بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
সূরাঃ ২১/ আল-আম্বিয়া | Al-Anbiya | ٱلْأَنْبِيَاء আয়াতঃ ১১২ মাক্কী
২১ : ৩১ وَ جَعَلۡنَا فِی الۡاَرۡضِ رَوَاسِیَ اَنۡ تَمِیۡدَ بِهِمۡ ۪ وَ جَعَلۡنَا فِیۡهَا فِجَاجًا سُبُلًا لَّعَلَّهُمۡ یَهۡتَدُوۡنَ ﴿۳۱﴾
و جعلنا فی الارض رواسی ان تمید بهم و جعلنا فیها فجاجا سبلا لعلهم یهتدون ﴿۳۱﴾
আর আমি যমীনে সৃষ্টি করেছি সুদৃঢ় পর্বত, যেন তা পর্বতসমূহ নিয়ে একদিকে হেলে না পড়ে*, আর আমি তাতে তৈরী করেছি প্রশস্ত রাস্তা, যেন তারা চলতে পারে।

-আল-বায়ান

আর পৃথিবীতে আমি স্থাপন করেছি সুদৃঢ় পর্বত যাতে পৃথিবী তাদেরকে নিয়ে নড়াচড়া না করে। আর তাতে সৃষ্টি করেছি প্রশস্ত পথ যাতে তারা পথ পেতে পারে।

-তাইসিরুল

এবং আমি পৃথিবীতে সৃষ্টি করেছি সুদৃঢ় পর্বত যাতে পৃথিবী তাদেরকে নিয়ে এদিক-ওদিক টলে না যায় এবং আমি তাতে করে দিয়েছি প্রশস্ত পথ যাতে তারা গন্তব্য স্থলে পৌঁছতে পারে।

-মুজিবুর রহমান

And We placed within the earth firmly set mountains, lest it should shift with them, and We made therein [mountain] passes [as] roads that they might be guided.

-Sahih International

* আধুনিক ভূ-তত্ত্ববিদগণ বলেন, পৃথিবীর অভ্যন্তরস্থ উত্তপ্ত গলিত পদার্থের তাপ ছড়ানোর কারণে পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশ সঙ্কুচিত হয়ে তাতে ভাঁজ সৃষ্টি হয় এবং তার উপরের অংশই হল পর্বত। পর্বতমালা পৃথিবী-পৃষ্ঠের ভারসাম্য রক্ষা করে।

৩১. এবং আমরা পৃথিবীতে সৃষ্টি করেছি সুদৃঢ় পর্বত, যাতে যমীন তাদেরকে নিয়ে এদিক-ওদিক ঢলে না যায়(১) এবং আমরা সেখানে করে দিয়েছি প্রশস্ত পথ, যাতে তারা গন্তব্যস্থলে পৌছতে পারে।

(১) ميد আরবী ভাষায় অস্থির নড়াচড়াকে বলা হয়। আয়াতের অর্থ এই যে, পৃথিবীর বুকে আল্লাহ্ তাআলা পাহাড়সমূহের বোঝা রেখে দিয়েছেন, যাতে পৃথিবীর ভারসাম্য বজায় থাকে এবং পৃথিবী অস্থির নড়াচড়া না করে। [ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর] পৃথিবী নড়াচড়া করলে পৃথিবীর বুকে বসবাসকারীদের অসুবিধা হত। পৃথিবীর ভারসাম্য বজায় রাখার ব্যাপারে পাহাড়সমূহের প্রভাব অপরিসীম।

তাফসীরে জাকারিয়া

(৩১) এবং আমি পৃথিবীতে সৃষ্টি করেছি পর্বতমালা; যাতে পৃথিবী তাদেরকে নিয়ে আন্দোলিত না হয়[1] এবং আমি তাতে[2] করে দিয়েছি প্রশস্ত পথ; যাতে তারা গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারে।

[1] অর্থাৎ যদি পৃথিবীতে এত বড় বড় পর্বত না থাকত, তাহলে পৃথিবী সব সময় নড়াচড়া করত। যার কারণে পৃথিবী মানুষ ও জীব-জন্তুর বসবাসের উপযোগী হত না। আমি পর্বতের বোঝা দিয়ে পৃথিবীকে আন্দোলিত হওয়া থেকে বাঁচিয়ে নিয়েছি।

[2] তাতে অর্থাৎ, পৃথিবীতে বা পর্বতমালায়। অর্থাৎ পৃথিবীতে প্রশস্ত পথ বা পর্বতমালার মাঝে উপত্যকা তৈরী করেছি। যাতে এক জায়গা হতে অন্যত্র যাওয়া সহজ হয়। يَهتَدُون এর অন্য এক অর্থ এও হতে পারে যে, ঐ পথ দ্বারা যাতে তারা নিজেদের জীবিকা ও জীবনযাপনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২১ : ৩২ وَ جَعَلۡنَا السَّمَآءَ سَقۡفًا مَّحۡفُوۡظًا ۚۖ وَّ هُمۡ عَنۡ اٰیٰتِهَا مُعۡرِضُوۡنَ ﴿۳۲﴾
و جعلنا السمآء سقفا محفوظا و هم عن ایتها معرضون ﴿۳۲﴾
আর আমি আসমানকে করেছি সুরক্ষিত ছাদ; কিন্তু তারা তার নিদর্শনাবলী হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

-আল-বায়ান

আর আমি আকাশকে করেছি সুরক্ষিত ছাদ, কিন্তু এ সবের নিদর্শন থেকে তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়।

-তাইসিরুল

এবং আকাশকে করেছি সুরক্ষিত ছাদ। কিন্তু তারা আকাশস্থিত নিদর্শনাবলী হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

-মুজিবুর রহমান

And We made the sky a protected ceiling, but they, from its signs, are turning away.

-Sahih International

৩২. আর আমরা আকাশকে করেছি সুরক্ষিত ছাদ; কিন্তু তারা আকাশে অবস্থিত নিদর্শনাবলী থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৩২) এবং আকাশকে করেছি সুরক্ষিত ছাদ স্বরূপ। [1] কিন্তু তারা আকাশস্থ নিদর্শনাবলী হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

[1] ‘সুরক্ষিত ছাদ’ অর্থাৎ, পৃথিবীর জন্য সুরক্ষিত ছাদ; যেমন তাঁবু বা গম্বুজের ছাদ হয়। অথবা এই অর্থে সুরক্ষিত যে, আল্লাহ তাকে পৃথিবীর উপর পতিত হওয়া থেকে রক্ষা করেছেন। নচেৎ আকাশ যদি পৃথিবীর উপর ভেঙ্গে পড়ে, তাহলে পৃথিবীর সমস্ত শৃঙ্খলা বিনষ্ট হয়ে পড়বে। অথবা তা শয়তানসমূহ হতে সুরক্ষিত, যেমন তিনি বলেছেন,{وَحَفِظْنَاهَا مِن كُلِّ شَيْطَانٍ رَّجِيمٍ}  অর্থাৎ, আমি আকাশকে প্রত্যেক বিতাড়িত শয়তান হতে সুরক্ষিত করেছি। (হিজরঃ ১৭)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২১ : ৩৩ وَ هُوَ الَّذِیۡ خَلَقَ الَّیۡلَ وَ النَّهَارَ وَ الشَّمۡسَ وَ الۡقَمَرَ ؕ كُلٌّ فِیۡ فَلَكٍ یَّسۡبَحُوۡنَ ﴿۳۳﴾
و هو الذی خلق الیل و النهار و الشمس و القمر كل فی فلك یسبحون ﴿۳۳﴾
আর তিনিই রাত ও দিন এবং সূর্য ও চাঁদ সৃষ্টি করেছেন; সবাই নিজ নিজ কক্ষপথে বিচরণ করে।

-আল-বায়ান

তিনিই সৃষ্টি করেছেন রাত ও দিন, সূর্য আর চন্দ্র, প্রত্যেকেই তার চক্রাকার পথে সাঁতার কাটছে।

-তাইসিরুল

(আল্লাহই) সৃষ্টি করেছেন রাত ও দিন এবং সূর্য ও চাঁদ; প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে বিচরণ করে।

-মুজিবুর রহমান

And it is He who created the night and the day and the sun and the moon; all [heavenly bodies] in an orbit are swimming.

-Sahih International

৩৩. আর আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন রাত ও দিন এবং সূর্য ও চাঁদ; প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে(১) বিচরণ করে।

(১) প্রত্যেক বৃত্তাকার বস্তুকে فلك বলা হয়। এ কারণেই সূতা কাটার চরকায় লাগানো গোল চামড়াকে فلكة المغزل বলা হয়। [বাগভী; ফাতহুল কাদীর] আর একই কারণে আকাশকেও فلك বলা হয়ে থাকে। এখানে সুর্য ও চন্দ্রের কক্ষপথ বোঝানো হয়েছে। “সবাই এক একটি ফালাকে (কক্ষপথে) সাঁতরে বেড়াচ্ছে”—এ থেকে দুটি কথা পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে। এক, প্রত্যেকের ফালাক বা কক্ষপথ আলাদা। দুই, ফালাক এমন কোন জিনিস নয় যেখানে এ গ্রহ-নক্ষত্রগুলো খুঁটির মতো প্রোথিত আছে এবং তারা নিজেরাই এ খুঁটি নিয়ে ঘুরছে। বরং তারা কোন প্রবাহমান অথবা আকাশ ও মহাশূন্য ধরনের কোন বস্তু, যার মধ্যে এই গ্রহ-নক্ষত্রের চলা ও গতিশীলতা সাঁতার কাটার সাথে সামঞ্জস্য রাখে।

তাফসীরে জাকারিয়া

(৩৩) আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন রাত্রি ও দিবস এবং সূর্য ও চন্দ্র; [1] প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে সন্তরণ করে। [2]

[1] অর্থাৎ রাত্রিকে আরামের জন্য ও দিবসকে জীবিকা অর্জনের জন্য সৃষ্টি করেছি, সূর্যকে দিনের ও চাঁদকে রাতের নিদর্শন বানিয়েছি। যাতে মাস ও বছর গণনা সম্ভব হয়; যা মানুষের জন্য একটি জরুরী বিষয়।

[2] যেরূপ একজন সাঁতারু পানির উপর সাঁতার কাটে, অনুরূপ চন্দ্র ও সূর্য নিজ নিজ কক্ষ পথে সন্তরণ অর্থাৎ, বিচরণ করে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২১ : ৩৪ وَ مَا جَعَلۡنَا لِبَشَرٍ مِّنۡ قَبۡلِكَ الۡخُلۡدَ ؕ اَفَا۠ئِنۡ مِّتَّ فَهُمُ الۡخٰلِدُوۡنَ ﴿۳۴﴾
و ما جعلنا لبشر من قبلك الخلد افائن مت فهم الخلدون ﴿۳۴﴾
আর তোমার পূর্বে কোন মানুষকে আমি স্থায়ী জীবন দান করিনি; সুতরাং তোমার মৃত্যু হলে তারা কি অনন্ত জীবনসম্পন্ন হয়ে থাকবে ?

-আল-বায়ান

তোমার পূর্বেও আমি কোন মানুষকে চিরস্থায়ী করিনি। তুমি যদি মারা যাও, তাহলে তারা কি চিরস্থায়ী হবে?

-তাইসিরুল

আমি তোমার পূর্বেও কোন মানুষকে চিরস্থায়ী জীবন দান করিনি; সুতরাং তোমার মৃত্যু হলে তারা কি চিরঞ্জীব হয়ে থাকবে?

-মুজিবুর রহমান

And We did not grant to any man before you eternity [on earth]; so if you die - would they be eternal?

-Sahih International

৩৪. আর আমরা আপনার আগেও কোন মানুষকে অনন্ত জীবন দান করিনি(১); কাজেই আপনার মৃত্যু হলে তারা কি চিরজীবি হয়ে থাকবে?

(১) এ আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, খাদির আলাইহিস সালাম মারা গেছেন। কারণ, তিনি একজন মানুষ। মানুষদের মধ্যে কাউকেই আল্লাহ চিরঞ্জাব করেননি। [ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমু ফাতাওয়া ৪/৩৩৭]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৩৪) আমি তোমার পূর্বে কোন মানুষকে অনন্ত জীবন দান করিনি; সুতরাং তোমার মৃত্যু হলে তারা কি চিরজীবী হয়ে থাকবে? [1]

[1] মক্কার কাফেররা নবী (সাঃ)-এর ব্যাপারে বলত যে, সে তো একদিন মারাই যাবে। এ আয়াত তারই উত্তর। আল্লাহ বললেন, মৃত্যু তো প্রত্যেক মানুষের জন্য অবধারিত। মুহাম্মাদ (সাঃ)ও এই নিয়ম-বহির্ভূত নয়। কারণ সেও একজন মানুষ। আর আমি কোন মানুষকে অমরতা দান করিনি। কিন্তু যারা এ কথা বলে তারা কি মরবে না? এ হতে মুশরিকদের মতবাদেরও খন্ডন হয়ে যায়; যারা দেবতা, আম্বিয়া ও আওলিয়াগণের চিরজীবী থাকার ধারণা পোষণ করে থাকে। আর সেই ভিত্তিতেই তারা তাঁদেরকে নিজেদের সাহায্যকারী ও বিপত্তারণ মনে করে। সুতরাং কুরআন-বিরোধী এই ভ্রষ্ট আকীদা হতে আমরা আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২১ : ৩৫ كُلُّ نَفۡسٍ ذَآئِقَۃُ الۡمَوۡتِ ؕ وَ نَبۡلُوۡكُمۡ بِالشَّرِّ وَ الۡخَیۡرِ فِتۡنَۃً ؕ وَ اِلَیۡنَا تُرۡجَعُوۡنَ ﴿۳۵﴾
كل نفس ذآئقۃ الموت و نبلوكم بالشر و الخیر فتنۃ و الینا ترجعون ﴿۳۵﴾
প্রতিটি প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে; আর ভাল ও মন্দ দ্বারা আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করে থাকি এবং আমার কাছেই তোমাদেরকে ফিরে আসতে হবে।

-আল-বায়ান

প্রত্যেক আত্মাকে মৃত্যু আস্বাদন করত হবে। আমি তোমাদেরকে ভাল ও মন্দ (উভয়টি দিয়ে এবং উভয় অবস্থায় ফেলে এর) দ্বারা পরীক্ষা করি। আমার কাছেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে আনা হবে।

-তাইসিরুল

জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে; আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভাল দ্বারা বিশেষভাবে পরীক্ষা করি এবং আমারই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।

-মুজিবুর রহমান

Every soul will taste death. And We test you with evil and with good as trial; and to Us you will be returned.

-Sahih International

৩৫. জীবমাত্ৰই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে(১); আমরা তোমাদেরকে মন্দ ও ভাল দ্বারা বিশেষভাবে পরীক্ষা করে থাকি(২) এবং আমাদেরই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।

(১) আলেমদের সর্বসম্মত মতে আত্মার দেহপিঞ্জর ত্যাগ করাই মৃত্যু। [ফাতহুল কাদীর] একটি গতিশীল, প্রাণবিশিষ্ট, সূক্ষ ও নূরানী দেহকে আত্মা বলা হয়। এই আত্মা মানুষের সমগ্র দেহে সঞ্চারিত থাকে, যেমন গোলাপজল গোলাপ ফুলের মধ্যে বিরাজমান। [ইবনুল কাইয়্যেম, আর-রূহ: ১৭৮]

(২) অর্থাৎ আমি মন্দ ও ভালো উভয়ের মাধ্যমে মানুষকে পরীক্ষা করি। প্রত্যেক স্বভাব বিরুদ্ধ বিষয় যেমন- অসুখ-বিসুখ, দুঃখ-কষ্ট ইত্যাদিকে মন্দ বলে অপরদিকে ভাল বলে প্রত্যেক পছন্দনীয় ও কাম্য বিষয় যেমন-সুস্থতা, নিরাপত্তা ইত্যাদি বোঝানো হয়েছে। দুঃখ-আনন্দ, দারিদ্র-ধনাঢ্যতা, জয়-পরাজয়, শক্তিমত্তা-দুর্বলতা, সুস্থতা-রুগ্নতা ইত্যাদি সকল অবস্থায় তোমাদেরকে পরীক্ষা করা হচ্ছে। অনুরূপভাবে হালাল, হারাম, আনুগত্য, অবাধ্যতা, হেদায়াত ও পথভ্রষ্টতা এ সবই পরীক্ষার সামগ্ৰী। [দেখুন, ইবন কাসীর]

আলেমগণ বলেন, বিপদাপদে সবর করার তুলনায় বিলাসব্যসন ও আরাম-আয়েশে হক আদায়ে দৃঢ়পদ থাকা অধিক কঠিন। তাই আব্দুর রহমান ইবন আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ “আমরা যখন বিপদে পতিত হলাম, তখন তো সবার করলাম, কিন্তু যখন সুখ ও আরাম আয়েশে লিপ্ত হলাম, তখন সবর করতে পারলাম না। অর্থাৎ এর হক আদায়ে দৃঢ়পদ থাকতে পারলাম না। [ইবনুল কাইয়্যেম, উদাতুস সাবেরীন: ৬৪]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৩৫) জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে; আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভাল দ্বারা বিশেষভাবে পরীক্ষা করে থাকি।[1] আর আমারই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। [2]

[1] কখনো দুঃখ-দুর্দশা দিয়ে, কখনো পার্থিব সুখ-শান্তি দিয়ে, কখনো সুস্বাস্থ্য ও প্রশস্ততা দিয়ে, কখনো অসুস্থতা ও সংকীর্ণতা দিয়ে, কখনো ধনবত্তা ও বিলাস-সামগ্রী দিয়ে, কখনো দরিদ্রতা ও অভাব দিয়ে পরীক্ষা করে থাকি। যাতে কে কৃতজ্ঞ ও কে অকৃতজ্ঞ, কে ধৈর্যশীল ও কে অধৈর্য তা আমি পরীক্ষা করি। কৃতজ্ঞতা ও ধৈর্য আল্লাহর সন্তুষ্টির এবং অকৃতজ্ঞতা ও ধৈর্যহীনতা আল্লাহর অসন্তুষ্টির বড় কারণ।

[2] ওখানে তোমাদের কর্মানুসারে ভাল-মন্দ প্রতিদান দেওয়া হবে। যারা সৎকর্মশীল তাদের জন্য উত্তম এবং যারা অসৎকর্মশীল তাদের জন্য মন্দ বিনিময় দেওয়া হবে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২১ : ৩৬ وَ اِذَا رَاٰكَ الَّذِیۡنَ كَفَرُوۡۤا اِنۡ یَّتَّخِذُوۡنَكَ اِلَّا هُزُوًا ؕ اَهٰذَا الَّذِیۡ یَذۡكُرُ اٰلِهَتَكُمۡ ۚ وَ هُمۡ بِذِكۡرِ الرَّحۡمٰنِ هُمۡ كٰفِرُوۡنَ ﴿۳۶﴾
و اذا راك الذین كفروا ان یتخذونك الا هزوا اهذا الذی یذكر الهتكم و هم بذكر الرحمن هم كفرون ﴿۳۶﴾
আর যারা কুফরী করে তারা যখন তোমাকে দেখে তখন তোমাকে কেবল উপহাসের পাত্র হিসেবে গ্রহণ করে। তারা বলে, ‘এ কি সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের দেবতাদের সমালোচনা করে?’ অথচ তারাই ‘রহমান’-এর আলোচনার বিরোধিতা করে।

-আল-বায়ান

কাফিররা যখন তোমাকে দেখে, তখন তারা তোমাকে একমাত্র উপহাসের পাত্র হিসেবেই গণ্য করে। (আর তারা বলে) ‘এই কি সেই লোক যে তোমাদের দেবতাগুলোর ব্যাপারে কথা বলে? অথচ এই লোকগুলোই ‘রহমান’ (শব্দটির) উল্লেখকে অগ্রাহ্য করে।

-তাইসিরুল

কাফিরেরা যখন তোমাকে দেখে তখন তারা তোমাকে শুধু বিদ্রুপের পাত্র রূপেই গ্রহণ করে। তারা বলেঃ এই কি সে যে তোমাদের দেবতাগুলির সমালোচনা করে? অথচ তারাইতো ‘রাহমান’ এর উল্লেখের বিরোধিতা করে।

-মুজিবুর রহমান

And when those who disbelieve see you, [O Muhammad], they take you not except in ridicule, [saying], "Is this the one who insults your gods?" And they are, at the mention of the Most Merciful, disbelievers.

-Sahih International

* রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাফিরদের দেবতাদের অস্বীকার করতেন বলে তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সমালোচনা করত। আবার তাঁরাই একমাত্র ইলাহ আল্লাহর গুণবাচক নাম ‘রহমান’ শব্দটি শুনতেই চাইতো না। এটি চূড়ান্ত পর্যায়ের অজ্ঞতা ও স্ববিরোধিতা। আল-কুরতুবী।

৩৬. আর যারা কুফরি করে, যখন তারা আপনাকে দেখে, তখন তারা আপনাকে শুধু বিদ্রুপের পাত্ররূপেই গ্রহণ করে। তারা বলে, এ কি সে, যে তোমাদের দেব-দেবীগুলোর সমালোচনা করে? অথচ তারাই তো রহমান তথা দয়াময়ের স্মরণে কুফরী করে।(১)

(১) অর্থাৎ মূর্তি ও বানোয়াট ইলাহদের বিরোধিতা তাদের কাছে এত বেশী অগ্ৰীতিকর যে, এর প্রতিশোধ নেবার জন্য আপনার প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রুপ ও অবমাননা করে, কিন্তু তারা যে আল্লাহ বিমূখ এবং আল্লাহর নামোল্লেখে ক্ৰোধে অগ্নিশৰ্মা হয়, নিজেদের এ অবস্থার জন্য তাদের লজ্জাও হয় না। যেমন অন্য আয়াতে এসেছে, “আর তারা যখন আপনাকে দেখে, তখন তারা আপনাকে শুধু ঠাট্টা-বিদ্রুপের পাত্ররূপে গণ্য করে বলে, এ-ই কি সে, যাকে আল্লাহ রাসূল করে পাঠিয়েছেন? সে তো আমাদেরকে আমাদের উপাস্যগণ হতে দূরে সরিয়েই দিত, যদি না আমরা তাদের আনুগত্যের উপর অবিচল থাকতাম। আর যখন তারা শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে, তখন জানতে পারবে কে অধিক পথভ্রষ্ট।” [সূরা আল-ফুরকান: ৪১–৪২]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৩৬) অবিশ্বাসীরা যখন তোমাকে দেখে, তখন তারা তোমাকে শুধু বিদ্রূপের পাত্ররূপেই গ্রহণ করে; তারা বলে, ‘এই কি সেই, যে তোমাদের উপাস্যগুলির সমালোচনা করে?’ অথচ তারাই পরম করুণাময়ের আলোচনার বিরোধিতা করে থাকে। [1]

[1] এর পরেও তারা রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-কে নিয়ে বিদ্রূপ-ঠাট্টা করে? যেমন অন্যত্র বলেছেন, {وَإِذَا رَأَوْكَ إِن يَتَّخِذُونَكَ إِلَّا هُزُوًا أَهَذَا الَّذِي بَعَثَ اللهُ رَسُولًا}  অর্থাৎ, ওরা যখন তোমাকে দেখে তখন ওরা তোমাকে কেবল উপহাসের পাত্ররূপে গণ্য করে এবং বলে, ‘এই কি সেই; যাকে আল্লাহ রসূল করে পাঠিয়েছেন? (ফুরকানঃ ৪১)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২১ : ৩৭ خُلِقَ الۡاِنۡسَانُ مِنۡ عَجَلٍ ؕ سَاُورِیۡكُمۡ اٰیٰتِیۡ فَلَا تَسۡتَعۡجِلُوۡنِ ﴿۳۷﴾
خلق الانسان من عجل ساوریكم ایتی فلا تستعجلون ﴿۳۷﴾
মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে তাড়াহুড়ার প্রবণতা দিয়ে। অচিরেই আমি তোমাদেরকে দেখাব আমার নিদর্শনাবলী। সুতরাং তোমরা তাড়াহুড়া করো না।

-আল-বায়ান

মানুষকে তাড়াহুড়াকারী করে সৃষ্টি করা হয়েছে। শীঘ্রই আমি তোমাদেরকে আমার নিদর্শনগুলো দেখাব (যে সব অলৌকিক ব্যাপার বদর ও অন্যান্য যুদ্ধে কাফিরদেরকে দেখানো হয়েছিল), কাজেই তোমরা আমাকে জলদি করতে বল না।

-তাইসিরুল

মানুষ সৃষ্টিগতভাবে ত্বরা প্রবণ, শীঘ্রই আমি তোমাদেরকে আমার নিদর্শনাবলী দেখাব; সুতরাং তোমরা আমাকে ত্বরা করতে বলনা।

-মুজিবুর রহমান

Man was created of haste. I will show you My signs, so do not impatiently urge Me.

-Sahih International

৩৭. মানুষ সৃষ্টিগতভাবে ত্বরাপ্রবণ(১), শীঘ্রই আমি তোমাদেরকে আমার নিদর্শনাবলী দেখাব; কাজেই তোমরা তাড়াহুড়া কামনা করো না।

(১) ত্বরাপ্রবণতার স্বরূপ হচ্ছে, কোন কাজ সময়ের পূর্বেই করা। এটা স্বতন্ত্র দৃষ্টিতে নিন্দনীয়। কুরআনের অন্যত্রও একে মানুষের দুর্বলতারূপে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছেঃ “মানুষ অত্যন্ত ত্বরাপ্রবন” [সূরা আল-ইসরাঃ ১১] আলোচ্য আয়াতের উদ্দেশ্য এই যে, মানুষের মজ্জায় যেসব দুর্বলতা নিহিত রয়েছে, তন্মধ্যে এক দুর্বলতা হচ্ছে ত্বরা-প্রবণতা। স্বভাবগত ও মজ্জাগত বিষয়কে আরবরা এরূপ ভঙ্গিতেই ব্যক্তি করে। উদাহরণতঃ কারও স্বভাবে ক্ৰোধ প্রবল হলে আরবরা বলেঃ লোকটি ক্রোধ দ্বারা সৃজিত হয়েছে। ঠিক তেমনি এখানে অর্থ করা হবে যে, ত্বরাপ্রবণতা মানুষের প্রকৃতিগত বিষয়। [দেখুন, কুরতুবী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৩৭) মানুষ সৃষ্টিগতভাবে ত্বরা-প্রবণ, শীঘ্রই আমি তোমাদেরকে আমার নিদর্শনাবলী দেখাব; সুতরাং তোমরা আমাকে তাড়াতাড়ি করতে বলো না। [1]

[1] এ কথা কাফেরদের আযাব চাওয়ার উত্তরে বলা হয়েছে। যেহেতু মানুষের প্রকৃতিই হল জলদি ও তাড়াহুড়ো করা, সেহেতু তারা নবীর সঙ্গেও জলদি করতে চায় যে, তোমার আল্লাহকে বলে আমাদের উপর অতি শীঘ্র আযাব অবতীর্ণ করা হোক। আল্লাহ বললেন, জলদি করো না, আমি অবশ্যই তোমাদেরকে নিজ নির্দশনাবলী দেখাব। এখানে নির্দশন বলতে আযাবও হতে পারে অথবা রসূল (সাঃ)-এর সত্যতার দলীল-প্রমাণাদিও হতে পারে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২১ : ৩৮ وَ یَقُوۡلُوۡنَ مَتٰی هٰذَا الۡوَعۡدُ اِنۡ كُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ ﴿۳۸﴾
و یقولون متی هذا الوعد ان كنتم صدقین ﴿۳۸﴾
আর তারা বলে, ‘তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে বল, এ ওয়াদা কখন পূর্ণ হবে?’

-আল-বায়ান

আর তারা বলে ‘তোমরা যদি সত্যবাদী হও তাহলে (বল) প্রতিশ্রুতি কখন বাস্তবে পরিণত হবে?’

-তাইসিরুল

আর তারা বলেঃ তোমরা যদি সত্যবাদী হও তাহলে বল, এই প্রতিশ্রুতি কখন পূর্ণ হবে?

-মুজিবুর রহমান

And they say, "When is this promise, if you should be truthful?"

-Sahih International

৩৮. আর তারা বলে, তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে বল এ প্রতিশ্রুতি কখন পূর্ণ হবে?

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৩৮) আর তারা বলে, তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে বল, এই প্রতিশ্রুতি কখন পূর্ণ হবে?

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২১ : ৩৯ لَوۡ یَعۡلَمُ الَّذِیۡنَ كَفَرُوۡا حِیۡنَ لَا یَكُفُّوۡنَ عَنۡ وُّجُوۡهِهِمُ النَّارَ وَ لَا عَنۡ ظُهُوۡرِهِمۡ وَ لَا هُمۡ یُنۡصَرُوۡنَ ﴿۳۹﴾
لو یعلم الذین كفروا حین لا یكفون عن وجوههم النار و لا عن ظهورهم و لا هم ینصرون ﴿۳۹﴾
হায়, কাফিররা যদি সে সময়ের কথা জানত, যখন তারা তাদের সামনে ও পেছন থেকে আগুন ফিরাতে পারবে না। আর তাদেরকে সাহায্যও করা হবে না;

-আল-বায়ান

অবিশ্বাসীরা যদি (সে সময়ের কথা) জানত যখন তারা তাদের মুখ হতে অগ্নি প্রতিরোধ করতে পারবে না, আর তাদের পিঠ থেকেও না, আর তারা সাহায্যপ্রাপ্তও হবে না।

-তাইসিরুল

হায়! যদি কাফিরেরা সেই সময়ের কথা জানতো যখন তারা তাদের সম্মুখ ও পশ্চাত হতে আগুন প্রতিরোধ করতে পারবেনা এবং তাদেরকে সাহায্য করাও হবেনা।

-মুজিবুর রহমান

If those who disbelieved but knew the time when they will not avert the Fire from their faces or from their backs and they will not be aided...

-Sahih International

৩৯. যদি কাফেররা সে সময়ের কথা জানত, যখন তারা তাদের চেহারা ও পিঠ থেকে আগুন প্রতিরোধ করতে পারবে না এবং তাদেরকে সাহায্য করাও হবে না। (তাহলে তারা সে শাস্তিকে তাড়াতাড়ি চাইত না।)

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৩৯) যদি অবিশ্বাসীরা সেই সময়ের কথা জানত, যখন তারা তাদের সম্মুখ ও পশ্চাৎ হতে অগ্নি প্রতিরোধ করতে পারবে না এবং তাদেরকে সাহায্য করাও হবে না (তাহলে তারা এ কথা বলত না)। [1]

[1] এখানে এর উত্তর ঊহ্য আছে। অর্থাৎ যদি এরা জানত, তাহলে আযাবের জন্য তাড়াতাড়ি করত না অথবা তারা নিশ্চিতরূপে জানত যে, কিয়ামত আসবে অথবা কুফরীর উপর অটল থাকত না বরং ঈমান আনয়ন করত।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২১ : ৪০ بَلۡ تَاۡتِیۡهِمۡ بَغۡتَۃً فَتَبۡهَتُهُمۡ فَلَا یَسۡتَطِیۡعُوۡنَ رَدَّهَا وَ لَا هُمۡ یُنۡظَرُوۡنَ ﴿۴۰﴾
بل تاتیهم بغتۃ فتبهتهم فلا یستطیعون ردها و لا هم ینظرون ﴿۴۰﴾
বরং অকস্মাৎ তাদের উপর তা এসে পড়বে। অতঃপর তাদেরকে হতবাক করে দেবে। ফলে তারা তা ফিরাতে সক্ষম হবে না এবং তাদেরকে অবকাশও দেয়া হবে না।

-আল-বায়ান

বরং তা তাদের উপর হঠাৎ এসে যাবে আর তা তাদেরকে হতবুদ্ধি করে দেবে। অতঃপর তারা তা রোধ করতে পারবে না, আর তাদেরকে অবকাশও দেয়া হবে না।

-তাইসিরুল

বস্তুতঃ ওটা তাদের উপর আসবে অতর্কিতে এবং তাদেরকে হতভম্ব করে দিবে; ফলে তারা ওটা রোধ করতে পারবেনা এবং তাদেরকে অবকাশ দেয়া হবেনা।

-মুজিবুর রহমান

Rather, it will come to them unexpectedly and bewilder them, and they will not be able to repel it, nor will they be reprieved.

-Sahih International

৪০. বরং তা তাদের উপর আসবে অতর্কিতভাবে এবং তাদেরকে হতভম্ব করে দেবে। ফলে তারা তা রোধ করতে পারবে না এবং তাদেরকে অবকাশও দেয়া হবে না।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৪০) বরং হঠাৎ করেই ওটা তাদের উপর আসবে এবং তাদেরকে হতভম্ব করে দেবে; [1] ফলে তারা ওটা রোধ করতে পারবে না এবং তাদেরকে অবকাশও দেওয়া হবে না। [2]

[1] অর্থাৎ, তারা কিছুই বুঝতে পারবে না যে, তারা কি করবে। (তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় বা হতবুদ্ধি হয়ে পড়বে।)

[2] অর্থাৎ, তাদেরকে তওবা বা ওজর-অজুহাত পেশ করার অবসর দেওয়া হবে না।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
দেখানো হচ্ছেঃ ৩১ থেকে ৪০ পর্যন্ত, সর্বমোট ১১২ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে পাতা নাম্বারঃ « আগের পাতা 1 2 3 4 5 6 · · · 9 10 11 12 পরের পাতা »