আল্লাহর কিতাব বিষয়ক আয়াতসমূহ ২৬৩ টি
আল-বাকারা
২:২ ذٰلِکَ الۡکِتٰبُ لَا رَیۡبَ ۚۖۛ فِیۡہِ ۚۛ ہُدًی لِّلۡمُتَّقِیۡنَ ۙ﴿۲﴾

এই সেই কিতাব, যাতে কোন সন্দেহ নেই, মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত। আল-বায়ান

এটা ঐ (মহান) কিতাব যাতে কোন সন্দেহ নেই, মুত্তাকীদের জন্য পথ নির্দেশ। তাইসিরুল

ইহা ঐ গ্রন্থ যার মধ্যে কোন সন্দেহ-সংশয়ের অবকাশ নেই; ধর্ম-ভীরুদের জন্য এ গ্রন্থ পথনির্দেশ। মুজিবুর রহমান

This is the Book about which there is no doubt, a guidance for those conscious of Allah - Sahih International

২. এটা(১) সে কিতাব; যাতে কোন সন্দেহ নেই(২), মুত্তাকীদের জন্য(৩) হেদায়াত,

১. ذَٰلِكَ শব্দের অর্থ- ঐটা, সাধারণতঃ কোন দূরবতী বস্তুকে ইশারা করার জন্য ব্যবহৃত হয়। এখানে ذَٰلِكَ দ্বারা কি উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে এ ব্যাপারে আলেমগণ থেকে কয়েকটি মত বর্ণিত হয়েছেঃ

১) ذَٰلِكَ শব্দের অর্থ তাওরাত ও ইঞ্জিল বুঝানো হয়েছে, তখন তার অর্থ হবেঃ হে মুহাম্মাদ (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ঐ কিতাব যা আমি তাওরাত ও ইঞ্জিলে উল্লেখ করেছিলাম, তা-ই আপনার উপর নাযিল করেছি। অথবা, হে ইয়াহুদী ও নাসারা সম্প্রদায়! তোমাদেরকে যে কিতাবের ওয়াদা আমি তোমাদের কিতাবে করেছি সেটা এই কিতাব যা আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর নাযিল করেছি।

২) এখানে ذَٰلِكَ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, এ আয়াতসমূহের পূর্বে মক্কা ও মদীনায় নাযিল কুরআনের অন্যান্য সূরা ও আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করা। আর যেহেতু সেগুলো আগেই গত হয়েছে, সেহেতু এ দ্বারা সম্বোধন শুদ্ধ হয়েছে।

৩) কোন কোন মুফাসসির বলেনঃ এখানে কিতাব বলতে ঐ কিতাবকে বুঝিয়েছেন, যা আল্লাহ তা'আলা তাঁর কাছে রেখে দিয়েছেন। যা লাওহে মাহফুজে সংরক্ষিত।

৪) এখানে কিতাব দ্বারা ঐ কিতাব উদ্দেশ্য, যাতে আল্লাহ্ তা'আলা বান্দার ভাল-মন্দ, রিযক, আয়ু ইত্যাদি লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন।

৫) এখানে ঐ কিতাব বুঝানো হয়েছে যা তিনি নিজে লিখে রেখেছেন তাঁর কাছে আরশের উপর, যেখানে লেখা আছে, “আমার রহমত আমার ক্রোধের উপর প্রাধান্য পাবে"। [বুখারী: ৭৫৫৩, মুসলিম: ২৭৫১]

৬) الم দ্বারা যদি পবিত্র কুরআন বুঝানো হয়ে থাকে, অর্থাৎ কুরআনের নাম হয়ে থাকে, তাহলে ذَٰلِكَ الْكِتَاب দ্বারা الم বুঝানো হয়েছে।

৭) এখানে ذلك দ্বারা هذا বুঝানো হয়েছে। [আত-তাফসীরুস সহীহ] অর্থাৎ এই কিতাব যার আলোচনা হচ্ছে, বা সামনে আসছে। সুতরাং এর দ্বারা কুরআনকেই বুঝানো হয়েছে। আর এ শেষোক্ত মতই সবচেয়ে বেশী বিশুদ্ধ। সুতরাং الْكِتَاب দ্বারা কুরআন মাজীদকে বোঝানো হয়েছে।


২.  এ আয়াতে উল্লেখিত ريب শব্দের অর্থ এমন সন্দেহ যা অস্বস্তিকর। এ আয়াতের বর্ণনায় মুফাসসিরগণ বিভিন্ন মত পোষন করেছেনঃ

১) এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এ কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল করা হয়েছে।
২) তোমরা এ কুরআনের মধ্যে কোন সন্দেহ করো না। [ইবনে কাসীর]
৩) কোন কোন মুফাসসির বলেনঃ এর অর্থ তোমরা এ কুরআনের মধ্যে কোন সন্দেহে নিপতিত হবে না। অর্থাৎ এর সবকিছু স্পষ্ট।
৪) কোন কোন মুফাসসির বলেনঃ যদি কিতাব দ্বারা ঐ কিতাব উদ্দেশ্য হয়, যাতে আল্লাহ্ তা'আলা সবকিছুর ভালমন্দ হওয়া লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন, তাহলে لَا رَيْبَ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, এতে কোন পরিবর্তন, পরিবর্ধন নেই।


৩. ‘মুত্তাকীন’ শব্দটি ‘মুত্তাকী’-এর বহুবচন। মুত্তাকী শব্দের মূল ধাতু তাকওয়া। তাকওয়া হলো, নিরাপদ থাকা, নিরাপত্তা বিধান করা। শরীআতের পরিভাষায় তাকওয়া হলো, বান্দা যেন আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে, আর তা করতে হলে যা করতে হবে তা হলো, তাঁর নির্দেশকে পুরোপুরি মেনে নেয়া, এবং তাঁর নিষেধকৃত বস্তুকে পুরোপুরি ত্যাগ করা। আর মুত্তাকী হলেন, যিনি আল্লাহর আদেশকে পুরোপুরি মেনে নিয়ে এবং তার নিষেধ থেকে সম্পূর্ণরূপে দূরে থেকে তাঁর অসন্তুষ্টি ও শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেন। [ইবনে কাসীর]

বর্ণিত আছে যে, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু উবাই ইবনে কাব রাদিয়াল্লাহু আনহুকে তাকওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, আপনি কি কখনো কাঁটাযুক্ত পথে চলেছেন? তিনি বললেন, অবশ্যই। উবাই বললেন, কিভাবে চলেছেন? উমর বললেন, কাপড় গুটিয়ে অত্যন্ত সাবধানে চলেছি। উবাই বললেনঃ এটাই হলো, তাকওয়া। [ইবনে কাসীর] তবে প্রশ্ন হতে পারে যে, মুত্তাকীগণকে কেন হেদায়াত প্রাপ্তির জন্য নির্দিষ্ট করেছেন? এ ব্যাপারে আলেমগণ বলেন, মূলতঃ মুত্তাকীরাই আল্লাহর কুরআন থেকে হেদায়াত লাভ করতে পারেন, অন্যান্য যারা মুত্তাকী নন তারা হেদায়াত লাভ করতে পারেন না। যদিও কুরআন তাদেরকে সঠিক পথের দিশা দেন। আর পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াত এ অর্থের উপর প্রমাণবহ। আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় এ কুরআন হিদায়াত করে সে পথের দিকে যা আকওয়াম তথা সুদৃঢ় এবং সৎকর্মপরায়ণ মুমিনদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার”। [সূরা আল-ইসরা ৯]

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা এ আয়াতের তাফসীরে বলেন, এ কুরআন তাদের জন্য হিদায়াত যারা হেদায়াত চেনার পর তা গ্রহণ না করার শাস্তির ভয়ে সদা কম্পমান। আর তারা তাঁর কাছ থেকে যা এসেছে তার সত্যায়নের মাধ্যমে রহমতের আশাবাদী। [তাফসীরে ইবনে কাসীর ও আত-তাফসীরুস সহীহ] তাছাড়া হিদায়াতের কোন শেষ নেই, মুত্তাকীরা সর্বদা আল্লাহর নাযিল করা হেদায়াতের মুখাপেক্ষী বিধায় হেদায়াতকে তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। তবে অন্যান্য আয়াতে কুরআনকে সমস্ত মানবজাতির জন্য হেদায়াতকারী বলে উল্লেখ করেছেন, সেখানে এর অর্থ হলো, হিদায়াতের পথ তাদের দেখাতে পারে যদি তারা তা থেকে হিদায়াত নিতে চায়।

তাফসীরে জাকারিয়া

২। এ গ্রন্থ; (কুরআন) এতে কোন সন্দেহ নেই, [1] সাবধানীদের জন্য এ (গ্রন্থ) পথ-নির্দেশক।[2]

[1] এ কিতাবের অবতরণ যে আল্লাহর নিকট থেকে এ ব্যাপারে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। যেমন অন্য আয়াতে এসেছে, ;এ কিতাবের অবতরণ বিশ্বপালনকর্তার নিকট থেকে এতে কোন সন্দেহ নেই।’’ (সূরা সাজদা ২) কোন কোন আলেমগণ বলেছেন, বাক্যটি ঘোষণামূলক হলেও তার অর্থ নিষেধমূলক। অর্থাৎ, لاَ تَرتَابُوا فِيهِ (এতে সন্দেহ করো না)। এ ছাড়াও এতে যেসব ঘটনাবলী উল্লেখ করা হয়েছে তার সত্যতা সম্পর্কে, যেসব বিধি-বিধান ও মসলা-মাসায়েল বর্ণিত হয়েছে সে সবের উপর মানবতার কল্যাণ ও মুক্তি যে নির্ভরশীল সে ব্যাপারে এবং যেসব আক্বীদা (তাওহীদ, রিসালাত ও আখেরাত) সংক্রান্ত বিষয় আলোচিত হয়েছে তার সত্য হওয়ার ব্যাপারে কোন প্রকার সন্দেহ নেই।

[2] এই ঐশী গ্রন্থ আসলে তো সমস্ত মানুষের হিদায়াত এবং পথ প্রদর্শনের জন্যই অবতীর্ণ হয়েছে, কিন্তু এই নির্ঝরের পানি দ্বারা কেবল তারাই সিক্ত হবে, যারা ‘আবে হায়াত’ (সঞ্জীবনী পানি)-এর সন্ধানী এবং আল্লাহর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হবে। আর যাদের অন্তরে মৃত্যুর পর আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে জবাবদিহি করার অনুভূতি এবং চিন্তা নেই, যাদের মধ্যে সুপথ সন্ধানের অথবা ভ্রষ্টতা থেকে বাঁচার কোনই উৎসাহ ও আগ্রহ নেই, তারা সুপথ কোথা থেকে এবং কেনই বা পাবে? (সকাল তো তাদের জন্য, যারা ঘুম ছেড়ে চোখের পাতা মেলে জেগে ওঠে।)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:২৩ وَ اِنۡ کُنۡتُمۡ فِیۡ رَیۡبٍ مِّمَّا نَزَّلۡنَا عَلٰی عَبۡدِنَا فَاۡتُوۡا بِسُوۡرَۃٍ مِّنۡ مِّثۡلِہٖ ۪ وَ ادۡعُوۡا شُہَدَآءَکُمۡ مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ اِنۡ کُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ ﴿۲۳﴾

আর আমি আমার বান্দার উপর যা নাযিল করেছি, যদি তোমরা সে সম্পর্কে সন্দেহে থাক, তবে তোমরা তার মত একটি সূরা নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সাক্ষীসমূহকে ডাক; যদি তোমরা সত্যবাদী হও। আল-বায়ান

আমি আমার বান্দাহর প্রতি যা নাযিল করেছি তাতে তোমাদের কোন সন্দেহ থাকলে তোমরা তার মত কোন সূরাহ এনে দাও আর তোমরা যদি সত্যবাদী হও, তবে আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সকল সাহায্যকারীকে আহবান কর। তাইসিরুল

এবং আমি আমার বান্দার প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি, যদি তোমরা তাতে সন্দিহান হও তাহলে তৎসদৃশ একটি ‘‘সূরা’’ আনয়ন কর এবং তোমাদের সেই সাহায্যকারীদেরকে ডেকে নাও যারা আল্লাহ হতে পৃথক, যদি তোমরা সত্যবাদী হও! মুজিবুর রহমান

And if you are in doubt about what We have sent down upon Our Servant [Muhammad], then produce a surah the like thereof and call upon your witnesses other than Allah, if you should be truthful. Sahih International

২৩. আর আমরা আমাদের বান্দার প্রতি যা নাযিল করেছি তাতে তোমাদের কোন সন্দেহ থাকলে তোমরা এর অনুরূপ কোন সূরা আনয়ন কর(১) এবং আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের সকল সাক্ষী সাহায্যকারীকে(২) আহবান কর, যদি তোমরা সত্যবাদী হও(৩)।

১. পূর্ববর্তী আয়াতে তাওহীদ প্রমাণ করা হয়েছিল। আর এ আয়াত ও পরবর্তী আয়াতে নবুওয়ত ও রিসালাতের সত্যতা সাব্যস্ত করা হচ্ছে। [ইবনে কাসীর]


২. شُهَدَاء শব্দের ব্যাখ্যা ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার মতে, أعْوَنُكُمْ বা সাহায্যকারীগণ। অর্থাৎ এমন সম্প্রদায় আহবান কর যারা তোমাদেরকে এ ব্যপারে সাহায্য-সহযোগিতা করতে পারবে। আবু মালেক বলেন, এর অর্থ, شُرَكَاءَكُمْ তোমাদের অংশীদারদেরকে বা যাদেরকে তোমরা আমার সাথে শরীক করছ সে শরীকদেরকে আহবান করে দেখ তারা কি এর অনুরূপ কোন সূরা আনতে পারে কি না? মুজাহিদ বলেন, شُهَدَاء শব্দটি এখানে সাধারণ অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ এমন লোকদের আহবান করে নিয়ে আস যারা এ ব্যাপারে সাক্ষ্য হবে যে, আল্লাহর কালামের বিপরীতে যা নিয়ে আসবে তা আল্লাহর কালামের মত হয়েছে। ভাষাবিদদের সাক্ষ্য এর সাথে যোগ করে দাও।

পবিত্র কুরআনে এ চ্যালেঞ্জ বিভিন্ন স্থানে এসেছে। মক্কী সূরায়ও এমন চ্যালেঞ্জ এসেছিল। বলা হয়েছে, “এ কুরআন আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো রচনা হওয়া সম্ভব নয়। বরং এর আগে যা নাযিল হয়েছে এটা তার সমর্থক এবং আল কিতাবের বিশদ ব্যাখ্যা। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এটা জগতসমূহের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে। তারা কি বলে, তিনি এটা রচনা করেছেন? বলুন, তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সূরা নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য যাকে পার ডাক, যদি তোমরা সত্যবাদী হও [সূরা ইউনুস ৩৭-৩৮) তারপর মদীনায় নাযিল হওয়া সূরাসমূহেও এ ধরনের চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। যেমন, সূরা আল বাকারাহ এর আলোচ্য আয়াত। [ইবনে কাসীর]


৩. কুরআন নিয়ে যারাই গবেষণা করেছেন, তারা একবাক্যে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, এর ভাষাগত বাহ্যিক রূপ ও মর্মগত আত্মিক স্বরূপ উভয় দিক দিয়েই এটা অতুলনীয়। মহান আল্লাহ বলেন, “আলিফ-লাম-রা, এ কিতাব প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞের কাছ থেকে; এর আয়াতসমূহ সুস্পষ্ট, সুবিন্যস্ত ও পরে বিশদভাবে বিবৃত।” [সূরা হুদঃ ১] সুতরাং কুরআনের ভাষা অত্যন্ত সুসংবদ্ধ ও তার মর্ম সূদুরপ্রসারী ও ব্যাপক। ভাব ও ভাষা উভয় ক্ষেত্রেই তা অতুলনীয় ও বিস্ময়কর। সব সৃষ্টিজগত তার সমকক্ষতার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত অক্ষমতার স্বীকৃতি প্রদান করেছে। তাতে একদিকে যেমন অতীতের ইতিহাস উপযুক্তভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তেমনি ভবিষ্যতে অনুষ্ঠিতব্য ঘটনাবলীও সুস্পষ্টভাবে বিধৃত হয়েছে। ন্যায় অন্যায় ও ভালো মন্দ সম্পর্কিত সব কিছুই সুনিপুণভাবে তাতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাই আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করলেন, “সত্য ও ন্যায়ের দিক দিয়ে আপনার রব-এর বাণী পরিপূর্ণ। তার বাক্য পরিবর্তন করার কেউ নেই। আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ”। [সূরা আল-আন’আম: ১১৫] অর্থাৎ যে সমস্ত সংবাদ দিয়েছেন সেগুলোর সত্যতা প্রমাণিত| আর যে সমস্ত বিধান দিয়েছেন বিধানদাতা হিসেবে সেগুলোর ন্যায়পরায়ণতা পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়েছে। এর প্রতিটি বিষয়ই সত্য ও ন্যায়ের মাপকাঠি ও পথের দিশারী। এতে কোন ধারণাপ্রসূত কথা, রূপকথা কিংবা কাল্পনিক গালগল্প ও মিথ্যাচার যা সাধারণত কবিদের কাব্যে পাওয়া যায়, এতে এর বিন্দুমাত্র ছোয়াও নেই।

কুরআনের মজীদের পুরোটাই হচ্ছে উচ্চাঙ্গের কথামালা। অনন্য ভাষাশৈলীতা এবং হৃদয়স্পশী উপমায় ভরপুর। আরবী ভাষায় সুপণ্ডিত ও গভীর দৃষ্টিসম্পন্ন মনীষীরাই কেবল কুরআনের ভাষারীতি ও ভাব সম্পদের গভীরে প্রবেশ করতে সক্ষম। কুরআন যখন কোন খবর প্রকাশ করে, হোক তা বিস্তারিত বা সংক্ষিপ্ত, আবার তা যদি একবারের জায়গায় বারবারও বলা হয়, তথাপি তার স্বাদ ও মাধুর্যে বিন্দুমাত্র ব্যত্যয় ঘটে না। যতই পাঠ করবে ততই যেন অজানা এক স্বাদে মন উত্তরোত্তর উদ্বেলিত হয়েই চলবে। তার বারবার পাঠ করলে যেমন সাধারণ পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে না। তেমনি অসাধারণ পাঠকরাও অনাগ্রহ প্রকাশ করেন না।

আল-কুরআনের ভীতি প্রদর্শনমূলক আয়াত ও কঠোর সতর্কবাণী ভালো করে অনুধাবন করলে কঠিন মানুষ তো দূরের কথা পাহাড় পর্যন্ত ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে কাঁপতে থাকে। অনুরূপভাবে তার আশ্বাসবাণী ও পুরস্কার বিবরণ দেখলে ও হৃদয়ঙ্গম করলে অন্ধ মনের বন্ধ দুয়ার উন্মুক্ত হয়ে যায়, অবরুদ্ধ শ্রবণশক্তি প্রত্যাশার পদ-ধ্বনি শুনতে পায়। আর মৃত মন ইসলামের অমিত শরবত পানের জন্যে ব্যাকুল হয়ে উঠে। এসব কিছু মিলে অজান্তে হৃদয়ে শান্তিধাম জান্নাতের প্রতি আগ্রহ বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। আর মহান আল্লাহর আরশের কাছে থাকার তীব্র আকাংখা জাগ্রত হয়।

এ কুরআনের বিষয় বৈচিত্র আশ্চর্যজনক। ভাষার অলংকারের ঔজ্জ্বল্য, নসীহতের প্রাচুর্য, হাজারো যুক্তি প্রমাণ ও তত্ত্বজ্ঞানের আধিক্য কুরআনকে গ্রন্থ জগতে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছে। বিধিনিষেধের বাণীসমূহকে অত্যন্ত ন্যায়ানুগ, কল্যাণকর, আকর্ষণীয় ও প্রভাবময় করা হয়েছে। ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু সহ অনেক প্রাচীন মনীষী বলেছেন (يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا) শোনার সাথে সাথে মনোযোগের সাথে কান পেতে পরবর্তী বক্তব্য শোন। কারণ, তারপর হয়ত কোন কল্যাণের পথে আহবান থাকবে, না হয় কোন অকল্যাণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ ঘোষিত হবে। [ইবন কাসীর]

আর যদি আল-কুরানে কিয়ামতের মাঠের ভয়াবহ চিত্র, চির সুখের জান্নাতের নেয়ামতরাজি, জাহান্নামের চিরন্তন দুর্ভোগের বিবরন, নেককারদের লোভনীয় পুরস্কার আর গুনাহগারদের নানা রকম ভয়াবহ শাস্তি, দুনিয়ার সম্পদ ও সুখ সম্ভোগের অসারতা ও পারলৌকিক জীবনের সুখ সম্ভোগের অবিনশ্বরতা সংক্রান্ত আলোচনার দিকে দৃষ্টি দেয়া যায় তবে তা বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা ও কল্যাণমূলক আলোচনায় সমৃদ্ধ। এসব বর্ণনা মানুষকে বার বার ন্যায়ের পথে উদ্বুদ্ধ করে, মনকে ভয়ে বিগলিত করে এবং শয়তানের প্ররোচণায় জমানো অন্তরের কালি ধুয়ে মুছে সাফ করে দেয়।

 আল-কুরআনের এ ধরনের অবিস্মরণীয় ও আশ্চর্যজনক মু'জিযার কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “মানুষের ঈমান আনার জন্য প্রত্যেক নবীকে কিছু কিছু মু'জিযা প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ প্রদত্ত ওহী হচ্ছে আমার মু'জিযা। আমি আশা করি কিয়ামতের দিন অন্যান্য নবীর তুলনায় আমার উম্মতের সংখ্যা অধিক হবে।” [বুখারী ৪৯৮১, মুসলিম: ১৫২] কারণ, প্রত্যেক নবীর মু'জিযা তাদের ইন্তেকালের সাথে সাথে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। কিন্তু কুরআনুল করীম কেয়ামত পর্যন্ত অক্ষত অবস্থায় বর্তমান থাকবে। সৰ্বকালের মানুষের কাছে অবিসংবাদিত হিসেবে থাকবে। [ইবনে কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

২৩। আমি আমার দাসের প্রতি (মুহাম্মাদের প্রতি) যা অবতীর্ণ করেছি তাতে তোমাদের কোন সন্দেহ থাকলে তোমরা তার অনুরূপ কোন সূরা আনয়ন কর, এবং তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের সকল সাক্ষী (এ কাজে সহযোগী উপাস্যদের)কে আহবান কর।

তাওহীদের পর এবারে রিসালাতের প্রমাণ পেশ করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, আমি আমার বান্দার প্রতি যে কিতাব অবতীর্ণ করেছি, সেটা যে আল্লাহরই পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এ ব্যাপারে যদি তোমাদের কোন সন্দেহ থাকে, তবে তোমরা তোমাদের সকল সহযোগীদের সাথে নিয়ে এই ধরনের কোন একটি সূরা রচনা করে দেখিয়ে দাও! আর যদি এ রকম করতে না পার, তাহলে জেনে নিও যে, বস্ত্ততঃ এ বাণী কোন মানুষের প্রচেষ্টার ফল নয়, বরং তা আল্লাহর বাণী। তোমাদের উচিত, আল্লাহর কালাম এবং রসূলের রিসালাতের উপর ঈমান এনে সেই জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে চেষ্টা করা, যা কাফেরদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:২৪ فَاِنۡ لَّمۡ تَفۡعَلُوۡا وَ لَنۡ تَفۡعَلُوۡا فَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِیۡ وَقُوۡدُہَا النَّاسُ وَ الۡحِجَارَۃُ ۚۖ اُعِدَّتۡ لِلۡکٰفِرِیۡنَ ﴿۲۴﴾

অতএব যদি তোমরা তা না কর- আর কখনো তোমরা তা করবে না- তাহলে আগুনকে ভয় কর যার জ্বালানী হবে মানুষ ও পাথর, যা প্রস্তুত করা হয়েছে কাফিরদের জন্য। আল-বায়ান

যদি তোমরা না পার এবং কক্ষনো পারবেও না, তাহলে সেই আগুনকে ভয় কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ এবং পাথর, যা প্রস্তুত রয়েছে কাফেরদের জন্য। তাইসিরুল

অতঃপর যদি তোমরা তা করতে না পার এবং তোমরা তা কখনও করতে পারবেনা, তাহলে তোমরা সেই জাহান্নামের ভয় কর যার খোরাক মনুষ্য ও প্রস্তর খন্ড - যা অবিশ্বাসীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। মুজিবুর রহমান

But if you do not - and you will never be able to - then fear the Fire, whose fuel is men and stones, prepared for the disbelievers. Sahih International

২৪. অতএব যদি তোমরা তা করতে না পার আর কখনই তা করতে পারবে না(১), তাহলে তোমরা সে আগুন থেকে বাঁচার ব্যবস্থা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর(২), যা প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে(৩) কাফেরদের জন্য।

১. এটা কুরআনের বিশেষ মু'জিযা। একমাত্র কুরআনই নিঃসংকোচে সর্বকালের জন্য নিজ স্বীকৃত সত্তার এভাবে ঘোষণা দিতে পারে। যেভাবে রাসূলের যুগে কেউ এ কুরআনের মত আনতে পারে নি। তেমনি কুরআন এ ঘোষণাও নিঃশঙ্ক ও নিঃসংকোচে দিতে পেরেছে যে, যুগের পর যুগের জন্য, কালের পর কালের জন্য এই চ্যলেঞ্জ ছুড়ে দেয়া হচ্ছে যে, এ কুরআনের মত কোন কিতাব কেউ কোন দিন আনতে পারবে না। অনুরূপই ঘটেছে এবং ঘটে চলেছে। রাসূলের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত কেউ এ কুরআনের মত কিছু আনার দুঃসাহস দেখাতে পারে নি। আর কোনদিন পারবেও না। গোটা বিশ্বের যিনি সৃষ্টিকর্তা তার কথার সমকক্ষ কোন কথা কি কোন সৃষ্টির পক্ষে আনা সম্ভব?


২. ইবনে কাসীর বলেন, এখানে পাথর দ্বারা কালো গন্ধক পাথর বোঝানো হয়েছে। গন্ধক দিয়ে আগুন জ্বালালে তার তাপ ভীষণ ও স্থায়ী হয়। আসমান যমীন সৃষ্টির সময়ই আল্লাহ্ তা'আলা কাফেরদের জন্য তা সৃষ্টি করে প্রথম আসমানে রেখে দিয়েছেন। কোন কোন মুফাসসির বলেন, এখানে ঐ সমস্ত পাথর উদ্দেশ্য, যেগুলোর ইবাদাত করা হয়েছে। [ইবনে কাসীর] আর জাহান্নামের আগুন সম্পর্কে হাদীসে এসেছে, “তোমাদের এ আগুন জাহান্নামের আগুনের সত্তর ভাগের এক ভাগ। সাহাবায়ে কিরাম বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এ এক ভাগ দিয়ে শাস্তি দিলেই তো যথেষ্ট হতো। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, জাহান্নামের আগুন তোমাদের আগুনের তুলনায় উনসত্তর গুণ বেশী উত্তপ্ত [বুখারী ৩২৬৫, মুসলিম: ২৪৮৩]


৩. এ আয়াতাংশের ব্যাখ্যা হচ্ছে, জাহান্নাম কাফেরদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এখানে أُعِدَّتْ এর সর্বনামটির ইঙ্গিত সুস্পষ্টতই মানুষ ও পাথর দ্বারা প্রজ্জ্বলিত জাহান্নামের দিকে। অবশ্য এ সর্বনামটি পাথরের ক্ষেত্রেও হতে পারে। তখন অর্থ দাঁড়ায়, পাথরগুলো কাফেরদের শাস্তি প্রদানের জন্য তৈরী করে রাখা হয়েছে। ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে অনুরূপ তাফসীর বর্ণিত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে উভয় অর্থের মধ্যে বড় ধরনের কোন তফাৎ নেই। একটি অপরটির পরিপূরক ও পরস্পর অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। আগুন বিহীন যেমন পাথর জ্বলে না, তেমনি পাথর বিহীন আগুনের দাহ্য ক্ষমতাও বাড়ে না। সুতরাং উভয় উপাদানই কাফেরদের কঠোর শাস্তি দেয়ার জন্যে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

আয়াতের এ অংশ দ্বারা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের ইমামগণ দলীল নেন যে, জাহান্নাম বর্তমানে তৈরী করা অবস্থায় আছে। জাহান্নাম যে বাস্তবিকই বর্তমানে রয়েছে তার প্রমাণ অনেক হাদীস দ্বারা পাওয়া যায়। যেমন, জাহান্নাম ও জান্নাতের বিবাদের বর্ণনা সংক্রান্ত হাদীস [বুখারী ৪৮৪৯, মুসলিম: ২৮৪৬] , জাহান্নামের প্রার্থনা মোতাবেক তাকে বছরে শীত ও গ্রীষ্মে দুই বার শ্বাস প্রশ্বাস গ্রহণের অনুমতি প্রদানের বর্ণনা [বুখারী ৫৩৭, মুসলিম: ৬৩৭] ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে এক হাদীসে আছে, “আমরা একটি বিকট শব্দ শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে তার কারণ জানতে চাওয়ায় তিনি বললেন, এটা সত্তর বছর পূর্বে জাহান্নামের উদ্দেশ্যে নিক্ষিপ্ত পাথর জাহান্নামে পতিত হওয়ার আওয়ায। (মুসলিম: ২৮৪৪, মুসনাদে আহমাদ ২/৪৭১] তাছাড়া সূর্যগ্রহণের সালাত এবং মিরাজের রাত্রির ঘটনাবলীও প্রমাণ করে যে, জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়টিই তৈরী করে রাখা হয়েছে। [ইবনে কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

২৪। যদি তোমরা তা (আনয়ন) না কর, এবং কখনই তা করতে পারবে না, (1) তাহলে সেই আগুনকে ভয় কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ এবং পাথর, (2) অবিশ্বাসীদের জন্য যা প্রস্তুত রয়েছে। (3)

(1) ক্বুরআন কারীমের সত্যতার এটি আর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যে, আরব (আরবী ভাষা-ভাষী) ও অনারব (যাদের ভাষা আরবী নয়) সকল কাফেরদেরকে চ্যালেঞ্জ্ করা হয়েছে। কিন্তু তারা আজ পর্যন্ত এই চ্যালেঞ্জের জওয়াব দিতে অপারগ সাব্যস্ত হয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত অপারগই থাকবে।

(2) ইবনে আববাস (রাঃ)-এর উক্তি অনুযায়ী পাথর বলতে এখানে গন্ধক জাতীয় পাথরকে বুঝানো হয়েছে। অন্যদের নিকট পাথরের সেই মূর্তিগুলোও জাহান্নামের ইন্ধন হবে, দুনিয়াতে পৌত্তলিকরা যাদের পূজা করত। যেমন ক্বুরআন মাজীদে আছে,

{إِنَّكُمْ وَمَا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ حَصَبُ جَهَنَّمَ} & তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের পূজা করো, সেগুলো দোযখের ইন্ধন। (আম্বিয়া ৯৮ আয়াত)

(3) এ থেকে প্রথমতঃ জানা গেল যে, প্রকৃতপক্ষে জাহান্নাম কাফের (অবিশ্বাসী) এবং মুশরিক (অংশীবাদী)-দের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। আর দ্বিতীয়তঃ জানা গেল যে, জান্নাত ও জাহান্নামের অস্তিত্ব আছে এবং এখনোও তা বিদ্যমান রয়েছে। সালফে-সালেহীনদের এটাই আক্বীদা (বিশ্বাস)। এটা কেবল উপমা বা দৃষ্টান্তমূলক কোন জিনিস নয়; যেমন অনেক আধুনিকতাবাদী ও হাদীস অস্বীকারকারীরা বোঝাতে চায়।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:৪১ وَ اٰمِنُوۡا بِمَاۤ اَنۡزَلۡتُ مُصَدِّقًا لِّمَا مَعَکُمۡ وَ لَا تَکُوۡنُوۡۤا اَوَّلَ کَافِرٍۭ بِہٖ ۪ وَ لَا تَشۡتَرُوۡا بِاٰیٰتِیۡ ثَمَنًا قَلِیۡلًا ۫ وَّ اِیَّایَ فَاتَّقُوۡنِ ﴿۴۱﴾

আর তোমাদের সাথে যা আছে তার সত্যায়নকারীস্বরূপ আমি যা নাযিল করেছি তার প্রতি তোমরা ঈমান আন এবং তোমরা তা প্রথম অস্বীকারকারী হয়ো না। আর তোমরা আমার আয়াতসমূহ সামান্যমূল্যে বিক্রি করো না এবং কেবল আমাকেই ভয় কর। আল-বায়ান

আর তোমরা ঈমান আন সেই কিতাবের প্রতি, যা তোমাদের নিকট আছে তার প্রত্যয়নকারী এবং তোমরাই তার প্রথম প্রত্যাখ্যানকারী হয়ো না এবং আমার আয়াতের বিনিময়ে সামান্য মূল্য গ্রহণ করো না, তোমরা কেবল আমাকেই ভয় কর। তাইসিরুল

এবং আমি যা অবতীর্ণ করেছি তৎপ্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর, ইহা (কুরআন) তোমাদের কাছে যা আছে উহারই সত্যতা প্রনয়নকারী এবং এতে তোমরাই প্রথম অবিশ্বাসী হয়োনা এবং আমার নিদর্শনাবলীর পরিবর্তে সামান্য মূল্য গ্রহণ করনা এবং তোমরা বরং আমাকেই ভয় কর। মুজিবুর রহমান

And believe in what I have sent down confirming that which is [already] with you, and be not the first to disbelieve in it. And do not exchange My signs for a small price, and fear [only] Me. Sahih International

৪১. আর আমি যা নাযিল করেছি তোমরা তাতে ঈমান আন। এটা তোমাদের কাছে যা আছে তার সত্যতা প্রমাণকারী। আর তোমরাই এর প্রথম অস্বীকারকারী হয়ো না এবং আমার আয়াতসমূহের বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করো না(১)। আর তোমরা শুধু আমারই তাকওয়া অবলম্বন কর।

১. আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলার আয়াতসমূহের বিনিময়ে মূল্য গ্রহণ নিষিদ্ধ হওয়ার অর্থ হলো, মানুষের মর্জি ও স্বার্থের বিনিময়ে আয়াতসমূহের মর্ম বিকৃত বা ভুলভাবে প্রকাশ করে তা গোপন রেখে টাকা-পয়সা, অর্থ-সম্পদ গ্রহণ করা। এ কাজটি সর্বসম্মতিক্রমে হারাম।

তাফসীরে জাকারিয়া

৪১। তোমাদের কাছে যা আছে তার সত্যায়নকারীরূপে আমি যা অবতীর্ণ করেছি তা বিশ্বাস কর। আর তোমরাই ওর (1) প্রথম অবিশ্বাসকারী হয়ো না এবং আমার আয়াতের বিনিময়ে স্বল্প মূল্য (2) গ্রহণ করো না। তোমরা শুধু আমাকেই ভয় কর।

(1) بِه (ওর) সর্বনাম দ্বারা ক্বুরআনকে বুঝানো হয়েছে অথবা মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে। আর উভয় মতই সঠিক। কেননা, দু'টিই আপোসে অবিচ্ছেদ্য। যে ক্বুরআনের সাথে কুফরী করল, সে মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর সাথেও কুফরী করল। আর যে মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর সাথে কুফরী করল, সে ক্বুরআনের সাথেও কুফরী করল। (ইবনে কাসীর) "প্রথম অবিশ্বাসকারী হয়ো না" এর অর্থ, প্রথমতঃ তোমাদের যে জ্ঞান রয়েছে, অন্যরা সে জ্ঞান থেকে বঞ্চিত। কাজেই তোমাদের দায়িত্ব সর্বাধিক। দ্বিতীয়তঃ মদীনায় ইয়াহুদীদেরকেই সর্বপ্রথম ঈমানের প্রতি আহবান জানানো হয়েছিল; যদিও হিজরতের পূর্বে অনেক মানুষ ইসলাম কবুল করে নিয়েছিল। তাই সতর্ক করা হচ্ছে যে, ইয়াহুদীদের মধ্যে তোমরা প্রথম অবিশ্বাসকারী হয়ো না। কারণ, যদি তোমরা তা হও, তাহলে সমস্ত ইয়াহুদীদের কুফরী ও অবিশ্বাস করার (পাপের) বোঝা তোমাদের উপর চাপব

(2) "আমার আয়াতের বিনিময়ে স্বল্প মূল্য গ্রহণ করো না" এর অর্থ এই নয় যে, বেশী মূল্য পেলে ইলাহী বিধানের বিনিময়ে তা গ্রহণ করো। বরং অর্থ হল, ইলাহী বিধানসমূহের মোকাবেলায় পার্থিব সবার্থকে কোন প্রকার গুরুত্ব দিও না। আল্লাহর বিধানসমূহের মূল্য এত বেশী যে, দুনিয়ার বিষয়-সম্পদ এর মোকাবেলায় খুবই তুচ্ছ; কিছুই না। উক্ত আয়াতে বানী-ইসরাঈলকে সম্বোধন করা হলেও এই নির্দেশ কিয়ামত পর্যন্ত আগত সকল মানুষের জন্য। যে ব্যক্তি সত্যকে বাতিল, বাতিলকে প্রতিষ্ঠা অথবা জ্ঞানকে গোপন করার কাজে জড়িত হবে এবং কেবল পার্থিব স্বার্থের খাতিরে সত্য-প্রতিষ্ঠা করা ত্যাগ করবে, সেও এই ধমকের অন্তর্ভুক্ত। (ফাতহুল ক্বাদীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:৪২ وَ لَا تَلۡبِسُوا الۡحَقَّ بِالۡبَاطِلِ وَ تَکۡتُمُوا الۡحَقَّ وَ اَنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ ﴿۴۲﴾

আর তোমরা হককে বাতিলের সাথে মিশ্রিত করো না এবং জেনে-বুঝে হককে গোপন করো না। আল-বায়ান

তোমরা সত্যকে মিথ্যের সাথে মিশ্রিত করো না এবং জেনে শুনে সত্য গোপন করো না। তাইসিরুল

এবং তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করনা এবং জেনে শুনে সত্য গোপন করনা। মুজিবুর রহমান

And do not mix the truth with falsehood or conceal the truth while you know [it]. Sahih International

৪২. আর তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না(১) এবং জেনে-বুঝে সত্য গোপন করো না(২)

১. কাতাদাহ ও হাসান বলেন, ‘হককে বাতিলের সাথে মিশ্রণ ঘটিয়ো না এর অর্থ ইয়াহুদীবাদ ও নাসারাবাদকে ইসলামের সাথে এক করে দেখবে না কেননা, আল্লাহর নিকট একমাত্র দ্বীন হচ্ছে, ইসলাম। আর ইয়াহুদীবাদ ও নাসারাবাদ (খৃষ্টবাদ) হচ্ছে বিদ'আত বা নব উদ্ভাবিত বিষয়। সেটি কখনো আল্লাহর পক্ষ থেকে নয়। সুতরাং এ আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, বিভিন্ন ধর্মকে একাকার করে এক ধর্মে পরিণত করার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে নাজায়েয। [আত-তাফসীরুস সহীহ] আবুল আলীয়াহ বলেন, এর অর্থ তোমরা হককে বাতিলের সাথে মিশ্রিত করো না। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ব্যাপারে আল্লাহর বান্দাদের কাছে নসীহত পূর্ণ কর। অর্থাৎ তোমাদের কিতাবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তা আল্লাহর বান্দাদের কাছে বর্ণনা কর। [আত-তাফসীরুস সহীহ]

আল্লামা শানকীতী বলেন, তারা যে হককে বাতিলের সাথে সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে তা হচ্ছে, তারা তাওরাতের কিছু অংশের উপর ঈমান এনেছে। আর যে বাতিলকে হকের সাথে মিশিয়েছে তা হচ্ছে, তারা তাওরাতের কিছু অংশের সাথে কুফরী করেছে এবং তা মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। যেমন, মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যে সমস্ত গুণাগুণসহ অনুরূপ যা কিছু তারা গোপন করেছে এবং মেনে নিতে অস্বীকার করেছে। এর বর্ণনায় পবিত্র কুরআনের অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “তবে কি তোমরা কিতাবের কিছুর উপর ঈমান আন, আর কিছুর সাথে কুফরী কর” [সূরা আল-বাকারাহ: ৮৫] এ আয়াত দ্বারা আরও প্রমাণিত হয় যে, শ্রোতা এবং সম্বোধিত ব্যক্তিকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করে উপস্থাপন করা সম্পূর্ণ নাজায়েয।


২. ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, এর অর্থ, তোমরা আমার রাসূল মুহাম্মাদ এবং তিনি যা নিয়ে এসেছেন তা সম্পর্কে যে জ্ঞান তোমাদের নিকট আছে তা গোপন কর না। অথচ তার সম্পর্কে তোমরা তোমাদের কাছে যে গ্রন্থ আছে তাতে নিশ্চিতভাবেই অনেক কিছু পাচ্ছ। [আত-তাফসীরুস সহীহ] মুজাহিদ বলেন, আহলে কিতাবগণ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গোপন করে থাকে। অথচ তারা তার ব্যাপারে তাওরাত ও ইঞ্জীলে সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা পেয়ে থাকে। [তাবারী] এ আয়াত থেকে আরও প্রমাণিত হয়েছে যে, কোন ভয় বা লোভের বশবর্তী হয়ে সত্য গোপন করাও হারাম।

তাফসীরে জাকারিয়া

৪২। তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না এবং জেনে শুনে সত্য গোপন করো না।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:৪৪ اَتَاۡمُرُوۡنَ النَّاسَ بِالۡبِرِّ وَ تَنۡسَوۡنَ اَنۡفُسَکُمۡ وَ اَنۡتُمۡ تَتۡلُوۡنَ الۡکِتٰبَ ؕ اَفَلَا تَعۡقِلُوۡنَ ﴿۴۴﴾

তোমরা কি মানুষকে ভাল কাজের আদেশ দিচ্ছ আর নিজদেরকে ভুলে যাচ্ছ? অথচ তোমরা কিতাব তিলাওয়াত কর। তোমরা কি বুঝ না? আল-বায়ান

তোমরা কি মানুষকে সৎকর্মের নির্দেশ দিবে এবং নিজেদের কথা ভুলে যাবে, অথচ তোমরা কিতাব পাঠ কর, তবে কি তোমরা বুঝ না? তাইসিরুল

তোমরা কি লোকদেরকে সৎ কাজে আদেশ করছ এবং তোমাদের নিজেদের সম্বন্ধে বিস্মৃত হচ্ছ? অথচ তোমরা গ্রন্থ পাঠ কর; তাহলে কি তোমরা হৃদয়ঙ্গম করছনা? মুজিবুর রহমান

Do you order righteousness of the people and forget yourselves while you recite the Scripture? Then will you not reason? Sahih International

৪৪. তোমরা কি মানুষকে সৎকাজের নির্দেশ দাও, আর নিজেদের কথা ভুলে যাও(১)! অথচ তোমরা কিতাব অধ্যয়ন কর। তবে কি তোমরা বুঝ না?

১. এ আয়াতে ইয়াহুদী আলেমদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। এতে তাদেরকে ভৎসনা করা হচ্ছে যে, তারা তো নিজেদের বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদেরকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণ করতে এবং ইসলামের উপর স্থির থাকতে নির্দেশ দেয়। এতে বুঝা যায় ইয়াহুদী আলেমগণ দ্বীন ইসলামকে নিশ্চিতভাবে সত্য বলে মনে করতো। কিন্তু নিজেরা প্রবৃত্তির কামনার দ্বারা এমনভাবে প্রভাবিত ছিল যে, ইসলাম গ্রহণ করতে কখনো প্রস্তুত ছিল না। মূলত: তারাই অপরকে পুণ্য ও মংগলের প্রেরণা দেয়, অথচ নিজের ক্ষেত্রে তা কার্যে পরিণত করে না, প্রকৃত প্রস্তাবে তারা সবাই ভৎসনা ও নিন্দাবাদের অন্তর্ভুক্ত।

এ শ্রেণীর লোকদের সম্পর্কে হাদীসে করুণ পরিণতি ও ভয়ংকর শাস্তির প্রতিশ্রুতি রয়েছে। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, মি'রাজের রাতে আমি এমন কিছুসংখ্যক লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলাম, যাদের জিহ্বা ও ঠোঁট আগুনের কাঁচি দিয়ে কাটা হচ্ছিল। আমি জিবরীল আলাইহিস সালামকে জিজ্ঞাসা করলাম, এরা কারা? জিবরীল বললেন, এরা আপনার উম্মতের পার্থিব স্বার্থপূজার উপদেশদানকারী - যারা অপরকে তো সৎকাজের নির্দেশ দিত, কিন্তু নিজের খবর রাখতো না। [মুসনাদে আহমাদ ৩/১২০, সহীহ ইবনে হিব্বান: ৫৩]

অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, কিছুসংখ্যক জান্নাতবাসী অপর কিছুসংখ্যক জাহান্নামবাসীদেরকে অগ্নিদগ্ধ হতে দেখে জিজ্ঞেস করবেন যে, তোমরা কিভাবে জাহান্নামে প্রবেশ করলে, অথচ আল্লাহর কসম, আমরা তো সেসব সৎকাজের দৌলতেই জান্নাত লাভ করেছি, যা তোমাদেরই কাছে শিখেছিলাম? জাহান্নামবাসীরা বলবে, আমরা মুখে অবশ্য বলতাম কিন্তু নিজে তা কাজে পরিণত করতাম না। [বুখারীঃ ৩২৬৭, মুসলিমঃ ২৯৮৯]

তাফসীরে জাকারিয়া

৪৪। কি আশ্চর্য! তোমরা নিজেদের বিস্মৃত হয়ে মানুষকে সৎকাজের নির্দেশ দাও, অথচ তোমরা কিতাব (গ্রন্থ) অধ্যয়ন কর, তবে কি তোমরা বুঝ না?

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:৫৩ وَ اِذۡ اٰتَیۡنَا مُوۡسَی الۡکِتٰبَ وَ الۡفُرۡقَانَ لَعَلَّکُمۡ تَہۡتَدُوۡنَ ﴿۵۳﴾

আর যখন আমি মূসাকে দিয়েছিলাম কিতাব ও ফুরকান* যাতে তোমরা হিদায়াতপ্রাপ্ত হও। আল-বায়ান

স্মরণ কর, যখন আমি মূসাকে কিতাব ও ফুরকান দিয়েছিলাম, যাতে তোমরা সৎপথ অবলম্বন কর। তাইসিরুল

আর যখন আমি মূসাকে গ্রন্থ এবং সত্য ও মিথ্যার প্রভেদকারী নির্দেশ দিয়েছিলাম, যেন তোমরা সুপথ প্রাপ্ত হও। মুজিবুর রহমান

And [recall] when We gave Moses the Scripture and criterion that perhaps you would be guided. Sahih International

*- সত্য-মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী তাওরাতের বাণীসমগ্র।

৫৩. আর স্মরণ কর, যখন আমরা মূসাকে কিতাব ও ‘ফুরকান(১) দান করেছিলাম; যাতে তোমরা হিদায়াত লাভ করতে পার।

১.  ফুরকান’ দ্বারা হয়ত তাওরাতের অন্তর্ভুক্ত শরীআতী বিধানমালাকে বুঝানো হয়েছে। কেননা, শরীআতের মাধ্যমে যাবতীয় বিশ্বাসগত ও কর্মগত মতবিরোধের মীমাংসা হয়ে যায়। অথবা মু'জিযা বা অলৌকিক ঘটনাকে বুঝানো হয়েছে- যা দ্বারা সত্য ও মিথ্যার দাবীর ফয়সালা হয়। অথবা ফুরকানের মানে হচ্ছে দ্বীনের এমন জ্ঞান, বোধ ও উপলব্ধি, যার মাধ্যমে মানুষ হক ও বাতিল এবং সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। অথবা স্বয়ং তাওরাতই এর অর্থ। কেননা, এর মধ্যেও মীমাংসাকারীর জন্য প্রয়োজনীয় উভয় গুণ ও বৈশিষ্ট্যের সমাবেশ রয়েছে।

তাফসীরে জাকারিয়া

৫৩। (স্মরণ কর,) যখন আমি মূসাকে কিতাব ও (সত্যকে মিথ্যা হতে) পৃথককারী বস্তু দান করেছিলাম; যাতে তোমরা সৎপথে পরিচালিত হও। (1)

(1) এটাও লোহিত সাগর অতিক্রম করার পরের ঘটনা। (ইবনে কাসীর) হতে পারে তাওরাত গ্রন্থকেই 'ফুরক্বান'(সত্য ও মিথ্যার মাঝে পার্থক্যকারী বস্তু) বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কেননা, প্রত্যেক আসমানী কিতাব সত্য ও মিথ্যার মাঝে পৃথককারী হয়। অথবা মুজিযাকে 'ফুরক্বান' বলা হয়েছে। কারণ, মুজিযাও হক ও বাতিল জানার ব্যাপারে বড় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:৭৮ وَ مِنۡہُمۡ اُمِّیُّوۡنَ لَا یَعۡلَمُوۡنَ الۡکِتٰبَ اِلَّاۤ اَمَانِیَّ وَ اِنۡ ہُمۡ اِلَّا یَظُنُّوۡنَ ﴿۷۸﴾

আর তাদের মধ্যে আছে নিরক্ষর, তারা মিথ্যা আকাঙ্খা ছাড়া কিতাবের কোন জ্ঞান রাখে না এবং তারা শুধুই ধারণা করে থাকে। আল-বায়ান

তাদের মাঝে এমন কিছু নিরক্ষর লোক আছে, যাদের মিথ্যা আকাঙ্ক্ষা ছাড়া কিতাবের কোন জ্ঞানই নেই, তারা কেবল অলীক ধারণা পোষণ করে। তাইসিরুল

এবং তাদের মধ্যে অনেক অশিক্ষিত লোক আছে যারা প্রবৃত্তি ব্যতীত কোন গ্রন্থ অবগত নয় এবং তারা শুধু কল্পনাসমূহ রচনা করে থাকে। মুজিবুর রহমান

And among them are unlettered ones who do not know the Scripture except in wishful thinking, but they are only assuming. Sahih International

৭৮. আর তাদের মধ্যে এমন কিছু নিরক্ষর লোক আছে যারা মিথ্যা আশা(১) ছাড়া কিতাব সম্পর্কে কিছুই জানে না, তারা শুধু অমূলক ধারণা পোষণ করে(২)।

১. أَمَانِيَّ শব্দের অনুবাদ করা হয়েছে, মিথ্যা আশা। এ অর্থের পক্ষে অন্যান্য আয়াতও সাক্ষ্য দেয়। যেমন বলা হয়েছে, “আর তারা বলে, ইয়াহুদী অথবা নাসারা ছাড়া অন্য কেউ কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এটা তাদের মিথ্যা আশা”। [সূরা আল-বাকারাহ: ১১১] আরও এসেছে, “তোমাদের আশা-আকাংখা ও কিতাবীদের আশা-আকাংখা অনুসারে কাজ হবে না” (সূরা আন-নিসা ১২৩] উপরোক্ত দুই আয়াতেও أَمَانِيَّ শব্দ মিথ্যা আশা-আকাংখা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে কোন কোন তাফসীরকার এর আরও একটি অর্থ করেছেন, তা হচ্ছে, লেখাপড়া না জানা। অর্থাৎ ইয়াহুদীদের মধ্যে এক গোষ্ঠী আছে যারা কোন লেখা পড়া জানে না। তাদের কাজ হলো অন্যের অন্ধ অনুসরণ করা। কিন্তু বাক্যের প্রথমে أُمِّيُّونَ শব্দের উল্লেখ থাকায় এ অর্থটি খুব বেশী উপযুক্ত নয়। [আদওয়াউল বায়ান]


২. লক্ষণীয় যে, আল্লাহ্ তা'আলা ৭৫-৭৮ আয়াতসমূহে ইয়াহুদীদের তিন শ্রেণীর লোকের উল্লেখ করেছেন। তাদের মধ্যে এক শ্রেণী হচ্ছে, আলেম সম্প্রদায় তাদের কাজ হলো আল্লাহর কালাম বিকৃত করা। আরেক দল হচ্ছে মুনাফিক। তারা মুমিনদের কাছে নিজেদেরকে মুমিন হিসেবে পেশ করে। আরেক শ্রেণী হচ্ছে, জাহেল মূৰ্খ গোষ্ঠী। তারা পড়ালেখা জানে না। তারা কেবল অন্যদের অন্ধ অনুসরণ করে থাকে। [ইবনে কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

৭৮। তাদের মধ্যে এমন কিছু নিরক্ষর লোক আছে, মিথ্যা আকাঙ্ক্ষা ছাড়া যাদের কিতাব (ঐশীগ্রন্থ) সম্বন্ধে কোন জ্ঞান নেই, তারা শুধু কল্পনা করে মাত্র। (1)

(1) ইয়াহুদী আলেম ও শিক্ষিত লোকদের আলোচনার পর এখানে তাদের নিরক্ষর, অশিক্ষিত ও মূর্খ লোকদের কথা বলা হচ্ছে যে, তারা তাদের কিতাবের (তাওরাতের) ব্যাপারে অজ্ঞ ছিল। কিন্তু তারা আশা অবশ্যই রাখত এবং তাদের আলেমরা তাদেরকে বিভিন্ন শুভ কল্পনা ও ধারণার মধ্যেই নিমজ্জিত রেখেছিল। যেমন, তাদের ধারণা ছিল, আমরা তো আল্লাহর প্রিয়পাত্র, আমরা জাহান্নামে গেলেও তা কিছু দিনের জন্য হবে, পরে আমাদের বুযুর্গরা ক্ষমা করিয়ে নেবেন ইত্যাদি। যেমন আজকের মূর্খ মুসলিমদেরকেও তথাকথিত কিছু পীর, উলামা ও মাশায়েখরা অনুরূপ সুন্দর জালে এবং প্রতারণামূলক অঙ্গীকারে ফাঁসিয়ে রেখেছে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:৭৯ فَوَیۡلٌ لِّلَّذِیۡنَ یَکۡتُبُوۡنَ الۡکِتٰبَ بِاَیۡدِیۡہِمۡ ٭ ثُمَّ یَقُوۡلُوۡنَ ہٰذَا مِنۡ عِنۡدِ اللّٰہِ لِیَشۡتَرُوۡا بِہٖ ثَمَنًا قَلِیۡلًا ؕ فَوَیۡلٌ لَّہُمۡ مِّمَّا کَتَبَتۡ اَیۡدِیۡہِمۡ وَ وَیۡلٌ لَّہُمۡ مِّمَّا یَکۡسِبُوۡنَ ﴿۷۹﴾

সুতরাং ধ্বংস তাদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব লিখে। তারপর বলে, ‘এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে’, যাতে তা তুচ্ছ মূল্যে বিক্রি করতে পারে। সুতরাং তাদের হাত যা লিখেছে তার পরিণামে তাদের জন্য ধ্বংস, আর তারা যা উপার্জন করেছে তার কারণেও তাদের জন্য ধ্বংস। আল-বায়ান

সুতরাং অভিসম্পাত তাদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব রচনা করে এবং নিকৃষ্ট মূল্য লাভের জন্য বলে এটা আল্লাহর নিকট হতে, তাদের হাত যা রচনা করেছে তার জন্য তাদের শাস্তি অবধারিত এবং তারা যা উপার্জন করে তার জন্যও শাস্তি রয়েছে। তাইসিরুল

তাদের জন্য আক্ষেপ যারা স্বহস্তে পুস্তক রচনা করে, যারা বলে যে, এটা আল্লাহর নিকট হতে সমাগত! এর দ্বারা তারা সামান্য মূল্য অর্জন করছে, তাদের হস্ত যা লিপিবদ্ধ করেছে তজ্জন্য তাদের প্রতি আক্ষেপ! এবং তারা যা উপার্জন করছে তজ্জন্যও তাদের প্রতি আক্ষেপ! মুজিবুর রহমান

So woe to those who write the "scripture" with their own hands, then say, "This is from Allah," in order to exchange it for a small price. Woe to them for what their hands have written and woe to them for what they earn. Sahih International

৭৯. কাজেই দুর্ভোগ(১) তাদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব রচনা করে অতঃপর সামান্য মূল্য পাওয়ার জন্য বলে, “এটা আল্লাহর কাছ থেকে। অতএব, তাদের হাত যা রচনা করেছে তার জন্য তাদের ধ্বংস এবং যা তারা উপার্জন করেছে তার জন্য তাদের ধ্বংস।(২)

১. وَيْلٌ শব্দটি পবিত্র কুরআনে এখানেই প্রথম ব্যবহৃত হয়েছে। ওপরে এর অর্থ করা হয়েছে, দূর্ভোগ। এছাড়া এর এক তাফসীর আতা ইবনে ইয়াসার থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘এটি জাহান্নামের একটি উপত্যকার নাম, যদি পাহাড়ও এতে নিয়ে ফেলা হয় তবে তার তাপে তাও মিইয়ে যাবে’। [ইবনুল মুবারকের আয-যুহদ, নং ৩৩২] আবু আইয়াদ আমর ইবনে আসওয়াদ আল-আনাসী বলেন, وَيْلٌ হচ্ছে জাহান্নামের মূল অংশ থেকে যে পুঁজ বয়ে যাবে তার নাম [তাবারী] মোটকথা: সব রকমের শাস্তি ও ধ্বংস তাদের জন্য অপেক্ষা করছে।


২. ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, ‘তোমরা কোন ব্যাপারে কিতাবীদেরকে কেন জিজ্ঞেস কর? অথচ তোমাদের কাছে রয়েছে তোমাদের রাসূলের কাছে নাযিলকৃত আল্লাহর কিতাব। যা সবচেয়ে আধুনিক, (আল্লাহর কাছ থেকে আসার ব্যাপারে) নবীন। তোমরা সেটা পড়ছ। আর সে কিতাবে আল্লাহ জানিয়েছেন যে, কিতাবীরা সে কিতাব লিপিবদ্ধ করে বলেছে যে এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে। তোমাদের কাছে এ সমস্ত জ্ঞান আসার পরও তা তোমাদেরকে তাদের কাছে জিজ্ঞেস করা থেকে নিষেধ করছে না। না, আল্লাহর শপথ! তাদের একজনকেও দেখিনি যে, সে তোমাদেরকে তোমাদের কাছে কি নাযিল হয়েছে সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে। [বুখারী: ৭৩৬৩] সুতরাং আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে কোন কিছুতেই ইয়াহুদী-নাসারাদের কোন বর্ণনার প্রয়োজন আমাদের নেই।

তাফসীরে জাকারিয়া

৭৯। সুতরাং তাদের জন্য দুর্ভোগ (ওয়াইল দোযখ), যারা নিজ হাতে গ্রন্থ রচনা করে এবং অল্প মূল্য পাবার জন্য বলে, ‘এটি আল্লাহর নিকট হতে এসেছে।’ তাদের হাত যা রচনা করেছে, তার জন্য তাদের শাস্তি এবং যা তারা উপার্জন করেছে তার জন্যও তাদের শাস্তি (রয়েছে)। [1]

[1] এখানে ইয়াহুদীদের আলেমদের দুঃসাহসিকতা এবং তাদের অন্তর থেকে আল্লাহর ভয় বিলুপ্ত হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। তারা নিজেরাই মনগড়া বিধান তৈরী করে বড় ধৃষ্টতার সাথে বুঝাতো যে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে। হাদীস অনুযায়ী 'ওয়াইল' জাহান্নামের এক উপত্যকা যার গভীরতা এত বেশী যে, একজন কাফেরকে তার তলদেশে পড়তে চল্লিশ বছর সময় লাগবে! (আহমাদ, তিরমিযী, ইবনে হিববান, হাকেম, ফাতহুল ক্বাদীর) কোন কোন আলেমগণ এই আয়াতের ভিত্তিতে ক্বুরআন বিক্রি করা নাজায়েয বলেছেন। কিন্তু এই আয়াত থেকে এ রকম দলীল গ্রহণ করা সঠিক নয়। এই আয়াতের লক্ষ্য কেবল তারা, যারা দুনিয়া অর্জনের জন্য আল্লাহর কালামের মধ্যে হেরফের করে এবং ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষকে প্রতারিত করে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:৮৫ ثُمَّ اَنۡتُمۡ ہٰۤـؤُلَآءِ تَقۡتُلُوۡنَ اَنۡفُسَکُمۡ وَ تُخۡرِجُوۡنَ فَرِیۡقًا مِّنۡکُمۡ مِّنۡ دِیَارِہِمۡ ۫ تَظٰہَرُوۡنَ عَلَیۡہِمۡ بِالۡاِثۡمِ وَ الۡعُدۡوَانِ ؕ وَ اِنۡ یَّاۡتُوۡکُمۡ اُسٰرٰی تُفٰدُوۡہُمۡ وَ ہُوَ مُحَرَّمٌ عَلَیۡکُمۡ اِخۡرَاجُہُمۡ ؕ اَفَتُؤۡمِنُوۡنَ بِبَعۡضِ الۡکِتٰبِ وَ تَکۡفُرُوۡنَ بِبَعۡضٍ ۚ فَمَا جَزَآءُ مَنۡ یَّفۡعَلُ ذٰلِکَ مِنۡکُمۡ اِلَّا خِزۡیٌ فِی الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا ۚ وَ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ یُرَدُّوۡنَ اِلٰۤی اَشَدِّ الۡعَذَابِ ؕ وَ مَا اللّٰہُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعۡمَلُوۡنَ ﴿۸۵﴾

অতঃপর তোমরাই তো তারা, যারা নিজদেরকে হত্যা করছ এবং তোমাদের মধ্য থেকে একটি দলকে তাদের গৃহ থেকে বের করে দিচ্ছ; পাপ ও সমীলঙ্ঘনের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে সহায়তা করছ। আর তারা যদি বন্দী হয়ে তোমাদের নিকট আসে, তোমরা মুক্তিপণ দিয়ে তাদেরকে মুক্ত কর। অথচ তাদেরকে বের করা তোমাদের জন্য হারাম ছিল। তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশে ঈমান রাখ আর কিছু অংশ অস্বীকার কর? সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা তা করে দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ছাড়া তাদের কী প্রতিদান হতে পারে? আর কিয়ামতের দিনে তাদেরকে কঠিনতম আযাবে নিক্ষেপ করা হবে। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। আল-বায়ান

পরন্ত তোমরাই সেই লোক যারা পরস্পর নিজেদেরকে হত্যা করছ এবং তোমাদের একদলকে স্বদেশ থেকে বহিষ্কার করছ, তোমরা নিজেরা তাদের বিরুদ্ধে অন্যায় ও সীমালঙ্ঘন করে পরস্পরের সহযোগিতা করছ এবং তারা যখন বন্দীরূপে তোমাদের নিকট হাজির হয়, তখন তোমরা মুক্তিপণ আদায় কর, মূলতঃ তাদের বহিষ্করণই তোমাদের জন্য ছিল নিষিদ্ধ; তাহলে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশকে বিশ্বাস কর এবং কিছু অংশকে প্রত্যাখ্যান কর? অতএব তোমাদের যারা এমন করে তাদের পার্থিব জগতে লাঞ্ছনা ও অবমাননা ছাড়া আর কী প্রতিদান হতে পারে? এবং ক্বিয়ামাতের দিন তারা কঠিন শাস্তির মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে, আর তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ গাফেল নন। তাইসিরুল

অতঃপর সেই তোমরাই পরস্পর খুনাখুনি করছ এবং তোমরা তোমাদের মধ্য হতে এক দলকে তাদের গৃহ হতে বহিস্কার করে দিচ্ছ, তাদের বিরুদ্ধে (শত্রুতা বশতঃ) পাপ ও অন্যায় কাজে সাহায্য করছ এবং তারা বন্দী হয়ে তোমাদের নিকট আনীত হলে তোমরা তাদেরকে বিনিময় প্রদান কর, অথচ তাদেরকে বহিস্কার করা তোমাদের জন্য অবৈধ ছিল, তাহলে কি তোমরা গ্রন্থের কিছু অংশ বিশ্বাস কর এবং কিছু অংশ অবিশ্বাস কর? তোমাদের মধ্যে যারা এরূপ করে তাদের পার্থিব জীবনে দুর্গতি ব্যতীত কিছুই নেই এবং উত্থান দিনে তারা কঠোর শাস্তির দিকে নিক্ষিপ্ত হবে এবং তোমরা যা করছ, তদ্বিষয়ে আল্লাহ অমনোযোগী নন। মুজিবুর রহমান

Then, you are those [same ones who are] killing one another and evicting a party of your people from their homes, cooperating against them in sin and aggression. And if they come to you as captives, you ransom them, although their eviction was forbidden to you. So do you believe in part of the Scripture and disbelieve in part? Then what is the recompense for those who do that among you except disgrace in worldly life; and on the Day of Resurrection they will be sent back to the severest of punishment. And Allah is not unaware of what you do. Sahih International

৮৫. তারপর তোমরাই তারা, যারা নিজদেরকে হত্যা করছ এবং তোমাদের একদলকে তাদের দেশ থেকে বহিস্কার করছ। তোমরা একে অন্যের সহযোগিতা করছ তাদের উপর অন্যায় ও সীমালঙ্ঘন দ্বারা। আর তারা যখন বন্দীরূপে তোমাদের কাছে উপস্থিত হয় তখন তোমরা মুক্তিপণ দাও(১); অথচ তাদেরকে বহিষ্কার করাই তোমাদের উপর হারাম ছিল। তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন।

১. ইসরাঈল-বংশধরকে তিনটি নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। প্রথমতঃ খুনোখুনী না করা, দ্বিতীয়তঃ বহিস্কার অর্থাৎ দেশ ত্যাগে বাধ্য না করা এবং তৃতীয়তঃ স্বগোত্রের কেউ কারো হাতে বন্দী হলে অর্থের বিনিময়ে তাকে মুক্ত করা। কিন্তু তারা প্রথমোক্ত দুটি নির্দেশ অমান্য করে তৃতীয় নির্দেশ পালনে বিশেষ তৎপর ছিল ঘটনার বিবরণ এরূপঃ মদীনাবাসীদের মধ্যে আউস ও খাযরাজ নামে দুটি গোত্রের মধ্যে শক্রতা লেগেই থাকত। মাঝে মাঝে যুদ্ধও বাধত। মদীনার আশেপাশে ইয়াহুদীদের দুটি গোত্র বনী-কুরাইযা ও বনী-নাদীর বসবাস করত। আউস গোত্র ছিল বনী-কুরাইযার মিত্র এবং খাযরাজ ছিল বনী-নাদীরের মিত্র। আউস ও খাযরাজের মধ্যে যুদ্ধ আরম্ভ হলে মিত্রতার ভিত্তিতে বনী-কুরাইযা সাহায্য করত এবং নায়ীর খাযরাজের পক্ষ অবলম্বন করত।

যুদ্ধে আউস ও খাযরাজের যেমন লোকক্ষয় ও ঘরবাড়ী বিধ্বস্ত হত, তাদের মিত্র বনী-নাদীরেরও তেমনি হত। বনী কুরাইযাকে হত্যা ও বহিস্কারের ব্যাপারে শক্ৰ পক্ষের মিত্র বনী-নাদীরেরও হাত থাকত। তেমনি নাদীরের হত্যা ও বাস্তুভিটা থেকে উৎখাত করার কাজে শক্র পক্ষের মিত্র বনী-কুরাইযারও হাত থাকত। তবে তাদের একটি আচরণ ছিল অদ্ভুত ৷ ইয়াহুদীদের দুই দলের কেউ আউস অথবা খাযরাজের করে দিত। কেউ এর কারণ জিজ্ঞেস করলে বলতঃ বন্দীকে মুক্ত করা আমাদের উপর ওয়াজিব। পক্ষান্তরে যুদ্ধে সাহায্য করার ব্যাপারে কেউ আপত্তি করলে তারা বলতঃ কি করব, মিত্রদের সাহায্যে এগিয়ে না আসা লজ্জার ব্যাপার। আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তাদের এ আচরনেরই নিন্দা করেছেন এবং তাদের এ অপকৌশলের মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছেন। [ইবনে কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

৮৫। তারপর (সেই তোমরাই তো) একে অন্যকে হত্যা করছ এবং তোমাদের এক দলকে (তাদের) আপন গৃহ হতে বহিষ্কার করে দিচ্ছ, তোমরা তাদের বিরুদ্ধে পাপ ও অন্যায়ের মাধ্যমে পরস্পরের সহযোগিতা করছ এবং তারা যখন বন্দীরূপে তোমাদের কাছে উপস্থিত হচ্ছে, তখন তোমরা মুক্তিপণ দিয়ে তাদেরকে মুক্ত করছ; অথচ তাদের বহিক্ককরণও তোমাদের জন্য অবৈধ ছিল। তবে কি তোমরা ধর্মগ্রন্থের কিছু অংশে বিশ্বাস আর কিছু অংশকে অবিশ্বাস কর? [1] অতএব তোমাদের যেসব লোক এমন কাজ করে, তাদের প্রতিফল পার্থিক জীবনে লাঞ্ছনাভোগ ছাড়া আর কি হতে পারে? আর কিয়ামতের (শেষ বিচারের) দিন কঠিনতম শাস্তির দিকে নিক্ষিপ্ত হবে। তারা যা করে সে সম্বন্ধে আল্লাহ অনবহিত নন।

[1] নবী করীম (সাঃ)-এর যুগে মদীনায় আনসার (যারা ইসলামের পূর্বে মুশরিক ছিল তাদের আউস ও খাযরাজ নামে দু'টি গোত্র ছিল। ওদের আপোসে সর্বদা যুদ্ধ লেগেই থাকত। মদীনাতে ইয়াহুদীদেরও বানু-ক্বায়নুক্বা, বানু-নাযীর এবং বানু-ক্বুরায়যা নামে তিনটি গোত্র ছিল। এরাও আপোসে সব সময় লড়ত। বানু-ক্বুরায়যা আউসের মিত্র ছিল এবং বানু-ক্বায়নুক্বা ও বানু-নাযীর খাযরাজের মিত্র ছিল। যুদ্ধে এরা আপন আপন মিত্রদের সাহায্য করত এবং নিজেদেরই জাতভাই ইয়াহুদীদেরকে হত্যা করত, তাদের ঘর-বাড়ী লুণ্ঠন করত এবং তাদেরকে সেখান থেকে বহিষ্কার করত। অথচ তাওরাত অনুযায়ী এ রকম করা তাদের জন্য হারাম ছিল। আবার ওই ইয়াহুদীরাই যখন পরাজিত হয়ে বন্দী হত, তখন তাদেরকে মুক্তিপণ দিয়ে মুক্ত করত এবং বলত যে, তাওরাতে আমাদেরকে এর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই আয়াতগুলোতে ইয়াহুদীদের সেই আচরণের কথাই বর্ণনা করা হয়েছে। তারা তাদের শরীয়তের বিধানকে খেলার পুতুল বানিয়ে নিয়েছিল। কোন কোন জিনিসের উপর ঈমান আনত এবং কোন কোন জিনিসকে উপেক্ষা করত। কোন নির্দেশকে পালন করত, আবার কোন সময় শরীয়তের কোন গুরুত্বই দিত না। হত্যা, বহিষ্কার এবং একে অপরের বিরুদ্ধে সাহায্য করা তাদের শরীয়তেও হারাম ছিল। তা সত্ত্বেও এ কাজগুলো নির্দ্বিধায় তারা করত এবং মুক্তিপণ দিয়ে মুক্তি করার যে বিধান ছিল, তার উপরে আমল করত। অথচ প্রথমের তিনটি নির্দেশ (হত্যা, বহিষ্কার এবং একে অপরের বিরুদ্ধে সাহায্য না করা) যদি তারা পালন করত, তাহলে মুক্তিপণ নিয়ে মুক্ত করার প্রয়োজনই হত না।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:৮৭ وَ لَقَدۡ اٰتَیۡنَا مُوۡسَی الۡکِتٰبَ وَ قَفَّیۡنَا مِنۡۢ بَعۡدِہٖ بِالرُّسُلِ ۫ وَ اٰتَیۡنَا عِیۡسَی ابۡنَ مَرۡیَمَ الۡبَیِّنٰتِ وَ اَیَّدۡنٰہُ بِرُوۡحِ الۡقُدُسِ ؕ اَفَکُلَّمَا جَآءَکُمۡ رَسُوۡلٌۢ بِمَا لَا تَہۡوٰۤی اَنۡفُسُکُمُ اسۡتَکۡبَرۡتُمۡ ۚ فَفَرِیۡقًا کَذَّبۡتُمۡ ۫ وَ فَرِیۡقًا تَقۡتُلُوۡنَ ﴿۸۷﴾

আর আমি নিশ্চয় মূসাকে কিতাব দিয়েছি এবং তার পরে একের পর এক রাসূল প্রেরণ করেছি এবং মারইয়াম পুত্র ঈসাকে দিয়েছি সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ। আর তাকে শক্তিশালী করেছি ‘পবিত্র আত্মা’র* মাধ্যমে। তবে কি তোমাদের নিকট যখনই কোন রাসূল এমন কিছু নিয়ে এসেছে, যা তোমাদের মনঃপূত নয়, তখন তোমরা অহঙ্কার করেছ, অতঃপর (নবীদের) একদলকে তোমরা মিথ্যাবাদী বলেছ আর একদলকে হত্যা করেছ। আল-বায়ান

এবং নিশ্চয়ই আমি মূসাকে কিতাব দিয়েছি এবং তার পরে ক্রমান্বয়ে রসূলদেরকে প্রেরণ করেছি, মারইয়াম পুত্র ঈসাকে সুস্পষ্ট প্রমাণ দিয়েছি এবং ‘পবিত্র আত্মা’যোগে (জিবরাঈলের মাধ্যমে) তাকে শক্তিশালী করেছি, অতঃপর যখনই কোন রসূল এমন কিছু এনেছে যা তোমাদের মনঃপুত নয়, তখনই তোমরা অহংকার করেছ এবং কিছু সংখ্যককে অস্বীকার করেছ এবং কিছু সংখ্যককে হত্যা করেছ। তাইসিরুল

এবং অবশ্যই আমি মূসাকে কিতাব প্রদান করেছি ও তৎপরে ক্রমান্বয়ে রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি, এবং আমি মারইয়াম নন্দন ঈসাকে নিদর্শনসমূহ প্রদান করেছিলাম এবং পবিত্র আত্মাযোগে তাকে শক্তি সম্পন্ন করেছিলাম; কিন্তু পরে যখন তোমাদের নিকট কোন রাসূল - তোমাদের প্রবৃত্তি যা ইচ্ছা করতনা তা নিয়ে উপস্থিত হল তখন তোমরা অহংকার করলে, অবশেষে এক দলকে মিথ্যাবাদী বললে এবং একদলকে হত্যা করলে। মুজিবুর রহমান

And We did certainly give Moses the Torah and followed up after him with messengers. And We gave Jesus, the son of Mary, clear proofs and supported him with the Pure Spirit. But is it [not] that every time a messenger came to you, [O Children of Israel], with what your souls did not desire, you were arrogant? And a party [of messengers] you denied and another party you killed. Sahih International

*পবিত্র আত্মা অর্থ জিবরীল (আ.)

৮৭. অবশ্যই আমরা মূসাকে কিতাব দিয়েছি এবং তার পরে পর্যায়ক্রমে রাসূলগণকে পাঠিয়েছি এবং আমরা মারইয়াম-পুত্র ‘ঈসাকে স্পষ্ট প্রমাণ দিয়েছি(১) এবং রূহুল কুদুস"(২) দ্বারা তাকে শক্তিশালী করেছি। তবে কি যখনি কোন রাসূল তোমাদের কাছে এমন কিছু এনেছে যা তোমাদের মনঃপূত নয় তখনি তোমরা অহংকার করেছ? অতঃপর (নবীদের) একদলের উপর মিথ্যারোপ করেছ এবং একদলকে করেছ হত্যা?

১. এ আয়াতে স্পষ্ট প্রমাণ' কি তা ব্যাখ্যা করে বলা হয়নি। তবে অন্য জায়গায় সেটা বলা হয়েছে, যেমন, “আর তাকে বনী ইসরাঈলের জন্য রাসূলরুপে (তিনি বলবেন) নিশ্চয় আমি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট নিদর্শন নিয়ে এসেছি যে, অবশ্যই আমি তোমাদের জন্য কাদামাটি দ্বারা একটি পাখিসদৃশ আকৃতি গঠন করব; তারপর তাতে আমি ফুঁ দেব; ফলে আল্লাহর হুকুমে সেটা পাখি হয়ে যাবে। আর আমি আল্লাহর হুকুমে জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্থকে নিরাময় করব এবং মৃতকে জীবিত করব। আর তোমরা তোমাদের ঘরে যা খাও এবং মজুদ কর তা আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেব।” [সূরা আলে ইমরান। ৪৯]


২. কুরআন-হাদীসের বিভিন্ন জায়গায় জিবরীল আলাইহিস সালাম-কে ‘রূহুল কুদুস’ বলা হয়েছে। যেমন, সূরা আশ-শু'আরা: ১৯৩, সূরা মারইয়াম: ১৭।

তাফসীরে জাকারিয়া

৮৭। অবশ্যই আমি মূসাকে কিতাব (তওরাত গ্রন্থ) দিয়েছি এবং তার পরে পর্যায়ক্রমে রসূলগণকে প্রেরণ করেছি, মারয়্যাম-তনয় ঈসাকে সুস্পষ্ট প্রমাণ (মু’জিযা) দিয়েছি এবং পবিত্র আত্মা (বা জিবরীল ফিরিশ্তা) দ্বারা তার শক্তি বৃদ্ধি করেছি। [1] অতঃপর যখনই কোন রসূল এমন কিছু নির্দেশ নিয়ে তোমাদের কাছে এসেছে যা তোমাদের মনঃপূত নয়, তখনই তোমরা অহংকার করেছ। পরিশেষে একদলকে মিথ্যাজ্ঞান করেছ এবং একদলকে করেছ হত্যা। [2]

[1] {وَقَفَّيْنَا مِنْ بَعْدِهِ بِالرُّسُلِ} এর অর্থ হল, মূসা (আঃ)-এর পর ক্রমাগতভাবে নবী ও রসূল এসেছিলেন। বানী-ইস্রাঈলের মধ্যে নবী আসার এই ধরাবাহিকতা ঈসা (আঃ) পর্যন্ত শেষ হয়। (بيِّنَاتٌ) বলতে সেই মুজিযাসমূহকে বুঝানো হয়েছে যা ঈসা (আঃ)-কে দান করা হয়েছিল। যেমন, মৃতকে জীবিত করা এবং কুষ্ঠরোগী ও জন্মান্ধকে সুস্থ করে তোলা ইত্যাদি, যা সূরা আলে-ইমরানের ৪৯ নং আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে। (رُوْحُ الْقُدُسِ) (রূহুল ক্বুদুস বা পবিত্রের আত্মা) বলে জিবরীল (আঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। তাঁকে 'পবিত্রের আত্মা' এই জন্য বলা হয়েছে যে, তিনি আল্লাহর ('কুন' শব্দের মাধ্যমে) নির্দেশক্রমে অস্তিত্বে এসেছিলেন। অনুরূপ ঈসা (আঃ)-কেও 'রূহ' বলা হয়েছে। আর 'ক্বুদুস'; থেকে আল্লাহকে বুঝানো হয়েছে। আর আল্লাহর সাথে উক্ত 'রূহ'বা আত্মার সম্বন্ধ সম্মানসূচক। ইবনে জারীর এ (রূহুল ক্বুদুস বলতে জিবরীল উদ্দিষ্ট হওয়ার) মতটাকেই সর্বাধিক সঠিক বলেছেন। কারণ সূরা মায়েদার ১১০নং আয়াতে 'রূহুল ক্বুদুস' এবং ইঞ্জীল পৃথক পৃথক উল্লিখিত হয়েছে। (কাজেই রূহুল ক্বুদুস অর্থ ইঞ্জীল হতে পারে না।) অন্য আর এক আয়াতে জিবরীল (আঃ)-কে 'রূহুল আমীন' বলা হয়েছে। অনুরূপ রসূল (সাঃ) হাসসান (রাঃ) সম্পর্কে বলেছিলেন, اللَّهُمَّ أَيِّدْهُ برُوْحِ الْقُدُسِ)) 'হে আল্লাহ! 'রূহুল ক্বুদুস' দ্বারা ওকে শক্তিশালী কর। অপর আর এক হাদীসে এসেছে, وَجِبْرِيْلُ مَعَكَ)) জিবরীল তোমার সাথে রয়েছেন। জানা গেল যে, 'রূহুল ক্বুদুস' বলে জিবরীল (আঃ)-কেই বুঝানো হয়েছে। (ফাতহুল বায়ান, ইবনে কাসীর, বরাতে আশরাফুল হাওয়াশী)

[2] যেমন, মুহাম্মাদ (সাঃ) ও ঈসা (আঃ)-কে মিথ্যাবাদী বলেছে এবং যাকারিয়া ও ইয়াহ্ইয়া (আলাইহিমাস্ সালাম)-কে হত্যা করেছে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:৮৯ وَ لَمَّا جَآءَہُمۡ کِتٰبٌ مِّنۡ عِنۡدِ اللّٰہِ مُصَدِّقٌ لِّمَا مَعَہُمۡ ۙ وَ کَانُوۡا مِنۡ قَبۡلُ یَسۡتَفۡتِحُوۡنَ عَلَی الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا ۚۖ فَلَمَّا جَآءَہُمۡ مَّا عَرَفُوۡا کَفَرُوۡا بِہٖ ۫ فَلَعۡنَۃُ اللّٰہِ عَلَی الۡکٰفِرِیۡنَ ﴿۸۹﴾

আর যখন তাদের কাছে, তাদের সাথে যা আছে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তার সত্যায়নকারী কিতাব এল, অথচ তারা পূর্বে কাফিরদের উপর বিজয় কামনা করত। সুতরাং যখন তাদের নিকট এল যা তারা চিনত, তখন তারা তা অস্বীকার করল। অতএব কাফিরদের উপর আল্লাহর লা‘নত। আল-বায়ান

তাদের কাছে যা আছে, তার সমর্থক কিতাব যখন আল্লাহর নিকট থেকে আসল, যদিও পূর্বে কাফিরদের বিরুদ্ধে তারা এর সাহায্যে বিজয় প্রার্থনা করত, আর সেটাকে তারা চিনতেও পারল, তবুও যখন তা তাদের নিকট আসল, তখন তারা তা অবিশ্বাস করল; সুতরাং অবিশ্বাসকারীদের প্রতি আল্লাহর অভিসম্পাত। তাইসিরুল

এবং যখন আল্লাহর সন্নিধান হতে তাদের নিকট যা আছে তার সত্যতা প্রতিপাদক গ্রন্থ উপস্থিত হল এবং যা পূর্ব হতেই তারা কাফিরদের উপর বিজয় প্রার্থনা করত; অতঃপর যখন তাদের নিকট সেই পরিচিত কিতাব এল তখন তারা তাকে অস্বীকার করল। সুতরাং এরূপ কাফিরদের উপর আল্লাহর লা’নত বর্ষিত হোক। মুজিবুর রহমান

And when there came to them a Book from Allah confirming that which was with them - although before they used to pray for victory against those who disbelieved - but [then] when there came to them that which they recognized, they disbelieved in it; so the curse of Allah will be upon the disbelievers. Sahih International

৮৯. আর যখন তাদের কাছে যা আছে আল্লাহর কাছ থেকে তার সত্যায়নকারী(১) কিতাব আসলো; অথচ পূর্বে তারা এর সাহায্যে কাফেরদের বিরুদ্ধে বিজয় প্রার্থনা করত, তারপর তারা যা চিনত যখন তা তাদের কাছে আসল, তখন তারা সেটার সাথে কুফরী করল(২)। কাজেই কাফেরদের উপর আল্লাহর লা'নত।

১. এ আয়াতাংশে বলা হয়েছে যে, তারা তাকে জানতে ও চিনতে পেরেছে। তার সপক্ষে বহু তথ্য-প্রমাণ সে যুগেই পাওয়া গিয়েছিল। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী সাক্ষ্য পেশ করেছেন উম্মুল মুমিনীন সাফিয়্যাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা। তিনি নিজে ছিলেন একজন বড় ইয়াহুদী আলেমের মেয়ে এবং আরেকজন বড় আলেমের ভাইঝি। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মদীনা আগমনের পর আমার বাবা ও চাচা দু’জনেই তার সাথে সাক্ষাত করতে গিয়েছিলেন। দীর্ঘক্ষণ তার সাথে কথাবার্তা বলার পর তারা ঘরে ফিরে আসেন।

এ সময় আমি নিজের কানে তাদেরকে এভাবে আলাপ করতে শুনিঃ চাচা বললেন, আমাদের কিতাবে যে নবীর খবর দেয়া হয়েছে, ইনি কি সত্যিই সেই নবী? পিতা বললেন, আল্লাহর কসম, ইনিই সেই নবী। চাচা বললেন, এ ব্যাপারে তুমি কি একেবারে নিশ্চিত? পিতা বললেন, হ্যাঁ। চাচা বললেন, তাহলে এখন কি করতে চাও? বাবা বললেন, যতক্ষণ দেহে প্রাণ আছে এর বিরোধিতা করে যাব। [দালায়েলুন নাবুওয়াহ লিল বাইহাকী, সীরাতে ইবনে হিশাম]


২. নবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগমণের পূর্বে ইয়াহুদীরা তাদের পূর্ববতী নবীগণ যে নবীর আগমনবার্তা শুনিয়ে গিয়েছিলেন তার জন্য প্রতীক্ষারত ছিল। তারা দো'আ করত তিনি যেন অবিলম্বে এসে কাফেরদের প্রাধান্য খতম করে ইয়াহুদী জাতির উন্নতি ও পুনরুত্থানের সূচনা করেন। মুহাম্মাদ রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুওয়াত লাভের পূর্বে মদীনাবাসীদের প্রতিবেশী ইয়াহুদী সম্প্রদায় নবীর আগমনের আশায় জীবন ধারণ করত, মদীনাবাসীরা নিজেরাই এর সাক্ষী। যত্রতত্র যখন তখন তারা বলে বেড়াতঃ ঠিক আছে, এখন প্রাণ ভরে আমাদের উপর যুলুম করে নাও।

কিন্তু যখন সেই নবী আসবেন, আমরা তখন এই যালিমদের সবাইকে দেখে নেব। মদীনাবাসীরা এসব কথা আগের থেকেই শুনে আসছিল। তাই নবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা শুনে তারা পরস্পর বলাবলি করতে লাগলঃ দেখ, ইয়াহুদীরা যেন তোমাদের পিছিয়ে দিয়ে এ নবীর দ্বীন গ্রহণ করে বাজী জিতে না নেয়। চল, তাদের আগে আমরাই এ নবীর উপর ঈমান আনব। কিন্তু তারা অবাক হয়ে দেখল, যে ইয়াহুদীরা নবীর আগমন প্রতীক্ষায় দিন গুনছিল, নবীর আগমনের পর তারাই তার সবচেয়ে বড় বিরোধী পক্ষে পরিণত হল। [দেখুন, মুসনাদে আহমাদ ৩/৪৬৭, তাফসীর ইবনে কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

৮৯। তাদের নিকট যা আছে আল্লাহর নিকট হতে তার সমর্থক কিতাব এল; যদিও পূর্বে অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে তারা এর (এই কিতাব সহ নবীর) সাহায্যে[1] বিজয় কামনা করত তবুও তারা যা জ্ঞাত ছিল তা (সেই কিতাব নিয়ে নবী) যখন তাদের নিকট এল, তখন তারা তা অস্বীকার করে বসল। সুতরাং অবিশ্বাসীদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ হোক।

[1] {يَسْتَفْتِحُوْنَ} এর একটি অর্থ হল, বিজয় লাভ ও সাহায্যের জন্য প্রার্থনা করা। অর্থাৎ, এই ইয়াহুদীরা যখন মুশরিকদল কর্তৃক পরাজিত হত, তখন তারা আল্লাহর নিকট এই বলে দুআ করত যে, হে আল্লাহ! সত্বর শেষ নবী প্রেরিত কর! যাতে আমরা তাঁর সাথে মিলে এই মুশরিকদের উপর বিজয় লাভ করতে পারি। অর্থাৎ, ‘ইস্তিফতাহ’র অর্থ হল, সাহায্য কামনা করা। দ্বিতীয় অর্থ হল, সংবাদ দেওয়া। অর্থাৎ, ইয়াহুদীরা মুশরিকদেরকে সংবাদ দিত যে, অতি সত্বর নবী প্রেরিত হবেন। (ফাতহুল ক্বাদীর) নবী প্রেরিত হবেন এ জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও কেবল হিংসাবশতঃ মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর নবুঅতের উপর ঈমান আনেনি; যেমন পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:১০১ وَ لَمَّا جَآءَہُمۡ رَسُوۡلٌ مِّنۡ عِنۡدِ اللّٰہِ مُصَدِّقٌ لِّمَا مَعَہُمۡ نَبَذَ فَرِیۡقٌ مِّنَ الَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡکِتٰبَ ٭ۙ کِتٰبَ اللّٰہِ وَرَآءَ ظُہُوۡرِہِمۡ کَاَنَّہُمۡ لَا یَعۡلَمُوۡنَ ﴿۱۰۱﴾۫

আর যখন তাদের নিকট আল্লাহর কাছ থেকে একজন রাসূল এল, তাদের সাথে যা আছে তা সমর্থন করে, তখন আহলে কিতাবের একটি দল আল্লাহর কিতাবকে তাদের পেছনে ফেলে দিল, (এভাবে যে) মনে হয় যেন তারা জানে না। আল-বায়ান

এবং যখন তাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ হতে রসূল আসল যে এদের নিকট যে কিতাব রয়েছে, সেই কিতাবের সমর্থক, তখন যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল তাদের একদল আল্লাহর কিতাবকে পিঠের পিছনে ফেলে দিল, যেন তারা কিছুই জানে না। তাইসিরুল

এবং যখন আল্লাহর নিকট হতে, তাদের নিকট যা আছে তার সত্য প্রত্যয়নকারী রাসূল তাদের নিকট আগমন করল, তখন যাদেরকে গ্রন্থ প্রদান করা হয়েছে তাদের একদল আল্লাহর গ্রন্থকে নিজেদের পশ্চাদভাগে নিক্ষেপ করল, যেন তারা কিছুই জানেনা। মুজিবুর রহমান

And when a messenger from Allah came to them confirming that which was with them, a party of those who had been given the Scripture threw the Scripture of Allah behind their backs as if they did not know [what it contained]. Sahih International

১০১.আর যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের নিকট একজন রাসূল আসলেন, তাদের কাছে যা রয়েছে তার সত্যায়নকারী হিসেবে, তখন যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল তাদের একদল আল্লাহ্‌র কিতাবকে পিছনে ছুঁড়ে ফেলল, যেন তারা জানেই না।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

১০১। যখন আল্লাহর নিকট থেকে একজন রসূল এল, যে তাদের নিকট যা (ঐশীগ্রন্থ) আছে, তার সত্যায়নকারী, তখন যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল, তাদের একদল আল্লাহর কিতাবকে পিছনের দিকে ফেলে দিল (অমান্য করল), যেন তারা কিছুই জানে না। [1]

[1] মহান আল্লাহ নবী করীম (সাঃ)-এর প্রতি ইঙ্গিত করে বলছেন যে, আমি রসূলকে বহু উজ্জ্বল নিদর্শনাবলী দান করেছি; যা দেখে ইয়াহুদীদেরও ঈমান আনা উচিত ছিল। তাছাড়া তাদের কিতাব তাওরাতেও তার গুণাবলীর উল্লেখ এবং তার উপর ঈমান আনার অঙ্গীকার রয়েছে, কিন্তু তারা পূর্বে কি কোন অঙ্গীকারের কোনই পরোয়া করেছে যে, এই অঙ্গীকারেরও করবে? অঙ্গীকার ভঙ্গ করা তাদের একটি দলের অভ্যাসই ছিল। এমন কি আল্লাহর কিতাবকেও তারা পশ্চাতে নিক্ষেপ করল; যেন তারা তা (আল্লাহর বাণী বলে) জানেই না।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:১২১ اَلَّذِیۡنَ اٰتَیۡنٰہُمُ الۡکِتٰبَ یَتۡلُوۡنَہٗ حَقَّ تِلَاوَتِہٖ ؕ اُولٰٓئِکَ یُؤۡمِنُوۡنَ بِہٖ ؕ وَ مَنۡ یَّکۡفُرۡ بِہٖ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡخٰسِرُوۡنَ ﴿۱۲۱﴾

যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি, তারা তা পাঠ করে যথার্থভাবে। তারাই তার প্রতি ঈমান আনে। আর যে তা অস্বীকার করে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত। আল-বায়ান

আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছি, তারা যথাযথভাবে কিতাব তিলাওয়াত করে, তারাই এতে বিশ্বাস পোষণ করে আর যারা এর প্রতি অবিশ্বাস করে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত। তাইসিরুল

আমি যাদেরকে যে ধর্মগ্রন্থ দান করেছি তা যারা সঠিকভাবে সত্য বুঝে পাঠ করে তারাই এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী, এবং যে কেহ এটা অবিশ্বাস করে ফলতঃ তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মুজিবুর রহমান

Those to whom We have given the Book recite it with its true recital. They [are the ones who] believe in it. And whoever disbelieves in it - it is they who are the losers. Sahih International

১২১. যাদেরকে আমরা কিতাব দিয়েছি(১), তাদের মধ্যে যারা যথাযথভাবে তা তিলাওয়াত করে(২), তারা তাতে ঈমান আনে। আর যারা তার সাথে কুফরী করে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।

(১) কাতাদাহ বলেন, এখানে ইয়াহুদী ও নাসারাদের বুঝানো হয়েছে। পক্ষান্তরে অন্য বর্ণনায় এসেছে যে, এর দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীদের বুঝানো হয়েছে। [ইবনে কাসীর]


(২) যথাযথভাবে তিলাওয়াতের অর্থ, তিলাওয়াতের হক আদায় করা। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এর অর্থ যখন জান্নাতের বর্ণনা আসবে তখন আল্লাহ তা'আলার কাছে জান্নাত চাওয়া। আর জাহান্নামের বর্ণনা আসলে জাহান্নাম থেকে নিস্কৃতি চাওয়া। ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এর অর্থ, এগুলোর হালালকে হালাল হিসেবে নেয়া। আর হারামকে হারাম হিসেবে গ্রহণ করা। যেভাবে নাযিল হয়েছে সেভাবে পড়া। সেগুলোর কোন অংশকে বিকৃত না করা এবং সঠিক ব্যাখ্যার বিপরীতে কোন বাজে ব্যাখ্যা উপস্থাপন না করা।

মোটকথা: আল্লাহর আয়াতকে পরিপূর্ণভাবে অনুসরণ করাই এর যথাযথ তেলাওয়াত বলে বিবেচিত হবে। [ইবনে কাসীর] যথাযথ তেলাওয়াতের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর ঈমান আনা এবং তার যাবতীয় আদেশ নিষেধ বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নেয়া। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যার হাতে আমার প্রাণ, তার শপথ করে বলছি, ইয়াহুদী ও নাসারাদের যে কেউ আমার কথা শোনার পর আমার উপর ঈমান আনবে না, সে অবশ্যই জাহান্নামে যাবে”। [মুসলিম: ১১৫৩]

তাফসীরে জাকারিয়া

১২১। আমি যাদেরকে কিতাব (ধর্মগ্রন্থ) দান করেছি [1] তারা যথাযথভাবে তা (ধর্মগ্রন্থ) পাঠ করে থাকে। [2] তারাই তাতে (ধর্মগ্রন্থ) বিশ্বাস করে। আর যারা তা অমান্য করে, তারাই হবে ক্ষতিগ্রস্ত। [3]

[1] আহলে-কিতাবের অযোগ্য উত্তরসুরিদের নিকৃষ্ট চরিত্র ও কর্মকান্ডের প্রয়োজনীয় আলোচনার পর তাদের মধ্যে যে কিছু সৎ ও উন্নত চরিত্রের লোক ছিল, এই আয়াতে তাদের গুণাবলী এবং তারা যে মুমিন ছিল সেই সংবাদ দেওয়া হচ্ছে। এদের মধ্যে আব্দুল্লাহ বিন সালাম এবং আরো কিছু অন্য লোক ছিলেন। ইয়াহুদীদের মধ্য থেকে এদেরকেই ইসলাম কবুল করার তাওফীক হয়েছিল।

[2] তারা যথাযথভাবে তা পাঠ করে (তারা তার হক আদায় করে তেলাঅত করে) এর কয়েকটি অর্থ বলা হয়েছে। যেমনঃ (ক) অত্যধিক একাগ্রতা ও মনোযোগের সাথে পড়ে। জান্নাতের কথা এলে জান্নাত কামনা করে এবং জাহান্নামের কথা এলে তা থেকে পানাহ চেয়ে নেয়। (খ) তার হালালকে হালাল ও হারামকে হারাম মনে করে এবং আল্লাহর কালামের কোন বিকৃতি ঘটায় না। (যেমন, ইয়াহুদীরা করত।) (গ) এতে যা কিছু লেখা আছে, তা সবই লোকমাঝে প্রচার করে, এর কোন কিছুই গোপন করে না। (৪) এর সুস্পষ্ট আয়াতগুলোর উপর আমল করে, অস্পষ্ট আয়াতগুলোর উপর ঈমান রাখে এবং যে কথাগুলো বুঝে আসে না, তা আলেমদের মাধ্যমে বুঝে নেয়। (ঘ) এর প্রত্যেকটি কথার অনুসরণ করে। (ফাতহুল ক্বাদীর) বস্তুতঃ (উল্লিখিত) সব অর্থই যথাযথভাবে তেলাঅতের আওতায় পড়ে। আর হিদায়াত এমন লোকদের ভাগ্যেই জুটে, যারা উল্লিখিত কথাগুলির প্রতি যত্ন নেয়।

[3] আহলে-কিতাবের মধ্যে যে নবী করীম (সাঃ)-এর উপর ঈমান আনবে না, সে জাহান্নামে যাবে। যেমন সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। (ইবনে কাসীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:১২৯ رَبَّنَا وَ ابۡعَثۡ فِیۡہِمۡ رَسُوۡلًا مِّنۡہُمۡ یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِکَ وَ یُعَلِّمُہُمُ الۡکِتٰبَ وَ الۡحِکۡمَۃَ وَ یُزَکِّیۡہِمۡ ؕ اِنَّکَ اَنۡتَ الۡعَزِیۡزُ الۡحَکِیۡمُ ﴿۱۲۹﴾

‘হে আমাদের রব, তাদের মধ্যে তাদের থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করুন, যে তাদের প্রতি আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবে এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবে আর তাদেরকে পবিত্র করবে। নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়’। আল-বায়ান

‘হে আমাদের প্রতিপালক! এদের কাছে একজন রসূল এদের মধ্য হতে প্রেরণ কর, যে এদেরকে তোমার আয়াতগুলো পড়ে শুনাবে এবং এদেরকে কিতাব ও জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা দেবে এবং এদেরকে বিশুদ্ধ করবে, নিশ্চয় তুমি ক্ষমতাশালী, প্রজ্ঞাময়।’ তাইসিরুল

হে আমাদের রাব্ব! তাদেরই মধ্য হতে এমন একজন রাসূল প্রেরণ করুন যিনি তাদেরকে আপনার নিদর্শনাবলী পাঠ করে শুনাবেন এবং তাদেরকে গ্রন্থ ও বিজ্ঞান শিক্ষা দান করবেন ও তাদেরকে পবিত্র করবেন। নিশ্চয়ই আপনি পরাক্রান্ত, বিজ্ঞানময়। মুজিবুর রহমান

Our Lord, and send among them a messenger from themselves who will recite to them Your verses and teach them the Book and wisdom and purify them. Indeed, You are the Exalted in Might, the Wise." Sahih International

১২৯. হে আমাদের রব! আর আপনি তাদের মধ্য থেকে তাদের কাছে এক রাসূল পাঠান(১), যিনি আপনার আয়াতসমূহ তাদের কাছে তিলাওয়াত করবেন(২); তাদেরকে কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেবেন(৩) এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন(৪) আপনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়’।

(১) হাদীসে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি আমার সূচনা বলে দিচ্ছি, আমার পিতা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর দোআ, ঈসা 'আলাইহিস সালাম-এর সুসংবাদ এবং আমার মা স্বপ্নে দেখেছিলেন যে, তার থেকে একটি আলো বের হল, যে আলোতে সিরিয়ার প্রাসাদসমূহ আলোকিত হয়েছে। [মুসনাদে আহমাদঃ ৫/২৬২] ঈসা আলাইহিস সালাম-এর সুসংবাদের অর্থ তার এ উক্তি (وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ) “আমি এমন এক নবীর সুসংবাদদাতা, যিনি আমার পরে আসবেন। তার নাম আহমাদ”। [সূরা আস-সাফঃ ৬] তার জননী গর্ভাবস্থায় স্বপ্নে দেখেন যে, তার পেট থেকে একটি নূর বের হয়ে সিরিয়ার প্রাসাদসমূহ আলোকোজ্জ্বল করে তুলেছে। কুরআনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আবির্ভাবের আলোচনা প্রসংগে দু’জায়গায়, সূরা আলে-ইমরানের ১৬৪তম আয়াতে এবং সূরা জুমুআয় ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর দোআয় উল্লেখিত ভাষারই পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। এভাবে ইংগিত করা হয়েছে যে, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যে নবীর জন্য দোআ করেছিলেন, তিনি হচ্ছেন শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম।


(২) ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দোআর কারণে আমাদের রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রেরণের মূল উদ্দেশ্য তিনটি। তন্মধ্যে প্রথম হচ্ছে, আল্লাহর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা। তিলাওয়াতের আসল অর্থ অনুসরণ করা। কুরআন ও হাদীসের পরিভাষায় এ শব্দটি কুরআন ও অন্যান্য আসমানী কিতাব পাঠ করার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কারণ, যে লোক এসব কালাম পাঠ করে, এর অনুসরণ করাও তার একান্ত কর্তব্য। আসমানী গ্রন্থ ঠিক যেভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হয়, হুবহু তেমনিভাবে পাঠ করা জরুরী। নিজের পক্ষ থেকে তাতে কোন শব্দ অথবা স্বরচিহ্নটিও পরিবর্তন পরিবর্ধন করার অনুমতি নেই। ইমাম রাগেব বলেন, “আল্লাহর কালাম ছাড়া অন্য কোন গ্রন্থ অথবা কালাম পাঠ করাকে সাধারণ পরিভাষায় তিলাওয়াত বলা যায় না’। [মুফরাদাতুল কুরআন]


(৩) ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দো’আ অনুসারে নবী রাসূলগন বিশেষ করে আমাদের রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দ্বিতীয় কর্তব্য হচ্ছে আল্লাহর কিতাব ও হিকমতের শিক্ষা দান। এখানে কিতাব বলে আল্লাহর কিতাব বুঝানো হয়েছে। ‘হিকমত’ শব্দটি আরবী অভিধানে একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যথা– সত্যে উপনীত হওয়া, ন্যায় ও সুবিচার, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা ইত্যাদি। ইমাম রাগেব বলেন, এ শব্দটি আল্লাহর জন্য ব্যবহৃত হলে এর অর্থ হয় সকল বস্তুর পূর্ণজ্ঞান ও সুদৃঢ় উদ্ভাবন। অন্যের জন্য ব্যবহৃত হলে এর অর্থ হয়, বিদ্যমান বস্তুসমূহের বিশুদ্ধ জ্ঞান, সৎকর্ম, ন্যায়, সুবিচার, সত্য কথা ইত্যাদি। এখন লক্ষ্য করা দরকার যে, আয়াতে হিকমতের অর্থ কি? মূলত: এখানে হিকমত শব্দের অর্থ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ। ইবনে কাসীর ও ইবনে জরীর রাহিমাহুল্লাহ কাতাদাহ থেকে এ ব্যাখ্যাই উদ্ধৃত করেছেন। হিকমত অর্থ কেউ কুরআনের তাফসীর, কেউ দ্বীনের গভীর জ্ঞান, কেউ শরীআতের বিধি-বিধানের জ্ঞান, কেউ এমন বিধিবিধানের জ্ঞান অর্জন বলেছেন, যা শুধু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বর্ণনা থেকেই জানা যায়। নিঃসন্দেহে এসব উক্তির সারমর্ম হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ।


(৪) ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দোআ অনুসারে নবী-রাসূলগণ বিশেষ করে আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তৃতীয় কর্তব্য হচ্ছে পরিশুদ্ধি ও পবিত্রকরণ। আয়াতে উল্লেখিত يُزَكِّيهِمْ শব্দটি زكاة শব্দ থেকে উদ্ভুত। এর অর্থ পবিত্রতা। বাহ্যিক ও আত্মিক সকল প্রকার পবিত্রতার অর্থেই এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। বাহ্যিক না-পাকী সম্পর্কে সাধারণ মুসলিমরাও ওয়াকিফহাল। আত্মিক না-পাকী হচ্ছে কুফর, শির্ক, আল্লাহ ব্যতীত অন্যের উপর ভরসা করা, অহংকার, হিংসা, শক্রতা, দুনিয়াপ্রীতি ইত্যাদি। কুরআন ও সুন্নাহতে এসব বিষয়ের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। এ আয়াত থেকে আরও স্পষ্ট হয়ে গেল যে, হেদায়াত ও সংশোধনের ধারা দুটি, আল্লাহর রাসূল ও আল্লাহর গ্রন্থ। এ দুটি ব্যতীত কারও হেদায়াত লাভ হতে পারে না। এ আয়াতসমূহে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম অনেকগুলো দোআ করেছিলেন,

১) “আপনার নির্দেশে আমি এই জনমানবহীন প্রান্তরে নিজ পরিবার-পরিজনকে রেখে যাচ্ছি। আপনি একে একটি শান্তিপূর্ণ শহর বানিয়েদিন-যাতে এখানে বসবাস করা আতংকজনক না হয় এবং জীবনধারণের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র সহজলভ্য হয়।” আল্লাহ্ তা'আলা কবুল করেছেন এবং সে উষর মরু প্রান্তর মক্কা নগরীতে পরিণত হয়েছে।

২) “হে রব! শহরটিকে শান্তির ভূমি করে দিন”। অর্থাৎ হত্যা, লুন্ঠন, কাফেরদের অধিকার স্থাপন, বিপদাপদ থেকে সুরক্ষিত ও নিরাপদ রাখুন। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর এই দোআও কবুল হয়েছে। মক্কা মুকাররামা শুধু একটি জনবহুল নগরীই নয়, সারা বিশ্বের প্রত্যাবর্তনস্থলও বটে। বিশ্বের চারদিক থেকে মুসলিমগণ এ নগরীতে পৌছাকে সর্ববৃহৎ সৌভাগ্য মনে করে। নিরাপদ ও সুরক্ষিতও এতটুকু হয়েছে যে, আজ পর্যন্ত কোন শক্রজাতি অথবা শক্রসম্রাট এর উপর অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। আল্লাহ তা'আলা হারাম শরীফের চতুঃসীমানায় জীব-জন্তুকেও নিরাপত্তা দান করেছেন। এই এলাকায় শিকার করা জায়েয নয়।

৩) ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর তৃতীয় দোআ এই যে, এ শহরের অধিবাসীদের উপজীবিকা হিসেবে যেন ফল-মূল দান করা হয়। মক্কা-মুকাররমা ও পাশ্ববর্তী ভূমি কোনরূপ বাগ-বাগিচার উপযোগী ছিল না। দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছিল না পানির নাম -নিশানা। কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলা ইবরাহীমের দোআ কবুল করেন। মক্কার কাছেই তায়েফে যাবতীয় ফলমূল প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হয় যা মক্কার বাজারেই বেচা-কেনা হয়। এখনো সারা বিশ্ব থেকে ফলমূল মক্কায় নিয়ে আসা হয়।

৪) ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর চতুর্থ দোআ হচ্ছে, “হে আমাদের রব! আমাদের উভয়কে আপনার একান্ত অনুগত করুন এবং আমাদের বংশধর হতে আপনার এক অনুগত জাতি উত্থিত করুন। আমাদেরকে ইবাদাতের নিয়ম-পদ্ধতি দেখিয়ে দিন এবং আমাদের প্রতি ক্ষমাশীল হোন। আপনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু”। এ দোআটিও ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান ও আল্লাহভীতিরই ফল, আনুগত্যের অদ্বিতীয় কীর্তি স্থাপন করার পরও তিনি এরূপ দো'আ করেন যে, আমাদের উভয়কে আপনার আজ্ঞাবহ করুন। কারণ, আল্লাহ সম্পর্কিত জ্ঞান যার যত বৃদ্ধি পেতে থাকে সে তত বেশী অনুভব করতে থাকে যে, যথার্থ আনুগত্য তার দ্বারা সম্ভব হচ্ছে না। এ দোআতে স্বীয় সন্তান-সন্ততিকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এতে বুঝা যায় যে, যিনি আল্লাহর পথে নিজের সন্তান-সন্ততিকে বিসর্জন দিতেও এতটুকু কুন্ঠিত নন, তিনিও সন্তানদের প্রতি কতটুকু আন্তরিকতা ও ভালবাসা রাখেন। আল্লাহর প্রিয় বান্দারা শারিরিকের চাইতে আত্মিক ও জাগতিকের চাইতে পরলৌকিক আরামের জন্য চিন্তা করেন বেশী। এ কারণেই ইবরাহীম আলাইহিস সালাম দোআ করলেন - “আমার সন্তানদের মধ্য থেকে একটি দলকে পূর্ণ আনুগত্যশীল কর”।

৫) ইবরাহীম 'আলাইহিস সালাম ভবিষ্যত বংশধরদের দুনিয়া ও আখেরাতের সার্বিক মংগলের জন্য আল্লাহর কাছে দোআ করেছেন যে, আমার বংশধরের মধ্যে একজন নবী প্রেরণ করুন - যিনি আপনার আয়াতসমূহ তাদের তিলাওয়াত করে শোনাবেন, কুরআন ও সুন্নাহ শিক্ষা দেবেন এবং বাহ্যিক ও আত্মিক অপবিত্রতা থেকে তাদের পবিত্র করবেন। দোআয় নিজের বংশধরের মধ্য থেকেই নবী হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর কারণ প্রথমতঃ এই যে, এটা তার সন্তানদের জন্য গৌরব-এর বিষয়। দ্বিতীয়তঃ এতে তাদের কল্যাণও নিহিত রয়েছে। কারণ স্বগোত্র থেকে নবী হলে তার চাল-চলন ও অভ্যাস-আচরণ সম্পর্কে তারা উত্তমরূপে অবগত থাকবে। ধোঁকাবাজি ও প্রবঞ্চনার সম্ভাবনা থাকবে না।

তাফসীরে জাকারিয়া

১২৯। হে আমাদের প্রতিপালক! আর তাদের মধ্য থেকে তাদের কাছে এক রসূল প্রেরণ কর, [1] যে তোমার আয়াতসমূহ তাদের নিকট আবৃত্তি করবে; তাদেরকে কিতাব (ধর্মগ্রন্থ) ও হিকমত (জ্ঞান ও প্রজ্ঞা) [2] শিক্ষা দেবে এবং তাদেরকে (শিরক থেকে) পবিত্র করবে। [3] নিশ্চয় তুমি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’

[1] এটা ইবরাহীম (আঃ)-এর শেষ দু'আ। তাঁর এ দু'আও আল্লাহ তাআলা কবুল করেন এবং ইসমাঈল (আঃ)-এর সন্তানের মধ্য থেকে মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে প্রেরণ করেন। আর এই জন্যই রসূল (সাঃ) বলেছেন, আমি হলাম আমার পিতা ইবরাহীম (আঃ)-এর দু'আ, ঈসা (আঃ)-এর সুসংবাদ এবং আমার জননীর স্বপ্ন । (ফাতহুররাব্বানী ২০/১৮১-১৮৯)

[2] 'কিতাব' বলতে কুরআন মাজীদ, আর 'হিকমত' বলতে হাদীস। আয়াতসমূহ তেলাঅত বা আবৃত্তি করার পর কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেওয়ার কথা বলা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কুরআন মাজীদের কেবল তেলাঅতও উদ্দিষ্ট ও বাঞ্ছিত এবং তা সওয়াব ও নেকী লাভের মাধ্যম। তবে তার অর্থ ও তাৎপর্যও যদি বুঝা যায়, তাহলে তা হবে সোনার উপর সোহাগা। কিন্তু যদি কেউ কুরআনের তরজমা ও অর্থ না জানে, তবুও তার জন্য তেলাঅতের ব্যাপারে উদাসীনতা জায়েয নয়। কারণ, তেলাঅত করাই পৃথক একটি নেকীর কাজ। তবে যথাসম্ভব তার অর্থ ও উদ্দেশ্য বুঝার চেষ্টা করা উচিত।

[3] তেলাঅত এবং কিতাব ও হিকমতের শিক্ষার পর রসূল (সাঃ)-এর আগমনের এটা হল চতুর্থ উদ্দেশ্য। আর তা হল, তাদেরকে শিরক ও কুসংস্কারের আবর্জনা থেকে এবং চরিত্র ও কর্মের সকল ত্রুটি থেকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করা।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:১৪৪ قَدۡ نَرٰی تَقَلُّبَ وَجۡہِکَ فِی السَّمَآءِ ۚ فَلَنُوَلِّیَنَّکَ قِبۡلَۃً تَرۡضٰہَا ۪ فَوَلِّ وَجۡہَکَ شَطۡرَ الۡمَسۡجِدِ الۡحَرَامِ ؕ وَ حَیۡثُ مَا کُنۡتُمۡ فَوَلُّوۡا وُجُوۡہَکُمۡ شَطۡرَہٗ ؕ وَ اِنَّ الَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡکِتٰبَ لَیَعۡلَمُوۡنَ اَنَّہُ الۡحَقُّ مِنۡ رَّبِّہِمۡ ؕ وَ مَا اللّٰہُ بِغَافِلٍ عَمَّا یَعۡمَلُوۡنَ ﴿۱۴۴﴾

আকাশের দিকে বার বার তোমার মুখ ফিরানো আমি অবশ্যই দেখছি। অতএব আমি অবশ্যই তোমাকে এমন কিবলার দিকে ফিরাব, যা তুমি পছন্দ কর। সুতরাং তোমার চেহারা মাসজিদুল হারামের দিকে ফিরাও এবং তোমরা যেখানেই থাক, তার দিকেই তোমাদের চেহারা ফিরাও। আর নিশ্চয় যারা কিতাবপ্রাপ্ত হয়েছে, তারা অবশ্যই জানে যে, তা তাদের রবের পক্ষ থেকে সত্য এবং তারা যা করে, সে ব্যাপারে আল্লাহ গাফিল নন। আল-বায়ান

নিশ্চয়ই আমি তোমার আকাশের দিকে মুখ ফিরিয়ে দেখাকে লক্ষ্য করেছি, যে ক্বিবলা তুমি পছন্দ কর, আমি তোমাকে সেদিকে ফিরে যেতে আদেশ করছি। তুমি মাসজিদুল হারামের দিকে মুখ ফিরাও এবং তোমরা যেখানেই থাক, ওরই দিকে মুখ ফিরাও; বস্তুতঃ যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের জানা আছে যে, ক্বিবলার পরিবর্তন তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে প্রকৃতই সত্য এবং তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে মোটেই গাফিল নন। তাইসিরুল

নিশ্চয়ই আমি আকাশের দিকে তোমার মুখমন্ডল উত্তোলন অবলোকন করেছি। তাই আমি তোমাকে ঐ কিবলাহমুখীই করাচ্ছি যা তুমি কামনা করছো। অতএব তুমি মাসজিদুল হারামের দিকে তোমার মুখমন্ডল ফিরিয়ে দাও এবং তোমরা যেখানেই থাক তোমাদের আনন সে দিকেই প্রত্যাবর্তিত কর; এবং নিশ্চয়ই যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তারা অবশ্যই অবগত আছে যে, নিশ্চয়ই এটি তাদের রবের নিকট হতে প্রেরিত সত্য; এবং তারা যা করছে তদ্বিষয়ে আল্লাহ অমনোযোগী নন। মুজিবুর রহমান

We have certainly seen the turning of your face, [O Muhammad], toward the heaven, and We will surely turn you to a qiblah with which you will be pleased. So turn your face toward al-Masjid al-Haram. And wherever you [believers] are, turn your faces toward it [in prayer]. Indeed, those who have been given the Scripture well know that it is the truth from their Lord. And Allah is not unaware of what they do. Sahih International

১৪৪. অবশ্যই আমরা আকাশের দিকে আপনার বারবার তাকানো লক্ষ্য করি(১)। সুতরাং অবশ্যই আমরা আপনাকে এমন কিবলার দিকে ফিরিয়ে দেব যা আপনি পছন্দ করেন(২)। অতএব আপনি মসজিদুল হারামের দিকে(৩) চেহারা ফিরান(৪)। আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন তোমাদের চেহারাসমূহকে এর দিকে ফিরাও এবং নিশ্চয় যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তারা অবশ্যই জানে যে, এটা তাদের রব এর পক্ষ হতে হক। আর তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ্‌ গাফেল নন।

(১) কেবলা পরিবর্তনের আদেশ আসার আগে থেকেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতীক্ষায় ছিলেন। তিনি নিজেই অনুভব করছিলেন ইসরাঈল বংশীয়দের নেতৃত্বের যুগ শেষ হয়ে গেছে এবং তার সাথে সাথে বায়তুল-মুকাদ্দাসের কেন্দ্রীয় মর্যাদা লাভেরও অবসান ঘটেছে। এখন আসল ইবরাহিমী কেবলার দিকে মুখ ফিরানোর সময় হয়ে গেছে। কা'বা মুসলিমদের কেবলা সাব্যস্ত হোক - এটাই ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আন্তরিক বাসনা। তিনি এর জন্য দোআও করছিলেন। এ কারণেই তিনি বার বার আকাশের দিকে চেয়ে দেখতেন যে, ফেরেশতা নির্দেশ নিয়ে আসছেন কি না।


(২) এ আয়াতাংশটি হচ্ছে কেবল পরিবর্তন সম্পর্কিত মূল নির্দেশ। এ নির্দেশটি তৃতীয় হিজরীর রজব বা শাবান মাসে নাযিল হয়। ইবনে সা’আদ বর্ণনা করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি দাওয়াত উপলক্ষে উম্মে বিশ্বর ইবনে বারা' ইবনে মা’রুর-এর ঘরে গিয়েছিলেন। সেখানে যোহরের সময় গিয়েছিল। তিনি সেখানে সালাতে লোকদের ইমামতি করতে দাঁড়িয়েছিলেন। দু’রাকাআত সালাত আদায় হয়ে গিয়েছিল। এমনি সময় তৃতীয় রাকাআতে ওহীর মাধ্যমে এ আয়াতটি নাযিল হল। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ও তার সঙ্গে জামা'আতে শামিল সমস্ত লোক বায়তুল মোকাদ্দাসের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে কাবার দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। [তাবাকাতে ইবনে সা'দ: ১/২৪২]

এরপর মদীনা ও মদীনার আশেপাশে এ নির্দেশটি সাধারণভাবে ঘোষণা করে দেয়া হল। বারা ইবনে আযেব বলেন, এক জায়গায় ঘোষকের কথা এমন অবস্থায় পৌছল, যখন তারা রুকূ করছিল। নির্দেশ শোনার সাথে সাথেই সবাই সে অবস্থাতেই কাবার দিকে মুখ ফিরালো। আনাস ইবনে মালেক বলেন, এ খবরটি কুবায় পৌছল পরের দিন ফজরের সালাতের সময়। লোকেরা এক রাকাআত সালাত শেষ করেছিল, এমন সময় তাদের কানে আওয়াজ পৌছলঃ ‘সাবধান! কেবলা বদলে গেছে। এখন কাবার দিকে কেবলা নির্দিষ্ট হয়েছে। এ কথা শোনার সাথে সাথেই সমগ্র জামাআত কাবার দিকে মুখ ফিরালো। [অনুরূপ বর্ণনা, বুখারী ৪৪৮৬]


(৩) ‘মসজিদুল হারাম’ অর্থ সম্মান ও মর্যাদাসম্পন্ন মসজিদ। এর অর্থ হচ্ছে এমন ইবাদতগৃহ, যার মধ্যস্থলে কা'বাগৃহ অবস্থিত।


(৪) হিজরতের পূর্বে মক্কা-মুকাররামায় যখন সালাত ফরয হয়, তখন কা'বাগৃহই সালাতের জন্য কেবল ছিল, না বায়তুল-মুকাদ্দাস ছিল - এ প্রশ্নে সাহাবী ও তাবেয়ীগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুম বলেনঃ ইসলামের শুরু থেকেই কিবলা ছিল বায়তুল-মুকাদ্দাস। হিজরতের পরও ষোল/সতের মাস পর্যন্ত বায়তুল-মুকাদ্দাসই কেবলা ছিল। এরপর কাবাকে কেবলা করার নির্দেশ আসে। তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় অবস্থানকালে হাজরে আসওয়াদ ও রোকনে-ইয়ামানীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করতেন যাতে কাবা ও বায়তুল-মুকাদ্দাস উভয়টিই সামনে থাকে। মদীনায় পৌছার পর এরূপ করা সম্ভব ছিল না।

তাই তার মনে কেবলা পরিবর্তনের বাসনা দানা বাঁধতে থাকে। অন্যান্য সাহাবী ও তাবেয়ীগণ বলেনঃ মক্কায় সালাত ফরয হওয়ার সময় কা'বা গৃহই ছিল মুসলিমদের প্রাথমিক কেবলা। কেননা ইবরাহীম ও ইসমাঈল আলাইহিমুস্ সালাম-এরও কেবলা তাই ছিল। মহানবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় অবস্থানকালে কাবাগৃহের দিকে মুখ করেই সালাত আদায় করতেন। মদীনায় হিজরতের পর তার কেবলা বায়তুল-মুকাদ্দাস সাব্যস্ত হয়। তিনি মদীনায় ষোল/সতের মাস পর্যন্ত বায়তুল-মোকাদাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেন। এরপর প্রথম কেবল অর্থাৎ কাবাগৃহের দিকে মুখ করার নির্দেশ নাযিল হয়।

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৪৪) আকাশের দিকে তোমার বারংবার মুখ ফিরানোকে আমি প্রায় লক্ষ্য করি। সুতরাং আমি তোমাকে এমন ক্বিবলার দিকে অবশ্যই ফিরিয়ে দেব, যা তুমি পছন্দ কর। অতএব (নামাযে) তুমি মাসজিদুল হারামের (পবিত্র কা’বাগৃহের) দিকে মুখ ফেরাও। তোমরা যেখানেই থাক না কেন, (নামাযে) সেই (কা’বার) দিকে মুখ ফেরাও। আর যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে, তারা নিশ্চিতভাবে জানে যে, এ (বিধান) তাদের প্রতিপালকের নিকট হতে আগত সত্য। [1] তারা যা করে সে সম্বন্ধে আল্লাহ উদাসীন নন।

[1] আহলে-কিতাবদের বিভিন্ন সহীফা (ধর্মগ্রন্থ)সমূহে কাবা শরীফ যে শেষ নবীর ক্বিবলা হবে তার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বিদ্যমান। কাজেই এর সত্যতা সম্পর্কে তাদের নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল, কিন্তু তাদের জাতিগত হিংসা ও বিদ্বেষ সত্য গ্রহণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:১৪৫ وَ لَئِنۡ اَتَیۡتَ الَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡکِتٰبَ بِکُلِّ اٰیَۃٍ مَّا تَبِعُوۡا قِبۡلَتَکَ ۚ وَ مَاۤ اَنۡتَ بِتَابِعٍ قِبۡلَتَہُمۡ ۚ وَ مَا بَعۡضُہُمۡ بِتَابِعٍ قِبۡلَۃَ بَعۡضٍ ؕ وَ لَئِنِ اتَّبَعۡتَ اَہۡوَآءَہُمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ مَا جَآءَکَ مِنَ الۡعِلۡمِ ۙ اِنَّکَ اِذًا لَّمِنَ الظّٰلِمِیۡنَ ﴿۱۴۵﴾ۘ

আর যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তুমি যদি তাদের নিকট সব নিদর্শন নিয়ে আস, তারা তোমার কিবলার অনুসরণ করবে না আর তুমিও তাদের কিবলার অনুসরণকারী নও এবং তারা একে অপরের কিবলার অনুসরণকারী নয়। আর যদি তুমি তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ কর তোমার নিকট জ্ঞান আসার পর, তবে নিশ্চয় তুমি তখন যালিমদের অন্তর্ভুক্ত। আল-বায়ান

আর যদি তুমি কিতাবধারীদের সামনে সমুদয় দলীল হাজির কর, তবুও তারা তোমার ক্বিবলার অনুসরণ করবে না আর তুমিও তাদের ক্বিবলার অনুসরণকারী নও, আর তারা একে অপরের ক্বিবলার অনুসরণকারী নয়। যদি তুমি তোমার নিকট জ্ঞান আসার পরেও তাদের মনগড়া মতবাদসমূহের অনুসরণ কর, সে অবস্থায় তুমিও অবাধ্য দলেরই অন্তর্ভুক্ত হবে। তাইসিরুল

এবং যাদেরকে গ্রন্থ প্রদত্ত হয়েছে তাদের নিকট যদি তুমি সমুদয় নিদর্শন আনয়ন কর তবুও তারা তোমার কিবলাহকে গ্রহণ করবেনা; এবং তুমিও তাদের কিবলাহ গ্রহণ করতে পারনা, আর তাদের কোন দলও অন্য দলের কিবলাহকে স্বীকার করেনি, এবং তোমার নিকট যে জ্ঞান এসেছে এর পরেও যদি তুমি তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ কর তাহলে নিশ্চয়ই তুমি অত্যাচারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। মুজিবুর রহমান

And if you brought to those who were given the Scripture every sign, they would not follow your qiblah. Nor will you be a follower of their qiblah. Nor would they be followers of one another's qiblah. So if you were to follow their desires after what has come to you of knowledge, indeed, you would then be among the wrongdoers. Sahih International

১৪৫. আর যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে আপনি যদি তাদের কাছে সমস্ত দলীল নিয়ে আসেন, তবু তারা আপনার কিবলার অনুসরণ করবে না; এবং আপনিও তাদের কিবলার অনুসারী নন(১)। আর তারাও পরস্পরের কিবলার অনুসারী নয়। আপনার নিকট সত্য-জ্ঞান আসার পরও যদি আপনি তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করেন, তাহলে নিশ্চয় আপনি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।

(১) আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে যে, কা'বা কেয়ামত পর্যন্ত আপনার কেবলা থাকবে। এতে ইয়াহুদী-নাসারাদের সে মতবাদ খণ্ডন করাই ছিল উদ্দেশ্য যে, মুসলিমদের কেবলার কোন স্থিতি নেই; ইতঃপূর্বে তাদের কেবল ছিল কাবা, পরিবর্তিত হয়ে বায়তুল-মুকাদ্দাস হল, আবার তাও বদলে গিয়ে পুনরায় কাবা হল। আবারো হয়ত বায়তুল-মুকাদ্দাসকেই কেবলা বানিয়ে নেবে। [তাফসীরে বাহরে মুহীত]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৪৫) যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে, তুমি যদি তাদের নিকট সমস্ত নিদর্শন পেশ কর, তবুও তারা তোমার ক্বিবলার অনুসরণ করবে না[1] এবং তুমিও তাদের ক্বিবলার অনুসারী নও।[2] তারাও একে অন্যের ক্বিবলার অনুসারী নয়।[3] তোমার নিকট জ্ঞান আসার পর তুমি যদি তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ কর, তাহলে নিশ্চয়ই তুমি সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে। [4]

[1] কারণ, ইয়াহুদীদের বিরোধিতা তো হিংসা ও বিদ্বেষের ভিত্তিতে। যার কারণে প্রমাণাদির কোন প্রভাব তাদের উপর পড়বে না। প্রভাব সৃষ্টি হওয়ার জন্য অন্তর পরিষ্কার হওয়া অত্যাবশ্যক।

[2] কারণ, আপনি আল্লাহর অহীর অনুসারী। আল্লাহর নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত আপনি তাদের ক্বিবলা গ্রহণ করতে পারেন না।

[3] ইয়াহুদীদের ক্বিবলা হল, বায়তুল মুক্বাদ্দাসের পাথর (যার উপর গম্বুজ নির্মিত আছে)। আর খ্রিষ্টানদের ক্বিবলা হল, বায়তুল মুক্বাদ্দাসের পূর্বদিক। আহলে-কিতাদের এই দু'টি দল যখন আপোসে একটি ক্বিবলার উপর ঐক্যবদ্ধ নয়, তখন তারা মুসলিমদের নিকট থেকে কিভাবে আশা করে যে, তারা (মুসলিমরা) এ ব্যাপারে তাদের সাথে একমত হবে?

[4] এ রকম ধমক পূর্বেও দেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য হল, উম্মতকে সতর্ক করা যে, কুরআন ও হাদীসের জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও বিজাতি ও বিদআতীদের অনুকরণ করা যুলুম, সীমালংঘন ও ভ্রষ্টতা বৈ কিছুই নয়।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:১৪৬ اَلَّذِیۡنَ اٰتَیۡنٰہُمُ الۡکِتٰبَ یَعۡرِفُوۡنَہٗ کَمَا یَعۡرِفُوۡنَ اَبۡنَآءَہُمۡ ؕ وَ اِنَّ فَرِیۡقًا مِّنۡہُمۡ لَیَکۡتُمُوۡنَ الۡحَقَّ وَ ہُمۡ یَعۡلَمُوۡنَ ﴿۱۴۶﴾ؔ

যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি, তারা তাকে চিনে, যেমন চিনে তাদের সন্তানদেরকে। আর নিশ্চয় তাদের মধ্য থেকে একটি দল সত্যকে অবশ্যই গোপন করে, অথচ তারা জানে। আল-বায়ান

আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছি, তারা তাকে সে রকমই চিনে, যেমন চিনে নিজের পুত্রদেরকে, আর ওদের কতকলোক জেনে শুনে সত্যকে গোপন করে থাকে। তাইসিরুল

যাদেরকে আমি কিতাব প্রদান করেছি তারা তাকে এরূপভাবে চিনে, যেমন চিনে তারা আপন সন্তানদেরকে এবং নিশ্চয়ই তাদের এক দল জ্ঞাতসারে সত্যকে গোপন করছে। মুজিবুর রহমান

Those to whom We gave the Scripture know him as they know their own sons. But indeed, a party of them conceal the truth while they know [it]. Sahih International

১৪৬. আমরা যাদেরকে কিতাব দিয়েছি তারা তাকে সেরূপ জানে যেরূপ তারা নিজেদের সন্তানদেরকে চিনে। আর নিশ্চয় তাদের একদল জেনে-বুঝে সত্য গোপন করে থাকে।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৪৬) আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছি, তারা তাকে (মুহাম্মাদকে) তেমনই চেনে, যেমন তাদের পুত্রগণকে চেনে; কিন্তু তাদের একদল জেনেশুনে সত্য গোপন করে থাকে। [1]

[1] এখানে আহলে-কিতাবের একটি দলের সত্যকে গোপন করার অপরাধ সাব্যস্ত করা হচ্ছে। কারণ, তাদের মধ্যে একটি দল আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ)-এর মত লোকেদেরও ছিল। যাঁরা স্বীয় সততা এবং অভ্যন্তরীণ নির্মলতার কারণে ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হোন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:১৫১ کَمَاۤ اَرۡسَلۡنَا فِیۡکُمۡ رَسُوۡلًا مِّنۡکُمۡ یَتۡلُوۡا عَلَیۡکُمۡ اٰیٰتِنَا وَ یُزَکِّیۡکُمۡ وَ یُعَلِّمُکُمُ الۡکِتٰبَ وَ الۡحِکۡمَۃَ وَ یُعَلِّمُکُمۡ مَّا لَمۡ تَکُوۡنُوۡا تَعۡلَمُوۡنَ ﴿۱۵۱﴾ؕۛ

যেভাবে আমি তোমাদের মধ্যে একজন রাসূল প্রেরণ করেছি তোমাদের মধ্য থেকে, যে তোমাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে, তোমাদেরকে পবিত্র করে এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়। আর তোমাদেরকে শিক্ষা দেয় এমন কিছু যা তোমরা জানতে না। আল-বায়ান

যেমন (তোমরা আমার একটি অনুগ্রহ লাভ করেছ যে) আমি তোমাদেরই মধ্য হতে তোমাদের কাছে একজন রসূল পাঠিয়েছি, যে আমার আয়াতগুলো তোমাদেরকে পড়ে শুনায়, তোমাদেরকে শুদ্ধ করে, তোমাদেরকে কিতাব ও জ্ঞান-বিজ্ঞান (সুন্নাত) শিক্ষা দেয় এবং তোমাদেরকে এমন সব বিষয় শিক্ষা দেয় যা তোমরা জানতে না। তাইসিরুল

আমি তোমাদের মধ্য হতে এরূপ রাসূল প্রেরণ করেছি যে তোমাদের নিকট আমার নিদর্শনাবলী পাঠ করে এবং তোমাদেরকে পবিত্র করে, তোমাদেরকে গ্রন্থ ও বিজ্ঞান শিক্ষা দেয় এবং তোমরা যা অবগত ছিলেনা তা শিক্ষা দান করে। মুজিবুর রহমান

Just as We have sent among you a messenger from yourselves reciting to you Our verses and purifying you and teaching you the Book and wisdom and teaching you that which you did not know. Sahih International

১৫১. যেমন আমরা তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের কাছে রাসূল পাঠিয়েছি(১) যিনি তোমাদের কাছে আমাদের আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তোমাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেন। আর তা শিক্ষা দেন যা তোমরা জানতে না।

(১) এ পর্যন্ত কেবলা পরিবর্তন সংক্রান্ত আলোচনা চলে আসছিল। এখানে বিষয়টিকে এমন এক পর্যায়ে এনে সমাপ্ত করা হয়েছে, যাতে বিষয়টির ভূমিকায় কা’বা নির্মাতা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর দো'আর বিষয়টিও প্রাসঙ্গিকভাবে আলোচিত হয়ে গেছে। অর্থাৎ ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর বংশধরদের মধ্যে এক বিশেষ মর্যাদায় মহানবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আবির্ভাব। এতে এ বিষয়েও ইংগিত করা হয়েছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আবির্ভাবে কা'বা নির্মাতার দো'আরও একটা প্রভাব রয়েছে। কাজেই তার কেবলা যদি কা'বা শরীফকে সাব্যস্ত করা হয়, তাহলে তাতে বিস্ময়ের কিংবা অস্বীকারের কিছু নেই।

(كَمَا أَرْسَلْنَاكَ) বাক্যে উদাহরণসূচক যে ‘কাফ (ك) বর্ণটি ব্যবহার করা হয়েছে, তার একটি ব্যাখ্যা তো উল্লেখিত তাফসীরের মাধ্যমেই বুঝা গেছে। এছাড়াও আরেকটি বিশ্লেষণ রয়েছে, যা কুরতুবী গ্রহণ করেছেন। তা হলো এই যে, ‘কাফ’ এর সম্পর্ক হলো পরবর্তী আয়াত (فَاذْكُرُونِي) এর সাথে। অর্থাৎ আমি যেমন তোমাদের প্রতি কেবলাকে একটি নেয়ামত হিসাবে দান করেছি অতঃপর দ্বিতীয় নেয়ামত দিয়েছি রাসূলের আবির্ভাবের মাধ্যমে, তেমনি আল্লাহর যিকরও আরেকটি নেয়ামত। সুতরাং এসব নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় কর, যাতে এসব নেয়ামতের অধিকতর প্রবৃদ্ধি হতে পারে। [তাফসীরে মা'আরিফুল কুরআন]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৫১) যেভাবে[1] আমি তোমাদের মধ্য হতে তোমাদেরই একজনকে রসূল করে পাঠিয়েছি, যে আমার আয়াত (বাক্য)সমূহ তোমাদের কাছে পাঠ করে, তোমাদেরকে (শিরক হতে) পবিত্র করে এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা দেয়।

[1] كَمَا (যেভাবে) এর সম্পর্ক পূর্বের বক্তব্যের সাথে। অর্থাৎ, উক্ত অনুগ্রহের পরিপূর্ণতা এবং হিদায়াতের তওফীক তোমরা ঐভাবেই পেয়েছ, যেভাবে এর আগে তোমাদের মধ্য থেকে একজন রসূল প্রেরণ করা হয়েছে, যে তোমাদেরকে পবিত্র করে, তোমাদেরকে কিতাব ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দেয় এবং এমন বিষয়ও শিক্ষা দেয় যা তোমরা জানতে না।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:১৫৯ اِنَّ الَّذِیۡنَ یَکۡتُمُوۡنَ مَاۤ اَنۡزَلۡنَا مِنَ الۡبَیِّنٰتِ وَ الۡہُدٰی مِنۡۢ بَعۡدِ مَا بَیَّنّٰہُ لِلنَّاسِ فِی الۡکِتٰبِ ۙ اُولٰٓئِکَ یَلۡعَنُہُمُ اللّٰہُ وَ یَلۡعَنُہُمُ اللّٰعِنُوۡنَ ﴿۱۵۹﴾ۙ

নিশ্চয় যারা গোপন করে সু-স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ ও হিদায়াত যা আমি নাযিল করেছি, কিতাবে মানুষের জন্য তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করার পর, তাদেরকে আল্লাহ লা‘নত করেন এবং লা‘নতকারীগণও তাদেরকে লা‘নত করে। আল-বায়ান

নিশ্চয়ই যারা আমার অবতীর্ণ কোন দলীল এবং হিদায়াতকে লোকেদের জন্য আমি কিতাবের মধ্যে বর্ণনা করার পরেও গোপন করে, আল্লাহ তাদেরকে অভিসম্পাত করেন আর অভিসম্পাতকারীরাও তাদের প্রতি অভিসম্পাত করে থাকে। তাইসিরুল

আমি যে সব উজ্জ্বল নিদর্শন ও পথ-নির্দেশ অবতীর্ণ করেছি ঐগুলিকে সর্ব সাধারণের নিকট প্রকাশ করার পরও যারা ঐসব বিষয়কে গোপন করে, আল্লাহ তাদেরকে অভিসম্পাত করেন এবং অভিসম্পাতকারীরাও তাদেরকে অভিসম্পাত করে থাকে। মুজিবুর রহমান

Indeed, those who conceal what We sent down of clear proofs and guidance after We made it clear for the people in the Scripture - those are cursed by Allah and cursed by those who curse, Sahih International

১৫৯. নিশ্চয় যারা(১) গোপন করে আমরা যেসব সুস্পষ্ট নিদর্শন ও হেদায়াত নাযিল করেছি, মানুষের জন্য কিতাবে তা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করার পর(২), তাদেরকে আল্লাহ লা'নত করেন এবং লা'নতকারীগণও(৩) তাদেরকে লা'নত করেন(৪)।

(১) যারা আল্লাহর কিতাবের জ্ঞান গোপন করত, তারা ছিল ইয়াহুদী আলেম সম্প্রদায়। তারা সর্বসাধারণ্যে প্রচার করার পরিবর্তে ইলমে দ্বীনকে একটি সীমিত ধর্মীয় পেশাদার গোষ্ঠীর মধ্যে আবদ্ধ করে রেখেছিল। সাধারণ জনগণকে এ জ্ঞান থেকে দূরে রাখা হয়েছিল। এমনকি এ গোষ্ঠীর লোকগুলো নিজেদের জনপ্রিয়তা অব্যাহত রাখার জন্য ভ্রষ্টতা ও শরীআত বিরোধী কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে পড়তে নিজেদের কথা ও কাজের সাহায্যে অথবা নীরব সমর্থনের মাধ্যমে বৈধতার ছাড়পত্র দান করত। এ আয়াতে এ ধরণের প্রবণতা থেকে মুসলিমদেরকে দূরে থাকার তাকীদ দেয়া হয়েছে।


(২) এ আয়াতে বলা হয়েছে যে, আল্লাহর যে সমস্ত প্রকৃষ্ট হিদায়াত নাযিল হয়েছে, সেগুলো মানুষের কাছে গোপন করা এত কঠিন হারাম ও মহাপাপ, যার জন্য আল্লাহ্ তাআলা নিজেও লা'নত বা অভিসম্পাত করে থাকেন এবং সমগ্র সৃষ্টিও অভিসম্পাত করে। এতে কয়েকটি বিষয় জানা যায়ঃ এক. যে জ্ঞানের প্রচার ও প্রসার বিশেষ জরুরী, তা গোপন করা হারাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘যে লোক দ্বীনের কোন বিধানের বিষয় জানা সত্ত্বেও তা জিজ্ঞেস করলে গোপন করবে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা'আলা তার মুখে আগুনের লাগাম পরিয়ে দেবেন’। [আবু দাউদঃ ৩৬৫৮, ইবনে মাজাহঃ ২৬৬, আহমাদঃ ২/২৬৩] দুই. জ্ঞানকে গোপন করার অভিসম্পাত সে সমস্ত জ্ঞান ও মাসআলা গোপন করার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যা কুরআন ও সুন্নাহতে পরিস্কারভাবে উল্লেখ রয়েছে এবং যার প্রকাশ ও প্রচার করা কর্তব্য।

পক্ষান্তরে এমন সূক্ষ্ম ও জটিল মাসআলা সাধারণ্যে প্রকাশ না করাই উত্তম, যদ্বারা সাধারণ লোকদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতে পারে। তখন তা জ্ঞানকে গোপন করার হুকুমের আওতায় পড়বে না। উল্লেখিত আয়াতে (مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَىٰ) বাক্যের দ্বারাও তেমনি ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, ‘তোমরা যদি সাধারণ মানুষকে এমনসব হাদীস শোনাও, যা তারা পরিপূর্ণভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না, তবে তাদেরকে ফেতনা ফাসাদেরই সম্মুখীন করবে’। [বুখারী, কিতাবুল ইলম, ইমাম মুসলিম, মুকাদ্দিমা] আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে উদ্ধৃত রয়েছে, তিনি বলেছেন, সাধারণ মানুষের সামনে ইলমের শুধু ততটুকু প্রকাশ করবে, যতটুকু তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি ধারণ করতে পারে। মানুষ আল্লাহ ও রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করুক; তোমরা কি এমন কামনা কর? কারণ, যে কথা তাদের বোধগম্য নয়, তাতে তাদের মনে নানা রকম সন্দেহসংশয় সৃষ্টি হবে এবং তাতে করে তারা আল্লাহ ও রাসূলকে অস্বীকারও করে বসতে পারে। [বুখারী, কিতাবুল ইলমঃ ৪৯ নং অধ্যায়]


(৩) যে কাফের কুফর অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেছে বলে নিশ্চিত নয়, তার প্রতি লা'নত করা বৈধ নয়। আর আমাদের পক্ষে যেহেতু কারো শেষ পরিণতির (মৃত্যুর) নিশ্চিত অবস্থা সম্পর্কে অবগত হওয়ার কোন উপায় নেই, সেহেতু কোন কাফেরের নাম নিয়ে তার প্রতি লা'নত বা অভিসম্পাত করাও জায়েয নয়। বস্তুতঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সমস্ত কাফেরের নাম উল্লেখ করে লা'নত করেছেন, কুফর অবস্থায় তাদের মৃত্যু সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে তিনি অবহিত হয়েছিলেন। অবশ্য সাধারণ কাফের ও যালেমদের প্রতি অনির্দিষ্টভাবে লা'নত করা জায়েয। এতে এ কথাও সাব্যস্ত হয়ে যায় যে, লা'নতের ব্যাপারটি যখন এতই কঠিন ও নাযুক যে, কুফর অবস্থায় মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে কোন কাফেরের প্রতিও লা'নত করা বৈধ নয়, তখন কোন মুসলিম কিংবা কোন জীব-জন্তুর উপর কেমন করে লা'নত করা যেতে পারে?

সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে আমাদের নারী সম্প্রদায় একান্ত গাফলতিতে পড়ে আছে। তারা কথায় কথায় নিজেদের আপনজনদের প্রতিও অভিসম্পাত বা লা'নত বাক্য ব্যবহার করতে থাকে এবং শুধু লা'নত বাক্য ব্যবহার করেই সন্তুষ্ট হয় না; বরং তার সমার্থক যে সমস্ত শব্দ জানা থাকে সেগুলোও ব্যবহার করতে কসুর করে না। লা'নতের প্রকৃত অর্থ হল, আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া। কাজেই কাউকে ‘মরদূদ’, ‘আল্লাহর অভিশপ্ত প্রভৃতি শব্দে গালি দেয়াও লা'নতেরই সমপর্যায়ভুক্ত। [মা'আরিফুল কুরআন]


(৪) এ আয়াতে কুরআনুল কারীম লা'নত বা অভিসম্পাতকারীদের নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেনি। মুফাসসিরগণ বলেন, এভাবে বিষয়টি অনির্ধারিত রাখাতে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, দুনিয়ার প্রতিটি বস্তু ও প্রতিটি সৃষ্টিই তাদের উপর অভিসম্পাত করে থাকে। মুজাহিদ ও আতা রাহিমাহুমাল্লাহ বলেন, এমনকি জীব-জন্তু, কীট-পতঙ্গও তাদের প্রতি অভিসম্পাত করে। [সুনান সাঈদ ইবনে মানসূর: ২/৬৩৮, ৬৩৯, বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান: ৫/২৪] কারণ, তাদের অপকর্মের দরুন সেসব সৃষ্টিরও ক্ষতি সাধিত হয়।

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৫৯) আমি যে সব স্পষ্ট নিদর্শন ও পথ-নির্দেশ অবতীর্ণ করেছি, মানুষের জন্য স্পষ্টভাবে আমি কিতাবে ব্যক্ত করার পরও যারা ঐ সকল গোপন করে, আল্লাহ তাদেরকে অভিশাপ দেন এবং অভিশাপকারীরাও তাদেরকে অভিশাপ দেয়। [1]

[1] মহান আল্লাহ যে সকল কথা কুরআন মাজীদে অবতীর্ণ করেছেন তা গোপন করা এত বড় অন্যায় যে, আল্লাহ ছাড়াও অন্যান্য অভিশাপকারীরা অভিশাপ দিতে থাকে। তাছাড়া হাদীসে আল্লাহর রসূল (সাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি কোন ইলম সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হওয়ার পর তা গোপন করে সে ব্যক্তিকে কিয়ামতের দিন আগুনের একটি লাগাম পরানো হবে। (আবূ দাঊদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান, বাইহাকী, হাকেম অনুরূপ।)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
দেখানো হচ্ছেঃ থেকে ২০ পর্যন্ত, সর্বমোট ২৬৩ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে পাতা নাম্বারঃ 1 2 3 4 5 6 · · · 13 14 পরের পাতা »