আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আকীদা তাওহীদ তথা একত্ববাদ ইমাম আবু জা‘ফর আহমাদ আত-ত্বহাবী রহ. ১ টি

১। মহান আল্লাহর তাওফীক কামনা করে তাঁর তাওহীদ[1] তথা একত্ববাদ সম্পর্কে আমরা বলব, নিশ্চয় আল্লাহ এক, যাঁর কোনো শরীক (অংশীদার) নেই।

২। তাঁর মতো কিছুই নেই।

৩। কিছুই তাঁকে অক্ষম করতে পারে না।

৪। তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই।

[1] জানা উচিৎ, যে তাওহীদ নিয়ে আল্লাহ তাঁর রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন এবং যা নিয়ে কিতাব নাযিল হয়েছে, তার তিনটি অংশ রয়েছে, যা কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্যসমূহ যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং দায়িত্ববানদের বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করেই তা নির্ধারিত হয়েছে।

প্রথম অংশ, তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ, আর তা হচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলাকে তাঁর মহান কর্মকাণ্ডে এক সত্তা জ্ঞান করা। তা হচ্ছে, এ ঈমান রাখা যে মহান আল্লাহই একমাত্র স্রষ্টা, রিযিকদাতা, সৃষ্টিজগতের সকলের কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারী, তাদের দুনিয়া ও আখেরাতের সকল বিষয় নিয়ন্ত্রণকারী। এগুলোতে তার কোনো শরীক নেই। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ٱللَّهُ خَٰلِقُ كُلِّ شَيۡءٖ﴾ [الزمر: ٦٢] 

“আল্লাহ সবকিছুর স্রষ্টা”। [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৬২]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

﴿إِنَّ رَبَّكُمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٖ ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰ عَلَى ٱلۡعَرۡشِۖ يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَۖ﴾ [يونس: ٣] 

“নিশ্চয় তোমাদের রব তো আল্লাহ, যিনি সৃষ্টি করেছেন আসমান ও যমীন ছয়দিনে, তারপর তিনি ‘আরশের উপর উঠেছেন, তিনি সবকিছু পরিচালনা করেন”। [সূরা ইউনুস, আয়াত: ৩] তাওহীদের এ অংশে আরবের মুর্তিপূজারী মুশরিকরা ঈমান রাখত, যদিও তাদের অধিকাংশই পুনরুত্থান ও হাশর-নশর অস্বীকার করত; কিন্তু এ ঈমান তাদেরকে ইসলামে প্রবেশ করায়নি। কারণ, তারা আল্লাহর ইবাদতের সাথে অন্য কিছুকে শরীক করত, তার ইবাদতের সাথে মূর্তি ও অন্যান্য কিছুরও ইবাদত করত এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ঈমান আনয়ন করেনি।

দ্বিতীয় অংশ হচ্ছে, তাওহীদুল ইবাদাহ, যাকে তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ বলেও নামকরণ করা হয়ে থাকে। আর উলুহিয়্যাহ অর্থই ইবাদত। তাওহীদের এ অংশটিই মুশরিকরা অস্বীকার করেছিল, যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা তাদের থেকে উল্লেখ করেছেন তাঁর নিম্নোক্ত বাণীতে,

﴿وَعَجِبُوٓاْ أَن جَآءَهُم مُّنذِرٞ مِّنۡهُمۡۖ وَقَالَ ٱلۡكَٰفِرُونَ هَٰذَا سَٰحِرٞ كَذَّابٌ ٤ أَجَعَلَ ٱلۡأٓلِهَةَ إِلَٰهٗا وَٰحِدًاۖ إِنَّ هَٰذَا لَشَيۡءٌ عُجَابٞ ٥ ﴾ [ص: ٤،  ٥] 

“আর কাফিররা আশ্চর্য হয়েছিল যে, তাদের কাছে তাদের থেকেই একজন ভীতিপ্রদর্শনকারী আসলো এবং কাফিররা বলল, এ তো জাদুকর মিথ্যাবাদী। সে কি সব ইলাহকে এক ইলাহ বানিয়ে দিয়েছে? নিশ্চয় এটি এক আশ্চর্য বিষয়”। [সূরা সোয়াদ, আয়াত: ৪-৫] অনুরূপ আরও বহু আয়াত রয়েছে। তাওহীদের এ অংশ ইবাদতকে খালেস বা নিষ্ঠাসহকারে একমাত্র আল্লাহর জন্য হওয়া, তিনিই একমাত্র ইবাদতের যোগ্য সত্তা হওয়া এবং তিনি ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত করা যে বাতিল এসব কিছুকে অন্তর্ভুক্ত করে। তাওহীদের এ অংশই কালেমা ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’-এর প্রকৃত অর্থ। কেননা এ কালেমা অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ ব্যতীত হক কোনো মা‘বুদ নেই, যেমনটি মহান আল্লাহ বলেছেন,

﴿ذَٰلِكَ بِأَنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدۡعُونَ مِن دُونِهِۦ هُوَ ٱلۡبَٰطِلُ﴾ [الحج: ٦٢] 

“এটা এজন্যই যে, আল্লাহ, একমাত্র তিনিই সত্য (মা‘বুদ), তাঁকে ছাড়া তারা অন্য যাকেই আহ্বান করে সেসবই বাতিল”। [সূরা আল-হাজ, আয়াত: ৬২]

তৃতীয় অংশ: তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাত। আর তা হচ্ছে, মহান আল্লাহর কিতাবে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লামের সহীহ সুন্নাহতে যে সকল নাম ও গুণ এসেছে সেগুলোর ওপর ঈমান আনয়ন, সেগুলোকে মহান আল্লাহর জন্য যথোপযুক্তভাবে সাব্যস্তকরণ, কোনো প্রকার বিকৃতি কিংবা অর্থমুক্তি অথবা কোনো প্রকার ধরণ নির্ধারণ বা সাদৃশ্য নির্ণয় ব্যতীত। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قُلۡ هُوَ ٱللَّهُ أَحَدٌ ١ ٱللَّهُ ٱلصَّمَدُ ٢ لَمۡ يَلِدۡ وَلَمۡ يُولَدۡ ٣ وَلَمۡ يَكُن لَّهُۥ كُفُوًا أَحَدُۢ ٤﴾ [الاخلاص: ١،  ٤] 

“বলুন, ‘তিনি আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়, ‘আল্লাহ হচ্ছেন ‘সামাদ’ (তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী); ‘তিনি কাউকেও জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি ‘এবং তাঁর সমতুল্য কেউই নেই।” [সূরা আল-ইখলাস, আয়াত: ১-৪] তিনি আরও বলেন,

﴿لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ ١١ ﴾ [الشورى: ١١] 

“তাঁর মতো কোনো কিছু নেই, আর তিনি তো সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা”। [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১] মহান সত্তা আরও বলেন,

﴿وَلِلَّهِ ٱلۡأَسۡمَآءُ ٱلۡحُسۡنَىٰ فَٱدۡعُوهُ بِهَاۖ﴾ [الاعراف: ١٨٠] 

“আর আল্লাহর জন্যই রয়েছে সুন্দর নামসমূহ। সুতরাং তোমরা তাকে সেগুলো দিয়েই আহ্বান কর”। [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৮০] অনুরূপ আল্লাহ তা‘আলা সূরা আন-নাহালে বলেন,

﴿وَلِلَّهِ ٱلۡمَثَلُ ٱلۡأَعۡلَىٰۚ وَهُوَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡحَكِيمُ ٦٠﴾ [النحل: ٦٠] 

“আর আল্লাহর জন্যই যাবতীয় মহত্তম উদাহরণ, আর তিনিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৬০] এ অর্থে আরও বহু আয়াত রয়েছে। এখানে উত্তম উদাহরণ বলতে এমন সুউচ্চ গুণাগুণ বোঝানো হয়েছে যাতে কোনো অপূর্ণতা নেই। আর এটাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত তথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল সাহাবী, তাদের যথাযথ সুন্দর অনুসরণকারী তাবে‘ঈগণের অভিমত যে, তারা আল্লাহর সিফাত তথা গুণাগুণসম্পন্ন আয়াত ও হাদীসসমূহকে যেভাবে এসেছে সেভাবে পরিচালনা করতেন, সেগুলোর অর্থকে মহান আল্লাহ তা‘আলার জন্য সাদৃশ্য নির্ধারণ মুক্তভাবে সাব্যস্ত করতেন। অনুরূপভাবে তারা মহান আল্লাহ তা‘আলাকে তাঁর সৃষ্টির কারও সামঞ্জস্যবিধান থেকে পবিত্র করতেন, কিন্তু সেগুলোকে (কুরআন ও হাদীসের গুণাগুণসম্পন্ন ভাষ্যসমূহকে) অর্থহীন করতেন না। আর তারা যা বলেছেন সেটার মাধ্যমেই কুরআন ও সুন্নাহর দলীলসমূহ একই সুত্রে গাঁথা সম্ভব এবং এর মাধ্যমেই যারা তাদের বিরোধিতা করবে তাদের বিরুদ্ধে দলীল-প্রমাণাদি উপস্থাপন ও প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব। আর মহান আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণীতে তাদেরকেই উদ্দেশ্য নেওয়া হয়েছে:

﴿وَٱلسَّٰبِقُونَ ٱلۡأَوَّلُونَ مِنَ ٱلۡمُهَٰجِرِينَ وَٱلۡأَنصَارِ وَٱلَّذِينَ ٱتَّبَعُوهُم بِإِحۡسَٰنٖ رَّضِيَ ٱللَّهُ عَنۡهُمۡ وَرَضُواْ عَنۡهُ وَأَعَدَّ لَهُمۡ جَنَّٰتٖ تَجۡرِي تَحۡتَهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ خَٰلِدِينَ فِيهَآ أَبَدٗاۚ ذَٰلِكَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡعَظِيمُ ١٠٠﴾ [التوبة: ١٠٠] 

“আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা ইহসানের সাথে তাদের অনুসরণ করে আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন। আর তিনি তাদের জন্য তৈরি করেছেন জান্নাত, যার নিচে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। এ তো মহাসাফল্য”। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১০০] মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন তাঁর একান্ত দয়া ও অনুগ্রহে আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। আল্লাহই সাহায্যকারী। [ই.বা.]

দেখানো হচ্ছেঃ থেকে ১ পর্যন্ত, সর্বমোট ১ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে