সূরাঃ ১৯/ মারইয়াম | Maryam | مَرْيَم আয়াতঃ ৯৮ মাক্কী
তাফসীরে জাকারিয়া

সূরা সম্পর্কে আলোচনাঃ

আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেনঃ বনী ইসরাইল, আল-কাহফ, মারইয়াম, ত্বা-হা এবং আম্বিয়া এগুলো আমার সবচেয়ে প্রাচীন সম্পদ বা সর্বপ্রথম পুঁজি। [বুখারীঃ ৪৭৩৯] তাই এ সূরাসমূহের গুরুত্বই আলাদা। তন্মধ্যে সূরা মারইয়ামের গুরুত্ব আরো বেশী এদিক দিয়েও যে, এ সূরায় ঈসা আলাইহিস সালাম ও তার মা সম্পর্কে স্পষ্ট বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যা অনুধাবন করলে নাসারাদের ঈমান আনা সহজ হবে। উম্মে সালামাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেনঃ হাবশার রাজা নাজাসী জাফর ইবন আবি তালিবকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তোমার কাছে তিনি (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর কাছ থেকে যা নিয়ে এসেছেন তার কিছু কি আছে? উম্মে সালামাহ বলেন, তখন জাফর ইবন আবি তালিব বললেনঃ হ্যাঁ। নাজাসী বললেনঃ আমাকে তা পড়ে শোনাও। জাফর ইবন আবি তালিব তখন কাফ-হা-ইয়া-আইন-সাদ থেকে শুরু করে সূরার প্রথম অংশ শোনালেন। উম্মে সালামাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেনঃ আল্লাহর শপথ করে বলছি, এটা শোনার পর নাজাসী এমনভাবে কাঁদতে থাকল যে, তার চোখের পানিতে দাড়ি পর্যন্ত ভিজে গেল। তার দরবারের আলেমরাও কেঁদে ফেলল। তারা তাদের ধর্মীয় কিতাবসমূহ বন্ধ করে নিল। তারপর নাজাসী বললঃ “অবশ্যই এটা এবং যা মূসা নিয়ে এসেছে সবই একই তাক থেকে বের হয়েছে।’ [মুসনাদে আহমাদ: ৫/৩৬৬–৩৬৮]

আহসানুল বায়ান

সূরা মারয়্যাম [1]

(মক্কায় অবতীর্ণ)
[1] হাবশার হিজরতের ঘটনায় বলা হয়েছে যে, হাবশার বাদশাহ নাজাশী ও তাঁর পারিষদবর্গের সামনে যখন জা’ফর বিন আবু তালিব (রাঃ) সূরা মারয়্যামের প্রাথমিক কিছু আয়াত পাঠ করে শুনালেন, তখন তাঁদের চক্ষুর অশ্রুতে দাড়ি পর্যন্ত ভিজে গিয়েছিল এবং নাজাশী বলেছিলেন, এই কুরআন ও ঈসা (আঃ) যা আনয়ন করেছিলেন, তা একই মশালের আলো। (ফাতহুল কাদীর)

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
১৯ : ৪১ وَ اذۡكُرۡ فِی الۡكِتٰبِ اِبۡرٰهِیۡمَ ۬ؕ اِنَّهٗ كَانَ صِدِّیۡقًا نَّبِیًّا ﴿۴۱﴾

আর স্মরণ কর এই কিতাবে ইবরাহীমকে। নিশ্চয় সে ছিল পরম সত্যবাদী, নবী। আল-বায়ান

এ কিতাবে উল্লেখিত ইবরাহীমের কথা স্মরণ কর, সে ছিল একজন সত্যনিষ্ঠ মানুষ, একজন নবী। তাইসিরুল

বর্ণনা কর এই কিতাবে উল্লিখিত ইবরাহীমের কথা; সে ছিল সত্যবাদী ও নাবী। মুজিবুর রহমান

And mention in the Book [the story of] Abraham. Indeed, he was a man of truth and a prophet. Sahih International

৪১. আর স্মরণ করুন। এ কিতাবে ইবরাহীমকে(১); তিনি তো ছিলেন এক সত্যনিষ্ঠ(২), নবী।

(১) এখান থেকে মক্কাবাসীদেরকে সম্বোধন করে কথা বলা হচ্ছে। তারা তাদেরকে যুবক পুত্র, ভাই ও অন্যান্য আত্মীয় স্বজনদেরকে ঠিক তেমনিভাবে আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের অপরাধে গৃহত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল যেমন ইবরাহীমকে তার বাপ-ভাইয়েরা দেশ থেকে বের করে দিয়েছিল। কুরাইশ বংশের লোকেরা ইবরাহীমকে নিজেদের নেতা বলে মানতো এবং তাঁর আওলাদ হবার কারণে সারা আরবে গর্ব করে বেড়াতো, একারণে অন্য নবীদের কথা বাদ দিয়ে বিশেষ করে ইবরাহীমের কথা বলার জন্য এখানে নির্বাচিত করা হয়েছে। [দেখুন, ইবন কাসীর]

(২) صديق “সিদ্দীক” শব্দটি কুরআনের একটি পারিভাষিক শব্দ। এর অর্থ সত্যবাদী বা সত্যনিষ্ঠ। [ফাতহুল কাদীর] শব্দটির সংজ্ঞা সম্পর্কে আলেমদের উক্তি বিভিন্নরূপ। কেউ বলেনঃ যে ব্যক্তি সারা জীবনে কখনও মিথ্যা কথা বলেননি, তিনি সিদ্দীক। কেউ বলেনঃ যে ব্যক্তি বিশ্বাস এবং কথা ও কর্মে সত্যবাদী, অর্থাৎ অন্তরে যেরূপ বিশ্বাস পোষণ করে, মুখে ঠিক তদ্রুপ প্রকাশ করে এবং তার প্রত্যেক কর্ম ও উঠা বসা এই বিশ্বাসেরই প্রতীক হয়, সে সিদ্দীক। [কুরতুবী, সূরা আন-নিসা: ৬৯ নং আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রঃ]

সিদ্দীকের বিভিন্ন স্তর রয়েছে। নবী-রাসূলগণ সবাই সিদ্দীক। কিন্তু সমস্ত সিদ্দীকই নবী ও রাসূল হবেন এমনটি জরুরী নয়, বরং নবী নয়- এমন ব্যক্তি যদি নবী ও রাসূলের অনুসরণ করে সিদ্দীকের স্তর অর্জন করতে পারেন, তবে তিনিও সিদ্দীক বলে অভিহিত হবেন। মারইয়ামকে আল্লাহ্ তা'আলা কুরআনে স্বয়ং সিদ্দীকাহ নামে অভিহিত করেছেন। তিনি নবী নন। কোন নারী নবী হতে পারেন না।

তাফসীরে জাকারিয়া

(৪১) বর্ণনা কর এই কিতাবে (উল্লিখিত) ইব্রাহীমের কথা; নিশ্চয় সে ছিল একজন পরম সত্যবাদী নবী। [1]

[1] صِدِّيق শব্দটি صِدق ধাতুর অতিশয়োক্তিমূলক রূপ। সিদ্দীকের অর্থঃ অত্যন্ত বা পরম সত্যবাদী। অর্থাৎ, যাঁর কথায় ও কাজে অত্যন্ত মিল থাকে এবং সত্যবাদিতাই তাঁর প্রতীক হয়। সিদ্দীক বা চরম সত্যবাদিতার এই মর্যাদা নবুঅতের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের। প্রত্যেক নবী ও রসূল নিজ নিজ যুগের সবচেয়ে বেশী সত্যবাদী ও সত্যের প্রতীক ছিলেন। সেই জন্য তিনি নবী হওয়ার সাথে সাথে সিদ্দীকও। তবে প্রত্যেক সিদ্দীক নবী নন। কুরআন কারীমে মারয়্যামকে সিদ্দীকাহ বলা হয়েছে, যার অর্থ হল, তিনি আল্লাহর ভয়, পবিত্রতা (সতীত্ব) ও সত্যবাদিতার উচ্চাসনে আসীন ছিলেন; যদিও তিনি নবী ছিলেন না। মুসলিমদের মধ্যেও সিদ্দীক আছে। তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলেন আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ); যাঁকে নবীদের পর উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি বলে মান্য করা হয়েছে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ৪২ اِذۡ قَالَ لِاَبِیۡهِ یٰۤاَبَتِ لِمَ تَعۡبُدُ مَا لَا یَسۡمَعُ وَ لَا یُبۡصِرُ وَ لَا یُغۡنِیۡ عَنۡكَ شَیۡئًا ﴿۴۲﴾

যখন সে তার পিতাকে বলল, ‘হে আমার পিতা, তুমি কেন তার ইবাদাত কর যে না শুনতে পায়, না দেখতে পায় এবং না তোমার কোন উপকারে আসতে পারে’? আল-বায়ান

যখন সে তার পিতাকে বলেছিল, ‘হে আমার পিতা! আপনি কেন এমন জিনিসের ‘ইবাদাত করেন যা শুনে না, দেখে না, আর আপনার কোন কাজেই আসে না? তাইসিরুল

যখন সে তার পিতাকে বললঃ হে আমার পিতা! যে শোনেনা, দেখেনা এবং তোমার কোন কাজে আসেনা তুমি তার ইবাদাত কর কেন? মুজিবুর রহমান

[Mention] when he said to his father, "O my father, why do you worship that which does not hear and does not see and will not benefit you at all? Sahih International

৪২. যখন তিনি তার পিতাকে বললেন, হে আমার পিতা! আপনি তার ইবাদাত করেন কেন যে শুনে না, দেখে না এবং আপনার কোন কাজেই আসে না?

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৪২) যখন সে তার পিতাকে বলল, ‘হে আমার পিতা! যে শোনে না, দেখে না এবং তোমার কোন কাজে আসে না তুমি তার উপাসনা কর কেন?

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ৪৩ یٰۤاَبَتِ اِنِّیۡ قَدۡ جَآءَنِیۡ مِنَ الۡعِلۡمِ مَا لَمۡ یَاۡتِكَ فَاتَّبِعۡنِیۡۤ اَهۡدِكَ صِرَاطًا سَوِیًّا ﴿۴۳﴾

‘হে আমার পিতা! আমার কাছে এমন জ্ঞান এসেছে যা তোমার কাছে আসেনি, সুতরাং আমার অনুসরণ কর, তাহলে আমি তোমাকে সঠিক পথ দেখাব’। আল-বায়ান

হে আমার পিতা! আমার কাছে এমন জ্ঞান এসেছে যা আপনার কাছে আসেনি, কাজেই আমার অনুসরণ করুন, আমি আপনাকে সরল সঠিক পথ দেখাব। তাইসিরুল

হে আমার পিতা! আমার নিকটতো এসেছে জ্ঞান যা তোমার নিকট আসেনি। সুতরাং আমার অনুসরণ কর, আমি তোমায় সঠিক পথ দেখাব। মুজিবুর রহমান

O my father, indeed there has come to me of knowledge that which has not come to you, so follow me; I will guide you to an even path. Sahih International

৪৩. হে আমার পিতা! আমার কাছে তো এসেছে জ্ঞান যা আপনার কাছে আসেনি; কাজেই আমার অনুসরণ করুন, আমি আপনাকে সঠিক পথ দেখাব৷

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৪৩) হে আমার পিতা! আমার নিকট সেই জ্ঞান এসেছে, যা তোমার নিকট আসেনি।[1] সুতরাং তুমি আমার অনুসরণ কর, আমি তোমাকে সঠিক পথ দেখাব। [2]

[1] যার দ্বারা আমি আল্লাহর পরিচয় ও প্রত্যয় প্রাপ্ত হয়েছি। মরণের পরপারের জীবন এবং আল্লাহ ছাড়া যারা অন্যের ইবাদত করে, তাদের স্থায়ী শাস্তি সম্বন্ধেও অবগত হয়েছি।

[2] যে পথ তোমাকে পরিত্রাণ ও চিরসুখের জীবন দান করবে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ৪৪ یٰۤاَبَتِ لَا تَعۡبُدِ الشَّیۡطٰنَ ؕ اِنَّ الشَّیۡطٰنَ كَانَ لِلرَّحۡمٰنِ عَصِیًّا ﴿۴۴﴾

‘হে আমার পিতা, তুমি শয়তানের ইবাদাত করো না। নিশ্চয় শয়তান হল পরম করুণাময়ের অবাধ্য’। আল-বায়ান

হে আমার পিতা! আপনি শয়তানের ‘ইবাদাত করবেন না, শয়তান হচ্ছে দয়াময়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী। তাইসিরুল

হে আমার পিতা! শাইতানের ইবাদাত করনা; শাইতান আল্লাহর অবাধ্য। মুজিবুর রহমান

O my father, do not worship Satan. Indeed Satan has ever been, to the Most Merciful, disobedient. Sahih International

৪৪. হে আমার পিতা! শয়তানের ইবাদত করবেন না।(১) শয়তান তো দয়াময়ের অবাধ্য।

(১) বলা হচ্ছে, “শয়তানের ইবাদাত করবেন না” যদিও ইবরাহীমের পিতা এবং তার জাতির অন্যান্য লোকেরা মূর্তি পূজা করতো কিন্তু যেহেতু তারা শয়তানের আনুগত্য করছিল তাই ইবরাহীম তাদের এ শয়তানের আনুগত্যকেও শয়তানের ইবাদাত গণ্য করেন। আয়াতের অর্থ দাঁড়ায়, আপনি এ মূর্তিগুলোর ইবাদত করার মাধ্যমে তার আনুগত্য করবেন না। কেননা, সেই তো এগুলোর ইবাদতের প্রতি মানুষদেরকে আহবান জানায় এবং এতে সে সন্তুষ্ট। [ইবন কাসীর] বস্তুত: শয়তান কোন কালেও মানুষের মাবুদ (প্রচলিত অর্থে) ছিল না। বরং তার নামে প্রতি যুগে মানুষ অভিশাপ বর্ষণ করেছে। তবে বর্তমানে মিশর, ইরাক, সিরিয়া, লেবাননাসহ বিভিন্ন আরব ও ইউরোপীয় রাষ্ট্রে শয়তানের ইবাদতকারী ‘ইয়াযীদিয়্যাহ’ ফের্কা নামে একটি দলের সন্ধান পাওয়া যায়, যারা শয়তানের কাল্পনিক প্রতিকৃতি স্থাপন করে তার ইবাদাত করে।

তাফসীরে জাকারিয়া

(৪৪) হে আমার পিতা! শয়তানের উপাসনা করো না; নিশ্চয় শয়তান পরম দয়াময়ের অবাধ্য। [1]

[1] অর্থাৎ শয়তানের কুমন্ত্রণা ও তার প্রলোভনে পড়ে তুমি এমন সব দেবদেবীর পূজা করছ, যারা না শুনতে ও দেখতে পায়, আর না লাভ-নোকসানের ক্ষমতা রাখে। বাস্তবে এটা তো সেই শয়তানেরই পূজা; যে আল্লাহর অবাধ্য এবং অন্যদেরকে তাঁর অবাধ্য করে নিজের মত করতে চেষ্টা করে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ৪৫ یٰۤاَبَتِ اِنِّیۡۤ اَخَافُ اَنۡ یَّمَسَّكَ عَذَابٌ مِّنَ الرَّحۡمٰنِ فَتَكُوۡنَ لِلشَّیۡطٰنِ وَلِیًّا ﴿۴۵﴾

‘হে আমার পিতা, আমি আশংকা করছি যে, পরম করুণাময়ের (পক্ষ থেকে) তোমাকে আযাব স্পর্শ করবে, ফলে তুমি শয়তানের সঙ্গী হয়ে যাবে।’ আল-বায়ান

হে আমার পিতা! আমার ভয় হয় যে, দয়াময়ের ‘আযাব আপনাকে ধরে বসবে, তখন আপনি শয়তানের বন্ধু হয়ে যাবেন।’ তাইসিরুল

হে আমার পিতা! আমি আশংকা করি, তোমাকে আল্লাহর শাস্তি স্পর্শ করবে এবং তুমি শাইতানের সাথী হয়ে পড়বে। মুজিবুর রহমান

O my father, indeed I fear that there will touch you a punishment from the Most Merciful so you would be to Satan a companion [in Hellfire]." Sahih International

৪৫. হে আমার পিতা! নিশ্চয় আমি আশংকা করছি যে, আপনাকে দয়াময়ের শাস্তি স্পর্শ করবে, তখন আপনি হয়ে পড়বেন শয়তানের বন্ধু।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৪৫) হে আমার পিতা! নিশ্চয় আমি আশংকা করি, তোমাকে পরম দয়াময়ের শাস্তি স্পর্শ করবে এবং তুমি শয়তানের বন্ধু হয়ে পড়বে।’[1]

[1] অর্থাৎ, আমার ভয় হয় যে, যদি তুমি নিজ কুফরী ও শির্কে অটল থাকো, আর এই অবস্থায় যদি তোমার মৃত্যু এসে যায়, তাহলে আল্লাহর শাস্তি হতে তোমাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। অথবা পৃথিবীতেই তোমার উপর আল্লাহর আযাব এসে পতিত হবে এবং শয়তানের সঙ্গী হয়ে চিরদিনের মত আল্লাহর রহমত হতে বিতাড়িত হয়ে যাবে। ইবরাহীম (আঃ) নিজ পিতার সম্মান-সম্ভ্রম সম্পূর্ণ খেয়াল রেখে অত্যদিক নম্রতা ও শ্রদ্ধার সাথে তাওহীদের (এক আল্লাহর ইবাদতের) নসীহত শোনালেন। কিন্তু তাওহীদের এই সবক (পাঠ) যতই নরম ভাষা ও মধুর ভঙ্গিমায় বলা হোক না কেন, মুশরিকদের কাছে তা অসহনীয়ই হবে। অতএব মূর্তিপূজক পিতা এই নম্রতা ও ভালবাসা-মাখা সম্বোধনের জবাবে অত্যন্ত কটু ও কঠোর বাক্য দ্বারা একেশ্বরবাদী পুত্রকে বলল, ‘যদি তুমি আমার দেবদেবী থেকে বিমুখ হওয়া হতে ফিরে না এসো, তাহলে আমি তোমাকে পাথরের আঘাতে শেষ করে ফেলব।’

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ৪৬ قَالَ اَرَاغِبٌ اَنۡتَ عَنۡ اٰلِهَتِیۡ یٰۤـاِبۡرٰهِیۡمُ ۚ لَئِنۡ لَّمۡ تَنۡتَهِ لَاَرۡجُمَنَّكَ وَ اهۡجُرۡنِیۡ مَلِیًّا ﴿۴۶﴾

সে বলল, ‘হে ইবরাহীম, তুমি কি আমার উপাস্যদের থেকে বিমুখ? যদি তুমি বিরত না হও, তবে অবশ্যই আমি তোমাকে পাথর মেরে হত্যা করব। আর তুমি চিরতরে আমাকে ছেড়ে যাও’।* আল-বায়ান

পিতা বলল, ‘হে ইবরাহীম! তুমি কি আমার দেবদেবীগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ? যদি তুমি বিরত না হও তবে আমি অবশ্যই তোমাকে পাথরের আঘাতে মেরে ফেলব। তুমি চিরতরে আমার কাছ থেকে দূর হয়ে যাও।’ তাইসিরুল

পিতা বললঃ হে ইবরাহীম! তুমি কি আমার দেব-দেবী হতে বিমুখ হচ্ছ? যদি নিবৃত্ত না হও তাহলে আমি প্রস্তরাঘাতে তোমার প্রাণ নাশ করবই; তুমি চিরদিনের জন্য আমার নিকট হতে দূর হয়ে যাও। মুজিবুর রহমান

[His father] said, "Have you no desire for my gods, O Abraham? If you do not desist, I will surely stone you, so avoid me a prolonged time." Sahih International

* ইবনে আববাসের মতে এ আয়াতের অর্থ হল তুমি আমার কাছ থেকে নিরাপদে সরে যাও। কেউ কেউ এ আয়াতের অর্থে বলেছেন, ‘তুমি আমার সাথে দীর্ঘ সময়ের জন্য কথা বলবে না’। (আত্-তাফসীর আল-মুয়াস্সার)

৪৬. পিতা বলল, হে ইবরাহীম! তুমি কি আমার উপাস্যদের থেকে বিমুখ? যদি তুমি বিরত না হও তবে অবশ্যই আমি পাথরের আঘাতে তোমার প্রাণ নাশ করব; আর তুমি চিরতরে আমাকে ত্যাগ করে চলে যাও।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৪৬) পিতা বলল, ‘হে ইব্রাহীম! তুমি কি আমার দেব-দেবী হতে বিমুখ হচ্ছ? যদি তুমি বিরত না হও, তাহলে অবশ্যই আমি প্রস্তরাঘাতে তোমার প্রাণ নাশ করব; তুমি দীর্ঘকালের জন্য আমার নিকট হতে দূর হয়ে যাও।’ [1]

[1] مَلِي অর্থঃ দীর্ঘ সময় ও কাল। এর দ্বিতীয় অর্থ সুস্থ ও অক্ষত করা হয়েছে। অর্থাৎ আমাকে নিজের অবস্থায় ছেড়ে দাও, যেন আমি তোমার হাত-পা ভেঙ্গে না ফেলি।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ৪৭ قَالَ سَلٰمٌ عَلَیۡكَ ۚ سَاَسۡتَغۡفِرُ لَكَ رَبِّیۡ ؕ اِنَّهٗ كَانَ بِیۡ حَفِیًّا ﴿۴۷﴾

ইবরাহীম বলল, ‘তোমার প্রতি সালাম। আমি আমার রবের কাছে তোমার জন্য ক্ষমা চাইব। নিশ্চয় তিনি আমার প্রতি বড়ই অনুগ্রহশীল’। আল-বায়ান

ইবরাহীম বলল, ‘আপনার প্রতি সালাম, আমি আমার প্রতিপালকের নিকট আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব, তিনি আমার প্রতি বড়ই মেহেরবান। তাইসিরুল

ইবরাহীম বললঃ তোমার নিকট হতে বিদায়; আমি আমার রবের নিকট তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব, তিনি আমার প্রতি অতিশয় অনুগ্রহশীল। মুজিবুর রহমান

[Abraham] said, "Peace will be upon you. I will ask forgiveness for you of my Lord. Indeed, He is ever gracious to me. Sahih International

৪৭. ইবরাহীম বললেন, আপনার প্রতি সালাম।(১) আমি আমার রব-এর কাছে আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব(২), নিশ্চয় তিনি আমার প্রতি খুবই অনুগ্রহশীল।

(১) ইবরাহীম আলাইহিস সালাম أَبَتِ বলে মিষ্ট ভাষায় পিতাকে সম্বোধন করেছিলেন। কিন্তু আযর তাকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করার হুমকি এবং বাড়ী থেকে বের হয়ে যাওয়ার আদেশ জারি করে দিল। তখন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম বললেনঃ سَلَامٌ عَلَيْكَ এখানে سلام শব্দটি অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, বয়কটের সালাম অর্থাৎ কারও সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার ভদ্রজন্যোচিত পন্থা হচ্ছে কথার উত্তর না দিয়ে সালাম বলে পৃথক হয়ে যাওয়া। পবিত্র কুরআন আল্লাহর প্রিয় ও সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের প্রশংসায় বলেঃ “মূর্খরা যখন তাদের সাথে মূর্খীসুলভ তর্কবিতর্কে প্রবৃত্ত হয়, তখন তারা তাদের মোকাবেলা করার পরিবর্তে সালাম শব্দ বলে দেন।” [সূরা আল-ফুরকান: ৬৩] অথবা এর উদ্দেশ্য এই যে, বিরুদ্ধাচরণ সত্বেও আমি আপনার কোন ক্ষতি করব না। [ফাতহুল কাদীর]

(২) কোন কাফেরের জন্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা শরীআতের আইনে নিষিদ্ধ ও নাজায়েয। একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার চাচা আবু তালেবকে বলেছিলেনঃ “আল্লাহর কসম, আমি আপনার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকব, যে পর্যন্ত না আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাকে নিষেধ করে দেয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াত নাযিল হয়: “নবী ও ঈমানদারদের পক্ষে মুশরেকদের জন্যে ইস্তেগফার করা বৈধ নয়।” [সূরা আত-তাওবাহঃ ১১৩] এ আয়াত নাযিল হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাচার জন্যে ইস্তেগফার ত্যাগ করেন।

ইবরাহীম আলাইহিস সালাম কর্তৃক তার পিতার জন্য ক্ষমা চাওয়ার উত্তর এই যে, ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ওয়াদা “আপনার জন্যে আমার প্রভুর কাছে ইস্তেগফার করব।” এটা নিষেধাজ্ঞার পূর্বেকার ঘটনা। নিষেধ পরে করা হয়। তারপর তিনি তার পিতার জন্য সুপারিশ করা পরিত্যাগ করেছিলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “ইবরাহীম তার পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছিল, তাকে এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বলে; তারপর যখন এটা তার কাছে সুস্পষ্ট হল যে, সে আল্লাহর শত্রু তখন ইবরাহীম তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলেন। ইবরাহীম তো কোমল হৃদয় ও সহনশীল।” [সূরা আত-তাওবাহঃ ১১৪]

তারপরও ইবরাহীম আলাইহিস সালাম হাশরের মাঠে যখন তার পিতাকে কুৎসিত অবস্থায় দেখবেন তখন তার জন্য কোন দোআ বা সুপারিশ করবেন না। এ ব্যাপারে হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “হাশরের মাঠে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তার পিতাকে দেখে বলবেন, হে আল্লাহ্! আপনি আমাকে আজকের দিনে অপমান থেকে রক্ষা করার ওয়াদা করেছেন। আমার পিতার অপমানের চেয়ে বড় অপমান আর কি হতে পারে? আল্লাহ তা’আলা বলবেনঃ “আমি কাফেরদের জন্য জান্নাত হারাম করেছি।” তারপর আল্লাহ তা'আলা তখন তাকে তার পায়ের নীচে তাকাবার নির্দেশ দিবেন। তিনি তাকিয়ে একটি মৃত দুৰ্গন্ধযুক্ত পঁচা জানোয়ার দেখতে পাবেন, ফলে তিনি তার জন্য সুপারিশ না করেই তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। [বুখারীঃ ৩১৭২, ৪৪৯০, ৪৪৯১]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৪৭) ইব্রাহীম বলল, ‘তোমার উপর সালাম; [1] আমি আমার প্রতিপালকের নিকট তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব, [2] নিশ্চয় তিনি আমার প্রতি অতিশয় অনুগ্রহশীল।

[1] এই সালাম অভিবাদনের জন্য নয়; যেমন এক মুসলিম অন্য মুসলিমকে করে থাকে; বরং এটি হল কথা বলা বন্ধ করার ইঙ্গিত। যেমন মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেন, ‘‘তাদেরকে যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, সালাম।’’ (সূরা ফুরকানঃ ৬৩) অর্থাৎ, তারা চুপ হয়ে যায়। আর এর মধ্যে ঈমানদার ও আল্লাহর প্রকৃত বান্দাদের আচরণ বর্ণনা করা হয়েছে।

[2] ইবরাহীম (আঃ) এ কথা ঐ সময় বলেছিলেন, যখন মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা নিষেধ হওয়া সম্পর্কে জ্ঞান ছিল না। অতঃপর যখন তিনি জানতে পারলেন, তখন সাথে সাথে প্রার্থনা করা বন্ধ করে দিলেন। (সূরা তাওবাঃ ১১৪)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ৪৮ وَ اَعۡتَزِلُكُمۡ وَ مَا تَدۡعُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰهِ وَ اَدۡعُوۡا رَبِّیۡ ۫ۖ عَسٰۤی اَلَّاۤ اَكُوۡنَ بِدُعَآءِ رَبِّیۡ شَقِیًّا ﴿۴۸﴾

‘আর আমি তোমাদের ও আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদাত তোমরা কর তাদের পরিত্যাগ করছি এবং আমি আমার রবের ইবাদাত করছি। আশা করি আমার রবের ইবাদাত করে আমি ব্যর্থ হব না’। আল-বায়ান

আমি পরিত্যাগ করছি আপনাদেরকে আর আপনারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে ডাকেন তাদেরকে। আমি আমার প্রতিপালককে ডাকি, আশা করি আমি আমার প্রতিপালককে ডেকে বঞ্চিত হব না।’ তাইসিরুল

আমি তোমাদের দিক হতে এবং তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদের ইবাদাত কর তাদের দিক হতে পৃথক হচ্ছি; আমি আমার রবের আহবান করি; আশা করি আমার রবের আহবান করে আমি ব্যর্থকাম হবনা। মুজিবুর রহমান

And I will leave you and those you invoke other than Allah and will invoke my Lord. I expect that I will not be in invocation to my Lord unhappy." Sahih International

৪৮. আর আমি তোমাদের থেকে ও তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদাত কর তাদের থেকে পৃথক হচ্ছি; আর আমি আমার রবকে ডাকছি; আশা করি, আমার রবকে ডেকে আমি দূর্ভাগা হব না।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৪৮) আমি তোমাদের নিকট হতে ও তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদের উপাসনা কর তাদের নিকট হতে পৃথক হচ্ছি। আমি আমার প্রতিপালককে আহবান করব। আর আশা করি, আমি আমার প্রতিপালককে আহবান করে ব্যর্থকাম হব না।’

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ৪৯ فَلَمَّا اعۡتَزَلَهُمۡ وَ مَا یَعۡبُدُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰهِ ۙ وَهَبۡنَا لَهٗۤ اِسۡحٰقَ وَ یَعۡقُوۡبَ ؕ وَ كُلًّا جَعَلۡنَا نَبِیًّا ﴿۴۹﴾

অতঃপর যখন সে তাদেরকে এবং আল্লাহ ছাড়া যাদের তারা ইবাদাত করত তাদের সবাইকে পরিত্যাগ করল, তখন আমি তাকে দান করলাম ইসহাক ও ইয়া‘কূব এবং তাদের প্রত্যেককে নবী করলাম। আল-বায়ান

অতঃপর সে যখন তাদেরকে আর তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদের ‘ইবাদাত করত তাদেরকে পরিত্যাগ করল, তখন আমি তাকে দান করলাম ইসহাক্ব আর ইয়া‘কূব আর তাদের প্রত্যেককে নবী করলাম। তাইসিরুল

অতঃপর সে যখন তাদের থেকে এবং তারা আল্লাহ ব্যতীত যাদের ইবাদাত করত সেই সব হতে পৃথক হয়ে গেল তখন আমি তাকে দান করলাম ইসহাক ও ইয়াকূব এবং প্রত্যেককে নাবী করলাম। মুজিবুর রহমান

So when he had left them and those they worshipped other than Allah, We gave him Isaac and Jacob, and each [of them] We made a prophet. Sahih International

৪৯. অতঃপর তিনি যখন তাদের থেকে ও তারা আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদাত করত সেসব থেকে পৃথক হয়ে গেলেন, তখন আমরা তাকে দান করলাম ইসহাক ও ইয়াকুব এবং প্রত্যেককে নবী করলাম।(১)

(১) পূৰ্ববতী বাক্যে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর উক্তি বর্ণিত হয়েছে যে, আমি আশা করি, আমার পালনকতার কাছে দোআ করে আমি বঞ্চিত ও বিফল মনোরথ হব না। বাহ্যতঃ এখানে গৃহ ও পরিবারবর্গ ত্যাগ করার পর নিঃসঙ্গতার আতঙ্ক ইত্যাদি থেকে আত্মরক্ষার দোআ বোঝানো হয়েছিল। আলোচ্য বাক্যে এই দোআ কবুল করার কথা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যখন আল্লাহর জন্য নিজ গৃহ, পরিবারবর্গ ও তাদের দেব-দেবীকে পরিহার করলেন, তখন আল্লাহ তা'আলা। তাকে পুত্র ইসহাক দান করলেন। এই পুত্র যে দীর্ঘায়ু ও সন্তানের পিতা হয়েছিলেন তাও ইয়াকুব (পৌত্র) শব্দ যোগ করে বর্ণনা করে দেয়া হয়েছে। পুত্ৰ দান থেকে বোঝা যায় যে, ইতিপূর্বে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম বিবাহ করেছিলেন। কাজেই আয়াতের সারমর্ম এই দাঁড়াল যে আল্লাহ তা'আলা তাকে পিতার পরিবারের চাইতে উত্তম একটি স্বতন্ত্র পরিবার দান করলেন, যা নবী ও সৎকর্মপরায়ণ মহাপুরুষদের সমন্বয়ে গঠিত ছিল। [দেখুন, ইবন কাসীর, ফাতহুল কাদীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৪৯) অতঃপর সে যখন তাদের হতে ও তারা আল্লাহ ব্যতীত যাদের উপাসনা করত সেই সব হতে পৃথক হয়ে গেল, তখন আমি তাকে দান করলাম ইসহাক ও ইয়াকূব[1] এবং প্রত্যেককে নবী করলাম।

[1] ইয়াকূব (আঃ) ইসহাক (আঃ)-এর পুত্র এবং ইবরাহীম (আঃ)-এর পৌত্র ছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর উল্লেখও পুত্রের সাথে পুত্রের মতই করেছেন। তাৎপর্য্য এই যে, যখন ইবরাহীম আল্লাহর একত্ববাদের খাতিরে নিজ পিতা, ঘর ও প্রিয় জন্মভূমি ত্যাগ করে পবিত্র ভূমির দিকে হিজরত করল, তখন আমি তাকে ইসহাক ও ইয়াকূব প্রদান করলাম; যাতে তাদের স্নেহ-ভালবাসা পিতাকে ছেড়ে আসার শোককে ভুলিয়ে দেয়।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ৫০ وَ وَهَبۡنَا لَهُمۡ مِّنۡ رَّحۡمَتِنَا وَ جَعَلۡنَا لَهُمۡ لِسَانَ صِدۡقٍ عَلِیًّا ﴿۵۰﴾

আর আমি তাদেরকে আমার অনুগ্রহ দান করলাম আর তাদের সুনাম সুখ্যাতিকে সমুচ্চ করলাম। আল-বায়ান

আমি তাদেরকে দান করলাম আমার অনুগ্রহ আর সত্যিকার নাম-যশের সুউচ্চ সুখ্যাতি। তাইসিরুল

এবং তাদেরকে আমি দান করলাম আমার অনুগ্রহ ও তাদের দিলাম সমুচ্চ বংশ। মুজিবুর রহমান

And We gave them of Our mercy, and we made for them a reputation of high honor. Sahih International

৫০. এবং তাদেরকে আমরা দান করলাম আমাদের অনুগ্রহ, আর তাদের নাম-যশ সমুচ্চ করলাম।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৫০) এবং তাদেরকে আমি দান করলাম আমার বহু অনুগ্রহ[1] ও তাদেরকে দিলাম সমুচ্চ খ্যাতি। [2]

[1] অর্থাৎ, নবুঅত ছাড়া আরো অনেক অনুগ্রহ তাকে দান করেছিলাম। যেমন ধন-মাল, অতিরিক্ত সন্তান-সন্ততি, অতঃপর তারই বংশে বহু কাল পর্যন্ত নবুঅতের পরম্পরা বজায় রাখা; যা ছিল সব থেকে বড় অনুগ্রহ যা আমি তার উপর করেছি। আর সেই কারণে ইবরাহীম (আঃ)-কে ‘আবুল আম্বিয়া’ (নবীদের পিতা) বলা হয়ে থাকে।

[2] لِسَان صِدق অর্থঃ সুনাম ও সুখ্যাতি। لسان (জিহ্বা)র সম্বন্ধ صِدق (সত্য) এর দিকে জুড়ার পর তার বিশেষণ ‘সমুচ্চ’ উল্লেখের মাধ্যমে এই কথার দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, মানুষের মুখে তাঁদের যে সুনাম ও সুখ্যাতি আছে, বাস্তবেই তাঁরা তার যোগ্য অধিকারী। সুতরাং আসমানী ধর্মসমূহের সকল অনুসারীগণ এমন কি মুশরিকরা পর্যন্ত ইবরাহীম (আঃ) ও তাঁর সন্তানদের কথা উত্তম শব্দ দ্বারা ও অত্যধিক আদব ও সম্মানের সাথে আলোচনা করে থাকে। এটি নবুঅত ও সন্তান দানের পর অন্য একটি অনুগ্রহ, যা আল্লাহর পথে হিজরত করার জন্য তিনি প্রাপ্ত হয়েছেন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ৫১ وَ اذۡكُرۡ فِی الۡكِتٰبِ مُوۡسٰۤی ۫ اِنَّهٗ كَانَ مُخۡلَصًا وَّ كَانَ رَسُوۡلًا نَّبِیًّا ﴿۵۱﴾

আর স্মরণ কর এই কিতাবে মূসাকে। অবশ্যই সে ছিল মনোনীত এবং সে ছিল রাসূল, নবী। আল-বায়ান

এ কিতাবে উল্লেখিত মূসার কথা স্মরণ কর, সে ছিল বিশেষভাবে মনোনীত, আর একজন রসূল ও নবী। তাইসিরুল

এই কিতাবে উল্লেখিত মূসার কথা বর্ণনা কর, সে ছিল বিশুদ্ধ চিত্ত এবং সে ছিল রাসূল, নাবী। মুজিবুর রহমান

And mention in the Book, Moses. Indeed, he was chosen, and he was a messenger and a prophet. Sahih International

৫১. আর স্মরণ করুন এ কিতাবে মূসাকে, তিনি ছিলেন বিশেষ মনোনীত(১) এবং তিনি ছিলেন রাসূল, নবী।

(১) مُخْلَصًا এর মানে হচ্ছে, “বিশেষভাবে মনোনিত করা, একান্ত করে নেয়া।” [ইবন কাসীর] অনুরূপভাবে মানুষের মধ্যে সে ব্যক্তি মুখলিস যে ব্যক্তি একান্তভাবে আল্লাহর জন্য আমল করে, মানুষ এর প্রশংসা করুক এটা চায় না। [ইবন কাসীর] মূসা আলাইহিস সালাম এ ধরনের বিশেষ গুণে বিশেষিত থাকায় মহান আল্লাহ তাকে তার কাজের পুরস্কারস্বরূপ একান্তভাবে নিজের করে নিয়েছিলেন। আল্লাহ তা’আলা যে ব্যক্তিকে নিজের জন্যে খাঁটি করে নেন তিনি পরম সৌভাগ্যবান ব্যক্তি। নবীগণই বিশেষভাবে এ গুণে গুণান্বিত হন, যেমন- কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছেঃ “আমি তাদেরকে (নবীদেরকে) আখেরাতের স্মরণ করা কাজের জন্যে একান্ত করে নিয়েছি।” [সূরা ছোয়াদঃ ৪৬]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৫১) এই কিতাবে (উল্লিখিত) মূসার কথা বর্ণনা কর, সে ছিল একজন মনোনীত এবং সে ছিল রসূল, নবী।[1]

[1] مُخلَص، مُصطَفى، مُجتَبى، مُختَار চারটি শব্দের অর্থ একই। অর্থাৎ রিসালাত ও নবুঅতের জন্য নির্বাচিত ও মনোনীত ব্যক্তি। রসূল (সংবাদবাহক, দূত) মুরসাল (প্রেরিত)এর অর্থে ব্যবহূত। আর নবীর অর্থঃ যিনি আল্লাহর বাণী মানুষদের নিকট পৌঁছে দেন বা আল্লাহর অহীর সংবাদ দেন। অবশ্য দুয়ের অর্থ প্রায় একই। অর্থাৎ, আল্লাহ যে বান্দাকে মানুষদের পথ প্রদর্শন ও হিদায়াতের জন্য নির্বাচিত করেছেন এবং অহী দ্বারা সম্মানিত করেছেন তাঁকে রসূল বা নবী বলা হয়। প্রাচীন কাল হতে উলামাদের মধ্যে মতবিরোধ চলে আসছে যে, রসূল ও নবীর মধ্যে কোন পার্থক্য আছে কি না? এবং থাকলে তা কি? পার্থক্যকারীগণ সাধারণতঃ বলে থাকেন যে, যাঁকে নতুন শরীয়ত তথা আসমানী কিতাব দান করা হয়েছে তাঁকে রসূল ও নবী দুই বলা হয়। কিন্তু যিনি পূর্ববতী শরীয়ত মোতাবেক মানুষদের কাছে আল্লাহর দ্বীনের কথা পৌঁছে দেন, তাঁকে নবী বলা হয়; রসূল নয়। তা সত্ত্বেও কুরআনে উভয় শব্দই একটি অন্যের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। আবার কোথাও পাশাপাশি পৃথক পৃথক অর্থেও ব্যবহার হয়েছে। যেমন (সূরা হাজ্জঃ ৫২ আয়াত) দেখুন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ৫২ وَ نَادَیۡنٰهُ مِنۡ جَانِبِ الطُّوۡرِ الۡاَیۡمَنِ وَ قَرَّبۡنٰهُ نَجِیًّا ﴿۵۲﴾

আমি তাকে তূর পর্বতের ডান দিক থেকে ডেকেছিলাম এবং অন্তরঙ্গ আলাপের উদ্দেশ্যে তাকে আমার নিকটবর্তী করেছিলাম। আল-বায়ান

আমি তাকে ডাক দিয়েছিলাম তূর পাহাড়ের ডান পার্শ্ব থেকে আর গোপনে কথাবার্তা বলার জন্য তাকে নিকটবর্তী করেছিলাম। তাইসিরুল

আমি তাকে আহবান করেছিলাম তূর পর্বতের দক্ষিণ দিক হতে এবং আমি গুঢ়তত্ত্ব আলোচনারত অবস্থায় তাকে নিকটবর্তী করেছিলাম। মুজিবুর রহমান

And We called him from the side of the mount at [his] right and brought him near, confiding [to him]. Sahih International

৫২. আর তাকে আমরা ডেকেছিলাম তূর পর্বতের ডান দিক থেকে(১) এবং আমরা অন্তরঙ্গ আলাপে তাকে নৈকট্য দান করেছিলাম।

(১) এই সুপ্ৰসিদ্ধ পাহাড়টি সিরিয়া, মিসর ও মাদইয়ানের মধ্যস্থলে অবস্থিত। বর্তমানেও পাহাড়টি এ নামেই প্ৰসিদ্ধ। আল্লাহ তা'আলা একেও অনেক বিষয়ে বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য দান করেছেন। তুর পাহাড়ের ডানদিকে মুসা আলাইহিস সালামের দিক দিয়ে বলা হয়েছে। কেননা, তিনি মাদইয়ান থেকে রওয়ানা হয়েছিলেন। তূর পাহাড়ের বিপরীত দিকে পৌঁছার পর তূর পাহাড় তার ডান দিকে ছিল। [দেখুন, ফাতহুল কাদীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৫২) আমি তাকে আহবান করেছিলাম তূর পর্বতের ডান দিক হতে এবং আমি নিভৃত আলাপ করা অবস্থায় তাকে নিকটবর্তী করেছিলাম।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ৫৩ وَ وَهَبۡنَا لَهٗ مِنۡ رَّحۡمَتِنَاۤ اَخَاهُ هٰرُوۡنَ نَبِیًّا ﴿۵۳﴾

আর আমি স্বীয় অনুগ্রহে তার জন্য তার ভাই হারূনকে নবীরূপে দান করলাম। আল-বায়ান

আর আমি স্বীয় অনুগ্রহে তাকে দান করেছিলাম তার ভাই হারূনকে, সেও ছিল একজন নবী। তাইসিরুল

আমি নিজ অনুগ্রহে তাকে দিলাম তার ভাই হারূনকে, নাবীরূপে। মুজিবুর রহমান

And We gave him out of Our mercy his brother Aaron as a prophet. Sahih International

৫৩. আর আমরা নিজ অনুগ্রহে তাকে দিলাম তার ভাই হারূনকে নবীরূপে।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৫৩) আমি নিজ অনুগ্রহে তাকে দিলাম তার ভ্রাতা হারূনকে নবীরূপে।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ৫৪ وَ اذۡكُرۡ فِی الۡكِتٰبِ اِسۡمٰعِیۡلَ ۫ اِنَّهٗ كَانَ صَادِقَ الۡوَعۡدِ وَ كَانَ رَسُوۡلًا نَّبِیًّا ﴿ۚ۵۴﴾

আর স্মরণ কর এই কিতাবে ইসমাঈলকে। সে ছিল সত্যিকারের ওয়াদা পালনকারী এবং সে ছিল রাসূল, নবী। আল-বায়ান

এ কিতাবে উল্লেখিত ইসমাঈলের কথা স্মরণ কর, সে ছিল ওয়া‘দা রক্ষায় (দৃঢ়) সত্যবাদী, আর ছিল একজন রসূল ও নবী। তাইসিরুল

এই কিতাবে উল্লেখিত ইসমাঈলের কথা বর্ণনা কর, সে ছিল প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যাশ্রয়ী এবং সে ছিল রাসূল, নাবী। মুজিবুর রহমান

And mention in the Book, Ishmael. Indeed, he was true to his promise, and he was a messenger and a prophet. Sahih International

৫৪. আর স্মরণ করুন এ কিতাবে ইসমাঈলকে, তিনি তো ছিলেন প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যাশ্রয়ী (১) এবং তিনি ছিলেন রাসূল, নবী;

(১) ওয়াদা পালনে ইসমাঈল আলাইহিস সালামের স্বাতন্ত্র্যের কারণ এই যে, তিনি আল্লাহর সাথে কিংবা কোন বান্দার সাথে যে বিষয়ের ওয়াদা করেছেন, অবিচল নিষ্ঠা ও যত্ন সহকারে তা পালন করেছেন। তিনি আল্লাহর সাথে ওয়াদা করেছিলেন যে, নিজেকে জবাই এর জন্যে পেশ করে দেবেন। এবং তজ্জন্যে সবর করবেন। তিনি এ ওয়াদায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। [ইবন কাসীর] একবার তিনি জনৈক ব্যক্তির সাথে একস্থানে সাক্ষাতের ওয়াদা করেছিলেন। কিন্তু লোকটি সময়মত আগমন না করায় সেখানে অনেক দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকেন। [ফাতহুল কাদীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৫৪) এই কিতাবে (উল্লিখিত) ইসমাঈলের কথা বর্ণনা কর, সে ছিল একজন প্রতিশ্রুতি পালনকারী এবং সে ছিল রসূল, নবী।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ৫৫ وَ كَانَ یَاۡمُرُ اَهۡلَهٗ بِالصَّلٰوۃِ وَ الزَّكٰوۃِ ۪ وَ كَانَ عِنۡدَ رَبِّهٖ مَرۡضِیًّا ﴿۵۵﴾

আর সে তার পরিবার-পরিজনকে সালাত ও যাকাতের নির্দেশ দিত এবং সে ছিল তার রবের সন্তোষপ্রাপ্ত। আল-বায়ান

সে তার পরিবারবর্গকে নামায ও যাকাতের হুকুম দিত আর সে ছিল তার প্রতিপালকের নিকট সন্তুষ্টির পাত্র। তাইসিরুল

সে তার পরিজনবর্গকে সালাত ও যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিত এবং সে ছিল তার রবের সন্তোষভাজন। মুজিবুর রহমান

And he used to enjoin on his people prayer and zakah and was to his Lord pleasing. Sahih International

৫৫. তিনি তার পরিজনবর্গকে সালাত ও যাকাতের নির্দেশ দিতেন(১) এবং তিনি ছিলেন তার রব-এর সন্তোষভাজন।

(১) ইসমাইল আলাইহিস সালামের আরও একটি বিশেষ গুণ এই উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি নিজ পরিবার পরিজনকে সালাত ও যাকাতের নির্দেশ দিতেন। কুরআনে সাধারণ মুসলিমদেরকে বলা হয়েছেঃ “তোমরা নিজেদেরকে এবং নিজেদের পরিবারবর্গকে অগ্নি থেকে রক্ষা কর।” [সূরা আত-তাহরীম: ৬] এ ব্যাপারে ইসমাঈল 'আলাইহিস সালাম বিশেষ গুরুত্বসহকারে ও সর্বপ্রযত্নে চেষ্টিত ছিলেন। তিনি চাননি তার পরিবারের লাকেরা জাহান্নামে প্রবেশ করুক। এ ব্যাপারে তিনি কোন ছাড় দেন নি। [ইবন কাসীর]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ 'আল্লাহ ঐ পুরুষকে রহমত করুন যিনি রাতে সালাত আদায়ের জন্য জাগ্রত হলো এবং তার স্ত্রীকে জাগালো তারপর যদি স্ত্রী জগতে গড়িমসি করে তার মুখে পানি ছিটিয়ে দিল। অনুরূপভাবে আল্লাহ ঐ মহিলাকে রহমত করুন যিনি রাতে সালাত আদায়ের জন্য জাগ্রত হলো এবং তার স্বামীকে জাগালো তারপর যদি স্বামী জাগতে গড়িমসি করে তার মুখে পানি ছিটিয়ে দিল। [আবু দাউদ: ১৩০৮, ইবন মাজাহ: ১৩৩৬]

অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “যদি কোন লোক রাতে জাগ্রত হয়ে তার স্ত্রীকে জাগিয়ে দু’রাকাত সালাত আদায় করে তাহলে তারা দু’জনের নাম অধিক হারে আল্লাহর যিকরকারী পুরুষ ও যিকরকারিনী মহিলাদের মধ্যে লিখা হবে।’ [আবু দাউদ: ১৩০৯, ইবন মাজাহ: ১৩৩৫]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৫৫) সে তার পরিজনবর্গকে নামায ও যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিত এবং সে ছিল তার প্রতিপালকের নিকট সন্তোষভাজন।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ৫৬ وَ اذۡكُرۡ فِی الۡكِتٰبِ اِدۡرِیۡسَ ۫ اِنَّهٗ كَانَ صِدِّیۡقًا نَّبِیًّا ﴿٭ۙ۵۶﴾

আর স্মরণ কর এই কিতাবে ইদরীসকে। সে ছিল পরম সত্যনিষ্ঠ নবী। আল-বায়ান

এ কিতাবে উল্লেখিত ইদরীসের কথা স্মরণ কর, সে ছিল সত্যনিষ্ঠ, একজন নবী। তাইসিরুল

এই কিতাবে উল্লেখিত ইদরীসের কথা বর্ণনা কর, সে ছিল সত্যবাদী নাবী। মুজিবুর রহমান

And mention in the Book, Idrees. Indeed, he was a man of truth and a prophet. Sahih International

৫৬. আর স্মরণ করুন এ কিতাবে ইদরীসকে, তিনি ছিলেন সত্যনিষ্ঠ নবী;

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৫৬) এই কিতাবে (উল্লিখিত) ইদরীসের কথা বর্ণনা কর; সে ছিল একজন সত্যবাদী নবী।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ৫৭ وَّ رَفَعۡنٰهُ مَكَانًا عَلِیًّا ﴿۵۷﴾

আর আমি তাকে উচ্চ মর্যাদায় সমুন্নত করেছিলাম। আল-বায়ান

আমি তাকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছিলাম। তাইসিরুল

এবং আমি তাকে দান করেছিলাম উচ্চ মর্যাদা। মুজিবুর রহমান

And We raised him to a high station. Sahih International

৫৭. আর আমরা তাকে উন্নীত করেছিলাম উচ্চ মর্যাদায়।(১)

(১) অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা ইদরীস আলাইহিস সালামকে উচ্চ মর্তবায় সমুন্নত করেছেন। উদ্দেশ্য এই যে, তাকে উচ্চ স্থান তথা আকাশে অবস্থান করার ব্যবস্থা করেছি। [ইবন কাসীর] হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “যখন আমাকে আকাশে উঠানো হয়েছিল মি'রাজের রাত্ৰিতে আমি ইদরীসকে চতুর্থ আসমানে দেখেছি।’ [তিরমিযী: ৩১৫৭]

কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, ইদরীস আলাইহিস সালামকে জীবিত অবস্থায় আকাশে তুলে নেয়া হয়েছে। এ সম্পর্কে ইবনে কাসীর বলেনঃ এটা ক'ব আল-আহবারের ইসরাঈলী বৰ্ণনা। এটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে গ্রহণযোগ্য বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত হয়নি। কাজেই আকাশে জীবিত অবস্থায় তুলে নেয়ার বিষয়টি স্বীকৃত নয়। আয়াতের অন্য অর্থ হচ্ছে, তাকে উঁচু স্থান জান্নাতে দেয়া হয়েছে। অথবা তাকে নবুওয়াত ও রিসালাত দিয়ে সম্মানিত করা হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৫৭) এবং আমি তাকে সুউচ্চ স্থানে উঠিয়ে নিয়েছিলাম। [1]

[1] কথিত আছে যে, ইদরীস (আঃ) আদম (আঃ)-এর পর প্রথম নবী ছিলেন এবং নূহ (আঃ) বা তাঁর পিতার দাদা ছিলেন। সর্বপ্রথম তিনিই কাপড় সিলাই শুরু করেন। ‘সুউচ্চ স্থানে’র তাৎপর্য্য কি? কিছু মুফাসসির মনে করেন যে, ঈসা (আঃ)-এর মত ইদরীস (আঃ)-কেও আকাশে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কুরআনের শব্দ এই অর্থের জন্য পরিষ্কার নয় এবং সহীহ হাদীসেও এ কথার উল্লেখ পাওয়া যায় না। অবশ্য ইস্রাঈলী বর্ণনায় তাঁকে আকাশে তুলে নেওয়ার কথা পাওয়া যায়, যা এ অর্থ প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়। সেই জন্য সঠিক অর্থ এটাই মনে হয় যে, ‘আমি তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করেছিলাম।’ সেই মর্যাদা ও সম্মান যা তাঁকে নবুঅত দান করার পর দেওয়া হয়েছিল। আর আল্লাহই ভাল জানেন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ৫৮ اُولٰٓئِكَ الَّذِیۡنَ اَنۡعَمَ اللّٰهُ عَلَیۡهِمۡ مِّنَ النَّبِیّٖنَ مِنۡ ذُرِّیَّۃِ اٰدَمَ ٭ وَ مِمَّنۡ حَمَلۡنَا مَعَ نُوۡحٍ ۫ وَّ مِنۡ ذُرِّیَّۃِ اِبۡرٰهِیۡمَ وَ اِسۡرَآءِیۡلَ ۫ وَ مِمَّنۡ هَدَیۡنَا وَ اجۡتَبَیۡنَا ؕ اِذَا تُتۡلٰی عَلَیۡهِمۡ اٰیٰتُ الرَّحۡمٰنِ خَرُّوۡا سُجَّدًا وَّ بُكِیًّا ﴿ٛ۵۸﴾ (سُجود‎‎)

এরাই সে সব নবী, আদম সন্তানের মধ্য থেকে যাদের উপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন এবং যাদের আমি নূহের সাথে নৌকায় আরোহণ করিয়েছিলাম। আর ইবরাহীম ও ইসরাঈলের বংশোদ্ভূত এবং যাদেরকে আমি পথ প্রদর্শন করেছিলাম ও মনোনীত করেছিলাম। যখন তাদের কাছে পরম করুণাময়ের আয়াতসমূহ পাঠ করা হত, তারা কাঁদতে কাঁদতে সিজদায় লুটিয়ে পড়ত। [সাজদাহ] ۩ আল-বায়ান

এরাই হল তারা আদাম বংশের নবীগণের মধ্য হতে, আর নূহের সঙ্গে যাদেরকে (নৌকায়) আরোহণ করিয়েছিলাম তাদের মধ্য হতে, আর ইবরাহীম ও ইসরাঈলের বংশধরদের মধ্য হতে যাদেরকে আমি অনুগ্রহ করেছিলাম, এরা তাদেরই মধ্য হতে, যাদেরকে আমি পথনির্দেশ দিয়েছিলাম আর বেছে নিয়েছিলাম, এদের নিকট দয়াময়ের আয়াত আবৃত্তি করা হলে তারা সাজদায় অবনত হয়ে কান্নাভরে লুটিয়ে পড়ত। [সাজদাহ] ۩ তাইসিরুল

নাবীদের মধ্যে যাদেরকে আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন এরাই তারা, আদমের এবং যাদেরকে আমি নূহের সাথে নৌকায় আরোহণ করিয়েছিলাম তাদের বংশদ্ভুত, ইবরাহীম ও ইসরাঈলের বংশদ্ভুত ও যাদেরকে আমি পথ নির্দেশ করেছিলাম ও মনোনীত করেছিলাম তাদের অন্তর্ভুক্ত; তাদের নিকট দয়াময়ের আয়াত আবৃত্তি করা হলে তারা সাজদাহয় লুটিয়ে পড়ত ক্রন্দন করতে করতে। [সাজদাহ] ۩ মুজিবুর রহমান

Those were the ones upon whom Allah bestowed favor from among the prophets of the descendants of Adam and of those We carried [in the ship] with Noah, and of the descendants of Abraham and Israel, and of those whom We guided and chose. When the verses of the Most Merciful were recited to them, they fell in prostration and weeping. Sahih International

৫৮. এরাই তারা, নবীদের মধ্যে আল্লাহ যাদেরকে অনুগ্রহ করেছেন, আদমের বংশ থেকে এবং যাদেরকে আমরা নূহের সাথে নৌকায় আরোহণ করিয়েছিলাম। আর ইবরাহীম ও ইসরাঈলের বংশোদ্ভূত, আর যাদেরকে আমরা হেদায়াত দিয়েছিলাম এবং মনোনীত করেছিলাম; তাদের কাছে দয়াময়ের আয়াত তিলাওয়াত করা হলে তারা লুটিয়ে পড়ত সিজদায়(১) এবং কান্নায়।(২) [সাজদাহ] ۩

(১) অন্য আয়াতেও বলা হয়েছে, “বলুন, তোমরা কুরআনে বিশ্বাস কর বা বিশ্বাস না কর, যাদেরকে এর আগে জ্ঞান দেয়া হয়েছে তাদের কাছে যখন এটা পড়া হয় তখনই তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ে। তারা বলে, আমাদের প্রতিপালক পবিত্র, মহান। আমাদের প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি কার্যকর হয়েই থাকে। এবং তারা কাঁদতে কাঁদতে ভূমিতে লুটিয়ে পড়ে এবং এটা তাদের বিনয় বৃদ্ধি করে।” [সূরা আল-ইসরা: ১০৭–১০৯]

(২) এ আয়াত থেকে জানা গেল যে, কুরআনের আয়াত তেলাওয়াতের সময় কান্নার অবস্থা সৃষ্টি হওয়া প্রশংসনীয় এবং নবীদের সুন্নত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন ও সৎকর্মশীলদের থেকে এ ধরনের বহু ঘটনা বর্ণিত আছে। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু একবার এ সূরা পড়ে সিজদা করলেন এবং বললেন, সিজদা তো হলো, কিন্তু ক্ৰন্দন কোথায়! [ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৫৮) নবীদের মধ্যে যাদেরকে আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন এরাই তারা, আদমের ও যাদেরকে আমি নূহের সাথে নৌকায় আরোহণ করিয়েছিলাম তাদের বংশোদ্ভূত, ইব্রাহীম ও ইস্রাঈলের বংশোদ্ভূত ও যাদেরকে আমি পথ নির্দেশ করেছিলাম ও মনোনীত করেছিলাম তাদের অন্তর্ভুক্ত। তাদের নিকট পরম করুণাময়ের আয়াত আবৃত্তি করা হলে, তারা ক্রন্দন করতে করতে সিজদায় লুটিয়ে পড়ত। [1] [সাজদাহ] ۩

[1] আল্লাহর আয়াত শ্রবণ করে নম্রতা ও কান্নাভাব সৃষ্টি হওয়া ও আল্লাহর মহত্ত্বের সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়া আল্লাহর বান্দাদের বিশেষ লক্ষণ। (এই আয়াত পাঠ শেষে তিলাঅতের সিজদাহ করা সুন্নত। সিজদার আহকাম জানতে সূরা আ’রাফের শেষ আয়াতের টীকা দেখুন।)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ৫৯ فَخَلَفَ مِنۡۢ بَعۡدِهِمۡ خَلۡفٌ اَضَاعُوا الصَّلٰوۃَ وَ اتَّبَعُوا الشَّهَوٰتِ فَسَوۡفَ یَلۡقَوۡنَ غَیًّا ﴿ۙ۵۹﴾

তাদের পরে আসল এমন এক অসৎ বংশধর যারা সালাত বিনষ্ট করল এবং কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করল। সুতরাং শীঘ্রই তারা জাহান্নামের শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে। আল-বায়ান

অতঃপর তাদের পর এল অপদার্থ পরবর্তীরা, তারা নামায হারালো, আর লালসার বশবর্তী হল। তারা অচিরেই ধ্বংসের সম্মুখীন হবে। তাইসিরুল

তাদের পরে এলো অপদার্থ পরবর্তীরা; তারা সালাত নষ্ট করল ও লালসা পরবশ হল; সুতরাং তারা অচিরেই কুকর্মের শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে। মুজিবুর রহমান

But there came after them successors who neglected prayer and pursued desires; so they are going to meet evil - Sahih International

৫৯. তাদের পরে আসল অযোগ্য উত্তরসূরীরা(১), তারা সালাত নষ্ট করল(২) এবং কুপ্রবৃত্তির(৩) অনুবর্তী হল। কাজেই অচিরেই তারা ক্ষতিগ্রস্ততার(৪) সম্মুখীন হবে।

(১) خلف শব্দে লামের সাকিন যোগে এ শব্দটির অর্থ মন্দ উত্তরসূরী, মন্দ সন্তান-সন্ততি এবং লামের যাবর যোগে এর অর্থ হয় উত্তম উত্তরসূরী এবং উত্তম সন্তান-সন্ততি। এখানে সাকিনযুক্ত হওয়ায় এর অর্থ হচ্ছে: খারাপ উত্তরসূরী। [ফাতহুল কাদীর] এদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ষাট বছরের পর থেকে খারাপ উত্তরসূরীদের আবির্ভাব হবে, যারা সালাত বিনষ্ট করবে, প্রবৃত্তির অনুসরণ করবে, তারা অচিরেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে জাহান্নামে নিপতিত হবে। তারপর এমন কিছু উত্তরসূরী আসবে যারা কুরআন পড়বে অথচ তা তাদের কণ্ঠনালীর নিম্নভাগে যাবে না। আর কুরআন পাঠকারীরা তিন শ্রেণীর হবে: মুমিন, মুনাফিক এবং পাপিষ্ঠ। বর্ণনাকারী বশীর বলেনঃ আমি ওয়ালিদকে এ তিন শ্রেণী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেনঃ কুরআন পাঠকারী হবে অথচ সে এর উপর কুফরকারী, পাপিষ্ঠ কুরআন পাঠ্যকারী হবে যে এর দ্বারা নিজের রুটি-রোজগারের ব্যবস্থা করবে। আর ঈমানদার কুরআন পাঠ্যকারী হবে যে এর উপর ঈমান আনবে। [মুসনাদে আহমাদ: ৩/৩৮, সহীহ ইবন হিব্বান: ৩/৩২, ৭৫৫]

(২) মুজাহিদ বলেনঃ কেয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে যখন সৎকর্মপরায়ণ লোকদের অস্তিত্ব থাকবে না, তখন এরূপ ঘটনা ঘটবে। তখন সালাতের প্রতি কেউ ক্ৰক্ষেপ করবে না এবং প্রকাশ্যে পাপাচার অনুষ্ঠিত হবে। এ আয়াতে “সালাত নষ্ট করা” বলে বিশিষ্ট তফসীরবিদদের মতে, অসময়ে সালাত পড়া বোঝানো হয়েছে। কেউ কেউ বলেনঃ সময়সহ সালাতের আদব ও শর্তসমূহের মধ্যে কোনটিতে ত্রুটি করা সালাত নষ্ট করার শামিল, আবার কারও কারও মতে ‘সালাত নষ্ট করা’ বলে জামা'আত ছাড়া নিজে গৃহে সালাত পড়া বোঝানো হয়েছে। [ইবন কাসীর]

খলীফা ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহু সকল সরকারী কর্মচারীদের কাছে এই নির্দেশনামা লিখে প্রেরণ করেছিলেনঃ আমার কাছে তোমাদের সব কাজের মধ্যে সালাত সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। অতএব যে ব্যক্তি সালাত নষ্ট করে সে দ্বীনের অন্যান্য বিধি-বিধান আরও বেশী নষ্ট করবে। [মুয়াত্তা মালেকঃ ৬]

তদ্রুপ হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু এক ব্যক্তিকে দেখলেন যে, সে সালাতের আদব ও রোকন ঠিকমত পালন করছে না। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তুমি কবে থেকে এভাবে সালাত আদায় করছ? লোকটি বললঃ চল্লিশ বছর ধরে। হুযায়ফা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেনঃ তুমি একটি সালাতও পড়নি। যদি এ ধরনের সালাত পড়েই তুমি মারা যাও, তবে মনে রেখো মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনীত আদর্শের বিপরীতে তোমার মৃত্যু হবে।” [নাসায়ীঃ ৩/৫৮, সহীহ ইবন হিব্বানঃ ১৮৯৪]

অনুরূপভাবে অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ঐ ব্যক্তির সালাত হয় না, যে সালাতে ‘একামত’ করে না। অর্থাৎ যে ব্যক্তি রুকু ও সেজদায়, রুকু থেকে দাঁড়িয়ে অথবা দুই সেজদার মধ্যস্থলে সোজা দাঁড়ানো অথবা সোজা হয়ে বসাকে গুরুত্ব দেয় না, তার সালাত হয় না। [তিরমিযীঃ ২৬৫]

মোটকথাঃ সালাত আদায় ত্যাগ করা অথবা সালাত থেকে গাফেল ও বেপরোয়া হয়ে যাওয়া প্রত্যেক উম্মতের পতন ও ধ্বংসের প্রথম পদক্ষেপ। সালাত আল্লাহর সাথে মুমিনের প্রথম ও প্রধানতম জীবন্ত ও কার্যকর সম্পর্ক জুড়ে রাখে। এ সম্পর্ক তাকে আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের কেন্দ্রবিন্দু থেকে বিচ্যুত হতে দেয় না। এ বাঁধন ছিন্ন হবার সাথে সাথেই মানুষ আল্লাহ থেকে দূরে বহুদূরে চলে যায়। এমনকি কার্যকর সম্পর্ক খতম হয়ে গিয়ে মানসিক সম্পর্কেরও অবসান ঘটে। তাই আল্লাহ একটি সাধারণ নিয়ম হিসেবে এখানে একথাটি বর্ণনা করেছেন যে, পূর্ববর্তী সকল উম্মতের বিকৃতি শুরু হয়েছে সালাত নষ্ট করার পর। হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বান্দা ও শির্কের মধ্যে সীমারেখা হলো সালাত ছেড়ে দেয়া। [ মুসলিম: ৮২] আরও বলেছেনঃ “আমাদের এবং কাফেরদের মধ্যে একমাত্র সালাতই হচ্ছে পার্থক্যকারী বিষয়, (তাদের কাছ থেকে এরই অঙ্গীকার নিতে হবে) সুতরাং যে কেউ সালাত পরিত্যাগ করল সে কুফরী করল।” [তিরমিযী: ২৬২১]

(৩) ‘কুপ্রবৃত্তি’ বলতে বুঝায় এমন কাজ যা মানুষের মন চায়, মনের ইচ্ছানুরূপ হয় এবং যা থেকে সে তাকওয়া অবলম্বন করে না। যেমন হাদীসে এসেছে, “জান্নাত ঘিরে আছে অপছন্দনীয় বিষয়াদিতে, আর জাহান্নাম ঘিরে আছে কুপ্রবৃত্তির চাহিদায়” [মুসলিম: ২৮২২] অনুরূপভাবে এখানেও ‘কুপ্রবৃত্তি’ বলে দুনিয়ার সেসব আকর্ষণকে বোঝানো হয়েছে, যেগুলো মানুষকে আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে গাফেল করে দেয়। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ বিলাসবহুল গৃহ নির্মাণ, পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণকারী যানবাহনে আরোহণ এবং সাধারণ লোকদের থেকে স্বাতন্ত্র্যমূলক পোশাক আয়াতে উল্লেখিত কুপ্রবৃত্তির অন্তর্ভুক্ত। [কুরতুবী]

(৪) আরবী ভাষায় غي শব্দটি رشد এর বিপরীত। প্রত্যেক কল্যাণকর বিষয়কে رشد বলা হয়। অপরদিকে প্রত্যেক অকল্যাণকর ও ক্ষতিকর বিষয়কে غي বলা হয়। [ফাতহুল কাদীর] আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেনঃ ‘গাই’ জাহান্নামের এমন একটি গর্তের নাম যাতে সমগ্ৰ জাহান্নামের চাইতে অধিক আযাবের সমাবেশ রয়েছে। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেনঃ ‘গাই’ জাহান্নামের এমন একটি গুহা জাহান্নামও এর থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে। [দেখুন, কুরতুবী; ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৫৯) তাদের পর এল অপদার্থ পরবর্তিগণ, তারা নামায নষ্ট করল ও প্রবৃত্তিপরায়ণ হল; সুতরাং তারা অচিরেই অমঙ্গল প্রত্যক্ষ করবে। [1]

[1] আল্লাহর পুরস্কারপ্রাপ্ত বান্দাদের বর্ণনার পর ঐ সমস্ত লোকেদের কথা বর্ণনা করা হচ্ছে যারা এর বিপরীত আল্লাহর আদেশের অন্যথাচরণ করে ও বিমুখতা অবলম্বন করে। নামায বিনষ্ট করার অর্থ একেবারে নামায না পড়া; যা মূলতঃ কুফরী, অথবা নামাযের সময় বিনষ্ট করা; যার অর্থ সঠিক সময়ে নামায আদায় না করা, যখন ইচ্ছা পড়া বা বিনা ওযরে দুই বা ততোধিক নামাযকে একত্রে পড়া, অথবা কখনো দুই, কখনো চার, কখনো এক, কখনো পাঁচ অক্তের নামায পড়া। এ সমস্ত নামায বিনষ্ট করার অর্থে শামিল। এ রকম ব্যক্তি অত্যন্ত পাপী এবং আয়াতে বর্ণিত শাস্তির যোগ্য। غَي এর অর্থ ধ্বংস, অমঙ্গল, অশুভ পরিণাম বা জাহান্নামের একটি উপত্যকার নাম।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ৬০ اِلَّا مَنۡ تَابَ وَ اٰمَنَ وَ عَمِلَ صَالِحًا فَاُولٰٓئِكَ یَدۡخُلُوۡنَ الۡجَنَّۃَ وَ لَا یُظۡلَمُوۡنَ شَیۡئًا ﴿ۙ۶۰﴾

তবে তারা নয় যারা তাওবা করেছে, ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে; তারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি কোন যুলম করা হবে না। আল-বায়ান

তারা বাদে যারা তাওবাহ করবে, ঈমান আনবে আর সৎ কাজ করবে। ফলে এরাই জান্নাতে প্রবেশ করবে, এদের প্রতি এতটুকু যুলম করা হবে না। তাইসিরুল

কিন্তু তারা নয় - যারা তাওবাহ করেছে, ঈমান আনয়ন করেছে ও সৎ কাজ করেছে; তারাতো জান্নাতে প্রবেশ করবে, তাদের প্রতি কোন যুলম করা হবেনা – মুজিবুর রহমান

Except those who repent, believe and do righteousness; for those will enter Paradise and will not be wronged at all. Sahih International

৬০. কিন্তু তারা নয়—যারা তাওবা করেছে, ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে। তারা তো জান্নাতে প্ৰবেশ করবে। আর তাদের প্রতি কোন যুলুম করা হবে না।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৬০) কিন্তু তারা নয় যারা তওবা করেছে, ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে; তারা তো জান্নাতে প্রবেশ করবে; আর তাদের প্রতি কোন যুলুম করা হবে না। [1]

[1] অর্থাৎ, যে ব্যক্তি তওবা করে নামায ত্যাগ ও খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করা হতে ফিরে আসবে এবং ঈমান ও সৎকাজের দাবীসমূহ পূরণ করবে তারা উল্লিখিত অশুভ পরিণাম হতে পরিত্রাণ লাভ করবে এবং জান্নাতের অধিকারী বিবেচিত হবে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
তাজউইদ কালার কোড
হামযা ওয়াসল মাদ্দে তাবিঈ ইখফা মাদ্দে ওয়াজিব গুন্নাহ মাদ্দে জায়েয নীরব ইদগাম (গুন্নাহ সহ) ক্বলক্বলাহ লাম শামসিয়্যাহ ইদগাম (গুন্নাহ ছাড়া) ইদগাম শাফাউই ইক্বলাব ইখফা শাফাউই মাদ্দে লাযিম ইদগাম মুতাক্বারিবাইন ইদগাম মুতাজানিসাইন