মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) নিয়তের হাদিস

পরিচ্ছেদঃ

ِسْمِ اللهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيْمِ

মূল গ্রন্থকারের ভূমিকা

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্যই। আমরা তাঁরই প্রশংসা করছি, তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করছি এবং তাঁর নিকট ক্ষমা চাচ্ছি। আমরা আমাদের মনের কুমন্ত্রণা ও মন্দ কাজ হতে তাঁর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আল্লাহ যাকে হিদায়াত দান করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না এবং তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন কেউ তাকে হিদায়াত করার সামর্থ্য রাখে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, ‘‘আল্লাহ ছাড়া সত্যিকারের কোন মা‘বূদ নেই’’। এটা আমার নাজাতের ওয়াসীলাহ্ এবং মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ হবে। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রসূল। মহান আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে এমন সময় দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন, যখন ঈমানের পথের সমস্ত নিশানা মুছে গিয়েছিল, ঈমানী আলোসমূহ নিভে গিয়েছিল, তার স্তম্ভসমূহ দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং মানুষ সে সবের স্থান পর্যন্ত ভুলে গিয়েছিল। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এসে ঐসব জিনিসকে মজবুতভাবে প্রতিষ্ঠা করলেন এবং ঈমানের মশালকে উঁচু করে ধরলেন। যারা গুমরাহীর রোগে মরতে বসেছিল, তাদেরকে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাওহীদের কালিমাহ্ দ্বারা আরোগ্য করলেন, যারা হিদায়াতের পথ খুঁজছিল তাদেরকে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পথ দেখালেন এবং যারা সৌভাগ্য ভান্ডারের মালিক হতে চেয়েছিল, তাদের জন্য তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সে পথ পরিষ্কার করে দিলেন।

অতঃপর নিশ্চয়ই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বক্ষ থেকে প্রকাশিত বিষয়াবলীর অনুসরণ ব্যতীত তাঁর আদর্শকে আঁকড়ে ধরাটা পরিপূর্ণ হবে না এবং আল্লাহর রজ্জু তথা কুরআনকে মজবুত করে ধারণ করা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ব্যাখ্যা ব্যতীত পূর্ণতা লাভ করবে না। ইমাম মুহয়্যিইউস্ সুন্নাহ্ আবূ মুহাম্মাদ হুসায়ন ইবনু মাস্‘ঊদ ফাররা বাগাবী (মৃঃ ১৫৬ হিঃ) কর্তৃক রচিত ‘‘মাসা-বীহ’’ শীর্ষক গ্রন্থটি বিরল হাদীসসমূহকে অন্তর্ভুক্তধারী হাদীস বিষয়ক একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ। সংকলক (রহঃ) সানাদসমূহ বিলুপ্ত করার মাধ্যমে হাদীস সংকলনে সংক্ষিপ্ততার পথ অবলম্বন করলে কতিপয় সমালোচক এতে সমালোচনা করেন। যদিও তাঁর মতো একজন নির্ভরশীল (সিক্বাহ্) ব্যক্তির হাদীস বর্ণনা করাই ‘সানাদতুল্য’। কিন্তু সানাদবিহীন গ্রন্থ সানাদবিশিষ্ট গ্রন্থের মতো নয়। তাই আল্লাহর নিকট সঠিক দিক-নির্দেশনা প্রার্থনা করে তিনি (ইমাম বাগাবী) যেগুলো সানাদবিহীন অবস্থায় উল্লেখ করেছেন আমি সে হাদীসগুলোতে সানাদ তথা সাহাবীর নাম সংযুক্ত করেছি, যেমনভাবে

(১) আবূ ‘আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু ইসমা‘ঈল বুখারী,[1]

(২) আবুল হাসান মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ আল কুশায়রী,[2]

(৩) আবূ ‘আবদুল্লাহ মালিক ইবনু আনাস আল আসবাহী,[3]

(৪) আবূ ‘আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু ইদ্রীস আশ্ শাফি‘ঈ,[4]

(৫) আবূ ‘আবদুল্লাহ আহমাদ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু হাম্বাল আশ্ শায়বানী,[5]

(৬) আবূ ‘ঈসা মুহাম্মাদ ইবনু ‘ঈসা আত্ তিরমিযী,[6]

(৭) আবূ দাঊদ সুলায়মান ইবনুল আশ্‘আস আস্ সিজিস্তানী,[7]

(৮) আবূ ‘আবদুর রহমান আহমাদ ইবনু শু‘আয়ব আন্ নাসায়ী,[8]

(৯) আবূ ‘আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াযীদ ইবনু মাজাহ্ আল্ কাযভিত্নী,[9]

(১০) আবূ মুহাম্মাদ ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আবদুর রহমান আদ্ দারিমী,[10]

(১১) আবুল হাসান ‘আলী ইবনু ‘উমার আদ্ দারাকুত্বনী,[11]

(১২) আবূ বাকর আহমাদ ইবনুল হুসায়ন আল বায়হাক্বী,[12]

(১৩) আবুল হাসান রযীন ইবনু মু‘আবিয়াহ্ আল্ ‘আবদারী (রহিমাহুমুল্লাহ)[13] প্রমুখ ন্যায়, দক্ষ ও বিশ্বস্ত ইমামগণ বর্ণনা করেছেন। সুতরাং আমি কোন হাদীসের শেষে ইমামের নাম উল্লেখ করলে মনে করতে হবে যে, আমি হাদীসের পূর্ণ সানাদ বর্ণনা করছি। কারণ, তাঁরা তাঁদের কিতাবে এ (পূর্ণ সানাদ বর্ণনা করার) কাজ সম্পন্ন করে এর দায়িত্ব থেকে আমাদেরকে অব্যাহতি দিয়েছেন।

তিনি (মাসা-বীহ গ্রন্থকার) তাঁর কিতাবকে যেভাবে বিভিন্ন ‘বাব’ বা অধ্যায়ে সাজিয়েছেন, আমিও তা-ই করেছি এবং এ ব্যাপারে তারই পথ অনুসরণ করেছি। তবে আমি প্রায় ‘বাব’কেই তিনটি ‘ফাস্‌ল’ বা অনুচ্ছেদে ভাগ করেছি (অবশ্য তিনি করেছিলেন দু’ ভাগ)।

প্রথম ভাগ : যা বুখারী ও মুসলিম (শায়খায়ন) উভয়ে অথবা তাঁদের কোন একজন বর্ণনা করেছেন। তবে, যেহেতু হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে শায়খায়নের মর্যাদা অনেক ঊর্ধ্বে, তাই তাঁদের নামের সাথে অন্য নাম উল্লেখের প্রয়োজন হয় না, এজন্য আমি তাঁদের নামের সাথে অন্য কারো নাম উল্লেখ করিনি, যদিও সে সকল হাদীস অন্যরাও বর্ণনা করেছেন।

দ্বিতীয় ভাগ : এতে রয়েছে বুখারী, মুসলিম ব্যতীত অন্যান্য ইমামগণের বর্ণিত হাদীস।

তৃতীয় ভাগ : (আমার পরিবর্ধিত এ ভাগে) বাবের (অধ্যায়ের) বিষয় সংশ্লিষ্ট কিছু নতুন হাদীস সংগ্রহ করেছি।[14] যার কোন কোনটি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী নয়; বরং কোন সাহাবী অথবা তাবি‘ঈর বাণী।[15]

যদি [ইমাম বাগাবী (রহঃ)-এর সংগৃহীত] কোন হাদীস কোন বাব বা অধ্যায়ে না পাওয়া যায়, তাহলে মনে করতে হবে যে, অন্য কোন অধ্যায়ে এরূপ হাদীস রয়েছে বলেই আমি তাকে বাদ দিয়েছি। এমনিভাবে যদি কোন হাদীসের কোন অংশবিশেষকে বাদ দিয়ে থাকি অথবা কোন অংশ বৃদ্ধি করে থাকি, তাহলে বুঝতে হবে যে, প্রয়োজনবোধেই আমি এরূপ করেছি। এছাড়া ইমাম বাগাবী (রহঃ)-এর সাথে আমার যদি এরূপ কোন মতভেদ দেখা যায় যে, আমি প্রথম ফাসলে শায়খায়ন ব্যতীত অন্য কারো নামের উদ্ধৃতি দিয়েছি অথবা দ্বিতীয় ফাসলে শায়খায়নের মধ্যে কারো নাম উল্লেখ করেছি। তার কারণ এই যে, আমি হুমায়দী’র[16] ‘‘আল জাম্‘উ বায়নাস্ সহীহায়ন’’ (যাতে তিনি শায়খায়নের হাদীস একত্র করেছেন) ও ‘‘জা-মি‘উল উসূল’’[17] গ্রন্থদ্বয় পর্যবেক্ষণের পরই কেবল শায়খায়নের মূল কিতাবের উপরই নির্ভর করেছি।

এতদ্ব্যতীত যদি কোন হাদীসের কোন বিষয়ে এরূপ মতভেদ দেখা যায় যে, তিনি (মাসা-বীহ গ্রন্থকার) তাকে এক শব্দে বর্ণনা করেছেন, আর আমি বর্ণনা করেছি ভিন্ন শব্দে, তার কারণ হলো, হাদীসের সানাদ বিভিন্ন। তিনি যে সানাদে বর্ণনা করেছেন সে সানাদ আমার হস্তগত হয়নি; আমি যে সানাদে যে শব্দ পেয়েছি তা-ই বর্ণনা করেছি। এরূপ স্থান খুব কমই দেখা যাবে যে, যেখানে আমি বলেছিঃ ‘এটা হাদীসের কোন প্রসিদ্ধ কিতাবে পাওয়া যায়নি অথবা আমি এর বিপরীত পেয়েছি।’ যদি কোথাও এরূপ দেখা যায় তাহলে মনে করবেন, এটা আমার অনুসন্ধানেরই ত্রুটি; ইমাম বাগাবী (রহঃ)-এর নয়। আল্লাহ সে বান্দার প্রতি অনুগ্রহ করুন যে এরূপ সানাদ অবগত হয়ে আমাকে তা’ অবহিত করবে। অবশ্য আমিও আমার সাধ্যানুযায়ী অনুসন্ধানে চেষ্টার ত্রুটি করিনি। তিনি যেখানে (কোন হাদীস বা শব্দ সম্পর্কে) বর্ণনার বিভিন্নতা দেখিয়েছেন, আমিও সেখানে তা-ই করেছি।

এছাড়া তিনি যে সকল হাদীসকে ‘গরীব’ বা ‘য‘ঈফ’ বলে অভিহিত করেছেন, অধিকাংশ স্থলে আমি তার কারণ ও ব্যাখ্যা দিয়েছি। আর যেখানে কোন হাদীসকে কোন প্রসিদ্ধ ইমাম গরীব বা ‘য‘ঈফ’ প্রভৃতি বলা সত্ত্বেও তিনি তার প্রতি ইঙ্গিত করেননি, আমিও সেখানে সেরূপই রেখে দিয়েছি। অবশ্য কোন কোন জায়গায় আবশ্যকবোধে এর ব্যতিক্রমও করেছি। কোন কোন জায়গায় এরূপও পাওয়া যাবে যে, সেখানে আমি কারো উদ্বৃতি দেইনি; বরং হাদীসের শেষে স্থান শূন্য রেখে দিয়েছি। তার কারণ এই যে, আমি তার সন্ধান কোথাও পাইনি। যদি কেউ কোথাও তার সন্ধান পান, তাহলে দয়া করে উদ্ধৃতি দিয়ে দিবেন [অবশ্য পরবর্তী মুহাদ্দিসগণ উদ্ধৃতি দিয়ে এ সকল শূন্যতা পূর্ণ করে দিয়েছেন]। আল্লাহ আপনাদেরকে এর জাযা (প্রতিদান) দিবেন। অবশেষে আমি এ কিতাবের নামকরণ করলাম ‘মিশকা-তুল মাসা-বীহ’। আমরা আল্লাহর নিকট তাওফীক্ব, সাহায্য, হিদায়াত, নিরাপত্তা ও আমাদের উদ্দেশ্যের সহজতা প্রার্থনা করছি, তিনি যেন এর দ্বারা আমার এবং সমস্ত মুসলিম নর-নারীর ইহ ও পরজগতে উপকার সাধন করেন। আমীন!

আল্লাহর সাহায্যই যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম অভিভাবক। তিনি ছাড়া কারো কোন শক্তি বা সামর্থ্য নেই, তিনি সুউচ্চ ও সুমহান।

১। ‘উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিয়্যাতের উপরই কাজের ফলাফল নির্ভরশীল। মানুষ তার নিয়্যাত অনুযায়ী ফল পাবে। অতএব যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সন্তুষ্টির জন্য হিজরত করবে, তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সন্তুষ্টির জন্যই গণ্য হবে। আর যে ব্যক্তি দুনিয়ার স্বার্থপ্রাপ্তির জন্য অথবা কোন মহিলাকে বিবাহের জন্য হিজরত করবে সে হিজরত তার নিয়্যাত অনুসারেই হবে যে নিয়্যাতে সে হিজরত করেছে। (বুখারী, মুসলিম)[1]

[1] সহীহ : বুখারী ১, মুসলিম ১৯০৭, তিরমিযী ১৬৩৭, নাসায়ী ৭৫, আবূ দাঊদ ২২০১, ইবনু মাজাহ্ ৪২২৭, আহমাদ ১৬৯, ৩০২।

عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ «إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ وَإِنَّمَا لِامْرِئٍ مَا نَوٰى فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهٗ إِلَى اللهِ وَرَسُوْلِه فَهِجْرَتُهٗ إِلَى اللهِ وَرَسُولِه وَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهٗ اِلٰى دُنْيَا يُصِيبُهَا أَوِ امْرَأَةٍ يَتَزَوَّجُهَا فَهِجْرَتُهٗ إِلٰى مَا هَاجَرَ إِلَيْهِ». مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ

ব্যাখ্যা : ঈমান হলো ‘‘অন্তরে বিশ্বাস করা মুখে স্বীকার করা এবং ‘আমল দ্বারা তা বাস্তবে পরিণত করা।’’ অতএব ঈমান কতকগুলো অংশের সমন্বয়ে গঠিত সমষ্টি। সুতরাং কর্ম বা ‘আমল প্রকৃতপক্ষে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। এতে প্রমাণিত হয় যে, ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি আছে। তবে ঈমানের সকল অংশ সমান মর্যাদাপূর্ণ নয়। কর্ম ঈমানের অংশ হলেও তা সালাতের মধ্যে ওয়াজিবসমূহের অনুরূপ, সালাতের রুকনের অনুরূপ নয়। ফলে ‘আমলের অনুপস্থিতির কারণে ঈমান সমূলে ধ্বংস হয় না, বরং অবশিষ্ট থাকে। ফলে কর্মপরিত্যাগকারী তথা কাবীরাহ্ (কবিরা) গুনাহ সম্পাদনকারী মু’মিন ফাসিক্ব। তার অন্য দু’টি শাখা মুখে স্বীকার ও অন্তরে বিশ্বাস পরিত্যাগ করার ন্যায় কাফির নয়। শুধু অন্তরের বিশ্বাস পরিত্যাগকারী মুনাফিক্ব। শুধুমাত্র মুখের স্বীকৃতি দানে অস্বীকারকারী কাফির। আর কর্মসম্পাদনের ত্রুটি দ্বারা ফাসিক্ব জাহান্নামে চিরস্থায়ী হওয়া থেকে অব্যাহতি পাবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে।


হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
পুনঃনিরীক্ষণঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
নিয়তের হাদিস
দেখানো হচ্ছেঃ থেকে ১ পর্যন্ত, সর্বমোট ১ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে