১৬ সূরাঃ আন-নাহাল | An-Nahl | سورة النحل - আয়াতঃ ৪
১৬:৪ خَلَقَ الۡاِنۡسَانَ مِنۡ نُّطۡفَۃٍ فَاِذَا هُوَ خَصِیۡمٌ مُّبِیۡنٌ ﴿۴﴾
خلق الانسان من نطفۃ فاذا هو خصیم مبین ﴿۴﴾

তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন ‘নুতফা’* থেকে, অথচ সে প্রকাশ্য বিতন্ডাকারী। আল-বায়ান

তিনি শুক্র-কীট থেকে মানুষ সৃষ্টি করেছেন অথচ সে প্রকাশ্য ঝগড়াটে সেজে বসল। তাইসিরুল

তিনি শুক্র হতে মানুষ সৃষ্টি করেছেন। অথচ দেখ, সে প্রকাশ্য বিতন্ডাকারী। মুজিবুর রহমান

He created man from a sperm-drop; then at once, he is a clear adversary. Sahih International

* ‘নুতফা’ হচ্ছে নারী ও পুরুষের যৌথ বীর্য, যা ভ্রুণে পরিণত হয়।

৪. তিনি শুক্র হতে মানুষ সৃষ্টি করেছেন(১); অথচ দেখুন, সে প্রকাশ্য বিতণ্ডাকারী(২)!

(১) শানকীতী বলেন, এ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন যে, তিনি শুক্র থেকে মানুষ সৃষ্টি করেছেন। সে শুক্র হচ্ছে পুরুষ ও মহিলার সম্মিলিত বীর্য। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “আমরা তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিলিত শুক্রবিন্দু হতে।” [সূরা আল ইনসান: ২] অর্থাৎ পুরুষ ও মহিলার বীর্যের সংমিশ্রণে। এটা জানার পর আরও একটি জিনিস জানা দরকার, তাহচ্ছে অন্যত্র আল্লাহ জানিয়েছেন যে বীর্য সেটির একটি বের হয় পিঠ থেকে, সেটি পুরুষের শুক্র, অপরটি বের হয় বুকের উপরের পাঁজর থেকে, সেটি মহিলার শুক্র। আল্লাহ বলেন, “অতএব মানুষ যেন চিন্তা করে দেখে তাকে কী থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে! তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে সবেগে স্খলিত পানি হতে, এটা নির্গত হয় মেরুদণ্ড ও পিঞ্জরাস্থীর মধ্য থেকে।” [সূরা আত-তারেকঃ ৫–৭]


(২) যেহেতু মানুষ সৃষ্টিকুলের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ট, তাই প্রথমেই মানুষ সৃষ্টির বিবরণ দিয়ে আল্লাহর একত্ববাদ ও কুদরতের আলোচনা শুরু করা হচ্ছে। [ফাতহুল কাদীর] ‘মানুষ প্রকাশ্য বিতণ্ডাকারী’ এর দুই অর্থ হতে পারে এবং সম্ভবত এখানে এ দুই অর্থই প্রযোজ্য। একটি অর্থ হচ্ছে, মহান আল্লাহ একটি তুচ্ছ শুক্রবিন্দু থেকে এমন মানুষ তৈরী করেছেন যে বিতর্ক ও যুক্তি প্ৰর্দশন করার যোগ্যতা রাখে এবং নিজের বক্তব্য ও দাবীর পক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ পেশ করতে পারে। [কুরতুবী] দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে, এই দুর্বল মানবকে যখন বল ও বাকশক্তি দান করা হলো, তখন সে আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলী সম্পর্কেই বিতর্ক উত্থাপন করতে লাগলো। যে মানুষকে আল্লাহ শুক্রবিন্দুর মত নগণ্য জিনিস থেকে তৈরী করেছেন তার অহংকারের বাড়াবাড়িটা দেখ, সে আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতার মোকাবিলায় নিজেকে পেশ করার জন্য বিতর্কে নেমে এসেছে। [ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর]

সে হিসেবে মানুষকে এ মর্মে সতর্ক করে দেয়া হচ্ছে, বড় বড় বুলি আওড়ানোর আগে নিজের সত্তার দিকে একবার তাকাও। কোন আকারে কোথা থেকে বের হয়ে তুমি কোথায় এসে পৌঁছেছো? কোথায় তোমার প্রতিপালনের সূচনা হয়েছিল? তারপর কোন পথ দিয়ে বের হয়ে তুমি দুনিয়ায় এসেছো? তারপর কোন পর্যায় অতিক্রম করে তুমি যৌবন বয়সে পৌছেছে এখন নিজেকে বিস্মৃত হয়ে কার মুখের ওপর কথার তুবড়ি ছোটাচ্ছে? [এ ব্যাপারে সূরা ফুরকানঃ ৫৪, ৫৫ এবং সূরা ইয়াসীনঃ ৭৭–৭৯ আয়াতসমূহ দেখুন] অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের এস্বভাবটি ব্যাখ্যা করেছেন। একবার তিনি তার হাতের তালুতে থুতু ফেললেন, তারপর তাতে তার তর্জনী রেখে বললেনঃ মহান আল্লাহ বলেন, হে বনী আদম! কিভাবে তুমি আমাকে অপারগ করতে পার? অথচ তোমাকে আমি এ ধরণের হীনতা থেকে সৃষ্টি করেছি। তারপর যখন তোমার রূহ ওখানে (তিনি তার কণ্ঠনালির দিকে ইঙ্গিত করলেন) পৌছে, তখন তুমি বলঃ আমি সাদকা করব। তখন কি তার আর সদকার সময় বাকী আছে? [ইবনে মাজাহঃ ২৭০৭; মুসনাদে আহমাদঃ ৪/২১০]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৪) তিনি মানুষকে বীর্য হতে সৃষ্টি করেছেন; পরে সে প্রকাশ্য বিতন্ডাকারী হয়ে বসল! [1]

[1] অর্থাৎ, এক জড়পদার্থ হতে যা জীবন্ত দেহ থেকে নির্গত হয়, যাকে বীর্য বলা হয়। তাকে বিভিন্ন পর্যায়ে পার করার পর এক পূর্ণ আকার দান করা হয়। তারপর তাতে (রূহ, বিশেষ) জীবন দান করা হয়। এরপর মায়ের পেট হতে পৃথিবীতে আনা হয়। পৃথিবীতে সে জীবন যাপন করতে করতে যখন জ্ঞানপ্রাপ্ত হয়, তখন সে তার প্রতিপালক আল্লাহর ব্যাপারে বিতর্ক করে, তাঁকে অস্বীকার করে বা তাঁর সাথে অন্যকে শরীক করে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান