আর-রাহীকুল মাখতূম আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী (রহঃ) ৪৩৪ টি
আর-রাহীকুল মাখতূম আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী (রহঃ) ৪৩৪ টি
১০. সাফিয়্যাহ বিনতে হুওয়াই বিন আখতাব (রাঃ) (صَفِيَّةُ بِنْتُ حُيَيِّ بْنِ أَخْطَب) :

এ মহিলা ছিলেন বনি ইসরাঈলের অন্তর্ভুক্ত। বনু নাযীর গোত্রের সর্দার হুওয়াই বিন আখতাব এর কন্যা। খায়বার যুদ্ধে তাঁকে বন্দী করা হয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ তাঁকে নিজের জন্য মনোনীত করেন ও তার কাছে ইসলামের বাণী পেশ করায় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে আযাদ করে দিয়ে খায়বার বিজয়ের পর ৭ম হিজরীতে তাঁর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। খায়বার হতে ফেরার পথে মদীনা হতে ১২ মাইল দূরে সাদ্দে সাহবা’তে উম্মুল মু’মিনীনের সাথে বাসর যাপন করেন। ৩৬ বা ৫২ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে বাক্বী’ কবরস্থানে দাফন করা হয়।

১১. মায়মুনাহ বিনতে হারিস (রাঃ) (مَيْمُوْنَةُ بِنْتُ الْحَارِث)

তিনি ছিলেন উম্মুল ফযল লুবাবাহ বিনতে হারিসের বোন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ৭ম হিজরীতে যুল ক্বা’দাহ মাসের ক্বাযা উমরাহ্ শেষ করার পর বিশুদ্ধ কথায় ইহরাম হতে হালাল হওয়ার পর তাঁর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। মক্কা হতে ৯ মাইল দুরত্বে সারিফ নামক স্থানে বাসর যাপন করেন। ৬১ হিজরীতে সারিফে ইনতিকাল করেন। আবার বলা হয় যে, তিনি ৩৮ বা ৬৩ হিজরীতে ইনতিকাল করেন এবং তাঁকে সেখানেই সমাহিত করা হয়। তার সমাহিত স্থান প্রসিদ্ধ লাভ করেন।

উপর্যুক্ত এগার জন মহিলা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তাঁর সাহচর্য ও বন্ধুত্ব লাভ করেছিলেন। এদের মধ্যে খাদীজাহ এবং উম্মুল মাসাকীন যায়নাব (রাঃ) নাবী কারীম (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর ওফাত প্রাপ্তির পর ৯ জন উম্মাহাতুল মু’মিনীন জীবিত ছিলেন। এছাড়া, আরও দু’জন মহিলা সম্পর্কে জানা যায় যাঁদেরকে নাবী কারীম (ﷺ)-এর খিদমতে বিদায় করা হয় নি। এ দু’ জনের মধ্যে একজন ছিলেন বনু কিলাব গোত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং অন্য জন ছিলেন কিন্দাহ গোত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্দাহ গোত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত এ মহিলাই জোনিয়া নামে প্রসিদ্ধ। এ মহিলার সঙ্গে নাবী কারীম (ﷺ) বিবাহে আবদ্ধ হয়েছিলেন কিনা এবং তাঁর পরিচয়ের ব্যাপারে চরিতকারদের মধ্যে যথেষ্ট মতবিরোধ রয়েছে। আমরা এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনার কোন প্রয়োজন বোধ করছি না।

মোটামুটিভাবে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর সংসারে দু’ জন দাসী রেখেছিলেন। এদের মধ্যে একজন হচ্ছে মারিয়া ক্বিবত্বীয়া যাকে মিশরের শাসক মুক্বাওয়াক্বিস উপঢৌকন হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন। এর গর্ভে নাবী কারীম (ﷺ)-এর পুত্র ইবরাহীম জন্ম গ্রহণ করেন। নাবী কারীম (ﷺ)-এর পুত্র ২৮ কিংবা ২৯শে শাওয়াল ১০ম হিজরী মুতাবিক ২৭শে জানুয়ারী ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে মদীনায় মৃত্যুবরণ করেন।

দ্বিতীয় দাসী ছিলেন রায়হানাহ বিনতে যায়দ যিনি ইহুদী গোত্র বনু নাযীর কিংবা বনু কুরাইযাহর সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি ছিলেন বনু কুরাইযাহ যুদ্ধবন্দীদের দলভুক্ত। তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর তত্ত্বাবধানেই থাকেন। তাঁকে নিজের জন্য মনোনীত করে নেন। তাঁর সম্পর্কে কতক চরিতকারদের ধারণা ছিল এরূপ যে, নাবী কারীম (ﷺ) তাঁকে মুক্তি করে দিয়ে তাঁর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

কিন্তু ইবনুল কাইয়্যেমের মতে প্রথম কথাই অগ্রগণ্য। আবূ উবাইদাহ্ ঐ দু’ দাসী ছাড়া অতিরিক্ত আরও দু’জন দাসীর কথা উল্লেখ করেছেন। এ দুই জনের মধ্যে একজনের নাম জামীলা যিনি কোন যুদ্ধবন্দীদের দলভুক্ত ছিলেন। দ্বিতীয় জনকে যায়নাব বিনতে জাহশ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জন্য হিবা করেছিলেন।[1]

এ পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পবিত্র জীবনের প্রাসঙ্গিক একটি দিক সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা ও আলোচনার বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। নাবী কারীম (ﷺ) তাঁর যৌবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রায় ত্রিশ বছর যাবত একমাত্র স্ত্রীর সাহচর্যে জীবন অতিবাহিত করেছিলেন। তাঁর সে স্ত্রী অর্থাৎ খাদীজাহ (রাঃ) ছিলেন প্রায় বিগত যৌবনা। এরপর তিনি বিবাহ করেন সওদা (রাঃ)-কে তিনিও ছিলেন বর্ষিয়সী মহিলা। তবে কি এ ধারণা করা সঙ্গত কিংবা গ্রহণযোগ্য হবে যে, বার্ধক্যের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়ে যৌন প্রয়োজনেই তাঁকে পরবর্তী সময়ে ৯টি স্ত্রী গ্রহণ করতে হয়? তা কখনোই হতে পারে না। নাবী কারীম (ﷺ)-এর পবিত্র জীবনের উভয় স্তর সম্পর্কে নিরপেক্ষতার সঙ্গে সমীক্ষা করে দেখলে কোন বিবেক সম্পন্ন ব্যক্তিই এ মতকে যুক্তিযুক্ত মনে করতে পারবে না। বরং তাঁকে অবশ্যই এটা স্বীকার করতে হবে যে, নাবী কারীম (ﷺ)-এর অধিক সংখ্যক স্ত্রী গ্রহণের পিছনে ছিল তাঁর নবুওয়াতী কার্যক্রমের মহান উদ্দেশ্য যা ছিল বিবাহর থেকে অনেক মহান।

এর ব্যাখ্যাস্বরূপ এখানে উল্লেখ করা যায় যে, আয়িশাহ এবং হাফসাহ (রাঃ)-এর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে আবূ বাকর ও উমার (রাঃ)-এর সঙ্গে নাবী কারীম (ﷺ) বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। এ ভাবেই উসমান (রাঃ)-কে দু’ কন্যা (রুক্বাইয়া (রাঃ) এবং উম্মু কুলসুম (রাঃ)) এবং আলী (রাঃ)-এর সঙ্গে কলিজার টুকরো ফাত্বিমাহ (রাঃ)-এর বিবাহ দিয়ে যে বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন তার উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর দ্বীনের স্বার্থে এ চার জন সম্মানিত ব্যক্তির সঙ্গে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তোলা। কারণ, এ চার ব্যক্তিই ইসলামের চরম দুর্যোগপূর্ণ বিভিন্ন সময়ে কুরবানী ও আত্মত্যাগের অসামান্য দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছিলেন।

তৎকালীন আরবের প্রচলিত রীতি ছিল বৈবাহিক সম্পর্কের উপর চরম গুরুত্ব ও সম্মান প্রদান। তাদের নিকট জামাতা সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত সম্মানের ব্যাপার এবং জামাতার সঙ্গে যুদ্ধ করা কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ব্যাপারটি ছিল চরম লজ্জার ব্যাপার। প্রচলিত এ পদ্ধতিকে এক মহান উদ্দেশ্য সাধনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে নাবী কারীম (ﷺ) একাধিক বিবাহ করেন ইসলামের বিরুদ্ধবাদী শক্তিকে সহায়ক শক্তিতে রূপান্তরিত করার লক্ষ্যে। তাঁর বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের কৌশলটি ইসলামের ইতিহাসের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সূচনা করে।

অন্যান্য ক্ষেত্রেও তিনি একই নীতি অনুসরণ করেন। উম্মু সালামাহ (রাঃ) ছিলেন বনু মাখযুমের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং তা ছিল আবূ জাহল এবং খালিদ বিন ওয়ালিদের গোত্র। উহুদ যুদ্ধে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ)-এর যে ভূমিকা ছিল উম্মু সালামাহ (রাঃ)-এর সঙ্গে নাবী কারীম (ﷺ)-এর বিবাহের পর সে ভূমিকা পরিবর্তিত হয়ে যায়। অল্প দিন পরেই তিনি স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন। অনুরূপভাবে আবূ সুফইয়ানের কন্যা উম্মু হাবীবাহ (রাঃ)-কে যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বিবাহ করলেন আবূ সুফইয়ান আর তখন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী থাকলেন না। অধিকন্তু, জুওয়াইরিয়া এবং সাফিয়্যাহ (রাঃ)-কে যখন পত্মীত্বে বরণ করে নিলেন তখন বনু মুসত্বালাক্ব গোত্র এবং বনু নাযীর গোত্রের যুদ্ধংদেহী ভাব আর রইল না। এ বিবাহ বন্ধনের পর এ গোত্রদ্বয়ের সঙ্গে কোন যুদ্ধবিগ্রহ কিংবা অসদ্ভাবের তথ্য ইতিহাসে পাওয়া যায় না। বরং এ বিবাহের পর জুওয়াইরিয়া স্বীয় সম্প্রদায়ের জন্য একজন অত্যন্ত মর্যাদা সম্পন্ন এবং বরকতময় মহিলা হিসেবে অভিহিত হন। কারণ, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন তাঁর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন তখন সাহাবীগণ (রাযি.) তাঁর গোত্রভুক্ত একশত পরিবারের বন্দীকে মুক্ত করে দিলেন এবং বললেন, ‘এরা যেহেতু নাবী কারীম (ﷺ)-এর শ্বশুর বংশের লোক সেহেতু এদের মুক্তি দেয়া হল।’- এ মুক্তি এবং এ বাণী তাদের অন্তরকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল।

ওই সকল ব্যাপারের চাইতেও যে বিষয়টি ছিল সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এক অপরিণামদর্শী সম্প্রদায়ের লোকজনদের শিক্ষাদীক্ষা, তাদের প্রবৃত্তিকে পবিত্র ও সুসংহত করা এবং সভ্যতা ও সামাজিক শিক্ষা দেয়ার জন্য নির্দেশিত ছিলেন যারা ছিল শালীনতা, সামাজিকতা ও নৈতিকতার সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে অপরিচিত। অথচ ইসলামী সমাজ সংগঠনের ক্ষেত্রে পুরুষ ও মহিলাদের অবাধ সংমিশ্রণের কোন অবকাশ ছিল না এবং এ ব্যাপারে অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল মহিলাদের উত্তম শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের। পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের শিক্ষার প্রয়োজন কোন অংশেই কম ছিল না, বরং যেহেতু তাদের শিক্ষাদীক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত সেহেতু তার প্রয়োজন ছিল অপেক্ষাকৃত বেশী।

এ কারণেই নাবী কারীম (ﷺ)-এর সামনে একটি পথ খোলা ছিল এবং সেটি ছিল বিভিন্ন বয়স এবং অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এমন কতগুলো মহিলা মনোনীত করা যাদের মাধ্যমে মহিলাদের শিক্ষাদীক্ষার জন্য তিনি উপযুক্ত সুযোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম হন। তাঁদের নির্বাচনের পর তিনি তাঁদের জন্য উপযুক্ত শিক্ষাদীক্ষার ব্যবস্থা করবেন, তাঁদের প্রকৃতি ও প্রবৃত্তিকে পবিত্র করে নেবেন। তাঁদেরকে শরীয়তের হুকুম আহকাম শিক্ষা দিবেন এবং ইসলামী সভ্যতা এবং সাজ-সজ্জায় এমনভাবে সজ্জিত করে তুলবেন যাতে তাঁরা শহর এবং গ্রামের সর্বত্র গমন করে যুবতী, বয়স্কা বৃদ্ধা সকল বয়সের মহিলাদের ইসলামের হুকুম আহকাম ও মসলা মাসায়েল শেখাতে পারেন। নাবী কারীম (ﷺ)-এর প্রচার কাজে তাঁরা সুযোগ মত সহযোগী হয়ে কাজ করতে পারেন।

এ প্রেক্ষিতে আমরা দেখতে পাই যে, মুসলিম সমাজের মহিলাদের নিকট ইসলামের শিক্ষাদীক্ষা ও নাবী (ﷺ)-এর সুন্নাত পৌঁছে দেয়ার ব্যাপারে উম্মাহাতুল মু’মিনীনগণের (রাঃ) ভূমিকা ছিল অতীব গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের মধ্যে থেকে যাঁরা দীর্ঘায়ু লাভ করেছিলেন এ ব্যাপারে তাঁদের ভূমিকা ছিল অধিক গুরুত্বপূর্ণ, যথা আয়িশা (রাঃ) নাবী (ﷺ)-এর কথা ও কাজ সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন।

নাবী কারীম (ﷺ)-এর এক বিবাহ জাহেলিয়াত যুগের এমন এক প্রথার ভিত্তি মূল উৎপাটিত করেছিল যা বহু পূর্ব থেকে চলে আসছিল এবং একটি প্রতিষ্ঠিত সংস্কারে পরিণত হয়েছিল। প্রথাটি ছিল পোষ্য পুত্র সম্পর্কিত। জাহেলিয়াত যুগে পোষ্য পুত্রকে ঔরষজাত সন্তানের দৃষ্টিকোণ থেকেই বিচার করা হতো এবং ঔরসজাত সন্তানের ন্যায় সে যাবতীয় সুযোগ সুবিধা ও সম্মান লাভ করত। এ প্রথার শিকড় আরব সমাজ ব্যবস্থার অত্যন্ত গভীরে প্রোথিত ছিল যার মূল উৎপাটন করা ছিল অত্যন্ত দূরূহ কিন্তু ইসলামিক সমাজ ব্যবস্থায় উত্তরাধিকার, বিবাহ, তালাক ইত্যাদি ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধনের ফলে জাহেলিয়াত যুগের সেই সকল সামাজিক ভিত্তিমূল ক্রমান্বয়ে শিথিল হয়ে শেষ পর্যন্ত উৎপাটিত হয়ে পড়ে।

অধিকন্তু, জাহেলিয়াত যুগের বিভিন্ন সামাজিক ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত ক্ষতিকারক এবং অশ্লীল। কাজেই, ইসালামের প্রথম কর্তব্য ছিল সমাজ থেকে সে সকল ক্ষতিকর বিধি ব্যবস্থা এবং অশ্লীলতা নির্মূল করা। এ প্রেক্ষিতে আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে যায়নাব বিনতে জাহশের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন। যায়নাব ছিলেন যায়েদের স্ত্রী এবং যায়দ ছিলেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পোষ্য পুত্র। কিন্তু যায়দ ও যয়নবের মধ্যে মিল মহববত সৃষ্টি না হওয়ার কারণে যায়দ তাঁকে তালাক দেয়ার মনস্থ করলেন। এটা ছিল সে সময় যখন কাফিরগণ নাবী কারীম (ﷺ)-এর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সম্মুখভাগে আসার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। উপরন্তু, খন্দকের যুদ্ধের জন্যও তারা প্রস্তুতি গ্রহণ করছিল।

এদিকে আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ হতে পোষ্য পুত্র সম্পর্ক রহিত করার ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। এ কারণে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মনে এ আশঙ্কার সৃষ্টি হল যে এমনি এক অবস্থার প্রেক্ষাপটে যায়দ যদি তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেন এবং যায়েদের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর সঙ্গে যদি নাবী (ﷺ)-কে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে হয় তাহলে মুনাফিক্ব, মুশরিক ও ইহুদীরা এ ব্যাপারটিকে কেন্দ্র করে খুব জোরে সোরে অপপ্রচার শুরু করবে যা সরল প্রাণ মু’মিনদের মনে কিছুটা বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এটা চাচ্ছিলেন যে যায়দ যেন যায়নাবকে তালাক না দেন এবং সে রকম কোন পরিস্থিতিও যেন সৃষ্টি না হয়।

কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা নাবী কারীম (ﷺ)-এর এ মনোভাব পছন্দ করলেন না। ইরশাদ হল,

‏(‏وَإِذْ تَقُوْلُ لِلَّذِيْ أَنْعَمَ اللهُ عَلَيْهِ وَأَنْعَمْتَ عَلَيْهِ أَمْسِكْ عَلَيْكَ زَوْجَكَ وَاتَّقِ اللهَ وَتُخْفِيْ فِيْ نَفْسِكَ مَا اللهُ مُبْدِيْهِ وَتَخْشَى النَّاسَ وَاللهُ أَحَقُّ أَن تَخْشَاهُ‏)‏ ‏[‏الأحزاب‏:‏ 37‏]‏‏

‘স্মরণ কর, আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন আর তুমিও যাকে অনুগ্রহ করেছ তাকে তুমি যখন বলছিলে- তুমি তোমার স্ত্রীকে (বিবাহবন্ধনে) রেখে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর। তুমি তোমার অন্তরে লুকিয়ে রাখছিলে যা আল্লাহ প্রকাশ করতে চান, তুমি লোকভয় করছিলে, অথচ আল্লাহ্ই সবচেয়ে বেশি এ অধিকার রাখেন যে, তুমি তাঁকে ভয় করবে।’ [আহযাব (৩৩) : ৩৭]

যায়দ শেষ পর্যন্ত যায়নাবকে তালাক দিয়ে ফেললেন। অতঃপর যখন তাঁর ইদ্দত কাল অতিক্রান্ত হল তখন তাঁর সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বিবাহের ব্যাপারটি স্থিরীকৃত হয়ে গেল। এটা এড়ানোর আর কোন পথই রাখা হল না। আল্লাহ তা‘আলা নাবী কারীম (ﷺ)-এর জন্য এ বিবাহ আবশ্যকীয় করে দিলেন। ইরশাদ হল

‏(‏فَلَمَّا قَضَى زَيْدٌ مِّنْهَا وَطَرًا زَوَّجْنَاكَهَا لِكَيْ لَا يَكُوْنَ عَلَى الْمُؤْمِنِيْنَ حَرَجٌ فِيْ أَزْوَاجِ أَدْعِيَائِهِمْ إِذَا قَضَوْا مِنْهُنَّ وَطَرًا‏)‏ ‏[‏الأحزاب‏:‏ 37‏]

‘অতঃপর যায়্দ যখন যায়নাবের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করল তখন আমি তাকে তোমার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করে দিলাম যাতে মু’মিনদের পোষ্যপুত্ররা তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সেসব নারীকে বিবাহ করার ব্যাপারে মু’মিনদের কোন বিঘ্ন না হয়।’ [আহযাব (৩৩) : ৩৭]

এর উদ্দেশ্য ছিল, পোষ্য ছেলেদের সম্পর্কে জাহেলিয়াত যুগে যে সংস্কার ও সাধারণ ধারণা প্রচলিত ছিল তা সম্পূর্ণরূপে মুলোৎপাটিত করা যে ভাবে এ আয়াত দ্বারা তা রহিত করা হয়ে গেল।

‏(‏ادْعُوْهُمْ لِآبَائِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِندَ اللهِ‏)‏ ‏[‏الأحزاب‏:‏ 5‏]‏ ‏

‘তাদেরকে তাদের পিতৃ-পরিচয়ে ডাক, আল্লাহর কাছে এটাই অধিক ইনসাফপূর্ণ।’ [আল-আহযাব (৩৩) :৫]

(‏مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّن رِّجَالِكُمْ وَلَكِن رَّسُوْلَ اللهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّيْنَ‏)‏ ‏[‏الأحزاب‏:‏ 40‏]

মুহাম্মাদ তোমাদের মধ্যেকার কোন পুরুষের পিতা নয়, কিন্তু (সে) আল্লাহর রসূল এবং শেষ নাবী। [আল-আহযাব (৩৩) :৪০]

এখানে এ কথাটি স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে সমাজে যখন কোন প্রথার ভিত্তিমূল দৃঢ় হয়ে যায় তখন শুধুমাত্র কথার দ্বারা তার মূলোৎপাটন কিংবা সংস্কার সাধন করা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। বস্তুত যে ব্যক্তি তার মুলোৎপাটন কিংবা পরিবর্তন সাধনে ব্রতী হন তাঁর বাস্তব কর্মপদ্ধতির নমুনা বিদ্যমান থাকা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। হুদায়বিয়াহ সন্ধি চুক্তির সময় মুসলিমগণের পক্ষ হতে যে আচরণ ধারা এবং ভাবভঙ্গী প্রকাশিত হয় তা থেকে এ প্রকৃত সত্যটি মুশরিকদের দৃষ্টিপটে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। সে সময় মুসলিমগণের মধ্যে ইসলামের প্রতি উৎসর্গীকরণ এবং নাবী প্রীতির যে পরাকাষ্ঠা প্রদর্শিত হয় তাতে মুশরিকগণ অভিভূত হয়ে পড়ে। উরওয়া বিন মাসউদ সাকাফী যখন প্রত্যক্ষ করল যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মুখের থু থু এবং লালা সাহাবীগণ গভীর আগ্রহ ভরে হাত পেতে গ্রহণ করছেন এবং নাবী কারীম (ﷺ)-এর অযুর নিক্ষিপ্ত পানি গ্রহণের জন্য সাহাবীগণের মধ্যে রীতিমত প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যাচ্ছে তখন তার মনে দারুন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়ে যায়।

জী হ্যাঁ, এরা ছিলেন সে সকল সাহাবা (রাযি.) যাঁরা বৃক্ষের নীচে মৃত্যু অথবা পলায়ন না করার শপথ গ্রহণের জন্য একজন অপর জনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে অগ্রসর হচ্ছিলেন। এরা ছিলেন সেই সাহাবীগণ (রাযি.) যাদের মধ্যে আবূ বাকর এবং উমার (রাঃ)-এর মতো জীবন উৎসর্গকারীগণও বিদ্যমান ছিলেন। কিন্তু নাবী কারীম (ﷺ)-এর জন্য অর্থাৎ ইসলামের স্বার্থে মৃত্যুবরণ করাকে যাঁরা চরম সৌভাগ্য এবং কামিয়াবি মনে করতেন। হুদায়বিয়াহ সন্ধিচুক্তি সম্পাদনের পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন তাঁদের কুরবাণীর পশু যবেহ করার নির্দেশ প্রদান করলেন তখন নাবী কারীম (ﷺ)-এর নির্দেশ পালনের জন্য তাঁরা কোন সাড়াই দিলেন না। তাঁদের এ মনোভাব প্রত্যক্ষ করে নাবী কারীম (ﷺ) অত্যন্ত ব্যাকুল ও বিচলিত বোধ করতে থাকলেন। কিন্তু উম্মাহাতুল মু’মিনীন উম্মু সালামাহ (রাঃ)-এর পরামর্শ অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন কারো সঙ্গে কোন বাক্যালাপ না করে নিজে কুরবানীর পশু যবেহ করলেন তখন তাঁর অনুসরণে নিজ নিজ কুরবানীর পশুর যবেহ করার জন্য সাহাবীগণ (রাযি.) দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিলেন এবং নিজ নিজ পশু যবেহ করলেন। এ ঘটনা থেকেই এটা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, প্রতিষ্ঠিত কোন রেওয়াজ রসমের মূলোৎপাটন করতে হলে কথা ও কাজের প্রভাবের মধ্যে কতটুকু পার্থক্য রয়েছে। এ কারণেই জাহেলিয়াত যুগের পোষ্য পুত্র প্রথার বিলোপ সাধনের ব্যাপারটিকে শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নাবী কারীম (ﷺ)-এর পালিতপুত্রের স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ বন্ধনের মতো একটি শক্তিশালী দৃষ্টান্ত অবলম্বনের জন্য আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ প্রদান করলেন।

এ বিবাহ সম্পর্কে কাজে পরিণত হওয়া মাত্রই মুনাফিক্বগণ নাবী কারীম (ﷺ)-এর বিরুদ্ধে খুব জোরেসোরে মিথ্যা ও বিদ্বেষমূলক প্রচারণা শুরু করে দিল। এ সকল মিথ্যা প্রচার ও গুজবের ফলে কিছু সংখ্যক সরল প্রাণ মুসলিম কিছুটা প্রভাবিতও হল। এ সকল অপপ্রচারে মূলসূত্র হিসেবে মুনাফিক্বগণ শরীয়তের যে রীতিটি নিয়ে তোলপাড় শুরু করে দিল তা হচ্ছে নাবী কারীম (ﷺ)-এর ৫ম বিবাহ। যেহেতু মুসলিমগণ একই সঙ্গে চারজনের বেশী স্ত্রী রাখা বৈধ জানতেন না, সেহেতু এ বিবাহের ফলে যায়নাব (রাঃ) যখন ৫ম স্ত্রী হিসেবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) গ্রহণ করলেন তখন তারা একটি মোক্ষম সুযোগ পেয়ে গেল। তাছাড়া যেহেতু যায়দকে নাবী কারীম (ﷺ)-এর পুত্র হিসেবে গণ্য করা হতো সেহেতু তিনি যখন যায়েদের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন তখন অপ প্রচারের জন্য তারা আরও একটি সুযোগ হাতে পেয়ে গেল। অবশেষে আল্লাহ তা‘আলা সূরাহ আহযাবের কয়েকটি আয়াত নাজিল করে সমস্যার সমাধান করে দেন। এতে সাহাবীগণ (রাযি.) অবহিত হন যে, ইসলামে পোষ্যপুত্র সম্পর্কের কোন ভিত্তি কিংবা মর্যাদা নেই। অধিকন্তু এর ফলে তারা এটাও উপলব্ধি করতে সক্ষম হন যে, জাহেলিয়াত যুগের একটি খারাপ রেওয়াজের মূলোৎপাটন কল্পেই একটি বিশেষ নবুওয়াতী ব্যবস্থা হিসেবে আল্লাহ তা‘আলাভ নাবী কারীম (ﷺ)-এর এ বিবাহের ব্যবস্থা করেছেন। বিবাহের এ সংখ্যা (৫ম) শুধুমাত্র নাবী (ﷺ)-এর জন্য, অন্য কারো জন্য নয়।

উম্মাহাতুল মু’মিনীনগণের (রাযি.) সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বসবাসের ব্যাপারটি ছিল অত্যন্ত ভদ্রোচিত, সুশোভন, স্বহৃদয়তাসম্পন্ন এবং সর্বোত্তম মর্যাদাবোধের উপর প্রতিষ্ঠিত। পবিত্র বিবিগণও (রাযি.) ছিলেন ভদ্রতা, ধৈর্য্য সহ্য, অল্পে তুষ্টি, বিনয় সেবা, এবং ত্যাগ তিতিক্ষার মূর্ত প্রতীক, অথচ নাবী কারীম (ﷺ)-এর জীবনযাত্রা ছিল এমন এক কষ্ট সাধনের স্বেচ্ছাবলম্বিত দারিদ্র এবং অভাব অনটনের যা মেনে নেয়া কিংবা যে অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলা কোন সাধারণ মহিলাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। আনাস (রাঃ) এ বলে বর্ণনা করেছেন যে, ‘মৃত্যুবরণ করা পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে কখনো ময়দার রুটি খেয়েছেন আমার জানা নেই এবং তিনি যে কখনো স্বচক্ষে বকরির ভূনা গোস্ত দেখেছেন সে কথাও আমার জানা নেই।[2]

আয়িশাহ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, দু’ মাস অতিবাহিত হয়ে গিয়ে তৃতীয় মাসের চাঁদ দেখা যেত অথচ রাসূলে কারীম (ﷺ)-এর গৃহে আগুন জ্বলত না।’ উরওয়া জিজ্ঞেস করলেন, ‘তাহলে আপনারা কী খেতেন?’ তিনি বললেন, ‘শুধু দু’টি কালো জিনিস খেজুর এবং পানি’।[3] এ বিষয় সম্পর্কিত হাদীসের সংখ্যাধিক্য রয়েছে।

উল্লেখিত অসচ্ছলতা সত্ত্বেও পরিত্র বিবিগণ কখনই কোন প্রকার অসন্তোষ প্রকাশ করেননি এবং এমন কোন কথা বলেন নি কিংবা কাজ করেননি যা নাবী কারীম (ﷺ)-এর মনে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। শুধু একবার একটি ঘটনা ঘটেছিল যার ফলে নাবী (ﷺ) কিছুটা বিব্রতবোধ করেছিলেন। কিন্তু সেটা মানব প্রকৃতির চাহিদার অনুরূপ ক্ষেত্রে তৈরি করে নিয়েছিলেন তা বলা মুস্কিল। এ ঘটনার প্রেক্ষিতেই আল্লাহ তা‘আলা আয়াতে ‘তাখয়ীর’ অবতীর্ণ করেন। (অর্থাৎ দুটি জিনিসের মধ্যে একটিকে সমানভাবে অবলম্বনের অধিকার দেয়া)। আয়তটি হচ্ছে,

(‏أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لأَزْوَاجِكَ إِن كُنتُنَّ تُرِدْنَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِيْنَتَهَا فَتَعَالَيْنَ أُمَتِّعْكُنَّ وَأُسَرِّحْكُنَّ سَرَاحًا جَمِيْلاً وَإِن كُنتُنَّ تُرِدْنَ اللهَ وَرَسُوْلَهُ وَالدَّارَ الآخِرَةَ فَإِنَّ اللهَ أَعَدَّ لِلْمُحْسِنَاتِ مِنكُنَّ أَجْرًا عَظِيْمً‏)‏ ‏[‏الأحزاب‏:‏ 28، 29‏]

‘হে নাবী! তুমি তোমার স্ত্রীদের বলে দাও- তোমরা যদি পার্থিব জীবন আর তার শোভাসৌন্দর্য কামনা কর, তাহলে এসো, তোমাদেরকে ভোগসামগ্রী দিয়ে দেই এবং উত্তম পন্থায় তোমাদেরকে বিদায় দেই। ২৯. আর তোমরা যদি আল্লাহ, তাঁর রসূল ও পরকালের গৃহ কামনা কর, তবে তোমাদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীল তাদের জন্য আল্লাহ মহা পুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন।’ [আল-আহযাব (৩৩) : ২৮-২৯]

এ আয়াতে কারীমার প্রেক্ষিতে নাবী কারীম (ﷺ)-এর পবিত্র বিবিগণ সম্পর্কে সহজেই ধারণা করা যায় যে, তাঁরা কতটা উন্নত রুচিসম্পন্ন এবং পদমর্যাদা সম্পর্কে কতটা সচেতন ছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর তাঁরা কতটা ভক্ত ও অনুরক্ত ছিলেন। তাঁদের জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে তাঁরা পার্থিব সুখ সাচ্ছন্দ্য ও আরাম আয়েশের পরিবর্তে আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এবং পরলৌকিক জীবনকেই প্রাধান্য প্রদান করেছেন।

সাধারণ ক্ষেত্রে সতীনদের মধ্যে যে হিংসা-বিদ্বেষ বাদানুবাদ, কলহ কিংবা অযাচিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা পরিলক্ষিত হয়ে থাকে পবিত্র বিবিগণের সংখ্যাধিক্য সত্ত্বেও অনাকাঙ্খিত সেরূপ কোন কিছু ঘটতে দেখা যায়নি। কদাচিৎ কখনো কোন ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে কিছুটা অসুবিধার সৃষ্টি হতে দেখা গেলে আল্লাহ তা‘আলাভ যখন আয়াত অবতীর্ণ করে তাঁদের সচেতন করে তুলছেন তার পর আর কখনই সে সবের পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেখা যায়নি। সূরাহ তাহরীমের প্রথম পাঁচটি আয়াতে সে সম্পর্কেই আলোচনা করা হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন,

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكَ تَبْتَغِي مَرْضَاتَ أَزْوَاجِكَ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ (1) قَدْ فَرَضَ اللَّهُ لَكُمْ تَحِلَّةَ أَيْمَانِكُمْ وَاللَّهُ مَوْلَاكُمْ وَهُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ (2) وَإِذْ أَسَرَّ النَّبِيُّ إِلَىٰ بَعْضِ أَزْوَاجِهِ حَدِيثًا فَلَمَّا نَبَّأَتْ بِهِ وَأَظْهَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ عَرَّفَ بَعْضَهُ وَأَعْرَضَ عَن بَعْضٍ فَلَمَّا نَبَّأَهَا بِهِ قَالَتْ مَنْ أَنبَأَكَ هَٰذَا ۖ قَالَ نَبَّأَنِيَ الْعَلِيمُ الْخَبِيرُ (3) إِن تَتُوبَا إِلَى اللَّهِ فَقَدْ صَغَتْ قُلُوبُكُمَا وَإِن تَظَاهَرَا عَلَيْهِ فَإِنَّ اللَّهَ هُوَ مَوْلَاهُ وَجِبْرِيلُ وَصَالِحُ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمَلَائِكَةُ بَعْدَ ذَٰلِكَ ظَهِيرٌ (4) عَسَىٰ رَبُّهُ إِن طَلَّقَكُنَّ أَن يُبْدِلَهُ أَزْوَاجًا خَيْرًا مِّنكُنَّ مُسْلِمَاتٍ مُّؤْمِنَاتٍ قَانِتَاتٍ تَائِبَاتٍ عَابِدَاتٍ سَائِحَاتٍ ثَيِّبَاتٍ وَأَبْكَارًا (5)

হে নবী! আল্লাহ যা তোমার জন্য হালাল করেছেন তা তুমি কেন হারাম করছ? (এর দ্বারা) তুমি তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি পেতে চাও, (আল্লাহ তোমার এ ত্রুটি ক্ষমা করে দিলেন কেননা) আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, বড়ই দয়ালু। ২. আল্লাহ তোমাদের জন্য নিজেদের কসমের বাধ্যবাধকতা থেকে নিস্কৃতি পাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন, আল্লাহ তোমাদের মালিক-মনিব-রক্ষক, আর তিনি সর্বজ্ঞাতা, মহা প্রজ্ঞার অধিকারী। ৩. স্মরণ কর- যখন নবী তার স্ত্রীদের কোন একজনকে গোপনে একটি কথা বলেছিল। অতঃপর সে স্ত্রী যখন তা (অন্য একজনকে) জানিয়ে দিল, তখন আল্লাহ এ ব্যাপারটি নবীকে জানিয়ে দিলেন। তখন নবী (তার স্ত্রীর কাছে) কিছু কথার উল্লেখ করল আর কিছু কথা ছেড়ে দিল। নবী যখন তা তার স্ত্রীকে জানাল তখন সে বলল, ‘আপনাকে এটা কে জানিয়ে দিল?’’ নবী বলল, ‘‘আমাকে জানিয়ে দিলেন যিনি সর্বজ্ঞাতা, ওয়াকিফহাল।’’ ৪. তোমরা দু’জন যদি অনুশোচনাভরে আল্লাহর দিকে ফিরে আস (তবে তা তোমাদের জন্য উত্তম), তোমাদের অন্তর (অন্যায়ের দিকে) ঝুঁকে পড়েছে, তোমরা যদি নবীর বিরুদ্ধে একে অপরকে সহযোগিতা কর, তবে (জেনে রেখ) আল্লাহ তার মালিক-মনিব-রক্ষক। আর এ ছাড়াও জিবরীল, নেককার মু’মিনগণ আর ফেরেশতাগণও তার সাহায্যকারী। ৫. নবী যদি তোমাদের সবাইকে তালাক দিয়ে দেয় তবে সম্ভবতঃ তার প্রতিপালক তোমাদের পরিবর্তে তাকে দিবেন তোমাদের চেয়ে উত্তম স্ত্রী- যারা হবে আত্মসমপর্ণকারিণী মু’মিনা অনুগতা, তাওবাহকারিণী, ‘ইবাদাতকারিণী, রোযা পালনকারিণী, অকুমারী ও কুমারী। (সূরাহ তাহরীম ৬৬ : ১-৫ আয়াত)

পরিশেষে এটা বলা অসঙ্গত হবে না যে, এ প্রসঙ্গে আমরা অধিক স্ত্রী গ্রহণের বিষয়টি আলোচনা করার প্রয়োজনবোধ করি নি। কারণ, এ ব্যাপারে যারা অধিক সমালোচনা মুখর থাকে অর্থাৎ ইউরোপবাসীগণ অধিক গ্রহণ ব্যবস্থাকে নিরুৎসাহিত করে তারা যে ধরণের দুর্বিষহ জীবন যাপনকে বৈধ করে নিয়েছে, ফ্রী স্টাইলে যৌন সম্ভোগকে পরোক্ষ অনুমোদন দান করার মাধ্যমে প্রত্যেক মুহূর্তে হলাহল পান করে যেভাবে সমাজ জীবনকে বিষাক্ত ও কলুষিত করে তুলেছে তা চিন্তা করতেও বিবেক দারুণভাবে বিপন্নবোধ করে। ইউরোপবাসীগণের পশু প্রবৃত্তিজাত ঘৃণ্য জীবন যাপন অধিক গ্রহণের যৌক্তিকতার সব চাইতে বড় সাক্ষী এবং সমাজবিজ্ঞানীদের জন্য উত্তম শিক্ষা ও চিন্তার বিষয়।

[1] যাদুল মা‘আদ ১ম খন্ড ২৯ পৃঃ।

[2] সহীহুল বুখারী ২য় খন্ড ৯৫৬ পৃঃ।

[3] সহীহুল বুখারী ২য় খন্ড ৯৬৫ পৃঃ।

নাবী কারীম (ﷺ) ছিলেন অসামান্য সৌন্দর্যমন্ডিত এবং পরিপূর্ণ স্বভাবের এমন এক ব্যক্তিত্ব, মানব সমাজে কোনকালেও যাঁর তুলনা মেলে না। তিনি ছিলেন সর্বগুণে গুণান্বিত এবং সর্বপ্রকার চরিত্র ভূষণে বিভূষিত এমন এক ব্যক্তিত্ব যাঁর সংশ্রবে আসা ব্যক্তিমাত্রই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা সম্পদে হৃদয় মন পরিপূর্ণ না করে পারতেন না। জাতি ধর্ম বর্ণ এবং শ্রেণী নির্বিশেষে সকল মানুষেরই তিনি ছিলেন অকৃত্রিম বন্ধু, একান্ত নির্ভরযোগ্য সুহৃদ এবং পরম হিতৈষী আপন জন। তাঁর সাহচর্যপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণও তাঁর জানমালের হেফাজত, সেবা যত্ম এবং মান-মর্যাদা সমুন্নত রাখার ব্যাপারে এতই সচেতন ও তৎপর থাকতেন যে, মানব জাতির ইতিহাসে কোন কালেও এর কোন নজির মেলে না। শুধু তাই নয়, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতেও কখনো কুণ্ঠাবোধ করতেন না।

নাবী কারীম (ﷺ)-এর বন্ধু ও সাহাবীগণ (রাযি.) তাঁকে মহববত করতেন আত্মহারার সীমা পর্যন্ত। নাবী কারীম (ﷺ)-এর দেহ কিংবা মনে সামান্যতম আঁচড় লাগাটাও তাঁরা বরদাশত করতে পারতেন না। যদিও এ ব্যাপারে তাঁদের গ্রীবা কর্তন করার পর্যায়ে উপনীত হতে হত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জন্য তাঁদের প্রাণাধিক এ ভক্তি ভালবাসার কারণ ছিল মানবত্বের বিকাশের ক্ষেত্রে তাঁকে এত অধিক পূর্ণত্ব প্রদান করা হয়েছিল যা কোন দিন কাউকেও দেয়া হয়নি। আমাদের অসহায়ত্বের স্বীকারোক্তি করে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে এ পর্যায়ে উপর্যুক্ত বিষয় সমূহের সার সংক্ষেপ লিপিবদ্ধ করছি।

উম্মু মা’বাদ খুযায়ীয়্যাহ এর বর্ণনা : হিজরতের সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উম্মু মা’বাদ খুযায়ীয়্যাহ নাম্নী এক মহিলার তাঁবুর পাশ দিয়ে গমন করেন। নাবী কারীম (ﷺ)-এর গমনের পর তাঁর চেহারা মুবারক সম্পর্কে সে মহিলা স্বীয় স্বামীর নিকট যে বর্ণনা চিত্র তুলে ধরেছিলেন তা হচ্ছে এই, ঝকঝকে গাত্রবর্ণ, সমুজ্জ্বল মুখমণ্ডল, সুশোভন দেহ সৌষ্ঠব, লম্বোদর ও টেকো মাথা হতে ত্রুটিমুক্ত, সুমিষ্ট উজ্জ্বলতায় সুস্নাত সুশোভন চিত্র, দীর্ঘ পলক বিশিষ্ট সুরমা সুশোভিত চক্ষু, গাম্ভীর্যমন্ডিত কণ্ঠস্বর, দীর্ঘ গ্রীবা, পরস্পর সন্নিবেশিত চিকন ভ্রূযুগল, জাঁকাল কৃষ্ণ কেশদাম, নীরবতা অবলম্বন করলে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে গাম্ভীর্য, অত্যন্ত আকর্ষণীয় কথনভঙ্গী, সুমিষ্টভাষী, সুস্পষ্ট ও পরিচ্ছন্ন কথাবার্তা না সংক্ষিপ্ত, না অতিরিক্ত, কথা বললে মনে হয় মালা থেকে মুক্তা ঝরছে, মানানসই মধ্যম উচ্চতা বিশিষ্ট দেহ, না স্বাভাবিক দীর্ঘ, না খর্ব, দুই শাখার মধ্যে এক শাখা বিশিষ্ট তিনটির মধ্যে যেটি সব চাইতে তাজা, সুন্দর ও উজ্জ্বলতাপূর্ণ। বন্ধুগণ তাঁর চারপাশে গোলাকৃতি ধারণ করেন। তিনি যখন কোন কিছু বলেন তাঁরা অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে তা শ্রবণ করেন। তাঁর পক্ষ থেকে কোন নির্দেশপ্রাপ্ত হলে তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে তা পালন করেন। আনুগত্যশীল, সম্মানিত, সুমিষ্ট ও স্বল্পভাষী।[1]

‘আলী (রাঃ) এর বর্ণনা : নাবী কারীম (ﷺ)-এর গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে আলী (রাঃ) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বেমানান দীর্ঘকায় কিংবা হ্রস্বকায় কোনটিই ছিলেন না। তিনি ছিলেন এ দুয়ের সমন্বয়ে অত্যন্ত মানানসই মধ্যম দেহী পুরুষ। তাঁর চুলগুলো অতিরিক্ত কোঁকড়ানো ছিল না, কিংবা একেবারে সোজা খাড়াও ছিল না, বরং এ দুয়ের সমন্বয়ে ছিল এক চমৎকার রূপভঙ্গী বিশিষ্ট। তাঁর গন্ডদেশে মাংস বাহুল্য ছিল না। চিবুক ক্ষুদ্রাকার এবং কপাল নীচু ছিল না। তাঁর মুখমণ্ডল ছিল গোলাকার গাত্রবর্ণ ছিল গোলাপী ও বাদামীর সংমিশ্রণ। চোখের পাতা ছিল লম্বাটে গড়নের, সন্ধিসমূহ এবং কাঁধের হাড্ডিগুলো ছিল বড় আকারের, বক্ষের উপরিভাগ থেকে নাভি পর্যন্তত ছিল স্বল্প পশমবিশিষ্ট একটি হালকা বক্ষরেখা, শরীরের অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ছিল কেশমুক্ত। হাত ও পাদ্বয় ছিল মাংসল, পথ চলার সময় একটু সম্মুখভাগে ঝুঁকে পা ওঠাতেন এবং এমনভাবে চলতেন যা দেখে মনে হতো যে, যেন কোন ঢালু পথ। যখন কারো প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেন তখন সে ব্যাপারে পুরোপুরি মনোযোগী হতেন। তাঁর পৃষ্ঠদেশে উভয় কাঁধের মধ্যভাগে ছিল মোহরে নবুওয়াত। নাবী কারীম (ﷺ) ছিলেন সর্বশেষ নাবী। দানশীলতা, সাহসিকতা এবং সত্যবাদিতায় তিনি ছিলেন সকলের চাইতে শ্রেষ্ঠ। তিনি ছিলেন সর্বাপেক্ষা অধিক আমানতের হেফাজতকারী এবং অঙ্গীকার পালনকারী, তিনি ছিলেন সর্বাধিক কোমল স্বভাবের অধিকারী এবং সকলের চাইতে বিশ্বস্ত সহচর এবং নির্ভরযোগ্য সঙ্গী।

কেউ আকস্মিকভাবে নাবী কারীম (ﷺ)-এর সাক্ষাতপ্রাপ্ত হলে তার অন্তর ভয়ে কম্পিত হত। কেউ তাঁর সঠিক পরিচয় লাভ করলে ঐকান্তিক আন্তরিকতার সাথে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করত। নাবী কারীম (ﷺ)-এর সীরাত বর্ণনাকারীগণ শুধুমাত্র এটুকুই বলতে পারেন যে, তাঁর আগে এবং পরে অনুরূপ কোন ব্যক্তিকেই তাঁর মতো দেখি নি।[2]

আলী (রাঃ)-এর এক বর্ণনায় আছে : রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাথা ছিল বড়, সন্ধির (জোড়ের) হাড্ডিগুলো ছিল ভারী এবং বক্ষপুটে ছিল পশমের দীর্ঘ রেখা। পথ চলার সময় সামনের দিকে এমন ভাবে একটু ঝুঁকে চলতেন যাতে মনে হতো যে, তিনি যেন কোন ঢালু স্থান হতে অবতরণ করছেন।[3]

জাবির বিন সামুরাহ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, নাবী কারীম (ﷺ)-এর মুখমণ্ডল ছিল প্রশস্ত, চক্ষু ছিল হালকা লাল বর্ণের এবং পায়ের গোড়ালি ছিল পাতলা।[4]

আনাস বিন মালিক বলেছেন : ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর গাত্রবর্ণ ছিল গৌর, মুখমণ্ডল ছিল অত্যন্ত সুশ্রী ও মাধূর্যমন্ডিত এবং দেহ মুবারক ছিল মাঝারি গড়নের।[5]

আনাস বিন মালিক (রাঃ) বলেছেন : ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাতের তালু ছিল প্রশস্ত, গাত্রবর্ণ ছিল সাদা এবং বাদামির মাঝামাঝি উজ্জ্বল। মৃত্যু পর্যন্ত চুল ও দাড়ি মুবারক তেমন সাদা হয় নি।[6] শুধু কান এবং মাথার মধ্যবর্তী স্থানে চুলগুলো কিছুটা সাদা হয়েছিল এবং মাথার উপরি ভাগে সামান্য কিছু সংখ্যক চুল সাদা হয়েছিল।[7]

আবূ যুহাইফাহ (রাঃ) বলেছেন, ‘আমি নাবী কারীম (ﷺ)-এর অধরের নিম্ন ভাগে কিছু সংখ্যক সাদা দাড়ি লক্ষ্য করেছি।[8]

আব্দুল্লাহ বিন বুসর (রাঃ) বর্ণনা করেছেন : ‘নাবী কারীম (ﷺ)-এর নীচের চুলগুলোর মধ্যে কয়েকটি চুল সাদা ছিল।[9]

বারা’ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, ‘নাবী কারীম (ﷺ)-এর দৈহিক গঠন ছিল মধ্যম ধরণের। উভয় কাঁধের মধ্যে ছিল দূরত্ব এবং কেশরাশি ছিল দু’ কানের লতি পর্যন্ত বিস্তৃত। আমি নাবী কারীম (ﷺ)-কে সৌন্দর্যমন্ডিত পোশাকাদি পরিহিত অবস্থায় প্রত্যক্ষ করেছি। নাবী কারীম (ﷺ)-এর চাইতে অধিক সুন্দর কোন কিছু আমি কখনো প্রত্যক্ষ করি নি।[10]

প্রথমাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আহলে কিতাবের সঙ্গে সাদৃশ্য বজায় রেখে চলা পছন্দ করতেন এবং এ কারণে চুলে চিরুনী ব্যবহার করতেন, কিন্তু তাঁর সিঁথি প্রকাশ পেত না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সিঁথি প্রকাশিত।[11]

বারা’ (রাঃ) বলেছেন, ‘নাবী কারীম (ﷺ)-এর মুখমণ্ডল ছিল সর্বাধিক সুশ্রী এবং তাঁর আচার আচরণ ছিল সর্বোত্তম।[12] তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল যে, নাবী কারীম (ﷺ)-এর মুখমণ্ডল কি তলোয়ারের মতো ছিল? উত্তরে বলা হল, ‘না, বরং পূর্ণ চন্দ্রের মতো ছিল।’ এক বর্ণনায় আছে যে, ‘নাবী কারীম (ﷺ)-এর মুখমণ্ডল ছিল গোলাকার।[13]

রুবায়্যি’ বিনতে মুওয়াভ্যিয বলেছেন, ‘যদি তোমরা নাবী কারীম (ﷺ)-কে দেখতে তাহলে মনে হতো যে, তোমরা উদিত সূর্য দেখছ।[14]

জাবির বিন সামুরাহ বলেছেন, ‘আমি এক চাঁদনী রাতে নাবী কারীম (ﷺ)-কে দেখলাম। তাঁর উপর রক্তিম আভা ছড়ানো ছিল। আমি তখন একবার রাসূল (ﷺ)-এর দিকে একবার চাঁদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম। শেষ পর্যন্ত এ সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম যে, চাঁদের চাইতেও তিনি অধিক সুন্দর।[15]

আবু হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর চেয়ে উজ্জ্বলতর কোন চেহারা আমি কক্ষনো দর্শন করিনি। তাঁর চেহারায় যেন সূর্য কিরণের ন্যায় ঝলমল করতো। আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর চেয়ে দ্রুত চলন কারো দেখিনি, জমিন যেন তার কাছে সংকুচিত হয়ে যায়। আমরা খুব কষ্ট করে তার নাগাল পেতাম অথচ এটা তার কাছে কিছুই মনে হতো না।

কা‘ব বিন মালিক বর্ণনা করেন যে, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন প্রফুল্ল থাকতেন তখন তাঁর মুখমণ্ডল এরূপ চমকিত হতো যে, মনে হতো যেন তা চন্দ্রের একটি অংশ।[16]

একদা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আয়িশাহ (রাঃ)-এর নিকট উপস্থিত ছিলেন, এমতাবস্থায় যখন তাঁর দেহ মুবারক ঘর্মাক্ত হল তখন তাঁর মুখমণ্ডল উজ্জ্বলতায় ঝলমলিয়ে উঠল। এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে আয়িশাহ (রাঃ) আবূ কাবীর হুযালীর এ কবিতার আবৃত্তি করলেন,

وإذا نظرت إِلٰى أسرة وجهه ** برقت كبرق العارض المتهلل

অর্থ: তাঁর মুখমণ্ডলের উজ্জ্বলতার দিকে লক্ষ্য করবে তখন তা এমনভাবে আলোকিত দেখবে যেন ঘনঘটার মধ্য থেকে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।’

আবূ বাকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে দেখে এ কবিতা আবৃত্তি করতেন,

أمين مصطفى بالخير يدعو ** كضوء البدر زايله الظلام

অর্থ : নাবী কারীম (ﷺ) বিশ্বাসী ছিলেন, মনোনীত এবং পছন্দনীয়। ভালোর দিকে আহবান জানাচ্ছেন, যেন পূর্ণমাত্রার আলো মুখে খেলছে।[17]

উমার (রাঃ) কবি যুহাইয়েরের এ কবিতা আবৃত্তি করতেন যা হারিম বিন সিনান সম্পর্কে বলা হয়েছিল,

لو كنت من شيء سوى البشر ** كنت المضيء لليلة البدر

অর্থ : ‘যদি আপনি মানুষ ছাড়া অন্য কিছুর অন্তর্ভুক্ত হতেন তবে আপনি স্বয়ং চতুর্দশী রাত্রিকে আলোকিত করতেন।’ অতঃপর ইরশাদ করতেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এমনটিই ছিলেন।[18]

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন রাগান্বিত হতেন তখন তাঁর মুখমণ্ডল রক্তিম বর্ণ ধারণ করত। মনে হতো যেন গন্ডদ্বয়ের উপর ডালিমের রস সিঞ্চিত হয়েছে।[19]

জাবির বিন সামুরাহ হতে বর্ণিত হয়েছে, নাবী কারীম (ﷺ) -এর পিন্ডলি কিছুটা পাতলা ছিল। তিনি যখন হাসতেন তখন মুচকি হাসতেন। তাঁর চক্ষুদ্বয় ছিল সুরমা বর্ণের। দেখে মনে হতো যে তিনি সুরমা ব্যবহার করেছেন। অথচ প্রকৃতপক্ষে তিনি তা ব্যবহার করেননি।[20]

‘উমার (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সামনে দাঁতগুলো সব মানুষের চেয়ে সুন্দর ছিল।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, ‘নাবী কারীম (ﷺ)-এর মুখের সম্মুখ ভাগে দুটি দাঁতের মধ্যে কিছু ফাঁক ছিল। তিনি যখন কথা বলতেন তখন তাঁর দাঁত দুটির ফাঁক দিয়ে আলোর আভাষ পাওয়া যেত।[21]

নাবী কারীম (ﷺ)-এর গ্রীবা ছিল যেন চন্দ্রের পরিচ্ছন্নতায় উজ্জ্বল একটি পুতুলের গ্রীবা। দাড়ি মুবারক ছিল ঘন সন্নিবেশিত, ললাট প্রশস্ত, ভ্রূযুগল ছিল বিজড়িত অথচ একটি হতে অন্যটি ছিল পৃথক, নাসিকা সমুন্নত, গন্ডদ্বয় ছিল হালকা গড়নের, গর্দান থেকে নাভি পর্যন্ত ছড়ির ন্যায় বক্ষকেশর একটি সুশোভন রেখা বিদ্যমান ছিল। সে রেখার পশম ব্যতীত বক্ষ এবং পেটের অন্য কোথাও পশম ছিল না। তবে হাতের কবজি এবং কাঁধের উপর পশম ছিল। পেট এবং বক্ষের সম্মুখ ভাগের দিকে দৃষ্টিপাত করে বক্ষ সমতল ও প্রশস্ত প্রতীয়মান হত। হাতের কবজিদ্বয় কিছুটা বড় আকারের, হাতের তালুদ্বয় প্রশস্ত ছিল সোজা, পায়ের পাতা শূন্য এবং আঙ্গুলগুলো কিছুটা বড় সড় আকারের ছিল। চলার সময় সামনের দিকে কিছুটা ঝুঁকে পড়ে সহজ ভাবে চলতেন।[22]

আনাস (রাঃ) বলেছেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাতের তুলনায় অধিক কোমল এবং মোলায়েম রেশম কিংবা মলমল আমি স্পর্শ করি নি। অধিকন্তু, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দেহ মুবারক নিঃসৃত সুগন্ধির তুলনায় অধিক সুগন্ধিযুক্ত কোন আতর কিংবা মেশক আম্বরের সুগন্ধি আমি গ্রহণ করি নি।[23]

আবূ যুহায়ফা (রাঃ) বলেছেন, ‘রাসূলে কারীম (ﷺ)-এর হাত মুবারক আমার মুখমণ্ডলের উপর স্থাপন করায় আমি তা বরফের ন্যায় শীতল এবং মেশক আম্বর হতে অধিক সুগন্ধিযুক্ত অনুভব করলাম।[24]

আনাস (রাঃ) বলেছেন, ‘নাবী কারীম (ﷺ)-এর ঘর্মবিন্দু দেখতে মণিমুক্তার মতো মনে হতো এবং উম্মু সুলাইম (রাঃ) বলেছেন, ‘নাবী (ﷺ)-এর ঘর্মরাজি থেকে উত্তম সুগন্ধি প্রকাশ পেত।[25]

জাবির (রাঃ) বলেছেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন কোন পথ ধরে চলতেন এবং তার পর অন্য কেউ সে পথ ধরে চললে, তাঁরা (নাবী (ﷺ)-এর) দেহ নিঃসৃত সুগন্ধি থেকে বুঝতে পারতেন যে, নাবী কারীম (ﷺ) এ পথে গমন করেছেন।[26]

রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দু’ কাঁধের মধ্যবর্তী স্থানে ছিল ‘মোহর নবুওয়াত’। আকার আকৃতি ছিল কবুতরের ডিমের ন্যায় এবং তা ছিল পবিত্র গাত্রবর্ণের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। এ মোহরের অবস্থিতি ছিল বাম কাঁধের নরম হাড়ের নিকট। এ মোহরের উপর ছিল সবুজ রেখার ন্যায় তিলের সমাহার।[27]

[1] যাদুল মা‘আদ ২য় খন্ড ৫৪ পৃঃ।

[2] ইবনু হিশাম ১ম খন্ড ৪০১-৪০২ পৃঃ। তিরমিযী তোহফাতুল আহওয়াযী সহ ৪র্থ খন্ড ৩০৩ পৃঃ।

[3] তিরমিযী মা‘য়া শরহ।

[4] সহীহুল মুসলিম ২য় খন্ড ২৫৮ পৃঃ।

[5] সহীহুল মুসলিম ২য় খন্ড ২৫৮ পৃঃ।

[6] সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৫০২ পৃঃ।

[7] সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৫০২ পৃ: ও সহীহুল মুসলিম ২য় খন্ড ২৫৯ পৃঃ।

[8] সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৫০১ -৫০২ পৃ: ।

[9] সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৫০২ পৃঃ।

[10] সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৫০২ পৃঃ।

[11] সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৫০৩ পৃঃ।

[12] সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৫০২ পৃ: ও সহীহুল মুসলিম ২য় খন্ড ২৫৯ পৃঃ।

[13] সহীহুল মুসলিম দারেমী, মিশকাত শরীফ ২য় খন্ড ৫১৭ পৃঃ।

[14] তিরমিযী শামায়েলের মধ্যে পৃ: ২ দারমী মিশকাত ২য় খন্ড ৫১৭ পৃঃ।

[15] শারহা তোহফা সহ তিরমিযী ৪র্থ ৩০৬ পৃঃ, মিশকাত ২য় খন্ড ৫১৮ পৃঃ।

[16] সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৫০২ পৃঃ।

[17] খোলাসাতুস সিয়ার ২০ পৃঃ।

[18] খোলাসাতুস সিয়ার ২০ পৃঃ।

[19] মিশকাত ১ম খন্ড ২২ পৃঃ, তিরমিযী কাদার অধ্যায় ভাগ্য সম্পর্কে খোঁজে কঠোরতা ২য় খন্ড ৩৫ পৃঃ।

[20] জামে তিরমিযী সারাহ সহ ৪র্থ খন্ড ৩০৬ পৃঃ।

[21] তিরমিযী, মিশকাত ২য় খন্ড ৫১৮ পৃঃ।

[22] খোলাসাতুস সিয়ার ১৯-২০ পৃঃ।

[23] সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৫০৩ পৃঃ, সহীহুল মুসলিম ২য় খন্ড ২৫৭ পৃঃ।

[24] সহীহুল মুসলিম ২য় খন্ড ২৫৬ পৃঃ।

[25] সহীহুল মুসলিম ।

[26] দারমী, মিশকাত, ২য় খন্ড ৫১৭ পৃঃ।

[27] সহীহুল বুখারী ২য় খন্ড ২৫৯ ও ২৬০ পৃঃ।
আত্মার পূর্ণত্ব ও আচার আচরণের আভিজাত্য (كَمَالُ النَّفْسِ وَمَكَارِمِ الْأَخْلَاقِ):

নাবী কারীম (ﷺ) বাকপটুতা ও বাগ্মীতার জন্য অত্যন্ত মশহুর ছিলেন। তিনি ছিলেন অসাধারণ এক বাকপটু ব্যক্তিত্ব। প্রয়োজন মতো সঠিক শব্দ চয়ন ও সংযোজনের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন বাক্য বিন্যাসের ক্ষমতা ছিল তাঁর অসাধারণ। তৎকালীন আরবে প্রচলিত সর্বপ্রকার ভাষারীতি অনুধাবন এবং যে কোন প্রয়োজনের প্রেক্ষাপটে তার যথাযথ প্রয়োগের এক দুর্লভ ক্ষমতা তাঁকে প্রদান করা হয়েছিল। কাজেই, আরবের যে কোন গোত্রের ভাষা অনুধাবন এবং অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে তা ব্যবহার করতে তিনি সক্ষম হতেন। একদিকে প্রত্যন্ত মরু অঞ্চলের বেয়াড়া বেদুঈনদের সঙ্গে যেমন তিনি অত্যন্ত সঙ্গত পন্থায় ভাব বিনিময় করতে এবং বক্তব্য পেশ করতে সক্ষম হতেন, অন্য দিকে তেমনি আবার নগরবাসী আরবগণের সঙ্গে অত্যন্ত উন্নত ও মার্জিত ভাষায় কথোপকথন ও বক্তব্য পেশ করতে সক্ষম হতেন। তাছাড়া তাঁর জন্য ছিল ওহীর মাধ্যমে আসমানী সমর্থন।

নাবী কারীম (ﷺ) ছিলেন সর্ব প্রকার মানবিক গুণে গুণান্বিত এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। ধৈর্য্যশীলতা, সহনশীলতা, দয়ার্দ্রচিত্ততা, সংবেদনশীলতা, পরহিতব্রততা, ক্ষমাশীলতা ইত্যাদি যাবতীয় মানবিক গুণাবলীর বিকাশ ঘটেছিল তাঁর মধ্যে পূর্ণমাত্রায়। মানব জাতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বহুবিধ গুণে গুণান্বিত ব্যক্তিগণের মধ্যেও কোন না কোন দোষত্রুটি পরিলক্ষিত হত। কিন্তু রাসূলে কারীম (ﷺ) ছিলেন সকল রকম মানবিক গুণে গুণান্বিত এমন ব্যক্তিত্ব যে ক্ষেত্রে কস্মিনকালেও কোন ব্যাপারে সামান্যতম ত্রুটিবিচ্যুতিও পরিলক্ষিত হয়নি। এক্ষেত্রে সব চাইতে লক্ষ্যণীয় ব্যাপার ছিল এটা যে, শত্রুদের শত্রুতা এবং দুষ্ট লোকদের দুষ্টুমির মাত্রা যতই বৃদ্ধি পেত নাবী কারীম (ﷺ)-এর সহনশক্তি এবং ধৈর্যশীলতা ততোধিক মাত্রায় বৃদ্ধি প্রাপ্ত হতো।

আয়িশা (রাঃ) বলেছেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে যখনই দুটি কাজের অধিকার দেয়া হতো কিংবা দুটি কাজের সুযোগ তাঁর সম্মুখে উপস্থাপিত তিনি সহজতর কাজটি গ্রহণ করতেন। কিন্তু কোন প্রকার অন্যায় কিংবা পাপের কাজ হলে কখনই তা গ্রহণ করতেন না। অন্যায় কিংবা পাপের কাজ হলে সর্বপ্রথম তিনিই তা থেকে বিরত হয়ে যেতেন। নাবী কারীম (ﷺ) ব্যক্তিগতভাবে তাঁর প্রতি কৃত কোন অন্যায়ের প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন না। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলার অবমাননাকর কোন কাজ কিংবা কথার তিনি তৎক্ষণাত প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি ক্রোধ এবং প্রতিহিংসাপরায়ণতার উর্ধ্বে অবস্থান করতেন।[1]

ন্যায়সঙ্গত কোন চুক্তি কিংবা বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে তিনিই সহজভাবে সম্মতি জ্ঞাপন করতেন। সমগ্র মানবজাতির জন্য তাঁর দয়া ও দানশীলতার কোন তুলনা মেলেনা। নাবী কারীম (ﷺ) অভাব অনটন এবং দরিদ্রতা বিমুক্ত মন নিয়েই সব সময় দান খয়রাত করতেন। দান খয়রাতের ব্যাপারে অভাব অনটন দরিদ্রতা সম্পর্কে তাঁর মনে কখনই কোন আশঙ্কার উদয় হতো না। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, ‘নাবী কারীম (ﷺ) ছিলেন সর্বাধিক দান-দক্ষিণার মূর্ত প্রতীক। দান-দক্ষিণার ব্যাপারে তিনি ছিলেন দরিয়ার ন্যায় উদার, উন্মুক্ত। নাবী কারীম (ﷺ)-এর এ দানের হাত রমাযানুল মুবারকের সময় আরও অধিক প্রসারিত হতো যখন জিবরাঈল (আঃ) তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে তশরীফ আনয়ন করতেন। এ প্রসঙ্গে বিষয়টি উল্লেখযোগ্য যে, জিবরাঈল (আঃ) আগমন করতেন এবং কুরআন পুনরাবৃত্তি করতেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সদকা খায়রাতে (রহমতের ভান্ডারে পরিপূর্ণ) প্রেরিত হাওয়া হতেও অধিক অগ্রসর থাকতেন।[2] জাবির (রাঃ) বলেছেন, ‘এমনটি কখনোও হয় নি যে, নাবী কারীম (ﷺ)-এর নিকট কিছু যাচ্ঞা করা হয়েছে, কিন্তু তিনি যাচ্ঞাকারীকে যাচ্ঞাকৃত বস্তু দান করেননি কিংবা ‘না’ কথাটি বলেছেন।[3]

বীরত্ব এবং সাহসিকতায় নাবী কারীম (ﷺ)-এর স্থান ছিল সর্বাগ্রে। তিনি ছিলেন সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর পুরুষ। অত্যন্ত সংকটময় মুহূর্তে এবং সমস্যাসংকুল স্থানে যেক্ষেত্রে প্রখ্যাত বীর পুরুষদের স্থানচ্যুত হয়ে পশ্চাদপসরণ করতে দেখা গেছে, সেরূপ ক্ষেত্রেও নাবী কারীম (ﷺ) স্বস্থানে অটল থেকে সম্মুখ পানে অগ্রসর হয়েছেন। সম্মুখ সমরে কোন না কোন ক্ষেত্রে মশহুর বীর পুরুষদেরও পলায়নরত পরিলক্ষিত হয়েছে, কিন্তু নাবী কারীম (ﷺ)-এর ক্ষেত্রে কখনই এমনটি পরিলক্ষিত হয় নি। আলী (রাঃ) বলেছেন, ‘সম্মুখ সমরে যখন বিভীষিকাময় অবস্থার সৃষ্টি হয়ে যেত তখন আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আড়ালে অবস্থান করতাম। কোন শত্রু নাবী কারীম (ﷺ)-এর নিকটবর্তী হওয়ার সাহস পেত না।[4]

আনাস (রাঃ) বলেছেন, ‘মদীনাবাসীগণ বিকট এক শব্দ শ্রবণে এক রাত্রে কিছুটা ভীত সন্ত্রস্ত্র হয়ে পড়লেন। শব্দ শ্রবণের পর শব্দের উৎপত্তিস্থলের দিকে দৌঁড় দিয়ে যেতে থাকলেন। পথে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাত হল। শব্দ শ্রবণ করে পূর্বাহ্নে তিনি লক্ষ্যস্থলে গমন করেছিলেন ‘খোঁজ খবর নেয়ার উদ্দেশ্যে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঐ সময় আবূ ত্বালহাহ (রাঃ)’র একটি পালানবিহীন ঘোড়ার উপর আরোহিত ছিলেন। তাঁর কাঁধে তরবারী কোষবদ্ধ অবস্থায় ছিল। তিনি লোকজনদের বললেন, ‘ভয়ের কিছুই নেই, তোমরা নিশ্চিন্ত থাক।’ এটি হচ্ছে তাঁর নির্ভিকচিত্ততার এক জ্বলন্ত প্রমাণ।[5]

নাবী কারীম (ﷺ) ছিলেন সব চাইতে লজ্জাশীল এবং অবনত দৃষ্টিসম্পন্ন। আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেছেন যে, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) পর্দানশীনা কুমারীর চাইতেও অধিক মাত্রায় লজ্জাশীল ছিলেন। তিনি যখন কোন কিছু অপছন্দ করতেন কিংবা কোন কিছু তাঁর অসহনীয় মনে হতো তাঁর মুখমণ্ডলেই তা প্রকাশ পেয়ে যেত।[6]

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কখনই নিজ দৃষ্টি অন্যের উপর নিক্ষেপ করে অধিকক্ষণ ধরে রাখতেন না। তিনি সব সময় দৃষ্টি নীচের দিকে রাখতেন এবং আকাশের দিকে রাখার চাইতে মাটির দিকে দৃষ্টি রাখাটাই অধিক পছন্দ করতেন। সাধারণতঃ দৃষ্টি নিম্নমুখী রেখেই তিনি কোন কিছু দেখতেন। লজ্জা প্রবণতা তাঁর মধ্যে এত অধিক ছিল যে, কোন অপছন্দনীয় কথা কাউকেও তিনি মুখোমুখী বলতেন না। তাছাড়া কারো কোন অসহনীয় কথা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কান পর্যন্ত পৌঁছতই না। তবে নাম ধাম নিয়ে এ ব্যাপারে আলাপ আলোচন করা হত। বরং বলা হত, ‘এ কেমন কথা যে কিছু লোক এরূপ বলাবলি করছে। ফারাযদাকের নিম্নোক্ত কবিতার তুলনা বিশুদ্ধভাবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজেই ছিলেন,

يغضي حياء ويغضي من مهابته ** فــلا يكلـم إلا حيـن يبتسـم

অর্থ : লজ্জাশীলতার কারণে নাবী কারীম (ﷺ) দৃষ্টি নীচু রাখতেন এবং তাঁর ভয়ে অন্যান্যরা দৃষ্টি নীচু রাখতেন। তিনি যখন মৃদু হাসতেন তখন তাঁর সঙ্গে কথোপকথন করা হত।

নাবী কারীম (ﷺ) ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ন্যায় বিচারক, সর্বাধিক পবিত্র, সর্বাধিক সত্যবাদী এবং সব চাইতে নির্ভরযোগ্য আমানতদার। তাঁর এ সকল গুণাবলীর কথা বন্ধুগণ তো বটেই, শত্রুগণও এক বাক্যে স্বীকার করে থাকেন। নবুওয়াতের পূর্বে জাহেলিয়াত যুগে তাঁকে আমীন (বিশ্বাসী) উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল। সে যুগেও বিরোধের ন্যায়সঙ্গত মীমাংসার উদ্দেশ্যে লোকেরা তাঁর নিকট আগমন করত। জামে তিরমিযীতে আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, ‘একবার নাবী (ﷺ)-এর নিকট আবূ জাহল এসে বলল, ‘আমরা আপনাকে মিথ্যুক বলছি না, তবে আপনি যা এনেছেন তাকে মিথ্যা বলছি’। এ প্রেক্ষিতে আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন,

(‏فَإِنَّهُمْ لاَ يُكَذِّبُوْنَكَ وَلَكِنَّ الظَّالِمِيْنَ بِآيَاتِ اللهِ يَجْحَدُوْنَ‏)‏ ‏[‏الأنعام‏:‏33‏]

‘এ লোকজনেরা আপনাকে মিথ্যা বলে না বরং এ জালেমেরা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করছে।’ [আল-আন‘আম (৬) : ৩৩)।[7]

রোমক সম্রাট হিরাক্বল আবূ সুফইয়ানকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, ‘ওই নাবী সম্পর্কে তোমরা যে সব কথা বলছ তার পূর্বে কি তোমরা তাঁকে মিথ্যাবাদী হিসেবে পেয়েছে?’ তখন আবূ সুফইয়ান উত্তরে বললেন, ‘না’।

নাবী কারীম (ﷺ) ছিলেন সব চাইতে বিনয়ী। তাঁর আচার আচরণে অহংকার কিংবা আত্মম্ভরিতার কোন ঠাঁই ছিল না। শাসক বা সম্রাটগণ যেভাবে খাদেম বা সেবকদের সঙ্গে আচরণ করে থাকেন তিনি তাঁর সাহাবা কিংবা সেবকগণের সঙ্গে কখনো সেরূপ আচরণ করতেন না। তিনি তাঁর সম্মানার্থে সাহাবীগণকে দন্ডায়মান থাকতে নিষেধ করতেন। তিনি অসহায়দের দেখাশোনা করতেন, পরমুখাপেক্ষীদের সঙ্গে উঠাবসা করতেন এবং দাসদের দাওয়াত কবুল করতেন। তাঁর এবং সাহাবাগণের মধ্যে কোন প্রকার ব্যবধান থাকত না। তিনি অত্যন্ত সাদাসিদে এবং সাধারণ ভাবেই তাঁদের সঙ্গে উঠাবসা করতেন। আয়িশা (রাঃ) বলেছেন যে, তিনি নিজেই জুতা সেলাই করতেন বা জুতার পট্টি লাগাতেন এবং নিজের কাপড় চোপড় নিজেই সেলাই করতেন। একজন সাধারণ মানুষের ন্যায় সংসারের যাবতীয় কাজকর্ম তিনি নিজেই সম্পন্ন করতেন। নিজ হাতে ছাগী দোহন করতেন, কাপড় থেকে উকুন বেছে নিতেন এবং কাপড় চোপড় পরিস্কার করতেন।[8]

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ছিলেন সর্বাধিক প্রতিজ্ঞাপরায়ণ এবং সকলের সঙ্গেই অত্যন্ত উঁচু মানের সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতেন। দয়ার্দ্রতা, স্নেহশীলতা এবং দানশীলতায় তিনি ছিলেন অতুলনীয়। তিনি ছিলেন সর্বোত্তম শিষ্টাচারী এবং তাঁর আচার আচরণ ছিল সব চাইতে উদার ও সর্বাধিক প্রশস্ত। কোন প্রকার সংকীর্ণতা কিংবা অশালীনতা থেকে তাঁর স্থান ছিল পূর্ব থেকে পশ্চিমের ন্যায় দূরত্বে। মুশরিককর্তৃক অবর্ণনীয় দুঃখ যন্ত্রণা সত্ত্বেও কাউকেও তিনি কোন অভিশাপ দেননি কিংবা অন্যায়াচরণের পরিবর্তে অন্যায়াচরণ করেননি বরং প্রতিদানে তিনি দিয়েছেন ক্ষমা ও মার্জনা।

পথে চলতে গিয়ে কাউকেও তিনি পিছনে ফেলে যেতেন না। তাছাড়া, পানাহারের ব্যাপারে আপন দাসদাসীদের নিকট তিনি কখনই অহংকার করতেন না। স্বীয় সেবকদের প্রতি ইহসানির উদ্দেশ্যে তিনি তাদের কাজ কর্মে সাহায্য করতেন। স্বীয় সেবকদের কাজকর্মের কারণে অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি কখনই ‘উহ’ শব্দটি পর্যন্ত উচ্চারণ করেননি কিংবা নিন্দা করেননি। তিনি অনাথ ও অসহায়দের ভাল বাসতেন, তাদের সঙ্গে চলাফেরা করতেন এবং তাদের জানাজায় উপস্থিত থাকতেন। দারিদ্রতার কারণে কোন দরিদ্রকে তিনি দীন-হীন মনে করতেন না।

একদা নাবী কারীম (ﷺ)-এর প্রবাসে থাকা অবস্থায় একটি ছাগল যবেহ করে তা রান্নাবান্নার সিদ্ধান্ত গৃহীত হল। একজন সাহাবী বললেন, ‘যবেহ করার দায়িত্ব আমার উপর বর্তিবে।’ দ্বিতীয় জন বললেন,‘ওর চামড়া ছাড়ানো আমার উপর বর্তিবে।’ নাবী কারীম (ﷺ) বললেন,‏(‏وَعَلَيَّ جَمْعُ الْحَطَبِ‏)‏ ‘জ্বালানী সংগ্রহ আমার দায়িত্বে থাকবে।’ সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) আরয করলেন, ‘আপনার কাজটা আমরাই করে নিব।’ তিনি বললেন,

‏(‏قَدْ عَلِمْتُ أَنَّكُمْ تُكْفُوْنِيْ وَلٰكِنِّيْ أَكْرَهُ أَنْ أَتَمَيَّزَ عَلَيْكُمْ، فَإِنَّ اللهَ يَكْرَهُ مِنْ عَبْدِهِ أَنْ يَرَاهُ مُتَمَيِّزاً بَيْنَ أَصْحَابِهِ‏)‏

‘আমি জানি যে, তোমরা আমার কাজটা করে দেবে, কিন্তু আমি এটা পছন্দ করি না যে, আমার ও তোমাদের মাঝে কোন পার্থক্য বা দূরত্ব থাকুক। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা এটা পছন্দ করেন না যে, তাঁর বান্দা নিজ বন্ধুদের উপর তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব দাবী করেন।’

অতঃপর তিনি জ্বালানী একত্রীকরণের কাজে রত হয়ে গেলেন।[9]

হিন্দ বিন আবী হালাহর বাচনিক বর্ণনা : হিন্দ বিন আবী হালাহর বাচনিক তথ্য সূত্রে রাসূলে কারীম (ﷺ)-এর গুণাবলী সম্পর্কে আমরা কিছুটা অবগত হই। হিন্দ এক দীর্ঘ বর্ণনায় বলেছেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একের পর এক কতগুলো দুশ্চিন্তায় ভুগছিলেন। সর্বক্ষণ চিন্তাগ্রস্ত থাকার কারণে তাঁর মানসিক শান্তি স্বস্তির যথেষ্ট অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। বিশেষ প্রয়োজনে ছাড়া তিনি কথাবার্তা তেমন বলতেন না। দীর্ঘক্ষণ যাবত নীরব থাকতেন। তবে কথাবার্তা যা বলতেন তা সম্পূর্ণ এবং সুস্পষ্টভাবেই বলতেন। তাঁর কথাবার্তার মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিংবা অসস্পূর্ণ কোন কথাবার্তা থাকত না। তিনি ছিলেন অত্যন্ত কোমল স্বভাবের, মিষ্টভাষী এবং কৃতজ্ঞাতাপরায়ণ। সামান্য অনুগ্রহেরও তিনি বড়ই কদর করতেন। কোন ব্যাপারে তিনি কারো নিন্দা করতেন না কিংবা অসাক্ষাতে কিছু বলতেন না।

কোন খাদ্যদ্রব্যকে তিনি কখনো খারাপ বলতেন না। সত্য সম্পর্কিত প্রশংসায় কেউ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে যতক্ষণ তিনি প্রতিশোধ গ্রহণ না করতেন ততক্ষণ তাঁর ক্রোধ স্তিমিত হতো না। তবে, নিশ্চিতরূপে তিনি প্রশস্ত অন্তরের অধিকারী ছিলেন। ব্যক্তিগত কোন ব্যাপারে তিনি ক্রোধান্বিত হতেন না, প্রতিশোধও গ্রহণ করতেন না। কোন কিছুর জন্য যখন হাত দিয়ে ইশরা করতেন তখন পুরো হাত ব্যবহার করতেন। কোন ব্যাপারে অবাক হওয়ার সময় হাত ফিরাতেন। যখন রাগান্বিত হতেন তখন চেহারা মুবারক পরিবর্তিত হয়ে যেত, যখন সন্তুষ্ট হতেন তখন দৃষ্টি নিম্নমুখী হয়ে যেত। হাসির প্রয়োজনে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মুচকি হাসি হাসতেন। হাসির সময় দাঁতগুলো বরফের ন্যায় চমকাতে থাকত।

অনর্থক কথাবার্তার ক্ষেত্রে তিনি মুখ বন্ধ রাখতেন। বন্ধু বান্ধবগণের সঙ্গে তিনি সব সময় সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতেন। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের সম্মানিত ব্যক্তিদের তিনি সম্মান করতেন এবং সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের অভিভাবক হিসেবে গণ্য করতেন। মানুষের ক্ষতির কারণ হতে পারে এমন সব কার্যকলাপ থেকে তিনি সতর্কতা অবলম্বন করতেন কিন্তু এ জন্য কারো নিকট তিনি নিজেকে হেয় প্রতিপন্ন করতেন না।

রাসুলুল্লাহ (ﷺ) নিজ সঙ্গীসাথীগণের খবরাখবর রাখতেন এবং মানুষের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। ভাল জিনিসের প্রশংসা ভাল কাজের সুফল এবং খারাপ জিনিসের মন্দ প্রভাব ও খারাপ কাজের কুফল সম্পর্কে বলতেন এবং সর্বক্ষেত্রেই সততা ও সত্যের সাক্ষ্য প্রদান করতেন। কোন ব্যাপারেই তিনি বাড়াবাড়ি করতেন না কিংবা চূড়ান্ত পন্থাও অবলম্বন করতেন না। সর্ব ব্যাপারেই তিনি মধ্যম পন্থা অবলম্বন করতেন এবং অনুরূপ পন্থাবলম্বনের জন্য অন্যদেরও উৎসাহিত করতেন। কোন ব্যাপারেই তিনি অমনোযোগী থাকতেন না যেন আল্লাহ না করুন লোকেরাও অমনোযোগী এবং আত্মসমাহিত হয়ে না পড়ে। যে কোন প্রয়োজনের প্রেক্ষাপটে তৎপরতা অবলম্বনের জন্য তিনি সর্বক্ষণ প্রস্তুত থাকতেন। কোন সত্যকেই তিনি ক্ষুদ্র ভাবতেন না। কোন অসত্য, অন্যায় কিংবা অসুন্দরকে তিনি কখনই সমর্থন করতেন না। যাঁরা নাবী কারীম (ﷺ)-এর সংস্পর্শে থাকতেন তাঁরা ছিলেন সর্বোত্তম শ্রেণীভুক্ত। এদের মধ্যে আবার তিনিই ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ যিনি ছিলেন সকলের চাইতে মঙ্গলকারী। রাসূলে কারীম (ﷺ)-এর নিকট তিনিই ছিলেন সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী যিনি সাহায্য ও সহানুভূতিতে ছিলেন সবার চাইতে অগ্রগামী।

নাবী কারীম (ﷺ) উঠতে বসতে সর্বক্ষণ আল্লাহর নাম স্মরণ করতেন। নিজের জন্য কখনো তিনি স্থান নির্দিষ্ট করে রাখতেন না। কোন সভা সমাবেশে গিয়ে তিনি যেখানে স্থান পেতেন সেখানেই বসে পড়তেন। সঙ্গী সাথীদের প্রত্যেককেই ন্যায্য অংশ প্রদান করতেন। তিনি কখনো কাউকেও এমন ধারণা করার সুযোগ দেন নি যে, নাবী কারীম (ﷺ)-এর নিকট অমুকের তুলনায় অমুক অধিক সম্মানিত। কেউ কোন প্রয়োজনে নাবী কারীম (ﷺ)-এর নিকট বসলে কিংবা দাঁড়ালে নাবী (ﷺ) এত ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করতে থাকতেন যে, সে নিজেই প্রত্যাবর্তন না করে পারত না। কোন প্রয়োজনে তাঁর নিকট কেউ কিছু চাইলে তৎক্ষণাৎ তিনি তাকে তা দিতেন, কিংবা ভাল কথা বলে বিদায় করতেন।

নাবী কারীম (ﷺ) ছিলেন সকলের জন্য পিতৃসমতুল্য এবং সর্বাধিক মর্যাদাসম্পন্ন। তাঁর নিকট অন্যদের মর্যাদার ভিত্তি ছিল তাক্বওয়া বা পরহেযগারী। তাঁর বৈঠক ছিল ধৈর্য, লজ্জা, শিক্ষা এবং বিশ্বাসের বৈঠক। স্বাভাবিক কথোপকথনে কিংবা আলাপ আলোচনার ক্ষেত্রে কখনই তিনি উচ্চ কণ্ঠ ব্যবহার করতেন না। কারো মান মর্যাদার হানিকর কোন কথাবার্তা তিনি কখনই বলতেন না। তাক্বওয়ার ভিত্তিতে অন্যান্যদের সঙ্গে তিনি পারস্পরিক সম্পর্ক, সহযোগিতা ও সহমর্মিতা বজায় রাখতেন। তিনি বয়স্ক ব্যক্তিদের সঙ্গত মর্যাদা দান করতেন। ছোটদের প্রতি স্নেহশীল এবং দয়ার্দ্র থাকতেন। গরীব দুঃখীদের সাহায্য করতেন এবং পরিচিত অপরিচিত সকলেরই সমাদর করতেন।

নাবী কারীম (ﷺ)-এর সব সময়ই প্রফুল্লতা বিরাজমান থাকত। অপ্রয়োজনীয় কাজ, কথা কিংবা বিষয় বস্তুর প্রতি তিনি মনোযোগ দান করতেন না। স্বীয় আত্মার পবিত্রতা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তিনি তিনটি পন্থা অবলম্বন করতেন, যথা : (১) বাহা্যড়ম্বরের বাড়াবাড়ি বর্জন, (২) কোন কিছুর আধিক্য পরিহার করে চলা, (৩) অনর্থক কথাবার্তা এড়িয়ে চলা। তাছাড়া তিনটি অপ্রীতিকর বিষয় থেকে তিনি মনকে মুক্ত রেখেছিলেন, যথা : (১) গীবত বা পরনিন্দা, (২) অন্যকে লজ্জা দেয়া, (৩) অন্যের দোষত্রুটি অনুসন্ধান করা।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সে সকল কথাই বেশী বলতেন যে সকল কথায় পুণ্যের আশা থাকত। তিনি যখন কথাবার্তা বলতেন তখন তাঁর সাহাবাগণ এমনভাবে মস্তক অবনত করে নিতেন যে, মনে হতো যেন তাঁদের মাথার উপর পাখি বসে রয়েছে। নাবী কারীম (ﷺ) যখন কথা বন্ধ করে দিতেন তখন সাহাবীগণ কথাবার্তা আরম্ভ করতেন। নাবী কারীম (ﷺ)-এর উপস্থিতিতে লোকজনেরা কখনই কোন অপ্রয়োজনীয় কথা বলতেন না। তাঁর উদ্দেশ্যে এক জন কথা বললে অন্যেরা নীরবতা অবলম্বন করতেন এবং তাঁর কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউই কথাবার্তা বলতেন না। কোন প্রসঙ্গ নিয়ে সকলের মুখে হাসি দেখা দিলে তিনিও সে হাসিতে অংশ গ্রহণ করতেন। কোন ব্যাপারে লোকজনেরা আশ্চর্য বোধ করলে তিনি তা প্রকাশ করতেন।

অপরিচিত ব্যক্তি বাচালতাজনিত অত্যাচারের মাধ্যমে কাজ হাসিল করতে চাইলে তিনি ধৈর্যাবলম্বন করতেন এবং বলতেন, ‘যখন তোমরা অভাবগ্রস্তদের দেখবে যে তারা আপন আপন প্রয়োজন পরিপূরণের অন্বেষায় রয়েছে তখন তাদের প্রয়োজনীয় দ্রব্য দান কর’। নাবী কারীম (ﷺ) ইহসানের পারিশ্রমিক দাতা ছাড়া অন্য কারো প্রশংসা করতেন না।[10]

খারিজাহ বিন যায়দ (রাঃ) বলেছেন, ‘নাবী কারীম (ﷺ) আপন আলোচনা বৈঠকে প্রগাঢ় আত্মবিশ্বাস এবং আত্মমর্যাদা সহকারে কথাবার্তা বলতেন। স্বীয় অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আবরণের বাইরে প্রকাশ করতেন না। অযৌক্তিক কিংবা অপ্রয়োজনে কোন কথাবার্তা বলতেন না, নীরবতা অবলম্বন করতেন, কেউ কোন অযৌক্তিক কথা বললে তিনি তা থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখতেন। হাসির প্রয়োজনে তিনি মৃদু মৃদু হাসতেন। অতিরঞ্জিত কথাবার্তা বলতেন না এবং বেশী কথা না বলে অল্প কথাতেই বক্তব্য পরিস্কারভাবে বোঝানোর চেষ্টা করতেন। হাসির প্রয়োজনে সাহাবীগণও নাবী কারীম (ﷺ)-এর অনুসরণে মৃদু হাসতেন।[11]

সার কথা হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ছিলেন অতুলনীয় ব্যক্তি বৈশিষ্ট্যে মন্ডিত ও সুশোভিত সর্ব কালোপযোগী এক পরিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। বিশ্ব জাহানের স্রষ্টা প্রতিপালক আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নাবী কারীম (ﷺ)-কে এক অতুলনীয় আদর্শবোধ, একাগ্রচিত্ততা এবং চরিত্র সম্পদে ভূষিত করেছিলেন। তাঁর সুমহান চরিত্র সম্পদ সম্পর্কে কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,

(‏وَإِنَّكَ لَعَلٰى خُلُقٍ عَظِيْمٍ‏)‏ ‏[‏القلم‏:‏ 4‏]

‘নিশ্চয়ই তুমি মহান চরিত্রের উচ্চমার্গে উন্নীত।’ [আল-ক্বলাম (৬৮) : ৪]

নাবী কারীম (ﷺ)-এর প্রতি ভালবাসায় জনগণের অন্তর পরিপূর্ণ হয়েছিল। অধিকন্তু, তাঁর অতুলনীয় নেতৃত্ব ও প্রাজ্ঞ পরিচালনাধীন আত্মিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের অভূতপূর্ব উন্নতি সাধনের ফলে নাবী কারীম (ﷺ)-এর ব্যক্তি বৈশিষ্ট্য, তাঁদের সমগ্র চেতনাকে আচ্ছন্ন রাখত। তাঁর এ ব্যক্তিমাধূর্যের প্রভাবেই রুক্ষ্ম প্রকৃতির মরুচারী আরবগণ নম্রতাভূষণে ভূষিত হয়ে দ্বীনে ইলাহীতে দলে দলে প্রবিষ্ট হতে থাকেন।

উপর্যুক্ত যে আলোচনা করা হলো তা তাঁর পূর্ণাঙ্গ ও মহাগুণে গুণান্বিত চরিত্রের সামান্য চিত্র মাত্র। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নাবী এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এ মহামানবের (ﷺ) চরিত্রের রূপরেখা চিত্রায়ণ কোন সাধারণ মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়- তা তিনি এ বিষয়ে যতই বিজ্ঞ এবং অভিজ্ঞ হোন না কেন, যেমনটা অসম্ভব এর তলদেশ পরিমাপ করা।

এ পৃথিবীর কোন মানুষের পক্ষে অসম্ভব ঐ মহা মহিম ব্যক্তিটির পূর্ণত্বের উচ্চ শিখরে আরোহণ করে তা সঠিক পরিমাপ করা যার আবাসিক ঠিকানা মানবত্বের সর্বোচ্চ শিখরে নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে এবং আপন প্রভু পরোয়ারদেগারের নূরে নূরান্বিত হয়ে অসামান্য কিতাব আলকুরআনের অবিকল ছাঁচে নিজ চরিত্রকে তৈরি করে নিয়েছেন।

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلٰى مُحَمَّدٍ وَّعَلٰى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلٰى إِبْرَاهِيْمَ وَعَلٰى آلِ إِبْرَاهِيْمَ إِنَّكَ حَمِيْدٌ مَّجِيْدٌ اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلٰى مُحَمَّدٍ وَّعَلٰى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلٰى إِبْرَاهِيْمَ وَعَلٰى آلِ إِبْرَاهِيْمَ إِنَّكَ حَمِيْدٌ مَّجِيْدٌ.

‘হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ (ﷺ) এবং তাঁর বংশধরের উপর রহমত বর্ষণ কর, যেমন রহমত বর্ষণ করেছ ইবরাহীম (আঃ) ও তাঁর বংশধরের উপর, নিশ্চয় তুমি প্রশংসনীয় ও সম্মানী। হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ (ﷺ) এবং তাঁর বংশধরের ওপর বরকত নাযিল কর যেমন বরকত নাযিল করেছ ইবরাহীম (আঃ) ও তাঁর বংশধরের উপর। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসনীয় ও সম্মানী।’

[1] সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৫০৩ পৃ।

[2] সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৫০২ পৃঃ।

[3] সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৫০২ পৃঃ।

[4] কাজী আয়াত রচিত শেফা ১ম খন্ড ৮৯ পৃঃ। সেহাত্ এবং সুনানে মধ্যেও উত্তর অর্থবহ হাদীষ বিদ্যমান আছে।

[5] সহীহুল মুসলিম ২য় খন্ড ২৫২ পৃঃ, সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৪০৭ পৃঃ।

[6] সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ৫০৪ পৃঃ।

[7] মিশকাত ২য় খন্ড ৫২১ পৃঃ।

[8] মিশকাত ২য় খন্ড ৫২০ পৃঃ।

[9] খোলাসাতুল সিয়ার।

[10] কাজী আয়াজ রচিত শেফাগ্রন্থের ১ম খন্ড ১২১-১২৬ পৃঃ। শামায়েল তিরমিযী দ্রষ্টব্য।

[11] প্রাগুক্ত
দেখানো হচ্ছেঃ ৪৩১ থেকে ৪৩৪ পর্যন্ত, সর্বমোট ৪৩৪ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে পাতা নাম্বারঃ « আগের পাতা 1 2 3 4 · · · 41 42 43 44