সূরা সম্পর্কেঃ
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ বনী-ইসরাঈল, কাহফ, মারইয়াম, ত্বা-হা ও আম্বিয়া- এগুলো আমার প্রাচীন সম্পদ ও উপার্জন ৷ [বুখারীঃ ৪৪৩১] এর থেকে বুঝা যায় যে, এ সুরাগুলো প্রাথমিক যুগে নাযিল হয়েছিল। এগুলোর প্রতি সাহাবায়ে কিরামের আলাদা দরদ ছিল। তাই আমাদেরও উচিত। এগুলোকে বেশি ভালবাসা এবং এগুলো থেকে হেদায়াত সংগ্ৰহ করা।
মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় আসন্ন, অথচ তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে। আল-বায়ান
মানুষের হিসাব গ্রহণের কাল ক্রমশঃ ঘনিয়ে আসছে কিন্তু তারা গাফলতিতে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। তাইসিরুল
মানুষের হিসাব নিকাশের সময় আসন্ন, কিন্তু তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে। মুজিবুর রহমান
[The time of] their account has approached for the people, while they are in heedlessness turning away. Sahih International
১. মানুষের হিসেব-নিকেশের সময় আসন্ন(১), অথচ তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে।(২)
(১) অর্থাৎ মানুষের কাছ থেকে তাদের কৃতকর্মের হিসাব নেয়ার দিন অর্থাৎ কেয়ামতের দিন ঘনিয়ে এসেছে। এখানে পৃথিবীর বিগত বয়সের অনুপাতে ঘনিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে। লোকদের নিজেদের কাজের হিসেব দেবার জন্য তাদের রবের সামনে হাজির হবার সময় আর দূরে নেই। মুহাম্মদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমন একথারই আলামত যে, মানব জাতির ইতিহাস বর্তমানে তার শেষ পর্যায়ে প্রবেশ করছে। এখন সে তার সূচনাকালের পরিবর্তে পরিণামের বেশী নিকটবর্তী হয়ে গেছে। সূচনা ও মধ্যবর্তীকালীন পর্যায় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে এবং এবার শেষ পর্যায়ে শুরু হয়ে গেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর একটি হাদীসে একথাই বলেছেন। তিনি নিজের হাতের দুটি আঙ্গুল পাশাপাশি রেখে বলেনঃ “আমার আগমন এমন সময়ে ঘটেছে। যখন আমি ও কেয়ামত এ দুটি আঙ্গুলের মতো অবস্থান করছি।” [বুখারীঃ ৪৯৯৫] অর্থাৎ আমার পরে শুধু কেয়ামতই আছে, মাঝখানে অন্য কোন নবীর আগমনের অবকাশ নেই। যদি সংশোধিত হয়ে যেতে চাও তাহলে আমার দাওয়াত গ্ৰহণ করে সংশোধিত হও।
(২) অর্থাৎ কোন সতর্কসংকেত ও সতর্কবাণীর প্রতি দৃষ্টি দেয় না। দুনিয়া নিয়ে তারা এতই মগ্ন যে, আখেরাতের কথা ভুলে গেছে। আখেরাতের জন্য প্রস্তুতি নিতে হলে যে আল্লাহর উপর ঈমান, তাঁর ফরায়েযগুলো আদায় করতে হয়, নিষিদ্ধ কাজগুলো থেকে দূরে থাকতে হয় সেটার জন্য তারা প্ৰস্তুতি নিচ্ছে না। [ফাতহুল কাদীর] আর যে নবী তাদেরকে সর্তক করার চেষ্টা করছেন তার কথাও শোনে না। তাদের রাসূলের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে যে ওহী এসেছে তারা সেটার প্রতি দৃষ্টি দেয় না। এ নির্দেশটি প্রাথমিকভাবে কুরাইশ ও তাদের মত যারা কাফের তাদেরকে করা হচ্ছে। [ইবন কাসীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(১) মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় আসন্ন, [1] অথচ ওরা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে। [2]
[1] হিসাবের সময় বলতে কিয়ামত; যা প্রতি সেকেন্ড নিকটবর্তী হয়ে চলেছে। আর প্রতিটি আগমনকারী জিনিসই নিকটবর্তী এবং প্রত্যেক ব্যক্তির মৃত্যু স্বস্থানে তার নিজের জন্য কিয়ামত। তাছাড়া বিগত যুগসমূহের তুলনায় কিয়ামত নিকটে; কারণ (বিশ্বসৃষ্টির পর হতে) যে সকল যুগ পার হয়ে গেছে তা অপেক্ষা অবশিষ্ট যুগ অতি অল্প।
[2] অর্থাৎ, ওর জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হতে অমনোযোগী, পৃথিবীর চাকচিক্যে নিমজ্জিত (যা সেদিনকার জন্য ক্ষতিকর) এবং ঈমানের চাহিদা হতে উদাসীন (যা সেদিনকার জন্য কল্যাণকর)।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানযখনই তাদের রবের পক্ষ থেকে তাদের নিকট কোন নতুন উপদেশ আসে তখন তারা তা কৌতুকভরে শ্রবণ করে। আল-বায়ান
তাদের কাছে তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে যখনই কোন নতুন উপদেশ আসে, তখন তারা তা হাসি-তামাশার বস্তু মনে করেই শোনে। তাইসিরুল
যখনই তাদের নিকট তাদের রবের কোন নতুন উপদেশ আসে তখন তারা তা শ্রবণ করে কৌতুকচ্ছলে। মুজিবুর রহমান
No mention comes to them anew from their Lord except that they listen to it while they are at play Sahih International
২. যখনই তাদের কাছে তাদের রব-এর কোন নতুন উপদেশ আসে(১) তখন তারা তা শোনে কৌতুকচ্ছলে(২),
(১) অর্থাৎ কুরআনের যে নতুন সূরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর নাযিল হয় এবং তাদেরকে শুনানো হয়। [ইবন কাসীর] তারা এটাকে কোন গুরুত্বের সাথে শুনে না। ইবন আব্বাস বলেন, তোমাদের কি হলো যে, তোমরা আহলে কিতাবদেরকে তাদের কাছে যা আছে তা জিজ্ঞেস কর, অথচ তারা তাদের কিতাবকে বিকৃতকরণ, পরিবর্তন, পরিবর্ধন, বাড়ানো-কমানো সবই করেছে। আর তোমাদের কাছে রয়েছে এমন এক কিতাব যা আল্লাহ সবেমাত্র নাযিল করেছেন, যা তোমরা পাঠ করে থাক, যাতে কোন কিছুর সংমিশ্রণ ঘটেনি। [বুখারী: ২৬৮৫]
(২) যারা আখেরাত ও কবরের আযাব থেকে গাফেল এবং তজন্যে প্রস্তুতি গ্ৰহণ করে না, এটা তাদের অবস্থার অতিরিক্ত বর্ণনা। যখন তাদের সামনে কুরআনের কোন নতুন আয়াত আসে এবং পঠিত হয়, তখন তারা একে কৌতুক ও হাস্য উপহাসচ্ছলে শ্রবণ করে। তাদের অন্তর আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন থাকে। এর এ অর্থও হতে পারে যে, তারা খেলাধুলায় লিপ্ত থাকে, কুরআনের প্রতি মনোযোগ দেয় না এবং এরূপ অৰ্থও হতে পারে যে স্বয়ং কুরআনের আয়াতের সাথেই তারা রঙতামাশা করতে থাকে। আবার এ অর্থও হতে পারে যে, এখানে খেলা মানে হচ্ছে এই জীবনের খেলা। আল্লাহ ও আখেরাতের ব্যাপারে গাফেল লোকেরা এ খেলা খেলছে। [দেখুন, কুরতুবী]
তাফসীরে জাকারিয়া(২) যখনই ওদের প্রতিপালকের কোন নতুন উপদেশ আসে ওরা তা কৌতুকচ্ছলে শ্রবণ করে। [1]
[1] অর্থাৎ, কুরআন যা সময়ানুসারে প্রয়োজন মত নিত্য নতুনভাবে অবতীর্ণ হয়। যদিও তা তাদেরই উপদেশের জন্য অবতীর্ণ হয় তবুও তারা এমনভাবে শ্রবণ করে যেন তারা তা নিয়ে হাসিঠাট্টা, উপহাস ও খেলা করছে; অর্থাৎ তা নিয়ে তারা কোন চিন্তা-ভাবনা করে না।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানতাদের অন্তর থাকে অমনোযোগী এবং যালিমরা গোপনে পরামর্শ করে, ‘এ তো তোমাদের মতই একজন মানুষ। এরপরও কি তোমরা দেখে শুনে যাদুর কবলে পড়বে’? আল-বায়ান
তাদের অন্তর থাকে খেলায় মগ্ন। যালিমরা গোপনে পরামর্শ করে- এটা তোমাদেরই মত মানুষ ছাড়া কি অন্য কিছু? তোমরা কি দেখে-শুনে যাদুর কবলে পড়বে? তাইসিরুল
তাদের অন্তর থাকে অমনোযোগী, সীমা লংঘনকারীরা গোপনে পরামর্শ করেঃ এতো তোমাদের মতই একজন মানুষ, তবুও কি তোমরা দেখে শুনে যাদুর কবলে পড়বে? মুজিবুর রহমান
With their hearts distracted. And those who do wrong conceal their private conversation, [saying], "Is this [Prophet] except a human being like you? So would you approach magic while you are aware [of it]?" Sahih International
৩. তাদের অন্তর থাকে অমনোযোগী। আর যারা যালেম তারা গোপনে পরামর্শ করে, এ তো তোমাদের মত একজন মানুষই, তবুও কি তোমরা দেখে-শুনে জাদুর কবলে পড়বে?(১)
(১) অর্থাৎ তারা বলতো, এ ব্যক্তি তো কোনক্রমে নবী হতেই পারে না। কারণ এতো আমাদেরই মতো মানুষ, খায় দায়, বাজারে ঘুরে বেড়ায়, স্ত্রী-সন্তানও আছে। কাজেই এ লোক কি করে নবী হয়? তবে কিনা এ ব্যক্তির কথাবার্তায় এবং এর ব্যক্তিত্ত্বের মধ্যে জাদু আছে। ফলে যে ব্যক্তি এর কথা কান লাগিয়ে শোনে এবং এর কাছে যায় সে এর ভক্ত হয়ে পড়ে। কাজেই যদি নিজের ভালো চাও তাহলে এর কথায় কান দিয়ো না এবং এর সাথে মেলামেশা করো না। কারণ এর কথা শোনা এবং এর নিকটে যাওয়া সুস্পষ্ট জাদুর ফাঁদে নিজেকে আটকে দেয়ার মতই। [দেখুন, ইবন কাসীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(৩) ওদের অন্তর থাকে অমনোযোগী। সীমালংঘনকারীরা গোপনে পরার্মশ করে, ‘এতো তোমাদেরই মত একজন মানুষ, তবুও কি তোমরা দেখে-শুনে জাদুর কবলে পড়বে?’ [1]
[1] নবীর মানুষ হওয়ার ব্যাপারটা তাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য। তাছাড়া তারা এ কথাও বলে যে, তোমরা কি দেখ না, সে একজন জাদুকর? দেখে-শুনেও তোমরা তাঁর জাদুর ফাঁদে কেন পা দিচ্ছ?
তাফসীরে আহসানুল বায়ানসে (রাসূল) বলল, ‘আমার রব আসমান ও যমীনের সমস্ত কথাই জানেন এবং তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ’। আল-বায়ান
বল, ‘আমার প্রতিপালক আসমান ও যমীনে (উচ্চারিত প্রতিটি) কথাই জানেন, আর তিনি সব কিছু শোনেন, সব কিছু জানেন।’ তাইসিরুল
বলঃ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সমস্ত কথাই আমার রাব্ব অবগত আছেন এবং তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। মুজিবুর রহমান
The Prophet said, "My Lord knows whatever is said throughout the heaven and earth, and He is the Hearing, the Knowing." Sahih International
৪. তিনি বললেন, আসমানসমূহ ও যমীনের সমস্ত কথাই আমার রব-এর জানা আছে এবং তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।(১)
(১) অর্থাৎ নবী তাদের মিথ্যা প্রচারণা ও গুজব রটনার এই অভিযানের জবাবে এটাই বলেন যে, তোমরা যেসব কথা তৈরী করো, সেগুলো জোরে জোরে বলো বা চুপিসারে কানে কানে বলো, আল্লাহ সবই শোনেন ও জানেন। [ফাতহুল কাদীর] তিনি আসমান ও যমীনের সমস্ত কথা জানেন। কোন কথাই তার কাছে গোপন নেই। আর তিনিই এ কুরআন নাযিল করেছেন। যা আগের ও পরের সবার কল্যাণ সমৃদ্ধ। কেউ এর মত কোন কিছু আনতে পারবে না। শুধু তিনিই এটা আনতে পারবেন যিনি আসমান ও যমীনের গোপন রহস্য জানেন। তিনি তোমাদের কথা শুনেন, তোমাদের অবস্থা জানেন। [ইবন কাসীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(৪) সে বলল, ‘আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সমস্ত কথাই আমার প্রতিপালক অবগত আছেন এবং তিনিই সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞাতা।’ [1]
[1] তিনি সমস্ত বান্দার কথা শ্রবণ করেন ও সকলের আমল সম্পর্কে সম্যক অবহিত। তোমরা যে মিথ্যা বলছ, তা তিনি শুনছেন আর আমার সত্যতা ও যে দাওয়াত আমি তোমাদের দিচ্ছি তার যথার্থতা সম্পর্কে ভালোই জানেন।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানবরং তারা বলে, ‘এগুলো অলীক কল্পনা, হয় সে এটি মন থেকে বানিয়েছে নয়তো সে একজন কবি। অতএব সে আমাদের কাছে এমন নিদর্শন নিয়ে আসুক যেরূপ নিদর্শনসহ প্রেরিত হয়েছিল পূর্ববর্তীগণ’। আল-বায়ান
তারা এও বলে, ‘এসব অলীক স্বপ্ন, না হয় সে মিথ্যে উদ্ভাবন করেছে, না হয় সে একজন কবি। কাজেই সে আমাদের কাছে এমন নিদর্শন নিয়ে আসুক যেমন পূর্ববর্তী (নবী)-গণের কাছে পাঠানো হয়েছিল। তাইসিরুল
তারা এটাও বলেঃ এ সব অলীক কল্পনা হয় সে উদ্ভাবন করেছে, না হয় সে একজন কবি; অতএব সে আনয়ন করুক আমাদের নিকট এক নিদর্শন যেরূপ নিদর্শনসহ প্রেরিত হয়েছিল পূর্ববর্তীগণ। মুজিবুর রহমান
But they say, "[The revelation is but] a mixture of false dreams; rather, he has invented it; rather, he is a poet. So let him bring us a sign just as the previous [messengers] were sent [with miracles]." Sahih International
৫. বরং তারা বলে, এসব অলীক কল্পনা, হয় সে এগুলো রটনা করেছে, না হয় সে একজন কবি।(১) অতএব সে নিয়ে আসুক আমাদের কাছে এক নিদর্শন যেরূপ নিদর্শনসহ প্রেরিত হয়েছিল পূর্ববর্তীগণ।
(১) যেসব স্বপ্নের মানসিক অথবা শয়তানী কল্পনা শামিল থাকে, সেগুলোকে أحلام বলা হয়। এ কারণেই এর অনুবাদ “অলীক কল্পনা” করা হয়েছে। এর আরেক অর্থ হয়, মিথ্যা স্বপ্ন। [ফাতহুল কাদীর] অর্থাৎ অবিশ্বাসীরা প্রথমে কুরআনকে জাদু বলেছে, এরপর আরও অগ্রসর হয়ে বলতে শুরু করেছে যে, এটা আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যা উদ্ভাবন ও অপবাদ যে, এটা তাঁর কালাম। অবশেষে বলতে শুরু করেছে যে, আসল কথা হচ্ছে লোকটি একজন কবি। তার কালামে কবিসুলভ কল্পনা আছে। এভাবে কাফেররা সীমালঙ্ঘন ও গোড়ামীর বশে যা ইচ্ছে তা-ই এ কুরআনের জন্য সাব্যস্ত করছে। যেমন অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, “দেখুন, তারা আপনার কী উপমা দেয়! ফলে তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে, সুতরাং তারা পথ পাবে না।” [সূরা আল-ইসরা: ৪৮] [ইবন কাসীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(৫) বরং ওরা বলে, ‘এ হল আবোল-তাবোল স্বপ্ন; বরং সে তা উদ্ভাবন করেছে, বরং সে একজন কবি। [1] অতএব সে আমাদের নিকট এক নিদর্শন আনুক; যেরূপ (নিদর্শন সহ) পূর্ববর্তীগণ প্রেরিত হয়েছিল।’ [2]
[1] গোপনে সমালোচনাকারী অত্যাচারীরা এতেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং তারা বলে, এ কুরআন তো অর্থহীন স্বপ্নের মত বিক্ষিপ্ত চিন্তাধারার এক সমষ্টি। বরং তা নিজের মনগড়া (স্বকপোলকল্পিত), বরং সে একজন কবি তথা এই কুরআন পথনির্দেশকারী গ্রন্থ নয়, কবিতাগুচ্ছ। অর্থাৎ, তারা কোন এক শ্রেণীর কথার উপর অটল নয়, বরং প্রত্যহ নিত্য নূতন পাঁয়তারা বদলায় এবং নূতন নূতন অভিযোগ আরোপ করে।
[2] অর্থাৎ, যেমন সামুদ জাতির জন্য উটনী ও মূসা (আঃ)-এর জন্য লাঠি ও উজ্জ্বল হাত ইত্যাদি।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানতাদের পূর্বে যে জনপদ ঈমান আনেনি তাদেরকে আমি ধ্বংস করেছি । তবে কি এরা ঈমান আনবে? আল-বায়ান
তাদের পূর্বে আমি যে সমস্ত জনপদ ধ্বংস করেছি তাদের একটিও ঈমান আনেনি, তাহলে এরা কি ঈমান আনবে? তাইসিরুল
তাদের পূর্বে যে সব জনপদ আমি ধ্বংস করেছি ওর অধিবাসীরা ঈমান আনেনি; তাহলে কি তারা ঈমান আনবে? মুজিবুর রহমান
Not a [single] city which We destroyed believed before them, so will they believe? Sahih International
৬. এদের আগে যেসব জনপদ আমরা ধ্বংস করেছি সেখানকার অধিবাসীরা ঈমান আনেনি; তবে কি তারা ঈমান আনবে?(১)
(১) এ সংক্ষিপ্ত বাক্যে নিদর্শন দেখাবার দাবীর যে জবাব দেয়া হয়েছে তার মধ্যে তিনটি বিষয় রয়েছে। এক, পূর্ববর্তী রাসূলদেরকে যে ধরনের নিদর্শন দেয়া হয়েছিল তোমরা তেমনি ধরনের নিদর্শন চাচ্ছো? কিন্তু তোমরা ভুলে যাচ্ছো হঠকারী লোকেরা সেসব নিদর্শন দেখেও ঈমান আনেনি। দুই, তোমরা নিদর্শনের দাবী তো করছে কিন্তু একথা মনে রাখছো না যে, সুস্পষ্ট মু'জিযা স্বচক্ষে দেখে নেবার পরও যে জাতি ঈমান আনতে অস্বীকার করেছে তারা এরপর শুধু ধ্বংসই হয়ে গেছে। তিন, তোমাদের চাহিদামতো নিদর্শনাবলী না পাঠানো তো তোমাদের প্রতি আল্লাহর একটি বিরাট মেহেরবাণী। কারণ এ পর্যন্ত তোমরা আল্লাহর হুকুম শুধুমাত্র অস্বীকারই করে আসছে কিন্তু এ জন্য তোমাদের উপর আযাব পাঠানো হয়নি।
এখন কি তোমরা নিদর্শন এ জন্য চাচ্ছে যে, যেসব জাতি নিদর্শন দেখার পরও ঈমান আনেনি এবং এ জন্য তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে তোমরাও তাদের মতো একই পরিণতির সম্মুখীন হতে চাও? তাদের পূর্বের লোকদের কাছে নিদর্শন পাঠানোর পরও তারা যখন ঈমান আনেনি তখন এরাও আসলে ঈমান আনবে না। আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় যাদের বিরুদ্ধে আপনার রবের বাক্য সাব্যস্ত হয়ে গেছে, তারা ঈমান আনবে না। যদিও তাদের কাছে সবগুলো নিদর্শন আসে, যে পর্যন্ত না তারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেখতে পাবে।” [সূরা ইউনুস: ৯৬–৯৭] এত কিছু বলা হলেও মূল কথা হচ্ছে, তারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এমন নিদর্শন দেখেছে যা পূর্ববর্তী নবী-রাসূলদের কাছে যে সমস্ত নিদর্শন ছিল তা থেকে অনেক বেশী স্পষ্ট, অকাট্য ও শক্তিশালী। [দেখুন, ইবন কাসীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(৬) এদের পূর্বে যে সব জনপদ আমি ধ্বংস করেছি ওর অধিবাসীরা বিশ্বাস করত না; তবে এরা কি বিশ্বাস করবে? [1]
[1] অর্থাৎ, এর আগে আমি যত বসতি ধ্বংস করেছি তারা এমন ছিল না যে, তাদের ইচ্ছানুযায়ী মু’জিযা দেখানোর পর তারা ঈমান এনেছে; বরং তারা মু’জিযা দেখার পরও ঈমান আনেনি। যার কারণে ধ্বংসই ছিল তাদের পরিণতি। তাহলে কি মক্কাবাসীদের ইচ্ছানুসারে কোন মু’জিযা দেখানো হলে তারা কি ঈমান আনবে? কক্ষনো না; বরং তারা অবিশ্বাস ও বিরোধিতার পথেই অগ্রসর হতে থাকবে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর তোমার পূর্বে আমি পুরুষই পাঠিয়েছিলাম, যাদের প্রতি আমি ওহী পাঠাতাম। সুতরাং তোমরা জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞাসা কর যদি তোমরা না জান। আল-বায়ান
তোমার পূর্বে যে সব রসূল পাঠিয়েছিলাম যাদের প্রতি আমি ওয়াহী করতাম তারা মানুষই ছিল, তোমরা যদি না জান তবে (অবতীর্ণ) কিতাবের জ্ঞান যাদের আছে তাদেরকে জিজ্ঞেস কর। তাইসিরুল
তোমার পূর্বে আমি অহীসহ মানুষই পাঠিয়েছিলাম; তোমরা যদি না জান তাহলে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস কর। মুজিবুর রহমান
And We sent not before you, [O Muhammad], except men to whom We revealed [the message], so ask the people of the message if you do not know. Sahih International
৭. আর আপনার আগে আমরা ওহীসহ পুরুষদেরকেই পাঠিয়েছিলাম(১); সুতরাং যদি তোমরা না জান তবে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস কর।(২)
(১) এটি হচ্ছে “এ ব্যক্তি তো তোমাদের মতই একজন মানুষ” তাদের এ উক্তির জবাব। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মানবিক সত্তাকে তাঁর নবী না হওয়ার বিরুদ্ধে যুক্তি হিসেবে পেশ করতো। জবাব দেয়া হয়েছে যে, পূর্ব যুগের যেসব লোককে আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো হয়েছে বলে তোমরা মানো তারা সবাইও মানুষ ছিলেন এবং মানুষ থাকা অবস্থায়ই তারা আল্লাহর অহী লাভ করেছিলেন। যেমন অন্য আয়াতে বলেছেন, “আর আমরা আপনার আগেও জনপদবাসীদের মধ্য থেকে পুরুষদেরকেই পাঠিয়েছিলাম, যাদের কাছে ওহী পাঠাতাম।” [সূরা ইউসুফ: ১০৯]
এ আয়াত থেকে আরো জানা গেল যে, মহান আল্লাহ নবুওয়ত ও রিসালাতের জন্য শুধুমাত্র পুরুষদেরকেই মনোনীত করেছেন। নারীরা এটার যোগ্যতা রাখে না বলেই তাদের দেয়া হয়নি। সৃষ্টিগতভাবে এতবড় গুরু-দায়িত্ব নেয়ার যোগ্যতা তাদের নেই। নবুওয়তের প্রচার-প্রসারের জন্য যে নিরলস সংগ্রাম দরকার হয় তা নারীরা কখনো করতে পারে না। তাদেরকে তাদের সৃষ্টি উপযোগী দায়িত্বই দেয়া হয়েছে। তাদের দায়িত্বও কম জবাবদিহীতাও স্বল্প। তাদেরকে এ দায়িত্ব না দিয়ে আল্লাহ তাদের উপর বিরাট রহমত করেছেন।
(২) এখানে أَهْلَ الذِّكْرِ বা “জ্ঞানীদের” বলে তাওরাত ও ইঞ্জীলের যেসব আলেম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছিল, তাদেরকে বোঝানো হয়েছে। উদ্দেশ্য এই যে, যে ইহুদীরা ইসলাম বৈরিতার ক্ষেত্রে আজ তোমার সাথে গলা মিলিয়ে চলছে এবং তোমাদেরকে বিরোধিতা করার কায়দা কৌশল শেখাচ্ছে তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, মূসা ও বনী-ইসরাঈলের অন্যান্য নবীগণ কী ছিলেন? মানুষ ছিলেন, না ফেরেশতা ছিলেন? কেননা, তারা সবাই জানে যে পুর্ববর্তী সকল নবী মানুষই ছিলেন। এটা তো মূলত: তাদের জন্য রহমতস্বরূপ। কারণ, তাদের মধ্য থেকে পাঠানোর কারণেই তিনি তাদের কাছে বাণী পৌছাতে সক্ষম হয়েছেন। আর মানুষও নবীদের থেকে রিসালাত ও হুকুম আহকাম গ্রহণ করতে পেরেছেন। [ইবন কাসীর]
এ আয়াত থেকে জানা গেল যে, শরীআতের বিধি -বিধান জানে না, এরূপ মুর্খ ব্যক্তিদের উপর আলেমদের অনুসরণ করা ওয়াজিব। তারা আলেমদের কাছে জিজ্ঞেস করে তদনুযায়ী আমল করবে। [সা’দী]
তাফসীরে জাকারিয়া(৭) তোমার পূর্বে পুরুষদেরকেই আমি (রসূলরূপে) প্রেরণ করেছি; [1] যাদের নিকট আমি অহী পাঠাতাম। তোমরা যদি না জান, তাহলে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞাসা কর। [2]
[1] সমস্ত নবীই পুরুষ মানুষ ছিলেন। না মানুষ ছাড়া, না পুরুষ ছাড়া অন্য কেউ নবী হয়েছেন। অর্থাৎ, নবুঅত শুধুমাত্র মানুষের ও পুরুষের জন্য নির্দিষ্ট। এ থেকে বোঝা গেল যে, কোন নারী নবী হননি। কারণ নবুঅতের দায়িত্ব ও কর্তব্য এমন, যা নারীদের স্বভাব ও প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
[2] এখানে أهل الذكر (আহলে ইলম বা জ্ঞানী) বলতে আহলে কিতাবকে বুঝানো হয়েছে, যারা পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবের জ্ঞান রাখত। অর্থাৎ, তোমরা তাদেরকে জিজ্ঞাসা কর যে, যে সকল নবী গত হয়েছে তারা মানুষ ছিল, না অন্য কিছু? উত্তরে তারা বলবে, সমস্ত নবী মানুষই ছিলেন। এ থেকে কিছু লোক তাকলীদ (অন্ধানুকরণ) করার আবশ্যকতা প্রমাণ করেন; যা সঠিক নয়। তাকলীদ হল কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও তার নির্দিষ্ট ফিকহ (শরয়ী জ্ঞান)-কে একমাত্র অবলম্বনীয় মনে করা ও তার উপর আমল করা; অন্য কথায় তা বিনা দলীলে মেনে নেওয়া। অথচ আয়াতে আহলে যিকর বলতে কোন বিশেষ ব্যাক্তিকে বুঝানো হয়নি; বরং প্রত্যেক সেই জ্ঞানীকে বুঝানো হয়েছে যে তাওরাত ও ইঞ্জীলের জ্ঞান রাখত। বাস্তবপক্ষে এখানে কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির তাকলীদ খন্ডন করা হয়েছে। আলোচ্য আয়াতে তো উলামাদের দিকে রুজু করার উপর তাকীদ রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য অপরিহার্য; যা কেউ অস্বীকার করতে পারে না। এখানে কোন ব্যক্তি বিশেষের অাঁচল ধরার হুকুম দেওয়া হয়নি। পক্ষান্তরে তাওরাত ও ইঞ্জীল আসমানী গ্রন্থ ছিল এবং কোন মানব রচিত ফিকহ ছিল না? সুতরাং এর অর্থ হল, উলামাদের সাহায্যে শরীয়তের উক্তি ও বক্তব্য সম্পর্কে জেনে নাও। আর এটাই হল আলোচ্য আয়াতের সঠিক মর্মার্থ।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর আমি তাদেরকে এমন দেহবিশিষ্ট করিনি যে, তারা খাদ্য গ্রহণ করত না, আর তারা স্থায়ীও ছিল না। আল-বায়ান
তাদেরকে এমন দেহবিশিষ্ট করিনি যে তারা খাদ্য খেত না আর তারা ছিল না চিরস্থায়ী। তাইসিরুল
আর আমি তাদেরকে এমন দেহ বিশিষ্ট করিনি যে, তারা আহার্য গ্রহণ করতনা। তারা চিরস্থায়ীও ছিলনা। মুজিবুর রহমান
And We did not make the prophets forms not eating food, nor were they immortal [on earth]. Sahih International
৮. আর আমরা তাদেরকে এমন দেহবিশিষ্ট করিনি যে, তারা খাবার গ্ৰহণ করত না; আর তারা চিরস্থায়ীও ছিল না।(১)
(১) এটা তাদের আরেক প্রশ্নের উত্তর। তারা বলত যে, এটা কেমন নবী হলেন যে, খাওয়া-দাওয়া করেন? বলা হচ্ছে যে, যত নবী-রাসূলই পাঠিয়েছি তারা সবাই শরীর বিশিষ্ট লোক ছিলেন। তারা খাবার খেতেন। যেমন অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “আপনার আগে আমরা যে সকল রাসূল পাঠিয়েছি তারা সকলেই তো খাওয়া-দাওয়া করত ও হাটে-বাজারে চলাফেরা করত।” [সূরা আল-ফুরকান: ২০] অর্থাৎ তারাও মানুষদের মতই মানুষ ছিলেন। তারাও মানুষদের মতই খানা-পিনা করতেন। কামাই রোযগার করতে, ব্যবসা করতে বাজারে যেতেন। এটা তাদের কোন ক্ষতি করেনি। তাদের কোন মানও কমায়নি। কাফের মুশরিকরা যে ধারণা করে থাকে তা ঠিক নয়। তারা বলত: ‘এ কেমন রাসূল’ যে খাওয়া-দাওয়া করে এবং হাটে-বাজারে চলাফেরা করে; তার কাছে কোন ফিরিশতা কেন নাযিল করা হল না, যে তার সংগে থাকত সতর্ককারীরূপে? অথবা তার কাছে কোন ধনভাণ্ডার এসে পড়ল না কেন অথবা তার একটি বাগান নেই কেন, যা থেকে সে খেতো? যালিমরা আরো বলে, “তোমরা তো এক জাদুগ্ৰস্ত ব্যক্তিরই অনুসরণ করছ।” [সূরা আল-ফুরকান: ৭-৮] [ইবন কাসীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(৮) আমি তাদেরকে এমন দেহবিশিষ্ট করিনি যে, তারা আহার্য ভক্ষণ করত না এবং তারা চিরজীবীও ছিল না। [1]
[1] বরং তারা খাবারও খেত এবং মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে চিরস্থায়ী জীবনের পথে পাড়ি দিয়েছে। এ কথা বলে নবীগণের মানুষ হওয়ারই প্রমাণ পেশ করা হচ্ছে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানঅতঃপর আমি তাদের প্রতি কৃত ওয়াদা পূর্ণ করলাম। আর আমি তাদেরকে ও যাদেরকে ইচ্ছা করি রক্ষা করলাম এবং সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে ধ্বংস করে দিলাম। আল-বায়ান
অতঃপর আমি তাদেরকে দেয়া আমার ওয়া‘দা সত্যে পরিণত করলাম। ফলতঃ আমি তাদেরকে এবং আরো যাদেরকে চাইলাম রক্ষা করলাম আর সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে ধ্বংস করে দিলাম। তাইসিরুল
অতঃপর আমি তাদের প্রতি আমার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করলাম, আমি তাদেরকে ও যাদেরকে ইচ্ছা রক্ষা করেছিলাম এবং যালিমদেরকে করেছিলাম ধ্বংস। মুজিবুর রহমান
Then We fulfilled for them the promise, and We saved them and whom We willed and destroyed the transgressors. Sahih International
৯. তারপর আমরা তাদের প্রতি কৃত ওয়াদা সত্য করে দেখলাম, ফলে আমরা তাদেরকে ও যাদেরকে ইচ্ছে রক্ষা করেছিলাম এবং সীমালংঘনকারীদেরকে করেছিলাম ধ্বংস।(১)
(১) অর্থাৎ পূর্ববর্তী ইতিহাসের শিক্ষা শুধুমাত্র একথা বলে না যে, পূর্বে যেসব রাসূল পাঠানো হয়েছিল তারা মানুষ ছিলেন বরং একথাও বলে যে, তাদের সাহায্য ও সমর্থন করার এবং তাদের বিরোধিতাকারীদেরকে ধ্বংস করে দেবার যতগুলো অংগীকার আল্লাহ তাদের সাথে করেছিলেন সবই পূর্ণ হয়েছে এবং যেসব জাতি তাদের প্রতি অমর্যাদা প্ৰদৰ্শন করার চেষ্টা করেছিল তারা সবাই ধ্বংস হয়েছে। [ইবন কাসীর] কাজেই নিজেদের পরিণতি তোমরা নিজেরাই চিন্তা করে নাও।
তাফসীরে জাকারিয়া(৯) অতঃপর আমি তাদের প্রতি আমার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করলাম, সুতরাং আমি তাদেরকে এবং যাদেরকে ইচ্ছা রক্ষা করলাম। আর সীমালংঘনকারীদেরকে ধ্বংস করলাম। [1]
[1] অর্থাৎ, প্রতিশ্রুতি অনুসারে নবীদের ও মু’মিনদেরকে আমি মুক্তিদান করলাম এবং সীমালংঘনকারী কাফের ও মুশরিকদের আমি ধ্বংস করে দিলাম।
তাফসীরে আহসানুল বায়াননিশ্চয় আমি তোমাদের প্রতি এক কিতাব নাযিল করেছি, যাতে তোমাদের জন্য উপদেশ* রয়েছে, তবুও কি তোমরা বুঝবে না? আল-বায়ান
আমি তোমাদের প্রতি নাযিল করেছি এক কিতাব যাতে তোমাদের জন্য আছে উপদেশ, তোমরা কি তবুও বুঝবে না? তাইসিরুল
আমিতো তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করেছি কিতাব যাতে আছে তোমাদের জন্য উপদেশ, তবুও কি তোমরা বুঝবেনা? মুজিবুর রহমান
We have certainly sent down to you a Book in which is your mention. Then will you not reason? Sahih International
* এ আয়াতে যিকর শব্দটি দু’টি অর্থে ব্যবহৃত হতে পারেঃ একটি উপদেশ আর অপরটি সম্মান ও মর্যাদা। অর্থাৎ যে এ কুরআন শিক্ষা করে এবং তদনুযায়ী জীবন পরিচালনা করে সেই মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী হবে।
১০. আমরা তো তোমাদের প্রতি নাযিল করেছি কিতাব যাতে আছে তোমাদের আলোচনা, তবুও কি তোমরা বুঝবে না?(১)
(১) কিতাব অর্থ কুরআন এবং যিকর অর্থ সম্মান, শ্রেষ্ঠত্ব, খ্যাতি, উল্লেখ্য, আলোচনা ও বর্ণনা। আয়াতের অর্থ হচ্ছে, এটা তোমাদের জন্য সম্মান, প্রতিপত্তি ও স্থায়ী সুখ্যাতির বস্তু। যদি তোমরা এর উপর ঈমান আন এবং এটা অনুসারে আমল কর। বাস্তবিকই সাহাবোয়ে কিরাম এর বড় নিদর্শন। তারা এর উপর ঈমান এনেছিল এবং আমল করেছিল বলেই তাদের সম্মান এত বেশী। [সা’দী]
তাফসীরে জাকারিয়া(১০) আমি অবশ্যই তোমাদের প্রতি এমন গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি, যাতে তোমাদের জন্য উপদেশ আছে, তবুও কি তোমরা বুঝবে না?
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআমি কত জনবসতিকে ধ্বংস করেছি যারা ছিল যালিম এবং তাদের পর অন্য জাতি সৃষ্টি করেছি। আল-বায়ান
কত জনপদ ছিল যেগুলোকে আমি পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছি যার অধিবাসীরা ছিল যালিম। তাদের পরে আমি অন্য জাতি সৃষ্টি করেছি। তাইসিরুল
আমি ধ্বংস করেছি কত জনপদ যার অধিবাসীরা ছিল যালিম এবং তাদের পরে সৃষ্টি করেছি অপর জাতি। মুজিবুর রহমান
And how many a city which was unjust have We shattered and produced after it another people. Sahih International
১১. আর আমরা ধ্বংস করেছি বহু জনপদ, যার অধিবাসীরা ছিল যালেম এবং তাদের পরে সৃষ্টি করেছি অন্য জাতি।
-
তাফসীরে জাকারিয়া(১১) আমি কত জনপদ ধ্বংস করেছি। [1] যার অধিবাসীরা সীমালংঘনকারী ছিল এবং তাদের পরে অপর জাতি সৃষ্টি করেছি।
[1] قصم এর অর্থ ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা। আর كَم (কত) আধিক্য বর্ণনার জন্য ব্যবহূত হয়েছে। অর্থাৎ কত বসতি আমি ধ্বংস করেছি, চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছি। যেমন তিনি অন্যত্র বলেছেন, নূহের পর আমি কত (মানব) বসতি ধ্বংস করেছি। (সূরা বানী ইস্রাঈলঃ১৭)
তাফসীরে আহসানুল বায়ানঅতঃপর তারা যখন আমার আযাব দেখল তখনই তারা জনপদ ছেড়ে পালাতে লাগল। আল-বায়ান
তারা যখন আমার শাস্তি (’র আগমন) অনুভব করল, তখন তারা তাত্থেকে পালিয়ে যেতে (চেষ্টা) করল। তাইসিরুল
অতঃপর যখন তারা আমার শাস্তি প্রত্যক্ষ করল তখনই তারা জনপদ হতে পালাতে লাগল। মুজিবুর রহমান
And when its inhabitants perceived Our punishment, at once they fled from it. Sahih International
১২. অতঃপর যখন তারা আমাদের শাস্তি টেরা পেল(১) তখনই তারা সেখান থেকে পালাতে লাগিল।
(১) অর্থাৎ যখন তাদের নবীর ওয়াদামত আল্লাহর আযাব মাথার উপর এসে পড়েছে এবং তারা জানতে পেরেছে যে, তাদের ধ্বংস এসে গেছে তখন তারা পালাতে লাগল। [ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(১২) অতঃপর যখন ওরা আমার শাস্তির কথা অনুভব করল, তখনই ওরা জনপদ হতে পলায়ন করতে লাগল। [1]
[1] অনুভব করার অর্থ ইন্দ্রীয় দ্বারা জানা। অর্থাৎ, যখন তারা চোখ দ্বারা আযাব বা আযাবের লক্ষণ আসতে দেখল অথবা কান দ্বারা মেঘের গর্জন শুনে জানতে পারল, তখন তারা তা থেকে বাঁচার পথ খুঁজতে শুরু করল। ركض এর অর্থ হল, ঘোড়ার উপর চড়ে তাকে দৌড়ানোর জন্য পায়ের গোড়ালি দ্বারা আঘাত করা। আর এখান থেকেই এই শব্দ পলায়নের অর্থে ব্যবহার হতে লাগে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান(তাদেরকে বলা হল) ‘পলায়ন করো না, বরং তোমাদের ভোগ-বিলাসিতায় এবং ঘরবাড়িতে ফিরে যাও, যেন তোমাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হয়’। আল-বায়ান
(ফেরেশতারা তাদেরকে ঠাট্টা করে বলেছিল) পালিয়ে যেয়ো না, ফিরে এসো তোমরা যে ভোগ-বিলাসে মত্ত ছিলে তার দিকে আর তোমাদের আবাসগুলোতে, যাতে তোমাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যায় (‘আযাবের রূপটা কেমন দেখলে?)। তাইসিরুল
তাদেরকে বলা হলঃ পলায়ন করনা এবং ফিরে এসো তোমাদের ভোগ সম্ভারের নিকট এবং তোমাদের আবাসগৃহে, হয়তো এ বিষয়ে তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করা হতে পারে। মুজিবুর রহমান
[Some angels said], "Do not flee but return to where you were given luxury and to your homes - perhaps you will be questioned." Sahih International
১৩. পালিয়ে যেও না এবং ফিরে এসো যেখানে তোমরা বিলাসিতায় মত্ত ছিলে ও তোমাদের আবাসগৃহে, যাতে এ বিষয়ে তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করা হয়।(১)
(১) অর্থাৎ তোমরা পালিয়ে যেও না। এ কথাটি হয় ফেরেশতারা বলেছিল অথবা মুমিনরা তাদেরকে উপহাস করে তা বলেছিল। [দেখুন, ফাতহুল কাদীর] অর্থাৎ তোমরা নিজের আগের ঠাঁট বজায় রেখে সাড়ম্বরে আবার মজলিস গরম করো। হয়তো এখনো তোমাদের চাকরেরা বুকে হাত বেঁধে জিজ্ঞেস করবে, হুজুর, বলুন কি হুকুম। নিজের আগের পরিষদ ও কমিটি নিয়ে বসে যাও, হয়তো এখনো তোমার বুদ্ধিবৃত্তিক পরামর্শ ও জ্ঞানপুষ্ট মতামত থেকে লাভবান হবার জন্য দুনিয়ার লোকেরা তৈরী হয়ে আছে। কিন্তু এটা আর কখনও সম্ভব নয়, তারা আর সে মজলিসগুলোতে ফিরে যেতে পারবে না। তাদের কর্মকাণ্ড ও অহংকার নিঃশেষ হয়ে গেছে। [সা’দী]
তাফসীরে জাকারিয়া(১৩) (ওদের বলা হয়েছিল,) ‘তোমরা পলায়ন করো না[1] এবং তোমাদের ভোগ-সম্ভারের নিকট ও তোমাদের আবাস গৃহে ফিরে এসো; [2] যাতে এ বিষয়ে তোমাদেরকে জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে।’[3]
[1] এটি ফিরিশতাদের আহবান অথবা মু’মিনরা উপহাস ছলে এ কথা বলেছিল।
[2] অর্থাৎ, যে সব সুখ-সুবিধা ও ভোগ-বিলাসের উপকরণ তোমাদেরকে দান করা হয়েছিল এবং যা তোমাদের কুফরী ও সীমালংঘনের কারণ ছিল, আর ঐ সব বাড়ি-ঘর যেখানে তোমরা বসবাস করতে ও যার সৌন্দর্য ও স্থায়িত্ব নিয়ে গর্ব করতে, সে দিকেই ফিরে এস!
[3] আযাবের পর তোমাদের অবস্থা কি, তা তো জিজ্ঞাসা করা হোক? তোমাদের এ অবস্থা কি জন্য ও কেন হল? এ প্রশ্ন উপহাসের জন্য। তাছাড়া ধ্বংসের যাঁতাকলে পিষে ফেলার পর উত্তর দেওয়ার যোগ্যতা কি তাদের কখনও থাকতে পারে?
তাফসীরে আহসানুল বায়ানতারা বলল, ‘হায় আমাদের দুর্ভোগ! আমরা তো অবশ্যই যালিম ছিলাম।’ আল-বায়ান
তারা বলল, ‘হায় আমাদের দুর্ভাগ্য! আমরা সত্যিই অন্যায়কারী ছিলাম।’ তাইসিরুল
তারা বললঃ হায় দুর্ভোগ আমাদের! আমরাতো ছিলাম যালিম। মুজিবুর রহমান
They said, "O woe to us! Indeed, we were wrongdoers." Sahih International
১৪. তারা বলল, হায়! দুর্ভোগ আমাদের! আমরা তো ছিলাম যালেম।(১)
(১) অর্থাৎ খেলা-তামাসা করা আমার কাজ নয়। এগুলোকে আমি অনাহুত ও আসার সৃষ্টি করিনি। বরং এটা বোঝানোর জন্য যে, এর একজন সৃষ্টিকর্তা রয়েছে, যিনি ক্ষমতাবান, যার নির্দেশ মানতে সবাই বাধ্য। তিনি নেককার ও বদকারের শাস্তি বিধান করবেন। তিনি আসমান ও যমীন এজন্যে সৃষ্টি করেননি যে মানুষ একে অপরের উপর যুলুম করবে। এজন্যে সৃষ্টি করেননি যে, তাদের কেউ কুফরী করবে, তাদেরকে যা নির্দেশ দেয়া হয়েছে তার বিরোধিতা করবে। তারপর মারা যাবে কিন্তু তাদের কোন শাস্তি হবে না। তাদেরকে এজন্যে সৃষ্টি করা হয়নি যে, তাদেরকে দুনিয়াতে ভাল কাজের নির্দেশ দিবেন না, খারাপ কাজ থেকে নিষেধ করবেন না। এ ধরনের খেলা একজন প্রাজ্ঞ থেকে কখনও হতে পারে না। এটা অবশ্যই প্রজ্ঞা বিরোধী কাজ। [কুরতুবী] বরং আল্লাহ আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে, ইনসাফ ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার জন্য। বরং তিনি সৃষ্টি করেছেন, “যাতে তিনি তাদের কাজের প্রতিফল দিতে পারেন যারা মন্দ কাজ করে এবং তাদেরকে তিনি উত্তম পুরস্কার দিতে পারেন যারা সৎকাজ করে।” [সূরা আন-নাজম: ৩১] [ইবন কাসীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(১৪) ওরা বলল, ‘হায় দুর্ভোগ আমাদের! আমরা ছিলাম সীমালংঘনকারী।’
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ানঅতঃপর তাদের এই বিলাপ চলতে থাকে আমি তাদেরকে কেটে ফেলা শস্য ও নিভে যাওয়া আগুন সদৃশ না করা পর্যন্ত। আল-বায়ান
তাদের এ আর্তনাদ বন্ধ হয়নি যতক্ষণ না আমি তাদেরকে করেছিলাম কাটা শস্য ও নিভানো আগুনের মত। তাইসিরুল
তাদের এই আর্তনাদ চলতে থাকে যতক্ষণ না আমি তাদেরকে কর্তিত শস্য ও নির্বাপিত আগুন সদৃশ করি। মুজিবুর রহমান
And that declaration of theirs did not cease until We made them [as] a harvest [mowed down], extinguished [like a fire]. Sahih International
১৫. অতঃপর তাদের এ আর্তনাদ চলতে থাকে আমরা তাদেরকে কাটা শস্য ও নেভানো আগুনের মত না করা পর্যন্ত।
-
তাফসীরে জাকারিয়া(১৫) আমি ওদেরকে কাটা শস্য ও নিভানো আগুনের মত না করা পর্যন্ত ওদের এ আর্তনাদ স্তব্ধ হয়নি। [1]
[1] যতক্ষণ জীবনের স্পন্দন ছিল তারা নিজেদের অত্যাচারের কথা স্বীকার করেছে। حَصِيد কাটা ফসল এবং خامِد নিভে যাওয়া আগুনকে বলে। অর্থাৎ, শেষ পর্যন্ত তারা কাটা ফসল ও নিভে যাওয়া আগুনের মত ভষ্মস্তূপে পরিণত হয়ে গেল। কোন প্রকার শক্তি, ক্ষমতা, অনুভূতি ও স্পন্দন কিছুই তাদের মাঝে রইল না।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআসমান-যমীন ও তাদের মাঝখানে যা কিছু আছে তার কোন কিছুই আমি খেলাচ্ছলে সৃষ্টি করিনি। আল-বায়ান
আসমান, যমীন আর এ দু’য়ের মধ্যে যা কিছু আছে তা আমি খেলতে খেলতে বানাইনি। তাইসিরুল
আকাশ ও পৃথিবী এবং যা এতদুভয়ের মধ্যে রয়েছে তা আমি ক্রীড়াচ্ছলে সৃষ্টি করিনি। মুজিবুর রহমান
And We did not create the heaven and earth and that between them in play. Sahih International
১৬. আর আসমান, যমীন ও যা এতদুভয়ের মধ্যে আছে তা আমরা খেলার ছলে সৃষ্টি করিনি।
-
তাফসীরে জাকারিয়া(১৬) আকাশ ও পৃথিবী এবং যা উভয়ের অন্তর্বর্তী তা আমি খেলাচ্ছলে সৃষ্টি করিনি। [1]
[1] বরং এর পিছনে বেশ কয়েকটি উদ্দেশ্য ও যুক্তি ছিল। যেমন বান্দারা আমার স্মরণ ও কৃতজ্ঞতা করবে, সৎলোকদেরকে সৎকাজের প্রতিদান এবং পাপীদেরকে পাপের শাস্তি দেওয়া হবে ইত্যাদি।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআমি যদি খেলার উপকরণ গ্রহণ করতে চাইতাম, তবে আমার কাছে যা আছে তা দিয়েই করতাম। কিন্তু আমি তা করিনি। আল-বায়ান
আমি যদি খেলাধূলার বস্তু বানাতে চাইতাম তাহলে আমার কাছে যা আছে তা নিয়েই তা করতাম, যদি আমাকে করতে হত! তাইসিরুল
আমি যদি ক্রীড়ার উপকরণ চাইতাম তাহলে আমি আমার নিকট যা আছে তা দিয়েই ওটা করতাম, আমি তা করিনি। মুজিবুর রহমান
Had We intended to take a diversion, We could have taken it from [what is] with Us - if [indeed] We were to do so. Sahih International
১৭. আমরা যদি খেলার উপকরণ গ্রহণ করতে চাইতাম তবে আমরা আমাদের কাছ থেকেই তা গ্ৰহণ করতাম; কিন্তু আমরা তা করিনি।(১)
(১) অর্থাৎ আমি যদি ক্রীড়াচ্ছলে কোন কাজ গ্রহণ করতে চাইতাম এবং একাজ আমাকে করতেই হত, তবে পৃথিবী ও আকাশ সৃষ্টি করার কি প্রয়োজন ছিল? একাজ তো আমার নিকটস্থ বস্তু দ্বারাই হতে পারত। لَهْوٌا শব্দের আসল অর্থ, কর্মহীনতার কর্ম, বা রং-তামাশার জন্য যা করা হয় তা। উদ্দেশ্য এই যে, যেসব বোকা ঊর্ধ্ব জগত ও অধঃজগতের সমস্ত আশ্চর্যজনক সৃষ্টবস্তুকে রং তামাশা ও ক্রীড়া মনে করে, তারা কি এতটুকুও বোঝে না যে, খেলা ও রং তামাশার জন্য এত বিরাট বিরাট কাজ করা হয় না। একাজ যে করে, সে এভাবে করে না। এ আয়াতে ইঙ্গিত আছে যে, রং তামাশা ও ক্রীড়ার যে কোন কাজ কোন ভালো বিবেকবান মানুষের পক্ষেও সম্ভবপর নয় - আল্লাহ্ তা'আলার মাহাত্ম্য তো অনেক ঊর্ধ্বে।
তাছাড়া لَهْوٌا শব্দটি কোন কোন সময় স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততির অর্থেও ব্যবহৃত হয়। এখানে এ অর্থ ধরা হলে আয়াতের উদ্দেশ্য হবে ইয়াহুদী ও নাসারাদের দাবী খণ্ডন করা। তারা উযায়ের ও ঈসা আলাইহিস সালামকে আল্লাহর পুত্র বলে। আয়াতে বলা হয়েছে যে, যদি আমাকে সন্তানই গ্রহণ করতে হত, তবে মানবকে কেন গ্রহণ করতাম, আমার নিকটস্থ সৃষ্টিকেই গ্রহণ করতাম। [দেখুন, ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর] এ আয়াতটির বক্তব্য অন্য আয়াতের মত, যেখানে বলা হয়েছে, “আল্লাহ সন্তান গ্ৰহণ করতে চাইলে তিনি তার সৃষ্টির মধ্যে যাকে ইচ্ছে বেছে নিতেন। পবিত্র ও মহান তিনি! তিনি আল্লাহ, এক, প্রবল প্রতাপশালী।” [সূরা আয-যুমার: ৪]
তাফসীরে জাকারিয়া(১৭) আমি যদি চিত্তবিনোদনের উপকরণ সৃষ্টি করতে চাইতাম, তবে আমি আমার নিকট যা আছে তা নিয়েই করতাম; [1] যদি আমি তা করতামই। [2]
[1] অর্থাৎ, নিজের কাছেই কিছু জিনিস খেলার জন্য সৃষ্টি করে নিতেন এবং নিজের শখ পূরণ করে নিতেন। এ বিশাল বিশ্ব ও তাতে সচেতন জীব ও জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন সৃষ্টির কি প্রয়োজন ছিল?
[2] ‘আমি তা করিনি’ --এই অনুবাদের তুলনায় আরবী বাগধারায় ‘যদি আমি তা করতামই’ বেশী সঠিক। (ফাতহুল কাদীর)
তাফসীরে আহসানুল বায়ানবরং আমি মিথ্যার উপর সত্য নিক্ষেপ করি; ফলে তা মিথ্যাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় এবং নিমিষেই তা বিলুপ্ত হয়। আর তোমাদের জন্য রয়েছে দুর্ভোগ তোমরা যা বলছ তার জন্য । আল-বায়ান
বরং আমি সত্যকে মিথ্যের উপর নিক্ষেপ করি, অতঃপর তা মিথ্যের মস্তক চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়, তৎক্ষণাৎ মিথ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। তোমরা (আল্লাহ সম্পর্কে অযথা বহু মিথ্যে কথা বানিয়ে নিয়ে) যা বলছ এ কারণে তোমাদের জন্য দুর্ভোগ। তাইসিরুল
কিন্তু আমি সত্য দ্বারা আঘাত হানি মিথ্যার উপর; ফলে ওটা মিথ্যাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় এবং তৎক্ষণাৎ মিথ্যা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। দুর্ভোগ তোমাদের! তোমরা যা বলছ তার জন্য। মুজিবুর রহমান
Rather, We dash the truth upon falsehood, and it destroys it, and thereupon it departs. And for you is destruction from that which you describe. Sahih International
১৮. বরং আমরা সত্য দ্বারা আঘাত হানি মিথ্যার উপর; ফলে তা মিথ্যাকে চূৰ্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় এবং তৎক্ষণাৎ মিথ্যা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।(১) আর তোমরা আল্লাহকে যে গুণে গুণান্বিত করছ তার জন্য রয়েছে তোমাদের দুর্ভোগ!(২)
(১) আয়াতের উদ্দেশ্য এই যে, পৃথিবী ও আকাশের অত্যাশ্চর্য বস্তুসমূহ আমি খেলার জন্য নয়, বরং বড় বড় রহস্যের উপর ভিত্তিশীল করে সৃষ্টি করেছি। তন্মধ্যে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য ফুটিয়ে তোলাও এক রহস্য। সৃষ্ট জগতের অবলোকন মানুষকে সত্যের দিকে এমনভাবে পথ প্রদর্শন করে যে, মিথ্যা তার সামনে টিকে থাকতে পারে না। এ বিষয়বস্তুটিই এভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে যে, সত্যকে মিথ্যার উপর ছুড়ে মারা হয়, ফলে মিথ্যার মস্তিষ্ক চূৰ্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় এবং মিথ্যা নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়ে। [দেখুন, ইবন কাসীর]
(২) এ আয়াতে আল্লাহ সম্পর্কে তাদের যাবতীয় কু ধারণার মুলোৎপাটন করা হয়েছে। তারা আল্লাহকে তার সমস্ত কর্মকাণ্ড থেকে বিমুক্ত করে রাখে। তারা তাঁকে মনে করে থাকে যে, তিনি এমনিতেই আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, কোন সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ছাড়া। এ সমস্ত মিথ্যা কথা ও রটনা দ্বারা আল্লাহকে খারাপ বিশেষণে বিশেষিত করা হয় বিধায় এ আয়াতে তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। [দেখুন, কুরতুবী; ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(১৮) বরং আমি সত্য দ্বারা মিথ্যার উপর আঘাত হানি; সুতরাং তা মিথ্যাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়; ফলে মিথ্যা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। [1] তোমরা যা বর্ণনা করছ তার জন্য দুর্ভোগ তোমাদের! [2]
[1] বিশ্ব সৃষ্টির উদ্দেশ্যসমূহের মধ্যে একটি বিশেষ উদ্দেশ্য এই যে, এখানে ন্যায় ও অন্যায়ের যে দ্বন্দ্ব, ভালো ও মন্দের মধ্যে যে সংঘর্ষ চলছে তার মধ্যে ন্যায় ও ভালোকে বিজয়ী করা ও অন্যায় ও মন্দকে পরাজিত করা। সুতরাং আমি সত্য দ্বারা অসত্যের উপর, ন্যায় দ্বারা অন্যায়ের উপর এবং ভালো দ্বারা মন্দের উপর আঘাত করি, যাতে অসত্য, অন্যায় ও মন্দের বিলুপ্তি ঘটে। دمغ মাথার উপর এমন আঘাতকে বলা হয় যা মগজ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আর زهق এর অর্থ শেষ হওয়া, ধ্বংস হওয়া বা বিনষ্ট হওয়া।
[2] অর্থাৎ, প্রতিপালকের প্রতি তোমরা যে সব ভিত্তিহীন কথা আরোপ করছ বা উদ্ভব করছ (যেমন এ পৃথিবী একটি খেলনা মাত্র, একজন খেলোয়াড়ের বাজে শখ, আল্লাহর স্ত্রী বা সন্তান আছে ইত্যাদি) তা তোমাদের ধ্বংসের মূল কারণ। কেননা এটাকে খেলতামাশা মনে করার ফলে তোমরা সত্য হতে দূর হওয়া এবং অসত্যকে বরণ করার ব্যাপারে কোন প্রকার দ্বিধা ও ভীতি অনুভব কর না, যার শেষ পরিণাম তোমাদের ধ্বংস ও সর্বনাশ।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর আসমান-যমীনে যারা আছে তারা সবাই তাঁর; আর তাঁর কাছে যারা আছে তারা অহঙ্কারবশতঃ তাঁর ইবাদাত হতে বিমুখ হয় না এবং ক্লান্তিও বোধ করে না। আল-বায়ান
আসমান ও যমীনে যারা আছে তারা তাঁরই মালিকানাধীন, আর যারা তাঁর সন্নিকটে আছে তারা গর্বভরে তাঁর ‘ইবাদাত থেকে বিমুখ হয় না, আর তারা (কক্ষনো তাঁর ‘ইবাদাত করার ব্যাপারে) ক্লান্তিবোধ করে না। তাইসিরুল
আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা আছে তা তাঁরই, তাঁর সান্নিধ্যে যারা আছে তারা অহংকার করে তাঁর ইবাদাত করা হতে বিমুখ হয়না এবং ক্লান্তিও বোধ করেনা। মুজিবুর রহমান
To Him belongs whoever is in the heavens and the earth. And those near Him are not prevented by arrogance from His worship, nor do they tire. Sahih International
১৯. আর আসমানসমূহ ও যমীনে যারা আছে তারা তাঁরই; আর তাঁর সান্নিধ্যে যারা আছে(১) তারা অহংকার-বশে তার ইবাদাত করা হতে বিমুখ হয় না এবং বিরক্তি বোধ করে না।(২)
(১) যারা তাঁর সান্নিধ্যে আছে তারা হলেন ফিরিশতারা। আরব মুশরিকরা সেসব ফেরেশতাদেরকে আল্লাহর সন্তান অথবা প্রভুত্ব কর্তৃত্বে শামিল মনে করে মাঝুদ বানিয়ে রেখেছিল। [কুরতুবী] এখানে তাদের ধারণা খণ্ডন করা হচ্ছে।
(২) অন্য আয়াতেও এসেছে, “মসীহ আল্লাহর বান্দা হওয়াকে কখনো হেয় মনে করেন না, এবং ঘনিষ্ঠ ফেরেশতাগণও করে না। আর কেউ তার ইবাদাতকে হেয় জ্ঞান করলে এবং অহংকার করলে তিনি অচিরেই তাদের সবাইকে তার কাছে একত্ৰ করবেন।” [সূরা আন-নিসা: ১৭২]
তাফসীরে জাকারিয়া(১৯) আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যারা আছে তারা তাঁরই মালিকানাধীন;[1] আর তাঁর সান্নিধ্যে যারা আছে[2] তারা তাঁর উপাসনা করতে অহংকার করে না এবং ক্লান্তি বোধও করে না।
[1] অর্থাৎ, সকলেই তাঁর অধীনস্থ দাস বা মালিকানাভুক্ত গোলাম, সুতরাং যখন তোমরাই কোন দাসকে নিজের পুত্র এবং কোন দাসীকে নিজের স্ত্রী রূপে গ্রহণ করতে প্রস্তুত নও, তাহলে মহান আল্লাহ নিজের অধীনস্থ দাস-দাসীদের মধ্যে হতে কাউকে পুত্র এবং কাউকে স্ত্রী রূপে কিভাবে গ্রহণ করতে পারেন?
[2] এখানে ফিরিশতাদের বুঝানো হয়েছে। তাঁরাও আল্লাহর দাস বা বান্দা। এই বাক্য দ্বারা তাঁদের সম্মান, মর্যাদা প্রকাশ পাচ্ছে যে, তাঁরা আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত, তাঁরা তাঁর কন্যা নয়; যেমন মুশরিকরা বিশ্বাস করে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানতারা দিন-রাত তাঁর তাসবীহ পাঠ করে, তারা শিথিলতা দেখায় না। আল-বায়ান
তারা রাত-দিন তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করতে থাকে, তারা কক্ষনো শিথিলতা করে না বা আগ্রহ হারায় না। তাইসিরুল
তারা দিন-রাত তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে, শৈথিল্য করেনা। মুজিবুর রহমান
They exalt [Him] night and day [and] do not slacken. Sahih International
২০. তারা দিন-রাত তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে, তারা ক্লান্তও হয় না।(১)
(১) আয়াতের শেষে বলা হয়েছে যে, ফেরেশতাদের ইবাদাতে কোন অন্তরায় নেই। তারা ইবাদতে অহংকারও করে না যে, ইবাদাতকে পদমর্যাদার খেলাফ মনে করবে এবং ইবাদাতে কোন সময় ক্লান্তও হয় না। আয়াতে এ বিষয়বস্তুকেই পূর্ণতা দান করে বলা হয়েছে যে, ফেরেশতারা রাত দিন তসবীহ পাঠ করে এবং কোন সময় অলসতা করেন না। যাজ্জাজ বলেন, আমাদের নিঃশ্বাস নিতে যেমন কোন কাজ বাধা হয় না, তেমনি তাদের তাসবীহ পাঠ করতে কোন কাজ বাধা হয় না। [দেখুন, কুরতুবী; ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(২০) তারা দিবা-রাত্রি তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে; তারা শৈথিল্য করে না।
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান