৩০৩৩

পরিচ্ছেদঃ ১৮. প্রথম অনুচ্ছেদ - কুড়িয়ে পাওয়া দ্রব্য-সামগ্রী

৩০৩৩-[১] যায়দ ইবনু খালিদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে কুড়িয়ে পাওয়া বস্তু সম্পর্কে প্রশ্ন করল। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তার থলি ও মুখবন্ধন চিনে নিবে, তারপর এক বছরকাল তার প্রচার করবে। ইতোমধ্যে যদি তার মালিক আসে, নতুবা তোমার ইচ্ছা (দান কর বা খাও)। আবার সে জিজ্ঞেস করল, তবে যদি হারানো বস্তু ছাগল হয়? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, সেটা তোমার, না হয় তোমার ভাইয়ের (অধিকার), না হয় নেকড়ে বাঘের। সে পুনরায় জানতে চাইল, তবে হারানো উটের বিধান কি? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তাতে তোমার মাথা ব্যথার কি আছে? যেহেতু এর সাথে তার মশক ও জুতা রয়েছে, তাই পানিতে নেমে পানি এবং গাছের কাছে গিয়ে পাতা খাবে, পরিশেষে তার মালিক তাকে পেয়ে যাবে। (মুত্তাফাকুন ’আলায়হি)[1]

মুসলিম-এর অপর এক বর্ণনায় আছে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ সেটা এক বছরকাল প্রচার করবে এবং দ্রব্যের মুখবন্ধন ও থলি চিনে রাখবে। অতঃপর (যদি মালিক না আসে) তুমি তা খরচ করবে। এরপর যদি মালিক আসে তখন তাকে তা দিয়ে দেবে।

بَابُ اللُّقْطَةِ

عَنْ زَيْدِ بْنِ خَالِدٍ قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَسَأَلَهُ عَنِ اللُّقَطَةِ فَقَالَ: «اعْرِفْ عِفَاصَهَا وَوِكَاءَهَا ثُمَّ عَرِّفْهَا سَنَةً فَإِنْ جَاءَ صَاحِبُهَا وَإِلَّا فَشَأْنُكَ بِهَا» . قَالَ: فَضَالَّةُ الْغَنَمِ؟ قَالَ: «هِيَ لَكَ أَوْ لِأَخِيكَ أَوْ لِلذِّئْبِ» قَالَ: فَضَالَّةُ الْإِبِل؟ قَالَ: «مَالك وَلَهَا؟ مَعَهَا سِقَاؤُهَا وَحِذَاؤُهَا تَرِدُ الْمَاءَ وَتَأْكُلُ الشَّجَرَ حَتَّى يَلْقَاهَا رَبُّهَا» . مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ. وَفِي رِوَايَةٍ لِمُسْلِمٍ: فَقَالَ: «عَرِّفْهَا سَنَةً ثُمَّ اعْرِفْ وِكَاءَهَا وَعِفَاصَهَا ثُمَّ اسْتَنْفِقَ بِهَا فَإِنْ جَاءَ رَبهَا فأدها إِلَيْهِ»

ব্যাখ্যা: (وِكَاءَهَا) অর্থাৎ- যার মাধ্যমে বাধা হয়। ‘‘ফায়িক’’-এ আছে (الْعِفَاصُ) বলতে চামড়া, কাপড় অথবা ইত্যাদি দিয়ে তৈরি পাত্র বা থলেবিশেষ যার মাঝে হারানো বস্তু থাকে।

নিহায়াহ্ গ্রন্থে আছে, (الْوِكَاءُ) বলতে ঐ সূতা যার দ্বারা থলে, ব্যাগ এবং অনুরূপ কিছু বাধা হয। ইবনুল মালিক বলেন, যে ব্যক্তি হারানো বস্তু দাবী করবে তার সত্য-মিথ্যা জানার জন্য কেবল হারানো বস্তুর থলে এবং তার বাঁধন চিনে নেয়ার নির্দেশ করা হয়েছে।

‘শারহুস্ সুন্নাহ্’তে আছে- বিদ্বানগণ (اعْرِفْ عِفَاصَهَا) ‘‘তুমি তার ব্যাগ বা পাত্রকে চিনে রাখ।’’ এ উক্তির ক্ষেত্রে ঐ বিষয় নিয়ে মতানৈক্য করেছেন যে, যদি কোনো ব্যক্তি এসে হারানো বস্তুর দাবী করে এবং হারানো বস্তুর পাত্র বা থলেকে ও তার বাঁধনকে চিনে, এমন অবস্থায় হারানো বস্তুটি যে পেয়েছে তার জন্য কি আবশ্যক তা দাবীদারকে ফেরত দেয়া? ইমাম মালিক ও আহমাদ বলেন যে, প্রমাণ ছাড়াই দাবীদারকে হারানো বস্তু দিয়ে দেয়া আবশ্যক। কেননা চিনে নেয়া এবং পাত্র বা থলের বাঁধন থেকে এটাই উদ্দেশ্য। ইমাম শাফি‘ঈ এবং আবূ হানীফার সাথীবর্গ বলেন, ব্যক্তি যখন পাত্র বা থলে, বাঁধন, সংখ্যা, ওযন জানবে চিনবে এবং হারানো বস্তু যে পেয়েছে তার অন্তরে গেঁথে যাবে যে, দাবীদার সত্যবাদী, তখন দাবীদারকে তা দিয়ে দিবে।

