এ প্রতিনিধিদল মদীনায় আগমন করেছিলেন ৯ম হিজরী সনে। মুসায়লামা কাযযাবসহ এ দলের সদস্য সংখ্যা ছিল ১৭ জন।[1]
মুসায়লামার বংশ পরিচয় : মুসায়লামা বিন সুমামাহ বিন কাবীর হাবীব বিন হারিস।
এ দলটি একজন আনসারী সাহাবীর বাড়িতে আশ্রিত হন। অতঃপর খিদমতে নাবাবীতে উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। তবে মুসায়লামা কাযযাব সম্পর্কে ভিন্নমুখী বর্ণনা রয়েছে। সকল বর্ণনার সারসংক্ষেপ সূত্রে বুঝা যায় যে, অধিনায়কত্বের বাসনা ও উৎকট অহংবোধের কারণে সে নাবী কারীম (ﷺ)-এর খিদমতে হাজির হয় নি। নাবী কারীম (ﷺ) প্রথমাবস্থায় অত্যন্ত নম্র ও ভদ্রোচিত আচরণের মাধ্যমে তাঁর মনোতুষ্টির চেষ্টা করেন। কিন্তু যখন তিনি অনুধাবন করেন যে ভদ্রোচিত আচরণ ফলোৎপাদক হবে না, তখন তিনি উপলব্ধি করতে সক্ষম হন যে, এর মধ্যে অনিষ্টতার সম্ভাবনা রয়েছে।
এর পূর্বে নাবী কারীম (ﷺ) স্বপ্ন দেখেছিলেন যে, পৃথিবীর ধনভান্ডার তাঁর নিকট এনে রাখা হয়েছে তার মধ্যে দুটি সোনার তৈরি বালা এসে তাঁর হাতে পড়েছে। এ দেখে নাবী কারীম (ﷺ) অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে পড়লেন। কাজেই, ওহীর মাধ্যমে তাঁকে ঐ দু’টিতে ফুঁক দেয়ার কথা বলা হল। তিনি সে মোতাবেক তাতে ফুঁক দিলেন এবং তৎক্ষনাত তা উড়ে গেল। নাবী কারীম এভাবে এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করলেন যে, তাঁর পরে দুই মিথ্যুকের (নিম্ন শ্রেণীর মিথ্যুক) আবির্ভাব ঘটবে। কাজেই মুসায়লামা যখন আত্মম্ভরিতার সঙ্গে বললেন যে, ‘মুহাম্মাদ যদি তাঁর পরে আমার উপর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব হাওয়ালা করে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তাহলে আমি তাঁর অনুসরণ করব।’
এ কথা শ্রবণের পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর নিকট গেলেন। তখন তাঁর হাতে ছিল একটি খেজুরের শাখা এবং তাঁর মুখপাত্র হিসেবে সঙ্গী ছিলেন সাবিত বিন ক্বায়স বিন শাম্মাস (রাঃ)। মুসায়লামাহ নিজ সঙ্গীগণের মধ্যে অবস্থান করছিলেন। নাবী (ﷺ) তাঁর মাথার উপর গিয়ে দাঁড়ালেন এবং কথা বললেন।
মুসায়লামা বললেন, ‘আপনি যদি চান তাহলে রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে আপনাকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ছেড়ে দিব। কিন্তু আপনার পরবর্তী অবস্থায় আমাদের জন্য আপনাকে নেতৃত্বে দানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। নাবী কারীম (খেজুরের শাখাটির প্রতি ইঙ্গিত করে)বললেন,
(لَوْ سَأَلْتَنِيْ هٰذِهِ الْقِطْعَةَ مَا أَعْطَيْتُكَهَا، وَلَنْ تَعْدُوْ أَمْرَ اللهِ فِيْكَ، وَلَئِنْ أَدْبَرْتَ لَيَعْقِرَنَّكَ اللهُ، وَاللهِ إِنِّيْ لَأَرَاكَ الَّذِيْ أُرِيْتُ فِيْهِ مَا رَأَيْتُ، وَهٰذَا ثَابِتٌ يُجِيْبُكَ عَنِّيْ)،
‘যদি তুমি আমার নিকট হতে এর অংশটুকুও চাও তবুও আমি তোমাকে তা দেব না। অথচ তুমি নিজের ব্যাপারে আল্লাহর নির্ধারিত অংশের একটুও ব্যতিক্রম করতে পারবে না। যদি তুমি পশ্চাদমুখী হও তবুও আল্লাহ তোমাকে ধ্বংস করে ছাড়বেন। আল্লাহর কসম! আমি তোমাকে সে ব্যক্তিই মনে করছি যার ব্যাপারে আমাকে স্বপ্ন দেখানো হয়েছে। আমাকে স্বপ্নে যা দেখানো হয়েছে আমার পক্ষ থেকে সাবিত বিন ক্বায়স তার বিবরণ দেবেন।’
অতঃপর তিনি সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করলেন।[2]
তাঁর অসাধারণ প্রজ্ঞার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যা অনুধাবন করেছিলেন ঠিক তাই হল। মুসায়লামা কাযযাব ইয়ামামা ফিরে গিয়ে প্রথমে নিজ সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করতে থাকেন। অতঃপর দাবী করেন যে, তাঁকে নাবী কারীম (ﷺ)-এর সঙ্গে নবুওয়াতের কাজে শরীক করা হয়েছে। কাজেই, সে নবুওয়াতের দাবী করতে থাকে এবং অমিল ছন্দের কবিতা রচনা করতে থাকে। নিজ সম্প্রদায়ের জন্য ব্যভিচার এবং মদ্যপান বৈধ করে দেয় এবং এসব কিছুর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করে এ সাক্ষ্যও দিতে থাকে যে, নাবী মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর নাবী। এ ব্যক্তির প্রচারণার কারণে তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা তাঁকে অনুসরণ করতে থাকে। তাঁর সম্প্রদায়ের লোকজনদের মধ্যে তাঁর প্রভাব প্রতিপত্তি ও মর্যাদা এত বেশী বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হতে থাকে যে, তাকে ইয়ামামাহর রহমান বলা হতে থাকে।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট তিনি এ মর্মে একটি পত্র লিখেন যে, ‘আপনি যে কাজে রত আছেন আমাকে সে কাজে আপনার শরীক করা হয়েছে, রাষ্ট্রের অর্ধেক আমাদের জন্য এবং অর্ধেক কুরাইশদের জন্য।’ উত্তরে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, (إِنَّ الْأَرْضَ لِلهِ يُوَرِّثُهَا مَنْ يَّشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ، وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِيْنَ) ‘পৃথিবী আল্লাহর! নিজ বান্দাগণের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তিনি তার তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করেন এবং এর শেষ ফলাফল সমীহকারীদের জন্যই।[3]
ইবনু মাসউদ হতে বর্ণিত আছে যে, ইবনু নাওওয়াহাহ এবং ইবনু উসাল মুসায়লামাহর পত্র বাহক হিসেবে নাবী কারীম (ﷺ)-এর নিকট আগমন করে। নাবী কারীম (ﷺ) জিজ্ঞেস করলেন, (أَتَشْهَدَانِ أَنِّيْ رَسُوْلُ اللهِ؟) ‘তোমরা কি সাক্ষ্য দিচ্ছ যে, আমি আল্লাহর রাসূল?’ তারা বলল, ‘আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুসায়লামা আল্লাহর রাসূল’। নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, (آمَنْتُ بِاللهِ وَرَسُوْلِهِ، لَوْ كَنْتُ قَاتِلاً رَسُوْلاً لَقَتَلْتُكُمَا) ‘আমি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলাম। যদি কোন পত্র বাহককে হত্যা করা আমার নীতি হতো তাহলে তোমাদের দু’জনকে হত্যা করতাম।’[4]
মুসায়লামাহ কাযযাব ১০ম হিজরীতে নুবওয়াতের দাবী করেন। আবূ বাকর (রাঃ)-এর খিলাফত আমলে ইয়ামামাহ যুদ্ধে দ্বাদশ হিজরী রবিউল আওয়ালে তাকে হত্যা করা হয়। তার হত্যাকারী ছিল ওয়াহশী যে হামযাহ (রাঃ)-কে হত্যা করেছিল। নুবওয়াতের দাবীদার মুসায়লামা কাযযাবে পরিণতি হয়েছিল এই ।
নবুওয়াতের দ্বিতীয় দাবীদার ছিল আসওয়াদ ‘আনসী যে ইয়ামানে বিবাদ সৃষ্টি করে রেখেছিল। রাসূলে কারীম (ﷺ)-এর ওফাত প্রাপ্তির মাত্র ২৪ ঘন্টা পূর্বে ফাইরুয (রাঃ) তাকে হত্যা করেন। অতঃপর তার সম্পর্কে নাবী কারীম (ﷺ)-এর নিকট ওহী নাজিল হয় এবং তিনি সাহাবীগণ (রাঃ)-কে তা অবহিত করেন। এরপর ইয়ামান হতে আবূ বাকর (রাঃ)-এর নিকট নিয়মিত সংবাদ আসতে থাকে।[5]
[2] সহীহুল বুখারী বনু হানীফা এবং আসওয়াদ আনাসীর অধ্যায় ২য় খন্ড ৬২৭-৬২৮ পৃঃ, এবং ফতুহুল বারী ৮ম খন্ড ৮৭-৯৩ পৃঃ।
[3] যাদুল মা‘আদ ৩য় খন্ড ৩১-৩২ পৃঃ।
[4] মুসনাদে আহমাদ, মিশকাত ২য় খন্ড ৩৪৭ পৃঃ।
[5] ফাতহুল বারী ৮ম খন্ড ৯৩ পৃঃ।
এ প্রতিনিধি দলে আল্লাহর শত্রু ‘আমির বিন তুফাইল, লাবীদের বৈমাত্রেয় ভাই আরবাদ বিন কায়স, খালিদ বিন জা’ফার এবং জাব্বার বিন আসলাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। এরা ছিল নিজ কওমের নেতা এবং শয়তান গোছের লোক। ‘আমির বিন তুফাইল ছিল সে ব্যক্তি যে, ‘বীরে মাউনাহ’তে সত্তর জন্য সাহাবীগণকে (রাঃ) শহীদ করিয়েছিল। এরা যখন মদীনায় আসার ইচ্ছা করল তখন ‘আমির এবং আরবাদ দু’ জনে মিলে ষড়যন্ত্র করল যে, প্রতারণার মাধ্যমে তারা নাবী কারীম (ﷺ)-কে হত্যা করবে। কাজেই, যখন তারা দলবদ্ধভাবে মদীনায় পৌঁছল তখন ‘আমির নাবী কারীম (ﷺ)-এর কথোপকথন আরম্ভ করল এবং আরবাদ পাশ কাটিয়ে নাবী কারীম (ﷺ)-এর পিছন দিকে গিয়ে দাঁড়াল। অতঃপর সে তার তলোয়ার খানা কোষমুক্ত করার চেষ্টা করল। কিন্তু কোষ হতে তলোয়ার খানা একটু বাহির হওয়ার পর আর বের হল না। এভাবে আল্লাহ তাঁর নাবী (ﷺ)-কে হেফাযত করলেন।
নাবী কারীম (ﷺ) তাদের বিরুদ্ধে বদ দু’আ করলেন। যার ফলে তাদের প্রত্যাবর্তনের প্রাক্কালে আল্লাহ তা’আলা আরবাদ এবং তার উটের উপর বিজলী নিক্ষেপ করেন যাতে আরবাদ দগ্ধ হয়ে মৃত্যু বরণ করে। এদিকে ‘আমির এক সালুলিয়া মহিলার নিকট অবতরণ করল। সে সময় তার গ্রীবাদেশে একটি ফোঁড়া ওঠে এবং তার ফলে তার অবস্থার দারুন অবনতি ঘটায়। সে মৃত্যুবরণ করে। মৃত্যুর সময় সে বলতে থাকে ‘আপসোস! উটের ফোঁড়ার ন্যায় ফোঁড়া এবং একজন সালুলিয়া মহিলার ঘরে মৃত্যু?’
সহীহুল বুখারীতে বর্ণিত আছে যে, নাবী কারীম (ﷺ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে ‘আমির বলল, ‘আমি আপনাকে তিনটি কথার অধিকার দিচ্ছি,
আপনার জন্য থাকবে উপত্যকার লোকজন আর আমার জন্য থাকবে জনবসতি।
অথবা আপনার পরে আমি হব খলীফা।
অন্যথায় আমি গাত্বাফানদের দ্বারা এক হাজার ঘোটক এবং এক হাজার ঘোটকী সহ আপনার উপর আক্রমণ চালাব।
এ প্রতিনিধি দলটি নিজ কওমের সাদকার অর্থ যা ফকীরদের দেওয়ার পর অতিরিক্ত ছিল তা নিয়ে মদীনায় আগমন করেছিল। এ দলে ১৩ জন লোক ছিল, যারা কুরআন ও সুন্নাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করত এবং শিক্ষা গ্রহণ করত। তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে কতগুলো কথা জিজ্ঞেস করে। তখন তিনি তাদেরকে সেগুলো লিখে দেন। মদীনায় স্বল্পকাল অবস্থান করে। যখন নাবী কারীম (ﷺ) তাদেরকে উপঢৌকন দ্বারা পুরস্কৃত করেন তখন তারা নিজেদের এক যুবককেও প্রেরণ করে। এ যুবককে তারা শিবিরে রেখে এসেছিল। যুবক খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করল, ‘হে রাসূলুল্লাহ! আল্লাহর কসম! আমাকে আমার অঞ্চল থেকে এছাড়া অন্য কোন বস্তু টেনে আনেনি যে, আপনি আমার জন্য আল্লাহ তা‘আলার সমীপে প্রার্থনা করবেন যেন আল্লাহ নিজ অনুগ্রহ ও রহমতের সঙ্গে আমার সম্পদ আমার অন্তরে নিহিত করে দেন। নাবী কারীম (ﷺ) তার জন্য দু‘আ করলেন। এর ফল হল এ ব্যক্তি সব চাইতে অল্পে তুষ্ট হল। যখন অন্যদের উপর ধর্ম ত্যাগের ঢেউ বয়ে যেতে থাকল তখন শুধু এ ব্যক্তিই ইসলামের উপর সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত রইল এবং নিজ কওমের লোকজনদের নসীহত করতে থাকল এর ফলে তারাও ইসলামে প্রতিষ্ঠা লাভ করল। অতঃপর এ দলভুক্ত লোকজনেরা ১০ম হিজরী বিদায় হজ্জের সময় দ্বিতীয়বার রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে সাক্ষাত করে।
এ দলের সঙ্গে আরবের প্রসিদ্ধ ঘোড়সওয়ার যায়দুল খাইলও ছিলেন। তাঁরা নাবী কারীম (ﷺ)-এর সঙ্গে কথাবার্তা বলেন এবং তাঁদের সামনে ইসলাম উপস্থাপন করেন। তাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং অনেক ভাল মুসলিম হয়ে যান। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যায়দ (রাঃ)-এর প্রশংসা করে বলেন,
(مَا ذُكِرَ لِيْ رَجُلٌ مِّنْ الْعَرَبِ بِفَضْلٍ، ثُمَّ جَاءَنِيْ إِلَّا رَأَيْتُه دُوْنَ مَا يُقَالُ فِيْهِ ، إِلَّا زَيْدُ الْخَيْلِ، فَإِنَّهُ لَمْ يَبْلُغْ كُلَّ مَا فِيْهِ)
‘আমাকে আরবের যে কোন লোকের প্রশংসা শুনানো হয়েছে এবং সে আমার নিকট এসেছে তখন আমি তাকে তার প্রচারকৃত প্রশংসা থেকে কম পেয়েছি। কিন্তু তার বিপরীত হচ্ছে যায়েদুল খাইল। কারণ, তাঁর খ্যাতি তাঁর প্রকৃত গুণের নিকটেই পৌঁছে নি।’
অতঃপর নাবী কারীম (ﷺ) তাঁর নাম রাখেন ‘যায়দুল খাইর’।
এমনি ভাবে ৯ম ও ১০ম হিজরীতে বিভিন্ন প্রতিনিধিদল মদীনায় আগমন করতে থাকেন। চরিতকারগণ ইয়ামান, আযদ, কুযা’আহর বনু সা‘দ, হুযাইম, বুন ‘আমির বিন ক্বায়স, বনু আসাদ, বাহরা, খাওলান, মুহারিব, বনু হারিস বিন কা‘ব, গামিদ, বনু মুনতাফিক্ব ও সালামান, বনু আবস, মুযাইনা, মুরাদ, যুবাইদ, কিন্দাহ, যূ মুররাহ, গাসসান, বুন ‘ঈশ এবং নাখ’ এর প্রতিনিধি দল সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। ‘নাখ’ এর দলই ছিল শেষ দল যা ১১শ হিজরী মুহাররম মাসের মধ্যে এসেছিল। ঐ দলের সদস্য সংখ্যা ছিল দুই শত। অবিশষ্ট অন্যান্য দলগুলো আগমন করে ৯ম ও ১০ম হিজরীতে। অল্প কিছু সংখ্যক পরে একাদশ হিজরীতে আগমন করেছিল।
ওই সকল প্রতিনিধি দলের আগমন ধারা থেকেই বুঝা যায় যে, সে সময় ইমলামী দাওয়াত কতটা বিস্তার লাভ করেছিল এবং বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলামের কতটা স্বীকৃতি অর্জিত হয়েছিল। অধিকন্তু, এটাও আঁচ অনুমান করা সম্ভব যে, আরববাসীগণ মদীনাকে কী পরিমাণ সম্মানের দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করেছিল। এমন কি মদীনার নিকট মাথা নত করা ছাড়া তাদের গত্যন্তর ছিল না। প্রকৃতই মদীনা সমগ্র আরব উপদ্বীপের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছিল। এবং মদীনাকে এড়িয়ে চলা কারো পক্ষেই সম্ভব ছিল না। অবশ্য সকল আরববাসীর অন্তর ইসলামের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল এমনটি বলা হয়ত সঙ্গত হবে না। কারণ, তাদের মধ্যে তখনো এমন কিছু সংখ্যক বেদুঈন ছিল যারা শুধুমাত্র তাদের নেতাদের অনুসরণে মুসলিম হয়েছিল। মুসলিম হিসেবে পরিচিতি প্রদান করলেও তাদের মধ্যে হত্যা এবং লুটতরাজের মনোভাব পূর্বের মতোই ছিল। ইসলামী আদর্শের প্রভাবে তারা ততটা প্রভাবিত হয় নি। এ প্রেক্ষিতে কুরআন কারীমের সূরাহ তাওবায় তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে,
(الأَعْرَابُ أَشَدُّ كُفْرًا وَنِفَاقًا وَأَجْدَرُ أَلاَّ يَعْلَمُوْا حُدُوْدَ مَا أَنزَلَ اللهُ عَلٰى رَسُوْلِهِ وَاللهُ عَلِيْمٌ حَكِيْمٌ وَمِنَ الأَعْرَابِ مَن يَتَّخِذُ مَا يُنفِقُ مَغْرَمًا وَيَتَرَبَّصُ بِكُمُ الدَّوَائِرَ عَلَيْهِمْ دَآئِرَةُ السَّوْءِ وَاللهُ سَمِيْعٌ عَلِيْمٌ) [التوبة:97، 98]
‘বেদুঈন আরবরা কুফুরী আর মুনাফিকীতে সবচেয়ে কঠোর, আর আল্লাহ তাঁর রসূলের প্রতি যা অবতীর্ণ করেছেন তার সীমারেখার ব্যাপারে অজ্ঞ থাকার তারা অধিক উপযুক্ত, আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, মহা প্রজ্ঞাবান। কতক বেদুঈন যা তারা আল্লাহর পথে ব্যয় করে তাকে জরিমানা ব’লে গণ্য করে আর তোমাদের দুঃখ মুসিবতের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে, মন্দের চক্র তাদেরকেই ঘিরে ধরুক। আর আল্লাহ তো সব কিছুই শুনেন, সব কিছু জানেন।’ [আত্-তাওবাহ (৯) : ৯৭-৯৮]
আবার কিছু লোকের সুনামও করা হয়েছে। তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে,
(وَمِنَ الأَعْرَابِ مَن يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَيَتَّخِذُ مَا يُنفِقُ قُرُبَاتٍ عِندَ اللهِ وَصَلَوَاتِ الرَّسُوْلِ أَلا إِنَّهَا قُرْبَةٌ لَّهُمْ سَيُدْخِلُهُمُ اللهُ فِيْ رَحْمَتِهِ إِنَّ اللهَ غَفُوْرٌ رَّحِيْمٌ) [ التوبة:99].
‘কতক বেদুঈন আল্লাহতে ও শেষ দিবসে বিশ্বাস করে আর তারা যা আল্লাহর পথে ব্যয় করে তাকে তারা আল্লাহর নৈকট্য ও রসূলের দু‘আ লাভের মাধ্যম মনে করে, সত্যিই তা তাদের (আল্লাহর) নৈকট্য লাভের মাধ্যম, অচিরেই আল্লাহ তাদেরকে তাঁর রহমাতের মধ্যে প্রবিষ্ট করবেন, অবশ্যই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।’ [আত্-তাওবাহ (৯) : ৯৯]
যতদূর পর্যন্ত মক্কা, মদীনা, সাকাফ, ইয়ামান ও বাহরায়েন অধিকাংশ শহরের অধিবাসীদের সম্পর্ক বিস্তৃত ছিল তাঁদের মধ্যে ইসলাম পূর্ণরূপে পরিপক্কতা লাভ করেছিল এবং তাঁদের মধ্য হতেই প্রখ্যাত সাহাবীগণ (রাঃ) এবং নেতৃস্থানীয় মুসলিমগণের আবির্ভাব ঘটেছিল।[1]
এখন আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পবিত্র জীবনের শেষ দিনগুলো আলোচনার পর্যায়ে পৌঁছেছি। কিন্তু এ আলোচনার জন্য কলমকে গতিশীল করার পূর্বে তাঁর সফল, বিচিত্র ও বিশিষ্ট জীবনধারা যা অন্যান্য নাবী ও রাসূলগণের তুলনায় তাঁকে বৈশিষ্ট্যময় করে তুলেছিল এবং প্রাধান্য প্রদান করেছিল, সে সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করতে চাই। আল্লাহ তা‘আলা নাবী কারীম (ﷺ)-এর মাথার উপর পূর্ব ও পরের সকল নেতৃত্বের মুকুট স্থাপন করেছিলেন। নাবী কারীম (ﷺ)-কে বলা হয়,
(يَا أَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ -قُمِ اللَّيْلَ إِلَّا قَلِيْلًا) الآيات [المزمل:1، 2]
‘ওহে চাদরে আবৃত (ব্যক্তি)! ২. রাতে সলাতে দাঁড়াও তবে (রাতের) কিছু অংশ বাদে।’ (আল-মুয্যাম্মিল (৭৩) : ১-২]
(يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ -قُمْ فَأَنذِرْ) [المدثر:1، 2]
‘ওহে বস্ত্র আবৃত (ব্যক্তি)! ২. ওঠ, সতর্ক কর। [আল-মুদ্দাসসির (৭৪) : ১-২]
অতঃপর কী ছিল? প্রস্তুত হয়ে গেলেন এবং এ পৃথিবীর সর্ব বৃহৎ আমানতের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে অনবরত দন্ডায়মান রইলেন। অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ মান বিকাশের সুমহান দায়িত্ব, একত্ববাদ বিশ্বাসের গুরুদায়িত্ব এবং আল্লাহর আমানত বাস্তবায়ন ও প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অবিরাম সাধনা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অভীষ্ট গন্তব্যের পানে এগিয়ে চলা যা জাহেলিয়াত যুগের গাঢ় অন্ধকারে ছিল আচ্ছন্ন, যা বস্তুবাদী ও বহুত্ববাদী ভাবধারায় ছিল দারুনভাবে ভারাক্রান্ত যা ছিল পশু প্রবৃত্তি ও লালসার বেড়াজালে আবদ্ধ। অতঃপর একদল অত্যন্ত বিবেকসম্পন্ন, বিশ্বস্ত ও নিবেদিত সাহাবার সহায়তায় সব কিছুকে পরাভূত ও ছিন্নভিন্ন করে ফেলে আল্লাহর ধ্যান ধারণা ও আলোয় সমুজ্জ্বল এক প্রান্তরে গিয়ে যখন দন্ডায়মান হলেন তখন আরম্ভ হল ভিন্নতর এক জীবন সংগ্রাম।
আরম্ভ হল যুদ্ধের পর যুদ্ধ সে সকল শত্রুর বিরুদ্ধে দাওয়াত ইলাহী এবং তার বিশ্ববাসীদের মূলোৎপাটনের লক্ষ্যে যারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং শিশু ইসলাম চারাটি তরতাজা হয়ে ভূগর্ভে তার শিকড় প্রোথিত এবং উন্মুক্ত আকাশে তার শাখা-প্রশাখা বিস্তার করানোর পূর্বেই চেয়েছিল তাকে ধ্বংস করে ফেলতে। দ্বীনে ইলাহির দাওয়াতে ঐ সকল শত্রুর সঙ্গে নাবী কারীম (ﷺ)-কে অবিরামভাবে যুদ্ধ করতে হয়েছিল এবং আরব উপদ্বীপের মুশরিকদের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হতে না হতেই বিশাল রোমক বাহিনী এ নতুন উম্মতকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার জন্য সীমান্ত এলাকায় সৈন্য মহড়া শুরু করে দেয়।
যুদ্ধের ময়দানে অস্ত্রসজ্জিত মুশরিক, মুনাফিক্ব ও কাফিরদের সঙ্গেই যে তাঁকে অনবরত যুদ্ধে লিপ্ত থাকতে হয়েছিল শুধু তাই নয় বরং আরও এক ভয়ংকর এবং সার্বক্ষণিক শত্রুর সঙ্গে তাঁকে অবিরাম যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়েছিল। সে শত্রুটি ছিল মানব জাতির চির শত্রু শয়তান। সে মানুষের শিরায় শিরায় বিচরণ করে মানুষকে এক গোমরাহী ও ভ্রষ্টতার অতল গহবরে নিমজ্জিত করার জন্য সর্বক্ষণ চক্রান্ত চালাতে থাকে। শয়তানের চক্রান্তের কারণে কোন কোন ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে মুসলিমগণকে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হলেও রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অত্যন্ত দক্ষতা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে সে সবের মোকাবিলা করে করে সব কিছুকে নস্যাৎ করে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং তাঁরা সাহাবীগণ যে নিষ্ঠা, ত্যাগ, আত্মবিশ্বাস ও সাহসিকতার সঙ্গে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াতের কাজে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছিলেন মানব জাতির ইতিহাসে তার কোন তুলনা মেলে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নাবী কারীম (ﷺ)-এর উপর দ্বীনের দাওয়াতের যে মহাসম্মানজনক এবং মহা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন তা বাস্তবায়ন এবং প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারে তাঁরা অন্য কিছুকে বড় করে দেখতেন না। দ্বীনের কাজে অকাতরে তাঁরা দিতেন প্রাণ এবং সর্বস্ব দিয়ে একদম নিঃস্ব হয়ে যেতে তাঁরা কখনো কুণ্ঠিত হতেন না। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পদতলে যখন সঞ্চিত হতো সম্পদের পাহাড় সে সব আল্লাহর পথে খরচ না করে তিনি অবসর নিতেন না। তাঁর নিকট প্রাচুর্য ছিল পরিত্যাজ্য, দারিদ্র ছিল কাম্য। দিবাভাগে দ্বীনের দাওয়াত এবং রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডে সর্বক্ষণ থাকতেন তিনি ব্যস্ত, রাত্রিবেলা দীর্ঘ সময় প্রভূর উদ্দেশ্যে থাকতেন নিবেদিত।[1]
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এমনিভাবে একের পর এক যুদ্ধ পরিচালনায় বিশ বছরের অধিক সময় অতিবাহিত করেন। এ সময়ের মধ্যে কোন একটি বিষয় তাঁকে অন্যান্য বিষয় হতে উদাসীন কিংবা গাফেল করতে পারেনি। অভ্যন্তরীণ এবং বহিস্থঃবহু প্রতিকূলতা ও বিড়ম্বনা সত্ত্বেও স্বল্প কালের মধ্যেই ইসলামী দাওয়াত এমনি এক বিশালায়তনে কৃতকার্যতা লাভ করেছিল যে, তা প্রত্যক্ষ করে বিশ্ব বিবেক একেবারে স্তম্ভিত এবং হতচকিত হয়ে পড়ে। দেখতে দেখতে কয়েক বছরের মধ্যেই সমগ্র আরব ভূভাগ থেকে জাহেলিয়াতের অন্ধকার বিদূরিত হয়ে ঈমান আমান, শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান, বিজ্ঞান, বিবেক ও শৌর্য-বীর্যের আলোকচ্ছটায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে এবং শিরক্, কুফরী, মুনাফিক্বী ও মূর্তিপূজার মূল উৎপাটিত হয় এবং আপামর আরববাসী দ্বীনের দাওয়াত গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর অনুগত হয়ে পড়ে। আল্লাহর একত্ববাদের ধ্বনি ও প্রতিধ্বনিতে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে ওঠে এবং সর্বত্র মুয়াযিযনের সুরেলা কণ্ঠে দিগ্বিদিক মুখরিত হয়ে ওঠে। মদীনা অভিমুখী বিভিন্ন গোত্রের আনাগোনা, নব্য মুসলিমগণের তাকবীরধ্বনি এবং কুরআন তিলাওয়াতকারীগণের কণ্ঠনিঃসৃত মধুর সুরে মরুপ্রান্তর মউ মউ করে ওঠে।
ভিন্ন ও পরস্পর শত্রুভাবাপন্ন বহুধাবিভক্ত গোত্রগুলোর মধ্যে ঐক্য, সহৃদয়তা ও সমঝোতার প্লাবন প্রবাহিত হতে থাকে। মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্তিলাভ করে মানুষ প্রবেশ করতে থাকে আল্লাহর দাসত্বে। কেউই অত্যাচারী রইল না কিংবা অত্যাচরিতও রইল না। রইল না মালিক কিংবা মামলুক, না হাকিম, না মাহকুম, না যালিম কিংবা মাযলুম। সব ভেদাভেদের অবসান হয়ে গেল। মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হল একমাত্র তাকওয়া বা পরহেজগারী। অন্যথায় সকল মানুষ আদমসন্তান এবং আদম (আঃ) মাটির সৃষ্টি।
ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হল আরবী একাত্মতা, বিশ্ব মানবতার একাত্মতা এবং সামাজিক সুবিচার। পাওয়া গেল মানব জাতির সমস্যা-সংকুল পার্থিব জীবনে চলার পথের ঠিক দিক নির্দেশনা এবং পরকালীন কল্যাণের মূলমন্ত্র। মানুষের জীবনযাত্রায় সূচিত হল আমূল পরিবর্তন। রাষ্ট্রনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি সর্বক্ষেত্রেই সূচিত হল যুগান্তকারী পরিবর্তন। মানব সভ্যতা হল মানবোচিত ধ্যান ধারণা, চিন্তা চেতনা ও জ্ঞান ও বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ ও সৌন্দর্য মন্ডিত।
ইসলামী দাওয়াতের পূর্বে পৃথিবীতে ছিল অন্ধকারের প্রাধান্য, পৃথিবীর পরিবেশ ছিল দুর্গন্ধযুক্ত এবং আত্মা ছড়িয়ে চলেছিল দুর্গন্ধ। মাপ ও পরিমাপ ছিল অস্পষ্ট। সর্বত্র বিরাজিত ছিল অন্যায়, দাসত্ব, শোষণ ও সন্ত্রাসের শাসন। অশান্তি, অশ্লীলতা এবং ধ্বংস প্রবণতা পৃথিবীকে চরম অস্থিরতার মধ্যে নিপতিত করছিল। কুফর ও ভ্রষ্টতার ঘন পর্দায় ঢাকা পড়েছিল মানুষের সনাতন জীবনধারার শাশ্বত রূপ। অথচ আসমানী জীবন বিধান ছিল তখনো বিদ্যমান। কিন্তু সে বিধান হয়ে পড়েছিল বিকৃত এবং বিভ্রান্তিপূর্ণ। সে বিধানের গ্রহণী শক্তি গিয়েছিল সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে। যার ফলে তা প্রাণহীন একটি লোকাচার বা রেওয়াজে পরিণত হয়েছিল।
ইসলামী দাওয়াত যখন তার অসামান্য প্রাণশক্তি, সর্ববাদীসম্মত আল্লাহর বিধি বিধান, শাশ্বত মানবিক মূল্যবোধ ও আধ্যাত্মিক চেতনা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করল, তখন প্রচলিত রেওয়াজ সর্বস্ব জীবনের বিধানের অসারতা প্রমাণিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধর্মের নামে যে অর্থহীন লোকাচার, শ্রেণীবিভেদ, অহমিকা, অস্থিরতা, শিরক ও বহুত্ববাদী, বিভ্রান্তিকর ধারণা প্রচলিত ছিল তার অবসান ঘটল। আর মানব সমাজ মুক্তি লাভ করল যাবতীয় অন্যায়-অনাচার, জোবরদস্তি থেকে। মুক্ত হলো পরস্পর বিচ্ছিন্ন হওয়া, পতন থেকে। সমাজের মধ্যে বিভিন্ন স্তরে দলাদলি, শাসক ও পুরোহিতদের স্বেচ্ছাচারিতার অবসান ঘটল। সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠল এক দয়া ও পরিচ্ছন্নতা, নতুনত্ব, ঈমান ইয়াক্বীন, ন্যায়নিষ্ঠতা, সহমর্মিতা এবং মানব জীবন স্বচ্ছ-নির্মল এক মহা উন্নত সোপানে উন্নীত হয়, প্রত্যেক প্রাপক তার প্রাপ্য অধিকার নিশ্চয়তা লাভ করে এমন কতকগুলো সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থার উপর।
এর ফলে আরব উপদ্বীপে এমন এক বরকতপূর্ণ পরিবেশ এবং উন্নত ও পরিচ্ছন্ন জীবনধারা সূচিত হল ইতোপূর্বে কোন কালেও যা দেখা যায় নি এবং সে সময়কার মতো উজ্জ্বল ও দীপ্তিময় ইতিহাস আর কোন কালেও দেখা যাওয়া সম্ভব নয়।[2]
[2] সৈয়দ কুতুব, ভূমিকা মা-যা খাসেরাল আলামু বিইনাহিতা তিল মুসলিমীন পৃষ্ঠা ১৪।
দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ সম্পূর্ণ হল এবং আল্লাহর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সার্বভৌমত্বে অস্বীকৃতি এবং মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর পয়গম্বরের ভিত্তির উপর এক নতুন সমাজ কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হল। অতঃপর আল্লাহ সুবহানাহূ ওয়া তা‘আলার পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট আভাষ দেয়া হচ্ছিল যে, পৃথিবীতে তাঁর অবস্থানের সময় কাল ফুরিয়ে এসেছে। এ প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মু’আয বিন জাবাল (রাঃ)-কে ইয়ামানের গভর্ণর নিযুক্ত করে প্রেরণ করেন দশম হিজরী সনে। তখন তাঁর বিদায় কালে অন্যান্য উপদেশাবলীর সঙ্গে এ কথাও বললেন,
(يَا مُعَاذُ، إِنَّكَ عَسٰي أَلَّا تَلْقَانِيْ بَعْدَ عَامِيْ هٰذَا، وَلَعَلَّكَ أَنْ تَمُرَّ بِمَسْجِدِيْ هٰذَا وَقَبْرِيْ)
‘হে মোয়ায! এ বছরের পর তোমার সঙ্গে আমার হয়ত আর সাক্ষাত নাও হতে পারে, তখন হয়ত বা আমার এ মসজিদ এবং আমার কবরের পাশ দিয়ে তোমরা যাতায়াত করবে।’
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মুখ থেকে মোয়ায (রাঃ) এ কথা শুনে আসন্ন বিচ্ছেদের চিন্তায় অস্থির হয়ে কাঁদতে লাগলেন।
প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ এটাই চেয়েছিলেন যে, তিনি তাঁর নাবী কারীম (ﷺ)-কে ইসলামী দাওয়াতের কার্যকারিতা এবং সুফল বাস্তবক্ষেত্রে দেখিয়ে দেবেন। এ দাওয়াতের কাজেই নাবী কারীম (ﷺ) অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্ট সহ্য করেছেন এবং অসাধারণ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। বস্তুত তাঁর এ অসাধারণ সাফল্যমন্ডিত কর্মকান্ডের অন্তিম পর্যায়ে এটাই সুসঙ্গত হবে যে, হজ্জের মৌসুমে যখন মক্কার পার্শ্ববর্তী আরব গোত্র সমূহের সদস্য ও প্রতিনিধিগণ একত্রিত হবেন তখন তাঁরা রাসূলে কারীম (ﷺ)-এর নিকট থেকে দ্বীনের আহবান এবং শরীয়তের বিধানসমূহ নেবেন এবং নাবী কারীম (ﷺ) তাঁদের নিকট থেকে এ সাক্ষ্য গ্রহণ করবেন যে, তিনি তাঁদের নিকট আল্লাহর পবিত্র আমানত যথার্থভাবে পৌঁছে দিয়েছেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন এবং উম্মতের কল্যাণ কামনার হক আদায় করেছেন।
আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন সেই ঐতিহাসিক হজ্জে মকবুলের জন্য তাঁর ইচ্ছা এবং কর্মসূচি ঘোষণা করলেন তখন আরবের মুসলিমগণ দলে দলে সমবেত হতে আরম্ভ করে দিলেন। প্রত্যেকেরই ঐকান্তিক ইচ্ছা ছিল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পদচিহ্নকে নিজ নিজ চলার পথে একমাত্র আকাঙ্ক্ষিত ও অনুসরণযোগ্য বা পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করে নেবেন।[1]
অতঃপর যূল ক্বা’দাহ মাসের ৪ দিন অবশিষ্ট থাকতে শনিবার দিবস রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মক্কা অভিমুখে যাত্রার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন।[2]
তিনি চুলে চিরুনী ব্যবহার করলেন, তেল মালিশ করলেন, পোশাক পরিচ্ছদ পরিধান করলেন, কুরবানীর পশুগুলোকে মালা বা হার পরালেন এবং যুহর সালাতের পর রওয়ানা হয়ে গেলেন। আসরের পূর্বে যুল হোলাইফা নামক স্থানে পৌঁছলেন। সেখানে আসরের দু’ রাকাত সালাত আদায় করলেন এবং শিবির স্থাপন ক’রে সারারাত সেখানে অবস্থান করলেন। সকাল বেলা তিনি সাহাবীদের (রাযি.) বললেন,
(أَتَانِيْ اللَّيْلَةَ آتٍ مِنْ رَبِّيْ فَقَالَ: صَلِّ فِيْ هٰذَا الْوَادِيِّ الْمُبَارَكِ وَقُلْ: عُمْرَةٌ فِيْ حَجَّةٍ)
আজ রাতে আমার প্রভূর পক্ষ হতে একজন আগন্তুক এসে বলেছেন, ‘এ পবিত্র উপত্যকায় সালাত আদায় কর এবং হজ্জের সঙ্গে ওমরা সংশ্লিষ্ট রয়েছে।[3]
অতঃপর যুহরের সালাতের পূর্বে নাবী কারীম (ﷺ) ইহরামের জন্য গোসল করলেন। এরপর আয়িশা (রাঃ) রাসূল (ﷺ)-এর শরীর এবং পবিত্র মাথায় নিজ হাতে যারীরা এবং মেশক মিশ্রিত এক প্রকর সুগন্ধি দ্রব্য মালিশ করে দিলেন। সুগন্ধির রেশ নাবী (ﷺ)-এর মাথার সিঁথি এবং দাড়িতে পরিলক্ষিত হল, কিন্তু তিনি সেই সুগন্ধি না ধুয়ে তা স্থায়ীভাবে রেখে দিয়েছিলেন। অতঃপর তিনি লুঙ্গি পরিধান করেন, চাদর গায়ে দেন এবং যুহরের দু’ রাকাত সালাত আদায় করেন।
এরপর সালাতের স্থানে একই সঙ্গে হজ্জ এবং উমরাহর ইহরাম বেঁধে ‘লাব্বায়িক’ ধ্বনি উচ্চারণ করেন। ইহরাম বাঁধার পর বাহিরে এসে ‘ক্বাসওয়া’ নামক উটের উপর আরোহণ করেন এবং দ্বিতীয়বার ‘লাববায়িক’ ধ্বনি উচ্চারণ করেন। অতঃপর উটে আরোহণ ক’রে ফাঁকা ময়দানে আগমন করেন এবং সেখানেও উচচ কণ্ঠে ‘লাব্বায়িক’ ধ্বনি উচ্চারণ করেন।
অতঃপর মক্কা অভিমুখে ভ্রমণ অব্যাহত রাখেন। সপ্তাহ কালব্যাপী পথ চলার পর সন্ধ্যার প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন মক্কার নিকটবর্তী যী’তাওয়া নামক স্থানে পৌঁছলেন, তখন যাত্রা বিরতি করে সেখানে রাত্রি যাপন করলেন এবং ফজরের সালাত আদায়ের পর গোসল করলেন। অতঃপর সকাল নাগাদ মক্কায় প্রবেশ করলেন। দিবসটি ছিল ১০ম হিজরীর ৪ঠা যুল হিজ্জাহ রবিবার। পথে তিনি আট রাত কাটান, মধ্যমভাবে এ দূরত্ব অতিক্রম করার জন্য এ সময়েরই প্রয়োজন হয়ে থাকে।
মাসজিদুল হারামে পৌঁছে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) প্রথমে কা‘বা গৃহের তাওয়াফ সম্পন্ন করেন। অতঃপর সাফা ও মারওয়ার মধ্যে সায়ী করেন। কিন্তু ইহরাম ভঙ্গ করেননি। কারণ, হজ্জ এবং ওমরার জন্য তিনি একই সঙ্গে ইহরাম বেঁধে ছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে হাদয়ীও (কুরবানীর পশু) ছিল। তাওয়াফ ও সায়ী সম্পন্ন করার পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মক্কার উপরিভাগে হাজূন নামক স্থানের পাশে অবস্থান করেন। কিন্তু দ্বিতীয়বার হজ্জের তাওয়াফ ছাড়া আর অন্য কোন তাওয়াফ করেননি। সাহাবাগণের মধ্যে যাঁরা কুরবানীর পশু (হাদয়ী) সঙ্গে নিয়ে আসেন নি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁদেরকে নিজ নিজ ইহরাম ওমরায় পরিবর্তন করে নিতে এবং বায়তুল্লাহ (রাঃ) তাওয়াফ ও সাফা মারওয়ার সায়ী সম্পন্ন করে নিয়ে হালাল হয়ে যাওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। কিন্তু যেহেতু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজে হালাল হচ্ছিলেন না সেহেতু সাহাবীগণ এ ব্যাপারে ইতস্তত করেছিলেন। নাবী কারীম (ﷺ) বললেন,
(لَوْ اِسْتَقْبَلْتُ مِنْ أَمْرِيْ مَا اسْتَدْبَرْتُ مَا أَهْدَيْتُ، وَلَوْلَا أَنَّ مَعِيْ الْهَدْيُ لَأَحْلَلْتُ)
‘আমি যা পরে জানলাম আমার ব্যাপারে আমি যদি তা আগেই জানতে পারতাম তাহলে আমি সঙ্গে হাদয়ী আনতাম না। তাছাড়া, আমার সঙ্গে যদি হাদয়ী না থাকত তাহলে আমি হালাল হয়েও যেতাম।’
তাঁর এ কথা শ্রবণের পর যাঁদের সঙ্গে হাদয়ী ছিল না তাঁরা নাবী কারীম (ﷺ)-এর নির্দেশ মেনে নিয়ে হালাল হয়ে গেলেন।
যুল হিজ্জাহ মাসের ৮ তারিখে তারবিয়ার দিন নাবী কারীম (ﷺ) মিনায় গমন করেন এবং তথায় ৯ই যুল হিজ্জাহর সকাল পর্যন্ত অবস্থান করেন। সেখানে যুহর, আসর, মাগরিব, এশা এবং ফজর এ পাঁচ ওয়াক্তের সালাত আদায় করেন। অতঃপর সূর্যোদয় পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। অতঃপর আরাফার দিকে রওয়ানা হয়ে গেলেন এবং সেখানে যখন পৌঁছেন তখন ওয়াদীয়ে নামেরায় তাঁবু প্রস্তুত হয়েছিল। সেখানে তিনি অবতরণ করলেন। সূর্য যখন পশ্চিম দিকে ঢলে গেল তখন নাবী কারীম (ﷺ)-এর নির্দেশে কাসওয়া নামক উটের পিঠে হাওদা চাপানো হল। এরপর তিনি বাতনে ওয়াদীতে গমন করলেন। ঐ সময় নাবী (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলেন এক লক্ষ চল্লিশ কিংবা এক লক্ষ চুয়াল্লিশ হাজারের এক বিশাল জনতার ঢল। এ বিশাল জনতার উদ্দেশ্যে তিনি এক ঐতিহাসিক এবং মর্মস্পর্শী ভাষণ প্রদান করেন। সমবেত জনতাকে লক্ষ্য করে তিনি বলেন,
(أَيُّهَا النَّاسُ، اِسْمَعُوْا قَوْلِيْ، فَإِنِّيْ لَا أَدْرِيْ لَعَلِّىْ لَا أَلْقَاكُمْ بَعْدَ عَامِيْ هٰذَا بِهٰذَا الْمَوْقِفِ أَبَداً)
‘ওহে সমবেত লোকজনেরা! আমার কথা শোন। কারণ, আমি জানি না এরপর আর কোন দিন তোমাদের সঙ্গে এ স্থানে মিলিত হতে পারব কিনা।[4]
(إِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ حَرَامٌ عَلَيْكُمْ كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هٰذَا، فِيْ شَهْرِكُمْ هٰذَا، فِيْ بَلَدِكُمْ هٰذَا. أَلَا كُلُّ شَيْءٍ مِنْ أَمْرِ الْجَاهِلِيَّةِ تَحْتَ قَدَمَيَّ مَوْضُوْعٌ، وَدِمَاءُ الْجَاهِلِيَّةِ مَوْضُوْعَةٌ، وَإِنَّ أَوَّلَ دَمٌ أَضَعُ مِنْ دِمَائِنَا دَمُ ابْنِ رَبِيْعَةَ بْنِ الْحَارِثِ ـ وَكَانَ مُسْتَرْضِعاً فِيْ بَنِيْ سَعْدٍ فَقَتَلَتْهُ هُذَيْلٌ ـ وَرِبَا الْجَاهِلِيَّةِ مَوْضُوْعٌ، وَأَوَّلُ رِبًا أَضَعُ مِنْ رِبَانَا رِبَا عَبَّاسِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ، فَإِنَّهُ مَوْضُوْعٌ كُلُّهُ).
তোমাদের রক্ত এবং তোমাদের ধন সম্পদ অন্যদের জন্য এমনিভাবে হারাম যেমনটি তোমাদের আজকের দিন, চলতি মাস এবং এ বরকতপূর্ণ শহরের হুরমত রয়েছে। শুনে রাখো, অন্ধকার যুগের প্রত্যেকটি রেওয়াজ রসম আমার পদতলে পিষ্ট হয়ে গেল। জাহেলিয়াত যুগের শোনিত প্রসঙ্গের পরিসমাপ্তি ঘটল। আমাদের রক্তের মধ্যে প্রথম রক্ত যা আমি নিঃশেষ করছি তা হচ্ছে রাবী’আহ বিন হারিসের ছেলের রক্ত। এ সন্তান বনু সা‘দ গোত্রে দুগ্ধ পান করছিল এমন সময় হুজাইল গোত্র তাকে হত্যা করে। অন্ধকার যুগের সুদ শেষ করা হল এবং আমাদের সুদের মধ্যে প্রথম সুদ যা আমি শেষ করছি তা আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিবের সুদ। এখন থেকে সুদের সকল প্রকার কাজ কারবার সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হল।
(فَاتَّقُوْا اللهَ فِي النِّسَاءِ، فَإِنَّكُمْ أَخَذْتُمُوْهُنَّ بِأَمَانَةِ اللهِ، وَاسْتَحْلَلْتُمْ فُرُوْجَهُنَّ بِكَلِمَةِ اللهِ، وَلَكُمْ عَلَيْهِنَّ أَلَّا يُوْطِئَنَّ فِرَشَكُمْ أَحَداً تَكْرَهُوْنَهُ، فَإِنْ فَعَلْنَ ذٰلِكَ فَاضْرِبُوْهُنَّ ضَرْباً غَيْرَ مُبَرِّحٍ، وَلَهُنَّ عَلَيْكُمْ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوْفِ).
হ্যাঁ, মহিলাদের সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় কর। কারণ, তোমরা তাদেরকে আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ এবং আল্লাহর কালেমার মাধ্যমে হালাল করে নিয়েছ। তাদের উপর তোমাদের প্রাপ্য হল তারা তোমাদের বিছানায় এমন কোন ব্যক্তিকে আনতে দেবে না যারা তোমাদের সহ্যের বাইরে হবে। যদি তারা এরূপ কোন অন্যায় করে বসে তাহলে তাদেরকে তোমরা মারধর করতে পারবে। কিন্তু গুরুতরভাবে আঘাত করবে না। তোমাদের উপর তাদের প্রাপ্য হল তোমরা তাদেরকে ন্যায়সঙ্গতভাবে খাওয়াবে ও পরাবে।
(َوَقَدْ تَرَكْتُ فِيْكُمْ مَا لَنْ تَضِلِّوْا بَعْدَهُ إِنْ اعْتَصَمْتُمْ بِهِ، كِتَابُ اللهِ).
আমি তোমাদের মাঝে এমন এক জিনিস রেখে যাচ্ছি যা শক্ত করে ধরে রাখলে তোমরা কখনোও পথহারা হবে না এবং তা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব।[5]
(أَيُّهَا النَّاسُ، إِنَّهُ لَا نَبِيَّ بَعْدِيْ، وَلَا أَمَّةَ بَعْدَكُمْ، أَلَا فَاعْبُدُوْا رَبَّكُمْ، وَصَلُّوْا خَمْسَكُمْ، وَصُوْمُوْا شَهْرَكُمْ، وَأَدُّوْا زَكَاةَ أَمْوَالِكُمْ، طِيْبَةً بِهَا أَنْفُسُكُمْ، وَتَحُجُّوْنَ بَيْتِ رَبِّكُمْ، وَأَطِيْعُوْا أُوْلَاتِ أَمْرَكُمْ، تَدْخُلُوْا جَنَّةَ رَبَّكُمْ)
হে লোকজনেরা! স্মরণ রেখ আমার পরে আর নাবী আসবে না। কাজেই তোমাদের পরে অন্য কোন উম্মতের প্রশ্নও থাকবে না। অতএব, আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত কর, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করো, রমাযান মাসে রোযা রেখো, সন্তুষ্ট চিত্তে নিজ সম্পদের যাকাত প্রদান করো, নিজ প্রভূর ঘরের হজ্জ পালন করো এবং সৎ নেতৃত্বের অনুসরণ করো। নিষ্ঠার সঙ্গে এ সব কাজ করলে ওয়াদা মোতাবেক জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।[6]
(وَأَنْتُمْ تَسْأَلُوْنَ عَنِّيْ، فَمَا أَنْتُمْ قَائِلُوْنَ؟)
আমার সম্পর্কে যদি তোমাদের জিজ্ঞেস করা হয় তখন তোমরা কী উত্তর দিবে?
সাহাবীগণ বললেন, ‘আমরা সাক্ষ্য প্রদান করছি যে, আপনার উপর অর্পিত দায়িত্ব আপনি যথাযথভাবে পালন করেছেন, ইসলামী দাওয়াতের যে আমানত আপনার উপর অর্পণ করা হয়েছিল তা যথাযথ ভাবে মানুষের নিকট পৌঁছে দিয়েছেন এবং বান্দাদের জন্য কল্যাণ কামনার হক্ব আদায় করেছেন।
সাহাবীগণ (রাযি.)-এর মুখ থেকে এ কথা শ্রবণের পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) শাহাদত আঙ্গুলটি আকাশের দিকে উত্তোলন করলেন এবং মানুষের দিকে তা নুইয়ে দিয়ে তিন বার বললেন,
(اللهم اشْهَدْ) (اللهم اشْهَدْ) (اللهم اشْهَدْ)
‘হে আল্লাহ সাক্ষী থাক, হে আল্লাহ সাক্ষী থাক, হে আল্লাহ সাক্ষ্য থাক।[7]
নাবী কারীম (ﷺ)-এর বাণীসমূহকে রাবী’আহ বিন উমাইয়া বিন খালফ উচ্চৈঃস্বরে লোকজনদের নিকট পৌঁছে দিচ্ছিলেন।[8] রাসূলে কারীম (ﷺ) যখন তাঁর ভাষণ হতে ফারেগ হলেন তখন আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করলেন,
(الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِيْ وَرَضِيْتُ لَكُمُ الإِسْلاَمَ دِيْنًا) [المائدة: 3]
‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নি‘মাত পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে কবূল করে নিলাম।’ [আল-মায়িদাহ (৫) : ৩]
এ আয়াত শ্রবণ করা মাত্রই উমার (রাঃ) ক্রন্দন করতে লাগলেন। তাঁর ক্রন্দনের কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, ‘আমি এ জন্য কাঁদছি যে, আমরা এতো দিন দ্বীনের বৃদ্ধিই দেখছিলাম। এখন যেহেতু তা পূর্ণতা লাভ করলো সেহেতু পূর্ণতার পর তো তাতে আবার কেবল ঘাটতিই দেখা দিতে থাকে।[9]
নাবী কারীম (ﷺ)-এর ভাষণের পর বিলাল (রাঃ) প্রথমে আযান এবং পরে ইকামত বললেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যুহরের সালাতে ইমামত করলেন। এরপর বিলাল (রাঃ) অবারও ইকামত করলেন। এ দু’ সালাতের মধ্যে আর কোন সালাত পড়লেন না। এরপর সওয়ারীতে আরোহণ করে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অবস্থান স্থলে গমন করলেন। নিজ উট ক্বাসওয়ার পেট পাথর সমূহের দিকে করলেন এবং হাবলে মুশাতকে (পদদলে যাতায়াতকারীগণের পথের মাঝে অবস্থিত স্তুপ) সামনে করলেন এবং ক্বিবলাহমুখী হয়ে নাবী কারীম (ﷺ) (একই অবস্থায়) অবস্থান করলেন। সূর্য অস্তমিত হওয়া পর্যন্ত এভাবে অবস্থান করলেন। সূর্যের অল্প অল্প হলুদ বর্ণ শেষ হল, আবার সূর্য মন্ডল অদৃশ্য হয়ে গেল। এর পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উসামা (রাঃ)-কে পিছনে বসিয়ে নিয়ে যাত্রা করলেন এবং মুযদালিফায় গিয়ে উপস্থিত হলেন। মুযদালিফায় মাগরিব এবং এশার সালাত এক বৈঠকে দু’ ইকামতের সঙ্গে আদায় করলেন। মধ্যে কোন নফল সালাত আদায় করেননি। এরপর নাবী কারীম (ﷺ) ঘুমিয়ে পড়লেন এবং সকাল পর্যন্ত ঘুমে কাটালেন। তবে সকাল হওয়া মাত্র আযান এবং ইকামত দিয়ে ফজরের সালাত আদায় করলেন। অতঃপর ক্বাসওয়ার উপর সওয়ার হয়ে মাশয়ারে হারামে আগমন করলেন এবং কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর সমীপে দু‘আ করলেন এবং তাকবীর, তাহলীল ও তাওহীদের বাণীসমূহ উচ্চারণ করলেন। অন্ধকার দূরীভূত হয়ে ফর্সা না হওয়া পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থান করলেন। অতঃপর সূর্যোদয়ের পূর্বেই মীনা অভিমুখে রওয়ানা হয়ে গেলেন। এ সময় তাঁর পিছনে বসিয়েছিলেন ফাযল বিন আব্বাস (রাঃ)-কে। বাতনে মোহাসসারে গিয়ে যখন পৌঁছলেন তখন সাওয়ারীকে একটু দ্রুত খেদালেন।
আর মধ্যের পথ দিয়ে যা জামরায়ে কুবরার দিকে বের হয় সে পথ ধরে জামরায়ে কুবরার নিকট গিয়ে পৌঁছেন। ঐ সময় সেখানে একটি বৃক্ষ ছিল। এ বৃক্ষটির জন্যও জামরায়ে কুবরা প্রসিদ্ধ ছিল। তাছাড়া জামরায়ে কুবরাকে জামরায়ে ‘আক্বাবাহ এবং জামরায়ে উলাও বলা হয়। নাবী কারীম (ﷺ) জামরায়ে কুবরায় ৭টি কংকর নিক্ষেপ করেন। প্রতিটি কংকর নিক্ষেপের সময় তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করছিলেন। কংকরগুলো আকারে এ রকম ছোট ছিল যে সেগুলোকে চিমটিতে ধরে নিক্ষেপ করা যাচ্ছিল। নাবী কারীম (ﷺ) বাতনে ওয়াদী হতে দাঁড়িয়ে কংকরগুলো নিক্ষেপ করেছিলেন। অতঃপর নাবী কারীম (ﷺ) কুরবানী স্থানে গিয়ে তাঁর মুবারক হাত দ্বারা ৬৩টি উট যবেহ করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নির্দেশক্রমে আলী (রাঃ) ৩৭টি উট যবেহ করেন। এভাবে এক শতটি উট কুরবানী করা হয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আলী (রাঃ)-কে তাঁর কুরবানীতে শরিক করে নেন। এরপর নাবী কারীম (ﷺ)-এর নির্দেশে প্রত্যেকটি যবেহকৃত পশু হতে এক একটি অংশ কেটে নিয়ে রান্না করা হয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং আলী (রাঃ) এ মাংস খান এবং ঝোল পান করেন।
অতঃপর আপন সওয়ারীতে আরোহণ করে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মক্কা গমন করেন। মক্কা পৌঁছার পর তিনি বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেন। এ তাওয়াফকে তাওয়াফে ইফাযা বলা হয়। তাওয়াফ শেষে যুহর সালাত আদায় করেন। সালাত শেষে জমজম কূপের নিকট বনু আব্দুল মুত্তালিবের পাশে গমন করেন। তাঁরা হাজীদেরকে জমজমের পানি পান করাচ্ছিলেন। তিনি বলেন,
(اِنْزِعُوْا بَنِيْ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ، فَلَوْلَا أَنْ يُغَلِّبُكُمْ النَّاسُ عَلٰى سِقَايَتِكُمْ لَنَزَعْتُ مَعَكُمْ)
‘বনু আব্দুল মুত্তালিব! তোমরা পানি উত্তোলন কর। যদি এ আশঙ্কা না থাকত যে পানি পান করানোর কাজে লোকজন তোমাদেরকে পরাজিত করে ফেলবে, তবে আমিও তোমাদের সঙ্গে পানি উত্তোলন করতাম। অর্থাৎ যদি সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে পানি উত্তোলন করতে দেখতেন তাহলে সাহাবীগণ নিজেরাই পানি উত্তোলনের চেষ্টা করতেন। এভাবে হাজীদেরকে পানি পান করানোর মর্যাদা ও সৌভাগ্য বনু মুত্তালিবেরই রয়ে গেল। অন্যথায় এ ব্যবস্থা তাঁদের আয়ত্বে আর থাকত না। কাজেই, বনু আব্দুল মুত্তালিব নাবী কারীম (ﷺ)-কে এক বালতি পানি উঠিয়ে দিলে তিনি তা হতে ইচ্ছানুযায়ী পান করলেন।[10]
দিনটি ছিল যুল হিজ্জাহ মাসের ১০ তারিখ কুরবানীর দিন। এ দিবস সূর্য কিছুটা উপরে উঠল (চাশতের সময়) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এক ভাষণ প্রদান করেন। ভাষণদানকালে তিনি খচ্চরের উপর আরোহিত অবস্থায় ছিলেন এবং আলী (রাঃ) তাঁর বাণীসমূহ সাহাবীগণ (রাঃ)-কে শুনিয়ে দিচ্ছিলেন। কিছু সংখ্যক সাহাবা (রাঃ) উপবিষ্ট অবস্থায় ছিলেন এবং কিছু সংখ্যক ছিলেন দন্ডায়মান অবস্থায়।[11] অদ্যকার ভাষণে নাবী কারীম (ﷺ) গত কালকের ভাষণের কিছু কিছু অংশের পুনরাবৃত্তি করেন। সহীহুল বুখারী এবং সহীহুল মুসলিমে আবূ বাকর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন ১০ই যুল হিজ্জাহ কুরবানীর দিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর ভাষণে আমাদের নিকট বলেন,
(إِنَّ الزَّمَانَ قَدْ اسْتَدَارَ كَهَيْئَتِهِ يَوْمَ خَلَقَ اللهُ السَّمٰوَاتِ وَالْأَرْضِ، السَّنَةُ اِثْنَا عَشَرَ شَهْراً، مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ، ثَلَاثٌ مُتَوَالِيَاتٌ، ذُوْ الْقَعْدَةِ وَذُوْ الْحِجَّةِ وَالْمُحَرَّمُ، وَرَجَبُ مُضَرَ الَّذِيْ بَيْنَ جُمَادٰي وَشَعْبَانَ)
‘আবর্তন বিবর্তনের মধ্য দিয়ে সময় সে দিনের প্রকৃতিতেই পৌঁছেছে যে দিন আসমান ও জমিনকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছিলেন। বার মাসে বছর হয়, যার মধ্যে চার মাস হল হারাম মাস। ক্রমাগতভাবে তিন অর্থাৎ যিকা’দাহ, যুল হিজ্জাহ এবং মুহাররম এবং একটি রজব মুযার যা জুমাদাল আখিরাহ এবং শাবানের মাঝে অবস্থিত।’
অতঃপর নাবী জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটা কোন্ মাস? আমরা বললাম, ‘আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ) ভাল জানেন।’ এ প্রেক্ষিতে নাবী কারীম (ﷺ) নীরব থাকেন। এমনকি আমরা ধারণা করলাম যে, তিনি হয়ত এর নাম অন্য কিছু রাখবেন। কিন্তু তিনি আবারও জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ মাসটি কি যুল হিজ্জাহ নয়?’ আমরা বললাম, ‘তা কেন হবে না’? এর পর নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, ‘এ শহরটি কোন্ শহর?’ আমরা বললাম, ‘আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল ভাল জানেন।’ নাবী কারীম (ﷺ) নীরব থাকলেন। এমনকি আমরা ধারণা করতে থাকলাম যে এর নাম হয়তো অন্য কোন কিছু বলবেন। কিন্তু তিনি বললেন, ‘এ শহর কি মক্কা নয়’? আমরা বললাম তা কেন হবে না’? অর্থাৎ অবশ্যই তা। নাবী কারীম (ﷺ) আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা তবে এ দিবসটি কোন্ দিবস’? আমরা বললাম, ‘আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল ভাল জানেন’। এতে তিনি নীরব থাকলেন। এমনকি আমরা ধারণা করতে থাকলাম যে, এর নাম হয়তো অন্য কিছু বলবেন। কিন্তু তিনি বললেন, ‘এ দিনটি কি কুরবানীর দিন নয়’? অর্থাৎ ১০ই যুল হিজ্জাহ নয়’? আমরা বললাম অবশ্যই’। তিনি বললেন,
(فَإِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ وَأَعْرَاضَكُمْ عَلَيْكُمْ حَرَامٌ كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هٰذَا، فِيْ بَلَدِكُمْ هٰذَا، فِيْ شَهْرِكُمْ هٰذَا)
‘তাহলে তোমরা জেনে রাখ যে, তোমাদের রক্ত, তোমাদের ধন সম্পদ এবং তোমাদের মান ইজ্জত পরস্পর পরস্পরের নিকট এমন পবিত্র তোমাদের এ শহর এবং তোমাদের এ মাস তোমাদের আজকের দিন যেমন পবিত্র।
(وَسَتَلْقَوْنَ رَبَّكُمْ، فَيَسْأَلُكُمْ عَنْ أَعْمَالِكُمْ، أَلَا فَلَا تَرْجِعُوْا بَعْدِيْ ضَلَالاً يَضْرِبُ بَعْضُكُمْ رِقَابَ بَعْضٍ) (ألَا هَلْ بَلَّغْتُ؟)
তোমরা অতি শীঘ্রই আপন প্রতিপালক প্রভূর সঙ্গে সাক্ষাত করলে তোমাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে তিনি তোমাদের জিজ্ঞেস করবেন। অতএব, স্মরণ রেখো যেন আমার পরে পুনরায় পশ্চাদমুখীনতা অবলম্বনের মাধ্যমে পথভ্রষ্টতা হয়ে না যাও। অধিকন্তু তোমরা এমন কোন কাজে লিপ্ত হবে না যার ফলে পরস্পর পরস্পরের গ্রীবা কর্তন করবে। বল! আম কি তাবলীগের দায়িত্ব পালন করেছি?
সাহাবীগণ বললেন, ‘হ্যাঁ, অতঃপর নাবী কারীম (ﷺ) বললেন,
(اللهم اشْهَدْ، فَلْيُبَلِّغُ الشَّاهِدُ الْغَائِبَ، فَرُبَّ مُبَلَّغٍ أَوْعٰي مِنْ سَامِعٍ)
‘হে আল্লাহ সাক্ষী থাক’ যারা এখানে উপস্থিত তাদের কর্তব্য হবে অনুপস্থিতদের নিকট এ কথাগুলো পৌছে দেয়া কারণ ঐ অনুপস্থিতদের মধ্যে এমন কতগুলো লোক থাকবে যারা এ উপস্থিত লোকদের কিছু সংখ্যকের তুলনায় দ্বীন সম্পর্কে অধিক মাত্রায় উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে।[12]
অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, এ ভাষণে নাবী কারীম (ﷺ) এ কথাও বলেছিলেন,
(ألَا لَا يَجْنِيْ جَانٍ إِلَّا عَلٰى نَفْسِهِ، أَلَا لَا يَجْنِيْ جَانٍ عَلٰى وَلَدِهِ، وَلَا مَوْلُوْدٌ عَلٰى وَالِدِهِ، أَلَا إِنَّ الشَّيْطَانَ قَدْ يَئِسَ أَنْ يُعْبَدَ فِيْ بَلَدِكُمْ هٰذَا أَبَداً، وَلٰكِنْ سَتَكُوْنُ لَهُ طَاعَةٌ فِيْمَا تَحْتَقِرُوْنَ مِنْ أَعْمَالِكُمْ، فَسَيَرْضٰى بِهِ)
স্মরণ রেখো! কোন অপরাধী নিজ অপরাধের দোষ অন্যের উপর আরোপ করতে পারবে না। (অর্থাৎ অপরাধের শাস্তি অপরাধীকে নিজেকেই ভোগ করতে হবে। অপরাধের জন্য নিজেকেই গ্রেফতার হতে হবে)। আরও স্মরণ রেখো! পিতার অপরাধের জন্য পুত্রকে কিংবা পুত্রের অপরাধের জন্য পিতাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে না। স্মরণ রেখো! শয়তান নিরাশ হয়ে পড়েছে এ কারণে যে, এখন থেকে তোমাদের এ শহরে আর কখনো তার পূজা করা হবে না। কিন্তু যে সব অন্যায় কাজকে তোমরা খুব তুচ্ছ মনে করবে ওতেই তার অনুসরণ করা হবে এবং সে তাতেই সন্তুষ্ট হবে।[13]
এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ১১, ১২, ও ১৩ যুল হিজ্জাহ (আইয়ামে তাশরীক) মীনায় অবস্থান করেন। এ সময় তিনি হজ্জের নিয়ম কানুন পালন করতে থাকেন এবং লোকজনকে শরীয়তের আহবানগুলো শিক্ষা দিতে থাকেন ও আল্লাহর যিকির করতে থাকেন। অধিকন্তু ইবরাহীমী রীতিনীতির সুনানে হাদীসমূহ প্রতিষ্ঠা করতে থাকেন এবং শিরকের নিশানগুলো নিশ্চিহ্ন করতে থাকেন। নাবী কারীম (ﷺ) আইয়ামে তাশরীকেও ভাষণ প্রদান করেন। সুনানে আবী দাউদে হাসান সনদে বর্ণিত আছে সারায়া বিনতে নাবহান (রাঃ) বলেন যে, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদেরকে রউসের দিন ভাষণ দেন।[14] তিনি বলেন,(أَلَيْسَ هٰذَا أَوْسَطُ أَيَّامِ الْتَشْرِيْقِ)‘এটা আইয়ামে তাশরীকের মধ্য দিবস নয় কি?[15] নাবী কারীম (ﷺ)-এর আজকের ভাষণও গতকালের ভাষণের অনুরূপ ছিল। এ ভাষণ দেয়া হয়েছিল সূরাহ নাসর নাজিল হওয়ার পর। আইয়ামে তাশরীকের শেষে, দ্বিতীয় ইয়াওমুন নাফারে অর্থাৎ ১৩ই যুল হিজ্জাহ তারিখে নাবী কারীম (ﷺ) মীনা হতে রওয়ানা হয়ে যান এবং ওয়াদীয়ে আবতাহ এর খাইফে বনু কিনানাহয় অবস্থায় করেন। দিনের অবশিষ্ট সময় এবং রাত্রি তিনি তথায় অতিবাহিত করেন এবং যুহর সালাত, আসর, মাগরিব ও এশার সালাত সেখানেই আদায় করেন। এশার সালাত শেষে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন এবং কিছুক্ষণ ঘুমানোর পর সওয়ারীতে আরোহণ করে বায়তুল্লাহ গমন করেন এবং তাওয়াফে বিদা’ আদায় করেন।
সকল মানুষ যখন হজ্জ (হজ্বের নিয়মাবলী) হতে ফারেগ হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আপন সওয়ারীকে মদীনা মনোয়ারাভিমুখী করলেন। তাঁর মদীনামুখী হওয়ার উদ্দেশ্য ছিল সেখানে গিয়ে আরাম আয়েশে গা ঢেলে দেয়া নয় বরং উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর দ্বীনের প্রয়োজনে আর এক নবতর প্রচেষ্টায় লিপ্ত হওয়া।[16]
[2] হাফিয ইবনু হাজার (রহ:) এর উত্তমরূপে তাহকীক করেছেন। কোন বর্ণনায় বর্ণিত হয়েছে যে যী কা’দার পাঁচ দিন অবশিষ্ট ছিল তখন নাবী (সাঃ) যাত্রা করেন । এর সংশোধনও করেছেন দ্র: ফাতহুল বারী ৮ম খন্ড ১০৪ পৃঃ।
[3] উমার (রাঃ) হতে বুখারী শরীফে এটা বর্ণিত হয়েছে ১ম খন্ড ২০৭ পৃঃ।
[4] ইবনু হিশাম ২য় খন্ড ৬০৩ পৃঃ,
[5] সহীহুল মুসলিম নাবীর হজ্জের অধ্যায় ১ম খন্ড ৩৯৭ পৃঃ।
[6] ইবনু মাজা, ইবনু আসাকের, রহমাতুল্লিল আলামীন ১ম খন্ড ২২৩ পৃঃ।
[7] সহীহুল মুসলিম ১ম খন্ড ৩৯৭ পৃঃ।
[8] ইবনু হিশাম ২য় খন্ড ৬০৫ পৃঃ।
[9] বুখারী ইবনু উমার হতে দ্র: রহমাতুল্লিল আলামীন ১ম খন্ড ২৬৫ পৃঃ।
[10] মুসলিম, জাবির হতে, নাবী কারীম (সাঃ)-এর হজ্জ অধ্যায় ১ম খন্ড ৩৯৭-৪০০ পৃঃ।
[11] আবূ দাউদ, কুরবানীর দিন কোন্ সময়ে তিনি খুৎবা দিয়েছিলেন সে অধ্যায় ১ম খন্ড ২৭০ পৃঃ।
[12] সহীহুল বুখারী, মীনার ভাষণ অধ্যায় ১ম খন্ড ২৩৪ পৃঃ।
[13] তিরমিযী ২য় খন্ড ১৬৫ পৃঃ। ইবনু মাজাহ হজ্জ পর্ব, মিশকাত ১ম খন্ড ২৩৪ পৃঃ।
[14] অর্থাৎ ১২ই যিলজহ্জ (আউনুল মাবূদ ২য় খন্ড ১৪৩ পৃঃ।
[15] আবূ দাউদ মীনায় কোন দিন ভাষণ দেন। ১ম খন্ড ২৬৯ পৃঃ।
[16] বিদায়ী হজ্জের বিস্তারিত বিবরণের জন্য দ্রষ্টব্য সহীহুল বুখারী মানাসিক পূর্ব ১ম খন্ড ও ২য় খন্ড ৬৩১ পৃঃ, সহীহুল মুসলিম নাবী কারীম (সাঃ)-এর হজ্জ অধ্যায় ফাতহুল বারী ৩য় খন্ড মানাসিক পর্বের ব্যাখ্যা ৮ম খন্ড ১০৩-১১০ পৃঃ, ইবনু হিশাম ২য় খন্ড ৬০১-৬০৫ পৃঃ।, যাদুল মা‘আদ ১ম খন্ড ১৯৬ এবং ২১৮-২৪০ পৃঃ।
আত্মাভিমানী ও অহংকারী রোমক সম্রাটদের পক্ষে এটা কিছুতেই সম্ভব ছিল না যে, ইসলামের প্রতিষ্ঠা লাভ ও মুসলিমগণের প্রাধান্য লাভকে তারা বরদাশত করে নেবে। এ কারণে তাদের শাসনাধীন কোন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করলে তাদের জান-মাল সব কিছু সাংঘাতিকভাবে বিপদাপন্ন হয়ে পড়ত। মায়ানের রুমী শাসক ফারওয়াহ বিন ‘আমির জুযামীর সঙ্গে যেমনটি আচরণ করেছিল।
রোমক সম্রাটের এরূপ সীমাহীন পক্ষপাতিত্ব এবং অর্থহীন অহংকারের প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ১১ হিজরী সফর মাসে এক বিশাল সেনাবাহিনী প্রস্তুত করলেন এবং উসামা বিন যায়দ বিন হারিসাহকে (রাঃ) নেতৃত্ব প্রদান করে বালক্বা অঞ্চল এবং দারুমের ফিলিস্তিনী আবাসভূমিকে ঘোড়সওয়ারদের দ্বারা পদদলিত করার নির্দেশ প্রদান করলেন। এ কার্যক্রমের কারণ হল এর ফলে রোমকগণের মধ্যে যেন ভীতির সঞ্চার হয়ে যায়, তাদের অঞ্চলে বসবাসরত আরব গোত্রসমূহের স্থিতাবস্থা বহাল থাকে এবং কেউই যেন এ ধারণা করতে না পারে যে গীর্জাকর্তৃক অনুসৃত কঠোরতার ব্যাপারে খোঁজখরব নেয়ার কেউ নেই, ইসলাম কবুল করার অর্থই হচ্ছে মৃত্যুকে দাওয়াত দেয়া।
ওই সময় কিছু সংখ্যক লোক বাহিনী প্রধানের বয়সের স্বল্পতার কারণে তাঁর নেতৃত্বের ব্যাপারে আপত্তি উত্থাপন করে এবং এ মহোদ্যমে অংশ গ্রহণ করতে বিলম্ব করে। এ প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,
(إِنْ تُطْعِنُوْا فِيْ إِمَارَتِهِ، فَقَدْ كُنْتُمْ تُطْعِنُوْنَ فِيْ إِمَارَةِ أَبِيْهِ مِنْ قَبْل، وَاَيْمُ اللهِ، إِنْ كَانَ لَخَلِيْقاً لِلْإِمَارَةِ، وَإِنْ كَانَ مِنْ أَحَبِّ النَّاسِ إِلَيَّ, إِنْ هٰذَا مَنْ أَحَبِّ النَّاسِ إِلَيَّ بَعْدَهُ)
এর নেতৃত্বের ব্যাপারে আজ যেমন তোমরা প্রশ্ন উত্থাপন করছ, ইতোপূর্বে এর পিতার নেতৃত্বের ব্যাপারেও তোমরা অনুরূপ প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলে। অথচ আল্লাহর কসম! সৈন্য পরিচালনার ব্যাপারে সে ছিল খুবই উপযুক্ত এবং আমার প্রিয়তম ব্যক্তিদের অন্যতম, এ ব্যক্তিও উপযুক্ত এবং আমার প্রিয়তম ব্যক্তিদের অন্যতম।[1]
যাহোক, সাহাবীগণ (রাঃ) উসামার (রাঃ) আশেপাশে একত্রিত হয়ে সৈন্যদলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলেন এবং অগ্রযাত্রার এক পর্যায়ে মদীনা হতে তিন মাইল দূরত্বে জুর্ফ নামক স্থানে শিবির স্থাপন করলেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর অসুস্থতাজনিত দুশ্চিন্তার কারণে অগ্রযাত্রা স্থগিত হয়ে গেল এবং আল্লাহর মীমাংসার জন্য বাহিনী অপেক্ষমান রইলেন। আল্লাহর মীমাংসায় এ বাহিনী আবূ বাকর (রাঃ)-এর খিলাফত আমলের প্রথম সৈনিক মহোদ্যমের ভূমিকায় ভূষিত ও সম্মানিত হল।[2]
[2] প্রাগুক্ত সহীহুল বুখারী এবং ইবনু হিশাম ২য় খন্ড ৬০৬ পৃঃ।
যখন দ্বীনের দাওয়াত পুরোপুরি পূর্ণতা লাভ করল, আরবের পুরো নিয়ন্ত্রণ মুসলিমগণের আয়ত্বে এসে গেল, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আবেগ ও অনুভূতি, প্রবণতা ও প্রতিক্রিয়া এবং কথাবার্তা ও আচার-আচরণ হতে এমন কতগুলো আলামত প্রকাশ পেতে থাকল যাতে এটা ক্রমেই স্পষ্ট হতে লাগল যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ অস্থায়ী জীবন থেকে বিদায় নিতে এবং এ অস্থায়ী দুনিয়ার অধিবাসীদেরকে বিদায় সম্ভাষণ জানাতে যাচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ এখানে তাঁর ই'তেকাফের প্রসঙ্গটি উল্লেখ করা যেতে পারে। সাধারণভাবে রমাযান মাসে তিনি শেষ দশ দিন ই’তিক্বাফ করতেন। কিন্তু ১০ম হিজরীতে তিনি ই’তিক্বাফ করেন বিশ দিন।
অধিকন্তু জিবরাঈল (আঃ) এ বছর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে দু’ বার কুরআন পুনঃপাঠ করিয়েছিলেন যেক্ষেত্রে অন্যান্য বছরগুলোতে মাত্র একবার কুরআন পুনঃপাঠ করিয়েছিলেন। তাছাড়া নাবী কারীম (ﷺ) বিদায় হজ্জে বলেছিলেন,
(إِنِّيْ لَا أَدْرِيْ لَعَلِّيْ لَا أَلْقَاكُمْ بَعْدَ عَامِيْ هٰذَا بِهٰذَا الْمَوْقِفِ أَبَداً)
‘আমি জানিনা এ বছর পর এ স্থানে তোমাদের সঙ্গে আর মিলিত হতে পারব কিনা’। জামরায়ে ‘আক্বাবাহর নিকট বলেছিলেন,
(خُذُوْا عَنِّيْ مَنَاسَكَكُمْ، فَلَعَلِّيْ لَا أَحُجُّ بَعْدِ عَامِيْ هٰذَا)
‘আমার নিকট থেকে হজ্জের নিয়ম কানুনগুলো শিখে নাও। কারণ, এ বছর পর সম্ভবতঃ আমার পক্ষে আর হজ্জ করা সম্ভব হবে না। আইয়ামে তাশরীক্বের মধ্যভাগে নাবী কারীম (ﷺ)-এর নিকট সূরাহ ‘নাসর’ অবতীর্ণ হয় এবং এর মাধ্যমে নাবী কারীম (ﷺ) উপলব্ধি করেন যে, পৃথিবী থেকে তাঁর যাওয়ার সময় সমাগত প্রায়।
একাদশ হিজরী সফর মাসের প্রথম দিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উহুদ প্রান্তে গমন করে আল্লাহ তা‘আলার সমীপে শহীদদের জন্য এমনভাবে দু‘আ করেন যেন তিনি জীবিত এবং মৃত সকলের নিকট থেকেই বিদায় গ্রহণ করছেন। অতঃপর সেখান থেকে ফিরে এসে তিনি মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে বলেন,
(إِنِّيْ فُرُطٌ لَّكُمْ، وَأَنَا شَهِيْدٌ عَلَيْكُمْ، وَإِنِّيْ وَاللهِ لَأَنْظُرُ إِِلٰى حَوْضِيْ الْآنَ، وَإِنِّيْ أُعْطِيْتُ مَفَاتِيْحُ خَزَائِنِ الْأَرْضِ، أَوْ مَفَاتِيْحُ الْأَرْضِ، وَإِنِّيْ وَاللهَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ أَنْ تُشْرِكُوْا بَعْدِيْ، وَلٰكِنِّيْ أَخَافُ عَلَيْكُمْ أَنْ تَنَافَسُوْا فِيْهَا).
‘আমি তোমাদের যাত্রীদলের প্রধান এবং তোমাদের উপর সাক্ষী, আল্লাহর কসম! আমি এখন আপন ‘হাউযে কাওসার’ দেখছি। আমাকে পৃথিবী এবং পৃথিবীর খাজানাসমূহের চাবি দেয়া হয়েছে। আল্লাহর কসম! আমার এ ভয় হয় না যে, আমার পর তোমরা শিরক করবে। কিন্তু আমার আশঙ্কা হচ্ছে পৃথিবী সম্পর্কে তোমরা এক অপরের সাথে প্রতিযোগিতায় নামবে।[1]
এ সময় একদা মধ্য রাত্রে তিনি ‘জান্নাতুল বাকী’ কবরস্থান গমন করলেন এবং কবরবাসীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। বললেন,
(السَّلَامُ عَلَيْكُـمْ يـَا أَهْلَ الْمَقَابِرِ، لِيَهْنَ لَكُمْ مَا أَصْبَحْتُمْ فِيْهِ بِمَا أَصْبَحَ النَّاسُ فِيْهِ، أَقْبَلَتْ الْفِتَنُ كَقَطْعِ اللَّيْلِ الْمُظْلِمِ، يَتَّبِعُ آخِرُهَا أُوْلَهَا، وَالْآخِرَةُ شَرٌّ مِنْ الْأَوْلٰي)،
‘ওহে কবরবাসীগণ! তোমাদের উপর সালাম বর্ষিত হোক! দুনিয়ার মানুষ যে অবস্থায় আছে তার তুলনায় তোমাদের সে অবস্থানই ধন্য হোক যার মধ্যে তোমরা রয়েছ। অন্ধকার রাত্রির অংশের ন্যায় অনিষ্টতা একটির পর একটি চলে আসছে। ভবিষ্যত প্রজন্ম অতীত প্রজন্মের তুলনায় অধিক খারাপ।’ এরপর এ বলে কবরবাসীদের শুভ সংবাদ প্রদান করলেন যে,
(إِنَّا بِكُمْ لَلَاحِقُوْنَ)
‘তোমাদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য আমরাও আগমন করছি।’
একাদশ হিজরীর ২৯শে সফর সোমবার দিবস রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একটি জানাযার উদ্দেশ্যে বাকী'তে গমন করেন। সেখান থেকে ফেরার পথেই তাঁর মাথা ব্যথা শুরু হয়ে যায় এবং উত্তাপ এতই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় যে, মাথায় বাঁধা পট্টির উপরেও তাপ অনুভূত হতে থাকে। এ অসুস্থতাই ছিল তাঁর ওফাতকালীন রোগ ভোগের সূচনা। এ অসুস্থ অবস্থাতেই তিনি এগার দিন পর্যন্ত সালাতে ইমামত করেন। এ অসুস্থ অবস্থায় তিনি ১৩ কিংবা ১৪ দিন অতিবাহিত করেন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর শারীরিক অবস্থা ক্রমেই অবনতির দিকে যেতে থাকে। এ সময়ের মধ্যে তিনি তাঁর পবিত্র পত্নীগণকে জিজ্ঞাসা করতে থাকেন যে, (أَيْنَ أَنَا غَدًا؟ أَيْنَ أَنَا غَدًا؟) ‘আমি আগামী কাল কোথায় থাকব, আমি আগামী কাল কোথায় থাকব?’
এ জিজ্ঞাসার কারণ অনুধাবন করতে পেরে বিবিগণ বললেন, ‘আপনার যেখানে ইচ্ছা সেখানে থাকতে পারবেন।’’ বিবিগণের কথার প্রেক্ষিতে নাবী কারীম (ﷺ) স্থান পরিবর্তন করে আয়িশার গৃহে গমন করেন। স্থান পরিবর্তনের সময় তিনি ফযল বিন আব্বাস (রাঃ) এবং আলী বিন আবূ ত্বালীবের কাঁধে ভর দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর মাথায় পট্টি বাঁধা ছিল এবং পা মাটিতে হেঁচড়িয়ে তিন চলছিলেন। এ অবস্থার মধ্য দিয়ে নাবী কারীম (ﷺ) আয়িশা (রাঃ)-এর ঘরে গমন করেন এবং জীবনের শেষ সপ্তাহটি সেখানেই অতিবাহিত করেন।
আয়িশা (রাঃ) সূরাহ নাস ও ফালাক্ব এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কর্তৃক মুখস্থকৃত দু‘আ পড়ে নাবী কারীম (ﷺ)-কে ঝাঁড় ফুঁক করতে থাকেন এবং বরকতের আশায় নাবী কারীম (ﷺ)-এর হাত তাঁর পবিত্র শরীরে বুলিয়ে দিতে থাকেন।