১১২৯

পরিচ্ছেদঃ ২৭. প্রথম অনুচ্ছেদ - ইমামের দায়িত্ব

এ অধ্যায়টি ইমামের ওপর মুক্তাদীদের অধিকারসমূহের বর্ণনা সম্পর্কে। এ অধিকারসমূহের মাঝে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মুক্তাদীদের অবস্থা, অসুস্থ, প্রয়োজনমুখী ইত্যাদির দিকে লক্ষ্য রেখে সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) হালকা করা, দীর্ঘ না করা যা মানুষকে জামা’আতে উপস্থিত হওয়া থেকে দূরে রাখতে পারে। ক্বারী বলেন, ইমামের ওপর মুক্তাদীদের যে বিষয় লক্ষ্য রাখা দরকার তা হল সালাত হালকা করা। ’’লুম্’আত’’-এ তিনি বলেন, জানা উচিত সালাত হালকা করা ও দীর্ঘতাকে বর্জন করা দ্বারা সুন্নাত ক্বিরাআত (কিরআত) ও তাসবীহ ছেড়ে দেয়া এবং সেগুলো আদায়ের ব্যাপারে অলস তা করা উদ্দেশ্য না বরং এ ব্যাপারে যথার্থ পরিমাণের উপর সীমাবদ্ধ থাকা। যেমন সালাতের ক্ষেত্রে মুফাসসাল ক্বিরাআত (কিরআত) থেকে যা নির্ধারণ করা হয়েছে সে অনুপাতে সকল প্রকার মুফাসসাল ক্বিরাআতের উপর সীমাবদ্ধ থাকা।

তিনবার তাসবীহ আদায়ের উপর যথেষ্ট মনে করা। যেমনিভাবে লক্ষ্য রাখা উচিত বৈঠক ও দন্ডায়মানের প্রতি। হাদীসসমূহে বর্ণিত সালাত হালকা করা দ্বারা অধিকাংশ সময় যা উদ্দেশ্য তা হল ক্বিরাআত (কিরআত) হালকা করা। অচিরেই অধ্যায়ের হাদীসসমূহের ব্যাখ্যাতে এ ব্যাপারে অতিরিক্ত বর্ণনা আসছে। ইমামের ক্ষেত্রে উদ্দেশিত নির্দেশিত হালকা এর অর্থে যা প্রাধান্য পাবে তাও আসছে।


১১২৯-[১] আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেয়ে আর কোন ইমামের পেছনে এত হালকা ও পরিপূর্ণ সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) আদায় করিনি। তিনি যদি (সালাতের সময়) কোন শিশুর কান্নার শব্দ পেতেন, মা চিন্তিত হয়ে পড়বে মনে করে সালাত হালকা করে ফেলতেন। (বুখারী, মুসলিম)[1]

بَابُ مَا عَلَى الإِمَامِ

عَنْ أَنَسٍ قَالَ: مَا صَلَّيْتُ وَرَاءَ إِمَامٍ قَطُّ أَخَفَّ صَلَاةً وَلَا أَتَمَّ صَلَاةً مِنَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَإِنْ كَانَ لَيَسْمَعُ بُكَاءَ الصَّبِيِّ فَيُخَفِّفُ مَخَافَةَ أَنْ تُفْتَنَ أمه

عن أنس قال: ما صليت وراء إمام قط أخف صلاة ولا أتم صلاة من النبي صلى الله عليه وسلم وإن كان ليسمع بكاء الصبي فيخفف مخافة أن تفتن أمه

ব্যাখ্যা : ইমাম মুসলিম আনাস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণনা করেন, নিশ্চয়ই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্ণাঙ্গ সালাত আদায়ের ক্ষেত্রে সর্বাধিক হালকা পন্থা অবলম্বনকারী। বুখারী ও মুসলিমে আনাস (রাঃ) থেকেই অন্য বর্ণনাতে আছে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতে সংক্ষিপ্ততার পন্থা অবলম্বন করতেন এবং পূর্ণাঙ্গ সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) আদায় করতেন। একমতে বলা হয়েছে তিনি যখন সাহাবীদের সালাত দীর্ঘ করার ক্ষেত্রে উৎসাহী ও আগ্রহী দেখতেন তখন সালাত দীর্ঘ করতেন এবং সালাত হালকা করা ও দীর্ঘতাকে বর্জন করার দিকে আহবান করে এমন কোন কারণ যা আপত্তি দেখলে সালাত হালকা করতেন। তবে প্রথম অর্থটিই স্পষ্ট।

একমতে বলা হয়েছে সালাত হালকা বলতে ক্বিরাআতের ব্যাপারে হাদীসসমূহে যা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং যা বর্ণিত হয়েছে তার উপর ক্বিরাআত (কিরআত)কে দীর্ঘ না করা এবং বসা হালকা করা। সালাতের পূর্ণতা হলো সকল রুকন, ওয়াজিব ও সুন্নাত আদায় করা এবং রুকূ' ও সিজদা্ (সিজদা/সেজদা) পূর্ণ করা। ইমাম নাসায়ী আনাস (রাঃ) সূত্রে যায়দ বিন আরক্বাম-এর মাধ্যমে বর্ণনা করেন। আনাস (রাঃ) বলেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সালাতের সাথে সর্বাধিক সাদৃশ্য রাখে এমন কোন সালাত আমি তোমাদের এ ইমাম অপেক্ষা কারো পেছনে আদায় করিনি। (‘উমার বিন ‘আবদুল ‘আযীয) যায়দ বলেন, ‘উমার বিন ‘আবদুল ‘আযীয রুকূ‘ ও সিজদা্ (সিজদা/সেজদা) পূর্ণাঙ্গভাবে করতেন এবং ক্বিয়াম (কিয়াম) ও বৈঠক হালকা করতেন।

আবূ দাঊদ ও নাসায়ী আনাস (রাঃ)-এর হাদীস কর্তৃকই বর্ণনা করেন। আনাস (রাঃ) বলেন, আমি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ এ যুবক অপেক্ষা কারো পেছনে সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) আদায় করিনি। অর্থাৎ ‘উমার বিন ‘আবদুল ‘আযীয। অতঃপর আমরা তার রুকূ‘র অনুমান করেছি দশ তাসবীহ। তার সাজদার অনুমান করেছি দশ তাসবীহ। এ হাদীস দু’টি থেকে জানা গেল, সালাত হালকা করা দ্বারা উদ্দেশ্য হল বৈঠক ও দাঁড়ানোকে হালকা করা এবং রুকূ' ও সাজদাকে পূর্ণাঙ্গভাবে আদায় করা।

আরও জানা গেল যে, যে ব্যক্তি রুকূ‘ ও সাজদাতে দশ তাসবীহ পাঠ করবে তার কাজ আনাস (রাঃ) রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সালাত পূর্ণাঙ্গ হওয়া সত্ত্বেও হালকা হত বলে যে বর্ণনা দিয়েছেন তার বিরোধী হবে না। বলা হয়েছে সালাত হালকা বলতে (أمر نسي) বা তুলনামূলক নির্দেশ। সুতরাং কতক দীর্ঘতা এমন যে, তা তার অপেক্ষা দীর্ঘতার দিক থেকে খাটো মনে করা হয় আবার অনেক খাটো এমন আছে যাকে তার অপেক্ষা খাটোর দিকে লক্ষ্য করে দীর্ঘ মনে করা হয়।

সুতরাং রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সালাত হালকা ছিল তবে হালকা হওয়া সত্ত্বেও তা পূর্ণাঙ্গ ছিল। আর এতে কোন জটিলতা নেই। একমতে বলা হয়েছে অন্যান্যদের সালাতের দিকে লক্ষ্য করে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ক্বিরাআতের মতো ক্বিরাআত (কিরআত) অন্য কেউ পাঠ করলে তা দীর্ঘ মনে করা হত, অন্যের পাঠ বিরক্ত সৃষ্টি করত। অথচ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঠ করলে তার বিপরীত মনে করা হত।

কেননা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উত্তম স্বর, উত্তমভাবে ক্বিরাআতের হক আদায়, জ্যোতির বিকাশ ও তাৎপর্যের প্রকাশের কারণে তাঁর কুরআন পাঠ স্বাদ, প্রাণ চঞ্চলতা ও মনোযোগ সৃষ্টি করত। তদুপরি তাঁর কুরআন পাঠে দ্রুতগামীতা, সময় ও জবানের ভাঁজ ছিল; স্পষ্টভাবে, তারতীল সহকারে উত্তম পদ্ধতিতে অতি অল্প সময়ে অনেক কুরআন পড়তে পারতেন ও পূর্ণ সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) আদায় করতে পারতেন। ইবনুল ক্বইয়্যিম কিতাবুস্ সালাতে অধ্যায়ের হাদীস এবং বুখারীতে ‘‘রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতকে সংক্ষেপ করতেন এবং পূর্ণ পড়তেন’’ এ শব্দে উল্লেখিত আনাস (রাঃ)-এর হাদীস উল্লেখের পর বলেন, যার শব্দ হলঃ অতঃপর আনাস (রাঃ) রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সালাত সংক্ষেপ ও পূর্ণাঙ্গ হওয়ার ব্যাপারে বর্ণনা দিয়েছেন। সংক্ষেপ বলতে তিনি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা করতেন।

সংক্ষেপ বলতে ঐ ব্যক্তির ধারণা উদ্দেশ্য নয়, যে ব্যক্তি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সালাতের পরিমাণ সম্পর্কে অবহিত না। কেননা সংক্ষেপ কথাটি একটি সম্বন্ধীয় নির্দেশ; সুন্নাতের দিকে প্রত্যাবর্তনশীল। ইমাম এবং তাঁর পেছনে যারা আছে তাদের প্রবৃত্তির দিকে না। সুতরাং রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাজরের (ফজরের) সালাতে ষাট থেকে একশত আয়াত পাঠ করতেন। অতএব ৬০/১০০ আয়াত হাজার আয়াতের দিকে সম্বন্ধ করে সংক্ষেপ। মাগরিবের সালাতে সূরাহ্ আল আ‘রাফ পড়েছেন অতএব তা সূরাহ্ আল বাক্বারাহ্ এর দিকে সম্বন্ধ করে সংক্ষেপ।

এর উপর আরও প্রমাণ বহন করে ইমাম আবূ দাঊদ ও নাসায়ী বর্ণিত ঐ হাদীস যে হাদীসে স্বয়ং আনাস (রাঃ) বলেনঃ আমি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পর তাঁর সালাতের সাথে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) এ যুবক অপেক্ষা আর কারো পেছনে আদায় করিনি। এ যুবক বলতে ‘উমার বিন ‘আবদুল ‘আযীয। অতঃপর আমরা তার রুকূ‘র ক্ষেত্রে দশ তাসবীহ অনুমান করেছি..... শেষ পর্যন্ত।

বুখারী ও মুসলিমের এক হাদীসে স্বয়ং আনাস (রাঃ) বলেনঃ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে নিয়ে যেভাবে সালাত  আদায় করতেন তোমাদের নিয়ে আমি সেভাবে সালাত আদায় করতে অবহেলা করব না। সাবিত বলেন, আনাস (রাঃ) এমন কিছু করতেন তোমাদের যা করতে দেখছি না। তিনি যখন রুকূ' থেকে তাঁর মাথা উঠাতেন তখন সোজা হয়ে এতক্ষণ পর্যন্ত দাঁড়াতেন যে, উক্তিকারী বলত তিনি ভুলে গেছেন।

আর তিনি যখন সিজদা্ (সিজদা/সেজদা) থেকে তার মাথা উঠাতেন এতক্ষণ পর্যন্ত বিলম্ব করতেন যে, উক্তিকারী বলত তিনি ভুলে গেছেন। আর আনাস (রাঃ) নিজেই এর উক্তিকারী; তিনি বলেনঃ আমি কোন ইমামের পেছনে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপেক্ষা অধিক হালকা ও অধিক পূর্ণ সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) আদায় করিনি। আর আনাস (রাঃ)-এর হাদীসের কতক কতককে মিথ্যা সাব্যস্ত করবে না।

(لَيَسْمَعُ بُكَاءَ الصَّبِيِّ) উল্লেখিত অংশ ছোট বাচ্চাদের মসজিদে প্রবেশ করানো বৈধ এ ব্যাপারে প্রমাণ রয়েছে। যদিও মসজিদে যাদের হাদাস (অপবিত্র) হওয়া থেকে নিরাপদ থাকা যায় না তাদের থেকে মাসজিদকে নিরাপদে রাখা উত্তম। এটা মূলত ঐ হাদীসের কারণে যাতে আছে ‘‘তোমরা আমাদের মাসজিদগুলোকে তোমাদের বাচ্চাদের থেকে আলাদা করে রাখ..... শেষ পর্যন্ত’’ এ হাদীসটিকে ইবনু মাজাহ অত্যন্ত দুর্বল সানাদে বর্ণনা করেছেন।

ইবনু হাজার বলেনঃ ছোট বাচ্চাদের মসজিদে প্রবেশ করানো বৈধ হওয়ার ব্যাপারে অধ্যায়ের হাদীসটি দ্বারা প্রমাণ গ্রহণ করতে বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। আর তা মূলত এ সম্ভাবনা থাকার কারণে যে, বাচ্চাটি মসজিদের নিকটবর্তী কোন বাড়িতে ছিল ফলে মাসজিদ থেকে বাচ্চার কান্না শোনা যেত।

(فَيُخَفِّفُ) মুসলিম আনাস (রাঃ) কর্তৃক সাবিত-এর এক বর্ণনাতে সালাত হালকা করা সম্পর্কে বলেন, (তিনি খাটো সূরাহ্ পড়তেন) ইবনু আবী শায়বাহ্ ‘আবদুর রহমান বিন সাবিত-এর সানাদে সূরার পরিমাণ সম্পর্কে বলেন, প্রথম রাক্‘আতে তিনি লম্বা সূরাহ্ পড়তেন, অতঃপর বাচ্চার কান্না শুনলে দ্বিতীয় রাক্‘আতে তিন আয়াত পড়েছেন। এটি মুরসাল। ফাতহুল বারীতে এভাবে আছে। ‘আয়নী ইবনু সাবিত-এর হাদীস (রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনি প্রথম রাক্‘আতে ষাট আয়াতের মতো পাঠ করলে বাচ্চার কান্না শুনতে পান) এ শব্দে উল্লেখ করেছেন।

(مَخَافَةَ أَنْ تُفْتَنَ) ‘আবদুর রাযযাক্ব ‘আত্বা এর মুরসাল বর্ণনাতে একটু বাড়িয়ে বলেছেন ‘‘মা বাচ্চাকে ছেড়ে রাখবে অতঃপর বাচ্চা (সালাত) নষ্ট করে দিবে’’ বুখারী কর্তৃক আবূ যার-এর এক কপিতে এসেছে (বাচ্চা ফিৎনাতে ফেলে দিবে) অর্থাৎ যাকে ফিৎনাতে ফেলে দিবে।

জাযারী জামি‘উল উসূল-এর ৬ষ্ঠ খন্ডে ৩৭৪ পৃষ্ঠাতে ‘‘তার মা ফেৎনায় পতিত হওয়ার আশঙ্কাতে’’ এ শব্দে উল্লেখ করেছেন। হাদীসটিতে সাহাবীদের প্রতি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্নেহ, সাহাবীদের সাথে বয়োবৃদ্ধ ও ছোটদের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রাখা কোন কিছু সংঘটিত হলে সালাতকে হালকা করা শারী‘আত সম্মত হওয়ার ব্যাপারে প্রমাণ রয়েছে। সিনদী বলেনঃ কখনো এ হাদীস থেকে এ মাসআলাও গ্রহণ করা যেতে পারে যে, ইমামের জন্য জায়িয আছে মসজিদে প্রবেশকারীর প্রতি লক্ষ রেখে সালাত দীর্ঘ করা যাতে ব্যক্তি রাক্‘আত পেতে পারে আর এটি ঠিক অনুরূপ যেমন মুসল্লীদের প্রতি লক্ষ্য রেখে তাদের জন্য সালাত হালকা করা বৈধ রয়েছে। তবে এ ধরনের করাকে লোক দেখানো আমল বলা যাবে না। বরং এটি কল্যাণকর কাজের ব্যাপারে সহযোগিতা ও অকল্যাণকর কাজ থেকে নিষ্কৃতি লাভ করার মাধ্যম।

খাত্ত্বাবী মা‘আলিম গ্রন্থের ১ম খন্ডে ২০১ পৃষ্ঠাতে বলেন, এ হাদীসে ঐ ব্যাপারে প্রমাণ রয়েছে যে, ইমাম যখন রুকূ‘ অবস্থায় থাকবে তখন যদি তিনি অনুভব করেন যে, কোন ব্যক্তি তাঁর সাথে সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) আদায়ের উদ্দেশ্য করছে তাহলে এমতাবস্থায় ইমামের পক্ষে ঐ মুসল্লীর জন্য রুকূ‘ অবস্থায় অপেক্ষা করা বৈধ রয়েছে যাতে মুসল্লী জামা‘আতের সাথে রাক্‘আতের মর্যাদা লাভ করতে পারে। কেননা তার পক্ষে যখন দুনিয়াবী কতিপয় বিষয়ে মানুষের প্রয়োজনার্থে সালাতের দীর্ঘতাকে বিলুপ্ত করা বৈধ হয়েছে তখন আল্লাহর ‘ইবাদাতের লক্ষ্যেও এ সালাতে প্রয়োজন মুহূর্তে কিছু সময় বৃদ্ধি করা বৈধ রয়েছে। বরং সময় বৃদ্ধি করাটাই বেশি হক ও উত্তম।

তবে কুরতুবী এর সমালোচনা করেছেন যে, এখানে সময় দীর্ঘ করা সালাতে অতিরিক্ত কাজ; যা সালাত হালকা করার বিপরীত ও উদ্দেশ্যহীন পক্ষান্তরে সালাতে দীর্ঘতাকে বিলুপ্ত করা উদ্দেশিত কাজ। ইবনু বাত্তাল বলেনঃ যারা এ ধরনের দীর্ঘ করাকে জায়িয বলেছেন তাদের মাঝে রয়েছে শা‘বী, হাসান ও ‘আবদুর রহমান বিন আবী লায়লা। অন্যরা বলেনঃ যতক্ষণ মুক্তাদীর ওপর জটিল না হবে ততক্ষণ ইমাম অপেক্ষা করবে। এটি মূলত আহমাদ, ইসহাক ও আবূ সাওর-এর উক্তি।

মালিক বলেনঃ অপেক্ষা করা যাবে না, কেননা তা পেছনের মুসল্লীদের ক্ষতি সাধন করবে এটি আওযা‘ঈ, আবূ হানীফা ও শাফি‘ঈর কথা। ‘আয়নী এটি উল্লেখ করেন। হাফিয ইবনু হাজার বলেনঃ এ মাসআলার ক্ষেত্রে শাফি‘ঈ মতাবলম্বীদের নিকট বিরূপ মন্তব্য ও বিশদ বিবরণ রয়েছে। ইমাম নাবাবী এটিকে তার নতুন মতানুযায়ী এটিকে মাকরূহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ ব্যাপারে উক্তি করেছেন আওযা‘ঈ, মালিক, আবূ হানীফাহ্ ও আবূ ইউসুফ। মুহাম্মাদ বিন হাসান বলেনঃ আমি এটিকে শির্ক হয়ে যাওয়ার আশংকা করছি।

‘উবায়দুল্লাহ (রাঃ) মুবারকপূরী বলেনঃ আমি বলবঃ ইমাম সালাতে কোন মুসল্লীর জন্য অপেক্ষা করা বিষয়টিকে যারা সালাতে অতিরিক্ত করা ও শির্কী সংশয় সৃষ্টি হওয়ার দিকে চাপিয়ে দিয়ে এমন কাজকে মাকরূহ বলেছেন তাদের এ ধরনের উক্তিতে বিশাল উদাসীনতা, দীনের মাঝে বিচ্ছিন্নতা এবং শারী‘আতে এমন গভীরতায় পৌঁছা যা আল্লাহভীরু ব্যক্তিদের জন্য বিশুদ্ধ হবে না। দীন সহজ আর আল্লাহ আমাদের সাধ্যের উপর আমাদের ওপর কিছু চাপিয়ে দেননি। কোন মুসলিমের প্রতি দয়ার নিয়্যাত করা এক ধরনের ভাল সুনদর নিয়্যাত। এর উপর ভিত্তি করে এর কর্তাকে সাওয়াব দেয়া হবে।

আর তা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে হওয়ার কারণে। কোন সন্দেহ নেই যে, মুসল্লী জামা‘আত শুরু হওয়ার পর মসজিদে প্রবেশ করবে ইমামের তার প্রতি লক্ষ্য রেখে রাক্‘আত দীর্ঘ করা এই উদ্দেশ্যে যে, যাতে পেছনের মুক্তাদীদের কোন রকম জটিলতা হওয়া ছাড়াই সেও রাক্‘আতটি পায়; রুকূ' দীর্ঘ করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের নিয়্যাতে তাকে আনুগত্যের ব্যাপারে সাহায্য করার নামান্তর। এতে শির্ক ও লোক দেখানো ‘আমলের সংস্পর্শতা নেই। কেনই বা থাকবে? অথচ আহমাদ, আবূ দাঊদ ‘আবদুল্লাহ বিন আবী আওফা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন ‘‘নিশ্চয়ই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুুহরের প্রথম রাক্‘আতে ক্বিয়াম (কিয়াম) করতেন যতক্ষণ না বসে পড়ার কথা শুনতেন’’- আবূ দাঊদ, মুনযিরী এ ব্যাপারে চুপ থেকেছেন। এতে একজন অপরিচিত বর্ণনাকারী আছেন।

মুনযিরী আরও বর্ণনা করেন, নিশ্চয়ই আবূ ক্বাতাদাহ্ বলেনঃ (অর্থাৎ প্রথম রাক্‘আত দীর্ঘ করার কৌশল বর্ণনা সম্পর্কে) আমরা ধারণা করেছি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম রাক্‘আত লম্বা করার দ্বারা মানুষ প্রথম রাক্‘আত পেয়ে যাওয়ার ইচ্ছা করতেন। আমাদের কাছে সর্বাধিক সমতাপূর্ণ উক্তি হল আহমাদ, ইসহাক ও আবূ সাওর যেদিকে গিয়েছেন। আর আল্লাহই সর্বাধিক ভাল জানেন। হাদীসটি বুখারী ও মুসলিম ঐকমত্যে বর্ণনা করেছেন কথাটিতে বিবেচনার সুযোগ রয়েছে, কেননা মুসলিম শুধু প্রথম অংশটি সংকলন করেছেন আর ইমাম বুখারী দ্বিতীয় অংশটি এককভাবে বর্ণনা করেছেন। ইসমা‘ঈলী বর্ণনায় এ হাদীসকে দীর্ঘ করে পূর্ণাঙ্গতার সাথে বর্ণনা করেছেন।


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
পুনঃনিরীক্ষণঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-৪: সালাত (كتاب الصلاة)