জান্নাত বিষয়ক আয়াতসমূহ ২৭৪ টি
আল-বাকারা
২:২৫ وَ بَشِّرِ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اَنَّ لَہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ ؕ کُلَّمَا رُزِقُوۡا مِنۡہَا مِنۡ ثَمَرَۃٍ رِّزۡقًا ۙ قَالُوۡا ہٰذَا الَّذِیۡ رُزِقۡنَا مِنۡ قَبۡلُ ۙ وَ اُتُوۡا بِہٖ مُتَشَابِہًا ؕ وَ لَہُمۡ فِیۡہَاۤ اَزۡوَاجٌ مُّطَہَّرَۃٌ ٭ۙ وَّ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ ﴿۲۵﴾

যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে তুমি তাদেরকে সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতসমূহ, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হবে নদীসমূহ। যখনই তাদেরকে জান্নাত থেকে কোন ফল খেতে দেয়া হবে, তারা বলবে, ‘এটাই তো পূর্বে আমাদেরকে খেতে দেয়া হয়েছিল’। আর তাদেরকে তা দেয়া হবে সাদৃশ্যপূর্ণ করে এবং তাদের জন্য তাতে থাকবে পবিত্র স্ত্রীগণ এবং তারা সেখানে হবে স্থায়ী। আল-বায়ান

যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তাদেরকে সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য আছে জান্নাত, যার নিম্নদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত। তাদেরকে যখনই ফলমূল খেতে দেয়া হবে, তখনই তারা বলবে, আমাদেরকে পূর্বে জীবিকা হিসেবে যা দেয়া হতো, এতো তারই মতো। একই রকম ফল তাদেরকে দেয়া হবে এবং সেখানে রয়েছে তাদের জন্য পবিত্র সঙ্গিণী, তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে। তাইসিরুল

এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে ও সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করে থাকে তাদেরকে সুসংবাদ প্রদান কর যে, তাদের জন্য এমন জান্নাত রয়েছে যার তলদেশ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত হচ্ছে; যখনই সেখানে তাদেরকে খাবার হিসাবে ফলপুঞ্জ প্রদান করা হবে তখনই তারা বলবেঃ আমাদেরতো এটা পূর্বেই প্রদত্ত হয়েছিল, বস্তুতঃ তাদেরকে একই সদৃশ ফল প্রদান করা হবে, এবং তাদের জন্য তন্মধ্যে শুদ্ধা সহধর্মিনীগণ রয়েছে, এবং তন্মধ্যে তারা চিরকাল অবস্থান করবে। মুজিবুর রহমান

And give good tidings to those who believe and do righteous deeds that they will have gardens [in Paradise] beneath which rivers flow. Whenever they are provided with a provision of fruit therefrom, they will say, "This is what we were provided with before." And it is given to them in likeness. And they will have therein purified spouses, and they will abide therein eternally. Sahih International

২৫. আর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে তাদেরকে শুভ সংবাদ দিন যে, তাদের জুন্য রয়েছে জান্নাত, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত(১)। যখনই তাদেরকে ফলমূল খেতে দেয়া হবে তখনই তারা বলবে, আমাদেরকে - পূর্বে জীবিকা হিসেবে যা দেয়া হত এতো তাই’। আর তাদেরকে তা দেয়া হবে সাদৃশ্যপূর্ণ করেই(২) এবং সেখানে তাদের জন্য রয়েছে পবিত্র সঙ্গিনী(৩)। আর তারা সেখানে স্থায়ী হবে।(৪)

১. 'জান্নাতের তলদেশে নদী প্রবাহিত’ বলে এটাই বোঝানো হয়েছে যে, এর গাছের নীচ দিয়ে ও এর কামরাসমূহের নীচ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত। ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, জান্নাতের নদী-নালাসমূহ মিশকের পাহাড় থেকে নির্গত। [সহীহ ইবনে হিব্বান: ৭৪০৮] আনাস ও ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত যে, 'জান্নাতের নহরসমূহ খাদ হয়ে প্রবাহিত হবে না। [সহীহুত তারগীব] অন্য বর্ণনায় এসেছে, হাউজে কাউসারের দুই তীর লালা-মোতির গড়া বিরাট গম্বুজ বিশিষ্ট হবে। [বুখারী: ৬৫৮১] আর তার মাটি হবে মিশকের সুগন্ধে ভরপুর। তার পথে বিছানো কাঁকরগুলো হলো লাল-জহরত, পান্না-চুন্নি সদৃশ। [ইবনে কাসীর]


২. জান্নাতবাসীদেরকে একই আকৃতি বিশিষ্ট বিভিন্ন ফলমূল পরিবেশনের উদ্দেশ্য হবে পরিতৃপ্তি ও আনন্দ সঞ্চার। কোন কোন তাফসীরকারের মতে ফলমূল পরস্পর সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ার অর্থ জান্নাতের ফলাদি আকৃতিগতভাবে ইহজগতে প্রাপ্ত ফলের অনুরূপই হবে। সেগুলো যখন জান্নাতবাসীদের মধ্যে পরিবেশন করা হবে, তখন তারা বলে উঠবে, অনুরূপ ফল তো আমরা দুনিয়াতেও পেতাম। কিন্তু স্বাদ ও গন্ধ হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের। অপর কোন কোন তাফসীরকারকের মতে, ফলমূল পরস্পর সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ার অর্থ, জান্নাতে পরিবেশিত ফল-মূলাদি দেখে জান্নাতিগণ বলবে যে, এটা তো গতকালও আমাদের দেয়া হয়েছে, তখন জান্নাতের খাদেমগণ তাদের বলবে যে, দেখতে একই রকম হলেও এর স্বাদ ভিন্ন। ইবনে আব্বাস বলেন, দুনিয়ার ফলের সংগে আখেরাতের ফল-মূলের কোন তুলনাই চলবে না, শুধু নামের মিল থাকবে। [ইবনে কাসীর]


৩. মূল আরবী বাক্যে ازواج ‘আযওয়াজ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এটি বহুবচন। এর এক বচন হচ্ছে زوج ‘যওজ’, অর্থ হচ্ছে জোড়া। এ শব্দটি স্বামী বা স্ত্রী অর্থে ব্যবহার করা হয়। স্বামীর জন্য স্ত্রী হচ্ছে ‘যওজ’! আবার স্ত্রীর জন্য স্বামী হচ্ছে ‘যওজ’। তবে আখেরাতে আযওয়াজ অর্থাৎ জোড়া হবে পবিত্রতার গুণাবলী সহকারে। জান্নাতে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন স্ত্রী লাভের অর্থ, তারা হবে পার্থিব যাবতীয় বাহ্যিক ও গঠনগত ক্রটি-বিচূতি ও চরিত্রগত কলুষতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত এবং প্রস্ৰাব-পায়খানা, রজঃস্রাব, প্রসবোত্তর স্রাব প্রভৃতি যাবতীয় ঘৃণ্য বিষয়ের উর্ধ্বে। অনুরূপভাবে নীতিভ্রষ্টতা, চরিত্রহীনতা, অবাধ্যতা প্রভৃতি আভ্যন্তরীণ ক্রটি ও কদৰ্যতার লেশমাত্রও তাদের মধ্যে পাওয়া যাবে না। তাদের গুণাগুণ সম্পর্কে বিভিন্ন আয়াতে এসেছে যে, “তাদের সংগে থাকবে আয়তনয়না, ডাগর চোখ বিশিষ্টাগণ” [সূরা আস-সাফফাত: ৪৮]

আরও বলা হয়েছে, “তারা যেন পদ্মরাগ ও প্রবাল” [সূরা আর-রহমান: ৫৮] আরও এসেছে, “আর তাদের জন্য থাকবে ডাগর চক্ষুবিশিষ্টা হুর, যেন তারা সুরক্ষিত মুক্তা [সূরা আল-ওয়াকি'আ: ২২-২৩) অনুরূপভাবে এসেছে, “আর সমবয়স্কা উদ্ভিন্ন যৌবনা তরুণী” [সূরা আন-নাবা ৩৩] যদি দুনিয়ার কোন সৎকর্মশীল পুরুষের স্ত্রী সৎকর্মশীলা না হয় তাহলে আখেরাতে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। সে ক্ষেত্রে ঐ সৎকর্মশীল পুরুষটিকে অন্য কোন সৎকর্মশীলা স্ত্রী দান করা হবে। আর যদি দুনিয়ায় কোন স্ত্রী হয় সৎকর্মশীলা এবং তার স্বামী হয় অসৎ, তাহলে আখেরাতে ঐ অসৎ স্বামী থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করে কোন সৎ পুরুষকে তার স্বামী হিসেবে দেয়া হবে। তবে যদি দুনিয়ায় কোন স্বামী-স্ত্রী দুজনই সৎকর্মশীল হয়, তাহলে আখেরাতে তাদের এই সম্পর্কটি চিরন্তন ও চিরস্থায়ী সম্পর্কে পরিণত হবে।


৪. বলা হয়েছে যে, জান্নাতের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও ভোগ-বিলাসের উপকরণসমূহকে যেন দুনিয়ার পতনশীল ও ক্ষীয়মান উপকরণসমূহের ন্যায় মনে না করা হয় যাতে যেকোন মূহুর্তে ধ্বংস ও বিলুপ্তির আশংকা থাকে। বরং জান্নাতবাসীগণ অনন্তকাল সুখস্বাচ্ছন্দ্যের এই অফুরন্ত উপকরণসমূহ ভোগ করে বিমল আনন্দ-স্ফূর্তি ও চরম তৃপ্তি লাভ করতে থাকবেন। [ইবনে কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

২৫। যারা বিশ্বাস করে ও সৎকর্ম করে(1) তাদেরকে শুভ সংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত; যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, যখনই তাদের ফলমূল খেতে দেওয়া হবে, তখনই তারা বলবে, ‘আমাদেরকে (পৃথিবীতে অথবা জান্নাতে) পূর্বে জীবিকারূপে যা দেওয়া হত, এ তো তাই।’ তাদেরকে পরস্পর একই সদৃশ ফল(2) দান করা হবে এবং সেখানে তাদের জন্য পবিত্র(3) সহধর্মিণীগণ রয়েছে, অধিকন্তু তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে। (4)

(1) ক্বুরআন কারীম প্রত্যেক স্থানে বিশ্বাস তথা ঈমানের সাথে সাথে সৎকর্ম তথা নেক আমলের কথা উল্লেখ করে এ কথা পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, ঈমান এবং নেক আমল পরস্পর অবিচ্ছেদ্য অংশ। নেক আমল ব্যতীত ঈমান ফলপ্রসূ নয় এবং আল্লাহর নিকট ঈমান ছাড়া নেক আমলের কোন গুরুত্ব নেই। আর নেক আমল তখনই নেক আমল বলে গণ্য হবে, যখন তা সুন্নত (নবী (সাঃ)-এর তরীকা) অনুযায়ী এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য খাঁটি নিয়তে করা হবে। সুন্নত পরিপন্থী আমল গ্রহণযোগ্য নয়। অনুরূপ খ্যাতি লাভ ও লোক দেখানোর জন্য কৃত আমলও প্রত্যাখ্যাত।

(2) مُتَشَابِهًا (সদৃশ)এর অর্থ হয়তো বা জান্নাতের সমস্ত ফলের আকার-আকৃতি এক রকম হবে অথবা তা দুনিয়ার ফলের মত দেখতে হবে। তবে এ সাদৃশ্য কেবল আকার ও নাম পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। নচেৎ জান্নাতের ফলের সবাদের সাথে দুনিয়ার ফলের সবাদের কোন তুলনাই নেই। জান্নাতের নিয়ামতের ব্যাপারে হাদীসে এসেছে, (এমন নিয়ামত) যা কোন চোখ দেখেনি, কোন কান শোনেনি এবং কোন মানুষের অন্তরে তার সঠিক ধারণা উদয় হয়নি। (সহীহ বুখারী, তাফসীর সূরা আলিফ-লাম-মীম সাজদাহ)

(3) অর্থাৎ, মাসিক, নিফাস (প্রসবোত্তর রক্ত) এবং অন্যান্য ঘৃণিত জিনিস থেকে পবিত্রা হবে।

(4) خَالِدِين এর অর্থ চিরস্থায়ী। জান্নাতবাসীরা জান্নাতে চিরকাল থাকবে এবং তারা বড়ই প্রফুল্ল থাকবে। আর জাহান্নামীরা জাহান্নামে অনন্তকাল থাকবে এবং তারা বড় কষ্টে বাস করবে। হাদীসে এসেছে যে, জান্নাতীরা জান্নাতে ও জাহান্নামীরা জাহান্নামে চলে যাওয়ার পর একজন ফিরিশতা ঘোষণা দেবেন, হে জাহান্নামবাসীগণ! আর মৃত্যু নেই। আর হে জান্নাতবাসীগণ! আর মৃত্যু নেই। যে দল যে অবস্থায় আছে, সব সময় ঐ অবস্থাতেই থাকবে। (সহীহ বুখারী, কিতাবুর রিক্বাক্ব, মুসলিম, কিতাবুল জান্নাহ)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:৩৫ وَ قُلۡنَا یٰۤاٰدَمُ اسۡکُنۡ اَنۡتَ وَ زَوۡجُکَ الۡجَنَّۃَ وَ کُلَا مِنۡہَا رَغَدًا حَیۡثُ شِئۡتُمَا ۪ وَ لَا تَقۡرَبَا ہٰذِہِ الشَّجَرَۃَ فَتَکُوۡنَا مِنَ الظّٰلِمِیۡنَ ﴿۳۵﴾

আর আমি বললাম, ‘হে আদম, তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস কর এবং তা থেকে আহার কর স্বাচ্ছন্দ্যে, তোমাদের ইচ্ছানুযায়ী এবং এই গাছটির নিকটবর্তী হয়ো না, তাহলে তোমরা যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। আল-বায়ান

আমি বললাম, ‘হে আদাম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস কর এবং যেখানে যা ইচ্ছে খাও, কিন্তু এই গাছের নিকটে যেয়ো না, গেলে তোমরা সীমালঙ্ঘনকারীদের মধ্যে শামিল হবে’। তাইসিরুল

এবং আমি বললামঃ হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে অবস্থান কর এবং তা হতে যা ইচ্ছা স্বচ্ছন্দে আহার কর; কিন্তু ঐ বৃক্ষের নিকটবর্তী হয়োনা, তাহলে তোমরা অত্যাচারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। মুজিবুর রহমান

And We said, "O Adam, dwell, you and your wife, in Paradise and eat therefrom in [ease and] abundance from wherever you will. But do not approach this tree, lest you be among the wrongdoers." Sahih International

৩৫. আর আমরা বললাম, 'হে আদম! আপনি ও আপনার স্ত্রী(১) জান্নাতে বসবাস করুন এবং যেখান থেকে ইচ্ছা স্বাচ্ছন্দ্যে আহার করুন, কিন্তু এই গাছটির কাছে যাবেন না(২); তাহলে আপনারা হবে যালিমদের(৩) অন্তর্ভুক্ত।

১. কুরআনের বাকরীতি দ্বারা বোঝা যায় যে, আদম আলাইহিস সালাম এর জান্নাতে প্রবেশের আগেই হাওয়াকে সৃষ্টি করা হয়। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক বলেন, আল্লাহ তা'আলা ইবলীসকে অভিশপ্ত করার পর আদমের প্রতি মনোনিবেশ করলেন। আদম আলাইহিস সালামকে তন্দ্রাচ্ছন্ন করা হল এবং তার বাম পাঁজর থেকে একখানা হাড় নেয়া হলো। আর সে স্থানে গোশত সংযোজন করা হলো। তখনও আদম ঘুমিয়ে ছিলেন। তখন হাড় থেকে তার স্ত্রী হাওয়াকে সৃষ্টি করা হল এবং তাকে যথাযথ রূপ দান করা হল যেন আদম তার সাহচর্যে পরিতৃপ্ত থাকেন। যখন তন্দ্রাচ্ছন্নতা কাটল এবং নিদ্রা থেকে জাগ্রত হলেন, তখন হাওয়াকে তার পাশে বসা দেখলেন। সাথে সাথে তিনি বললেন, আমার গোশত, আমার রক্ত ও আমার স্ত্রী [ইবনে কাসীর]

অন্য বর্ণনায় ইবনে মাসউদ, ইবনে আব্বাস এবং অন্যান্য সাহাবী থেকে এসেছে, ইবলীসকে জান্নাত থেকে বের করা হল আর আদমকে জান্নাতে বসবাসের সুযোগ দেয়া হল। কিন্তু তিনি জান্নাতে একাকীত্ব অনুভব করতে থাকলেন। তারপর তার ঘুম আসল, সে ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে দেখতে পেলেন যে, তার মাথার পাশে একজন মহিলা বসে আছেন, যাকে তার পাঁজর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তিনি তাকে প্রশ্ন করলেন, তুমি কে? বললেন, মহিলা। আদম বললেন, তোমাকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে? বললেন, যাতে তুমি আমার কাছে প্রশান্তি লাভ কর। তখন ফেরেশতাগণ তাকে প্রশ্ন করলেন: হে আদম! এর নাম কি? আদম বললেন, হাওয়া। তারা বলল, তাকে হাওয়া কেন নাম দেয়া হল? তিনি বললেন, কেননা তাকে জীবিত বস্তু থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। [ইবনে কাসীর]

এর সমর্থনে আমরা একটি হাদীস পাই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমরা নারীদের ব্যাপারে আমার উপদেশ গ্রহণ কর। কেননা, তাদেরকে পাঁজর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর পাঁজরের সবচেয়ে বাঁকা অংশ হচ্ছে, উপরিভাগ। তুমি যদি তাকে সোজা করতে যাও তবে তাকে ভেঙ্গে ফেলবে। আর যদি ছেড়ে দাও, সব সময় বাঁকাই থেকে যাবে। সুতরাং নারীদের ব্যাপারে উপদেশ গ্রহণ কর। [বুখারী ৩৩৩১, মুসলিম: ১৪৬৮] হাফেজ ইবনে হাজার এ হাদীসের ব্যাখ্যায় ইবনে ইসহাক থেকে উপরোক্ত বর্ণনা উল্লেখ করেন।


২. কোন বিশেষ গাছের প্রতি ইংগিত করে বলা হয়েছিল যে, এর ধারে কাছেও যেও না। প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল, সে গাছের ফল না খাওয়া। কিন্তু তাকীদের জন্য বলা হয়েছে, কাছেও যেও না। সেটি কি গাছ ছিল, কুরআনুল কারীমে তা উল্লেখ করা হয়নি। কোন নির্ভরযোগ্য ও বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারাও তা নির্দিষ্ট করা হয়নি। এ নিষেধাজ্ঞার ফলে এ কথা সুস্পষ্ট বুঝা যায় যে, সে বৃক্ষের ফল না খাওয়া ছিল এ নিষেধাজ্ঞার প্রকৃত উদ্দেশ্য। কিন্তু সাবধানতা-সূচক নির্দেশ ছিল এই যে, সে গাছের কাছেও যেও না। এর দ্বারাই ফিকাহশাস্ত্রের কারণ-উপকরণের নিষিদ্ধতার মাসআলাটি প্রমাণিত হয়। অর্থাৎ কোন বস্তু নিজস্বভাবে অবৈধ বা নিষিদ্ধ না হলেও যখন তাতে এমন আশংকা থাকে যে, ঐ বস্তু গ্রহণ করলে অন্য কোন হারাম ও অবৈধ কাজে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে, তখন ঐ বৈধ বস্তুও নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়। যেমন, গাছের কাছে যাওয়া তার ফল-ফসল খাওয়ার কারণও হতে পারতো। সেজন্য তাও নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। একে ফিকাহশাস্ত্রের পরিভাষায় উপকরণের নিষিদ্ধতা বলা হয়।


৩. যালিম শব্দটি গভীর অর্থবোধক। ‘যুলুম’ বলা হয় অধিকার হরণকে। যে ব্যক্তি কারো অধিকার হরণ করে সে যালিম। যে ব্যক্তি আল্লাহর হুকুম পালন করে না, তার নাফরমানি করে সে আসলে তিনটি বড় বড় মৌলিক অধিকার হরণ করে। প্রথমতঃ সে আল্লাহর অধিকার হরণ করে। কারণ আল্লাহর হুকুম পালন করতে হবে, এটা বান্দার প্রতি আল্লাহর অধিকার। দ্বিতীয়তঃ এ নাফরমানি করতে গিয়ে সে যে সমস্ত জিনিষ ব্যবহার করে তাদের সবার অধিকার সে হরণ করে। তার দেহের অংগপ্রত্যংগ, স্নায়ুমণ্ডলী, তার সাথে বসবাসকারী সমাজের অন্যান্য লোক, তার ইচ্ছা ও সংকল্প পূর্ণ করার ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত ফেরেশতাগণ এবং যে জিনিষগুলো সে তার কাজে ব্যবহার করে-এদের সবার তার উপর অধিকার ছিল, এদেরকে কেবলমাত্র এদের মালিকের ইচ্ছানুযায়ী ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু যখন তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সে তাদের উপর নিজের কর্তৃত্ব ব্যবহার করে তখন সে আসলে তাদের উপর যুলুম করে। তৃতীয়তঃ তার নিজের অধিকার হরণ করে। কারণ তার উপর তার আপন সত্তাকে ধ্বংস থেকে বাচাবার অধিকার আছে। কিন্তু নাফরমানি করে যখন সে নিজেকে আল্লাহর শাস্তি লাভের অধিকারী করে তখন সে আসলে ব্যক্তি সত্তার উপর যুলুম করে। এসব কারণে কুরআনের বিভিন্ন স্থানে ‘গোনাহ’ শব্দটির জন্য যুলুম এবং ‘গোনাহগার’ শব্দের জন্য যালিম ব্যবহার করা হয়েছে।

তাফসীরে জাকারিয়া

৩৫। আমি বললাম, ‘হে আদম! তুমি তোমার স্ত্রীসহ জান্নাতে বসবাস কর (1) এবং যথা ও যেথা ইচ্ছা আহার কর, কিন্তু এই বৃক্ষের নিকটবর্তী হয়ো না; (2) হলে তোমরা অনাচারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’

(1) এটা আদম (আঃ)-এর তৃতীয় ফযীলত। জান্নাতকে তাঁর জন্য বাসস্থান বানানো হয়েছিল।

(2) এই গাছটি কিসের গাছ ছিল? ক্বুরআন ও হাদীসে এর কোন পরিষ্কার বর্ণনা নেই। তা গমের গাছ বলে যে লোকমাঝে প্রসিদ্ধি আছে তার কোন ভিত্তি নেই। পক্ষান্তরে আমাদের গাছের নাম জানার কোন প্রয়োজন নেই এবং তাতে কোন লাভও নেই।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:৮২ وَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ الۡجَنَّۃِ ۚ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ ﴿۸۲﴾

আর যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, তারা জান্নাতের অধিবাসী। তারা সেখানে হবে স্থায়ী। আল-বায়ান

আর যারা ঈমান আনে ও নেক ‘আমাল করে তারাই জান্নাতবাসী, তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে। তাইসিরুল

এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে ও সৎ কাজ করছে তারাই জান্নাতবাসী, তন্মধ্যে তারা চিরকাল অবস্থান করবে। মুজিবুর রহমান

But they who believe and do righteous deeds - those are the companions of Paradise; they will abide therein eternally. Sahih International

৮২. আর যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে তারাই জান্নাতবাসী, তারা সেখানে স্থায়ী হবে।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

৮২। পক্ষান্তরে যারা বিশ্বাস করেছে (মু’মিন হয়েছে) এবং সৎকাজ করেছে, তারাই হবে জান্নাতের অধিবাসী; তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। [1]

[1] এখানে ইয়াহুদীদের দাবী খন্ডন করে জান্নাত ও জাহান্নামে যাওয়ার মূলনীতির কথা বর্ণনা করা হচ্ছে। যার আমলনামায় কেবল পাপ আর পাপই থাকবে; অর্থাৎ, কুফরী ও শির্ক, (এই কুফরী ও শির্কীয় কর্ম সম্পাদনের কারণে তাদের অনেক ভাল কাজও কোন উপকারে আসবে না) সে তো চিরস্থায়ী জাহান্নামবাসী হবে এবং যে ঈমান ও নেক আমলের ভূষণে ভূষিত হবে, সে জান্নাতবাসী হবে। আর যে মুমিন পাপী হবে, তার ব্যাপার আল্লাহর ইচ্ছাধীন থাকবে, তিনি ইচ্ছা করলে স্বীয় অনুগ্রহ ও দয়ায় তাকে ক্ষমা করে দেবেন অথবা শাস্তি স্বরূপ কিছু দিন জাহান্নামে রেখে নবী করীম (সাঃ)-এর সুপারিশে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আর এ কথা বহু সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত এবং আহলে সুন্নাহর এটাই আক্বীদা ও বিশ্বাস।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:১১১ وَ قَالُوۡا لَنۡ یَّدۡخُلَ الۡجَنَّۃَ اِلَّا مَنۡ کَانَ ہُوۡدًا اَوۡ نَصٰرٰی ؕ تِلۡکَ اَمَانِیُّہُمۡ ؕ قُلۡ ہَاتُوۡا بُرۡہَانَکُمۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ ﴿۱۱۱﴾

আর তারা বলে, ইয়াহূদী কিংবা নাসারা ছাড়া অন্য কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এটা তাদের মিথ্যা আশা। বল, ‘তোমরা তোমাদের প্রমাণ নিয়ে আস, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক’। আল-বায়ান

তারা বলে, ইয়াহূদী এবং নাসারাগণ ছাড়া কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, ওটা তাদের আকাঙ্ক্ষা মাত্র। বল, ‘যদি তোমরা সত্যবাদী হও, তবে নিজেদের দলীল পেশ কর’। তাইসিরুল

এবং তারা বলেঃ ইয়াহুদী বা খৃষ্টান ছাড়া আর কেহই জান্নাতে প্রবেশ করবেনা; এটা তাদের মিথ্যা আশা। তুমি বলঃ যদি তোমরা সত্যবাদী হও তাহলে তোমাদের প্রমাণ উপস্থিত কর। মুজিবুর রহমান

And they say, "None will enter Paradise except one who is a Jew or a Christian." That is [merely] their wishful thinking, Say, "Produce your proof, if you should be truthful." Sahih International

১১১. আর তারা বলে, ইয়াহুদী অথবা নাসারা ছাড়া অন্য কেউ কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না’(১)। এটা তাদের মিথ্যা আশা। বলুন, “যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে তোমাদের প্রমাণ পেশ কর”।

(১) আলোচ্য আয়াতসমূহে আল্লাহ্ তা'আলা ইয়াহুদী ও নাসারাদের পারস্পরিক মতবিরোধের উল্লেখ করে তাদের নির্বুদ্ধিতা ও মতবিরোধের কুফল বর্ণনা করেছেন। অতঃপর আসল সত্য উদঘাটন করেছেন। নাসারা ও ইয়াহুদী উভয় সম্প্রদায়ই দ্বীনের প্রকৃত সত্যকে উপেক্ষা করে ধর্মের নাম-ভিত্তিক জাতীয়তা গড়ে তুলেছিল এবং তারা প্রত্যেকেই স্বজাতিকে জান্নাতী ও আল্লাহর প্রিয়পাত্র বলে দাবী করত এবং তাদের ছাড়া অন্যান্য জাতিকে জাহান্নামী ও পথভ্রষ্ট বলে বিশ্বাস করত। আল্লাহ তা'আলা তাদের মূর্খতা সম্পর্কে মন্তব্য করছেন যে, এরা জান্নাতে যাওয়ার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে উদাসীন। জানাতে যাওয়ার প্রকৃত উপায় পরবর্তী আয়াতে বলে দেয়া হয়েছে।

তাফসীরে জাকারিয়া

১১১। তারা বলে, ‘ইয়াহুদী বা খ্রিষ্টান ছাড়া অন্য কেউ কখনও বেহেশত প্রবেশ করবে না।’ এ তাদের মিথ্যা আশা। বল, ‘যদি তোমরা সত্যবাদী হও, তাহলে (এ কথার সত্যতার) প্রমাণ উপস্থিত কর।’ [1]

[1] এখানে আহলে-কিতাবদের অহংকার ও তাদের সেই আত্মপ্রবঞ্চনার কথাকে আবারও তুলে ধরা হচ্ছে, যাতে তারা লিপ্ত ছিল। আল্লাহ তাআলা বললেন, এটা কেবল ওদের মনের বাসনা, এ ব্যাপারে কোন দলীল তাদের কাছে নেই।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:২১৪ اَمۡ حَسِبۡتُمۡ اَنۡ تَدۡخُلُوا الۡجَنَّۃَ وَ لَمَّا یَاۡتِکُمۡ مَّثَلُ الَّذِیۡنَ خَلَوۡا مِنۡ قَبۡلِکُمۡ ؕ مَسَّتۡہُمُ الۡبَاۡسَآءُ وَ الضَّرَّآءُ وَ زُلۡزِلُوۡا حَتّٰی یَقُوۡلَ الرَّسُوۡلُ وَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا مَعَہٗ مَتٰی نَصۡرُ اللّٰہِ ؕ اَلَاۤ اِنَّ نَصۡرَ اللّٰہِ قَرِیۡبٌ ﴿۲۱۴﴾

নাকি তোমরা ভেবেছ যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে অথচ এখনো তোমাদের নিকট তাদের মত কিছু আসেনি, যারা তোমাদের পূর্বে বিগত হয়েছে। তাদেরকে স্পর্শ করেছিল কষ্ট ও দুর্দশা এবং তারা কম্পিত হয়েছিল। এমনকি রাসূল ও তার সাথি মুমিনগণ বলছিল, ‘কখন আল্লাহর সাহায্য (আসবে)’? জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী। আল-বায়ান

তোমরা কি এমন ধারণা পোষণ কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ লাভ করবে, অথচ এখনও পর্যন্ত তোমাদের আগের লোকেদের মত অবস্থা তোমাদের সামনে আসেনি? তাদেরকে অভাবের তীব্র তাড়না এবং মুসীবত স্পর্শ করেছিল এবং তারা এতদূর বিকম্পিত হয়েছিল যে, নাবী ও তার সঙ্গের মু’মিনগণ চিৎকার করে বলেছিল- আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে? জেনে রেখ, নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী। তাইসিরুল

তোমরা কি মনে করেছ যে, তোমরাই জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ তোমরা এখনও তাদের অবস্থা প্রাপ্ত হওনি যারা তোমাদের পূর্বে বিগত হয়েছে; তাদেরকে বিপদ ও দুঃখ স্পর্শ করেছিল এবং তাদেরকে প্রকম্পিত করা হয়েছিল; এমন কি রাসূল ও তৎসহ বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ বলেছিলঃ কখন আল্লাহর সাহায্য আসবে? সতর্ক হও, নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী। মুজিবুর রহমান

Or do you think that you will enter Paradise while such [trial] has not yet come to you as came to those who passed on before you? They were touched by poverty and hardship and were shaken until [even their] messenger and those who believed with him said, "When is the help of Allah?" Unquestionably, the help of Allah is near. Sahih International

২১৪. নাকি তোমরা মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে(১) অথচ এখনো তোমাদের কাছে তোমাদের পূর্ববর্তীদের মত অবস্থা আসেনি? অর্থ-সংকট ও দুঃখ-ক্লেশ তাদেরকে স্পর্শ করেছিল এবং তারা ভীত-কম্পিত হয়েছিল এমনকি রাসূল ও তার সংগী-সাথী ঈমানদারগণ বলে উঠেছিল, আল্লাহ্‌র সাহায্য কখন আসবে?(২) জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহর সাহায্য অতি নিকটে।

(১) এ আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, পরিশ্রম ও মেহনত ব্যতীত এবং বিপদ-আপদে পতিত হওয়া ছাড়া কেউই জান্নাত লাভ করতে পারবে না। তবে কষ্ট ও পরিশ্রমের স্তর বিভিন্ন। নিন্মস্তরের পরিশ্রম ও কষ্ট হচ্ছে স্বীয় জৈবিক কামনা-বাসনা ও শয়তানের প্রতারণা থেকে নিজেকে রক্ষা করে কিংবা সত্য দ্বীনের বিরুদ্ধবাদীদের বিরুদ্ধাচরণ করে নিজের বিশ্বাস ও আকীদাকে ঠিক করা। এ স্তর প্রত্যেক মুমিনেরই অর্জন করতে হয়। অতঃপর মধ্যম ও উচ্চস্তরের বর্ণনা- যে পরিমাণ কষ্ট ও পরিশ্রম করতে হবে, সে স্তরেরই জান্নাত লাভ হবে। এভাবে কষ্ট ও পরিশ্রম হতে কেউই রেহাই পায়নি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সবচাইতে অধিক বালা-মুসীবতে পতিত হয়েছেন নবী-রাসূলগণ। তারপর (মর্যাদার দিক থেকে) তাদের নিকটবর্তী ব্যক্তিবর্গ’। [ইবনে মাজাহঃ ৪০২৩]


(২) নবীগণ ও তাদের সাথীদের প্রার্থনা যে, ‘আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে’ তা কোন সন্দেহের কারণে নয়। বরং এ প্রশ্নের উদ্দেশ্য ছিল এই যে, যদিও আল্লাহ্ তাআলা সাহায্যের ওয়াদা করেছেন, এর সময় ও স্থান নির্ধারণ করেননি। অতএব, এ অশান্ত অবস্থায় এ ধরনের প্রার্থনার অর্থ ছিল এই যে, সাহায্য তাড়াতাড়ি আসুক। এমন প্রার্থনা আল্লাহর প্রতি ভরসা ও শানে নবুওয়াতের খেলাফ নয়। বরং আল্লাহ্ তাআলা স্বীয় বান্দাদের সবিনয় প্রার্থনাকে পছন্দ করেন। বস্তুত নবী এবং সালেহীনগণই এরূপ প্রার্থনার অধিক উপযুক্ত।

তাফসীরে জাকারিয়া

(২১৪) তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা বেহেশত প্রবেশ করবে; যদিও পূর্বে যারা গত হয়েছে তাদের অবস্থা এখনো তোমরা প্রাপ্ত হওনি?[1] দুঃখ-দারিদ্র্য ও রোগ-বালা তাদেরকে স্পর্শ করেছিল এবং তারা ভীত-কম্পিত হয়েছিল। তারা এতদূর বিচলিত হয়েছিল যে, রসূল ও তাঁর প্রতি বিশ্বাসস্থাপনকারিগণ বলে উঠেছিল, ‘আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে?’ জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী।[2]

[1] মদীনায় হিজরত করার পর মুসলিমরা যখন ইয়াহুদী, মুনাফিক এবং আরবের মুশরিকদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পীড়া ও কষ্ট পেতে লাগল, তখন কোন কোন মুসলিম নবী করীম (সাঃ)-এর কাছে অভিযোগ করল। তাই মুসলিমদেরকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য এই আয়াত নাযিল হল এবং রসূল (সাঃ) ও বললেন যে, তোমাদের পূর্বের লোকদেরকে তাদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত করাত দিয়ে চিরা হত এবং লোহার চিরুনী দিয়ে তাঁদের গোশত ও চামড়াকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করা হত। কিন্তু এই অকথ্য যুলুম-নির্যাতন তাদেরকে তাদের দ্বীন থেকে ফেরাতে পারেনি।’’ অতঃপর বললেন, ‘‘আল্লাহর শপথ! মহান আল্লাহ এই দ্বীনকে এমনভাবে জয়যুক্ত করবেন যে, একজন আরোহী (ইয়ামানের) সানআ’ থেকে হাযরে-মাউত পর্যন্ত একা সফর করবে, তার মধ্যে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ভয় থাকবে না।’’ (সহীহ বুখারী ৩৬১২নং) এ থেকে নবী করীম (সাঃ)-এর উদ্দেশ্য, মুসলিমদের মধ্যে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার প্রেরণা ও অটল থাকার দৃঢ় সংকল্প সৃষ্টি করা।

[2] এই জন্যই বলা হয়, ‘যা আসবেই, তা আসন্ন’। আর ঈমানদারদের জন্য আল্লাহর সাহায্য যেহেতু সুনিশ্চিত তাই তা নিকটেই।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:২২১ وَ لَا تَنۡکِحُوا الۡمُشۡرِکٰتِ حَتّٰی یُؤۡمِنَّ ؕ وَ لَاَمَۃٌ مُّؤۡمِنَۃٌ خَیۡرٌ مِّنۡ مُّشۡرِکَۃٍ وَّ لَوۡ اَعۡجَبَتۡکُمۡ ۚ وَ لَا تُنۡکِحُوا الۡمُشۡرِکِیۡنَ حَتّٰی یُؤۡمِنُوۡا ؕ وَ لَعَبۡدٌ مُّؤۡمِنٌ خَیۡرٌ مِّنۡ مُّشۡرِکٍ وَّ لَوۡ اَعۡجَبَکُمۡ ؕ اُولٰٓئِکَ یَدۡعُوۡنَ اِلَی النَّارِ ۚۖ وَ اللّٰہُ یَدۡعُوۡۤا اِلَی الۡجَنَّۃِ وَ الۡمَغۡفِرَۃِ بِاِذۡنِہٖ ۚ وَ یُبَیِّنُ اٰیٰتِہٖ لِلنَّاسِ لَعَلَّہُمۡ یَتَذَکَّرُوۡنَ ﴿۲۲۱﴾

আর তোমরা মুশরিক নারীদের বিয়ে করো না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে এবং মুমিন দাসী মুশরিক নারীর চেয়ে নিশ্চয় উত্তম, যদিও সে তোমাদেরকে মুগ্ধ করে। আর মুশরিক পুরুষদের সাথে বিয়ে দিয়ো না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে। আর একজন মুমিন দাস একজন মুশরিক পুরুষের চেয়ে উত্তম, যদিও সে তোমাদেরকে মুগ্ধ করে। তারা তোমাদেরকে আগুনের দিকে আহবান করে, আর আল্লাহ তাঁর অনুমতিতে তোমাদেরকে জান্নাত ও ক্ষমার দিকে আহবান করেন এবং মানুষের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ স্পষ্টরূপে বর্ণনা করেন, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করতে পারে। আল-বায়ান

মুশরিকা নারীরা ঈমান না আনা পর্যন্ত তোমরা তাদেরকে বিবাহ করো না। মূলতঃ মু’মিন ক্রীতদাসী মুশরিকা নারী হতে উত্তম ওদেরকে তোমাদের যতই ভাল লাগুক না কেন, ঈমান না আনা পর্যন্ত মুশরিক পুরুষদের সাথে বিবাহ দিও না, বস্তুতঃ মুশরিককে তোমাদের যতই ভাল লাগুক না কেন, মু’মিন গোলাম তার চেয়ে উত্তম। ওরা অগ্নির দিকে আহবান করে আর আল্লাহ নিজের অনুগ্রহে জান্নাত ও ক্ষমার দিকে আহবান করেন। তিনি মানুষদের জন্য নিজের হুকুমগুলো বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করছেন যাতে তারা শিক্ষা গ্রহণ করে। তাইসিরুল

এবং মুশরিক নারীকে ঈমান না আনা পর্যন্ত তোমরা বিয়ে করনা এবং নিশ্চয়ই মু’মিন কৃতদাসী মুশরিক মহিলা অপেক্ষা উত্তম যদিও সে তোমাদেরকে মোহিত করে; এবং অংশীবাদীরা বিশ্বাস স্থাপন না করা পর্যন্ত তাদের সাথে (মুসলিম নারীদের) বিয়ে দিওনা এবং নিশ্চয়ই অংশীবাদী তোমাদের মনঃপুত হলেও বিশ্বাসী দাস তদপেক্ষা শ্রেয়তর; এরাই জাহান্নামের দিকে আহবান করে এবং আল্লাহ স্বীয় ইচ্ছায় জান্নাত ও ক্ষমার দিকে আহবান করেন ও মানবমন্ডলীর জন্য স্বীয় নিদর্শনাবলী বিবৃত করেন যেন তারা শিক্ষা গ্রহণ করে। মুজিবুর রহমান

And do not marry polytheistic women until they believe. And a believing slave woman is better than a polytheist, even though she might please you. And do not marry polytheistic men [to your women] until they believe. And a believing slave is better than a polytheist, even though he might please you. Those invite [you] to the Fire, but Allah invites to Paradise and to forgiveness, by His permission. And He makes clear His verses to the people that perhaps they may remember. Sahih International

২২১. আর মুশরিক নারীকে ঈমান না আনা পর্যন্ত তোমরা বিয়ে করো না(১)। মুশরিক নারী তোমাদেরকে মুগ্ধ করলেও অবশ্যই মুমিন কৃতদাসী তার চেয়ে উত্তম। ঈমান না আনা পর্যন্ত মুশরিক পুরুষদের সাথে তোমরা বিয়ে দিও না(২), মুশরিক পুরুষ তোমাদেরকে মুগ্ধ করলেও অবশ্যই মুমিন ক্রীতদাস তার চেয়ে উত্তম। তারা আগুনের দিকে আহবান করে। আর আল্লাহ তোমাদেরকে নিজ ইচ্ছায় জান্নাত ও ক্ষমার দিকে আহবান করেন(৩)। আর তিনি মানুষের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন, যাতে তারা শিক্ষা নিতে পারে।

(১) আয়াতে মুশরিক শব্দ দ্বারা সাধারণ অমুসলিমকে বোঝানো হয়েছে। কারণ, কুরআনুল কারীমের অন্য এক আয়াতের দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, প্রকৃত কিতাবে বিশ্বাসী নারীরা এ আদেশের অন্তর্ভুক্ত নয়। বলা হয়েছে, “তোমাদের আগে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের সচ্চরিত্রা নারী তোমাদের জন্য বৈধ করা হলো” [সূরা আল-মায়েদাহঃ ৫]। তাই এখানে মুশরিক বলতে ঐ সব বিশেষ অমুসলিমকেই বোঝানো হয়েছে, যারা কোন নবী কিংবা আসমানী কিতাবে বিশ্বাস করে না। আহলে কিতাব ইয়াহুদী ও নাসারা নারীদের সাথে মুসলিম পুরুষদের সম্পর্কের অর্থ হচ্ছে এই যে, যদি তাদেরকে বিবাহ করা হয়, তবে বিবাহ ঠিক হবে এবং স্বামীর পরিচয়েই সন্তানদের বংশ সাব্যস্ত হবে। কিন্তু আল্লাহর কাছে এ বিবাহও পছন্দনীয় নয়।

মুসলিম বিবাহের জন্য দ্বীনদার ও সৎ স্ত্রীর অনুসন্ধান করবে, যাতে করে সে তার দ্বীনী ব্যাপারে সাহায্যকারীর ভূমিকা পালন করতে পারে। এতে করে তাদের সন্তানদেরও দ্বীনদার হওয়ার সুযোগ মিলবে। যখন কোন দ্বীনহীন মুসলিম মেয়ের সাথে বিবাহ পছন্দ করা হয়নি, সে ক্ষেত্রে অমুসলিম মেয়ের সাথে কিভাবে বিবাহ পছন্দ করা হবে? এ কারণেই উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন খবর পেলেন যে, ইরাক ও শাম দেশের মুসলিমদের এমন কিছু স্ত্রী রয়েছে এবং দিন দিন তাদের সংখ্যা বেড়ে চলেছে, তখন তিনি ফরমান জারি করলেন যে, তা হতে পারে না। তাদেরকে সতর্ক করে দেয়া হলো যে, এটা বৈবাহিক জীবন তথা দ্বীনী জীবনের জন্য যেমন অকল্যাণকর, তেমনি রাজনৈতিক দিক দিয়েও ক্ষতির কারণ। [তাফসীরে কুরতুবী: ৩/৪৫৬]

বর্তমান যুগের অমুসলিম আহলে কিতাব, ইয়াহুদী ও নাসারা এবং তাদের রাজনৈতিক ধোঁকা-প্রতারণা, বিশেষতঃ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত বিবাহ এবং মুসলিম সংসারে প্রবেশ করে তাদেরকে নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করা এবং মুসলিমদের গোপন তথ্য জানার প্রচেষ্টা আজ স্বীকৃত সত্যে পরিণত হয়েছে। ইসলামের খলীফা উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সুদূর প্রসারী দৃষ্টিশক্তি বৈবাহিক ব্যাপার সংক্রান্ত এ বিষয়টির সর্বনাশা দিক উপলব্ধি করতে সমর্থ হয়েছিলেন। বিশেষতঃ বর্তমানে পাশ্চাত্যের দেশসমূহে যারা ইয়াহুদী ও নাসারা নামে পরিচিত এবং আদম-শুমারীর খাতায় যাদেরকে দ্বীনী দিক থেকে ইয়াহুদী কিংবা নাসারা বলে লেখা হয়, যদি তাদের প্রকৃত দ্বীনের অনুসন্ধান করা যায়, তবে দেখা যাবে যে, নাসারা ও ইয়াহুদী মতের সাথে তাদের আদৌ কোন সম্পর্ক নেই। তারা সম্পূর্ণভাবেই দ্বীন বর্জনকারী। তারা ঈসা আলাইহিস সালামকেও মানে না, তাওরাতকেও মানে না, এমনকি আল্লাহর অস্তিত্বও মানে না, আখেরাতও মানে না।

বলাবাহুল্য, বিবাহ হালাল হওয়ার কুরআনী আদেশ এমন সব ব্যক্তিদেরকে অন্তর্ভুক্ত করে না। তাদের মেয়েদের সাথে বিবাহ সম্পূর্ণই হারাম। সূরা আল-মায়েদাহ এর আয়াতে যাদের বিয়ে করার অনুমতি দেয়া হয়েছে, আজকালকার ইয়াহুদী-নাসারারা তার আওতায় পড়ে না। সে হিসেবে সাধারণ অমুসলিমদের মত তাদের মেয়েদের সাথেও বিবাহ করা হারাম। মানুষ অত্যন্ত ভুল করে যে, খোঁজ-খবর না নিয়েই পাশ্চাত্যের মেয়েদেরকে বিয়ে করে বসে। এমনিভাবে যে গিয়ে পৌছেছে, তার সাথে মুসলিম নারীর বিয়ে জায়েয নয়। আর যদি বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর তার আকীদা এমনি বিকৃত হয়ে পড়ে তবে তাদের বিয়ে ছিন্ন হয়ে যাবে। আজকাল অনেকেই নিজের দ্বীন সম্পর্কে অন্ধ ও অজ্ঞ এবং সামান্য কিছুটা আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা করেই স্বীয় দ্বীনের আকীদা নষ্ট করে বসে। কাজেই প্রথমে ছেলের আকীদা সম্পর্কে খোজ-খবর তারপর বিয়ে সম্পর্কে চূড়ান্ত কথা দেয়া মেয়েদের অভিভাবকদের উপর ওয়াজিব। [মাআরিফুল কুরআন থেকে সংক্ষেপিত]


(২) উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, কোন মুসলিম অমুসলিম মহিলাকে বিয়ে করতে পারে কিন্তু কোন অমুসলিমের সাথে কোন মুসলিম মহিলাকে বিয়ে দেয়া যাবে না। [তাবারী] যুহরী, কাতাদাহ বলেন, কোন অমুসলিম চাই সে ইয়াহুদী হোক বা নাসারা বা মুশরিক তার কাছে কোন মুসলিম মহিলাকে বিয়ে দেয়া যাবে না। [তাফসীরে আবদুর রাজ্জাক] এ ব্যাপারে উম্মতের ঐক্যমত রয়েছে।


(৩) আলোচ্য আয়াতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা বর্ণনা করা হয়েছে যে, মুসলিম পুরুষের বিয়ে কাফের নারীর সাথে এবং কাফের পুরুষের বিয়ে মুসলিম নারীর সাথে হতে পারে না। কারণ, কাফের স্ত্রী-পুরুষ মানুষকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। সাধারণত বৈবাহিক সম্পর্ক পরস্পরের ভালবাসা, নির্ভরশীলতা এবং একাত্মতায় পরস্পরকে আকর্ষণ করে। তা ব্যতীত এ সম্পর্কে প্রকৃত উদ্দেশ্য সাধিত হয় না। আর মুশরিকদের সাথে এ জাতীয় সম্পর্কের ফলে ভালবাসা ও নির্ভরশীলতার অপরিহার্য পরিণাম দাঁড়ায় এই যে, তাদের অন্তরে কুফর ও শির্কের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হয় অথবা কুফর ও শির্কের প্রতি ঘৃণা তাদের অন্তর থেকে উঠে যায়। এর পরিণামে শেষ পর্যন্ত সেও কুফর ও শির্কে জড়িয়ে পড়ে; যার পরিণতি জাহান্নাম। এজন্যই বলা হয়েছে যে, এসব লোক জাহান্নামের দিকে আহবান করে। আল্লাহ্ তা'আলা জান্নাত ও মাগফেরাতের দিকে আহবান করেন এবং পরিস্কারভাবে নিজের আদেশ বর্ণনা করেন, যাতে মানুষ উপদেশ মত চলে। [মাআরিফুল কুরআন]

তাফসীরে জাকারিয়া

(২২১) অংশীবাদী রমণী যে পর্যন্ত না (ইসলাম ধর্মে) বিশ্বাস করে তোমরা তাদেরকে বিবাহ করো না। [1] অংশীবাদী নারী তোমাদেরকে চমৎকৃত করলেও নিশ্চয় (ইসলাম ধর্মে) বিশ্বাসী ক্রীতদাসী তার থেকেও উত্তম। (ইসলাম ধর্মে) বিশ্বাস না করা পর্যন্ত অংশীবাদী পুরুষের সাথে (তোমাদের কন্যার) বিবাহ দিয়ো না। অংশীবাদী পুরুষ তোমাদেরকে চমৎকৃত করলেও (ইসলাম ধর্মে) বিশ্বাসী ক্রীতদাস তার থেকেও উত্তম। কারণ, ওরা তোমাদের আগুনের দিকে আহবান করে এবং আল্লাহ তোমাদেরকে স্বীয় ইচ্ছায় বেহেশত ও ক্ষমার দিকে আহবান করেন। তিনি মানুষের জন্য স্বীয় নিদর্শনসমূহ সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন, যাতে তারা তা থেকে উপদেশ গ্রহণ করতে পারে।

 [1] ‘অংশীবাদী রমণী’ বা মুশরিক নারী বলতে এখানে মূর্তিপূজক নারীদেরকে বুঝানো হয়েছে। কেননা, আহলে কিতাব (ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টান) নারীদের সাথে বিবাহ করার অনুমতি কুরআন দিয়েছে। অবশ্য কোন মুসলিম নারীর বিবাহ কোন আহলে কিতাব পুরুষের সাথে হতে পারে না। পরন্তু উমার (রাঃ) কোন সৎ উদ্দেশ্যেও ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টান নারীদের সাথেও বিবাহ পছন্দ করতেন না। (ইবনে কাসীর) আলোচ্য আয়াতে মু’মিনদেরকে কেবল ঈমানদার পুরুষ ও নারীদের পরস্পর বিবাহ দেওয়ার উপর তাকীদ করা হয়েছে এবং দ্বীনকে দৃষ্টিচ্যুত করে কেবল রূপ-সৌন্দর্যের ভিত্তিতে বিবাহ করাকে আখেরাতের জন্য বরবাদী সাব্যস্ত করা হয়েছে। যেমন হাদীসে নবী করীম (সাঃ) বলেছেন যে, ‘‘চারটি জিনিসের ভিত্তিতে মহিলাদেরকে বিবাহ করা হয়; মাল, বংশ এবং সৌন্দর্য ও দ্বীনের ভিত্তিতে। তোমরা দ্বীনদার মহিলা নির্বাচন কর।’’ (বুখারী ৫০৯০, মুসলিম ১৪৬৬নং) অনুরূপ তিনি পুণ্যময়ী সৎশীলা মহিলাকে দুনিয়ার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সম্পদ গণ্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সম্পদ হল পুণ্যময়ী নারী।’’ (মুসলিম ১৪৬৭নং)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আলে-ইমরান
৩:১৫ قُلۡ اَؤُنَبِّئُکُمۡ بِخَیۡرٍ مِّنۡ ذٰلِکُمۡ ؕ لِلَّذِیۡنَ اتَّقَوۡا عِنۡدَ رَبِّہِمۡ جَنّٰتٌ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَا وَ اَزۡوَاجٌ مُّطَہَّرَۃٌ وَّ رِضۡوَانٌ مِّنَ اللّٰہِ ؕ وَ اللّٰہُ بَصِیۡرٌۢ بِالۡعِبَادِ ﴿ۚ۱۵﴾

বল, ‘আমি কি তোমাদেরকে এর চেয়েও উত্তম বস্তুর সংবাদ দেব? যারা তাকওয়া অর্জন করে, তাদের জন্য রয়েছে তাদের রবের নিকট জান্নাত, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয় নহরসমূহ। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর পবিত্র স্ত্রীগণ ও আল্লাহর পক্ষ থেকে সন্তুষ্টি’। আর আল্লাহ বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা। আল-বায়ান

বল, আমি কি তোমাদেরকে এ সব হতেও অতি উত্তম কোন কিছুর সংবাদ দেব? যারা মুত্তাকী তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট এমন বাগান রয়েছে, যার নিম্নে নদী প্রবাহিত, তারা তাতে চিরকাল থাকবে আর রয়েছে পবিত্র সঙ্গী এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি, বস্তুতঃ আল্লাহ বান্দাগণের সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা। তাইসিরুল

তুমি বলঃ আমি কি তোমাদেরকে এটা অপেক্ষাও উত্তম বিষয়ের সংবাদ দিব? যারা ধর্মভীরু তাদের জন্য তাদের রবের নিকট জান্নাত রয়েছে যার তলদেশে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিতা, তন্মধ্যে তারা সদা অবস্থান করবে এবং সেখানে শুদ্ধা সহধর্মিনীগণ ও আল্লাহর প্রসন্নতা রয়েছে এবং আল্লাহ বান্দাদের প্রতি লক্ষ্যকারী। মুজিবুর রহমান

Say, "Shall I inform you of [something] better than that? For those who fear Allah will be gardens in the presence of their Lord beneath which rivers flow, wherein they abide eternally, and purified spouses and approval from Allah. And Allah is Seeing of [His] servants - Sahih International

১৫. বলুন, আমি কি তোমাদেরকে এসব বস্তু থেকে উৎকৃষ্টতর কোন কিছুর সংবাদ দেব? যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতসমূহ যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর পবিত্র স্ত্রীগণ এবং আল্লাহর নিকট থেকে সন্তুষ্টি(১)। আর আল্লাহ্‌ বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা।

(১) আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ্ তা'আলা জান্নাতবাসীদেরকে বলবেন, হে জান্নাতবাসী! তখন তারা বলবে, আমরা হাজির, তখন তিনি বলবেনঃ তোমরা কি সন্তুষ্ট হয়েছ? তারা বলবে, আমরা কেন সন্তুষ্ট হব না অথচ আপনি আমাদেরকে এমন কিছু দান করেছেন যা আর কোন সৃষ্টিকে দান করেননি। তখন তিনি বলবেনঃ আমি তোমাদেরকে তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ কিছু দান করব। তারা বলবে, হে রব! এর চেয়ে উত্তম আর কি হতে পারে? তিনি বলবেন; আমি তোমাদের উপর আমার সন্তুষ্টি অবতরণ করাব, এর পর আমি আর কখনও তোমাদের উপর ক্রোধাম্বিত হব না।” [বুখারী: ৬৫৪৯, মুসলিম: ২৮২৯]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৫) বল, আমি কি তোমাদেরকে এ সব বস্তু হতে উৎকৃষ্ট কোন কিছুর সংবাদ দেব? যারা সাবধান (পরহেযগার) হয়ে চলে তাদের জন্য রয়েছে উদ্যানসমূহ যার নিম্নদেশে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে,[1] তাদের জন্য পবিত্রা সঙ্গিনীগণ [2] এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি রয়েছে। বস্তুতঃ আল্লাহ তার দাসদের সম্বন্ধে সম্যক অবহিত।

[1] এই আয়াতে ঈমানদারদেরকে হুঁশিয়ার করা হচ্ছে যে, উল্লিখিত পার্থিব জিনিসেই তোমরা নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলো না, বরং এর চেয়ে উত্তম হল সেই জীবন ও সেই নিয়ামত, যা রয়েছে প্রতিপালকের কাছে এবং যার অধিকারী হবে কেবল আল্লাহভীরু লোকেরা। অতএব তোমরা আল্লাহভীরুতা অবলম্বন করো। এই আল্লাহভীরুতার গুণ তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়ে গেলে, নিশ্চিতভাবে তোমরা দ্বীন ও দুনিয়ার সমূহ কল্যাণ দ্বারা নিজেদের ঝুলি ভরে নিবে।

[2] পবিত্রা সঙ্গিনীগণঃ অর্থাৎ, তারা পার্থিব নোংরামী, হায়েয-নিফাস এবং অন্যান্য অপবিত্রতা থেকে পবিত্রা এবং নির্মলচরিত্রা হবে। এর পরের দু’টি আয়াতে আল্লাহভীরু লোকদের গুণাবলীর কথা উল্লেখ হয়েছে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আলে-ইমরান
৩:১৩৩ وَ سَارِعُوۡۤا اِلٰی مَغۡفِرَۃٍ مِّنۡ رَّبِّکُمۡ وَ جَنَّۃٍ عَرۡضُہَا السَّمٰوٰتُ وَ الۡاَرۡضُ ۙ اُعِدَّتۡ لِلۡمُتَّقِیۡنَ ﴿۱۳۳﴾ۙ

আর তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও তোমাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও জান্নাতের দিকে, যার পরিধি আসমানসমূহ ও যমীনের সমান, যা মুত্তাকীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। আল-বায়ান

তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে ও সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি হচ্ছে আসমানসমূহ ও যমীনের সমান, যা মুত্তাকীদের জন্য তৈরী করা হয়েছে। তাইসিরুল

তোমরা স্বীয় রবের ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে ধাবিত হও, যার প্রসারতা নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল সদৃশ, ওটা ধর্মভীরুদের জন্য নির্মিত হয়েছে। মুজিবুর রহমান

And hasten to forgiveness from your Lord and a garden as wide as the heavens and earth, prepared for the righteous Sahih International

১৩৩. আর তোমরা তীব্র গতিতে চল নিজেদের রবের ক্ষমার দিকে এবং সে জান্নাতের দিকে(১) যার বিস্তৃতি আসমানসমূহ ও যমীনের সমান(২), যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে মুত্তাকীদের জন্য(৩)।

(১) এ আয়াতে ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে প্রতিযোগিতামুলকভাবে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ্ ও রাসূলের আনুগত্যের পর এটি দ্বিতীয় নির্দেশ। এখানে ক্ষমার অর্থ আল্লাহর কাছে সরাসরি ক্ষমা চাওয়া হতে পারে। তবে অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে এখানে এমন সব সৎকর্ম এর উদ্দেশ্য, যা আল্লাহ্ তা'আলার ক্ষমা লাভ করার কারণ হয়। এটাই মত। সাহাবী ও তাবেয়ীগণ বিভিন্নভাবে এর ব্যাখ্যা করেছেন; কিন্তু সারমর্ম সবগুলোরই এক। এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, ‘কর্তব্য পালন’ ইবনে-আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন, ‘ইসলাম’। আবুল আলিয়া বলেছেন ‘হিজরত’। আনাস ইবনে-মালেক বলেছেন ‘সালাতের প্রথম তাকবীর’। সায়ীদ ইবনে-জুবায়ের বলেছেন ইবাদাত পালন। দাহহাক বলেন ‘জিহাদ’। আর ইকরিমা বলেছেন ‘তওবা’। এসব উক্তির সারকথা এই যে, ক্ষমা বলে এমন সৎকর্ম বুঝানো হয়েছে, যা আল্লাহর ক্ষমার কারণ হয়ে থাকে।

এখানে দুটি বিষয় জানা আবশ্যক। এক. শ্রেষ্ঠত্ব দু'প্রকারঃ

এক, ঐ শ্রেষ্ঠত্ব, যা অর্জন করা মানুষের ইচ্ছা ও শক্তির বাইরে। এগুলোকে অনিচ্ছাধীন শ্রেষ্ঠত্ব বলা হয়। উদাহরণতঃ শ্বেতাঙ্গ হওয়া, সুশী হওয়া ইত্যাদি। দুই, ঐ শ্রেষ্ঠত্ব, যা মানুষ অধ্যবসায় ও চেষ্টার দ্বারা অর্জন করতে পারে। এ গুলোকে ইচ্ছাধীন শ্রেষ্ঠত্ব বলা হয়। অনিচ্ছাধীন শ্রেষ্ঠত্বের ক্ষেত্রে অন্যের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের চেষ্টা এবং বাসনা করতে নিষেধ করা হয়েছে। [যেমন, সূরা আন-নিসা ৩২] কারণ, এ জাতীয় শ্রেষ্ঠত্ব আল্লাহ্ স্বীয় হেকমত অনুযায়ী মানুষের মধ্যে বন্টন করেছেন। এতে কারও চেষ্টার কোন দখল নাই। সুতরাং যত চেষ্টা ও বাসনাই করা হোক না কেন এ জাতীয় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জিত হবে না। চেষ্টাকারীর মনে হিংসা ও শক্রতার আগুন জ্বলা ছাড়া আর কোন লাভ হবে না। তবে যে সব শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে মানুষের ইচ্ছা শক্তি কাজ করে থাকে সেগুলোকে প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে অর্জন করার নির্দেশ বহু আয়াতে দেয়া হয়েছে। ঠিক এ আয়াতেও আল্লাহর ক্ষমার কারণ হয় এমন যাবতীয় কাজ করে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, কেননা এটা মানুষের ইচ্ছাধীন বিষয়।

দুই. আল্লাহ্ তা'আলা এ আয়াতে ক্ষমাকে জান্নাতের পূর্বে উল্লেখ করে সম্ভবতঃ এদিকেই ইঙ্গিত করেছেন যে, জান্নাত লাভ করা আল্লাহর ক্ষমা ছাড়া সম্ভব নয়। কেননা, মানুষ যদি জীবনভর পুণ্য অর্জন করে এবং গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে, তবুও তার সমগ্র পুণ্যকর্ম জান্নাতের মুল্য হতে পারে না। জান্নাত লাভের পস্থা মাত্র একটি। তা হচ্ছে আল্লাহ্ তা'আলার ক্ষমা ও অনুগ্রহ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেনঃ “সততা ও সত্য অবলম্বন কর, মধ্যবর্তী পথ অনুসরণ কর এবং আল্লাহর অনুগ্রহের সুসংবাদ লাভ কর। কারও কর্ম তাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে না। শ্রোতারা বললোঃ আপনাকেও নয়কি- ইয়া রাসূলাল্লাহ। উত্তর হলোঃ আমার কর্ম আমাকেও জান্নাতে নেবে না। তবে আল্লাহ যদি স্বীয় রহমত দ্বারা আমাকে আবৃত করে নেন।” [বুখারীঃ ৫৩৪৯, মুসলিমঃ ২৮১৬] মোটকথা এই যে, আমাদের কর্ম জান্নাতের মূল্য নয়। তবে আল্লাহ্ তাআয়ালার রীতি এই যে, তিনি স্বীয় অনুগ্রহ ঐবান্দাকেই দান করেন, যে সৎকর্ম করে। বরং সৎকর্মের সামর্থ্য লাভ হওয়াই আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির লক্ষণ। অতএব সৎকর্ম সম্পাদনে ক্রটি করা উচিৎ নয়।


(২) আয়াতে জান্নাত সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এর বিস্তৃতি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সমান। নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের চাইতে বিস্তৃত কোন বস্তু মানুষ কল্পনা করতে পারে না। এ কারণে জান্নাতের প্রস্থতাকে এ দু’টির সাথে তুলনা করে বুঝানো হয়েছে যে, জান্নাত খুবই বিস্তৃত। প্রশস্ততায় তা নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলকে নিজের মধ্যে ধরে নিতে পারে। এর প্রশস্ততাই যখন এমন, তখন দৈর্ঘ্য কতটুকু হবে, তা আল্লাহই ভাল জানেন। অবশ্য কোন কোন মুফাসসির বলেনঃ জান্নাত দৈর্ঘ ও প্রস্থে সমান। কেননা তা আরশের নীচে গম্বুজের মত। গম্বুজের মত গোলাকার বস্তুর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ সমান হয়ে থাকে। এ বক্তব্যের সপক্ষে প্রমাণ হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস, তিনি বলেছেনঃ “তোমরা যখন আল্লাহর কাছে জান্নাত চাইবে তখন ফেরদাউস চাইবে; কেননা তা সর্বোচ্চ জান্নাত, সবচেয়ে উত্তম ও মধ্যম স্থানে অবস্থিত জান্নাত, সেখান থেকেই জান্নাতের নহরসমূহ প্রবাহিত। আর তার ছাদ হলো দয়াময় আল্লাহর আরশ। [বুখারীঃ ২৭৯০, ৭৪২৩]

তবে আয়াতের এ ব্যাখ্যা তখন হবে, যখন عرض শব্দের অর্থ طول তথা দৈর্ঘ্যের বিপরীতে নেয়া হয়। কিন্তু যদি এর অর্থ হয় মূল্য’ তবে আয়াতের অর্থ হবে যে, জান্নাত কোন সাধারণ বস্তু নয়- এর মূল্য সমগ্র নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল। সুতরাং এহেন মূল্যবান বস্তুর প্রতি ধাবিত হও। কোন কোন মুফাসসির বলেনঃ আয়াতে উল্লেখিত عرض শব্দের অর্থ ঐ বস্তু যা বিক্রিত বস্তুর মোকাবেলায় মূল্য হিসেবে পেশ করা হয়। উদ্দেশ্য এই যে, যদি জান্নাতের মূল্য ধরা হয়, তবে সমগ্র নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল এবং এতদুভয়ের সবকিছু হবে এর মূল্য। এতে করে জান্নাত যে অমূল্য বিষয় তা প্রকাশ করাই লক্ষ্য। [তাফসীরে কাবীর]


(৩) জান্নাতের দ্বিতীয় বিশেষণে বলা হয়েছেঃ জান্নাত মুত্তাকীগণের জন্যে নির্মিত হয়েছে। এতে বুঝা গেল যে, জান্নাত সৃষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়া কুরআন ও হাদীসের অন্যান্য সুস্পষ্ট প্রমাণাদি দ্বারা বুঝা যায় যে, জান্নাত তৈরী হয়ে আছে। আর এটাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদা-বিশ্বাস। তাছাড়া কুরআন ও হাদীসে জান্নাতের যে সমস্ত বর্ণনা এসেছে সেগুলোতে কোথাও কোথাও স্পষ্ট করে বলা আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জান্নাত ও জাহান্নাম দেখেছেন। যেমন জান্নাতের বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “জান্নাতের এক ইট রৌপ্যের ও এক ইট স্বর্ণের, তার নীচের আস্তর সুগন্ধি মিশকের, তার পাথরকুচিগুলো হীরে-মুতি-পান্নার সমষ্টি, মিশ্রণ হচ্ছে, ওয়ারস ও যা’ফরান। যে তাতে প্রবেশ করবে সে তাতে স্থায়ী হবে, মরবে না, নিয়ামত প্রাপ্ত হবে, হতভাগা হবে না, যৌবন কখনও ফুরিয়ে যাবে না, কাপড়ও কখনও ছিড়ে যাবে না।” [মুসনাদে আহমাদ ২/৩০৪, ৩০৫, সহীহ ইবন হিব্বান: ১৬/৩৯৬]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৩৩) তোমরা প্রতিযোগিতা (ত্বরা) কর, তোমাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে ক্ষমা এবং বেহেশ্তের জন্য, যার প্রস্থ আকাশ ও পৃথিবীর সমান, যা ধর্মভীরুদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। [1]

[1] পার্থিব ধন-সম্পদের পিছনে পড়ে আখেরাত বরবাদ না করে আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের আনুগত্যের, আল্লাহর ক্ষমা এবং তাঁর সেই জান্নাতের পথ ধর, যা ধর্মভীরু বা মুত্তাক্বীদের জন্য তিনি প্রস্তুত করেছেন। পরের আয়াতগুলোতে মুত্তাক্বীদের কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আলে-ইমরান
৩:১৩৬ اُولٰٓئِکَ جَزَآؤُہُمۡ مَّغۡفِرَۃٌ مِّنۡ رَّبِّہِمۡ وَ جَنّٰتٌ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَا ؕ وَ نِعۡمَ اَجۡرُ الۡعٰمِلِیۡنَ ﴿۱۳۶﴾ؕ

এরাই তারা, যাদের প্রতিদান তাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও জান্নাতসমূহ যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহরসমূহ। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর আমলকারীদের প্রতিদান কতই না উত্তম! আল-বায়ান

এরাই তারা যাদের জন্য রয়েছে তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে ক্ষমা এবং এমন এক জান্নাত যার নিম্নে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত, তারা তার স্থায়ী অধিবাসী এবং সৎকর্মশীলদের পুরস্কার কতই না উত্তম! তাইসিরুল

তাদের পুরস্কার হবে তাদের রবের নিকট হতে মার্জনা এবং এমন উদ্যানসমূহ যেগুলির তলদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিত থাকবে, তন্মধ্যে তারা সদা অবস্থান করবে, এবং কর্মীদের জন্য কি সুন্দর প্রতিদান! মুজিবুর রহমান

Those - their reward is forgiveness from their Lord and gardens beneath which rivers flow [in Paradise], wherein they will abide eternally; and excellent is the reward of the [righteous] workers. Sahih International

১৩৬. তারাই, যাদের পুরস্কার হলো তাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা এবং জান্নাত, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত; সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর সৎকর্মশীলদের পুরস্কার কতইনা উত্তম!

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৩৬) ঐ সকল লোকের প্রতিদান তাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা এবং জান্নাত; যার নিচে নদীসমূহ প্রবাহিত। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে এবং (সৎ) কর্মশীলদের পুরস্কার কতই না উত্তম।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আলে-ইমরান
৩:১৯৫ فَاسۡتَجَابَ لَہُمۡ رَبُّہُمۡ اَنِّیۡ لَاۤ اُضِیۡعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِّنۡکُمۡ مِّنۡ ذَکَرٍ اَوۡ اُنۡثٰی ۚ بَعۡضُکُمۡ مِّنۡۢ بَعۡضٍ ۚ فَالَّذِیۡنَ ہَاجَرُوۡا وَ اُخۡرِجُوۡا مِنۡ دِیَارِہِمۡ وَ اُوۡذُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِیۡ وَ قٰتَلُوۡا وَ قُتِلُوۡا لَاُکَفِّرَنَّ عَنۡہُمۡ سَیِّاٰتِہِمۡ وَ لَاُدۡخِلَنَّہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ ۚ ثَوَابًا مِّنۡ عِنۡدِ اللّٰہِ ؕ وَ اللّٰہُ عِنۡدَہٗ حُسۡنُ الثَّوَابِ ﴿۱۹۵﴾

অতঃপর তাদের রব তাদের ডাকে সাড়া দিলেন যে, ‘নিশ্চয় আমি তোমাদের কোন পুরুষ অথবা মহিলা আমলকারীর আমল নষ্ট করব না। তোমাদের একে অপরের অংশ। সুতরাং যারা হিজরত করেছে এবং যাদেরকে তাদের ঘর থেকে বের করে দেয়া হয়েছে এবং যাদেরকে আমার রাস্তায় কষ্ট দেয়া হয়েছে, আর যারা যুদ্ধ করেছে এবং নিহত হয়েছে, আমি অবশ্যই তাদের ত্রুটি-বিচ্যুতিসমূহ বিলুপ্ত করে দেব এবং তাদেরকে প্রবেশ করাবো জান্নাতসমূহে, যার তলদেশে প্রবাহিত হচ্ছে নহরসমূহ; আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদানস্বরূপ। আর আল্লাহর নিকট রয়েছে উত্তম প্রতিদান। আল-বায়ান

তখন তাদের প্রতিপালক তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে বললেন, তোমাদের মধ্যে পুরুষ হোক কিংবা নারীই হোক কোন কর্মীরই কর্মফল আমি নষ্ট করি না, তোমরা একে অপরের অংশ। সুতরাং যারা হিজরাত করবে এবং স্বীয় গৃহ হতে বিতাড়িত হবে ও আমার পথে নির্যাতিত হবে, যুদ্ধ করবে ও নিহত হবে, নিশ্চয় আমি তাদের গুনাহসমূহ দূর করে দেব এবং নিশ্চয়ই তাদেরকে এমন জান্নাতে দাখিল করবো, যার নীচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে নদ-নদী, আল্লাহর নিকট হতে পুরস্কার হিসেবে, বস্তুতঃ আল্লাহর নিকটেই উত্তম বিনিময়। তাইসিরুল

অনন্তর তাদের রাব্ব তাদের জন্য ওটা স্বীকার করলেন এবং বললেনঃ আমি তোমাদের পুরুষ অথবা নারীর মধ্য হতে কোন কর্মীর কৃতকর্ম ব্যর্থ করবনা, তোমরা পরস্পর এক, অতএব যারা দেশ ত্যাগ করেছে অথবা স্বীয় গৃহসমূহ হতে বিতাড়িত হয়েছে ও আমার পথে নির্যাতিত হয়েছে এবং সংগ্রাম করেছে ও নিহত হয়েছে - নিশ্চয়ই তাদের জন্য আমি তাদের অমঙ্গলসমূহ অপসারণ করাব এবং নিশ্চয়ই আমি তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাব, যার নিম্নে স্রোতস্বিনী নদীসমূহ প্রবাহিত; এটা আল্লাহর নিকট হতে প্রতিদান এবং আল্লাহর নিকটই উত্তম প্রতিদান রয়েছে। মুজিবুর রহমান

And their Lord responded to them, "Never will I allow to be lost the work of [any] worker among you, whether male or female; you are of one another. So those who emigrated or were evicted from their homes or were harmed in My cause or fought or were killed - I will surely remove from them their misdeeds, and I will surely admit them to gardens beneath which rivers flow as reward from Allah, and Allah has with Him the best reward." Sahih International

১৯৫. তারপর তাদের রব তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে বললেন, নিশ্চয় আমি তোমাদের মধ্যে আমলকারী কোন নর বা নারীর আমল বিফল করি না(১); তোমরা একে অপরের অংশ। কাজেই যারা হিজরত করেছে, নিজ ঘর থেকে উৎখাত হয়েছে, আমার পথে নির্যাতিত হয়েছে এবং যুদ্ধ করেছে ও নিহত হয়েছে আমি তাদের পাপ কাজগুলো অবশ্যই দূর করব(২) এবং অবশ্যই তাদেরকে প্রবেশ করাব জান্নাতে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। এটা আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার; আর উত্তম পুরস্কার আল্লাহরই কাছে রয়েছে।

(১) উম্মে সালামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেনঃ আল্লাহ তা'আলা মহিলাদের হিজরত সম্পর্কে কোন কিছু বলেন না কেন? তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত নাযিল করেন। [মুস্তাদরাকে হাকেমঃ ২/৩০০]


(২) অর্থাৎ আল্লাহর হকের বেলায় যে সমস্ত ক্রটি গাফলতী ও পাপ হয়ে থাকবে তা হিজরত ও শাহাদাতের মাধ্যমে মাফ হয়ে যাবে। তার কারণ, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীসে ঋণ বা ধারকে এ থেকে পৃথক করে দিয়েছেন। বান্দার হক থেকে ক্ষমা পাওয়ার নিয়ম হল স্বয়ং পাওনাদার কিংবা তার উত্তরাধিকারীকে প্রাপ্য পরিশোধ করে দেবে অথবা তাদের কাছ থেকে ক্ষমা করিয়ে নেবে। অবশ্য যদি কারো প্রতি আল্লাহ্ তা'আলা বিশেষ অনুগ্রহ করে পাওনাদারকে রাযী করিয়ে দেন, তবে তা স্বতন্ত্র কথা।

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৯৫) অতঃপর তাদের প্রতিপালক তাদের ডাকে সাড়া[1] দিলেন (এবং বললেন), আমি তোমাদের মধ্যে কোন কর্মনিষ্ঠ নর অথবা নারীর কর্ম বিফল করি না;[2] তোমরা পরস্পর সমশ্রেণীভুক্ত। [3] সুতরাং যারা হিজরত (ধর্মের জন্য স্বদেশত্যাগ) করেছে, নিজ নিজ গৃহ থেকে উৎখাত হয়েছে, আমার পথে নির্যাতিত হয়েছে এবং যুদ্ধ করেছে ও নিহত হয়েছে, আমি তাদের মন্দ কাজগুলি অবশ্যই গোপন করব, আর অবশ্যই তাদেরকে বেহেশ্তে প্রবেশ করাব; যার নিচে নদীসমূহ প্রবাহিত। এ হল আল্লাহর দেওয়া পুরস্কার, বস্তুতঃ আল্লাহর নিকটই উত্তম পুরস্কার রয়েছে।

[1] فَاسْتَجَابَ  এখানে أَجَابَ অর্থাৎ, তিনি তাদের দু’আ কবুল করলেন বা তাদের ডাকে সাড়া দিলেন --এর অর্থে ব্যবহার হয়েছে। (ফাতহুল ক্বাদীর)

[2] ‘নর অথবা নারী’ কথাটি এখানে এই জন্য বলা হয়েছে যে, ইসলাম কোন কোন বিষয়ে নর ও নারীর মধ্যে তাদের উভয়ের প্রাকৃতিক গুণাবলীর ভিন্নতার কারণে কিছু পার্থক্য করেছে, যেমন, কর্তৃত্বে ও নেতৃত্বে, জীবিকা উপার্জনের দায়িত্বে এবং জিহাদে অংশ গ্রহণ ও অর্ধেক মীরাস পাওয়ার ব্যাপারে। তাই এই পার্থক্যগুলো দেখে যেন এই মনে করে না নেওয়া হয় যে, নেক কাজের প্রতিদানেও পুরুষ ও মহিলার মধ্যে পার্থক্য করা হবে। না, এ রকম হবে না। বরং প্রত্যেক নেকীর যে প্রতিদান একজন পুরুষ পাবে, সেই নেকী যদি কোন মহিলা করে, তাহলে সেও অনুরূপ প্রতিদান পাবে।

[3] এটা جملة معترضة অর্থাৎ, বাক্যের মধ্যে ব্যাকরণগত সম্পর্কহীন একটি প্রবিষ্ট বাক্য। এই বাক্যের উদ্দেশ্য হল পূর্বোক্ত বিষয়কে আরো পরিষ্কার করে বর্ণনা করা। অর্থাৎ, নেকী ও আনুগত্যে তোমরা পুরুষ ও মহিলা সমান। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, উম্মে সালামা (রাঃ)  বললেন, হে আল্লাহর রসূল! মহান আল্লাহ হিজরত করার ব্যাপারে মহিলাদের নাম নেননি। তাঁর এ কথার ভিত্তিতে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। (তাফসীরে ত্বাবারী, ইবনে কাসীর ও ফাতহুল ক্বাদীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আলে-ইমরান
৩:১৯৮ لٰکِنِ الَّذِیۡنَ اتَّقَوۡا رَبَّہُمۡ لَہُمۡ جَنّٰتٌ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَا نُزُلًا مِّنۡ عِنۡدِ اللّٰہِ ؕ وَ مَا عِنۡدَ اللّٰہِ خَیۡرٌ لِّلۡاَبۡرَارِ ﴿۱۹۸﴾

কিন্তু যারা তাদের রবকে ভয় করে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত, যার তলদেশে প্রবাহিত হবে নহরসমূহ, সেখানে তারা স্থায়ী হবে। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে মেহমানদারী। আর আল্লাহর নিকট যা রয়েছে তা নেককার লোকদের জন্য উত্তম। আল-বায়ান

কিন্তু যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে, তাদের জন্য আছে জান্নাত যার পাদদেশে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত, তারা তাতে চিরকাল থাকবে, এ হল আল্লাহর নিকট হতে আতিথ্য আর আল্লাহর নিকট যা আছে, তা সৎকর্মপরায়ণদের জন্য অতি উত্তম। তাইসিরুল

কিন্তু যারা স্বীয় রাব্বকে ভয় করে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত-যার নিম্নে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিত, তম্মধ্যে তারা সদা অবস্থান করবে, এটা আল্লাহর নিকট রয়েছে, তা সৎকর্মশীলদের জন্য বহুগুণে উত্তম। মুজিবুর রহমান

But those who feared their Lord will have gardens beneath which rivers flow, abiding eternally therein, as accommodation from Allah. And that which is with Allah is best for the righteous. Sahih International

১৯৮. কিন্তু যারা তাদের রবকে ভয় করে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা স্থায়ী হবে। এ হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে আতিথেয়তা; আর আল্লাহর কাছে যা আছে তা সৎকর্মপরায়ণদের জন্য উত্তম।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৯৮) কিন্তু যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত; যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত, সেখানে তারা স্থায়ী হবে। এ হল আল্লাহর পক্ষ হতে আতিথ্য। আর আল্লাহর নিকট যা আছে তা পুণ্যবানদের জন্য উত্তম। [1]

[1] ওদের বিপরীত যাঁরা প্রতিপালককে ভয় করে পরহেযগারী এবং আল্লাহভীরুতার জীবন যাপন করে তাঁর সমীপে উপস্থিত হবেন, যদিও দুনিয়াতে তাঁদের কাছে আল্লাহ ভুলানোর মত ধন-সম্পদের প্রাচুর্য এবং অঢেল রুযী ছিল না, তবুও তাঁরা সমগ্র বিশ্বের স্রষ্টা এবং তার একচ্ছত্র মালিক আল্লাহর মেহমান হবেন এবং সেখানে এই সৎলোকরা যে প্রতিদান পাবেন, তা দুনিয়াতে কাফেররা ক্ষণস্থায়ীভাবে যা পেয়েছে, তা থেকে বহুগুণে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ হবে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আন-নিসা
৪:১৩ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ ؕ وَ مَنۡ یُّطِعِ اللّٰہَ وَ رَسُوۡلَہٗ یُدۡخِلۡہُ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَا ؕ وَ ذٰلِکَ الۡفَوۡزُ الۡعَظِیۡمُ ﴿۱۳﴾

এগুলো আল্লাহর সীমারেখা। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে আল্লাহ তাকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতসমূহে, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহরসমূহ। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর এটা মহা সফলতা । আল-বায়ান

এসব আল্লাহর নির্ধারিত সীমা এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের অনুসরণ করবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে দাখিল করবেন, যার পাদদেশে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত, তারা তাতে চিরবাসী হবে এবং এটা বিরাট সাফল্য। তাইসিরুল

এটাই আল্লাহর নির্দিষ্ট সীমাসমূহ; এবং যে কেহ আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের অনুগত হয় তিনি তাকে এরূপ জান্নাতে প্রবিষ্ট করাবেন যার নিম্নে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিতা, তম্মধ্যে তারা সদা অবস্থান করবে; এবং এটাই বড় সফলতা। মুজিবুর রহমান

These are the limits [set by] Allah, and whoever obeys Allah and His Messenger will be admitted by Him to gardens [in Paradise] under which rivers flow, abiding eternally therein; and that is the great attainment. Sahih International

১৩. এসব আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। কেউ আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করলে আল্লাহ তাকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত; তারা সেখানে স্থায়ী হবে আর এটাই হলো মহাসাফল্য।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৩) এসব আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। আর যে আল্লাহ ও রসূলের অনুগত হয়ে চলবে আল্লাহ তাকে বেহেশ্তে স্থান দান করবেন; যার নীচে নদীসমূহ প্রবাহিত। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে এবং এ মহা সাফল্য।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আন-নিসা
৪:৫৭ وَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ سَنُدۡخِلُہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَاۤ اَبَدًا ؕ لَہُمۡ فِیۡہَاۤ اَزۡوَاجٌ مُّطَہَّرَۃٌ ۫ وَّ نُدۡخِلُہُمۡ ظِلًّا ظَلِیۡلًا ﴿۵۷﴾

আর যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, অচিরেই আমি তাদেরকে প্রবেশ করাব জান্নাতসমূহে, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহরসমূহ। সেখানে তারা হবে স্থায়ী। সেখানে তাদের জন্য রয়েছে পবিত্র স্ত্রীগণ এবং তাদেরকে আমি প্রবেশ করাব বিস্তৃত ঘন ছায়ায়। আল-বায়ান

যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে নিশ্চয়ই আমি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করব যার নিম্নে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরবাসী হবে, তাতে তাদের জন্য থাকবে পবিত্র স্ত্রী এবং আমি তাদেরকে চির স্নিগ্ধ ঘন ছায়ায় দাখিল করব। তাইসিরুল

আর যারা বিশ্বাস স্থাপন করে সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করেছে, নিশ্চয়ই আমি তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাব, যার নিম্নে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিতা, তন্মধ্যে তারা চিরকাল অবস্থান করবে; সেখানে তাদের জন্য পবিত্রা সহধর্মিণীগণ রয়েছে এবং আমি তাদেরকে সুবিস্তৃত ছায়া শীতল স্থানে প্রবেশ করাব। মুজিবুর রহমান

But those who believe and do righteous deeds - We will admit them to gardens beneath which rivers flow, wherein they abide forever. For them therein are purified spouses, and We will admit them to deepening shade. Sahih International

৫৭. আর যারা ঈমান আনে এবং ভাল কাজ করে, অচিরেই আমরা তাদেরকে এমন জান্নাতে প্রবেশ করাব, যার পাদদেশে নদী-নালাসমূহ প্রবাহিত; যেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে, সেখানে তাদের জন্য পবিত্র স্ত্রী থাকবে এবং তাদেরকে আমরা চিরস্নিগ্ধ ছায়ায় প্রবেশ করাব।(১)

(১) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'জান্নাতে এমন একটি বৃক্ষ আছে এর ছায়ায় যদি কোন আরোহণকারী ভ্রমণ করতে চায় তাহলে একশত বছর ভ্রমণ করতে পারবে। তোমরা ইচ্ছা করলে এ আয়াত পড়তে পার “আর সম্প্রসারিত ছায়া।” [সূরা আল ওয়াকিয়াঃ ৩০, বুখারীঃ ৩২৫২]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৫৭) আর যারা বিশ্বাস করে ও ভাল কাজ করে[1] তাদেরকে বেহেশ্তে প্রবেশ করাব; যার পাদদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে, সেখানে তাদের জন্য পবিত্র সঙ্গিনী আছে এবং তাদেরকে চিরস্নিগ্ধ ঘন ছায়ায় স্থান দান করব। [2]

[1] কাফেরদের বিপরীত ঈমানদারদের জন্য জান্নাতে নিরবচ্ছিন্ন যে নিয়ামত হবে এই আয়াতে তার আলোচনা করা হচ্ছে। তবে ঈমানদার বলতে এমন ঈমানদার ব্যক্তিবর্গ যাদের থাকবে অধিকহারে সৎকর্মের সম্বল। – جَعَلَنَا اللهُ مِنْهُم - মহান আল্লাহ কুরআন মাজীদের প্রত্যেক স্থানে ঈমানের সাথে সাথে সৎকর্মের কথা উল্লেখ করে এ কথা পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, এরা (ঈমান ও সৎকর্ম) আপোসে একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। নেক আমল ছাড়া ঈমান হল ঐরূপ, যেরূপ সুবাসবিহীন ফুল এবং ফলবিহীন গাছ। সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) এবং ইসলামের স্বর্ণযুগের মুসলিমরা এ কথা অনুধাবন করে নিয়েছিলেন। তাই তাঁদের জীবন ছিল ঈমানের ফল আমল দ্বারা পরিপূর্ণ। সে যুগে আমলবিহীন বা মন্দ আমলের সাথে ঈমানের কথা কল্পনাই করা যেত না। পক্ষান্তরে বর্তমানে কেবল মৌখিক জমা-খরচের নাম হয়েছে ঈমান। ঈমানের দাবীদারদের ঝুলি নেক আমল থেকে খালি।-هَدَانَا اللهُ تَعَالى- আবার অনেকে সততা, আমানতদারী, দয়া-দাক্ষিণ্য এবং অপরের দুঃখ মোচনের কাজ সহ আরো অনেক নৈতিকতার এমন কাজ করে, যা সৎকর্মের অন্তর্ভুক্ত; কিন্তু ঈমানের মূলধন থেকে সে বঞ্চিত থাকে। ফলে তার এই কর্মসমূহ দুনিয়াতে তার প্রসিদ্ধি এবং সুনামের মাধ্যম সাব্যস্ত হলেও আখেরাতে আল্লাহর নিকট তার কোন মূল্য থাকবে না। কারণ, নেক আমলকে আল্লাহর নিকট লাভদায়ক সাব্যস্তকারী ঈমানই তার মধ্যে নেই। বরং তার নেক আমলের ভিত্তি ছিল পার্থিব স্বার্থ অথবা জাতিগত অভ্যাস ও নৈতিকতা।

[2] চিরস্নিগ্ধ ঘন এবং পবিত্র ছায়া বলতে পরিপূর্ণ আরামকে বুঝানো হয়েছে। একটি হাদীসে এসেছে যে, ‘‘জান্নাতে একটি গাছ আছে; যার ছায়া এত সুদীর্ঘ যে, এক সওয়ার শত বছর চলার পরও তা অতিক্রম করতে পারবে না। এটা হল, ‘শাজারাতুল খুলদ’ (চিরস্থায়িত্বের গাছ)।’’

(মুসনাদ আহমদ ২/৪৫৫ এর মূল অংশ বুখারীতে জান্নাতের বিবরণ অধ্যায় রয়েছে।)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আন-নিসা
৪:১২২ وَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ سَنُدۡخِلُہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَاۤ اَبَدًا ؕ وَعۡدَ اللّٰہِ حَقًّا ؕ وَ مَنۡ اَصۡدَقُ مِنَ اللّٰہِ قِیۡلًا ﴿۱۲۲﴾

আর যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, অচিরেই তাদেরকে আমি প্রবেশ করাব জান্নাতসমূহে, যার তলদেশে প্রবাহিত হচ্ছে নহরসমূহ। সেখানে তারা হবে স্থায়ী। আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। আর কথায় আল্লাহ অপেক্ষা অধিক সত্যবাদী কে? আল-বায়ান

আর যারা ঈমান এনেছে ও নেক কাজ করেছে অবিলম্বে আমি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করব; যার পাদদেশে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত, তারা তাতে চিরকাল চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে, আল্লাহর ওয়া‘দা সত্য, কথায় আল্লাহ অপেক্ষা কে বেশি সত্যবাদী? তাইসিরুল

এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে ও সৎ কাজ করে, আমি তাদেরকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করাব যার নিম্নে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিতা, তন্মধ্যে তারা চিরকাল অবস্থান করবে, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য; এবং কে আল্লাহ অপেক্ষা বাক্যে অধিকতর সত্যপরায়ণ? মুজিবুর রহমান

But the ones who believe and do righteous deeds - We will admit them to gardens beneath which rivers flow, wherein they will abide forever. [It is] the promise of Allah, [which is] truth, and who is more truthful than Allah in statement. Sahih International

১২২. আর যারা ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে, আমরা তাদেরকে প্রবেশ করাব জান্নাতে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে; আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। আর কে আল্লাহর চেয়ে কথায় সত্যবাদী?(১)

(১) বস্তুত: আল্লাহর কথা বা বাণীর উপর কারও কথা সত্য হতে পারে না। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, সবচেয়ে উত্তম বাণী হচ্ছে, আল্লাহর কিতাব। আর সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি হচ্ছে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দেয়া পদ্ধতি। আর সবচেয়ে খারাপ কাজ হচ্ছে, দ্বীনে প্রবর্তিত নতুন পদ্ধতিসমূহ, আর তোমাদেরকে যার ওয়াদা করা হয়েছে তা অবশ্যই আসবে, তোমরা তাকে অপারগ করে দিতে সক্ষম নও। [বুখারী: ৭২৭৭; মুসনাদে আহমাদ ৩/৩১০]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১২২) যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, তাদেরকে বেহেশ্তে প্রবেশাধিকার দান করব; যার পাদদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। আর কে আছে আল্লাহ অপেক্ষা অধিক সত্যবাদী? [1]

[1] শয়তানের প্রতিশ্রুতি তো নিছক ধোকা-প্রতারণা বৈ কিছু নয়। পক্ষান্তরে আল্লাহর অঙ্গীকার যা তিনি ঈমানদারদের সাথে করেছেন তা সত্য ও যথার্থ। আল্লাহর চেয়ে অধিক সত্যবাদী কে হতে পারে? কিন্তু মানুষের ব্যাপার বড়ই বিস্ময়কর। এরা সত্যকে গ্রাহ্য কমই করে এবং মিথ্যার পিছনেই এরা বেশী চলে। তাই তো শয়তানী জিনিসের প্রচলন অতি ব্যাপক। পক্ষান্তরে আল্লাহর কর্ম সম্পাদন করার মানুষ প্রত্যেক যুগে এবং প্রত্যেক স্থানে কমই থেকেছে ও কমই পাওয়া যায়। [وَقَلِيلٌ مِنْ عِبَادِيَ الشَّكُورُ] ‘‘আমার কৃতজ্ঞ বান্দা কমই হয়।’’ (সাবাঃ ১৩)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আন-নিসা
৪:১২৪ وَ مَنۡ یَّعۡمَلۡ مِنَ الصّٰلِحٰتِ مِنۡ ذَکَرٍ اَوۡ اُنۡثٰی وَ ہُوَ مُؤۡمِنٌ فَاُولٰٓئِکَ یَدۡخُلُوۡنَ الۡجَنَّۃَ وَ لَا یُظۡلَمُوۡنَ نَقِیۡرًا ﴿۱۲۴﴾

আর পুরুষ কিংবা নারীর মধ্য থেকে যে নেককাজ করবে এমতাবস্থায় যে, সে মুমিন, তাহলে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি খেজুর বীচির আবরণ পরিমাণ যুলমও করা হবে না। আল-বায়ান

পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে সৎকাজ করবে আর সে ঈমানদারও বটে, তাহলে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, তাদের প্রতি তিল পরিমাণও অন্যায় করা হবে না। তাইসিরুল

পুরুষ অথবা নারীর মধ্যে যারা সৎ কাজ করে এবং সে বিশ্বাসীও হয়, তাহলে তারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তারা খর্জুর দানার কণা পরিমাণও অত্যাচারিত হবেনা। মুজিবুর রহমান

And whoever does righteous deeds, whether male or female, while being a believer - those will enter Paradise and will not be wronged, [even as much as] the speck on a date seed. Sahih International

১২৪. আর পুরুষ বা নারীর মধ্যে কেউ মুমিন অবস্থায় সৎকাজ করলে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি অণু পরিমাণও যুলুম করা হবে না।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১২৪) আর পুরুষই হোক অথবা নারীই হোক, যারাই বিশ্বাসী হয়ে সৎকাজ করবে, তারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি (খেজুরের আঁটির পিঠে) বিন্দু পরিমাণও যুলুম করা হবে না। [1]

[1] যেমন পূর্বে আলোচনা হয়েছে যে, ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরা নিজেদের ব্যাপারে সুধারণার বড় আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত ছিল। এখানে মহান আল্লাহ তাদের সেই সুধারণার পর্দা ফাঁস করে বলেন যে, আখেরাতের সফলতা কেবল আশা ও আকাঙ্ক্ষায় পাওয়া যাবে না। তার জন্য তো ঈমান এবং নেক আমলের সম্বল প্রয়োজন। পক্ষান্তরে আমলনামা যদি মন্দ কাজে পরিপূর্ণ থাকে, তাহলে যেভাবেই হোক না কেন তার শাস্তি ভোগ করতেই হবে। সেখানে এমন কোন বন্ধু অথবা সাহায্যকারী হবে না যে মন্দ কাজের শাস্তি থেকে বাঁচিয়ে নিতে পারবে। আলোচ্য আয়াতে ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের সাথে সাথে মহান আল্লাহ ঈমানদারদেরকেও সম্বোধন করেছেন, যাতে তারা যেন তাদের মত বৃথা সুধারণা এবং আমলশূন্য আশা ও আকাঙ্ক্ষা থেকে নিজেদেরকে সুদূরে রাখে। কিন্তু অনুতাপের বিষয় যে, এই সতর্কতা সত্ত্বেও মুসলিমরা সেই খামখেয়ালীর মধ্যে পতিত হয়ে পড়েছে যার মধ্যে পতিত ছিল পূর্বের জাতিসমূহ। বর্তমানে বে-আমল ও বদ-আমল মুসলিমদের আলামত ও চিহ্ন হয়ে গেছে, আর তা সত্ত্বেও তারা নিজেদেরকে উম্মতে মারহুমা (রহমপ্রাপ্ত উম্মত) বলে দাবী করছে! هَدَانَا اللهُ تَعَالَى

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-মায়েদা
৫:১২ وَ لَقَدۡ اَخَذَ اللّٰہُ مِیۡثَاقَ بَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ ۚ وَ بَعَثۡنَا مِنۡہُمُ اثۡنَیۡ عَشَرَ نَقِیۡبًا ؕ وَ قَالَ اللّٰہُ اِنِّیۡ مَعَکُمۡ ؕ لَئِنۡ اَقَمۡتُمُ الصَّلٰوۃَ وَ اٰتَیۡتُمُ الزَّکٰوۃَ وَ اٰمَنۡتُمۡ بِرُسُلِیۡ وَ عَزَّرۡتُمُوۡہُمۡ وَ اَقۡرَضۡتُمُ اللّٰہَ قَرۡضًا حَسَنًا لَّاُکَفِّرَنَّ عَنۡکُمۡ سَیِّاٰتِکُمۡ وَ لَاُدۡخِلَنَّکُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ ۚ فَمَنۡ کَفَرَ بَعۡدَ ذٰلِکَ مِنۡکُمۡ فَقَدۡ ضَلَّ سَوَآءَ السَّبِیۡلِ ﴿۱۲﴾

আর অবশ্যই আল্লাহ বনী ইসরাঈলের অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন এবং আমি তাদের মধ্য থেকে বার জন দলনেতা পাঠিয়েছিলাম এবং আল্লাহ বলেছিলেন, নিশ্চয় আমি তোমাদের সাথে আছি, যদি তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও, আমার রাসূলদের প্রতি ঈমান আন, তাদেরকে সহযোগিতা কর এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও, তবে নিশ্চয় আমি তোমাদের থেকে তোমাদের পাপসমূহ মুছে দেব। আর অবশ্যই তোমাদেরকে প্রবেশ করাব জান্নাতসমূহে, যার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হবে নদীসমূহ। তোমাদের মধ্য থেকে এরপরও যে কুফরী করেছে, সে অবশ্যই সোজা পথ হারিয়েছে। আল-বায়ান

আল্লাহ বানী ইসরাঈলের নিকট থেকে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছিলেন, আর তাদের মধ্যে বারজন প্রধান নিযুক্ত করেছিলেন। আর আল্লাহ বলেছিলেন, আমি তোমাদের সঙ্গে আছি, যদি তোমরা নামায কায়িম কর, যাকাত আদায় কর এবং আমার রসূলগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর আর তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা কর আর আল্লাহকে ঋণ দান কর উত্তম ঋণ, তাহলে আমি তোমাদের পাপগুলো অবশ্য অবশ্যই দূর করে দেব, আর অবশ্য অবশ্যই তোমাদেরকে জান্নাতে দাখিল করাব যার নিম্নে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত। এরপরও তোমাদের মধ্যে যারা কুফুরী করবে তারা সত্য সঠিক পথ হারিয়ে ফেলবে। তাইসিরুল

আর আল্লাহ বানী ইসরাঈলের নিকট থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, আমি তাদের মধ্য হতে বারো জন দলপতি নিযুক্ত করেছিলাম; এবং আল্লাহ বলেছিলেনঃ আমি তোমাদের সাথে রয়েছি, যদি তোমরা সালাত সুপ্রতিষ্ঠিত কর ও যাকাত দিতে থাক এবং আমার রাসূলদের উপর ঈমান আন ও তাদেরকে সাহায্য কর এবং আল্লাহকে উত্তমরূপে কর্জ দিতে থাক; তাহলে আমি অবশ্যই তোমাদের পাপগুলি তোমাদের থেকে মুছে দিব এবং অবশ্যই তোমাদেরকে এমন উদ্যানসমূহে দাখিল করব যার তলদেশে নহরসমূহ বইতে থাকবে, অতঃপর যে ব্যক্তি এরপরও কুফরী করবে, নিশ্চয়ই সে সোজা পথ থেকে দূরে সরে পড়ল। মুজিবুর রহমান

And Allah had already taken a covenant from the Children of Israel, and We delegated from among them twelve leaders. And Allah said, "I am with you. If you establish prayer and give zakah and believe in My messengers and support them and loan Allah a goodly loan, I will surely remove from you your misdeeds and admit you to gardens beneath which rivers flow. But whoever of you disbelieves after that has certainly strayed from the soundness of the way." Sahih International

১২. আর অবশ্যই আল্লাহ বনী ইসরাঈলের অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন এবং আমরা তাদের মধ্য থেকে বারজন দলনেতা পাঠিয়েছিলাম। আর আল্লাহ বলেছিলেন, নিশ্চয় আমি তোমাদের সংগে আছি; তোমরা যদি সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও, আমার রাসূলগণের প্রতি ঈমান আন, তাদেরকে সম্মান-সহযোগিতা কর এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান কর, তবে আমি তোমাদের পাপ অবশ্যই মোচন করব এবং অবশ্যই তোমাদেরকে প্রবেশ করাব জান্নাতসমূহে, যার পাদদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত। এর পরও কেউ কুফরী করলে সে অবশ্যই সরল পথ হারাবে।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১২) নিশ্চয় আল্লাহ বনী-ইস্রাঈলের অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন[1] এবং তাদের মধ্য হতে বারো জন নেতা নিযুক্ত করেছিলেন[2] আর বলেছিলেন, ‘আমি তোমাদের সঙ্গে আছি, তোমরা যদি নামায পড়, যাকাত দাও, আর আমার রসূলগণকে বিশ্বাস কর ও তাদেরকে সাহায্য কর এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান কর, তাহলে তোমাদের পাপরাশি অবশ্যই মোচন করব এবং নিশ্চয় তোমাদেরকে বেহেশ্তে প্রবেশাধিকার দান করব; যার পাদদেশে নদীমালা প্রবাহিত। এর পরও তোমাদের মধ্যে যে অবিশ্বাস করবে সে সরল পথ হারাবে।’

[1] যখন আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দাদেরকে ঐ অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করলেন, যা তিনি তাঁর রসূল (সাঃ)-এর মারফৎ গ্রহণ করেছেন। আর তাদেরকে হক প্রতিষ্ঠা ও ন্যায্য সাক্ষী প্রদানের নির্দেশ দিলেন এবং তাঁদেরকে তাঁর ঐ সকল পুরস্কার ও অনুগ্রহের কথা স্মরণ করালেন, যা তাঁদের জীবনে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্যভাবে প্রকাশ পেয়েছে; বিশেষ করে এই অনুগ্রহ যে, তিনি তাঁদেরকে সত্য ও সঠিক পথে চলার তওফীক দান করেছেন। তখন এই স্থানে ঐ অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করা হচ্ছে, যা ইতিপূর্বে বানী ইস্রাঈলের নিকট থেকে গ্রহণ করা হয়েছিল এবং যা পূরণ করতে তারা অকৃতকার্য প্রমাণিত হয়েছিল। এ যেন পরোক্ষভাবে মুসলিমদেরকে সতর্ক করা হচ্ছে যে, তোমরা যেন বানী ইস্রাঈলের ন্যায় অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ শুরু করে না দাও।

[2] এটি ঐ সময়কার ঘটনা, যখন মূসা (আঃ) দুর্দান্ত জাতি আমালেকাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন তিনি নিজ জাতির বারটি গোত্রের জন্য একজন করে দলপতি নির্বাচন করেন। যাতে তারা তাদের স্বগোত্রের লোকদেরকে যুদ্ধের জন্য পূর্ণরূপে প্রস্ত্তত করে, তাদের নেতৃত্ব ও পরিচালনার দায়িত্বও পালন করে এবং তাদের অন্যান্য ব্যাপারেও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় অগ্রণীর ভূমিকা গ্রহণ করে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-মায়েদা
৫:৭২ لَقَدۡ کَفَرَ الَّذِیۡنَ قَالُوۡۤا اِنَّ اللّٰہَ ہُوَ الۡمَسِیۡحُ ابۡنُ مَرۡیَمَ ؕ وَ قَالَ الۡمَسِیۡحُ یٰبَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ اعۡبُدُوا اللّٰہَ رَبِّیۡ وَ رَبَّکُمۡ ؕ اِنَّہٗ مَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰہِ فَقَدۡ حَرَّمَ اللّٰہُ عَلَیۡہِ الۡجَنَّۃَ وَ مَاۡوٰىہُ النَّارُ ؕ وَ مَا لِلظّٰلِمِیۡنَ مِنۡ اَنۡصَارٍ ﴿۷۲﴾

অবশ্যই তারা কুফরী করেছে, যারা বলেছে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ হচ্ছেন মারইয়াম পুত্র মাসীহ’। আর মাসীহ বলেছে, ‘হে বনী ইসরাঈল, তোমরা আমার রব ও তোমাদের রব আল্লাহর ইবাদাত কর’। নিশ্চয় যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, তার উপর অবশ্যই আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার ঠিকানা আগুন। আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই। আল-বায়ান

তারা অবশ্যই কুফরী করেছে যারা বলে, মারইয়াম পুত্র মাসীহই হচ্ছেন আল্লাহ। মাসীহ তো বলেছিল, হে বানী ইসরাঈল! তোমরা আল্লাহর ‘ইবাদাত কর যিনি আমার প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক। যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে অংশীস্থাপন করে তার জন্য আল্লাহ অবশ্যই জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন আর তার আবাস হল জাহান্নাম। যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই। তাইসিরুল

নিশ্চয়ই তারা কাফির হয়েছে যারা বলে - মসীহ ইবনে মারইয়ামই আল্লাহ। অথচ মসীহ্ নিজেই বলেছিলঃ হে বানী ইসরাঈল! তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর! যিনি আমার রাব্ব এবং তোমাদেরও রাব্ব; নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহর অংশী স্থাপন করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন এবং তার বাসস্থান হবে জাহান্নাম; এবং এরূপ অত্যাচারীদের জন্য কোন সাহায্যকারী থাকবেনা। মুজিবুর রহমান

They have certainly disbelieved who say, "Allah is the Messiah, the son of Mary" while the Messiah has said, "O Children of Israel, worship Allah, my Lord and your Lord." Indeed, he who associates others with Allah - Allah has forbidden him Paradise, and his refuge is the Fire. And there are not for the wrongdoers any helpers. Sahih International

৭২. যারা বলে, নিশ্চয় আল্লাহু তিনি তো মারইয়াম-তনয় মসীহ, অবশ্যই তারা কুফরী করেছে(১)। অথচ মসীহ বলেছিলেন, হে ইসরাঈল-সন্তানগণ! তোমরা আমার রব ও তোমাদের রব আল্লাহর ইবাদাত কর। নিশ্চয় কেউ আল্লাহর সাথে শরীক করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত অবশ্যই হারাম করে দিয়েছেন(২) এবং তার আবাস হবে জাহান্নাম। আর যালেমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।

(১) পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে বনী-ইসরাঈলের ঔদ্ধত্য ও তাদের অত্যাচার-উৎপীড়ন বর্ণনা করা হয়েছিল যে, আল্লাহ প্রেরিত রাসূল- যারা তাদের অক্ষয় জীবনের বার্তা এবং তাদের দুনিয়া ও আখেরাত সংশোধনের কার্যবিধি নিয়ে আগমন করেছিলেন, তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের পরিবর্তে তারা তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে। কতক নবীকে তারা মিথ্যারোপ করে এবং কতককে হত্যা করে ফেলে। আলোচ্য আয়াতে বনী-ইসরাঈলের কুটিলতার আরেকটি দিক উল্লেখ করা হয়েছে যে, মূৰ্খরা যেমন ঔদ্ধত্য ও অবাধ্যতার এক প্রান্তে থেকে আল্লাহর নবীদের প্রতি মিথ্যারোপ করেছে এবং কতককে হত্যা করেছে, তেমনি এরাই বক্রতার অপর প্রান্তে পৌছে নবীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে বাড়াবাড়ি তো মারইয়াম তনয় মসীহ এ কথা বলে তারা কুফরী করল এবং কাফের হয়ে গেল।

ইতিহাস বলে যে, যারা এ ধরণের উক্তি করত তারা হচ্ছে, নাসারাদের মালেকিয়্যা, ইয়াকুবিয়্যা এবং নাসতুরিয়্যাহ সম্প্রদায়। [ইবন কাসীর] আলোচ্য আয়াতে যদিও এ উক্তিটি শুধু নাসারাদের বলে বর্ণিত হয়েছে। অন্যত্র এ ধরণের বাড়াবাড়ি ও পথভ্রষ্টতা ইয়াহুদী এবং নাসারা উভয়ের ব্যাপারেও বর্ণনা করা হয়েছে, (وَقَالَتِ الْيَهُودُ عُزَيْرٌ ابْنُ اللَّهِ وَقَالَتِ النَّصَارَى الْمَسِيحُ ابْنُ اللَّهِ ذَٰلِكَ قَوْلُهُمْ بِأَفْوَاهِهِمْ يُضَاهِئُونَ قَوْلَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَبْلُ قَاتَلَهُمُ اللَّهُ أَنَّىٰ يُؤْفَكُونَ) অর্থাৎ “আর ইয়াহুদীরা বলে, উযায়র আল্লাহর পুত্র, এবং খৃস্টানরা বলে, মসীহ আল্লাহর পুত্র। ওটা তাদের মুখের কথা। আগে যারা কুফরী করেছিল ওরা তাদের মত কথা বলে। আল্লাহ ওদেরকে ধ্বংস করুন। কোন দিকে তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে?” [সূরা আত-তাওবাহঃ ৩০]


(২) অর্থাৎ নাসারারা যতই বাড়াবাড়ি করুক এবং ঈসাকে তাদের ইলাহ ঘোষণা করুক, ঈসা এতে কখনও সন্তুষ্ট নন। তিনি নিজেই এর বিপরীত ঘোষণা করেছিলেন। দুনিয়ায় আসার পর দোলনাতেই তার মুখের প্রথম কথা ছিল, (إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ)  অর্থাৎ আমি তো আল্লাহর বান্দা বা দাস। [সূরা মারইয়াম: ৩০) তিনি আরও বলেছিলেন, আমার ও তোমাদের রব একমাত্র আল্লাহ। তাঁরই ইবাদাত কর। সরল সঠিক পথ এটিই। [সূরা আলে ইমরান: ৫১; মারইয়াম: ৩৬; আয-যুখরুফ ৬৪] তাছাড়া যৌবনের পরবর্তী বয়সেও বলেছেন, তোমরা আল্লাহরই ইবাদাত কর, যারা তার সাথে অন্য কারও ইবাদাত করে তাদের জন্যে আল্লাহ জান্নাত হারাম করেছেন এবং তার ঠিকানা হবে জাহান্নামে। যেমন অন্য আয়াতেও আল্লাহ বলেছেন, “আল্লাহ শির্কের গোনাহ কখনও ক্ষমা করবেন না”। [সূরা আন-নিসা ৪৮, ১১৬]

অনুরূপভাবে জাহান্নামবাসীরা যখন জান্নাতবাসীদের কাছে খাদ্য ও পানি চাইবে, তখন তারা উত্তরে বলবে, নিশ্চয় আল্লাহ এ দুটি জিনিস কাফেরদের উপর হারাম করে দিয়েছেন। [সূরা আল-আরাফ: ৫০] হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করতে বলেছেন যে, শুধু মুমিন মুসলিমরাই জান্নাতে যাবে’। [মুসলিম: ১১১] আরও বলেছেন, যতক্ষণ তোমরা ঈমানদার না হবে ততক্ষণ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। [মুসলিম: ৫৪] সুতরাং ঈসা আলাইহিস সালাম কখনোও ইলাহ হওয়ার দাবী করেন নি এবং এটা তার পক্ষে শোভনীয়ও নয়। [ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৭২) তারা নিঃসন্দেহে অবিশ্বাসী (কাফের), যারা বলে, ‘আল্লাহই মারয়্যাম-তনয় মসীহ।’[1]অথচ মসীহ বলেছিল, ‘হে বনী ইস্রাঈল! তোমরা আমার প্রতিপালক ও তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহর উপাসনা কর।[2] অবশ্যই যে কেউ আল্লাহর অংশী করবে, নিশ্চয় আল্লাহ তার জন্য বেহেশ্ত্ নিষিদ্ধ করবেন ও দোযখ তার বাসস্থান হবে এবং অত্যাচারীদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।’ [3]

[1] একই বিষয় ১৭নং আয়াতেও আলোচিত হয়েছে। এখানে আহলে কিতাবদের ভ্রষ্টতার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে তার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। এ আয়াতে তাদের ঐ ফির্কার কুফরীর কথা প্রকাশ পেয়েছে, যারা মাসীহ (ঈসা (আঃ))-কে স্বয়ং আল্লাহ বলে।

[2] ঈসা (আঃ) দুগ্ধপোষ্য শিশু অবস্থায় আল্লাহর নির্দেশে (যে বয়সে সাধারণতঃ শিশুরা কথা বলতে পারে না) সর্বপ্রথম নিজের মুখ থেকে নিজের দাসত্বের কথা প্রকাশ করে বলেছিলেন, {إِنِّي عَبْدُ اللهِ آتَانِيَ الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا} অর্থাৎ ‘আমি আল্লাহর বান্দা বা দাস, তিনি আমাকে কিতাব দান করেছেন।’ (সূরা মারয়্যাম ৩০) মাসীহ (আঃ) এটা বলেননি যে, আমিই আল্লাহ অথবা আল্লাহর পুত্র। বরং শুধুমাত্র তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আল্লাহর বান্দা বা দাস’ এবং তিনি পরিণত বয়সে উপনীত হয়ে (মানুষকে) এই দাওয়াতই দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, {إِنَّ اللهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ هَذَا صِرَاطٌ مُّسْتَقِيمٌ} অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার প্রভু এবং তোমাদের প্রভু, সুতরাং তোমরা তাঁরই ইবাদত কর --এটাই সরল পথ। (সূরা আলে ইমরান ৫১) এই সেই শব্দাবলী যা তিনি মায়ের কোলেও বলেছিলেন। (দ্রষ্টব্য; সূরা মারয়্যামের ৩৬নং আয়াত) অনুরূপ কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে তিনি আসমান হতে অবতরণ করবেন, যার সংবাদ সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে এবং তাঁর (অবতরণের) ব্যাপারে আহলে সুন্নাহ ঐকমত্য পোষণ করেছেন। তিনি মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর আদর্শের অনুগামী হয়ে মানুষকে আল্লাহর একত্ব ও তাঁর আনুগত্যের প্রতি আহবান জানাবেন; নিজের ইবাদতের প্রতি নয়।

[3] মাসীহ (আঃ) আল্লাহর নির্দেশ ও ইচ্ছায় নিজ মুখে দাসত্বের ও রিসালতের কথা প্রকাশ ঐ সময় করেছিলেন যখন তিনি মায়ের কোলে দুগ্ধপোষ্য শিশু ছিলেন। অনুরূপ যখন তিনি পরিণত বয়সে উপনীত হলেন তখনও এই কথাই ঘোষণা করে (বলেছিলেন যে, আমি আল্লাহর বান্দা বা দাস ও তাঁর রসূল।) সেই সঙ্গে তিনি শিরকের ভয়াবহতা ও পরিণাম সম্পর্কে অবহিত করে বলেছিলেন যে, মুশরিকদের জন্য জান্নাত চিরতরে হারাম, আর তার কেউ সাহায্যকারীও হবে না যে, তাকে সে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবে; যেরূপ মুশরিকরা মনে করে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-মায়েদা
৫:৮৫ فَاَثَابَہُمُ اللّٰہُ بِمَا قَالُوۡا جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَا ؕ وَ ذٰلِکَ جَزَآءُ الۡمُحۡسِنِیۡنَ ﴿۸۵﴾

সুতরাং তারা যা বলেছে এর কারণে আল্লাহ তাদেরকে পুরস্কার দেবেন জান্নাতসমূহ, যার নীচে নদীসমূহ প্রবাহিত হয়, তারা সেখানে স্থায়ী হবে। আর এটা হল সৎকর্মপরায়ণদের প্রতিদান। আল-বায়ান

তাদের এ কথার কারণে আল্লাহ তাদেরকে জান্নাত দান করবেন, যার তলদেশে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত, তাতে তারা চিরকাল থাকবে, আর এটাই হল সৎকর্মশীলদের পুরস্কার। তাইসিরুল

ফলতঃ তাদের এই উক্তির বিনিময়ে আল্লাহ তাদেরকে এমন উদ্যানসমূহ প্রদান করবেন, যার তলদেশে নহর বইতে থাকবে, তারা তাতে অনন্তকাল অবস্থান করবে। সৎ কর্মশীলদের জন্য এটাই প্রতিদান! মুজিবুর রহমান

So Allah rewarded them for what they said with gardens [in Paradise] beneath which rivers flow, wherein they abide eternally. And that is the reward of doers of good. Sahih International

৮৫. অতঃপর তাদের এ কথার জন্য আল্লাহ তাদের পুরস্কার নির্দিষ্ট করেছেন জান্নাত, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত; তারা সেখানে স্থায়ী হবে। আর এটা মুহসিনদের পুরস্কার।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৮৫) অতঃপর তাদের এ কথার জন্য আল্লাহ তাদের পুরস্কার নির্দিষ্ট করেছেন জান্নাত, যার নিম্নে নদীমালা প্রবাহিত। তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। এ সৎকর্মশীলদের পুরস্কার।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-মায়েদা
৫:১১৯ قَالَ اللّٰہُ ہٰذَا یَوۡمُ یَنۡفَعُ الصّٰدِقِیۡنَ صِدۡقُہُمۡ ؕ لَہُمۡ جَنّٰتٌ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَاۤ اَبَدًا ؕ رَضِیَ اللّٰہُ عَنۡہُمۡ وَ رَضُوۡا عَنۡہُ ؕ ذٰلِکَ الۡفَوۡزُ الۡعَظِیۡمُ ﴿۱۱۹﴾

আল্লাহ বলবেন, ‘এটা হল সেই দিন যেদিন সত্যবাদীগণকে তাদের সততা উপকার করবে। তাদের জন্য আছে জান্নাতসমূহ যার নীচে প্রবাহিত হবে নদীসমূহ। সেখানে তারা হবে চিরস্থায়ী। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। এটা মহাসাফল্য। আল-বায়ান

আল্লাহ বলবেন, আজকের দিনে সত্যপন্থীদের সত্যপন্থা উপকার দিবে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত যার তলদেশে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত, তাতে তারা স্থায়ী হয়ে চিরকাল থাকবে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। এটাই হল মহা সাফল্য। তাইসিরুল

আল্লাহ বলবেনঃ এটি সেই দিন যেদিন সত্যবাদীদের সত্যবাদীতা কাজে আসবে, তারা উদ্যান প্রাপ্ত হবে, যার তলদেশে নহরসমূহ বইতে থাকবে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট; এটাই হচ্ছে মহাসফলতা। মুজিবুর রহমান

Allah will say, "This is the Day when the truthful will benefit from their truthfulness." For them are gardens [in Paradise] beneath which rivers flow, wherein they will abide forever, Allah being pleased with them, and they with Him. That is the great attainment. Sahih International

১১৯. আল্লাহ বলবেন, এ সে দিন যেদিন সত্যবাদিগণ তাদের সত্যের জন্য উপকৃত হবে, তাদের জন্য আছে জান্নাত যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে; আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তার প্রতি সন্তুষ্ট(১); এটা মহাসফলতা(২)।

(১) আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি। এক হাদীসে বলা হয়েছেঃ জান্নাত পাওয়ার পর আল্লাহ্ তা'আলা বলবেনঃ বড় নেয়ামত এই যে, আমি তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট; এখন থেকে কখনো তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হব না। [বুখারী: ৬৫৪৯; মুসলিম: ১৮৩]


(২) এটিই মহান সফলতা। স্রষ্টা ও পরম প্রভুর সন্তুষ্টি অর্জিত হয়ে গেলে এর চাইতে বৃহত্তর সফলতা আর কি হতে পারে? আল্লাহ্ তা'আলা অন্য আয়াতে এর জন্যই বলছেন যে, “এরূপ সাফল্যের জন্য আমলকারীদের উচিত আমল করা।” [সূরা আসসাফফাত: ৬১] আরও বলেন, “আর এ বিষয়ে প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতা করুক।” [আল-মুতাফফিফীন: ২৬]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১১৯) আল্লাহ বলবেন, ‘এ সেই (শেষ বিচারের) দিন; যেদিন সত্যবাদিগণকে তাদের সত্যবাদিতা উপকৃত করবে,[1] তাদের জন্য আছে বেহেশত্ যার পাদদেশে নদীমালা প্রবাহিত, তারা সেখানে চিরদিন থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তারাও তাতে সন্তুষ্ট। এটি হল মহাসাফল্য।’

[1] ইবনে আববাস (রাঃ) এর ব্যাখ্যায় বলেন, ‘যেদিন তওহীদবাদিগণকে তাঁদের তওহীদ উপকৃত করবে।’ অর্থাৎ, মুশরিকদের ক্ষমা ও পরিত্রাণের কোন রাস্তাই থাকবে না।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-আ'রাফ
৭:১৯ وَ یٰۤاٰدَمُ اسۡکُنۡ اَنۡتَ وَ زَوۡجُکَ الۡجَنَّۃَ فَکُلَا مِنۡ حَیۡثُ شِئۡتُمَا وَ لَا تَقۡرَبَا ہٰذِہِ الشَّجَرَۃَ فَتَکُوۡنَا مِنَ الظّٰلِمِیۡنَ ﴿۱۹﴾

‘আর হে আদম, তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বাস কর। অতঃপর তোমরা আহার কর যেখান থেকে চাও এবং এই গাছটির নিকটবর্তী হয়ো না। তাহলে তোমরা উভয়ে যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবে’। আল-বায়ান

‘আর, হে আদাম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বাস করতে থাক, দু’জনে যা পছন্দ হয় খাও আর এই গাছের কাছে যেও না, তাহলে যালিমদের দলে শামিল হয়ে যাবে।’ তাইসিরুল

আর হে আদম! তুমি এবং তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস কর এবং এখানে তোমাদের মনে যা চায় তাই খাও, কিন্তু এই বৃক্ষের নিকটবর্তী হয়োনা, তাহলে অত্যাচারীদের মধ্যে গণ্য হবে। মুজিবুর রহমান

And "O Adam, dwell, you and your wife, in Paradise and eat from wherever you will but do not approach this tree, lest you be among the wrongdoers." Sahih International

১৯. আর হে আদম! আপনি ও আপনার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করুন, অতঃপর যেথা হতে ইচ্ছা খান, কিন্তু এ গাছের ধারে-কাছেও যাবেন না, তাহলে আপনারা যালেমদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৯) আর বললাম, ‘হে আদম! তুমি ও তোমার সঙ্গিনী জান্নাতে বসবাস কর এবং যথা ও যেথা ইচ্ছা আহার কর। কিন্তু এ বৃক্ষের নিকটবর্তী হয়ো না,[1] হলে তোমরা অত্যাচারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’

[1] অর্থাৎ, কেবল এই একটি গাছ বাদ দিয়ে যেখান থেকে এবং যেভাবে চাও খাও। একটি গাছের ফল খাওয়ার প্রতিবন্ধকতা পরীক্ষা স্বরূপ আরোপ করেছিলেন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
দেখানো হচ্ছেঃ থেকে ২০ পর্যন্ত, সর্বমোট ২৭৪ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে পাতা নাম্বারঃ 1 2 3 4 5 6 · · · 13 14 পরের পাতা »