স্বামী তালাক দিলে স্ত্রী ইদ্দত পালন না করে দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণ করতে পারে না। এতে স্বামী-স্ত্রীকে বিবাহ-বিচ্ছেদের ব্যাপারে পুনর্বিবেচনা করতে সুযোগ দেওয়া হয়। ফলে সেই সুযোগে স্ত্রী প্রত্যানীতা করতে পারে। তাছাড়া ইদ্দত বিধিবদ্ধ করায় এ কথার ইঙ্গিত রয়েছে যে, বিবাহ কোন ছেলেখেলার বিষয় নয়। এর আগে-পিছে রয়েছে বিভিন্ন নিয়ম-নীতি ও সীমা-সময়।

পরন্তু ইদ্দতের মাঝে নারীর গর্ভাশয় পরীক্ষা হয়। যাতে দুই স্বামীর তরফ থেকে বংশের সংমিশ্রণ না ঘটে।

তালাকপ্রাপ্ত নারী যদি অরমিতা হয় বা তার বাসরই না হয়ে থাকে, তবে তার কোন ইদ্দত নেই।[1]

রমিতা মহিলা যদি ঋতুমতী হয়, তবে তার ইদ্দত তিন মাসিক; তিন মাস নয়। সুতরাং সন্তানকে দুধ পান করাবার সময় যদি ২/৩ বছরও মাসিক না হয়, তবে তিন মাসিক না হওয়া পর্যন্ত সে ইদ্দতেই থাকবে।[2]

ঋতুহীনা কিশোরী বা বৃদ্ধা হলে তার ইদ্দত তিন মাস।[3]

কিন্তু ইদ্দত শুরু করে কিছু দিন পরে তার ঋতু শুরু হলে, ঋতু হিসাবেই তাকে তিন ইদ্দত পালন করতে হবে।[4]

কোন জানা কারণে মাসিক বন্ধ থাকলে বা হবার সম্ভাবনা না থাকলে তার ইদ্দতও তিন মাস। কিন্তু হবার র্সম্ভাবনা থাকলে ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করে তিন মাসিক ইদ্দত পালন করবে। অবশ্য যদি অজানা কারণে মাসিক বন্ধ থাকে তাহলে ১ বছর অর্থাৎ গর্ভের ৯ মাস এবং ইদ্দতের তিন মাস অপেক্ষা করে তবে দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণ করতে পারবে।[5]

গর্ভবতীর ইদ্দত প্রসবকাল পর্যন্ত।[6]

মাস অথবা মাসিক হিসাবে ইদ্দত শুরু করার কিছু দিন পর গর্ভ প্রকাশ পেলে প্রসবকাল পর্যন্তই অপেক্ষা করতে হবে।

তালাকপ্রাপ্ত মহিলা তার তালাকের খবর তিন মাসিক পর পেলে তার ইদ্দত শেষ। আর নতুন করে ইদ্দত নেই।[7]

খোলা তালাকের ইদ্দত এক মাসিক। মাসিকের পর দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণ করতে পারে।[8]

অনুরূপ স্বামী মারা গেলে বিরহবিধুরা বিধবা স্ত্রীকেও ইদ্দত ও শোকপালন করতে হবে। (সূরা আল-বাক্বারা (২) : ২৩৪)

এতে স্ত্রীর গর্ভাশয় গর্ভ থেকে খালি কি না তা পরীক্ষা হবে; যাতে বংশে সংমিশ্রণ না ঘটে। তাছাড়া এতে স্ত্রীর নিকট স্বামীর যে মর্যাদা ও অধিকার তার অভিব্যক্তি ঘটে।

সুতরাং বিধবা গর্ভবতী হলে প্রসবকাল পর্যন্ত ইদ্দত পালন করবে। (আর তা ২/১ ঘন্টাও হতে পারে।) অতঃপর সে ভিন্ন স্বামী গ্রহণ করতে পারে। তবে গর্ভবতী না হলে ৪ মাস ১০ দিন অপেক্ষা করে ইদ্দত পালন করবে।[9]

বিধবার বিবাহের পর বাসর না হয়ে থাকলেও ঐ ইদ্দত পালন করবে। যেমন, নাবালিকা কিশোরী অথবা অতিবৃদ্ধা হলেও ইদ্দত পালন করতে হবে।[10]

রজয়ী তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী (ইদ্দতে থাকলে; যাকে স্বামী ফিরিয়ে নিতে পারে) তার স্বামী মারা গেলে নতুন করে স্বামী-মৃত্যুর ইদ্দত পালন করবে।[11]

কোনও কারণে ইদ্দতের সময় পিছিয়ে দেওয়া যায় না। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকেই ইদ্দত পালন শুরু করতে হবে।[12]

স্বামীর মৃত্যুর খবর ৪ মাস পর জানলে তার ইদ্দত মাত্র ঐ বাকী ১০দিন। ৪ মাস দশ দিন পর জানলে আর কোন ইদ্দত নেই।[13]

ইদ্দতের ভিতরে বিধবার শোকপালন ওয়াজেব। এই শোক পালনে বিধবা ত্যাগ করবেঃ-

- প্রত্যেক সুন্দর পোশাক। তবে এর জন্য কোন নির্দিষ্ট ধরনের বা রঙের কাপড় নেই। যে কাপড়ে সৌন্দর্য নেই সেই কাপড় পরিধান করবে। সাদা কাপড়ে সৌন্দর্য থাকলে তাও ব্যবহার নিষিদ্ধ।[14] নির্দিষ্টভাবে কালো পোষাক ব্যবহারও বিধিসম্মত নয়।[15]

- সর্বপ্রকার অলঙ্কার। অবশ্য সময় দেখার জন্য হাতে ঘড়ি বাঁধায় দোষ নেই।[16] হ্যাঁ, তবে বাইরে গেলে টাইম দেখার জন্য প্রয়োজন না হলে বা রাখার মত পকেট বা ব্যাগ থাকলে হাতে বাঁধবে না। কারণ, ঘড়িতেও সৌন্দর্য আনে।

- সর্বপ্রকার প্রসাধন ও অঙ্গরাগ; সুরমা, কাজল, যে কোন রং ইত্যাদি।

- সর্বপ্রকার সুগন্ধি; সুবাসিত সাবান বা তৈলাদি ব্যবহার নিষিদ্ধ।[17]

এমন কি নিজের ছেলেমেয়ে বা অন্য কাউকে সেন্ট জাতীয় কিছু লাগিয়ে দিতেও পারে না। যেহেতু সুগন্ধি হাতে এসে যাবে তাই।[18]

অবশ্য মাসিক থেকে পবিত্রতার সময় দুর্গন্ধ দূরীকরণার্থে কিছু সেন্ট লজ্জাস্থানে ব্যবহার করতে পারে।[19]

- স্বামীগৃহের বাইরে যাওয়া। যেহেতু স্বামীগৃহেই ইদ্দত পালন ওয়াজেব। তবে একান্ত প্রয়োজন বা অগত্যায় (পর্দার সাথে) বাইরে যাওয়া বৈধ। যেমন, ছাত্রী বা শিক্ষিকা হলে স্কুল-কলেজ যেতে পারে।[20] কেউ না থাকলে গরু-ছাগল, ফসলাদির দেখাশোনা করতে পারে ইত্যাদি।

অনুরূপ স্বামীর বাসস্থানে কোন আত্মীয় না থাকলে ভয়ের কারণে কোন অন্য আত্মীয়র বাড়িতে ইদ্দত পালন করা যায়।[21]

এ ছাড়া কুটুমবাড়ি, সখীর বাড়ি বা আর কারো বাড়ি বেড়াতে যাওয়া নিষিদ্ধ।[22] এমনকি হজ্জও করতে পারে না। অবশ্য মায়ের বাড়িতে থাকা অবস্থায় স্বামীর মৃত্যু-সংবাদ পৌঁছলে স্ত্রী সেখানেই ইদ্দত পালন করবে।

ইদ্দতের সময় অতিবাহিত হলে এসব বিধি-নিষেধ শেষ হয়ে যাবে। এর পর রীতিমত সব কিছু ব্যবহার করতে পারে এবং বিবাহও করতে পারে। বরং যারা ধৈর্যহারা হয়ে ব্যভিচারের পথে পা বাড়িয়ে ‘রাঁড়ের ঘরে ষাঁড়ের বাসা’ করে তাদের পক্ষে বিবাহ ফরয।

ইদ্দতের মাঝে বোগল ও গুপ্তাঙ্গের লোম এবং নখাদি কেটে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, মাছ-গোশত, ফল ইত্যাদি উত্তম খাদ্য খাওয়া দূষণীয় নয়। যেমন চাঁদের মুখ দেখতে নেই, বিয়ের কনে স্পর্শ করতে নেই প্রভৃতি ধারণা ও আচার কুসংস্কার।[23]

এই বিধবা স্বামীর ওয়ারেস হবে। রজয়ী তালাকপ্রাপ্তা হলে এবং ইদ্দতের ভিতরে বিধবা হলে ওয়ারেস হবে। বাতিল বিবাহ, খোলা তালাক প্রভৃতির ইদ্দতে ওয়ারেস হবে না। এদের শোক পালনের ইদ্দতও নেই। অনুরূপ তালাকপ্রাপ্তা তার ইদ্দত অতিবাহিত হওয়ার পর স্বামী মারা গেলে ওয়ারেস হবে না। হ্যাঁ, যদি স্বামী তার মরণ-রোগে স্ত্রীকে মীরাস থেকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে তালাক দিয়েছে বলে জানা যায়, তবে তার ইদ্দত পার হয়ে গেলেও (১ বা ২ তালাকের পর; যাতে পুনর্বিবাহ সম্ভব) ঐ স্ত্রী দ্বিতীয় বিবাহ না করে থাকলে ওয়ারেস হবে। যথানিয়মে তিন তালাকপ্রাপ্তা হলে অথবা ইদ্দতের পর বিবাহ করে থাকলে সে আর ওয়ারেস হবে না।[24] মিলন না হয়ে স্বামী মারা গেলেও স্ত্রী ওয়ারেস হবে।[25]

[1] (সূরা আল-আহযাব (৩৩) : ৪৯)

[2] (সূরা আল-বাক্বারা (২) : ২২৮, ফাতাওয়া ইবনে উসাইমীন ২/৭৯৯)

[3] (সূরা আল-আহযাব (৬৫) : ৪)

[4] (ফিকহুস সুন্নাহ ২/২৯৭)

[5] (ফাতাওয়া ইবনে উসাইমীন ২/৭৯৯)

[6] (সূরা আল-আহযাব (৬৫) : ৪)

[7] (ফাতাওয়া ইবনে উসাইমীন ২/৮০৪)

[8] (ফাতাওয়া ইবনে উসাইমীন ২/৭৯৯)

[9] (আল-বাক্বারা (২) : ২৩৪)

[10] (মাজাল্লাতুল বহুসিল ইসলামিয়্যাহ ১৬/১১৪,১২০,১৩২)

[11] (ফাতাওয়া ইবনে উসাইমীন ২/ ৮২০)

[12] (মাজাল্লাতুল বহুসিল ইসলামিয়্যাহ ২/৮১৫, ফাতাওয়াল মারআহ ৬৫পৃঃ)

[13] (ফাতাওয়া ইবনে উসাইমীন ২/৮০৪)

[14] (মাজাল্লাতুল বহুসিল ইসলামিয়্যাহ ১৯/১৫৮)

[15] (ফাতাওয়াল মারআহ ৬৫পৃঃ)

[16] (মাজাল্লাতুল বহুসিল ইসলামিয়্যাহ১৯/১৫৮)

[17] (ফাতাওয়া ইবনে উসাইমীন ২/৮১৩)

[18] (কিতাবুদ দাওয়াহ২/১৪৩)

[19] (লিকাউল বা-বিল মাফতুহ, ইবনে উসাইমীন ২৪/১৩)

[20] (মাজাল্লাতুল বহুসিল ইসলামিয়্যাহ ১৬/১৩১)

[21] (মাজাল্লাতুল বহুসিল ইসলামিয়্যাহ ১৯/১৬৮)

[22] (তামবীহাতুল মু’মিনাত ১৫৪পৃঃ)

[23] (তামবীহাতুল মু’মিনাত ১৫৪-১৫৫ পৃঃ)

[24] (ফাতাওয়া ইবনে উসাইমীন ২/৮২০, কিতাবুদ দাওয়াহ২/২০৫, ফাতাওয়াল মারআহ ৯৭-৯৮)

[25] (ফাতাওয়া ইবনে উসাইমীন ২/৮২১)