আর-রাহীকুল মাখতূম আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী (রহঃ) ৪৩৪ টি
আর-রাহীকুল মাখতূম আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী (রহঃ) ৪৩৪ টি
যুবাইর দূর্গ বিজয় (فَتْحُ قِلْعَةِ الزُّبَيْرِ):

মুসলিমগণ কর্তৃক নায়িম এবং সা’ব দূর্গ বিজয়ের পর নাযাত এর দূর্গসমূহ থেকে বাহির হয়ে ইহুদীগণ যুবাইর দূর্গে একত্রিত হল। এটি ছিল পর্বতের উঁচু চূড়ায় অবস্থিত একটি সুসংরক্ষিত দূর্গ। সেখানে যাওয়ার পথ ছিল এতই দুর্গম এবং কষ্টকর যে ঘোড়সওয়ার তো নয়ই, পদাতিক বাহিনীর পক্ষেও তা ছিল একটি দুঃসাধ্য ব্যাপার। এ জন্য রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) নির্দেশ দিলেন এর চতুর্দিকে অবরোধ সৃষ্টি করতে। তিন দিন পর্যন্ত এ অবরোধ অব্যাহত থাকল। এরপর একজন ইহুদী এসে বলল, ‘হে আবুল কাসেম! আপনি যদি এক মাস পর্যন্ত এ অবরোধ অব্যাহত রাখেন তবুও তাদের কোন ভয় থাকবে না। তবে সেখানে তাদের পানীয় পানির সমস্যা রয়েছে। কারণ পানির ঝরণা রয়েছে নীচে জমিনে। রাতের বেলা এরা দূর্গ থেকে বেরিয়ে এসে পানি পান করে এবং সংগ্রহ করে নিয়ে দূর্গে ফিরে যায়। কাজেই আপনার আক্রমণ থেকে তারা নিরাপদেই থাকছে। যদি আপনি তাদের পানি বন্ধ করে দেন, তাহলে তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে।’ এ কথা জানার পর নাবী কারীম (ﷺ) তাদের পানি বন্ধ করে দিলেন। এ অবস্থার প্রেক্ষাপটে ইহুদীগণ দূর্গের বাইরে বেরিয়ে এসে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এ সংঘর্ষে কয়েকজন মুসলিম শহীদ হন এবং আনুমানিক দশ জন ইহুদী নিহত হয়। দূর্গ মুসলিমগণের দখলে এসে যায়।

যুবাইর দূর্গের যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর ইহুদীগণ উবাই দূর্গে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। মুসলিমগণ এ দূর্গেও অবরোধ সৃষ্টি করেন। এ দূর্গের দুজন বীর ও পরিশ্রমী ইহুদী যোদ্ধা দ্বন্দ্ব যুদ্ধের আহবান দিয়ে একের পর এক ময়দানে অবতরণ করে। এরা দু জনেই মুসলিম বীরদের হাতে নিহত হয়। দ্বিতীয় ইহুদীর হত্যাকারী ছিলেন লাল পট্টিধারী বিখ্যাত তেজস্বী বীর আবূ দোজানা সাম্মাক বিন খারশাহ আনসারী (রাঃ)। দ্বিতীয় ইহুদীকে হত্যা করার পর তিনি অত্যন্ত ক্ষিপ্র গতিতে দূর্গের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। তার সঙ্গে ইসলামী সৈন্যগণও দূর্গের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। দূর্গের অভ্যন্তরে উভয় পক্ষের মধ্যে প্রচন্ড সংঘর্ষ বেধে যায় এবং বেশ কিছুক্ষণ ধরে তা চলতে থাকে। কিন্তু ইহুদীগণ মুসলিম বীরদের আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে দূর্গ ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে নিযার দূর্গে আশ্রয় গ্রহণ করে। সেটি ছিল প্রথম অঞ্চলের শেষ দূর্গ।

নিযার দূর্গ বিজয় (فَتْحُ حِصْنِ النِّزَارِ):

এটি ছিল এ অঞ্চলের সব চাইতে শক্ত ও মজবুত দূর্গ। ইহুদীদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, সর্বশক্তি প্রয়োগ করেও এ দূর্গের অভ্যন্তরে প্রবেশ করা মুসলিমগণের পক্ষে সম্ভব হবে না। এ জন্য তাদের মহিলা ও শিশুদের নিয়ে তারা এ দূর্গ মধ্যে অবস্থান করছিল। পূর্বোল্লিখিত চারটি দূর্গের কোনটিতেই মহিলা ও শিশুদের রাখা হয় নি।

মুসলিমগণ এ দূর্গটিও অবরোধ করলেন এবং প্রবল চাপ সৃষ্টি করে চললেন। কিন্তু যেহেতু দূর্গটি একটি উঁচু পর্বত চূড়ায় অত্যন্ত সুরক্ষিত অবস্থানে ছিল সেহেতু দূর্গের মধ্যে প্রবেশ লাভের কোন সুযোগ মুসলিম সৈন্যরা করে নিতে পারছিলেন না। এদিকে দূর্গের বাহিরে এসে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার সাহস ইহুদীদের ছিল না। তবে দূর্গের অভ্যন্তর ভাগ থেকেই তারা মুসলিমগণের উপর প্রবলভাবে তীর ও পাথর নিক্ষেপ করে আসছিল।

নিযার দূর্গ জয় করা যখন খুব আয়াসসাধ্য মনে হল তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মিনজানীক যন্ত্রটি ব্যবহারের জন্য পরামর্শ দিলেন। কয়েকটি কামানের গোলা আঘাত হানার ফলে তাদের দেয়ালে বেশ বড় আকারে ফাটল সৃষ্টি হয়ে যায়। সে ফাটলের পথ ধরে মুসলমানেরা দূর্গ মধ্যে প্রবেশ করতে সক্ষম হন এবং ইহুদীদের সঙ্গে তীব্র সংঘর্ষে লিপ্ত হন। এ যুদ্ধে ইহুদীরা শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করার পর ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অবস্থায় দূর্গ ছেড়ে পলায়ন করে। তারা প্রাণভয়ে এতই ভীত হয়ে পড়ে যে, তাদের মহিলা ও শিশুগণকে পিছনে রেখেই পলায়ন করে এবং তাদেরকে মুসলিমগণের দয়ার উপর ছেড়ে যায়। সুরক্ষিত নিযার ঘাঁটি দখলের ফলে খায়বারের প্রথম অর্ধেক অর্থাৎ নাত্বাত ও শিক অঞ্চলের সকল অংশই মুসলিমগণের দখলে চলে আসে। এ অঞ্চলে আরও কিছু সংখ্যক ছোট ছোট দূর্গ ছিল। কিন্তু অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ঘাঁটিগুলো মুসলিমগণের দখলে চলে যাওয়ার ফলে ইহুদীরা ছোট খাট দূর্গগুলো পরিত্যাগ করে এবং পরবর্তী পর্যায়ে খায়বার শহর পরিত্যাগ করে দ্বিতীয় অঞ্চলে অর্থাৎ কাতীবার দিকে পলায়ন করে।

খায়বারের দ্বিতীয়ার্ধের বিজয় (فَتْحُ الشَّطْرِ الثَّانِيْ مِنْ خَيْبَرَ):

নাত্বাত ও শাক্ব অঞ্চল বিজয়ের পর রাসূলে কারীম (ﷺ) কাতীবা, অতীহ এবং সালালিম অঞ্চলের প্রতি মনোনিবেশ করলেন। সালালিম বনু নাযির গোত্রের এক প্রসিদ্ধ ইহুদী আবুল হুক্বাইক্বের দূর্গ ছিল। এদিকে নাত্বাত ও শাক্ব অঞ্চলের বিজিত ইহুদীগণ এখানে এসে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল এবং এ দূর্গের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অধিকতর শক্তিশালী এবং সুদৃঢ় করেছিল।

এ তিনটি দূর্গের কোনটিতে যু্দ্ধ হয়েছিল কিনা সে ব্যাপারে যুদ্ধ বিশারদগণের মধ্যে মত পার্থক্য রয়েছে। ইবনু ইসহাক্বের বর্ণনা সূত্রে জানা যায় যে, কোমুস দূর্গ বিজয়ের জন্য যুদ্ধ করা হয়েছিল এবং বর্ণনাভঙ্গী থেকে এটা বুঝা যায় যে, যুদ্ধের মাধ্যমেই এ দূর্গের উপর মুসলিমগণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এ দূর্গ স্বেচ্ছায় সমর্পণের ব্যাপারে মুসলিমগণের সঙ্গে ইহুদীদের কোন কথাবার্তা হয়নি।[1]

কিন্তু ওয়াক্বিদী স্পষ্টভাবে দুটি শব্দে প্রকাশ করেছেন যে, এ অঞ্চলের দূর্গ তিনটি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে মুসলিমগণের হাতে সমর্পণ করা হয়। সম্ভবত কোমুস দূর্গটি নিয়ে প্রথমাবস্থায় যুদ্ধ হয় এবং তারপর আলাপ-আলোচনা শুরু হয়। তবে অন্য দুটি যুদ্ধ ছাড়াই মুসলিমগণের হাতে সমর্পণ করা হয়।

অতঃপর মুসলিম বাহিনী কাতীবা গমণ করে সেখানকার অধিবাসীদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবরোধ সৃষ্টি করেন। এ অবরোধ চৌদ্দ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। অবরোধ কালে ইহুদীগণ সে সময় পর্যন্ত দূর্গ হতে বাহিরে আসে নি যে পর্যন্ত না রাসূলে কারীম (ﷺ) মিনজানীক যুদ্ধ ব্যবহারের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এ যুদ্ধ ব্যবহারের আশঙ্কায় যখন তারা বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়ার ভয়ে ভীত হয়ে পড়ল তখন সন্ধির মনোভাব ব্যক্ত করল।

[1] ইবনু হিশাম ২য় খন্ড ৩৩১, ৩৩৬-৩৩৭ পৃঃ।

ইবনু আবিল হুক্বাইক্ব সর্ব প্রথম রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট এ বলে সংবাদ প্রেরণ করে যে, ‘আমি কি আপনার নিকট আগমণ করে আপনার সঙ্গে কথাবার্তা বলতে পারি? নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, ‘হ্যাঁ’’।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ)’র হ্যাঁ সূচক উত্তর লাভের পর সে তাঁর খিদমতে উপস্থিত হয়ে এ শর্তের ভিত্তিতে সন্ধি করল যে, দূর্গের মধ্যে যে সকল সৈন্য অবস্থান করছে তাদের জীবন রক্ষা করতে হবে, তাদের পরিবারবর্গকে তাদের সঙ্গে থাকতে দিতে হবে (অর্থাৎ তাদেরকে দাসাদাসী বানানো যাবে না), পরিবার পরিজনসহ তাদের খায়বার জমিন ছেড়ে বাইরে যেতে দিতে হবে। তাদের সম্পদাদি, যথা- বাগ-বাগীচা, সোনাদানা, অশ্ব, যুদ্ধে ব্যবহারযোগ্য লৌহবর্ম ইত্যাদি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট সমর্পণ করবে। শুধু সে কাপড়গুলো তারা সঙ্গে নিতে পারবে যা মানুষের লজ্জা নিবারণ ও জীবন ধারণের প্রয়োজন হবে।[1]

রাসূল কারীম (ﷺ) বললেন,‏(‏وَبَرِئَتْ مِنْكُمْ ذِمَّةُ اللهِ وَذِمَّةُ رَسُوْلِهِ إِنْ كَتَمْتُمُوْنِيْ شَيْئًا‏)‏ ‘যদি তোমরা আমার নিকট থেকে কিছু গোপন কর তাহলে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ) দায়িত্ব মুক্ত হবেন।’

ইহুদীগণ এ সকল শর্ত মেনে নেয়ার ফলে মুসলিমগণের সঙ্গে তাদের সন্ধি হয়ে গেল।[2] এ সন্ধির ফলশ্রুতিতে আলোচ্য দূর্গ তিনটি মুসলিমগণের অধিকারে এসে যায় এবং এভাবে খায়বার বিজয় সম্পূর্ণ হয়।

[1] কিন্তু সুনানে আবূ দাউদের মধ্যে এ কথা উল্লেখিত হয়েছে যে, এ শর্তের উপর তিনি সন্ধি চুক্তি করেছিলেন যে, খায়বার ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় নিজ নিজ সওয়ারীর উপর যে পরিমাণ সম্পদ নিয়ে যাওয়া সম্ভব তা নিয়ে যাওয়ার অনুমতি তাদের দেয়া হবে। দ্র: আবূ দাউদ ২য় খন্ড পৃঃ।

[2] যাদুল মা‘আদ ২য় খন্ড ১৩৬ পৃঃ।
ওয়াদা ভঙ্গের কারণে আবুল হুক্বাইক্বের দু’ ছেলের হত্যা (قَتْلُ اِبْنَيْ أَبِيْ الْحُقَيْقَ لِنَقْضِ الْعَهْدِ):

আবুল হুক্বাইক্বের দু’ ছেলে এ সন্ধি চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে অনেক সম্পদ গোপনে সরিয়ে নেয়। তারা একটি চামড়াও উধাও করে দেয় যার মধ্যে অনেক সম্পদ এবং হুয়াই বিন আখতাবের অলঙ্কারাদি ছিল। হুয়াই বিন আখতাব মদীনা হতে বনু নাযিরের বিতাড়নের সময় এ সকল অলঙ্কারাদি সঙ্গে এনেছিল।

ইবনু ইসহাক্বের বর্ণনায় আছে যে, যখন কিনানাহ বিন আবিল হুক্বাইক্বকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট নিয়ে আসা হল, তখন তার নিকট বনু নাযিরের সম্পদ গচ্ছিত ছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন এ বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন তখন সে তার জানার ব্যাপারটি সরাসরি অস্বীকার করে বলল যে, এ গচ্ছিত সম্পদের স্থান সম্পর্কে সে কিছুই জানে না। এরপর একজন ইহুদী এসে বলল যে, ‘আমি কেনানকে প্রতিদিন এ বিজন প্রান্তরের কোন এক স্থানে ঘোরাফিরা করতে দেখি।’

ইহুদীর এ কথার প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কিনানাহকে বললেন, ‏(‏أَرَأَيْتَ إِنْ وَجَدْنَاهُ عِنْدَكَ أَأَقْتُلُكَ‏؟‏‏)‏ ‘এ কথা বল যে, যদি এ গচ্ছিত সম্পদ আমরা তোমার নিকট থেকে বাহির করে নিতে পারি তাহলে তোমাকে হত্যা করব কি না?’

সে বলল, ‘জী হ্যাঁ’।

সাহাবীগণ (রাঃ) সেই প্রান্তর খননের নির্দেশ দিলেন। অতঃপর সেখান থেকে কিছু সম্পদ পাওয়া গেল।

অবশিষ্ট সম্পদ সম্পর্কে নাবী কারীম (ﷺ) তাকে জিজ্ঞাসা করলে আগের মতোই সে অস্বীকার করল। ফলে তার শাস্তি বিধানের জন্য তাকে যুবাইরের হস্তে সমর্পণ করা হল এবং এ কথাও বলা হল যে, যতক্ষণ পর্যন্ত সমস্ত সম্পদ আমাদের হস্তগত হবে না ততক্ষণ শাস্তিদান অব্যাহত থাকবে।

যুবাইর (রাঃ) চকমকি পাথর দ্বারা তার বক্ষে আঘাত করতে থাকেন যার ফলে জীবন মরণ সন্ধিক্ষণের অবস্থা সৃষ্টি হল তার। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মুহাম্মাদ বিন মাসলামার হস্তে তাকে সমর্পণ করেন। তিনি মাহমুদ বিন মাসলামাহর হত্যার বদলাস্বরূপ তার গ্রীবা কর্তন করে তাকে হত্যা করেন। (মাহমুদ ছায়ায় বিশ্রাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে নায়িম দূর্গের দেয়ালের পাশে বসেছিলেন। এমনি সময়ে এ ব্যক্তি তাঁর উপর একটি চাক্কির পাট নিক্ষেপ করে তাঁকে হত্যা করে।)

ইবনুল কাইয়্যেমের বর্ণনা সূত্রে জানা যায় যে, রাসূলে কারীম (ﷺ) আবুল হুক্বাইক্বের দু’জন ছেলেকে হত্যা করেছিলেন। ঐ দুজনের বিরুদ্ধে সম্পদ গোপন করার সাক্ষ্য দিয়েছিল কিনানাহর চাচাত ভাই। এরপর রাসূলে কারীম (ﷺ) হুয়াই বিন আখতাবের কন্যা সাফিয়্যাহকে বন্দী করেন। সে ছিল কিনানাহ বিন আবিল হুক্বাইক্বের স্ত্রী এবং তখনো সে নববধূ ছিল এ অবস্থায় তার বিদায় দেয়া হয়েছিল।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইচ্ছা করেছিলেন খায়বার হতে ইহুদীদের বিতাড়িত করতে এবং সেই শর্তেই চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। কিন্তু ইহুদীগণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট আরয পেশ করল এ জমিন তাদের থাকতে দেয়ার জন্য। তারা বলল, ‘আমাদের এ জমিনে থাকতে দিন, আমরা এর দেখাশোনা করব। কারণ, এ জমিন সম্পর্কে আপনাদের তুলনায় আমদের দক্ষতা এবং অভিক্ষতা অনেক বেশী। এদিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং সাহাবীগণ (রাঃ)-এর নিকট এমন দাস ছিল না যারা এ জমিন দেখাশোনা এবং চাষাবাদ ও বুননের কাজকর্ম করতে পারবে। তাছাড়া, সাহাবীগণ (রাঃ)-ও এমন অবসর ছিল না যে, তাঁরা এ সকল কাজকর্ম করতে পারবেন। এ কারণে নাবী কারীম (ﷺ) এ শর্তে খায়বারের ভূমি ইহুদীদের হাত ছেড়ে দিলেন যে সমস্ত ক্ষেত খামার ও বাগ-বাগিচার উৎপাদনের অর্ধাংশ ইহুদীদের দেয়া হবে এবং তিনি যতদিন চাবেন ততদিন এ ব্যবস্থা বজায় থাকবে (যখন প্রয়োজন বোধ করবেন তখন তাদের বিতাড়িত করা হবে) উৎপাদনের পরিমাণ নির্ধারণের জন্য আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রাঃ)-কে নিয়োজিত করা হয়।

খায়বারের লব্ধ সম্পদ ছত্রিশ অংশে বণ্টনের ব্যবস্থা করা হয়। এর প্রতি অংশ পুনরায় একশত অংশে বিভাজন করে বন্টনের ব্যবস্থা করা হয়। এভাবে মোট সম্পদ বন্টন করা হতো তিন হাজার ছয়শ অংশে। এর মধ্য হতে অর্ধেক অর্থাৎ এক হাজার আটশ অংশ ছিল রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং সাহাবীগণের (রাঃ)। সাধারণ মুসলিমগণের মতোই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মাত্র একটি অংশ গ্রহণ করতেন। অবশিষ্ট এক হাজার আটশ অংশ (অর্থাৎ দ্বিতীয়ার্ধ) রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) মুসলিমগণের সামাজিক প্রয়োজন এবং আপাৎকালীন সময়ের জন্য পৃথক করে রাখতেন। খায়বারের লব্ধ সম্পদ এ কারণে আঠার শত অংশে বন্টনের ব্যবস্থা ছিল যে, হুদায়বিয়াহয় অংশগ্রহণকারীদের জন্য আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে এটা ছিল এক বিশেষ দান। উপস্থিত অনুপস্থিত সকলের জন্যই অংশের ব্যবস্থা ছিল। হুদায়বিয়াহয় অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা ছিল চৌদ্দ শত। খায়বার আসার সময় এরা দুশ ঘোড়া সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। যেহেতু আরোহী ছাড়া ঘোড়ারও অংশ নির্ধারিত ছিল এবং প্রতিটি ঘোড়ার জন্য দু’টি অংশ ধার্য ছিল। সেহেতু লব্ধ সম্পদ আঠারশ অংশে বন্টন করা হয়েছিল। দুইশ ঘোড়সওয়ারকে তিন তিন অংশ হিসেবে ছয়শ অংশ এবং বারশ পদাতিককে এক এক অংশ হিসেবে বার শত অংশ সর্ব মোট আঠারশ অংশে বন্টনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।[1]

খায়বারের যুদ্ধ লব্ধ সম্পদের আধিক্যের কথা সহীহুল বুখারীর আব্দুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে প্রমানিত হয়েছে। তিনি এ কথাও বলেছেন, যে পর্যন্ত না খায়বার বিজয় করতে আমরা সক্ষম হয়েছিলাম সে পর্যন্ত পরিতৃপ্তি হতে পারিনি। অনুরূপ প্রমাণ আয়িশা (রাঃ) বর্ণিত হাদীসেও পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, ‘যখন খায়বার যুদ্ধে মুসলিমগণ বিজয়ী হলেন তখন আমরা বললাম এখন পেট পুরে খেজুর খেতে পারব।[2]

[1] যাদুল মা‘আদ ২য় খন্ড ১৩৭-১৩৮ পৃঃ, ব্যাখ্যাসহ ।

[2] সহীহুল বুখারী ২য় খন্ড ৬০৯ পৃঃ।
জা’ফর বিন আবূ ত্বালিব এবং আশয়ারী সাহাবাদের আগমন (قُدُوْمُ جَعْفَرَ بْنِ أَبِيْ طَالِبٍ وَالْأَشْعَرِيِّيْنَ)

সেই যুদ্ধের মধ্যে জা’ফর বিন আবূ ত্বালিব (রাঃ) খিদমতে নাবাবীতে উপস্থিত হন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আশয়ারী মুসলিমগণ অর্থাৎ আবূ মুসা (রাঃ) এবং তাঁর বন্ধুগণ (রাঃ)।

আবূ মুসা আশয়ারী (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, ‘আমরা যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আবির্ভাব সম্পর্কে অবগত হলাম তখন আমাদের সম্প্রদায়ের পঞ্চাশ জন লোকসহ আমার ভাই ও আমি হিজরতের উদ্দেশ্যে একটি নৌকা করে যাত্রা করলাম খিদমতে নাবাবীতে পৌঁছার জন্য। কিন্তু আমাদের নৌকাটি নাজ্জাশীর দেশে নিয়ে গিয়ে আমাদের নামিয়ে দিল। জা’ফার (রাঃ) এবং তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে সেখানেই আমাদের সাক্ষাত হয়। তিনি বললেন যে, রাসূলুল্লাহ আমাদের এখানে প্রেরণ করেছেন, আপনারাও আমাদের সঙ্গে অবস্থান করুন। এ প্রেক্ষিতে আমরাও তাঁদের সঙ্গে অবস্থান করলাম এবং খিদমতে নাবাবীতে সে সময় পৌঁছতে পারলাম যখন তিনি খায়বার বিজয় করেছেন। নাবী কারীম (ﷺ) জা’ফার (রাঃ) ও তাঁর বন্ধুদের এবং আমাদের সঙ্গে আগত নৌকার আরোহীদের জন্যও গনীমতের অংশ নির্ধারণ করেছিলেন।[1] এছাড়া যাঁরা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেননি তাঁদের জন্য কোন হিসসা নির্ধারণ করা হয় নি।

জা’ফার (রাঃ) যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খিদমতে উপস্থিত হলেন তখন তিনি তাঁকে খোশ আমদেদ জানিয়ে চুম্বন করে বললেন, ‏ (‏وَاللهُ مَا أَدْرِيْ بِأَيِّهِمَا أَفْرَحُ‏؟‏ بِفَتْحِ خَيْبَرَ أَمْ بِقُدُوْمِ جَعْفَرَ‏)‏‏ ‘আল্লাহর কসম! আমি জানি না যে, আমার অধিক আনন্দ কিসের, খায়বার বিজয়ের না জাফরের আগমনের? [2]

এটা স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, এ সকল লোকজনকে নিয়ে আসার জন্য রাসূলে কারীম (ﷺ) ‘আমর বিন উমাইয়া যামরী (রাঃ)-কে নাজ্জাশীর নিকট প্রেরণ করেছিলেন এবং তাঁকে বলে পাঠিয়েছিলেন যে, তিনি যেন ঐ সকল লোকজনকে তাঁর নিকট পাঠিয়ে দেন। ফলে নাজ্জাশী দুটি নৌকা করে তাঁদের মদীনার উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেন। এরা ছিলেন সর্বমোট ষোল জন। অধিকন্তু, কিছু সংখ্যক মহিলা এবং শিশুও ছিল সে দলে, আর অন্যান্য যাঁরা ছিলেন তাঁরা এর পূর্বেই মদীনায় ফিরে এসেছিলেন।[3]

[1] সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৪৪৩ পৃঃ, ফাতহুল বারী ৭ম খন্ড ৪৮৪-৪৮৭ পৃঃ।

[2] যাদুল মা‘আদ ২য় খন্ড ১৩৯ পৃঃ।

[3] তারীখে খুযরী ১ম খন্ড ১২৮ পৃঃ।
সাফিয়্যাহর সঙ্গে বিবাহ (الزَّوَاجُ بِصَفِيَّةَ):

পূর্বে উল্লেখিত হয়েছে যে, সাফিয়্যাহর স্বামী কিনানাহ বিন আবিল হুক্বাইক্ব স্বীয় অঙ্গীকার ভঙ্গের কারণে মুসলিমগণের হাতে নিহত হয়েছিল। তার মৃত্যুর পর স্ত্রী সাফিয়্যাহকে বন্দী মহিলাদের দলভুক্ত করা হয়। এরপর যখন এ বন্দী মহিলাদের একত্রিত করা হয় তখন দাহয়াহ বিন খলীফা কালবী (রাঃ) নাবী কারীম (ﷺ)-এর খিদমতে আরয করলেন, ‘হে আল্লাহর নাবী! বন্দী মহিলাদের থেকে আমাকে একটি দাসী প্রদান করুন।’

নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, ‏(‏خُذْ جَارِيَةً مِّنَ السَّبِيِّ غَيْرِهَا‏)‏ ‘তাদের মধ্য থেকে একজনকে মনোনীত করে নিয়ে যাও।’ তিনি সেখানে গিয়ে তাদের মধ্যে থেকে সাফিয়্যাহ বিনতে হুয়াইকে মনোনীত করেন। এ প্রেক্ষিতে এক ব্যক্তি নাবী কারীম (ﷺ)-এর নিকট আরয করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! বনু কুরাইযাহ ও বনু নাযীর গোত্রের সাইয়েদা সাফিয়্যাহকে আপনি দাহয়াহর হাতে সমর্পণ করলেন, অথচ সে শুধু আপনার জন্য শোভনীয় ছিল।

নাবী (ﷺ) বললেন, ‘সাফিয়্যাহসহ দেহয়াকে এখানে আসতে বল।’

দাহয়াহ যখন সাফিয়্যাহকে সঙ্গে নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-এর নিকট উপস্থিত হলেন তখন তিনি বললেন, ‘বন্দী মহিলাদের মধ্য থেকে তুমি অন্য একজনকে দাসী হিসেবে গ্রহণ কর।’

অতঃপর নাবী (ﷺ) নিজে সাফিয়্যাহর নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করলেন। তিনি যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁকে মুক্ত করে দিয়ে তাঁর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। তাঁর এ মুক্ত করাকে বিবাহে তাঁর জন্য মাহর নির্ধারণ করা হয়।

মদীনা প্রত্যাবর্তন কালে সাদ্দে সাহবা নামক স্থানে পৌঁছলে সাফিয়্যাহ (রাঃ) হালাল হয়ে গেলেন। তখন উম্মু সুলাইম (রাঃ) নাবী কারীম (ﷺ)-এর জন্য তাঁকে সাজগোজ ও শৃঙ্গার সহকারে প্রস্তুত করে দিলেন এবং বাসর রাত্রি যাপনের জন্য প্রেরণ করলেন। দুলহা হিসেবে তাঁর সঙ্গে সকাল পর্যন্ত অবস্থান করলেন। অতঃপর খেজুর, ঘী এবং ছাতু একত্রিত করে ওয়ালীমা খাওয়ালেন এবং রাস্তায় দুলহা দুলহানের রাত্রি যাপন হিসেবে তিন দিন তাঁর সঙ্গে অবস্থান করলেন।[1] ঐ সময় নাবী কারীম (ﷺ) তাঁর মুখমণ্ডলের উপর শ্যামল চিহ্ন দেখতে পেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ওটা কী?

তিনি বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আপনার খায়বার আগমনের পূর্বে আমি স্বপ্নযোগে দেখেছিলাম যে, চাঁদ তার কক্ষচ্যুত হয়ে এসে পড়ল আমার কোলের উপর। আল্লাহ তা‘আলাভ জানেন, আপনার সম্পর্কে আমার কোন কল্পনাও ছিল না। কিন্তু আমার স্বামীর নিকট যখন এ স্বপ্ন বৃত্তান্ত বর্ণনা করলাম তখন তিনি আমার মুখে এক চপেটাঘাত করে বললেন, ‘মদীনার বাদশাহর প্রতি তোমার মন আকৃষ্ট হয়েছে।[2]

[1] সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৫৪ পৃঃ, ২য় খন্ড ৬০৪-৬০৬ পৃঃ,, যাদুল মা‘আদ ২য় খন্ড ১৩৭ পৃঃ।

[2] যাদুল মা‘আদ ২য় খন্ড ১৩৭ পৃঃ, ইবনু হিশাম ২য় খন্ড ৩৩৬ পৃঃ।
বিষাক্ত বকরির ঘটনা (أَمْرُ الشَّاةِ الْمَسْمُوْمَةِ):

খায়বার বিজয়ের পর যখন রাসূলে কারীম (ﷺ) নিরাপদ হলেন এবং তৃপ্তিবোধ করলেন তখন সালাম বিন মুশরিকের স্ত্রী যায়নাব বিনতে হারিস উপঢৌকন হিসেবে বকরির ভূনা মাংস তাঁর নিকট প্রেরণ করে। সে বিভিন্ন সূত্র থেকে জিজ্ঞাসার মাধ্যমে জেনে নিয়েছিল যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বকরির মাংসের কোন কোন অংশ অধিক পছন্দ করেন। তাকে বলা হয়েছিল যে, তিনি রানের মাংস অধিক পছন্দ করেন। এ জন্য সে রানের মাংসগুলো ভাল ভাবে বিষ মিশ্রিত করেছিল এবং অবশিষ্ট অন্যগুলোতেও বিষ প্রয়োগ করেছিল। অতঃপর সে মাংসগুলো নাবী কারীম (ﷺ)-এর সামনে এনে রাখা হলে নাবী কারীম (ﷺ) রানের মাংসের টুকরোটি উঠিয়ে তার কিছু অংশ চিবুনোর পর মুখ থেকে বের করে তা ফেলে দিলেন এবং বললেন,‏ (‏إِنَّ هٰذَا الْعَظْمُ لَيُخْبِرُنِيْ أَنَّهُ مَسْمُوْمٍ‏)‏‘এ হাড্ডি আমাকে বলছে যে এর সঙ্গে বিষ মিশ্রিত করা হয়েছে।’

এরপর নাবী কারীম (ﷺ) যায়নাবকে ডাকিয়ে নিয়ে তাকে যখন বিষয়টি জিজ্ঞেস করলেন তখন সে বিষ প্রয়োগের কথা স্বীকার করল। তিনি তাকে পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি এমন কাজ করলে কেন? সে উত্তরে বলল, ‘আমি চিন্তা করলাম যে, এ ব্যক্তি যদি বাদশাহ হন তাহলে আমরা তাঁর থেকে নিস্কৃতি লাভ করব, আর যদি তিনি নাবী হন তাহলে তাঁকে এ সংবাদ জানিয়ে দেয়া হবে এবং তিনি বেঁচে যাবেন। তার এ কথা শুনে নাবী কারীম (ﷺ) তাকে ক্ষমা করলেন। এ সময় নাবী (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলেন বিশর বিন বারা’ বিন মারুর (রাঃ)। তিনি এক গ্রাস গিলে ফেললেন। ফলে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল।

এ মহিলাকে নাবী (ﷺ) ক্ষমা করেছিলেন কিংবা হত্যা করেছিলেন সে ব্যাপারে বর্ণনাকারীগণের মধ্যে মত পার্থক্য রয়েছে। মত পার্থক্যের সামঞ্জস্য বিধান করতে গিয়ে বলা হয়েছে যে, নাবী (ﷺ) প্রথমে মহিলাকে ক্ষমা করেছিলেন, কিন্তু যখন বিশর (রাঃ)-এর মৃত্যু সংঘটিত হয়ে গেল তখন তাকে হত্যার বিনিময়ে হত্যা করা হল।[1]

[1] যাদুল মা‘আদ ২য় খন্ড ১৩৯-১৪০ পঃ, ফাতহুল বারী ৭ম খন্ড ৪৯৭ পৃঃ, মূল ঘটনা সহীহুল বুখারীতে বিস্তারিত এবং সংক্ষিপ্ত দুভাবে বর্ণিত হয়েছে ১ম খন্ড ৪৪৯ পৃঃ, ২য় ৬১০ ও ৮৬০ পৃ: ইবনু হিশাম ২য় খন্ড ৩৩৭ ও ৩৩৮ পৃঃ।
দেখানো হচ্ছেঃ ৩০১ থেকে ৩১০ পর্যন্ত, সর্বমোট ৪৩৪ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে পাতা নাম্বারঃ « আগের পাতা 1 2 3 4 · · · 28 29 30 31 32 · · · 41 42 43 44 পরের পাতা »