আর আল্লাহ যে সম্পর্ক অটুট রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, যারা তা অটুট রাখে এবং তাদের রবকে ভয় করে, আর মন্দ হিসাবের আশঙ্কা করে। আল-বায়ান
তারা সে সব সম্পর্ক সম্বন্ধ বহাল রাখে যা বহাল রাখার জন্য আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন। তারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে এবং ভয়াবহ হিসাব নিকাশকে ভয় পায়। তাইসিরুল
আর আল্লাহ যে সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখতে আদেশ করেছেন যারা তা অক্ষুণ্ণ রাখে, ভয় করে তাদের রাব্বকে এবং ভয় করে কঠোর হিসাবকে । মুজিবুর রহমান
And those who join that which Allah has ordered to be joined and fear their Lord and are afraid of the evil of [their] account, Sahih International
২১. আর আল্লাহ যে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখতে আদেশ করেছেন যারা তা অক্ষুন্ন রাখে, ভয় করে তাদের রবকে এবং ভয় করে হিসাবকে,
-
তাফসীরে জাকারিয়া(২১) আর আল্লাহ যে সম্পর্ক অক্ষুণ´ রাখতে আদেশ করেছেন যারা তা অক্ষুণ´ রাখে[1] এবং ভয় করে তাদের প্রতিপালককে ও ভয় করে কঠোর হিসাবকে।
[1] অর্থাৎ আত্মীয়তার সম্পর্ক ও বন্ধন নষ্ট করে না; বরং সম্পর্ক গড়ে এবং আত্মীয়তা বন্ধন রক্ষা করে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানযারা তাদের রবের সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে সবর করে, সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদের যে রিয্ক প্রদান করেছি, তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে এবং ভাল কাজের মাধ্যমে মন্দকে দূর করে, তাদের জন্যই রয়েছে আখিরাতের শুভ পরিণাম। আল-বায়ান
তারা তাদের প্রতিপালকের চেহারা (সন্তুষ্টি) কামনায় ধৈর্য ধারণ করে, নামায প্রতিষ্ঠা করে, আর আমি তাদেরকে যে জীবিকা দিয়েছি তাত্থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে। তারা অন্যায়কে ন্যায় দ্বারা প্রতিরোধ করে। পরকালের ঘর প্রাপ্তি এদের জন্যই নির্দিষ্ট। তাইসিরুল
আর যারা তাদের রবের সন্তুষ্টি লাভের জন্য ধৈর্য ধারণ করে, সালাত সুপ্রতিষ্ঠিত করে, আমি তাদেরকে যে জীবনোপকরণ দিয়েছি তা হতে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে এবং যারা ভাল দ্বারা মন্দ দূর করে তাদের জন্য শুভ পরিণাম । মুজিবুর রহমান
And those who are patient, seeking the countenance of their Lord, and establish prayer and spend from what We have provided for them secretly and publicly and prevent evil with good - those will have the good consequence of [this] home - Sahih International
২২. আর যারা তাদের রবের সন্তুষ্টি লাভের জন্য ধৈর্য ধারণ করে এবং সালাত কায়েম করে, আর আমরা তাদেরকে যে জীবনোপকরণ দিয়েছি তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে এবং ভাল কাজের দ্বারা মন্দ কাজকে প্রতিহত করে, তাদের জন্যই রয়েছে আখেরাতের শুভ পরিণাম।
-
তাফসীরে জাকারিয়া(২২) আর যারা তাদের প্রতিপালকের মুখমন্ডল (দর্শন বা সন্তুষ্টি) লাভের জন্য ধৈর্য ধারণ করে,[1] নামায সুপ্রতিষ্ঠিত করে,[2] আমি তাদেরকে যে জীবনোপকরণ দিয়েছি তা হতে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে[3] এবং যারা ভাল দ্বারা মন্দকে প্রতিহত করে[4] তাদের জন্য শুভ পরিণাম (পরকালের গৃহ); [5]
[1] আল্লাহর অবাধ্যতা এবং পাপ থেকে বেঁচে থাকে। এটা এক প্রকার ধৈর্য। দুঃখ-কষ্টে ধৈর্য ধারণ করে। এটা ধৈর্যের দ্বিতীয় প্রকার। জ্ঞানীরা উভয় প্রকার ধৈর্য অবলম্বন করে।
[2] তার সময়-সীমা বহাল রেখে, বিনয়-নম্রতার সাথে এবং ধীর-স্থির চিত্তে, বিশুদ্ধ-চিত্তে, রসূল (সাঃ)-এর পদ্ধতি অনুযায়ী; নিজের মন মত পদ্ধতিতে নয়।
[3] যখন যেখানে ব্যয় করার প্রয়োজন হয়, আত্মীয়-অনাত্মীয়ের মাঝে প্রকাশ্যে ও গোপনে ব্যয় করে থাকে।
[4] অর্থাৎ তাদের সাথে কেউ অসঙ্গত ব্যবহার করলে তারা তার জবাব উত্তম পদ্ধতিতে দিয়ে থাকে, অথবা ক্ষমা করে দিয়ে ধৈর্য ধারণ করে নেয়। যেমন মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন: ﴿ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ﴾ অর্থাৎ, মন্দের জবাব উত্তম পদ্ধতিতে দাও, (যদি তোমরা এমনটি কর) তাহলে যে ব্যক্তি তোমার শত্রু, সে এমন হয়ে যাবে যেন সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু। (সূরা হা-মীম সাজদাহ: ৩৪)
[5] অর্থাৎ যে এই উন্নত চরিত্রের অধিকারী হবে এবং উল্লিখিত গুণাবলীতে গুণান্বিত হবে, তার জন্য রয়েছে শুভ পরিণামের গৃহ (বেহেশত)।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানস্থায়ী জান্নাতসমূহ, যাতে তারা এবং তাদের পিতৃপুরুষগণ, তাদের স্ত্রীগণ ও তাদের সন্তানদের মধ্যে যারা সৎ ছিল তারা প্রবেশ করবে। আর ফেরেশতারা প্রতিটি দরজা দিয়ে তাদের নিকট প্রবেশ করবে। আল-বায়ান
তা হল স্থায়ী জান্নাত, তাতে তারা প্রবেশ করবে। আর তাদের পিতৃ পুরুষ, স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানাদির মধ্যে যারা সৎকর্ম করেছে তারাও। আর ফেরেশতারা সকল দরজা দিয়ে তাদের কাছে হাযির হয়ে সংবর্ধনা জানাবে (এই বলে যে)- তাইসিরুল
স্থায়ী জান্নাত, তাতে তারা প্রবেশ করবে এবং তাদের মাতা-পিতা, পতি-পত্নী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে যারা সৎ কাজ করেছে তারাও এবং মালাইকা/ফেরেশতারা তাদের কাছে হাযির হবে প্রত্যেক দরজা দিয়ে। মুজিবুর রহমান
Gardens of perpetual residence; they will enter them with whoever were righteous among their fathers, their spouses and their descendants. And the angels will enter upon them from every gate, [saying], Sahih International
২৩. স্থায়ী জান্নাত(১), তাতে তারা প্রবেশ করবে এবং তাদের পিতা-মাতা, পতি-পত্নী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে যারা সৎকাজ করেছে তারাও।(২) আর ফেরেশতাগণ তাদের কাছে উপস্থিত হবে প্রত্যেক দরজা দিয়ে,
(১) পূর্ববর্তী আয়াতে আল্লাহ তা'আলা আনুগত্যশীলদের নয়টি গুণ বর্ণনা করার পর তাদের প্রতিদান বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, তাদের জন্যই রয়েছে আখেরাতের সাফল্য। আয়াতে বর্ণিত دار শব্দের অর্থ এখানে আখেরাত। [ফাতহুল কাদীর] আর এ আয়াতের প্রথমেই আখেরাতের সাফল্য বর্ণিত হয়েছে যে, জান্নাতে আদনে তারা থাকবে। عدن শব্দের অর্থ স্থায়ী আবাস। উদ্দেশ্য এই যে, এসব জান্নাত থেকে তাদেরকে বহিস্কার করা হবে না; বরং এগুলোতে তাদের অবস্থান চিরস্থায়ী হবে। [ইবন কাসীর] কেউ কেউ বলেনঃ জান্নাতের মধ্যস্থলের নাম আদন। জান্নাতের স্থানসমূহের মধ্যে এটা উচ্চস্তরের। [ফাতহুল কাদীর] দাহহাক বলেনঃ عدن হলো জান্নাতনগরীর নাম। যাতে রাসূল, নবী, শহীদ এবং হেদায়াতের ইমামগণ থাকবে। মানুষজন থাকবে তাদের চারপাশে। আর অন্যান্য জান্নাতসমূহ এর চারপাশে থাকবে। [ইবন কাসীর]
(২) এরপর তাদের জন্য আরো একটি পুরস্কার উল্লেখ করা হয়েছে। তা এই যে, আল্লাহ তা'আলার এ নেয়ামত শুধু তাদের ব্যক্তিসত্তা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তাদের বাপ-দাদা, স্ত্রী ও সন্তানরাও এর অংশ পাবে। শর্ত এই যে, তাদেরকে এর উপযুক্ত হতে হবে। এর নূ্ন্যতম স্তর হচ্ছে মুসলিম হওয়া। [ফাতহুল কাদীর] উদ্দেশ্য এই যে, তাদের বাপ-দাদা ও স্ত্রী এবং সন্তান-সন্ততিদের আমল যদিও এ স্তরে পৌছার যোগ্য নয়; কিন্তু আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের খাতিরে তাদেরকেও এ উচ্চস্তরে পৌছে দেয়া হবে। [কুরতুবী] অন্যত্র আল্লাহ বলেন “এবং যারা ঈমান আনে আর তাদের সন্তান-সন্ততি ঈমানে তাদের অনুগামী হয়, তাদের সাথে মিলিত করব তাদের সন্তান-সন্ততিকে এবং তাদের কর্মফল আমি একটুও কমাবো না।” [সূরা আত-তূরঃ ২১]
তাফসীরে জাকারিয়া(২৩) স্থায়ী জান্নাত,[1] তাতে তারা প্রবেশ করবে এবং তাদের পিতা-মাতা, পতিপত্নি ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করেছে তারাও।[2] আর ফিরিশতাগণ তাদের কাছে প্রবেশ করবে প্রত্যেক দরজা দিয়ে।
[1] ‘আদন’ এর অর্থ হলো স্থায়ী অর্থাৎ চিরস্থায়ী বাগান।
[2] অর্থাৎ এমনিভাবে সৎশীল (জান্নাতী) আত্মীয়দেরকে পরস্পর একত্র করে দেবেন, যাতে একে অপরকে দেখে তাদের চক্ষু শীতল হয়। এমনকি নিম্ন শ্রেণীর জান্নাতীদের উচ্চ শ্রেণীর মর্যাদা দান করবেন, যাতে তারা সব সব আত্মীয়ের সাথে একত্রিত হতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন, ﴿وَالَّذِينَ آمَنُوا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُم بِإِيمَانٍ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَمَا أَلَتْنَاهُم مِّنْ عَمَلِهِم مِّن شَيْءٍ ﴾ অর্থাৎ, যারা ঈমান আনে আর তাদের সন্তান-সন্ততি ঈমানে তাদের অনুগামী হয়, তাদের সাথে মিলিত করব তাদের সন্তান-সন্ততিকে এবং তাদের কর্মফল আমি কিছুমাত্র হ্রাস করব না। (সূরা ত্বূ-র ২১) এখান থেকে যেমন এটা জানা গেল যে, মহান আল্লাহ আত্মীয়দেরকে জান্নাতে একত্র করে দেবেন, তেমন এটাও জানা গেল যে, যদি কারো কাছে ঈমান ও সৎ আমলের সম্বল না থাকে তাহলে সে জান্নাতে যাবে না, যদিও তার অন্যান্য অত্যন্ত নিকটাত্মীয় জান্নাতে চলে যায়। কেননা জান্নাতে প্রবেশ জাত-কূলের ভিত্তিতে হয় না, বরং ঈমান ও সৎ আমলের ভিত্তিতে হয়ে থাকে। মহানবী (সাঃ) বলেন, "যাকে তার আমল পিছে ছেড়ে দেয়, তার বংশ তাকে সামনে বাড়াবে না।" (মুসলিম)
তাফসীরে আহসানুল বায়ান(আর বলবে) ‘শান্তি তোমাদের উপর, কারণ তোমরা সবর করেছ, আর আখিরাতের এ পরিণাম কতই না উত্তম’। আল-বায়ান
‘‘তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক, কারণ তোমরা ধৈর্যধারণ করেছিলে। কতই না উত্তম পরকালের এই ঘর!’’ তাইসিরুল
(তারা বলবেঃ) তোমরা ধৈর্য ধারণ করেছ বলে তোমাদের প্রতি শান্তি (সালাম)! কতই না ভাল এই পরিণাম! মুজিবুর রহমান
"Peace be upon you for what you patiently endured. And excellent is the final home." Sahih International
২৪. এবং বলবে, তোমরা ধৈর্য ধারণ করেছ বলে তোমাদের প্রতি শান্তি; আর আখেরাতের এ পরিণাম কতই না উত্তম!(১)
(১) এরপর তাদের আরও একটি আখেরাতের সাফল্য বর্ণনা করা হয়েছে যে, ফিরিশতারা তাদেরকে সালাম করতে করতে প্রত্যেক দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে এবং বলবেঃ সবরের কারণে তোমরা যাবতীয় দুঃখ-কষ্ট থেকে নিরাপত্তা লাভ করেছ। [ফাতহুল কাদীর] এটা আখেরাতের কতই না উত্তম পরিণাম। অর্থাৎ তারা তাদেরকে এ সুখবর দেবে যে, এখন তোমরা এমন জায়গায় এসেছে যেখানে পরিপূর্ণ শান্তি ও নিরাপত্তা বিরাজমান। এখন তোমরা এখানে সব রকমের আপদ-বিপদ, কষ্ট, কাঠিন্য, কঠোর পরিশ্রম, শংকা ও আতংকমুক্ত। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে প্রথম যে দলটি জান্নাতে যাবে তারা হলেন দরিদ্র মুহাজিরগণ। যাদের দ্বারা সীমান্ত পাহারা দেয়া হয়। খারাপ অবস্থায় তাদের সাহায্য নেয়া হয়। তাদের অনেকেই এমনভাবে মারা যায় যে, তাদের মনে অনেক অপূর্ণ বাসনা রয়েই গেছে।
আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতাদের বলবেনঃ তোমরা যাও এবং তাদেরকে সালাম-সম্ভাষণ জানাও। ফেরেশতাগণ বলবেনঃ আমরা আপনার আসমানের বাসিন্দা, আপনার শ্রেষ্ট সৃষ্টির অন্যতম তারপরও কি আপনি আমাদেরকে তাদেরকে সম্মান জানানোর জন্য নির্দেশ দিচ্ছেন। আল্লাহ বলবেনঃ তারা আমার এমন বান্দা ছিল যারা কেবলমাত্র আমার ইবাদত করত। আমার সাথে সামান্যও শির্ক করেনি। তাদের দ্বারা সীমান্ত পাহারা দেয়া হতো এবং বিপজ্জনক সময়ে তাদের সাহায্য নেয়া হত। তারা এমনভাবে মারা গেছে যে, তাদের মনের বাসনা মনেই রয়ে গেছে তা তারা পূরণ করতে পারেনি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তখন ফেরেশতাগণ তাদের কাছে বিভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করে তাদেরকে সাদর-সম্ভাষণ জানাবে। তোমরা ধৈর্য ধারণ করেছ বলে তোমাদের প্রতি শান্তি; কত ভাল এ পরিণাম। [মুসনাদে আহমাদঃ ২/১৬৮]
তাফসীরে জাকারিয়া(২৪) (তারা বলবে,) তোমরা ধৈর্যধারণ করেছ বলে তোমাদের প্রতি শান্তি! কতই না ভাল এই পরিণাম।
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকার করার পর তা ভঙ্গ করে এবং আল্লাহ যে সম্পর্ক অটুট রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তা ছিন্ন করে এবং যমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করে, তাদের জন্যই লা‘নত আর তাদের জন্যই রয়েছ আখিরাতের মন্দ আবাস। আল-বায়ান
আর যারা আল্লাহর সাথে শক্ত ও‘য়াদা করার পর তা ভঙ্গ করে, আল্লাহ যা বহাল রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তা ছিন্ন করে, আর যমীনে অশান্তি সৃষ্টি করে, তাদের প্রতি অভিশাপ, তাদের জন্য আছে অতিশয় মন্দ আবাসস্থল। তাইসিরুল
যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের জন্য আছে অভিসম্পাত এবং আছে মন্দ আবাস। মুজিবুর রহমান
But those who break the covenant of Allah after contracting it and sever that which Allah has ordered to be joined and spread corruption on earth - for them is the curse, and they will have the worst home. Sahih International
২৫. পক্ষান্তরে যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং যমীনে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের জন্যই রয়েছে লা’নত এবং তাদের জন্য রয়েছে আখেরাতের মন্দ আবাস।(১)
(১) এ আয়াতে সে সমস্ত অপরিণামদর্শী লোকদের আলোচনা করা হচ্ছে, যারা পূর্ববর্তী গুণগুলোর বিপরীত কাজ করে। তাদের জন্য কি শাস্তি রয়েছে তাও বর্ণনা করা হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর] এ সমস্ত অবাধ্য বান্দাদের স্বভাব হলো যে, তারা আল্লাহ তা'আলার অঙ্গীকারকে পাকাপোক্ত করার পর তা ভংগ করে থাকে। হাদীসে অঙ্গীকার ভঙ্গ করাকে মুনাফিকের একটি আলামত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। [ইবন কাসীর] অবাধ্য বান্দাদের দ্বিতীয় স্বভাব এরূপ বর্ণিত হয়েছে যে, তারা ঐসব সম্পর্ক ছিন্ন করে, যেগুলো বজায় রাখতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন। আত্মীয়তার সম্পর্কও আয়াতের অন্তর্ভুক্ত। তাছাড়া সমস্ত নবী-রাসূলদের উপর ঈমান আনাও এর অন্তর্ভুক্ত। [কুরতুবী]
তৃতীয় স্বভাব এই যে, তারা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করে। তারা কুফরি ও গোনাহ করে যমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করে। [কুরতুবী] যারা আল্লাহ্ তা'আলা ও মানুষের অঙ্গীকারের পরওয়া করে না এবং কারো অধিকার ও সম্পর্কের প্রতি লক্ষ্য করে না, তাদের কর্মকাণ্ড যে অপরাপর লোকদের ক্ষতি ও কষ্টের কারণ হবে, তা বলাই বাহুল্য। ঝগড়া-বিবাদ ও মারামারি-কাটাকাটির বাজার গরম হবে। এটা এক বিরাট ফাসাদ।
আবুল আলীয়া রাহেমাহুল্লাহ বলেন, মুনাফিক শ্রেণীর লোক যখন মানুষের উপর কর্তৃত্ব করে তখন ছয়টি খারাপ অভ্যাস ও কর্ম করে থাকেঃ কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তার বিপরীত কাজ করে, তাদের কাছে আমানত রাখা হলে তা খেয়ানত করে, আল্লাহর নেয়া অঙ্গীকারকে ভঙ্গ করে, আল্লাহ যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ঠিক রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন তা কর্তন করে এবং যমীনের মধ্যে বিপর্যয় ও ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করে। আর যখন তারা কর্তৃত্বে থাকে না বা অন্যরা তাদের উপর কর্তৃত্ব করে তখন তারা তিনটি কাজ করেঃ কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তার বিপরীত করে এবং আমানতের খেয়ানত করে। [ইবন কাসীর] হাদীসেও তাদের কর্মকাণ্ডের কথা বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মুনাফিকের আলামত তিনটি, যখন কথা বলবে মিথ্যা বলবে, যখন ওয়াদা করবে তার বিপরীত করবে এবং যখন আমানত রাখা হবে তখন তার খেয়ানত করবে। [বুখারীঃ ৩৩, মুসলিমঃ ৫৯] অন্য বর্ণনায় এসেছে, যখন অঙ্গীকার করবে তা ভঙ্গ করবে, যখন ঝগড়া করবে গালি-গালাজ করবে। [বুখারীঃ ৩৪, মুসলিমঃ ৫৮]
অবাধ্য বান্দাদের এই সমস্ত স্বভাব বর্ণনা করার পর তাদের শাস্তি উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, তাদের জন্য লা'নত ও মন্দ আবাস রয়েছে। লানতের অর্থ আল্লাহর রহমত থেকে দূরে থাকা এবং বঞ্ছিত হওয়া। [কুরতুবী] বলাবাহুল্য, আল্লাহর রহমত থেকে দূরে থাকাই সর্বাপেক্ষা বড় আযাব এবং সব বিপদের বড় বিপদ। পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে যেমন অনুগত বান্দাদের প্রতিদান উল্লেখ করে বলা হয়েছিল যে, তাদের স্থান হবে জান্নাতে, ফিরিশতারা তাদেরকে সালাম করে বলবে যে, এসব নেয়ামত তোমাদের সবর ও আনুগত্যের ফলশ্রুতি, তেমনিভাবে এ আয়াতে অবাধ্যদের অশুভ পরিণতি বর্ণনা করে বলা হয়েছে যে, তাদের উপর আল্লাহর লা'নত অর্থাৎ তারা আল্লাহর রহমত থেকে দূরে এবং তাদের জন্য জাহান্নামের আবাস অবধারিত। এতে বুঝা যায় যে, অঙ্গীকার ভঙ্গ করা এবং আত্মীয় ও স্বজনদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা অভিসম্পাত ও জাহান্নামের কারণ।
তাফসীরে জাকারিয়া(২৫) যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুণ´ রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন, তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের জন্য আছে অভিসম্পাত এবং তাদের জন্য আছে মন্দ আবাস। [1]
[1] এখানে সৎকর্মশীলদের সাথে অসৎকর্মশীলদের পরিণাম বর্ণনা করেছেন, যেন মানুষ এই পরিণাম থেকে বাঁচার চেষ্টা করে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা করেন রিযক বাড়িয়ে দেন এবং সঙ্কুচিত করেন। আর তারা দুনিয়ার জীবন নিয়ে উৎফুল্লতায় আছে, অথচ আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবন খুবই নগণ্য। আল-বায়ান
আল্লাহ রিযক সম্প্রসারিত করেন যার জন্য ইচ্ছে করেন, আর যার জন্য চান সীমিত পরিমাণে দেন। তারা পার্থিব জীবনে আনন্দে মেতে আছে অথচ আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবন অতি নগণ্য বস্তু। তাইসিরুল
আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা করেন তার জীবনোপকরণ বর্ধিত করেন কিংবা সংকুচিত করেন; কিন্তু তারা পাথির্ব জীবন নিয়েই উল্লসিত, অথচ ইহজীবনতো পরজীবনের তুলনায় ক্ষণস্থায়ী ভোগ মাত্র। মুজিবুর রহমান
Allah extends provision for whom He wills and restricts [it]. And they rejoice in the worldly life, while the worldly life is not, compared to the Hereafter, except [brief] enjoyment. Sahih International
২৬. আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছে তার জীবনোপকরণ বৃদ্ধি করেন এবং সংকুচিত করেন; কিন্তু এরা দুনিয়ার জীবন নিয়েই আনন্দিত, অথচ দুনিয়ার জীবন তো আখিরাতের তুলনায় ক্ষণস্থায়ী ভোগমাত্র।(১)
(১) এ আয়াতের পটভূমি হচ্ছে, সাধারণ মূর্খ ও অজ্ঞদের মতো মক্কার কাফেররাও বিশ্বাস ও কর্মের সৌন্দর্য বা কদৰ্যতা দেখার পরিবর্তে ধনাঢ্যতা বা দারিদ্র্যের দৃষ্টিতে মানুষের মূল্য ও মর্যাদা নিরূপণ করতো। তাদের ধারণা ছিল, যারা দুনিয়ায় প্রচুর পরিমাণ আরাম আয়েশের সামগ্ৰী লাভ করছে তারা যতই পথভ্রষ্ট ও অসৎকর্মশীল হোক না কেন তারা আল্লাহর প্রিয়। আর অভাবী ও দারিদ্র পীড়িতরা যতই সৎ হোক না কেন তারা আল্লাহর অভিশপ্ত। এ ব্যাপারে তাদেরকে সতর্ক করে বলা হচ্ছে, রিযিক কমবেশী হবার ব্যাপারটা আল্লাহর অন্য নীতির সাথে সংশ্লিষ্ট। সেখানে অন্যান্য অসংখ্য প্রয়োজন ও কল্যাণ-অকল্যাণের প্রেক্ষিতে কাউকে বেশী ও কাউকে কম দেয়া হয়।
এটা এমন কোন মানদণ্ড নয় যার ভিত্তিতে মানুষের নৈতিক ও মানসিক সৌন্দর্য ও কদর্যতার ফায়সালা করা যেতে পারে। মানুষের মধ্যে কে চিন্তা ও কর্মের সঠিক পথ অবলম্বন করেছে এবং কে ভুল পথ, কে উন্নত ও সৎগুণাবলী অর্জন করেছে এবং কে অসৎগুণাবলী -এরি ভিত্তিতে তাদের সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের আসল মানদণ্ড নির্ধারণ হওয়া উচিত। কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এ বিষয়টি আল্লাহ্ তাআলা বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন। যেমন আল্লাহ বলেন, “তারা কি মনে করে যে, আমি তাদেরকে সাহায্যস্বরূপ যে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দান করি, তা দ্বারা তাদের জন্য সকল মংগল তুরান্বিত করছি? না, তারা বুঝে না।” [আল-মু'মিনূনঃ ৫৫–৫৬]
আয়াতের শেষে আল্লাহ তা'আলা দুনিয়ার জীবনের যাবতীয় সামগ্ৰী যে আখেরাতের তুলনায় কিছুই নয় তা বর্ণনা করে বলেছেন যে, “দুনিয়ার জীবন তো আখিরাতের তুলনায় ক্ষণস্থায়ী ভোগমাত্র।” অন্যত্র এসেছে, “বলুন, পার্থিব ভোগ সামান্য এবং যে মুত্তাকী তার জন্য আখেরাতই উত্তম। তোমাদের প্রতি সামান্য পরিমাণও যুলুম করা হবে না।” [সূরা আন-নিসাঃ ৭৭]
আরো এসেছে, “কিন্তু তোমরা পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দাও, অথচ আখিরাতই উৎকৃষ্ট এবং স্থায়ী।” [সূরা আল-আলাঃ ১৬–১৭] হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “আখেরাতের তুলনায় দুনিয়া হলো এমন যেন তোমাদের কেউ সমুদ্রে তার এই আঙ্গুল ঢুকিয়ে আনল”, তারপর তিনি নিজের তর্জনীর দিকে ইঙ্গিত করলেন। [মুসলিমঃ ২৮৫৮] অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার এক মরা কান ছোট ছাগলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তিনি তা দেখিয়ে সাহাবায়ে কিরামকে বললেন, আল্লাহর শপথ! এ ছাগলটি যেমন তার মালিকের নিকট মূল্যহীন তেমনি দুনিয়ার মূল্য আল্লাহর নিকট তার ছেয়েও সামান্য। [মুসলিমঃ ২৯৫৭]
তাফসীরে জাকারিয়া(২৬) আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা করেন তার জীবনোপকরণ বর্ধিত করেন এবং সংকুচিত করেন।[1] কিন্তু তারা পার্থিব জীবন নিয়েই উল্লসিত; [2] অথচ ইহজীবন তো পরজীবনের তুলনায় নগণ্য ভোগ মাত্র। [3]
[1] যখন কাফের এবং মুশরিকদের ব্যাপারে বললেন যে, তাদের জন্য রয়েছে নিকৃষ্ট স্থান, তখন মস্তিষ্কে এই প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারে যে, তারা তো পৃথিবীতে হরেক রকমের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ভোগ করে থাকে। এ কথা খন্ডনের জন্য বললেন যে, পার্থিব উপায়-উপকরণ ও জীবিকার কম-বেশি হওয়ার এখতিয়ার আল্লাহর হাতে রয়েছে। তিনি নিজ হিকমত ও ইচ্ছা অনুযায়ী (যা শুধু তিনিই জানেন) কাউকে বেশি এবং কাউকে কম দিয়ে থাকেন। জীবিকার আধিক্য এ কথার প্রমাণ নয় যে, মহান আল্লাহ তার উপর সন্তুষ্ট এবং কমতির অর্থ এটা নয় যে, আল্লাহ তা‘আলা তার উপর অসন্তুষ্ট।
[2] আল্লাহর অবাধ্য হওয়া সত্ত্বেও যদি কেউ পার্থিব সম্পদ পায়, তাহলে তাতে আনন্দ-উল্লাসের কিছু নেই। কেননা তা আল্লাহর পক্ষ হতে অবকাশ মাত্র। কারো জানা নেই যে, অকস্মাৎ কখন এই অবকাশ সময়ের অবসান ঘটবে এবং তাঁর পাকড়াও এসে আক্রমণ করবে।
[3] হাদীসে এসেছে যে, পরকালের অপেক্ষা ইহকালের মূল্য ততটুক, যতটুক কোন ব্যক্তি তার আঙ্গুল সমুদ্রে ডুবায় অতঃপর তা বের করে দেখে যে সমুদ্রের পানির তুলনায় তার আঙ্গুলে কতটুক পরিমাণ পানি এসেছে? (মুসলিমঃ কিতাবুল জান্নাহ) অন্য এক হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) একটি মৃত ছাগলের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তা দেখে বললেন, আল্লাহর শপথ! দুনিয়া আল্লাহর নিকট এটির চাইতেও বেশি তুচ্ছ, যতটা এই মৃত ছাগল তার মালিকদের নিকট সেই সময় তুচ্ছ ছিল, যে সময় তারা তাকে ফেলে দিয়েছিল। (মুসলিম, কিতাবুযযুহ্দি অররিক্বাক)
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর যারা কুফরী করেছে, তারা বলে, ‘তার নিকট তার রবের পক্ষ থেকে কোন নিদর্শন কেন নাযিল হয় না’? বল, ‘নিশ্চয় আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যে তাঁর অভিমুখী হয়, তাকে তিনি তাঁর দিকে পথ দেখান’। আল-বায়ান
সত্য প্রত্যাখ্যানকারীরা বলে, ‘তার কাছে তার প্রতিপালকের নিকট হতে কোন নিদর্শন অবতীর্ণ হয় না কেন?’ বল, ‘আল্লাহ যাকে ইচ্ছে গুমরাহ করেন, আর যে তাঁর অভিমুখী তাকে সত্য পথে পরিচালিত করেন।’ তাইসিরুল
যারা কুফরী করেছে তারা বলেঃ তার রবের নিকট হতে তার নিকট কোন নিদর্শন অবতীর্ণ হয়না কেন? তুমি বলঃ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং তিনি তাদেরকে তাঁর পথ দেখান যারা তাঁর অভিমুখী। মুজিবুর রহমান
And those who disbelieved say, "Why has a sign not been sent down to him from his Lord?" Say, [O Muhammad], "Indeed, Allah leaves astray whom He wills and guides to Himself whoever turns back [to Him] - Sahih International
২৭. আর যারা কুফরী করেছে তারা বলে, তার রবের কাছ থেকে তার কাছে কোন নিদর্শন নাযিল হয় না কেন?(১) বলুন, আল্লাহ যাকে ইচ্ছে বিভ্রান্ত করেন এবং যারা তার অভিমুখী তিনি তাদেরকে তার পথ দেখান।(২)
(১) আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছে করলে তারা যে ধরণের নিদর্শন চাচ্ছে সেটা দিতে পারেন। [ইবন কাসীর] এমনকি হাদীসে এসেছে, যখন মক্কার কাফের কুরাইশরা চাইলো যে, আমাদের জন্য সাফা পাহাড়কে স্বর্ণে পরিণত করে দিন। আমাদের জন্য ঝর্ণাধারা প্রবাহিত করে দিন। মক্কার পাশ থেকে পাহাড়গুলো সরিয়ে নিয়ে যান। যাতে সেখানে বাগান ও নদী-নালা পূর্ণ হয়ে যায়। তখন আল্লাহ তা’আলা তাঁর রাসূলের কাছে ওহী পাঠালেন যে, হে মুহাম্মাদ! আপনি চাইলে আমি তাদেরকে তা প্রদান করব।
কিন্তু তারপর যদি তারা কুফরি করে তবে তাদেরকে এমন শাস্তি দেব যা আমি সৃষ্টিকুলের কাউকে কোনদিন দেইনি। আর যদি আপনি চান যে, আমি রহমত ও তাওবার দরজা খুলে দেই তবে তা-ই করব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, বরং তাদের জন্য রহমত ও তাওবার দরজা খোলা হোক। [মুসনাদে আহমাদ ১/২৪২] [ইবন কাসীর] সুতরাং নিদর্শন পাওয়াই বড় কথা নয়, হিদায়াত নসীব হওয়াই বড় কথা। তাই তো আল্লাহ তাদের জন্য নিদর্শন না দিয়ে রহমত ও তাওবার রাস্তা খোলা রেখেছেন। পরবর্তীতে মক্কাবাসীদের অনেকেই সে রহমতে ধন্য হয়।
(২) অর্থাৎ যে নিজেই আল্লাহর দিকে রুজু হয় না বরং তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, হিদায়াত গ্রহণ করতে চায় না, তাকে জোর করে সত্য-সঠিক পথ দেখানো আল্লাহর রীতি নয়। যারা আল্লাহর পথের সন্ধান করে ফিরছে তারা নিদর্শন দেখতে পাচ্ছে এবং নিদর্শনসমূহ দেখেই তারা সত্য পথের সন্ধান লাভ করছে। তোমাদের কাছে যদি যাবতীয় নিদর্শনও আনা হয় তবুও তোমরা ঈমান আনবে না। [দেখুন, মুয়াসসার; আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর] অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “নিদর্শনাবলী ও ভীতি প্রদর্শন অবিশ্বাসী সম্প্রদায়ের উপকারে আসে না। [সূরা ইউনুসঃ ১০১]
অন্য আয়াতে এসেছে, “নিশ্চয়ই যাদের বিরুদ্ধে আপনার রবের বাক্য সাব্যস্ত হয়ে গেছে, তারা ঈমান আনবে না, যদিও তাদের কাছে সবগুলো নিদর্শন আসে, এমনকি তারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেখতে পাবে।” [সূরা ইউনুসঃ ৯৬–৯৭] আল্লাহ আরো বলেনঃ “আমি তাদের কাছে ফিরিশতা পাঠালেও এবং মৃতেরা তাদের সাথে কথা বললেও এবং সকল বস্তুকে তাদের সামনে হাযির করলেও আল্লাহর ইচ্ছে না হলে তারা কখনো ঈমান আনবে না; কিন্তু তাদের অধিকাংশই অজ্ঞ। [সূরা আল-আনআমঃ ১১১]
তাফসীরে জাকারিয়া(২৭) যারা অবিশ্বাস করেছে তারা বলে, ‘তার প্রতিপালকের নিকট হতে তার নিকট কোন নিদর্শন অবতীর্ণ করা হয় না কেন?’ তুমি বল, ‘আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং তিনি তাদেরকেই তাঁর পথ দেখান যারা তাঁর অভিমুখী;
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান‘যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়’। আল-বায়ান
তারাই ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে তাদের অন্তর প্রশান্তি লাভ করে। জেনে রেখ, আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমেই দিলের সত্যিকারের প্রশান্তি লাভ করা যায়। তাইসিরুল
যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের চিত্ত প্রশান্ত হয়; জেনে রেখ, আল্লাহর স্মরণেই চিত্ত প্রশান্ত হয়। মুজিবুর রহমান
Those who have believed and whose hearts are assured by the remembrance of Allah. Unquestionably, by the remembrance of Allah hearts are assured." Sahih International
২৮. যারা ঈমান আনে(১) এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের মন প্রশান্ত হয়; জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই মন প্রশান্ত হয়(২);
(১) অর্থাৎ তারা যে নিদর্শন চাচ্ছে তেমনি কোন নিদর্শন ছাড়াই যারা ঈমান আনে তাদের সম্পর্কে আলোচনা করা হচ্ছে।
(২) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি তার প্রভুর স্মরণ অর্থাৎ যিকির করে আর যে করে না তাদের উদাহরণ হলো জীবিত এবং মৃত ব্যক্তির ন্যায়। [বুখারীঃ ৬৪০৭] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেনঃ “যে ব্যক্তি প্রতিদিন একশতবার সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী পাঠ করবে, তার গুনাহ যদি সমুদ্রের ফেনাতুল্যও হয় তবুও আল্লাহ দয়া করে তা ক্ষমা করে দিবেন।” [বুখারীঃ ৬৪০৫]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, যে ব্যক্তি দিনে একশতবার ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া 'আলা কুল্লি শাইয়্যিন ক্বাদীর’ পড়ে সে ব্যক্তি দশটি দাস স্বাধীন করার সওয়াব পাবে, তার জন্য একশটি নেকী লিখা হবে এবং তার একশটি গুণাহ মিটিয়ে দেয়া হবে। ওই দিন সন্ধা পর্যন্ত শয়তান থেকে তার রক্ষা পাওয়ার ব্যবস্থা হবে এবং তার চেয়ে উত্তম আর কেউ হবে না। তবে যে ব্যক্তি এটা তার চেয়ে বেশী পড়ে সে ব্যতিত”। [বুখারীঃ ৬৪০৩]
তাফসীরে জাকারিয়া(২৮) যারা বিশ্বাস করেছে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের হৃদয় প্রশান্ত হয়। জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই হৃদয় প্রশান্ত হয়। [1]
[1] আল্লাহর স্মরণ বা যিকরের অর্থ তাঁর তওহীদের (একত্ববাদের) বর্ণনা, যার দ্বারা মুশরিকদের অন্তর সঙ্কুচিত হয়ে যায়। অথবা যিকর অর্থঃ তাঁর ইবাদত, কুরআন তিলাঅত, নফল ইবাদত এবং দু‘আ ও মুনাজাত; যা ঈমানদারদের মনের খোরাক। অথবা তাঁর আদেশ-নির্দেশ পালন করা; যা ব্যতিরেকে ঈমানদার ও পরহেযগারগণ অস্থির থাকেন।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান‘যারা ঈমান আনে এবং নেক আমল করে, তাদের জন্য রয়েছে স্বাচ্ছন্দ ও সুন্দর প্রত্যাবর্তনস্থল’। আল-বায়ান
যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, সৌভাগ্য তাদেরই, উত্তম পরিণাম তাদের জন্যই। তাইসিরুল
যারা ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে, কল্যাণ ও শুভ পরিণাম তাদেরই। মুজিবুর রহমান
Those who have believed and done righteous deeds - a good state is theirs and a good return. Sahih International
২৯. যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, তাদেরই জন্য রয়েছে পরম আনন্দ(১) এবং সুন্দর প্রত্যাবর্তনস্থল।
(১) মূলে বলা হয়েছে, (طُوبَىٰ لَهُمْ) বা তাদের জন্য রয়েছে ‘তুবা’। এখানে তুবা শব্দ দ্বারা কি উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে এ ব্যাপারে বিভিন্ন বর্ণনা এসেছে। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে এসেছে যে, এর অর্থঃ তাদের জন্য রয়েছে খুশী ও চক্ষু সিক্তকারী। ইকরিমা বলেন, এর অর্থঃ তাদের জন্য যা আছে তা কতইনা উত্তম! দাহহাক বলেন, এর অর্থঃ তাদের জন্য ঈর্ষান্বিত হওয়ার মত নেয়ামত। ইবরাহীম নাখায়ী বলেন, এর অর্থঃ তাদের জন্য কল্যাণ। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, তুবা হলো জান্নাতের একটি গাছের নাম। [ইবন কাসীর]
তবে নিঃসন্দেহে এ সমস্তের মূল অর্থঃ জান্নাত। কারণ জান্নাত এ সবগুলোর সমষ্টি। জান্নাতের নে’আমত অগণিত, অসংখ্য। এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “আল্লাহ্ তাআলা সর্বশেষে জান্নাতে গমনকারীকে বলবেন, তোমার যাবতীয় আকাংখা আমার কাছে ব্যক্ত কর। সে লোক চাইতেই থাকবে। শেষ পর্যন্ত যখন তার চাহিদা শেষ হয়ে যাবে। তার আর চাওয়ার কিছু থাকবে না তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাকে বলবেনঃ এটা থেকে চাও, ওটা থেকে চাও, এভাবে তাকে তিনি স্মরণ করিয়ে দিবেন। তারপর তিনি তাকে এসব দিয়ে বলবেন। তোমাকে এসবকিছু এবং এগুলোর দশগুণ দেয়া হলো”। [বুখারীঃ ৮০৬, ৮৪৩৭, ৮৪৩৮, মুসলিমঃ ১৮২]
আবু যর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসে কুদসিতে এসেছে, আল্লাহ তা'আলা বলেন, হে আমার বান্দারা! তোমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী, জিন ও মানব সবাই যদি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আমার কাছে চাইতে থাক, তারপর আমি তাদের সবাইকে তাঁর প্রার্থিত বস্তু প্রদান করি, তবে তা আমার রাজত্বের কিছুই কমাবে না। তবে এতটুকু যতটুকু সুই সমুদ্রের পানিতে ডুবিয়ে কমাতে পারে। [মুসলিম: ২৫৭৭]
তাফসীরে জাকারিয়া(২৯) যারা বিশ্বাস করে ও সৎকর্ম করে, কল্যাণ[1] ও শুভ পরিণাম তাদেরই।’
[1] طُوْبَى এর একাধিক অর্থ বর্ণনা করা হয়েছে, উদাহরণ স্বরূপঃ কল্যাণ, পুণ্য, কারামত, ঈর্ষা, জান্নাতের বিশেষ গাছ অথবা বিশেষ স্থান ইত্যাদি। সবের ভাবার্থ প্রায় একই; অর্থাৎ জান্নাতে উত্তম স্থান এবং তার সুখ-সুবিধা।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানএমনিভাবে আমি তোমাকে পাঠিয়েছি এমন এক জাতির নিকট, যার পূর্বে অনেক জাতি গত হয়েছে, যেন আমি তোমার প্রতি যে ওহী প্রেরণ করেছি, তা তাদের নিকট তিলাওয়াত কর। অথচ তারা রহমানকে অস্বীকার করে। বল, ‘তিনি আমার রব, তিনি ছাড়া আর কোন (সত্য) ইলাহ নেই, তাঁরই উপর আমি তাওয়াক্কুল করেছি এবং তাঁরই দিকে আমার প্রত্যাবর্তন’। আল-বায়ান
(পূর্বে যেমন পাঠিয়েছিলাম) এভাবেই আমি তোমাকে এমন এক সম্প্রদায়ের কাছে পাঠিয়েছি যার পূর্বে অনেক সম্প্রদায় গত হয়ে গেছে, যাতে তুমি তাদের কাছে তেলাওয়াত কর যা আমি তোমার প্রতি ওয়াহী করি, তবুও তারা দয়াময় আল্লাহকে অস্বীকার করে। বল, ‘তিনি আমার প্রতিপালক, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, আমি তাঁর উপরই নির্ভর করি আর তিনিই প্রত্যাবর্তনস্থল।’ তাইসিরুল
এভাবে আমি তোমাকে পাঠিয়েছি এক জাতির প্রতি, যার পূর্বে বহু জাতি গত হয়েছে, তাদের নিকট আবৃত্তি করার জন্য, যা আমি তোমার প্রতি প্রত্যাদেশ করেছি; তথাপি তারা দয়াময়কে অস্বীকার করে। তুমি বলঃ তিনিই আমার রাব্ব! তিনি ছাড়া অন্য কোন মা‘বূদ নেই, তাঁরই উপর আমি নির্ভর করি এবং আমার প্রত্যাবর্তন তাঁরই কাছে। মুজিবুর রহমান
Thus have We sent you to a community before which [other] communities have passed on so you might recite to them that which We revealed to you, while they disbelieve in the Most Merciful. Say, "He is my Lord; there is no deity except Him. Upon Him I rely, and to Him is my return." Sahih International
৩০. এভাবে আমরা আপনাকে পাঠিয়েছি এমন এক জাতির প্রতি যাদের আগে বহু জাতি গত হয়েছে, যাতে আমরা আপনার প্রতি যা ওহী করেছি, তা তাদের কাছে তিলাওয়াত করেন। তথাপি তারা রহমানকে অস্বীকার করে।(১) বলুন, তিনিই আমার রব; তিনি ছাড়া অন্য কোন হক্ক ইলাহ নেই। তারই উপর আমি নির্ভর করি এবং তারই কাছে আমার ফিরে যাওয়া।
(১) অর্থাৎ তাঁর বন্দেগী থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে আছে। তাঁর গুণাবলী, ক্ষমতা ও অধিকারে অন্যদেরকে তাঁর সাথে শরীক করছে। তাঁর দানের জন্য অন্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে। তারা নতুন কিছু করছে না, তাদের পূর্বেও আমরা অনেক রাসুল প্রেরণ করেছি। তারা যেভাবে দয়াময় প্রভুকে ভুলে শাস্তির অধিকারী হয়েছে তেমনিভাবে আপনার জাতির কাফেররাও রহমান তথা দয়াময় প্রভুকে অস্বীকার করছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে তাদের শাস্তি অনিবার্য। [এ সংক্রান্ত আরো আয়াত দেখুন, সূরা আন-নাহলঃ ৬৩, সূরা আল-আনআমঃ ৩৪]
আয়াতে বলা হয়েছে, যে তারা “রাহমান”কে অস্বীকার করছে। এখানে মূলতঃ তারা আল্লাহ তা'আলাকে “রাহমান” বা অত্যন্ত দয়ালু এ গুণে গুণান্বিত করতে অস্বীকার করছিল। এটা ছিল আল্লাহর নাম ও গুণের সাথে শির্ক করা। কুরআনের অন্যত্র স্পষ্টভাবে এসেছে যে, তারা এ নামটি অস্বীকার করত। যেমন, “যখনই তাদেরকে বলা হয়, সিজদাবনত হও রহমান এর প্রতি, তখন তারা বলে, রহমান আবার কে? তুমি কাউকেও সিজদা করতে বললেই কি আমরা তাকে সিজদা করব? এতে তাদের বিমুখতাই বৃদ্ধি পায়।” [সূরা আল-ফুরকানঃ ৬০] হুদায়বিয়ার সন্ধির সময়ও কাফেররা আল্লাহর এ গুণটি লিখা নিয়ে আপত্তি করেছিল এবং বলেছিলঃ আমরা রহমানকে চিনি না। [বুখারীঃ ২৭৩১-২৭৩২]
অথচ এ নামটি এমন এক নাম যে নাম একমাত্র তাঁর জন্যই ব্যবহার হতে পারে। আর কাউকে কোনভাবেই রহমান নাম বা গুণ হিসেবে ডাকা যাবে না। আর এজন্যই আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলকে বলছেন যে, তারা যদিও গোয়ার্তুমি করে এ নামটি অস্বীকার করছে আপনি তাদেরকে এ নামটি যে আমার তা অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে তুলে ধরুন এবং বলুনঃ তিনিই আমার রব; তিনি ছাড়া অন্য কোন হক্ক ইলাহ নেই। তারই উপর আমি নির্ভর করি এবং তারই কাছে আমার ফিরে যাওয়া। তোমাদের অস্বীকার তার এ নামকে তার জন্য সাব্যস্ত করতে কোন ভাবেই ব্যাহত করতে পারবে না।
অন্যত্র বলা হয়েছে, “বলুন, তোমরা আল্লাহ নামে ডাক বা রাহমান নামে ডাক, তোমরা যে নামেই ডাক সকল সুন্দর নামই তো তাঁর। তোমরা সালাতে স্বর উচ্চ করো না এবং খুব ক্ষীণও করো না; দুয়ের মধ্যপথ অবলম্বন করো। [সূরা আল-ইসরাঃ ১১০] আল্লাহ আরো বলেনঃ বলুন, তিনিই দয়াময়, আমরা তার প্রতি বিশ্বাস করি ও তারই উপর নির্ভর করি। [সূরা আল-মুলকঃ ২৯] আর এ নামটি সবচেয়ে বেশী মহিমান্বিত নাম হওয়াতে আল্লাহর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছেন যে, “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় নাম হচ্ছে 'আবদুল্লাহ ও আব্দুররাহমান।” [মুসলিমঃ ২১৩২]
তাফসীরে জাকারিয়া(৩০) এইভাবে আমি তোমাকে পাঠিয়েছি এমন এক জাতির প্রতি যার পূর্বে বহু জাতি গত হয়েছে;[1] যাতে আমি তোমার প্রতি যা প্রত্যাদেশ করেছি তাদের নিকট তা আবৃত্তি কর। তারা পরম দয়াময়কে অস্বীকার করে।[2] তুমি বল, ‘তিনিই আমার প্রতিপালক; তিনি ছাড়া অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই।[3] তাঁরই উপর আমি নির্ভর করি এবং আমার প্রত্যাবর্তন তাঁরই কাছে।’
[1] যেমন আমি তোমাকে আমার বার্তা পৌঁছানোর জন্য প্রেরণ করেছি, অনুরূপ তোমার পূর্ববর্তী উম্মতদের মাঝেও রসূল প্রেরণ করেছিলাম, তাদেরকেও তেমনই মিথ্যাজ্ঞান করা হয়েছিল যেমন তোমাকে করা হয়েছে এবং যেমন উক্ত সম্প্রদায়ের লোকেরা মিথ্যাজ্ঞান করার কারণে আযাবগ্রস্ত হয়েছিল, এদেরও সেই পরিণাম থেকে নিশ্চিন্ত থাকা উচিত নয়।
[2] মক্কার মুশরিকরা ‘রাহমান’ শব্দে চরম চকিত হত। হুদাইবিয়া সন্ধির সময় যখন ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ এর শব্দাবলী লেখা হয়েছিল, তখন তারা বলেছিল, ‘রাহমান রাহীম’ কি আমরা জানি না। (ইবনে কাসীর)
[3] অর্থাৎ, ‘রাহমান’ আমার সেই প্রতিপালক, যিনি ব্যতীত কোন মাবূদ নেই।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর যদি এমন কোন কুরআন হত, যার দ্বারা পাহাড়সমূহকে চলমান করা যেত অথবা যমীনকে টুকরো-টুকরো করা যেত অথবা তার দ্বারা মৃতকে কথা বলানো যেত (তবে সেটা এই কুরআনই হত, আর তারা ঈমান আনত না)। বরং সব সিদ্ধান্ত আল্লাহরই। যারা ঈমান এনেছে, তারা কি (ওদের ঈমানের ব্যাপারে) নিরাশ হয়নি এবং তারা জানে যে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে সমগ্র মানুষকে হিদায়াত দান করতেন? আর যারা কুফরী করে, তাদের কর্মের দরুন সর্বদা তাদের বিপদ ঘটতে থাকবে অথবা তাদের আবাসের আশপাশে বিপদ আপতিত হতে থাকবে,* অবশেষে আসবে আল্লাহর ওয়াদা। নিশ্চয় আল্লাহ প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম করেন না। আল-বায়ান
কুরআন দিয়ে পর্বতকে যদি গতিশীল করা যেত, কিংবা যমীনকে দীর্ণ করা যেত কিংবা তা দিয়ে মৃত মানুষকে কথা বলানো যেত (তবুও তারা তাতে বিশ্বাস করত না)। (আলৌকিক কিছু করা মানুষের সাধ্যাতীত) বরং সমস্ত কিছুই আল্লাহর ক্ষমতাভুক্ত। যারা ঈমান এনেছে তারা কি জানে না যে, আল্লাহ ইচ্ছে করলে সকল মানুষকে সৎ পথে পরিচালিত করতে পারতেন। যারা কুফুরী করে তাদের কার্যকলাপের কারণে তাদের উপর কোন না কোন বিপদ আসতেই থাকে কিংবা তাদের ঘরের আশেপাশেই নাযিল হতে থাকে, যতক্ষণ না আল্লাহর ও‘য়াদা পূর্ণ হয়। নিশ্চয়ই আল্লাহ ওয়াদার ব্যতিক্রম করেন না। তাইসিরুল
যদি কোন কুরআন এমন হত যদ্বারা পর্বতকে গতিশীল করা যেত অথবা পৃথিবীকে বিদীর্ণ করা যেত অথবা মৃতের সাথে কথা বলা যেত, তবুও তারা তাতে বিশ্বাস করতনা; কিন্তু সমস্ত বিষয়ই আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত; তাহলে কি যারা ঈমান এনেছে তাদের প্রত্যয় হয়নি যে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে নিশ্চয়ই সকলকে সৎ পথে পরিচালিত করতে পারতেন? যারা কুফরী করেছে তাদের কর্মফলের জন্য তাদের বিপর্যয় ঘটতেই থাকবে, অথবা বিপর্যয় তাদের আশেপাশে আপতিত হতেই থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ঘটবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রতিশ্রুতি পালনে অক্ষম নন। মুজিবুর রহমান
And if there was any qur'an by which the mountains would be removed or the earth would be broken apart or the dead would be made to speak, [it would be this Qur'an], but to Allah belongs the affair entirely. Then have those who believed not accepted that had Allah willed, He would have guided the people, all of them? And those who disbelieve do not cease to be struck, for what they have done, by calamity - or it will descend near their home - until there comes the promise of Allah. Indeed, Allah does not fail in [His] promise. Sahih International
* মুসলিম সৈন্যরা তাদের বিপক্ষে অবস্থান নেয়া, তাদের সাথে যুদ্ধ করা, তাদের হত্যা করা,তাদের ভূখন্ড মুসলমানদের করায়ত্ব হওয়া ইত্যাদি। (ইব্ন কাসীর)
৩১. আর যদি কুরআন এমন হত যা দ্বারা পর্বতকে গতিশীল করা যেত অথবা যমীনকে টুকরো টুকরো করা যেত অথবা মৃতের সাথে কথা বলা যেত(১), কিন্তু সববিষয়ই আল্লাহর ইখতিয়ারভুক্ত(২)তবে কি যারা ঈমান এনেছে তারা জানে না।(৩) যে, আল্লাহ ইচ্ছে করলে সবাইকেই সৎপথে পরিচালিত করতে পারতেন? আর যারা কুফর করেছে তাদের কর্মকাণ্ডের কারণে তাদের বিপর্যয় ঘটতেই থাকবে, অথবা বিপর্যয় তাদের আবাসের আশেপাশে আপতিত হতেই থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহর প্রতিশ্রুতি এসে পড়বে।(৪) নিশ্চয় আল্লাহ প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম করেন না।(৫)
(১) এখানে উত্তর উহ্য আছে। কিন্তু উহ্য পদটি নির্ধারণে বিভিন্ন মত এসেছে।
এক. কোন কোন মুফাসসির বলেন, আয়াতের অর্থ হবেঃ যদি কুরআন এমন হত যা দ্বারা পর্বতকে গতিশীল করা যেত অথবা যমীনকে বিদীর্ণ করা যেত অথবা মৃতের সাথে কথা বলা যেত, তবুও তারা তাতে বিশ্বাস করত না, তারা রহমানের সাথে কুফরী করত। [কুরতুবী] পূর্ববর্তী আয়াতে বলা হয়েছে, “আর তারা রহমানের সাথে কুফরী করছে” এ বাক্যটি উপরোক্ত অর্থের স্বপক্ষে জোরালো দলীল।
দুই. কোন কোন মুফাসসির বলেন, আয়াতের অর্থ হবেঃ ”যদি কোন কুরআন এমন হত যা দ্বারা পর্বতকে গতিশীল করা যেত অথবা পৃথিবীকে বিদীর্ণ করা যেত অথবা মৃতের সাথে কথা বলা যেত তা হলে তা এ কুরআনই হতো। [কুরতুবী; ইবন কাসীর] কারণ, এ কুরআনে নিহিত রয়েছে চ্যালেঞ্জ। জিন ও মানব এর মত বা এর একটি সূরার মত কিছু আনতে অপারগ। সে হিসেবে কুরআন শব্দ দ্বারা পূর্ববর্তী সমস্ত কিতাবকেই বুঝানো হবে। পবিত্র কুরআনের অন্যত্র কুরআন শব্দটিকে পূর্ববর্তী গ্রন্থ সমূহের জন্যও ব্যবহার করা হয়েছে। বলা হয়েছেঃ যেভাবে আমরা নাযিল করেছিলাম বিভক্তকারীদের উপর; যারা কুরআনকে বিভিন্নভাবে বিভক্ত করেছে। [সূরা আল-হিজরঃ ৯০–৯১]
আবার কোন কোন সহীহ হাদীসেও পূর্ববর্তী কোন কোন কিতাবকে কুরআন নাম দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাউদ আলাইহিস সালামের উপর পড়াকে এতই সহজ করে দেয়া হয়েছিল যে, তিনি তার বাহনের লাগাম লাগানোর নির্দেশ দিতেন। আর তা লাগানোর পূর্বেই তার কুরআন পড়া শেষ হয়ে যেত”। [বুখারী ৩৪১৭] এখানে কুরআন বলে নিঃসন্দেহে তার কাছে নাযিলকৃত কিতাব যাবুরকেই বুঝানো হয়েছে। অর্থের দিক থেকেও পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহকে কুরআন বলা যায়। কারণ, কুরআন শব্দের অর্থ, জমা করা। সে সমস্ত গ্রন্থসমূহে আয়াত জমা করার পর তা কুরআনে পরিণত হয়েছে। [ইবন কাসীর] এ অর্থের আরেকটি দলীল হলোঃ قرآناً শব্দের تنوين কারণ, এ তানভীনকে تنكير হলে তা আমাদের পরিচিত কুরআনকে বুঝানো হয়নি বলেই ধরে নিতে হয়।
(২) মূলত: এর কারণ হচ্ছে, সবকিছু আল্লাহ্ তা'আলার নিয়ন্ত্রণে। তিনি চাইলে তা হবে আর না চাইলে হবে না। তিনি যার হিদায়াত চান তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারবে না। আর তিনি যার ভ্রষ্টতা চান তাকে কেউ হিদায়াত দিতে পারবে না। [ইবন কাসীর] কারণ, তারা যে সব মু'জিযা প্রত্যক্ষ করেছে, সেগুলো এর চাইতে কম ছিল না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইশারায় চন্দ্রের দ্বিখণ্ডিত হওয়া, পাহাড়ের স্বস্থান থেকে সরে যাওয়া এবং বায়ুকে আজ্ঞাবহ করার চাইতে অনেক বেশী বিস্ময়কর। এমনিভাবে নিষ্প্রাণ কংকরের কথা বলা এবং তাসবীহ পাঠ করা কোন মৃত ব্যক্তির জীবিত হয়ে কথা বলার চাইতে অধিকতর বিরাট মু'জিযা। মি'রাজের রাত্রিতে মসজিদুল আকসা, অতঃপর সেখান থেকে নভোমণ্ডলের সফর এবং সংক্ষিপ্ত সময়ে প্রত্যাবর্তন, সুলাইমান আলাইহিস সালামের বায়ুকে বশ করার মু'জিযার চাইতে অনেক মহান। কিন্তু যালেমরা এগুলো দেখার পরও বিশ্বাস স্থাপন করেনি।
(৩) আয়াতের মূলশব্দ হচ্ছে, ييأس শব্দটির যে অর্থ উপরে উল্লেখ করা হয়েছে তা আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে। [আত-তাফসীরুস সহীহ] সে অনুসারে অর্থ হবে, ঈমানদারগণ কি জানে না যে, আল্লাহ্ ইচ্ছা করলে সমস্ত মানুষকেই নিদর্শন দেখানো ছাড়াই হিদায়াত দিয়ে দিতে পারেন? [কুরতুবী] তাছাড়া শব্দটির অন্য আরেকটি অর্থ হলো, নিরাশ হওয়া। তখন আয়াতের ভাবার্থ এভাবে বলতে হবে যে, মুসলিমগণ মুশরিকদের হঠকারিতা দেখা ও জানা সত্বেও কি এখন পর্যন্ত তাদের ঈমানের ব্যাপারে নিরাশ হয়নি? আল্লাহ ইচ্ছা করলে সমস্ত মানুষকেই হেদায়েত প্রদান করতেন। কারণ, মুসলিমরা কাফেরদের পক্ষ থেকে বার বার নিদর্শন দেখাবার দাবী শুনতো। ফলে তাদের মন অস্থির হয়ে উঠতো। তারা মনে করতো, আহা, যদি এদেরকে এমন কোন নিদর্শন দেখিয়ে দেয়া হতো যার ফলে এরা মেনে নিতো, তাহলে কতই না ভালো হতো! [কুরতুবী] বস্তুত: যারা কুরআনের শিক্ষাবলীতে, বিশ্ব-জগতের নিদর্শনসমূহের মধ্যে, নবীর পবিত্র-পরিচ্ছন্ন জীবনে, সাহাবায়ে কেরামের পবিত্র জীবনধারায় কোন সত্যের আলো দেখতে পাচ্ছে না, তোমরা কি মনে করো তারা পাহাড়ের গতিশীল হওয়া, মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যাওয়া এবং কবর থেকে মৃতদের বের হয়ে আসার মত অলৌকিক ঘটনাবলীতে কোন আলোর সন্ধান পাবে? আবুল আলীয়া বলেন, এর অর্থ অবশ্যই ঈমানদাররা তাদের হিদায়াত সম্পর্কে নিরাশ হয়েছে, তবে আল্লাহ্ ইচ্ছা করলে তাদের সবাইকে তিনি হিদায়াত দিতে পারেন। [ইবন কাসীর]
(৪) قَارِعَةٌ শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য, আকাশ থেকে শাস্তি নাযিল হওয়া। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া [ইবন কাসীর] অথবা এর অর্থ, বিপদাপদ। [ইবন কাসীর] অর্থাৎ তাদের উপর আপদ-বিপদের এ ধারা অব্যাহতই থাকবে, যে পর্যন্ত আল্লাহ্ তা'আলার ওয়াদা পূর্ণ না হয়ে যায়। কারণ, আল্লাহর ওয়াদা কোন সময়ই টলতে পারে না। ওয়াদা বলে এখানে মক্কা বিজয় বুঝানো হয়েছে। [ইবন কাসীর] উদ্দেশ্য এই যে, তাদের উপর বিভিন্ন প্রকার আপদ আসতে থাকবে। এমন কি, পরিশেষে মক্কা বিজিত হবে এবং তারা সবাই পরাজিত ও পর্যুদস্ত হয়ে যাবে। তবে হাসান বসরীর মতে, ওয়াদার অর্থ এ স্থলে কেয়ামতও হতে পারে। [ইবন কাসীর] এ ওয়াদা সব নবীগণের সাথে সব সময়ই করা আছে। ওয়াদাকৃত সেই কেয়ামতের দিন প্রত্যেক কাফের ও অপরাধী কৃতকর্মের পুরোপুরি শাস্তি ভোগ করবে।
(৫) অর্থাৎ তিনি রাসূলদের সাথে যে সমস্ত ওয়াদা করেছেন সেটা তিনি ভঙ্গ করেন না। তিনি তাদেরকে ও তাদের অনুসারীদেরকে সাহায্য সহযোগিতার যে ওয়াদা করেছেন তা অবশ্যই ঘটবে। চাই তা দুনিয়াতে হোক বা আখেরাতে। [ইবন কাসীর] অন্য আয়াতেও আল্লাহ সেটা বলেছেন, সুতরাং আপনি কখনো মনে করবেন না যে, আল্লাহ তার রাসূলগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রতিশোধ গ্রহণকারী। [সূরা ইবরাহীমঃ ৪৭]
তাফসীরে জাকারিয়া(৩১) যদি কোন কুরআন এমন হত, যার দ্বারা পর্বতকে গতিশীল করা যেত অথবা পৃথিবীকে বিদীর্ণ করা যেত অথবা মৃতের সাথে কথা বলা যেত, (তবুও তারা তাতে বিশ্বাস করত না)। বরং সমস্ত বিষয়ই আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত।[1] তবে কি যারা বিশ্বাস করেছে তাদের প্রত্যয় হয়নি যে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে নিশ্চয় সকলকে সৎপথে পরিচালিত করতে পারতেন; যারা অবিশ্বাস করেছে তাদের কর্মফলের জন্য তাদের বিপর্যয় ঘটতেই থাকবে অথবা বিপর্যয় তাদের আশে পাশে আপতিত হতেই থাকবে;[2] যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহর প্রতিশ্রুতি এসে উপস্থিত হবে।[3] নিশ্চয় আল্লাহ প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম করেন না।
[1] (‘কোন কুরআন’ থেকে বুঝা যায়, কুরআন একাধিক) ইমাম ইবনে কাসীর বলেন, প্রত্যেক আসমানী গ্রন্থকে কুরআন বলা হয়। যেমন একটি হাদীসে এসেছে যে, ‘‘দাউদ (আঃ) সওয়ারী প্রস্তুত করার হুকুম দিতেন, এবং এই অবসরে কুরআনের অযীফা পড়ে নিতেন। (বুখারী, আম্বিয়া অধ্যায়) এখানে স্পষ্ট যে কুরআনের অর্থ যাবূর। আয়াতের অর্থ এই যে, যদি পূর্বে কোন আসমানী গ্রন্থ অবতীর্ণ হত, যা শুনে পাহাড় চলতে আরম্ভ করত অথবা পৃথিবীর পথ-দূরত্ব কমে আসত (অথবা ভূমি বিদীর্ণ করে নদী সৃষ্টি হত) অথবা মৃতেরা কথা বলত, তাহলে কুরআন কারীমের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য উত্তম রূপে পাওয়া যেত। কেননা কুরআন পূর্ববর্তী সমস্ত গ্রন্থের তুলনায় মু’জিযা এবং সাহিত্য-শৈলীতে উচ্চতর। কেউ কেউ এর অর্থ বলেছেন যে, যদি কুরআনের মাধ্যমে উক্ত মু’জিযাগুলি প্রকাশ পেত, তবুও এই কাফেররা ঈমান আনয়ন করত না, কেননা কারো ঈমান আনয়নের ব্যাপার আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল; মু’জিযার উপর নয়। তাই বলেছেন, ‘‘সমস্ত বিষয় আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত।’’
[2] যা তারা দেখতে অথবা জানতে অবশ্যই পারবে, যেন তারা উপদেশ গ্রহণ করতে পারে।
[3] অর্থাৎ, কিয়ামত চলে আসবে অথবা মুসলিমরা পূর্ণ বিজয় লাভ করবে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর অবশ্যই তোমার পূর্বে রাসূলদের নিয়ে উপহাস করা হয়েছে। অতঃপর যারা কুফরী করেছে, আমি তাদেরকে অবকাশ দিয়েছি, তারপর আমি তাদেরকে পাকড়াও করেছি। অতএব, কেমন ছিল আমার আযাব! আল-বায়ান
তোমার আগেও বহু রসূলকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা হয়েছিল, তখন আমি কাফিরদেরকে (ইচ্ছেমত কাজ চালিয়ে যাওয়ার) অবকাশ দিয়েছিলাম, অবশেষে তাদেরকে পাকড়াও করেছিলাম। কেমন (ভয়াবহ) ছিল আমার শাস্তি! তাইসিরুল
তোমার পূর্বেও অনেক রাসূলকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা হয়েছে এবং যারা কুফরী করেছে তাদেরকে কিছু অবকাশ দিয়েছিলাম, অতঃপর তাদেরকে পাকড়াও করেছিলাম; কেমন ছিল আমার পাকড়াও! মুজিবুর রহমান
And already were [other] messengers ridiculed before you, and I extended the time of those who disbelieved; then I seized them, and how [terrible] was My penalty. Sahih International
৩২. আর অবশ্যই আপনার আগে অনেক রাসূলকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা হয়েছে এবং যারা কুফর করেছে তাদেরকে আমি কিছু অবকাশ দিয়েছিলাম, তারপর তাদেরকে পাকড়াও করেছিলাম। সুতরাং কেমন ছিল আমার শাস্তি(১)!
(১) আল্লাহ্ তা'আলা পূর্ববর্তী রাসূলদের সাথে তাদের উম্মতদের কর্মকাণ্ড এবং তাদের সাথে কৃত আল্লাহর ব্যবহার সম্পর্কে জেনে তা থেকে শিক্ষাগ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। তারা তাদের বর্তমান ছাড় দেয়া অবস্থাকে যেন স্থায়ী মনে করে না নেয়। তিনি কাউকে পাকড়াও করলে তার আর রক্ষা নেই। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “আল্লাহ অত্যাচারীকে ছাড় দিতে থাকেন তারপর যখন তাকে পাকড়াও করেন তখন তার আর পালানোর কোন পথ থাকে না।” [বুখারীঃ ৪৬৮৬, মুসলিমঃ ২৫৮৩]
তাফসীরে জাকারিয়া(৩২) তোমার পূর্বেও অনেক রসূলকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা হয়েছে। সুতরাং যারা অবিশ্বাস করেছিল তাদেরকে কিছু অবকাশ দিয়েছিলাম, তারপর তাদেরকে পাকড়াও করেছিলাম; অতএব কেমন ছিল আমার শাস্তি![1]
[1] হাদীসেও এসেছে, আল্লাহ অত্যাচারীকে ঢিল দেন। অবশেষে যখন তাকে পাকড়াও করেন, তখন আর ছাড়েন না।’’ অতঃপর নবী (সাঃ) এই আয়াত পাঠ করলেন, وَكَذَلِكَ أَخْذُ رَبِّكَ إِذَا أَخَذَ الْقُرَى وَهِيَ ظَالِمَةٌ إِنَّ أَخْذَهُ أَلِيمٌ شَدِيدٌ অর্থাৎ, এরূপেই তখন তিনি কোন জনপদের অধিবাসীদেরকে পাকড়াও করেন, যখন তারা অত্যাচার করে; নিঃসন্দেহে তাঁর পাকড়াও হচ্ছে অত্যন্ত যাতনাদায়ক, কঠিন। (সূরা হূদ ১০২) (বুখারীঃ সূরা হূদের তাফসীর, মুসলিমঃ কিতাবুল বির্র)
তাফসীরে আহসানুল বায়ানতবে কি প্রতিটি নাফ্স যা উপার্জন করে যিনি তার দায়িত্বশীল (তিনিই ইবাদাতের অধিক উপযুক্ত, নাকি এই শরীকগুলো?) এতদসত্ত্বেও তারা আল্লাহর সাথে অনেক শরীক সাব্যস্ত করেছে। বল, ‘তোমরা এদের পরিচয় দাও’। নাকি তোমরা তাকে যমীনের এমন কিছু জানাবে যে ব্যাপারে তিনি জানেন না? নাকি তোমরা ভাসাভাসা কথা বলছ? বরং যারা কুফরী করেছে তাদের নিকট তাদের ষড়যন্ত্রকে শোভিত করা হয়েছে এবং তারা সরল পথ হতে বাধা প্রদান করেছে। আর আল্লাহ যাকে পথহারা করেন, তার কোন হিদায়াতকারী নেই। আল-বায়ান
প্রত্যেক প্রাণীর উপার্জনের প্রতি যিনি দৃষ্টি রাখেন (তিনি কি তাদের অক্ষম ইলাহদের মত?) অথচ তারা আল্লাহর শরীক নির্দিষ্ট করে রেখেছে। বল, ‘তাদের নাম বল (যাদেরকে তোমরা আল্লাহর অংশীদার মনে কর), তোমরা কি পৃথিবীর এমন কোন সংবাদ তাঁকে দিতে চাও যা তিনি জানেন না। নাকি এগুলো কেবল কথার প্রদর্শনী? প্রকৃত ব্যাপার হল, কাফিরদের নিকট তাদের কলা কৌশলকে আকর্ষণীয় করে দেয়া হয়েছে আর তাদেরকে সৎ পথ থেকে বিরত রাখা হয়েছে। আল্লাহ যাকে গুমরাহ করেন তাঁকে পথ দেখানোর কেউ নেই। তাইসিরুল
তাহলে কি প্রত্যেক মানুষ যা করে, তার যিনি পর্যবেক্ষক তিনি অক্ষম এদের উপাস্যগুলির মত? অথচ তারা আল্লাহর বহু শরীক করেছে। তুমি বলঃ তোমরা তাদের পরিচয় দাও; তোমরা কি পৃথিবীর এমন কিছুর সংবাদ তাঁকে দিতে চাও যা তিনি জানেননা? না বরং ওদের ছলনা ওদের নিকট শোভন প্রতীয়মান হয় এবং তারা সৎ পথ হতে নিবৃত্ত হয়; আল্লাহ যাকে বিভ্রান্ত করেন তার কোন পথ প্রদর্শক নেই। মুজিবুর রহমান
Then is He who is a maintainer of every soul, [knowing] what it has earned, [like any other]? But to Allah they have attributed partners. Say, "Name them. Or do you inform Him of that which He knows not upon the earth or of what is apparent of speech?" Rather, their [own] plan has been made attractive to those who disbelieve, and they have been averted from the way. And whomever Allah leaves astray - there will be for him no guide. Sahih International
৩৩. তবে কি প্রত্যেক মানুষ যা করে তার যিনি পর্যবেক্ষক(১) (তিনি কি এদের অক্ষম ইলাহগুলোর মত?) অথচ তারা আল্লাহর বহু শরীক সাব্যস্ত করেছে। বলুন, তাদের পরিচয় দাও। নাকি তোমরা যমীনের মধ্যে এমন কিছুর সংবাদ দিতে চাও যা তিনি জানেন না? নাকি (তোমরা) বাহ্যিক কথা মাত্র জানাচ্ছ? বরং যারা কুফরী করেছে তাদের কাছে তাদের ছলনা(২) শোভন করে দেয়া হয়েছে এবং তাদেরকে সৎপথ থেকে ফিরিয়ে রাখা হয়েছে(৩), আর আল্লাহ যাকে বিভ্রান্ত করেন তার কোন পথপ্রদর্শক নেই।
(১) অর্থাৎ যিনি স্বয়ং প্রত্যেকটি লোকের অবস্থা জানেন। কোন সৎলোকের সৎকাজ এবং অসৎলোকের অসৎকাজ যার দৃষ্টি আড়ালে নেই। তিনি কি ইবাদতের যোগ্য নাকি তারা যাদেরকে ইবাদত করছে তারা? অথচ এসমস্ত উপাস্যগুলো সম্পূর্ণরূপে অক্ষম। [দেখুন, সা’দী] [এ অর্থে আরো দেখুন সূরা ইউনুসঃ ৬১, সূরা আল-আনআমঃ ৫৯, সূরা হুদঃ ৬, সূরা আর-রাদঃ ১০, সূরা ত্বা-হাঃ ৭, সূরা আল-হাদীদঃ ৪]
(২) এখানে শির্ক ও কুফরকে ছলনা বা প্রতারণা বলা হয়েছে। কারণ তাদের এগুলো নিছক ভ্রষ্টতা ও আল্লাহর উপর মিথ্যাচার। [বাগভী; ইবন কাসীর] এর মাধ্যমে কিছু লোক নিজেদেরকে ভ্রান্ত মা’বুদদের প্রতিনিধি হিসেবে দাঁড় করিয়ে আপন আপন স্বার্থোদ্ধারের কাজ শুরু করে দিয়েছে। তাছাড়া শির্ক আসলেই একটি আত্মপ্রতারণা। অথবা তাদের কুফরিকেই এখানে প্রতারণা বলা হয়েছে, কারণ রাসূলের সাথে তাদের প্রতারণা ছিল কুফরি। [কুরতুবী]
(৩) অর্থাৎ তাদের কাছে যখন কুফরি সুশোভিত হলো এবং তাদের কাছে তাদের কর্মকাণ্ড তথা শির্ক ও কুফরি হক বলে প্রতিভাত হলো, তখন তারা সে দিকে মানুষদেরকে আহবান জানাতে থাকল। এভাবে তারা মানুষদেরকে রাসূলদের পথে চলা থেকে বিরত রাখল। অথবা আয়াতের অর্থ, যখন তাদের কাছে তারা যা করছে তা সুশোভিত করা হলো তখন এর দ্বারা তাদেরকে সত্য সঠিক পথে আসা থেকে বিরত রাখা হয়েছে। [ইবন কাসীর] যেমন কুরআনের অন্যত্র এসেছে, “আর আমরা তাদের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম মন্দ সহচরসমূহ, যারা তাদের সামনে ও পিছনে যা আছে তা তাদের দৃষ্টিতে শোভন করে দেখিয়েছিল। আর তাদের উপর শাস্তির বাণী সত্য হয়েছে, তাদের পূর্বে চলে যাওয়া জিন ও মানুষের বিভিন্ন জাতির ন্যায় [সূরা ফুসসিলাতঃ ২৫]
তাফসীরে জাকারিয়া(৩৩) তবে কি প্রত্যেক মানুষ যা করে তার যিনি পর্যবেক্ষক, তিনি (এদের অক্ষম উপাস্যগুলির মত)?[1] তারা আল্লাহর বহু শরীক করেছে। তুমি বল, ‘তোমরা তাদের নাম উল্লেখ কর;[2] তোমরা কি পৃথিবীর মধ্যে এমন কিছুর সংবাদ তাঁকে দিতে চাও, যা তিনি জানেন না? অথবা তা অসার উক্তি?’[3] বরং যারা অবিশ্বাস করেছে তাদের চক্রান্তকে তাদের নিকট সুশোভিত করা হয়েছে[4] এবং তাদেরকে সঠিক পথ হতে বিরত রাখা হয়েছে। আর আল্লাহ যাকে বিভ্রান্ত করেন তার কোন পথপ্রদর্শক নেই। [5]
[1] এখানে এর জবাব ঊহ্য রয়েছে, অর্থাৎ মহান আল্লাহ এবং ঐ মিথ্যা দেবতারা কি সমান হতে পারে, এরা যাদের পূজা-অর্চনা করছে? যারা না কারো ইষ্টানিষ্ট করতে সক্ষম, না তারা দেখতে পায় আর না তারা বিবেক-বুদ্ধির অধিকারী।
[2] অর্থাৎ, আমাকেও বল, যেন আমি তাদেরকে চিনতে পারি, এই জন্য যে তাদের কোন বাস্তবতাই নেই। এ জন্য পরবর্তীতে বলেছেন, তোমরা কি আল্লাহকে সেসব কথার সংবাদ দিচ্ছ, যা তিনি পৃথিবীতে জানেন না? অর্থাৎ তাদের অস্তিত্বই নেই, কেননা পৃথিবীতে যদি তাদের অস্তিত্ব থাকত, তাহলে মহান আল্লাহ অবশ্যই জানতেন। যেহেতু তাঁর জ্ঞানে কোন কিছু গোপন নেই।
[3] এখানে ظَاهِر من القول এর অর্থ ধারণা। অর্থাৎ এগুলি কেবল তাদের ধারণাপ্রসূত কথা। অর্থ এই যে, তোমরা মূর্তিপূজা এই ধারণা নিয়ে করছ যে, তারা ইষ্টানিষ্ট করার ক্ষমতা রাখে এবং তোমরা তাদের নামও উপাস্য রেখে নিয়েছ। অথচ ‘‘এগুলো কতক নাম মাত্র, যা তোমরা ও তোমাদের পূর্বপুরুষেরা রেখে দিয়েছ, যার সমর্থনে আল্লাহ কোন দলীল প্রেরণ করেননি। তারা তো অনুমান এবং নিজেদের প্রবৃত্তিরই অনুসরণ করে।’’ (সূরা নাজ্ম ২৩)
[4] مَكْر (চক্রান্ত)এর অর্থ তাদের ঐসব ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাস ও আমল, যাতে শয়তান তাদেরকে ফাঁসিয়ে রেখেছে, শয়তান ভ্রষ্টতার উপরও আকর্ষণীয় আবরণ চড়িয়ে রাখে।
[5] যেমন অন্যত্র বলেছেন, ﴿وَمَن يُرِدِ اللهُ فِتْنَتَهُ فَلَن تَمْلِكَ لَهُ مِنَ اللهِ شَيْئًا﴾ অর্থাৎ, আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করার ইচ্ছা করেন তার জন্যে আল্লাহর সাথে তোমার কোন জোর চলতে পারে না।’’ (সূরা মায়িদাহ ৪১) তিনি আরো বলেন, ﴿إِن تَحْرِصْ عَلَى هُدَاهُمْ فَإِنَّ اللهَ لاَ يَهْدِي مَن يُضِلُّ وَمَا لَهُم مِّن نَّاصِرِينَ﴾ অর্থাৎ, তুমি তাদের পথপ্রদর্শন করতে আগ্রহী হলেও আল্লাহ যাকে বিভ্রান্ত করেছেন, তাকে তিনি সৎপথে পরিচালিত করবেন না এবং তাদের কোন সাহায্যকারীও নেই। (সূরা নাহল ৩৭)
তাফসীরে আহসানুল বায়ানতাদের জন্যই রয়েছে দুনিয়ার জীবনে আযাব, আর আখিরাতের আযাব তো আরো কঠিন। আল্লাহর আযাব থেকে তাদের কোন রক্ষাকারী নেই। আল-বায়ান
দুনিয়ার জীবনে তাদের জন্য আছে শাস্তি, আর আখেরাতের শাস্তি অবশ্যই আরো বেশি কঠিন। আল্লাহর শাস্তি থেকে বাঁচানোর তাদের কেউ নেই। তাইসিরুল
তাদের জন্য পার্থিব জীবনে আছে শাস্তি এবং পরকালের শাস্তিতো আরও কঠোর! এবং আল্লাহর শাস্তি হতে রক্ষা করার তাদের কেহ নেই। মুজিবুর রহমান
For them will be punishment in the life of [this] world, and the punishment of the Hereafter is more severe. And they will not have from Allah any protector. Sahih International
৩৪. তাদের জন্য দুনিয়ার জীবনে আছে শাস্তি এবং আখিরাতের শাস্তি তো আরো কঠোর! আর আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করার মত তাদের কেউ নেই।(১)
(১) আল্লাহ তা'আলা কাফেরদের জন্য দুনিয়াতে যে শাস্তি রেখেছেন তার থেকে আখেরাতের শাস্তি যে কত ভয়াবহ এখানে সে কথাই তুলে ধরেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও লি'আনকারী পুরুষ ও মহিলাকে আখেরাতের শাস্তির ভয়াবহতা সম্পর্কে সাবধান করে দিয়ে বলেছিলেন, “অবশ্যই দুনিয়ার আযাব আখেরাতের আযাবের চেয়ে অনেক সহজ।” [মুসলিমঃ ১৪৯৩] কারণ, দুনিয়ার আযাব যত দীর্ঘ সময়ই হোক না কেন তা তো লোকের মৃত্যুর সাথে সাথে বা দুনিয়ার শেষদিনটির সাথে সাথে শেষ হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে আখেরাতের আযাব কোন দিন শেষ হবার নয়, তা চিরস্থায়ী। আবার তার পরিমাণও অনেক বেশী। যার বর্ণনা আল্লাহ্ তা'আলা পবিত্র কুরআনের অন্যত্র করেছেন। [দেখুন, সূরা আল-ফাজরঃ ২৫, ২৬, সূরা আল-ফুরকানঃ ১১–১৫]
তাফসীরে জাকারিয়া(৩৪) তাদের জন্য পার্থিব জীবনে আছে শাস্তি[1] এবং পরকালের শাস্তি তো আরো কঠোর।[2] আর আল্লাহর (শাস্তি) হতে রক্ষাকর্তা তাদের কেউ নেই।
[1] এর অর্থ হত্যা ও বন্দিদশা, যা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় এই কাফেরদের ভাগে আসে।
[2] যেমন নবী (সাঃ) লিআনকারী ও লিআনকারিণীকে বলেছিলেন, ‘‘দুনিয়ার শাস্তি আখেরাতের শাস্তির তুলনায় হাল্কা ও সহজ।’’ (মুসলিম, কিতাবুল লিআন, লিআনের সংজ্ঞা জানতে সূরা নূর ৭নং আয়াতের টীকা দ্রঃ) এ ছাড়া দুনিয়ার শাস্তি (যেমনই হোক এবং যতই হোক তা কাফেরদের জন্য) সাময়িক ও অস্থায়ী এবং আখেরাতের শাস্তি চিরস্থায়ী, যা শেষ হবে না। তাছাড়া জাহান্নামের আগুন দুনিয়ার আগুনের তুলনায় ঊনসত্তর গুণ বেশি তীব্র। অনুরূপ অন্য কিছুও রয়েছে। সুতরাং শাস্তির কঠিন হওয়ার ব্যাপারে কি সন্দেহ থাকতে পারে?
তাফসীরে আহসানুল বায়ানমুত্তাকীদের যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে, সেটির দৃষ্টান্ত এরূপ, তার তলদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত। তার খাদ্যসামগ্রী ও তার ছায়া সার্বক্ষণিক। যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে, এটি তাদের শুভ পরিণাম আর কাফিরদের পরিণাম আগুন। আল-বায়ান
মুত্তাকীদেরকে যে জান্নাতের ওয়া‘দা দেয়া হয়েছে তার দৃষ্টান্ত এই যে, তার তলদেশ দিয়ে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত, তারা ফলফলাদি চিরস্থায়ী আর তার ছায়াও। যারা তাক্ওয়া অবলম্বন করে তাদের পরিণাম হবে এই। আর কাফিরদের পরিণতি হবে জাহান্নামের আগুন। তাইসিরুল
মুত্তাকীদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তার উপমা এইরূপঃ ওর পাদদেশে নদী প্রবাহিত, ওর ফলসমূহ এবং ওর ছায়া চিরস্থায়ী; যারা মুত্তাকী এটা তাদের কর্মফল, এবং কাফিরদের কর্মফল আগুন। মুজিবুর রহমান
The example of Paradise, which the righteous have been promised, is [that] beneath it rivers flow. Its fruit is lasting, and its shade. That is the consequence for the righteous, and the consequence for the disbelievers is the Fire. Sahih International
৩৫. মুত্তাকীদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে, তার উপমা এরূপঃ তার পাদদেশে নদী প্রবাহিত(১), তার ফলসমূহ ও ছায়া চিরস্থায়ী।(২) যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে এটা তাদের প্রতিফল আর কাফিরদের প্রতিফল আগুন(৩)।
(১) মুত্তাকীদের জন্য কি পুরষ্কার রেখেছেন এখানে তার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, তাদের জন্য রয়েছে এমন জান্নাত যার পাদদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত। এ নহর সমূহের বিস্তারিত বর্ণনায় এসেছে যে, মুত্তাকীদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তার দৃষ্টান্তঃ তাতে আছে নির্মল পানির নহর, আছে দুধের নহর যার স্বাদ অপরিবর্তনীয়, আছে পানকারীদের জন্য সুস্বাদু সুরার নহর, আছে পরিশোধিত মধুর নহর এবং সেখানে তাদের জন্য থাকবে বিবিধ ফলমূল আর তাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা। মুত্তাকীরা কি তাদের ন্যায় যারা জাহান্নামের স্থায়ী হবে এবং যাদেরকে পান করতে দেয়া হবে ফুটন্ত পানি যা তাদের নাড়ীভুঁড়ি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দেবে? [সূরা মুহাম্মাদঃ ১৫] অন্যত্র বলা হয়েছে যে, “এমন একটি প্রস্রবণ যা হতে আল্লাহর বান্দাগণ পান করবে, তারা এ প্রস্রবণকে যথা ইচ্ছে প্রবাহিত করবে। [সূরা আল ইনসানঃ ৬]
(২) জান্নাতের নে'আমতসমূহ সর্বদা থাকবে, তাতে কোন অভাব বা কমতি পরিলক্ষিত হবে না। একথাই এখানে বোঝানো হয়েছে। অন্যত্র বলা হয়েছে, “যা শেষ হবে না ও যা নিষিদ্ধও হবে না” [সূরা আল-ওয়াকি'আহঃ ৩৩] এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্যগ্রহণের সালাত আদায়ের সময় এগিয়ে গিয়ে কিছু একটা নিতে যাচ্ছিলেন তারপর আবার ফিরে আসলেন। পরে সাহাবায়ে কিরাম সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আমি জান্নাত দেখেছি, তার থেকে আঙ্গুরের একটি থোকা নিতে চাচ্ছিলাম। যদি তা নিয়ে নিতাম তবে যতদিন দুনিয়া থাকত ততদিন তোমরা তা খেতে পারতে।” [বুখারীঃ ১০৫২, মুসলিমঃ ৯০৭]
অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন “তাতে কোন কমতি হতো না”। [মুসলিমঃ ৯০৪] অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “জান্নাতবাসীগণ খাবে, পান করবে অথচ তাদের কোন কাশি, থুথু আসবে না, পায়খানা ও পেশাব করবে না। তাদের খাবারের ঢেকুর আসবে যার সুগন্ধ হবে মিসকের সুগন্ধির মতো, দুনিয়াতে যেভাবে নিঃশ্বাস প্রশ্বাস নেয় তেমনি তাদেরকে সেখানে তাসবীহ ও পবিত্রতা ঘোষণার জন্য ইলহাম করা হবে।” [মুসলিমঃ ২৮৩৫]
অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এক ইয়াহুদী এসে বলল, হে আবুল কাশেম! আপনি মনে করেন যে, জান্নাতবাসীগণ খানাপিনা করবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ “অবশ্যই হ্যাঁ, যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ তার শপথ! সেখানে জান্নাতবাসীদের প্রত্যেককে খানাপিনা ও কামবাসনার ক্ষেত্রে একশত জনের সমান ক্ষমতা দেয়া হবে।” লোকটি বললঃ যার খানাপিনা আছে তার তো আবার শৌচক্রিয়ারও প্রয়োজন পড়বে। অথচ জান্নাতে কোন ময়লা-আবর্জনা বা কষ্টের কিছু নেই। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ “তাদের সে প্রয়োজনটুকু শুধুমাত্র একটু ঘামের মাধ্যমে শেষ হয়ে যাবে। যে ঘামের সুগন্ধ হবে মিসকের গন্ধের মত। আর এতেই তাদের পেট কৃশকায় হয়ে যাবে।” [মুসনাদে আহমাদঃ ৪/৩৬৭]
আর জান্নাতের ছায়ার ব্যাপারে আয়াতে বলা হয়েছে যে, তার ছায়াও চিরস্থায়ী। কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে, তারা এবং তাদের স্ত্রীগণ সুশীতল ছায়ায় সুসজ্জিত আসনে হেলান দিয়ে বসবে। [সূরা ইয়াসীনঃ ৫৬] আল্লাহ আরো বলেছেনঃ “মুত্তাকীরা থাকবে ছায়ায় ও প্রস্রবণ বহুল স্থানে।” [সূরা আল-মুরসালাতঃ ৪১] আরো বলেনঃ “সন্নিহিত গাছের ছায়া তাদের উপর থাকবে এবং তার ফলমূল সম্পূর্ণরূপে তাদের আয়ত্তাধীন করা হবে। [সূরা আল-ইনসানঃ ১৪] আরো বলেছেনঃ “যারা ঈমান আনে এবং ভাল কাজ করে তাদেরকে প্রবেশ করাব জান্নাতে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত; সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে, সেখানে তাদের জন্য পবিত্র স্ত্রী থাকবে এবং তাদেরকে চিরস্নিগ্ধ ছায়ায় প্রবেশ করাব। [সূরা আন-নিসাঃ ৫৭] হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “জান্নাতে এমন গাছও আছে, যার ছায়ায় অত্যন্ত দ্রুতগামী অশ্বারোহী উন্নত ঘোড়া নিয়ে শত বছর সফর করলেও শেষ করতে পারবে না।” [বুখারীঃ ৩২৫১, ৩২৫২, ৬৫৫৩, মুসলিমঃ ২৮২৬, ২৮২৮]
(৩) পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এভাবেই জান্নাত ও জাহান্নামের প্রতিফলের তুলনামূলক উল্লেখ থাকে। যাতে করে অনুসন্ধিৎসু মন কোনটা ভাল এবং কোনটা মন্দ তা সহজেই বুঝতে পারে। [যেমন, সূরা আল-হাশরঃ ২০, সূরা মুহাম্মাদঃ ১৫]
তাফসীরে জাকারিয়া(৩৫) সাবধানীদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তার বিবরণ এইরূপঃ ওর পাদদেশে নদী প্রবাহিত, ওর ফলমূলসমূহ ও ছায়া চিরস্থায়ী; যারা সাবধানী এটা তাদের পরিণাম।[1] আর অবিশ্বাসীদের পরিণাম হল জাহান্নাম।
[1] কাফেরদের অশুভ পরিণামের সাথে ঈমানদারদের শুভ পরিণামের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে জান্নাত লাভের প্রতি আগ্রহ ও আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়। এই স্থানে ইমাম ইবনে কাসীর জান্নাতের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য এবং বিশেষ অবস্থা সংক্রান্ত হাদীসসমূহ উল্লেখ করেছেন, যেগুলো ওখানে দেখা যেতে পারে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছি, তোমার উপর যা নাযিল হয়, তাতে তারা উৎফুল্ল হয়। আর দলগুলোর মধ্যে কেউ কেউ এর কিছু অংশকে অস্বীকার করে। বল, ‘আমাকে কেবল আদেশ দেয়া হয়েছে, যেন আমি আল্লাহর ইবাদাত করি এবং তাঁর সাথে শরীক না করি। আমি তাঁরই দিকে দাওয়াত দেই এবং তাঁরই নিকট আমার প্রত্যাবর্তনস্থল’। আল-বায়ান
আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছিলাম তারা তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে উৎফুল্ল, কিন্তু কতক দল তার কোন কোন কথা মানে না। বল, ‘আমি আল্লাহর ‘ইবাদাত করার জন্য এবং তাঁর সাথে কোন কিছু শারীক না করার জন্য নির্দেশপ্রাপ্ত হয়েছি, আমি তাঁর দিকেই আহবান জানাই, আর আমার প্রত্যাবর্তন তাঁর দিকেই। তাইসিরুল
আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছি তারা যা তোমার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে তাতে আনন্দ পায়, কিন্তু কোন কোন দল ওর কতক অংশ অস্বীকার করে। তুমি বলঃ আমিতো আল্লাহরই ইবাদাত করতে ও তাঁর কোন শরীক না করতে আদিষ্ট হয়েছি; আমি তাঁরই প্রতি আহবান করি এবং তাঁরই নিকট আমার প্রত্যাবর্তন। মুজিবুর রহমান
And [the believers among] those to whom We have given the [previous] Scripture rejoice at what has been revealed to you, [O Muhammad], but among the [opposing] factions are those who deny part of it. Say, "I have only been commanded to worship Allah and not associate [anything] with Him. To Him I invite, and to Him is my return." Sahih International
৩৬. আর আমরা যাদেরকে কিতাব দিয়েছি তারা যা আপনার প্রতি নাযিল হয়েছে তাতে আনন্দ পায়(১)। আর দলগুলোর(২) মধ্যে কেউ কেউ তার কিছু অংশকে অস্বীকার করে। বলুন, আমি তো আল্লাহর ইবাদাত করতে ও তার কোন শরীক না করতে আদেশপ্রাপ্ত হয়েছি। আমি তারই দিকে ডাকি এবং তারই কাছে আমার ফিরে যাওয়া।
(১) আল্লাহ তা'আলা এখানে জানাচ্ছেন যে, যাদের কিতাব দেয়া হয়েছে, তারা যা নাযিল হয়েছে তা দেখে খুশী হয়। এখানে ‘যাদের কিতাব দেয়া হয়েছে’ বলে কি বোঝানো হয়েছে সে ব্যাপারে দু’টি মত রয়েছে। এক. কিতাবধারী বলে আহলে কিতাব তথা ইয়াহুদী ও নাসারাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে তাদের উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। তখন অর্থ হবে, কিতাবীদের মধ্যে যারা কিতাবের বিধানকে আঁকড়ে আছে, তার উপর প্রতিষ্ঠিত, তারা আপনার কাছে যা নাযিল হয়েছে অর্থাৎ কুরআন সেটা দেখলে খুশী হয়। কারণ, তাদের কিতাবে এ রাসূলের সত্যতা ও সুসংবাদ সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য সন্নিবেশিত আছে। [ইবন কাসীর] যেমন, আব্দুল্লাহ ইবন সালাম, সালমান প্রমুখ। [কুরতুবী] দুই. কাতাদা বলেন, এখানে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথী তথা সাহাবীদের কথা বলা হয়েছে। তারা কুরআনের আলো নাযিল হতে দেখলেই খুশী হত। [তাবারী; কুরতুবী]
(২) দলগুলো বলে এখানে কাদের উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে সে ব্যাপারে কয়েকটি মত রয়েছে, এক. তারা মক্কার মুশরিক কুরাইশরা এবং ইয়াহুদী ও নাসারাদের মধ্যে যারা ঈমান আনেনি তারা। [কুরতুবী] দুই. অথবা এখানে শুধু ইয়াহুদী ও নাসারাদেরকেই উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। [ইবন কাসীর] তিন. অথবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে যারা জোট বেঁধেছিল তারা সবাই এখানে উদ্দেশ্য। [কুরতুবী]
তাফসীরে জাকারিয়া(৩৬) আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছি তারা[1] যা তোমার প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে তাতে আনন্দিত হয়,[2] আর কোন কোন দল ওর কতক অংশকে অস্বীকার করে।[3] তুমি বল, ‘আমি তো কেবল আল্লাহরই ইবাদত করতে এবং তাঁর কোন শরীক না করতে আদিষ্ট হয়েছি। আমি তাঁরই প্রতি আহবান করি এবং তাঁরই নিকট আমার প্রত্যাবর্তন।’
[1] এর অর্থ মুসলমান; যারা কুরআনের আদেশ মোতাবেক আমল করে।
[2] অর্থাৎ কুরআনের সত্যতার দলীল-প্রমাণ দেখে অধিক আনন্দিত হয়।
[3] এ থেকে ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান, কাফের ও মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। কতিপয় উলামার নিকট কিতাবের অর্থ তাওরাত ও ইঞ্জীল। তাদের মধ্যে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে তারা আনন্দিত হয়। অস্বীকারকারী সেই ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরা, যারা ইসলাম গ্রহণ করেনি।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর এভাবেই আমি কুরআনকে বিধানস্বরূপ আরবীতে নাযিল করেছি। তোমার নিকট জ্ঞান পৌঁছার পরও যদি তুমি তাদের খেয়াল খুশির অনুসরণ কর, তবে আল্লাহ ছাড়া তোমার কোন অভিভাবক ও রক্ষাকারী নেই। আল-বায়ান
এভাবে আমি একে বিধানরূপে নাযিল করেছি আরবী ভাষায়। তোমার কাছে জ্ঞান আসার পরেও তুমি যদি তাদের খাহেশের অনুসরণ কর, তবে আল্লাহর মোকাবালায় তোমার কোন অভিভাবক থাকবে না, থাকবে না কোন রক্ষাকারী। তাইসিরুল
আর এভাবে আমি ইহা (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি এক বিধান, আরাবী ভাষায়। জ্ঞান প্রাপ্তির পর তুমি যদি তাদের খেয়াল খুশীর অনুসরণ কর তাহলে আল্লাহর বিরুদ্ধে তোমার কোন অভিভাবক ও রক্ষক থাকবেনা। মুজিবুর রহমান
And thus We have revealed it as an Arabic legislation. And if you should follow their inclinations after what has come to you of knowledge, you would not have against Allah any ally or any protector. Sahih International
৩৭. আর এভাবেই(১) আমরা কুরআনকে নাযিল করেছি আরবী ভাষায় বিধানরূপে। আর জ্ঞান পাওয়ার পরও যদি আপনি তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করেন তবে আল্লাহর বিরুদ্ধে(২) আপনার কোন অভিভাবক ও রক্ষক থাকবে না।(৩)
(১) অর্থাৎ যেভাবে আপনার পূর্বে আমরা অনেক নবী-রাসূল পাঠিয়েছি এবং আপনার পূর্বে যখনই প্রয়োজন মনে করেছি তখনই কিতাব পাঠিয়েছি সেভাবে আমরা আপনাকে রাসূল হিসেবে পাঠিয়েছি এবং আমরা আপনাকে কুরআন নামক গ্রন্থখানি দিয়েছি, তাকে আরবী ভাষায় নাযিল করেছি। [ইবন কাসীর; মুয়াসসার] এ কিতাব আপনার উপর নাযিল করে আমি আপনাকে সম্মানিত করেছি এবং অন্যদের উপর আপনার শ্ৰেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছি। কারণ, এ কুরআনের বৈশিষ্ট্য অন্যগুলোর চেয়ে আলাদা। এটি এমন যে, “বাতিল এতে অনুপ্রবেশ করতে পারে না-সামনে থেকেও না, পিছন থেকেও না। এটা প্রজ্ঞাময়, স্বপ্রশংসিতের কাছ থেকে নাযিলকৃত [সূরা ফুসসিলাতঃ ৪২] [ইবন কাসীর] অথবা আয়াতের অর্থ যেভাবে প্রত্যেক নবী ও রাসূলকে তাদের নিজস্ব ভাষায় কিতাব দিয়েছি তেমনি আপনাকে আরবী ভাষায় এ কুরআন প্রদান করলাম। [কুরতুবী]
(২) অর্থাৎ আল্লাহর শাস্তি ও পাকড়াও এর বিপরীতে আপনার কোন সাহায্যকারী থাকবে না। [মুয়াসসার]
(৩) তাদের খেয়ালখুশীর কোন শেষ নেই। তবে বিশেষ করে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করা। [কুরতুবী] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশ্যই কারও খেয়াল-খুশী ও কোন মনগড়া মতের অনুসারী হতে পারেন না। এখানে রাসূলের উম্মতদেরকে সাবধান করা হচ্ছে। বিশেষ করে এ উম্মতের আলেম সম্প্রদায়কেই এখানে বেশী উদ্দেশ্য করা হয়েছে। তারা যেন আল্লাহর নির্দেশ, কুরআন ও সুন্নাহ বোঝার পর অন্য কোন কারণে সেটা বাস্তবায়ন করতে পিছপা না হয়। অন্য কোন মত ও পথের অনুসারী না হয়। অন্যথা তাদের পরিণাম হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের কোন সাহায্যকারী, উদ্ধারকারী ও অভিভাবক থাকবে না। [দেখুন, ইবন কাসীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(৩৭) আর এভাবে আমি এ (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি আরবী ভাষায় জীবন-বিধান স্বরূপ;[1] জ্ঞান প্রাপ্তির[2] পর তুমি যদি তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ কর,[3] তাহলে আল্লাহর বিরুদ্ধে তোমার কোন অভিভাবক ও রক্ষাকর্তা থাকবে না।[4]
[1] অর্থাৎ, যেমন তোমার পূর্ববর্তী রসূলদের প্রতি স্থানীয় ভাষায় গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছিলাম, তেমনই তোমার উপর কুরআন আরবী ভাষায় অবতীর্ণ করলাম। কেননা তোমার প্রথম সম্বোধিত লোকেরা আরব, যারা কেবল আরবী ভাষাই জানে। যদি এই কুরআন অন্য কোন ভাষায় অবতীর্ণ করা হত, তাহলে তারা বুঝতে সক্ষম হতো না, ফলে হিদায়াত গ্রহণ করার ব্যাপারে তাদের জন্য ওজর রয়ে যেত। সুতরাং আমি আরবী ভাষায় কুরআন অবতীর্ণ করে তাদের এই ওজর খন্ডন করে দিলাম।
[2] এর অর্থ সেই জ্ঞান যা অহীর মাধ্যমে নবী (সাঃ)-কে প্রদান করা হয়েছে, যাতে ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের আকীদা-বিশ্বাসের বাস্তব রূপও তাঁর কাছে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
[3] এ থেকে ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের কতিপয় খেয়াল-খুশী ও আকাঙ্ক্ষাকে বুঝানো হয়েছে, যার সম্বন্ধে তারা চেয়েছিল যে, শেষ নবী যেন তা পূরণ করেন, যেমন; বাইতুল মাকদিসকে সর্বদা কিবলা করে রাখা এবং তাদের আকীদা-বিশ্বাসের বিরোধিতা না করা প্রভৃতি।
[4] এটা বাস্তবে উম্মতের উলামাদের জন্য সতর্কবাণী যে, তারা যেন পার্থিব ক্ষণস্থায়ী সুখ-স্বার্থ লাভের জন্য কুরআন ও হাদীসের মোকাবিলায় লোকেদের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার অনুসরণ না করে। যদি তারা এমনটি করে, তাহলে তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি থেকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর অবশ্যই তোমার পূর্বে আমি রাসূলদের প্রেরণ করেছি এবং তাদেরকে দিয়েছি স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি। আর কোন রাসূলের জন্য এটা সম্ভব নয় যে, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোন নিদর্শন নিয়ে আসবে। প্রতিটি সুনির্দিষ্ট সময়ের জন্য রয়েছে লিপিবদ্ধ বিধান। আল-বায়ান
আমি তোমার পূর্বেও রসূলগণকে পাঠিয়েছিলাম, আর তাদেরকে দিয়েছিলাম স্ত্রী ও সন্তানাদি, আল্লাহর হুকুম ব্যতীত নির্দশন হাযির করার শক্তি কোন রসূলের নেই। যাবতীয় বিষয়ের নির্দিষ্ট সময় লিপিবদ্ধ আছে। তাইসিরুল
তোমার পূর্বেও আমি অনেক রাসূল প্রেরণ করেছিলাম এবং তাদেরকে স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দিয়েছিলাম। আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোন নিদর্শন উপস্থিত করা কোন রাসূলের কাজ নয়; প্রত্যেক বিষয়ের নির্ধারিত কাল লিপিবদ্ধ। মুজিবুর রহমান
And We have already sent messengers before you and assigned to them wives and descendants. And it was not for a messenger to come with a sign except by permission of Allah. For every term is a decree. Sahih International
৩৮. আর অবশ্যই আমরা আপনার আগে অনেক রাসূল পাঠিয়েছিলাম এবং তাদেরকে স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দিয়েছিলাম।(১) আর আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোন নিদর্শন উপস্থিত করা কোন রাসূলের কাজ নয়।(২) প্রত্যেক বিষয়ের ব্যাপারেই নির্ধারিত সময় লিপিবদ্ধ আছে।(৩)
(১) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে যেসব আপত্তি উত্থাপন করা হতো এটি তার মধ্য থেকে আর একটি আপত্তির জবাব। তারা বলতো, এ আবার কেমন নবী, যার স্ত্রী-সন্তানাদিও আছে। নবী-রাসূলদের যৌন কামনার সাথে কোন সম্পর্ক থাকতে পারে না কি? এ রাসূলের কি হলো যে, তিনি বিয়ে করেন? [বাগভী; কুরতুবী] নবী-রাসূল সম্পর্কে কাফের ও মুশরিকদের একটি সাধারণ ধারণা ছিল এই যে, তাদের মানুষ না; বরং ফিরিশতা হওয়া দরকার। ফলে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে তাদের শ্ৰেষ্টত্ব বিতর্কের উর্ধ্বে থাকবে। কুরআন তাদের এ ভ্রান্ত ধারণার জবাব একাধিক আয়াতে দিয়েছে। হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি তো সিয়ামও পালন করি এবং সিয়াম ছাড়াও থাকি; আমি রাত্রিতে নিদ্ৰাও যাই এবং সালাতের জন্যও দণ্ডায়মান হই; এবং নারীদেরকে বিবাহও করি। যে ব্যক্তি আমার এ সুন্নাত হতে মুখ ফিরিয়ে নিবে, সে আমার দলভুক্ত নয়। [বুখারীঃ ৪৭৭৬, মুসলিমঃ ১৪০১]
(২) এটিও একটি আপত্তির জবাব। কাফের ও মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে নিদর্শনের দাবী করত। আগেও সেটার জবাব দেয়া হয়েছে। এখানে আবার সেটার জওয়াব দেয়া হচ্ছে। [কুরতুবী] অনুরূপভাবে তারা কুরআনের আয়াত পরিবর্তনের জন্যও প্রস্তাব করত। তারা বলতো আল্লাহর কিতাবে আমাদের অভিপ্রায় অনুযায়ী বিধি-বিধান নাযিল হোক। তারা আব্দার করত যে, আপনি বর্তমান কুরআনের পরিবর্তে সম্পূর্ণ ভিন্ন কুরআন নিয়ে আসুন, যাতে আমাদের প্রতিমাসমূহের উপাসনা নিষিদ্ধ করা না হয় অথবা আপনি নিজেই এর আনীত বিধি-বিধান পরিবর্তন করে দিন অথবা আযাবের জায়গায় রহমত এবং হারামের জায়গায় হালাল করে দিন। [দেখুন, সূরা ইউনুসঃ ১৫]
কুরআনুল কারীমের উপরোক্ত বাক্যে آية শব্দ দ্বারা উভয় অর্থই হতে পারে। কারণ, কুরআনের পরিভাষায় আয়াত কুরআনের আয়াতকেও আয়াত বলা হয় এবং মু'জিযাকেও। এ কারণেই এ ‘আয়াত’ শব্দের ব্যাখ্যায় কোন কোন তাফসীরবিদ কুরআনী আয়াতের অর্থ ধরে উদ্দেশ্য এরূপ ব্যক্ত করেছেন যে, কোন নবীর এরূপ ক্ষমতা নেই যে, তিনি নিজের পক্ষ থেকে কোন আয়াত তৈরী করে নেবেন। [কাশশাফ; আল-বাহরুল মুহীত, আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর] তবে অধিকাংশ মুফাসসির এখানে আয়াতের অর্থ মু'জিযা ধরে ব্যাখ্যা করেছেন যে, কোন রাসূল ও নবীকে আল্লাহ্ তা'আলা এরূপ ক্ষমতা দেননি যে, তিনি যখন ইচ্ছা, যে ধরনের ইচ্ছা মু'জিযা প্রকাশ করতে পারবেন। [তাবারী; কুরতুবী; ইবন কাসীর; সা’দী] আয়াতের সারবস্তু এই যে, আমার রাসূলের কাছে কুরআনী আয়াত পরিবর্তন করার দাবী অন্যায় ও ভ্রান্ত। আমি কোন রাসূলকে এরূপ ক্ষমতা দেইনি। এমনিভাবে কোন বিশেষ ধরনের মু'জিযা দাবী করাও নবুওয়াতের স্বরূপ সম্পর্কে অজ্ঞতারই পরিচায়ক। সেটা তো আমার কাছে, আমি যখন ইচ্ছা সেটা দেখাই।
(৩) এখানে أجل শব্দের অর্থ নির্দিষ্ট সময় ও মেয়াদ। আর كتاب শব্দটির অর্থ গ্রন্থ অথবা লেখা। বাক্যের অর্থ নির্ধারনে কয়েকটি মত আছেঃ
এক. এখানে শরীআতের কথাই আলোচনা হয়েছে। তখন অর্থ হবে, প্রত্যেক সময়ের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট কিতাব আছে। আল্লাহ্ তা'আলা জানেন কখন কোন কিতাবের প্রয়োজন। সে অনুসারে তিনি প্রত্যেক জাতির জন্য তাদের সময়ে তাদের উপযোগী কিতাব নাযিল করেছেন। তারপর আল্লাহ্ তা'আলা যখন কুরআন নাযিল করলেন, তখন সেটা পূর্ববর্তী সবগুলোকে রহিত করে দিয়েছে। [দেখুন, ইবন আবিল ইয, শারহুত তাহাওয়ীয়্যা, ১/১০১-১০২ বাগভী; কুরতুবী; ইবন কাসীর]
দুই. আয়াতের অর্থ বর্ণনায় প্রসিদ্ধ মত এই যে, এখানে তাকদীরের কথাই আলোচনা হচ্ছে। অর্থাৎ প্রত্যেক বস্তুর মেয়াদ ও পরিমাণ আল্লাহ তা'আলার কাছে লিখিত আছে। তিনি সৃষ্টির সূচনালগ্নে লিখে দিয়েছেন যে, অমুক ব্যক্তি অমুক সময়ে জন্মগ্রহণ করবে এবং এতদিন জীবিত থাকবে। কোথায় কোথায় যাবে, কি কি কাজ করবে এবং কখন ও কোথায় তার মৃত্যু হবে, তাও লিখিত আছে। অন্য আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ “আপনি কি জানেন না যে, আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু রয়েছে আল্লাহ তা জানেন। এ সবই আছে এক কিতাবে; নিশ্চয়ই এটা আল্লাহর জন্য সহজ। [সূরা আল-হাজ্জঃ ৭০] [বাগভী; কুরতুবী; ইবন কাসীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(৩৮) তোমার পূর্বেও আমি অনেক রসূল প্রেরণ করেছিলাম এবং তাদেরকে স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দান করেছিলাম।[1] আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোন নিদর্শন উপস্থিত করা কোন রসূলের কাজ নয়;[2] প্রত্যেক নির্ধারিত কালের লিপিবদ্ধ গ্রন্থ আছে। [3]
[1] অর্থাৎ, যত নবী ও রসূল এসেছেন সবাই মানুষই ছিলেন, তাঁদের নিজস্ব পরিবার, বংশ, স্ত্রী এবং সন্তান-সন্ততি ছিল। তাঁরা না ফিরিশতা ছিলেন আর না মানব রূপে নূরের সৃষ্টি ছিলেন। বরং তারা মানবকুল থেকেই ছিলেন। কেননা যদি তাঁরা ফিরিশতা হতেন তাহলে মানুষের জন্য তাঁদের প্রকৃতির সাথে স্বাভাবিক হওয়া এবং তাঁদের কাছাকাছি হওয়া অসম্ভব ছিল, যার ফলে তাঁদেরকে প্রেরণ করার মুখ্য উদ্দেশ্যই বিফল হয়ে যেত। আর যদি উক্ত ফিরিশতাগণ মানব রূপে আসতেন তাহলে দুনিয়াতে না তাদের পরিবার ও বংশ হতো আর না স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি হতো। এ থেকে জানা গেল যে, সকল নবীগণ মানবকুল থেকেই ছিলেন, মানবরূপে ফিরিশতা অথবা কোন নূরের সৃষ্টি ছিলেন না। উল্লিখিত আয়াতে أزْوَاجًا (স্ত্রী দান করেছিলাম) থেকে বৈরাগ্য বা সন্ন্যাস্বাদ খন্ডন হয়। আর ذُرِّيَّةٌ (সন্তান-সন্ততি দান করেছিলাম) থেকে পরিবার পরিকল্পনার কথা খন্ডন হয়, কেননা ذُرِّيَّةٌ (অর্থগত) বহুবচন শব্দ; যা কমপক্ষে তিন হবে।
[2] অর্থাৎ মু’জিযা (অলৌকিক ঘটনা) প্রদর্শন রসূলদের এখতিয়ারে নেই যে, যখন তাদের কাছে তলব করা হবে, তখনই তা প্রকাশ করে দেখিয়ে দেবেন, বরং এটা সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর এখতিয়ারে, তিনি স্বীয় হিকমত ও ইচ্ছা অনুসারে ফায়সালা করেন যে, মু’জিযার প্রয়োজন আছে না নেই। আর যদি আছে, তাহলে কি রকম এবং কখন তা দেখাবার প্রয়োজন আছে।
[3] অর্থাৎ আল্লাহ যা কিছুরই ওয়াদা করেছেন, তার একটি সময় নির্ধারিত আছে, উক্ত নির্ধারিত সময়ে তা অবশ্যই ঘটবে, কেননা আল্লাহর ওয়াদা ভঙ্গ হয় না। কেউ কেউ বলেছেন যে বাক্যে আগে-পিছে রয়েছে, মূল বাক্য এরূপ لِكُلِّ كِتَابٍ أجَلٌ অর্থাৎ প্রত্যেক সেই বিষয় যা আল্লাহ লিখে রেখেছেন, তার একটা সময় নির্ধারিত আছে। অর্থাৎ বিষয়টি কাফেরদের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার উপর নয়; বরং কেবল মাত্র আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআল্লাহ যা ইচ্ছা করেন মিটিয়ে দেন এবং যা ইচ্ছা করেন স্থির রাখেন, আর তাঁর কাছেই রয়েছে মূল কিতাব। আল-বায়ান
আল্লাহ যা ইচ্ছে করেন নিশ্চিহ্ন করে দেন আর যা ইচ্ছে প্রতিষ্ঠিত রাখেন, উম্মুল কিতাব তাঁর নিকটই রক্ষিত। তাইসিরুল
আল্লাহর যা ইচ্ছা তা নিশ্চিহ্ন করেন এবং যা ইচ্ছা তা প্রতিষ্ঠিত রাখেন এবং তাঁরই নিকট আছে কিতাবের মূল। মুজিবুর রহমান
Allah eliminates what He wills or confirms, and with Him is the Mother of the Book. Sahih International
৩৯. আল্লাহ যা ইচ্ছে তা মিটিয়ে দেন এবং যা ইচ্ছে তা প্রতিষ্ঠিত রাখেন(১) এবং তারই কাছে আছে উম্মুল কিতাব।(২)
(১) অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা যা ইচ্ছে তা পরিবর্তন করে অন্য কিছু নাযিল করেন, আবার যা ইচ্ছে তা ঠিক রাখেন। এটা সম্পূর্ণই তার ইচ্ছাধীন। শরীআতের মধ্যে পরিবর্তন পরিবর্ধন করার সম্পূর্ণ ইখতিয়ার তাঁরই। তবে কোন জিনিস পরিবর্তন করবেন আর কোনটি পরিবর্তন করবেন না, কোন হুকুমকে অন্য হুকুমের পরিবর্তে নাযিল করবেন আর কোনটিকে পুরোপুরি রহিত করবেন সে সবই তাঁর কাছে যে মূল কিতাব আছে সে অনুসারেই হবে। সেখানে কোন পরিবর্তন নেই। [ইবন কাসীর, ইবন আব্বাস ও কাতাদা হতে]
(২) এখানে (أُمُّ الْكِتَابِ) এর শাব্দিক অর্থ মূলগ্রন্থ। এর দ্বারা লওহে-মাহফুষ বুঝানো হয়েছে, যাতে কোনরূপ পরিবর্তন-পরিবর্ধন হতে পারে না। চাই সেটা শরীআত সম্পর্কিত হোক অথবা তাকদীর সম্পর্কিত হোক। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তার শরীআতের মধ্য থেকে যা ইচ্ছা তা রহিত করেন। আর যা ইচ্ছে তা নাযিল করেন। কিন্তু মূলটি উম্মুল কিতাব তথা লাওহে মাহফুযে আছে। সেখানে কোন পরিবর্তন পরিবর্ধন নেই। অনরূপভাবে প্রত্যেক ব্যক্তির তাকদীর সম্পর্কে লাওহে মাহফুজে যা লিখা আছে তাতে কোন পরিবর্তন পরিবর্ধন নেই। [ইবন কাসীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(৩৯) (তার মধ্য হতে) আল্লাহ যা ইচ্ছা তা মুছে দেন এবং যা ইচ্ছা তা বহাল রাখেন। আর তাঁর নিকট রয়েছে মূল গ্রন্থ।[1]
[1] এর একটি অর্থ এই যে, তিনি স্বীয় ইচ্ছা মোতাবেক কোন হুকুমকে রহিত করেন এবং কোন হুকুমকে বহাল রাখেন। দ্বিতীয় অর্থ এই যে, তিনি যে ভাগ্য লিখে রেখেছেন তাতে পরিবর্তন করতে থাকেন। কতিপয় হাদীস দ্বারা এর সমর্থন হয়, তন্মধ্যে একটি হাদীস হলো, ‘‘মানুষকে পাপের কারণে রুযী থেকে বঞ্চিত করা হয়, দু‘আর মাধ্যমে ভাগ্য পরিবর্তন হয় এবং আত্মীয়তা বন্ধন বজায় রাখার কারণে আয়ু বৃদ্ধি পায়।’’ (মুসনাদ আহমাদ ৫/২৭৭) কতিপয় সাহাবা থেকে নিম্নলিখিত দু‘আটি বর্ণিত হয়েছে,(اللَّهُمَّ إنْ كُنْتَ كَتَبْتَنَا أشْقِيَاءَ فَامْحُنَا وَاكْتُبْنَا سُعَدَاءَ، وَإنْ كُنْتَ كَتَبْتَنَا سُعَدَاءَ فَأثْبِتْنَا، فَإنَّكَ تَمْحُوْ مَا تَشَاءُ وَتُثْبِتُ وَعِنْدَكَ أُمُّ الْكِتَابِ) । অর্থাৎ, হে আল্লাহ! যদি তুমি আমাদেরকে দুর্ভাগ্যবান বলে লিখে দিয়েছ, তাহলে তা মিটিয়ে দিয়ে আমাদেরকে সৌভাগ্যবান বলে লিখে দাও। আর যদি সৌভাগ্যবান বলে লিখেছ, তাহলে সেটাই বহাল রাখো, কেননা তুমি যা চাও মিটিয়ে দাও আর যা চাও বহাল রাখ এবং তোমার কাছেই রয়েছে লওহে মাহফূয বা সংরক্ষিত ফলক। উমার (রাঃ) সম্বন্ধে উল্লেখ আছে যে, তিনি তাওয়াফ কালীন সময়ে কাঁদতেন এবং এই দু‘আ পড়তেন: (اللَّهُمَّ إنْ كُنْتَ كَتَبْتَ عَلَيَّ شَقْوَةً أوْ ذَنْبًا فَامْحُهُ، فَإنَّكَ تَمْحُوْ مَا تَشَاءُ وَتُثْبِتُ، وَعِنْدَكَ أُمُّ الْكِتَابِ، فَاجْعَلْهُ سَعَادَةً وَمَغْفِرَةً)। অর্থাৎ, হে আল্লাহ! যদি তুমি আমার ব্যাপারে দুর্ভাগ্য বা পাপ লিখে দিয়েছ, তাহলে তা মিটিয়ে দাও, কেননা তুমি যা চাও মিটিয়ে দাও আর যা চাও বহাল রাখ, আর তোমার কাছেই রয়েছে লওহে মাহফূয বা সংরক্ষিত ফলক, সুতরাং তা তুমি সৌভাগ্য ও ক্ষমায় পরিবর্তন করে দাও। (ইবনে কাসীর) এই অর্থের উপর আপত্তি আসতে পারে যে, অন্য হাদীসে তো এসেছে, (جَفَّ الْقَلَمُ بِمَا هُوَ كَائِنٌ) অর্থাৎ, যা কিছু ঘটবে, তা লিখে কলম শুকিয়ে গেছে। (বুখারী, হাদীস নং ৫০৭৬) এর জবাব এই দেয়া হয়েছে যে, এই পরিবর্তনও ভাগ্যে লিখিত বিষয়াবলীর অন্তর্ভুক্ত। (ফাতহুল কাদীর)
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর যে প্রতিশ্রুতি আমি তাদেরকে দিচ্ছি, যদি তার কিছু তোমাকে দেখাই অথবা তোমার মৃত্যু ঘটাই (তাতে কিছুই আসে যায় না)। তবে তোমার কর্তব্য কেবল পৌঁছে দেয়া, আর আমার দায়িত্ব হিসাব নেয়া। আল-বায়ান
আমি তাদেরকে যে শাস্তি দেয়ার ওয়া‘দা করেছি তার কিছু যদি তোমাকে দেখাই কিংবা (দেখানোর পূর্বেই) তোমার মৃত্যু ঘটাই, (উভয় অবস্থাতেই) তোমার দায়িত্ব হল প্রচার করে দেয়া, আর হিসেব নেয়ার কাজ হল আমার। তাইসিরুল
আমি তাদেরকে যে শাস্তির কথা বলি, তার কিছু যদি তোমাকে দেখিয়েই দিই অথবা যদি এর পূর্বে তোমার মৃত্যু ঘটিয়েই দিই - তোমার কর্তব্যতো শুধু প্রচার করা; আর হিসাব গ্রহণের দায়িত্ব আমার। মুজিবুর রহমান
And whether We show you part of what We promise them or take you in death, upon you is only the [duty of] notification, and upon Us is the account. Sahih International
৪০. আর আমরা তাদেরকে যে শাস্তির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি তার কিছু যদি আমরা আপনাকে দেখাই বা যদি এর আগে আপনার মৃত্যু ঘটাই(১) তবে আপনার কর্তব্য তো শুধু প্রচার করা, আর হিসাব-নিকাশ তো আমারই দায়িত্ব।
(১) অর্থাৎ আপনার শক্রদেরকে যে অপমান ও লাঞ্ছনাজনক শাস্তির ধমক দেয়া হচ্ছে তা যদি দুনিয়াতেই এসে যায় তবে তা হবে দুনিয়াবী শাস্তি। আর যদি আপনাকে তাদের শাস্তি দেখানোর পূর্বেই আমরা মৃত্যু দিয়ে দেই, তবে আপনার দায়িত্ব তো শুধু দাওয়াত প্রচার করে যাওয়া, তারপর আমার কাছেই তাদের হিসাব ও প্রতিফল। [মুয়াস্সার]
তাফসীরে জাকারিয়া(৪০) আমি তাদেরকে যে শাস্তির প্রতিশ্রুতি দিই, তার কিছু যদি তোমাকে দেখিয়ে দিই অথবা যদি এর পূর্বে তোমার মৃত্যু ঘটিয়েই দিই, তাহলে তোমার কর্তব্য তো শুধু প্রচার করা, আর আমার কাজ হিসাব গ্রহণ করা।
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান