সূরাঃ আল-মায়েদা | Al-Ma'ida | سورة المائدة - আয়াতঃ ২০
৫:২০ وَ اِذۡ قَالَ مُوۡسٰی لِقَوۡمِہٖ یٰقَوۡمِ اذۡکُرُوۡا نِعۡمَۃَ اللّٰہِ عَلَیۡکُمۡ اِذۡ جَعَلَ فِیۡکُمۡ اَنۡۢبِیَآءَ وَ جَعَلَکُمۡ مُّلُوۡکًا ٭ۖ وَّ اٰتٰىکُمۡ مَّا لَمۡ یُؤۡتِ اَحَدًا مِّنَ الۡعٰلَمِیۡنَ ﴿۲۰﴾

আর যখন মূসা তার কওমকে বলল, ‘হে আমার কওম, স্মরণ কর তোমাদের উপর আল্লাহর নিআমত, যখন তিনি তোমাদের মধ্যে নবী বানিয়েছেন এবং তোমাদেরকে রাজা-বাদশাহ বানিয়েছেন, আর তোমাদেরকে দান করেছেন এমন কিছু যা সকল সৃষ্টির মধ্যে কাউকে দান করেননি’। আল-বায়ান

স্মরণ কর, যখন মূসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর নি‘য়ামাত স্মরণ কর যে, তিনি তোমাদের মধ্যে নাবী করেছেন এবং তোমাদেরকে বাদশাহ করেছেন আর তোমাদেরকে তিনি এমন কিছু দিয়েছেন যা বিশ্বভুবনে অন্য কাউকে দেননি। তাইসিরুল

আর যখন মূসা স্বীয় সম্প্রদায়কে বললঃ হে আমার সম্প্রদায়! তোমাদের প্রতি আল্লাহর নি’আমতকে স্মরণ কর, যখন তিনি তোমাদের মধ্যে বহু নাবী সৃষ্টি করলেন, রাজ্যাধিপতি করলেন এবং তোমাদেরকে এমন বস্তুসমূহ দান করলেন যা বিশ্ববাসীদের মধ্যে কেহকেও দান করেননি। মুজিবুর রহমান

And [mention, O Muhammad], when Moses said to his people, "O my people, remember the favor of Allah upon you when He appointed among you prophets and made you possessors and gave you that which He had not given anyone among the worlds. Sahih International

২০. আর স্মরণ করুন(১) যখন মূসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর যখন তিনি তোমাদের মধ্যে নবী করেছিলেন ও তোমাদেরকে রাজা-বাদশাহ করেছিলেন এবং সৃষ্টিকুলের কাউকেও তিনি যা দেননি তা তোমাদেরকে দিয়েছিলেন।(২)

(১) আলোচ্য আয়াতসমূহে বনী-ইসরাঈলের একটি বিশেষ ঘটনা উল্লেখিত হয়েছে। ঘটনাটি এই যে, ফিরআউন ও তার সৈন্যবাহিনী যখন সমুদ্রে নিমজ্জিত হয় এবং মূসা আলাইহিস সালাম ও তার সম্প্রদায় বনী-ইসরাঈল ফিরআউনের দাসত্ব থেকে মুক্তিলাভ করে তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে কিছু নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন এবং তাদের পৈতৃক দেশ শামদেশকেও তাদের অধিকারে প্রত্যার্পণ করতে চাইলেন। সেমতে মূসা আলাইহিস সালামের মাধ্যমে তাদেরকে জিহাদের উদ্দেশ্যে পবিত্র ভূমি শাম (বর্তমান সিরিয়া, ফিলিস্তীন তথা বাইতুল মুকাদ্দাস) এলাকায় প্রবেশ করতে নির্দেশ দেয়া হল। সাথে সাথে তাদেরকে আগাম সুসংবাদও দেয়া হল যে, এ জিহাদে তারাই বিজয়ী হবে। কারণ, আল্লাহ্ তা'আলা এ পবিত্র ভূমির আধিপত্য তাদের ভাগ্যে লিখে দিয়েছেন যা অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে।

কিন্তু বনী-ইসরাঈল প্রকৃতিগত হীনতার কারণে আল্লাহর বহু নেয়ামত তথা ফিরআউনের সাগরডুবি ও তাদের মিসর অধিকার ইত্যাদি স্বচক্ষে দেখেও এক্ষেত্রে অঙ্গীকার পালনের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে সক্ষম হল না। তারা জিহাদ সম্পর্কিত আল্লাহ্ তা'আলার এ নির্দেশের বিরুদ্ধে অন্যায় জেদ ধরে বসে রইল। পরিণতিতে তারা চল্লিশ বৎসর পর্যন্ত একটি সীমাবদ্ধ এলাকায় অবরুদ্ধ ও বন্দী হয়ে রইল। বাহ্যতঃ তাদের চারপাশে কোন বাধার প্রাচীর ছিল না এবং তাদের হাত-পা শেকলে বাধা ছিল না; বরং তারা ছিল উন্মুক্ত প্রান্তরে।

তারা স্বদেশে অর্থাৎ মিসর ফিরে যাবার জন্য প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পথও চলত; কিন্তু তারা নিজেদেরকে সেখানেই দেখতে পেত, যেখান থেকে সকালে রওয়ানা হয়েছিল। ইত্যবসরে মূসা ও হারূন আলাইহিমাস্ সালামের ওফাত হয়ে যায় এবং বনী-ইসরাঈল তীহ প্রান্তরেই উদভ্ৰান্তের মত ঘোরাফেরা করতে থাকে। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা তাদের হেদায়াতের জন্য অন্য একজন নবী প্রেরণ করলেন। এমনিভাবে চল্লিশ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর বনী-ইসরাঈলের অবশিষ্ট বংশধর তৎকালীন নবীর নেতৃত্বে শাম দেশের সে এলাকা তথা সিরিয়া ও বায়তুলমুকাদ্দাসের জন্যে জিহাদের সংকল্প গ্রহণ করে এবং আল্লাহ্ তা'আলার ওয়াদাও পূর্ণতা লাভ করে। [ইবন কাসীর]


(২) আল্লাহ বলেনঃ “তোমাদের প্রতি আল্লাহর নেয়ামতকে স্বরণ কর। তিনি তোমাদের মধ্যে অনেক নবী পাঠিয়েছেন, তোমাদেরকে রাজ্যের অধিপতি করেছেন এবং তোমাদেরকে এমন নেয়ামত দিয়েছেন, যা বিশ্বজগতের কেউ পায়নি”। এতে তিনটি নেয়ামতের কথা বর্ণিত হয়েছে। একটি ঈমানী নেয়ামত; অর্থাৎ তার সম্প্রদায়ে অব্যাহতভাবে বহু নবী প্রেরণ। এর চাইতে বড় সম্মান আর কিছু হতে পারে না। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ইসরাইল বংশীয়দেরকে নবীরা শাসন করতেন। যখনই কোন নবী মারা যেত, তখনই অন্য নবী তার স্থলাভিষিক্ত হতেন। [বুখারী ৩৪৫৫; মুসলিম: ১৮৪২] আয়াতে বর্ণিত দ্বিতীয় নেয়ামতটি হচ্ছে পার্থিব ও বাহ্যিক। অর্থাৎ তাদেরকে রাজ্য দান। এতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, বনী-ইসরাঈল সুদীর্ঘ কাল ফিরআউন ও ফিরআউন বংশীয়দের ক্রীতদাসরূপে দিনরাত অসহনীয় নির্যাতনের শিকার হচ্ছিল। আজ আল্লাহ্ তাআলা ফিরআউন ও তার বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করে বনী-ইসরাঈলকে তার রাজ্যের অধিপতি করে দিয়েছেন।

অথবা, এখানে রাজ্যদান বলতে রাজার হাল বোঝানো হয়েছে। কারণ, ইসরাইল বংশীয়দের মধ্যে ইউসুফ আলাইহিস সালাম ব্যতীত তখনও আর কেউ রাজা হন নি। তাই এর অর্থ এটাও হতে পারে যে, তারা খুবই অবস্থাসম্পন্ন মানুষ ছিল। তারা রাজার হালে থাকত। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তারা বাড়ী, নারী ও দাস-দাসী নিয়ে জীবন যাপন করত বলেই তাদেরকে রাজা বলা হয়েছে। [ইবন কাসীর] তৃতীয় নেয়ামত বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ উভয় প্রকার নেয়ামতের সমষ্টি। বলা হয়েছেঃ তোমাদেরকে এমনসব নেয়ামত দিয়েছেন, যা বিশ্বজগতের আর কাউকে দেননি। আভ্যন্তরীণ সম্মান, নবুওয়াত এবং রেসালাতও এর অন্তর্ভুক্ত।

এ ছাড়া বাহ্যিক রাজত্ব এবং অর্থ-সম্পদও এরই মধ্যে পরিগণিত। প্রশ্ন হতে পারে, কুরআনের উক্তি অনুযায়ী মুসলিম সম্প্রদায় অন্য সব উম্মতের চাইতে শ্রেষ্ঠ। কুরআনের উক্তি (كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ) [সূরা আলে-ইমরানঃ ১১০] (وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا) [সূরা আল-বাকারাহঃ ১৪৩]-প্রভৃতি বাক্য এবং অসংখ্য হাদীসও এ বক্তব্য সমর্থন করে। এর উত্তর এই যে, আয়াতে সৃষ্টিকুলের ঐসব লোককে বোঝানো হয়েছে, যারা মূসা আলাইহিস সালামের আমলে বিদ্যমান ছিল। তখন সমগ্র বিশ্বের কেউ ঐসব নেয়ামত পায়নি, যা বনী-ইসরাঈল পেয়েছিল। পরবর্তী যুগের কোন উম্মত যদি আরো বেশী নেয়ামত লাভ করে, তবে তা আয়াতের পরিপন্থী নয়। [ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(২০) (স্মরণ কর) মূসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমাদের প্রতি আল্লাহ-প্রদত্ত অনুগ্রহকে স্মরণ কর যে, তিনি তোমাদের মধ্যে আম্বিয়া সৃষ্টি করেছেন ও তোমাদেরকে রাজ্যাধিপতি করেছেন[1] এবং তোমাদেরকে এমন কিছু দান করেছেন, যা বিশ্বজগতে আর কাউকেও দান করেননি। [2]

[1] অধিকাংশ নবী-রসূল বানী ইসরাঈলের (বানী ইয়াকূবের) মধ্য হতেই আগমন করেছেন এবং তাঁদের সর্বশেষ নবী ছিলেন ঈসা (আঃ)। আর নবী ও রসূলগণের সর্বশেষ নবী আগমন করেন বানী ইসমাঈলের মধ্য হতে মুহাম্মাদ (সাঃ)। অনুরূপভাবে বানী ইসরাঈলের মধ্যে বহু রাজা-বাদশাহর আবির্ভাব ঘটেছে এবং কোন কোন নবীকে আল্লাহ বাদশাহীও দান করেছিলেন; যেমন সুলাইমান (আঃ)। আর এর অর্থ হল, নবুঅতের মতই বাদশাহীও আল্লাহ প্রদত্ত একটি অনুগ্রহ। অতএব সাধারণভাবে বাদশাহী বা রাজতন্ত্রকে খারাপ মনে করলে বড় ভুল হবে। যদি রাজতন্ত্র বা বাদশাহী কোন খারাপ জিনিস হত, তাহলে আল্লাহ কোন নবীকে রাজা-বাদশাহ বানাতেন না এবং এই বাদশাহীকে অনুগ্রহ ও নেয়ামত বলে উল্লেখ করতেন না। যেমনটি বর্তমানে পাশ্চাত্য গণতন্ত্রের বুকচাপা (ভূত) এমনভাবে মানুষের মন ও মস্তিষ্কে চেপে ধরে আছে এবং পাশ্চাত্যের চতুররা এমনভাবে তাদেরকে যাদু করেছে যে, পাশ্চাত্য চিন্তাধারার অন্ধভক্ত কেবল রাজনৈতিক নেতারাই নয়; বরং জুব্বা-পাগড়ী-ওয়ালারাও বটে। মোটকথা, রাজতন্ত্র বা শাহীতন্ত্র; যদি রাজা ও শাসক ন্যায়পরায়ণ ও আল্লাহ-ভীরু হন, তাহলে তা গণতন্ত্র থেকে হাজার গুণ উত্তম।

[2] আয়াতের এই অংশটিতে ঐ সকল অনুগ্রহ ও অলৌকিক ঘটনাবলীর দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যা বানী ইস্রাঈলকে দান করা হয়েছিল। যেমন, ‘মান্ন্ ও সালওয়া’র অবতরণ, মেঘমালার ছায়াদান এবং ফিরআউনের কবল থেকে মুক্তির জন্য সাগরের মাঝে রাস্তা হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। এই দিক দিয়ে এই জাতি নিজ যুগে মাহাত্ম্য ও মর্যাদায় শীর্ষস্থানে ছিল। কিন্তু শেষনবী মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর আগমনের পর ঐ মাহাত্ম্য ও মর্যাদার অধিকারী শুধুমাত্র উম্মতে মুহাম্মাদী হয়ে গেল। যেমন মহান আল্লাহ বলেন, {كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاس} অর্থাৎ, তোমরাই মানবমন্ডলীর জন্যে শ্রেষ্ঠতম সম্প্রদায়রূপে সমুদ্ভূত হয়েছ। তবে হ্যাঁ, এই মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী তখনই হওয়া যাবে, যখন পরে বর্ণিত অংশের উপর আমল করা হবে। আল্লাহ বলেন, {تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِالله} অর্থাৎ, তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দেবে, মন্দ কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে। (সূরা আলে ইমরান ১১০) মহান আল্লাহর নিকট আকুল প্রার্থনা যে, তিনি যেন মুসলিম উম্মাহকে এই গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার তাওফীক দান করেন; যাতে তাঁরা শ্রেষ্ঠ উম্মত হওয়ার মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যকে অক্ষয় ও অম্লান রাখতে পারে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান