পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার রহমতের ব্যাপকতা

অত্র অধ্যায়ের অধিকাংশ হাদীস অবাধ্যতা থেকে তওবা্ করা, আশা করার পরিণাম এবং ক্ষমা থেকে নিরাশ না হওয়ার ব্যাপারে উৎসাহ প্রদানকারী দয়াময় আল্লাহর রহমতে সম্পর্কে। এটি কারীর উক্তি। ’উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী বলেন, কতিপয় কপিতে (আল্লাহর রহমতের প্রশস্ততা সম্পর্কে অধ্যায়) এভাবে এসেছে এবং তাতে উল্লেখিত হাদীসের সাথে এর সামঞ্জস্যতা অস্পষ্ট নয়।


২৩৬৪-[১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা মাখলূকাত (সৃষ্টিজগত) সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নিলে একটি কিতাব লিখলেন, যা ’আরশের উপর সংরক্ষিত আছে। এতে আছে, আমার রহমত আমার রাগকে প্রশমিত করেছে। অন্য এক বর্ণনায় আছে, আমার রাগের উপর (রহমত) জয়ী হয়েছে। (বুখারী, মুসলিম)[1]

بَابُ سَعْةِ رَحْمَةِ اللهِ

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَمَّا قَضَى اللَّهُ الْخَلْقَ كَتَبَ كِتَابًا فَهُوَ عِنْدَهُ فَوْقَ عَرْشِهِ: إِنَّ رَحْمَتِي سَبَقَتْ غَضَبِي «. وَفِي رِوَايَةٍ» غَلَبَتْ غَضَبي

عن أبي هريرة قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: لما قضى الله الخلق كتب كتابا فهو عنده فوق عرشه: إن رحمتي سبقت غضبي «. وفي رواية» غلبت غضبي

ব্যাখ্যা: (لَمَّا قَضَى اللّٰهُ الْخَلْقَ) অর্থাৎ- যখন তিনি সকল সৃষ্টিজীবকে সৃষ্টি করলেন। যেমন তার বাণী, فقضاهن سبع سماوات অর্থাৎ- তিনি এগুলোকে সৃষ্টি করলেন।

কারী বলেন, (لَمَّا قَضَى اللّٰهُ الْخَلْقَ) অর্থাৎ- যখন আল্লাহ সকল সৃষ্টিজীবের সৃষ্টিকে নির্ধারণ করলেন, অস্তিত্বসমূহের প্রকাশ সম্পর্কে ফায়সালা দিলেন অথবা যখন আল্লাহ অঙ্গীকার গ্রহণের দিন সৃষ্টিজীবকে সৃষ্টি করলেন অথবা তাদেরকে সৃষ্টি করতে শুরু করলেন।

‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী বলেন, আমি বলব, বুখারীর এক বর্ণনাতে তাওহীদ পর্বে আল্লাহর বাণী, وَيُحَذِّرُكُمُ اللّٰهُ نَفْسَهٗ (সূরা আ-লি ‘ইমরান ৩ : ২৮) এ অধ্যায়ে এসেছে, (لما خلق الله الخلق) অর্থাৎ- আল্লাহ যখন সকল সৃষ্টিজীবকে সৃষ্টি করলেন। এভাবে আহমাদ এবং মুসলিমের এক বর্ণনাতে এবং তিরমিযীতে এসেছে, (ان الله حين خلق الخلق) অর্থাৎ- নিশ্চয়ই আল্লাহ যখন সকল সৃষ্টিজীবকে সৃষ্টি করলেন। আর বুখারী ও মুসলিমের এক বর্ণনাতে আছে, (كتب فى كتاب) অর্থাৎ- লাওহে মাহফূযে মালায়িকাহকে (ফেরেশতাগণকে) অথবা কলমকে লিখতে নির্দেশ দেয়ার মাধ্যমে। আর একে সমর্থন করছে ‘উবায়দাহ্ বিন সামিত-এর (اول ما خلق الله القلم) অর্থাৎ- সর্বপ্রথম আল্লাহ যা সৃষ্টি করেছেন তা হল কলম। এ হাদীস, অর্থাৎ- ‘আরশ এবং পানি ছাড়া অন্য যা কিছু আছে তার দিকে সম্বন্ধ করে। এরপর আল্লাহ কলমকে বললেন, তুমি লিখ তখন কলম কিয়ামাত পর্যন্ত যা হবে তা লিখতে শুরু করল। আরো সমর্থন করছে (جف القلم بما هو كائن إلى يوم القيامة) অর্থাৎ- কিয়ামাত পর্যন্ত যা হবে সে সম্পর্কে অথবা লেখা সম্পর্কে কলম শুকিয়ে গেছে। এ হাদীস তিরমিযী এবং ইবনু মাজাহতে (كتب بيده على نفسه) এসেছে। অর্থাৎ- তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতির দাবী অনুযায়ী নিজের ওপর তা আবশ্যক করে নিয়েছেন। এখানে আল্লাহ যে কিতাব শব্দের উল্লেখ করেছেন তা মূলত তাঁর সাহায্যার্থে নয়। কারণ তিনি তা ভুলে যায় না, কেননা এ সব থেকে তিনি পবিত্র। তার নিকট কোন কিছু গোপন নয়। আর তা কেবল শারী‘আতের দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে এমন সৃষ্টি দায়িত্বশীল মালায়িকাহর (ফেরেশতার) কারণে। অতঃপর যদি বলা হয়, কলম প্রতিটি জিনিসকে লিখে রেখেছে এ সত্ত্বেও আলোচনাতে এ বিষয়টি নির্দিষ্ট করার কারণ কি? ‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী বলেন, আমি বলব, এতে যেই পূর্ণাঙ্গ আশা রয়েছে তা এবং নিশ্চয়ই তার রহমাতে প্রতিটি জিনিসকে পরিব্যাপৃত করে নিয়েছে তা প্রকাশ করার জন্য এ নির্দিষ্টতা। যা অন্যান্য বিষয়ের বিপরীত।

(فَهُوَ) অর্থাৎ- ঐ কিতাব যা লিখিত অর্থে ব্যবহৃত। একমতে বলা হয়েছে, তার বিদ্যা অথবা তার আলোচনা। (عِنْدَه) অর্থাৎ- সাধারণ অর্থ তার নিকটে। তবে এখানে এর অর্থ তাঁর নিকটে তথা স্থান উদ্দেশ্য নয় বরং তাঁর মর্যাদা উদ্দেশ্য, কেননা তিনি শুরু বা প্রারম্ভের লক্ষণ থেকে পবিত্র।

(فَوْقَ عَرْشِه) সকল সৃষ্টিজীব থেকে সুরক্ষিত, অনুভূতি থেকে দূরে। হাফেয বলেন, এখানে عند এর অর্থ ‘স্থান’ হবে না বরং তা সৃষ্টিজীব থেকে পূর্ণাঙ্গ গোপন হওয়ার দিকে ইঙ্গিত, তাদের অনুভূতিশক্তি থেকে দূরে। এতে বিষয়াবলীকে মর্যাদা দানের ব্যাপারে মহা সম্মানের ব্যাপারে সতর্কতা রয়েছে।

ইমাম খাত্ত্বাবী বলেন, الكتاب দ্বারা দু’টি বিষয়ের একটি উদ্দেশ্য আর তার একটি হল সম্পন্ন করা যা আল্লাহ সম্পন্ন করেছেন। যেমন তাঁর বাণী, كَتَبَ اللّٰهُ لَأَغْلِبَنَّ أَنَا وَرُسُلِيْ অর্থাৎ- ‘‘আল্লাহ সম্পন্ন করে দিয়েছেন বা রায় দিয়েছেন, অবশ্যই আমি এবং আমার রসূলগণ বিজয় লাভ করবে’’- (সূরা আল মুজাদালাহ্ ৫৮ : ২১)। অর্থাৎ- ঐ বিষয়টি সম্পন্ন করে তিনি বলেছেন। আর রসূলের উক্তি (فوق العرش) এর অর্থ হল তার নিকটে আছে তার জ্ঞান, তিনি তা ভুলেন না এবং পরিবর্তনও করেন না। যেমন আল্লাহর বাণী, ‘‘কিতাবে রয়েছে আমার প্রভু পথভ্রষ্ট হন না এবং ভুলেও যান না’’- (সূরা ত্ব-হা- ২০ : ৫২)। পক্ষান্তরে লাওহে মাহফূয, যাতে রয়েছে সৃষ্টির প্রকারসমূহের বর্ণনা, তাদের বিষয়াবলী, তাদের মৃত্যু নির্দিষ্ট সময়, তাদের রিযক ও তাদের অবস্থাসমূহের বর্ণনা। আর (فَهُوَ عِنْدَه فَوْقَ عَرْشِه) এর অর্থ হল, তাঁর জিকির ও তাঁর জ্ঞান এবং ব্যাখ্যা ক্ষেত্রে এ প্রত্যেকটি বৈধ। একমতে বলা হয়েছে, আল্লাহ এর ক্ষেত্রে (عند) এর সুপরিচিত ‘‘স্থান’’ অর্থ নেয়া অসম্ভব। সুতরাং আল্লাহর ক্ষেত্রে (عند) এর অর্থ ঠিক সেভাবে গ্রহণ করতে হবে যেভাবে তার সাথে মানানসই বা এর অর্থ তাঁরই দিকে সোপর্দ করতে হবে। ‘উবায়দল্লাহ মুবারকপূরী বলেন, এটা এমন এক বিষয় যে ব্যাপারে চুপ থাকা বাঞ্ছনীয়। সুতরাং এ খবর সম্পর্কে আমরা বলব, তবে এর ধরন বর্ণনা থেকে আমরা বিরত থাকব। কেননা তার মতো কোন কিছু নেই। সুতরাং উত্তম হল বরং সুনির্দিষ্ট হল, বিষয়টিকে তাঁর বাহ্যিকতার দিকে ঘুরিয়ে দেয়া এবং কোন ধরনের পরিবর্তন না করা।

(سَبَقَتْ غَضَبِىْ وَفِىْ رِوَايَةٍ غَلَبَتْ غَضَبِىْ) দ্বিতীয় বর্ণনাটি শুধু বুখারীর, তিনি এটা সৃষ্টির সূচনা সম্পর্কিত অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন। মুসলিমের শব্দ (تغلب) এভাবে বুখারীতে আল্লাহর বাণী, (সূরা আ-লি ‘ইমরান ৩ : ২৮ আয়াত) وَيُحَذِّرُكُمُ اللهُ نَفْسَهٗ এ অধ্যায়ে এসেছে।

কারী বলেন, (غَلَبَتْ غَضَبِىْ) অর্থাৎ- আমার রহমাত আমার রাগের উপর বিজয় লাভ করেছে। এর উদ্দেশ্য হল, আমার রহমাতের প্রভাবসমূহ আমার রাগের প্রভাবসমূহের উপর বিজয় লাভ করেছে, এটি এর পূর্ববর্তী অংশের ব্যাখ্যা। উদ্দেশ্য হল, রহমাতের প্রশস্ততা, তার আধিক্যতা এবং তা সমস্ত সৃষ্টিকে শামিল করে নেয়া এমনকি যেন তা অগ্রগামী ও বিজয়ী যেমন একজন ব্যক্তির স্বভাব বৈশিষ্ট্যের মাঝে যখন দয়ার পরিমাণ অধিক হয় তখন সে ক্ষেত্রে (غلب على فلان الكرم) অর্থাৎ- অমুকের উপর দয়ার দিক প্রাধান্য পেয়েছে- এ কথা বলা হয়। অন্যথায় আল্লাহর (رحمة) অর্থাৎ- দয়া, এবং (غضب) অর্থাৎ- রাগ। দু’টি আলাদা বৈশিষ্ট্য যা আল্লাহর পুণ্যদান ও শাস্তিদান ইচ্ছার দিকে প্রত্যাবর্তনশীল। আর তাঁর গুণসমূহের ব্যাপারে তাদের একটিকে অপরটির উপর বিজয় লাভের বর্ণনা করা হয় না। তা কেবল আধিক্যতার পদ্ধতিতে রূপকতার জন্য ব্যবহার করা হয়।

আর (سَبَقَتْ رَحْمَتِىْ) এর অর্থ ক্রোধের উপর রহমাতের আধিক্যতার জন্য পণ করা। যেমন বলা হয়, (تسابقتا فسبقت احداهما على الأخرى) ঘোড়া দু’টি প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হল, অতঃপর দু’টির একটি অপরটির উপর অগ্রগামী হল।

লাম্‘আত গ্রন্থকার বলেন, ওটা এজন্য যে, কেননা আল্লাহর রহমাতের প্রভাবসমূহ তাঁর উদারতা এবং অনুগ্রহ সকল সৃষ্টিজীবকে ব্যাপক করে নিয়েছে আর তা সীমাবদ্ধ নয় যা غضب তথা ক্রোধের প্রভাবের বিপরীত। কেননা তা কিছু কারণবশত কতিপয় আদম সন্তানের ওপর প্রকাশ পেয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন, অর্থাৎ- ‘‘আর যদি তোমরা আল্লাহর নিয়ামতসমূহ গণনা কর তোমরা তা পরিসংখ্যান করতে পারবে না’’- (সূরা আন্ নাহল ১৬ : ১৮)। তিনি আরো বলেন, অর্থাৎ- ‘‘আমার শাস্তি যাকে ইচ্ছা তাকে পৌঁছিয়ে থাকি, এবং আমার রহমাত প্রতিটি জিনিসকে পরিব্যাপৃত করে নিয়েছে’’- (সূরা আল আ‘রাফ ৭ : ১৫৬)। আল্লাহর বাণীঃ ‘‘আর আল্লাহ যদি মানুষকে তাদের অন্যায়ের কারণে পাকড়াও করতেন তাহলে জমিনের উপর কোন প্রাণী ছেড়ে দিতেন না’’- (সূরা আন্ নাহল ১৬ : ৬১)। সুতরাং তিনি তাঁর রহমাতকে তাদের মাঝে অবশিষ্ট রাখবেন এবং বাহ্যিকভাবে তাদেরকে দান করবেন ও তাদের প্রতি অনুগ্রহ করবেন, এজন্য তাদেরকে দুনিয়াতে পাকড়াও করবেন না। সুতরাং এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে, আল্লাহর রহমাত তাঁর عضب এর উপর অগ্রগামী।


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
পুনঃনিরীক্ষণঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১০: আল্লাহ তা‘আলার নামসমূহ (كتاب اسماء الله تعالٰى)

পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার রহমতের ব্যাপকতা

২৩৬৫-[২] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে এ হাদীসটিও বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলার একশটি রহমত রয়েছে, তন্মধ্যে মাত্র একটি রহমত তিনি (দুনিয়ার) জিন্, মানুষ, পশু ও কীট-পতঙ্গের জন্যে অবতীর্ণ করেছেন। এই একটি রহমত দিয়ে তারা পরস্পরকে স্নেহ-মমতা করে, এ রহমত দিয়ে তারা পরস্পরকে দয়া করে। এর দ্বারাই বন্য প্রাণীরা এদের সন্তান-সন্ততিকে ভালবাসে। আর অবশিষ্ট নিরানব্বইটি রহমত আল্লাহ তা’আলা পরবর্তী সময়ের জন্য রেখে দিয়েছেন। যা দিয়ে তিনি কিয়ামতের দিন তাঁর বান্দাদেরকে রহম করবেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]

بَابُ سَعْةِ رَحْمَةِ اللهِ

وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «إِنَّ للَّهِ مائةَ رَحْمَةٍ أَنْزَلَ مِنْهَا رَحْمَةً وَاحِدَةً بَيْنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ وَالْبَهَائِمِ وَالْهَوَامِّ فَبِهَا يَتَعَاطَفُونَ وَبِهَا يَتَرَاحَمُونَ وَبِهَا تَعْطُفُ الْوَحْشُ عَلَى وَلَدِهَا وَأَخَّرَ اللَّهُ تِسْعًا وَتِسْعِينَ رَحْمَةً يَرْحَمُ بِهَا عِبَادَهُ يَوْمَ الْقِيَامَة»

وعنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: «إن لله مائة رحمة أنزل منها رحمة واحدة بين الجن والإنس والبهائم والهوام فبها يتعاطفون وبها يتراحمون وبها تعطف الوحش على ولدها وأخر الله تسعا وتسعين رحمة يرحم بها عباده يوم القيامة»

ব্যাখ্যা: হাদীসটির অনেক সানাদ এবং শব্দ রয়েছে তবে এখানে উল্লেখিত শব্দ মুসলিমের, তিনি একে আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে ‘আত্বার সানাদে তাওবার অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন। এ ব্যাপারে (علاء) ‘আলা- এর একটি বর্ণনাও আছে, যা তিনি আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)  থেকে পিতার মাধ্যমে বর্ণনা করেন আর তা হল, (خلق الله مائة رحمة فوضع واحدة بين خلقه وخبأ عنده مائة الا واحدة) অর্থাৎ- আল্লাহ একশতটি রহমাত তৈরি করেছেন, অতঃপর একটি তার সৃষ্টির মাঝে স্থাপন করেছেন এবং তাঁর কাছে তিনি একশতটি গোপন রেখেছেন একটি ছাড়া। এভাবে মুসলিমে তাওবাহ্ অধ্যায়ে আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)  থেকে সা‘ঈদ বিন মুসাইয়্যাব এর বর্ণনাতে আছে,

 جعل الله مائة جزء فأمسك عنده تسعة وتسعين جزءا وانزل فى الأرض جزءا واحدا فمن ذلك الجزء يتراحم الخلق حتى ترفع الفرس حافرها عن ولدها خشية ان تصيبه

অর্থাৎ- আল্লাহ রহমাতকে একশতটি অংশে বিভক্ত করেছেন, অতঃপর তার কাছে তিনি ৯৯ টি অংশ অবশিষ্ট রেখেছেন জমিনে মাত্র একটি অংশ অবতীর্ণ করেছেন, অতঃপর ঐ একটি অংশের কারণে সৃষ্টিজীব একে অপরের প্রতি দয়া করে থাকে। এমনকি ঘোড়া তার খুরকে তার সন্তান থেকে দূরে রাখে এ আশংকায় যে, তা তার সন্তানের গায়ে লেগে যাবে।

আর বুখারীতে আবূ হুরায়রাহ  থেকে সা‘ঈদ মাকবূরীর সানাদে ‘রিকাক’ অধ্যায়ে আছে,

(ان الله خلق الرحمة يوم خلقها مائة رحمة فأمسك عنده تسعة و تسعين رحمة وأرسل فى خلقه كلهم رحمة واحد)

অর্থাৎ- নিশ্চয়ই আল্লাহ যে দিন রহমাতেকে সৃষ্টি করেছেন সেদিন একশতটি রহমাত সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তাঁর কাছে নিরানববইটি রহমাত মজুদ রেখেছেন এবং একটি রহমাত তাঁর প্রত্যেক সৃষ্টির মাঝে অবতীর্ণ করেছেন।

(أَنْزَلَ مِنْهَا رَحْمَةً وَاحِدَةً) এক বর্ণনাতে (وارسل فى خلقه كلهم رحمة واحدة) এসেছে। কারী বলেন, রহমাত অবতীর্ণ করা এমন এক উপমা যা ঐ দিকে ইঙ্গিত করছে যে, তা স্বভাবজনিত বিষয়াবলীর অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং তা আসমানী বিষয়াবলীর অন্তর্ভুক্ত যা সৃষ্টির যোগ্যতা অনুযায়ী বণ্টিত।

(وَأَخَّرَ اللّٰهُ) ইমাম ত্বীবী (রহঃ) বলেন, এ অংশটুকুকে (انزل منها رحمة) এর উপর সংযোজন করা হয়েছে এবং আল্লাহর পরকালীন রহমাতের প্রতি মনোযোগ বৃদ্ধির জন্য স্পষ্টকরণ স্বরূপ লুকায়িত বিষয়কে প্রকাশ করা হয়েছে। এক বর্ণনাতে আছে, فأمسك عنده আর সুলায়মান-এর হাদীসে আছে, وخبأ عنده

(يَوْمَ الْقِيَامَةِ) জান্নাতে প্রবেশের পূর্বে এবং পরে। এতে মু’মিন বান্দাদের ওপর আল্লাহর প্রশস্ত অনুগ্রহের দিকে ইঙ্গিত রয়েছে। আরো ঐ দিকে ইঙ্গিত রয়েছে যে, তিনি অনুগ্রহকারীদের মাঝে সর্বাধিক অনুগ্রহকারী। ইবনু আবী হামযাহ্ বলেন, হাদীসে মু’মিনদের ওপর আনন্দের প্রবিষ্টকরণ আছে। কেননা স্বভাবত নাফসকে যা দান করা হয় সে ব্যাপারে নাফসের আনন্দ তখনই পূর্ণতা লাভ করবে যখন প্রতিশ্রুত বিষয়টি জানা থাকবে। হাদীসটিতে ঈমানের ব্যাপারে এবং আল্লাহর সঞ্চিত রহমাতের ক্ষেত্রে সুপ্রশস্ত আশার ব্যাপারে উৎসাহ রয়েছে।


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
পুনঃনিরীক্ষণঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১০: আল্লাহ তা‘আলার নামসমূহ (كتاب اسماء الله تعالٰى)

পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার রহমতের ব্যাপকতা

২৩৬৬-[৩] মুসলিম-এর এক বর্ণনায় সালমান ফারসী (রাঃ) হতে অনুরূপ একটি বর্ণনা রয়েছে। এর শেষের দিকে আছে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা ঐ সকল রহমত দিয়ে তাকে পূর্ণতা দান করবেন।[1]

بَابُ سَعْةِ رَحْمَةِ اللهِ

وَفِي رِوَايَةٍ لِمُسْلِمٍ عَنْ سَلْمَانَ نَحْوُهُ وَفِي آخِرِهِ قَالَ: «فَإِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ أَكْمَلَهَا بِهَذِهِ الرَّحْمَة»

وفي رواية لمسلم عن سلمان نحوه وفي آخره قال: «فإذا كان يوم القيامة أكملها بهذه الرحمة»

ব্যাখ্যা: (فَإِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ أَكْمَلَهَا) অর্থাৎ- কিয়ামতের দিন ঐ একটি রহমাতকে তিনি পূর্ণতা দান করবেন যা তিনি দুনিয়াতে অবতীর্ণ করেছেন।

(بِهٰذِهِ الرَّحْمَةِ) অর্থাৎ- যা তিনি পিছিয়ে রেখেছেন তা দিয়ে। পরিশেষে যা একশত রহমাতে পরিণত হবে, অতঃপর তা দ্বারা তাঁর মু’মিন বান্দাদের প্রতি তিনি দয়া করবেন।


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
পুনঃনিরীক্ষণঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১০: আল্লাহ তা‘আলার নামসমূহ (كتاب اسماء الله تعالٰى)

পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার রহমতের ব্যাপকতা

২৩৬৭-[৪] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর কাছে কি শাস্তি রয়েছে মু’মিন বান্দা যদি তা জানত, তাহলে কেউই তাঁর জান্নাতের আশা করত না। আর কাফির যদি জানত আল্লাহর কাছে কি দয়া রয়েছে, তাহলে কেউই তাঁর জান্নাত হতে নিরাশ হত না। (বুখারী, মুসলিম)[1]

بَابُ سَعْةِ رَحْمَةِ اللهِ

وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَوْ يَعْلَمُ الْمُؤْمِنُ مَا عِنْدَ اللَّهِ مِنَ الْعُقُوبَةِ مَا طَمِعَ بِجَنَّتِهِ أَحَدٌ وَلَوْ يُعْلَمُ الْكَافِرُ مَا عِنْدَ اللَّهِ مِنَ الرَّحْمَةِ مَا قَنَطَ من جنته أحد»

وعن أبي هريرة قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: «لو يعلم المؤمن ما عند الله من العقوبة ما طمع بجنته أحد ولو يعلم الكافر ما عند الله من الرحمة ما قنط من جنته أحد»

ব্যাখ্যা: (لَوْ يَعْلَمُ الْمُؤْمِنُ) এক মতে বলা হয়েছে, মাজীর সিগাহ্ ছাড়া মুজারের বিশ্লেষণ হিকমাত হল, ঐ দিকে ইঙ্গিত করা যে, এ বিষয়ের জ্ঞান তার অর্জন হয়নি এবং অর্জন হবেও না, আর এ থেকে ভবিষ্যতে যখন বাধাগ্রস্ত হবে যখন অতীতে আরো ভালভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।

(مَا قَنَطَ مِنَ جَنَّتِه) অর্থাৎ- মু’মিনদের মধ্য থেকে কেউ জান্নাতের আশা করতো না। অর্থাৎ- কাফির দূরের কথা কোন মু’মিনই জান্নাতের আশা করত না। এ অংশে আল্লাহর শাস্তির আধিক্যতার বর্ণনা রয়েছে যাতে মু’মিন ব্যক্তি তাঁর আনুগত্যের কারণে বা তাঁর রহমাতের উপর নির্ভর করে ধোঁকায় না পড়ে ফলে নিজেকে নিরাপদ ভাববে অথচ আল্লাহর কৌশল থেকে একমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায় ছাড়া কেউ নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারে না।

(مَا قَنَطَ مِنَ جَنَّتِه أَحَدٌ) অর্থাৎ- কাফিরদের থেকে কেউ নিরাশ হত না, উপরন্তু মু’মিনদের থেকে কেউ। ত্বীবী বলেন, হাদীসটি আল্লাহ তা‘আলার দয়া এবং কঠোরতা দু’টি গুণের বর্ণনা সম্পর্কে। অতঃপর আল্লাহর গুণাবলীর যেমন সীমাবদ্ধতা নেই, তাঁর গোপন করা গুণাবলী কেউ জানতে পারে না। এমনিভাবে তাঁর শাস্তি এবং তাঁর রহমাত, যদি ধরে নেয়া হয় নিশ্চয়ই মু’মিন ব্যক্তি তার গোপন করা কঠোরতা সম্বন্ধীয় গুণের ব্যাপারে অবহিত হয়েছে অবশ্যই তখন ঐ গুণ থেকে এমন কিছু প্রকাশ পাবে যা ঐ সমস্ত ধারণা থেকে নিরাশ করবে ফলে তাঁর জান্নাত সম্পর্কে কেউ লালায়িত হবে না।

হাদীসটির সারাংশ হল, নিশ্চয়ই বান্দার উচিত হবে সৌন্দর্যমণ্ডিত গুণাবলী গবেষণার মাধ্যমে এবং কঠোরতা গুণাবলী পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আশা এবং ভয়ের মাঝে থাকা। লামআত গ্রন্থকার বলেন, হাদীসটির বাচনভঙ্গি দয়া এবং ক্রোধ এ দু’টি গুণ বর্ণনার জন্য এবং এ দু’টির গোপনীয়তা পর্যন্ত কেউ পৌঁছতে না পারার বর্ণনা করা। ঐ সমস্ত মু’মিনগণ যারা আল্লাহর রহমাতের বাহ্যিক রূপ সম্পর্কে অবহিত তারা যদি জানত আল্লাহর কাছে কি পরিমাণ কঠোরতা আছে তাহলে তাদের কেউ জান্নাতের আশা করত না। এভাবে কাফিরদের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। অর্থাৎ- তারা আল্লাহর দয়ার কথা বলতে পারলে তাঁর জান্নাত পাওয়া থেকে নিরাশ হত না। এটা আল্লাহর রহমাত তাঁর ক্রোধের উপর অগ্রগামী হওয়ার পরিপন্থী নয়।


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
পুনঃনিরীক্ষণঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১০: আল্লাহ তা‘আলার নামসমূহ (كتاب اسماء الله تعالٰى)

পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার রহমতের ব্যাপকতা

২৩৬৮-[৫] ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জান্নাত তোমাদের কারো জন্য জুতার ফিতা হতেও বেশি কাছে, আর জাহান্নামও ঠিক অনুরূপ। (বুখারী)[1]

بَابُ سَعْةِ رَحْمَةِ اللهِ

وَعَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْجَنَّةُ أَقْرَبُ إِلَى أَحَدِكُمْ مِنْ شِرَاكِ نَعْلِهِ وَالنَّارُ مِثْلُ ذَلِكَ» . رَوَاهُ البُخَارِيّ

وعن ابن مسعود قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: «الجنة أقرب إلى أحدكم من شراك نعله والنار مثل ذلك» . رواه البخاري

ব্যাখ্যা: (الْجَنَّةُ أَقْرَبُ إِلٰى أَحَدِكُمْ مِنْ شِرَاكِ نَعْلِه) উল্লেখিত অংশে شراك বলতে জুতার ফিতা উদ্দেশ্য যা জুতার সামনে থাকে। একমতে বলা হয়েছে, তা হল, এমন এক ফিতা যাতে পায়ের আঙ্গুল প্রবেশ করে এবং তা প্রত্যেক ঐ ফিতার উপরও প্রয়োগ করা হয় যার দ্বারা পা কে জমিন থেকে রক্ষা করা হয়। ত্বীবী বলেন, ‘আরবদের কর্তৃক জুতার ফিতার মাধ্যমে উদাহরণ পেশ করার কারণ হল পুণ্য এবং শাস্তি অর্জন বান্দার চেষ্টার মাধ্যমে হয় আর চেষ্টা পায়ের মাধ্যমে সম্পাদন হয়ে থাকে। প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি যে ভাল ‘আমল করবে তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সে জান্নাতের উপযুক্ত হবে, পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মন্দ কাজ করবে সে তার শাস্তির হুমকি অনুযায়ী জাহান্নামের উপযুক্ত হবে। আর আল্লাহ যা প্রতিশ্রুতি ও হুমকি দিয়েছেন তা সম্পন্ন হবে যেন সেগুলো অর্জন হয়ে গেছে।

(وَالنَّارُ مِثْلُ ذٰلِكَ) অর্থাৎ- তা তোমাদের কারো জুতার ফিতা অপেক্ষাও তার কাছাকাছি।

কারী বলেনঃ উল্লেখিত বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত, অর্থাৎ- জুতার ফিতা অপেক্ষা কাছাকাছি হওয়ার দিক দিয়ে জাহান্নাম জান্নাতের মতো। সুতরাং অল্প কল্যাণ সম্পাদনের ব্যাপারে কেউ যেন বিমুখ না হয়। হয়ত অল্প কল্যাণই ব্যক্তির প্রতি আল্লাহর রহমাতের কারণ হবে এবং অল্প অকল্যাণকর ‘আমল থেকে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে ও যেন অমনোযোগী না হয়। হয়ত কখনো অল্প অকল্যাণকর কাজে আল্লাহর ক্রোধ থাকবে। কোন ব্যক্তি জান্নাতে ও জাহান্নামে প্রবেশের কারণ হল, সৎ ‘আমল ও অসৎ ‘আমল আর তা ব্যক্তির জুতার ফিতা অপেক্ষাও অধিক নিকটবর্তী। কেননা ‘আমল তার পাশেই থাকে এবং তার মাধ্যমেই তা সম্পাদিত হয়। ইবনু বাত্তাল বলেন, হাদীসটিতে এ বর্ণনা রয়েছে যে, নিশ্চয়ই আনুগত্য জান্নাতে পৌঁছায় এবং অবাধ্যতা জাহান্নামের নিকটবর্তী করে। নিশ্চয়ই পাপ এবং পুণ্য কখনো অধিকতর হালকা হয়ে থাকে তখন ব্যক্তির উচিত হবে অল্প কল্যাণকর কাজ সম্পাদনের ব্যাপারে এবং অল্প অকল্যাণকর কাজ থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে অবহেলা না করা। কেননা সে ঐ পুণ্য কর্মের ব্যাপারে জানে না যার কারণে আল্লাহ তার প্রতি অনুগ্রহ করবেন এবং ঐ পাপের ব্যাপারেও সে জানে না যার দরুন আল্লাহ তার ওপর ক্রোধান্বিত হবেন। ইবনুল জাওযী বলেন, হাদীসটির অর্থ হল, নিশ্চয়ই বিশুদ্ধ নিয়্যাত ও আনুগত্যমূলক কাজের মাধ্যমে জান্নাত অর্জন করা সহজ। এভাবে প্রবৃত্তির অনুকূল এবং অবাধ্যকর কাজের মাধ্যমে জাহান্নামে যাওয়ার কারণ।


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
পুনঃনিরীক্ষণঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১০: আল্লাহ তা‘আলার নামসমূহ (كتاب اسماء الله تعالٰى)

পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার রহমতের ব্যাপকতা

২৩৬৯-[৬] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এমন এক ব্যক্তি তার পরিবার-পরিজনকে বলল, কোন সময় সে কোন ভাল কাজ করেনি। আর এক বর্ণনায় আছে, এক ব্যক্তি নিজের ওপর অবিচার করেছে। মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসলে নিজের সন্তান-সন্ততিকে ওয়াসিয়্যাত করল, যখন সে মারা যাবে তাকে যেন পুড়ে ফেলা হয়। অতঃপর মৃতদেহের ছাইভস্মের অর্ধেক স্থলভাগে, আর অর্ধেক সমুদ্রে ছিটিয়ে দেয়া হয়। আল্লাহর কসম! যদি তিনি (আল্লাহ) তাকে ধরতে পারেন তাহলে এমন শাস্তি দিবেন, যা দুনিয়ার কাউকেও কক্ষনো দেননি। সে মারা গেলে তার সন্তানেরা তার নির্দেশ মতই কাজ করল। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা সমুদ্রকে হুকুম করলেন, সমুদ্র তার মধ্যে যা ছাইভস্ম পড়েছিল সব একত্র করে দিলো। ঠিক এভাবে স্থলভাগকে নির্দেশ করলেন, স্থলভাগ তার মধ্যে যা ছাইভস্ম ছিল সব একত্র করে দিলো। পরিশেষে মহান আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কেন এরূপ কাজ করলে? (উত্তরে বললো) তোমার ভয়ে ’হে রব!’ তুমি তো তা জানো। তার এ কথা শুনে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]

بَابُ سَعْةِ رَحْمَةِ اللهِ

وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم: قَالَ رَجُلٌ لَمْ يَعْمَلْ خَيْرًا قَطُّ لِأَهْلِهِ وَفِي رِوَايَةٍ أَسْرَفَ رَجُلٌ عَلَى نَفْسِهِ فَلَمَّا حَضَرَهُ الْمَوْتُ أَوْصَى بَنِيهِ إِذَا مَاتَ فَحَرِّقُوهُ ثُمَّ اذْرُوا نِصْفَهُ فِي الْبَرِّ وَنِصْفَهُ فِي الْبَحْرِ فو الله لَئِنْ قَدَرَ اللَّهُ عَلَيْهِ لَيُعَذِّبَنَّهُ عَذَابًا لَا يُعَذِّبُهُ أَحَدًا مِنَ الْعَالَمِينَ فَلَمَّا مَاتَ فَعَلُوا مَا أَمَرَهُمْ فَأَمَرَ اللَّهُ الْبَحْرَ فَجَمَعَ مَا فِيهِ وَأَمَرَ الْبَرَّ فَجَمَعَ مَا فِيهِ ثُمَّ قَالَ لَهُ: لِمَ فَعَلْتَ هَذَا؟ قَالَ: مِنْ خَشْيَتِكَ يَا رَبِّ وَأَنْتَ أَعْلَمُ فَغَفَرَ لَهُ

وعن أبي هريرة قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: قال رجل لم يعمل خيرا قط لأهله وفي رواية أسرف رجل على نفسه فلما حضره الموت أوصى بنيه إذا مات فحرقوه ثم اذروا نصفه في البر ونصفه في البحر فو الله لئن قدر الله عليه ليعذبنه عذابا لا يعذبه أحدا من العالمين فلما مات فعلوا ما أمرهم فأمر الله البحر فجمع ما فيه وأمر البر فجمع ما فيه ثم قال له: لم فعلت هذا؟ قال: من خشيتك يا رب وأنت أعلم فغفر له

ব্যাখ্যা: (قَالَ رَجُلٌ) অর্থাৎ- আমাদের পূর্বে যারা ছিল তাদের মাঝ থেকে। বুখারীতে আবূ সা‘ঈদ-এর হাদীসে আছে, নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্বে এক লোক ছিল, আল্লাহ তাকে প্রচুর সম্পদ দিয়েছিলেন।

বুখারীর অন্য বর্ণনাতে আছে, (ذكر رجلا فيمن سلف أو فيمن كان قبلكم) অর্থাৎ- রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন এক লোকের উল্লেখ করেছেন যে অতীত হয়ে গেছে অথবা তোমাদের পূর্বে যারা ছিল তাদের মাঝে। ত্ববারানীতে হুযায়ফাহ্ এবং আবূ মাস্‘ঊদ এর হাদীসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, (انه كان من بنى اسرائيل) নিশ্চয়ই লোকটি ছিল বানী ইসরাঈল গোত্রের। আর এ কারণেই বুখারী বানী ইসরাঈলের আলোচনায় আবূ সা‘ঈদ, হুযায়ফাহ্ এবং আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)-এর হাদীস উল্লেখ করেছেন। বলা হয়েছে, এ লোকটির নাম ছিল জুহায়নাহ্। সুহায়লী বর্ণনা করেন তার কাছে এসেছে লোকটির নাম হুনাদ।

(خَيْرًا قَطُّ) অর্থাৎ- ইসলামের পরে সৎ ‘আমল। মুসলিমের এক বর্ণনাতে এসেছে, (لم يعمل حسنة قط) সে কখনো ভাল কাজ করেনি। বাজী বলেন, স্পষ্ট যে, যে ‘আমল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সাথে সম্পর্ক রাখে সেটাই প্রকৃত ‘আমল। যদিও রূপকভাবে ‘আমলকে বিশ্বাসের উপর প্রয়োগ করা সম্ভব। এ লোকটি সম্পর্কে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথার ব্যাপকতা যে, কোন পুণ্যকাজ করেনি এ থেকে উদ্দেশ্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে ‘আমল। হাদীসটিতে কুফরীর বিশ্বাস সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি, এ হাদীসটি কেবল ঈমানী বিশ্বাসের উপর প্রমাণ বহন করছে। তবে লোকটি তার শারী‘আত থেকে কোন কিছুর উপর ‘আমল করেনি। অতঃপর লোকটির কাছে যখন মরণ উপস্থিত হল তখন সে নিজ বাড়াবাড়ির ব্যাপারে ভয় করল, অতঃপর সে তা পরিবারকে তার দেহ জালিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিল।

‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী বলেনঃ আমি বলব, আহমাদ-এর এক বর্ণনাতে (দ্বিতীয় খণ্ডে ৩০৪ পৃষ্ঠা) এসেছে, তোমাদের পূর্বে যারা ছিল তাদের মাঝে এক লোক ছিল যে একমাত্র তাওহীদ তথা আল্লাহ একত্ববাদে বিশ্বাসী হওয়া ছাড়া কোন ভাল ‘আমল করেনি।

(أَسْرَفَ رَجُلٌ عَلٰى نَفْسِه) অর্থাৎ- অবাধ্যকর কাজে বাড়াবাড়ি করল। এটা মসলিমের শব্দ এবং বুখারীতে আছে, (كان رجل يسرف على نفسه) অর্থাৎ- লোকটি তার নিজের উপর বাড়াবাড়ি করত। বুখারীতে হুযায়ফার হাদীসে আছে, (انه كان يسيئ الظن بعمله) অর্থাৎ- লোকটি তার আমলের মাধ্যমে মন্দ ধারণা করত। বুখারী, মুসলিমে আবূ সা‘ঈদ-এর হাদীসে এসেছে, (فإنه لم ييترأ عند الله خيرا فسرها قتادة لم يدخر) অর্থাৎ- সে আল্লাহর কাছে কোন ভাল কাজ করেনি। কাতাদাহ্ এর ব্যাখ্যা করেছেন ‘‘সঞ্চয় করেনি’’ বুখারীতে হুযাইফার হাদীসের শেষে এসেছে। ‘উকবাহ্ বিন ‘আমর (আবূ মাস্‘ঊদ) বলেন, আমি তাঁকে (নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলতে শুনেছি লোকটি কবর খুড়ত (অর্থাৎ- কবর খুঁড়ে মৃত ব্যক্তিরদের কাফন চুরি করত)।

(فَلَمَّا حَضَرَهُ الْمَوْتُ) এখানে মৃত্যুকে তার নিকটবর্তী অবস্থার মাধ্যমে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। কেননা ঐ অবস্থাতে তার কাছে যা উপস্থিত হয়েছে তা মৃত্যুর আলামাত উপস্থিত হয়েছে; স্বয়ং মৃত্যু না।

(أَوْصٰى بَنِيهِ) এটা মুসলিমের শব্দ। বুখারীতে আছে, অতঃপর তার কাছে যখন মৃত্যু উপস্থিত হল সে তার সন্তানদেরকে বলল। বুখারীতে আবূ সাঈ‘দ-এর হাদীসে আছে, অতঃপর তার কাছে যখন মৃত্যু উপস্থিত হল সে তার সন্তানদেরকে বলল, আমি তোমাদের কেমন পিতা ছিলাম? তারা বলল, ভাল পিতা। সে বলল, শেষ পর্যন্ত।

(إِذَا مَاتَ فَحَرِّقُوهُ) এটা মুসলিমে আছে আর বুখারীতে আছে, فأحرقوه অর্থাৎ- الإحراق থেকে। এখানে বাচনভঙ্গির দাবী এভাবে বলা, আমি যখন মারা যাব তখন তোমরা আমাকে জ্বালিয়ে দিবে। তবে মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য এভাবে বলা হয়েছে।

(نِصْفَه فِى الْبَرِّ وَنِصْفَه فِى الْبَحْرِ) এবং বুখারীতে হুযায়ফার হাদীসের বানী ইসরাঈলের আলোচনার শুরুতে আছে, আমি যখন মারা যাব তখন তোমরা আমার জন্য অনেক লাকড়ি জমা করবে এবং তাতে আগুন জ্বালাবে এমনকি আগুন যখন আমার গোশতকে খেয়ে নিবে, আমার হাড্ডি পর্যন্ত পৌঁছে যাবে, অতঃপর তা জ্বলে উঠবে তখন তোমারা তা নিয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ করবে এরপর এক বাতাসযুক্ত দিনের অপেক্ষা করবে (অর্থাৎ- প্রবল বায়ুর) অতঃপর তা দরিয়াতে নিক্ষেপ করবে। (আল হাদীস) আর রিকাক অধ্যায়ে আবূ সাঈ‘দ-এর হাদীসেও আছে, আমি যখন মারা যাব তখন তোমরা আমাকে জ্বালিয়ে দিবে এমনকি যখন আমি কয়লাতে পরিণত হব তখন আমাকে তোমরা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলবে। রাবীর সন্দেহ এক্ষেত্রে লোকটি فاسحقونى অথবা فاسهكونى বলেছে।

অতঃপর যখন প্রবল বায়ু প্রবাহের দিন হবে তখন তোমরা তা তাতে নিক্ষেপ করবে এভাবে লোকটি তার সন্তানদের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করল। বাজী বলেন, এটা দু’ভাবে হতে পারে। দু’টির একটি হল, আল্লাহর ধরা থেকে সে মুক্তি পাবে না। এ বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও পলায়নের মাধ্যমে যেমন ব্যক্তি সিংহের সামনে থেকে পলায়ন করে এ বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও যে, সে দৌড়িয়ে সিংহ থেকে পলায়ন করতে পারবে না তবে সে এটা তার চূড়ান্ত সম্ভব অনুযায়ী করে থাকে।

দ্বিতীয়টি হল, এটা স্রষ্টার ভয়ে করে থাকে এবং বিনয় ও এ আশায় করে থাকে যে, এটি তার প্রতি রহমাতের কারণ হবে এবং সম্ভবত এটি তার ধর্মে শারী‘আতসম্মত ছিল।

(لَا يُعَذِّبُه أَحَدًا مِنَ الْعَالَمِينَ) এ হাদীসটি জটিলতা সৃষ্টি করেছে, কেননা লোকটির কাজ এবং উক্তি পুনরুত্থান ও জীবিত করার উপর আল্লাহর ক্ষমতার ব্যাপারে স্পষ্ট সন্দেহ সৃষ্টি করছে। আর আল্লাহর ক্ষমতার ব্যাপারে সন্দেহ করা কুফর। আর লোকটি হাদীসের শেষে বলেছে তোমার ভয়ে এবং তাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। অথচ কাফির ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে না এবং তাকে ক্ষমাও করা হবে না। এখানে হাদীসটির ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে মতানৈক্য করা হয়েছে। একমতে বলা হয়েছে, (قدر) শব্দটি তাশদীদ ছাড়া সংকীর্ণ অর্থে ব্যবহৃত এবং এ ব্যাপারে আল্লাহর বাণী, وَمَنْ قُدِرَ عَلَيْهِ رِزْقُه অর্থাৎ- ‘‘আর আল্লাহ যার ওপর রিযককে সংকীর্ণ করে দেন’’- (সূরা আত্ ত্বলা-ক ৬৫ : ৭)। অপর বাণী যা এ ধরনের বাণীসমূহের একটি। আর তা হল, অর্থাৎ- ‘‘আল্লাহ যদি তার ওপর সংকীর্ণ অবস্থা করেন এবং কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে হিসাব নেন’’- (সূরা আল আম্বিয়া ২১ : ৮৭)।

একমতে বলা হয়েছে, অর্থাৎ- যদি আল্লাহ তার ওপর শাস্তি আরোপ করার সিদ্ধান্ত নেন। এতে قدر শব্দটির راء বর্ণে তাশদীদ ও তাশদীদ ছাড়া উভয়ভাবে পড়া যায়। উভয় ক্ষেত্রে অর্থ এক, অভিন্ন, অর্থাৎ- আল্লাহ যদি তার ওপর শাস্তি ধার্য করেন তাহলে অবশ্যই তাকে শাস্তি দিবেন। তবে এটিও অর্থগতভাবে পূর্বের মতো যা মূলত বাচনভঙ্গির অনুকূল নয়। যদিও এটি আহমাদ-এর চতুর্থ খণ্ড- ৪৪৭ পৃষ্ঠাতে মু‘আবিয়াহ্ বিন হুমায়দাহ্-এর হাদীসে এসেছে এবং ৫ম খণ্ড- ৩-৪ পৃষ্ঠাতে এসেছে, আর তা এভাবে, ‘‘অতঃপর তোমরা বাতাসের মাঝে আমাকে ছেড়ে দিবে যাতে আমি আল্লাহ থেকে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারি তাঁর ধরা হতে মুক্তি পেতে পারি।’’ আর অদৃশ্য হওয়ার এ বর্ণনাটি ঐ কথার উপর প্রমাণ বহন করছে যে, তার উক্তি (لئن قدر الله عليه) তার বাহ্যিকতার উপর প্রমাণ বহন করছে এবং লোকটি তার নিজেকে জ্বালিয়ে দেয়ার মাধ্যমে আল্লাহর ক্ষমতা প্রত্যাহারের উদ্দেশ্য করছে। এ সত্ত্বেও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকটির ক্ষমার ব্যাপারে সংবাদ দিয়েছেন।

সুতরাং এমন একটি দিক অবশ্যই থাকা চাই যার মাধ্যমে লোকটি ঈমানদার হওয়ার ব্যাপারে উক্তি করা সম্ভব। অতঃপর একমতে বলা হয়েছে, লোকটির এ ধরনের নাসীহাত দ্বারা উদ্দেশ্য হল, সন্তানেরা যদি আমার অংশগুলোকে স্থলে এবং জলে এমনভাবে ছড়িয়ে দেয় যে, তাতে সে অংশগুলো একত্র করার কোন পথ থাকবে না। এ ক্ষেত্রে এ সম্ভাবনা থাকবে যে, লোকটি মনে করেছে তখন তাকে একত্র করা অসম্ভব আর ক্ষমতা অসম্ভবতার সাথে সম্পর্ক রাখে না। আর এ কারণেই লোকটি বলেছে যদি আল্লাহ তার ওপর ক্ষমতা খাটান, এতে ক্ষমতা অস্বীকার করা বা ক্ষমতার ব্যাপারে সন্দেহ করা আবশ্যক হচ্ছে না। সুতরাং এ কারণে কাফির হয়ে যাচ্ছে না, অতএব কিভাবে তাকে ক্ষমা করা হবে এ ধরনের কথা বলারও কোন সুযোগ নেই। লোকটি যা অস্বীকার করেছে তা হল সম্ভব বিষয়ের উপর ক্ষমতা। লোকটি অসম্ভব নয় এমন বিষয়কে অসম্ভব মনে করেছে যে ব্যাপারে তার কাছে কোন প্রমাণ সাব্যস্ত হয়নি যে, তা জরুরীভাবে দীনের সম্ভব বিষয়। প্রথমটিকে অস্বীকার করা হয়েছে দ্বিতীয়টিকে না। একমতে বলা হয়েছে, লোকটি ধারণা করেছিল যখন সে এ কাজ করবে তখন তাকে ছেড়ে দেয়া হবে, তাকে জীবিত করা হবে না এবং শাস্তিও দেয়া হবে না। পক্ষান্তরে তার لئن قدر الله এবং فلعلى اضل الله উক্তি উচ্চারণ করার কারণ হল, সে এ ব্যাপারে মূর্খ ছিল। তার ব্যাপারে মতানৈক্য করা হয়েছে এতে কি সে কাফির হয়ে যাবে নাকি হবে না? উত্তর- তার অবস্থান আল্লাহর সিফাত অস্বীকারকারীর বিপরীত।

ইমাম খাত্ত্বাবী বলেন, লোকটি পুনরুত্থানকে অস্বীকার করেনি, লোকটি কেবল অজ্ঞ ছিল ফলে সে ধারণা করল তার সাথে যদি এ আচরণ করা হয় তাহলে তাকে জীবিত করা হবে না এবং শাস্তিও দেয়া হবে না। সে কেবল আল্লাহর ভয়ে এটি করেছে- এ স্বীকৃতির মাধ্যমে ব্যক্তির ঈমান প্রকাশ পেয়েছে।

(فَأَمَرَ اللّٰهُ الْبَحْرَ فَجَمَعَ مَا فِيهِ وَأَمَرَ الْبَرَّ فَجَمَعَ مَا فِيهِ) অর্থাৎ- লোকটির অংশসমূহ থেকে। বুখারীর অন্য বর্ণনাতে আছে, অতঃপর আল্লাহ জমিনকে নির্দেশ দিয়ে বললেন, তুমি তার থেকে যা তোমার মাঝে আছে তা একত্র কর, অতঃপর তাই করলে লোকটি সুপ্রতিষ্ঠিত হল। বুখারীতেই আবূ সা‘ঈদ-এর হাদীসে আছে, অতঃপর আল্লাহ বললেন, হও তখনই লোকটির পুড়ে ফেলা অংশগুলো একত্রিত হয়ে মানবে রূপ নিল। হাফেয বলেন, আবূ ‘আওয়ানাহ্-এর সহীহাতে সালমান ফারিসীর হাদীসে আছে, অতঃপর আল্লাহ তাকে বললেন, হও অতঃপর তা চোখের পলকের ন্যায় দ্রুত হয়ে গেল।

(ثُمَّ قَالَ لَه: لِمَ فَعَلْتَ هٰذَا؟) অর্থাৎ- অতঃপর আল্লাহ লোকটিকে বললেন, তুমি এটা কেন করেছ? অর্থাৎ- লোকটি উপদেশবাণী থেকে যা উল্লেখ করেছে তা। অন্য এক বর্ণনাতে আছে, তুমি যা করেছ সে ব্যাপারে কোন জিনিস তোমাকে উদ্ভুদ্ধ করেছে? (قال من خشيتك رب) বুখারীতে হুযায়ফার হাদীসে আছে, সে ব্যাপারে একমাত্র তোমার ভয়ই আমাকে উদ্ভুদ্ধ করেছে। (وانت اعلم) অর্থাৎ- আপনি অধিক জানেন যে, এটা কেবল আপনার ভয়ের জন্যই করেছি।

ইবনু ‘আবদুল বার বলেন, এটা ঈমানের ব্যাপারে দলীল। কেননা ভয় মু’মিন ছাড়া কারো সৃষ্টি হয় না বরং বিদ্বান ব্যক্তিরই কেবল ভয় সৃষ্টি হয়। আল্লাহ বলেন, অর্থাৎ- ‘‘নিশ্চয়ই ‘আলিমরাই কেবল আল্লাহকে ভয় করে’’- (সূরা আল ফা-ত্বির ৩৫ : ২৮)। যে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখে না তার দ্বারা আল্লাহকে ভয় করা অসম্ভব। ‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী বলেন : আমি বলব, ভয়-ভীতি ঈমানের আবশ্যকীয়তার অন্তর্ভুক্ত। আর ঐ ব্যক্তি এ কাজ যখন আল্লাহর ভয়ে করেছে, সুতরাং তখন ব্যক্তির ঈমানের ব্যাপারে সাক্ষ্য দেয়া আবশ্যক।

(فَغَفَرَ لَه) ‘‘আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন।’’ লোকটিকে ক্ষমা করা হয়েছে কেবলমাত্র আল্লাহকে পূর্ণাঙ্গভাবে ভয় করার কারণে, কেননা ভয় করা সুউচ্চ স্থানের অন্তর্ভুক্ত এবং তা যখন তাওবার চূড়ান্ত স্তরের উপর প্রমাণ বহন করেছে যদিও তা মৃত্যুর আলামাত প্রকাশ পাওয়ার অবস্থায় অর্জন হয়েছে তথাপিও তা সমস্ত গুনাহসমূহ মোচনের কারণে পরিণত হয়েছে এবং সকল গুনাহ ক্ষমা হওয়ার মাধ্যমে হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন, অর্থাৎ- ‘‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সাথে অংশীস্থাপন করার গুনাহ ক্ষমা করবেন না, এ ছাড়া অন্য যত গুনাহ আছে তা যাকে ইচ্ছা তাকে ক্ষমা করবেন’’- (সূরা আন্ নিসা ৪ : ৪৮)। ইতোপূর্বে অতিবাহিত হয়েছে যে, আল্লাহর ভয় ঈমানের আবশ্যকতার অন্তর্ভুক্ত।


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
পুনঃনিরীক্ষণঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১০: আল্লাহ তা‘আলার নামসমূহ (كتاب اسماء الله تعالٰى)

পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার রহমতের ব্যাপকতা

২৩৭০-[৭] ’উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে কিছু যুদ্ধবন্দী এলো। তখন দেখা গেল, একটি মহিলার বুকের দুধ ঝরে পড়ছে, আর সে শিশু সন্তানের সন্ধানে দৌড়াদৌড়ি করছে। হঠাৎ বন্দীদের মধ্যে একটি শিশু দেখতে পেল। তাকে কোলে উঠিয়ে নিয়ে সে দুধ পান করাল। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বললেন, তোমাদের কি মনে হয় এ মহিলাটি স্বীয় সন্তানকে আগুনে নিক্ষেপ করতে পারে? উত্তরে আমরা বললাম, না, হে আল্লাহর রসূল! কক্ষনো না। যদি সে নিক্ষেপ না করার সামর্থ্য রাখে। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, অবশ্যই এ মহিলার সন্তানের প্রতি মায়া-মমতার চেয়ে বান্দার ওপর আল্লাহ তা’আলার মায়া-মমতা অনেক বেশি। (বুখারী, মুসলিম)[1]

بَابُ سَعْةِ رَحْمَةِ اللهِ

وَعَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ قَالَ: قَدِمَ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَبْيٌ فَإِذَا امْرَأَةٌ مِنَ السَّبْيِ قَدْ تَحَلَّبَ ثديُها تسْعَى إِذا وَجَدَتْ صَبِيًّا فِي السَّبْيِ أَخَذَتْهُ فَأَلْصَقَتْهُ بِبَطْنِهَا وَأَرْضَعَتْهُ فَقَالَ لَنَا النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَتُرَوْنَ هَذِهِ طَارِحَةً وَلَدَهَا فِي النَّارِ؟» فَقُلْنَا: لَا وَهِيَ تَقْدِرُ عَلَى أَنْ لَا تَطْرَحَهُ فَقَالَ: «لَلَّهُ أَرْحَمُ بِعِبَادِهِ مِنْ هَذِهِ بِوَلَدِها»

وعن عمر بن الخطاب قال: قدم على النبي صلى الله عليه وسلم سبي فإذا امرأة من السبي قد تحلب ثديها تسعى إذا وجدت صبيا في السبي أخذته فألصقته ببطنها وأرضعته فقال لنا النبي صلى الله عليه وسلم: «أترون هذه طارحة ولدها في النار؟» فقلنا: لا وهي تقدر على أن لا تطرحه فقال: «لله أرحم بعباده من هذه بولدها»

ব্যাখ্যা: (فَإِذَا امْرَأَةٌ مِنَ السَّبِىِّ) ‘‘বন্দীদের মাঝে একজন মহিলা দেখা গেল’’। হাফেয মহিলাটির নাম উল্লেখ করেননি।

(قَدْ تَحَلَّبَ ثَدْيُهَا) অর্থাৎ- নিজ সন্তান সঙ্গে না থাকায় দুধের আধিক্যতার কারণে স্তনের দুধ বয়ে যাচ্ছিল। হাফেয বলেন, সন্তানকে দুধ পান করানোর জন্য প্রস্ত্তত।

(تسْعٰى) শব্দটি (السعى) থেকে, অর্থাৎ- মহিলাটি তার সন্তানের অনুসন্ধানে দৌড়ে যাচ্ছিল। এক বর্ণনাতে আছে যা ابتغاء থেকে এসেছে অর্থ, অনুসন্ধান করা। ‘ইয়ায বলেন, তা ধারণা মাত্র আর বুখারীর বর্ণনাতে السعى থেকে যে تسعى এসেছে তা সঠিক। তবে ইমাম নাবাবী (রহঃ) এভাবে পর্যালোচনা করেছেন যে, উভয় বর্ণনাই সঠিক, তাতে কোন সন্দেহ নেই, মোট কথা মহিলা দৌড়াচ্ছিল ও তার সন্তানকে অনুসন্ধান করছিল।

কুরতুবী বলেন, تسعى বর্ণনার উত্তমতা ও স্পষ্টতা কারো কাছে গোপন নয়। তবে تبتغى বর্ণনার একটি বিশেষ দিক আছে, তা হল মহিলাটি তার সন্তানকে অনুসন্ধান করছিল। এখানে কর্ম সম্পর্কে জানা থাকার কারণে তা বিলুপ্ত করে দেয়া হয়েছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণনাকারী ভুল করছে না।

(أَخَذَتْهُ فَأَلْصَقَتْهُ بِبَطْنِهَا) ‘‘মহিলাটি শিশুকে স্বীয় পেটের সাথে মিলিয়ে নিন’’। হাফেয বলেন, এখান থেকে কোন কিছুকে বিলুপ্ত করে দেয়া হয়েছে। ইসমা‘ঈলী-এর বর্ণনা যা প্রমাণ করছে। আর তার শব্দ হল, মহিলাটি যখন বাচ্চা পেল তখন তাকে নিয়ে দুধ পান করালো। অতঃপর আরেকটি বাচ্চা পেল তাকে ধরে নিজ পেটের সাথে মিলিয়ে নিল। হাদীসটির বাচনভঙ্গি থেকে বুঝা গেল, নিশ্চয়ই মহিলাটি তার শিশুকে হারিয়ে ফেলেছিল এবং স্তনে দুধ জমা হওয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। অতঃপর যখন কোন শিশু পেয়েছিল হালকা হওয়ার জন্য তাকে দুধ পান করিয়েছিল, অতঃপর যখন নিজ সন্তান বাস্তবে পেয়েছিল তখন তাকে জড়িয়ে ধরেছিল এবং সন্তান পাওয়াতে আনন্দের কারণে এবং সন্তানের প্রতি চূড়ান্ত ভালোবাসার কারণে তাকে নিজ পেটের সাথে মিলিয়ে নিয়েছিল।

(وَهِىَ تَقْدِرُ عَلٰى اَنْ لَا تَطْرَحَه) অর্থাৎ- স্বেচ্ছায় কখনো তাকে নিক্ষেপ করবে না। কারী বলেন, এখানে واو বর্ণটি অবস্থা বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। আর একে এখানে ব্যবহারের উপকারিতা হল, মহিলাটি যদি নিরুপায় হয়ে যায় তাহলে সে তার সন্তানকে নিক্ষেপ করবে। তবে আল্লাহ নিরুপায় থেকে পবিত্র, সুতরাং তিনি কখনো তার বান্দাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন না।

(لله) এখানে শুরুতে যবর বিশিষ্ট লামটি তাকীদ তথা গুরুত্ব বুঝানের জন্য এসেছে, ইসমাঈলী বর্ণনাতে কসম দ্বারা আরো স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে। তাতে আছে, অতঃপর তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ! অবশ্যই আল্লাহ আরো দয়ালু ..... শেষ পর্যন্ত। (بعباده من هذه بوالدها) অর্থাৎ- মু’মিনদের প্রতি অথবা মুত্বলাকভাবে সকলের প্রতি। হাফেয বলেন, এখানে العباد দ্বারা যেন ঐ ব্যক্তি উদ্দেশ্য যে ইসলামের উপর মারা গেছে। ইমাম আহমাদ, হাকিম সহীহ সানাদে আনাস থেকে যা বর্ণনা করেছেন তা এই, আনাস  বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের একটি দল এবং পথে একটি শিশুর পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন। অতঃপর মা যখন সম্প্রদায়কে দেখলেন তখন তার সন্তানের ব্যাপারে তিনি আশংকা করলেন অথবা সম্প্রদায়ে মাড়ানোর ব্যাপারে তিনি আশংকা করে দৌড়ে সামনের দিকে অগ্রসর হলেন এবং বলতে লাগলেন, হে আমার ছেলে! হে আমার ছেলে! এ বলে মহিলাটি দৌড়াল এবং সন্তানকে ধরল। এরপর সম্প্রদায় বলল, হে আমার রসূল! এ মা এমন নয় যে, সে তার ছেলেটিকে আগুনে নিক্ষেপ করতে পারে। তখন আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহও তার বন্ধুকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন না। ‘বন্ধু’ শব্দ দ্বারা বিশ্লেষণ করাতে কাফির ব্যক্তি বেরিয়ে যাবে, এভাবে কাবীরাহ্ গুনাহে জড়িত হওয়ার পর তাওবাহ্ করেনি এমন ব্যক্তি থেকে যাদেরকে আল্লাহ জাহান্নামে প্রবেশ করানোর ইচ্ছা করেন। শায়খ আবূ মুহাম্মাদ আবূ হামযাহ্ বলেন, العباد শব্দটি ব্যাপক এবং এর অর্থ দ্বারা মু’মিনগণ নির্দিষ্ট। এর সমর্থনে আল্লাহর বাণীঃ অর্থাৎ- ‘‘আর আমার দয়া প্রতিটি জিনিসকে পরিব্যাপৃত করে নিয়েছে অচিরেই আমি সে দয়া ঐ সকল লোকদের জন্য লিখে রাখব যারা আল্লাহকে ভয় করে চলে।’’ (সূরা আল আ‘রাফ ৭ : ১৫৬)

অতএব রহমাতটি কার্যকারিতার দিক থেকে ব্যাপক, কিন্তু যার জন্য লিখা হয়েছে তার জন্য নির্দিষ্ট। অতঃপর ইবনু আবূ হামযাহ্ উল্লেখ করেন এ বাণী, অর্থাৎ- রহমাতের ব্যাপকতার সম্ভাবনা প্রাণীকুলের মাঝেও বিরাজ করছে। এ মতটিকে ‘আয়নী প্রাধান্য দিয়েছেন যেমন তিনি বলেন, স্পষ্ট যে, রহমাত ঐ ব্যক্তির জন্য ব্যাপক যার হুকুম গত হয়ে গেছে। রহমাতের একটি অংশ যে কোন বান্দার জন্য এমনকি প্রাণীকুলের জন্য। আর তা আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) -এর এ হাদীস অনুযায়ী (وانزل فى الأرض جزءا واحدا الخ) অর্থাৎ- আর রহমাত থেকে একটি অংশ জমিনের মাঝে অবতীর্ণ করেছেন আর ঐ অংশের সৃষ্টিজীব একে অপরের প্রতি দয়া করে থাকে।

ইবনু আবূ হামযাহ্ বলেন, হাদীসটিতে এমন বিষয়ের মাধ্যমে উদাহরণ দেয়া হয়েছে, মূলত ঐ জিনিসের যথার্থ পরিচিতির জন্য ঐ উদাহরণ দ্বারা বুঝা যায় না। আর উদাহরণটি যার জন্য পেশ করা হয়েছে তা প্রকৃতপক্ষে আয়ত্ব করা যায় না। কেননা আল্লাহর রহমাত জ্ঞান দ্বারা অনুভব করা যায় না। এ সত্ত্বেও নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উল্লেখিত মহিলার অবস্থার মাধ্যমে শ্রোতা ব্যক্তিদের উপমাটি পেশ করেছেন।


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
পুনঃনিরীক্ষণঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১০: আল্লাহ তা‘আলার নামসমূহ (كتاب اسماء الله تعالٰى)

পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার রহমতের ব্যাপকতা

২৩৭১-[৮] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কাউকেই তার ’আমল (’ইবাদাত-বন্দেগী) মুক্তি দিতে পারবে না। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনাকেও না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আমাকেও নয়। অবশ্য যদি আল্লাহ তা’আলা তাঁর রহমত দিয়ে আমাকে ঢেকে নেন। তবুও তোমরা সঠিকভাবে ’আমল করতে থাকবে ও মধ্যমপন্থা অবলম্বন করবে। সকাল-সন্ধ্যায় ও রাতে কিছু ’আমল করবে। সাবধান! তোমরা (’ইবাদাতে) মধ্যমপন্থা অবলম্বন করবে, মধ্যমপন্থা অবলম্বন করবে। তাতে তোমরা তোমাদের মঞ্জীলে মাকসূদে পৌঁছে যাবে। (বুখারী, মুসলিম)[1]

بَابُ سَعْةِ رَحْمَةِ اللهِ

وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَنْ يُنْجِيَ أَحَدًا مِنْكُمْ عَمَلُهُ» قَالُوا: وَلَا أَنْتَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: «وَلَا أَنَا إِلَّا أَنْ يَتَغَمَّدَنِي اللَّهُ مِنْهُ بِرَحْمَتِهِ فَسَدِّدُوا وَقَارِبُوا واغْدُوا وروحوا وشيءٌ من الدُّلْجَةِ والقَصدَ القصدَ تبلغوا»

وعن أبي هريرة قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: «لن ينجي أحدا منكم عمله» قالوا: ولا أنت يا رسول الله؟ قال: «ولا أنا إلا أن يتغمدني الله منه برحمته فسددوا وقاربوا واغدوا وروحوا وشيء من الدلجة والقصد القصد تبلغوا»

ব্যাখ্যা: (لَنْ يُنْجِىَ أَحَدًا مِنْكُمْ عَمَلُه) আবূ দাঊদ আত্ ত্বয়ালিসী এর বর্ণনাতে আছে, তোমাদের মাঝে এমন কেউ নেই যে, তার ‘আমল তাকে মুক্তি দিবে। বুখারী ও মুসলিম উভয়ের বর্ণনাতে আছে, তোমাদের কারো ‘আমল কখনো তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারবে না। মুসলিমের বর্ণনাতে আছে, তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে, তার ‘আমল তাকে মুক্তি দিবে। মুসলিমের অন্য বর্ণনাতে আছে, তোমাদের কেউ কখনো তার বিদ্যার মাধ্যমে মুক্তি পাবে না। এ হাদীস এবং অনুরূপ হাদীস আল্লাহর وَتِلْكَ الْجَنَّةُ الَّتِيْ أُورِثْتُمُوْهَا بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُوْنَ [অর্থাৎ- ‘‘আর ঐ জান্নাত যার উত্তরাধিকারী তোমাদেরকে করা হয়েছে তা তোমাদের কর্মের বিনিময়ে’’- (সূরা আয্ যুখরুফ ৪৩ : ৭২)] এ বাণীর কারণে জটিলতা সৃষ্টি করছে। এর উত্তরে বলা হয়েছে, আয়াতটি ঐ ব্যাপারে উৎসাহিত করছে যে, জান্নাতের মাঝে স্তরসমূহ ‘আমলের বিনিময়ে অর্জন করা হবে। কেননা ‘আমলের বিভিন্নতা অনুযায়ী জান্নাতের স্তরসমূহও বিভিন্ন হয়ে থাকে। হাদীসটি জান্নাতে প্রবেশের মৌলিকতা এবং তাতে স্থায়ী হওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করছে। অতঃপর যদি কেউ বলে নিশ্চয়ই আল্লাহর [অর্থাৎ- ‘‘তোমাদের ওপর শান্তি বর্ণিত হোক, তোমরা যে ‘আমল করতে তার বিনিময়ে জান্নাতে প্রবেশ কর’’- (সূরা আন্ নাহল ১৬ : ৩২)] এ বাণীটি ঐ ব্যাপারে স্পষ্ট যে, জান্নাতে প্রবেশ করাও ‘আমলের মাধ্যমে সাব্যস্ত। উত্তরে বলা হবে আল্লাহর বাণীটি সংক্ষিপ্ত হাদীস তাকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। ‘উহ্য’ বাক্যটি এভাবে হবে, তোমরা তোমাদের ‘আমলের মাধ্যমে জান্নাতের স্তরসমূহে ও তার প্রাসাদসমূহে প্রবেশ কর, এর দ্বারা প্রবেশের মৌলিকতা উদ্দেশ্য নয়। হাদীসটি আয়াতের তাফসীরকারী হওয়াও সম্ভব। ‘উহ্য’ বাক্য হল, তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর রহমাতে ও তোমাদের প্রতি আল্লাহর কৃপার দরুন তোমাদের কর্মের বিনিময়ে জান্নাতে প্রবেশ কর। কেননা জান্নাতের স্তরসমূহের বিভক্তি তার রহমাত অনুসারে। এভাবে জান্নাতে প্রবেশের মৌলিকতাও তাঁর রহমাত অনুসারে যেমন আল্লাহর বাণী ‘আমলকারীদেরকে উৎসাহিত করেছে, যার কারণে তারা তা অর্জন করেছে এবং বান্দাদের প্রতি তাঁর পুরস্কারসমূহ থেকে কোন কিছু তাঁর রহমাত ও কৃপা মুক্ত নয়। শুরুতেই আল্লাহ তাদেরকে তাদের সৃষ্টি করার মাধ্যমে অনুগ্রহ করেছেন, অতঃপর তাদেরকে রিযক দেয়ার মাধ্যমে, এরপর তাদেরকে জ্ঞান দান করার মাধ্যমে। এটি হল হাদীসদ্বয় এবং অধ্যায়ের হাদীসের মাঝে সমন্বয় সাধনে ইবনু বাত্ত্বাল-এর কথার সারাংশ।