(ثُمَّ عَرِّفْهَا سَنَةً) ইবনুল হুমাম বলেনঃ এক বছর যাবৎ হারানো বস্তু অবহিতকরণ সম্পর্কে নির্দেশের বাহ্যিক রূপ শারী‘আতী রীতি এবং সাধারণ অভ্যাস অনুযায়ী বারংবার অবহিতকরণকে দাবী করেছে, যদিও সারা বছরে একবার অবহিতকরণ সংঘটিত হওয়াকে সমর্থন করছে। তবুও একে অভ্যাসের উপর চাপিয়ে দেয়া আবশ্যক যে, একের পর এক তা করবে এবং যখনই সম্ভাব্য স্থান পাবে তখনই তার পুনরাবৃত্তি করবে। ইবনুল মালিক বলেন, প্রথম সপ্তাহে প্রত্যেক দিন দু’বার করে হারানো বস্তু সম্পর্কে অবহিত করবে, একবার দিনের শুরুতে, অন্যবার দিনের শেষে। দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রত্যেক দিন একবার করে, এরপর সপ্তাহে একবার।

(فَشَأْنُكَ بِهَا) অর্থাৎ- তুমি যা ভালো মনে কর তাই কর, একে ত্বীবী উল্লেখ করেছেন। একমতে বলা হয়েছে, সাদাকা, বিক্রয়, খাওয়া এবং অনুরূপ যা চাও তুমি তাই কর। মূল কথা, তুমি যদি ঐ সম্পদের মুখাপেক্ষী হও, তাহলে তার দ্বারা উপকৃত হও অন্যথায় তা দান করে দাও। কাযী বলেন, এতে ঐ ব্যাপারে প্রমাণ রয়েছে যে, যে ব্যক্তি হারানো বস্তু কুড়াবে এবং এক বছর তা অবহিত করবে, এমতাবস্থায় ঐ বস্তুর মালিক প্রকাশ না পেলে তার অধিকারে থাকবে, ঐ বস্তুর মালিক হওয়ার চাই সে ব্যক্তি ধনী হোক অথবা দরিদ্র হোক। অনেক সাহাবী এবং তাবি‘ঈ এ মত পোষণ করেছেন। শাফি‘ঈ, আহমাদ এবং ইসহকও এ মত পোষণ করেছেন। ইবনু ‘আব্বাস হতে বর্ণনা করা হয়েছে, নিশ্চয় তিনি বলেনঃ ধনী ব্যক্তি তা দান করে দিবে, তার দ্বারা উপকার নিবে না এবং তার মালিকও হবে না। এ মত পোষণ করেন সাওরী, ইবনুল মুবারক ও আবূ হানীফার সাথীবর্গ। উবাই বিন কা‘ব হতে যা বর্ণনা করা হয়েছে তা এ প্রথম মতটিকে সমর্থন করছে। নিশ্চয় উবাই বিন কা‘ব বলেন, ‘‘আমি একটি থলে পেলাম। অতঃপর যদি তার মালিক আসে তাহলে তাকে তা দিয়ে দাও, অন্যথায় তুমি তা উপভোগ কর।’’ এ পর্যন্ত আর উবাই ছিল স্বচ্ছল আনসারীদের অন্তর্ভুক্ত।

(قَالَ : هِىَ لَكَ) অর্থাৎ- তুমি যদি সেই হারানো বস্তু গ্রহণ কর এবং সে সম্পর্কে অবহিত কর। এমতাবস্থায় তার মালিক না আসে সে বস্তু তোমার বলে গণ্য হবে। (أَوْ لِأَخِيكَ) এর মাধ্যমে তিনি বস্তুর মালিককে উদ্দেশ্য করেছেন অর্থাৎ হারানো বস্তু তুমি কুড়িয়ে নেয়ার পর তার মালিক আসলে তা ঐ মালিকের জন্য অথবা তুমি তা কুড়িয়ে না নিয়ে ঐভাবেই রেখে দাও আর হঠাৎ তার মালিক চলে আসলে তাহলেও সেটা তার জন্য। একমতে বলা হয়েছে, এর অর্থ হলো- তুমি যদি হারানো বস্তু না কুড়াও তাহলে অন্য কেউ তা কুড়াবে।

(أَوْ لِلذِّئْبِ) অর্থাৎ- তুমি যদি তা না কুড়াও তাহলে নেকড়ে তা নিয়ে নিবে, এতে হারানো বস্তু কুড়ানোর ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়েছে। ত্বীবী (রহঃ) বলেন, তুমি যদি তা ছেড়ে দাও এবং অন্য কেউ তা গ্রহণ না করে, তাহলে অধিকাংশ সময় নেকড়ে তা খেয়ে নিবে।

(مَعَهَا سِقَاؤُهَا) অর্থাৎ- তৃষ্ণা নিবারণের জন্য তার পাকস্থলী পানপাত্রের স্থলাভিষিক। কেননা যখন সে পানির কাছে যায় তখন কয়েকদিন পিপাসিত থাকার কারণে তৃষ্ণা নিবারণ স্বরূপ পানিতে যা থাকে সব পানি পান করে নেয়।

(وَحِذَاؤُهَا) অর্থাৎ- তার খুরসমূহ। চারণভূমিতে যাওয়ার ব্যাপারে তার ক্ষমতা থাকা এবং পিপাসার ব্যাপারে তার ধৈর্য ধারণ করার কারণে পিপাসায় মারা যাওয়া থেকে তার ব্যাপারে সাধারণত নিরাপদ থাকা যায়। পানপাত্র দুধের হয়ে থাকে আবার পানিরও হয়ে থাকে। এখানে উট তার পাকস্থলিতে যা সংরক্ষণ করে থাকে তাই উদ্দেশ্য। সুতরাং মাঠে চড়ার ক্ষেত্রে উটের পাকস্থলী পানপাত্রের স্থলাভিষিক্ত। অথবা এর দ্বারা তিনি পিপাসার ব্যাপারে উটের ধৈর্যধারণকে উদ্দেশ্য করেছেন, কেননা ঐ ব্যাপারে প্রাণীসমূহের মাঝে উট সর্বাধিক ধৈর্যশীল।

(وَتَأْكُلُ الشَّجَرَ حَتّٰى يَلْقَاهَا رَبُّهَا) ত্বীবী বলেন, তিনি ‘‘পাত্র’’ কথা দ্বারা উদ্দেশ্য করেছেন যে, উট যখন পানির ঘাটে যায় তখন উট নিজ পিপাসার কারণে তৃষ্ণা নিবারণ স্বরূপ সেখানে যা পানি থাকে সব পান করে নেয়। উট প্রাণীসমূহের মাঝে সবচাইতে দীর্ঘ সময় পিপাসার্ত অবস্থায় থাকতে পারে। একমতে বলা হয়েছে, উট পানির প্রয়োজনমুখী হওয়ার সময় পানির কাছে যায়, অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উল্লেখিত অংশ পানির ব্যাপারে উটের ধৈর্য ধারণ করাকে উদ্দেশ্য করেছেন এবং জুতা দ্বারা উটের পায়ের খুর উদ্দেশ্য করেছেন। এ খুরের মাধ্যমে সে ভ্রমণ করা, দূরবর্তী দেশ পাড়ি দেয়া এবং দূরবর্তী পানির কাছে যাওয়ার ব্যাপারে ক্ষমতা রাখে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটকে ঐ ব্যক্তির সাথে সাদৃশ্য দিয়েছেন যার কাছে জুতা ও পানপাত্র আছে। তিনি رب শব্দটিকে উটের দিকে কেবল এজন্য সম্বন্ধ করেছেন, কেননা চতুস্পদ জন্তু ‘ইবাদাতকারী না, শারী‘আতী হুকুম পালনে সম্বোধিত না। সুতরাং তা সম্পদসমূহের স্থলাভিষিক্ত। যার মালিককে সে সম্পদের দিকে সম্বন্ধ করা বৈধ। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে ঐ সম্পদের রব সাব্যস্ত করেছেন।
 

(ثُمَّ اسْتَنْفِقْ) অতঃপর যখন হারানো বস্তুর মালিক জানা যাবে না তখন তুমি তার মালিকানা গ্রহণ কর এবং তা তোমার নিজের জন্য খরচ কর। এখানে নির্দেশটি বৈধতা বুঝানোর জন্য এসেছে। (فَإِنْ جَاءَ رَبُّهَا فَأدِّهَا إِلَيْهِ) ‘‘অতঃপর যদি তার মালিক আসে তাহলে তা ঐ মালিকের কাছে ফেরত দাও’’ এ উক্তির মর্ম। অর্থাৎ- যদি হারানো বস্তুটি হুবহু অবশিষ্ট থাকে তাহলে তাই ফেরত দিবে, অন্যথায় তার মূল্য ফেরত দিবে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)