আলিফ- লাম -মীম। আল-বায়ান
আলিফ-লাম-মীম। তাইসিরুল
আলিফ লাম মীম মুজিবুর রহমান
Alif, Lam, Meem. Sahih International
১. আলিফ-লাম-মীম;
-
তাফসীরে জাকারিয়া(১) আলিফ, লাম, মীম ; [1]
[1] এই সূরার শুরুতেও ‘হরূফে মুক্বাত্ত্বাআত’ (বিচ্ছিন্ন অক্ষরমালা) আছে। যার অর্থ আল্লাহ ছাড়া কেউ অবগত নয়। এর পরেও কোন কোন মুফাস্সির এর দুটো বড় গুরুত্বপূর্ণ যৌক্তিকতা বর্ণনা করেছেন। প্রথম এই যে, এই কুরআন এই শ্রেণীরই বিচ্ছিন্ন অক্ষরমালা দ্বারা সুবিন্যস্ত ও লিপিবদ্ধ, যার অনুরূপ কোন লিপি পেশ করতে আরববাসীরা অসমর্থ হয়েছে। সুতরাং এ কথা প্রমাণ দেয় যে, এই কুরআন আল্লাহরই অবতীর্ণ করা একটি গ্রন্থ এবং যার প্রতি তা অবতীর্ণ করা হয়েছে তিনি সত্যই রসূল। তিনি যে শরীয়ত নিয়ে এসেছেন মানুষ তার মুখাপেক্ষী এবং মানুষের পরিশুদ্ধি ও সৌভাগ্যের পরিপূর্ণতা একমাত্র এই শরীয়ত দ্বারাই সম্ভব। দ্বিতীয় এই যে, কাফেররা নিজেদের সাথীদেরকে এই কুরআন শ্রবণ করা থেকে বিরত রাখত এই ভয়ে যে, তারা তা শ্রবণ করে প্রভাবিত হয়ে মুসলমান হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন সূরা বিচ্ছিন্ন অক্ষরমালা দ্বারা আরম্ভ করেছেন, যাতে তারা তা শ্রবণ করতে বাধ্য হয়। কারণ এই বর্ণনা-ভঙ্গি অভিনব ও নতুন ছিল। (আইসারুত তাফাসীর) আর আল্লাহই অধিক জানেন।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানএগুলো প্রজ্ঞাপূর্ণ কিতাবের আয়াত, আল-বায়ান
এগুলো হিকমাতে ভরপুর কিতাবের আয়াত। তাইসিরুল
এগুলি জ্ঞানগর্ভ কিতাবের আয়াত। মুজিবুর রহমান
These are verses of the wise Book, Sahih International
২. এগুলো হিকমতপূর্ণ কিতাবের আয়াত,
-
তাফসীরে জাকারিয়া(২) এগুলি জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থের বাক্য,
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ানসৎকর্মশীলদের জন্য হিদায়াত ও রহমতস্বরূপ, আল-বায়ান
সৎকর্মশীলদের জন্য পথ নির্দেশ ও রহমত। তাইসিরুল
পথ নির্দেশ ও দয়া স্বরূপ, সৎকর্মপরায়ণদের জন্য। মুজিবুর রহমান
As guidance and mercy for the doers of good Sahih International
৩. পথ-নির্দেশ ও দয়াস্বরূপ মুহসিনদের জন্য(১);
(১) অর্থাৎ এ আয়াতগুলো সঠিক পথনির্দেশক এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে অনুগ্রহের রূপ লাভ করে এসেছে। কিন্তু এ পথনির্দেশনা ও অনুগ্রহ থেকে লাভবান হয় একমাত্র তারাই যারা সৎকাজ করার পথ অবলম্বন করে, সৎ হতে চায়, কল্যাণ ও ন্যায়ের সন্ধান করে এবং অসৎকাজ সম্পর্কে যখনই সতর্ক করে দেয়া হয় তখনই তা পরিহার করে এবং কল্যাণ ও ন্যায়ের পথ যখনই সামনে খুলে রেখে দেয়া হয় তখনই সে পথে চলতে শুরু করে। আর যারা অসৎকাজ করে ও অসৎ মনোবৃত্তির অধিকারী তারা এ পথনির্দেশনা থেকে লাভবান হবে না এবং এ অনুগ্রহেরও কোন অংশ পাবে না। [তাবারী, ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(৩) সৎকর্মপরায়ণদের[1] জন্য পথনির্দেশ ও করুণা স্বরূপ;
[1] مُحسِن এক অর্থ হল, পিতা-মাতা, আত্মীয়, হকদার ও অভাবীদের সাথে সদ্ব্যবহারকারী। দ্বিতীয় অর্থ হল, সৎকর্মপরায়ণ; অর্থাৎ অসৎকর্ম থেকে দূরে থেকে সৎকর্ম সম্পাদনকারী। তৃতীয় অর্থ হল, আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে ইখলাস (আন্তরিকতা) ও একাগ্রতার সাথে আল্লাহর ইবাদতকারী। যেমন হাদীসে জিবরীলে বর্ণনা হয়েছে; ‘ইহসান’ হল এমনভাবে ইবাদত করা, যাতে মনে হয়, যেন আল্লাহকে দেখছি অথবা তিনি আমাকে দেখছেন। প্রকৃতপক্ষে কুরআন সারা পৃথিবীর জন্য করুণা ও পথপ্রদর্শক; কিন্তু তা হতে প্রকৃত উপকৃত হয়ে থাকে শুধুমাত্র পরহেযগার ও সৎকর্মপরায়ণগণই, তাই এখানে তাঁদের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানযারা সালাত কায়েম করে এবং যাকাত দেয়, আর তারাই আখিরাতে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করে; আল-বায়ান
যারা নামায প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দেয় আর তারা আখেরাতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখে। তাইসিরুল
যারা সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয়, তারাই আখিরাতে নিশ্চিত বিশ্বাসী। মুজিবুর রহমান
Who establish prayer and give zakah, and they, of the Hereafter, are certain [in faith]. Sahih International
৪. যারা সালাত কায়েম করে এবং যাকাত দেয়, আর তারাই আখিরাতে নিশ্চিত বিশ্বাসী;
-
তাফসীরে জাকারিয়া(৪) যারা যথাযথভাবে নামায পড়ে, যাকাত দেয় ও পরলোকে নিশ্চিত বিশ্বাস রাখে। [1]
[1] নামায ও যাকাত আদায় এবং আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস এই তিনটিই অতীব গুরুত্বপূর্ণ, তাই বিশেষ করে এইগুলোকে (পরহেযগার ও সৎকর্মপরায়ণদের কর্মরূপে) উল্লেখ করা হয়েছে। নচেৎ তাঁরা তো আসলে সকল ফরয ও সুন্নত বরং মুস্তাহাব কর্মাবলীকেও যথাযথভাবে মেনে চলেন।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানতারাই তাদের রবের পক্ষ থেকে হিদায়াতের ওপর এবং তারাই সফলকাম। আল-বায়ান
তারাই তাদের পালনকর্তার সঠিক পথে আছে আর তারাই সফলকাম। (দুনিয়া ও আখেরাতে) তাইসিরুল
তারাই তাদের রবের নির্দেশিত পথে রয়েছে এবং তারাই সফলকাম। মুজিবুর রহমান
Those are on [right] guidance from their Lord, and it is those who are the successful. Sahih International
৫. তারাই তাদের রবের পক্ষ থেকে হিদায়াতের উপর আছে এবং তারাই সফলকাম।(১)
(১) যাদেরকে সৎকর্মপরায়ণ বলা হয়েছে তারা কেবলমাত্র এ তিনটি গুণাবলীর অধিকারী, একথা বলা হয়নি। আসলে প্রথমে ‘সৎকর্মপরায়ণ’ শব্দটি ব্যাপক অর্থে বর্ণনা করে এদিকে ইংগিত করা হয়েছে যে, এ কিতাব যেসব অপকর্মে বাধা দেয় এ সৎকর্মশীলরা সেসবগুলো থেকেই বিরত থাকে। আর এ কিতাব যেসব সৎকাজ করার হুকুম দেয় এরা সেসবগুলোই করে। তারপর এ “সৎকর্মশীলদের” তিনটি গুরুত্বপূর্ণ গুণাবলী বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে একথা প্ৰকাশ করাই উদ্দেশ্য যে, বাদবাকি সমস্ত সৎকাজ কিন্তু এ তিনটি সদগুণের ওপরই নির্ভর করবে। তারা সালাত কায়েম করে। এর ফলে আল্লাহর হুকুম মেনে চলা ও আল্লাহর ভয়ে ভীত হওয়া তাদের স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। তারা যাকাত দেয়। এর ফলে আত্মত্যাগের প্রবণতা তাদের মধ্যে সুদৃঢ় ও শক্তিশালী হয়, পার্থিব সম্পদের প্রতি মোহ প্ৰদমিত হয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আকাংখা জেগে ওঠে। তারা আখেরাতে বিশ্বাস করে। এর ফলে তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহি করার অনুভূতি জাগে।
এর বদৌলতে তারা এমন জন্তু-জানোয়ারের মতো হয় না। যারা চারণক্ষেত্রে বাঁধন-হারা হয়ে এদিক ওদিক চরে বেড়ায়। বরং তারা এমন মানুষদের মতো হয়ে যায় যারা নিজেদেরকে স্বেচ্ছাচারী মনে করে না। মনে করে, তারা কোন প্রভুর গোলাম এবং নিজেদের সমস্ত কাজের জন্য প্রভুর সামনে জবাবদিহি করতে বাধ্য। এ তিনটি বিশেষত্বের কারণে এ “সৎকর্মশীলরা” ঠিক তেমনি ধরনের সৎকর্মশীল থাকে না যারা ঘটনাক্রমে কোন সৎকাজ করে বসে এবং তাদের অসৎকাজও তেমনি সৎকাজের মতো একই ধারায় অনুষ্ঠিত হতে পারে। পক্ষান্তরে এ বিশেষত্বগুলো তাদের মধ্যে একটি চিন্তা ও নৈতিক ব্যবস্থার জন্ম দেয় যার ফলে তাদের সৎকাজগুলো একটি ধরা বাঁধা নিয়মানুসারে অনুষ্ঠিত হতে থাকে এবং অসৎকাজ যদি কখনো হয়ে যায়ই তাহলে তা হয় ঘটনাক্ৰমে। তাদের কোন গভীর চিন্তা ও নৈতিক উদ্যোগ তাদেরকে প্রাকৃতিক চাহিদা অনুসারে অসৎপথে নিয়ে যায় না। [দেখুন: ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(৫) ওরাই ওদের প্রতিপালক কর্তৃক নির্দেশিত পথে আছে এবং ওরাই সফলকাম। [1]
[1] فَلاح (সফলতা)র অর্থ জানার জন্য সূরা বাক্বারাহ ৫নং ও সূরা মু’মিনূনের ১নং আয়াতের তফসীর দেখুন।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা খরিদ করে, আর তারা ঐগুলোকে হাসি-ঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে; তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর আযাব। আল-বায়ান
কতক মানুষ আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার উদ্দেশে অজ্ঞতাবশতঃ অবান্তর কথাবার্তা (গান-বাজনা) ক্রয় করে আর আল্লাহর পথকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। ওদের জন্যই আছে অবমাননাকর শাস্তি। তাইসিরুল
মানুষের মধ্যে কেহ কেহ অজ্ঞতা বশতঃ আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করার জন্য অসার বাক্য ক্রয় করেএবং আল্লাহর প্রদর্শিত পথ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে, তাদেরই জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি। মুজিবুর রহমান
And of the people is he who buys the amusement of speech to mislead [others] from the way of Allah without knowledge and who takes it in ridicule. Those will have a humiliating punishment. Sahih International
৬. আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য আসার বাক্য কিনে নেয়(১) জ্ঞান ছাড়াই(২) এবং আল্লাহর দেখানো পথ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে। তাদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।
(১) (لَهْوَ الْحَدِيثِ) বাক্যটিতে حديث শব্দের অর্থ কথা, কিসসা-কাহিনী এবং لَهْوَ শব্দের অর্থ গাফেল হওয়া। যেসব বিষয় মানুষকে প্রয়োজনীয় কাজ থেকে গাফেল করে দেয় সেগুলোকে لَهْوَ বলা হয়। মাঝে মাঝে এমন কাজকেও لَهْوَ বলা হয়, যার কোন উল্লেখযোগ্য উপকারিতা নেই, কেবল সময় ক্ষেপণ অথবা মনোরঞ্জনের জন্যে করা হয়। আলোচ্য আয়াতে (لَهْوَ الْحَدِيثِ) এর অর্থ ও তফসীর কি, এ সম্পর্কে তাফসীরবিদগণের উক্তি বিভিন্নরূপ। ইবনে মাসউদ্দ, ইবনে আব্বাস ও জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহুম এর মতে এর অর্থ, গান-বাদ্য করা। অধিকাংশ সাহাবী, তাবেয়ী ও তফসীরবিদগণের মতে এর অর্থ গান, বাদ্যযন্ত্র ও অনর্থক কিসসা-কাহিনীসহ যেসব বস্তু মানুষকে আল্লাহর ইবাদত ও স্মরণ থেকে গাফেল করে, সেগুলো সবই (لَهْوَ الْحَدِيثِ)। ইমাম বুখারী তার কিতাবে (لَهْوَ الْحَدِيثِ) এর এ তাফসীরই অবলম্বন করেছেন। তিনি বলেন, لَهْوَ الْحَدِيثِ هُوَ الْغِنَاءُ وَأشْبَاهُه অর্থাৎ, (لَهْوَ الْحَدِيثِ) বলে গান ও অনুরূপ অন্যান্য বিষয় বোঝানো হয়েছে যা আল্লাহর ইবাদত থেকে গাফেল করে দেয়।
পূর্বেই বলা হয়েছে যে, অধিকাংশ সাহাবী উল্লেখিত আয়াতে (لَهْوَ الْحَدِيثِ) এর তাফসীর করেছেন গান-বাজনা করা। তবে কোন কোন সাহাবী আয়াতের ব্যাপক তাফসীর করে বলেছেন যে, আয়াতে এমন যে কোন খেলা বোঝানো হয়েছে, যা মানুষকে আল্লাহ থেকে গাফেল করে দেয়। আলেমগণ পবিত্র কুরআনের (لَا يَشْهَدُونَ الزُّورَ) আয়াতের শব্দের তাফসীর করেছেন গান-বাজনা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ “আমার উম্মতের কিছু লোক মদের নাম পাল্টিয়ে তা পান করবে। তাদের সামনে গায়িকারা বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র সহকারে গান করবে। আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে ভূ-গর্ভে বিলীন করে দেবেন এবং কতকের আকৃতি বিকৃত করে বানর ও শূকরে পরিণত করে দেবেন। [বুখারী: ৫৫৯০, আবু দাউদ: ৪০৩৯]
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা’আলা মদ, জুয়া, তবলা ও সারেঙ্গী হারাম করেছেন। তিনি আরও বলেন, নেশাগ্ৰস্ত করে এমন প্রত্যেক বস্তু হারাম। [আহমদ: ১/৩৫০, আবু দাউদ: ৩৬৯৮] এতদ্ভিন্ন বহু প্রমাণ ও নির্ভরযোগ্য হাদীস রয়েছে, যাতে গান-বাদ্য হারাম ও না-জায়েয। বলা হয়েছে, এ ব্যাপারে বিশেষ সতর্কবাণী রয়েছে এবং কঠিন শাস্তির ঘোষণা রয়েছে।
সারকথা এই যে, যেসব কাজ প্রকৃতপক্ষে খেলা; অর্থাৎ যাতে কোন দ্বীনী বা পার্থিব উপকারিতা নেই, সেগুলো অবশ্যই নিন্দনীয় ও মাকরূহ। তবে কতক একেবারে কুফর পর্যন্ত পৌছে যায়, কতক প্রকাশ্য হারাম এবং কতক কমপক্ষে মাকরূহ। যেসব কাজ প্রকৃতই খেলা, তার কোনটিই এ বিধানের বাইরে নয়। বর্তমান যুগে অধিকাংশ যুবক-যুবতী অশ্লীল উপন্যাস, পেশাদার অপরাধীদের কাহিনী অথবা অশ্লীল কবিতা পাঠে অভ্যস্ত। এসব বিষয় উপরোক্ত হারাম খেলারই অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপভাবে পথভ্রষ্ট বাতিলপন্থীদের চিন্তাধারা অধ্যায়ন করাও সর্বসাধারণের জন্যে পথভ্রষ্টতার কারণ বিধায় না-জায়েয। তবে গভীর জ্ঞানের অধিকারী আলেমগণ জওয়াব দানের উদ্দেশ্যে এগুলো পাঠ করলে তাতে আপত্তির কারণ নেই।
খেলার সাজ-সরঞ্জাম ক্ৰয়-বিক্রয়ের বিধান হলো, যেসব সাজ-সরঞ্জাম কুফর অথবা হারাম খেলায় ব্যবহৃত হয়, সেগুলো ক্ৰয়-বিক্রয় করাও হারাম এবং যেগুলো মাকরূহ খেলায় ব্যবহৃত হয়, সেগুলোর ব্যবসা করাও মাকরূহ। পক্ষান্তরে যেসব সাজ-সরঞ্জাম বৈধ ও ব্যতিক্রমভুক্ত খেলায় ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর ব্যবসাও বৈধ এবং যেগুলো বৈধ ও অবৈধ উভয় প্রকার খেলায় ব্যবহার করা হয়; সেগুলোর ব্যবসাও অবৈধ।
এর বাইরে এমনও কতক খেলা রয়েছে যেগুলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশেষভাবে নিষিদ্ধ করেছেন, যদিও সেগুলোতে কিছু কিছু উপকারিতা আছে বলেও উল্লেখ করা হয়, যেমন দাবা, চওসর ইত্যাদি। এগুলোর সাথে হারজিত ও টাকা-পয়সার লেনদেন জড়িত থাকলে এগুলো জুয়া ও অকাট্য হারাম। অন্যথায় কেবল চিত্তবিনোদনের উদ্দেশ্যে খেলা হলেও হাদীসে এসব খেলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি চওসর খেলায় প্রবৃত্ত হয়, সে যেন তার হাতকে শূকরের রক্তে রঞ্জিত করে। [মুসলিম: ২২৬০] এমনিভাবে কবুতর নিয়ে খেলা করাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অবৈধ সাব্যস্ত করেছেন। [আবু দাউদ: ৪৯৪০]
এই নিষেধাজ্ঞার বাহ্যিক কারণ এই যে, সাধারণভাবে এসব খেলায় মগ্ন হলে মানুষ জরুরী কাজকর্ম এমন কি সালাত, সাওম ও অন্যান্য ইবাদত থেকেও অসাবধান হয়ে যায়। তাই সংক্ষেপে এটাই বলা যায় যে, যে খেলায় কোন ধর্মীয় ও পার্থিব উপকারিতা নেই, সেসব খেলাই নিন্দনীয় ও নিষিদ্ধ। যে খেলা শারীরিক ব্যায়াম তথা স্বাস্থ্য রক্ষার জন্যে অথবা অন্য কোন ধর্মীয় ও পার্থিব উপকারিতা লাভের জন্যে অথবা কমপক্ষে মানসিক অবসাদ দূর করার জন্যে খেলা হয়, সে খেলা শরীয়ত অনুমোদন করে, যদি তাতে বাড়াবাড়ি না করা এবং এতে ব্যস্ত থাকার কারণে প্রয়োজনীয় কাজকর্ম বিঘ্নিত না হয়। আর ধর্মীয় প্রয়োজনের নিয়তে খেলা হলে তাতে সওয়াবও আছে। হাদীসে তিনটি খেলাকে নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়েছে তীর নিক্ষেপ, অশ্বারোহণ এবং স্ত্রীর সাথে হাস্যরস করা। [সাঈদ ইবন মানসূর: ২৪৫০, ইবন আবি শাইবাহঃ ৫/৩২০,৩২১ নাসায়ী: আস সুনানুল কুবরা ৪৩৫৪, ৮৯৩৮, ৮৯৩৯, ৮৯৪০, আস-সুগরা: ৬/২৮, ত্বাবরানী: আল-মুজামুল কবীর ১৭৮৫, আবু দাউদ: ২৫১৩, আল-মুনতাকা: ১০৬২, মুসনাদে আহমাদ ৪/১৪৪, ১৪৬, ১৪৮]
কোন কোন বর্ণনায় এর সাথে যোগ করা হয়েছে, সাঁতার কাটা। [ত্ববারানী: মুজামুল কাবীর ২/১৯৩, (১৭৮৬)]। অপর বর্ণনায় এর সাথে যোগ করা হয়েছে, দৌড় প্রতিযোগিতা করা। [নাসায়ী: সুনানুল কুবরা ৫/৩০২, (৮৯৩৯)]। অন্য বর্ণনায় এসেছে, সালামাহ ইবনে আকওয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, জনৈক আনসারী দৌড়ে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। প্রতিযোগিতায় কেউ তাকে হারাতে পারত না। তিনি একদিন ঘোষণা করলেন কেউ আমার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে প্রস্তুত আছে কি? আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে অনুমতি চাইলে তিনি অনুমতি দিলেন। অতঃপর প্রতিযোগিতায় আমি জয়ী হয়ে গেলাম। [মুসলিম: ১৮০৭] এ থেকে জানা গেল যে, দৌড় প্রতিযোগিতা বৈধ।
আবিসিনিয়ার কতিপয় যুবক মদীনা তাইয়্যেবায় সামরিক কলা-কৌশল অনুশীলনকল্পে বর্শা ইত্যাদি নিয়ে খেলায় প্রবৃত্ত ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে নিজের পেছনে দাঁড় করিয়ে তাদের খেলা উপভোগ করাচ্ছিলেন। তিনি তাদেরকে বলেছিলেন খেলাধুলা অব্যাহত রাখ৷ [বুখারী: ৪৫৪] অনুরূপভাবে কোন কোন সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, যখন তারা কুরআন ও হাদীস সম্পর্কিত কাজে ব্যস্ততার ফলে অবসন্ন হয়ে পড়তেন, তখন অবসাদ দূর করার জন্যে মাঝে মাঝে আরবে প্রচলিত কবিতা ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলী দ্বারা মনোরঞ্জন করতেন। এক হাদীসে এরশাদ হয়েছে “তোমরা মাঝে মাঝে অন্তরকে বিশ্রাম ও আরাম দিবে।” [আবু দাউদ: ১৫২৮] এ থেকে অন্তর ও মস্তিষ্কের বিনোদন এবং এর জন্যে কিছু সময় বের করার বৈধতা প্রমাণিত হয়।
(২) “জ্ঞান ছাড়াই” শব্দের সম্পর্ক “কিনে নেয়।” এর সাথেও হতে পারে আবার “বিচ্যুত করে” এর সাথেও হতে পারে। যদি প্রথম বাক্যাংশের সাথে এর সম্পর্ক মেনে নেয়া হয়, তাহলে এর অর্থ হবে, সেই মূর্খ অজ্ঞ লোক এই মনোমুগ্ধকর জিনিসটি কিনে নেয় এবং সে জানে না কেমন মূল্যবান জিনিস বাদ দিয়ে সে কেমন ধ্বংসকর জিনিস কিনে নিচ্ছে। একদিকে আছে জ্ঞান ও সঠিক পথনির্দেশনা সমৃদ্ধ আল্লাহর আয়াত। বিনামূল্যে সে তা লাভ করছে কিন্তু তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। অন্যদিকে রয়েছে সব অর্থহীন ও বাজে জিনিস। সেগুলো চিন্তা ও চরিত্ৰশক্তি ধ্বংস করে দেয়। নিজের টাকা পয়সা খরচ করে সে সেগুলো লাভ করছে। আর যদি একে দ্বিতীয় বাক্যাংশের সাথে সম্পর্কযুক্ত মনে করা হয়, তাহলে এর অর্থ হবে যে, সে জ্ঞান ছাড়াই লোকদের পথ দেখাচ্ছে এবং আল্লাহর সৃষ্টিকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করে সে যে নিজের ঘাড়ে কত বড় জুলুমের দায়ভার চাপিয়ে নিচ্ছে, তা সে জানে না।
তাফসীরে জাকারিয়া(৬) মানুষের মধ্যে কেউ কেউ অজ্ঞ লোকদের আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করার জন্য অসার বাক্য ক্রয় করে[1] এবং আল্লাহর প্রদর্শিত পথ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে।[2] ওদেরই জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি। [3]
[1] সৌভাগ্যবান মানুষরা আল্লাহর কিতাব দ্বারা পথপ্রাপ্ত হন এবং তা শ্রবণ করে উপকৃত হন। তাঁদের কথা উল্লেখের পর ঐ সকল দুর্ভাগ্যবানদের কথা উল্লেখ করা হচ্ছে, যারা আল্লাহর কুরআন শ্রবণ করা থেকে দূরে থাকে, বরং গান-বাজনা ইত্যাদি খুব একাগ্রতার সাথে শোনে এবং তাতে বড় আগ্রহী হয়। এখানে ‘ক্রয় করা’র অর্থ হচ্ছে, গান-বাজনার সামগ্রী (ক্রয় করে) নিজেদের ঘরে নিয়ে আসে এবং তৃপ্তি সহকারে তার সুর ও ঝংকার উপভোগ করে। لَهوَ الحَدِيث (অসার বাক্য) বলতে গান-বাজনা ও তার সামগ্রী, বাঁশি এবং ঐ সকল যন্ত্র যা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাস করে দেয়। কেচ্ছা-কাহিনী, রূপকথা, উপকথা, নাটক, উপন্যাস, অশ্লীল ও সেক্সী পত্র-পত্রিকা এবং বর্তমানের রেডিও, অডিও, টিভি, সিডি, ভিসিয়ার, ভিসিপি, ডিভিডি এবং ভিডিও ফিল্ম ইত্যাদিও এর মধ্যে পড়ে। নবী (সাঃ)-এর যুগে অনেকে গায়িকা ক্রীতদাসী এই উদ্দেশ্যে ক্রয় করত যে, যাতে সে গান শুনিয়ে লোকেদের মন জয় করতে এবং কুরআন ও ইসলাম থেকে দূরে রাখতে পারে। এই অর্থে গায়ক-গায়িকা ও নায়ক-নায়িকাও এসে যায়। বর্তমানে যাদেরকে শিল্পী, ফিল্মী তারকা, সাংস্কৃতিক, না জানি আরো কত রকম সভ্য, চিত্তাকর্ষী এবং মন-মাতানো নামে অভিহিত করা হয়!
[2] এই সকল বস্তুর মাধ্যমে অবশ্যই মানুষ আল্লাহর পথ থেকে ভ্রষ্ট হয়ে যায় এবং দ্বীনকে ঠাট্টা-বিদ্রূপের নিশানা বানায়।
[3] এ সবের পৃষ্ঠপোষক ও উৎসাহদাতা সরকার, প্রতিষ্ঠান বা কারখানার মালিক, পত্র-পত্রিকার সম্পাদক, লেখক বা রচয়িতা এবং সংযোজক ও পরিচালকরাও এই কঠোর শাস্তির ভাগী হবে। (আল্লাহ আমাদের তা থেকে পরিত্রাণ দিন।)
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর তার কাছে যখন আমার আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন সে দম্ভভরে মুখ ফিরিয়ে নেয়, যেন সে শুনতে পায়নি, তার দু’কানে যেন বধিরতা; সুতরাং তাকে যন্ত্রণাদায়ক আযাবের সুসংবাদ দাও। আল-বায়ান
যখন তার কাছে আমার আয়াত আবৃত্তি করা হয়, তখন সে অহংকারবশতঃ এমনভাবে মুখ ফিরিয়ে নেয় যেন সে তা শুনতেই পায়নি, যেন তার দুই কানে বধিরতা আছে, কজেই তাকে ভয়াবহ শাস্তির সুসংবাদ দাও। তাইসিরুল
যখন তার নিকট আমার আয়াত আবৃত্তি করা হয় তখন সে দম্ভভরে মুখ ফিরিয়ে নেয়, যেন সে এটা শুনতে পায়নি, যেন তার কর্ণ দু’টি বধির; অতএব তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও। মুজিবুর রহমান
And when our verses are recited to him, he turns away arrogantly as if he had not heard them, as if there was in his ears deafness. So give him tidings of a painful punishment. Sahih International
৭. আর যখন তার কাছে আমাদের আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হয় তখন সে অহংকারে মুখ ফিরিয়ে নেয় যেন সে এটা শুনতে পায়নি(১), যেন তার কান দুটো বধির; অতএব তাকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সংবাদ দিন।
(১) অহংকারই মূলত কাফের-মুশরিকদেরকে ঈমান থেকে দূরে রেখেছিল। অন্য আয়াতেও আল্লাহ্ তা'আলা এ সত্য প্রকাশ করে বলেছেন, দুর্ভোগ প্রত্যেক ঘোর মিথ্যাবাদী পাপীর, যে আল্লাহর আয়াতসমূহের তিলাওয়াত শোনে অথচ ঔদ্ধত্যের সাথে অটল থাকে যেন সে তা শোনেনি। তাকে সংবাদ দিন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির; যখন আমার কোন আয়াত সে অবগত হয় তখন তা নিয়ে পরিহাস করে। তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি। তাদের পিছনে রয়েছে জাহান্নাম; তাদের কৃতকর্ম তাদের কোন কাজে আসবে না, তারা আল্লাহ্র পরিবর্তে যাদেরকে অভিভাবক স্থির করেছে ওরাও নয়। তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি। [সূরা আল-জাসিয়াহ্ঃ ৭–১০]
তাফসীরে জাকারিয়া(৭) যখন ওদের নিকট আমার বাক্য আবৃত্তি করা হয়, তখন ওরা দম্ভভরে মুখ ফিরিয়ে নেয়; যেন ওরা তা শুনতে পায়নি; যেন ওদের কান দু’টি বধির।[1] অতএব ওদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তির সুসংবাদ দাও।
[1] এটা ঐ সকল মানুষদের অবস্থা, যারা উল্লিখিত অসার ও মন উদাসকারী বস্তুসমূহ নিয়ে মগ্ন থাকে। কুরআনের আয়াত এবং আল্লাহ ও রসূলের কথা শুনতে তারা বধির হয়ে যায় অথচ তারা বধির (বা কালা) নয়। তারা অন্য দিকে এমনভাবে মুখ ফিরিয়ে নেয়, ঠিক যেন তারা শুনতেই পায়নি। কারণ তা শুনতে তারা কষ্ট অনুভব করে। এই জন্য তা শোনাতে তাদের কোন উপকারও হয় না। وَقر এর অর্থ কানের মধ্যে এমন বোঝা, যার ফলে কিছু শোনা যায় না।
তাফসীরে আহসানুল বায়াননিশ্চয় যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তাদের জন্য রয়েছে নিআমতপূর্ণ জান্নাত; আল-বায়ান
যারা ঈমান আনে আর সৎকাজ করে তাদের জন্য আছে নি‘য়ামাতে ভরা জান্নাত। তাইসিরুল
যারা ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে তাদের জন্য রয়েছে সুখ কানন, মুজিবুর রহমান
Indeed, those who believe and do righteous deeds - for them are the Gardens of Pleasure. Sahih International
৮. নিশ্চয় যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে তাদের জন্য রয়েছে নেয়ামতপূর্ণ জান্নাত;
-
তাফসীরে জাকারিয়া(৮) নিশ্চয় যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য আছে সুখের উদ্যানরাজি;
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ানসেখানে তারা স্থায়ী হবে, আল্লাহর ওয়াদা যথার্থ। আর তিনি মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল-বায়ান
তাতে তারা চিরকাল থাকবে। আল্লাহর ও‘য়াদা সত্য আর তিনি মহাপরাক্রমশালী, মহাপ্রজ্ঞাময়। তাইসিরুল
সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। মুজিবুর রহমান
Wherein they abide eternally; [it is] the promise of Allah [which is] truth. And He is the Exalted in Might, the Wise. Sahih International
৯. সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আল্লাহ্র প্রতিশ্রুতি সত্য (অকাট্য)। আর তিনি প্রবল পরাক্রমশালী, হিকমতওয়ালা।(১)
(১) অর্থাৎ নিজের প্রতিশ্রুতি পালন থেকে কোন জিনিসই তাঁকে ঠেকিয়ে রাখতে পারে না এবং তিনি যা কিছু করেন ঠিকমতো জ্ঞান ও ন্যায়পরায়ণতার দাবী অনুযায়ীই করেন। [ইবন কাসীর, ফাতহুল কাদীর; সা'দী]
তাফসীরে জাকারিয়া(৯) সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য।[1] আর তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
[1] অর্থাৎ, তা নিঃসন্দেহে পূর্ণ হবে। কারণ এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি। আর আল্লাহ নিজ ওয়াদা ভঙ্গ করেন না।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানতিনি খুঁটি ছাড়া আসমানসমূহ সৃষ্টি করেছেন, যা তোমরা দেখছ, আর যমীনে স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পাহাড়, যাতে তা তোমাদেরকে নিয়ে হেলে না পড়ে, আর তাতে ছড়িয়ে দিয়েছেন প্রত্যেক প্রকারের প্রাণী; আর আসমান থেকে আমি পানি পাঠাই। অতঃপর তাতে আমি জোড়ায় জোড়ায় কল্যাণকর উদ্ভিদ জন্মাই। আল-বায়ান
তিনি আকাশমন্ডলী নির্মাণ করেছেন স্তম্ভ ছাড়া যা তোমরা দেখছ। তিনি পৃথিবীতে স্থাপন করেছেন দৃঢ়ভাবে দন্ডায়মান পর্বতমালা যাতে পৃথিবী তোমাদেরকে নিয়ে নড়াচড়া না করে আর তাতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সকল প্রকার জীবজন্তু, আর আমিই আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করি, অতঃপর তাতে উদ্গত করি যাবতীয় কল্যাণকর উদ্ভিদ। তাইসিরুল
তিনি আকাশমন্ডলী নির্মাণ করেছেন স্তম্ভ ব্যতীত, তোমরা এটা দেখছ। তিনিই পৃথিবীতে স্থাপন করেছেন পবর্তমালা যাতে এটা তোমাদেরকে নিয়ে ঢলে না পড়ে এবং এতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সর্ব প্রকার জীব-জন্তু এবং আমিই আকাশ হতে বারি বর্ষণ করে এতে উদ্ভব করি সর্বপ্রকার কল্যাণকর উদ্ভিদ। মুজিবুর রহমান
He created the heavens without pillars that you see and has cast into the earth firmly set mountains, lest it should shift with you, and dispersed therein from every creature. And We sent down rain from the sky and made grow therein [plants] of every noble kind. Sahih International
১০. তিনি আসমানসমূহ নির্মাণ করেছেন খুঁটি ছাড়া—তোমরা এটা দেখতে পাচ্ছ; তিনিই যমীনে স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পর্বতমালা যাতে এটা তোমাদেরকে নিয়ে ঢলে না পড়ে এবং এতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সব ধরনের জীব-জন্তু। আর আমরা আকাশ হতে বারি বর্ষণ করি তারপর এতে উদগত করি সব ধরনের কল্যাণকর উদ্ভিদ।
-
তাফসীরে জাকারিয়া(১০) তিনি আকাশমন্ডলীকে স্তম্ভবিহীন নির্মাণ করেছেন; তোমরা তা দেখছ।[1] তিনিই পৃথিবীতে পর্বতমালা স্থাপন করেছেন, যাতে তা তোমাদেরকে নিয়ে আন্দোলিত না হয়[2] এবং এতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সর্বপ্রকার জীবজন্তু।[3] আর আমি আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করে, তাতে সর্বপ্রকার কল্যাণকর উদ্ভিদ উদ্গত করেছি। [4]
[1] تَرَونَهَا যদি عَمَد শব্দটির বিশেষণ হয়, তাহলে অর্থ হবেঃ তিনি আকাশমন্ডলীকে এমন স্তম্ভ ছাড়াই নির্মাণ করেছেন; যা তোমরা দেখতে পাও। অর্থাৎ, আসমানের স্তম্ভ আছে; কিন্তু তা এমন যা, তোমরা দেখতে পাও না।
[2] رَوَاسِي শব্দটি رَاسِيَة এর বহুবচন। যার অর্থঃ স্থিতিশীল। অর্থাৎ, পর্বতমালাকে পৃথিবীর উপর ভারী বোঝা করে রাখা হয়েছে যাতে পৃথিবী স্থির থাকে এবং নড়া-চড়া না করে। এই জন্য পরে বলা হয়েছে, أَن تَمِيدَ بِكُم অর্থাৎ, এই কথা অপছন্দ করে যে, পৃথিবী তোমাদেরকে নিয়ে আন্দোলিত হবে অথবা এই জন্য যে, যাতে পৃথিবী তোমাদেরকে নিয়ে এদিক-ওদিক না দোলে। যেমন সমুদ্র তীরে সামুদ্রিক জাহাজগুলোকে বড় বড় নঙ্গর গেড়ে বেঁধে দেওয়া হয় যাতে জাহাজ সরে না যায়। পৃথিবীর জন্য পর্বতমালাও অনুরূপ নঙ্গর স্বরূপ।
[3] অর্থাৎ, বিভিন্ন প্রকার জীব-জন্তু পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যার কিছু মানুষ ভক্ষণ করে থাকে, কিছু সওয়ারীরূপে ব্যবহার করে, কিছুকে জমি চাষাবাদের কাজে লাগায় এবং কিছুকে সৌন্দর্য স্বরূপ নিজের কাছে রাখে।
[4] زَوج শব্দটি এখানে صِنف (প্রকার বা শ্রেণী)এর অর্থে ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ, সর্বপ্রকার শস্য, ফলমূল ইত্যাদি সৃষ্টি করেছেন। তার বিশেষণ كَريم শব্দ ব্যবহার করে তার সুন্দর রং ও তার বিবিধ উপকারিতার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে ।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানএ আল্লাহর সৃষ্টি; অতএব আমাকে দেখাও, তিনি ছাড়া আর যারা আছে তারা কী সৃষ্টি করেছে! বরং যালিমরা সুস্পষ্ট গোমরাহীতে রয়েছে। আল-বায়ান
এগুলো আল্লাহর সৃষ্টি। কাজেই আমাকে দেখাও তিনি ছাড়া অন্যেরা কী সৃষ্টি করেছে। বরং যালিমরা সুস্পষ্ট গুমরাহীতে ডুবে আছে। তাইসিরুল
এটা আল্লাহর সৃষ্টি! তিনি ছাড়া অন্যরা কি সৃষ্টি করেছে আমাকে দেখাও। সীমালংঘনকারীরাতো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে। মুজিবুর রহমান
This is the creation of Allah. So show Me what those other than Him have created. Rather, the wrongdoers are in clear error. Sahih International
১১. এটা আল্লাহর সৃষ্টি! সুতরাং তিনি ছাড়া অন্যরা কি সৃষ্টি করেছে আমাকে দেখাও। বরং যালিমরা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে।(১)
(১) অর্থাৎ যখন এরা এ বিশ্ব-জাহানে আল্লাহ ছাড়া আর কারো কোন সৃষ্টি চিহ্নিত করতে পারেনি এবং একথা সুস্পষ্ট যে, তারা তা করতে পারে না তখন তাদের যারা স্রষ্টা নয় এমন সত্ত্বকে আল্লাহর একচ্ছত্র ও সার্বভৌম কর্তৃত্বে শরীক করা, তাদের সামনে আনুগত্যের শিরা নত করা এবং তাদের কাছে প্রার্থনা করা ও অভাব মোচন করার জন্য আবেদন জানানোকে সুস্পষ্ট নিৰ্বদ্ধিতা ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে?
তাফসীরে জাকারিয়া(১১) এ আল্লাহর সৃষ্টি![1] তিনি ব্যতীত অন্যেরা কি সৃষ্টি করেছে আমাকে দেখাও তো।[2] বরং সীমালংঘনকারীরা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে।
[1] هٰذَا (এ) শব্দ দ্বারা আল্লাহর ঐ সকল সৃষ্টিকৃত বস্তুর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, যার উল্লেখ পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে রয়েছে।
[2] যাদের তোমরা ইবাদত কর এবং সাহায্যের জন্য যাদেরকে ডেকে থাকো তারা আকাশ ও পৃথিবীর কোন্ বস্তুটি সৃজন করেছে? তাদের সৃজনকৃত একটি বস্তুও দেখাও তো। অতএব যখন সকল বস্তুর সৃষ্টিকর্তা একমাত্র আল্লাহ তাআলা, তখন ইবাদতের একমাত্র অধিকারীও তিনিই। তিনি ছাড়া বিশ্বজগতে আর এমন কেউ নেই, যে ইবাদতের যোগ্য হতে পারে এবং তার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা যেতে পারে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর আমি তো লুকমানকে হিকমাত* দিয়েছিলাম (এবং বলেছিলাম) যে, ‘আল্লাহর শুকরিয়া আদায় কর। আর যে শুকরিয়া আদায় করে সে তো নিজের জন্যই শুকরিয়া আদায় করে এবং যে অকৃতজ্ঞ হয় (তার জেনে রাখা উচিত) আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, প্রশংসিত’। আল-বায়ান
আমি লুকমানকে প্রজ্ঞা দান করেছিলাম। (তাকে বলেছিলাম) যে, তুমি আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, সে তা নিজের কল্যাণেই করে। আর কেউ অকৃতজ্ঞ হলে (সে জেনে রাখুক যে) আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, প্রশংসিত। তাইসিরুল
আমি অবশ্যই লুকমানকে জ্ঞান দান করেছিলাম এবং বলেছিলামঃ আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সেতো তা করে নিজের জন্য এবং কেহ অকৃতজ্ঞ হলে আল্লাহতো অভাবমুক্ত, প্রশংসা। মুজিবুর রহমান
And We had certainly given Luqman wisdom [and said], "Be grateful to Allah." And whoever is grateful is grateful for [the benefit of] himself. And whoever denies [His favor] - then indeed, Allah is Free of need and Praiseworthy. Sahih International
১২. আর অবশ্যই আমরা লুকমান(১) কে হিকমত(২) দিয়েছিলাম এবং বলেছিলাম যে, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। আর যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সে তো তা করে নিজেরই জন্য এবং কেউ অকৃতজ্ঞ হলে আল্লাহ তো অভাবমুক্ত, চির প্রশংসিত।(৩)
(১) কোন কোন তাবে’ঈ আলোচ্য আয়াতে বর্ণিত লুকমানকে আইয়্যুব আলাইহিস সালাম এর ভাগ্নে বলেছেন। আবার কেউ কেউ তার খালাতো ভাই বলে বর্ণনা করেছেন। বিভিন্ন তফসীরে রয়েছে যে, তিনি দীর্ঘায়ু লাভ করেছিলেন এবং দাউদ আলাইহিস সালাম-এর সময়েও বেঁচে ছিলেন। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, লুকমান ছিলেন একজন হাবশী গোলাম। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু, মুজাহিদ, ইকরিমাহ ও খালেদ আর-রাবাঈও একথাই বলেন। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তিনি ছিলেন নূবার অধিবাসী। অপর বর্ণনায় তিনি বলেন, লুকমান চেপ্টা নাকবিশিষ্ট, বেঁটে আকারের হাবশী ক্রীতদাস ছিলেন।
সাঈদ ইবনে মুসাইয়েবের উক্তি হচ্ছে, তিনি মিসরের কালো লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। মুজাহিদ বলেন, তিনি ফাটা পা ও পুরু ঠোঁটবিশিষ্ট হাবশী ক্রীতদাস ছিলেন। এ বক্তব্যগুলো প্রায় কাছাকাছি অবস্থান করছে। কারণ আরবের লোকেরা কালো বর্ণের মানুষদেরকে সেকালে প্রায়ই হাবশী বলতো। আর নূবা হচ্ছে মিসরের দক্ষিণে এবং সুদানের উত্তরে অবস্থিত একটি এলাকা। তাই উক্ত বক্তব্যগুলোতে একই ব্যক্তিকে নূবী, মিসরীয় ও হাবশী বলা কেবলমাত্র শাব্দিক বিরোধ ছাড়া আর কিছুই নয়। অর্থের দিক দিয়ে এখানে কোন বিরোধ নেই। এ ব্যক্তি আসলে বাসিন্দা ছিলেন মাদয়ান ও আইল (বর্তমান আকাবাহ) এলাকার। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমার বর্ণনা অনুযায়ী লুকমান কাঠ চেরার কাজ করতেন। আবার কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, তিনি দর্জি ছিলেন।
কোন কোন গবেষক লুকমানকে আদ জাতির অন্তর্ভুক্ত ইয়ামনের বাদশাহ মনে করতো। তাদের মতে আদ জাতির ওপর আল্লাহর আযাব নাযিল হবার পর হূদ আলাইহিস সালামের সাথে তাদের যে ঈমানদার অংশটি বেঁচে গিয়েছিল লুকমান ছিলেন তাঁদেরই বংশোদ্ভূত। ইয়ামনে এ জাতির যে শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তিনি ছিলেন তার অন্যতম শাসক ও বাদশাহ। কিন্তু প্ৰবীণ সাহাবী ও তাবেঈদের মাধ্যমে প্রাপ্ত অন্য বর্ণনাগুলো এর সম্পূর্ণ বিপরীত। সম্ভবত: এর কারণ হচ্ছে, ইতিহাসে লুকমান ইবন আদ নামক এক ব্যক্তি প্ৰসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। কোন কোন গবেষক তাকে এই লুকমান হাকীমই ধরে নিয়েছেন। আল্লামা সুহাইলী এ সন্দেহ অপনোদন করে বলেছেন যে, লুকমান হাকীম ও লুকমান ইবনে আদ দু'জন আলাদা ব্যক্তি। তাদেরকে এক ব্যক্তি মনে করা ঠিক নয়।
লুকমান কোন নবী ছিলেন না; বরং ওলী, প্রজ্ঞাবান ও বিশিষ্ট মনীষী ছিলেন। ইবনে কাসীর বলেন যে, প্রাচীন ইসলামী মনীষীবৃন্দ এ ব্যাপারে একমত যে, তিনি নবী ছিলেন না। কেবল ইকরিমা থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি নবী ছিলেন। কিন্তু এর বর্ণনাসূত্র বা সনদ দুর্বল। ইমাম বগবী বলেন, একথা সর্বসম্মত যে, তিনি বিশিষ্ট ফকীহ ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি ছিলেন, নবী ছিলেন না। ইবনে কাসীর আরো বলেন, তার সম্পর্কে কাতাদাহ থেকে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ লুকমানকে নবুওয়ত ও হেকমত বা প্রজ্ঞা-দুয়ের মধ্যে যে কোন একটি গ্রহণের সুযোগ দেন। তিনি হেকমতই গ্ৰহণ করেন। কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, তাকে নবুওয়ত গ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়েছিল। তিনি আরয করলেন যে, “যদি আমার প্রতি এটা গ্ৰহণ করার নির্দেশ হয়ে থাকে, তবে তা শিরোধার্য। অন্যথায় আমাকে ক্ষমা করুন।”
কাতাদাহ্ থেকে আরও বর্ণিত আছে যে, লুকমানের নিকট এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, আপনি হেকমতকে নবুওয়ত থেকে সমধিক গ্রহণযোগ্য কেন মনে করলেন, যখন আপনাকে যে কোন একটা গ্ৰহণ করার অধিকার দেয়া হয়েছিল? তিনি বললেন যে, নবুওয়ত বিশেষ দায়িত্বপূর্ণ পদ। যদি তা আমার ইচ্ছা ব্যতীত প্রদান করা হতো, তবে স্বয়ং মহান আল্লাহ তার দায়িত্ব গ্রহণ করতেন যাতে আমি সে কর্তব্যসমূহ পালন করতে সক্ষম হই। কিন্তু যদি আমি তা স্বেচ্ছায় চেয়ে নিতাম, তবে সে দায়িত্ব আমার উপর বর্তাতো। বর্ণিত আছে যে, দাউদ আলাইহিস সালাম-এর আবির্ভাবের পূর্বে লুকমান শরীয়তী মাসআলাসমূহ সম্পর্কে জনগণের নিকট ফতোয়া দিতেন। দাউদ আলাইহিস সালাম-এর নবুওয়ত প্ৰাপ্তির পর তিনি এ ফতোয় প্রদান কার্য পরিত্যাগ করেন এই বলে যে, এখন আর তার প্রয়োজন নেই।
কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, তিনি ইসরাঈল গোত্রের বিচারপতি ছিলেন। লুকমানের বহু জ্ঞানগর্ভ বাণী লিপিবদ্ধ আছে। কোন কোন তাবেয়ী বলেন, আমি লুকমানের জ্ঞান-বিজ্ঞানের দশ হাজারের চাইতেও বেশী অধ্যায় অধ্যায়ন করেছি। একদিন লুকমান এক বিরাট সমাবেশে উপস্থিত জনমণ্ডলীকে বহু জ্ঞানগর্ভ কথা শোনাচ্ছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞেস করলো যে, আপনি কি সে ব্যক্তি -যে আমার সাথে অমুক বনে ছাগল চরাতো? লুকমান বলেন, হ্যাঁ-আমিই সে লোক। অতঃপর লোকটি বললো, তবে আপনি এ মর্যাদা কিভাবে লাভ করলেন যে, আল্লাহর গোটা সৃষ্টিকুল আপনার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে এবং আপনার বাণী শোনার জন্যে দূর-দূরান্ত থেকে এসে জমায়েত হয়? উত্তরে লুকমান বললেন যে, এর কারণ আমার দুটি কাজ-[এক] সর্বদা সত্য বলা, [দুই] অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা পরিহার করা। অপর এক বর্ণনায় আছে যে, লুকমান বলেছেন, এমন কতগুলো কাজ আছে যা আমাকে এর স্তরে উন্নীত করেছে। যদি তুমি তা গ্রহণ কর, তবে তুমিও এ মর্যাদা ও স্থান লাভ করতে পারবে। সে কাজগুলো এইঃ নিজের দৃষ্টি নিম্নমুখী রাখা এবং মুখ বন্ধ করা, হালাল জীবিকাতে তুষ্ট থাকা, নিজের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করা, সত্য কথায় অটল থাকা, অঙ্গীকার পূর্ণ করা, মেহমানের আদর-আপ্যায়ন ও তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, প্রতিবেশীর প্রতি সর্বদা লক্ষ্য রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় কাজ ও কথা পরিহার করা। [ইবন কাসীর: আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ]
(২) হেকমত অর্থ প্রজ্ঞা, জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা, পাণ্ডিত্য, যুগ ও সময়োপযোগী কথা বলা ও কাজ করার যোগ্যতা ইত্যাদি। [তাবারী, ইবন কাসীর বাগভী]
(৩) অর্থাৎ যে ব্যক্তি কুফরী করে তার কুফারী তার নিজের জন্য ক্ষতিকর। এতে আল্লাহর কোন ক্ষতি হয় না। তিনি অমুখাপেক্ষী। কারো কৃতজ্ঞতার মুখাপেক্ষী নন। কারো কৃতজ্ঞতা তাঁর সার্বভৌম কর্তৃত্বে কোন বৃদ্ধি ঘটায় না। বান্দার যাবতীয় নিয়ামত যে একমাত্র তাঁরই দান, কারো অকৃতজ্ঞতা ও কুফৱী এ জাজ্জ্বল্যমান সত্যে কোন পরিবর্তন ঘটাতে পারে না। কেউ তাঁর প্রশংসা করুক বা নাই করুক তিনি আপনা আপনিই প্রশংসিত। বিশ্ব-জাহানের প্রতিটি অণু-কণিকা তাঁর পূর্ণতা ও সৌন্দর্য এবং তাঁর স্রষ্টা ও অন্নদাতা হবার সাক্ষ্য দিচ্ছে এবং প্রত্যেকটি সৃষ্ট বস্তু নিজের সমগ্র সত্তা দিয়ে তাঁর প্রশংসা গেয়ে চলছে। [ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(১২) আমি লুকমানকে প্রজ্ঞা দান করেছিলাম[1] (আর বলেছিলাম), ‘তুমি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।[2] যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সে তো তা নিজেরই জন্য করে এবং কেউ অকৃতজ্ঞতা করলে নিশ্চয় আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসার্হ।’
[1] লুকমান আল্লাহর একজন নেক বান্দা ছিলেন, যাঁকে আল্লাহ তাআলা হিকমত অর্থাৎ, সাধারণ জ্ঞান-বুদ্ধি এবং দ্বীনী ইলমে উচ্চ স্থান দান করেছিলেন। একদা তাঁকে কেউ জিজ্ঞাসা করল যে, ‘আপনি এই জ্ঞান-বুদ্ধি কিভাবে অর্জন করলেন?’ তার উত্তরে তিনি বললেন, ‘সত্যবাদিতা ব্যবহার করে, আমানত রক্ষা করে, বাজে কথা থেকে দূরে থেকে এবং নীরবতা অবলম্বন করে।’ তাঁর প্রজ্ঞা ও হিকমত পূর্ণ একটি ঘটনা এ রকমও প্রসিদ্ধ আছে যে, তিনি একজন দাস ছিলেন। একদা তাঁকে তাঁর মালিক বললেন, ‘ছাগল যবেহ করে তার মধ্য হতে সর্বোৎকৃষ্ট দুই টুকরো কেটে নিয়ে এস।’ সুতরাং তিনি জিভ ও হৃৎপিণ্ড নিয়ে এসে দিলেন। অন্য এক দিন তাঁর মালিক তাঁকে ছাগল যবেহ করে তার মধ্য হতে সব থেকে নিকৃষ্ট দুই টুকরো নিয়ে আসার আদেশ করলে তিনি পুনরায় জিভ ও হৃৎপিণ্ড নিয়ে উপস্থিত হলেন। এর কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তরে বললেন, ‘জিভ ও হৃৎপিণ্ড যদি ঠিক থাকে, তাহলে তা সর্বোৎকৃষ্ট জীব। আর যদি তা নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে তার চেয়ে নিকৃষ্ট জীব আর কিছু হতে পারে না। (ইবনে কাসীর)
[2] কৃতজ্ঞতা বা শুক্র এর অর্থ হল, আল্লাহর নিয়ামতের উপর তাঁর প্রশংসা করা এবং তাঁর আদেশ মেনে চলা।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর স্মরণ কর, যখন লুকমান তার পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিল, ‘প্রিয় বৎস, আল্লাহর সাথে শিরক করো না; নিশ্চয় শিরক হল বড় যুলম'। আল-বায়ান
স্মরণ কর, যখন লুকমান তার ছেলেকে নসীহত ক’রে বলেছিল- হে বৎস! আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শিরক কর না, শিরক হচ্ছে অবশ্যই বিরাট যুলম। তাইসিরুল
স্মরণ কর, যখন লুকমান উপদেশাচ্ছলে তার পুত্রকে বলেছিলঃ হে বৎস! আল্লাহর সাথে কোন শরীক করনা। নিশ্চয়ই শিরক হচ্ছে চরম যুলম। মুজিবুর রহমান
And [mention, O Muhammad], when Luqman said to his son while he was instructing him, "O my son, do not associate [anything] with Allah. Indeed, association [with him] is great injustice." Sahih International
১৩. আর স্মরণ করুন, যখন লুকমান উপদেশ দিতে গিয়ে তার পুত্ৰকে বলেছিল, হে আমার প্রিয় বৎস! আল্লাহর সাথে কোন শির্ক করো না। নিশ্চয় শির্ক বড় যুলুম।(১)
(১) জ্ঞানগর্ভ বাণীসমূহের মধ্যে সর্বাগ্রে হলো আকীদাসমূহের পরিশুদ্ধিতার ব্যাপারে কথা বলা। সে জন্য লুকমানের সর্বপ্রথম কথা হলো কোন প্রকারের অংশীদারিত্ব স্থির না করে আল্লাহ কে গোটা বিশ্বের স্রষ্টা ও প্ৰভু বলে বিশ্বাস করা। সাথে সাথে আল্লাহর কোন সৃষ্ট বস্তুকে স্রষ্টার সমমর্যাদাসম্পন্ন মনে করার মত গুরুতর অপরাধ দুনিয়াতে আর কিছু হতে পারে না। তাই তিনি বলেছেন, “হে আমার প্রিয় বৎস, আল্লাহর অংশীদার স্থির করো না, অংশীদার স্থাপন করা গুরুতর যুলুম। জুলুমের প্রকৃত অর্থ হচ্ছে, কারো অধিকার হরণ করা এবং ইনসাফ বিরোধী কাজ করা। শির্ক এ জন্য বৃহত্তর জুলুম যে, মানুষ এমন সব সত্তাকে তার নিজের স্রষ্টা, রিযিকদাতা ও নিয়ামতদানকারী হিসেবে বরণ করে নেয়, তার সৃষ্টিতে যাদের কোন অংশ নেই। তাকে রিযিক দান করার ক্ষেত্রে যাদের কোন দখল নেই এবং মানুষ এ দুনিয়ায় যেসব নিয়ামত লাভে ধন্য হচ্ছে সেগুলো প্ৰদান করার ব্যাপারে যাদের কোন ভূমিকাই নেই। এটা এত বড় অন্যায়, যার চেয়ে বড় কোন অন্যায়ের কথা চিন্তাই করা যায় না। তারপর মানুষ একমাত্র তার স্রষ্টারই বন্দেগী করবে, এটা মানুষের ওপর তার স্রষ্টার অধিকার। কিন্তু সে অন্যের বন্দেগী ও পূজা-অৰ্চনা করে তাঁর অধিকার হরণ করে।
তারপর স্রষ্টা ছাড়া অন্য সত্তার বন্দেগী ও পূজা করতে গিয়ে মানুষ যে কাজই করে তাতে সে নিজের দেহ ও মন থেকে শুরু করে পৃথিবী ও আকাশের বহু জিনিস ব্যবহার করে। অথচ এ সমস্ত জিনিস এক লা-শরীক আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন এবং এর মধ্যে কোন জিনিসকে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো বন্দেগীতে ব্যবহার করার অধিকার তার নেই। তারপর মানুষ নিজেকে লাঞ্ছনা ও দুর্ভোগের মধ্যে ঠেলে দেবে না, তার নিজের ওপর এ অধিকার রয়েছে। কিন্তু সে স্রষ্টাকে বাদ দিয়ে সৃষ্টির বন্দেগী করে নিজেকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করে এবং এই সঙ্গে শাস্তির যোগ্যও বানায়। এভাবে একজন মুশরিকের সমগ্র জীবন একটি সৰ্বমুখী ও সার্বক্ষণিক যুলুমে পরিণত হয়। তার কোন একটি মুহুৰ্তও যুলুমমুক্ত নয়। পক্ষান্তরে মুমিন এ ধরনের অবস্থা থেকে মুক্ত। হাদীসে এসেছে, যখন নাযিল হল “যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের ঈমানের সাথে যুলুমের সংমিশ্রণ ঘটায়নি তাদের জন্যই রয়েছে নিরাপত্তা।” [সূরা আল-আন’আম: ৮২] তখন সাহাবায়ে কিরাম অত্যন্ত ভীত হয়ে গেলেন; (কারণ তারা যুলুমের আভিধানিক অর্থ ধরে নিয়েছিলেন)। তারা বলতে লাগলেন, আমাদের কেউ কি এমন আছে যে, যার ঈমানের সাথে যুলুম নেই? তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এটা সেই যুলুম নয় (যার ভয় তোমরা করছ)। তোমরা কি শুননি লুকমান তার ছেলেকে কি বলেছে, তিনি বলেছেনঃ নিশ্চয় শির্ক হচ্ছে বড় যুলুম। [বুখারী: ৪৭৭৬]
তাফসীরে জাকারিয়া(১৩) (স্মরণ কর) যখন লুকমান উপদেশচ্ছলে তার পুত্রকে বলেছিল, ‘হে বৎস! আল্লাহর কোন অংশী করো না।[1] আল্লাহর অংশী করা তো চরম অন্যায়।’ [2]
[1] আল্লাহ্ তাআলা লুকমান হাকীমের সর্বপ্রথম অসিয়ত এই উল্লেখ করেছেন যে, তিনি নিজ ছেলেকে শিরক করতে নিষেধ করেছিলেন। যাতে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, পিতা-মাতার কর্তব্য হল, নিজেদের সন্তানদেরকে শিরক থেকে বাঁচানোর সর্বপ্রথম ও সর্বাধিক বেশী চেষ্টা করা।
[2] অনেকের নিকট এ বাক্যাংশটি লুকমান হাকীমের উক্তি। আবার অনেকে এটিকে আল্লাহর উক্তি বলেছেন এবং তার সমর্থনে (الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمَانَهُمْ بِظُلْمٍ) আয়াতটি অবতীর্ণ সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। যাতে সাহাবাগণ বললেন, ‘আমাদের কে আবার যুলম করে না?’ সুতরাং তারই পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হল, (إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ) (বুখারী ৪৭৭৬নং) কিন্তু আসলে এতে ঐ কথা আল্লাহর উক্তি হওয়ার বা না হওয়ার কোন প্রমাণ হয় না। পক্ষান্তরে অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর সাহাবাগণ তা বড় কঠিন মনে করে নবী (সাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলেন এবং তিনি তার উত্তরে বললেন, ‘‘তোমরা যা ধারণা করছ, তা নয়। এখানে যুলম বলতে সেই যুলমকে বুঝানো হয়েছে, যার কথা লুকমান তাঁর ছেলেকে বলেছিলেন, (يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ) (বুখারী) এ বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, ঐ উক্তি লুকমান হাকীমেরই ছিল।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর আমি মানুষকে তার মাতাপিতার ব্যাপারে (সদাচরণের) নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট ভোগ করে তাকে গর্ভে ধারণ করে। আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দু’বছরে; সুতরাং আমার ও তোমার পিতা-মাতার শুকরিয়া আদায় কর। প্রত্যাবর্তন তো আমার কাছেই। আল-বায়ান
আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করে। তার দুধ ছাড়ানো হয় দু’বছরে, (নির্দেশ দিচ্ছি) যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতামাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। (তোমাদের সকলের) প্রত্যাবর্তন তো আমারই কাছে। তাইসিরুল
আমিতো মানুষকে তার মাতাপিতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। মা সন্তানকে কষ্টের পর কষ্ট বরণ করে গর্ভে ধারণ করে এবং তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। সুতরাং আমার প্রতি ও তোমার মাতাপিতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। প্রত্যাবর্তনতো আমারই নিকট। মুজিবুর রহমান
And We have enjoined upon man [care] for his parents. His mother carried him, [increasing her] in weakness upon weakness, and his weaning is in two years. Be grateful to Me and to your parents; to Me is the [final] destination. Sahih International
১৪. আর আমরা মানুষকে তাঁর পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট বরণ করে গর্ভে ধারণ করে, আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দু’বছরে। কাজেই আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।(১) ফিরে আসা তো আমারই কাছে।
(১) এখানে যখন পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য পালন এবং তাদের কৃতজ্ঞতা স্বীকারের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে, তখন এর হেকমত ও অন্তর্নিহিত রহস্য এই বর্ণনা করেছেন যে, তার মা ধরাধামে তার আবির্ভাব ও অস্তিত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রে অসাধারণ ত্যাগ স্বীকার ও অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট বরদাশত করেছেন। নয় মাস কাল উদরে ধারণ করে তার রক্ষণাবেক্ষণ করেছেন এবং এ কারণে ক্রমবর্ধমান দুঃখ-কষ্ট বরদাশত করেছেন। আবার ভূমিষ্ট হওয়ার পরও দু’বছর পর্যন্ত স্তন্যদানের কঠিন ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। যাতে দিন-রাত মাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। ফলে তার দুর্বলতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। আর সন্তানের লালন-পালন করার ক্ষেত্রে মাকেই যেহেতু অধিক বুকি-ঝামেলা বহন করতে হয়, সেজন্য শরীয়তে মায়ের স্থান ও অধিকার পিতার অগ্রে রাখা হয়েছে। যদি পিতা-মাতার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা না হয় তাতে আল্লাহরও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয় না। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে কেউ মানুষের কাছে কৃতজ্ঞ হয় না সে আল্লাহর কাছেও কৃতজ্ঞ হতে পারে না।” [আবু দাউদ: ৪৮১১, তিরমিযী: ১৯৫৪, মুসনাদে আহমাদ: ২/২৯৫]
তাফসীরে জাকারিয়া(১৪) আমি তো মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি।[1] জননী কষ্টের পর কষ্ট বরণ করে সন্তানকে গর্ভে ধারণ করে[2] এবং তার স্তন্যপান ছাড়াতে দু বছর অতিবাহিত হয়।[3] সুতরাং তুমি আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। আমারই নিকট (সকলের) প্রত্যাবর্তন।
[1] তাওহীদ গ্রহণ (শিরক বর্জন) ও আল্লাহর ইবাদতের সাথে সাথে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার তাকীদপূর্ণ আদেশের জন্য উক্ত নসীহতের গুরুত্ব স্পষ্ট।
[2] উদ্দেশ্য এই যে, মাতৃগর্ভে বাচ্চা যত বাড়ে, মায়ের উপর কষ্টের বোঝা তত বাড়তে থাকে, যার ফলে মা দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে থাকে। মায়ের কষ্টের কথা উল্লেখে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, পিতা-মাতার অধিকার আদায় করার সময় মাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যেমন হাদীসেও সে কথা বর্ণিত হয়েছে।
[3] এতে বুঝা যায় যে, শিশুকে দুধ পান করানোর সময় হল দুই বছর, তার অধিক নয়।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর যদি তারা তোমাকে আমার সাথে শিরক করতে জোর চেষ্টা করে, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তখন তাদের আনুগত্য করবে না এবং দুনিয়ায় তাদের সাথে বসবাস করবে সদ্ভাবে। আর অনুসরণ কর তার পথ, যে আমার অভিমুখী হয়। তারপর আমার কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তখন আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেব, যা তোমরা করতে। আল-বায়ান
তোমার পিতামাতা যদি তোমাকে পীড়াপীড়ি করে আমার অংশীদার স্থির করার জন্য যার জ্ঞান তোমার নেই, তবে তুমি তাদের কথা মানবে না। কিন্তু পৃথিবীতে তাদের সাথে সদ্ভাবে বসবাস করবে। যে আমার অভিমুখী হয় তার পথ অনুসরণ করবে। অতঃপর আমারই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তখন আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেব তোমরা যা করছিলে। তাইসিরুল
তোমার মাতা-পিতা যদি তোমাকে পীড়াপীড়ি করে আমার সাথে শরীক করতে যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই তাহলে তুমি তাদের কথা মানবেনা। তবে পৃথিবীতে তাদের সাথে বসবাস করবে সদ্ভাবে এবং যে বিশুদ্ধ চিত্তে আমার অভিমুখি হয়েছে তার পথ অবলম্বন কর, অতঃপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন আমারই নিকট এবং তোমরা যা করতে সে বিষয়ে আমি তোমাদেরকে অবহিত করব। মুজিবুর রহমান
But if they endeavor to make you associate with Me that of which you have no knowledge, do not obey them but accompany them in [this] world with appropriate kindness and follow the way of those who turn back to Me [in repentance]. Then to Me will be your return, and I will inform you about what you used to do. Sahih International
১৫. আর তোমার পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার সাথে শির্ক করার জন্য পীড়াপীড়ি করে, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই(১), তাহলে তুমি তাদের কথা মেনো না এবং দুনিয়াতে তাদের সাথে বসবাস করবে সদ্ভাবে(২) আর যে আমার অভিমুখী হয়েছে তার পথ অনুসরণ কর। তারপর তোমাদের ফিরে আসা আমারই কাছে, তখন তোমরা যা করতে সে বিষয়ে আমি তোমাদেরকে অবিহিত করব।
(১) অর্থাৎ তোমার জানা মতে যে আমার সাথে শরীক নয়। অথবা তুমি আমার কোন শরীক আছে বলে জান না। তুমি তো শুধু এটাই জান যে, আমি এক, আমার কোন শরীক নেই। এমতাবস্থায় কিভাবে তুমি তোমার পিতা-মাতার কথা মানতে পার? অন্যায়কে যেন তুমি প্রশ্রয় না দাও। শির্ক গুরুতর অপরাধ হওয়ার কারণেই আল্লাহর নির্দেশ এই যে, যদিও সন্তানের প্রতি পিতা-মাতাকে মান্য করার ও তাদের কৃতজ্ঞতা স্বীকারের বিশেষ তাকীদ রয়েছে এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সাথে সাথে পিতা-মাতার প্রতিও তা করার জন্যে সন্তানকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু শির্ক এমন গুরুতর অন্যায় ও মারাত্মক অপরাধ যে, মাতা-পিতার নির্দেশে, এমন কি বাধ্য করার পরও কারো পক্ষে তা জায়েয হয়ে যায় না।
যদি কারো পিতা-মাতা তাকে আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপনে বাধ্য করতে চেষ্টা করতে থাকেন, এ বিষয়ে পিতা-মাতার কথাও রক্ষা করা জায়েয নয়। যেমনটি হয়েছিল, সা'দ ইবন আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে তার মায়ের আচরণ। তিনি ইসলাম গ্রহণ করলে তার মা শপথ করলেন যে, যতক্ষণ তুমি আবার পূর্ববর্তী দ্বীনে ফিরে না আসবে ততক্ষণ আমি কোন খাবার গ্রহণ করবনা। কিন্তু সা’দ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তার এ কথা মান্য করলেন না। তার সমর্থনেই এই আয়াত নাযিল হয়। [মুসলিম: ১৭৪৮]
(২) যদি পিতা-মাতা আল্লাহর অংশী স্থাপনে বাধ্য করার চেষ্টা করেন, তখন আল্লাহর নির্দেশ হল তাদের কথা না মানা। এমতাবস্থায় মানুষ স্বভাবতঃ সীমার মধ্যে স্থির থাকে না। এ নির্দেশ পালন করতে গিয়ে সন্তানের পক্ষে পিতা-মাতার প্রতি কটু বাক্য প্রয়োগ ও অশোভন আচরণ করে তাদেরকে অপমানিত করার সম্ভাবনা ছিল। ইসলাম তো ন্যায়নীতির জ্বলন্ত প্রতীক — প্রত্যেক বস্তুরই একটি সীমা আছে। তাই অংশীদার স্থাপনের বেলায় পিতা-মাতার অনুসরণ না করার নির্দেশের সাথে সাথে এ হুকুমও প্ৰদান করেছে যে, দ্বীনের বিরুদ্ধে তো তাদের কথা মানবে না, কিন্তু পার্থিব কাজকর্ম যথা শারীরিক সেবা-যত্ন বা ধন-সম্পদ ব্যয় ও অন্যান্য ক্ষেত্ৰে যেন কার্পণ্য প্রদর্শিত না হয়। তাদের প্রতি বেআদবী ও অশালীনতা প্রদর্শন করো না।
তাদের কথাবার্তার এমনভাবে উত্তর দিবে না, যাতে অহেতুক মনোবেদনার উদ্রেক করে। মোটকথা, শিরক-কুফরীর ক্ষেত্রে তাদের কথা না মানার কারণে যে মর্মপীড়ার উদ্রেক হবে, তা তো অপারগতা হেতু বরদাশত করবে, কিন্তু প্রয়োজনকে তার সীমার মধ্যেই রাখতে হবে। অন্যান্য ব্যাপারে যেন মনোকষ্টের কারণ না ঘটে সে সম্পর্কে সচেতন থাকবে। [কুরতুবী, তাবারী, সা’দী]
তাফসীরে জাকারিয়া(১৫) তোমার পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার অংশী করতে পীড়াপীড়ি করে, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের কথা মান্য করো না, তবে পৃথিবীতে তাদের সঙ্গে সদভাবে বসবাস কর এবং যে ব্যক্তি আমার অভিমুখী হয়েছে তার পথ অবলম্বন কর,[1] অতঃপর আমারই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন এবং তোমরা যা করতে, আমি সে বিষয়ে তোমাদেরকে অবহিত করব। [2]
[1] অর্থাৎ, (বিশ্বাসী) মুমিনের পথ।
[2] অর্থাৎ, আমার অভিমুখী বিশ্বাসীর পথ অনুসরণ এই জন্য করবে যে, অবশেষে তোমাদের সকলকেই আমারই নিকট ফিরে আসতে হবে এবং আমারই পক্ষ থেকে সকলকেই তার ভাল-মন্দ কর্মের প্রতিফল দেওয়া হবে। যদি তোমরা আমার পথ অনুসরণ কর এবং আমাকে স্মরণ রেখে নিজেদের জীবন পরিচালিত কর, তাহলে কিয়ামতের দিন আমার বিচারালয়ে তোমাদের মুখ উজ্জ্বল হওয়ার আশা করা যায়। পক্ষান্তরে এর বিপরীত কর্মে আমার আযাবে গ্রেফতার হবে। কথা লুকমান হাকীমের অসিয়ত প্রসঙ্গে চলছিল। সামনে পুনরায় সেই অসিয়ত বর্ণনা করা হচ্ছে, যা তিনি আপন বৎসকে করেছিলেন। মাঝের দুটি আয়াতে পৃথকভাবে আল্লাহ তাআলা পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার গুরুত্ব বর্ণনা করেছেন। যার প্রথম কারণ এই বলা হয়েছে যে, লুকমান উক্ত অসিয়ত তাঁর ছেলেকে করেননি। কারণ, এতে তাঁর নিজস্ব স্বার্থ ছিল। দ্বিতীয় কারণ এই যে, যাতে এটা পরিষ্ফুটিত হয়ে যায় যে,আল্লাহর একত্ব ও ইবাদতের পর পিতা-মাতার আনুগত্য ও তাদের সেবা করা জরুরী। তৃতীয় কারণ এই যে, শিরক করা এত বড় পাপ যে, যদি পিতা-মাতা তা করার আদেশ করেন, তাহলে তাঁদের কথা মানা চলবে না।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান‘হে আমার প্রিয় বৎস, নিশ্চয় তা (পাপ-পুণ্য) যদি সরিষা দানার পরিমাণ হয়, অতঃপর তা থাকে পাথরের মধ্যে কিংবা আসমানসমূহে বা যমীনের মধ্যে, আল্লাহ তাও নিয়ে আসবেন; নিশ্চয় আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী, সর্বজ্ঞ’। আল-বায়ান
হে বৎস! কোন বস্তু যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় আর তা থাকে পাথরের ভিতরে অথবা আকাশে অথবা যমীনের নীচে, আল্লাহ তাকে এনে হাজির করবেন। আল্লাহ সূক্ষ্ণদর্শী, সব কিছুর খবর রাখেন। তাইসিরুল
হে বৎস! কোন কিছু যদি সরিষার দানা পরিমানও হয় এবং তা যদি থাকে শিলাগর্ভে অথবা আকাশে কিংবা মাটির নীচে, আল্লাহ ওটাও হাযির করবেন। আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী, সর্ববিষয়ে খবর রাখেন। মুজিবুর রহমান
[And Luqman said], "O my son, indeed if wrong should be the weight of a mustard seed and should be within a rock or [anywhere] in the heavens or in the earth, Allah will bring it forth. Indeed, Allah is Subtle and Acquainted. Sahih International
১৬. হে আমার প্রিয় বৎস! নিশ্চয় তা (পাপ-পুণ্য) যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয়, অতঃপর তা থাকে শিলাগর্ভে অথবা আসমানসমূহে কিংবা যমীনে, আল্লাহ তাও উপস্থিত করবেন।(১) নিশ্চয়ই আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত।
