নবী-রাসূলগণের দা‘ওয়াতী মূলনীতি মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম আত-তুওয়াইজিরী ১০১ টি
নবী-রাসূলগণের দা‘ওয়াতী মূলনীতি মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম আত-তুওয়াইজিরী ১০১ টি
ক. সৃষ্টিজগতের চিরন্তন রীতি (السنن الكونية)

আল্লাহ তা‘আলা তার ক্ষমতাবলে জগৎসমূহ সৃষ্টি করেছেন। তিনি তার রীতি অনুযায়ী তা পরিচালনাও করেন, আর তার এ রীতি দ্বারাই তার ক্ষমতাকে গোপন করেন। মহাপবিত্র আল্লাহ তা‘আলা এ মহাজগত সৃষ্টি করে তাতে প্রতিটি সৃষ্টির জন্য নিয়ম পদ্ধতি নির্ধারণ করেছেন, যার উপর সৃষ্টি জগত পরিচালিত হয়। আর এর মাধ্যমে শ্রবণ, আনুগত্য, উপকারিতা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে আল্লাহ তা‘আলার উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়। অতঃপর চন্দ্র, সূর্য, দিন, রাত্রি, উদ্ভিদ, প্রাণি জগত, বাতাস, পানি, সমুদ্র, পাহাড়-পর্বত, তারকারাজি, মেঘমালা এরূপ প্রতিটি সৃষ্টির জন্যই সুনির্দিষ্ট নিয়ম-পদ্ধতি রয়েছে, যার উপর এগুলো পরিচালিত হয় এবং আল্লাহর ইবাদত করে। একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ ছাড়া এগুলো পরিবর্তন হয় না।

১। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿سُبْحَانَ الَّذِي خَلَقَ الْأَزْوَاجَ كُلَّهَا مِمَّا تُنْبِتُ الْأَرْضُ وَمِنْ أَنْفُسِهِمْ وَمِمَّا لَا يَعْلَمُونَ (36) وَآيَةٌ لَهُمُ اللَّيْلُ نَسْلَخُ مِنْهُ النَّهَارَ فَإِذَا هُمْ مُظْلِمُونَ (37) وَالشَّمْسُ تَجْرِي لِمُسْتَقَرٍّ لَهَا ذَلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ (38) وَالْقَمَرَ قَدَّرْنَاهُ مَنَازِلَ حَتَّى عَادَ كَالْعُرْجُونِ الْقَدِيمِ (39) لَا الشَّمْسُ يَنْبَغِي لَهَا أَنْ تُدْرِكَ الْقَمَرَ وَلَا اللَّيْلُ سَابِقُ النَّهَارِ وَكُلٌّ فِي فَلَكٍ يَسْبَحُونَ (40)﴾ [يس: 36 - 40]

‘পবিত্র সত্তা তিনি, যিনি সৃষ্টি করেছেন সকল জোড়া জোড়া, যমীন থেকে উৎপন্ন উদ্ভিদ এবং তাদের (মানুষের) নিজেদের মধ্য থেকেও (পুরুষ ও নারী) আর সে সব কিছু থেকেও যা তারা জানে না (৩৬) আর রাত তাদের জন্য একটি নিদর্শন; আমরা তা থেকে দিনকে সরিয়ে নেই। ফলে তখনই তারা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায় (৩৭) আর সূর্য ভ্রমণ করে তার নির্দিষ্ট পথে, এটা মহাপরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ (আল্লাহ)-র নির্ধারণ (৩৮) আর চাঁদের জন্য আমি নির্ধারণ করেছি মানযিলসমূহ, অবশেষে সেটি খেজুরের শুষ্ক পুরাতন শাখার মত হয়ে যায় (৩৯) সূর্যের জন্য সম্ভব নয় চাঁদের নাগাল পাওয়া, আর রাতের জন্য সম্ভব নয় দিনকে অতিক্রম করা, আর প্রত্যেকেই কক্ষ পথে সন্তরণ করে’ (৪০) (সূরা ইয়াসীন ৩৬: ৩৬-৪০)।

২। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَسْجُدُ لَهُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ وَالنُّجُومُ وَالْجِبَالُ وَالشَّجَرُ وَالدَّوَابُّ وَكَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ وَكَثِيرٌ حَقَّ عَلَيْهِ الْعَذَابُ وَمَنْ يُهِنِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ مُكْرِمٍ إِنَّ اللَّهَ يَفْعَلُ مَا يَشَاءُ (18) ﴾ .. [الحج: 18]

‘তুমি কি দেখ না যে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে সিজদা করে যা কিছু রয়েছে আসমানসমূহে এবং যা কিছু রয়েছে যমীনে, সূর্য, চন্দ্র, তারকারাজি, পর্বতমালা, বৃক্ষলতা, জীব-জন্তু ও মানুষের মধ্যে অনেকে। আবার অনেকের উপর শাস্তি অবধারিত হয়ে আছে। আল্লাহ যাকে অপমানিত করেন তার সম্মানদাতা কেউ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ যা ইচ্ছা তাই করেন’ (সূরা আল-হাজ্জ: ১৮)।

৩। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿تُسَبِّحُ لَهُ السَّمَاوَاتُ السَّبْعُ وَالْأَرْضُ وَمَنْ فِيهِنَّ وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُبِحَمْدِهِ وَلَكِنْ لَا تَفْقَهُونَ تَسْبِيحَهُمْ إِنَّهُ كَانَ حَلِيمًا غَفُورًا (44)) [الإسراء: 44]

‘সাত আসমান ও যমীন এবং এগুলোর মধ্যে যা কিছু আছে, সব কিছু তাঁর তাসবীহ পাঠ করে এবং এমন কিছু নেই যা তাঁর প্রশংসায় তাসবীহ পাঠ করে না; কিন্তু তাদের তাসবীহ তোমরা বুঝ না। নিশ্চয় তিনি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ (সূরা বনী ইসরাঈল: ৪৪)।

৪। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿سُنَّةَ اللَّهِ الَّتِي قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلُ وَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّةِ اللَّهِ تَبْدِيلًا (23)) [الفتح: 23]

‘তোমাদের পূর্বে যারা গত হয়েছে, তাদের ব্যাপারে এটি আল্লাহর নিয়ম; আর তুমি আল্লাহর নিয়মে কোন পরিবর্তন পাবে না’ (সূরা আল-ফাতহ: ২৩)।

আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতিকে নিজ হাতে সৃষ্টি করে সকল সৃষ্টির উপর তাকে সম্মান ও মর্যাদা দান করেছেন, তাকে বহু সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। মানব জাতি সুনির্দিষ্ট নিয়ম পদ্ধতির মুখাপেক্ষী, ইহকালিন ও পরকালিন কল্যাণ লাভের জন্য সকল অবস্থায় যার উপর তারা পরিচালিত হবে। আর এ নিয়মনীতিই হলো দ্বীন বা জীবন ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা তাকে সম্মানিত করেছেন, এটাকে তার দ্বীন হিসাবে পছন্দ করেছেন এবং এটা ছাড়া অন্য কিছুকে (অন্য কোন দ্বীনকে) তিনি তার পক্ষ থেকে গ্রহণ করবেন না। এ দ্বীনকে আঁকড়ে ধরা অথবা এ থেকে বিমুখ হওয়ার মাপকাঠি অনুযায়ী আল্লাহ তা‘আলা মানুষের কল্যাণ ও অকল্যাণ নির্ধারণ করেন এবং এ দ্বীন গ্রহণ করা বা প্রত্যাখ্যান করার ব্যাপারে তাকে স্বাধীনতা দিয়ে থাকেন।

১। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا) [المائدة: 3]

‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম আর ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসাবে পছন্দ করলাম ’ (সূরা আল-মায়েদা: ৩)।

২। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿وَقُلِ الْحَقُّ مِنْ رَبِّكُمْ فَمَنْ شَاءَ فَلْيُؤْمِنْ وَمَنْ شَاءَ فَلْيَكْفُرْ) ... [الكهف: 29]

‘আর বল, হক্ব তোমাদের রবের পক্ষ থেকে। সুতরাং যে ইচ্ছা করে, সে ঈমান আনুক এবং যে ইচ্ছা করে, সে কুফরী করুক’ (সূরা আল-কাহফ: ২৯)।

৩। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿قُلْنَا اهْبِطُوا مِنْهَا جَمِيعًا فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُمْ مِنِّي هُدًى فَمَنْ تَبِعَ هُدَايَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ (38) وَالَّذِينَ كَفَرُوا وَكَذَّبُوا بِآيَاتِنَا أُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ (39)) [البقرة: 38 - 39]

‘আর আমরা বললাম, তোমরা সবাই তা থেকে নেমে যাও। অতঃপর যখন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে কোন হেদায়াত আসবে, তখন যারা আমার হেদায়াত অনুসরণ করবে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না (৩৮) আর যারা কুফরী করেছে এবং আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে, তারাই আগুনের অধিবাসী। তারা সেখানে স্থায়ী হবে (সূরা আল-বাকবারা: ৩৭-৩৯)।

গ. মানব জাতির প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ (فضل الله على البشرية)

আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতিকে সৃষ্টি করে আসমান-যমীনে অবস্থিত সবকিছু তাদের জন্য বশীভূত করে দিয়েছেন এবং তার জন্য নেয়ামতরাজি বরাদ্দ করেছেন। তাদের উপর নাযিল করেছেন কিতাবসমূহ এবং তাদের নিকট প্রেরণ করেছেন নবী-রাসূলগণকে। আর তারা যাতে স্বেচ্ছায় এক আল্লাহর ইবাদত করে ধন্য হতে পারে সেজন্য তাদেরকে জ্ঞান-বুদ্ধির নানা উপকরণ দান করেছেন। যেমন: শ্রবণ শক্তি, দর্শন শক্তি এবং বিবেক-বুদ্ধি।

১। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿أَلَمْ تَرَوْا أَنَّ اللَّهَ سَخَّرَ لَكُمْ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَأَسْبَغَ عَلَيْكُمْ نِعَمَهُ ظَاهِرَةً وَبَاطِنَةً وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يُجَادِلُ فِي اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَلَا هُدًى وَلَا كِتَابٍ مُنِيرٍ (20)) [لقمان: 20]

‘তোমরা কি দেখ না, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের জন্য নিয়োজিত করেছেন আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে। আর তোমাদের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নেয়ামত ব্যাপক করে দিয়েছেন; মানুষের মধ্যে কেউ কেউ জ্ঞান, হেদায়াত ও আলো দানকারী কিতাব ছাড়াই আল্লাহ সম্পর্কে তর্ক করে (সূরা লুক্বমান: ২০)।

২। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿وَاللَّهُ أَخْرَجَكُمْ مِنْ بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ لَا تَعْلَمُونَ شَيْئًا وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ (78)) .. [النحل: 78]

‘আর আল্লাহ তোমাদেরকে বের করেছেন তোমাদের মাতৃগর্ভ হতে এমতাবস্থায় যে, তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিসমূহ এবং অন্তরসমূহ। যাতে তোমরা শুকরিয়া আদায় কর’ (সূরা আন-নাহল: ৭৮)।

৩। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ فَمِنْهُمْ مَنْ هَدَى اللَّهُ وَمِنْهُمْ مَنْ حَقَّتْ عَلَيْهِ الضَّلَالَةُ فَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ لْمُكَذِّبِينَ﴾ [النحل: 36]

‘আর আমি অবশ্যই প্রত্যেক জাতিতে একজন রাসূল প্রেরণ করেছি যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং পরিহার কর ত্বাগূতকে। অতঃপর তাদের মধ্য হতে আল্লাহ কাউকে হেদায়াত দিয়েছেন এবং তাদের মধ্য হতে কারো উপর পথভ্রষ্টতা সাব্যস্ত হয়েছে। সুতরাং তোমরা যমীনে ভ্রমণ কর, অতঃপর দেখ, অস্বীকারকারীদের পরিণতি কীরূপ হয়েছে’(সূরা আন-নাহল: ৩৬)।

আল্লাহ তা‘আলা অসংখ্য নেয়ামতের মাধ্যমে তার বান্দাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন। এ নেয়ামত সমূহের মূলতঃ তিনটি ধরণ রয়েছে:

(ক) সৃষ্টি সম্পর্কিত নেয়ামত (খ) সাহায্য সম্পর্কিত নেয়ামত (গ) হেদায়াত সম্পর্কিত নেয়ামত।

আর এসব নেয়ামতের মধ্যে ইসলাম সর্বাপেক্ষা বড়, যা দিয়ে যুগে যুগে আল্লাহ তা‘আলা রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন এবং প্রেরিত রাসূলগণের সর্দার (মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে সকল মানুষের নিকট পাঠিয়ে তিনি নবুঅতের ইতি টেনেছেন।

প্রত্যেক নবী-রাসূলকে আল্লাহ তা‘আলা তিনটি বিষয় বর্ণনার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেছেন:

(১) মানুষের নিকট তাদের প্রতিপালক, সৃষ্টিকর্তা এবং রিযিক্বদাতার পরিচয় দান করা, যাতে তারা তার ইবাদত, সম্মান ও শুকরিয়া আদায় করতে পারে।

(২) মানুষকে তার প্রতিপালকের নিকট পৌঁছার রাস্তা সম্বন্ধে পরিচয় করানো, আর তা হলো দ্বীন ইসলাম।

(৩) মুমিন কাফের আল্লাহর নিকট গমনের পর মানুষের জন্য কী থাকবে, সে সম্বন্ধে তাদেরকে জানানো। আর তা হচ্ছে, মুমিনদের জন্য জান্নাত এবং কাফেরদের জন্য জাহান্নাম।

১। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿وَإِنْ تَعُدُّوا نِعْمَتَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا إِنَّ الْإِنْسَانَ لَظَلُومٌكَفَّارٌ ) ... [إبراهيم: 34]

‘যদি তোমরা আল্লাহর নেয়ামত গণনা কর, তবে তার সংখ্যা নিরূপণ করতে পারবে না। নিশ্চয় মানুষ অধিক অত্যাচারী এবং অকৃতজ্ঞ’(সূরা ইবরাহীম:৩৪)।

২। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿وَمَا بِكُمْ مِنْ نِعْمَةٍ فَمِنَ اللَّهِ ثُمَّ إِذَا مَسَّكُمُ الضُّرُّ فَإِلَيْهِ تَجْأَرُونَ ) [النحل: 53]

‘আর তোমাদের নিকট যে সব নেয়ামত আছে, সেসব আল্লাহর পক্ষ হতে। অতঃপর দুঃখ-দুর্দশা যখন তোমাদেরকে স্পর্শ করে, তখন তোমরা শুধু তাঁর নিকটই ফরিয়াদ কর’(সূরা আন-নাহল:৫৩)।

ঙ. দ্বীন ইসলামের পরিপূর্ণতা (كمال دين الإسلام)

ইসলাম এমন একটি দ্বীন, যা দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা রাসূলগণকে তার সৃষ্টির কাছে প্রেরণ করেছেন। আর মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে আল্লাহ তা‘আলা যে দ্বীনসহ সকল মানুষের কাছে প্রেরণ করেছেন, তা হচ্ছে ইসলাম, যা পরিপূর্ণ, জীবনের সকল দিক ও বিভাগ যার অন্তর্ভুক্ত, যা ব্যাপক, স্থায়ী এবং নির্ভেজাল। এ দ্বীন পূর্ণাঙ্গ, কেননা তা মান-সম্মান ও সৌন্দর্যকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। আর এর বিধি-বিধান ন্যায়সঙ্গতও পূর্ণরূপে একত্রিত করা হয়েছে। জীবনের সকল দিক ও বিভাগ দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত, কেননা তা দুনিয়া ও আখেরাতে মানুষের সৌভাগ্য বয়ে আনে। এ দ্বীন ব্যাপক, কেননা তা সমগ্র জগতর এবং সমস্ত মানুষের জন্য রহমত। তা স্থায়ী, কেননা তা ক্বিয়ামত পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকবে। তা নির্ভেজাল, কেননা আল্লাহ তা‘আলা নিজে তা সংরক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। অতএব, এ দ্বীন পরিবর্তন-পরিবর্ধন ও হ্রাস-বৃদ্ধি হতে নিরাপদ।

১। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا) ... [المائدة: 3]

‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসাবে পছন্দ করলাম’ (সূরা আল-মায়েদা:৩)।

২। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنْتُمْ تُوعَدُونَ (30) نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنْفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ (31) نُزُلًا مِنْ غَفُورٍ رَحِيمٍ (32)) ... [فصلت: 30 - 32]

নিশ্চয় যারা বলে, ‘আল্লাহই আমাদের রব’ অতঃপর অবিচল থাকে, ফেরেশতামণ্ডলী তাদের কাছে অবতীর্ণ হন এবং বলেন, ‘তোমরা ভয় পেয়ো না, দুশ্চিন্তা করো না এবং সেই জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ কর, যার ওয়াদাপ্রাপ্ত তোমরা হয়েছিলে (৩০) আমরা দুনিয়ার জীবনে তোমাদের বন্ধু এবং আখেরাতেও। সেখানে তোমাদের জন্য থাকবে যা কিছু তোমাদের মন চাইবে এবং সেখানে তোমাদের জন্য আরও থাকবে যা তোমরা দাবী করবে (৩১) পরম ক্ষমাশীল ও অসীম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ থেকে আপ্যায়নস্বরূপ (৩২) (সূরা হা-মীম সাজদা: ৩০-৩২)।

৩। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ (164)) ... [آل عمران: 164]

‘অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদের উপর অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের মধ্য থেকে তাদের প্রতি একজন রাসূল পাঠিয়েছেন, যিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ ততেলাওয়াত করেন এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন আর তাদেরকে কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেন। যদিও তারা ইতঃপূর্বে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে ছিল’ (সূরা আলে ইমরান:১৬৪)।

৪। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

(وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ (28)) ... [سبأ: 28]

‘আর আমি তো কেবল তোমাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সুসংবাদ দাতা ও সতর্ককারী হিসাবে প্রেরণ করেছি; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না’(সূরা সাবা: ২৮)।

৫। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

(وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ (107)) ... [الأنبياء: 107]

‘আর আমি তো কেবল তোমাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসাবেই প্রেরণ করেছি’(সূরা আল-আম্বিয়া:১০৭)।

৬। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

(إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ (9)) [الحجر: 9].

‘নিশ্চয় আমি কুরআন নাযিল করেছি, আর আমিই তার হিফাযতকারী’ (সূরা আল-হিজর:৯)।

চ. দ্বীন ইসলামের পূর্ণাঙ্গতার কতিপয় দিক (مظاهر الكمال في دين الإسلام)

ইসলাম পরিপূর্ণ দ্বীন (জীবন ব্যবস্থা), যা জীবনের সার্বিক দিক অন্তর্ভুক্ত করে এবং সব ধরণের প্রয়োজন পূরণ করে:

১। এটা এমন সত্য দ্বীন, যা ইবাদত, একত্ববাদ, সম্মান প্রদর্শন, আনুগত্য করণ, শুকরিয়া জ্ঞাপনসহ মানুষের সকল বিষয়ে তার প্রভূর দিকে প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে উভয়ের মধ্যকার সম্পর্ককে সুবিন্যস্ত করে।

২। এটা এমন দ্বীন যা আল্লাহর প্রতি ঈমান, ভালবাসা, ভরসা, ভয়ভীতি, আশা, সাহায্য কামনা, তার মুখাপেক্ষী হওয়া এবং তার জন্য বিনম্র হওয়া ইত্যাদির মাধ্যমে অন্তরকে পরিপূর্ণ করে দেয়।

৩। ইসলাম এমন জীবন ব্যবস্থা, যা বিবেকের সামনে আল্লাহকে তার নাম ও গুণাবলিসহ চেনা, মানুষের নিজেকে চেনা, দুনিয়া ও আখেরাত সম্পর্কে জানা, শরী‘আতের নানা বিধি-বিধান সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা এবং তদনুযায়ী আমল করার দরজা উম্মুক্ত করে দেয়।আখেরা

৪। ইসলাম রাসূলগণের সাথে মানুষের সম্পর্ককে সুবিন্যস্ত করে এবং তাদের অনুসরণের জন্য মানুষকে আহবান করে। ইসলাম সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে মানুষের সম্পর্ককেও সুবিন্যস্ত করে। ফলে, ইসলাম রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ভালবাসা, তার আনুগত্য করা, তাকে শ্রদ্ধা করা, তার সুন্নাতের অনুসরণ করা, তিনি যা নিয়ে এসেছেন তার সত্যায়ন করা, তার অনুসরণ করা এবং শরী‘আত তার নির্দেশিত পদ্ধতি ছাড়া ভিন্ন পদ্ধতিতে আল্লাহর ইবাদত না করার প্রতি মানুষকে নির্দেশ দেয়।

৫। ইসলাম মুসলিম-কাফের, শাসক-প্রজা, জ্ঞানী-মূর্খ, ধনী-গরীব, শত্রু-মিত্র, আত্মীয়-অনাত্মীয় ইত্যাদি শ্রেণীর মানুষের সাথে সম্পর্ককেও সুশৃঙ্খলিত করে এবং এর উপর অনেক নেকী দান করে।

৬। হালাল উপার্জন, হারাম বর্জন এবং ঠগবাজি ও ধোঁকাবাজি না করার মাধ্যমে ইসলাম মানুষের অর্থনৈতিক লেনদেনকে সুশৃঙ্খলিত করে। ক্রয়-বিক্রয়, উত্তম ও কল্যাণকর কাজে ব্যয়, সর্বদা সত্য অনুসন্ধান এবং মিথ্যা ও সূদ বর্জনের ক্ষেত্রে মহানুভবতার দিকে আহবান জানায়। সাথে সাথে দান-ছাদাকা ও মীরাছ বণ্টনের পদ্ধতি বর্ণনা করে।

৭। সুখ-দুঃখ, স্বচ্ছলতা-অস্বচ্ছলতা, সুস্থতা-অসুস্থতা, সফর-ইক্বামাত, নিরাপত্তা-ভয়ভীতি সর্বাবস্থায় ইসলাম নারী-পুরুষের জীবনকে শৃঙ্খলিত করে। সদাচরণ ও ন্যায়, সুন্দরভাবে সন্তান প্রতিপালন, ফাসাদ থেকে পরিবার রক্ষা এবং স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সদাচার বজায় রাখার মাধ্যমে মানুষের বৈবাহিক জীবনকেও ইসলাম সুশৃঙ্খলিত করে। আর এগুলোর মহা প্রতিদান দেয়।

৮। আল্লাহর জন্য ভালবাসা ও শত্রুতা পোষণ করার মত সৎ চরিত্রসহ নানা শক্ত সেতুর উপর প্রতিষ্ঠিত সকল সম্পর্ককে ইসলাম সুশৃঙ্খলিত করে। ইসলাম সম্মান-বদান্যতা, ক্ষমা-মার্জনা, সহনশীলতা-লজ্জাশীলতা, সত্যবাদিতা-উদারতা, ন্যায়পরায়ণতা-উত্তম ব্যবহার, দয়া-সহানুভূতি, নরম-কোমল আচরণ ইত্যাদির মত নানা উত্তম চরিত্র ও সুন্দর গুণাবলীর দিকে আহবান করে। আর এগুলোর উত্তম প্রতিদান দেয়।

৯। ইসলাম জীবনধারাকে সুশৃঙ্খলিত করে যাবতীয় কল্যাণের আদেশ এবং যাবতীয় অকল্যাণ, যুলম-অত্যাচার ও বাড়াবাড়ি থেকে নিষেধের মাধ্যমে। যেমন- আল্লাহর সাথে শিরক, অন্যায়ভাবে হত্যা, ব্যভিচার, মিথ্যা, অহংকার, কপটতা, প্রতারণা, অপকৌশল, ষড়যন্ত্র, হিংসা, শত্রুতা, গীবত, চোগলখোরি, চুরি, ছিনতাই, যাদু, মদপান, অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভক্ষণ ইত্যাদি নানা অশ্লীলতা, হারাম কাজ ও কাবীরা গুনাহ, যেগুলি ব্যক্তি ও সমাজকে নষ্ট করে ফেলে। আর এগুলোর এমন সাজা প্রয়োগ করে, যদ্বারা যুলম বিদূরিত হয়।

১০। এসব কিছুর পরে ইসলাম মানুষের পরকালীন জীবনকে সুশৃঙ্খলিত করে এবং ইহকালীন জীবনের উপর পরকালীন জীবনের ভিত্তি রচনা করে। তাই, যে ঈমান আনবে ও সৎ আমল করবে, সে দুনিয়াতে ভাগ্যবান হবে এবং আখেরাতে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর আল্লাহ তা‘আলা তার বান্দাদের উত্তম কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশতগুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেন এবং মন্দ বিষয়ের খারাপ প্রতিদান অনুরূপই দান করেন।

১। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿قَدْ جَاءَكُمْ مِنَ اللَّهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُبِينٌ (15) يَهْدِي بِهِ اللَّهُ مَنِ اتَّبَعَ رِضْوَانَهُ سُبُلَ السَّلَامِ وَيُخْرِجُهُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِهِ وَيَهْدِيهِمْ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ (16)) ... [المائدة: 15 - 16]

‘অবশ্যই তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ হতে আলো ও স্পষ্ট কিতাব এসেছে। এর দ্বারা যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে, তিনি তাদেরকে নিরাপত্তার পথ প্রদর্শন করেন এবং তাদেরকে স্বীয় নির্দেশ দ্বারা অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে আনয়ন করেন এবং সরল পথে পরিচালিত করেন (সূরা আল-মায়িদা: ১৫-১৬)।

২। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ يُدْخِلْهُ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَاوَذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ (13) وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَتَعَدَّ حُدُودَهُ يُدْخِلْهُ نَارًا خَالِدًا فِيهَا وَلَهُ عَذَابٌ مُهِينٌ (14)) ... [النساء: 13 - 14]

‘আর যে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহ তাকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতসমূহে, যেগুলির তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহরসমূহ। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর এটা মহা সফলতা। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করে এবং তাঁর সীমালঙ্ঘন করে, আল্লাহ তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন। সেখানে সে স্থায়ী হবে। আর তার জন্যই রয়েছে অপমানজনক আযাব’ (সূরা আন-নিসা: ১৩-১৪)।

ক. বিশ্বজগৎ সৃষ্টির রহস্য (حكمة خلق الكائنات)

মহান আল্লাহ তার বান্দার নিকট তার পূর্ণজ্ঞান, ক্ষমতা ও মহানত্ব প্রমাণ করার জন্য এই মহাজগৎ সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি এই মহাজগতের সবকিছুকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, সবকিছুই তাদের প্রতিপালকের প্রশংসাসহ পবিত্রতা বর্ণনা করে। মানুষ যখন এই বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারবে, তখন তার প্রতিপালকের ইবাদতের দিকে ধাবিত হবে, যিনি একক এবং যার কোন শরীক নেই। আর সে মহান আল্লাহ ও তার রাসূলগণের আনুগত্যের মাধ্যমে মহান আল্লাহর উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সক্ষম হবে। সাথে সাথে সে আল্লাহর পূর্ণ দাসত্ব ও আনুগত্যে অন্যান্য সৃষ্টির সাথেও অংশগ্রহণ করতে পারবে।

১। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ وَمِنَ الْأَرْضِ مِثْلَهُنَّ يَتَنَزَّلُ الْأَمْرُ بَيْنَهُنَّ لِتَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ وَأَنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَاطَ بِكُلِّ شَيْءٍ عِلْمًا (12)) ... [الطلاق: 12].

‘তিনি আল্লাহ, যিনি সাত আসমান এবং অনুরূপ যমীন সৃষ্টি করেছেন; এগুলির মাঝে তাঁর নির্দেশ অবতীর্ণ হয়, যেন তোমরা জানতে পার যে, আল্লাহ সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান এবং আল্লাহর জ্ঞান সবকিছুকে বেষ্টন করে আছে’(সূরা আত-তালাক্ব:১২)।

২। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

(وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ (56) مَا أُرِيدُ مِنْهُمْ مِنْ رِزْقٍ وَمَاأُرِيدُ أَنْ يُطْعِمُونِ (57) إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ (58)) [الذاريات: 56 - 58]

‘আর আমি জিন ও মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমার ইবাদত করবে। আমি তাদের কাছে কোন রিযক চাই না; আর আমি চাই না যে, তারা আমাকে খাবার দিবে। নিশ্চয় আল্লাহই রিযকদাতা, তিনি শক্তিধর, পরাক্রমশালী’(সূরা আয-যারিয়াত:৫৬-৫৮)।

খ. মানুষ যেসব স্তর অতিক্রম করে (المراحل والدُّور التي يمر بها الإنسان)

আল্লাহ তা‘আলা মানুষ সৃষ্টি করে তার জন্য কতিপয় স্তর, কাল, স্থান ও অবস্থার বন্দোবস্ত করেছেন, যেগুলি তাকে অতিক্রম করতে হয়। শেষ পর্যন্ত সে জান্নাত বা জাহান্নামে স্থায়ী হয়ে যায়।

মানুষ যেসব স্তর অতিক্রম করে, সেগুলি চারটি:

প্রথম: মায়ের পেট: এটি প্রথম স্তর, যা মানুষকে অতিক্রম করতে হবে এবং প্রথম গৃহ, যেখানে সে বাস করে। এখানে মানুষ (সাধারণতঃ) নয় মাস বসবাস করে। মহাজ্ঞানী, ক্ষমতাবান আল্লাহ এ অন্ধকার ঘরে তার জন্য খাদ্য-পানীয় এবং তার উপযোগী বাসস্থান ও আশ্রয়স্থলসহ যা কিছু তার প্রয়োজন, তার সবই প্রস্ত্তত করে দিয়েছেন। এইঘরে অক্ষমতা ও দুর্বলতার কারণে সে কোন প্রকার কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত নয়। এ ঘরে তার অস্তিত্ব লাভের দু’টি রহস্য আছে: ভিতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পরিপূর্ণ হওয়া। আর বাহিরের অঙ্গ-প্রত্যেঙ্গ পরিপূর্ণ হওয়া। ভেতর ও বাইরে তার সৃষ্টিগত পরিপূর্ণতা লাভের পর সে দুনিয়ায় বেরিয়ে আসে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

(وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ سُلَالَةٍ مِنْ طِينٍ (12) ثُمَّ جَعَلْنَاهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَكِينٍ (13) ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا ثُمَّ أَنْشَأْنَاهُ خَلْقًا آخَرَ فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ (14)) [المؤمنون: 12 - 14]

‘আর অবশ্যই আমি মানুষকে মাটির নির্যাস হতে সৃষ্টি করেছি। তারপর আমি তাকে শুক্রবিন্দুরূপে সংরক্ষিত আঁধারে স্থাপন করেছি। তারপর শুক্রবিন্দুকে আমি রক্তপিণ্ড পরিণত করি। তারপর রক্তপিণ্ডকে মাংসপিণ্ড পরিণত করি। তারপর মাংসপিণ্ডকে হাড়ে পরিণত করি। তারপর হাড়কে মাংস দিয়ে আবৃত করি। অতঃপর তা অন্য এক সৃষ্টরূপে গড়ে তুলি। অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময় (সূরা আল-মুমিনূন: ১২-১৪)।

দ্বিতীয়: দুনিয়া: মায়ের পেটের চেয়ে এ ঘরের প্রশস্ততা অনেক বেশি। পাহাড়ের সাথে অতি ক্ষুদ্র বস্ত্তর তুলনা যেমন, মায়ের পেটের সাথে দুনিয়ার তুলনা তেমন। মায়ের পেটের চেয়ে অধিক সময় দুনিয়ায় অবস্থান করে। আল্লাহ তা‘আলা মানুষের জন্য দুনিয়ায় সকল প্রকার প্রয়োজনীয় নেয়ামতের ব্যবস্থা করেছেন। তাকে বিবেক, শ্রবণ এবং দর্শন শক্তি দান করেছেন, রাসূল প্রেরণ করেন, আসমানী কিতাব নাযিল করে এর প্রতি বিশ্বাস ও আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন। আর কুফরী ও সব ধরণের অবাধ্যতা থেকে তিনি নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদেরকে জান্নাতের এবং কাফেরদেরকে জাহান্নামের অঙ্গিকার করেছেন।

দুনিয়ায় মানুষের অস্তিত্ব লাভের রহস্য দু’টিঃ (ক) ঈমান পূর্ণ করা। (খ) সৎ আমল পূর্ণ করা। মানুষ আমলসহ দুনিয়া ছেড়ে কবরের জগতের দিকে যাত্রা করে।

১। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

(أَلَمْ تَرَوْا أَنَّ اللَّهَ سَخَّرَ لَكُمْ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَأَسْبَغَ عَلَيْكُمْنِعَمَهُ ظَاهِرَةً وَبَاطِنَةً وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يُجَادِلُ فِي اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَلَا هُدًى وَلَا كِتَابٍ مُنِيرٍ (20)) ... [لقمان: 20].

‘তোমরা কি দেখ না, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের জন্য নিয়োজিত করেছেন আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে। আর তোমাদের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নেয়ামত ব্যাপক করে দিয়েছেন; মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহ সম্পর্কে তর্ক করে জ্ঞান, হেদায়াত ও আলো দানকারী কিতাব ছাড়া’ (সূরা লুকমান: ২০)।

২। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

(يَاأَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ(21) الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ فِرَاشًا وَالسَّمَاءَ بِنَاءً وَأَنْزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجَ بِهِ مِنَ الثَّمَرَاتِ رِزْقًا لَكُمْ فَلَا تَجْعَلُوا لِلَّهِ أَنْدَادًا وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ (22)) ... [البقرة: 21 - 22]

‘হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবের ইবাদত কর, যিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্বে যারা ছিল তাদেরকে, যাতে তোমরা তাক্বওয়া অবলম্বন করতে পারো। যিনি তোমাদের জন্য যমীনকে করেছেন বিছানা, আসমানকে ছাদ এবং আসমান থেকে নাযিল করেছেন বৃষ্টি। অতঃপর তাঁর মাধ্যমে উৎপন্ন করেছেন ফল-ফলাদি তোমাদের জন্য রিযকস্বরূপ। সুতরাং তোমরা জেনে-বুঝে আল্লাহর জন্য সমকক্ষ নির্ধারণ করো না’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২১-২২)।

তৃতীয়: দারুল বারযাখ বা কবরের জগত। কবর আখেরাতের প্রথম মঞ্জিল বা ঘর। সকল সৃষ্টির মৃত্যু সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত মানুষ এখানে অবস্থান করতে থাকবে। তারপর ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে। দুনিয়ায় অবস্থানের চেয়ে এখানের স্থায়ীত্ব বেশি। এখানে দুনিয়ার চেয়ে ঘনিষ্ঠতা ও দুঃখ-দুর্দশা বেশি ও পরিপূর্ণ। দুনিয়ার আমলানুযায়ী এখানে প্রতিদান দেয়া হয়। সেটা হয়তো জান্নাতের বাগান অথবা জাহান্নামের গর্ত হবে।এখানেই প্রতিদান দেওয়া শুরু হবে এবং এখান থেকেই চিরস্থায়ী গৃহ জান্নাত বা জাহান্নামে স্থানান্তরিত করা হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

(إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنْتُمْ تُوعَدُونَ (30) نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنْفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ (31) نُزُلًا مِنْ غَفُورٍ رَحِيمٍ (32)) [فصلت: 30 - 32].

‘নিশ্চয় যারা বলে, ‘আল্লাহই আমাদের রব’ অতঃপর অবিচল থাকে, ফেরেশতামণ্ডলী তাদের কাছে অবতীর্ণ হন এবং বলেন, ‘তোমরা ভয় পেয়ো না, দুশ্চিন্তা করো না এবং সেই জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ কর, যার ওয়াদাপ্রাপ্ত তোমরা হয়েছিলে। আমরা দুনিয়ার জীবনে তোমাদের বন্ধু ও আখেরাতেও। সেখানে তোমাদের জন্য থাকবে, যা তোমাদের মন চাইবে এবং সেখানে তোমাদের জন্য আরও থাকবে, যা তোমরা দাবী করবে পরম ক্ষমাশীল ও অসীম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ থেকে আপ্যায়নস্বরূপ’ (সূরা হামীম সাজদা: ৩০-৩২)।

চতুর্থ: আখেরাত। এখানে চিরকাল অবস্থান করতে হবে। এটা স্থায়ী ঘর। যারা দুনিয়ায় আল্লাহ তা‘আলা যে ঈমান, আমল এবং আখলাক্বকে ভালবাসেন, তা সম্পন্ন করবে, ক্বিয়ামতের দিন সে যে স্থায়ীত্ব ও নেয়ামত পেতে চায়, আল্লাহ তার জন্য তা পূর্ণ করবেন, যা কোন দিন কোন চোখ দেখেনি, যার কথা কান শুনেনি এবং যা কোন মানুষের কল্পনায়ও কখনও আসেনি। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি আল্লাহর ক্রোধের কারণ কুফর, শিরক এবং পাপ নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, তার প্রতিফল হলো জাহান্নাম, সেখানে সে চিরকাল থাকবে।

প্রথম দু’টি ঘর (মায়ের পেট ও দুনিয়া) প্রত্যক্ষ বা দৃশ্য। আর পরবর্তী দু’টি ঘর (কবর ও আখেরাত) পরোক্ষ বা অদৃশ্য। তবে, সবগুলোই সত্য। প্রতিটি ঘরই মানুষ দেখবে এবং জানবে। মুমিন ব্যক্তি যখনই কোন পর্যায় ত্যাগ করবেন, তখনই পূর্ববর্তী পর্যায়কে তুচ্ছ জ্ঞান করবেন, অবশেষেজান্নাতে স্থায়ী হবেন।

১। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

(وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ يَوْمَئِذٍ يَتَفَرَّقُونَ (14) فَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ فَهُمْ فِي رَوْضَةٍ يُحْبَرُونَ (15) وَأَمَّا الَّذِينَ كَفَرُوا وَكَذَّبُوا بِآيَاتِنَا وَلِقَاءِ الْآخِرَةِ فَأُولَئِكَ فِي الْعَذَابِ مُحْضَرُونَ (16)) [الروم: 14 - 16].

‘আর যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সেদিন তারা বিভক্ত হয়ে পড়বে। অতএব, যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদেরকে জান্নাতে পরিতুষ্ট করা হবে। আর যারা কুফরী করেছে এবং আমার আয়াত ও আখেরাতের সাক্ষাতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, তাদেরকে আযাবের মধ্যে উপস্থিত করা হবে’(সুরা আর-রূম: ১৪-১৬)।

২। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

(وَعَدَ اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا
وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ وَرِضْوَانٌ مِنَ اللَّهِ أَكْبَرُ ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ (72)) ... [التوبة: 72].

‘আল্লাহ মুমিন পুরুষ এবং মুমিন নারীদেরকে জান্নাতের ওয়াদা দিয়েছেন, যার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হবে নহরসমূহ, তাতে তারা চিরদিন থাকবে এবং (ওয়াদা দিয়েছেন) স্থায়ী জান্নাতসমূহে পবিত্র বাসস্থান সমূহের। আর আল্লাহর পক্ষ হতে সন্তুষ্টি সবচেয়ে বড়। এটাই মহা সফলতা’ (সূরা আত-তাওবা: ৭২)।

গ. অন্তরে নেয়ামতের পূর্ণতা (كمال نعيم القلب)

আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে উত্তম আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন, অন্যান্য বহু সৃষ্টির উপর তাকে সম্মান দান করেছেন আর তার প্রত্যেকটি অঙ্গের এমন পূর্ণতা দিয়েছেন, যা তাকে আনন্দিত ও ভাগ্যবান করে। তিনি চোখের পূর্ণতা দিয়েছেন দৃষ্টিশক্তির মাধ্যমে, কানের পূর্ণতা দিয়েছেন শ্রবণশক্তির মাধ্যমে এবং জিহবার পূর্ণতা দিয়েছেন বাকশক্তির মাধ্যমে। এভাবে অন্যান্য অঙ্গেরও পূর্ণতা দিয়েছেন। এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পূর্ণতা হারালে সেগুলি বেদনা, ত্রুটি ও দুশ্চিন্তা অনুভব করবে।

এভাবে, আল্লাহ তা‘আলা মানুষের অন্তরের পূর্ণতা, নেয়ামত, আনন্দ, স্বাদ এবং প্রশান্তি দান করেছেন তার রবকে জানা, তাকে ভালবাসা, তার ইবাদত করা, তার সাথে বন্ধুত্ব, তারই উপর ভরসা, তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা, তার আনুগত্য এবং তার সন্তুষ্টিমূলক আমলের মধ্যে।

আর যখন অন্তরে এগুলো থাকবে না, তখনকারও চোখের আলোও কানের শ্রবণশক্তি না থাকলে যেমন কষ্ট ও বিপদের সম্মুখীন হয়, তার চেয়েও অধিকশাস্তি ও বিপদের সম্মুখীন হবে।

যে ব্যক্তি তার প্রতিপালক ও তার উপর যা ওয়াজিব, সে ব্যাপারে অজ্ঞ, সে স্থায়ী শাস্তি ভোগ করবে। কেননা তার যা চাওয়া ও ভালবাসা উচিত ছিল, তা করা থেকে সে বঞ্চিত ছিল। সে কারণে, চোখ যেমন সূর্য দেখে, তেমনি কলুষমুক্ত অন্তর সত্যকে দেখে, আর এ অন্তর ঈমান এবং সৎ আমলের মাধ্যমে ঠিক তেমন স্বাদ আস্বাদন করে, যেমন শরীর খাদ্য-পানীয় দ্বারা তৃপ্তি অনুভব করে।

আল্লাহ তা‘আলা মানুষ সৃষ্টি করেছেন যেন সে গোলাম হতে পারে। আর এক্ষেত্রে তার স্বাধীনতা রয়েছে, সে হয় আল্লাহর গোলাম হবে, না হয় শয়তানের গোলাম হবে। আল্লাহ তা‘আলা ঈমান, আনুগত্য এবং কল্যাণের নির্দেশ দেন। অপরপক্ষক্ষ শয়তান কুফর, পাপ এবং অকল্যাণের নির্দেশ দেয়। যে তার নিজেকে ঈমান ও আনুগত্যের মধ্যে পাবে, সে আল্লাহর হিসাবে গোলাম। আর যে নিজেকে কুফর ও পাপের মধ্যে পাবে, সে শয়তানের গোলাম।

১। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

(الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُمْ بِذِكْرِ اللَّهِ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ (28)) [الرعد: 28].

‘যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়’(সূরা আর-রা‘দ: ২৮)।

২। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

(اللَّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا يُخْرِجُهُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ وَالَّذِينَ كَفَرُواأَوْلِيَاؤُهُمُ الطَّاغُوتُ يُخْرِجُونَهُمْ مِنَ النُّورِ إِلَى الظُّلُمَاتِ أُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ (257)) [البقرة: 257]

‘যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহ তাদের বন্ধু, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন। আর যারা কুফরী করে, তাদের অভিভাবক হল ত্বাগূত। তারা তাদেরকে আলো থেকে বের করে অন্ধকারে নিয়ে যায়। তারা আগুনের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে’(সূরা আল-বাক্বারাহ: ২৫৭)।

৩। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

(إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوًّا إِنَّمَا يَدْعُو حِزْبَهُ لِيَكُونُوا مِنْأَصْحَابِ السَّعِيرِ) ... [فاطر: 6]

‘নিশ্চয় শয়তান তোমাদের শত্রু। অতএব, তোমরা তাকে শত্রু হিসাবে গণ্য কর। সে তার দলকে কেবল এজন্যই ডাকে যাতে তারা জ্বলন্ত আগুনের অধিবাসী হয়’(সূরা ফাতিবর: ৬)।

ঘ. ইবাদত ও দাসত্বের মর্মার্থ (فقه العبادة والعبودية)

ইবাদত যেন শরীর, আর দাসত্ব যেন আত্মা। ইবাদতের শুরু ও শেষ আছে। যেমন-ছালাত, ছিয়াম, হাজ্জ ইত্যাদি ইবাদত। কিন্তু দাসত্ব হলো আত্মিক আমল, যা বান্দা থেকে কখনই পৃথক হয় না। সব সময় অনুভব করবে যে, তুমি আল্লাহর একজন বান্দা। ইবাদতের আত্মা হচ্ছে দাসত্ব। আর দাসত্ব হচ্ছে, সদা সর্বদা আল্লাহ তা‘আলার মুখাপেক্ষী হওয়া। আর কুফরীর আত্মা হচ্ছে, সীমালঙ্ঘন ও আল্লাহর তোয়াক্কা না করা।

আল্লাহ তা‘আলা আমাদের নিকট থেকে দাসত্বের পূর্ণতা চান দুইভাবেঃ

(ক) পূর্ণাঙ্গ দাসত্ব (খ) শরী‘আত সম্মত ইবাদত।

চারটি বিষয়ের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্যে আগ্রহ তৈরি হয়ঃ

(ক) আল্লাহ তা‘আলার প্রতি এবং তার নামসমূহও গুণাবলীর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখা

(খ) আল্লাহর সার্বভৌমত্বের প্রতি দৃঢ়বিশ্বাস রাখা

(গ) আল্লাহর শান্তির অঙ্গীকারের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখা

(ঘ) আল্লাহর শাস্তির অঙ্গীকারের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস করা।

যখন এসব বিষয়ে অথবা এসবের আংশিক কোন বিষয়ে সন্দেহ তৈরি হয়, তখন মানুষ আল্লাহর আনুগত্য থেকে বিমুখ হয়, অবাধ্যতায় লিপ্ত হয় আর শয়তানের আনুগত্য করতে থাকে।

১। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

(ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ فَاعْبُدُوهُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ ) [الأنعام: 102]

‘তিনিই আল্লাহ, তোমাদের রব। তিনি ব্যতীত কোন সত্য ইলাহ নেই। তিনি প্রতিটি জিনিসের স্রষ্টা। সুতরাং তোমরা তাঁর ইবাদত কর। আর তিনি প্রতিটি জিনিসের উপর তত্ত্বাবধায়ক (সূরা আল-আন‘আম: ১০২)।

২। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

(فَمَنْ كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا) [الكهف: 110]

‘সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদতে কাউকে শরীক না করে’(সূরা আল-কাহাফ: ১১০)।

দেখানো হচ্ছেঃ থেকে ১০ পর্যন্ত, সর্বমোট ১০১ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে পাতা নাম্বারঃ 1 2 3 4 5 6 · · · 8 9 10 11 পরের পাতা »