২২৯৮

পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ - তাসবীহ (সুবহা-নাল্ল-হ), তাহমীদ (আল হাম্‌দুলিল্লা-হ), তাহলীল (লা- ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ) ও তাকবীর (আল্ল-হু আকবার)- বলার সাওয়াব

২২৯৮-[৫] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দু’টি খুব সংক্ষিপ্ত বাক্য যা বলতে সহজ অথচ (সাওয়াবের) পাল্লায় ভারী এবং আল্লাহর নিকট পছন্দনীয়, তা হলো ’’সুবহা-নাল্ল-হি ওয়া বিহামদিহী, সুবহা-নাল্ল-হিল ’আযীম’’। (বুখারী, মুসলিম)[1]

بَابُ ثَوَابُ التَّسْبِيْحِ وَالتَّحْمِيْدِ وَالتَّهْلِيْلِ وَالتَّكْبِيْرِ

وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: كَلِمَتَانِ خَفِيفَتَانِ عَلَى اللِّسَانِ ثَقِيلَتَانِ فِي الْمِيزَانِ حَبِيبَتَانِ إِلَى الرَّحْمَنِ: سُبْحَانَهُ الله وَبِحَمْدِهِ سُبْحَانَهُ الله الْعَظِيم

وعنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: كلمتان خفيفتان على اللسان ثقيلتان في الميزان حبيبتان إلى الرحمن: سبحانه الله وبحمده سبحانه الله العظيم

ব্যাখ্যা: (كَلِمَتَانِ) অর্থাৎ- দু’টি পূর্ণাঙ্গ বাক্য। আর (الكلمة) শব্দকে বাক্য বুঝানোর জন্য প্রয়োগ হয়। যেমন বলা হয় (كلمة الإخلاص) এবং (كلمة الشهادة)। সিনদী বলেন, হাদীসে (كلمة) দ্বারা আভিধানিক দৃষ্টিকোণ উদ্দেশ্য বা সমাজের মানুষ সাধারণত (كلمة) বলতে যা বুঝে থাকে তা উদ্দেশ্য। নাহুর দৃষ্টিকোণ উদ্দেশ্য না।

আলোচ্য হাদীসে বিধেয়কে উদ্দেশের আগে এনে শ্রোতার আগ্রহ আকর্ষণ করা হয়েছে। আর বিধেয়-এর বর্ণনার ক্ষেত্রে বাক্য যখনই দীর্ঘতা লাভ করবে তখন তাকে উদ্দেশের পূর্বে আনা উত্তম হবে। কেননা সুন্দর গুণাবলীর আধিক্যতা উদ্দেশের ব্যাপারে শ্রোতার আগ্রহ বৃদ্ধি করে। ফলে তা অন্তরে বদ্ধমূল হয় এবং গ্রহণযোগ্যতায় অধিক উপযোগী। সিনদী বলেন, বাহ্যিক দিক থেকে বুঝা যায় (كلمتان) উক্তিটি (سبحان الله) শেষ পর্যন্ত। এর খবর বা বিধেয়। তার দিকে শ্রোতার আগ্রহ সৃষ্টির জন্য তাকে উদ্দেশের আগে আনা হয়েছে।

(خَفِيفَتَانِ عَلَى اللِّسَانِ) অর্থাৎ- বাক্যদ্বয়ের অক্ষরসমূহ নরম হওয়ার দরুন জিহ্বাতে সহজেই উচ্চারিত হয়ে থাকে। কেননা বাক্যদ্বয়ে ‘আরবীয়দের নিকট পরিচিত কোন শক্ত অক্ষর নেই।

(ثَقِيلَتَانِ فِى الْمِيزَانِ) অর্থাৎ- প্রকৃতপক্ষেই তা সাওয়াবের পাল্লায় ভারী। হাফেয বলেন, ‘আমলের স্বল্পতা ও সাওয়াবের আধিক্যতার বর্ণনা দেয়ার্থে পাল্লাকে হালকা ও ভারত্বের মাধ্যমে বিশেষিত করা হয়েছে।

‘আল্লামা সিনদী বলেন, বাক্যদ্বয়ের উত্তম শৃঙ্খলা, অক্ষরের কমতি হওয়ার দরুন জিহ্বাতে এদের উচ্চারণে সহজতা থাকায় তা হালকা। হালকা হওয়ার অপর কারণ বাক্যদ্বয় আল্লাহর সম্মানিত নামকে অন্তর্ভুক্ত করেছে যার জিকিরে মেজাজ অনুগত হয়। আর আল্লাহর কাছে সম্মানের দিক থেকে বাক্যদ্বয়ের শব্দের বড়ত্বের কারণে তা দাড়িপাল্লায় ভারি। ইমাম ত্বীবী বলেন, ‘‘হালকা’’ কথাটিকে সহজ অর্থে প্রয়োগ করা হয়েছে। পক্ষান্তরে ভারি বলতে আহলুস্ সুন্নাহ এর কাছে মূল অর্থই উদ্দেশ্য, কেননা ‘আমলসমূহ মাপার সময় দাড়িপাল্লাতে অবয়ব দান করা হবে। আর মীযান বা দাড়িপাল্লা ঐ জিনিস কিয়ামতের দিন যার মাঝে বান্দাদের ‘আমলসমূহ ওযন দেয়া হবে। আর পাল্লার ধরণ সম্পর্কে অনেক উক্তি আছে তবে সর্বাধিক বিশুদ্ধ মত নিশ্চয়ই তা অনুভূতিশীল গঠনের কাটা বিশিষ্ট ও দু’টি পাল্লা বিশিষ্ট হবে। আল্লাহ তা‘আলা ‘আমলসমূহকে বাহ্যিক ওযনে পরিণত করবেন। এক মতে বলা হয়েছে, আমলের খাতাসমূহ ওযন করা হবে। পক্ষান্তরে ‘আমল হল সম্মান আর সম্মানকে ওযন করা অসম্ভব। কেননা সম্মান মূলত ওযনযোগ্য না। সুতরাং ‘আমলসমূহকে ভারত্ব বা হালকার সাথে গুণান্বিত করা যাবে না। আর একে সমর্থন করছে (بطاقة) তথা কার্ডের হাদীস। যা ইমাম তিরমিযী সংকলন করেছেন ও হাসান বলেছেন। ইমাম হাকিমও একে সংকলন করেছেন ও সহীহ বলেছেন। তার বর্ণনাতে আছে ‘‘অতঃপর খাতাসমূহ এক পাল্লাতে এবং কার্ড আরেক পাল্লাতে রাখা হবে’’।

আবার কারো মতে, ‘আমলসমূহকে অবয়ব দান করা হবে অতঃপর তা উত্তম আকৃতিতে আনুগত্যশীলদের ‘আমলে পরিণত হবে এবং নিকৃষ্ট আকৃতিতে পাপীদের ‘আমলে পরিণত হবে। এরপর ওযন দেয়া হবে। হাফেয বলেন, বিশুদ্ধ মতানুযায়ী ‘আমলসমূহকেই ওযন দেয়া হবে। ইবনু হিব্বান আবূ দারদা (রাঃ) থেকে একে মারফূ' সূত্রে বর্ণনা করেছেন তাতে আছে ‘‘কিয়ামতের দিন সচ্চরিত্র অপেক্ষা ভারী কোন জিনিস মীযানের পাল্লায় পরিমাপ করা হবে না’’।

‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী বলেন, ‘আমল যেহেতু স্থির থাকে না বরং নিঃশেষ হয়ে যায়- এ ত্রুটি সাব্যস্ত করে ‘আমলসমূহ ওযন করা অসম্ভব হওয়ার ব্যাপারে কৃত উক্তি খুবই দুর্বল। বরং তা বাতিল। বর্তমানে প্রাকৃতিক বিদ্যার অধিকারীরা একে বাতিল বলে ঘোষণা দিয়েছে। আর তারা নিশ্চিত করেছে উক্তিসমূহ শেষ হয়ে যায় না বরং তা শূন্যে বিদ্যমান থাকে যাকে সংরক্ষণ করা সম্ভব। আর তারা কথা ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ইলেক্ট্রিক যন্ত্র আবিষ্কারের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। হাদীসে ঐ দিকে ইঙ্গিত রয়েছে যে, সকল দায়িত্ব অর্পণমূলক নির্দেশ কষ্টকর, আবার অন্তরের উপরেও ভারী। তবে এ ‘আমলসমূহ দাড়িপাল্লাতে ভারি হওয়া সত্ত্বেও নাফসের উপর সহজ হালকা, সুতরাং এ ক্ষেত্রে শিথিলতা উচিত না। আসারে (তথা সাহাবীদের উক্তি) আছে, ‘ঈসা (আঃ)-কে প্রশ্ন করা হল পুণ্য ভারি হবে এবং পাপ হালকা হবে, তার কারণ কি? উত্তরে তিনি বললেন, কেননা পুণ্যসমূহের তিক্ততা উপস্থিত এবং তার মিষ্টতা অনুপস্থিত থাকে, সুতরাং তা ভারি। অতএব তার ভারত্ব যেন তা বর্জনের ব্যাপারে তোমাকে উৎসাহিত না করে। পক্ষান্তরে পাপের মিষ্টতা উপস্থিত, তিক্ততা অনুপস্থিত (সাধারণত তা পরকালে দেয়া হয়ে থাকে) এজন্য পাপ তোমাদের ওপর হালকা, সুতরাং তার হালকা হওয়া তাতে জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে তোমাদের যেন উৎসাহিত না করে। কেননা পাপের কাজের মাধ্যমে কিয়ামতের দিন মীযানসমূহ হালকা হয়ে যাবে।

সিনদী বলেন, (حَبِيبَتَانِ إِلَى الرَّحْمٰنِ) এর অর্থ হল নিশ্চয়ই এ দু’টি বাক্য আল্লাহ তা‘আলার কাছে অধিক প্রিয় হওয়ার সাথে গুণান্বিত। অন্যান্য হাদীসগুলো থেকে যা বুঝা যাচ্ছে। যেমন আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় বাক্য হল (سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِه سُبْحَانَ اللهِ الْعَظِيْمِ)। অন্যথায় সকল জিকির আল্লাহর কাছে প্রিয়। এক মতে বলা হয়েছে, এ বাক্যদ্বয়ের পাঠকারী আল্লাহর কাছে প্রিয় হওয়া উদ্দেশ্য আর বান্দাকে আল্লাহর ভালবাসা বলতে বান্দার প্রতি কল্যাণ পৌঁছানোর ইচ্ছা করা এবং তাকে সম্মান দান করা। বাক্যে আল্লাহর উত্তম নামসমূহ থেকে রহমান নামকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। কারণ এর দ্বারা বান্দার ওপর আল্লাহর রহমাতের প্রশস্ততা বর্ণনা করে দেয়া উদ্দেশ্য। যেমন অল্প কাজের জন্য তিনি অফুরন্ত প্রতিদান দিয়ে থাকেন। হাদীসে তাহমীদ বা আল্লাহর প্রশংসার বাণী পাঠ অপেক্ষা পবিত্রতা ঘোষণার বাণীতে অধিক মনোযোগ দেয়া হয়েছে আর তা আল্লাহকে পবিত্র সাব্যস্তকারীদের বিরোধিতাকারীর আধিক্যতার কারণে। আর এটা বুঝা গেছে আল্লাহর (سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِه سُبْحَانَ اللهِ الْعَظِيْمِ) এ বাণীতে আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা বারংবার করার কারণে।


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
পুনঃনিরীক্ষণঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১০: আল্লাহ তা‘আলার নামসমূহ (كتاب اسماء الله تعالٰى)