কাযী ‘ইয়ায বলেন, সমন্বয়ের দিক হল নিশ্চয়ই হাদীসটি আয়াতের মাঝে যা সংক্ষেপিত তার ব্যাখ্যা করেছে। আর নিশ্চয়ই ‘আমলের তাওফীক পাওয়া, আনুগত্যের দিক নির্দেশনা পাওয়া আল্লাহর রহমাতের অন্তর্ভুক্ত। এ প্রতিটি ক্ষেত্রকে ‘আমলকারী তার ‘আমলের মাধ্যমে লাভ করতে পারেনি।

ইবনুল জাওযী বলেন, এ থেকে চারটি উত্তর অর্জন হচ্ছে।

প্রথমত ‘আমল করার তাওফীক লাভ আল্লাহর রহমাতের অন্তর্ভুক্ত। যদি আল্লাহর পূর্বোক্ত রহমাত না থাকত তাহলে ঈমান এবং ঐ আনুগত্য অর্জন হত না যার মাধ্যমে মুক্তি অর্জন হয়।

দ্বিতীয়ত নিশ্চয়ই মুনীবের প্রতি বান্দার কল্যাণ হচ্ছে, বান্দার ‘আমল তার মুনীবকে লাভ করবে। সুতরাং তিনি প্রতিদানের মাধ্যমে বান্দার ওপর যাই নিয়ামত দান করেছেন তা তাঁর অনুগ্রহের আওতাভুক্ত।

তৃতীয়ত কতিপয় হাদীসে এসেছে, খোদ জান্নাতে প্রবেশ আল্লাহর রহমাতের মাধ্যমে এবং জান্নাতের স্তরসমূহের বিন্যাস ‘আমলসমূহের মাধ্যমে।

চতুর্থত নিশ্চয়ই আনুগত্যের ‘আমলসমূহ অল্প সময়, পক্ষান্তরে তার পুণ্য শেষ হওয়ার নয়। সুতরাং ঐ পুরস্কার যা বদলার ক্ষেত্রে শেষ হওয়ার না, তা ‘আমলের মুকাবালাতে কৃপাপ্রদর্শনের ক্ষেত্রেও শেষ হওয়ার না।

কিরমানী বলেন,بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُوْنَ আল্লাহর এ বাণীতে الباء অক্ষর কারণসূচক অর্থ বর্ণনার জন্য নয়, বরং সাথে অথবা সাথী অর্থ বুঝানোর জন্য, অর্থাৎ- তোমাদেরকে যে জান্নাতের অধিকারী করা হয়েছে সঙ্গ বা ঘনিষ্ঠতা স্বরূপ। অথবা মুকাবালার জন্য ব্যবহৃত। যেমন দিরহামের বিনিময়ে আমি বকরী দান করেছি এবং এ শেষটির ব্যাপারে শায়খ জামালুদ্দীন বিন হিশাম আল মুগনী গ্রন্থে দৃঢ়তা প্রকাশ করেছেন। অতঃপর তিনি ১ম খণ্ডে ৯৭ পৃষ্ঠাতে বলেন, الباء অক্ষর মুকাবালার জন্য ব্যবহার আর তা বিনিময়সমূহের উপর প্রবেশ করে যেমন (اشتريته بألف) অর্থাৎ- আমি তা এক হাজার এর বিনিময়ে ক্রয় করেছি এবং (كا فأت احسانه بضعف) অর্থাৎ- আমি তার ইহসানের বিনিময় বহুগুণে দিয়েছি। ‘আরবদের এ কথার সমর্থনে কুরআনের আয়াত ادْخُلُوا الْجَنَّةَ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُوْنَ অর্থাৎ- ‘‘তোমরা যা করতে তার বিনিময় স্বরূপ জান্নাতে প্রবেশ কর’’- (সূরা আন্ নাহ্ল ১৬ : ৩২)। আমরা এ الباء অক্ষরকে কারণসূচক الباء হিসেবে সাব্যস্ত করিনি, যেমন মু‘তাযিলাহ্ সম্প্রদায় বলেছে (কেননা তারা বলে থাকে সৎ ‘আমল জান্নাতকে ওয়াজিব করার কারণ) যেমন সকল আহলুস্ সুন্নাহগণ বলে থাকেন কেউ কখনো তার ‘আমলের বিনিময়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, কেননা দাতা কখনো বদলার ক্ষেত্রে বিনামূল্যেও কিছু দিয়ে থাকে যা السبب এর বিপরীত যা السبب তথা কারণ ছাড়া পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, باء এর দু’টি সম্ভাবনাময় অর্থের মতানৈক্যের কারণে দলীলসমূহের মাঝে সমন্বয় সাধনকরণে হাদীস ও আয়াতের মাঝে কোন বিরোধ নেই।

‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী বলেন, আমি বলব, এ ব্যাপারে ইবনুল কইয়্যিম পূর্বেই মত ব্যক্ত করেছেন। যেমন হাফেয বলেন, (مفتاح دار السعادة) কিতাব থেকে তার আলোচনা বর্ণনা করা হয়েছে।

হাফেয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, আয়াত এবং হাদীসের মাঝে সমন্বয় সাধনে আমার কাছে আরেকটি দিক স্পষ্ট হচ্ছে আর তা হল হাদীসটিকে ঐ দিকে চাপিয়ে দেয়া যে ‘আমল, যেহেতু সেটা এমন ‘আমল যা জান্নাতে প্রবেশের ক্ষেত্রে ‘আমলকারীর কোন উপকারে আসবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তা গ্রহণযোগ্য ‘আমল না হবে। আর তা যখন এমনই তখন গ্রহণের বিষয় আল্লাহর কাছে ন্যস্ত। আর তা কেবল আল্লাহ যার থেকে ‘আমল গ্রহণ করবেন তার জন্য আল্লাহর রহমাতের মাধ্যমে অর্জন হবে।

এ উত্তরটির সারাংশ হল, হাদীসটিতে গ্রহণযোগ্যতা মুক্ত ‘আমলের মাধ্যমে জান্নাতে প্রবেশ নিষেধ করা হয়েছে পক্ষান্তরে আয়াতে গ্রহণযোগ্য ‘আমলের মাধ্যমে জান্নাতে প্রবেশের কথা বলা হয়েছে। আর ‘আমলের গ্রহযোগ্যতা কেবল আল্লাহর তরফ থেকে অনুগ্রহ স্বরূপ হয়ে থাকে।

ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেনঃ আয়াতসমূহের অর্থ হল জান্নাতে প্রবেশ ‘আমলসমূহের কারণে। আয়াতসমূহ ও হাদীসের মাঝে সমন্বয় সাধন এভাবে যে, ‘আমলসমূহের ক্ষেত্রে ‘আমল করার তাওফীক লাভ, নিষ্ঠার প্রতি দিক নির্দেশনা এবং ‘আমলসমূহের গ্রহণযোগ্যতা কেবল আল্লাহর রহমাত ও করুণাস্বরূপ। সুতরাং এ কথা বিশুদ্ধ যে, শুধুমাত্র ‘আমলসমূহের মাধ্যমে জান্নাতে প্রবেশ করা যাবে না এটিই হাদীসের উদ্দেশ্য এবং এ কথাও বিশুদ্ধ যে ব্যক্তি ‘আমলসমূহের কারণে জান্নাতে প্রবেশ করবে আর তাও আল্লাহর রহমাতের অন্তর্ভুক্ত। তবে শেষ মতটিকে কিরমানী প্রত্যাখ্যান করেছেন কেননা তা স্পষ্ট বিরোধী।

তুরবিশতী বলেন, এ হাদীস থেকে ‘আমল করাকে নিষেধ করা এবং ‘আমলের বিষয়কে শিথিলভাবে দেখা উদ্দেশ্য নয়। বরং বান্দাদেরকে ঐ ব্যাপারে অবহিত করা যে, ‘আমল কেবল আল্লাহর রহমাত ও তার কৃপার মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করে আর এটা এ কারণে যে, যাতে তারা ‘আমলের ব্যাপারে ধোঁকা খেয়ে ‘আমলের উপর ভরসা করে বসে না থাকে। কেননা মানুষ স্পষ্ট উদাসীনতা ও বিপদের সম্মুখীন হয়ে ভুলে যায়। তার পক্ষে অসৎ উদ্দেশ্য, বিশৃঙ্খলা নিয়্যাত, সূক্ষ্ম প্রবৃত্তি বা লোক দেখানো ‘আমলের ময়লা থেকে মুক্ত থাকার সুযোগ কমই হয়ে থাকে। অতঃপর যদি তার ‘আমল সমস্ত কিছুর ময়লা থেকে নিরাপদও হয় তথাপিও তা আল্লাহর রহমাতের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। কেননা বান্দার ‘আমলসমূহ থেকে সর্বাধিক আশাপূর্ণ ‘আমল আল্লাহর নিয়ামতসমূহ থেকে নিয়ামতস্বরূপ সর্বনিম্ন কৃতজ্ঞতার মাধ্যমে পূর্ণ হয় না। সুতরাং যে ‘আমলের সে দিক-নির্দেশনাই পায়নি আল্লাহর রহমাত ছাড়া সে ‘আমলের মাধ্যমে তার সাহায্য প্রার্থনা করা কি সম্ভব?

ইমাম ত্বীবী বলেন, অর্থাৎ- শাস্তি থেকে মুক্তি এবং পুণ্যের মাধ্যমে সফল হওয়া আল্লাহর কৃপা ও রহমাতের মাধ্যমে হয়ে থাকে। ‘আমল আবশ্যকীয়ভাবে এগুলোতে কোন প্রভাব ফেলে না। বরং এর চূড়ান্ত পর্যায় হল ‘আমলকারীর উপর করুণাপ্রদর্শন ও রহমাতকে তার নিকটবর্তী করার বিবেচনা করা হয়। আর এজন্যই (فسددوا الخ) অর্থাৎ- ‘‘তোমরা সঠিক পন্থা অবলম্বন কর’’ এ কথা বলেছেন।

সাহাবীদেরকে সম্বোধন করা হলেও এর উদ্দেশ্য আদম সন্তানের দল। মাযুরী বলেন, আহলুস্ সুন্নাহর মত হল, যে আল্লাহর আনুগত্য করবে আল্লাহ অনুগ্রহের মাধ্যমে তাকে সাওয়াব দান করবেন, পক্ষান্তরে যে তার অবাধ্য হবে তিনি ন্যায় ইনসাফস্বরূপ তার থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন। আর আনুগত্যশীলকে শাস্তি দেয়া এবং অবাধ্যের প্রতি অনুগ্রহ করার ক্ষমতা আল্লাহর আছে। কেননা সমগ্র বিশ্বে তার মালিকত্বে, ইহকাল এবং পরকাল তাঁর কর্তৃত্বের মাঝে, উভয় জগতে তিনি যা ইচ্ছা করতে পারেন, সুতরাং তিনি যদি আনুগত্যশীলদেরকে শাস্তি দেন এবং তাদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করান তাহলে সেটা তার তরফ থেকে ইনসাফস্বরূপ হবে। পক্ষান্তরে যখন তিনি তাদেরকে সম্মানিত করবেন তাদের প্রতি অনুগ্রহ ও তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন তখন তা তার তরফ থেকে অনুগ্রহস্বরূপ হবে। আর যদি তিনি কাফিরদেরকে অনুগ্রহ করেন এবং তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করান তাহলে তাঁর সে অধিকার আছে তবে তিনি সংবাদ দিয়েছেন আর তার সংবাদ সত্য যাতে কোন বৈপরীত্য নেই যে, তিনি এটা করবেন না বরং তিনি মু’মিনদেরকে ক্ষমা করবেন এবং তাদেরকে নিজ রহমাতে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং কাফিরদেরকে শাস্তি দিবেন এবং তাঁর তরফ থেকে ইনসাফস্বরূপ তাদেরকে জাহান্নামে স্থায়ী করবেন।

এ হাদীসটি মু‘তাযিলাহ্ সম্প্রদায়ের কথাকে প্রত্যাখ্যান করছে। যেমন তারা বিবেকের মাধ্যমে বদলা সাব্যস্ত করে থাকে, ‘আমলসমূহের পুণ্য আবশ্যক করে থাকে, সঠিকতর দিককে আবশ্যক করে থাকে, এ ব্যাপারে তাদের অনেক অপ্রকৃতিস্থতা ও দীর্ঘ ব্যাখ্যা আছে।

(وَلَا أَنْتَ يَا رَسُوْلَ اللّٰهِ؟) অর্থাৎ- মহাসম্মান থাকা সত্ত্বেও আপনার ‘আমল আপনাকে মুক্তি দিবে না। ‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী বলেন, আমি বলব, মুসলিমের এক বর্ণনাতে আছে, এক লোক বলল আপনাকেও না হে আল্লাহর রসূল? কিরমানী বলেন, যখন প্রত্যেক মানুষ আল্লাহর রহমাতে আচ্ছাদিত হওয়া ছাড়া জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না তখন আলোচনাতে রসূলকে খাস করার কারণ হল, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতে প্রবেশ করবেন- এ বিষয়টি যখন অকাট্য হওয়ার পরও তিনি যদি আল্লাহর রহমাত ছাড়া জান্নাতে প্রবেশ করতে না পারেন তাহলে তিনি ব্যতীত অন্যের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি আরো জটিল হওয়াই স্বাভাবিক। রাফি‘ঈ বলেন, আনুগত্যের ক্ষেত্রে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পারিশ্রমিক যেমন বড়, ‘ইবাদাতে তার ‘আমল যেমন সঠিক তখন এদিকে দৃষ্টি দিয়েই বলা হয়েছে, আপনিও নন হে আল্লাহর রসূল? অর্থাৎ- মহামর্যাদার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও আপনার ‘আমলও কি আপনাকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারবে না? তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, (ولا انا) আমিও না। কথাটি (ولا انت) তথা আপনিও না কথাটির অনুকূল। অর্থাৎ- যাকে তার ‘আমল মুক্তি দিবে আমি তার অন্তর্ভুক্ত না। মুসলিমে এক বর্ণনাতে এ বর্ণনার দিকে ইঙ্গিত দেয়া আছে, যেমন- قال و لا إياى অর্থাৎ- তিনি বলেন, আমাকেও না।

(إِلَّا أَنْ يَتَغَمَّدَنِى اللّٰهُ) অর্থাৎ- তবে আল্লাহ যদি আমাকে আচ্ছাদিত করে নেন। মুসলিমের এক বর্ণনাতে আছে, الا ان يتداركنى অর্থাৎ- তবে তিনি যদি আমাকে সংশোধন করে নেন।

(مِنْهُ بِرَحْمَتِه) উভয়ের বর্ণনাতে আছে, بفضل ورحمته তথা তাঁর কৃপা ও তাঁর দয়ার মাধ্যমে। অর্থাৎ- তাঁর দয়া ও তাঁর ক্ষমার মাধ্যমে কথা বলা আছে। আবূ ‘উবায়দ বলেন, التغمد দ্বারা আচ্ছাদিত করা উদ্দেশ্য। আমি মনে করি এটি غمد السيف তথা তরবারিকে আচ্ছাদিত করা- এ কথা থেকে এসেছে।

কারী বলেন, التغمد এর অর্থ আড়াল করা, অর্থাৎ- তিনি আমাকে তার রহমাত দিয়ে আড়াল করবেন এবং আমাকে ঐভাবে সংরক্ষণ করবেন যেভাবে তরবারিকে কোষ বা খাপ দ্বারা সংরক্ষণ করা হয়।

শায়খ দেহলবী বলেন, পৃথকীকরণ এর অর্থ হল, আমার ‘আমল আমাকে মুক্তি দিতে পারবে না তবে আল্লাহ যদি আমার প্রতি অনুগ্রহ করেন তখন আমার ‘আমল আমাকে মুক্তি এবং আমার মুক্তির ক্ষেত্রে তা কারণ হতে পারবে, ‘আমল ছাড়া তখন কোন কিছু মুক্তির কারণ হতে পারবে না। কেননা প্রকৃতপক্ষে ‘আমল মুক্তিলাভকে আবশ্যক করে দেয়ার মতো কোন কারণ না।

(فَسَدِّدُوْا) উক্তি দ্বারা তিনি ‘আমলের ইতিবাচকের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, অর্থাৎ- তোমরা বিষয়টির সঠিক দিক অবলম্বন কর। আর এটিই হল ‘আরবদের (سدد السهم اذا تحرى الهدف) যখন লক্ষ্যস্থলের ইচ্ছা করল তখন তিরটিকে সোজা করল বা ঠিক করল- এ উক্তির দিক থেকে সঠিক। অর্থাৎ- তোমরা কাজ সম্পাদন কর এবং সঠিক দিক অনুসন্ধান কর এবং ‘আমলে বাড়াবাড়ি ও শিথিলতা প্রদর্শন না করে মধ্যম পন্থা অবলম্বন কর। সুতরাং বেশিও করবে না ও কমও করবে না। মুসলিমের এক বর্ণনাতে আছে, ولكن سددوا অর্থাৎ- তবে সঠিক দিক অবলম্বন কর। হাফেয বলেন, এ استدراك এর অর্থ হল, উল্লেখিত নেতিবাচক থেকে ‘আমলের উপকারিতার নেতিবাচক বুঝা যায়, অতঃপর যেন বলা হয়েছে বরং ‘আমলের উপকারিতা আছে আর তা হল, নিশ্চয়ই ‘আমল রহমাতের অস্তিত্বের ব্যাপারে আলামাত বা চিহ্ন যা ‘আমলকারীকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে। সুতরাং তোমরা ‘আমল কর এবং তোমাদের ‘আমলের মাধ্যমে সঠিকতা উদ্দেশ্য কর আর তা হল নিষ্ঠা ও সুন্নাতের অনুসরণ যাতে তোমাদের ‘আমল গ্রহণ করা হয় এবং তোমাদের ওপর রহমাত বর্ষণ করা হয়।

(وقاربوا) অর্থাৎ- তোমরা নৈকট্য অনুসন্ধান কর। আর তা হল কোন বিষয়ে মধ্যম পন্থাবলম্বন কর যাতে কোন বাড়াবাড়ি নেই, ঘাতটিও নেই। একমতে বলা হয়েছে, অর্থাৎ- তোমরা যদি কোন বিষয়কে পূর্ণাঙ্গভাবে অবলম্বন করতে সক্ষম না হও তাহলে পূর্ণাঙ্গের যা কাছাকাছি সে অনুপাতে ‘আমল কর। অর্থাৎ- তোমরা সোজাভাবে ‘আমল কর, অতঃপর যদি তোমরা তা করতে অক্ষম হয়ে যাও তাহলে তোমরা তার কাছাকাছি ‘আমল কর। হাফেয বলেন, তোমরা বাড়াবাড়ি করবে না, করলে তোমরা নিজেদেরকে ‘ইবাদাতের ক্ষেত্রে কষ্টে পতিত করবে। এটা এ কারণে যে, যাতে এ পরিস্থিতি তোমাদেরকে বিরক্তির দিকে ধাবমান না করে, পরিশেষে যা তোমাদের ‘আমল বর্জন ও বাড়াবাড়ি করার কারণ হয়।

(وَرُوْحُوْا) উল্লেখিত ক্রিয়াটি الروح থেকে এসেছে। আর তা দিনের দ্বিতীয় অর্ধেকের শুরু অংশে চলা। জাযারী বলেনঃ الغدو শব্দের অর্থ সকাল সকাল বের হওয়া আর الروح শব্দের অর্থ বিকাল বেলাতে প্রত্যাবর্তন করা। উদ্দেশ্য দিনের অংশসমূহে সময়ে সময়ে তোমরা ‘আমল কর।

(وَشَىْءٌ مِنَ الدُّلْجَةِ) অর্থাৎ- রাতে চলা, উদ্দেশ্য রাতে ‘আমল করা। এখানে রাতর কিছু সময় বলা হয়েছে তার কারণ হল, সমস্ত রাত চলাচল কঠিন। অতএব এতে সমস্তকে বাদ দিয়ে স্বল্পতার দিকে এবং সহানুভূতির উপর উৎসাহ প্রদানের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। হাদীসটিতে شيئ-কে লক্ষ্য করে কথা বলা হয়েছে আর তার সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তা গোপন আছে, অর্থাৎ- তোমরা তাতে ‘আমল কর অথবা তাতে তোমাদের ‘আমলকে উদ্দেশ্য করা হয়। কারো মতে গোপনীয় অংশটুকু হল ‘তবে রাতের কিছু অংশে’। একমতে বলা হয়েছে, অর্থাৎ- তোমরা সকাল সন্ধায় ‘আমল কর এবং রাত্রের কিছু অংশে অথবা অর্থটি এমন হবে ‘তোমরা রাতের কিছু অংশের মাধ্যমে সাহায্য নাও’।

(والقَصْدَ الْقَصْدَ) অর্থাৎ- তোমরা সমতাপূর্ণ মধ্যম পন্থা অবলম্বন কর। জাযারী বলেন, তোমরা কাজে ও কথায় সমতাপূর্ণ মধ্যম পন্থা অবলম্বন কর।

(تَبْلُغُوْا) অর্থাৎ- তোমরা ঐ স্তরে পৌঁছতে পারবে যা তোমাদের লক্ষ্য। হাদীসে ‘ইবাদাতকারীকে মুসাফির তথা ভ্রমণকারীদের সাথে সাদৃশ্য দেয়ার কারণ হল ‘ইবাদাতকারী ভ্রমণকারীর ন্যায় তার অবস্থানস্থলের দিকে ভ্রমণকারী। আর তা হল জান্নাত। যেন তিনি বলেছেন তোমরা ভ্রমণের মাধ্যমে সমস্ত সময়কে আয়ত্ত করিও না। বরং তোমরা প্রাণবন্ততার সময়সমূহকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাও। আর তা হল দিনের শুরু, শেষ ও রাত্রের কিছু অংশ এবং এ দুয়ের মাঝে যা আছে তাতে তোমরা তোমাদের নিজেদের প্রতি রহম কর যাতে করে তা ‘ইবাদাত ছেড়ে দিয়ে ‘ইবাদাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণ না হয়। মহান আল্লাহ বলেন, অর্থাৎ- ‘‘তোমরা দিনের দু’প্রান্তে এবং রাতের একটি অংশে সালাত প্রতিষ্ঠা কর’’- (সূরা হূদ ১১ : ১১৪)।

ইমাম ত্বীবী বলেন, প্রথমে বলা হয়েছে, নিশ্চয়ই ‘আমল আবশ্যকীয়ভাবে কাউকে মুক্তি দেয় না, এ বর্ণনার কারণ যাতে মানুষ ‘আমলের উপর ভরসা করে বসে না থাকে। শেষে ‘আমল করার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে যাতে করে মানুষ ‘আমলের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি সমান, এর উপর ভিত্তি করে বাড়াবাড়ি না করে। বরং মুক্তির ক্ষেত্রে ‘আমল সর্বনিম্ন কার্যকরী হিসেবে গণ্য; যদিও তা মুক্তির পথ আবশ্যক না করে।


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
পুনঃনিরীক্ষণঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১০: আল্লাহ তা‘আলার নামসমূহ (كتاب اسماء الله تعالٰى)

পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার রহমতের ব্যাপকতা

২৩৭২-[৯] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কাউকেই তার ’আমল (’ইবাদাত-বন্দেগী) জান্নাতে পৌঁছাতে পারবে না এবং তাকে জাহান্নাম হতেও মুক্তি দিতে পারবে না, এমনকি আল্লাহর রহমত ছাড়া আমাকেও নয়। (মুসলিম)[1]

بَابُ سَعْةِ رَحْمَةِ اللهِ

وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يُدْخِلُ أَحَدًا مِنْكُمْ عَمَلُهُ الْجَنَّةَ وَلَا يُجِيرُهُ مِنَ النَّارِ وَلَا أَنا إِلا برحمةِ الله» . رَوَاهُ مُسلم

وعن جابر قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: «لا يدخل أحدا منكم عمله الجنة ولا يجيره من النار ولا أنا إلا برحمة الله» . رواه مسلم

ব্যাখ্যা: (إِلَّا بِرَحْمَةِ اللهِ) অর্থাৎ- আল্লাহর রহমাতজনিত ‘আমল ছাড়া জান্নাতে প্রবেশ করা যাবে না। অতএব পৃথককৃত অংশটুকু যার থেকে পৃথক করা হয়েছে তার জাতেরই অন্তর্ভুক্ত। অতএব জান্নাতে প্রবেশ করা কেবল কৃপার মাধ্যমেই সাব্যস্ত। আর জান্নাতের স্তরসমূহ ইনসাফের দাবী অনুযায়ী ‘আমলকারীর ‘আমল অনুপাতে সাব্যস্ত। ইমাম আহমাদ একে তাঁর কিতাবের ৩য় খণ্ড-র ৩৩৭ পৃষ্ঠাতে জাবির থেকে আবূ সুফ্ইয়ান কর্তৃক সানাদে (قاربواو سددوا فإنه ليس احدكم ينجيه عمله، قالوا ولا اياك يا رسول الله، قال ولا اياى الا ان يتغمدنى الله برحمة) অর্থাৎ- ‘‘তোমরা ‘আমলে মধ্যম পন্থা ও সোজা পন্থা অবলম্বন কর, কেননা তোমাদের মধ্যে কেউ এমন নেই যে, তার ‘আমল তাকে মুক্তি দিতে পারে। তারা বলল, হে আল্লাহর রসূল! আপনাকেও না? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আমাকেও না তবে আল্লাহ যদি তাঁর রহমাতের মাধ্যমে আমাকে আচ্ছাদিত করে নেয় তবে আলাদা কথা।’’ এ শব্দের মাধ্যমে সংকলন করেছেন।


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
পুনঃনিরীক্ষণঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১০: আল্লাহ তা‘আলার নামসমূহ (كتاب اسماء الله تعالٰى)

পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার রহমতের ব্যাপকতা

২৩৭৩-[১০] আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বান্দা যখন ইসলাম কবূল করে, তার ইসলাম খাঁটি হয়। (ইসলাম গ্রহণের কারণে) তার প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ আল্লাহ তার পূর্বের সকল গুনাহ মিটিয়ে দেন। অতঃপর তার এক একটি নেক কাজের তার দশ গুণ হতে সাতশ’ গুণ, বরং অনেক গুণ পর্যন্ত লেখা হয়। আর পাপ কাজের জন্য একগুণ মাত্র। তবে আল্লাহ যাকে (ইচ্ছা) এ পাপ কাজকে ছেড়ে যান। (বুখারী)[1]

بَابُ سَعْةِ رَحْمَةِ اللهِ

وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِذَا أَسْلَمَ الْعَبْدُ فَحَسُنَ إِسْلَامُهُ يُكَفِّرُ اللَّهُ عَنْهُ كُلَّ سَيِّئَةٍ كَانَ زَلَفَهَا وَكَانَ بَعْدَ الْقِصَاصِ: الْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا إِلَى سَبْعِمِائَةِ ضِعْفٍ إِلَى أَضْعَافٍ كَثِيرَةٍ وَالسَّيِّئَةُ بِمِثْلِهَا إِلَّا أَنْ يَتَجَاوَزَ اللَّهُ عَنْهَا . رَوَاهُ البُخَارِيّ

وعن أبي سعيد قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: إذا أسلم العبد فحسن إسلامه يكفر الله عنه كل سيئة كان زلفها وكان بعد القصاص: الحسنة بعشر أمثالها إلى سبعمائة ضعف إلى أضعاف كثيرة والسيئة بمثلها إلا أن يتجاوز الله عنها . رواه البخاري

ব্যাখ্যা: (إِذَا أَسْلَمَ الْعَبْدُ) ‘‘বান্দা যখন ইসলাম গ্রহণ করে’’। এ হুকুমের মাঝে পুরুষ এবং মহিলা সকলে শামিল। এখানে প্রাধান্যের দিক বিবেচনায় (الْعَبْدُ) শব্দটিকে পুঃলিঙ্গ শব্দের মাধ্যমে উল্লেখ করেছেন।

(فَحَسُنَ إِسْلَامُه) এখানে حسن ক্রিয়ার سين বর্ণে পেশ দিয়ে হালকা উচ্চারণে। অর্থাৎ- বাহ্যিক ও গোপন সব মিলে তার ইসলাম উত্তমতায় পরিণত হল। سين বর্ণে তাশদীদ দিয়ে পড়াও সম্ভব যাতে তা (اَحْسَنُ اَحَدَكُمْ اِسْلَامِه) এ বর্ণনার অনুকূল হতে পারে। অর্থাৎ- উল্লেখিত বাহ্যিক ও গোপন সব মিলে তার ইসলামকে সুন্দর করল। ‘আয়নী বলেন, ‘ইসলাম সুন্দর হওয়া’ এর উদ্দেশ্য হল, বাহ্যিক ও গোপন সব দিক দিয়ে ইসলামে প্রবেশ করা। কেউ যখন পৃকতপক্ষে ইসলামে প্রবেশ করে তখন শারী‘আতের পরিভাষায় বলা হয় অমুকের ইসলাম সুন্দর হয়েছে। অর্থাৎ- বিশ্বাস ও নিষ্ঠায়, মুনাফিক না হয়ে বাহ্যিক ও গোপনে ইসলামে প্রবেশ করে তার ইসলাম উত্তমতায় পরিণত হয়েছে।

(كُلَّ سَيِّئَةٍ) ‘‘যা সে করেছে’’। অর্থাৎ- সগীরাহ্, কাবীরাহ্ প্রত্যেক গুনাহ।

(كَانَ زَلَفَهَا) খাত্ত্বাবী এবং তিনি ছাড়াও অন্যান্যগণ বলেন, অর্থাৎ- ইসলামের পূর্বে যা করেছে। মুহকাম-এ আছে, أَزْلَفُ الشَّيئ অর্থাৎ- সে তাকে নিকটবর্তী করল। আর তাশদীদ দ্বারা زلفه সে যা আগে করেছে। জামি‘তে আছে, ألزلفه কল্যাণ, অকল্যাণ উভয় ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। মাশারিক্বে বলেন, زلف তাশদীদবিহীন হালকা উচ্চারণে, অর্থাৎ- সে একত্রিত করল, উপার্জন করল- এটি দু’টি বিষয়কে শামিল করে। পক্ষান্তরে القرية শুধু কল্যাণের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।

(وَكَانَ بَعْدَ) অর্থাৎ- ভালভাবে ইসলাম গ্রহণের পর অথবা গুনাহসমূহ মোচনের পর। بعد উক্তিটি মিশকাত, মাসাবীহ এর সকল কপিতে এসেছে। আর সহীহাতে যা আছে তা হল, وكان بعد ذلك এভাবে الجامع الصغير এর মাঝে এসেছে।

(الْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا) অর্থাৎ- পুণ্যের বদলা তার দশগুণ লেখা হবে। বাক্যটি নুতন যা قصاص এর ব্যাখ্যাস্বরূপ আর (الحسنة) এর মাঝে لام ব্যাপকতা বুঝানোর জন্য এসেছে যা (كتاب الإيمان) এ বিগত হওয়া আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত ৪৪ নং হাদীসে كل حسنة বাণীর উপর প্রমাণ বহন করছে। (إلى سبع مائة ضعف) অর্থাৎ- সাতশত গুণ পর্যন্ত তার পরিসমাপ্তি। (الى أضعاف كثيرة) অর্থাৎ- আল্লাহর তরফ থেকে তা অনুগ্রহ ও নিয়ামতস্বরূপ বহুগুণে সুবিস্তৃত। (والسيئة بمثلها) ‘‘গুনাহ তার সমপরিমাণ’’, অর্থাৎ- অধিক না করে সমতা ও রহমাতস্বরূপ। যেমন বলেছেন কেবল তার সমপরিমাণ বদলা তাকে দেয়া হবে।

(إِلَّا أَنْ يَتَجَاوَزَ اللّٰهُ عَنْهَا) অর্থাৎ- তবে আল্লাহ যদি তাওবাহ্ গ্রহণের মাধ্যমে তার পাপ থেকে পাশ কাটিয়ে যান অথবা ক্ষমা করার মাধ্যমে যদিও সে তাওবাহ্ না করে। এতে আহলুস্ সুন্নাহ্’র দলীল আছে যে, বান্দা আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে যদি তিনি চান তাহলে তার পাপরাশিকে পাশ কাটিয়ে চলবেন, আর চাইলে তাকে পাকড়াও করবেন। আর কাবীরাহ্ গুনাহকারীদের জাহান্নামী হওয়ার বিষয় অকাট্যভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে যেমন মু‘তাযিলাহ্ সম্প্রদায় মনে করে থাকে। অতঃপর (الى اضعاف كثيرة) এভাবে মিশকাতের সকল কপিতে এসেছে আর তা লেখক অথবা কপি তৈরিকারীর অতিরিক্ত এবং বিনা সন্দেহে তা ভুল, কেননা তা সহীহুল বুখারীতে নেই, সুনানে নাসায়ীতেও তা আসেনি এবং তা জামি‘উস্ সগীর, মাসাবীহ এবং কান্য-এও (১ম খণ্ড ৬০ পৃষ্ঠাতে) তা আসেনি। ইমাম নাসায়ী তাঁর সুনানে কিতাবুল ঈমানে মাওসূলভাবে বর্ণনা করেছেন, হাসান বিন সুফ্ইয়ান তাঁর মুসনাদে, বাযযার বায়হাক্বী শু‘আবে ও ইসমা‘ঈলীতে। আর তা শব্দ ‘আবদুল্লাহ বিন নাফি‘-এর সানাদে তিনি মালিক থেকে, আর মালিক যায়দ বিন আসলাম থেকে আর তিনি ‘আত্বা বিন ইয়াসার থেকে আর ‘আত্বা আবূ সাঈ‘দ আল খুদরী থেকে বর্ণনা করেন, নিশ্চয়ই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, বান্দা যখন ইসলাম গ্রহণ করবে তখন আল্লাহ তার জন্য প্রত্যেক ঐ পুণ্য কাজ লেখবেন যা সে পূর্বে করেছে এবং তার থেকে প্রত্যেক ঐ গুনাহসমূহ মিটিয়ে দিবেন যা সে পূর্বে করেছে। এরপর যখনই সে ভাল ‘আমল করবে তখন তার সাওয়াব দশগুণ থেকে সাতশত গুণ লিখতে বলা হবে। পক্ষান্তরে পাপের বদলা সে পরিমাণেই লিখতে বলা হবে। তবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলে তা আলাদা কথা। দারাকুত্বনী একে ‘মালিকিল গারায়িব’-এ নয়টি সানাদ কর্তৃক বর্ণনা করেছেন।

আর মালিক থেকে তালহা বিন ইয়াহ্ইয়া-এর সানাদে এর শব্দ হল, যে কোন বান্দা ইসলাম গ্রহণ করবে অতঃপর তার ইসলামকে সুন্দর করবে তাহলে আল্লাহ তার প্রত্যেক ঐ পুণ্য লিখবেন যা সে পূর্বে করেছিল এবং তার থেকে প্রত্যেক ঐ গুনাহ মিটিয়ে দিবেন যা সে পূর্বে করেছিল। নাসায়ীতেও অনুরূপ আছে, কিন্তু সেখানে زلف নেই ازلفها আছে যা সকল বর্ণনাতে প্রমাণিত হয়েছে, যা বুখারীর বর্ণনা থেকে পড়ে গিয়েছে। আর তা হল ইসলামের পূর্বে পূর্বোক্ত পুণ্যসমূহের লিখনী। আর তাঁর উক্তি كتب الله অর্থাৎ- আল্লাহ লিখার নির্দেশ দিবেন। দারাকুত্বনীতে মালিক থেকে ইবনু শু‘আয়ব-এর সানাদে আছে, আল্লাহ মালায়িকাহকে (ফেরেশতাকে) (ফেরেশতাগণের উদ্দেশে) বলবেন, তোমরা লিখ।

এক মতে বলা হয়েছে, বুখারী একে সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করেছেন এবং অন্যেরা যা বর্ণনা করেছে তিনি তা ইচ্ছাকৃতভাবে ফেলে দিয়েছেন। কেননা তা নীতিমালা অনুযায়ী জটিল। অতঃপর আল মাযিরী বলেন, এরপর কাযী ‘ইয়ায ও অন্যান্যগণ বলেন, কাফির ব্যক্তি কর্তৃক নৈকট্যলাভ বিশুদ্ধ হবে না। সুতরাং শির্কের যুগে তার সৎকাজের উপর ভিত্তি করে তাকে সাওয়াব দেয়া হবে না। কেননা নৈকট্যলাভকারী সাব্যস্ত হওয়ার জন্য শর্ত হল সে যার নৈকট্য লাভ করে তার সম্পর্কে তার জ্ঞাত থাকা। আর কাফির এ রকম না। সুতরাং তার নৈকট্যলাভ আশা করা যায় না। আর নাবাবী একে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অতঃপর বলেছেন সঠিক ঐ মতটি যার উপর বিশ্লেষকগণ আছেন। বরং তাদের কতকে নকল করেছেন যাতে সকলের ঐকমত্য আছে যে, কাফির ব্যক্তি যখন আল্লাহর নৈকট্যলাভ করার জন্য সুন্দর কাজ করবে, যেমন- সদাকাহ্ করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক ঠিক রাখা, দাস মুক্ত করা ইত্যাদি। অতঃপর ইসলাম গ্রহণ করবে ও ইসলামের উপর মারা যাবে তখন নিশ্চয়ই তার সাওয়াব তার জন্য লিখা হবে। এর দলীল, নাসায়ী, দারাকুত্বনী ও অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে আবূ সাঈ‘দ আল খুদরীর হাদীস এবং সহীহায়নে হাকীম ইবনে হিযাম-এর হাদীস, নিশ্চয়ই তিনি আল্লাহর রসূলকে বললেন, আপনি কি ঐ বিষয়াবলীর কথা ভেবেছেন? জাহিলী যুগে আমি যে পুণ্য কাজ করতাম, তাতে আমার কি কিছু চাওয়া-পাওয়ার আছে? তখন আল্লাহর রসূল তাকে বললেন, তুমি অতীতে যা পুণ্য কাজ করেছ তার উপরই তুমি ইসলাম গ্রহণ করেছ।

কাফির অবস্থাতে ব্যক্তি থেকে যা প্রকাশ পেত যা ব্যক্তি ভাল হিসেবে ধারণা করত তার সাওয়াব ইসলামী যুগে আল্লাহ তার ভাল কাজের দিকে সম্বন্ধ করবেন। এ থেকে বাধাদানকারী কেউ নেই। যেমন সূচনালগ্নেই যদি কোন ‘আমল ছাড়াই তার ওপর অনুগ্রহ করতে পারেন যেমন অপরাগ ব্যক্তির ওপর ঐ সাওয়াবের মাধ্যমে যা সে সুস্থাবস্থায় করত। অতএব ব্যক্তি যা করেনি তার সাওয়াব তার জন্য লিপিবদ্ধ করা যদি সম্ভব হয় তাহলে সে শর্তপূরণ ছাড়াবস্থায় যা করেছে তার সাওয়াব তার জন্য লেখা সম্ভব হবে। আর ইবনু বাত্তাল আবূ সাঈ‘দ-এর (নিজ ইচ্ছানুযায়ী বান্দার ওপর অনুগ্রহ করা আল্লাহর ক্ষমতার অধীন এ ব্যাপারে কারো কোন আপত্তি নেই।) এ হাদীস উল্লেখের পর বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর (‘আয়িশাহ্ (রাঃ) যখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ইবনু জাদ্‘আন সম্পর্কে প্রশ্ন করলেন সে যা কল্যাণকর কাজ করত তা কি তার উপকারে আসবে? এরপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে কোন দিন বলেনি হে আমার প্রভু! তুমি বিচারের দিন আমাকে ক্ষমা করে দিও) এ উক্তির দ্বারা অনেকে দলীল গ্রহণ করেছেন। অতএব এ উক্তিটি ঐ কথার উপর প্রমাণ বহন করছে যে, ইবনু জাদ্‘আন যদি ইসলাম গ্রহণের পর কোন দিন বলত, হে আমার প্রভূ! তুমি বিচারের দিন আমার পাপ ক্ষমা করে দিও তাহলে সে কুফরী অবস্থায় যা করেছিল তা তার উপকারে আসত। ‘উবায়দুল্লাহ মুবারকপূরী বলেন, আমি বলব, যারা এ ধরনের উক্তি করেনি তারা হাকীম বিন হিযাম-এর হাদীসের কয়েক দিক দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন।

১. (اسلمت على ما اسلفت من خير) এর অর্থ হল, নিশ্চয়ই তুমি তোমার ঐ কাজের মাধ্যমে সুন্দর স্বভাব অর্জন করেছ। ঐ স্বভাব কর্তৃক তুমি উপকৃত হবে। আনুগত্যের কাজে তোমার যে প্রশিক্ষণ লাভ হবে সে কারণে তুমি নতুন চেষ্টার মুখাপেক্ষী হবে না। অতএব তোমার ইসলাম গ্রহণের পর তার কারণে তোমার উপকৃত হওয়ার দ্বারা যে ‘আমলগত হয়েছে সে সম্পর্কে আল্লাহর কৃপা কর্তৃক তোমাকে সাওয়াব দেয়া হবে।

২. তার মাধ্যমে তুমি ইসলামে উত্তম প্রশংসা অর্জন করেছ, সুতরাং তা ইসলামে তোমার ওপর স্থায়ী থাকবে।

৩. নিশ্চয়ই সে ইসলামে যে পুণ্যকর্মগুলো করেছে তাতে সাওয়াব বেশি দেয়া এবং পূর্বে তার যে সমস্ত প্রশংসিত কাজ অতিবাহিত হয়েছে তার সাওয়াব বেশি করে দেয়া অসম্ভব নয়। এটাও এসেছে যে, কাফির ব্যক্তি যখন ভাল কাজ করে ঐ কাজের কারণে তার থেকে শাস্তি হালকা করা হয়। সুতরাং ঐ ভাল কাজের দরুন তার সাওয়াবে বৃদ্ধি করে দেয়া অসম্ভব নয়।

৪. তোমাকে তোমার বিগত হওয়া কল্যাণকর কাজের বারাকাতে ইসলামের দিকে পথপ্রদর্শন করা হয়েছে, কেননা সূচনা শেষের উদাহরণ।

৫. নিশ্চয়ই ঐ কর্মসমূহের কারণেই তোমাকে প্রশস্ত রিযক দান করা হয়েছে।

ইবনুল জাওযী বলেন, একমতে বলা হয়েছে, নিশ্চয়ই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর থেকে গোপন করেছেন কেননা হাকীম বিন হিযাম তাকে প্রশ্ন করল তাতে কি আমার কোন সাওয়াব আছে? তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কল্যাণ থেকে যা অতিবাহিত হয়েছে তুমি তার উপর ইসলাম গ্রহণ করেছ; আর মুক্তি হল কল্যাণকর কাজ এতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেন উদ্দেশ্য করেছেন, নিশ্চয়ই তুমি ভাল কাজ করেছ আর ভাল কাজের কর্তার প্রশংসা করা হয় এবং দুনিয়াতে তার বদলা দেয়া হয় মুসলিম মারফূ' সূত্রে আনাস-এর হাদীস বর্ণনা করেন, নিশ্চয়ই কাফির ব্যক্তি যে সমস্ত ভাল কাজ করে তার উপর ভিত্তি করে তাকে রিযক্বের মাধ্যমে ইহজীবনে সাওয়াব দেয়া হয়। আর কারো কাছে গোপন না যে ব্যাখ্যাকারীগণ যে সকল উক্তির মাধ্যমে হাকীম বিন হিযাম-এর হাদীসের ব্যাখ্যা করেছে তাতে কৃত্রিমতা আছে, যা বাহ্যিকতার বিপরীত। সুতরাং প্রণিধানযোগ্য বিশ্বস্ত উক্তি হল, ওটা যে উক্তি ইমাম নাবাবীও তার অনুকূলকারীগণ করেছেন। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞাত।


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
পুনঃনিরীক্ষণঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১০: আল্লাহ তা‘আলার নামসমূহ (كتاب اسماء الله تعالٰى)

পরিচ্ছেদঃ ৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - আল্লাহ তা‘আলার রহমতের ব্যাপকতা

২৩৭৪-[১১] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা সৎ-অসৎ চিহ্নিত করে রেখেছেন। যে ব্যক্তি সৎ কাজের সংকল্প করে, কিন্তু তা করেনি আল্লাহ তা’আলা তার জন্য একটি পূর্ণ নেকী লিখে নেন। আর যদি সৎ কাজের সংকল্প করার পর তা বাস্তবায়ন করে, তাহলে আল্লাহ তা’আলা তাকে এই একটি সৎ কাজের জন্য দশ গুণ হতে সাতশ’ গুণ, বরং বহুগুণ পর্যন্ত সৎ কাজ হিসেবে লিখে রাখেন। আর যে ব্যক্তি অসৎ কাজের সংকল্প করে, কিন্তু বাস্তবে তা না করে, আল্লাহ তা’আলা তার জন্য একে একটি পূর্ণ নেক কাজ হিসেবে লিখে নেন। আর যদি অসৎ কাজের সংকল্প করার পর তা বাস্তবে করে, তাহলে আল্লাহ এর জন্য তার একটি মাত্র গুনাহ লিখে রাখেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]

بَابُ سَعْةِ رَحْمَةِ اللهِ

وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ الحسناتِ والسيِّئاتِ: فَمَنْ هَمَّ بِحَسَنَةٍ فَلَمْ يَعْمَلْهَا كَتَبَهَا اللَّهُ لهُ عندَهُ حَسَنَة كَامِلَة فَإِن هم بعملها كَتَبَهَا اللَّهُ لَهُ عِنْدَهُ عَشْرَ حَسَنَاتٍ إِلَى سَبْعِمِائَةِ ضِعْفٍ إِلَى أَضْعَافٍ كَثِيرَةٍ وَمَنْ هَمَّ بسيئة فَلَمْ يَعْمَلْهَا كَتَبَهَا اللَّهُ عِنْدَهُ حَسَنَةً كَامِلَةً فَإِن هُوَ هم بعملها كتبهَا الله لَهُ سَيِّئَة وَاحِدَة

وعن ابن عباس رضي الله عنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: إن الله كتب الحسنات والسيئات: فمن هم بحسنة فلم يعملها كتبها الله له عنده حسنة كاملة فإن هم بعملها كتبها الله له عنده عشر حسنات إلى سبعمائة ضعف إلى أضعاف كثيرة ومن هم بسيئة فلم يعملها كتبها الله عنده حسنة كاملة فإن هو هم بعملها كتبها الله له سيئة واحدة

ব্যাখ্যা: (وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ؓ قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ) আহমাদ ১ম খণ্ডে ৩১০ পৃষ্ঠাতে ‘আবদুল্লাহ বিন ‘আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন। তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। হাফেয বলেন, আমি এ হাদীসটি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ইবনু ‘আব্বাস-এর শ্রবণ সম্পর্কে স্পষ্টতা কোন সানাদে দেখিনি।

বুখারী, মুসলিম এবং মুসনাদে (فيما يروى عن ربه عزوجل) এভাবে এসেছে। অর্থাৎ- এটি হাদীসে কুদসীর আওতাভুক্ত। অতঃপর এটি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রব থেকে বিনা মধ্যস্থতায় বর্ণনা করেছেন বলে সম্ভাবনা রয়েছে এবং তা মালাকের (ফেরেশতার) মধ্যস্থতায় গ্রহণ করেছেন বলে সম্ভাবনা রয়েছে। হাফেয বলেন, এটিই প্রণিধানযোগ্য। কিরমানী বলেন, এটা মূলত ঐ কথা বর্ণনা করে দেয়ার জন্য যে, তা হাদীসে কুদসীসমূহের অন্তর্ভুক্ত।

অথবা যাতে আল্লাহ তা‘আলা পর্যন্ত স্পষ্ট সানাদ আছে তা বর্ণনা করে দেয়ার জন্য। যেমন তিনি বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ লিখে রেখেছেন এবং তা বর্ণনা করে দেয়ার জন্য হতে পারে বলে সম্ভাবনা আছে। তাতে এমন কিছু নেই যে, তিনি ছাড়া অন্য কেউ এমন নন। কেননা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহী ছাড়া কথা বলতেন না, তিনি যা বলতেন তা তাঁর কাছে ওহী মারফতই অবতীর্ণ হত।

(إِنَّ اللّٰهَ كَتَبَ الْحَسَنَاتِ وَالسَّيِّئاتِ) বুখারীতে আছে, যা তিনি তার পরাক্রমশালী ও মর্যাদাবান প্রভূ থেকে বর্ণনা করেন নিশ্চয়ই তিনি বলেন, তিনি বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ লিখে রেখেছেন... শেষ পর্যন্ত। হাফেয বলেন, (ان الله كتب الخ) এটি আল্লাহ তা‘আলার কথা হওয়ার সম্ভাবনা আছে তখন উহ্য বাক্য (রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ বলেছেনঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ লিখে রেখেছেন) এরূপ হবে এবং তা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উক্তি হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে যাতে তিনি আল্লাহর কাজ সম্পর্কে বর্ণনা করেন। তখন উহ্য বাক্য (ইবনু ‘আব্বাস বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ লিখে রেখেছেন)। আহমাদ ১ম খণ্ডে ২৭৯ পৃষ্ঠাতে

 عن ابن عباس عن رسول الله صلى الله عليه وسلم فيما روى عن ربه قال : قال رسول الله ان ربكم تبارك وتعالى رحيم من هم بحسنة

অর্থাৎ- রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রব থেকে যা বর্ণনা করেন সে সম্পর্কে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ইবনু ‘আব্বাস কর্তৃক বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয়ই তোমাদের প্রভু বারাকাতময়, সুউচ্চ যে পুণ্যের ইচ্ছা করেছে তার প্রতি দয়ালু) এ শব্দে এসেছে। বুখারীতে আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)  থেকে

عن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال : يقول الله عزوجل اذا اراد عبدى ان يعمل

অর্থাৎ- ‘‘রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত। নিশ্চয়ই তিনি বলেন, পরাক্রমশালী ও মর্যাদাবান আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা যখন ‘আমল করার ইচ্ছা করবে’’ এ শব্দে এসেছে। মুসলিম-এর এক বর্ণনাতে আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, পরাক্রমশালী ও মর্যাদাবান আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা যখন ইচ্ছা করবে।

(كتب الخ) অর্থাৎ- ঘটনা অনুপাতে তিনি পাপ ও পুণ্যকে ‘ইল্মে আযালীতে প্রমাণ করে রেখেছেন। অথবা كتب এর অর্থ হল আল্লাহ পাপ ও পুণ্য লাওহে মাহফূযে লিখে রাখার ব্যাপারে মালায়িকাহর (ফেরেশতাগণের) নির্দেশ করেছেন অথবা পুণ্যসমূহ লিখে রেখেছেন, অর্থাৎ- পুণ্যের ব্যাপারটি ফায়সালা করে রেখেছেন, পুণ্য হিসেবে নির্ধারণ করে রেখেছেন। এভাবে পাপের বিষয়টিও পাপ হিসেবে নির্ধারণ করে রেখেছেন। অথবা উভয়কে লিখার মাধ্যমে সংরক্ষণ করতে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন। যাতে পাপ, পুণ্যকে বা তাদের খাতাগুলোকে কিয়ামতের দিন ওযন করা যায়। আর বুখারী, মুসলিমে এবং মুসনাদে ১ম খণ্ডে ৩৬১ পৃষ্ঠাতে এরপরে (ثم بين ذلك) আছে। অর্থাৎ- অতঃপর আল্লাহ তাঁর (كتب الحسنات والسيئات) এ উক্তি যা সংক্ষিপ্তভাবে বলেছেন তা তাঁর (فمن هم) এ উক্তির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন।

(فَمَنْ هَمَّ) ত্বীবী বলেন, এখানে الفاء বর্ণটি বিশ্লেষণের জন্য, কেননা كتب الحسنات উক্তিটি অস্পষ্ট এ অংশ থেকে লিখনীর পদ্ধতি জানা যায়নি। আর الهم বলতে কাজের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেয়া। সুতরাং هممت بكذا অর্থাৎ- আমি হিম্মাতের সাথে ইচ্ছা করেছি আর তা অন্তরে হঠাৎ কোন কিছু জাগ্রত হয়ে চলে যাওয়ার উপর পর্যায়ের। আর মুসলিমে আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস (من هم) এসেছে। বুখারীতে তাওহীদ পর্বে اذا اراد এসেছে। পক্ষান্তরে মুসলিমে اذا هم এসেছে। এ শব্দগুলো একই অর্থে ব্যবহৃত। অর্থাৎ- পুণ্য কাজের উপর তার ইচ্ছা দৃঢ় হল। এমন বর্ণনা এসেছে যা ঐ কথার উপর প্রমাণ বহন করে যে, সাধারণ ইচ্ছা যথেষ্ট নয়।

(كَتَبَهَا اللّٰهُ) অর্থাৎ- আল্লাহ তা নির্ধারণ করে ফায়সালা করে রেখেছেন অথবা বুখারীতে কিতাবুত্ তাওহীদে 

(اذا اراد عبدى ان يعمل سيئة فلا تكتبوها عليه حتى يعملها)

অর্থাৎ- ‘‘আমার বান্দা যখন মন্দ কর্ম করার ইচ্ছা করবে তখন তার ওপর তোমরা ঐ পাপ কাজটি লিখবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তার ওপর সে ‘আমল না করে।’’

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) এর বর্ণিত হাদীস দ্বারা বুঝা যায় আল্লাহ হিফাযাতকারী মালায়িকাহকে (ফেরেশতাদেরকে) তা লিখার ব্যাপারে নির্দেশ করেছেন। মুসলিমও এরূপ বর্ণনা করেছেন। আর তাতে ঐ ব্যাপারে দলীল আছে যে, মানুষের হৃদয়ে যা আছে মালাক সে ব্যাপারে অবগত। হয়ত আল্লাহ তাকে জানিয়ে দেয়ার মাধ্যমে অথবা তার কোন চিহ্ন তৈরির মাধ্যমে যার মাধ্যমে তা বুঝা যেতে পারে। প্রথমটিকে সমর্থন করেছেন ইবনু আবিদ্ দুন্ইয়া আবূ ‘ইমরান আল জাওনী থেকে যা বর্ণনা করেছেন। তাতে আছে, তিনি বলেছেন, আল্লাহ মালায়িকাহ্ (ফেরেশতা)’কে ডাক দিয়ে বলেন, তুমি অমুকের জন্য এরূপ এরূপ লিখ তখন মালাক বলেন, হে আমার পালনকর্তা! নিশ্চয়ই সে তা ‘আমল করেনি। তখন আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই সে তার নিয়্যাত করেছে। একমতে বলা হয়েছে, বরং মন্দ কর্মের ইচ্ছার সময় মালাক পঁচা গন্ধ পেয়ে থাকে, পক্ষান্তরে ভালো কর্মের ইচ্ছার সময় ভালো গন্ধ পেয়ে থাকেন। ত্ববারী এটিকে আবূ মা‘শার আল মাদানী থেকে সংকলন করেছেন।

(عِنَدَه) অর্থাৎ- আল্লাহর নিকট, এতে মর্যাদার দিকে ইঙ্গিত আছে।

(حَسَنَةً) আর এটা এ কারণে যে, ‘আমল নিয়্যাতের উপর নির্ভরশীল, আর মু’মিন ব্যক্তির নিয়্যাত তার ‘আমল অপেক্ষা উত্তম। নিয়্যাতের উপর নির্ভর করেই তার সাওয়াব দেয়া হয়, ‘আমলের কারণে নয়। আর নিয়্যাত ছাড়া ‘আমলের উপর সাওয়াব দেয়া হয় না। কিন্তু শুধু নিয়্যাতের কারণে পুণ্যের সাওয়াব বৃদ্ধি করা হয় না। এভাবে মিরকাতে এসেছে, ত্বওফী বলেনঃ কেবল ইচ্ছার কারণে পুণ্য লিখা হয়, কেননা পুণ্যের ইচ্ছা ‘আমলের কারণ। আর কল্যাণের ইচ্ছা করাও কল্যাণ, কেননা কল্যাণের ইচ্ছা করা অন্তরের ‘আমলের অন্তর্গত। জটিল হয়ে পড়েছে যে, অন্তরের ‘আমল যখন পুণ্য অর্জনের ব্যাপারে বিবেচনা করা হবে তখন কি করে পাপ অর্জনের ব্যাপারে চিন্তা করা হবে না? উত্তরঃ যে পাপের ব্যাপারে ইচ্ছা সৃষ্টি হয়েছে ঐ পাপ বর্জন করা অর্জিত পাপকে মিটিয়ে দিবে। কেননা এতে পাপের ক্ষেত্রে তা বিবেচনা রহিত হয়ে যায় এবং প্রবৃত্তির বিরোধিতা করা হয়।

(كَامِلَةً) অর্থাৎ- তাতে কোন কমতি নেই। যদিও তা কেবল ইচ্ছা থেকে সৃষ্টি হয়। সুতরাং হাদীসে পুণ্যের ঘাতটির প্রতি ধারণাকে দূর করে দেয়ার প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে, কেননা ঐ পাপে ইচ্ছা কেবল ইচ্ছার মাধ্যমে সৃষ্ট এবং বহুগুণ সাওয়াব দেয়ার সম্ভাবনাকেও দূর করে দেয়ার দিকে ইঙ্গিত রয়েছে। কেননা তা কাজের সাওয়াবের মতো না। যে কাজে বহুগুণ সাওয়াব দেয়ার কথা আছে যার সর্বনিম্ন পরিমাণ দশগুণ।

ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেন, তিনি তার عنده উক্তি দ্বারা তার উক্তির প্রতি অধিক মনোযোগের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন এবং كاملة উক্তি দ্বারা পুণ্যের মর্যাদার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন ও তার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। সুতরাং كمال দ্বারা মহা মর্যাদা উদ্দেশ্য দশগুণে গুণান্বিত করা উদ্দেশ্য নয়। যেমন তাদের কতকে ধারণা করেছে যে, كاملة ঐ কথার উপর প্রমাণ বহন করছে যে, পুণ্যের বদলা তার দশগুণ দেয়া হবে, কেননা এটিই হল পূর্ণাঙ্গ। এটি ঠিক নয়, কেননা এতে কল্যাণের ইচ্ছাকারী ও কর্তার মাঝে সমতা আবশ্যক হয়ে যাচ্ছে। অথচ বহুগুণ শুধু ‘আমলকারীর সাথে নির্দিষ্ট। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, অর্থাৎ- ‘‘যে ব্যক্তি পুণ্য কাজ করবে তাকে সে পুণ্য কাজের দশগুণ সাওয়াব দেয়া হবে।’’ (সূরা আল আন্‘আম ৬ : ১৬)

বহুগুণ সাওয়াবের জন্য শর্ত হল কাজটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে সম্পাদন হওয়া। পক্ষান্তরে নিয়্যাতকারীর ব্যাপারে কেবল পুণ্য লিপিবদ্ধের কথা বলা হয়েছে। এর অর্থ হল, তার জন্য পুণ্য কর্মের সাওয়াবের মতো সাওয়াব লিখা। আর تضعيف বলতে বহুগুণ, অর্থাৎ- পুণ্যকর্মের মূল সাওয়াবের উপর অতিরিক্ত পরিমাণ।

হাফেয বলেন, হাদীসের বাহ্যিক দিক হল, শুধু পাপের ইচ্ছা বর্জনের কারণেই সাওয়াব অর্জন হয়। চাই পাপ বর্জনের ব্যাপারটি কোন প্রতিবন্ধকতার কারণে হোক বা প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই হোক। এ কথা বলারও দিক রয়েছে যে, প্রতিবন্ধক অনুপাতে পুণ্যের মর্যাদাও বিভিন্ন হয়ে থাকে। অতঃপর যে ব্যক্তি পুণ্য কাজের প্রতি ইচ্ছা করেছে তার ইচ্ছার অবশিষ্টতার সাথে সাথে তার প্রতিবন্ধকটি বাহ্যিক হয় তাহলে সে পুণ্য মহামর্যাদাকর। আর বিশেষ করে পুণ্য কাজের বিচ্যুতি ঘটার কারণে ব্যক্তির পুণ্যের সাথে যদি লজ্জা শামিল হয় এবং ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যদি নিয়্যাত স্থির হয়, আর কল্যাণকর কাজের বর্জন যদি ইচ্ছাকারীর তরফ থেকে হয় তাহলে তা মহামর্যাদার কিছুটা নিম্নের পর্যায়ের। তবে পুণ্যকর কাজের ক্ষেত্রে যদি পুণ্যকর কাজ থেকে সম্পূর্ণ মুখ ফিরিয়ে নেয়া উদ্দেশ্য হয় তাহলে আলাদা কথা। আর কল্যাণকর কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া বিশেষ করে ‘আমল যদি কল্যাণের বিপরীতে সংঘটিত হয় উদাহরণস্বরূপ কেউ একটি দিরহাম দান করার ইচ্ছা করল, অতঃপর স্বচক্ষে তা অবাধ্য কাজে ব্যয় করল শেষ মতানুযায়ী যা প্রকাশ পাচ্ছে তা হল মূলত তার জন্য কোন পুণ্য লেখা হবে না। পক্ষান্তরে এর পূর্বের মতানুযায়ী পুণ্য লিখার বিষয়টি সম্ভাবনার উপর নির্ভরশীল।

(عَشْرَ حَسَنَاتٍ) ‘‘দশটি সাওয়াব’’। আল্লাহ বলেনঃ ‘‘যে ব্যক্তি ভাল কাজ করবে তার জন্য সে ভাল কাজের দশগুণ সাওয়াব থাকবে’’- (সূরা আল আন্‘আম ৬ : ১৬০)। আল্লাহ পুণ্যের বহুগুণ সাওয়াবের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তার মাঝে এটা সর্বনিম্ন সংখ্যা। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উক্তি অতঃপর ব্যক্তি পুণ্যের প্রতি ইচ্ছা করে যদি ‘আমল করে আল্লাহ তার জন্য দশগুণ নেকি লেখবেন। আল্লাহ মূলত পুণ্যকাজের ইচ্ছাকারীর সাওয়াবকে দশগুণে গুনান্বিত করবেন। সুতরাং সব মিলে এগারো সংখ্যায় পরিণত হবে। অতঃপর নিশ্চয়ই এ ব্যাখ্যাটি এ হাদীসের বাহ্যিকতার বিপরীত।

(إِلٰى أَضْعَافٍ كَثِيرَةٍ) অর্থাৎ- নিষ্ঠা, ইচ্ছার সততা, আন্তরিক উপস্থিতি, উপকার ছড়িয়ে পড়া, যেমন- সদাকায়ে জারিয়াহ্, উপকারী বিদ্যা, উত্তম সুন্নাত, উত্তম ‘আমল ইত্যাদি ক্ষেত্রে আধিক্যতা অনুপাতে।

(وَمَنْ هَمَّ بِسَيِّئَةٍ فَلَمْ يَعْمَلْهَا) ‘‘যে ব্যক্তি পাপ করার ইচ্ছা করল, অতঃপর তা বাস্তবে করল না।’’ অর্থাৎ- পাপের উপর ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর তদারকির কারণে ও তাঁর ভয়ে। যা বুখারীতে কিতাবুত্ তাওহীদে আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) -এর হাদীসে এসেছে। আর বান্দা যদি তা আমার কারণে বর্জন করে তাহলে তার জন্য একটি পুণ্য লিখ। আর মুসলিমে আছে, আর সে যদি তা বর্জন করে থাকে তাহলে তার জন্য একটি পুণ্য লিখ সে কেবল তা আমার কারণেই ছেড়ে দিয়েছে।

হাফেয বলেন, অবাধ্যতার ইচ্ছায় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সঞ্চালনের কারণে পাকড়াও করা হবে না যখন ইচ্ছাকৃত বিষয়ের প্রতি ‘আমল না করা হবে। এটা করা হবে ইচ্ছা ও মধ্যস্ততার মাঝে পার্থক্য সাধনের জন্য। কতকে অন্তরে পতিত হওয়া বিষয়কে কয়েক প্রকারে বিভক্ত করেছেন যা তার থেকে প্রকাশ পায়। অবাধ্যতার ইচ্ছাসমূহের মাঝে যা। হঠাৎ জাগ্রত হয়ে মুহূর্তের মাঝে চলে যায়। এটা কুমন্ত্রণা বা ওয়াস্ওয়াসার অন্তর্ভুক্ত। আর ক্ষমা করে দেয়া হবে। এটা সিদ্ধান্তহীনতার নিম্নের পর্যায়ে। আর তা এর উপরে হল কোন বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় থাকা, অতঃপর সে ব্যাপারে ইচ্ছা করা পুনরায় সে ইচ্ছা দূর হয়ে যাওয়াতে ঐ কাজ বর্জন করা। অতঃপর আবার ইচ্ছা করে আবার এভাবে বর্জন করা, তার ইচ্ছার উপর স্থির না হওয়া। এটিই হল, تردد বা সিদ্ধান্তহীনতা, এটিও ক্ষমা করে দেয়া হবে। এর উপর পর্যায় হল, ব্যক্তি অবাধ্যতার ইচ্ছার প্রতি ঝুঁকবে তা এড়িয়ে যাবে না তবে কাজের ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্প করবে না এটাই হল الهم (হাম্) এ ক্ষেত্রেও ক্ষমা করা হবে। এর উপর পর্যায় হল, ব্যক্তি মন্দের প্রতি ঝুঁকবে, তা এড়িয়ে চলবে না বরং সে মন্দ কাজের প্রতি দৃঢ় সংকল্প করবে এটাই হল العزم (‘আযম), এটাই হল الهم এর চূড়ান্ত পর্যায়। العزم আবার দু’ প্রকার প্রথম প্রকার হলঃ এটি কেবল অন্তরের ‘আমলসমূহের অন্তর্ভুক্ত। যেমন একত্ববাদ, নবূওয়্যাত ও পুনরুত্থানে সন্দেহ করা। এটি কুফর। এ কারণেই তাকে নিশ্চিতভাবে শাস্তি দেয়া হবে। এর নিম্নে হল ঐ অবাধ্যতা যা কুফর পর্যন্ত পৌঁছে না যেমন ঐ ব্যক্তি আল্লাহর বিদ্বেষ পোষণ করা জিনিসকে ভালবাসে, পক্ষান্তরে আল্লাহ যা ভালবাসেন তার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, অন্যায়ভাবে মুসলিম ব্যক্তিকে কষ্ট দেয়া পছন্দ করে এ ব্যক্তি এর মাধ্যমে গুনাহ করবে। এর সাথে আরো শামিল হবে অহংকার, বড়াই, অবিচার, চক্রান্ত ও হিংসা।

দ্বিতীয় প্রকারঃ তা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ‘আমলসমূহের অন্তর্ভুক্ত। যেমন- যিনা, চুরি করা, আর এটি এমন যাতে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়েছে। অতঃপর এক দল মত পেশ করেছেন এ কারণে মূলত পাকড়াও করা হবে না। এটি ইমাম শাফি‘ঈর ভাষ্য কর্তৃক বর্ণিত। খারীম বিন ফাতিক-এর হাদীসে যা এসেছে তা একে সমর্থন করছে। যেখানে তিনি পুণ্য কাজের প্রতি ইচ্ছার কথা উল্লেখ সেখানে তিনি (খারীম) বলেছেন, আল্লাহ জানেন তিনি বান্দার অন্তরের পুণ্যের ব্যাপারে অবহিত করেছেন ও সে ব্যাপারে তাকে লালায়িত করেছেন, পক্ষান্তরে যেখানে পাপ কাজের প্রতি ইচ্ছার কথা বর্ণনা করেছেন সেখানে ইচ্ছাকে কোন শর্তের সাথে জোড়ে দেননি। বরং সেখানে বলেছেন, যে ব্যক্তি পাপ কাজের প্রতি ইচ্ছা করবে তার উপর কিছুই লিখা হবে না। স্থানটি কৃপা প্রদর্শনের স্থান, সুতরাং এ ক্ষেত্রে সংকীর্ণতা প্রদর্শন মানানসই নয়। পাপ কাজের প্রতি দৃঢ় সংকল্পের কারণে ব্যক্তিকে শাস্তির মুখোমুখী করা হবে অনেক বিদ্বানগণ এ মত পোষণ করেছেন।

ইবনুল মুবারক সুফ্ইয়ান সাওরীকে প্রশ্ন করল বান্দা যে পাপ কাজের প্রতি ইচ্ছা করে সে কারণে কি তাকে পাকড়াও করা হবে? উত্তরে তিনি বলেন, যখন বান্দা সে ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্প করবে। আর তাদের অনেকে আল্লাহর [অর্থাৎ- ‘‘তবে তোমাদের অন্তর যা অর্জন করেছে সে কারণে তোমাদেরকে পাকড়াও করা হবে’’- (সূরা আল বাকারাহ্ ২ : ২২৫)] এ বাণী দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছে আর তারা আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) এর

 (ان الله تجاوز لأمتى عما حدثت به انفسها مالم تعمل به او تتكلم) অর্থাৎ- ‘‘নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মাতের অন্তরে যা সৃষ্টি হয় তা থেকে তিনি পাশ কেটে চলেন যতক্ষণ পর্যন্ত সে ঐ ব্যাপারে ‘আমল না করে অথবা কথা না বলে।’’ এ সহীহ মারফূ‘ হাদীসটিকে কুমন্ত্রণাসমূহের উপর চাপিয়ে দিয়েছে।

(كَتَبَهَا اللهُ لَه سَيِّئَةً وَاحِدَةً) ‘‘আল্লাহ একটি পাপ লিখবেন’’। এটি বুখারীর বর্ণনা, মুসলিম আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) এর হাদীসে আছে (فاكتبوها له بمثلها) অর্থাৎ- তোমরা তার জন্য তার অনুরূপ পাপ লিখ। আর মুসলিমে আবূ যার-এর হাদীসে আছে (فجزاءه بمثلها او اغفرله) অর্থাৎ- তার বদলা তার অনুরূপ অথবা তাকে আমি ক্ষমা করে দিব।

মুসলিমে ইবনু ‘আব্বাস-এর হাদীসের শেষে (او محاها الله) অথবা গুনাহ মুছতে পারে এমন পুণ্য ‘আমল দ্বারা তার গুনাহ মুছে দিবেন।


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
পুনঃনিরীক্ষণঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১০: আল্লাহ তা‘আলার নামসমূহ (كتاب اسماء الله تعالٰى)
দেখানো হচ্ছেঃ থেকে ১১ পর্যন্ত, সর্বমোট ১১ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে