ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.) ৭২ টি
ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.) ৭২ টি

বিশ্বের সকল সমাজের সকল মুসলিমকে কাফির বলে গণ্য করার ক্ষেত্রে তাদের একটি বড় তত্ত্ব ছিল জামা‘আত ও বাই‘আত তত্ত্ব। তারা দাবি করত যে সমকালীন সকল মুসলিম দেশ ও সমাজ কাফির ও জাহিলী সমাজ। এগুলির সাথে কুফরী ও সম্পর্কচ্ছেদ না করা পর্যন্ত কেউ মুমিন বলে গণ্য হবে না। আর কাউকে মুমিন বলে বা ‘‘দীনী ভাই’’ বলে চিনতে পারার একমাত্র মাধ্যম হলো বাই‘আত। শুধুমাত্র ‘জামা‘আত’ ও বাইয়াতের মাধ্যমেই একজন মুসলিমকে অমুসলিম থেকে পৃথক করা যাবে। যতক্ষণ না কোনো মুসলিম তাদের ইমামের হাতে বাইয়াত করে তাদের ‘জামাআতে’ যোগ দিবে ততক্ষণ তাকে মুমিন বলে গণ্য কার যাবে না।

এ দাবির পক্ষে তারা কুরআন ও হাদীসের বাইয়াত ও জামা‘আত বিষয়ক নির্দেশগুলিকে দলিল হিসেবে পেশ করে। তাদের এ দাবি মুর্খতা ও বিভ্রান্তির সংমিশ্রণ ছিল। কারণ তাদের পেশ করা দলিলের কোনোটিতেই বাইয়াত ও জামা‘আতকে ঈমানের পরিচয় হিসেবে উল্লেখ করা হয় নি। তারা এ পরিভাষাদ্বয়ের অর্থও বুঝতে পারে নি। ভাষাবিদগণ জানেন যে, ভাষায় ব্যবহৃত শব্দের অর্থ যুগের আবর্তনে পরিবর্তিত হয়। আরবী ভাষা যদিও কুরআন, হাদীস ও ইসলামী সভ্যতার কারণে স্বাভাবিক বিবর্তন ও পরিবর্তন থেকে অনেকটা রক্ষা পেয়েছে, তবুও অনেক আরবী শব্দের অর্থ আংশিক বা পরিপূর্ণভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও সাহাবীগণের যুগের ব্যবহৃত অর্থ এবং বর্তমানে প্রচলিত অর্থের মধ্যে অনেক সময় আকাশ-পাতাল পার্থক্য দেখতে পাওয়া যায়।

এ জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও সাহাবীগণের বক্তব্য ব্যাপক অধ্যয়ন এবং প্রাচীন মুফাস্সির ও মুহাদ্দিসগণের ব্যাখ্যা অধ্যয়ন না করলে এ সকল ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ আরব পাঠকও বিভ্রান্ত হন। এরূপ বিভ্রান্তি শিকার হন ‘জামা‘আতুল মুসলিমীন’ নেতৃবৃন্দ ‘জামা‘আত’ শব্দের ক্ষেত্রে। ‘জামা‘আত’ ও ‘বাই‘আত’ ইসলামের দুটি রাষ্ট্রনৈতিক পরিভাষা। জামা‘আত শব্দের অর্থ ও প্রয়োগ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি ‘‘কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা’’ গ্রন্থে।[1] এখানে সংক্ষেপে বলা যায় যে, জামাআত শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘‘ঐক্য’’ বা ‘‘ঐক্যবদ্ধ জনগোষ্ঠী’’। যে কোনো স্থানে যে মানুষগুলি থাকেন তাদের সমষ্টিকে বা তাদের ঐক্যবদ্ধতাকে ‘‘জামাআত’’ বলা হয়। জামাআতের বিপরীত হলো ফিরকা বা হিযব, অর্থাৎ দল বা গ্রুপ।

মনে করুন একটি মসজিদের মধ্যে ১০০ জন মুসল্লি আছেন। এরা মসজিদের জামা‘আত। এদের মধ্যে কম বা বেশি সংখ্যক মুসল্লী যদি পৃথকভাবে একত্রিত হয়ে মসজিদের এক দিকে বসেন তবে তারা একটি ফিরকা, কাওম বা হিযব, অর্থৎ দল, গ্রুপ বা সম্প্রদায় বলে গণ্য, কিন্তু তারা জামা‘আত বলে গণ্য নয়। যেমন, উপর্যুক্ত ১০০ জনের মধ্য থেকে ৫ জন এক দিকে পৃথক হয়ে বসলেন, আর দশ জন অন্য কোণে পৃথক হয়ে বসলেন এবং অন্য কোণে আরো কয়েকজন একত্রিত হলেন। এখন আমরা ফিরকা ও জামা‘আতের রূপ চিন্তা করি। মূলত মসজিদের জামা‘আত বা ঐক্য ভেঙ্গে ইফতিরাক বা দলাদলি এসেছে। তিনটি ফিরকা বা দল মূল জামা‘আত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। আর বাকি যারা কোনো ‘দল’ বা ফিরকা গঠন না করে দলবিহীনভাবে রয়ে গিয়েছেন তারা নিজেদেরকে ‘জামা‘আত’ বলতে পারেন। আর এ অর্থে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে ‘‘জামাআত’’ বলা হয়।

এভাবে একটি ঘর, মসজিদ বা মাহফিলের মধ্যে বিদ্যমান সকল মানুষের বা অধিকাংশ মানুষের সমষ্টি বা তাদের ঐক্যবদ্ধতাকে উক্ত স্থানের ‘জামাআত’ বলা হয়। যেমন বলা হয়, মসজিদের জামাআত, ঘরের জামাআত, মহল­ার জামাআত, মাহফিলের জামাআত। অর্থাৎ ঘর, মহল্লাহ, মসজিদ বা মাহফিলের সকল মানুষ। এ অর্থে অল্প কিছু মানুষকেও জামাআত বলা যেতে পারে, তবে তা ‘সকল মানুষের ঐক্য’ অর্থে নয়, বরং ‘নির্ধারিত স্থানের সকল মানুষের ঐক্য’ অর্থে। কুরআন-হাদীসে ‘‘জামাআত’’ বলতে ‘‘জামাআতুল মুসলিমীন’’ বা সকল মুসলিমের বা অধিকাংশ মুসলিমের ঐক্য বুঝানো হয়েছে। কুরআন, হাদীস ও মূল আরবী ব্যবহার অনুসারে ‘জামা‘আত’ অর্থ জনগণ, জনগোষ্ঠী বা সমাজ (community, society). বিভিন্ন হাদীসে ‘জামা‘আত’-এর গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। ‘জামা‘আত-বদ্ধ’ থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং ‘বিচ্ছিন্ন হতে’ নিষেধ করা হয়েছে। এ সকল নির্দেশের অর্থ, মুসলিম যে সমাজে বা জনগোষ্ঠীতে বসবাস করবেন, সে সমাজের মানুষদের রাজনৈতিক, সামাজিক সিদ্ধান্তাদির সাথে একমত থাকতে হবে, যদিও সে সিদ্ধান্ত তার বা তার গোষ্ঠীর মতামত বা স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়।

মূলত রাষ্ট্রীয় বিষয়েই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ সকল নির্দেশনা দিয়েছেন। জামা‘আত ও বাইয়াত বিষয়ক নির্দেশাদি একই সুত্রে বাঁধা। জামা‘আত অর্থ সমাজ বা রাষ্ট্রের জনগণ বা তাদের ঐক্য এবং বাইয়াত অর্থ রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের শপথ। আরবগণ প্রাচীন যুগ থেকে ‘কাবীলা’ বা গোত্রতান্ত্রিক বিভক্ত সমাজে বসবাস করত। ইসলামের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বিচ্ছিন্ন কবীলা বা গোত্র কেন্দ্রিক আরব সমাজকে বিশ্বের সর্বপ্রথম আধুনিক জনগণতান্ত্রিক পরামর্শভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার অধীনে আনেন। আরবরা রাষ্ট্রিয় আনুগত্য বুঝতো না। তারা বুঝতো কবীলা বা গোত্র প্রধানের আনুগত্য। বিচ্ছিন্নভাবে ছোট বা বড় গোত্রের অধীনে তারা বাস করত। গোত্রের বাইরে কারো আনুগত্য বা অধীনতাকে তারা অবমাননাকর বলে মনে করত। এছাড়া ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবোধ ও স্বাধীনতাবোধ তাদেরকে তাদের মতের বাইরে সকল সিদ্ধান্ত অমান্য করতে প্রেরণা দিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ বিচ্ছিন্ন জাতিকে প্রথমবারের মত কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসেন। তিনি এজন্য বারবার তাদেরকে রাষ্ট্রীয় ঐক্য ও আনুগত্যের মধ্যে অবস্থান করতে নির্দেশ দিয়েছেন। রাষ্ট্র প্রধানের আনুগত্য বর্জন করা, রাষ্ট্রদ্রোহিতা করা, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বাইরে বা রাষ্ট্রহীনভাবে বাস করাকে তিনি জাহিলী জীবন ও এ প্রকারের মৃত্যুকে জাহিলী মৃত্যু বলেছেন। কারণ জাহিলী যুগের মানুষ রাষ্ট্র চিনত না এবং রাষ্ট্রহীনভাবে বসবাস করত। কাজেই এভাবে থাকা নিঃসন্দেহে জাহিলী জীবন ও এভাবে মরা জাহিলী মরা। পছন্দ হোক বা না হোক রাষ্ট্র প্রশাসনের আনুগত্য করতে হবে। ব্যক্তি, গোষ্ঠী, কবীলা বা দলের মতামতের কারণে বা কোন অবস্থাতেই রাষ্ট্র বা সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে না। প্রয়োজনে রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রশাসনকে সৎকাজে আদেশ, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ ও সংশোধন করতে হবে। কিন্তু বিদ্রোহ, গৃহযুদ্ধ ও হানাহানি নিষিদ্ধ।

এ অর্থে তিনি যে সকল নির্দেশনা দিয়েছেন তা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। তিনি মুসলিম উম্মাহকে সর্বদা রাষ্ট্রপ্রধানের আনুগত্য করতে বলেছেন। রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের প্রতীক ‘‘বাইয়াত’’ বা ‘‘আনুগত্যের শপথ’’ সর্বদা বজায় রাখতে বলেছেন। তিনি তাদেরকে ‘‘জামা‘আত’’ বদ্ধ থাকতে বলেছেন। এ সকল হাদীসের মর্মাথ একই। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মধ্যে থাকতে হবে এবং বিদ্রোহ, হানাহানি বা ক্ষমতা দখলের অবৈধ প্রক্রিয়া ও প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে হবে।[2]
এ অর্থের হাদীসগুলি পর্যালোচনা করলেই আমরা তা বুঝতে পারব। ইবনু আববাস (রা:) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:

من رأى من أميرِه شيئًا يكرهُه فليصبر عليه فإنَّهُ من فارقَ الجماعةَ شبرًا فمات (ليس أحد يفارق الجماعة شبراً فيموت) إلا مات ميتةَ جاهليةٍ

‘‘কেউ তার শাসক বা প্রশাসক থেকে কোন অপছন্দনীয় বিষয় দেখলে তাকে ধৈর্য্য ধারণ করতে হবে। কারণ যদি কেউ জামা‘আতের (মুসলিম সমাজ বা রাষ্টের ঐক্যের) বাইরে এক বিঘতও বের হয়ে যায় এবং এ অবস্থায় মৃত্যু বরণ করে, তাহলে সে জাহিলী মৃত্যু বরণ করল।’’[3]
আবু হুরাইরা (রা:) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:

من خرج من الطاعةِ ، وفارقَ الجماعةَ ، فماتَ ، ماتَ ميتةً جاهليّةً


‘‘যে ব্যক্তি ‘তা‘আত’ বা ‘রাষ্ট্রীয় আনুগত্য’ থেকে বের হয়ে এবং জামা‘আত বা মুসলিম সমাজ ও জনগোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মৃত্যু বরণ করল সে জাহিলী মৃত্যু বরণ করল।’’[4]
মু‘আবিয়া (রা) তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর পুত্র ইয়াযিদকে রাষ্ট্র প্রধান পদে মনোনয়ন দান করেন এবং তার আনুগত্যের জন্য তিনি রাষ্ট্রের সকল নাগরিক থেকে বাইয়াত বা আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেন। ৬০ হিজরীতে মু‘আবিয়া (রা)-এর ইন্তেকালের পরে ইয়াযিদ শাসনভার গ্রহণ করেন এবং চার বছর শাসন করে ৬৪ হিজরীতে মৃত্যু বরণ করেন। তার শাসনামলে ৬৩ হিজরীতে মদীনার অধিবাসীগণ ইয়াযিদের জুলুম-অত্যাচার, ইমাম হুসাইনের শাহাদত ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে বিদ্রোহ করেন। তাদের বিদ্রোহ ছিল যুক্তিসঙ্গত এবং একান্তুই আল্লাহর ওয়াস্তে ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অনুপ্রেরণা নিয়ে। কিন্তু তা সত্বেও সে সময়ে জীবিত সাহাবীগণ বিদ্রোহে রাজী ছিলেন না। সহীহ মুসলিমে সংকলিত হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু উমর (রা) মদীনার বিদ্রোহের নেতা আব্দুল্লাহ ইবনু মুতি’র নিকট গমন করেন। তিনি তাকে সম্মানের সাথে বসতে অনুরোধ করেন। ইবনু উমর বলেন: আমি বসতে আসিনি। আমি তোমাকে একটি হাদীস শুনাতে এসেছি। আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি:


من خلع يدًا من طاعةٍ ، لقيَ اللهَ يومَ القيامةِ ، لا حُجَّةَ له . ومن مات وليس في عُنُقِه بَيعةٌ ، مات مِيتةً جاهليةً


‘‘যে ব্যক্তি ‘তাআত’ বা রাষ্ট্রীয় আনুগত্য থেকে নিজেকে বের করে নিল সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সাথে সাক্ষাত হলে নিজের জন্য কোন ওজর পেশ করতে পারবে না। আর যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যু বরণ করল যে, তার গলায় কোন ‘বাই‘আত’ বা রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের অঙ্গীকার নেই সে ব্যক্তি জাহিলী মৃত্যু বরণ করল।’’[5]
রাষ্ট্রীয় ঐক্য বা ‘‘জামাআত’’ বিনষ্ট করা এত বড় অপরাধ যে, এর শাস্তি মৃত্যুদন্ড। আরফাজা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:


إنه ستكون هنّاتٌ وهنّاتٌ فمن أرادَ أن يُفَرّقَ أمرَ هذهِ الأمةِ وهي جميعٌ ، فاضرِبُوهُ بالسيفِ كائنا من كانَ (من أتاكم وأمركُم جميعٌ على رجلٍ واحدٍ يريدُ أن يشقُّ عصاكُم أو يفرقَ جماعتكُم فاقتلوهُ)


‘‘ভবিষ্যতে অনেক বিচ্যুতি-অন্যায় সংঘটিত হবে। যদি এমন ঘটে যে, এ উম্মাতের ঐক্যবদ্ধ থাকা অবস্থায় কেউ এসে সে ঐক্য বিনষ্ট করে বিভক্তি সৃষ্টি করতে চায় তবে সে যেই হোক না কেন তোমরা তাকে তরবারী দিয়ে আঘাত করবে। অন্য বর্ণনায়: তোমাদের বিষয়টি একব্যক্তির বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকা অবস্থায় (একজন্য রাষ্ট্রপ্রধানের অধীনে থাকা অবস্থায়) কোনো একব্যক্তি যদি এসে তোমাদের ঐক্য বিনষ্ট করতে বা ‘জামাআত’ বিভক্ত করতে চায় তবে তাকে হত্যা করবে।’’[6]
আবূ সাঈদ খুদরী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:


إذا بُويِعَ لخليفتينِ ، فاقتلُوا الآخرَ منهما


‘‘যদি দুজন খলীফার বাইয়াত করা হয় তবে যে পরে বাইয়াত নিয়েছে তাকে হত্যা করবে।’’[7]
হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান বলেন, মানুষেরা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)কে ভাল বিষয়াদি সম্পর্কে প্রশ্ন করত। আমি তাঁকে খারাপ বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করতাম, এ ভয়ে যে, কি জানি আমি কোনো খারাপের মধ্যে নিপতিত হয়ে যায় কিনা। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমরা জাহিলিয়্যাত ও অকল্যাণের মধ্যে ছিলাম। তখন আল্লাহ আমাদেরকে এ কল্যাণ এনে দিলেন। এর পরে কি আবার কোনো অকল্যাণ আসবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, সে অকল্যাণের পরে কি আবার কল্যাণ ফিরে আসবে? তিনি বলেন, হ্যাঁ, তবে তার মধ্যে কিছু জঞ্জাল-ময়লা থাকবে। আমি বললাম, সে জঞ্জাল-ময়লা কি? তিনি বলেন, কিছু মানুষ যারা আমার আদর্শ ও নীতি ছেড়ে অন্য আদর্শ ও রীতি অনুসরণ করবে। তুমি তাদের মধ্যে ভাল ও মন্দ দেখতে পাবে। আমি বললাম, এ ভাল অবস্থার পরে কি আবার খারাপ অবস্থা আছে? তিনি বলেন, হ্যাঁ। জাহান্নামের দরজাগুলির দিকে আহবানকারীগণ (আবির্ভুত হবে), যারা তাদের ডাকে সাড়া দিবে তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি তাদের বর্ণনা দিন। তিনি বললেন, তারা আমাদেরই চামড়ার মানুষ-আমাদেরই স্বজাতি, আমাদের ভাষাতেই তারা কথা বলবে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমি যদি এ অবস্থায় পড়ে যাই তবে আপনি আমাকে কি করতে বলেন, তিনি বলেন:


تلزمُ جماعةَ المسلمين ، وإمامَهم قلتُ فإن لم يكن لهم جماعةٌ ولا إمامٌ قال فاعتزل تلك الفِرقَ كلَّها ولو أن تعضَّ على أصلِ شجرةٍ حتى يُدرِكَك الموتُ وأنت على ذلك


‘‘তুমি মুসলিমদের জামা‘আত (সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ জনগোষ্ঠী) ও তাদের ইমাম (রাষ্ট্রপ্রধান)-কে ধরে থাকবে। আমি বললাম, যদি তাদের কোনো জামা‘আত না থাকে এবং কোনো ইমামও না থাকে (জনগণ সকলেই ক্ষুদ্রক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থাহীন বিশৃঙ্খল অবস্থায় থাকে), তিনি বললেন, সেক্ষেত্রে তুমি সে সকল দল সবগুলিকেই পরিত্যাগ করবে। যদি তোমাকে কোনো গাছের মূল কামড়ে ধরে পড়ে থাকতে হয় তাও থাকবে। এভাবে থাকা অবস্থাতেই যেন তোমার মৃত্যু এসে যায়।’’[8]
হারিস আশ‘আরী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,

أنا آمرُكم بخمسٍ ، اللهُ أمرني بهنَّ : السمعُ ، و الطاعةُ ، و الجهادُ ، و الهجرةُ ، والجماعةُ ، فإنه من فارق الجماعةَ قَيْدَ شبرٍ ، فقد خلع رِبقةَ الإسلامِ من عُنُقِه ، إلا أن يراجِعَ

‘‘আমি তোমাদেরকে পাঁচটি বিষয়ের নির্দেশ দিচ্ছি, যেগুলির নির্দেশ আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন: শ্রবণ, আনুগত্য, জিহাদ, হিজরত ও জামা‘আত; কারণ যে ব্যক্তি জামা‘আত থেকে এক বিঘত সরে গেল সে ইসলামের রজ্জু নিজের গলা থেকে খুলে ফেলল, যদি না ফিরে আসে।’’[9]
এভাবে আমরা দেখছি যে, হাদীসের পরিভাষায় জামা‘আত বলতে ‘‘রাষ্ট্রীয় ঐক্য’’ বা মুসলিম সমাজ বা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ঐক্য বুঝানো হয়েছে। তারা যখন কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন তখন ব্যক্তিগতভাবে, দলগতভাবে বা গোষ্ঠীগতভাবে সে সিদ্ধান্ত অমান্য করা, নিজের মতের উপর অটল থাকা বা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মতের বিরোধিতা করা নিষিদ্ধ।
উপরের হাদীসগুলি মূলত কুরআনের এ বিষয়ক নির্দেশের ব্যাখ্যা। মহান আল্লাহ বলেন:


وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا


‘‘তোমরা আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধারণ কর ঐক্যবদ্ধভাবে; এবং দলেদলে বিভক্ত হয়ো না।’’[10]
এখানে আল্লাহ ‘জামাআত’ বা ঐক্যের নির্দেশ দিয়েছেন এবং ‘তাফার্রুক’ বা দলাদলি করতে বা দলে দলে বিভক্ত হতে নিষেধ করেছেন। জামাআতের সর্বোচ্চ নির্দশন ছিলেন সাহাবীগণ। এছাড়া ধর্মীয় বিষয়ে ‘জামাআত’ বুঝাতে মুসলিম উম্মাহর আলিম সমাজের সমষ্টি বা ঐক্য বুঝানো হয়েছে বলে মনে করেছেন কোনো কোনো আলিম।[11] সর্বাবস্থায় সকলেই ‘জামা‘আত’ বলতে ‘সাধারণ জনগোষ্ঠী’ বা (society, community) বুঝিয়েছেন, কেউ ‘জামা‘আত’ বলতে ‘দল’ (group, party) বুঝান নি। আরবীতে ‘‘দল’’ বা সংগঠন বুঝাতে ‘ফিরকা’, ‘হিযব’ ‘কাওম’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, ‘জামা‘আত’ নয়।

আমরা আগেই বলেছি যে, একটি নির্ধারিত স্থানের সকল মানুষ বুঝাতেও ‘‘জামাআত’’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এরূপ সীমিত ‘‘জামাআত’’ বা ঐক্য অর্থে আধুনিক যুগে কখনো কখনো জামাআত বলতে ‘‘দলবদ্ধতা’’ বুঝানো হয়। অর্থাৎ কোনো উদ্দেশ্য সামনে রেখে কতিপয় মানুষের ঐক্য। এরূপ ঐক্য বা ‘‘জামাআত’’-ও ইসলাম নির্দেশিত। কোনো সফরে বা অন্য কোনো কর্মে বা উদ্দেশ্যে তিনজন মানুষ থাকলে একজনকে আমীর বা নেতা নিযুক্ত করে ঐক্যবদ্ধ থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)।

এ অর্থে দীনী কর্মে ক্ষুদ্র পরিমন্ডলে মুসলিমগণ ‘‘জামাআতবদ্ধ’’ অর্থাৎ ‘‘একই কর্মে রত সকল মানুষ ঐক্যবদ্ধ’’ থাকতে পারেন; তবে উপরের আয়াত ও হাদীসগুলিতে ‘জামাআত’ বলতে এ ক্ষুদ্র ঐক্য বা ‘‘দল’’ বুঝানো হয় নি; মুসলিমদের সামগ্রিক ঐক্য বুঝানো হয়েছে। কাজেই এরূপ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলভুক্ত হওয়াকে ইসলাম পালনের অংশ মনে করার অর্থ ইবাদত পালনের জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে বিষয়কে শর্ত করেননি তাকে যুক্তি দিয়ে শর্ত বানিয়ে নেওয়া। উপরন্তু এরূপ ধারণার দ্বারা ইসলাম নিষিদ্ধ ‘‘দলাদলি’’, ‘‘বিভক্তি’’ বা ‘‘বিচ্ছিন্নতা’’ একটি ইসলামী ইবাদত বলে পরিগণিত হবে! দীন পালন ও দীনী দাওয়াতে সামষ্টিক প্রচেষ্টা অধিকতর ফলদায়ক। ন্যায়ের আদেশ, অন্যায়ের নিষেধ, দীন প্রতিষ্ঠা বা আল্লাহর পথে দাওয়াতের জন্য এরূপ ক্ষুদ্রতর বা আংশিক ‘‘জামাআত’’ (ঐক্য) একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকারী উপকরন। কিন্তু দাওয়াতের জন্য ‘‘জামাআত’’ শরীয়ত-নির্দেশিত কোনো জরুরী বিষয় নয়। ‘সালাতের’ ক্ষেত্রে ফরয সালাত একাকী পালন করলে সাওয়াব কম হবে বা গোনাহ হবে বলে সুন্নাত থেকে আমরা জানতে পারি। কিন্তু ‘দাওয়াতের’ ক্ষেত্রে এ ইবাদত একাকী পালন করলে সাওয়াব কম হবে বা গোনাহ হবে বলে আমরা মনে করতে পারি না।

এরূপ মনে করলে তা সুন্নাতের ব্যতিক্রম এবং বিদআতে পরিণত হবে। যেমন অধিক উপকার বা অনুরূপ কোনো যুক্তি দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত, দরুদ-সালাম, যিকর ইত্যাদি ইবাদত পালনের জন্য ‘জামাআত’ বা দলবদ্ধতা, দন্ডায়মান হওয়া, চিৎকার করা ইত্যাদিকে উক্ত ইবাদতের অংশ মনে করা বা এ সকল ইবাদত একাকী পালন করলে, বসে পালন করলে বা মৃদু শব্দে পালন করলে সাওয়াব কম হবে বলে মনে করা।

‘জামা‘আতুল মুসলিমীন’-এর বিভ্রান্তির কারণ হলো তারা ‘জামা‘আত’ বিষয়ক প্রচলিত সংকীর্ণ অর্থকে ইসলামী পারিভাষিক অর্থ বলে দাবি করেন। এরপর সুন্নাতের নির্দেশনা ছাড়াই বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে দীন পালন ও দীন প্রতিষ্ঠার জন্য ‘‘দলবদ্ধতা’’ শর্ত বলে গণ্য করেন। ‘জামাআত’ বিষয়ক উপরের হাদীসগুলির আলোকে তারা দাবি করেন যে, দলের মধ্যে থাকা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কারণ দল বা জামা‘আত পরিত্যাগ করাকে জাহিলিয়্যাত বলা হয়েছে, আর জাহিলিয়্যাত অর্থই কুফরী। এছাড়া জামা‘আত পরিত্যাগ করাকে ইসলামের রজ্জু খুলে ফেলা বলে অভিহিত করা হয়েছে। এতে বুঝা যায় ‘জামা‘আত’ ত্যাগকারী কাফির বলে গন্য হবে। উপরের আয়াত ও হাদীসগুলির নির্দেশনা হলো, মুমিনগণ দলাদলি করবেন না। ইসলামের মধ্যে কোনো দলাদলি থাকবে না; বরং সকল মুসলিম ঐক্যবদ্ধ থাকবেন। অন্তত মুমিন সকল মুমিনকে একদল বলে বিশ্বাস করবেন। দল, মত, বর্ণ, দেশ, কর্ম, মাযহাব ইত্যাদির পার্থক্যের কারণে এক মুসলিম আরেক মুসলিমকে ‘‘অন্যদল’’ বলে মনে করবেন না; বরং এগুলি-সহ সকল মুসলিমকে একদল বলে বিশ্বাস করবেন। কিন্তু এ কথার ব্যাখ্যায় জামাআতুল মুজাহিদীন নেতৃবৃন্দ বলেন, ‘‘মুসলিম হতে হলে কোনো না কোনো দলে থাকতে হবে!’’ অর্থাৎ দলাদলি করতেই হবে! এ হলো কুরআন ও হাদীসের নির্দেশনার সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থ।

এ ভুল অর্থের ভিত্তিতে তারা দাবী করেন যে, ইসলাম পালনের জন্য কোনো না কোনো দলের মধ্যে থাকতে হবে। আর যেহেতু একমাত্র তারাই দীন প্রতিষ্ঠা ও দীনের বিজয়ের জন্য চেষ্টা করছেন সেহেতু তাদের দলই একমাত্র সঠিক দল। যারা তাদের বিরোধিতা করেন তারা মূলত দীন প্রতিষ্ঠা ও দীনের বিজয় চাচ্ছেন না। এজন্য তারাও কাফির। জামা‘আতের পাশাপাশি তারা ‘বাইআত’-কেও ঈমানের অংশ বলে গণ্য করেন, কারণ বাইয়াত পরিত্যাগ করাকে জাহিলিয়্যাত বলা হয়েছে। তারা বলেন দলের আমীরের হাতে বাইয়াতই হলো দলভূক্তির একমাত্র পথ। যে ব্যক্তি তাদের দলের আমীরের হাতে বাইয়াত করে তাদের দলে যোগদান করবে শুধু তারাই মুসলিম বলে গণ্য হবে। যারা এভাবে তাদের দলভুক্ত হতে অস্বীকার করবে তারা কাফির বলে গণ্য হবে। উপরের আলোচনা থেকে এ সকল বিষয়ের বিভ্রান্তি আমরা বুঝতে পেরেছি। বস্ত্তত মুসলিমকে বা যে ব্যক্তি নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করছে তাকে কোনো কর্ম, দ্ব্যর্থবোধক কথা, অপছন্দনীয় বিশ্বাস, আকীদা বা মতবাদের কারণে কাফির বলে গণ্য করার প্রবণতা মুসলিম উম্মাতের জন্য সর্বদা বেদনা ও ক্ষতি বয়ে এনেছে। এ থেকে উম্মতের মধ্যে দলাদলি, মারামারি, সংঘর্ষ, সংঘাত ও সন্ত্রাসের জন্ম হয়েছে। সাহাবীগণ ও তাঁদের অনুসারী উম্মাতের মূলধারার আলিমগণ ঈমানের দাবিদারকে কাফির বলার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। পাপের কারণে তো নয়ই, এমনকি ইসলামী বিশ্বাসের সাথে আংশিক বা বাহ্যিক সাংঘর্ষিক মতবাদ, বিশ্বাস বা আকীদার কারণেও তারা ঈমানের দাবিদারকে কাফির বলতেন না। তার কোনো ব্যাখ্যা বা ওজর আছে কিনা তা সন্ধান করতেন এবং ঈমানের বিষয়ে তার মুখের দাবির উপরেই নির্ভর করতেন। এজন্য খারিজী, শিয়া, মুতাযিলী, কাদারীয়া, জাবারিয়া ইত্যাদি বিভ্রান্ত বিশ্বাস বা মতবাদের অনুসারীরা কুরআনের অনেক আয়াত ও ইসলামী অনেক বিশ্বাস অস্বীকার করলেও তাদেরকে কাফির না বলে বিভ্রান্ত বা ভ্রান্তিতে নিপতিত মুসলিম বলে গণ্য করেছেন। আমি ‘‘কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা’’ গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। সম্মানিত পাঠককে বইটি পড়তে অনুরোধ করছি।

[1] কুরআন সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকিদা, পৃ. ৫৭৬-৫৮২।

[2] দেখুন: ইবনু হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী ১৩/৭, শাওকানী, নাইলুল আউতার ৭/৩৫৬-৩৫৭।

[3] সহীহ বুখারী, ৬/২৬১২, নং ৬৭২৪, সহীহ মুসলিম ৩/১৪৭৭ নং ১৮৪৯।

[4] সহীহ মুসলিম ৩/১৪৭৬-১৪৭৭ নং ১৮৪৮।

[5] সহীহ মুসলিম ৩/১৪৭৮, নং ১৮৫১।

[6] সহীহ মুসলিম ৩/১৪৭৮, নং ১৮৫১।

[7] সহীহ মুসলিম ৩/১৪৭৮, নং ১৮৫১।

[8] সহীহ বুখারী, ৩/১৩১৯, ৬/২৫৯৫; সহীহ মুসলিম ৩/১৪৭৫।

[9] তিরমিযী, আস-সুনান ৫/১৪৮।

[10] সূরা (৩) আল-ইমরান: ১০৩ আয়াত।

[11] শাতিবী, ইবরাহীম ইবনু মূসা (৭৯০ হি.), আল-ই’তিসাম ২/২৫৮-২৬৫। ড. খোন্দকার আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর, কুরান-সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকিদা, ৫৭৬-৫৮২।
৩. ৯. ইসলামী রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা - (৩. ৯. ১. ইসলাম ও রাষ্ট্র)

ইসলাম ধর্ম ও ইসলামী সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অংশ সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা। ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বকে নিয়ে ইসলাম একটি সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থা। তবে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে স্বাভাবিক পার্থক্য রক্ষা করা হয়েছে ইসলামে। রাষ্ট্র-ব্যবস্থাসহ ও রাষ্ট্র-ব্যবস্থা ছাড়া সকল দেশের সকল সমাজের মানুষদের জন্য পালনীয় প্রশস্ততা রয়েছে ইসলামে। রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে মুমিনের ধর্ম পালনের জন্য শর্ত বা মূল বিষয় বলে গণ্য করা হয় নি। রাষ্ট্র ব্যবস্থা ইসলামের একটি অংশ। ইসলামে রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় বিধিবিধান আছে। তবে ইসলাম শুধু রাষ্ট্র ব্যবস্থার নাম নয়। মুমিন আরকানে ইসলাম ও অন্যান্য ফরয, নফল ইবাদত সাধ্যমত পরিপূর্ণভাবে পালনের মাধ্যমে নিজের জীবনে পূর্ণতমভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবেন। কোনো মুসলিম কোনো রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকলে তিনি তার দায়িত্ব আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে পালন করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন। এক্ষেত্রে তার নিজ জীবনের অন্যান্য কর্মের মত রাষ্ট্রীয় কর্ম আল্লাহর হুকুম মত পালন করা তার দায়িত্ব। অন্যান্য মুসলিমের দায়িত্ব রাষ্ট্র, সমাজ, ব্যক্তি বা পরিবারের সকল ক্ষেত্রে সবাইকে আল্লাহর হুকুম পালন করার জন্য দাওয়াত দেওয়া। যে কোনো ক্ষেত্রে আল্লাহ বা তাঁর রাসূলের (ﷺ) নির্দেশ লঙ্ঘিত হলে সুযোগ ও সাধ্যমত কুরআন নির্দেশিত উত্তম আচরণ দ্বারা খারাপ আচরণের প্রতিরোধ পদ্ধতিতে দাওয়াত, ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধের মাধ্যমে তা সংশোধন ও পরিবর্তনের চেষ্টা করবেন। তবে এ চেষ্টা সফল না হলে মুমিনের দ্বীন-পালন ব্যাহত হয় বা সমাজ ও রাষ্ট্রের পাপের কারণে ব্যক্তি মুমিন পাপী হন এরূপ চিন্তার কোনো ভিত্তি নেই।

ইসলাম সর্বকালের ও সর্বযুগগের সমগ্র মানব জাতির জন্য স্থায়ী জীবন ব্যবস্থা এবং বিশ্বজনীন ও সর্বজনীন ধর্ম। কুরআন কারীম, হাদীসে রাসূল (ﷺ) ও সাহাবীগণের জীবনপদ্ধতি থেকে আমরা দেখতে পাই যে, এতে দু’টি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়েছে: একদিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখা হয়েছে যেন যুগ, সমাজ, সামাজিক রুচি ও আচার আচরণের পরিবর্তনের ফলে ইসলামের ধর্মীয় রূপে পরিবর্তন না আসে। অপর দিকে লক্ষ্য রাখা হয়েছে যে, যুগ, সমাজ, আচার-আচরণ ইত্যাদির পরিবর্তনের কারণে ইসলামের আহকাম পালনে যেন কারো কোনো অসুবিধা না হয়। সকল যুগের সকল দেশের মানুষেরা যেন সহজেই জীবন ধর্ম ইসলাম পালন করতে পারে।

এ মূলনীতির ভিত্তিতে ইসলামে মানব জীবনের কর্মকান্ডকে মূল দুভাগে ভাগ করা হয়েছে: (১) ইবাদাত ও (২) মুআমালাত। মানুষকে জীবন ধারণ করতে জাগতিক ও জৈবিক প্রয়োজনে যা করতে হয় এবং বিশ্বাসী-অবিশ্বাস ও ধার্মিক-অধার্মিক সকলেই যা করেন তা মুআমালাত বা জাগতিক কর্ম বলে গণ্য। আর জাগতিক প্রয়োজনের ঊর্দ্ধে শুধু মহান স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্য মানুষ যে কর্ম করে তা ইবাদত বলে গণ্য।
ইবাদত ও মুআমালাতের পার্থক্য বিষয়ে বিস্তারিত জানতে আমার লেখা ‘‘এহইয়াউস সুনান’’ গ্রন্থটি পাঠ করতে পাঠককে অনুরোধ করছি। এখানে সংক্ষেপে বলা যায় যে, ইবাদতের ক্ষেত্রে ইসলামে বিস্তারিত ও খুটিনাটি নিয়ম-পদ্ধতি ও বিধিবিধান প্রদান করা হয়েছে। এক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে কর্ম যেভাবে করেছেন অবিকল সেভাবে করার বিশেষ তাকিদ দেওয়া হয়েছে। পক্ষান্তরে মুআমালাত বা জাগতিক কর্মের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রশস্ততা দেওয়া হয়েছে। কিছু মূলনীতি প্রদান করা হয়েছে এবং ফরয ও হারাম নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বাইরে সবই বৈধ বলে গণ্য হবে। মুআমালাতের ক্ষেত্রে কোনো বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তা বৈধ বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ ইবাদতের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যা করেননি তা করা নিষিদ্ধ। আর মুআমালাতের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যা নিষেধ করেছেন শুধু তাই নিষিদ্ধ, যা তিনি নিষেধ করেননি তা বৈধ।

চাষাবাদ, চিকিৎসা, বাড়িঘর তৈরি ইত্যাদি জাগতিক বিষয়ে যেমন প্রশস্ততা প্রদান করা হয়েছে, তেমনি প্রশস্ততা প্রদান করা হয়েছে ইবাদত পালনের জাগতিক উপকরণের ক্ষেত্রে। যেমন ইলম শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তবে শিক্ষার পদ্ধতি, উপকরণ ইত্যাদির বিষয় উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। কেউ বলতে পারেন না যে, সাহাবীগণের যুগে ছাপানো বই ছিল না, পরীক্ষা পদ্ধতি ছিল না বা সনদ প্রদানের পদ্ধতি ছিল না কাজেই তা নিষিদ্ধ। বরং যতক্ষণ না শরীয়তে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা পাওয়া যাবে ততক্ষণ তা বৈধ।

বিবাহ, পরিবারগঠন, আবাসন, চিকিৎসা ইত্যাদির মত রাষ্ট্রগঠন, রাষ্ট্রপরিচালনা ও এ বিষয়ক দায়িত্বাবলি ‘‘মুআমালাত’’। এজন্য ইসলামে এ বিষয়ে মৌলিক নীতিমালার মধ্যে প্রশস্ততা প্রদান করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর খুটিনাটি বিষয়ে দেশ, যুগ, জাতি ও পরিবেশের আলোকে ভিন্নতার অবকাশ রাখা হয়েছে। এ সকল মূলনীতির আলোকে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রকৃতি আলোচনার জন্য পৃথক গ্রন্থের প্রয়োজন। এখানে সংক্ষেপে বলা যায় যে, ইসলামী রাষ্ট্র ‘‘থিওক্র্যটিক’’ বা পুরোহিত-তান্ত্রিক নয়, বরং জনগণতান্ত্রিক। এখানে মোল্লা, পুরোহিত, ইমাম বা অন্য কোনো ধর্মীয় নেতাকে ‘‘আল্লাহর নামে’’ বা ‘‘আল্লাহর খলীফা’’ হয়ে শাসন করার ক্ষমতা বা সুযোগ দেওয়া হয় নি। ইসলামে কখনোই শাসককে ‘‘আল্লাহর খলীফা’’ হিসেবে গণ্য করা হয় নি, তাকে বিশেষ অধিকার, ক্ষমতা বা অভ্রান্ততা প্রদান করা হয় নি বা তাকে জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে রাখা হয় নি। বরং শাসককে জনগণের প্রতিনিধি ও জনগণের কাছে জবাবাদিহী বলে গণ্য করা হয়েছে।

কেবলমাত্র ‘শীয়া’ সম্প্রদায়ের ধর্মবিশ্বাসে ইসলামের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রাজতান্ত্রিক ও পুরোহিততান্ত্রিক বলে দাবি করা হয়েছে। তাঁরা বিশ্বাস করেন যে, ইসলামের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব বা রাষ্ট্রক্ষমতা আলী (রা)-এর বংশধরদের পাওনা। আর ‘‘রাষ্ট্রীয় নেতা’’ বা ইমাম আল্লাহর খলীফা হিসেবে বিশেষ জ্ঞান, ক্ষমতা ও অধিকার সংরক্ষণ করেন। রাষ্ট্রীয় বিষয়ে তাঁর মতামতই চূড়ান্ত। তাঁর অনুপস্থিতি বা অদৃশ্য থাকা অবস্থায় ‘‘ফকীহ’’ তাঁর প্রতিনিধিত্ব করবেন এবং তাঁর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। কুরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট নির্দেশনার আলোকে সাহাবীগণ ও পরবর্তী মূলধারার মুসলিম আলিমগণ এ মত প্রত্যাখ্যান করেছেন। বস্ত্তত রাসুলুল্লাহ (ﷺ)এর আগমনের সময়ে পৃথিবীতে বিদ্যমান রাষ্ট্রগুলির মধ্যে মূল তিনটি বিষয় দেখা যায়:

প্রথমত: রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস বংশ বা জবরদখল
রাজবংশের কেউ রাজা হবে এটাই ছিল সর্বজনস্বীকৃত রীতি। রাজতন্ত্রের বাইরে ক্ষমতা গ্রহণের একমাত্র উৎস ছিল অস্ত্র বা জবরদখল। রাজাকে হত্যা করে বা অস্ত্রের ক্ষমতায় রাজদন্ড গ্রহণ করা।


দ্বিতীয়ত: রাষ্ট্রের মালিকানা বা সার্বভৌমত্ব রাজার রাজ্যের সকল সম্পদ ও নাগরিক রাজার মালিকানাধীন। তিনি সকল জবাবাদিহিতার ঊধ্বে। রাষ্ট্রের সম্পদ ও নাগরিকদের বিষয়ে তিনি ইচ্ছামত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রাখেন এবং তার সিদ্ধান্ত প্রশ্নাতীত।
এরূপ সর্বোচ্চ ক্ষমতা বুঝাতে ইংরেজিতে (sovereignty) শব্দটি ব্যবহার করা হয়। শব্দটি প্রাচীন ফরাসী souverein, ল্যাটিন superanus/ super শব্দ থেকে এসেছে। এর মূল অর্থ (above) বা ঊধ্বে। যেহেতু রাজার ক্ষমতা সকলের ঊর্ধ্বে সেহেতু রাজাকে ইংরেজিত বলা হয় sovereign । ইংরেজীতে sovereign অর্থই king বা রাজা। আরবী অভিধানেও sovereign অর্থ ملك (রাজা)। (sovereignty) অর্থ বাংলায় রাজত্ব এবং আরবীতে মুলক (الملك) বা সিয়াদাত (السيادة) অর্থাৎ রাজত্ব বা কর্তৃত্ব।
বাংলায় এর প্রতিশব্দ হিসেবে ‘‘সার্বভৌমত্ব’’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। বাংলা এ শব্দটি ‘‘সর্বভূমি’’ থেকে গৃহীত। এর অর্থ ‘বিশ্বজনীন’ বা universal হওয়া উচিত। ইংরেজি (sovereign) বা সর্বোচ্চ শব্দের মূল অর্থের সাথে বাংলা সর্বভূম বা বিশ্বজনিন শব্দের মূল অর্থের মিল নেই। তবে প্রাচীন যুগে ‘‘সারা বিশ্বে পরিচিত’’ অর্থে শাসক বা বড় পন্ডিতকে ‘‘সার্বভৌম’’ উপাধি দেওয়া হতো। এভাবে রাজাকে ‘‘সার্বভৌম’’ বলার প্রচলন ঘটে। আর এথেকেই রাজত্বকে সার্বভৌমত্ব বলা হয়।


তৃতীয়ত: রাজা ঈশ্বরের প্রতিনিধি বা প্রতিভূ
প্রায় সকল সমাজেই রাজাকে কোনো না কোনোভাবে ঈশ্বরের পুত্র, প্রতিনিধি বা বংশধর বলে কল্পনা করে তাকে ঐশ্বরিক বা ধর্মীয় পবিত্রতা, অধিকার ও অভ্রান্ততা (infalliblity) প্রদান করা হয়েছে। বিশেষত খৃস্টীয় চতুর্থ শতকের শুরুতে বাইযান্টাইন- রোমান সাম্রাজ্যে খৃস্টধর্মকে রাষ্ট্রধর্মের মর্যাদা প্রদানের পর থেকে ইউরোপে থিওক্র্যাটিক শাসনের শুরু হয় এবং ধর্মের নামে বা আল্লাহর নামে শাসক ও পুরোহিতদেরকে আল্লাহর প্রতিনিধি ও প্রতিভু হিসেবে বিশেষ পবিত্রতা প্রদান করা হয়। তাদের নির্দেশ আক্ষরিক পালন করা ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তাদের নির্দেশ অমান্য করা ধর্মদ্রোহিতা বলে গণ্য হয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) রাষ্ট্রের বিষয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন মূলনীতি প্রদান করেন। তাঁর দেওয়া মূলনীতির প্রধান দিকগুলি নিম্নরূপ:

প্রথমত: রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস নাগরিকদের পরার্মশ
কুরআন কারীমে এবং হাদীস শরীফে মুমিন জীবনের সকল ক্ষেত্রে সংশি­ষ্ট সকলের পরামর্শ গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ মূলনীতি হাতে-কলমে শেখানোর জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কাউকে তাঁর পরে রাষ্ট্রক্ষমতার জন্য মানোনয়ন দেওয়া থেকে বিরত থাকেন, যেন মুসলিমগণ পরামর্শ ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগ করতে পারেন।
মহান আল্লাহ মুমিনদের মৌলিক বৈশিষ্ট্য উল্লেখ প্রসঙ্গে বলেন:

وَالَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِرَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَمْرُهُمْ شُورَىٰ بَيْنَهُمْ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ

‘‘যারা তাদের প্রতিপালকের আহবানে সাড়া দিয়েছে, সালাত কায়েম করেছে, তাদের কর্ম তাদের মধ্যে পারস্পরিক পরামর্শভিত্তিক এবং তাদেরকে যা রিযকপ্রদান করেছি তা থেকে তারা ব্যয় করে।’’[1]
তাহলে, মুমিনদের সকল কর্ম তাদের সকলের পরামর্শভিত্তিক। যে বিষয়ে আল্লাহর সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই এরূপ সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সংশি­ষ্ট সকলের পরামর্শ গ্রহণই মুসলিম সমাজের বৈশিষ্ট্য। আর এরূপ বিষয়ের অন্যতম রাষ্ট্রীয় বিষয়াদি, যা সকল নাগরিকের স্বার্থের সাথে সংশি­ষ্ট। শাসক, প্রশাসক, সরকার বা জনপ্রতিনিধি নির্বাচন, নির্বাচনের মেয়াদ, সরকার পরিচালনা পদ্ধতি, এ বিষয়ক নীতি নির্ধারণ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিমালা তৈরি ইত্যাদি বিষয়ে পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে।

কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশনা যে সংশি­ষ্ট সকলেই পরামর্শ প্রদান করবেন। নারী-পুরুষ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সাধারণ-অসাধারণ সকলের পরামর্শ গ্রহণ এ নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত। কাউকে বাদ দেওয়ার কোনোরূপ নির্দেশনা নেই। যদি কেউ পরামর্শ দেন ও অন্যরা মেনে নেন তাহলেও অসুবিধা নেই।

কুরআন-হাদীসে সংশি­ষ্ট সকলের পরামর্শ গ্রহণের তাকিদ দেওয়া হয়েছে, তবে পরামর্শ গ্রহণের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি নির্ধারণ করে দেওয়া হয় নি। বরং অন্যান্য জাগতিক ও উপকরণ সংশি­ষ্ট বিষয়াদির মত এ বিষয়কে যুগ, জাতি ও পরিবেশের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। সংশি­ষ্ট মানুষদের অবস্থা অনুসারে সরাসারি সকল নাগরিকের, তাদের প্রতিনিধিদের, গোত্রপতিদের, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের বা সামাজিক নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে পরামর্শ গ্রহণ করা যেতে পারে। এরূপ পরামর্শ গ্রহণ মুখে হতে পারে বা গোপন ব্যালটে হতে পারে। এক্ষেত্রে পরামর্শ গ্রহণের কোনো একটি পদ্ধতিকে ইসলামী বা ইসলাম বিরোধী বলে গণ্য করার কোনো সুযোগ নেই।
সাহাবীগণের যুগে বা পরবর্তী যুগে ছিল না বলে বা প্রাচীন ফিকহের গ্রন্থে লেখা নেই বলে সার্বজনীন ভোট ব্যবস্থা, ৪ বা ৫ বৎসর পরে ভোট গ্রহণের ব্যবস্থা বা পরামর্শ গ্রহণের অনুরূপ কোনো পদ্ধতিকে ইসলাম বিরোধী বলে চিন্তা করা আর মাদ্রাসায় পরীক্ষা ব্যবস্থা, সনদ প্রদানের ব্যবস্থা, ছাপানো বই পড়ার ব্যবস্থা বা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া ব্যবহার ইসলাম বিরোধী বা নিষিদ্ধ বলে চিন্তা করা একই ধরনের অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তি।


দ্বিতীয়ত: রাষ্ট্রের মালিকান জনগণের
মালিকানা দু প্রকারের। সকল কিছুর প্রকৃত মালিকানা মহান আল্লাহর। তিনিই মালিক, রাজা বা sovereign । পাশাপাশি জাগতিকভাবে মানুষকে দুনিয়াতে তার সম্পদের মালিকানা প্রদান করা হয়েছে এবং মালিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এভাবে রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের।
আমরা দেখেছি যে, প্রাচীন ব্যবস্থায় রাজা ছিলেন sovereign বা সার্বভৌম। রাজ্যের সকল সম্পদ ও নাগরিকের সর্বোচ্চ বা প্রশ্নাতীত মালিকানা (sovereignty) ছিল তার একার। তিনি নিজের প্রয়োজন, সুবিধা ও ইচ্ছামত তা ব্যবহার করবেন, এতে কারো কোনো আপত্তি বা প্রশ্ন করার অধিকার ছিল না। পক্ষান্তরে ইসলামে রাষ্ট্রের মালিকান নাগরিকগণের। নিজের মালিকানাধীন জমিন যেমন মুমিন আল্লাহর নির্দেশের আওতায় নিজের প্রয়োজন, সুবিধা ও ইচ্ছামত ব্যবহার করতে পারেন, তেমনি রাষ্ট্রের জনগণ রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা ও সম্পদ আল্লাহর নির্দেশের আওতায় থেকে নিজেদের প্রয়োজন ও সুবিধা অনুসারে ব্যবহার করবেন।

নিজের মালিকানাধীন সম্পদ, অর্থ ও অন্যান্য বিষয়ের ন্যায় রাষ্ট্রের বিষয়াবলিও আল্লাহর নির্দেশ মত পরিচালনা করার বিষয়ে জনগণ দায়বদ্ধ। এ দায় পালনের জন্য শাসক তাদের প্রতিনিধি এবং তাদের কাছে জবাবদিহী। শাসক রাষ্ট্রের মালিক নন, বরং জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালন করেন। তিনি জনগণের কাছে জবাবাদিহী। জনগণ তাকে যে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করতে পারে, শাসন ও সংশোধন করতে পারে। এজন্যই শাসক বা সরকার নির্বাচনে জনগণের পরামর্শ গ্রহণের নির্দেশনা। জনগণের মধ্য থেকে তাদের পরামর্শে সরকার নির্বাচিত হবেন। আর তাদের কর্মকান্ডের জন্য তারা জনগণের কাছে জবাবদিহী থাকবেন।

তৃতীয়ত: শাসকের কোনো অভ্রান্ততা বা পবিত্রতা নেই
ইসলামের দৃষ্টিতে শাসক কখনোই আল্লাহর খলীফা বা স্থলাভিষিক্ত (successor/vicar) নন। অন্য সকল মানুষের মতই তিনি আল্লাহর বিধান ও ব্যবস্থার অধীন। মহান আল্লাহ রাষ্ট্র পরিচালনা ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য যে মূলনীতি প্রদান করেছেন তা পালন করতে তিনি বাধ্য। রাষ্ট্রপরিচালনা বিষয়ে ইসলাম কিছু মূলনীতি দিয়েছে, যেগুলির মধ্যে রয়েছে জাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সকলের মৌলিক নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণ করা, জীবন, জীবিকা, ধর্ম, বাসস্থান ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জনগণের পরামর্শ গ্রহণ করা, বৈষম্যহীন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, অপরাধীর সঠিক শাস্তি নিশ্চিত করা ইত্যাদি। বিচার ও শাস্তির ক্ষেত্রে ইসলামে কিছু শাস্তি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, যেগুলি সমাজের অপরাধ দমন করে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করে। অন্যান্য অপরাধে শাসক, সরকার বা প্রশাসন প্রয়োজনীয় যুগোপযোগী শাস্তির ব্যবস্থা করবেন। এ সকল মূলনীতি ও বিধিবিধান প্রয়োগের ক্ষেত্রে এবং ইসলামের নির্দেশনার ব্যাখ্যা প্রদানে শাসকের নিজস্ব কোনো পবিত্রতা বা অভ্রান্ততা নেই। জনগণের শাসনে, নির্দেশ দানে বা আল্লাহর বিধানের ব্যাখ্যায় তাঁর নিজের মতের কোনো বিশেষ মূল্য নেই। তার ব্যাখ্যা বা সিদ্ধান্ত ভুল বলে মনে হলে যে কেউ তার সমালোচনা এবং ভুল সংশোধন করতে পারেন।

অন্যান্য মুআমালাতের ন্যায় রাষ্ট্রনীতি ও আইন-বিচারের ক্ষেত্রে ইসলামে মূলনীতি দেওয়া হয়েছে এবং প্রায়োগিক ক্ষেত্রে প্রশস্ততা প্রদান করা হয়েছে। কয়েকটি অপরাধের জন্য শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু শাস্তি প্রদানের প্রক্রিয়া কঠিন করা হয়েছে। নীতি, বিধান ইত্যাদির ব্যাখ্যা ও প্রয়োগে কারো অভ্রান্ততা দেওয়া হয় নি। এজন্য মুসলিম দেশগুলিতে কখনোই ইউরোপের মত স্বৈরাচার বা থিওক্র্যাসি প্রতিষ্ঠিত হয় নি।
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় আলিমগণ কখনো ধর্মের নামে ক্ষমতা গ্রহণ করেননি। আলিমগণ কুরআন-হাদীসের নীতিমালা ব্যাখ্যা করেছেন আর শাসকগণ প্রয়োগ করেছেন। উভয় বিভাগেরই স্বকীয়তা ও স্বাধীনতা ছিল। ব্যাখ্যায় ভুল হয়েছে বলে মনে হলে শাসকগণ তা প্রত্যাখ্যান করেছেন ও সকল আলিমের পরামর্শ নিয়েছেন। প্রয়োগে ও বাস্তবায়নে ভুল হয়েছে মনে করলে জনগণ ও আলিমগণ প্রতিবাদ করেছেন। সকল স্বৈরাচারের মধ্যেও শাসকের সমালোচনা, কম বেশি বাকস্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, গবেষনা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত ছিল। কখনোই কোনো মুসলিম রাষ্ট্রে ধর্মের নামে ভিন্মমতাবলম্বী বা ভিন্নধর্মীয়দের উপর নিয়মতান্ত্রিক বা রাষ্ট্রীয় নির্যাতন করা হয় নি। খৃস্টীয় অষ্টম শতক থেকে অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতক পর্যন্ত ইউরোপ, ভারত, মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের যে কোনো অমুসলিম দেশের সাথে সে যুগের মুসলিম দেশগুলির অবস্থা তুলনা করলে যে কোনো গবেষক নিশ্চিত হবেন যে, মুসলিম দেশগুলিতে সকল ধর্মের মানুষ সর্বোচ্চ নাগরিক অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করেছেন।

[1] সূরা (৪২) শূরা: আয়াত ৩৮।

‘‘তন্ত্র’’ বা cracy একটি আধুনিক পরিভাষা। বাংলায় ‘‘তন্ত্র’’ শব্দটির অনেক অর্থ রয়েছে, যেমন, শাস্ত্র, বিদ্যা, প্রাধান্য, রাজ্যশাসন পদ্ধতি ইত্যাদি। এখানে আমাদের উদ্দেশ্য হলো ‘‘রাজ্যশাসন পদ্ধতি’’, যা ইংরেজি (cracy) শব্দের অনুবাদ হিসেবে ব্যবহৃত। ইংরেজি (cracy) শব্দটি গ্রীক (kratos) শব্দ থেকে আগত, যার অর্থ (power, strength, rule) ক্ষমতা, শক্তি, শাসন ইত্যাদি। বিশ্বের অতীত ও বর্তমান বিভিন্ন ‘‘রাজ্যশাসন পদ্ধতি’’ পর্যালোচনা করলে আমরা বলতে পারি যে, রাজ্যশাসন পদ্ধতি মূলত দূ প্রকারের হতে পারে:
(১) জনগণের অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে এবং
(২) শাসকের একচ্ছত্র ক্ষমতার ভিত্তিতে। দ্বিতীয় পদ্ধতিতে শাসকের একচ্ছত্র অধিকার ও ক্ষমতার উৎস তার বংশ বা দখল হতে পারে বা ‘‘ঐশ্বরিক’’ হতে পারে। শাসক নিজের বংশ বা দখলের অধিকারে রাষ্ট্রের সকল কিছুর মালিকানা দাবি করবেন অথবা নিজেকে ‘‘ঈশ্বরের’’ প্রতিনিধি হিসেবে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী বলে দাবি করবেন।

আধুনিক পরিভাষায় ‘‘রাজ্যশাসনের’’ প্রথম পদ্ধতি ‘‘গণতন্ত্র’’ (Democracy) এবং দ্বিতীয় পদ্ধতি ‘‘স্বৈরতন্ত্র’’ (Autocracy) নামে পরিচিত। আর যদি শাসক বা শাসকগোষ্ঠী তাদের ঈশ্বরের প্রতিনিধিত্ব বা ধর্মীয় অভ্রান্ততা দাবি করেন তাহলে তা ‘‘পুরোহিততন্ত্র’’, ‘‘যাজকতন্ত্র’’ বা (Theocracy) নামে পরিচিত। এখন প্রশ্ন হলো, ইসলামের উপর্যুক্ত ‘‘রাজ্যশাসন পদ্ধতি’’-কে আমরা কোন্ প্রকারের বলে গণ্য করব?
আমরা অনেক সময় বলি যে, ইসলাম ইসলামই, একে কোনো তন্ত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। কথাটির মধ্যে সত্যতা রয়েছে। তবে যে ব্যক্তি ইসলামকে ভালভাবে জানেন না, তাকে ইসলামের বিষয় বুঝাতে হলে তাঁর ভাষায় বা পরিভাষায় অনুবাদ করেই তাঁকে বুঝাতে হবে। এছাড়া ইসলাম একটি পরিপূর্ণ ধর্ম, যার মধ্যে, বিশ্বাস, কর্ম, আচার আচরণ, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সকল বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। ‘‘ইসলাম’’ বললে এগুলির সমষ্টি বুঝায়। রাজ্যশাসন পদ্ধতি বিষয়ে ইসলামের দিক নির্দেশনার সমষ্টিকে আমরা সহজবোধ্যভাবে কী বলতে পারি? ইসলামের রাজ্যশাসন পদ্ধতি কি গণতন্ত্র? না স্বৈরতন্ত্র? না পুরোহিততন্ত্র? অন্তত এর কোন্টির সবচেয়ে নিকটবর্তী?

উপরের আলোচনা থেকে আমরা সহজেই অনুধাবন করতে পারি যে, ইসলামের রাজ্যশাসন পদ্ধতি ‘‘গণতান্ত্রিক’’। কিন্তু ধর্মের সাথে সংশি­ষ্টতার কারণে পাশ্চাত্য গবেষকগণ একে (Theocracy) বলে উল্লেখ করেছেন। Theocracy শব্দটি গ্রীক (theokratia) থেকে আগত। এর অর্থ (government by a god) বা একজন দেবতার সরকার। এ ব্যবস্থায় দেবতা, ঈশ্বর বা মহান স্রষ্টাকে একচ্ছত্র ক্ষমতা ও সর্বোচ্চ মালিকানার অধিকারী (ংড়ষব ংড়াবৎবরমহ) এবং সকল আইনকে ঈশ্বরের নির্দেশ বলে গণ্য করা হয়। স্বভাবতই দেবতা বা ঈশ্বর নিজে শাসন করেন না। কাজেই ঈশ্বরের নামে পুরোহিতগণ বা রাজাই শাসন পরিচালনা করেন। তবে তারা নিজেদেরকে ‘‘ঈশ্বরের প্রতিনিধি’’ বলে দাবি করেন এবং তাদের আদেশ নিষেধকে অলঙ্ঘনীয় ঐশ্বরিক নির্দেশ বলে গণ্য করেন।
ইসলামে আল্লাহকে সর্বোচ্চ মালিকানার অধিকারী (sovereign) বলে বিশ্বাস করা হয়। তিনিই হুকুম, নির্দেশ বা বিধান প্রদানের অধিকারী। কিন্তু এর অর্থ এ নয় যে, ইসলামী শাসনব্যবস্থা থিওক্রাটিক। থিওক্র্যাসির সাথে ইসলামের মৌলিক পার্থক্য হলো, থিওক্র্যাসিতে রাজা বা পুরোহিতগণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তারা ধর্মের নামে বা ঈশ্বরের নামে যে ব্যাখ্যা, আইন বা বিধান প্রদান করবেন তা মান্য করা জনগণের ‘‘ধর্মীয়’’ দায়িত্ব এবং অমান্য করা ‘‘ধর্মদ্রোহিতা’’। থিওক্রাসী হলো ঈশ্বরের বা ধর্মের নামে স্বৈরতন্ত্র।

থিওক্র্যাসির মূল প্রেরণা বর্ণনা করে রাজা প্রথম জেমস (১৫৬৬-১৬২৫) বলেন: The state of monarchy is the supremest thing upon earth: for kings are not only god's lieutenants upon earth, and sit upon God's throne, but even by God himself they are called gods.
‘‘রাজার অবস্থানই পৃথিবীর উপরে সর্বোচ্চ বিষয়। কারণ, রাজাগণ পৃথিবীর বুকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি এবং ঈশ্বরের সিংহাসনে আসীন। শুধু তাই নয়, সর্বোপরি স্বয়ং ঈশ্বর তাদেরকে ঈশ্বর বলে আখ্যায়িত করেছেন।’’ (মাইক্রোসফট এনকার্টা)
পক্ষান্তরে ইসলামে আল্লাহর নির্দেশ, হুকুম বা বিধান সকল মানুষের জন্য উন্মুক্তভাবে প্রদান করেছেন। ‘‘রাজ্যশাসন’’ বিষয়েও আল্লাহ মূলনীতি প্রদান করেছেন। এগুলি সবার জন্য উন্মুক্ত। এগুলি হলো সবার জন্য পালনীয় সংবিধানের মৌলিক নীতিমালার মত। এর প্রয়োগে, ব্যাখ্যায় বা আইন প্রণয়নে রাজা বা যাজকগণের কোনোরূপ বিশেষত্ব নেই। বরং রাজ্যশাসন বিষয়ক ইসলামের নীতিমালা ‘লিখিত সংবিধানের’ মত স্বৈরতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও জনগণের অধিকার রক্ষার অন্যতম মাধ্যম।

গণতন্ত্রের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখব যে, গণতন্ত্র অর্থ নির্ধারিত কোনো সরকার ব্যবস্থা নয়। রাজ্যশাসন ব্যবস্থায় যে কোনোভাবে জনগণের অংশীদারিত্ব, পরামর্শগ্রহণ ও জনগণের নিকট জবাবদিহিতার ব্যবস্থা থাকলেই তাকে ‘‘গণতন্ত্র’’ বলা যায়। এ অর্থে মূলত ইসলামই সর্বপ্রথম একটি ‘‘গণতান্ত্রিক’’ রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রদান করে। ইসলামের আগে গ্রীসে ও রোমে গণতন্ত্রের কিছু চর্চা হয়। এরপর তা বিলীন হয়ে যায় এবং বিশ্বের সর্বত্র রাজতান্ত্রিক বা যাজকতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সর্বপ্রথম পরামর্শভিত্তিক প্রতিনিধিত্বমূলক ‘‘গণতান্ত্রিক’’ ব্যবস্থা প্রদান করেন। জনগণতান্ত্রিক এ নতুন ব্যবস্থা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন তৎকালীন প্রেক্ষাপটে কষ্টকর ছিল। খিলাফতে রাশেদার পরেই এর থেকে কমবেশি বিচ্যুতি শুরু হয়। তবে ইসলামের ইতিহাসের যে কোনো যুগের স্বৈরাচারী শাসকদের সাথে সে সময়ের ইউরোপের চার্চ ও খৃস্টান শাসকদের অবস্থা তুলনা করলে যে কোনো গবেষক নিশ্চিত হবেন যে, এ মূলনীতির প্রভাব সর্বদা বিদ্যমান ছিল।

৩. ৯. ৪. ইসলামী রাষ্ট্র ও ইসলামী আইন-বিচার

ইসলামের অপরাধ আইন (criminial law) সম্পর্কে ভয়ঙ্কর বিভ্রান্তি ও অপপ্রচার পাশ্চাত্যে ও মুসলিম সমাজগুলিতে বিদ্যমান। ইসলামী অপরাধ আইনের কিছু বিষয়কে আংশিকভাবে উপস্থাপন করে এগুলির ভিত্তিতে ইসলামী আইন, বিচার ও বিচারব্যবস্থাকে বর্বর, মধ্যযুগীয় এবং পুরোহিততান্ত্রিক বলে অপপ্রচার করা হয়। আবার অনেক আবেগী মুসলিম ইসলামী অপরাধ আইনের কয়েকটি দিককেই ‘‘ইসলামী আইন’’, এগুলির অনুপস্থিতিকে ইসলামী আইন ও বিচার ব্যবস্থার অনুপস্থিতি এবং এগুলি প্রতিষ্ঠা করাই ইসলামী রাষ্ট্রের একামত্র পরিচয় বলে মনে করেন।

যে কোনো রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব (১) নাগরিকদের বৈষম্যহীন অধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা (২) বহির্শত্রুর আগ্রাসন থেকে রাষ্ট্র ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ইসলামেও এ দুটি বিষয়কে রাষ্ট্রের মূল দায়িত্বগুলির অন্যতম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয় দায়িত্ব পালনের জন্য ইসলামে ‘‘জিহাদ’’-এর বিধান প্রদান করা হয়েছে। আর প্রথম দায়িত্ব পালনের জন্য ইসলামে আইন ও বিচারব্যবস্থা বিষয়ক নীতিমালা প্রদান করা হয়েছে।

ইসলামী আইন ও আইন প্রয়োগের দুটি দিক রয়েছে: (১) আইন ও (২) বিচারব্যবস্থা। ইসলামী আইন বিষয়ে অনেক অপপ্রচার থাকলেও যে কোনো মতের ও ধর্মের গবেষক ইসলামী বিচারব্যবস্থার শ্রেষ্ঠতের বিষয়ে নিশ্চিত হবেন। বিচারকের নিরপেক্ষতা, বিচারের সচ্ছতা, সাক্ষ্য গ্রহণ, সাক্ষ্য-প্রমাণের সঠিকত্ব প্রমাণ, অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, সন্দেহের সুযোগ ইত্যাদির মাধ্যমে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকললের জন্য ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলাম অত্যন্ত কার্যকর, মানবিক ও সচ্ছ বিচারব্যবস্থা প্রদান করেছে। আধুনিক বিশ্বের প্রায় সকল দেশের বিচারব্যবস্থার অনেক বিষয় ইসলামী বিচারব্যবস্থা থেকে গৃহীত।

ইসলামের পারিবারিক, সামাজিক, বাণিজ্যিক, সাম্পদিক, অধিকার বিষয়ক ও অন্যান্য সকল দেওয়ানী (civil) আইনের বিষয়েও অবিকল একই কথা বলতে হবে। বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই বিচার ব্যবস্থার পাশাপাশি দেওয়ানী, সামাজিক, পারিবারিক ও অন্যান্য বিষয়ে ইসলামী আইন গৃহীত, প্রচলিত বা স্বীকৃত হয়েছে। আমাদের দেশের ও অন্যান্য মুসলিম দেশের বিচারব্যবস্থা ও দেওয়ানী আইন সবই মূলত ইসলামী।

এগুলির পাশাপাশি ইসলামে ‘‘অপরাধ আইন’’ রয়েছে। বিশ্বের সকল দেশের অপরাধ-আইনের উদ্দেশ্য অপরাধীর শাস্তি ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ। ইসলামের অপরাধ আইনেরও একই উদ্দেশ্য। পার্থক্য শাস্তির প্রকৃতিতে। ইসলামে অল্প কয়েকটি অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট সকল অপরাধের ক্ষেত্রে যুগ, জাতি ও সমাজের প্রেক্ষাপটে শাসক, পার্লামেন্ট, সরকার বা বিচারক শাস্তির প্রকৃতি নির্ধারণ করতে পারেন।

ইসলামে নির্ধারিত শাস্তিগুলি নিম্নরূপ: (১) ইচ্ছাকৃত হত্যার শাস্তি মৃত্যুদন্ড। (২) ইচ্ছাকৃত অঙ্গহানির শাস্তি অনুরূপ অঙ্গহানি। (৩) চুরির শাস্তি কব্জি থেকে হাত কেটে দেওয়া। (৪) ব্যভিচারের শাস্তি ১০০ বেত্রাঘাত ও বিবাহিত ব্যভিচারীর শাস্তি মৃত্যুদন্ড। (৫) কারো বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ করে তা ৪ জন সুস্পষ্টভাবে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর মাধ্যমে প্রমাণ করতে না পারলে অভিযোগকারী ও সাক্ষীগণের শাস্তি ৮০ বেত্রাঘাত। (৫) জেনে বুঝে ইসলাম গ্রহণ করার পর ইচ্ছাকৃতভাবে ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগের শাস্তি মৃত্যুদন্ড। (৬) মদপানের শাস্তি ৪০ বা ৮০ বেত্রাঘাত।

এ সকল শাস্তি কেবলমাত্র মুসলিম নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য। বিশেষত ব্যভিচার ও মদপানের উপর্যুক্ত শাস্তি একান্তভাবেই মুসলিম অপরাধীর জন্য প্রযোজ্য। কোনো মুসলিম নাগরিক এ সকল অপরাধে লিপ্ত হয়েছেন বলে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলে তিনি এ শাস্তি ভোগ করবেন। অমুসলিমদের জন্য এ সকল শাস্তি প্রযোজ্য নয়। তারা তাদের ধর্মীয় আইনে বা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় আইনে বিচার ও শাস্তি ভোগ করবেন।

হত্যা, অঙ্গহানি ও চুরি এ তিনটি অপরাধের বিষয়ে কারো দ্বিমত নেই। তবে শাস্তির প্রকৃতি সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। ইসলামী শাস্তিকে পাশ্চাত্য পন্ডিতগণ কঠোর বা মধ্যযুগীয় বলে দাবি করেন। ব্যভিচার, মদপান ও ধর্মত্যাগকে তারা অপরাধ বলে গণ্য করতে নারাজ। এগুলির শাস্তিপ্রদানকেও তারা মধ্যযুগীয় ও ধর্মান্ধতা বলে আখ্যায়িত করেন। প্রকৃত সত্য হলো, ‘‘অপরাধ নিয়ন্ত্রণ’’-এর লক্ষ্য অর্জনে ইসলামী বিচারব্যবস্থা ও ইসলামী দেওয়ানী আইন-এর পাশাপাশি ইসলামী অপরাধ-আইনের সঠিক বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় সহায়ক। এ সকল আইন কঠোর হলেও তা অমানবিক বা বর্বর নয়; বরং মানবতার সংরক্ষণে ও বর্বরতা নিয়ন্ত্রণে তা সর্বোচ্চ সহায়ক। এখানে নিম্নের বিষয়গুলি লক্ষণীয়:

(১) ইসলামের এ সকল শাস্তি যেমন কঠোর করা হয়েছে প্রয়োগ তার চেয়ে অনেক কঠিন ও প্রায় অসম্ভব করা হয়েছে, যেন কোনোভাবেই নিরপরাধ বা কম অপরাধী শাস্তি না পায়। অপরাধ শতভাগ প্রমাণিত হওয়া, অপরাধে লিপ্ত হওয়ার কোনোরূপ ওযর না থাকা এবং অপরাধের শাস্তিযোগ্যতার পর্যায় নিশ্চিত হওয়া এ সকল নির্ধারিত শাস্তি প্রয়োগের পূর্বশর্ত। সামান্য সন্দেহ হলে বিচারক অপেক্ষাকৃত হালকা শাস্তি প্রদান করবেন। হত্যা, অঙ্গহানী ইত্যাদি ক্ষেত্রে নিহতের উত্তরাধিকারিগণ বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ইচ্ছা করলে ক্ষতিপূরণ নিয়ে বা কিছু না নিয়ে ক্ষমা করতে পারেন। ব্যভিচারের ক্ষেত্রে চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী অথবা ব্যক্তির স্বেচ্ছায় স্বীকৃতির ভিত্তিতেই বিচার শুরু হতে পারে। সাক্ষীগণের সাক্ষ্য ত্রুটিপূর্ণ হলে সাক্ষীগণ ও অভিযোগকারী প্রত্যেকে ৮০ বেত্রাঘাত শাস্তি ভোগ করবেন। উপরন্তু সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও বিচারিক সকল ক্ষেত্রে তাদেরকে স্থায়ীভাবে ‘‘সাক্ষ্যদানের অযোগ্য’’ বলে ঘোষণা দেওয়া হবে। স্বেচ্ছায় স্বীকৃতি প্রদানকারী ব্যক্তি পরে অস্বীকৃতি জানালে তার অস্বীকৃতিই কার্যকর হবে।


(২) বস্ত্তত, এ সকল শাস্তির উদ্দেশ্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণ। সহজ শাস্তির মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ হয় না। এছাড়া শাস্তি সহজ হলে নিরপরাধের শাস্তি পাওয়ার সুযোগ বেশি হয়। শাস্তি হালকা হওয়ার কারণে বিচারক সহজেই শাস্তি দেন এবং শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিরপরাধ হলেও তা মেনে নেন। আর কঠিন শাস্তির ক্ষেত্রে বিচারক, সমাজ, রাষ্ট্র, বিচারকৃত ব্যক্তি সকলেই অত্যন্ত সজাগ থাকেন, যেন নিরপরাধ শাস্তি না পায় বা অল্প অপরাধে কঠিন শাস্তি না হয়।


(৩) অপরাধ বিষয়ক গবেষণা প্রমাণ করে যে, অল্পসংখ্যক অপরাধীর শাস্তি দিয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা ইসলামী আইনের মাধ্যমেই সম্ভব। অতীতের মুসলিম সমাজগুলিতে খুব কম মানুষেরই হাত কাটা হয়েছে বা মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শাস্তির ভয়াবহতার কারণে অপরাধ কম সংঘটিত হয়েছে। বর্তমানেও সৌদি আরব, ইরান, পাকিস্তান, উপসাগরীয় ও মধ্যপ্রাচীয় কয়েকটি দেশে এ সকল শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে খুব কম সময়ে এ সকল শাস্তি প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু শাস্তির বিদ্যমানতার কারণে অপরাধী ভয় পায়। পক্ষান্তরে পাশ্চাত্য ব্যবস্থায় শাস্তির মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ হয় না, বরং অপরাধীর মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পায়।


(৪) পাশ্চাত্যে অধিকাংশ দেশে ‘ড্রাগস’ বা ‘মাদকদ্রব্য’ গ্রহণ ও বিপনন শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও মদপান অপরাধ নয়। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, ব্যক্তি ও সমাজের ক্ষতির দিক থেকে মদ ও ড্রাগস উভয়ই সমান, বরং মদের ক্ষতি অধিক। প্রায় আড়াই শতাব্দী ধরে ইউরোপ ও আমেরিকায় মদ নিষিদ্ধ ও নিয়ন্ত্রণ করার জন্য অনেক আন্দোলন হয়েছে। নারীরা এ সকল আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। এ সকল আন্দোলনের ভিত্তিতে গত শতাব্দীতে ইউরোপের অনেক দেশে মদ নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়। আমেরিকায় ১৯২০ সালে মদ নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু মদব্যবসায়ীদের চাপে ১৯৩৩ সালে তা আবার বৈধ করা হয়।
মাদকাসক্তি/মদ-নির্ভরতা (Alcoholism/Alcohol Dependence) আধুনিক সভ্যতার ভয়ঙ্করতম ব্যধিগুলির অন্যতম। বিশ্বে অগণিত সফল ব্যবসায়ী, চাকুরীজীবি, টেকনিশিয়ান, শ্রমিক ও অনুরূপ সফল মানুষের জীবন ও পরিবার ধ্বংস হয়েছে মদের কারণে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুসারে বিশ্বের ৭৬ মিলিয়ন মানুষ মদ পানের কারণে সৃষ্ট বিভিন্ন রকমের কঠিন রোগে ভুগছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার শতকরা ১৫ ভাগ এবং রাশিয়ার মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ মদপান জনিত মারাত্মক রোগব্যধিতে ভুগছেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ মদপান ও মদ-নির্ভরতাকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যা বলে চিহ্নিত করছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুসারে বর্তমান বিশ্বের সকল রোগব্যাধির শতকরা ৩.৫ ভাগ মদপান জনিত। মদপান ও মাতলামির কারণে প্রতি বৎসর শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই ১৮৫ বিলিয়ন ডলার নষ্ট হয়।[1] ইসলাম ঈমান ও আল্লাহর ভয়ের পাশাপাশি আইনের মাধ্যমে এ ভয়ঙ্কর ব্যাধিকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করেছে। এ আইনে একমাত্র মদব্যবসায়ী ছাড়া কারো কোনো ক্ষতি হয় না, শাস্তিপ্রাপ্তের সংখ্যা বাড়ে না কিন্তু এ আইনের মাধ্যমে এ ভয়ঙ্কর ব্যাধি নির্মূল হয় বা নিয়ন্ত্রিত হয়।

(৫) ইহূদীধর্ম, খৃস্টধর্ম ও অন্য সকল ধর্মেই ব্যভিচারকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ, বিশেষত বাইবেলে ব্যভিচার ও সকল প্রকার অবৈধ যৌনতাকে মৃত্যুদন্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতায় ধর্ষণকে অপরাধ বলা হলেও ব্যভিচারকে বৈধ করা হয়েছে এবং বিষয়টিকে মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কিন্তু ‘ড্রাগস’ বিক্রয় ও গ্রহণকে এভাবে ব্যক্তিস্বাধীনতা হিসেবে গণ্য করা হয় না। অথচ ব্যক্তি, সমাজ ও মানবসভ্যতার জন্য ড্রাগসের চেয়ে ব্যভিচার অনেক বেশি ক্ষতিকর। আধুনিক সভ্যতা প্রমাণ করেছে যে, ব্যভিচারের মাধ্যমে পরিবার নষ্ট হয়, সন্তানগণ পারিবারিক স্নেহ ও প্রতিপালন থেকে বঞ্চিত হয়, তাদের মধ্যে মানবীয় মূল্যবোধের বিকাশ ব্যহত হয় এবং হিংস্রতা বৃদ্ধি পায়। বস্ত্তত ড্রাগসের কারণে ব্যক্তির জীবন নষ্ট হয় আর ব্যভিচারের মাধ্যমে মানবসভ্যতা বিনষ্ট হয়। এজন্য ইসলামে মদপান, মাদকদ্রব্য গ্রহণ, বিপনন ও ব্যভিচারকে কাছাকাছি পর্যায়ের কঠিন অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।


(৬) ইহূদী-খৃস্টীয় ধর্মগ্রন্থ বাইবেলে বিধর্মী ও ধর্মত্যাগীর মৃত্যুদন্ডের বিধান রয়েছে। যদি কোনো গ্রাম বা নগরীর অধিবাসীরা ধর্মত্যাগ করে তাহলে তথাকার সকল মানুষকে অবশ্যই হত্যা করতে হবে এবং সকল পশুও হত্যা করতে হবে। তথাকার সকল সম্পদ ও দ্রব্যাদি পুড়িয়ে ফেলতে হবে। অগ্নিদগ্ধ জনপদটি চিরিকালীন ঢিবি হয়ে থাকবে। কখনোই আর তা পুনর্বার নির্মিত হবে না। উপরন্তু ধর্মের নির্দেশ সামান্য লঙ্ঘন করলেও মৃত্যুদন্ডের বিধান দেওয়া হয়েছে। যেমন, শনিবারে খড়ি কুড়ালে বা কর্ম করলে তাকে জনসমক্ষে পাথর মেরে মৃত্যুদন্ড দেওয়ার বিধান রয়েছে।[2] ইসলাম অন্য ধর্মের অনুসারীদের ইসলাম গ্রহণের জন্য চাপপ্রয়োগ বা প্রলোভন নিষিদ্ধ করেছে। পাশাপাশি মুসলিমের জন্য অন্যধর্ম গ্রহণ মৃত্যুদন্ডযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য করেছে। ইসলামী রাষ্ট্রের স্থিতি বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্র রোধ করতেই এ বিধান দেওয়া হয়েছে। যারা বাইবেলকে ঈশ্বরের বাণী বলে বিশ্বাস করেন তাদের মুখে এবং আধুনিক যুগে যারা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষার নামে অমানবিক আইন তৈরি করছেন বা সমর্থন করছেন তাদের মুখে ইসলামের এ আইনকে অমানবিক বলা মোটেও মানায় না।


(৭) মুমিন বিশ্বাস করেন যে, কিভাবে মানুষের অপরাধ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং কোন্ অপরাধে কোন্ শাস্তি সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য তা মহান স্রষ্টা আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন। আইনের বিষয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মহান আল্লাহ প্রশস্ততা দিয়েছেন এবং যুগ ও সমাজের আলোকে আইন তৈরির সুযোগ দিয়েছেন। শুধু যে সকল বিষয়ে প্রয়োজন সেক্ষেত্রেই তিনি শাস্তি নির্ধারিত করে দিয়েছেন।
মুমিনের ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ মহান আল্লাহর বিধানের শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাস করা। সালাত, সিয়াম, বিবাহ ইত্যাদি সকল বিষয়ের ন্যায় বিচারব্যবস্থা, দেওয়ানী আইন ও অপরাধ আইনের ক্ষেত্রেও আল্লাহর নির্দেশ মান্য করা মুমিনের ঈমান ও ইসলামের দাবী। যদি কোনো মানুষ মনে করেন যে, সালাতের ক্ষেত্রে কুরআনের নির্দেশ সর্বজনীন, সর্বকালীন এবং সর্বোত্তম, কিন্তু বিচারের ক্ষেত্রে কুরআনের নির্দেশ সর্বোত্তম নয় বা সর্বজনীন নয় তাহলে তিনি মুমিন বলে নিজেকে দাবি করতে পারেন না।


(৮) অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী যে কোনো দেশের জন্য ইসলামী আইনের বাস্তবায়ন এ আগ্রহ পূরণের অন্যতম সহায়ক। বিশেষত মুসলিম দেশগুলির আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা অবস্থার উন্নয়নে ইসলামী অপরাধ-আইন বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। সকল মুসলিম দেশের সরকার ও প্রশাসনের দায়িত্ব আল্লাহর প্রতি ঈমান, ধর্মীয় প্রেরণা, দেশপ্রেম ও নাগরিকদের স্বার্থে ইসলামী আইনের সঠিক বাস্তবায়নে সচেষ্ট হওয়া।


(৯) আল্লাহর পথে আহবানকারী যেমন সালাত, সিয়াম, যিকর ইত্যাদি কুরআন নির্দেশিত ইবাদত বাস্তবায়নের আহবান করবেন, তেমনি কুরআন নির্দেশিত আইন, বিচার ইত্যাদির বাস্তবায়নের আহবান করবেন। সালাত পালনে আল্লাহর নির্দেশের অবহেলা যেমন তাকে ব্যথিত করে, বিচার পালনে আল্লাহর নির্দেশের অবহেলাও তাকে তেমনি ব্যথিত করে। এ তার ঈমানের দাবি। কুরআন-সুন্নাহর কোনো নির্দেশনার প্রতি অবহেলা দেখে ব্যথিত না হলে ঈমান থাকে না।

(১০) সালাত, সিয়াম ইত্যাদির দাওয়াতের ন্যায় আইন ও বিচার বিষয়ক দাওয়াতও বিনম্রতা, উত্তম আচরণ ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে হতে হবে। কোনো অবস্থাতেই সহিংসতা বা বলপ্রয়োগ মুমিনের জন্য বৈধ নয়। আল্লাহর কোনো নির্দেশ অমান্য হতে দেখলে কোনোরূপ ব্যাথা ও আপত্তি হৃদয়ে অনুভব না করা ঈমান হারাণোর লক্ষণ। সাধ্য থাকা সত্ত্বেও দাওয়াত না দিয়ে নীরব থাকলে পাপ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অন্তত কেউই যদি কথা না বলেন তবে সকলেরই পাপী হওয়ার সম্ভাবনা। বিনম্রতা ও শোভন আচরণের সাথে দাওয়াতের দায়িত্ব আদায় করলে সুনিশ্চিত সাওয়াবের আশা করা যায়। আর অশোভন আচরণ, উগ্রতা, বলপ্রয়োগ বা সহিংসতার আশ্রয় গ্রহণ করলে সুনিশ্চিত কঠিন পাপ অর্জন ছাড়া কোনোই লাভ হবে না। এতে নিজের মনের ক্ষোভ বা প্রতিশোধস্পৃহা পূরণ হতে পারে এবং মুমিনকে জাহান্নমে নেওয়ার ও মুসলিম সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য শয়তান ও তার অনুসারীদের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে পারে, কিন্তু ব্যক্তি মুমিনের বা মুসলিম উম্মাহর ক্ষতি ছাড়া কোনো লাভ হয় না। আমরা দেখছি যে, আমাদের দেশে বিচারব্যবস্থা, দেওয়ানী আইন ও কোনো কোনো অপরাধ-আইন ইসলাম নির্দেশিত বা ইসলাম সম্মত। আর কিছু ইসলামী আইন বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এজন্য কি কোনো মুসলিম সমাজ ও রাষ্ট্রকে কাফির বা অনৈসলামিক রাষ্ট্র বলা বৈধ?

আমরা পরবর্তী অনুচ্ছেদে তা পর্যালোচনা করতে চাই। মহান আল্লাহর কাছে তাওফীক প্রার্থনা করছি।

[1] দেখুন: মাইক্রোসফট এনকার্টা, Articles: Alcohol, Alcoholism, Prohibition, Wine.

[2] বিস্তারিত দেখুন: যাত্রাপুস্তক ৩২ অধ্যায়, ২২ অধ্যায়ের ২০ শ্লোক, ৩৫ অধ্যায়ের ২য় শ্লোক, গণনাপুস্তক: ১৫ অধ্যায়ের ৩২-৩৬। দ্বিতীয় বিবরণ ১৩ অধ্যায়: ১-১৬ শ্লোক; দ্বিতীয় বিবরণ ১৭ অধ্যায় ২-৭ শ্লোক।
৩. ৯. ৫. ইসলামী রাষ্ট্র বনাম অনৈসলামিক রাষ্ট্র

আমরা দেখেছি যে, জামাআতুল মুসলিমীন বা ‘‘তাকফীর ওয়াল হিজরা’’ সংগঠন উপনিবেশোত্তর মুসলিম দেশগুলিকে কাফির রাষ্ট্র বলে গণ্য করে। এ বিষয়ে তাদের বিভ্রান্তি আমরা নিম্নরূপে বিন্যস্ত করতে পারি:
(১) আধুনিক মুসলিম রাষ্ট্রগুলি কাফির রাষ্ট।
(২) কাফির রাষ্ট্র উৎখাত করে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা বড় ফরয।
(৩) এ ফরয পালনের জন্য জিহাদই একমাত্র পথ এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যা কিছু করা হয় সবই জিহাদ বলে গণ্য।
(৪) এ জিহাদ পালনে রাষ্ট্রের নাগরিকদের নির্বিচারে হত্যা করা বৈধ। এভাবে তারা ইসলামী শিক্ষার বিকৃতি সাধন করেছেন। অজ্ঞতা, আক্রোশ ও আবেগ তাদেরকে এ পথে পরিচালিত করে।
অথবা ইসলামকে কলঙ্কিত করতে এবং ইসলামী জাগরণকে থামিয়ে দিতে কৌশলে তাদেরকে বিভ্রান্ত করে এ সকল কথা বলানো হয়েছে। তৃতীয় ও চতুর্থ বিষয়ের বিভ্রান্তি আমরা ইতোপূর্বে আলোচনা করেছি। আমরা দেখেছি যে, জিহাদ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ নয়, জিহাদ প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার পথ। আর জিহাদ শুধু শত্রু বাহিনীর সশস্ত্র যোদ্ধাদের বিরুদ্ধেই পরিচালিত হবে। পারিভাষিক জিহাদ বা রাষ্ট্রীয় যুদ্ধের বাইরে রাষ্ট্র সংস্কার বা রাষ্ট্রে ইসলামী মূল্যবোধ ও বিধিবিধান প্রতিষ্ঠার কর্ম ইসলামী পরিভাষায় জিহাদ নয়, তা হলো ‘‘আল্লাহর পথে দাওয়াত’’ এবং ‘‘ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধ’’। একে পারিভাষিক জিহাদ বলে মনে করা বা এজন্য অস্ত্রধারণ ও হত্যা বৈধ মনে করা ইসলামী শিক্ষার কঠিনতম বিকৃতি ছাড়া কিছুই নয়। আমরা এখানে প্রথম ও দ্বিতীয় বিষয় আলোচনা করতে চেষ্টা করব। আর এ বিষয়ক বিভ্রান্তি বুঝতে হলে আমাদেরকে জানতে হবে, কখন আমরা একটি রাষ্ট্রকে ‘‘ইসলামী রাষ্ট্র’’ বলে গণ্য করব এবং কখন আমার একটি রাষ্ট্রকে ‘‘কাফির রাষ্ট্র’’ বা অনৈসলামিক রাষ্ট্র বলে গণ্য করব?

আগেই বলেছি যে, সাধারণ খুটিনাটি বিষয়ে প্রশস্ততা দেওয়ার জন্য মুআমালাত বিষয়ে ইসলামে অনেক বিষয় উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। তারই একটি প্রকাশ হলো ‘‘দারুল ইসলাম’’ বা ইসলামী রাষ্ট্র ও দারুল কুফর বা কুফরী রাষ্ট্র বিষয়ক কোনো সুনির্ধারিত সংজ্ঞা কুরআন-হাদীসে প্রদান করা হয় নি। এখন যদি আমাদের কাউকে ইসলামী বিবাহ ও কুফরী বিবাহ অথবা ইসলামী পরিবার ও কুফরী পরিবারের ‘‘সুনির্ধারিত সংজ্ঞা’’ জিজ্ঞাসা করা হয় তাহলে আমরা দেখব যে, বিষয়টি বেশ প্রশস্ত। পরিপূর্ণ ইসলামী বিবাহের বা পরিবারের যে ধারণা আমাদের রয়েছে তার কিছু বিচ্যুতি হলেই আমরা সে বিবাহ বা পরিবারকে ‘‘কুফরী’’ বলে গণ্য করতে পারছি না। বরং কুফরী বিবাহ বা পরিবারের ঊধ্বে উঠলেই তাকে ‘ইসলামী’ বলে মানতে বাধ্য হচ্ছি, যদিও পুরোপুরি ইসলামী নয় বলে বুঝতে পারছি।


ইসলামী রাষ্ট্রের বিষয়টিও অনুরূপ। কুরআন ও হাদীসে ইসলামী রাষ্ট্রের কোনো সুস্পষ্ট সংজ্ঞা প্রদান করা হয় নি। মহান আল্লাহ বলেন:

وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَىٰ لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُمْ مِنْ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا وَمَنْ كَفَرَ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ

‘‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে তাদেরকে আল্লাহ ওয়াদা করেছেন যে, অবশ্যই তিনি তাদেরকে পৃথিবীতে স্থলাভিষিক্ত করবেন যেমন তিনি স্থলাভিষিক্ত করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের জন্য তাদের দীনকে যা তিনি তাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং তিনি অবশ্যই তাদের ভয়-ভীতিকে শান্তি-নিরাপত্তায় পরিবর্তিত করবেন। তারা আমার ইবাদত করবে, আমার কোনো শরীক করবে না। এরপর যারা অকৃতজ্ঞ হবে তারাই সত্যত্যাগী।’’[1]
অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন:

الَّذِينَ إِنْ مَكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ

‘‘যাদেরকে আমি পৃথিবীতে ক্ষমতাবান করলে তারা সালাত কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে, ন্যায়ের আদেশ করে এবং অন্যায় থেকে নিষেধ করে। আর কর্মসমূহের পরিণাম আল্লাহরই অধীনে।’’[2]
এ আয়াতদ্বয়ে ইসলামী রাষ্ট্রের কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম আয়াতে দীনের সুদৃঢ়তা, শান্তি-নিরাপত্তায় দীন পালনের স্বাধীনতা এবং নির্ভয়ে আল্লাহর শিরকমুত্ত ইবাদত করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয় আয়াতে সালাত, যাকাত, ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধের বিদ্যমানতা ইসলামী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ সকল আয়াতের আলোকে ফকীহগণ দারুল ইসলাম বা ইসলামী রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রকারের সংজ্ঞা দিয়েছেন। এক্ষেত্রে কেউ কেউ মুসলমানদের রাজনৈতিক আধিপত্যকে মূল বলে গণ্য করেছেন এবং বলেছেন যে, দাও‘আত, যুদ্ধ, সন্ধি, স্বাধীনতা বা অন্য যে কোনোভাবে কোনো দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা মুসলিমদের হাতে আসলে সে দেশ দারুল ইসলাম।[3] অন্যান্য ফকীহ ইসলামী বিধি বিধানের প্রকাশকে মানদন্ড বলে গণ্য করেছেন। তাঁদের ভাষ্যমতে যে কোনো দেশ, রাষ্ট্র বা জনপদে ইসলামের বিধিবিধান প্রকাশিত থাকলে তা দারুল ইসলাম বা ইসলামী রাষ্ট্র বলে গণ্য।[4]

এখানে লক্ষণীয় যে, ব্যক্তি মুমিনের ক্ষেত্রে যেমন পরিপূর্ণ ও আদর্শ মুমিনের পাশাপাশি কম বা বেশি পাপে লিপ্ত পাপী মুমিনদেরকেও মুসলিম বলে গণ্য করা হয়েছে, তেমনি ইসলামী রাষ্ট্র বা ইসলামী দেশের ইসলামের দাবি গ্রহণে প্রশস্ততা অবলম্বন করা হয়েছে। পাপের প্রকাশ, ইসলামী বিধিবিধানের অবমাননা, ইসলামী বিধান লঙ্ঘন, কুরআন বিরোধী বিধিবিধান বা আকীদা বিশ্বাসের প্রকাশের কারণে রাষ্ট্রকে কাফির রাষ্ট্র বলে গণ্য করা হয় নি। মুসলিম উম্মাহর ফকীহ ও ইমামগণ বারংবার উল্লেখ করেছেন যে, কোনো দেশ বা রাষ্ট্র মুসলিম শাসনাধীন হয়ে ‘‘দারুল ইসলামে’’ পরিণত হওয়ার পর শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন, অমুসলিমদের প্রাধান্য বা অন্য কোনো কারণে পুনরায় ‘‘দারুল কুফর’’ বা ‘‘দারুল হরব’’ অর্থাৎ অনৈসলামিক রাষ্ট্র বা শত্রু রাষ্ট্র বলে গণ্য করার ক্ষেত্রে ব্যাপক সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এ বিষয়ে ফকীহগণের বিভিন্ন মতামত রয়েছে। ইমাম আবূ হানীফা (রাহ) বলেন, তিনটি শর্ত পূরণ হলে ইসলামী রাষ্ট্রকে কাফির রাষ্ট্র বলে গণ্য করা যাবে:
(১) কুফরের বিধিবিধান প্রতিষ্ঠিত হওয়া,
(২) কাফির রাষ্ট্রের সাথে সংযুক্ত হওয়া এবং
(৩) উক্ত রাষ্ট্রের মুসলিম ও অমুসলিম সকল নাগরিকের মুসলিমগণ প্রদত্ত নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা বাতিল হওয়া।[5]

ইসলামের ইতিহাসে শীয়াগণ সর্বদা শীয়া রাষ্ট্র ছাড়া সকল সরকার ও রাষ্ট্রকে তাগূতী রাষ্ট্র বলে বিশ্বাস করেছেন। পক্ষান্তরে সাহাবীগণ ও তাঁদের অনুসারী আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আলিমগণ কখনোই এ ধরনের মতামত পোষণ করেননি। এমনকি বাতিনী শিয়া, কারামিতা, ফাতিমী শিয়া ও অন্যান্য গোষ্ঠী যারা প্রকাশ্যে ও সুস্পষ্টভাবে কুরআন-হাদীসের বিধানাবালি ব্যাখ্যা করে অস্বীকার ও অমান্য করত এবং এর ব্যতিক্রম বিধান প্রদান করত তাদের রাষ্ট্রকেও তাগূতী, জাহিলী বা কাফির রাষ্ট্র বলে গণ্য করেননি। বরং এগুলিকে ইসলামী রাষ্ট্র বলেই গণ্য করেছেন।

রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কুরআনের বিধিবিধানের ব্যতিক্রম চলা বা ‘‘আল্লাহর আইনের’’ ব্যতিক্রম বিধান দান উমাইয়া যুগেই শুরু হয়েছে। বিশেষত আববাসী, ফাতিমী, বাতিনী, মোগল ইত্যাদি রাজ্যে ইসলামী বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক সুস্পষ্ট কুফরী বিশ্বাস ও মতবাদকে রাষ্ট্রীয় মতবাদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, ইসলামের আইন বিচার অনেকাংশেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, এমনকি ইসলামের হারাম অনেক বিষয় বিভিন্ন ব্যাখ্যা করে বৈধ করা হয়েছে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে ইহূদী, খৃস্টান, অগ্নিউপাসক বা পৌত্তলিকদের রাষ্ট্রীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আলিমগণ সাধ্যমত এগুলির কঠোর প্রতিবাদ করেছেন, অনেকে সরকারের বিরাগভাজন হয়েছেন, শাস্তিভোগ করেছেন, কিন্তু কখনোই রাষ্ট্র প্রশাসনের এ সকল বিচ্যুতির কারণে এ সকল রাষ্ট্র বা সমাজকে কাফির রাষ্ট্র বা সমাজ বলে গণ্য করেননি, রাষ্ট্র, সরকার বা তাদের অনুগতদের বা নাগরিকদের কাফির বলে গণ্য করেননি বা ‘‘ইসলামী রাষ্ট্র’’ প্রতিষ্ঠার জন্য এরূপ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বা যুদ্ধে লিপ্ত হন নি। বরং এরূপ রাষ্ট্রের আনুগত্য করেছেন, আইন মেনেছেন এবং এদের নেতৃত্বে কাফির রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জিহাদে শরীক হয়েছেন।

উমাইয়া, আববাসী, স্পেনীয়, খারিজীয়, ফাতেমীয়, কারামিতীয়, বাতিনী, তাতার, মুগল ইত্যাদি সকল যুগের সকল রাষ্ট্রকেই মুসলিম আলিম ও ফকীহগণ দারুল ইসলাম বলে গণ্য করেছেন এবং ইসলামী রাষ্ট্রের সকল বিধান সেখানে প্রয়োগ করেছেন। জুমুআ, জামাত, রাষ্ট্রের আনুগত্য, রাষ্ট্র প্রধানের নির্দেশে ও নেতৃত্বে শত্রুদেশের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জিহাদ ইত্যাদি সকল বিধান এ সকল রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে উল্লেখ করেছেন।
বর্তমান বিশ্বের মুসলিম দেশগুলির অবস্থা উমাইয়া যুগ ও পরবর্তী যুগের মুসলিম দেশগুলি থেকে মোটেও ভিন্ন নয়, বরং কিছুটা ভালই বলতে হয়। শাসক নির্বাচন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের পরামর্শ গ্রহণ, জনগণের নিকট জবাবদিহিতা, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, নিরপেক্ষভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও আইন প্রয়োগ ইত্যাদি ইসলামী নির্দেশনা পালনের ক্ষেত্রে এ সকল রাষ্ট্র পূর্ববর্তী রাষ্ট্রগুলি থেকে কিছুটা হলেও উন্নত হয়েছে। এ সকল দেশের অধিকাংশ আইন-কানুন ও বিচার ব্যবস্থা ইসলামী আইন ও বিচার ব্যবস্থা থেকে গৃহীত। ইসলমী বিধানের পরিপন্থী কিছু আইন-কানুনও বিদ্যমান, যেগুলির অপসারণ ও সংশোধনের জন্য মুমিন চেষ্টা ও দাওয়াত অব্যাহত রাখবেন। কিন্তু শাসকদের পাপ, রাষ্ট্র ব্যবস্থার পাপ বা কিছু ইসলাম-বিরোধী আইন-কানুনের জন্য কোনো রাষ্ট্রকে ‘‘দারুল কুফর’’ বা কাফির রাষ্ট্র মনে করার কোনোরূপ ভিত্তি নেই। উপনিবেশোত্তর মুসলিম দেশগুলির স্বৈরাচার, ইসলাম বিরোধী আচরণ ও বিধিবিধান, ধার্মিক মানুষদের প্রতি অত্যাচার ইত্যাদির প্রেক্ষাপটে অনেক আবেগী মুসলিমই অনুভব করেন যে, তার দেশটি একটি অনৈসলামিক দেশ এবং এদেশে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি। আবেগ-তাড়িত মতামত বা কর্ম জাগতিক ফল বা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সহায়ক নয়। আবেগ যাই বলুক না কেন, আমাদেরকে আবেগমুক্ত হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কুরআন-হাদীসের সামগ্রিক নির্দেশনা, ইসলামের ইতিহাসের সকল যুগের রাষ্ট্রগুলির অবস্থা, সেগুলির সংস্কারে আলিম, উলামা, পীর, মাশাইখ ও বুজুর্গগণের কর্মধারার ভিত্তিতে আবেগমুক্ত হয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।


কুরআন-হাদীসের সামগ্রিক নির্দেশনা, উমাইয়া যুগ ও পরবর্তী যুগগুলির বিষয়ে সাহাবী, তাবিয়ী ও তৎপরবর্তী আলিমগণের মতামতের আলোকে আমরা সুনিশ্চিত বুঝতে পারি যে, সমকালীন মুসলিম দেশগুলিকে কাফির রাষ্ট্র বলে গণ্য করার কোনো সুযোগ নেই। সমকালীন কোনো কোনো গবেষক মুসলিম রাষ্ট্র ও ইসলামী রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্য করেছেন। এ পার্থক্য একান্তই গবেষণা। ইসলামী শরীয়তের বিধান প্রদানের ক্ষেত্রে এ পার্থক্যের কোনো গুরুত্ব নেই। শরীয়তের বিধানের আলোকে এগুলি সবই দারুল ইসলাম। আল্লাহর পথে দাওয়াত বা ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধের অংশ হিসেবে মুমিন এ সকল রাষ্ট্রের অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন, সংশোধনের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন, কিন্তু কখনোই রাষ্ট্রীয় আনুগত্য পরিত্যাগ করবেন না বা রাষ্ট্রদ্রোহিতায় লিপ্ত হবেন না।

[1] সূরা (২৪) নূর: আয়াত ৫৫।

[2] সূরা (২২) হজ্জ: আয়াত ৪১।

[3] দেখুন: ইমাম শাফিয়ী, আল-উম্ম ৪/১৯১; ইবনু হাজম, আল-মুহাল্লা ১১/২০০।

[4] দেখুন: সারাখসী, আল-মাসবূত ১০/১৪৪; কাসানী, বাদাইউস সানাইয় ৭/১৩০।

[5] কাসানী, বাদাইউস সানাইয় ৭/১৩০-১৩১; ইবনু আবেদীন, রদ্দুল মুহতার ৩/২৫৩; আল-মাওসূআ আল-ফিকহিয়্যাহ, কুয়েত ২০/২০২।
৩. ৯. ৬. দীন প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্র সংস্কার

আমরা বলেছি যে, ইসলামী জীবন ব্যবস্থার একটি দিক রাষ্ট্র। ইসলামে রাষ্ট্র ব্যবস্থার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। মুসলিম উম্মাহর আলিমগণ উল্লেখ করেছেন যে, সমাজে রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত রাখা মুসলিমদের জন্য ফরয কিফায়া। তবে এ বিষয়ে খারিজীগণ, বিশেষত আধুনিক খারিজীগণ কিছু বিভ্রান্তির মধ্যে নিপতিত হন। তারা দাবি করেন যে, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা বড় ফরয। তাদের দাবীর দুটি বিশেষ দিক লক্ষণীয়: প্রথমত বিশ্বে কোথাও ‘‘ইসলামী রাষ্ট্র’’ নেই, বরং সকল মুসলিম রাষ্ট্রই ‘‘কাফির’’ রাষ্ট্র এবং দ্বিতীয়ত, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সবচেয়ে বড় ফরয। মূলধারার আলিমদের সাথে এদের দাবির পার্থক্য দুটি:
প্রথমত, মূলধারার আলিমগণের মতানুসারে মুসলিম সমাজে বিদ্যমান রাষ্ট্রগুলি বিচ্যুতি ও পাপাচার সত্ত্বেও ‘‘ইসলামী রাষ্ট্র’’ বা ‘‘দারুল ইসলাম’’; কাজেই মুমিনের দায়িত্ব শূন্য থেকে প্রতিষ্ঠা নয়, বরং প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাকে সংস্কার ও সংশোধন করা। সাধারণ নাগরিকদের দায়িত্ব রাষ্ট্র সংস্কার ও সংশোধন। আর রাষ্ট্র প্রশাসন ও সরকারের দায়িত্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত রাখা, শরীয়তের বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় জিহাদ পরিচালনা করা।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, সংশোধন ইত্যাদির দায়িত্ব সাধারণভাবে ফরয কিফায়া, কখনো ফরয আইন, তবে কখনোই বড় ফরয নয়। এখানে লক্ষণীয় যে, সমকালীন প্রাজ্ঞ ও সুপ্রসিদ্ধ কোনো কোনো আলিম ও গবেষকের কিছু কিছু বক্তব্য ‘জামাআতুল মুসলিমীন’ তাদের মতামতের দলীল হিসেবে পেশ করতেন। এ সকল বক্তব্য থেকে তারা যা প্রমাণ করতেন এ সকল আলিম সে অর্থে তাঁদের কথা বলেন নি। ইসলামী দাওয়াত, আন্দোলন, সমাজ পরিবর্তন, দীনের বিজয়, দীন প্রতিষ্ঠা, জাহিলী সমাজ বর্জন ইত্যাদি বিষয়ে গুরুত্ব বুঝাতে তারা যে সকল কথা বলেছেন এ সকল আবেগী যুবক সেগুলিকে ‘‘বেদবাক্যের’’ মত আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করে তাদের আবেগকে আরো বেশি শানিত করেছেন। এভাবে আবেগতাড়িত উগ্রতায় নিপতিত হয়েছে। কখনো বা এভাবে তাদের আবেগ উজ্জীবিত করে তাদেরকে বিপথগামী করা হয়েছে বিশেষ উদ্দেশ্যে। খারিজীগণের প্রমাণাদির মধ্যে ছিল:


প্রথমত, জিহাদ বিষয়ক নির্দেশাবলি
তারা দাবি করতেন যে, জিহাদ বড় ফরয। আর জিহাদের উদ্দেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যা কিছু করা হয় তা জিহাদ বলে গণ্য। কাজেই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই জিহাদ এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই বড় ফরয। আমরা আগেই উল্লেখ করেছি যে, ‘‘বড় ফরয’’ পরিভাষাটিই কুরআন-সুন্নাহ সমর্থিত নয়। কুরআন-হাদীসের সুস্পষ্ট নির্দেশনা ছাড়া কোনো ইবাদতকে ‘‘বড় ফরয’’ বলা যায় না। আরকানে ইসলামের পরে আর কোনো ইবাদতকে ঢালাওভাবে বড় ফরয বলার সুযোগ নেই। আমরা দেখেছি যে, জিহাদ সাধারণত ফরয কিফায়া এবং কখনো বা ফরয আইন। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয় দাওয়াতের মাধ্যমে, জিহাদের মাধ্যমে নয়। রাষ্ট্র সংস্কারও হয় দাওয়াতের মাধ্যমে, জিহাদের মাধ্যমে নয়।


দ্বিতীয়ত: প্রতিপালকের খিলাফাত
মহান আল্লাহ বলেন:

وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً


‘‘যখন তোমার প্রতিপালক মালাকগণকে বললেন: আমি পৃথিবীতে একজন ‘স্থলাভিষিক্ত’ সৃষ্টি করছি।’’[1]
রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে বড় ফরয বলে দাবি করে তারা বলেন যে, মহান আল্লাহ মানুষকে তাঁর রুবূবিয়্যাত বা প্রতিপালনের খিলাফাত বা প্রতিনিধির দায়িত্ব প্রদান করেছেন। রুবূবিয়্যাতের এ দায়িত্ব পালনই মুমিনের বড় ফরয। আর এ দায়িত্ব পালনের জন্য রাষ্ট্র ব্যবস্থা অপরিহার্য। বস্ত্তত তাদের এ ‘‘দলীল’’-টি একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার দায়িত্ব কুরআন ও হাদীসের অন্যান্য বাণী দ্বারা প্রমাণিত। তবে এ আয়াতটির সাথে এ দায়িত্বের কোনো সম্পকই নেই।

খলীফা অর্থ ‘স্থলাভিষিক্ত’ বা ‘গদ্দিনশীন’, যিনি অন্যের অনুপস্থিতিতে তার স্থলে অবস্থান বা কর্ম করেন। আল্লাহ বলেছেন যে, তিনি আদমকে পৃথিবীতে ‘খলীফা’ বা স্থলাভিষিক্ত হিসেবে প্রেরণ করবেন, কার স্থলাভিষিক্ত তা বলেন নি। মুফাস্সিরগণ থেকে তিনটি মত প্রসিদ্ধ: (১) ইবনু আববাস (রা), ইবনু মাসঊদ (রা) প্রমুখ সাহাবীর মতে এখানে ‘স্থলাভিষিক্ত’ বলতে পূর্ববর্তী জিন্ন জাতির স্থলাভিষিক্ত বুঝানো হয়েছে। (২) ইবনু যাইদ ও অন্যান্য কোনো কোনো মুফাস্সিরের মতে এখানে ‘খলীফা’ বা স্থলাভিষিক্ত বলতে বুঝানো হয়েছে যে, আদম সন্তানগণ এক প্রজন্মের পর আরেক প্রজন্ম পৃথিবীতে বসবাস করবে এবং পরবর্তী প্রজন্ম পূর্ববর্তীদের স্থলাভিষিক্ত হবে। (৩) ইমাম তাবারী ও অন্যান্য কতিপয় মুফাস্সির বলেন যে, এখানে খলীফা অর্থ আল্লাহর খলীফাও হতে পারে। অর্থৎ আদম ও তাঁর সন্তানগণ পৃথিবীতে আল্লাহর নিয়ম-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁরই স্থলাভিষিক্ত।[2]

খলীফা শব্দ, এর বহুবচন এবং এর ক্রিয়াপদ কুরআন কারীমে প্রায় ২০ স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে। এ সকল ব্যবহারের আলোকে সুস্পষ্ট যে, খলীফা বলতে পূর্ববর্তী প্রজন্মের স্থলাভিষিক্ত বুঝানো হয়। এজন্য কুরআনের ব্যবহারের আলোকে প্রথম ও দ্বিতীয় মতই অধিক গ্রহণযোগ্য।

তৃতীয় মতটির বিষয়ে প্রথম যুগের অনেক আলিম আপত্তি করেছেন। তাঁরা বলেছেন যে, মানুষকে আল্লাহর খলীফা বলা ইসলামী বিশ্বাসের পরিপন্থী। কারণ, কারো মৃত্যু, স্থানান্তর বা অবিদ্যমানতার কারণেই তার স্থলাভিষিক্ত, গদ্দিনশীন বা খলীফার প্রয়োজন হয়। আর মহান আল্লাহ তো এরূপ কোনো প্রয়োজনীয়তা থেকে মহা পবিত্র। কুরআনে কোথাও মানুষকে ‘আল্লাহর খলীফা’ বলা হয় নি। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে যে, আল্লাহই মানুষের খলীফা বা স্থলাভিষিক্ত হন। যেমন সফরের দু‘আয় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলতেন: ‘‘আপনিই সফরে (আমাদের) সাথী এবং পরিবারে (আমাদের) খলীফা বা স্থলাভিষিক্ত।’’[3] একব্যক্তি আবূ বাকর (রা)-কে সম্বোধন করে বলেন, হে আল্লাহর খলীফা। তখন তিনি বলেন, ‘‘আমি আল্লাহর খলীফা নই, বরং আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খলীফা বা স্থলাভিষিক্ত।’’[4]
এতদসত্ত্বেও পরবর্তীকালে এ আয়াতের তাফসীরে তৃতীয় মতটিই প্রসিদ্ধি লাভ করে। শিয়াগণ এ ব্যাখ্যাকে তাদের মতের দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাদের মতে মানুষ আল্লাহর খলীফা। আর আল্লাহর খিলাফাতের পরিপূর্ণতা ইমাম বা রাষ্ট্র প্রধানের মধ্যে বিদ্যমান থাকতে হবে। এজন্য তাদের বিশ্বাস অনুসারে ইমাম আল্লাহর গাইবী জ্ঞান ও ক্ষমতার অধিকারী এবং তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ধর্মীয় সিদ্ধান্ত বলে গণ্য।


তৃতীয়ত, দীনের বিজয়
মহান আল্লাহ কুরআন কারীমে একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি দীনকে প্রকাশ বা বিজয় দান করবেন। এ সকল আয়াত থেকে তারা দাবি করেন যে, দীনকে বিজয় করার দায়িত্ব উম্মাতের বড় ফরয। আমরা উল্লেখ করেছি যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও সাহাবীগণের প্রায়োগিক সুন্নাত ও ব্যাখ্যা বর্জন করে, শুধু নিজের মন ও মনন দিয়ে কুরআনের অর্থ নির্ধারণ করা এবং এ অর্থের ভিত্তিতে কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করা খারিজীগণের বিভ্রান্তির অন্যতম কারণ ছিল। নিঃসন্দেহে দীনের বিজয় ইসলামের নির্দেশনা। তবে বিজয়ের অর্থ ও পদ্ধতি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও সাহাবীগণের মাধ্যমে জানতে হবে। আমরা এখানে এ সকল আয়াতের অর্থ ও এর ব্যাখ্যায় সাহাবী-তাবিয়ী ও পরবর্তী আলিমগণের মতামত আলোচনা করব।
মহান আল্লাহ বলেন:


هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَىٰ وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ


‘‘তিনিই প্রেরণ করেছেন তার রাসূলকে সঠিক পথের নির্দেশনা ও সত্য দীন-সহ; যেন তিনি তাকে প্রকাশ করেন সকল দীনের উপর; যদিও মুশরিকগণ তা অপছন্দ করে।’’[5] কুরআনে আরো দু স্থানে আল্লাহ অনুরূপ কথা বলেছেন।[6] এ সকল স্থানে আল্লাহ তাকে সকল দীনের উপর ‘‘ইযহার’’করবেন বলে উল্লেখ করেছেন। ইযহার অর্থ প্রকাশ করা। বিজয় করা অর্থেও তা ব্যবহৃত হয়। ইবনু আববাস (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, এ আয়াতের অর্থ ‘‘আল্লাহ মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে সকল ধর্মের সকল তথ্য প্রকাশ করবেন বা জানিয়ে দিবেন; যদিও ইহূদী-খৃস্টান ও অন্যন্য ধর্মের অনুসারীরা তাদের এ সকল বিষয় প্রকাশ পাওয়া অপছন্দ করত।’’

অন্যান্য মুফাস্সির বলেছেন যে, এখানে প্রকাশ বা বিজয় বলতে তাত্ত্বিক প্রকাশ বা বিজয় বুঝানো হয়েছে। সকল দীনের উপর প্রকাশ বা বিজয় বলতে সকল দীনের অনুসারীদের এ দীন গ্রহণ করা বা সকল সমাজ ও রাষ্ট্রের উপরে মুসলিম রাষ্ট্রের বিজয় বুঝানো হয় নি। বরং তত্ত্বে, তথ্যে, প্রমাণে ও যুক্তিতে সকল দীনের উপর এ দিনকে আল্লাহ প্রকাশিত ও বিজয়ী করবেন বলে বুঝানো হয়েছে। আবূ হুরাইরা (রা) ও অন্যান্য মুফাস্সির থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, শেষ যুগে ঈসা (আঃ)-এর পুনরাগমণের মাধ্যমে মহান আল্লাহ এ দীনকে চূড়ান্ত বিজয় ও প্রকাশ দান করবেন। সে সময়ে বিশ্বের সকল মানুষ এ দীন গ্রহণ করবে এবং দীন একমাত্র আল্লাহরই হবে।[7]
বিভিন্ন হাদীসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মুসলিম উম্মাহর ক্রমপ্রসারিত বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। এক হাদীসে তিনি বলেন:


إنَّ اللهَ زوى لي الأرضَ,فرأيتُ مشارقَها ومغاربَها وإنَّ أُمَّتي سيبلغُ ملكها ما زُوِيَ لي منها


‘‘আল্লাহ আমার জন্য পৃথিবীকে সংকুচিত করেন, তখন আমি পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিম দেখলাম। আর পৃথিবীর যতটুকু আমার জন্য সংকুচিত করা হয়েছিল তার তাবৎ স্থানে আমার উম্মাতের রাজত্ব পৌঁছে যাবে।’’[8]
অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:

(ليبلغن هذا الأمر ما بلغ الليل والنهار) لا يبقى على ظهر الأرض بيت مدر ولا وبر الا ادخله الله كلمة الاسلام (هذا الدين) بعز عزيز أو ذل ذليل إما يعزهم الله عز وجل فيجعلهم من اهلها أو يذلهم فيدينون لها

‘‘দিবারাত্র যেখানে পৌঁছে সেখানেই এ দীন পৌঁছাবে। এ ধরাপৃষ্ঠে এমন একটি বাড়ি বা তাবুও অবশিষ্ঠ থাকবে না যেখানে এ দীন পৌঁছাবে না। প্রতিটি বাড়িতেই আল্লাহ এ দীন পৌঁছাবেন, কারো সম্মানের সাথে কারো লাঞ্ছনার সাথে। কাউকে আল্লাহ দীনের অনুসারী হওয়ার তাওফীক দিয়ে সম্মানিত করবেন। আর কেউ এর বশ্যতা স্বীকার করে অনুগত হবে।[9] বস্ত্তত আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন। তিনি তাঁর মহান রাসূল (ﷺ)-এর মাধ্যমে দীনকে প্রকাশিত ও বিজয়ী করেছেন। যুক্তি ও প্রমাণে তাঁর দীনের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশিত হয়েছে। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ দীনকে প্রকাশিত ও বিজয়ী করেছেন। আর এ বিজয়ের ধারা অব্যাহত থাকবে।

এমন নয় যে, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এর মাধ্যমে অর্জিত বিজয় কোনো এক সময় একেবারে হারিয়ে যাবে এবং এরপর আমাদেরকে নতুন করে বিজয়ের যাত্রা শুরু করতে হবে। বরং বিজয়ের ধারা অব্যাহত রয়েছে। কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা এবং সাহাবীগণ ও পূর্ববর্তীগণের কর্মধারার আলোকে আমাদের দায়িত্ব হলো, প্রত্যেকের নিজের জীবনে দীন পালন, নিজের সাধ্যমত দীনের দাওয়াত, দীনের শত্রুদের ষড়যন্ত্রের জাল উন্মোচন, ইসলাম বিরোধী প্রচারণার মিথ্যাচার উন্মোচন, ইসলামের সঠিক চিত্র বিশ্ববাসীর নিকট তুলে ধরা ইত্যাদি। পাশাপাশি ইসলামী রাষ্ট্রগুলির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, আদর্শিক ও দীনী সংস্কার ইত্যাদির জন্য যথাসাধ্য সচেষ্ট হওয়া। কিন্তু বিজয় অর্জনের নামে ইসলাম নিষিদ্ধ কোনো কর্ম বা সুন্নাত-বহির্ভুত কোনো পদ্ধতির অনুসরণ আমাদের দায়িত্ব নয়। অনুরূপভাবে ফলাফলের চিন্তা আমাদের দায়িত্ব নয়।


চতুর্থত: দীন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব
রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে বড় ফরয বলে দাবি করার জন্য তারা দীন প্রতিষ্ঠার নির্দেশকে দলিল হিসেবে পেশ করতেন। তাদের মতে, দীন অর্থই রাষ্ট্র এবং ‘‘দীন প্রতিষ্ঠা’’-র অর্থই ‘‘দীনী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা’’। আর এ দায়িত্ব হলো সবচেয়ে বড় ফরয। কারণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত না হলে দীনের অন্যান্য অনেক দায়িত্ব পালন করা যায় না বা দীনের অন্যান্য অনেক বিষয় প্রতিষ্ঠা করা যায় না। বস্ত্তত মহান আল্লাহ দীন প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছেন। রাষ্ট্র ব্যবস্থা দীনের অংশ। দীনের অন্যান্য বিষয়ের ন্যায় সুন্নাত নির্দেশিত পথে আমাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালন করতে হবে।

মহান আল্লাহ বলেছেন:

شَرَعَ لَكُمْ مِنَ الدِّينِ مَا وَصَّىٰ بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَىٰ أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ

‘‘তিনি তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন দীন, যার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি নূহকে- আর যা আমি ওহী করেছি আপনাকেএবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মূসা এবং ঈসাকে, এ বলে যে, তোমরা দীন প্রতিষ্ঠা কর এবং তাতে দলাদলি-বিচ্ছিন্নতা করো না।’’[10]

এখানে আল্লাহ এ সকল নবী-রাসূলকে দীন প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। অধিকাংশ মুফাস্সির উল্লেখ করেছেন যে, এখানে ‘‘দীন’’ বলতে ‘‘তাওহীদ’’ বুঝানো হয়েছে; কারণ সকল নবীর মূল দীন ছিল তাওহীদ। শরীয়তের বিধিবিধানের ক্ষেত্রে তাঁদের মধ্যে পার্থক্য ছিল। কুরআন কারীমে নবী ও রাসূলগণের দাওয়াতের যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে তা থেকেও বিষয়টি বুঝা যায়। কুরআন কারীমে ২৫ জন নবী-রাসূলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া নাম উল্লেখ না করে অন্য নবীদের দাওয়াতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

সকলের ক্ষেত্রেই ‘‘তাওহীদ’’-কেই তাদের দাওয়াতের মূল বিষয়ই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআনের বর্ণনা অনুসারে তাদের সকলের দাওয়াতের মূল বিষয় ছিল: আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, একমাত্র তাঁরই ইবাদত কর, তাঁকে ভয় কর এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর, সকল বিপদে শুধু তাঁকেই ডাক, একমাত্র তাঁরই কাছে সাহায্য চাও, তাঁরই জন্য সাজদা কর, তাঁরই উপর নির্ভর কর, তাঁরই জন্য উৎসর্গ, কুরবানী ও জবাই কর। আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য যাদের বা যা কিছুর ইবাদত করা হয় তার ইবাদত বর্জন কর, তাদের ইবাদত পাওয়ার যোগ্যতা অবিশ্বাস কর। অধিকাংশ নবী-রাসূলের ক্ষেত্রে ‘‘তাওহীদ’’ ছাড়া অন্য কোনো বিষয় উল্লেখ করা হয় নি। কয়েকজন নবী-রাসূলের ক্ষেত্রে তাওহীদের পাশাপাশি চারিত্রিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিধিবিধান উল্লেখ করা হয়েছে। সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আল্লাহ বলেছেন যে, সকল নবীকেই ‘‘দীন প্রতিষ্ঠার’’ নির্দেশ দিয়েছেন, আর অধিকাংশ নবীই তাওহীদ ছাড়া অন্য কিছুর দাওয়াত দিয়েছেন বলে কুরআনে উল্লেখ করা হয় নি। এজন্য অধিকাংশ মুফাস্সির বলেছেন যে, দীন প্রতিষ্ঠার অর্থ তাওহীদ পালন ও তাওহীদের দাওয়াত। অন্য অনেকে দীন বলতে তাওহীদ ও আহকামের সমষ্টি বুঝিয়েছেন। কারণ প্রত্যেক নবীকে তাঁকে প্রদত্ত দীন কায়েমের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।[11]
‘‘ইকামতের দীন’’ বা দীন প্রতিষ্ঠা বলতে অধিকাংশ মুফাস্সির ‘‘দীন পালন’’ বা ‘‘দীনের নির্দেশনা অনুসারে কর্ম করা’’ বুঝিয়েছেন। ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু জারীর তাবারী (৩১০ হি) বলেন:


وعنى بقوله: (أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ) أن اعملوا به على ما شرع لكم وفرض كما قد بينا فيما مضي قبل فى قوله: (أقيموا الصلاة). وبنحو الذى قلنا فى ذلك قال اهل التأويل ... عن السدى فى قوله، فى قوله (أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ) قال: اعملوا به


‘‘‘দীন প্রতিষ্ঠা কর’ কথাটির অর্থ হলো ‘দীন পালন কর’ বা ‘দীন অনুসারে কর্ম কর, যেভাবে তোমাদের জন্য তা বিধিবদ্ধ করা হয়েছে এবং ফরয করা হয়েছে’, যেমনটি আমরা ইতোপূর্বে ‘সালাত প্রতিষ্ঠা কর’ কথাটির অর্থ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছি। পূর্ববর্তী (সাহাবী-তাবিয়ী-তাবি-তাবিয়ী যুগের) মুফাস্সিরগণ এরূপ ব্যাখ্যাই করেছেন। .... তাবিয়ী ইসমাঈল ইবনু আব্দুর রাহমান সুদ্দী (১২৮ হি) বলেন ‘দীন প্রতিষ্ঠা কর’ অর্থ দীন পালন কর।’’[12]
এ অর্থে তাবিয়ী মুজাহিদ ইবনু জাবর (১০৪ হি) বলেন:


والإقرار بالله وطاعته فهو اقامة الدين


‘‘আল্লাহ যত নবী প্রেরণ করেছেন সকলকেই সালাত কায়েম করতে, যাকাত প্রদান করতে, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের স্বীকৃতি দিতে ও তাঁর আনুগত্য করতে নির্দেশ দিয়েছেন, আর এ-ই হলো দীন প্রতিষ্ঠা করা।’’[13]
অন্য তাবিয়ী আবুল আলিয়া রুফাইয় ইবনু মিহরান (৯০ হি) বলেন:


اقامة الدين الا خلاص لله وعبادته


‘‘দীন প্রতিষ্ঠা হলো আল্লাহর জন্য ইখলাস ও তাঁর ইবাদত করা।’’[14]
কোনো কোনো মুফাস্সির বলেন:


والمراد باقامته: تعديل اركانه وحفظه من ان يقع فيه زيغ، والمواظبه عليه والتشمير فى القيام به


‘‘দীন প্রতিষ্ঠার অর্থ: তার রুকনগুলি যথাযথ পালন করা, তার মধ্যে বিকৃতির অনুপ্রবেশ থেকে তাকে সংরক্ষণ করা, দীন পালনে নিয়মানুবর্তী হওয়া এবং তা যথাযথ পালনের জন্য পূণউদ্দ্যোমী হওয়া।’’[15] এভাবে অধিকাংশ সাহাবী-তাবিয়ী ও প্রাচীন মুফাস্সিরের মতানুসারে পরিপূর্ণ পালনই প্রতিষ্ঠা করা। যেমন সালাত প্রতিষ্ঠা করার অর্থ ‘যেভাবে ফরয ও বিধিবদ্ধ করা হয়েছে সেভাবে তা আদায় করা’। আমরা দেখেছি যে, বিজন প্রান্তরের নির্জনবাসী ‘আবিদ’ বান্দার একাকী সালাত আদায়কেও হাদীসে ‘‘ইকামাতে সালাত’’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ তিনি তার জন্য যে ভাবে ফরয ও বিধিবদ্ধ করা হয়েছে সেভাবে তা পালন করেছেন।

বস্ত্তত নিজের জীবনে দীনের পরিপূর্ণ পালন অর্থ নিজের জীবনে দীনকে প্রতিষ্ঠিত করা। অন্যের জীবনে দীন প্রতিষ্ঠা করা, অর্থাৎ অন্য কোনো মানুষকে পরিপূর্ণ দীনের মধ্যে আনয়ন করা মুমিনের আয়ত্বাধীন নয়; এক্ষেত্রে মুমিনের আয়ত্বাধীন হলো অন্যকে দীন পরিপূর্ণ পালনের আহবান জানানো। কেউ আহবান প্রত্যাখ্যান করলে তাকে জবরদস্তি করে তা পালন করানোর ক্ষমতা বা দায়িত্ব মুমিনের নেই।
উপরের আয়াতে উল্লেখিত চারজন রাসূল: নূহ, ইবরাহীম, মূসা ও ঈসা (আলাইহিমুস সালাম)-এর বিষয়ে কুরআনের বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারি যে, তাঁদের মধ্যে নূহ, ইবরাহীম ও ঈসা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেননি বা রাষ্ট্র ও জিহাদ বিষয়ক কোনো দাওয়াত দেন নি। তাঁরা তাওহীদ, রিসালাত, ঈমান, নেক কর্ম, হালাল-হারাম ইত্যাদি বিষযক দাওয়াত দিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের সমাজের অত্যন্ত অল্প মানুষ তাদের দাওয়াত গ্রহণ করেছিলেন। এতে তাঁদের দীন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব অপূর্ণ থাকে নি। মূসা (আঃ) অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি তার জাতিকে জিহাদের দাওয়াত দেন। তার জাতি তা পালন করতে অস্বীকার করে। তখন তিনি আল্লাহর কাছে তাঁর নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন:


قَالَ رَبِّ إِنِّي لَا أَمْلِكُ إِلَّا نَفْسِي وَأَخِي فَافْرُقْ بَيْنَنَا وَبَيْنَ الْقَوْمِ الْفَاسِقِينَ


‘‘হে আমার প্রতিপালক, আমার নিজের ও আমার ভাইয়ের উপর ছাড়া আর কারো উপর আমার কর্তৃত্ব-মালিকানা নেই। সুতরাং তুমি আমাদের ও ফাসিক মানুষদের মধ্যে বিচ্ছেদ করে দাও।’’[16]
এভাবে আমরা দেখছি যে, এ সকল নবী-রাসূল মূলত নিজের জীবনে দীন পালন এবং দীনের দাওয়াতের বিষয়ে আল্লাহর নির্দেশ পালন করেই দীন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালন করেছেন। অন্যরা গ্রহণ না করায় বা সমাজে বা রাষ্ট্রে দীন ক্ষমতাবান না হওয়ায় তার দীন পালনের দায়িত্ব অপূর্ণ থাকে নি।
আমরা আরো দেখছি যে, অন্যরা গ্রহণ করুক অথবা না করুক তাদেরকে দাওয়াত দেওয়া, অর্থাৎ নিজের জীবনে দীনের পরিপূর্ণ প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়নের পাশাপাশি অন্যদেরকে দীনের দাওয়াত দেওয়া দীন পালনেরই অংশ। এজন্য কোনো কোনো মুফাস্সির দীন প্রতিষ্ঠা বলতে দীন পালন ও দীনের দাওয়াত বুঝেছেন। হিজরী ৭ম শতাব্দীর প্রসিদ্ধ আলিম আব্দুল আযীয- ইয্য ইবনু আব্দুস সালাম (৬৬০ হি) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন:


(أَقِيمُوا الدِّينَ) اعملوابه أو ادعوا اليه


‘‘দীন প্রতিষ্ঠা কর: অর্থাৎ দীন পালন কর অথব দীনের প্রতি আহবান কর।’’[17]
কোনো কোনো মুফাস্সির দীন প্রতিষ্ঠা করা বলতে ঐক্যবদ্ধভাবে দীনকে আঁকড়ে ধরা বুঝিয়েছেন; কারণ এখানে বলা হয়েছে ‘‘দীন প্রতিষ্ঠা কর এবং তাতে দলাদলি করো না।’’ এথেকে বুঝা যায় যে, দীনের বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়াই দীন প্রতিষ্ঠা করা এবং দীনের বিষয়ে দলাদলি করার অর্থ দীন প্রতিষ্ঠা না করা। মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াকূব ফিরোযআবাদী (৮১৭ হি) তার সংকলিত ‘‘তানবীরুল মিকবাস’’ নামক তাফসীর গ্রন্থে সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে, তিনি বলেছেন:


(أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ) أمر الله جملة الانبياء أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ: أن انفقوا في الدين (وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ) لا تختلفوا في الدين


‘‘‘দীন প্রতিষ্ঠা কর’: আল্লাহ সকল নবীকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, দীন প্রতিষ্ঠা কর: অর্থাৎ দীনের বিষয়ে ঐকমত হও ‘এবং তাতে দলাদলি করো না’ অর্থাৎ দীনের বিষয়ে মতভেদ করো না।’’[18]
ইমাম তাবারী ও অন্যান্য মুফাস্সির প্রসিদ্ধ তাবিয়ী মুফাস্সির কাতাদা ইবনু দিআমাহ (১১৫ হি) থেকেও অনুরূপ তাফসীর উদ্ধৃত করেছেন।[19] এ বিষয়ে আল্লামা ইবনু কাসীর (৭৭৪ হি) বলেন:

(أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ) أي: وصى الله تعالى جميع الأنبياء عليهم السلام بالاءتلاف والجماعة ونهاهم عن الا فتراق والاختلاف

‘‘দীন প্রতিষ্ঠা কর এবং তাতে দলাদলি করো না: অর্থাৎ মহান আল্লাহ সকল নবীকে (আলাইহিমুস সালাম) নির্দেশ দিয়েছেন ভালবাসা ও ঐক্যের এবং নিষেধ করেছেন দলাদলি ও মতভেদ থেকে।’’[20]
এখানে উলে­খ্য যে, কুরআন কারীমে আর কোথাও ‘‘ইকামাতে দীন’’ বাক্যাংশ ব্যবহার করা হয় নি। হাদীসে নববীতেও ‘‘ইকামতে দীন’’ কথাটি কোথাও কোনোভাবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে জানা যায় না। ইসলামী ফিকহে ‘‘ইকামতে দীন’’ বলে কোনো পরিভাষা নেই। বাহ্যত এর কারণ হলো, দীন একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা। এর বহু দিক রয়েছে। প্রত্যেক দিকের জন্য পৃথক বিধান রয়েছে। সকল বিষয়ের সামষ্টিক পালন, দাওয়াত ও ঐক্যবদ্ধতা দীনের ইকামত। প্রত্যেক বিষয়ের ইকামত বা পালন, দাওয়াত ও ঐক্যবদ্ধতা ইকামতে দীনের অংশ। প্রত্যেক বিষয়ের ‘‘ইকামত’’ বা পালন, দাওয়াত ও ঐক্যবদ্ধতার পৃথক বিধান রয়েছে। কাজেই ‘‘ইকামতে দীন’’ নামে কোনো পৃথক পরিভাষা বা বিধান প্রদান করা হয় নি।

উপরের আলোচনা থেকে আমরা দেখছি যে, মহান আল্লাহ মুমিনদেরকে দীন প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছেন। আর দীন প্রতিষ্ঠার অর্থ হলো নিজের জীবনে দীনকে প্রতিপালন করে প্রতিষ্ঠিত রাখা। পাশাপাশি অন্যদেরকে তা প্রতিষ্ঠিত রাখতে দাওয়াত দেওয়া এবং দীনের বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকাও ইকামতে দীন বা দীন প্রতিষ্ঠার অন্তর্ভুক্ত।

দীন ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা, যা বিশ্বাস, কর্ম, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল বিষয়ে প্রয়োজনীয় বিধান প্রদান করেছে। সকল বিধানই দীন এবং প্রত্যেকের নিজের জীবনে যে বিধান প্রযোজ্য তা আল্লাহর নির্দেশনা মত পালন করা দীন প্রতিষ্ঠার অংশ। পাশাপাশি দীনের সকল বিষয়ের দাওয়াত প্রদানও দীন প্রতিষ্ঠার অংশ। তাওহীদ, ঈমান, সালাত, যাকাত, সিয়াম, পরিবার, হালাল-হারাম, বিচার-ব্যবস্থা, অর্থ-ব্যবস্থা, রাষ্ট্র-ব্যবস্থা ইত্যাদি সকল বিষয় আল্লাহর নির্দেশ মত পালন করা, পালনের দাওয়াত দেওয়া ও পালনে ও দাওয়াতে ঐক্যবদ্ধ থাকা দীন প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন দিক। দীনের যে কোনো বিষয় পালন ও দাওয়াতই দীন প্রতিষ্ঠার অংশ। যে মুমিন রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে রয়েছেন তার জন্য দীনের অন্যান্য বিধানের ন্যায় রাষ্ট্রীয় বিষয়ে দীনের বিধান পালন করা দীন প্রতিষ্ঠার অংশ। আর অন্যান্য মুমিনের জন্য এ বিষয়ে তাকে ও অন্যান্য সকলকে দাওয়াত দেওয়া দীন প্রতিষ্ঠার অংশ।

আমরা আগেই বলেছি, ইসলামে রাষ্ট্র ব্যবস্থার গুরুত্বের বিষয়ে দীন সম্পর্কে অভিজ্ঞ কোনো মুসলিমই দ্বিমত পোষণ করবেন না। তবে দীন অর্থ শুধু রাষ্ট্র বলে মনে করা, শুধু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে দীন প্রতিষ্ঠা বলে দাবি করা, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা না করলে বড় ফরয তরক হবে এবং অন্য কোনো ইবাদত কবুল হবে না ইত্যাদি চিন্তার কোনো শরীয়তসম্মত ভিত্তি নেই। রাষ্ট্রক্ষমতার গুরুত্বের বিষয়ে জামাআতুল মুসলিমীন তাদের লিখনি ও বক্তব্যে যে সকল যুক্তি পেশ করতেন সেগুলির অন্যতম হলো, রাষ্ট্রব্যবস্থা না হলে দীনের অনেক বিধান পালন করা যায় না এবং একমাত্র রাষ্ট্র ক্ষমতা হাতে থাকলেই সমাজের সর্বস্তরে দীন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

তাদের এ কথার মধ্যে সত্যতা রয়েছে। রাষ্ট্র-ব্যবস্থার ইসলামীকরণের গুরুত্ব বুঝাতে দীনী দাওয়াতের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকেই এরূপ কথা বলেন। কিন্তু জামাআতুল মুসলিমীন এ কথাকে ভুল অর্থে ব্যবহার করতেন। এ যুক্তি দিয়ে তারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকে বড় ফরয বলে প্রমাণ করতে চেষ্টা করতেন। আমরা দেখেছি যে, কোনো ইবাদতকে কোনো যুক্তি দিয়ে বড় ফরয বলা যায় না, বরং এজন্য কুরআন-সুন্নহের সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন। এ যুক্তি দিয়ে তারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের জন্য আরকানে ইসলাম, অন্যান্য ‘ফরয আইন’, ওয়াজিব বা ব্যক্তিজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত বর্জন করা বা হারাম-মাকরূহ কর্মে লিপ্ত হওয়ার বৈধতা প্রমাণ করতেন। এগুলি সুস্পষ্ট বিভ্রান্তি ছাড়া কিছই নয়।

আমরা কুরআন, হাদীস ও সাহাবীগণের বক্তব্য থেকে দেখেছি যে, আরকানুল ইসলাম ও অন্যান্য ফরয-নফল ইবাদত পালনই মুমিনের জীবনের মূল উদ্দেশ্য। রাষ্ট্রে বা বিজন প্রান্তরে, সমাজে বা একাকী, মুসলিম দেশে বা অমুসলিম দেশে সকল অবস্থায় ও স্থানে মুমিন ইবাদত-বন্দেগী পালন করবেন। জিহাদ ও রাষ্ট্রক্ষমতা ইবাদতের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা রক্ষার মাধ্যম বা উপকরণ। এরা বিষয়টিকে উল্টা করে বুঝেন। তারা বলেন, জিহাদ ও রাষ্ট্রক্ষমতাই মুমিন জীবনের মূল উদ্দেশ্য। আরকানুল ইসলাম ও অন্যান্য ইবাদত সবই জিহাদ ও রাষ্ট্রক্ষমতা দখল ও সংরক্ষণের উপকরণ মাত্র। এজন্য রাষ্ট্রক্ষমতার জন্য সবই করা যায় বা সবই বাদ দেওয়া যায় বলে তারা দবি করতেন।

এছাড়া তারা বুঝাতেন যে, রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের আগে তাওহীদ, আহকাম, ইলম, আত্মশুদ্ধি ইত্যাদির পালন ও দাওয়াত গুরুত্বহীন। যারা এগুলির পালন ও দাওয়াতের মাধ্যমে দীন প্রতিষ্ঠার বা দীনের এদিকগুলি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতেন তাদেরকে দীন প্রতিষ্ঠার বিরোধী বলে গণ্য করতেন। একমাত্র রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের প্রচেষ্টাকেই তারা দীন প্রতিষ্ঠা বলে মনে করতেন। তাদের এ সকল মতামত দীন, দীন প্রতিষ্ঠায় নবী-রাসূলগণের কর্মপদ্ধতি, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও সাহাবীগণের সুন্নাত, মানবপ্রকৃতি ও ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে প্রগাঢ় অজ্ঞতার সাথে আবেগের সংমিশ্রণের ফল।
রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন বা দখল কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কর্মকান্ডের উপর নির্ভর করে না। হাজার বছরের মুক্তিযুদ্ধ, সশস্ত্র সংগ্রাম, গণতান্ত্রিক কর্মকান্ড, প্রচার ইত্যাদির মাধ্যমেও ক্ষমতার পরিবর্তন বা দখল অসম্ভব হতে পারে। দখল হলেও তা বেদখল হতে পারে। দীন প্রতিষ্ঠা বা দাওয়াতকে রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের অধীন বলে চিন্তা করা দীন প্রতিষ্ঠা ও দীনের বিজয় অর্জনের ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক ও অবাস্তব চিন্তা।


রাষ্ট্রশাসন ব্যবস্থা এবং এ ব্যবস্থার প্রয়োগে নিয়োজিত মানুষ- এ দুয়ের সমন্বয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালিত হয়। খিলাফাতে রাশিদার পরে ইসলামী ব্যবস্থা একইরূপ আছে, কিন্তু ব্যবস্থার প্রয়োগের মানুষের পরিবর্তন ঘটেছে। তাঁদের পরে আর কখনোই তাঁদের মত মানুষ আসবে না। এজন্যই বিভিন্ন হাদীসে বারংবার বলা হয়েছে যে, ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় ‘‘মন্দ’’ ও ‘‘ভাল’’ আসবে, তবে কখনোই প্রথম সময়ের মত হবে না।
আর খিলাফতে রাশিদার পর থেকে সকল মুসলিম সমাজের অবস্থা পর্যালোচনা করলে আমরা দেখি যে, কোনো সরকারই সমাজের পাপ, অনাচার ইত্যাদি দূর করে নি। রাষ্ট্র বা সরকার রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষা করেছে এবং ভাল বা মন্দভাবে আইনের প্রয়োগ করেছে। ইসলামী মূল্যবোধের বিকাশ, ন্যায়ের আদেশ, অন্যায়ের নিষেধ, আল্লাহর পথে দাওয়াত ইত্যাদি মূলত আলিম-উলামা, পীর-মাশাইখ ও দায়ীগণের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়েছে। ‘‘ভাল’’ ইসলামী রাষ্ট্র বড়জোর দাওয়াতের পরিবেশ রক্ষা করেছে। পক্ষান্তরে অনেক ‘‘খারাপ’’ ইসলামী রাষ্ট্র দাওয়াতকে বাধাগ্রস্ত করেছে। কাজেই রাষ্ট্র হলেই সব হয়ে যাবে অথবা রাষ্ট্র না হলে কিছুই হবে না- এরূপ চিন্তা মানব প্রকৃতি ও ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞতা-প্রসূত আবেগতাড়িত কথা। ‘‘মন্দ’’ বা ‘‘ভাল’’ উভয় অবস্থায় ‘‘দায়ী’’-গণ দাওয়াত এগিয়ে নিবেন। দাওয়াতের মাধ্যমেই রাষ্ট্রীয় বিষয়ে জুলূম, অনাচার, অত্যাচার ও ইসলামী বিধান লঙ্ঘন দূর করতে এবং ভাল বা দাওয়াত-বান্ধব (DawahFriendly) সরকার লাভ করতে চেষ্টা করবেন।
অনুরূপভাবে রাষ্ট্রের অবিদ্যমানতায় বা বিচ্যুতিতে মুমিনের দীন ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা মুমিন পাপী হয় বলে চিন্তা করার কোনো শরীয়ত সম্মত ভিত্তি নেই। এ কথা বলা যায় যে, বিবাহ না করলে, সম্পদ না থাকলে বা ক্ষমতা না থাকলে দীনের অনেক বিধান পালন করা যায় না। কিন্তু এর অর্থ এ নয় যে, বিবাহ করা, সম্পদ অর্জন করা বা ক্ষমতা লাভ করা সবচেয়ে বড় ফরয। অথবা বলা যায় না, যে মুমিন শরীয়ত সম্মত ওজরের কারনে বিবাহ করেননি, সম্পদশালী হতে পারেন নি বা ক্ষমতাশালী হতে পারেন নি তিনি তার সাধ্যমত দীনের বিধানগুলি পালন করলেও তা কবুল হবে না বা তিনি পাপী বলে গণ্য হবেন।

যারা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে রয়েছেন তারা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করলে পাপী হবেন। যার সম্পদ আছে তার জন্য যাকাত দেওয়া যেমন ফরয, যার ক্ষমতা আছে তার জন্য ক্ষমতা আল্লাহর নির্দেশমত ব্যবহার করা, দুনীতি বন্ধ করা, অধিকার ও ন্যয়বিচার নিশ্চিত করাও তেমানি ফরয। অন্যরা এ বিষয়ে দাওয়াত দেওয়ার পরেও সংশি­ষ্টরা না মানলে তাদের পাপ থাকে না। কাজেই ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা, আবেগ বা দ্রুত ফলাফলের জন্য শরীয়ত নিষিদ্ধ কোনো কাজকে ‘‘বড় ফরয’’ পালনের অযুহাতে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ নেই। এমনকি এ দায়িত্ব পালনের অযুহাতে কোনো সুন্নাত-মুসতাহাব কর্ম পরিত্যাগও মুমিনের দায়িত্ব নয়। সুন্নাতের ব্যতিক্রম পদ্ধতি অনুসরণও মুমিনের জন্য ক্ষতিকর।

[1] সূরা (২) বাকারা: ৩০ আয়াত।

[2] তাবারী, তাফসীর ১/১৯৯-২০০; কুরতুবী, আল-জামি লি আহকামিল কুরআন ১/২৬৩-২৭৫; ইবনু কাসীর, তাফসীর ১/৭০-৭১।

[3] মুসলিম, আস-সহীহ ২/৯৭৮।

[4] আহমদ, আল-মুসনাদ ১/১০; হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ৫/১৮৪, ১৯৮।

[5] সূরা (৯) তাওবা: ৩৩ আয়াত।

[6] সূরা (৪৮) ফাতহ: ২৮ আয়াত ও সূরা (৬১) সাফ্‌ফ: ৯ আয়াত।

[7] তাবারী, তাফসীর ১৪/২১৫-২১৬; কুরতুবী, আল-জামিউ লি আহকামিল কুরআন ৮/১২১; ইবনুল জাওযী, যাদুল মাসীর ৩/১৭০।

[8] মুসলিম আস-সহীহ ৪/২২১৫।

[9] আহমদ, আল-মুসনাদ ৪/১০৩; ৬/৪। হাদিসটি সহীহ। আলবানী, সহীহাহ ১/৩২।

[10] সূরা শুরা: আয়াত ১৩।

[11] তাবারী, তাফসীর (জামিউল বায়ান) ২১/৫১৩; আবূ হাইয়ান মুহাম্মাদ ইবনু ইউসুফ (৭৪৫ হি.), আল- বাহরুল মুহীত ৯/৪৮২; ইবনু কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম ৭/১৯৫; কুরতুবী আল-জামিউ লি আহকামিল কুরআন ১৬/১০।

[12] তাবারী, তাফসীর (জামিউল বায়ান) ২১/৫১৩।

[13] আবু হাইয়ান মুহাম্মাদ ইবনু ইউসুফ (৭৪৫ হি.), আল-বাহরুল মুহীত ৯/৪৮২।

[14] আবু হাইয়ান, আল-বাহরুল মুহীত ৯/৪৮২।

[15] ইবনু আজীবাহ, আহমাদ ইবনু মুহাম্মাদ (১২২৪), আল-বাহরুল মাদীদ ৫/৪২৩।

[16] সূরা (৬) মায়িদা: আয়াত ২৫।

[17] ইয্‌য ইবনু আব্দুস সালাম, তাফসীরুল ইয্‌য ১/১০৫১।

[18] ফিরোযআবাদী, তানবীরুল মিকবাস (শামিলা) ২/৪।

[19] তাবারী, তাফসীর (জামিউল বায়ান) ২১/৫১৩।

[20] ইবনু হাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম (শামিলা) ৭/১৯৫।
৩. ১০. সমাজ পরিবর্তনে সাহাবী ও পরবর্তীদের কর্মধারা

সমাজ-পরিবর্তন, সংস্কার, রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি বিষয়ক সমকালীন গবেষণার ক্ষেত্রে প্রায় সকলেই একটি বিশেষ ভুলের মধ্যে নিপতিত হন। তা হলে, তারা শূন্য থেকে শুরুর বিষয়ে চিন্তা করেন। তারা ধারণা করেন যে, ইসলামী সমাজ বা রাষ্ট্র বলতে কিছুই বিদ্যমান নেই; কাজেই আমাদেরকে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যেমন একটি কাফির সমাজে দাওয়াত দিয়ে ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, আমাদেরকেও তেমনি একটি কাফির সমাজকে পরিবর্তন করতে হবে। পূর্বের আলোচনা থেকে আমরা বুঝেছি যে, এ সকল চিন্তার ভিত্তি আরেকটি ভুলের উপর, তা হলো পাপের কারণে মুসলিম ব্যক্তি, সমাজ রাষ্ট্রকে ‘‘অমুসলিম’’ বলে গণ্য করা। জেনে বা না-জেনে অসতর্কভাবে আমর এ ভুলের মধ্যে নিপতিত হই।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইসলামী দীন, সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিতরূপে আমাদের জন্য রেখে গিয়েছেন। তিনি বিভিন্ন হাদীসে বারংবার ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, এ ব্যবস্থায় বিচ্যুতি আসবে, আবার কিছু ভাল হবে, আবার বিচ্যুতি আসবে। আবার কিছু ভাল হবে। কখনো হবে স্বৈরতান্ত্রিক রাজত্ব এবং কখনো হবে নুবুওয়াতের পদ্ধতিতে জনগণতান্ত্রিক খিলাফাত। এভাবেই চলতে থাকবে কিয়ামত পর্যন্ত। এ ব্যবস্থা একেবারে বিলীন হবে না, আবার খিলাফাতে রাশেদার মত পরিপূর্ণ ব্যবস্থাও আর আসবে না।

কাজেই বর্তমান সমাজগুলিকে মক্কার কাফির সমাজের মত কল্পনা করার কোনো সুযোগ নেই। বরং এ সকল সমাজ উমাইয়া, আববাসী, ফাতিমী, বাতিনী, কারামিতী, মোগল, তাতার ও অন্যান্য রাষ্ট্র ও সমাজের মত। এক্ষেত্রে দীনী দাওয়াত, পরিবর্তন বা সংস্কারের জন্য আমাদেরকে পূর্ববর্তী সমাজ ও রাষ্ট্রগুলিতে সাহাবী-তাবিয়ী ও পরবর্তী আলিমগণের কর্মধারা পর্যালোচনা করতে হবে। কুরআন-হাদীসের নির্দেশনার আলোকে এবং তাঁদের কর্মধারার ভিত্তিতে আমাদেরকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

৩. ১০. ১. মুসলিম সমাজে রাষ্ট্র সংস্কারে হাদীসের নির্দেশনা

আমরা দেখেছি যে, সমকালীন মুসলিম রাষ্ট্রগুলি উমাইয়া, আববাসী, ফাতিমী, বাতিনী ইত্যাদি মুসলিম রাষ্ট্রের মতই পাপে লিপ্ত মুসলিম রাষ্ট্র। এ সকল রাষ্ট্রে দীনের অন্যান্য বিষয়ের ন্যায় রাষ্ট্রীয় পাপ, অনাচার, অবিচার ও ইসলাম বিরোধী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে আপত্তি ও প্রতিবাদ করা এবং এগুলো দূর করার দাওয়াত দেওয়া দীন প্রতিষ্ঠার অবিচ্ছেদ্য অংশ। পাশাপাশি এ সকল রাষ্ট্রের মুসলিম নাগরিকের জন্য রাষ্ট্রীয় আনুগত্য বজায় রাখা ও আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখাও দীন প্রতিষ্ঠার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ বিষয়ে অনেক নির্দেশনা দিয়েছেন। ইতোপূর্বে আনুগত্য, জামা‘আত, বাই‘আত ইত্যাদি প্রসঙ্গে এ বিষয়ক কয়েকটি হাদীস আমরা উল্লেখ করেছি। আমরা দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:

(১) ‘‘কেউ তার শাসক বা প্রশাসক থেকে কোন অপছন্দনীয় বিষয় দেখলে তাকে ধৈর্য্য ধারণ করতে হবে। কারণ যদি কেউ জামা‘আত (মুসলিম সমাজ বা রাষ্টের ঐক্য)-এর বাইরে এক বিঘতও বের হয়ে যায় এবং এ অবস্থায় মৃত্যু বরণ করে, তাহলে সে জাহিলী মৃত্যু বরণ করল।’’

(২) ‘‘যে ব্যক্তি আনুগত্য থেকে বের হয়ে এবং ঐক্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মৃত্যু বরণ করল সে জাহিলী মৃত্যু বরণ করল।’’

(৩) ‘‘যে ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় আনুগত্য থেকে নিজেকে বের করে নিল কিয়ামতের দিন আল্লাহর সাথে সাক্ষাত হলে সে নিজের জন্য কোন ওজর পেশ করতে পারবে না। আর যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যু বরণ করল যে, তার গলায় কোন ‘বাই‘আত’ বা রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের অঙ্গীকার নেই সে ব্যক্তি জাহিলী মৃত্যু বরণ করল।’’

(৪) ‘‘অচিরেই তোমাদের উপর অনেক শাসক-প্রশাসক আসবে যারা ন্যায় ও অন্যায় উভয় প্রকারের কাজ করবে। যে ব্যক্তি তাদের অন্যায়কে ঘৃণা করবে সে অন্যায়ের অপরাধ থেকে মুক্ত হবে। আর যে ব্যক্তি আপত্তি করবে সে (আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে) নিরাপত্তা পাবে। কিন্তু যে এ সকল অন্যায় কাজ মেনে নেবে বা তাদের অনুসরণ করবে (সে বাঁচতে পারবে না।)’’ সাহাবীগণ বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না? তিনি বলেন, ‘‘না, যতক্ষণ তারা সালাত আদায় করবে।’’

(৫) ‘‘হুশিয়ার থাকবে! তোমাদের কারো উপরে যদি কোনো শাসক-প্রশাসক নিযুক্ত হন এবং সে দেখতে পায় যে, উক্ত শাসক-প্রশাসক আল্লাহর অবাধ্যতার কোনো কাজে লিপ্ত হচ্ছেন, তবে সে যেন আল্লাহর অবাধ্যতার উক্ত কর্মকে ঘৃণা করে, কিন্তু আনুগত্য থেকে হাত গুটিয়ে না নেয়।’’

(৬) ‘‘যখন তোমরা তোমাদের শাসক-প্রশাসকগণ থেকে এমন কিছু দেখবে যা তোমরা অপছন্দ কর, তখন তোমরা তার কর্মকে অপছন্দ করবে, কিন্তু তার আনুগত্য থেকে হাত গুটিয়ে নিবে না।’’

(৭) ‘‘ভবিষ্যতে অনেক বিচ্যুতি-অন্যায় সংঘটিত হবে। যদি এমন ঘটে যে, এ উম্মাতের ঐক্যবদ্ধ থাকা অবস্থায় কেউ এসে সে ঐক্য বিনষ্ট করে বিভক্তি সৃষ্টি করতে চায় তবে সে যেই হোক না কেন তোমরা তাকে তরবারী দিয়ে আঘাত করবে। অন্য বর্ণনায়: তোমাদের বিষয়টি একব্যক্তির বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকা অবস্থায় (একজন্য রাষ্ট্রপ্রধানের অধীনে থাকা অবস্থায়) কোনো একব্যক্তি যদি এসে তোমাদের ঐক্য বিনষ্ট করতে বা ‘জামাআত’ বিভক্ত করতে চায় তবে তাকে হত্যা করবে।’’

(৮) ‘‘যদি দুজন খলীফার বাইয়াত করা হয় তবে যে পরে বাইয়াত নিয়েছে তাকে হত্যা করবে।’’

(৯) আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:


على المرءِ المسلمِ السمْعُ والطاعةُ . فيما أحبّ وكَرِهَ . إلا أن يُؤْمَرَ بمعصيةٍ . فإن أُمِرَ بمعصيةٍ ، فلا سَمْع ولا طاعَةَ

‘‘মুসলিমের দায়িত্ব রাষ্ট্রের আনুগত্য করা, তার পছন্দনীয়-অপছন্দনীয় সকল বিষয়ে, যতক্ষণ না কোনো পাপের নির্দেশ দেওয়া হয়। যদি কোনো পাপের নির্দেশ দেওয়া হয় তবে সে বিষয়ে কোনো আনুগত্য নেই।’’[1]

(১০) অন্য হাদীসে উবাদা ইবনুস সামিত বলেন:


على المرء المسلم

بايعْنا رسولَ اللهِ صلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ على السمعِ والطاعةِ . في العُسرِ واليُسرِ . والمَنشطِ والمَكرهِ . وعلى أَثَرةٍ علينا . وعلى أن لا ننازعَ الأمرَ أهلَه . وعلى أن نقولَ بالحقِّ أينما كنّا . لا نخافُ في اللهِ لومةَ لائمٍ (في لفظ: وأن لا تنازع الأمر أهله قال الا أن تروا كفراً بواحاً عندكم من الله برهان)


‘‘আমরা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)এর বাইয়াত করলাম যে, আমরা কষ্টে ও আরামে, উদ্দীপনায় ও আপত্তিতে এবং আমাদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হলেও রাষ্ট্রের আনুগত্য করব, রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্তদের থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করব না এবং আল্লাহর বিষয়ে কারো নিন্দা-আপত্তির ভয়-তোয়াক্কা না করে যেখানেই থাকি না কেন হক্ক কথা বলব। অন্য বর্ণনায়: আমরা ক্ষমতাপ্রাপ্তদের থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে চেষ্টা করব না, তবে তিনি বলেন: তোমরা যদি সুস্পষ্ট ব্যাখ্যাতীত কুফর দেখতে পাও, যে বিষয়ে তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে (তবে সেক্ষেত্রে ক্ষমতাপ্রাপ্তরা তাদের এ অধিকার হারাবে)।’’[2]

(১১) হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান বলেন,

قلتُ : يا رسولَ اللهِ ! إنا كنا بشرٌ . فجاء اللهُ بخيرٍ . فنحن فيه . فهل من وراءِ هذا الخيرِ شرٌّ ؟ قال ( نعم ) قلتُ : هل من وراءِ ذلك الشرِّ خيرٌ ؟ قال ( نعم ) قلتُ : فهل من وراءِ ذلك الخيرِ شرٌّ ؟ قال ( نعم ) قلتُ : كيف ؟ قال ( يكون بعدي أئمةٌ لا يهتدون بهدايَ ، ولا يستنُّون بسُنَّتي . وسيقوم فيهم رجالٌ قلوبُهم قلوبُ الشياطينِ في جُثمانِ إنسٍ ) قال قلتُ : كيف أصنعُ ؟ يا رسولَ اللهِ ! إن أدركت ُذلك ؟ قال تسمعُ وتطيع للأميرِ . وإن ضَرَب ظهرَك . وأخذ مالَك . فاسمعْ وأطعْ

‘‘আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমরা মন্দ অবস্থায় ছিলাম, এরপর আল্লাহ ভাল অবস্থা প্রদান করলেন, যার মধ্যে আমরা এখন রয়েছি। এরপর কি আবার মন্দ রয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, সে মন্দের পরে কি আবার ভাল রয়েছে? তিনি বললেন: হ্যাঁ। আমি বললাম, সে ভালর পরে কি আবার মন্দ রয়েছে? তিনি বলেন: হ্যাঁ। আমি বললাম, তা কেমন? তিনি বলেন, আমার পরে এমন অনেক শাসক হবে যারা আমার আদর্শ গ্রহণ করবে না এবং আমার রীতি পালন করবে না। তাদের মধ্যে এমন অনেক মানুষ থাকবে যাদের অন্তর হলো মানব দেহের মধ্যে শয়তানের অন্তর। আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল, আমি যদি এরূপ অবস্থায় পড়ি তাহলে কী করব? তিনি বলেন: তুমি শাসকের কথা শুনবে ও আনুগত্য করবে, যদিও তোমার পৃষ্ঠদেশে আঘাত করা হয় এবং তোমার সম্পদ কেড়ে নেয়া হয় তবুও তুমি কথা শুনবে ও আনুগত্য করবে।’’[3]

(১২) আবূ যার (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে বলেন:


كيف أنت إذا كانت عليك أمراءُ يُؤخِّرونَ الصلاةَ عن وقتِها ، أو يُميتونَ الصلاةَ عن وقتِها ؟ قال قلتُ : فما تأمرني ؟ قال صَلِّ الصلاةَ لوقتِها . فإن أدركتَها معهم فصلِّ . فإنها لكَ نافلةً

‘‘যখন তোমার উপর এমন শাসক-প্রশাসকগণ থাকবে যারা সালাতকে তার সময়ের পরে আদায় করবে বা সালাতকে তার সময়ের পরে নিয়ে হত্যা করবে তখন তোমার কী অবস্থা হবে? আমি বললাম, আপনি আমাকে এমতাবস্থায় কী করতে নির্দেশ দেন? তিনি বলেন: তুমি ওয়াক্ত অনুসারে সালাত আদায় করবে। এরপর যদি তাদের সাথে সালাত পাও তাহলে তাদের সাথে তা আদায় করবে; আর তা তোমার জন্য নফল বলে গণ্য হবে।’’[4]

এ থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, শাসক-প্রশাসকগণ যদি জাগতিক বা ধর্মীয় অপছন্দনীয় ও অন্যায় কর্মকান্ডে লিপ্ত হন তবে তাদের অন্যায়ের প্রতি ঘৃণা, আপত্তি ও প্রতিবাদ সহ তাদের আনুগত্য ও সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। এ বিষয়ে আরো অনেক হাদীস হাদীসগ্রন্থগুলি সংকলিত রয়েছে। সহীহ মুসলিমের ‘‘কিতাবুল ইমারাত’’ পাঠ করলে পাঠক এ বিষয়ক আরো অনেক হাদীস জানতে পারবেন। মূলত এ সকল হাদীস এ বিষয়ক কুরআনী নির্দেশনার ব্যাখ্যা। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا

‘‘হে মুমিনগণ, তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর, এবং আনুগত্য করা রাসূলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে কর্তৃত্বের অধিকারীদের। অতঃপর কোনো বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও; যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের উপর ঈমান রেখে থাক। এটি উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর।’’[5] এ আয়াতে আল্লাহ তাঁর ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর ‘‘উলিল আমর’’-এর আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন। আরবীতে ‘‘উলূ’’ বা ‘‘উলী’’ শব্দের অর্থ মালিকগণ বা অধিকারিগণ। আর ‘‘আমর’’ অর্থ আদেশ। ‘‘উলুল আমর’’ অর্থ আদেশের মালিকগণ।
‘‘উলূল আমর’’ বা আদেশের মালিকগণ বলতে কাদেরকে বুঝানো হয়েছে সে বিষয়ে তিনটি মত রয়েছে: (১) রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মালিকগণ, (২) আলিম ও ফকীহগণ ও (৩) সাহাবীগণ। নিঃসন্দেহে আলিমগণ ও সাহাবীগণের অনুসরণ ও আনুগত্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে ‘‘আদেশের মালিকানা’’ মূলত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অধিকারীদের; কারণ তারাই মূলত আদেশের মালিক, যাদের আদেশ পালন করতে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয় এবং যাদের আদেশ পালন না করলে অশান্তির সৃষ্টি হয়। এজন্য ইমাম তাবারী বলেন:


وأولى الأقوال في ذالك بالصواب، قول من قال: هم الأمراء والولاة، لصحة الأخبار عن رسول الله صلى الله عليه وسلم بالأمر بطاعة الأئمة والولاة فيما كان [الله] طاعة، وللمسلمين مصلحة

‘‘সঠিক মত হলো, যে ‘‘উলুল আমর’’ বা আদেশের মালিকগণ বলতে রাষ্ট্রীয় শাসক-প্রশাসকগণকে বুঝানো হয়েছে। কারণ বিভিন্ন সহীহ হাদীসে প্রমাণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আল্লাহর আনুগত্যের মধ্যে এবং মুসলিম সমাজের স্বার্থ সংরক্ষণে রাষ্ট্রপ্রধান, ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্তদের আনুগত্য করতে নির্দেশ দিয়েছেন।’’[6] অর্থাৎ যারা সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের অধিকারী বা মালিক তাদের নির্দেশ মান্য করা ও আনুগত্য করা মুমিনের দীনী দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনের বিভিন্ন দিক উপরের হাদীসগুলিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ইমাম তাবারী ও অন্যান্য মুফাস্সির, মুহাদ্দিস ও ফকীহ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ও এ প্রসঙ্গে উপরের হাদীসগুলি ও সমার্থক অন্যান্য হাদীস উল্লেখ করেছেন। আমাদের সমাজে অনেকে মনে করেন, খিলাফতে রাশেদার মত ‘‘ইসলামী রাষ্ট্রের’’ ক্ষেত্রেই এ আয়াত ও এ সকল হাদীস প্রযোজ্য, আমাদের মত রাষ্ট্রে সেগুলি প্রযোজ্য নয়। ধারণাটি সঠিক নয়; কারণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এরূপ কোনো শর্ত আরোপ করেননি।

বস্ত্তত এ হাদীসগুলি খিলাফাতে রাশেদার মত রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বলা হয় নি। কারণ তাদের সময়ে শাসকগণ পাপ, অন্যায় বা ইসলাম বিরোধিতায় লিপ্ত হন নি। তাদের যুগে সালাত হত্যা করা হয় নি এবং মানুষের খোলসে শয়তানের অন্তর বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দের আবির্ভাব হয় নি। এগুলি সবই পরবর্তী যুগের জন্য বলা হয়েছে। সাহাবীগণ ও পরবর্তী আলিমগণ উমাইয়া, আববাসী, ফাতিমী, বাতিনী, শিয়া, রাফিযী, মোগল, তাতার ও অন্যান্য সকল রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই এ সকল নির্দেশ প্রযোজ্য বলে গণ্য করেছেন। আর সমকালীন মুসলিম দেশগুলি এ সকল রাষ্ট্রের চেয়ে ব্যতিক্রম কিছুই নয়। এ সকল রাষ্ট্রেও উপরের হাদীসগুলি ও সমার্থক হাদীসগুলির সামগ্রিক শিক্ষার আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। এ সকল হাদীসের আলোকে আমরা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বা রাষ্ট্র-সংস্কারের বিষয়ে কয়েকটি মূলনীতি লাভ করি:


(১) রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত রাখা
উপর্যুক্ত সকল হাদীসের নির্দেশনা যে, মুসলিম সমাজে রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত রাখতে হবে এবং মুমিনকে অবশ্যই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে জীবনযাপন করতে হবে। এ সকল হাদীসের আলোকে আলিমগণ বলেছেন যে, মুসলিম সমাজে ‘ইমাম নিয়োগ’ বা ‘খলীফা নিয়োগ’ ‘‘ফরয কিফায়া’’। এখানে ইমাম বা খলীফা বলতে রাষ্ট্রপ্রধান বুঝানো হয়েছে। এ রাষ্ট্রপ্রধানকে ইমাম, খলীফা, রাজা, সম্রাট, আমীরুল মুমিনীন, প্রেসিডেন্ট, রাষ্ট্রপতি ইত্যাদি যে নামেই আখ্যায়িত করা হোক না কেন, রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত রাখা মুসলিম সমাজের উপর ফরয কিফায়া এবং রাষ্ট্রপ্রধান বা রাষ্ট্রের আনুগত্য করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয আইন।[7]


(২) বাইয়াত, জামাআত ও তাআত
রাষ্ট্রপ্রধান রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতীক। তার আনুগত্যের প্রতীক ‘‘বাইয়াত’’। মুমিনকে রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের অঙ্গীকার বহন করতে হবে। সকল পরিস্থিতিতে ‘‘জামাআত’’ বা রাষ্ট্রীয় ঐক্য বজায় রাখতে হবে। রাষ্ট্রের নাগরিকগণ বা সংখ্যগারিষ্ট নাগরিক কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে বা মেনে নিলে নিজের ব্যক্তিগত, দলগত বা গোষ্ঠীগত মতামত বর্জন করে রাষ্ট্র ও সমাজের ঐক্য বজায় রাখতে হবে। বাইয়াত ও জামাআতের পাশাপাশি ‘তা‘আত’ বা আনুগত্য বজায় রাখতে হবে। শাসক-প্রশাসকদের আনুগত্য ইসলাম নির্দেশিত দায়িত্ব। সরকারের জুলুম, অন্যায় বা পাপের কারণে আনুগত্যের এ দায়িত্ব রহিত হয় না। যে নির্দেশ বা আইন পাপ নয় তা মান্য করা মুমিনের দীনী দায়িত্ব।


(৩) পাপে ঐক্য বা আনুগত্য নেই
যে বিষয় কুরআন-হাদীস দ্বারা নিষিদ্ধ নয় এরূপ বিষয়েই ঐক্য ও আনুগত্যের বিধান। রাষ্ট্র যদি কোনো পাপের নির্দেশ দেয় তাহলে সে নির্দেশ মান্য করা বা সে বিষয়ে আনুগত্য করা মুমিনের জন্য নিষিদ্ধ। পাপের নির্দেশ মুমিন পালন করেন না। আবার পাপের নির্দেশের কারণে অন্যান্য সাধারণ বিধান ও আইন অমান্য করেন না।


(৪) ঘৃণা, আপত্তি বনাম স্বীকৃতি
রাষ্ট্র, রাষ্ট্রপ্রধান, সরকার বা শাসক-প্রশাসকের পাপের ক্ষেত্রে মুমিনের দায়িত্ব ঘৃণা ও আপত্তি। শাসক-প্রশাসকদের পাপ দুপ্রকারের: তাদের জীবনের ব্যক্তিগত পাপ এবং পাপের নির্দেশনা বা পাপনির্ভর আইন, নীতি বা বিধান প্রণয়ন। সকল ক্ষেত্রে মুমিনের ন্যূনতম দায়িত্ব পাপকে ঘৃণা করা। এরপর মুমিন সাধ্যমত আপত্তি ও প্রতিবাদ করবেন। এরূপ পাপ মেনে নেওয়া, স্বীকৃতি দেওয়া, পাপের বিষয়ে তাদের অনুসরণ করা বা এর পক্ষে অবস্থান নেওয়া মুমিনের জন্য নিষিদ্ধ।
পাপের ঘৃণা, আপত্তি বা প্রতিবাদের অর্থ অন্যান্য বিষয়ে রাষ্ট্রীয় আনুগত্য বজায় রেখে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার মধ্যে ঘৃণা, আপত্তি ও প্রতিবাদ জানানো। অনেক সময় আবেগী মুমিন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে যেয়ে রাষ্ট্রদ্রোহিতা, শৃঙ্খলা ভঙ্গ, আইন অমান্য, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা অনুরূপ অন্যায় ও পাপে লিপ্ত হয়। খারিজীগণ ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধের নামে এরূপ অন্যায়ে লিপ্ত হতো। সাহাবীগণ তাদেরকে রাষ্ট্রীয় আনুগত্য ও আইন পালনের কথা বললে আপত্তি করত। এক ঘটনায় কতিপয় খারিজী হুযাইফা (রা)-কে বলে, আমরা কি ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধ করতে পারব না?! আপনি কি তা করবেন না?! তিনি বলেন:


ألا إن الأمر بالمعروف والنهي عن المنكر لحسن ولكن ليس من السنة أن ترفع السلاح على إمامك


‘‘ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধ নিঃসন্দেহে ভাল কাজ। তবে তোমার রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে বা তার নির্দেশের বাইরে অস্ত্রধারণ, বলপ্রয়োগ বা বিদ্রোহ করা সুন্নাত সম্মত নয়।’’[8] উপরের মূলনীতিগুলির আলোকে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের বিষয়টি ভালভাবে উপলব্ধি করতে আমাদেরকে এ বিষয়ে সাহাবী-তাবিয়ী ও পরবর্তী যুগগুলির প্রসিদ্ধ আলিম, ইমাম, পীর-মাশাইখ ও সংস্কারকগণের কর্মধারা পর্যালোচনা করতে হবে। সেজন্য মহান আল্লাহর নিকট তাওফীক প্রাথনা করছি।

[1] মুসলিম, আস-সহীহ ৩/১৪৬৯।

[2] বুখারী, আস-সহীহ ৬/২৫৮৮, ২৬৩৩; মুসলিম, আস-সহীহ ৩/১৪৭০।

[3] মুসলিম, আস-সহীহ ৩/১৪৭৬।

[4] মুসলিম, আস-সহীহ ১/৪৪৮।

[5] সূরা (৪) নিসা: আয়াত ৫৯।

[6] তাবারী, তাফসীর (শামিলা) ৮/৫০২।

[7] বিস্তারিত দেখুন: আবদুল্লাহ ইবনু উমার দুমাইজী, আল-ইমামাতুল উযমা, পৃ. ৪৫-৭৫।

[8] ইবনু আবী শায়বা (২৩৫ হি.), আল-মুসান্নাফ ৭/৫০৮; বাইহাকী, আহমাদ ইবনুল হুসাইন (৪৫৮ হি.), শু’আবুল ঈমান, ৬/৬৩; দানী, আস-সুনানুল ওয়ারিদাতুল ফিল ফিতান, ২/৩৯১।
৩. ১০. ২. সাহাবী ও পরবর্তীদের কর্মধারা

আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, খিলাফতে রাশিদার পর থেকে সকল ইসলামী রাষ্ট্রেই রাষ্ট্র পরিচালনায় ইসলামী বিধিবিধানের কমবেশি লঙ্ঘন ঘটেছে। শাসক নির্বাচন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের পরামর্শ গ্রহণ, জনগণের নিকট জবাবদিহিতা, মানবাধিকার, আমানত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, নিরপেক্ষভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও আইন প্রয়োগ ইত্যাদি অগণিত ইসলামী নির্দেশনা কম বা বেশি লঙ্ঘিত হয়েছে এসকল রাষ্ট্রে। রাষ্ট্রপ্রধান বা শাসকগণ নিজেদেরকেই আইন বা আইনদাতা বলে মনে করেছেন। কুরআনী বিধিবিধান ও আইনকে বেপরোয়াভাবে অবহেলা করেছেন। এমনকি সালাতের সময়ও পদ্ধতিও পরিবর্তন করা হয়েছে।
এ সকল পরিস্থিতিতে সাহাবীগণ কিভাবে সংস্কার, প্রতিবাদ ও দীন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালন করেছেন তা আমাদের গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কারণ কুরআন-সুনণাহর নির্দেশনা অনুধাবনে ও পালনে তাঁরা উম্মাতের অনুকরণীয় আদর্শ। মহান আল্লাহ বলেন:

وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ

‘‘মুহাজির ও আনসারদিগের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করেছেন, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। এবং তিনি তাদের জন্য প্রস্ত্তত করেছেন জান্নাত, যার নিম্নদেশে নদী প্রবাহিত, যেথায় তারা চিরস্থায়ী হবে। এ মহাসাফল্য।’’[1]
এখানে মুমিনগণকে দুভাগে ভাগ করা হয়েছে: (১) প্রথম অগ্রগামী মুহাজিরগণ ও আনসারগণ এবং (২) তাঁদের পরবর্তীগণ। আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে, প্রথম ভাগের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট এবং তাদের জন্য জান্নাত প্রস্ত্তত করেছেন। আর দ্বিতীয় ভাগের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভের পূর্বশত প্রথম শ্রেণীর সাহাবীগণকে নিষ্ঠার সাথে অনুসরণ করা। এভাবে আমরা দেখছি যে, অগ্রগামী মুহাজির ও আনসারগণের অনুসরণ সফলতার মাপকাঠি। তাদের অনুসরণের ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে ছিলেন তাদের সমসাময়িক অন্যান্য সাহাবী। এরপর তাবিয়ী-তাবি-তাবিয়ীগণ।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর উম্মাতকে তাঁর সাহাবীদের জীবন পদ্ধতি ও মতামতের উপর নির্ভর করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:

فَإِنَّهُ مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ بَعْدِي فَسَيَرَى اخْتِلَافًا كَثِيرًا فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الْمَهْدِيِّينَ الرَّاشِدِينَ تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ

‘‘তোমাদের মধ্যে যারা আমার পরে বেঁচে থাকবে তারা অনেক মতবিরোধ দেখতে পাবে। এক্ষেত্রে তোমাদের দায়িত্ব আমার সুন্নত ও সুপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাত অনুসরণ করা। তোমরা দৃঢ়ভাবে তা আঁকড়ে ধরবে, কোনো প্রকারেই তার বাইরে যাবে না। আর তোমরা (আমার ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতের বাইরে) নতুন উদ্ভাবিত সকল বিষয় সর্বতোভাবে পরিহার করবে; কারণ সকল নতুন উদ্ভাবিত বিষয়ই বিদ‘আত এবং সকল বিদ‘আতই বিভ্রান্তি ও পথভ্রষ্টতা।’’[2]
আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সাহাবীদেরকে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে মতবিরোধ সম্পর্কে সতর্ক করেন। সাহাবীগণ প্রশ্ন করেন, এক্ষেত্রে কোন্ দল সঠিক বলে গণ্য হবে? তিনি বলেন:


ما انا عليه (اليوم) واصحابى

‘‘আমি এবং আমার সাহাবী-সঙ্গীরা বর্তমানে যে মত ও পথের উপর আছি সেই মত ও পথের উপর যারা থাকবে তারাই সুপথপ্রাপ্ত।’’[3] সাহাবী, তাবিয়ী ও তাবি-তাবিয়ী- এ তিন প্রজন্মের মানুষদের ধার্মিকতার প্রশংসা করেছেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)। ইমরান ইবনু হুসাইয়িন (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:


خيرُ أُمَّتِي قَرْنِي (الذى بعثت فيهم) ثُمَّ الذين يَلُونَهُمْ ثمَّ الذين يَلُونَهُمْ


‘‘আমার উম্মতের সবচেয়ে ভালো যুগ আমার যুগ, যে যুগের মানুষের মধ্যে আমি প্রেরিত হয়েছি (অর্থাৎ সাহাবীগণ), আর তাদের পরে সবচেয়ে ভালো তাদের পরবর্তী যুগের মানুষ (অর্থাৎ তাবিয়ীগন), আর এর পর তাদের পরবর্তী যুগের মানুষ (অর্থাৎ তাবি তাবিয়ীগণ)’’।[4]
এ অর্থে আবূ হুরাইরা, বুরাইদা আসলামী, নু’মান ইবনু বাশীর (রাঃ) প্রমুখ সাহাবী থেকে পৃথক পৃথক সহীহ সনদে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। কোনো কোনো হাদীসে সাহাবীগণের পরে তিন প্রজন্মের কথা বলা হয়েছে।[5]
এজন্য কুরআন ও হাদীসের নির্দেশনা সঠিক অনুধাবন ও বাস্তবায়নের জন্য আমাদেরকে সাহাবীগণের কর্মধারা এবং তৎপরবর্তী তিন প্রজন্মের কর্মধারা বিবেচনা করতে হবে। উমাইয়া যুগে সাহাবীগণ রাষ্ট্র ও সরকারের এরূপ বিচ্যুতি প্রত্যক্ষ করেছেন। কিন্তু কখনোই তারা এ কারণে ‘রাষ্ট্র’ বা সরকারকে কাফির বা অনৈসলামিক বলে গণ্য করেননি। বরং তাঁরা সাধ্যমত এদের অন্যায়ের আপত্তি জ্ঞাপন-সহ এদের আনুগত্য বহাল রেখেছেন। এদের পিছনে সালাত আদায় করেছেন এবং এদের নেতৃত্বে জিহাদে অংশগ্রহণ করেছেন।

পরবর্তীকালেও কোনো ইমাম, ফকীহ বা আলিম এ কারণে এ সকল রাষ্ট্রকে ‘দারুল হরব’ বা ‘কাফির রাষ্ট্র’ বলে মনে করেননি। তারা সাধ্যমত সংশোধন ও পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন। সাথে সাথে রাষ্ট্রীয় আনুগত্য ও সংহতি বজায় রেখেছেন।[6] তাঁরা সর্বদা শান্তিপূর্ণ পন্থায় অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে উৎসাহ দিতেন এবং জিহাদ বা আদেশ-নিষেধের নামে অস্ত্রধারণ, আইন-লঙ্ঘন, রাষ্ট্রদ্রোহিতার উস্কানি ইত্যাদি নিষেধ করতেন। এ বিষয়ে তাঁদের অগণিত নির্দেশনা হাদীসগ্রন্থসমূহে সংকলিত হয়েছে।[7] সাহাবী-তাবিয়ীগণের যুগে কখনো কখনো তাঁদের কেউ কেউ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, তবে তা রাষ্ট্রকে কাফির মনে করে বা ‘‘ইসলামী রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার জন্য নয় বরং অন্যান্য পারিপার্শিক কারণে তা ঘটেছে।

[1] সূরা (৯) তাওবা: ১০০ আয়াত।

[2] তিরমিযী, আস-সুনান ৫/৪৪; আবু দাউদ, আস-সুনান ৪/২০০; ইবনু মাজাহ ১/১৫। তিরমিযী বলেন হাদিসটি হাসান সহীহ।

[3] তিরমিযী, আস-সুনান ৫/২৬; হাকিম, আল-মুসতাদরাক ১/২১৮; মাকদিসী, আল-আহাদীস আল-মুখতারাহ ৭/২৭৮; আলবানী সহীহু সুনানিত তিরমিযী ৬/১৪১ নং ২৬৪১।

[4] বুখারী, আস-সহীহ ৩/১৩৩৫।

[5] ড. খোন্দকার আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর, বুহুসুন ফী উলূমিল হাদীস, পৃ. ৩০-৩২।

[6] বুখারী, আস-সহীহ ৬/২৬৩৪, ২৬৫৪; মুসলিম, আস-সহীহ ১/৬৯; ইবনু আবিল ইয্‌য, শারহুল আকীদাহ আত-তাহাবিয়্যাহ, পৃ. ৩৭৯-৩৮৮।

[7] ইভবু আবী শাইবা, আল-মুসান্নাফ ৭/৫০৮; দানী, আস-সুনানুল ওয়ারিদাতু ২/৩৮৮-৪০৫।
দেখানো হচ্ছেঃ ৪১ থেকে ৫০ পর্যন্ত, সর্বমোট ৭২ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে পাতা নাম্বারঃ « আগের পাতা 1 2 3 4 5 6 7 8 পরের পাতা »