ইসলামী জীবন-ধারা সফরের আদব আবদুল হামীদ ফাইযী ২৬ টি

নিজ ঘর-বাড়ি ছেড়ে লেখাপড়া, ব্যবসা, জিহাদ, হজ্জ-উমরাহ অথবা দাওয়াতের উদ্দেশ্যে বিদেশে সফর করা সহজ জিনিস নয়। সফর বড় কষ্টের, বড় ধৈর্যের। রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘‘সফর হল আযাবের একটি টুকরা। সফর তোমাদেরকে (নিয়মিত) পানাহার ও নিদ্রা থেকে বিরত রাখে। সুতরাং নিজ প্রয়োজন শেষ হলেই পরিবারের প্রতি সত্বর প্রত্যাবর্তন কর।’’[1]

মহানবী (ﷺ) নিজ জীবনে বহু সফর করেছেন। সুতরাং সফরের আদবেও তিনিই আমাদের আদর্শ। আসুন আমরা সেই আদব জেনে আমল করি।

দূরের সফরে একা যাওয়া উচিত নয়। কথায় বলে ‘একা না বোকা।’ বিপদে-আপদে একজন সহযোগী সঙ্গী হলে সফর অনেক সহজ হয়।

এক ব্যক্তি সফর থেকে ফিরে এলে আল্লাহর রসূল (ﷺ) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘তোমার সঙ্গে কে ছিল?’’ লোকটি বলল, ‘কেউ ছিল না।’ এ শুনে আল্লাহর রাসুল (ﷺ) বললেন,

الرَّاكِبُ شَيْطَانٌ وَالرَّاكِبَانِ شَيْطَانَانِ وَالثَّلاَثَةُ رَكْبٌ

‘‘একাকী সফরকারী শয়তান, দু’জন মিলে সফরকারীও দু’টি শয়তান। আর তিনজন মিলে সফরকারী হল (শয়তান মুক্ত) সফরকারী।’’[2]

শয়তান মু’মিনকে একা-দোকা পেয়ে কষ্ট দিতে ভারী সুযোগ ও অত্যন্ত মজা পায়। তাই একলা বা দোকলা সফরকারীকে শয়তান বলা হয়েছে।

উল্লেখ্য যে, জামাআতবদ্ধভাবে সফর করলে বিপদ-আপদে সহায়তা লাভ হয় এবং লাঘব হয় সফরের কষ্ট। রাসুল (ﷺ) বলেন, ‘‘একাকীত্বে কত কষ্ট তা যদি মানুষ যদি জানত, যেমন আমি জানি, তাহলে রাতে কোন সওয়ারী একাকী পথ চলত না।’’[3]

[1]. বুখারী তাওহীদ পাবঃ হা/১৮০৪, মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/১৯২৭ প্রমুখ

[2]. আহমদ, আবূ দাঊদ হা/২৬০৭, তিরমিযী, হাকেম ২/১০২, সহীহুল জা’মে হা/৩৫২৪

[3]. বুখারী তাওহীদ পাবঃ হা/ ২৯৯৮ প্রমুখ
সফরে হলেও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে মুসলিমকে

জামাআত ও একতাবদ্ধ হয়ে সফর করতে হবে। আর এ জন্য একজনকে আমীর বানিয়ে নিতে হবে। রাসুল (ﷺ) বলেন, إِذَا خَرَجَ ثَلَاثَةٌ فِي سَفَرٍ فَلْيُؤَمِّرُوا أَحَدَهُمْ

‘‘যখন তিনজন লোক কোন সফরে বের হয়, তখন তারা যেন তাদের মধ্যে একজনকে আমীর বানিয়ে নেয়।’’[1]

[1]. আবূ দাঊদ হা/২৬০৮
মহিলা হলে দূর সফরে একাকিনী যেতে পারে না

যেহেতু নারীর দুশমন সে নিজেই। তার যৌবন তার শত্রু ডেকে আনে। তাই একা সফরে তার বিপদের আশঙ্কা খুব বেশী। আর সে জন্যই সঙ্গে স্বামী অথবা কোন এগানা আত্মীয় ছাড়া সফরে বের হওয়া নিষিদ্ধ।

রাসুল (ﷺ) বলেন, ‘‘মাহরাম ছাড়া কোন মহিলা যেন একাকিনী সফর না করে।’’[1]

তিনি আরো বলেন, ‘‘আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে এমন কোন মহিলার জন্য বৈধ নয় যে, সে তার পিতা, পুত্র, স্বামী, ভাই অথবা কোন এগানা পুরুষ ছাড়া তিনদিন বা তার বেশী পথ সফর করে।’’[2]

এমনকি ইবাদতের সফর, হজ্জ ও উমরার সফর, জিহাদ বা দাওয়াত ও তবলীগের সফরেও একাকিনী কোন এগানা পুরুষ অথবা স্বামী ছাড়া যেতে পারে না।

এমনকি পেস্ননে এক-আধ ঘন্টার সফর হলেও না। কারণ, এয়ারপোর্টে একাকিনী ঢুকিয়ে দেওয়ার পর তাকে কত পুরুষের সম্মুখীন হতে হয়। চেহারা খুলে দেখাতে হয়। তাছাড়া পথিমধ্যে যদি পেস্নন গন্তব্যস্থলে না পৌঁছে অন্য কোন এয়ারপোর্টে নামতে বাধ্য হয়, তাহলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? আপনার স্ত্রী স্মার্ট্ হলেও কেবল বিশ্বাসের উপর ভরসা করে হাদীস অমান্য করা তো উচিত নয় ভাইজান। তবে যদি বলেন, এমন সফর ছাড়া আমি নিরুপায়, তাহলে তার হিসাব আল্লাহর কাছে।

[1]. বুখারী তাওহীদ পাবঃ হা/ ১৭৬৩, মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/১৩৪১

[2]. আহমাদ, মুসলিম, আবূ দাঊদ হা/১৭২৬, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, সহীহুল জা’মে হা/৭৬৫০

মহিলা একাকিনী নিজের বাড়ির অথবা ভাড়া গাড়ির ড্রাইভারের সাথে, একাকিনী রিক্সায় রিক্সা-ওয়ালার সাথে অথবা একাকিনী অন্য কোন বেগানা পুরুষের সাথে হাঁটা পথে সফর করবে না।

অবিবাহিতার সফরে পিতার এবং বিবাহিতার সফরে স্বামীর অনুমতি জরুরী।

সফরে বের হওয়ার সময় মহিলা শরয়ী পর্দার সাথে বের হবে এবং কোন পারফিউম বা সুগন্ধি ব্যবহার করবে না। চলার পথে কোন দৃষ্টি-আকর্ষী ভঙ্গিমা প্রদর্শন করবে না। এমন কোন (জুতা বা অলংকারের) শব্দ প্রকাশ করবে না, যাতে পরপুরুষের মন প্রলুব্ধ হয়।

পারলে বৃহস্পতিবার এবং সকাল সকাল সফরে বের হন

যেহেতু আল্লাহর নবী (ﷺ) বৃহস্পতিবার সফরে বের হতে পছন্দ করতেন।[1]

সখর গামেদী (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসুল (ﷺ) বলেন, ‘‘হে আল্লাহ! তুমি আমার উম্মতের প্রত্যূষে বরকত দাও।’’ আর তিনি কোন সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করলে সকাল-সকাল প্রেরণ করতেন। সখ্র (রাঃ) একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনিও সকাল-সকাল ব্যবসায় (লোক) পাঠাতেন। ফলে তিনি ধনবান হয়েছিলেন এবং তাঁর মাল-ধন হয়েছিল প্রচুর।[2]

[1]. মুসনাদে আহমাদ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/১৫৩৫৪, বুখারী তাওহীদ পাবঃ হা/ ২৯৫০

[2]. আহমাদ, আবু দাঊদ ২৬০৬, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, সহীহ আবু দাঊদ ২২৭০
নিরুপায় না হলে জুমআর দিন জুমআর আযান হওয়ার পর সফর করা উচিত নয়

নিরুপায় না হলে জুমআর দিন জুমআর আযান হওয়ার পর সফর করা উচিত নয়। যেহেতু তাতে ইচ্ছাকৃত জুমআহ নষ্ট হবে। আর মহান আল্লাহ বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا إِذَا نُوْدِيَ لِلصَّلاَةِ مِنْ يَّوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ، ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ

অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ! যখন জুমআর দিন নামাযের জন্য আহবান করা হবে, তখন তোমরা সত্বর আল্লাহর স্মরণের জন্য উপস্থিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় বর্জন কর। এটিই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা উপলব্ধি কর।[1]

[1]. সূরা জুমুআহ ৯
বাড়িতে পরিজনের থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা করুন

বাড়িতে পরিজনের থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা করুন। কারো আমানত বা ঋণ থাকলে প্রত্যর্পণ ও পরিশোধ করুন। কারণ, আপনি জানেন না যে, সফর শেষে বাড়ি ফিরতে পারবেন কি না? অতএব পরিজনকে আল্লাহর কাছে সঁপে দিয়ে আপনি তাঁরই উপর ভরসা করে ঘর থেকে বের হওয়ার দু‘আ পড়ুনঃ (ক)

بِسْمِ اللهِ تَوَكَّلْتُ عَلَى اللهِ وَلاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللهِ

উচ্চারণ- বিসমিল্লা-হ, তাওয়াক্কালতু আলাল্লা-হ, অলা হাওলা অলা ক্বুউওয়াতা ইল্লা বিল্লা-হ।

অর্থঃ আল্লাহর নাম নিয়ে বের হচ্ছি, আল্লাহর উপর ভরসা করছি, আর আল্লাহর তওফীক ছাড়া পাপ থেকে ফিরার এবং সৎকাজ করার (নড়া-সরার) শক্তি কারো নেই।

এই দু‘আ পড়ে ঘর থেকে কোথাও বের হলে পাঠকারীর জন্য আল্লাহ যথেষ্ট হন, তাকে পথ নির্দেশ করা হয়, সকল প্রকার বিপদ থেকে রক্ষা করা হয় এবং শয়তান তার নিকট থেকে দূরে সরে যায়।[1]

খন্ড আকাশের দিকে দৃষ্টিপাত করে এই দু‘আ পড়তে হয়,

اَللّهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ أَنْ أَضِلَّ أَوْ أُضَلَّ أَوْ أَزِلَّ أَوْ أُزَلَّ أَوْ أَظْلِمَ أَوْ أُظْلَمَ أَوْ أَجْهَلَ أَوْ يُجْهَلَ عَلَيَّ

উচ্চারণ- আল্লা-হুম্মা ইন্নী আঊযু বিকা আন আয্বিল্লা আউ উয্বল্লা আউ আযিল্লা আউ উযাল্লা, আউ আযলিমা আউ উযলামা আউ আজহালা আউ য়্যুজহালা আলাইয়্যা।

অর্থঃ হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি, আমি ভ্রষ্ট হই বা আমাকে ভ্রষ্ট করা হয়, আমার পদস্খলন হয় বা পদস্খলন করানো হয়, আমি অত্যাচারী হই অথবা অত্যাচারিত হই অথবা আমি মূর্খামি করি অথবা আমার প্রতি মূর্খামি করা হয় -এসব থেকে।[2]

[1]. আবূ দাঊদ হা/৪/৩২৫, তিরমিযী ৫/৪৯০

[2]. সহীহ তিরমিযী ৩/১৫২
মুসাফির সফরে বের হলে তাকে বিদায় দিন

মুসাফির সফরে বের হলে তাকে বিদায় দিন এবং তার জন্য দু‘আ করুন। তার বিদায়কালে নিম্নের দু‘আ বলুন। (ক)

أَسْتَوْدِعُ اللهَ دِيْنَكَ وَأَمَانَتَكَ وَخَوَاتِيْمَ عَمَلِكَ

উচ্চারণঃ আস্তাউদিউল্লা-হা দীনাকা অআমা-নাতাকা অখাওয়াতীমা আমালিক।

অর্থঃ আমি তোমার দ্বীন, আমানত এবং আমলের শেষ পরিণতিকে আল্লাহর নিকট গচ্ছিত রাখছি।[1]

(খ)

زَوَّدَكَ اللهُ التَّقْوى، وَغَفَرَ ذَنْبَكَ، وَيَسَّرَ لَكَ الْخَيْرَ حَيْثُ مَا كُنْتَ

উচ্চারণঃ যাউওয়াদাকাল্লা-হুত্ তাক্বওয়া অগাফারা যামবাকা অ য়্যাসসারা লাকাল খাইরা হাইসু মা কুন্‌তা।

অর্থঃ আল্লাহ তোমাকে তাকওয়ার পাথেয় দান করুন, তোমার গোনাহ মাফ করুন এবং যেখানেই থাক, তোমার জন্য কল্যাণকে সহজ করুন।[2]

(গ)

اَللّهُمَّ اطْوِ لَهُ الْبُعْدَ وَهَوِّنْ عَلَيْهِ السَّفَرَ

উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মাত্ববি লাহুল বু’দা অ হাউবিন আলাইহিস সাফার।

অর্থঃ হে আল্লাহ! তুমি ওর জন্য (সফরের) দূরত্বকে সঙ্কুচিত করে দাও এবং সফরকে সহজ করে দাও।[3] সফরকারীও সেই মুহূর্তে নিজের পরিবারের জন্য দু‘আ করবে এবং বলবে,

أَسْتَوْدِعُكُمُ اللهَ الَّذِيْ لاَ تَضِيْعُ وَدَائِعُهُ

উচ্চারণঃ আস্তাউদিউকুমুল্লা-হাল্লাযী লা তাযবীউ অদা-ইউহ।

অর্থঃ আমি তোমাদেরকে সেই আল্লাহর নিকট আমানত রাখছি যাঁর আমানত নষ্ট হয় না।[4]

[1]. আহমদ ২/৭, সহীহ তিরমিযী ২/১৫৫

[2]. সহীহ তিরমিযী ৩/১৫৫

[3]. তিরমিযী আল মাদানী প্রকাশনী হা/৩৪৪৫

[4]. আহমাদ ২/৪০৩, সহীহ ইবনে মাজাহ ২/১৩৩
দেখানো হচ্ছেঃ থেকে ১০ পর্যন্ত, সর্বমোট ২৬ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে পাতা নাম্বারঃ 1 2 3 পরের পাতা »