(১) এ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আসমান ও যমীন এবং এর মাঝে যা কিছু আছে, এর প্রতিটি বিন্দুকণা আল্লাহর অসীম জ্ঞানের আওতাধীন এবং সবকিছুর উপর তাঁর পূর্ণ ক্ষমতা ও আধিপত্য রয়েছে। কোন বস্তু যত গভীর আঁধার বা যবনিকার অন্তরালেই থাক না কেন - মহান আল্লাহর জ্ঞান ও দৃষ্টির আড়ালে থাকতে পারে না এবং তিনি যে কোন বস্তুকে যখন ও যেখানে ইচ্ছা উপস্থিত করতে পারেন। যাবতীয় বস্তু মহান আল্লাহর জ্ঞান ও ক্ষমতার আওতাভুক্ত। আল্লাহর জ্ঞান ও তাঁর পাকড়াও এর বাইরে কেউ যেতে পারে না। পাথরের মধ্যে ছোট্ট একটি কণা তোমার দৃষ্টির অগোচরে থাকতে পারে। কিন্তু তাঁর কাছে তা সুস্পষ্ট। আকাশ মণ্ডলে একটি ক্ষুদ্রতম কণিকা তোমার থেকে বহু দূরবর্তী হতে পারে কিন্তু তা আল্লাহর বহু নিকটতর। ভূমির বহু নিম্ন স্তরে পতিত কোন জিনিস, তোমার কাছে কোথায়, কোন অবস্থায় ও কী অবস্থায় রয়েছে, তুমি যে কোন সৎ বা অসৎ কাজই করো না কেন, তা আল্লাহর অগোচরে নয়। তিনি কেবল তা জানেন তাই নয় বরং যখন হিসেব-নিকেশের সময় আসবে তখন তিনি তোমাদের প্রত্যেকটি কাজের ও নড়াচড়ার রেকর্ড সামনে নিয়ে আসবেন। [কুরতুবী, ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(১৬) ‘হে বৎস ! কোন (পাপ অথবা পুণ্য) যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয়[1] এবং তা যদি কোন পাথরের ভিতরে অথবা আকাশমন্ডলীতে অথবা মাটির নীচে থাকে, তাহলে আল্লাহ তাও উপস্থিত করবেন। আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী, সকল বিষয়ে অবগত।
[1] هَا সর্বনামের ইঙ্গিত যদি خَطِيئَة এর দিকে হয়, তাহলে তার অর্থ হবে আল্লাহর অবাধ্যতা ও পাপকর্ম। আর যদি خَصلَة এর দিকে হয়, তাহলে তার অর্থ হবে ভাল অথবা মন্দের যে কোন অভ্যাস। উদ্দেশ্য এই যে, মানুষ ভাল অথবা মন্দ কর্ম যতই গোপনে করুক না কেন, তা আল্লাহর কাছে লুক্কায়িত থাকতে পারে না; কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তা উপস্থিত করে নেবেন। অর্থাৎ, তার যথাযথভাবে ভাল আমলের ভাল প্রতিদান ও মন্দ আমলের মন্দ প্রতিফল দেবেন। সরিষা দানার উদাহরণ এই জন্য দিয়েছেন যে,তা এত ছোট হয়, যার না ওজন বুঝা যায় আর না দাঁড়িপাল্লাকে ঝুঁকাতে পারে। অনুরূপ পাথর (সাধারণত বসবাসের স্থান থেকে দূরে জঙ্গল বা পাহাড়ে) একান্ত গুপ্ত ও সুরক্ষিত স্থান। এই অর্থ হাদীসেও বর্ণিত হয়েছে। মহানবী (সাঃ) বলেছেন, ‘‘যদি কোন ব্যক্তি এমন ছিদ্রহীন পাথরেও কোন আমল করে, যার কোন দরজা বা জানালা নেই, তাহলেও আল্লাহ্ তাআলা তাও মানুষের সামনে প্রকাশ করে দেবেন সে আমল যে ধরনেরই হোক না কেন।’’ (আহমদ ৩ /২৮) এই জন্য যে, আল্লাহ তাআলা সূক্ষ্মদর্শী; তিনি অতি সূক্ষ্ম দৃষ্টি রাখেন। নিতান্ত গুপ্ত বস্তুও তাঁর জ্ঞান বহির্ভূত নয় এবং তিনি সর্বজ্ঞ; রাতের অন্ধকারে পিঁপড়ের চলা-ফেরা করার খবরও তিনি রাখেন।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান‘হে আমার প্রিয় বৎস, সালাত কায়েম কর, সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজে নিষেধ কর এবং তোমার উপর যে বিপদ আসে তাতে ধৈর্য ধর। নিশ্চয় এগুলো অন্যতম দৃঢ় সংকল্পের কাজ’। আল-বায়ান
হে বৎস! তুমি নামায কায়িম কর, সৎ কাজের নির্দেশ দাও আর মন্দ কাজ হতে নিষেধ কর এবং বিপদাপদে ধৈর্যধারণ কর। নিশ্চয় এটা দৃঢ় সংকল্পের কাজ। তাইসিরুল
হে বৎস! সালাত কায়েম করবে, ভাল কাজের আদেশ করবে ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করবে এবং আপদে-বিপদে ধৈর্য ধারণ করবে, এটাইতো দৃঢ় সংকল্পের কাজ। মুজিবুর রহমান
O my son, establish prayer, enjoin what is right, forbid what is wrong, and be patient over what befalls you. Indeed, [all] that is of the matters [requiring] determination. Sahih International
১৭. হে আমার প্রিয় বৎস! সালাত কায়েম করো, সৎ কাজের নির্দেশ দাও এবং অসৎ কাজে নিষেধ কর, আর তোমার উপর যা আপতিত হয় তাতে ধৈৰ্য ধারণ করা। নিশ্চয় এটা অন্যতম দৃঢ় সংকল্পের কাজ।
-
তাফসীরে জাকারিয়া(১৭) হে বৎস ! যথারীতি নামায পড়, সৎকাজের নির্দেশ দাও, অসৎকাজে বাধা দান কর এবং আপদে-বিপদে ধৈর্য ধারণ কর। [1] নিশ্চয়ই এটিই দৃঢ় সংকল্পের কাজ। [2]
[1] নামায প্রতিষ্ঠা, ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজে বাধা দান এবং মুসীবতে ধৈর্যধারণ করার কথা উল্লেখ এই জন্য করা হয়েছে যে, উক্ত তিনটিই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও ভাল কাজের মূল বা ভিত্তি।
[2] অর্থাৎ, পূর্বে আলোচিত কথাগুলি ঐ সকল কর্মের অন্তর্ভুক্ত, যে বিষয়ে আল্লাহ্ তাআলা তাকীদ করেছেন এবং বান্দার উপর তা ফরয করেছেন। অথবা এ হল শক্ত মনোবল ও সুদৃঢ় হিম্মত সৃষ্টি করার জন্য উদ্বুদ্ধকারী। কারণ শক্ত মনোবল ও সুদৃঢ় হিম্মত ছাড়া উল্লিখিত নির্দেশাবলীর উপর আমল অসম্ভব। কোন কোন মুফাসসিরের মতে ذلك (এটি) বলে ধৈর্যের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। ইতিপূর্বে ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধের অসিয়ত করা হয়েছে। যেহেতু সে পথে বিভিন্ন কষ্ট ও মানুষের কথার খোঁচা ইত্যাদি হওয়াটা স্বাভাবিক সেহেতু তার পরেই ধৈর্যধারণের কথা বলে পরিষ্কার বুঝানো হয়েছে যে, ধৈর্যধারণ করবে। কেননা, তা শক্ত মনোবল ও সুদৃঢ় হিম্মতের কাজ। আর তা শক্ত মনোবল ও সুদৃঢ় হিম্মত পোষণকারী সংকল্পবদ্ধ মানুষদের জন্য একটা বড় হাতিয়ার; যে হাতিয়ার ছাড়া তবলীগের কাজ করা সম্ভব নয়।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান‘আর তুমি মানুষের দিক থেকে তোমার মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না। আর যমীনে দম্ভভরে চলাফেরা করো না; নিশ্চয় আল্লাহ কোন দাম্ভিক, অহঙ্কারীকে পছন্দ করেন না’। আল-বায়ান
অহংকারের বশবর্তী হয়ে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা কর না, আর পৃথিবীতে গর্বভরে চলাফেরা কর না, নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না। তাইসিরুল
অহংকার বশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করনা এবং পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে বিচরণ করনা। কারণ আল্লাহ কোন উদ্ধত, অহংকারীকে পছন্দ করেননা। মুজিবুর রহমান
And do not turn your cheek [in contempt] toward people and do not walk through the earth exultantly. Indeed, Allah does not like everyone self-deluded and boastful. Sahih International
১৮. আর তুমি মানুষের প্রতি অবজ্ঞাভরে তোমার গাল বাঁকা কর না(১) এবং যমীনে উদ্ধতভাবে বিচরণ কর না(২); নিশ্চয় আল্লাহ কোন উদ্ধত, অহংকারীকে পছন্দ করেন না।(৩)
(১) পঞ্চম উপদেশ সামাজিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে, বলা হয়েছে যে, লোকের সাথে সাক্ষাত বা কথোপকথনের সময় মুখ ফিরিয়ে রেখো না-যা তাদের প্রতি উপেক্ষা ও অহংকারের নিদর্শন এবং ভদ্রোচিত স্বভাব ও আচরণের পরিপন্থী। এর আরেক অর্থ হলো, মানুষের প্রতি গাল বাঁকা করে কথা বলো না। এ অর্থ অনুসারে তার প্রতি তাকিয়েও যদি গাল বাঁকা করে তাকে অপমান করা উদ্দেশ্য হয় তবে তাও নিষিদ্ধ হবে। [কুরতুবী, ফাতহুল কাদীর]
(২) অর্থাৎ গর্বভরে ঔদ্ধত্যের সহিত বিচরণ করো না। আল্লাহ ভূমিকে যাবতীয় বস্তু হতে নত ও পতিত করে সৃষ্টি করেছেন। তোমাদের সৃষ্টিও এ মাটি দিয়েই। তোমরা এর উপর দিয়েই চলাফেরা করা-নিজের নিগুঢ় তত্ত্ব বুঝতে চেষ্টা কর। আত্মাভিমানীদের ধারা অনুসরণ করে অহংকারভরে বিচরণ করো না। আল্লাহ কোন অহংকারী আত্মাভিমানীকে পছন্দ করেন না। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যার অন্তরে শরিষা দানা পরিমান ঈমান আছে সে জাহান্নামে যাবে না, পক্ষান্তরে যার অন্তরে শরিষা দানা পরিমান অহংকার আছে সে জান্নাতে যাবে না।’ [মুসলিম: ১৩২] অন্য এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ আর তিনজনকে আল্লাহ পছন্দ করেন না, অহংকারী, দাম্ভিক। যেমন তোমরা আল্লাহর কিতাবে পাও, তারপর আলোচ্য আয়াত তেলাওয়াত করলেন। আর দান করে খোঁটা প্রদানকারী কৃপণ ব্যক্তি; এরং শপথের মাধ্যমে বিক্রয়কারী। [মুসনাদে আহমাদ: ৫/১৭৬]
(৩) ‘মুখতোল’ মানে হচ্ছে, এমন ব্যক্তি যে নিজেই নিজেকে কোন বড় কিছু মনে করে। আর ‘ফাখুর’ তাকে বলে, যে নিজের বড়াই করে অন্যের কাছে। [ইবন কাসীর] মানুষের চালচলনে অহংকার, দম্ভ ও ঔদ্ধত্যের প্রকাশ তখনই অনিবাৰ্য হয়ে ওঠে, যখন তার মাথায় নিজের শ্রেষ্ঠত্বের বিশ্বাস ঢুকে যায় এবং সে অন্যদেরকে নিজের বড়াই ও শ্রেষ্ঠত্ব অনুভব করাতে চায়। [ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(১৮) মানুষের জন্য নিজের গাল ফুলায়ো না[1] এবং পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে বিচরণ করো না;[2] কারণ আল্লাহ কোন উদ্ধত, অহংকারীকে ভালবাসেন না।
[1] অর্থাৎ, (অহংকার বশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না।) এমন অহংকার করো না, যাতে তুমি মানুষকে তুচ্ছ ভাবো ও তাকে ঘৃণা কর এবং কোন মানুষ তোমার সাথে কথা বললে তার থেকে বৈমুখ হও অথবা কথোপকথনের সময় নিজ মুখমন্ডলকে অন্য দিকে ফিরিয়ে রাখো। صعر এক প্রকার ব্যাধি, যা উটের মাথা অথবা ঘাড়ে হয় এবং যার ফলে সেই উটের ঘাড় বাঁকা হয়ে যায়। এখানে অহংকার হেতু মুখ ফিরিয়ে নেওয়া (বা মুখ বাঁকানো)র অর্থে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। (ইবনে কাসীর)
[2] অর্থাৎ, এমন বিচরণ ও চালচলন, যাতে ধন-সম্পদ, পদ বা বংশ মর্যাদা অথবা শক্তিমত্তা, ক্ষমতার বড়াই ও অহংকার ফুটে ওঠে, তা আল্লাহ পছন্দ করেন না। কারণ মানুষ একজন অক্ষম ও নগণ্য বান্দা মাত্র। তাই আল্লাহ তাআলা এটাই পছন্দ করেন যে, সে নিজের মান ও অবস্থা অনুযায়ী বিনয় ও নম্রতা বজায় রাখবে এবং তা অতিক্রম করে অহংকার প্রদর্শন করবে না। কারণ গর্ব ও অহংকার শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যই শোভনীয়; যিনি সকল এখতিয়ারের মালিক এবং সকল গুণের অধিকারী। এই জন্যই হাদীসে বলা হয়েছে, ‘‘আল্লাহ আয্যা অজাল্ল্ বলেন, গৌরব ও গর্ব খাস আমার গুণ। সুতরাং যে তাতে আমার অংশী হতে চাইবে, আমি তাকে শাস্তি দেব।’’ (মুসলিম ২৬২০নং) ‘‘ঐ ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার অন্তরে সরিষার দানা সমপরিমাণ অহংকার আছে।’’ (আহমাদ ১/৪১২, তিরমিযী) ‘‘যে ব্যক্তি অহংকার হেতু নিজ (পরনের) কাপড় (মাটিতে) ছেঁচড়ে চলাফেরা করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তার দিকে তাকিয়ে দেখবেন না।’’ (আহমাদ ৫/১০৯, বুখারীঃ কিতাবুল লিবাস) তা সত্ত্বেও অহংকার প্রকাশ না করে আল্লাহর নিয়ামত প্রকাশ বা ভাল পোশাক পরা ও উত্তম খাবার খাওয়া ইত্যাদি অবৈধ নয়। (বরং অহংকার প্রকাশ না করে আল্লাহর নিয়ামত প্রকাশ করাই উত্তম।)
তাফসীরে আহসানুল বায়ান‘আর তোমার চলার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন কর, তোমার আওয়াজ নীচু কর; নিশ্চয় সবচাইতে নিকৃষ্ট আওয়াজ হল গাধার আওয়াজ’। আল-বায়ান
চলাফেরায় সংযত ভাব অবলম্বন কর এবং কণ্ঠস্বর নীচু কর। স্বরের মধ্যে নিশ্চয়ই গাধার স্বর সর্বাপেক্ষা শ্রুতিকটু। তাইসিরুল
পদচারণায় মধ্য পন্থা অবলম্বন করবে এবং তোমার কন্ঠস্বর করবে নীচু; স্বরের মধ্যে গাধার স্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর। মুজিবুর রহমান
And be moderate in your pace and lower your voice; indeed, the most disagreeable of sounds is the voice of donkeys." Sahih International
১৯. আর তুমি তোমার চলার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন কর(১) এবং তোমার কণ্ঠস্বর নীচু করো(২); নিশ্চয় সুরের মধ্যে গর্দভের সুরই সবচেয়ে অপ্ৰীতিকর।(৩)
(১) অর্থাৎ দৌড়-ধাপসহ চলো না, যা সভ্যতা ও শালীনতার পরিপন্থী। এভাবে চলার ফলে নিজেরও দুর্ঘটনায় পতিত হওয়ার আশংকা থাকে বা অপরের দুর্ঘটনার কারণও ঘটতে পারে। আবার অত্যধিক মন্থর গতিতেও চলো না—যা সেসব গর্বস্ফীত আত্মাভিমানীদের অভ্যাস, যারা অন্যান্য মানুষের চাইতে নিজের অসার কৌলিন্য ও শ্রেষ্ঠত্ব দেখাতে চায়। অথবা সেসব স্ত্রীলোকদের অভ্যাস, যারা অত্যধিক লজ্জা-সংকোচের দরুন দ্রুতগতিতে বিচরণ করে না। অথবা অক্ষম ব্যাধিগ্রস্তদের অভ্যাস। প্রথমটি তো হারাম। দ্বিতীয়টি যদি নারী জাতির অনুসরণে করা হয় তাও না-জায়েয। আর যদি এ উদ্দেশ্য না থাকে, তবে পুরুষের পক্ষে এটা একটা কলঙ্ক। তৃতীয় অবস্থায় আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রদর্শন—সুস্থ থাকা সত্বেও রোগগ্রস্তদের রূপ ধারণ করা। [ইবন কাসীর, কুরতুবী]
(২) অর্থাৎ তোমাদের স্বর ক্ষীণ কর। যার অর্থ স্বর প্রয়োজনীতিরিক্ত উচ্চ করো না। [ইবন কাসীর, কুরতুবী]
(৩) অর্থাৎ চতুস্পদ জন্তুসমূহের মধ্যে গাধার চীৎকারই অত্যন্ত বিকট ও শ্রুতিকটু। [কুরতুবী, ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(১৯) তুমি তোমার চলনে মধ্যপন্থা অবলম্বন কর[1] এবং তোমার কণ্ঠস্বর নীচু কর;[2] স্বরের মধ্যে গাধার সবরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর।’
[1] অর্থাৎ চলন যেন এমন ধীর গতির না হয়, যাতে দেখে অসুস্থ মনে হয় এবং এমন দ্রুত গতিরও না হয়, যা সম্ভ্রম ও গাম্ভীর্যের পরিপন্থী হয়। এ কথাকে অন্য জায়গায় এভাবে বলা হয়েছে, (يَمْشُوْنَ عَلَى الاَرْضِ هَوْنًا) ‘‘(আল্লাহর বান্দাগণ) পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে।’’ (সূরা ফুরকান ৬৩ আয়াত)
[2] অর্থাৎ, উচ্চ স্বরে (চিৎকার করে) কথা বলবে না। কারণ বেশি চিৎকার করে কথা বলা যদি পছন্দনীয় হতো, তাহলে গাধার আওয়াজ সব থেকে উত্তম গণ্য হতো। কিন্তু তা হয় না, বরং গাধার আওয়াজ সর্বনিকৃষ্ট ও সকলের কাছে অপছন্দনীয়। এই জন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, ‘‘গাধার চিৎকার শুনলে শয়তান থেকে (আল্লাহর নিকট) আশ্রয় প্রার্থনা করো।’’ (বুখারীঃ বাদউল খালক অধ্যায়, মুসলিম ইত্যাদি)
তাফসীরে আহসানুল বায়ানতোমরা কি দেখ না, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের জন্য নিয়োজিত করেছেন আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে। আর তোমাদের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নিআমত ব্যাপক করে দিয়েছেন; মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহ সম্পর্কে তর্ক করে জ্ঞান, হিদায়াত ও আলো দানকারী কিতাব ছাড়া। আল-বায়ান
তোমরা কি লক্ষ্য কর না যে, যা কিছু আসমানসমূহে আর যমীনে আছে, আল্লাহ সমস্তই তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন এবং তোমাদের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নি‘য়ামাতসমূহ পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন? কতক মানুষ জ্ঞান ছাড়াই আল্লাহ সম্বন্ধে বাক-বিতন্ডা করে, তাদের না আছে সঠিক পথের দিশা, আর না আছে কোন আলোপ্রদ কিতাব। তাইসিরুল
তোমরা কি দেখনা যে, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই আল্লাহ তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন এবং তোমাদের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করেছেন? মানুষের মধ্যে কেহ কেহ অজ্ঞতা বশতঃ আল্লাহ সম্বন্ধে বিতন্ডা করে, তাদের না আছে পথ নির্দেশক আর না আছে কোন দীপ্তিমান কিতাব। মুজিবুর রহমান
Do you not see that Allah has made subject to you whatever is in the heavens and whatever is in the earth and amply bestowed upon you His favors, [both] apparent and unapparent? But of the people is he who disputes about Allah without knowledge or guidance or an enlightening Book [from Him]. Sahih International
২০. তোমরা কি দেখ না, নিশ্চয় আল্লাহ আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে সবকিছুই তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন এবং তোমাদের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করেছেন?(১) আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ কোন জ্ঞান, কোন পথনির্দেশ বা কোন দীপ্তিমান কিতাব ছাড়াই আল্লাহ সম্বন্ধে বিতণ্ডা করে।
(১) অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদের উপর তার প্রকাশ্য-অপ্ৰকাশ্য সকল প্রকারের নেয়ামত পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। প্রকাশ্য নেয়ামত বলতে সেসব নেয়ামতকেই বোঝায়, যা মানুষ তার পঞ্চেন্দ্ৰিয়ের সাহায্যে অনুধাবন করতে পারে। যেমন, মনোরম আকৃতি, মানুষের সুঠাম ও সংবদ্ধ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং প্রত্যেক অংগ এমন সুসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে তৈরী করা যেন তা মানুষের কাজে সর্বাধিক সহায়কও হয় অথচ আকৃতি-প্রকৃতিতেও কোন প্রকারের বিকৃতি না ঘটায়। অনুরূপভাবে জীবিকা, ধন-সম্পদ, জীবনযাপনের মাধ্যমসমূহ, সুস্থতা ও কুশলাবস্থা—এসবই ইন্দ্ৰিয়গ্রাহ্য নেয়ামত ও অনুকম্পাসমূহের অন্তর্ভুক্ত। তদ্রুপ দ্বীন ইসলামকে সহজ ও অনায়াসলব্ধ করে দেয়া, আল্লাহ-রাসূলের অনুসরণ ও আনুগত্য প্রদর্শনের তওফীক প্ৰদান, অন্যান্য দ্বীনের উপর ইসলামের বিজয় ও প্রভাবশীলতা এবং শক্ৰদের মোকাবেলায় মুসলিমদের প্রতি সাহায্য ও সহায়তা- এসবই প্রকাশ্য নেয়ামতসমূহের পর্যায়ভুক্ত।
আর গোপনীয় নেয়ামত সেগুলো, যা মানব হৃদয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত- যথা ঈমান, আল্লাহর পরিচয় লাভ এবং জ্ঞান-বুদ্ধি, সচ্চরিত্র, পাপসমূহ গোপন করা ও অপরাধসমূহের ত্বরিৎ শাস্তি আরোপিত না হওয়া ইত্যাদি। অথবা যেসব নেয়ামত মানুষ জানে না এবং অনুভবও করে না সেগুলো গোপন নিয়ামত। মানুষের নিজের শরীরে এবং তার বাইরে দুনিয়ায় তার স্বার্থে কাজ করে যাচ্ছে এমন অগণিত ও অসংখ্য জিনিস রয়েছে কিন্তু মানুষ জানেও না যে, তার স্রষ্টা তার হেফাযত ও সংরক্ষণের জন্য, তাকে জীবিকা দান করার জন্য, তার বৃদ্ধি ও বিকাশ সাধনের জন্য এবং তার কল্যাণার্থে কত রকমের সাজ-সরঞ্জাম যোগাড় করে রেখেছেন। [দেখুন: ফাতহুল কাদীর; বাগভী]
তাফসীরে জাকারিয়া(২০) তোমরা কি দেখ না যে, আল্লাহ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সমস্তই তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন[1] এবং তোমাদের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করেছেন?[2] মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহ সম্বন্ধে বিতন্ডা করে; তাদের না আছে জ্ঞান, না আছে পথনির্দেশ এবং না আছে কোন দীপ্তিমান গ্রন্থ।[3]
[1] تسخير এর অর্থ হল উপকার নেওয়া। এখানে তাকে কাজে লাগানো, অধীন করা বা সেবায় নিয়োজিত করার অর্থ করা হয়েছে। যেমন সৌরজগৎ; চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র ইত্যাদি সকল বস্তুকে আল্লাহ তাআলা এমন নিয়মের অধীন করে দিয়েছেন যে, তারা মানুষের উপকারার্থে অবিরাম কাজ করে চলেছে এবং মানুষ তার দ্বারা উপকৃত হচ্ছে। এর দ্বিতীয় অর্থ হলঃ অধীন করে দেওয়া। সুতরাং এ পৃথিবীর বহু সৃষ্টিকে মানুষের অধীনস্থ করে দেওয়া হয়েছে; যা মানুষ নিজের ইচ্ছামত ব্যবহার করে থাকে। যেমন মাটি, উদ্ভিদ, জীব-জন্তু ইত্যাদি। অতএব تسخير এর অর্থ এই হল যে, আকাশ ও পৃথিবীর সকল বস্তু মানুষের উপকারে নিয়োজিত। তাতে তা মানুষের অধীনে হোক বা মানুষের অধীনের বাইরে। (ফাতহুল ক্বাদীর)
[2] প্রকাশ্য নিয়ামত ও অনুগ্রহের অর্থ হল, যা জ্ঞান ও ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভব করা যায়। আর অপ্রকাশ্য অনুগ্রহ ও নিয়ামত হল, যা মানুষের অনুভূতির বাইরে। এই উভয় প্রকার নিয়ামত এতই অসংখ্য ও বেশি যে, মানুষ তা গণনা করতে অক্ষম।
[3] অর্থাৎ, এর পরেও মানুষ আল্লাহ সম্পর্কে তর্ক-ঝগড়া করে; কেউ তাঁর অস্তিত্ব নিয়ে, কেউ তাঁর সাথে শরীক স্থাপন করা নিয়ে এবং কেউ তাঁর শরীয়ত ও আহকাম নিয়ে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান