সূরার আয়াত সংখ্যাঃ ৫২ আয়াত।
সূরার নাযিল হওয়ার স্থানঃ এটি মাক্কী সূরা।
সূরা ইবরাহীম মক্কায় হিজরতের পূর্বে নাযিল হয়েছে। কতিপয় আয়াত সম্পর্কে মতভেদ আছে যে, মক্কায় হিজরতের পূর্বে নাযিল, না মদীনায় নাযিল হয়েছে।
নামকরনঃ এ সূরার শুরুতে রিসালাত, নবুওয়াত ও এসবের কিছু বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর কাহিনী বর্ণিত হয়েছে এবং এর সাথে মিল রেখেই সূরার নাম সূরা ইবরাহীম রাখা হয়েছে।
আলিফ-লাম-রা; এই কিতাব, যা আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে তুমি মানুষকে তাদের রবের অনুমতিক্রমে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আন, পরাক্রমশালী সর্বপ্রশংসিতের পথের দিকে। আল-বায়ান
আলিফ-লাম-র, একটা কিতাব যা তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি যাতে তুমি মানুষকে তাদের প্রতিপালকের নির্দেশে অন্ধকার থেকে নিয়ে আসতে পার আলোর দিকে- মহাপরাক্রমশালী প্রশংসিতের পথে। তাইসিরুল
আলিফ লাম রা। এই কিতাব আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি যাতে তুমি মানব জাতিকে বের করে আনতে পার অন্ধকার হতে আলোর দিকে; তাঁর পথে, যিনি পরাক্রমশালী, প্রশংসা । মুজিবুর রহমান
Alif, Lam, Ra. [This is] a Book which We have revealed to you, [O Muhammad], that you might bring mankind out of darknesses into the light by permission of their Lord - to the path of the Exalted in Might, the Praiseworthy - Sahih International
১. আলিফ-লাম্-রা, এ কিতাব, আমরা এটা আপনার প্রতি নাযিল করেছি(১) যাতে আপনি মানুষদেরকে তাদের রবের অনুমতিক্রমে বের করে আনতে পারেন অন্ধকার থেকে আলোর দিকে(২) পরাক্রমশালী, সর্বপ্রশংসিতের পথের দিকে(৩),
(১) অর্থাৎ এটা ঐ গ্রন্থ, যা আমরা আপনার প্রতি নাযিল করেছি। এতে নাযিল করার কাজটি আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করা এবং সম্বোধন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দিকে করার দ্বারা এটা বুঝা যায় যে, এ গ্রন্থ আল-কুরআন অত্যন্ত মহান। একে স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা নাযিল করেছেন। এটি আসমান থেকে নাযিল হওয়া কিতাবাদির মধ্যে অতি সম্মানিত গ্রন্থ। তিনি তা নাযিল করেছেন আরব বা অনারব যমীনের অধিবাসী সকল মানুষের কাছে প্রেরিত রাসূলদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তির উপর। [ইবন কাসীর]
(২) এখানে ناس শব্দের অর্থ সাধারণ মানুষ। এতে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সকল যুগের মানুষই বোঝানো হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর] ظلمات শব্দটি ظلمة এর বহুবচন। এর অর্থ অন্ধকার। এখানে ظلمات বলে কুফর, শির্ক ও মন্দকর্মের অন্ধকারসমূহ আবার কারও কারও মতে, বিদ'আত। অপর কারও মতে, সন্দেহ। পক্ষান্তরে نور বলে ঈমানের আলো বোঝানো হয়েছে। অথবা সুন্নাত বা ইয়াকীন বা দৃঢ়বিশ্বাস বোঝানো হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর] ظلمات শব্দটি বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। কেননা, কুফর ও শির্কের প্রকারভেদ অনেক। অমনিভাবে মন্দকর্মের সংখ্যাও গণনার বাইরে। বিদ'আতের সংখ্যাও অনুরূপভাবে প্রচুর। আর যে সন্দেহ মানব ও জিন শয়তান মানুষের মনে তৈরী করে তা বহু রকমের। পক্ষান্তরে نور শব্দটি একবচনে আনা হয়েছে। কেননা, ঈমান ও সত্য এক। আয়াতের অর্থ এই যে, আমি এ গ্রন্থ এ জন্য আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি এর সাহায্যে বিশ্বের মানুষকে কুফর, শির্ক ও মন্দকর্মের অন্ধকার থেকে মুক্তি দিয়ে তাদের রবের আদেশক্রমে ঈমান ও সত্যের আলোর দিকে আনয়ন করেন। যেমন অন্য আয়াতে আল্লাহ্ বলেন, “তিনিই তাঁর বান্দার প্রতি সুস্পষ্ট আয়াত নাযিল করেন, তোমাদেরকে অন্ধকার হতে আলোতে আনার জন্য [সূরা আল-হাদীদঃ ৯] [ইবন কাসীর]
(৩) এ আয়াতের শুরুতে যে অন্ধকার ও আলোর উল্লেখ করা হয়েছিল, বলাবাহুল্য তা ঐ অন্ধকার ও আলো নয়, যা সাধারণ দৃষ্টিতে দেখা যায়। তাই তা ফুটিয়ে তোলার জন্য এ বাক্যে বলা হয়েছে যে, ঐ আলো হচ্ছে আল্লাহর পথ। যে সুস্পষ্ট পথ আল্লাহ মানুষের চলার জন্য প্রবর্তন করেছেন। যে পথে যেতে এবং যে পথে প্রবেশ করতে তিনি মানুষদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। [ফাতহুল কাদীর] এস্থলে আল্লাহ শব্দটি পরে এবং তার আগে তার দুটি গুণবাচক নাম عزيز ও حميد উল্লেখ করা হয়েছে। عزيز শব্দের অর্থ শক্তিশালী ও পরাক্রান্ত এবং حميد শব্দের অর্থ ঐ সত্তা, যিনি প্রশংসার হকদার হওয়ার ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ। [ফাতহুল কাদীর]। তিনি তার যাবতীয় কাজ, কথা, শরীআত, নির্দেশ, ও নিষেধের ক্ষেত্রে প্রশংসিত এবং তাঁর যাবতীয় নির্দেশের ক্ষেত্রে সত্যবাদী। [ইবন কাসীর] আল্লাহর এ দুটি গুণবাচক নাম আসল নামের পূর্বে উল্লেখ করে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, এ পথ পথিককে যে সত্তার দিকে নিয়ে যায়, তিনি প্রবল পরাক্রান্ত এবং প্রশংসার হকদার হওয়ার ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ। ‘হামীদ’ শব্দটির অপর অর্থ, প্রত্যেকের মুখেই তাঁর প্রশংসা, সকল স্থানে ও সকল অবস্থায় তিনি সম্মানিত। [ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(১) আলিফ লা-ম রা। এই কিতাব এটা আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি; যাতে তুমি মানব জাতিকে তাদের প্রতিপালকের নির্দেশক্রমে[1] অন্ধকার হতে আলোকের দিকে;[2] পরাক্রমশালী, সর্বপ্রশংসিতের পথে বের করে আনতে পার।
[1] অর্থাৎ, নবীর কাজ শুধু হিদায়াতের রাস্তা দেখানো। যদি কেউ হিদায়াতের পথ অবলম্বন করে, তাহলে তা একমাত্র আল্লাহর হুকুম ও ইচ্ছার ভিত্তিতেই করে থাকে। কেননা মূল হিদায়াতদানকারী তো তিনিই। যদি তাঁর ইচ্ছা না হয়, তাহলে নবী যতই ওয়ায-নসীহত করুক না কেন, লোকেরা হিদায়াতের পথে আসতে প্রস্তুত হবে না। এর বিভিন্ন উদাহরণ পূর্ববর্তী নবীদের জীবনে বিদ্যমান রয়েছে। স্বয়ং শেষনবী (সাঃ)-এর কঠিন ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাঁর দয়ার্দ্র চাচা আবূ তালেবকে মুসলমান করতে পারেননি।
[2] যেমন মহান আল্লাহ অন্য স্থানেও বলেছেন, هُوَ الَّذِي يُنَزِّلُ عَلَى عَبْدِهِ آيَاتٍ بَيِّنَاتٍ لِيُخْرِجَكُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ অর্থাৎ, তিনিই তাঁর বান্দার প্রতি সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ অবতীর্ণ করেন, তোমাদেরকে সমস্ত প্রকার অন্ধকার হতে আলোর দিকে আনার জন্য। (সূরা হাদীদ ৯) তিনি আরো বলেন, ﴿اللهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُواْ يُخْرِجُهُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّوُرِ﴾ অর্থাৎ, আল্লাহই হচ্ছেন মুমিনদের অভিভাবক, তিনি তাদেরকে অন্ধকার হতে আলোর দিকে নিয়ে যান। (সূরা বাক্বারাহ ২৫৭)
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআল্লাহর (পথ), আসমানসমূহ ও যমীনের সব কিছুই যার মালিকানায় এবং কাফিরদের জন্য রয়েছে কঠিন আযাবের দুর্ভোগ। আল-বায়ান
আল্লাহ- আসমানসমূহে যা কিছু আছে আর পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সবই তাঁর মালিকানাধীন। কিন্তু কাফিরদের জন্য আছে কঠিন শাস্তির দুর্ভোগ। তাইসিরুল
আল্লাহ, আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে তা তাঁরই; কঠিন শাস্তির দুর্ভোগ কাফিরদের জন্য। মুজিবুর রহমান
Allah, to whom belongs whatever is in the heavens and whatever is on the earth. And woe to the disbelievers from a severe punishment Sahih International
২. আল্লাহর পথে—আসমানসমূহে যা কিছু রয়েছে ও যমীনে যা কিছু রয়েছে তা তাঁরই(১)। আর কাফিরদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তির দুর্ভোগ(২)
(১) মালিক হিসেবেও এগুলো তাঁর, দাস হিসেবেও এরা তাঁরই দাস, উদ্ভাবক হিসেবেও তিনিই এগুলোর উদ্ভাবক, আর স্রষ্টা হিসেবেও তিনিই তাদের স্রষ্টা। [কুরতুবী] আয়াতের অন্য অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ আসমান ও যমীনের সবকিছু যার, তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান। [কুরতুবী]
(২) ويل শব্দের অর্থ কঠোর শাস্তি ও বিপর্যয়। অথবা শাস্তি ও ধ্বংসের জন্য ব্যবহৃত বাক্য। [কুরতুবী] অর্থ এই যে, যারা কুরআনরূপী নেয়ামত অস্বীকার করে এবং অন্ধকারেই থাকতে পছন্দ করে, তাদের জন্য রয়েছে ধ্বংস ও বিপর্যয়, ঐ কঠোর আযাবের কারণে যা তাদের উপর আপতিত হবে। [ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(২) আল্লাহর পথে; যাঁর মালিকানাধীন আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে। কঠিন শাস্তির দুর্ভোগ অবিশ্বাসীদের জন্য।
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ানযারা দুনিয়ার জীবনকে আখিরাত থেকে অধিক পছন্দ করে, আর আল্লাহর পথে বাধা দেয় এবং তাতে বক্রতার সন্ধান করে; তারা ঘোরতর ভ্রষ্টতায় রয়েছে। আল-বায়ান
যারা আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার জিন্দিগীকে শ্রেয় জ্ঞান করে, যারা আল্লাহর পথ থেকে (লোকদেরকে) বিরত রাখে আর তাতে বক্রতা আনার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে। এরা গোমরাহীতে বহু দূরে চলে গেছে। তাইসিরুল
যারা পার্থিব জীবনকে পরকালিন জীবনের উপর প্রাধান্য দেয়, মানুষকে নিবৃত্ত করে আল্লাহর পথ হতে এবং তা (আল্লাহর পথ) বক্র করতে চায়; তারাইতো ঘোর বিভ্রান্তিতে রয়েছে। মুজিবুর রহমান
The ones who prefer the worldly life over the Hereafter and avert [people] from the way of Allah, seeking to make it (seem) deviant. Those are in extreme error. Sahih International
৩. যারা দুনিয়ার জীবনকে আখিরাত থেকে অধিক ভালবাসে এবং মানুষকে ফিরিয়ে রাখে আল্লাহর পথ থেকে, আর আল্লাহর পথ বাঁকা করতে চায়; তারাই ঘোর বিভ্রান্তিতে নিপতিত।
-
তাফসীরে জাকারিয়া(৩) যারা ইহজীবনকে পরজীবনের উপর প্রাধান্য দেয়, মানুষকে আল্লাহর পথ হতে নিবৃত্ত করে এবং তাতে বক্রতা অনুসন্ধান করে;[1] তারাই তো ঘোর বিভ্রান্তিতে রয়েছে।[2]
[1] এর একটি অর্থ এই যে, ইসলামের শিক্ষার ব্যাপারে মানুষের মাঝে কুধারণা উৎপন্ন করার জন্য ত্রুটি বের করে এবং তা বিকৃত করে পেশ করে। এর দ্বিতীয় অর্থ এই যে, নিজ মনমত তাতে পরিবর্তন সাধন করতে চায়।
[2] কেননা তাদের মধ্যে উল্লিখিত বিভিন্ন অপরাধ একত্রিত হয়েছে, যেমন; আখেরাতের তুলনায় দুনিয়াকে প্রাধান্য দেওয়া, আল্লাহর রাস্তা থেকে মানুষকে বাধা প্রদান করা এবং ইসলাম ধর্মের দোষ-ত্রুটি অনুসন্ধান করা।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর আমি প্রত্যেক রাসূলকে তার কওমের ভাষাতেই পাঠিয়েছি, যাতে সে তাদের কাছে বর্ণনা দেয়, সুতরাং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা সঠিক পথ দেখান। আর তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল-বায়ান
আমি কোন রসূলকেই তার জাতির ভাষা ছাড়া পাঠাইনি যাতে তাদের কাছে স্পষ্টভাবে (আমার নির্দেশগুলো) বর্ণনা করতে পারে। অতঃপর আল্লাহ যাকে ইচ্ছে পথহারা করেছেন, আর যাকে ইচ্ছে সঠিক পথ দেখিয়েছেন, তিনি বড়ই পরাক্রান্ত, বিজ্ঞানময়। তাইসিরুল
আমি প্রত্যেক রাসূলকেই তার স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাদের নিকট পরিস্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎ পথে পরিচালিত করেন এবং তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। মুজিবুর রহমান
And We did not send any messenger except [speaking] in the language of his people to state clearly for them, and Allah sends astray [thereby] whom He wills and guides whom He wills. And He is the Exalted in Might, the Wise. Sahih International
৪. আর আমরা প্রত্যেক রাসূলকে তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষী(১) করে পাঠিয়েছি(২) তাদের কাছে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য(৩), অতঃপর আল্লাহ যাকে ইচ্ছে বিভ্রান্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছে সৎপথে পরিচালিত করেন এবং তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।(৪)
(১) অর্থাৎ আল্লাহ যে সম্প্রদায়ের মধ্যে যে নবী পাঠিয়েছেন তার উপর তার ভাষায়ই নিজের বাণী নাযিল করেছেন। এর উদ্দেশ্য ছিল, সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায় যেন নবীর কথা বুঝতে পারে এবং যা নাযিল হয়েছে তাও জানতে পারে। [ইবন কাসীর] যাতে করে পরবর্তী পর্যায়ে তারা এ ধরনের কোন ওজর পেশ করতে না পারে যে, আপনার পাঠানো শিক্ষা তো আমরা বুঝতে পারিনি কাজেই কেমন করে তার প্রতি ঈমান আনতে পারতাম। এ উদ্দেশ্যে কোন জাতিকে তার নিজের ভাষায়, যে ভাষা সে বোঝে, পয়গাম পৌছানো প্রয়োজন।
(২) আদম 'আলাইহিস সালাম জগতে প্রথম মানুষ। তিনি তাকেই মানুষের জন্য সর্বপ্রথম নবী মনোনীত করেন। এরপর পৃথিবীর জনসংখ্যা যতই বৃদ্ধি পেয়েছে, আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে বিভিন্ন নবীর মাধ্যমে হেদায়াত ও পথ-প্রদর্শনের ব্যবস্থা ততই সম্প্রসারিত হয়েছে। প্রত্যেক যুগ ও জাতির অবস্থার উপযোগী বিধি-বিধান ও শরীআত নাযিল হয়েছে। শেষ পর্যন্ত মানব জগতের ক্রমঃবিকাশ যখন পূর্ণত্বের স্তরে উপনীত হয়েছে, তখন সাইয়্যেদুল আউয়ালীন ওয়াল আখেরীন, ইমামুল আম্বিয়া মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে সমগ্র বিশ্বের জন্য রাসূলরূপে প্রেরণ করা হয়েছে।
তাকে যে গ্রন্থ ও শরীআত দান করা হয়েছে, তাতে তাকে সমগ্র বিশ্ব এবং কেয়ামত পর্যন্ত সর্বকালের জন্য স্বয়ংসম্পূর্ণ করে দেয়া হয়েছে। এখানে এটা জানা আবশ্যক যে, এ আয়াতে যদিও বলা হয়েছে যে, আল্লাহ্ তা'আলা প্রত্যেক নবীকে তার জাতির কাছে পাঠিয়েছেন কিন্তু অন্য আয়াতে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, আল্লাহ্ তা'আলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সমস্ত মানুষের জন্যই রাসূল করে পাঠিয়েছেন। কোন জাতির সাথে সুনির্দিষ্ট করে নয়। যেমন, আল্লাহ বলেন, বলুন হে মানুষ! নিশ্চয় আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহ্র রাসূল। [সূরা আল-আরাফ: ১৫৮]
আরও বলেন, “কত বরকতময় তিনি যিনি তার বান্দার উপর ফুরকান নাযিল করেছেন, সৃষ্টিজগতের জন্য সতর্ককারী হতে।” [সূরা আল-ফুরকান: ১] আরও বলেন, “আর আমরা তো আপনাকে সমগ্র মানুষের জন্যই সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি।” [সূরা সাবা: ২৮] ইত্যাদি আয়াতসমূহ। যা থেকে প্রমাণিত হয় যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালাত সমস্ত সৃষ্টিকুলের জন্য, প্রতিটি ভাষাভাষির জন্য। প্রতি ভাষাভাষির কাছে এ বাণী পৌছে দেয়া মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লমের কর্তব্য। [আদওয়াউল বায়ান]
(৩) এ আয়াত এ প্রমাণ বহন করছে যে, যা দিয়ে আল্লাহর কালাম ও তার রাসূলের সুন্নাত স্পষ্টভাবে বুঝা যাবে, ততটুকু আরবী ভাষাজ্ঞান প্রয়োজন এবং আল্লাহর কাছেও প্রিয় বিষয়। কেননা এটা ব্যতীত আল্লাহর কাছে যা নাযিল হয়েছে তা জানা অসম্ভব। তবে যদি কেউ এমন হয় যে, তার সেটা শিক্ষা গ্রহণ করার প্রয়োজন পড়ে না যেমন ছোটকাল থেকে এটার উপর বড় হয়েছে এবং সেটা তার প্রকৃতিতে পরিণত হয়েছে তাহলে সেটা ভিন্ন কথা। কারণ, তখন সে আল্লাহ ও তার রাসূলের বাণী থেকে দ্বীন ও শরীআত গ্রহণ করতে সক্ষম হবে। যেমন সাহাবায়ে কিরাম গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। [সা’দী]
(৪) অর্থাৎ আমি মানুষের সুবিধার জন্য নবীগণকে তাদের ভাষায় প্রেরণ করেছি- যাতে নবীগণ আমার বিধি-বিধান উত্তমরূপে বুঝিয়ে দেন। কিন্তু হেদায়াত ও পথভ্রষ্টতা এরপরও মানুষের সাধ্যাধীন নয়। আল্লাহ তা'আলাই স্বীয় শক্তিবলে যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্টতায় রাখেন এবং যাকে ইচ্ছা হেদায়াত দেন। সমগ্র জাতি যে ভাষা বোঝে নবী সে ভাষায় তার সমগ্র প্রচার কার্য পরিচালনা ও উপদেশ দান করা সত্বেও সবাই হেদায়াত লাভ করে না। কারণ কোন বাণী কেবলমাত্র সহজবোধ্য হলেই যে, সকল শ্ৰোতা তা মেনে নেবে এমন কোন কথা নেই। সঠিক পথের সন্ধান লাভ ও পথভ্রষ্ট হওয়ার মূল সূত্র রয়েছে আল্লাহর হাতে। তিনি যাকে চান নিজের বাণীর সাহায্যে সঠিক পথে পরিচালিত করেন এবং যার জন্য চান না সে হিদায়াত পায় না। আয়াতের শেষে আল্লাহর দু'টি মহান গুণের উল্লেখ করা হয়েছে, বলা হয়েছে, তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাবান।
এ দুটি গুণবাচক নাম এখানে উল্লেখ করার পিছনে বিশেষ উদ্দেশ্য রয়েছে। যার অর্থ, লোকেরা নিজে নিজেই সৎপথ লাভ করবে বা পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে, এটা সম্ভব নয়। কোন যুক্তিসংগত কারণ ছাড়াই তিনি যাকে ইচ্ছা হেদায়াত দান করবেন এবং যাকে ইচ্ছা অযথা পথভ্রষ্ট করবেন এটা তাঁর রীতি নয়। কর্তৃত্বশীল ও বিজয়ী হওয়ার সাথে সাথে তিনি জ্ঞানী এবং প্রজ্ঞও। তাঁর কাছ থেকে কোন ব্যক্তি যুক্তিসংগত কারণেই হেদায়াত লাভ করে। আর যে ব্যক্তিকে সঠিক পথ থেকে বঞ্চিত করে ভ্রষ্টতার মধ্যে ছেড়ে দেয়া হয় সে নিজেই নিজের ভ্রষ্টতাপ্রীতির কারণে এহেন আচরণ লাভের অধিকারী হয়। [দেখুন, সা’দী]
তাফসীরে জাকারিয়া(৪) আমি প্রত্যেক রসূলকেই তার স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাদের নিকট পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করবার জন্য।[1] আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করেন। আর তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। [2]
[1] মহান আল্লাহ দুনিয়াবাসীর প্রতি এই অনুগ্রহ করলেন যে, তাদের হিদায়াতের জন্য কিতাব অবতীর্ণ করলেন এবং রসূলগণকে প্রেরণ করলেন এবং উক্ত অনুগ্রহকে এভাবে পরিপূর্ণতা দান করলেন যে, প্রত্যেক রসূলকে তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষী করে প্রেরণ করলেন, যাতে হিদায়াতের রাস্তা বুঝতে কোন প্রকার জটিলতা না আসে।
[2] কিন্তু উক্ত বর্ণনা ও ব্যাখ্যা সত্ত্বেও হিদায়াত সেই পাবে, যাকে আল্লাহ দিতে চাইবেন।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর আমি মূসাকে আমার আয়াতসমূহ দিয়ে পাঠিয়েছি যে, ‘তুমি তোমার কওমকে অন্ধকার হতে আলোর দিকে বের করে আন এবং আল্লাহর দিবসসমূহ* তাদের স্মরণ করিয়ে দাও’। নিশ্চয় এতে প্রতিটি ধৈর্যশীল, কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য রয়েছে অসংখ্য নিদর্শন। আল-বায়ান
আর অবশ্যই আমি মূসাকে আমার নিদর্শনসমূহ দিয়ে পাঠিয়েছিলাম আর বলেছিলাম, তোমার জাতিকে অন্ধকার থেকে আলোতে বের করে আন, আর তাদেরকে আল্লাহর হুকুমে ঘটিত অতীতের ঘটনাবলী দিয়ে উপদেশ দাও। এতে প্রত্যেক পরম সহিষ্ণু ও পরম কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য অবশ্যই নিদর্শনসমূহ রয়েছে। তাইসিরুল
মূসাকে আমি আমার নিদর্শনসহ প্রেরণ করেছিলাম এবং বলেছিলামঃ তোমার সম্প্রদায়কে অন্ধকার হতে আলোতে আনয়ন কর, এবং তাদেরকে আল্লাহর দিনগুলি দ্বারা উপদেশ দাও, এতেতো নিদর্শন রয়েছে পরম ধৈর্যশীল ও পরম কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য। মুজিবুর রহমান
And We certainly sent Moses with Our signs, [saying], "Bring out your people from darknesses into the light and remind them of the days of Allah." Indeed in that are signs for everyone patient and grateful. Sahih International
* দিবসসমূহ দ্বারা উদ্দেশ্য ইতঃপূর্বের ঐতিহাসিক ঘটনাসমূহ।
৫. আর অবশ্যই আমরা মূসাকে আমাদের নিদর্শনসহ পাঠিয়েছিলাম(১) এবং বলেছিলাম, আপনার সম্প্রদায়কে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসুন(২), এবং তাদেরকে আল্লাহর দিনগুলোর দ্বারা উপদেশ দিন।(৩) এতে তো নিদর্শন(৪) রয়েছে প্রত্যেক পরম ধৈর্যশীল ও পরম কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য।(৫)
(১) এ আয়াতে বলা হয়েছেঃ আমি মূসা আলাইহিস সালাম-কে আয়াত দিয়ে প্রেরণ করেছি, যাতে তিনি স্বজাতিকে কুফর ও গোনাহর অন্ধকার থেকে দাওয়াত দিয়ে ঈমান ও আনুগত্যের আলোতে নিয়ে আসে। [বাগভী] এখানে আয়াত শব্দের অর্থ তাওরাতের আয়াতও হতে পারে। কারণ, সেগুলো নাযিল করার উদ্দেশ্যই ছিল সত্যের আলো ছড়ানো। আয়াতের অন্য অর্থ মু'জিযাও হয়। এখানে এ অর্থও উদ্দিষ্ট হতে পারে। [ফাতহুল কাদীর] মুজাহিদ বলেন, এখানে নয়টি বিশেষ নিদর্শন উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। [ইবন কাসীর] মূসা আলাইহিস সালাম-কে আল্লাহ্ তা'আলা ন’টি মু'জিযা বিশেষভাবে দান করেন।
(২) এ আয়াতে ‘কাওম’ তথা “সম্প্রদায়” শব্দ ব্যবহার করে নিজ কওমকে অন্ধকার থেকে আলোতে আনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়বস্তুটিই যখন আলোচ্য সূরার প্রথম আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে সম্বোধন করে বর্ণনা করা হয়েছে, তখন সেখানে ‘কওম’ শব্দের পরিবর্তে ناس (মানুষ) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। বলা হয়েছেঃ (لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ ) এতে ইঙ্গিত আছে যে, মূসা আলাইহিস সালাম শুধু বনী ইসরাঈল ও মিসরীয় জাতির প্রতি নবীরূপে প্রেরিত হয়েছিলেন, অপরদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওয়াত সমগ্র মানুষের জন্য।
(৩) এরপর আল্লাহ্ তা'আলা মূসা আলাইহিস সালাম-কে নির্দেশ দেন যে, স্বজাতিকে 'আইয়্যামুল্লাহ' স্মরণ করান। কিন্তু আইয়্যামুল্লাহ কি? أيام শব্দটি يوم এর বহুবচন, এর অর্থ দিন। (أَيَّامِ اللَّهِ) শব্দটি দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন শাস্তির দিনগুলো, যেমন কাওমে নূহ, আদ ও সামূদের উপর আযাব নাযিল হওয়ার ঘটনাবলী। [ফাতহুল কাদীর] এসব ঘটনায় বিরাট জাতিসমূহের ভাগ্য ওলট-পালট হয়ে গেছে এবং তারা পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় আইয়্যামুল্লাহ স্মরণ করানোর উদ্দেশ্য হবে, এসব জাতির কুফরের অশুভ পরিণতির ভয় প্রদর্শন করা এবং হুশিয়ার করা। ‘আইয়্যামুল্লাহ’র অপর অর্থ আল্লাহ তা'আলার নেয়ামত ও অনুগ্রহও হয়।
এ জাতির উপর আল্লাহর যেসব নেয়ামত দিবারাত্র বর্ষিত হয় এবং যেসব বিশেষ নেয়ামত তাদেরকে দান করা হয়েছে, সেগুলো স্মরণ করিয়ে আল্লাহর আনুগত্য ও তাওহীদের দিকে আহবান করুন; উদাহরণতঃ তীহ উপত্যকায় তাদের মাথার উপর মেঘের ছায়া, আহারের জন্য মান্না ও সালওয়ার অবতরণ, পানীয় জলের প্রয়োজনে পাথর থেকে ঝর্ণা প্রবাহিত হওয়া ইত্যাদি। [ইবন কাসীর] এগুলো স্মরণ করানোর লক্ষ্য হবে এই যে, ভাল মানুষকে যখন কোন অনুগ্রহদাতার অনুগ্রহ স্মরণ করানো হয়, তখন সে বিরোধিতা ও অবাধ্যতা করতে লজ্জা বোধ করে। এখানে দু’টি অর্থই উদ্দেশ্য হতে পারে। বিশেষ করে হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “একদিন মূসা আলাইহিসসালাম তার কাওমকে আইয়ামুল্লাহ বিপদাপদ।” [মুসলিমঃ ২৩৮০]
(৪) এখানে آيات -এর অর্থ নিদর্শন ও প্রমাণাদি। অর্থাৎ এসব ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্যে এমন সব নির্দশন রয়েছে যার মাধ্যমে এক ব্যক্তি আল্লাহর একত্ববাদ ও তার ক্ষমতাবান হওয়ার সত্যতা ও নির্ভুলতার প্রমাণ পেতে পারে। [ফাতহুল কাদীর] এ সংগে এ সত্যের পক্ষেও অসংখ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারে যে, প্রতিদানের বিধান পুরোপুরি হক এবং তার দাবী পূরণ করার জন্য অন্য একটি জগত অর্থাৎ আখেরাতের জগত অপরিহার্য।
(৫) আয়াতে বর্ণিত صبار শব্দটি صبر থেকে مبالغة এর পদ। এর অর্থ অধিক সবরকারী। شكور শব্দটি شكر থেকে مبالغة এর পদ। এর অর্থ অধিক কৃতজ্ঞ। [ফাতহুল কাদীর] বাক্যের অর্থ এই যে, অবিশ্বাসীদের শাস্তি ও আযাব সম্পর্কিত হোক অথবা আল্লাহর নেয়ামত ও অনুগ্রহ সম্পর্কিত হোক, উভয় অবস্থাতে অতীত ঘটনাবলীতে আল্লাহর অপার শক্তি ও অসীম রহস্যের বিরাট শক্তি বিদ্যমান ঐ ব্যক্তির জন্য, যে অত্যন্ত সবরকারী এবং অধিক শোকরকারী। সংক্ষেপে শোকর ও কৃতজ্ঞতার স্বরূপ এই যে, আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতকে তার অবাধ্যতা এবং হারাম ও অবৈধ কাজে ব্যয় না করা, মুখেও আল্লাহ্ তা'আলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং স্বীয় কাজকর্মকেও তার ইচ্ছার অনুগামী করা। সবরের সারমর্ম হচ্ছে স্বভাব বিরুদ্ধ ব্যাপারাদিতে অস্থির না হওয়া, কথায় ও কাজে অকৃতজ্ঞতার প্রকাশ থেকে বেঁচে থাকা এবং দুনিয়াতেও আল্লাহর রহমত আশা করা, আর আখেরাতে উত্তম পুরস্কার প্রাপ্তিতে বিশ্বাস রাখা। [দেখুন, ইবনুল কাইয়্যেম, উদ্দাতুস সাবেরীন]
তাফসীরে জাকারিয়া(৫) মূসাকে আমি আমার নিদর্শনাবলীসহ প্রেরণ করেছিলাম (এবং বলেছিলাম,) তোমার সম্প্রদায়কে অন্ধকার হতে আলোতে বের করে আনো[1] এবং তাদেরকে আল্লাহর দিনগুলি স্মরণ করিয়ে দাও।[2] এতে তো নিদর্শন রয়েছে প্রত্যেক পরম ধৈর্যশীল ও পরম কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য। [3]
[1] অর্থাৎ, হে মুহাম্মাদ! যেমন আমি তোমাকে তোমার সম্প্রদায়ের কাছে পাঠিয়েছি এবং কিতাব দিয়েছি যাতে তুমি স্বীয় সম্প্রদায়কে কুফরী ও শিরকের অন্ধকার থেকে ঈমানের আলোর দিকে বের করে আনো, তেমনই আমি মূসাকে মু’জিযা ও দলীল-প্রমাণ দিয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে পাঠিয়েছি, যেন সে তাদেরকে কুফরী ও অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে বের করে ঈমানের আলো দান করে। আয়াতে উদ্দেশ্য হল সেই সব মুজিযা; যা মূসা (আঃ)-কে প্রদান করা হয়েছিল অথবা সেই ন’টি মু’জিযা যার উল্লেখ সূরা বানী ইস্রাঈলে করা হয়েছে।
[2] أيام الله (আল্লাহর দিনগুলি) এর অর্থ আল্লাহর সেসব অনুগ্রহ, যা বানী ইসরাঈলের প্রতি করা হয়েছিল, যেসবের বিবরণ পূর্বে কয়েকবার এসেছে। অথবা أيام এর অর্থ ঘটনাবলী। অর্থাৎ ঐসব ঘটনা তাদেরকে স্মরণ করাও, যা ঘটতে তারা দেখেছে এবং যাতে তাদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুকম্পা অবতীর্ণ হয়েছে। যার মধ্যে কয়েকটির বর্ণনা এখানেও আসছে।
[3] ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা দুটি মহৎ গুণ; যার উপর নির্ভর করে ঈমান, এজন্য এখানে এ দু’টির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ শব্দ দু’টি অতিশয়োক্তি রূপে এসেছে। صبّار অত্যধিক ধৈর্যশীল شكور অত্যধিক কৃতজ্ঞ। কৃতজ্ঞতার পূর্বে ধৈর্যের উল্লেখ এই কারণে করা হয়েছে যে কৃতজ্ঞতা ধৈর্যের ফলাফল। হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘‘মুমিনদের ব্যাপারটা আশ্চর্যজনক। মহান আল্লাহ তার ক্ষেত্রে যা কিছুরই ফায়সালা করুন, তা তার জন্য মঙ্গলজনক। যদি তাকে দুঃখ পৌঁছে এবং ধৈর্য ধারণ করে, তাহলে এটাও তার পক্ষে উত্তম। আর যদি তাকে সুখ পৌঁছে এবং সে এর উপর আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, তাহলে এটাও তার পক্ষে উত্তম। (মুসলিম, কিতাবুয যুহ্দ)
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর যখন মূসা তার কওমকে বলেছিল, তোমাদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামাত স্মরণ কর, যখন তিনি তোমাদেরকে ফির‘আউন পরিবারের কবল থেকে রক্ষা করেছেন, তারা তোমাদের জঘন্য আযাব দিত। আর তারা তোমাদের ছেলেদেরকে যবেহ করত এবং নারীদেরকে জীবিত রাখত। আর তাতে ছিল তোমাদের রবের পক্ষ থেকে মহাপরীক্ষা। আল-বায়ান
স্মরণ কর, যখন মূসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, ‘তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর নি‘মাতের কথা স্মরণ কর যখন তিনি তোমাদেরকে ফির‘আওনী গোষ্ঠী থেকে রক্ষা করেছিলেন যারা তোমাদেরকে জঘন্য রকমের শাস্তিতে পিষ্ট করছিল। তোমাদের পুত্রদেরকে তারা হত্যা করত আর তোমাদের নারীদেরকে জীবিত রাখত। এটা ছিল তোমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে এক কঠিন পরীক্ষা। তাইসিরুল
যখন মূসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিলঃ তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর যখন তিনি তোমাদেরকে রক্ষা করেছিলেন ফির‘আউন সম্প্রদায়ের কবল হতে যারা তোমাদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তি দিত, তোমাদের পুত্রদেরকে যবাহ করত ও তোমাদের নারীদেরকে জীবিত রাখত; এবং এতে ছিল তোমাদের রবের পক্ষ হতে এক মহা পরীক্ষা। মুজিবুর রহমান
And [recall, O Children of Israel], when Moses said to His people, "Remember the favor of Allah upon you when He saved you from the people of Pharaoh, who were afflicting you with the worst torment and were slaughtering your [newborn] sons and keeping your females alive. And in that was a great trial from your Lord. Sahih International
৬. আর স্মরণ করুন, যখন মূসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, তোমাদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর(১) যখন তিনি তোমাদেরকে রক্ষা করেছিলেন ফিরআউন গোষ্ঠীদের কবল হতে, যারা তোমাদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তি দিত, তোমাদের পুত্রদেরকে যবেহ করত এবং তোমাদের নারীদেরকে জীবিত রাখত; আর এতে ছিল তোমাদের রবের পক্ষ থেকে এক মহাপরীক্ষা।(২)
(১) অর্থাৎ মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ মোতাবেক তাদেরকে ‘আইয়্যামুল্লাহ’ বা নেয়ামত ও মুসিবত সম্পর্কে স্মরণ করানোর জন্য এ ভাষণটি প্রদাণ করেছিলেন। [ইবন কাসীর] এ নেয়ামতগুলো স্মরণ করার অর্থ হচ্ছে, নিয়ামতসমূহের কথা মুখে ও অন্তরে স্বীকার করে নেয়া। [সা’দী] অনুরূপভাবে নেয়ামতগুলোর অধিকার ও মর্যাদা চিহ্নিত করে সেগুলোকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা, সেগুলো যিনি প্রদান করেছেন তার শোকরিয়া আদায় করে তার নির্দেশের বাইরে না চলা। তাঁর বিধানের অনুগত থাকা, ইত্যাদি।
(২) আয়াতে ব্যবহৃত শব্দটি হচ্ছে, بلاء এ শব্দটি বিপরীত অর্থবোধক, এর এক অর্থ, নেয়ামত আর অপর অর্থ, বিপদ বা পরীক্ষা। এ আয়াতে পূর্ববতী বিষয়বস্তুর বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে যে, বনী-ইসরাঈলকে নিম্নলিখিত বিশেষ নেয়ামতটি স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য মূসা আলাইহিস সালাম-কে আদেশ দেয়া হয়। মূসা আলাইহিস সালাম-এর পূর্বে ফিরআউন বনী-ইসরাঈলকে অবৈধভাবে দাসে পরিণত করে রেখেছিল। এরপর এসব দাসের সাথেও মানবোচিত ব্যবহার করা হত না। তাদের ছেলে সন্তানকে জন্মগ্রহণের পরই হত্যা করা হত এবং শুধু কন্যাদেরকে খেদমতের জন্য লালন-পালন করা হত।
মূসা আলাইহিস সালাম-কে প্রেরণের পর তার দোআয় আল্লাহ্ তাআলা বনী-ইসরাঈলকে ফিরআউনের কবল থেকে মুক্তি দান করেন। সুতরাং একদিক থেকে তা তাদের পরীক্ষা ছিল অপর দিক থেকে সে পরীক্ষা থেকে মুক্তি দিয়ে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বিরাট নেয়ামত প্রদান করেন। উভয় অর্থটিই এখানে উদ্দেশ্য হতে পারে। যেমন অন্য আয়াতে এসেছে, “আর আমরা তাদেরকে মঙ্গল ও অমঙ্গল দ্বারা পরীক্ষা করেছি, যাতে তারা প্রত্যাবর্তন করে।” [সূরা আল-আরাফ: ১৬৮] [দেখুন, ইবন কাসীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(৬) যখন মূসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, ‘তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ কর; যখন তিনি তোমাদেরকে রক্ষা করেছিলেন ফিরআউনীয় সম্প্রদায়ের কবল হতে, যারা তোমাদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তি দিত, তোমাদের পুত্রদেরকে যবেহ করত এবং তোমাদের নারীদেরকে জীবিত রাখত। আর এতে ছিল তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে এক মহাপরীক্ষা।[1]
[1] অর্থাৎ, যেরূপ এটা আল্লাহর এক বিরাট পরীক্ষা ছিল, অনুরূপ এ থেকে মুক্তিলাভ আল্লাহর বিরাট অনুগ্রহ ছিল। এ জন্যই কোন কোন অনুবাদক بَلَاءٌ এর অনুবাদ ‘পরীক্ষা’ এবং কেউ কেউ এর অনুবাদ ‘অনুগ্রহ’ করেছেন।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর যখন তোমাদের রব ঘোষণা দিলেন, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেব, আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, নিশ্চয় আমার আযাব বড় কঠিন’। আল-বায়ান
স্মরণ কর, যখন তোমাদের প্রতিপালক ঘোষণা করেন, যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর তাহলে আমি অবশ্যই তোমাদের জন্য (আমার নি‘য়ামাত) বৃদ্ধি করে দেব, আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও (তবে জেনে রেখ, অকৃতজ্ঞদের জন্য) আমার শাস্তি অবশ্যই কঠিন। তাইসিরুল
যখন তোমাদের রাব্ব ঘোষণা করেনঃ তোমরা কৃতজ্ঞ হলে তোমাদেরকে অবশ্যই অধিক দিব, আর অকৃতজ্ঞ হলে অবশ্যই আমার শাস্তি হবে কঠোর। মুজিবুর রহমান
And [remember] when your Lord proclaimed, 'If you are grateful, I will surely increase you [in favor]; but if you deny, indeed, My punishment is severe.' " Sahih International
৭. আর স্মরণ করুন, যখন তোমাদের রব ঘোষণা করেন, তোমরা কৃতজ্ঞ হলে অবশ্যই আমি তোমাদেরকে আরো বেশী দেব আর অকৃতজ্ঞ হলে নিশ্চয় আমার শাস্তি তো কঠোর।(১)
(১) تأذن শব্দটির অর্থ সংবাদ দেয়া ও ঘোষণা করা। [ইবন কাসীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(৭) যখন তোমাদের প্রতিপালক ঘোষণা করেছিলেন,[1] তোমরা কৃতজ্ঞ হলে তোমাদেরকে অবশ্যই অধিক দান করব,[2] আর অকৃতজ্ঞ হলে অবশ্যই আমার শাস্তি হবে কঠোর।’ [3]
[1] تَأذَّنَ এর অর্থ أعْلَمَكُمْ بِوَعْدِهِ لَكُمْ তিনি তোমাদেরকে তাঁর প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে অবহিত করেছিলেন। আর এও হতে পারে যে, এটা শপথের অর্থে, অর্থাৎ যখন তোমাদের প্রতিপালক স্বীয় গৌারব-মর্যাদার শপথ করে বলেছিলেন। (ইবনে কাসীর)
[2] অর্থাৎ, নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা করলে তোমাদেরকে অধিক পুরস্কারে পুরস্কৃত করব।
[3] এর অর্থ এই যে, নিয়ামতের অকৃতজ্ঞতা আল্লাহ অত্যন্ত অপছন্দ করেন। যার জন্য তিনি কঠিন শাস্তির ধমক দিয়েছেন। এই জন্য নবী (সাঃ)ও বলেছেন যে, অধিকাংশ মহিলারা স্বামীর অকৃতজ্ঞ হওয়ার কারণে জাহান্নামে যাবে। (মুসলিম, আল-ঈদাইন)
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর মূসা বলল, ‘যদি তোমরা ও যমীনের সকলে কুফরী কর, তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, প্রশংসিত’। আল-বায়ান
মূসা বলেছিল, তোমরা আর দুনিয়ার সকল লোক যদি অকৃতজ্ঞ হও (তাতে কিছুই যায় আসে না) কারণ আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, প্রশংসিত। তাইসিরুল
মূসা বলেছিলঃ তোমরা এবং পৃথিবীর সকলেও যদি অকৃতজ্ঞ হও তথাপি আল্লাহ অভাবমুক্ত এবং প্রশংসা । মুজিবুর রহমান
And Moses said, "If you should disbelieve, you and whoever is on the earth entirely - indeed, Allah is Free of need and Praiseworthy." Sahih International
৮. আর মূসা বলেছিলেন, তোমরা এবং যমীনের সবাই যদি অকৃতজ্ঞ হও তারপরও আল্লাহ্ অভাবমুক্ত ও সর্বপ্রশংসিত।(১)
(১) অর্থাৎ মূসা আলাইহিস সালাম স্বজাতিকে বললেনঃ যদি তোমরা এবং পৃথিবীতে যারা বসবাস করে, তারা সবাই আল্লাহ্ তা’আলার নেয়ামতসমূহের নাশোকরী করো, তবে স্মরণ রেখো, এতে আল্লাহ তা'আলার কোন ক্ষতি নেই। তিনি সবার তারিফ, প্রশংসা, কৃতজ্ঞতা ও অকৃতজ্ঞতার উর্ধ্বে। তিনি আপন সত্তায় প্রশংসনীয়। তোমরা তার প্রশংসা না করলেও সব ফিরিশতা এবং সৃষ্টজগতের প্রতিটি অণু-পরমাণু তার প্রশংসায় মুখর। কৃতজ্ঞতার উপকার সবটুকু তোমাদের জন্যই।
তাই আল্লাহর পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতার জন্য তাকীদ দেয়া হয়, তা নিজের জন্য নয়; বরং দয়াবশতঃ তোমাদেরই উপকার করার জন্য। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, হে আমার বান্দাগণ! যদি তোমাদের আগের ও পরের সমস্ত মানুষ ও জিন একত্রিত হয়ে তাকওয়ার চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে এক জনের অন্তরে পরিণত হও তবুও তা আমার রাজত্বের সামান্যতম কিছুও বৃদ্ধি করবে না। হে আমার বান্দাগণ! যদি তোমাদের আগের ও পরের সমস্ত মানুষ ও জীন একত্রিত হয়ে অন্যায়ের দিক থেকে একজনের অন্তরে পরিণত হও তবুও তা আমার রাজত্বের সামান্যতম অংশও কমাতে পারবে না...”। [মুসলিমঃ ২৫৭৭]
তাফসীরে জাকারিয়া(৮) মূসা বলেছিল, ‘তোমরা এবং পৃথিবীর সকলেই যদি অকৃতজ্ঞ হও; তবুও নিঃসন্দেহে আল্লাহ অভাবমুক্ত এবং সর্বপ্রশংসিত।’[1]
[1] ভাবার্থ এই যে মানুষ আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে তাতে তারই লাভ রয়েছে, আর অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে তাতে আল্লাহর কি ক্ষতি? তিনি তো অমুখাপেক্ষী। সারা বিশ্ব অকৃতজ্ঞ হয়ে গেলে তাঁর কি আসে যায়? যেমন হাদীসে কুদসীতে এসেছে, মহান আল্লাহ বলেন, ‘‘হে আমার বান্দারা! তোমাদের পূর্বের ও পরের মানব ও দানব সকলেই যদি আমার বান্দাদের মধ্যে সর্বাধিক তাকওয়ার অধিকারী একজন ব্যক্তির হৃদয়ের মত হয়ে যায়, তাহলে আমার সাম্রাজ্যের একটুও শ্রীবৃদ্ধি ঘটবে না। হে আমার বান্দারা! তোমাদের পূর্বের ও পরের মানব ও দানব সকলেই যদি আমার বান্দাদের মধ্যে সর্বাধিক বড় পাপী একজন ব্যক্তির হৃদয়ের মত হয়ে যায়, তাহলে আমার সাম্রাজ্যের কিছুই কম হবে না। হে আমার বান্দারা! তোমাদের পূর্বের ও পরের মানব ও দানব যদি একটি জায়গাতে সমবেত হয় এবং প্রত্যেকেই আমার নিকট প্রার্থনা করে, আর আমি প্রত্যেকের চাহিদা পূরণ করি, তাহলে আমার সাম্রাজ্যের ততটুকু পরিমাণ কম হবে, যতটুকু সমুদ্রে সুচ ডুবিয়ে তা তুলে নিলে তা থেকে কমে যায়। (মুসলিম, কিতাবুল বির্র) সুতরাং তিনি পূত-পবিত্র, মহিমান্বিত, অভাবমুক্ত ও সর্বপ্রশংসনীয়।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানতোমাদের কাছে কি তোমাদের পূর্বের লোকদের সংবাদ পৌছেনি? নূহ, আদ ও সামূদ জাতির এবং যারা তাদের পরের, যাদেরকে আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। তাদের রাসূলগণ তাদের নিকট স্পষ্ট প্রমাণাদি নিয়ে এসেছিল, ফলে তারা ফিরিয়ে দিল তাদের হাত তাদের মুখে এবং বলল, ‘নিশ্চয় তোমাদেরকে যা দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছে, তা আমরা অস্বীকার করলাম। আর তোমরা আমাদের যে বিষয়ের প্রতি দাওয়াত দিচ্ছ, সে বিষয়ে আমরা ঘোর সন্দেহে রয়েছি’। আল-বায়ান
তোমাদের পূর্বেকার লোকেদের খবর কি তোমাদের কাছে পৌঁছেনি? নূহ, ‘আদ আর সামূদ সম্প্রদায়ের, আর তাদের পরবর্তীদের; তাদের সম্পর্কে আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। রসূলগণ তাদের কাছে স্পষ্ট নিদর্শনাসমূহ নিয়ে এসেছিল, তখন তারা নিজেদের মুখে হাত চেপে ধরল আর বলল, ‘যে জিনিস দিয়ে তোমাদেরকে পাঠানো হয়েছে তা আমরা অস্বীকার করি আর যে বিষয়ের প্রতি তোমরা আমাদেরকে আহবান জানাচ্ছ সে সম্পর্কে আমরা বিভ্রান্তিকর সন্দেহের মধ্যে রয়েছি।’ তাইসিরুল
তোমাদের কাছে কি সংবাদ আসেনি তোমাদের পূর্ববর্তীদের; নূহের সম্প্রদায়ের, ‘আদ ও ছামূদের এবং তাদের পূর্ববর্তীদের? তাদের বিষয় আল্লাহ ছাড়া অন্য কেহ জানেনা; তাদের কাছে স্পষ্ট নিদর্শনসহ তাদের রাসূল এসেছিল; তারা তাদের হাত তাদের মুখে স্থাপন করত এবং বলতঃ যা নিয়ে তোমরা প্রেরিত হয়েছ তা আমরা প্রত্যাখ্যান করি এবং আমরা অবশ্যই বিভ্রান্তিকর সন্দেহ পোষণ করি সেই বিষয়ে, যার প্রতি তোমরা আমাদেরকে আহবান করছ। মুজিবুর রহমান
Has there not reached you the news of those before you - the people of Noah and 'Aad and Thamud and those after them? No one knows them but Allah. Their messengers brought them clear proofs, but they returned their hands to their mouths and said, "Indeed, we disbelieve in that with which you have been sent, and indeed we are, about that to which you invite us, in disquieting doubt." Sahih International
৯. তোমাদের কাছে কি সংবাদ আসেনি তোমাদের পূর্ববর্তীদের, নূহের সম্প্রদায়ের, আদের ও সামূদের এবং যারা তাদের পরের? যাদেরকে আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কেউ জানে না। তাদের কাছে স্পষ্ট প্রমাণাদিসহ তাদের রাসূলগণ এসেছিলেন, অতঃপর তারা তাদের হাত তাদের মুখে স্থাপন করেছিল।(১) এবং বলেছিল, যা সহ তোমরা প্রেরিত হয়েছ তা আমরা অবশ্যই অস্বীকার করলাম। আর নিশ্চয় আমরা বিভ্রান্তিকর সন্দেহে রয়েছি সে বিষয়ে(২), যার দিকে তোমরা আমাদেরকে ডাকছ।
(১) এ শব্দগুলোর ব্যাখ্যার ব্যাপারে তাফসীরকারদের মধ্যে বেশ কিছু মত দেখা গেছে। কারো কারো মতে, এর অর্থ তারা নবীদেরকে চুপ থাকতে বলেছে। [ইবন কাসীর] অথবা মুখ দিয়ে সেগুলো উড়িয়ে দিয়েছে। [ইবন কাসীর] আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি এর অর্থ করেছেনঃ তারা তাদের আঙ্গুলে কামড় দিয়েছে। অর্থাৎ তারা যাতে বিশ্বাসী ছিল তাতে কামড়ে পড়ে ছিল, নবীরাসূলদের কথা শুনেনি। [কুরতুবী] কাতাদা ও মুজাহিদ এখানে এর অর্থঃ রাসূলগণ যা নিয়ে এসেছে তারা তাদের কথা প্রত্যাখ্যান করেছে আর মুখে তাদের উপর মিথ্যারোপ করেছে। [কুরতুবী] [ইবন কাসীর]
(২) অর্থাৎ এমন সংশয় যার ফলে প্রশান্তি বিদায় নিয়েছে। অর্থাৎ তোমরা যা নিয়ে এসেছ তাতে আমরা বিশ্বাস স্থাপন করবো না। কারণ, তোমাদের দাওয়াতের ব্যাপারে আমরা শক্তিশালী সন্দেহে নিপতিত। [ইবন কাসীর] আমরা মনে করছি তোমরা রাজত্ব অথবা দুনিয়ার কোন উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টায় আছ। [কুরতুবী] কিন্তু পরবর্তী আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, তারা সম্ভবত: ঈমান ও তাওহীদের ব্যাপারেই সন্দেহ করছিল। [দেখুন, মুয়াসসার] কারণ, রাসূলগণ তাদের কথার উত্তরে বলেছিলেন যে, তোমরা কি আল্লাহর ব্যাপারে সন্দেহ করতে পার? অথচ তিনিই আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন।
তাফসীরে জাকারিয়া(৯) তোমাদের কাছে কি সংবাদ আসেনি তোমাদের পূর্ববর্তীদের; নূহের সম্প্রদায়ের, আ’দের ও সামূদের এবং তাদের পরবর্তীদের? তাদের বিষয় আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জানে না; তাদের কাছে স্পষ্ট নিদর্শনাবলীসহ তাদের রসূলগণ এসেছিল; তারা তাদের হাত তাদের মুখে স্থাপন করল[1] এবং বলল, ‘যা নিয়ে তোমরা প্রেরিত হয়েছ, তা আমরা প্রত্যাখ্যান করি এবং যার প্রতি তোমরা আমাদেরকে আহবান করছ, তাতে আমরা অবশ্যই বিভ্রান্তিকর সন্দেহ পোষণ করি।’ [2]
[1] ব্যাখ্যাকারিগণ এর বিভিন্ন অর্থ বর্ণনা করেছেন, যেমন
(ক) তারা নিজ হাত নিজ মুখে রেখে বলল, আমাদের তো শুধু একটিই উত্তর যে, আমরা তোমার রিসালাতকে অস্বীকার করি।
(খ) তারা নিজ আঙ্গুল দ্বারা নিজ মুখের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, চুপ থাকো এবং এই লোক যে পয়গাম নিয়ে এসেছে সেদিকে ধ্যান দিও না।
(গ) তারা নিজ হাত নিজ মুখে বিদ্রূপ বা বিস্ময় প্রকাশ করে রেখে নিল, যেমন কোন ব্যক্তি হাসি দমানোর জন্য এমনটি করে থাকে।
(ঘ) তারা নিজ হাত রসূলদের মুখে রেখে বলল, চুপ থাকো।
(ঙ) তারা ক্রোধান্বিত হয়ে নিজ হাত মুখে রেখে নিল, যেমন মুনাফিকদের সম্পর্কে দ্বিতীয় স্থানে এসেছে, عَضُّواْ عَلَيْكُمُ الأَنَامِلَ مِنَ الْغَيْظِ তারা তোমাদের প্রতি আক্রোশে আঙ্গুলসমূহ দংশন করে। (সূরা আলে ইমরান ১১৯) ইমাম শওকানী ও ইমাম ত্বাবারী এই শেষ অর্থটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
[2] مُرِيْبٌ অর্থাৎ এমন সন্দেহ, যাতে মন অত্যন্ত ব্যাকুলতা ও চাঞ্চল্যের শিকার হয়।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানতাদের রাসূলগণ বলেছিল, ‘আল্লাহর ব্যাপারেও কি সন্দেহ, যিনি আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টিকর্তা? তিনি তোমাদেরকে আহবান করেন যাতে তিনি তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করেন এবং তিনি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তোমাদেরকে অবকাশ দেন’। তারা বলল, ‘তোমরা তো আমাদের মতই মানুষ, ‘তোমরা আমাদেরকে আমাদের পিতৃপুরুষরা যার ইবাদাত করত, তা থেকে ফিরাতে চাও। অতএব তোমরা আমাদের কাছে স্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে আস’। আল-বায়ান
তাদের রসূলগণ বলেছিল, ‘আল্লাহ সম্পর্কে সন্দেহ? যিনি আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টিকর্তা, তিনি তোমাদেরকে ডাকছেন তোমাদের অপরাধ মার্জনা করার জন্য আর একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তোমাদেরকে অবকাশ দেয়ার জন্য।’ তারা বলল, ‘তুমি আমাদেরই মত মানুষ বৈ তো নও, আমাদের পূর্বপুরুষরা যার ‘ইবাদাত করত তাত্থেকে আমাদেরকে তুমি বাধা দিতে চাও, তাহলে তুমি (তোমার দাবীর স্বপক্ষে) আমাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ উপস্থিত কর। তাইসিরুল
তাদের রাসূলগণ বলেছিলঃ আল্লাহ সম্বন্ধে কি কোন সন্দেহ আছে, যিনি আকাশসমূহ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা? তিনি তোমাদেরকে আহবান করেন তোমাদের পাপ ক্ষমা করার জন্য এবং নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত তোমাদেরকে অবকাশ দেয়ার জন্য। তারা বলতঃ তোমরাতো আমাদের মতই মানুষ; আমাদের পিতৃ পুরুষগণ যাদের ইবাদাত করত তোমরা তাদের ইবাদাত হতে আমাদেরকে বিরত রাখতে চাও; অতএব তোমরা আমাদের কাছে কোন অকাট্য প্রমাণ উপস্থিত কর। মুজিবুর রহমান
Their messengers said, "Can there be doubt about Allah, Creator of the heavens and earth? He invites you that He may forgive you of your sins, and He delays your death for a specified term." They said, "You are not but men like us who wish to avert us from what our fathers were worshipping. So bring us a clear authority." Sahih International
১০. তাদের রাসূলগণ বলেছিলেন, আল্লাহ সম্বন্ধে কি কোন সন্দেহ আছে, যিনি আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টিকর্তা?(১) তিনি তোমাদেরকে ডাকছেন তোমাদের পাপ ক্ষমা করার জন্য এবং নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত তোমাদেরকে অবকাশ দেয়ার জন্য। তারা বলল, তোমরা তো আমাদেরই মত মানুষ। আমাদের পিতৃপুরুষগণ যাদের ইবাদাত করত তোমরা তাদের ইবাদাত হতে আমাদেরকে বিরত রাখতে চাও(২)। অতএব তোমরা আমাদের কাছে কোন অকাট্য প্রমাণ(৩) উপস্থিত কর।
(১) আয়াতের অর্থে দুটি সম্ভাবনা রয়েছে।
এক. আল্লাহর অস্তিত্বে কি সন্দেহ আছে? অথচ মানুষের স্বভাবজাত প্রকৃতি ফিতরাতই তাঁর অস্তিত্বের সাক্ষ্য দিচ্ছে, তাঁর স্বীকৃতি দেয়া বাধ্য করছে। সুতরাং যাদের প্রকৃতি ও স্বভাবজাত বিবেক ঠিক আছে তারা অবশ্যই তাঁর অস্তিত্বকে অবশ্যম্ভাবী মনে করে। হ্যাঁ, তবে কখনও কখনও সে সমস্ত ফিতরাতে সন্দেহ ও দ্বিধার অনুপ্রবেশ ঘটে, আর তখনই তার অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য দলীল-প্রমাণাদির দিকে তাকানোর প্রয়োজন পড়ে। আর এজন্যই রাসূলগণ এমন এক কথা এরপর বলেছেন যা তাদেরকে তার পরিচয় ও তাঁর অস্তিত্বের ব্যাপারে দলীল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
রাসূলগণ সেটাই তাদের উম্মতদেরকে বলেছেন যে, আমরা ঐ আল্লাহ সম্পর্কে বলছি যিনি “আসমান ও যমীনের সৃষ্টিকর্তা”। তিনিই এ দুটোকে সৃষ্টি করেছেন এবং কোন পূর্ণ নমুনা ব্যতীত নতুনভাবে অস্তিত্বে এনেছেন। কেননা, এ দুটো নব্য হওয়া, সৃষ্ট হওয়া ও আজ্ঞাবহ হওয়া অত্যন্ত স্পষ্ট। সুতরাং এগুলোর জন্য একজন নির্মাতা অবশ্যই প্রয়োজন। আর তিনি আর কেউ নন, তিনি ইলাহ ও মালিক। [ইবন কাসীর]
দুই. রাসূলদের একথা বলার কারণ হচ্ছে এই যে, প্রত্যেক যুগের মুশরিকরা আল্লাহর অস্তিত্ব মানতো এবং আল্লাহ পৃথিবী ও আকাশের স্রষ্টা একথাও স্বীকার করতো। এরই ভিত্তিতে রাসূলগণ বলেছেন, এরপর তোমাদের সন্দেহ থাকে কিসে? আমরা যে জিনিসের দিকে তোমাদের দাওয়াত দিচ্ছি তা এ ছাড়া আর কিছুই নয় যে, পৃথিবী ও আকাশের স্রষ্টা আল্লাহ তোমাদের বন্দেগীলাভের যথার্থ হকদার।
এরপর কি আল্লাহর ব্যাপারে তোমাদের সন্দেহ আছে? অর্থাৎ স্রষ্টাকে মেনে নেয়া এটা সৃষ্টিজগতের সবার কাছেই স্বীকৃত ব্যাপার। মুখে যতই অস্বীকার করুক না কেন মন তাদের তা স্বীকৃতি দিতে বাধ্য। কেননা তারা যদি স্রষ্টা না হয়ে থাকে তবে তারা সৃষ্টি, এ দুয়ের মাঝে অবস্থানের সুযোগ নেই। সুতরাং তিনি যদি একমাত্র স্রষ্টা হয়ে থাকেন, একমাত্র তাঁর ইবাদাত করতে বাধা কোথায়? [দেখুন, ইবন কাসীর] অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেনঃ “ওরা কি স্রষ্টা ছাড়া সৃষ্টি হয়েছে, না ওরা নিজেরাই স্রষ্টা? না কি ওরা আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছে? বরং তারা দৃঢ় প্রত্যয়ী নয়।।” [সূরা আত-তুরঃ ৩৫–৩৬]
(২) তাদের কথার অর্থ ছিল এই যে, তোমাদেরকে আমরা সব দিক দিয়ে আমাদের মত একজন মানুষই দেখছি। তোমরা পানাহার করো, নিদ্রা যাও, তোমাদের স্ত্রী ও সন্তানাদি আছে, তোমাদের মধ্যে ক্ষুধা, পিপাসা, রোগ, শোক, ঠাণ্ডা ও গরমের তথা সব জিনিসের অনুভূতি আছে। এসব ব্যাপারে এবং সব ধরনের মানবিক দুর্বলতার ক্ষেত্রে আমাদের সাথে তোমাদের সাদৃশ্য রয়েছে। তোমাদের মধ্যে এমন কোন অসাধারণত্ব দেখছি না যার ভিত্তিতে আমরা এ কথা মেনে নিতে পারি যে, আল্লাহ তোমাদের সাথে কথা বলেন এবং ফেরেশতারা তোমাদের কাছে আসে। তোমরা তো আমাদের কাছে কোন মু'জিযা নিয়ে আসনি।
(৩) অর্থাৎ তোমরা এমন কোন প্রমাণ বা মু'জিযা নিয়ে আস যা আমরা চোখে দেখি এবং হাত দিয়ে স্পর্শ করি। যে প্রমাণ দেখে আমরা বিশ্বাস করতে পারি যে, যথার্থই আল্লাহ তোমাদেরকে পাঠিয়েছেন এবং তোমরা যে বাণী এনেছো তা আল্লাহর বাণী।
তাফসীরে জাকারিয়া(১০) তাদের রসূলগণ বলেছিল, ‘আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সম্বন্ধে কি কোন সন্দেহ আছে? তোমাদের পাপরাশি মার্জনা করবার জন্য[1] এবং নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত তোমাদেরকে অবকাশ দিবার জন্য তিনি তোমাদেরকে আহবান জানাচ্ছেন।’ তারা বলল, ‘তোমরা তো আমাদেরই মত মানুষ;[2] আমাদের পিতৃপুরুষগণ যাদের উপাসনা করত, তোমরা তাদের উপাসনা করা হতে আমাদেরকে বিরত রাখতে চাও।[3] সুতরাং তোমরা আমাদের কাছে কোন অকাট্য প্রমাণ উপস্থিত কর।’ [4]
[1] অর্থাৎ, আল্লাহ সম্বন্ধে তোমাদের সংশয় আছে, যিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের স্রষ্টা। এছাড়া তিনি তোমাদের কাছে ঈমান ও তাওহীদের দাওয়াতও শুধু তোমাদেরকে পাপ থেকে পবিত্র করার উদ্দেশ্যে পেশ করেন, তা সত্ত্বেও তোমরা নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের স্রষ্টাকে মানতে প্রস্তুত নও এবং তাঁর দাওয়াতকে অস্বীকার কর?
[2] এটা সেই প্রশ্ন যা কাফেরদের মনে উদ্রেক হতে থাকে যে, মানুষ কিভাবে আল্লাহর অহী এবং নবুঅত ও রিসালতের অধিকারী হতে পারে?
[3] এটা দ্বিতীয় প্রতিবন্ধক যে আমরা সেসব উপাস্যের পূজা কি করে বর্জন করি, যাদের পূজা আমাদের পূর্বপুরুষরা করে এসেছে? অথচ তোমাদের উদ্দেশ্য আমাদেরকে তাদের পূজা থেকে সরিয়ে দিয়ে এক উপাস্যের ইবাদতে লাগিয়ে দেওয়া।
[4] প্রমাণ, নিদর্শন ও মু’জিযা তো প্রত্যেক নবীকে দেওয়া হয়েছিল। এর অর্থ এমন প্রমাণ, নিদর্শন অথবা মু’জিযা, যা দেখার জন্য তারা আকাঙ্ক্ষিত ছিল। যেমন; মক্কার মুশরিকরা নবী (সাঃ)-এর কাছে বিভিন্ন ধরনের মু’জিযা তলব করেছিল, যেগুলোর বিবরণ সূরা বানী ইস্রাঈলে আসবে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানতাদেরকে তাদের রাসূলগণ বলল, ‘আমরা তো কেবল তোমাদের মতই মানুষ, কিন্তু আল্লাহ তার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা অনুগ্রহ করেন। আর আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তোমাদের কাছে প্রমাণ নিয়ে আসার সাধ্য আমাদের নেই। আর কেবল আল্লাহর উপরই মুমিনদের তাওয়াক্কুল করা উচিত’। আল-বায়ান
তাদের রসূলগণ তাদেরকে বলেছিল, ‘যদিও আমরা তোমাদের মতই মানুষ ব্যতীত নই, কিন্তু আল্লাহ তাঁর বান্দাহদের মধ্যে যার উপর ইচ্ছে অনুগ্রহ করেন। আল্লাহর হুকুম ছাড়া তোমাদের কাছে কোন প্রমাণ উপস্থিত করা আমাদের কাজ নয়। মু’মিনদের উচিত আল্লাহরই উপর ভরসা করা। তাইসিরুল
তাদের রাসূলগণ তাদেরকে বলতঃ সত্য বটে আমরা তোমাদের মত মানুষ, কিন্তু আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা অনুগ্রহ করেন; আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তোমাদের নিকট প্রমাণ উপস্থিত করা আমাদের কাজ নয়; মু’মিনদের আল্লাহর উপরই নির্ভর করা উচিত। মুজিবুর রহমান
Their messengers said to them, "We are only men like you, but Allah confers favor upon whom He wills of His servants. It has never been for us to bring you evidence except by permission of Allah. And upon Allah let the believers rely. Sahih International
১১. তাদের রাসূলগণ তাদেরকে বললেন, সত্য বটে, আমরা তোমাদের মত মানুষই কিন্তু আল্লাহ তার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছে অনুগ্রহ করেন এবং আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তোমাদের কাছে প্রমাণ উপস্থিত করার সাধ্য আমাদের নেই।(১) আর আল্লাহর উপরই মুমিনগণের নির্ভর করা উচিত।
(১) অর্থাৎ নিঃসন্দেহে আমরা তো মানুষই। তবে আল্লাহ নবুওয়াত ও রিসালাতের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে আমাদেরকে বাছাই করে নিয়েছেন। এখানে আমাদের সামর্থের কোন ব্যাপার নেই। এ তো আল্লাহর পূর্ণ ইখতিয়ারের ব্যাপার। তিনি নিজের বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে যা ইচ্ছা দেন। আমাদের কাছে যা কিছু এসেছে তা আমরা তোমাদের কাছে পাঠাতে বলতে পারি না এবং আমাদের কাছে যে সত্যের দ্বার উন্মুক্ত হয়ে গেছে তা থেকে আমরা নিজেদের চোখ বন্ধ করে নিতেও পারি না। আমরা নিজেদের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে কোন প্রমাণ বা মু'জিযা নিয়ে আসতে পারি না। যতক্ষণ না আল্লাহর কাছে আমরা তা চাইব এবং তিনি তা অনুমোদন করবেন। দেখুন, [ইবন কাসীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(১১) তাদের রসূলগণ তাদেরকে বলল, ‘(সত্য বটে) আমরা তোমাদের মত মানুষ, কিন্তু আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা অনুগ্রহ করে থাকেন;[1] আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তোমাদের নিকট প্রমাণ উপস্থিত করা আমাদের কাজ নয়।[2] আর বিশ্বাসীদের উচিত, কেবল আল্লাহর উপরই নির্ভর করা। [3]
[1] রসূলগণ প্রথম প্রশ্নের উত্তর দিলেন যে, অবশ্যই আমরা তোমাদের মত মানুষ, সুতরাং মানুষ রসূল হতে পারে না, তোমাদের এই ধারণা ভুল। মহান আল্লাহ মানবকুলের হিদায়াতের জন্য তাদের মধ্য থেকেই কতিপয় মানুষকে নির্বাচন করে নেন এবং তোমাদের মধ্য হতে এই অনুগ্রহ আমাদের প্রতি করেছেন।
[2] তাদের মন মোতাবেক মু’জিযা প্রদর্শনের ব্যাপারে রসূলগণ জবাব দিলেন যে, মু’জিযা প্রদর্শনের এখতিয়ার আমাদের হাতে নয়, বরং তা শুধু মাত্র আল্লাহর হাতে।
[3] এখানে ‘বিশ্বাসীদের’ বলে উদ্দেশ্য প্রথমত নবীগণ। অর্থাৎ আমাদের উচিত, আল্লাহর উপরেই সম্পূর্ণ ভরসা রাখা, যেমন পরবর্তী আয়াতে বলেছেন, ‘‘আমরা আল্লাহর উপর নির্ভর করব না কেন?’’
তাফসীরে আহসানুল বায়ান‘আর আমরা কেন আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করব না, অথচ তিনিই আমাদেরকে আমাদের পথের দিশা দিয়েছেন। আর তোমরা আমাদের যে কষ্ট দিচ্ছ, আমরা তার উপর অবশ্যই সবর করব। আর আল্লাহর উপরই যেন তাওয়াক্কুলকারীরা তাওয়াক্কুল করে’। আল-বায়ান
আমরা আল্লাহর উপর ভরসা করব না কেন, তিনিই তো আমাদেরকে পথ দেখিয়েছেন, তোমরা আমাদেরকে যে ক্লেশই দাওনা কেন, আমরা তাতে অবশ্য অবশ্যই ধৈর্য ধারণ করব, আর ভরসাকারীদের আল্লাহরই উপর ভরসা করা উচিত। তাইসিরুল
আমরা আল্লাহর উপর নির্ভর করবনা কেন? তিনিইতো আমাদেরকে পথ প্রদর্শন করেছেন; তোমরা আমাদেরকে যে ক্লেশ দিচ্ছ, আমরা অবশ্যই তা ধৈর্যের সাথে সহ্য করব এবং নির্ভরকারীদের আল্লাহরই উপর নির্ভর করা উচিত। মুজিবুর রহমান
And why should we not rely upon Allah while He has guided us to our [good] ways. And we will surely be patient against whatever harm you should cause us. And upon Allah let those who would rely [indeed] rely." Sahih International
১২. আর আমাদের কি হয়েছে যে, আমরা আল্লাহর উপর ভরসা করব না? অথচ তিনিই তো আমাদেরকে আমাদের পথ দেখিয়েছেন।(১) আর তোমরা আমাদেরকে যে কষ্ট দিচ্ছ, আমরা তাতে অবশ্যই ধৈর্য ধারণ করব।(২) সুতরাং নির্ভরকারীগণ আল্লাহর উপরই নির্ভর করুক।
(১) অর্থাৎ তিনি আমাদেরকে সবচেয়ে সঠিক ও সবচেয়ে স্পষ্ট ও প্রকাশমান পথটির দিশা দিয়েছেন। [ইবন কাসীর]
(২) এভাবে যখনই কোন নবী বা রাসূল কোন কাওমের কাছে এসেছে তখনই তাদের নেতা গোছের লোকেরা নবী-রাসূলদেরকে বিভিন্নভাবে চাপের মুখে রাখত। কখনও তাদেরকে দেশান্তর করার ভয় দেখাত। আবার কখনও তাদেরকে হত্যা করতে উদ্যত হত। যেমন শু'আইব আলাইহিস সালামের কাওম তাকে বলেছিল, “তার সম্প্রদায়ের অহংকারী নেতারা বলল, হে শু'আইব! আমরা তোমাকে ও তোমার সাথে যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে আমাদের জনপদ থেকে বের করে দেবই অথবা তোমাদেরকে আমাদের ধর্মাদর্শে ফিরে আসতে হবে। তিনি বললেন, যদিও আমরা ওটাকে ঘৃণা করি তবুও? [সূরা আল-আরাফঃ ৮৮] লুত আলাইহিস সালামের জাতি তাকে বলেছিলঃ “উত্তরে তার সম্প্রদায় শুধু বলল, 'লুত-পরিবারকে তোমরা জনপদ থেকে বহিষ্কার কর, এরা তো এমন লোক যারা পবিত্র সাজতে চায়।” [সূরা আননামলঃ ৫৬]
তদ্রুপ অন্যত্রও এসেছে যে, মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও তারা অনুরূপ কথা বলেছিল, যেমনঃ “তারা আপনাকে দেশ থেকে উৎখাত করার চূড়ান্ত চেষ্টা করেছিল আপনাকে সেখান থেকে বহিস্কার করার জন্য; তাহলে আপনার পর তারাও সেখানে অল্পকাল টিকে থাকত।” [সূরা আল-ইসরাঃ ৭৬] “স্মরণ করুন, কাফিররা আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে আপনাকে বন্দী করার জন্য, হত্যা করার বা নির্বাসিত করার জন্য এবং তারা ষড়যন্ত্র করে এবং আল্লাহও কৌশল করেন আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ কৌশলী। [সূরা আল-আনফালঃ ৩০]
তাফসীরে জাকারিয়া(১২) আমরা আল্লাহর উপর নির্ভর করব না কেন? তিনিই তো আমাদেরকে পথ প্রদর্শন করেছেন; তোমরা আমাদেরকে যে ক্লেশ দিচ্ছ, আমরা অবশ্যই তা ধৈর্যের সাথে সহ্য করব। আর নির্ভরকারীদের উচিত, কেবল আল্লাহর উপরই নির্ভর করা।’ [1]
[1] নির্ভর এই যে, তিনিই কাফেরদের বদমায়েশি ও মূর্খামি থেকে রক্ষাকারী। এই অর্থও হতে পারে যে, আমাদের কাছে মু’জিযা তলব না করে আল্লাহর উপর ভরসা করা উচিত। তাঁর ইচ্ছা হলে তিনি মু’জিযা প্রকাশ করবেন, না হলে না।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর যারা কুফরী করেছে, তারা তাদের রাসূলদের বলল, ‘আমরা তোমাদেরকে আমাদের ভূ-খন্ড থেকে অবশ্যই বের করে দেব, অথবা তোমরা অবশ্যই আমাদের মিল্লাতে ফিরে আসবে’। অতঃপর তাদের রব তাদের নিকট ওহী পাঠালেন, ‘আমি অবশ্যই যালিমদের ধ্বংস করে দেব’। আল-বায়ান
কাফিরগণ তাদের রসূলদের বলেছিল, ‘আমরা তোমাদেরকে আমাদের দেশ থেকে অবশ্য অবশ্যই বের করে দেব, অন্যথায় তোমাদেরকে অবশ্য অবশ্যই আমাদের ধর্মমতে ফিরে আসতে হবে।’ এমতাবস্থায় রসূলদের প্রতি তাদের প্রতিপালক এ মর্মে ওয়াহী করলেন যে, ‘আমি যালিমদেরকে অবশ্য অবশ্যই ধ্বংস করব। তাইসিরুল
কাফিরেরা তাদের রাসূলদেরকে বলেছিলঃ আমরা তোমাদেরকে অবশ্যই আমাদের দেশ হতে বহিস্কার করব, অথবা তোমাদেরকে আমাদের ধর্মাদর্শে ফিরে আসতেই হবে। অতঃপর রাসূলদেরকে তাদের রাব্ব অহী প্রেরণ করলেন; যালিমদেরকে আমি অবশ্যই বিনাশ করব। মুজিবুর রহমান
And those who disbelieved said to their messengers, "We will surely drive you out of our land, or you must return to our religion." So their Lord inspired to them, "We will surely destroy the wrongdoers. Sahih International
১৩. আর কাফিররা তাদের রাসূলদেরকে বলেছিল, আমরা তোমাদেরকে আমাদের দেশ হতে অবশ্যই বহিস্কৃত করব অথবা তোমরা আমাদের ধর্মাদর্শে ফিরে আসবে।(১) অতঃপর রাসূলগণকে তাদের রব ওহী পাঠালেন, যালিমদেরকে আমি অবশ্যই বিনাশ করব;
(১) এর মানে এ নয় যে, নবুওয়াতের মর্যাদায় সমাসীন হবার আগে নবীগণ নিজেদের পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়ের মিল্লাত বা দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত হতেন। বরং এর মানে হচ্ছে, নবুওয়াত লাভের পূর্বে যেহেতু তারা এক ধরনের নীরব জীবন যাপন করতেন, তাই তাদের সম্প্রদায় মনে করতো তারা তাদেরই দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। [আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর] তারপর নবুওয়াতের কাজ শুরু করে দেয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে দোষারোপ করা হতো যে, তারা বাপ-দাদার দ্বীন ত্যাগ করেছেন। অথচ নবুওয়াত লাভের আগেও তারা কখনো মুশরিকদের দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। যার ফলে তাদের বিরুদ্ধে দ্বীনচ্যুতির অভিযোগ করা যেতে পারে। অথবা আয়াতের অর্থ, তোমরা আমাদের ধর্মাদর্শের অনুসারী হয়ে যাবে। অথবা কাফেররা এটা দ্বারা নবীদের অনুসারীদের উদ্দেশ্য নিয়েছে। যারা নবীর উপর ঈমান আনার আগে তাদের ধর্মাদর্শে ছিল। নবীকেও তারা নবীর অনুসারীদের সাথে একসাথে সম্বোধন করে নিয়েছে। [বাগভী; ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(১৩) অবিশ্বাসীগণ তাদের রসূলদেরকে বলেছিল, ‘আমরা তোমাদেরকে অবশ্যই আমাদের দেশ হতে বহিষ্কৃত করব, অথবা তোমাদেরকে আমাদের ধর্মে ধর্মান্তরিত হতেই হবে।’[1] অতঃপর রসূলদের প্রতিপালক তাদের প্রতি অহী (প্রত্যাদেশ) প্রেরণ করলেন, ‘সীমালংঘনকারীদেরকে আমি অবশ্যই বিনাশ করব।[2]
[1] এখানে অনেকে ধর্মাদর্শে ফিরে আসার অনুবাদ করেছেন। কিন্তু নবীগণ আদৌ কুফরী ধর্মাদর্শে ছিলেন না। অতএব ফিরে আসার অনুবাদ না করাই উত্তম। (ফাতহুল কাদীর) (সূরা আ’রাফ ৮৮নং আয়াতের টীকা দ্রঃ)
[2] যেমন আরো কয়েক জায়গাতে মহান আল্লাহ বলেছেন, وَلَقَدْ سَبَقَتْ كَلِمَتُنَا لِعِبَادِنَا الْمُرْسَلِينَ. إِنَّهُمْ لَهُمُ الْمَنصُورُونَ. وَإِنَّ جُندَنَا لَهُمُ الْغَالِبُونَ অর্থাৎ, আমার প্রেরিত বান্দাদের সম্পর্কে আমার এই বাক্য পূর্বেই স্থির হয়েছে যে, অবশ্যই তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে, এবং আমার বাহিনীই হবে বিজয়ী। (সূরা সাফ্ফাত ১৭১-১৭৩) كَتَبَ اللَّهُ لَأَغْلِبَنَّ أَنَا وَرُسُلِي অর্থাৎ, আল্লাহ সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেছেন যে, আমি এবং আমার রসূল অবশ্যই বিজয়ী হব। (সূরা মুজাদালা ২১)
তাফসীরে আহসানুল বায়ান‘আর নিশ্চয় আমি তাদের পর তোমাদেরকে যমীনে বাস করতে দেব। এটা তার জন্য, যে আমার অবস্থানকে ভয় করে এবং ভয় করে আমার ধমকের’। আল-বায়ান
আর তাদের পরে তোমাদেরকে অবশ্য অবশ্যই যমীনে পুনর্বাসিত করব। এ (শুভ) সংবাদ তাদের জন্য যারা আমার সামনে এসে দাঁড়ানোর ব্যাপারে ভয় রাখে আর আমার শাস্তির ভয় দেখানোতে শংকিত হয়।’ তাইসিরুল
তাদের পরে আমি তোমাদেরকে দেশে প্রতিষ্ঠিত করবই; এটা তাদের জন্য যারা ভয় রাখে আমার সম্মুখে উপস্থিত হওয়ার এবং ভয় রাখে আমার শাস্তির। মুজিবুর রহমান
And We will surely cause you to dwell in the land after them. That is for he who fears My position and fears My threat." Sahih International
১৪. আর অবশ্যই তাদের পরে আমরা তোমাদেরকে দেশে বাস করাব(১); এটা তার জন্য যে ভয় রাখে আমার সামনে উপস্থিত হওয়ার এবং ভয় রাখে আমার শাস্তির।(২)
(১) অন্যত্রও আল্লাহ তা'আলা এ ওয়াদা করেছেন, যেমন বলেছেনঃ “আমার প্রেরিত বান্দাদের সম্পর্কে আমার এ বাক্য আগেই স্থির হয়েছে যে, অবশ্যই তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে, এবং আমার বাহিনীই হবে বিজয়ী।” [সূরা আস-সাফফাতঃ ১৭১–১৭৩] আরো বলেছেনঃ “আল্লাহ সিদ্ধান্ত করেছেন, আমি অবশ্যই বিজয়ী হব এবং আমার রাসূলগণও নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রমশালী [সূরা আল-মুজাদালাহঃ ২১] আরও এসেছে, “যে সম্প্রদায়কে দুর্বল মনে করা হত তাদেরকে আমরা আমাদের কল্যাণপ্রাপ্ত রাজ্যের পূর্ব ও পশ্চিমের উত্তরাধিকারী করি” [সূরা আল-আরাফ: ১৩৭] আরও এসেছে, “আর তিনি তোমাদেরকে অধিকারী করলেন তাদের ভূমি, ঘরবাড়ী ও ধন-সম্পদের।” [সূরা আল-আহযাব: ২৭] কাতাদা রাহেমাহুল্লাহ বলেনঃ এ আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করার এবং আখেরাতে জান্নাতের ওয়াদা করেছেন। [তাবারী]
(২) যদিও আল্লাহর ওয়াদা সবার জন্যই কিন্তু এর থেকে উপকার ও শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে শুধু দু’শ্রেণীর লোকেরাই। যারা কিয়ামতের মাঠে তাদের প্রভুর সামনে উপস্থিত হতে হবে এ দৃঢ় বিশ্বাস রাখার কারণে তাদের মধ্যে ভাবান্তর হয় এবং সে ভয়ে সদা কম্পমান থাকে। আর যারা আল্লাহর ওয়াদাকে ভয় করে এবং এটা বিশ্বাস করে যে, তাঁর ওয়াদা বাস্তবায়িত হবেই। অন্যত্র আল্লাহ বলেনঃ “তারপর যে সীমালংঘন করে এবং পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দেয়। জাহান্নামই হবে তার আবাস। পক্ষান্তরে যে স্বীয় রবের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে এবং প্রবৃত্তি হতে নিজকে বিরত রাখে জান্নাতই হবে তার আবাস।” [সূরা আন-নাযি আতঃ ৩৭–৪১] আরো বলেছেনঃ “আর যে তার প্রভুর সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করে তার জন্য রয়েছে দুটি জান্নাত।” [সূরা আর-রাহমানঃ ৪৬] আয়াতের অপর অর্থ হচ্ছে, যারা দুনিয়াতে আমার বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে সাবধান হয়ে এটা বিশ্বাস করে যে, আমি অবশ্যই তাকে দেখছি, তার কর্মকাণ্ড আমার সার্বিক পর্যবেক্ষণে রয়েছে, তারাই ওয়াদা ও ধমকি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। [কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(১৪) তাদের পরে আমি অবশ্যই তোমাদেরকে দেশে পুনর্বাসিত করব;[1] এটা তাদের জন্য যারা ভয় রাখে আমার সম্মুখে দন্ডায়মান হওয়ার এবং ভয় রাখে আমার (শাস্তির) হুমকির।’ [2]
[1] এ বিষয়ও মহান আল্লাহ কয়েক জায়গাতে বর্ণনা করেছেন; যেমন, وَلَقَدْ كَتَبْنَا فِي الزَّبُورِ مِن بَعْدِ الذِّكْرِ أَنَّ الْأَرْضَ يَرِثُهَا عِبَادِيَ الصَّالِحُونَ অর্থাৎ, আমি উপদেশের পর কিতাবে লিখে দিয়েছি যে, আমার সৎকর্মশীল বান্দারা পৃথিবীর অধিকারী হবে। (সূরা আম্বিয়া ১০৫) (আরো দেখুন সূরা আ‘রাফ: ১২৮-১৩৭) অতএব এই মোতাবেক মহান আল্লাহ নাবী (সাঃ)-এর সাহায্য করেন। তাঁকে বড় দুঃখ-বেদনা নিয়ে মক্কা থেকে বের হতে হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু কয়েক বছর পরেই তিনি বিজয়ী রূপে মক্কা প্রবেশ করেন এবং তাঁকে বের হতে বাধ্যকারী যালেম মুশরিকরা তাঁর সামনে অবনত মস্তকে দন্ডায়মান হয়ে তাঁর চোখের ইশারার অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু তিনি মহান চরিত্রের প্রমাণ দিলেন এবং ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই’ বলে সকলকে ক্ষমা করে দিলেন।
[2] যেমন অন্যত্র বলেছেন, وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى، فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى ‘অর্থাৎ, যে স্বীয় প্রতিপালকের সামনে দন্ডায়মান হওয়ার ভয় রাখে এবং কুপ্রবৃত্তি হতে নিজেকে বিরত রাখে, জান্নাতই হবে তার অবস্থান ক্ষেত্র। (সূরা নাযিআত ৪০-৪১) وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَانِ অর্থাৎ, যে ব্যক্তি আল্লাহর সামনে দন্ডায়মান হওয়ার ভয় রাখে, তার জন্যে রয়েছে দুটি জান্নাত। (সূরা রাহমান ৪৬)
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর তারা বিজয় কামনা করল, আর ব্যর্থ হল সকল স্বেচ্ছাচারী, হঠকারী। আল-বায়ান
তারা (অর্থাৎ কাফিররা) চূড়ান্ত বিজয়ের ফায়সালা কামনা করেছিল, কিন্তু (আল্লাহ ও তাঁর রসূলদের বিরোধিতা করার কারণে) প্রত্যেক উদ্ধত সীমালঙ্ঘনকারী ব্যর্থ হয়ে গেল। তাইসিরুল
তারা বিচার কামনা করল এবং প্রত্যেক উদ্ধত স্বৈরাচারী ব্যর্থ মনোরথ হল। মুজিবুর রহমান
And they requested victory from Allah, and disappointed, [therefore], was every obstinate tyrant. Sahih International
১৫. আর তারা বিজয় কামনা করলো(১) আর প্রত্যেক উদ্ধত স্বৈরাচারী ব্যর্থ মনোরথ হল(২)।
(১) এ আয়াতে কারা বিজয় কামনা করল এ ব্যাপারে দুটি মত রয়েছে। এক. এখানে রাসূলগণই বিজয় কামনা করেছিলেন। দুই. কাফেরগণ উদ্ধত ও কুফর এবং শির্কী ব্যবস্থাপনার উপর থাকা সত্ত্বেও নিজেদের জন্য বিজয় কামনা করল। [ফাতহুল কাদীর] এ অর্থের সমর্থনে অন্যত্র বর্ণিত একটি আয়াত পেশ করা যায় যেখানে বলা হয়েছে যে, কাফেররা তাদের দো'আয় বলেছিলঃ “হে আল্লাহ! এগুলো যদি আপনার কাছ থেকে সত্য হয়, তবে আমাদের উপর আকাশ থেকে পাথর বর্ষণ করুন কিংবা আমাদেরকে মর্মন্তদ শাস্তি দিন।” [সূরা আল-আনফালঃ ৩২] আবার কোন কোন মুফাসসিরের মতে, এটি উভয় সম্প্রদায়েরই কামনা হতে পারে। [কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর]
(২) جبار অর্থ, নিজের মতকে প্রাধান্যদানকারী এবং অপরের উপর নিজের মত চাপানোর প্রয়াস যিনি চালান। হক্ক গ্রহণের মানসিকতা যার নেই। অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা এ ধরনের লোকদের পরিণতি সম্পর্কে বলেছেনঃ “আদেশ করা হবে, তোমরা উভয়ে নিক্ষেপ কর প্রত্যেক উদ্ধত কাফিরকে, যে কল্যাণকর কাজে প্রবল বাধাদানকারী, সীমালংঘনকারী ও সন্দেহ পোষণকারী। যে ব্যক্তি আল্লাহর সংগে অন্য ইলাহ গ্রহণ করত তাকে কঠিন শাস্তিতে নিক্ষেপ কর [সূরা ক্কাফঃ ২৪–২৬] তদ্রুপ হাদীসেও এসেছে, “কিয়ামতের দিন জাহান্নামকে নিয়ে আসা হবে তখন সে সমস্ত সৃষ্টিজগতকে ডেকে বলবে, আমাকে প্রত্যেক সীমালঙ্ঘনকারী, উদ্ধতের ব্যাপারে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।” [তিরমিযীঃ ২৫৭৪]
তাফসীরে জাকারিয়া(১৫) তারা ফায়সালা কামনা করল[1] এবং প্রত্যেক উদ্ধত হঠকারী ব্যর্থকাম হল।
[1] ‘তারা’ বলতে অত্যাচারী মুশরিকরাও হতে পারে। অর্থাৎ, তারা শেষ পর্যন্ত আল্লাহর কাছে ফায়সালা তলব করল যে, এই রসূল যদি সত্য হন, তাহলে হয় আল্লাহ আমাদেরকে আযাব দিয়ে ধ্বংস করে দিন; যেমন মক্কার মুশরিকরা বলেছিল, اللَّهُمَّ إِن كَانَ هَذَا هُوَ الْحَقَّ مِنْ عِندِكَ فَأَمْطِرْ عَلَيْنَا حِجَارَةً مِّنَ السَّمَاء أَوِ ائْتِنَا بِعَذَابٍ أَلِيمٍ অর্থাৎ, হে আল্লাহ! এই কুরআন যদি তোমার পক্ষ হতে সত্য হয় তবে আকাশ থেকে আমাদের উপর প্রস্তর বর্ষণ কর অথবা আমাদের উপর কঠিন পীড়াদায়ক শাস্তি এনে দাও! (সূরা আনফাল ৩২) আর না হয় যেমন বদর যুদ্ধের সময়েও মক্কার মুশরিকরা এই ধরনেরই কামনা করেছিল, যার উল্লেখ মহান আল্লাহ সূরা আনফালের ১৯নং আয়াতে করেছেন। অথবা ‘তারা’ বলতে রসূলগণ হতে পারেন। অর্থাৎ, তাঁরা আল্লাহর কাছে বিজয় ও সাহায্য চেয়ে দু’আ করলেন, যা মহান আল্লাহ কবুল করলেন।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানএর সামনে রয়েছে জাহান্নাম, আর তাদের পান করানো হবে গলিত পুঁজ থেকে। আল-বায়ান
এদের জন্য পরবর্তীতে আছে জাহান্নাম, আর এদেরকে পান করানো হবে গলিত পুঁজ। তাইসিরুল
তাদের প্রত্যেকের জন্য পরিণামে জাহান্নাম রয়েছে এবং প্রত্যেককে পান করানো হবে গলিত পুঁজ । মুজিবুর রহমান
Before him is Hell, and he will be given a drink of purulent water. Sahih International
১৬. তার সামনে রয়েছে জাহান্নাম এবং পান করানো হবে গলিত পুঁজ;(১)
(১) আয়াতে এসেছে যে, তাদেরকে صديد পান করানো হবে। صديد শব্দের অর্থ নির্ধারণে কয়েকটি মত রয়েছে। মুজাহিদ বলেন, এর অর্থ, পুঁজ ও রক্ত। [তাবারী] কাতাদা বলেন, এর দ্বারা কাফেরদের চামড়া ও গোস্ত থেকে যা গলিত হয়ে বের হবে তাই উদ্দেশ্য। [তাবারী] কারও কারও মতে, এর দ্বারা কাফেরদের পুঁজ ও রক্তের সাথে তাদের পেট থেকে যা বের হবে তা মিললে যা হয় তা বুঝানো হয়েছে। [তাবারী; বাগভী; ফাতহুল কাদীর] মোটকথা, এটা এমন খারাপ পানীয় যা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। ইবনে কাসীর রাহেমাহুল্লাহ বলেন, জাহান্নামবাসীদের পানীয় দু’ধরনের, হামীম অথবা গাসসাক, তন্মধ্যে হামীম হলো সবচেয়ে গরম।
আর গাসসাক হলো সবচেয়ে ঠান্ডা ও ময়লা দুৰ্গন্ধযুক্ত গলিত পানীয়। এ আয়াতের সমার্থে অন্যত্র এসেছে, “এটা সীমালংঘনকারীদের জন্য কাজেই তারা আস্বাদন করুক ফুটন্ত পানি ও পুঁজ। আরো আছে এরূপ বিভিন্ন ধরনের শাস্তি। [সূরা ছোয়াদঃ ৫৭–৫৮] অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেনঃ “এবং যাদেরকে পান করতে দেয়া হবে ফুটন্ত পানি যা তাদের নাড়ীভুড়ি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দেবে?” [সূরা মুহাম্মাদঃ ১৫] আরো বলেছেন “তারা পানীয় চাইলে তাদেরকে দেয়া হবে গলিত ধাতুর ন্যায় পানীয়, যা তাদের মুখমন্ডল দগ্ধ করবে; এটা নিকৃষ্ট পানীয়! আর জাহান্নাম কত নিকৃষ্ট আশ্রয়! [সূরা আল-কাহফঃ ২৯]
তাফসীরে জাকারিয়া(১৬) তাদের প্রত্যেকের সম্মুখে রয়েছে জাহান্নাম এবং প্রত্যেককে পান করানো হবে পূঁজমিশ্রিত পানি।[1]
[1] صَدِيْدٌ জাহান্নামীদের শরীর ও চামড়া থেকে নির্গত পুঁজ ও রক্ত। কতিপয় হাদীসে বলা হয়েছে, (عُصَارَةُ أهْلِ النَّارِ) (জাহান্নামীদের দেহ-নিঃসৃত রক্ত, পুঁজ ইত্যাদি) এবং কতিপয় হাদীসে আছে যে, উক্ত পুঁজ ও রক্ত এত গরম ও ফুটন্ত অবস্থায় হবে যে, তাদের মুখ পর্যন্ত পৌঁছতেই তাদের মুখমন্ডলের চামড়া ঝলসে খসে পড়বে এবং এর এক ঢোক পান করতেই তাদের পেটের নাড়ীভুঁড়ি পায়খানা-দ্বার দিয়ে বেরিয়ে পড়বে। আল্লাহ আমাদেরকে এ থেকে রক্ষা করুন। আমীন।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানসে তা গিলতে চাইবে এবং প্রায় সহজে সে তা গিলতে পারবে না। আর তার কাছে সকল স্থান থেকে মৃত্যু ধেঁয়ে আসবে, অথচ সে মরবে না। আর এর পরেও রয়েছে কঠিন আযাব । আল-বায়ান
সে তা খুব কষ্ট করে গিলতে চেষ্টা করবে, আর খুব কমই গিলতে পারবে। মৃত্যু যন্ত্রণা তার কাছে চতুর্দিক থেকে আসবে কিন্তু সে মরবে না, এরপর তার জন্য থাকবে এক কঠিন ‘আযাব। তাইসিরুল
যা সে অতি কষ্টে গলধঃকরণ করবে এবং তা গলধঃকরণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। সর্ব দিক হতে তার নিকট আসবে মৃত্যু যন্ত্রণা, কিন্তু তার মৃত্যু ঘটবেনা এবং সে কঠোর শাস্তি ভোগ করতেই থাকবে। মুজিবুর রহমান
He will gulp it but will hardly [be able to] swallow it. And death will come to him from everywhere, but he is not to die. And before him is a massive punishment. Sahih International
১৭. যা সে অতি কষ্টে একেক ঢোক করে গিলবে এবং তা গিলা প্রায় সহজ হবে না। সকল স্থান থেকে তার কাছে আসবে মৃত্যু(১) অথচ তার মৃত্যু ঘটবে না(২)। আর এরপরও রয়েছে কঠোর শাস্তি।(৩)
(১) ইবরাহীম আত-তাইমী বলেন, সবদিক থেকে মৃত্যু আসার অর্থ, শরীরের প্রতিটি লোমকূপ থেকে মৃত্যুর কষ্ট আসতে থাকবে। [তাবারী]
(২) আল্লাহ বলেন, “এবং তাদের জন্য থাকবে লোহার মুগুর।” [সূরা আল-হাজ্জঃ ২১], তারা সেটা গিলতে চেষ্টা করলেও সেটার দুর্গন্ধ, তিক্ততা, ময়লা আবর্জনা ও প্রচণ্ড ঠাণ্ডা বা গরম হওয়ার কারণে সহজে গিলতে সমর্থ হবে না। এভাবে তার শাস্তি চলতেই থাকবে, তার সমস্ত শরীরে মৃত্যু যন্ত্রণা ভোগ করবে কিন্তু মৃত্যু তার আসবে না। তার অগ্র, পশ্চাত, উপর বা নীচ সবদিক থেকে তার শাস্তি এমন হবে যে, এর সবগুলিই তার মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট। কিন্তু তার মৃত্যু হবে না। আল্লাহ্ তা'আলা অন্যত্র বলেনঃ “কিন্তু যারা কুফরী করে তাদের জন্য আছে জাহান্নামের আগুন। তাদের মৃত্যুর আদেশ দেয়া হবে না যে, তারা মরবে এবং তাদের থেকে জাহান্নামের শাস্তিও লাঘব করা হবে না।” [সূরা ফাতিরঃ ৩৬]
(৩) অর্থাৎ এটাই তাদের শাস্তির শেষ নয়। এর পরও তাদের জন্য আরো ভয়াবহ, কঠোর ও মারাত্মক শাস্তি অপেক্ষা করছে। [ইবন কাসীর] অন্যত্র বলেছেনঃ “যাক্কুম গাছ, যালিমদের জন্য আমি এটা সৃষ্টি করেছি পরীক্ষাস্বরূপ, এ গাছ উদগত হয় জাহান্নামের তলদেশ হতে, এর মোচা যেন শয়তানের মাথা। তারা এটা থেকে খাবে এবং উদর পূর্ণ করবে এটা দিয়ে। তার উপর তাদের জন্য থাকবে ফুটন্ত পানির মিশ্রণ। আর তাদের গন্তব্য হবে অবশ্যই প্রজ্বলিত আগুনের দিকে [সূরা আস-সাফফাতঃ ৬২–৬৮]
এভাবেই তারা কখনো যাক্কুম গাছ থেকে খাবে, আবার কখনো তারা ফুটন্ত পানি পান করবে যা তাদের পেটের নাড়ীভুড়ি ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে। আবার কখনো তাদেরকে জাহান্নামের কঠোর শাস্তির দিকে ফেরত পাঠানো হবে। এভাবে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্নভাবে তাদের শাস্তি হতে থাকবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এটাই সে জাহান্নাম, যা অপরাধীরা মিথ্যা প্রতিপন্ন করত, ওরা জাহান্নামের আগুন ও ফুটন্ত পানির মধ্যে ছুটোছুটি করবে।” [সূরা আর-রাহমানঃ ৪৩–৪৪] আরো বলেনঃ “নিশ্চয়ই যাক্কুম গাছ হবে—পাপীর খাদ্য; গলিত তামার মত, তাদের পেটে ফুটতে থাকবে ফুটন্ত পানির মত। তাকে ধর এবং টেনে নিয়ে যাও জাহান্নামের মধ্যস্থলে, তারপর তার মাথার উপর ফুটন্ত পানি ঢেলে শাস্তি দাও- এবং বলা হবে, আস্বাদ গ্রহণ কর, তুমি তো ছিলে সম্মানিত, অভিজাত! এ তো তা-ই, যে বিষয়ে তোমরা সন্দেহ করতে।” [সূরা আদ-দোখানঃ ৪৩–৪৯]
আরো বলেনঃ “আর বাম দিকের দল, কত হতভাগ্য বাম দিকের দল! ওরা থাকবে অত্যন্ত উষ্ণ বায়ু ও উত্তপ্ত পানিতে, কালোবর্ণের ধোয়ার ছায়ায়, যা শীতল নয়, আরামদায়কও নয়। [সুরা আল-ওয়াকি'আহঃ ৪১–৪৪] আরো বলেনঃ “আর সীমালংঘনকারীদের জন্য রয়েছে নিকৃষ্টতম পরিণাম— জাহান্নাম, সেখানে তারা প্রবেশ করবে, কত নিকৃষ্ট বিশ্রামস্থল! এটা সীমালংঘনকারীদের জন্য। কাজেই তারা আস্বাদন করুক ফুটন্ত পানি ও পুঁজ। আরো আছে এরূপ বিভিন্ন ধরনের শাস্তি।” [সূরা ছোয়াদঃ ৫৫–৫৮]।
তাফসীরে জাকারিয়া(১৭) যা সে অতি কষ্টে এক ঢোক এক ঢোক করে গিলতে থাকবে এবং তা গিলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে; সর্বদিক হতে তার নিকট আসবে মৃত্যু-যন্ত্রণা, কিন্তু তার মৃত্যু ঘটবে না[1] এবং তার পরে থাকবে কঠোর শাস্তি।
[1] অর্থাৎ, বিভিন্ন প্রকারের শাস্তি আস্বাদন করতে করতে তারা মৃত্যু-কামনা করবে, কিন্তু সেথায় মৃত্যু কোথায়? সেখানে তো তাদের এই ধরনের অবিরাম শাস্তি হতেই থাকবে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানযারা তাদের রবের সাথে কুফরী করে তাদের আমলসমূহের দৃষ্টান্ত হল এমন ছাইয়ের মত, প্রবল ঘুর্ণিঝড়ের দিনে বাতাস প্রচন্ড বেগে যা বহন করে নিয়ে যায়। তারা যা অর্জন করেছে, তার মাধ্যমে কিছুই করতে পারে না। এ তো ঘোরতর বিভ্রান্তি। আল-বায়ান
যারা তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করে তাদের ‘আমালের দৃষ্টান্ত হল সেই ছাইয়ের মত যা ঝড়ের দিনে বাতাস প্রচন্ড বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়। নিজেদের উপার্জনের কিছুই তারা কাজে লাগাতে পারে না। এটাই ঘোর গুমরাহী। তাইসিরুল
যারা তাদের রাব্বকে অস্বীকার করে তাদের উপমা - তাদের কাজসমূহ ছাই সদৃশ যা ঝড়ের দিনে বাতাস প্রচন্ড বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়; যা তারা উপার্জন করে তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাতে পারেনা; এটাতো ঘোর বিভ্রান্তি। মুজিবুর রহমান
The example of those who disbelieve in their Lord is [that] their deeds are like ashes which the wind blows forcefully on a stormy day; they are unable [to keep] from what they earned a [single] thing. That is what is extreme error. Sahih International
১৮. যারা তাদের রবের সাথে কুফর করে তাদের উপমা হল, তাদের কাজগুলো ছাইয়ের মত যা ঝড়ের দিনে বাতাস প্রচণ্ড বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়(১)। যা তারা উপার্জন করে তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাতে পারে না। এটা তো ঘোর বিভ্রান্তি।
(১) উদ্দেশ্য এই যে, কাফেরদের ক্রিয়াকর্ম বাহ্যতঃ সৎ হলেও তা আল্লাহ তা'আলার কাছে গ্রহণীয় নয়। তাই সব অর্থহীন ও অকেজো। তারা দুনিয়াতে যা করেছে সবই বৃথা ও নিষ্ফল হবে। অন্যত্র আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেনঃ “আমি তাদের কৃতকর্মের প্রতি লক্ষ্য করব, তারপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করব।” [সূরা আল-ফুরকানঃ ২৩] “এ পার্থিব জীবনে যা তারা ব্যয় করে তার দৃষ্টান্ত হিমশীতল বায়ু, ওটা যে জাতি নিজেদের প্রতি যুলুম করেছে তাদের শষ্যক্ষেত্রকে আঘাত করে ও বিনষ্ট করে।” [সূরা আলে ইমরানঃ ১১৭] “হে মু’মিনগণ! দানের কথা বলে বেড়িয়ে এবং কষ্ট দিয়ে তোমরা তোমাদের দানকে ঐ ব্যক্তির ন্যায় নিস্ফল করো না যে নিজের ধন লোক দেখানোর জন্য ব্যয় করে থাকে এবং আল্লাহ ও আখিরাতে ঈমান রাখে না। তার উপমা একটি মসৃণ পাথর যার উপর কিছু মাটি থাকে, তারপর ওটার উপর প্রবল বৃষ্টিপাত ওটাকে পরিস্কার করে রেখে দেয়। যা তারা উপার্জন করেছে তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাতে পারবে না। আল্লাহ কাফির সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।” [সূরা আল-বাকারাহঃ ২৬৪]
তাফসীরে জাকারিয়া(১৮) যারা তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করে, তাদের বিবরণ এই যে, তাদের কর্মাবলী ভষ্মের মত যা ঝড়ের দিনে বাতাস প্রচন্ড বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়।[1]যা তারা উপার্জন করে, তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাতে পারে না; এটাই তো ঘোর বিভ্রান্তি।
[1] কিয়ামতের দিন কাফেরদের ভালো কর্মসমূহেরও এই অবস্থা হবে যে তারা তার কোন প্রতিফল ও নেকী পাবে না।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানতুমি কি দেখ না যে, আল্লাহ আসমানসমূহ এবং যমীন সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে? তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদেরকে নিশ্চিহ্ন করতে পারেন এবং অস্তিত্বে আনতে পারেন নতুন সৃষ্টি । আল-বায়ান
তুমি কি দেখ না যে, আল্লাহ যথাযথ নিয়ম বিধানসহ আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, তিনি চাইলে তোমাদেরকে সরিয়ে দিবেন আর এক নতুন সৃষ্টি নিয়ে আসবেন। তাইসিরুল
তুমি কি লক্ষ্য করনা যে, আল্লাহ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী যথাবিধি সৃষ্টি করেছেন? তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদের অস্তিত্ব বিলোপ করতে পারেন এবং এক নতুন সৃষ্টি অস্তিত্বে আনতে পারেন। মুজিবুর রহমান
Have you not seen that Allah created the heavens and the earth in truth? If He wills, He can do away with you and produce a new creation. Sahih International
১৯. আপনি কি লক্ষ্য করেন না যে, আল্লাহ আসমানসমূহ ও যমীন যথাবিধি সৃষ্টি করেছেন?(১) তিনি ইচ্ছে করলে তোমাদের অস্তিত্ব বিলোপ করতে পারেন এবং এক নূতন সৃষ্টি অস্তিত্বে আনতে পারেন,
(১) এখানে আল্লাহ্ তা'আলা মানুষকে স্বশরীরে আবার পুনরায় নিয়ে আসতে তিনি যে সক্ষম সেটার পক্ষে দলীল পেশ করে বলছেন যে, মানুষ তো কোন ব্যাপার নয়। যে আল্লাহ আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন তাঁর পক্ষে মানুষকে পুনরায় সৃষ্টি করা কোন ব্যাপারই নয় কারণ, মানুষের সৃষ্টির চেয়ে আসমান ও যমীন সৃষ্টি করা বড় ব্যাপার। [ইবন কাসীর]
আল্লাহ্ তা'আলা পবিত্র কুরআনের অন্যত্রও এটাকে তুলে ধরেছেন। যেমনঃ তারা কি দেখে না যে, আল্লাহ, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং এসবের সৃষ্টিতে কোন ক্লান্তি বোধ করেননি, তিনি মৃতের জীবন দান করতেও সক্ষম? বস্তুত তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। [সূরা আল-আহকাফঃ ৩৩] “মানুষ কি দেখে না যে, আমি তাকে সৃষ্টি করেছি শুক্রবিন্দু থেকে? অথচ পরে সে হয়ে পড়ে প্রকাশ্য বিতণ্ডাকারী। এবং সে আমার সম্বন্ধে উপমা রচনা করে, অথচ সে নিজের সৃষ্টি কথা ভুলে যায়। সে বলে, কে অস্থিতে প্রাণ সঞ্চার করবে যখন তা পচে গলে যাবে? বলুন, তাতে প্রাণ সঞ্চার করবেন তিনিই যিনি তা প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি প্রত্যেকটি সৃষ্টি সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত। তিনি তোমাদের জন্য সবুজ গাছ থেকে আগুন উৎপাদন করেন এবং তোমরা তা থেকে প্রজ্বলিত কর। যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন তিনি কি তাদের অনুরূপ সৃষ্টি করতে সমর্থ নন? হ্যাঁ, নিশ্চয়ই তিনি মহাস্রষ্টা, সর্বজ্ঞ। তার ব্যাপার শুধু এই, তিনি যখন কোন কিছুর ইচ্ছে করেন, তিনি বলেন, হও, ফলে তা হয়ে যায়। অতএব পবিত্র ও মহান তিনি, যার হাতেই প্রত্যেক বিষয়ের সর্বময় কর্তৃত্ব; আর তারই কাছে তোমরা ফিরে যাবে [সূরা ইয়াসীনঃ ৭৭–৭৮]
তাফসীরে জাকারিয়া(১৯) তুমি কি লক্ষ্য কর না যে, আল্লাহ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী যথার্থই সৃষ্টি করেছেন? তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদের অস্তিত্ব বিলোপ করতে পারেন এবং এক নতুন সৃষ্টি অস্তিত্বে আনতে পারেন।
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর এটা আল্লাহর জন্য মোটেই কঠিন নয়। আল-বায়ান
এটা আল্লাহর জন্য কঠিন কিছু নয়। তাইসিরুল
আর এটা আল্লাহর জন্য আদৌ কঠিন নয়। মুজিবুর রহমান
And that is not difficult for Allah. Sahih International
২০. আর এটা আল্লাহর জন্য আদৌ কঠিন নয়।(১)
(১) অর্থাৎ তোমাদেরকে ধ্বংস করে সেখানে অন্যদের প্রতিষ্ঠিত করা তার জন্য কোন ব্যাপারই নয়। কোন বড় ব্যাপার নয় আবার কোন অসম্ভব ব্যাপার নয়। বরং এটা তার জন্য সহজ। যদি তোমরা তাঁর নির্দেশ অমান্য কর, তখন তিনি তোমাদেরকে ধ্বংস করে তোমাদের স্থলে অন্য কাউকে প্রতিস্থাপন করবেন। [ইবন কাসীর] অন্যত্র আল্লাহ বলেনঃ “হে মানুষ! তোমরা তো আল্লাহর মুখাপেক্ষী; কিন্তু আল্লাহ, তিনি অভাবমুক্ত, প্রশংসার যোগ্য। তিনি ইচ্ছে করলে তোমাদেরকে অপসৃত করতে পারেন এবং এক নূতন সৃষ্টি নিয়ে আসতে পারেন।” [সূরা ফাতিরঃ ১৫–১৭] “যদি তোমরা বিমুখ হও, তিনি অন্য জাতিকে তোমাদের স্থলবর্তী করবেন, তারা তোমাদের মত হবে না।” [সূরা মুহাম্মাদঃ ৩৮] “হে মুমিনগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ দ্বীন থেকে ফিরে গেলে নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায় আনবেন যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন এবং যারা তাকে ভালবাসবে।” |সূরা আল-মায়িদাহঃ ৫৪] “হে মানুষ। তিনি ইচ্ছে করলে তোমাদেরকে অপসারিত করতে ও অপরকে আনতে পারেন; আল্লাহ তা করতে সম্পূর্ণ সক্ষম [সূরা আন-নিসাঃ ১৩৩]
তাফসীরে জাকারিয়া(২০) আর এটা আল্লাহর জন্য আদৌ কঠিন নয়। [1]
[1] অর্থাৎ, তোমরা যদি অবাধ্যতা হতে বিরত না হও, তাহলে মহান আল্লাহ এটা করতে সক্ষম যে, তোমাদেরকে ধ্বংস করে দিয়ে তোমাদের স্থলে নতুন সৃষ্টিকুল সৃষ্টি করবেন। উক্ত বিষয়টিই মহান আল্লাহ সূরা ফাতির ১৫-১৭, সূরা মুহাম্মাদ ৩৮, সূরা মাইদা ৫৪ এবং সূরা নিসার ১৩৩নং আয়াতে বর্ণনা করেছেন।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান