২৩৩৬

পরিচ্ছেদঃ ২. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - ক্ষমা ও তাওবাহ্

২৩৩৬-[১৪] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা বলেন, হে আদম সন্তান! তুমি যতক্ষণ পর্যন্ত আমাকে ডাকবে ও আমার নিকট ক্ষমার আশা পোষণ করবে, তোমার অবস্থা যা-ই হোক না কেন, আমি কারো পরোয়া করি না, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেবো। হে আদম সন্তান! তোমার গুনাহ যদি আকাশ পর্যন্তও পৌঁছে, আর তুমি আমার কাছে ক্ষমা চাও, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিব, আমি কারো পরোয়া করি না। হে আদম সন্তান! তুমি যদি পৃথিবীসম গুনাহ নিয়েও আমার সাথে সাক্ষাৎ করো এবং আমার সাথে কাউকে শারীক না করে সাক্ষাৎ করো, আমি পৃথিবীসম ক্ষমা নিয়ে তোমার কাছে উপস্থিত হব। (তিরমিযী)[1]

عَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: يَا ابْنَ آدَمَ إِنَّكَ مَا دَعَوْتَنِي وَرَجَوْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ عَلَى مَا كَانَ فِيكَ وَلَا أُبَالِي يَا ابنَ آدمَ إِنَّك لَوْ بَلَغَتْ ذُنُوبُكَ عَنَانَ السَّمَاءِ ثُمَّ اسْتَغْفَرْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ وَلَا أُبَالِي يَا ابْنَ آدَمَ إِنَّكَ لَوْ لَقِيتَنِي بِقُرَابِ الْأَرْضِ خَطَايَا ثُمَّ لَقِيتَنِي لَا تُشْرِكُ بِي شَيْئًا لَأَتَيْتُكَ بِقُرَابِهَا مغْفرَة . رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ

عن أنس قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: قال الله تعالى: يا ابن آدم إنك ما دعوتني ورجوتني غفرت لك على ما كان فيك ولا أبالي يا ابن آدم إنك لو بلغت ذنوبك عنان السماء ثم استغفرتني غفرت لك ولا أبالي يا ابن آدم إنك لو لقيتني بقراب الأرض خطايا ثم لقيتني لا تشرك بي شيئا لأتيتك بقرابها مغفرة . رواه الترمذي

ব্যাখ্যা: (إِنَّكَ مَا دَعَوْتَنِىْ وَرَجَوْتَنِىْ) অর্থাৎ- তুমি আমাকে ডাকবে ও আমার কাছে আশা করবে। অর্থাৎ- তোমার দু‘আ করার সময়টুকু ও আশা করা সময়টুকুতে আমি তোমাকে ক্ষমা করব।

(عَلٰى مَا كَانَ فِيكَ) অর্থাৎ- যত বেশি গুনাহ তোমার মাঝে থাকুক।

(وَلَا أُبَالِىْ) অর্থাৎ- তোমার গুনাহের অধিকতার কারণে আমি পরোয়া করি না, তা আমার কাছে বড় মনে হয় না এবং তা আমি বেশি মনে করি না, অর্থাৎ- তোমাকে ক্ষমা করা আমার কাছে বড় মনে হয় না। যদিও তোমার বা বান্দার গুনাহ অনেক হয়ে থাকে। যদিও গুনাহ অনেক বা বড় হয়ে থাকুক না কেন? কেননা আল্লাহর ক্ষমা এর অপেক্ষাও বড়। তা বড় হলেও আল্লাহর ক্ষমার ক্ষেত্রে তা ছোট।

‘আল্লামা কারী বলেন, অবস্থা এমন যে, আমি তোমার ক্ষমার বিষয়টা আমার কাছে বড় মনে করি না যদিও তা বড় বা পরিমাণে বেশি হোক না কেন?

(لَوْ بَلَغَتْ ذُنُوبُكَ عَنَانَ السَّمَاءِ) অর্থাৎ- তোমার মাথা যখন আকাশের দিকে উঠাবে ও দৃষ্টি দিবে এবং তোমার দৃষ্টিসীমা আকাশের যে পর্যন্ত পৌঁছবে তোমার গুনাহের পরিমাণ যদি সে পর্যন্তও পৌঁছে যায়।

আর ত্বীবী বলেন, অর্থাৎ- তোমার গুনাহগুলোকে যদি দেহের আকার দেয়া হয় আর আধিক্যতা ও বড়ত্বের কারণে তা যদি জমিন ও শূন্যকে পূর্ণ করে নেয় এমনকি তা আকাশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

(ثُمَّ اسْتَغْفَرْتَنِىْ غَفَرْتُ لَكَ) এ বাক্যটি, অর্থাৎ- ‘‘আর যে ব্যক্তি মন্দ কর্ম করবে অথবা নিজের প্রতি অবিচার করবে, এরপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, সে আল্লাহকে অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু হিসেবে পাবে’’- (সূরা আন্ নিসা ৪ : ১১০) আল্লাহর এ বাণীর অনুরূপ।

(لَوْ لَقِيتَنِىْ) মিশকাতের বর্তমান সকল কপিতে এভাবে আছে আর তিরমিযীতে যা আছে, তা হল, (لو أتيتنى) এভাবে মাসাবীহ, তারগীব, হিসন, জামিউস্ সগীর, কানয এবং মাদারিযুস্ সালিকীন গ্রন্থে আছে। এ ধরনের বর্ণনা হতে যা প্রকাশ পাচ্ছে তা হল, নিশ্চয়ই মিশকাতে যা উল্লেখ হয়েছে তা কপি তৈরিকারীর পক্ষ থেকে ভুল।

(بِقُرَابِ الْأَرْضِ) অর্থাৎ- যা জমিন পরিপূর্ণ হওয়ার কাছাকাছি।

একমতে বলা হয়েছে, তা জমিনকে পূর্ণ করে দিবে আর এটি সর্বাধিক সামঞ্জস্যশীল। অর্থাৎ- এখানে তাই উদ্দেশ্য। কেননা আলোচনাটি আধিক্যতার বাচনভঙ্গিতে। আর আহমাদে আবূ যার-এর হাদীসের শেষে যা উল্লেখিত হয়েছে তা একে সমর্থন করেছে, তা হল قراب الأرض বলতে জমিন পরিপূর্ণ।

(لَا تُشْرِكُ بِىْ شَيْئًا) অর্থাৎ- আমার একত্ববাদে বিশ্বাসী এবং আমার রসূল-মুহাম্মাদ এবং তিনি যা নিয়ে এসেছেন তার প্রতি সমর্থন করাবস্থায়। আর তা হল ঈমান। ‘আল্লামা কারী বলেন, (لا تشرك بى شيئا) বাক্যটি আল্লাহর সামনে সাক্ষাতের সময় শির্ক না থাকার ব্যাপারে অতীত অবস্থার বর্ণনা বুঝানো হয়েছে।

(لَأَتَيْتُكَ بِقُرَابِهَا مَغْفِرَةً) হাদীস থেকে উদ্দেশ্য হল, ক্ষমা প্রার্থনা এবং তাওবার ব্যাপারে উৎসাহ দান। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাহ্কারীর তাওবাহ্ গ্রহণ করেন এবং তাকে ক্ষমা করেন যদিও তার গুনাহ অধিক হয়।

ইবনু রজাব ‘‘শারহুল আরবা‘ঈন’’-এ বলেন, আনাস (রাঃ)-এর এ হাদীসটি ঐ কথাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে যে, এ তিনটি উপকরণের মাধ্যমে ক্ষমা অর্জন হয়। তিনটির একটি হল আশা-আকাঙ্খার সাথে দু‘আ করা। দ্বিতীয় ক্ষমা প্রার্থনা করা যদিও গুনাহ বড় এবং তার আধিক্যতা আকাশের মেঘমালা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তৃতীয় তাওহীদ আর এটাই হল সর্বাধিক বড় উপকরণ। সুতরাং যে এটিকে হারিয়ে ফেলবে সে ক্ষমা হারিয়ে ফেলবে, পক্ষান্তরে যে এটিকে সম্পন্ন করবে সে ক্ষমা প্রার্থনার সর্বাধিক বড় উপকরণকে সম্পন্ন করবে। আল্লাহ বলেন, ‘‘নিশ্চয়ই আল্লাহ শির্কের গুনাহ ক্ষমা করেন না এছাড়া আরো যত গুনাহ আছে তা যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন’’- (সূরা আন্ নিসা ৪ : ১১৬)। সুতরাং যে ব্যক্তি তাওহীদের সাথে জমিন ভরপুর গুনাহ নিয়ে আসবে আল্লাহ তার সাথে জমিন ভরপুর ক্ষমা নিয়ে সাক্ষাত করবেন। তবে এটি আল্লাহর ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত। যদি তিনি চান তাকে ক্ষমা করবেন আর যদি চান তাকে তার গুনাহের দরুন পাকড়াও করবেন তার শাস্তি জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে না বরং জাহান্নাম থেকে বেরিয়ে আসবে, অতঃপর সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

কেউ কেউ বলেন, একত্ববাদী বান্দাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে না। যেমন কাফিরকে নিক্ষেপ করা হবে এবং একত্ববাদী বান্দা জাহান্নামে প্রবেশ করলেও তাতে স্থায়ী হবে না। যেমন কাফিররা স্থায়ী হবে। সুতরাং বান্দা যদি তাওহীদ এবং তার মাঝে আল্লাহর প্রতি নিষ্ঠা পূর্ণতা লাভ করে এবং ঈমানের সকল শর্তগুলো অন্তর, জবান ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে অথবা মরণের মুহূর্তে অন্তর এবং জবান দিয়ে সম্পন্ন করে তাহলে তার এ ধরনের ‘আমল অতীতের সকল গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেয়াকে আবশ্যক করে দিবে। অথবা পূর্ণাঙ্গভাবে তাকে জাহান্নামে প্রবেশ থেকে বাধা দিবে। সুতরাং যার অন্তর তাওহীদের বাণী দ্বারা প্রতিষ্ঠিত তার অন্তর থেকে আল্লাহ ছাড়া যত ভালবাসা আছে, সম্মান প্রদর্শন, ভয় করা, আশা-আকাঙ্খা করা, আশা করা ও ভরসা করা সকল কিছুকে বের করে দেয়া হবে এবং তখন তার সকল গুনাহসমূহ জ্বলে যাবে যদিও তা সমুদ্রের ফেনা পরিমাণ হয় এবং কখনো এ তাওহীদী বাণী সে গুনাহসমূহকে পুণ্যে পরিণত করে দিবে, কেননা এ তাওহীদ হল সর্বাধিক বড় সঞ্জীবনী। সুতরাং এ তাওহীদের অনুপরিমাণ যদি গুনাহের পাহাড়ের উপর রাখা হয় অবশ্যই এ তাওহীদ সে গুনাহসমূহকে পুণ্যে পরিণত করবে।


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
পুনঃনিরীক্ষণঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১০: আল্লাহ তা‘আলার নামসমূহ (كتاب اسماء الله تعالٰى)