ইতোপূর্বে যেমনটি আলোচিত হয়েছে যে, মক্কা বিজয়ের যুদ্ধ ছিল এমন একটি যুগান্তকারী ঘটনা যা মূর্তিপূজার মূলকে সম্পূর্ণরূপে উৎপাটিত করে এবং আরবে মিথ্যাকে অপসৃত করে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে। ইসলামের বিজয় গৌরবে আরববাসীগণের মনের সর্বপ্রকার দ্বিধা-দ্বনদ্ধ ও সন্দেহ দূরীভূত হয়ে যায় এবং তারা দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে থাকে। ‘আমর বিন সালামাহহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ‘আমরা এক ঝর্ণার ধারে বসবাস করতে ছিলাম। সে স্থানটি ছিল বাণিজ্য কাফেলার গমনাগমনের পথ। বাণিজ্য কাফেলা যখন সে পথ দিয়ে গমনাগমন করত তখন লোকজনদের জিজ্ঞেস করতাম, ‘লোকজনেরা সব কেমন আছ? ঐ লোক, অর্থাৎ নাবী কারীম (ﷺ)-এর অবস্থা কেমন? তারা বলত, ‘তিনি মনে করেন যে, আল্লাহ তাঁকে নাবী করেছেন এবং আল্লাহর তরফ থেকে তাঁর নিকট ওহী আসে। আল্লাহ তাঁর নিকট এ এ বিষয়ে ওহী অবতীর্ণ করেছেন। আমি তাদের কথা এমনভাবে স্মরণ করে রাখতাম যে সেগুলোকে যেন আমার সীনা চিমটে ধরে রাখত।’
ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় লাভের জন্য সমগ্র আরব জাহান মক্কা বিজয়ের অপেক্ষায় ছিল। তারা বলত ‘তাঁকে এবং তাঁর দলকে ক্ষমতা পরীক্ষার জন্য ছেড়ে দাও। যদি তিনি কুরাইশ এবং তাদের মিত্রদের উপর বিজয়ী হন তাহলে বুঝতে হবে যে, তিনি প্রকৃতই নাবী। কাজেই, যখন মক্কা বিজয়ের ঘটনা সংঘটিত হল তখন বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা ইসলাম গ্রহণের উন্মুখতা নিয়ে মদীনা অভিমুখে অগ্রসর হল। ‘আমর গোত্রের লোকজনদের ইসলাম গ্রহণের জন্য আমার পিতাও গমণ করলেন। অতঃপর যখন তিনি খিদমতে নাবাবী থেকে ফেরত আসলেন তখন বললেন, ‘আল্লাহর শপথ! একজন সত্য নাবীর নিকট থেকে আমি তোমাদের নিকট আসছি। নাবী (ﷺ) বললেন, ‘অমুক সময় সালাত আদায় কর। যখন সালাতের সময় হবে তোমাদের মধ্য হতে একজন আযান দেবে এবং কোনআন শরীফ যার ভাল জানা আছে সে সালাতে ইমামত করবে।[1]
এ হাদীস দ্বারা স্পষ্টত প্রমাণিত হয় যে, মক্কা বিজয়ের ঘটনা, ঘটনা প্রবাহের মোড় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে, ইসলামকে শক্তিশালী করার ব্যাপারে, আরব অধিবাসীদের নীতি-নির্ধারণের ব্যাপারে এবং তাদের বহুত্ববাদের ধারণাকে মন মস্তিষ্ক থেকে অপসারণ করে ইসলামের নিকট আত্মসমর্পণ করার ব্যাপারে কত ব্যাপক ও গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। বিশেষ করে তাবুক অভিযানের পর অত্যন্ত দ্রুত গতিতে এ অবস্থার বিস্তৃতি ঘটতে থাকে। এর প্রমাণ হিসেবেই এটা প্রত্যক্ষ করা যায় যে, ৯ম ও ১০ম হিজরীতে ইসলাম গ্রহণেচ্ছু বিভিন্ন দলের মদীনা আগমণ একের পর এক অব্যাহত থাকে এবং তারা দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে থাকে।
এ সময় আরববাসীগণ যে অত্যন্ত অধিক সংখ্যক হারে ইসলামে দীক্ষিত হতে থাকেন তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ হচ্ছে সেনাবাহিনী। মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে যেক্ষেত্রে সেনাবাহিনীতে সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র দশ হাজার, সেক্ষেত্রে একটি বছর অতিবাহিত না হতেই মুসলিম বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা উন্নীত হয় ত্রিশ হাজারে। এর অল্প কাল পরেই বিদায় হজ্জের সময় এ বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা উন্নীত হয় এক লক্ষ চবিবশ হাজার অথবা এক লক্ষ চুয়াল্লিশ হাজারে। শ্রাবণ প্লাবনের ন্যায় উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে ইসলামের সৈন্যসংখ্যা। বিদায় হজ্জের সময় এ বিশাল বাহিনী নাবী কারীম (ﷺ)-এর চার পাশে এমনভাবে লাববায়িক, তাকবীর, হামদ ও তসবীহ ধ্বনি উচ্চারণ করতে থাকেন যে, আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে ওঠে এবং আল্লাহর একত্ববাদের ঐকতানে সমগ্র উপত্যকা মুখরিত হয়ে ওঠে।
ধর্ম যুদ্ধ সম্পর্কে তথ্যাভিজ্ঞ ব্যক্তিগণ যে সকল প্রতিনিধি দলের কথা উল্লেখ করেছেন তার সংখ্যা ছিল সত্তরের অধিক। কিন্তু এখানে সে সবের পুরো বিবরণ প্রমাণের অবকাশ নেই এবং তার কোন প্রয়োনও সেই। এ প্রেক্ষিতে আমরা শুধু সে সকল প্রতিনিধিদলের কথা আলোচনা করব যে গুলো ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে আরও যে বিষয়টির প্রতি পাঠকবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ প্রয়োজন তা হচ্ছে যদিও সাধারণ গোত্র সমূহের প্রতিনিধি দলগুলো মক্কা বিজয়ের পর খিদমতে নাবাবীতে উপস্থিত হতে আরম্ভ করেছিল,কিন্তু কোন কোন গোত্র এমন যে তাদের প্রতিনিধিদলগুলো মক্কা বিজয়ের পূর্বেই মদীনাতে আগমন করেছিল। এখানে আমরা তাদের কথাও উল্লেখ করছি।
১. আব্দুল কাইসের প্রতিনিধিদল(وَفْدُ عَبْدِ الْقَيْسِ) : এ গোত্রের প্রতিনিধিদল দু’বার খিদমতে নাবাবীতে উপস্থিত হয়েছিল। প্রথম বার ৫ম হিজরীতে কিংবা তারও কিছু পূর্বে এবং দ্বিতীয় বার ৯ম হিজরীতে। প্রথমবার তাদের আগমণের কারণ ছিল ঐ গোত্রের মুনকেজ বিন হেববান নামক এক ব্যক্তি বাণিজ্য পণ্যাদি নিয়ে মদীনায় যাতায়াত করত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হিজরতের পর প্রথমবার যখন সে মদীনায় আগমন করল তখন ইসলাম সম্পর্কে অবহিত হয়ে মুসলিম হয়ে গেল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর একটি পত্রসহ নিজ গোত্রে প্রত্যাবর্তন করল। ইসলামের বিষয়াদি অবগত হয়ে সেই গোত্রের লোকজনেরাও ইসলাম গ্রহণ করল। ১৩ কিংবা ১৪ জনের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রতিনিধিদল হারাম মাসগুলোর মধ্যে খিদমতে নাবাবীতে গিয়ে হাজির হল। সে সময় ঐ প্রতিনিধিদল নাবী কারীম (ﷺ)-এর নিকট ঈমান এবং পানীয় দ্রব্যাদি সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল। এ দলের নেতা ছিল আল আশাজ্জ আল আসরী।[1] যাদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছিলেন যে,
(إِنَّ فِيْكَ خَصْلَتَيْنِ يَحِبُّهُمَا اللهُ : الحِلْمُ وَالْأَنَاةُ)
‘তোমাদের মধ্যে এমন দুটি স্বভাব রয়েছে যা আল্লাহ পছন্দ করেন এবং তা হচ্ছে (১) ধৈর্য্য ও (২) দূরদর্শিতা।’
ইতোপূর্বে যেমনটি উল্লেখিত হয়েছে, এ গোত্রের দ্বিতীয় দলটি আগমন করে ছিল ৯ম হিজরীতে। ঐ সময় দলের সদস্য সংখ্যা ছিল চল্লিশ। তাদের অন্যতম ছিল জারুদ বিন ‘আলা- আবদী নামক একজন খ্রিষ্টান। কিন্তু সে ইসলাম গ্রহণ করেছিল এবং তার ইসলামই ছিল উত্তম।[2]
২. দাউস গোত্রের প্রতিনিধি দল (وَفْدُ دَوْسٍ) : ৭ম হিজরীর প্রথম ভাগে এ প্রতিনিধিদল মদীনায় আগমন করে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সে সময় খায়বারে অবস্থান করছিলেন। ইতোপূর্বে এটা উল্লেখিত হয়েছে যে, এ গোত্রের নেতা তুফাইল বিন ‘আমর দাউসী (রাঃ) ঐ সময় ইসলামের আওতাভুক্ত হয়েছিলেন, যখন নাবী কারীম (ﷺ) মক্কায় ছিলেন। অতঃপর তিনি নিজ সম্প্রদায়ের নিকট প্রত্যাবর্তন এবং দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে মনোনিবেশ করে অবিরামভাবে কাজ করে যেতে থাকেন। কিন্তু তাঁর সম্প্রাদায়ের লোকেরা নানা প্রকার ছলনার আশ্রয় নিয়ে বিলম্ব করতে থাকে। এভাবে অযথা সময় অতিবাহিত হওয়ার কারণে তুফাইল তাদের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে পড়েন এবং খিদমতে নাবাবীতে হাজির হয়ে দাউস গোত্রের লোকজনদের জন্য বদ দু‘আ করার আরজি পেশ করেন। কিন্তু বদ দু‘আর পরিবর্তে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ বলে দু‘আ করলেন, ‘হে আল্লাহ! দাউস গোত্রের লোকজনদের হিদায়াত করুন।’
নাবী (ﷺ)-এর দু‘আর বরকতে দাউস গোত্রের লোকেরা মুসলিম হয়ে যায়। তুফাইল দাউসী নিজ সম্প্রদায়ের ৭০ কিংবা ৮০টি পরিবারের একটি দল সহ ৭ম হিজরীর প্রথমভাগে মদীনায় আগমন করেন। ঐ সময় নাবী কারীম (ﷺ) খায়বার গিয়েছিলেন এ কারণে তুফাইল সামনের দিকে অগ্রসর হয়ে খায়বারে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে মিলিত হন।
৩. ফারওয়াহ বিন ‘আমর জুযামীর সংবাদ বহন (رَسُوْلُ فَرْوَةَ بْنِ عَمْرِو الْجُذَامِيْ) : ফারওয়াহ ছিলেন রোমক সেনাবাহিনীতে একজন আরবীয় সেনাপতি। রুমীগণ তাঁকে রোমক সাম্রাজ্যের সীমান্তে আরব অঞ্চলসমূহের গভর্ণর নিযুক্ত করেছিলেন। তাঁর কেন্দ্র ছিল মা’আন (দক্ষিণ উরদুন) এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে এর কার্যকারিতা ছিল। মুতাহ যুদ্ধে (৮ম হিজরী) তিনি মুসলিমগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। এ যুদ্ধে তিনি মুসলিমগণের বীরত্ব এবং সমর দক্ষতা দেখে মুগ্ধ হন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। অতঃপর একজন সংবাদ বাহকের মাধ্যমে তাঁর মুসলিম হওয়ার সংবাদ তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট প্রেরণ করেন। উপঢৌকনের মধ্যে একটি সাদা খচ্চরও তিনি প্রেরণ করেন। রুমীগণ তাঁর মুসলিম হওয়ার সংবাদে তাঁকে বন্দী করে কয়েদখানায় নিক্ষেপ করে। অতঃপর ইসলাম পরিত্যাগ করে পুনরায় পূর্ব ধর্মে প্রবেশ করা নতুবা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য তাঁকে বলা হয়। তিনি ইসলাম পরিত্যাগ করার চাইতে মৃত্যুবরণ করাকেই প্রাধান্য দেন। কাজেই, ফিলিস্ত্বীনের আফরা’ নামক এক ঝর্ণার উপর সুলীকাষ্ঠে ঝুঁলিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়।[3]
৪. সুদা’ প্রতিনিধি দল (وَفْدُ صَدَاء) : নাবী কারীম (ﷺ)-এর জি’রানা হতে প্রত্যাবর্তনের পর ৮ম হিজরীতে এ প্রতিনিধিদল খিদমতে নাবাবীতে উপস্থিত হয়। এর কারণ ছিল রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ৪০০ (চারশ) মুজাহিদীন সমন্বয়ে এক বাহিনী সংগঠন করে ইয়ামানের সুদা’ গোত্রে আবাসিক অঞ্চলে আক্রমণ পরিচালনার নির্দেশ প্রদান করেন। এ বাহিনী যখন কানাত উপত্যকায় স্থাপিত শিবিরে অবস্থান করছিল তখন যিয়াদ বিন হারিস সুদায়ী এ ব্যাপারটি অবগত হয়ে তৎক্ষণাত রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খিদমতে হাজির হন এবং আরয করেন যে, আমার পরে যারা আছেন তাদের প্রতিনিধি হিসেবে আমি আমার সম্প্রদায়ের জন্য জামিন হচ্ছি। নাবী কারীম (ﷺ) কাল বিলম্ব না করে উপত্যকা থেকে মুসলিম বাহিনীকে ফিরিয়ে আনেন। এরপর নিজ গোত্রে ফিরে গিয়ে যিয়াদ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দরবারে উপস্থিত হওয়ার জন্য নিজ সম্প্রদায়ের লোকজনদের উৎসাহিত করতে থাকেন। এর ফলে ১৫ জনের একটি দল খিদমতে নাবাবীতে উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণে আজ্ঞানুবর্তী হওয়ার শপথ গ্রহণ করে। অতঃপর নিজ সম্প্রদায়ের নিকট ফিরে এসে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে রত হয়। এর ফলে এ সম্প্রদায়ের মধ্যে ইসলাম প্রসার লাভ করে। বিদায় হজ্জের সময় এ সম্প্রদায়ের একশ ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খিদমতে উপস্থিত হওয়ার সম্মান অর্জন করেন।
[2] আল্লামা নাবাবী রচিত মুসলিম শরীফের শারাহ ১ম খন্ড ৩৩ পৃঃ, এবং ফতুহুল বারী ৮ম খন্ড
[3] যাদুল মা‘আদ ৩য় খন্ড ৪৫ পৃঃ।
তিনি ছিলেন আরবের এক অভিজাত বংশদ্ভূত একজন প্রখ্যাত কবি। তিনি কাফির ছিলেন এবং নাবী কারীম (ﷺ)-এ নামে কুৎসা রটনা করতেন। এদিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন ত্বায়িফ যুদ্ধ হতে ফিরে আসেন (৮ম হিজরী) তখন কা‘বের নিকট তার ভাই বুজাইর বিন যুহাইর এ মর্মে পত্র লিখেন যে, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মক্কার এমন কয়েক ব্যক্তিকে হত্যা করেছেন যারা তাঁর নামে কুৎসা রটনা করত এবং তাঁকে কষ্ট দিত। কুরাইশদের ছোটখাটো কবিগণের মধ্যে যার যে দিকে সুযোগ সুবিধা হয়েছে সে সেদিকে পলায়ন করেছে। অতএব, যদি তুমি প্রাণে রক্ষা পেতে চাও তাহলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খিদমতে গিয়ে হাজির হয়ে যাও। কারণ, নাবী কারীম (ﷺ)-এর দরবারে গিয়ে কেউ তওবার সঙ্গে ক্ষমা প্রার্থনা করলে তিনি তাকে ক্ষমা করে দেন। তাকে হত্যা করেন না। যদি এ কথার উপর তুমি আস্থাশীল না হও তাহলে যেখানে খুশী গিয়ে প্রাণ রক্ষার চেষ্টা করতে পার।’’
এরপর দু’ ভাইয়ের মধ্যে পত্রালাপ চলতে থাকে এবং ক্রমে ক্রমে কা’বের নিকট পৃথিবীর পরিসর সংকীর্ণ মনে হতে থাকে। এমনকি তার নিকট নিজের জীবনের ফুল নিক্ষিপ্ত হতে দেখা গেল- এ কারণে অবশেষে সে মদীনায় আগমন করল এবং জুহাইনা গোত্রের এক ব্যক্তির মেহমান হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করল। অতঃপর তার সঙ্গে ফজরের সালাত আদায় করল। ফজরের সালাত হতে ফারেগ হওয়া মাত্রই জুহাইনা গোত্রের লোকটি তাঁকে ইঙ্গিত করলে তিনি উঠে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট উপবিষ্ট হলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে চিনতেন না। তিনি বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! কা‘ব বিন জুহাইর তওবা করে মুসলিম হয়েছেন এবং আপনার নিকট ক্ষমা ও আশ্রয় প্রার্থনা করছেন। আমি যদি তাঁকে আপনার খিদমতে হাজির করি তাহলে আপনি কি তাঁকে আশ্রয় প্রদান করবেন?
নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, ‘হ্যাঁ’
অতঃপর তিনিই বললেন, ‘আমি হচ্ছি কা‘ব বিন জুহাইর’। এ কথা শুনে একজন আনসারী সাহাবী তাকে হত্যা করার জন্য লাফ দিয়ে ওঠেন এবং তাঁর গ্রীবা কর্তন করার জন্য অনুমতি চান। নাবী কারীম (ﷺ) বললেন,
(دَعْهُ عَنْكَ، فَإِنَّهُ قَدْ جَاءَ تَائِباً نَازِعاً عَمَّا كَانَ عَلَيْهِ)
‘ক্ষান্ত হও, এ ব্যক্তি তাওবা করেছে, এবং তাওবা করার কারণে সমস্ত দোষত্রুটি থেকে সে মুক্তি লাভ করেছে।’
এ সময়েই কা‘ব বিন জুহাইর তাঁর একটি প্রসিদ্ধ কবিতা পাঠ করে নাবী কারীম (ﷺ)-কে শোনাল যার প্রথম পংক্তিটি এখানে লিপিবদ্ধ করা হল,
بانت سعاد فقلبي اليوم مَتْبُول ** مُتَيَّمٌ إثْرَهَا، لم يُفْدَ، مَكْبُول
অর্থ : ‘সু’আদ চলে গেছে, বিরহ ব্যথায় আমার অন্তর বিদীর্ণ, আমি বন্দী শৃঙ্খলাবদ্ধ আমার মুক্তিপণ দেয়া হয়নি।
এ কবিতাতেই কা‘ব রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রশংসাসহ তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে নিম্নোক্ত লাইনগুলো আবৃত্তি করেন,
نبئت أن رسول الله أوعدني ** والعفو عند رسول الله مأمول
مهلا هداك الذي أعطاك نافلة الـ ** قرآن فيها مواعيظ وتفصيل
لا تأخذن بأقوال الوشاة ولم ** أذنب، ولو كثرت فيَّ الأقاويل
لقد أقوم مقاما ما لو يقوم به ** أرى وأسمع ما لو يسمع الفيل
لظل يرعد إلا أن يكون له ** من الرسول بإذن الله تنويل
حتى وضعت يميني ما أنازعه ** في كف ذي نقمات قيله القيل
فلهو أخوف عندي إذ أكلمه ** وقيل: إنك منسوب ومسئول
من ضيغم بضراء الأرض مخدرة ** في بطن عثر غيل دونه غيل
إن الرسول لنور يستضاء به ** مهند من سيوف الله مسلول
অর্থ : আমি সংবাদ পেয়েছি যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে ধমক দিয়েছেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট ক্ষমার আশা করা হয়। আপনি অপেক্ষা করুন। যে আল্লাহ আপনাকে হিদায়াতপূর্ণ কুরআন দিয়েছেন, তিনি আপনাকে হিদায়াতের কাজে সাফল্য দান করুন। (নিন্দুকদের কথায়, কান দিবেন না) যদিও আমার সম্পর্কে অনেক কথাই বলা হয়েছে, কিন্তু আমি কোন অপরাধ করিনি। আমি এমন এক জায়গায় দন্ডায়মান আছি, আমি সেই কথাই শুনেছি এবং দেখেছি যে হাতীও যদি সেখানে দাঁড়ায় এবং সেই কথাগুলো শুনে তাহলে কম্পিত হবে। এ অবস্থা ব্যতীত যে তার উপর আল্লাহর অনুমতিতে রাসূল (ﷺ)-এর মেহেরবানী হয়। এমন কি আমি নিজ হাত কোন দ্বিধা ছাড়াই এমন এক সম্মানিত ব্যক্তির হাতে রেখেছি যাঁর প্রতিশোধ নেয়ার পূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে এবং যার কথাই আসল কথা যখন আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলছি। এমতাবস্থায় আমাকে বলা যে, ‘তুমি এ কথা বলেছ এবং তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। তা তো আমার নিকট সে সিংহের চাইতেও ভয়ানক যার থাকার স্থান এমন এক উপত্যকায় অবস্থিত যা অত্যন্ত কঠিন এবং ধ্বংসাত্মক যার পূর্বেও ধ্বংস হয়ে থাকে। নিশ্চয়ই রাসূল আলোকস্বরূপ, তাঁর দ্বারা অন্ধকার দূর হয়। কোষমুক্ত হিন্দুস্থানী ধারালো তলোয়ার।
এরপর কা‘ব বিন জুহাইর কুরাইশ মুহাজিরগণের প্রশংসা করেন। কারণ, কা'বের আগমনে তাদের কোন ব্যক্তি ভাল উক্তি ছাড়া কোন মন্তব্য করে নি এবং কোন গতিভঙ্গীও পরিলক্ষিত হয়নি। কিন্তু তাদের প্রশংসা কালে আনসারদের প্রতি তিনি কটাক্ষ করেন। কারণ তাঁদের একজন তার গ্রীবা কর্তনের অনুমতি চেয়েছিল। কাজেই তিনি বললেন,
يمشون مَشْي الجمال الزُّهْرِ يعصمهم ** ضَرْبٌ إذا عَرَّد السُّودُ التَّنَابِيل
অর্থ : ওরা (কুরাইশগণ) সুশ্রী উটের ন্যায় হেলে দুলে চলেন। অসিযুদ্ধ তাদের রক্ষা করে যখন কদাকার কুৎসিত লোকেরা রাস্তা ছেড়ে পলায়ন করে।
কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর যখন তাঁর ঈমান দৃঢ় হয় তখন আনসারদের প্রশংসাসূচক একটি কবিতা আবৃত্তি করেন এবং তাঁদের ব্যাপারে তাঁর যে ত্রুটি হয়েছিল তার তিনি সংস্কার করে নেন। এ কবিতাটি নিম্নে লিপিবদ্ধ করা হল :
من سره كَرَمُ الحــياة فلا يَزَلْ ** في مِقْنَبٍ من صالحي الأنصار
ورثوا المكارم كابراً عن كـابر ** إن الخـيار هـم بنـو الأخيار
অর্থ : ভদ্রোচিত জীবন যাপন যার পছন্দনীয় হয় তিনি সর্বদাই সৎ সাহায্যকারীদের দলভুক্ত হয়ে থাকেন। তার ভাল স্বভাবগুলো পিতা এবং পূর্বের পিতৃপুরুষগণের নিকট হতে প্রাপ্ত হয়েছে। প্রকৃতই ভাল লোক ভাল লোকেরই সন্তান হয়।
এ প্রতিনিধি দল ৯ম হিজরীতে মদীনায় আগমন করেন। এ দলের সদস্য সংখ্যা ছিল বার জন। এদের মধ্যে হামযাহ বিন নু’মানও ছিলেন। তাঁদের উৎস সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে দলনেতা বলেন যে, তাঁরা বনু উযরাহর অন্তর্ভুক্ত কুসাই গোত্রের বৈমাত্রেয় ভাই। আমরাই কুসাই’র সমর্থন দান করে বনু বাকর এবং বনু খুযা’আহ গোত্রকে মক্কা হতে বহিস্কার করেছিলাম। এদের সঙ্গে আমাদের আত্মীয়তা সম্পর্ক আছে। এ প্রেক্ষিতে নাবী কারীম (ﷺ) তাঁদের স্বাগত জানালেন এবং শাম দেশ বিজয় করার সুসংবাদ দিলেন। তিনি গণক মহিলাদেরকে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার ব্যাপারে তাঁদের নিষেধ করলেন এবং তাঁদেরকে সে সব যবেহ থেকে নিষেধ করলেন যা তাঁরা (মুশরিক থাকা কালীন) যবেহ করতেন। এ দলটি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং কয়েকদিন অবস্থান করার পর নিজ গোত্রের নিকট ফিরে যান।
৯ম হিজরীর রবিউল আওয়াল মাসে এ দলটি মদীনায় আগমন করেন এবং ইসলাম গ্রহণের পর ৩ দিন সেখানে অবস্থান করেন। মদীনায় অবস্থান কালে দলের নেতা আবূ যবীর জিজ্ঞেস করেন যে, নিমন্ত্রণ করাতে কিরূপ সওয়াব আছে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন,
(نَعَمْ، وَكُلُّ مَعْرُوِفٍ صَنَعَتْهُ إِلٰى غَنِيٍّ أَوْ فَقِيْرٍ فَهُوَ صَدَقَةٌ)،
‘ধনাঢ্য কিংবা মুখাপেক্ষীদের যে কোন ভাল আচরণই করবে সেটাই সাদকা হিসেবে পরিগণিত হবে।’
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘নিমন্ত্রণের সময় সীমা কত?
নাবী কারীম (ﷺ) উত্তর দিলেন, ‘তিন দিন’।
তিনি আরও জিজ্ঞেস করলেন, ‘মালিক বিহীন হারানো ভেড়া কিংবা বকরী পেলে তার হুকুম কী? নাবী কারীম বললেন, (هِيْ لَكَ أَوْ لِأَخِيْكَ أَوْ لِلذِّئْبِ) ‘তা তোমার কিংবা তোমার ভাইয়ের জন্য হবে অথবা বাঘের খোরাক হবে।’ এরপর তিনি হারানো উট সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, (مَالَكَ وَلَهُ؟ دَعْهُ حَتّٰى يَجِدَهُ صَاحِبُهُ)‘এর সঙ্গে তোমার কী সম্পর্ক? তার মালিক প্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত ওকে ছেড়ে দিতে হবে।’
তাবুক হতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রত্যাবর্তনের পর ৯ম হিজরীর রমাযান মাসে এ দলটি খিদমতে নাবাবীতে উপস্থিত হন। এ গোত্রের ইসলাম গ্রহণের পূর্বের ঘটনার গতি প্রকৃতি ছিল ৮ম হিজরীর যুল ক্বাদাহ মাসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন ত্বায়িফ যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তনের করেন তখন তাঁর মদীনায় পৌঁছার পূর্বেই এ গোত্রের সর্দার উরওয়াহ বিন মাসউদ সাক্বাফী মদীনায় আগমন করে ইসলাম গ্রহণ করেন। অতঃপর নিজ কওমের নিকট ফিরে গিয়ে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। যেহেতু তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের নেতা ছিলেন এবং শুধু এটাই নয় যে, কওমের লোকেরা তাকে মান্য করে চলত বরং তাঁকে তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা তাদের মেয়েদের এবং মহিলাদের চাইতেও বেশী প্রিয় ভাবত। এ কারণেই তাঁর ধারণা ছিল যে, লোকেরা অবশ্যই তাঁকে অনুসরণ করে চলবে। কিন্তু যখন তিনি ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকলেন তখন সম্পূর্ণ উল্টো ফল ফলল। লোকেরা তীরের আঘাতে আঘাতে তাঁকে হত্যা করে ফেলল।
তাঁকে হত্যার পর একই অবস্থার মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত হতে থাকে। কয়েক মাস অতিবাহিত হওয়ার পর এটা তাদের নিকট সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, পার্শববর্তী অঞ্চলসমূহের যারা ইসলাম গ্রহণ করেছেন তাঁদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকার ক্ষমতা তাদের নেই। সুতরাং অবস্থার প্রেক্ষিতে আলাপ আলোচনা ও সলাপরামর্শের পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খিদমতে একজন লোক পাঠানোর সিদ্ধান্ত তারা গ্রহণ করল এবং এ কাজের জন্য আবদে ইয়ালিল বিন ‘আমরকে মনোনীত করল কিন্তু এ কাজের জন্য সে প্রথমাবস্থায় রাজি হল না। তার আশঙ্কা ছিল যে, তার সঙ্গেও সে আচরণ করা হতে পারে যা উরওয়া বিন মাসউদ সাকাফীর সঙ্গে করা হয়েছিল। এ কারণে তিনি বললেন, ‘আমার সঙ্গে আরও কিছু সংখ্যক লোক না পাঠালে আমার পক্ষে একাজ করা সম্ভব নয়।’
লোকেরা তাঁর এ দাবী মেনে নিয়ে তাঁর সঙ্গে সাহায্যকারীদের মধ্য হতে দু’জনকে এবং বনু মালিক গোত্রের মধ্য হতে তিনজনকে তাঁর সঙ্গে দিল। কাজেই, তাঁকে সহ মোট ছয় জনের সমন্বয়ে দলটি গঠিত হল। এ দলে উসমান বিন আবিল আস সাক্বাফীও ছিলেন যিনি ছিলেন বয়সে সর্বকনিষ্ঠ।
যখন তাঁরা খিদমতে নাবাবীতে গিয়ে উপস্থিত হলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁদের জন্য মসজিদের এক কোণে একটি তাঁবু খাটিয়ে দিলেন। যাতে তাঁরা কুরআন শ্রবণ করতে এবং সাহাবীগণ (রাঃ)-কে সালাতরত অবস্থায় দেখতে পারেন। অতঃপর তাঁরা নাবী কারীম (ﷺ)-এর নিকট যাতায়াত করতে থাকেন এবং তিনি তাঁদেরকে ইসলামের প্রতি আহবান জানাতে থাকেন। অবশেষে তাঁদের নেতা প্রস্তাব করলেন যে, নাবী কারীম (ﷺ) তাঁর নিজের এবং সাক্বীফ গোত্রের মধ্যে এমন একটি সন্ধি চুক্তি সম্পাদন করে দেবেন যার মধ্যে ব্যভিচার, মদ্যপান এবং সুদ খাওয়ার অনুমতি থাকবে। অধিকন্তু, তাদের উপাস্য লাত বিদ্যমান থাকবে, তাদের জন্য সালাত মাফ করে দিতে হবে এবং তাদের মূর্তিগুলোকে বিনষ্ট করা হবে না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁদের অযৌক্তিক দাবীসমূহের কোনটিকেই মেনে নিতে পারলেন না। অতএব তাঁরা নির্জনে নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করতে থাকলেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট আত্মসমর্পণ করা ছাড়া তাঁরা কোন উপায় স্থির করতে পারলেন না। অবশেষে তাঁরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট আত্মসমর্পণ করে ইসলাম গ্রহণ করলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে তাঁরা একটি শর্ত আরোপ করলেন এবং তা হচ্ছে তাঁদের মূর্তি লাতকে বিনষ্ট করার ব্যাপারে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হবে। সাক্বীফ গোত্রের লোকেরা কখনই নিজ হাতে তা ধ্বংস করবে না। উসমান বিন আবিল আস সাকাফীকে তাঁদের দলের নেতা মনোনীত করে দিলেন। কারণ, ইসলাম সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ এবং দ্বীন ও কুরআনের শিক্ষাদীক্ষার ব্যাপারে তিনি ছিলেন সব চাইতে উৎসাহী এবং অগ্রণী। এর কারণ ছিল দলের সদস্যগণ প্রত্যহ সকালে যখন খিদমতে নাবাবীতে উপস্থিত হতেন তখন উসমান বিন আবিল আস শিবিরে থাকতেন। অতঃপর দলের লোকেরা যখন দুপুর বেলা শিবিরে ফিরে এসে বিশ্রাম গ্রহণ করতেন তখন উসমান বিন আবিল আস রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে কুরআন পাঠ করতেন এবং দ্বীনের কথাবার্তা জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। তিনি যখন নাবী কারীম (ﷺ)-কে বিশ্রামের অবস্থায় পেতেন তখন আবূ বকরের খিদমতে গিয়ে হাজির হতেন। উসমান বিন আবিল আসের নেতৃত্ব অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মৃত্যুবরণ করার সময়ের পর আবূ বাকর (রাঃ)-এর খিলাফতকালে যখন নব্য মুসলিমগণের মধ্যে ধর্মত্যাগের হিড়িক পড়ে যায় তখন সাক্বীফ গোত্রের লোকেরা ধর্মত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তখন উসমান বিন আবিল ‘আস (রাঃ) সকলকে সম্বোধন করে বলল,
(يَا مَعْشَرَ ثَقِيْفٍ، كُنْتُمْ آخِرُ النَّاسِ إِسْلَاماً، فَلَا تَكُوْنُوْا أَوَّلُ النَّاسِ رِدَّةً، فَامْتَنِعُوْا عَنْ الرِّدَّةِ، وَثَبِّتُوْا عَلَى الْإِسْلَامِ)
‘হে সাক্বীফ গোত্রের লোকজনেরা! তোমরা সকলের শেষে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছ। এখন স্বধর্ম ত্যাগ করলে সকলের পূর্বেই তোমরা স্বধর্ম ত্যাগী, তোমরা এভাবে স্বধর্ম ত্যাগ করো না।’ এ কথা শ্রবণের পর ধর্মত্যাগের চিন্তা পরিহার করে তাঁরা ইসলামের উপর সুদৃঢ় থাকেন।
যাহোক, দলের লোকেরা নিজ গোত্রীয় লোকজনদের নিকট ফিরে আসার পর তাঁদের প্রকৃত অবস্থা গোপন রেখে ভবিষ্যত লড়াইয়ের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে চিন্তান্বিত ও দুঃখিত হয়ে বলল যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘তোমরা ইসলাম গ্রহণ এবং ব্যভিচার, মদ ও সুদ পরিত্যাগ কর, অন্যথায় তোমাদের বিরুদ্ধে ভীষণ যুদ্ধ আরম্ভ করা হবে।’ এ কথা শ্রবণের পর প্রথমাবস্থায় সাক্বীফ গোত্রের লোকদের মধ্যে জাহেলিয়াত যুগের অহমিকা প্রাবল্য লাভ করে এবং দু’ তিন দিন যাবত তাঁরা যুদ্ধের কথাই চিন্তাভাবনা করতে থাকেন। কিন্তু এর পর আল্লাহ তাদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার করে দেন, যার ফলে পুনরায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট লোক পাঠিয়ে তাঁর সমস্ত শর্ত মেনে নেয়ার চিন্তা ভাবনা করতে থাকেন। পরিস্থিতি অনুকূল হওয়ায় প্রতিনিধিদল প্রকৃত বিষয় প্রকাশ করে এবং যে সকল কথার পর উপর সন্ধি হয়েছিল তা সুস্পষ্টভাবে বলে। সব কিছু অবগত হওয়ার পর সাক্বীফ গোত্রের লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করেন।
এদিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) লাত মূর্তিটি ভেঙ্গে ফেলার উদ্দেশ্যে খালিদ বিন ওয়ালীদের নেতৃত্বে কয়েকজন বিশিষ্ট সাহাবীর সমন্বয়ে গঠিত একটি দলকে প্রেরণ করেন। মুগীরা বিন শু‘বা দাঁড়িয়ে লৌহ নির্মিত গদা বিশেষ উত্তোলন করলেন এবং তাঁর সঙ্গীদের লক্ষ্য করে বললেন, ‘আল্লাহর শপথ! আমি আপনাদের জন্য সাক্বীফদের সম্পর্কে একটু হাসির ব্যবস্থা করব।
অতঃপর লাতের উপর গুর্জ দ্বারা আঘাত করলেন এবং নিজেই মাটির উপর লুটিয়ে পড়লেন এবং পায়ের গোড়ালি দ্বারা মাটিতে আঘাত করতে থাকলেন। এ উদ্ভট দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে ত্বায়িফবাসীদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার হল। তারা বলতে লাগল ‘আল্লাহ মুগীরাকে ধ্বংস করুক’। লাত দেবী তাকে হত্যা করেছে’। এমন সময় মুগীরা লাফ দিয়ে উঠে বললেন, ‘আল্লাহ তোমাদের মন্দ করুন। এ তো হচ্ছে মাটি এবং পাথরের তৈরি একটি মূর্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। অতঃপর তিনি দরজার উপর আঘাত করেন এবং তা ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলেন। এর পর সব চাইতে উঁচু দেয়ালের উপর ওঠেন, তাঁর সঙ্গে আরও কয়েক সাহাবীও ওঠেন। অতঃপর তা ভেঙ্গে মাটির সমতল করে ফেলেন। এমনকি ভিত পর্যন্ত উঠিয়ে ফেলেন এবং অলঙ্কার ও পোশাকাদি বাহির করে ফেলেন। সাক্বীফ গোত্রের লোকেরা শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় এ সব কাজকর্ম প্রত্যক্ষ করেন। খালিদ (রাঃ) অলংকার ও পোশাকাদিসহ নিজ দলের সঙ্গে মদীনায় ফিরে আসেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) লাতের মন্দির থেকে আনীত দ্রব্যাদি বন্টন করে দেন এবং নাবী (ﷺ)-এর সাহায্য এবং দ্বীনের সম্মানের জন্য আল্লাহর প্রশংসা করেন।[1]
তাবুক হতে নাবী কারীম (ﷺ)-এর প্রত্যাবর্তনের পর হিমইয়ার সম্রাট অর্থাৎ হারিস বিন আবদে কুলাল, না’ঈম বিন আবদে কুলাল, নু’মান এবং যূ রু’ঈন, হামদান ও মু’আফিরের অধিনায়কের পত্র আসে। পত্রবাহক ছিলেন মালিক বিন মুররাহ রাহাভী। ঐ সম্রাটগণ ইসলাম গ্রহণ এবং শিরক্ ও শিরককারী হতে বিচ্ছিন্নতা অবলম্বনের সংবাদাদিসহ পত্র প্রেরণ করেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁদের পত্রের উত্তরে পত্র লিখে ঈমানদারদের প্রাপ্য এবং দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন। এ পত্রে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অঙ্গীকারাবদ্ধদের জন্য শর্ত সাপেক্ষে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর অঙ্গীকারাবদ্ধদের জন্য শর্ত সাপেক্ষ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর দায়িত্বের কথা উল্লেখ করেন। এতে শর্ত ছিল তাঁরা যথারীতি কর পরিশোধ করবেন। অধিকন্তু, নাবী কারীম (ﷺ) কতিপয় সাহাবা (রাঃ)-কে ইয়ামানে প্রেরণ করেন। মু’আয বিন জাবালকে এ দলের আমীর নিযুক্ত করেন।
তাঁকে ‘আদন’ এর দিকে ‘সাকূন ও সাকাসিক’ এর নামক উঁচু অঞ্চলের দায়িত্ব প্রদান করেন। তিনি ‘হূরূব’এর ক্বাযী ও বিচারক এবং যাকাত ও যিযিয়াহ উসূলকারী ছিলেন। তিনি তাদের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করতেন। আর আবূ মূসা আশয়ারী (রাঃ) কে ‘যুবায়দ’, ‘মারিব’, ‘যামাআ’, ‘সাহিল’ নামক নিম্নাঞ্চলের দায়িত্বে প্রেরণ করে বললেন, (يسرا ولا تعسرا, وبشرا ولا تنفرا, وتطاوعا ولا تختلفا) ‘‘সহজ করবে, কঠিন করবেনা; সুসংবাদ দিবে, ভয় দেখাবে না; আনুগত্য করবে, মতবিরোধ করবেনা।’’ মু’আয (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মৃত্যু অবধি ইয়ামানে অবস্থান করেন আর আবূ মূসা আশয়ারী বিদায় হজ্জে রাসূল (ﷺ)-এর নিকট আগমন করেন।
তাবুক যুদ্ধ হতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রত্যাবর্তনের পর ৯ম হিজরীতে এ প্রতিনিধিদল খিদমতে নাবাবীতে উপস্থিত হন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট কিছু তথ্য জানতে চাওয়ার প্রেক্ষিতে তিনি তাঁদের একটি পত্র দেন এবং মালিক বিন নামাত্বকে (রাঃ) তাঁদের নেতা এবং তাঁদের সম্প্রদায়ের যারা মুসলিম হয়েছিলেন তাঁদের গভর্ণর নিযুক্ত করেন। অবশিষ্ট অন্যান্যদের নিকট ইসলামের দাওয়াত দেয়ার জন্য খালিদ (রাঃ)-কে প্রেরণ করেন। তিনি সেখানে ছয় মাস অবস্থান করেন এবং দাওয়াত দিতে থাকেন। কিন্তু লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করে নি। অতঃপর নাবী কারীম (ﷺ) আলী বিন আবূ ত্বালিব (রাঃ)-কে সেখানে প্রেরণ করেন এবং খালিদকে মদীনায় ফেরত পাঠানোর পরামর্শ প্রদান করেন।
আলী (রাঃ) হামদান গোত্রের লোকজনদের নিকট রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পত্র পাঠ করে শোনান এবং ইসলামের দাওয়াত প্রদান করেন। এর ফলে তাঁরা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেন। আলী (রাঃ)-এর নিকট থেকে তাঁদের ইসলাম গ্রহণের সংবাদ প্রাপ্ত হয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সিজদায় পতিত হন। অতঃপর মাথা উঠিয়ে বলেন,
(السَّلَامُ عَلٰى هَمْدَانَ، السَّلَامُ عَلٰى هَمْدَانَ)
‘হামদানের উপর শান্তি বর্ষিত হোক , হামদানের উপর শান্তি বর্ষিত হোক।’
তাবুক হতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রত্যাবর্তনের পর এ প্রতিনিধিদল ৯ম হিজরীতে মদীনায় আগমন করেন। এ দলের সদস্য সংখ্যা ছিল দশ জনের অধিক। এরা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা তাঁদের অঞ্চলে দুর্ভিক্ষের কথা বলায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মিম্বরের উপর পদার্পণ করলেন এবং দু’ হাত তুলে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করলেন। তিনি আল্লাহর সমীপে আরয করলেন,
(اللهم اَسْقِ بِلَادَكَ وَبَهَائِمِكَ، وَانْشُرْ رَحْمَتَكَ، وَأَحْيِ بَلَدَكَ الْمَيِّتِ، اللهم اَسْقِنَا غَيْثاً مُغِيْثاً، مَرِيْئًا مَرِيْعاً، طَبَقاً وَاسِعاً، عَاجِلاً غَيْرَ آجِلٍ، نَافِعاً غَيْرَ ضَارٍّ، اللّٰهُمَّ سُقْيًا رَحْمَةٌ، لَا سُقْيًا عَذَابٌ، وَلَاهَدْمَ وَلَا غَرَقَ وَلَا مَحْقَ، اللّٰهُمَّ اَسْقِنَا الْغَيْثَ، وَانْصُرْنَا عَلَى الْأَعْدَاءِ)
‘হে আল্লাহ! তোমার রহমত ধারা বর্ষণ ও বিস্তৃত করে তোমার সৃষ্টিরাজিকে পরিতৃপ্তি করো এবং মৃতপ্রায় জনপদকে সঞ্জীবিত কর। হে আল্লাহ! আমাদের উপর এমন বৃষ্টি বর্ষণ কর যা আমাদের জন্য আনন্দদায়ক কল্যাণকর ও আরামদায়ক হয় এবং বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে হয়, তা যেন বিলম্বে না হয়ে শীঘ্র হয়। হে আল্লাহ! এ বৃষ্টি যেন তোমার রহমতের বৃষ্টি হয়, শাস্তিমূলক কিংবা ধ্বংসাত্মক না হয়, তা যেন আমাদের ভাসিয়ে না দেয় এবং নিশ্চিহ্ন করে না ফেলে। হে আল্লাহ! বৃষ্টিদ্বারা আমাদের পরিতৃপ্ত কর এবং শত্রুদের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য কর।[1]
মক্কা হতে ইয়ামানের দিকে যেতে সাত দিনের দূরত্বে একটি বড় অঞ্চল ছিল, ঐ অঞ্চলটি ছিল ৭৩ পল্লী বিশিষ্ট। কোন দ্রুতগামী বাহন একদিনে পুরো অঞ্চল ভ্রমণ করতে সক্ষম হতো না। এ অঞ্চলে এক লক্ষ যোদ্ধা পুরুষ ছিল। এরা ছিল সকলেই খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারী।
নাজরানের প্রতিনিধি দল মদীনায় আগমন করেন ৯ম হিজরী সনে। এর সদস্য সংখ্যা ছিল ষাট। ২৪ জন ছিলেন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গ। যার মধ্যে ৩ জন ছিলেন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। এর মধ্যে একজনের নাম ছিল আব্দুল মাসীহ। তিনি ছিলেন আক্বিব। তাঁর দায়িত্ব ছিল অধিনায়কত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনা। দ্বিতীয় জনের নাম ছিল আইহাম অথবা শুরাহবিল। তিনি রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক বিষয়াদি দেখাশোনা করতেন, উপাধি ছিল সাইয়্যিদ। তৃতীয় জন হলেন আসক্বাফ’। তার নাম ছিল আবূ হারিসাহ বিন আলক্বামাহ। তিনি ছিলেন ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিক নেতা (লাট পাদরী) উপকুফ।
মদীনায় পৌঁছার পর এ দলটি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে সাক্ষাত করেন। অতঃপর নাবী কারীম (ﷺ) এবং এ প্রতিনিধি দলের মধ্যে উভয় পক্ষের কিছু প্রশ্ন নিয়ে কথাবার্তা হয়। এরপর নাবী কারীম (ﷺ) তাঁদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন এবং কুরআনের কিছু অংশ পাঠ করে শোনান। কিন্তু তাঁরা ইসলাম গ্রহণ না করে পাল্টা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন- ‘আপনি মাসীহ (আঃ) সম্পর্কে কী বলছেন? তাঁদের জবাবে কিছু না বলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিরুত্তর রইলেন। অতঃপর নিম্নোক্ত আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হল:
(إِنَّ مَثَلَ عِيْسَى عِندَ اللهِ كَمَثَلِ آدَمَ خَلَقَهُ مِن تُرَابٍ ثِمَّ قَالَ لَهُ كُن فَيَكُوْنُ - الْحَقُّ مِن رَّبِّكَ فَلاَ تَكُن مِّن الْمُمْتَرِيْنَ - فَمَنْ حَآجَّكَ فِيْهِ مِن بَعْدِ مَا جَاءكَ مِنَ الْعِلْمِ فَقُلْ تَعَالَوْا نَدْعُ أَبْنَاءنَا وَأَبْنَاءكُمْ وَنِسَاءنَا وَنِسَاءكُمْ وَأَنفُسَنَا وأَنفُسَكُمْ ثُمَّ نَبْتَهِلْ فَنَجْعَل لَّعْنَةُ اللهِ عَلَى الْكَاذِبِيْنَ) [آل عمران:59-61]
‘আল্লাহর নিকট ঈসার অবস্থা আদামের অবস্থার মত, মাটি দ্বারা তাকে গঠন করে তাকে হুকুম করলেন, হয়ে যাও, ফলে সে হয়ে গেল। এ বাস্তব ঘটনা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতেই, সুতরাং তুমি সংশয়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। তোমার নিকট জ্ঞান আসার পর যে ব্যক্তি তোমার সাথে (ঈসার সম্বন্ধে) বিতর্ক করবে তাকে বল, ‘আসো, আমাদের পুত্রদেরকে এবং তোমাদের পুত্রদেরকে আর আমাদের নারীদেরকে এবং তোমাদের নারীদেরকে এবং আমাদের নিজেদেরকে এবং তোমাদের নিজেদেরকে আহবান করি, অতঃপর আমরা মুবাহালা করি আর মিথ্যুকদের প্রতি আল্লাহর অভিসম্পাত বর্ষণ করি।’ [আল ‘ইমরান (৩) : ৫৯-৬১]
সকাল হলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ আয়াত সমূহের আলোকে ঈসা (আঃ) সম্পর্কে তাঁদের প্রশ্নের জবাব দেন এবং এর পর সারা দিন যাবত এ ব্যাপারে তাদের চিন্তা ভাবনা করার অবকাশ দেন। কিন্তু তাঁরা ঈসা (আঃ) সম্পর্কিত নাবী কারীম (ﷺ)-এর কথাবার্তা মেনে নিতে অস্বীকার করলেন। অতঃপর পরবর্তী দিবস সকালের কথা যেহেতু দলের সদস্য ঈসা (আঃ) সম্পর্কিত নাবী কারীম (ﷺ)-এর কথাবার্তা মেনে নিতে এবং ইসলামের দাওয়াত গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন সেহেতু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁদেরকে মুবাহালার জন্য দাওয়াত দিলেন। হাসান ও হোসাইন (রাঃ) একই চাদর পরিবেষ্টিত অবস্থায় আগমন করলেন। পিছনে পিছনে যাচ্ছিলেন ফাত্বিমাহ (রাঃ)।
প্রতিনিধি দল যখন লক্ষ্য করলেন যে, প্রকৃতই নাবী (ﷺ) সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছেন তখন নির্জনে গিয়ে তাঁরা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করলেন। আকেব এবং সাইয়্যিদ একজন অপরজনকে বললেন, ‘দেখ মুবাহালা করো না। আল্লাহর কসম! তিনি যদি সত্যিই নাবী হন এবং আমরা তাঁর সঙ্গে মুলা‘আনত করি তাহলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কখনই কৃতকার্য হবে না। পৃথিবীর উপরিভাগে আমাদের একটি লোম এবং নখও ধ্বংস হতে রক্ষা পাবে না। অবশেষে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে এ ব্যাপারে বিচারক নির্ধারণ করা হোক ।
কাজেই তাঁরা নাবী কারীম (ﷺ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করলেন যে, ‘আপনি যে দাবী করবেন আমরা তার মানার জন্য প্রস্তুত থাকব।’ এ প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁদের নিকট থেকে কর গ্রহণের স্বীকৃতি প্রদান করেন এবং তাঁদের দুই হাজার জোড়া কাপড় প্রদানের স্বীকৃতি সাপেক্ষে সন্ধিচুক্তি সম্পাদিত হয়। তাঁরা এ কাপড় প্রদান করবেন এক হাজার জোড়া রজব মাসে, এক হাজার জোড়া সফর মাসে। অধিকন্তু, এটাও স্বীকৃত হল যে, প্রতি জোড়া কাপড়ের সঙ্গে এক উকিয়া রৌপ্য (একশ বায়ান্ন গ্রাম) প্রদান করবে। এর বিনিময়ে নাবী কারীম (ﷺ) আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলে কারীম (ﷺ)-এর জামানত প্রদান করলেন এবং দ্বীনের ব্যাপারে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করলেন। পক্ষান্তরে তাঁরা এ আরজি পেশ করলেন যে, তাঁদের নিকট হতে কর আদায়ের জন্য নাবী কারীম (ﷺ) যেন একজন আমানতদার প্রেরণ করেন। চুক্তি মোতাবেক এ কাজের জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উম্মতের আমানতদার আবূ উবাইদাহ বিন জাররাহকে প্রেরণ করেন।
এরপর তাদের মধ্যে ইসলাম বিস্তৃতি লাভ করে। চরিত বিশারদগণের বর্ণনানুযায়ী সৈয়দ এবং আকেব নাজরানে প্রত্যাবর্তনের পর ইসলাম গ্রহণ করেন। অতঃপর নাবী কারীম (ﷺ) তাঁদের সাদকা ও কর আদায়ের জন্য আলী (রাঃ)-কে প্রেরণ করেন। এটি একটি বিদিত বিষয় যে, মুসলিমগণের নিকট থেকেই সাদকা গৃহীত হয়ে থাকে।[1]