সূরাঃ ৬১/ আস-সফ | As-Saff | ٱلصَّفّ আয়াতঃ ১৪ মাদানী
তাফসীরে জাকারিয়া

সূরা সম্পর্কেঃ

আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদল সাহাবী পরস্পরে আলোচনা করলেন যে, আল্লাহ তা'আলার কাছে সর্বাধিক প্রিয় আমল কোনটি আমরা যদি তা জানতে পারতাম, তবে তা বাস্তবায়িত করতাম। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে সমগ্র সূরা আস-সাফ্‌ফ পাঠ করে শুনিয়ে দিলেন, যা তখনই নাযিল হয়েছিল। [তিরমিযী: ৩৩০৯, সুনান দারমী: ২৩৯০, মুসনাদে আহমদ: ৫/৪৫২]

আহসানুল বায়ান

সূরা  আস্-স্ব-ফ্ [1]

(মদীনায় অবতীর্ণ)
[1] এই সূরাটির শানে নুযূল (অবতীর্ণ হওয়ার কারণ) সম্পর্কে এসেছে যে, কিছু সংখ্যক সাহাবী (রাঃ) আপোসে বলাবলি করছিলেন যে, আল্লাহর নিকট যেটা সর্বাধিক প্রিয় আমল, সেটা সম্পর্কে রসূল (সাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করা দরকার, যাতে সেই আমল আমরা করতে পারি। কিন্তু রসূল (সাঃ)-এর কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করার সাহস কারো হচ্ছিল না। এ ব্যাপারেই মহান আল্লাহ এই সূরা অবতীর্ণ করলেন। (মুসনাদে আহমাদ ২/৪৫২, সুনানে তিরমিযী, তাফসীর সূরা সাফ্ফ)

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
৬১ : ১ سَبَّحَ لِلّٰهِ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَ مَا فِی الۡاَرۡضِ ۚ وَ هُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡحَكِیۡمُ ﴿۱﴾

আসমানসমূহে যা কিছু আছে ও যমীনে যা কিছু আছে, সবই আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করছে। আর তিনি মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল-বায়ান

আসমানে যা কিছু আছে আর যমীনে যা কিছু আছে (সবই) আল্লাহর প্রশংসা ও মহিমা ঘোষণা করে; তিনি মহাপরাক্রান্ত মহাবিজ্ঞানী। তাইসিরুল

আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সমস্তই আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। মুজিবুর রহমান

Whatever is in the heavens and whatever is on the earth exalts Allah, and He is the Exalted in Might, the Wise. Sahih International

১. আসমানসমূহে যা কিছু আছে এবং যমীনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। আর তিনি প্রবলপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১) আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সমস্তই আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৬১ : ২ یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لِمَ تَقُوۡلُوۡنَ مَا لَا تَفۡعَلُوۡنَ ﴿۲﴾

হে ঈমানদারগণ, তোমরা তা কেন বল, যা তোমরা কর না? আল-বায়ান

হে মু’মিনগণ! তোমরা এমন কথা কেন বল যা তোমরা কর না। তাইসিরুল

হে মু’মিনগণ! তোমরা যা করনা তা তোমরা কেন বল? মুজিবুর রহমান

O you who have believed, why do you say what you do not do? Sahih International

২. হে ঈমানদারগণ! তোমরা যা কর না তা তোমরা কেন বল?

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(২) হে বিশ্বাসীগণ! [1] তোমরা যা কর না, তা বল কেন?

[1] এখানে সম্বোধন যদিও ব্যাপক, তবুও প্রকৃতপক্ষে সেই মু’মিনদেরকেই লক্ষ্য করে বলা হয়েছে, যাঁরা বলাবলি করছিলেন যে, আমরা যদি আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় কাজ কি জানতে পারি, তাহলে আমরা তা করব। কিন্তু যখন তাদেরকে সেই প্রিয় কাজটা বলে দেওয়া হল, তখন তারা অলস হয়ে গেল। তাই তাদেরকে ধমক দেওয়া হচ্ছে যে, কল্যাণকর যেসব কথা বল, তা কর না কেন? যে কথা মুখে বল, তা কাজে কর না কেন? যা জবান দিয়ে বল, তা রক্ষা কর না কেন?

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৬১ : ৩ كَبُرَ مَقۡتًا عِنۡدَ اللّٰهِ اَنۡ تَقُوۡلُوۡا مَا لَا تَفۡعَلُوۡنَ ﴿۳﴾

তোমরা যা কর না, তা বলা আল্লাহর নিকট বড়ই ক্রোধের বিষয়। আল-বায়ান

আল্লাহর দৃষ্টিতে এটা অত্যন্ত নিন্দনীয় ব্যাপার যে, তোমরা বলবে এমন কথা যা তোমরা কর না। তাইসিরুল

তোমরা যা করনা তোমাদের তা বলা আল্লাহর দৃষ্টিতে অতিশয় অসন্তোষজনক। মুজিবুর রহমান

Great is hatred in the sight of Allah that you say what you do not do. Sahih International

৩. তোমরা যা কর না তোমাদের তা বলা আল্লাহর দৃষ্টিতে খুবই অসন্তোষজনক।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৩) তোমরা যা কর না, তোমাদের তা বলা আল্লাহর নিকট অতিশয় অসন্তোষজনক। [1]

[1] এখানে আরো তাকীদ করে বলা হয়েছে যে, এই ধরনের লোকদের প্রতি আল্লাহ চরম অসন্তুষ্ট হন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৬১ : ৪ اِنَّ اللّٰهَ یُحِبُّ الَّذِیۡنَ یُقَاتِلُوۡنَ فِیۡ سَبِیۡلِهٖ صَفًّا كَاَنَّهُمۡ بُنۡیَانٌ مَّرۡصُوۡصٌ ﴿۴﴾

নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন, যারা তাঁর পথে সারিবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করে যেন তারা সীসা ঢালা প্রাচীর। আল-বায়ান

আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন যারা তাঁর পথে সারিবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করে- যেন তারা সীসা-গলানো প্রাচীর। তাইসিরুল

যারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে সারিবদ্ধভাবে সুদৃঢ় প্রাচীরের মত, আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন। মুজিবুর রহমান

Indeed, Allah loves those who fight in His cause in a row as though they are a [single] structure joined firmly. Sahih International

৪. নিশ্চয় যারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে। সারিবদ্ধভাবে সুদৃঢ় প্রাচীরের মত, আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৪) যারা আল্লাহর পথে সুদৃঢ় প্রাচীরের মত সারিবদ্ধভাবে যুদ্ধ করে, নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন।[1]

[1] এখানে জিহাদকে একটি বড় মাহাত্ম্যপূর্ণ নেক কাজ বলা হয়েছে; যা আল্লাহর নিকট অনেক প্রিয় আমল।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৬১ : ৫ وَ اِذۡ قَالَ مُوۡسٰی لِقَوۡمِهٖ یٰقَوۡمِ لِمَ تُؤۡذُوۡنَنِیۡ وَ قَدۡ تَّعۡلَمُوۡنَ اَنِّیۡ رَسُوۡلُ اللّٰهِ اِلَیۡكُمۡ ؕ فَلَمَّا زَاغُوۡۤا اَزَاغَ اللّٰهُ قُلُوۡبَهُمۡ ؕ وَ اللّٰهُ لَا یَهۡدِی الۡقَوۡمَ الۡفٰسِقِیۡنَ ﴿۵﴾

আর মূসা যখন তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, ‘হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আমাকে কেন কষ্ট দিচ্ছ, অথচ তোমরা নিশ্চয় জান যে, আমি অবশ্যই তোমাদের নিকট আল্লাহর রাসূল’। অতঃপর তারা যখন বাঁকাপথ অবলম্বন করল, তখন আল্লাহ তাদের হৃদয়গুলোকে বাঁকা করে দিলেন। আর আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না। আল-বায়ান

স্মরণ কর, যখন মূসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আমাকে কেন কষ্ট দিচ্ছ, তোমরা তো জানই যে, আমি তোমাদের নিকট আল্লাহর রসূল!’ অতঃপর তারা যখন বাঁকা পথ ধরল, আল্লাহ তাদের হৃদয়কে বাঁকা করে দিলেন। আল্লাহ পাপাচারীদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন না। তাইসিরুল

স্মরণ কর মূসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিলঃ হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আমাকে কেন কষ্ট দিচ্ছ যখন তোমরা জান যে, আমি তোমাদের নিকট আল্লাহর রাসূল? অতঃপর তারা যখন বক্র পথ অবলম্বন করল তখন আল্লাহ তাদের হৃদয়কে বক্র করে দিলেন। আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না। মুজিবুর রহমান

And [mention, O Muhammad], when Moses said to his people, "O my people, why do you harm me while you certainly know that I am the messenger of Allah to you?" And when they deviated, Allah caused their hearts to deviate. And Allah does not guide the defiantly disobedient people. Sahih International

৫. আর স্মরণ করুন, যখন মূসা তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আমাকে কেন কষ্ট দিচ্ছ অথচ তোমরা জান যে, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহ্‌র রাসূল অতঃপর তারা যখন বাঁকা পথ অবলম্বন করল তখন আল্লাহ্‌ তাদের হৃদয়কে বাঁকা করে দিলেন। আর আল্লাহ ফাসিক সম্প্রদায়কে হেদায়াত করেন না।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৫) (স্মরণ কর,) যখন মূসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আমাকে কেন কষ্ট দিচ্ছ অথচ তোমরা জান যে, আমি তোমাদের প্রতি (প্রেরিত) আল্লাহর রসূল?’ [1] অতঃপর তারা যখন বক্রপথ অবলম্বন করল, তখন আল্লাহ তাদের হৃদয়কে বক্র করে দিলেন।[2] আর আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।

[1] মূসা (আঃ) আল্লাহর সত্য রসূল --এ কথা জানা সত্ত্বেও বনী ইস্রাঈল তাঁকে তাদের জবান দ্বারা কষ্ট দিত। এমনকি, তাঁর ব্যাপারে দৈহিক কিছু ত্রুটির কথাও তারা বলে বেড়াত, অথচ সে ত্রুটি ও ব্যাধি তাঁর মধ্যে ছিল না।

[2] অর্থাৎ, জানা সত্ত্বেও সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। হকের পরিবর্তে বাতিল, ভালোর পরিবর্তে মন্দ এবং ঈমানের পরিবর্তে কুফরীর পথ অবলম্বন করল। ফলে মহান আল্লাহ শাস্তি স্বরূপ তাদের অন্তরকে সব সময়ের জন্য হিদায়াত থেকে ফিরিয়ে দিলেন। কেননা, এটাই হল আল্লাহর চিরাচরিত বিধান। অব্যাহতভাবে কুফরী ও ভ্রষ্টতার উপর অবিচল থাকলে, তা অন্তঃকরণে মোহর লেগে যাওয়ার কারণ হয়। অতঃপর অন্যায়, কুফরী এবং যুলুম-অত্যাচার করা তার সবভাবে পরিণত হয়ে যায়। যা কেউ পরিবর্তন করতে সক্ষম নয়। এই কারণে আয়াতের শেষাংশে বললেন যে, আল্লাহ কোন পাপাচারী অবাধ্যজনকে হিদায়াত দান করেন না। কারণ, এই ধরনের লোকদেরকে আল্লাহ তাঁর চিরাচরিত বিধান অনুযায়ী ভ্রষ্ট করে থাকেন। এখন তাকে কে পথ দেখাতে পারে, যাকে এই পথ থেকে আল্লাহই ভ্রষ্ট করে দিয়েছেন?

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৬১ : ৬ وَ اِذۡ قَالَ عِیۡسَی ابۡنُ مَرۡیَمَ یٰبَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ اِنِّیۡ رَسُوۡلُ اللّٰهِ اِلَیۡكُمۡ مُّصَدِّقًا لِّمَا بَیۡنَ یَدَیَّ مِنَ التَّوۡرٰىۃِ وَ مُبَشِّرًۢا بِرَسُوۡلٍ یَّاۡتِیۡ مِنۡۢ بَعۡدِی اسۡمُهٗۤ اَحۡمَدُ ؕ فَلَمَّا جَآءَهُمۡ بِالۡبَیِّنٰتِ قَالُوۡا هٰذَا سِحۡرٌ مُّبِیۡنٌ ﴿۶﴾

আর যখন মারইয়াম পুত্র ঈসা বলেছিল, ‘হে বনী ইসরাঈল, নিশ্চয় আমি তোমাদের নিকট আল্লাহর রাসূল। আমার পূর্ববর্তী তাওরাতের সত্যায়নকারী এবং একজন রাসূলের সুসংবাদদাতা যিনি আমার পরে আসবেন, যার নাম আহমদ’। অতঃপর সে যখন সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ নিয়ে আগমন করল, তখন তারা বলল, ‘এটাতো স্পষ্ট যাদু’। আল-বায়ান

স্মরণ কর, যখন মারইয়ামের পুত্র ‘ঈসা বলেছিল, ‘হে বানী ইসরাঈল! আমি তোমাদের প্রতি আল্লাহর রসূল, আমার পূর্ববর্তী তাওরাতের আমি সত্যায়নকারী এবং আমি একজন রসূলের সুসংবাদদাতা যিনি আমার পরে আসবেন, যার নাম আহমাদ।’ অতঃপর সে [অর্থাৎ ‘ঈসা (আঃ) যাঁর সম্পর্কে সুসংবাদ দিয়ে ছিলেন সেই নবী] যখন তাদের কাছে সুস্পষ্ট নিদর্শন নিয়ে আসল, তখন তারা বলল, ‘এটা তো স্পষ্ট যাদু।’ তাইসিরুল

স্মরণ কর, মারইয়াম তনয় ঈসা বললঃ হে বানী ইসরাঈল! আমি তোমাদের নিকট আল্লাহর রাসূল এবং আমার পূর্ব হতে তোমাদের নিকট যে তাওরাত রয়েছে আমি উহার সমর্থক এবং আমার পরে আহমাদ নামে যে রাসূল আসবেন আমি তাঁর সুসংবাদদাতা। পরে সে যখন স্পষ্ট নিদর্শনসহ তাদের নিকট এলো তখন তারা বলতে লাগলঃ এটাতো এক স্পষ্ট যাদু। মুজিবুর রহমান

And [mention] when Jesus, the son of Mary, said, "O children of Israel, indeed I am the messenger of Allah to you confirming what came before me of the Torah and bringing good tidings of a messenger to come after me, whose name is Ahmad." But when he came to them with clear evidences, they said, "This is obvious magic." Sahih International

৬. আর স্মরণ করুন, যখন মারইয়াম-পুত্র ঈসা বলেছিলেন, হে বনী ইসরাঈল! নিশ্চয় আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসূল এবং আমার পূর্ব থেকে তোমাদের কাছে যে তাওরাত রয়েছে আমি তার সত্যায়নকারী এবং আমার পরে আহমাদ নামে(১) যে রাসূল আসবেন আমি তার সুসংবাদদাতা।(২) পরে তিনি(৩) যখন সুস্পষ্ট প্রমাণাদিসহ তাদের কাছে আসলেন তখন তারা বলতে লাগল, এটা তো স্পষ্ট জাদু।

(১) এখানে ঈসা আলাইহিস সালাম কর্তৃক সুসংবাদ প্রদত্ত সেই রাসূলের নাম বলা হয়েছে আহমদ। আমাদের প্রিয় শেষনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নাম মুহাম্মদ, আহমদ এবং আরও কয়েকটি নাম ছিল। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমার কয়েকটি নাম রয়েছে, আমি মুহাম্মাদ, আমি ‘আহমদ, আমি মাহী’ বা নিশ্চিহ্নকারী; যার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ কুফারী নিশ্চিহ্ন করে দিবেন। আর আমি ‘হাশির’ বা একত্রিতকারী; আমার কদমের কাছে সমস্ত মানুষ জমা হবে। আর আমি ‘আকিব’ বা পরিসমাপ্তিকারী ৷ [বুখারী: ৩৫৩২, ৪৮৯৬, মুসলিম: ২৩৫৪, তিরমিযী: ২৮৪০, মুসনাদে আহমাদ: ৪/৮০, ইবনে হিব্বান: ৬৩১৩] তবে রাসূলের নাম এ কয়টিতে সীমাবদ্ধ নয়। অন্য হাদীসে আরও এসেছে, আবু মূসা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই আমাদেরকে তার নাম উল্লেখ করেছেন, তন্মধ্যে কিছু আমরা মুখস্ত করতে সক্ষম হয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, আমি ‘মুহাম্মাদ’ ‘আহমাদ, হাশির, মুকাফফি (সর্বশেষে আগমনকারী), নাবিইউত তাওবাহ (তাওবাহর নবী), নাবীইউল মালহামাহ, (সংগ্রামের নবী)। [মুসলিম: ২৩৫৫, মুসনাদে আহমাদ: ৪/৩৯৫, ৪০৪, ৪০৭]

(২) ঈসা আলাইহিস সালাম এর সুসংবাদ প্রদানের কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীসেও এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীগণ তাকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদেরকে আপনার নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন। জবাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “আমি আমার পিতা (পিতৃপুরুষ) ইবরাহীম এর দোআ, ঈসা এর সুসংবাদ এবং আমার মা যখন আমাকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন তখন তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন যে, তার থেকে একটি আলো বের হয়ে সিরিয়ার বুসরা নগরীর প্রাসাদসমূহ আলোকিত হয়ে গেছে।” [মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/৬০০, অনুরূপ বর্ণনা আরও দেখুন: মুসনাদে আহমাদ: ৫/২৬২] এমনকি এ সুসংবাদের কথা হাবশার বাদশাহ নাজাসীও স্বীকার করেছিলেন। [দেখুন: মুসনাদে আহমাদ: ১/৪৬১-৪৬২]

(৩) কারও কারও মতে, এখানে ‘তিনি’ বলে ঈসা আলাইহিস সালামকে বোঝানো হয়েছে। সে অনুসারে بينات বা স্পষ্ট প্রমাণাদি দ্বারা ঈসা আলাইহিস সালাম এর ইঞ্জীল বোঝানো হবে। তবে অধিকাংশ তাফসীরবিদের মতে, এখানে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বোঝানো হয়েছে। সে হিসেবে بينات বা স্পষ্ট প্রমাণাদি দ্বারা কুরআন বোঝানো হবে। আর এ মতটিই এখানে বেশী প্রাধান্যপ্ৰাপ্ত মত। [ফাতহুল কাদীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৬) (স্মরণ কর,) যখন মারয়্যাম তনয় ঈসা বলেছিল, ‘হে বানী ইস্রাঈল! আমি তোমাদের প্রতি (প্রেরিত) আল্লাহর রসূল এবং আমার পূর্ব হতে (তোমাদের নিকট) যে তাওরাত রয়েছে, আমি তার সমর্থক[1] এবং আমার পরে আহমাদ নামে যে রসূল আসবেন, আমি তাঁর সুসংবাদদাতা।’[2] পরে সে যখন স্পষ্ট নিদর্শনাবলীসহ তাদের নিকট আগমন করল, তখন তারা বলতে লাগল, ‘এটা তো এক স্পষ্ট যাদু।’ [3]

[1] ঈসা (আঃ)-এর ঘটনা এই জন্য বর্ণনা করলেন যে, বানী ইস্রাঈলরা যেমন মূসা (আঃ)-এর অবাধ্যতা করেছিল, অনুরূপ তারা ঈসা (আঃ)-কেও অস্বীকার করেছিল। এতে নবী (সাঃ)-কে সান্ত্বনা দেওয়া হচ্ছে যে, এই ইয়াহুদীরা কেবল তোমার সাথেই এইরূপ আচরণ করেনি, বরং তাদের সম্পূর্ণ ইতিহাসই নবীদেরকে মিথ্যাজ্ঞান করাতে ভরপুর। ‘তাওরাত’-এর সত্যায়ন বা সমর্থন করার অর্থ হল, আমি যে দাওয়াত দিচ্ছি, সেটা ঐ দাওয়াতই, যা তাওরাতে ছিল। আর এটা প্রমাণ করে যে, যে পয়গম্বর আমার পূর্বে তাওরাত নিয়ে এসেছিলেন এবং আমি ইঞ্জীল নিয়ে এসেছি, আমাদের উভয়েরই মূলসূত্র একটাই। কাজেই যেভাবে তোমরা মুসা, হারূন, দাউদ ও সুলাইমান (আলাইহিমুস্ সালাম) এর উপর ঈমান এনেছ, অনুরূপ আমার উপরেও ঈমান আন। কারণ, আমি তো তাওরাতের সত্যায়ন করছি, তার খন্ডন ও মিথ্যায়ন করছি না।

[2] এ বলে ঈসা (আঃ) তাঁর পর আগমনকারী শেষ নবী মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর আগমনের সুসংবাদ শুনিয়েছেন। যেমন নবী (সাঃ) বলতেন, (( أَنَا دَعْوَةُ أَبِي إِبْرَاهِيْمَ وَبَشَارَةُ عِيْسَى ‘‘আমি পিতা ইবরাহীম (আঃ)-এর দু’আ এবং ঈসা (আঃ)-এর সুসংবাদের বাস্তব রূপ।’’ (আহমাদ) ‘আহমাদ’ শব্দটি যদি ‘ইসমে ফায়েল’ (কর্তৃপদ) থেকে মুবালাগার সীগা (যার দ্বারা কোন কিছুর আধিক্য বর্ণনা করা হয় তা) হয়, তবে এর অর্থ হবে, অন্যান্য সকল মানুষের চেয়ে আল্লাহর অধিক প্রশংসাকারী। আর যদি এটা ‘ইসম মাফউল’ (কর্মপদ) থেকে হয়, তবে অর্থ হবে, (প্রশংসিত) সুন্দর গুণাবলী এবং বহুমুখী পরিপূর্ণতার অধিকারী হওয়ার কারণে যত প্রশংসা তাঁর করা হয়েছে, এত প্রশংসা অন্য কারো করা হয়নি। (ফাতহুল ক্বাদীর)

[3] অর্থাৎ, ঈসা (আঃ)-এর পেশ করা সমস্ত ‘মু’জিযা’ (অলৌকিক ঘটনাবলী)-কে যাদু বলে আখ্যায়িত করল। পূর্ববর্তী জাতিরাও তাদের নবীদেরকে এই কথাই বলেছিল। কেউ কেউ এ থেকে নবী (সাঃ)-কে বুঝিয়েছেন এবং قَالُوا ক্রিয়ার ‘ফায়েল’ (কর্তৃপদ) মক্কার কাফেরদেরকে বানিয়েছেন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৬১ : ৭ وَ مَنۡ اَظۡلَمُ مِمَّنِ افۡتَرٰی عَلَی اللّٰهِ الۡكَذِبَ وَ هُوَ یُدۡعٰۤی اِلَی الۡاِسۡلَامِ ؕ وَ اللّٰهُ لَا یَهۡدِی الۡقَوۡمَ الظّٰلِمِیۡنَ ﴿۷﴾

সেই ব্যক্তির চেয়ে অধিক যালিম আর কে? যে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা রচনা করে, অথচ তাকে ইসলামের দিকে আহবান করা হয়। আর আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না। আল-বায়ান

তার চেয়ে অধিক যালিম আর কে যে আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যে রচনা করে- অথচ তাকে ইসলামের পথ অবলম্বন করার জন্য আহবান জানানো হয়। (এ রকম) যালিম সম্প্রদায়কে আল্লাহ সঠিক পথে চালিত করেন না। তাইসিরুল

যে ব্যক্তি ইসলামের দিকে আহুত হয়েও আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা করে তার অপেক্ষা অধিক যালিম আর কে হতে পারে? আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে সৎ পথে পরিচালিত করেননা। মুজিবুর রহমান

And who is more unjust than one who invents about Allah untruth while he is being invited to Islam. And Allah does not guide the wrongdoing people. Sahih International

৭. আর সে ব্যক্তির চেয়ে বড় যালিম আর কে যে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা রচনা করে? অথচ তাকে ইসলামের দিকে আহবান করা হয়। আর আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৭) যে ব্যক্তি আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা করে,[1] তার অপেক্ষা অধিক যালেম আর কে? অথচ তাকে ইসলামের[2] দিকে আহবান করা হয়। আর আল্লাহ যালেম সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।

[1] অর্থাৎ, আল্লাহর সন্তান-সন্ততি সাব্যস্ত করে। অথবা যে পশুগুলোকে তিনি হারাম বলেননি, সেগুলোকে হারাম সাব্যস্ত করে।

[2] অর্থাৎ, যা সমস্ত দ্বীনের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও মহান দ্বীন। সুতরাং যে ব্যক্তি এই দ্বীনের প্রতি আহূত হয়, তার জন্য তো শোভনীয়ই নয় যে, সে কারো ব্যাপারে মিথ্যা গড়বে। তাহলে আল্লাহর ব্যাপারে মিথ্যা গড়া কি তার জন্য কখনও শোভনীয় হতে পারে?

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৬১ : ৮ یُرِیۡدُوۡنَ لِیُطۡفِـُٔوۡا نُوۡرَ اللّٰهِ بِاَفۡوَاهِهِمۡ وَ اللّٰهُ مُتِمُّ نُوۡرِهٖ وَ لَوۡ كَرِهَ الۡكٰفِرُوۡنَ ﴿۸﴾

তারা তাদের মুখের ফুৎকারে আল্লাহর নূরকে নিভিয়ে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ তাঁর নূরকে পূর্ণতাদানকারী। যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে। আল-বায়ান

তারা তাদের মুখের ফুঁৎকারে আল্লাহর নূরকে নিভিয়ে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ তাঁর নূরকে পরিপূর্ণ করবেনই যদিও কাফিররা (তা) অপছন্দ করে। তাইসিরুল

তারা আল্লাহর নূর ফুৎকারে নিভিয়ে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ তাঁর নূর পূর্ণরূপে উদ্ভাসিত করবেন, যদিও কাফিরেরা তা অপছন্দ করে। মুজিবুর রহমান

They want to extinguish the light of Allah with their mouths, but Allah will perfect His light, although the disbelievers dislike it. Sahih International

৮. তারা আল্লাহর নূর ফুৎকারে নেভাতে চায়, আর আল্লাহ্‌, তিনি তাঁর নূর পূর্ণতাদানকারী, যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৮) তারা আল্লাহর জ্যোতিকে তাদের মুখ দিয়ে নিভিয়ে দিতে চায়,[1] কিন্তু আল্লাহ তাঁর জ্যোতিকে পূর্ণরূপে উদ্ভাসিত করবেন; [2] যদিও অবিশ্বাসীরা তা অপছন্দ করে।

[1] আল্লাহর ‘নূর’ (জ্যোতি) অর্থঃ কুরআন, ইসলাম, মুহাম্মাদ (সাঃ) কিংবা দলীল-প্রমাণাদি। ‘মুখ দিয়ে নিভিয়ে দেওয়া’ মানে তাদের সেই সব কটূক্তি ও নিন্দনীয় কথাবার্তা যা তাদের মুখ থেকে বের হয়, তা দিয়ে তারা ঐ জ্যোতিকে প্রতিহত করতে চায়!

[2] অর্থাৎ, আল্লাহ সারা বিশ্বে তার প্রসার ঘটাবেন এবং অন্য সমস্ত ধর্মের উপর তাকে জয়যুক্ত করবেন। দলীল-প্রমাণের দিক দিয়ে অথবা পার্থিব জয়ের দিক দিয়ে কিংবা উভয় দিক দিয়ে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৬১ : ৯ هُوَ الَّذِیۡۤ اَرۡسَلَ رَسُوۡلَهٗ بِالۡهُدٰی وَ دِیۡنِ الۡحَقِّ لِیُظۡهِرَهٗ عَلَی الدِّیۡنِ كُلِّهٖ وَ لَوۡ كَرِهَ الۡمُشۡرِكُوۡنَ ﴿۹﴾

তিনিই তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্যদ্বীন দিয়ে প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি সকল দ্বীনের উপর তা বিজয়ী করে দেন। যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে। আল-বায়ান

তিনিই তাঁর রসূলকে হিদায়াত ও সত্য দীনসহ পাঠিয়েছেন তাকে সকল দীনের উপর বিজয়ী করার জন্য- যদিও মুশরিকরা (তা) অপছন্দ করে। তাইসিরুল

তিনিই তাঁর রাসূলকে প্রেরণ করেছেন হিদায়াত এবং সত্য দীনসহ সকল দীনের উপর ওকে শ্রেষ্ঠত্ব দানের জন্য, যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে। মুজিবুর রহমান

It is He who sent His Messenger with guidance and the religion of truth to manifest it over all religion, although those who associate others with Allah dislike it. Sahih International

৯. তিনিই তাঁর রাসূলকে প্রেরণ করেছেন হেদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ সকল দ্বীনের উপর তাকে বিজয়ী করার জন্য, যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৯) তিনিই তাঁর রসূলকে প্রেরণ করেছেন পথনির্দেশ এবং সত্য দ্বীনসহ সকল দ্বীনের উপর তাকে শ্রেষ্ঠত্ব দানের জন্য; [1] যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে। [2]

[1] এটা পূর্বের কথার তাকীদস্বরূপ। বিষয়ের গুরুত্বের দিকে লক্ষ্য করে তার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে।

[2] তবুও এটা হবেই।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৬১ : ১০ یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا هَلۡ اَدُلُّكُمۡ عَلٰی تِجَارَۃٍ تُنۡجِیۡكُمۡ مِّنۡ عَذَابٍ اَلِیۡمٍ ﴿۱۰﴾

হে ঈমানদারগণ, আমি কি তোমাদেরকে এমন এক ব্যবসায়ের সন্ধান দেব, যা তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আযাব থেকে রক্ষা করবে? আল-বায়ান

হে মু’মিনগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক ব্যবসায়ের সন্ধান দেব যা তোমাদেরকে মর্মান্তিক ‘আযাব থেকে রক্ষা করবে? তাইসিরুল

হে মু’মিনগণ! আমি কি তোমাদের এমন এক বাণিজ্যের সন্ধান দিব যা তোমাদের রক্ষা করবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি হতে? মুজিবুর রহমান

O you who have believed, shall I guide you to a transaction that will save you from a painful punishment? Sahih International

১০. হে ঈমানদারগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক ব্যবসার সন্ধান দেব, যা তোমাদেরকে রক্ষা করবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে?

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১০) হে বিশ্বাসীগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক বাণিজ্যের সন্ধান বলে দেব না, [1] যা তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি হতে রক্ষা করবে?

[1] এই আমল (অর্থাৎ, ঈমান ও জিহাদ)-কে বাণিজ্য বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কারণ এতেও তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের মত লাভ হবে। আর সে লাভ কি? জান্নাতে প্রবেশ এবং জাহান্নাম হতে মুক্তি লাভ। এ থেকে বড় লাভ আর কি হতে পারে? এই লাভকে আল্লাহ অন্যত্র এইভাবে বর্ণনা করেছেন, إِنَّ اللهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ ‘‘অবশ্যই আল্লাহ ক্রয় করে নিয়েছেন মু’মিনদের নিকট থেকে তাদের জান ও মালকে জান্নাতের বিনিময়ে।’’ (সূরা তাওবাহঃ ১১১)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৬১ : ১১ تُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰهِ وَ رَسُوۡلِهٖ وَ تُجَاهِدُوۡنَ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ بِاَمۡوَالِكُمۡ وَ اَنۡفُسِكُمۡ ؕ ذٰلِكُمۡ خَیۡرٌ لَّكُمۡ اِنۡ كُنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ ﴿ۙ۱۱﴾

তোমরা আল্লাহর প্রতি ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনবে এবং তোমরা তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা জানতে। আল-বায়ান

(তা এই যে) তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি ঈমান আনো আর তোমরা তোমাদের মাল ও জান দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ কর; এটাই তোমাদের জন্য অতি উত্তম, যদি তোমরা জানতে! তাইসিরুল

তা এই যে, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং তোমাদের ধন সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা জানতে। মুজিবুর রহমান

[It is that] you believe in Allah and His Messenger and strive in the cause of Allah with your wealth and your lives. That is best for you, if you should know. Sahih International

১১. তা এই যে, তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের উপর ঈমান আনবে এবং তোমরা তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্য শ্ৰেয় যদি তোমরা জানতে!

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১১) (তা এই যে,) তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলে বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যদি তোমরা জানতে।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৬১ : ১২ یَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوۡبَكُمۡ وَ یُدۡخِلۡكُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِهَا الۡاَنۡهٰرُ وَ مَسٰكِنَ طَیِّبَۃً فِیۡ جَنّٰتِ عَدۡنٍ ؕ ذٰلِكَ الۡفَوۡزُ الۡعَظِیۡمُ ﴿ۙ۱۲﴾

তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দিবেন। আর তোমাদেরকে এমন জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন যার তলদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত এবং চিরস্থায়ী জান্নাতসমূহে উত্তম আবাসগুলোতেও (প্রবেশ করাবেন)। এটাই মহাসাফল্য। আল-বায়ান

(তোমরা যদি আল্লাহর সন্ধান দেয়া ব্যবসা কর তাহলে) তিনি তোমাদের পাপ ক্ষমা করে দেবেন আর তোমাদেরকে দাখিল করবেন জান্নাতে যার তলদেশে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত। আর চিরস্থায়ী আবাসস্থল জান্নাতে অতি উত্তম ঘর তোমাদেরকে দান করবেন। এটাই বিরাট সাফল্য। তাইসিরুল

আল্লাহ তোমাদের পাপ ক্ষমা করে দিবেন এবং তোমাদের দাখিল করবেন জান্নাতে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত এবং স্থায়ী জান্নাতের উত্তম বাসগৃহে। এটাই মহা সাফল্য। মুজিবুর রহমান

He will forgive for you your sins and admit you to gardens beneath which rivers flow and pleasant dwellings in gardens of perpetual residence. That is the great attainment. Sahih International

১২. আল্লাহ তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন এবং তোমাদেরকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, এবং স্থায়ী জান্নাতের উত্তম বাসগৃহে। এটাই মহাসাফল্য।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১২) আল্লাহ তোমাদের পাপরাশিকে ক্ষমা করে দেবেন এবং তোমাদেরকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে; যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত এবং (প্রবেশ করাবেন) স্থায়ী জান্নাতের উত্তম বাসগৃহে। এটাই মহা সাফল্য।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৬১ : ১৩ وَ اُخۡرٰی تُحِبُّوۡنَهَا ؕ نَصۡرٌ مِّنَ اللّٰهِ وَ فَتۡحٌ قَرِیۡبٌ ؕ وَ بَشِّرِ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ ﴿۱۳﴾

এবং আরো একটি (অর্জন) যা তোমরা খুব পছন্দ কর। (অর্থাৎ) আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য ও নিকটবর্তী বিজয়। আর মুমিনদেরকে তুমি সুসংবাদ দাও। আল-বায়ান

আর অন্য আরেকটিও (তিনি তোমাদেরকে দিবেন) যা তোমরা পছন্দ কর (আর তা হল) আল্লাহর সাহায্য ও আসন্ন বিজয়। (হে নবী!) ঈমানদার লোকেদেরকে তুমি সুসংবাদ দাও। তাইসিরুল

আর তিনি দান করবেন তোমাদের বাঞ্ছিত আরও একটি অনুগ্রহ; আল্লাহর সাহায্য এবং আসন্ন বিজয়; মু’মিনদেরকে এর সুসংবাদ দাও। মুজিবুর রহমান

And [you will obtain] another [favor] that you love - victory from Allah and an imminent conquest; and give good tidings to the believers. Sahih International

১৩. এবং (তিনি দান করবেন) আরও একটি অনুগ্রহ, যা তোমরা পছন্দ কর। আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য ও আসন্ন বিজয়; আর আপনি মুমিনদেরকে সুসংবাদ দিন।(১)

(১) আখেরাতের নেয়ামতের সাথে কিছু দুনিয়ার নেয়ামতেরও ওয়াদা করে বলা হয়েছে, (وَأُخْرَىٰ تُحِبُّونَهَا نَصْرٌ مِنَ اللَّهِ وَفَتْحٌ قَرِيبٌ  وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ) “এবং তিনি দান করবেন তোমাদের বাঞ্ছিত আরো একটি অনুগ্রহ। আল্লাহর সাহায্য ও আসন্ন বিজয়; মুমিনদেরকে সুসংবাদ দিন।” অর্থাৎ আখেরাতের নেয়ামত ও বাসগৃহ তো পাওয়া যাবেই; দুনিয়াতেও একটি নগদ নেয়ামত পাওয়া যাবে, তা হচ্ছে আল্লাহর সাহায্য ও আসন্ন বিজয়। এর অর্থ শত্রুদের উপর বিজয় লাভ। এখানে قَرِيبٌ (বা নিকট) শব্দটি আখেরাতের বিপরীতে ধরা হলে ইসলামের সকল বিজয়ই এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আর যদি প্রচলিত قَرِيبٌ (বা আসন্ন) ধরা হয়, তবে এর প্রথম অর্থ হবে খাইবার বিজয় এবং এরপর মক্কা বিজয়। تُحِبُّونَهَا অর্থাৎ, তোমরা এই নগদ নেয়ামত খুব পছন্দ কর। কারণ মানুষ স্বভাবগতভাবে নগদকে পছন্দ করে। পবিত্র কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে, (وَكَانَ الْإِنْسَانُ عَجُولًا) অর্থাৎ, মানুষ তড়িঘড়ি পছন্দ করে। [সূরা আল-ইসরা: ১১] এর অর্থ এই নয় যে, আখেরাতের নেয়ামত তাদের কাছে প্রিয় নয়। বরং অর্থ এই যে, আখেরাতের নেয়ামত তো তাদের প্রিয় কাম্যই, কিন্তু স্বভাবগতভাবে কিছু নগদ নেয়ামতও তারা দুনিয়াতে চায় তাও দেয়া হবে। [দেখুন: ফাতহুল কাদীর, মুয়াস্‌সার, বাগভী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৩) আর তিনি তোমাদেরকে দান করবেন বাঞ্ছিত আরো একটি অনুগ্রহ; আল্লাহর সাহায্য ও আসন্ন বিজয়।[1] আর বিশ্বাসীদেরকে সুসংবাদ দাও। [2]

[1] অর্থাৎ, যখন তোমরা তাঁর রাস্তায় যুদ্ধ করবে এবং তাঁর দ্বীনের সাহায্য করবে, তখন তিনি তোমাদেরকে জয় ও সাহায্য দানে ধন্য করবেন। ﴿إِنْ تَنْصُرُوا اللهَ يَنْصُرْكُمْ وَيُثَبِّتْ أَقْدَامَكُمْ﴾ অর্থাৎ, যদি তোমরা আল্লাহর (দ্বীনের) সাহায্য কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন, এবং তোমাদের পা দৃঢ়-প্রতিষ্ঠিত রাখবেন। (সূরা মুহাম্মাদ ৭ আয়াত) ﴿وَلَيَنْصُرَنَّ اللهُ مَنْ يَنْصُرُهُ إِنَّ اللهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ﴾ অর্থাৎ, আল্লাহ নিশ্চয়ই তাকে সাহায্য করেন যে তাঁকে (তাঁর ধর্মকে) সাহায্য করে। (সূরা হাজ্জ ৪০ আয়াত) আখেরাতের নিয়ামতের তুলনায় এটাকে আসন্ন বিজয় গণ্য করেছেন। আর এ থেকে মক্কা বিজয় বুঝানো হয়েছে। আর কেউ কেউ প্রতাপশালী পারস্য ও রোমক রাজ্যদ্বয় মুসলিমদের জয়লাভ করাকে এরই বাস্তব চিত্র গণ্য করেছেন; যা খেলাফতে রাশেদার যুগে মুসলিমরা লাভ করেন।

[2] অর্থাৎ, মৃত্যুর পর জান্নাতের এবং দুনিয়াতে বিজয় ও সাহায্যের। তবে শর্ত হল, ঈমানদারদেরকে ঈমানের দাবীসমূহ পূরণ করতে হবে। ﴿وَأَنْتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ﴾ (آل عمران: ১৩৯) পরের আয়াতে মহান আল্লাহ মু’মিনদেরকে দ্বীনের সাহায্যের প্রতি আরো তাকীদ করছেন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৬১ : ১৪ یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا كُوۡنُوۡۤا اَنۡصَارَ اللّٰهِ كَمَا قَالَ عِیۡسَی ابۡنُ مَرۡیَمَ لِلۡحَوَارِیّٖنَ مَنۡ اَنۡصَارِیۡۤ اِلَی اللّٰهِ ؕ قَالَ الۡحَوَارِیُّوۡنَ نَحۡنُ اَنۡصَارُ اللّٰهِ فَاٰمَنَتۡ طَّآئِفَۃٌ مِّنۡۢ بَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ وَ كَفَرَتۡ طَّآئِفَۃٌ ۚ فَاَیَّدۡنَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا عَلٰی عَدُوِّهِمۡ فَاَصۡبَحُوۡا ظٰهِرِیۡنَ ﴿۱۴﴾

হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারী হও। যেমন মারইয়াম পুত্র ঈসা হাওয়ারীদেরকে* বলেছিল, আল্লাহর পথে কারা আমার সাহায্যকারী হবে? হাওয়ারীগণ বলল, আমরাই আল্লাহর সাহায্যকারী। তারপর বনী-ঈসরাইলের মধ্য থেকে একদল ঈমান আনল এবং অপর এক দল প্রত্যাখ্যান করল। অতঃপর যারা ঈমান আনল আমি তাদেরকে তাদের শত্রুবাহিনীর ওপর শক্তিশালী করলাম। ফলে তারা বিজয়ী হল। আল-বায়ান

হে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারী হও, যেমন মারইয়ামের পুত্র ‘ঈসা হাওয়ারীদেরকে বলেছিল- ‘আল্লাহর পথে কে আমার সাহায্যকারী হবে?’ হাওয়ারীরা উত্তরে বলেছিল- ‘আমরাই আল্লাহর সাহায্যকারী (হব)।’ অতঃপর বানী ইসরাঈলের একদল ঈমান আনল, আরেক দল প্রত্যাখ্যান করল। তখন যারা ঈমান আনল তাদেরকে আমি তাদের শত্রুদের উপর শক্তিশালী করলাম। ফলে তারা বিজয়ী হল। তাইসিরুল

হে মু’মিনগণ! আল্লাহর দীনের সাহায্যকারী হও, যেমন মারইয়াম তনয় ঈসা তার শিষ্যদেরকে বলেছিলঃ আল্লাহর পথে কে আমার সাহায্যকারী হবে? হাওয়ারীগণ বলেছিলঃ আমরাইতো আল্লাহর পথে সাহায্যকারী। অতঃপর বানী ইসরাঈলের একদল ঈমান আনল এবং একদল কুফরী করল। পরে আমি মু’মিনদেরকে শক্তিশালী করলাম তাদের শত্রুদের মুকাবিলায়; ফলে তারা বিজয়ী হল। মুজিবুর রহমান

O you who have believed, be supporters of Allah, as when Jesus, the son of Mary, said to the disciples, "Who are my supporters for Allah?" The disciples said, "We are supporters of Allah." And a faction of the Children of Israel believed and a faction disbelieved. So We supported those who believed against their enemy, and they became dominant. Sahih International

*ঈসাঃ (আঃ) এর খাস অনুসারীদেরকে হাওয়ারী বলা হত।

১৪. হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারী হও, যেমন মার্‌ইয়াম-পুত্র ঈসা হাওয়ারীগণকে বলেছিলেন, আল্লাহর পথে কারা আমার সাহায্যকারী হবে? হাওয়ারীগণ বলেছিলেন, আমরাই আল্লাহর পথে সাহায্যকারী।(১) তারপর বনী ইসরাঈলের একদল ঈমান আনল এবং একদল কুফরী করল। তখন আমরা যারা ঈমান এনেছিল, তাদের শক্ৰদের মুকাবিলায় তাদেরকে শক্তিশালী করলাম, ফলে তারা বিজয়ী হলো।(২)

(১) حَوَارِيِّينَ শব্দটি حَوَارِيي এর বহুবচন। এর অর্থ আন্তরিক বন্ধু। ঈসা আলাইহিস সালাম এর অনুসারীদেরকে ‘হাওয়ারী’ বলা হত। [ইবন কাসীর]

(২) এই আয়াতের তাফসীরে আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, ঈসা আলাইহিস সালাম আসমানে উত্থিত হওয়ার পর নাসারারা তিন দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একদল বলল, তিনি ইলাহ ছিলেন এবং আসমানে চলে গেছেন। দ্বিতীয় দল বলল, তিনি ইলাহ ছিলেন না বরং ইলাহর পুত্র ছিলেন। এখন আল্লাহ তাকে আসমানে উঠিয়ে নিয়েছেন এবং শত্রুদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। তৃতীয় দল বিশুদ্ধ ও সত্যকথা বলল। তারা বলল, “তিনি ইলাহও ছিলেন না, ইলাহর পুত্রও ছিলেন না; বরং আল্লাহর দাস ও রাসূল ছিলেন। আল্লাহ তা'আলা তাকে শক্ৰদের কবল থেকে হেফাযত ও উচ্চ মর্তবা দান করার জন্যে আকাশে উঠিয়ে নিয়েছেন।” মূলত: এরাই ছিল সত্যিকার ঈমানদার।

প্রত্যেক দলের সাথে কিছু কিছু জনসাধারণও যোগদান করে এবং পারস্পরিক কলহ বাড়তে বাড়তে যুদ্ধের উপক্রম হয়। ঘটনাচক্ৰে উভয় কাফের দল মুমিনদের মোকাবিলায় প্রবল হয়ে ওঠে। অবশেষে আল্লাহ তা'আলা সর্বশেষ নবী ও রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে প্রেরণ করেন। তিনি মুমিন দলকে সমর্থন দেন। এভাবে পরিণামে মুমিন দল যুক্তি প্রমাণের নিরীখে বিজয়ী হয়ে যায়। এই তফসীর অনুযায়ী আয়াতে উল্লেখিত (الَّذِينَ آمَنُوا) বা “যারা ঈমান এনেছে” বলে ঈসা আলাইহিস সালাম-এর উম্মতের মুমিনগণকেই বোঝানো হয়েছে, যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহায্য ও সমর্থনে বিজয়ের গৌরব অর্জন করবে। সে হিসেবে উম্মতে মুহাম্মদী যারা রাসূলের প্রকৃত অনুসারী তারা সর্বদা বিজয়ী থাকবে। [দেখুন: তাফসীরে তাবারী: ২৮/৬০, দ্বিয়া আল-মাকদেসী: আল-মুখতারাহ: ১০/৩৭৬–৩৭৮, নং ৪০২]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৪) হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারী হও,[1] যেমন মারয়্যাম তনয় ঈসা তার শিষ্যদেরকে বলেছিল, ‘আল্লাহর পথে কে আমার সাহায্যকারী হবে?’ শিষ্যগণ বলেছিল, ‘আমরাই তো আল্লাহর সাহায্যকারী।’[2] অতঃপর বানী ইস্রাঈলের একদল বিশ্বাস করল এবং একদল অবিশ্বাস করল। [3] পরে আমি বিশ্বাসীদেরকে তাদের শত্রুদের মুকাবিলায় শক্তিশালী করলাম; ফলে তারা বিজয়ী হল। [4]

[1] সর্বাস্থায়; নিজেদের কথা ও কাজের মাধ্যমে এবং জান ও মালের মাধ্যমেও। যখনই যে সময়ে এবং যে অবস্থাতেই তোমাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রসূল দ্বীনের জন্য ডাক দেবেন, তখনই তোমরা সেই ডাকে সাড়া দিয়ে বলবে, ‘লাব্বায়িক’ (আমরা হাজির)। যেভাবে ঈসা (আঃ)-এর শিষ্যরা তাঁর ডাকে ‘লাববায়িক’ বলেছিলেন।

[2] অর্থাৎ, যে দ্বীনের প্রচার-প্রসারের নির্দেশ মহান আল্লাহ আপনাকে দিয়েছেন, সেই দ্বীনের প্রচার-প্রসারের কাজে আমরা হব আপনার সাহায্যকারী। এইভাবে রসূল (সাঃ) হজ্জের মৌসুমে বলতেন, ‘‘কে আছে এমন যে আমাকে আশ্রয় দিবে, যাতে আমি মানুষের কাছে আল্লাহর পয়গাম পৌঁছে দিতে পারি। কারণ, কুরাইশরা আমাকে রিসালাতের দায়িত্ব পালন করতে দিচ্ছে না।’’ নবী করীম (সাঃ)-এর এই ডাকে মদীনার আওস ও খাযরাজ গোত্রের লোকেরা সাড়া দিয়েছিলেন এবং তাঁর হাতে তাঁরা বায়আত করে তাঁকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অনুরূপ তাঁরা তাঁকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে, যদি আপনি হিজরত করে মদীনায় আসেন, তবে আমরাই আপনার হিফাযতের দায়িত্ব গ্রহণ করছি। সুতরাং যখন তিনি হিজরত করে মদীনায় এলেন, তখন প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাঁরাই তাঁর এবং তাঁর সমস্ত সঙ্গী-সাথীর পরিপূর্ণ সাহায্য করেছিলেন। এমন কি আল্লাহ এবং তাঁর রসূল (সাঃ) তাঁদের নামই রেখে দিলেন, ‘আনসার’। আর এই নামই তাঁদের পরিচয় হয়ে রইল। رَضِيَ اللهُ عَنْهُمْ وأَرْضَاهُمْ (ইবনে কাসীর)

[3] এরা ছিল সেই ইয়াহুদী, যারা ঈসা (আঃ)-এর নবুঅতকে কেবল অস্বীকারই করেনি, বরং তাঁর এবং তাঁর মায়ের উপর মিথ্যা অপবাদও দিয়েছিল। কেউ কেউ বলেন, এই বিচ্ছিন্নতা ও দলাদলি তখন সৃষ্টি হয়, যখন ঈসা (আঃ)-কে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হল। এক দল বলল, মহান আল্লাহই ঈসা (আঃ)-এর আকার নিয়ে যমীনে অবতরণ করেছিলেন। এখন তিনি আবার আসমানে চলে গেছেন। এদেরকে ‘য়্যা’কূবিয়্যাহ’ ফির্কা বলা হয়। ‘নাসত্বুরিয়্যাহ’ ফির্কাদের বক্তব্য হল, তিনি ‘ইবনুল্লাহ’ (আল্লাহর বেটা) ছিলেন। পিতা পুত্রকে আসমানে ডেকে নিয়েছেন। তৃতীয় ফির্কা বলল, তিনি আল্লাহর বান্দাহ এবং তাঁর রসূল ছিলেন। বলা বাহুল্য, এটাই হল হকপন্থী ফির্কা।

[4] অর্থাৎ, নবী (সাঃ)-কে প্রেরণ করে আমি এই শেষোক্ত ফির্কাটিকে অন্য ভ্রষ্ট ফির্কার বিরুদ্ধে সাহায্য করেছি। তাই সঠিক আকীদার অধিকারী এই দলটি নবী (সাঃ)-এর উপরও ঈমান আনল। আর এইভাবে আমি দলীল-প্রমাণের দিক দিয়েও সমস্ত কাফেরদের উপর এদেরকে জয়যুক্ত করলাম এবং শক্তি ও রাজত্বের দিক দিয়েও। আর এই জয়ের সর্ব শেষ বিকাশ ঘটবে তখন, যখন কিয়ামতের পূর্বকালে ঈসা (আঃ) পুনরায় পৃথিবীতে অবতরণ করবেন। যেমন, এই অবতরণ ও বিজয়ের কথা স্পষ্টরূপে বহু সহীহ হাদীসে বহুধাসূত্রে বর্ণিত হয়েছে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
তাজউইদ কালার কোড
হামযা ওয়াসল মাদ্দে তাবিঈ ইখফা মাদ্দে ওয়াজিব গুন্নাহ মাদ্দে জায়েয নীরব ইদগাম (গুন্নাহ সহ) ক্বলক্বলাহ লাম শামসিয়্যাহ ইদগাম (গুন্নাহ ছাড়া) ইদগাম শাফাউই ইক্বলাব ইখফা শাফাউই মাদ্দে লাযিম ইদগাম মুতাক্বারিবাইন ইদগাম মুতাজানিসাইন