১০. ৫. ২. হজ্জ, ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতর

সালাত ছাড়া আরো দুটি রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট ইবাদতের কথা তাহাবী উল্লেখ করেছেন: হজ্জ ও জিহাদ। অন্যান্য আকীদাবিদ ও ফকীহ সালাতুল জুমুআ ও দু ঈদের কথাও উল্লেখ করেছেন। প্রসিদ্ধ কালামবিদ ইমাম আবুল হাসান আশআরী (৩২৪হি) বলেন:


ومن ديننا أن نصلي الجمعة والأعياد وسائر الصلوات والجماعات خلف كل بر وفاجر كما روى أن عبد الله بن عمر كان يصلي خلف الحجاج


‘‘আর আমাদের দীনের অন্যতম দিক যে, আমরা জুমুআর সালাত, ঈদগুলো এবং অন্যান্য সকল সালাত এবং জামাআত সকল নেককার ও বদকারের পিছনে আদায় করি। যেমনিভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, আব্দুল্লাহ ইবন উমার (রা) হাজ্জাজ ইবন ইউসুফের পিছনে সালাত আদায় করতেন।’’[1]

হজ্জ ইসলামের পাঁচ রুকনের শেষ রুকন। এটি মূলত ব্যক্তিগত ফরয ইবাদত। মুমিন যে কোনো অবস্থায় হজ্জ ফরয হলে তা আদায় করবেন। পাশাপাশি হজ্জের ব্যবস্থাপনা রাষ্ট্রীয় বিষয়। হজ্জের তারিখ ঘোষণা, কার্যক্রম পরিচালনা, আরাফাত, মুযদালিফা, মিনায় ইমাম নিযুক্ত করা ইত্যাদি কর্ম অবশ্যই রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত হতে হবে। রাষ্ট্রব্যবস্থা বা রাষ্ট্রপ্রধানের পাপ, অন্যায়, ইসলাম বিরোধী মতামত বা জুলুমের কারণে এক্ষেত্রে হজ্জ বন্ধ করা বা রাষ্ট্র ঘোষিত চাঁদ দেখাকে বাতিল করে নিজেদের ইচ্ছামত হজ্জ আদায় করা মুমিনের জন্য বৈধ নয়।

ঈদুল আযহা এবং ঈদুল ফিতরেরও একই বিধান। হাদীস শরীফে ‘চাঁদ দেখে সিয়াম ও ঈদুল ফিতরের’ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এ নয় যে, যে কেউ যেখানে ইচ্ছা চাঁদ দেখলেই ঈদ করা যাবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে তার সাক্ষ্য গৃহীত হলে বা চাঁদ দেখা প্রমাণিত হলেই শুধু ঈদ করা যাবে। রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও সমাজের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ঈদ পালন করতে নির্দেশ দিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:


الْفِطْرُ يَوْمَ يُفْطِرُ النَّاسُ وَالأَضْحَى يَوْمَ يُضَحِّي النَّاسُ


‘‘যে দিন সকল মানুষ ঈদুল ফিত্র পালন করবে সে দিনই ঈদুল ফিত্র-এর দিন এবং যেদিন সকল মানুষ ঈদুল আযহা পালন করবে সে দিনই ঈদুল আযহার দিন।’’[2]

প্রসিদ্ধ তাবিয়ী মাসরূক বলেন, আমি একবার আরাফার দিনে, অর্থাৎ যিলহাজ্জ মাসের ৯ তারিখে আয়েশা (রা)-এর নিকট গমন করি। তিনি বলেন, মাসরূককে ছাতু খাওয়াও এবং তাতে মিষ্টি বেশি করে দাও। মাসরূক বলেন, আমি বললাম, আরাফার দিন হিসাবে আজ তো রোযা রাখা দরকার ছিল, তবে আমি একটিমাত্র কারণে রোযা রাখি নি, তা হলো, চাঁদ দেখার বিষয়ে মতভেদ থাকার কারণে আমার ভয় হচ্ছিল যে, আজ হয়ত চাঁদের দশ তারিখ বা কুরবানীর দিন হবে। তখন আয়েশা (রা) বলেন:


اَلنَّحْرُ يَوْمَ يَنْحَرُ الإِمَامُ وَالْفِطْرُ يَوْمَ يُفْطِرُ الإِمَامُ


যেদিন রাষ্ট্রপ্রধান কুরবানীর দিন হিসাবে পালন করবেন সে দিনই কুরবানীর দিন। আর যেদিন রাষ্ট্রপ্রধান ঈদুল ফিতর পালন করবে সে দিনই ঈদের দিন।’’[3]

মুমিনের জন্য নিজ দেশের সরকার ও জনগণের সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে ঈদ করা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নির্দেশ। অন্য দেশের খবর তো দূরের কথা যদি কেউ নিজে চাঁদ দেখেন কিন্তু রাষ্ট্র তার সাক্ষ্য গ্রহণ না করে তাহলে তিনিও একাকী সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিপরীতে ঈদ করতে পারবেন না। সাহাবী-তাবিয়ীগণ বলেছেন যে, এক্ষেত্রে ভুল হলেও ঈদ, হজ্জ, কুরবানী সবই আদায় হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে ভুলের জন্য মুমিন কখনোই দায়ী হবেন না।[4]

সরকারের পাপাচার বা ইসলাম বিরোধিতার অজুহাতে এ সকল ক্ষেত্রে সরকারী সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করা শরীয়ত নিষিদ্ধ। কোনো মুসলিম দেশকে ‘দারুল হারব’ বা ‘তাগূতী’ রাষ্ট্র বলে গণ্য করা খারিজী ও শীয়াগণের পদ্ধতি। আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত শাসক বা সরকারের পাপ বা কুফরীর কারণে মুসলিমদের দেশকে কাফিরের দেশ বানান নি। ইয়াযীদের জুলম-পাপের রাষ্ট্র, মামূনের কুফরী মতবাদের রাষ্ট্র, আকবারের দীন ইলাহীর রাষ্ট্র ও অন্যান্য সকল মুসলিম রাষ্ট্রকেই তারা ‘দারুল ইসলাম’ হিসেবে গণ্য করেছেন এবং জুমুআ, জামা‘আত, ঈদ, জিহাদ, হজ্জ ইত্যাদি সকল বিষয়ে এরূপ সকল দেশে দারুল ইসলামের আহকাম পালন করেছেন।

বর্তমানে ‘সারা বিশ্বে একদিনে ঈদ’ বিষয়ে অনেক কথা বলা হচ্ছে। তবে ‘সকল দেশে একদিনে ঈদ’ পালনের নামে ‘একই দেশে একাধিক দিনে ঈদ’ পালন নিঃসন্দেহে ইসলামী নির্দেশনার সাথে সাংঘর্ষিক। বিষয়টি নিয়ে তাত্ত্বিক গবেষণা ও মতবিনিময় অবশ্যই হতে পারে। রাষ্ট্র যদি ঐকমত্যের ভিত্তিতে অন্য কোনো দেশের চাঁদ দেখার সাক্ষ্য গ্রহণ করে ঘোষণা দেয় তবে জনগণ তা অনুসরণ করবে। তবে আমাদের বুঝতে হবে যে, মহান আল্লাহ ইসলামকে সহজ-পালনীয় করেছেন। বর্তমানে প্রযুক্তির উৎকর্ষতার কারণে বিশ্বের কোথাও চাঁদ উঠলে সকল দেশেই তা জানা সম্ভব। কিন্তু অতীতে তা ছিল না। আর দূরবর্তী এলাকার চাঁদের খবর নিতে কেউ চেষ্টা করেন নি। মদীনায় চাঁদ দেখার পরে -ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আযহায় রাতারাতি বা ৯ দিনের মধ্যে- দ্রুত দূরবর্তী অঞ্চলে সংবাদ প্রদানের চেষ্টা বা সর্বত্র একই দিনে ঈদ হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করার চেষ্টা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বা খুলাফায়ে রাশেদীন করেন নি। সাহাবীগণের যুগ থেকেই একাধিক দিবসে ঈদ হয়েছে।[5] একাধিক দিনে ঈদ পালন বিষয়ক হাদীসটি উদ্ধৃত করে ইমাম তিরমিযী বলেন:


وَالْعَمَلُ عَلَى هَذَا الْحَدِيثِ عِنْدَ أَهْلِ الْعِلْمِ أَنَّ لِكُلِّ أَهْلِ بَلَدٍ رُؤْيَتَهُمْ


‘‘আলিমগণের সিদ্ধান্ত এ হাদীসের উপরেই: প্রত্যেক দেশের মানুষ তাদের নিজেদের চাঁদ দেখার উপর নির্ভর করবে।’’[6]

বস্ত্তত, সাহাবী-তাবিয়ীগণ ও পরবর্তী আলিমগণ বিভিন্ন দেশে একাধিক দিনে ঈদ পালনকে ইসলামী নির্দেশনার বিরোধী বলে গণ্য করেন নি। পক্ষান্তরে একই রাষ্ট্রের মধ্যে বা একই ইমামের (রাষ্ট্রপ্রধানের) অধীনে একাধিক দিনে ঈদ পালনকে সকলেই নিষিদ্ধ, অবৈধ ও ইসলামী নির্দেশনার সাথে সাংঘর্ষিক বলে গণ্য করেছেন।

[1] আবুল হাসান আশআরী, আল-ইবানাহ, পৃষ্ঠা ২০।

[2] তিরমিযী, আস-সুনান ৩/১৬৫ (কিতাবুস সাওম, বাবু মা জাআ ফিল ফিতরি ওয়াল আদহা মাতা ইয়াকূনু) তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন।

[3] বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা ৫/১৭৫; হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ৩/১৯০; মুনযিরী, তারগীব ২/৬৮। মুনযিরী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।

[4] ইবনু হাজার, তালখীসুল হাবীর ২/২৫৬।

[5] মুসলিম, আস-সহীহ ২/৭৬৫ (কিতাবুস সাওম, বাবু ... লিকুল্লি বালাদিন রুইয়াতুহুম)।

[6] তিরমিযী, আস-সুনান ৩/৭৬ (কিতাবুস সাওম, বাবু ...লিকুল্লি আহলি বালাদিন রুইয়াতুহুম)।