আর-রাহীকুল মাখতূম আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী (রহঃ) ৪৩৪ টি
আর-রাহীকুল মাখতূম আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী (রহঃ) ৪৩৪ টি
যুদ্ধ প্রস্তুতির জন্য মুসলিমগণের দৌড় ঝাঁপ (الْمُسْلِمُوْنَ يِتَسَابَقُوْنَ إِلَى التَّجَهُّزِ لِلْغَزْوِ):

সাহাবীগণ (রাঃ) যখনই অবগত হলেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) রুমীগণের বিরুদ্ধে উত্তম যুদ্ধ প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য নির্দেশ প্রদান করেছেন, তখনই তাঁরা পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য তৎপর হয়ে ওঠেন। বিভিন্ন গোত্র এবং মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজনেরা মদীনায় সমবেত হতে আরম্ভ করে দিলেন। যাদের অন্তরে কপটতা ছিল তারা ব্যতীত কোন মুসলিমই এ যুদ্ধের ব্যাপারে নির্লিপ্ত থাকার কথাটা ঘুণাক্ষরেও মনে ঠাঁই দেন নি। তবে তিন জন মুসলিম এ নির্দেশের বাইরে ছিলেন। নিষ্ঠাবান ঈমানদার হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেননি।

পক্ষান্তরে অবস্থা এই ছিল যে, গরীব ও অসহায় ব্যক্তিবর্গ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করতেন যে, তাঁদের জন্য সওয়ারীর ব্যবস্থা করা হলে তাঁরাও যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে পারেন। নাবী কারীম (ﷺ) যখন তাঁদের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতেন যে,

‏(‏لاَ أَجِدُ مَا أَحْمِلُكُمْ عَلَيْهِ تَوَلَّواْ وَّأَعْيُنُهُمْ تَفِيْضُ مِنَ الدَّمْعِ حَزَنًا أَلاَّ يَجِدُوْا مَا يُنفِقُوْنَ‏)‏ ‏[‏التوبة‏:‏92‏]

‘তাদের বিরুদ্ধেও কোন অভিযোগ নেই যারা তোমার কাছে যখন বাহন চাওয়ার জন্য এসেছিল তখন তুমি বলেছিলে, ‘আমি তো তোমাদের জন্য কোন বাহন পাচ্ছি না’। তখন তারা ফিরে গেল, আর সে সময় তাদের চোখ থেকে অশ্রু ঝরে পড়ছিল- এ দুঃখে যে, ব্যয় বহন করার মত কোন কিছু তাদের ছিল না।’ [আত্-তাওবাহ (৯) : ৯২]

যুদ্ধ প্রস্তুতির প্রয়োজনের প্রেক্ষাপটে মুসলিমগণের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। পরস্পর পরস্পরের তুলনায় সাদকা এবং দান-খয়রাত করতে পারে কে কত বেশী আল্লাহর রাহে। সেই সময় উসমান বিন আফফান শাম রাজ্যের উদ্দেশ্যে এমন একটি বাণিজ্য কাফেলা প্রস্তুত করছিলেন যার মধ্যে ছিল পালান ও গদিসহ দু’শ উট এবং দু’শ উকিয়া রৌপ্য (যার ওজন ছিল প্রায় ঊনত্রিশ কেজি)। এর সব কিছুই তিনি সাদকা করে দেন যুদ্ধের জন্য। এর পর তিনি হাওদাসহ আরও একশ উট দান করেন। এর পরও পুনরায় তিনি এক হাজার (আনুমানিক সাড়ে পাঁচ কেজি ওজনের) স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে এসে নাবী কারীম (ﷺ)-এর কোলের উপর ঢেলে দেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) স্বর্ণমুদ্রাগুলো উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখতে দেখতে বললেন, ‘আজকের পর উসমান যা কিছু করবে তাতে তার কোনই ক্ষতি হবে না। এর পরও উসমান আবার দান করেন এবং আরও সাদকা করেন। এমন কি তাঁর দানকৃত জিনিসের পরিমাণ নগদ অর্থ বাদে নয়শ উট এবং একশ ঘোড়া পর্যন্ত পৌছেছিল।[1]

অন্যদিকে আব্দুর রহমান বিন আওফ (রাঃ) দু’শ উকিয়া রৌপ্য (যার ওজন ছিল প্রায় সাড়ে ঊনত্রিশ কেজি) নিয়ে এলেন এবং আবূ বাকর (রাঃ) তাঁর সমস্ত সম্পদ নাবী কারীম (ﷺ)-এর খিদমতে এনে সমর্পণ করলেন। আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ছাড়া তাঁর পরিবারবর্গের জন্য আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। তাঁর দানের পরিমাণ ছিল চার হাজার দিরহাম এবং নাবী কারীম (ﷺ) সমীপে দান সামগ্রী আনার জন্য তিনিই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি। উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) দান করেন তাঁর অর্ধেক সম্পদ। আব্বাস (রাঃ) অনেক সম্পদ নিয়ে আসেন। ত্বালহাহ (রাঃ), সা‘দ বিন অবী ওয়াক্কাস (রাঃ) এবং মুহাম্মাদ বিন মাসলামাহ যথেষ্ট অর্থ নিয়ে আসেন। ‘আসিম বিন আদী নব্বই অসাক (অর্থাৎ সাড়ে তের হাজার কেজি) খেজুর নিয়ে হাজির হন। অন্যান্য সাহাবীগণও কম বেশী দান খয়রাতের বিভিন্ন দ্রব্য নিয়ে আসেন। এমনকি কেউ কেউ এক মুঠ দু’ মুঠ যার নিকট যা ছিল তাই দান করেন। কারণ, এর বেশী দান করার ক্ষমতা তাঁদের ছিল না। মহিলাগণ গলার মালা, হাতের চুড়ি, পায়ের অলংকার, কানের রিং, আংটি ইত্যাদি যার যা ছিল তা নাবী কারীম (ﷺ)-এর খিদমতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে কেউ কৃপণতা করেননি এবং এমন কোন হাত ছিল না যে হাত কিছুই দান করে নি। শুধু মুনাফিক্বগণ দান খয়রাতে অংশ গ্রহণ করে নি। শুধু তাই নয়, যে সকল মুসলিম দান খয়রাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন, কথাবার্তায় তাঁদের খোঁচা দিতে তারা ছাড়েনি। যাঁদের শ্রম ছাড়া অন্য কিছুই দেবার মতো ছিল না, তাঁদের ঠাট্টা বিদ্রূপ করে বলল, ‘একটা দু’টা খেজুর দিয়েই এরা রোমক সাম্রাজ্য জয়ের স্বপ্ন দেখছে। (৯ : ৭৯)।

‏(‏الَّذِيْنَ يَلْمِزُوْنَ الْمُطَّوِّعِيْنَ مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ فِيْ الصَّدَقَاتِ وَالَّذِيْنَ لاَ يَجِدُوْنَ إِلاَّ جُهْدَهُمْ فَيَسْخَرُوْنَ مِنْهُمْ‏)‏‏[‏التوبة‏:‏ 79‏]

‘মু’মিনদের মধ্যে যারা মুক্ত হস্তে দান করে, তাদেরকে যারা দোষারোপ করে আর সীমাহীন কষ্টে দানকারীদেরকে যারা বিদ্রূপ করে, আল্লাহ তাদেরকে বিদ্রূপ করেন আর তাদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি।’ আত্-তাওবাহ (৯) : ৭৯]

[1] জামে তিরমীযি, উসমান বিন আফফান (রাঃ)-এর কৃতিত্ব অধ্যায়।
তাবুকের পথে ইসলামী সৈন্য (الْجَيْشُ الْإِسْلَامِيْ إِلٰى تَبُوْكَ):

উল্লেখিত তৎপরতা, উৎসাহ-উদ্দীপনা দৌড় ঝাঁপের মধ্য দিয়ে মুসলিম বাহিনীর প্রস্তুতি সম্পন্ন হল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মুহাম্মাদ বিন মাসলামাকে (মতান্তরে সেবা বিন আরফাতকে) মদীনার গভর্ণর নিযু্ক্ত করেন এবং নিজ পরিবারের লোকজনদের দেখাশোনা করার জন্য আলী ইবনু আবি ত্বালিবকে নির্দেশ প্রদান করেন। কিন্তু মুনাফিক্বগণ তাঁর প্রতি কটাক্ষ করে কিছু কথাবার্তা বলায় মদীনা হতে বাহির হয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট চলে যান। কিন্তু নাবী কারীম (ﷺ) পুনরায় তাঁকে মদীনায় ফিরে যাওয়ার জন্য নির্দেশ প্রদান করলেন এবং বললেন :

‏(‏ألَا تَرْضٰى أَنْ تَكُوْنَ مِنِّيْ بِمَنْزِلَةِ هَارُوْنَ مِنْ مُوْسٰي، إِلَّا أَنَّهُ لَا نَبِيَ بَعْدِيْ‏)‏‏.‏

‘তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, আমার সঙ্গে তোমার সে রূপই সম্পর্ক রয়েছে যেমনটি ছিল হারুন (আঃ)-এর সঙ্গে মুসা (আঃ)-এর তবে এটা জেনে রাখ যে আমার পরে কোন নাবী আসবে না।’

যাহোক, এ ব্যবস্থাদির পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উত্তর দিকে রওয়ানা হয়ে গেলেন। (নাসায়ীর বর্ণনা মোতাবেক দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার)। গন্তব্যস্থল ছিল তাবুক ও সৈন্য সংখ্যা ছিল ত্রিশ হাজার। এর পূর্বে মুসলিমগণ আর কখনই এত বড় সেনাবাহিনীর সমাবেশ ঘটাতে সক্ষম হন নি। বিশাল এক বাহিনী এবং সাধ্যমতো অর্থসম্পদ ব্যয় করা সত্ত্বেও সৈন্যদের পুরোপুরি প্রস্তুত করে নেয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয় নি। খাদ্য সম্ভার এবং যান বাহনের যথেষ্ট অভাব ছিল। আঠার জনের প্রতিটি দলের জন্য ছিল মাত্র একটি করে উট যার উপর তাঁরা আরোহণ করতেন পালাক্রমে। অনুরূপভাবে খাওয়ার জন্য প্রায়ই গাছের পাতা ব্যবহার করতে হতো যার ফলে ওষ্ঠাধরে স্ফীতি সৃষ্টি হয়েছিল। অধিকন্তু, উটের অভাব থাকা সত্ত্বেও উট যবেহ করতে হতো যাতে পাকস্থলী এবং নাড়িভূড়ির মধ্যে সঞ্চিত পানি এবং তরল পদার্থ পান করা যেতে পারে। এ কারণে এ বাহিনীর নাম রাখা হয়েছিল ‘জায়শে উসরাত’ (অভাব অনটনের বাহিনী)।

তাবুকের পথে মুসলিম বাহিনীর গমনাগমন চলল হিজর অর্থাৎ সামুদ সম্প্রদায়ের অঞ্চলের মধ্য দিয়ে। সামুদ ছিল সেই সম্প্রদায় যারা ওয়াদিউল কোরা নামক উপত্যকায় পাথর কেটে কেটে ঘরবাড়ি তৈরি করেছিল। সাহাবীগণ (রাঃ) সেখানকার কূপসমূহ হতে পানি সংগ্রহ করার পর যখন যাত্রা করলেন তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন,

‏(‏لَا تَشْرَبُوْا مِنْ مَائِهَا وَلَا تَتَوَضَّأُوْا مِنْهُ لِلصَّلَاةِ، وَمَا كَانَ مِنْ عَجِيْنٍ عَجَنْتُمُوْهُ فَاعْلِفُوْهُ الْإِبِلَ، وَلَا تَأْكُلُوْا مِنْهُ شَيْئاً‏)‏

‘তোমরা এখানকার পানি পান করনা, এ পানি দ্বারা অযু করোনা এবং এ পানির দ্বারা আটার যে তাল তৈরি করেছ তা পশুদের খাইয়ে দাও, নিজে খেও না।’

তিনি এ নির্দেশও প্রদান করেন যে, ‘সালেহ (আঃ)-এর উট যে কূপ থেকে পানি পান করেছিল তোমরা সে কূপ থেকে পানি সংগ্রহ করবে।’

বুখারী ও মুসলিম শরীফের হাদীসে ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নাবী কারীম (ﷺ) যখন হিজর (সামুদ সম্প্রদায়ের অঞ্চল) দিয়ে গমন করছিলেন তখন বলেন,

‏(‏لَا تَدْخُلُوْا مَسَاكِنِ الَّذِيْنَ ظَلَمُوْا أَنْفُسَهُمْ أَنْ يُّصِيْبَكُمْ مَا أَصَابَهُمْ إِلَّا أَنْ تَكُوْنُوْا بَاكِيْنَ‏)

‘সেই অত্যাচারী সামুদের আবাসভূমিতে প্রবেশ করো না যাতে তোমাদের উপর যেন সে মুসিবত নাযিল হয়ে না যায়, যা তাদের উপর নাযিল হয়েছিল। হ্যাঁ, তবে কাঁদতে কাঁদতে অতিক্রম করতে হবে। অতঃপর তিনি তাঁর মস্তক আবৃত করে নিয়ে দ্রুত গতিতে সেই উপত্যকা অতিক্রম করে গেলেন।[1]

পথের মধ্যে সৈন্যদের পানির তীব্র প্রয়োজন দেখা দিল। এমন কি লোকজনেরা পিপাসার কষ্ট সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট অভিযোগ পেশ করল। তিনি পানির জন্য দু‘আ করলে আল্লাহ তা‘আলা মেঘ সৃষ্টি করলেন এবং বৃষ্টিও হয়ে গেল। লোকেরা পূর্ণ পরিতৃপ্তির সঙ্গে পানি পান করলেন এবং প্রয়োজন মতো তা সংগ্রহ করে নিলেন।

অতঃপর যখন তাবুকের নিকট গিয়ে পৌঁছেন তখন নাবী কারীম (ﷺ) বললেন,

‏(‏إِنَّكُمْ سَتَأْتُوْنَ غَداً إِنْ شَاءَ اللهُ تَعَالٰى عَيْنَ تَبُوْكَ، وَإِنَّكُمْ لَنْ تَأْتُوْهَا حَتّٰى يَضْحَي النَّهَارَ، فَمَنْ جَاءَهَا فَلَا يَمُسُّ مِنْ مَائِهَا شَيْئاً حَتّٰى آتِيْ‏)‏

‘ইনশাআল্লাহ, আগামী কাল আমরা তাবুকের ঝর্ণার নিকট গিয়ে পৌঁছব। কিন্তু সূর্যোদয় ও দুপুরের মধ্যবর্তী সময়ের পূর্বে পৌঁছানো যাবে না। কিন্তু আমার পৌঁছানোর পূর্বে কেউ যদি সেখানে পৌঁছে তাহলে আমি যতক্ষণ সেখানে গিয়ে না পৌঁছি ততক্ষণ যেন তাঁরা সেখানকার পানিতে হাত না লাগায়।

মু‘আয (রাঃ) বলেছেন, ‘আমরা যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছলাম, দেখলাম তার পূর্বেই দু’জন সেখানে গিয়ে পৌঁছেছেন। ঝর্ণা দিয়ে অল্প অল্প পানি আসছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জিজ্ঞেস করলেন, ‏(‏هَلْ مَسَسْتُمَا مِنْ مَائِهَا شَيْئاً‏؟‏‏)‏ ‘তোমরা কি এর পানিতে কেউ হাত লাগিয়েছ? তাঁরা উত্তর দিলেন, হ্যাঁ। নাবী কারীম (ﷺ) সে দু’ ব্যক্তিকে আল্লাহ যা ইচ্ছা করলেন তাই বললেন।

অতঃপর অঞ্জলির সাহায্যে ঝর্ণা থেকে অল্প অল্প পানি বের করলেন এবং এভাবে কিছুটা পানি সংগৃহীত হল। এ পানির দ্বারা তিনি মুখমণ্ডল ও হাত ধৌত করলেন এবং ঝর্ণার মধ্যে হাত ডুবালেন। এর পর ঝর্ণায় ভাল পানির প্রবাহ সৃষ্টি হল। সাহাবা কেরাম (রাঃ) পূর্ণ পরিতৃপ্তির সঙ্গে পানি পান করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন,

‏(‏يُوْشِكُ يَا مُعَاذُ، إِنْ طَالَتْ بَكَ حَيَاةٌ أَنْ تَرٰي مَاهَاهُنَا قَدْ مُلِّئَ جَنَاناً‏)

‘হে মু’আয! যদি তোমার জীবন দীর্ঘ হয় তাহলে এ স্থান তুমি বাগানে পরিপূর্ণ ও শ্যামল দেখবে।[2]

পথের মধ্যে কিংবা তাঁবুকে পৌঁছার পর বর্ণনায় কিছুটা পার্থক্য রয়েছে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন,

‏(‏تَهِبُ عَلَيْكُمْ اللَّيْلَةَ رِيْحٌ شَدِيْدَةٌ، فَلَا يَقُمْ أَحَدٌ مِنْكُمْ، فَمَنْ كَانْ لَهُ بِعَيْرٍ فَلْيِشُدُّ عِقَالَهُ‏)

‘আজ রাতে তোমাদের উপর দিয়ে প্রবল ঘূর্ণি ধূলি ঝড় বয়ে যেতে পারে। কাজেই, কেউই উঠবে না। অধিকন্তু, যার নিকট উট আছে সে তাকে মজবুত রশি দ্বারা শক্তভাবে বেঁধে রাখবে।’ হলও ঠিক তাই, চলতে থাকল প্রবল থেকে প্রবলতর ধূলো বালি যুক্ত ঘূর্ণি বায়ু। এ সময় এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে ছিল। ঘূর্ণি ঝড় তাকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে তাই গোত্রের দু’ পর্বতের নিকট নিক্ষেপ করল।[3]

পথ চলা কালে নাবী কারীম (ﷺ)-এর এটা ব্যবস্থা ছিল যে, তিনি যুহর ও আসর এবং মাগরিব ও এশার সালাত একত্রে আদায় করতেন। তাছাড়া, তিনি জমা তাকদীমও করতেন এবং জমা তাখীরও করতেন (জমা তাকদীমের অর্থ হচ্ছে যুহর ও আসর এ দু’ সালাতকে যুহরের সময় এবং মাগরিব ও এশা এ দু’ সালাতকে মাগরিবের সময় আদায় করা এবং জমা তাখিরের অর্থ হচ্ছে যুহর ও আসর এ দু’ সালাত আসরের সময় এবং মাগরিব ও এশা এ দু’ সালাতকে এশার সময়ে আদায় করা)।

[1] সহীহুল বুখারী রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর হিজরে অবতরণ অধ্যায় ২য় খন্ড ৬৩৭ পৃঃ।

[2] মুসলিম শরীফ মু’আয বিন জাবাল হতে বর্ণিত ২য় খন্ড পৃ: ২৪৬

[3] প্রাগুক্ত ।
ইসলামী সৈন্য তাবুকে (الْجَيْشُ الْإِسْلَامِيْ بِتَبُوْكَ):

ইসলামী সৈন্য তাবুকে অবতরণ করে শিবির স্থাপন করলেন। রোমকগণের সঙ্গে দুই দুই হাত করার জন্য তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সৈন্যদের উদ্দেশ্য করে জাওয়ামেউল কালাম দ্বারা (এক সারগর্ভ) ভাষণ প্রদান করেন। এ ভাষণে তিনি তাৎপর্যপূর্ণ নির্দেশাবলী প্রদান করেন, দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের প্রতি উৎসাহিত করেন, আল্লাহর শাস্তির ভয় প্রদর্শন এবং তাঁর রহমতের শুভ সংবাদ প্রদান করেন। নাবী কারীম (ﷺ)-এর এ ভাষণ সৈন্যদের মনোবল বৃদ্ধি করে। তাঁদের খাদ্য সম্ভার ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ঘাটতি জনিত যে অসুবিধা ছিল এ ভাবে মনস্তাত্মিক স্বস্তিবোধ সৃষ্টির মাধ্যমে বহুলাংশে তা পূরণ করা সম্ভব হল।

অন্য দিকে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও মুসলিম বাহিনীর আগমনের সংবাদ অবগত হয়ে রুমী এবং তাদের মিত্র গোত্রসমূহের মধ্যে এমন ভয় ভীতির সঞ্চার করে যে, সামনে অগ্রসর হয়ে তাঁদের মোকাবেলা করার সাহস তারা হারিয়ে ফেলল এবং বিক্ষিপ্ত হয়ে দেশের অভ্যন্তরভাগে বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ল। রুমীদের এ ভয় ভীতিজনক নিষ্ক্রিয়তা আরব উপদ্বীপের ভিতরে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করল এবং মুসলিম বাহিনীর জন্য তা এমন সব রাজনৈতিক সুযোগ সুবিধা লাভের ক্ষেত্র তৈরি করে দিল যুদ্ধের মাধ্যমে যা অর্জন করা মোটেই সহজ সাধ্য ছিল না। এ সবের বিস্তারিত বিবরণ হচ্ছে যথাক্রমে নিম্নরূপ :

আয়লার প্রশাসক ইয়াহনাহ্ বিন রুবা নাবী কারীম (ﷺ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে কর দানের স্বীকৃতি জ্ঞাপন করে সন্ধি চুক্তি সম্পাদন করল। জারবা এবং আজরুহর অধিবাসীগণও খিদমতে নাবাবীতে হাজির হয়ে কর দানের প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদের লিখিত প্রমাণ প্রত্র প্রদান করেন যা তাদের নিকট সংরক্ষিত ছিল। তিনি আয়লার প্রশাসকের নিকটও লিখিত একটি প্রমাণ পত্র প্রেরণ করেন যার বিষয়বস্তু হচ্ছে নিম্নরূপ:

‏(‏بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ، هٰذِهِ أَمَنَةٌ مِّنْ اللهِ وَمُحَمَّدِ النَّبِيِّ رَسُوْلِ اللهِ لِيَحْنَةَ بْنِ رُؤْبَةَ وَأَهْلِ أَيْلَةِ، سفنِهِمْ وَسِيَارَاتِهِمْ فيِ الْبَرِّ وَالْبَحْرِ لَهُمْ ذِمَّةُ اللهِ وَذِمَّةُ مُحَمَّدِ النَّبِيِّ، وَمَنْ كَانَ مَعَهُ مِنْ أَهْلِ الشَّامِ وَأَهْلِ الْبَحْرِ، فَمَنْ أَحْدَثَ مِنْهُمْ حَدَثاً، فَإِنَّهُ لَا يَحُوْلُ مَالهُ دُوْنَ نَفْسِهِ، وَإِنَّهُ طِيْبٌ لِمَنْ أَخَذَهُ مِنْ النَّاسِ، وَأَنَّهُ لَا يَحِلُّ أَنْ يَّمْنَعُوْا مَاءً يُرَدُّوْنَهُ، وَلَا طَرِيْقاً يُرِيْدُوْنَهُ مِنْ بَرٍّ أَوْ بَحْرٍ‏)

‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম : এ হচ্ছে শান্তির আদেশ পত্র আল্লাহর এবং নাবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর পক্ষ হতে ইয়াহনাহ বিন রুবা এবং আয়লার অধিবাসীদের জন্য স্থল এবং সমুদ্র পথে তাদের নৌকা এবং ব্যবসায়ী দলের জিম্মা আল্লাহর এবং নাবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর রইল। তাছাড়া, এ দায়িত্ব সিরিয়া এবং ঐ সকল সমুদ্র তীরবর্তী অধিবাসীদের জন্য রইল যারা ইয়াহনার সঙ্গে থাকে। হ্যাঁ, যদি তাদের কোন ব্যক্তি কোন প্রকার বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে তবে তার অর্থ তার জীবন রক্ষা করবে না এবং যে ব্যক্তি তার অর্থ নিয়ে নেবে তার জন্য তা বৈধ হবে। তাদেরকে কোন ঝর্ণার নিকট অবতরণ করতে এবং স্থল কিংবা জলভাগের কোন পথ অতিক্রম করতে বাধা দেয়া যাবে না।

এছাড়া রাসূলুল্লাহ (ﷺ) চারশ’ বিশ জন সৈন্যের সমন্বয়ে গঠিত এক বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ)-কে দুমাতুল জান্দালের শাসক উকায়দেরের নিকট প্রেরণ করেন। যাত্রাকালে তিনি তাঁকে বলেন, ‏(‏إِنَّكَ سَتَجِدُهُ يَصِيْدُ الْبَقَرَ) ‘তোমরা তাকে নীল গাভী শিকার করার সময় দেখতে পাবে।’

রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর নির্দেশ মোতাবেক খালিদ (রাঃ) তথায় গমন করলেন। মুসলিম বাহিনী যখন এতটুকু দূরত্বে অবস্থান করছিলেন যে দূর্গটি পরিস্কার চোখে পড়ছিল তখন হঠাৎ একটি নীল গাভী বেরিয়ে এসে দূর্গের দরজার উপর শিং দ্বারা গুঁতো দিতে থাকল। উকায়দের তাকে শিকার করার জন্য বাহির হলে খালিদ (রাঃ) এবং তাঁর ঘোড়সওয়ার দল তাকে বন্দী করে ফেললেন এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খিদমতে প্রেরণ করলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে ক্ষমা করলেন এবং দুই হাজার উট, আটশ’ দাস, যুদ্ধের চারশ’ লৌহ বর্ম এবং চারশ’ বর্শা দেয়ার শর্ত সাপেক্ষে একটি সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করেন। এ সন্ধি চুক্তিতে কর প্রদানের শর্তও সংযোজিত হল। সুতরাং তিনি তার সাথে ইয়াহনাহ্সহ দুমাহ, তাবুক, আয়লাহ এবং তাইমার শর্তানুযায়ী চুক্তিতে আবদ্ধ হলেন।

যে সকল গোত্র তখনো রোমকগণের পক্ষে কাজ করছিল, পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে যখন তারা অনুধাবন করল যে, পুরাতন ব্যবস্থাধীনে থাকার দিন শেষ হয়েছে তখন তারা নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে মুসলিমগণের সঙ্গে মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গেল। এভাবে ইসলামী সাম্রাজ্যের সীমা বিস্তৃতি লাভ করে রোমক সাম্রাজ্যের প্রান্ত সীমা পর্যন্ত পৌঁছে গেল। ফলে যে সকল গোত্র রোমকদের শক্তি জোগাত তারা একদম নিঃশেষ হয়ে গেল।

মদীনায় প্রত্যাবর্তন (الرُّجُوْعُ إِلْى الْمَدِيْنَةِ):

সংঘর্ষ এবং রক্তক্ষয় ছাড়াই মুসলিম বাহিনী বিজয়ী বেশে মদীনা প্রত্যাবর্তন করলেন। যুদ্ধের ব্যাপারে মু’মিনদের আল্লাহই যথেষ্ট হলেন। তবে পথের মধ্যে এক জায়গায় একটি গিরিপথের নিকট ১২ জন মুনাফেক নাবী কারীম (ﷺ)-কে হত্যার এক ঘৃণ্য প্রচেষ্টা চালায়। সে সময় নাবী সে গিরিপথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন শুধু আম্মার (রাঃ) যিনি উটের লাগাম ধরে ছিলেন এবং হুযায়ফা (রাঃ) ইয়ামান যিনি উটকে খেদিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। অন্যান্য সাহাবীগণ (রাঃ) দূরবর্তী উপত্যকার নিম্নভূমির মধ্য দিয়ে পথ চলছিলেন। এ কারণে মুনাফিক্বগণ তাদের এ ঘৃণ্য চক্রান্তের জন্য এটিকে একটি মোক্ষম সুযোগ মনে করে নাবী কারীম (ﷺ)-এর দিকে অগ্রসর হতে থাকল।

এদিকে সঙ্গীদ্বয়সহ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যথারীতি সম্মুখ পানে অগ্রসর হচ্ছিলেন এমন সময় পশ্চাত দিকে থেকে অগ্রসরমান মুনাফিক্বদের পায়ের শব্দ তিনি শুনতে পান। এরা সকলেই মুখোশ পরিহিত ছিল। তাদের আক্রমণের উপক্রমমুখে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হুযায়ফাকে তাদের দিকে প্রেরণ করলেন। তিনি তাঁর ঢালের সাহায্যে মুনাফিক্বদের বাহনগুলোর মুখের উপর প্রবল ভাবে আঘাত করতে থাকলেন। এর ফলে আল্লাহর ইচ্ছায় তারা ভীত সন্ত্রস্ত্র অবস্থায় পলায়ন করতে করতে গিয়ে লোকদের সঙ্গে মিলিত হয়ে গেল। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদের নাম বলে দেন এবং তাদের অসদুদ্দেশ্য সম্পর্কে সকলকে অবহিত করেন। এ জন্য হুযায়ফা (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ‘রাযদান’ রহস্যবিদ বলা হয়। এ ঘটনা উপলক্ষে আল্লাহর এ ইরশাদ অবতীর্ণ হয়

‏(‏وَهَمُّوْا بِمَا لَمْ يَنَالُوْا‏)‏ ‏[‏التوبة‏:‏74‏]‏‏

‘তারা ঐ কাজ করার ইচ্ছা পোষণ করেছিল যা তারা পায় নি।’ [আত্-তাওবাহ (৯) : ৭৪]

সফর শেষে নাবী কারীম (ﷺ) যখন দূর হতে মদীনার দৃশ্য দেখতে পেলেন তখন তিনি বললেন, (তাবা) এবং (উহুদ), এগুলো হচ্ছে সেই পর্বত যা আমাদেরকে ভালবাসে এবং আমরাও যাকে ভালবাসি। এদিকে যখন মদীনায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আগমন সংবাদ পৌঁছে গেল তখন মহিলা ও কিশোরেরা ঘর থেকে বের হয়ে এসে তাঁকে এবং তাঁর সাহাবীগণকে (রাঃ) খোশ আমদেদ জানিয়ে এ সঙ্গীতে গুঞ্জণধ্বনি উচ্চারণ করল।[1]

طلع البـدر علينا ** من ثنيات الوداع

وجب الشكر علينا ** ما دعا لله داع

অর্থ : সান্নায়াতুল ওয়াদা’ নামকস্থান হতে আমাদের উপর চৌদ্দ তারিখের চন্দ্র উদিত হল। আহবানকারীগণ যতক্ষণ আল্লাহকে আহবান করতে থাকবে ততক্ষণ আমাদের কর্তব্য হবে শোকর করা।’

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) রজব মাসে তাবুকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন এবং প্রত্যার্তন করেছিলেন রমযান মাসে। এ সফরে পূর্ণ পঞ্চাশ দিন অতিবাহিত হয়েছিল। বিশ দিন তাবুকে এবং ত্রিশ দিন পথে যাতায়াতে। তাবুকে অভিযান ছিল তাঁর জীবনের শেষ যুদ্ধাভিযান যাতে স্বশরীরে তিনি অংশ গ্রহণ করেছিলেন।

[1] এ হচ্ছে ইবনুল কাইয়্যেমের বিবরণ। ইতোপূর্বে এ সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে।
যারা যুদ্ধ হতে পিছনে রয়ে গিয়েছিলেন (المُخَلَّفُوْنَ):

তাবুক যুদ্ধ ছিল আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে এমন এক কঠিন পরীক্ষা যা দ্বারা ঈমানদার ও অন্যান্যদের মধ্যে প্রভেদের একটি সুস্পষ্ট সীমারেখা তৈরি হয়েছিল। এ ধরণের অবসরে আল্লাহর বিধি-বিধানও এরূপ :

‏(‏مَّا كَانَ اللهُ لِيَذَرَ الْمُؤْمِنِيْنَ عَلٰى مَآ أَنتُمْ عَلَيْهِ حَتّٰى يَمِيْزَ الْخَبِيْثَ مِنَ الطَّيِّبِ‏)‏‏[‏ آل عمران‏:‏179‏]‏‏.

‘আল্লাহ মু’মিনদেরকে সে অবস্থায় পরিত্যাগ করতে পারেন না। যার উপর তোমরা আছ, ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না অপবিত্রকে পবিত্র থেকে পৃথক করে দেন।’ (আলু ‘ইমরান (৩): ১৭৯]

কাজেই, এ যুদ্ধে মু’মিন ও সত্যবাদিগণ শরীক হন। যুদ্ধ হতে অনুপস্থিতি কপটতার লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত হয়। সুতরাং তখন ঠিক এ রকম এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল যে, যদি কেউ পিছনে পড়ে থাকত কিংবা পিছুটান হয়ে থাকত তার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সামনে আলোচনা করা হলে তিনি বলতেন,

(‏دَعَوْهُ، فَإِنْ يَكُنْ فِيْهِ خَيْرٌ فَسَيَلْحَقُهُ اللهُ بِكُمْ، وَإِنْ يَكُنْ غَيْرَ ذٰلِكَ فَقَدْ أَرَاحَكُمْ مِنْهُ‏)

‘তাকে ছেড়ে যাও। যদি তার মধ্যে মঙ্গল নিহিত থাকে তাহলে আল্লাহ শীঘ্রই তাকে তোমাদের নিকট পৌঁছে দিবেন। আর যদি তা না হয় তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে তার অনুপস্থিতির মাধ্যমে শান্তি প্রদান করবেন।’ প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে এ যুদ্ধ হতে সেই সকল লোক অনুপস্থিত ছিল, যারা ছিল অপারগ, অথবা ছিল মুনাফিক্ব। মুনাফিক্বগণ আল্লাহ এবং তদীয় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উপর ঈমানের মিথ্যা দাবী করত এবং এ দাবীর ভিত্তিতেই তারা যুদ্ধে শরীক হয়েছিল, কিন্তু যুদ্ধের ব্যাপারে তারা ছিল সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়। মিথ্যা অযুহাতে তারা যুদ্ধরত সৈন্যদের পিছনে বসে থাকত। হ্যাঁ, তিন ব্যক্তি এমন ছিল যারা প্রকৃতই মু’মিন ছিল এবং কোন কারণ ছাড়াই যুদ্ধে শরিক হওয়া থেকে বিরত ছিল। আল্লাহ তাদেরকে পরীক্ষার মধ্যে নিপতিত করেন এবং পুনরায় তাদের তওবা কবুল করেন।

এর বিবরণ হচ্ছে, তাবুক হতে প্রত্যাবর্তন করে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মদীনায় প্রবেশের পর সর্ব প্রথম মাসজিদে নাবাবীতে অবস্থান গ্রহণ করেন এবং সেখানে দু’ রাকাত সালাত আদায় করেন। অতঃপর লোকজনদের জন্য সেখানে বসে পড়েন। এ সময় আশি জনেরও অধিক মুনাফিক্বের একটি দল সেখানে উপস্থিত হয়ে নানা ওযর আপত্তি আরম্ভ করে দেয়[1] এবং শপথ করতে থাকে। নাবী (ﷺ) বাহ্যিকভাবে তাদের ওযর গ্রহণ করে আজ্ঞানুবর্তী হওয়ার শপথ গ্রহণ করেন এবং ক্ষমা প্রদান করেন। অতঃপর প্রশ্নটি আল্লাহর সমীপে সমর্পণ করে দেন।

অবশিষ্ট তিন জন মু’মিন অর্থাৎ কা‘ব বিন মালিক, মুরারাহ বিন রাবী’ এবং হেলাল বিন উমাইয়া সত্যবাদিতা অবলম্বন ক’রে স্বীকার করে যে, কোন রকম অসুবিধা ছাড়াই তারা যুদ্ধে শরীক হওয়া থেকে বিরত ছিল। এ প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এদের সঙ্গে কথাবার্তা না বলার জন্য সাহাবীগণ (রাঃ)-কে নির্দেশ প্রদান করেন।

সুতরাং তাদের বিরুদ্ধে কঠিন বয়কট বা বর্জন ব্যবস্থা কার্যকর হয়ে গেল। মানুষের মধ্যে পরিবর্তন এসে গেল, পৃথিবী ভয়ানক আকার ধারণ করল এবং প্রশস্ততা থাকা সত্ত্বেও সংকীর্ণ হয়ে গেল। তাদের জীবনের জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে গেল।

এমনি এক বিপদের সৃষ্টি হয়ে গেল যে, ৪০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর তাদেরকে আপন আপন স্ত্রী এবং পরিবার পরিজন থেকে পৃথক থাকার নির্দেশ দেয়া হল। যখন বয়কটের ৫০ দিন পূর্ণ হল তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদের তাওবা কবুল করার সুসংবাদ প্রদান করে আয়াত নাযিল করলেন,

‏(‏وَعَلَى الثَّلاَثَةِ الَّذِيْنَ خُلِّفُوْا حَتّٰى إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْهِمْ أَنفُسُهُمْ وَظَنُّوْا أَن لاَّ مَلْجَأَ مِنَ اللهِ إِلاَّ إِلَيْهِ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوْبُوْا إِنَّ اللهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيْمُ‏)‏ ‏[‏التوبة‏:‏118‏]‏‏.‏

‘আর (তিনি অনুগ্রহ করলেন) ঐ তিনজনের প্রতিও যারা পিছনে থেকে গিয়েছিল [কা‘ব ইবনে মালিক, মুরারা ইবনে রাবী‘আ ও হিলাল ইবনে উমায়্যা (রাযি।) তাঁরা অনুশোচনার আগুনে এমনি দগ্ধীভূত হয়েছিলেন যে] শেষ পর্যন্ত পৃথিবী তার পূর্ণ বিস্তৃতি নিয়েও তাদের প্রতি সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল আর তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠল আর তারা বুঝতে পারল যে, আল্লাহ ছাড়া তাদের কোন আশ্রয়স্থল নেই তাঁর পথে ফিরে যাওয়া ব্যতীত। অতঃপর তিনি তাদের প্রতি অনুগ্রহ করলেন যাতে তারা অনুশোচনায় তাঁর দিকে ফিরে আসে। আল্লাহ অতিশয় তাওবাহ কবূলকারী, বড়ই দয়ালু।’ [আত্-তাওবাহ (৯) : ১১৮]

মীমাংসা সম্পর্কিত এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ায় সাধারণ মুসলিমগণ এবং ঐ তিন জন সাহাবা অত্যন্ত আনন্দিত হন। লোকেরা দৌড় দিয়ে গিয়ে এ শুভ সংবাদ প্রচার করতে থাকে। আনন্দের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে সকলের মুখমণ্ডলে উজ্জ্বলতা প্রকাশ পায় এবং সকলে দান খয়রাত করতে থাকে। প্রকৃতই এ দিনটি ছিল তাদের জন্য চরম ও পরম সৌভাগ্যের দিন।

যারা অপারগতার কারণে যুদ্ধে শরিক হতে পারেন নি অনুরূপভাবে আল্লাহ তা‘আলা তাদের জন্যও বলেন,

‏(‏لَّيْسَ عَلٰى الضُّعَفَاء وَلاَ عَلٰى الْمَرْضٰى وَلاَ عَلٰى الَّذِيْنَ لاَ يَجِدُوْنَ مَا يُنفِقُوْنَ حَرَجٌ إِذَا نَصَحُوْا لِلهِ وَرَسُوْلِهِ‏)‏ ‏[‏التوبة‏:‏ 91‏]‏‏

তাঁদের সম্পর্কে নাবী কারীমও (ﷺ) মদীনায় পৌঁছার পর বলেছেন, (‏إِنَّ بِالْمَدِيْنَةِ رِجَالاً مَا سِرْتُمْ مَسِيْراً، وَلَا قَطَعْتُمْ وَادِياً إِلَّا كَانُوْا مَعَكُمْ، حَبَسَهُمْ الْعُذْرُ‏) ‘মদীনায় এমন কতগুলো লোক আছে তা তোমরা যেখানেই সফর করেছ এবং যে উপত্যাকা অতিক্রম করেছ তারা তোমাদের সঙ্গেই রয়েছে। তাদের অপারগতা তাদেরকে রেখেছিল।’

লোকেরা বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল! তারা মদীনায় অবস্থান করেও আমাদের সঙ্গে ছিল? নাবী কারীম (ﷺ) বললেন, (‏وَهُمْ بِالْمَدِيْنَةِ) ‘হ্যাঁ’ মদীনায় অবস্থান করেও তারা সঙ্গেই ছিল।’

[1] ইমাম ওয়াক্বিদী উল্লেখ করেছেন যে, এ সংখ্যা ছিল মুনাফিক্ব আনসারদের। এদের ছাড়া বনু গেফার এবং অন্যন্যদের মধ্যে বাহানাকারীদের সংখ্যাও ছিল। অতঃপর আব্দুল্লাহ বিন উবাই এবং তার অনুসারীগণ ছিল ওই সংখ্যার বাইরে এবং এদের সংখ্যাও ছিল বেশ বড়। দ্র: ফাতহুল বারী ৮ম খন্ড ১১৯ পৃঃ।

আরব উপদ্বীপের উপর মুসলিমগণের প্রভাব বিস্তার এবং তাঁদের অবস্থানকে শক্তিশালী করার ব্যাপারে এ যুদ্ধ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফলোৎপাদক ঘটনা। এ যুদ্ধের পর থেকে মানুষের নিকট এটা দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, আরব উপদ্বীপের মধ্যে ইসলামী শক্তিই হচ্ছে একমাত্র প্রতিষ্ঠিত শক্তি। অন্য কোন শক্তিরই আর তেমন কোন কার্যকারিতা নেই। এর ফলে অর্বাচীন ও মুনাফিক্বগণের সেই সকল অবাঞ্ছিত কামনা বাসনা যা মুসলিমগণের বিরুদ্ধে যুগের বিবর্তনের গতিধারায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশায় আশান্বিত ছিল তা একদম নিঃশেষ হয়ে গেল। কারণ, তাদের সকল আশা ভরসার কেন্দ্রবিন্দু ছিল যে, রোমক শক্তি তা যখন ইসলামী শক্তির মোকাবেলায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল, তখন তাদের লালিত আকঙ্ক্ষা পূরণের আর কোন পথই রইল না। তখন তাদের কাছে এটাও সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, ইসলামী শক্তির নিটক আত্মসমর্পণ করা ছাড়া নিস্কৃতি লাভের আর কোন পথই অবশিষ্ট রইল না।

কাজেই পরিবর্তিত এ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তখন এ রকম কোন প্রয়োজন ছিল না যে, মুসলিমগণ মুনাফিক্বদের সঙ্গে নম্র ও অযাচিত ভাবে ভদ্র ব্যবহার করবেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে মুসলিমগণ নির্দেশিত হলেন তাদের সঙ্গে শক্ত, সাহসিকতাপূর্ণ ও শঙ্কাহীন আচরণ করতে। এমনকি তাদের সদকা গ্রহণ, তাদের সালাতে জানাযায় অংশ গ্রহণ, তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা এবং তাদের কবরের পাশে যাওয়ার ব্যাপারেও মুসলিমগণকে নিষেধ করে দেয়া হল। অধিকন্তু, ষড়যন্ত্র ও দূরভিসন্ধির বশবর্তী হয়ে মসজিদ নামের যে ক্ষুদ্র কুটিরটি তৈরি করেছিল তা ধ্বংস করে দেয়ার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হল। এ সময় তাদের সম্পর্কে এমন এমন সব আয়াত অবতীর্ণ হতে থাকল যার মাধ্যমে তাদের কার্যকলাপ উলঙ্গ ভাবে জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়ে পড়ল। তাদের শঠতা ও দুরভিসন্ধির ব্যাপারে সন্দেহের আর কোন অবকাশই রইল না। এ যেন মদীনাবাসীদের জন্য উল্লেখিত আযাতসমূহ ছিল ঐ মুনাফিক্বদের চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে অঙ্গুলি সংকেত।

এ যুদ্ধের ইতিবাচক প্রভাবসমূহের মধ্যে এ কথাটা সুস্পষ্টভাবে বলা যায় যে, মক্কা বিজয়ের পরে এমন কি পূর্বে যদিও আরবের প্রতিনিধিগণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খিদমতে আসতে আরম্ভ করেছিল কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাবুক যুদ্ধের পরই যথোচিতভাবে শুরু হয়েছিল।[1]

[1] উল্লেখিত যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ নিম্নোক্ত উৎস হতে সংঘৃহীত হয়েছে, ইবনু হিশাম ২য় খন্ড ৫১৫-৫৩৭ পৃঃ, যাদুল মা’আদ ৩য় খন্ড, ২-১৩ পৃঃ, সহীহুল বুখারী ২য় খন্ড ৬৩৩-৬৩৭ ও ১ম খন্ড ২৫২-৪১৪ পৃ: অন্যান্য সহীহুল মুসলিম নাবাবী সহ ২য় খন্ড ২৪৬ পৃঃ, ফাতহুল বারী ৮ম খন্ড ১১০-১২৬ পৃঃ, শাইখ আব্দুল্লাহ রচিত মুখতাসারুস সীরাহ ৩৯১-৪০৭ পৃঃ।
এ যুদ্ধ সম্পর্কে কোরবানের আয়াত নাযিল (نُزُوْلُ الْقُرْآنِ حَوْلَ مَوْضُوْعِ الْغَزْوَةِ):

উল্লেখিত যুদ্ধের পরিস্থিতি সম্পর্কে সূরাহ ‘তাওবায়’ অনেক আয়াত অবতীর্ণ হয়, কিছু যাত্রার পূর্বে, কিছু যাত্রার পরে, কিছু কিছু ভ্রমণ কালে এবং কিছু মদীনা প্রত্যাবর্তনের পর। উল্লেখিত আয়াতসমূহে মুনাফিক্বদের চক্রান্তের যবনিকা উন্মোচন, যুদ্ধের অবস্থা ও মুখলেস মুজাহিদদের মর্যাদা সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। তাছাড়া, সিদ্দীকীন মু’মিনদের মধ্যে যাঁরা যুদ্ধে শরীক হয়েছিলেন এবং যাঁরা হন নি তাদের তওবা কবুল ইত্যাদি ব্যাপারে আলোচনা করা হয়েছে।

এ সনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী (بَعْضُ الْوَقَائِعِ الْمُهِمَّةِ فِيْ هٰذِهِ السَّنَةِ):

এ সনে (৯ম হিজরী) যে সকল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয় তা হচ্ছে যথাক্রমে নিম্নরূপ:

১. তাবুক হতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রত্যাবর্তনের পর উওয়াইমের আজলানী ও তার স্ত্রীর মধ্যে লি’আন হয়। (স্বামী যদি স্ত্রীর প্রতি ব্যভিচারের অপবাদ দেয় আর তার সাক্ষী না থাকে তাহলে যে পদ্ধতির মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটানো হয় তাকে লি’আন বলা হয়।)

২. গামিদিয়া মহিলা যে নাবী কারীম (ﷺ)-এর খিদমতে হাজির হয়ে ব্যভিচারের স্বীকৃতি দিয়েছিল তাকে প্রস্তরাঘাত করে মেরে ফেলা হয়েছিল। এ মহিলার সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর যখন শিশুটি দুগ্ধ পান থেকে বিরত হয়েছিল তখন তাকে প্রস্তরাঘাত করা হয়েছিল।

৩. সম্রাট আসাহামা নাজ্জাশী মৃত্যুবরণ করেন এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর গায়েবানা জানাযা আদায় করেন।

৪. নাবী কারীম (ﷺ)-এর কন্যা উম্মু কুলসুম মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে নাবী কারীম (ﷺ) গভীরভাবে শোকাভিভূত হন। তিনি উসমানকে বলেন যে, ‏(‏لَوْ كَانَتْ عِنْدِيْ ثَالِثْةً لَزَوَّجْتُكَهَا‏) ‘আমার তৃতীয় কন্যা থাকলে তার বিবাহও তোমার সঙ্গে দিতাম’।

৫. রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর তাবূক হতে প্রত্যাবর্তনের পর মুনাফিক্ব নেতা আব্দুল্লাহ বিন উবাই মৃত্যুবরণ করে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং উমার (রাঃ)-এর বাধা দান সত্ত্বেও তার সালাতে জানাযা আদায় করেন। পরে কুরআন শরীফের আয়াত অবতীর্ণ হয়ে তাতে উমার (রাঃ)-এর মত সমর্থন করে মুনাফিক্বদের জানাযা আদায় করতে নিষেধ করা হয়।

আবূ বাকর (রাঃ)-এর হজ্জ পালন (حَجُّ أَبِيْ بَكْرٍ ):

নবম হিজরীর হজ্জ (আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর নেতৃত্বে) এ সালের (৯ম হিজরী) যুল ক্বাদাহ কিংবা যুল হিজ্জাহ মাসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মানাসিকে হজ্জ (হজ্জের বিধি বিধান) কায়েম করার উদ্দেশ্যে আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)-কে আমিরুল হজ্জ (হজ্জযাত্রী দলের নেতা) হিসেবে প্রেরণ করেন। এরপর সূরাহ বারাআতের (তাওবার) প্রথমাংশ অবতীর্ণ হয় যাতে মুশরিকদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিনামা সমতার ভিত্তিতে শেষ করে দেয়ার নির্দেশ প্রদান করা হয়। এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর তাঁর পক্ষ থেকে এ সম্পর্কে ঘোষণা প্রদানের জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আলী (রাঃ)-কে প্রেরণ করেন। যেহেতু রক্ত এবং সম্পদ সংশ্লিষ্ট অঙ্গীকার বা চুক্তিনামার প্রশ্নে এটাই ছিল আরবের নিয়ম, সেহেতু এমনটি করতে হয় (সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজেই ঘোষণা করবে কিংবা পরিবারের কোন সদস্যের মাধ্যমে তা করানো হবে। পরিবার বহির্ভূত কোন ব্যক্তির মাধ্যমে প্রদত্ত ঘোষণা স্বীকৃত হতো না।) আবূ বাকর (রাঃ)-এর সঙ্গে আলী (রাঃ)-এর সাক্ষাত হয় আরয অথবা জাজনান নামক উপত্যকায়। আবূ বাকর জিজ্ঞেস করলেন নির্দেশদাতা, না নির্দেশ প্রাপ্ত? আলী (রাঃ) বললেন, না, বরং নির্দেশ প্রাপ্ত।

অতঃপর দু’ জনই সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। আবূ বাকর (রাঃ) সকল লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে হজ্জ পালন করেন। ১০ই যুল হিজ্জাহ কুরবানী দিবসে আলী বিন আবূ ত্বালিব (রাঃ) জামরার (কংকর নিক্ষেপের স্থান) নিকট দাঁড়িয়ে সমবেত জনতার মাঝে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নির্দেশিত বিষয়ে ঘোষণা প্রদান করেন, অর্থাৎ অঙ্গীকারকারীগণের সকল অঙ্গীকারের বিলুপ্তি ঘোষণা প্রদান করেন এবং এ সকল বিষয় চূড়ান্ত করার জন্য চার মাস মেয়াদের কথা বলা হয়। যাদের সঙ্গে কোন চুক্তি ছিল না তাদেরকেও চার মাসের সময় দেয়া হয়। তবে যে মুশরিকগণ মুসলিমগণের সঙ্গে অঙ্গীকার পালনে কোন প্রকার ত্রুটি করে নি, কিংবা মুসলিমগণের বিরুদ্ধে অন্য কাউকেই সাহায্য প্রদান করে নি, তাদের অঙ্গীকার নামা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত বলবত রাখা হয়।

আবূ বাকর (রাঃ) একদল সাহাবায়ে কেরামের মাধ্যমে ঘোষণা প্রদান করেন যে, আগামীতে কোন মুশরিক খানায়ে কা‘বাহর হজ্জ করতে পারবে না এবং কোন উলঙ্গ ব্যক্তি কা‘বাহ ঘর তাওয়াফ করতে পারবে না।

এ ঘোষণা ছিল মূর্তিপূজার জন্য শেষ অশনি সংকেত অর্থাৎ এর পর থেকে মূর্তি পূজার আর কোন সুযোগই রইল না।[1]

[1] এ হজ্জের বিস্তারিত বিবরণের জন্য দ্রষ্টব্য: সহীহুল বুখারী ১ম খন্ড ২২০ ও ৪৫১ পৃঃ, ২য় খন্ড ৬২৬ ও ৬৭১ পৃঃ. যাদুল মা‘আদ ৩য় খন্ড ২৫ ও ২৬ পৃঃ, ইবনু হিশাম ২য় খন্ড ৫৪৩-৫৪৬ পৃঃ, এবং সূরাহ বারাআতের প্রথমাংশের তফসীর।
যুদ্ধ পরিক্রমা (نَظْرَةٌ عَلَى الْغَزَوَاتِ):

রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পরিচালনায় সংঘটিত বিভিন্ন যুদ্ধ, যুদ্ধাভিযান ও সৈনিক মহোদ্যম সম্পর্কে সঠিকভাবে অবহিত হওয়ার পর যুদ্ধের পটভূমি, পরিবেশ, পরিচালনা, নিকট ও সুদূর-প্রসারী প্রভাব প্রতিক্রিয়া এবং ফলাফল সম্পর্কে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে যিনি বিচার বিশ্লেষণ করবেন তাঁকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে নাবী কারীম (ﷺ) ছিলেন সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ সমর বিশারদ এবং সমর নায়ক। শুধু তাই নয়, তাঁর সমরাদর্শও ছিল সকল যুগের সকল সমর নায়কের অনুসরণ ও অনুকরণযোগ্য সর্বোত্তম আদর্শ। তাঁর যুদ্ধ সম্পর্কিত উপলব্ধি ও অনুধাবন ছিল সঠিক ও সময়োপযোগী, অর্ন্তদৃষ্টি ছিল অত্যন্ত গভীর এবং সিদ্ধান্ত ছিল সুতীক্ষ্ণ প্রজ্ঞাপ্রসূত। রিসালাত ও নবুওয়াতের বৈশিষ্ট্যে তিনি ছিলেন রাসূলগণের সরদার (সাইয়্যিদুল মুরসালীন) এবং ছিলেন নাবীকুল শিরোমণি (আ’যামুল আমবিয়া)। সৈন্য পরিচালনের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অতুলনীয় এক ব্যক্তিত্ব এবং একক গুণের অধিকারী। যখনই কোন যুদ্ধের জন্য তিনি প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন তখই দেখা গেছে যে, যুদ্ধের স্থান নির্বাচন, সেনাবাহিনীর বিন্যাস ব্যবস্থা, সমর কৌশল, সমরাস্ত্রের ব্যবহার বিধি , আক্রমণ, পশ্চাদপসরণ ইত্যাদি সর্ব ব্যাপারে তিনি সাহসিকতা, সতর্কতা ও দূরদর্শিতার চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছেন। তাঁর সমর পরিকল্পনায় কোন ত্রুটি হয় নি এবং এ কারণেই মুসলিম বাহিনীকে কখনই কোন যুদ্ধে পরাজয় বরণ করতে হয় নি।

অবশ্য উহুদ এবং হুনাইন যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীকে সাময়িকভাবে কিছুটা বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। কিন্তু সমর পরিকল্পনা কিংবা সমর কৌশলের ত্রুটি কিংবা ঘাটতির কারণে এ বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয় নি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)’র নির্দেশিত কৌশল নিষ্ঠার সঙ্গে অবলম্বন করলে এ বিপর্যয়ের কোন প্রশ্নই আসত না। এ বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছিল কিছু সংখ্যক সৈন্যের ভুল ধারণা এবং দুর্বল মানসিকতা থেকে। উহুদ যুদ্ধে যে ইউনিটকে গিরিপথে পাহারার দায়িত্বে নিযুক্ত রাখা হয়েছিল তাঁদের ভুল বুঝাবুঝির কারণেই সেদিন কিছুটা বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছিল। হুনাইন যুদ্ধের দিন কিছুক্ষণের জন্য বিপর্যয়ে সৃষ্টি হয়েছিল কিছু সংখ্যক সৈন্যের কিছুটা মানসিক দুর্বলতা এবং শত্রুপক্ষের আকস্মিক আক্রমণে হতচকিত হয়ে পড়ার কারণে।

উল্লেখিত দুই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর বিপর্যয়ের মুখে নাবী কারীম (ﷺ) যে অতুলনীয় সাহসিকতা ও কর্মদক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন মানব জাতির যুদ্ধের ইতিহাসে একমাত্র তিনিই ছিলেন তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। যুদ্ধের ভয়াবহ বিভীষিকার মুখেও পর্বতের ন্যায় অটল অচল থাকার কারণেই বিপর্যস্ত প্রায় মুসলিম বাহিনী ছিনিয়ে এনেছিলেন বিজয়ের গৌরব।

ইতোপূর্বে যে আলোচনা করা হল তা ছিল যুদ্ধ সম্পর্কিত। কাজেই, যুদ্ধের দৃষ্টিকোণ থেকে সে সব বিষয় আলোচিত হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ ছাড়াও এমন কতগুলো সমস্যা যেগুলো ছিল সমধিক গুরুত্বপূর্ণ। নিরলস প্রচেষ্টার দ্বারা সে সকল সমস্যার সমাধান করে নাবী কারীম (ﷺ) তৎকালীন আরব সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করেন, অশান্তি ও অনিষ্টতার অগ্নি নির্বাপিত করেন, মূর্তিপূজার মূলোৎপাটনের মাধ্যমে একটি পরিচ্ছন্ন ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করেন এবং আপোষ ও সন্ধিচুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে মুশরিকদের বৈরিতার অবসান ঘটান। তাছাড়া সে সকল সংগ্রামের মাধ্যমে তিনি প্রকৃত মুসলিম ও মুনাফিক্বদের সম্পর্কে অবহিত হন এবং তাদের ষড়যস্ত্র এবং ক্ষতিকর কার্যকলাপ থেকে মুসলিমগণকে মুক্ত রাখতে সক্ষম হন।

অধিকন্তু, বিভিন্ন যুদ্ধে শত্রুদের সঙ্গে মুখোমুখী মোকাবেলায় লিপ্ত হয়ে বাস্তব দৃষ্টান্ত সৃষ্টির মাধ্যমে এত যুদ্ধাভিজ্ঞ ও শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে মুসলিম বাহিনীকে তিনি তৈরি করে দিয়েছিলেন যে, পরবর্তী কালে এ বাহিনী ইরাক ও সিরিয়ার ময়দানে বিশাল বিশাল পারস্য ও রোমক বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে তাদের শোচনীয় ভাবে পরাস্ত করার পর তাদের বাড়িঘর, সহায় সম্পদ, বাগ-বাগিচা, ঝর্ণা ও ক্ষেতখামার থেকে বিতাড়িত করেন এবং নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেন।

অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সে সকল যুদ্ধের মাধ্যমে হিজরতের কারণে ছিন্নমূল মুসলিমগণের আবাসভূমি, চাষাবাদযোগ্য ভূমি ও কৃষি ব্যবস্থা এবং অন্যান্য বৃত্তিমূলক কর্মকান্ডের মাধ্যমে আয় উপার্জনহীন শরণার্থীদের জন্য উত্তম পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেন। তাছাড়া যুদ্ধাস্ত্র এবং যুদ্ধের উপযোগী সরঞ্জামামি, ঘোড়া এবং যুদ্ধের ন্যায় নির্বাহের জন্য অর্থ সম্পদ ইত্যাদিও সংগ্রহ করে দেন, অথচ এ সব করতে গিয়ে কখনই তিনি বিধিবহির্ভূত কোন ব্যবস্থা, অন্যায় কিংবা উৎপীড়নের পথ অবলম্বন করেননি।

যুদ্ধের লক্ষ্য উদ্দেশ্য এবং নীতির ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এক যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধন করেন। জাহলিয়াত যুগে যুদ্ধের রূপ ছিল লুটতরাজ, নির্বিচার হত্যা, অত্যাচার ও উৎপীড়ন, ধর্ষণ, নির্যাতন, কায়ক্লেশ ও কঠোরতা অবলম্বন এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি। কিন্তু ইসলাম জাহেলী যুগের সে যুদ্ধ নামের দানাবীয় কান্ডকারখানাকে পরিবর্তন ও সংস্কার সাধনের মাধ্যমে পবিত্র জিহাদে রূপান্তরিত করেন। জিহাদ হচ্ছে অন্যায় ও অসত্যের মূলোৎপাটন করে ন্যায় সঙ্গত ও যুক্তিসঙ্গত উপায়ে সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম। জিহাদ বা সত্য প্রতিষ্ঠার এ সংগ্রামে অযৌক্তিক বাড়াবাড়ি, অন্যায় উৎপীড়ন, ধ্বংস, ধর্ষণ, নির্যাতন, লুণ্ঠন, অপহরণ, অহেতুক হত্যা ইত্যাদি কোন কিছুরই সামান্যতম অবকাশও ছিল না। ইসলামে যুদ্ধ সংক্রান্ত যে কোন সিদ্ধান্তের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোরভাবে আল্লাহ প্রদত্ত বিধি-বিধান অনুসরণ করা হত।

শত্রু পক্ষের উপর আক্রমণ পরিচালনা, সাক্ষাত সমরে যুদ্ধ পরিচালনা, যুদ্ধ বন্দী, যুদ্ধোত্তর ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিভিন্ন ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে নিয়ম নীতি অনুসরণ করেছিলেন সর্বযুগের সমর বিশারদগণ তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। ইসলামে যুদ্ধের উদ্দেশ্য ভূমি কিংবা সম্পদ দখল, সাম্রাজ্য বিস্তার কিংবা আধিপত্যের সম্পসারণ নয়, নির্যাতিত, নিপীড়িত ও অবহেলিত মানুষকে সত্যের পথে আনয়ন, ন্যায় ও কল্যাণ ভিত্তিক সমাজের সদস্য হিসেবে সম্মানজনক জীবন যাপন, সকল প্রকার ভূয়া আভিজাত্যের বিলোপ সাধনের মাধ্যমে অভিন্ন এক মানবত্ববোধের উন্মেষ ও লালন। অশান্তি, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার স্থলে মানবত্বের পরিপূর্ণ বিকাশ সাধন এবং নিরাপদ ও শান্তি স্বস্তিপূর্ণ জীবন যাপনের উদ্দেশ্যে আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠাই ছিল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুদ্ধ বিগ্রহের প্রধান উদ্দেশ্য।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

‏(‏وَالْمُسْتَضْعَفِيْنَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاء وَالْوِلْدَانِ الَّذِيْنَ يَقُوْلُوْنَ رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْ هٰذِهِ الْقَرْيَةِ الظَّالِمِ أَهْلُهَا وَاجْعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ وَلِيًّا وَاجْعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ نَصِيْرًا‏)‏ ‏[‏النساء‏:‏75‏]

‘এবং অসহায় নারী-পুরুষ আর শিশুদের জন্য, যারা দু‘আ করছে- ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এ যালিম অধ্যূষিত জনপথ হতে মুক্তি দাও, তোমার পক্ষ হতে কাউকেও আমাদের বন্ধু বানিয়ে দাও এবং তোমার পক্ষ হতে কাউকেও আমাদের সাহায্যকারী করে দাও।’ [আন-নিসা (৪) : ৭৫]

যুদ্ধ বিগ্রহের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে সকল মানবোচিত আইন কানুন প্রণয়ন ও প্রবর্তন করেছিলেন সেনাবাহিনী প্রধান কিংবা সাধারণ সৈনিকগণ যাতে কোনক্রমেই তার অপপ্রয়োগ না করেন কিংবা এড়িয়ে না যান তার প্রতি তিনি সর্বদাই সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন।

সোলায়মান বিন বোরাইদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন কোন ব্যক্তিকে কোন মুসলিম সেনাবাহিনীর অধিনায়ক কিংবা অভিযাত্রী দলের নেতা নির্বাচিত করতেন তখন গন্তব্যস্থলে যাত্রার প্রাক্কালে তাঁকে তাঁর নিজের ব্যাপারে আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করতে এবং তাঁর সঙ্গী সাথীদের ভাল মন্দের ব্যাপারে বিশেষভাবে উপদেশ প্রদান করতেন। অতঃপর বলতেন,

‏(‏اُغْزُوْا بِسْمِ اللهِ، فِيْ سَبِيْلِ اللهِ، قَاتِلُوْا مَنْ كَفَرَ بِاللهِ، اُغْزُوْا، فَلَا تَغُلُّوْا، وَلَاتَغْدِرُوْا، وَلَا تَمْثِلُوْا، وَلَا تَقْتُلُوْا وَلِيْداً‏.‏‏.‏‏.‏‏)

‘আল্লাহর নির্দেশিত পথে আল্লাহর নামে যুদ্ধ করবে, যারা আল্লাহর কুফরী করেছে তাদের সঙ্গে যু্দ্ধ করবে। ন্যায় সঙ্গতভাবে যুদ্ধ করবে, বিশ্বাসঘাতকতা করবে না, অঙ্গীকার ভঙ্গ করবে না, শত্রুপক্ষের কোন ব্যক্তির নাক, কান ইত্যাদি কর্তন করবে না, বাড়াবাড়ি করবে না, কোন শিশুকে হত্যা করবে না।’ - শেষপর্যন্ত।

অনুরূপভাবে নাবী কারীম (ﷺ) সহজভাবে কাজকর্ম সম্পাদন করার জন্য নির্দেশ প্রদান করতেন এবং বলতেন, ‏(‏يَسِّرُوْا وَلَا تُعَسِّرُوْا، وَسَكِّنُوْا وَلَا تُنَفِّرُوْا‏) ‘সহজভাবে কাজ করো, কঠোরতা অবলম্বন করো না। মানুষকে শান্তি দাও, ঘৃণা করো না[1]

যখন তিনি আক্রমণের উদ্দেশ্যে কোন বস্তির নিকট রাত্রে গমন করতেন তখন সকাল হওয়ার পূর্বে কখনই তিনি আক্রমণ করতেন না। কোন শত্রুকে জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করার ব্যাপারে তিনি কঠোরভাবে নিষেধ করতেন। কোন ব্যক্তিকে হাত, পা বাঁধা অবস্থায় হত্যা করতে এবং মহিলাদের মারধর এবং হত্যা করতেও নিষেধ করতেন। লুণ্ঠন কার্যকে তিনি কঠোর ভাবে নিরুৎসাহিত করে বলতেন, ‏(‏إِنَّ النُّهْبٰى لَيْسَتْ بِأَحَلٍّ مِنْ الْمَيْتَةِ‏)‏ ‘লুণ্ঠন-লব্ধ মাল মুর্দার চাইতে অধিক পবিত্র নয়।’ তাছাড়া ক্ষেতখামার নষ্ট করা, পশু হত্যা এবং অহেতুক গাছপালা কেটে ফেলতে তিনি নিষেধ করতেন। অবশ্য যুদ্ধের বিশেষ প্রয়োজনে গাছপালা কেটে ফেলার অনুমতি যে তিনি দিতেন না তা নয়, কিন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটিও না।

মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালেও নাবী কারীম (ﷺ) নির্দেশ প্রদান করেছিলেন,‏(‏لَا تُجَهِّزَنَّ عَلٰى جَرِيْحٍ، وَلَا تَتَّبِعَنَّ مُدْبِراً، وَلَا تَقْتُلَنَّ أَسِيْراً‏) আহত ব্যক্তিদের আক্রমণ করবে না, কোন পলাতকের পিছু ধাওয়া করবে না, এবং কোন বন্দীকে হত্যা করবে না, কোন কওম কিংবা রাষ্ট্রের দূতকে হত্যা করবে না।’

অঙ্গীকারাবদ্ধ অমুসলিম দেশের নাগরিকদেরও হত্যা করতে তিনি কঠোরভাবে নিষেধ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‏(‏مَنْ قَتَلَ مُعَاهِداً لَمْ يُرِحْ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ، وَإِنَّ رِيْحَهَا لَتُوْجَدُ مِنْ مَسِيْرَةِ أَرْبَعِيْنَ عَاماً‏) ‘কোন অঙ্গীকারাবদ্ধ ব্যক্তিকে যে হত্যা করবে সে জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না। অথচ তার সুগন্ধ চল্লিশ বছরেরও অধিক পথের দূরত্বে পাওয়া যাবে।’

উল্লেখিত বিষয়াদির বাইরে আরও অনেক উন্নত মানের নিয়ম-কানুন তিনি প্রণয়ন ও প্রবর্তন করেছিলেন যার ফলে তাঁর সমর কার্যক্রম জাহেলিয়াত যুগের পৈশাচিকতা ও অপবিত্রতার কলুষতা থেকে মুক্ত হয়ে পবিত্র জিহাদের রূপ লাভ করে।

[1] সহীহুল মুসলিম ২য় খন্ড ৮২-৮৩ পৃৃঃ।
দেখানো হচ্ছেঃ ৩৮১ থেকে ৩৯০ পর্যন্ত, সর্বমোট ৪৩৪ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে পাতা নাম্বারঃ « আগের পাতা 1 2 3 4 · · · 36 37 38 39 40 41 42 43 44 পরের পাতা »