরিত্রের দিক দিয়ে তাঁরা হলেন সম্মানিত; অর্থাৎ, শ্রদ্ধেয় এবং বুযুর্গ। আর কর্মের দিক দিয়ে তাঁরা পুণ্যবান ও পবিত্র। এখান থেকে জানা যায় যে, কুরআন বহনকারী (হাফেয এবং আলেমগণ)-কেও চরিত্র এবং কর্মের দিক দিয়ে ‘কিরামিম বারারাহ’র মূর্ত-প্রতীক হওয়া উচিত। (ইবনে কাসীর) হাদীসেও ‘সাফারাহ’ শব্দ ফিরিশতাদের জন্য ব্যবহার হয়েছে। নবী (সাঃ) বলেছেন, ‘‘যে কুরআন পাঠ করে এবং তাতে সুদক্ষ হয়, সে ‘কিরামিম বারারাহ’র সাথে - অর্থাৎ, সম্মানিত পুণ্যবান ফিরিশতাগণের সাথী হবে। আর যে কুরআন পাঠ করে কিন্তু কষ্টের সাথে (আটকে আটকে) পাঠ করে তার জন্য ডবল সওয়াব রয়েছে।’’ (সহীহ বুখারী তাফসীর সূরা আবাসা, মুসলিম নামায অধ্যায়, কুরআনে সুদক্ষ হওয়ার মাহাত্ম্যের পরিচ্ছেদ)
তাফসীরে আহসানুল বায়ানমানুষ ধ্বংস হোক, সে কতইনা অকৃতজ্ঞ! আল-বায়ান
মানুষ ধ্বংস হোক! কোন্ জিনিস তাকে সত্য প্রত্যাখ্যানে উদ্বুদ্ধ করল? তাইসিরুল
মানুষ ধ্বংস হোক! সে কত অকৃতজ্ঞ! মুজিবুর রহমান
Cursed is man; how disbelieving is he. Sahih International
১৭. মানুষ ধ্বংস হোক! সে কত অকৃতজ্ঞ!(১)
(১) এর অর্থ, সে কত বড় সত্য-অস্বীকারকারী। তাছাড়া এ আয়াতের আর একটি অর্থ হতে পারে অর্থাৎ “কোন জিনিসটি তাকে সত্য অস্বীকার করতে উদ্বুদ্ধ করেছে? [তাবারী]
তাফসীরে জাকারিয়া১৭। মানুষ ধ্বংস হোক! সে কত অকৃতজ্ঞ! [1]
[1] এ থেকে সেই মানুষ উদ্দেশ্য, যে বিনা প্রমাণ ও দলীলে কিয়ামতকে অস্বীকার করে। قتل অভিশপ্তের অর্থে ব্যবহার হয়েছে। ما أكفره ফে’ল তাআজ্জুব। অর্থাৎ, কত বড় অকৃতজ্ঞ ও নিমকহারাম সে! পরবর্তীতে এই অকৃতজ্ঞ মানুষকে চিন্তা-ভাবনা করার জন্য আহবান জানানো হচ্ছে, যাতে সে কুফরী হতে ফিরে আসে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানতিনি তাকে কোন বস্তু থেকে সৃষ্টি করেছেন? আল-বায়ান
আল্লাহ তাকে কোন বস্তু হতে সৃষ্টি করেছেন? তাইসিরুল
তিনি তাকে কোন বস্তু হতে সৃষ্টি করেছেন? মুজিবুর রহমান
From what substance did He create him? Sahih International
১৮. তিনি তাকে কোন বস্তু থেকে সৃষ্টি করেছেন?
-
তাফসীরে জাকারিয়া১৮। তিনি তাকে কোন্ বস্তু হতে সৃষ্টি করেছেন?
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ানশুক্র বিন্দু থেকে তিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তাকে সুগঠিত করেছেন। আল-বায়ান
শুক্রবিন্দু হতে। তিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তাকে পরিমিতভাবে গড়ে তুলেছেন। তাইসিরুল
শুক্র বিন্দু হতে তিনি তাকে সৃষ্টি করেন, পরে তার পরিমিত বিকাশ সাধন করেন, মুজিবুর রহমান
From a sperm-drop He created him and destined for him; Sahih International
১৯. শুক্রবিন্দু থেকে, তিনি তাকে সৃষ্টি করেন, পরে তার পরিমিত বিকাশ সাধন করেন(১),
(১) قدّره অর্থাৎ সুপরিমিত করেছেন, তার গঠন-প্রকৃতি, আকার-আকৃতি সুপরিমিতভাবে সৃষ্টি করেছেন। قدّره শব্দের এরূপ অৰ্থও হতে পারে যে, মানুষ যখন মাতৃগর্ভে সৃষ্টি হতে থাকে তখন আল্লাহ তা'আলা তার কাজ, বয়স, রিযিক, ভাগ্য ইত্যাদি তকদীর নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তাছাড়া পূর্ব থেকেই প্রতিটি মানুষের জন্য নির্দিষ্ট করা আছে তার গায়ের রং কি হবে, সে কতটুকু উচু হবে, তার দেহ কতটুকু কি পরিমাণ মোটা ও পরিপুষ্ট হবে। এত সব সত্বেও সে তার রবের সাথে কুফরী করে। [দেখুন: কুরতুবী]
তাফসীরে জাকারিয়া১৯। শুক্রবিন্দু হতে তাকে সৃষ্টি করেছেন, [1] অতঃপর তাকে সুপরিমিত করেছেন। [2]
[1] অর্থাৎ, যার জন্ম এমন ঘৃণিত পানির বিন্দু থেকে, তার কি অহংকার করা শোভা পায়?
[2] এর ভাবার্থ হল যে, তাকে তার প্রয়োজনীয় কল্যাণ দান করা হয়েছে; দুটি হাত, দুটি পা, দুটি চক্ষু এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দেওয়া হয়েছে। (অনেকের মতে এর অর্থ হল, অতঃপর তার নিয়তি নির্ধারণ করেছেন।)
তাফসীরে আহসানুল বায়ানতারপর তিনি তার পথ সহজ করে দিয়েছেন। আল-বায়ান
অতঃপর তিনি (উপায়-উপকরণ ও প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী দিয়ে জীবনে চলার জন্য) তার পথ সহজ করে দিয়েছেন। তাইসিরুল
অতঃপর তার জন্য পথ সহজ করে দেন; মুজিবুর রহমান
Then He eased the way for him; Sahih International
২০. তারপর তার জন্য পথ সহজ করে দেন(১);
(১) অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় ক্ষমতা-বলে মাতৃগর্ভে মানুষকে সৃষ্টি করেন। তারপর তিনিই তার অপার শক্তির মাধ্যমে মাতৃগর্ভ থেকে জীবিত ও পুর্নাঙ্গ মানুষের বাইরে আসার পথ সহজ করে দেয়। ফলে দেহটি সহী-সালামতে বাইরে চলে আসে এবং মায়েরও এতে তেমন কোন দৈহিক ক্ষতি হয় না। এছাড়া আয়াতের আরেকটি অর্থ হচ্ছে, দুনিয়ায় তিনি তার জন্য নিজের জন্য ভালো বা মন্দ, কৃতজ্ঞতা বা অকৃতজ্ঞতা আনুগত্য বা অবাধ্যতার মধ্যে সে কোন পথ চায় তা তার সামনে খুলে রেখে দিয়েছেন এবং পথ তার জন্য সহজ করে দিয়েছেন। ফলে সে শুকরিয়া আদায় করে সৎপথ গ্রহণ করতে পারে, আবার কুফরী করে বিপথে যেতে পারে। [দেখুন: ইবন কাসীর]
তাফসীরে জাকারিয়া২০। অতঃপর তার জন্য তার পথ সহজ করে দিয়েছেন। [1]
[1] অর্থাৎ, ভাল-মন্দের পথ স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ বলেন, এ থেকে উদ্দেশ্য হল মায়ের পেট থেকে বের হবার পথ। তবে প্রথম অর্থটিই অধিক শুদ্ধ।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান