সন্ধিপত্র লেখার কাজ তখন চলছিল এমন সময় সুহাইলের পুত্র আবূ জান্দাল লৌহ শিকল পরিহিত অবস্থায় হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে এসে সেখানে উপস্থিত হল। সে মক্কার নিম্নাঞ্চল হতে বের হয়ে এসেছিল। সে এখানে পৌঁছে নিজে নিজেই মুসলিমগণের দলের মধ্যে শামিল হল। তার এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে সোহাইল বলল, ‘এ আবূ জান্দালই হচ্ছে প্রথম ব্যক্তি যার সম্পর্কে আপনার সঙ্গে মত বিনিময় করেছি যে, আপনি তাকে ফেরত দেবেন।’
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন,(إِنَّا لَمْ نَقَضَ الْكِتَابُ بَعْدُ) ‘এখন তো আমাদের সন্ধিপত্র সম্পন্নই হয় নি।’
সে বলল, ‘তাহলে আমি সন্ধির ব্যাপারে আপনার সঙ্গে আর কোন আলাপ-আলোচনা করতে রাজি নই।’
নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, ‘আচ্ছা তাহলে আমার খাতিরে তুমি তাকে ছেড়ে দাও।’
সে বলল, ‘আমি আপনার খাতিরেও তাকে ছাড়ব না।’
নাবী কারীম বললেন, ‘না, না, অন্তত পক্ষে এতটুকু তোমাকে করতেই হবে।’
সে বলল, ‘না, আমি তা করতে পারি না।’
অতঃপর সোহাইল আবূ জান্দালের মুখের উপর চপেটাঘাত করল এবং মুশরিকদের নিকট প্রত্যাবর্তনের জন্য তাঁর গলবস্ত্র ধারণ করে হেঁচড়িয়ে টানতে টানতে নিয়ে গেল।
আবূ জান্দাল তখন জোরে জোরে চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘হে মুসলিম ভ্রাতৃবৃন্দ! আমি কি মুশরিকদের কাছে ফিরে যাব এবং তারা আমাকে দ্বীনের ব্যাপারে ফেৎনায় নিক্ষেপ করবে?’
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন,
(يَا أَبَا جَنْدَلٍ، اِصْبِرْ وَاحْتَسِبْ، فَإِنَّ اللهَ جَاعِلٌ لَّكَ وَلِمَنْ مَّعَكَ مِنْ الْمُسْتَضْعَفِيْنَ فَرَجاً وَمَخْرَجًا، إِنَّا قَدْ عَقَدْنَا بَيْنَنَا وَبَيْنَ الْقَوْمَ صُلْحاً، وَأَعْطَيْنَاهُمْ عَلٰى ذٰلِكَ، وَأَعْطُوْنَا عَهْدَ اللهِ فَلَا نَغْدِرُ بِهِمْ)
‘আবূ জান্দাল! ধৈর্য্য ধারণ কর এবং একে সওয়াব লাভের উপায় মনে করে নাও। আল্লাহ তা‘আলা তোমার এবং তোমার মতো দুর্বল ও নির্যাতিত মুসলিমগণের জন্য প্রশস্ত আশ্রয় স্থান তৈরি করে রেখেছেন। আমরা কুরাইশগণের সঙ্গে সন্ধি করেছি এবং আমরা পরস্পরের নিকট অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়েছি। এ কারণে আমরা অঙ্গীকার ভঙ্গ করতে পারব না।’
এরপর উমার (রাঃ) বাহির হয়ে অত্যন্ত ক্ষিপ্র গতিতে আবূ জান্দালের নিকট গিয়ে পৌঁছে গেলেন এবং তাঁর পাশ দিয়ে যেতে যেতে বলছিলেন, ‘আবূ জান্দাল! ধৈর্য্য ধারণ কর। এরা মুশরিক, এদের রক্ত তো কুকুরের রক্ত।’ সঙ্গে সঙ্গে তলোয়ারের হাতলও তিনি তাঁর সামনে তুলে ধরলেন। উমার (রাঃ)-এর বর্ণনা রয়েছে যে, ‘আমার আশা ছিল যে, আবূ জান্দাল তলোয়ার হাতে নিয়ে তাঁর পিতাকে নিঃশেষ করে ফেলবেন, কিন্তু তিনি তাঁর পিতার ব্যাপারে কৃপণতা অবলম্বন করলেন এবং সন্ধিচুক্তি কার্যকর হয়ে গেল।’
সন্ধি চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে নিস্কৃতি লাভের পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজ নিজ পশু কুরবানী করার জন্য সাহাবীগণকে পরামর্শ দিলেন। কিন্তু আল্লাহর শপথ! কেউই আপন স্থান ত্যাগ করলেন না। মনে হল যেন এ কথা তাঁদের কানেই যায় নি।
নাবী কারীম (ﷺ) তিন বার তাঁর উক্তির পুনরাবৃত্তি করলেন। কিন্তু কেউই স্থান ত্যাগ করলেন না। তখন তিনি উম্মু সালামাহ (রাঃ)-এর নিকট গেলেন এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করলেন। উম্মুল মু’মিনীন বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যদি চান যে, সকলে নিজ নিজ পশু কুরবানী করে মস্তক মুন্ডন করুক তাহলে আর কাউকেও কিছু না বলে নিজ পশু যবহ করুন এবং হাজ্জামকে (নাপিতকে) ডাকিয়ে নিয়ে নিজ মস্তক মুন্ডন করে নিন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উম্মুল মু’মিনীনের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করলেন, অর্থাৎ নিজ হাদয়ের পশু যবেহ করলেন এবং হাজ্জামকে ডাকিয়ে নিয়ে নিজ মস্তক মুন্ডন করিয়ে নিলেন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে কুরবানী ও মস্তক মুন্ডন করতে দেখে অন্যেরা সকলেই নিজ নিজ পশু যবেহ করলেন এবং একে অন্যের সাহায্য নিয়ে মস্তক মুন্ডন করে নিলেন। সমগ্র পরিবেশটা তখন গাম্ভীর্যপূর্ণ এবং সকলেই এতই চিন্তাযুক্ত ছিলেন যে, মনে হচ্ছিল অত্যধিক চিন্তিত থাকার কারণে পরস্পর পরস্পরকে হত্যা করে ফেলবে। সে সময় সাত সাত জনের জন্য একটি গরু এবং একটি উট যবেহ করা হয়।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আবূ জাহলের একটি উট যবেহ করেন যার নাকে রূপোর তৈরি একটি নোলক বালি বা বৃত্ত ছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল, এর ফলে কুরাইশ মুশরিকগণ যেন মানসিক যন্ত্রণায় ভোগে। অতঃপর রাসূলে কারীম (ﷺ) মস্তক মুন্ডনকারীদের জন্য তিনবার ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং কাঁচি দ্বারা চুল কর্তনকারীদের জন্য একবার দু‘আ করেন। এ সফরে আল্লাহ তা‘আলা কা‘ব বিন উজরাহ সম্পর্কে এ হুকুম নাযিল করেন যে, যে ব্যক্তি কষ্টের কারণে নিজ মস্তক মুন্ডন করবে (ইহরামের অবস্থায়) সে যেন রোযা পালন করে, অথবা সদকা করে কিংবা কোন পশু যবেহ করে তা উৎসর্গ করে।
এরপর কিছু সংখ্যক মহিলা মুহাজির আগমন করলেন। তাদের অভিভাবকগণ দাবী করল যে, হুদায়াবিয়ার যে সন্ধিচুক্তি সম্পন্ন হয়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতে এদের ফেরত প্রদান করা হোক । কিন্তু তাদের এ দাবী রাসূলুল্লাহ (ﷺ) প্রমাণের ভিত্তিতে প্রত্যাখ্যান করে দিলেন যে, এ চুক্তির শর্ত সম্পর্কে সন্ধিপত্র যে কথা লিখা হয়েছিল তা ছিল-
(وَعَلٰى أَنَّهُ لَا يَأْتِيْكَ مِنَّا رَجُلٌ، وَإِنْ كَانَ عَلٰى دِيْنِكَ إِلَّا رَدَدْتُّهُ عَلَيْنَا)
‘এ শর্ত সাপেক্ষে এ সন্ধি করা হচ্ছে যে, আমাদের যে ব্যক্তি আপনার নিকট চলে যাবে আপনি অবশ্যই তাকে ফেরত পাঠাবেন যদিও সে আপনার দ্বীনের অনুসারী হয়।[1]
অতএব, এ মহিলাগণ সন্ধিচুক্তির শর্তাবলীর আওতাভুক্ত ছিলেন না। অন্য দিকে আবার এ মহিলাগণ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াতে কারীমও নাযিল করেন,
(يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا إِذَا جَاءكُمُ الْمُؤْمِنَاتُ مُهَاجِرَاتٍ فَامْتَحِنُوْهُنَّ)، حَتّٰى بَلَغَ (بِعِصَمِ الْكَوَافِرِ) [الممتحنة : 10]
‘হে মু’মিনগণ! ঈমানদার নারীরা যখন তোমাদের কাছে হিজরাত করে আসে তখন তাদেরকে পরখ করে দেখ (তারা সত্যিই ঈমান এনেছে কি না)। তাদের ঈমান সম্বন্ধে আল্লাহ খুব ভালভাবেই জানেন। অতঃপর তোমরা যদি জানতে পার যে, তারা মু’মিনা, তাহলে তাদেরকে কাফিরদের কাছে ফেরত পাঠিও না। মু’মিনা নারীরা কাফিরদের জন্য হালাল নয়, আর কাফিররাও মু’মিনা নারীদের জন্য হালাল নয়। কাফির স্বামীরা (মাহর স্বরূপ) যা তাদের জন্য খরচ করেছিল তা কাফিরদেরকে ফেরত দিয়ে দাও। অতঃপর তোমরা তাদেরকে মাহর প্রদান করতঃ বিয়ে করলে তাতে তোমাদের কোন অপরাধ হবে না। তোমরা কাফির নারীদেরকে (বিবাহের) বন্ধনে আটকে রেখ না।’ [আল-মুমতাহিনাহ (৬০ : ১০]
উল্লেখিত আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর যখনই কোন মহিলা হিজরত করে আসতেন তখন রাসূলে কারীম (ﷺ) আল্লাহর এ নির্দেশের আলোকে তাঁর পরীক্ষা গ্রহণ করতেন,
(يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا جَاءَكَ الْمُؤْمِنَاتُ يُبَايِعْنَكَ عَلٰى أَنْ لَا يُشْرِكْنَ بِاللهِ شَيْئاً وَلَا يَسْرِقْنَ وَلَا يَزْنِيْنَ وَلَا يَقْتُلْنَ أَوْلَادَهُنَّ وَلَا يَأْتِيْنَ بِبُهْتَانٍ يَفْتَرِيْنَهُ بَيْنَ أَيْدِيْهِنَّ وَأَرُجُلِهِنَّ وَلَا يَعْصِيْنَكَ فِيْ مَعْرُوْفٍ فَبَايِعْهُنَّ وَاسْتَغْفِرْ لَهُنَّ اللهَ إِنَّ اللهَ غَفُوْرٌ رَحِيْمٌ) [الممتحنة : 12]
‘হে নাবী! যখন মু’মিনা নারীরা তোমার কাছে এসে বাই‘আত করে যে, তারা আল্লাহর সঙ্গে কোন কিছুকে শারীক করবে না, চুরি করবে না, যিনা করবে না, নিজেদের সন্তান হত্যা করবে না, জেনে শুনে কোন অপবাদ রচনা ক’রে রটাবে না এবং কোন ভাল কাজে তোমার অবাধ্যতা করবে না- তাহলে তুমি তাদের বাই‘আত (অর্থাৎ তোমার প্রতি আনুগত্যের শপথ) গ্রহণ কর এবং তাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর; আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, বড়ই দয়ালু।’ [আল-মুমতাহিনাহ (৬০ : ১২]
এ প্রেক্ষিতে মহিলাগণ এ আয়াতে বর্ণিত শর্তাবলী অনুসরণ করবে বলে যখন অঙ্গীকার করত, নাবী কারীম (ﷺ) তখন তাদের অঙ্গীকার গ্রহণ করতেন। অতঃপর তাদরকে আর ফেরত দেয়া হতো না।
এ নির্দেশাবলী পালনার্থে মুসলিমগণ নিজ নিজ কাফেরা মুশরিকা স্ত্রীগণকে তালাক প্রদান করেন। ঐ সময় উমারের দাম্পত্যে দুই অংশীবাদী মহিলা ছিল। তিনি তাদের দু’ জনকে তালাক প্রদান করেন। এদের একজনকে বিবাহ করেন মুওয়াবিয়া এবং অন্য জনকে বিবাহ করেন সফওয়ান বিন উমাইয়া।
ইসলামের ইতিহাসে দিকে পরিবর্তনকারী এবং সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ সন্ধি হচ্ছে হুদায়বিয়াহর সন্ধি। যে ব্যক্তি এ সন্ধির দফাগুলো এবং পরবর্তী দৃশ্যপট সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করবেন এটা তাঁর নিকট স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হবে যে, এ সন্ধি ছিল মুসলিমগণের জন্য একটি বিরাট বিজয় স্বরূপ। কারণ এর পূর্ব পর্যন্ত কুরাইশগণ ইসলামী সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের কোন অস্তিত্বই স্বীকার করত না। এমন কি একে নিশ্চিহ্ন করার জন্য এরা ছিল বদ্ধপরিকর। তারা এ অপেক্ষায় ছিল যে, এক দিন না একদিন এদের শক্তি বিনষ্ট হয়ে যাবে। অধিকন্তু, কুরাইশগণ আরব উপদ্বীপে ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং পার্থিব প্রধানের দায়িত্বে সমাসীন থাকার কারণে ইসলামী দাওয়াত এবং সাধারণ মানুষের মাঝে পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে প্রতিবন্ধক ছিল।
এর পরবর্তী দৃশ্যপট বিশ্লেষণ করলে এটা পরিস্কার হয়ে যায় যে, এ সন্ধিতে আপাত: দৃষ্টিতে মুসলিমগণের কিছুটা নতি স্বীকার করার কথা মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এতে ছিল মুসলিমগণের শক্তির স্বীকারোক্তি এবং এ সত্যের স্বীকৃতি যে ইসলামী শক্তিকে পিষ্ট কিংবা নিশ্চিহ্ন করার ক্ষমতা কুরাইশদের নেই।
তৃতীয় দফার ক্ষেত্রে এটা প্রতীয়মান হচ্ছিল যে, কুরাইশগণের নিকট পরিবর্তিত পরিস্থিতির ব্যাপারটি তাদের অতীতের অবস্থা এবং অবস্থান সম্পর্কে তেমন কোন সচেতনতা যেন ছিল না। ধর্মীয় ব্যাপারে তাদের ভূমিকা যে ছিল শীর্ষস্থানে এ কথাটি তারা প্রায় ভুলতেই বসেছিল। অধিকন্তু, আরব উপদ্বীপের সাধারণ মানুষের কথাটাও যেন তাদের চিন্তা ও চেতনার বাইরে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। আরব উপদ্বীপের সকল সাধারণ মানুষ যদি ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে তাতেও যেন তাদের মাথা ব্যথার আর তেমন কিছুই ছিল না এবং এ ব্যাপারে তারা আর কোন প্রতিবন্ধকও হবে না। কুরাইশগণের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং সংকল্পের প্রেক্ষাপটে এটা কি তাদের জন্য প্রকাশ্য পরাজয় ছিল না? পক্ষান্তরে, মুসলিমগণের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের প্রেক্ষাপটে এটা কি তাদের জন্য সুস্পষ্ট বিজয় ছিল না?
অবশেষে মুসলিম ও ইসলামের শত্রুদের মধ্যে যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ সংঘটিত হয়েছিল এর লক্ষ্য এর উদ্দেশ্য এছাড়া আর কী ছিল যে, বিশ্বাস বা দ্বীনের ব্যাপারে জনসাধারণ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করবে এবং ক্ষমতার অধিকারী হবে? অর্থাৎ স্বাধীন ইচ্ছানুযায়ী যে ব্যক্তি যা ইচ্ছা করবে তাই অবলম্বন করতে পারবে? মুসলিম হতে চাইলে মুসলিম হবে, আর কাফের থাকতে চাইলে কাফের থাকবে। তাদের ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষার সামনে কোন শক্তি বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। মুসলিমগণের এ ইচ্ছা তো কখনই ছিল না যে শত্রুদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হোক , তাদেরকে মৃত্যু ঘাটে অবতরণ করা হোক এবং জোরজবরদস্তি করে মুসলিম করা হোক। অর্থাৎ মুসলিমগণের উদ্দেশ্য এটা ছিল যা আল-কুরআন বর্ণনা করছে,
فَمَنْ شَاءَ فَلْيُؤْمِنْ وَمَنْ شَاءَ فَلْيَكْفُرْ
‘কাজেই যার ইচ্ছে ঈমান আনুক আর যার ইচ্ছে সত্যকে অস্বীকার করুক’। (সূরাহ আল-কাহফ ১৮ : ২৯)
লোকেরা যা করতে চায় এ ব্যাপারে কোন শক্তিই যেন বাধা হয়ে দাঁড়াতে না পারে। এটা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য যে, এ সন্ধির মাধ্যমে মুসলিমগণের উল্লেখিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য সুবিধাদি অর্জিত হয়ে গেল এবং সে সব এভাবে অর্জিত হল যে, অধিকাংশ সময় যুদ্ধে প্রকাশ্য বিজয় লাভ করেও তা সম্ভব হয় নি। সন্ধির মাধ্যমে প্রচার কাজের ঝুঁকি এবং বিপদাপদের সম্ভাবনা থেকে মুক্ত হওয়ায় ইসলামের দাওয়াত ও প্রচারের ময়দানে মুসলিমগণ অভূতপূর্ব কৃতকার্যতা অর্জন করতে থাকেন। সন্ধির পূর্বে যে ক্ষেত্রে মুসলিমগণের সৈন্য সংখ্যা কখনই তিন হাজারের অধিক হয় নি, সে ক্ষেত্রে সন্ধির পর মাত্র দু’ বছরের ব্যবধানে মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে তা দশ হাজারে পৌঁছে গেল।
দ্বিতীয় দফাও প্রকৃতপক্ষে এ প্রকাশ্য বিজয়েরই অংশ ছিল। কারণ, সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করে মুশরিকগণই যুদ্ধ আরম্ভ করেছিল। এ প্রসঙ্গে কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,
(وَهُم بَدَؤُوْكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ) [التوبة: 13]
‘প্রথমে তারাই তোমাদেরকে আক্রমণ করেছিল।’ [আত্-তাওবাহ (৯) : ১৩]
যে অঞ্চল পর্যন্ত মুসলিম প্রহরী চক্র বা টহলদারী সৈন্য দলের কার্যক্রম বিস্তৃত ছিল মুসলিমগণের এটা উদ্দেশ্য এবং আশা ছিল যে, কুরাইশগণ তাদের নির্বুদ্ধিতা প্রসূত অহংকার পরিহার করে আল্লাহর দ্বীনের পথে বাধা সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকবে এবং সাম্য ও মৈত্রীর ভিত্তিতে কার্যাদি সম্পন্ন করবে। অর্থাৎ প্রত্যেক পক্ষই আপন আপন লক্ষ্যে কার্যাদি নিষ্পন্ন করার ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকবে। এখন চিন্তা করে দেখলে ব্যাপারটি পরিস্কার হয়ে যাবে যে, দশ বছরের জন্য যুদ্ধ বিরতির সন্ধি ছিল তাদের অর্থহীন অহংকার এবং আল্লাহর পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকার। অধিকন্তু, এটা এ কথা প্রমাণ করে যে, যারা যুদ্ধ আরম্ভ করেছিল তারা দুর্বল এবং পর্যুদস্ত হওয়ার ফলে স্বীয় উদ্দেশ্য হাসিল করতে গিয়ে তারা সম্পূর্ণ অকৃতকার্য হয়ে গেল।
প্রথম দফার প্রসঙ্গটি বিশ্লেষণ করলেও এটা সহজেই অনুধাবন করা যায় যে, আপাত দৃষ্টিতে মুসলিমগণের জন্য অবমাননাকর মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা ছিল তাঁদের সাফল্যেরই প্রতীক। কারণ, এ শর্তের মাধ্যমে মুসলিমগণ মসজিদুল হারামে প্রবেশাধিকার লাভ করেছিলেন যেখানে তাঁদের প্রবেশের ব্যাপারে কুরাইশরা ইতোপূর্বে নিষেধাজ্ঞা জারী করেছিল। তবে এ শর্তের মধ্যে কুরাইশদের পরিতৃপ্ত হওয়ার যে বিষয়টি ছিল তা হচ্ছে, তারা ঐ বছরের জন্য মুসলিমগণকে মক্কায় প্রবেশ থেকে বিরত রাখার ব্যাপারে সফলকাম হয়েছিল। কিন্তু তা ছিল নিতান্ত গুরুত্বহীন একটি সাময়িক ব্যাপার।
এ সন্ধির ব্যাপারে বিশেষভাবে চিন্তা-ভাবনার আরও একটি বিষয় হচ্ছে, কুরাইশগণ মুসলিমগণকে তিনটি বিষয়ে সুযোগদানের বিনিময়ে তারা মাত্র একটি সুযোগ গ্রহণ করেছিল যা ৪র্থ দফায় উল্লেখিত হয়েছে। কিন্তু এ সুযোগ ছিল খুবই সাধারণ এবং গুরুত্বহীন। এতে মুসলিমগণের কোন ক্ষতি হয় নি। কারণ, এটা একটা বিদিত বিষয় ছিল যে, যতক্ষণ কোন মুসলিম ইসলামের বন্ধনের মধ্যে থাকবে সে ততক্ষণ আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এবং মদীনাতুল ইসলাম হতে পলায়ন করতে পারবে না। মাত্র একটি কারণেই সে পলায়ন করতে পারে এবং তা হচ্ছে স্বধর্ম ত্যাগ। প্রকাশ্যে হোক কিংবা গোপনে হোক কোন মুসলিম যখন স্বধর্ম ত্যাগ করবে তখন তো মুসলিম সমাজে তার কোন প্রয়োজন থাকবে না। বরং মুসলিম সমাজে তার উপস্থিতির থেকে তার পৃথক হয়ে যাওয়াই হবে বহু গুণে উত্তম। এ মোক্ষম ব্যাপারটির প্রতি ইঙ্গিত করে রাসূলে কারীম (ﷺ) ইরশাদ করেছেন
(إِنَّهُ مَنْ ذَهَبَ مِنَّا إَلَيْهِمْ فَأَبْعَدَهُ اللهُ)
অর্থ: যে আমাদের ছেড়ে মুশরিকদের নিকট পলায়ন করল আল্লাহ তাকে দূর করে দিলেন এবং ধ্বংস করে দিলেন।[1]
এরপর অবশিষ্ট থাকে মক্কার সেই সব অধিবাসীর কথা যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল কিংবা ইসলাম গ্রহণের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান ছিল। অবশ্য এ চুক্তির ফলে যদিও তাদের জন্য একটি সান্তনার বিষয় এ ছিল যে, ‘আল্লাহর জমিন প্রশস্ত।’ ইসলামের প্রথম পর্যায়ে মক্কার মুসলিমগণের অত্যন্ত সংকটময় মুহূর্তে কি হাবাশাকে মুসলিমগণের জন্য তার বাহুবন্ধন উন্মুক্ত করে দেয় নি যখন মদীনার অধিবাসীগণ ইসলামের নাম পর্যন্ত শোনেনি? অনুরূপভাবে আজও পৃথিবীর যে কোন অংশ মুসলিমগণের জন্য স্বীয় বাহু বন্ধন উন্মুক্ত করতে পারে।
এ বিষয়টির প্রতিই ইঙ্গিত করে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন, (وَمَنْ جَاءَنَا مِنْهُمْ سَيَجْعَلَ اللهُ لَهُ فَرَجاً وَمَخْرَجاً) অর্থ: তাদের মধ্য হতে কোন ব্যক্তি আমাদের কাছে আসলে আল্লাহ তার জন্য যে কোন সুরাহা এবং প্রশস্ততা বের করে দেবেন।[2]
অতঃপর এ ধরণের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যদিও বাহ্যিকভাবে কুরাইশগণের সাময়িক মান-মর্যাদা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছিল, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের জন্য তা ছিল ব্যক্তিগত ব্যাকুলতা, চিন্তাভাবনা, গোত্রীয় চাপ এবং বিপর্যয়ের নিদর্শন। অধিকন্তু, এ থেকে এমনটিও বোধগম্য হচ্ছিল যে, তারা তাদের মূর্তি পূজক সমাজ সম্পর্কে খুবই ভীতসন্ত্রস্ত ছিল। তাছাড়া তারা এটাও উপলব্ধি করছিল যে, শিশুদের খেলা ঘরের ন্যায় ঠুনকো ও অর্থহীন সমাজ-ব্যবস্থা এমন একটি ফাঁকা অন্তসারশূন্য এবং অভ্যন্তর ভাগ হতে খননকৃত পরিখার পাশে অবস্থিত যা যে কোন মুহূর্তে ধ্বসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অতএব এর হেফাজতের জন্য ঐ জাতীয় রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা অবলম্বনের প্রয়োজন ছিল।
অন্যপক্ষে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে উদার অন্তঃকরণের সঙ্গে এ শর্তগুলোর স্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছিলেন যে, কুরাইশগণের নিকট আশ্রিত কোন মুসলিমকে ফেরত চাইবেন না, তা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত করে যে, প্রস্তর প্রতিম সুদৃঢ় ও সুসংঘঠিত ইসলামী সমাজের উপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ পুরোমাত্রায় কার্যকর ছিল। এ প্রকার শর্তে সম্মতি জ্ঞাপনের ব্যাপারে তাঁর মনে দ্বিধা, দ্বন্দ্ব কিংবা আশংকার কোনই কারণ ছিল না।
[2] ক সহীহুল মুসলিম ২য় খন্ড ১০৫ পৃঃ, হুদায়বিয়াহর সন্ধি অধ্যায়।
হুদায়বিয়াহ সন্ধি চুক্তির শর্তাদি এবং তার সমীক্ষাসূচক আলোচনা ইতোপূর্বে উপস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু এ শর্ত সমূহের মধ্যে দুটি শর্ত স্পষ্টতঃ এ প্রকারের ছিল যা মুসলিমগণের মনে দারুন দুঃখ, বেদনা, হতাশা ও বিষণ্ণতার ভাব সৃষ্টি করেছিল। সেগুলো হচ্ছে (১) বিষয়টি ছিল, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছিলেন যে, তিনি আল্লাহর ঘরের নিকট গমন করবেন এবং তাওয়াফ করবেন, কিন্তু পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তাওয়াফ না করেই মদীনা ফিরে যাওয়ার শর্তে তিনি সম্মতি জ্ঞাপন করেন। (২) দুঃখ-বেদনার দ্বিতীয় বিষয়টি ছিল, তিনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এবং সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ তা‘আলাভ তাঁর দ্বীনকে জয়যুক্ত করবেন বলে তিনি ঘোষণাও দিয়েছিলেন, অথচ কুরাইশগণের চাপে পড়ে কী কারণে তিনি সন্ধির এ অবমাননাকর শর্তে সম্মতি জ্ঞাপন করলেন তা কিছুতেই মুসলিমগণের বোধগম্য হচ্ছিল না। এ দুটি বিষয় মুসলিমগণের মনে দারুণ সংশয় সন্দেহ এবং শঙ্কার সৃষ্টি করেছিল। এ দুটি বিষয়ে মুসলিমগণের অনুভূতি এতই আঘাতপ্রাপ্ত ও আহত হয়েছিল যে বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করে এর সুদূর প্রসারী ফলাফল সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করার মতো মানসিক ধৈর্য তাঁদের ছিল না। ভাবানুভূতির ক্ষেত্রে তাঁরা সকলেই প্রায় ভেঙ্গে পড়েছিলেন এবং সম্ভবত উমার (রাঃ) আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন সব চাইতে বেশী।
তিনি নাবী কারীম (ﷺ)-এর দরবারে উপস্থিতত হয়ে আরয করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমরা কি সত্যের উপর দন্ডায়মান নই এবং কাফিরেরা বাতিলের উপর?
নাবী কারীম (ﷺ) উত্তর দিলেন, ‘অবশ্যই।’
তিনি পুনরায় আরয করলেন, ‘আমাদের শহীদগণ জান্নাতে এবং তাদের নিহতগণ কি জাহান্নামে নয়? ‘তিনি বললেন, ‘কেন নয়।’
উমার বললেন, ‘তবে কেন আমরা আল্লাহর দ্বীন সম্পর্কে মুশরিকদের চাপে পড়ব এবং এমন অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করব যে, এখনও আল্লাহ তা‘আলা আমাদের ও তাদের মধ্যে কোনই ফয়সালা করেননি?’
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, (يَا ابْنَ الْخَطَّابِ، إِنِّيْ رَسُوْلُ اللهِ وَلَسْتُ أَعْصِيَهُ، وَهُوَ نَاصِرِيْ وَلَنْ يُضَيِّعَنِيْ أَبَداً)
‘ওহে খাত্তাবের সন্তান! আমি আল্লাহর রাসূল এবং কখনই তাঁর অবাধ্য হতে পারব না। আমি বিশ্বাস করি যে সকল প্রয়োজনে তিনিই সাহায্য করবেন এবং কখনই আমাকে ধ্বংস হতে দেবেন না।’
উমার (রাঃ) বললেন, ‘আপনি কি আমাদের বলেন নি যে, আপনি আল্লাহর ঘরের নিকট গমন করবেন এবং তাওয়াফ করবেন?’
নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, (بَلٰى، فَأُخْبِرْتُكَ أِنَّا نَأْتِيَهُ الْعَامَ؟) ‘অবশ্যই, কিন্তু আমি কি এ কথা বলেছিলাম যে, আমরা এ বছরই আসব।’
তিনি উত্তর করলেন, ‘না’
নাবী (ﷺ) বললেন, (فإنك آتيه ومطوف به) ‘যাহোক ইনশাআল্লাহ্ তোমরা আল্লাহর ঘরের নিকট আসবে এবং তাওয়াফ করবে।
এরপর উমার (রাঃ) ক্রোধে ও অভিমানে অগ্নিশর্মা হয়ে আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর নিকট গিয়ে উপস্থিত হলেন এবং তাকেও সে সব কথা বললেন যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলেছিলেন। প্রত্যুত্তরে আবূ বাকরও (রাঃ) সে সব কথাই বললেন যা রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলেছিলেন এবং পরিশেষে এটুকুও বললেন যে, ধৈর্য সহকারে নাবী (ﷺ) পথের উপর দন্ডায়মান থাক যতক্ষণ পর্যন্ত সত্য সমাগত না হয়। কেননা আল্লাহর শপথ তিনি সত্যের উপরেই প্রতিষ্ঠিত রয়েছেন।’
এরপর(إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِيْنًا) ‘আমি তোমাকে দিয়েছি স্পষ্ট বিজয়।’ [আল-ফাতহ (৪৮) : ১] আয়াত অবতীর্ণ হয়। যার মধ্যে এ সন্ধিকে সুস্পষ্ট বিজয় প্রমাণ করা হয়েছে। এ আয়াতে কারীমা অবতীর্ণ হলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উমার (রাঃ)-কে আহবান করলেন এবং আয়াতটি পড়ে শোনালেন। তিনি তখন বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি একে বিজয় বলতে পারি?
নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, ‘হ্যাঁ’’।
এতে তিনি সাত্ত্বনা লাভ করলেন এবং সেখান থেকে চলে গেলেন।
পরে উমার (রাঃ) যখন নিজের ভুল বুঝতে পারলেন তখন অত্যন্ত লজ্জিত হলেন। এ ব্যাপারে তাঁর নিজের বর্ণনা হচ্ছে, ‘আমি সে দিন যে ভুল করেছিলাম এবং যে কথা বলেছিলাম তাতে ভীত হয়ে আমি অনেক আমল করেছি, প্রচুর দান খয়রাত করে আসছি, রোযা রেখে আসছি এবং দাস মুক্ত করে আসছি। এত শত করার পর এখন আমার মঙ্গলের আশা করছি।[1]
মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কিছুটা নিশ্চিন্ত বোধ করতে থাকলেন। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই অন্য এক সমস্যার সৃষ্টি হয়ে গেল। একজন মুসলিম- মক্কায় যার উপর নির্যাতন চালানো হচ্ছিল- কোন ভাবে মুক্ত হয়ে মদীনায় এসে উপস্থিত হল। তাঁর নাম ছিল আবূ বাসীর। তিনি সাক্বীফ গোত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং কুরাইশদের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তিতে আবদ্ধ ছিলেন। তাঁকে ফেরত নেয়ার জন্য কুরাইশগণ দু’ ব্যক্তিকে মদীনায় প্রেরণ করে। তাঁরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলল, ‘আমাদের ও আপনার মধ্যে যে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে তা কার্যকর করে আবূ বাসীরকে ফেরত দিন।’
তাদের এ কথার প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আবূ বাসীরকে তাদের হস্তে সমর্পণ করে দিলেন। তারা দুজন তাঁকে সঙ্গে নিয়ে মক্কা অভিমুখে যাত্রা করল। পথ চলার এক পর্যায়ে তারা যুল হোলাইফা নামক স্থানে অবতরণ করে খেজুর খেতে লাগল। খাওয়া দাওয়া চলাকালীন অন্তরঙ্গ পরিবেশে আবূ বাসীর একজনকে বলল, ‘ওগো ভাই! আল্লাহর শপথ! তোমার তরবারীখানা আমার নিকট খুবই উকৃষ্ট মনে হচ্ছে। সে ব্যক্তি কোষ থেকে তরবারী খানা বের করে নিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আল্লাহর শপথ! এ হচ্ছে অত্যন্ত উৎকৃষ্ট তরবারী। আমি একে বার বার পরীক্ষা করে দেখেছি।’
আবূ বাসীর বলল, ‘তরবারীখানা আমার হাতে একবার দাও ভাই, আমিও দেখি।’
সে তার কথা মতো তরবারীখানা তার হাতে দিল। এদিকে তরবারী হাতে পাওয়া মাত্রই আবূ বাসীর তাকে আক্রমণ করে স্ত্তপে পরিণত করে দিল।
দ্বিতীয় ব্যক্তি প্রাণভয়ে পলায়ন করে মদীনায় এসে উপস্থিত হল এবং দৌঁড় দিয়ে মসজিদে নাবাবীতে প্রবেশ করল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে দেখে বললেন, (لَقَدْ رَأَى هٰذَا ذعْراً) ‘কী হয়েছে একে এত ভীত দেখাচ্ছে কেন?’
লোকটি নাবী (ﷺ)-এর নিকট অগ্রসর হয়ে বলল, ‘আল্লাহর শপথ! আমার সঙ্গীকে হত্যা করা হয়েছে এবং আমাকেও হত্যা করা হবে।’ এ সময় আবূ বাসির সেখানে এসে উপস্থিত হল এবং বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আল্লাহ আপনার অঙ্গীকার পূরণ করে দিয়েছেন। আপনি আমাকে তাদের হস্তে সমর্পণ করে দিয়েছেন। অতঃপর আল্লাহ আমাকে তাঁদের নির্যাতন থেকে পরিত্রাণ দিয়েছেন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন,(وَيْلُ أَمِّهِ، مِسْعَرْ حَرْبٍ لَوْ كَانَ لَهُ أَحَدٌ) ‘তার মাতা ধ্বংস হোক , এ কোন সঙ্গী পেলে যুদ্ধের অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করবে।’
নাবী কারীম (ﷺ)-এর এ কথা শুনে আবূ বাসীর বুঝে নিলেন যে, পুনরায় তাকে কাফিরদের হস্তেই সমর্পণ করা হবে। কাজেই , কালবিলম্ব না করে তিনি মদীনা থেকে বের হয়ে সমুদ্রোপকূল অভিমুখে অগ্রসর হলেন।
এদিকে আবূ জান্দাল বিন সোহাইলও কোন ভাবে মুক্ত হয়ে মক্কা হতে পলায়ন করেন এবং আবূ বাসীরের সঙ্গে মিলিত হন। এরপর থেকে কুরাইশদের কেউ ইসলাম গ্রহণ করলে মক্কা থেকে পলায়ন করে গিয়ে আবূ বাসীরের সঙ্গে গিয়ে মিলিত হতেন। এভাবে একত্রিত হয়ে তারা একটি সুসংগঠিত দলে পরিণত হয়ে যান।
এরপর থেকে শাম দেশে গমনাগমনকারী কোন কুরাইশ বাণিজ্য কাফেলার খোঁজ খবর পেলেই তাঁরা তাদের উপর চড়াও হয়ে লোকজনদের মারধোর করতেন এবং ধনমাল যা পেতেন তা লুটপাট করে নিয়ে যেতেন। বার বার প্রহৃত এবং লুণ্ঠিত হওয়ার ফলে ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে অবশেষে কুরাইশগণ নাবী কারীম (ﷺ)-এর নিকট এসে আল্লাহ এবং আত্মীয়তার মধ্যস্থতার বরাত দিয়ে এ প্রস্তাব পেশ করেন যে তিনি যেন তাঁদেরকে তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীনে নিয়ে আসেন। এ প্রেক্ষিতে নাবী কারীম (ﷺ) তাঁদেরকে মদীনায় আগমনের জন্য আহবান জানালে তাঁরা মদীনায় চলে আসেন। কুরাইশরা আরও প্রস্তাব করে যে, যে সকল মুসলিম মক্কা থেকে মদীনা চলে যাবে তাদের আর ফেরত চাওয়া হবে না।’’[1]
হুদায়বিয়াহর সন্ধিচুক্তির পর সপ্তম হিজরী সালের প্রথম ভাগে ‘আমর বিন আস, খালিদ বিন ওয়ালিদ এবং উসমান বিন ত্বালহাহ (রাঃ) ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এরা যখন মসজিদে নাবাবীতে উপস্থিত হলেন তখন নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, (إِنَّ مَكَّـةَ قَدْ أَلْقَتْ إِلَيْنَا أَفْلاَذَ كَبِدِهَا) ‘মক্কা তার কলিজার টুকরোদের (প্রিয়জনদেরকে) আমাদের নিকট সমর্পণ করে দিয়েছে।[1]
ইসলাম এবং মুসলমানদের জীবনে হুদায়বিয়াহর সন্ধি প্রকৃতই এক নবতর পরিবর্তন ধারার সূচনা করে। কারণ, ইসলামের শত্রুতা ও বিরোধিতায় কুরাইশগণই সর্বাধিক দৃঢ়, একগুঁয়ে এবং দাঙ্গাবাজ সম্প্রদায় হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল। কিন্তু যখন তারা যুদ্ধের ময়দানে পশ্চাদপসরণ করে সন্ধিচুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে নিরাপত্তা বিধানের প্রতি ঝুঁকে পড়ল তখন যুদ্ধবাজ তিনটি দলের মধ্যে (কুরাইশ, গাত্বাফান ও ইহুদী) সব চাইতে শক্তিশালী দলটি (কুরাইশ) নমনীয়তা অবলম্বন করায় তাদের ঐক্যজোটের সুদৃঢ় বন্ধন আলগা হয়ে পড়ল। অধিকন্তু সমগ্র আরব উপদ্বীপে মূর্তিপূজার চাবিকাঠি এবং মূর্তিপূজকদের নেতৃত্ব ছিল কুরাইশদের হাতে, কিন্তু তারা যখন যুদ্ধের ময়দান হতে পিছু হটে গেল তখন মূর্তিপূজকদের যুদ্ধোন্মাদনা ও উদ্দীপনায় ভাটা পড়ে গেল এবং মুসলিমগণের প্রতি উৎকট বৈরী ভাবের গোত্রের দিক হতে বড় রকমের শত্রুতামূলক ক্রিয়াকলাপ কিংবা গোলমাল সৃষ্টির জন্য বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়নি। এ সব ব্যাপারে তারা যদি কিছু করেও থাকে তা তাদের নিজস্ব চিন্তা চেতনার ফলশ্রুতি ছিল না, বরং তা ছিল ইহুদীদের প্ররোচনার কারণে।
ইহুদীগণের ব্যাপার ছিল, ইয়াসরিব হতে বিতাড়িত হওয়ার পর তারা খায়বারকে সর্বরকম যোগশাজস এবং ষড়যন্ত্রের আখড়া বা কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছিল। সেখানে শয়তান তাদের সর্বরকম ইন্ধনের যোগান দিচ্ছিল এবং তারা ফেৎনা ফাসাদের অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করার কাজে লিপ্ত ছিল। তারা মদীনার পার্শ্ববর্তী আবাদীর বেদুঈনদের উত্তেজিত করা এবং নাবী কারীম (ﷺ)ও মুসলিমগণকে নিঃশেষ করা কিংবা তাঁদের উপর খুব বড় রকমের আঘাত হানার ফন্দি ফিকিরে ব্যস্ত ছিল। এ জন্যই হুদায়বিয়াহর সন্ধির পর নাবী কারীম (ﷺ) সর্ব প্রথম ইহুদীদের প্ররোচনামূলক ক্রিয়াকলাপ ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত পদক্ষেপ অবলম্বনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন।
যাহোক, হুদায়বিয়াহর সন্ধির মাধ্যমে নিরাপত্তা ও শান্তি-স্বস্তির যে বাতাবরণ সৃষ্টি হয়েছিল ইসলামী প্রচারভিযান ও দাওয়াতের বিস্তৃতির ব্যাপারে মুসলিমগণের জন্য তা একটি বড় সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছিল। এ সুযোগের ফলে তাঁদের উদ্যম যেমন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকল, তেমনি কর্মক্ষেত্রের পরিধিও প্রসারিত হতে থাকল। যুদ্ধ মহোদ্যমের তুলনায় শান্তিকালীন প্রচেষ্টা ও প্রক্রিয়া অনেক বেশী কার্যকর প্রমাণিত হল। বিষয়ের উপস্থাপনা ও আলোচনার সুবিধার্থে সন্ধি পরবর্তী কার্যক্রমকে দ্বিবিধ দৃষ্টিকোণ থেকে পরিবশেন করা হল।
১. প্রচারাভিযান এবং সম্রাট ও সমাজপতিদের নামে পত্র প্রেরণ এবং
২. যুদ্ধাভিযান।
অবশ্য, এটা বলা অন্যায় কিংবা অমূলক হবে না যে, এ স্তরের যুদ্ধাভিযান সম্পর্কে বলার আগে সম্রাট এবং সমাজপতিগণের নামে পত্র প্রেরণ প্রসঙ্গে বিস্তারিত বিবরণ পেশ করা প্রয়োজন। কারণ ইসলামী দাওয়াতের ক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে প্রচার এবং প্রকাশের কথাই আগে আসে এবং এ কারণেই মুসলিমগণকে নানা নির্যাতন, দুঃখ-কষ্ট, ফেৎনা-ফাসাদ ও দুর্ভাবনার শিকার হতে হয়েছিল।
৬ষ্ঠ হিজরীর শেষের দিকে হুদায়বিয়াহ হতে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রসমূহের বাদশাহ ও সমাজপতিদেরকে ইসলামের প্রতি আহবান জানিয়ে তাদের নিকট পত্র প্রেরণ করেন। নাবী কারীম (ﷺ) প্রস্তাবিত পত্রসমূহ লেখার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তাঁর নিকট এ বলে আরয করা হল যে, বাদশাহগণ সে অবস্থায় প্রত্র গ্রহণ করবেন যখন তার উপর সীলমোহর অংকিত থাকবে। এ প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একটি রূপোর আংটি করিয়ে নিলেন যার উপর মুদ্রিত বা খোদিত ছিল মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)। এ মুদ্রণ ছিল তিন পংক্তি বিশিষ্ট এক পংক্তিতে মুহাম্মাদুন, অন্য এক পংক্তিতে ‘রাসূলুন’ এবং তৃতীয় পংক্তিতে ‘আল্লাহ’ শব্দটি মুদ্রিত ছিল।
এ মুদ্রনের আকৃতি ছিল ঠিক এরূপ : [1]
الله
رسول
محمد
অতঃপর বিচক্ষণ, সুশিক্ষিত ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সাহাবীগণণকে (রাঃ) বার্তাবাহক মনোনীত করে তাঁদের মাধ্যমে বাদশাহ ও সমাজপতিগণের নিকট পত্র প্রেরণ করলেন। আল্লামা মানসুরপুরী দৃঢ়তার সঙ্গে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর খায়বার যাত্রার কয়েক দিন পূর্বে ১লা মুহররম ৭ম হিজরীতে এ বার্তা বাহকগণকে প্রেরণ করেছিলেন।[2] পরবর্তী পংক্তিগুলোতে ঐ সকল পত্র ও তার পরিপ্রেক্ষিত এবং কার্যকর প্রভাবসমূহ সম্পর্কে উপস্থাপন করা হল।
[2] রহমাতুল্লিল আলামীন ১ম খন্ড ১৭১ পৃঃ।
উল্লেখিত নাজ্জাশির নাম ছিল আসহামা বিন আবযার। নাবী কারীম (ﷺ) তাঁর নামে যে পত্রখানা লিখেছিলেন তা ‘আমর বিন উমাইয়া যামরীর হাতে ৬ষ্ঠ হিজরীর শেষ কিংবা ৭ম হিজরীর প্রথমভাগে প্রেরণ করেছিলেন। তাবারী এ পত্রের রচনা বা বিষয়বস্তু সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এ সম্পর্কে গভীর ভাবে চিন্তা ভাবনা করলে এটা মনে হয় যে, এ পত্রটি সেই পত্র নয় যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হুদায়বিয়াহর সন্ধির পর লিখেছিলেন বরং এটা ছিল সেই পত্র যা নাবী কারীম (ﷺ) মক্কা যুগে জা’ফরকে তাঁর হাবশ হিজরতের সময় দিয়েছিলেন। কারণ, পত্রের শেষাংশে ঐ সকল হিজরতকারীর সম্পর্কে বলা হয়েছে নিম্নলিখিত ভাষায় :
(وقد بعثت إليكم ابن عمي جعفراً ومعه نفر من المسلمين، فإذا جاءك فأقرهم ودع التجبر)
‘আমি আপনার নিকট আমার চাচাতো ভাই জা’ফরকে মুসলিমগণের একটি দলসহ প্রেরণ করলাম। যখন তাঁরা আপনার নিকট পৌঁছবেন তখন তাঁদেরকে আপনার নিজের পাশে আশ্রয় দেবেন এবং কোন প্রকার জোর জবরদস্তি অবলম্বন করবেন না।’
ইমাম বায়হাক্বী ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে অন্য একটি পত্রের বিষয়বস্তু বর্ণনা করেছেন যা নাবী কারীম (ﷺ) নাজ্জাশীর নিকট প্রেরণ করেছিলেন। এর অনুবাদ হল এরূপ :
(بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ . هٰذَا كِتَابٌ مِّنْ مُحَمَّدٍ رَّسُوْلِ اللهِ إِلَى النَّجَاشِيْ، الْأَصْحَمُ عَظِيْمُ الْحَبَشَةِ، سَلَامٌ عَلٰى مَنْ اِتَّبَعَ الْهُدٰي، وَآمَنَ بِاللهِ وَرَسُوْلِهِ، وَشَهِدَ أَنْ لَّا إِلٰهَ إِلَّااللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ، لَمْ يَتَّخِذْ صَاحِبَهُ وَلَا وَلَداً، وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ، وَأَدْعُوْكَ بِدِعَايَةِ الْإِسْلَامِ، فَإِنِّيْ أَنَا رَسُوْلُهُ فَأَسْلِمْ تَسْلَمْ،
(يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلٰى كَلَمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلاَّ نَعْبُدَ إِلاَّ اللهَ وَلاَ نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلاَ يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضاً أَرْبَابًا مِّن دُوْنِ اللهِ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَقُوْلُوْا اشْهَدُوْا بِأَنَّا مُسْلِمُوْنَ)
فإن أبيت فعليك إثم النصارى من قومك)
‘এটি নাবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর পক্ষ হতে হাবশের সম্রাট নাজ্জাশী আসহামার নিকট প্রেরিত একটি পত্র।
সালাম তাদের উপর যারা হেদায়াত অনুসরণ করবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর উপর বিশ্বাস করবে। আমি সাক্ষ্য প্রদান করছি যে, আল্লাহ এক এবং অদ্বিতীয়, তাঁর কোনই অংশীদার নেই, তিনি ব্যতীত অন্য কেউ উপাস্য হওয়ার উপযুক্ত নয়। তিনি কোন স্ত্রী গ্রহণ করেননি এবং তাঁর কোন সন্তানও নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দান করছি যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) তাঁর বান্দা এবং রাসূল। আমি আপনাকে ইসলাম গ্রহণ করার জন্য দাওয়াত দিতেছি। কারণ, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ), অতএব, ইসলাম গ্রহণ করুন তাহলে শান্তিতে বসবাস করতে পারবেন।’
‘হে কিতাব প্রাপ্ত ব্যক্তিগণ! এমন এক কথার দিকে আসুন যা আমাদের এবং আপনাদের মাঝে সমান তা এই যে, আমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও উপাসনা করি না, তাঁর কোন অংশীদার গণ্য এবং আমাদের মধ্যে কেউ আল্লাহ ছাড়া ভিন্ন কোন রবের কথা চিন্তা করি না। সুতরাং যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে বলে দাও যে সাক্ষী থাক, আমরা কিন্তু মুসলিম। যদি আপনি (এ দাওয়াত) গ্রহণ না করেন তবে আপনার উপর নিজ জাতি নাসারাদের (খ্রিষ্টানদের) পাপ বর্তাবে।’’ [সূরাহ আলু ‘ইমরান (৩) : ৬৪]
ডক্টর হামিদুল্লাহ সাহেব (প্যারিস) ভিন্ন একটি পত্রের বিষয়বস্তুর কথা উল্লেখ করেছেন যা নিকট অতীতে হস্তগত হয়েছে। শুধুমাত্র একটি শব্দের পার্থক্যের প্রেক্ষিতে আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেমের গ্রন্থ যাদুল মাআদেও উলেলখিত হয়েছে। এ পত্রখানার বিষয়বস্তু বিশ্লেষণের ব্যাপারে ডক্টর সাহেব যথেষ্ট শ্রম স্বীকার করেছেন। নতুন যুগের আবিস্কারসমূহের নিরীখে তথ্যাদি চয়ন করে এ পত্রখানার ফটো কিতাবে সন্নিবেশিত করেছেন। পত্রখানার বিষয়বস্তু হচ্ছে নিম্নরূপ :
(بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ . مِنْ مُحَمَّدٍ رَّسُوْلِ اللهِ إِلَى النَّجَاشِيْ عَظِيْمُ الْحَبَشَةِ، سَلَامٌ عَلٰى مَنْ اِتَّبَعَ الْهُدٰى، أَمَّا بَعْدُ:
فَإِنِّيْ أَحْمَدُ إِلَيْكَ اللهُ الَّذِيْ لَا إِلٰهَ إِلَّا هُوَ الْمَلِكُ الْقُدُّوْسُ السَّلَامُ الْمُؤْمِنُ الْمُهَيْمِنُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ عِيْسٰى بْنَ مَرْيَمَ رُوْحُ اللهِ وَكَلِمْتُهُ أَلْقَاهَا إِلٰى مَرْيَمَ الْبُتُوْلِ الطَّيِّبَةِ الْحَصِيْنَةِ، فَحَمَلَتْ بِعِيْسٰى مِنْ رُّوْحِهِ وَنَفْخِهِ، كَمَا خَلَقَ آدَمَ بِيَدِهِ، وَإِنِّيْ أَدْعُوْ إِلَى اللهَ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ، وَالْمُوَالَاةُ عَلٰى طَاعَتِهِ، وَأَنْ تَتَّبِعْنِيْ، وَتُؤْمِنَ بِالَّذِيْ جَاءَنِيْ، فَإِنِّيْ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَإِنِّيْ أَدْعُوْكَ وَجُنُوْدَكَ إِلَى اللهِ عَزَّ وَجَلَّ، وَقَدْ بَلَّغْتُ وَنَصَحَتْ، فَاَقْبِلْ نَصِيْحَتِىْ، وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ اِتَّبَعَ الْهُدٰى)
বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম
আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর পক্ষ হতে হাবশের সম্মানিত সম্রাট নাজ্জাশীর নামে :
সে ব্যক্তির উপর সালাম যে হেদায়াতের অনুসরণ করবে। অতঃপর আমি আপনার প্রতি ঐ আল্লাহর প্রশংসা জ্ঞাপন করছি। যিনি ব্যতীত আর কোন উপাস্য নেই। যিনি পবিত্র এবং শান্তি বিধানকারী, নিরাপত্তা প্রদানকারী, সংরক্ষক এবং তত্ত্বাবধায়ক। আমি সাক্ষ্য প্রদান করছি যে, ঈসা (আঃ) বিন মরিয়ম আল্লাহ প্রদত্ত আত্মা এবং তাঁর কালেমা। আল্লাহ তাঁকে পবিত্রা এবং সতী-সাধ্বী মরিয়মের প্রতি নিক্ষেপ করেছিলেন এবং তাঁর প্রদত্ত আত্মা ও ফুৎকারের মাধ্যমে মরিয়ম ঈসার জন্য গর্ভ ধারণ করেছিলেন, যেমন ভাবে আদমকে স্বীয় কুদরতের হাত দ্বারা সৃষ্টি করেছিলেন। আমি এক আল্লাহর প্রতি যাঁর কোনই অংশীদার নেই এবং তাঁর আনুগত্যের উপর পরস্পর পরস্পরের প্রতি সাহায্য সহানুভূতির উদ্দেশ্যে আহবান জানাচ্ছি এবং সে কথার প্রতি ডাক দিচ্ছি যে, আপনি আমার অনুসরণ ও অনুকরণ করবেন এবং আমার উপর যা অবতীর্ণ হয়েছে তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবেন। কারণ, আমি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল (ﷺ)। আমি আপনাদের এবং আপনাদের সৈন্য সম্পদকে আল্লাহর প্রতি যিনি মহা-সম্মানিত ও মহা মহীয়ান- আহবান জানাচ্ছি। আল্লাহ আমার উপর যে দায়িত্ব কর্তব্য অর্পণ করেছেন তা আপনাদের পৌঁছে দিয়ে তা গ্রহণ করার জন্য উপদেশ প্রদান করলাম। অতএব আমার উপদেশ গ্রহণ করুন। সে ব্যক্তির জন্য সালাম যিনি হিদায়াত গ্রহণ ও অনুসরণ করবেন।[1]
ডক্টর হামিদুল্লাহ পূর্ণ দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন যে, এটি সে পত্র রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যা হুদায়বিয়াহর সন্ধির পরে নাজ্জাশীর নিকট প্রেরণ করেছিলেন। এ পত্রের প্রমাণপঞ্জী ভিত্তিক তথ্যাদি নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করলে এর বিশুদ্ধতার ব্যাপারে কোন সন্দেহ থাকে না। কিন্তু এ কথার কোন দলিল পাওয়া যায় না যে, নাবী কারীম (ﷺ) হুদায়বিয়াহর পরে এ পত্রখানা প্রেরণ করেছিলেন, বরং ইবনু আব্বাস (রাঃ)-এর বর্ণনায় ইমাম বায়হাকী যে পত্রখানা উদ্ধৃত করেছেন তার বিষয় বস্তুর মিল ঐ সকল পত্রের সঙ্গে পরিলক্ষিত হয় নাবী কারীম (ﷺ) হুদায়বিয়াহর সন্ধির পরে খ্রিষ্টান সম্রাট এবং সমাজপতিগণের নিকট যে সকল পত্র লিখেছিলেন। কারণ, উল্লেখিত পত্রসমূহে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে ভাবে আয়াতে কারীমাহ :
(يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلٰى كَلَمَةٍ...)
উদ্ধৃত করেছেন, অনুরূপভাবে বায়হাক্বীর বর্ণনাকৃত পত্রেও এ আয়াতে কারীমার উদ্ধৃতি রয়েছে। তাছাড়া, এ পত্রে স্পষ্টভাবে আসহামার নামও উল্লেখিত হয়েছে। কিন্তু ডক্টর হামিদুল্লাহর উদ্ধৃত পত্রে কারো নামের উল্লেখ নেই। এ কারণে আমার জোরালো ধারণা হচ্ছে, ডক্টর হামিদুল্লাহর উদ্ধৃত পত্রখানা হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে সে পত্র যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আসহামার মৃত্যুর পর তার স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তির নামে লিখেছিলেন এবং সম্ভবত এ কারণেই ওর মধ্যে কারও নাম উল্লেখিত হয় নি।
পরে উল্লেখিত তরতীরের ব্যাপারে আমার নিকট কোনই প্রমাণ নেই, বরং ওর ভিত্তি শুধু ঐ অন্তর্নিহিত প্রমাণাদি যা উল্লেখিত পত্রসমূহের রচনা বা বিষয়বস্তু হতে পাওয়া যায়। তবে ডক্টর হামিদুল্লাহর উপস্থাপনের ব্যাপারে আমি অবাক হচ্ছি এই কারণে যে, তিনি ইবনু আব্বাস (রাঃ)-এর বর্ণনা হতে বায়হাকীর উদ্ধৃত পত্র খানাকেই পূর্ণ দৃঢ়তার সাথে নাবী কারীম (ﷺ)-এর সে পত্র সাব্যস্ত করেছেন যা আসহামার মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারীর নামে লিখেছিলেন, অথচ এ পত্রে স্পষ্টভাবে আসহামার নাম উল্লেখিত হয়েছে। প্রকৃত জ্ঞান আছে আল্লাহর নিকটে।[2]
যাহোক, যখন ‘আমর বিন উমাইয়া যামরী (রাঃ) নাবী কারীম (ﷺ)-এর পত্র খানা নাজ্জাশীর নিকট সমর্পণ করলেন, তখন নাজ্জাশী তা নিয়ে চোখের উপর রাখলেন এবং সিংহাসন থেকে অবতরণ করে জা’ফর বিন আবী ত্বালীবের নিকট ইসলাম গ্রহণ করেন। অতঃপর নাবী কারীম (ﷺ)-এর নিকট পত্র লিখেন যার বিষয়বস্তু ছিল নিম্নরূপ :
বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম
আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর খিদমতে নাজ্জাশী আসহামার পক্ষ হতে,
হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আল্লাহর তরফ হতে আপনার উপর সালাম, রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক । আল্লাহ তা‘আলা এমন সত্তা যিনি ব্যতীত অন্য কেউ উপাসনার উপযু্ক্ত নয়। অতঃপর হে আল্লাহর রাসূল! আপনার অতীব মূল্যবান পত্রখানা আমার হস্তগত হয়েছে যার মধ্যে আপনি নাবী ঈসা (আঃ)-এর ব্যাপারে উল্লেখ করেছেন। আকাশ ও পৃথিবীর মালিক আল্লাহর কসম! আপনি যা উল্লেখ করেছেন ঈসা (আঃ) তা হতে এক কণাও অতিরিক্ত ছিলেন না। তিনি ঠিক তেমনটি ছিলেন যেমনটি আপনি উল্লেখ করেছেন।[3]
অতঃপর আপনি যা কিছু আমাদের নিকট প্রেরণ করেছেন আমরা তা অবগত হলাম এবং আপনার চাচাত ভাই ও সাহাবাবৃন্দকে আপ্যায়ন করলাম। সুতরাং আমি সাক্ষ্য প্রদান করছি যে, আপনি সত্যই আল্লাহর রাসূল। আমি আপনার পত্রের মাধ্যমে ইসলামের প্রতি অঙ্গীকার গ্রহণ করলাম এবং আপনার চাচাত ভাইয়ের হাতে হাত রেখে আল্লাহ রাববুল আলামীনের উদ্দেশ্যে ইসলাম গ্রহণ করলাম।[4]
নাবী কারীম (ﷺ) নাজ্জাশীকে এ কথাও বলেছিলেন যে, তিনি যেন জা’ফর এবং অন্যান্য হাবশ মুহাজিরদের পাঠিয়ে দেন। এ কারণে তিনি ‘আমর বিন উমাইয়া যামরী (রাঃ)-এর সঙ্গে দুটি নৌকা করে তাদের প্রেরণের ব্যবস্থা করে দিলেন। একটি নৌকায় আরোহীদের মধ্যে ছিলেন জা’ফর, আবূ মুসা আশআরী এবং অন্যান্য সাহাবীগণ (রাঃ)। তাঁরা সরাসরি খায়বারে পৌঁছে খিদমতে নাবাবীতে উপস্থিত হলেন। দ্বিতীয় নৌকার আরোহীদের মধ্যে ছিল বেশির ভাগই বিভিন্ন পরিবারের লোকজন। তারা সোজাসুজি মদীনায় গিয়ে পৌঁছল।[5]
এ নাজ্জাশী সম্রাট তাবুক যুদ্ধের পর ৯ম হিজরীর রজব মাসে মৃত্যুমুখে পতিত হন। তাঁর মৃত্যুর দিনই নাবী কারীম (ﷺ) সাহাবীগণ (রাঃ)-কে তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে অবহিত করেন এবং তাঁর গায়েবানা জানাযা আদায় করেন। তাঁর মৃত্যুর পর অন্য একজন তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়ে সিংহাসনে সমাসীন হন। নাবী কারীম (ﷺ) তাঁর নিকটেও একটি পত্র প্রেরণ করেন। কিন্তু তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন কিনা সে ব্যাপারে কিছু জানা যায়নি।[6]
[2] ডক্টর হামীদুল্লাহ সাহেবের গ্রন্থ ‘হুযুর আকরাম (সাঃ) কী সিয়াসী জিন্দেগী পৃ: ১০৮, ১১৪ এবং পৃ: ১২১-১২৩ ।
[3] ঈসা (আঃ)-এর সম্পর্কে এ বাক্য ড: হামিদুল্লাহ সাহেবের এ মতামতের সাহায্য করছে যে, তার উল্লেখকৃত পত্রে আসহামার নাম ছিল। আল্লাহই ভাল জানেন।
[4] যা’দুল মাআদ ৩য় খন্ড ৬২ পৃঃ।
[5] ইবনু হিশাম ২য় খন্ড ৩৫৯ পৃ: ও অন্যান্য।
[6] এ কথার অংশ বিশেষ সহীহুল মুসলিমের র্বণনা হতে গ্রহণ করা যেতে পারে যা আনাস হতে বর্ণিত হয়েছে। ২য় খন্ড ৯৯ পুৃঃ।